Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Shri Bijaykrishna
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বিজয়কৃষ্ণ
আশুতোষ লাইব্রেরী
কা ও কলকাতা
No text on this page.
তিন আনা সংস্করণের জীবনীমালা
তৃতীয়
শ্রীবিজয়কৃষ্ণ
শ্ৰীযােগেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রণীত।
প্রকাশক
মৃন্দাবন ধর এণ্ড সন্স,
আশুতােষ লাইব্রেরী
৩৯১ কলেজ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
১৩২৯
প্রথম সহ )
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
ঢাকা, আশুতােষ প্রেসে
শ্ৰীরেবতীমােহন দাসদ্বারা মুদ্রিত
শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ ( ১ ) চারি শত বৎসর আগের কথা,-নবদ্বীপে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেবের আবির্ভাব হইয়াছিল,—তখন ভক্তি ও প্রেমের মধুর বন্যায় সত্য সত্যই শান্তিপুর ডুবু ডুবু, নদে ভেসে গিয়াছিল। সে সময়ে শ্ৰীমন্ মহাপ্রভুর পার্ষদবৃন্দের মধ্যে শান্তিপুরের শ্রীমদদ্বৈতাচাৰ্য প্রভু ছিলেন একজন প্রধান। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে তিনি মহাবিষ্ণুর অবতার বলিয়া প্রসিদ্ধ। এই অদ্বৈত প্রভুর বংশে বর্তমান যুগে শ্রীমৎ আনন্দকিশাের গােস্বামীর জন্ম হয়। বিজয়কৃষ্ণ এই আনন্দ- কিশোরের কনিষ্ঠ পুত্র। পৃথিবীতে দেখা যায় যে—ধৰ্ম্মজগতে কিংবা কৰ্ম্মজগতে যে সকল মহাপুরুষ অলৌকিক কীর্তিমান হইয়া গিয়াছেন,
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ *
তঁাহাদের সকলের পিতামাতাই অসাধারণ গুণবিশিষ্ট ছিলেন।
গােস্বামী প্রভুর পিতামাতার পক্ষেও একথা প্রযােজ্য।
আনন্দকিশাের বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া দেখিলেন যে, তাহাদের
পূর্বপুরুষ প্রবর্তিত ধৰ্ম্ম লুপ্তপ্রায় হইয়াছে। ধৰ্ম্মের
এইরূপ পতন দেখিয়া তাহার প্রাণ কাঁদিত। কেমন করিয়া
লুপ্তপ্রায় ধৰ্ম্মের পুনরুদ্ধার সাধন হইবে, কিসে জীবের দুঃখ
দূর হইবে, এই ভাবিয়া তিনি সর্বদা বিষন্ন থাকিতেন। এজন্য
তিনি কুলদেবতা শ্যামসুন্দরের শ্রীচরণে আপনার মনের
কথা, প্রাণের ব্যথা নিবেদন করিয়া শান্তি প্রাপ্ত হইতেন।
আনন্দকিশাের একজন ত্যাগী মহাপুরুষ ছিলেন। শিষ্য
সেবকের নিকট এক পয়সাও যা! করিতেন না। ইচ্ছ।
করিয়া যে যাহা প্রদান করিত, তাহাই সাদরে গ্রহণ করিতেন।
তিনি ভবিষ্যতের জন্য এক পয়সা ও সঞ্চয় করিতেন না।
দীন, দুঃখী, অন্ধ, আতুর প্রভৃতি যে কেহ তাহার কাছে
প্রার্থীরূপে উপস্থিত হইত, অমনি তাহাকে যথাসাধ্য দান
করিতেন। তাহার নিকট হইতে কেহ কখনও বিমুখ হইয়া
যাইত না। নিরাশ্রয় দরিদ্র শিষ্যদিগকেও তিনি যথাসাধ্য
সাহায্য করিতে ত্রুটি করিতেন না। সেবা বিষয়ে তিনি
এতদূর নিষ্ঠাবান্ ছিলেন যে, ঠাকুরের ভােগ রন্ধন করিবার
কাষ্ঠাদি পৰ্য্যন্ত গঙ্গাজলে ধৌত করিয়া শুকাইয়া লইতেন।
এইজন্য লােকে তাহাকে “লাকড়ী ধােয়া” গোঁসাই বলিত।
[ ২
t
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
ধৰ্ম্মের জন্য তাহার প্রাণের এমন ব্যাকুলতা ছিল যে,
তিনি একবার তঁাহার নিত্যপূজার শালগ্রাম শিলা গলদেশে
বন্ধনপূর্বক পদব্রজে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব দর্শনে যাত্রা করিলেন,
এবং শান্তিপুর হইতে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিতে করিতে প্রায়
এক বৎসরে পুরুষােত্তমক্ষেত্রে উপনীত হইলেন। এইরূপ
ভয়ানক ক্লেশ করিয়া তিনি শ্রীক্ষেত্রে উপনীত হইয়া
শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের দর্শনলাভে অপার আনন্দ লাভ করেন।
এ সময়ে একদিন রাত্রিতে তিনি স্বপ্ন দেখিলেন যে, জগন্নাথ
দেব তাহাকে বলিতেছেন—“তুই বাড়ী যা, আমরা দুইজনে
তাের পুত্ররূপে উৎপন্ন হইব, এবং তাের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ
হইবে।” এই বর লাভ করিয়াই আনন্দকিশাের শান্তিপুরে
ফিরিয়া আসিলেন।
আনন্দকিশাের গােস্বামী মহাশয় ইতঃপূর্বে দুইবার
বিপত্নীক হন। পত্নীদ্বয়ের কোন সন্তানাদি হয় নাই।
অতঃপর প্রায় পঞ্চাশ বৎসর বয়সে নদীয়া জেলার অন্তর্গত
শিকারপুরের
নিকটবর্তী দহফুল। গ্রামনিবাসী পরম ভাগবত
গৌরীপ্রসাদ জোদ্দার মহাশয়ের কন্যা শ্ৰীমতী স্বর্ণময়ী
দেবীকে বিবাহ করেন। ইহার গর্ভে আনন্দকিশাের
গগাস্বামী মহাশয় দুইটী পুত্রসন্তান লাভ করেন। প্রথমটীর
নাম ব্ৰজগােপাল এবং দ্বিতীয়টির নাম বিজয়কৃষ্ণ।
বিজয়কৃষ্ণের জননী স্বর্ণময়ী দেবী, অতি গুণবতী এবং
[ ৩ ]
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ ৫ দয়াবর্ত! রমণী ছিলেন। তাঁহার দয়ার সম্বন্ধে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। তাঁহার নিকট কেহ কোন বিষয়ের অভাব জ্ঞাপন করিলে, সর্বস্ব দান করিয়া সে অভাব মােচন করিতে হইলেও তিনি তাহা করিতেন। ক্ষুধার্তকে অন্ন, রােগীকে ঔষধ পথ্য, শােকার্তকে সান্ত্বনা দান-- তাহার নিত্য নৈমিত্তিক কাৰ্য্যের মধ্যে ছিল। প্রত্যহ চারি পাঁচজনের উপযুক্ত অতিরিক্ত অন্নব্যঞ্জন রন্ধনপূর্বক গরীব দুঃখীকে অনুসন্ধান করিয়া আহার করাইতেন, পরে নিজে আহার করিতেন। তিনি বলিতেন—“যে একাকী আপনার জন্য রান্না করে, সেত শেয়াল কুকুরের মত। পাঁচ জনের কম কিছুতেই রান্না করা উচিত নয়।” কৃপণদিগের কথা উল্লেখ করিয়া বলিতেন- “আহ! উহারা বড়ই দয়ার পাত্র, নিজেদের থাকিতে খাইতে পায় না।” এজন্য তিনি কৃপণদিগকে অধিকতর যত্ন সহকারে খাওয়াইতেন। দেবী স্বর্ণময়ীর নিকট আপন পর বলিয়া কোনও প্রভেদ ছিল না। গােস্বামী মহাশয় নিজে তাহার জননীর সমদর্শিতার কথা উল্লেখ করিয়া বলিয়াছিলেন—“তিনি দাসী- পুত্রকে আমার সহিত তুল্যৰূপে ভালবাসিতেন। একখানা থালা, ঘটি এবং গ্লাসও তাহাকে নির্দেশ করিয়া দিয়া- ছিলেন।” একদিন একজন কাঠুরিয়ার সঙ্গে মজুরীর পয়সা লইয়া গােস্বামী মহাশয়ের কথাবার্তা হইতেছিল। মজুরের [ ৪ ]
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ &
দাবী অপেক্ষা গােস্বামী মহাশয় তাহাকে কিছু কম দিতে
চাহিয়াছিলেন। তাহা দেখিয়া মজুর বলিল—“দাদা গোঁসাই,
আপনার সঙ্গে দর ঠিক হইবে না, আপনি মা গোসাইকে
ডাকুন।” গােস্বামী মহাশয় মাতাঠাকুরাণীকে ডাকিলে,
তিনি সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া বলিলেন—“গরীব লােকের
দুই চারি আনা মারিয়া তুই কি বড়লোক হবি রে? ইহাদের
সহিত গােল করি না। ইহারা যা চায়, তাই দে। ইহা-
দিগকে বরং কিছু বেশীই দিতে হয়, নতুবা ইহাদের স্ত্রীপুত্রের
কি খাইয়া বাঁচিবে ?” এইরূপ মহীয়সী জননীর গর্ভে বঙ্গাব্দ
১২৪৮ সন, ১৯শে শ্রাবণ, সােমবার ঝুলন পূর্ণিমায় মহাত্মা
বিজয়কৃষ্ণ জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
( ২ )
বিজয়কৃষ্ণের বয়স যখন তিন বৎসর, তখন তিনি পিতৃহীন
হন। স্বর্ণময়ী দেবী শিবাড়ী ভ্রমণ করিয়া যাহা পাইতেন,
তদ্বারা কোনরূপে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতেন। কখনও
বা পিতৃহীন বালক দুইটীকে লইয়া পিত্রালয় শিকারপুরে,
কখনও বা শান্তিপুরে বাস করিতেন। এইভাবে দিন
চলিত।
অতি শৈশব হইতেই বিজয়কৃষ্ণের হৃদয়ে ধৰ্ম্মের ভাব
বিকশিত হইয়াছিল। তিনি মাতা, পিতা প্রভৃতি আত্মীয়-
[ ৫ ]
• শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ & গণের অনুকরণে পূজা-অর্চনা, সন্ধ্যা-বন্দনা, ঠাকুর-নমস্কার, তুলসীবৃক্ষে জলদান ইত্যাদি কৰ্ম্ম করিতে বড়ই ভালবাসিতেন, এবং আপন মনে নিজের ভাবে ঐ সকল কাৰ্য্যের এমন সুন্দর সুন্দর অনুকরণ করিতেন, যাহাতে সকলেই মুগ্ধ হইয়া যাইত। “বালক বিজয়কৃষ্ণ সময়ে সময়ে স্বীয় কুলদেবতা শ্যামসুন্দরের বিগ্রহকে স্বহস্তে সেবা করিতে অত্যন্ত জেদ করিতেন। কিন্তু তিনি নিতান্ত শিশু ও হনুপবীতী, এজন্য তাহাকে শ্যামসুন্দরের মন্দিরে প্রবেশ করিতে দেওয়া হইত না। ইহাতে তিনি মর্মান্তিক ক্লেশ প্রকাশ করিতেন এবং বাল্যবুদ্ধি বশতঃ ইহার জন্য শ্যামসুন্দরকেই দোষী সাব্যস্ত করিয়া, কখন ও মন্দিরের বাহিরে থাকিয়া, কখনও বা স্বপ্ন- যােগে তাহার সহিত বাদানুবাদ করিতেন। এই সময়ে তঁাহার কথাবার্তা ও হাবভাবে প্রকাশ পাইত, যেন স্বয়ং শ্যামসুন্দরের সহিত তাঁহার বাক্যালাপ ও ভাব-বিনিময় চলিতেছে। “একদিন কার্তিক মাসে জননী স্বর্ণময়ী শ্যামসুন্দরের মঙ্গল আরতি দর্শন করিয়া কিছুক্ষণ পরে প্রভাতে গৃহে আসিয়া দেখেন শয্যায় বিজয় নাই। ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিতে করিতে দেখিলেন যে, বিজয় শ্যামসুন্দরের মন্দিরের রুদ্ধ দ্বার ঠেলাঠেলি করিতেছে ; দ্বার মােচন করিতে না পারিয়া [ ৬ ]
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ +
কখনও দ্বার খুলিবার জন্য শ্যামসুন্দরকে কাকুতি মিনতি
করিতেছে। এইরূপে সমস্ত কৌশল ব্যর্থ হইতে দেখিয়া, প্রভুর
শ্রীবিগ্রহকে বিস্মৃত বালক আরক্ত নয়নে শাসাইতেছে—
“একটু পরে দুয়ার খুলিলে তােমাকে কে রক্ষা করিবে
দেখিব ?” এই বলিয়া দীর্ঘ যষ্টি হস্তে বালক দ্বারের নিকট
অপেক্ষা করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে পূজারী আসিয়া
দ্বার খুলিল । কিন্তু অনুপবীত বালক শ্ৰীমন্দিরে প্রবেশ
লাভ করিতে পারিল না। তখন বালক-রাগে কি অনুরাগে
কে বলিবে-শ্যামসুন্দরকে সম্বােধন করিয়া বলিতে
লাগিল-“আমার ভাটা চুরি করিয়া পলাইয়া আসিলে।
আর আমাকে ঘরে যাইতে দেওয়া হইল না। আচ্ছা, কাল
আবার খেলিতে আসিও ? আমি এর প্রতিশােধ না লইয়া
জল গ্রহণ করিব না।” সেদিন আর বালক কিছুই আহার
করিতে পারিল না। মধ্যরাত্রে জননী দেখিলেন, প্ৰেমাবিষ্ট
বালক শয্যা ত্যাগ করিয়া শ্যামসুন্দরকে সম্বোধন করিয়া
বলিতেছে—“যাই আমার কাছে ঘাট মানিলে, তাই বাঁচিলে ।
নতুবা আজ তােমাকে ভাল করিয়া মজা দেখাইতাম।” আবার
বালক বলিতে লাগিল—“আমি যেন ভাই, তােমার উপর রাগ
করিয়া খাই নাই। তুমিও কেন আজ খাও নাই ? এখন
