Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah

Gaye Holud

Sen,dinesh Chandra · 2010/04/30

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

গরহ
দীনেশ চন্দ্র সেন
১২৭

No text on this page.

উপহার পত্র)

No text on this page.

:
পরম কল্যাণীয়া
মতী শচীরাণী দেবীকে
এই বইখানি দিয়া
আশীর্বাদ করিলাম।
দীনেশচন্দ্র সেন।
ull 1]
il]]

No text on this page.

ভূমিকা
ছােট্ট কনে বউদের জন্য এই বইখানি লেখা হয়েছে।
বাপমায়ের জন্য যাদের চোখের জল এখনও তাকায়নি
—মাথায় ঘােমটা রাখার অভ্যাসটা যাদের এখনও ঠিক
আয়ত্ত হয়নি-খাট সুরে কথা বলতে যাদের বাধ বাধ
ঠকে—বাল্য-শীলার শত শত কথা যা এখনও
ঘিরে রেখেছে—সেই নূতন বউদের হাতে দেখা
মতন করে আমি এই বইখানি লিখেছি। গত
বাড়ীতে গিয়ে নিজের জায়গা জুড়ে বসে বন্ধু আমার
গৃহ খানি পড়বেন। কিন্তু এ বইখানি যখন হাতে
দিতে চাচ্ছি, তখন শশুর বাড়ী বউএর কাছে যত
একটা প্রহেলিকা। সেই নূতন জায়গায় যেয়ে এখন
হ’তে কিরূপে চলতে হবে—এই বইখানিতে তাই বলা
হয়েছে। হিন্দুর ঘরের শমী যখন চঞ্চল প্রকৃতিটি
সংবরণ করে নুতন গৃহে মেহের পদ্মানে স্থির হয়ে
বসনে, এই আমার অধ্য তখন যদি তিনি প্রতির
চক্ষে দেখেন তবেই আমার শ্রম সার্থক। গৃহ
মেয়েরা যত্ন করে পড়ছেন, এটি আমি জানতে পেরেছি।
তাদের সরে, আম-প্রকোষ্ঠে, নবজাত শিশুৰ ৰালিসের

কাছে, হেঁসেলে সৰ্বত্ৰ গৃহ দেখতে পেয়েছি, তা
না হলে তিন বৎসরে য়টা শংকরণের দরকার কি করে
হতে পারে?
কিন্তু গায়েহলুদ ঠিক বিয়ের কনেকে দেওয়ারই
জয় হয়েছে। যদি এক থেকে নূতন বউ আমার কথা
মত চলতে পারেন তবে তিনি লক্ষ্মীটি হবেন।
যার নামে এই বই দেওয়া হল, তার বিয়ের
পূর্বেই বইখানি লেখা হয়েছিল, কিন্তু তাড়াতাডি
ছপা শেষ কতে পারি নাই। এই জন্য আমার
শৰ্বাট দিতে দেরি হয়ে গেল।
বেহালা, ২৪ পরগণা
১৩ই আষাঢ়, ১৩২
{ দীনেশ চন্দ্র সেন

সূচীপত্র नई ••• •• ৯ হঠাৎ নূতন জায়গায় সোলের কথা আগমনী গান ছােট বউয়ের প্রথম আলাপ একালের কথা সয়ে থাকা তোমার বাড়ী নিজের দোষ ও পরের দোষ . ১০ ১৮ ২১ পরের . খুত ধরা ০০ ••• ০ ০ ০ ২৫ ২। ••• আদর ও অনাদন আবদারে বাণীর গল্প বেড়াল কাটার গল্প দেওয়া-নেওয়ার হিসাব ০ ৩ সলের পাশা २ ০ ০ ০ st কোন্ বেশ পৰে শৰ শাড়ী ৫০০

বরযে
দীক্ষা নেওয়া
•••
। এ
•••
০ ০ ০
बांगयांगांव भब
দেবর গল্প
ভালবাসা, দেওয়ানের হিসাব নয়
শেজের ক্য
পরিশিষ্ট
•••
০ ০
১১৫
ছবির সুচী
গায়ে হলুদ
মায়ের আশীর্বাদ
মুখপত্র

গারহ
হঠাৎ নূতন জায়গায়
তুমি তাে শ্বশুর বাড়ী চলে। তােমার ছােট
বড় ভাই বােনদের ফেলে, তোমার বাপ মাকে কেলে,
তােমার সাথীদের ফেলে-তােমার এই খেলাৰেড়ার
পথ ঘাট ফেলে—জানা শােনা সব জিনিষ ফেলে
চলে এক অজানা অচেনা রাতে। তোমার মনের
ভাবটি আমি কতকটা বুকুতে পাচ্ছি। তােমার
মনের ভিতর যে একটা ভয় না হচ্ছে, তা নয়।
এখন ক্ষুধা হলে চেয়ে খেতে পাবে না; নিজে
ভাড়ার ঘরে গিয়ে এটুকু ওটুকু মুখে দিতে পাৰে
না; আর তার সামনে আর হতে পারবে না,
...]

