Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mandakini

Ray,debendranath · 2009/10/10

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মন্দাকিনী
( গীতিনাটিক
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ রায় প্রণীত।
( টালা, ২ নং বারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড হইতে )
শ্ৰজানকীনাথ বসু কর্তৃক প্রকাশিত।
[ বন্ধুত্বৰ্গকে বিতরণার্থ ।
কলিকাতা
৬ নং ভীম ঘােযের লেন,
গ্রেট ইডেম প্রেস, ইউ, সি, বসু এণ্ড কোম্পানি দ্বারা মুর্তিও।

No text on this page.

নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ।
পুরুষ।
০ ০ ০
বিজয়
বিজয়পুরের রাজকুমার।
বিজয়পুরের রাজা, বিজয়-রাজমন্ত্রী, বিজয়রাজ-সেনাপতি
( রণধীরসিংহ }, সভাসদগণ, পারিযগণ, কস্মচারীগণ,
ইয়ারগণ, সিন্ধুরাজ, সিন্ধুরীজমন্ত্রী, দূতগণ ও
ভিখারী প্রভৃতি।
सौ
মন্দাকিনী
সিন্ধুরাজকন্যা।
বিজয়পুরের রাণী, মাধুরী (জনৈক নর্তকী), বৃদ্ধা,
নর্তকীগণ ও সখীগণ প্রভৃতি।

No text on this page.

মন্দাকিনী
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বিজয়পুর রাজসভা।
(রাজা, মন্ত্রী, সভাসদগণ ও বৈতালিকগণ )
বৈতালিকগণ।
( গীত )
রাজ অবিরাজ তব ভালে জয়মালা ।
বিজয়পুর-লক্ষ্মী বহে তব বরণডালা।
শিক্ষিত সব শাস্ত্রে অস্ত্রে, দীক্ষিত দীন-পালনে,
রক্ষিত সদ। দেববৃন্দে, বলিত সারা ভুবনে,
তরুপ তব মুখ-অরুণ, করুণ-রস-ঢালা ।
গুণীজন-শরণ-কারণ, তারণ দুখ-সাগরে,
প্রকৃতি পুঞ্জে সতত গুঞ্জে মহিমা তব আদরে,
স্মরণে তব শান্তি রাজে, দূর সকল জালা ।
রাজা। মন্ত্রীবর! প্রজাগণের
প্রজাগণের সমস্ত কুশল ত ?
কল্য রজনীতে চোৰ্য, দস্যুবৃত্তি প্রভৃতি কোন পাপাচরণ
দ্বারা নগরবাসীদিগের শান্তিপূর্ণ নিদ্রার কোন ব্যাঘাত

২ মন্দাকিনী। [ ১ম অঙ্ক। হয় নাই ? অামার রাজ্যমধ্যে কল্য কেহ ত তানাহারে ছিলনা ? সন্ধ্যাকালে সকলেই সেই জগৎপিতা জগদীশ্বরের নাম উচ্চারণ করেছিল। দেবালয় সমূহে দেবসেবার কোন ব্যাঘাত হয় নাই ? মন্ত্রী। মহারাজ! আপনার প্রতাপে চোৰ্য্য তস্করত। কেবল বাক্যমত্রে প্রচলিত আছে। এরপ কার্য্য কখনও সম্পাদিত হয় নাই। প্রজাগণ নিরুদ্বেগে অকুতো- ভয়ে নিশাযাপন করেছে। স্বয়ং দাতা কর্ণ যে দেশের পালক, সে রাজ্যে তানাহারে কেহ থাকা সম্ভব নয়। দেবালয় সমূহের কাৰ্যের কোন প্রতিবন্ধক হয় নাই এবং দিনান্তে সেই পরম পিতার নাম উচ্চারণে' কেহই বিস্মৃত হয় নাই। রাজা। দ্য কি কি কাৰ্য্য আছে, আমাকে সুতি কর। মন্ত্রী। ভূপাল-নরপতি এক দূত প্রেরণ করেছেন, অাজ্ঞা হেতু দ্বারে উপস্থিত। রাজা। সমাদরে লয়ে এস। (মন্ত্রীর প্রস্থান ও দূতসহ পুনঃ প্রবেশ) রাজা। (পত্র পাঠান্তে) মন্ত্রী ! পাঠ কর--অর্থ- লােভী ঈর্ষামত্ত ভূপাল-নরপতি আমার নিকট হতে রাজস্ব আদায়ের জন্য ভয় প্রদর্শন করেছেন।

১া দৃশ্য । ]
মন্দাকিনী।
মন্ত্রী।
(পত্র পাঠ) “ঐবিজয়পুর রাজসমীপেযু—
আমি তোমা হইতে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করি, সেই হেতু এই
পত্র দ্বারা জানাইতেছি যে, যদি নিজের মঙ্গল প্রার্থনা
কর, তবে বিনা অপত্তিতে অদ্য হইতে করদানে স্বীকৃত
হও, নচেৎ যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া তােমার রাজ্য ছারখার
ও সপরিবারে প্রাণ নষ্ট করিব ইতি।”
সভাসদগণ! তােমরা সকলেই শ্রবণ কল্লে ?
এরূপ গর্বিত বাক্যের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা উচিত
এবং ভবিষ্যতে তিনি পুনরায় এরূপ উদ্ধত আচরণে
বিরত হন তাহারও প্রতিবিধান আবশ্যক।
১ম সভা। বিজয়পুরে এক ব্যক্তি জীবিত থাকতে
ভূপাল এ দেশে পদার্পণ করতে পারবেনা।
২য় সভা। এ দেহে যতক্ষণ এক বিন্দু শােণিত
থাকিবে, বিজয়পুর বিজয়-নিশান ততক্ষণ নিরুদ্বেগে
উভড়ীয়মান থাকবে।
রাজা। (দূতের প্রতি) যাও দূত, তোমার রাজাকে
ধ’লো যে বিজয়পুর-রাজ এ পর্যন্ত কাহারও অধীনতা
স্বীকার করেননি এবং কাহারও গতি বাক্যে কর্ণপাত
করেন না।
দূত। যে জ্ঞা।
[ প্রস্থান।
রাজ।
বিজয়
এখন কোথায় ?

৪
মন্দাকিনী।
[ ১ম অঙ্ক
মন্ত্রী। তিনি তাঁর জন্মতিথি উৎসবাদি দর্শন কচ্ছেন।
রাজা। বিজয়কে এ স্থানে আনয়ন কর। কি
আশ্চৰ্য। মানুষের অর্থলিপ্সা কি ' কিছুতেই পরিতৃপ্ত
হয়না? সামান্য কুটীরবাসী ভিক্ষুক হতে প্রাসাদারূঢ়
সম্রাটু পৰ্যন্ত সকলেই অর্থলােভে সমুৎসুক !
ধন-শস্যে পূর্ণ সেই ভূপাল-ভাণ্ডার,
অভাব নাহিক কিছু অবনীমণ্ডলে,
তথাপি কি হেতু রণ চাহে মাের সনে ?
কি হেতু পড়িতে সাধ জ্বলন্ত পাবকে ?
বীরশূন্য নহে এই বিজয়নগর
ক্ষীণহস্তে রাজদণ্ড নাহি ধরে বাহু।
দেখিব কেমনে সেই পরদ্রব্যহারী
প্রবেশে নগরে লোভী ভূপাল-ভূপতি।
(বিজয়সিংহের প্রবেশ)
এস বৎস! শুন পুত্র, যেহেতু ডেকেছি,
ধন-শে রণসাজে আসিছে ভূপাল ;
লিখিয়াছে গর্বভরে, সমরে বধিবে
মোরে, সহ মম আত্মীয় কুটুম্বগণে।
দেহ অনুমতি পিতঃ! সমূলে নির্মূল
অামি করিব পামরে ; প্রবেশি’ সংগ্রামে
বিনাশিব তারে, নহে আনিব বাঁধিয়া
রাজপদে উপহার দানিবার তরে।
।
বিজয়।

/ ১ম দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী ।
কেশরী-বিবরে চাহে শৃগাল পশিতে ?
বামন হইয়ে চাহে ধরিতে শশাঙ্কে ?
অজ্ঞা দেহ পিতা তুমি, দেখিবে সকলে
পুত্র তব ক্ষীণহস্তে অস্ত্র নাহি চালে।
শরজাল আবরিবে মেঘজাল সম
দশদিশি। মুহূৰ্ম্ম ধ্বনিবে কাৰ্ম্মক,
বরিষার ধারা সম অস্ত্রবৃষ্টি ঘাের
ভাসায়ে লইয়ে যাবে তারাতি নিকরে-
শুষ্কপত্র ধায় যথা প্লাবনের কালে।
রাজা।
জানি আমি, জানি বৎস, তব বীরপণ,
ন্যায়যুদ্ধে কেহ নাহি আঁ টিবে তোমারে।
বিষম কপটাচারী জানি সে দুৰ্ম্মতি,
কপট সমরে পাছে বিমুখে তোমারে ?
বংশের দুলাল তুমি ভরসা আমার,
কিরূপে তােমারে আমি পাঠাব সমরে ?
বিজয়। থাকিতে এ দাস যদি রণে যাও প্রভু,
দারুণ কলঙ্ক মম ঘোষিবে জগতে,
হাসিবে সকলে করিলে এ হেন কাজ।
রাজা। তবে যদি ইচ্ছা তব একান্ত সমরে
নাহি নিবারি তােমারে। কিন্তু এক কথা,
অবিলম্বে প্রের দূত রণধীর পাশে।
অর্ধলক্ষ সৈন্য সহ হ’তে আগুয়ান

৬
মন্দাকিনী।
১ম অঙ্ক।
আজ্ঞা দেহ তারে স্বচ্ছবরি নদীতীরে,
সমর বাধিবে কল্য নিশা অবসানে ।
'
[ সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
দেবালয় সান্নিধ্য।
(দুইজন রাজকর্মচারীর প্রবেশ )
২য় কৰ্ম্ম ।
ওরে ঐ রকম করে কি ঠাকুর প্রণাম
করে ?
১ম কৰ্ম্ম। কি করব ভাই, কাল যুবরাজ বিজয়ের
জন্মতিথি উপলক্ষে রাজবাড়ীতে যে খাট দিইছি,
এখনও তা হজম করতে পারিনি। আর নীচু হ’বার কি
যে অাছে ভাই ? বাবা, কিছু অপরাধ নিওনা, আমি
একটু পেটুক তা’ত তুমি জান ? “অসারে খলু সংসারে
সারং উদর-মন্দিরং।”
২য় কৰ্ম্ম ।
রেখে দে তাের মন্দিরং, আমি যা বলি
তশােন্, তা না হলে এক মুষ্ট্যাঘাতে তাের মন্দির
ভূমিসাৎ করে দেব।
১ম কৰ্ম্ম। বল দাদা, যা বলবে বল, আমি শুনছি।
এখন সাপে ব্যাঙ গিলেছে, আমার ত আর নড়বার যে

/ ২য় দৃশ্য।] মন্দাকিনী।
নেই, কিন্তু মুষ্ট্যাঘাত টাত করােনা। মন্দির ভাঙ্গলে
এর ভিতর যে রাবিস পােরা আছে, তাতে তুমি চাপা
পড়লে আর উঠতে পারবেনা দাদা।
২য় কৰ্ম্ম। তবে শােন, কাল ঐ যে নৰ্তকীরা এসে-
ছিল তার ভেতর যার নাম মাধুরী তাকে তুমি দেখে-
ছিলে ? যেমন রূপ তেমনি গুণ, যুবরাজের দিকে আড়ে
আড়ে তাকাচ্ছিল, আমার বােধ হ’ল যুবরাজ বুঝি
মুচ্ছ। যান।
১ম কৰ্ম্ম। ভায়া, যুবরাজ ত আমার মত পেটুকও
না, আর তােমার মত লম্পট ও না, যে একেবারে
গোগ্রাসে গিলবেন ?
তা সে কোথায় গেল?
২য় কৰ্ম্ম। যে সেনাপতি মহাশয় আছেন, যেন
রাঘব বো’ল—তাকে নিয়ে সটকেছেন।
১ম কৰ্ম্ম। তবে আর তুমি ভ্যানভ্যান করে কি
করবে ?
২য় কৰ্ম্ম। করব আর কি, ও সব কি আমাদের
বরাতে অাছে ? হাহা কি রূপ! “বিধি যদি তোরে
অামি বিরলেতে পাইরে’-
(তৃতীয় কৰ্ম্মচারীর প্রবেশ )
৩য় কৰ্ম্ম। তোমরা'ত বেশ অামোদ করছ ? কাল
যুদ্ধ হবে তার খবর রাখ ?

৮ মন্দাকিনী। [ ১ম অঙ্ক। ২য় কৰ্ম্ম ২য় কৰ্ম্ম। তা কি হয়েছে ? কাল যুদ্ধ হবে বলে কি অজই মরে থাকব নাকি ? ৩য় কৰ্ম্ম। না না তা বলছিনে, তার একটা উপায় ঠাওরাতে ত হবে? ধর, যদি যুদ্ধে আমাদের হার হয়? ২য় কৰ্ম্ম । দেখ বাপু তােমার মতন বীরপুরুষ আর দু’চার জন থাকলে নিশ্চয়ই হার হবে। ৩য় কৰ্ম্ম। তা ভাই যা বল, আমার কিন্তু হাত পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। ১ম কৰ্ম্ম। একটু বেশী করে সোণামুখীর পাতা বেটে খেও, সব বেরিয়ে পড়বে। দেখ বাপু, তােমার অন্যায় ভয়। সেনাপতি রণধীরসিংহ ও যুবরাজ বিজয় থাকতে কার সাধ্য এ দেশে পদার্পণ করে ? সে সব কথা যাক, কাল, কের অমন আমোদটা যে অকালে ভেসে গেল এটী বড় দুঃখের বিষয়। ভূপাল কি যুদ্ধ প্রস্তাব করবার আর দিন পাননি ? ৩য় কৰ্ম্ম। কেন ভাই কি রকম হ’ল ? ২য় কৰ্ম্ম। দুঃখের কথা আর কি বলব, যখন খুবনচি গান চলছে এমন সময়ে একজন দূত এসে যুব- রাজকে ডেকে নিয়ে গেল, তার পর খানিক পরে যুব- রাজ এসে বল্লেন যে আর আমােদ প্রমােদে কাজ নেই। শীঘ্রই ভূপালরাজের সহিত অামাদের যুদ্ধ হবে, অতএব

• ২য় দৃশ্য।
মার্কিনী।
তামোদ প্রমোদের এখন সময় নেই। আর অমনি সেই
জমায়েত অসির ভেঙ্গে গেল।
১ম কৰ্ম্ম। নে ভাই আর দুঃখ করে করবি কি,
চল্ বাড়ী চল, আমার পেট চচ্চড় করছে আমি আর
দাড়াতে পারছিনি।
২য় কৰ্ম্ম। চল—অাহাহা! কি রূপ ! কি রূপ !!
৩য় কৰ্ম্ম ।
যুদ্ধ হলে পালাৰ কোথা ?
তাইত,
[ সকলের প্রস্থান।
(বৈষ্ণবগণের প্রবেশ )
বৈষ্ণবগণ।
( গীত )
কেরে অলস রবি, নবীন রবি, ফুটায় ছবি, গগন-গায়।
মোহ-নিদ্রা ত্যজি, প্রেমে মজি, চরণ পূজি, আয়রে আয় ।
কবে আসবে শমন, পাপীর দমন, নরক-গমন হায়রে হায়
এবে তারণ-কারণ, লওরে শরণ, জলদ-বরণ-চরণ-ছায়।
[ প্রস্থান।

