Makardah Saraswat Library, Howrah

Kaler Padadhani Ba Sangram

Bhattacharya, Nitai · 2009/08/24

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কালের পদধ্বনি
বা
সংগ্রাম
নিতাই ভট্টাচার্য্য
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২৪৪ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলিকাতা ॥

প্রকাশক-শ্ৰীভুবনমােহন মজুমদার
শ্রীগুরু লাইব্রেরী, কলিকাতা
মূল্য—দুই টাকা
মুদ্রাকর—শ্রীরামদেব ঝ
১০৩ নং ন্যাশন্যাল লিটারেচার প্রেস,
কলিকাতা।

উৎসর্গ-পত্র
বাংলার চিত্র জগতের পঞ্চ পাণ্ডবগণের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠ
শ্ৰীমুরলীধর চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের
করকমলে-
মেহমুগ্ধ গ্রন্থকার

লেখকের বক্তব্য এর আগে আমার লেখা “উড়াে চিঠি’ ও ‘মাইকেল মধুসূদন’ সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হলেও-কালের পদধ্বনি’ই আমার প্রথম নাটক যা প্রকাশিত হলাে। এর জন্যে আমি বিশেষ ভাবে ঋণী আমার পরম শ্ৰদ্ধাস্পদ বন্ধু শ্ৰীললিতমােহন সিংহ ( আমাদের ললিতদা’ ) আর আমার অশেষ প্রীতি-পাত্রী শ্রীমতী রমা চক্রবর্তীর কাছে। এদের উৎসাহ আর সাহায্য না পেলে আমার পক্ষে এ বই প্রকাশ করা সম্ভব হতাে কিনা সন্দেহ। ‘কালের পদধ্বনি’কে সামাজিক নাটক না বলে বর্তমান যুগের ঐতিহাসিক নাটক বল্লে আমার মনে হয় ঠিক বলা হবে। বাংলার বিপ্লববাদই ভারতীয় জাতীয় সংগ্রামের প্রথম জাগ্রত বৈপ্লবিক চেতনা। এবং সেই বিপ্লববাদ গণবিপ্লবের আকার ধারণ করে মহাত্মাজী অনুপ্রাণিত বৈপ্লবিক অহিংসবাদে পরিণত হলাে—এ একটা বর্তমান ভারতের অবিসংবাদিত ঐতিহাসিক ঘটনা, যদিও জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাসে এইটেই একমাত্র বা শেষ ঘটনা নয়। এর পরের পরের ঘটনা আগষ্ট বিপ্লব ও আজাদহিন্দ, বিপ্লব। সেই সম্বন্ধে—আমার লেখা দুখানি নাটক প্রকাশের সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এই তিনখানি নাটকের মধ্যে আমাদের জাতীয় সংগ্রামের যে ধারাবাহিক অখণ্ড ও বিশেষ রূপ আছে তা দেবার চেষ্টা করেছি। ‘কালের পদধ্বনি’ সেই তিনখানির প্রথম। সুতরাং ‘কালের পদধ্বনির’ যা বক্তব্য—তা ইতিহাসের সত্য বক্তব্য হলেও,-একমাত্র, বা শেষ বক্তব্য নয়। আশা করি পাঠক বা সমালােচক- গণ একথা মনে রেখে—এ বই সম্বন্ধে তাদের মত নির্ধারণ করবেন। এই ‘কালের পদধ্বনিই’ ‘সংগ্রাম’ নামে চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। নবদ্বীপ- বিনীত গ্রন্থকার আনি—১৩৫৩ “কালের পদধ্বনি” বা সংগ্রাম প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রােডের ধারে প্রতাপপুর গ্রাম। গ্রামখানি যেমন বড় তেমনি বহু ধনী ও শিক্ষিত ভদ্রলোকের বাসস্থান। দরিদ্র মূখ চাষার তো আছেই। জাপানী বােমার ভয়ে কলিকাতা হইতে গ্রামের ধনী, চাকুরে ও ভদ্রলােকের—যারা পৈত্রিক বাসভূমির কথা ভুলিয়াই গিয়াছিলেন- এইখানে পালাইয়া আসাতে গ্রামটি যেমন জজমা হইয়া উঠিয়াছে তেমনি—এর জটিলতাই বাড়িয়া গিয়াছে। একটি প্রকাণ্ড বিলের চারি- পাশে জমিদারপাড়া, গােয়ালপাড়া, বাগদিপাড়া, কুৰ্ম্মিপাড়া, কাহারপাড়া, সাওতালপাড়া, মুসলমানপাড়া প্রভৃতি বহুপাড়া লইয়া—এই বিরাট গ্রাম। —গ্রামে থানা, পােষ্ট অফিস, হাইস্কুল, রেজেষ্ট্রী অফিস—সবই আছে।

সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক এই গ্রামের একপ্রান্তে—পঞ্চবটীর ধারে—যেখানে পাটি প্রকাণ্ড বট-অশ্বথ একত্রে জোট পাকিয়ে আছে--সুব্রত ডাক্তারের বাড়ী।—বাড়ী মানে একটা প্রকাগু আটচালার পাশে খান চারেক ঘর। ঐ আট- চালাতেই আছে সুব্রতর ডাক্তারখানা, অবৈতনিক স্কুল, অশিক্ষা দূরীকরণ সমিতি, কুটীর শিল্পাশ্রম প্রভৃতি। আজ বৈকালে সুব্রত এই আট-চালায় বসিয়া পড়িতেছে-দূরে টেবিলে বসিয়া আছে প্রসাদ। সুব্রত সুন্দর সুশ্রী শক্তিমান যুবক। তাহার চোখে ও মুখে সাহস চিন্তাশীলতা ও অভিজাত্যের ছাপ —তাহার কথাবার্তা শান্ত সংযত ধীর ও স্পষ্ট। প্রসাদ উৎসাহশীল প্রাণবন্ত বালক। হঠাৎ প্রসাদ মুখ তুলিয়া বলিল প্রসাদ। দাদা! নায়েব মশাই আসছেন। সুব্রত। ওঃ ! তাকে ডেকে নিয়ে এসাে। প্রসাদ বাহির হইয়া গেল একটু পরেই নায়েব মশাই প্রবেশ করিলেন। নায়েব মশাই প্রৌঢ়, বিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও কৰ্ম্মকুশল। সুব্রত। আসুন, আসুন, নায়েব মশাই, বসুন (বসিলেন) অসময়ে আপনার পায়ের ধূলাে পড়লো? কি খবর বলুন তাে? নায়েব। আপনি বুদ্ধিমান লােক, খবর তাে বুঝতেই পাচ্ছেন ! সুব্রত। (হাসিয়া) বুদ্ধি আমার অবশ্য কিছু আছে, আর সে খবরটা আপনারা যখন জানতেই পেরেছেন—তখন অস্বীকার করে লাভ নেই। আপনারা তা হলে প্রতাপপুর মৌজা বিরজা suger mill কে বিক্রী করলেন ?

১ম অঙ্ক।
সংগ্রাম
নায়েব। আজ্ঞে, জমিদারীর মালিকও যে বিরজাবাবু, চিনির
কলের মালিকও সেই বিরজাবাবু। কাজেই বিক্রীও বলতে পারেন
হস্তান্তরও বলতে পারেন। যেমন ডান হাত থেকে বাঁ হাতে
নেওয়া আর কি ?
সুব্রত। তা ঠিক! ভাগ্যবান লােক বিরজাবাবু।
নায়েব। সে আর বলতে ? পঁচিশ বছর আগে ছিল শুধু এই
জমিদারীটুকু; আর আজ বিরজা কটন মিল একটা কোটী টাকার কারবার।
হাজার হাজার লােক খাটছে ! দেখুন না, বিরজা সুগার মিলের কথা
খবরের কাগজে ওঠার আগেই বিশ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রী হয়ে গেল।
আর ঐ একজন কপালে লােক রাজেনবাবু, তার জামাই—এ মিল-টিল তত
সব তারই কীৰ্ত্তি, ধুলাে ধরে তা সােনা হয়ে যায় ! শ্বশুর জামাই নয়তাে,
যেন একেবারে মণিকাঞ্চন যােগ !
সুব্রত। স্যার বিরজা প্রসাদের তাে একই জামাই রাজেনবাবু ?
নায়েব। বাবুর তাে একই মেয়ে; ছেলে বলুন, জামাই বলুন,
ম্যানেজার বলুন সবই ঐ রাজেন বাবু। ওঁর আবার ছেলে নেই ; দুটি
যমজ মেয়ে—ছবি আর বিবি—যেন লক্ষ্মী সরস্বতী। জামাই হবে যারা
তারা সব তপস্যা করছে। সব তারাই পাবে ভবিষ্যতে।
সুব্রত। (হাসিয়া) কপাল করে যারা এসেছে তারাই জামাই
হবে ! আমাদের আর ভেবে ফল কি ?
যাক।
রেজেষ্টারী
হয়ে গেছে!
নায়েব। কাল হয়ে গেছে।
সুব্রত। এখন বিলের মাঠের জমিগুলাে চাষীদের কাছ থেকে নিতে
পারলেই চিনির কলের কাজ আরম্ভ হয়—কেমন তো ?
নায়েব। ঐ জমিগুলােই হচ্ছে এ অঞ্চলের সেরা জমি--আখের

৪ সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক চাষের জন্য দরকার। আর station এর ধারে দেখেছেন তো কারখানা তৈরীর জিনিস-পত্তর সব এসে পড়েছে। এখন শুভস্য শীঘ্রম- সুব্রত। কিন্তু চাষীরা যদি শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রী করতে রাজী হয় ? নায়েব। (হাসিয়া) আজ্ঞে এখন তাদের নামে উচ্ছেদের নালিশ করতে হবে। তাদের জন্য তাে-এত টাকার কারবার আটকে থাকতে পারে না, বা থাকা উচিত নয়। সুব্রত। নিশ্চয়ই নয়। দুশাে পাঁচশ ছােটলােক চাষীদের জন্যে স্যার বিরজা প্রসাদের এত বড় একটা লক্ষ লক্ষ টাকা ঢালা পরিকল্পনা আটকে থাকলে যে ঘােরতর অন্যায় হবে ? নায়েব। (সুব্রতর কথার সুর ঠিক বুঝিতে না পারিয়া) আজ্ঞে ! কিন্তু জমি তত আমাদের চাই। সুব্রত। তা তো বটেই—ত যে উপায়েই হােক। কিন্তু আমি ভাবছি নায়েব মশাই চাষীরা যদি উচ্ছেদ হতে রাজী না হয়। নায়েব। আজ্ঞে—সে বিষয়ে কোন অসুবিধাই হবে না। গত তিন বছরে চার টাকার চাল চল্লিশ টাকার ধাক্কা মেরেছে। অনেক প্রজা কৌড় ফেরার। যারা কোন রকমে টিকে আছে, তাদের বেশীর ভাগই খাজনা দিয়ে উঠতে পারেনি। লাঙ্গল গরু আগেই বেঁচে খেয়েছে। এখন খেয়ে বেঁচে থাকতে হলে যখন জমি বিক্রী করতেই হবে, তখন আমাদের কাছেই বা করবে না কেন? সুব্রত। সত্যিই ভাগ্যবান আপনার ! এই ভয়াবহ মন্বন্তরও আপনাদের পক্ষে কাজ করলাে ! একদল থেকে বিশ লক্ষ লােক অন্নাভাবে মরে গেল, সেই সুযোগে আর এক দলের বিশ হাজার কোটী টাকা বেড়ে গেল!

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম নায়েব। আজ্ঞে আপনার কথার সুব্রত। আমার কথার সুরটা ঠিক বুঝতে পাচ্ছেন না ? অঙ্ক শাস্ত্রের একটা সােজা যযাগবিয়ােগের হিসেব কল্লা নায়েব মশাই। খাদ্য সচিবের ইস্তাহারে প্রকাশ যে এই দুর্ভিক্ষে দেশে আধমরা ও মড়ার বাড়াদের বাদ দিয়ে প্রায় বিশ লাখ লােক মারা গেছে ; আর অর্থসচিবের ব্যাঙ্ক ব্যবসা সম্বন্ধীয় ইস্তাহারে প্রকাশ যে দেশে এই আলােচ্যসময়ে বিশহাজার কোটি টাকার বাড়তি কারবার হয়েছে। সুতরাং বিশ হাজার কোটীকে বিশলাখ দিয়ে ভাগ দিলে হয় দুই লক্ষ ; অর্থাৎ দেশে না খেতে পাওয়ার দরুণ প্রতি মড়াটায় মাথা পিছু একলক্ষ টাকা আয় বেড়ে গিয়েছে। ভাবুনতাে সব গরীবগুলো মলে টাকা কি পরিমাণ বেড়ে যেতাে। সেইজন্যই বলছিলাম বাবুরা সত্যই ভাগ্যবান। নায়েব। সুব্রতবাবু, আমার কথাটা রাখুন। আপনি গাঁয়ের লােকের যথেষ্ট উপকার করেছেন। আপনি করেছেন। আপনি রিলিফ নিয়ে এসে খাওয়ানর ব্যবস্থা না করলে এদিককার অর্ধেক গরীব মরে যেতে। অসুখে বিসুখে আপনিই তাদের একমাত্র সহায়। আপনাকে কত শ্রদ্ধা করি। আমার অনুরােধ জমিদারের সঙ্গে বিরােধে আসবেন না। তারা প্রবল প্রতাপ। বহু টাকার মালিক ; আইন আদালত সবই তাদের পক্ষে। সুব্রত। ঠিক সেই জন্যেই আমাদের যেতে হবে তাদের বিপক্ষে নায়েব মশাই। ধনের অধিকারীরাই আজ পৃথিবীর অধিকারী। রাষ্ট্র, সমাজ, ধৰ্ম্ম, ন্যায়, নীতি সবই তাদের স্বার্থের অনুকুল। সেইজন্যেই তাে ফাটকাবাজারের পাশেই তৈরী হয় কললাবাজার, পুজিপতিদের লাভের জন্য লক্ষ থেকে কোটীর ঘরে যায় ; আবার ঘােটলােক চাষীদের পেটের দায়ে থালা ঘটী লাঙ্গল গরু থেকে আরম্ভ করে চাষের জমি পর্যন্ত বেচে খেতে হয়। তাতেও যখন পােড় পেট ভরেনা তখন প্রথমে • সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক ভিক্ষে করে ফ্যান খেয়ে,-তারপর রােগে আর না খেয়ে রাস্তায় পড়ে মরে পােড়া পেটের জ্বালার হাত থেকে নিস্তার পেতে হয়। সবই তাে আপনি চোখের সামনে দেখেছেন। আপনি কি মনে করেন না, নায়েব মশাই, এইরকম ধনবৈষম্যের আমূল পরিবর্তন দরকার । নায়েব। কিন্তু চাষীদের জমিবেচা বা বাবুদের জমি কেনা—আপনি বা আমি ঠেকিয়ে রাখতে পারবাে না ? সুব্রত। নিশ্চয়ই পারব না! দুঃখতে এখানেই নায়েব মশাই। মন্দকে মন্দ বলে জেনেও তাকে ঠেকিয়ে রাখবার উপায় নেই। এমনি সমাজ বিধানের মধ্যে আমরা এসে পড়েছি। সেই জন্যই আমরা বলি লাঙ্গল যার জমি তারই। জমির ওপর অন্য কারাে নৈতিক অধিকার নেই। নায়েব। তবু একবার ভাল করে বুঝে দেখুন সুব্রতবাবু। সুব্রত। অনেক দুঃখ সয়ে আমাদের বুঝতে হয়েছে, নায়েব মশাই ; কাজেই আমরা খুব ভাল করেই বুঝেছি যে যা চলছে তা আগা গােড়া বদলালে মানুষের মঙ্গলের কোন উপায় নেই। নায়েব। কিন্তু তবুও আমার কথায় কাজের কত সুবিধে হতাে ভাবুন দেখি? আপনার অনাথ আশ্রম স্কুল দাতব্য হাসপাতালের জন্য বাবুদের দেশসেবা ফাণ্ড থেকে—একটা মােটা টাকা আদায় করে দিতে পাত্তাম। আমি দেখতে পাচ্ছি যে টাকার অভাবে আপনি মনের মত করে দেশমাতার সেবা করতে পাচ্ছেননা? সুব্রত। আপনার বাবুরা অবশ্য টাকা দিলে আমি নিশ্চয়ই ধন্যবাদের সঙ্গে গ্রহণ করবে। কিন্তু তাদের কথায় রাজী পারবো না। টাকার ১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম জন্যে আমরা মনের মতাে কাজ করতে পারিনে—এটা খুব সত্যি। কিন্তু আপনি যে ভাবে বলছেন—ঐ ভাবে টাকা নিতে পারবাে না। নায়েব। বড় মুখ করে এসেছিলাম, সুব্রতবাবু-( উঠিলেন) সুব্রত। খুবই দুঃখিত নায়েব মশাই যে আপনার মুখ রক্ষা করতে পারলাম না। নায়েব। আচ্ছা চলিবার উপক্রম করিলেন) সুব্রত। একটা কথা মনে রাখবেন, নায়েব মশাই,-শম্ভ বঁড়িয্যের বেদখলী জমিদারী প্রতাপপুর আপনাদের বিক্রী করার কোন অধিকার নেই। কাজেই ও জমি বেচা এবং কেনা দুইই বেআইনি হয়েছে। নায়েব। কি বলছেন আপনি! সুব্রত। আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আমি যা বলছি তা আপনি বেশ বুঝতে পারছেন। ভবিষ্যতে আরও ভাল করে বুঝতে পারবেন- আচ্ছা, নমস্কার। ( ফিরিয়া ভিতরে চলিয়া গেল। নায়েব বিভ্রান্ত ভাবে তাকাইয়া বাহির হইয়া গেলেন) সুব্রতও বাহির হইয়া গেল। প্রসাদ আসিয়া সুব্রতের চেয়ারে বসিয়া ছবির বই দেখিতে আরম্ভ করিল। এমন সময়ে একটি হাস্যমুখরা, প্রগলভা দীপ্তিময়ী তরুণী-( নাম অমিতা) ধীরে ধীরে প্রবেশ করিল। প্রসাদ প্রথমে তাহাকে দেখিতে পায় নাই। যখন দেখিতে পাইল তখন অমিতা একেবারে তাহার পিঠের কাছে আসিয়া পড়িয়াছে। প্রসাদ। (তাড়াতাড়ি উঠিয়া) আপনি কাকে চান ? অমিতা। ডাক্তার বাবুকে।

সংগ্রাম
[ম অল্প
প্রসাদ।
ওঃ আপনার কি পেট কামড়াচ্ছে ? কি খেয়েছিলেন ?
অমিতা। রােজ যা খাই; ভাত, ডাল তরকারী মাছ, চা-ডাব !
প্রসাদ। জমিদার বাড়ী খিচুরী খান নি তাে? আর গােকুলদের
দোকানের তেলে ভাজা বোঁদে ?
অমিতা। না তাে!
প্রসাদ। আপনার ওষুধ পালসেটিলা ৩০ শক্তি। আচ্ছা, আপনার
অম্বল হয় ?
অমিতা। না-
প্রসাদ। তবে শুধু নাক্সভমিকা। আমিই দিতে পাৰ্তাম। কিন্তু
ওষুধের বাক্সে আমার আর হাত দেওয়া চলবে না। একটু আগেই
—“ফের আমার ওষুধের বাক্সে হাত দিলে এক শিশি কুইনিন্ মিক্সচার
গলা টিপে খাইয়ে দেব”—দাদা না এলে আপনার কোন ব্যবস্থাই হবে না।
অমিতা। সুব্রতবাবু বুঝি তােমার দাদা ?
প্রসাদ। না, না, দাদা বলে ডাকি। আর মাকে বলি মা, পাঁচ বছর
আগে আমার আসল মা বাপ কলেরায় মারা গেছে। আচ্ছা আপনি
নিশ্চয়ই জমিদার বাড়ীতে এসেছেন ?
অমিতা। তাদের বাড়ী বেড়াতে এসেছি। তুমি কেমন করে জানলে ?
প্রসাদ। আমি না জেনেই বুঝতে পেরেছি। আমাদের গ্রামে
আপনার মত এমন ভাল দেখতে কেউ নেই। আর এমন কাপড়ও কেউ
পরতে জানেনা। ঠিক টকীর মতাে।
অমিতা। আমিও টকী করি কি না।
প্রসাদ। ওঃ! তাই আপনার মুখটা চেনা চেনা বলে মনে হচ্ছে।
কি নাম বলুন তাে আপনার ? আমার কাছে সব তারকাদের ছবি আছে।
অমিতা। তার মধ্যে আমাকে পাবে না। আমি বােম্বাই থাকি।

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম।
প্রসাদ। এখানে বুঝি আপনাদের সুটিং হবে ? আপনি বুঝি একজন
তারকা ? আপনার একটা ছবি আমাকে দেবেন নীচে নাম সই করে ?
আর ওপরে লেখা থাকবে—প্রসাদকে দিলাম।
অমিতা। নিশ্চয়ই দেব ।
প্রসাদ। (একখানি চেয়ার বেশ ভাল করিয়া মুছিয়া) আপনি
এইখানে ভাল করে বসুন। আমি এক্ষুনি দাদাকে ডেকে আনছি। ঐ দাদা
আসছে! দাদাকে বলবেন না যেন ঐ ছবির কথা !
[ দ্রুত প্রস্থান-সুব্রতের প্রবেশ ]
অমিতা। নমস্কার। নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ?
সুব্রত। (প্রতি নমস্কার) নিশ্চয়ই না। আপনাকে ভুলে যাওয়া
যায় না। বসুন, কিন্তু এতদূর কি মনে করে ? আশ্চর্য !
অমিতা। মােটেই না। কৌতুহল। চারবার আপনার সঙ্গে দেখা।
কিন্তু পরিচয় হয়নি তাই ভাবলাম আলাপটা জমিয়ে আসি। দেখলাম
আকাশে মেঘ। বৃষ্টি যদি আসে তবে বেশীক্ষন থাকবার একটা অছিলা
পাওয়া যাবে ; আর তাড়াতাড়ি ওঠবার কোন প্রশ্নও থাকবে না। ঐ
বৃষ্টি এলো। এ অবস্থায় নিশ্চয়ই আপনি একজন ভদ্র মহিলাকে বাড়ী
থেকে বের করে দেবেন না ?
সুব্রত। নিশ্চয়ই না। আশ্রয় সবলােকের সর্ব অবস্থাতেই আমার
এখানে আছে। কিন্তু আমি এখানে থাকি এটা জানলেন কেমন করে ?
অমিতা। অনেক চেষ্টা করে। আপনি তাে বলেন নি ?
সুব্রত। (সুব্রত একটু হাসিয়া কথা ঘুরাইয়া লইল) পাড়া গাঁ
আপনার কেমন লাগছে?
অমিতা। খুব ভাল। তবে একটা অসুবিধে তেমন কম্পানী
(Company) পাওয়া যায় না; সেইজন্যেই জমিদারের বড় নাতনী,
আপনি জমিদার বিরজাবাবুর নাতনীদের দেখেননি বুঝি ?
;

সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
সুব্রত। না সে সৌভাগ্য হয়নি ; হবে বলেও কিছু আশা রাখিনে।
অমিতা। কেন? একদিন গিয়ে দেখে আসবেন না, তারা খুব
accomplished ও সুন্দরী!
সুব্রত। আপনার চেয়েও ?
অমিতা। আমি বুঝি খুব সুন্দরী ?
সুব্রত। আমাকে জিজ্ঞাসা করে কষ্ট পাচ্ছেন কেন ? আপনিও তাে
সেটা জানেন।
অমিতা। আমি অবশ্য জানি—তবুও আপনার মতটা নিয়ে রাঙ্গাম।
যা এখন জমিদারের বড় নাতনী আমাকে এখানে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে
এলেন, up to date মেয়ে জমিদার বাড়ীতে অনেক জুটেছে; কিন্তু
presentable যুবকের সংখ্যা এত কম যে সব থাকতেও তেমন জমছে
। একটা mixed অভিনয়ের আয়ােজন সব ঠিক। সমস্তই এই
গ্রামের ছেলে মেয়ে হওয়া চাই। বিরজাবাবু পৰ্য্যন্ত পার্ট বলতে রাজী
হয়েছেন। কিন্তু Romantic Hero বলবার কোন লােক পাওয়া যাচ্ছে।
। আপনার সঙ্গে সেদিন trainএ আলাপ হওয়া একেবারে ঈশ্বর
প্রেরিত। এইবার নিয়ে আপনার সঙ্গে চার বার দেখা হলাে না?
সুব্রত। হ্যা। কিন্তু আমাকে বুঝি সেই Romantic Herঠর
পার্ট বলতে হবে ?
অমিতা।
ঠিক ধরেছেন।
The strong silent
with a mysterious past ! রহস্যময় পুরুষ-অতীত যার যবনিকা নিয়ে
ঘেরা! ঠিক আপনার পার্ট। আপনার বয়স আর একটু বেশী হলেই
একেবারে Ronald colman !
সুব্রত। কিন্তু আমি অত্যন্ত unromantic; আর মােটেই আপনার
man

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম ত ; ঐ ' strong silent man with a mysterious past নয়। আমি এই চাষ। গায়ের হাতুড়ে হােমিওপ্যাথ সুব্রত ডাক্তার। অমিতা। আমি ভাল ছবি আঁকতে পারি, জানেন? আমাকে একজন artist বললে ভুল বলা হবে না। মুখটা একটু ফেরান তো; আপনার প্রফিল একেবারে জন্ ব্যারিমুরের মতো ; চেহারার typical আভিজাত্যের ছাপ ! মাত্র পাঁচ বছর এখানে এসেছেন। আপনার অতীত কেউ জানে । পুলিশের নজর আছে বলে গ্রামের ভদ্র ছেলেরা আপনার সঙ্গে মিশতে ভয় পায় ; কিন্তু চাষীরা আপনার নামে শত মুখ। আপনার সমস্ত জীবন একটা রহস্যের যবনিকা দিয়ে ঢাকা। সুব্রত। কী সর্বনাশ! আমার মত অন্ততঃ পাঁচ হাজার ছেলে এই বাংলা দেশে আছে। অমিতা। জানেন আমাকে দুবার kidnap করবার চেষ্টা হয়েছে । গুণ্ডা দিয়ে আক্রমণ করিয়ে উদ্ধার করবার চেষ্টা হয়েছে তিনবার ; আমার মােটরে ধাক্কা লাগিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করবার চেষ্টা হয়েছে চারবার ! সুব্রত। বলেন কি! কারণ ? অমিতা। কারণ খুব সরল। আমার বাবার কিছু মােটা টাকা আছে এবং আমি তার অর্ধেকের অধিকারিণী। বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করে বা কোন রকমে আমার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা লাভের দুরাশা! এতেও আচাৰ্য্য প্রফুল্ল রায় বলেন ধনলাভে বাঙ্গালীর ছেলেদের কোন প্রচেষ্টা নেই । সুব্রত। এতে আপনার অস্বাভাবিকত্ব প্রমাণ হলাে বটে, কিন্তু আমার অস্বাভাবিকত্ব কোথা থেকে এলাে ? অমিতা। তাই বলার জন্যেই তাে এই ভূমিকা কচ্ছি। আপনি সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক ফুরসুৎ দিচ্ছেন কই ? জীবনে সত্যিই আমি একবার মাত্র বিপদে পড়েছিলাম—সে সেদিন ট্রেনে। হঠাৎ ঠিক হলাে আমার বাবা বিশেষ কাজের জন্যে Delhi Express এ যাবেন। আমি চেক ভাঙ্গিয়ে station এ তাকে টাকা পৌঁছে দেব। এক লাখ বায়াত্তর হাজার টাকা suitcase এ বােঝাই! এদিকে তারা train ফেল করলেন। আর আমি তা না জেনে ছুটে গিয়ে গাড়ীতে উঠলাম। গাড়ী ছেড়ে দিল। যে দুটো লােক Bank থেকে আমার পিছু নিয়েছিল তারাও দৌড়ে এসে সেই গাড়ীতে উঠলাে। আপনার ঘুসিতে তাদের একজনের নাক ফাটে, আর একজনের দাত ভাঙ্গে! ওরকম ভয়ও আমি জীবনে কখনও পাইনি। আমার জন্যে নয়, suitcase বােঝাই টাকার জন্যে। আবার বিপদটা দেখুন! টিকিট নেই; অত টাকা থাকতেও টিকিট কিনবার টাকাও নেই, সব হাজার টাকার নােট। সুব্রত। আপনার suitcase এ অত টাকা আছে জানতে পারলে ওটা আমিই নিয়ে সরে পরতাম ! ভারি ঠকা হয়ে গেছে । অমিতা। আপনি জানতেন। গুণ্ডাদের সঙ্গে টানাটানিতে suitcaseটা খুলে গিয়েছিল। আপনিই নােটের কেতাগুলাে গুছিয়ে রেখে দেন। সুব্রত। ও তাই নাকি? অমিতা। আপনি কি বলতে চান আমার মত একজন সুন্দরী তরুণীকে অমন বিপদ থেকে রক্ষা করার পর বাংলাদেশের কোন যুবক অন্ততঃ কৃতজ্ঞতার দাবীতে আমার সঙ্গে ভালবাসার চেষ্টা না করে ছেড়ে দিত? তাছাড়া, আমি আপনাকে অনেক chance দিইছিলাম। অতখানি রাস্তা আপনার সঙ্গে গিইছি, আবার ফিরে এসেছি, সমস্ত গাড়ীটা অত খােলাখুলিভাবে আলাপ জমাবার চেষ্টা করেছি। বাড়ীর ঠিকানা

১ম অঙ্ক
সংগ্রাম
!
দিয়ে নিমন্ত্রণ করেছি ! কিন্তু এ-সবের বদলে আপনি আমার নামটাও
জিজ্ঞাসা করেন নি! হয় আপনি খুব গভীর, নয় পাথর !
সুব্রত। বলুন তাে আমি ঠিক কোনটা ?
অমিতা। এখনও ঠিক বুঝতে পারি নি বলেই আপনাকে ওই
strong silent heroর পার্ট দিয়ে পরখ করে নিতে চাই।
সুব্রত। আপনি বুঝি heroine ?
অমিতা। মনে মনে তাই ঠিক করেছি; অবশ্য আপনি যদি মত
করেন।
সুব্রত। (অমিতার দিকে তাকাইয়া) লােভনীয় বটে। নাটকের
নাম কি ?
অমিতা। নিয়তি।
সুব্রত। নিয়তি? কার লেখা?
অমিতা। কারাে লেখা নয়। অর্থাৎ এখনও সে নাটক লেখা হয়নি।
শুধু নামটা উঠেছে লটারীতে
সুব্রত। ব্যাপারটা খুব ধোঁয়াটে হয়ে বুদ্ধির বাইরে যাচ্ছে।
অমিতা। বুঝতে পারলেন না ? প্রত্যেক অভিনেতা কেবল তার
চরিত্র জানবে। কথা তাকে তৈরী করে বলতে হবে। এই কথার ঝোঁকে
ঝেকে নাটক রূপ নেবে।
সুব্রত। ট্রাজেডি না কমেডি ?
অমিতা। শেষে গিয়ে যা দাঁড়ায়। এরকম নাটক আজকাল
অনেক হয়।
বিরজাবাবুর প্রবেশ। বিরজাবাবু বৃদ্ধ। ভাগ্যবান
পুরুষের লক্ষণে এবং সরল প্রসন্নতায় মুখ উদ্দীপ্ত।
বিরজা। আমি কি এখন আত্মপ্রকাশ করতে পারি
?

১৪ সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক সুব্রত। (বিস্মিত হইয়া) আপনি। আপনি কে ? অমিতা। আমার দাদু। বিরজা। ভয় নেই ভায়া ; আমি কারাে rival নই, সুন্দরী আদুরে নাতনী ; মােটা টাকার মালিক, তরুণী তরলমতি এবং modernismএর ভাবে অন্ধ ! তাকে সুধু আগলে বেড়াতে হয়। আমাকে সম্পূর্ণ ignore করে তােমরা কথাবার্তা চালাতে পারাে। ; অমিতা। দাদু, আপনি atsolutely backdate ! ভদ্রসমাজে একেবারে অচল! একটু পরে এলেই পারতেন। মাত্র আমাদের আলাপটা জমে উঠছিল ! বিরজা। দেখচো, ভায়া, up to date এর নমুনা! একেবারে ঠিক যেন petrol tank এর ওপর High explosive সাজান বােমরু বিমান! এখন প্রাচীন প্রথামত ভায়ার পরিচয়টা জিজ্ঞাসা করা যাক। খ্যাতি, অখ্যাতি তত অনেকই শুনেছি ? সুব্রত। পরিচয় আমার খুবই সামান্য ; আমি এই গাঁয়ের সুব্রত ডাক্তার, হাতুড়ে হােমিওপ্যাথ। বিরজা। বড়ই কৌতুহল ভায়া ! আর দুটি প্রশ্ন—ভায়ার University qualificationটা কি? আর ডাক্তার হলে কেমন করে ? আলমারীতে COT Chefs Shelley Shakespeare 43 oftear Differential calculus আর Biology; রবীন্দ্রনাথের পাশে ধাত্রীবিদ্যা আর Penal code; নীচে মার্কস, লেনিন, রাসেলের এর পাশে pathology, কলেরা চিকিৎসা, Meterea Medica! অনেক বই বিলাসী দেখছি, অনেক পণ্ডিতও দেখছি, কিন্তু এমন অদ্ভুত বই সংগ্রহ তাে কোথাও দেখিনি ? সুব্রত। Universityর qualification হিসেবে আমি B. S. c.