এস, দুইজনে খাই।” এই বলিয়া বালক আহারে বসিল এবং
আহার শেষে পুনরায় শয়ন করিল। এইরূপ অলৌকিক
[ ৭ ]
• ঐবিজয়কৃষ্ণ &
ঘটনা দেখিতে দেখিতে জননী স্বর্ণময়ী একরূপ অভ্যস্ত হইয়া
গিয়াছিলেন, পূর্বের ন্যায় পরে আর ভীত হইতেন না।
আশ্চৰ্য্য যে, পরদিন বালককে এ সকল কথা জিজ্ঞাসা
করিলে, সে কিছুই বলিতে পারিল না। তবে, সেই রাত্রিতে
পূজারি স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন যে, ঠাকুরের মাধ্যাহিক ভােগ
হয় নাই।
“বিজয়কৃষ্ণের বাল্যজীবনে আরও একটী অতি বিস্ময়-
কর ঘটনা ঘটিয়াছিল। একদিন বৈশাখী পূর্ণিমার রাত্রে
চন্দ্রের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া বালক অনেকক্ষণ বসিয়াছিল।
তৎকালে তাহার কিছুমাত্র বাহ্যজ্ঞান ছিল না। আত্মীয়-
স্বজনের অনেক ডাকাডাকির পর যেন তাহার চমক ভাঙ্গিল।
পরে যখন সকলে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন, তখন
বালক বলিল—“আজ বাবা আমায় চাদের রাজ্যে লইয়া
গিয়াছিলেন। আমাকে তাহার কোলে বসাইয়া কত নদী,
কত পাহাড়, কত সুন্দর সুন্দর ফুল বাগান দেখাইয়া
বলিলেন—“দেখ বাবা, আমার বংশে একজন খুব বড় সাধু,
আর একজন খুব বড় বৈষ্ণব হইবে। তুই কি সেই বড় সাধু
হইতে পারিবি? আমি বলিলাম-“হ। বাবা, তুমি আশীর্বাদ
কর, আমি পারুবাে। তারপর আর তাহাকে দেখিতে
পাইলাম না।”
বালক বিজয়কৃষ্ণ
boru
✉ শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ৫ বাল্যকাল হইতেই বালক বিজয়কৃষ্ণের সাধু সন্ন্যাসীর প্রতি অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল। বিজয়কৃষ্ণ অই অতটুকু বয়সেই সন্ন্যাসী সাজিতে ভালবাসিতেন। কাপড় ছিড়িয়া কৌপীন পরিধান করিতেন । এসময়ে হার মাথায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জটা ছিল, এজন্য সকলে তাহাকে আদর করিয়া ‘জটা গোঁসাই বলিত। বিজয়কৃষ্ণের প্রথম বিদ্যারম্ভ তাহার মাতুলালয় শিকার- পুরের পাঠশালায় ; পরে শান্তিপুরে ভগবান সরকার নামক একজন ধার্মিক পণ্ডিত মহাশয়ের পাঠশালাতে তিনি বিদ্যা- ভ্যাস করিয়াছিলেন। ভগবান সরকার মহাশয় বালক বিজয়- কৃষ্ণের সরলতা, সত্যপ্রিয়তা ও তেজস্বিতা দেখিয়া তাহাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। বিজয়কৃষ্ণও গুরুকে অতিশয় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিতেন। গােস্বামী মহাশয় ভগবান সরকার মহাশয়ের কথা প্রসঙ্গে বলিয়াছিলেন—“গুরু মহাশয় একদিন পাঠশালায় ছাত্রদিগকে ডাকিয়া বলিলেন-“ওরে ছেলেরা, কাল সকালে আসিস্, এক সঙ্গে গঙ্গায় নাইতে যাইব। সেখানে আমি দেহ ত্যাগ করিব।' এসংবাদে শান্তিপুরের স্ত্রী-পুরুষ বালক-বৃদ্ধ সকলে গঙ্গার ঘাটে উপনীত হইলেন। গুরুমহাশয় স্নান করিয়া সকলকে প্রণাম করতঃ গঙ্গাজলে বসিয়া জপ করিতে লাগিলেন। চারিদিকে সংকীৰ্ত্তন হইতে লাগিল। জপ শেষ করিয়া গুরুমহাশয় বলিলেন—ছেলে সব, [ ৯ ]
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
আমি কায়স্থ, তােমরা অনেকে ব্রাহ্মণ, আমি তােমাদিগকে
কত তাড়না করিয়াছি; এখন বাপু সকল, আমার মাথায় পা
দেও, আর সময় নাই, ঐ দেখ আমার রথ আসিতেছে।
ইহা বলিয়া তিনি দণ্ডায়মান হইলেন এবং নাম করিতে
করিতে সজ্ঞানে দেহ ত্যাগ করিলেন ; আশ্চর্যের বিষয় যে,
দেহ টলিয়া পড়িল না। তখন সমস্ত ব্রাহ্মণ শূদ্র ছাত্র মিলিয়া,
যেমন পিতামাতার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া করিতে হয়, তেমনি
তাঁহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন করিলেন।” এমন ধাম্মিক সাধু
মহাপুরুষের নিকট তাহার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হইয়াছিল।
ইংরেজীতে একটা কথা আছে—বাল্যকাল ভবিষ্যৎ
জীবনের দর্পণ-স্বরূপ। যে বালক ভবিষ্যতে যেরূপ হইবে,
বাল্যকালে তাহার চরিত্রানুশীলন করিলেই তাহার পরিচয়
পাওয়া যায়। শৈশবকালেই বিজয়কৃষ্ণ পরের দুঃখ ক্লেশ
সহ্য করিতে পারিতেন না। বিজয়কৃষ্ণের বয়স যখন কেবল
মাত্র ছয় বৎসর, সে সময়ে তিনি একদিন শুনিতে পাইলেন যে,
শান্তিপুরের একজন জমিদার একটী গরীব প্রজার নিকট
হইতে টাকা আদায় করিবার জন্য তাহাকে বাঁশ দলন
দিতেছেন। শুনিবামাত্রই তাহার প্রাণ কঁদিয়া উঠিল, তিনি
দ্রুতপদে উক্ত জমিদার বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া ঘটনা প্রত্যক্ষ
করিবামাত্র উন্মত্তের ন্যায় অত্যাচারী
লাফাইয়া পড়িয়া বলিতে লাগিলেন--“তুমি ডাকাত !
[ ১০ ]
জমিদারের সম্মুখে
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ • দেশে ডাকাত! লােকটি যে ক্লেশে মারা গেল, তােমার লাগছে না ? ভাল চাও ত এখনি ইহাকে ছেড়ে দাও।” জমিদার মহাশয় বালকের এইরূপ সাহস ও মহাপ্রাণতার পরিচয় পাইয়া সেই ব্যক্তিকে তৎক্ষণাৎ ছাড়িয়া দিলেন। বিজয়কৃষ্ণের শৈশবকালের কার্যকলাপ সম্বন্ধে তাহার অধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত বনমালী ভট্টাচাৰ্য মহাশয় বলিয়াছেন— “দরিদ্রের নিরন্ন কুটীরে, রােগীর শয্যা পার্শ্বে করুণাপূর্ণ হৃদয় লইয়া, তাহাদের অন্ন ও পথ্যদানে সাহায্য করিতেন। কলেরা,বসন্ত প্রভৃতির সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ সময়ে যখন গৃহে গৃহে মৰ্ম্মভেদী হাহাকার ও রােগীর আর্তনাদ উঠিত, নিরাশ্রয় নীরব কুটীরদ্বার হইতে যখন আত্মীয় স্বজন- গণ জীবনাশঙ্কার নানা অজুহাত ও প্রতিবন্ধকতা দেখাইয়া ধীরে ধীরে পাশ কাটাইতেন, তখন বিজয় আর স্থির থাকিতে পারিতেন না। সকলের পুনঃ পুনঃ নিষেধ সত্ত্বেও দেবশিশুর ন্যায় সেখানে সদলবলে আবির্ভূত হইয়া, পীড়িতের সেবা ও মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করিয়া দিতেন। “জ্যৈষ্ঠের এক নিশীথ রাত্রিতে ছারপােকা ও মশকের উপদ্রবে শয্যায় শয়ন করিতে করিতে কাতরে নিদ্রাদেবীর আরাধনা করিতেছি, এমন সময়ে ‘আগুণ আগুণ’ এই ভীষণ কোলাহলে তাড়াতাড়ি শয্যা ত্যাগ করিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিলাম, তাঁতিপাড়ায় একখানি চালায় আগুণ [ ১১ ] সু শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ৫ লাগিয়াছে ও বিজয় তাহার দলবল লইয়া সেই প্রবল দাবানল নির্বাপিত করিতে প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে। সেদিন বিজয় যেরূপ ক্ষিপ্রতা সহকারে সে অগ্নি নির্বাপিত করিয়া- ছিল, তাহার তুলনা খুঁজিয়া পাই নাই। তাহারই চেষ্টাতে সেইরাত্রে অনেক দরিদ্র তন্তুবায়ের কুটীর ব্রহ্মার করাল কবল হইতে রক্ষা পাইয়াছিল। “আর একবার বর্ষার সময়ে বাওয়ের (জলাশয়ের ) বাঁধ কাটিয়া দিয়াছিল, আমার মাতা আর্জবস্ত্রে হঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া বলিলেন বাবা! বােনন ! বিজয় যে আজ কি করে একটা ছেলেকে ঘড়-ভাঙ্গা স্রোতের মুখ হইতে বাঁচাইয়াছে, তুই দেখিয়া নয়ন সার্থক করে আয়! ছেলেটি এখনও পুলের উপরে আছে। ছুটিয়া গিয়া দেখিলাম যে স্থানটি লােকে লােকারণ্য হইয়া গিয়াছে। বালকটি ধীরে তখন সকলের চেষ্টা ও যত্নে উঠিয়া বসিয়া ধীরে ধীরে নিশ্বাস ফেলিতেছে, আর নিমজ্জিত বালকের উন্মাদিনী মাতা তাহার পরিজনবর্গ সহ বিজয়ের নিষেধ সত্ত্বেও তাহার অবশ ও শিথিল হস্তপদাদি টিপিয়া দিতেছে।” বাল্যজীবনেই যাহার চরিত্র এত মহৎ, পবিত্র ও পােপ- কার-ব্ৰতে দীক্ষিত হইয়াছিল, উত্তরকালে যে তিনি একজন দেশবিখ্যাত মহাপুরুষরূপে পরিচিত হইবেন, সে বিষয়ে কি কোনও সন্দেহ থাকিতে পারে ? [ ১২ ] • শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ • পাঠশালার পড়া শেষ করিয়া বিজয়কৃষ্ণ আগ্রহ ও অধ্যবসায় সহকারে চতুপাঠিতে ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠ করিয়া অবশেষে বেদান্ত ও দর্শনাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াছি- লেন। বেদান্ত অধ্যয়ন করিতে করিতে তাহার প্রাণে বেদান্ত প্রতিপাদ্য ব্রহ্মজ্ঞান প্রস্ফুটিত হইয়াছিল। এবিষয়ে আচাৰ্য কৃষ্ণগােপাল বলিয়াছেন—“বিজয়ের অদ্ভুত মেধা আমি দেখিয়াছি, সে আমার কাছে দর্শনশাস্ত্র পাঠ করিয়াছিল। প্রথমে কয়েকদিন সঙ্খ্য দর্শন দেখিয়া পরে বদান্ত শাস্ত্র গ্রহণ করিয়াছিল। আমি তাহাকে বেদান্ত পরিভাষা ও বেদান্ত দর্শন পড়াইয়াছিলাম। অল্প অল্প আয়াসেই বালক শাস্ত্রের গূঢ়তত্ত্ব সকল উপলব্ধি করিতে লাগিল-ব্ৰহ্মজ্ঞান তাহার ভিতর দেখিতে লাগিলাম। মুখ মানব-হৃদয়ের দর্পণস্বরূপ। হৃদয়ের ভাব মুখেই প্রতিফলিত হইয়া থাকে। তাহার মুখশ্রীতে অপূৰ্ব ভাব সকল খেলা করিত।” ( ৩ ) ১২৬৬ সনে অষ্টাদশ বৎসর বয়সে বিজয়কৃষ্ণ কলিকাতায় আগমন করিয়া সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হইলেন। এসময়ে তাঁহার সহপাঠি ছিল, তাহার বাল্যসহচর আঘাের- নাথ গুপ্ত। অঘােরনাথ অতিশয় সাধু-প্রকৃতির লােক ছিলেন বলিয়া, সকলে তাহাকে সম্মান করিয়া “সাধু অঘােরনাথ” [ ১৩ ]
* শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
বলিয়া সম্বােধন করিতেন। এই সংস্কৃত কলেজে পড়িবার
সময় বিজয়কৃষ্ণের বিবাহ হয়। তাহার মাতুলালয় শিকারপুর
নিবাসী রামচন্দ্র ভাদুড়ী মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্ৰীমতী
যােগমায়া দেবীর সহিত বিবাহ হয়। বিবাহের সময়
তাহার বয়স অষ্টাদশবর্ষ ও যােগমায়া দেবীর বয়স ছিল ছয়।
সংস্কৃত কলেজে পড়িবার সময় ভঁহার প্রাণে ধৰ্ম্মের
স্রোত প্রবাহিত হইতে আরম্ভ করে । তখন দেশের অবস্থা
অতি ভয়ানক। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার নবীন মােহময়
আদর্শ দেশের সর্বত্র ছাইয়া ফেলিয়াছিল। তখন মদ্যপান,
যথেচ্ছভােজন ছাত্রগণের নিকট সভ্যতার আদি বলিয়া
বিবেচিত হইত। এ সময়ে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারকগণ নানা প্রকার
কৌশল বিস্তার করিয়া শিক্ষিত যুবকগণকে খ্রীষ্টধৰ্ম্মের দিকে
আকর্ষণ করিতেছিলেন। তাঁহাদের বক্তৃতার মোহে শত শত