তৃতীয় দৃশ্য।
রণধীরসিংহের শিবির।
(রণধীরসিংহ, ইয়ারগণ, নর্তকীগণ ও মাধুরী)
নর্তকীগণ।
( গীত )
৪.
রস-রঙ্গিণ সঙ্গিনী আয় লো।
ফুল-কামিনী যামিনী যায় লো ।
বিধুর মধুর হাসি, ছড়ায় জোছনা-রাশি,
মধুর মলয়া আসি' কত যে নাচায় লো ।
ঠেলে ফেলে লাজ মান, প্রাণে মিশাইয়ে প্রাণ,
প্রেমের পঞ্চম গান পিক-বধূ গায় লো ।
৩.
১ম ইয়ার। আহ! স্বর্গরাজ্য যে এত কাছে তা
জানতেন না। এই ছিলেম তাঁবুর ভিতর বসে, আর এরই
মধ্যে একেবারে নন্দনকাননে ? কি মজা! এই জন্যে
লোকে স্বর্গে আসতে চায়। আহা, দেবতা বেটারা কি সুখ
ভােগই করে ! অপ্সরীরা থামলে কেন ? চালাও,
চলাওঁ।
২য় ইয়ার। এ বেটার ভয়ানক নেশা ধরেছে।
স্বপ্ন দেখছ নাকি বাবা ? তা দেখ, ঘুম ছুটে গেলে
কিন্তু আবার অদৃষ্টের দোষ দিতে ছাড়বে না। তখন
আবার কেঁদে বুক ভাসিয়ে দেবে, এই বেলা দিন থাকতে
নেবে পড়, আর বেশী অমৃত খেওনা।

৩য় দৃশ্য।] মন্দাকিনী। ? ১ম ইয়ার। দূর বেটা, আমি স্বপ্ন দেখছি তা অদৃষ্টের দোষ দেব কেন ? দোষ হচ্ছে তোর, তুই গােল- মাল করে আমার নেশা ভঙ্গিবার চেষ্টা কচ্ছিস কেন? ৩য় ইয়ার। তুই যেমন, ঐ ছটাকে বেটার সঙ্গে কথা কচ্ছিস ; বেটার পেটে এইটুকু পড়েছে আর বেটা যনি মাতলাম আরম্ভ করেছে । ১ম ইয়ার। বেশ করেছি, তাের কি ? আমি ত আর তো ব্যাটাদের মৃত নেমকহারাম নই, আমি যার খাই তারই গুণ গাই । রণ। তোমরা কি ঝগড়া আরম্ভ করলে ? গান বাজনা সব বন্ধ হয়ে গেল। এবারে যে গোলমাল করবে তার পেট চিরে মদ বের করে দেব । ১ম ইয়ার। দোহাই সেনাপতি মশাই! এমন কাজ করবেন না। পেট চিরলে আরও গােলমাল হবে, যার যার পেটের কথা একেবারে বেরিয়ে পড়বে। রণ। রূপসি ! তুমি একটা গাওনা, তোমার গানে যেন অমৃত লহরী খেলে।-এই, সব চুপ ! মাধুরী। ( গীত ) হাসিতে নাচিতে, জীবনের ভেলা ভেসে যায় যদি ভাল। কেন তবে চিতে, অনরে ডাকিয়ে কোথা আছে মহাকাল ।

১২ মন্দাকিনী। [ ১ম অঙ্ক। হাগ নাচ গাও, মাতাও হৃদয় এখনো থাকিতে কাল। সুখের সাগরে ঢেলে দাও দেহ দুখ-দীপ কেন জ্বল। এল এল ওই, আঁধার ঘনায়ে ঘিরিছে জলদ-জাল । কে জানে কখন, ডুবিবে এ রবি নিভিবে সকল আলো। ; রণ। এ দার, তুমি আমার মনের কথা টেনে বলেছ। আমিও তাই ভাবি, এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে যতটুকু আনন্দ উপভােগ করা যায় সেই লাভ ; কারণ কার অদৃষ্টে কি অাছে কিছুই বলা যায়না। আজ আমি সুন্দরীগণ পরিবেষ্টিত হয়ে আমোদ উপভোগ করছি, কাল হয়ত এমন সময়ে শৃগাল কুকুর বেষ্টিত হয়ে রণক্ষেত্রে মৃত্যু শয্যাশায়ী হব। কিন্তু উপায় নাই--আমি পরের বেতনভােগী দাস মাত্র। কাঞ্চনের বিনিময়ে এই অমূল্য জীবন বিক্রয় করেছি । মাধুরী। সেনাপতি মহাশয়, আমার একটা অনু- রােধ শুনুন। রণ। রাত্র অধিক হয়েছে, কল্য প্রত্যুষে যুদ্ধ আরম্ভ হবে, অত এৰ বিশ্রাম প্রয়োজন। অদ্য কার আমােদ- প্রমোদ এই পর্যন্ত, যাও তােমরা নিজ নিজ স্থানে প্রস্থান কর। 4 ®য় দৃশ্য। ] মন্দাকিনী। ১ম ইয়ার। ও সুন্দরীরা, চল একটা গেয়ে নিয়ে অজিকের মত যবনিকা পতন কর। নর্তকীগণ। ( গীত ) ( সখি) ছড়িয়ে দেরে ফুলরাশি। ফুলের খেলা, ফুলের মেলা, ফুলে ফুলে মেশামিশি । নলিনী আমােদ বিভােরা, হেসে হেসে হয় দিশেহারা, আমরা কেন, নীরব হেন, হাসির কোলে যাই ভাসি । গাইছে পাখী শাখী-শাখে ওই, বল সজনী, সুখ রজনী, কি অমনি যাবে সই- প্রেমের গানে, সুখের তানে, বাঁধব জোরে প্রেম-ফাসি । [ রণধীর ও মাধুরী ব্যতীত সকলের প্রস্থান। 'রণ। যুদ্ধক্ষেত্রে নায়ক মাধুরী। অাপনি রণক্ষেত্রে নিজে যাবেন না, অামাকে একদিনের জন্য সুখী করে চিরকালের জন্য অকূলে ফেলে দেবেন না। মাধুরী, তা কি কখন হয়? না থাকলে কি কখন জয়লাভের সম্ভাবনা থাকে ? নাবিকবিহীন তরী কি কখন নিরাপদে কূল প্রাপ্ত হয় ? মাধুরী। আমার ছেলেবেলায় গণৎকার গুণে বলে। ছিল যে তুমি রাজরাণী হবে। রণ। গণৎকার মিথ্যা বলেনি, 'তুমি রাজরাণী হবারই উপযুক্ত। ০

১৪
মন্দাকিনী।
[ ১ম অঙ্ক।।
নাই ।
। যুদ্ধ
মাধুরী। গণক মিথ্যাবাদী, তুমি রাজা না হলে
অমি রাণী হব কোথা হতে ?
রণ। কি করব মাধুরী, যুদ্ধ ভিন্ন অামার উপায়
কেবল এক পথ আছে সে পথে আমি যেতে
পারবনা।
মাধুরী। কি সে পথ ?
রণ। আমি যদি এখন ভূপাল-রাজকে লিখে পাঠাই
যে সি যুদ্ধ করবনা, যদি তিনি আমাকে এই রাজ্যের
করদ রাজা করেন কিন্তু এমন বিশ্বাসঘাতকের কার্য
করতে আমি পারবনা।
মাধুরী। কেন পারবেনা ? সেই বেশ।
করতে হবেনা অথচ তুমি রাজা হবে, আমি রাজরাণী
হব। দুজনে পরম সুখে কালযাপন করব ।
রণ।
না না, ও কথা বলােনা।
মধুরী। এই বুঝি তােমার ভালবাসা ? বেশ, তা
হলে তুমি যুদ্ধে যাও, আমি বিষ খেয়ে মরি।
রণ। না, মাধুরী তা আমি পারবনা। তার
চেয়ে চল তোমায় আমায় পালিয়ে যাই।
মাধুরী। তা হবেনা। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি হয়
রাণী হব, না হয় বিষ খেয়ে মরব। বল, পারবে ?
রণ। না।
মাধুরী । বেশ ! তুমি অর্থের জন্য চিরকাল

৩য় দৃশ্য । ]
মন্দাকিনী।
পরের মােট বও, আমি এই তােমার সামনে প্রাণত্যাগ
করি।
(রণবীরের কট হইতে তরবারি কাড়িয়া লওন)
রণ। মাধুরী! মাধুরী ! কর কি ? আমায় ক্ষমা
কর, আমাকে একটু বিবেচনার সময় দাও। কাল অতি
প্রত্যুষে তােমার কথার উত্তর দিব।
মাধুরী। শুধু কথার উত্তর নয়, তুমি যা বল্লে সেই
মৰ্ম্মে একখানি চিঠি লিখে আমাকে দেবে। আমি নিজে
ভূপাল-রাজের নিকট যাব। আমি কাকেও বিশ্বাস
করিনা। অন্যথায় তােমার সম্মুখে প্রাণত্যাগ করব।
এখন বিশ্রাম করগে ।
রণ। তাইত কি করি, বিষম সমস্যা ।
[ প্রস্থান।
মাধুরী। যুবরাজ বিজয় ! যুবরাজ থাকতে তােমায়
আমায় মিলন হতে পারেনা, সমানে সমানে না হলে
প্রণয় হয়না। আমি তােমার সমান হতে পারবনা,
কিন্তু তোমাকে আমার মত হতে হবে। এই যুদ্ধে
হারলে তােমাকে আমার পাবার আশা হবে। দেখি
রমণীর বুদ্ধিতে কত দূর কি হয়। রণধীর, যাবে কোথা ?
তােমায় আর যুদ্ধ করতে হবেনা। যে ফাঁদে পা দিয়েছ
তােমার ন্যায় লম্পটের তাহ’তে আর উদ্ধার হবার উপায়

মন্দাকিনী।
[ ১ম অঙ্ক।
নাই। এইবার বিজয় ! দেখব তুমি কোথায় যাও।
রাজরাণী আমি হব কিন্তু রণধীর ! তােমার নয়—আমি
বিজয়ের ।
{ প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
পৰ্বত-প্রদেশ।
( পাহাড়ীয়াবালকগণের প্রবেশ)
( গীত )
(আরে) হেঁইয়া রে হেঁইয়া।
গুটি গুটি ছুটি ছুটি চলে। সব ভেইয়া।
চলে কাঁধে মােগার রাজা,
হাতে সাধে তালি বাজা,
পাতা ফুলে ছাতা সাজা, মাথে ধর - উছেইয়া
ফুলটী পাৰা উঠছে ফুটি,
ছােটা ছোেটা আঁখি দুটি,
মিঠি মিঠি হাসি লুটি, নাচি তাথেই থেইয়ার
[ সকলের প্রস্থান।
(মাধুরীর প্রবেশ)
মাধুরী। হায়, আমি কি কল্লেম ? আমার সকল
অাশা অকূল পাথারে ভেসে গেল ! বিজয়কে পাবার
আশায় পুরুষবেশ ধারণ কল্লেম, আমার জন্ম কত প্রাণী

৪র্থ দৃশ্য। মন্দাকিনী। ১৭ নষ্ট হ’ল, স্ত্রীলােক হয়ে রণক্ষেত্রে যেতেও কুণ্ঠিত হইনি, কিন্তু কই ? তার ত কোন ফল ফললো না। বরং সবই বিপরীত হ’ল। এখানে থাকলে তবু তাঁকে সময় সময় দেখতে পেতেম, এখন সে আশাটুকুও গেল। রাজ্যেশ্বরকে রাজ্যচ্যুত কল্লেম, রাজরাণী ভিখারিণী হলেন, রাজপুত্র মুষ্টি অন্নের ভিখারী হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন। উঃ ! অবশেষে এই হ’ল ? আহা! তাকে যদি এক- বার দেখতে পাই তার পায়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষা চাই। কিন্তু সে সময় গেছে, অার তঁার দর্শন পাবনা। বিজয়। তুমি দেবতা-দেবতারা ত সামান্য হীনজাতিরও পূজাগ্রহণ করে থাকেন, তবে তুমি আমায় ত্যাগ করছ কেন ? ( গীত ) কেন প্রাণে হেন আশা হয়। পতঙ্গ হইয়ে কেন মাতঙ্গে ধরিতে পায় । বিমল সরসী-বুকে, কমল হাসিছে সুখে, কোমল কোরকে তার কাট পশিবারে চায়। অকলঙ্ক শশধর, আকাশে বিকাশে কর, সতত বাসনা কেন ওরে অবাধ তান্তর, কলঙ্ক কালিমা দিয়ে মলিন করিতে তায় । প্রাণ, তুই কঁদছিস কেন ? দে তোর কত অন্যায়। তুই বারাঙ্গনা, কিজন্য সেই অকলঙ্ক চন্দ্রে 'কলঙ্ক অর্পণ করতে চাস ? ধিক্ তােরে, এই কি তোর ভালবাসা?

১৮
মন্দাকিনী। [১ম অঞ্চ।
আরে প্রাণ ! তাের তাড়নায় যে কাৰ্য্য করেছি তার
প্রায়শ্চিত্তের প্রয়ােজন ; না হলে মরেও সুখ হবেনা।
বিজয়কে তার পিতৃরাজ্যে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত না দেখে আমি
মরতে পারবনা। এখন কি করি? আমি সামান্য স্ত্রীলােক
মাত্র, আমার ত কোন বল নাই। (ভাবিয়া) যাই,
সিন্ধুরাজ্যে যাই। প্রবল-প্রতাপান্বিত সিন্ধুরাজ ভিন্ন
এ বিপদে আর অন্য উপায় নাই। শুনেছি সিন্ধুরাজ
বড় দয়াবান, যাবার কাছে যাবার পায়ে ধরে
কঁাদ ধ—যদি কোন উপায় হয়।
[ প্রস্থান।
( বিজয়পুররাজ, রাণী ও বিজয়সিংহের প্রবেশ)
রাজা। অপূৰ্ব বিধির বিধি ! কাল সন্ধ্যাকালে
রাজা ছিনু, আজ আমি পথের ভিখারী ।
কপটী শৃগাল মিলি’ কপট সমরে
বিমুখিল কেশরীরে এই খেদ মনে।
নিজ দুঃখে দুঃখী নহি আমি—পুত্রসম
প্রজাগণ মম অত্যাচার প্রপীড়িত
সে সবার তরে মম ফাটিছে পরাণ ।
দেখ রাণি, সূৰ্য্যতাপে তাপিত যেজন
বিশ্রাম বিলাস আশে আসে তরুপাশে,

৪র্থ দৃশ্য। মন্দাকিনী । মুছায় তাহার ক্লেশ বৃক্ষ ছায়াদানে-- শুষ্ক তরু হের আমি পত্ৰপুষ্পহীন- রক্ষিতে আশ্রিত জনে নাহিক ক্ষমতা। মৃত্যু শ্রেয় ইহা হতে সম্মুখ সংগ্রামে। বিজয়। কহ পিতা, কিবা হেতু আদেশিল দাসে ত্যজিতে সে রণক্ষেত্র ? ধিক্ মৃত্যু শ্রেয় পরাজয় হতে—প্রাণভয়ে পালাই মানব সমাজে নাহি দেখাব বদন । গহন কাননে পশি’ ফলমূলাহারে জীবনের অবশেষ করিব যাপন। রাজা। জয় পরাজয় রণে বিধির ইচ্ছায়, সেই হেতু মনস্তাপ নহেত উচিত । প্রাণপণে যুঝি’ মােরা সমরে বিরত, এ নিমিত্ত কে ধিক্কার দিবে আসবে। ত্যজ খেদ, শান্ত হও, সুস্থ কর হিয়া, অধৰ্ম্মের জয় নাহি সম্ভব কখন। যত দিন নাহি পাব রণধীরাধমে হৃদয়-শোণিত মম না হবে শীতল, উত্তপ্ত রুধিরে তার করিলে অর্পণ হৃদয়ের জ্বালা মম হবে প্রশমিত। রাণী। তৃষ্ণায় কাতর বৎস! বাহিরায় প্রাণ, অশক্ত চরণ মম, ভ্ৰমিয়া কাতর, বিজয়।

