Makardah Saraswat Library, Howrah
Sesh Kheya, Vol.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
(১২৯০
সে যে
(কবি
সা।
বন্দোব্য
No text on this page.
***
শেষ খেয়া
প্রথম খণ্ড
No text on this page.
শ্ৰীমান সুরেশ চক্রবর্তী
প্রিয় সুরেশ,
তোমাকে স্নেহ করি,-তার কারণ অন্য ।
তোমাকে ভালবাসি,—তার কারণ—তুমি সাহিত্য-প্রেম,
—“সাহিত্য, “সাহিত্যিক” আর “সাহিত্য-চচ্চ।" ভালবাস ।
শুধু “ভালবাস" বললে সবটা বলা হয় না,—এই তিনটির
চেয়ে তােমার আর বড় নেশার জিনিষ বা সখের কি আনন্দের
জিনিষ দেখিনি। এই তিনটির প্রসঙ্গ পড়লে, তােমার সময়-
অসময়, নাওয়া-খাওয়া, লাভ-ক্ষতি, অসুখ-অনটন—কোন কিছুরই
জ্ঞান থাকেনা,তুমি সব ভুলে যাও। এইটি হচ্ছে নেশার
লক্ষ।
তােমার এই নেশ টির জন্যেই আমি তােমাকে ভালবাসি।
তাই আমার এই “শেষ খেয়া” আজ নিশ্চিন্ত মনে তােমার হাতে
দিয়ে, তার আনন্দটা নিজে নিলুম ।
গ্রন্থকার
কাশীধাম,
মহাষ্টমী--১৩৩২।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শেষ খেয়া
দোকানের জন্য ঐরূপ একটি লােকের আবশ্যকও হইয়াছিল।
তনি ইতস্ততঃ না করিয়া নবীনকে তাহার চীনাবাজারের
কানে কুড়ি টাকা বেতনে নিযুক্ত করিয়া লইলেন। তাহাতে :
নবীনের বাপ মনােহর পালকে বলিয়াছিল—“কলকেতায় চাকরী
’ল—এর পর আমাকে ‘বাবা’ বলতে লজ্জা পাবেনা তো!”
মনােহর পাল হাসিয়া বলেন—“না, তত ইংরিজি শেখে নাই !”
সেই বৎসরেই নবীনের বিবাহ হইয়া যায়। পার্বতীকে
ধরে আনিয়া বাড়ীর যেন ঐ ফিরিয়া গেল ;-কষ্টের সংসারের
ছোটবড় অভাব-অভিযােগ ও অশান্তি, অল্পদিনেই অন্তর্হিত
ইল। সেই অবজ্ঞাত চালাঘর কয়খানি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়
অনেকেরি লােভনীয় হইয়া উঠিল। বধূর কোন দোষ আবিষ্কার
করিতে না পারিয়া প্রতিবেশিনীদের মধ্যে কেহ কেহ হতাশ ও
ক্ষুব্ধ হইয়া বলিলেন-“বয়স ভীড়িয়ে বে দিয়েছে!” কেহ
বলিলেন—“বেম্ম-টেন্মর ঘরের মেয়ে হবে—তা-নাতে ও-বাড়ীর
কা’কেও আর ময়লা কাপড় পরতে দেখতে পাস কি !” ইত্যাদি।
কিন্তু ঐ সঙ্গে নিত্য তুলসীমঞ্চ মার্জন, তথায় দীপদানান্তে
গলবস্ত্র হইয়া প্রণাম, প্রভৃতি অবাঞ্ছনীয় ব্যবহারগুলা অন্তরায়-
রূপে উপস্থিত থাকায়, অত-বড় পাকা অনুমানটা ভাল করিয়া ।
মাথা তুলিতে পারে নাই।
তাহার পর যে দশটা বৎসর আসিল, তাহারা নবীনকে
দুইটি পুত্ৰ দিয়া, মনােহর পালের দোকানের দুই আনা অংশীদার
করিয়া গেল। ঐ সঙ্গে তিনখানি পাকা কোঠার ও বৈঠকখানার
শেষ খেয়া
পত্তনও দেওয়াইল, এবং নবীনের পিতাকে পৌত্ৰমুখ দেখাই।
স্বর্গের অধিকারী করিয়া লইয়া গেল।
পিতা যে কেন বড়,-শাস্ত্রে, সমাজে কি সংসারে তার
প্রমাণ খুজিতে হয় না। তাহাদের কৃত পুত্রাদির নামকরণটিও
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরর্থক বা অসার্থক হইত না। এখন আর
সন্তানের নামকরণটা বাপকে করিতে হয় না—উপন্যাস বা
অভিধানই সে কাজটা করিয়া দেয় ; তাই আমরা পথে-ঘাটে
“অমলধবল,” “কষিত-কাঞ্চন” প্রভৃতি দেখিয়া দেখিয়া, কথাগুলার
প্রকৃত অর্থ ভুলিয়া যাইতেছি। নবীনের বাপ কিন্তু স্বয়ংই
নাতীদের নামকরণ করিয়া গিয়াছিলেন—গণেশ ও কার্তিক ।
তাহারাও রূপে-গুণে, আকৃতিতে-প্রকৃতিতে, পিতামহ-দত্ত নামের
মৰ্য্যাদা বড় একটা ক্ষুন্ন হইতে দেয় নাই।
গণেশ প্রবাদানুরূপ বিছার দিকে না বাড়িলেও, বুদ্ধিটাকে
সত্বর অতিরিক্ত বাড়াইয়া সে-অভাব পূরণ করিয়া লইয়াছিল ।
ধীর ও অল্পভাষী ত ছিলই, তাছাড়া তাহার প্রকৃত মনােভাব
বুঝিতে পারিয়াছে—এতটা বুদ্ধির স্পর্ধা কেহ কখনাে করিতে
পারে নাই ;—অপর পক্ষে, চুলের পারিপাট্য, পােষাক-পরিচ্ছদ
ও গীতবাদ্যে, পার্শ্বস্থ পাঁচখানা গ্রামের মধ্যে কার্তিক ছিল
অদ্বিতীয়
। সে “রেণান্ডের" নভেলের ভাবটা বুঝিবার মত
ইংরাজি শিখিয়াই, বিদ্যাচর্চার আর আবশ্যক দেখে নাই।
কেহ কেহ বলেন—বঙ্গদেশে কার্তিকচন্দ্রই ছিলেন সােনার
চশমার প্রথম প্রচলনকর্তা।
শেষ খেয়া পালবংশের বংশানুক্রমিক পদ্ধতি অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য নবীন পুত্রদ্বয়ের বিবাহ দিতে বিলম্ব করে নাই। গ্রামের সন্নিকটস্থ কন্যাদায়গ্রস্ত বিপন্ন নিমাই নন্দীর প্রকৃতি সম্বন্ধে বহু । বিরুদ্ধ মন্তব্য বর্তমান থাকিলেও, তাহার বয়ঃস্থা কন্যাটির সহিত গণেশের বিবাহ দিয়া নবীন তাহাকে দায়মুক্ত করে। নবীনের মনে-মনে সন্দেহ ছিল,উপযুক্ত পুত্র গণেশ এ- কুটুম্বিতায় আপত্তি করিতে পারে; কিন্তু তাহার তরফ হইতে কেহ কোন প্রতিবাদ পায় নাই। পাড়ায় গণেশের বুদ্ধিমান বলিয়া খ্যাতি ত ছিলই,-এই ঘটনায় প্রতিবেশীরা বুঝিল- গণেশ আদর্শ পিতৃভক্তও বটে, এবং বলিল—“ছেলে হবে ত গণেশের মত।" মানুষ কাজ দেখিয়াই বিচার করে, কারণ কাজটাই সে দেখিতে পায়। কিন্তু আমরা জানি, এ-বিবাহের পূর্বে থেকেই নিমাই নন্দীর সহিত গণেশের পরিচয় ছিল। নিমাইয়ের জমি-সংলগ্ন নবীনের একটি নারকোল-বাগান থাকায়, গণেশ মাঝে মাঝে সেখানে নারকোল পাড়াইতে যাইত,—সেই সূত্রেই উভয়ের আলাপ হয়। যে কারণেই হউক, নিমাই, গণেশকে ডাকিয়া কথা কহিত এবং সে-কথার মধ্যে স্নেহ ও তাহার ভবিষ্যৎ উন্নতির শুভ প্রার্থনা ফুটিয়া উঠিত। নিমাই বলিত—“আমাদের দেশটা কন্ধ-কাটার দেশ, এদের পেট আছে—মাথা নেই, তা-নাত এমন দুর্দশা ! যে উন্নতি করতে চায়, আর তােমার বুদ্ধির অর্ধেকও রাখে,—তার
শেষ খেয়
আবার ভাবনা ! এই ধর না-এক নারকোলগাছ থেকেই সে
লক্ষপতি হতে পারে ;-ওর কোটা ফেবে বলে ! চৈত্র
মাসে তারকেশ্বরে ওর ডাবগুলো যত পার পাঠাও—আর
ছ’পয়সা করে ছাড়াে;-এক-একটা সন্নিসী যেন একএকট।
পােড় ছিচকে,-তেষ্টা কি! বাঙ্গল। দেশে কিছু নেই-নেই-তর
দুটো জিনিস বারােমাসই আছে--ম্যালেরিয়া আর মেয়ের-বে ;
আর বে থাকলেই জনায়ের মনােহরাও আছেন,ডাবের
‘নেয়া’ই হচ্ছে তার সােনার কাঠি। ওর জলটা কায়দা করে
বােতলবন্দী করতে পারলে—বড়লাটের ‘লেভি’থেকে চুনে। গলির
‘টেবি’ পৰ্যন্ত টান ধরাবে ; তােমাকে পলাশ গেটেও মাথা গলাতে
হবেনা—হত্যে দিতেও হবে না, এক বাথগেটে’ গছাতে পারলেই
ফতে। ঝুনাে থেকে চন্দ্রপুলি, নারকোল-নাড়ু, রসকরা, এতে
মসকরা নয়-বাঙ্গলা দেশের সনাতন মিষ্টান্ন। আবার বুনে
খডুলি মারলেই খােট্টার দেশে মেওয়া,পােচলেই তেল !
ফোপােল্ Preserve করতে পারলে ফ্রান্সের মত ফ্যাসানের
দেশ লুফে নেবে। গাছ বেরুলেই ছ’গণ্ডা ! রইলােখােলটা ;
হুকোপটি ত আর কলকেতা ছেড়ে দিল্লী যাচ্চেনা! ছােবড়ায়
কাতাদড়ি—পাপােষ, গদির খােরাক, সােফাপুঞ্জী—বগায়রা !
আবার পাতায় ঝাটা, গামড়ায় লেড়ি ! আর কি চাও ?
করতে পারলে কি না হয় বাবাজি! চাই কেবল বুদ্ধি,—সেট।
ভগবান তােমাকে দিয়েছেন। তােমার সামনে বলা নয়
গণেশধার, দাওয়ানজী মশাইকে দেখিনি—তার বুদ্ধির কথাই
•
শেষ খেয়া
••
;
শুনেছি ; সত্যি বলতে কি,-তােমাকে দেখে তাকে দেখার
আনন্দ পাই, তােমার সঙ্গে কথা কয়েও তাই এত সুখ হয় ।
“লােকের বুদ্ধিটাই হ’ল সেরা সম্পত্তি ; আর চাই একটি
শক্ত সবল সঙ্গিনী,—যদি সে লােক মানুষ হতে চায়। ভেতরের
বাধন আলগা হ'লে, কিছুই দাড়াতে পায় না—সব সঞ্চয়ই
ফাক বেয়ে বেরিয়ে যায় !
“বাবুরা রূপ খোঁজেন,-দেখে কেবল দুঃখের হাসি হাসি :
আরে মুখ—লক্ষ্মীর চেয়ে রূপ কার,—যিনি হচ্ছেন রূপে-য়া !
সব রূপই ওরির মধ্যে আছে।
“তাই বলছিলুম-বুদ্ধিমান যে হবে তার চাই একটি
সুস্থ সবল পরিবার। যদি দেখতে হয় তাে-মেয়েকে নয়
মেয়ের বাপ-মাকে
বাপ-মাকে ;-আকরটা নির্বোধের না হয়—বা ।
ধনী বনতে হলে খনি খুঁজতে হয় বাবাজি ? দেখবে—সুখ
আর ঐশ্বৰ্য্য দুই-ই ঘরে বেঁধেছ। তােমাকে ভালবাসি আর
তুমি বুদ্ধিমান, তাই এই ৫২ বছরে যা যৎসামান্য বুঝেছি
তা না বলে থাকতে পারিনা। গ্রামের একজনেরও ভাল দেখে
যেতে পারলে মরণে সুখ আছে ।”—ইত্যাদি।
লােকের মনের মত করিয়া এবং আবশ্যক বুঝিলে সরস
করিয়া কথা কহিবার ক্ষমতা নিমাইয়ের বিলক্ষণ ছিল।
গণেশ তাহার কথা মনােযােগের সহিত শুনিত এবং মনে
মনে মানিয়া লইতেও বাধ্য হইত। বার কয়েক এই সাধুসঙ্গ
করিয়াই তাহার বুদ্ধির ভাণ্ডার নানারত্নে ভরিয়া উঠিয়ছিল ।
শেষ খেয়া
এই সব অধিবেশনান্তে নিমাই তাহাকে মুড়ি-গুড় খাওয়াই
বিদায় দিত,-গণেশ পান মুখে দিয়া বাড়ী ফিরিত।
নিমাইয়ের চতুর্দশবর্ষীয়া কন্যা চণ্ডিকার সবল সুপুষ্ট দেহ
কখনাে কলস-কক্ষে, পুষ্করিণী হইতে দশ কলসী জল আনিয়া
গরুগুলির গামলায় ঢালিত ; কখনো তাহাদের শিং ধরিয়া মুখ
ফিরাইয়া দিত; কখনাে ভীষণদর্শন কৃষ্ণবর্ণ দুষ্ট এড়েটার ঘাড়ে
ঘুসি মারিয়া গােয়ালের বাহির করিয়া অন্যের ক্ষেতে আহার
অন্বেষণে ও রাত্রিযাপনে পাঠাইত। কখনাে বা অপরের
বাগান হইতে সদ্য-পতিত নারকোল-পাতাগুলির কান ধরিয়া
হিড়হিড় করিয়া টানিয়া আনিয়া, তখনি পাতা ছাড়াইয়া
গামড়া কাটিতে বসিত ;—অল্পক্ষণেই তাহারা আলানি কাঠে
রূপান্তরিত হইয়া গৃহপ্রবেশ করিত।
গণেশের চক্ষের সম্মুখেই, পেশী-পুষ্ট শক্তিরূপিণী চণ্ডিকার
এই রুদ্রলীলা চলিত। একদিন সে দেখিল—কোন এক পুষ্করিণীর
সােপান-শয়ন ত্যাগ করিয়া একটা “তালগাছের খানিকটা
চণ্ডিকা-চালিত হইয়া ডিগবাজি খাইতে খাইতে দ্রুত আসিয়া
নিমাইয়ের বাড়ী ঢুকিল !
গণেশ নিজে ছিল বেঁটে। চিন্তাশীল লােকের নিকট
হইতেই আবিষ্কারগুলা আসে । সে আবিষ্কার করিয়াছিল—
লম্বা লােক বুদ্ধিমান হইতেই পারে না; যেমন সুপারিগাছ
দৈর্ঘ্যের অনুপাতে অল্প ফল দেয়। যাহা হউক-গণেশ বেঁটে
হইলেও কম জোয়ান ছিলনা। তথাপি সে অবাক হইয়া
ষে খেয়া ভাবিতে লাগিল,-এতটা সামথ্য বােধ হয় তাহার নাই। এই তাল-দণ্ডই তার মেয়ে-পছন্দর মানদণ্ডের কাজ করিল । সে ভাবিতে ভাবিতে বাড়ী ফিরিল—“এইতো দরকার,—ঘরে আগুন লাগলে একাই একশাে কী জল তুলে নিতে পারে ;-পয়সা হলে ওসব ভয়ও তাে আছে !” ফুল কথা,—সে নিমাই নন্দীর মধ্যে বুদ্ধির সন্ধান পাইয়া- ছিল,তাই তাহাদের মনের মিলও ঘটিয়াছিল। নিমাই, গণেশের বুদ্ধিকে অতিরিক্ত সম্মান দিয়া, তাহার কাছে প্রাপ্য আদায় করিয়া নিজে বুদ্ধিমান হইতে পারিয়াছিল। গণেশের কাছে এ সার্টিফিকেট আদায় করা যে কিরূপ কঠিন তাহ গ্রামের অনেকেই জানিত ; তাই নিমাইকে বুদ্ধিমান বলিয়া স্বীকার করিয়া লইতে গণেশকে মনে মনে সে কতটা ত্যাগ- স্বীকার করিতে হইয়াছিল তাহ! বলাই বাহুল্য। এই সব কারণে, গণেশের তরফ হইতে অপ্রতিবাদেই এই বিবাহরূপ শুভকাৰ্য্যটা সম্পন্ন হইয়া যায়। নবীন একজন বিপন্নকে দায়মুক্ত করিতে পারিয়া, চিত্ত-প্রসাদ লাভ করিল ; গণেশ প্রয়ােজনানুরূপ স্ত্রীর ও একটি বুদ্ধিমান অভিভাবক লাভ করিয়া আনন্দ লাভ করিল; আর চতুর নিমাই শুধু অন্তরে নয়—হাড়ে হাড়ে স্বস্তিলাভ করিল। * * কার্ত্তিক বড় বউকে দেখিয়া সভয়ে বলিয়াছিল—“দাতব্যখাতে শৰ্ম্মা নাই !” তাহার বিবাহ কলিকাতা জানবাজারের এক ধনী শেষ খেয়া বংশেই সম্পন্ন হয়। কলিকাতা সহর ও সুন্দরী কন্যা, এতদুভয়ের কোনটির ব্যতিক্রম ঘটিলে, কার্তিক বিবাহ করিবে না,-তাহ। তাহার যােগ্যই হইতে পারে না, ইহাই এ বিবাহের কারণ, অর্থলাভ বা অর্থলােভ নহে। ফল হইল—পরীর মত পুত্রবধূ এক-গা গহনা পরিয়া ও এক বাক্স বাড়তি সুটু লইয়া, একবার মাত্র এক সপ্তাহ কাল শ্বশুর বাড়ীতে কাটাইয়া যান। দাসীরা গিয়া রিপাের্ট দেয়—“এ-মেয়ে সেজঙ্গলে আর সে-বাড়ীতে থাকলে বাঁচবেই না ;”—ইত্যাদি। শুনিয়া মেয়ের মা বলেন-“আমার সরােজকে তত বাড়ীর সঙ্গে বে দিইনি, বাড়ীতে আমার দরকার ? ছেলে দেখে বে দিইছি, ছেলেকে এনে রাখবো,"—ইত্যাদি। ঘটিলও তাই। সেই বৎসর জামাই-ষষ্ঠীর শ্যালি-সভায় কার্ত্তিক গীতবাদ্যাদিতে প্রথম শ্রেণীর সার্টিফিকেট তাে পাইলই ; তদ্ভিন্ন শ্বশ্রু ঠাকুরাণীর ও বড়-ঘরের ভায়রা-ভায়েদের সুপরামর্শও লাভ করিল। তাহারা বুঝাইয়া দিল,—সকল বিদ্যার সর্বাঙ্গীণ উন্নতির ও চরম উৎকর্ষের স্থানই কলিকাতা। কলিকাতায় না থাকিলে এ প্রতিভা পূর্ণ বিকাশের পথ পাইবে না,—মাটি হইয়া যাইবে। কার্তিকের ধারণাও ছিল তাই। স্বতন্ত্র ঘর, বৈঠকখানা, চাকর দাসী, মাষ্টার ওস্তাদ বাহাল হইতে বিলম্ব হইল না ; শিক্ষা- সৌকৰ্য্যার্থে কার্তিক সেই ভূস্বৰ্গই ভােগ করিতে চলিয়া গেল ; এবং অল্পদিন মধ্যেই সে ক্ল্যারিওনেটে পাকিয়া, কলিকাতা সমাজে “পাপিয়া” নামে পরিচিত হইয়া পড়িল ।
শেষ খেয়া
* ১১
গণেশের প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ বিভিন্ন । বিবাহের পরই সে ।
বাপের সঙ্গে কলিকাতায় গিয়া দোকানের কাজকৰ্ম্ম শিখিতে
আরম্ভ করিয়া দিল, এবং অল্পকাল মধ্যেই তাহা আয়ত্ত করিয়া,
কাজের লোক হইয়া পড়িল। মনােহর পাল তাহার বেচা-
কেনায় সন্তুষ্ট হইয়া বেতন ধার্য্য করিয়া দিলেন। তিন বৎসর
পূর্ণ না হইতেই সে মাসিক ৩৫ টাকা করিয়া পাইতে লাগিল।
পাঁচটি নির্বোধের সংসার যে একটি বুদ্ধিমানের উন্নতির
অন্তরায় এবং রােজগারের অপয়া শােষক-স্বরূপ—গণেশ এ-সত্যটা
রােজগারের বহু পূর্বেই বুঝিয়া রাখিয়াছিল। তাহার উপর
তাহার স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় বিষয়াতুর হৃদয়কে শ্বশুর নিমাই নন্দী
যথাশক্তি মােহমুদগরাঘাত করিয়া সংসার-মােহ-মুক্ত করিয়া দিতে
লাগিল।
সংসারে নবীনের বিধবা খুড়ি ছিলেন, পার্বতীর অনুরােধে
নবীন তাহার কাশীবাসের ব্যবস্থা করিয়া দিল। কলিকাতার
সান্নিধ্য বলিয়া ভাগ্নেটি নবীনের সংসারে থাকিয়া রেলির আপিসে
যাতায়াত করিত, কুড়ি টাকা করিয়া বেতনও পাইত। নবীন
তাকে ভালবাসিত, এবং তাহার কলিকাতা যাতায়াতের
ব্যয়ভার নিজেই বহন করিত—যাহাতে সে তাহার উপার্জনের
সব টাকা কয়টি বিধবা মাকে পাঠাইতে পারে। কিন্তু ণেশের
বুদ্ধিমার্জিত অবিরল
অবিরল উপদেশ-ধারা তাহাকেও বেশীদিন
শেষ খেয়া টিকিতে দিলনা। নবীন কিছু কিছু বুঝিল, বেশী বেশী কষ্ট বােধ করিল,—অবশ্য নীরবে । কার্তিকের সুখৈশ্বয্য, তাহার ভাবী লক্ষপতিত্বের সম্ভাবনা, গণেশের ভিতরটাকে ঈর্ষায় অশান্ত করিয়া তুলিতেছিল। আর থাকিতে পারিলনা, বাপকে বলিল—“দেখুন যে-ছেলে বাপিমার মুখ হেঁট করে’ বংশের নাম ডুবিয়ে, পৈতৃক ভিটেকে হেয়জ্ঞানে জন্মের মত ত্যাগ করে গেছে, এখনাে তাকে ‘আপনার’ ভাবার চেয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা আর নেই, শুধু তাই নয়, সেধে অপমান কেনা। প্রত্যেক ভাল লােকেরই চিন্তা করে দেখা উচিত—কিসে আর কারদ্বারা বংশ-মর্যাদা বজায় থাকবে আর সময় থাকতে সেইমত কাজ করা উচিত। বিবেচক- মাত্রেই তা করেও থাকেন” ইত্যাদি । অর্থাৎ, পৈতৃক যা-কিছু, তা জ্যেষ্ঠ ও অনুগত পুত্রেরই প্রাপ্য, এবং সেটা অবিলম্বে লেখাপড়া হইয়া লেখাপড়া হইয়া যাওয়া আবশ্যক; গণেশ এই সুবিবেচিত প্রস্তাবট। বাপের নিকট পেস করিল । শুনিয়া, নবীন বিস্ময়ে অবাক হইয়া যায়, পরে একটা দীর্ঘশ্বাস মােচনের সঙ্গে একটু হাসির রেখা টানিয়া বলে—“তার বয়সটা কি গণেশ ; ভগবান না করুন—ছােট বউমার একটা ভালমন্দ ঘটলে, এই ভিটেটুকু ছাড়া তার দাঁড়াবার স্থান কোথায় ?” গণেশ একটু দৃঢ় স্বরে উত্তর দেয়—“যে-ছেলে সমাজের সামনে বাপমাকে ত্যাগ করে শ্বশুর-শাশুড়ীকে বড় ভাবে, আপনারা কোন্ অধিকারে তাকে ছেলে বলেন, সে } শেষ খেয়া ১৩ অধিকার রাখতে সে দিয়েছে কি ? জগতে তেজপুত্তর কথাটা এলো কেন, আর দরকার না থাকলে রয়েছেই বা কেন ? মানুষের কাজে কাজে লেগেছে আর লাগে বলেই তো রয়েছে। অপরাধীকে সাজা না দেওয়াটাই পাপ,—সেটা ধৰ্ম্ম নয় । রকম দোষীকে কোন বুদ্ধিমানেই ক্ষমা করেনা; সে তাে আর বংশের নাম রাখতে আসচেনা।” নবীন নিতান্ত অনিচ্ছায় কেবল মাত্র বলিল-“এ নিৰ্ব্ব স্কিটে ছেলের বাপ না হলে আসেন গণেশ! তা এত তাড়াতাড়ি কেন, আজই তাে আমি মরচিনা।" গণেশ বুঝিল, তাহার মাত্রাধিক্য ঘটিয়া গিয়াছে ; তাহার মুখে আসিয়াছিল—“তবে কি নিঃসন্তানেরাই ত্যাজ্যপুত্রট। করেন। সেটা চাপিয়া সে বলিল——“সে কাজ করাই উচিত, সেটা ফেলে রাখাই অনুচিত,-তাই বল।।" এই বলিতে বলিতে গণেশ ধীর ভাবে উঠিয়া গেল। সে কাজের কথায় রােষ প্রকাশের লােক ছিলনা । নবীন ভাবিতে লাগিল-গণেশ আজন্মই একটু বেশী বুদ্ধি ধরে ; কিন্তু সেটাকে সহসা এতটা ঠেলে বাড়িয়ে দিতে একমাত্র বেই মশায়ই সক্ষম,ভগবানই জানেন ? ভগবানকে অনেক কিছুই জানিতে হয়, তাই আমরাও কলিতে বাধ্য-কারণটা ভগবানই জানেন,বাপের বাড়ীর প্রচণ্ড পরিশ্রমান্তে চণ্ডিকাদাসী দ্বিতীয়বার যেন বিশ্রাম লাভার্থে শশুর- বাড়ী আসিল, সে যেন হাসপাতালে সেবাপ্রার্থিনী হইয়া ঢুকিল !
১৪ শেষ খেয়া ৪ চণ্ডিক। যেদিন বধুরূপে তাহার সুগঠিত শ্যামবণ দেই, সুউচ্চ কপালের উপর সুস্পষ্ট দেড় ইঞ্চি কাটাদাগ আর কপালের নীচে সুবৃহৎ ও অত্যধিক বহিমুখী চক্ষু দুটি, এবং খাটো চুল লইয়া নবীনের বাড়ী প্রথম পদার্পণ করিল,—পাৰ্বতীর অন্তরট। কাপিয়া উঠিয়াছিল। প্রতিবেশিনীরা খানিকক্ষণ একদষ্ট দেখিয়া নীরবে ঘরে ফিরিয়াছিল ; বাহিরে আসিয়া হর ঠাকরুণ কেবল বলিয়াছিলেন—“সংসারটা এইবার গেল !" পাৰ্বতী কিন্তু পুত্রবধূটিকে মনের মত করিয়া গড়িয়া তুলিবার যত্ন ও প্রয়াসে আত্মনিয়ােগ করিলেন। খােদার উপর খোদকারী অদ্যাবধি কাহারাে খাটে নাই,-হারাে খাটিলনবিপরীত লই পাইতে লাগিলেন। চোদ্দ বছর বয়সে চণ্ডিকা বধূরূপে আসে, সতেরো বছরে তাহার অন্তর্নিহিত কুটিলতা ও স্বাধীন প্রকৃতি সুস্পষ্টভাবে প্রকট হইয়া পাৰ্বতীকে সশঙ্ক করিয়া তুলিল। বাটীর সে পূৰ্ব্ব পরিচ্ছন্নতা শ্ৰী-হারা হইয়া, কদৰ্য্য আবর্জনায় ভরিয়া উঠিল পার্বতীর হাতে-গড়া শান্তিময় কুটিরের প্রত্যেক রন্ধ, হইতে অশান্তির হাওয়া গুমরিতে লাগিল। তিনি তাহার সংসারিক মঙ্গল-কামনার ও আত্মনিবেদনের একমাত্র স্থান, সেই তুলসী মঞ্চটির পবিত্রতা পর্যন্ত আর রক্ষা করিতে পারিলেন না।
শেষ খেয়া ৪াছে প্রতিবেশীরা জানিতে পারে, লােকে হাসে,স্বামী কষ্ট পান, সেইভয়ে তিনি একা নীরবেই সব সহিতে লাগিলেন। তাহার মধুর বিনম্র প্রকৃতি বধূর উগ্রমূর্তি ও উদ্ধত প্রকৃতির নিকট নত হইয়া সহজেই হার মানিল ;-বধূর মনরক্ষায় ও বধূর সেবায় তাহার দিন কাটিতে লাগিল। খাটুনি তো দ্বিগুণ বাড়িয়াইছিল, তাহার উপর অশান্তি ও অপমানের বােঝায় পার্বতীর শরীর ভাঙ্গিয়া পড়িল । সংসারের অপ্রিয় সত্যগুলিকে প্রফুল্লতার প্রলেপে ঢাকিয়া রাখিবার একটা কঠিন ও ব্যর্থ প্রয়াস সকল মানুষেরই থাকে এবং চিরদিন থাকিবেও। কিন্তু বিধাতা জ্ঞাতি ও প্রতিবেশীদের কেবল সে অসামান্য বিচক্ষণ, সূক্ষ্মদর্শন ও অনুমান শক্তি দিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন তাহাই নহে, তাহার উপর আবার নব নব ও অভিনব সৃজন-শক্তি দানেও কিছুমাত্র কার্পণ্য করেন নাই। তাই, পাৰ্বতী নীরবে ও অম্লান মুখে নিজের শরীর ও মনের উপর সকল আঘাত লইলেও তাহার সাংসারিক সম রক্ষার সদিচ্ছা যে সম্পূর্ণ ই ব্যর্থ হইতেছিল, তাহা বলাই বাহুল্য। নিত্যই কেহ না কেহ দয়া করিয়া খোঁজখবর লইতে বা বেড়াইতে আসিতেন এবং পান মুখে দিয়াই অতীত ও বর্তমানের প্রসঙ্গ তুলিতেন, এবং সমবেদনা জানাইয়া ফিরিতেন। কেহ কেহ বাড়ীর বাহিরে পা দিয়াই হাসি-ভরা চোখে বলিতেন- “মাগী মরবে, তবু ময্যেদা হারাবেনা ;—ভামরাও মরছিনা ক’দিন ঢাকে দেখি !”
১৬
শেষ খেয়া
সে-দিন বৈকালে “গেরস্থদের কি হয় গাে,"—বলিতে বলিতে
ও-পাড়ার হরপিসি আসিয়া দেখেন, পৰ্বতী ছাড়া-কাপড়গুলি
কাচিয়া আনিয়া উঠানে দড়ির উপর মেলিয়া দিতেছেন।
পার্বতীর বিশেষ সাবধানতা সত্ত্বেও বউয়ের কাপড়খানি
হরপিসির খরদৃষ্টি এড়াইলন। তিনি বলিলেন—“তা আর
হয়েছে কি–করতে পারলেই ত ভাল ! তিনি ঘুমুচ্ছেন বুঝি,
শীতের পাঁচটা বইত না।”
পাৰ্বতী বলিতে গেলেন--“বউমার শরীরটে,"--কথা শেষ
করিতে না দিয়াই পিসি বলিলেন,—“হ্যা–তাকি আর জানিনা।
ন-বৌ,—ও-রকম খেজমং পেলে আমাদেরি কি শরীর ভাল
থাকত ? তা যা’হােক,হরির একি অভাগ্যি, মঞ্চটা আবার
কবে থেকে সাবান, চুলের দড়ি আর পা ঘশ বার ঝাম।
রাখবার জায়গা হ’ল !-তাের মত মেয়ের কপালে এতও
ছিল !”—বলিতে বলিতে তার অতলদর্শী চক্ষু দুটি দিয়ে বাড়ীর
সবটা যেন কটাক্ষে ঝেটিয়ে নিয়ে ঝড়ের মত বেরিয়ে গেলেন।
উঠোনের মধ্যে ভিজে-কাপড়-হাতে পাৰ্বতী নিৰ্বাক্ নিস্পলক
পাষাণ-প্রতিমার মত দাড়াইয়া রহিল।
বিধাতাপুরুষ একই জাতীয় জীবের মধ্যে আকৃতি-প্রকৃতি,
বর্ণ ও গুণের তারতম্য দিয়া কতই-না প্রভেদ সৃষ্টি করিয়াছেন।
সেই বৈচিত্র্যই বহু বিরুদ্ধতার মধ্যে আমাদের বাঁচিবার অবলম্বন
জোগায়। সরলা মেয়েটি জ্ঞাতি-কন্যা হইলেও পার্বতীর পরম
অবলম্বন ও আন্তরিক স্নেহের পাত্রী। তাহার বাপ-মা না থাকায়
শেষ খেয়া
১৭
নী অভয়চরণ শ্বশুরালয়েই বাস করিয়াছিল ।
সে পাের্ট
মিনারের জেটিতে সামান্য বেতনে চাকুরি করিত,—তাহাতেই
ষ্টে সংসার-নিৰ্বাহ হইত।
সরলা এ-বাড়ী ঢুকিয়াই সহসা পাৰ্বতীকে তদবস্থ দেখিয়া
শিহরিয়া উঠিল। একটা অশুভ আশঙ্কা যেন তাহার শিরায় শিরায়
সাড়া দিয়া গেল। সে আজ অন্যদিনের মত হাসিমুখে “জ্যাঠাইমা”
বলিয়া ডাকিতে পারিল না,—সশ ধীরপদে পাৰ্বন্তীর কাছে গিয়া
বলিল—“খােকাকে একবারটি ধরন জ্যোঠাইমা,-বড় জ্বালাতন
করছে! দাও কাপড়গুলাে আমি শুকূতে দিচ্চি।” এই বলিয়াই
সে কাপড়গুলি টানিয়া লইয়া কোলের ছেলেটিকে পার্বতীর
বুকের উপর দিতেই পার্বতী দুই হাতে থােকাকে চাপিয়া
তাহার মুখচুম্বন করিল,-সে যেন একটা জুড়াইবার জিনিস
পাইল ।
সরলা নীরবেই কাপড়গুলি মেলিয়া দিতে লাগিল। ব্যাপার
বা কারণ জানিবার জন্য সরল। কিছুমাত্র উৎসুক হইল না ;
যেহেতু—কারণের অভাব কোন দিনই ছিলনা; তাই সে অবস্থা
পরিবর্তনের যত্নই পাইল। ফিরিয়া দেখে-বহু দিনের রুদ্ধ
বেনা আজ পাষাণ-কারা ভাঙ্গিয়া পাৰ্ব্বতীর দুই চক্ষে পথ
পাইয়াছে! পাৰ্বতীকে কঁদিতে সরল। এই প্রথম দেখিল ; তাহার
চোখের জল মুছাইতে গিয়া সে নিজেও কাদিল । পরক্ষণেই
বলিয়া উঠিল—“এ কি, গা যে কাট ফাট চে! চল জ্যাঠাইমা,
ঘরে চল ;-কাজকৰ্ম্ম আমি দেখব অখন।”
2
১৮
শেষ খেয়া
নবীন কর্মস্থল হইতে ফিরিয়া সরকার কাছে পাৰ্বতীর
জ্বরের সংবাদ পাইল।
ঘরে ঢুকিয়া দেখিল—জর খুব বেশী,
পার্বতীর চক্ষু লাল, অধর-ওষ্ঠ কঁপিতেছে। জিজ্ঞাসা করায়
পাৰ্বতী নিজের হাত দুখানির মধ্যে নবীনের হস্তদ্বয় চাপিয়া
ধরিয়া বলিল,-“বড় মাথার যাতনা। নবীন তাহার মাথায় ধীরে
ধীরে হাত বুলাইতে বুলাইতে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল,-“তােমার
মনের যাতনা থেকেই সব যাতনা, তাকি আমি বুঝিনা ন-বৌ,
কিন্তু আমি কি করতে পারি।” পাৰ্বতী:তাড়াতাড়ি বলিল,-
“ছি, তুমি আবার কি করবে?” নবীন বলিল,-“সহ্য করার চেয়ে
আর কিছু নেই, ও-সব মনে নিওনা।” পাৰ্বতী একটু হাসিবার
চেষ্টা করিয়া বলিল,-“যাও, কাপড় ছেড়ে কিছু মুখে দাওগে,
আমি উঠতে পারছি না, সরল দেবে অখন।”
নবীন কি করিয়া বুঝিবে যে পাৰ্বতীর সহ্যের সীমা বলিয়া
আর কিছু নাই, সে এখন অসীমের মাঝখানে প্রাণপণে যুঝিয়া
চলিয়াছে ! “লােকে কি বলিবে”—মানব-সভ্যতার এই প্রথম
সূত্রটি শাসনের সহােদরের মতই মানুষের বুকে আসন পাতিয়া,
সমাজ ও সংসারের শাসনভার হাতে লইয়া বসিয়া আছে ।
সমাজের লােমাত্রেই এই কথাটির অধীনে। ইহার শক্তির
সমক্ষে “পেনা-কোর্ডের” শক্তি কতটুকু ! শৃঙ্খলা রক্ষার এই
শব্দ শৃঙ্খলে বিশ্বটা যে বাধা!
শেষ খেয়া
পাৰ্বতী তিন দিন জ্বরে এক প্রকার সংজ্ঞাহারাই ছিল,
আজ দু’একটা প্রলাপ আরম্ভ হইয়াছে।
উপযুক্ত জ্যেষ্ঠপুত্র গণেশ সংসারে কখন টাকাকড়ি দিত।
,—পরিবর্তে প্রচুর উপদেশ দানে সেটা পূরণ করিয়া দিত।
দ্বিতীয় দিনে ডাক্তার লাহিড়ীকে আনিতে বলায় সে হাসিয়া
বলে—“জরে ডাক্তার ডাকতে হলে, রােজগারট। তাদের জন্যেই
করতে হয় ;-বাঙ্গলাদেশে নাড়ী দেখলেই জ্বর!” এই বলিয়া
আজ দুই দিন মাকে শিউলি-পাতার রস খাওয়াইতেছিল।
সরলা এ কয়দিন এই বাড়ীতেই রহিয়াছে ; সকালে কেবল
ঘণ্টাখানেকের তরে নিজের বাড়ী গিয়া স্বামীর কুঠীর-ভাত
বঁধিয়া দিয়া আসে। সে আজ কাদিয়া বলিল—“তােমার পায়ে
পড়ি জ্যাঠামশাই,—ডাক্তারকে আনতে পাঠাও ; দাদা গা
করবেন না, তাই এঁকে ( স্বামীকে ) আজ বেরুতে বারণ করেছি।
ক্রমশ যে বিকার দেখা দিলে !”—“অ্য, কে বললে,-পাঠিয়ে
দাও—পাঠিয়ে দাও” বলিতে বলিতে নবীন তাড়াতাড়ি বাড়ীর
ভিতর গেল।
ডাক্তার লাহিড়ী আসিয়া পরীক্ষান্তে ধীরভাবে প্রশ্ন করিলেন
—“বিশেষ শােক-তাপ পেয়েছেন কি ?” সরলা বলিয়া ফেলিল,-
“হ্যা, তা খুবই পেয়েছেন।”
অপব্যয়টার জন্য গণেশ ত’ চটিয়াই ছিল, সে মুখটা বিকৃত
করিয়া, সরলাকে ধমক দিয়া বলিল,-“তােকে কথা কইতে
হবেনা,-শােক-তাপটা কিসের।” ডাক্তার ধীরে বলিলেন,-
শেষ খেয়া
“এ-ঘরে গােলমাল করাটা চলবেনা বাপু ;-কোন ওষুধ দেওয়া
হয়েছে কি ?” গণেশ অপ্রিয় দৃষ্টিপূর্ণ চোখে মুখখানা গম্ভীর
করিয়া বলিল,-“জ্বরের যা ওষুধ,-শিউলি-পাতার রস দেওয়া
হচ্ছে।”
ডাক্তার ধীরভাবেই বলিলেন—“ওটা যেন আর না দেওয়া
পরে ঔষধাদির ও ববফের ব্যবস্থা করিয়া এবং রােগীর
ওঠা-নাবা নিষেধ করিয়া ডাক্তার বিদায় লইলেন।
অভয় ঔষধ
ও বরফ আনিতে চলিয়া গেল। অর্ধ-ঘণ্টায় যদি দশ টাকা খরচ
হইয়া যায়, ত’ দিন-রাতে কত পড়ে, এবং তাহাতে পথে বসিতে
কয় দিন লাগে,-সেটা মুখে মুখে কম্মিা বাড়ীর সকলকে
শুনাইয়া দিয়া, গণেশ কাজে চলিয়া গেল ; কারণ বুদ্ধির অ৭-
ব্যবহার সে চোখের সম্মুখে দেখিতে পারিবেনা।
৯
তেরাে দিন সংজ্ঞাহীন থাকার পর আ জ পার্বতীর জ্ঞান
আসিয়াছে। সরলা একয়দিন একটিবারও পার্বতীর শয্যা ত্যাগ
করে নাই। ইতিমধ্যে নিমাই নন্দী আত্মীয়তা হিসাবে সগােষ্ঠী
আসিয়া উপস্থিত হওয়ায়, চণ্ডিকা স্বয়ংই রন্ধনশালায় ঢুকিয়াছে।
‘গড়ার মেয়েরা রান্না ঘরে উকি মারিয়া বলিয়া গিয়াছে,
“এই যে—বউ রাঁধতেও জানে!”