* গায়ে হলুদ
দুটোছুটি করুতে পারবে না; গুণে গুণে পা ফেলতে
হবে; শাড়ীটায় সমস্ত শরীর ঢেকে-ঘােটায়
মুখখানি আড়াল কোরে ঠিক জ্যান্ত একটি পুলিন্দা
যেয়ে বসে থাকতে হবে। আর সবার চাইতে
বিপদ, তােমার দিকে একশ চোক চেয়ে থাকবে।
এখানে তুমি কি কোচ্ছ না কোচ্ছ, তার খবর কে
রাখে। কিন্তু সেখানে তুমি একটু হাই তুললে
তা নিয়ে কথা হবে। কিরূপে হাসতে হবে,
কিরূপে পা ফেলতে হবে, কিরূপে ভাতের গ্রামটি
পর্যন্ত মুখে তুলতে হবে—তা তোমায় নূজ্ঞ কোরে
শিতে হবে। এখানে পাশের বাড়ীর হরিদাসী
এসে তােমায় ডাকলে যেমন তুমি ছুটে গিয়ে তার
গলা জড়িয়ে ধরে প্রত্যেক কথায় হেসে ঢলে পড়,
—এ পাড়া হােতে ও পাড়, এ বাড়ী হতে ও বাড়ী
ছুটোছুটি কোরে বেড়াও সেখানে তার কিছু পাৰে
। সেখানে কথা বলবার লােক খুঁজে পাওয়া
কঠিন হবে; সারাদিন কেবলই ঘাড় নেড়ে মনের
কথা বুঝতে হবে। দুই একটি সঙ্গিনী পেলে ও
২

* গায়ে লুদ
ছোট ছোট ছেলে মেয়ে দেখলে, তাদের সঙ্গে হয়ত
কথা বলতে পারে, কিন্তু ফিল ফিস কোরে।
ছেড়ে কথা বলবার পালা তােমার একরকম শেষ
হােয়ে গেল।
সে কালের কথা
কিন্তু পচিশ ত্রিশ বৎসর পূর্বে তােমার চাইতেও
ঢের ছােট ছােট মেয়েদের বিয়ে হােত। তাদের
দশা একবার ভেবে দেখ। তারা ঘােটা-টা নিয়ে
প্রথম প্রথম বেশ আমােদ বােব কত।
সেটা টেনে মুখের উপর অনেকটা বাড়িয়ে দিলে,
তখন চোখে কিছুই দেখতে পেল না। সেই অবস্থায়
হেঁটে যেতে পাটের ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। কখনও বা
ঘোটা ঘােট করে দিয়ে, মুখখানি সৰ ঢেকে আঙ্গুল
দিয়ে খােটা টি সরিয়ে একটা মাত্র চোখ খুলে,
তাই দিয়ে লােক জন সব দেখতে লাগল,যােমটাটা

* গায়ে হ%
তার খেলার জিনিষ হয়ে দাড়াল। প্রথম প্রথম
সে ভারি মজা পেল; কিন্তু সে খেলার সটা বেশী
দিন রইল না। হয়ত একটু ছুটে আসছে, বাড়ীর
বুড় ঠানদিদি ভাড়া দিলেন। মাথার ঘােটাটা
খুলে একটু বসে আছে, পাড়ার এক বুড় মাসী এসে
বলে গেলেন বউএর লজ্জা সরম নেই। বউএর
বয়স কিন্তু তখন ছয় কি সাত। বউ এর ক্ষুধা
পেলে দুটি চোখ জলে ভেসে যেত, তখন মায়ের
কাছে যেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদবার ইচ্ছা হােত।
ছেলে মেয়েরা এবাড়ী ওবাড়ী ছুটোছুটি করে
খেলা করছে দেবে তারও তাদের একন যেয়ে
খেলতে সাধ হােত। এতগুলি দুঃখ ও ইচ্ছা তাকে
চেপে রাখতে হােত! সেই এতটুকু মেয়ের যে কি
কষ্ট হােত, তা তােমরা বুঝতে পার। চোখের
দেখলে শাসন, কোন লােকের দিকে
চাইতে দেখলে শাসন, পুকুরে জল আনুতে
গিয়ে সঙ্গিনী কারু সঙ্গে আলাপের সময় একটু
জোরে হাসূলে শাসন-তার কাজকর্ম চলাফেরা
৪

* গায়ে *
কথাবার্তা সবই অতি অপরাধীর মত তাকে করতে
হাত।
তার একটি মাত্র সান্ত্বনার জায়গা ছিল। সে
ঘুমুবার ঘরটিতে যেয়ে “মা” “মা” বলে লুটোপুটি
করে কাঁদতে থাকতাে। সে কিছু বলে কয়ে
শােক প্রকাশ করুত না; সবাই ঘুমিয়ে পােল
সে “মা” “মা” বলে কাদতে কাদতে অবসন্ন হােয়ে
শেষে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।
আগমনী গান—দুর্গাপুজা
সেই সময় ছােট মেয়েদের শ্বশুরবাড়ী পাঠিয়ে
দিয়ে তাদের মা বাপ কিরূপে ঘরে থাকতেন, তা যদি
তুমি আগমনী গান শুনে থাক, তবে কতকটা বুঝতে
পারবে। শিবের ঘরে আট বছরের গৌরী গেছেন।
শিব পাগল, কত কষ্টে গৌরী ঘরকন্না করছেন,
ভাবতে মা মেনকা রাণীর দুটি চোখ জলে ভেসে
..

