Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Phoolhar
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ফুলহাৱEA
@
voc০০
၁၀၊
শ্রীমতী শিখৱবাসিনী দেবী।
প্রকাশক- শ্ৰীঅমিয় কুমার ট্টোপাধ্যায় । ডাষ্টিকণার ১১ নং ঘােষাল ৮ট, বালিগঞ্জ, কলকাতা। মূল্য ১০ পাঁচ সিকা মাত্র। প্রিন্টার ঐফণীভূষণ কুণ্ডু বিশ্বনাথ প্রেস ৭ নং এজরা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
উপহাৰ ।
প্রবাসের দিদিদের কর কমলে—
দিৱিা ?
কৈশােরে প্রবাস বাসে হয়ে আত্ম বন্ধু হীন ,
বিচ্যুতা স্বজন স্নেহে থাকিতাম ফুৰ্ত্তিহীন।
মাতৃস্নেহে সখী রূপে মিটালে প্রাণের তৃষা,
লভিলাম ভগিনীর অনাবিল ভালবাসা।
যে মধুর স্নেহ ঋণে বেঁধেছ আমার প্রাণ,
সাধ্য কিবা আছে দিদি ! দিব তার প্রতিদান ।
ৰাণীর চরণ তলে দিতে পূজা উপচার,
নাহিক শকতি মম, এ নহে সে ফুলহার।
হারায়েছি সে উৎসাহ ষষ্ঠ বর্ষ ব্যাপী রােগে,
ফেলে আসা অতীতের দিনগুলি প্রাণে জাগে,
প্রবাসী ফিরিনু বাসে দ্বাবিংশতি বর্ষ পরে,
তােমাদের স্নেহ প্রীতি দিবা নিশি মনে পড়ে,
কীট জীর্ণ খাতা হতে তাই তুচ্ছ গাথাগুলি,
তােমাদের স্নেহ করে স্মৃতিরূপে দিনু তুলি।
তােমাদের
শিখর
No text on this page.
ܙܙ ܀
ܙ
5
No text on this page.
অশুদ্ধ ৯ AV ভালবাসা ৮ কত ভালবাসা অসতী অসতি ৯৪ আবেগ আবেশ নহি নাহি ব্যপ্ত ate বসতে ১৬ বসন্ত ঝা ঝঙ্কা সানাইয়ে ১৩৮ সানায় যাবে ১৪৩ যাব শানিয়ে আচল সানিয়ে আঁচল ব্যাপি ব্যপি ১৫৮ ১৫৮ আবার বসিবি নীরবিল আর বার বহিৰি নীরবিলা , রূপে রূপ বুনিছে ১৮ রণিছে २७ গৃঢ় বিকাবো দুট বিকাৰে ২৭ মার २१ যার উছল। ৩১ উচ্ছল মাড়বড় মাড়বার বল 3 ০৭ আর মা প্রাকাশিবে আয় না প্রকাশিবে,
অশুদ্ধ
পৃষ্টা
অতসী
কুসুম কলিকা
মুখ খানি
১
অতসী কুসুমা বালিকা
ছােট মুখ খানি
বীণ,
বীন
সবসে
সরসে
৩৮
সুপ্তা
গৃহপাণি
স্তম্ভিত
দ্বিযান
নিজ্য
সুষুপ্তা
গৃহখানি
স্তম্ভিত
দ্বিযাম
৩
sob
নিজ রাজ্যে
নিবেদন।
অনেক দিন আগে প্রবাসের নিরালা অবসরে, সময়
কাটাবার অবলম্বন স্বরূপ যে মালা গেঁথেছিলাম,
কল্পনা করিনি তা আবার ছাপার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ
করূবে, এই দীর্ঘ ১৭ বৎসর পরে যখন সেই কিশাের
কালের একান্ত তুচ্ছ লেখাগুলি ছেড়া খাতার পৃষ্ঠা থেকে
স্নেহময় ভ্রাতা “গােপাল দাদা” নােক চক্ষে প্রকাশ
করলেন, এই অবসরে
তাকেও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা
জানাচ্ছি। তার একার ঐকান্তিক চেষ্টা যত্নেই এগুলি
ছাপা সম্ভব হােল, দীর্ঘ ছয় বৎসর রােগে ভুগে প্রুফ
দেখা পৰ্যন্ত সম্ভব হয় নি, সবই তিনি করেছেন, সেজন্য
তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
“অম্বর মহিষীর” মূল গল্পটি কোন বইতে পড়েই
তাকে রূপ দিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘকাল পরে ঠিক
স্মরণ করূতে ও পারছিনা কোন বই থেকে গল্পটি পেয়ে-
ছিলাম, কাজেই লেখকের অনুমতি নেওয়া সম্ভব হােল
না, এই সঙ্গে সেই অজ্ঞাত লেখকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা
কছি। ইতি
কলিকাতা
১১ ঘােষাল স্ট্রীট, বালিগঞ্জ | শ্রীমতী শিখরবাসিনী দেবী
(ডাষ্টি কর্ণার)
সন ১৩৪৫ সাল।
দতি
কা।
বইখানি সম্বন্ধে আমার দুটি কথা যা বর
আছে, এখানে বলে বােধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে
। গাথাগুলি লেখিকার অল্প বয়সের লেখা।
সাংসারিক নানা কাজের অবসরে তার এই অল্প
বয়সের সাহিত্য চর্চাকে আশা করি সকলেই স্নেহের
চক্ষে দেখবেন। সাহিত্য হিসাবে এর মূল্য কি আছে
কি নেই, তাহা জানি না, নিজে আমি সাহিত্য চর্চা
কর অবসর কখনাে পাই নি, তবু আমার ভাল
লেগেছিল বলেই এ অনধিকার চচ্চ। করূতে সাহসী
হলাম।
বিনীত
গােপাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
সূচীপত্র । বিষয় পৃষ্ঠা ১। বীরাঙ্গনা ২। গান্ধী বন্ধন ৮ ০ ০ ১৬ ৩। কাননে দময়ন্তী ••• •• ২০ ৫। চির প্রতীক্ষায় ২৪ ১৭ কন্যা বিয়ােগে । স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের মহাপ্রয়ান উপলক্ষে ৭। দুঃখিনী .. ৮। উত্তরা ... ৯। রাণী ভবানী ১। সহী ... ১১। অম্বর মহিষী ... ••• ১২। তাজমহল ১১। ১০। বর্ষণে ... ১০। আগ্রা দুর্গ • ১৫। পূজা ১১৮ ১৬। প্রত্যাখ্যান ১৭। বীর ধর্ম ১৮। ভিক্ষা ১৮ ১৯। শােক স্মৃতি ২০। সংযুক্ত ১৩
বিষয়
পৃষ্ঠা
১৩
।
১৪০
:
১৪)
২১। কুতৰ মিনার
২২। শারদীয়া
২৩। অজানা.দেশ
২৪। নিশীথে
২৫। জীবনের পারে
২৬। নিবেদন
২৭। হারা নিধি
২৮। অপূর্ণ
২৯। কে
৩। নব বর্ষের ব্যথা
১৮
•••
•••
১০
৩১। খোকা খুকু
৩২। প্রস
১৮
ফুলহান ।
বীরাঙ্গনা।
জোছনা প্লাবিত ক্ষিতি একদা নিশীথ কালে,
বসিয়া আছেন ভদ্রা আনমনে তরু তলে,
গােলাপ গঞ্জিত গণ্ডে স্থাপিত মৃণাল পাণী,
প্রমােদ কানন মাঝে চিন্তা মগ্ন সুবদনি।
চৌদিকে হেলিয়া আছে নব দ্রুম কিশলয়,
একাকিনী বাস ধনী, স্থিরা সৌদামিনী প্রায়,
মৃদুল সমীর স্পর্শে নাচিছে অলক দাম,
উচ্চারেন প্রেম ভরে মৃদু স্বরে পার্থ নাম।
সহসা যুগল আঁখি আবরিল কোন্ জন্
বিচ্ছিন্ন চিন্তার সুত্ৰ চমকিয়া ভদ্রা কন্
“বুঝিয়াছি ছাড় সখি লুকাতে কি পার আর ;
এমন মধুর স্পর্শ সত্যভামা বিনা কার।
হাসিয়া কেশব প্রিয় কহিলেন পাশে বসি
কার তরে সুভদ্রা লাে জাগিয়া কাটাস নিশি?
গৃহেতে না রহে মন প্রমােদ কাননে তাই,
কোন্ ভাগ্যবান জনে চিন্তিতেছ বল ভাই।
ফুলহাৱ
কিসের অভাৰ স্মরি সজল কমল আঁখি।
সদা হাস্যানন আজ বিমলিন কেন সখি ?
বলিতে বলিতে রাণী আলিঙ্গিলা সুভদ্রায়,
মুখে হাসি চোখে জল রৌদ্রে বারি পাত প্রায়,
যেন স্থিরা ক্ষণপ্রভা বেড়ি স্বর্ণ প্রতিমায়,
মিলিল সোহাগে যেন সিদ্ধি আসি সুষমায়,
উজলিল উপবন সে ছবি ধরিয়া বুকে
সুধাংশু সােনার কর ঢেলে দিল দুটি মুখে।
সত্যভামা বক্ষ পরে রাখিয়া আনতানন,
আধ ফোটা মধু স্বরে মন কথা ভদ্রা কন্
“স্নেহের সাগর মোর সােহাগের শতদল
তাের কাছে মন কথা লুকায়েছি কবে বল্ ?”
যে দিন হেরেছি পার্থে তুমি তাহা জান দেবি !
অর্পিয়াছি সে পদে দেহ মন প্রাণ সবি,
বলিতে বলিতে বালা নীরবিলা লাজ ভরে
ব্ৰীড়ার অরুণ ৰাগ ফুটিল কপােল পরে।
সস্নেহে নিরখি সেই শরদিন্দু নিভাননী,
সাদরে ললাট চুমি কহিলা মাধব রাণী,
“ফলিবে লাে আশালতা শান্ত কর নিজ মন ।
ঘটাৰ অৰ্জ্জুন সনে সুভদ্রার মিলন
অচিরে অর্জুন ভদ্রা সন্মিলন শুভােল্লাসে
হাসিৰে দ্বারকা পুরী সাজি ফুলময়ী বাসে
২
ফুলহাৱ
পাণ্ডবে মিলিত হবে যদুকুল কমলিনী
বসিৰি পার্থের পাশে তুই, প্রেম মন্দাকিনী
“কেন এ বেদনা ভার কেন এ বিষাদ সখি ?
পুরাইব মনােরথ মুছলো সজল আঁখি ”
পুন আলিঙ্গন করি উচ্ছসিত মমতায়,
নীরবিলা স্নেহময়ী সান্ত নিয়া সুভদ্রায়।
( ২ )
সুসজ্জিত কক্ষ মাঝে সুবর্ণ পালঙ্কপরি—
অসিনা অলস তাৰে দ্বারকার অধিশ্বরী ।
সায়াহ্নের শেষ আভা মেলিয়া সােনার কর,
পশিছে গবাক্ষ পথে বিরাম প্রকোষ্ট পর,
অরুণ উজল ৰাস আবরি পেলব তনু,
সমুজ্জল রূপ জ্যোতি নিলি শত শশী ভানু,
খঞ্জন গঞ্জিত আঁখি অনিমেষ দ্বার পথে
কার আগমন আশা জাগিছে অধীর চিতে।
সহসা সুনীল আভা আরঞ্জিল গৃহখানি,
স্ত্রস্ত পদে শয্যা ত্যাজি উঠিলেন নারায়ণী।
পশিলেন গৃহ মাঝে যদু কুল শশধর,
নলিন নীলাজ নেত্র নব শ্যাম কলেবর,
বর্ণিবার নাহি ভাষা সে অতুল্য নীল রূপ,
কোকনদ জিনি পদ নিখিল অমিয় কূপ,
ফুলহার
সপ্রেম সাদরে করি মহিষীরে সম্ভাষণ।
প্রীত মনে শয্যা পরে বসিলেন জনার্দন ।
নীরবে বসিলা সতী অধােমুখে পতি পাসে—
জিজ্ঞাসেন প্রেম ময় প্রণয় স্কুরিত ভাষে
“কেন বা নীরব প্রিয়ে সুর ভরা কণ্ঠ বীণা,
প্রফুল্ল পঙ্কজ মাের কেন হেরি বিমলিনা,
চিন্তার কালিমা কেন নেহারী ললাট পরে।
অমঙ্গল বার্তা কিছু এসেছে কি যদু পূরে?
বলিয়া আদরে সেই আরক্তিম মুখ খানি;
সুবিশাল বক্ষ পরে রক্ষিলেন চিন্তামণি,
নব ঘন নভে যেন শেভিল দামিনী লতা-
অম্লান মুকুতা যেন নীল কান্ত সহযুতা,
নবীন ব্রততী যেন বেড়িল রে বনস্পতি,
সুনীল আকাশে যেন শুকতারা দিল ভাতি,
ক্ষণ পরে ধীরে ধীরে তুলিয়া আনন খানি-
ঈষৎ হসিতাধরে কৃষ্ণ
প্রতি চেয়ে রাণী,
উত্তরিলা মধুস্বরে, আপনি মঙ্গলময়
পতি যার, বল তার অমঙ্গলে কিবা ভয় !
স্নেহ প্রেমে কল্প তরু, ন্যায়, ধৰ্ম্মে অবতার,
তুমি যার অধিপতি অশুভ কি আছে তার ?”
শুনিলাম সুভদ্রার স্বয়ম্বর আয়ােজন,
কি জানি কি ঘটে ভাবি ব্যকুল দাসীর মন,
ফুলহার
স্নেহের সরসী নীরে কনক কমল সম,
মূর্তিমতী পবিত্রতা সরলা সুভদ্রা মম,
দেবের বাঞ্ছিতা বালা পারিজাত অমরার,
মিলিবে কি স্বয়ম্বরে যােগ্য পতি সুভদ্রার,
তাই মম লয় মনে বৃথা এই অনুষ্ঠানে
বেদনা বাজিবে শুধু ভদ্রার কোমল প্রাণে,
বিস্মিত চকিত হয়ে
কহিলেন শূল
পাণী,
“বুঝতে নারিনু প্রিয়ে হেন অর্থ হীন বাণী ;
বেদনা বাজিবে কেন ভগিনী ভদ্রার প্রাণে ?
সুখী বা না হবে কেন মিলিয়া সুপতি সনে ?
আসিবেন স্বয়ম্বরে শ্রেষ্ঠতর রাজ গণ,
মনােমত পতি বালা লভিবেনা কি কারণ ;
হাসিয়া কহেন রাণী “রাজনীতি জান ভাল ,
রমণী হৃদয় নীতি কেমনে বুঝিবে বল,
সিন্ধু বিনা তটিনী কি তড়াগে মিশায় কায়?
রবি প্রিয়া পঙ্কজিনী রাকা শশী নাহি চায়।
বীর সুতা বীর ভগ্নী ৰীরে চায় পূজিবারে,
দিয়াছে হৃদয় বালা ৰীর শ্রেষ্ঠ ফাল্গুনীরে,
মহীরুহ বিনা কোথা মাধবীর সুআশ্রয় ?