স্বামীকে বসিতে ইঙ্গিত করিয়া পাৰ্বতী বলিল,-“দেখ,
আজ ক’বচর কেবল কাজেই কেটেছে, দু’টো কথা কইবার
(শেষ খেয়া
ফুরসৎ নিইনি;—আজ কাজ-কর্ম নেই,—ছুটির দিনে দু’টে।
কথা কইলে বাধা দিওনা কিন্তু।”
নবীন ম্লান মুখে বলিল,-“ডাক্তার যে বেশী কথা কইতে,
বারণ করে গেছেন।” পাৰ্বতী বলিল,-“আমি আজ বেশ
আছি—কষ্ট হলেই চুপ কোরব।”
পাৰ্বতী বলিতে লাগিল,-“দেখ, কার্তিক আমার
আছে--থাক্। যেখানেই থাক্, সে আমাদের ছেলে। একটা
কিছু নিয়ে যে ভুলে থাকতে পারে, সে-ই ভাল থাকে,-তাত্রি
জিত। আমি তাই কাজ নিয়ে ছিলুম,—কিন্তু পারলুম কই
“আজ আমার সেই প্রথম এ-বাড়ীতে আসার কথা মনে
পড়ছে,তখন কত সাধ, কত আশা, কত আনন্দ, কত
সাজানো-গােছানাে ! কত যত্ন—কিসে তােমার ভাল লাগবে,
কিসে তুমি ভাল থাকবে। আর আজ -আজ মনে হচ্ছে-
মানুষের কত টুকুই বা ক্ষমতা,তার আবার ইচ্ছা।
“একবার দিন-কতকের তরে বাপের বাড়ী যাবার ইচ্ছে
হয়েছিল,—পারিনি, পাছে তােমার অযত্ন হয় ! তখন মনে
করেছি—সব যেন আমারি হাতে,—” এই বলিতে বলিতে
পাৰ্বতী পাশ ফিরিয়া বালিসে চক্ষু মুছিল। প্রদীপটা উজ্জল
করিয়া দিতে বলিল।
নবীন দু’একবার কথা কহিতে নিষেধ করিয়াছিল, কিন্তু
পার্বতীর কাতর অনুনয়ে তাহাকে হতবুদ্ধির মত বসিয়া শুনিয়া
যাইতে হয়। পাৰ্বতী বলিল,-“স্বামীর কোলে মরাটাই
শেষ খেয়া
;
স্ত্রীলােকদের সবার-বড় সৌভাগ্য,—আমিও ঐ কামনাই
করতুম ;-আজ মনে হচ্ছে—আমাদের মরেও সুখ নেই।”
সে স্বামীর কোলে মাথা রাখিয়! নীরব হইল,-মুহূর্ত পরে
একটা নিশ্বাস যেন তার মৰ্ম্মে মােচড় দিয়া বাহির হইয়া আসিল ।
নবীনের মুখ থেকে কি বুক থেকে অতি ধীরে চাপ নিশ্বাসের
সঙ্গে “ভগবান” উচ্চারিত হইতেই, তার চোখ থেকে টপ টপ
করিয়া দু’ফোটা অশ্রু পাৰ্বতীর কপােল স্পর্শ করিল। পার্বতী
বিচলিত ভাবে বলিয়া উঠিল,—“তুমি আমার দেবতা, তুমি
আমাকে দয়া কর ; আমি তােমারি কথা ভাবচি,--ভগবানকে
ভাবতে পারচিনা! আমি কি তােমাকে জানিনা,আর আমাকে
জানতে দিওনা। আমাকে ঢের দিয়েছ
আমাকে ঢের দিয়েছ ; তােমার এই দু'ফোটা
আশীৰ্বাদ মাথায় নিয়ে যেখানে যাব, সেখানেই স্থান পাবাে,
এই আমার পরম সম্বল।—থাক্-মুছে দিওনা।” এই উচ্ছ্বাসের
উত্তেজনা পাৰ্বতীকে অবসন্ন করিয়া দিল—সে নীরব হইল, অশ্রুই
তাহার কথার ভার লইল ! পরক্ষণেই সে ঘুমাইয়া পড়িল ।
নবীন বসিয়া বসিয়া আকাশ-পাতাল ভাবিতে লাগিল ; সে
ভাবনা কোথাও তাহাকে কূল দেয়না,—যেটা ধরে সেইটাই
সে দীপ-সমুজ্জ্বল ঘরে মাঝে মাঝে অন্ধকার
দেখিতে লাগিল। কখনও বা দেখিল, কে যেন ঘরে ঢুকিল
তাহার বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল । দেয়ালের গায়ে ছায়াগুলা
যেন জীবন্ত জীবজন্তুরূপে নড়িতে লাগিল।
সহসা একটা
পেচক জানালার ও-পিঠের কামিনী গাছটাকে নাড়া দিয়া
খুসিয়া যায় !
শেষ খেয়।
সচীৎকারে উড়িয়া গেল,—সশঙ্ক নবীন নড়িয়া উঠিল। বাহিরে
কাক ডাকিল।
পাৰ্বতী ধীরে ধীরে চাহিল,—ক্ষীণকণ্ঠে সরলাকে ডাকিল ।
“কি বলচ জ্যাঠাইমা”—বলিয়া সরলা তাহার মুখের কাছে
আসিয়া নত হইল। সে এতক্ষণ পাৰ্বতীর পাছ-তলায়—মেজেয়
বসিয়া খাটে মাথা রাখিয়া কতকি ভাবিতেছিল, কত অলৌকিক
কল্পনায় আশা সঞ্চয় করিতেছিল, কত কাতর মিনতি ভগবানের
কাছে পাঠাইতেছিল।
পাৰ্বতী বলিল,-“সত্যিই স্বপ্ন !
ভাল দেখতে পাচ্ছিনা।
জানালা খুলে দে।" . এক ঢােক গঙ্গাজল খাইবার পর কষ্টে
নবীনকে বলিল,-“আমার হার-ছড়াটি সরলাকে পরিয়ে দাও
আমি দেখি।” নবীন তাহাই করিল। সরলা তার চীৎকারান্মুখ
কণ্ঠ চাপিয়া, পাৰ্বতীর পায়ে মাথা রাখিয়া ছটফট করিতে
লাগিল,সে কি বেদনা !
“আর যা রইল—দুই বৌয়ের।” তারপর সরলাকে আশীর্বাদ
জানাইয়া, বাষ্প-বিজড়িত কণ্ঠে বলিল,-“তাের জ্যাঠামশাইকে
দেখিস্ !” স্বর আর ফুটিল না, দুই চক্ষু ভাসিয়া গেল, এবং সঙ্গে
সঙ্গেই তাহারা বিস্ফারিত হইয়া পদ্ম-কোরকের মত মুহূর্তে খুলিয়া
গিয়া স্থির হইল ! সাধ্বী স্বামীর জলন্ত হৃদয়-চিতায় প্রবেশ
করিলেন ।
সরলা চীৎকার করিয়া কঁদিয়া উঠিল ;-নবীন মূঢ়ের মত
বসিয়া রহিল,—শ্বাসে শব্দ নাই, চক্ষে পলক নাই,—অসম্বিৎ।
২৪.
শেষ খেয়া
সকলে আসিল, সকলে দিল। যে
যে সত্যটা সহ্য হইত না—
মুখে আনিতে গায়ে বাজিত,আজ সেটা সহজেই সকলে
শতমুখে প্রকাশ করিল,-“পার্বতীর মত বউ দশ খানা গায়ের
মধ্যে কেউ খুঁজে পাবে না।”
সপ্তাহ গত হইয়াছে,-পাৰ্ব্বতা ইহধামে নাই। সরলার
প্রাণটা সৰ্ব্বদাই হু হু করে,—মাঝে মাঝে হা হা করিয়া উঠে।
ক্রন্দন, শােক, বেদনা, উচ্ছাস—যাহার যাহা ছিল, স্বাভাবিক
নিয়মে কমিয়া আসিতেছে ;-বাড়িতেছে কেবল ' নবীনের।
আঘাতটার গুরুত্ব দিনে দিনে তার কঠিনতর বােধ হইতেছে।
তাহার উপর নিমাই নন্দীর সহানুভূতির পীড়াটাই সৰ্ব্বাপেক্ষা
বিরক্তিকর ও অসহনীয়।
সময় নাই, অসময় নাই, নিমাই বলে,-“সংসারে এ-সব ঘটনা
অতবড় মােগল-পাঠানেও এড়াতে পারেনি-আমরা তাে
বাঙ্গালী ! ও-বিষয়ে মানুষের হাত নেই,—মিছে দুখখু করে’
ঠোকোনা দাদা! বহু ভাগ্যে গণেশের মত ছেলে পেয়েছ,
একেবারে ওর ওপর সব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হও, দেখবে কি
আরাম ! লােকে উপযুক্ত ছেলে খোঁজে আর কি জন্যে।
বাইরের বাজে চিন্তা আর মাথায় ঢুকিও না, সেখানে যেটুকু
জায়গা আছে—হরিনাম-দে ভরিয়ে ফ্যালাে। চিন্তাগুলাে যদি
শেষ খেয়া
নিজে হতে সরে যাবার পথ করে,—ডেকে আবার তাদের
জড়ানাে বুদ্ধির কাজ নয়। হালকা হও,হালকা হও।”
কখনাে বলে,-“তােমার আবার ভাবনা কি বেই, ভয়ই বা,
কিসের ? যে বাপ-পিতামাের নাম রাখে, সে-ই বিষয় রক্ষে করে
থাকে। চরিত্র ভাল না হলে উটি হবার যাে নেই। তােমার
গণেশ ত দেবচরিত্র ।"
কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়,—যাতে পয়সা খরচ আছে গণেশ
সে-দিক মাড়ায় না। প্রত্যেক পয়সাটি সে “চোটা-সুদে” খাটাইত,
এবং অল্প দিনেই গ্রামের মধ্যে “কাবলে ওলা” খেতাব পাইয়াছিল।
এক দিন বলিল, “যারা ভুগিয়ে খেত—তাদের মুখেই এখন
প্রকাশ হচ্ছে-বেয়ান প্রতি মাসে অন্তত আধ মােন চাল
দাতব্য করতেন,-পূজোর সময় অনেকগুলি ছেলে-মেয়ে কাপড়
পেতাে। এ-সব শুনতে বেশ, কিন্তু তাতে সংসারটি আধাআধি
গরীব হয়ে গেছে ;-নয় কি? মেয়ে মানুষের বুদ্ধি কতটুকু,
তার দোষ নেই ;—কিন্তু যার যায় তার গায় লাগে বৈকি ! শুনে
গণেশ ত বসে পড়েছে ; ছেলে মানুষ,—এই নতুন সংসার মাথায়
পড়েচে,-বসে পড়বারই কথা। সে তােমার বড় ছেলে—বড়
ছেলেরাই বুদ্ধিমান্ হয় ; তা না হলে—ইংরেজ জাতটি পাগল
নয়,—বড় ছেলেকেই সমস্ত বিষয়ের অধিকারী করত না। 'এত
বড় নজীর আর পাবে না। মিছে শােক-তাপ নিয়ে কি থাকে
দাদা-কৰ্তব্য করে যাওয়াই পুরুষের কাজ ;-ওতে ভাবুকতা কি
চক্ষুলজ্জা রাখতে নেই।” ইত্যাদি।
শেষ খেয়া
এই সব দয়ার আক্রমণে অতিষ্ঠ হইয়া নবীন একদিন কাতর
ভাবে বলিল,-“এখন ও-সব কথা থাক নন্দী মশাই।” নিমাই
তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিল,—“তাড়াতাড়ি কি—থাক্ না ; দুদিনের
জায়গায় চার দিন থাক না । তবে বেশী দেরী করে বেশী কষ্ট
পাওয়া কেন, তাই আমার বলা। একটা ‘সই’ করা বইত নয়,
লেখাপড়া সে করেই রেখেছে ! ছেলে মানুষ—শােকটা বডড
লেগেছে, তার মনটাও একটু চাঙ্গা হয়। সেটা হয়ে গেলে
তুমি ও দেখবে কি আরাম—কতটা খােলস হয়ে গেছ। দুনিয়ার
কারখানাই এইরে দাদা ;—সব মিথ্যে—সব মিথ্যে! তাই না
বুদ্ধিমান লােকে সব ছেড়ে শান্তি খোজে ! তা থাক্-থাক না
দু’দিন।” ইত্যাদি
*
কার্তিককে পাওয়া গেল না,..সে কিছুদিন হইল ক্লারিওনেটে
সানাই সাবিতে কাশী যাত্ৰা করিয়াছে। সাধনায় সিদ্ধিলাভ না
করিয়া ফিরিবে না, ঠিকানা পৰ্যন্ত দিবে না। নিমাই কষ্ট
স্বীকার করিয়া এই সংবাদ আনিয়া দিল, এবং বলিল,-“হু:-
তুমিও যেমন,—সব ছেলে যদি ছেলে হত তবে আর ভাবন।
ছিল না। দুখখু কোরােনা দাদা,—কেবল দ্যাখাে, বােঝাে আর
শেখে।!"
নিমাই মনে মনে প্রফুল্ল ও নিশ্চিন্ত হইল। কিন্তু শ্রাদ্ধের
পূৰ্ব্বে কার্তিককে বিষয়চ্যুত করিবার অত্যাবশ্যক কৰ্ত্তব্যটি বা
ধৰ্ম্মকর্যটি কিছুমাত্র অগ্রসর না হওয়ায়, এবং নিমাই নদীর
শেষ খেয়া
२१
নবীনকে চিন্তাভারমুক্ত করিয়া খােলসা করিবার সদিচ্ছা অপূর্ণ
থাকায়,শ্বশুর-জামাই উভয়েই মনে মনে সন্দিহান ও বিরূপ
হইয়া উঠিল। গণেশ তাহার সমগ্র বুদ্ধিটুকু প্রয়ােগ করিয়া,
শ্রাদ্ধে ব্যয়-সঙ্কোচের ব্যবস্থা দিল, এবং বলিল,-“যে-কাজ পাচ
টাকায় হতে পারে, তাতে ছ'টাকা ব্যয় করা আর সংসারের
শত্রুতা করা। একই কথা। বাহুল্য মাত্রই রাজসিকতা, এটা তাে
রাজার মার শ্রাদ্ধ নয়।" এই বলিয়া সে শিউলি পাতার
সাত্ত্বিক তার কথা তুলিয়া অনেক কিছুই বলিল, এবং বলিল—
“অতিরিক্তটাই পাপ-পাপের প্রশ্রয় দিতে সে আর রাজি নয়।”
সে-কথায় কিন্তু বড় বেশী কাজ হইল না ;—নবীন যথারীতি
এবং ইচ্ছানুরূপ শ্রাদ্ধাদি শেষ করাইল। বিশেষ করিয়া কাঙালী
বিদায় করিল ও পাড়ার গরীব প্রতিবেশীদের কাপড় দিল ।
শ্বশুর-জামাই মন্তব্য প্রকাশ করিল—এক পক্ষের অনভিমতে
যে কাজ করা হয়, অন্য পক্ষ তাহার ক্ষতিপূরণের জন্য ন্যায়তঃ,
এমন কি আইনমতেও দায়ী।
৭
পার্বতীর দেহান্তের পর ছয়মাস গত হইয়াছে। নবীনের
তাহা ছয় যুগের মতই কাটিয়াছে। এখন সরলার আর এ-বাড়ীতে
প্রবেশাধিকার নাই। নবীনও কাজে যাওয়া বন্ধ করিয়াছে,
বহিৰ্বাটীতেই থাকে। আহারের সময় একবার বাড়ীর মধ্যে
২৮ শেষ খেয়া আসে ; যায়, এবং যাহা পায় তাহাই নীরবে মাথা গুজিয়া খাইয়া রাত্রে কিছু খায় না,—সে-জন্য কেহ অনুরােধও করে না। সরলা—যেদিন যেমন জোটে, কোন দিন নারকোল- মুড়ি, কোনদিন মুড়ি-মুড়কি, কোনদিন নারকেল নাড়, আনিয়া—অনেক করিয়া খাওয়ায়—আর চোখের জল মুছিয়া যায় । রাত্রে নবীন অনায়াসেই সরলার বাড়ী খাইতে পারিত ; কিন্তু তাহাতে বাড়ীর নিন্দা রটিবে, এবং তাহা পাৰ্বতীর আত্মাকে পীড়া দিবে। -এমন কাজ নবীনের দ্বারা সম্ভব ছিলনা। এ-সম্বন্ধে গণেশের বড় বেশী দোষ ছিল না,সে নজির-ছাড় কাজ করে নাই। নিমাই যে-দিন রেবতী কবিরাজকে জিজ্ঞাসা করে ( তখন গণেশ সেথায় উপস্থিত )—“বয়স প্রায় পঞ্চাশ হ’ল, বাড়ীতেও বসে রয়েছি,-খাটুনি একদম নেই ; এ অবস্থায় দু’বেলা খাওয়া কি ভাল? খাটুনি থাকলে কথা ছিল না।” তাহাতে রেবতী কবিরাজ রায় দেন—“পারলে এ-বয়সে একবেলা খাওয়াই ত’ উচিত,—রাতে একটু দুধ আর দুটো সন্দেশ। তাতে বাঁচবেও দু’দিন, থাকবেও ভাল,ডাক্তার-বদ্যিকে পয়সা দিতে হবে না।” স্বাস্থ্য-রক্ষার সূত্রটা ধরিয়া কি ( ডাক্তার বদ্যি বাবদে ) অর্থনৈতিক সূত্র পরিয়া তাহা ঠিক্ বলা কঠিন, ব্যবস্থাটার পরীক্ষার ভার নবীনের দেহকেই লইতে হইয়াছিল, অবশ্য “দুধ-সন্দেশটা” বদ-অভ্যাস বলিয়া বাদ দেওয়া হয় ।
শেষ খেয়।
-
পাৰ্বতী চলিয়া যাইবার পর নবীন নিজের কাজে গণেশকে
বাহাল করিয়া দিয়া ফার্মের কাছে বিদার লইয়াছিল । কাজের
মধ্যে ছিল–গঙ্গাস্নান, বাজার করিয়া দেওয়া আর উদাসভাবে
দিন কাটানাে,মাঝে মাঝে তামাক খ ওর।
মাসখানেক পরেই গণেশ চীনাবাজারে স্বতন্ত্র দোকান
খুলিল, এবং শ্বশুর-জামাইয়ে তাহা চালাইতে আরম্ভ করিল।
শুনিয়া নবীন মনে মনে লজ্জিত হইল, ভয়ও পাইল।
পাল ও বিপিন উভয়েই কিন্তু খুসী হইলেন। নবীনের খাতিরেই
তাহারা গণেশকে কাজ দিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার অতিরিক্ত
বুদ্ধির জন্য দোকান সন্ধে তাহাদের স্বস্তি ছিলনা।
বিপিনবাবু নবীনকে পরম বন্ধুভাবেই দেখিতেন। হাহারি
পরামর্শ ও চেষ্টায়, নবীন বহির্বাটীসংলগ্ন পােড়ো জমিট
একখানি ছােটখাটো বাগান স্বত করতে আরম্ভ করিল।
সময়টা কাটিবে, মনটাও অনেকটা চিন্তামুক্ত থাকিবে,—ইহাই
ছিল বিপিনবাবুর অভিপ্রায়। তাহার উদ্দেশ্য নিস্ফল হয় নাই।
কাগজে বাগানের নক্সা করিয়া কোথায় রাস্তা, কোথায় কি
বেড়, কোথায় কোন গাছ শােভন ইত্যাদি চিন্তা-চৰ্চ্চা ক্রমেই
নবীনকে আনন্দ দিতে লাগিল। ফুলগাছ ও এক একটি বেড়ের
মধ্যে নানী ও দামী আম ও নাচুর কলমের চার! লাগানাে হইল।
বাগানটি পরিষ্কার রাখা, গাছে জল দেওয়া,—এ-সকল এখন
নবীনের নিত্যকৰ্ম্ম। ইহাতে বেশ মন ও বসিয়াছে—নেশা ও
ধরিয়া আসিয়াছে। নূতন গাছে নূতন একটি পাতা দেখিলে
শেষ খেয়া বা ফুল ধরিলে, নবীন তাহা দশবার দেখিয়া আসে,-রাতেও লাষ্ঠান ধরিয়া দেখে ! দিনের অধিকাংশ সময়ই তাহার বাগানে কাটে,-গুরু পরিশ্রমও গায়ে লাগে না। বাল্যাবধিই নবীন ছিল ধম্ম ভীরু ও সদাশয়,সাধ্যমত পরােপকারে প্রস্তুত; তাই সকলেই তাহাকে ভালবাসিত ও চাহিত। সন্ধ্যার পর অনেকেই তার বহিবাটীর দালানটিতে আসিয়া বসেন ; কোন দিন সংকীর্তন, কোন দিন পুরাণাদি পাঠ, কোন দিন বা পােস গল্প চলে,—এই ভাবে রাত ন'দশটা পৰ্য্যন্ত কাটিয়া যায়। নবীন একমনে শােনে আর মধ্যে মধ্যে তামাক সাজিয়া খাওয়ায়, কখনাে এক-অধিটি কথা কয়। তামাকটা রােজ একপে আন্দাজ পােড়ে। কিন্তু এই পােড়াটার পশ্চাতে যে আর একটা কিছু ধুয়াইতে ছিল, নির্বোধ নবীনের সে খেয়াল ছিল না। এই বেপরােয়া ব্যয়টা এবং নবীনের অপেক্ষাকৃত নিশ্চিন্ত ভাবটা, ভিতরে ভিতরে তার ভবিষ্যংটা যে কিভাবে গড়িতেছিল, নবীনের স্বাভাবিক সারল্য তাহাকে সে সাড়া দেয় নাই। তাহার উপর তাহার দুৰ্ব্বদ্ধিটা, অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন—মৃত তিন পুরুষের তৃপ্ত্যর্থে, অনিশ্চিতের পশ্চাতে তাহাকে • দশ টাকা অপব্যয় করাইয়া,—জীবিত নিম্নতন এক পুরুষের অতৃপ্তি উদ্রেক করতঃ তাহার কুগ্রহ- গুলিকে নিবিড়তর করিয়া প্রমাণ করিয়া দিল যে, নবীন এখন গণেশের গলগ্রহ। গণেশ ইহাও শুনিল যে, শুভ বৈশাখের মধ্যেই এই পিতৃ-প্রীতির উপসংহারকল্পে দ্বাদশটি ব্রাহ্মণ শেষ খেয়া ভাজনে আরাে অনেক গুলি টাকা সংহারের সংকল্পও রহিয়াছে। এ-সবগুলির একত্র যােগফল ও ভােগফল যে কতটা সাংঘাতিক ও কিরূপ গুরুতর দাড়াইতে পারে,-নবীন সে-কথাও ভাবে নাই। এদিকে চীনাবাজারে নূতন দোকান খুলিয়া শ্বশুর-জামাই আমদানীর সত্বর একটা short cut ( সহজ পন্থা) আবিষ্কারে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল,—কিসে অল্প সময়ে অধিক টাকা আসিতে পারে। নিমাইয়ের উর্বর মস্তিষ্ক উদ্ভাবন করিয়া দিল,-বেশী টাকা ফেলিতে পারিলেই বেশী লাভ হয় ! হাজার পাঁচেক হাতে করিয়া দশহাজারের কাজ করা যায়, তাহাতে মাসিক ছ'শাে টাকা লাভ তো গালাগাল ! টাকা চাই- এই পর্যন্ত বলিয়া নিমাই ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া ভাবিতে লাগিল,-নবীনের টাকা নােহর পালের দোকানে বিপিন- বাবুর হাতে। বিপিন নবীনের পশ্রম বন্ধু,—লােকস্টাও বিচক্ষণ। নবীন দিতে রাজি হলেও বিপিন বাধা দেবে ; নবীনও বিপিনের অমতে কাজ করবে না। নবীন হাল্কা লােক, মুখখুদের মত ধৰ্ম্মে মতি আছে। সংসারে বিরক্তি আসতে আসতে রুকে গেছে ; সেটা উসকে দিয়ে ব্যবস্থার লােভ দেখালে, তীর্থে গিয়ে নিঝঞ্চাটে থাকতে রাজী হয়ে যাবে। তখন টাকাটা ছেলের হাতে আসতে বাধ্য,পরের কাছে পড়ে থাবেনা। দেখা যাক— নিমাই এইরূপ ভাজিয়া, গণেশকে তাহার মনের মত করিয়া উপায়টা শুনাইয়া দিল। ; ,
শেষ খেয়া
বুদ্ধিমানেরা কাহাকেও বিশ্বাস করে না বা করিতে পারে না।
বিপিনবাবুর উপরও গণেশের বিশ্বাস ছিল না।
সে উত্তেজিত
ভাবে বলিল,-“টাকা বড় লােভের জিনিস ;-পরের কাছে
পড়ে থাকবে কেন,—সে কি ছেলের চেয়েও বিশ্বাসের
লােক।”
নিমাই বলিল,-“এর চেয়ে সত্য আর ন্যায়সঙ্গত কথা
আমার ৫২ বছরের এই পুরােনাে মাথাটাতেও আসে না; তুমি
দীঘজীবী হও ! আর যদি বলে বাবাজি ত’ বলি—টাকা-
সম্বন্ধে বাপকেও বিশ্বাস নেই। তুমি বুদ্ধিমান,—কথাটার সার
গ্রহণ করতে পারবে, তাই বলুম। ঐ বিপিনবাবুটি বেইকে
গিলে বসে আছেন; এই বলে রাখছি—দ্যালে লিখে রাখাে,—বেই
এখানে থাকতে একটি আধলাও তােমার হাতে পড়বে না। যদি
বললুম তাে সবটাই বলি,-মেয়েরা বলে থাকে,
পেটের ছেলের
চেয়েও জামাই স্নেহের জিনিস,—সেটা আগে বুঝতুম না ;
যা ! তাই বলতে হয়,—অসম্ভব ত’ নয়, ওঁদের দুজনের মধ্যে
{ ঈশ্বর না করুন) একজনের ভালমন্দ হলে, তােমাকে ধাম্মিক
সেজে টাকাগুলির উদ্দেশে ‘ঠাকুরদের নমঃ' বলে হাত ধুয়ে
বতে হবে, সেটা মনে রেখাে। টাকা তো আর ঘূতুন্তে
এড়ে নয় যে, বিপিন কি তার ছেলে তােমাকে সেধে এসে
বলবে—গণেশ বাবু, এটা তােমার বাপ আমাদের গােয়ালে
গােপনে গচ্ছিত রেখে গেছেন,—নিয়ে যাও—আমরা ঋণমুক্ত
হই!” ইত্যাদি
শুনিয়া গণেশ সত্যই চঞ্চল হইয়া উঠিল, এবং শ্বশুর মহাশয়ের শরণ লইল। তাহার পর হইতে হিন্দুর কর্তব্য, স’র অসার-মায়া- মাত্র, চতুরাহম-তত্ত্ব, পরলােকের সম্বল, ত্যাগাং শান্তি, সাধু- সঙ্গের মহিমা, পৰ্যটনের আনন্দ ও লাভ, বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, বৃন্দাবন বাসের ফল,-প্রভৃতি সুমধুর কথা নানা যন্ত্রের সাহায্যে নবীনের কানে পৌছিতে লাগিল। বন-হুগলীর মার্ক কথক ইতিমধ্যে কয়েক দিন পায়ের ধূলা দিয়া অনেক সেরা সেরা তত্ত্ব- কথা শুনাইয়া গেলেন। হাতে একখানি পয়ারে লেখা বৈরাগ্য শতকের বাঙ্গল তরজম ছিল, সেখানি নবীনকে দিয়া বলিলেন,-- । “এখানি একটি শিষ্যকে দেবার জন্যে এনেছিলুম, তুমিও..যােগ্য পাত্র—ঠি সময়ও হয়েছে,তুমিই দেখাে। এমন বই বাল্মীকি । আর লেখেন নি,-রত্ন-রত্ন !” যাইবার সময় বলিয়া গেলেন, “ভগবান যদি কৃপাই করেছেন—আর কেন, বৃন্দাবন-বৃন্দাবন।” ভগবানের ইচ্ছা না হলে তা হবে না। তাই সে সকলের কথা শুনিয়া যাইত, কখনাে বা বলিত, বাপ-পিতামাের ভিটেয় যে-কদিন আপনাদের পায়ের ধূলো পাই, নিয়েনি—এটা ছাড়ি কেন! অদৃষ্টে থাকে—আপনাদের ইচ্ছাও ফলে যাবে। 3
শেষ খেয়া
নবীন ছিল সরল প্রকৃতির ভীতু
লােক ;
হঠাৎ বেরিয়ে
পড়ার মত মনের বল, বা আজন্ম-পরিচিত ঘরবাড়ী, দেশ, দেশের
লােক—এমন কি ছেলে বেলা থেকে দেখা কনকচাপার গাছটি
পৰ্য্যন্ত ছাড়বার মত দুঃসাহস তাহার ছিলনা; সে-কথা ভাবিতেও
তাহার কষ্ট হইত—চক্ষে জল আসিত। তাহার উপর বাগান
লইয়া ইদানীং তাহার দিন গুলি নিতান্ত মন্দও কাটিতেছিলনা।
বাগান আর সান্ধ্য-বৈঠক, তাহার সুতীব্র অভাব-অবহেলা-
গুলিকে সহজ করিয়া দিতেছিল
তাই বলিয়া নবীন যে ওই পরিমাণে পাৰ্বতীকে ভুলিতে
রতেছিল, তাহা নহে। পৰ্ব্বতীর কথা : পড়িলেই সে
ছাতাড়ি নিড়ানখানি লইয়া বাগানে ছুটিত,ঘাস ।
লেও জমি নিড়াইত,-আবশ্যক না থাকিলেও ব্যস্ততার
ত মাটির কঁাকর বাছিত।..
{ বার ০ ,
য়াল ঘরখানি পড়িয়া গিয়াছে। সে একটু লক্ষ্য করলেই
খতে পাইত—চালাখানি বেশ সতর্কতার সহিতই শুইয়াছে,
থাও একটু আঁচ লাগে নাই—একগাছি খড়ও এদিক ওদিক
হয় নাই। নবীন ভাবিল-কালবৈশাখী।
শেষ খেয় সন্ধ্যার পর বাগান হইতে ফিরিয়া দেখিল,-বহিব্বাটীর দালানটি তাহাদেরি গরুবাছুরে দখল করিয়াছে,-জাব দিবার ট, গামলা, সবই হাজির। বসিবার নাদুর দুইখানি টবের মধ্যে টানিয়া, গাভীর মহানন্দে চর্বণ করিতেছে; এবং এই অল্প সময় মধ্যেই সেই পুরাণাদি পাঠের পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন স্থানটিকে- গােময় ও গােমূত্ৰে পবিত্ৰতর করিয়া ফেলিয়াছে ! নবীন স্তম্ভিত হইয়া এই দৃশ্য দেখিতে লাগিল। তাহার মুখে একে একে নানা ভাবের রেখাপাত হইয়া ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল,একটা দীর্ঘ নিশ্বাস সেগুলিকে মুছিয়া সমান করিয়া দিল। নিত্য যাহারা সন্ধ্যার পর আসিতেন--তাহারা আনি। সকলেই আশ্চর্য হইয়া নানা প্রশ্ন করিলেন। নবীন গােয়ালের অবস্থা ও কালবৈশাখী বলিয়াই নীরব হইল। সেদিন সকলে। নবীনের শয়ন-বক্ষেই বসিলেন এবং এক ছিলিন তামাক খাইয়াই উঠিয়া গেলেন। যাইতে গাইতে একজন বলিলেন- “ভালমানুষের ভালাই নেই” ; একজন বলিলেন—“ মানুাই নয় তাে ভালমানুষ,ওট। মেয়েমানুষের অধ।” রাত্রে সরল চারটি টাকা-ভাজা মুড়ি আর ঝালের নাড়ু লইয়া নবীনকে খাওয়াইতে আসিল, এবং চক্ষু মুছিয়া বলি “জ্যাঠামশাই, তােমাকে ওরা দেখছি তিতে দেবেনা। চারটে রাতে দেখি—গােয়লের খুটিগুলাে উপড়ে—তিনজনে ধরাধরি করে চালাখানা তয়তয় শুইয়ে দিলে,-তারপর দেখছি কাণ্ড! তুমি একটু শক্ত হও জ্যাঠামশাই।” নবীন একটু
শেষ খেয়া
;
।
মান হাসি হাসিয়া বলিল—“মা, এ অবস্থায় আমি একটা কথা
কইলেই ইতরের মত কেলেঙ্কারী সুরু হবে ; চুপচাপই ভা,
সরলা ! বাগানেই দিন কাটিয়ে দেব।”
দিন কাটিয়াই যায়,-নবীনেরও দিন কাটিতে লাগিল ,
কিন্তু সন্ধ্যা হইলেই সে অবলম্বনন্য অসহায় হইয়া যেন ভাঙ্গিয়া
পড়িত। গরু কয়টি দিন দিন পবিত্রতা বাড়াইয়া, বসিবার
দালানটিকে সমূহ পীড়াদায়ক করিয়া ফেলিল ;—আর কেহ সেই
পবিত্র ভূমি মাড়ান না। ঝড়-বৃষ্টি না থাকিলে নবীন একাক;
উদাসভাবে বাগানেই বসিয়া থাকে,-বাগানের এক পাশে
একখানি ছােট চালা তুলিবার কথাও ভাবে । ফুল-ফলের
গাছ। বৃষ্টির জল পাইয়া পল্লবে পল্লবে যৌবনের সুর তুলিয়াছে,
গাছগুলির উপর নবীনের এখন পুত্রস্নেহ ;-তাহার প্রাণ
তাহাদেরই কাছে পড়িয়া থাকে। বাগানের বেড়া যথাসম্ভব
সুদৃশ্য ও বেশ মজবুং করিয়া বাধা হইয়াছে ; আগােড়ে তাল।
দেওয়া থাকে। এটা যে কত যত্নের জিনিস—দেখিলেই তাহ
বুঝিতে বিলম্ব হয় না।
নবীন নিত্য ভােরে গাডু আর ঈতন হাতে করিয়া বাগানে
যাইত ; সেদিন অপেক্ষাকৃত একটু প্রত্যুষেই সে চলিল ;-
কাল সে দেখিয়া আসিয়াছে-কয়েকটি নবমল্লিকার কলি
স্ফুটনােখ! আজ তাহারা নিশ্চয়ই ফুটিয়াছে ! দেখার পূর্বে
দেখিবার আনন্দে তাহার বুক ভরিয়া উঠিতেছে ! আগােড়ের
কাছে পৌছিয়া দ্যাখে—বাগানের মধ্যে একপাল গরু! মাথাটা
শেষ খেয়া
-
গুরিয়া গেল,—দ্বার না খুলিয়াই, গাড়ু ফেলিয়া—উন্মত্তের মত
একটা ভেরেণ্ডা ডাল ভাঙ্গিয়া বাগানের চারিদিকে ছুটাছুটি
করিয়া গরু তাড়াইতে লাগিল। কোথা দিয়া যে তাহারা
ঢুকিয়াছে বা কোথা দিয়া বাহির হইয়া যাইবে,—সে-সব
ভাবিবার মত অবস্থা তাহার ছিলনা, সে যেন বেড়া-আগুনের
মধ্যে আত্মরক্ষার্থে ছুটাছুটি করিতেছে ! কোন একটা বিশেষ
মুহূৰ্ত্ত সহসা তাহাকে দেখাইয়া দিল—গরুগুলা নিজেদেরই
ডালটা
দূরে
নিক্ষেপ করিয়া সে স্থির হইল, পরে গাছগুলির দিকে
চাহিয়াইশরবিদ্ধের মত একটা মর্মান্তিক কাতর “উ:” ধ্বনি
করিয়াই ঘুরিয়া পড়িতে পড়িতে বেড়ার খুটি ধরিয়া দাড়াইয়া
গেল ; তাহার অন্য হাতটা তাহার অজ্ঞাতেই বুকটা চাপিয়া
বরিল। নবীন পাগলের মত এক দৃষ্টে বাগানের দিকে তাই,
পাষাণ-মূৰ্তিবং দ্বাড়াইয়া রহিল।
সূৰ্য্যদেব দেখা দিলেন,—লােক চলাচল আরম্ভ হইল।
পাড়ার লােকেরা একবার নবীনের দিকে, একবার তার বাগানের
দিকে চাহিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল ; কেহ আর গরুগুলি বাহির
করিয়া দিবার চেষ্টা করিল না। সকলেই দেখিল-নবীনের
প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় গাছগুলি সমূলে উৎপাটিত ও পত্রপল্লব ছিন্ন
অবস্থায় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। এতটা সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলার
সবটা যে গরুর দ্বারা সম্ভব নহে তাহা সকলেই সন্দেহ করিল।
সেই সুদৃঢ় সুউচ্চ বেড়ার বাখারিগুলি একস্থানে কিরূপে যে
এতটা নামিয়া আসিয়াছে অনেকে সেই আলােচনাই করিতে
৮
শেষ খেয়া
লাগিল, কারণ গরু গলা বাড়াইয়া কোন প্রকারে সর্বোচ্চ
বাখারি স্পর্শ করিতে পারে—কিন্তু তাহার উপর বলপ্রয়ােগ করা
চলে না।
-
সুখশান্তি-হারা নবীনের উপর এই আকস্মিক আঘাত যে
কতটা সাংঘাতিক তাহা সকলেই বুঝিতেছিল, তাই সাহস করিয়া
কেহই একটি সান্ত্বনার কথা পৰ্য্যন্ত মুখে আনিতে পারে নাই,
কারণ তাহা তখন পরিহাসের মতই শুনাইবে ।
একালে দৈববাণীটা আর শোনা যায় না, মেঘ গর্জনই কানে
আসে। সকলকে চমকিত করিয়া কোথা হইতে ধ্বনিত হইল,-
“হবে না,ঝড়-বৃষ্টির দিনে গরুগুলো কোথায় থাকে, তাই
তাদের দালানে রেখে এসেছিলুম,—তা সইতে না পেরে, যেমন
অবলাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ফল ভুগতে হবে না,”-
ইত্যাদি।
গ্রামে হরঠাকরুণের ছিল-হাকিমের আসন; সকল বিষয়েই
তার একটা রায় আছে। গঙ্গাস্নানে যাইবার পথে তিনিও
দাড়াইয়া গিয়াছিলেন, এবং অতিশয় মনােযােগের সহিত বেড়াট
পরীক্ষা করিতেছিলেন। গাে-প্রবেশ-পথের সৰ্বোচ্চ থাকের
বাখারি দুখানা রক্তে মাখামাখি দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন—
-
•
শুনিয়া সকলে সাগ্রহে সেই দিকে চাহিল, এবং বলিয়া
উঠিল—“ইস—রক্ত যে !
গরুর গলাটা-নারায়ণ-নারায়ণ !”
ইরঠাকরুণ বলিলেন—“ভয় নেই, গরুর গলা নয়,ষাঁড়ের পা
শেষ খেয়া
ঘাড়ের পা; এ বেড়ার উপর না নাচলে তো নুইবে না। তাই
নিমে পােড়ারমুখাে সাড়ে চারটে রাতে পায়ে একরাশ নেকড়
জড়িয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ী যাচ্ছিল ;—সঙ্গে গুণধর
জামাই !” শুনিয়া যে-যার মূখ-চাওয়াচাই করিয়া ইঙ্গিতে
অনুমােদন করিল ।
ঠিক এই সময়ে আবার চণ্ডিকার কর্কশ কণ্ঠে—“হবে না—
ভগবান নেই !” প্রভৃতি মােক্ষ মীমাংসা-বাণী শ্রুত হওয়ায়
হরঠাকরুণ সপ্তমে বলিয়া উঠিলেন—“হবে—হবে—ভাবিসনি ;
ভগবান আর নেই, তিনি না থাকলে নিমে নদীর পা খসে যাবার
ব্যবস্থা হবে কেন!” তাহার পর উপস্থিত সকলকে শুনাইয়া
বলিলেন—“আহা, অমন বুদ্ধিমান শশুর-জামাই দুজনে থেকেও
ছুরি-দে-কাটা কাতাদড়িগুলো কুড়িয়ে নে যেতে ভুলে গেল !”
সকলে তখন সেগুলি তুলিয়া পরীক্ষা করিয়া বলিল—“তাইত’
ছুরি-দে-কাটাই ত’ বটে !”
হরঠাকরুণ আবার শুরু করিলেন-“পালের বুদ্ধি আর কত
হবে,-তানাতে আর নবীন গরু খুলে তাড়িয়ে এনে—বেড়া
কেটে তাদের নিজের বাগানে ঢুকিয়ে দেয় ! রাক্ষুসীর মুখখানা
পুড়বে না!”—এই বলিতে বলিতে নবীনের কাছে উপস্থিত
হইয়া মাতৃসুলভ স্নেহে বলিলেন—“নবীন, যাও বাবা, হাত-মুখ
ধুয়ে গঙ্গাস্নান করে এস গে। হয়েছে কি ? পাৰ্বতীর চেয়ে
কি বাগান বড় ছিল, চুলােয় যাক্ ! এই সে-দিন এক আশ্বিনে
ঝড়ে কার কি না গিয়েছে,—কারুর ছেলে, কারুর স্বামী, কারুর
৪০
শেষ খেয়া
স্ত্রী, কারুর ঘর-বাড়ী, কেউ সপরিবারে, আর প্রায় সকলেরি'
ফলন্ত গাছপালা,-এক রাত্তিরেই যায়নি কি বাবা? তাই মনে
করনা ! এ তার চেয়ে বেশী কিছু কি ! যাও-পুরুষ মানুষের
আবার ভাবনাটা কি তার যেখানে ভাল লাগবে সেই খানেই
সে থাকতে পারে। তােমার এখানে থাকা আর চলতে পারে
। যাও, এখন মুখহাত ধুয়ে গঙ্গাস্নানে যাও;—এদিকে আর
চেয়ােনা। আর'দেখ বাবা,আমার বাড়ী আজ প্রসাদ পাবে।”
নবীন মন্ত্র-চালিতের মত বাগানের দিক হইতে মুখ ফিরাইল,
এবং ভূমিষ্ঠ হইয়া হরপিসিকে প্রণাম করিল। তিনি বাধা দিয়া
বলিলেন-“ঐ হয়েছে থাক, আমি তেল মেখেছি ; ভগবান
তােমায় শান্তি, দিন্। আমি গঙ্গাস্নান করে ফিরেই রান্না
চড়াব।” নিৰ্বাক্ নবীন ধীরে ধীরে বহিৰ্বাটীর দিকে চলিল
দেখিয়া, হরপিসি স্নানে চলিয়া গেলেন।
বাগান যেমন বন্ধ ছিল—বন্ধই রহিল ; গরুগুলি যেমন
নির্বিঘ্নে চরিতেছিল, তেমনি চরিতে লাগিল।
৫
বিপিনবাবুর সহিত নবীনের কোন দিনই প্রভু-ভৃত্য সম্বন্ধ
ছিলনা, উভয়ের মধ্যে বন্ধু-ভাবই প্রবল ছিল ; এবং বিপিনবাবু
নবীনকে দাদা বলিয়াই ডাকিতেন। নবীন তাহার নিকট গিয়া
তীথাদি ভ্রমণের বাসনা ব্যক্ত করিলেন, ও স্থাবর অস্থাবর
শেষ খেয়া
৪১
৫৫
দম্পত্তির ব্যবস্থার প্রস্তাব করিয়া পরামর্শ চাহিলেন।
প্রস্তাবের কারণটা বিপিনবাবুর কাছে পূৰ্বেই পৌছিয়া গিয়া-
ছিল। তিনি বিষন্ন মুখে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন—
“সেই ভাল,-তােমার এ অশান্তি আর দৌরাত্ম সয়ে থাকাই বা
কেন! আমার বেরুতে দেখছি-এখনো পাচ সাত বচর,
তুমিই এগােও দাদা -এ নিৰ্যাতনের মধ্যে তােমাকে আর
থাকতে বলিনা। জানি, আমার এখানে তুমি থাকবে না-তাতে
তােমার গণেশের মাথা হেট হবে ! তখন আর উপায় কি ?
দিন কতক না হয় দেখে শুনেই এসাে।” ইত্যাদি
গণেশ ও কার্তিকের নামে স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তিই
সমান ভাবে লেখাপড়া করিয়া দেওয়া হইল। বিপিনবাবুদের
নিকট যে পনের হাজার টাকা জমা ছিল, বিপিনবাবু তাহার
পাঁচ হাজার নবীনের জন্য রাখিলেন, গণেশ ও কার্তিককে পাঁচ
হাজার করিয়া দেওয়াইলেন। নবীন নিজের জন্য আড়াই
হাজার রাখিতে বলায়, বিপিনবাবু বলেন—“বেশ তুমি
আড়াই হাজারই লও, আর বাকি আড়াই হাজার আপাততঃ
তােমার নামে আমার কাছেই জমা থাকুক,-পরে যাহা হয়
করিও।”
নবীন বলিল—“তবে একটা কাজ কোরাে ভাই, আমাদের
পাড়ায় বড় জলকষ্ট, ঐ টাকাটায় পার্বতীর নামে সাধারণের
ব্যবহারের জন্যে একটি ঘাট-বাধানাে পুষ্করণী, আমার উত্তর
বাগানের জমিতে করিয়ে দিও। তার ওপর ছেলেদের কোন
8२ শেষ খে। কর্তৃত্ব বা অধিকার থাকবেনা। আমি ওসব বিশেষ বুঝিনা হলে ওটা সাধারণের হাতে থাকে, তাই করে দিও ভাই।” বিপিনবাবু বলিলেন—“বেশ তাই হবে, সেটাও তবে লেখা- পড়ার মধ্যে থাক্।” নবীন তখন সংসার হইতে রেহাই পাইয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারিলে যেন বাঁচে। পর দিন রেজিষ্ট্র করিয়া সকল ভার বিপিনবাবুর উপর দিয়া, নবীন সরলাদের বাটা উপস্থিত হইল, ও সরলার হাতে পাচশত টাকার নম্বরী-নােট দিয়া, অভয়চরণকে বলিল—ইহা সরলার নামে আজই সেভিংস্ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া। চাই।” পরে সরলাকে বলিল—“বিশেধ দরকার না হলে এতে হাত দিওনা মা।—আর অভয়, তুমি যে কাজ করচে। কর, এখানে সুবিধা না হলে বিপিনবাবুর সঙ্গে দেখা কোরো ; সত্য আর পৰ্ম্ম এই দুটিতে দৃঢ় থেকোভান হবে।” সরলা আড়ষ্টভাবে শুনিতেছিল, সে আর থাকিতে পারিল ; কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল—“এ-সব কেন করচ জ্যাঠ- মশাই! তুমি কি কোথাও চলে যাবে ?” নবীন মুখে একটু ম্লান হাসি আনিয়া বলিল-“তুই কি এখনাে আমাকে থাকতে বলি সরল!” এইবার সরলা কাদি। ফেলিল। সে বলিল— “আমি কি জ্যাঠাইমাকেই থাকতে বলতে পেরেছিলুম, আমি এমনি পাষাণী—আমার প্রাণ চেয়েছিল—তিনি এ-জালা জুড়িয়ে যান।” সে আর বলিতে পারিল না—কঁদিতে লাগিল। কথাটার মৰ্ম্ম নবীনের মৰ্ম্মপৰ্যন্ত গতি পাইয়া তপ্ত শলাকার মত
শেষ খেয়া
3
ধিধিল ।
সে দুই তিনবার ঢােক গিলিয়া একটু সামলাই
বলিল—“নারে সরলা, তেমন কিছু নয়—তীর্থে যাবার সঙ্কল্প
করেছি ; তা মা, ভবিষ্যতের কথা ত কেউ বলতে পারে না,
তাই মানুষ সঙ্কল্পই করে, বাকিট। ভগবানের হাতে; তাকে
কখনাে ভুলােনা মা, ভালই থাকবে।" পরে উদাস ভাবে বলিল—
“কার্তিককে আর দেখতে পেলুমনা" ;-কথাটা বলিতে গিয়?