গায়ে হল *
কোনো গানে তিনি স্বামী গিরিরাকে
কৈলাসে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, কেঁদে কেঁদে বলছেন,
“আজ আমি স্বপ্নে দেখলুম,গৌরী ‘মা’ ‘মা’ বলে
কাছে। কোনাে গানে তিনি বলছেন, “তুমি
শিবকে এখানে নিয়ে এল, আমি তাকে ঘর জামাই
কোরে রাখব। তা হােলে আমি বারমাস তাদের
দেখতে পাব তােমাকে বছর বা পরকালে
গিয়ে তাদের আনূতে হবে না। কোনো গানে
বলছেন—“না আমায় সব বলে গেছে, শিব ভাঙ্গ
খেয়ে তাকে কত কটু কথা বলতে থাকে—বিয়ের
সময় গৌরীকে যে সকল কাপড় ও গহনা দিয়ে
ছিলুম, শিব তা সমস্ত বেচে সাবাড় ক’য়ে দিয়েছে।”
শরৎকালে যখন বৈষ্ণৰ ভিখারীর সারেঙ্গ বাজিয়ে
মেনকামায়ের এই সকল বিলাপের কথা গাইতে,
তখন বঙ্গদেশের পাড়াগাঁয়ের সমস্ত মায়ের প্রাণ
সাড়া দিয়ে কেঁদে উঠতে; কারণ সেই সকল গান
তাদেরই প্রাণের কথা, সে গুলি তাদেরই চোখের
এলে গড়া, বৈষ্ণব ভিখারী তা সুরে গাইত মাত্র।
;

* গায়ে হলুদ
এই ছােট্ট ছোট্ট মেয়েরা যখন শ্বশুরবাড়ী বেত
তখন মা, বাপ, ভাই-বােনের মনে কত কষ্ট হােত,
সেই কষ্টের কথা পুরাণে অনেক চড়ায় পাওয়া
যায়। বাপ কঁদছেন; গামছা দিয়ে চোখ মুছছেন
এদিকে মেয়ে বেচে যে পণের টাকা পেয়েছেন,
তা তুলে রাখছেন। মা গলা ছেড়ে কাঁদছেন;
যে বােন দিনরাত ঝগড়া করতো, তাকে গালাগালি
দিত, সে আজ খাটের পায় থােরে কাঁদছে। মেয়ে
যাবার সময় মাকে বলছে, “আমায় দিও না। মা
কেঁদে বলছেন—“সতার মধ্যে টাকা নিয়ে বিয়ে
দিয়েছি, তােমায় কেমন কোরে রাখবাে?”
তখন আত্মীয়েরা ছেড়ে দিল। সমুদ্রের জলে
যেমন একটা খড় কুটো ভেসে যায়, অজানা রাজ্যের
অচেনা স্থানে ছােট্ট বউটি তেমনই ভেসে চর।
পুরাণ ছড়ায় আছে, বালিকা মাঝিকে বলছে-
“নৌকাখানি ভাঙ্গা, মাদারের ডাল দিয়ে বৈঠা তৈরী
হােয়েছে, নদীর জলে নৌকা চলছে, কিন্তু চলতে
চলকে এল উঠছে—মাঝি ভাই আমার বড় জয়

গায়ে লু
হেছে। আবার বলছে, “মাঝি একটু ধীরে ধীরে
নৌকাখানি বেয়ে যাও, আমার মা মাটিতে পড়ে
গলা ছেড়ে কাদছে, আমি একটু শুনব, অত
তাড়াতাড়ি যেও না।” এই ছােট্ট বউটির দুঃখে
সমস্ত পাড়াগাঁয়ের প্রাণ কেদে উঠতাে। ছড়াগুলি
পড়লে তা স্পষ্ট বােঝা যায়।
তুমি তাে দুর্গাপূজা দেখেছ। এই দুর্গাপূজার
অর্থ কি? বছর ভরে কষ্ট সয়ে মেয়ে বাপের
বাড়ী আছে। মাত্র তিনটি দিনের ছুটি পেয়ে
আছে। সে কি আনন্দ। সে কি উৎসব।
সমস্ত মায়ের প্রাণের ব্যাথা দিয়ে এই পূজা-গড়া।
সারা বছরের যত দুঃখের কথা মেয়ে মায়ের আঁচলে
নিজকে লুকিয়ে অতি ছোট সুরে বলছেন। মা
তছেন, আর আঁচলে মুখ মুচছেন। এ পূজা
বাইরের জিনিষ নয়। সারা বছরের কষ্টের বােক
কথা মায়ের চরণছায়ায় নামিয়ে রেখে একটু
সােয়ান্তি বােধ কচ্ছেন। শুধু তিনটি দিনের মিলন।
এই তিনটা দিন তাে দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যাবে।

* গানের সুর এই জন্যইতে এ পূজা এত দু। যত দুঃখ সব যুটে গিয়ে মা ও মেয়ে আর একত্র হয়েছেন- এই মিলন যেন কত তপন্যার ফল। তাই দুর্গা- পূজা আমাদের দেশের মায়ের প্রাণের উৎসব। এই পূজার সংবাদ দিচ্ছে আগমনী গান, পূজা শেষ হওয়ার কামার সুর বিয়া গানে বেয়ে উঠছে। সেই পুরানাে আমলে বয়ের বয়স প্রায়ই নে যেত। কনেটি হােত হােট। এই এত বড় ও গানে আমরা পিঠাকুরকে বুড় দেখতে পাই। বয়স বেশী থােক, ছােট্ট বউটির জন্য তার প্রাণে মেহের অভাব ছিল না। ছােট বউএর প্রথম আলাপ ছােট্ট মেয়ে বয়স্ক স্বামীর সঙ্গে যাচ্ছে। একটা ছড়ায় দেখতে পাই কেঁদে কেঁদে তার চোখ ফুলে উঠল। সে স্বামীকে জিজ্ঞাসা কছে-“আমি