নীরবিল সত্যভামা, কক্ষ নীরবতাময়,
কতক্ষণ পরে ধীরে কহিলেন গদাধর
“সত্য প্রিয়ে পার্থ হতে কেবা আছে শ্রেষ্ঠতর,
ফুলহার
ধরাতলে ধৰ্ম্মরাজ্য করিবারে প্রতিষ্ঠিত,
কৌন্তেয় সুভদ্রা সনে হয় যদি সম্মিলিত
ভুবন বিজিত পার্থ সব্যসাচী গুণধাম,
প্রেমের সাগরােপম ভদ্রার কোমল প্রাণ,
এ দোহার সন্মিলনে ধরাতলে অনিবার,
উথলিবে শক্তি সনে শান্তি প্রেম পারাবার
নব যুগে নব ধর্ম প্রচারিতে মহাতলে,
প্রতিষ্ঠিতে ন্যায় সত্য সখা পার্থ বাহুবলে,
পুরাইতে মনােরথ অবতার ধনঞ্জয়,
মম অঙ্গ অংশােদ্ভুত সামান্য মানব নয়,
হের প্রিয়ে জ্ঞান চক্ষে ছিন্ন হােক মােহ পাশ,
পাণ্ডব কেশৰ দেখ এক অঙ্গ অবিনাশ”,
নীরবিল নারায়ণ, সত্রাসিত। সত্যভামা
চাহি পতি মুখ পানে নিশ্চল পুত্তলি সমা—
অকস্মাৎ দিবালােকে পূর্ণ হােল গৃহখাণী,
স্তম্ভিত নিৰ্বাকমুক, সভয়ে হেরিলা রাণী,
নীলােৎপল পতি অঙ্গে মিলিত পাণ্ডবগণ,
নিখিল ব্ৰহ্মাণ্ড সহ দেব দেবী অগণণ,
কমলা সেবেন দুটি রাজীব রাতুল পদ,
চারি করে শােভে শঙ্খ, গদা, চক্র, কোকনদ
যােড় করে শচীপতি গাহিছেন স্তুতি গান,
অনন্ত ওঙ্কার রৰে ধ্বনিছে গভীর তান,
৬
ফুলহাৱ
পদতলে বিলুণ্ঠিত দেব দৈত্য ত্রিভুন,
ও কি দৃশ্য পুনঃ রাণী করিলেন বিলােকন।
কমলার কোমলঙ্গে শােভিত। গােপিনীগণ,
রুক্মিনী ও সত্যভামা সুধাময় বৃন্দাবন,
উথলিছে ক্ষীরসিন্ধু আঘাতিয়া তটভূমি,
সুউত্তাল উৰ্ম্মিপরে শায়িত নিখিল স্বামী।
হেরিলা সভয়ে বামা আবরিলা দুনয়ন,
মহা সুপাবেশে যেন ভরে গেল প্রাণ মন,
সে যে কি গভীর ভয় সে যে কি পুলক মােহ,
অপূৰ্ব আনন্দ ত্রাসে অবশ রাণীর দেহ,
ধীরে ধীরে মায়াজাল ঘুচালেন মায়াময় ;
অভিনব মায়া দৃশ্য মিলাইল ছায়া প্রায় ।
তথাপি বিস্মিত। রাণী আঁখি দুটি শূন্য পানে,
লগ্ন যেন পুনঃ সেই মহা দৃশ্য অন্বেষণে;
কতক্ষণে ধীরে ধীরে স্বপন উর্থিতা প্রায় ;
সম্বিত হইয়া বাম পতি মুখ পানে চায় ;
বুঝিয়া মনেতে তবে অন্তর্যামী নারায়ণ ;
সংসারের মােহে পূর্ণ করিলা রাণীর মন,
দূরে গেল ত্ৰাস পুনঃ লভিয়া সহজ জ্ঞান,
নিমেষে সকল ভুলি পত্নীত্বে পুরিল প্রাণ,
প্রণয় পুলকে দেহে বসিলেন শয্যাপরি,
মােহন শােভায় গেল নিখিল জগৎ ভরি ।
৭
ফুলহার অনন্ত জলধি, গর্জি নিরবধি, উত্তাল নৰ্ত্তনে ধায়। সীমাহীন বেলা তারি পরে খেলা, করে উর্মিমালায়। শােভে এক পুরী, উপকুলে, তারি, হেরি যেন জ্ঞানহয়। অমরা বিজিত, বিশাই রচিত, নন্দন মরতে রয়। শিল্পের চরম, স্তম্ভ মনােরম, মরকত জ্বলে তাহে সর্ব শােভাধার, কাননে তাহার, বিহগ কূজন গাহে। হেন পরী মাঝে, উৎসব সাজে; সজ্জ্বিল কিঙ্করীগণ- হাসিয়া হাসিয়া, হরষে মাতিয়া, করিছে কি আয়ােজন। পুষ্প বিভূষিত, পতাকা শােভিত, প্রাসাদ গেরণ পরে- প্রভাত রাগিনী, বাজিছে পুরবী সুরে । মধুর নিক্কনী, s
ফুলহার
চন্দ্রাতপ নীল,
নীলাম্ব, সলিল,
যেন উপহাসি চায়—
পুষ্প ভারে ভারে,
যতনে বেষ্টিত তায়।
গাঁথি মালাকারে,
তল দেশে তার, সভা সুবিস্তার,
অতুলন শোভা তার
অসংখ্য আসন,
করেছেন অধিকার।
নৃপ শ্রেষ্ঠগণ,
সবে পরস্পরে-
কহে মৃদু স্বরে--
কেবা ভাগ্যবান জন,
ভদ্র। রাজকন্যা,
ত্রিভুবন ধন্যা,
লভিবে নৃপতি কোন্।
রূপে নিরুপমা, গুণে নাহি সীমা,
শ্রেয়সী ষােড়শী বালা–
জানি কাহারে,
অর্পিবে অাদরে,
স্বকরে বরণ মালা।
সহসা অদুরে,
সাহানার সুরে,
বাঁশরী উঠিল বেজে
লয়ে হেম ঝারি,
শত সহচরী,
পশিল সভার মাঝে-
৯
ফুলহার অগ্রে যদুপতি, করিয়া মিনতি, যুড়িয়া যুগল পাণী আনত মস্তকে, কহেন সবাকে, বিনয় মণ্ডিত বাণী। “যদি কৃপ বশে, দানের আবাসে, মিলিত নৃপতি সবে— আতিথ্য স্বীকার, করিয়া আমার, বাধিত করুন তবে।” । নরপতিগণ, প্রীত ভাষে কন, অবধান যদুরাজ। তব শিষ্টাচারে, যােগ্য ব্যবহারে, বড় প্রীত মাের আজ। এরূপে উৎসবে, সারাদিন সবে কৌতুকে যাপিলা দিবা। ক্রমে দিনমণি, অস্তাচলগামী, গলেন লােহিত অভা, গগাধূলি সময়, রক্তিম শােভায়, সাজিল। প্রকৃতি দেবী শ্যামল আঁচলে, তারা ঝলমলে, বিশ্ব বিমােহন ছবি ।
ফুলহাৱ
শুভ সন্ধিক্ষণ,
কুলাচাৰ্যগণ,
কহিলেন যদুবরে
‘আগত রাজন,
এবে শুভক্ষণ,
কন্যা আন স্বয়ম্বরে।
পুর নারীগণ,
মঙ্গলাচরণ,
করিলেন বিধি মত।
পুষ্প বৃষ্টি আর, লাজ ভারে ভার,
শঙ্খ হুলু নিনাদিত।
។
ধীরে সভা পথে,
স্বর্ণ রথ হতে,
নামিলা যাদব বালা,
কোষেয় বসনা,
আনত আননা,
করেতে প্রসূন মালা।
হেরি সে মুরতি, জ্ঞান হয় রতি,
তাজিয়া অমরাপুরী
ছলিতে মানবে,
অবতীর্ণা ভবে,
মানবীর রূপ ধরি।
বিমুগ্ধ নয়ন,
নরপতিগণ,
পলক পড়ে না আর--
সভাস্থ সবারে,
করিলেন নমস্কার ।
ভদ্রা ধীরে ধীরে
ফুলহার
পিতার চরণ,
করিলা বন্দন,
দুহিতা সজল চোখে
প্রসারিয়া কর,
বৃদ্ধ নৃপবর,
কন্যারে নিলেন বুকে।
চুমি স্নেহভরে, কপোল উপরে,
সেই গদগদ স্বরে
কহিলেন পিতা, “হও পরিণীতা,
মা আমার যােগ্যবরে,
করিয়াছ খেলা,
শুধু এত বেলা,
আজ অবসান তার,
হও পতিব্রতা,
লভ সার্থকতা,
আদরিণী মা আমার ।
পিতার বচন,
শুনি নারায়ণ,
স্বগত হাসিয়া কন,
জান দুহিত, নিখিলের মাতা
স্নেহে অন্ধ দুনয়ন।
পাশ্বে ধনঞ্জয়,
হেরি মনে লয়,
নির্বিকার দুইজন
স্থির চারি আঁখি, স্তম্ভ পরে রাখি,
করিছেন নিরীক্ষণ।
ফুলহার
পলক পড়িতে, একি আচম্বিতে,
পূর্ণ সভা কোলাহলে
শুধু শােনা যায়,
কন্যা হরি লয়,
দুষ্ট ধনঞ্জয় ছলে।
লক্ষ লক্ষ অসি,
পলকে ঝলমি,
গরজিল মহা রােষে
শুধু বাহীন,
নিখিল স্বামিন,
নীরবে দাঁড়ায়ে পাশে।
প্রবল কম্পনে,
গভীর গর্জনে,
সিন্ধু উথলিল যেন
ত্যাজিয়া আসন,
নরপতিগণ,
সরােষে ধাইলা হেন।
মিলন বাঁশরী,
নীরব শিহরি,
সমর বাজনা বাজে
ত্যাজি বর সাজ,
নৃপতি সমাজ,
সাজিলা বীরের সাজে।
হেরিলা সকলে
মুগ্ধ কুতূহলে
দীপ্ত জ্যোতিষ্মন রথে
বীরাঙ্গনা সতী,
সুভদ্রা সারর্থী,
রথ রশ্মি লয়ে হাতে-
ফুলহার সুনিপুণ করে অশ্ব বন্ধধরে, আসীনা যাদব বালা শ্রম, স্বেদ বিন্দু, শােভে মুখ ইন্দু কণ্ঠে শােভে ফুলমালা। কাঠিন্য তরলে, মাধুৰ্য কোমলে, সে কি দৃশ্য সুমহান। পাশে পার্থ রথী, রণমদে মাতি, ধনুকে পুরেন টান, বীর সব্যসাচী, শ্রেষ্ঠ ভূণ বাছি, রােধিছেন রাজ সেনা। মুগ্ধ দেবগণ, স্তব্ধ ত্রিভুবন, নেহারি সে বীরপনা । করুণায় যার, ছিল দ্বারকার- মােহিত সকল লােকে- মৃত বিহঙ্গেরে, লয়ে স্নেহ ক্রোড়ে, কাঁদিত যে ব্যথা শশাকে, কুসুম কোমলা, কিশােরী সরলা, জানিত সকলে তারে, জানিত না কেহ, সুকোমল দেহ, বজ্ৰ বল বুকে ধরে। ১৪
ফুলহার
বীরাঙ্গনা বেশে,
বীর পতি পাশে,
শক্তিস্বরূপিনী বামা,
মিলিত ব্রততী,
যেন বনস্পতি,
জলদে বিজলি সমা।
সে দৃশ্য মহান,
সে গৌরব গান,
যুগ যুগান্তর ধরে,
সে বীরত্ব গাথা, সে অমর কথা,
ধ্বনিছে ভারত পরে।
স
ফুলহার
গান্ধী বন্দনা
নন্দন হতে নন্দিত হয়ে
কল্প লােকের আসন ত্যজি,
লক্ষ্য বিহীন ভারত গগনে
ধ্রুবতারা ঐ উদিল বুঝি।
অলস সুপ্তি কে দিল ঘুচায়ে —
স্বরাজ স্বপন দেখাল কে-
সত্যাগ্রহের শঙ্খ নিনাদি’
নব জাগরণ আনিল রে ।
দেশের দুঃখে, ব্যথিত বক্ষে,
কে নিল বরিয়া ভাষণ কারা,
নবীন তন্ত্রে, নূতন মন্ত্রে,
অর্ধ জগতে জাগাল সাড়া।
কে গাে সেই ঋষি, যাঁর সাম্য বাঁশী,
প্লাবিত করেছে সারাটি দেশ,
সুধা সঞ্জীবনী কে দিল রে আনি,
চরকায় করিতে দৈন্ত শেষ।
ফুলহার
ক্ষীণ তনু মাঝে, খদ্দর সাজে,
ক্ষমতা তড়িৎ খেলিছে কার।
নিখিল পূজ্য, ভারত সূৰ্য্য,
সে মহাপুরুষে নমস্কার।
(২)
দেশের জন্য, আপন দৈন্য,
কে নিল সাদরে বরণ করি ।
কার জয় ধ্বনি, ব্যপিল ধরণী,
আফ্রিকা হতে ভারত ভরি।
অমা রজনীর, নিবিড় আঁধার,
নাশিয়া, জ্বালিল আশার আলাে
অহিংসা ব্ৰতে দীক্ষিত করি,
শিখাল সবারে বাসিতে ভালাে।
কেবা শক্তিমান, অভয় বিষাণ,
বাজাল পতিত দেশের পরে।
স্বাধীনতা পথ দেখাইল কেবা,
সহযােগীতায় বর্জন করে।
অসীম সাগর সমতুল কার,
বিশাল হেরি বিশ্বপ্রেমে
স্বদেশ যজ্ঞে পূজারী প্রধান
হােম শিখা কার গগন চুমে।
১৭
ফুলহার
পরম পিতার প্রিয় নন্দন,
চির বরেণ্য সে সকার ।
নিখিল পূজ্য ভারত সূৰ্য্য
সে মহাপুরুষে নমস্কার।
( ৩ )
উদারত। কার অদ্রি জিনিয়া,
স্বার্থ বিহীন জ্ঞানের খনি,
অবতার রূপে অদ্বিতীয় কেৰা,
ভারত মাতার মুকুট মণি।
জাতিভেদ রূপে কঠিন প্রাকার,
কে দিল ভাঙিয়া প্রীতির করে ।
কে মুসলমানে হিন্দুর সনে
বাঁধিল ভ্রাতৃ প্রেমের ডােরে।
হৃদয় রুধির গলিল আপন,
একতায় দেশে ৰাধিতে কেবা ?
সাগর মথিয়া, অমিয় ছানিয়া,
কে করিল হেন দেশের সেবা।
সারা ভারতের, আনত প্রাণের,
শ্রদ্ধা কমল চরণে রাজে-
অতুলন কার, অমর কাহিনী
নিস্কাম কেব। নিখিল মাঝে।
>
ফুলহার
কুমারিকা হতে সুমেরু ব্যপিয়া,
রনিছে আজিকে মহিমা কার ?
নিখিল পূজ্য ভারত সূৰ্য্য
নমামি গান্ধী নমস্কার ।
ন
ফুলহার
কাননে দময়ন্তী।
=
গভীর তমসা নিশি, নিবিড় কাননে বসি,
কে গাে তুমি বিষাদিনী বামা?
পরিধান চীর বাস, বিলুণ্ঠিত কেশ পাশ
মেঘাবৃতা সৌদামিনী সমা।
বিরলে বিজন বনে, বল কার অন্বেষণে,
ব্যগ্ৰ তব নলিন নয়ন,
অবিরল অশ্রু জল,
সিক্ত করে ধরাতল,
বরষার করা যেমন।
চন্দ্রিকার কর রাশী, ছানিয়া বিরলে বসি,
সৃজিলা কি বিধাতা তােমায় ?
নবনীত তনু লতা,
স্নিগ্ধ পূত কোমলতা,
নিখিলের নয়ন জুড়ায়।
কে গাে তুমি গরীয়সি, এ বিজন বনে বসি,
পরিমানা কমলিনী প্রায়।
চিনেছি তােমায় আমি, রাজা নল তব স্বামী,
পেয়েছি মা তাের পরিচয়।
২০
ফুলহাৱ
গ্রহ বশে রাজ্যচ্যুতা, দুষ্ট জন নিপীড়িতা,
রাজ রাণী ভিখারিণী নারী—
হেরিয়া স্বামীর মুখ, ভুলেছিলে সৰ্ব্বদুখ,
সব ব্যথা ছিলে মা পাসরি।
প্রাণের তনয় সুতা,
ভাবি তাদের কথা,
ছিলে সতী স্বামীর সঙ্গিনী,
ঘোর বনে নিশাকালে,
স্বামী সহ তরুতলে,
সুপ্তি মগ্না ছিলে মা জননি।
সরলতা পূর্ণ প্রাণ,
জানিতে ভগবান
আরও কত লিখেছিলা ভালে
গ্রহ ফেরে নষ্ট মতি, মােহাবিষ্ট তব পতি,
ত্যজি তােমা গেল হেন কালে।
উদাসিনী সেই হতে
ভ্রমিতেছ বন পথে
মণি হারা ফণিনী যেমন।
বিক্ষত কণ্টক ঘায়,
রুধির ঝরিছে হায়,
সুকোমল কমল চরণ।
তােমার বেদনা হেরি কঁদিছে বনের সারী
মেদিনী সে বিষাদ বিধুরা,
নত শিরে তরুগণ
করে অশ্রু বরিষণ
হেরি তােমা স্বামী সঙ্গ হারা।
1
ফুলহাৱ
হিংস্র স্বাপদ যারা, হেরি তােমা শােকাতুরা,
হিংসা ভুলি নীরবে দাঁড়ায়ে
তব তপ্ত শ্বাসে ভার,
নৈশ বায়, বার বার,
সান্ত্বনিছে স্নিগ্ধ মৃদু বায়ে ।
মধুর কুজন ভুলি
বনের বিহগগুলি
মৌন মুখে ঢালে আঁখিলাের।
নীল নভে শশী তারা, বিষাদ নীলিমা ভরা,
বনস্থলী বিষাদিনী ঘাের ।
রুদ্ধ স্থির ধরণীর,
চিরন্তনী প্রকৃতির,
সব খেলা সকল শােভন,
সিন্ধু সুতা স্রোতস্বতী
ভুলি কুলু কুলু গীতি
গতি হীনা জানায় বেদন।
কঙ্কর বন্ধুর পথে,
বনদেবী নিজ হাতে,
বিছায়েছে কোমল আসন।
নব শ্যাম দুৰ্বাদলে, প্রকৃতি আপন কোলে,
রচিয়াছে রাজ সিংহাসন।
নিশার তুষার ছলে শুক্ল বাসে নেত্র জলে
কঁদে ওই অদুরে ভূধর।
রজনী শােকের ছায়,
বিমণ্ডিয়া নিজ কায়,
তমােময়ী ত্যজি নীলাম্বর।
২২
ফুলহার
অগুরু চর্চিত তনু, ভরেছে মৃত্তিকারেণু
পীন বক্ষ কঁপে দীর্ঘ শ্বাসে।
শ্লথ বেশ পথ হারা
নয়নে শ্রাবণ ধারা
আবরিত দেহ ছিন্নবাসে।
বুঝি তােমা শ্ৰমাতুরা, বন পথ সীমা হারা,
লুকায়েছে পাদপ আড়ালে
পাপ পূর্ণ লােকালয়,
তৰ উপযুক্ত নয়,
লভ শান্তি প্রকৃতির কোলে।
হেরি এ করুণ দৃশ্য,
বেদনা কাতর বিশ্ব,
কর দেবি শােক সম্বরণ।
অচিরে পতির সনে মিলিবে সানন্দ নে-
পুন ফিরে পাবে রাজ্য ধন।
ঘুচিবে এ অমানিশি, আবার সৌভাগ্য শশী,
উজলিবে তােমার অন্তরে
তােমার অমিয় গাথা,
চির ব্যপ্ত রবে চরাচরে।
অলৌকিক এ বারতা,
২
ফুলহার
চির প্রতীক্ষা ।
বসন্ত পবন, মাতায়ে ভুবন,
মৃদুল বহিয়া যায়।
লােহিত বরণ, ক্লান্ত দিবাকর,
পশ্চিমেতে অন্ত প্রায়।
পুণ্যতােয়া গঙ্গা তরঙ্গ তুলিয়ে,
ধাইছে সাগর পানে
উপকুলে দুই তরুণ তরুণী
দাড়াল বিষাদ মনে।
রজত তরঙ্গ গােধূলি আভায়,
তুলি তান কল কল,
উত্তাল নৰ্তনে স্পর্শিছে দোহার
সুকোমল পদতল।
তরুণী চিবুক ধরিয়া আদরে
সাদরে যুবক কয়
“জেন মনােরমা ! সুখ দুঃখ কভু
চির দিন স্থায়ী নয়।
ফুলহার
স্মরি তব মুখ দ্বিগুণ উদ্যমে,
যুঝিব যখন সনে
কর এ কামনা জয়ী যেন হই,
জীবনের ঘাের রণে।
কেঁদনাক আর মানস মােহিনি !
হেরে ও মলিন মুখ,
কেমনে কর্তব্যে হব অগ্রসর,
কেমনে বাঁধিব বুক।
জান নাকি প্রিয়ে বীর বল কত,
নিজ পতি পুত্রগণে-
সহস্তে সাজায়ে দানিত বিদায়,
সহাস্যে ভীষণ রণে।
তুমি ও তাে সেই রাজপুত বালা।
তুমি ও তাে বীর সুতা।
তবে কেন মােরে দানিতে বিদায়,
প্রকাশিছ কাতরতা।
সজল নয়নে, চাহি পতি পানে,
ধীরে মনােরমা কয়,
‘ক্ষম প্রিয়তম দুর্বল হৃদয়,
প্রবােধ না মানে হয়।”
ফুলহাৱ
জানি আমি নাথ ! রাজপুত জন্ম,
কঠোর সমর তরে
কিন্তু ভাব যদি, বিজয় কমলা,
মােগল সম্রাটে বরে ।
শিহরিয়া উঠে অন্তর আমার,
স্মরি ভবিষ্যৎ বাণী,
মহা বলবান দিল্পিপতি আর--
দুৰ্বলা বিধবা রাণী ।
সত্য বটে দেয় রাজপুত বালা,
বিদায় হৃদয় ধনে-
জানি না বিধাতা গঠেন তাদের
কোন গুঢ় উপাদানে।
চাহি না ঐশ্বৰ্য্য অতুল গৌরব,
চাহি না কিছুই আর,
চাহি মাত্র তব শীতল চরণ,
সেবিবারে প্রাণাধার।
প্রেমপূর্ণ স্বরে কহিল যুবক,
পত্নীরে হৃদয়ে ধরি
“হাসি মুখে মােরে দান লাে বিদায়,
মুছলাে নয়ন বারি।
ফুলহার
ভ ইচ্ছা তব, বৰ্ম্ম সম মােরে
ঘিরে রবে দিবা নিশি, .
যুদ্ধ অন্তে আসি মিলিব আবার,
অনন্দ সলিলে ভাসি।
ভেবে দেখ প্রিয়ে। এই মাড়বারে—
বিজড়িত কত সুখ,
বিকাবাে সে দেশ অন্যের চরণে,
স্মরিলে বিদরে বুক।
মার স্নেহরসে পুষ্ট দেহ মন,
বর্ধিত যাহার কোলে
স্নিগ্ধ ছায়ে যার, বাল্য খেলা কত,
খেলেছি শৈশব কালে।
মধুরতাময়, কিশাের জীবন,
যাপিয়াছি যেই খানে—
শুভ গােধূলিতে, যে পবিত্র স্থানে,
মিলিয়াছি তব সনে।
স্নেহের আধার, জনক জননী,
চির নিদ্রাগত যথা,
কেমনে ভুলিব বল প্রিয়তমে ।
সেই মাড়বার কথা।
২৭
ফুলহাৱ
পুত্ৰৰৎ স্নেহে যশােবন্ত রাণা,
পালিতেন প্রজাগণ,
কেমনে ঠেলিব তাঁর মহিষীর—
এ কাতর আবাহন।
বিপন্ন মােদের বিধবা জননী,
দুরন্ত মােগল তরে-
এ মহা দুর্দিনে, বিলাস শয়নে,
বল কে থাকিতে পারে।
প্রবাসী পুত্রেরে, ডেকেছে কাতরে,
জননী জনম ভূমি,
করিব তর্পণ হৃদয় রুধিরে,
বাঞ্ছিত মরণে চুমি।
দাও লাে বিদায়, হৃদয় রঙ্গিণী,
সহাস্যে গরব ভরে
অযােগ্য এ প্রাণ উৎসর্গিব আজ,
সােনার স্বদেশ তরে।
নশ্বর জগতে অনিত্য সকলি,
সকলি বিলয় পায়,
চির অমরতা লভিব, সমরে
যদি এ জীবন যায়।
২৮
ফুলহাৱ যদি আমি ফিরে এ দীর্ঘ বিরহ- নিমেষে ভুলিব দেহে, শ্রান্তি হবে দূর, ঘুচিবে বেদনা, তােমার স্বর্গীয় স্নেহে। আদরে তুমি লাে, পরাবে আমারে, গাঁথিয়া বিজয় মালা, হৃদয় বিষাদ কর প্রিয়ে ! দূর পরিহার ভয় বালা।” প্রবােধি পত্নীরে উঠিল যুবক- তরণী উপরে গিয়ে, নিস্পন্দ হৃদয়ে, হেরে মনােরমা, অনিমেষ চোখে চেয়ে দৃষ্টি বহিভূত, হইল তরণী, আর নাহি দেখা যায়। দীর্ঘ শ্বাস ফেলি, বসিল তরুণী, নিদারুণ বেদনায়। সন্ধ্যাকাশ পরে, শুভ্র নিশাকর, হরষে হাসিয়া চায়, সােহাগে গলিয়া, পড়ে ফুলরাণী, ঢলিয়া সমীর গায়।
ফুলহাৱ।
সারা দিন পরে, শ্রান্ত পদে কৃষি,
চলেছে আপন গেহে
তুলিয়া পঞ্চমে, মিঠা মেঠো সুর,
মনের আনন্দে গেয়ে।
শঙ্খ ধ্বনি করি, গৃহস্থের বধু,
সাঁজের প্রদীপ জ্বালে
হাতে দীপ লয়ে, ভক্তি ভরে নমে,
পবিত্র তুলসী তলে ।
দুরন্ত বালক, ক্লান্ত দেহে শুয়ে,
ঘুমাল মায়ের কোলে
স্তব্ধ অবসাদ, ধরণীর গায়,
কে যেন দিয়েছে ঢেলে ।
ভাসি শান্তি নীরে, শিথিল বসনে,
এলায়ে সুতনুখানি
পড়েছে ঢলিয়া, প্রিয় পতি ক্রোড়ে,
যেন রে প্রকৃতি রাণী।
সোণার কিরণ, করে ঝলমল,
পড়িয়া তটিনী গায়—
রজত তরঙ্গ, নেচে নেচে যেন,
সাগরে মিশিতে ধায়।
ফুলহাৱ
পুলকিত মনে, পতি সম্ভাষণে
উছলা তটিনী চলে
সারাটি ধরণী, সুখ শান্তি ভরা,
সান্ধ্য মিলন কোলে।
মনােরমা চোখে, আজি অন্ধকার,
শূন্য স্বভাবের হাসি,
নিভে গেছে যেন, চারি ধারে তার,
বিশ্বের লাবণ্য রাশী।
( ২ )
ত্রস্ত হয়ে আজি মাড়বার বাসী,
সমবত এক স্থানে,
কি এক আকুল উদ্বেলিত ভাব,
জাগিছে সবার প্রাণে।
ভারত সম্রাট, ঔরংজেব সনে,
বাধিয়াছে ঘাের রণ,
যুঝিবে তাহারা, মাড়বার তরে,
করিয়া জীবন পণ।
আসিবেন এই, বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে
তাহাদের অধিশ্বরী।
উৎকণ্ঠিত মনে, রয়েছে তাহারা
তঁাহারই প্রতীক্ষা করি।
৩
ফুলহার
মধ্যে শােভে এক, প্রস্তর বেদিকা-
দাঁড়াবেন তায় রাণী।
ব্যকুল সকলে, শুনিতে তাহার
মৃদু উপদেশ বাণী।
ক্রমে আসি রাণী, দাঁড়ালেন সেই,
প্রস্তর বেদিকা পরে,
কহিলা সকলে, সম্বোধন করি,
কোমল মধুর স্বরে
শুন ভ্রাতৃগণ ! শুন বন্ধুগণ !