হৃদয়ের সমস্ত বেদনা একটিমাত্র গভীর নিশ্বাসে 'বাহির হইয়া
আসিল। রুদ্ধকণ্ঠে নবীন বলিল—“সে এলে তাকে যত্ন করি
সরলা, কেউ যেন তাকে কথার আঘাত না দেয়।
আমাদের কোন দিন রাগ ছিলনা, কেবল একটু অভিমান ছিল,
—সে টুকু না থাকলে তাকে সে পর করা হয়।”
কিছুক্ষণ কে কথা কহিতে পারিলনা, সরল। নীরবে কঁদিতে-
ছিল। নবীন উস ভাবেই বলিল-“গণেশের দেখা পেলুম
অভয় কথা কহিল—“দাদা যে তার শ্বশুরকে নিয়ে বড়
বিব্রত হয়ে রয়েছেন-তার পা কেটে গিয়েছিল, তাই ধনুষ্টঙ্কার
আরম্ভ হয় ; কাশীপুর হাসপাতালে নেয়নি। পা নাকি কেটে
বাদ দিতে হবে, কলকেতার মেডিকেল কলেজে নিয়ে যেতে
হয়েছে।” “বলাে কি অভয়,—আহা অনেকগুলি কাচ্চাবাচ্ছা
যে, ভগবান ভাল করে দি—বলিতে বলিতে অন্যমনস্ক ভাবে
নবীন উঠিল। সরলা খাইবার জন্য কাতর অনুরােধ জানাইলে
নবীন বলিল—“আজ থাক সরল—কাল
তােমার হাতেই
খাব না।”
৪৪ শেষ খেয়া যে নবীন পার্বতীর শত নানা সত্ত্বেও কাল-বৈশাখার ঝড়-বৃষ্টি ও আনুষঙ্গিক বিপদ মাথায় করিয়া কলিকাতায় কৰ্মস্থান হইতে নিত্য বাড়ী ফিরত, দোকানে থাকিবার ব্যবস্থা থাকিলেও বাড়ীর মায়া কাটাইতে পারিনা, আজ সেই নবীনই সেই বাড়ীর দিকে একবার ফিরিয়া চাহিল না ; একটি ক্যাম্বিসের ব্যাগ হাতে করিয়া দ্রুতপদে বাড়ীর গণ্ডী পার হইয়া কুটীঘাটার গঙ্গার ঘাটে আসিয়া হাঁপ ছাড়িল ! বহু দিনের বন্দী যেন মুক্ত বাতাসে আসিয়া শান্তি বােধ করিল। এখন সে যেন সত্বর অগ্রসর হইতে পারিলে বাচে, গঙ্গার পরপারটাই এখন তাহার প্রিয় বােধ হইতেছে। তাহার অজ্ঞাতে কখন যে সংসার আজ তাহাকে সকল চিন্তা হইতে ছুটি দিয়াছে, সে তাহা বুঝিতেই পরে নাই। অথচ সে একটা অর্থহীন আরাম অনুভব করিতে- ছিল। অনেকদিন পরে গঙ্গার মুক্ত মহিমা, তাহার তরঙ্গলীলা, —আনন্দ, নৃত্য,-কুলু কুলু ধ্বনি,-বটের ছায়ায় বসিয়া নবীন অজ বুভুক্ষিতের মত উপভােগ করিতে লাগিল। গাছের উপর একটা কাক ডাকিতেছিল, তাহাও নবীনের আজ মধুর বােধ হইল ! প্রকৃতির মুক্ত সুরগুলি অজ তাহার মুক্ত প্রাণে প্রবেশ- পথ পাইয়াছে । :
শেষ খেয়া
৪ ৫
অনেকদিন পরে সরলা আজ “জ্যাঠাইম। গাে”-বলিয়া
চীৎকার করিয়া কঁদিয়া উঠিল। প্রতিবেশিনীরা ছুটিয়া আসিল
ও শুনিল নবীন গৃহত্যাগ করিয়া গিয়াছে। সকলেই সমবেদনা
জানাইয়া হায় হায় করিতে লাগিল ; অনেকেই চোখের জল
মুছিল । “কলিতে ভগবান নেই"—বলিয়া কেহ দীর্ঘনিশ্বাস
ফেলিল কেহ বলিল,-“অমন কথা বলিনি, ভগবান এখন
মেডিকেল কলেজে ব্যস্ত আছেন।"
হরঠাকরুণ আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন, তিনি ধমক দিয়া
বলিলেন—“থাম্ তােরা,-এ নরক ভােগ ছেড়ে সে যেখানে
থাকবে সেখানেই ভাল থাকবে।” ইত্যাদি মন্তব্য কিছুক্ষণ
চলিবার পর বিমর্ষ ও দুঃখভারাক্রান্ত মনে যে-যার বাড়ী
ফিরিল ।
;
আজ কয়দিন' চণ্ডিকার মনে সুখ ছিলনা। বাপের পা
কাটাটা বাহিরের কারণ হইলে ও, ভিতরে কত কি যেন তাহাকে
ঘিরিয়া তাহার অন্তরটা চাপিতেছিল,—সে স্বস্তি পাইতেছিলনা।
অথচ কি যে সে ‘কতকি’ তাহা ভাবিবার মত ইচ্ছাও তাহার
আসিতেছিলনা;—একাই এ-ঘর ও-ঘর করিয়া বেড়াইতেছিল।
সরলার কান্না শুনিয়া, তাহার প্রাণটাও আপনা আপনি
সেই সুরে বাজিয়া উঠিতে চাহিল। তাহার চক্ষু তাহার
অজ্ঞাতেই অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল ; সে ব্যাকুল ব্যগ্রতায়
দ্বারের বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। প্রতিবেশিনীদের সেইটাই
ছিল ফিরিবার পথ। মােহিনী-পাড়ার ‘ঝিউড়ি’ মেয়ে,
;
। সে চণ্ডিকাকে সম্মুখে পাইয়া সামলাইতে পারিল না, বলি বসিল—“কি লো বউ-মিষ্টিমুখ করা,-আজ তাে তােদের বিজয়া,—শিবদুর্গা দু’ই তো বিসর্জন দিলি !” তরঙ্গিণী বলিল— “সন্ধ্যেবেলা আসবে। নাকি বউ !” ইত্যাদি। “আমি তােমাদের কি করেছি যে”—বলিতে বলিতে চণ্ডিকা চোখে আঁচল দিয়া কাদিয়া ফেলিল। হরপিসি পুরুষােচিত কণ্ঠে হাকিলেন— “চলে আয় ছুড়িরে। সত্যিই তো ও তােদের কি করেছে ? ও যা করেছে, নিজের শ্বশুর-শাশুড়ীর করেছে ।"—এই বলিয়া এবং এই সুবিজ্ঞ বাণীর পশ্চাতে সুতীব্র জ্বালা রাখিয়া, তিনি দল তাড়াইয়া লইয়া গেলেন। চণ্ডিকা আর দাড়াইতে পারিল না, দ্রুত দ্বাররুদ্ধ করিয়া—শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িল, ও “ও মা গো—ওগাে বাবা গাে—তােমরা ফিরে এস গো”—বলিয়া গুমরিয়! গুমরিয়া তাহার অবসাদিত হৃদয়টাকে শান্তি দিবার বৃথা প্রয়াস পাইতে লাগিল। এক একবার তাহার নিজমূৰ্তি ফিরিয়া আসিতেছিল, তখন সে জোর করিয়া বলিতেছিল—“কেন, আমি কি করেছি—আমার দোষ কি ?” কিন্তু তাহার কথাগুলি মন হইতে বল সঞ্চয় করিতে পারিতেছিলনা, মুহূর্তেই নিস্তেজ হইয়া পড়িতেছিল। সে আর পারিল না—উঠিয়া পড়িল ও দ্রুত বহিব্বাটীর দিকে চলিল। দালানে উঠিতেই অর্ধ-শুষ্ক থােল বিচালি ও গােময়ের দুর্গন্ধ এবং ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত আবর্জনা ও অৰ্দ্ধচর্বিত মাদুর তাহাকে যেন ধিক্কার দিয়া উঠিল । সে তাড়াতাড়ি নবীনের ৪৭ য়নকক্ষে ঢুকিয়া পড়িল । তক্তপােষের উপর ধূলিমলিন সামান্য শয্যা পাতাই ছিল ; তাহার উপর নবীনের একখানি ময়লা কাপড় ও আলপাকার কোটটি পড়িয়া রহিয়াছে। হুকা দুইটি ও টিকে-তামাকের সাজসরঞ্জাম আর একটি ভাঙ্গা ছাতা, এক কোণে মাকড়সার জাল ও ধূলায় আত্মগােপন করিবার চেষ্টা ইতেছে। সকলে মিলিয়া যেন একবাক্যে কক্ষটির প্রাণশত জানাইয়া দিল। বিছানার উপর একখণ্ড কাজ দেখিতে পাইয়া চণ্ডিকা তাহ। সাগ্রহে তুলিয়া লইল। তাহাতে লেখা ছিল—“ভগবান তােমাদের মঙ্গল করুন,--আশীৰ্বাদ করি—সুখী হও। বিপিন- বাবুর সহিত দেখা করিও!”—সে আর দাড়াইতে পারিল , বিছানায় বসিয়া পড়িল ;--সঙ্গে সঙ্গে টাকার শব্দ হওয়ায় আলপাকার কোটটা তুলিতেই পাচটি টাকা দেখিতে পাইল। তাহার বুঝিতে বিলম্ব হইল না যে, উহা দুই দিনের সংসার খরচের জন্য । সে শয্যায় লুটাইয়া কাদিয়া উঠিল— “বাবা গাে, ফিরে এসো !" জগৎ কথার ভিখারী ; চণ্ডিকার এ-কথাটা নবীন শুনিতে পাইলে,-তাহার জন্য কাহারে। কোথাও বেদনা বাজে জানিতে পারিলে, নবীনের প্রকৃতির লােক—সহস্র দুঃখ-যন্ত্রণার মধ্যেও সংসারে পড়িয়া থাকিত,-- সে বােধ হয় কাহাকেও বেদনা দিতে পারিত না। একটা নৃতন-কিছুর জন্য—আর সে নৃতন-কিছুর পর সুখের কিছুর জন্য, যে উৎসাহ উত্তেজনার কাজগুলি থাকে, তাহা সমাপ্ত
৪৮
শৈষ খেয়া
হইবার পর স্বতই একটা অবসন্নতা-একটা ফাকা-ফাকা ভাব
আসে। সেটা সব সময় আরামের বিশ্রামরূপে গৃহীত হয় না,
উপভোগের আনন্দও আনে না; বরং কাজের উৎসাহ
উত্তেজনাটাই বেশী উপভােগ্য থাকে। চণ্ডিকার ঘটিয়াছিল ।
তাই। কাজগুলা,পশ্চাতে দীর্ঘ একটা ফাক রাখিয়া শেষ হইয়া
গেল ! আবার বাপ কি স্বামী নিকটে না থাকায়, চারিদিকের
শূন্যতার চাপটাই তাহার প্রাণটাকে দুর্ভর করিয়া তুলিয়াছিল,
একটা প্রতিক্রিয়া আরম্ভ করিয়া দিয়াছিল। তাহার সব রাগট।
স্বামীকে আর বাপকে ঘিরিয়া এক একবার ঘুরিয়া আসিতেছিল।
“আমি কি করেছি"—অযাচিত এই নীরব উচ্ছাসটি বারবার উদয়
হইয়া তাহার অভিমানকে খােরাক জোগাইতেছিল ও পুষ্ট করিয়:
তুলিতেছিল। তাই শ্বশুর গৃহত্যাগ করিয়া যাওয়ায়, আজ তাহার
প্রাণ তাহার দিকে ঝুকিয়া স্বতই বলিয়া উঠিল- “এ কি হল ?"
বহিৰ্বাটীর বাহিরের কদৰ্য্যতা আর ভিতরের প্রাণশূন্যতা
মুমূর্ষর ম্লান হাসির মত চণ্ডিকার চারিদিকে সুস্পষ্ট হইয়া
উঠিল—সে আর সেখানে থাকিতে পারিল না—ছুটিয়া বাহির
হইয়া আসিল। বাহিরে পা দিতেই কানে বাজিতে লাগিল
-পাড়ার সবাই যেন তাহারই নাম করিতেছে। উৎকর্ণ হইয়া
শুনিতে শুনিতে দ্রুত বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। একটা কাল
বিড়ালকে বিকৃত স্বরে ডাকিতে ডাকিতে দালানে বেড়াইতে
দেখিয়া তাহার বুকটা কাপিয়া উঠিল ; উঠান হইতে ঘরের
দিকে তাহার আর পা উঠিল না। সকলে যাহাকে পাড়ার
শেষ খেয়া
৪১
বাঘিনী বলিত, আজ সে একটা বিড়ালের ডাক শুনিয়া এতটুকু
হইয়া গেল। পাড়ার একটি ছােট মেয়েকে পাইলে আজ সে বাঁচে;
কিন্তু আজ তিন দিন কেহ তাহাদের বাড়ী মাড়ায় নাই।
এই অবস্থায় বাড়ীর দরজাটা হঠাৎ ধড়াস করি। খুলিয়া
"ওয়ায়, চণ্ডিক সশব্দে শিহরিয়া উঠিল ।
“কি—ভয় পেলে নাকি!” বলিতে বলিতে গণেশ বাড়ী
ঢুকল । চণ্ডিকা নিশ্বাস ফেলিয়া বঁচিল ।
আসিবার সময় পথে গণেশের সহিত অনেক পরিচিত
লোকের দেখা হইয়াছে, কেহ কিন্তু একটি কথাও কহে নাই,
নিমাই কেমন আছে, তাহাও কেহ জিজ্ঞাসা করে নাই।
তাহাতে নিজের মনের কাছে সে যতটা না ঘােট হইয়াছে
তপর সকলকে ততই অধিক ঘােটলােক ভাবিতে ভাবিতে
আসিয়াছে । বাড়ী ঢুকিয়া চণ্ডিকার চেহারা দেখিয়া সে চমকিয়া
গেল চণ্ডিকা কঁাদ-কঁাদ ভাবে বলিল—“যেমন করে পার
বাবাকে তুমি ফিরিয়ে নিয়ে’স।”
গণেশ বলিল—“কেন, তিনি ত’ আজ একটু ভালই
আছেন, ও-সব রােগের চিকিৎসা বাড়ীতে হওয়া অসম্ভব।”
চণ্ডিকা বলিল—“আমি তার কথা বলছি না,কৰ্ত্তার কথা
বলচি,—তিনি বাড়ী ছেড়ে চলে গেছেন।”
শেষ খেয়া
গণেশ ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করিল—“বিছানাগুলো!" চণ্ডিকার
বর্তমান মানসিক অবস্থায় স্বামীর এই প্রশ্নটা বড় বিরুদ্ধ ও মলিন
বলিয়া লাগিল ; সে বিরক্তভাবে বলিল—“ছেড়া কথা বয়ে
বেড়াবার লােভে ত’ কেউ নিজের বাড়ীঘর ত্যাগ করে না,
তিনি কিছুই নিয়ে যাননি।” গণেশের মনটা তখনো অন্যত্র ছিল,
সে যেন কূল পাইল ! বলিল—“উঃ—এখনি বিশ পচিশ টাকা
বেরিয়ে যেত, ভাগ্যিস বাড়ী এলুম ! ০-রােগে অনেক
বিছানার দরকার।
গণেশের কথা শুনিয়া চণ্ডিকা কেবল অবাক হইয়া তাহার
নখের উর চাহিয়া রহিল। সে চাহনিতে কোন ভাবটার
আতিশ ব্য.ছিল তাহা বলা কঠিন ; কিন্তু তাহা বুদ্ধিমান গণেশকে
প্রকৃতিস্থ করিয়া দিল। সে সামলাইয়া বলিল—“আমার মাথাটা
শ্বশুর মশাযের জন্যে বিছানার ব্যবস্থায় ভরে রয়েছে,ত। হ্য।
তুমি কি বলছিলে—বাবা কোথায় গেছেন !”
চণ্ডিকা স্থির দৃঢ়কণ্ঠে বলিল—“ত। আর আমি কি করে
জানবো, তার বিছানার উপর এই পড়ে ছিল”—এই বলিয়া লেখ।
কাগজটুকু আর টাকা পাঁচটি স্বামীর হাতে দিল। গণেশ টাকা-
গুলি গণিয়া টাকে গুজিতে জিতে লেখাটুকু পড়িয়া বলিল,-
“ত। আমি আর কি কোরব।”
চণ্ডিকা পূৰ্ব্ববৎ দৃঢ় থাকিয়াই বলিল—“কেন—তুমি তাকে
ফিরিয়ে আনবে।” গণেশ একবার—“তবে", একবার—“তা হলে”
বলিয়া চণ্ডিকার মুখের প্রতি তাকাইয়া রহিল। সেই অসম্পূর্ণ
শেষ খেয়া
“তবে” আর “তা হলেটা উভয়েই বােধ হয় মনে মনে একই
ভাবে পূরণ করিয়াছিল, কিন্তু তাহার উত্তরটা যে উভয়ের কাছে
আর এক নহে, চণ্ডিকার চক্ষেই তাহার প্রমাণ ফুটিয়া উঠিল ।
তাই সে কিছু বলিবার পূর্বেই গণেশ বলিল—“আচ্ছ। এখন
বড় খিদে পেয়েছে কিছু খেতে নও; দু’রাত শুইনি, অর
দাড়াতে পারচিনা।" কথাটা সত্য।
গণেশ সত্বর পুকুরে ডুব দিয়া আসিয়া মুড়ি গুড় ও ?
খাইতে খাইতে বলিল—“আজ বুঝি রাধনি !” চণ্ডিকা :
ভাবে বলিল—“কি রাধবােকে বাজার করে দেছে।"
গণেশ চুপ করিয়া আহার শেষ করিল। তাহার মটি।
কিন্তু ভিতরে গােলমাল আরম্ভ করিয়া দিল। চণ্ডিক। উ7
ভাবে বলিল—“তিনি কালকের বাজার খরচটা পর্যন্ত ‘ন
গেছেন !
গণেশ স্নানে যাইবার সময় বাপের বিছানাটা একবার নাডিয়া
চাড়িয়া দেখিয়া গিয়াছিল—দি আর কিছু টাকাকড়ি কোথ
আত্মগােপন করিয়া থাকে,—চণ্ডিকা নিশ্চয়ই ভাল করিয়া দে
সে এখন আহতের ন্যায় ধীরে ধীরে শয্যায় গিয়া শুই।
পড়িল ; চণ্ডিকাকে খাইতে বলিতে বা বাড়ীতে তাহার অঙ্গর
করিবার মত কিছু আছে কি না তাহা জিজ্ঞাসা করিতে ভুলিয়া
গেল। চণ্ডিকা লজ্জায়, অভিমানে ও ক্ষোভে, যেখানে ছিল
সেই খানেই বসিয়া রহিল। বেলা তিনটা বাজিয়া গিয়াছে
মুখে জল পর্যন্ত দেয় নাই, স্বামী সে-সম্বন্ধে একবার খোঁজ
.
নাই।
;
শেষ খেয়া
সইল না। বহুদিন পরে আজ তাহার শাশুড়ীকে মনে পড়ি।
তাহার ভালবাসা, তাহার যত্ন,—বেলা আটটা না বাজিতে
তাহাকে ডাকিয়া জল খাওয়ানো, তাহাকে ব্ৰত লওয়াইয়া
উপবাসের ভার নিজে লওয়া, এইরূপ আরো কত কি মনে হইয়া,
তাহার সমস্ত হৃদয়টা ব্যথায় ভরিয়া উঠিল। সে অস্ফুট স্বরে
কেবল “নাগে-মাগাে" করিতে লাগিল,-“মা গো" ছাড় আর
সে অগ্রসর হইতে পারিতেছিল না। একটা সলঙ্গ-সঙ্কেচ
তার কণ্ঠ চাপিয়! ধরিতেছিল,—তাহার দুই চক্ষু জলে ভাসি
নাইতেছিল
গণেশ খুবই শান্ত ছিল ; তাহা সত্ত্বেও আজ তাই চক্ষে
নদ আলি ন। সংসারে যে টাকার আবশ্যক হয়, এ অদ্ভুত
সত্য। জানিবার এমন কুযােগ তাহার কোনদিন ঘটে নাই ,
এই না সেট: জীবনব্যাপী তাগদার মূর্তিতে অশুভ গ্রহের মত
সংস; উদয় হইয়া তাহাকে ভীত ও বিক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছে ?
পড়িয়া পড়িয়া সে কেবল খরচের মধ্যদিয়া বাপের মূল্য নির্ধারণ
করিতে লাগিল,—মূল্যটা ক্রমেই বাড়িয়া চলিল
ডুব-জলে গিয়া পড়িল । একে ত’ শ্বশুরকে লইয়া গত কয়দিনের
ভেগাভাগে সে বিরক্ত ও অশক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার
উপর নিমাই ঘােষের পরামর্শ ও প্ররােচনায় এতবড় সুস্পষ্ট
লােকসান, তাহর অস্থি-গ্রন্থিগুলি শিথিল করিয়া দিল, এবং
তাহার বুদ্ধির গৰ্ব্বকে অপমানের প্রচণ্ড আঘাতে ভূলুণ্ঠিত করিয়া
তাহাকে ক্রোধোন্মত্ত করিয়া তুলিল।
• -
শেষ খেয়া
নবীন ছিল বাড়ীর সৰ্ব্বক্ষণের ও সকল ঝাটের অভিভাবক।
বড় মেরামত, টেক্স দেওয়া, সংসারখরচ জোগানো, বাজার
করিয়া আনা ছিল নবীনের কাজ। এটা সে সব অন্যান্য
কনকে কতটা নিশ্চিন্ত রাখে, তাহার বর্তমানে একথাট।
করে ভাবিবার বিষয় ছিলনা, তুচ্ছের সামিলই ছিল।
পিতার গৃহত্যাগে গণেশ আজ কোনদিক হইতে সিসি।
লাভের লক্ষণ দেখিতে না পাওয়ায়,সংসারের সকল ঝ#
সক কষ্ট, সকল চিন্তা ও সকল ব্যয়ভার বহনের দুর্লভ বস্তুটিকে
খােয়ানাে, তাহার মৃত্যুবং বােধ হইতে লাগিল,-অসহনীয়
হইয়া উঠিল । সে একলক্ষে শয্যা ত্যাগ করিয়া, উড়ানী কবে
ফেলিতে ফেলিতে বাহিরে আসিয়া দেখে—চণ্ডিকা পূর্বাবস্থায়
একস্থানেই বসিয়া আছে! গণেশ বলিল—“একি, তুমি এখানে।
খ ওনি নাকি । চণ্ডিকা কোন উত্তর দিল না। গণেশ পুনরায়
বলিল—“বেলা গেল যে,—খেয়ে নাও, আমি একবার খোজ
করে দেখি !” এই বলিয়া সে দ্রুত পা বাড়াইতেই, চণ্ডিক
বলিল,-“সন্ধ্যের আগেই বাড়ী ফেরা চাই।”
গণেশের ভিতরটা তখন তাহাকে ছুটিবার জন্য ঠেলিতেছিল।
সে বাধা পাইয়া ঈষৎ বিরক্ত ভাবে বলিল—“কেন,-তক
এখন বলতে পারি।” চণ্ডিকা দৃঢ় কণ্ঠে বলিল—“আমি একা
এখানে থাকতে পারবনা ; না হয় আমার বাপের বাড়ীর
যাকে হােক পাঠিয়ে দিয়ে যাও।” এ কথার মধ্যে অভিমানের
মাত্ৰ থাকিতে পারে—অন্যায় কিছু ছিলনা। শুনিয়া
অং4
শেষ খেয়।
গণেশ কিন্তু থমূকিয়া গেল ও বলিয়া ফেলিল-“ওঃ—সেইটেই
(म
চণ্ডিক। এইবার নিজমূর্তিতেই জবাব চাহিল—“সেইটে
কি ?” গণেশ সামলাইয়া একটু নরম সুরে বলিল—“আর কেউ
এলে হবেনা?" চণ্ডিকা কড়া সুরেই জবাব দিল—“হবেন।
বলেছে কে,—কিন্তু এ ভিটেয় আর কেউ আসবে কি ?"
মনটা নানা বিষয়ে বিক্ষিপ্ত থাকায়, গণেশের বুদ্ধিট। আজ
কেবলি ধাক্কা খাইয়া খাইয়া নিরেট হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সে
বাধা পাইয়া উত্যক্ত ত’ হইয়াইছিল, তাহার উপর চণ্ডিকার
এই শেষ কথাটা তাহাকে সজোরেই আঘাত করিল।
বলিয়া বসিল—“তা বটে, আসবে আর কে,আসবে তােমাদেরি
সব তােমার বাপের বুদ্ধিতে যখন-.",
ক্রুদ্ধা বাঘিনীর ন্যায় উঠিয়া গড়াইয়া চণ্ডিকা গৰ্জন করিয়া
বলিল—“খবরদার, বাপ তুলােনা,-বুদ্ধি তাে আমার বাপের
একারই একচেটে ছিলনা, তােমার বুদ্ধিকেও তো কখনাে কারুকে
টে। বলতে শুনিনি !”
কথাটাকে মিথ্যা প্রমাণ করিবার সামর্থ্য বা ইচ্ছা গণেশের
ছিন; সে আর উত্তর করিল না,—বােধ হয় তাহার বুদ্ধি
ফিরিল; সে নীরবে বাহির হইয়া গেল। চণ্ডিকা দ্বার পর্যন্ত ছুটিয়া
আসিয়া উচ্চকণ্ঠে জানাইয়া দিল-সন্ধ্যা হইলেই সে বাপের বাড়ী
চলিয়া যাইবে,—চাবি বহিৰ্বাটীর বিছানার নীচে থাকিবে।
কথাটার প্রত্যেক অক্ষর গণেশের কর্ণে প্রবেশ করা সত্ত্বেও সে
শেষ খেয়া
গা-ভরে চলিয়া গেল। চণ্ডিকা সক্রোধে ও সশব্দে দ্বার রুবী
করিয়া দিয়া, দালানে আসিয়া লুটাইয়া পড়িল ও শ্বশুর-শাশুড়ীকে
স্মরণ করিয়া গুমরিয়া গুমরিয়া কাদিতে লাগিল। যে ব্যথার ব্যথা
নাই—তাহারই ভীষণ বেদনা আজ চণ্ডিকাকে মথিতে লাগিল ।
তখনে দু'ঘণ্টা বেলা আছে। গণেশের মাথার ঠিক
ছিলনা; কিছুক্ষণ সে চলন্ত জড়ের মতই চলিল। তাহার পর
মনে হইল, কোথায় সে চলিয়াছে ! বিপিনবাবু ত’ রাত দশটার
পূৰ্বে বাড়ী ফিরিবেন না,কাহার কাছে সে পিতার সন্ধান
লইবে ! এইরূপ অনির্দেশ ভাবে আরাে খানিকটা সে অগ্রসর
হইল। দূর হইতে সে যে দুই তিনটি পরিচিত লােককে
চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া তামাক খাইতে দেখিল, নিকটে যাইবার
পূৰ্বেই তাহারা বাটার মধ্যে প্রবেশ করিল । গণেশের মনে
হইল—তাহারা যেন তাহাকে দেখিয়াই সরিয়া গেল ।
অবস্থায় যদি সে কাহাকেও জিজ্ঞাসা করে—“আমার বাবা
কোথায় গেছেন বলতে পারেন, বা জানেন কি ?” সেটার
উত্তর যে কতটা বিদ্রুপের আঘাত সঙ্গে করিয়া বাহির হইতে
পারে, তাহা ভাবিতেও তাহার সাহস হইলনা। স্থির করিল—
সে বিপিনবাবুর জন্য অপেক্ষা করিবে।
এই সময় পাড়ার ছেলেদের কলরব তাহার কর্ণে প্রবেশ
করিল। কচু,আস-স্যাওড়া ও কালকাসুন্দা-বহুল একখণ্ড ভূমিতে
এ
*
শেষ খেয়া ছয় সাত বৎসরের ছেলেমেয়েরা গাছ উপড়াইতেছে আৰু উচ্চহস্য । করিয়া বলিতেছে—“আমরা সব হাত-ওলা গরু।” গণেশ সেক হইতে তাড়াতাড়ি মুখ ফিরাইয়া বাড়ীর দিকে ফিরিল । তাহা উদ্যত চিন্তাগুলা মুহুর্তেকে ধূসর-শ্ৰী লইয়া কে-কোথায় মুখ ঢাকিল। সারা পথটা মাথা হেঁট করিয়া শুশুরের উদ্দেশে অযােগ্য বাণী সকল প্রয়ােগ করিতে করিতে বহাটা আসিয়া উপস্থিত হইল। সে আর দাড়াইতে পাৱলন, পিতৃ-পরিত্যক্ত শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িল। পিতা বহিৰ্বাটা আশ্রয় লইবার পর, সে এ ঘরটিতে কোনদিন কে নাই । শুইতেই ঠক্ করিয়া তার কনুইটায় কি লাগিয়া তকে সচেতন করিয়া দিল,—সে উঠিয়া পড়িল। এতটা মানসিক অপােড়নের মধ্যে এমন একটা সামান্য ঘটন! ও মানুষকে বিষয়ান্তরে টানিয়া লয় ! সে সেই সামান্য আঘাতটার কর অনুসন্ধান করিতে বসিল। গণেশ বিছানা তুলিতেই দেখি, তাহার পিতৃশােণিতপুষ্ট অসংখ্য ছারপােকা, যে যেখানে সুবিধা পাইল-কেহ তক্তপােষের ফাটলে, কেহ ছিন্ন পটপটির মাদুর- খানির মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। মাদুরখানির উপর ছিল— আচ্ছাদন-বিরল পুরাতন একখানি বালাপােষের তুলার-- বা জমাট তুলার জমিটা, ও তদুপরি একখানি জীর্ণ ও মনি চাদর এবং একখণ্ড কাপড় ঢাকা ও দুইধারে গাটবাঁধ'—ওয়া- শর্তা ছােট একটি বালিস ।
শেষ খেয়া
কে যেন গণেশকে কশাঘাত করিল ! সে | নাব্য
একটা “উঃ" শব্দ করিয়া, সমস্ত নিশ্বাসটা মুখ দিয়া বাহির
করিয়া দিল ও গুম হইয়া বসিয়া রহিল,—তুই চক্ষে তপ
দুইটি ধারা নীরবে বাহির হইয়া আসিল।
পাৰ্বতী বধূরূপে আসার পর, পালেদের বাড়ীর স্যার
পারিপাট্য ও সুখ্যাতি, পাড়ায় প্রবচনের মতই ছিল ; সে-
কথা পুরুষ-মহলে ৭ উঠিত। চাদর ওয়ার্ড প্রভৃতি সপ্তা
দুইবার “খারে” কচা পাৰ্বতীর অবশ্যকরণীয়ের মধ্যে ছিল ।
তাহারই স্বামীর শয্যার এই শােচনীয় দুদ্দশ ও দীনতা, সহ।
আজ গদ্যময় গণেশের হৃদপিণ্ডটায় কঠিন একটা মোচড় দিল।
সে একবার “মা গো" একবার “বাবা গো", দুইবার “মা” করে।
—মাপ করো” বলিতে বলতে বুকটা চাপিয়া ঝুকিয়া পড়িল ।
সন্ধ্যা হইয়া গেল,-আজ পালেদের বাড়ীর কোথাও একটি
প্রদীপ জলিল না।
No text on this page.
দ্বিতীয় খণ্ড
No text on this page.
দিনে আলে৷ যার ফল; --জে অ;ে ভুল ন,
১: : : : পেয়ে,
রবীন্দ্রনাথ।
No text on this page.
••
ঘণ্টাখানেক ঘাটে বসিবার পর, নবীনের প্রাণট। “ত
চ, আগে চল্ করিয়া তাকে ঠেলিতে লাগিল ; অওর
হইবার আগ্রহ তাহাকে নূতন করিয়া পাইয়া বসিল।
অজান। “আগেটায় যেন তার সবকিছু পড়িয়া আছে—তাহ
পাইবার আনন্দে
সে চঞ্চল হইয়! উঠিল । একন
পানসী, ভট। ঠেলিয়া উত্তরমুখে চলিয়াছে দেখিয়া সে উক।
মাঝি নৌকার • মুখ সােজা রাখিয়াই জিজ্ঞাসা করিল--
“কোথায় যাবেন ?” নবীন বলিল—“যেখানে হয়,-ওরে :
মাঝি বলিল—“আমরা একেবারে শ্রীরামপুরে ভিড়বো।” নব
বলিল—“আমাকেও সেইখানে নাবিয়ে দিও।" নেক। 'টে
ভিড়িল। নবীন “জয় বিশ্বনাথ” বলিয়া উঠিয়া পাছল ;
সঙ্গেই মাঝি বলিল—“হুজুর, আমার ভাড়ার নৌকে, বাইরেই
থাকতে হবে। পার্বতীর পরলােক প্রাপ্তির পর হইতেই
নবীনের বাহিরে থাকিবার অধিকার প্রাপ্তি টিয়াছিল ;
তাই, মাঝির কথাটা শুনিয়া, বহুদিন পরে, আজ মুক্তির দিন
নবীনের মুখে একটু হাসি ফুটিয়া উঠিল, কিন্তু তাহার ভিতর
৬s শেষ খেয়া মায়ের • দিকটায় একটা বেদনাও আঘাত দিয়া গেল। “খন মায়ের রয়েছেন, আমি ভিতরে যাব কেন, মাঝি।"—এই বলিয়া নবীন উত্তরখ হইর! বাহিরেই বসিল। উর্ধে ও নিম্নে শুভ্র সুবিশাল ব্যবধানের মধ্যে আসিয়া, মুহ মধ্যে নবীন নিজেকে বাধাহীন বােধ করিল। পূৰ্ব্বে, কৰ্ম্ম ও সংসার বা বাড়ী ও কৰ্ম্মস্থানের মধ্যে কে যেন ও কি নে তাহাকে ' বড়শীতে গাঁথিয়া নিদ্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়িত ৩ টানিয়া আনিত। আজ সে কোথাও গাঁথা নাই। অগ্র- পশ্চাতের টান না থাকায় তার দেহটাও দেহটাও ভারমুক্ত ও হালকা হইয়া গিয়াছে ; সে যেন একট। অশরীরী “বোধে::" মত সম্মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। সহসা রমণাকরে একটি মর্মস্পর্শী কাতর ধ্বনি নবীনকে নাড়া দিয়া সজাগ করিয়া দিল। সে পশ্চাতে ফিরিয়া দেখিল, নৌকার মধ্যে একটি প্রৌঢ়া ও একটি তরুণী এবং একটি যুবক। কথা শুনিয়াই নবীন বুঝিল—প্রৌঢ়াটি দাসী । সে বলিতে ছিল—“বামুন এমন চামার হয় গা, নারীহত্যে করলে, সােনা ৱিতিমে ভাসিয়ে দিলে । হে হরি, ভালয় ভালয় বাড়ী পৌছে দাও।" তরুণীটি কেবল সােনার প্রতিমা নয়—নিখুং স্বপ্রতিমা। যুবকটি ঋজু ও সুন্দর, নয়নে ও বদনে সরল প্রকৃতি ও বিষাদ যেন ব্যাপিয়া রহিয়াছে। তাহার সামান্য পরিচ্ছ। এবং সময়ােচিত না হইলেও ব্রাহ্মণােচিত শিখা ও স্নেহ-মাখা মুখ দেখিয়া নবীন বুঝিল, সে তরুণীটির ভাই বা শেষ খেয়া আত্মীয় হইবে—সামী নহে। যুবক গঙ্গা হইতে জল লইয়া চঞ্চল হস্তে বার বার তরুণীর মুখে ও মস্তকে দিতেছিল- আর, কখন “মনােরমা," কখন “মনু” বলিয়া ডাকিতেছিল । প্রো বাতাস করিতেছিল । মাঝি রােষ ও বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে বলতেছিল---"পের জন্মে এমন কেঁদে-চাপান তুলনি," ইত্যাদি। নবীন ধীরভাবে যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করিল-“মায়ের কি হয়েছে বাবা,রােগটা কি ?" যুবক বলিল—“কিছু বুঝতে পারছিনা, বড়ই বিপদে পড়েছি মশাই।" তাহার কণ্ঠস্বর ভয় ৭ কাতরতাপূর্ণ। নবীন বলিল-“ভয় কি বাবা, রােগ ' মানুষের হয়েই থাকে, ভাল হয়ে যাবে।” এই সময় সাটি সকলকে চমকাইয়া দিয়া বলিয়া উঠিল--- “ও বাবা দেবেশ, পতে-দাতে ঠেৰে মনু যে কাঠ হয়ে গেল, ওগাে কি হলো গো ?" যুবক ভয়-বিমূঢ় হইয়া পড়িল । দাড়ি-মাঝি ? চাপান ভােলা লইয়া এ উহাকে দোষ দিতে লাগিল। নবীনের ফি বা মূচ্ছা রােগ দেখা ছিল। সে সকলকে ভরসা দিয়া বলিল—“কোন ভয় নেই,—তোমরা গােল ক’রনা।" পরে যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করিল—“মা কি সম্প্রতি কোন পােক বা ব্যথা পেয়েছেন?” দাসী মাথার উপর একটু কাপড় টানিয়া একটা বড় রকম বক্তৃতার আয়ােজন করিয়া বলিল—“আমরা ছেরামপুরের কৈবর্তের মেয়ে, কিন্তু আজ বামুনের মেয়ে দেখে ঘেন্না হয়ে
শেষ খেয়া
গেছে বাবু : এতটা বিষ যে ভদ্দরদের ঘরের মেয়েদের
মুখের ভেতর থাকতে পারে আর জিভ দিয়ে বেরুতে পারে
তা জনিতু না !—তার সামনে পোড়লে আমাদের গায়ের
ইলেদের বনীও
বনীও দাউ দাউ করে জলে যেত! মেনের
পুতুল কি তা এড়াতে পারবে, সে কি আর বাঁচবে –
মাগীর যেন মাছের চোখ গাে,একেবারে “রদা নেই "
দেবেশ চপল, ইয়া উঠিতেছিল। নবান বুঝিতে রয়.
বলিল—“এখন এসব কথা থাক বাছা, মায়ের চেয়ে
বিদ বেড়ে যাবে।"
সব কথাটাই দাবি রহিল দেখিয়া, নিতান্ত তা •চ্ছয় রম
বরক্তজ্ঞপিক একটা মুখভঙ্গির, সহিত “আর বাকিটা কি
যে বাড়বে !"-বলিয়া দাসীটি নারব হইয়া ঘুরিয়া বলি ।
নবীন সবকটিকে বলিল—“মার হৃদ্বয়ের মাঝখানে ৩
দিয়ে জোরে চেপে থাকে, বিশ্বনাথের কৃপায় ও ভাব কমে
আসবে,-মা’ও ঘুমিয়ে পড়বেন।” দেবে। তাহাই কল
মিনিট দশেকের মধ্যে সত্যসত্যই সে ভাবটা কমিয়া রে
মনােরমাও ঘুমাইয়া পড়িল । ইতিপূৰ্বেই দাসীর নাসিকানি
আরম্ভ হইয়া গিয়াছিল।
দেবেশ উঠিয়া ধীরে ধীরে নবীনের পখে আসিয়া বসিল, ও
কতজ্ঞতাপূর্ণকণ্ঠে বলিল—“আপনি না থাকলে আমার যে কি
অবস্থা হত বলতে পারিনা, এরূপ বিপদে আমি কখন পড়িনি,
ভয়ে ভাবনায় আমার আর হাত-পা আসছে না ;
আপনি
শেষ খেয়া
১৭
••
শরমপুরেই নাববেন ? নবীন বলিল—“ঝিকে এখন
বলেছি তখন এ রামপুরেই নাব’ : তা, আর তুমি ভয় "চ্ছ
কেন বাবা, মা’ত স্মৃমিয়ে পড়েছেন ! এখন সন্ধ্য হয়েছে-
ণ্ডা হাওয়া দিয়েছে ; ভাটা ঠেলে পৌছতে আর ::-দুই
লাগতে পারে, ওঁর ঘন না ভাঙ্গাই সম্ভব।”
অন্যমনস্ক ভাবে একটা দীর্ঘনিশ্বাস নেয়।
"রলল—“দু-দণ্টার-বেশী লাগবে না। অন্ধকার পাওয়া :
'!” নবীন একটু আশ্চর্য হইয়া বলিল—“কেন—অন্ধকষ্ট ?
কি প্রার্থনীয় ?” দেবেশ একটু থতমত খাইয়া বলিল—“খে,
আমি সারা পথট। নারায়ণকে স্মর: করতে করতে চলেছি, 'কন।
"থনীয় বা কোনটা প্রার্থনায় না, তা পর্যন্ত বুঝতে পারছিনা.-
কারণ দিন বা রাতের কোনটাই বােধ হয় আমাদের অ..
ন, আমরা বড়ই বিপন্ন।”
নবীন প্রসঙ্গটা বাড়িতে না দিবার ইচ্ছায় তা
বলিল—“দেখ বাবা, সব সংসারেই একটা-না-একই।
সকলকে বিব্রত করে রাখে, তাতে কি অতটা আকুল হয়েছে,
যার স্মরণ নিয়েছ তিনিই সব সামলে দেবেন, তারি উপর ‘নতর
করে চল,ও চিন্তা ছেড়ে দাও। তােমার বাবা আছেন ;
তবে আর তুমি অত ভাবচ কেন ?” দেবেশ উদাস ভাবে বলি—
“বাবা আর কত পারবেন, কি করেই বা পারবেন ।
জীবনটায় যে তারা এতটা কষ্ট কি করে সইবেন, সেই চিন্তই
অমকে সর্বক্ষণ শরশয্যায় ফেলে রেখেছে”
ক
শেষ খেয়!