গায়ে হলুদ
তােমার সঙ্গে যাচ্ছি, আমায় কে ভাত দেবে?
স্বামী সস্নেহে বলছেন—“তােমার জন্য আমি একশ
দু’শ চাষী দিয়ে ক্ষেত চষে রেখেছি, ভাতের অভাৰ
হবে না” বউ আবার বলছে—“কাপড় কোথা
পাব?”—তােমার জন্য ঘরে ঘরে উঁতিরা, নীলা-
স্বরী, ডুরে ও মেঘডুমুর শাড়ী তৈরী করছে। কিন্তু
এ কথাতাে আসল কথা নয়। প্রাণের কথাটি বলতে
যেয়ে কনে বউ এর চোখে জল এল, ঠোট দুটি
কাপতে লাগল। অতি কষ্টে সেই প্রাণের ব্যাথাটি
চেপে রেখে সঙ্কোচের সঙ্গে বউ বলে ফেলে
“আমি তােমার সঙ্গে যাচ্ছি, কিন্তু আমি কাকে মা
বলে ডাকবো?” স্বামী সস্নেহে বলছেন—'আমার
যে মা আছেন, তাকেই তুমি মা বলে ডাকবে।এই
ছােট্ট মেয়েটির অজানা দেশে যাওয়ার ভয়, তার মনের
দুঃখ ও ইচ্ছা এবং স্বামীর সেই পুরাণে ছড়ায়
কেমন একটা কান্নার সুরে মনকে আঘাত কচ্ছে।

* গায়ে একালে খা সে অন্যটি এতো গেল সেকালের কথা। এখন তো আর তুমি তত ছোট নও। এখন মাঝি ভাইকে বলে কয়ে ধীরে ধীরে নৌকা বেয়ে তো আর মায়ের কান্না শুনতে চাইবে না। কিন্তু তবু তােমার মায়ের জন্য প্রাণ কাবে, তােমার ছােট ভাইবােনকে স্মরণ কোরে চোখের পল পড়বে। যেখানে যাবে, সেখানকার তাঁরা একশবার ঘােমটা খুলে তােমার মুখখানি দেখবেন ও দেখাবেন। যে খুব সুখের কি না, তা বলতে পারি না। যদি সকলেই তােমাকে নিয়ে আলােচনা করেন- তােমার নাকের ডগা হােতে সরু করে পায়ের নখ পৰ্যন্ত যখন সকলের দোর জিনিষ হােয়ে দাড়াবে -কেউ চসমা আঁটা চোখে ভাল কোরে নিরীক্ষণ কোরে দেখবেন—কেউবা ঘােটা আস্তে তুলে স্থির হয়ে চেয়ে দেখবেন, কেউ তােমার বর্ণের কথা বলে মন্তব্য প্রকাশ করবেন, কেউ তােমার

গায়ে লু
আঙ্গুলগুলি মােটা কি সরু, তােমার ঠোট পুরু কি
পালা, তােমার চুল ঘন কি অল্প, তােমার
পাদুখানি খড়মের মত কি পদ্মের মত, হাতের
তেলাে শক্ত কি কোমল—তুমি হাঁটতে যেয়ে কোন
দিকে হেলে পড়, ডান পা আগে ফেল কি বাম পা,
বর্ণটি চাপা ফুলের মত কি কাল কেশরের মত, না
মেঘের মত, ফ্যাকাশে না উজ্জ্বল,—এই রকমের
তর্ক বিতর্ক করুবেন, এবং সেই সঙ্গে আর আর
বউদের সহিত তুলনা চলতে থাকবে, তখন তুমি
হয়ত অরহর কাঁপতে থাকবে ৭ ঘন ঘন ডােক
গিলবে—তা আমি এখানে বােসে কেশ কল্পনা
করতে পাচ্ছি।
সফ
তুমি এখানে আছ ঠিক স্বচ্ছলভাবে, কে
তােমার খােজ করে। কিন্তু বাজার হতে কোন

* গায়ে হলুদ
জিনিষ কিনে আনলেযেরূপ সকলেই একবার নেড়ে
চেড়ে দেখতে থাকেন এবং কি রকমের জিনিষ,
তাহার দাম কি হােতে পারে এই সম্বন্ধে সকলেই
বিচার কোর্নে থাকেন, তােমাকে নিয়ে সেই
হােতে পারে-হবেই যে তা বলতে পারি না, কারণ
এমন সকল বাড়ী আছে, যাতে এরূপ করা তার
রুচি-সঙ্গত মনে করেন না। কিন্তু অr
জায়গায়ই এরূপ দরদস্তুর ও যাচাই হােয়ে থাকে।
নাে জিনিষের সঙ্গে এইটুকু তফাৎ যে সে সকল
জিনিষ, তাদের সম্বন্ধে যা কথাবার্তা হয়, তাহা কিছুই
বুঝতে পারে না; কিন্তু তুমি তাে একখানি ঢাকাই
শাড়ি কি কাণের মাড়ি নও; তােমার সম্বন্ধে যে
সকল কথাবার্তা হবে, তা তুমি সবই বুঝবে; কিন্তু
তােমাকে ঠিক মাকড়িটা বা শাড়ি খানার মত চুপ
কোরে থাকতে হবে। কোন বুড়ী এসে নাকটা
শিকেয় তুলে হয়ত বলবেন—এই বউএর রং।
এ যে কালো—তার সঙ্গে তাে মােটেই মানাবে না।”
তখন তােমাকে দেখাতে হবে যেন তােমাকে কিছু

* গায়ে হলু
T
বলা হয় নাই। তােমার সম্বন্ধে যে আলােচনাই
হউক না কেন—তুমি ঠিক সিদ্ধ পুরুষের মত হয়ে
থাকবে। দুঃখে বিরক্তির ভাব দেখাতে পারবে না।
দাত বার কোরে হাসতে পারবে না—মাটীর দিকে
চেয়ে থাকতে হবে; তুমি নিজে ছুটে যেতে পারলেও
যিনি তােমায় থােরে নে যাবেন, তার সঙ্গে তালে
তালে পা ফেলে মল বাজিয়ে অতি ধীরে হেঁটে যেতে
হবে। মুখে কথাটি নেই–লজ্জায় জড়সড়, যেন ছবি
বা পুতুল, এমনটি হােয়ে থাকতে পেলে তবে লক্ষী-
বউ নামটি পাবে।
তােমার বাড়ী
কিন্তু তােমার যতই কেন দুঃখ কষ্ট না হউক,
এটা তােমার নিশ্চয় বুৰূতে হবে, যে ঘরে তুমি এলে,
সেই নূতন অচেনা স্থানটি হবে তােমার বাড়ী।
পুরাণাে চেনা জায়গা ও তার সঙ্গে জড়িত শত শত
১৪