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম M. A. মোক্তার, বাড়ীতে পড়ে Holeopathic ডাক্তার, আর দিন কতক আগে L. M. P. পাশ করেছি। বিরজা। (উচ্চহাস্যে) বড়ই বিস্মিত হচ্ছি, ভায়া ! qualification এর এমন আশ্চৰ্য্য সমাবেশটা কেমন করে সম্ভব হলো ? সুব্রত। একেবারে বিনা চেষ্টায়, নিছক কোম্পানীর কৃপায়। B. Sc. পাশ করে ছিলাম Biology নিয়ে Medical College এ পড়বাে তখন বয়েস উনিশ। পুলিশে ধরলে, জেলে বসে দিলাম M. A. ইংরিজি আর Economicsএ। অবসর মত পাশ করলাম মােক্তারী। জেলে দাদারা সময় কাটাবার জন্যে Hoineopathy পড়েন; কাজেই সঙ্গদোষে Homeopath, আর সর্বশেষে ম্যালেরিয়ার খাতিরে এখানে এসে L. M. F. বিরজা। সত্য অনেক সময়ে উপন্যাসের চেয়েও চমকপ্রদ ! কিন্তু মাষ্টার বা মােক্তার না হয়ে ডাক্তার হলে কেমন করে ভায়া? সুব্রত। সে-ও কোম্পানীর কৃপা। বছর কতক জেলে বাস করার পর interned হলাম এই গ্রামে। তার আগে বাংলার ম্যাপে প্রতাপপুর বলে একটা গ্রাম আছে তা জানতাম না। হােমিওপ্যাথির বই আর বাক্স সঙ্গেই থাকতো। দিনকতক পরে কুর্মিপাড়া, বাগদিপাড়া, মুসলমানপাড়ায় লাগলে কলেরা আর বসন্ত। অসভ্য হতভাগাদের রােগ আছে, কিন্তু চিকিৎসা করার পয়সা নেই। বাধ্য হয়ে দিতে লাগলাম জলপড়া পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে গ্রামে গিয়ে। আরও আশ্চর্যের বিষয় যে ফল ও হতে লাগলে অদ্ভুত! আর পিছবার উপায় থাকলাে না। সেই থেকেই হয়ে গেলাম ডাক্তার। নিছক ভাগ্য। অমিতা। পুলিশে ধরলাে কেন? বােমা তৈরী করেছিলেন? সুব্রত। কেন যে ধরলাে তা আমি আজও জানিনে। তবে শুনেছি আমার এক বন্ধুর বন্ধুর বাড়ী খানাতল্লাসী করে পিস্তলের ছবি পাওয়া গিছলাে।

সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক বিরজা। গলায় পৈতার কোণাটা দেখে বুঝতে পাচ্ছি ব্রাহ্মণ। ভায়ার আত্মীয় স্বজন কে আছেন? সুব্রত। কোন বালাই নেই। বিধবার একমাত্র পুত্র। শুধু মা-ই আছেন। বিরজা। আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, ভাই, কিছু মনে করাে না। extent 77 old fool সুব্রত। না, না এতে মনে করবার কি আছে— বিরজা। ডাক্তারী করে তাে যা হয় তাতে বুঝতেই পাচ্ছি, ভায়ার কিসে চলে ? অমিতা। দাদু, আপনি একেবারে Hopeless ! আপনি কি এখানে নাতনীর বিয়ের সম্বন্ধ করতে এসেছেন যে এত জেরা করছেন ? কিসে চলে ? এ প্রশ্নের জবাব কোন ভদ্রলােকের দেওয়া উচিত নয়। সুব্রত। ভদ্রলােক আমি নয়,কেন না যে পয়সা থাকলে সমাজে ভদ্রলােক বলে পরিচিত হওয়া যায়, আমি আজও জমাতে পারিনি। সুতরাং উত্তর আপনি পেতে পারেন। চলা আমার কোন রকমে উচিত নয় ; তবুও যে কেমন করে চলে--তা economics এ M. A. পাশ করেও বুঝে উঠতে পারিনি। বিরজা। এতকাল গ্রামে বাস করে কি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলে ভায়া ? সুব্রত। একটা কথা বেশ বুঝতে পেরেছি যে ভালভাবে গ্রামে বাস করতে হলে আমাকে হতে হবে একধারে ডাক্তার, মােক্তার আর এমন একজন মহাজন যে টাকা ধার দিয়ে সূদ তাে নেবেই না-এমন কি আসল পৰ্য্যন্ত দাবী করবে না। বিবি। সেই সঙ্গে আর একটা জিনিষও বােধ হয় বুঝতে পেরেছেন যে উঁদা চেয়ে আর ভিক্ষে করে দেশের কোন বড় কাজ করা যায় না?

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম বিরজা। নিশ্চয়ই সুব্রত। হ্যা, চাঁদা না চেয়ে আর ভিক্ষে না করে অনেক কাজ করা যায় বটে—সে গুলাে বড় কাজও হতে পারে—কিন্তু মােটেই দেশের কাজ হয় না। বিবি। আপনার হেঁয়ালী বােঝা গেল না ? বিরজা। বা যেটুকু বােঝা গেল তাতে বক্তব্যটা শেষ পর্যন্ত দুর্বোধ্যই থেকে গেল । সুব্রত। (ঈষৎ হাসিয়া) দেখুন,—মুক্তিকামী সন্ন্যাসীরা সব কাজ ত্যাগ করে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে। কারণ সংসারের কাজ গুলাে যে পথে গিয়েছে মুক্তির পথ ঠিক তার উল্টো দিকে। দেশের পক্ষেও ঠিক তাই। দেশের কাজগুলাে যেদিকে গিয়েছে, তার বিপরীত দিক হচ্ছে দেশের মুক্তি। তাই প্রকৃত দেশ-সেবকের কাছে ভিক্ষে করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। বিরজা। কিন্তু তােমার মত একজন ছেলের পক্ষে এই পাড়াগাঁয়ে বসে দাতব্য হাসপাতাল আর অশিক্ষা দূরীকরণ নিয়ে জীবন নষ্ট করাতে এক রকম আত্মহত্যা! এতে তােমার নিজেরও ক্ষতি, দেশেরও ক্ষতি। সুব্রত। একদল যুদ্ধে প্রাণ না দিলে আর একদল শান্তিতে বাস করতে পারে না। এই চাষাদের মধ্যে পড়ে আছি কারণ অশিক্ষা এদের সব চেয়ে বেশী—আর বােগে মরে এরাই সব চেয়ে বেশী । বিবি। কিন্তু পয়সা যে এদের সবচেয়ে কম! যে সভ্যতার মধ্যে আমরা বাস কচ্ছি সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুবিধা সব অধিকারের ব্যাপার -পয়সা না থাকলে পাওয়া যায় না । সুব্রত। ঠিক সেই কারণেই তাে এই বৈষম্য মূলক সভ্যতার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান। আমাদের চাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুবিধা ধনীক শ্রেণীর

৮
সংগ্রাম
[ ১ম অ
বিশেষ অধিকারের ব্যাপার থাকবে নওগুলাে হবে—মানুষ মাত্রেরই
জন্মগত অধিকার।
বিবি। আপনি আলো মনে করে আলেয়ার পিছনে ছুটছেন !
সুব্রত। না ! আমি আলেয়ার পিছনে ছুটেছিলাম সেইদিন যেদিন
বড়লােকের ড্রইংরুমে রুজ পাউডার সেট সাড়ীর হৃদয়হীন অভিনয়,
আর চক্চকে বাঁধানোে দাঁতের মিষ্টি হাসির সঙ্গে যে শান্ত সংযত কপটতা,
তাকেই culture আর aristocracy মনে করে তার মধ্যে নিজেকে
প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু সে ঘাের কেটে গিয়ে আমি
আলাে দেখতে পেয়েছি। এই নিঃস্ব মূঢ় হতভাগ্য চাষাদের নিয়তির
মধ্যে খুঁজে পেয়েছি আমার আত্মাকে (বাড়ীর ভিতর হইতে ঘণ্টা বাজিল)
একটু বসুন, আমি এলাম বলে।
[ সুব্রত ভিতরে গেল ]
বিরজা। (বিবিকে সুব্রতর দিকে লক্ষ্য করিয়া মনে হচ্ছে, দিদি-
ভাই, তুমিও আলাে ভেবে আলেয়ার দিকে ছুটছো ?
বিবি। চাদ দেখে সমুদ্রে জোয়ার আসে বটে; কিন্তু হাত বাড়ালেই
তাকে পাওয়া যায় না দাদু,-(হাস্য)
বিরজা। ব্যাপার সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে ?
বিবি। (হাসিয়া) ভয়ের কোন কারণ নেই, দাদু, কৌতুক আর
কৌতুহল মাত্র !
(সুব্রতর প্রবেশ)
বিবি। আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি ?
সুব্রত। নিশ্চয়ই পারেন।
জিজ্ঞাসা করি এরকম পাগলামী আর কতদিন চলবে?
সুব্রত। যতদিন না কোম্পানীর পয়সায় রচি পৌছুই।
বিবি।

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম বিবি। জানেন—এমন পাগল অনেক আছে যারা শেষ পর্যন্ত রাঁচি পৌছয় না; কিন্তু কাজের নামে এমন সব অকাজ করে যায় সারা- জীবন যাতে পরের কোনাে ভালতাে হয়ই না অথচ নিজের যথেষ্ট মন্দ হয় ! সুব্রত। আপনার সঙ্গে আমি এক মত। বিবি। বিয়ে করেন নি কেন ? তাহলে অনেকটা সুস্থ আর সাব্যস্থ হতে পার্তেন। বিরজা। (হাসিয়া) তাতে অন্ততঃ খানিকটা mental balance আসততা ? কি বলে। দিদিভাই ? সুব্রত। কিন্তু পছন্দসই মেয়ে কোথায় ? আর বিয়ে দিচ্ছেই বা কে ? আমাদের অনেক গুণ অনেকে স্বীকার করে, এমনকি আপনারাও করেন, কিন্তু বিয়ের বাজারে আমরা যে সুপাত্র একথা কেউ বলে না। বিবি। চরকা কাটতে কাটতে ২দ্ধিতে এমন জট পাকিয়ে ফেলেছেন সোজা কথা বুঝতে পারেন না, বা সােজা করে কথা বলতেও পারেন না। (প্রসাদ ও পদহরি বাগের প্রবেশ) প্রসাদ। দাদা, বাগদিপাড়ায় আরও সাতজনের বাহে বমি ; কারণ, কাল জমিদার বাবুদের বাড়ী টাটকা ও বাসী খিচুরী ভােজন, আর তার সঙ্গে গােকুলদের দোকানের তেলে ভাজা বোঁদে। সুব্রত। জমিদার বাবুদের হঠাৎ এ সুমতি হলাে কেন? এতলােক থাকতে বাগদিপাড়া খাওয়ান ? প্রসাদ। বােধ হয় জমিদার বাবুর নাতনীদের বিয়ের পাকা দেখা। অমিতা। (কোন রকমে হাসি চাপিয়া) জমিদার বাবুরা নয় খাইয়েছে; কিন্তু রাক্ষসের মত খেয়ে অসুখ করতে তাে তারা বলেনি ? সুব্রত। এ দয়াটা জমিদার বাবুরা তাে না করলেও পারতেন ? কখনও যারা গরীবদের প্রতি তাকিয়ে দেখেন না। সারা বছর ধরে ৩০ সংগ্রাম [ ১ম অন্ধ দিনের পর দিন তারা খায় কি উপােস করে সে খোঁজ রাখেন না। আজ তাদের ভােজ খাইয়ে সস্তায় নাম কেনবার চেষ্টা না করলেই ভাল হতো ? * অমিতা। (সুব্রতর কথার ঝাজে রুষ্টভাবে) আপনি জমিদারদের জানেন , আমি জানি। তাদের আগের থেকেই এত নাম আছে যে আপনাদের দেশ সেবার মততা, সস্তার নাম কেনবার কোন দরকারই তাদের নেই। আর না ডাকতে যারা খেতে এসেছিল তাদের তাড়িয়ে না দিয়ে, খিচুড়ী: খেতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন বলে জমিদারদের এমন কিছু অন্যায় হয়নি। . সুব্রত। একশবার হয়েছে। যারা রােগী তাদের জন্য পথ্যের ব্যবস্থা না করে যারা ভােজ খাওয়ার ব্যবস্থা করে তারা হাজারবার অন্যায় করে। বলতে ও যারা আসে, সেইসব ইতর বুভুক্ষিতের দল অর্ধেকদিন আধ- পেষ্টা খেয়ে, আর অর্ধেকদিন যেতে না পেয়ে, শীর্ণদেহ, জীবনীশক্তিহীন। কেবল ভাতের ফ্যান ভিক্ষে করে খেয়ে খেয়ে তাদের ছেলেগুলাের সব পা, ফুলেছে, আর সেই সঙ্গে অল্পজ্বর। তঁার খােজ রাখেন? তাদের তাড়িয়ে দিতে জমিদার বাবুদের কোমল প্রাণে লেগেছিল তবে তাদের দিকে একটু চোখ চেয়ে তাকিয়ে দেখে খিচুরির বদলে দুধভাত দুধসাবুর ব্যবস্থা করলেই তো বিশেষ মহানুভবতার পরিচয় দেওয়া হতো। শুনেছিতে। তাদের টাকার অভাব নেই। একবার মারবেন শোষণে, আর একবার মারবেন দানে! চিরদিনকার শোষক যখন দাতার মুখােস পরে আসে তখনি বিপদ বাড়ে সবচেয়ে বেশী । : [ এর মধ্যে আরও অনেকে প্রবেশ করিল, নাসের মত দেখতে জন- কতক চাষীদের মেয়ে ও ছেলে। হিন্দু মুসলমান দুই-ই। সুব্রত এই কথা বলার ফাঁকে Homeopathic ওষুধের বাক্স, শিশি, গেলাস, saline injection এর যন্ত্রপাতি বােতল প্রভৃতি তাদের হাতে পাঠাইয়া ১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম দিল। তারপর কলেরা inocculation এর syringe তৈরী করিতে করিতে ] সুব্রত। সর্দার, তুমি আগে গিয়ে কাহার পাড়া, বাগদিপাড়া মুসল- মান পাড়া, মাঝের গ্রাম, নিকিড়ী পাহাড় সকলকে সাবধান করে দাও যেন বিলের জল কেউ ব্যবহার না করে। আর রাম হাড়ি মােড়লমিয়া, বদর শেখ বিল পাহারা দেবে। ঝাগদ্বিপাড়ার কোন মেয়ে যেন বিলের জলে কিছু না কাচে। আর আপনারা জমিদার বাড়ীর সকলকে সাবধান করে দেবেন। অমিতা। জমিদার বাড়ীর লােকের জন্য আপনার দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। তারা নিজেদের ভাল মন্দ জানেন। সুব্রত। (হাসিয়া) নিছক রাগের বলে এমন একটা কথা বল্লেন যার জন্য লজ্জা পাওয়া উচিত। বিলের যে মুখটা জমিদার বাড়ীর অন্দর মহলে ঢুকে খিড়কীর পুকুর হয়েছে, তারি অন্য মুখে বাগদিপাড়া। খিড়কী পুকুরের জলে আপনাদের বাড়ীর বাসন মাজা হয়। এই বাগদিপাড়ার কলেরা জমিদার বাড়ীতে যেতেই জমিদার বিরবাবুর একমাত্র ছেলে আর একটি মেয়ে মারা যায়। নায়েব মশাইকে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন আমার কথা সত্যি কিনা। কলেরা inoccuilation নিয়েছেন ? অমিতা। সেটা আপনার বাগদিপাড়ার জন্যে রাখুন। সুব্রত। spoilt child এর মত কথা হলাে; modern মেয়ের মত হলাে না; পারেন তাে একবারে মেমসাহেব হন-নইলে নকলে ভাল ফল হয় না। প্রসাদ ! (প্রসাদ তুলা ও spirit এর শিশি লইয়া আগাইয়া আসিল ) অমিতা। আপনার স্পর্ধা কম নয়। আপনি আমাকে জোর করে injection দেবেন?

সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক সুব্রত। কোন ভুল নেই। হাত বের কর, আমার অনেক কাজ আছে। অমিতা। জানেন না বােধ হয় আমরা হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাইনে। সুব্রত। Health officer কে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন আমার চেয়ে ভাল কলেরা চিকিৎসক এ জেলায় নেই। (হাত চাপিয়া ধরিল) sleeveটা একটু গােটান। অমিতা। খবরদার বলছি! (ডান হাত দিয়া বাম হাত চাপিয়া ধরিল) সুব্রত। বড়লােকের আদুরে মেয়ে। লজ্জা করছে না ? আজ বিকেলেও আপনি বিলের জলে সাঁতার কেটেছেন! ছটফট করলে বেশী লাগবে! এখানকার কলেরা একেবারে Asiatic type! ১২ ঘণ্টার মধ্যে মরে যায়! হাত সরান- বিরজা। আমি কি তােমাকে একটু সাহায্য করব ভায়া? সুব্রত। বুড়াে ধাড়ী মেয়ে, একটা injection নেবে, তার আবার, ধরতে চারটে লোক, চাই ! সেদিন ট্রেণে আপনার টাকা বােঝাই suitcaseটা নিয়ে আমি পালাইনি, কেন ভুলে যাচ্ছেন কেনআমি আপনার কোন অমঙ্গল করতে পারিনে। (Hypnotised এর মত হাত সরাইয়া ইল) চমৎকার সুডৌল হাত তাে আপনার ! ( injection করিয়া) ৩২ টাকা fee প্রতিশােধ দেবেন। অমিতা। fee! [ অন্য হাত দিয়া সুব্রতের গালের দিকে হাত ছুড়ল। হাসিয়া সুব্রত সরিয়া গেল। অমিতা। তারপর রাগে ক্ষোভে দাদুকে জড়াইয়া ধরিল ]।

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম। বিরজা। ওটা ফি নয়, ভায়া, সেটা আমি কাল পাঠিয়ে দেবে। সুব্রত। তার আর দরকার হবে না, নগদই পেইছি বলে খাতায় শােধ লিখে নেব। (অন্য সিরিঞ্জ লইয়া) আপনি ওহাত গােটান, দাদু, অন্য নাম জানা নেই বলে ঐ নামেই সম্বােধন করলাম। কিছু মনে করবেন না। আপনার আদুরে নাতনীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছিনে। [ দাদুর কোল হইতে মুখ তুলিয়া অমিতা sharply সুব্রতের দিকে চাহিল। সুব্রত injection করিয়া দিল ]। সুব্রত। সামান্য জ্বর আর একটু ব্যথা হতে পারে—অন্য ভয়ের কোন কারণ নেই। জমিদার বাড়ীতে বলবেন—তারা সকলেই যেন inocculation caq! অমিতা। ধন্যবাদ! আর কোন খবর দেওয়ার আছে জমিদার বাড়ীতে ? বললে বাধিত হবে। বিরজা। বিষ নেই বটে, কিন্তু চক্রটা এখনও ঠিকই আছে। সুব্রত। আচ্ছা, নমস্কার । রিহার্সেল বসলে ডেকে পাঠাবেন। fagfs atoopi Romantic Hero, the strong silent man with a mysterious past- (বাহির হইয়া গেল ) অমিতা। কি রকম দেখলেন, দাদু ? বলেছিলাম কিন৷ the most interesting character ! বিরজা। লাঙ্গা তরওয়ারের মত সােজা আর ধারালাে! অমিতা। কিন্তু বড় বেশী ধার ! একটু অসাবধান হলেই হাত কেটে যেতে পারে।

২৪ সংগ্রাম [১ম অঙ্ক বিরজা। ছেলেকে তাে দেখলাম—এখন সে মাকে দেখলেই চক্ষু- কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হয় ! (লীলার প্রবেশ ) লীলা। তার জন্যে আপনাকে আর বেশী দূর যেতে হবে না, বাবা, আমিই সুব্রত ডাক্তারের মা। জিজ্ঞাসা করতে পারিকি আপনারা কি মনে করে এসেছেন ? বিরজা। বাড়ীতে অবিবাহিত নাতনী থাকলে দায়ে পড়ে দাদা- মশাইকে অনেক বাড়ীতে যেতে হয়, মা। আর আমি বিশেষ করে জমিদার বাড়ী থেকে তােমাকে নিমন্ত্রণ করতে এসেছি। গ্রামস্থ শূদ্র, ভদ্র সকলেরই পায়ের ধুলাে জমিদারের বাড়ীতে পড়েছে। পড়েনি কেবল তােমার আর তােমার ছেলের। তাই ভাবলুম এটা মুখুজ্যে কুলীনের অভিমান বা অহংকার যাই হােক না কেন—আমাকে গিয়ে নিমন্ত্রণ করে আসতে হবে। লীলা। আপনার পরিচয়টা জানতে পারি কি ? সুব্রত। (প্রবেশ করিয়া) সেটা আমিই দিয়ে দিইমা। ইনি হচ্ছেন বিখ্যাত ধনকুবের বিরজা মিলের অধিকারী, গ্রামের জমিদার বিরজাপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়। আর ইনি হচ্ছেন দাদামশাইয়ের অতি আদরের ছােট নাতনী শ্রীমতী অমিতা দেবী ডাক নাম বিবি। বিরজা। (হাসিয়া) এখন বুঝতে পারছ, মা ; এই বিবিদের উপযুক্ত সাহেব কোথায় পাওয়া যায়-বাংলা দেশময় তাই খুজে বেড়াচ্ছি। অমিতা। দাদুর যেমন বুদ্ধি ! কলকাতা ছেড়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে এসেছেন সাহেব খুজতে ? বিরজা। (হাসিয়া) তা কি বলা যায় ? শুক্তিপােকার মধ্যে থাকে মুক্তি, আর কয়লার খনির মধ্যে পাওয়া যায় হীরে ! (লীলাকে) এখন বল মা, আমার নিমন্ত্রণ তুমি গ্রহণ করলে ?

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম ; লীলা। আমি কোথাও যাইনি; তবে আপনি যখন নিজে এসেছেন তখন একদিন যাবো। বিরজা। বেশ, মা ; কবে যাবে বলে ?—আমি গাড়ী পাঠিয়ে দেবাে ? লীলা। গাড়ী পাঠানর দরকার হবে না, আমি নিজেই যাবো, আমি রান্না ফেলে এসেছি—অনুমতি করেন তো আমি যাই। বিরজা। যাও, মা; কিন্তু দু-এক দিনের মধ্যে না গেলে আমি নিজে এসে তোমায় নিয়ে যাবাে। (লীলার নমস্কার করিয়া প্রস্থান) বিবি। (সুব্রতকে) আপনিও যাবেন কিন্তু সুব্রত। জমিদারের তরুণী নাতনীর সনির্বন্ধ অনুরােধ, নিশ্চয়ই যেতে হবে। বিবি। (আড় চোখে ) নিজেই যাবেন না গাড়ী পাঠাতে হবে ? সুব্রত। সেকি! ধনকুবের জমিদার বাড়ীতে নিমন্ত্রণ ! করছেন স্বয়ং তার সুন্দরী নাতনী! উড়াে জাহাজের নীচে কোনখানেই চড়বাে না! কি বলেন দাদু ? বিরজা। (হাসিয়া) আমাকে সাক্ষী মেনে বিপদে ফেললে, ভায়া। তােমাদের মত স্বদেশী ছেলেদের কোথাও নিয়ে যাওয়া যায় না-তা আমি জানি। বিবি। (হাসিয়া) আপনাদের নিয়ে যেতে পারে এক কেবল পুলিশ- বিরজা। (হাসিয়া) আর সুন্দরী তরুণী মেয়েদের নীরব আকর্ষণ। এ ছাড়া তােমরা কোন বাঁধনই স্বীকার করােনা। কি বল, ভায়া? (হাস্য) সুব্রত। (হাসিয়া ) বর্তমান ক্ষেত্রে ও দুটোরই সম্ভাবনা আছে কি ? বিরজা। (হাসিয়া) পুলিশ যে নেই সে বিষয়ে তােমাকে নিশ্চিন্ত করতে পারি। কিন্তু বাকীটার কথা বলতে পারলাম না।

সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
মন জুগিয়ে চলি বটে কিন্তু মনের খবর পাইনে। আজ তাহলে আসি
ভায়া।
বিবি। ( যাইতে যাইতে ঘাড় ফিরাইয়া) কাল একবার গিয়ে দেখে
আসবেন আপনার রােগীরা সব কেমন আছে। আর ভদ্রতার খাতিরেও
আমাদের একটু আগিয়ে দিননা?
সুব্রত। (হাসিয়া ) চলুন।
সুব্রত, বিরজা ও বিবির প্রস্থান।
মনীষার প্রবেশ। মনীষা শিক্ষিতা সুবেশা
সালঙ্করা দীপ্তিময়ী তরুণী। তাহার পিছনে
আসিল তাহার দুই suitcase হাতে এক
taxi driver 1
মনীষা। (ড্রাইভারকে) বাহারমে থােরা ঠায়রাে। waiting
charge ভি মিলেগা, বকসিস ভি মিলেগা। আউর দেখে কিসিসে কুছ
কভি নেই কহানা! সমাজায়া ?
ড্রাইভার। যে হুকুম মাইজি। (সেলাম করিয়া প্রস্থান)
কাহার আসার শব্দ পাইয়া মনীষা suit
case দুটি সামনের ঘরে রাখিল ও ভিতরে
গিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল।
মনীষার স্বামী শিবশঙ্কর প্রবেশ করিল।
তাহার এক হাতে বন্দুক অন্য হাতে একটি
painted মেম্। সে suit পর ও বেশ
গােলাপী মাতাল।

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
২৭
fatal Most probably she has come this way.
মেম। May be,
শিব। (সুব্রতের প্রবেশ ) who you may be please?
সুব্রত। well ( নিরীক্ষণ করিয়া ) I put the same question
to yoti ?
শিব। আপনি কি সুব্রত বাবু ?
সুব্রত। কোন সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু আপনাদের প্রয়ােজনটা
জানিতে পারি কি?
শিব।
নিশ্চয়ই পারেন। what shall I say--আপনার প্রিয়
বান্ধবী অথবা আমার স্ত্রী কি এখানে এসেছেন?
সুব্রত। বান্ধবী আমার অনেক আছে। কিন্তু, আপনিই বা কে,
আর আপনার স্ত্রীই বা কে-না জানলে তাে আপনার কথার
জবাব দিতে পারবো না।
শিব। আপনি ঠিক বলেছেন ! He is quite right, don't
you think so darling ?
Garai quite so ! He is a nice boy ! So tall and
handsome !
সুব্রত। (মেমকে চেয়ার আগাইয়া দিয়া) 0'ake your seat
please.
cal Thank you. He is so nice darling. Thank
you very much.
শিব। very many thanks. আপনি ঠিক বলেছেন। আমি
হচ্ছি Mr. S. S. Roy-Here is my card (কার্ডদান )
সুব্রত। (কার্ড লইয়া ) But this does not mean much?.

২৮ সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক . শিব। No? আচ্ছা! সবল বাংলায় আমি হচ্ছি শ্ৰীমান শিবশঙ্কর রায়-আপনার ভূতপূৰ্ব ছাত্রী এবং প্রতি পাত্রী শ্রীমতী মনীষার স্বামী। খুঁজতে এসেছি আমার স্ত্রীকে। সে বাড়ী থেকে চলে এসেছে। Vulgar ভাষায় যাকে বলে গৃহত্যাগ করেছে। দাম্পত্য কলহ আর কি ? একটা বিশেষ জরুরী প্রয়ােজনে তাকে আমার চাই। সুব্রত। আপনি মনীষার স্বামী ? শিব। You crest fallen ! এতে আশ্চর্য হবার কি আছে ? মনীষার ঠাকুরদাদা-ব্যাঙ্কার ভবদেব বাঁড়ুজ্যে পাঁচ বছর আগে আমার হাঁটু ধরে দান করেছিলেন তাঁর সবস্ত্রা সালঙ্কারা নাতনী মনীষাকে— আর ফাউ দিয়াছিলেন যৌতুকস্বরূপ নগদ দশহাজার টাকা। সে টাকা আমি বিলেতে একবছরেই উড়িয়ে দিয়েছি; কিন্তু স্ত্রীটি এখনও ঘাড়ে 6669 175 1 A dead weight and a bad block investment. সুব্রত। কিন্তু এত জায়গা থাকতে মনীষাকে আবার এখানে খুঁজতে এসেছেন যে ? শিব। কারণ খুব সরল। আমার স্ত্রী আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করে, মানে ভালবাসে ! (হাস্য)-না,না, আপনার প্রতিবাদ করার কোন দরকার নেই। কেননা আমি জানি এটা নিছক সত্যি। সে বেশ স্পষ্ট করে আমায় জানিয়ে দিয়েছে যে সে ভালবাসে মনে প্রাণে দুশ্চরিত্র মাতাল স্বামীকে নয়—তার কৈশােরের শিক্ষক সুব্রত ডাক্তারকে, আমি তার জুতার মুখতলার ঘােগ্য নই। (হাস্য ) I don't mind it nor do I envy you. আমি বিলেত ফেরৎ and most modern-minded . আপনার লজ্জা পাবার কোন কারণ নেই। আমি নিজে সৎ নয় (বােতল ও মেম দেখাইয়া) আর মেয়েদের সতীত্বে আমি বিশ্বাস করিনে। দেখতেই তাে পাচ্ছেন?

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
২৯
সুব্রত। হ্যা, দেখতে পাচ্ছি—বৈকী! বেশ দেখতে পাচ্ছি।
শিব। কি দেখতে পাচ্ছেন ?
সুব্রত। দেখতে পাচ্ছি যে আপনি একটা moral pervert !
শিব। what!
7951 A moral wreck and pervert of the worst
type !
শিব। oh ! don't be a silob! মনীষা তােমাকে ভালবাসে
তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। you may live as husband
and wife. বিলেতে এরকম কে অনেক হয়। তার উপর সে আমার
কাছে absolutely useless। তােমরা স্বচ্ছন্দে ভালবাসাবাসি বা
আরও কিছু করতে পারাে। I siinply don't care ! কিন্তু আমার
সঙ্গে একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
সুব্রত। তার মানে ?
শিব। তার মানে ( টাকা বাজাইল) মনীষার নামে তার বাবার
অনেক টাকা আছে। So many thousands ! ut po
মােটা অংশ আমার চাই। For the present I am short of
liquid cash!
সুব্রত। ওঃ ! সে বুঝি পতি পরমগুরুকে টাকাটা দিতে
আপত্তি কচ্ছে ?
শিব। (হাসিয়া) ঠিক ধরেছ! তুমি স্ত্রীলােকদের জানাে দেখছি।
মনীষাই প্রথম শীকার নয়! বেশ! (হাস্য) তার উপর আমার ঠাকুরদাদা
রায় বাহাদুর, হরিশঙ্কর রায় এবং তস্য পুত্র পিতাঠাকুর স্বনামধন্য
৬ কালীশঙ্কর রায়
সুব্রত। কালীশঙ্কর রায়, কোন কালীশঙ্করায় ?..