শুন পুত্রগণ ! মাের,
সুখ শান্তি পূর্ণ, মাড়বারে আজি
এসেছে অশান্তি ঘাের,
করেছে প্রতিজ্ঞা দুরন্ত সম্রাট,
গ্রাসিবারে মাড়বার,
উপযুক্ত দিনে, কর পরিশােধ,
জনম ভূমির ধার ।
ভেবে দেখ সবে সােনার স্বদেশ,
বিকায়ে যবন করে—
থাকিতে কি চাহ দাসত্ব বরিয়া,
অলস সুপ্তির ক্রোড়ে?
৩২
ফুলহার:
বীরেন্দ্র জননী মাড়াবার এবে-
হয়েছে কি বীর হীনা ?
নীরবিলা রাণী, ঝঙ্কারিয়া যেন।
নীরবিলা শত বীণা।
কহিল সকলে, বিজড়িত স্বরে,
বিনয়ে যুড়িয়া বাহু
মাড়াবাড়াকাশে হয়েছে উদয়,
ভীষণ সম্রাট রাহু,
অপ্রমেয় তার বীর্য্যবান সেনা,
অতুল বিক্রম ধরে –
ক্ষুদ্র অনীকিনী মােদের জননি,
কেমনে জিনিবে তারে ?
উত্তেজিত হয়ে কহিলেন রাণী,
জলদ গম্ভীর স্বরে।
“লইবে কি তবে যবন দাসত্ব,
সাদরে তুলিয়া শিরে”।
ধিক্ তােমাদের রাজপূত হয়ে,
এত হীন বল সৰে-
সােনার স্বদেশ, স্বাধীনতা নিধি,
অপরে হরিয়া লবে-
৩
।
ফুলহাৱ
দেখিবে তাহাই মৃত প্রায় পড়ে,
জালি দিবে সবাকারে-
ভগ্নী কন্যা মাতা, পতিপ্রাণ জায়া,
নীরবে অন্যের করে ?
স্মরি এই কথা ধমনী প্রবাহে
ছুটে না শশাণিত স্রোত ?
এত ক্ষীণ বাহু অলস হৃদয়,
নিজ্জীব জড়ের মত ?
ত্যাজ সুপ্তি ঘাের মাড়বারবাসি,
জাগরিত হও আজি,
যাও পদ ভরে কঁপায়ে মেদিনী,
সমর সজ্জায় সাজি।
বীর প্রসবিনী মােদের জননী,
বুকের অমৃত ধারে-
ভীরু মেষপাল করেনি পোেষণ,
দেখাও তা সবাকারে।
হের একবার মানস নয়নে
মৃত রাণা তােমাদের
সে পবিত্ৰাসন হৰে কলুষিত,
পদম্পর্শে যবনের।
O3
ফুলহার
স্বর্গীয় রাণার শেষ অভিজ্ঞান,
নবজাত সুকুমারে—
সপিনু আজিকে করে তােমাদের
অতুল বিশ্বাস ভরে।
কহিল সকলে উচ্ছসিত সুরে,
জয় মহারাণী জয়,
জয় শিশু রাণা কুমার অজিত,
স্বর্গীয় রাণার জয়!
চল ভাই সবে এ মহা আহবে,
রক্ষিতে হবে-
জীবন মরণ নিত্য অগণন,
কে চির অমর ভবে।
কুমারে
থাকিবে জীবন দেহে যতক্ষণ,
ত্যাজিব মােরা রণ।
না পারি জিনিতে পারিব মরিতে
কবিলাম এই পণ।
দেহ গাে জননি! আশীষ সকলে,
কর পদধুলি দান।
যেন এ সময়ে পারি রক্ষিবারে,
মাড়বার রাজ মান।
ফুলহার
দেবী করালিনী নৃমুণ্ড মালিনী,
প্রসাদী নিৰ্মাল্য লও
করিবেন শুভ ভবেশ ভামিনী,
রণে আগুয়ান হও।
প্রফুল্ল আননে কন তেজময়ী,
“করি এই আশীর্বাদ।
বিজয় গৌরবে ফিরে এস সবে,
পূর্ণ হােক মনােসাধ”।
প্রখর মধ্যাহ্নে সুতীব্র কিরণ
ছড়ায়ে ধরাটি ভরে
আরক্ত লােচন, তেজময় ভানু,
বিরাজে গগন পরে।
স্তব্ধ জনহীন জাহ্নবীর তটে—
বসিয়া সােপান’পরি—
গভীর চিন্তায় নিমগন এক,
মলিনা যুবতী নারী।
বিন্দু স্বেদ ধারা, রক্তিম ললাটে
শােভে মুক্তা মালা সম ;
স্থাপিত কপােল, মৃণাল কোমল
ভুজ লতা নিরুপম।
ফুলহার
দর দর ধারে, ঝরি অশ্রুজল,
ইন্দিবর আঁখি হতে
পড়ি রৌদ্র তপ্ত, সােপান উপরি,
মিলাইল ধরণীতে।
দাড়ায়ে তরুণী, কহে সকাতরে,
চাহিয়া সলিল পানে
“বল গাে জননি! হৃদয়ের নিধি,
পাব গেলে কোন খানে ?”
ডাকিতেছ বুঝি ? কল কল স্বরে,
মিলাতে তােমার কোলে
জুড়াইতে জ্বালা, শান্তি ভরা ঘুমে,
তােমার শীতল জলে,
সত্য কি গাে নাই? এ জগতে প্রিয় ?
বল্ মা তটিনী বল্।
আর না আসিবে, নিভাতে আমার,
হৃদয়ের শােকানল।
পাগলিনী আজ, বিরহে যাহার,
যে আশায় প্রাণ রাখি—
ফলিবেনা আশা, আরাধ্য আমার,
ফিরিয়া আসিবে নাকি ?
ফুলহাৱ
যাব মাড়বারে, মহারাণী পাশে,
জিজ্ঞাসিব তঁায় আমি--
কোন্ অধিকারে-জনম মতন
নিলেন আমার স্বামী।
( ৪ )
বিষাদ মগন, বিশাল প্রাসাদ,
মাড়বার মহিষীর ।
চিন্তাকুল চিতে—বসি মহারাণী—
নয়নে ঝরিছে নীর।
সুশিক্ষিত কত, রাজপূত সেনা,
পুত্র সম প্রজাগণ।
সমর অনলে, দিয়েছে সকলে—
নিজ প্রাণ বিসর্জন।
কঁদিতেছে কত—পুত্র হারা মাতা-
পতি হারা সতী নারী,
হৃদি ভেদ করা—করুণ বিলাপে
নগর গিয়াছে ভরি।
প্রতি ঘরে ঘরে—মহা হাহাকার,
করাল শোকের ছায়া
টেকেছে যেন রে মাড়াবারে আজি
বিস্তারি আপন কায়া।
/
ফুলহাৱ.
পালঙ্কে একটি, সুকুমার শিশু,
শুভ্র যুথিকার মত,
এলায়ে আপন ক্ষুদ্র তনুখানি
সুখে আছে নিদ্রাগত।
বসি বাতায়নে ব্যথিত। মহিষী—
বিষাদ মলিন মুখে
সমাচ্ছন্ন প্রাণ, শােক মেঘ জালে,
পাষাণের ভার বুকে,
সঙ্কোচে সমে, আসিয়া কিঙ্করী,
কহিল প্রণাম করে-
রমণী একটি, মহিষীর সনে,
চায় দেখা করিবারে।
কহিলেন রাণী, এই খানে তারে,
“লয়ে এস সমাদরে।
শিখিল বাসনা, শুষ্ক বেশা নারী।
দাড়াল গৃহের দ্বারে
ধীরে ধীরে ধরি, হাত দুটি তার
সস্নেহে মহিষী কয়—
“কে তুমি ভগিনি! সাক্ষাৎ আমার,
মাগিয়াছ কি আশায় ?
।
ফুলহার বাধা দিয়া বলে, দীপ্ত স্বরে নারী, বল বল মহারানি ! কোন্ অধিকারে, এ মহা সমরে, ডালি দিলে মাের স্বামী। । নিজ প্রাণ তরে, শত কণ্ঠস্বরে, তুলিয়াছ হাহাকার। এত মমতার, জীবন তােমার ? এতই কি মূল্য তার ? রুদ্ধ বিষাদিত, সকরুণ স্বরে বলে রাণী ম্লান মুখে, “দিবস যামিনী, শতেক বৃশ্চিক, দংশিছে আমার বুকে, কি বুঝিবে নারি! প্রাণ হতে মাের- কত প্রিয় প্রজাগণ। বুঝিলে আমায়, এত তিরস্কার— করিতে না তুমি বােন। তুচ্ছ প্রাণ তরে দিইনি ভগিনি। পুত্র সম প্ৰজাগণে— পুণ্য মাড়বারে, পশিবে যবন, কেমনে সহিৰ প্রাণে। F
ফুলহাৱ
যবন চরণে, করিবে দাসত্ব,
মাড়বার বাসী বীর।
শৃগাল প্রভূত্ব, করিবে কি হয়,
রাজপুত কেশরীর ?
প্রিয় পতি শােকে, হয়েছ ব্যথিতা,
জ্ঞান হারা উন্মাদিনী,
মুছে ফেল্ ব্যথা-ভাব সগৌরবে—
তুমি বীর সিমন্তিনী।
বীরাস্ত্রে শােভিত বীর পতি তব
অতুল গরব ভরে
সমর প্রাঙ্গনে অনন্ত শয়নে-
গিয়াছেন স্বর্গ পুরে।
বীর ললনার, কাম্য কভু নহে,
ভীরু কাপুরুষ পতি,
বীৰ্য্যবান স্বামী, যার সেই বাে-
ধরা মাঝে ভাগ্যবতী।
পড়িয়া যুবতী, রাণী পদতলে—
কহে অনুতাপ ভরে
“কয়েছি কুকথা, না চিনি তােমায়,
ক্ষমা কর দেবি ! মােরে”-
ফুলহাৱ
দাও পদে স্থান, শিষ্যা রূপে মােরে,
রহি তব পাশে যদি-
পারি গাে নিতে, প্রাণের অনল
জ্বলিছে যা নিরবধি ।
শয়নে স্বপনে, বাজিছে শ্রবণে,
বিদায়ের সেই বাণী,
সে মধুর হাসি, ভাসিছে নয়নে,
সে অতুল মুখখানি।
উঠায়ে তাহারে পদতল হতে
কহে দয়াবতী রাণী।
রাখিব তােমারে, স্নেহের আদরে,
আপন সােদরা জানি।
(৫)
লক্ ল লক্, অনলের শিখা,
স্পর্শিতেছে নভস্থল,
পশিবেন তাতে—মাড়বাড় রাণী—
জ্বলিয়াছে চিতানল।
হয়েছে সাধন, কর্তব্য তঁাহার,
মাড়বার রাজাসনে
অভিষেক করি, স্নেহের কুমারে
মিলিবেন পতি সনে।
৪২
ফুলহার
বেড়ি’ চারি ধারে বিধবা রমণী
তারাও রাণীর সনে—
পশি চিতানলে, হাসি মুখে যাবে—
আপন পতির স্থানে।
অদূরেতে শুধু, একটী রমণী,
পলক বিহীন চোখে
আনত আননে, অনলের পানে,
সতৃষ্ণ নয়নে দেখে,
কুমার ললাটে-চুম্বনিয়া স্নেহে—
বিদায় মাগিল। রাণী,
আত্ম পরিজনে, সুমিষ্ট বচনে,
কহিলা সান্ত্বনা বাণী,
পরে ধীরে ধীরে অনল অদূরে
আসি রমণীর পাশে
ধরি হাত খানি, কহিলেন রাণী,
মমতা মণ্ডিত ভাষে,
“আয় মনােরমা ! আয়লাে ভগিনি।
এসেছে সুখের দিন,
সানন্দে আজিকে, যাব ধ্রুবলােকে,
হব পতি পদ লীন।
ফুলহাৱ
বল মনােরমা, লক্ষ্যহীন ভাবে
চেয়ে মহিষীর পানে
যাও দিদি তুমি, তাঁহার আশায়,
থাকি আমি এইখানে ;
গেছেন বলিয়া প্রাণেশ আমার,
আবার আসিব ফিরে
করিব প্রতীক্ষা, আমি দিদি তার,
যুগ যুগান্তর ধরে।
কাদি কন রাণী, করুণ কাতরে,
“ওরে মাের অভাগিনী।
কার প্রতীক্ষায়, রবি যুগ ধরে,
নাই এ মরতে তিনি।
জুড়াইবি জ্বালা এ দীপ্ত অনলে,
ভুলিবি অতীত স্মৃতি -
অনন্ত মিলনে, শান্তিময় কোলে
আবার লভিবি পতি।
কেবা শান্তিময় ? পাগলিনী কয়,
“না মানি তাহায় আমি,
ধ্যেয় শুধু মাের, পতির চরণ,
আমার দেবতা স্বামী।
।
৪৪
ফুলহাৱ
সত্য যদি কেহ, শান্তিময় নামে—
স্বরগে অদৃশ্য রয়,
থাকুক সেখানে সে স্বরগবাসী,
এ ধরার সেতো নয়।
সারা নিশি ধরে, কতই কাতরে
ডেকেছি তাহারে দিদি।
কেন শান্তি নাহি, আসিল হৃদয়ে,
শান্তিময় তিনি যদি।
তােমরা বলিবে, প্রাক্তন নিজ।
কি শকতি তবে তাঁর ?
লাঘবিতে যদি না পারেন তিনি,
সন্তানের ব্যথা ভার।
পুর নারীগণ, করিয়া যতন,
বুঝান, পাগলে কত
নাহি শুনে বাণী, স্থিরা উন্মাদিনী,
পাষাণ প্রতিমা মত ।
সপ্ত প্রদক্ষিণ, করি বৈশ্বানরে,
মহীয়সী নারীগণ
অকম্পিত প্রাণে, দিল অৰহেলে-
মরণেরে আলিঙ্গন।
s
ফুলহার
আচ্ছন্ন করিল, উদার আকাশ,
উড়িয়া সে ধুমরাশী,
সৰ্ব্ব ভূক দেব, নিমেষে ফেলিল,
ত্রিদিব কমল গ্রাসি।
তীব্র হাহাকার, জয় জয় নাদ,
সমস্ত বাতাস ভরে
সে পবিত্র গাথা, পলকে ব্যপিল—
সুবিশাল চরাচরে।
নিভিল অনল, সম্ভ্রমে সকলে
সতীর বিভূতি লয়।
বসি মনােরমা, চির প্রতীক্ষায়,
স্বামীর আশায় হায়।
ফুলহার
কন্যা বিয়ােগে।
আর মা ফুলের রাণি !
আয় ছুটে আয় বুকে,
ছােট দুটি বাহু তুলে
মা মা বলে হাসি মুখে।
কত দিন মা আমার
রয়েছি রে তুই হারা,
শুনিনি কাকলি তাের
আধ ফোটা মধু ভরা।
কমল কোরক সম
কোলে বসে বাহু তুলে,
ডাকে না সন্ধ্যায় কেহ
আয় চাঁদ আয় বলে।
খেলাইতে অন্য মনে
চমকিয়া আচম্বিতে,
ঝাঁপায়ে আসে না কেহ
গলা ধরে আলিঙ্গিতে।
૩૯
ফুলহাৱ
তাই তাই তাই বলে
তালি দিয়ে গর্ব হাসি,
মা গাে তাের সেই সব
মনে পড়ে দিবা নিশি।
স্ফরিত অধর সেই
অকারণ অভিমানে,
জল ভরা আঁখি দুটি
আঁকা যে রে আছে মনে।
আদরে গলাটি ধরি
ফুলের মতন হাতে,
প্রভাতে ডাকিয়া মােরে
জাগাতি ঘুম হতে।
শান্তি নামে সার্থকতা
এই কি রে রেখে গেলি ;
জনমের মত প্রাণে
কি আগুন জ্বেলে দিলি ।
জ্বলে পুড়ে গেল বুক
নিষ্ঠর স্মৃতির দাহে,
ডেকে নিয়ে জুড়া জ্বালা
তাের অভাগিনী মায়ে।
s
ফুলহার
স্যৱ আখতােষ মুখােপাধ্যায়ের
মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে
একি শুনি অকস্মাৎ
বজ সম কি সংবাদ
জাগিল ভারতে এ কি মহা হাহাকার,
কালের করাল করে
গিয়াছে গিয়াছে ছিড়ে
বঙ্গ মাতা বক্ষ লগ্ন মণিময় হার।
ভারত জননী ওগো
কি শেল সহিছ মাগো
কর্মবীর পুত্রগণে দিয়াছ বিদায়,
শুখতে আঁখিলাের
অবার খলিল তাের
প্রাণের কুমার আশু ত্যজিলা তোমায়।
বঙ্গের গৌরব রবি
তােমার মধুর ছবি
দীপ্ত রবে চির দিন সকলের প্রাণে,
অসীম পাণ্ডিত্য তব
দেশ ভক্তি অভিনব
গাহিবে ভারতবাসী মেঘমন্দ্র তানে।
* মিরাটে আশুতােষ শােক সভায় পঠিত ।
ফুলহাৱ
যত দিন বিদ্যালয়
বঙ্গে নাহি হবে লয়
লুপ্ত হয়ে নাহি যাবে ইউনিভারসিটি,
তত দিন তব স্মৃতি
তােমার জ্ঞানের জ্যোতি
প্রাকাশিবে বাঙালীর যশের কিরীটি।
মহাপ্রাণ কর্মবীর
প্রিয় পুত্র ভারতীর
চলে গেছ চির তরে প্রত্যয় না হয়,
শ্রান্ত বুঝি হয়েছিলে
পরম পিতার কোলে
বিশ্রাম লভিতে তাই গেছ অমরায়।
উদার হিমাদ্রি সম
বিশ্ব প্রেম নিরুপম
প্রাতঃস্মরনীয় চির বরেণ্য সবার,
গন্ধ হীন পুষ্প হারে
আনিয়াছি পূজিবারে
লহ দেব! সকলের শােক অশ্রুভার।
ফুলহাৱ
দুঃখিনী।
( কোনও একটী বালিকার প্রতি।)
কল্পলােকের পূত পরিমল
অতসী কুসুম কলিকা,
দেবের পূজার ফুল নিৰ্ম্মল
প্রভাতের ম্লান মালিকা।
ছােট বুকে তাের কবিত্ব সুষমা
মধুর মুঞ্জ হাসিনি ।
ঝরে পড়ে যেন ভাষা মাধুরিমা
মৃদুল অমৃত ভাষিণি!