মন্দাকিনী।
[ ১ম অঙ্ক
;
বিশ্রাম বিহনে আর চলিতে না পারি ;
ত্বর পুত্র কর কোন বিহিত বিধান।
বিজয়। হায় মাতঃ ! কি কহিব বিদরে হৃদয়,
রাজমাতা হেরি তােম। এ হেন দশায়।
চন্দ্র সূৰ্য যার নাহি হেরেছে বদন,
চলে যেতে তৃণাঙ্কুর ফোটে যার পায়,
রাজরাণী ভিখারিণী তৃষ্ণায় কাতর ।
নাহি বহু দূর মাতা, ওই দেখা যায়
বিজয়পুরের সীমা; নাহি আর ভয়।
মাগো জন্মভূমি! যাচি বিদায় চরণে,
বিদায় স্বদেশবাসী জনমের মত ।
যদি কভু উদে মম সুখ-দিবাকর,
শেয যদি হয় কভু দুখের রজনী,
রাজপুত্র প্রবেশিবে বিজয়নগরে--
নহে কেহ না দেখিবে তা ভাগ। বিজয়ে।
হৃদয়ের প্রতি স্তরে রয়েছে গ্রথিত
শৈশবের স্মৃতি সহ স্বদেশ বৈভব;
কেমনে ভুলিব মম সুখের সদন,
কেমনে সহিব হেন দারিদ্রের ক্লেশ ?
পিতঃ ! মাতঃ চল ওই মঠ সন্নিধানে
ফল জলে করি ক্ষুধাতৃষ্ণা নিবারণ।
( সকলের প্রস্থান।

পঞ্চম দৃশ্য।
সিন্ধুরাজ মন্ত্রণা-গৃহ।
(রাজা ও জনৈক পারিষদ )
পারি। মহারাজ ! আপনি ভিন্ন এর সুবিচার আর
কারও দ্বারা হবেনা। দোহাই মহারাজ! এর বিচার
আপনাকে করতেই হবে।
রাজা। কিহে, আজ আবার একি ভাব ? মতলবটা
কি ভেঙ্গেই বলনা।
পারি। আজ্ঞে মহারাজ! আমি এর ভেতর নেই
আমাকে জোর করে ধরে এনেছে।
রাজা। কি বিপদ! ব্যাপারটা কি হয়েছে ?
আজ্ঞে আমার মত লােকের সাধ্য কি যে
এ কাজ পারে ? আমরা চক্ষু থাকতে অন্ধ-কর্ণ থাকতে
বধির-নাসিকা-
রাজা। কি জ্বালা ! তুমি যে ধান ভাতে মহী-
পালের গীত আরম্ভ করলে। আসল কথাটা কি ?
পারি অজ্ঞে রাস্তায় আসতে আসতে দুটী
স্ত্রীলোক বিবাদ করছে। ও বলছে আমি তাের চেয়ে
গুণবতী, এ বলছে আমি তোর চেয়ে কোন অংশে ন্যূন
নই। আমি যাচ্ছিলেম সেই পথ দিয়ে, আমাকে ধরে
বল্লে যে তুমি এর বিচার কর।
এর বিচার কর। তা আমি পারব
পারি।

মন্দাকিনী।
[ ১ম অঙ্ক।
কেন ?
মহারাজ ত জানেন, আমি স্ত্রীলােকের গুণ
ভিন্ন দোষ দেখতে পাইনা, সে বিষয়ে আমি একেবারে
অন্ধ। সেইজন্য একেবারেই মহারাজের নিকট এনেছি ।
হুকুম হলেই আপনার সম্মুখে হাজির করি।
রাজা।
তা আমি আগেই বুঝেছি ; তুমি যখন
আছ তখন স্ত্রীলোক ও ঝগড়া যে এর ভিতর আছে তা
নিশ্চিত তা দেখ, আজ আমার মন তেমন ভাল নয়,
ও সব ভাল লাগছেনা।
পারি। অমৃতে অরুচি হলে চলবে কেন মহারাজ ?
অার যখন তারা রাজবাটী পৰ্যন্ত এসেছে তখন তারা কি
অমনি ফিরে যাবে ?
রাজা। তবে নিয়ে এস।
( পরিষদের প্রস্থান ও নৰ্তকীদ্বয়ের সহিত পুনঃ প্রবেশ )
পারি। দেখুন মহারাজ! এক্ষণে বিচার করুন।
রাজা। যথার্থ, তােমরা উভয়েই রূপবতী বটে,
তোমাদের মধ্যে কে অধিক সুন্দরী বলা অসম্ভব ; তবে
কিছু গুণের পরিচয় দাও, তাতে যদি কিছু অনুমান
করা যায়।
( দ্বৈত-গীত )
১ম নর্তকী।
কার হৃদয়ের সাধ, জোছনার চাদ,
কোন্ মরমের আশা।
কার স্বরগের ফুল,
সোহাগের দুল,
কোন্ মলয়ায় ভাসা ।

৫ম দৃশ্য । ] মন্দাকিনী। ২৩ ২য় নর্তকী । - আমি হেসে হেসে, বেড়াই ভেসে, যে ডাকে তার কাছে আসি। আমি তারা তুলে, পরাই চুলে, ফুটাই মেঘে হীরের হাসি। ১ম নর্তকী - কার হারাণ রতন, সুখের স্বপন, কোন্ প্রণয়ের ভাষা। কার দুখভরা হিয়া, ছিড়িয়া দহিয়া, কোন্ অশে তব আসা। আমি ফুলের কোলে, পাখীর বােলে, বসাই মথুর প্রণয়রাশি। আমি প্রাণী নিয়ে, গানটা গেয়ে, উধাও হতে ভালবাসি। ২য় নকী। পারি। দেখুন মহারাজ, এর বিচার করা কি অামার সাধ্য ? রাজা। যথার্থ, তােমরা উভয়ে রূপে গুণে তুল্য, কেহই নৃন নয় । অদ্য আমার মন সুস্থির নয়, অজ তোমরা বিদায় হও, অন্য একদিন এর মীমাংসা করা যাবে। যাও, এদের প্রত্যেককে শত স্বর্ণমুদ্রা পারিতােষিক দাও। [ নর্তকীদ্বয়ের প্রস্থান। দেখ বয়স্য, মন্দাকিনী যেরূপ কৃশ হচ্ছে, আমার ভয় হয় পাছে আমার একটিমাত্র নিধি অকালে বিধাতা হরণ করেন। আমি প্রচার করেছি যে, যে কেহ এই রােগ নির্ণয় করতে পারবে তাকে যথেষ্টরূপে পুরস্কৃত করব।

২৪
মন্দাকিনী।
[ ১ম অঙ্ক।
পারি। (স্বগতঃ) পুরস্কৃত হয়ে কাজ নেই, আমি
এমন অসময়ে বকামি করে তিরস্কৃত ও বহিষ্কৃত হইনি
তাই যথেষ্ট। ( প্রকাশ্যে ) মহারাজ উতলা হবেন না,
ঈশ্বরের কৃপায় শীঘ্রই উপায় হবে।
(মন্ত্রী ও মাধুরীর প্রবেশ )
মন্ত্রী। এই স্ত্রীলােকটি রাজকন্যার অসুস্থতার কথা
শুনে এখানে এসেছে, রাজকুমারীকে দেখলে তার রােগ
নির্ণয় করতে পারবে বলছে।
রাজা। এস বৎসে, চল অন্তঃপুরে চল।
[ সকলের প্রস্থান।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
পান্থশালা।
( বিজয়পুর-রাজ ও রাণী আসীনা )
রাণী।
সবে বলে ভগবান্ ! দয়াসিন্ধু তুমি,
আমা দোহা প্রতি তবে কি হেতু নিদয় !
পশু পক্ষী পতঙ্গাদি জীবশ্রেণী যত,
সর্বোপরি বিরাজিছে করুণা তােমার !
কি পাপে হে জগৎপিতা! ভাগ্যহীন আমি
করিতেছি দিবানিশি অশ্রুবরিষণ ?

৬ষ্ঠ দৃশ্য।] মন্দাকিনী। হৃদি-মেধ মুক্ত কর-কর বিমােন প্লাবনের ধারা সম আঁখিবারি মাের- নিৰ্ম্মল শারদাকাশ দেখাও বারেক- দেখাও মহিমা তব মহিমা-নিদান। রাজা। শুন রাণি ! যদি মােরা থাকি ধৰ্ম্মপথে, পূজি’ নিত্য ইষ্টদেবে বঞ্চি এ জীবন, রাজলক্ষী কভু নাহি বিমুখী হইবে। সুসময় কিছু দিনে উদিবে আবার আবার ভাসিব দেহে সুখ-পারাবারে। বিজয়ে অর্পিয়ে রাজ্য রহিব নির্জনে তোমা সনে, যাবত শমনদূত অসি’ যাবে মােরে লয়ে, ছিড়ি’ প্রণয়-বন্ধন। ভেবে দেখ রাণি ! বালক যখন আমি, ( বালিকা তখন তুমি) হাতে হাতে ধরি’ উদ্যানেতে মােরা দেহে করেছি ভ্রমণ- পরে রাজারাণী হয়ে বসি’ সিংহাসনে করিয়াছি প্রজার পালন-কালচক্র- ফেরে এবে ভিখারীর বেশে ভূমিশয্যা- শায়ী দোঁহে, অনুক্ষণ করিছ রােদন। বুঝ মনে, সব হয় বিধির ইচ্ছায় শান্ত হও, ধৈৰ্য্য ধর, না হও অধীর। 5 বনি ! কে তোমারে বলে ভিখারিণী ?

মন্দাকিনী। [ ১ম হাঙ্ক। অমূল্য রতন গাছে গৃহেতে তোমার। দিপাল সম দেখ বিজয় কুমার অচিরে করিবে তুব দুখ বিমোচন। রাণী। বহুক্ষণ ভিক্ষা হেতু গিয়াছে বিজয়, এখনও কেন নাহি আসিছে ফিরিয়া ? একমাত্র প্রিয় বস্তু—যার তালম্বনে রাখিয়াছি এই প্রাণ কালগ্রাস হতে, কঠিন বিধাতা বুঝি নিঠুর হইয়ে হরিল সে অভাগীর অমূল্য রতন ? . ( গীত ) হে বিধি! কি বিধি তব ভালে মম লিখেছিলে। সহসা তমসা দোরে হসি চাদে ঢেকে দিলে । কালি ছিনু রাজরাণী, অজি হনু ভিখারি, পতি সনে ভ্রমি বনে, একি লীলা দেখাইলে। অভাগী নয়ন-মণি, পুত্রধনে ছিনু ধনী, সে ধনে বঞ্চিলে কেন, কোন্ পাপে হ'রে নিলে। (বিজয়সিংহের প্রবেশ ) ক বিজয়। সম্বর রোদন মাতঃ ! মেলহ নয়ন- ভিক্ষা হতে আসিয়াছে তনয় তােমার। এতদিনে বুঝি মাতা বিধি অনুকূল, মুষ্টি ভিক্ষা হেতু আর যেতে নাহি হবে । (স্বর্ণমুদ্রা প্রদর্শন ) ওষ্ঠ দৃশ্য। মন্দাকিনী। রাজা। কহ পুত্র ! কিরূপেতে করিলা অর্জন এহেন কাঞ্চনরাশি ? কোন্ দয়াবান্ বরষিল দয়াবারি আমা সব পরে, কে হইল মােসবার দুঃখেতে দুঃখিত ? বিজয়। নাগেশ্বর-অধিপতি কৃপাবান্ তাতি মম প্রতি, তঁার কৃপাবলে লভিয়াছি সহস্র কাঞ্চন, আর তিনি তােমা দেহে দিবেন আশ্রয়, করেছেন অঙ্গীকার। ওই দেখ মন্ত্রী তার তাসিছেন হেথা তােমা দেহে লয়ে যেতে রাজেন্দ্র সদন। জনক জননি! দেহে রহ সেই স্থানে, যাব আমি বহুদূরে ভিক্ষার সন্ধানে। অন্য ভিক্ষ। আর নাহি যাচিব কাহারে ; নিজরাজ্য উদ্ধারিব বলে বা কৌশলে – এই হেতু যেতে চাই ত্যজি’ তােমা দেহে। খেদ নাহি কর পিত, না বার জননি! অদ্য হতে এক বর্ষ ব্যবধান পরে ফিরি’ তাসি পুত্র তব বন্দিবে চরণ। (নাগেশ্বর-মন্ত্রী প্রভৃতির প্রবেশ ) মন্ত্রী। আপনারা আসুন, রাজার অনুরোধ আপ- নাদের অার এস্থানে বাস করবার প্রয়োজন নাই। [ সকলের প্রস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
সিন্ধু-রাজান্তঃপুর - ক্রীড়া-কানন।
( মন্দাকিনী ও সখীগণ)
সখীগণ।
( গীত )
কেন সখি বল দেখি মলিন মুখ-নলিন।
সুনীল নয়ন কেন সদা ভূমিতলে লীন।
চাদের কিরণ: হাসে, কোকিলা মধুর ভাষে,
বিবিধ কুসুম বাসে, হিয়া কেন সুখহীন।
হরষে সরসী-জলে, কুমুদিনী হেলে.দোলে,
শীতল মলয়া খেলে, কেন তোর তনু ক্ষীণ।
মন্দা।
হায় সখি! বৃথা চেষ্টা, বৃথা যত্ন তব—
নৃত্যগীত বিষসম হয় অনুভব।
শরীর বিকল যার, সকলি নীরস
তার হয় অনুমান,
তিক্ত
সমুদয় -
আঁখি জ্বলে হেরে স্নিগ্ধ চঁাদের কিরণ,
শ্রবণে কক্কশ বাজে কোকিলের স্বর,
ভাল নাহি লাগে তার সুগন্ধি কুসুম,

১ম দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী।
সতত বিস্বাদ জিহ্বা হয় অনুমান,
মলয় মারুতে শীতে কঁপে কলেবর।
অামা হেতু কষ্ট সবে পাও কি কারণ ?
এত যত্ন এত ক্লেশ তোমা সবাকার
এ জীবনে কণামাত্র নারিব শােধিতে।
চিরঋণী আমি সখি তোম। সব কাছে ;
লৌহখণ্ড সলিলেতে করিলে নিক্ষেপ
দিনে দিনে ক্ষয় হয় কলঙ্ক ধরিয়া,
সেইমত দেহ মম ব্যাধির পরশে
ম্লানতর ক্ষীণতর হতেছে ক্রমেতে।
১ম সখী। কেন সখি, কেন হেন হতাশ জীবনে ?
দৈববরে রোগমুক্ত হইবে অচিরে।
মােরা সব সখী মিলি প্রাণ তুচ্ছ কার
রাখিব যতনে এই সুন্দর কুসুমে।
দুরন্ত মাৰ্ত্তও তেজে না দিব শুকাতে
যতনে বর্ধিত এই হেম-কুমুদিনী !
বিষধর কালফণী দংশিয়াছে যারে
শুশ্রুষায় কিবা ফল লভিবে সেঁজন ?
শত শত চিকিৎসক অপারগ সবে
করিতে নির্ণয় মম এ দুরন্ত ক্যাধি।
যেই করে ধরি’ সদা কঠিন কৃপণ
সুরঙ্গে ত সঙ্গে করেছ মন
মন্দ।।

মন্দাকিনী।
[ ২য় অঙ্ক।
এবে দেখ সেই বাহু অক্ষম অলস
বিচ্ছিন্ন মৃণাল সম পড়ি’ শয্যাপকি।
1.
(রাজা ও মাধুরীর প্রবেশ)
রাজা।
ম্লানমুখ শুষ্কদেহ দেখ কন্যা মোর
শরতের শশী সম বদন-সরােজ !
কেশজাল আলুথালু পড়েছে ছড়ায়ে-
কাল জলে ভাসে যেন কনক-কমল !
দেখ বৎসে ! পার যদি করিতে নির্ণয়
কিবা কীট পশিয়াছে এ হেন প্রসূনে।
অদেয় তােমারে কিছু না রবে জগতে,
ধন রত্ন যা চাহিবে তাহা পাবে তুমি।
হের পুত্রি ! আসিয়াছে রমণী ললাম
ব্যাধির কারণ তব করিতে নির্ণয়।
লয় মনে ইহা হ’তে হইবে উপায়
তীক্ষ্ণবুদ্ধি বিচক্ষণা হয় অনুভব।
মাধুরী। অন্য রােগ নাহি কিছু শুন হে রাজন্ ।
চিন্তা-কীট পশিয়াছে এ দেহ-পিঞ্জরে ;
সতত হৃদয়-পাখী জ্বলিছে দংশনে,
জরজর দিন দিন বিষের তাড়নে।
মন্দা। মূর্তিমতী বুদ্ধি তুমি ধরণীমণ্ডলে
দেবের রমণী কিবা এসেছ ছলিতে ?