সংগ্রাম [১ম অঙ্ক শিব। Special Tribunal এর ম্যাজিষ্ট্রেট কালীশঙ্কর রায়—যিনি এক সন্ত্রাসবাদীর হাতে বােমার আঘাতে মারা যান। May his soul rest in peace ! সুব্রত। আপনি তার ছেলে ! নিয়তি। শিব। নিয়তি বৈকী! আমার ঠাকুরদা বাপমরা নাতীটিকে আদর দিয়ে নষ্ট করে, সম্পত্তির একত্র ব্যবস্থা করে গেছেন—যে বেচে বা বন্ধক দিয়ে নগদ কিছু সংগ্রহ করবে—তার কোন উপায় নেই। সব তাতে মনীষার সই চাই। The old fool! বিরহিনী সুন্দরী নাতবৌয়ের সঙ্গে love এ পড়েছিল ! (হাস্য বিলেত থেকে ফিরে আসবার কোন ইচ্ছে ছিলনা। কিন্তু ঠাকুরদা হটাৎ মারা যাওয়াতে টাকা বন্ধ হয়ে গেল। ফিরে এলাম—এখানকার সব বিক্রী করে নগদ টাকা নিয়ে হলিউডে গিয়ে বাস করবে আর film produce করবাে বলে। কিন্তু বুড়াের এমনি উইল যে মনীষার সম্মতি বা সই ছাড়া আমার কিছু করবার উপায় নেই। তাই তাকে আমার দরকার। এতদিন পরে তাকে আমি wrong side এ পেইছি ! (হাস্য ) সুব্রত। অর্থাৎ আপনার কুৎসিৎ চরিত্রে আর ব্যবহারে তাকে বাধ্য করিয়েছেন বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে ? শিব। অবিকল! এতদিন আমি ছিলাম দুশ্চরিত্র মাতাল আর সে নির্যাতিতা সতীসাধ্বী কুললক্ষী—with all the sympathy of the fools on her side! 937 678 gautistant! now we are on equal terms ! ( 919 ) She is such a lovely girlwell bred, well mannered, cultured, accomplished, such delicate and refined temparament! আদর্শ ভালবাসার পাত্রী।

৯ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
মেম।
(হাস্য ) but a bit prudish for nay-laste!) তাকে আমার
দরকার নেই, দরকার টাকার ! হিন্দু সতীস্ত্রীর মতাে পতি পরমগুরুজ্ঞানে
আমার হাতে সব তুলে দিক ; অথবা বিলিতী মেয়েদের মত মাতাল
দুশ্চরিত্র স্বামীকে টাকা দিয়ে তার স্বাধীনতা উপভােগ করুক—আমার
কিছুতেই আপত্তি নেই
It is getting late, darling.
শিব। Surely it is getting late, আমি আর দেরী করতে
পারিনে। এখন বল মনীষা কোথায় ?
সুব্রত। মনীষা এখানে আসেনি।
শিব। নিছকমিথ্যা! no bluff, my dear man, আজ বিকালে
ও আমাদের দাম্পত্যকলহের সময় আমি তাকে শাসাই স্বামীগৃহত্যাগ
করলে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে তার ঠাকুরদার বাড়ীতেও তার জায়গা
হবেনা। ভীষণতর জবাবে সে বলে তার এমন একটা জায়গা আছে
যেখানে সব সময়ে সব অবস্থায় তার স্থান হবে। of course সে
তােমাকেই mean করেছিল।
সুব্রত। সে ঠিক বলেছিল Mr. Roy! সব সময়ে, সব অবস্থায়
তার স্থান এখানে আছে। সে এখানে এলে আমি সুখী হতাম, এ
অবস্থায় তার এখানে আসা উচিত ছিল, এটা আমার দাবী ! কিন্তু তবুও
গভীর দুঃখ এবং দুশ্চিন্তার সঙ্গে জানাচ্ছি সে এখানে আসেনি; এবং
না এলে আপনার মত আমাকে ও তার অনুসন্ধান করতে হবে। আরও
একটা কথা মনীষার সঙ্গে তার বিয়ের আগে থেকে আমার দেখা
হয়নি বা আমাদের মধ্যে কোন পত্রালাপ নেই।
শিব। পু! এ-কথা তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে বল ?
সুব্রত। বিশ্বাস করার শক্তি সকলের সমান নয়, কিন্তু তবুও আমি

সংগ্রাম [ ১ম অঞ্চ ', যা বলছি তা সত্যি। সে যদি এখানে আসে তবে আমি শুধু তাকে আশ্রয় দেব না—তার কাজের সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করবে; এবং আপনাকে তা জানাবাে। শিব। তুমি বলতে চাও যে মনীষা তােমাকে ভালবাসে না, বা তুমি মনীষাকে ভালবাস না ? সুব্রত। আমি মনীষাকে ভালবাসি কিনা সে কথা জিজ্ঞাসা করবার কোন অধিকার আপনার নেই। আর মনীষা আমাকে ভালবাসে কিনা —সে কথা আমি জানিনে-বা সে কথা কোনদিন আমাকে আকারে ইঙ্গিতেও বলেনি। আচ্ছা, আমার অনেক কাজ, এখন আপনারা উঠলে বিশেষ বাধিত হবে। মেম। He may be right, darling- শিব। But where she may be possibly going? Oh ! I forgot.-এই গ্রামে সার বিরজাপ্রসাদের বাড়ী না? সুব্রত। হঁ্যা, ষ্টেশনের ধারে খুব বড় সাদা বাড়ী। শিব। মনিষার ঠাকুরদাদা ব্যাঙ্কার ভবদেব বাড়জ্যে সার বিরজা প্রসাদের বন্ধু ; তার ওখানে আসার কথা আছে। She must be there. Galati I told you so. শিব। আচ্ছা, তােমার কথা মেনে নিলাম এখনকার মত—যদিও Faretta pgat ay. 1 You are a good actor, my dear man ! Let us walk out darling: মেম। Thank you, young man! I am Miss Maurice. You can always find me on the phone. Good Night ! (মেমের হাত ধরিয়া শিবশঙ্করের প্রস্থান) {

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
সুব্রত দরজা খুলিতে যাইয়া দেখিল তাহা বন্ধ, প্রসাদ
‘প্রসাদ’ বলিয়া ধাক্কা দিতেই দরজা খুলিয়া
মনীষা বাহির হইয়া আসিল।
সুব্রত। মনীষা
;
মনীষা। হ্যা, মনীষা, ভেবেছিলাম, হয়ত ভুলে গিয়েছ, চিনতে
পারবে না।
সুব্রত। তাই বুঝি ভেবেছিলে ! (ঈষৎ হাস্য )—বসাে।
মনীষা। না, তা ভাবিনি। এ বিশ্বাস ছিল যে ভুলেও তুমি যাবে
, আর চিনতেও পারবে। কিন্তু এতদিন পরে এতরাত্রে একলা আমাকে
দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছ? -না ? সম্ভ্রান্ত বড়লােকের বাড়ীর মেয়ে
আর এক খ্যাতনামা বড়লােকের ঘরের বউ এতদিন পরে হঠাৎ তারকি
বলব ? দাদার বন্ধু ! না?—দাদার বন্ধুর বাড়ী, একলা এসে হাজির।
আশ্চৰ্য্য ত হবারই কথা !
সুব্রত। তুমি এসেছ, খুসী হয়েছি, মনীষা; কিন্তু তবুও তােমার এই
অতর্কিত আসাটার জন্য আমি ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না।
মনীষা। একদিন আমিও তােমার একটা অতর্কিত আচরণের জন্য
প্রস্তুত ছিলাম না; তাই সেদিন তােমাকে রাগ করে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম ।
আজ নিশ্চয়ই তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না?
সুব্রত। নিশ্চয়ই না।
মনীষা। (ঈষৎ হাসিয়া) তা জানি বলেই আসতে পেরেছি ; তুমি
আমাকে কতদিন পড়িয়েছিলে সুব্রত দা ?
সুব্রত। অনেকদিন।
মনীষা। না; সেকেণ্ডক্লাস থেকে ইন্টারমিডিয়েট—অর্থাৎ আমার
চৌদ্দ বছর বয়স থেকে আঠার বছর বয়স পর্যন্ত তুমি ছিলে আমার

।
সংগ্রাম
[ ১ম অঞ্চ
শিক্ষক আর বন্ধু। তােমার নিজ হাতে গড়া মনীষা! জিজ্ঞাসা করলে
ত একবার কেমন আছ ?
সুব্রত। পরিচয় যেখানে অগভীর, দরদ যেখানে কম, সেইখানেই
জিজ্ঞাসা করে জানতে হয় কেমন আছাে ।
মনীষা।
তা ঠিক, কিন্তু কি দাবীতে এসেছি জানাে ?
সুব্রত। দাবী তাে অনেক আছে। তার যে কোন একটাই যথেষ্ট।
মনীষা। দাদার সঙ্গে পড়েছ, আমায় পড়িয়েছ—জানা শােনা ছিল
এইতাে বলবে ?-না, সে দাবীতে আসিনি। মনে আছে 1. A. পরীক্ষার
শেষ দিন তুমি আর আমি একসঙ্গে ছবি দেখতে গিয়েছিলাম,
সুব্রত। ছবিটার নাম ছিল Melody of Love,
মনীষা। ছবিটা দেখতে দেখতে মাঝখানে তােমার আমার মধ্যে
একটা ছােট্ট ঘটনা ঘটে গেল। তারপর আমি উঠে চলে এলাম।
সুব্রত। কিন্তু তুমি যে কেন সেদিন রাগ করে উঠে এসেছিলে তা
আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি। অন্যায় কিছু হয়ত আমার হয়েছিল,
কিন্তু আশা ছিল হয়ত তুমি সেটাকে ক্ষমা করবে, বা উপেক্ষা করে চলে
যাবে। তুমি তাে আমাকে জানতে।
মনীষা। জানতাম বলেই তাে উপেক্ষা করতে পারিনি।
ক্ষমার কোন প্রশ্নই আসে না। আমিই সেদিন দুজনে ছবি দেখতে
যাওয়ার প্রস্তাব করে Box এর টিকিট কিনি। সেদিন আমার উদ্দেশ্য
ছিল তােমাকে প্রলুব্ধ করা। অবাক হয়ে চাইছ কি? সত্যি কথা বলছি।
আমার কাছ থেকে তুমি তাে নিজেকে অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে রেখেছিলে,
আমিই তাকে আঘাত দিয়ে টেনে বের করেছিলাম।
সুব্রত। কিন্তু মনীষা-
মনীষা। তােমার আমার অবস্থার বৈষম্যকে তুমি খুব বড় করে
।
।

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম দেখতে। তাই ছিল আমাদের নিবিড়তম পরিচয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তাই সে দাবীকে আমি উল্লম্বন করতে চেয়েছিলাম—তােমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে যেখান থেকে আর ফেরবার কোন উপায় থাকবে না। কিন্তু এমন একটা অসতর্ক অবস্থায় তুমি আমায় ধরে ফেল্লে যে তােমার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। তাই নিজেকে বাঁচাবার জন্য মিথ্যে রাগ দেখিয়ে উঠে চলে আসি। কিন্তু প্রতি মুহূর্তেই আশা করেছিলাম তুমি বােধ হয় আসবে। মেয়েদের মনস্তত্ব তুমি জানাে না, তাই সেদিনকার সমস্ত ঘটনাটা তুমি ভুল করেছিলে আর ভুল বুঝেছিলে। তারপর আর তুমি আমাদের বাড়ী যাওনি। সুব্রত। না। কেবল তােমায় একটা চিঠি দিয়েছিলাম। মনীষা। কিন্তু আমি সে চিঠি জবাব দেওয়ার আগেই তুমি ধরা পড়লে। সুব্রত। জেলে বসে পেলাম তােমার বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র। আর সেইটাকেই আমার চিঠির জবাব বলে মনে করে নিয়েছিলাম। মনীষা। সেটা আমার জবাব ছিল না, সুব্রত দা, ছিল আমার ধন- গর্বিত অভিভাবকের। আর তখন আমার বয়স ছিল মাত্র আঠারো। আমিও বােঝাতে পারলাম না—তুমিও ভুল বুঝলে। ( T'axi Driver এর প্রবেশ) ড্রাইভার। মাইজি বহুত দের হােতা হ্যায় ; ফি এতনা দূর ঘুমনে পড়েগা। মনীষা। আউর থােরা সবুর করােদশ মিনিট কিছিসে কুছ নেই বােলা তাে? ড্রাইভার। কভি নেই মাইজি— ( প্রস্থান)

সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
মনীষা। (হাতের চুড়ি খুলিয়া) এইটে রেখে গােটাকতক টাকা
দিতে পারে সুব্রত দা? নইলে taxi ভাড়া দিতে পারবাে না।
সুব্রত। (চুড়ি ফিরাইয়া দিয়া) তার জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না।
আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কত টাকা?
মনীষা। Waiting charge আর বকসি নিয়ে গােটা পঁচিশ
টাকা লাগবে।
সুব্রত এ পকেট ও পকেট, ড্রয়ার খুজিয়া টাকা
সংগ্রহ করিতে লাগিল-মন। স্মিতহাস্যে
তাহাকে দেখিতে লাগিল। কোন রকমে
টাকা সংগ্রহ হইল।
মনীষা। আর্থিক অবস্থা আগেকার চেয়ে বিশেষ ভাল হয়নি দেখছি ?
সুব্রত। (হাসিয়া চলিয়া গেল )
মনীষা উঠিয়া ঘরের চারিদিক ঘুরিয়া
ঘুরিয়া দেখিতে লাগিল—
(সুব্রত প্রবেশ করিল )
মনীষা। ড্রাইভার চলে গেলাে ?
সুব্রত। • হা-
মনীষা। ড্রাইভারকে ফিরিয়ে দেবার আগে একবার ভেবে দেখলে
না, সুব্রতদা ?
সুব্রত। কেন ?
মনীষা। ড্রাইভার চলে যাওয়ার মনে হচ্ছে আজরাত্রে আমার এখানে
থাকা। আমি একলা চলে এসেছি। সামাজিক কলঙ্কের ভয় তােমার
নেই—তা আমি জানি কিন্তু তবুও?

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম সুব্রত। (হাসিয়া) তবুও মনীষা এখানেই থাকবে,শুধু আজ রাত্রের মত নয় যতদিন তার ইচ্ছে, তাতে সে একলা এসেছে বা কারাে সঙ্গে এসেছে এ প্রশ্নটা বড় নয় । মনীষা। কোন কথা জিজ্ঞাসা না করে এমন নির্বিচারে তুমি ছাড়া আমাকে আর কেউ নিতে পারতাে না। তুমি সতত্যই আমাকে ভালবাসতে, সুব্রতদা ? সুব্রত। তােমার কি মনে হয় ? মনীষা। তােমার ভালবাসার অঙ্গীকার আমার দেহে আঁকা আছে, তাকে অবিশ্বাস করার কোন অধিকার আমার নেই। যে কারণে সেদিন সিনেমা দেখতে গিয়ে রাগ করে উঠে এসেছিলাম—আজ ঠিক সেই দাবীকেই আশ্রয় করে এখানে এলাম। জীবনটা এই রকমই ! (মনীষার চোখে জল আসিয়া পড়িল) তােমার সঙ্গে বেশী মেশামেশী আমার ধনী অভিভাবক কোন দিনই ভাল চোখে দেখেননি। বিশেষ করে তােমার খদ্দর পর। সুব্রত। সেটাতাে খুবই স্বাভাবিক। মনীষা। তুমি ধরা পড়ার পর আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলাে যে তােমার আর ফিরে আসবার সম্ভাবনা নেই। জীবনটা যে এত জটিল তা জানতাম না! তখন কেবল মনে হয়েছিল, তুমিই যদি না ফিরে এলে তবে যাই হােক না কেন—কিছুতেই কিছু যায় আসেনা। B. A. পরীক্ষা দেওয়ার পর আমার বিয়ে হয়। নামজাদা ধনীর একমাত্র নাতি-বিদ্যা- বুদ্ধির অভাব টাকায় ঢাকা ছিল। মনে আছে ফুলশয্যার রাত্রে তিনি সারারাত ধরে কোট প্যান্টালুন আর নেকটাই গুছিয়েছিলেন, পরদিন বিলেত রওনা হবেন ব্যারিষ্টারী পড়ার জন্য। এখানকার পাশের বালাই বিশেষ না থাকলেও ব্যারিষ্টারী পড়তে বাধেনা। তাড়াতাড়ি বিয়েটা দেওয়া হলাে এই মনে করে—যেন বিলেত গিয়ে তার চরিত্রটা নষ্ট না ৩৮ সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক হয়। আমার দাদাশ্বশুরের বিশ্বাস ছিল যে বিয়ে হয়েছে জানলে বিলেতের লােকেরা তার নাতির চরিত্রটা রক্ষা করতে সাহায্য করবে। বেচারা বােধ হয় জানতেন না—তার গুণধর নাতির চরিত্র বলে কোন জিনিষ কোন দিনই ছিল না, বা যেটুকু ছিল তা এদেশেই নষ্ট হয়েছিল। সম্পত্তি বেচে বিলেত বাস করবেন বলে দিন কতক আগে ফিরেছেন। দেহটি একটি হাসপাতাল—আর স্বভাব চরিত্র ? কিছুক্ষণ আগে তুমি তত তার পরিচয় পেয়েছে ! সেই মনীষা ! যে মেয়েদের Right to Happiness বলে তােমর সঙ্গে তর্ক করতে। পরিণামটা কী dramatic আর শােচনীয় ! ( হাতে মুখ ঢাকিল ) সুব্রত। দুঃখ তােমার সত্যিই গভীর, মনীষা, কাজেই সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা আমি করবাে না। কিন্তু তবুও বলছি, তুমি একলা নও, যে পচাপঙ্কিল সমাজবিধানের মধ্যে আমরা বাস করছি তার লক্ষ বলির . মধ্যে তুমি একজন। তাদের অনেকের দুঃখ তােমার চেয়ে গভীরতর যাদের দুঃখের কাছে তােমার দুঃখ বিলাস বলে মনে হবে ! মনীষা। নিষ্ঠুর হয়ােনা, সুব্রতদা ; আমি সব সহ্য করতে পারবাে শুধু সহ্য করতে পারবো না তোমার নিষ্ঠুরতা! সুব্রত। নিষ্ঠুর আমি নই, মনীষা,—সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য ! তােমার তো তবু অর্থ আছে, আর আছে, আমি আছি। (মনীষা সুব্রতর হাত ধরিয়া নিজের কপালে রাখিল) কিন্তু এমন মেয়েও সমাজে অনেক আছে, যাদের এর একটাও নেই। নারী পেটের দায়ে দেহ বিক্রী করতে বাধ্য হয়, রুগ্ন ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখের গ্রাস কেড়ে খায় -বুবুক্ষা বর্বর বাপ মা, + ভগবানের সৃষ্ট লক্ষ-লক্ষ মানুষ না খেতে পেয়ে তিলে তিলে রাস্তায় পড়ে মারা যায় ! তাওতাে চোখের ওপর দেখলাম—ভাবতাে তাদের

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
৩৯
দুঃখ কতখানি। কাল সকালে আমার হাসপাতালে গেলে তাদের
সকলের নমুনা দেখতে পাবে।
মনীষা। কিন্তু এখন আমার কি কর্তব্য বলে দাও। মেয়েদের মন
যে বয়সে সবচেয়ে তরল থাকে তখন ছিলে তুমি আমার শিক্ষক। তােমার
চোখ দিয়ে আমি পৃথিবী দেখতে শিখেছিলাম তােমার মনের ছাঁচে গড়ে
উঠেছিল আমার মন। তুমিও তাে শিখিয়েছিলে দেহ দেবতার মন্দিরের
মত পবিত্র ! সে পবিত্রতা আমি আজও রক্ষা করে এসেছি। কিন্তু
বিয়ের মন্ত্রের জোরে অসচ্চরিত্র স্বামীর কুৎসিৎ রােগ পৰ্যন্ত গ্রহণ করতে
হবে ? নইলে আমি নারী-ধৰ্ম্ম থেকে পতিত হব? এই কি
শাস্ত্রের বিধান।
সুব্রত। আজও পর্যন্ত বিধান তাই।
মনীষা। কিন্তু যেখানে মন দিতে পারিনি, সেখানে দেহ দেব কেমন
করে ? তাতে কি নারীর সত্যিকার ধর্ম থেকে পতিত হবে না ?
সুব্রত। হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু সমাজ শাসন বজায় থাকবে।
মনীষা। নইলে ?
সুব্রত। নইলে বিদ্রোহীর শান্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সাহস তােমার আছে ?
মনীষা। পরীক্ষা করে দেখ।
(খানিক স্থিরভাবে থাকিয়া) তােমার সিথির সিদুরটা
মুছে ফেলতে পার, মনীষা
মনীষা। সুব্রত দা!
সুব্রত। বাের্জোয়া ! বাের্জোয়া কুসংস্কারকে ঘুস দিয়ে সুবিধা
কিনবার চেষ্টা করে বিপ্লব করবার সাহস রাখে না!
মনীষা। সুব্রত দা!—তাহলে তােমাকে পাবাে ?
?

৪০
সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
সুব্রত। ছিঃ! নিজেকে ছােট করাে না, মনীষা, আর সেই সঙ্গে
আমাকে! তাহলে তুমি ফিরিয়ে পাবে তােমার হারানাে আত্মাকে—
আর সেই পাওয়াটাই জগতের সব চেয়ে বড় পাওয়া !
মনীষা। তুমি মুছে দাও, দায়িত্বটা তােমার থাক।
( শিবশঙ্করের প্রবেশ )
শিব।
ও কাজটা আমি করতে রাজী আছি, মনীষা দেবী, কিন্তু তার
আগে চাই এই বিক্রী কবলাটায় একটা সই, আর তােমার নিজের টাকা
থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা চে। ( উচ্চহাস্য fine young
man, very clever of you, very clever! সুখ্যাতি করতে
বাধ্য।
Now ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির, তােমাকে দু’মিনিট সময় দিচ্ছি;—আমি
বাপের বেটা-কালীশঙ্কর রায়ের ছেলে (বন্দুক উঠাইল )
সুব্রত। (মনীষাকে পিছনে লইয়া) আর আমি সুব্রত মুকুয্যে
সেই দেবব্রত মুকুয্যের ছেলে—যার হাতে তােমার বাবা কালীশঙ্কর রায়
ভবলীলা সম্বরণ করেন। সুতরাং তােমাকে এক মিনিট সময় দিচ্ছি,
Just clear out !
শিব। তুমি !–আচ্ছা ; এর পরে যেদিন দেখা হবে সেদিন আমার
বন্দুকে গুলি ভরা থাকবে।
সুব্রত। আমি তার জন্য প্রস্তুত থাকবে।
( শিবশঙ্করের প্রস্থান)
মনীষা আগাইয়া গেল--সুব্রত রুমাল দিয়া
তার সিন্দুর মুছিয়া দিল ।
মনীষা। এখন আমার কি কাজ?

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
৪১
সুব্রত। বাগদীপাড়া আর মুসলমান-পাড়া থেকে সাতটা কলেরা
কেস আমাদের হাসপাতালে এসেছে, সারারাত তাদের শুশ্রুষা করার
জন্য তৈরী হয়ে এসাে—
(সুব্রত বাহিরে চলিয়া গেলে--মনীষা তাহার
দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল)

দ্বিতীয় দৃশ্য
••
বিরজাবাবুর সুসজ্জিত হল-ঘর। গল্পনিরত বিরজাবাবু
ও ব্যাঙ্কার ভবদেব। ভবদেব বাবু বৃদ্ধ, মুখে
কূটবুদ্ধি ও বিচক্ষণতার ছাপ।
ভবদেব। মাথা বটে রাজেনের। ও একটা ক্ষণজন্মা পুরুষ ! তােমার
জামাই বলে বলছিনে, ব্যবসার বাজারে অমন বিচক্ষণ লােক আমি
দেখিনি ! তাহলে ঐ কথাই ঠিক থাকলাে। আমি তােমার চিনির কলে
দুলক্ষ টাকার প্রেফারেন্স শেয়ার নেব। এক লাখ টাকা আমার নামে ;
আর আমার নাতি দীব্যেন্দু আর নাতনী মনীষার নামে ৫০ হাজার,
৫০ হাজার।
বিরজা। সে তাে নেবেই। কিন্তু ফাইন্যান্স করবে কত টাকা
পৰ্যন্ত? আর কত সূদ নেবে ?
ভবদেব। দশলাখ টাকা পর্যন্ত ফাইনেন্স করবাে6% সুদ ; তা
একবারেই নাও বা instalment এ নাও। তবে তােমার চিনির কলে
আমার নাতিটার একটা কিছু করে দিও। অবশ্য এটা আমার স্বত্ব
নয়, অনুরােধ।
বিরজা। তােমার নাতি তত M. Sc. পাশ, না ?
ভবদেব। Chemistryতে first class M. Sc. দিন কতক
প্রফেসারী করেছিলো, তারপর দিনকতক পশ্চিমে একটা suger mill এ
মােটা মাইনেতে chief chemist এর কাজ করেছে।
বিরজা। তা হলে ত খুব ভাল ছেলে হে ?
ভবদেব। নিজের নাতী হলেও সে কথা ঠিক বলতে পারবাে না।
;

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
৪৩
স্বভাব চরিত্র অত্যন্ত নির্মল, কিন্তু কেউ বিয়ের প্রস্তাব করলে সত্যের
খাতিরে বলতে বাধ্য হবে। যে মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বিরজা। কেন বলতাে ?
ভবদেব। দোষ যে কোথায় তা ঠিক বলতে পারবাে না। আজকাল
কার এই inodern ছেলে মেয়েদের আমরা যেন ঠিক বুঝতে পারিনে।
কি ভাবে, কি বলে, কি করে। এদের মনের গঠনই অন্য রকম।
বিরজা। আমাদের সঙ্গে কিছু গরমিল তাে এদের হবেই ! আমাদের
যুগে আমরা আদর্শ খুঁজে বেড়িয়েছি ইংলণ্ডে, আর আজকাল কার
ছেলেরা তাদের আদর্শ খুঁজছে রাশিয়ায় ! আমার ধারণা ইংরাজ শাসনের
এইখানেই প্রকৃত পরাজয় হচ্ছে ।
ভবদেব। তাতাে বটেই
তাতাে বটেই। এক আমাদের মত সেকেলে লােক,
আর মােটা মাইনের চাকুরে ছাড়া দেশের অন্য কেউ আজকাল আর কোন
বিষয়ে বিলাতী আদর্শের পক্ষপাতী নয়। এতদিন পরে তাদের ধাপ্পা-
বাজীটা নগ্ন ভাবে ধরা পড়েছে ; আর (হাসিয়া) সেই সঙ্গে আমাদেরও।
কি বলাে ?
বিরজা। সে আর বলে কষ্ট পাচ্ছ কেন?
ভবদেব। হ্যা, চিনির কলের জমি কেনা নিয়ে কি একটা গােলমাল
শুনেছিলাম।
বিরজা। তেমন বিশেষ কিছুই না। তবে যতটা নিঃশব্দে কাজ
হাসিল হবে মনে করেছিলাম, বােধ হয় তা হবেনা।
ভবদেব। বুঝেছি ; ঐ ইনক্লাব জিন্দাবাদের দল,(হাস্য) তা তাদের
কিছু দিয়ে কিনে নাওনা? সেইটেই সবচেয়ে সােজা হবে ।
বিরজা। ঐখানেই একটু মুস্কিল হয়েছে। কোন দল নয়, একটা
অদ্ভুত ধরণের ছেলে! টাকা দিয়ে কেনা যাবে কিনা বুঝতে পারছিনে।

৪৪
সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
ভবদেব। (হাসিয়া) এমন লােক কেউ আছে নাকি যাকে টাকা দিয়ে
কেনা যায়না। Every man has his value এর চেয়ে বড় সত্য কথা
আমি আজও পাইনি। হাত পেতে অবশ্য অনেকে টাকা ঘুস নেয়না ;
অন্যরকমে নেয়। খুঁজে দেখ কোথায় তার দুর্বলতা, সেই খানে ঘা দাও।
মানুষের সব অদ্ভুত sense of honesty আছে !
বিরজা। তা বটে! আমার একটা চাকর ছিল। পকেটে যত
টাকাই থাক না কেন, সে কখনও একটার বেশী চুরি করতাে না। আমি
তাকে অতি সৎলােক মনে করেই তাড়িয়ে দেইনি।
ভবদেব। হঁ্যা, পাছে তার পরের চাকরটা একটাকার বদলে সব
পকেটটাই ফাক করে দেয় ! (হাস্য ) সে কথা যদি বললে তবে শােন।
বছর দশ আগে হঠাৎ আমার নামে দশহাজার টাকার একটা insure
আর একটা বেনামী চিঠি আসে। তাতে পত্র প্রেরক type করা
চিঠিতে লিখছেন যে তিনি ঐ টাকাটা আমার insurance কোম্পানীকে
ঠকিয়ে নিয়েছিলেন—আর আজ সেই টাকাটা সূদসুদ্ধ ফেরৎ দিলেন।
আমি কিন্তু খাতার কোথাও কোন গলদ পেলাম না। টাকাটা কি করি !
বিরজা। Oh; you shylock! তাই সেই সময়ে তুমি সেবাসদনে
হঠাৎ এককালীন দশহাজার টাকা দান করেছিলে ?
ভবদেব। ঠিক ধরেছ ! নামটা আমার হলাে বটে! কিন্তু পুণ্যটা
যে কার হলাে তা বলা শক্ত!
বিরজা। সেটা চিত্রগুপ্তের খাতার জমা খরচটা দেখবার আগে ঠিক
বােঝা যাবে না। (হাস্য )-
(ছবি ও বিবির প্রবেশ ; ছবি চেহারায়
বিবির অনুরূপ কিন্তু একটু শান্তি ও সংযত

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
৪৫
বিবি। আপনাদের ওপরে যেতে হবে, দাদু। (ভবদেবকে উভয়ের
নমস্কার )
ভবদেব। আরে আরে! এই তাে ছবি আর বিবি ! এরি মধ্যে
বেশবড় হয়ে গেছে তাে ! বেশ ! বিয়ের কিছু ঠিক কচ্ছাে ?
বিরজা। চেষ্টা যে কচ্ছিনে তা নয়-
বিবি। কিন্তু ফুল আর ফুটছেনা !
ছবি। (বিবিকে এক কিল মারিয়া) ধেৎ! অভদ্র কোথাকার।
ভবদেব। একসঙ্গেই দুজনের বিয়ে দিয়ে ফেল,—দুটি ভাল পাত্র দেখে।
বিরজা। আমার ও মনে মনে তাই সঙ্কল্প।
বিবি। সেইজন্যেই তাে আমাদের একজনেরও বিয়ে হচ্ছেনা।
ভবদেব। কেন ?
বিবি। ছবির জন্য যে সব পাত্র ঠিক হয় তারা পছন্দ করে আমাকে।
আর আমার জন্য যারা আসে তার পছন্দ করে ছবিকে। ফলে কারাে
বিয়ে হয়না।
ছবি। তুই বড় অসভ্য হচ্ছিস, বিবি ! দাদুতাে কিছুই বলেননা।
বিবি। দাদু, এবার যখন কোন ছেলেকে বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে
আনবেন, তখন বলে দেবেন কার জন্যে ; নইলে ছবি মনে করে আমার
জন্যে ; আর আমি মনে করি ছবির জন্ঠে। কেউ উৎসাহ প্রকাশ করিনে।
ফলে এত চেষ্টা সত্ত্বেও আপনার নাতনীদের বিয়ে হয়না।
ছবি। দাদু, আপনি বিবিকে বকুন! (হাসিয়া ফেলিল)
বিবি। দোহাই, দাদু ; মার কাছে চব্বিশঘণ্টা বকুনি খাচ্ছি! বাবার
কাছে ভয়ে কথা বলিনে। আবার আপনি যদি বকেন তাহলে আমি.
বৈরাগিনী হয়ে চলে যাবে !
ছবি। তাহলে তুমি অভ্যাগত অতিথির সামনে বাচালতা করবে ?
;

৪৬ সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক বিবি। বাচালতা কোথায় পেলি ? দাদুর বন্ধু দাদু। দাদুর সামনে যা করি, ওঁর সামনেও তাই করবাে। ওঁর সত্যি জানা দরকার আমরা কেমন। যদি কোন দুরভিসন্ধি নিয়ে এসে থাকেন (হাদিয়া ফেলিল) তা হলে দেখে শুনেই ঠক্‌লেন ; আমরা ঠকাবে না। বিরজা। ধরা পড়ে গেছ, ভবদেব ! তােমার নাতিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ শুনে আমি ও ঠিক সন্দেহ করে উঠতে পারিনি। Cheerio v• বিবি ! ছবি। দাদু, সব তাতেই বিবির বুদ্ধি দেখেন ! মার জলখাবারের ঘটা দেখে সকলেই সন্দেহ করেছে। বিবি। দাদু, আমাদের দুজনকে দুজায়গায় না করলে কারাে বিয়ে হবেনা বলে দিচ্ছি। ছবিকে কলকাতায় পাঠিয়েদিন ; আর আমি এখানে থাকি। ছবি। (নিম্নস্বরে) সুব্রত ডাক্তারের nurse হবি ? (মুখটিপিয়া হাস্য) বিবি। এটা বুঝি খুব সভ্য কথা হলো ? হালি নয়, মুখ টিপে টিপে ; সে বড় কঠিন ঠাঁই ! কাল থাকলে দেখতে পেতে। আমি তাে তবু রেগে গিয়ে যাহোক একটা কিছু করেছিলাম। কিন্তু দাদু একেবারে ‘স্পিকটি নট। বিরজামিলের সুপ্রসিদ্ধ মালিক ধনকুবের জমিদার শান্ত সুবােধ ছেলের মত হাত বের করে injection নিলেন ! আমার যা রাগ হচ্ছিল ছবি। কী স্পর্ধা! দাদু, আপনি আপত্তিও করলেন না? সুষমার প্রবেশ। সুষমার রং বেশ ফর্সা, মােটাসােটা ধনী গৃহিনীর মত চেহারা। কথা- বার্তায় পল্লীর অশিক্ষিত সারল্য, মনটি একেবারে কাচের মত স্বচ্ছ।

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
৪৭
;
সুষমা। বাবা, জ্যেঠামশাই, আপনাদের জলখাবার দেওয়া হয়েছে,
ওপরে চলুন। তােমাদের কখন পাঠিয়েছি এদের ডাকতে। আর
এখানে এসে দাদুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছ। চলুন আবার সব জুড়িয়ে
যাবে। আমি আজ নিজে হাতে আপনাকে খাওয়াবাে।
ভবদেব। আমার সুষমা মার কাছে এলে ভুরিভােজন করতেই হবে।
আর ক্ষিধেও হয়েছে বেশ! পাড়া গাঁয়ের হাওয়া, কি বল বিরজা ?
(উঠিলেন)
বিরজা। তুমি ১৫টা দিন এখানে থাকো; পশ্চিমে হাওয়ার কাজ
হবে।
সুষমা। তাই থাকুন জ্যেঠামশাই ; আমি আপনার শরীর ভাল করে
দেব। আসুন, (ফিরিয়া) আপনার নাতি কোথায় ? দীব্যেন্দু ?
ভবদেব। একসঙ্গেই train থেকে নামলাম তাে ! আমাকে
তােমাদের মােটরে তুলে দিয়ে বল্লো যে গ্রামট। “একবার রেকেনয়টার” করে
যাবে। (হাস্য) বােধ হয় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সুষমা। কি সর্বনাশ! আমি যে তার খাবার দিইছি।
ভবদেব। তুলে রাখগে, মা, কখন যে ফিরবে তার ঠিক নেই। হয়তাে
বা কোথা থেকে খেয়ে আসবে। একেবারে বদ্ধ পাগল !
ছবি। মজার লােক তো ?
সুষমা। তােমরা এখানে থাকো, দীব্যেন্দু যদি এসে পড়ে তাকে
নিয়ে আসবে।
( ছবি ও বিবি ব্যতীত সকলের বাড়ীর মধ্যে গমন)
ছবি। হারে, বিবি, এই দীব্যেন্দুটি আবার কার জন্যে ? তাের
না আমার?