যুবক ধৰ্ম্ম ও সমাজ পরিত্যাগ করিয়া খ্রীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে-
ছিলেন।
রামময় ও কৃষ্ণময় ভট্টাচাৰ্য নামক গোস্বামী
মহাশয়ের দুইজন বন্ধু ও এসময়ে খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণ করিলেন।
তাহাদের ধর্ম পরিত্যাগ করায় বিজয়কৃষ্ণের প্রাণে প্রচলিত
হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে অনাস্থা জন্মিল। কি করিবেন তাহাই ঠিক
করিতে পারিতেছিলেন না। “এই সময়ে এক দিবস রংপুর
জেলার অন্তর্গত আমলাগাছি নামক গ্রামে গােস্বামী প্রভুর
জনৈক পিতৃশ্যি
[ ১৪ ]
**
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ ,
অনতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ।
এই মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক তাহার পদ পূজা করিতেছিলেন।
বিজয়কৃষ্ণ তাহাতে সহসা চমকিত হইয়া উঠিলেন এবং মনে
মনে ভাবিতে লাগিলেন যে, আমাতে এ সকল ক্ষমতা নাই,
আমি স্বয়ং বি রূপে পরিত্রাণ পাইব তাহার নিশ্চয়তা নাই; দূর
হউক, এরূপ কপটাচরণ করিব না। মনে মনে এইরূপ চিন্তা
করিয়া শিবাড়ী পরিত্যাগ করিয়া আসিলেন এবং স্বাধীন
ভাবে জীবিকা অর্জনের জন্য সঙ্কল্প করিয়া কলিকাতা
মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। এবং
মেডিকেল কলেজের বাঙ্গালা বিভাগে ভর্তি হইয়া অধ্যয়ন
করিতে লাগিলেন।
ধৰ্ম্মপ্রাণ বিজয়কৃষ্ণের বাল্যকাল হইতেই ধৰ্ম্মের জন্য
ব্যাকুলতা ছিল।
কলিকাতার শিক্ষিত সমাজের মধ্যে
পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব দেখিয়া তাঁহার প্রাণ ও উহাতে
আন্দোলিত হইতেছিল। এ সময়ে কলিকাতার ব্রাহ্মসমাজ
সংস্থাপিত হইয়াছে। কয়েক জন বন্ধুর অনুরােধে তিনি
একদিন বুধবার সন্ধ্যাকালে ব্রাহ্মসমাজে গমন করিলেন।
তখন বুধবার দিবস সমাজে উপাসনা হইত। সমাজে গিয়া
সে স্থানের আলােকমাল, সুমধুর সঙ্গীত, ভক্তিভাবে স্তোত্র
পাঠ ইত্যাদি দেখিয়া তাহার চিত্ত মুগ্ধ হইয়া গেল। সেইদিন
[ ১৫ ]
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ® আচাৰ্য দেন্দ্রেনাথ ঠাকুর মহাশয় “পাপীর দুর্দশা ও ঈশ্বরের বিশেষ করুণা” সম্বন্ধে বক্তৃতা করিয়াছিলেন। বিজয়কৃষ্ণ নিজকে নিতান্ত নিরাশ্রয় মনে করিয়া তখন মনে মনে ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিলেন—“দয়াময় ঈশ্বর, ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে আমার ন্যায় হতভাগ্য লােক বােধ হয় আর পৃথিবীতে কেহ নাই। পূর্বে ইষ্টদেবতার পূজা করিয়া অপার আনন্দ লাভ করিতাম, এখন তাহাতে বঞ্চিত হইয়াছি। এই মাত্র শুনিলাম, তুমি অনাথের নাথ ! প্রতে। আমি তােমার শরণাপন্ন হইলাম। তুমি আমাকে রাখ, আমি আর কোথায়ও যাইব । তােমার দ্বারেই পড়িয়া রহিলাম।” এই ঘটনার অল্প- দিন পরেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট তিনি দীক্ষা গ্রহণ করিয়া ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশ করিলেন। শ্ৰীযুক্ত অমৃতলাল সেন মহাশয় বলেন—“এই সময় হইতে গােস্বামী প্রভু, প্রত্যহ নিয়মিত উপাসনা করিয়া অপার শান্তি সুখ অনুভব করিতেন। এবং ধর্ম সম্বন্ধে যাহা কিছু জানিতে অভিলাষী হইতেন, নির্জনে প্রার্থনা করিয়া দয়াময় পিতার নিকট হইতে তাহার উপযুক্ত উত্তর পাইতে লাগিলেন। যে দিন যে সত্য প্রাপ্ত হইতেন, তাহা লিখিয়া রাখিতেন ; এবং সেই লেখাগুলি সংগ্রহ করিয়া ধৰ্ম্মশিক্ষা নামক এক- খানি পুস্তক প্রকাশ করেন। অতঃপর গােস্বামী মহাশয় কলিকাতা হইতে শান্তিপুর [ ১৬ ] • ঐবিজয়কৃষ্ণ , গমন করেন। একদিন তিনি মনে মনে আলােচনা করিতে ছিলেন যে, ভগবান্ সমস্ত মনুষ্যকে সৃজন করিয়াছেন, তিনিই সকলের মাতা পিতা, সুতরাং প্রত্যেক নরনারীকেই ভাই- ভগিনী বলিয়া বিশ্বাস করিতে হইবে। অতএব জাতিভেদ স্বীকার করিলে ঈশ্বরকে পিতা বলিয়া স্বীকার করা যায় কি প্রকারে ? এই প্রকার আলােচনা করিতেছেন, এমন সময়ে একাদশ বষীয় একটী বালক হঠাৎ বলিয়া উঠিল— “যদি তুমি জাতিভেদ না মান, তবে পৈতা রাখিয়াছ কেন ? বালকের কথা ঠিক বােধ হওয়াতে গােস্বামী প্রভু তৎক্ষণাৎ উপবীত ত্যাগ করিলেন। জননী স্বর্ণময়ী এই ব্যাপার অবগত হইয়া উদ্বন্ধনে প্রাণত্যাগ করিতে সঙ্কল্প করিলে, মাতৃহত্যা ভয়ে গােস্বামী প্রভু পুনরায় উপবীত গ্রহণ করিলেন।” একদিন ভক্তিভাজন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুবের নিকটে গােস্বামী- প্রভু প্রশ্ন করিলেন—“উপবীত রাখা উচিত কিনা, মৎস্য মাংস আহার করা উচিত কিনা ?” তদুত্তরে তিনি বলিলেন “উপবীত রাখা নিতান্ত কর্তব্য। উপবীত না রাখিলে সমাজের অনিষ্ট হয়। এই দেখ, আমি উপবীত রাখিয়াছি। মৎস্য, মাংস না খাইলে শরীর রক্ষা হয় না; মশা ছারপােকা যখন মার, তখন অন্য জীবহত্যায় দোষ কি ?” এই দুইটী উত্তর শুনিয়া গােস্বামী-প্রভু সন্তুষ্ট হইতে পারিলেন না। যাহা সত্য বলিয়া হৃদয়ঙ্গম হইবে, তাহা প্রতিপালন না করা [ ১৭ ] ২ * ঐবিজয়কৃষ্ণ ৫ মহাপাপ ও কপটতা, এইরূপ বিবেচনা করিয়া বাড়ীতে পত্র লিখিয়া পুনরায় উপবীত পরিত্যাগ করিলেন। পরদুঃখে কাতর ধর্মপ্রাণ বিজয়কৃষ্ণ ব্রাহ্মসমাজের সংস্পর্শে আসিয়া দেশের শত শত নরনারীর কুসংস্কার, ধৰ্ম্মহীনতা ইত্যাদি দূর করিবার জন্য প্রকাশ্য রাজপথে দাড়াইয়া বক্তৃতা করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার মধুর ভাষা, অপূর্ব শব্দযােজনা, সর্বোপরি ভক্তিরসসিক্ত অপূর্ব বক্তৃতা শ্রবণে প্রায় চার পাঁচ শত লােক মন্ত্রমুগ্ধবৎ রাজপথে দণ্ডায়মান থাকিত। এই ভাবে ব্রাহ্মসমাজে সর্বপ্রথম প্রচার- প্রণালী প্রবর্তিত হইল। গােস্বামী মহাশয়ের উপবীত পরিত্যাগ ঘটনা লইয়া শান্তিপুরে ভীষণ আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল। তাহার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সকলেই তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া- ছিলেন। কিন্তু ধাৰ্মিক ও তেজস্বী বিজয়কৃষ্ণ কোন দিকে লক্ষ্য না করিয়া ব্রাহ্মধৰ্ম্মের প্রচারকের পদে ব্ৰতী হইলেন। তিনি প্রচারক ব্ৰত গ্ৰহণ করিলে, আচাৰ্য দেবেন্দ্রনাথ প্রচারকের বৃত্তি নির্দিষ্ট করিয়া দিতে প্রবৃত্ত হইলে বিজয়কৃষ্ণ উহার প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছিলেন-ঈশ্বরের উপর সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়াই প্রচারকের চলা কর্তব্য। এ সময়ে বিজয়কৃষ্ণের ধৰ্ম্মানুরাগ কতদূর বৃদ্ধি পাইয়া- ছিল, তাহা নিম্নের বিবরণ হইতে জানা যায়, “একদিন একটা [ ১৮ ] -
• ঐবিজয়কৃষ্ণ ৫
প্রবল ঝঞাবাত কলিকাতার উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছিল।
রাজপথে বুক সমান জল দাড়াইয়াছিল। সেই প্রবল
ঝড়ে বহু গৃহ ভগ্ন, অসংখ্য বৃক্ষ উন্মলিত হইতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে রাজপথ নদীর স্রোতে পরিণত হইল।
অগণ্য মৃতদেহ সেই স্রোতে ভাসিয়া চলিয়াছে। গােস্বামী
মহাশয় ছাদে উঠিয়া প্রকৃতি দেবীর সেই ভীষণ লীলা
দেখিতেছিলেন,
এমন সময়ে তাহার মনে হইল, অদ্য
উপাসনার দিন; কিন্তু কাহার সাধ্য যে ঘরের বাহির
হয় ? উপাসনার সময় যতই নিকটবর্তী হইতে লাগিল,
গােস্বামী প্রভু ততই অস্থির হইতে লাগিলেন; কিন্তু তাহার
প্রবল ধৰ্ম্মাকাঙক্ষার নিকট সমস্ত বাধা বিপ্ন পরাস্ত হইল।
তিনি কোমর বাঁধিয়া গৃহের বাহির হইলেন। হালিডে স্ট্রীটের
নিকট গিয়া দেখিলেন, গলাজল হইয়াছে। কিয়দ্র অগ্রসর
হইয়া সাঁতার জলে পড়িলেন। অবশিষ্ট সমস্ত পথ প্রায়
সন্তরণ করিয়া ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা গৃহে উপস্থিত হইলেন।
আসিয়া দেখেন, ঘর জনশূন্য এবং সমাজগৃহও ভগ্নদশায়
উপনীত হইয়াছে। তখন মন্দিরের ভৃত্যদ্বারা একখানি পত্র
প্রেরণ করিয়া আচাৰ্য্য দেবেন্দ্রনাথের মত জিজ্ঞাসা করিলেন।
তিনি তদুত্তরে লিখিলেন—“আজ প্রকৃতির মধ্যে যে ভীষণ
ব্যাপার হইতেছে, তুমি তাহাতে পরমেশ্বরের লীলা দর্শন
কর। সুতরাং তাহাকে একাকী বসিয়াই উপাসনা করিতে
[ ১৯ ]
।
* শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
হইল। উপাসনা করিয়া ফিরিবার সময় পথে কেশব বাবুর
সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইল। তিনিও পালকিতে চড়িয়া
সমাজে গমন করিতেছিলেন। পুনরায় দুইজনে একত্র হইয়া
সমাজে আগমনপূর্বক উপাসনা করিয়া স্ব স্ব অালয়ে
প্রত্যাবৃত্ত হইলেন।”
“যদি আসে তার কাজে দিয়াছেন যে প্রাণ ;
ছাড়ি যাব অনায়াসে তারে করিব দান।”
ইহাই ছিল বিজয়কৃষ্ণের মূলমন্ত্র। তিনি দেহ প্রাণ মন
ঢালিয়া দিয়া ব্ৰহ্মকৃপাহি কেবল মহামন্ত্র সার করিয়া
ধর্মের জন্য সমাজের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করিয়াছিলেন।
কত দুঃখ দৈন্য, কত অনাহার নির্যাতন যে এসময়ে
তাহাকে সহ্য করিতে হইয়াছিল, তাহার ইয়ত্তা ছিল না।
কোনদিন মুড়ি খাইয়া কোন দিন বা অনাহারে থাকিয়া দিন
কাটিয়া যাইত। প্রতিদিনের আহাৰ্য্য সামগ্রী প্রায়ই কিছু
সঞ্চিত থাকিত না। অনেক সময় অনাহারে রজনী কাটিয়া
যাইত। ভাত জুটিলেও কত সময়ে কেবল নূন ভাতই
অমৃতের স্থান অধিকার করিত।
অনেক সময় কাঁটানটে শাকের ব্যঞ্জন হইত।
অনেক
সময় অন্নের উপকরণ সংগৃহীত না হওয়ায় হলুদ মিশাইয়া
খেচরান্ন করা হইত এবং দোপাটি ফুল ভাজিয়া লওয়া হইত।
আচাৰ্য বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী-৮০ পৃষ্টা।
[ ২ ]
ক্ষু বিজয়কৃষ্ণ
বাঙ্গালা দেশের নানাস্থানে ধর্মপ্রচার করিয়া অবশেষে
ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম প্রচার করিবার জন্য পঞ্জাব দেশে উপস্থিত
হইলেন।
এ সময়ে তিনি ধর্ম বিষয়ে বিবিধ চিন্তা করিয়া
কখনও কখনও মনে করিতেন যে তাহার মত পাপী আর
নাই। এ সময়ে মনের এই দুর্বলতা কোনরূপেই দূর করিতে
পারিয়া কাদিতে কাঁদিতে গাহিয়াছিলেন ?