শুনির। নব অন্যমনস্কভাবে দেবেশের মস্তকে ও পৃষ্টে
গভরি স্নেহে হাত বুলাতে বুলাইতে “আহা আহা-বেঁচে থাক
বাবা,যার বাপ-মার জন্যে এতটা চিন্তা, সে ছেলের বাসনা, কি
বিশ্বনাথ কখন অপূর্ণ রাখতে পারেন। তিনিই সকল বাধা, সকল
বিদ উত্তীর্ণ করে দেবেন, ভয় কি বাবা,-" বলিতে বলিতে
নবীন নিজের ভিতরকার ধাক্কাগুলা সামলাইতে লাগিল। সেই
সস্পের্শে দেবেশের দেহ ক্ষণেকের জশান্ত-শিথিল হইয়।
সে বালকের ন্যায় তাহ উপভােগ করিতে লাগিল ।
সন্ধ্যার অন্ধকারে কে দেখিল না যে নবানের হৃদয়ে কি একটু
তুমুল ঝঞ্চর পর ধারা। দেখ দিয়া তাহার গণ্ডদয় সিক্ত
করিয়াছে ।
নেবেশ সহসা করুণ কণ্ঠে একটা অনুরোধ করিয়া বসিল :
নবীনের কর্ণে সেট। আবদারেরমতই শুনাইল ।
-“চিন্তায়, কষ্ট, ভয়ে, চিত্ত স্থির না থাকায়, আমি বােধ হয়
কতকগুলা অসংবদ্ধ কথাই বকেছি, তাতে আমার ভগ্নী নননামা-
সম্বন্ধে আপনার কোনরূপ ভুল ধারণাই থেকে যাওয়া সম্ভব ।
আমার মনে হচ্ছে, তার বিষয়টা আপনাকে একটু খুলে না বলে,
তর প্রতি বড়ই অবিচার করা হবে। আপনি বাধা দেবেন
না।”
নবীনের অন্তরটা তখনে সম্পূর্ণ শান্ত হয় নাই
শান্ত হয় নাই। তাহার
সুকোমল স্থানগুলা তখনো স্নেহাভিমানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গে
বেনান্দোলিত হইতেছিল । নবীন সংসারের বস্তু-সম্পর্ক
দেবেশ বলি
শেষ খেয়া
(ড়িয়া আসিয়াছে-ভাব-সম্পর্ক ত্যাগ অতটা সহজ নই।
নবীন দেবেশকে বাধা দিল না, বা দিতে পারি না; কেবল মাত্র
বলল-“তুমি যদি তাতে শান্তি বােধ কর' বল, আমি ত’
কে আবশ্যক দেখি না বাবা।”
দেবেশ, বলিল—“এই সময় মনু ঘুমুচ্ছে, উঠলে তার ।
হবে না; শীগগির পৌছে যাবনাত?” নবীন সর সংযত হই।
বলিল-“এখনও অনেক দেরি বাবা, দু-ঘণ্টার কম নয়-
ত', সবে কোন্নগর ।” নবীন বঝিল শ্রীরামপুর ই সনিকট
ইয়া আসিতেছে দেবেশ ততই যেন চঞ্চল , ত হইয়
পড়িতেছে, সুতরাং তাহাকে অন্যমনস্ক রাখিবার জন্যই নবীন
বলিল—“মা আমার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী প্রতিমা, ওঁর কথা শুনতে কার
না ইচ্ছা হয়, তুমি বল।” অপরের, বিশেষতঃ স্ত্রীলােকসম্বন্ধে
কোন কথা শুনিতে নবীনের কিছুমাত্র আগ্রহ না থাকিলে ও
সেও পেন ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই রহস্যের ভিতর আঁকৃষ্ট হয়।
ডিতেছিল।
দেবেশ বলিতে আরম্ভ করিল,আমার ছােট ভাই থড
ইয়ারে পড়ি ; আর মনোরমা আমাদের
ওদাগরী আপিসে মাসিক ৬০ টাকা
বাড়ীতে মা আর ঠাকুর-মা আছেন
৭ শেষ খেয়া অনের তিন ভাই-বােনের মধ্যে মনােরম। সকল নেই তমদের শ্রেষ্ঠ। বুদ্ধি, বিবেচন, ব্যবহার, বিনয়, কাজকর্ম, শিক্ষা, শিল্প, সেবা, সহানুভূতি, গুরুজনের উপর শ্রদ্ধা ভক্তি, করে প্রতি অকপট ভালবাসা, প্রভৃতি ভালবাসা, প্রভৃতি সকল বিষয়েই আমাদের অপেক্ষ! তার একটু বিশেষত্ব আছেই। তাই বৰ; বলতেন-মনােরমকে আমি যার-তার হাতে দিতে পারবন, নারায়ণ যখন তার উপযুক্ত পাত্র দেবেন, তখন ভিটেমাটি বেচে তা তাকে সেই পাত্রেই সম্প্রদান করব। করলেনও তা ; অনেক অনুসন্ধানের পর রামকৃষ্ণপুরের বিরূপাক্ষবাবুর ছেলেটি সরােজ রূপে চরিত্রে লেখা-পড়ায় খুবই ভাল ছেলে ;- তার মেডিকেল কলেজের সেকেণ্ডইয়ার। বাবার ভরসা,-মর গায়ের গহনাগুলি, আর ভিটেখানি ; আর সেই জানুয়ারী থেকে পচিশ টাকা বেতন-বৃদ্ধির একটা অনিশ্চিত আশা। ফর্দ কিন্তু সাড়ে তিন হাজারের। মনােরমার বয়সও তখন চতুর্দশ বর্ষ, আর বিলম্ব করাও ঠিক নয়। তখন, কত অনুরােধ ও অনুনয়-বিনয়ে বিরূপাক্ষবাবু নগদ দু’হাজারের,—এক হাজার টাকাট। ৫ংসরের মধ্যে নিতে রাজি হলেন। এ অনুগ্রহের কারণ- সরোজ মনুকে খুবই পছন্দ করেছিল। বাবা আপিসের বড় সাহেবের কাছে, উপলক্ষ্যটা জানিয়ে কিছু এডভান্সের জন্যে প্রার্থনা করলেন। সাহেব পাঁচশ টাকা দিয়ে বলেন, “ব্রজমােহন, আমি বরাবর লক্ষ্য করেছি তােমার উপর রােজগার নেই, এ
শেষ খেয়,
ক; আমি তোকে খুশী হয়ে দিচ্চি, এ, আর তোমাকে
পরিশােধ করতে হবে না।" সতেরশ টাকা ঋণ মাথায় করে,
মনের বিবাহ হয়ে গেল। বাবা বলেছিলেন ওই
বোট, ভিটে বাঁধা পড়ল। অপিসের কি একটা বড় রক
* : বেতন-বুদ্ধির কথাটাও চাপা পড়ে গেল। বাড়ী,
বিন ;- সাক্ষং আর রইল না। দুপ, পান,
দুপ, পান, পূজ,
ক, * * প্রতি বন্ধ হয়ে গেল, বাব। ভাবনা চিন্তায় আর মনকষ্ট,
দিন দিন ঐ তে লাগলেন।
গ মুক্ত, চিন্তা মুক্ত, সুপাত্র হয়ে ও, কেহ যেন আনন্দ
! করতে পারতেন। : দিন যেতে লাগল, সকলের মুখ:
থেকে হাসি মুছে গেল । নােরমার বোই কে জ্ঞান হয়েছি
তা নয়, এর পরিণশট। পূর্বে থেকেই বুঝতে পেরে, মা
কছে এরূপ বা বিশে মত প্রকাশ করেছিল ।
যাহোক মনেরই শেষে সাপেক্ষা বিষ আর অপরাধীর মত
আমরা এই তিন বছর একই কাপড় জামা পরে
কষ্ট, তার সীবন-দক্ষতায়, কখনও ছেড়। জিনিষ পরে বাইরে
নোরা আমাকে দিয়ে ছিট কিনিয়ে আনিয়ে দিবারাত্রি
খেটে ছেলেদের কোট পিরান ফ্রক পেনি তয়ের করত। আমিই
চানী দোকানে দিয়ে আসতুম। যা ? ওরা যেত তাতে মাসে
সাত-আট টাকার বেশী লাভ হত ন! ; পুজি ও বাড়তে। ন; ।
তার প্রধান লক্ষ্য ছিল হরিশ মিত্তিরের সুদটা যাতে মাসে মাসে
१२ শেষ খেয়। ফেলে দেওয়া হয়, কারণ সে শুনেছিল মিত্তির মশায়ের এসে পেড়ে আজ পর্যন্ত কারুর ভিটেই ফেরেনি। শীত এসে পােড়ল’, সুতি কাপড়ের জিনিষ আর চলল’ না ; পশমী কাপড় কিনে কাজ কবুবার পুজি নেই। মন্থর এত চিন্তা বাড়তে লাগল, বাবার ততই পূজাপাঠ বাড়তে লাগল । মনু একদিন আমাকে ডেকে বলে—“দাদা, কি হবে,—ইরিশ- মিত্তিরের সুদ কি করে দেওয়া হবে ?" হামি বল্লাম-“তিনি ত’ সুদের জন্যে পেড়াপিড়ি করচেন না, বরং প্রতিমাসেই বলেন —“তােমাদের টানাটানির সংসার, যখন সুবিধে হতে দিও, আমি ত’ তাগাদা করচি না।" মনােরমা ব্যস্ত হয়ে বল্ল-“ন না, ঐটি হতে দিও না, যেমন করে হ’ক মাসে মাসে ওঁর সুদ ফেলে দেওয়া চাই-ই—” পরে একটু অন্যমনা হয়ে বলে- “আমাকে মামার বাড়ী রেখে এলে কিছু সুবিধা হয় না দাদা?” আমি বল্লাম-“তুমি এখন বড় হয়েছ, সরােজ নিশ্চয়ই তা পছন্দ করবে না।” বােধ হয় ঐটিই সে শেষ উপায় ভেবেছিল, তাই 'আমার কথা শুনে সে যেন ভেঙ্গে পােড়, তার অনুচ্চ তাণ- কাতর কণ্ঠে শুনতে পেলাম—“আমি দে আর কিছু ভেবে পাইনা দাদা!” এই খানে নবীনের মুখ দিয়া দমকা হাওয়ার মত "বিশ্বনাথ শব্দটি সহসা বহিয়া গেল। দেবেশ বলিয়া লিল-"ই,, মনােরমার ঐ শেষ কথাটা যেন ত্রিভুবনের শেষ সীমায় প্রতি- ঘাত পাওয়া ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি। তার বেদনাগুলা বাদ দিয়েই A
শেষ খেয়া
বলছি।
সেই দিনই বৈকালে গানের
অনকে সাতটি
টাকা আর একখানি ফন্দ দিয়ে বলে—“দাদা, এই জিনিষগুলি
আমাকে এনে দাও, নে খুব পরিষ্কার , মন সুগন্ধি গুলো
যেন খুব উৎকৃষ্ট হয়—কম দেয়, তাতে ক্ষতি নাই।"
আমি এনে দিলাম । সপ্তাহখানেক মধ্যে তেথি নেন।
নানা প্রকারের সুদৃশ্য, সুস্বাদু আর সুগন্ধক, বিৰিণ বর্ণের স্বচ্ছ
সুন্দর লঞ্জেস অনিয়া তােমাকে বল্লে---“দাদা, একবার ১৪
করে দেখ—এগুলি বাজারে যদি চলে।" আমি দেখে অবক
হয়ে গেলাম—এসব ছা কি করে বের করলে।
সেগুলিকে আস্বাদনে তাকারে ‘গর সৌন্দর্য্যে এমন মত
দিয়েছিল যে, বাল; এই অতি প্রিয় খাদ্যটি সহজেই বাজারে
চলে গেল। রিশ মিত্তিরের । নিঃনি দিয়ে, গানের
বই কেনা, স্কুলে মাইনে প্রভৃতি সে মেতে লাগল ।
দেড় বছর এইরূপে কটল, কিন্তু বিরূপাক্ষবারকে প্রতিশ
হাজার টাকা দেবার উপায় হল না।
বাব। •ধ্যে মধ্যে ।
আর ক্ষমা চাইতে গিয়ে অপদস্থ হয়ে আসতে লাগলে
বাবার সবচেয়ে চিন্তার কথা হল এই যে, তারা মনােরমাকে
নিয়ে যাবার কথাটি পর্যন্ত মুখে আনেন না। মনােরমার যে
সে চিন্তা ছিল না সেটা ভাবাই ভুল, কিন্তু হরিশ মিত্তিরের
গ্রাস থেকে কি করে যে আমাদের আশ্রয়টুকু রক্ষা হবে এই
চিন্তাই তাকে যেন পেয়ে বসেছি। ঘরবাড়ী বন্ধকের জন্য
সেই যেন মােল আন! অপরাধী ।
৭s
শেষ খেয়া
}
যা হােক না রায়ণের কৃপায় আপিসের খাবার ভাল সময় এল,
বাবার পঁচিশ টাকা বেতন বৃদ্ধি হল। ইতিমধ্যে আরো
প্রায় দেড়বৎসর বহু লাঞ্ছনা আর মানসিক যাতনা সয়ে, এই গত
শনিবার অর্থ। পরশু, তিনি বিরূপাক্ষ বাবুকে পাঁচশ টাক
নিয়ে এসেছেন। এবার তাকে আমদের বংশ জাতি আর
শ্রেণী সম্বন্ধে সুকট শব্দ সকল শুনতে না হলেও, দু’একটি
মম্মানিক পরিহাস যে না শুনতে হয়েছিল তা নয়, তবে অন্যান্য
বারের মত নেপথ্যের শব্দভেদী নিৰ্য্য;তনটা ছিলনা। কর
কথঃ বাবা শুনলেন, মনােরমার শাশুড়ীর আজ কয়েক দিন
শরীর ভাল নয়, সংসারে বড়ই কষ্ট যাচ্চে, আহারাদিটাও ঠিক
জুচে না,, একবেলা বাজারের খেয়েই কাটাতে হচ্চে, ইত্যাদি ।
এ কথা শুনে বাবা বলেন—“সে কি, আপনার বন্ধু সংসারের সকল
কাজই একা মাথায় নিতে পারে ; সে থাকঙে এত কষ্ট পাওয়া
কেন, আমি কালই তাকে পাঠিয়ে দেব।" শুনে বিরূপাক্ষবার
তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বল্লেন—“না না, সে এখন হতে পারে
,—সে হবে না। তাতে বাবা বলেন--“বেশ ত’ যে ক’দিন
বোন ভালরূপে সেরে না উঠেন সে না হয় সেই ক’দিন মাত্র
থাকবে, তাতে তাঁর শুশ্রুষাও করতে পারবে, আপনাদের
আহারাদির অনিয়মও নিবারণ হবে। এটা যে বড় দরকার বেই,
লতে বেয়ানের শরীর সত্বর সুধরে উঠবে, স্বাস্থ্য নষ্ট হতে পাবে
। বাড়ীর কত্রীর শরীর একবার ভাঙ্গলে, তার সঙ্গে সংসারের
অনেক কিছু ভেঙ্গে যায়—আনন্দ, আরাম, শান্তি নষ্ট হয়।
সব আবার গড়ে উঠতে অনেক সময় নেয় বেই।"
কথাট;
যেন বিরূপাক্ষবাবুর কতকটা অনুমান পেয়েছিল, তিনি
অন্যমনস্থ হয়ে নােটের তাড়াটি নাড়তে নাড়তে থেকে
কেবল বলেন--“আসাই নরকর, তাই, হওয়।
উচিত, তাই হয়ে
হয়ে থাকে,
থাকে, তা দেখি,--সরােজ আসুক"
—ইত্যাদি ।
সরােজ অরাজি হবে না এট; সকলের বিশ্বাস, কি
সরােজের উল্লেখটা ৫ে অর্থহীন বা সম্পূর্ণ অন্যার্থজ্ঞাপক, সেট
অনুমানের পথ ধরে না বুঝে ব'ব সরল ভাবেই নিয়েছিলেন।
মনােরম। কিন্তু তার কাছে বলে-“এক সন্দেহস্থলে তাকে
পাঠান উচিত নয়, এর ফল ভাল হবেনা,আর ভাল যদি না
হয় । তার ফল বে কি হবে ত; •ে এখন ভাবতেও পারেন।"
কিন্তু বাড়ীর সকলের ধারণা-নােকে একবার দেখলে
অ’র তাকে কাজে কর্মে একটা দিনও পেলে কেউ ছাড়
চাইব না,—ছাড়তে পারবে না।
বাড়ার সকলেই তাকে একবার শ্বশুর বাড়ী পাঠাবার
সুযোগের সন্ধানে অসম্ভবরূপ ব্যর্থ ছিলেন। তাই এ সুযােগটা
সকলেই অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরলেন। টাকাটার স্থান যে অধিকাংশ
লোকের কাছেই—সকল সৌন্দৰ্য্য—সকল গুণ—সকল শিল্পের
উপরে, ভালবাসা, প্রেম এমন কি ভগবানও যে তার কাছে,
নিত্যই এ সংসারে নিষ্প্রভ ও প্রকাশ্যে পরাস্ত হচ্ছে, এ কথাট।
ভাবতেও আবার অনেকের কষ্ট হয়। প্রথম শ্রেণীর লােকের
শেষ খেয়া সেটাকে লক্ষ্মীছাড়ার লক্ষণ বলেন। যাই হােক—বাবা ঐ দ্বিতীয় শ্রেণীর একজন। নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে যাত্রা করে—সত্যই হোক বা ভ্রমই হােক—আমার এই রকম ধারণাই এসে গেছে। বাকু,ভাল ভেবে হলেও সেই নির্মম কাজটার গুরুভার আমার উপরেই পড়ল ! মনােরমার অবস্থা দেখে বােধ হল সে সম্পূর্ণ হতাশ ভাবেই যেন আত্মসমর্পণ করলে, কেবল মাকে একবার বল্লে—“তােমরা সইতে পারবে না,কিন্তু আমার আর সে শক্তি নেই—অামি তার এই শেষ অসমাপ্ত কথাট। মার আশীর্বাদের মধ্যে ডুবে গেলেও, আমাকে শিউরে দিলে । সামান্য কিছু মুখে দিয়ে, আজ ভােরের ট্রেণে বিরূপাক্ষ- বাবুর বাড়ী যাত্রা করলাম। মনােরমা কিছুই খেলেন, একটি পান মুখে দিলে মাত্র। বাংলা দেশে “মেয়ে বিয়ে করা” বলে কথাটা আছে, এও ঠিক তাই হল। আমি আর তার মুখের দিকে চাইতে পারলুম না, বুকটা ফেটে যেতে লাগল । সে গাড়ীতে উঠে পৰ্যন্ত একটি কথাও কইলে না, বাইরের দিকেই চেয়ে রইল। তার এই নিস্তব্ধতা আমার হৃদয়টাকে যেন পিসতে লাগল । বালী ষ্টেশন পার হয়ে বলুন—“মনু, হরিশ মিত্তিরের সুদের কথা ভেবে তুমি কষ্ট পেওনা। আমি আরাে একবাড়ী ছেলে পড়াবাে,”—বর্ষার দিনে মেঘের ফাকের বিষাদ মলিন শুভ্রতার কচিং বিকাশের মত একটু ম্লান হাসির আভাস এনে নহু বলে—“মানুষের চেষ্টা-যত্নে কতটুকু হয় দাদা, তামরা রাজা হও, যিনি নিমেষে সব পারেন, তাকে জানিও, শেষ খেয়া ৭৭ তিনি সব ঠিক করে দেবেন, আমিও তাকেই জানাতে জানাতে চলুম।" আমার চোখের জল উন্মুখ হয়েই ছিল ; তার হত- কার কথা শুনে ঝর ঝর করে নেবে এল । বন “বিশ্বনাথ” বলিয়া, রুদ্ধশ্বাস : করিল। বলি—“মনুর সে হাসিটুকু যেন পরপর থেকে এলো, আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। তার পরেই সে সহসা বল সঞ্চয় করে সােজা হয়ে বসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেদা, বসুন্ধর কি কেবল সাঁতারই মা। ট্রেণ হাওড়া স্টেশনে এসে পৌছ, আমি একখানি গাড: ডাকলাম ; বলবার আগেই ননােরম বেশ উৎসাহের সহিত তাতে উঠে বসল, কিন্তু অর কথ: কইলেন। গড়া যতই বিরূপাক্ষবাবুর বাড়ীর সন্নিকট হতে লাগল, আমার বুক ততই দুর দুর করতে লাগল ; মনােরমার ভাব কিন্তু সহজ হয়ে এল। সরােজকে বাড়ীতে পাবার আশাতেই এত সকালে অস, কিন্তু তার ডিউটি পড়ায়, ভােরেই সে কলেজে বেরিয়ে গিয়েছিল তার পর মানুষের বিষয়ান্তরপ্রিয় মন নানা অসম্ভব বিষয় ভাবতে পারলেও,ইতর অশিক্ষিতের প্রাণও যা ভাবতে বা অনুমােদন করতে বা বিশ্বাস করতে পারেনা, আজ”– দেবেশ আর বলিতে পরিলনা, চোখে কাপড় দিয়া বালকের মত কঁদিতে লাগিল। ব্যথিত নবীন দীর্ঘনিশ্বাসের সহিত বিশ্বনাথের নাম লইয়া দেবেশের মাথায় ও গায়ে সস্নেহে হাত বুলাইতে লাগিল ; অপর হন্তে নিজের চক্ষু মুছিতে মুছিতে বলিল- * * শেষ খেয়া “আহা মালক্ষ্মী আমার বড় মর্মান্তিক ব্যথাই পেয়েছেন, মর্মান্তিক আঘাত লেগেছে। দেবেশ রােদনের মধ্যেই বলিল— “ওগাে, না না,—মর্মান্তিক লেগেছে সে আমাদের, মনুর বুকে সেটা যে নরহন্তার বিষসিক্ত করের মত প্রবেশ করে প্রাণান্তিক প্রক্রিয়া আরম্ভ করে দিয়েছে। অকস্মাৎ সামনে বজ্রপাত হয়ে, লােককে যেমন মূক বধির আর বিমূঢ় করে দেয়, সরল মনুর অবস্থা ঠিক তাই হয়ে গেছে : -সে আর বাচবেনা। টাক; জাজ মানুষের চেয়ে বড় হয়ে, আমাদের সংসারটাকে জীবন্ম । আর আমাদের জীবনটাকে ব্যর্থ করে দিলে। সম্পূর্ণ নির্দেশ ভগ্নার আমার সকল গুণ সত্ত্বেও তার এই পরিণাম । সে তার পরিপূর্ণ আশা আকাঙ্ক্ষার সকলগুলিই নিয়ে চল ! বাপ- যে কি হবে জানিনা। নারায়ণ কি করলে, আমাদের সে তোম। বই কেহ নাই, বাবা যে কেবল তােমার ভরসাইকরেন " নবীন মধ্যে মধ্যে কেব উদাস ভাবে “বিশ্বনাথের নামােচ্চারণ করিয়া বেদনার পাকা গুলা সামলাইতেছিল ; এইবার দেবেশের আন্তরিকতাপূর্ণ শেষ কারােক্তিগুলি শুনিয়া সবলে বলিয়া উঠিল—-“তবে আবার ভয়কি বাবা, তোমরাত যাকে-তাকে ধরে নেই ! না ওচোখ-মুখ ধুয়ে বােসত’ বাবা, দু একটা কথা কই।” এই বলিয়া গঙ্গাজল লইয়া দেবেশের চোখে মুখে নিজেই দিল । দুৰ্যোগ-রাতের পথভ্রান্ত হতাশ পথিক সহসা সুদূর পল্লীর ক্ষীণ আলােক-দৃষ্টে যেমন মুহুর্তে তীর হার ন অাশাভরসার প্রায় সবটাই ফিরিয়া পায়, তার
.শষ খেয়া
লুপ্ত বল সাড়া দিয়া ওঠে, নবীনের কথা কয়টির মধ্যে বিশ্বাসের
এমন একটি সজীব সুর ছিল—যা দেবেশের ধম্মপ্রবণ প্রকৃতিকে
অবিশ্বাসের অপরাধে তিরস্কৃত করিয়া জাগ্রত করিয়া দিল।
দেবেশের হতাশ-শিথিল দেহে অলক্ষ্যে যেন একটা আশার
তড়িৎপ্রবাহ বহিয়া, তহতে একটু শক্তি সঞ্চার করিল। সে
নবীনের মুখের দিকে তিয়া স্থির হইয়া বসিল।
নবীন বলিল—“বাবা, তুমি
আমাকে তােমাদের সংসারিক
কথার মধ্যে প্রবেশাধিকার দিয়ে, আমার আরাে দু একটা
কথা শােবার আগ্রহ বাড়িয়ে দিলে ; যদি বাধা না থাকে ত’
শুনতে ইচ্ছা কর।" নেবেশ বিনয়ব্যাকুল কণ্ঠে বলিল--
“অ”নাকে কোন কুই বলতে আমার বাধা নেই, বরং
আপনাকে বলে আমি নে অনেকখানি শান্তি পেয়েছি, বেদনার
বোঝা আমার ব্যে তার ধরছিলনা, তাকে বার করে আমি
যেন কতকটা হা! বোধ করচি ; আপনি কি জানতে চান
অসঙ্কোচে বলুন।”
নবীন। মনে হয় আমার বিবাহ হয়েছিল তােমার বয়সের
২৩ বছর আগেই হবে । তােমার বাবাও ইচ্ছা করলে তোমার
বিবাহ দিয়ে, ঋণ আর এইসব ভাবনা নাতন। এড়াতে
‘ারতেন।
দেবেশ। এ কথা না বাবাকে অনেক করেই বলেছিলেন।
বাবা তাতে বলেন-“টাকা নিয়ে যদি ছেলের বিবাহ দিতে হয়,
আমার দেহান্তের পরে দিও।” এত কষ্ট, এত অপমান, আর এত
৮০
শেষ খেয়া
বিপদের সম্ভাবনা মাথায় করে নিয়েও তিনি সে বিষয়ে অটল ।
বলেন—“নারায়ণের সংসার, তিনি যা ভাল বুঝবেন করবেন।”
শুধু তা কেন, তিনি যে কাজ করেন তাতে যথেষ্ট উপরি পাওনা
আছে, কিন্তু কেউ তাকে তা আজ পর্যন্ত লওয়াতে পারলে না।
তিনি সেটাকে বেনামী চুরি ভাবেন । বরাবরই তঁার এই
৩
ভাব।
নবীন “জয় * বিশ্বনাথ" বলিয়া পুনরায় বলিল—“আচ্ছা,
মমার উপর, তােমার ভগ্নীপতি সােজবার ভাবটা কেমন,
ব্যবহারই বা কিরূপ ?”
দেবেশ বলিল—“ত। ত’ ভাল বলেই বােধ হয়, তবে
ব্যবহারের অবকাশ হ’ল কই। ছেলের ঝোঁক বুঝে মনুকে তার
নিলেন বটে, কিন্তু ঐ বাকি হাজার টাকাটা পুরােপুরী হাতে না
পাওয়া পর্যন্ত, মনুকে নিয়ে যাওয়া ত’ বন্ধ রাখলেনই, উপরন্তু
সােজকে শ্রীরামপুরে আসার বিরুদ্ধে শপথ করিয়ে নিলেন। টাকা
আদায়ের এর চেয়ে সহজ উপায় আর সুনিশ্চিত পন্থা চাণক্যের
মাথাথেকেও বেরােয়নি! কিন্তু ব্রহ্মারও ভুল হয়, তাই বােধ হয়
পত্র-ব্যবহারের পথটা বন্ধ করতে তারা ভুলেছিলেন।”
নবীন। জয় বিশ্বনাথ !—তার পর?
দেবেশ। সরোজ মনুকে নিয়মিত পত্রাদি লেখে, সে এই
কারণে বড়ই লজ্জিত আর দুঃখিত হয়ে আছে, মনকষ্টও খুব ।
মনুকে সান্ত্বনা আর আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছে—সে ইতিমধ্যেই
পশ্চিমের এক রাজষ্টেটে কাজের উপায় করে রেখেছে, তাতে
শেষ খেয়া
বাইরের প্রাটিও চলবে। কলেজ থেকে বেরিয়েই সেথায়
চলে যাবে,—তার পর মনুকে নিয়ে যাবে।
নবীন। জয় বিশ্বনাথ ! বাবাজী বেঁচে থাকুন।
আর ভাবনা কি বাবা-স্বামীর ভালবাসাই মূল।
দেবেশ বলিল—“কিন্তু আজকের এই দুঃসহ অপমানের
কঠিন বেদনা মনু কি—
নবীন তাড়াতাড়ি বলিল—“কঠিন ত বটেই বাবা,
বিশ্বনাথই
দেবেশ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিল; পরে কি ভাবিয়া
মনােরমাকে দেখিতে ধীরে ধীরে নৌকার মধ্যে ঢুকিল। নবীন
মনে মনে বলিল—“এ মর্মন্তুদ আঘাতটাকে কিন্তু সত্বর বিদায়
করবার উপায় করা চাই।” তাহার পর সে অন্যমনস্ক হইয়া
পড়িল।
বল দেবেন।”
কয়েক ঘণ্টা পূৰ্ব্বে নবীন মুক্তির আনন্দে মগ্ন হইয়াছিল, তখন
সবই যেন তার ইচ্ছাধীন। বিশ্ব বাধাশূন্য, গতি অবাধ বােধ
হইতেছিল। ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ অনাহূত ও আকস্মিক ভাবে
মনােরমার মর্মন্তুদ ইতিহাস যেন সুমহান্ বেদনার মত আসিয়া
তাহার অন্তরে বিক্ষোভ তুলিয়া দিল !একি বন্ধন । মনােমা
কে ?. তাহার সহিত নবীনের সম্পর্ক কি ? জগতে কোটী
6
শেষ খেয়া
কোটী প্রাণীর কোটী কোটী প্রকারের দুঃখ কষ্ট আছে-নবীন
তাহার কি করিতে পারে ;--করিবার ভারই বা তাহাকে কে
দিয়াছে, না করিলে তাহাকে দায়ীই বা কে করিতেছে? তবে
নির্বোধ নবীন এত বিচলিত হয় কেন? অন্তর্যামীই এ-কেনর
উত্তর দিতে পারেন।
দেবেশ দেখিল মনােরমা তখনাে ঘুমাইতেছে। সারাদিনের
অনাহার, চিন্তা, শ্রম ও বেদনায় দেবেশও অবসন্ন ছিল।
নৌকায় একটি উন্মুক্ত গবাক্ষ হাতের উপর হাত দিয়া মাথা
রাখিতেই সে ঘুমাইয়া পড়িল।
চতুর্থীর চাদ ডুবিল, আকাশ-ভরা নক্ষত্রগুলি সে ৩ ভাব
পূর্ণ করিবার জন্য যেন অবগুণ্ঠন মুক্ত করিয়া উজ্জ্বলতর হইল ।
গঙ্গার ঘাটগুলি জনশূন্য হইয়া আসিল। শৃগালেরা ডাকিয়া
থামিল,থামিলনা। কেবল পঁাছের ঝপ ঝপ শব্দ। নবীন তন্ময়,
নিম্নে ভাগীরথীবক্ষে,উপরে তাহার মস্তিষ্কের মধ্যে তরঙ্গের
পর তরঙ্গ বহিয়া যাইতেছে, কোনটাই তাহাকে কূল দিতেছে না,
সে ভাসিয়াই চলিয়াছে। কতকি চিন্তার মধ্যে সে যেস্থানে
আসিয়া পড়িয়াছে সেটা এইরূপ—“যখন ঘর ছেড়েছি তখন
নয় কেহই আমার নয়, না হয় সকলেই আমার।” এই শেষ
কথাটা মনে উঠিতেই সে যেন একটা স্ফুর্তি, একটা বল, একটা
অস্পষ্ট আনন্দ অনুভব করিল ;
; তাহার প্রাণ সেইটাকেই বরণ
করিয়া বঁচিল, সে ‘জয় বিশ্বনাথ” বলিয়া আবার চিন্তামগ্ন হইয়া
পড়িল ; আবার ভাবনা-স্রোতে ভাসিল। কতক্ষণ পরে চিন্তাটা
কষ্ট । তাহাকে আর এক পথে উপস্থিত করিয়া দিল,—সে ভাবি, সংসারসংশ্লিষ্ট বা সমাজনির্দিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের অধিকার পূরণবে সামাজিক কৰ্তব্য পালন বলা চলে, তাতে সংস্কারগত একটা সৌন্দর্য আছে, আনন্দও আছে বটে, কিন্তু সেটা যেন কতকট। দাবী আদায় দেওয়া ; তাকে “ত্যাগ” ভাবলে আত্মপ্রবঞ্চনা কর। আবার “জয় বিশ্বনাথ" বলিয়া, নবীন নীরব হইল বটে, কিন্তু এবার শ্বার সে চিন্তামগ্ন হইলনা, উৎসাহী যুবার মন গ্রীবা উন্নত করিয়া বসিল। তাহার মনে পড়িল, পাত” একদিন বলিয়াছিল-“দেশে মেয়েমানুষদের বড় কষ্ট গাে-বড় তোমর! তা বুঝবেন—ঝতে পারবেও না,—কিছু করতে না পার ত’ একবার ‘আহা বােলাে। তারা সেটুকু থেকেও বঞ্চিত !" তাহার কথাটা মনে হইতেই নবীনের দু চক্ষু হইতে ঝর ঝর করিয়া অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। সে মনে মনে বলিল—“সতী সত্য কথাই বলেছিল !” তাহার পর নবী সহসা যেন অভীষ্ট লাভান্তে আনন্দসূচক স্বরে বলিয়া উঠিল —“জয় বিশ্বনাথ !” সঙ্গে সঙ্গে মাঝিকেও প্রশ্ন করিল-“মাঝি, আর কতদূর?” মাঝি বলিল—“ঐ যে বাবু সামনেই গোসাই বাবুদের ঘাট—ঐ যে-ঘাটে একটা আলাে দেখা যাচ্ছে।” নবীন চঞ্চল হইয়া উঠিল। সে তাহার নিজের মধ্যে নূতন কি একটা যেন পাইয়াছে, যাহার অনুভবটা অস্পষ্ট হইলেও সুখকর । তাহার ভাবনা বেদনা মুহূর্তে যেন তাহাকে পথ ছাড়িয়া দিয়! সরিয়া গেল—সে দেখিল তাহার অভীষ্ট বস্তু,—তাহার দীনতম ৮৪ শেষ খেয়া জীবনের দুর্লভ সার্থকতা,-ঐ সম্মুখস্থ ঘাটে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। ঘাটের ঐ ক্ষীণ আলােকটিতে চক্ষু মেলিয়া দিয়া সে যেন অনন্ত আলােকের আনন্দ উপভােগ করিতে লাগিল । = নৌকা ঘাটের সন্নিকট হইতেই নবীন দেখিল, হাত-লণ্ঠন- হাতে একটি লােক সােপান অতিক্রম করিয়া দ্রুত নামিতেছে । কয়েক ধাপ নামিবার পর লােকটি সহজ সুমিষ্ট আগ্রহ-ব্যাকুল কণ্ঠে উচ্চারণ করিলেন-“দেবেশ এলেকি বাবা?” “আজ্ঞে হ”—বলিয়াই নবীন মাঝির দিকে ফিরিয়া বলিল— “নৌকা ভিড়িয়ে তােমরা তামাক খাও,এখন এদের তুলােনা; আমি ওঁর সঙ্গে দুটো কথা কয়ে আসছি।" এই বলিয়া মাঝির হাতে একটি টাকা দিয়া নবীন নামিয়া পড়িল। লােকটিকে অধিক অগ্রসর হইতে না দিয়া নবীন জিজ্ঞাসা করিল—“আপনিই ব্রজবাবু ?” লােকটি চমকিয়া ভীতভাবে বলিল—“আজ্ঞে হ”— “আমাকে ওরূপ বলবেন না, আমি আপনাদের দাস”—এই বলিয়া নবীন প্রণাম করিয়া তাহার পদধূলি মাথায় লইল। ব্রজবাবু উৎকণ্ঠার সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন—“তবে—দেবেশ মনােরমা-এরা?" নবীন। তারা নৌকার মধ্যেই আছেন—ভাল আছেন, ঘুমিয়ে পড়েছেন,-এখনি ডেকে আনচি। দু একটা কথা অাছে, আগে আপনাকে বলে নি ।
শেষ খেয়া সে সব আমি জানি, আমি আপিস থেকে বিরূপাক্ষ- বাবুর বাড়ী হয়ে এসেছি, নবীন। “বিশ্বনাথ ?” আমার মেয়ে মনােরমার- নবীন বাধা দিয়া, সংক্ষেপে মনােরর অবস্থা তাহাকে জানাইয়া বলিল—“এখন একটা কিছু এমন উপায় আজই করা দরকার হয়েছে যাতে এই নিষ্ঠুর আঘাতের উগ্রতাটা কতক পরিমাণেও উপশম হয়—অন্তত তাতে আশ্বাস পাবার মত কিছু থাকে।” ব্রজমােহন বাবু গভীর হতাশাব্যঞ্জক হাস্যের ভাব আনিয়া বলিলেন-“মানুষের শক্তি কতটুকু—বিশেষ আমার হতভাগার। পয়সা থাকলে সংসারের অনেক বিপত্তি হতে রক্ষা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু যারা বিপত্তি ভােগ করতেই জন্মেছে—আমি যে তাদেরই একজন ভাই, আমি নিঃস্ব। আমার সব ভারটুকুই নারায়ণের, যা করবার তিনিই করবেন।” নবীন “জয় বিশ্বনাথ” উচ্চারণ করিল ও পুনরায় তাহার পদধূলি লইয়া বলিল—“যখন নারায়ণের উপর ভরতখন আর চিন্তা কি দাদা! এখন বলি—দেবেশবাবু আমাকে” ব্রজমােহন বাধা দিয়া বলিলেন--“তবে আবার দেবেশবাবু কেন ?” নবীন বলিল—“ভুল হয়েছে দাদা,দেবেশ অপমানের আঘাতে অভিভূত অবস্থায় মনঃকষ্টে আমাকে সাংসারিক সকল
শেষ খেয়া
কথাই বলেছে। আশ্চর্য্য দেখুন, নারায়ণের ইচ্ছায় বােব হয়
তাঁর নির্দেশেই আমার কাছেও কতক গুলাে ফালতু টাকা আছে-
যার এখন কোন দরকারই নেই—কেবল বােঝা আর বিপদ বওয়া।
অনুগ্রহ করে সেই গুলো এখন কাজে লাগিয়ে দিন দাদ।।
কাল প্রত্যুষেই বিরূপাক্ষবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঋণমুক্ত হয়ে
সরােজবাবুকে সঙ্গে নিয়ে আসুন। মনুমার অবস্থাটা জানিয়ে
বলবেন—এখন কেবল—সরােজবাবু তাকে স্বয়ং নিয়ে আসেন
এই ব্যবস্থার উপরিই মনােরমাঃ জীবন-মরণ নিভর করচে।
এতে বিন্দুমাত্র মিথ্যা বলা হবেনা।”
নবীনের কথাগুলি ব্রজমােহনের বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে যথাযথ অর্থ
বহন করিতে পারে নাই। সম্পূর্ণ অপরিচিতের ঐরূপ অভাবনীয়
ও অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবের আকস্মিকতা তাহাকে চমকিত ও
স্তম্ভিত করিয়া দিয়াছিল। কিন্তু এত কথার ও এত বিক্ষোভ
বিক্ষিপ্ততার মধ্যেও মনােরমার জীবন-মরণের সত্য ইঙ্গিতটা
একেবারে সুতীব্র সপ্তমসুরেই ব্রজবাবুর সন্তপ্ত প্রাণের মধ্যে গিয়া
পৌছিয়াছিল। তিনি কাতর কণ্ঠে “নারায়ণ" মাত্র বলিয়া
নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন ।
ওদিকে নৌকার মাঝি গর্জিয়া উঠিল—“সব উঠে যা ওনাগো,
আমাকে কি সারা রাত বসে থাকতে হবে নাকি?”
নবীন তাড়াতাড়ি পাঁচশত টাকার
টাকার একতাড়া নােট,
ব্ৰজমােহন বাবুর হাতে এক প্রকার জোর করিয়াই গুজিয়া
দিতে দিতে বলিল,-“ধরুন দাদা, এ এখন আর পরের জিনিষ
শেষ খেয়া ৮৭ নয় ;--নিন্ ধরুন। যা বলতে চান এর পর বলবেন, কিন্তু এর দরকার এখুনি। আমি এদের আনচি। বিমূঢ় ব্রজমােহন যন্ত্রবৎ তাহা ধরিয়া রহিলেন। তাহার মুখ হইতে একটি কথাও বাহির হইল না। “বিশ্বনাথ” বলিয়াই নবীন যেন যুবার মত দ্রুত গিয়া নৌকায় উঠিল। সকলেই তখন জাগিয়াছে। ঘাটের সন্নিকটেই ব্রজমােহনবাবুর বাড়ী। মনােরমা পাষাণ-প্রতিমার মত দৃঢ় ও ধীর ভাবে নীরবে বাড়ী পৌছিয়া, বালিসে মুখ ও জিয়া শুইল, কাহার ও সহিত কোন কথা কহিল ;--মুখ তুলিয়চাহিলও না। মা শয্যার একপার্শ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে গায়ে হাত বুলাইতে লাগিলেন—কে কোন কথা কহিতে সাহস হলেননা,কোন কথাও কাহারাে জোগাইল না । ঝি সেখানে শতমুখে স্বপ্রকাশের পথ পাইয়া বহিৰ্বাটীতে আসিয়া চড়া সুর তুলিতেই নবীন তাহাকে বাধা তখন সে-“এ পােড়ারমুখাে জেলের-প্যায়দা আবার কোখেকে এখানে মরতে এলগা—একটা কথা কবার জো নেই- বলিতে বলিতে খিড়কির পুষ্করিণীর দিকে চলিয়া গেল। ব্রজ- মােহন দেবেশের উপর নবীনের ভার দিয়া ঠাকুর-ঘরে ঢুকিলেন। দিল ।
bb
শেষ খেয়া
এই ভয় ভাবনা ও অস্বস্তি-ভাব—সকলের বুকে বােঝার
মত চাপিয়া রহিল। এই ভাবে কিছুক্ষণ কাটিবার পর
সহসা মনােরমা বলিল—“তােমরা খাওয়া দাওয়া করগেনা,
দাদা যে সমস্ত দিন খায়নি। আর সেই মানুষটি, তিনি যদি
আমাদের বাড়ী এসে থাকেন, ত’ তারও ত’ খাবার ব্যবস্থা
করা চাই, তুমি যাও মা।”
এইবার মা কাদিয়া বাঁচিলেন,-বলিলেন—“আমিই এট।
ঘটালুম-আমারি দোষে এমনটা হ’ল”—
মনােরমা জিদ করিয়া মাকে উঠাইয়া দিল। তিনি অঞ্চলে
চক্ষু মুছিতে মুছিতে উঠিলেন।
মনােরমার কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইয়া ব্ৰজমােহনবাবু নারায়ণকে
স্মরণ করিতে করিতে সেই কক্ষে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
মনােরমা সহজ ভাবে জিজ্ঞাসা করিল-“কত রাত হ’ল বাবা?”-
“এখনাে এগারটা বাজেনি মা” বলিয়া, তিনি একটা স্বস্তির নিশ্বাস
ফেলিলেন। মনােরমা পুনরায় বলিল-“অনেক রাত হ’ল যে
বাবা? নৌকোর সেই ভদ্রলােকটিও খাবেন ত’?” ব্রজমােহন
সাহস পাইয়া বলিলেন-“আহা—সত্যি মা, এমন ভদ্রলােক
দেখিনি।” পরে ধীরে ধীরে নবীনের সদাশয়তা, সহৃদয়তা, উদারতা,
তাহার অযাচিত সাহায্যের সনির্বন্ধ প্রস্তাবাদির কথা, একে একে
প্রকাশ করিয়া, পরে বলিলেন—“টাকাটা আমার কাছেই রয়েছে,
কিছুতেই শুনলেননা, বললেন—এ পরের টাকা নয় জানবেন।
আমার ত’ মা মাথারও ঠিক নেই, মনেরও ঠিক নেই—
'?