কিন্তু মা গাে তােরে দেখে ব্যথা পাই
কোন্ সে নিঠুর জন,
এ ফুল্ল কমলে আহা মরে যাই
করিল রে নিপীড়ন।
মা যে যাহা করুক ধুলির মতন
বিনীতা রহিও সদা,
নারীর ধরম স্নেহ ও যতন
এ কথা ভুল না কদা।
স্নেহ ছাঁচে ঢালা মুখখানি
বড়ই লাগিল ভালাে,
কৰি আশীৰ্বাদ হও গরবিনী
লভিয়া সত্যের আলাে।
ফুলহাৱ
উত্তৱা ।
ফুরাতে শৈশবের
হাসিময় সুপ্রভাত,
ফুরাল সকল সুখ
বুকে হোল বজ্রাঘাত।
বীর শ্রেষ্ঠ ফাল্গুনীর
আদরিণী পুত্রবধু,
যৌবন প্রারম্ভে মাগো
হারাইলি সব মধু।
অভিমন্যু সিমন্তিনী
বিরাটের রাজসুতা,
যাহা ভবে রমনীর
বাঞ্ছনীয় সার্থকতা।
সকলি লভিয়ে হায়
দুলঙ্ নিয়তি বলে,
সকল সুখের সার
পতি ধনে হারাইলে।
২
ফুলহা
না উঠিতে পঞ্চমেতে
ছিড়িল সাধের বীন,
তরুণ প্রভাতে হােল
সুখ সূৰ্য্য চির লীন।
পুণিমার শশধরে
ঢাকিল রে অমানিশা,
ফুরাইল জীবনের
সব সুখ সব আশা।
করুণারূপিনী মাতা
ভদ্রার নয়ন তারা,
পাণ্ডব গৌরব রবি
দিগন্ত উজল করা।
ষােড়শ বর্ষীয় শিশু
বীর মণি মহারথী,
কি শেল বাজিল বুকে
হারাইয়ে হেন পতি।
তুই গো মা পুণ্যবতী
ত্রিদিবের কমলিনী।
নন্দনের পারিজাত
পবিত্রতা মন্দাকিনী।
৩
ফুলহার
তাের যদি এই দশা
আমরা তাে তুচ্ছ নারী,
দুদিনের সুখে হায়
কেন অহঙ্কার করি।
তারি অহঙ্কার করি
একটি নিমেষে হায়
তাসের প্রাসাদ সম
ভেঙে যাহা পড়ে যায়।
s
ফুলহার
রাণী ভবানী ,
কোন্ শুভক্ষণে ওগাে গরীয়সি ।
কি মধুর শুভ লগনে তুমি,
স্বর্গচ্যুতা পূত অমরার ফুল
পবিত্র করিলে ভারত ভূমি।
তােমারে লভিয়া ভারত জননী
হরষে হাসিলা গরব ভরে,
বিমল জ্ঞানের উজল কিরণ
ছড়ালে আঁধার অন্তঃপুরে।
নারী শিরােমণি পুণ্যের প্রতিমা
ন্যায়ের মুরতি মহিমময়ী,
তেজের আকর দীনের জননী
রমণী কুলের গৌরব অয়ি।
নিরাশ্রয়েরে দিয়েছ আশ্রয়
খাদ্য দিয়েছ ক্ষুধিত মুখে,
নিরাশেরে কয়ে আশার কাহিনী
হতাশ হিয়ারে ভরেছ সুখে।
ফুলহাৱ
সার্থক তিনি জননী যাহার
জঠরে জনম লয়েছ তুমি,
ওগো মহিয়সি ! চরণে তােমার
ভকতি প্লাবিত প্রাণেতে নমি ।
এবে ধ্রুবলােকে পেয়েছ গাে স্থান
পরম পিতার শীতল পদে,
স্নেহাশীষ ধারা ঢাল তথা হতে
সকল ভারত নারীর হৃদে ।
তােমার পদাঙ্ক ধরি যেন শিরে
তোমারই আদর্শে ভারত বালা,
গঠিতে শিখে গাে আপন হৃদয়
শান্তি স্নেহে ঘুচে সকল জ্বালা।
a,
ফুলহার
সতী।
পুরাণ কাহিনী অপূর্ব বচন,
পতিব্রতা নারী ছিল এক জন,
কুষ্ঠরােগী পতি বিকৃত দর্শন,
দরিদ্র কুটির বাসী।
লক্ষহীর নামে বার বিলাসিনী
সুপণ্ডিতা বাম ভুবন মােহিনী
হেরি সে আনন সৌন্দর্য্যের খনি—
লুকায় শারদ শশী।
একদা মােহিনী জাহ্নবীর নীরে—
আসে মহা যােগে স্নান করিবারে
কুষ্ঠরােগী দ্বিজ হেরিল তাহারে
মােহিল হৃদয় মন।
বলে পত্নী প্রতি শুনলাে নির্মলে।
অভিশপ্ত আমি এই ভূমণ্ডলে,
ও রতন হার না পরিনু গলে,
বিফল মাের জীবন।
ফুলহার
তুমি সাধ্বী সতি! পতিব্রতা অতি,
বিখ্যাত ভুবনে সতীর শকতি,
মােহিয়াছে মন লক্ষহীরা প্রতি,
বাঁচাও আমায় এবে-
মরি মরি কিবা সুচারু আনন,
হের বাহু দুটি মৃণাল মতন,
ধর গাে নির্মলে আমার বচন,
রাখ কীর্তিগাথা ভবে !
বলে পতিব্রতা, “শুন প্রাণধন।
আছে গো উহার, নিদারুণ পণ,
লক্ষ মুদ্রা নাথ! দিৰে যেই জন,
যাপিবে একটি নিশি।
এ বাসনা হায়, হােল কি কারণ,
ভিক্ষা অন্নে করি, জীবন ধারণ,
ত্যাজ এ বাসনা, ধরি গাে চরণ,
আমরা কুটির বাসী।
কহিলেন দ্বিজ, শুনলাে নির্মলে!
লক্ষহীরা পাশে, না লইয়া গেলে
তেয়াগিব প্রাণ, জাহ্নবীর জলে
বৃথা এ জীবন ভার।
ফুলহার
ব্যথিত অন্তরে, বলে পতিব্রতা-
পায়ে ধরি দেব ! বোলনা ওকথা,
লয়ে যাব তােমা, লক্ষহীরা যথা,
কর স্নান প্রাণাধার।
তার পরে কিবা আশ্চর্য্য কাহিনী,
কিরূপে শপথ, রক্ষিল সে ধনী,
গেল যথা সেই, ভুবন মােহিনী,
পরিচারিকার বেশে
দাসী ভাবে তার, ভবনে রহিয়া,
একদিন তারে, সকল বলিয়া,
আনিল পতিরে-মস্তকে বহিয়া
সেই বারাঙ্গনা পাশে।
বসাইয়া দ্বিজে রজত আসনে-
বলে লক্ষহীরা ডাকি দাসীগণে,
“আহারের থালা আন এই খানে,”
চলিল কিঙ্করী দ্রুত।
আনিল আহার দুইটি থালায়-
একটি সুবর্ণ একটি মৃন্ময়,
মৃদুল হাসিয়া লক্ষহীরা কয়,
বস্থান পছন্দ মত ।
ফুলহার
সুবৰ্ণ থালিকা, উচ্ছিষ্ট সব র,
সুপবিত্র এই মৃন্ময় আধার,
বসুন যাহাতে মন আপনার,
নাহি বাধা তার কোন।
শুনি দ্বিজবর এতেক ভারতী—
মৃদু হাসি বলে, লক্ষহীরা প্রতি,
“সদাচারে রােলে হয় মহাগতি,
উচ্ছিষ্ট ভঙ্গিব কেন ?”
বলে লক্ষহীরা, কৌতুকে হাসিয়া,
শােভে না ও কথা, এখানে আসিয়া,
পৰিত্ৰ গিয়াছে কুটীরে ফিরিয়া—
মজেছ সুবর্ণ থালে ;
আমি স্বর্ণ থালা, উচ্ছিষ্ট সবার,
সুচি পতিব্রতা, নির্মলা তােমার,
কেন ত্যজি তবে পবিত্র আধার,
বেশ্যায় হৃদয় দিলে ?
এত শুনি দ্বিজ, লভিল চেতন,
লক্ষহীরা প্রতি বলিল তখন,
বেশ্যা নহ তুমি রমণী রতন,
দানিলে চৈতন্য মােরে।
{
ফুলহার
আসি পতিব্রতা প্রত্যুষ সময়,
বলে দেখ নাথ ! হােল উষাদয়,
যাবে কি কুটীরে কি আদেশ হয়,
দুটি করযোড় করে।
বলে লক্ষহীরা “যাও গুণবতি ।
প্রফুল্ল অন্তরে লয়ে নিজ পতি,
রহিবে বিখ্যাত তমার ভারতী,
অতু তুমি ভবে।
বহিয়া পতিরে দ্রুত সতী যায়,
পাছে হয়ে পড়ে অরুণ উদয়,
জেগে যদি কেহ দেখে এসময়,
নিন্দিবে স্বামীরে সবে।
মাওব্য নামেতে তাপস প্রবর,
ছিলেন ধ্যানস্থ শূলের উপর,
লইয়া পতিরে যাইতে সত্বর,
লাগিল অঞ্চল গায়।
আরে রে দুর্মতি। এ অহঙ্কার।
ভাঙিলি পরম ধেয়ান আমার,
উদিৰে গগনে যখন ভাস্কর,
যাবে পতি যমালয়।
৬৯
ফুলহাৱ
গুনিয়া মুনির অভিশাপ বাণী,
বলে পতিব্রতা যুড়ি দুই পানী—
“সকলি তাে জান তুমি অন্তর্যামী।
স্বেচ্ছায় ভাঙিনি ধ্যান ।
পূজে থাকি যদি পতির চরণ,
উদিবে রবি না দিবে কিরণ,
দেখিব কেমনে আসিয়া শমন,
লইবে পতির প্রাণ।”
সতীর আদেশ লঙ্ঘন না হয়,
হােল গগনে অরুণ উদয়,
ভীষণ আঁধার ছাইল ধরায়,
কাতর মানব যত।
ব্যকুল অন্তরে যত দেবগণ,
আসিল ধরায় সতীর সদন,
ইন্দ্র, চন্দ্র, শিব, ব্রহ্মা, নারায়ণ,
বুঝান সতীরে কত।
হের পতিব্রতা ! সৃষ্টি নাশ হয়,
কর আজ্ঞা, রবি হউক উদয়,
অমর কে কোথা অাছে গাে ধরায়,
এক দিন মরে সবে';
!
ফুলহাৱ
নাহিক লঙ্ঘন মুনির আজ্ঞার,
দিনু এই বর স্বামীরে তােমার,
মরণের পরে সদগতি তাহার,
বৈকুণ্ঠ নগরে যাবে।
বলে পতিব্রতা, প্রণমি তখন,
“এ কি আজ্ঞা দেহ প্রভু নারায়ণ ।
শুনেছ কি কেহ স্বেচ্ছায় কখন ?
পরে গাে বৈধব্য সাজ ?
বহু পুণ্যে হােল দেব দরশন,
অপরাধ মম কোরনা গ্রহণ,
পতি বিনা হেরি আঁধার ভুবন,
ক্ষমা কর রাজরাজ।”
চিন্তিয়া তখন, বলে দেবগণ,
ক্ষণতরে দ্বিজ, হারাবে জীবন,
পুন ফিরে সতি! পাবে পতি ধন,
দেহগগা সম্মতি এবে
কুষ্ঠরােগ বালা! হইবে আরাম,
জ্যোতিন্ময় বপু হবে রূপবান,
অর্থ সম্পদেতে কুবের সমান,
রাজ রাজেন্দ্রানী হবে।
শ
ফুলহার
সতীর আজ্ঞায় উদে দিনকর,
আৰ্তনাদ করি পড়ে দ্বিজবর,
সতীর বিলাপে কঁাদে চরাচর,
ক্ষণেক বৈধব্য তার ।
দেবের আশীষে ক্ষণ পরে মরি,
জাগে দ্বিজবর দিব্য দেহ ধরি,
স্বর্গ সুখ দোহে ভুঞ্জে ধরাপরি,
টুটিল দুখের ভার।
ধন্য ধন্য মাতঃ ভারত জননী,
গর্ভে ধর তুমি এ হেন নন্দিনী,
ব্রিলােক পূজিতা রত্ন প্রসবিনী,
লহ মাের নমস্কার।
৬৪
ফুলহার
অম্বর মহিষী।
ধুসর বসনা কুমারী সন্ধ্যা
ধীরে ধীরে নেমে আসে,
রজত বরণ, জগত মোহন,
চাদিমা গগনে হাসে।
সরদীর নীরে, ফুটেছে সরোজ,
শােভিয়াছে অনুপম,
মাঝে করে খেলা, বালিকা একটি,
দ্বিতীয় সরােজ সম।
এলায়ে পড়েছে সুনীল সলিলে—
নিবিড় কেশের রাশী,
জোছনায় মাখা, পরী রাণী যেন,
রয়েছে বসে ভাসি।
তটেতে দাঁড়ায়ে যুবক একটী—
মুগধ নয়নে চেয়ে
হেরিছে বালার-নলিনী আনন—
আপনা বিস্মৃত হয়ে।
ফুলহার
কহিল বালিকা, সম্ভাষী যুবকে,
“কেন এলে সুদর্শন !
যাও তুমি চলে, ডুবিব সলিলে,
জেনেছি তােমার মন,
বুঝিয়াছি ভাই, ভালবাসা তব,
নাহিক আমার 'পরে,
কহিলে কথা, খেলিতে যখন,
ডাকিলাম বারে বারে ।
বালিকা বলিয়া, কর অবহেলা,
কপট চিন্তার ভাণে—
আর না খেলিব, জানিহ নিশ্চয়,
কহে বালা অভিমানে।
সুপ্তোত্থিত প্রায়, চমকিয়া যুবা,
বলিল ব্যথিত স্বরে-
“কেন গাে সবিতা বলিছ এমন,
কেন ব্যথা দাও মােরে।
হৃদয় চিরিয়া দেখাবার হলে—
দেখাতাম আজি তােমা,
তােমারি মূরতি, বিরাজিছে সেথা,
তুমি মাের প্রাণসমা।
ফুলহার
হের গো সবিতা, আসিছেন পিতা,
উঠে এস এই বার।
ভুলেছ কি তুমি, পূজার যােগাড়,
করিতে হইবে তাঁর।
পাপিয়া দোয়েল, যায় নিজ নীড়ে
সাজের সমীরে ভেসে,
চল কুটিরেতে, রুষিবেন পিতা,
দেখিলে হেথায় এসে।
চল সুদর্শন
বলিয়া বালিকা,
উঠিল সরসী হতে
চঞ্চল চরণে বাপী তট ত্যজি,
চলিল যুবার সাথে ।
(২)
বিজন বিপিনে, কুটির একটি,
সুউচ্চ শৈলের মাঝে-
ভিতরে তাহার, মুদিত নয়ন,
সন্ন্যাসী মুরতি রাজে।
স্তিমিত আলােক, ঘৃতের প্রদীপ,
জ্বলিছে কুটীর কোণে
যুড়ি দুই কর, বসিয়া তাপস,
পরমেশ পদ ধ্যানে।
।
ফুলহাৱ 1 সুপ্তা ধরণী, সুগভীর নিশা, ঘুমায় প্রকৃতি দেবী, উজলি অম্বর, হাসে শশধর, ধরিয়া মােহন ছবি। ধীর পদক্ষেপে যুবক একটি প্রবেশি কুটীর মাঝে নীরবে বন্দিয়া, তাপস চরণ, বসিল তঁাহার কাছে। পরম ধেয়ানে মগন তাপস- ঝরিছে নয়ন নীর, উথলিছে বারি, ছাপিয়া হৃদয়, বিভু প্রেম তটিনীর। টুটিলে ধেয়ান, মেলিয়া নয়ন, দেখেন সম্মুখে চেয়ে বসি সুদর্শন, পদতলে তার, চরণে মাথাটি ধুয়ে। দর দর ধারে, ঝরে অশ্রু জল, তাঁহার চরণ 'পরে, চমকি বিস্ময়ে, তুলি মাথা তার, লইলেন অঙ্ক পরে।
ফুলহার
গভীর স্নেহেতে হাতটি তঁাহার,
রাখি সুদর্শন শিরে
মধু মাখা বােলে, প্রবােধিয়া তায়,
জিজ্ঞাসেন ধীরে ধীরে।
“বল বৎস! মােরে কিসের ব্যথায়,
কাতর অন্তর তব,
গভীর নিশায়, কেন বা হেথায়,
একি ভাব অভিনব।
অতীত কাহিনী, ব্যথা ভরা কোন
উদিত কি মনে আজ।
গৈরিক বসন, ত্যজি কি কারণ,
হেরি এ নূতন সাজ ?
সরল পুলকে, সহাস নয়ন,
বিষাদ মলিন কেন?
অশ্রু পারাবার, উথলি উঠেছে,
কিসের বেদনা হেন ?
শুনিয়া গুরুর অমিয় বচন,
বলে যুব সকাতরে-
“দাও দাও খুলে, স্নেহ ডাের তব,
ঘৃণা কর প্রভু! মােরে।
হার
পরম অপাত্রে, করিয়াছ দেব।
গভীর বিশ্বাস দান,
মহা পাপী সে যে রাখিতে নারিল,
তােমার স্নেহের মান।
নহি হিন্দু আমি, ওগাে দয়াময়!
ব্রাহ্মণ তনয় নই,
ফৈজি মাের নাম, জাতিতে মােগল,
সম্রাট সদনে রই,
এসেছিনু যবে বাদশাহ সনে—
মৃগয়া কারণ বনে-
হেরিনু সবিতা, বন দেবী সম,
ফুল তুলে এক মনে।
আপনা ভুলিনু, ধরম ডুবানু,
হেরি সে সৌন্দৰ্যরাশী,
আঁকি হৃদয়ে, প্রতিমা তাহার,
নিরজনে একা বসি,
রিপু বশী আমি, রাখিতে নারিনু,
হৃদয় সংযত করে-
আসিনু লভিতে, সৰিত লতায়-
ব্রাহ্মণের বেশ ধরে-
৭০
ফুলহাৱ
T
মহান্ হৃদয়, দয়াময় তুমি,
সাদরে গ্রহিলে মােরে,
সেই হতে প্রভু। নিজ সুত সম,
পালিতেছ স্নেহ ভরে।
সরলতা মাখা, সবিতা সুন্দরী,
সােনার নলিনী যেন,
কেমনে তাহায়, এ পাপ কাহিনী,
শুনাব অশনি হেন।
বলে দাও দেব! প্রায়শ্চিত্ত এর,
শাস্ত্রেতে কি লেখা আছে-
যতই কঠোর, হােক্ সে বিধান,
সহজ আমার কাছে।
ওহহ কি যাতনা, অনুতাপানলে,
চিতা সম জ্বলে বুক,
বিদায় লইনু চরণে তােমার,
আর না দেখাৰ মুখ।
বারেক হেরিব, দাও অনুমতি,
সবিতা লতায় তব,
বারেক হেরিয়া, সেই মুখ খানি,
জনমের শােধ যাব।
ফুলহাৱ
অশনি সমান, যুবার কাহিনী
বাজিল তাপস বুকে,
ভাঙিল সুদৃঢ়, ধৈর্য্যের বাঁধ
নিদারুণ দুঃখ ক্ষোভে।
মুহুর্ভেক পরে সংযমি আপনা—
বলেন কোমল স্বরে-
“যাও সুদর্শন! স্নেহ বশে আজি
ক্ষমিলাম আমি তোরে,
করি প্রার্থনা, পরমেশ পদে,
তিনিও ক্ষমেন যেন,
এত প্রতারণা কেন রে করিলি,
হইয়ে সরল হেন।
শাস্তি তাে তােমার হইয়াছে পুত্র !