রাগিণী মল্লার-তাল আড়াঠেকা।
“মলিন পঙ্কিল মনে কেমনে (নাথ) ডাকিব তােমায়।
পারে কি তৃণ পশিতে জ্বলন্ত অনল যথায়।
তুমি পুণ্যের আধার, জ্বলন্ত অনল সম,
আমি পাপী তৃণ সম, কেমনে পূজিব তােমায়।
শুনি তব নামের গুণে, তরে মহাপাপী জনে,
লইতে পবিত্র নাম কঁাপে যে মম হৃদয়।
অভ্যস্ত পাপের সেবায় জীবন চলিয়া যায়।
কেমনে করিব আমি পবিত্র পথ আশ্রয়।
এ পাতকী নরাধমে, তার যদি দয়াল নামে,
বল করে কেশে ধরে’ দাও চরণে আশ্রয়।”
এই গান করিয়াও যখন মনের গ্লানি দূর হইল না, তখন তিনি
জলে ঝাঁপ দিয়া আত্মহত্যা করিবার জন্য গভীর রাত্রিতে রাবী
নদীর তীরে উপস্থিত হইলেন। জলে ঝাঁপ দিতে যাইবেন,
[ ২১ ]
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ •
এমন সময়ে পশ্চাদ্দক হইতে একজন মুসলমান ফকির
আসিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন এবং বলিলেন -“ইএ
বাচ্চা, শরীর ছােড়নেসে পাপপ্রবৃত্তি নষ্ট হােগা নেহি।
তু ধৈর্য ধর। তেরা ভাল। হােগা। যব, পাপ ছুটেগা,
তু কুচ, নেহি জানােগে। আভি বহুত রােজ দের হায়।
খােদ। সব কামকা বখৎ ঠিক কর রাখা। বাতাসে ধুর
উড়তা, ওভি খােদাক। ইচ্ছাসে তো। ঘাবড়াও মৎ।
দুনিয়ামে খােদাকা খেল্ দেখ।” অর্থাৎ বৎস! শরীর নাশে
পাপের নাশ হয় না। ধৈর্য্য ধর, তােমার মঙ্গল হইবে।
যখন পাপ তােমাকে ছাড়িয়া যাইবে, তখন তুমি জানিতেও
পারিবে না। কিন্তু এখন তাহার অনেক দেরী আছে।
ভগবান্ সমস্ত কাৰ্যেরই সময় নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন।
বায়ুবেগে ধূলিরাশি উখিত হয়, তাহাও তাহার ইচ্ছামত হয়।
অতএব চিন্তিত হইও না । জগতে জগদীশ্বরের লীলা দর্শন
পশ্চিমের নানা স্থানে ধৰ্ম প্রচার করিয়া ৫১৮৬৩
খৃষ্টাব্দের শেষ ভাগে গােস্বামী মহাশয় ঢাকা নগরে পদার্পণ
করেন। তিনি পূর্ব-বাঙ্গালাতে সর্ব প্রথম ব্রাহ্মধর্ম প্রচার
করিতে আসেন। গােস্বামী মহাশয় এখানে আগমন করিয়া
কয়েকটি প্রকাশ্য বক্তৃতা প্রদান করেন। তঁাহার বক্তৃতাতে
অনেক শিক্ষিত লােকের মনে ব্রাহ্মধর্মের প্রতি বিশ্বাস জন্মে।
[ ২২ ]
শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ ঢাকা হইতে তিনি ময়মনসিংহ, কুমিল্লা প্রভৃতি স্থানে ব্ৰহ্মধৰ্ম্মের আন্দোলন উপস্থিত করেন। তাহার ফল পূর্ব- বাঙ্গালা বহুকাল ভােগ করিবে।” ( ৪ ) অদ্বৈত গোস্বামীর বংশধর বিজয়কৃষ্ণ ব্রাহ্ম সমাজের প্রচারক ও আচার্য্যের পদে ব্ৰতী হইয়া ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মের জন্য প্রাণপাত করিলেও অবশেষে ধৰ্ম্মপরায়ণতা, ঈশ্বরানুরাগ ও সংকীর্ণতার বিরোধী ভাব ব্রাহ্ম সমাজের গণ্ডীতে আর তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারিল না । নদীতে বাণ ডাকিলে যেমন জলরাশি নদীবক্ষ উচ্ছ্বসিত হইয়া চারিদিক ভাসাইয়া নেয়, বিজয়কৃষ্ণের ধৰ্ম্মানুরাগও তেমনি তাহাকে বিশ্বজনীন প্রেম ও ভক্তির দ্বারে আকর্ষণ করিয়া লইল। ক্ষুদ্র প্রেম-নদী বিশাল সমুদ্রের জল কেমন করিয়া বক্ষে ধারণ করিবে ? যে ধৰ্ম্মের জন্য, যে সংস্কার দূর করিবার জন্য তিনি দেশে দেশে ভ্রমণ করিয়াছিলেন, বক্তৃতা করিয়াছিলেন, তবু কি যেন কিসের অভাবে তিনি প্রাণে শান্তি অনুভব করিতেছিলেন । একদিন একজন সাধু মহাপুরুষ সমাজ গৃহে উপস্থিত ছিলেন; সেদিন বিজয়কৃষ্ণ সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের বেদী হইতে উপদেশ প্রদান করিতেছিলেন। উপাসনার পর গােস্বামী [ ২৩ ]
• শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ ৫
মহাশয় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “উপাসনা কেমন হইল ?”
উত্তরে সাধু বলিলেন, “বড়ী আচ্ছা! সবতে বেদকা বাণী
হায়।” বিজয়কৃষ্ণ বলিলেন “উপদেশ দিই বটে, কিন্তু
আমার প্রাণের অবস্থা উপদেশের অনুরূপ নহে।” তঁাহার
কথা শুনিয়া, সাধু কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া বলিলেন-“আচ্ছা,
তােম্ গুরু কিয়?” গােস্বামী-প্রভু বলিলেন—“না মহারাজ,
আমরা গুরুবাদ মানি না।” সাধু কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া
কহিলেন, “ওঃ! এইহি ওয়াস্তে সব, বিগড়, গিয়া।”—অর্থাৎ
এই জন্যই সমস্ত বিগড়াইয়া গিয়াছে, সমস্ত সাধন ভজন পণ্ড
হইয়া যাইতেছে। সাধুর এই কথায় গােস্বামী প্রভুর
হৃদয়ে এক পরিবর্তন দেখা দিল ; গুরুবাদের বিরুদ্ধে তিনি যে
মত পােষণ করিতেছিলেন, সে ভাব শিথিল হইয়া পড়িল,
এবং গুরু লাভের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। সে মুহুর্তেই
সাধুর নিকট কহিলেন, “আপনি আমাকে দীক্ষা দিন্।”
তিনি বলিলেন—“নেহি। তােমহারা গুরু দোস্রা হায়,
বখৎ হােনেসে মিল্ যায়গা। ঘাবড়াও মৎ।” এই সময়
হইতেই গােস্বামী মহাশয় ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের জন্য যখন
যেখানে যাইতেন, সেখানেই সৎগুরুর অন্বেষণ করিতেন।
এ সময়ে তিনি যে কত বিপদ ও বাধা বিঘ্ন সহ
করিয়াছেন, তাহার সীমা সংখ্যা নাই। সে সম্বন্ধে বহু আশ্চর্য
ঘটনা আছে। এক সময়ে চন্দ্রনাথ তীর্থের কোন একটী
[ ২৪ ]
অদৃশ্য হইল। • শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ জঙ্গলের মধ্যে গােস্বামী-প্রভু দাবানলে পতিত হইয়া আশ্চৰ্য্য ভাবে রক্ষা পাইয়াছিলেন। তিনি নিজে বলিয়াছেন যে ‘আমি ও বারদীর ব্রহ্মচারী মহাশয় এক সময়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কিছুকাল একত্রে সাধন ভজন করিয়াছিলাম। সেই স্থানে একদিন হঠাৎ চারিদিকে দাবানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। পশুপক্ষী কীট পতঙ্গ অগ্নিতে দগ্ধ হইতে লাগিল। উত্তাপ আর সহ করা যায় না। আমাদের কুটীরেও প্রায় ২০০ হাত নীচে সমতল ভূমি ছিল। প্রথম দেখি একটী প্রকাণ্ড পাহাডিয়া সর্প লম্ফ প্রদান পূর্বক পরে একটী ব্যাঘ্রও ঐরূপ করিল। তৎপর ব্রহ্মচারী মহাশয় ‘বম্ বম্ শব্দ উচ্চারণ করতঃ আমাকে পৃষ্ঠে করিয়া দুই শত হাত নীচে লাফাইয়া পড়িলেন। আমরা একটুও আঘাত পাইলাম না। ব্রহ্মচারী মহাশয়ের সহিত প্রথম দেখা হইলে তিনি আমাকে দেখিয়াই বলিলেন- ‘আমাকে চিনিতে পারি ? তাের সঙ্গে আমার চন্দ্রনাথ পাহাড়ে দেখা হয়েছিল। দাবানলে তােকে কে রক্ষা করেছিল ? তখন আমার সব মনে পড়িল।” গােস্বামী মহাশয় নিজের গুরুলাভের কথা এইরূপ লিখিয়াছেন, “একদিন গয়ার সুবিখ্যাত মহাপুরুষ রঘুবর দাস বাবাজী ও আমার ব্রহ্মচারী বন্ধুর সহিত ধৰ্ম্মকথা প্রসঙ্গে আশ্রমে উপবিষ্ট আছি, এমন সময়ে কয়েকটি রাখাল বালক [ ২৫ ] • ঐবিজয়কৃষ্ণ • আসিয়া সংবাদ দিল যে, পর্বতের উপরে একজন মহাপুরুষ আসিয়াছেন। এই সংবাদ পাইয়া আমরা তাড়াতাড়ি পর্বতের উপরে গিয়া সতাই একজন দিব্য রূপলাবণ্য বিশিষ্ট তেজস্বী মহাপুরুষকে দর্শন করিলাম। দুই একটি কথার পরই তিনি আমাদিগকে স্বস্থানে গমন করিতে আদেশ করিলেন। মহাপুরুষের আদেশ লঙ্ঘন করিতে নাই, তাই আমরা সেই দিন আশ্রমে ফিরিয়া আসিলাম। পর দিবস রঘুদাস ও ব্রহ্মচারী মহাশয় স্ব স্ব কাৰ্য্যে স্থানান্তরে গমন করিলে, আমি সুযােগ বুঝিয়া, এবং সাধুরা সাধারণতঃ গাঁজা সেবন করেন জানিয়া, কিছু গাজা সঙ্গে লইয়া মহাপুরুষের নিকট একাকী উপস্থিত হইলাম। যাইয়া দেখিলাম, তঁাহার দেহ হইতে এক অপূর্ব জ্যোতিঃ বাহির হইতেছে। চিত্রপটস্থিত দেবতা- দির মস্তকের চতুর্দিকে যেমন একপ্রকার জ্যোতিগোলক অঙ্কিত দেখিতে পাওয়া যায়, এই মহাত্মার মস্তকের চতুর্দিকেও সেইরূপ একটী জ্যোতিগোলকের প্রকাশ দেখিয়া আমি অতীব বিস্ময়াবিষ্ট হইলাম । তাহাকে অভিবাদন করিয়া, নিকটে বসিতেই, তিনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক বলিয়া স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলে, তিনি বলিলেন, “ওঃ ব্রাহ্ম ধরম্ ! ব্রাহ্ম ধরম্ হাম্ জান্তা হায়। কলকাত্তামে ব্রাহ্মসমাজ হায়। রাজা রাম- মােহন একঠে। বড়া আদমি থা। অগাড়ী ওহি ব্রাহ্ম ধরম, [ ২৬ ]
ক্ষু শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
স্থাপন কিয়া। ও লেগ, বেলায়েত গিয়া। কেশব বাবু,
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হাম পছন্তা।” এই বলিয়া তিনি
ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বলিতে লাগিলেন।
সম্পূর্ণ অজ্ঞাতকুলশীল পশ্চিম দেশীয় এই মহাপুরুষের মুখে
এই সকল কথা শুনিয়া আমি একেবারে বিস্মিত ও স্তম্ভিত
হইয়া গেলাম। তিনি যতই ঐ সকল কথা বলিতে লাগিলেন,
ততই আমার শরীর অবশ হইতে লাগিল ; অবশেষে আমার
নড়িবার চড়িবার পর্যন্ত সামর্থ্য রহিল না। আমি জ্ঞানহারা
হইয়া অজ্ঞাতসারে রােদন করিতে লাগিলাম। তখন পিতা
যেমন সন্তানকে ক্রোড়ে গ্রহণ করেন, মহাপুরুষও সেইরূপ
আমাকে ক্রোড়ে গ্রহণ পূর্বক শক্তিসঞ্চার করিয়া দীক্ষামন্ত্র
ও সাধন প্রণালী শিক্ষা দিলেন। (১২৯০ সন, আষাঢ় মাস)।
এইরূপ অযাচিত দয়া লাভ করিয়া আমি ভক্তিভরে গুরু-