শেষ খেয়া
৮১
মনােরমা নবীন সম্বন্ধে কথাগুলি আর তার ব্যবহার
বিস্মিত ও মুগ্ধার মতই শুনিতেছিল ;—টাকা সম্বন্ধে কথাটা
কিন্তু তাহাকে বিচলিত করিয়া দিল, সে সহসা বলিয়া উঠিল—
“তােমার পায়ে পড়ি বাবা,আর ঋণ বাড়িওনা।”
ব্রজমোহন বলিলেন—“সত দূর বুঝছি মা, তিনি সু তো
নেবেন না, টাকাটাও যখন সুবিধা হবে, দিলেই চলবে—”
মনােরমা উঠিয়া বসিয়াছিল—বলিল—“আমি বুঝতে পারচিন।
বাবা, তুমি দাদাকে জিজ্ঞাসা কোরাে। যদি নােয়াই ঠিক হয়,
"আর সুদ না দিতে হয়, ত ও টাকায় সেন হরিশ মিত্তিরের ঋণ
কমানাে হয়। তিন বচর ত’ শেষ হয়, আমার ভায়েদের না
পথে বসতে হয়। আমার জন্য কিছু করবার আর দরকার নেই।”
ব্রজবাবু দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন—“মা, তােমার
ব্যথা আমার পাজরার হাড় কখনােই জানচে,আর তার খবর
নারায়ণই রাখছেন,-আমাদের ত’ আর কেউ নেই মা।”
এই বলিয়া চোখের জল মুছিলেন।
ব্রজবাবু কিছু পূৰ্ব্বে মনােরমাকে এক এক করিয়া সকল কথাই
বলিয়াছিলেন,—বাদ দিয়াছিলেন কেবল স্বয়ং শিবপুর গিয়া
সরােজকে সঙ্গে করিয়া আনিবার প্রস্তাবটি। এখন বলিলেন-“মা,
ঐ ভদ্রলােকটি কিন্তু বলছিলেন-‘সােজবাবুকে একবার দেখে
যেতে ইচ্ছা হয় তাকে আনবার জন্যে অনুরোেধও করছিলেন।”
শুনিয়া মনােরমা বলিয়া উঠিল—“না বাবা, টাকা যদি
হরিশ মিত্তিরকে দেওয়া না হয় তাে নিওনা,তােমরা খাওস
শেষ খেয়া অন্যের বাবা।" ক্ষণিক উত্তেজনার বশে এই কথাগুলি বলিয়া ফেলিয়া সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়া শুইল,সে আর বসিতে পারিনা। ইতিপূৰ্ব্বে মনােরমা কখনও বাপের সঙ্গে এত কথা, বিশেষতঃ এরূপ বিষয়ে কথা কহে নাই। নিতান্ত আবশ্যকে মার সঙ্গে কখন দুএকটি সাংসারিক কথা কহিয়াছে বটে, কিন্তু সাংসারিক সমস্যাদির ও সুখ দুঃখের আলােচনা বা পরামর্শ দেবেশের সঙ্গেই তাহার হইত, দেবেশই তাহার একমাত্র নির্ভর ছিল ; তাহার কাছেই মনােরমার হৃদয় অসঙ্কোচে উন্মুক্ত হইত। ইতিমধ্যে দেবেশ অলক্ষ্যে দুইবার আসি পিতা ও কন্যার কথাবার্তা শুনিয়া ও মনােরমার ভাবান্তঃ দেখিয়া চিন্তিত ও ভীত হইয়া গিয়াছে। ননােরমার উঠিয়া বসা, কথা কওয়া ও কথা শােনা প্রভৃতি তাহার যে বাপ-মাকে কঞ্চিৎ উদ্বেগশূন্য করিবার ও তাহাদের ব্যথা-ব্যাকুল হৃদয়কে একটু আশ্বাস দিবার, একটা সচেষ্ট- দৃঢ়তা, একটা বাহ্যিক প্রয়াস মাত্র, সেটা সে বুঝিয়াছিল । হরিশ মিত্রের ঋণ পরিশোধের চিন্তার কাছে যে মনােরমার আত্মচিন্তা একদিন এক মুহূর্তও মাথা তুলিতে পায় নাই—ইহা যে কতটা সত্য, ইহার জন্য মনােরমা যে অনায়াসে আত্মসুখ বিসর্জন দিতে পারে,—তাহা দেবেশই জানিত। কিন্তু সরােজকে না আনিতে পারিলে মনােরমাকে বাঁচানও যে करिन অন্ধকারে বহিৰ্বাটীর তুলসীমঞ্চে মাথা রাখিয়া দেবেশ বালকের মত কঁদিল। নারায়ণকে উদ্দেশ করিয়া তাহার তবে
শেষ খে।
উচ্ছ্বসিত কাতর নিবেদন, তাহার অলক্ষ্যে তুলসীমঞ্চের পাদমূলে
অপরদিকে উপবিষ্ট নবীনকে অধীর করিয়া দিল ।
*
পিতাকে আহারে পাঠাইবার পর মনােরম? রুদ্ধ হৃদয়
শতধা ফাটিয়া পড়িবার উপক্রম করিল ;-তাহার
আজিকার নিম্মম আঘাতগুলা এমন অনুপ্রবিষ্ট হইয়া গিয়া-
হল , স্মরণে আসিবার মত তাহাদের আর স্বাতন্ত্র ছিল না।
হারা স্বতই এক হইয়া গিয়াছিল। সে বিষ এখন তাহার
অজ্ঞাতেই কাজ করিতেছিল। তাহাকে বােধ হয় জ্বলিয়া-
পুড়য়! ছাই হইয়া নিবিয়া যাইবার প্রতীক্ষাটা নীরবেই করিতে
হইত--যদি না ব্রজমােহন সরেজের উল্লেখ করিয়া তাহার
লাঞ্ছিত অপমানিত বিমূঢ় চৈতন্যকে উদ্বোধিত করিয়া দিতেন।
একটু পূৰ্বে সে ভাবিতেই পারে, নাই যে তাহার উপর কাহারও
অধিকার আছে ; এবং তাহারও কাহার উপর সকল অবস্থাতেই
নভর সম্ভব । সে ভাবিল-জগতে জড়-বস্তুরও অধিষ্ঠাত্রী
দেবত আছেন—আমার দেবতা ত তিনি।
মনােরমা আর শব্যায় থাকতে পারিল না, মেঝেয়
লুটাইয়া ছট ফট করিতে করিতে পাষাণ-ভেদী কাতর কণ্ঠে
বলিল—“ওগাে আমি কি অপরাধ করেছি—তুমি আমার কষ্ট
দেখলেনা! ওগো আমার দেবত-একবার দেখা দাও, একবারটি
এসােগো,আমি যে—ব্যথায়— তাহার কণ্ঠরােধ হইল ।
পড়িয়া রহিল-একটি নীরব নিস্পন্দ মূর্তিমতী বেদনা।
৯২ শেষ খেয়া আহার করিবে বলিয়া দেবেশ দেবেশ মনােরমাকে ডাকিতে আসিয়া দেখে সে অজ্ঞান অবস্থায় মেঝেয় পডিয়া আছে। ব্রজমােহন বাবুর আত্মীয়, ডাক্তার গােকুলবার বাড়ীর সন্নিকটেই থাকিতেন। তিনি আসিয়া দুইবার ইজেক্স দিবার পর মনােরমার অজ্ঞান ভাবটা তন্দ্রার মত অবস্থায় আসিয়া সেই ভাবেই রহিল। মধ্যে মধ্যে অল্প পরিমাণে গরম দুধ খাওয়াইতে বলিয়া ও ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া, গােকুলবাবু বহিৰ্বাটিতে আসিলেন । কারণটা যথাসম্ভব শুনিয়া ডাক্তারবাবু বলিলেন—“কোন ভয়ের কারণ এখনাে উপস্থিত হয় নাই, কোন প্রতিকূল উপসর্গও নেই, সুতরাং হঠাৎ, কোন বিপদের আশঙ্কা নেই- তােমরা ভয় পেয়ো না, তবে, সন্দেহ থাকার চেয়ে সরােজবাবুকে আনাই ভাল, তিনি এলে আর develop করবে না (বড়বেনা) বলেই আমার ধারণা। ডাক্তার চলিয়া গেলেন। রাত্রি তিনটার পর মনােরমার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়া আসিল। দেবেশ সংবাদ দিতেই নবীন ব্ৰজমােহনকে বলিল—“দাদা তয়ের হয়ে পড়ুন, পাঁচটার গাড়ীতে গিয়ে, ১০ টার ট্রেণে সরােজবাবুকে নিয়ে ফেরাই চাই,-” দেবেশ বলিল—“কাকা, মনুর কথা ত শুনেছেন, শেষে না" ব্ৰজমােহন। আমিও সেই কথাই ভাবছি।
শেষ খেয়া
নবীন। আপনাকে ভাবতে হবে না, নারায়ণকে স্মরণ করে
বেরিয়ে যান তাে’; সে সব সামলাবার ভার—ঘােট ভায়ের
রইল, আপনি কিছু মাত্র ভয় পাবেন না। তবে এ কথা এখন
যেন বাড়ীতে প্রকাশ করা না হয় ।
ঘণ্টাখানেক ঠাকুর-ঘরে কাটাইয় এবং মনোরমাকে সহজ
অবস্থায় নিদ্রাভিভূতা দেখিয়া ব্রজমােহন বাহিরে আসিলেন ।
পরে নবীন ও দেবেশের সহিত দুইচারিটা আবশ্যকীয় কথার
পর-নারায়ণকে স্মরণ করিয়া শিবপুর যাত্রা করিলেন
ব্ৰহ্মণের পা উঠিতেছিল না, নবীনের উৎসাহ-বাক্যই তাহাকে
গতি দিয়া অগ্রসর করিয়া দিল ।
সকাল হইল—ক্রমে বেল। আটটা বাজিল, তখনো
মনােরমা ঘুমাইতেছে দেখিয়া, দেবেশের ছােট ভাই শিবেশকে
বাড়ীতে থাকিত বলিয়া ও, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরিয়া
আসিতেছি বলিয়া নবীন দেবেশকে সঙ্গে লইয়া “জয় বিশ্বনাথ”
বলিয়া বাহির হইল।
-
আজ একটা ছুটির দিন, হরিশ মিত্রের বৈঠকখানায় ইতি
মধ্যেই ৫৭ টি ভদ্রলােক উপস্থিত
উপস্থিত হইয়াছেন,—সকলেই
চাকুরে। কেহ কিছু কর্জের প্রত্যাশায়, কেহ বা সুদটা দিতে
আসিয়াছেন; বিনা কাজে বড় একটা কেই এ ভিটে মাড়ান না।
৯৪ ষে খেয়া এই দড়ি-বাধা চশমা-চক্ষে মিত্ৰজা মহাশয় একখানা দেখিতেছিলেন। সম্মুখে পংগুলির অন্ন-বৰ্ম্ম-স্বরূপ বহু পুরান একটি শালকাঠের বাক। তাহার উ র শ্রী শ্রসিদ্ধিদাত? গণেশজীউর সনাতন সিন্দুর-চিত্র এবং সর্বাঙ্গে শতাধিক বর্ষের প্রত্যেক ভূত-চতুর্দশী সিন্দব-চন্দনের চৌদ্দ ফোটাযজ্ঞের সহস্র চক্ষুর মত পাতকদের দিকে আর কটাক্ষে চাহিয়; তাহাদের অন্তরাত্মার শোণিত শােষণ করিতেছিল শুভ মাঙ্গলিক চিহ্নও বােধ হয় সংস্কার বা সঙ্গদোষেই এইরূপ ভাবান্তর সৃষ্টি করিয়! থাকিবে । মিত্ৰজা মাশয় হয়। -তামাকের পক্ষপাতী নহেন ; বিলাস মাত্রকেই তিনি বং জ্ঞান করেন। আবাল্য তাহাকে কোন বদ অভ্যাসই বিগড়াইতে পারে নাই,—সুতরাং তাহার বৈঠকে কোন বালাই-ই ছিল না। দেবেশ তথায় প্রবেশ করিতেই মিত্র মহাশয় চশমা হইতে চক্ষুদ্বয় উর্দ্ধে টানিয়া দেবেশকে সম্যক্ নিরীক্ষণান্তর বলিলেন— “কিহে—আজ যে বড়? এখনাে ত’ মাসের সাত দিন বাকি, তোমাদের ঘুম হয়না বুঝি ?” দেবেশ। না জ্যেঠামশাই--একটা কথা ছিল- মিত্ৰজা। উঠতে হবে বুঝি ?দাড়াও যাচ্ছি। এই বলিয়া হস্তস্থিত খংখানি বাক্সে রাখিয়া তালা বন্ধ করিলেন ও তাহা তিন চারবার টানিয়া দেখিয়া সন্দেহ-মুক্ত হইবার পর বাক্সের বাহিরে চতুর্দিকে একবার হাত বুলাইয়া দেখিলেন কিছু ৫ শেষ খেয়া পড়িয়া রহিল কি না। পরে দ্বার পর্যন্ত আসিয়া আর একবার সে দিকে ফিরিয়া দেখিয়া বারান্দায় উপস্থিত হইলেন। দেবেশের দিকে চাহিয়া বলিলেন—“সব ফেলে এসেছি—চট করে বল।” দেবেশ টাকা পরিশােধ করিয়া ঋৎখানা ফিরাইয়া লই চায়,–এই অপ্রত্যাশিত কথাটা কর্ণে প্রবেশ করিতেই তিনি আশ্চর্য হইয়া গেলেন। বলিলেন—“ছেলেমানুষ-ন’-নশাে টাকা ঠাট্টা-তামাসার কথা নয়, কারো ফন্দিতে পড়েই বুঝি ! যিনি টাকা দি—আমার চেয়ে কেউ ভাল ভেবে দেবেন না, তােমাদের মুখও চাইবেন না, শেষ ভিটেটি খোয়াতে হবে। ত’ না মানুষ, না---- আর তোমরা ত’ বাপের দশহাজার টাকা জল দিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসাে-বিশ-পঁচিশ টাকা মাইনের চাকরির দরখাস্ত লিখতে শিখে,—এ-সব বােঝ ৭ --বুঝতে পারছে না। যাও, পাগলামি কোরনা, তােমার জেঠামশাই তা বলে তােমাদের জোচ্চোরের হাতে পড়তে দিতে পারেন না।” দেবেশ সবিনয়ে মিত্ৰ-জ্যেঠাকে যথাসম্ভব বুঝাইয়া বলিল- তিনি তাদের যথেষ্ট ভালবাসেন বলে ন্যায্য সন্দেহ করছেন, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার কোন সন্দেহের কারণই নেই। আলাপ সম্পর্কে বাবার এক ভাই, উপকারাথেই বিনা সুদে টাকাটা দিয়েছেন। শুনিয়া মিত্ৰজা বলিলেন—“এত বড় উপকারী ভাই এতদিন কোথায় ছিল হে; এমন ভাই আমাদের জোটে না। রক্ষা হবে ত’?”
শেষ খেয়া
এইরূপ অনেক কথার পর, শেষ বলিলেন—“সে কাগজ এখন
কোথায় পড়ে আছে বলতে পারি না। আমাকে আবার কতক
কাগজ কুচবিহারে অধর ভায়ার কাছে রাখতে হয়। সে
পূজোর ছুটিতে সঙ্গে করে আনলে—দরকারীগুলি রেখেনি,
আবার যাবার সময়ে কতকগুলি দিয়ে দি। পরের ঝুঁকি
মাথায় রাখা সহজ মনে ক’রনা—কত কি বিপদ-আপদ আছে,
তােমরা কি জানবে । এখন না খুঁজে কিছু বলতে পারিনা।"
দেবেশের মুখ ফ্যাকাসে হইয়া গেল। বৈঠকখানার বাবুরা
সকলেই সাগ্রহে মিত্ৰমশায়ের কথাগুলি শুনিতেছিলেন।
একজন অপরকে মৃদুকণ্ঠে বলিলেন—“ভায়া, সৱে পড়ি চল, টাকা
দিতে এলেও খৎ ওগরাতে চায়না,-বাঘা-খপ্পোর !” অনুচ্চতা
সত্ত্বেও কথাগুলা মিত্ৰজার কর্ণ এড়ায় নাই।
দেবেশের সর্বশরীর শিথিল হইয়া তাহার ক্ষের সমক্ষে সকল
বস্তু দ্রুত ঘুরিয়া অস্পষ্ট হইয়া গেল। সে অবলম্বন পাইবার জন্য
হাত বাড়াইল। একটি পরিচিত ভদ্রলােক তাহা বুঝিতে পারিয়া
ছুটিয়া গিয়া তাহাকে ধরিলেন ও ধীরে ধীরে ঘরের ভিতর আনিয়া
বসাইলেন। বলিলেন—“তুমি ইয়ংম্যান্ এত (nervous) দুৰ্বল
কেন হে, ওঁর কথার মানেটা বুঝতে পারলেন, ওঁরা পাকালােক,
তােমাকে নেড়ে-চেড়ে দেখছিলেন—ভুল-চুকে না ভিটেটা বেহাত
করে ফেল। প্রত্যেক প্রতিবেশীরই এটা ত’ দেখাই উচিত।
তা না ত’ টাকা দিয়ে খৎ ফিরিয়ে নেবে, তাতে আবার
গােলমালটা কি আছে, ওরি বা আপত্তি কি থাকতে পারে।
শেষ খেয়া
ลา
Cheer up—চাঙ্গা হও।” বাবুটি ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের হেডক্লার্ক
—তিনিও কন্যাদায়ে পড়ে মহামহিম-পাঠ লিখতে এসেছিলেন।
একদিকে স্বকর্ণশ্রুত Customerদের ( খাতকদের) প্রতিকূল
মন্তব্য, তাহার উপর দেবেশের আকস্মিক অবসন্নতা-রূপ বিধি
বিড়ম্বনা,-তদুপরি ম্যাজিষ্ট্রেটের ক্লার্কবাবুর সহানুভূতি ও
অনুকূল ব্যাখ্যা—সবগুলি একত্র হইয়া, মিত্র মহাশয়ের মাথা
তুলিবার শক্তি লােপ করিয়া দিল। তিনি মনে মনে শপথ
করিলেন ঘরে শিকার থাকিতে–বারাণ্ডায় দাড়াইয়া বৈষয়িক কথা
ইহ জন্মে আর কাহারও সহিত কহিবেন না। পরে উপায়ান্তর
থাকায় ক্লার্কবাবুর কথার সাহায্য লওয়াই সঙ্গত ভাবিয়া,
সহাস্যে বলিলেন—“ও হরি, এই তােমাদের কলেজিবুদ্ধি ! এত
বড় ছেলেমানুষ ত’ দেখিনি, নিজেদের স্বার্থের কথাটাও বুঝতে
পারনা। ব্রজমােহন একদম গােবচারা, তাই আমার মতলবটা
ছিল—নতুন লেখাপড়াট। একবার নিজে না দেখে একাজ
করতে দেবনা,—কে একটু সদাশয়তার ভাণ করে ব্রাহ্মণকে পথে
বসাবে। আমার এ স্বভাব আজও গেলনা, চুলােয় যাক—আমার
এত মাথাব্যথাই বা কেন ;-দাও—টাকা গুলে দাও দিকি।”
দেবেশ একটু সামলাইয়াছিল, বলিল—“আপনি আমার
ওপর রাগ করচেন—আমি কিন্তু আপনার কাছে একটিও মিথ্যা
কথা কইনি জ্যেঠামশাই।”
মিত্ৰজা। রাগ করে আমার বড় লাভ। জগতে আপন
আর পর না ঠেকলে বুঝবেনা ত’!
৯৮ শেষ খেয়া হেডক্লার্ক বাবু দেখিলেন, দেবেশ সন্দেহে আর ভয়ে ভড়কে যেতে পারে। তিনি মিত্ৰজাকে আর কথার অবসর না দিয়া দেবেশকে বলিলেন—“এখন আর তােমার কথা চলেনা—টাকা বার করে দাও, ওঁর এখন অনেক কাজ রয়েছে।” এই বলিয়া, দেবেশের অগ্রসর করিয়া দেওয়া কেঁচার খুট খুলিয়া-নয়শত টাকা আসল ও সেই মাসের সুদ একে একে গুণিয়া মিত্র মহাশয়ের হাতে দিলেন। মিত্ৰজা প্রত্যেক গিনিটি বাজাইয়া ও প্রত্যেক নােটখানির এপিট ওপিট দুই তিন বার করিয়া দেখিয়া বাক্সের মধ্যে তুলিলেন এবং সেই প্রাচীন গহ্বরটির কোন এক গুপ্ত রন্ধ হইতেই গরিব ব্ৰজমােহনের রেহাণী দলিল খানি বাহির করিয়া দেবেশের হাতে দিয়া বলিলেন—“বেশ করে দেখে শুনে লও, আপনারাও দেখুন,—এই পরের ঝুঁকি বইতেই জন্মেছিলুম।” সঙ্গে সঙ্গে তাহার একটি নিশ্বাস পড়িল । কক্ষস্থ সকলেই লক্ষ্য করিলেন—মিত্ৰমহাশয়ের বত্রিশ নাড়ী ছিড়িয়া দলিলখানি যেন বাহিরে আসিল এবং হস্তচ্যুতির ক্লেশ, পরাজয়ের বিরক্তি ও রােষ, আশাভঙ্গের অন্তর্দাহ যেন উপসর্গের মত তাহার মুখে চোখে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল । হেডক্লার্কবাবু দলিলখানায় কটাক্ষে দৃষ্টিপাত করিয়াই “কেমন হে, কিছু দেখবার আছে ?” এই বলিয়াই অন্যের অলক্ষ্যে দেবেশকে সরিয়া পড়িবার ইঙ্গিত করিলেন । দেবেশ বলিল—“আজ্ঞে দেখব’ আবার কি? জ্যেঠামহাশয়ের দয়া কখন ভুলতে পারবনা।” পরে মিত্রজার দিকে চাহিয়া “আমার
নবীন।
যদি কোন অপরাধ হয়ে থাকে ত’ ক্ষমা করবেন”—বলিতে বলিতে
দেবেশ ঘরের বাহিরে আসিয়া পড়িল ও রাস্তায় পৌছিয়া
নবীগকে দেখিতে পাইয়া হাঁপ ছাড়িল। নবীন জিজ্ঞাসা করিল—
“এত বিলম্ব হল যে, কাজ হয়েছে ত’ ?"
দেবেশ।
তা হয়েছে,
নবীন। কাগজখানা দেখে নিয়েছ ত’,—দেখি ?
তা ঠিক আছে,—এই নিন,বলিয়া নবীনের
হতে দিল।
জয় বিশ্বনাথ ! নাও এখন মনুমাকে দাওগে,
বলিয়া ফেরৎ দিল ।
হরিশ মিত্রের বৈঠক সেদিনকার মত ভাঙ্গিয়া গেল। তিনি
বলিলেন—“আজ আর কিছু হবেনা, ছােকরা মাথাটা বিগড়ে
দিয়ে গেছে,--আপনারা রবিবার আসবেন। একেই বলে
কলিকাল, ধৰ্ম্ম আর কোথাও নেই।”
একজন বলিলেন—“সেটা ঠিক বলেছেন।”
একজন বলিলেন—“রবিবারত পরশু—সেই ভাল।”
ফুল কথা, সকলেই বুঝিয়াছিলেন,-আজ আর সুবিধা
হইবেনা, সুতরাং সকলেই উঠিয়া পড়িলেন। পথে যাইতে
যাইতে তাহারা মিত্ৰমহাশয়ের মাথাটা বিগড়াইবার কারণ,
এবং কলিতে ধৰ্ম্ম যে দুনিয়াকে ফতুর ও ফকির করিয়া মিত্ৰজার
বাক্সটির মধ্যে সঞ্চিত ও বর্ধিত হইয়া উঠিতেছে, ইহা
অবিসম্বাদিত ভাবে আবিষ্কার করিয়া বাড়ী ফিরিলেন ।
।
১০০
শেষ খেয়া
দেবেশ যখন বাড়ী ফিরিল তখন বেলা ১০টা। মনােরমাকে
ডাক্তার গােকুলবাবু দেখিয়া গিয়াছেন—সে উঠিয়া বসিয়াছে ;
দেবেশের খোঁজ করিতেছে। দেবেশ বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ
করিতেই মনােরমা দুৰ্বল ক্ষীণকণ্ঠে বলিল—“কোথায় গিছলে
দাদা-কাল থেকে কিছু পেটে পড়েনি, আজ এই এতটা বেলা
হল ; মা, দাদাকে আমার সামনে কিছু খেতে দাও ত’।”
এই স্নেহস্পর্শে দেবেশের সকল কষ্ট, সকল ক্ষুধা-তৃষ্ণা মুছিয়া
নিল। সে বলিল—“বেশ কথা, মা ঐ সঙ্গে মনুকেও কিছু দাও,
এক সঙ্গেই খাই।”
নিজের নিৰ্ব্বদ্ধিতায়, এই অনর্থটা ঘটিল,-মা এই ভাবিয়া
মৰ্ম্মে মরিয়া গিয়াছিলেন—ভয়ে ও ভাবনায় এতটুকু হইয়া
গিয়াছিলেন। তিনি সকল কাজ ও সকল ঘােরা-ফেরা যন্ত্রের
মতই করিতেছিলেন । কিন্তু প্রাণটা তার লুটাইতেছিল
নারায়ণের পাদপদ্মে। তাহার অনুচ্চারিত প্রার্থনা সেখানে
সুস্পষ্ট কাতর ভাষায় জানাইতেছিল—“ঠাকুর, আমি নির্বোধ
মেয়েমানুষ, আমার ভুল, আমার অপরাধ তুমি না মার্জনা
করলে, তুমি না আমার লজ্জা রাখলে, আমি যে আর মুখ
দেখাতে পারবনা, আমাকে চিরদোষী করে রেখনা প্রভু,
ইত্যাদি। তিনি নিজের কাছে এতটা দোষী হইয়া পড়িয়াছিলেন
যে, দেবেশের যে কাল হইতে আহার নাই তাহা জানিয়াও
শেষ খেয়া
১০১
ছেলেকে কিছু আহারের জন্য বলিতেও তাহার
কুলাইতেছিলনা। তিনি দূরে দূরে থাকিয়া অন্তরালেই অশ্রু
মুছিতেছিলেন।
মনু ও দেবেশের প্রার্থনা যেন বহুযুগ পরে তাহার কর্ণে
স্বর্গবীণার মত বাজিল। তিনি তাড়াতাড়ি গরম দুধ, কিছু
ফলমূল ও এক রেকাবি মােহনভােগ আনিয়া উভয়ের মধ্যে
ধরিয়া দিলেন ও দুই গেলাস জল আনিয়া রাখিলেন।
মনােরমা কহিল-“মা, তুমি অমন হয়ে রয়েছ কেন, শরীর
খারাপ বুঝি ?”
দেবেশ । তাইত, আমি লক্ষ্যই করিনি, সত্যিই তকাল
থেকে মার একটি কথাও শুনিনি, একবার ডাকেনও নি
মার চক্ষে রুদ্ধ বন্যা যেন মুক্তি পাইল,-অঞ্চল তাহাকে
বাধা দিতে গিয়া নিজেই ভাসিয়া গেল। তিনি রুদ্ধকণ্ঠে কেবল
মাত্র বলিলেন-“তাের খা—আমি দেখি।”
“এই ত’ আমরা খাচ্চি মা”—বলিয়া উভয়েই খাইতে আরম্ভ
। মায়ের সেই স্নেহধারার মুখে, মনােরমার গােপন
সঙ্কল্পের দৃঢ়তা তাহার অজ্ঞাতেই ক্ষুদ্র তৃণের মত ভাসিয়া গেল।
মনােরমা নবীনের খোজ লইল। দেবেশ বলিল-“কাকা
বােধ হয় শিবেশকে নিয়ে বাজারে গেছেন। এমন মানুষ দেখিনি,
সকালে হরিশ মিত্তিরের ওখানে গিয়ে উপস্থিত!”
মা। সেখানে কেন ?
দেবেশ। সে কি মা-মনুর কথা কি শােননি?
করিল।
১০২ শেষ খেয়া মনু হাসিয়া ফেলিল। বলিল—“তুমি কী দাদা-মা যেন ঐ জন্যে বড় ব্যস্ত আছেন।" দেবেশ হাসিয়া বলিল—“মা বুঝি কেবল তােমার জন্যেই ব্যস্ত থাকেন, আমরা কেউ নই।” মা। আমি বাছা তােদের কথা কিছু বুঝতে পারিনা। মনু। তােমায় বুঝতে হবেনা। মা,—দাদার রেকাবি যে খালি ওমা তাইত ! এই বলিয়া তিনি কিছু আনিতে ছুটিয়া গেলেন। মনু। কাকা ফিরে এসে কি বল্লেন দাদা? মা কয়েক ফালি পেঁপে আনিয়া উভয়কে দিলেন । দেবেশ। সে সব তিনি ঠিক করে এসেছেন। মা। কি সব রে-- মার কথায় কান না দিয়া বলিল—“সব কি করে হবে দাদা ?” দেবেশ। যদি হয় ? মনােরমার চক্ষু দেবেশের মুখ চাহিয়া যেন পদ্ম-কোরকের মত বিস্ফারিত হইয়াই খুলিয়া রহিল। মনােরমার মা-টি সম্পূর্ণ সেকালের ধাতের মানুষ- মনােরমার এতটা উৎসাহের সঙ্গতি বিচার না করিয়াই সাগ্রহে বলিলেন—“কিরে দেব—কি ঠিক্ করে এসেছেন, সরােজকে আনার কথা ?”
শেষ খেয়া ১০৩ দেবেশ। তুমি কি ঠাওরাও মা, তােমার ইচ্ছাটা, কি ? মা। মা। এক্ষুনি—এক্ষুনি বাবা, অমরতে কার আর অরুচি ; বাবা আমার শুনলেই আসবেন, লক্ষ্মীটি, যা বাবা- দেবেশ। তা হলে তুমি যেতে বলচ ? মা। না বাবা, না। আমি কিছু বলছিনি বাবা। দেবেশ। এই যে বল্লে মা । কই বলুম রে! (পরেই বলিলেন) আমি না-ই বা বলুম, তুই-ই বলনা বাবা। দেবেশ । তুমি বলতে বল ত বলি । মা। না, আমি জানিনা বাপু, তােদর কি নিজের বুদ্ধি নেই—তুই না হয় বলি । হায়রে মায়ের প্রাণ, তার প্রতি-পদেই আশঙ্কা, প্রতি-পলেই চিন্তা- মনােরমার কান পর্যন্ত লাল হইয়া উঠিয়াছিল ! সে চক্ষু অবনত করিয়া বিরক্তি-কুঞ্চিত লইয়া বসিয়া ছিল। কথাটার মধ্যে কঠিন আঘাতও ছিল, আশার প্রচ্ছন্ন উন্মেষও ছিল—বােধ হয় আনন্দও ছিল, অথচ বিশ্বাসের বস্তু মাত্র ছিল না। কিন্তু মা’র শেষ কথাটায় এই বিরুদ্ধ অবস্থাতেও তাহার ওষ্ঠপ্রান্তে হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল,—সে উঠিয়া পড়িল। দেবেশ। মনু, এই কাগজখানা রাখ ত’ ভাই-
১০৪
শেষ খেয়া
মনু। দাও,—বলিয়া হাত বাড়াইয়া লইবার সময়, অনুচ্চে
বলিল—“মিছে কথা কয়ে মাকে অত জ্বালাতন করছো কেন দাদা?”
দেবেশ। মা যখন বলেছেন,“তুমি দেখ ভাই, তার কথা
মিছে হতেই পারে না।
মা। আমি কিন্তু কিছু বলি-টলিনি বাবা-তা বলচি—
ইতিমধ্যে ফেরৎ-পাওয়া খৎখানি ভাল করিয়া দেখিতে
দেখিতে মনােরমার বেদনা-বিষন্ন চক্ষুদ্বয়
চক্ষুদ্বয় আনন্দাশ্রুম্পর্শে
উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়াছিল। সে একটা পরম স্বস্তির নিশ্বাস
ফেলিয়া দেবেশকে বলিল—“তুমি কি দুষ্টমি করচ’ দাদা-"
দেবেশ। মনু, মার বাক্যই বেদ—তার ইচ্ছাই নারায়ণের
ইচ্ছা রে !
ঠাকুর-ঘরে
মা, নয়নভরা নীরব দৃষ্টিপাতে সন্তানদের উপর আশীষ
বর্ষণ করিয়া স্নেহ-সজল নেত্রে দ্রুতপদে
গিয়া
ঢুকিলেন ও একটি প্রণামে নারায়ণকে তাহার সকল কথা, সকল
ব্যথা নিবেদন করিয়া, নবােৎসাহে কাৰ্যান্তরে মন দিলেন।
দেবেশ যদিও হাসিতে হাসিতে বাহিরে চলিয়া গেল—তাহার
অন্তরটা কিন্তু মনােরমার এতটা আকস্মিক পরিবর্তন সত্য বলিয়া
স্বীকার করিল না, সন্দেহ-বিচলিত হইয়া রহিল। মনােরমা,
কাগজখানা হাতে করিয়া বিমূঢ়ের মত সেইখানেই বসিয়া রহিল।
ঠিক এই সময়ে ঝির কাংস-কণ্ঠে বাজিয়া উঠিল—“আক্কেল
দেখদিকি—এই এত বেলায় কিনা একটা যজ্ঞির বাজার এনে
ফেলে,-এত বড় মাছ এখন কোটে কে ?”
শেষ খেয়া
মনােরমার মনটা নানা সন্দেহের ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে
কখন চঞ্চল, কখন ভীত, কখন অন্যমনস্ক হইয়া উঠিতেছিল।
ঝির শেষ কথাটায় তাহার হৃদয়টা নড়িয়া উঠিল। সে ধীরে
ধীরে শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িল ।
দশ বারটি সভ্য উপস্থিত থাকিলেও আজ আর শিবপুর
Young Men's Evening Club-এ সংবাদপত্র পাঠের উৎসাহ
নাই। নূতন কবি রবীন্দ্রনাথের নব-প্রকাশিত সন্ধ্যা-সঙ্গীত লইয়া
কাড়াকাড়িও নাই, সমাজ-সংস্কার বা স্ত্রীশিক্ষার আলােচনাও
নাই। সকলেই নিৰ্ণিমেযে উৎকর্ণ হইয়া ইন্দুভূষণের বক্তৃতা
শুনিতেছিল ও মাঝে মাঝে তাহাদের মধ্য হইতে ঘৃণা লজ্জা
শােক ও রােষব্যঞ্জক উচ্ছ্বাস—কখন ইংরাজিতে, কখন বাংলায়
প্রকাশ পাইতেছিল। অভাবটা ছিল কেবল হাস্যরসের।
সরােজ প্রবেশ করিতেই, সহসা সব থামিয়া গেল।
ভ্যাকুয়ম্ ব্ৰেক্ কসিয়া হঠাৎ গতিটাকে রােধ করা হইল,
শক্তিটা কিন্তু এঞ্জিনের মধ্যে গুমরিতে লাগিল। ঐটুকু ফাকের
মধ্যেই ইসারা ইঙ্গিতে স্থির হইয়া গেল—কথাটা সরােজকে
জানান চাই,—এমন কি দু’কথা শােনানও চাই।
সরােজ ঈষৎ হাস্য মুখেই বলিল—“ভয় নেই, ভূতও নয়,
প্রেতও নয়,-আমি। কেন, কিছু গােপনীয় নাকি?”
শেষ খেয়া শরং বলিল—“যদি না শুনে থাক ত’ গােপন থাকাই বােধ হয় ভাল- সরােজ একটু দমিয়া গেল। বলিল—“কই ভাই, আমি ত’ কিছুই শুনিনি, ব্যাপারটা কি ?” বিনয় বড় নরম প্রকৃতির যুবক। সে বলিল—“ও এল একটু আনন্দের জন্যে, কেন ওকে উদ্বিগ্ন করে তুচ, কিছু নয় হে সরােজ !” বীরেশ্বর উত্তেজিত কণ্ঠে বলিল—“তােনার এটা গুণ নয় frau, -weakness (56901 )-rather want of moral courage ( বরং সৎ-সাহসের অভাব।” বিনয় ধীর ভাবেই বলিল—“তােমার কাছে তা হতে পারে, কারণ তুমি ত’ শুধু বীর নও-বীরেশ্বর বীরেশ্বর। তা হাজার বার সরােজ আগ্রহব্যাকুল কণ্ঠে বলিল-“তােমাদের পায় পড়ি ভাই, ব্যাপারটা কি খুলে বল।” রজনী বলিল—“শুনেছি তােমাদের ডাক্তারী শাস্ত্রে নাকি বলে,—নিজে ডাক্তার হলেও পরমাত্মীয়ের বা প্রিয়জনের চিকিৎসা করবেনা। তাকে দেখবেওনা—এ কথা বলে কি?” সরােজ। তােমরা কি ব’লচ ভাই—আমি ত’ কিছুই বুঝতে পারছিনা। এ কথার উদ্দেশ্য কি ? শরৎ। উদ্দেশ্য আছে বই কি ;--তােমার স্ত্রী পীড়িতা, তাকে একবার দেখতে তােমার নিষেধ আছে কি ?
শেষ খেয়া
১০৭
সরােজ। এ কথা কে বলে ? এখবর আমি পেলুমনা
আর তােমরা পেলে ?
বীরেশ্বর। পাওয়া ত’ উচিত ছিল না। কিন্তু ভাই, ভগবান
জগতে সব জিনিষেরই সঙ্গত স্থান নির্দেশ করে দিয়েছেন—
খবরের ও দিয়েছেন। যার ভাগ্যে তা জুটলনা-তাকে ভগবানের
মধ্যেই তা খুঁজতে হয় ; তিনি জগৎময়।
সরােজ এইবার বিরক্ত হইয়াই বলিল—“আমি Sermon
শোনবার জন্য ব্যস্ত নই বীরু, যদি বলবার কিছু থাকে-
স্পষ্ট করে খুলে বল। একজনের পরিবার নিয়ে হেঁয়ালিতে
কথা কওয়াটা ভদ্রতা নয়।"
বীরু। গােলমাল ত’ ঐখানেই,কোষ্টা যে ভদ্রতা, আর
কোষ্টা যে ভদ্রতা নয়, সেটা বোঝবার ভদ্রতা সকলের থাকেনা।
শাস্ত্র অপ্রিয় সত্য approve ( পছন্দ করেননা,তুমি চাও
স্পষ্ট কথা—কাকে preference দি? (কার মান রাখি ।
শাস্ত্রের মান রাখি, কি তােমার মান রাখি ?
সরােজ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। সে বিরক্তির সহিত
বলিল—“তােমাদের বলবার ভার ত’ কেউ দেয়নি যে বলতেই
হবে,—মাপ কর, আমি শুনতে চাইনা।”
শরং বলিল—“সে কি কথা সরােজ ! ভার আছে বই কি।
যে সমাজে যে জন্মায়,—সেই জন্মানর সঙ্গে সঙ্গেই সে সেই
সমাজের ভালমন্দের ভার নিয়েই জন্মায়,-সেটা কারুর কাছে
হাত পেতে নিতে হয়না।”
।
১০৮
শেষ খেয়া
সয়ােজ বলিল—“সে কথা ত’ আমি অস্বীকার করছিনা,
কিন্তু এসে পর্যন্ত কথাটা যে কি তাত’ শুনতেই পেলামনা,
কেবল ফিলজফিই চলেছে। আমাকে এরকম suspense-এ
( সন্দেহে ঝুলিয়ে ) রাখাটা কি আমার প্রতি অন্যায় অত্যাচার
নয়? বলতে হয় বল, না হয় ব’লনা।”
শরৎ। এত কথার পর এখন যদি না বলা হয়—সেটা
তােমায় স্বস্তি দেবে ত’?
' সরােজ। তা ত’ দেবেনা,কিন্তু যখন বলবেইনা, তখন
আর উপায় কি ?
নবীন। সরােজ ত’ ঠিকই বলেছে। ও ত’ শােবার
জন্যে গােড়াগুড়িই প্রস্তুত, তােমাদেরই ত’ ইতস্তত দেখচি ।
moral courage-গুলাের ভার তাে বরাবরই বীরেশ্বরের,-
ও-ই বলুকনা।
এ ক্ষেত্রে যখন সাক্ষাৎদ্রষ্টা ইন্দুভূষণ হাজির,
আর ও-ই যখন সরােজদের next door neighbour
( দেল-ঘেঁশা প্রতিবেশী) তখন ও-ই উপযুক্ত পাত্র ; আমার
সিংহাসন আজ ওকেই ছেড়ে দিলুম।
এ প্রস্তাব সকলে অনুমােদন করিলে, সর্বসম্মতিক্রমে
ইন্দুভূষণ বলিতে আরম্ভ করিল। সরােজ শঙ্কিত-আগ্রহে
পলকহীন নেত্রে তাহার মুখের উপর তাকাইয়া রহিল।
ইন্দুভূষণ বলিয়া গেল, কাল সবরাজের শ্বশুর সরােজদের
বাড়ী এসে শুনে যান সরােজের মা পীড়িতা ; সে কারণ বাড়ীর
বীরু।
শেষ খেয়া
সকলের আহারাদির অসুবিধা অনিয়ম খুবই যাচ্ছে,তাই ,
সে ভদ্রলােক সরােজের স্ত্রীকে এখানে পৌছে দেওয়াটা
উচিত ভাবেন। এরূপ ভাবার মধ্যে সম্ভবত তার ভুল
থাকতে পারে। যাক, তার পর আজ সকাল ৭টার সময়
সরাজের শ্যালক দেবেশবাবু বাড়ীর ঝির সঙ্গে ভগ্নীকে নিয়ে,
সরােজদের বাড়ীতে রেখে
যেতে আসেন।
অবাঞ্ছনীয় আগমনে, তঁারা মর্মন্তুদ গঞ্জনা
ও লাঞ্ছনা
সহ ৫/৭ মিনিট মধ্যেই সরােজদের বাটী হইতে বিতাড়িত
এই অনাহূত
ইন ।
-
এই আকস্মিক গােলমালে প্রতিবেশীরা আকৃষ্ট ও উপস্থিত
হইয়া, তাহাদের সান্ত্বনা ও সাহায্য করিতে চেষ্টা করেন এবং
বিনয়ের মা উপস্থিত হইয়া তাহাদের নিজের বাড়ীতে লইয়া
গিয়া স্নানাহার করাইবার জন্য যত্ন পান। “মা আজ ক্ষমা
করুন, আপনি ত’ আমার ভগ্নীর অবস্থা বুঝতেই পারছেন,
সকলে আশীৰ্বাদ করুন, পথে না কোন বিপদ ঘটে”—
দেবেশবাবুর এই সা-সকাতর বাক্য উপস্থিত সকলকে
ব্যথিত ও বিচলিত করে ।
পূরে—দেবেশকে অসহায় দেখিয়া ইন্দু ও বিনয় একখানি
নৌকা ভাড়া করিয়া দেয়। দেবেশবাবুর ভগ্নী কাশপত্রের
মত কঁপিতেছিলেন এবং নৌকামধ্যে গিয়াই অজ্ঞান হইয়া
পড়েন ও তাহার দাতে দাত লাগিয়া যায়। তাহা দেখিয়া মাঝিরা
এরূপ রােগী লইয়া যাইতে অসম্মত হইলে—“মেয়ে শ্বশুর বাড়ী
১১০
শেষ খেয়া
* যাবার সময় এরূপ করিয়াই থাকে,—কোন ভয়ের কারণ নাই”
প্রভৃতি বলিয়া তাহাদের রাজি করান হয়।
প্রতিমা বিসর্জনান্তে লােকে যেন নিরানন্দের ব্যথা লইয়া
বাটী প্রত্যাবর্তন করে। নৌকা ছাড়িবার পর প্রায় ৩০৩৫টি
সহানুভূতিপরায়ণা ইতর ভদ্র মহিলা অঞ্চলে অশ্রু মুছিতে
মুছিতে ও নানা মন্তব্য প্রকাশ করিতে করিতে ধীরে ধীরে
বাড়ী ফেরে।
ইত্যাদি বলা শেষ করিয়া ইন্দুভূষণ বলিল—“তাদের
মন্তব্যাদি উল্লেখ করবার অধিকার আমার নাই, আগ্রহও
নাই, তবে ইতর সাধারণের মধ্যে একজন বলে—এমন রূপ
লাখের মধ্যে দেখিনি,তার এমন ভাগ্যি গা! বিশ্বাস ত’ হয়
না,নারায়ণ জানেন।'
ক্লাবের মধ্যে এতক্ষণ যেন, মানুষ ছিল না, কেবল একটি
মাত্র সুর একই পদ্দায় ঘুরিয়া ফিরিয়া, ঘরের নিস্তব্ধতা
বাড়াইয়া থামিয়া গেল।
সরােজ স্বভাবতই ধীর, সে পাষাণ-মূর্তির মত অচঞ্চল
ভাবেই বসিয়া শুনিল । তাহার বর্ণ গৌর সুতরাং তাহার
বদনে কয়েকবার বর্ণ-বৈষম্য দেখা দিয়াছিল মাত্র।
বীরেশ্বরই প্রথম কথা কহিল! বলিল—“এখন আমরা কিছু
বলতে পারি ?”