মহা অনুতাপানল,
যা সে অনলে, মরমের ক্লেদ,
পাও যেন হৃদে ব”।
করিও না দেখা, সবিতার সনে
সরলা বালিকা সে যে-
যদি তব এই, চকিত গমন,
নিদারুণ তারে বাজে
૧૬
ফুলহার
কথা শেষ করি, দেখেন তাপস,
যায় যুব ধীরে ধীরে,
কহেন স্বগত, বিভূর আশীষ,
ঝরুক তমার শিরে ।
( ৩ )
মিশেছে চারিটি দীরঘ বরষ,
অতীত কালের কোলে
মানবের সুখে, মানবের দুখে-
হেসে কেঁদে গেছে চলে ।
অতীতের স্মৃতি, বুকে লয়ে কেহ,
ভাসিছে নয়ন নীরে-
কাল ধীরে ধীরে, সময় প্রলেপে
মুছায় সে ব্যথাটিরে।
বিজয়ী সমরে আনন্দিত প্রাণ,
রাজা মানসিংহ রায়,
বিজয় গৌরবে, আসিয়া দিল্লীতে,
নিবেদিলা বাদশায় ।
কর অবধান, দিল্লীর ঈশ্বর ।
এসেছি জিনিয়া রণে
এনেছি যতনে, অম্বর প্রাসাদে,
যতেক বন্দিনীগণে।
ফুলহাৱ ৫ পরম সন্তোষে দিয়া আলিঙ্গন, ভারত সম্রাট কয়, অবলা নারীরে, বন্দিনী করিতে উচিত রাজ নয়। পালহ নিদেশ, নির্দোষী তাহারা, দাও মুক্তি সবাকার, তােমারি করেতে অৰ্পিনু রাজ- তাদের বিচার ভার । প্রফুল্ল অন্তরে-অম্বরের পতি— অম্বরে আসিয়া ফিরে— এক জন বিনা-যতেক বন্দিনী দিলা মুক্তি সবাকারে। ভাসি নেত্ৰ নীরে, কহিল সে জন, কোন্ দোষে দোষী আমি; সবে মুক্ত করি, আমাকেই কেন, রেখেছ অম্বর স্বামী। মৃদু মৃদু হাসি, কহিল। রাজন। কোর না সুন্দরী রােষ, জোছনা বরণী, স্বর্গ দূতী তুমি, করিতে না পার দোষ! s
ফুলহার
কেন কঁাদ বালা, কিসের অভাব ?
কেন বল এত ভাবাে ।
এ অধম রাজা, অম্বর প্রাসাদ,
জেন এ সকলি তব।
বিনয় বচনে—বলিল তরুণী
বীরেন্দ্র অম্বর পতি!
পরিহাস তব, শােভে কি রাজন্ ?
নগন্যা কিঙ্করী প্রতি ।
দাও মুক্তি রাজা, অরণ্যবাসিনী,
যাই প্রিয় বনে চলে
চঞ্চলা হরিণী, হয় কি গাে সুখী ?
সুবৰ্ণ শৃঙ্খল দিলে ?
ক্ষুদ্রা নারী আমি, কোন্ প্রয়ােজনে,
রেখেছ বন্দিনী করে-
আজন্ম পালিত, বনের বিহগে-
ফিরে দাও তার নীড়ে।
কহিলা রাজন, অবােধ বালিকা।
কেন অকারণ ভয়,
থাক হৃষ্ট মনে, নাহিক ভাবনা,
দিব মুক্তি সুনিশ্চয়,
।
ফুলহার ভীতা কুরঙ্গিনী ব্যাধেরে যেমন- সত্রাস নয়নে হেরে তেম্নি সভয়ে—রাজা মুখ পানে- চাহে বালা অতি ধীরে। (৪) সভা মধ্যখানে, কনক আসনে, আসীন অম্বর রাজ। বেষ্টিত চৌদিকে, পাত্র মিত্ৰগণ, অমাত্য মন্ত্রী সমাজ। শােভে স্বর্ণ ছত্র, মস্তক উপরে- গায় জয় ধ্বনি সবে মুখরিত দিশি, পূরিত অম্বর, ঘন জয় জয় রবে। হােল রাজ কাজ, বিচার সবার, সভা সমাপন হয়- “মাগে দরশন, মুনি একজন, কিঙ্কর প্রণমি কয়। আন সমাদরে, সভার ভিতরে দিল। আজ্ঞা মহারাজ। জটাজুট ধারী, তাপস একটি, পশিল সভার মাঝ। S ৭৬
ফুলহাৱ
সন্ত্ৰমে উঠিয়া, আসন দানিয়া,
বিনয়ে রাজন্ কয়,
“কোন্ প্রয়ােজনে, অধম আসে—
আগমন মহাশয়” ?
কহিল তাপস, “আবেদন এক,
আছে রাণা ! তব পাসে,
ব্যপ্ত সৰ্বজনে—বিবেচক তুমি
এসেছি বিচার আশে”।
সভার সুমুখে, না চাহি বলিতে
গােপনীয় তাহা অতি,
সভা ভঙ্গ পরে, কহিলা তাপস,
চাহিয়া রাজার প্রতি।
“শুন রাণা! অজ করহ বিচার,
বিচারক রাজা তুমি ।
ছিল মাের এক পালিতা দুহিতা,
আলো করে বন ভূমি,
সংসার ত্যাগী, সন্ন্যাসী বন্ধন,
নয়ন পুতলি মম,
সদানন্দময়ী, সরলা বালিকা,
নন্দন কুসুম সম”।
૧૧
ফুলহার
রাখিনু তাহারে—রাজঅন্তঃপুরে
নিরাপদে রবে ভেবে
জিনি তুমি রণে, দুর্গ অধিকারি,
অম্বরে আনিলে সবে –
একে একে রাজা, দিলে মুক্তি সবে-
সেই শুধু একা আছে,
দাও ফিরাইয়া তনয়া আমার,
এই ভিক্ষা তব কাছে।
বিনয় বচনে, কহিলা রাজন,
বনবাসী ঋষি তুমি,
কি করিবে প্রভু। তনয়া লইয়া,
যতনে রেখেছি আমি ।
বিজন অরণ্য, যুবতী নারীর,
নিরাপদ কভু নয়,
সুরক্ষিত সদা, অন্তঃপুর মম,
নাহিক বিপদ ভয়।
৮
গরজিয়া ক্রোধে-কহিলা তাপস
দিবে না ফিরায়ে তবে ?
ভেবেছ কি রাজা! সবিতা তােমার
বিলাস গণিকা হবে ?
দ
ফুলহার
কামিনী অভাব, নাহি তাে তােমার,
তবে কেন মন্দ মতি।
নিভৃত অরণ্যে, ফুটছিল ফুল,
কুদৃষ্টি তাহার প্রতি।
শুন মহারাজ! হস্তপ্রার্থী যদি
হও মাের কাছে তার,
পরম নিশ্চিন্তে, তোমার করেতে
অর্পিব তাহার ভার।
কিন্তু যেন স্থির, পবিত্রা সবিতা
হবে না গণিকা তব,
নাহি পাই যদি, সুবিচার হেথা,
সম্রাট সমীপে যাব।
অনত আননে কহিলা রাজ
অজ্ঞাত বংশীয়া নারী,
বল দেব! আমি, কেমনে তাহারে
বিবাহ করিতে পারি ?
কহিল তাপস, “আমার বচন,
যদি তব মনে লয়,
জানিও রাজ, সবিতা আমার
নীচ কুলােদ্ভৰা নয়।
ফুলহার
রাজপুত বালা, রাজার বংশীয়া
শুধু এই পরিচয়,
এই মাত্র জেনে—যদি ইচ্ছা হয়—
কর তারে পরিণয়”।
ক্ষণেক চিন্তিয়া কহিলা রাজ
প্রণমি তাপস পায়,
তাই হে'ক দেব ! কর মােরে দান,
অতুলনা সবিতায়।
( ৫ )
সুরম্য প্রাসাদে—বসিয়া পালঙ্কে-
অম্বার নূতন রাণী,
চাদের হাসিটি, তুলিয়ে কে যেন,
গঠেছে প্রতিমা খানি।
হাতে লয়ে ক্ষুদ্র, লিপি এক খানি,
বলিছে আপন মনে
বহু দিন গত মধুর শৈশব,
আবার জাগিছে প্রাণে।
জান না কি তুমি ভাই সুদর্শন।
আমি যে পরের দারা-
তবে কেন ভাই! লিখিলে এ লিপি,
হইয়ে পাগল পারা।
ফুলহাৱ
অম্বর মহিষী, আমি যে এখন,
নহি তাে সবিতা আর
আমা সনে তব, দেখা করিবার,
নাহি কোন অধিকার।
এ হেন রূপেতে কত কথা রাণী—–
ভাবেন বিরলে বসি,
আসিল চঞ্চল বড় রাণী সখি,
অধরে ক্ষারছে হাসি।
কহিলা হাসিয়া, কই গাে মহিষী ।
লিপির উত্তর তার ?
কহিল মহিষী, বল লাে চঞ্চলা।
উত্তর কি দিব আব ।
বাল্য সখা মোর, সেই সুদর্শন,
কহিও তাহারে আজ
নিশা দ্বিপ্রহরে, সম্রাট সদনে,
যাবেন অম্বর রাঙ্গ।
সেই অবসরে—মহেশ মন্দিরে
করিব লাে আমি দেখা,
ফিরাইয়া দিও লিপিখানি তার
রাখিব তার লেখা।”
৪৯
ফুলহার
“যে অজ্ঞ।” বলিয়া চতুরা চঞ্চলা,
গেল বড় রাণী কাছে—
বুঝিল তাহা, সরল সবিতা,
ডুবিয়া চিন্তার মাঝে।
সহসা শুনিল, সসম্ভ্রমে দ্বারী,
কাহারে জানায় নতি,
অসময়ে আজ, অন্তঃপুরে কেন,
আসেন অম্বর পতি ;
দেখিল ফিরিয়া, দাঁড়ায়ে দুয়ারে
রাজা মানসিংহ রায়।
ভালবাসা-ভরিয়া আঁখিতে
অনিমেষে দেখে তায়।
“আসুন রাজ!” বলিয়া সবিতা,
করি আবাহন তারে—
ধরি দুটি হাত, বসাল সাদরে
' রজত পালঙ্ক পরে।
কহিলা রূজ “বিদায় আমায়,
দাও গাে হৃদয় রাণি ।
যেতে হবে রণে, ছাড়িয়া তােমায়,
চুমিয়া ও মুখ খানি ।
৮২
ফুলহা
যদি আসি ফিরে, পুন লাে তােমারে
ধরিব হৃদয় মাঝ ।
নহিলে সরলে! এ মধু মিলন,
শেষ আমাদের আজ।
কহিল সবিতা, “বােল না ও কথা-
আনিও না আর মুখে
ও দারুণ বাণী, বাজের মতন
বাজে গাে আমার বুকে।
।
যাইবে সমরে, নাহি ডরি তায়,
করিব অভয়া পূজা,
করালী কালিকা-কবচ মতন
রক্ষিবেন তােমা রাজা!
কিন্তু গাে বােল না,—এ শেষ মিলন,
বােলনা ও কথা আর,
হৃদয় রতন তুমি যে স্বামিন,
অভাগিনী সবিতার।
সাদরে আলিঙ্গি, বলেন রাজন,
চুমি মুখ বার বার,
সমরে কি ভয় হয় লাে তাহার,
এমন দয়িতা যার।
ফুলহাৱ
(৬)
প্রমােদ কাননে মৰ্ম্মর আসন,
মনােহর শােভা পায় ।
প্রধানা মহিষী কমল কুমারী,
আসীনা আছেন তায়।
বেড়ি চারি ধারে শত সহচরী
কেহ সেবে রাঙা পদ,
কেহ সযতনে-সাজায় চন্দনে--
মুখ ইন্দু কোকনদ।
হেলিয়া দুলিয়া, ভাবেতে বিভাের,
আসিল চঞ্চল দাসী,
কি যেন হরষে অধরে তাহার,
উথলি উঠিছে হাসি।
কহিলা মহিষী, “আয় লাে চঞ্চলা ।
বল্ কি খবর পেলি ?
মহারাজ নাকি, যাবেন সমরে ?
কি সংবাদ নিয়ে এলি” ?
নূতন মহিষী, সবিতা সুন্দরী,
বড়ই সৌভাগ্যবতী,
তাহার মন্দিরে, বসতি এখন,
করেন অম্বর পতি।
৪
ফুলহার কহিল চঞ্চলা, “সুখ রবি অস্তমিত হােল রাণি । দেখিনু রাজার, হৃদয় জুড়িয়া, বসেছে নূতন রাণী । কত না সােহাগ, করিছেন রাজা পলকে হারান তায়, এইবার তৰ-পাট রাণী নাম- ঘুচে গেল বুঝি হয় । কিন্তু গো মহিষী ! চঞ্চলা তােমার, সহিবে না এত জ্বালা, দেখিব কেমনে–পাট রাণী হয়, ভিখারী সন্ন্যাসী বালা। এই দেখ তার-মরণ ঔষধি রয়েছে আমার হাতে ; ভাঙিব তাহার, কোমল হৃদয়, ভীষণ অশনি পাতে। “বল্ লাে চঞ্চলা ! বল্ কি ঔষধি,” শিহরি কহেন রাণী। হাসিয়া চঞ্চলা, দিল হাতে ভর, ক্ষুদ্র লিপি একখানি।
ফুলহাৱ
(৭)
সমাগত প্রায়, রজনী দ্বিযান,
আলােক উজ্জ্বল ঘরে-
করি যুক্ত পানী, অম্বরের রাণী,
পূজিছেন মহেশ্বরে।
ব্যথিত ব্যকুল-প্রাণের প্রার্থনা
জানাইয়া পূজা শেষে
দেখেন চাহিয়া, সঙ্কোচে চঞ্চলা-
দাঁড়ায়ে দুয়ার পাশে।
কহিলেন রাণী, আয় লো সজনী !
বল্ কিবা প্রয়ােজন ?
জিজ্ঞাসে চঞ্চলা, গভীর নিশায়,
কেন পূজা আয়ােজন ?
উত্তরে সবিতা, জান না কি সখি !
সমরে যাবেন রাজা,
কল্যাণ কামনা করিয়া নাথের,
করিতেছি তাই পূজা।
ক্ষণ দ্বিধা ভরে—কহিল চঞ্চল
চল রাণী ! ত্বরা করে—
সেথা সুদর্শন, আশায় তােমার,
দাড়ায়ে মন্দির দ্বারে।
ফুলহার
সুধা মাখা স্বরে—কহিল সবিতা,
রাখ লাে মিনতি আজ।
কহিও তাহারে—আজিকে সমরে-
যাবেন অম্বর রাজ ।
ব্যকুল আজিকে—অন্তর আমার
নাথের মঙ্গল তরে,
করিব সাক্ষাৎ, পশ্চাতে সজনী।
প্রিয়তম এলে ফিরে।
অনুমতি নিতে হয়নি সময়
জানাইনি সব কথা,
আজিকে ক্ষমিতে—বলিও আমায়,
যাও সখি তুমি তথা।
কহিল চঞ্চলা, এক কথা রাণী ।
নিবেদি তােমার পায়,
দণ্ড মাত্র শুধু, করিবে সাক্ষাৎ,
বল কি ক্ষতি তায় ?
জানাতে বারতা—মহারাজ পাশে
এবে নাহি প্রয়ােজন,
ফিরিলে আদরে-বসায়ে হারে
বােল সব বিবরণ।
}
৮৭
ফুলহাৱ চিন্তি ক্ষণকাল, কহে ধীরে ধীরে সরলা সবিতা রাণী, চল তবে সখি রাখিব তােমার বাণী। করিব সাক্ষাৎ, ( ৮ ) অন্তঃপুর হতে, সকলের সাথে, করি মিষ্ট আলাপন হেরিলেন রাজা, গুপ্ত দ্বার পথে— ভাতা নারী একজন। বিস্মিত কৌতুকে—অগ্রসর ধীরে— কহিলেন তায় রাণা, “এই দ্বার পথে—নিষেধ আসিতে নাহ কি তোমার জানা ? কে তুমি রমণি! হেন নিশঙ্কিনী, লঙ্েিল আদেশ আজ ! ভয়স্ত্রস্ত স্বরেকহিল রমণী, ক্ষমা কর মহারাজ! প্রধানা রাণীর, সেবা দাসী আমি, চঞ্চলা অামার নাম- নূতন মহিষী, প্রেরিলা আমারে, ক্ষমা কর গুণধাম। BE
ফুলহার
(৯)
নিশা দ্বিপ্রহর, অতীত এখন,
অচেতন রাজপুরী।
প্রাসাদ হইতে-ধীর পদক্ষেপে
বাহিরিল দুই নারী।
ক্রমে উপনীতা, সবিতা চঞ্চলা—
মহেশের মন্দিরে
যেথা সুদর্শন, আশায় তাদের,
আগ্রহে দাড়ায়ে দ্বারে ।
“কোন্ প্রয়ােজনে, সাক্ষাৎ আমার,
মাগিয়াছ সুদর্শন ?
ভুলেছ কি ভাই! রাজার মহিষী,
দেখে না রবি কিরণ”
বলি এই কথা, অধােমুখে রাণী,
দাঁড়াল তাহার পাশে,
কহে সুদর্শন, বিজড়িত স্বরে,
নয়নের নীরে ভেসে।
পাষানী সবিতা ! এতই পাষাণী ?
হয়েছ এখন তুমি ?
ঐশ্বৰ্য সেবিতা, রাজ রাণী তুমি,
আমি হা ভাল জানি।
৯১
ফুলহার
কিন্তু কি করিব, অবােধ হৃদয়
কিছুই বােঝে না সখি!
যাব দেশান্তরে-জনমের মত
একবার তােমা দেখি।
নিয়ত জাগিছে—হৃদয় মাঝারে
ও মধু মূরতি খানি,
একবার শুনি, ও বীণা ঝঙ্কার,
যাব গাে হৃদয় রাণি !
এখনাে বােঝে না হৃদয় তোমার ?
বলিয়া চকিত স্বরে
চমকি মহিষী, যেন কি ভাবিয়া—
দাঁড়াল সরিয়া দূরে।
সহােদর সম, আমি যে এখন,
সদা তােমা মনে করি,
তবে কেন তুমি, আবার দেখিতে,
এসেছ পরের নারী।
এসেছ কি তবে, ভুলাতে আমায় ?
হরিতে সবিতা মন,
নহে দ্বিচারিনী, অম্বরের রাণী,
মিছা আশা সুদর্শন !
ফুলহার
অধিক বিস্ময়ে, কহিলা রাজ
বল্ কোন্ প্রয়োজনে ?
কি আদেশ লয়ে–নূতন রাণীর
এসেছি এই খানে ?
কম্পিত কাতরে, কহিল সাপিনী ।
কেমনে নিবেদি পায়,
কহিতে রাণীর, কলঙ্ক কাহিনী
রসনা অবশ প্রায়।
পূর্বের প্রণয়ী, আছে যে রাণীর,
নাহি জানিতাম কভু।
ধর মহারাজ !.এই লিপি তার,
আমারে ক্ষমিও প্রভু!
আদেশ বাহিকা, দাসী মাত্র আমি,
আদেশ অমার প্রতি,
নিশা দ্বিপ্রহরে মিলাতে দোহারে
কহে বাম জানু পাতি ।
সুনীল আকাশে, সহসা যেমতি,
নিবিড় মেঘের ছায়া
পলকে তেমনি, হােল মুখখানি,
রােষে ক্ষোভে জ্বলে হিয়া।
৪৯
ফুলহার
সে ভীম মুরতি, হেরিয়া রাণার,
শঙ্কা আকুল বুকে-
নাহি সরে বাণী, সভয়ে পাপিনী,
চাহিল রাজার দিকে।
কঠিন কণ্ঠেতে—কহিলেন রাণী,
বুক ফাটা
বেদনায়,
দাসীর বচনে--প্রত্যয় না মানে-
রাজা মানসিংহ রায়।
জান তুমি নারি! কি মহা গরল !
আনিয়াছ রসনায় ?
কেমনে বুঝিব এ বারতা তব,
শুধু প্রতারণা নয়”।
ভাসি অশ্রুজলেরাজা পদতলে
বসিয়া কুটিলা কহে,
“দীনা দাসী আমি, হেন স্পর্ধা মাের,
অসম্ভব কভু নহে।
যদি মহারাজ! চাহেন দেখিতে
দেখাৰ সকলি তবে,
আজি নিশাকালে, মহেশ মন্দিরে
দোহার মিলন হবে।
ফুলহার
মন্দ অভিপ্রায়ে আসি নাই দেব ।
পুরীর বাহির হয়ে-
“আসিয়াছ রাণি ! চঞ্চলার সাথে-
উত্তম মানস লয়ে,
।
অথবা এসেছ, পূজিতে মহেশে-
পরম ভকতি ভরে,
নিজন নিশায়, কর বুঝি পূজা
': আমার মঙ্গল তরে ।
কিন্তু গাে তােমার মঙ্গল কামনা
চাহে না অম্বর রাজ।
তার সনে তব সকল সম্বন্ধ,
শেষ হয়ে গেল আজ।
“চিরদিন মনে রাখিব তােমায়,
কাহারে কহিলে সতি।
ঈষৎ হাসিয়া, বিদ্রুপের স্বরে
কহিল অম্বরপতি।
পুরীর বাহিরে, কোথা গিয়াছিলে,
জিজ্ঞাসি যখন সবে-
কলঙ্কিনী ওই, মানসিংহ বাণী,
দেখায়ে তােমারে কবে।
।
.
.
ফুলহার
সন্তোষজনক,
উত্তর তাহার,
কি দিৰে তাপস বালা ?
অরণ্যে পালিতা, সরলা বালিকা,
হৃদে ধর এত ছলা ?