দেবকে প্রণাম কবিলাম। প্রণাম করিয়াই অজ্ঞান হইয়া
পড়িয়াছিলাম। কিয়ৎকাল পরে চৈতন্য লাভ করিয়া দেখি,
মহাপুরুষ প্রস্থান করিয়াছেন। অনেক অনুসন্ধান করিয়াও
তাহার দর্শন না পাইয়া আমার ব্রহ্মচারী বন্ধুর নিকট আনু-
পূর্বিক সমস্ত ঘটনা বললাম। তাহাতে তিনি অতিশয়
আনন্দিত হইয়া বলিলেন, “তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইয়াছে।
তুমি যােগেশ্বরের কৃপালাভ করিয়াছ। এখন তুমি যে স্থানেই
গমন কর না কেন, মহাপুরুষেরা তােমাকে সাদরে গ্রহণ
[ ২৭ ]
• বিজয়কৃষ্ণ • করিবেন। তােমার গুরুদেবের জন্য ব্যস্ত হইও না। প্রয়ােজন হইলেই তঁাহার দর্শন পাইবে।” “এই ঘটনার কয়েকদিন পরে রামশীলার পাহাড়ে অকস্মাৎ আমার সহিত গুরুদেবের সাক্ষাৎ হইলে, তিনি অসীম স্নেহের সহিত সান্ত্বনা প্রদান পূর্বক বলিলেন, ‘ঘাবড়াও মৎ। ভজন কর, বখৎমে স মিল, যায়গা।” ( ৫ ) দীক্ষা গ্রহণের পর বিজয়কৃষ্ণ গয়া ও জ্বালামুখী প্রভৃতি স্থানে সাধন ভজন করিয়া প্রাণে এক অপূর্ব সরস অবস্থা লাভ করিয়াছিলেন। জ্বালামুখী হইতে গােস্বামী মহাশয় গয়ায় ফিরিয়া আসিয়া আকাশ গঙ্গার আশ্রমে থাকিয়া সাধন করিতে থাকেন। এই সময়ে তাহার “গুরুদেব পরমহংসজী সর্বদা তাহার নিকট উপনীত হইয়া সাধন বিষয়ে উপদেশ ও সাহায্য প্রদান করিতেন। একদিন তিনি গােস্বামী- প্রভুকে নির্জনে লইয়া গিয়া অণিমা, লঘিমা প্রভৃতি অষ্ট- সিদ্ধির সমস্ত ব্যাপার প্রত্যক্ষ করাইয়াছিলেন। পরমহংসজী কখনও বায়ু অপেক্ষা লঘু হইয়া শূন্যে পরিভ্রমণ, কখনও বা পরমাণু অপেক্ষাও সূক্ষা হইয়া পর্বত ভেদ করিয়া অপর পার্শ্বে গমন করিতে লাগিলেন। অতঃপর তিনি পর-শরীরে ২৮ ] • শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ** প্রবেশের ব্যাপারও প্রত্যক্ষ করাইলেন। পাহাড়ের নীচে, নীচজাতীর কয়েকটি লােক একটী মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনিয়াছিল। কাষ্ঠসংগ্রহের জন্য লােকগুলি মৃতদেহটি রাখিয়া স্থানান্তরে গেল ; পরমহংসজী স্বীয় স্থূলদেহ হইতে বহির্গত হইয়া ঐ দেহে প্রবিষ্ট হইলে, উহা সজীব হইয়া উঠিয়া বসিল, আর তাহার নিজের দেহ মৃতবৎ পড়িয়া রহিল। স্বীয় গুরুদেবের এই সকল অদ্ভুত ক্ষমতা দর্শন করিয়া গােস্বামী-প্রভু বিস্মিত হইলেন।” এইরূপ ভাবে গুরুর কৃপায় নানাবিধ অলৌকিক সাধন- ক্রিয়া দর্শন করিয়া ও স্বয়ং সিদ্ধ হইয়া বিজয়কৃষ্ণ কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়া পরিবারবর্গের সহিত বাস করিতে লাগিলেন। অনেকে ভাবিয়াছিলেন, সন্ন্যাসী বিজয়কৃষ্ণ আর দেশে ফিরিয়া আসিবেন না। এই সময়ে এক দিবস তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য তদীয় চুঁচুড়াস্থ বাসভবনে গমন করিয়াছিলেন। মহর্ষি তাহাকে দেখিয়া বলিলেন—“তােমাকে যে নূতন মানুষ দেখিতেছি। তুমি নিশ্চয় কিছু নূতন বস্তু লাভ করিয়াছ। এই দেবদুল্লভ বস্তু কি প্রকারে, কোথায় লাভ করিলে ?” গােস্বামী মহাশয় দীক্ষা প্রাপ্তির ইতিহাস বলিলে, মহর্ষি কহিলেন—“যে অমূল্য বস্তু লাভ করিয়াছ, ইহাদ্বারা তুমি ধন্য হইয়া যাইবে, উদ্ধার হইয়া যাইবে। এই দেবদুল্লভ বস্তু কদাচ ত্যাগ করিও [ ২৯ ] শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ । কিন্তু ব্রাহ্মসমাজে তােমার স্থান হইবে না। তুমি তিষ্ঠিতে পারিবে না। ব্রাহ্ম-সমাজ পরিত্যাগ করিতে হয় করিবে, তথাপি এ বস্তু কখনও ছাড়িও না।” মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ বাণী অতি তাল্পকাল মধ্যেই কাৰ্যে পরিণত হইল। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজভুক্ত অনেক ব্রাহ্ম তাঁহার ব্রাহ্ম তঁাহার নিকট যােগদীক্ষা গ্রহণ করিতে লাগিলেন। ইহাতে ব্রাহ্মসমাজে এক ভয়ানক গােযােগ উপস্থিত হইল। প্রধান প্রধান ব্রাহ্মগণ আশঙ্কা করিতে লাগিলেন যে, বিজয়কৃষ্ণের প্রভাবে বহু ব্রাহ্মই ব্রাহ্মসমাজের সাধন প্রণালী পরিত্যাগ করিবেন। তাহারা দেখিলেন যে গােস্বামী মহাশয় গােপনে সাধন প্রদান করেন, তাঁহার নিকট রাধা-কৃষ্ণ ও শ্যাম বিষয়ক গান হয়, তিনি দেব-প্রতিমার নিকট প্রণাম করেন, তঁাহার বাসভবনে হিন্দু দেবদেবীর মূৰ্ত্তি রাখা হয়-এইসকল নানা কারণে ব্রাহ্মগণ তাহাকে প্রচারকের পদত্যাগ করিবার জন্য প্রস্তাব উত্থাপিত করেন। বিজয়কৃষ্ণ সন্তুষ্টচিত্তে পদত্যাগ পত্র প্রেরণ করিলে, কলি- কাতার ব্রাহ্মসমাজের কর্তৃপক্ষগণ তাহা গ্রহণ করিতে বাধ্য হইলেন। কলিকাতা সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ গােস্বামী-প্রভুকে ত্যাগ করিলে পূর্বব- বালা ব্রাহ্মসমাজ তাহাকে সাদরে গ্রহণ করেন। এখানে প্রথমে কোন গােলােেগ উপস্থিত হয় [ ৩ ] • শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ , নাই, কিন্তু তাহার নামকীৰ্ত্তন, দেবদেবীর উল্লেখ,, গুরুবাদ, পদধূলি গ্রহণ, ইত্যাদি নানা কারণে অবশেষে এখানকার ব্রাহ্মগণও তাহার কার্যপ্রণালী সম্বন্ধে আলােচনা করিতে থাকেন। এবিষয়ে বহু পত্র বিনিময় হয়, অবশেষে তিনি তাঁহার প্রিয়তম ব্রাহ্মসমাজের সহিত সর্ববিধ বন্ধন পরিত্যাগ করিলেন। এইবার তিনি যােগাবস্থা অবলম্বন পূর্বক, তাহাতে সিদ্ধকাম হইয়া ভক্তিরাজ্যে প্রবেশ করিয়া বাঙ্গালা দেশে নবীন ধৰ্ম্মের মধুর বিস্তৃতি দ্বারা দেশকে পুণ্য ও পবিত্র করিতে লাগিলেন। এতদিন তিনি ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক নিবাসে সপরিবারে বাস করিতেন, কিন্তু ব্রাহ্ম- সমাজের প্রচারকের পদ পরিত্যাগ করায় তাহাকে স্থানান্তরে আসিতে হইল। এই সময়ে তাহার সমাধির ভাব পরিলক্ষিত হইত। নাম গান শুনিলেই তিনি সমাধিস্থ হইতেন। ঢাকা নগরী আনন্দ ধামে পরিণত হইয়াছিল। ঘন ঘন নগর-কীৰ্ত্তন, মহােৎসব প্রভৃতিতে সর্বত্র পুণ্যের পবিত্রধারা ছুটিয়া বেড়াইতেছিল। ঢাকাবাসী ব্রাহ্ম ও হিন্দুগণ গগাস্বামী মহাশয়ের অসাধারণ শক্তির পরিচয় পাইয়া, একেবারে বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়াছিলেন। ঢাকার বিখ্যাত ঘূর্ণীবায়ুর কথা বাঙ্গালাদেশে বিখ্যাত। ইংরেজীতে ইহা Tornedo নামে পরিচিত। এই ভীষণ [ ৩১ ]
• শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ
!
ঝড়ের সময় গােস্বামী মহাশয় ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন।
ভীষণ রবে প্রলয়ের হুঙ্কারে এই ঘূর্ণীবায়ুতে যখন বহু
অট্টালিকা ভগ্ন, অনেক লােকের প্রাণনাশ এবং নদীর বুকে
বহু নৌকা ডুবিয়া শত শত লােকের সর্বনাশ হইতেছিল,
আকাশের বুকে শত শত আগুণের গােল। ছুটিয়া বেড়াইতে
ছিল, সারা সহর প্রলয়ের কোলে কাপিতেছিল, তখন “গােস্বামী-
প্রভু ঐ শব্দ শুনিয়া ব্যস্ততার সহিত গৃহের বহির্ভাগে আগমন
করিলেন, এবং উর্ধদিকে দৃষ্টি পূর্বক, করযােড়ে নমস্কার
করিয়া উচ্চৈঃস্বরে ‘জয় মা কালী! দয়া কর, প্রসন্ন হও;
জয় মহাবীর ! জয় মহাবীর ! ঐ সব অগ্নিগােলা আমার বুকে
নিক্ষেপ কর’–ইত্যাদি প্রকারে মহাবীর ও মহাকালীর স্তব
করিতে লাগিলেন। এইরূপ স্তব করিবার পরই ঘূর্ণীবায়ু
আকাশে মিলিয়া গেল, উপদ্রবেরও শান্তি হইল। ঝড়
থামিয়া গেলে তিনি বলিলেন যে, আকাশের দিকে দৃষ্টি
করিয়া দেখিলেন, মহাকালী ও মহাবীর ভীষণ মূর্তিতে
প্রকাশিত হইয়া গভীর গর্জনে দিগন্ত কঁপাইয়া অসংখ্য
অগ্নিগােলা নিক্ষেপ পূর্বক নৃত্য করিতে করিতে অগ্রসর
হইতেছেন, এবং ডাকিনী যােগিনী প্রভৃতি কালিকাদেবীর
সঙ্গিনীগণ সম্মুখে যাহা দেখিতেছেন, তাহাই লণ্ডভণ্ড করিয়া
ভীষণ গতিতে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিতেছেন। আজ
তিনি ঐ ভাবে স্তব করিয়া তাহাদিগকে শান্ত না করিলে আর
[ ৩২ ]
• ঐবিজয়কৃষ্ণ রক্ষা ছিল না। কোন কোন পাপের মাত্রা অত্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাহারা অজি সংহার মুর্তি ধারণ করিয়াছিলেন। * ১২৯৫ সনের ভাদ্র মাসে জন্মাষ্টমী তিথিতে গেণ্ডােরিয়ার নির্জন প্রান্তে একটী আশ্রম নির্মাণ পূর্বক তিনি বাস করিতে লাগিলেন। আশ্রমের একটী প্রাচীন আম্রবৃক্ষতলে গােম্বামী মহাশয় সাধনের জন্য ১০ হাত দীর্ঘ এবং ৮ হাত প্রশস্ত দক্ষিণদ্বারী একটী কুটীর নির্মাণ করিয়াছিলেন। সেই কুটীরে দুইটা প্রকোষ্ঠ ছিল, তাহার একটীতে তিনি সাধন ভজন করিতেন, অপরটীতে শাস্ত্রপাঠ, ধৰ্ম্মালােচন এ সকল হইত। তিনি এই সুন্দর শান্তিপূর্ণ কুটীরের দেয়ালের বহির্ভাগে একটী নিশান চিত্রিত করিয়া তদুপরি “ওঁ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যায় নমঃ” এবং কুটীরের ভিতর দেয়ালের গায়ে চাখড়ি দ্বারা নিম্নলিখিত উপদেশ কয়টি লিখিয়া রাখিয়াছিলেন- ১। এই দিন নেহি রহেগা। ২। আত্মপ্রশংসা করিও না। ৩। পরনিন্দা করিও না। ৪। অহিংসা পরমাে ধৰ্ম্মঃ। ৫। শাস্ত্র ও মহাজনদিগকে বিশ্বাস কর। শাস্ত্র ও মহাজনদিগের আচরণের সহিত যাহা মিলিবে না, তাহা বিষবৎ ত্যাগ কর। * শ্রমদাচাৰ্য প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী-৩১৭ পৃষ্টা। [ ৩৩ ]