গায়ে লু
স্নেহ মায়া তুমি ছেড়ে এলে—সেটির জন্য তােমার
মনের চিরকালই একটা মনের টান থাকবে সত্য,
কিন্তু সেটি তােমার আসল খাবার খান নয়।
এই জন্য কিসের মধ্যে পড়লুম—ভেবে বেশী
কান্না কাটি কোর না। আকাশে ডানা ঝাপটে উড়ে
বেড়াতে, এখন পিজরার মধ্যে পড়ে দম বন্ধ হবার
জো হােয়েছে—এরূপ তেব না। যেটা তােমার
প্রকৃত বাড়ী হােল—প্রথম থেকেই তা চিনতে সুরু
করে দাও। কেন না এখানেই তােমাকে থাকতে
হবে। বাড়ীর কার কিরূপ মেজা—এটা ভাল
কোরে বুঝে নাও। কেউ এমন আছেন—ভয়ানক
চটা মেজাজ-কথায় কথায় রাগ, কিন্তু হয়ত প্রাণটা
কোমল; যেমন ডাবের বাইরেটা শক্ত, কিন্তু ভিতরটা
নরমতার প্রকৃতি তেমনই বাইরে খারাপ হােলে
ভিতরে ভাল ; এটা তােমাকে ভাল কোরে বুঝতে
হবে। এই সকল লােককে খুশী রাখা বেশী শক্ত
নয়। তিনি রাগ কল্পে, তুমি সয়ে থেকো। কথার
পিঠে কথা বােল না। কিম্বা মুখখানি মজা করে

* গায়ে হলুদ আর কোরে দেখিয়ে না যে তুমিও খুব চটে গেছ- কিন্তু কথা বলতে পাচ্ছ না, কেননা তুমি বউ। কিছু কাল বকে ঝকে তিনি ঠাণ্ডা হয়ে যাবেন। তার পর যদি দেখেন, তুমি তার রাগটা ঠিক বুদ্ধিমানের মত সহ করে ফেলেছ, তা হােলে তিনি মনে মনে বড় খুসী হবেন। তার পর যদি তুমি তার একটু সেবা শুশ্রষা কর, তা হোলে তিনি তােমার খুব পক্ষপাতী হয়ে পড়বেন। ঝড়ের সময় যেমন ডিলিখানির একটু সামলে থাকা দরকার, তার আগের সময়ও তােমার তেমনই একটু সামলে থাকতে হবে, এই পৰ্যন্ত। কোন কোন বউ এইরূপ গুরুজনের রাগের সময়ে হয়ত কোন কথার উত্তর করে না, কিন্তু মুখ চোখ দিয়ে দেখাতে ছাড়ে না যে, সেও বেজায় চটে গেছে এবং তার কাছে আর সহজে যেতে চায় না, ফলে এই দাড়ায় যে তার রাগও ক্রমশ বেড়ে যেতে থাকে। বাইরের লােক এসে হয়ত তােমার কাছে “আহ” “উহ” কৰে। সেই গুরু ব্যক্তির কথা তুলে বলবে—“তার এ ভারি অন্যায়, এমন সকল

* গায়ে হলুদ
কখাও নাকি মানুষে নতুন বউকে বলতে পারে।”
এই সকল বাইরের দয়া হতে তুমি নিজকে
সাবধান রেখে ; কারণ সে সকল কথা শুনলে
তােমার রাগ ও মনের বিরক্তি বৃদ্ধি পাবে মাত্র।
যারা রাগ উস্কিয়ে দেয়—তার মিত্র নয়। গৃহের
শান্তি বজায় রাখতে হবে—এটি তােমার প্রথম ও
প্রধান চেষ্টা হওয়া উচিত। গুরুজনের ভৎসনা
শুনে অপরের কাণে সে কথা তুল না, কিংবা অপরে
যদি দয়া দেখাতে আসে, তাকে প্রশ্রয় দিও না।
কারণ সেই গুঞ্জন তােমার আপনার বাইরের
লােক-দেখান স্নেহে তােমার মনের ক্ষুধা মিটবে না।
বাড়ীতে কোন গােলমাল হােলে সেই গােলযােগের
মূলটা কোথায়, 'তা ভেবে দেখ, এবং তুমি সয়ে
থাকলে, কিংবা বিনয় ক,ে মাটীর মতন হােতে
পারুলে সেই গােল মিটতে পারে কিনা—তা চিন্তা
কোরে দেখ। এ অন্য তােমার দে ও অতিমান
সব ছেড়ে দিও; সমস্ত ঝড় মাথায় কোরে নিয়ে,
নিজের মান অপমান ও রাগ ছেড়ে দিয়ে যদি তুমি,
১৭