হায় রে বিধাত, কোমল প্রসূনে
সৃজিয়াছ কীট এত,
পারিজাত ভ্রমে, কণ্ঠে পরে তায়,
অজ্ঞান মানব যত।
পাষাণ প্রতিমা, মতন সবিতা,
শুনিল রাজার বাণী।
মূরছিত হয়ে, পতি পদতলে—
পড়িল অম্বার রাণী।
মহা ঘৃণাভরে, করি পদাঘাত,
কোমল তনুতে হায়-
ফিরাইয়া মুখ অম্বরের রাণ।
সরােষে চলিয়া যায় ।
শীতল সমীরে শিশিরের নীরে—
জ্ঞান হােল সবিতার,
হেরি তরু বরে, বলে রাজা ভ্রমে,
নয়নে সলিল ধার।
ফুলহাৱ
চির পূজ্য তুমি, রহিবে আমার,
পবিত্র ভ্রাতার স্নেহে,
কলুষিত তায়, করিও না আর
কামনার ক্লেদ দিয়ে।
হেরিলেন রাণী, অবনত মুখে
যায় যুবা
ধীরে ধীরে,
করুণ হৃদয়ে, কহে স্নেহময়ী,
মমতা মণ্ডিত স্বরে--
“চিরদিন ভাই! সােদর সমান,
রাখিব তােমায় মনে,
“গভীর নিশায়, অম্বর ঈশ্বরি।
এত প্রেম কার সনে ?
A
1
কে যেন করিল পশ্চাতে রাণীর,
এ ভীষণ প্রতিধ্বনি
চমকিয়া ফিরি, জোছনা আলােকে
হেরিলা সভয়ে রাণী,
দাঁড়াইয়া রাজা মানসিংহ রায়
গভীর জলদ প্রায়,
নয়ন হইতে-অনলের কণা,
যেন রে ছুটিয়া যায়।
ফুলহাৱ কহিল রাজন, সুগম্ভীর স্বরে আসিয়াছ অভিসারে ? স্বর্ণলতা ভ্রমে, এ কাল সাপিনী । রেখেছিনু বুকে করে- অবসর পেয়ে ভীষণ দংশন, করিয়াছ পাপিয়সি ! চাদের কিরণে—নিমেষে রাজার ঝলকি উঠিল অসি। -- । - মিলনে রবে। কহিলা রাজন, নিশঙ্কিনী নারী। স্মর নিজ ইষ্টদেবে— নাহিক ভাবনা, শমন সদনে, যুগল অথবা পাপিনি ! না বধিব তােরে, নিজ অসি কলঙ্কিতে প্রভাত না হতে—ত্যজিয়া অম্বর- যেও প্রণয়ার সাথে । কহিলা কাতরে—সবিতা সুন্দরী, “অবিশ্বাস মােরে স্বামী। সাক্ষী মহেশ্বর, সাক্ষী নিশাকর, নহিক অসতি আমি ।
ফুলহার
“দাও দাও স্বামি! শীতল কৃপাণ,
পশিয়ে.আমার বুকে
পতি উপেক্ষিতা, জগত ঘৃণিত,
বাঁচিবে কিসের সুখে,
যথার্থ কাহিনী শুন রাজা এই,
অভাগীর নিবেদন,
নহি কলঙ্কিনী ! নহেক আমার,
প্রণয়ী সে সুদর্শন।
সহোদর সম—আমি গো তাহায়,
চিরদিন ভালবাসি,
সেই স্নেহ বশে, দেখা করিবারে,
মহেশ মন্দিরে আসি।
বল গাে স্বামি ! বল একবার,
ক্ষমিলে কি অভাগীরে ?
শুনি এই কথা তিরপিত প্রাণে
আলিঙ্গিব মরণেরে।
হায় হায়, একি গেছেন স্বামি ;
নাই মোর কেহ নাই ;
কলঙ্কিনী বলে, ছেড়েছে সকলে
জুড়াতে নাহিক ঠাঁই।
ফুলহাৱ
কোন্ পথে তুমি, গিয়াছ রাজ।
বলিয়া পাগল মেয়ে-
উন্মাদিনী প্রায়, গভীর নিশায়,
গেল রাজ পথে ধেয়ে।
(১০)
লতায় রচিত কুটির একটি,
দাঁড়ায়ে বিপিন গায়,
গৈরিক বসনা নব সন্ন্যাসিনী,
ধ্যানে নিমগনা তায়।
কুটিরের গায়ে আলেখ্য কাহার,
বাঁধিয়া লতার ডােরে
দিয়া পুস্পাঞ্জলি, আলেখ্যর পায়,
পরম ভকতি ভরে।
নমি সন্ন্যাসিনী, কহিল হাসিয়া,
“ত্যজেছ আমায় স্বামি।
ভকতি শৃঙ্খলেও পদ পঙ্কজ
বাঁধিয়া রেখেছি আমি।
সাধ্য কি তােমার, ছিড়িতে শৃঙ্খল,
বেঁধেছি সুদৃঢ় কোরে।
এমন সময়, তাপস একটি,
প্রবেশিল সেই ঘরে
s
ফুলহার
বারেক ফিরিয়া, হেরি বালা রে—
বারেক হেরিল ছবি
বারেক হেরিল, গগনের গায়
অস্তমিত হয় রবি।
কহিলা তাপস, “উঠ মা সবিতা!
দেখ দিনমণি গেল,
এমন করিয়া অনাহারে রােলে’-
কি উপায় হবে বল ?
কহিল সবিতা, “বল বল পিতা !
এসেছেন স্বামী মাের?
এলেন কি রাজা, লইতে আমায় ?
ভেঙেছে কি ভ্রম ঘাের ?
কালি নিশা কালে—দেখিনু স্বপন,
এলেন অম্বর নাথ।
বলিলেন যেন—যাইতে অম্বরে—
ধরিয়া আমার হাত।
কহিলা তাপস—তিতি আঁখি নীরে-
পূর্ণ হােতূ মনস্কাম,
করি আশীৰ্বাদ, পুন যেন যাও
আপন পতির ধাম।
ফুলহার
ফুরাল না কথা-সহসা সবিতা—
পড়িল মুচ্ছিতা হয়ে
কে যেন আসিল, দেখিল তাপস,
দুয়ারের দিকে চেয়ে।
;
বিষাদ মুরতি, অম্বরের পতি,
চরণ পাদুকা হীন ;
বিশুষ্ক আনন, মলিন বসন,
অাঁখি দুটি প্রভা হীন।
জ্বলি রােষানলে, পরুষ কণ্ঠেতে--
কহিলা তাপসবুর !
আরাে কি সাধিতে এসেছ হেথায়,
সত্য বল নরবর !
বনের কুসুম সবিতা আমার
ফুটেছিল নিরজনে,
কি কুক্ষণে হয়—পরিণয় তার,
দিলাম তােমার সনে।
দেখ, নরাধম । কঠিন করের
কঠোর পেষনে তাের !
দলিতা কলিকা-সরলা বালিকা
হয়ে উন্মাদিনী ঘাের।
—
ফুলহাৱ
এখনাে পূজিছে চরণ তােমার,
হের ও আলেখ্য কার,
আরাধ্য দেবতা, তুই সে নিঠুর,
উন্মাদিনী সবিতার ।
সজল নয়নে-স্খলিত বচনে—
কহিলা অম্বর রাজ,
করেছি যে ভুল, নাহি প্রতিকার,
ক্ষম মােরে প্রভু অজি।
কাচ ভ্রমে আমি—কাঞ্চন রতনে
করিয়াছি হেলা হায়,
বুঝি তাহা পরে-মহা অনুতাপে
হয়েছি পাগল প্রায়।
যশাে বিমণ্ডিত, মস্তক যাহার,
শােভিত সম্রাট পাশে
সে গর্বিত রাজা, তাপস চরণে
লুটাইল শির শেষে।
নয়নে যাহার, দেখেনিক কেউ,
কখন অখির ধারা,
আজি সে রাজার, কপােল বহিয়া,
ঝারিল শতেক ঝারা।
ফুলহাৱ
মহৎ উদার করুণায় ভরা,
তাপস হৃদয় খানি,
দ্রবিল তখন, শুনিয়া রাজার
কাতর বিনয় বাণী।
সহানুভূতির কোমল কণ্ঠেতে—
রাখি রাজা শিরে হাত
কহিলা তাপস, “ক্ষমিয়াছি আমি,
শান্ত হও নর নাথ”।
দেখহ রাজ, সুবর্ণ লতিকা--
ধুলায় লুটিছে হায়,
নিয়তির গতি, খণ্ডিতে কে পারে—
শােকে কিবা ফলােদয় ?
উঠ প্রাণাধিকা—সবিতা আমার ।
মেল আঁখি একবার,
তাপিত হৃদয়ে লইতে তােমায়
এসেছে স্বামী তােমার ।
পরম পিতার, করুণা আশীষে
সুখে রও দেহে মিলি,
বলি এই কথা, গেলেন তাপস,
কুটির বাহিরে চলি।
ফুলহাৱ
রাজার যতনে, সুস্থ হয়ে বালা-
কহিল আবেগ ভরে,
এত দিন পরে—পড়িল কি মনে
অভাগিনী সবিতারে ?
বল দেব ! এবে, ও চরণে স্থান
পাবে কি আশ্রিত দাসী ?
পাব কি সেবিতে, রাতুল চরণ,
আনন্দ সাগরে ভাসি ?
সস্নেহ কণ্ঠেতে, কহিল রাজ,
সদরে কপোল চুমি,
স্বরগ সুষমা, সােনার প্রতিমা,
মন্দার মালিকা তুমি,
রাখিব তোমারে হৃদয় মাঝারে,
করিয়া হৃদয় রাণী ।
ক্ষমার ভিখারী, এবে তব পাশে
তােমার অধম স্বামী।
ধরি রাজা কর, কহিল সবিতা
দেবতা আমার তুমি,
ক্ষমার ভিখারী—কার কাছে নাথ
চির দাসী তব আমি।
ফুলহার
সস্মিত আননে, এমন সময়,
প্রবেশি তাপস ঘরে-
প্রফুল্লা দেখিয়া, পালিতা কন্যায়,
বলেন হরষ ভরে-
দুখের রজনী, এবে অবসান,
হইয়াছে বসে তব।
চির সুখী হও করি আশীৰ্বাদ,
লভিয়া জীবন নব ।
সহসা সবিতা, মহা শ্রান্তি ভরে—
মুদিল নয়ন দুটি,
গোলাপ নিন্দিত, অধরে মধুর,
হাসিটি উঠিল ফুটি।
শােণিত বিহীন, বদন কমল,
হইল নিমেষে হায়,
প্রসারিয়া কর, পতি পদ রজ,
সতী নিজ শিরে লয়,
দেখ দেখ দেব ! কনক দীপিকা
বুঝি গাে নিৰ্বাণ হয়,
হতাশ কণ্ঠেতে, সম্ভাষী তাপসে
রাজা মানসিংহ কয় ।
১০৪
স্কুলহার
অতি ক্ষীণ-স্বরে, কহিল সবিতা
চলিলাম নাথ। আমি,
মৃত দেহ মাের, সাধের অম্বরে
লইয়া যাইও স্বামী !
কহিলা তাপস, সংসার বিরাগী,
সন্ন্যাসী বন্ধন তুমি ।
বল রে কেমনে ভুলিবে তোমার
স্নেহের এ বন ভূমি?
ঢালিবে তােমার রােপিত লতিকা,
নিতি নিতি
কঁদিবে পালিত মৃগ শিশু তব
শােকের সাগরে ভাসি।
ফুলরাশী।
চরণ ধােয়ায়ে, কুলু কুলু রবে
তুলিবে না নদী তান,
গাহিবে না আর মােহিয়া শ্রবণ
পাপিয়া মধুর গান।
নিভিবার তরে,
প্রদীপ যেমন
বারেক উজলি উঠে
তেনি বালার, অধরে হাসিটি,
আবার উঠিল ফুটে।
ফুলহার । তার পরে হায়, সব শেষ হােল- নিভে গেল চির তরে জ্বলিত যে দীপ রূপের প্রভায় বন ভূমি আলাে করে পূর্ণ হােল সাধ পতি পদ-রেণু, লইয়া মস্তকে সতী । প্রতারণা ভরা, তাপ দগ্ধ ধরা, তেয়াগিল পুণ্যবতী ! পাষাণের মত ছিলেন রাজ নীরব নিচল হয়ে উদাস পরাণে বনিতার পানে অনিমেষ চোখে চেয়ে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলি, বিদীর্ণ হৃদয়ে কহিলা তাপসে এবে; অম্বরের রাণী, উচিত সম্মানে, আজিকে অম্বরে যাবে। বল বাহকেরে আনিতে শিবিকা, ত্বরায় কুটির দ্বারে বসন ভূষণে, অগুরু চন্দনে, সাজাইয়ে সবিতারে। ১০৬
ফুলহা
ঘুমন্ত প্রতিমা, শিবিকার মাঝে,
তুলে দিব নিজ হাতে।
থােয়াব তাহার বিবর্ণ আনন,
অনুতাপ অশ্রুপাতে।
বলিতে বলিতে নয়নে রাজার
ছুটিল আঁখির ধারা,
করি আলিঙ্গন মৃতা দয়িতায়,
কহিলা পাগল পারা।
“হৃদয় সরসে, তুমি ললা আমার,
সােণার কমল ছিলে
ফুটিতে হায়, অযত্নে আমার,
অকালে ঝরিয়া গেলে”।
বড় অভিমানে—তুমি প্রিয়তমে ।
ত্যজেছ আপন প্রাণ,
আজি হতে মাের, সুখ শান্তি রবি,
হােল চির অবসান।
উঠ, একবার, প্রাণের সবিতা।
ঘুচাও মরম জ্বালা,
হৃদয়ের বল্ তােমারে হারায়ে,
কেমনে বাঁচিব বালা।
১০৭
ফুলহাৱ কেমনে ভাবিব, সবিতা আমার, বিশাল জগতে নাই, করেছিনু প্রিয়ে! অনাদর তােমা, গেলে কি ত্যজিয়া তাই ? মুছিয়া নয়ন, কহিলা তাপস- সম্বর রাজন্ শােক। যাইবে সকলে, এক দিন রাজা, সে পুণ্য অমর লােক। মিলিবে একদা, সকলে সেথায় নাহিক বিচ্ছেদ তার, গিয়া নিজ রাজ্যপাল মানসিংহ আপন কৰ্তব্য ভার। করিয়া সাধিত, জীবনের ব্রত, মিলিবে সবিতা পাশে আমিও রহিব, পরিহরি শােক, অনন্ত মিলন আশে। = পড়িল রাজন, দয়িতার বুকে যেন কুমুদিনী পরে— ভীষণ শােকের রাহু অমানিশা ঢেকেছে রে শশধরে। ১০
ফুলহার
(১১)
উঠেছে সঙ্গীত আজি সাহানার তানে,
সজ্জিত অম্বর আজি কুসুম ষণে,
সুনীল পতাকা শােভে প্রাসাদ উপরে-
কঁপিতেছে মৃদু মৃদু সমীরণ ভরে।
কুসুম মালিকা শােভে সকল গৰাক্ষে,
উর্ধে শোভে তারা হার নীল নভ বুকে।
আসিছে মহিষী লয়ে অম্বরের রাজ।
আনন্দ উৎসব তাই অম্বরেতে আজ।
ক্রমে উপনীত হােল শিবিকা রাণীর,
চৌদিকে ঘেরিয়া যত রাজপুত বীর।
পিছনে আসিছে ধীরে রাজনের হয়।
আনন্দের স্রোত যেন চারিদিকে বয়।
মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি করে প্রজাগণ,
কিন্তু গাে রাজার কেন বিষন্ন আনন?
কেন হাসি নাই মুখে আনন্দের দিনে ?
সজল নয়ন দুটি কিসের কারণে?
শিবিকা প্রাসাদ দ্বারে উত্তরিল আসি—
শুভ ঘট লয়ে এল যত পুরবাসী।
ধীর হন্তে আবরণ করি উন্মােচন,
ব্যথিত করুণ কণ্ঠে কহিল রাজ।
ফুলহার
“দেখ সবে আনিয়াছি ঝরে পড়া ফুল,
কেন সবে হইয়াছ আমােদে আকুল,
যার তরে সাজায়েছ অম্বর নগরী,
সে গেছে অমর ধাম ত্যজি মৰ্ত্তপুরী।
কহিলা আকুল স্বরে কমল কুমারী,
উঠ বােন্! একবার নিদ্রা পরিহরি।
স্বরগের দেৰী তুমি পাপের মহীতে
অকালে শুখালে বােন কিসের নিমিত্তে ?
অভিমানে আদরিণী ? ত্যজিয়াছ প্রাণ,
সজ্জিত অম্বর হােল শ্মশান সমান।
ফিরেনাক আর হায় সহস্র রােদনে-
একবার গিয়াছে যে সে মহা প্রস্থানে।
ফুলহাৱ
ভাজমহল।
ধন্য তুমি পতির প্রেমে
ধন্য তুমি মােগল সুতা,
চির অটুট এ মর ধরায়,
তােমার প্রেমের অমর গাথা।
শুভ্র পাষাণ সৌধে হেরি-
সবারি শির লুটায় ভূমে,
সুপ্ত হেথা দিল্লিশ্বরী
পতির পাশে সুখের ঘুমে।
অতুল প্রেমের অট্টালিকায়,
চুম্বনিয়া অপন ভুলি
যমুনা বয় পদতলে--
কল কলে লহর তুলি।
নয় এ পাষাণ, পুষ্পরাশী,
নিজ্জীব নয় লতা পাতা,
জানায় তারা মৌন মুখে
মহান প্রেমের করুণ কথা।
ফুলহার
কু সন্তানের নিষ্ঠুরতা,
পশেছিল তােমার কাণে-
ব্যথিত হয়ে টেনে নিলে
আপন পাশে হৃদয় ধনে,
শীতল করে সকল ব্যথা,
মুছিয়ে দিলে প্রণয় ভরে,
ডেকে নিলে প্রেমের ছায়ায়,
স্বপ্নলােকে শান্তি ক্রোড়ে,
নিজন ঘরে অন্ধকারে
পতির নিবিড় আলিঙ্গনে
বিশ্ব জগৎ ভুলিয়ে সতি।
ঘুমিয়ে আছ মুগ্ধ মনে,
ঘুমাও তুমি ঘুমাও সতি।
তাজমহলের আঁধার ঘরে,
মহান্ প্রেমের মিলন তাজে
দেখুক জগৎ নয়ন ভরে।
১১
ফুলহার বর্ষণে। (আজি) ভরেছে সুনীল উদার গগন সজল নীরদ নবীন ঘনে, তাপিত ধরণী হােল সুশীতল, জুড়াইল দাহ সুবরিষণে । প্রকৃতি আজিকে ধূসর বসনে- সেজেছে মধুর স্নিগ্ধ বেশ- স্মিত শান্তি ভরা সারাটি ধরণী, আবেগ বিভােলা সিক্ত কেশ, পিয়াসা আকুল প্রাণেতে চাতকী- ফুকারিতেছিল দিবস নিশা আজি সুশীতল বারি বিন্দু পিয়ে নিভাইল জ্বালা মিটাল তৃষা। ফুল গন্ধ ভরা মৃদু সমীরণ, সস্নেহ পরশ লাগায় গায়, পরম পিতার বিপুল করুণা প্রাণের মাঝারে জাগায়ে দেয়। নাম বিশ্বরাজ! নমি পিতঃ ! তব, চরণ কমলে আনত শিরে— কি করুণা দিয়ে, কি গভীর স্নেহে, বিশাল ধরে রেখেছ ঘিরে। । । ৯৯৩
ফুলহার
আগ্রা দুর্গ।
অতুল সৌন্দৰ্য্যময়ী রাজ অট্টালিকা,
কোন্ সুনিপুণ করে,
সম্রাটের তৃপ্তি তরে,
নির্মিত হয়েছ তুমি বেষ্টিত পরিখা।
কঠিন প্রস্তর ফলা,
লইয়ে এ শিল্পকলা,
জানি না দেখায়ে গেছে কোন শিল্পকার ;
কাঠিন্য কোমলে ভরা
মরি কিবা মনােহরা
মরতে এনেছে যেন শােভা অমরার।
আমােস দরবার,
অতুলন এ ধরার,
অপূৰ্ব পাষাণ শিল্প নহে বর্ণিবার,
বারি হীন ফোয়ারার
নব শােভা নাহি আর
তবু যেন ভরা হে সৌন্দৰ্য্য সম্ভার।
১৩
ফুলহার বীরের রুধির ধারা, রঞ্জিত পাষাণ কারা, দেখিলে না শিহরায় হৃদয় কাহার ? কত উষ্ণ অশ্রুধার, বুকে ভরা আছে তার, এইখানে কত শত নির্দোষীর প্রাণ, শেষ শ্বাস বায়ুস্তরে, মিশায়েছে অবিচারে, অকালে ভবের খেলা করি অবসান। উপরেতে শােভা ধার, নিকেতন বাশার, নীচে তার ভরা আছে শুধু হাহাকার, উপরে নন্দন বন আনন্দের প্রবন বুক ফাটা আর্তনাদ নীচে অবলার- ভাই ভাই পরস্পরে- ধুয়েছে রুধির ধারে— কতই মৰ্ম্মরময় কক্ষ প্রাসাদের একই মায়ের স্তনে- পালিত যে দুই জনে— ধমনীতে এক রক্ত একই গর্ভের।
ফুলহাৱ
.