৪
সংগ্রাম
[১ম অঙ্ক
বিবি। তুই যখন আমার আধঘণ্টার বড়, শাস্ত্রমতে জ্যেষ্ঠ, সুতরাং
তাের জন্যে!
ছবি। নামটি তত বেশ, দীব্যেন্দু ! কিন্তু বস্তুটি কেমন না দেখলে
বােঝা যাচ্ছেনা।
বিবি। তোর যে নাম শুনেই ভাব লেগে গেল ! এখনও তারে
চোখে দেখিনি
ছবি। যা ! (এক কিল কসিল )
বিবি। দেখিস, যেরকম slush কচ্ছিস, maidenly modestyতে
আবার মূচ্ছা না যাস্। পড়তিস সুব্রত ডাক্তারের হাতে !
ছবি। যাবি ভাই একদিন চুপি চুপি সুব্রত ডাক্তারের বাড়ী। আমি
তোের প্রতিদ্বন্দ্বী হবােনা—ভয় নেই ?
বিবি। (স্থির হইয়া) যেখানে আশা থাকে সেখানেই ভয় থাকে ।
সুব্রত ডাক্তার সম্বন্ধে আমার কোনটাই নেই। অতএব তুমি স্বচ্ছন্দে
তার উপর তােমার মায়াজাল বিস্তার করতে পারে। কিন্তু সাবধান করে
দিচ্ছি, সে পাথরের ঠাকুর। (হাত তুলে প্রণাম )
ছবি। সত্যি বিবি, তাের অবস্থা সন্দেহজনক !
গান।
ও মাধবি! সে কথাকি
পড়বে নাকো মনে.......
দীব্যেন্দুর প্রবেশ : পায়ে কাদা, অনেক
ছােট (বা বড়) একটা জামা গায়ে, পরণে
পায়জামা-রুক্ষ চুল-পেয়ারা খাইতেছে ।

১ম অঙ্ক ।
সংগ্রাম
ncajane i Excuse nie please, may I coine in ?
ছবি। Oh yes ! আপনি কাকে চান ?
165Toni Shylock the jew 64, the old tisurer !
আপনি কি oিria ?
বিবি। না উনি Miranda; আপনি নিশ্চয়ই caliban নন্ ?
Acajoy i fine! tfa Antouio, the good merchant of
Venice i Slıylock 6* frco 867 the pound of flesh ! 67967
মাত্র Portia আমাকে বাঁচাতে পারে। তাই ব্যাকুলভাবে তাকে
খুঁজে বেড়াচ্ছি।
ছবি। পাগল নাকি ? আপনার কোন দরকার আছে ?
দীব্যেন্দু। Absolutely nothing! আমার নিজের কোন দরকার
নেই। (বসিল) এবেলার মত একরকম নিশ্চিন্ত—বিপ্লব দীর্ঘজীবী হােক!
খান চল্লিশেক হিংএর কচুরী আর গােটা ত্রিশেক পেয়ারা ! fine thing
this guava, full of vitamind, ataca CG 797 ?
বিবি। দিন্ (লইয়া খাইতে লাগিল ) দীব্যেন্দুবাবু, আপনি বুঝি
সুব্রত ডাক্তারের ওখানে গিয়েছিলেন ?
দীব্যেন্দু। (বিস্মিতভাবে ) But how do you find out
Monalisa ? আপনার চোখে মুখে ঠোঁটে সেই মনালিসার হাসি-
unscrutable, mysterious baffling ? fratca stafa
একটু বিপজ্জনক কিন্তু শালী হিসেবে আপনি অধিকতর মনােরমা ! (ছবি
ও বিবির হাস্য) অভিনয় যাক্। কিন্তু আমি যে আমার পরমস্নেহের
দাদামশাই Shylock the Jew, পূজনীয় ব্যাঙ্কার ভবদেব শর্মার নাতি
দীব্যেন্দু, আর গিইছিলাম first class idiot সুব্রত ডাক্তারের ওখানে-
৪

--- ৫০, সংগ্রাম [ ১ম অং একথা আপনারা কেমন করে জানলেন ? (গৃহে বসসি কৌমারী অটব্যাং গচ্ছসি) বিবি। দেবগুরু প্রদাদেন জিহ্বাগ্রে মে সরস্বতী শুনলাম আপনি গ্রীন রেকনয়টার করতে গেছেন। তারপর দেখলাম আপনার হাতে কলেরা injection! দুই আর দুই এ চার। চলুন বাড়ীর মধ্যে দব্যেন্দু। বাড়ীর মধ্যে আমাকে যেতেই হবে, নিস্তার আমার নেই, আপনাদের দেখে তা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু একটু দাড়ান। আপনারা নিশ্চয়ই সুপ্রসিদ্ধ বিরজাবাবুর most accomplished নাতনীদ্বয় ছবি আর বিবি—I ineau অজিতা আর অমিতা ? বিবি। নিঃসন্দেহে। দীব্যেন্দু। আমার পরম স্নেহের পূজ্যপাদ ঠাকুরদা ব্যাঙ্কার ভবদেব একটি টাকার কুমীর। চক্রবৃদ্ধি সুদে অনেক ভদ্রলােকের সর্বস্ব গ্রাস করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। আমি তার একমাত্র নাতি-বংশের প্রদীপ। এখন সমাজনৈতিক পরিস্থিতি হচ্ছে এই জমিদার বিরজাবাবুর উদ্দেশ্য তাঁর ছবি বিবি নামক সুদরী নাতনীদ্বরের একটিকে কোন সালাে শিক্ষিত অথচ সচ্চরিত্র সুপার স্কন্ধে চাপান ; আর আমার পরম স্নেহাস্পদ পূজনীয় পিতামহ Shylock the Jewর দ্বিতীয় অবতার ব্যাঙ্কার ভবদেবের মংলব এক পয়সা ধার না দিয়ে or finalice না করে শুদ্ধমাত্র পরম গুণধর এই নাতিটির বিনিময়ে—এই জমিদারী এবং বিরজা, মিলের আদ্ধেক স্বওঁ হাত করে নেওয়া। সুতরাং আপনারা যখন ধনকুবের জমিদার বিরজা প্রসাদের নাতনী—তখন যার সঙ্গেই হােক, আমার বিবাহ saugtat! Suel marriages are made in heaven, ostata স্বয়ং এ বিয়ে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন। এ বাের্জোয়া সভ্যতা থাকতে এ আর ভাঙ্গবে না।

৫১ ১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম ছবি। আপনি বুঝি কমুনিষ্ট ? দীব্যেন্দু। তার জন্যে ভয় পাবেননা। আমার কম্যুনিজম only skin deep! আর কমুনিষ্ট হওয়াটাই সবচেয়ে বড় কারণ যে ঠাকুরদার মতের বিরুদ্ধে আমার আবার উপায় নেই। কেননা Comilluitisin is a very costly job! এ বুড়াের টাকা ছাড়া আমার কমুনিজ চলবেনা; এবং সেই জন্যেই তঁার মতেই আমাকে বিয়ে করতে হবে । বিবি। আমরা দুই যমজ বােন। কার ভাগে যে আপনি পড়বেন, সেই এক ভাবনা! দীব্যেন্দু। আমার দিক থেকে বেছে নেওয়ার কিছুই নেই। আপনারা যা ঠিক করে দেবেন, আমি তাতেই রাজী। শুধু নিমন্ত্রণের চিঠিতে ধনকুবের বিরজাবাবুর নাতনী আর প্রসিদ্ধ ব্যাঙ্কার ভবদেব মুখার্জির নাতি এই কথাটা থাকলেই সামাজিক মর্যাদার পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত হবে। ছবি। সেকি । আপনার কোন পছন্দ নেই ? দীব্যেন্দু। পছন্দর কি কোন শেষ আছে? না, একবার পছন করলেই তা আর কখনও অপছন্দ হবেনা? অন্ততঃ পঞ্চাশটে মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে, কিন্তু তাতে লাভ কি? আপনাদের দুজনকেই আমার পছন্দ হয়েছে। তাবলে দুজনেই আর কিছু আমার গলায় মালা দেবেন না ? সব বুঝবার ভুল! আসলে জীবনের ভিত্তি হচ্ছে দৈহিক। যার সঙ্গে যার বিয়ে হােক না কেন বর বধূ একইরকম চিঠি লেখে এক পায়। যাক, এখন আমার একটা অবােধ ছবি। কি বলুন তাে? দীব্যেন্দু। আমার এই বেশভূষা দেখে বা কথাবার্তা শুনে ভয় পাবেন ; এটা আমার prsonality culture করার একটা চেষ্টা মাত্র।

সংগ্রাম [ ১ম অঞ্চ 17677 sta categtal to the back one! Shylock 93 9 আমার শিরায় শিরায় প্রবাহিত আপনাদের সঙ্গে আমার মনের বা মতের কোন অমিল হবে না। কিন্তু দিনকতক আমাকে রেহাই দিতে হবে, তাড়াতাড়ি করে একটা কিছু precipitate করবেন না। বিবি। আমার দিক থেকে আমি আপনাকে রেহাই দিলাম। দীব্যেন্দু। ( ছবিকে ) এখন আপনি যদি একটু ভরসা দেন তবে আমি এখানে দিনকতক থাকি। ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতের গর্ভে থাক। ভবিষ্যৎ দৃষ্টি দিয়ে দেখে বৰ্তমানকে কদাকার করবার দরকার নেই। ছবি। আচ্ছা! আপনার আপাতত কোন ভয়ের কারণ নাই এখন চলুন তাে দেখি বাড়ীর মধ্যে দীব্যেন্দু। বাড়ীর মধ্যে এ অবস্থায় আমি যাব না। আমার পরম স্নেহের দাদা মশায়কে বলবেন আমি আছি সুস্থ, সবল, এবং সজ্ঞান, তঁার কোন দুর্ভাবনার কারণ নেই। বিবি। আপনি বুঝি এখন সুব্রত ডাক্তারের বাড়ী যাবেন ? দব্যেন্দু। সুব্রত ডাক্তার সম্বন্ধে আপনার uncanny penetration! এটা কেমন করে সম্ভব হলাে? বুঝতে পেরেছি। বিবি। কি বুঝলেন বলুন তাে? দীব্যেন্দু। স্ত্রী-চরিত্র দেবতারও দুজ্ঞেয়, তা এ কমরেড দীব্যেন্দু কোন ছার! সব চেয়ে কারা বেশী দান করে জানেন? যারা মানুষ মেরে আর জুয়ােচুরী করে সবচেয়ে বেশী টাকা উপায় করে। যেমন কার্ণেগী, রকফেলার বা তাদেরই দেশী edition মাড়ােয়ারী সম্প্রদায় আমার স্নেহাস্পদ পিতামহ সাইলক-পূজনীয় তার বন্ধু,—অাপনার দাদু। সবচেয়ে সন্ন্যাসী ভক্ত কারা জানেন? ওই তাদের বাড়ীর মেয়েরা। ইয়ােরােপ আমেরিকার ধনীদের মেয়ের ভালবাসায় পড়ে (হা ঘরে ) ১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম গরীব aristocratদের সঙ্গে। ধনী কন্যাদের কাছে তারাই হচ্ছে সব চেয়ে বিপদ জনক ! সুব্রত ডাক্তার হচ্ছে typical aristocrat ! কথায় বার্তায়, চিন্তায়, এমন কি অঙ্গভঙ্গীতে পৰ্য্যন্ত। কাছে গেলে নিজেকে নীচু বলে মনে হবেই! তার ওপরে সে declassed মানে সন্ন্যাসী! ঐ যে সৰ্ব্বস্তত্যাগ করার সাহস ওর মতন বিপজ্জনক আর কিছুই নেই—বিশেষতঃ বড়লােকদের বাড়ীর মেয়েদের কাছে। ছবি। আপনার কথা কিছুই বোেঝা গেল না। বিবি। বা যেটুকু বােঝা গেল তাতে মনে হচ্ছে আপনি সুব্রত ডাক্তারের পক্ষে ওকালতি করছেন ! দীব্যেন্দু। কি সর্বনাশ! আমি dialectic process এ দেখাবার চেষ্টা করছি সে একটা ভয়ানক লােক! এই দেখুন না আজকাল হাই- কোর্টে আগেকার মতন তেমন বড় উকিল নেই। কারণ উকিলদের বুদ্ধি কমে যায়নি, বড় মকদ্দমা কমে গিয়েছে। দেশে টাকা বেড়েছে অথচ মকদ্দমা কমে গেল কেন ? দেশ কি সাধু হয়ে গেছে ? মােটেই না। আসল কারণ তেমন মামলাবাজ লােক নেই। বাংলার পুরণাে জমিদার কুলের বন্ধকী জমিদারী চলে যাচ্ছে ব্যবসাদার মহাজনদের হাতে। এখন তারাই হচ্ছে জমিদার, হেরে যাব, সৰ্বস্ব যাবে এ জেনেও জিদ করে মামলা করতে পারে একমাত্র Aristocrat জমিদাররাই-শাধনী ব্যবসাদাররা নয়–যারা বন্ধকী খতে জমিদারী পেয়েছে, যুদ্ধ করে নয়, এই যে সবটুকু দেওয়ার সাহস Aristocrat দের আছে, আর আছে সর্বহারাদের। পুজিপতিদের নেই বা থাকতে পারে না। সেই জন্যেই হাইকোর্টে বড় উকিল হচ্ছে না এবং সেই জন্যেই (বিবিকে দেখাইয়া) মনালিসার জাগ্রত কৌতুহল সুব্রত ডাক্তার সম্বন্ধে—সেই daring declassed aristocrat--যে নিজের মতের জন্য শেষ পর্যন্ত যেতে ৫৪ সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক পারে বা সবটুকু দিতে পারে। (নীচে হর্ন ও পদধ্বনি) coniing evelts cast their sounds before. নীচে হর্ন ও পদধ্বনি- নিশ্চয়ই কেউ এখানে আসছেন। এখন দয়া করে এইখান থেকে নিঃশব্দে অপসারণের ব্যবস্থাটা করে দিন কেউ দেখবার আগে, কথা দিচ্ছি বৈকালে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করব। বিবি। দেখি দাড়ান, (দেখিয়া ) বাবা আসছেন। ছবি। আমার সঙ্গে আসুন। (দীব্যেন্দু ও ছবির প্রস্থান) রাজেন্দ্রবাবু ও নায়েবমশাই এর প্রবেশ। রাজেন্দ্রবাবু যাকে বলে inaguetic personality, দৃষ্টি তীব্র অন্তরভেদী, কথা স্থির, ধীর ও measured. রাজেন্দ্র। বসুন ; আচ্ছা নায়েব মশাই, এদিকার মধ্যে জমিদার- দের নীচেই আপনি সবচেয়ে ধনী এবং প্রতিপত্তিশালী লােক ? নায়েব। আজ্ঞে সেটা আপনাদের জন্যেই। আজ তিন পুরুষ আমরা এই estate এর সদর নায়েব। মান বলুন, টাকা বলুন, বলুন সবই আপনাদের দৌলতে। তবে ঐ ধন অপবাদটা যতখানি রটে ততখানি নয়। রাজেন্দ্র। কিন্তু আপনি আমাদের চিনির কলের ৫০ হাজার টাকার শেয়ার নিতে চেয়েছেন ? নায়েব। আজ্ঞে ঐ আমাদের সর্বস্ব ! পুরুষানুক্রমে আপনাদের চাকরি করেই আমাদের যা কিছু ; থাকে আপনাদের সঙ্গে থাকবে । যায় আপনাদের সঙ্গেই যাবে। রাজেন্দ্র। যাবার কোন প্রশ্নই নেই। আপনার ঐ ৫০ হাজার কালে ৫০ লাখে দাঁড়াবে—তাতে আর কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি ভাবছি বলুন, খাতির ;

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম আপনার মত প্রতিপত্তিশালী বুদ্ধিমান লােক থাকতে, আর আপনার পিছনে এতবড় ধনীর অর্থ আর প্রতাপ থাকতে প্রজারা একজন অজ্ঞাত কুলশীল হাতুড়ে হােমিওপ্যাথ ডাক্তারের কথা শুনে গােলমাল বাধাবে, এই বা কি কথা ? বিবি। (এতক্ষণ পাখা লইয়া বাবাকে বাতাস করিতেছিল) বাবা তুমি সুব্রত ডাক্তারকে দেখনি, না ? রাজেন্দ্র। না! শুনেছি ছেলেমানুষ ! বিবি। তাই (injection এর উপর ফু দিয়ে হাত বুলাইতে লাগল ) নায়েব। কি জানেন জামাইবাবু, ইংরেজ-রাজত্বের সুবিধে নিয়ে যারা বড়লােক হয়েছে তাদের চেয়ে যারা হতে পারেনি তাদের সংখ্যা অনেক বেশী ; কাজেই আপনি যত বড়লােকই হােন না কেন, ঐ স্বদেশী লােকদের প্রতিপত্তি—দেশের সাধারণ লােকদের কাছে একটু বেশী হবেই। তার ওপর দেখুন, এতকাল ধরে সুজন্মায় থােক, অজন্মায় হোক খাজনার জন্যে কাউকে ক্ষমা করিনি। দেওয়ানী করে, দাঙ্গা করে, লাঠি আর টাকার জোরে নিজেদের অধিকার বজায় রেখে এসেছি, তারা খেলাে, কি খেলল না ; বঁচলো কি মরলাে সে খবর কোন দিনই রাখিনি। আজকের যার। না খেয়ে সে খবর রাখছে তাদের কিছু প্রতিপত্তি তাে হবেই। রাজেন্দ্র। সে কথা ঠিক বলেছেন। কিন্তু আমাদের চিনির কল হলে দেশের টাকা দেশে থাকবে, কত লােক চাকরী পাবে, জমির দর বেড়ে যাবে, চাষাদের উৎপন্ন জিনিষপত্রের দর বেড়ে যাবে, গ্রামের লােকের ব্যবসা বাণিজ্যের কত সুবিধে হবে। আর আমরা কারো জমি কেড়েও নিচ্ছিনে বা কম দামও দিচ্ছিনে। নায়েব। কম দাম ! যা ন্যায্য দাম তার চেয়েও, শতকরা কুড়ি

সংগ্রাম
[ ১ম অঞ্চ
টাকা বেশী দর দিইছি; বায়না নামায় সই করার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক টাকা,
বাকী অর্ধেক রেজেষ্টারীর পরই।
রাজেন্দ্র। তবে বিলের মাঠের জমি বেচবো না, চাষীদের এ মনাে-
ভাবের পিছনে যুক্তি কোথায় ?
নায়েব। কোন যুক্তি টুক্তির ধার চাষীর ধারে না। সুব্রত ডাক্তার
যা বলে ওরা তাই শােনে।
রাজেন্দ্র। কায়দা করে কিছু বেশী দাম আদায় করতে চায়, না
সুব্রত ডাক্তার নিজে কিছু খেতে চায় ?
বিবি। মােটেই না।
রাজেন্দ্র। ( বিবির প্রতি কৌতুহলপূর্ণ দৃষ্টি) তবে?
নায়েব। দিদিমণি ঠিকই বলেছে, জামাইবাবু; লােকটা খুব খাটা।
আজ শত্রুতা কচ্ছে বলে মিথ্যে কথা বললে মহাপাপ হবে, খুব সােজা
লােক। সত্যবাদী, শিক্ষিত, বিনয়ী আবার তেমনি তেজী। দেখুন না,
গায়েতো এত লোক রয়েছে, বাগদিপাড়ার কলেরা যাতে গাময় ছড়িয়ে
পড়তে না পারে তার জন্যে কে মাথা ঘামাচ্ছে ; আগে তো অসুখ বিসুখে
Sanitary বাবুর চুলের টিকি দেখা যেত না। আর আজ ভাের থেকেই
দলবল নিয়ে সুব্রত ডাক্তারের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার উপর
বেজায় সাহস—কিছুতেই ভয় পায় না--
(ব্যস্ত সমস্ত হইয়া গােকুল দের প্রবেশ)
গগাকুল। বাবু, আমাকে বাঁচান, নইলে আমার সর্বনাশ হয়।
নায়েব। ব্যাপার কি গােকুল ?
গােকুল। আপনাদের কাছারীতে আমার একটা লুকোনাে চালের
গুদাম আছে। ৫০০ মন চাল আছে, বাবু—৩২ টাকা দরে কেনা।
সুৰত ডাক্তার আশপাশ গাঁয়ের সব চোয়াড় জড় করে লুট করিয়ে দিচ্ছে।

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম রাজেন্দ্র। লুট করিয়ে দিচ্ছে ? নায়েব। লুট করিয়ে দিচ্ছে কি, গােকুল ? গােকুল। লুট ছাড়া আর কি বলবো, বাবু? কাল থেকে আমাদের এতবড় হাটখানার কোথাও চাল নেই বাবু, যাদের আছে তারা ৪০ টাকার কমে বেচতে চাচ্ছে না। কোন শালা বলে দিয়েছে, বাবু, আমার ৫০ মন চাল লুকানাে আছে—কোন শালা নেমােখারাম ধরিয়ে দিয়েছে। অমনি চাষার পাল এসে দোকান ঘিরেছে ! আপনাদের চরণ তলায় পড়ে আছি, নায়েব মশায়, আপনারা না বাঁচালে কেউ বাঁচাবে না। দোহাই বাবু, আমি এ গায়ে আপনাদের সবচেয়ে বড় প্রজা। বছর শালিয়ানা প্রায় হাজার টাকা খাজনা দেই। কখনও এক পয়সা পড়ে থাকে না। সুব্রত ডাক্তার বাবু, কলিকালে ধর্ম নেই, নইলে কোনদিন ওলাওটা হয়ে গােল্লায় যেতো—আমার পিছনে আড় হয়ে লেগেছে। একখানা মুপি- থানার দোকান করি ; গায়ের লােকের ভেদবমি হলে কি আমার দোষ ? তেল ঘি ভেজাল বলে ধরিয়ে দিয়ে আমার চারবার জরিমানা করিয়ে দিয়েছে ! আজকে আবার Sanitary বাবু নমুনা নিয়ে গেল। জমিদার মানে না, মহাজন মানে না, কোথা থেকে উড়ে এসে বুকে বসে দাড়ী ওপড়াচ্ছে। দুঃখের কথা বলবাে কি, আমার ছেলেটা বিপিন ডাক্তারের কম্পাউণ্ডারী করতাে। আজ বছর কয়েক গায়ে এসে বসেছে, বেশ দু’পয়সা পাচ্ছিল, বাবু, হাতযশও বেশ হয়েছিল। ঐ শালা সুব্রত ডাক্তার বিনি পয়সায় ঔষধ দিয়ে তার পারটামী করে দিল—আবার কুইনাইনের দাম বেশী নিয়েছে বলে একটা নাহোক মিথ্যে মামলা বাধিয়ে মিছিমিছি হয়রাণ কচ্ছে। দোহাইবাবু, সবই আপনাদের প্রজা, পাইক বরকন্দাজ নিয়ে আপনি একবার গিয়ে দাঁড়ালে আর লুঠ করতে সাহস করবে না। নায়েব। পাশেই তো থানা পুলিশে খবর দিয়েছ ?

সংগ্রাম
[ ম স
গোকুল। ও শালারা সব ডাকাত! গায়ের পুলিশ টুলিশ মানে না।
আসততা সহর থেকে সেই বন্দুকধারী পুলিশ—তবে ঠিক মুখের মত জুতাে
হতাে। আমার ৩২১ টাকা মন দরে কেনা ৫০০ মন চাল।
নায়েব। এ সব লুট রাজ পুলিশের ব্যাপার। আমরা এতে কি
করতে পারি বল ?
গােকুল। আজ আমার পিছনে লেগেছে, কাল আপনার পিছনে
লাগবে, বাবু ; ওকে সায়েস্তা করতে না পারলে জমিদারী করে শান্তি
পাবেন না। এ আমি, গােকুল দে, হক কথা বলে দিচ্ছি বাবু। আম্পন্দা
দেখুন বাবু! একেবারে মাথায় উঠেছে। আমি গােকুল দে, ৫০ হাজার
টাকার ওপর আমার তেজারতি কারবার। গায়ের আদ্দেক চাষা আমার
ঘাতক! আজ আমার চালের গুদাম লুট করলো, কাল আপনার কাছারী
বাড়ী লুট করবে!
(দারােগার প্রবেশ)
দারােগা। এই যে গোকুল দে! নমস্কার ছােটবাবু, আপনিও
আছেন ভালই হয়েছে !
রাজেন। সুঠপাট হচ্ছে শুনলাম, দারােগাবাবু,-ব্যাপার কি ?
দারােগা। লুঠপাট ! কার কাছে শুনলেন ?
নায়েব। গােকুল দে বলছিল সুব্রত ডাক্তার নাকি চাষার পাল নিয়ে
তার লুকানাে চালের গুদাম লুঠ করিয়ে দিচ্ছে ?
দারোগা। জানেন তােঢেড়ী দেওয়া হয়েছে। গতকাল থেকে ২০
টাকায় চাল বেচতে হচ্ছে। তার আগে চাল ৪০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল,
হঠাৎ কাল থেকে সমস্ত দোকান হতে চাল উধাও হয়ে গেল। ২০ টাকা
মন তো নয়ই, এমন কি ৩৩৫ টাকাতেও কোথাও চাল পাওয়া গেল
। গোকুলদের অনেক চাল লুকানাে আছে-
=

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
•
গােকুল। ঐ আমার সব শেষ বাবু; আর কোথাও কিছু নেই।
দাবােগা। (হাসিয়া) সুব্রতবাবু চাষাদের সঙ্গে করে নিয়ে এসে
বলেন ঐ চাল কন্টোল রেটে বিক্রী করতে হবে। গােকুল রাজী হয় না।
গােকুল। বাবু, আমার ৩২ টাকা দরে কেনা চাল! মন প্রতি
১২ টাকা লােকসান।
দারােগা। দশ টাকার চালও চল্লিশ টাকায় বেচেছো; তখন মন
প্রতি যে ৩০ টাকা লাভ হয়েছিল ।
গােকুল। দেশে কি একটা আইন নেই, দারােগাবাবু? আমার
চাল আমি যদি না বেচি ! আমার দর পছন্দ না হয় তাের নিসনে!
দারােগা। দেশের আইন আজকাল বদলেছে। আজ সকালে
S. D. O. র অর্ডার নিয়ে সুব্রতবু এসে হাজির। গােকুলদের চাল
seize করে সুব্রতবাবুর কথামত ২০ টাকা দরে বিক্রী করে দিতে হবে।
S. D. O. আবার সুব্রতবাবু আর আপনাদের বাড়ী কে দীব্যেন্দুবাবু
এসেছেন, তাঁর বিশেষ বন্ধু ।
বিবি। ভবদেববাবুর নাতি দীব্যেন্দুবাবু
দারােগা। কাজেই ৫০০ মন চালই গ্রামস্থ এবং আশপাশ গাঁয়ের
চাষাদের মধ্যে বিক্রী হয়ে গেল।
গােকুল। বিক্রী হয়ে গেল। কোন শালা জোচ্ছোর টাকা দেবেন।
দারােগা। টাকা সব আপনাদের কাছারীতে গোমস্তাবাবুর কাছে
জমা হয়েছে। মুহুরীবাবুর কাছে সমস্ত হিসেব পাবে।
গােকুল। আর হিসেব ! আমার ৩২১ টাকায় কেনা চাল, বিরেশী
দশ আনা ওজন! তার ওপর একসের ঢলতা !
দারােগা। তুমি অবশ্য নিজে হাতে বিক্রী করলে ৫০০ মনকে ৮০
মন করতে পারতে। লাভ তাে অনেক খেয়েছ, এখন দেবার সময়

সংগ্রাম
[ ১ম অ
এসেছে। নায়েব মশাই, আপনি গােকুল দেকে নিয়ে টাকাটা সব হিসেব
করে বুঝিয়ে দেবেন। নমস্কার, আমি এখন তাহলে আসি।
(প্রস্থান)
গােকুল। দেখলেন, বাবু; সুব্রত ডাক্তার কী চীজ! এমন পাকা
কাজ যে আইনে পাবার যাে নেই! আচ্ছা! বারে বারে পাখী তুমি
খেয়ে যাও ধান ! আমার নামও গােকুল দে ! বাবু, টাকার পরােয়া
আমি করিনে! ৫০০ মন যাক—হাজার মন চালের দাম আমি খরচ
করবাে! আমার লােকবল নেই। আপনার জমিদার, কোটীপতি।
মাথার মণি ! আপনি যদি একটু অভয় দেন—তবে আমি বাছাধনকে
উঠো ধানের পত্যি করতে দেব না। শুধু আপনার চরণ ছাড়া
করবেন না।
নায়েব। চলাে এখন, সে সব পরামর্শ পরে হবে এখন।
(নমস্কার করিয়া গােকুল দে চলিয়া গেল )
চলি জামাইবাবু
রাজেন্দ্র। লােকটা খুবই শক্ত আর বুদ্ধিমান। যেমন করেই হােক,
আর যে দামেই হােক বিলের মাঠের জমি আমার চাই-ই।
নায়েব। চেষ্টার কোন কষ্ট হবে না। এখন আপনাদের কপাল,
আর ভগবানের দয়া।
রাজেন্দ্র। আপনার বুদ্ধি আর আমার টাকা।
(নায়েব মশাইএর প্রস্থান)
বিবি। কী জঘণ্য লােক ঐ গােকুল দে !
রাজেন্দ্র। ( ফিরিয়া) নিজের স্বার্থ বুঝলে যদি জঘণ্য হয়, তবে
অনেক বড় বড় কোটীপতিও তাছাড়া আর কিছুই নয়।
বিবি। বাবা, তুমি তো আমাকে খুব ভালবাস না ?

১ম অঙ্ক ।
সংগ্রাম
বিবি।
বিবি।
বিবি।
রাজেন্দ্র। তাের চেয়ে ছবিকে বেশী ভালবাসি।
। আমাকে।
রাজেন্দ্র। আমাকে কিছু বলবি ?
সুব্রত ডাক্তারের সঙ্গে তােমার ঝগড়া মিটিয়ে ফেল না
কেন ?
রাজেন্দ্র। ঝগড়া! ঝগড়া তাে আমি কারও সঙ্গে করিনে।
, তা করাে না। কিন্তু ভাবও তুমি কারও সঙ্গে করে
। তােমার মন—যে যন্ত্রের মধ্যে তুমি দিন রাত কাজ করো—সেই
যন্ত্রের মতই কঠোর অমােঘ নিয়মে চলে।
রাজেন্দ্র। (চকিতে ফিরিয়া অল্প হাসিলেন) বিবি। নির্মম বা
নিষ্ঠুর আমি তো নই
বিবি। না, নির্মম বা নিষ্ঠুর তুমি ঠিক নও। কিন্তু তােমার কোথাও
টা নেই, সেইজন্য মায়াও তােমার কিছুতে নেই! তােমার মন অঙ্ক
শাস্ত্রের মত কেবল নির্ভুল উত্তর চায়—তাতে ভাল হলাে, কি মন্দ হলাে
দেখে না। সংসারে কোথাও তােমার মন নেই। নিজের শূন্যতা সহ
করতে পার না বলে দিনরাত কেবলি কাজের পিছনে ছোট। এইখানে
তুমি আর সুব্রত ডাক্তার এক !
রাজেন্দ্র। (সস্নেহে) সুব্রতকে বুঝি তাের খুব ভাল লেগেছে।
মারে?
বিবি। ভাল যে তাকে তত ভাল লাগেই, বাবা।
রাজেন্দ্র। তার বেশী কিছু নয় ?
বিবি। আচ্ছা, একটা খুব ভাল দাতব্য হাসপাতাল আর একটা
free minor school চালাতে মাসে কত খরচ হয় বাবা ? সুত্রঃ
ডাক্তারের চেয়েও ভাল হওয়া চাই।

৬২.
সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
রাজেন্দ্র। তেমন বেশী নয়—ধর বার মাসে বার হাজার।
বিবি।
সেইটে তুমি করে দাও না কেন, বাবা ? গ্রামের সত্যি-
কারের উপকার হবে। যেটা অনেক আগে তোমাদের করা উচিত ছিল,
সেইটেই সুব্রত ডাক্তার করেছে বলে তার এত প্রতিপত্তি। তার অস্ত্র
দিয়ে তার সঙ্গে লড়াই করো-নইলে ছােট হয়ে যাবে।
রাজেন্দ্র। ছােট হয়ে যাব ?
বিবি। নিশ্চয়ই যাবে। সে এমন একটা কাজ নিয়ে এমন জায়গায়
বসে আছে যে তাকে অবাত করার সঙ্গে সঙ্গে দাগ পড়বে তােমার গায়ে।
তাকে হারিয়ে দিতে পারে, কিন্তু জিততে পারবে না।
রাজেন্দ্র। বিবি, সুব্রত ডাক্তারকে হারিয়ে দেওয়ার জন্য আমি এক
লাখ বাহাত্তর হাজার টাকা খরচ করবাে ঠিক করেছি। যে টাকাটা সেদিন
ট্রেনে তাের stuitcase এ ছিল ।
বিবি।
রাজেন্দ্র। তাের মার সঙ্গে আমার বিয়ে হবার আগে আমি ছিলাম
একরকম সন্ন্যাসী। আজ সুব্রত ডাক্তার যে কাজ কচ্ছে, সেই ছিল আমার
কাজ, অবশ্য যদি একটু তফাৎ। যে কথাটা কেউ জানে না—বিলের
মাঠের জমি আমি চিনির কলের জন্য কিনছিনে। চিনির কল হবে
station এর ধারে। সে জমি কেনা হয়ে গেছে।
বিবি। তবে বাবা?
রাজেন্দ্র। ঐখানে একলাখ বাহাত্তর হাজার টাকায় হাসপাতাল আর
স্কুল করে সুব্রত ডাক্তারের দেনা শােধ করবাে। আমার ২৫ বছরের
২৫ বছর আগে আমি যখন গেরুয়া ছেড়ে এই জমিদারীর
ম্যানেজার হয়ে আসি, তখন থেকেই আমি এর জন্যে তৈরী হচ্ছি।
বাবা, তুমি যে কত বড়, আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।
বাবা !
বিবি।

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম ৬৩ বিবি। রাজেন্দ্র। একদিন তাের ঐ সুব্রত ডাক্তারও জানবে। সুব্রত ডাক্তারের কাছে আমার এখনও হার ; সেইদিন জিতবাে। ( সুব্রতের প্রবেশ) রাজেন্দ্র। কে ? কে তুমি ? সুব্রত। আমি সুব্রত ডাক্তার ! আপনি--রাজেনবাবু ? বিবি। হ্যা, আমার বাবা, (সুব্রতের নমস্কার) আপনার দোকান লুট শেষ হয়েছে ? রাজেন্দ্র। বসে। সুব্রত। (না বসিয়া) আপনার কাছে একটা অনুরােধ জানাতে এসেছি। রাজেন্দ্র। কি বল ? সুব্রত। আপনারা গ্রামস্থ প্রজাদের যে খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছেন, তা দিন কতক স্থগিত রাখলে ভাল হয়। গ্রামে কলেরা দেখা দিয়েছে ব্যাপকভাবে। রাজেন্দ্র। সে তো গরমকালে এখানে প্রতিবছরই হয়। সুব্রত। আগে হতাে বটে; কিন্তু এখন আর তেমন হয় না। অর্থাৎ আপনি এখানে আসার পর—এই তাে বলতে চান? সুব্রত। মিথ্যা নয়। সবটুকু না হলেও, অনেকখানি আমার জন্যে। কলেরা দেখা দিয়েছে বলে গ্রামের লােকে কিছু আর না খেয়েও থাকবে না, বা দুধ-সবুও খাবে না। তবে আমাদের বাড়ীতে খেতে আপত্তি কি ? আমরা না হয় মাছ ভাতই খাওয়াব। তার ওপরে কিছু দই মিষ্টি। সুব্রত। আপনারও কি এই মত ? বিবি। বিবি।