১ম দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী।
শুন সতি! এত দিন রেখেছি গােপৰ
ফাহা, আজি প্রকাশিব তােমার নিকটে।
কিন্তু সখি, এক ভিক্ষা যাচি তব কাছে
সখীভাবে মম পাশে রবে চিরদিন ?
মাধুরী। স্বীকৃত হইনু আমি তােমার প্রস্তাবে,
কহ এবে কিবা সখি রেখেছ গােপন।
( মন্দাকিনীর সহিত কাণে কার্ণে কথা )
মহারাজ! রােগ নির্ণয় করেছি। ভূপালরাজের
সহিত তাপনি প্রিয়সখীর বিবাহ সম্বন্ধ করেছেন, সে
সম্বন্ধ, এর মনােমত হয়নি। কিন্তু আপনার প্রতিভা
ভঙ্গ হবে বলে এ কথা এত দিন কারাে নিকট প্রকাশ
করেননি এবং অাজও কনে না, তবে আমি তার মনের
ভাব জানতে পেরেছি বলে সে কথা আমায় বল্লেন। এখন
রাজ কন্যার অারােগ্যের ভার আপনারই উপর নির্ভর
করছে। ভূপালপতির সহিত বিবাহ সম্বন্ধ ভঙ্গ করুন,
রাজকন্যা তারােগ্য হবেন।
রাজা।
বৎসে ! এ কথা আমাকে এতদিন বলনি
কেন ? তুমি আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ, তােমার জন্য
আমি সব করতে প্রস্তুত। হায়! আমি না বুঝে অকালে
এই সােণার প্রতিমা জলে বিসর্জন দিতে উদ্যত হয়ে-
ছিলেম। ধিক্‌ আমাকে ! আমি আজ প্রতিজ্ঞা করছি যে
তােমার অমতে কারাে হস্তে তােমাকে সমর্পণ করব না।

৩২ মন্দাকিনী। [ ২য় অঙ্ক। আর মাধুরী! তুমি যে আমার কি উপকার করেছ তা আমি বলতে অক্ষম। তুমি বলেছিলে তােমার পিতা মাতা নাই, অজি হ’তে অামি তােমার পিতা, তুমি আমার কন্যা। আজ হতে স্বচ্ছন্দে এখানে বাস কর। তােমার এই ভগ্নীকে তােমায় সমর্পণ করলেম, দুজনে একসঙ্গে কালযাপন কর। মন্দা। পিতঃ! আপনার এ তনয়ার প্রতি এত স্নেহ তা জানতেম না। আমার আর একটী অনুরােধ যদি রক্ষা করেন তাহলে এ দুঃখিনী মাতৃহীন। চির- কালের জন্য সুখী ও নিরুদ্বেগ হতে পারে এবং এই রােগজনিত কষ্ট এক কালের জন্য বিস্মৃত হয়। রাজন্ । আনার এই অনুরােধ রাখবেন বলুন ? রাজা। তােমাকে অদেয় আমার কিছুই নাই। তুমি নিঃসঙ্কোচে তোমার হৃদয়-ভাব ব্যক্ত কর। আমি প্রতিস্থা করছি যে তুমি যা বলবে আমি তাতেই সম্মত হব। মন্দা। জানেন আমি বাল্যকাল হতে বিদ্য'-বুদ্ধির ও যুদ্ধকৌশলের পক্ষপাতী ; এ হেতু নিবেদন, আমাকে কোন মূর্খ কাপুরুষ ব্যক্তির হস্তে সমর্পণ করবেন না। আমি দুইটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব ও রণ-কৌশল পরীক্ষা করব, যে তার প্রকৃত উত্তর দানে কৃতকার্য হবে, আমি তাকেই পতিত্বে বরণ করব। আর যদি যথার্থ উত্তর দিতে না পারে ও অস্ত্রবিদ্যা-বিশারদ না হয় তবে অাপনার আজ্ঞায় তার শিরচ্ছেদন করা হবে। ;

১ম দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী।
রাজা। বৎসে, এ অতি ভয়ানক প্রতিজ্ঞা। এ হ'তে
নিবৃত্ত হও, অন্য কোন ব্যবস্থা স্থির কর।
মন্দ।। না মহারাজ, তা হবেনা।
যে মূর্থ নিজের
বিদ্যা ও বুদ্ধির সীমা না জেনে এরূপ কাৰ্যে অগ্রসর হয়,
তার মরণই মঙ্গল, তার এ পৃথিবীতে না থাকাই উচিত।
আপনার পায়ে ধরি, মিনতি করি—এ বিষয়ের অনু
মােদন করুন।
রাজা। আচ্ছা তাই হবে। অষ্টই সমস্ত দেশে
এই স্বদেশ প্রচারিত হবে।
( প্রস্থান।
মাধুরী। অার কেন প্রিয়সখি, অার অধোমুখে
কেন ? তোমার প্রতিজ্ঞা ত পূর্ণ হয়েছে, আর মিয়মাল
কিজন্য ? সখীগণ, তোমাদের রাজকন্যা আরােগ্য হয়েছেন
তোমরা একটু আমোদ প্রমােদ কর।
সখীগণ । ( গীত )
এস:সবে সখী মিলি গাইব হরষে।
অকলঙ্ক শশাঙ্কেরে হেরিয়ে আকাশে।
সরস বসন্ত আবার আসিবে,
মলয় সুশান্ত আবার বহিবে,
পিপুঞ্জ পুনঃ গুঞ্জিবে ঘন ঘন,
রোগশূন্য হেরি’ সখী মাতিব উল্লাম্বে।
• সকলের প্রস্থান ।
১

দ্বিতীয় দৃশ্য।
কুটীর-সম্মুখ।
( ভিখারিণী বালিকাগণের প্রবেশ )
( গীত )
সকলে।
প্রথম।
দ্বিতীয়।
উভয়ে।
পেটের দায়ে, ভিক্ষা চেয়ে, ঘুরে বেড়াই ঘরে ঘরে।
নিদয় মানুষ, সবাই বেহুস, মােদের পানে চায়না ফিরে।
দুদিন পেটে যায়নি অন্ন,
শরীর আমার অবসন্ন,
এবার বুঝি যাই উচ্ছন্ন, চরণ মােদের বইতে নারে।
মা আমার থাকত যদি,
বেঁচে থাকলে আমার দিদি,
এমন করে কেঁদে কেঁদে বেড়াতাম না সহর ঘুরে ।
)
তৃতীয়।
চতুর্থা।
উভয়ে ।
( জনৈক বৃদ্ধার প্রবেশ)
বৃদ্ধা। যা যা, পালা-এখন দিক্ করিসনি।
[ ভিখারিণী বালিকাগণের প্রস্থান।
বাপরে! এমন প্রতিজ্ঞা ত কখন শুনিনি! বিয়ে করতে
এসে মুণ্ডী পাদপদ্মে দিয়ে যেতে হবে ? পােড়া কপাল
এমন বিয়ের ! ওমা! আমি মনে করেছিলেম যে এমন
সখের বিয়েতে কেউ সম্মত হবেনাও বাবা! একি,
সাতদিন যেতে না যেতে গণ্ডা গণ্ডা রাজপুত্রের মুণ্ডপাত হয়ে
গেল ! ও রাজকন্য। নিশ্চয়ই কোন রাক্ষসী, মানুষের

২য় দৃশ্য । ]
মন্দাকিনী
৩৫
রূপ ধরে এসেছে, তা না হলে মেয়েমানুযে কি যুদ্ধ
করে ? না জানি কত রক্ত খেয়ে তার পেট ভরবে ।
হাহা ! বাছারা সব রূপে মুগ্ধ হয়ে ফড়িংএর মত
তাগুনে ঝাঁপ দিয়ে পুড়ে মরছে। রাজার ছেলেগুলো
বড় হাহাম্মক, নইলে এ পৃথিবীতে এত সুন্দরী থাকতে
রাক্ষসীর কুহকে পড়ে প্রাণ হারাবে কেন ? তাহা ঐ
একজন কে অাসছে--কি সুন্দর রূপ! এও বোধ হয়
কোন রাজার পুত্র হবে। যাহ’ক, যখন আমার কাছে
হাসছে তখন কিছুতেই আমি ওকে সেই রাক্ষসীর ফাঁদে
পড়তে দেবনা।
( বিজয়সিংহের প্রবেশ )
আপনি কে মশাই? আপনার বেশভূষা দেখে রাজপুত্র
বলে বোধ হচ্ছে। এ দুখিনীর কুটীরে কিজন্য এসেছেন ?
বিজয়। অমি রাজপুত্র নই, একজন বণিকপুত্র,
দেশভ্রমণ উপলক্ষে এখানে এসেছি। এ দেশের ন্যাচার
ব্যবহার ও রীতিনীতি কিছুই আমার জানা নাই, পথ
দুটিও জানিনা। আপনাকে মাতৃ সম্বোধন করছি,
অজিকের মত এখানে একটু আশ্রয় দিন। রাত্রি প্রভাত
হলে অামি অন্যত্র গমন করব।
বৃদ্ধা। আহা কি মিষ্টি
কথা ! উপরও যেমন,
ভিতরও তেমনি। বাবা, তুমি চিরজীবী হও, এ বাড়ী
তোমারই মনে কর। একরাত্রির জন্য কেন, যতদিন

মার্কিনী ।
[ ২য় অঙ্ক।
৬.
তোমার ইচ্ছা এইখানে থাক। আমি বিধবা, ছেলে পিলে
নাই ; যথাসাধ্য তােমার সেবা করব।
বিজয়। মা । আমি তােমার কথায় যে কি পৰ্যন্ত
সুখী হলেম তা আর কি বলব। এমন যত্ন আমি
কোথাও পাইনি, এত আদর আমায় কেউ করেনি।
যতদিন এই নগরে থাকৰ, এই আমার আবাস স্থান
হবে। জগদীশ্বর ! ধন্য তােমার মহিমা ! তােমার নাম
করে যেখানেই যাওয়া যায়, সেইখানেই তোমার করুণা-
বলে বিপদাপদ তিরােহিত হয়। প্রান্তরে, পর্বতে,
সমুদ্রে, অরণ্যে—সকল স্থানেই তােমার করুণাকণা
বিস্তৃত রয়েছে। আমি সৌভাগ্যবলে আজ এই আশ্রয়
না পেলে হয়ত কোন প্রবঞ্চকের হস্তে পতিত হয়ে
সর্বস্বান্ত ও প্রাণে বিনষ্ট হতেম ।
বৃদ্ধা। এখানে সে সব ভয় নাই বাবা। সিন্ধু-
রাজার প্রতাপে বাঘে হরিণে এক ঘাটে জল খায়। অমা-
দের রাজা পরম দয়ালু। তঁার রাজ্যের মধ্যে কোন
অবিচার নাই, কারাে কোন দুঃখ নাই; কিন্তু এক কার্য্যের
জন্য রাজা প্রজা সকলেই অসুখী।
বিজয়। যিনি সিন্ধুরাজ্যের অধীশ্বর, এ হেন প্রজা-
রঞ্জক, দয়ালু ও ধৰ্ম্মভীরু, তার আবার অসুখ কি ?
জগদীশ্বর কি তাকে কোন কঠিন পীড়া গ্রস্ত করেছেন, না
তিনি কোন শোক প্রাপ্ত হয়েছেন ?

২য় দৃশ্য। মন্দাকিনী। বৃদ্ধা। শোকই বল আর অসুখই বল, দুঃখের কারণ তঁার কন্যা। রাজার স্ত্রী নাই পুত্র নাই, কেবল একটীমাত্র কন্যা-পরম রূপবতী ও গুণবতী। একাধারে যেন লক্ষমা সরস্বতী ! রাজা ভূপাল-রাজকুমারের সহিত তার বিবাহ স্থির করেন, কিন্তু কন্যার তা তা মনােমত হয়নি। তিনি একেবারে আহার নিদ্রা ত্যাগ করে শয্যাশায়ী হলেন। চিকিৎসকেরা অনেক চেষ্টা করলেন কিছুই করতে পারলেন না। অবশেষে রাজা কোন গতিকে অসুখের কারণ জানতে পেরে এই সম্বন্ধ ভেঙ্গে দিলেন, রাজকন্যা ও আরোগ্য হলেন। কিন্তু রাজকন্যা প্রতিজ্ঞা করলেন যে, যে তার সহিত বিচারে জয়ী হবে তাকে বিবাহ করবেন, আর হারলে তার শিরচ্ছেদনের আজ্ঞা হবে। সেই থেকে কত রাজা রাজপুত্র এল, কিন্তু কেউ সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন। রাজ- কুমারদের রক্তে সিন্ধুরাজ্য ভেসে যাচ্ছে, আর রাজা এই নিষ্ঠ র ব্যাপারে অতি দুঃখে কালযাপন করছেন। ( নেপথ্যে কোলাহল ও বাদ্যধ্বনি) বিজয়। ও কি ও ! দূরে ও কোলাহল কিসের ? বোধ হয় আবার কোন হতভাগা রাজপুত্র প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় যমের বাড়ী যেতে অগ্রসর হচ্ছেন।

৩৮
মন্দাকিনী।
[ ২য় অঙ্ক।
বিজয়। আচ্ছা আমি শীঘ্রই আসছি, দেখে অাসি
কোন্ হতভাগ্য বধ্যভূমিতে প্রাণ বিসর্জন করতে যাচ্ছে।
[ প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
বধ্যভূমির নিকটস্থ পথ ।
(জনৈক ভিখারীর প্রবেশ)
ভিখারী।
( গীত )
দয়াময়! তব চরণে ধরি।
ঘুরি ভব ঘোরে, দারুণ আঁধারে,
সুপথ কুপথ চিনিতে না পারি ।
কর আলো দান, করুণা-নিদান,
(আমি) অজ্ঞান মানব, বিহীন বৈভব,
কিরূপে তােমার পাব পদতরী।
( বিজয়সিংহের প্রবেশ)
বিজয়। ওহে এই পথে কি বধ্যভূমিতে যাওয়া যায় ?
ভিখারী। হুঁ, দেখতে পাচ্ছনা ? ঐ যে স্বর্গের
দোর দেখা যাচ্ছে। তুমি দরজা খুজছ কেন বাবা ?
তোমারও ঘুনিয়ে এসেছে নাকি ? তা এত খুঁজে সে
জায়গায় যেতে হবে কেন ? সটান রাজবাড়ীতে যাও,
গিয়ে রাজকন্যার প্রশ্নের বিচার কর, তাহলেই মহা
সমারোহে মহাশয়কে যথাস্থানে নিয়ে যাবে।