সরােজকে কে যেন সজোরে ধাক্কা দিল। তাহার আপাদ-মস্তক
নড়িয়া উঠিল। সে বিদ্রোহীর মত উচ্চকণ্ঠে বলিল—“না”।
শেষ খেয়া
১১১
এই “না”টিকে কেবলমাত্র “না” বলিয়া কেহই গ্রহণ করিতে
পারিল না। সকলেই ইহার পূৰ্বে ‘খবরদার’ শব্দটির গােপন
অস্তিত্ব উপলব্ধি করিল ।
পরক্ষণেই সে আবার বলিল—“যতটা বলা আবশ্যক ছিল,
তার অনেক বেশী বলা হয়েছে—আমারাে শােনা হয়েছে।"
বীরেশ্বর নিরস্ত হইবার পাত্র নহে। সে বলিল—“হ্যাঁ, মল
ঘটনাটা তোমার শােনা হয়েছে বটে কিন্তু তােমার duty
( কৰ্তব্য) সম্বন্ধে বন্ধুদের কিছু বলবার দাবীও ত’ আছে।
অন্ততঃ সাত বছর আগে তুমি যােডশবর্ষ প্রাপ্ত হয়েছ।
এখন তোমার বাপ-মাকে--
সরােজ উঠিয়া দাঁড়াইল। বাধা দিয়া বলিল—“শাসন করা
বা শিক্ষা দেওয়া, অথবা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করা
উচিত",—এইত বলতে চাও। কোন সভ্য দেশের কোন সভা
সমাজ এমন উপদেশ দিয়েছেন বলে ত জানি না। দিলেও আমার
তা’ পালন করবার মত Moral courage ( নৈতিক বল )
নেই ভাই, আমাকে মাপ করাে-(পরে বিনয়ের প্রতি “বিনয়
আমি একবার তােমাদের বাড়ী যাব”—বলিয়াই সরােজ কক্ষ
ত্যাগ করিল। বিনয়ও উঠিল।
সরােজ শুনিতে পায় এমন সুরেই বীরেশ্বর বলিল—“আমাদের
সরােজবাবুর অত্যাচারের ideaটা (ধারণাটা) খুব জবর ।
১০টা মিনিট suspense-এ ( সন্দেহ-দোলায় ) রাখায় একটু
আগে উনিই না বলেছিলেন—সেটা তার প্রতি অন্যায় অত্যাচার।
১১২
শেষ খেয়া
আর এই কদৰ্য্য অমানুষী অত্যাচারগুলো নীরবে সহ্য করবে,
দেশের নির্দোষী কচি মেয়েগুলি আর শিক্ষিত নিলজ্জ ছেলেরা
পিতৃভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে খালা। অক্ষয়বীজ হে অক্ষয়ুবীজ
ও বীজ মরবার নয়, এরাই আবার ঐ বাপ বনবে।”
রজনী। Noa's Arc !
Well said (বেশ বলেচ ) বলিয়া সকলে কল হাস্যে ক্লাব
কাপাইয়া তুলিল।
নবীন বলিল—“এর মধ্যে একটু ভাববার কথা আছে।”
এইটুকু বলিতেই সকলে তাহার দিকে তাকাইল ।
নন্দ গলাটা একটু বাড়াইয়া করজোড়ে হাস্যোদ্দীপক বিনয়ে
কহিল—“নিবেদন করুন”
বীরু বলিল—“আমি জানি, দলের মধ্যে নবীনই আমাদের
গবেশ—গবেষণার দিকেই ওর ঝে। ভাববার কথা আছে
বৈ কি-সেটা বেশ করে ভেবে এস ত’ দাদা, কাল শােনা
যাবে। তুমি মুশড়ে যেও না যেন! এ subject ( বিষয় ) সহজে
ছাড়া হচ্ছেনা—একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।”
সেদিনকার মত সভা ভঙ্গ হইল।
রাত্রি ৮ টার সময় সােজ উপস্থিত হওয়ায় বিনয়ের মা
তাহার আসার কারণ বুঝিয়াই ছিলেন। তিনি সরােজের
প্রশ্নের উত্তরে তাহার বাপ-মার কোন কথা উল্লেখ না করিয়া
শেষ খেয়া
১১৩
দুই এক কথাতেই শেষ করিয়া দিলেন, এবং তাহার স্বাভাবিক
স্নেহ-মধুর সমবেদনা-পূর্ণ বচনে বলিলেন—“বাবা, ও-সব কোথায়
হয় ? তবে বৌমার আমার জ্ঞান হয়েছে বলেই ভাবনা
হয়,—সারাদিনই ভাবছি আর হরিকে ডাকছি। সে রূপ দেখলে
কারুর সাধ্য নেই—তাকে ভােলে, তার জন্যে না ভেবে থাকতে
পারে! আহা!”—বলিয়াই একটি নিশ্বাস ফেলিলেন।
পরে
বলিলেন—“একবার দেখবিনি ? কাল একবারটি দেখে আয়
বাবা, আজ ত’ আর উপায় নেই—রাত হয়ে গেছে; আজ গেলেই
কিন্তু ভাল ছিল।"
সরােজ মুখটাতে হাসি আনিবার চেষ্টা করিয়া বলিল—“কাল
কারুকে পাঠিয়ে খবর নিলে হবেনা। পিসিমা ?”
বিনয়ের মা বলিলেন—“ও আমার কপাল ! তাহলে আর
আমি এত করে তােমাকে যেতে বােলব কেন? জ্ঞান-হওয়া
মেয়ে না হলে, লােক পাঠিয়ে খবর নিলেই হত। এখন
স্বামীকে দেখলে, স্বামীর দুটো ভাল কথা শুনলে, তবেই সে
সামলাতে পারবে, তা ছাড়া তার আর অন্য ওষুধ নেই বাবা।
হরি যেন তাকে সইবার শক্তি দেন।”
সরােজ হতাশভাবে বলিল—“তুমি ত সবই জান পিসিমা—”
বিনয়ের মা বলিলেন-“জানি বাবা, কিন্তু এটা
নিরপরাধিনীর মান-প্রাণ দুইই নিয়ে কথা। তুমি যাও
রাত্তির হয়েছে, খেয়ে শুয়ে পড়’গে, কাল আমি দাদার।
কাছে যাব।”
৪
১১৪
শেষ খেয়া
সরােজ নীরবে বিদায় লইয়া ধীরে ধীরে বাড়ী ফিরিল।
মাতার ইঙ্গিতে বিনয় সঙ্গে গেল। কুব হইতে ফিরিবার সময়
একটা বিরুদ্ধ উত্তেজনা তাহাকে গতি দিয়াছিল। বিনয়দের
বাটী হইতে সে নির্জীবের মতই ফিরিল ।
সােজ বাড়ী গিয়া অল্প কথায় মাকে জানাইল তাহার শরীর
ভাল নয়, সে কিছু খাইবে না! এই বলিয়া বাহিরে তাহার পড়িবার
ঘরে আসিয়া নিরুপায়ের মত উৰ্দ্ধমুখ হইয়া, হাতপা ছাড়িয়া
চেয়ারে বসিয়া পড়িল। সে পড়িবার ঘরেই শয়ন করিত।
সরােজের কথা শুনিবামাত্রই তাহার মা তাহার অসুস্থতার
মূল আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছিলেন, কিন্তু আলােচনাটা সঙ্গত
ভাবেন নাই ; কারণ, কর্তা সেই দালানেই তখনাে আহ্নিকের
আসন ত্যাগ করেন নাই। সরােজ বাহিরে যাইবার পরক্ষণেই
কর্তা বলিলেন—“শরীর ভাল নয়—বল্লে না?”
গৃহিণী। তাইত’ বলে ।
কর্তা। ই-তুমি কি ঠাওরালে?
গৃহিণী। ছেলে যখন কলেজ থেকে এল—তখন ত বেশ
হাসিমুখ ছিল, এখন দেখলুম সে চেহারা নেই—
এ শুভানুধ্যায়ীদের কাজ,আমাদের চেয়ে তাদের
মাথা ব্যথাটা বেশী কি না।
কর্তা।
শেষ খেয়া ১১ গৃহিণী। ( নিশ্বাস ফেলিয়া । যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর ! কৰ্ত্তা। সে-সব চলবে না, ওকে খেতে বল। আমরা থাকতে ওর এত দুর্ভাবনা কিসের, ওর মাতব্বর হয়ে মাথা ধরান কেন, ওর ত বাপ-মা মরেনি—চেহারা বিগড়ােয় কেন ? গৃহিণী। যারা 'জ্যান্ত মানুষে পােকা পড়ান-তারা রটিয়েছেন কিনা—বােয়ের ফিট হয়েছিল, দাঁতকপাটি লেগে গিছলাে । বােলে না কি ? গৃহিণী। তুমি যে অবাক করলে দেখছি, এ সব কি আমাদের কানে শুনে জানতে হবে নাকি,-হয়ে মরিনি কেন ? কর্তা। না, ঐ যে ফিটের কথাটা—তাও- গৃহিণী। তুমি থামাে ত—ফিট না আমার মাথা ; এতে আছে কি, ও যেন আমি জানিনা। কথাটা কর্তাকে অনেককিছু স্মরণ করাইয়া দিল। তিনি প্রকাশ্যে বলিলেন-“তবে ও-ছোড়া খাবেনা কেন?” গৃহিণী। কি জানি বলল । কৰ্ত্তা ! না, না। পাচশাে টাকার কথা সে কখখনাে জানে , তা জানলে আর শরীর খারাপ হয় না-হতেই পারে না। আর যদি জেনে শুনে পাচ ভূতের কথায় কান দেয় ত সে আমার , ছেলেই নয় ;—এ কথা তুমি তাকে এক্ষুণি স্পষ্ট করে বলে দাও।
শেষ খেয়া গৃহিণী। ওটা তুমিই কর্তা। না না,আমার এখন ঢের দেরি,আমি কি আসন ছাড়তে পারি, আসল স্তোত্রগুলােই বাকি।আর দেরী, ছেলে আমি বিগডুতে দেব না—তা বলে দিচ্চি । গৃহিণী। আমিও ত’ তাই চাচ্চি। কৰ্ত্তা। কই চাচ্চো, ও হারামজাদা তবে কিসের জোরে বলে খাবনা। কচি থােকা ত’ নয় যে হুটু বলতে পাচশ টাকা লােকসান করে দেবে ! বােলোমােহন্তেও একটা পয়সা ছাড়ে না । তারাতত নির্বোধ নন। কচি ছেলের চুল দিতে যাও, সেলামীর এক পয়সা কম নি দিকি। ছেলে খিদেয় ককিয়ে মরচে মরু আগে তাদের পেট কড়ায় গণ্ডায় ভরানাে চাই। কম পড়ে, ভিক্ষে করে—না হয় ছেলের মাদুলী বেচে পুরাে করো। দেবতার দরবারে আর সাধুর কারবারে ‘দুগাছা চুল দিতেই এই! আর মানুষের সংসারে একটা জ্যান্তো পরের মেয়ে ফঁাকিদে ঢুকিয়ে দে যাবে ! মােহন্তদের চেয়ে আমরা বড় হয়েছি নাকি? পাজি কি বলে, আমি এক্ষুণি শুনতে চাই ; বুঝলে ? গৃহিণী। আমি ত’ সব বুঝচি—তবে কি না- কৰ্ত্তা। তবে’—আবার কি? এর ভেতর ‘তবে’টা কি আছে ! দেখচি আমাকেই উঠতে হল- গৃহিণী। তাই ভাল, চল দুজনেই যাই- কৰ্ত্তা। না,-উঠলে আমি একাই যাব, বিরূপাক্ষ মুখুয্যে যা করবে তা নিজেই করবে, তখন কিন্তু
শেষ খেয়া
ودد
গৃহিণী “তােমায় উঠতে হবে না, আমিই যাচ্চি” বলিয়া
একপদ অগ্রসর হইতেই, কর্তা বলিলেন—“আগে ভাল করে
শােননা, হঠাৎ যেন কিছু বােলে বােসো না”
গৃহিণী। তবে কি করতে যাব ?
কর্তা। তা বলে যা-তা বলতে যাবে নাকি ? কি বলবে
শুনি?
গৃহিণী।
যেমন আসবে বােলব’-
কর্তা। তােমায় যেতে হবে না।
গৃহিণী। বেশ ! তার পর ?
কর্তা। এখন বিরক্ত কেরােনা,-এত তাড়াতাড়িই বা কি,
বগুলাে আগে শেষ করতে দাও।
গৃহিণী। ছেলেটা কিছু খেলেনা
কা। দেখ-রাগ বাড়িও,না, তাকে খেতেত’ কেউ বারণ
করেনি। একটা ছেলে নিয়ে ধৰ্মকৰ্ম্ম খােয়াতে হবে নাকি !
তিনি উচ্চকণ্ঠে অব আরম্ভ করিয়াদিলেন। কণ্ঠ কণ্ঠের
কাজ করিতে লাগিল, মন সাত-চাল ভাবিতে নিযুক্ত হইল !
গৃহিণী মুহুৰ্তকাল অপেক্ষা করিয়া হঠাৎ যেন কি মনে পড়ায
দ্রুতপদে রান্না ঘরে গিয়া ঢুকিলেন।
ফল কথা, সকালের কদৰ্য্য কাণ্ডটার পর উভয়েরই মন অন্তরে
অন্তরে একটা সাজা ভােগ করিতেছিল, তাই কাজটার ন্যায্যতা
সম্বন্ধে উভয়ের মধ্যেই সারাদিন জোর আস্ফালন চলিয়াছে।
বাঙ্গলা দেশের মধ্যে ব্রজবাবুর মত ছােট লােক যে আর দ্বিতীয়
।
১১৮
শেষ খেয়া
৫
নাই, তাহা শতবার ব্যক্ত
ব্যক্ত হইয়াছে ! পরের কথার মূল্য
নির্ধারণও হইয়া গিয়াছে কিন্তু নিজেদের রেহাই মেলে নাই ।
মনের পশ্চাতে আর একজন কে যেন সকাল-বেলাকার কুদৰ্য্য
অভিনয়টা, তপ্ত শলাকা দিয়া কেবলি আঁকিতেছিল । গলার
জোরে তাহা নড়ে না, চক্ষু বুজিলে তাহা মেটেনা, পাঁচশ টাকার
প্রলেপে তাহা ঢাকে না।
এই অবস্থায় সুস্থ সবল সরােজ যখন বাড়ী ফিরিয়া সহসা
বলিল তাহার শরীর ভাল নয়, সে কিছু খাইবে না এবং সরাসরি
বাহিরের ঘরে চলিয়া গেল, তখন মাতাকে ভয় ও অভিমান
এবং পিতাকে বােষ ও সঙ্কোচ আশ্রয় করে। তাই উপযুক্ত
পুত্রের সহিত চোখােচাখি কোন প্রশ্নের সহজ স্বাভাবিকতা
আজ তাহাদের ছিল না, পাছে পুত্রকে ঐ অপ্রিয় আলােচনার
সূত্র দেওয়া হয় এবং নিজেদের অধিকারে আঘাত আহ্বান করা
হয়।
আজ আর বিরূপাক্ষবাবুর স্তবের বিরাম ছিল না,সেই দ্রুত
ঘূর্ণীর মধ্যে যাহা আসিয়া পড়িতেছে, তাহাই পাঁচ-সাত পাক
খাইতেছে।
তাঁহার সদর-দরজার বাম পার্শ্বে একটি কঁঠাল গাছ ছিল,
তাহাতে ফল ধরিয়াছিল প্রচুর। তাহার একটিও না অন্যের
গর্ভে যায়, তাই গুড়ির গায়ে ফুটো ক্যানেস্তারার ২৩ সার মালা
ঝুলাইয়া, তাহার উপর বালার ডাল বাঁধিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া-
ছিলেন। কারণ তাহারা বাধা ও সংবাদ একই সঙ্গে দিতে সমর্থ ।
শেষ খেয়া ১১১ কিন্তু শৃগালের কোন এক অভিনব উপায়ে আজ একটি সুবৃহৎ, ও সুপক্ক ফলকে সহসা বৃন্তচ্যুত করায়, তাহা ক্যানেস্তারায় টক্কর খাইয়া সশব্দে ভূমে আসিয়া পড়ে। আসিয়া পড়ে। তাহাতে অন্যমনস্ক বাপ-মার হৃদপিণ্ড সজোরে দুলিয়া ওঠে। মাতা-“ওগাে সর্বনাশ হ’ল বুঝি” বলিতে বলিতে পাগলিনীর মত, আর মুখুয্যে মশাই “দুরী ছুরী-বঁটা—বঁটী” করিতে করিতে উন্মাদের মত ছুটিয়া গিয়া সরােজের পাঠাগারের মধ্যে ঢুকিয়া পড়েন। অবস্থাবিশেষে স্নেহ আর পাপ, একই আধারে অভিন্নভাবে থাকিয়া একই রূপ কাজ করে—একই পথে গতি দেয়। কৰ্ত্তা এতক্ষণ ঘােড়া গজ দাবা ঘাটিতে ঘাঁটিতে বসাইয়া যে-সব অব্যর্থ চাল মস্তিষ্ক মধ্যে সাজাইয়াছিলেন তাহা একদম ওলট পালট হইয়া যায়। আসন ত্যাগের অন্ধবেগ, কোশাখানাকে বাণের মুখে দড়িছেড়া পানসির মত সাতপাক খাওয়াইয়া দালানের একপ্রান্তে উপুড় করিয়া দেয়। বিরূপাক্ষবাবুর বরাবরই সূৰ্যোদয়ের আগে শয্যা ত্যাগ করা অভ্যাস। ঘণ্টাদেড়েক পূৰ্বে শয়ন করিলেও অভ্যাসবশতঃ আজও সে নিয়মের অন্যথা হইল না। জীবনে এই প্রথম পরাজয়ের চিহ্ন মুখে মাখিয়া এবং তার বেদনা বুকে করিয়া নয়নতারা উপুড় হইয়। নিদ্রা যাইতেছিলেন। সরােজ চেয়ারে উপবিষ্ট অবস্থায় টেবিলের উপর দুই হাতের মধ্যে মাথা রাখিয়া কখন্ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। টেবিলের এক ১২০ শেষ খেয়া পার্শ্বে এক থাল লুচি, বেগুণ-ভাজা, আলুর দম, এক বাটি দুধ আর এক গেলাস জল অনাদরে হত হইয়া পড়িতেছিল। যে কারণে বিরূপাক্ষবাবুর প্রত্যুষে উঠিবার অভ্যাসটি পাকা দাড়াইয়া গিয়াছিল, অসুস্থ অবস্থাতেও নিয়ম ভঙ্গ হইতে দিত না—সেটি বর্তমান থাকা সত্ত্বেও দিনের আসন্ন প্রকাশ আজ তাঁহাকে সহসা সে কাজে বাধা দিল। মাঝি-মাল্লারা তার কাছে আবশ্যক মত দশ-পাচ টাকা চোটা সুদে কর্জ পাইত ও লইত। তাই তিনি প্রত্যহ প্রত্যুষে দাঁতন করিতে করিতে গঙ্গা-তীরে উপস্থিত হইয়া বেশ সহজ ভাবেই নিজের অবশ্য-প্রাপ্য হিসাবে তাহাদের ডিঙ্গী হইতে টাটকা সেরা সেরা মাছগুলি স্বহস্তে তুলিয়া লইয়া বাড়ী ফিরিতেন। গত কল্যকার ব্যাপারে মালারাই নাকি বড় বেশী ক্ষুব্ধ হইয়াছিল ও অপর পক্ষকে নানাপ্রকারে সান্ত্বনা ও সাহায্য করিয়াছিল,-মেয়েরা অশ্রু মােচন করিয়াছিল। দিনের আলো রাত্রের বিপদ বিপন্নতাকে হাল্কা করিয়া যেমন মানুষের মনে উৎসাহ উদ্যম, শক্তি সাহস আনিয়া দেয়, তেমনি তাহার লজ্জা-সঙ্কোচকেও বাড়ায়। মালাদের কাছে মাছ আদায় করিতে যাইতে আজ তাহার পা উঠিল না। তিনি বহির্বাটীর ভিতরের দিকের বারাণ্ডায় দাঁতন লইয়া পদচারণা করিতে লাগিলেন। অভুক্ত লুচির থালার উপর যতই তাহার নজর পড়িতে লাগিল ততই তিনি ভাবিতে লাগিলেন। রাত্রের ভাবনা চিন্তার মধ্যে যে একটা আশঙ্কা তাহার সমস্ত প্রকৃতিটাকে আচ্ছন্ন ও
শেষ খেয়া
১২১
অবসন্ন করিয়া রাখিয়াছিল, দিবালােকে সেটা সরিয়া গেল।
তিনি মনে মনে আবৃত্তি করিতে লাগিলেন—“রাত্রে কি আমাকে
ভূতে পেয়েছিল ? ওর মা শেষ বলে কি না—তাদের ধম্ম
তাদের কাছে—আমাদের হকের টাকা হয়—পাবই। আমিও
তাই বুঝে গেলুম ! দুনিয়ার লােকগুলাে হাতে টাকা গুজে
দেবার জন্যে ছুটোছুটি করূচে-ধম্ম হবে বলে ! টাকা আবার
হকের অহক্কের কি ? কোনটাই পউনে যােল আনার নয়,
এতেও ষােল আনা, ওতেও যােল আনা। তায় এক টাকা
দু টাকা নয়—পাচ-পাচশো টাকা,—পাগল আর কি ! বিরূপাক্ষ
মুখুয্যের আজো এত বড় মতিচ্ছন্ন ঘটেনি। আর যে-ছেলে
একবার মুখ ভার কবলে পাঁচশাে টাকা উড়ে যায়—সে ত ছেলে
নয়—শনি! ওর মা একবার উঠুন,
ওর মা একবার উঠুন, আমি এখুনি এর হেস্তনেস্ত
কোরব।" ইত্যাদি
সরােজের মা ইতিমধ্যে উঠিয়া, সরােজের ঘরে উকি মারিয়া
বড় একটা নিশ্বাস বুকে চাপিয়া ফিরিয়া গিয়াছিলেন, কৰ্ত্ত৷
তাহ লক্ষ্যই করেন নাই। মাতার সযত্ন-প্রস্তুত খাদ্যাদি সরােজ
স্পর্শও করে নাই, সে একটু কিছু ত মুখে দিতে পারিত !
দুধটা খাইলে তার কোন অনিষ্ট হইত? এই অভিমানের
আঘাতটা মার প্রাণে একটা কঠিন মােচড় দিয়া তঁার চক্ষের
জল বাহির করিয়া দিল। তিনি দালানেই বসিয়া পড়িলেন।
সরােজ বরাবরই মা-বাপের খুবই বাধ্য—এমন কি বন্ধু-
মহলে এটা তার দুর্নামের মধ্যেই দাঁড়াইয়াছিল। বন্ধুবান্ধবদের
।
२२ শেষ খেয়া ; গত রাত্রের কথাগুলা অতিরঞ্জিত রহস্য ভাবিয়া সে বিরক্ত হইয়াছিল, এবং ব্যথাও বােধ করিয়াছিল; কিন্তু বিশ্বাস করিতে পারে নাই। তবু একটা অনিশ্চিত সম্ভাবনার ভয় তাহাকে বিনয়ের মার কাছে টানিয়া লইয়া যায়। বিনয়ের মা সবরাজের আপন পিসি এবং সােজকে পুত্ৰাধিক ভালবাসেন। তিনি কথা বাড়িতে না দিয়া দু' এক কথার পরই যখন “বউমার জ্ঞান হয়েছে বলেই ভয় হয় ;-কাল একবার তুই নিজে গিয়ে দেখে আয়না বাবা,—এটা যে নিরপরাধিনীর মান-প্রাণ দুই নিয়েই কথা,স্বামীকে পেলে মেয়েমানুষে সব কিছু সইতে সামলাতে পারে,”—ইত্যাদি বলিয়া শেষ করেন- বিশ্বটা তখন সবরাজের চতুর্দিকে দ্রুত ঘুরিতে থাকে । অসাড় দেহ-মন লইয়া বিনয়ের সাহায্যে বাড়ী ফিরিয়া আসে। বাপ-মা-সম্বন্ধে কোন ভাবই তাহার মনে উদয় হয় নাই। সে অবস্থাই তাহার ছিল না। (म * ঝিকে আসিতে দেখিয়া নয়নতারা তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া বলিলেন-“তাের যে আজ এত দেরি ?” ঝি বলিল,-“দোর খােলা পেলে তাে আমি তাে কখন এসেছি। আজ বুঝি গঙ্গাচানে যাও নি? তা ভালই করেছ মা।” নয়নতারা। কেন রে মল্লিকে ? মল্লিকে। রাস্তায় ঘাটে আমারই কান পাতবার যাে নেই, আসতে কি পারি,—যে করে এসেছি।
শেষ খেয়া
নয়নতারা। কারুর ধার করে খেয়েচি নাকি,-কে কি বলে ,
শুনি ?
০
মল্লিকে। সে আর আমার মুখে শুনবে কি—সেই কালকের
সব কাণ্ড! আমি আজ আর বাজারে যেতে পারবনা মা।
সবাই বলে—কে আগে মেরেছিল বল ত’ মল্লিকে--কৰ্ত্তা না
গিন্নি? যত বলি,আমি তা দেখিনি, কেউ বিশ্বেস করে না।
বলে, বউ যদি না বঁচে-তখন আদালতে ঐ কথা বলে মজ।
দেখি। শুনে আমার ত ভয়ে গা কাপচে !
নয়নতারার প্রচণ্ড রােষ সশব্দে ফাটিয়া বাহির হইবার
সীমায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল, কিন্তু আদালতের উল্লেখে
তাহা সহসা অন্তমুখী হইয়া গুমরিতে লাগিল । নয়নতারা রুদ্ধ
রােষে বলিলেন,—“তুই যে বড় বলেচিস—‘আমি তা দেখিনি,
তবে কি আমরা মরেছিলুম নাকি ?
মল্লিকে। সে তােমরাই জান মা, আমি দেখিনি তাই
বলেছি। আমার ওপর রাগ কর কেন?
নয়নতারা। কেন, তােমার পােড়ার মুখ থেকে একথা
বেরুলে কি মিছে কথা বলা হত যে, “মারলে আবার কে,
মারবে কেন ? ও-সব ধাড়ি মেয়ের অনেক ঢলানেপন
০
মল্লিকা তাড়াতাড়ি জিভ কাটিয়া বলিল—“ওমা চুপ কর,-
অমন লক্ষ্মীকে এমন কথা বললে সঙ্গে সঙ্গেই আমার জিভ খসে
পােড়ত।”
১২৪
শেষ খেয়া
নয়নতারা। বটে! এত । তা বেশ, তাের যা ইচ্ছে
বগে যানা, আমার ভয়টা কাকে, কে আমার কি করবে
করুক না।
মল্লিকে। আমাদের ছােট লােকের ঘরে কেউ মাথা উচ
করে অমন কথা বলে পার পায় না মা। তা হলে আজ আমার
এ দুর্দশা হবে কেন। আমি আর কি অপরাধটা করেছিলাম।
হরি মাইতি এসে বলে—“নলিকে একটা পান খাওয়াতে পারিস,
বড় গাটা কেমন করছে। আমি তাড়াতাড়ি একটা পান সেজে
তার হাতে দিলুম। সে পান খেতে খেতে বলে গেল—“কি পানই
খাওয়ালি মল্লিকে—মুখটা জুড়িয়ে গেল।” সত্যি এই তােমার
পায়ে হাত দে বচি—সে দাওয়ার ওপরও ওঠেনি। পী
গয়লানী গরু খুঁজতে এসে নাকি মাইতির কথা শুনে গিছলাে।
তার পর সে কি ঘোঁটকি পঞ্চায়েৎ ! কই আমার কথা কেউ
শুনূলে ? দণ্ড দিয়েও আমি সেথায় আর মুখ দেখাতে পারলুম
কি? সেখানে ত আমার কিছুর অভাব নেই, তবে সব ছেড়ে
এত দূরে দাসীবৃত্তি করূতে এসেছি কেন ? সমাজ থাকলে,
মােড়ল থাকলে—“ভয় করি না” কেউ বলুক দিকি, বলতে আর
হয় না।
একটা কিছু পাইলে, নয়নতারা যতক্ষণ না তাহার সদ্ব্যবহার
করিতে পারিতেন, ততক্ষণ তাহার স্বস্তি থাকিত না ; ভাল
কথাকেও তিনি অস্ত্র হিসাবে প্রয়ােগ করিবার ক্ষমতা রাখিতেন ।
দোষী অপরের দোষ উল্লেখ করিয়া যেমন সুখানুভবের চেষ্টা
শেষ খেয়া গয় সেই হিসাবে, আর—“আমি ত দেখিনি" বলার প্রতিশােধ লােভে নয়নতারা বলিয়া ফেলিলেন-“কাজটি ত' বাছা ভাল কর নি, ও বদনামের চেয়ে মেয়েমানুষের মরাই ভাল—” মল্লিকের জয়নগরে বাড়ী, সে সদৃগােপের মেয়ে। ছেলে বেলা মেয়ে ইস্কুলে “আখ্যানমঞ্জরী” ধরেছিল। তাই নির্দোষী ল্লিকে দোষী নয়নতারার মুখে এই উপদেশের খোঁচা সহিতে রিল না। বলিল—“আর তুমি যা কাল দেখিয়েছ মা, তাতে তােমায় অমর করে রাখবে,তােমাদের ভদ্দর-সমাজে মানুষ থাকলে আজ--" পূৰ্ব্ব হইতেই নয়নতারার মধ্যে অগ্ন্যুৎপাতের আয়ােজন চলিতেছিল, তিনি এতক্ষণ তাহাতে নিজেই দগ্ধ হইতেছিলেন, করিয়া জ্বলিয়া উঠিলেন। তার বড় বড় ভাটার মত চক্ষু দুটি যাহাবিরূপক্ষের, অক্ষিদ্বয়কে চিরদিনই অবনত থাকিতে বাধ্য করিয়াছে, এবং গত রাত্রেও যাহা স্ত্রীপুরুষের মধ্যে পরস্পরের উপর পরস্পরের সতর্ক দোষারােপ-সংগ্রামে নয়নতারাকে বিশেষ সাহায্য করিয়াছে, সেই প্রদীপ্ত ভীষণ অস্ত্র দুইটি উদ্যত করিয়া যখন তিনি তীরবেগে উঠিয়া বলিলেন-“কী -কি বল্লি তুই ?” পুরী মধ্যে সহসা যেন বজ্রপাত হইল, মল্লিকা সভয়ে সাত হাত সরিয়া দাড়াইল । কৰ্তা সেই বজ্রধ্বনি ঢাকিবার জন্য সমুচ্চকণ্ঠে “ঝি-বার- বাড়ীতে কি আজ ঝাঁট পড়বে না” বলিতে বলিতে ছুটিয়া আসিলেন। মল্লিকা বহির্বাটির দিকে দ্রুত প্রস্থান করিয়া বাঁচিল। এইবার দপ,
শেষ খেয়া
নয়নতারার এই প্রচণ্ড রােষ যদি অবিমিশ্র হইত, তাহার
পশ্চাতে নিজের দোষাংশ, অভিমান, অপমান না থাকিত, তাহা
হইলে সে আজ কাহাকেও দগ্ধ না করিয়া প্রতিনিবৃত্ত হইতে
পারিত না। স্বামীকে সম্মুখে পাইয়া অভিমানে, অপমানে, রােষে,
ক্ষোভে নয়নতারা কঁদিয়া ফেলিলেন—“কার আমি কি করেছি
যে দাসী বাদীতেও আমাকে শাসাবে ; দেশের লােককে ভয়
করে বাস করতে হবে,তাদের খাই, না পরি। আমাদের কথা
নিয়ে তাদের এত মাথা-ব্যথা কিসের গা,-তারা আমার কে?
যার যা ইচ্ছে বলবে কেন? গরীবের ভাল করে, আমরা হলুম
দুষী,শেষ,—ছেলে পৰ্য্যন্ত কি না, আমার হাতের খাবার
ছুলে না!” ইত্যাদি বলিয়া তিনি আহত-দর্পের অব্যক্ত বেদনায়
কাদিতে লাগিলেন।
বিরূপাক্ষবাবু বিচক্ষণ লােক, আসল কথাটা আর অবস্থাটা
বুঝিতে তার মুহূর্ত বিলম্বও হইল না। তিনি বলিলেন,-
“এ কি, তুমিও যে পাগল হলে দেখচি। পরের কথায় কান
দিয়ে নিজের লােকসান আর নিজের মন খারাপ করবার মত
বুদ্ধি ত তােমার ছিল না ;-তাহলে আর এ বিষয় সম্পত্তি
করতে পারতুম না,রাখতেও পারতুম না।
এ কথাটা আর
কেউ বুঝুক না বুঝুক, আমি তাে বুঝি। পরের সঙ্গে ত’
আমাদের ঘর করতে হবে না,তারা কে ? আর কলিকালে
ভাল করলে যে দুষী হতে হবে, এ তােত শাস্ত্র-বাক্যশাস্ত্র কি
মিথ্যে হয় কখন। তাই কত সাবধানে ওদিকটা এড়িয়ে চলি তা
-
শেষ খেয়া
১২৭
ত’ দেখেচ। জীবনে ঐ একটা ভুল হয়ে গিছলাে, যাক—তুমি
দেখ না—সব সামলে নিচ্ছি। এখন কি ঝি মাগিকে ঘাটাতে
আছে ? দশটা দিন চেপে যাও, সক্কলের বিষ দাত না ভাঙ্গি ত’
আমি বিরূপাক্ষই নই।”
এই সময় বিনয়ের মার কণ্ঠস্বর শুনা গেল—“বৌদি কোথায়
গাে?” নয়নতারা তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া-“এই যে—এস
ঠাকুরঝি”—বলিতেই তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সম্মুখে
বিরূপাক্ষবাবুকে দেখিতে পাইয়া বলিলেন-“দাদা, বেই মশাই
এসেছেন, বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।” এই অপ্রত্যাশিত কথাটায়
একটা শঙ্কা যেন উভয়কেই থতমৃত খাওয়াইয়া দিল। সম্পূর্ণ
বিশ্বাস করিতে না পারিয়া বিরূপাক্ষবাবু বলিলেন-“আঁ,-
কে বেই? বিনয়ের শ্বশুর ?” নয়নতারার মুখ ফ্যাকাসে হইয়া
গিয়াছিল, তাহার কথা ফুটিতেছিল না।
বিনয়ের মা বলিলেন-“তুমি কিগাে দাদা,—তিনি ত’ আজ
তিন বছর হল মারা গেছেন নেমন্তন্ন রেখে এলে ? সরােজের
শওর এসেছেন।”
“ওঃ—তা এত সকালে ? কেন বল দিকি ?” বলিয়া বিরূপাক্ষ
চিন্তাকুল-আগ্রহে রুদ্ধশ্বাসে ভগ্নীর মুখের উপর স্থিরদৃষ্টে চাহিয়া
রহিলেন! বােধ হয় মনে মনে দুর্গানামও করিতে লাগিলেন
১২৮
শেষ খেয়া
বিনয়ের মা ভাবটি বুঝিয়া, আশ্বাসের স্বরে বলিলেন-“না-
এমন কিছু নয়, তবে বউমার এখনাে সেই ভাবই রয়েছে,
মাঝে মাঝে জ্ঞান হচ্ছে, আবার সেই রকম হয়ে যাচ্ছেন।
ডাক্তাররা তিনবার হাত ফুড়ে ওষুধ দিয়েছে, আর বলেচে-এ
সময় স্বামীর আসা খুব দরকার, তাকে দেখলে, তিনি দুটো ভাল
কথা কইলে, সহজে সামলে যেতে পারেন। ওষুধে কি করবে !
তাই ব্রাহ্মণ ছুটে এসেছেন। বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন—ডাকতে
পারছিলেন না। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন জানি না, ভাগ্যে
আমি বিনুকে সঙ্গে করে এসে পড়লুম।”
নয়নতারা এতক্ষণে একটু সামলাইয়াছিলেন—তিনি বলি-
লেন—“তা—সেত’ যেতে পারবে না, তার নিজের শরীরই ভাল
নয়, রাতে এক ফোটা জল পৰ্য্যন্ত মুখে দেয়নি, যেমন দিয়েছিলুম
সব তেমনি পড়ে আছে, তাকে কি যেতে দেওয়া যায়।”
বিরূপাক্ষ অন্যমনস্কভাবে বলিলেন-“তা কখনাে কি হয়?”
বিনয়ের ম; বলিলেন—“কাল যখন সে ক্লব থেকে এলাে,
তাকে দেখেই বুঝেছিলুম, তার শরীর ভাল নয়। এমন মলিন,
এত উদাস ত’ তাকে কখন দেখিনি,তার অবস্থা দেখে, একা
পাঠিয়ে দিতে ভরসা হলনা, বিনুকে তাই সঙ্গে দিছলুম। সারা
রাত্তির দুর্ভাবনায় কাটিয়েছি, তাইত’ সকালে ছুটে এসেছি, সে
কোথায়?”
সে প্রশ্নে কান না দিয়া নয়নতারা বলিলেন—“তবে আবার
যাবার কথা উঠছে কেন? আমার ছেলে আগে না বউ আগে ?
শেষ খেয়া ১২৯ যখন নিজের চোখে দেখেছিলে তখন সেটা মিনসেকে বলে দিলেই ত’ হত !” বিনয়ের মা একটু বিরক্ত হইয়াই উত্তর দিলেন-“শুধু তােমর কাছেই ছেলে আগে নয় বউ, তাদের কাছেও জামাই আগে তা জেনাে। আর, আমি ত’ পাগল হইনি যে ঐ কথা বেইমানুষের কাছে বলতে যাব।-ও ত আর শরীরের অসুখ নয়, মনের অসুখ, মর্মান্তিক কিছু না লাগলে ছেলে এক মুহূর্তে অত কাহিল- অত অবশ হয়ে পড়ে না।” সয়ােজের পিসি শচী দেবী বাপ-মার বড় আদরের মেয়ে ছিলেন। সকলের ছােট বলে তার আবদার অনুরােধ কখন অবহেলা পায় নি। সুশিক্ষিত স্বামীর হাতেও পড়েছিলেন, ভাগ্যদোষে আজ বিধবা। প্রকৃতিতে আকাশ পাতাল প্রভেদ থাকায় বরাবরই নয়নতারার সঙ্গে তার বনে নাই, তাই ডাকিলে বা নিতান্ত আবশ্যক না হইলে, এ বাড়ীতে তিনি আসিতেন না। সরােজ কিন্তু প্রতিদিন পিসিমার কাছে একবার না গিয়া, তার হাতের দেওয়া কিছু না খাইয়া, থাকিতে পারিত না। এটা তার আন্তরিক ভালবাসার আকর্ষণ। এই লইয়া অনেকবার বিরূপাক্ষ ও নয়নতারার মধ্যে অনেক আশঙ্কাজনক ভবিষ্যদ্বাণীর বিনিময় হইয়া গিয়াছে,—বিশেষ করিয়া সবরাজের বিবাহের পর। ছেলের মনের অসুখটা মা-বাপের মনের কাছে অস্পষ্ট ছিল না কিন্তু তাদের কাছে এই অপ্রিয় সত্যটা স্বীকার করায় যেন হীনতা ছিল,—সম্ভবত লােকসান ছিল। তাই 9
শেষ খেয়া
নয়নতারা স্বামীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন,-“আমার ছেলে এত
বেহায়া কবে থেকে হ’ল তা তাে জানি না। তবে ঠাকুরঝি যখন
বলছেন,—ওঁর তাে সকল বিদ্যেই আসে—মনের অসুখও ধরতে
পারেন!—কলিকালে তা হবে বইকি। আমাদের আর থাকা
কেন!” বলিয়া স্বামীর মুখের উপর চাহিলেন।
বিরূপাক্ষবাবু বড় হইলেও শচীকে নে মনে ভয় করিতেন,
কারণ, শচী দেবীর কাছে দুইটি মাত্র পথ ছিল,—হয় চুপ করিয়া
থাকা, না হয় সত্য বলা ; কোন মধ্য পথে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন
।
অথচ এই সত্য কথাটা, কি বিরূপাক্ষ, কি নয়নতারা,
কাহারও নিকট রুচিকর হইত না।
বিরূপাক্ষবাবু নয়নতারার শেষ কথাটি “আমাদের আর
থাকা কেন!” ধরিয়া বলিলেন-“তা বটে,—পড়বার বয়সেই
ছেলে যদি বউয়ের ভাল-মন্দ ভেবে অজ্ঞান হয়, তার মনের অসুখ
জন্মাতে শুরু হয়, তা হলে তাই বটে। কিন্তু আমরা তাে
আজো মরিনি,ওকে এ ভাবনার ভার দিলে কে ?”
নয়নতারা গম্ভীরভাবে উচ্চারণ করিলেন—“অবিশ্যি ভাল
গুরু মিলে থাকবে।”
শচীর গায়ে কে যেন অগ্নিবৃষ্টি করিল। দাঁতে দাঁত চাপিয়া
তিনি সেটা সামলাইয়া লইলেন ; উত্তাপটা নিশ্বাসের সহিত
বাহির করিয়া দিয়া স্থির দৃঢ়কণ্ঠে
বলিলেন—“দেখ বউ,
তােমরাও ১২ বছরের ছেলেটির বে দাওনি, তারাও আট বছরের
গৌরীদান করেন নি যে উভয়ের সম্পর্কটা বােঝতে গুরুর
৩
শেষ খেয়া ১৩১ চলছিল। দরকার ছিল, আর তাদের মনের কাজটা বাপ-মার মন দিয়ে ' এত বড় জোর দেবতার আছে কিনা জানি না যে ২৪ বছরের ছেলের আর ১৭ বছরের মেয়ের মন আর মনের সুখ- দুঃখগুলাে চোখ বুজে অস্বীকার করতে পারেন। পেতল-কাসার বাসনগুলােও আঘাত পেলে কেঁপে ঝন্ ঝন্ করে সাড়া দিয়ে ওঠে। শুধু বাপ-মা হবার দাবীর জোরে ছেলের মনের অসুখ দাবিয়ে রাখা যায় না বউ ; চুপ করে থাকাটাই স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। পেছন ফিরলেই পেছনের জিনিষগুলাে উড়ে যায় না, বরং সেই দিকটা থেকেই বিপদের আশঙ্কা বেশী থাকে। বিরূপাক্ষবাবুর মাথাটা রাগে রি রি করিতেছিল কিন্তু দুর্বল পক্ষের আত্মসমর্থনে যতটা চীংকারের দরকার, আজিকার অবস্থা ও আসর ততটার মত খােলসা ছিল না ; বিশেষত পরিবারের পক্ষ সমর্থনে। নয়নতারা কিন্তু এ কাজটিতে, কখন কাহার মুখাপেক্ষী ছিলেন না, তিনি ঝঙ্কার দিয়া উঠিলেন— “সাত সকালে কোমর বেঁধে শাপ দিতে এলে নাকি—তােমাকে ত’ কেউ ডেকে পাঠায় নি।” শচী ধীরভাবেই বলিলেন—“আমার বাপের বাড়ীতে আমায় আবার ডেকে পাঠাতে হবে কেন ? কই কালকের কাণ্ডটা আমার মুখটা বাদ দিয়ে কাজ করেছে কি ? এটা আমার বাপের ভিটে যে। যা—এখন যাতে ব্যাপারটা আর বাড়বার পথ না পায়, ভগবান করেন বউয়ের ভাল মন্দ না ঘটে—ভালয় ভালয় , সব মিটে যায় সেই অনুরােধ করতে এসেছি।”
শেষ খেয়া
বিরূপাক্ষবাবু এতক্ষণ কিছু বলিতে না পাইয়া বড়ই অস্বস্তি
বােধ করিতেছিলেন। তিনি বলিলেন—“এসে পৰ্যন্ত ত’
শাসাচ্ছিস আর বুড়ােমি কচ্ছিস, মেটাবার কৰ্ত্তা কি আমরা
যে আমাদের কাছেই অনুরােধের মাথাব্যথাটা তাের এত
বেশী
শিবপূজার ফলে, স্বামি-স্ত্রী যে অভিন্ন, বিবাহের পরই
নয়নতারা তাহার প্রমাণ পাইয়াছিলেন, কিন্তু কখন কখন রাগের
মাথায় বিস্মৃতি আসিয়া পড়িত। তিনি সােৎসাহে বলিলেন--
“দ্যাখনা,আমাদের ফাসি দেবে নাকি!”