৬৪ সংগ্রাম [ ১ম অঞ্চ রাজেন্দ্র। আগে তোমার উত্তরটা শুনি। তারপর দরকার হলে আমার মতও বলবাে। সুব্রত। আপনারা জমিদার, ধনী, মৰ্যাদাসম্পন্ন। যত লঘুপাক ভােজের ব্যবস্থাই করুন না কেন, ঐ সব বুভুক্ষিত চাষাদের কাছে গুরু- পাক হবেই। তারা রাক্ষসের মত খাবে, আর যা খেতে পারবে না তা বেধে নিয়ে যাবে পরদিনের জন্য। কাজেই লঘুপাক মাছ ভাত খাওয়ান বা গুরুপাক লুচি পুরীই খাওয়ান, বিশেষ বিপদের আশঙ্কা আছে। বিবি। কেন ? আপনি দাঁড়িয়ে থেকে তদ্বির করবেন যাতে তারা কম খায় ? সুব্রত। পাতের কাছে অনেক পেয়েও কম খেতে পারে তারাই যাদের নিত্য ভুরি ভােজনের ব্যবস্থা পাকা করা আছে। কিন্তু যারা শাক ভাতও বছরের অর্ধেক দিন পেট ভরে খেতে পায় না ; মােণ্ডা মেঠাই খাবার জন্যে যাদের তাকিয়ে থাকতে হয় আপনাদের মত ধনী দাতাদের সাময়িক মহানুভবতার ওপরে, তাদের পক্ষে হাতের কাছে পেয়েও কম ; খাওয়া অসম্ভব। বিবি। অসম্ভব! সুব্রত। হ্যা। যেমন অসম্ভব বিশেষ দুর্দিনেও আপনাদের কাছে খাজনা মাপ চাওয়া। বিবি। ও! তা সেরকম অসম্ভব হলে আপনার কষ্ট করে এতদূর অনুরােধ করতে আসা নিছক সময় নষ্ট ! বাবা ঠিক করেছেন এ-বছর সত্যই যারা অপারগ সেই সব প্রজাদের খাজনা অবস্থা বিচার করে অর্ধেক বা পুরাে মাপ করে দেবেন। রাজেন্দ্র। তুমি এ-কথা বিশ্বাস করতে পার, সুব্রত। সুব্রত। আপনি সমর্থন না করলেও আমি বিশ্বাস করি। আপনার ১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম মহত্ত্বেরই পরিচয় দিয়েছেন। গরীব প্রজাদের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিচ্ছি। বিবি। গরীব প্রজাদের পক্ষ থেকে অত কষ্ট করে আপনি আর না-ই বা করলেন। ধন্যবাদ দিতে হয়, গাল দিতে হয় তারাই দেবে। সুব্রত। আমিও আপনাদের একজন প্রজা, এবং গরীব বলতে পারেন। বুঝতে পেরেছি আপনার কোথায় লাগছে। কিন্তু আমি কোন রূঢ়তা প্রকাশ করতে আসিনি। আমার কথার মধ্যে জ্বালা থাকলেও বিদ্বেষ একেবারেই নেই। এখন আপনার মতটা জানতে পারলে? রাজেন্দ্র। শােন সুব্রত, তােমার কথার মধ্যে যে যুক্তি আছে, তা আমি অস্বীকার করবাে না। কিন্তু জমিদারেরও একট। মৰ্য্যাদা আছে। ভােজের জন্য সংগৃহিত জিনিষপত্তর লােকসান কোন প্রশ্ন নয়। কিন্তু গ্রামস্থ শূদ্র, ভদ্র সকলকেই বলা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নিমন্ত্রণ ফিরিয়ে নিয়ে ভােজ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে তােমাকে কথা দিচ্ছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে যতদূর সম্ভব সাবধান হওয়া যেতে পারে তার কোন ক্রুট হবে না। বিবি। আপনাকেও আমরা অনুরোধ করবাে-একটু দেখাশােনা করে সব সুব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। রাজেন্দ্র। আশা করি প্রজারা সকলেই খেতে আসবে। (একটু থামিয়া) আমি সঙ্কল্প করেছি যে সব প্রজারা আসবে তাদের সকলকেই একজোড়া করে বিরজা মিলের ধুতি বা সাড়ী এবং পাঁচটা করে টাকা দেব। সুব্রত। জমিদারের মর্যাদার উপযুক্ত হবে সন্দেহ নেই। রাজেন্দ্র। আর একটা ব্যাপারে তােমার সাহায্য এবং পরামর্শ চাই। আমি মনে করেছি এই গ্রামে একটা ভাল দাতব্য হাসপাতাল—সেই

৬৬
সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
সঙ্গে একটা destitute hone আর একটা Free Mitor school
স্থাপন করবে বিরজা Trust find থেকে। গ্রামের প্রতিষ্ঠান, যাতে
সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দর হয় গ্রামবাসী সকলকেই দেখেশুনে নিতে হবে। আশা করি
এতে তোমার সব রকম সাহায্য পাবাে ?
সুব্রত। অতি সাধু সঙ্কল্প ! আমার আন্তরিক সাহায্য আপনি
পাবেন,—অবশ্য যদি প্রয়ােজন হয় ?
বিবি। আমি মনে করেছিলাম--আপনার দেশসেবার পেশা চলে
যাবে মনে করে হয়তো আপত্তি করবেন ?
সুব্রত। দেখুন, স্বর্গ থেকে দেশসেবার সনন্দ নিয়েও আমরা কিছু
আসিনি ; আর আমি পেশাদার দেশসেবকও নই।
বিবি। তাই নাকি ?
সুব্রত। দেশসেবাকে পেশা হিসেবে নিতে হলে যে টাকার
দরকার তা আজও আমি জমাতে পারিনি, কখনও পারবও না।
সে অধিকারটা চিরদিন আপনাদের মত অর্থশালী লােকদের জন্যই অক্ষুন্ন
থাকবে। সুতরাং ভয় পাবেন না।
বিবি। আমার ভয় পাওয়ার কথা নয়, আপনি তখন কি করবেন ?
সুব্রত। কলকাতায় গিয়ে হােমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিস করবাে-
বড়লোক মহলে মোটা fee নিয়ে।
বিবি। তা B.s.c, L.M.P. মােক্তার-Homeo! বেশ জমকালাে
সুব্রত। (সেও হাসিয়া উপায় কি বলুন!. পেশা উঠে গেলে আর
কেমন করে থাকবাে? পাঁচবছর আপনাদের গ্রামের সেবা করেছিলাম
বলে আমায় কিছু মাসােহার ব্যবস্থা করে দিয়ে রেখে দেবেন না।
রাজেন্দ্র। তুমি কি সত্যিই চলে যাবে, সুব্রত ?

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম ৬৭ সুব্রত। নিশ্চয়ই না। বিবি। তখন গ্রামে বসে কি করবেন ? সুব্রত। তখন আমার কাজ হবে গরীব জনসাধারণকে বুঝিয়ে দেওয়া যে শােষক সম্প্রদায়ের এই যে জনহিতকর অনুষ্ঠান—এটা একজাতীয় ঘুস, —তাদের বিপ্লবের পথথেকে বিভ্রান্ত করার জন্য। আমি এখন যাই। রাজেন্দ্র। শোন, আর একটা কথা। আমি শুনেছি তােমার প্ররােচনায় নাকি চাষীরা আমাকে জমি বিক্রী করতে অস্বীকার করছে—একথা কি ঠিক ? সুব্রত। আপনি ঠিকই শুনেছেন, তবে আমার প্ররােচনায় নয়, পরামর্শে। রাজেন্দ্র। জানতে পারিকি তােমার এ পরামর্শ দেওয়ার কারণ? জমির দামতো আমি কম দিচ্ছিনে? সুব্রত। নিশ্চয়ই পারেন। জমির যা ন্যায্য দাম অনেক স্থলে আপনারা তার চেয়ে বেশী দিয়েছেন। অন্ততঃ কোথাও কম দেননি। কিন্তু জমি বিক্রীর নগদ টাকা হাতে পেয়ে চাষীরা আর জমি কিনছে না, ইলিশ মাছ খেয়ে, আর কুটুম্ব খাইয়ে সব টাকা খরচ করে ফেলছে। ফলে এতদিন যারা ছিল ভূমির অধিকারী চাষা, আজ তারা হয়ে পড়েছে ভূমিহীন। অর্থনৈতিক সংগ্রামে তাদের বেশীর ভাগই টিকে থাকবে না, যারা বা কোন রকমে বেঁচে যাবে তাদের হতে হবে আপনাদের মিলের মজুর! রাজেন্দ্র। এতে কি দেশের অমঙ্গল হবে? তােমরা স্বদেশী করেছ, তােমাদের তাে বােঝা উচিত। দেশের নিজস্ব শিল্পবাণিজ্যের বিস্তার না হলে এ বৈদেশিক অর্থনৈতিক শােষণ কিছুতেই বন্ধ হতে পারে না। আজ এতকাল পরে যুদ্ধের কল্যাণে ভারতীয় ব্যবসাদারদের হাতে এসে ৬? সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক পড়েছে প্রভূত টাকা আর প্রভূত সুযােগ। এই সময় যদি যুদ্ধের শিল্প বাণিজ্যের বিস্তার না হয়, তবে আর কবে হবে ? প্রত্যেক দেশসেবককে এতে সাহায্য করা উচিত। সুব্রত। চমৎকার বলেছেন ! যে কথা আপনার ঐতিহাসিক ভূমিকা হিসেবে বলা উচিত। দেশের শিল্পবাণিজ্যের বিস্তার না হলে অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ হতে পারে না একথা আমরা জানি। দেশের শিল্পবাণিজ্য বিস্তারে আমাদের আপত্তি হতে পারে না। কিন্তু সে বিস্তৃত শিল্পবাণিজ্যের অধিকারী হবে কারা? এইখানেই প্রশ্ন। সেই বিস্তৃত শিল্পবাণিজ্যের অধিকারী এই পুঁজিপতিদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হবে কতখানি সেইখানেই প্রশ্ন। ভারতের রাজনৈতিক সমস্যা ও সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে বােম্বাই কলওয়ালা ধনীদের যুদ্ধোত্তর ভারতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, —এই প্রতাপপুর গ্রামে বিরজা সুগার মিল স্থাপন, আপনার দাতব্য হাসপাতাল, অবৈতনিক স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প—এই সমস্ত ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা—একই বুদ্ধি প্রণােদিত। এই যুদ্ধের কল্যাণে ভারতীয় ব্যবসাদারদের হাতে এসে পড়েছে প্রভূত পয়সা, পণ্যের কর্তৃত্ব এবং সুযােগ —যা আবার আত্মপ্রকাশ করবে নূতন শিল্পবাণিজ্যের বিস্তারের মধ্যে। ঐতিহাসিক যুক্তির সঠিক পারম্পর্য ! এতদিন পরে Semi-fuedal, Sem-ii dustrialise1 ভারতবর্ষে দেশীয় পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক তথা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিলেত আমেরিকার ধনীদের মত দৃঢ়প্রভাব বিস্তারের প্রথম ব্যাপক চেষ্টা। কিন্তু ইনক্লাব জিন্দাবাদ। তা হবেনা। আমি সুব্রত ডাক্তার, বাংলার এক অখ্যাত পল্লীগ্রামের হাতুড়ে হােমিও- প্যাথদেশের সেই দুঃস্থ, দুর্গত চাষী মজুরদের প্রতীকরূপে বলছি তা কখনও হবে না। কারণ আমরা হতে দেবনা। রাজেন্দ্র । (বিস্ময় ও কৌতুহলের সঙ্গে সুব্রতের কথা শুনিতেছিলেন) কেমন করে আটকাবে ?

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম সুব্রত। বল্লাম যে “ইনক্লাব জিন্দাবাদ”। ঐ আমাদের মন্ত্র এবং অস্ত্র দুইই। বিরজা সুগার মিল বা আপনার school বা হাসপাতাল সুব্রত ডাক্তার ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু ভারতীয় বাের্জোয়াদের রাজনৈতিক অভীষ্ট সিদ্ধ হবেনা। যুদ্ধোত্তর যুগে বর্তমানের অস্বাভাবিক কর্মোদ্যমের কলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আসবে এক ভীষণ প্রতিক্রিয়া। তার ফলে তাদের হাতে রাষ্ট্রশক্তি যাবার পূর্বেই বাঁধবে সংগ্রাম। সে সংগ্রামে আমরা দেখবাে আপনারা আছেন আমাদের বিপক্ষের শিবিরে। সেই সংগ্রামের চূড়ান্ত মীমাংসা হবে সেইখানে—যেখানে জমির মালিক হবে চাষা, আর কলের মালিক হবে মজুর। রাজেন্দ্র। তোমার কথা যদি সত্যি হয়, সুব্রত, তবে তােমার সঙ্গে আমার সংঘর্ষ অনিবার্য। সুব্রত। দিনের পর রাত্রি যেমন অনিবাৰ্য তেমনি। রাজেন্দ্র। কিন্তু কোন রকম করে সেটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না? সুব্রত। যায়। আমি যদি বিশ্বাসঘাতকতা করি। আপনি নিশ্চয়ই আমাকে সে কাজ করতে বলবেন না ? রাজেন্দ্র। নিশ্চয়ই তা বলতে পারব না। তােমাকে আমার পথ থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে পারি ; পারি কেন নিশ্চয়ই করবাে। কিন্তু একথা বলতে পারবাে না যে তুমি আদর্শ ভ্রষ্ট হও। সত্য, ধৰ্ম্ম, ন্যায়, নিষ্ঠা, সুবিচার, এসব কথাগুলাে, আমরা এই বাের্জোয়া সম্প্রদায়—একদিন সভ্যতার সবচেয়ে বড় আদর্শ বলে জোর গলায় প্রচার করেছিলাম। কিন্তু আজ আমরাই সবচেয়ে আগে ঐ কথাগুলাের ওপর শ্রদ্ধা হারিয়েছি। মুখে স্বীকার না করলেও মনে মনে বুঝতে পেরেছি যে আমরা ভ্রষ্ট, ভণ্ড, শঠ, লোভী, প্রতারক। আমি একজন তােমরা যাকে বলে পরশ্রমভোগী পুজিপতি বা তার প্রতিনিধি। তাই কথাটা হয়ত আমার মুখে আশ্চৰ্য্য ;

সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক শােনাবে। অনেক সময়ে যখন নিজেদের এই ভণ্ডামি, প্রবঞ্চনা, অসারতা অসহ্য হয়ে আসে, তখন আমরাও সতৃষ্ণ চোখে তাকাই তােমাদের দিকে – ভবিষ্যতের উন্নততর মহত্তর সমাজগঠনের আশা নিয়ে। সুব্রত। আপনার সম্বন্ধে আমি ভুল ধারণা করেছিলাম। রাজেন্দ্র। (হাসিয়া) এখন যা ধারণা কচ্ছে সেটাও ভুল হতে পারে। আমার কথা শুনে এ-মনে করাে না যে যেখানে আমাদের স্বার্থের সংঘাত-সেখানে তােমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বিরত হবাে বা শত্রুতায় কার্পণ্য দেখাবে। স্বার্থের খাতিরে, জেদের বশে বা মর্যাদার জন্যে ছলে বলে কৌশলে তােমাকে হয়তাে দমন করবাে। কিন্তু ভাল কাজ করেছি বলে মনে গর্ব অনুভব করতে পারবাে না। আমার এই অনুরােধটা তুমি রাখাে। আমি সঙ্কল্প করেছি বিলের মাঠের জমিগুলাে আমি নেবাে। আমি জীবনে কখনও সঙ্কল্প ভ্রষ্ট হইনি। আমার কত দিনের আশা—তুমি প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে তাতে বাধা দিওনা। আমার স্ত্রী এই গ্রামের মেয়ে বলে, এই গ্রামের ওপর আমার বড় মায়া। এখানে আমি বাস করবাে বলে এসেছি। টাকা দিয়ে মানুষ যা করতে পারে সেই সব কাজ আমি করে দেবে। এতে আমার কোন ব্যক্তিগত বা শ্রেণীগত স্বার্থবুদ্ধি নেই। এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে অযথা তুমি আমার সঙ্গে বিরােধে এসাে না,-এ আমার অনুরােধ সুব্রত। ( স্থির ও গম্ভীরভাবে ) আপনার অনুরােধ আমি রাখতে পারবাে না। যে প্রতিষ্ঠানের সেবক আমরা,—যে মহাত্মার নির্দেশে চলি—তাতে কারাে সঙ্গে অযথা বিরােধে আসা আমাদের নীতিও নয় ধৰ্ম্মও নয়। কিন্তু বিরজা কটন মিলের মজুরদের পেটমার অতিরিক্ত মুনাফার টাকা খাটবে বিরজা সুগার মিলে; আপনাদের একশ টাকার শেয়ার কালে হাজার টাকায় দাড়াবে,—আর এতকাল ধরে রােদে ১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম ৭১ জলে, শীতে গ্রীষ্মে, সুজন্মায় অজন্মায় মাটি চাষ করে ফসল ফলালে যারা,সেই হাজার বারশ ঘর প্রজা যাবে জমির বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে ! আর একে আপনি অযথা বিবাদ বলছেন ?-আপনার স্ত্রীর জন্মভূমি বলে এই গ্রাম আপনার কাছে যতখানি প্রিয়—তার চেয়ে অনেক বেশী প্রিয় চাষাদের ঐ সাত পুরুষের বাস্তুভিটে যার থেকে আপনি চাচ্ছেন তাদের উচ্ছেদ করতে—এই মন্বন্তর আর মহামারীর সুযােগ নিয়ে ! কারাে সঙ্গে বিবাদ আমরা চাইনে ; কিন্তু যা ন্যায় এবং সত্য- সেই পথে চলতে গিয়ে যদি বিবাদ আসে, তবে তা দেখে আমরা ভয় পাইনে। রাজেন্দ্র। (গম্ভীর ভাবে আমি কখনও কাউকে দু-বার এক কথা বলিনে। তবুও তােমাকে বলছি আমার কথা ভাল করে ভেবে দেখ, সুব্রত ! সুব্রত। (হাসিয়া) ভয় দেখিয়ে যাদের টলানাে যায়, আমি সে ধাতের নয়। আমি ভাল করে ভেবে দেখেই বলছি। নিয়তি আমাকে এই গ্রামে এনেছে। যা আমার আদর্শের প্রতিকূল বলে মনে করবাে তাতে আমি বাধা দেবই। পারি না পারি আলাদা কথা। রাজেন্দ্র। ও-বিলের মাঠের জমি আমি নেবই। যদি সরল ভাবে না পাই তবে টাকা আর লাঠির জোরে সুব্রত। (হাসিয়া) লাঠি বের করে তারাই, যাদের লাঠি ছাড়া অধিকার প্রতিষ্ঠার আর কোন উপায় নেই। রাজেন্দ্র। সব অধিকারের মূলে হচ্ছে—ঐ লাঠির জোর। তারপর আইন। সুব্রত। টাকা বা লাঠি কোন জোরেই আপনি বিলের মাঠের জমি নিতে পারবেন না। ( ছবির প্রবেশ)

१२
সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
;
রাজেন্দ্র। বেশ।
ছবি। বাবা, একবার ওপরে চলে; দাদু ডাকছেন। ভবদেব বাবু
এসেছেন।
রাজেন্দ্র। কখন এলেন ?
ছবি। সকালের ট্রেনে। ( বিবিকে ইসারায় ‘এ-কে ? meaning
সুব্রত)
রাজেন্দ্র। (উঠিয়া) তুমি বসাে সুব্রত, আমি আসছি। (বিবির
প্রতি ছবির অর্থপূর্ণ এই সুব্রত ডাক্তার’—দৃষ্টিক্ষেপ )
(রাজেন্দ্রবাবুর প্রস্থান)
বিবি। আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। আমার অভিন্ন
ছবি। লজ্জা করে না বলতে ? বন্ধু !-না, না, আমি ওর দিদি-
ছবি-ভাল নাম অজিত।
সুব্রত। আর আমি সুব্রত ডাক্তার।
fafai The strong silent man with a mysterious
past.
ছবি। চব্বিশ ঘণ্টা আপনার সুনাম আর দুর্নাম শুনতে শুনতে কান
জলে গেল!
সুব্রত। গােপনে গােপনে যে আমার এত খ্যাতি রটে গেছে, তাতে
জানতাম না ?
বিবি। দেশের জন্য আত্মত্যাগের ফল! নাম তাে হবেই।
সুব্রত। সে তাে দুর্নামটা ! গাঁয়ে মানে না আপনি মােড়ল,
ভূইফোর leader, কংগ্রেসের বিলমারা স্বদেশী জোচ্ছাের, পুলিশের
spy, চাষার ন্যাতা চাষা—এ সমস্ত পুরাণাে শােনা কথা ! কিন্তু সুনামটা
এলাে কোথা থেকে ?
।

১ম অঞ্চ ]
সংগ্রাম
ছবি। সে ও বিবি! (ছােট করিয়া বিবিকে) জপিতে জপিতে
নাম অবশ হইল তনু।
বিবি। আপনি আমাকে যতখানি গাল দিয়ে বেড়ান, আমি সত্যিই
ততখানি খারাপ নই।
সুব্রত। কি সর্বনাশ! আমি আপনাকে গাল দিয়ে বেড়াই।
বিবি। Spoilt child ; বড়লােকের আহলাদে আদুরে নাতনী,
বাের্জোয়া, পুজিপতি, ধনবিলাসী—এগুলাে বােধ হয় খুব ভাল কথা নয় ?
সুব্রত। কিন্তু ওর একটাও গাল নয়
ছবি। না, স্নেহের তিরস্কার ! (উচ্চহাস্য : চাকরে চা লইয়া আসিল)
সুব্রত। ধন্যবাদ ।
ছবি। আপনি চা খান না?
সুব্রত। নিশ্চয়ই খাই।
ছবি। তবে খাবেন না যে?
সুব্রত। সাধারণতঃ আমি কোথাও খাইনে; এমন কি খুব বড়
লােকের বাড়ী ভদ্রতার খাতিরেও না।
বিবি। আর অসাধারণতঃ ?
সুব্রত। আমি কেবল তাদের বাড়ীই খাই—যারা শুধু সামাজিক
কায়দা হিসেবে চা আর সিগারেট আগিয়ে দেয় না, খাওয়াবার পিছনে
রাখে আন্তরিকতা, তারা আমার সঙ্গে বসে খায়, আর তাদের বাড়ীর
মেয়েরা পরিবেশন করে খাওয়ায়।
বিবি। হুল ফোটাবার একটা সুযােগও ছেড়ে দেবেন না?
সুব্রত। আর আপনি ও কিছু মুখে মধু মাখিয়ে কথা বলেন না !
[ এক হাতে খাবারের থালা, অন্য হাতে জলের গেলাস বগলে আসন লইয়া
সুষমার প্রবেশ। চাকরের হাতে এক ঘটি জল ও ফেলার পাত্র ]।

৭৪। সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক সুষমা। নিশ্চয়ই তুমি, বাবা, সুব্রত ! বসসা, বাবা, বসাে, ওঁর মুখে শুনলাম তুমি এসেছে। আজ আমাদের বাড়ী প্রথম এসেছ, একটু কিছু মুখে না দিয়ে যেতে পারবে না। বিবি আসনটা পেতে ঠাই করে দেত মা ; ছবি থালাটা ধর (তথাকরণ ) বসাে বাবা বসে। এসব আমি নিজে হাতে তৈরী করেছি। ঠাকুর দুটো আছে বটে, বকে ঝকে রান্না বান্নাও কিছু শিখিয়েছি। তবুও বাবা অন্ততঃ একটা তরকারী নিজে হাতে রেধে না খেলে তৃপ্তি হয়না। হাতটা ধুয়ে নাও, জল দে ছবি। (তথাকরণ ) বিবি। কেন মিছিমিছি অপমান হতে এসব নিয়ে এসেছ, মা ? উনি বড়লােকের বাড়ী কিছু খাননা। সুব্রত। ঠিক নয়, মা। সাধারণতঃ আমি কোথাও খাইনে। কিন্তু আপনি মা, হাতে করে এনেছেন—আমি নিশ্চয়ই খাবাে। ছবি। তবে চা খেলেন না কেন ? বিবি। বুঝলি নে, আমরা দিইছিলাম বলে ! সুষমা। চা খায়নি বেশ করেছে। দিন নেই, রাত নেই কেবল ওই বাটি বাটি চা খাওয়া—আমি দুচক্ষে দেখতে পারিনে। দুচার বাটী দুধ খা, যে গায়ে গাও লাগবে, দু’এক গেলাস ঘােলের সরবৎ খা যে দেহ ঠাণ্ডা হবে। তা নয় কেবল দিনরাত চা আর চা! বলব কি বাবা একটা ঠাকুর আর কিছুই করেনা, কেবল দিনরাত ঐ কতকগুলো পাতা সেদ্ধ করতে হিমসিম খেয়ে গেল! এ যে কি সভ্যতা বাবু বুঝিনে? জপ নেই আহ্রিক নেই সকাল বেলা উঠেই একবাটী চা মুখের কাছে। আর কি বলব! বলতাে, বাবা মেয়েদের মধ্যে একটু আধটু ধৰ্মকৰ্ম্ম না থাকলে কি সংসার থাকে ? বিবি। মা আমাদের নিলে করার একটা সুযােগও ছাড়ে না !

১ম অঙ্ক ] সংগ্রাম সুষমা। এ আবার নিন্দে কোথায় ? যা সত্যি তাই বলছি। এটো-কাটা পৰ্যন্ত মানে না, আর বেশী বলবাে কী? ছবিটার তবু একটু বুদ্ধি শুদ্ধি আছে ; আর এই যে বিবিটে যেমন চেহারা তেমনি বেয়াদব- আর বচনে যেন একটি মােক্তার! (ছবি ও বিবি হাসিয়া উঠিল ) সুব্রত। সে আমি খুব ভাল জানি, মা। আদরে আদরে একেবারে মাথায় উঠেছে। সুষমা। ঠিক বলেছ বাবা ! বাবার আদরেই মেয়ে দুটো একেবারে মাথায় উঠেছে। আর উনিও তাে কখনও কিছু বলেন না। সুব্রত। তা আপনি শাসন করতে পারেন না ? সুষমা। শাসন ! হা আমার কপাল ! আমাকে মানে যে শাসন করবাে ? একটা কথা শশানে ? বলি যদি বাঁ দিক দিয়ে যা, যাবে ডান দিক দিয়ে। সুব্রত। আপনার কাছে নয় যা হয় হলাে, কিন্তু পরের বাড়ী যেতে হবে তাে ? তারাে তত বেশী দেরী নেই ! [ দুই বােনে খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল ] সুষমা। বলােতাে, বাবা! বিবি। আমাদের নিলে করতে পেলে, মার ঘরের লােক বাইরের শােক জ্ঞান থাকে না ? সুষমা। বাইরের লােক কোথায় পেলি লা? সুব্রত গাঁয়ের ছেলে, পেটের ছেলের মত ! ছবি। আমি মা তােমার খুব ভাল মেয়ে, না ? সুষমা। কত ভাল তা আমি জানি। বিবিটা ডাকসাইটে বজ্জাত, আর তুমি নিঃশব্দে করে।—এই যা তফাৎ!

সংগ্রাম [ ১ম অঙ্ক বিবি। আমার হাতে একখানা দাও না ; খুব ভাল গন্ধ বেরিয়েছে । সুষমা। নে হাত পাত। গরম গরম খেয়ে নে। তাের আর লজ্জায় কাজ নেই ছবি! সুব্রত পেটের ছেলের মতাে! (ছবি ও বিবির চপ ভক্ষণ ) বিবি। (সুব্রতকে নিম্নস্বরে) দেখুন আপনার সঙ্গে খাচ্ছি; আর বােধ হয় আপনার মর্যাদাহানি হলাে না ? সুষমা। পেট ভরে খেতে হবে, বাবা । সুব্রত। আর দেবেন না, মা। তাহলে আর বাড়ী ফিরে যেতে পারবাে না। ছবি। তার জন্যে ভাববেন না। আমরা গাড়ী করে পাঠিয়ে দেব। সুষমা। নে হাতে জল দে, ছেলেদের হাতে করে খাওয়াতে আমার খুব ভাল লাগে, বাবা। ভগবান নিজের পেটে ছেলে দেননি। ঐ যমজ মেয়ে দুটো হওয়ার পর ডাক্তার বল্লো আর ছেলে পিলে হলে বাঁচব না। রাজার ঐশ্বৰ্য্য বাবা।-ঐ মেয়ে দুটোর পেটে ছেলে পিলে হয়ে ভােগ করে তবেই সার্থক ! হাসছি যে বেহায়ার মতত? তােয়ালে দে। বাবার আমার যেমন চেহারা, তেমনি সুশ্রী খাওয়া! এরকম চেটে মুটে খেলে কি খেয়ে তৃপ্তি, না খাইয়ে তৃপ্তি ? আমার বাবা, পাত চেটে খেলে তৃপ্তি হয় না। ভাগ্যি, বড় লােকের মেয়ে হইছিলাম, নইলে খাওয়া দেখে লােকে বলতো হা ঘরের মেয়ে! সুব্রতকে মশলা দে। এই মেয়ে দুটোকে নিয়ে হয়েছে বিপদ! পরের বাড়ী চলে যাবে ভাবলে বুকখানা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়! চোখের সামনে থাকে, বকি, আদর করি এক রকম দিন কেটে যায়। ওদের শ্বশুর বাড়ী পাঠিয়ে এই শূন্য পুরীর মধ্যে বাস করা যায় বলােততা, বাবা?

১ম অঙ্ক 1 সংগ্রাম ৭৭ সুব্রত। তাই কি যায় ? একটি ছেলে থাকলেও বিয়ে দিয়ে বৌ-মাটিকে নিয়ে এসে ঘর করতেন। সুষমা। তােমাদের স্বদেশী ছেলেদের কথা শুনলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আর আজকালকার হালফ্যাসানের ছেলে সব, পা-জামা পরা, বারসাই মুখে—দেখলে গা বিষ বিষ করে। বিবি। তােমার স্বদেশী ছেলেরাও লুকিয়ে লুকিয়ে কম বিড়ী খায়না? সুষমা। তা খাক গিয়ে—তবু তারা অনেক ভদ্র! সেবার মাগি ভাতার জন্যে আমাদের কলে ধৰ্ম্মঘট হইছিল। পুলিশে পুলিশ একেবারে গিজিগিজি ; যে সব ছেলেরা পিকেটিং করতে এসেছিল দেখলে বুক ফেটে যেত বাবা—আমি তাদের লুকিয়ে লুকিয়ে কত খাবার টাকা পাঠিয়ে দিতাম। (হাসিয়া ) একদিন ধরা পড়ে লাঞ্ছনার একশেষ ! সুব্রত। আপনি মা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা ! আপনাকে দেখে বুঝতে পাচ্ছি এ বাড়ীর এত সৌভাগ্যের মূল কোথায় ! সুষমা। আমার কি মনের ইচ্ছে জান, বাবা ; দুটি বেশ সৎগরীবের ছেলের সঙ্গে মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই করে রাখি। (দুই বনের হাসি) বিবি। (অলক্ষ্যে ) সাবধানে থাকবেন এবার। সুষমা। হাসি কিসের ? ঘর-জামাই নাকি অপমানের কথা ! বলি বাবা যে আমার বিয়ে দিয়ে জামাইকে বাড়ীতে রেখে ছিলেন; তাতে ওঁর কি মানের হানি হয়েছে ? না উনি দশের মধ্যে একটা মাথাওয়ালা মান্যগণ্য হতে পারেন নি ? আর আমার ছেলে নেই, যে ভবিষ্যতে ছেলে জামাইতে বিবাদ হবে। তােমাদের স্বদেশী ছেলেদের মধ্যে তাে কত খাসা খাসা ছেলে আছে, দুটি ভাল ছেলে দেখে দিতে পার না, বাবা?