৩য় দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী।
বিজয়। তা রাগ করছ কেন বাপু! আমি এ সহরে
নূতন
এসেছি তাই পথ ঘাট অবগত নই।
ভিখারী। ফ্লেইজন্যই ত তােমাকে সাবধান করে
দিচ্ছি। এ স্থান হতে প্রস্থান কর, এ সবের ভেতর
যেওনা। আবার কোথেকে যদি তােমারও সখ চেপে
যায় তাহলেই চিত্তির ! যাও, বিদেশী লোক-রাত
হয়েছে, ঘুমােওগে—বধ্যভূমিতে গিয়ে কি করবে ?
[ প্রস্থান।
বিজয়। লােকটা বাতুল বােধ হয়। এই যে ওরা
সব এইদিকেই আসছে।
( রণধীরসিংহ, সিন্ধুরাজমন্ত্রী প্রভৃতির প্রবেশ)
একে ? এযে সেই রণধীরসিংহ।
সিন্ধু-মন্ত্রী। অভাগ্য যুবক! তুমি আপনার বুদ্ধির
দোষে এক উন্মাদিনীর প্রেমপিপাসায় উন্মত্ত হয়ে এই
তরুণ বয়সে বধমঞ্চে তমূল্য জীবন উৎসর্গ করলে।
তোমার এই অকাল মৃত্যুর জন্য সিন্ধুরাজ বা সিন্ধুবাসী
দোয়ী নয়।
রণধীর। মহাশয় ! নহে দোষী সিন্ধু নরপতি,
কোন দোষে নহে দোষী সিন্ধুবাসীগণ।
তাগ্নিশিখা দেখি’ যথা পতঙ্গনিচয়
ঝাপ দিয়া পুড়ি’ মরে আনল মাঝারে
স্বইচ্ছায়, সেইমত মরিতেছি আমি
বিজয়।

৪০ মন্দাকিনী। [ ২য় অঙ্ক। মন্দাকিনী-রূপরাশি-অগ্নিশিখা-মাঝে। কায়মনােবাক্যে আমি যাচি ভগবানে কণামাত্র পাপ নাহি স্পর্শে সিন্ধুরাজে। অাশার ছলনে মজি’ লভিনু কি ফল ? প্রাণ দিনু প্রবাসেতে বধমঞ্চোপরি । কোথা রেল জন্মভূমি প্রিয় বন্ধুজন- কোথা রৈল সিংহাসন আত্মীয় স্বজন-- অসহায় কালেতে দিনু বিসর্জন সোণার জীবন-তরী সাগরের নীরে ! কামমদে মত্ত হয়ে উপেক্ষিনু যত মিত্রগণে—ঠেলিলাম বচন সবার উপযুক্ত ফল তার লভিনু অচিরে- মরিলাম অকালেতে শীতল শােণিতে ! কামমদে মত্ত সদ। যেজন দুৰ্ম্মতি, সতত এ গতি তার বিদিত জগতে। কে ওই ? বিজয় ! দেখিছ কি দশা মম ? বৈর-নিৰ্যাতন তরে এসেছ এখানে? মিটিয়াছে সাধ তব বিনা পরিশ্রমে। প্রতিজ্ঞা করেছ তুমি মারিবে আমারে মম সৃনে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে জয়লাভ করি'- কিন্তু মম ভাগ্যদোষে সে সাধে বিষাদ তব হ’ল সংঘটন। মরিতাম যদি,

৩য় দৃশ্য । ]
মন্দাকিনী।
৪১
আমি
সম্মুখ সমরে অস্ত্র হাতে করি’
সগৌরবে ত্যজিতাম এই কলেবর।
কপটী যেমন আমি, বিধির বিধানে
মৃত্যু হ'ল আজি মম ঘাতকের করে।
যদি কভু যাও ফিরি’ বিজয়নগরে,
কহিও আত্মীয়গণে এসব বারতা।
রাজ্যচ্যুত করিয়াছি তােমার জনকে,
সেই পাপে এই দণ্ডে দণ্ডিলা বিধাতা।
এই লই বিষপূর্ণ সুন্দর কুসুম
কালফণি বসে সদা যাহার কোরকে
এই ফণী প্রলােভিয়া আনিয়া আমারে
বধিয়াছে অবশেষে নির্দয় দংশনে।
( ছবি নিক্ষেপ)
ভগবান! দয়াসিন্ধু! অগতির গতি ।
তোমারে ভুলিয়াছিনু নশ্বর প্রমোদে,
কালপূর্ণ এবে–তাই যাচি ও চরণে
ক্ষমা কর জগদীশ এ দীন কিঙ্করে?
মন্ত্রিবর, চল লয়ে বধযোগ্য স্থানে,
জনমের মত দেহ বিদায় আমারে।
-
[ সকলের প্রস্থান ।

চতুর্থ দৃশ্য। বৃদ্ধার কুটীর। (বিজয়সিংহ শয্যায় শয়ান) বিজয়। সৃষ্টি স্থিতি লয় হয় যাহার ইচ্ছায়, অনাদি অনন্ত যিনি তার এই রীতি কি বুঝিবে লীলা ভঁর অজ্ঞান মানব- বিধিলিপি দেবতারা বুঝিতে অক্ষম। যেই যমদ ও নামে বিপুল জগত, যাহার প্রহারে ক্ষয় অক্ষয় অমর, সর্বব-অন্তকারী যম যাহার প্রভাবে- ধৰ্ম্মনিষ্ঠ জনে নাহি শক্তি পরশিতে। গিরিশৃঙ্গ উড়ে যেই প্রভঞ্জন-বলে, তরুরাজি ভগ্ন যার ভীষণ নিঃশ্বাসে— মৃদু মন্দ বহে দেখ বসন্তের কালে, মলয় মারুত বলি আদরে মানবে। যেই জলস্রোত বহে গভীর নির্ঘোষে সু-উচ্চ পর্বত হ’তে পড়ে ভূমিতলে শিলাখণ্ড তরুরাজি ঠেলি’ অবহেলে-- কুলুরবে বহে মন্দ সমতল ভূমে। প্রকৃতির গতি দেখি হয় অনুভব এ জগত মাঝে সাজে যা কিছু যেখানে,

৪র্থ দৃশ্য।
মন্দাকিনী।
৪৩
তেমতি করিয়ে বিধি রাখেন সেস্থানে।
পুণ্যবান্ লভে সুখ দুঃখ লভে পাপী
নিজ নিজ কৰ্ম্মফল ভুঞ্জে ভবে নরে।
চিরদিন পাপাচারী রণধীর রাজ
তেঁই শেষ হেন দশা ঘটিল তাহার ।
মদ্যপায়ী মিথ্যাবাদী লম্পট যেজন
রাজাদেশে দণ্ড তার হয় বিধিমতে।
প্রজা যদি হয় দোষী দণ্ড দেন রাজা,
রাজা যদি করে দোষ দণ্ড দেন বিধি ;
সে বিধি লঙ্ঘিতে শক্ত নহে কোন জন।
(শয্যায় শয়ন)
আহা মরি কেবা নারী বসি’ রত্নাসনে
কৌস্তুভ রতন যথা সুবর্ণে মণ্ডিত,
বিমােহিছে প্ৰাণ মন রূপের ছটায়
কেবা আছে হেন জন এ তিন
ভুবনে
যে পারে ফিরাতে আঁখি হেরি’ ও বদন।
( নিদ্রাভঙ্গ)
কিব রূপ নিদ্রা-ঘোরে দেখিনু স্বপনে,
চিত্রিত সে মূৰ্ত্তি মম হৃদয়-করে-
মন্দাকিনী প্রতিমূর্তি অঙ্কিত যেমতি
সুবর্ণ গণ্ডিত এই সুনিৰ্ম্মিত পটে।

৪৪
মন্দাকিনী।
[ ২য় অঙ্ক।
( চিত্র দেখিয়া )
?
একি দেখি ! এই তার প্রতিমূৰ্ত্তি ? যারে
দেখিনু স্বপনে এই কি সে মন্দাকিনী
যার রূপে আনিতেছে চুম্বক সমান
আকর্ষিয়া শত শত রাজপুত্রগণে?
কোন দোষে নহে দোষী রাজসুতগণ,
দেবে যদি দেখে হেন রূপের মাধুরী
মজিবে তখনি, তুচ্ছ মানব কি ছার।
ধিক্ ! কিবা ভাবিতেছি বাতুল সমান।
রাজ্যহারা—বিতাড়িত জন্মভূমি হতে
বৃদ্ধ পিতামাতা যার পরশ্নে পালিত
সুন্দরী রমণী তার কিবা প্রয়ােজন ?
তার চেয়ে যাব আমি সিন্ধু-রাজ পাশে,
মন্দাকিনী বিনিময়ে যাচিব তাহারে
পদাতিক একলক্ষ। সহায়ে তাদের
পিতৃরাজ্য জন্মভূমি করিব উদ্ধার।
কেবা আছে হেন শক্তিমান্, যে নিবারে
বিজয়-চালিত সিন্ধুরাজ-অনীকিনী।
যা থাকে অদৃষ্টে মাের, যা করেন বিধি,
ভবিষ্যৎ ভাগ্য মম দেখিব বিচারি’
রমণী ললাম সেই মন্দাকিনী সনে।

৪র্থ দৃশ্য।]
মন্দাকিনী
৪৫
(বৃদ্ধার প্রবেশ ও ছবি কাড়িয়া লও)
বৃদ্ধা। এই ত সেই মন্দাকিনীর ছবি! এ ছবি
তুমি কোথা পেলে ?
বিজয়। যে রাজপুত্র গত রজনীতে ঘাতক হস্তে
প্রাণ বিসর্জন করেছেন, এ ছবি তঁার নিকট হতে
পেয়েছি। তোমাকে জিজ্ঞাসা করি তুমি স্বচক্ষে মন্দা-
কিনীকে দেখেছ ? সত্য সত্যই এই কি মন্দাকিনীর রূপ,
চিত্রকরেরা অতিরঞ্জিত করে চিত্রিত করেছে ?
বৃদ্ধা। হাঁ, আমি স্বচক্ষে দর্শন করেছি। সে রূপের
শতাংশের এক অংশও চিত্রিত হয়নি, আগুনের শিখা
যেমন চিত্র করা যায়না, করলেও যেমন আলো প্রদান
করেনা, এ ছবিও সেইরূপ হয়েছে। সে যে রাক্ষসী,
এরূপ রূপবতী হয়েই
ত রাজপুত্রগণের প্রাণনাশ
করছে। তুমি কখনও সে রাক্ষসীর অাশা ক’রন।
বিজয়। তুমি এ বিষয়ে আমাকে বাধা দিওনা,
আমি যে সংকল্প করেছি তাতে কিছুতেই বিরত হবনা।
বৃদ্ধা। বাছা, তুমি কি পাগল হয়েছ ? সে রাক্ষসীর
প্রশ্নের কি অর্থ আছে ? তার মানে থাকলে কি একজনও
তার উত্তর করতে পারেনা ?
বিজয়। অামার বােধ হয়
ঈশ্বরের কৃপায় আমি
নিশ্চয়ই জয়লাভ করব।
বৃদ্ধা। বাই', এ কথা আর মুখে এননা। অসি

মন্দাকিনী।
[ ২য় ভাঙ্ক।
তোমায় ছেলের মত ভালবাসি, আমার কথা ঠেলনা, আমি
কিছুতেই তােমায় সেই
কালসাপিনীর কাছে যেতে
দেবনা।
বিজয়। মা তোমার কোন ভয় নাই, আমি নিশ্চয়ই
জয়লাভ করব। আমাকে ক্ষমা কর, এই একটী
বিষয়ে তােমার অবাধ্য হলেম। তোমার পায়ে ধরি
আমায় মার্জনা কর। তোমার কোন ভয় নাই, আমি
শীঘ্রই ফিরে আসব।
[ প্রস্থান।
হা অদৃষ্ট ! দুদিনের জন্য ভালবাসা, তাও
বৃদ্ধা।
সইল না ?
পঞ্চম দৃশ্য।
সিন্ধু-রাজসভা।
( রাজা, মন্ত্রী ও পারিষদগণ আসীন)
রাজা।
দেখ মন্ত্রি ! কেবা যুবা আসিছে হেথায়,
রতিপতি লজ্জা পায় হেরি’ ও মাধুরী।
তীক্ষ্ণদৃষ্টি স্বর্ণকান্তি প্রশস্ত ললাট,
রাজার তনয় বলি হয় অনুভব।

৫ম দৃশ্য।
মন্দাকিনী।
3
(বিজয়সিংহের প্রবেশ )
কহ বৎস! কোথা হতে কাহার নন্দন
আসিয়াছ মম পাশে কিসের কারণ?
বিজয়। প্রণিপাত করি পায় ওহে নররায়
কিরা দিব পরিচয়—রাজার তনয়
আসিয়াছি তব কাছে ভিক্ষার কারণ।
কপট সমরে মিলি’ কপটী সকলে
কাড়িয়া লয়েছে রাজ্য ধন রত্ন মম,
এই হেতু যাচি পদে কর অঙ্গীকার
বিচারে যদ্যপি জিনি তব তনয়ারে,
সৈন্য বল দিবে মোরে কন্যা বিনিময়ে,
হারি যদি দিব প্রাণ ঘাতকের কৰে।
রাজা। বিচারে যদ্যপি জিন তনয়ারে মাের,
সহায় হইব রণে এ নহে অধিক —
রাজ্যহারা নাহি রবে সিন্ধুর জামাতা।
কিন্তু বৎস! সাধি তােমা ত্যজ’ হেন অাশা।
নাহি জান দয়াহীন তনয়া আমার,
পিশাচিনী সম তার কঠিন আচার।
কলঙ্কিত সিন্ধুরাজ্য তাহার কারণ,
কলুষিত বসুমতী রুধির-প্রপাতে,
অবশ রসনা মম দণ্ড আজ্ঞাদান,
আর নাহি কর মােরে কলঙ্কের ভাগী ;

৪৮ মন্দাকিনী। [ ২য় অঙ্ক বিজয়। অকুল পরাণ মম কঁাদে দিবানিশি বিজ্ঞ তুমি, কেম ভােল আশার ছলনে ? (স্বগতঃ) অতি উচ্চ অভ্রভেদী গিরিশৃঙ্গ মাঝে, বহু নিম্নে ঘোর নাদে বহে স্রোতস্বতী ; এক শৃঙ্গ’পরি আমি রয়েছি দাড়ায়ে, দেখিতেছি অন্য শৃঙ্গে অমূল্য রতন। পারি যদি লঙ্কিারে, পাইব সে ধন- অন্যথায় যাব ডুবে চির অন্ধকারে । তারে অাশা কুহকিনী ধন্য তোর খেলা । জা গ্রতে স্বপন তুই দেখাস্ রঙ্গিণী দরিদ্র যেজন ভিক্ষা মাগে দ্বারে দ্বারে, ধনভােগ করে সেই তাের ছলে ভুলি’ ; অকূল সমুদ্র মাঝে পতিত যেজন, তাঁর লাভ হবে বলি’ সেও আশা করে । নভস্পর্শী পর্বতের উচ্চ চূড়া হতে সুদূর পাতাল ভূমে পতিত যেজন, বাঁচিবার অশে সেও ধরে গুলতা। রােগ-ক্লিষ্ট স্থির-দৃষ্টি মৃত্যুশয্যাশায়ী, বাঁচিতে বাসনা তার তোমার কুহকে। ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তাের দীপ জ্বলে, এ কুহক পাইলি লো কোন্ দেব-বরে ? স্বইচ্ছায় আগুয়ান হয়েছি যে কাজে,