# ঐবিজয়কৃষ্ণ ৫
৭। নাহংকারাৎ পরে রিপুঃ।
আর তিনি স্বয়ং করতাল সংযোগে নিম্নলিখিত সঙ্গীত
তিনটি গান করিতেন।
১। ললিত-ঠুংরি ।
হরি সে লাগি রহরে ভাই।
তাের বনত বনত বনি যাই ।
ওঙ্কা তারে, বা তারে, তারে সুধন কসাই,
শুয়া পড়ায়েকে গণিকা তারে, তারে মিরাবাই।
দৌলত দুনিয়া, মাল খাজনা, বেনিয়া বয়েল চড়াই,
এক বাসে ঠাণ্ঠা লাগে, খোজ খবর নাহি পাই ।
এইসা ভক্তি, কর ঘট-ভিতর, ছােড় কপট চতুরাই,
সেবা-বন্দন, আউর দীনতা সহজ মিলয়ে রঘুরাই ।
২। খাম্বাজ-যং।
ঠাকুর, এইসাহি নাম তুহার ।
প্রভুজী, এইসাহি নাম তুহার ।
পতিত অপবিত্র লিয়ে কর আপনার,
সকল করত নমস্কার।
জাত-বরণকো, পুছত নাহি,
যাচত চরণার বার।
সাধু সঙ্গ, নানক বুধ পাই,
হরিকীৰ্ত্তন জীউ-আধার।
[ ৩৪ ]
সুশ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ
(মধুর
৩। খাম্বাজ-একতালা।
( মনরে ) সদায় হরি বােল, (মধুর ) হরিনামের নাই তুলনা।
যদি বিষয়েতে সুখ হ’তরে, তবে লালজী ফকির হত না।
নামে অজামিল বৈকুণ্ঠে গেলরে, তারে যমদূতে ছুঁতে পেল না।
হরিনামে রে)
নামে জগাই-মাধাই তরে গেলরে! ভবে অপার নামের মহিমা।
(হরিনামের গুণে রে)
নামে রূপ সনাতন ফকির হল রে ! (ভবে) কি দিব নামের
তুলনা ।
ঢাকার আশ্রমে স্থায়ীভাবে থাকিবার ব্যবস্থা তাহার
পক্ষে করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। যাহাকে বাঙ্গালার
সব স্থানের লােকেরাই চাহিতেছে, সেই ধর্মপ্রাণ মহাত্মার
পক্ষে কি একস্থানে অবস্থান করা সম্ভবপর ? ঢাকা হইতে
তিনি নানাস্থানে ভ্রমণ করিতে বাহির হইয়াছিলেন। কখনও
তীর্থ পৰ্যটন, কখনও সাধু মহাত্মার দর্শন, কখনও কুম্ভমেলায়
গমন, এইভাবে বহু স্থান পরিভ্রমণ করিয়া ১৩০৪ সনের
২৪শে ফাল্গুন পুরীধামে যাত্রা করেন, এবং
এবং সেখানেই
দেহত্যাগ করেন, সে কথা পরে বলিব।
বিজয়কৃষ্ণ ধৰ্ম্মের জন্য—সাধনার জন্য ও ঈশ্বর লাভের
জন্য যে কত ক্লেশ সহ্য করিয়াছিলেন, সে সকল কথা স্মরণ
করিলেও হৃদয়ে অপূৰ্ব আনন্দের ও ভক্তির উদয় হয়।
[ ৩৫ ]
বিজয়কৃষ্ণ ৫
" তিনি যখন যে স্থানে গমন করিয়াছেন, তখনই সে স্থানের
সাধুমগুলী তঁাকে সাক্ষাৎ প্রেমাবতার মহাসাধকপুরুষ
রূপে সাদরে কিরূপ অভিনন্দিত ও অর্চনা করিয়াছেন, এক্ষুদ্র
গ্রন্থে তাহা প্রকাশ করা অসম্ভব।
এখানে তাহার কৈলাসপুরী দর্শনের কথা বলিতেছি।
তিনি সেই অদ্ভুত ঘটনাটি নিজে এইরূপ প্রকাশ
করিয়াছিলেন,—“এক সময়ে আমি কয়েকজন সাধুর সঙ্গে
হিমালয় পার হইয়া যুধিষ্ঠির প্রভৃতি যে পথে মহাপ্রস্থান
করিয়াছিলেন, সেই পথে চলিতে থাকি। বরফের উপর দিয়া
অনেক কষ্টে চলিতে লাগিলাম । সরু রাস্তা ধরিয়া চলিতে
চলিতে একস্থানে গিয়া বিশ্রাম করিলাম। সেই স্থানে
একটী কুণ্ড দেখিলাম। মহাদেব কুণ্ড ও মহাদেবের পূজা
করিতে হয়।
আমরা যেমন পূজা করিয়া শঙ্খ ধ্বনি
করিলাম, অমনি কোথা হইতে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হনুমান
আসিয়া কুণ্ডের চতুর্দিকে ঘিরিয়া বসিল। পরে, কুণ্ড
হইতে এক রথ উঠিল। তার মধ্যে মহাদেব দর্শন করিলাম।
পরে সেই হনুমানদিগকে যথাসাধ্য ফলাদি খাইতে দেওয়া
হইল। তাহারা খাইয়া চলিয়া গেল।
অমনি রথসহ
মহাদেব সেই কুণ্ডে অন্তর্হিত হইলেন। কিংবদন্তী এই যে,
এই দিবস এই রথ দর্শন করিতে না পারিলে, কৈলাসপুরী
গমন অথবা জগতের আদি দর্শন করিতে পারা যায় না।”
[ ৩৬ ]
• শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ ,
এই স্থানের পর হইতেই চিরতুষারাবৃত পর্বত শ্রেণী
আরম্ভ হইয়াছে। হঠযােগের প্রক্রিয়া বিশেষ অভ্যস্ত না
থাকিলে, সেই স্থানের ভীষণ শীত সহ্য করা যায় না।
অনেকে এই পথে শীতের দারুণ প্রকোপে প্রাণ হারাইয়া-
ছেন। এই সকল বরফাবৃত স্থানে মৃতদেহ পচিয়া যায় না।
শরীরের রক্ত মাংস প্রথমতঃ জমাট বাঁধিয়া সমগ্র শরীরটি
বরফে পরিণত হয়, এবং এই অবস্থায় দীর্ঘকাল থাকিলে,
বিশ্বনিয়ন্তার কি এক আশ্চর্য কৌশলে, অবশেষে বরফ
হইতে প্রস্তরে পরিণত হয়। মহাপ্রস্থানের সময় মহামতি
যুধিষ্ঠির এই বিষয় অবগত হইয়া, পরবর্তী যাত্রীদিগকে সতর্ক
করিবার জন্য একখানি প্রস্তর খণ্ডে “অত্র অগ্রে ন গচ্ছন্তি”—
একয়েকটি কথা বড় বড় অক্ষরে লিখিয়া রাখিয়াছিলেন।
তাহারা তাহাও গর্শন করিলেন।”
“গােস্বামী প্রভুর শরীর অপটু ছিল, তাহাতে আবার
তিনি হঠযোগের ক্রিয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন না, সুতরাং তিনি
আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না। তাঁহার সঙ্গী সাধু দুইজন
হঠযােগে সিদ্ধ ছিলেন। তাহারা বরফময় প্রদেশের উপর
দিয়া কৈলাশপুরীর অভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
এই পথে উক্ত মহাপুরুষদ্বয় অনেক আশ্চর্য দৃশ্য দেখিয়া-
ছিলেন। শাস্ত্রে তপােবনের যেরূপ বর্ণনা আছে, কৈলাস
পর্বতের এই সকল নিভৃত স্থানে তাদৃশ অনেক তপােবন
[ ৩৭ ]
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ
তাঁহারা দর্শন করিতে লাগিলেন, নরমাংসভােজী অনেক
অসভ্য জাতিও তাহাদের দৃষ্টিপথে পতিত হইয়াছিল।
এই প্রকার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করিবার পর শিবরাত্রির দিবস
তাহারা অবিকল শিবলিঙ্গের আকার বিশিষ্ট একটী পর্বতের
নিকট উপস্থিত হইয়া, তদুপরি একটা স্বর্ণময়ী পুরী দর্শন
করিলেন। এই পর্বতের গাত্রস্থিত একটী প্রকাণ্ড গোঁফার
মধ্যে তাহার বহু প্রাচীন ঋষি মুনিদের এক অপূর্ব সমাবেশ
দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। এই দুইজন সঙ্গীর মধ্যে একজন
ছিলেন গােরক্ষপুরের সুবিখ্যাত সিদ্ধ মহাপুরুষ গম্ভীরনাথজী।
তিনি বলিয়াছিলেন, “কিছুদিন গমন করিয়া পথের সম্মুখে
এক প্রকাণ্ড পর্বত পাইলাম, আর পথ নাই। সেই পথ
ঐ স্থানে শেষ। সম্মুখে পাহাড়ের নিকট গিয়া দেখিলাম যে
এক প্রকাণ্ড পাথরের দরজা। দুইদিকে দুই ঘণ্টা রহিয়াছে।
ভিতরে যতদূর দেখা যায়, দেখিবে অসংখ্য তপস্বী। কেহ
দীর্ঘকায়, কেহ শীর্ণকায়। কাহারও কেশসমূহ শুভ্র, কাহারও
দীর্ঘ শ্মশ্র। শরীরের রং কাহারও কৃষ্ণবণ, কাহারও
শ্বেতবর্ণ। কেহ হােম করিতেছেন, কেহ যােগ করিতেছেন,
কেহ ভজন সঙ্গীত গাইতেছেন, ইত্যাদি। সেই দ্বার রক্ষককে
জিজ্ঞাসা করিলাম—“দেব, এই কোন্ ধাম ?”
তিনি
বলিলেন “হরগৌরী ধাম। অদূরে ঐ মন্দির দেখিতেছ,
ঐ স্থানে হরগৌরী বিরাজ করিতেছেন। ইহাই কৈলাসপুরী।
[ ৩৮ ]
# ঐবিজয়কৃষ্ণ
সন্ধ্যার সময় পুরীর দ্বার উদ্ঘাটিত হইল। মহাপুরুষগণ
অভ্যন্তরে প্রবেশ পূৰ্ব্বক পুরীর অপূর্ব শােভা দর্শন করিয়া
মােহিত হইলেন। অতঃপর একস্থানে
একস্থানে গােস্বামি-বন্ধুকে
দেখিয়া তদীয় সহযাত্রী বিস্মিত হইলেন। “কি উপায়ে
তিনি তাহাদের পূর্বেই কৈলাস-পুরীতে উপস্থিত
হইতে সক্ষম হইয়াছেন।” এই কথা জিজ্ঞাসা করাতে,
গােস্বামী প্রভু উত্তর করিলেন যে, তিনি শারীরিক অপটুতা-
প্রযুক্ত অগ্রসর হইতে অক্ষম হইয়া ক্ষুন্ন মনে অবস্থান
করিতেছিলেন, এমন সময় দয়ার সাগর ভগবান্ আশুতােষ
দয়া করিয়া তাহাকে
সূক্ষম
শরীরে এইস্থানে আনয়ন করিয়া-
ছেন, এবং তাহার স্থূল শরীর পর্বতের নিয়ে অবস্থিত একটী
মন্দিরে রক্ষিত হইতেছে। অনন্তর মহাপুরুষগণ দেখিতে
পাইলেন, একটী মন্দিরের মধ্যস্থলে একখানি বিচিত্র হিরন্ময়
সিংহাসনে যােগেশ্বর মহাদেব, যােগমায়া পার্বতী দেবীকে
অঙ্কে ধারণপূর্বক উপবিষ্ট আছেন। জগতের আদি পিতা-
মতাকে স্বচক্ষে দর্শন করিয়া মহাপুরুষগণ আনন্দাশ্রু বিসর্জন
পূর্বক, ভক্তিগদগদচিত্তে নানাপ্রকার স্তব পাঠ করিয়া
তাহাদের অর্চনা করিতে লাগিলেন। এইভাবে শিবরাত্রি
অতীত হইয়া গেল। প্রত্যুষে ভগবান্ মহাদেব ও ভগবতী
পার্বতী দেবী মহাপুরুষদিগকে শুভাশীৰ্বাদ পূৰ্বক, গােস্বামী
প্রভুকে পুনরায় পর্বতের নিম্নভাগে অবস্থিত স্বীয় স্থূলদেহে
[ ৩৯ ]
• বিজয়কৃষ্ণ ৫ প্রবিষ্ট করাইয়া দিয়া অপ্রাকৃত কৈলাস ধামে গমন করিলেন।” ( ৬ ) গােস্বামী মহাশয় পুরীধামে আগমন করিয়া প্রথমতঃ সমুদয় দর্শনীয় স্থানগুলি পরিদর্শন করেন। এখানে আসিয়া তিনি তাহার শিষ্যদিগকে কয়েকটি নিয়ম প্রতিপালন করিয়া চলিতে উপদেশ দিয়াছিলেন। এই স্থানে সুস্থ শরীরে থাকিতে হইলে প্রত্যহ যথেষ্ট পরিমাণে তৈল মাখিয়া স্নান করা উচিত, পুরাতন তেঁতুল সহযােগে কিঞ্চিৎ পাকালপ্রসাদ ভােজন করা উচিত, এবং প্রখর রৌদ্রের সময়ে ভ্রমণ বন্ধ করা নিতান্ত প্রয়ােজন।” গােস্বামী মহাশয় যখন যে স্থানে অবস্থান করিতেন, সেখানেই তাহার আশ্রমে প্রত্যহই পাঠ, পূজা, কীৰ্ত্তন, ধৰ্ম্ম- লােচনা, অতিথিসেবা, ভিক্ষারীদিগকে ভিক্ষাদান, পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ ইত্যাদিকে তাহাদের আহাৰ্য্য ও বৃক্ষলতাদিগকে অতি সুন্দররূপে জলদান ইত্যাদি কার্যের ব্যবস্থা করিতেন। একদিনও এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয় নাই। পুরীধামে আসিয়া তিনি যে কয়টি কাৰ্য করিয়া সর্ব- সাধারণের কল্যাণ করিয়া গিয়াছেন, এখানে এখানে তাহার কয়েকটির উল্লেখ করিলাম। (১) এ সময়ে পুরীতে বানর বধ করিবার জন্য তথাকার [ ৪ ]
* শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ,
মিউনিসিপালিটির কর্তৃপক্ষ আদেশ করিয়াছিলেন। তাহার
প্রতিরােধ। (২) জগন্নাথ দেবের মন্দির সংলগ্ন পায়-
খানার উচ্ছেদ সাধন। (৩) দান যজ্ঞ।
পুরীধামে বানরের অত্যধিক উৎপাত হওয়ায় স্থানীয়
মিউনিসিপালিটির কর্তৃপক্ষগণ বন্দুকের সাহায্যে তাহাদিগকে
বধ করিতে আরম্ভ করেন। পুরীবাসীর এইরূপ ভয়ানক
নিষ্ঠুর ব্যবহারে, গােস্বামী-প্রভু এতদূর মর্মাহত হইয়াছিলেন
যে, তিনি অনেক সময়ে বালকের ন্যায় ক্রন্দন করিতেন এবং
একদিন ইহার প্রতিবিধান কল্পে জগন্নাথ বল্লভ উদ্যানস্থিত
মহাবীরের মন্দিরে যথাসাধ্য ভােগ মানস করিয়াছিলেন।
সমধিক আশ্চর্যের বিষয় এই যে, মর্কটদিগের প্রতি গােস্বামী-
প্রভু ও তদীয় শিষ্যবর্গের সহানুভূতির বিষয়, জানি না কি
প্রভাবে অবগত হইয়া, তাহারা দলে দলে গােস্বামী-প্রভুর
বাসভবনে আগমন করতঃ বিবিধ প্রকার হাবভাব দ্বারা
তাদের ঘাের বিপদের কথা প্রকাশ করিত; এবং একদিবস
বড়দও নামক রাস্তায় জনৈক শীকারীকে দেখিয়া একটি বানর
দৌড়িয়া আসিয়া গােস্বামী-প্রভুর একজন শিষ্যের পদধারণ
পূর্বক ইঙ্গিত দ্বারা তাহার আসন্ন বিপদের কথা জ্ঞাপন
করিয়াছিল। অতঃপর শীকারীর সন্ধান পাইলেই বানরগণ
সন্তান সন্ততিসহ গােস্বামী-প্রভুর আলয়ে উপস্থিত হইত এবং
তিনিও তাহাদিগকে অতিশয় আদরের সহিত আম, কলা
[ ৪১ ]
;
* শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
ইত্যাদি উপাদেয় দ্রব্য সকল খাইতে দিতেন। বানরগণও
নির্ভয়চিত্তে তাহার আসনের নিকটে বসিয়া আহার করিত।
অতঃপর গােস্বামী প্রভুর আদেশে শিষ্যগণ বানরবধের
বিরুদ্ধে শাস্ত্রযুক্তির সহায়তায় প্রকাশ্য পত্রিকায় তীব্র
আন্দোলন করিতে থাকিলে, তদানীন্তন সহৃদয় ঘােটলাট
সারজন্ উডবরণ সাহেব বানরবধ রহিত করিয়া দেন।
বানরবধের অবৈধতা ও অশাস্ত্রীয় বিষয়ক ব্যবস্থা পত্রে,
কলিকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহামহােপাধ্যায়
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এম, এ, রিপণ কলেজের অধ্যক্ষ স্বর্গীয়
কৃষ্ণকমল ভট্টাচাৰ্য, কটক কলেজের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় নীলকণ্ঠ
মজুমদার এম, এ, বেঙ্গল গৰ্ণমেন্টের লাইব্রেরিয়ান শ্রদ্ধেয়
রাজেন্দ্রনাথ শাস্ত্রী এম, এ, মহামহােপাধ্যায় চন্দ্রকান্ত
তর্কালঙ্কার, পূজ্যপাদ জীবানন্দ বিদ্যাসাগর প্রভৃতি বঙ্গ,
উৎকল ও বারাণসী-বাসী প্রায় ৫০ ৬০ জন প্রধান প্রধান
পণ্ডিত স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিয়াছিলেন। মর্কটবধ বন্ধ
হইলে, গােস্বামী-প্রভু পূর্বোক্ত মহাবীর ঠাকুরকে যোড়-
শােপচারে পূজা প্রদান করিয়াছিলেন।
স্থানীয় মিউনিসিপালিটি, মন্দিরের সেবকদিগের
সুবিধার জন্য মন্দিরের প্রাচীরের সহিত সংলগ্ন একটি
পায়খানা প্রস্তুত করেন। ইহাতে গােস্বামী-প্রভু আপত্তি
উত্থাপিত করিয়া বলেন যে, শাস্ত্রমতে প্রাচীরাদি সমন্বিত
[ ৪২ ।
এ বিজয়কৃষ্ণ ,
সমগ্র মন্দিরটীই ভগবানের দেহস্বরূপ
এবং তন্মধ্যস্থিত।
বিগ্রহ ঐ দেহের আত্মস্বরূপ; সুতরাং শাস্ত্রমতে কিছুতেই
মন্দিরের গাত্রে পায়খানা প্রস্তুত করা যাইতে পারে না।
অতঃপর তদীয় শিষ্যবর্গ ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এই বিষয়ে তুমুল
আন্দোলন উপস্থিত করিলে, পূর্বোক্ত মহামতি উড়বরণ
সাহেবের আদেশে মিউনিসিপালিটির কর্তৃপক্ষ পায়খানা
ভগ্ন করিয়া ফেলেন।
গােস্বামী-প্রভুর তৃতীয় কাৰ্য্য
দান-যজ্ঞ। তিনি
পুরীতে পদার্পণ করিয়াই যে দান সত্ৰ খুলিয়াছিলেন, তাহা
ক্রমশঃ বর্ধিত হইয়া একটি বিরাট দানসাগরে পরিণত
হইয়াছিল। এই দান ব্যাপারে পাত্রপাত্র বিচার ছিল না,
জাতিবর্ণ বিচার ছিল না, সাধু অসাধু বিচার ছিল না; যিনি
যে অভাব জ্ঞাপন করিয়াছেন, তাহার তাহাই মােচন করা
হইয়াছে। কেহ আসিয়া বলিলেন, অর্থাভাবে তাহার পুত্রের
উপনয়ন কাৰ্য্য সমাধা হইতেছে না, দাও উহাকে ১০ টাকা;
কেহ বলিলেন, তাহার ঘর মেরামত করিতে পারিতেছে না,
দাও উহাকে ২০ টাকা ; কেহ বলিলেন, তাহার দেশে
যাইবার রেলভাড়া জুটিতেছে না ; দাও যাহা প্রয়ােজন।
ভাণ্ডারে একটি পয়সা থাকিতেও দিবানিশি এই ভাবেই দান
কাৰ্য্য চলিয়াছিল। টাকার অভাব হইলে ঋণ করিয়াও দান
করা হইয়াছে। এতদ্ভিন্ন ইমর মঠে দুই হাজার ব্রাহ্মণকে
[ ৪৩ ]
;
;
# শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ
বস্ত্রদান, বড় আখড়ায় চারি সম্প্রদায়ের প্রায় ৫ হাজার
সাধুদিগকে ভােজন ও তাহাদের প্রত্যেককে একটি করিয়া
লােটা ও ৮ হস্ত পরিমিত বস্ত্র দান, বড়দণ্ডের প্রায়
এক হাজার কাঙ্গালীকে সর্বোৎকৃষ্ট মহাপ্রসাদ দ্বারা ভোজন
এবং বহু পূজারী পাণ্ডাকে গরদের বস্ত্র প্রভৃতি প্রদান,
গােস্বামী-প্রভুর দান-যজ্ঞের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
বড় আখড়ার চারি সম্প্রদায়ের সাধু সেবার দিবস
জনৈক প্রসাদ বহনকারী মুটে এক আটিকা (ভাড়) কাণিক।
( মিষ্ট পলান্ন ) প্রসাদ অপহরণ করিয়াছিল। ঘটনাটি
গােস্বামী-প্রভুর কর্ণগোচর হইলে, তিনি লােকটিকে ডাকিয়া
পাঠাইলেন। তখন কেহ কেহ ভাবিয়াছিলেন যে গােস্বামী-
প্রভু ঐ ব্যক্তিকে পুলিশের হস্তে অৰ্পণ করিবেন, অন্ততঃ পক্ষে
তীব্র ভৎসনা করিবেন। কিন্তু ঐ ব্যক্তি নিকটে উপস্থিত
হইলে তিনি তাহাকে আরও চারি আটিকা প্রসাদ প্রদান
পূর্বক বলিলেন—“প্রসাদ বিতরণ করিবার জন্যই আনা
হইয়াছে। তােমরাও উহা আহার করিবার জন্যই লইয়াছ,
এক অটিকায় কি হইবে? আরও চারি আটিকা লও,
এবং ঘরে গিয়া দশ জনে মিলিয়া আনন্দ করিয়া খাও।”
সাধু সেবার জন্য আনীত দ্রব্যের অপহরণকারীর প্রতি
গাে হমী-প্রভুর এইরূপ ব্যবহার দেখিয়া উপস্থিত সকলে
একেবারে বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইয়া গেলেন।
[ ৪৪ ]
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ৫ তাহার এই অপূর্ব দান ব্যাপারে তিন মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় হইয়াছিল। পুরীতে আসিবার পর হইতে তাহার অসাধারণ ভক্তি, ক্ষমতা ও শিষ্য-সংখ্যা ও প্রভাব দেখিতে পাইয়া একদল লোক তাহার শত্রু হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। নানারূপে তাহারা তাহার শত্রুতা করিত। গােস্বামী মহাশয় জগন্নাথ ধামে মহাপ্রসাদ ব্যতীত আর কিছুই গ্রহণ করিতেন না এবং কেহ মহাপ্রসাদ বলিয়া কিছু প্রদান করিলে, তাহা প্রত্যাখ্যান করিতেন না। তাহার মহাপ্রসাদের প্রতি এইরূপ অসাধারণ শ্রদ্ধা জানিয়া একবার একজন সাধু-বেশধারী খল প্রকৃতির লােক তীব্র বিষ মিশ্রিত একটী লাড়ু, তাহার হস্তে প্রদান পূর্বক তাহা প্রাপ্তি- মাত্র তােজনের জন্য নির্বন্ধাতিশয়ে অনুরােধ করিতে লাগিল। সে দিন কোন সেবকই সে স্থানে উপস্থিত ছিল না। তিনি প্রসাদের ন্যায় মহাপ্রসাদরূপে সেই লাডড ভক্ষণ করিলেন। তীব্র হলাহলের ক্রিয়া তাহার দেহে প্রকাশিত হইল, তিনি ক্ষণকালের মধ্যে অচেতন হইয়া পড়িলেন। কিন্তু নীলকণ্ঠ মহাদেব লােকনাথ প্রভুর কৃপাতে অত্যল্পকালের মধ্যে পুনঃ সংজ্ঞা প্রাপ্ত হইলেন। বিষের শক্তি হ্রাস পাইল, যেন কিছুই হয় নাই তেমনি ভাবে পুনরায় পাঠ, পূজা, কীৰ্ত্তন ইত্যাদি নিত্য নৈমিত্তিক কাৰ্য চলিতে লাগিল। শিষ্যগণ তাহার এইরূপ আকস্মিক পীড়ার বিষয় [ ৪৫, ]
• শ্রীশ্রীবিজয়কৃষ্ণ
অবগত হইয়া কারণ অনুসন্ধান করিলে, তিনি বলিয়াছিলেন
“ইহা এক বিষম ষড়যন্ত্রের ফলা। প্রায় পঁচিশ জন ব্যক্তি
ইহাতে সংশ্লিষ্ট। শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেব আমাকে ঐ সকল লােক
দেখাইয়া দিয়াছেন। আমাদের পুরী আগমনের পর ঐ
সকল লােকের প্রতিষ্ঠা ও স্বার্থের ব্যাঘাত হইয়াছে বলিয়া
ইহারা এইরূপ অমানুষিক কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছে।”
কোন কোন স্থানীয় উচ্চ রাজকর্মচারী এ বিষয়টি
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে জানাইবার জন্য অনুরােধ করায় তিনি
বলিয়াছিলেন, “আমি শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের আশ্রয়ে বাস
করিতেছি। তিনি সমস্ত দেখিয়াছেন, ইচ্ছা হইলে তিনিই
প্রতিবিধান করিবেন, নতুবা লােকের নিকটে আমি কোনরূপ
প্রতিকারের ইচ্ছা জ্ঞাপন করিব না।”
তাহার শিষ্যগণ এইরূপ শত্রু-পরিবেষ্টিত ভাবে না
থাকিয়া কলিকাতা যাইবার জন্য অনুরােধ করিলে, তিনি
বলিয়াছিলেন, “তােরা এত ভাবছিস্ কেন ? স্বয়ং
জগন্নাথ দেব তিনবার আমার খবর নিচ্ছেন। ইনি স্বয়ং
বিশ্বেশ্বর, আমার ভয় কি ? অন্যস্থানে গেলে কি ত্রাণ
পাইব? একটা কাঁটা ফুটিলেও তো মৃত্যু হইতে পারে।
আর তঁাহার ইচ্ছা না হইলে ধরিয়া আছড়াইলেও কিছু
হইবার জো নাই। অন্যদিকে তােমরা তাকাও কেন?