৭৮
সংগ্রাম
[ ১ম অঙ্ক
ছবি। (আস্তে ) দেখুন যদি পারেন তাে, ভাল ঘটক বিদেয় পাবেন।
(সুব্রত গালে হাত বুলাইল)
বিবি। মা, তুমি যেমন করে বলছে, তাতে সুব্রতবাবু মনে করতে
পারেন যে তুমি ওঁকেই এক জামাই ঠিক করে ফেলেছ।
সুষমা। তাতে দোষ কি হলাে বাবা ? একটি ভাল ছেলে দেখলে
সব মেয়ের মার ইচ্ছে হয় তাকে জামাই করতে।
বিবি। আর মেয়েদেরও যদি ইচ্ছে হয় ঐ রকম—তখন কি হবে ?
সুষমা। শােন একবার মেয়ের কথা ! কত পাত্র উঠলে তবে
একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়। কথায় বলে জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, তিন
বিধাতা নিয়ে !
সুব্রত। এখন উঠি মা। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এমন
অনাবিল মন নিয়ে যদি আমরা সকলেই এমনি সরল ভাবে কথা বলতে
পারতাম, তাহলে জীবনে অনেক দুঃখের হাত থেকে রেহাই পেতাম।
এখন আসি মা। [ সুব্রত সুষমাকে প্রণাম করিল ]
সুষমা। এসসা, বাবা, বেঁচে থাকো, একশ বছর হয়ে—সুখে শান্তিতে
থাকো; বেশী আর কি বলবাে।
বিবি। দয়া করে মাঝে মাঝে পায়ের ধূলাে দেবেন, বল না মা ?
সুষমা। সে কি আর বলতে হবে ? আমরা এক গাঁয়ের মানুষ ,
মাঝে মাঝে না এলে রাগ করবে—বাবা। একদিন তােমাদের বাড়ী
গিয়ে তােমার মার সঙ্গে আলাপ করে আসবাে।
[ ছবি ও সুষমা পিছনে ছিলেন। ছবি
হাসিয়া ঘাড় বাকাইয়া বিবির দিকে সহাস্য
কৌতুক দৃষ্টিপাত করিল—বিবি ইসারায়
সুব্রতকে বলিল—ড়ন—সুব্রত

১ম অঙ্ক ]
সংগ্রাম
৭৯
থামিল—বিবি ছবির দিকে
আগাইয়া আসিল ]
বিবি। রূপ কথা পড়েছেন ? চুপ করে থাকলেন যে? জিজ্ঞাসা
করছি রূপ কথা পড়েছেন ?
সুব্রত। ( অনেকক্ষণ বিবির দিকে তাকাইয়া, পরে তাহার কথার
ইঙ্গিত বুঝিয়া) পড়েছি। কিন্তু সেখানে রাজকন্যার বিয়ে হয় চিরদিনই
রাজপুত্রের সঙ্গে।
বিবি। এমন রূপ কথাও আছে, যেখানে সােনার বরণ রাজার কন্যা-
মেঘের মত চুল—গজমােতির হার পরিয়ে দেয় রাখাল ছেলের গলায় !
সুব্রত। কিন্তু শেষে দেখা যায়—সে রাখাল ছেলে সত্যিই রাখালদের
ছেলে নয়—ছদ্মবেশী রাজ্যহারা রাজপুত্র। বিবি, শােন, এই হাতে বােনা
মােটা খন্দরের কাপড়ের আর ঐ মিহি দামী জর্জেট এককরে গাঁটছড়া
বাঁধা যায় না! বা কোন রকমে বাঁধলেও সে বাঁধন শক্ত বা সুখের হয় না।
ভালবাসি—কেন না ভাল না বেসে থাকবার উপায় নেই। কিন্তু জীবনটা
বায়স্কোপের ছবির মত নয় ; কাজেই ভুল করে না বা ভুল বুঝো না ।
বিবি। দূর থেকে নমস্কার ! (বলিয়া সুব্রত একটু তফাতে থাকিতেই
প্রণাম করিল ) এটা আন্তরিক ; বিশ্বাস করতে পারেন।
সুব্রত। কিন্তু কেন ?
বিবি। পাথরের নারায়ণকে মেয়েদের ছোঁবার অধিকার নেই।
শুধু দূর থেকে প্রণাম করতে হয়।
[ বিবির দ্রুত প্রস্থান—সুব্রত তার দিকে
চাহিয়া রহিল-মনীষা অলক্ষে আসিয়া
বিবির প্রণামটা দেখিয়াছিল ]

৫০
সংগ্রাম
(১ম অঙ্ক
মনীষা। [ Looking intently at Bibi's retreating
figure ] Congratulation !
সুব্রত। ভুল বুঝো না মনীষা।
( মনীষা যাইবে কি দাড়াইবে বুঝিবার আগেই
-দীব্যেন্দু-যে মনীষার সঙ্গেই প্রবেশ
করিয়া সব দেখিয়াছিল—প্রবেশ করিল)
দীব্যেন্দু।' (তিনজনের প্রতি বেশ ভাল করিয়া দেখিয়া ) “এতক্ষণে
জানি কেমনে লক্ষণ পশিল রক্ষোপুরে” (সুব্রতের প্রতি) “কিন্তু হায়,
তাত! উচিত কি তব এ কাজ ?” “অমরবৃন্দ যার ভুজবলে কাতর
(সুব্রতকে দেখাইয়া) ঐ অমিতা সিন্ধুর বুকে কুল পেলল! কিন্তু শােন
কমরেড জগৎসিংহ! এ জগতে কমরেড আয়েষার প্রণয়াকাঙ্ক্ষী দুই
জনের স্থান নেই। সুতরাং অস্ত্র বাহির করাে,-হয় তােমাকে নয় এই
কমরেড ওসমানকে দুনিয়া ছাড়তে হবে !
( ছবির প্রবেশ )
ছবি। (তাকাইয়া) ব্যাপার কি ?
দীব্যেন্দু। ক্লাইভ স্ট্রীটের prospective extention ছকু খান
মামার Lane পৰ্যন্ত [ সুব্রত ও বিবিকে দেখাইল উল্টা হাতে ]
সুব্রত। কি বলতে পারেন নিয়তি নাট্যকর দ্বিতীয় অঙ্ক।
দীব্যেন্দু। এখন পরিচয়টা করিয়ে দেই—আমার বােন মনীষা
এসেছে আমার স্নেহাস্পদ সাইলকের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে,-ছবি-
বিবি (উভয়কে দেখাইল)
বিবি। আর ইনি সুব্রত ডাক্তার—আমাদের পল্লী সমাজের
রমেশ! (হাস্য )
মনীষা। কিন্তু রমা কোনটি ? নিশ্চয়ই তুমি ?

২য় অঙ্ক ] সংগ্রাম আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে রমার পার্ট বোধ হয় আপনাকেই দিতে হবে ! মনীষা। তা কি বলা যায়—এ যাত্রায় বােধ হয় তাে আমায় জ্যাঠাই- মার পাটেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে! ছবি। চলুন আপনারা সব ওপরে ; বাবা আপনাকেও যেতে বলেছেন, সুব্রতবাবু। সুব্রত। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করাে, মনীষা-- মনীষা। অপেক্ষা আমি তােমার জন্য নিশ্চয়ই করববা সুব্রত-দা- বিবি। চলুন রমেশদা (হাস্য ) [ দীব্যেন্দু ও মনীষা ব্যতীত সকলের প্রস্থান । মনীষা। ঠাকুরদাকে আমার কথা সব বলেছ, দাদা? দীব্যেন্দু। ইঙ্গিতে কিছু আভাস দিইছি মাত্র। বুদ্ধিমান লােক, গুরুত্বটা তাতেই বুঝে নিয়েছেন। মনীষা। এমন একটা জীবন মরণের ব্যাপার নিয়েও তুমি রহস্য করাে । দীব্যেন্দু। তার কারণ আমি সত্যিকারের রসিক। হাসির কথায় সাধারণ লােকও হাসে; দুঃখের কথায় হাসতে পারে তারাই যারা সত্যিকারের অসাধারণ। আর তাছাড়া দুশ্চরিত্র স্বামীর ঘর থেকে দাদার বন্ধুর বাড়ী গিয়ে থাকা এমন একটা ভয়াবহ সামাজিক ব্যাপার নয় যে তার জন্যে-দুঃখ করতে হবে! মনীষা। তুমি থামাে দাদা,—ও কথা আমার ভাল লাগছে না। দীব্যেন্দু। আমাদের মুখ থেকে শুনে একটু গা সওয়া হয়ে যাওয়া ভাল। ভবিষ্যতে অনেক শুনতে হবে ! তবুও স্বীকার করছি তুই ঠিকই করেছিস। যে কোন মূল্যেই হােক না কেন, মুক্তি সর্বদাই বরণীয়।

সংগ্রাম [ ২য় অঙ্ক মনীষা। কিন্তু কুলত্যাগিনী বােনের জন্যে তােমার বিয়েটা আবার ভেঙ্গে না যায় ? দীব্যেন্দু। না যাওয়া তাে উচিত!—তবুও যদি যায় তাে যাক। তার জন্যে দুঃখিত হবে না ! মনীষা। দুঃখিত নিশ্চয়ই হবে। দীব্যেন্দু। তা একটু হয়ত হবে। তবে সে এমন মারাত্মক কিছু হবে না। তাের তার জন্যে ভাবনা নেই। Shylock আসছে! বুড়ো সেকেলে সমাজের সাদাসিদে লােক। এক পয়সার বাজার ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সৎ আর সামাজিক আদর্শে বিশ্বাসী। তাকে অযথা আঘাত করাে না। ( প্রস্থান) ( ভবদেবের প্রবেশ) ভবদেব। আরে আরে দিদিভাই,ভাল তাে? (মনীষার নমস্কার ) মন কি ! মস্ত বড়লােক দেখে মা বাপ মরা নাতনীর বিয়ে দিইছিলেন। দুঃখ কিসের ? বাড়ী, গাড়ী, সাড়ী, হীরে জহরতের গয়না, অভাব কিসের ? কেবল স্বামীদেবতা রাত্রে বাড়ী থাকেন না, আর যেদিন বা থাকেন সেদিন খিস্তি খেউর-আর দুই এক ঘা লাথি জুততা! হিন্দু মেয়ের পক্ষে তা এমন আর কি বেশী। আমার এক set নূতন হীরের গয়না হয়েছে—দেখবেন, দাদাভাই ? Hamilton এর বাড়ীর খুব grand ! ভবদেব। অত বড় বংশের ছেলে-শিবশঙ্কর যে এমন মানুষের বার হয়ে যাবে তা জানতাম না ! সবই তােমার কপাল। জানতেন বৈকী। বিয়ের আগে হবু নাত-জামাই- এর চরিত্র সম্বন্ধে অনেক জনশ্রুতি কানে এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু বিশ্বাস করেননি। মন্ত বাড়ী, মন্তু নাম আর অনেক টাকা দেখে মনীষা।

২য় অঙ্ক ] সংগ্রাম ভুলে গিইছিলেন। আর সুব্রতর সঙ্গে মনীষার বেশী মাখামাখি আপনার সামাজিক মর্যাদার হানিকর বলে তাড়াতাড়ি তার বিয়ে দেওয়ার দরকার হইছিল। আমার কপালের দোষ দিই না—দোষ দিই আপনার। আপনার নিজের প্রচ্ছন্ন লোভ, আর তার মাপকাঠিতে গড়া মিথ্যা সামাজিক মর্যাদা-জ্ঞান আমার এই দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী ! আমি শশুর বাড়ী থেকে চলে এসেছি—আর কখনও ফিরে যাব না মনে করে। ভবদেব। সে-কি! মনীষা। ভয় নেই আপনাদের সামাজিক মর্যাদার। আমি এখানে বা আপনাদের সংস্পর্শে থাকবাে না। আমার নামে যে টাকা আছে তাতেই আমার চলে যাবে। ভবদেব। কিন্তু মনীষা, হঠাৎ এমন কি ঘটলো যার জন্যে তুমি চলে এলে ? মনীষা। এমন বিশেষ কিছুই না। দাম্পত্য কলহ ! তিনি আমার নামে যে টাকাটা আছে চাইলেন-নইলে মদ মেমের খরচ চলছে না আমি দিতে অস্বীকার করলাম। ফলে কলহ এবং কুলবধু মনীষার গৃহত্যাগ ! ভবদেব। সেটা এমন কি কারণ যার জন্যে মনীষা। বুঝলেন দাদাভাই, হিন্দু শাস্ত্রকাররা মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারিণী না হতে দিয়ে কী অপূৰ্ব্ব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন! চিরদিন পুরুষের দাসী হওয়া ছাড়া তাদের আৰু কোন উপায় অবশিষ্টই থাকবে না। দাদা শ্বশুরের উইলে আমার সম্মতি ও সই ছাড়া—টাকা পাবার উপায় নেই। তার ওপর স্বামী দেবতা বুঝলেন আমার এই তেজ যা কুকথা আর ছাতি জুতােতেও ভাঙ্গা যায় না, তার মূলে বােধ হয় আমার ঐ টাকাটা! সুতরাং সেটা তার চাই। আমিও দিতে নারাজ। স্বভাবতই

৮৪
সংগ্রাম
[ ২য় অঙ্ক
অবাধ্য স্ত্রীর ওপর রাগ হলাে,-এবং পড়লাে পিঠে stick দিয়ে দু'ঘা।
আমার ও গায়ে জোর কম নয়। আমিও সেই sick কেড়ে নিয়ে দিলাম
বেশ জোরে ঘা কতক। নেশা ছুটে ভদ্রলােক যেন কি রকম হয়ে গেল।
সিড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। আমিও গয়নার বাক্স আর suitcase
গুছিয়ে taxiতে একেবারে সুব্রতদার বাড়ী, কাল রাত্রে সেখানেই
ছিলাম। আজ দাদার মুখে শুনলাম আপনি এখানে এসেছেন। তাই
একবার দেখা করে জানাতে এলাম। ভয় নেই আপনার, এখনি
চলে যাবাে সুব্রতদার ওখানে
ভবদেব। কোন সুব্রত ?—যে ছেলেটির সঙ্গে
মনীষা। হঁা, যে ছেলেটির সঙ্গে ছেলেবেলায় আমার ভালবাসা
হইছিল—যার সঙ্গে আমি সঙ্কল্প করেছিলাম পালিয়ে যাবে'—এবং যেতামও
যদি না সে ধরা পড়তাে।
ভবদেব । ছিঃ ছেলেমানুষী করাে না, মনীষা ! ওকথা বলতে নেই।
আমি একবার শিবশঙ্করকে বুঝিয়ে দেখি ।
একবার কেন, একশবার বুঝিয়ে দেখতে পারেন ; কিন্তু
আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। এতদিন পরে আপনাদের সামাজিক
ধাপ্পাবাজি ধরা পড়েছে,-আজ বোঝাপড়ার দিন এসেছে, সত্যকে আর
গলাটিপে চেপে রাখবার উপায় নেই।
ভবদেব। হঠকারিতা করতে নেই। তুমি মেয়ে মানুষ সেটা ভুলে
গেলে চলবে না।
মনীষা। সেটা ভুলতে পারিনি বলেই তাে আপনাদের আদর্শমত
পতিতা হতে পারলাম না ! চলি দাদাভাই, আমি যাবাে সুব্রতদার
ওখানে, থাকবােও ওখানে—যতদিন আমার স্থান হবে।
ভবদেব। তুমি চলে গেলে আমি বুঝবে, মনীষা মরে গেছে।
মনীষা।

২য় অঙ্ক ]
সংগ্রাম
মনীষা। না; বুঝবেন মনীষাকে আপনার মেরে ফেলেছিলেন
কিন্তু আপনাদের সামাজিক ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে সে আবার নূতন করে
বেঁচে উঠেছে। সে আর কোন কিছুতেই ভয় পায় না।
( মাতাল শিবশঙ্করকে ধরিয়া নায়েব মশাই এর প্রবেশ )
শিব। ছেড়ে দিন ; I and quite all right now-very
niany thanks for
your
kind services.
নায়েব। দেখুন তো ভবদেব বাবু,-এই ছেলেটি বলছে—সে
আপনার নাতজামাই ?
মনীষা। উত্তর দিন দাদাভাই! হ্যা, এই জীবটির সঙ্গে—আমার
বিয়ে দিইছিলেন ৫ বছর আগে।
fo7 I There is no doubt about it,-67 Fasco cata
সন্দেহ নেই। Hallo sweetie !-প্রণাম মনীষা দেবী—আরে !
Honourable দাদাখশুর ব্যাঙ্কার ভবদেব যে ?—প্রাতঃপ্রণাম
ভবদেব। তুমি এতখানি অধঃপাতে গেছ—তা জানতাম না,
শিবশঙ্কর! ছিঃ ছিঃ, তােমাকে নাতজামাই বলে পরিচয় দিতে লজ্জায়
মাথা কাটা যাচ্ছে।
শিব। কুছ পরােয়া নেই! পরিচয় দেবেন না। আমি রায়
বাহাদুর হরিশঙ্কর রায়ের পৌত্র — District magistrate কালীশঙ্কর
রায়ের পুত্র—শিবশঙ্কর।
নায়েব। কালীশঙ্কর রায়ের ছেলে !!
শিব। নিশ্চয়ই কালীশঙ্কর রায়ের ছেলে। আমার নিজের পরিচয়ই
যথেষ্ট-আপনার পরিচয় আমার কাছে অপ্রয়ােজনীয়—superfluous !
কিন্তু আপনার প্রিয়তমা নাতনী শ্রীমতী মনীষা দেবী যে স্বামী গৃহ ত্যাগ করে
পর পুরুষের ভজনা করছেন,—সে পরিচয়টা লুকোবেন কি করে ? (হাস্য)

সংগ্রাম
[ ২য় অঙ্ক
শিব।
ভবদেব। তুমি জাহান্নমে যাও!
শিব। নিশ্চয়ই যাবে। কিন্তু তাতে পয়সা লাগে, সেই জন্যইত
সুব্রত ডাক্তারের নামে enticement and asduction of wife
from husband's lawful custody বলে case কচ্ছি কিন্তু টাকা
পেলেই মিটিয়ে নেব, আর এই দলিলটাতেও একটা সই।-বাস্।
ভবদেব। কিসের কাগজ ?
শিব। আমার বাবার সম্পত্তি বিক্রীর দলিল।
ভবদেব। এতে Blackinail !
শিব। বলতে পারেন। (হাস্য )
মনীষা। আমি সই করে দেবে! কাগজ দাও।
That's a good girl !
সই করে দিতেই
হবে । নইলে
প্রিয়তম সুব্রত নারীহরণের মামলায় কাঠগড়ায় উঠবে! (হাস্য )—সাক্ষী
হবে প্রিয়তমা মনীষা আর এই অধম।
মনীষা। নির্যাতিতা নারীকে আশ্রয় দেওয়ার নাম নারীহরণ নয়।
( বিবি ও সুব্রতের প্রবেশ)
সুব্রত। আর সুব্রত ডাক্তার তাতে ভয় পায়না। শিবশঙ্করকে বলে
দাও মনীষা—যে মহাত্মার নাম আমার এই খদ্দরের জামা কাপড়ে লেখা
আছে—তারই নির্দেশ—সত্যের পথই একমাত্র ন্যায় ও নির্ভয়ের পথ।
সুব্রত ডাক্তার এখনও সে পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়নি। সুতরাং ভয় তার নেই
-কাউকে এবং কিছুতেই। তুমি সই করাে না কাগজ ছিড়ে ফেলে
দিল) অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে দুই সমান কাপুরুষ ! চলে
এসাে, মনীষা, আমার সঙ্গে
বিবি। দাড়াও ; আমি যা ভেবেছিলাম তুমি তার চেয়েও বড়।
আর একটা প্রণাম নিয়ে যাও, পাথরের ঠাকুর। ভাগ্যবতী তুমি মনীষাদি ।

২য় অঙ্ক ]
সংগ্রাম
শিব। একদিন তােমার সঙ্গে আমার বােঝাপড়া হবে, ফেরারী
বােমার আসামী দেবব্রত মুখুজ্যের ছেলে সুব্রত মুখুজ্যে
[ বিবি ও মনীষাকে লইয়া সুব্রতর প্রস্থান—চোখেরাগ ও প্রতিহিংসা
লইয়া শিবশঙ্কর চাহিয়া রহিল।]

তৃতীয় অঙ্ক জমিদার বাড়ীতে স্যার বিরজা প্রসাদের সুসজ্জিত বসিবার ঘর। তিনি একটি কোচের উপর বসিয়া কাগজ পড়িতেছেন। পিছন দিক হইতে ছবি ও বিবির প্রবেশ । তাহাদের পােষাকে একটু বিশেষ পরিপাট্য। বিবি। Good evening, কমরেড দাদু! ( Salute করিল ) বিরজা। ব্যাপার কি! ছবি। আমরা সব কমুনিষ্ট হয়ে গেছি, দাদু ! বিরজা। পােষকের চটক দেখে সেটা বেশ অনুমান করা যাচ্ছে । অবশ্য যদিও সেগুলাে লাল নয় । ছবি। পােষাক দেখছেন কেন ? মনের দিকে তাকিয়ে দেখুন- বিবি। সেখানে দেখবেন একেবারে টকে লাল! বিরজা। দেখতে আর পাচ্ছিনে? মনের লাল একেবারে গাল দিয়ে ফুটে বেরুচ্ছে ! মনের কতটুকু লালই বা গালে এসে পৌঁছায়, দাদু । বিবি। আমার গালে যে লাল দেখছেন দাদু, তার সবটুকু অবশ্য মনের রং নয় ; তার সঙ্গে কিছু রুজ মিশানাে আছে। বিরজা। হা,–ঐ মনােহর রং কিছু বা মনের, কিছু বা মনােহারী দোকানের। তাহলে ও মেয়ে পুরুষের সম্বন্ধ নিয়ে ক্যুনিজমের যে সিদ্ধান্ত আমি শুনেছি তাতে আমার মত বুড়াে বয়সের রংচটা মর্চেপড়া মনও লাল হয়ে ওঠে। ছবি।

৩য় অঙ্ক ]
সংগ্রাম
বিরজা।
বিবি। (হাসিয়া) আনন্দে না লজ্জায়, দাদু ?
বিরজা। কিছু বা আনন্দে, কিছু বা লজ্জায়
ছবি। দাদুর নজর কেবল নীচু দিকে।
বিরজা। ওটা বয়সের দোষ ভাই। প্রথম বয়সে নজর থাকে
উচুদিকে, তারপর চোখ নেমে আসে মাঝে ; শেষে গিয়ে দৃষ্টি সীমাবদ্ধ
হয় নীচে।
ছবি। দাদু বড় অসভ্য কথা বলেন।
বিবি। অসভ্য নয়—আদি রস।
এও বয়সের দোষ ভাই। বুড়াে বয়সে অন্য সবের সঙ্গে
জিহ্বান্দ্রিও কিছু শিথিল হয়ে পড়ে।
ছবি। ছিঃ দাদু ।
বিরজা।
এত সামান্যতে চমকালে তাে কমুনিষ্ট হতে পারবে না,
কমরেড, নাতনী! এখন তােমাদের কম্যুনিজমের মাষ্টারটি কে শুনি ?
ছবি। বলুন দেখি দাদু ?
বিরজা। বােধ হয় সুপুরুষ সুব্রত ডাক্তার ?
বিবি। আপনার লজ্জা পাওয়া উচিত, দাদু ! আমাদের মাষ্টার ঐ
একাদশী নিরিমিযি অহিংসা গান্ধীবাদী সুব্রত ডাক্তার। আমরা হচ্ছি
আসল রেড, fourth, fifth, sixth International ! Stalin
Tortsky-র চেয়েও আগিয়ে আছি।
বিরজা। তাহলে তাে বিশেষ ভয়ের কথা ! এখন তােমাদের
মাষ্টারটির নাম জানতে পারলে বুঝতে পারবে। ভয়ের কারণ
কতখানি ?
ছবি। আমাদের মাষ্টার আপনার অভিন্নহৃদয় বন্ধু ব্যাঙ্কার ভবদেব
বাবুর নাতি-কমরেড়, দীব্যেন্দুবাবু-

সংগ্রাম
! শুধু প্রার্থনা
।
(সঙ্গে সঙ্গে দীব্যেন্দুর প্রবেশ ও salute)
দীব্যেন্দু। Good evening, Sir ওমরখায়াম ! Betrayal,
Sabotage, সুব্রত ডাক্তারের আদ্যশ্রাদ্ধ সব করতে রাজী
আপনার গলায়—ঐ যে জোড়া বেল আর কুইএর মালা ওরই একগাছি
প্রসাদী মালা আমার চাই।
ছবি। বেল না জুই ?
দীব্যেন্দু। বেল যেমন মনােহারী জুই তেমনি প্রাণমাতান, বেছে
নেবার কিছু নেই।
বিরজা। এ অবেলায় এমন সেজেগুজে কোথায় গিয়েছিলে সব ?
বিবি। আমি বলছি, দাদু-peasant front এ work করতে।
ছবি। অর্থাৎ সুব্রত ডাক্তারের হার, আমাদের জিত !
বিরজা। তা যেমন মােহিনীমূর্তিতে গিয়েছ তাতে সুব্রত ডাক্তার
কোন ছার, স্বয়ং মহাদেবেরও হার হতাে ।
বিবি। সেদিক থেকে বিশেষ সুবিধে হয়নি, দাদু। তবে কাজ হাসিল
হয়েছে।
ছবি। অর্থাৎ চাষীরা জমি বিক্রি করতে রাজী হয়েছে ।
বিরজা। তাই নাকি? কিন্তু কেমন করে সম্ভব হল ?
আমাদের আর দীব্যেন্দু বাবুর যৌথ শক্তি।
দীব্যেন্দু। আমি বলছি, সার ওমরখায়াম! ওটা ideologyর ব্যাপার
সুতরাং আমার province। বিলের মাঠের জমি আপনাদের চাইই—
তা সে দামেই হােক আর যে উপায়েই হােক। জমিদার ও পুঁজিপতির
মৰ্য্যাদার ব্যাপার। ওদিকে প্রবল বাধা গান্ধী বাদী কমুনিষ্ট সুব্রত
ডাক্তার! চাষীদের সব এককাট্টা করেছে। যুদ্ধছাড়া এর আর
মীমাংসা নেই। কিন্তু এপক্ষ দেখলাম সুব্রত ডাক্তারের সঙ্গে বিরােধ

৩য় অঙ্ক। সংগ্রাম চায়না অথচ জমি চায়। আজ চাষীদের এক মিটিং ছিল সুব্রতর বাড়ীতে। সেখানে গেলাম পরশ্রমভোগী পুঁজিপতিদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র peace offensive নিয়ে। একাজে আমার মত উপযুক্ত লােক, সারা বাংলা কেন ভারতবর্ষেও বিরল ! ধনপতি ব্যাঙ্কারের কমুনিষ্ট নাতি- 47916 Sir Stafford Crips ! বিরজা। (হাসিয়া) তারপর ? দীব্যেন্দু। meeting আক্রমণ করলাম ইনক্লাব জিন্দাবাদ বলে। আর বক্তৃতায় যে সব কথা বল্লাম তা শুনলে আমার পরম স্নেহাস্পদ দাদামশাই পূজনীয় সাইল নিশ্চয়ই আমাকে ত্যাজ্য নাতি করতেন। আর আপনি নাতনী দেওয়া তাে দূরের কথা দ্বারওয়ান মারফৎ অর্ধচন্দ্র দিয়ে বিদেয় দিতেন। কিন্তু কিছুতেই সুবিধে হয়না দেখে শেষে ঐ অগতির গতি “ফ্যাসীবিরােধী” ভাবটা নিয়ে কৌশলে এলাম আপােষের কথায়। আপােষও বলতে পারেন sabotage'ও বলতে পারেন, আপনাদের কথা- মত ঠিক হলো পুরো দাম ; আর ঐ নদীর ধারে যে বিরাট চর আপনাদের দখলে এসেছে-ঐখানে বিনা নজরে আর সমান খাজনায় যার যতখানি জমি ছিল তাকে ততখানি জমি দিতে হবে। চাষীরা জমিহীন হলােনা। জমিদারী সেরেস্তায় খাজনার টাকা লােকসান হলােনা—অথচ জমিদারের জেদ ও মর্যাদাও বজায় থাকলাে। এখন ঐ সােনার চারুব্রত ডাক্তারকে তার ডাক্তারখানা গুটিয়ে এই মহামান্য প্রতাপপুর জমিদারীর এলাকার বাইরে চলে যেতে হবে। গান্ধী বাদী অহিংস নিরামিষ—উনি এসেছেন প্রবলপ্রতাপ জমিদারের সঙ্গে লড়াই করতে চাষার অধিকার নিয়ে। এই নিন্ সব চাষীদের সই করা বিক্রী কবলা। (কবলা দান ) বিরজা। আশ্চৰ্য্য! সুব্রত রাজী হলাে? দীব্যন্দু। হবেনা? আমার এই ক্ষুরধার যুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলাে সংগ্রাম [ ৩য় অঞ্চ ; ; আপনার রূপে গুণে বরীয়সী নাতনীদ্বয়ের সনির্বন্ধ অনুরোধ রূপে বৈদ্যুতিক চার্জ! বাছাধন সুব্রত—একবারে ঘায়েল ! বিরজা। দীব্যেন্দু, আমার এই সুগার মিলে একজন ম্যানেজার দরকার। দীব্যেন্দু। আমার চেয়ে ভাল লোক আপনি পাবেন না, সার ; একটি মাত্র কাজ আমি যা করতে পারি সে হচ্ছে ম্যানেজারী করা যাতে সই করা ছাড়া আর কিছুই করতে হয়না। বিরজা। মাইনে দেব প্রথম দীব্যেন্দু। মাইনের কথা বলে আমায় দুঃখ দেবেন না, সার ; আমার স্নেহাস্পদ সাইলক দীর্ঘজীবী হােন মাইনের দরকার আমার কখনও হবেনা। আমার দরকার কেবল একটি respectable চাকরী আর একটি স্ত্রী। তাহলেই আমার পরম স্নেহের পূজনীয় ভবদেব স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে এবং অতি প্রফুল্লচিত্তে তার সর্বস্ব আমায় উইল করে দিয়ে যাবেন। অবশ্য যদি তিনি আমার আগে মারা যান। বিরজা। ছিঃ ওকথা বলতে নেই দীব্যেন্দু। বলা যায়না, সার, শাস্ত্রের বচন দুরাত্মা দীর্ঘজীবী হয়। (হাস্য) ছবি। ম্যানেজারী তত পেলেন—কিন্তু স্ত্রীটি পাবেন কোথায় ? দব্যেন্দু। কেন? এ বাড়ীর tradition আছে ম্যানেজাররা বাড়ীর জামাই হয়। সেইজন্যই তো চিনিরকলের মিষ্টি ম্যানেজারীর প্রতি আমার লােভ! বিরজা। (হাসিয়া) তুমি কি আমার কাছে ম্যানেজার এবং নাতজামাই, এ-দু’য়ের জন্যই দরখাস্ত পেশ কচ্ছো? দীব্যেন্দু। বুঝতে পাচ্ছেন না সার ? এ দুরভিসন্ধি না থাকলে কি আপনার বন্ধু ক্লাইভ স্ট্রীটের সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরাপ্পাবাজ ভবদেব শর্মা Sir Stafford Crips এর মতন এই কমুনিষ্ট নাতিটি নিয়ে আজ সপ্তাহকাল ৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম এখানে স্থির হয়ে বসে আছেন ? কমরেড ভবদেব বাঁড়ুজ্যে শুধু সুদখাের নন্-একজন পাক্কা specti]ator ! সুতরাং ভয়ানক লােক ! খুব সাবধানে থাকবেন, সার। পক্ষকাল এখানে থাকলে আপনার অর্ধেক সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে চলে যাবেন, আর এমন মিষ্টি মুখে কাজ হাসিল করবেন-যেন আপনি কৃতার্থ হয়ে গেলেন। বিরজা। সত্যিই আমি কৃতার্থ হয়ে যাবে। দব্যেন্দু। হতেই হবে। আপনি হচ্ছেন Aristocrat এবং বুজৌয়া inixed অর্থাৎ জমিদার আর ব্যবসাদার মিশিয়ে। প্রাতঃস্মরণীয় পিতামহ হাড়ফাটা ভবদেব হচ্ছেন একেবারে পাক্কা বেনিয়া। ওঁর বাবা ছিলেন আবার মাড়োয়ারী মহাজনের তহবিলমরা মুহুরী—একেবারে নৈক্য কুলীনের বংশ! সুতরাং আপনার হার নিশ্চিত। (হাস্য ) বিরজা। আচ্ছ, দীব্যেন্দু, সুব্রত তােমার বাল্যবন্ধু, না? দব্যেন্দু। আমার সহপাঠী বটে। কিন্তু বন্ধু আসলে আমার বােন মনীষার। কালস্য কুটিলা গতি। তার সঙ্গে ঝগড়া হয়ে আমার সঙ্গে হলাে ভাব। এখন সেই ভাব নিবিড় প্রেমে পরিণত হয়ে একেবারে গলায় এসে ঠেকেছে। বির জা। জাননা ওর পরিচয় কি ? দীব্যেন্দু। পরিচয়। পরিচয়—ও সুব্রত ডাক্তার, scholar, কর্মী, সবল সুপুরুষ, আদর্শে বিশ্বাস রাখে—আর রাখে বিশ্বাস অনুসারে চলবার সাহস—যেটা এই জমি কেনার ব্যাপারে বেশ হাড়ে হাড়ে জানতে পেরেছেন। বিরজা। ওটা আমি বেশ জানি। ওর পিতৃ পরিচয় জিজ্ঞাসা কচ্ছি ? দীব্যেন্দু। পিতৃ পরিচয়—সুব্রত ডাক্তারের ? আপনি হাসালেন সার। ওর মত লােকের কোন পিতৃ পরিচয় থাকে, না, থাকলেও কেউ ১৪ সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক জানে। ঐ যে মাঠের মধ্যে প্রকাণ্ড বট গাছটা দেখছেন—যার তলায় সুব্রত ডাক্তারের ডিসপেনসারী-কে বলতে পারে ওটা কোন্ বট গাছের চারা, কোন দেশ থেকে কোন্ বগের পাখায় উড়ে এসেছিল এক সূক্ষ্ম বীজ--তা কেউ জানে না। বিরজা। তােমার কথার ঈঙ্গিত তো আমি বুঝতে পাচ্ছিনে দীব্যেন্দু ? দীব্যেন্দু। না—না, আমার কথায় কোন খারাপ ইঙ্গিত নেই। সুব্রত যখন ছেলে তখন নিশ্চয়ই ওর একজন বাবা ছিলেন—তিনি যেই হােন না কেন biological necessity! সে কথা কেউ জানে না—কারণ জানার দরকার হয়নি। শ্বশুরের নামে পরিচিত যে সে অধম, যে বাবার নামে পরিচিত সে মধ্যম—আর সুব্রতর মত লােকের স্বনামমাপুরুষােধ নিজের নামে পরিচিত বন্য পুরুষ !—ওদের পিতৃ পরিচয় দরকার হয় না। এ তিন দলের মধ্যে আপনি কোন দলে ? দীব্যেন্দু। আমি কোন দলেই পড়লাম না--কারণ আমার মত জীব যে হতে পারে—তা অমন উর্বর মস্তিষ্ক শাস্ত্রকাররাও জানতেন না। আমি এখন আছি দাদামশাইএর নাতি বলে পরিচিত—পরে হবাে দাদাশ্বশুরের নাত জামাই বলে পরিচিত। বিরজা। কিন্তু পিতৃ পরিচয় নইলে যে বিয়ে হয় না দীব্যেন্দু। কেন হবে না? বাবার নাম অজ্ঞাত হলেও যখন ভােট দেওয়া যায় তখন বিয়ে হবে না কেন? বিয়ে হয় ছেলেতে মেয়েতে। আগে পাত্র পাত্রীকে সনাক্ত করার জন্য তাদের তিন পুরুষের খবরের দরকার হতো। এখন পুলিশের খাতায় সব পাওয়া যায়। এই গ্রামে তাে কত ছেলে আছে; তাদের শুধু পিতৃ কেন—পিতৃপিতামহ, প্রপিতামহ, ছবি।