৫ম দৃশ্য।
মন্দাকিনী।
৪৯
ভীরু সম পরায়ুখ হইব কেমনে?
প্রাণভয়ে ছাড়ি যদি কল্পনা এখন,
হাস্যাস্পদ হব আমি সভার মাঝারে।
(প্রকাশ্যে) বহু চিন্তা করি’ মনে করিলাম স্থির,
বিচার করিব আমি রাজকন্য। সনে ;
তাহে যদি পরাভব হয় অজি মম
বধমঞ্চে দিব প্রাণ ঘাতকের করে ।
রাজা। মন্ত্রি ! মন্দাকিনীকে লয়ে এস।
{ মন্ত্রীর প্রস্থান।
বিকার প্রাপ্ত ব্যক্তি কি ঔষধির গুণাগুণ বুঝতে সক্ষম
হয় ? যুবক ! আমার কোন দোষ নাই, আমি যথাসাধ্য
তোমায় এই পথ হতে নিবৃত্ত হতে অনুরােধ করেছি।
বিজয়। হে মাতঃ ভারতি! অজি দয়া কর দাসে
এ বিপদে এস মম মানস-আসনে,
মুকুলিত আশা-কলি হৃদয়-কাননে,
মুকুলে বিনাশ তারে করােনা জননি।
( মন্দাকিনী, সখীগণ ও মন্ত্রীর প্রবেশ)
মন্ত্রী। রাজপুত্রি । এই
যুবক আপনার প্রশ্নের উত্তর
প্রদানে ও শস্ত্রবিদ্যার পরীক্ষাদানে ইচ্ছুক হয়ে এইস্থানে
এসেছেন। অাপনীর যাহা অভিরুচি জিজ্ঞাসা করুন।

মন্দাকিনী।
[ ২য় অঙ্ক।
দিবা।
নিশা।
মন্দা। যুবক ! আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিন ।
(পট পরিবর্তন )
[ গোলােকাকারে পৃথিবী—উভয় পার্শ্বে দিবা ও নিশা
( গীত )
(আমি) যে দিকে ফিরাই আঁখি, হেসে উঠে দশদিক।
বেচে উঠে মরা-ধরা, ডেকে উঠে শতপিক।
সাগরে লহর তুলি, নগরেতে হুলহুলি,
বিজনে বিজলী খেলি, সুজনেরে রাখি ঠিক।
( গীত )
( অমি) আঁধারে আনাই, করি’ আলােকে বিদায়-দান।
শ্রান্তজনে শান্তিদানে তুষি তার দেহ-প্রাণ।
দিবাকর খরকরে, নিভে যায় মাের ডরে,
ধুরা-ভরা কোলাহল আমা হেতু অবসান ।
বিজয়। অসিত-বসন “নিশা”, “দিবা” শুভ্রবসা-
“ধরিত্রী” গােলােকরূপে মধ্যে বিরাজিতা।
সভাসদগণ।
ধন্য যুবক ! ধন্য যুবক !
এরূপ
অসাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রখরতা এ পর্যন্ত দৃষ্ট হয়নি।
মন্দা। অামার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর প্রদান করুন।
(পট পরিবর্তন)
[ কালচক্র ঘূর্ণমানা—উভয় পার্শ্বে সুখ ও দুঃখ ]
( দ্বৈত-গীত )
সুখ। যেখানে যেজন আছে, আমার নামে সবাই হাসে।
ভুবন ভরা জীবন ধরা আমায় শুধু পাবার আশে

৫ম দৃশ্য। ] মন্দাকিনী।
যালো থাম্ অবিশ্বাসী,
হাসিতে পরস ফাসি,
তোর ছলনে যেজন ভোলে, কেঁদে বেড়ায় হা হুতাশে ।
আমি আসন পাতি সবার বুকে,
আদর আমার সবার মুখে ;-
আমার জোরে তাের বসতি,
নইলে তাের কি হ'ত গতি,
শোধন করি রোদন-ধারায় মন বাধা যার তােরই পাশে ?
বিজয়। প্রফুল্ল কমল তুল্য ফুল্ল মুখ-রাগ
“সুখ”-রাণী সুহাসিনী আনন্দে বিহরে,
বিষাদিনী “দুঃখ”-ধনী ব্যথিত হৃদয়
কালচক্ৰফেয়ে দেহে ফিরে অবিরাম।
১ম সভা। এতদিনে সব দুঃখ মিটল, এতদিনে
রাজকন্যার উপযুক্ত বর মিলল।
রাজা। যুবক ! আমি তোমার প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট
হলেম। তুমি আজ আমাকে এক মহৎ দায় হতে মুক্ত
করলে । মন্দাকিনি! তুমি বিদ্যাবুদ্ধিতে পরাজিত হয়েছ,
এখন এই যুবকের অস্ত্র-কৌশল পরীক্ষা কর।
মন্দা। না মহারাজ, আমার আরও প্রশ্ন আছে।
রাজা।
এ অতি অন্যায়, দুইটী প্রশ্নই তােমার
জিজ্ঞাস্য, অার কেন ?
বিজয় । রাজন্ ! মন্দাকিনী আমার নিকট পরাস্ত
হলেন, এখন আমি একটী প্রশ্ন ওকে জিজ্ঞাসা করি।

৫২:
মন্দাকিনী।
[ ২য় অঙ্ক।
বিজয়।
যদি তার যথার্থ উত্তর দিতে পারেন তাহলে আমি তাকে
ত্যাগ করে এ রাজ্য হতে চলে যাব। আর যদি না
পারেন তবে অামাকে বিবাহ করতে হবে।
মন্দা। অাচ্ছা তাই হবে, আপনি প্রশ্ন বলুন।
বল দেখি রাজকাল জিজ্ঞাসি তােমারে
কেবা সেই রাজপুত্র কিবা নাম ধরে ।
ভিক্ষায় রাখিল প্রাণ ভুঞ্জি’ বহু ক্লেশ
দুখনিশি তার বুঝি এবে অবশেষ।
মন্দা। আমাকে একদিন সময় দিন।
বিজয়। বেশ, তাতে আপত্তি নাই।
রাজা। অদ্যকার সভা এই পর্যন্ত। কল্য প্রাতঃ
কালে ক্রীড়াকাননে এই যুবকের অস্ত্র-কৌশল পরীক্ষা
হবে ও তার প্রশ্নের উত্তরও মীমাংসিত হবে।
[ রাজা প্রভৃতির প্রস্থান।
সখীগণ।
( গীত )
আজ ঘুচল সকল জ্বালা।
আন্ সখি আন্ ফুলের মালা, আলাে বরণডালা ।
ফুটেছে ফুলের কলি, জুটেছে রসিক অলি,
টুটেছে গুমাের লো তাের, শোলে। রাজবালা।
জিনেছে সমর ঘােরে, বেঁধেছে প্রেমের ডােরে,
কেটেছে দুখের নিশি, এবার সুখের পাল।

ততীয় অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। কক্ষ। ( মাধুরী । মাধুরী। এই ত সময়, এই ত অবসর—এই ত আমার মনস্কামনা পূর্ণ হবার সুযােগ ! এতকাল যে আশার আশে জীবন ধারণ করে আছি, এতদিনে বিধি কি তা পূর্ণ করবার পথ প্রদর্শন করলেন ? রাজকুমার ! হৃদয়সৰ্বস্ব বিজয় ! তুমি মনে করছ এদেশে তােমার পরিচিত কেহ নাই, কিন্তু একজন অাছে যে তােমাকে এ জীবন থাকতে ভুলতে পারবেন—যার প্রাণের আকর্ষণে তুমি এই সুদূর সিন্ধুরাজ্যে এসেছ। আমি যদি এখন রাজকন্যাকে তােমার পরিচয় বলে দিই, তাহলে তুমি তাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হবে, তার পরিবর্তে এই চির- হতভাগিনী দাসীকে সঙ্গে নিও। দেখবে, এ হৃদয়ে কজ প্রেম কত ভালবাসা আছে। এই কুপথ-অবলম্বিনী কত যত্ন কত সেবা করতে জানে। বিজয় একবার আমার দিকে চাও, এই হৃদয়ের চির-প্রজ্জ্বলিত বহ্নি নির্বাপিত

৫৪
মন্দাকিনী।
[ ৩য় অঙ্ক।
করে দাও। অামার এই পাপজীবন সার্থক কর, আমার
একটীমাত্র ভিক্ষা পূর্ণ কর।
( গীত )
মিটাও মনের সাধ প্রাণপতি হৃদয়েশ !
কৃপণতা কেন কর বিতর হে কৃপা-লেশ।
অশা-মালা গাথি’ মনে,
বসে আছি শূন্য প্রাণে,
শুকায়ে ঝরেছে ফুল—ডুরিটুকু অবশেষ।
আঁ অামি কি করছি ? আমি কি পাগল হলেম ? ঐ
রাজকুমারী এইদিকে আসছেন ? যাই, আগে তার
মনের ভাব না জেনে অামার মনের কথা ব্যক্ত করবনা।
( অন্তরালে অবস্থান )
( মন্দাকিনীর প্রবেশ )
মন্দা। এতদিনে চূর্ণ মম বিদ্যা-অহঙ্কার !
এতদিনে পরাজিত হইনু সমরে !
বিদ্যবান্ রাজবৃন্দে জিনিনু বিচারে,
অকারণে যমপুরে পাঠানু সকলে,
লভিতে কি এই পরিণাম ? অবশেষে
হারিনু যাহার কাছে—কেহ নাহি জানে,
নাহি পারে বলিবারে কি নাম তাহার ।
ধিক্ মাের বিগবে, এ জীবনে ধিক্ !
পুরুষ হইল জয়ী রমণী-সমবে ?

১ম দৃশ্য । ]
মন্দাকিনী।
৫৫
অতিশয় সুচতুর হয় এই যুবা,
প্রশ্নছলে জিজ্ঞাসিল নিজ পরিচয়।
কুলবালা পুরবাসী—কেমনে জানিব
তার পরিচয়, হেথা কে মোরে কহিবে ?
( গীত )
দুচেছে রমণী-মােহ, টুটেছে বিদ্যার বল ।
হয়েছি যে হতমান—-ছার প্রাণে কিবা ফল ।
এসেছে রসিকবর,
কিব নাম কোথা ঘর,
অবল। এ কুলবালা কেমনে জানিবে বল ।
( মাধুরীর পুনঃ প্রবেশ)
মাধুরী।
কেন এত দিশেহারা,
মুছ সখি আঁখিবার,
এনে দিব পরিচয় পাতিয়া কৌশল-ছল।
মাধুরী। তার তরে কেন সখি ভাব অকারণ?
সহচরী আমি তব, ছলে কি কৌশলে
যুবকের পরিচয় এনে দিব তোরে
আজিকার নিশি নাহি অবসান হতে।
কিন্তু সখি, মনে মনে দেখহ বিচারি’,
পরম সুন্দর যুবা, সুচতুর অতি-
সবদিকে তব যোগ্য যয় মম মনে
বরমাল কেন নাহি দেহ তার গলে ?

মার্কিনী।
[ ৩য় অঙ্ক।
মন্দা। সত্য বটে সর্বগুণধর এই যুবা,
মিথ্যা নহে, দেখে হয় প্রণয় সঞ্চার ;
কিন্তু সখি, কহ দেখি, মাগি পরাজয়
কিরূপে বিবাহ আমি করিব তাহারে ?
তার চেয়ে সহি’ চির যৌবন-যাতনা
কুমারী হইয়ে আমি বঞ্চিব জীবন।
মাধুরী। ত্যজ খেদ প্রিয়সখি, করিনু শপথ -
অদ্য নিশা অবসানে কহিব তােমারে
কিবা নাম ধরে যুবা, কাহার নন্দন,
কোন্ হেতু আসিয়াছে এই সিন্ধুদেশে।
কিন্তু সখি, কই মােরে কি দিবে আমারে
এ হেন দুরূহ কাৰ্য্য করিলে সাধন ?
মন্দা। ধন রত্ন অশ্ব হস্তী যা চাহিবে তুমি
তাহাই তােমারে অামি করিব অর্পণ।
কি আর কহিব সখি, চিরদিন তরে
ঋণে বদ্ধ রহিলাম তোমার নিকট।
আসি সখি, মনে রেখে প্রতিজ্ঞা তােমার,
আসিব তােমার কাছে না পােহাতে যামী।
[ প্রস্থান।
মাধুরী। হৃদয়!' একটু স্থির হ’। আজ তাের
পরীক্ষার দিন। যে অমূল্য নিধি পাবার আশে এই

১ম দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী।
সংসার-সাগরে ঝাঁপ দিইছিলি, তা তাের অতি নিকট। যে
অমৃত পান করবার নিমিত্ত তুই উন্মাদিনী, তা আজ তোর
সম্মুখে । স্থির হ’—ব্যস্ত হয়ে অতি-যত্নে-সংগৃহীত বারি-
পাত্র মৃত্তিকায় ফেলে দিনি। বিজয় ! আমার জীবনের
উদ্দেশ্য সফল হবার উপক্রম হয়েছে।
হয় আমি
তোমাকে লাভ করব, নয় সিন্ধুরীজের সাহায্যে তােমার
রাজ্য তােমাকে দিয়ে আমার হৃদয়ের বােঝা তােমার
কাছে নাবিয়ে এ জীবন বিসর্জন দেব। আমি জানি
যে আমি যে পথের পথিক, তোমার ন্যায় ব্যক্তি সে পথে
কখনই পদার্পণ করবেন না; কিন্তু বিজয় ! সে কথা
যে আমি মনে আনতে পারিনা, সে কথা আমি মনকে
বোঝাতে পারবনা, সে অাশা বিসর্জন দিয়ে আমি
একদিনও বাঁচব না ! অামি কি সুখী হবনা? আমি কি
চিরদুঃখী থাকব ? কেন পরমেশ্বর ! অামি কি পাপ
করেছি ? রাক্ষসীরূপিনী মাতার তাড়নায় যৌবনসুলভ
চিত্তের চাঞ্চল্যে আমি কি এমন পাপ করেছি কার সীমা
নাইক্ষমা নাই—প্রায়শ্চিত্ত নাই ? ক্ষমা কর ক্ষমা
কর, ক্ষমা কর করুণাময় ! তোমার করুণাময় নামে
কলঙ্ক দিওনা।
[ প্রস্থান।