শচী পূৰ্ব্ববৎ স্থির থাকিয়াই বলিলেন—“উলটো বােঝে
কেন বউ, এখন একটা ছুতাে ধরে ঝগড়ায় দিনটে ভাল কাবার
উপায় করে নেবার সময় নেই। ফাসির কথা ত’ কেউ বলেনি।
আর সেটা ত’ বড় কথাও নয়—তাতে ত সব জ্বালা সব
অশান্তিকে ফাকি দিতে পারি। এর পেছনে যে তার চেয়ে বড়
কথা রয়েছে। আমাদের বউমাও ত’ আজো বাপ-মার
অধিকারের অসহায় জিনিষ, সে ত’ নিজের ইচ্ছেয় কাল আসেনি,
কিন্তু নিরপরাধিনী অপমানের যে আঘাত নিয়ে ফিরেচে, স্বামীর
সাহায্য ছাড়া সে কিছুতেই তা সামলাতে পারবে না, এ তােমরা
বেশ জেনাে। তাকে পরের মেয়ে ভাবলেই ত’ মন ছুটি পায়
না-সে যে আমাদের সরােজের বউ! তােমাদের পায় পড়ি-
জ্ঞানবান ছেলের জন্মটা মাটি করে দিও না। ভগবান আমাদের
সবাইকে যেন সে সাজা থেকে রক্ষা করেন।”
শেষ খেয়া
১৩৩
বিরূপাক্ষবাবু বিরক্তি ভাব দেখাইয়া বলিলেন-“তাের ত’
নিজের কথাই সাতকাহন দেখচি, আমি যা বল্লুম সেটা কি
কথা নয়?”
নয়নতারা বলিলেন-“সেটা ত’ ওর কাছে বাজে কথা গাে।”
শচী বলিলেন—“ভয় নেই বউ-আমার কাছে বাজে হলেও
তাতে তােমার কাজে কিছু ক্ষতি হবে না, তুমি নিশ্চিন্ত হও।
তবে একটা কথা মনে রেখ বউটাকাটা প্রাণের চেয়েও বড়
নয়, মনের চেয়েও বড় নয়—আর মানুষের চেয়ে ত নয়ই।
মেটাবার কৰ্ত্তা বেইকে না করেও ত’ মিটতে পারত, তােমাদের
মেটাবার রাস্তায় ত’ কেউ বেড়া দেয়নি,আর তাতে
মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না।"
নয়নতারা তীব্র উপহাসচ্ছলে বলিলেন-“শুনলে আপনার
ললাকের কথা,—এমন না হলে আপনার লােক!”
বিরূপাক্ষবাবু মুখখানা বিকৃত করিয়া, কণ্ঠে কর্কশ কিছু
যােজনা করিবার মুখেই শচী বলিলেন—“ও-সব কিছুই দরকার
হবে না দাদা,—এতে রাগের কথা নেই। এখন টাকাগুলাে
গুণে নাওগে,-নােটগুলাে ভাল করে দেখেশুনে নিও। তিনি
ছটফট করছেন, এই ১০ টার গাড়ীতে তাকে ফিরতেই হবে।”
বিরূপাক্ষবাবুর যেন ভ্যাবাচ্যাকা লাগিয়া গেল। তিনি এক
মুহূর্তে অস্বাভাবিক মূর্তিটা সামলাইয়া স্বাভাবিক রাগত ভাবে
অপলক চক্ষেবলিলেন,-“দ্যা শচী, তাের আস্পর্ধা খুবই বেড়েছে
দেখছি, তুই আমার সঙ্গে মিছে কথা কয়ে ঠাট্টা আরম্ভ করেছিস?”
০
১৩৪ শেষ খেয়া সে চক্ষু দেখিলে অন্য সময়ে শচী বােধ হয় ভয় পাইতেন, আজ কেবল মৃদু-হাস্যে বলিলেন-“আমাকে কখন মিছে কথা কইতে শুনেছ দাদা!” তার কথাগুলি এত স্বাভাবিক ও এত সুমিষ্ট শুনাইল যে, বিরূপাক্ষ দুইদিন পূর্বে যে অবস্থায় ছিলেন সহসা সেই অবস্থায় পৌছিয়া গেলেন। তিনি মােলায়েম ভাবে বলিলেন- “আগে বলিনি কেন? তুই ত’ কখন কথা বাড়াতে ভাল- বাসতিনি !” শচী মৃদুকণ্ঠে বলিলেন—“সরােজকে যে বৌয়ের কাছে পাঠাতেই হবে, তােমরা সে কথা যে বুঝেও বুঝতে চাইছিলে না। এ নারীহত্যের পাপ মাথায় করবার মিছে বল থাকলেও, সমাজের চাপ যে মাথা নুইয়ে দেবে।” বিরূপাক্ষবাবুর এতক্ষণে একটু হাসি দেখা দিল ; তিনি বলিলেন—“ওঃ তুই তাই ভাবছি বুঝি ! আমি তােক সে দিকটায় অভয় দিচ্ছি, আমাদের সমাজের সব মুখই পােড়া!” শচী। আমি ভদ্রসমাজের কথা বলছিনা দাদা, লােক- সমাজের কথাই বলছি, যাতে, যাদের আমরা ঘােটলােক বলি তাদের সংখ্যাই বেশী, আর যাদের সঙ্গে আমাদের জীবন-যাত্রার সম্পর্ক, লৌকিকতার নয়, যাদের কাছে ছােট হলে আর কোথাও বড় হবার জায়গা থাকেনা, সাত মহল বাড়ীর মধ্যে 'টাকার গদিতে বসে—নিজের মনের কাছেও না।
শেষ খেয়া
১৩
বিরূপাক্ষবাবু বাজে কথা কখন গায়ে মাখেন না, তিনি অবাক
হইয়া শচীর মুখের প্রতি চাহিয়া শুনিতেছিলেন—তাহার একটু
চাঞ্চল্যও আসিয়াছিল।
নয়নতারার মনটাও ধীরে ধীরে মেঘমুক্ত হইয়া আসিয়াছিল,
তিনি স্বামীর দিকে চাহিয়া সহাস্যে বলিলেন-“বাসরে !
ঠাকুরঝিকে আজ বীর-বাতাস লেগেছে!”
বিরূপগবাবুও মুখে হাসি টানিয়া শচীকে লক্ষ্য করিয়া
বলিলেন-“তাইত, তাের মুখে ত’ এত কথা কখন শুনিনি, তুই
যে আজ পেক্ষায় বক্তা হয়ে এসেছিস দেখছি।”
শচী লজ্জায় চক্ষু অবনত করিয়া মৌনহাস্যে রহিলেন ও
বুঝিলেন উভয়েরি চিত্ত প্রসন্নতা লাভ করিয়াছে।
এই সময়ে মল্লিকে আসিয়া সংবাদ দিল—“বেইমশাই
দাড়িয়ে আছেন, আর মাঝে মাঝে নারায়ণ—নারায়ণ করছেন,
আহা, যেন পাগলের মত হয়ে গেছেন।”
“ওঃ আমি চলুম”—বলিয়া বিরূপাক্ষবাবু বহিৰ্বাটির দিকে
প্রস্থান করিলেন। শচী তাড়াতাড়ি বলিলেন-“আমি তবে
সরােজকে তয়ের হ’তে বলি।”—সে কথার কোন উত্তর
আসিলনা, সম্ভবতঃ কর্তার কানে গেলনা।
মল্লিকে একটু পূৰ্বেই আসিয়াছিল এবং অন্তরালে থাকিয়া
অনেক কথাই শুনিয়াছিল ও কিছু বলিবার জন্য উসখুস
করিতেছিল। কৰ্ত্তাকে বিদায় করিয়া দিয়া শচীর সন্নিকট
হইয়া চাপা স্বরে বলিল-“আহা দিদিঠাকরুণ, বামুনকে আর
শেষ খেয়া
১
কেন বধ করা, বাড়ী ঘর বন্ধক দিয়ে থাকবেন ! বাজারে ত’
চদা উঠছে দেখে এসেছি-
শচী অন্তরে শিহরিয়া উঠিলেন, ও তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করিলেন,
“কে চাঁদা তুলছে শুনি?”
মল্লিকে তেমনি চাপা গলায় বলিল—“এই দোকানী, মজুর,
মালা, কলের লােক—সবাই গাে—”
নয়নতারার মুখের উপর মুহূর্তে একটা ছায়া আসিয়া
পড়িয়াছিল। তিনি যেন সভয়ে জিজ্ঞাসা করিবেন—“কিসের চাঁদা
গা ঠাকুরঝি !”
মল্লিকেকে কথা কহিবার অবসর না দিয়া শচী সত্বর তাহার
মুখের উপর কুঞ্চিত দুই চক্ষু তুলিয়া বিরক্তিব্যঞ্জক স্বরে
বলিলেন—“তাের ত’ বড় বদ স্বভাব,-আমাদের কি কথা হচ্ছে
জানা নেই শােনা নেই, কথার মাঝখানে একটা অন্য কথা
কইতে এলি! এখন যা এখান থেকে।”
শেষ কথা কয়টি এমন তীব্র অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারিত হইল
যে, তাহাতে মল্লিকার মত ঝির পক্ষে তাহার উদ্দেশ্য ও অর্থ
বােধে বিলম্ব হইল না। সে আপন মনে বলিতে বলিতে
প্রস্থান করিল,—“মানুষ মেরে টাকাও চাই, ময্যেদাও চাই,
নমস্কার ভদ্দর লােকের পায়।”
নয়নতারা সন্দেহ ও ভয়মিশ্রিত আগ্রহে শচীর দিকে
চাহিতেই তিনি বলিলেন—“দ্যাখ না মাগীর আক্কেল, আমরা
নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে রয়েছি, তার মাঝখানে চঁাদার খবর
শেষ খেয়া
শচী।
ভাল লাগে কি ? সে ত আমি জানি বাজারে যখন বারােয়ারী,
চঁদা ত উঠবেই। মাগী পাগল নাকি।”
নয়নতারার মত তীক্ষবৃদ্ধির স্ত্রীলােকের এ-কথায় সম্পূর্ণ
সন্দেহভঞ্জনও যেমন অসম্ভব, তৃপিলাভও তেমনি সুদূর ছিল।
কিন্তু শচী এমনভাবে কথাগুলি প্রয়ােগ করিয়াছিলেন, যে, তিনি
আপাততঃ তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকিতে বাধ্য হইলেন ও বলিলেন--
“ওর বড় বড় হয়েছে দেখছি।
এখন কিছু বলে কাজ নেই দু’দিন যাক ।
লােকের মর্ম বুঝবে কি?” পরে আর ও-কথার পুনরালােচনার
সময় না দিয়া বলিলেন—“চল বউ, সরােজের আবার কি ভাব
সেটা দেখি।” এই বলিয়া অগ্রসর হইলেন। নয়নতারা যাইতে
যাইতে বলিলেন-“যদি যাওয়াই স্থির হয় ত না খেয়ে যাওয়া
হবে না কিন্তু।” শচী বলিলেন-“কিছু জল খেলেই হবে, শ্বশুর
বাড়ী খেয়ে গেলে চলবে কেন।”
সরােজ মায়ের বিছানায় আসিয়া শুইয়াছিল। উভয়ে
উপস্থিত হইতেই উঠিয়া পড়িল। তাহার চেহারা দেখিয়া
দুজনেই চমকিয়া উঠিলেন।
মল্লিকে সদর দরজা খুলিয়া দিলে বিনয়ের মা, বিনয় ও
তাহাদের পশ্চাতে ব্রজবাবু প্রবেশ করেন। দোরটা আর বন্ধ
করা হয় নাই।
শেষ খেয়া
করিল।
বীরেশ্বর ইতিপূৰ্বেই আসিয়াছিল, কিন্তু দ্বার রুদ্ধ দেখিয়া
ইন্দুকে ডাকিতে যায়। ফিরিয়া আসিয়া দ্বার উন্মুক্ত দেখিয়া
উভয়ে ঢুকিয়া পড়িল ও সরােজের পড়িবার ঘরে গিয়া প্রবেশ
এরূপ আসাটা তাহাদের আজ নূতন নয়। কিন্তু
সরােজ সেখানে ছিলনা, বিনয় আসিয়া তাহার বিনিদ্র বিষগ্ন
অবস্থা দেখিয়া, তাহাকে তাহার ঘরে লইয়া যায় এবং “এক।
ঘুমিয়ে সুস্থ হয়ে নাও—শ্বশুর মশাই এসেছেন—ঘণ্টা দুই পরে
শ্রীরামপুর যেতে হবে,—খবর ভাল,”—এই বলিয়া বাহিরে
ব্রজবাবুর নিকট চলিয়া আসে।
বীরেশ্বর আলমারী ইতে Peel's Essay on lappiness
বইখানা লইতে যাইতেছিল, এমন সময় লুচির থালায় নজর পড়ায়
ইন্দু বলিয়া উঠিল, “সরােজ রাত্রে কিছু খায়নি দেখছি।”
“কিসে বুঝলি” বলিয়া বীরু পশ্চাতে চাচ্ছিতেই প্রমাণ পাইয়া,
1)eo gratis ( ঈশ্বরকে ধন্যবাদ) বলিয়াই একখানা চেয়ার
টানিয়া লইয়া বলিয়া গেল,-বইখানা আলমারীর বাহিরে আর
আসিল না। ইন্দুকে একবার মাত্র “লেগে যা” বলিয়াই কাৰ্যার
করিয়া দিল।
ইন্দু কাজটা অনুমােদন করিতে পারিনা। বলিল—“সে
বােধ হয় মুখ-হাত ধুতে গেছে—এসে খেত।”
“ওরে নির্বোধ, তার মত বেলে মাছের পেটে এ বাসি
মাল সইত না, এ কাঠখােলায়-ভাজা, মাওয়া হজম করতে
কইমাছের জান্ চাই। দুধটো তুই খেয়ে ফ্যাল, ওটা খেয়ে
শেষ খেয়া
১৩৯
আর জাত দেবনা, ওটা অকেজো আদুরে অপচারদের খােরাক।
তুই খেতে পারি।”
ইন্দু বলিল—“কেন?”
বীরু বলিল-“তােরা কলকেতার ভিস-কলেজের
নারক্তে কার্তিক ; ময়দানবের শিবপুর কর্মশালায় আমার মত
লােহা পিলে এক সপ্তাতেই সাবাড় হয়ে যা।” এই বলিতে
বলিতে হাত ধুইয়া বলিল—“বাঃ কেয়া কেতাৰ! জ্যান্ত বই রে—
একদা হাতে হাতে Happiness, ছুতে তর সয় না,-একখানা
কিনতে হয়েছে।”
বারাণ্ডার অপর প্রান্তে কত্তার বৈঠকখানা ঘর। সেখান
হইতে তার কর্কশ কণ্ঠ উচ্চরবে উভয়কে উৎকৰ্ণ করিয়া দিল।
উভয়ে অবাক হইয়া মুখ চাওয়া-চাই করিল। পরে বীরেশ্বর
বলিল—“মহীরাবণের গলা না?. নিশ্চয়ই একটা নতুন কিছু
আছে, তানাত’ গলা আজ এত উচু পর্দায় ওঠ বার কথা ত
নয়,—ব্যাপারটা কি দ্যাখ দিকি।”
ইন্দু একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিল—“আমাদের এক পাচিলে
বাড়ী, অমনিতেই রক্ষে নেই, যদি দেখে ফ্যালেন তো”-
বীরু বলিল-“আরে মুখ খু বুঝচিস্ না—এযে শ্রোতা
সংগ্রহের সুর, লােক পাওয়াই ত উদ্দেশ্য,চ’ আমিও যাচ্ছি।
একেবারে সামনে গিয়ে পড়ার দরকার নেই।” এই বলিয়া উভয়ে
গিয়া বিরূপাক্ষের নজর এড়াইয়া জানালার বহিঃপার্শ্বে দাড়াইল।
দেখিল—ব্রজবাবু বিষন্নমুখে নিম্নদৃষ্টিতে অপরাধীর মত বসিয়া
১৪ শেষ খেয়া শুনিয়া যাইতেছেন, বিনয় তার পাশেই চুপচাপ বসিয়া আছে, কিন্তু তার মুখ দেখিলেই বােধ হয় যেন সরিয়া পড়িতে পারিলে সে বাঁচে। নিরীহ ব্রাহ্মণের প্রতি অন্যায় আর মিথ্যা অভিযােগ- গুলা তাহাকে লজ্জায় অতিষ্ঠ করিয়া তুলিতেছে। বাহিরে রাস্তার দিকেও লােকের নীরব অবস্থিতির আভাস পাওয়া যাইতেছে। প্রতিবেশী নবকুমার রায়, সাহেব-এটর্ণির বড়বার, নানাকারণে তার সঙ্গে বিরূপাক্ষবাবুর বসা-দাড়ানটা ছিল। বিরূপাক্ষবাবুর আওয়াজটা তাহাকেও আকর্ষণ করিয়াছিল। তিনি গড়গড়া- হাতে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন ও একটি কোণ অধিকার করিয়া ধীরে ধীরে ধে। ছাড়িতেছিলেন, আর অনুমােদনটা আদায়ের জন্য “কি বলহে,” “তুমি কি বল” প্রভৃতি বাক্য যখন তাহার উপর আসিয়া পড়িতেছিল, তখন মধ্যে মধ্যে—“তাত’ বটেই”—“তাত’ ঠিকই” বলিতেছিলেন। আজ বিরূপাক্ষবাবুর শাস্ত্রনিষ্ঠা, পঞ্জিকাপ্রীতি—আর হিন্দুত্বে ইস-শ্রোতাদের সত্য যুগের সামনাসামনি আনিয়া ফেলিয়াছিল। তিনি তখন বলিতেছেন-এই শুনতে পাই তুমি গোঁড়া হিন্দু, তার পরিচয় ত’ এই—পাজিখানাও দেখা আসে না! মঘা, অশ্লেষা, তেরস্পর্শ, দিশূল, এ গুলােত’ আজ কাল সাহেবরাও মানে, আর তুমি কিনা ঐ সব মাথায় করে অদিনে অক্ষণে কাল বউমাকে পাঠিয়েছিলে। আমার বাড়ীর লক্ষ্মীকে আমি শুভদিন দেখে আবাে, তােমার সাত-তাড়াতাড়ি এ শত্রুতা সাধা কেন? তুমি পারলে বটে, কিন্তু এত বড় বুকের পাটা শেষ খেয়া ১৪১ আমার ত’ নেই যে জেনে শুনে, হিন্দু হয়ে গ্রহ-দেবতাদের অবহেলা করি। এমন কুবুদ্ধি যেন না আসে।” এই বলিয়া তিনি, হাত জোড় করিয়া তিনবার কপালে ঠেকাইলেন এবং নাক-কাণ মলিলেন। পরে বলিলেন—“নল রাজার উপাখ্যানটাও পড়নি কি,—মেয়েরা জানে যে ! বল দিকি কি সর্বনাশটা ঘটিয়েছিলে ! আমি বলে তাই কর্তাদের পুণ্যে সামলাতে পেরেছি,তারাই বল দিছলেন ; তানা ত’ সে সঙ্গিন অবস্থায় আর কেউ পারুক দিকি;—সবাই ত’ হিন্দু কবলায়। একনিষ্ঠা চাই, মুখে হিন্দু বল্লেই হি দু হয় না। পাচ জনে এসব কথা বুঝবে কি ? তারা পরের বেলায় পঞ্চমুখ হতেই ভালবাসে, ভেতরের কথা কজন জানে ? তা’বলে মানুষের খাতির রাখতে গিয়ে দেবতার খাতিরকে তত খাটো করতে পারি না”-এই বলিয়া ডান্ হাতের অরে-মাদুলিটা কপালে ঠেকাইয়া বলিলেন- “এই নবগ্রহ-কবচই কাল রক্ষা করেছেন। আর কি সীতারাম রায় আছেন যে হিদুর সম্মান রাখবেন । কলিকাল—এখন যে শাস্ত্র মানে সেই দোষী, যে উপকার করে সেই অপরাধী!” “A veteran rogue” (পড় বদমাইস) বলিয়া বীরেশ্বর ইন্দুর কঁাধে একটা চাপ দিল ও বলিল—“শিখে রাখ !” বাহিরে বৃদ্ধ তারিণী ভট্টচায্যি এতক্ষণ গােপনে কাণ পাতিয়া দিনের খােরাক জোগাড় করিবার জন্য, সংবাদ সংগ্রহের প্রয়াস পাইতেছিলেন। আর থাকিতে পারিলেন না,-“গঙ্গদর্শন করে ফিরছিলুম-কাণে যেন সুধা যেন সুধা বর্ষণ হল,-কি কথাই ১৪২ শেষ খেয়া ; বলছিলে বাবা—জীবী হও; এ-সব শাস্ত্রবাক্য আর শুনতে পাওয়া যায় না, সে-সব দিন চলে গেছে। এখন গ্রহশান্তির পরামর্শ দিলে—সব হাসে; বলে, বেটার লােটবার ফন্দি,ঐ যা বল্লে বাবা,কলিকাল ! উচ্ছন্ন যাবে ।” এই বলিতে বলিতে ভিতরে আসিয়া ঢুকিলেন ! ব্রজবাবু অপরাধীর মত মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া শুনিতে- ছিলেন। বেলা বাড়িতেছে দেখিয়া অন্তরে তাহার চাঞ্চল্য উপস্থিত হইয়াছিল ; তাই মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে সসঙ্কোচে ও সবিনয়ে বললেন—“নারায়ণ জানেন বেই, আমার ওসব কোন চিন্তাই আসেনি, পরশু আপনার কাছে শুলুম, বে- ঠাকরুণের অসুখ, বড় কষ্ট যাচ্ছে। আমি বল্লুম—আমার মেয়েটা সব কাজই করতে পারে, সে থাকতে কষ্ট পাওয়া কেন-বাড়ীতে ত আর দ্বিতীয় স্ত্রীলোক নেই, সে এসে ২৪দিন সেবা করতে পারে, বেন ভাল হলেই নিয়ে যাব— বিরূপাক্ষ স্পষ্টই দেখিলেন—তার বক্তৃতার ফলটা জল্ হইয়া আসিবার উপক্রম হইয়াছে, তাই বাধা দিয়া গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করিলেন—“আমি তাতে রাজি হয়েছিলুম?” ব্রজবাবু বলিলেন-“আপনি একটু চুপ করে থেকে, শেষ বলেন—সরােজ আসুক, জিজ্ঞাসা করি।” বিরূপাক্ষ। তবে ! ব্রজবাবু। আমারই দুৰ্ব্বদ্ধি বেই, আমি ভাবলুম বেন- ঠাকরুণের অসুখ, মেয়েটা যখন রয়েছে দু’দিন সেবা করে
শেষ খেয়া
১৪৩
।
আসুক না, এ ত’ পরেও করে থাকে, ঝি-দাসীতেও করতে পারে।
আপনি রাজি থাকলে, এতে সরােজবাবুর কি আপত্তি হতে
পারে? কারণ এ ত’ মেয়ে পাঠানো নয়, আমি যখন ঋণী,
সাহস আমার হবে কি করে বেই, তাই দিন-ক্ষণের কথাও মনে
আসেনি।
দরকার হলে লােকের যা করা উচিত আমি মাত্র
তাই করেছিলুম,—আমি আপনাদের সেবার জন্যেই পাঠিয়ে-
ছিলুম।
এর বেশী আর কিছুই আমার আক্কেলে আসেনি,
তা হলে এমনটা ঘটবেই বা কেন? এই বলিয়াই তঁাহার
চক্ষু সজল হইয়া আসিল, তিনি মাত্র একটি নিশ্বাস ফেলিয়া
বলিলেন—“যেমন অপরাধ করেছি বেই, তেমনি সাজাও ভােগ
করচি।” এই কথা বলিতে বলিতে কেঁাচার খুট হইতে পাঁচখানি
এক-একশাে টাকার নােট খুলিয়া বিরূপাক্ষবাবুর পায়ের কাছে
রাখিয়া দিলেন ও করজোড়ে বলিলেন-“আমাকে মাপ করুন,
ঋণ হতে মুক্তি দি।”
বিরূপাক্ষ অন্যমনস্ক ভাব দেখাইয়া বলিলেন—“অ্যা—একি ।
ওঃ!” তঁার হিন্দুত্বের ইমারৎ ক্রমেই তাকে আশ্রয়হীন করিয়া
আনিতেছিল। তার শাস্ত্রোক্ত মাল-মসলা মনুষ্যত্বের সামনে মলিন
হইয়া পড়িতেছে দেখিয়া, এইবার নিজের পায়ে দাড়াইলেন,
বলিলেন-“দেখুন সব, একবার বুঝুন,—এ ব্যাপারটার কৰ্ত্তা
সবাই নিৰ্বাক্, ব্রজবাবু কাঠ। পরে একটু সামনে ঝুকিয়া,
মাথা নাড়িয়া বিরূপাক্ষবাবু অভিনব স্বরে বলিলেন—“এই পুরাে
১৪৪ শেষ খেয়া টাকাটা পরশু একেবারে দিয়ে গেলে তাে এতটা ঘটেনা। মন্দ মতলবের ফল এই রকমই হয়। নির্দোষীকে দোষী করতে যাওয়া সােজা কাজ নয় বেই।” কথাগুলা উত্তেজনার মুখে বাহির হইয়া আসে, রাগ মানুষকে পরাজয়ের পথেই টানে। নবকুমার বাবু তাকে বাধা দিয়া সতর্ক করিবার জন্য বলিলেন —“ও-সব আলােচনা আবার কেন, উনি টাকা দিতে এসেছেন -নাও।” বিরূপাক্ষবাবুও নিজের ভুল ধরিয়াছিলেন, বলিলেন—“ওটা যেন একটা কথার পিঠে কথা কইলুম,-আমার বলবার মতলব পরশু যিনি বলেছেন,-সব টাকা জোগাড় করতে পারলুমনা, আবার একদিন না যেতেই সে টাকা কোথা থেকে আসে ! কাছেই ছিলনা কি?” বিরূপক্ষের নিষ্ঠুর বাক্য রচনায় ও বৃথা মিথ্যা কথায় সময় যাইতেছে দেখিয়া নিরীহ ব্রজবাবুরও বিরক্তি আসিয়াছিল। তাহার উপর সর্বসমক্ষে এই মিথ্যাবাদী প্রমাণ করিবার চেষ্টাটা তাহাকে কঠিন আঘাত করিল। তিনি কাতর কণ্ঠে বলিলেন- “দেখুন বেই মশাই, আমি বড় গরীব, আমাকে সব-কিছু বলার যােগ্যতাই আপনার আছে। আমি কিন্তু একটি কথাও আপনার কাছে মিথ্যা বলিনি—আপনি বিশ্বাস না করতে পারেন, কিন্তু একজন আছেন যিনি তা বিশ্বাস করেছেন। এই ঋণমুক্ত হবার জন্যে ছেলে দুটিকে পর্যন্ত নিরাশ্রয় করেছি, কিন্তু তাতেও পেরে
শেষ খেয়া
১৪৫
উঠিনি। থাকলে পরশুই সব নিয়ে যেতুম ।
টাকা জোগাড়
করে আনবার আর কিছু রেখেছি কি বেই!”
বাহিরে কে একজন বলিল,-“চল আবার গঙ্গাস্নান করা
দরকার !"
বিরূপাক্ষ। তা হলে এ টাকাটা আকাশ থেকে পড়লো ।
ব্রজবাবু ঈষৎ উত্তেজিত ভাবেই বলিলেন--“, ঠিকই তাই।"
বিরূপাক্ষ সকলকে উদ্দেশ করিয়া সহাস্যে বলিলেন-“শুনে
যাবেন সব।"
শ্রোতাদের মন বিরূপাক্ষের কথায় বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছিল
নবকুমারবাবু ব্যাজার হইয়া বলিলেন—“কি বোচ তুমি ?
ওঁর বিশ্বাসে পৌছবার ক্ষমতা তােমার-আমার না থাকতে
পারে।”
ব্রজবাবু বিরূপাক্ষবাবুর দিকে চাহিয়া বলিলেন—“আমি
যদি বলি, ‘বেই, টাকাট। নারায়ণ দিলেন, আপনি ত’ তা বিশ্বাস
করতে পারবেন না।"
বিরূপাক্ষ মৃদু বিদ্রুপহাস্যে বলিলেন-“সে কি কথা, বিশ্বাস
ত’ করতেই হবে-নারায়ণের আর আমার বেই মশায়ের মত
এমন যােগ্য লােক, এমন সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ জুটবে কোথায় !”
ব্রজবাবুর চক্ষুদুটি হাসির আভাস দিল। তিনি বলিলেন—
“বেই, নারায়ণ ভুল করেন নি, তিনি যােগ্য লােককেই দিয়েছেন।
তার ভুল হয় না বেই! তিনি যােগ্য লােক চেনেন। আমি
কেবল বয়ে এনেছি।”
i)
৪৬ শেষ খেয়া - সকলেই কথাটা অন্তরে অন্তরে উপভােগ করিল । বীরেশ্বরের বচন এবার অপেক্ষাকৃত সুস্পষ্ট শােনা গেল- “most fitting” ( মুখের মত) ! বিরূপাক্ষের মুখে সহসা কে যেন এক-পােচ কালি মাখাইয়া দল। কিন্তু পরমুহুর্তেই তিনি সচেষ্ট হাসি হাসিয়া বলিলেন-- “বেই ঠক্বার বান্দা নন, ভাল-মানুষটি সেজে থাকেন।” ব্রজবাবু ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন,- “বলেছি ত’ বেই, আমাকে সব-কিছু ঠাওরাবার অধিকার আপনার আছে। এখন দয়া করে নােট ক'খানা দেখে শুনে নিন, আমাকে রেহাই দি।” বিরূপাক্ষ বিপমিশ্রিত আগ্রহে বলিলেন-“যখন নারায়ণের দেওয়া টাকা তখন দেখে-শুনে লওয়া উচিত বই কি,বিনয়- দেখত বাবা, তােমাদের চোখ ভাল।” বিনয় এতক্ষণ করেনীর মতই বসিয়া সাজা ভােগ করিতেছিল। তাহার মন যেমন তিক্ত হইয়া উঠিয়াছি, লজ্জাতেও সে ততােধিক মরিয়া যাইতেছিল। এ প্রস্তাবে তাহার প্রাণ বিদ্রোহ করিয়া উঠিল, সে মাথা নত করিয়াই বলিল—“আমি আর বসতে পারছি না, আমার একটু কাজ আছে।” এই বলিয়া সে উঠিয়া পড়িতেই, বিরূপাক্ষ বলিলেন- “তবে দোত-কলমটা আর ঐ বেতের প্যাটরাটা থেকে গােল কাচােনা দিয়ে যাও—চশ'টা ভেঙ্গে গেছে।” বিনয় সত্বর সেগুলি তার সম্মুখে ধরিয়া দিয়া বাহির হইয়া বাঁচিল ।
১৪৭ . বীরেশ্বর তার হাতটা ধরিয়া বলিল,-" itli all thy faults) should love thee for this single act of thine. ( হাের হাজার দোষ থাকলেও শুধু এই জটির জন্য তোকে আমার ভালবাসা চাই।। বিরূপাক্ষ নোটগুলির পশ্চাতে জবার পর। নাম লিখাইয়া লইয়া magnifying glass । অতসী কচ। খানি দয়া ভাল করিয়া দেখিয়া লইতে লইতে বলিতেন—"এ যে বেঙ্গল ব্যাঙ্কের ছাপমারা আনকোর নোট খেচি। তা হলেও সই থাকাটা ভাল।" ব্রজবাবু বলিলেন-“ঠিক অাছে । যেই? মাকে এই ১০ | টার ট্রেনে ফিরতেই হবে, বেশী সময় নেই, তবে- বিরূপাক্ষ। সে কি হয়, বেল। ব্রজবাব। বীতে নারায়ণ হছে, তা ছাড়া আজকের কথা স্বতন্ত্র, Civil Surgeon আসবেন, ৰজীকে ও আমার সঙ্গে যেতে অনুমতি দিন, বিনয়বার মাকে নিয়ে সে-কথা বেন-ঠাকরুণকে বলে ও পাঠিয়েছি। বিরূপাক্ষবাবু সজোরে মাথা নাড়িতে নাছিত বলিলেন- “না-না—সে হতেই পারে না, সে যাবে কি । পারে- ব্রজবাবু ভাবিয়াছিলেন এখন অলর হইতে কার বাহিরে আসিতে অতটা বিলম্ব হইয়াছে, তখন এ বিষয়টা স্থির হইয়াই গয়াছে। তাই এখন যেন একটা নতন ধাক্কা খাইলেন।
১৪7
শেষ খেয়া
মিনিটখানেক কোন কথা কহিতে পারিলেন না।
পরে একটি
মৃদুনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন-“আপনার। তবে সেখানকার
অবস্থাটা একবার চিন্তা করাও আবশ্যক মনে করেন নি !
আমার অদৃষ্ট ! আমার আত্মীয় গােকুল ডাক্তার কাল রাত্রেই
সরােজবাবুকে নে যাবার জন্যে বার বার বলেছিল, পরে Civil
Surgeon সাহেবের কাছে ছােটে। তিনি অবস্থা শুনে
বলেছিলেন—“আমাদের যাওয়ার চেয়ে তার স্বামীর আসায়
বেশী কাজ হবে।” Alajor Bloodhead Danker 45
টিফিনের পর সস্ত্রীক আসবেন। স্ত্রীলােককে দেখতে এলে তিনি
পরিবারকে সঙ্গে না নিয়ে আসেন না। তিনি বাবাজীকে
উপস্থিত থাকতে বলেছেন, এসে নিশ্চয়ই সর্বাগ্রে সরােজবাবুর
খোজ নেবেন। আমি তাকে কি বােলব বেই? সময় অল্পই
আছে, আমি তা হলে আর মিছে দেরী করি না।” এই শেষ
কথা কয়টি হতাশভাবে বলিয়া বিরূপাক্ষের মুখের পানে সকাতর
দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন।
বিরূপাক্ষের মুখ ফ্যাকাশে হইয়া গিয়াছিল। সকল অবয়ব
শূন্য করিয়া সহসা তার সমস্ত রক্ত বুকের দিকে ছুটিয়া গিয়া ধাক্কা
দিতেছিল। Major Bloodbead Danker-এই অপ্রত্যাশিত
অশ্রুতপূর্ব নামটার মধ্যে তিনি যেন ভয়ঙ্কর একটা ত্রাসের
বার্তা পাইলেন। ভয়ে রােষে তঁাহার চেহারা যেন কেমন
হইয়া গেল, তিনি থতমত খাইয়া বলিলেন—“এটা কি বেই
তােমার আপনার লােকের মত কাজ হয়েছে ? যাকের ঘরে
শেষ খেয়া
১৪১
কত কি হয়ে থাকে,—“হদুর ঘরের কথসবার কান
তােলাটা কি ভাল হয়েছে ?”
•ঐ হি দু কথাটার মাধূয্যে অকষ্ট হইয়া ‘রণী ভট্টচাষি।
মাথা নাড়িয়া বলিলেন-“না, এটা ত হ ,তা হাজার বর
বোল্ব। হিদুর ঘরের কথার মর্ম ম্লেচ্ছ বুঝবে কি? আজ
কাল ঐ একটা ফ্যাসন হয়েছে,-কেন-নদন, রাখালদাস
এরা কি ছিলেন না?”
নবকুমারবাবুর মুখে হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিয়াছিল। তিনি
বলিলেন—“দিন দেখানো কি প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থার ত দরকার
হয়নি ভট্টচাষি মশাই, রােগের ব্যবস্থা নিতে ডাক্তারের কাছে
যাবেন না ৩ কোথায় যাবেন !"
ভট্টাচাৰ্য। ওঃ, ওরা ডাক্তার নাকি ?
বিরূপাক্ষ বলিলেন-“তা , কিন্তু এ যে ইন্দিরনারাণের
ওপর যাওয়া। ক’টা মাথা ফেটেছে যে দু’দু-জন ভীমার্জুনের সাহায্য
নিতে ছুটে গেছেন ;-ঘরের কথা দু’দু-জন সাহেবের কাছে না
টালে কি উপায় হত না? এ ত শুধু রােগের উপায় খোঁজা নয় !
তা নাত আমাদের ঘরে এমন রােগ হয় না যে সহব ডাকতে
হয়।” কথাগুলাে বেরুলাে যেন হতাশা মাখানো--উস-উদাস।
ব্রজবাবু অবাক হইয়া শুনিতেছিলেন-বলিলেও সব কি
বকছেন বেই। Civil Surgeonএর কথা আমার মাথায় ও
আসেনি, আসতে পারে না। যা থাকলে তা আসে-তাত’
আমার নেই। আমি এর বিন্দুবিসর্গ ও জান না। আমার
০
শেষ খেয়া } * একমাত্র নারায়ণ আছেন, আমি তার উপরেই নির্ভর করেছি বেই। তিনি রাখেন—কবে । আসবার আগে শুনলু গােকুল নাকি ভয় পেয়ে রাত্রে Civil Surgeonএর কাছ ছিলো। তিনি যা বলেছেন-তত বলেছি।” বিরূপাক্ষ nervous । ভয়-বিহ্বল । হইয়া পড়িয়াছিলেন। বলিলেন—“গােকুল লোকট, কে, তার এত মাথা-ব্যথা কিসের ছিল ?" ব্রজবাবু বলিলেন—“সব ভুলে যাস্টন কে. এই যে বল্লশ- গােকুল আমার আত্মীয়, নিজে সে Asstt. Surgeon, সে দেখছিল। আর তাতে হয়েছে কি ?" বিরূপক্ষ। আচ্ছা, সাহেবদের কি বলা হল ? নবকুমারবাবু বলিলেন-“তােমার কি হয়েছে, ডাক্তারের কাছে লোকে কি বলতে যায়, রোগের কথা বলা হল, আবার কি বলবেন?” বিরূপাক্ষ । তুমি বুঝচ না নব,তা হলে রাত্তিরে দু’দু-জন সাহেবের কাছে ছুটবে কেন,-এ ত নবকেষ্টর নাতীর অসুখ নয় । নবকুমার। তােমার মাথাটা ঘুলিয়ে গেছে দেখচি। বুঝচ না-গােকুল Asstt. Surgeon-011 FATT Civil Surgeon অমনিও আসতে পারেন। নয় কি বেই ? ব্রজবাবু। তা নাত টাকা দেবে কে? তিনি গােকুলকে খুব ভালও বাসেন জানি। নবকুমার। শুনলে ?
শেষ খেয়: বিরূপাক্ষ ; আর একজন সাহেব ? ব্রজবাবু। আর এক জন আবার কে বলে ? বিরূপাক্ষ। লুকুচ্চ কেন বেই, তুমিই আগে দুজনের নাম করেছিলে ! ব্রজবাবু। কই না, আমি ত’ বলেছিলুম-Civil Surgeon- Slajor Bloodhead Danker- দ্বিতীয়বার নামটা শুনির বিরূপক্ষের মুখ আবার এতটুকু হইয়া গেল। তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন-“তাহলে দুজন নয়?” নবকুমার। ও হরি—তুমি ঐতে দু'জন ঠাউরেছিলে : নামটা হাতখানেক বটে-ব্লডহেড, তারিণী ভটচাষি একবার কিয়?, আর কথা কহেন নাই। এইবার বাে পাইয়া বলিলেন—“শুনতে ও দে। জেদা। তা হলেই বা, ওদের ৪রকম হয়। • আজ শুনলুম William, দুদিন পরে শুনি Fort William-ও আমি টের শুনিছি। ইতে আর তােমার আমার কিগো বিরূপাক্ষবাবু,বাড়লেই মােরবে !" ঘরে বাইরে চাপা হাসির একটা ঢেউ খেলিয়া গেল, কিন্তু বিরূপাক্ষবাবুকে তাহা স্পশ করিল না। Ianker ( ড্যাংকার। ব্দশটা তাহার কানে তখন danger-এর ( বিপদের) প্রতিধ্বনি- রূপে ঘুরিতে ফিরিতেছিল। তাহার বুক দমিয়া যাইতেছিল। নবকুমারবাবু। আর দেরি কোরন ভায়া, সরােজকে ওঁর সঙ্গে দাও,-আমিও উঠি, তােমার এখানে ত’ মাকের পিসে নেই।
পাঠাতে বল !
বিরূপক্ষের মনে কালকের জঘন্য কা শুটার গুরুত্ব আজ
ক্রমেই নানা আশঙ্কা আঁকিতেছিল ; বউটা যদি মরেই যায়—এই
পয্যন্ত আসিয়া তিনি শিহরিয়া উঠিলেন। তাহার মাথার মধ্যে
যেন আগুন লাগিয়া গেল, দুই কান দিয়া তার তপ্ত শিখা বাহির
হইতে লাগিল। এই সময় নবকুমারবাবুর প্রস্তাবটায় তিনি
দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিলেন—“ক বােচ নবকুমার—এ কি
ঠাট্টা তামাসা, বার বিপদ সে-ই জানে। কত দূরে নে গে দাড়
করিয়েছেন সেটা ভেবেছ কি ? ঐ খপ্পরে তুমি
ঐ খপ্পরে তুমি সরােজকে
সে ছেলেমানুষকে নিয়ে টানাটানি কেন, সে
কি জানে;—তার বাপ থাকতে বৌয়ের কথায় সে থাকবে কি ?”
ইত্যাদি
তারিণী ভটচাষি আবার একটা সুবিধা পাইয়া বলিয়া
উঠিলেন—“হায়রে সে কাল, সে সনাতন-রক্ত এক তােমাতেই
আছে দেখচি; আমাদের থেকেও নেই বাবা। বড় ছেলেটা
আর একটা বে করলে, বাড়ীর সামনে আজো কি স্কুল থাকতে
দি, যেন ভীমরুলের চা, দুপুর বেলা একটু ঘুমােবার যাে নেই,
কেবল মেচ্ছভাষা কানে ঢুকচেকি করি কানে পইতে জড়িয়ে
পড়ে থাকি। টাকাটা পেলে মতি স্যেকরার মতিচ্ছন্ন ঘােচাই
-বেটা যেন ফেউ লেগেছে। জমিও দেড় বিঘে হবে গো।
কায়দা আর কারওয়াই করতে টাকা ত চাই, তা অবাধ্য ছেলে
বেটারা বােঝে না-বলে দুটো বে আবার কি ? ওরে ব্যাটা
—কি, তা তাের খােজে দরকার কি, সে বাপ রয়েছে—বাপ
;
তারিণী ।
ঝৈবে। আবার লেহাপ। শুনলেন। ওরা কি ছেলে,
বামনের ঘরের মেয়ের সামিল। দুটো বের নামে ওঁদের পাপ
হয় ! বাপের অধিকার অর রইল কই? পইষর পর আর
যে,-যাক্। তা হলে আর অমন সম্পত্তিটা
নবকুমারবাবু বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন ।
“অধিকার রক্ষার পরামর্শ এর পর এসে করবেন ভট্টচার্য্যি মশাই,
এখন কাজের কথাটা শেষ হতে দিন—বেই মশাই আর দাড়াতে
*রেন না।”
বেশ বেশ, তা হোক না, আমার তাড়া নেই।
তবে, ঐ যে বাপ থাকতে ছেলের বউ-ব্যথা-
নবকুমারবার বাধা দিয়া বলিলেন-“থামুন ত ভট্টচাষি
মশাই! ও-সব বাজে কথার সময় অসময় আছে। ছেলের
কি ছেলের স্ত্রীর মনের অবস্থার ওপর ছেলের বাপের কোন্
অধিকারটা আছে শুনি ! এ ত বউ আনার দিন ঠিক করার
কি দেনা-পাওনা ঠিক করার অধিকার নয়। তাতে তার
আমাদের দেশের কোন্ ছেলে কবে বাধা দিয়েছে? আর
২০২৫ বছরের ছেলের বই হাতে করে কলেজে যায় বলেই
ত থােকা নয়, তারা দি
দি বিবাহিত পত্নীর দুঃখে কষ্টে
অপমানে বেদনাটাও না বােধ করে তবে তারা ত পশু।
কারুর মনের ওপর অধিকার ভগবান কারুকে দেন নি,
সেখানে সকলেই স্বাধীন। সব কথা যদি সরোজের কানে
পৌছে থাকে—দুঃসহ আঘাতে সে নষ্ট হয়ে যেতে পারে-
১৫ 3
তখন অধিকার নিয়ে বুরে খেয়ে। ব্যাপারটি তে। সােজ
ঘটে নি,এখন সরেজের সেখানে যাওয়া, আর সরােজের
মুখের উৎসাহ আর অশ্বাসবাণীই বৌমাকে বাঁচবার পথে
এনে দিতে পারে। তের উটে কথাই ভাবচে।। Civil
Surgeon ( সিভি সার্জন : হে রামর্শ দিয়েছেন—ছেলে, বউ,
উভয়ের জন্যেই সেটা সামলাবার একমাত্র উপায় জেনো। কাজে
দোষে যে ভয়টা এসে ধরেছে, এখনো তার কোন কারণ উপস্থিত
হয় নি, বিশেষ, বেই মশাই যেরকম সাধুপ্রকৃতির লােক। কিন্তু
সরােজকে না পাঠালে দেখো সেইটি ডেকে আনা হবে। ইংরেজ
(ivil Surgeon-এর কত বড় ক্ষমতা তা জাননা ;-তার;
রাজা মহারাজাদেরও মাথা খারাপ হয়েছে বলে, কলম ডাল
সিংহাসনচ্যুত করতে পারেন, আবার অসুস্থ লােককে সুস্থ বলে
ঘানি টানাতে পারেন, সেখানে লাটেরও কথা কবার ক্ষমতা নেই
ভয়ে ভাবনায় বিরূপক্ষের বিরূপ ভাব একেবারে ঘুচিয়,
গেল। তার দুৰ্বলতা আসিয়া গিয়াছিল। হতাশামিশ্রিত
উদাস ভাবে বলিলেন—“তুমি যখন রাগ করচ নব, তখন ভাল
বুঝেই করে থাকবে, যা ভাল হয় কর ভাই, আমি সরােজকে
বে’য়ের হাতে দিলুম, তার জিনিষ তিনি দেখবেন।” ইত্যাদি
বিনয় ভিতরে খাইবার সময়, একখানি গাড়ী আনির!