যাইবার ইচ্ছা হইলে তোমরা চলিয়া যাও। আমি কেবল
[ ৪৬ ]
• বিজয়কৃষ্ণ ৫
}
মাত্র লাঠিগাছা অবলম্বন করিয়া পড়িয়া থাকিব। তাহার
ইচ্ছা ভিন্ন কদাচ কিছু করিব না। এখানে আমি যে
উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছিলাম, তাহা সিদ্ধ হইয়াছে। এই
স্থানে আমার আর কোন কৰ্ম্ম নাই। এখন আদেশ হইলেই
যাইতে পারি। কিন্তু এক কপর্দক ঋণ থাকিতেও নড়িব না।
এই কথা শুনিয়া শিষ্যগণ শীঘ্র শীঘ্র ঋণ শােধের ব্যবস্থা
করিতে লাগিলেন। এই সময়ে তাহার শরীর একবারে ভাঙ্গিয়া
গিয়াছিল। উঠিতে, বসিতে, হাঁটিতে চলিতে, সর্বদা তাহাকে
অপরের সাহায্য গ্রহণ করিতে হইত ; তথাপি একটি দিনের
জন্যও, তাহার পাঠ, পূজা, কীৰ্ত্তন, শাস্ত্রালােচনা প্রভৃতি
নিত্য-নৈমিত্তিক কার্যের ব্যতিক্রম হয় নাই। গােস্বামী-প্রভু
শেষ-জীবনে বহু বৎসর পর্যন্ত একেবারই নিদ্রা যান নাই,
সমস্ত রাত্রি আসনে বসিয়া ভগবৎধ্যানে অতিবাহিত করিতেন,
কখনও বা জাগ্রত শিষ্যগণের সহিত নানাবিধ ধর্মালােচনা
করিতেন। বর্তমানে ঈদৃশ ভগ্ন শরীর লইয়াও তিনি এই
কঠোর নিয়ম প্রতিপালন করিতেছেন দেখিয়া তাহার স্নেহশীল।
শ্ব ঠাকুরাণী একদিন বলিলেন, “তুমি এখন কিছুদিন শয়ন
করিলেও ত পার।” তদুত্তরে গােস্বামী প্রভু বলিলেন,
“আমি যে দিন শয়ন করিব, সে দিন আর থাকিব না, যে দিন
আসন ত্যাগ করিব সেদিন আমি থাকিব না।”
ঠাকুরাণী এই কথা শুনিয়া নিরুত্তর হইয়া রহিলেন।
[ ৪৭ ]
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ , একদিবস তিনি কয়েক জন শিষের নিকট বলিলেন- “দেখ, তােম'দের সম্মুখে বর্ষাকাল উপস্থিত।” আর একদিবস বলিলেন “দেখ, মাতাঠাকুরাণীর কথাই বুঝি বা সত্য হয়।” (তাহার মাতৃদেবী কোন সময় শিষদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন যে, “বিজয় পুরী গেলে আর ফিরিবে না।”) আর এক দিবস তিনি ধ্যানাবস্থায় হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন “অন্তে গঙ্গা নারায়ণ ব্রহ্ম” “গঙ্গা নারায়ণ ব্রহ্ম।” একজন শিষ্য জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি এ কথা বলিলেন কেন?” তিনি হাসিয়া উত্তর করিলেন “আমার অন্তর্জলী হইল, দেবতারা আমার অন্তর্ডলী করিলেন।” এই সময়ে তিনি সাধারণতঃ নিম্নলিখিত গান কয়টী শুনিতে ভালবাসিতেন। বাহার মিশ্র—তেও। লম্পট নিরদয়, হরি দয়াময় বলে তােমায় কোন্ গুণে। ও কেউ চন্দনদানে বলে রাজ-সিংহাসনে, আমরা প্রাণদানেও স্থান পেলেম না চরণে। ছিল প্রবীণে, হলাে নবীনে, হায়গো সে যে তােমা বিনে, যেমন শ্রীরাম বিনে জানকী অসুখী অশােক বনে। হ’ল রাজকন্যা বনবাসী, দাসী হয় রাজমহিষী হরি সকলই তােমারই কৃপায় ; তুমি যারে না রাখ পায়, তার বিপদ ঘটে পায় পায়, [ ৪৮ ]
• শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ ৫
(আর) তুমি যারে রাখ পায় সে সকলই পায়,
লজ্জা পায় হে হরি, তােমার পায় ধরা দিন প’লে মনে।
খাম্বাজ-মধ্যমান।
দীনবন্ধু হে, দিন যাবে রবে না।
দিন যাবে সুখে না হয় দুঃখে, রবে কেবল ঘােষণা
(লােকে বলে) তুমি দয়াময় দীনবন্ধু, প্রেমময় প্রেমসিন্ধু,
ওহে করুণার সিন্ধু একবিন্দু দানে শুকাবে না।
তুমি বাম করে ধরলে শৈল, সে ভারত তােমার সৈ’ল,
(এই) ত্রিজগতের ভার সৈ’ল (বুঝি ) অধমের ভার
সৈ’ল না।
এক দিবস গােস্বামী-প্রভু শিষ্যদিগকে সম্বােধন করিয়া
কহিলেন—“আজ হইতে স্বয়ং জগন্নাথদেব তােমাদের ভার
গ্রহণ করিয়াছেন। আমি বলিতেছি, আমার কথা বিশ্বাস
কর, নিশ্চয়ই তােমাদের শান্তি আসিবে, কিন্তু সময় সাপেক্ষ।”
এই কথা বলিয়া তিনি উর্দ্ধে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন—
“এই যে! এখানে জগন্নাথদেব উপস্থিত। এসব কথা আমি
বলিতেছি না, তিনিই আমার মুখ দিয়া বলাইতেছেন।” ইহাই
তাহার শিষ্যদের প্রতি শেষ উপদেশ বাণী। ১৩০৬ সনের
২১ জ্যৈষ্ঠ তারিখ তাহার সমুদায় ঋণ পরিশােধ হইয়া গেল।
ঋণ শােধ হইলে শিষ্যগণ তাহাকে লইয়া কলিকাতা যাইবার
( ৪৯ ]
৪
• শ্ৰীশ্ৰীবিজয়কৃষ্ণ , উদ্যোগ করিতে লাগিলেন, কিন্তু এদিকে যে তিনি লীলাবসান করিতে সঙ্কল্প করিয়াছেন, সে কথা শিষ্যেরা কেহই বুঝিতে পারেন নাই। ২২শে জ্যৈষ্ঠ পূর্বাহ্নে প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া তিনি এতদূর অবসন্ন হইয়া পড়িলেন যে, স্বীয় আসনে গিয়া উপবেশন করিতে সমর্থ হইলেন না। একেবারে শয়ন করিয়া পড়িলেন এবং কিয়ৎকাল পরে সমাধিস্থ হইলেন। শিষ্যদের মুখে বিপদের চিহ্ন দেখা দিল। পরদিন চক্ষু উন্মীলন করিয়া উচ্চৈঃস্বর তাহার জামাতা শ্ৰীযুক্ত জগদ্বন্ধু মৈত্র মহাশয়কে ডাকিয়া কহিলেন, “আজ আমার শরীর বড় খারাপ, তুমি নিকটে থাকিও।” আসনে গিয়া আর উপবেশন করিলেন না। পূবে এক দিবস তিনি স্বীয় শশ্রুঠাকুরাণীর নিকট “যেদিন আসন ছাড়িব, সেদিন আর আমি থাকিব না” ইত্যাদি যাহা বলিয়াছিলেন, দৈব দুর্বিপাকবশতঃ তাহা কাহারও স্মৃতিপথে উদিত হইল না। সে যাহা হউক, সমস্ত দিন পরে গােস্বামী-প্রভুকে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলিতে দেখিয়া শিষ্যদিগের মনে আশার সঞ্চার হইল। শ্রদ্ধেয় জগদ্বন্ধু বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন--“আপনার এখন কি অসুখ বােধ হই- তেছে ?” গােস্বামী-প্রভু উত্তর করিলেন—“দুর্বলতা ভিন্ন আমার আর কোন অসুখ নাই।” এই সময়ে তিনি কিছু ছানা ও ডাবের জল পান করিলেন। [ ৫০ ।
• বিজয়কৃষ্ণ •
গােস্বামী-প্রভুর অন্যতম শিষ্য শ্রদ্ধেয় কিশােরী লাল
সেন মহাশয় (অবসর প্রাপ্ত সবরডিনেট জজ) তথায় উপস্থিত
ছিলেন। স্বহস্তে চা প্রস্তুত করিয়া গোস্বামী প্রভুকে পান
করাইতে, অনেকদিন হইতেই তাহার অন্তরে একটি বাসনা
ছিল। তিনি গােস্বামী-প্রভুকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“আপনার
চা পান করিবার অভ্যাস। সমস্তদিন চা খান নাই, কিছু চা
খাইবেন কি ?” গােস্বামী-প্রভু উত্তর করিলেন “আচ্ছা,
ভাল করে, খুব ঘন করে প্রস্তুত করে নিয়ে এস।” এই
আদেশ প্রাপ্ত হইয়া শ্রদ্ধেয় কিশােরী বাবু তাড়াতাড়ি চা
প্রস্তুত করিয়া আনিলেন। গােস্বামী-প্রভুর অন্যতম সেবক
শ্ৰীযুক্ত সরল নাথ গুহ মহাশয় চায়ের পাত্রটী সম্মুখে ধরিয়া
রাখিলেন এবং গােস্বামী-প্রভু স্বহস্তে ছােট একটি পাথরের
বাটিতে করিয়া চা পান করিতে লাগিলেন। এই প্রকারে
চা পান করিতে করিতে গােস্বামী প্রভু ক্ষণকাল ঊর্ধে দৃষ্টি
করতঃ মস্তক নত করিয়া কাহাকে যেন প্রণাম করিলেন,
এবং তমুহূর্তে উপবিষ্ট অবস্থাতেই ভগ্নদেহের সঙ্গে তাহার
অমর আত্মার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হইয়া গেল। (১৩০৬ সন,
২২শে জ্যৈষ্ঠ, রবিবার সায়াহ্ন, ৯ ঘটিকা ২০ মিনিট, কৃষ্ণা-
দ্বাদশী তিথি।)”
গােস্বামী মহাশয়ের আদেশ অনুসারে তাহার পবিত্র
দেহ সমাধিস্থ করিবার ব্যবস্থা হইল। অতি অল্প সময়ের
[ ৫১ ]
ক্ষু শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ৫
;
মধ্যে নরেন্দ্র সরােবরের উত্তর তীরের বিস্তীর্ণ স্থানটি ক্রয়
করিয়া মহাসমারােহে শিষ্যগণ কীৰ্ত্তন করিয়া সমাধিস্থ
করিলেন। একদিন বিজয়কৃষ্ণ সরােবরের অপর পারে
দাড়াইয়া বলিয়াছিলেন—“ওপারে স্বর্ণমণ্ডিত একটী মন্দির
চূড়া দৃষ্ট হইতেছে।”
তাহার সেই ভবিষ্যদ্বাণী সফল
হইয়াছে ; এখন সেখানে একটী মনােহর সমাধি মন্দির সংস্থা-
পিত হইয়াছে।
এই মহাপ্রাণ মহাসাধক একদিকে যেমন প্রেম-রাজ্য
সংস্থাপক ছিলেন, তেমনি তিনি এই দেশকে প্রাণাপেক্ষ।
ভালবাসিতেন। একবার কোন দেশপ্রাণ ব্যক্তি ভারতবর্ষের
ভবিষ্যৎ উন্নতির বিষয়ে প্রশ্ন করায় তিনি গদ্ গদ্ কণ্ঠে
বলিয়াছিলেন,-“ভারতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল—আমি দেখিয়াছি
মহাতপা সাধকগণ ভারতের কল্যাণ কামনায় ঈশ্বরের নিকট
প্রার্থনা করিতেছেন।
গোস্বামী মহাশয়ের কীৰ্ত্তনের সহিত নৃত্য ছিল এক
অপূর্ব জিনিষ। সে নৃত্য যিনি না দেখিয়াছেন, তিনি
কল্পনায়ও অনুভব করিতে পারিবেন না। তাঁর দেহত্যাগের
পূর্বে পুরীধামে কীৰ্ত্তন হইতেছিল, সে কীৰ্ত্তনে গায়ক
ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ ভক্ত শ্ৰীযুক্ত রেবতীমােহন সেন মহাশয়,
তিনি গাহিতেছিলেন,
[ ৫২ ]
* শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ ৫
গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর,
হরি হরি বলিতে নয়নে বহে নীর
আর কবে নিতাই চঁাদ করুণা করিবে,
সংসার বাসনা মাের কবে তুচ্ছ হবে।
বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন,
কবে হাম রহব সাে বৃন্দাবন।
রূপ রঘুনাথ বলি হইব আকুতি,
আর কবে বুঝব যুগল পীরিতি ।
রূপ রঘুনাথ পদে রহে মাের আশ,
প্রার্থনা করয়ে সদা নরােত্তম দাস।
গোঁসাই প্রভু এই গান শুনিয়া নৃত্য করিতে করিতে তাহার
বহির্বসনের এক টুকরা রেবতীমােহনকে দান করিলেন, এবং
আনন্দে চীৎকার করিয়া বলিলেন-“জগন্নাথদেব আমাকে
বলিতেছেন, এই কীৰ্ত্তন-গায়ককে একখানা লুই কিনিয়া
দাও।” ভক্ত সরলনাথ তন্মুহুর্তে গোসাইর আদেশ প্রতি-
পালন করিলেন।
ভারতবর্ষের যে স্থানে যখন তিনি গমন করিয়াছেন, তখনই
সেস্থানে মহাপুরুষগণ তাহাকে সমাদরে গ্রহণ করিয়াছেন।
‘ইনি আমার প্রাণ ; কেহ বলিতেন—“সাক্ষাৎ মহাদেব”,কেহ
বলিতেন—“সাক্ষাৎ বিষ্ণু”—এমনি ভাবে তাঁহাকে সকলে
আরতি করিতেন। এমন বিনয়ের অবতার, দয়ার অবতার,
[ ৫৩ ]
• শ্ৰীশ্ৰবিজয়কৃষ্ণ এঁ সর্বজীবে সমভাব-অতি অল্প মহাপুরুষের মধ্যেই সমভাবে দেখিতে পাওয়া যায়। গােস্বামী প্রভুর অপূর্ব কান্তি ও ধ্যানপ্ৰভা মণ্ডিত অপূৰ্ব মুখশ্রী যিনি জীবনে কখনও দেখি- বার সুযােগ লাভ করিয়াছেন, তিনিই তাহার শিষ্যগণের সহিত সমস্বরে বলিতে বাধ্য হইবেন- পরজ মিশ্র-ঝাপতাল। অপরূপ শ্রীগুরুরূপ, হৃদয়ে সদা ভাবনারে। ভবন বন সমান হবে মন-ভয় আর রবে না রে। তরুণ রবি-কিরণ দুটী চরণ পাশে পরকাশে, ধন্য সে জন ও চরণ (যা’র) হৃদি-সরসে সদা ভাসে, কোটী জন্মের পাপ না, ও রাঙ্গা পদ-পরশে, মজ ও পদে মন ভৃঙ্গ আনুসঙ্গ ছাড় না রে ॥ কটিতে ঝাপি কৌপীন বহিৰসন শােভে সুন্দর, দণ্ড কমণ্ডলু করে শোভে কিবা মনােহর, (জিনি) মদমত্ত কুঞ্জর গমন কি মন্থর, মধুর হাস, মধুর ভাষ, মধুমাখা সব ব্যবহারে। সুবিশাল বক্ষে শােভে সপ্ত-লহরী-মা, উর্ধ তিলক-রেখা ভালে কিবা শােভে ভাল, মৌলী-রচিতচূড়া—যেন শ্যামের মােহন চূড়া, কিম্বা ফণি-ফণা যেন ধরে গঙ্গাধর-শিরে । [ ৫৪ ]
• এবিজয়কৃষ্ণ *
পৃষ্ঠে দোলে বেণী – যেন ভানু রাজনন্দিনী,
প্রেমনীরে ভাসে সদা শ্রীমুখ কমলখানি,
আনন্দময় সব, অনিন্দ-রস-খনি,
মগন দিবা-রজনী কিৰা আনন্দ-সায়রে ।
গোঁসাই প্রভুর ইহাই কীৰ্ত্তনে শেষ নৃত্য।
সমাপ্ত
{ ৫৫ ]
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.