গায়ে সুদ * ভগবানের পায়ে ফুলটির মত হােয়ে পড়তে পার তবেই তুমি লক্ষীৰউ হােতে পাবে। হয়ত নূতন বাড়ীতে এমন দুই একটি লােক পাবে, যারা মুখে বড় রাগ দেখান না; কিন্তু কোন অন্যায় আচরণ দেখলে মনে মনে চটে থাকেন ; তাঁরা তত ক্ষমাশীল ন। তারা যেটা তােমার দোষ বলে মনে করে, সেটা সহজে ভুলবেন না। সকল লােক নিয়ে কারবার করাটা একটু শক্ত এবং এইরূপ প্রকৃতির লােকের কাজ কর্ম করতে একটু বিশেষ সাবধানতার দরকার। যাতে নিজের কোন ত্রুটি না হয়, সে দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। নিজের দোষ ও পরের দোষ কিন্তু যিনি যেমন লােকই হউন না কেন, ভাল- বাসার যাদু মন্ত্র দিয়ে সকলকে ভুলিয়ে ফেলা যায়।

* গায়ে হলুদ * তুমি যদি সব্বাইকে আপনার জন বলে মনে কর, তবে তুমি কখনও কারো মন হােতে দুরে থাকবে না। নিজের মান অপমান সরিয়ে রেখে, পরের সুখ- স্বাচ্ছন্দের জন্য নিজকে সমর্পণ কোরে দেওয়া—এই হচ্ছে গৃহস্থালীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। স্বামীগৃহ হােচ্চে এই শিক্ষার কলেজ। এখানে পরের দোষ দেখবে না, তা নিয়ে আলোচনা করূবে না; নিজের কি দোষ আছে, তাই সর্বদা চিন্তা করে। পরের দোষের জন্য ভগবান তােমাকে দায়ী করবেন না। তারা তােমায় কষ্ট দিতে পারেন সত্য, কিন্তু নিজে নিরপরাধ থাকলে তােমায় মনের শান্তি হেতে কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না। যে তােমার উপর অন্যায় কোরেছে, তাকে যদি অন্তঃকরণ দিয়ে ক্ষমা করতে পার, তবে দেখবে তােমার ইষ্ট হয়েছে—অপকারী তােমার কোন অনিষ্ট করতে পারে নাই। পরের দোষ দেখা অতি সহজ। যে নােক খত অশিক্ষিত ও বৰ, সে তত বেশী পরের দোষ দেখে ও আলোচনা করে। তােক যত সভ্য ও উন্নত ,

গায়ে হলুদ
সে ততই নিজের দোষের আলােচনা করে। এই
সত্যটি সর্বদা মনে রেখাে যে, একজন যদি তােমার
উপর হাজার অন্যায় করে, তার বিষয়ে তুমি ৰত
চিন্তা করবে, ততই তােমার রাগ বৃদ্ধি পাবে মাত্র।
রাগে মানুষের কল্যাণ হয় না,কল্যাণ হয় প্রেমে।
তােমার যদি অতি ছােট একটি দোষ থাকে, তা
আলােচনা করে সংশােধন করূতে চেষ্টা করুলে
তােমার উন্নতি হবে, কিন্তু পরের যদি পৰ্বত প্রমাণ
দোষ থাকে, তা আলােচনা করে তােমার নিজের
অবনতি বই উন্নতি হবে না।
এজন্য তুমি নিজের দিকে সর্বদা একটা লক্ষ্য
রেখ, এবং মনে কো’র তুমি একটি ফুলের কলি,
পৃথিবীর হাওয়ায় ও আলােতে তুমি ফুৰে ব'লে
এসে। সে হাওয়া ও আলাের যিনি কর্তা, তিনি
তােমার ফোটার অপেক্ষা কচ্ছেন। সুতরাং পৃথিবীর
ধূলাে যাতে তােমার গায়ে না লাগে সেই লৰে
তুমি তাই যােগ্য হয়ে উঠতে চেষ্টা কোর। তার
পূজায় লাগাতে হবে। সেইটি হবে তােমার জীবনের

* গায়ে * লক্ষ্য। তুমি গঙ্গাধারার মত হৰিৰ হতে এচ্ছে, তারই পাদপদ্ম হােতে ছুটে এসে তােমার সম্মুখে প্রেমের মহাসাগর বুক বিস্তার কোনে আছেন, তুমি সংসারের কাছে আটকে গেলে সেখানে যেতে পারবে না। পত্র জমা আজ তােমার গায়ে হলুদ। আর লাল চেলি পরে মাথায় চন্দন মেখে, গায়ে অলঙ্কার পরে, চুল বেণী করে বেঁধে তুমি যাচ্ছ। পুরুৎ মন্ত্র পড়ছে, বাড়ীর দোরে নহৰৎ উঠেছে। তুমি বাপ মায়ের দুশ্চিন্তার কারণ ছিলে; বাড়ী ও সকলে তােমায় বাড়ী ছেড়ে যাওয়ার জন্য এতকাল বসে বলে ভেবেছেন; আজ তুমি লক্ষীমূর্তিতে পায়ে আলতা পরে চলে। তোমার মাথায় চারদিক হােতে ধান- দূর্বা পড়ছে, সেই আশীর্বাদ মাথায় কোরে পরের ২১

* গায়ে *
বাড়ীতে যাও। জন্মে জন্মে তুমি পরের জন্য হােয়য়া
এবং পরের জন্যই যেও। দেন, পরের জন্য যার
জীবন, তিনিই দেবতা। নিজকে ভুলে যেয়ে পরকে
বরণ করাই হচ্ছে মনুষত্বের চরম বিকাশ।
তা হেলে দুঃখ কোথায় ? যে নিজের ক্ষুধা
ভুলে যেয়ে পরের ক্ষুধা দেখলে উতলা হয়—সেই
তাে দেবতা। সে দেবতা কি দেখ নাই? সে দেবতা
ঘরে ঘরে দেখে। সে দেবতা তােমার মা। যার
নিজের গায়ে কাঁটার আচড় লাগলে সে দিকে তিনি
ফিরেও তাকান না, কিন্তু পরের গায়ে লাগলে
“আহা উহু” কোরে উঠেন সে দেবতা কি তুমি
দেখ নাই ? দেখেছ বইকি? সে দেবতা তােমার
মা। তাঁকে প্রণাম করে নতুন জায়গায় যেও,
পরের জন্য বেদনার সেই মহাশিক্ষা মাথায় পেতে
মূলধনের মত নিয়ে যেও। নিজের মুখ খুলতে
যেও না, তা মারা গেছে তারা সে সুখ পায় নি,
সংসারটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এসেছে। দেবতার
নৈবেদ্য হাতে পূজারিণীর মত, নিজকে সঁপে