৩য় অঞ্চ ] সংগ্রাম ; বৃদ্ধ পিতামহ, অতিবৃদ্ধ পিতামহের পরিচয় পৰ্য্যন্ত খাতায় লেখা আছে। কিন্তু সুব্রত ডাক্তারের মত কটা ছেলে আছে ? পিতৃ পরিচয়ের অভাবে যদি সুব্রতের মত ছেলের বিয়ে আটকে থাকে তবে সেটা মেয়ের বাপের দুর্ভাগ্য । বিরজা। আগে তােমার মেয়ে যােক তখন দেখ ! দীব্যেন্দু। আমার মেয়ের বিয়ের সময় ওসব কিছু দেখবাে না, দেখবাে শুধু ছেলের intelligence test আর blood exainination report আর একটা psycho-analysis cliart। বিরজা। তাহলে ও বিষয়ে তুমি কিছু জানো না? দীব্যেন্দু। জানি না! জানি তাে নাই-ই এবং জানবার দরকার আছে বলেও মনে করি না। আপনার বাবার নাম আমি জানি না এমন কি জানবার কৌতুহলও নেই ; আপনি বলে দিলেও মনে করে রাখতে পারবাে না। আমার পরম স্নেহাস্পদ আমার পরম স্নেহাস্পদ পূজনীয় সাইলক, ভবদেবের যে কোন বাবা ছিল বলে আমি বিশ্বাস করিনে। আমার পূজনীয় পিতৃদেব আমাদের জন্মদান কাৰ্য কোন রকমে সম্পন্ন করে অল্প বয়সে অতিরিক্ত মদ্যপান ও আনুষঙ্গিক দোষের জন্য গর্ভধারিণী মাটিকে মেরে ফেলে আমাদের শৈশব অবস্থায় মারা যান। বাবা মানে আমার কাছে এমন একটা অনুভুতি—যিনি বাড়ী এসে বমি করেন, মাকে ধরে মারেন আর লিভারের যন্ত্রণায় চিৎকার করেন। তার নাম ন্যায়ত ধৰ্ম্মতঃ আমার ভুলে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু ছেলেবেলায় মুখস্থ করে রেখেছিলাম বলে এখনও মনে আছে—শ্রীজয়দেব বন্দোপাধ্যায়। গত বছর ৪০১ টাকা চালের বাজারে অনেক শালা তাদের জানা বাবার নাম ভুলে গেছে ; আর ফাটকার বাজারে যা কিছু কামিয়েছে—তাদের মধ্যে যাদের কোন দিন কোন বাবা ছিল না—তারাও ফলাও করে। বাবা মা সংগ্রাম [ ৩য় অঞ্চ লিখছে। সার, আমি বয়সে অর্বাচীন হলেও জ্ঞানে প্রাচীন। অজ্ঞাতসারে আপনাদের ফেলে কাল অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে—এই মহাযুদ্ধের ধাক্কায়। সুতরাং ভুল করবেন না বিরজা। সেই ভুলটা বাঁচিয়ে চলতে চাই বলেই তাে এতাে ভাবছি। নায়েব মশাইএর প্রবেশ নায়েব। বাবু, দারােগা বাবুকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন—তিনি এসেছেন। বিরজা। ওঃ—তাকে এখানে পাঠিয়ে দিন। (নায়েবের প্রস্থান) দীব্যেন্দু। আমরা উঠি সার—এখন। বিরজা। হ্যা, তােমরা উপরে গিয়ে বিশ্রাম করাে ভাই। তােমরা জানাে না যে কী দুঃশ্চিন্তা থেকে তােমরা আমাকে বাঁচিয়েছ। ( ছবি, বিবি ও দীব্যেন্দুর প্রস্থান) দারােগাবাবুর প্রবেশ দাবােগা। নমস্কার, সার- বিরজা। নমস্কার, নমস্কার। বসুন- দারােগা। আমাকে আপনি বলবেন না, সার। আমার বাবা হরিদাস সরকার। আপনার ষ্টেটের নায়েব ছিলেন রামপুর কাছারীতে। বিরজা। ওঃ তুমি হরিদাসদার ছেলে। বেশ ! বেশ! তােমার বাবা শুধু আমাদের নায়েব ছিলেন না—আমার বিশেষ বন্ধুও ছিলেন। তােমার মাকে আমি বৌদি বলে ডাকতাম, খুব ভাল রাধতে পারতেন। দাবােগা। মা'র কাছে আপনার অনেক কথা শুনেছি, সার—

৩য় অঙ্ক ]
সংগ্রাম
১৭
বিরজা। একটা বিশেষ কাজের জন্য তােমাকে ডেকেছি। কথাটা
অবশ্য খুবই গােপনীয়।
দারােগা। বলুন! নায়েবমশাই বলছিলেন—সুব্রতবাবু সম্বন্ধে
বিরজা। হ্যা, হ্যা, সুব্রত ডাক্তার সম্বন্ধে পুলিশ record তােমার
সব জানা আছে?
দারােগা। সব খবরই আমাদের রাখতে হয়, সার। তার ওপর এর
আগে আমি I. B. তেও কাজ করেছি। কাজেই সবই জানি। সুত
বাবুর
উপর আমাদের নজর আছে বটে, কিন্তু কুনজর নেই।
বিরজা। একটা বিশেষ কারণে সুব্রতর পরিচয় আর ইতিহাস
আমার জানা দরকার।
দারােগা। Record আমার মনে আছে সার। আমাদের
record এ সুব্রত বাবুর পরিচয় এই—নাম সুব্রত মুখার্জি। বাবা দেবব্রত
মুখার্জি, সাতাশ বছর আগে রেঙ্গুনে এক Railway accident এ মারা
যান বলে প্রকাশ। সুব্রত বাবুর বর্তমান বয়স ২৬-২৭। B. Sc. affat
করবার পর তিন বছর detention camp, তারপর দুবছর এই গ্রামে
interned al Brilliant scholar,--Matric, Intermediate
এ stand করেন ; B. Sc. তে first class Second। স্বামীর মৃত্যুর
পর সুব্রত বাবুর মা লীলাবতী দেবী দশহাজার টাকা Insurance claim
পান।
বিরজা। ঠিক হয়েছে।সুতর মার নাম লীলালতী; বাবার নাম
কিবশ্লে-দেবব্রত মুখার্জিনা ?
দারােগা। আজ্ঞে-দেবব্রত মুখার্জি। এই দেবব্রত মুখার্জির নামেও
একটা প্রকাণ্ড record আছে।
বিরজা। তাই নাকি! একেবারে স্বদেশী কুলীন। বলতে শুনি।
৭

১৮ সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক দারোগা। সাতাশ বছর আগেকার record নাম দেবব্রত মুখার্জি, পিতা শিবব্রত মুখার্জি, বাড়ী নদীয়া-শ্বশুরবাড়ী বর্ধমান জেলায় প্রতাপপুর গ্রাম অর্থাৎ এই গ্রাম- বিরজা। তাই নাকি! শ্বশুর—? দারােগা। শ্বশুর শম্ভুনাথ ব্যানার্জি বিরজা। শম্ভুনাথ ব্যানার্জি। অর্থাৎ আমাদের শম্ভুদা!—যিনি আমাদের জ্ঞাতি আর সরিক ছিলেন ? দারােগা। তা বলতে পারবােনা সার। দেবব্রত মুখার্জির স্ত্রীর নাম লীলাবতী দেবী—শম্ভ ব্যানার্জির একমাত্র কন্যা ও 'ওয়ারিশান্। বিরজা। হ্যা, হ্যা, তারপর ? দারােগা। সাতাশ বছর আগে একটা গুরুতর রাজনৈতিক অপরাধ করার পর তিনি ফেরারী হন। বিরজা। ফেরারী হন! অপরাধ কি ? ataatst i Special tribuual 47 Magistrate play*** রায়কে তিনি পিস্তলের গুলিতে হত্যা করেন বলে প্রকাশ। সেই থেকে আজ ২৭ বছর তার কোন খোঁজ নেই। রেঙ্গুনে যে দেবব্রত মুখার্জি মারা যান—তিনি এই দেবব্রত মুখার্জি কিনা পুলিশ তার সঠিক প্রমাণ পায়নি বলে আমাদের record তাকে নিরুদ্দিষ্ট বলেই সাব্যস্ত করেছে এবং তাকে ধরার জন্য এখনও দশহাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা আছে। বিরজা। Special tribunal এর Magistrate কালীশঙ্কর রায় তাে আমাদের ভবদেবের দারােগা। আজ্ঞে, হা-ভবদেব বাবুর নাতনী মনীষা দেবীর শ্বশুর ; যে মনীষা দেবী—তাঁর স্বামী শিবশঙ্কর বাবুর ডাইরি অনুসারে স্বামী গৃহ ত্যাগ করে-সুব্রত বাবুর বাড়ীতে বাস কচ্ছেন।

৩য় অঙ্ক ] সংমি বিরজা। (চিন্তিত ভাবে ) ব্যাপারটা খুবই জটিল। দাবােগা। বাবার ছেলে বলে সুব্রত বাবুর ওপর আমাদের কোন বিদ্বেষ নেই। তাকে আমরা প্রকৃত অহিংস কংগ্রেসসেবী বলেই বিশ্বাস করি। যদিও তাঁর সব কাজের ওপর দৃষ্টি রাখি। বিরজা। (পূর্বের মত চিন্তিত ভাবে ) : দারােগা। আমি তাহলে এখন উঠি সার। কোন কিছুর দরকার হলেই ডেকে পাঠাবেন। বিরজা। নিশ্চয়ই। তােমার বাবা ছিলেন আমার বাল্য বন্ধু। যখনই সময় পাবে, আসবে বাবা। দারােগা। আমাদের S. P. যতীন বাবু সেদিন আপনার কথা বলছিলেন- বিরজা। ওঃ, যতীন বুঝি এখানকার S.P. হয়ে এসেছে ? আমাকে যতীন সেদিন একটা চিঠি দিয়েছে চিনির কলের শেয়ারের জন্য। দারােগা। S. P.র সঙ্গে দেখা হলে আমার কথা একটু দয়া করে বলবেন, সার। বিরজা। নিশ্চয়ই বলবাে। আমার দ্বারা তােমার যা সুবিধা হয়, আমাকে দিয়ে তা করিয়ে নেবে। তুমি হরিদাসদার ছেলে। দাবােগা। তাহলে উঠি, সার—( প্রণামকরণ) বিরজা। যাবার সময় একবার নায়েব মশাইকে পাঠিয়ে দিয়ে যেময় তে। দারােগা। যে আজ্ঞে—( প্রস্থান ) [ নায়েব মশাইয়ের প্রবেশ ] বিরজা। আচ্ছা, নায়েবমশাই—অাপনার ত অনেকদিনের চাকরি হলাে ? নায়েব। তা হলাে বৈকি, বাবু! চল্লিশবছর পার হয়ে গেল। আমি যখন চাকরিতে ঢুকি, সুষমা মা তখন ৫৬ বছরের মেয়ে। সেকি আর সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক *** আজকের কথা। আমিই আপনার সবচেয়ে পুরাণাে চাকর। আপনার বিয়েতে বরযাত্রীর নিমন্ত্রণ খেয়েছি-বাবার সঙ্গে। আবার আপনার নাতনীদের বিয়েতে নাতি পুতি সঙ্গে করে এসে কন্যযাত্রীর নিমন্ত্রণ খাবাে। বিরজা। নিমন্ত্রণ খাবেন কি রকম ? আপনিই তো হবেন কন্যাকৰ্ত্তা। নায়েব। আগেও আমরা চিরকালই তাইতাে হয়ে এসেছি বাবু। আপনার বিয়েতে আমার বাবা-ই ছিলেন বরকর্তা। মেয়ে দেখা থেকে আরম্ভ করে—ভােজ খাওয়ান পর্যন্ত। ওটা আমাদের বংশগত অধিকার। বিরজা। সে অধিকার চিরদিন বজায় থাকবে, নায়েবমশাই। আচ্ছা, আমাদের জ্ঞাতি শম্ভ বাড়জ্যেকে তাে আপনার মনে আছে ? নায়েব। মনে আবার নেই ? খুব সুপুরুষ আর ভারী তেজালাে লােক ছিলেন। আবার তিনি আমাদের এই প্রতাপপুর জমিদারীর দু’ আনা হগণ্ডা, তিনকড়া, এক ক্রান্তির সরিক ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর-জামাইবাবু তখন ম্যানেজার তঁারি কথায় আমরা শম্ভুবাবুর অংশ বেদখল করে নেই। বিরজা। রাজেনের ম্যানেজারীর আমলে ? নায়েব। হঁ্যা, বাবু। জমিদারিতে যা কিছু উন্নতি সবইতে। তারই আমলে। ধরুণ শম্ভুবাবুর অংশের আয়-বছর শালিয়ানা-খরচ খরচা বাদ প্রায় দশ হাজার টাকা! সেইটে আজ ২৫ বছর আমাদের। আপনারা তখন কাশী থাকতেন, সেই জন্য আপনার ঠিক মনে নেই। বিরজা। একমাত্র ছেলে মরে যাওয়ার পর গ্রাম ছেড়েছিলাম, আর প্রায় তিরিশ বছর পরে গ্রামে ফিরে এসেছি, নায়েব মশাই। পুরাণে কথা কিছুই বিশেষ মনে নেই। আচ্ছ। শম্ভুদার ছেলেপিলে কি ছিল ? নায়েব। ছেলে ছিল না, বাবু; কেবলমাত্র একটি মেয়ে ছিল।

৩য় অঞ্চ ] সংগ্রাম টুকটুকে সুন্দরী—অনেক বয়েস পর্যন্ত ইংরিজী লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছিলেন। তাই নিয়ে একটা কুৎসাও হয়েছিল। বিরজা। কুৎসা কিরকম? নায়েব। আজ্ঞে, সত্যি মিথ্যে ভগবান জানেন। একটি স্বদেশী ছেলের সঙ্গে মেয়েটি একরাত্রে পালিয়ে যায়, এই তাে প্রবাদ। পরদিন ভােরবেলা শম্ভুবাবুর বাড়ী প্রায় ৫০ জন পুলিশে ঘিরে খানাতল্লাসী কল্লো। ৪.৫ দিন ঐসব বন্দুকধারী পুলিশ এখানে ছিল। গাঁয়ের সব লােককে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে লাগলাে তারা দেবব্রত মুখুজ্যে বলে কাউকে চেনে কিনা; বা দেখেছে কিনা। সে নাকি এক বােমার মামলার ফেরারী আসামী। শম্ভ বাবুর তখন অসুখ। তার মেয়েটিকে পাওয়া গেলনা। লােকে কানা ঘােষা করতে লাগল ঐ দেবব্রত মুখুজ্যের সঙ্গেই নাকি মেয়েটি পালিয়েছে। মেয়েটি নাকি তলায় তলায় স্বদেশী ষড়যন্ত্রের মেম্বর ছিল। শম্ভুবাবুকে পুলিশে গ্রেপ্তার করে দিন কতক খুব টানা হচড়া করল্লো। শেষে ছেড়ে দিল। বিরজা। তারপর ? নায়েব। তারপর হাজত থেকে বেড়িয়ে শম্ভুবাবু সেই যে কলকাতায় গেলেন আর ফেরেননি। দিন কতক পরেই মারা যান। বিরজা। শম্ভুদার মেয়ের কোন সংবাদ পাওয়া গিইছিল ? নায়েব। আজ্ঞে না। সেই পালানর পর থেকে আজ পর্যন্ত তার খবর কেউ জানেনা। বিরজা। জানেন কি শম্ভুদার মেয়ের বিয়ে হইছিল কিনা ? নায়েব। আমি যতদূর জানি বিয়ে হয়নি। আর আমি যা জানিনে তা আর কেউ জানেনা। নইলে আপনার এত বড় জমিদারী রক্ষা করতে পারতাম না।

সংগ্রাম [ অঙ্ক বিরজা। সঠিক জানেন সে মেয়ের বিয়ে হয়নি ? নায়েব। এখানে যে বিয়ে হয়নি এটা ঠিক জানি। আর আমার বিশ্বাস সে মেয়ের বিয়ে হয়নি, বা তার স্বামী বা ছেলেপিলে কেউ নেই। বিরজা। আপনার এ বিশ্বাসের কারণ? নায়েব। হাজত থেকে খালাস পেয়েই শম্ভুবাবু কলকাতায় গিয়ে মারা যান, দুবছর আমি নিজের দায়িত্বে তার অংশের কালেক্টারী চালাই। তারপর জামাইবাবু ম্যানেজার হয়ে এসে তার অংশ বেদখল করে নে। বল্লেন, কেউ কোন দিন দাবী দাওয়া উপস্থিত করলে ছেড়ে দেব। প্রায় দশ হাজার টাকা নে আয়ের সম্পত্তি! ধরুণ সে মেয়ের বিয়ে হলে কিম্বা তার স্বামী বা ছেলেপিলে কেউ থাকলে এত বড় একটা মােটা জমিদারী—যার দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা তার ওপর কেউ এতদিন কোন দাবী দাওয়া উপস্থিত করলো না? কোন গোলমাল না থাকলে কি এত বড় লাভের সম্পত্তি কেউ কোনদিন ছেড়ে দেয়? বিশেষকরে বিষয়ী লােকেরা? বিরজা। ধরুণ, এখন কেউ যদি ঐ সম্পত্তির উপর দাবী আনে ? নায়েব। তাহলে তিনি কোর্ট মামলা লড়ে প্রমাণ হলে আমাদের অবশ্য সম্পত্তি ছেড়ে দিতে হবে। আর ফেরৎ দিতে হবে সুদে আসলে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা—২৫ বছরের আয় যা আমরা ভােগ করেছি। তবে এতদিন পরে প্রমাণ অসম্ভব। বিরজা। আমার ঠিক স্মরণ নেই, কোন মৌজা শম্ভুদার ছিল? নায়েব। আজ্ঞে এই প্রতাপপুর মৌজা। যেটা চিনির কল আমাদের কাছ থেকে কিনেছে। ঐ বড় বিলের দুধারের গ্রামগুলাে-গােয়ালপাড়া, বাগ্নীপাড়া, কুর্মিপাড়া, ইসলামপুর, যে জমি কেনা নিয়ে সুব্রত ডাক্তারের কথায় চাষাদের সঙ্গে আমাদের বিবাদ বেধেছে। এই জমিদারীর সেরা অংশ।

৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম == বিরজ + একেই বলে নিয়তি নায়েব। (না বুঝিয়া) নিয়তি বৈকি, বাবু; আপনাদের মিলের ষ্টে শম্ভ বাড়য্যের বেদখলী জমিদারী কিনে নেওয়াতে আমাদের জমিদারী ষ্টেটের একটা মােটা লাভ হলাে বিরজা। জমিদারী লাভ লােকসানের কথা আমি ভাবছিনে, নায়েব মশাই, সেটা খুবই ছােট কথা। আমি ভাবছি নায়েব। জমিদারী লাভ লােকসানের কথা ছােট কথা বলছেন, আমি তাে এর চেয়ে বড় কথা কিছু জানিনে। গত ৪০ বছর এছাড়া আর কিছুই ভাবিনি। বিরজা। আপনার মত বিশ্বাসী, মুনিবের হিতৈষী কর্মচারী আর কটা হয়, নায়েব মশাই ?—কিন্তু আমি একটা বিশেষ গােলমালে পড়ে গিইছি। ঠিক পথ দেখতে পাচ্ছিনে! নায়েব। ইংরিজি লেখাপড়া তেমন জানিনে বটে; কিন্তু আপনার বাবাঠাকুরদার আশীর্বাদে, বুদ্ধির জোরে বড় বড় দেওয়ানী ফৌজদারী, বড় প্রজাবিদ্রোহফয়শালা করেছি বাবু, বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ হলে আমাকে বলতে পারেন—বাবু। বিরজা। চিন্তার কারণ কিছু হলেও এখনও বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ হয়নি। পরে দরকার হলে আপনাকে নিশ্চয়ই বলবে। নায়েব। আমি তাহলে এখন উঠি বাবু! দেওয়ানী, দাঙ্গা-খুন জখম থেকে আরম্ভ করে জমিদার বাড়ীর ছেলে মেয়ের ঘটকালী পৰ্যন্ত সব কাৰ্যস্থলেই আমরা ফয়শালা করেছি, বাবু-দরকার হলে হুকুম দেবেন- কোন চিন্তার কারণ হবেনা। [প্রণাম করিয়া নায়েব মশাইএর প্রস্থান ও ভিতর হইতে বিবির প্রবেশ। বিরজাকে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখিয়া] •

১০৪
সংগ্রাম
[ ৩য় অঙ্ক
বিবি। আমি পাশের ঘর থেকে সব কথাই শুনেছি, দাদু। বিধির
সঙ্গে যে সুব্রতর বিয়ে হতে পারেনা-তা বিবিই সব চেয়ে ভাল জানে।
কাজেই মিছি মিছি আপনার দুর্ভাবনার কোন কারণ নেই।
বিরজা। দিদিভাই!
বিবি। বলুন দাদু
বিরজা। বিবির মনের কথা তো ঠিক বােঝা যাচ্ছে ?
বিবি। কেন? সে মন এত স্বচ্ছ—যে ভুল বুঝবার উপায় নেই।
বিরজা। আমি কি তাহলে এতদিন ভুল বুঝে এসেছি? সুব্রতকে
বিবি-?
বিবি। না, দাদু, আপনি ঠিকই বুঝেছেন—সুব্রতকেই বিবি।
বিরজা। কথার মানে তা ঠিক বােঝা গেল না ?
বিবি। কেন দাদু ?
এখনও পর্যন্ত সুব্রতর সঙ্গে পরিচয়
হওয়াটাই বিবির জীবনের সব চেয়ে বড় ঘটনা। কিন্তু, কিন্তু দাদু,
সুতর মার সঙ্গে তার বাবার বিয়ে হয়নি—এইটেই যদি তাদের
মিলনের পথে একমাত্র বাধা হত তবে বিবি নিজেই তার মীমাংসা করে
নিতে।
বিরজা। কি মীমাংসা করে নিতো ?
বিবি। সুব্রত ডাকলে বিবি সব ছেড়ে দিয়ে তার সঙ্গে চলে যেত।
কিন্তু আরও একটা দুল বাধা আছে—যা ঠেলে সুব্রতর কাছে পৌছান
বিবির পক্ষে অসম্ভব।
বিরজা। সে বাধা কি মনীষা ?
বিবি। মনীষা! যে মনীষা রূপে, গুণে, দীপ্তিতে বিবির চেয়ে কোন
অংশে কম নয়, আর ভালবাসার সাহস আর সাধনায় বিবির চেয়ে অনেক
বড়! , দাদু-মনীষাও সে বাধা নয়।

৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম বিরজা। তা হলে বিবির কি হবে ? বিবি। (হাসিয়া) কি আর হবে ? দুয়ােরাণী সুয়ােরাণীর যুগ কেটে গেছে। কৌলীন্য প্রথাও উঠে গেছে ! বিরজা। দুর্ভাবনা তত কমলো না, দিদিভাই ? বিবি। কেন, দাদু? বিবি শুধু পােষাকে নয়, মনের গঠনেও আধুনিকা। সে জানে সব বিয়েতে যেমন ভালবাসা থাকেনা-তেমনি সব ভালবাসাও বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছায় না। সুতরাং দুঃখ সেখানে নয়। বিরজা। তবে কোথায় দুঃখ তার? সুব্রতর আঘাতটা কম লেগেছে বলে মনে হচ্ছেনা ? বিবি। কোথায় লেগেছে জানেন, দাদু ? পরিচয় গােপন করে বিবি সুব্রত ডাক্তারের কাছে গিইছিল—তার সংস্কারহীন আধুনিকতার জৌলসে তাকে মুগ্ধ করে দেবে বলে। বিরজা। Poor বিবি! সে নিজেই মুগ্ধ হয়ে ফিরলাে ? বিবি। শুধু তাই নয়, দাদু,সুব্রতর কাছে গিয়ে বিবি বুঝতে পারলাে—সে আসল হীরে নয়, চক্চকে সােনার setting এ বসান ঝুটো কাচ! সার বিরজা প্রসাদের বিস্তৃত জমিদারী আর কল কারখানার আর্ধেকের সে মালিক এছাড়া তার দেবার মতাে পরিচয় কিছুই নেই। বিরজা। কিন্তু এটা কি কম পরিচয় হলো, দিদিভাই! বিবি। কম কি বেশী তা জানিনে। কিন্তু দেখলাম আপনার সম্পত্তির ওপর যার লােভ নেই, তার কাছে আমার কোন মূল্যই নেই। আজ সকালে সুব্রত ডাক্তারের ওখানে আমি আর ছবি বেড়াতে গিইছিলাম। দেখি, সুব্রত, মনীষ', আরও কটি ভদ্র, অভদ্র ছেলেমেয়ে বাগদী পাড়া আর মুসলমান পাড়ার কলেরার সঙ্গে সারারাত যুদ্ধ করে ফিরছে। সকলেই কৰ্ম্ম শান্ত, তবুও বিশ্রামের অবকাশ নেই। সুতরা সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক চলে গেল হাসপাতালে জমায়েৎ রােগীদের ওষুধ দিতে, মনীষারা গেল শিশুসদনের ছেলেমেয়েদের তদ্বির করতে। তারপর আছে পড়া, পড়ান, সংগঠনের কাজ। অর্থ, ওষুধ, ব্যবস্থা সব জিনিষেরই অভাব কিন্তু আশা আর উৎসাহ তাদের অফুরন্ত! সেই আধময়লা কাপড়পড়া ক্লান্তি মলিন গাঁয়ের মেয়েদের কাছে আপনার এই ঝলক দিয়ে চলা দীপ্তিময়ী বিবি নিজেকে ছােট মনে কল্পে ! বিরজা। মনের ভুল দিদিভাই। আমার এই উচ্ছাসময়ী বেগবতী বিবি কারাে চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বিবি। স্নেহের দৃষ্টি অন্ধ হয়, দাদু ; এই সাজানাে ড্রইংরুম, এই দামী সাড়ী আর হীরে জহরতের গয়না, সার বিরজাপ্রসাদের উত্তরাধীকারী এ বাদ দিলে বিবির যেটুকু অবশিষ্ট থাকে তার দাম ঐ ময়লা কাপড়পড়া চাষীদের মেয়ের চেয়েও অনেক কম। কাজের কষ্টিপাথরে কসলে বিবি মরা সােনা ! বিরজা। না, দিদিভাই,সুব্রত ডাক্তার যে কাজ করে, তাই জগতের একমাত্র কাজ নয় ! বিবি। মনকে চোখ ঠেরে লাভ নেই, দাদু ; তাতে লােককে ধাপ্পা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মনকে প্রবােধ দেওয়া যাবে না। আজ সারা দেশ একটা দুঃসহ বেদনার মধ্য দিয়ে চলেছে। দেশব্যাপী নগ্ন দারিদ্র, অন্ধ অজ্ঞানতা, অন্ন সমস্যা, বস্ত্র সমস্যা, শিক্ষা সমস্যা। কী সাহস নিয়ে সাধকরা আগিয়ে চলেছে! কী তাদের আগ্রহ—কী তাদের আকুতি; দেশের জন্য তারা সব দিতে প্রস্তুত! আর এর মধ্যে আমার মত মেয়ের উপযুক্ত কোথায়, দেশের কোন কাজে আমরা লেগেছি ? আমরা এই বড় লােকের মেয়েরা মাটির সঙ্গে সম্বন্ধহীন—চারতলায় ঝােলানাে পাতাবাহারের গাছের মত শুধু শােভা করে বসে আছি! সার বিরজা প্রসাদের নাতনী। অর্থাৎ ।

৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম বড়লােকদের showcase এ সাজান দামী পুতুল। বিয়ের পর আর একজন বড়লােক গাড়ী করে নিয়ে যাবে তার বাড়ীতে, সাড়ী আর জড়ােয় দিয়ে মুড়িয়ে দেবে তার মেহগিনীর glase case এ ! থিয়েটার, সিনেমা, পার্টি, নিয়মিত বৎসর অন্তর সন্তান প্রসব করা—বাঁধা ছকে ঢালা হিসেবকরা ভদ্রজীবন! যার প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত, আত্মপেষণে ভরা ! সুব্রত আর মনীষা আগামীকালের ছেলেমেয়েদের প্রতীক। তাই তাদের দীপ্তি আর দুঃসাহসের কাছে বড়লােকের ঘরের ঠুনকো সাজানাে পুতুল সাবধানী বিবি নিভে গেল ! এই খানেই লেগেছে দাদু ; এইখানেই বিবির হার, দাদু। সার বিরজা প্রসাদের আধকোটি টাকার শত চাকচিক্য গায়ে মেখেও আজকের বিবি আগামীকালের কষ্টিপাথরে কাচ বলে প্রমাণিত হবে ! বিরজা। আগামী কাল! আগামীকাল, দিদিভাই, চিরদিন আগামী থাকবে,কখনও আসবে না। বিবি। দাদু, অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। আগামীকাল আর আগামী নয়, সে এসেছে। বিরজা। কোথায় এসেছে ? বিবি । উষার প্রথম আলাের মত পাহাড়ের মাথায় ! প্রতাপপুর গ্রামে, ঐ দুঃসাহসী সুব্রত মনীষার মধ্যে, ঐ জাগ্ৰত নিৰ্ভীক চাষীদের মধ্যে ; সাধকদের মুখ জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছে সেই নূতন আলাের রঙ্গীন আভায়। এই গর্বিতা বিবির আভিজাত্যের শক্ত খােলসও চির খেয়েছে ! বিরজা। দিদিভাই, মনের কথা খুলে বলতে লজ্জা করােনা। একদিন জমিদার বিরজাপ্রসাদ তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিইছিল একটি অজ্ঞাত কুলশীল ছেলের সঙ্গে, কারণ ছেলেটিকে তার মেয়ের পছন্দ হইছিল।

১০৮ সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক আর আজ তার বুকে করে মানুষকরা নাতনীর সুখের জন্য সায় বিরজাপ্রসাদ সামাজিক প্রশ্নকে উপেক্ষা করতে এতটুকু সঙ্কোচ করবে না। বিবি। না, দাদু ; সুব্রতের সঙ্গে বিবির বিয়ে হতে পারে না, সুব্রতর মার সঙ্গে তার বাবার বিয়ে হয়নি বলে নয়—মনীষা সুব্রতকে ভালবাসে বলেও নয়- বিরজা। তবে ? বিবি। সে ত্যাগের জন্যে বিবির উপযুক্ত সাধনা নেই বলে। প্রাণের প্রবাহে অধীর দুঃসাহসী সুব্রত নির্ভীক পদক্ষেপে চলেছে ভবিষ্যতের দিকে—চোখে তার আশার স্বপ্ন, বুকে তার উৎসাহের স্পন্দন,সমাজকে সুস্থ, সবল, সুন্দর করে গড়বে,আর জড়, পচা, পঙ্কিল সমাজের সােনার খাচায় পােমানা পাখী সাবধানী বিবি—তার সঙ্গে পা ফেলে চলতে পারবে না। দাদু, মিউজিয়ামে রক্ষিত বাঘিনীর মরা কালের সঙ্গে একটা জ্যান্তো তেজালাে বাঘের বাচ্চার মিলন হয় না। বিরজা। বুঝতে পেরেছি, দিদিভাই, আঘাতটা বড় বেশীই লেগেছে। কিন্তু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সার বিরজাপ্রসাদ এখনও বেঁচে আছে। (সুষম ও লীলার প্রবেশ) সুষমা। এই যে বাবা এখানে,-এসসা দিদি,—সুব্রতর মা এসেছেন। (সুব্রতর মা বিরজাকে প্রণাম করিল। বিবি লীলাকে প্রণাম করিল।) বিরজা। এস মা, এস। কতক্ষণ এসেছ ? লীলা। অনেকক্ষণ এসেছি। চলে যাচ্ছিলাম ; কিন্তু ভাবলাম যার নিমন্ত্রণে এসেছি তার সঙ্গে দেখা না করে গেলে ভাল দেখাবে না। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। সুষমা। তুমি আর আসােনি দিদি, আমি নিজে গিয়ে তােমাকে ধরে নিয়ে এনেছি।

৩য় অঙ্ক ]
সংগ্রাম
১০৯
লীলা। কিন্তু নিমন্ত্রণটা
নিমন্ত্রণটা আপনিই করে এসেছিলেন সকলের
আগে।
বিরজা। নিমন্ত্রণের সম্বন্ধ তােমার সঙ্গে আর আমার নেই মা।
তােমার যে পরিচয় আমি জানতে পেরেছি তাতে তুমি আমার নিকট
আত্মীয় ; তােমার বাবা আমার দাদা হতেন। সম্বন্ধে আমি তােমার জ্ঞাতি
কাকা ।
লীলা। জানতে যখন পেরেছেন তখন সে পরিচয় আর সম্বন্ধ আমি
স্বীকার করে নিলাম।
বিরজা। জিজ্ঞাসা করতে পারি কি এতদিন কেন তােমার পরিচয়
গোপন করে রেখেছিলে ?
লীলা। জিজ্ঞাসা নিশ্চয়ই করতে পারেন, কিন্তু উত্তর পাবেন না।
বিরজা। কেন উত্তর পাবােনা ?
লীলা। সব কেনর কি জবাব আছে, কাকাবাবু? থাকলেও
দেওয়া উচিত ?
সুষমা। এই আমার ছােট মেয়ে বিবি। [ বিবির প্রণাম ]
লীলা। একে আমি একদিন আমাদের বাড়ীতে দেখেছি। বেঁচে
থাকে, মা, সুখী হও। সুব্রতর মুখে দিনরাতই তােমার কথা শুনি।
বিবি। নিশ্চয়ই নিলে শশানেন ?
লীলা। মােটেই না, মা,অজস্র সুখ্যাতি শুনি। তার ভাষায় তুমি
হচ্ছে দীপ্তিময়ী বিবি। হীরের মত যেমন শক্ত তেমনি দ্যুতিময়ী।
বিবি। একথা তিনি কাকে বলছিলেন ?
লীলা। আমাকে আর মনীষাকে।
বিরজা। জহুরীতে জহর চেনে’ আর বিবিকে চেনে দাদু আর
সুব্রত ডাক্তার ! শােন মা, তােমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।

সংগ্রাম
[ ৩য় অঙ্ক
আমরা বিষয়ী লোক কাজেই আমার কথাও জরুরী এবং গােপনীয়।. কবে
আর কখন তােমার বাড়ী যাবাে বল ?
লীলা। যখন সুবিধা হবে যাবেন ; সৰ্ব্বদাই আমি বাড়ী থাকি।
বিরজা। আচ্ছা, কাল বৈকালে; তােমার ছেলেরও কিন্তু থাকা চাই।
লীলা। বেশ, আমি সুব্রতকে বলে রেখে দেব।
বিরজা। তুমি ভাবছাে মা, তােমার ছেলেকে আমার কেন দরকার ?
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করবে—একখানা খাটী হীরে পেলে সে মনেরমত
করে কেটে পালিশ করে নিতে পারে কিনা। তােমরা গল্প করে মা,
আমি আর বিবি যাই। আর যদি সময় হয় তবে আর একবার আমার
সঙ্গে দেখা করে যেও। কেমন ?
উভয়ের প্রস্থান)
সুষমা। আজ তাে একটু জল পৰ্য্যন্ত খাওয়াতে পারলাম না; এবার
এলে না খেয়ে কিন্তু যেতে পারবে না। কবে আসছে বলে ?
লীলা। পাঁচবছর পরে আজ প্রথম বাড়ী থেকে বেরুলাম। এপােড়া
কপাল নিয়ে কারাে বাড়ী যেতে ইচ্ছে করে না।
সুষমা। ছিঃ, ভাই, ওকথা বলতে নেই। অমন সােনার চাদ ছেলে
বেঁচে থাকুক। কত রাজা রাজড়া তপস্যা করে পায় না। যে মেয়ের
সঙ্গে বিয়ে হবে সে কত ভাগ্য করেছে।
[ সুষমা যখন কথা বলিতেছিল, লীলা তখন দেওয়ালের গায়ে টাঙ্গান
বরবেশে রাজেনবাবু ও বধু বেশে সুষমার ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া
দেখিতেছিল ]
লীলা। ওটা কার ছবি ?
সুষমা। কৰ্ত্তার ছবি
লীলা। রাজেন বাবুর ?