এক প্রাণ দুই দেহ,
ভুলে গিয়ে সেই স্নেহ,
বিরােধ সাম্রাজ্য তরে অর্থ পিপাসায়,
বিসজ্জি মমতা স্নেহে-
অগ্রজ কনিষ্ঠ দেহে
করিয়াছে অস্ত্রাঘাত শত্রুরূপে হায়।
পিতা পুত্ৰ অসি হাতে
আলিঙ্গন মৃত্যু সাথে
পুত্রের বাৎসল্য নাই হৃদয়ে পিতার,
অস্ত্র হানে পিতৃ বুকে-
সন্তান অম্লান মুখে
পার্থিব সম্পদে শুধু আকিঞ্চন তার।
রাজনীতি চক্র তলে,
নিষ্পেষিত প্রতি পলে
পুত্র স্নেহ, পিতৃভক্তি, বৃত্তি সুকুমার।
তাই হায় সাজাহান
বিষাদে ত্যজিলা প্রাণ
অশ্রু জলে ভাসি’ স্মরি পুত্র ব্যবহার।
মরু মাঝে জন্ম লয়ে,
ভারত সম্রাজ্ঞী হয়ে,
রূপ রাণী নুরজাহান গিয়াস দুহিতা
১৯৬
ফুলহাৱ
সারাটি ভারত ভরে
রেখে গেছে চিরতরে
ইতিহাস পৃষ্ঠা পরে, নারীর ক্ষমতা।
পুণ্য নিঝরিণী প্রায়,
স্নেহ প্রীতি মমতায়,
গুণবতী মমতাজ সৌন্দর্য প্রতিমা,
দেবের নির্মাল্য সম,
পবিত্রতা নিরুপম,
পতি পরায়ণা সতী নারী অতুলনা।
চির তরে আঁখি মুদে
শেষ শ্বাস এ প্রাসাদে
রেখে গেছে, আজও আছে সৌরভ তাহার।
সেই সুখ ভরা দিন,
কাল গর্ভে এবে লীন,
অতীত কাহিনী শুধু স্বপনের পার।
ছিন্ন তার বীণা প্রায়,
নির্জন এ পুরী হায়,
এক দিন ছিল এ যে-সদা মুখরিত,
শোভায় সম্পদে সুখে-
স্বর্গ ছিল ধরা বুকে
এবে যেন রূপ কথা কল্পনা অতীত।
ফুলহার পূজা। কি দিয়ে তােমারে পূজিব গাে প্রিয় । কিছু নাই কিছু নাই, প্রতিদান তার না হয় যে দান- পেয়েছি তােমার ঠাঁই। সফল হয়েছে জীবন আমার, তােমর করুণা লভি- যা আছে আমার গর্ব দৰ্প মান, তােমারি তত দেওয়া সকি! মােহাচ্ছন্ন হৃদি জানিত না কভু কর্তব্য কাহারে বলে- সহসা উঠিল, ন। নিকা নবীন জীবন দিলে। আশা উৎসাহের মধুর মূচ্ছ না, মরম বীণায় তুলি, দুহাতে মুছায়ে দিয়াছ হে প্রভাে। অবসাদ ক্লেদ ধূলি। ১১
ফুলহাৱ
বিশাল ধরারে হেরিয়া যখন,
হয়েছিনু, দিশা হারা
দেবতার বেশে দেখাইলে পথ,
হে আমার ধ্রুবতারা ।
কল্প লোকের অমর কাননে
আর নাহি প্রাণ ধায়,
সঞ্চিত যে গাে স্বরগ আমার,
ও দুটি কমল পায় ।
জানি না পূজিতে নিরাকার বিভু,
বল নাই সাধনার,
তুমিই আমার সাকার দেবতা,
হে বাঞ্ছিত জ্ঞানাধার ।
ইহ পরকালে জীবনে মরণে,
যেন ও চরণ পাই,
আমার আমিত্ব বিলীন করিয়া
তােমাতে মিশিয়া যাই।
যেন নিশি দিন, ও চরণে লীন,
থাকি গাে ধূলির সম,
হে আমার সখা হে আমার প্রভু!
হে আমার প্রিয়তম ।
ফুলহাৱ
প্রত্যাখ্যান।
( অম্বার প্রতি ভীষ্ম )
ফের গো পাষাণ আমি
অচল হিমাদ্রি মত,
ফেলিয়াছি হৃদি হতে’-
কোমল আশা যত।
শুনেছি মধুর বাণী,
ব্যাসের মুখ হতে
সুখ যদি চাও ভবে-
ত্যাগ শেখ পরহিতে।
হৃদয়ের স্তরে স্তরে
গাঁথি সে অমিয় গাথা,
প্রতিজ্ঞা করেছি বালা,
ভুলে যাও পূৰ্ব্ব কথা ।
সত্য বটে ভালবেসে
বলেছ আমায় তুমি,
জীবনে মরণে শুধু
তুমিই আমার স্বামী।
১২০
ফুলহার
কিন্তু সে মুখের কথা-
নহে বরমাল্য দান।
তােমারে লভিয়া সুখী
হােক অন্য ভাগ্যবান।
.
অনেক দিয়েছি আশা-
প্রেমের মােহন ছবি,
ধরিয়াছি নেত্রে তব,
অস্ত গাে সে সুখ রবি।
রজত কিরণ ঢালা
মধুর জোছনা নিশি,
যাপিয়াছি বসে পাশে
দেখে তব মুখ শশী।
এক দিন ছিনু তব—
প্রেম ভিক্ষু হে সরলে !
ক্ষমার ভিখারী এবে-
ক্ষম মােরে মূঢ় বলে।
হায় যদি জানিতাম
এই আছে পরিণামে—
সব সুখ বিসজ্জিতে
হবে মােরে ধরা ধামে।
২১
ফুলহাৱ
আঁধার তামসী ভরা,
ভবিষ্যৎ গর্ভ হতে
বারেক ললাট লিপি,
পড়িত গাে নেত্র পথে।
তাহলে, তাহলে “বালা” ।
তােমর কোমল প্রাণে,
দিয়ে দারুণ জ্বালা,
পূজিতাম মাতৃ জ্ঞানে।
আজি সে কঠোর দিন,
এসেছে ভগিনী! মম,
ভুলে যাও রাজ বালা !
অধম ভ্রাতারে ক্ষম।
সরলা বালিকা তুমি-
সহজে চপল মতি,
ভুলে যাও দেবব্রতে-
লভ অন্য যােগ্য পতি।
।
জননী স্বরূপ হেরি,
নিখিলের নারীগণে—
মাতৃরূপে আঁকা তুমি,
চিরদিন রবে প্রাণে।
২২
নাহি আর দেবব্রত
শান্তনু নন্দন সেই,
ভীষ্ম নামে এবে দেবি।
বিশ্বে পরিচিত হই।
যে মহা ত্যাগের মন্ত্র,
শুনেছি ব্যাসের মুখে,
ধ্বনিত মূচ্ছ না তার,
ভরেছি আপন বুকে।
জনকের তৃপ্তি তরে –
দিছি আত্ম বিসর্জন,
করেছি কৌমার ব্রতে
আপনারে সমর্পণ।
সমস্ত জগৎ যদি
ডুবে যায় রসাতলে,
সাগর শুখায় যদি-
সুমেরুও টলমলে—
নভ হতে ধরাতলে,
খসে রবি শশী তারা,
এ জনমে ভীষ্ম তবু,
হবে না প্রতিজ্ঞা হারা।
ফুলহাৱ
গ্রহিয়াছি মহা ব্রত,
সাক্ষী করি দেবগণ,
বৃথা তব অশ্রু জল,
বৃথা দেবি আকিঞ্চন।
প্রেমের আসনে আজি,
বসায়েছি ভগ্নী স্নেহ,
সে পূত নিৰ্ম্মল নীরে,
জুড়াইব সব দাহ।
অনেক পবিত্র স্নেহ,
আছে এ জগৎ ভরা,
ভগ্নী স্নেহ, সখ্য স্নেহ
কন্যার বাৎসল্য ধারা,
7
সেই স্নেহ সুধা ভরা,
ঢালিব তােমার 'পরে
ধুয়ে দিব ক্লেদ যত,
সেই মন্দাকিনী নীরে,
নহে এই স্নেহ মম,
কামনা কলুষ ভরা,
নিঃস্বার্থ স্বর্গীয় প্রীতি--
পবিত্র জাহ্নবী ধারা।
২৪
ফুলহা
আজি গো ভগিনী তােমা,
বরিনু জননী রূপে,
পুত্রেরে রেখ মনে,
বিপদে সম্পদে সুখে।
ত
ফুলহার
।
বীৱ ধৰ্ম্ম।
যা রে ভীরু কাপুরুষ,
আমার সম্মুখ হতে
অর্জুন তনয় হলে,
আসিতি অসি হাতে।
যােদ্ধার ধরম ভুলি,
ভুলি আত্ম মানামান,
আসে না ভিক্ষুক বেশে
ফাল্গুনীর সুসন্তান।
পুত্র মাের ইলাবন্ত,
অভিমন্যু বীরবর,
যাদের গৌরব গানে,
ব্যপ্ত আজি চরাচর।
অামার তনয় হলে
অশ্রুজল বিনিময়ে
আসিতি রণাঙ্গনে,
অসি উপহার লয়ে।
১২৬
ফুলহার
নম্র মুখে, নত শিরে,
ফিরাইয়ে দিয়ে হয়,
কি সাহসে রে অবােধ ।
দিস্ পুত্র পরিচয় ?
সিংহের শাবক কভু,
শিবাধম নাহি হয়,
বীরেন্দ্র কুমার কভু,
রণ ভয়ে ভীত নয় ।
অৰ্জ্জুনের পুত্র তুই।
দেখাতি বিশ্ব জনে-
আমিও সাদরে তােরে
বাঁধিতাম আলিঙ্গনে।
কি বলিব শিশু তাই,
হেন স্পর্ধা সহিলাম।
নহিলে রে পদাঘাতে,
ৰীৰ ধৰ্ম্ম শিখাতাম।
১২
লহার
ভিক্ষা।
আজি গাে ভকতি ভরে
ও রাঙা চরণে নমি,
করযােড়ে তব পাশে,
ভিক্ষা চাই বিশ্ব স্বামী।
তােমারি এ দেওয়া মন,
তােমারি এ দেওয়া হাত,
ক্ষুধিতের মুখে খাদ্য,
তুলে যেন দেয় নাথ।
তােমারি এ দেওয়া হৃদি,
ভালবাসে সবাকায়,
পিত লভে গাে শান্তি-
আমার স্নেহের ছায়।
মুছাতে সজল আঁখি
সদা হই যত্নবতী,
মনে যেন একে রাখি—
আমি হীনা ক্ষুদ্র অতি ।
১৮
ফুলহার
।
যা পেয়েছি সবা কাছে
স্নেহ প্রতি ভালবাসা
তাহাতেই পূর্ণ হয়ে
পুরে যেন যায় আশা।
মনে যেন ভাবি সদা,
হে জগত প্রিয়তম!
বিশাল জগতে আমি,
অতি ক্ষুদ্র তৃণ সম।
অতি হীন ধূলি কণা,
বহে সকলের ভার,
নাহি তার অভিমান,
নাহি তার অহঙ্কার।
দলিয়া চরণে তারে
সকলেই চলে যায়,
তবু সে সবার তরে
নিজ বক্ষ মেলি দেয়।
সহি ঘাত, প্রতিঘাত,
আমি যেন সেই মত,
ধরণীর পদতলে-
সদা থাকি অবনত।
ফুলহার
শিশুর সারল্যে যেন
ভরা থাকে বক্ষখানি,
উদার নভের মত,
স্নেহ মমতার খনি।
দেবের মন্দির যেন,
হয় গাে হৃদয় মম,
সদা তাহে প্রতিষ্ঠিত,
থেক বিশ্ব প্রিয়তম।
ফুলহার
শ্লোক স্মৃতি।
আজি এই জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধাকাশ হেরি,
মুক্ত প্রকৃতির মাঝে সেই দিন স্মরি,
এম্নি সে হেসেছিল সুনীল অম্বরে-
প্লাবিয়ে ধরণী শশী স্নিগ্ধ শুভ্র করে
ফুল পরিমল লয়ে এম্নি সমীর
দিয়েছিল মৃদু বায়ে জুড়ায়ে শরীর।
সেই শােভাময় দিনে দিদি গাে আমার,
গিয়াছ অমরধামে ত্যজি এ সংসার।
দারুণ শােকের শ্বাসে নিস্তব্ধ ভবন,
মৃত প্রায় পড়ে যত আত্মীয় স্বজন।
তোমার অভাগা শিশু পুত্র কন্যা গণে
দিয়াছিনু সিক্ত করি অশ্রু বরিষণে।
হেরিয়া তাদের সেই চিন্তাহীন মুখ,
কি দারুণ শােক শ্বাসে ফেটেছিল বুক।
হায় রে অবােধ তারা কিছুই জানে না,
কি রত্ন হারাল আর জীবনে পাবে না।
কেমনে ভুলিলে দিদি তাদের আনন,
কেমনে ছিড়িলে দিদি মায়ার বন্ধন।
৯৩১
ফুলহাৱ
t
গিয়াছ কোথায় কোন্ স্বপনের পুরে--
ভুলিয়াছ সবাকায় কার স্নেহ ডােরে ?
স্নেহময়ী মার কোল পেয়েছ কি সেথা ?
পশে না সেথায় নাকি দুঃখ তাপ ব্যথা ।
পেয়েছ কি সেই দেশে স্বামীর আদর ?
প্রাণের তনয় কন্যা স্নেহের সােদর।
নাহি কি গাে হিংসা দ্বেষ সেই পূত দেশে-
ভিখারী সম্রাটে সবে সম ভালবাসে।
অনন্ত বসন্তে নাকি বিরাজে সেখানে
বিমল আনন্দ নাকি বয় সদা প্রাণে
সীমন্তে সিন্দুর লয়ে তুমি পুণ্যবতি !