* গায়ে হলুদ দেওয়ার মন্ত্র নিয়ে নূতন গৃহে প্রবেশ কর। আমরা যাত্রাকালে তােমার সেই মূর্তি দেখবে—সে দেবী মূর্তি মাটিতে গড়া পুতুল নহে; পরের দুঃখে সম- বেদনাময়ী, পরের ওভ করিবার ইচ্ছার জীবন্ত মূর্তি স্বরূপা সেই দেবীমূর্তি। এই গায় হলুদের দিনে এই ক’টি কথা তােমায় বলতে এসেছি। খুৎবা যাঁরা তােমায় নূতন জিনিষ মনে কোরে কেবলই তােমার সম্বন্ধে আলােচনা কচ্ছিলেন, তাঁরা শেষে থেমে যাবেন। পাড়ায় তােমার চুলের কথা নিয়ে, বর্ণের কথা নিয়ে যে বিচার চলছিল, সে বিচারের বৈঠক ভাবে। “কই গাে তােমাদের বউকে দেখাও” বলে দিনের মধ্যে একশবার আর লােক আনাগােণা করবেন না। সব্বাই তােমায় চিনে ফেলেছেন। বাইরের রূপ দেন হেয়েছে, এখন

গায়ে হলুদ
তােমার ভিতরকার রূপ দেখার পালা। এখন
তােমার বাইরের রূপ সম্বন্ধে যে দুই একটি মন্তব্য
হবে, সে কেবল ভিতরকার রূপের সাক্ষী কবার
অঙ্গ। তােমার ব্যবহারে চটে গেলে, তুমি সুন্দর
হােলে কেউ হয়ত বলবেন “এটি একটি মাকাল
ফল”। তােমার রং কালো হলে হয়ত বলবে-
“যেমন ভেতর তেমন বাইর। এ ছাড়া কথায়
কথায় তােমার মা বাপকে ধধরে হয়ত বা টানাটানি
হবে। তােমার ব্যরহারে কোন খুৎ পেলে এমন
সকল কথা হয়ত তারা কইবেন, যাতে তােমার
মনে খুব বিধবে। যখন তােমার মায়ের কথা ও
বাপের কথা ভাবতে তােমার বুক ফেটে যাবে,
তখনই হয়ত তাদের সম্বন্ধে অতি নিষ্ঠুর মন্তব্য
তােমায় শুনতে হবে। সেগুলি সয়ে থাকা খুব
শক্ত, কিন্তু তােমাকে সয়ে থাকতে হবে। তুমি
কনে বউ, তােমার মুখে কথা বলার শক্তি সমাজ
দেন নাই। সকল সময়ই যে নূতন বউকে এই
সকল কষ্ট সইতে হয়, তা বলছি না, কিন্তু অনেক
২৪

* গায়ে হলুদ
হিন্দু ধরেই—বিশেষ পাড়াগাঁয়ে নূতন বউকে এই
ভাবে লাঞ্ছনা পেতে হয়, আমি তাদেরেই মনে করে
আমার কথা বলে যাচ্ছি।
এখন দেখা যাচ্ছে তুমি শারীরিক রূপ সম্বন্ধে
অতিরিক্ত আলােচনা হােতে যে দিন মুক্তি
পাৰে, সেইদিন যেতেই হয়ত তােমার চরিত্রের
আলোচনা শুরু হবে। সে ও তােমার সয়ে থাকতে
কিন্তু মানুষ যেরূপ বাহিরের একটা রূপ লয়ে
সংসারে আসে, তার একটা ভিতরকার রূপ ও
মাল হােতেই দেখা যায়। কেউ যদি কানা
বা খােড়া হয়, তাকে দেখে তােমার রাগ হয় না
দুঃখ হয় ? নিশ্চয়ই দুঃখ হয়। কেউ যদি রাগী,
হিংসুক বা অত্যাচারী হয়, তবে সেটিও দেন তার

* গায়ে হলুদ
স্বভাব।
তার রূপগত দোষগুলি দেখে যদি
তােমার দুঃখ বা করুণা হয়, তার চরিত্রগত দোষ
দেখলে তােমার বিরক্ত হওয়ার কারণ কি? তাকে
দয়া বা করুণা কতে শেখ। এই জন্য যে রেগেছে
তার দেখাদেখি তুমি রেগ না, কানাকে দেখে নিজের
চােখ কানা কে কোরে থাকে। যে হিংসুক সে তো
নিজেই জলে মাছে, তার কথা নিয়ে রেগে যাওয়ার
কোন প্রয়ােজন নাই। বরঞ্চ মেহদ্বারা এবং করুণা
দ্বারা তাদের স্বভাবের ক্রটি শােধূরাতে চেষ্টা কর।
সেই চেষ্টায় যদি একটি লােকের ও চরিত্র সংশােধন
করতে পার, তবে জীবনে একটা মহৎকাজ করতে
পারুলে এরূপ মনে হবে। আর যদি ক্ষমারা
ক্রোধকে জয় কতে না পার, ত্যাগধারা ভােগকে
জয় না কতে পার, অন্ধকে বহু চেষ্টায় ও চক্ষু দিতে
পার, তবে একফোটা চোখের জল ফেলে জোড়
হাতে ভগবানের নিকট তাদের হােয়ে প্রার্থনা
করে। নিও তুমি যা পাবে না, ভগবান তােমার
নিকট তা চাবেন না। তুমি চেষ্টা করুতে পার,