রাখিবার জন্য ইন্দুকে অনুরােধ করিয়া যায়। গাড়ী আসি।
প্রস্তুতই হল। বিরূপাক্ষ ও নয়নতারার বিশেষ ইচ্ছায় আর
VATL.RAR MAKARDAH-TORAH. সরােজের অনুরােধে বিনয় ও সয়ে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া লইল ব্রজবাবুকে একলা পাইয়া বিরুপাক্ষ তার হাত দুটি পরির সকাতরে বলিলেন-“বেই, তোমার ছেলে তোমার হাত দিচ্ছি- তুমি” বলিয়াই তিনি অশ্রু হইয়া পড়িলেন। নােট কয়খানি হতেই ছিল—বলিলেন—“এ তুমি নিয়ে যাও, কেন সুদ গুণবে, সুবিধামত- ব্রজবাবু বলিলেন—“বেই, আপনি এত বিচলিত হচ্ছেন কেন! ভাবনাটা কিসের ? আমি কালই বাবাকে পৌছে দেব । নারায়ণ দিয়েছেন, এ টাকা আপনি রাখুন, আমার সু লাগবে । আপনি শুধু ছেলে-বউকে আশীৰ্বাদ করুন।" সকলে গাড়ীতে উঠিতেই গাড়ােয়ান গাড়ী ঘঁকাইয়া দিল । বীরেশ্বর সরােজকে বলিল,-যেন সঙ্গে করে আনা হয়, খবরদার ভুল করিনি।” o Eatd:-1219, ও wi
No text on this page.
তৃতীয় খণ্ড
No text on this page.
“এখন কে একটি পেজ বাচি,
এসেছি ই ঘটের কাছাকাছি,
এখন শুধু অকুল মনে যাচি
তােমার পরে খেয়ার তরী ভাস;
জনেছি অ" জ চলেছি কার লাগি,
ছড়েছি সব কশ্মতের আশা।"
“এবার তোমার পথ চাহি
বসে খেলা দুমারে,
তোমারে ধরতে হবে বলয়।
র; ২: তান?।"
বন্দ্রনাথ
No text on this page.
Estd:-119.
MAKARDAH –+
-Hiuvinte
নবীন ছিল সাধারণ মানুষ—সরল কর্তব্যনিষ্ঠ গৃহস্থ।
পার্বতী তাহাকে সংসারের জ্বালা-যন্ত্রণা ও অসুখের আস্বাদ
হইতে সযত্নে রক্ষা করিয়া আসিয়াছিল। নবীনের অজ্ঞাতে
সকল আঘাত নিজে সহিয়া স্বামীকে সুখী করিবার ও সংসারকে
ভদ্র রাখিবার প্রয়াসেই সে অকালে প্রাণ দিয়াছে। নবীন
বহু বিলম্বে অবস্থাটা কিছু কিছু বুঝিয়াছিল ও উভয়ে কাশী
গিয়া অবশিষ্ট জীবনটা কাটাইবার আলােচনাও হইয়াছিল।
তবে, সে-কথার মধ্যে কাহারও বিশেষ দৃঢ়তা ছিল না ;
কারণ পাৰ্বতী বাঁচিয়া থাকিতে তাহার স্বহস্তে ও সযত্নে
রচিত সংসারের উপর কোন ছুলে কোন নিন্দার কথা প্রকাশ
পাইবে, একথা ভাবাও তাহার পক্ষে অসম্ভব ছিল। সতী।
তাহার এই কঠিন সাধনায় বােধ হয় সিদ্ধিলাভ করিয়া
জয়পতাকা লইয়া গিয়াছে।
তাই নবীনের পক্ষে অভিনব ও অবাধ আঘাতগুলা অল্প
দিনেই তাহাকে অতিষ্ঠ করিয়া গৃহত্যাগী করিয়া দিল। সে
বাত্যাতাড়িত বৃন্তচ্যুত পত্রের মত লক্ষ্যশূন্য গতিতে মাঝির
ইচ্ছায় আত্মসমর্পণ করিয়া নৌকায় আসিয়া পড়িয়াছিল ও
অনির্দেশ যাত্রা করিয়াছিল। শৃঙ্খলমুক্ত হইয়া প্রকৃতির অবাধ
রাজ্যের আস্বাদ সে সেই প্রথম পাইল। তাই তার প্রাণটা মুক্তির
11
১৬২ শেষ খেয়া নাই। আরামে অন্তরে অন্তরে পরম স্বাচ্ছন্দ্যের সাড়া দিয়া “আঃ” বলিয়া উঠিয়াছিল। কে জানিত যে কৰ্ম্মজগৎ তাহা অনুমােদন করে এখানে একটা কাজ শেষ না হইতে অন্য কাজ আসিয়া মাথা তােলে, এবং কর্তব্যজ্ঞান লােকের প্রকৃতি মত তাহাকে দীক্ষা দেয় ! তাই পরক্ষণেই দেবেশের মুখে তাহাদের কষ্টকর কাহিনী শুনিয়া পরদুঃখকাতর নবীনের চিত্ত ব্যথিত, আলােড়িত ও আকৃষ্ট হইয়া পড়ে এবং সন্তান- বৎসল নবীন, এই দুইটি ভাই-ভগ্নীর অবস্থা অনুমান করিয়া, আত্মচিন্তার অবসর না লইয়াই কৰ্তব্য স্থির করিয়া ফেলে। তাহারই চিন্তা, চেষ্টা, তাহারই উৎসাহ এই কয়দিন চারিদিক হইতে এই নব বৈরাগ্যবান লােকটিকে বল জোগাইয়াছিল, ও টানিয়া খাড়া রাখিয়াছিল। সে সবেমাত্র সংসার-সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া বাহির হইয়াছে, নবােৎসাহের মুখে, সে এই বিচ্যুতির বেদনা চোখ বুজিয়া এড়াইয়া থাকিলেও, তাহা তাহার অজ্ঞাতে ছিল, এবং সে ক্ষত তখনাে কঁাচাই ছিল। তাই অন্যের বেদনা সে সহিতে পারে নাই, পরকে আপন ভাবিতে তাহার বিলম্ব হয় নাই। হাতে একটা আরামও সে পাইয়াছিল। কয়দিন সে যেন আপন কন্যাকে শ্বশুরালয়ে পাঠাইবার আয়ােজনের উৎসাহে একটা উৎসবের মধ্যে কাটাইয়াছে। মনােম স্বামীর সহানুভূতি ও সঙ্গ পাইয়া অনেকটা সামলাই- যাছে। ডাক্তারেরা অভয় দিয়াছেন ও তাহাকে সরােজের সহিত
শেষ খেয়া
' ১৬৩
পাঠাইয়া দিতে বলিয়াছেন। সরোজকে ও বিনয়কে নবীনের
বাহা যাহা বলিবার ছিল তাহা বলা হইয়াছে, এবং আজ
ভেবের ট্রেণে তাহারা মনােরমাকে লইয়া চলিয়া গিয়াছে।
ব্রজবাবুর ইচ্ছা ছিল নিজে সঙ্গে যাইবেন, অন্তত দেবেশ যাইবে;
মনােরম দৃঢ় ভাবে তাহাতে আপত্তি করায় এবং নবীন তাহা
অনুমোদন করায়, সেটা ঘটিতে পায় নাই।
নবীন আজ ৯ টার মধ্যে আহারাদি করাইয়া ব্রজবাবুকে
আপিসে এবং দেবেশ ও শিবেশকে কলেজে পাঠাইয়া দিয়াছে,
নিজেও তাহাদের সহিত প্রসাদ পাইয়াছে। এ কয়দিন যাহ।
লইয়া সে উৎসাহে ছিল, তাহা আজ শেষ হইয়াছে।
নবীন কৰ্ম্ম শূন্য লােকের মত বহিৰ্বাটির সম্মুখে কিছুক্ষণ
অন্যমনস্ক ভাবে কাটাইয়া ধীরে ধীরে বাহিরের ঘরটিতে আসিয়া
ঢুকিতেই সহসা সম্মুখ হইতে কে যেন তাহাকে বলিল--
“তারপর?” সে এই আকস্মিক প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলনা, তাই
অসহায়ের মত থতমত খাইয়া গেল। কয়দিনের ভাবনা চিন্তা
উদ্বেগের পর কোথায় সে আজ আহারান্তে একটু নিশ্চিন্ত হইয়া
গড়াইবেনা এ কি? ধীরে ধীরে তাহার প্রাণ বলিতে লাগিল
‘সত্যই ত নবীন—এ কার বাড়ী ? কোথায় আরাম করিবে ?
এখানকার কাজ ত’ শেষ হইয়াছে, আর কেন ?
এখানে
কাটাইবার আর •োমার কৈফিয়ত কি আছে ? নবীনের
মাথাটা ঘুরিয়া উঠিল । সে বসিয়া পড়িল, কেবল তাহার
মুখ হইতে বাহির হইল—“তাই ত’!”
১৬৪ শেষ খেয়া পার্বতী মৃদুহাশ্যে নবীন মুহূর্তে যেন ভাঙ্গিয়া পড়িল। গৃহত্যাগের পর মুক্তির বাতাস গায়ে লাগিয়া সে ত মত্তহস্তীর বল পাইয়াছিল। ঘণ্টা দুই পূৰ্বেও ত’ সে যুবার মত উৎসাহপূর্ণ ছিল । নবীন বরাবরই হিসাবী লােক নয়, তাহার প্রকৃতিতে সেটা সম্ভবও ছিলনা, তবে সে অপব্যয়ীও নয়। সে যে হিসাব করিয়া গৃহত্যাগ করিয়াছিল তাহাও নয়। হৃদয়হীন আঘাতের মুখে সে আর দাড়াইতে না পারিয়া অতিষ্ঠ হইয়াই জ্বালা-যন্ত্রণা-অভিমানের তাড়নায় ছুটিয়া বাহির হইয়াছিল। তারপর ? এই “তারপর”টা ভাবিতে সে অভ্যস্ত ছিলনা, এমন কি ভাবিতে ভয় পাইত, তাই সেটাকে এড়াইয়া চলিত। পাৰ্বতী পেড়াপীড়ি করিলে বলিত— “ভাবচো কেন, তারপর বিশ্বনাথ আছেন।” তাহাই মানিয়া লইত এবং যাহা করিবার নিজেই করিত। এই বিশ্বনাথে নির্ভরটা-পার্বতীর সহিত কাশীধামে গিয়া জীবনের শেষ দিনগুলা উভয়ে নিশ্চিন্তে ও শান্তিতে কাটাইবার সুমধুর আলােচনার পর সে লাভ করিয়াছিল । তাহার মধ্যে কতটা সত্য আর দৃঢ়তা ছিল তাহা বিশ্বনাথই জানিতেন। তাহার শােনা ছিল সংসারের জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াইবার ও শান্তি লাভ করিবার কাশীধামই একমাত্র কাম্য ভূমি। সেখানে মা অন্নপূর্ণা অন্ন দেন, আর বিশ্বনাথ মুক্তি দেন। আর মহান্তের নিকট কিছু টাকা জমা দিলে—আজীবন মার প্রসাদ নিত্য- নিয়মিত পাওয়া যায়, এবং নির্ভাবনায় বিশ্বনাথের নাম করিয়া অবশিষ্ট দিন আনন্দে যাপন করা যায়—ইত্যাদি শেষ খেয়া '। সরলবিশ্বাসী শুদ্ধচিত্ত নবীনের হৃদয়ের অপর পৃষ্ঠায়, তাহার অজ্ঞাতেই তাহা অঙ্কিত হইয়া যায়। সে যে এই সম্বন্ধে সর্বদা সজাগ ছিল তাহা নহে, কিন্তু কি অসহায় অবস্থায়, কি আনন্দের অবস্থায়—অসম্বিতেই “বিশ্বনাথ” নামটি আপনা আপনি তাহার মুখে আসিত। কেন আসে, কোথা হইতে আসে, তাহা সে কখন ভাবে নাই। গৃহত্যাগের সময়, ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তাহার যদি কোন দুর্ভাবনা আসিয়া থাকে ত’—“পরের কথা বিশ্বনাথ জানেন, তিনি যাহা করাইবেন, যেখানে লইয়া যাইবেন তাহাই হইবে”— এই ভাবটা অবলম্বন করিয়াই সে তাড়াতাড়ি সেটাকে বিদায় করিয়াছিল। তদতিরিক্ত ভাবিতে তাহার সাহসে কুলায় নাই। মানুষ নিজের প্রকৃতিকে এড়াইয়া চলিতে পারে না, প্রকৃতির অনুকূল কিছু পাইলে তাহার প্রাণ তাহাতে স্বতই সাড়া দিয়া উঠে। তাই মনােরমার অবস্থা শুনিয়া ও তাহার বেদনা অনুমান করিয়া সে স্থির থাকিতে পারে নাই। তাহার একটা উপায়ের জন্য নিজের যাহা কিছু অবশিষ্ট অর্থ ছিল তাহা আবশ্যক মত ত্যাগ করিয়া তবে সে শান্তি বােধ করিয়াছে এবং টাকাটাও বিশ্বনাথের ও তাহারই ইচ্ছা মত তাহা ব্যয় হইতেছে—ইহাই ভাবিয়া সে নিশ্চিন্ত ভাবে তাহারই কাৰ্য্য করিয়া গিয়াছে। এইরূপ ভাবে পাশ-কাটাইয়া চলাটাই তাহার অভ্যাস ছিল। এই মাত্র হঠাৎ তাহার হৃদয়ের অস্পষ্ট পর-পৃষ্ঠাটা সুস্পষ্ট হইয়া সম্মুখে আসিয়া পড়িয়াছে। কাশবাস যে তার শেষ খেয়া একমাত্র অভীষ্ট অবলম্বন, এবং উক্ত অর্থ যে তাহারই উপায়- স্বরূপ ছিল, এই সুপ্ত চেতনাটা সহসা জাগ্রত হইয়া দেখা দিয়াছে । কাশীতে যে কাহারও কিছু গ্রহণ করিতে নাই, কাহাকেও বিব্রত করিতে নাই ! ব্যবসায়—লােভ ও মিথ্যা অনিচ্ছায় ও অজ্ঞাতে ঘটিয়া যায়, সুতরাং তাহাও সে করিবে না। এখন উপায় ! সে ঘণ্টাখানেক একভাবেই বসিয়া ভাবিল—কোন কূল- কিনারা পাইল না। সে চঞ্চল হইয়া উঠিল ;—সত্যই ত’, এখানে আর সে কি বলিয়া থাকে। ব্রজবাবু বাড়ী ফিরিলে— চোখােচোখি হইলে এইবার কি কথা হইবে ? নবীন উঠিয়া দাড়াইল, অদূরেই কাগজ-কলম দেখিতে পাইয়া টানিয়া লইয়া তাড়াতাড়ি সে লিখিতে বসিয়া গেল, “শ্রীশ্রীবিশ্বনাথভরসা”-তাহার পর “সেবক শ্ৰী” লিখিয়াই তাহা কাটিল, তাহার পরিবর্তে সেই লাইনেই লিখিল,-“কোটি কোটি প্রণামান্তর সেবকের নিবেদন”। তাহার পর চাঞ্চল্যের আবেগে কম্পিত হস্তে নিম্নলিখিত ৪৫ লাইন পৰ্যন্ত দ্রুত অগ্রসর হইল— “আমি অন্য কাজে চলিলাম । আমার ধোজ করিয়া বৃথা কষ্ট পাইবেন না। যাহার টাকা—তাহারই ইচ্ছামত ব্যয় করিয়াছি মাত্র। ইহাকে ঋণ বা দান বলিয়া ভাবিবেন না। ইহার মধ্যে পরিশােধের প্রশ্ন নাই- টাইপিটার দিকে দৃষ্টি, পড়িতেই—“কি দরকার” বলিয়াই তাহা মুঠার মধ্যে মুড়িয়া, সজোরে একটা চাপ দিয়া খােলা
শেষ খেয়া
১৬৭
জানলার দিকে ঘুড়িয়া দিয়াই সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ং উঠিয়া পড়িল।
সেটা যে জানলায় ঠেকিয়া ঘরের মধ্যেই পড়িল নবীন তাহা লক্ষ্য
করিল না।
ঘরের বাহিরে আসিয়া, শিকল তুলিয়া দিয়া তালা বন্ধ করিল,
ও চাবিটি দেবেশ যেখানে রাখিত সেইখানে রাখিয়া দিয়া,
“জয় বিশ্বনাথ” বলিয়া সত্বর বাহির হইয়া পড়িল।
আবার তাহার প্রাণে প্রশ্ন উঠিল—“তারপর ?” বহুদিন
হইতেই সে এই “তারপর”-টা, সহজেই “বিশ্বনাথ” দিয়া পূরণ
করিয়া আসিয়াছে, আজ আর তাহা পারিল না-হতাশায়,
অভিমানে তাহার মন কেবলমাত্র বলিল-“যা হয় হবে!” সে
আর কিছু ভাবিতে পারিল না, তাহার প্রাণ ব্যাকুল হইয়া
কেবলই পাৰ্বতীকে খুঁজিতে লাগিল। তাহার পদক্ষেপ দ্রুত
হইলেও তাহা দুৰ্বল ও লক্ষ্যহীন লােকের পরিচয় দিতে লাগিল।
আজ আর সে বাহিরের বাতাসে উম্মুক্ত প্রকৃতির ক্রোড়ে মুক্তির
আরাম পাইল না।
পাঁচকড়ি জেলের চালাঘর ঘাটের নিকটেই-রাস্তার ধারে।
লাউ-গাছের অবাধ বৃদ্ধিতে চালের বড় দেখা যায় না।
দাওয়া, উঠান পরিষ্কার ভাবে নিকোনো। উঠানের মাঝা-
মাঝি এ-মুড়াে ও-মূড় একটি বাঁশের আলনা। তাহার এক
১৬৮
শেষ খেয়া
পার্শ্বে কতকগুলি গাব-মাখানাে শণের দড়ি আর কতকগুলা
তাড়াবাঁধা শােলা ঝুলিতেছে, মধ্যে একখানা ছেড়া জাল
শুকাইতেছে। দাওয়ায় একটা পটপটির মাদুরের উপর পাঁচকড়ি
দুই হাত বুকে দিয়া, অপলক দৃষ্টিতে আড়কাটার দিকে চাহিয়া
পাষাণ-মূর্তির মত নিস্পন্দ নীরব পড়িয়া আছে ।
গত রাত্রে তাহার বড়ই বিপদ গিয়াছে,-ইলিস মাছ ধরিতে
গিয়াছিল, জালে হাঙ্গর পড়িয়া জালখানি ছিড়িয়া একেবারে
নষ্ট করিয়া দিয়া গিয়াছে—তাহার আর আদায় নাই। সেই
আকস্মিক হচিকায়, নিজেও জালের মধ্যে পড়িতে পড়িতে
কোন প্রকারে টাল সামলাইয়া বাচিয়া ফিরিয়াছে। কিন্তু জাল
যাওয়ার চেয়ে তার নিজের যাওয়া যে ভাল ছিল !
ইলিশ মাছের সময়টা জেলেদের রােজগারের মরসুম।
দোকানীর দেনা পরিশােধ, বন্ধকী জিনিষ উদ্ধার, মতি সার
পাওনা মেটানাে, পূজায় পুটিকে জামদানী কুঞ্জদার সাড়ী আর
বেলােয়ারী চুড়ি পরানাে, এ-সবই যে ইলিস মাছের রােজগারের
উপর নির্ভর করে। সেই রােজগারের একমাত্র অস্ত্রখানি বেকাম
হইয়া গিয়াছে। ঐ সব বাৎসরিক অবশ্যকর্তব্যগুলির উপায়
কি হইবে—এই চিন্তায় পাঁচকড়ির হাত-পা শিথিল হইয়া
গিয়াছে; সে ওঠে নাই, খায় নাই—সারাদিন পড়িয়াই আছে।
পুটির কি লাগে নাই? খুবই লাগিয়াছে। কারণ, এই
পূজায় সে রূপার তাবিজ পরিবেই পরিবে আশা করিয়াছিল,
কিন্তু মা গঙ্গা যে পাঁচকড়িকে রক্ষা করিয়াছেন, সে স্বামীকে
শেষ খেয়া ফিরিয়া পাইয়াছে-এই পরম লাভটার কাছে তার আর সব ক্ষতি তুচ্ছ হইয়া গিয়াছে। সে রাঁধিয়া বাড়িয়া অনেক সাধ্য-সাধনা করিয়াছে, পাঁচকড়ি ওঠে নাই, খায় নাই, কথাও কয় নাই- কেবলমাত্র বলিয়াছে—“দ্যাখ, পুটি, জ্বালাতন করিনে—সামনে থেকে সরে যা বলছি।” পুটি আর সহিতে পারে নাই, অভিমানে “এই চলুম” বলিয়া সে সােজা গঙ্গার ঘাটে গিয়া ভাতের থালা উপুড় করিয়া দিয়া তাহা মাজিয়া ধুইয়া আনিয়া ঝন্ ঝন্ শব্দে রাখিয়া, দাওয়ার এক ধারে উপ হইয়া, দুই গালে হাত দিয়া উদাস দৃষ্টিতে বসিয়াছিল। বাহার যে প্রকৃতি তাহা তাহার অন্তরে অজ্ঞাতভাবে থাকিলেও, আঘাত পাইলে পরিচয় দেয়। পুটির প্রকৃতিটা ছিল সরল, সে মালার মেয়ে হইলেও, ভাল কাজ করিতে, ভাল কথা শুনিতে ভালবাসিত—তুচ্ছতা এড়াইয়া চলিত। এইটাই ছিল তার স্বভাব। তার ঝোকের মধ্যে ছিল, গ্রামের মধ্যে যেখানেই “কথা” হউক—সে শুনিতে যাইবেই। ঐ বিষয়ে তাহার মনটা ক্ষুধিতের ন্যায় ব্যাকুল থাকিত। যদিও ক্ষতিটা সে গায়ে মাখে নাই, কিন্তু উহা যে তাহাকে একটুও বিচলিত করে নাই, এমন কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় না। তাহার উপর সযত্ন-প্রস্তুত অন্ন স্বহস্তে গঙ্গায় ঢালিয়া দিয়া আসিয়াছে। কাজেই, দুঃখে, অভিমানে, রােষে সংসারটা তাহার কাছে তিক্ত বােধ হইতেছিল। সে আপনা-আপনি উচ্চ কণ্ঠেই বকিয়া চলিয়াছিল—“জাল ভেঁড়া ত’ ভাগ্যির কথারে, কত
১৭০
শেষ খেয়া
ভাগ্যিবানের ভাগ্যে ঘটে না। ইলিস মাছ ওকে স্বগ্যে দেবে—
আর একটু হলে দিছলােত’! জাল গেছে জঞ্জাল গেছে,
বেঁচেছি
আবার জালে পড়তে হবে নাকি ? মিসের বুদ্ধি
দেখ না, জেলে-মালার আর কত হবে!"
নবীন যন্ত্রপরিচালিতবৎ গঙ্গাতীরেই আসিয়া পড়িয়াছিল—
অনতিদূরেই ঘাট
পুটির কথাগুলা সহসা নবীনের কানে আসিতেই তাহার যেন
চট্কা ভাঙ্গিল,—তাহার গতি ভঙ্গ হইল। সে দাঁড়াইয়া পড়িল ।
ক্ষতিটা পাঁচকড়িকে খুবই লাগিয়াছিল। তাহার উপর ক্ষুধা
লাগিয়া, সে রাগিয়া উঠিল—আর থাকিতে পারিল না, বলিল—
“তুই কি গোঁসামের মেয়ে নাকি, তাের যে বড় মুখ হয়েছে !
জাল গেল, এখন খাবি কি তা ভেবেছিস?”
পুটি সেদিকে না চাহিয়া বলিল—“ভাবব আবার কি, ও
আমার ঢের ভাব আছে। যখন জাল ছিলনা তখন কি
উপােষ করতুম ? সেই মা গঙ্গাই ত’ আছেন, দয়া করে যা দেবেন
তাই খাবাে।”
পাঁচকড়ি। কি করে তাই শুনি
অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া পুটি বলিল—“কেন, ভুলে গিচি
নাকি ? কিনারা-জলে পালা ফেলে আসবি-ভােরে গিয়ে
চিংড়ি, চুননা, চঁাদা পেলেই চলে যাবে, পাড়ায় গিয়ে বাড়ী-বাড়ী
বেচে আসবাে। এই ত’ করতুম। জাল ত’ আর কপাল নয়,
সেটা ত’ সঙ্গেই আছে।”
শেষ খেয়া
১৭১
এতক্ষণে নবীনের মুখ হইতে আপনা আপনি অনুচ্চস্বরে বাহির
হইল—“জয় বিশ্বনাথ ?” সে উৎকর্ণ হইয়া শুনিতে লাগিল।
পাঁচকড়ি বলিল—“মাগির বুদ্ধি দেখ—মেয়েমানুষ কিনা,
চুনােমাছে চলবে,-চুনে। আর ইলিস এক।”
পুটি তেমনি মুখ বাঁকাইয়া বলিল—“আরে মিসে—এ-ও
মাছ, ও-ও মাছ, ছোট লক্ষ্মী—বড় লক্ষ্মী আছে নাকি! ছােট
আগুন, বড় আগুন নেইরে ; এতটুকু আগুনেও বেহ্মাণ্ড জ্বালা-
বার তেজ আছে—জানি। আগে যে রেখেছিল, সেই হ’ল
আপন, আগেরটাই সহজরে,অসময়ে তাকেই মনে পড়ে
সেই রাখে। বামুনের ছেলেরা আগে পূজো করতে—মােন্তার
পড়তে শেখে। ও পাড়ার ভট্টাচাষ্যিমশাইদের তাে ওই কাজই
ছেলে ইংরাজি পড়ে তা ছেড়ে দিছল ;-গৌরীপুরের
কলে বাবু হয়ে-মজুর আর উপরি মেরে সাতবছরে নাকোটাকার
নােক হয়। যদু স্যাকরার জমী নিলে,-সদীবামনীর সাত
বাগানে নাচগান,রাস্তা জোড়া গাড়ী-ঘােড়া,
দেউড়িতে ডালকুল্লোপাড়ায় মাছ বেচতে যেতে পারিনা।
পাঁচ বচরেই সব ফুট-ফাট! লালচের খাওয়া হজম হয় না রে,
তাতে রােগ ধরে,গত্তি লাগে না। এখন শুনি, কোথায়
রেঙ্গুনে গে পুরুত হয়েছে,-পূজো করে, ছাদ্দো করায়,—বেশ
আছে। দেখলি তোপেথােম্ যা শিখে ছালাে—সেই তাে
শেষ রাখলে ! মাঝে যে আসে সে মজা করতে আর মজাতে
আসে, সে গরীবের কেউ নয় রে, সে শুধু বাজে খরচের পয়সা
ছিল।
হাজার!
“
১৭২
শেষ খেয়া
জোগায়—আর সং সাজায়, শুধু মেজাজ বাড়ায় রে মিসে
মেজাজ বাড়ায়। তাতে কোন ইশ্বয্যি বেড়েছিল ! পেথম সাত
বছর ভাল ছিলি, না জাল বানিয়ে ভাল ছিলি ? আগে কত স্বস্তি
ছিল বল দিকি মালার পাে! জালের বাড়তি রােজগারে জেলের
পায়ে জুতাে উঠেছে আর ম’তে সার পেট ভরেছে বইত’ নয়—”
নবীন অবাক হইয়া শুনিতে লাগিল। তাহার প্রাণে
তরঙ্গের পর তরঙ্গ আঘাত করিয়া চলিল ।
পাঁচকড়ি শুনিয়া যাইতেছিল। এইবার জ্বলিয়া উঠিল, বলিল
—“দ্যাখ, পুটি, ঝুটি ধরে ঝাটা-পেটা কোরবাে। জেলের পায়ে
জুতাে উঠেছে, আর পণ্ডিতের বেটির গায়ে পঁইচে ওঠেনি।
পুটি অন্যদিকে চাহিয়াই বলিল—“উঠেছে তা কি হয়েছে?
কঁচের চুড়িতেই বা কোন্ অসুখ ছিল ?”
নবীনের অবসন্ন দেহে রক্তের চাঞ্চল্য আরম্ভ হইয়াছিল
সে নিজেকে সংযত রাখিতে পারিতেছিলনা। সে যেন পুটি
মালানির প্রত্যেক কথায় সত্যের সাক্ষাৎ পাইতেছিল !
পাঁচকড়ি বলিল—“বটে! কাচের চুড়ি আর রূপাের পইচে
একই জিনিষ ; এর মূল্যি আর ওর মূলি-এর গরব, আর ওর
গরব—এর আহলাদ আর ওর আলাদ—একই, না? মিথুক
মাগি-
পুটি এইবার গ্রীবা বক্র করিয়া স্বামীর মুখের উপর চাহিয়া
দৃঢ় কণ্ঠে বলিল—“দ্যাখ নাকড়ি, আর ইচ্ছে বখবরদার
ধলচি মিথ্যুক বলিসনি, ভাল হবেনা,পুটি মিছে কথা কয়না—”
শেষ খেয়া ১৭৩ বাড়ীর বিড়াল “সুন্দরীর”ও সারাদিন খাওয়া হয় নাই, সে উঠানে বসিয়া পুটির মুখ চাহিয়া মধ্যে মধ্যে কাতর কণ্ঠে মিউ মিউ করিতেছিল। তাহাতে কোন ফল হইলনা দেখিয়া সে দাওয়ায় উঠিয়া আসিয়াছিল এবং লাঙ্গল উচ্চ ও মেরুদণ্ড ধনুকাকৃতি করিয়া পুটির গায়ে গা ঘসিয়া আবেদন জানাইতে আরম্ভ করিয়াছিল। পুটির সেদিকে হুসই ছিলনা। স্বামী মিথ্যক বলায় সে উদ্ধফণা ক্রুদ্ধা ফণিনীর মত স্বামীর দিকে ঘাড় ফিরাইয়া গর্জন করিবার সময় সুন্দরীর উপর নজর পড়িবা মাত্র—“দূর হ”—বলিয়া বাঁহাত দিয়া তাহাকে উঠানে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল । পাঁচকড়ি তাহার সক্রোধ তাড়নায় আর এই ঘটনায় হাসিয়া ফেলিল। বলিল-“ও কি করলে? বেচারি সারাদিন খায়নি" পুটি আবার উঠানের দিকে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল- “না-আমিই যত করেচি—আমিই যত খেয়েছি—আমি মিছে কথা কইচি-আমি মিথ্যেবাদী” বলিতে বলিতে সে কাদিয়া ফেলিল। এইবার মুস্কিল ভাবিয়া পাঁচকড়ি উঠিয়া পড়িল। নরম হইয়া বলিল—“পাগলীর বুদ্ধি দেখ, আমি কি সত্যি বলচি ? তা বলে পুটি, কাচের চুড়ি আর পইচের এক কদর শুনলে সবাই তােকে পাগল ঠাওরাবে ! চুড়ির মূল্যি পাঁচ পয়সা-পইচের মূল্যি পাঁচ গণ্ডা টাকা—তা জানিস্।” পুটি কঁদিতে কাদিতেই বলিল—“আমার দাম জানবার ভারি দরকার। মেয়েমানুষের কাছে সিদুরের দাম লা টাকার
১৭৪
শেষ খেয়া
বেশী, তা তুই বুঝবি কি ! সিদুর বক রাখতে যানা কেউ
কাণা কড়িও দেবেনা। মনেই ছােট বড় রে, ছােটকে বড় করে
নেবার মন চাই। যখন আদর করে চুড়ি এনে দিছলি তখন
যেমন আহ্লাদ করে পরেছিলুম, “ইচে যখন দিলি তখনও
তেমনই অলাদ হয়েছিল, মনে করিসনি কম-বেশী হয়েছিল ।
আহলাদটা বুঝি দাম খতিয়ে কম বেশী হয়রে মিসে! তাের
দেওয়া বলে রে পােড়ার মুখােতাের দেওয়া বলে ! এ-ও তুই
আদর করে দিছলি, ও-ও তুই আদর করে দিছলি বলেরে
নাচকড়ি ! বুকড়ি চালের ভাত ভগবানের পেসাদ বলে,
তিনি কিরূপা করে দেছেন বলে, মুখে দিলে অমতাে লাগে।”
নবীনের সারা দেহটাকে কে যেন নাড়া দিয়া সচেতন করিয়া
দিল। তাহার অসাড় প্রায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সহসা বল সঞ্চার হইল।
তাহার শােণিত বেগ তাহাকে দোলা দিতে লাগিল।
পুটি বলিয়াই চলিল—“ভাসুর ভেন্ন হলে যখন অন্ধকার
দেখেছিলিমা গঙ্গা আঁচল ভরে চুনাে চাদা ঢেলে দিয়ে সাত বচর
পেলেছিলেন,“জাল জুটলাে আর সে কিরূপা ভুলে গেলি।
জাল ত’ মা দেয়নি—নিজের লালচে জোটালি, তার বিপত্তিটে
দেখলি ত’? ভারি-জিনিষ ডুবিয়েই থাকে—তােলেনা রে মিসে
-তােলেনা। তানা ত জুয়ান মদ্দো আজ চিৎ হয়ে পড়বি কেন!”
নবীন গভীর নিশ্বাস সহ দুইবার “বিশ্বনাথ, বিশ্বনাথ,”
উচ্চারণ করিল। সঙ্গে সঙ্গে নিজের মূঢ়তায় তাহার লজ্জা ও
ধিক্কার আসিল।
শেষ খেয়া
পাঁচকড়ি উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল—পুটি তাহা লক্ষ্য করে নাই।
ফাক পাইয়া সে বলিল—“আমি চিৎ হয়ে থাকব’ কেন?
দেখবিনি ত !”
পুঁটি পশ্চাৎ ফিরিতেই চোখখাচোখি হইয়া গেল। পাঁচকড়িকে
ভূতের মত দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া সে হাসিয়া ফেলিল, তাহার
মুখ হইতে বাহির হইল—“মিসের মূর্তি হয়েছে দেখনা!”
পাঁচকড়ি অবসর বুঝিয়া অব্যর্থ উপায়টি প্রয়ােগ করিল
বলিল-“খিদেয় মরে যাচ্চি পুটি, বড় মাথা ঘুরছে।”
পুটি তাড়াতাড়ি উঠিয়া তাহার হাত ধরিয়া বলিল—“দ্যালে
ঠেশ দিয়ে বাে”-বলিয়া জোর করিয়া টানিয়া বসাইয়া দিল,
ও তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকিয়া এক ধামি মুড়ি-মুড়কি আনিয়া বলিল,
“খাজল আনি।” তাহার পূৰ্ব্ব ভাবের চিহ্নমাত্র আর তাহাতে
পাওয়া গেল না। পরে একটি কাসার ফেরাে করিয়া জল
আনিয়া সম্মুখে রাখিল। ঘটিটি দেখিলেই তৃপ্তি আসে, লােক
তৃষ্ণা ভুলিয়া যায়,—এমন সুন্দর করিয়া মাজা। যেন সাহেব
বাড়ীর নূতন পালিস-করা। চাকর দাসীর উপর খাঁহাদের নির্ভর
তাহারা এ সুখে চিরব:ঞ্চত।
পুটি পূৰ্ব্ব যখন ভাত দিতে আসিয়াছিল তখন তামাক
সাজিয়া, হুকায় জল ফিরাইয়া রাখিয়াছিল। এখন তাহাতে
টিকা ধরাইয়া দিয়া, সক’টই রাখিল ও বলিল—“তুই তামুক
খেতে খেতে আমি ভাত আর মাছ ঝলদে করে আনচি,”—এই
বলিয়া পুটি রধিতে গেল।
শেষ খেয়া
পাঁচকড়ি আর উচ্চবাচ্য করিল না, মুড়ি-মুড়কিতে মন দিল ;
সুন্দরী আসিয়াও যােগ দিল। পাঁচকড়ি জালের কথা একদম
ভুলিয়া গিয়াছিল, সে পুটির সেই “তাের দেওয়া বলেইরে
পােড়ার মুখাে” এই সুমধুর ভাষণের আনন্দ-গৌরবে ভােরপুর
হইয়া মুড়ি গিলিতে লাগিল।
নবীন অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছিল । সহসা একটা নিশ্বাসের
সহিত তাহার চক্ষু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল ; প্রাণ ঘন ঘন “বিশ্বনাথ
বিশ্বনাথ” করিতে লাগিল । কর দুইটি পরস্পর সজোরে
মর্দন করিতে করিতে তাহার মুখে প্রফুল্লতার আভাস ফুটিয়া
তাহার অন্তরটা
যেন তাহার অজ্ঞাতে যৌবনকে
বরণ করিয়া লইয়াছে। সে উৎসাহ উদ্যমপূর্ণ যুবার মত
সােজা হইয়া দৃঢ় পদক্ষেপে গঙ্গার ঘাটে গিয়া পদচারণা করিতে
উঠিল ।
লাগিল।
পুটি মালানির কথাগুলি নবীনের কানে ও প্রাণে দৈববাণীর
মত বাজিয়াছে। সে তাহার প্রত্যেক কথাটিতে সত্যের উপলব্ধি
করিয়াছে—সে গুলি যেন তাহারই জীবনের পরীক্ষিত ইতিহাস।
সব চেয়ে বড় লাভ—তাহা তাহাকে পথ দেখাইয়া দিয়াছে ।
নবীন ভাবিতে লাগিল—“ঠিকইত, জীবনযাত্রায় যে প্রথম সহায়
হয়, যে প্রথম সামলাইয়া দিয়া রক্ষা করে, সে যে মায়েরই মত
শেষ খেয়া
আপনার, তাহার আশ্রয় ত’ সকল সময়েই নিরাপদ। আমি
বাবার দোকানে প্রথম বাতাসা কাটিতে আরম্ভ করি, আমার
বাতাসার সকলেই সুখ্যাতি করিত, তাহাতে দোকানের উন্নতি,
সংসারের স্বচ্ছলতা দুই-ই ঘটে; তখন দিনও বেশ সুখে
কাটিয়াছিল। সে-শিক্ষা আমাকে ত’ ত্যাগ
সেই বাল্যবন্ধুই আমাকে আশ্রয় দিবে।"
গৃহত্যাগী স্বজনবিচ্যুত নবীনের অসময়ে এই বা
পাইবার একটা প্রবল ইচ্ছা জাগিয়া তাহার অত
উৎসাহের ঘাত-প্রতিঘাত আরম্ভ করিয়া দিল, ত
নেহে সহসা সে অসীম বল অনুভব করিতে লাগি
•চারণার গতিটা দ্রুততর হইল ।
সে পুটির কথাগুলি একে একে স্মরণ করি
“মনেইত’ ছােট বড়,-বড় করে নেবার মন চাই।”
“তার দেওয়া বলে নিতে পারলে ছােট-বড় কিছু থ
তিনি আমাকে যেখানে স্থান দিবেন সেই আমা
এনি ত’ আর সে স্থানটি বাদ দিয়ে থাকতে পার ।
তিনি থাকলেই কাশীর্তাকে আর ছাড়চে কে?”
ন্যায়ের (বা নব্য ন্যায়ের) সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া, সে
বালকের মানলে, সহাস্যে ও সতেজে আপনা আপনি বাস।
উঠিল—“যেখানেই থাকিনা কেন-কাশীবাস কোরবই।"
ঘাটে দশ-বারােজন লােক জড হইয়াছিল। তাহারা
শান্তিপুরে যাইবে ;-শান্তিপুরের জাহাজ সেই ঘাটেই লাগে,
19
১৭৮ শেষ খেয়া -তাহ' তপ্রায়। নবীনের . কথা যাহাদের কানে ফিরিয়া চাহিল, বােধ হয় তাহাকে পাগল কট কিনিতে গেল। নবীন নিজের গেঁজে -এখনও ৫২ টাকা আছে। ইতিপূৰ্ব্বে নিজের র সাহস তাহার ছিল না। এখন প্রফুল্লচিত্তে “ওঃ, বাতাসার দোকান খুব হবে—দের হবে ! কনিয়া সে যেন পুনর্জন্ম লাভ করিল; এতক্ষণে । আবার তাহার গায়ে লাগিল । প্রাণ বলিয়া উঠিল- “পয়সাটাই তো সব নয়, 1 আছে ! আর, তাতে যতক্ষণ প্রাণটা আছে 1 তাে শুধু মাংসপিণ্ড নয় ! সে কারেও এক কলসী দবার, কি কারুর বােঝাটা নাবিয়ে দেবার কাজে এখন জামা কি জুতো-জোড়াটাও তাহার বিরক্তিকর বন্ধনের মত বােধ হইতে লাগিল। তার। যে মানুষকে মানুষের কাজগুলাকে ছােট করে দেখতে শেখায় ! বাপ- কেবল বাধা ! শান্তিপুরের ষ্টীমার ঘাটে আসিয়া লাগিল । নবীন তাড়াতাড়ি নীচে নার্বিয়া গিয়া গঙ্গাজল স্পর্শ করিল ও “জয় বিশ্বনাথ” বলিয়া জাহাজে গিয়া উঠিল।
GANT WAT LIEMAR শেষ খেয়া ১৭. ; জাহাজের মুখ ঘুরিতেই দেখা গেল, নবীন ডিঙি মারিয়। সেই লাউগাছ-টাকা চালাখানি খ জিতেছে; পরেই—দুই হাত একত্র করিয়া মাথায় ঠেকাইল । জাহাজ “আগে চল—আগে চল" শব্দে চলিল। নবীন শুনি—“কাশী চল—কাশী চল্ !” ঈমার শান্তিপুরে পৌছিলে, যাত্রীরা নামিয়া যাইবার পর, সারেং দেখিল—কে একজোড়া পুরাতন জুতা ও একটা পুরাতন কোট কেলিয়া গিয়াছে । সম্পূর্ণ ***** Est.c: 17197 MAKARON-
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.