দ্বিতীয় দৃশ্য।
রাজ-ক |
( শাশায়িত বিজয়সিংহ )
বিজয়। মন্দাকিনীকে আমি যে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা
করেছি সে কখনই তার উত্তর দানে সক্ষম হবেনা।
তাহলেই তান্য অন্য রাজগণ যে পুষ্পচয়নে ফণিদংশিত
হয়ে প্রাণত্যাগ করেছেন, ঈশ্বর অনুগ্রহে আমি সেই
পুষ্প অনায়াসে প্রাপ্ত হব। ওকি ও ! কিসের শব্দ?
(মাধুরীর প্রবেশ )
এ কে ! সুন্দরি, তুমি কে ? এ রাত্রিকালে এখানে কেন ?
মাধুরী। আমি মন্দাকিনীর প্রধান সখী, আমার
নাম মাধুরী। আপনি অতি ভয়ঙ্কর বিপদে পতিত
হয়েছেন, অাপনার উদ্ধারের জন্য, আমি প্রহরীগণকে
উৎকোচ দানে বশীভূত করে এখানে এসেছি, আপনি
এইরাত্রেই এস্থান হতে পলায়ন করুন।
বিজয়। কেন ! কি হয়েছে ?
মাধুরী। তবে শুনুন। নিষ্ঠুরা অহক্কতা মন্দাকিনী
অাপনার নিকট পরাস্ত হয়ে আপনাকে পতি বলে
গ্রহণ করতে অবমানিত বোধ করে। এজন্য সেই দুবৃত্তা
কাল প্রত্যুষে অাপনাকে হত্যা করবার নিমিত্ত একজন
ঘাতক নিযুক্ত করেছেন। আপনি শীঘ্র' পলায়ন করুন ।

২য় দৃশ্য।
মন্দাকিনী।
তামিও আপনার সঙ্গে গিয়ে দাসীত্ব হতে মুক্ত হই।
বাহিরে দুটী সুসজ্জিত অশ্ব অ!ছে, চলুন আমরা উভয়ে
একত্রে এইরাত্রে দেশ ছেড়ে চলে যাই।
বিজয়। এই সুদূর প্রবাসে যে আপনার মত বন্ধু
পেয়েছি আমার নিতান্ত শুভদৃষ্ট। ঈশ্বর আপনার
মঙ্গল করুন। আপনি যে এই অপরিচিত যুবকের জন্য
এতদূর
কষ্ট স্বীকার করেছেন এজন্য আপনার নিকট
চিরকৃতজ্ঞ রইলেম। যদি কখন সময় পাই, দেখবেন
আপনার এই স্নেহ নিতান্ত অপাত্রে অর্পিত হয়নি।
অাপনি অামার পরম হিতৈষিণী। আপনার নিকট
গোপনে প্রয়োজন নাই, আমার পরিচয় শুনুন। আমি
বিজয়-রাজপুত্র। অামি কখন পলায়ন করবা। মন্দা,
কিনী হ’তে যদি আমি বিনষ্ট হই, তাতেও ক্ষতি নাই ;
অাপনাকে অনুরোধ করছি মাকে ক্ষমা করবেন।
অকারণ আমার জন্য যে কষ্ট পেয়েছেন বিস্মৃত হন।
আমি প্রতিজ্ঞা করেছি হয় আমার উদ্দেশ্য সাধন করব
নয় প্রাণ বিসর্জন দেব ।
মাধুরী। যুবরাজ ! এমন প্রতিজ্ঞা করবেন না।
সে. রাক্ষসীকে ভুলে যান। দেখুন, আমারও বিবাহ হয়নি,
আমি রমণী হয়ে যা করছি, চলুন আমরা দুজনে
পালিয়ে গিয়ে জীবনের অবশিষ্টাংশ একত্রে পরম সুখে
অতিবাহিত করব।

মন্দাকিনী। [ ৩য় তঙ্ক। বিজয়। তা হবার নয়। যদি হত, বড় সুখের হ’ত সন্দেহ নাই-কিন্তু অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি আর পেছ’বার উপায় নাই। আমায় অার অনুরোধ করন। কিন্তু তোমার ঋণ এ জীবনে শােধ দিতে পারবনা। তুমি আমার জন্য যা করেছ এমন কখন কেউ করেনি ; তুমি ঘরে যাও, অামাকে ভুলে যাও। মাধুরী। (স্বগতঃ ) বিজয় ! তােমায় ভুলতে পারবনা। এ জীবনে পারবন—মরে গেলেও পারব কি জানিনা। পারবনা বলে দেশ ছেড়ে এসেছি-- পারবনা বলে তােমায় রাজ্যচ্যুত করেছি—পারবনা বলে দাসীবৃত্তি করছি—পারবনা বলে অজি মরতে বসেছি। ( প্রকাশ্যে) বিজয় ! তােমার হাতে ধরে বলছি আমার কথা ঠেলনা। ( হস্তধারণ ) বিজয়। ওকি, তুমি কঁদছ ? কেঁদনা। তোমার কোন ভয় নাই, আমি মরবনা। আমায় কেউ মারতে পারবেনা। আমি খুব সাবধানে থাকব, আমার নিকট অস্ত্র আছে, গুপ্তহন্ত। কখনই আমাকে বধ করতে পারবেনা। ধৈৰ্য্য ধর, কঁদছ কেন ? মাধুরী। কাঁদছি কেন শুনবে ? শােন—যে এক- গাছি অাশাসূত্রে আমার জীবন ঝুলছিল সেই সূত্র তুমি ছিড়ে দিচ্ছ, তাই কাদছি । যে বৃক্ষতল আশ্রয় করে দগ্ধপ্রাণ শীতল করব মনে করেছিলেম, সে বৃক্ষ মরীচিকায়

২য় দৃশ্য।
মন্দাকিনী।
পরিণত হ’লতাই কাঁদছি। যে মেঘ দেখে জলের
অাশায় এতদিন চেয়েছিলেম তা কুয়াশায় পরিণত হ’ল,
তাই কাদছি। আমার সব ফুরিয়ে গেল, তাই কাদছি। তুমি
যখন আমায় গ্রহণ করলেন, এই আমার শেষ কান্না।
আর কাঁদবনা, তুমিও আর আমার কান্না দেখতে পাবেনা।
বিজয়। তুমি এ কথা আমায় আগে বলনি কেন ?
আমি এখন দারুণ কর্তব্য সম্পাদনে নিয়ােজিত। আমার
বৃদ্ধ পিতামাতা পরের আশ্রিত। রাজা রাণী ভিক্ষনে
পালিত। এখন আমার প্রাণ অামাতে নাই, এখন আমি
কি করে তোমায় দেব? কিন্তু তুমি কেঁদনা, তোমায়
আমি সহোদরার ন্যায় ভালবাসব, ভগ্নীর ন্যায় যত্ন
করব, আমার জীবনপাত করে তোমায় সুখী করবার
চেষ্টা করব।
মাধুরী।
অামায় ক্ষমা কর, ও সম্বোধন আমায়
করেন।
বিজয়। 'ভবন! একি হল? একি করলে? একি
নিদারুণ পরীক্ষায় অনায় ফেলে ? দয়াময় ! বল দাও,
এ দুৰ মৰুষ; হৃদয়ে বল দাও। ওঠ, আমাকে ক্ষন।
কর, আমায় ভুলে যাও। তুমি যদি যথার্থ আমকে
ভালবাস, * ক; ' স্যার মুখে এননা।
মাধুর। । ফুৱা, আমার সব ফুরিয়ে গেল
। কাজ কি ? আছে-~-একটি তে

মন্দাকিনী।
[ ৩য় অঙ্ক।
আছে। মন্দাকিনীকে বিজয়ের পরিচয় জানাব, তার
বিনিময়ে তার পিতৃরাজ্য উদ্ধারের জন্য সৈন্য সাহায্য
প্রার্থনা করব । এ জীবনের শেষ কাৰ্য্য সাঙ্গ করব।
তারপর—তারপর এ কলঙ্কিনীকে আর কেহ এ জগতে
দেখতে পাবেন। বিজয় ! চল্লেম, এ জন্মে বোধ হয়
আর দেখা হবেনা—এই শেষ ! ঈশ্বরের চরণে এই ভিক্ষা
যেন পরলােকে তোমাকে পাই। তুমি সুখে থাক, আমার
কথা ভুলে যাও।
এ হতভাগিনীর জন্য দুঃখ করােনা।
আমি যাই, আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে যাই।'
[ বেগে প্রস্থান ।
বিজয়। যেও না, কোথা যাও, শােন। আমায়
চিরদুঃখী করে যেওনা। আহা ! অভাগিনী, কেন
তোের এমন মতি হ’ল ? কেন তুই আমাকে ভালবেসে
ছিলি ? ভগবন্ ! করুণা-নিদান । এ দুখিনীর
সহায়
হও, এর জ্বলন্ত হৃদয়ে শান্তিবারি প্রদান কর। অামা
মাধুরী, আমার জন্য তাের এই দশা হল ।
নেপথ্যে বন্দীগণ।
(গীত )
ঐ দেখ যামিনী পােহায়।
কুমুদিনী অনাথিনী কেঁদে পতিপানে চায়।
অরু, উদিত দেখি, তারাদল মুদি' আঁখি,
নীলাচলে মুখ ঢাকি’ গগনে লুকাতে যায়।
তা দেখি’ চন্দ্ৰমা মরি লাজে ম্লানমুখী হায়।

তৃতীয় দৃশ্য। উদ্যান। মন্দা। ( মন্দাকিনী ) প্রভাত রজনী, দিনমণি উদিছে গগনে। নাহি জানি, কেন সখী ফিরি’ না আইল। কি হেতু বিলম্ব তার নারিনু নির্ণিতে। ঐ বুঝি আসিছে সজনী ? ( মাধুরীর প্রবেশ ) সখি ! পেয়েছ কি যুবকের কিছু পরিচয় ? কি নাম তাহার, বাস তার কোন্ দেশে ? মাধুরী। রাজবালা ! না হও উতলা। কাৰ্য্য তব সিদ্ধি করি’ অ!সিয়াছি আমি। বিজয়নগর ধাম, রাজার তনয়, বিজয় তাহার নাম- রাজ্যহারা, 8 মন্দাকিনী। [ ৩ অষ্ট। হীনবল কপট সমরে। এ মম মিনতি সখি তােমার সংহতি, কর অঙ্গীকার, করিবারে পিতৃরাজ্যোদ্ধার, সিন্ধুপতি হবেন সহায়, স্বরাজ্য পাইবে পুনঃ রাজার তনয় । শুন সখি, তব পাশে কহি সবিশেষ ; যুবরাজ বিজয়েরে জিনিয়া সভাতে বিবাহ করিব তারে করেছি মনন। দেখ ভেবে মনে, যত রাজাগণে আসিল হেথায়, সবা’ হতে শ্রেষ্ঠ এই যুবা। আমিলােলা সজনি মজিয়াছি হেরে সেই অপূর্ব মাধুরী। বরিব তাহারে আমি, অঙ্গীকারে কিবা প্রয়ােজন। স্থির কর মন- সিন্ধুপতি নাহি দিবে নিজ জামারে সহিতে দিনেক তরে রাজ্যহারা শোক। সাধি সখি, ৩য় দৃশ্য। ] মন্দাকিনী। । এ সব বারতা, নাহি কহ কারো কাছে। বেলা হ’লযাই আমি রাজার সদনে। [ প্রস্থান। মাধুরী! শূন্যময় হৃদয়-আগার- আঁধার চৌদিক- জীবনের দীপ মম হয়েছে নির্বাণ । ঘোর অমানিশা অসি’ লয়েছে আশ্রয় । উত্তাল-তরঙ্গ-ব্যাপ্ত অপার জলধি- ঝঞ্ঝা বায়ু বহে যথা ভীষণ নিঃস্বনে দিবানিশি-- শূন্য নয় মম হৃদি হ’তে। দিগন্ত বিস্তৃত মরু অগ্নিকণা সম বালুরাশি উড়িছে চৌদিকে যথা অগ্নিময় বায়ুর তাড়নে- শুষ্ক নহে মম প্রাণ হ'তে। তুঙ্গ শৃঙ্গ পর্বতের অন্তর-নিহিত তমােময় দারুণ গহ্বর- বসে যথা কালরূপী অজগর আকৃতি ভীষণ, উগারিছে কালকুট- -

মন্দাকিনী।
[ ৩য় অঙ্ক।
নহে ভয়ঙ্কর মম হৃদি হতে।
শূন্য মন, শুষ্ক প্রাণ, তাপিত জীবনে
মম নাহি প্রয়ােজন।
বিজয় ! তোমায় ভালবেসে আমার এই হ’ল
কলঙ্কিনী বলে আমার এই প্রায়শ্চিত্ত হ’ল ? উঃ পাপের
পরিণাম কি ভয়ানক! জ্বলে যাচ্ছে, দিন রাত পুড়ছে,
তবু ছাই হ’লনা। মাথা ঘুরছে, আর দাড়াতে পাচ্ছিনা
( শয়ন )
{ ক্ষণেক পরে ) খুব হয়েছে, বেশ হয়েছে, যেমন কর্ম
তেমনি ফল !
যেমন চাদ ধরতে গিয়েছিলে তেমন
পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেল। পাথরে কামড়াতে গিয়ে
কেমন বি-দাত ভেঙ্গে গেল ! অমৃতে লােভ করে এখন
পাতিলে চল। ও বাবা-কত নাবিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ।
আর আমি যাবন—-আমায় ছেড়ে দে আমি বাড়ী
যাই। অনেকক্ষণ এসেছি আবার মা বকবে, মারবে!
এতা আমার নাগর এসে বসে আছে, আমি ।
গেলো সে রাগ করে চলে যাবে। এই যাই,
এই যাই, এখন টু
বাড়াও! ( অগ্রসর)
ওকে ! বিজয় ? ছিছি, তুমি এখানে কেন ? এ যে
শরক, এখানে কি দেবতাদের ভাসতে তছ ? তােমার
কি আমার কাছে আসতে স্যাছে ? আর এসলস?
যাও~~~-আরে সরে যাও-- আরো- জাহা-- আরে ।

মন্দাকিনী।
তবু কাছে আসছ ? আমায় ধরবে ? আমি পালাই, দেখি
১। কামায় ধরতে পার।
{ বেগে প্রস্থান ।
চতুর্থ দৃশ্য।
ক্রীড়া-কানন।
(সজ্জায় মন্দাকিনী ও সখীগণ }
- সখী। মরি মরি কি মাধুরী
বারাজে ধারেছ সজনি,
মৃগু ও আলিনী যথা অসুর-সমর
২? কব তােমারে
বিচলিত মন মম
দ রাণা আমি।
৫ -মৃণালে সখি
ধান fলকে,
শাকে যুবকে তুমি জিনিৰ হবে
দার---
হাৱা হবে-
ইন বেশে হেরিলে তোমারে :
এস সবে সখী মিলি’ রণখে যেন
সিন্ধুপতি না আসেন হেথ।
ৰদবধি

৬৮
মন্দাকিনী।
[ ৩য় অঙ্ক।
সখীগণ।
( গীত )
বীনৃত্যে, ত্তচিত্তে, চললো যতেক কামিনী।
তীর ফলকে, অগ্নি ঝলকে, অসিতে নলকে দামিনী।
অবল বাহুতে বল, আছে কি দেখাবি চল,
ক্ষিতি হবে টলমল-দিবসে উদিবে যামিনী।
বাণে বাণে খরতর, ঢাকিব রবির কর,
সরম লাজে, হানিয়া বাজে, নাচলো মরাল-গামিনী ।
১ম সখী।
সখিগণ !
ক্ষণতরে রই অন্তরালে।
[ সখীগণের প্রস্থান।
রাজবালা
একি ভাব আজি তব দেখি।
বীরাঙ্গনা কিহেতু বিরত রণরঙ্গে?
সমর-তুরঙ্গ কভু থাকে কি সজনি
শুনি’ রণধ্বনি
মন্দুরাতে নিরানন্দে ?
কহ সখি ।
কিভাবে বিভাের আজি তুমি ?
সুবচনি !
কিছু নাহি জাগে মম হৃদে।
গত যামী কাটিয়াছে জাগরণে,
সে কারণে তলসত হয় অনুভব ।
মন্দা।