গিয়াছ সহাস্য মুখে সে অমরাবতী,
লভিয়াছ চির শান্তি অনন্ত আরাম,
করিছ যে দেশে দেবি! সুখের বিশ্রাম।
ফুলহার
সংযুক্ত।
-
ইতিহাসে তব অমর কাহিনী,
কনকাক্ষরে লিখিত আছে।
বীর বিনােদিনী, রাঠোর নন্দিনী,
অতুলনা তুমি নিখিল মাঝে।
পুলকে পরাণ পূণিত হয়,
শুনিলে তােমার চরিত গাথা,
দলিয়া চরণে বাধা বিঘ্ন ভয়,
রেখেছিলে নিজ পবিত্রতা।
পঙ্কে যেমন পঙ্কজ ফোটে,
সাগর গর্ভে জনমে মণি,
রাঠোর কলঙ্ক কনােজ ঈশ্বর
জয়াদ সুতাতেম্নি তুমি।
বিষ্ণুর পাশে লক্ষমীর মত,
মিলেছিলে সতি পৃথ্বিরাজে-
সাধিতে ধাতার কোন্ অভিলাষ,
এসেছিলে দোহে মৰ্ত্ত মাঝে।
১৩৩
ফুলহার
দেশের কল্যাণে, পুণ্য তরায়নে,
বীর পতি তব ত্যজিলা প্রাণ,
সার্থক হােল, ঘােরীর বাঞ্ছা,
মােগল পতির সে অভিযান।
আঁধার করিয়া, ভারত গগন,
ভারত ভাস্বর নিভিয়া গেল,
আৰ্য ভূমির চরম পতন,
হাহাকারে দিক্ পূর্ণ হােল।
যবন চরণে সপিয়া স্বদেশ,
জামাতা সুতায় আহুতি দিয়া,
মাখিয়া কালিম, তিরপিত হােল,
পাষাণ পিতার পিশাচ হিয়া।
স্বরগ সমানা, গরীয়সী যাহা,
ধৰ্ম্মরাজের বিচারাসন,
সখ্যতা পাশে বদ্ধ ছিলেন,
আপনি যেথায় জনার্দন।
আৰ্য জাতির পূত প্রিয়তর,
সেই যে স্বদেশ যবন পায়,
লুটাইয়া দিয়া, কনােজ রাজার,
প্রতিশােধ স্পৃহা মিটিল হায়।
ফুলহার
তােমরা দুজন, নন্দন কুসুম,
এসেছিলে বুঝি প্লাবনে ভেসে
সুকীর্তি সৌরভ ছড়ায়ে ধরায়,
চলে গেলে পুন আপন দেশে।
১৩
ফুলহার
কুভব মিনার।
কত যুগ যুগান্তর ঝ বাত্যা বায় ।
বয়ে গেছে হে কুতব ! তােমার মাথায়।
কত নর নরপতি গিয়াছেন চলে।
বর্ষ মাস মিশে গেছে অতীতের কোলে।
অচল অটল তুমি আছ বঁড়াইয়া।
নির্বাক নিস্তব্ধ মুক ইতিহাস নিয়া।
গেছে সে সুখের দিন গিয়াছে গৌরব।
কাল গর্ভে একে একে লীন এবে সব।
তুমি শুধু বক্ষে ধরে পুরাতন গাথা।
জানাও জগৎ জনে সেই স্মৃতি কথা ।
নাহি জানি কোন জন তােমার বিধাতা।
প্রহেলিকা সম শুনি তব জন্ম কথা।
হে নীরব হে একক গম্ভীর প্রস্তর।
নিত্য ধ্বংসী জগতের হে দীর্ঘ অমর।
নাহি জানি কোন্ ভাষে বর্ণিব তােমায়।
জানাই বিস্ময় শুধু নীরব ভাষায়।
*,
(কুতব মিনার নির্মাতা প্রকৃত কে, এ বিষয়ে সঠিক সংবাদ অজ্ঞাত)
১৬
ফুলহাৱ
শারদীয়া।
এস যত বঙ্গবাসী এ সুখের দিনে,
প্রণমি মায়ের পদে ভক্তিপ্লত প্রাণে,
সবে মিলি এস আজি,
ভরিয়া প্রসূন সাজি,
আনন্দ অশ্রুতে মাখি দিই মার পায়,
এসেছেন বিশ্ব মাতা আজিকে ধরায়।
ভরেছে সবার গেহ,
দুঃখী আজ নাই কেহ,
অনাথ আতুর অন্ধ দাঁড়ায়ে দুয়ারে,
মাগিছে আশীষ মার নত শির করে,
নব বস্ত্র পরি সবে,
মাতিয়াছে দুর্গোৎসবে,
তারাই মলিন শুধু ছিন্ন বাস পরে
দাড়ায়েছে রুদ্ধ ব্যথা বক্ষ মাঝে ভরে,
তারাও সন্তান মার,
ভাই বােন মাে সবার,
১৩৭
ফুলহার
তবে কেন রাখিয়াছি তাহাদের দূরে
এস সবে কোল দেই স্নেহের আদরে।
এসেছে আনন্দময়ী,
শােভাময় তাই মহী,
তাই গাে সুধাংশু আজ অম্বরের ভালে,
প্রণমিছে মার পায় স্নিগ্ধ কর ঢেলে,
বায় ভরে ফুলরাশী,
আনন্দে উঠেছে হাসি,
তারা যে পড়িবে মার পবিত্র চরণে
সার্থক জনম তারা লভেছে ভুবনে।
পাপিয়া মধুর স্বরে
আগমনী তান ধরে
উঠেছে দেরও প্রাণে আনন্দ লহর,
ভাসিছে আনন্দ স্রোতে আজি চরাচর।
সানাইয়ে উঠেছে সুর,
ধরা আজি ভােরপুর,
পুলকে আলােকে আর সুমােহন সুরে,
স্থাপিত মঙ্গল ঘট সবার দুয়ারে।
হিংসা দ্বেষ নির্মমতা,
নাহি স্থান পায় হেথা,
১৩
ফুলহাৱ
আজি ধরা শোভা ভরা, মার রূপালােকে
শারদ উৎসবে সবে নিমগন সুখে।
দয়াময়ী মা আমার,
ঢালিছেন স্নেহ ধার,
কর মা, কর মা, এই আশীষ সবারে-
তােমারে বাসিতে ভাল পারি প্রাণ ভরে।
ফুলহার
অজানা দেশ।
জানি না সে কোন্ সাগরের পারে—
কোন্ অজানা দেশ।
শুনি শুধু, সেথায় নাকি নাহি
হতাশ দুঃখ ক্লেশ।
নাইকো জরা, নাইকো মৃত্যু সেথা
শশাকের আগুন, বিচ্ছেদেরি ব্যথা-
চির শান্তি বিরাজ করে তথা,
নাই যাতনা লেশ।
জানি না সে কোন্ সাগরের পারে
কোন অজানা দেশ।
মন্দাকিনী সদাই সেখানে
প্লাবিয়ে তট বয় নিজ মনে
কুল কুল তান পথিকের প্রাণে
বহায় সুধার ধার।
জানি না সে কোন্ অজানা দেশ,
কোন্ সাগরের পার।
৪০
ফুলহার বসন্তেরী তথায় আবাস ভূমি মলয় মারুত ফুল রাণীরে চুমি ফুলের গায়ে সুখে পড়ে ঘুমি- নাই কো শােভার শেষ। জানি না সে কোন সাগরের পার কোন্ অজানা দেশ। গায় ভ্রমরা মধুর বীণার স্বর, ফলে ফুলে শোভে তরুবর, শান্তি মলয় বইছে নিরন্তর, প্লাবি সবার মন, জানি না সে কোন্ অজানা দেশ- শান্তি আলয় কোন্। ভবের মাঝে সকল কর্ম সারি- জীর্ণ হৃদয় শ্রান্ত হবে হরি, তখন দিয়ে অভয় চরণ তরী, দেখায়াে পথ মােরে, জানি না সে কোন্ অজানা দেশ কোন্ সাগরের পারে। ১৪১
ফুলহার
সাঁজের বাতাস বইবে ধীরে ধীরে
ফুলের পরাগ লয়ে চুরি করে—
তখন তােমার দূত যদি মাের দ্বারে
দাঁড়ায় ভয়াল বেশে,
লয়ে যেতে ধরার পরপারে-
সেই অজানা দেশে।
ভয় না পেয়ে তখন যেন আমি,
ত্যজিয়া এই দগ্ধ মরত ভূমি,
সকল ভুলে মহানন্দে স্বামি,
মিশি তােমার পাশে,
শাস্তি প্রেমে ভরবে হৃদয়খানি—
সেই অজানা দেশে।
আবার যখন উষার ধবল করে –
জগৎখানি উঠবে হাসি ভরে
তখন যদি দাঁড়ায় শমন দ্বারে
লয়ে ডাকের লিপি,
হে নাথ! যেন মানস চোখে আমার,
সে পথ একে রাখি,
তখন যেন সকল বাঁধন খুলি
তােমার পায়ে পড়তে ছুটে চলি—
ভুলিয়া এই ধরার স্মৃতিগুলি—
তােমার মূর্তি দেখি।
ম
১৪২
ফুলহার
শমন যদি দাড়ায় তখন দ্বারে
লয়ে ডাকের লিপি।
কিম্বা যখন প্রখর রবির করে
দারুন তাপে ধরা যাবে ভরে-
তখন যদি দাড়ায় শমন দ্বারে
স্নিগ্ধ শীতল সাজে,
লয়ে যেতে সেই সাগরের পারে-
সেই সে দেশের মাঝে,
যাবে যখন অজানা সেইখানে-
ছাড়ি প্রিয় স্নেহের পরিজনে,
তখন যেন বারেক আমার মনে,
হয় না ব্যথার লেশ।
জানি না সে কোথায় কত দূরে
তােমার প্রিয় দেশ।
তারা বিহীন সুপ্ত আকাশ তলে
আঁধার রাতে খদ্যোতিকা জ্বলে
যদি শমন তেম্নি নিশীথ কালে--
আসে আমার পাশে,
ধুলার দেহ ধুলায় যেন ফেলে
আমার আত্মা তােমার পায়ে মেশে।
১৪৩
ফুলহার
নিশীথে।
নীরব গভীর এবে—
তামসী রজনী।
দিবসের কর্ম সেরে
নিশীথ নিদ্রার ক্রোড়ে
এলায়ে দিয়াছে জীব,
শ্রান্ত দেহখানি।
কৰ্ম্ম ব্যস্ত কোলাহলে
সারা দিন গেছে চলে
এখন বিরাম কোলে
মগ্ন চরাচর,
বেন কোন্ যাদুস্পর্শে
স্বপন পরীর দেশে-
মুচ্চাহিত সজীবতা,
নীরব নীথর।
33
ফুলহার
স্তব্ধ এ নিশায় আজি,
ভরিয়া প্রাণের সাজি,
আমি শুধু আছি জাগি,
তােমার আশায়।
তােমারে লভিব বলে
হৃদয় দুয়ার খুলে
গন্ধ হীন পুস্পাঞ্জলী
দিতে রাঙা পায়।
মলিন অন্তরখানি,
ভক্তিহীনা পূজারিণী,
সব পঙ্কিলতা ধুয়ে
কর ভক্তি দান।
সংসারের মােহ জালে
তােমারে না যাই ভুলে,
সত্য পথে মতি যেন,
থাকে ভগবান।
Y
১৪
ফুলহার
জীবনেৱ পারে।
জীবনের পারে যেতে হবে ভেবে
সঞ্চয় কিছু করিনি কভু,
সারাটি জনম শুধু আত্মজনে,
শুধু সংসারে চিনেছি প্রভু।
তােমারে কখন হে জগৎ স্বামী।
ডাকিনি আমার আপন জেনে,
ওগাে দয়াময়, শেষের সময়,
বিকশিও মাের মলিন মনে।
করম শ্রান্ত অবশ হৃদয়,
বিশ্রাম যবে মাগিবে হরি ।
জীবনের খেলা হবে অবসান,
পাই যেন তব চরণ তরী।
তােমার প্রেমের পুণ্য আলােক,
পশে যেন মাের আঁধার প্রাণে,
ঘুচে যায় যেন সব দুঃখ শােক,
কোন আবিলতা থাকে না মনে।
১৪৬
ফুলহার
ধ্রুব তারা সম মানস নেত্রে-
জাগে যেন তব বিমল আলাে,
এ মর ধরার সব ভুলে গিয়ে,
বাসি যেন শুধু তােমারে ভালাে।
তােমার নামের মধুর রাগিনী
বাজে যেন মাের হৃদয় তারে,
অযােগ্য এ প্রাণে আলিঙ্গি তােমারে-
দুখানি দুর্বল বাহুর ডােরে।
১৪৭
ফুলহাৱ
নিবেদন।
নবীন নীরদ জালে ছেয়েছে অম্বর,
নাহি আজ শােভা পায় তারকা নিকর।
নাহি আজ সুধাংশুর সুমধুর হাসি,
নাহি আজ ধরা ভরা স্নিগ্ধ কর রাশী,
সজল ফুটেছে ফুল কদম্বের ডালে,
তৃপ্ত আজি চাতকিনী সুশীতল জলে,
ক কল্ বহে জল, পথের দুধারে—
বিধির আশীষ যেন ঝরে ধরা পরে।
আজি এই স্নিগ্ধ দিনে, হে মহা সুন্দর ।
যাচিছে করুণা তব, আমার অন্তর,
যত দিন ধরা মাঝে রহিব গাে হরি ।
প্রভু ত্রাতা রূপে যেন তােমাকেই বরি,
আমার অযােগ্য প্রাণ তােমার চরণে-
নিবেদন করি যেন স্বার্থহীন মনে।
রহিও হৃদয় যুড়ি হে সখা আমার !
বিতর করুণা মােরে ওহে সারাৎসার।
}
ত
ফুলহাৱ
হাৱা নিখি।
হারা নিধি আজকে আমার
ফিরে এলি কোলে,
শূন্য হৃদয় উঠল ভরে-
আনন্দ হিল্লোলে।
কোন্ স্বরগের সুধা নিয়ে
বুকটি আমার ভরে দিয়ে
কেমন করে দিলি যাদু!
সান্ত্বনা জাল ফেলে,
হার নিধি আজকে আমার,
ফিরে এলি কোলে।
হার
অপূর্ণ।
সকল কাজে সকল সময়,
হৃদয় মনের সব প্রেরণায়,
জাগাও প্রভু আমার প্রাণে
তােমার প্রেমের আলাে।
আঁধার আমার হৃদয় পুরে
জ্বালাও প্রদীপ আপন করে
শিখাও আমায় নিবিড় করে
বাতে তােমায় ভালো।
তােমার ধরার শত কাজে,
আছ তুমি সবার মাঝে,
আছ আমার দুঃখ ব্যথায়,
আনন্দ ও গানে।
ভয়ের মাঝে অভয় হয়ে,
শােকে আমায় শানিয়ে,
অলক্ষ্যে যে স্নেহের ধারা,
গল আমার প্রাণে।
ফুলহার
থাক আমার বুকের মাঝে,
পাইনে তবু তোমায় খুজে,
ঘুচাও আমার অপূর্ণতা,
মেহের নাগপাশ।
বিফলতার নিরাশ ব্যথায়,
ভরিয়ে তােল সার্থকতায়,
ফুটাও প্রভাে! আমার বুকে,
তোমার মধুর হাস।
হৃদয় বীণার তারে তারে,
ঝঙ্কারিয়া শত সুরে,
বাজাও আমার জীবন ভরে,
তােমার বাঁশরী,
তােমার নামের মােহন তানে,
তােমার স্পর্শে, তােমার ধ্যানে,
মুগ্ধ হউক আমার হিয়া
নিখিল পাসরি।
তােমার স্নেহ ব্যথার বেশে
আসবে যখন আমার পাশে
ছদ্মবেশী ! তখন দিও,
আপন পরিচয়।
ফুলহার
তােমার স্নেহের শাসন সে যে-
বুঝিয়ে দিও আমায় নিজে
আমার সকল অনুভূতি
তােমায় কোর লয় ।
ফুলহা
কে।
নীল আকাশে থরে থরে,
কে সাজালে মেঘের রাশী।
কাহার নিপুণ হস্তে গড়া,
তারার মালা চাঁদের হাসি।
কাহার গুণের মােহন গীতি,
গায় পাপিয়া মধু স্বরে,
কার আদেশে প্রভাত পাখী,
জাগায় ডেকে সুপ্ত নরে।
স্নিগ্ধ পবন ফুলের রেণু--
মেখে যখন আপন গায়,
দুলিয়ে পাতা, সকল ব্যথা,
শীতল করে মুছিয়ে দেয়,
সন্ধ্যা রাণী, অচলখানি,
ফেলেন যবে ধরার মাঝে
দিবস নিশির সন্ধিক্ষণে
কার করুণা প্রাণে বাজে।
L
ফুলহাৱ
জগৎ পতি! এই মিনতি,
তােমার দুটি কমল পায়,
অশান্ত এই হৃদয় আমার,
তােমার পথেই যেন ধায়।
*
সত্যালােকে পরাণ আমার,
সদাই যেন উজল থাকে,
মােহের বশে সুপথ ভুলে
যাই না কভু কুয়ের দিকে।
স্বার্থ বিলাস প্রবঞ্চনা,
এসব যেন থাকে দূরে,
পরের ব্যথায় দুঃখে যেন,
হৃদয়খানি যায় গাে ভরে।
১৫৪
ফুলহার
নব বর্ষেৱ ব্যথা।
কিশলয় দল,
আজি এ নব বরষে,
নূতন দিবসে,
পুলক পুরিত ধরা।
শুধু মাের মনে জাগে, বেদনার রাগে,
সেই মুখ হাসি ভরা।
এম্নি কোমল,
তুল্য সে দুটি বাহু,
চাদের নিছনি,
সেই মুখখানি,
অকালে গ্রাসিল রাহু।
কোকিল নিন্দিত, সেতার ঝঙ্কত,
কচি কল কণ্ঠ সেই
নীরব হায় রে
আর এ মহীতে নেই।
কার অভিশাপে, কোন্ মহা পাপে
হারানু আমার বাঁশী,
কাহার পরশে,
গিয়েছে রে ভেসে
ফুল কমল রাশী।
চির দিন তরে,
১০:
লহাৱ
স্নেহের মুকুল,
প্রাণের পুতুল,
ভীরু পােষা পাখী মোর,
. ছিনাইয়া তাকে,
মার বুক থেকে,
হরিল রে কোন্ চোর।
নিশি দিন ধরে,
হৃদয়ের তরে,
একই বেদনা বাজে,
সেই মুখখানি, আধ ফোটা বাণী,
মনে পড়ে সব কাজে।
ফুলহার
খােকা খুকু।
সকাল বেলা উষার আলাে,
ফুটিতে ধরার গায়ে
জেগে ওঠে খােকা খুকু —
কচি মুখে হাসি নিয়ে।
উঠিতে পাখীর গীতি,
শুনি তোদের কলধ্বনি,
অফুট সে কাকলীতে
অর্থ বিহীন মধুর
বাণী।
সদ্য ফোটা ফুলের মত
প্রাণে তােদের পবিত্রতা,
সৌরভেতে তেম্নি ভরা,
তেনি হাসি সরলতা।
তুলনা যে নাই রে তােদের,
বীণার তােরা মূর্ত গীতি,
হর্ষ ভরা স্পর্শমণি,
স্বর্গ ঝরা বিমল প্রীতি।
তােদের স্নেহের কোমল পরশ,
ভুলিয়ে যে দেয় সকল ব্যথা,
জাগিয়ে তােলে নীরস প্রাণে
ত্রিদিব সুপার সরসতা।
৯৭
ফুলহার
প্রভাস।
“দারুক ! কোথায় কৃষ্ণ ? কোথা বলরাম।
বল মােরে বল ত্বরা করে,
জিজ্ঞাসেন ধনঞ্জয়,
উদ্বেলিত প্রাণ,
দাড়াইয়া প্রভাসের তীরে।
অনন্ত নীলাম্বুরাশী, প্লাবি তট ভূমি
ফেনিল তরঙ্গ তুলি চলে
গগাধূলির স্লানালােক, ব্যপি চরাচর,
পড়িয়াছে সাগরের জলে।
দারুকে নীরব হেরি, কহেন কিরীটি ,
আবার সম্বােধিয়া তায়,
কুশল তাে দ্বারকার ? কহ রে দারুক।
রাখিও না সন্দেহে আমায়।
হয়েছে কি অবসান প্রভাস উৎসব ?
পুরবাসী ফিরেছে কি পুরে ?
স্তব্ধ কেন হেরি চারিদিক,
ছিন্ন মালা কেন চারিধারে ?
ফুলহাৱ
সুসজ্জিত প্রভাস প্রাঙ্গণ,
শিবারবে মুখরিত কেন?
যেন কোন্ অশুভ সুচনা
ঘটিয়াছে লয় মনে হেন।
নত আঁখি করি উন্নমিত,
অশ্রু স্বরে কহিল দারুক,
“কি কহিব হে ফাল্গুনী ! আর
মহা শশাকে বিদীর্ণ যে বুক,
যদু কুল নিৰ্ম্মলিত প্রায়,
হত সবে রণে পরস্পর,
নেহারিবে সকলি আপনি,
অগ্রসরি চল বীরবর ।
1
হের দেব সুবৰ্ম্মা, সাত্যকি,
পড়িয়াছে ছিন্ন দ্রুম প্রায়,
বীরপূর্ণা দ্বারকায় আজ
বীর শূন্যা হেরিলাম হায়।
শােণিতাক্ত ভূতল শয্যায়,
হের পার্থ ! কৃষ্ণ সুতগণ,
সুরা পানে পরস্পর রণে-
লভিয়াছে অনন্ত শয়ন।
ফুলহাৱ
সকাতরে কহেন কিরীটি,
আবরিয়া যুগল নয়ন,
দারুক রে ! কি দৃশ্য দেখিতে
দ্বারকায় মম আগমন,
সখা! সখা ! যদু কুলেশ্বর।
কোথা তুমি কোথা এ সময়,
বল বুদ্ধি তুমি গদাধর !
দেখা দাও অভাগা সখায়,
কুরুক্ষেত্রে আত্মীয় নিধনে--
লয়েছ তত পরীক্ষা আমার,
কি পরীক্ষা আজ মায়াময় ।
একি দৃশ্য দেখালে আবার।
জগত জীবন প্রভু তুমি,
কেন আজ তব বংশধর,
গত প্রাণ কালের শয্যায়,
শায়িত হে ধূলির উপর।
নিখিলের মঙ্গল নিদান্!
বল কোন্ মঙ্গল সাধনে,
এ ভীষণ নব অভিনয়,
বিনাশিয়া প্রিয় পরিজনে।
১৬০
ফুলহার
শােকাকুল স্খলিত চরণে
ভ্ৰমিছেন কুন্তীর নন্দন,
মৌন মুখে নীরবে দারুক,
পাশে তার করিছে গমন ।
ধীরে ধীরে নিশার আঁধার,
ছেয়ে গেল ধরার উপর,
ঘন কৃষ্ণ অন্ধকার মাঝে-
নৈশ বায়, বহে তর তর ।
--
আন মনে চলেন ফাল্গুনী ।
প্রতি পদে বাধে শব পায়,
স্থানে স্থানে আলােকিত পথ,
সমুজ্জ্বল মণির প্রভায় ।
কিছু দূর চলিয়া দারুক,
দেখাইল অঙ্গুলি হেলনে-
নিম্ব বৃক্ষে হেলায়ে সুতনু-
কে দাড়ায়ে বঙ্কিম চরণে?
ক্ষণ মাত্র স্তম্ভিত অৰ্জ্জুন,
ৰাহ্য জ্ঞান বিরহিত প্রায়,
ক্ষণ পরে লভিল চেতনা
কাঁদি কন কুন্তীর তনয় ।
১১
১৬৯
ফুলহার
সখা! সখা । পাণ্ডব জীবন।
ইহাও কি করি প্রত্যয় ?
প্রাণ নাই প্রাণময় দেহে
শূন্য আজ সব শূন্যময়।
আলিঙ্গিয়া কৃষ্ণ কলেবর,
প্রাণ ফাটা শােক রুদ্ধ স্বরে
বীর সিংহ বালকের মত
সকরুণে কঁাদেন কাতরে।
বহে চোখে গঙ্গোত্রী যমুনা-
গলিয়া রে দৃঢ় হিমালয়,
সুকঠোর বীরের হৃদয়ে
এত অশ্রু লুকান কি রয়?
সখা! প্রভু ! হে মধুরভাষী !
একবার মধুমাখা স্বরে—
কর শান্ত অৰ্জ্জুনে তােমার,
কথা কও বারেকের তরে,
অভিন্ন যে পাণ্ডব যাদব,
জানে লােক জানে ত্রিভুবন,
আজ কেন ভুলিলে দাসেরে ?
কেন হেন ভিন্ন আচরণ।
১৬২
ফুলহাৱ বলেছিলে কত বার তুমি, আমি যদি করি অভিমান, বড় ব্যথা পাও তুমি সখা, দুই দেহে মাের এক প্রাণ। স্নেহ বশে সখা ভাষে যদি তুষেছিলে দাসেরে শ্রীহরি । আজ কেন হে নিঠুরতম ! চলে গেলে সকল পাসরি। পেয়ে কোন্ মহা অপরাধ- হেন শাস্তি করিলে বিধান, পাণ্ডবের সুখ রবি আজ, চির তরে হােল অবসান। বজ্র সম পুত্র শােকানল- অভিমন্যু বিয়ােগ বেদন, স্থির লক্ষ্য রাখি তােমা পরে- সয়েছিল হে মধুসুদন ! বিপদের তুমি হে কাণ্ডারী সম্পদের তুমি হে সহায়, চলে গেলে সকলি ভুলিয়ে পার্থ পাসে না লয়ে বিদায়। ১৬৩
ফুলহার
পড়িল না বারেক কি মনে ?
প্রিয় ভগ্না ভদ্ৰারে তােমার,
কোন্ ভাষে প্রবােধিব তারে ?
কেমনে বা দিব সমাচার।
হস্তিনায় বিদায়ের কালে
জিজ্ঞাসিল পাঞ্চালী যখন,
কত দিনে আসিবে আবার,
কবে দেখা পাব নারায়ণ।
বলেছিলে পরিহাস ভাষে
দেখো মােরে আপন অন্তরে
কে জানিত রহস্য তােমার,
হেন গূঢ় সত্য রূপ ধরে।
ভেবেছিনু কভু কি কেশব ?
তুমি যাবে ছাড়িয়া আমায়।
কৃষ্ণাৰ্জ্জুন ভিন্ন হবে ভবে
কায়া বিনা ছায়া কভু রয়?
লুপ্ত হােক অস্তিত্ব আমার,
কোন সুখে ধরিব জীবন।
শােকাবেগে কৃষ্ণ দেহ পরে-
কুন্তী পুত্র হারাল চেতন।
সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.