৩য় অঙ্ক ) সংগ্রাম সুষমা। হ্যা, দিদি। আমার বিয়ের সময়কার ফটো । লীলা। ছবিটা কতদিন আগেকার ভােলা ? সুষমা। তা প্রায় ২৫ বছর হবে। লীলা। রাজেনবাবুর কত বয়স হবে ? সুষমা। আমার চেয়ে ৮৯ বছরের বড়। আমার বিয়ে একখানা ইতিহাস, দিদি, এইখানে বসে শােন। [ উভয়ের উপবেশন ] তিন চারটে ভাই বােন মরে গিয়ে আমি তাে দাড়ালাম বংশের পীদিপ। জমিদারের মেয়ে হলে কি হবে ? রূপের তাে এই ছিরি আর বিদ্যে ঐ চক্রবক্ৰ পৰ্য্যন্ত। হালফ্যাসানের সেলাই ফোড়াই গান বাজনা কিছুই জানতাম না। কত সম্বন্ধ আসে, বিয়ে আর হয় না। বাবার পাত্র পছন্দ হয়তাে পাত্ররা আমায় অপছন্দ করে, আবার পাত্ররা আমায় পছন্দ করে তো বাবার পাত্র পছন্দ হয়না। শেষে এক উদাসীন সন্নাসী ধরে আমায় বিয়ে দিলেন। লীলা। সন্নাসী ধরে কি রকম ? সুষমা। তা নয়তাে আর কি ? আমার একমাত্র ভাই এই গাঁয়ে কলেরায় মারা যাওয়ার পর বাবা মা আর আমাদের দুই বােনকে নিয়ে কাশী চলেন যান। সেই থেকে আমরা বরাবরই কাশীতে থাকতাম। সেবার মা ধরলেন হরিদ্বারে কুম্ভমেলা দেখতে যাবাে। বাবা বাড়ী ঠিক করে আমাদের সব নিয়ে গেলেন কিন্তু মেলা ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতে সেখানে লাগলাে ভীষণ প্লেগ। আমাদের বাড়ী শুদ্ধ সকলের ঐ রােগ হলাে। ঠাকুর চাকর সব পালালাে ! পাশের ধর্মশালার একটা উদাসীন ছেলে প্রাণ দিয়ে সেবা যত্ন করে আমাকে আর বাবাকে বাঁচিয়ে তুল্লো। মা আর আমার ছােট বােনটি মারা গেল। আমরা কি রকম তার মায়ায় পড়ে গেলাম। কিছুতেই তো আমাদের সঙ্গে আসবেনা। শেষে বাবার আর ১১২ সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক আমার অনেক অনুবােধ উপরােধে আসতে রাজী হলাে! বাবা তাকে জমিদারীর ম্যানেজার করে দিলেন। তার দুই বছর পরে বিয়ে হয়। জন্মেজন্মে অনেক তপস্যা করেছিলাম, দিদি, যে অমন মহাদেবের মত স্বামী পেইছি। মনান্তর তাে দূরের কথা,-একদিনের জন্য ও কথান্তর হয়নি। এক জমিদারী ছাড়া বাবার আর কিছুই ছিলনা। যেদিন থেকে উনি এলেন ধন দৌলত যেন উথলে পড়তে লাগলাে ! ধন ঐশ্বর্য অনেক হয়েছে, দিদি, আর চাইনে। এখন আশীর্বাদ করে হাতের লােহা বজায় রেখে যেন মরতে পারি—আর ঐ মেয়ে দুটো যেন বেঁচে থেকে সব ভােগ করতে পারে। লীলা। ( ছবির দিকে তাকাইয়া) প্রাণ খুলে আশীৰ্বাদ কচ্ছি, ভাই, তােমার সিঁথির সিন্দুর অক্ষয় হােক। তােমার ছবি, বিবি একশবছর হয়ে বেঁচে থাকুক। চলি ভাই- সুমা। আর একটু বসে যাবে না ? তােমার ভগ্নীপতি এখন কলকাতা থেকে এসে পড়বেন,-আলাপ করে যাবে না। আর সম্বন্ধও কিছু ফেলনা নয়,-শম্ভু জ্যাঠামশাইয়ের মেয়ে হিসাবে তুমি আমার দিদি লীলা। (হাসিয়া) নিশ্চয়ই ভগ্নীপতি বখন—কত মিষ্টি সম্বন্ধ নিশ্চয়ই আলাপ করবে। তবে আজ নয়। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তারওপর আমার ছেলে এত কাজ জুটিয়েছে যে একদণ্ড বাড়ী ছেড়ে থাকবার উপায় নেই। আজ যাই, ভাই, আর একদিন আসবে। আবার কাকার সঙ্গে দেখা করে যেতে হবে। সুষমা। চলাে- (সিড়ি দিয়া সার বিরজাপ্রসাদের ঘরের দিকে লীলা ও সুষমা যাইতে উদ্যত হইলে-বাহির হইতে রাজেন ডাকিলেন—“রাণী—রাণী” ) == ৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম লীলা। (চমকিত হইয়া ও কে ডাকছে ? সুষমা। ঐ তত তােমার ভগ্নীপতি। লীলা। রাজেন বাবু ? সুষমা। হাঁ।—এসে পড়েছে। একটু থেকে আলাপ করে যাবে না ? লীলা। তােমার নাম তো সুষমা। তােমাকে রাণী বলে ডাকেন কেন ? সুষমা। (হাসিয়া )—উনি বলেন ওঁর আর জন্মের স্ত্রীর নাম ছিল রাণী— তাই রাণী ছাড়া অন্য কোন নামে আমায় ডাকেন না। বলেন- ঐ নাম বলতে ওঁর খুব ভাল লাগে। (রাজেন আবার ডাকিলেন--“রাণী”—) যাই-- লীলা। তুমি যাও- ( এক দরজা দিয়া, সুষমা প্রস্থান করিলেন অন্য দরজা দিয়া রাজেন ঘরে প্রবেশ করিলেন—লীলা তখন সিড়ির উপরে। রাজেন ও লীলার চোখখা চোখি হইল। লীলা তাড়াতাড়ি উপরে উঠিয়া গেল। রাজেন—চেয়ারে বসিয়া নিজের ছবির দিকে চাহিয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিলেন। সুষমা ঘরে প্রবেশ করিল। রাজেন মুখ তুলিয়া) রাজেন। ইনি কে? সুষমা। সুব্রতর মা। রাজেন। ওঃ ? সুষমা। কি ভাবছাে? রাজেন। ভাবছি সুব্রতর মত আমার যদি একটা ছেলে থাকতে ! সুষমা। আমার একটা কথা শুনবে?

সংগ্রাম
[ ৩য় অঞ্চ
রাজেন। নিশ্চয়ই শুনবাে।
সুষমা। সুব্রতকে জামাই করে।
রাজেন। বল কি ?
সুষমা। কেন? খাসা সােনার চাদের মতাে ছেলে। যেমন রূপ
তেমনি গুণ! মা বলে ডাকলাে, প্রাণটা যেন জুড়িয়ে গেল! ঐ একটু
যা দোষ, স্বদেশী। তা বিয়ে থাওয়া হলেই সেরে যাবে।
রাজেন। কার সঙ্গে হবে ? ছবি, না বিবি ?
সুষমা। সে একজনের সঙ্গে হলেই হবে। দুজনেই দেখতে ভাল,
দুজনকেই সমান সমান দেবো।
রাজেন। (হাসিয়া) মেয়েদের মত নয় নিলেনা কিন্তু সুব্রতর মতটা
কি না হলেও চলবে ?
সুষমা। তা কেন ? বিবির তো মুখের বুলি সুব্রত ডাক্তার, সুব্রত
ডাক্তার। আর দুজনে দেখা হলে যেমন কথা কাটাকাটি করে তাতে মনে
হয় ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করে।
রাজেন। খানিকটা তােমার কথা সত্য বটে! শাস্ত্রে একে বলে
অশিক্ষিত পটুত্ব। কিন্তু সুব্রত অজ্ঞাতকুলশীল।
সুষমা। মুকুয্যে, কাজেই বামুন এটা তাে জানাে?
রাজেন। নিশ্চয়ই। তার ওপর স্যার বিরজাপ্রসাদ যখন নাতনীর
বিয়ে দিচ্ছেন তখন একেবারে নৈকষ্যকুলীন ! লােকে অবশ্য প্রশ্ন
তুলবেনা। কিন্তু আমাদের তাে জানা দরকার।
সুষমা। তােমার গলায় পৈতে আর নামের পিছনে গাঙ্গুলী
ছিল, আমার বাবা কেমন করে তোমার সঙ্গে
সঙ্গে আমার বিয়ে
দিইছিলেন ?
রাজেন। সেটা আমি আজি ও ভেবে পাইনি। আচ্ছা সুষমা, এখন

৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম বদি তুমি জানতে পারো—যে আমি মােটেই বামুন নই—ধরে একটা খুনী মামলার ফেরারী আসামী, তাহলে তুমি কি করাে? সুষমা। (হাসিয়া) কি আর করি ? যা হয়ে গেছে তাতে আর ফেরানাে যায়না। আছি বামুন, হয়ে যাবাে ঘােষ, বােস, কি দাস ? রাজেন। না, আমি আর যাই হেইনা কেন, তোমাদের পাল্টা ঘর, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কাজেই জাত যাবার সম্ভাবনা তােমার নেই। সুষমা। ঠাট্টা রাখাে। এখন সুব্রত সম্বন্ধে তােমার মতটা বলাে? তোমার মত হলে কারাে অমত হবেনা। রাজেন। হিন্দুর বিয়েতে কন্যাদান করার সময় চারপুরুষের নামের দরকার হয়। অন্তত সেটাতাে জানা দরকার ? সুষমা। সেটা কি না জেনেই সুব্রতর সঙ্গে আমি বিবির বিয়ের সম্বন্ধ করছি? দীনেন্দুকে দিয়ে আমি সমস্ত খবর জোগাড় করে এনেছি। কোথাও বাধবে না। রাজেন্দ্র। যদি হয় তােমার মেয়ের ভাগ্য। সুষমা। আমি কি ছাই এত জানি? আমাদের জ্ঞাতি শম্ভ বড়য্যে আমাদের জ্যাঠা হতেন—তুমি তাকে দেখনি—সুব্রতর মা হচ্ছেন তারি মেয়ে লীলা। [Re-action] রাজেন্দ্র। আর সুব্রতর বাবা !!! সুষমা। বােমার মামলার ফেরারী আসামী দেবব্রত মুখুজ্যে—যাকে খুজতে আমাদের গাঁ সাতদিন ধরে পুলিশে খানা তল্লাসী করেছিল সুব্রত যখন পেটে তখন তার বাবা রেঙ্গুনে রেল কলিসানে মারা যান। তাই ভাবি নইলে এত তেজ হয় ! সুব্রত আমার বাঘের বাচ্চা। রাজেন। তুমি ঠিক বলেছ, সুষমা। সুব্রত বাঘের বাচ্চা, তার বাবা দেবব্রত মুকুয্যে ফেরারী বােমার আসামী !

সংগ্রাম
[ ৩য় অঙ্ক
সুষমা। সে কবেকার কথা কবে মিটে গিয়েছে। আমি সব কথাই
একরকম ইসারায় বলেছি, তুমি একটা শুভদিন দেখে সুব্রতকে আশীৰ্বাদ
করে এসো।
রাজেন। আমি তাকে নিশ্চয়ই আশীৰ্ব্বাদ করে আসবাে সুষমা।
তুমি একবার বিবিকে এখানে পাঠিয়ে দাও। আর আমার Bedding
suitcase ঠিক করে দাওগে ; কাল ভােরে আমাকে একবার বাইরে
যেতে হতে পারে। [ “আচ্ছ।” বলিয়া সুষমার প্রস্থান। রাজেনবাবু
উঠিয়া তার ছবির দিকে চাহিলেন। তারপর দেরাজ হইতে একটি পিস্তল
বাহির করিয়া পরীক্ষা করিলেন এবং নিজের ছবির দিকে পিস্তলটা
উঠাইলেন। ]
সুব্রতর প্রবেশ
রাজেন। কে ?
সুব্রত।
আমি সুব্রত।
রাজেন। দেবব্রত মুখুজ্যের ছেলে সুব্রত, বাঘের বাচ্চা ! এসাে-
সুব্রত। (আগাইয়া) মা কি আপনাদের বাড়ী থেকে চলে গেছেন?
রাজেন। না, এখনও যাননি। বসাে-। ওখানে নয়, বাবা-
আমার পাশে এই কোচে এসে বসো। [ধরিয়া বসাইলেন] তােমার কথাই
ভাবছিলাম।
সুব্রত। কেন বলুন তাে?
রাজেন। তােমাকে আশীর্বাদ করবাে বলে। দেবব্রত মুখুজ্যের
ছেলে সুব্রত বাঘের বাচ্চা।
সুব্রত। আপনি কথাটা বারবার বলছেন কেন ?
রাজেন। বলতে খুব ভাল লাগছে, আচ্ছা, সত্যি বলতে, সুব্রত,
সত্যিই কি আমার জীবনটা একেবারে বৃথা হয়ে গেছে?

৩য় অ]
সংগ্রাম
সুব্রত। সে কি কথা বলছেন ? আপনার মত লােক দেশে কটা
আছে ?
রাজেন্দ্র। আমি
যতদূর
জানি আমার মত লােক সারা বাংলাদেশে
আর একটাও নেই। কিন্তু এই যশ, অর্থ, মান, প্রতিষ্ঠা—এ সব আমি
কিছুই চাইনি, সুব্রত ! আমি চেইছিলাম তােমার মত ছেলে, বিবির মত
মেয়ে, দেশের কাজ নিয়ে থাকবে। রােজ আমাকে এসে বলবে কার
সঙ্গে তারা ঝগড়া কল্লো, কার সঙ্গে তারা ভাব কল্লো, আর তার মধ্য
দিয়ে সকলে মিলে দেশের কাজ কতখানি আগিয়ে নিয়ে গেল। নাম
করেছি, অর্থ করেছি, কিন্তু কিছুই সৃষ্টি করতে পারিনি, সুব্রত ; এইখানেই
আমার কর্মজীবনের বিফলতা। তুমি আমার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে
যাচ্ছে, সুব্রত, না ?
সুব্রত। আশ্চৰ্য্য না হলেও ঠিক এরকম কথা আমি আপনার মুখ
থেকে আশা করিনি, মনে হচ্ছে আপনার শরীর ভাল নেই।
রাজেন্দ্র। (হাসিয়া) শরীর আমার চিরদিন এত ভাল যে খারাপ
যদি হয় তবে আজই প্রথম হবে! অথচ আজই আমার সবচেয়ে ভাল
থাকা দরকার।
সুব্রত। আজকে আপনাকে দেখে একেবারে নূতন লােক বলে মনে
হচ্ছে।
আমারও ঠিক তাই। সেদিন তুমি ছিলে অপরিচিত,
তাই তােমার কথায় আমার চমক লেগেছিল—মনে হইছিল তুমি
অস্বাভাবিক। আর আজ তােমার পরিচয় পেয়ে মনে হচ্ছে, জগতে তুমিই
সবচেয়ে স্বাভাবিক ! আচ্ছা, সুব্রত, তােমার বাবাকে তাে তুমি দেখনি?
সুব্রত। না। তিনি মারা যাওয়ার পর আমি জন্মেছি।
রাজেন্দ্র। তিনি বুঝি রেঙ্গুনে মারা যান।
;

সংগ্রাম
সুব্রত। হ্যা, Rail accident এ। তার আগে থেকেই তিনি
নিরুদ্দেশ
রাজেন্দ্র। হঁা, শুনেছি, একটা গুরুতর রাজনৈতিক অপরাধে
অভিযুক্ত হয়ে।
সুব্রত। কালীশঙ্কর রায়ের হত্যার ব্যাপারে
রাজেন্দ্র। তোমার বাবার কথা মার কাছে কি শুনেছ? আমার
খুব ভাল লাগছে তােমার সঙ্গে গল্প করতে--তােমার বাবার কথা
জানতে
সুব্রত। মার কাছে শুনেছি তিনি দেহে মনে শক্তিমান পুরুষ ছিলেন।
রাজেন্দ্র। সে তোমাকে দেখেই বােঝা যাচ্ছে—আর ?
সুব্রত। তিনি ভারতবর্ষের সব প্রদেশের ভাষা বলতে পারতেন,
আর তাদের মতো বেশভূষা করতে পারতেন।
রাজেন্দ্র। সেই জন্যেই বােধ হয় পুলিশের চোখে ধূলাে দিয়ে তিনি
পালাতে পেরেছিলেন। আচ্ছা, তুমি কোথায় জন্মেছিলে ?
সুব্রত। বর্মায়। বাবার মরার খবর শুনে, মা বর্ষায় চলে যান।
সেইখানে এক আত্মীয়ের বাড়ী তিন বছর থাকার পর কলকাতায় ফিরে
আসেন।
রাজেন্দ্র। শুনেছি তােমার দাদামশাই মারা যান কলকাতায় ; তার
মৃত্যু সময় তোমার মা বুঝি সেখানে ছিলেন না?
সুব্রত। না। বাবা তখন ফেরারী,-মা তার খোঁজেই ঘুরে
বেড়াচ্ছিলেন।
রাজেন্দ্র। তাই কি? [ Re-action ] আমি শুনেছি সেই সময়
তােমার বাবা পুলিশের গুলিতে জখম হন—এই প্রতাপপুরে, তােমার
মামার বাড়ী থেকে পালাবার সময়। তােমার মা তখন তাকে নিয়ে

৩য় অঙ্ক ] সংগ্রাম মুসলমান সঙ্গে কলকাতার এক মুসলমান প্রজার বাড়ীতে ওঠেন। এবং তিন মাস দিনরাত শুশ্রুষা করে তাকে বাঁচিয়ে তােলেন। নয় কি ? সুব্রত। সে কথা আপনি জানলেন কি করে ? রাজেন্দ্র। সেই ঘাের দুর্দিনে নিবিড়তম পরিচয়ের ফলে তুমি এলে তোমার না: গর্ভে। এবং অন্য কোন উপায় ছিল না বলে মুসলমানী মতে তােমার মার সঙ্গে তােমার বাবার বিয়ে হয়। সেই জন্যই এই গ্রামে এসেও তােমরা এতদিন তােমাদের পরিচয় গোপন করে আছাে-আর তােমার দাদামশাই এর সম্পত্তির ওপর কোন দাবী উপস্থিত করেনি। নয় কি দেবব্রত মুখুজ্যের ছেলে—সুব্রত মুখুজ্যে ? সুব্রত। সে কথা আমি আর আমার মা ছাড়া জগতে আর কেউ জানে না, সে কথা আপনি জানলেন কেমন করে ? রাজেন্দ্র। আর ও পােন বাঘের বাচ্চা। বিয়ের সময় বােধ হয় কেউ সনেহ করে যে তােমার মা বাপ মুসলমান নয়,—সেই সন্দেহ কানাকানিতে পরিণত হয়,এবং পুলিশ সেই বাস! raid করে। তােমার মা তখন তােমার দাদামশাইএর খোঁজে কলকাতার বাইরে। অসীম দুঃসাহস দেখিয়ে তােমার বাবা পালিয়ে লুকিয়ে ওঠেন রেঙ্গুনগামী steainer; তারপর থেকে তোমার মার সঙ্গে তােমার বাবার আর দেখা হয়নি [ Re-action ] আরও শােন, বাঘের বাচ্চা, তােমার বাবা তোমার মাকে আদর করে ডাকতেন ‘রাণী’ বলে—সেইজন্য ‘রাণী’ কথাটা উল্কি করে লেখা আছে তােমার মার বুকের ওপরে ! সুব্রত। মার কাছে শুনেছি মার দেওয়া বাবারও নাম ছিল “রাজা” -যে কথাটা তার ডান হাতে লেখা ছিল। কিন্তু আপনি এত কথা জানলেন কেমন করে ?—আপনি কে ? [ রাজেন জামা গুটাইয়া হাতে লেখা “রাজা” দেখাইলেন ] রাজা! আপনি ! বাবা!

সংগ্রাম
[ ৩য় অঙ্ক
জেন্দ্র। চুপ ! চুপ ! বাঘের বাচ্চা ! যে আবেগ বুক ফেটে বেরুতে
চাচ্ছে, তাকে গলা টিপে আটকে রাখাে ! বিপ্লবীর ছেলে বিপ্লবী।
বিপ্লবী নিয়তিকে দেখলে ভয় পায় না। মা, বাপ, স্ত্রী, পুত্র পরিবার,
আত্মীয় স্বজন, সমাজ সংসার, স্নেহ, দয়া, মায়া, মমতা-বিপ্লবীর কিছু
নেই। আছে শুধু তার মহান আদর্শের প্রতি স্থির নিবদ্ধ দৃষ্টি, আর
নির্ভীক পদক্ষেপে—অসীম দুঃসাহসের সঙ্গে লক্ষ্যের দিকে আগিয়ে চলা।
সুব্রত। বাবা! [ রাজেনের কোলের ওপর পড়িল ] মা জানেন ?
রাজেন্দ্র। বুদ্ধিমতী সন্দেহ করেছে নিশ্চয়।
[ বিবির প্রবেশ—সুব্রত ও রাজেনকে ঐ অবস্থায় দেখে
বিন্দুমাত্র বিস্মিত না হইয়া ]
বিবি। বাবা!
রাজেন্দ্র। সুব্রতর সঙ্গে গল্প কচ্ছি, বিবি, আয়।
বিবি। তুমি আমায় ডাকছিলে ?
রাজেন্দ্র। আমার পাশে এসে বােস্। লজ্জা কি ? [ বিবি রাজেন
ও সুব্রতর মাঝখানে বসিল ] সুব্রতকে নমস্কার কর্লিনে ?
বিবি। একদিন একবার করেছিলাম। কিন্তু কোন ফল হয়নি।
রাজেন্দ্র। তাই বুঝি আর করবিনে ?
বিবি। তােমরা সব পাথর! প্রণাম করে আর মাথা কুটে পাথর
গলান যায় না। (তাহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল )
রাজেন্দ্র। সুব্রতকে খুব ভালবাসি নারে ? বলতে কোন লজ্জা
নেই। আজ সব গােপনতা ত্যাগ করবার দিন এসেছে।
বিবি। খুব ভালবাসি [ সুব্রতের হাত হাতের মধ্যে নিল ]
তােমাদের দেখলে ভাল না বেসে থাকা যায় না ;আর ভাল বাসলে
চিরদিনই কাঁদতে হয়!

৩য় অঙ্ক ]
সংগ্রাম
১২১
==
রাজেন্দ। বােধ হয় তুই ঠিকই বলেছি, বিবি,—আমাদের
ভালবাসলে চিরদিনই কাদতে হয়--
(রাজেন কোনরকমে অশ্রু সংবরণ করিলেন )
বিবি। বুকের রক্ত দিয়ে গড়া জিনিষ ভেঙ্গে দিতে তােমাদের
একটুও বাধে না।
রাজেন্দ্র। আর সুব্রতকে জিজ্ঞাসা কল্লিনে তােকে ভালবাসে কিনা ?
বিবি। সাহস হচ্ছে না। যদি বলে ‘না’—তাহলে সহ্য করতে
পারবাে না।
রাজেন্দ্র। আমি সুব্রতকে কতখানি ভালবাসি, জানিস্ ? তাের
চেয়ে, ছবির চেয়ে, সংসারের সব চেয়ে বেশী।
বিবি। তা জানি, বাবা ; বাপেরা মেয়ের চেয়ে ছেলেকে বেশী
ভালবাসে।
সুব্রত। বিবি।
বিবি। তােমার সঙ্গে বাবার কথা সব শুনেছি, দাদা।
রাজেন্দ্র। সুব্রত ! (“বাবা”) বিবি—দেবব্রত মুখুজ্যের মেয়ে,
এর সব ভার তােমাকে দিয়ে গেলাম। নিজের মনের মতো করে
মানুষ করাে....... সুষমা, লীলা, মনীষা ও বিরজা পরপর আসিলেন ]
দেখাে, সুষমা, ফেরারী বোমার মামলার আসামী দেবব্রত মুখুজ্যের ছেলে
সুব্রতকে আমি আশীৰ্বাদ কচ্ছি। কিন্তু সুষমা—দেবব্রত মুখুজ্যের ছেলের
সঙ্গে তােমার মেয়ের বিয়ে হতে পারে না।
বিরজা। কেন পারে না, রাজেন ? বরং এর চেয়ে ভাল
লীলা। না ! না !
মনীষা। মনীষা যদি কারণ হয়, তবে সুব্রত আর বিবির সুখের
জন্য সে নিজেকে মুছে ফেলতে রাজী আছে।

সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক লীলা। না, মনীষ, তুমি কারণ নও। তার কারণ, কাকাবাবু, দেবব্রত মুখুজ্যের সঙ্গে সুব্রতর মা লীলার বিয়ে হবার আগেই তিনি মারা যান। রাজেন্দ্র। রাণী ! সুব্রত। মা ! লীলা। সুব্রত আমার পিতৃ পরিচয়হীন। বিবি। না, সুব্রত পিতৃ পরিচয়হীন নয় ! সুব্রতর বাবা দেবব্রত মুখুজ্যে রূপেগুণে কুলে-শীলে এতবড় ছিলেন যে তার সঙ্গে সার বিরজা প্রসাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতেও বাধতো না। [ অঞ ও আবেগে বিবির কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া গেল। বিবি ‘বাবা’ বলিয়া রাজেনকে জড়াইয়া ধরিল—রাজেনও তাহাকে ‘মা’ বলিয়া বুকের কাছে লইলেন। সকলে বিস্ময়ে তাকাইতে লাগিল ] বিরজা। কি ব্যাপার কিছুই তাে বুঝতে পাচ্ছিনে? রাজেন্দ্র। বুঝতে পাচ্ছেন না? লীলা। (চীৎকার করিয়া) ওগাে-না-না-না- রাজেন। নিয়তির দাবী মিটিয়ে দেবার সময় এসেছে, রাণী, ভয় পেলে চলবেনা। নিয়তি কাউকে ক্ষমা করে না। অতীতে কালের গর্ভে নিজে হাতে যে বীজ পুঁতেছিলাম,সেই মহা মহীরুহ হয়ে আজ তার ফল প্রসব করেছে। বিষই হােক আর অমৃতই হােক আমাকে তা খেতেই হবে। লীলা। নানা—আমি তােমাকে চিনিনা রাজেন। কিন্তু নিয়তি আমাকে চিনেছে, আর চিনেছে তােমার চেনা দিয়েই। এখন তুমি চিনিনে বল্লেও সে তাে ছাড়বে না। বিরজা। রাজেন! একি হেঁয়ালী -আমি তাে কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনে। রাজেন। বুঝতে পাচ্ছেন না? কালীশঙ্কর রায়ের হত্যাকারী ফেরারী আসামী দেবব্রত মুখুজ্যে আমি! এই দেখুন দেবব্রত মুখার্জির সনাক্তের ৩য় অঙ্ক । সংগ্রাম ১২৩ ! চিহু “রাজা” নাম আমার ডান হাতে লেখা ! ২৭ বছর এমনি করে আত্মগোপন করি যে শুধু লােকেই দেবব্রত মুখুজ্যেকে ভুলে যায়নি,আমিও ভুলে গিইছিলাম। কিন্তু আমােঘ নিয়তি ভুলতে দিল না। দুৰ্ব্বার সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে পথের সমস্ত বাধ। বিরােধকে চূর্ণ করে মনে ভেবেছিলাম আমি জয়ী হইছি ! কিন্তু আমার নেই ভুলে যাওয়া—ফেলে আসা জীবন --নববিরোধের রূপে -- অদ্ভুত শক্তি আর দর্প নিয়ে আমার পথ আটকে দাড়ালো।—সে আমারি ছেলে—সুব্রত, আর তার পিছনে তার মহীয়সী মা, আমার স্ত্রী লীলা যারা ভেবেছিল আমি মরে গেছি—আর আমি ভেবেছিলাম যারা মরে গেছে। আমার সেই পুরানাে জীবন আর নূতন জীবনের সংঘাতে জয়ের মুখে নূতনটী হেরে গেল। আমার নূতন আমির পিছনে ছিল শুধু শক্তি আর অহংকার—ছিলনা সেই পুরাণে আমির স্বপ্ন আমির স্বপ্ন আর সাধনা। সত্যিকারের আমি কে ? সার বিরজাপ্রসাদের জামাই শক্তিমান রাজেন ? সাধক দেবব্রত—সুব্রত যার ছেলে ? এই বিরােধে রাজেন মরে গিয়ে মরা দেবব্রত বেঁচে উঠলাে। কেননা রাজেন না মলে তত সুব্রতের প্রতিষ্ঠা হয় না—আর সুব্রতের প্রতিষ্ঠা না হলে অপরাজেয় দেবব্রতের পরাজয়। তাই দেবব্রত মরছে —যাতে সুব্রত প্রকাশ পায় পূর্ণ গৌরবে ! বিরজা। ওরে—ওরে—ওমর খায়ামের সব স্বপ্ন—ধূলিসাৎ হয়ে ভেঙ্গে পড়লো- রাজেন। দুঃখ করবেন না—বাবা,-স্বপ্ন—চিরদিনই ভেঙ্গে যায়- শুধু সাধনাই টিকে থাকে। [ নেপথ্যে “হুসিয়ার ! চোর ! চোর!”—মাতাল শিবশঙ্করের প্রবেশ তারহাতে উদ্যত পিস্তল—] শিবশঙ্কর। এই বার তােমাকে পেইছি সুব্রত। আমি কালীশঙ্কর রায়ের ছেলে শিবশঙ্কর রায়- ১২৪ সংগ্রাম [ ৩য় অঙ্ক রাজেন। ( সুব্রতকে আড়াল করিয়া)-এসেছে, নিয়তি এসেছে- আমি কালীশঙ্কর রায়ের হত্যাকারী ফেরারী বোমার আসামী দেবব্রত মুখুজে শিবশঙ্কর। জানি জানি—( শিবশঙ্করের পিস্তল গর্জিয়া উঠিল। রাজেন পড়িয়া গেলেন, শিবশঙ্কর ভয়ে আত্মহত্যা করিল ) রাজেন্দ্র। রাণী—! (লীলা ও সুষমা উভয়েই তাহার কাছে গেল) আমায় ভাল করে বসিয়ে দাও, সুব্রত।—নিয়তির চাকা এমনি করে ঘােরে, বাঘের বাচ্চা! কিন্তু বিপ্লবী প্রতি পদক্ষেপে নিয়তিকে পদদলিত করে আগিয়ে চলে তার মহান আদর্শের দিকে। কেঁদ না সুষমা,- তােমার চোখের জলে আমার যাবার পথটা পিছল করে দিও না। সােনার সংসার আমি রেখে গেলাম।-সুব্রতর মত ছেলে, বিবির মত মেয়ে, দীব্যেন্দুর মত জামাই! মনীষা, দীব্যেন্দু, তােমরাই আগামী কালের অগ্রদূত ! তােমাদের বিপ্লবী মনের জাগ্রত দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখােঐ সবরমতী আশ্রমের মহামানব মহাত্মার দিকে। সত্য হােক তোমাদের ধর্ম ; অহিংসা হােক তােমাদের অস্ত্র, শিক্ষা, সেবা, ঐক্য, সংগঠন হােক তােমাদের মন্ত্র। আগিয়ে নিয়ে এস তােমরা তােমাদের মহত্তর উন্নততর সমাজ-বিধান—“কৃষক মজদুর প্রজা রাজ সুব্রত,-ঐ-কালের পদধ্বনি শােনা যাচ্ছে ? ঐ প্রলয়পয়ােধির জল কল্লোল, ঐ ধুমায়িত আগ্নেয়গিরি পঙ্ক স্রোত গদমুখর—! এ নহে কাহিনী—এ নহে স্বপন, আসিবে, সেদিন আসিবে! (সুব্রতের কোলের উপর রাজেনের মৃত্যু Dead march বাজিয়া উঠিল—ধীরে ধীরে যবনিকা পড়িল—I) -শেষ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kaler Padadhani Ba Sangram

Author
Bhattacharya, Nitai
Title
Kaler Padadhani Ba Sangram
File name
Kaler Padadhani Ba Sangram
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/08/24
Publisher
Sri Bhubanmohan Majumdar, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
134
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama. Plays.
Keywords
Drama
DLI number
512785
Barcode
4990010019826.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
k9jAUEZvtW3
Download PDF

Kaler Padadhani Ba Sangram