৪র্থ দৃশ্য। ]
মন্দাকিনী।
৬৯
১ম সখী।
মিথ্যা বলি’ কেন সখি ভুলাও আমারে ?
নিদ্রাহেতু হেন ভাব তব
নহে ত সম্ভব।
মন্দা।
১ম সখী।
লয় মম মনে
অঙ্গ তব রঙ্গহীন অনঙ্গপীড়নে।
জান সখি! কঠিন রমণী আমি,
কি করিবে ফুলশর--
লৌহশর নাহি পশে এ দৃঢ় হৃদয়ে।
কঠিন সে ফুলবণ,
অব্যর্থ সন্ধান তার ।
সাধি সতি।
সখী আমি, কেন বঞ্চ মােরে ?
সত্য কহি’ কর দূর হৃদয়-বেদনা।
কি আর কহিব সখি সরমের কথা-
কাল নিশা হতে
কোথা হতে
দুরন্ত মাতঙ্গ আসি’ পশিয়া সলিলে
পঙ্কিল করেছে
এই স্বচ্ছবারি মন্দাকিনী-নীর!
অবিরাম প্রধাবিত আপন গরবে—
গতি তার ফিরিয়াছে এতদিন পরে।
ওই সই আসিছেন জনক আমার
মন্দা।
ক

৭০ মন্দাকিনী। [ ৩য় অঙ্ক। পদে ধরি সাধি- নাহি কহ কোন কথা। ( সিন্ধুরাজ, বিজয় ও মন্ত্রীর প্রবেশ) রাজা। বৎসে ! তুমি কি এই যুবকের প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর স্থির করতে পেরেছ ? মন্দা। হাঁ মহারাজ, আমি উত্তর স্থির করেছি। ইনি প্রশ্নচ্ছলে নিজের পরিচয় জিজ্ঞাসা করেছেন। এই যুবা বিজয়পুর রাজতনয় বিজয়সিংহ, রাজ্যচ্যুত হয়ে ছদ্মবেশে দেশ পর্যটন করে কালাতিপাত কচ্ছেন ইহাই ওর প্রশ্নের উত্তর। ১ম সখী। রাজন্ ! রাজকুমারীর উত্তরের শেষ কথাগুলি তিনি নিজে বলতে অক্ষম, তাই আমাকে বলতে অনুমতি করেছেন। যদিও ঐ রাজকুমার কুমারীর নিকট পরাস্ত হয়েছেন তবুও বিদ্যা-বুদ্ধিতে কুমারী অপেক্ষা কোন তাংশে নন নন, সুতরাং রণ- ভিনয়ে আর প্রয়ােজন নাই। এই বিজয়পুর রাজতনয়কে আপনার জামাতা বলে গ্রহণ করতে পারেন, তাতে আমাদের প্রিয়সখীর কোন অমত নাই। রাজা। মন্দাকিনি! আমি পরম সন্তোষ লাভ করলেম, এখন বিজয় তােমার মত কি ? বিজয়। রাজন্ ! আমার বক্তব্য কিছুই নাই।

৪র্থ দৃশ্য।]
মন্দাকিনী।
৭১
কেবল প্রার্থনা আমার পিতৃরাজ্য যাতে উদ্ধার হয়
তার প্রতিবিধান করুন । আমার পিতামাতা নাগেশ্বর
রাজ্যে বাস করেন, তাদের সংবাদ দিন। তারা এলে
এই শুভকাৰ্য সম্পন্ন হবে।
রাজা। মন্ত্রি ! শীঘ্র নাগেশ্বর-রাজের নিকট দূত
প্রেরণ কর। অতি সত্বর বিজয়পুর-রাজারাণীকে এ
স্থানে অনিয়ন কর। সভাসদ্‌গণ ! আজ অতি আনন্দের
দিন। এতদিনে সিন্ধুরাজ্য রক্ত প্রপাত হতে মুক্তিলাভ
করলে। তোমরা সকলে ঘােষণা কর অদ্য হতে সপ্তদিন
পরে মন্দাকিনীর সহিত বিজয়ের পরিণয় হবে।
সপ্তদিন নগরময় আমােদ প্রমােদ ও-~-
( দূতের প্রবেশ)
দূত। মহারাজ ! রাজকুমারীর প্রধান সহচরী
মাধুরী অকস্মাৎ সংজ্ঞাশূন্য হয়ে উদ্যানে পতিত আছেন,
এখনাে তার জ্ঞানসঞ্চার হয়নি।
রাজা। সেকি ! এই আনন্দের দিনে আবার একি
অশুভ সংবাদ ! মন্দাকিনি, বিজয়, দেখগে কি হ’ল ।
শীঘ্র যাও, আমি চিকিৎসক সঙ্গে অনতিবিলম্বে যাচ্ছি।
সকলের প্রস্থান।

পঞ্চম দৃশ্য।
অন্তঃপুরস্থ উদ্যান।
(মাধুরী পতিত—বিজয়ের প্রবেশ)
মাধুরী। কে, বিজয় এসেছ ? ব’স–আমার কাছে
এসে বস। মনে করেছিলেম আর তােমার সঙ্গে দেখা
হবেনা। তুমি দয়াময়, তাই দেখা দিলে। আমি ভেবে-
ছিলেম আর তুমি এই হতভাগিনীর মুখদর্শন করবেন।
আমি চিরকাল তোমায় প্রতারণা করেছি। আমার
জীবন প্রতারণাময়। তােমার ন্যায় লােককে প্রবঞ্চন।
করলে আমার মরেও সুখ হবেনা। আমায় মার্জনা
কর, তোমায় আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমারই
ছলনায় তুমি রাজ্যহারা হয়েছ। আমি পাগল হয়েছিলেম,
পাগল না হলে ভূপালরাজকে আমি যুদ্ধে প্রবৃত্ত করার
কেন? পাগল না হলে রমণী হয়ে পুরুষ-সৈনিকবেশে
যুদ্ধক্ষেত্রে যাব কেন ? পাগল না হলে রণধীরকে
ভূপালের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে নিবৃত্ত করাব কেন ? পাগল
হলে ভোমায় পাবার আশা করব কেন ? আমার
পাপের যথেষ্ট প্রতিশােধ হয়েছে, এ প্রতারণাময়
প্রবঞ্চনাময় জীবন-তরী জলমগ্ন হবার আর অধিক বিলম্ব
নাই। আমি চাল্লেম—এ জন্মের মত চল্লেম - তুমি সুখে
থাক, মন্দাকিনীকে নিয়ে সুখী হও। তার কোন দোষ

মন্দাকিনী। } নাই, আমিই অকাৰ্যসাধনের জন্য তার নামে অন্যায় দোষারােপ করেছি, এখন আমায় বিদায় দাও। বিজয়। অমন কথা বলােনা। মরুবে কেন ? তুমি আবার ভাল হবে। হবে মাধুরী। অামার আর ভাল হয়ে কাজ কি বিজয় ? মৃত্যুই আমার ভাল, আমার হৃদয়তন্ত্রী ছিড়ে গেছে । আর অধিক বিলম্ব নাই, আমার মাথায় পায়ের ধূলাে দাও, আমি হাসতে হাসতে প্রাণত্যাগ করি। আমার আনন্দের দিন, আজ আমার সকল দুঃখের শেষ দিন। ( মন্দাকিনীর প্রবেশ ) মন্দা। প্রিয়সখি ! ভগিনি ! কি হয়েছে ? আমন করে ভুয়ে পড়ে কেন ? এস, আমার কোলে এস। মাধুরী। ভগিনি! এসেছ ? তােমার পতিকে নিয়ে পরমসুখে কালযাপন কর। কেঁদনা, এই অনাথিনীর জন্য কেঁদনা। আমি যেমন কোথা হতে এসেছিলেম জানতে না, তেমনি কোথায় যাচ্ছি তাও জানতে পারবে মনে করো মাধুরী বলে কেউ ছিলনা। আমি আর কথা কইতে পারছিনি, আমার জিব অবশ হয়ে আসছে ! বিজয়—যাই—ভগবান্ ! (মৃত্যু ) বিজয়। হতভাগিনি ! চলে গেলে ? আমায় চির- দুঃখী করে গেলে ? আমার ভালবাসাই তােমার মৃত্যুর না।

৭৪ মন্দাকিনী। [ পঞ্চম দৃশ্য। কারণ। চিরদুঃখিনি ! আর তােমায় দুঃখ পেতে হবেনা। যাও—সেই করুণাময়ের কোলে যাও—যেখানে চিরশান্তি বিরাজ কচ্ছে সেইখানে যাও—এই জীবনের ঘাের ঝঞ্ঝাবায়ু বজ্রাঘাত হতে মুক্তিলাভ করে চির- শান্তি লাভ কর। (রাজা ও চিকিৎসক প্রভৃতির প্রবেশ ) মন্দা। পিতা! দিদি আমাদের ছেড়ে গেছে। আর চিকিৎসার প্রয়োজন নাই, আর কেউ তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। এই ছিল, এই মাত্র কথা কচ্ছিল, কিন্তু এখন আর নাই। সখিগণ ! উদ্যানে যত ফুল আছে সব নিয়ে এস, প্রিয়সখীর পা থেকে মাথা পৰ্য্যন্ত ঢেকে দাও। ফুলের মতন মুখ শুকিয়ে যাবে আমি তা দেখতে পারবনা [ সখীগণের প্রস্থান। রাজা। রে শমন। নির্মম নির্দয় । নাহি জানি:হৃদি তাের কঠিন কেমন। নাহি জানি বিধি তব কিরূপ বিধান। আহা মরি— সদ্য প্রস্ফুটিত এই সুন্দর কুসুম বৃন্তচ্যুত করি’ তারে হরিলা অকালে । অকালে পশিল শশী চির রাহুগ্রাসে।

৩য় অঙ্ক।]
মন্দাকিনী
৭৫
(ফুল লইয়া সখীগণের পুনঃ প্রবেশ)
এস সবে সখী মিলি
ঢালি’ আঁখিবারি,
হৃদয়ের জ্বালা করি প্রশমিত।
সখীগণ।
(গীত)
কেন সখী আজি দেখি হেন অঘটন হায়।
ফুটন্ত চদিমা কেন ঘন-কোলে ডুবে যায়।
এতদিন তব সঙ্গে, ছিনু সবে কত রঙ্গে,
বল কোন অভিমানে ধুলাতে ঢেলেছ কায়।
নব রবি ছবি সম, তব রূপ অনুপম,
রাহুগ্রাসে কেন শেষে হারাইল সুষমায়।
সকালে ফুটিয়া সখী অকালে শুকালি হায়।
যষ্ঠ দৃশ্য।
কক্ষ।
( বিজয়পুররাজ ও রাণী )
রাণী
কতদিন এল,
গেল কত দিন,
দিনে দিনে বহুদিন গত,
কহ নাথ,
কহ কোথা কুমার আমার ?
চিন্তা-কীট পশি’ দেহে

মন্দাকিনী।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
দহিছে সতত তার দারুণ দংশনে।
দিনে দিনে করিছে ছেদন
হৃদয়ের যতেক বন্ধন
তুষানল সম প্রাণ পুড়িছে সতত,
ভস্ম নাহি হয় কেন ?
রাজা।
ধৈৰ্য্য ধর মনে
রোদনে কি ফল বল,
কাদিলে কি ফিরিবে কুমার ?
দেখ ভেবে মনে,
কৃপাব নাগেশ্বর-কৃপাবলে
অবহেলে করিতেছি জীবন যাপন।
মাত্র এক দুঃখ মনে
বিজয় বিহনে।
গুণনিধি তনয় তােমার
আসিবে ফিরিয়া আর অল্পদিন পরে।
আবার উদিবে রবি নবীন কিরণ,
প্রাবৃটের মেঘ-বৃষ্টি অবসান পরে।
কি জানিবে নাথ তুমি নারীর হৃদয় ?
কেমনে বুঝিবে বল জননীর প্রাণ ?
কাল নিশাকালে হেরিনু স্বপনে
নন্দনে, আমার রাজবেশে
বসি’ সিংহাসনে,
রাণী।

৩য় তঙ্ক। ]
মন্দাকিনী।
৭৭
চামর চুলায়
শিরোদেশে কনক-মুকুট শােভে,
পাশে নারী ভুবনমােহিনী
কামপত্নী রতি সম।
সুন্দরী রমণী সবে
চারি পাশে।
নাহি জানি
কিবা আছে বিধাতার মনে,
কত দিনে পাব পুনঃ তনয় আমার !
গেছে বহুদিন,
অল্প বাকী আর ;
লয় মম মন,
অল্পদিনে হবে তব দুঃখ বিমােচন।
রাজা।
(দুতের প্রবেশ)
দূত। রাজন্ ! সিন্ধুরাজ এই লিপি আপনাকে
‘পাঠিয়েছেন।
[ পত্র প্রদান ও প্রস্থান।
(পত্র পাঠান্তে )
জগৎপিতা জগদীশ্বর !
অপার করুণা তব।
ধন্য আমি,
ধন্য তুমি রাণী,
ধন্য তার মহিমা প্রকাম।

৭৮
মন্দাকিনী।
[ যষ্ঠ দৃশ্য।
এতদিনে অবসান দুখ-বিভাবরী
এতদিনে মেঘমুক্ত হ’ল শশধর।
রাণি !, সম্বর রােদন
ফলেছে স্বপন তব।
নন্দন তােমার
সিন্ধুরাজ-দুহিতারে জিনিয়া বিচারে
লভিয়াছে সিন্ধু-সৈন্যবল।
বিবাহ হইবে সিন্ধুরাজ-কন্যাসনে!
লতে অামা দোহে সিন্ধুরজ পাশে
আসিয়াছে দূতগণ।
চল প্রিয়ে।
চল ত্বরা নাগেশ্বর পাশে।
যাব দেহে সিন্ধুদেশে লইয়ে বিদায়।
[ উভয়ের প্রস্থান।
সপ্তম দৃশ্য।
সিন্ধুরাজ-সভা।
( সিন্ধুরাজ, মন্ত্রী, সভাসদ্‌গণ, বিজয়পুররাজ, রাণী,
বিজয়সিংহ, মন্দাকিনী ও সখীগণ )
সিন্ধুরাজ। হে ভূপতি !
দেহ অনুমতি

৩য় অঙ্ক। ]
মন্দাকিনী।
৭>
কন্যা মম করিতে অর্পণ
নয়ন-অানন্দ
এই নন্দনে তােমার।
বিজয়রাজ। কৃতার্থ রাজন্ আজি।
লক্ষীস্বরূপিণী তােমার নন্দিনী
পুত্রবধূ হবে মম—
পরম সৌভাগ্য বলে মানি।
( বিজয়সিংহের হস্তে মন্দাকিনীকে সমর্পণ )
সখীগণ।
( গীত )
বহিয়া যায়,
দেখলৈ সই, হাসিছে ওই,
তমালে মাধবী বেড়িয়া রে ।
সুখের বায়,
ঠমক রঙ্গে নাচিয়া রে ?
চাদিমা রাতি, বিমল ভাতি
কুসুম রাশি, বিকাশে হাসি,
যুগল চাদে,
হষ-সরসে ভাসিয়া রে ।
হেরিব সাধে,
যবনিকা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mandakini

Author
Ray,debendranath
Title
Gitinatika
File name
Mandakini
Text
OCR done
Citation
1902
Published
2009/10/10
Publisher
Jankinath Basu,barrackpur
Language
Sanskrit
Pages
89
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poem
Keywords
Bhupalraj
DLI number
512905
Barcode
4990010019934.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
k8gUVatdRMX
Download PDF

Mandakini