* গায়ে হলুদ
সেইটুকু তিনি তােমার কাছে চাইবেন, ফলাফল
তাঁরই হাতে।
আদর ও অনাদন
নূতন বাড়ীতে যদি বেশী আর পাও, তবে সেই
আদরে অন্তু হােয়ে নিজের কর্তব্য ভুল না। দুখ
অনেককে একবারে দাময়ে ফেলে—তাকে পাগ
পথে নিয়ে যায়। দুঃখে প'ড়ে কত লােক চুরি করে,
মদ খেতে সুরু করে, এমন কি গলায় ফাঁসি দিয়ে
মরে। আবার সেই দুঃখই কত লােককে উন্নতির
পথে নিয়ে যায়। যে হয়ত কুড়ে হয়ে ঘরে বসে
থাকত, দুঃখে পড়ে সে কষ্টসহিষ্ণু হয়, পরিশ্রমী
হয়, সংসারে কাজ কর্তে শেখে। এমন কি যে নিতে
দুখ পেয়েছে, সে পরের দুই বােঝে, তাকে দয়া
করতে শেখে, এবং সে ভগবানের উপর নির্ভর
কোরে তাকে ভক্তি করতে পারে।
২০

গায়ে হলুদ
দুঃখ পেলে যেরূপ কোন কোন মানুষ মাটী
হােয়ে যায়, সেরূপ বেশী আদরে কত লােক এক
বারে নষ্ট হয়। সে অন্যায় করলে ও তাকে কেউ
কিছু বলে না, সুতরাং সে ভাবে সে যা ইচ্ছা তা
কতে পারে। সে সংসারটাকে তার বড় একটা
খেলার পুতুল ভেবে ভেঙ্গে গ'ড়ে তার খেয়ালের
মতন কোরে সেটাকে চালাতে চায়। তার যা ইচ্ছা
তাই যদি না হয়, তবে রেগে গিয়ে সে একেবারে
জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। অপরের হাজার কষ্ট হােক
না কেন, সে যেটি ধ'রে বসেছে, তা করতেই হবে,
তা না কল্পে রক্তে নেই। এ সম্বন্ধে একটা গল্প
বলছি শােন।
আবদানে রাণীর গল্প
এক রাজার একটি আবদারে রাণী ছিল।
রাজা আদর দিয়ে তার মাথাটি খেয়েছিলেন। সেই

* গায়ে হলুদ
রাজা পশুপাখীর কথা বুঝতে পাতেন, কিন্তু তার
উপর দেবতাদের একটা হুকুম ছিল বে তিনি পশু-
পাখীর কথা যা শুনবেন ও বুঝবেন, তা আর
কাউকে বলতে পারবেন না; যে দিন বলবেন,
সেই দিনেই তাকে মরতে হবে।
একদিন রাজা রাণীর সঙ্গে বসে ছিলেন, এমন
সময় তার সােণার খাচা হেতে দুটো টিয়েপাখী কথা
কইচে শুনতে পেয়ে তিনি সেইদিকে কান পেতে
রইলেন। টিয়ের স্ত্রীটা তাকে বলছে, “তুমি দাড়টার
ওদিক পানে অত ঘেঁসে যেও না, বলছি, তােমার
পায়ে পড়ি। ঐ কালাে বেড়ালটা বসে বসে তােমার
দিকে তাকিয়ে থাকে ও আমার মােটেই ভাল লাগে
। তারপর যখন তুমি দাড় ঘেসে খাচার জালগুলির
এক কোণে যাও, তখনই দেখতে পাই, বেড়ালটার
দুটো চোখ ঠিক দুই টুকুর কাচের মত জ্বলতে
থাকে। এবং তুমি যখন চোখ বুজে খাঁচার শলা-
গুলির দিকে চেয়ে একটু বসেছ, অমনই বেড়ালটা
মই দুটো চোখ আগুনের ফিনকির মতন কোরে

গায়ে হলুদ
s
লেটা ফুলায়ে আসতে থাকে। তোমায় দুদিন
থাবা মেরেছিল আর কি। আমি চেঁচামিচি করে
জাগিয়ে দিলুম তাই রক্ষে”। টিয়েটা বলে,“রেখে দে,
পিঞ্জরার মধ্যে থাকা গলাবে কিরূপে?”
“খাবার কতকটা ঢুকিয়ে পাখের উপর তো
আঁচর মারতে পারে। খানিকটা মাংস তুলে নিয়ে
তাে একটু রক্তারক্তি করতে পারে। আমার বড়
“যা তাের এ সকল মেয়েলী ভয় আমার নেই।
আমি যদি ছাড় পেতুম ভাবে বেড়ালটাকে দেখিয়ে
দিতুম।
‘কি কতে?
“আচ্ছা করে ঠুকরে দিতুম। দেখবি কেমন
ম।”
এই বলে টিয়েটা গলাটা ফুলিয়ে বীরের মতন
সেই দাড়টার উপর দাড়ালাে! যেমন করে গােরা
সৈন্যগুলি কলার গলায় এটে বুকটা উচু কোলে
দৃকপাত না কোরে দাঁড়ায়, টিয়েটা সেইরূপ গলা ও

* গায়ে হলুদ *
বুকের পাটাটা ফুলিয়ে ঘাড়টা উচু কোরে বীরত্ব
দেখাতে লাগলাে। এই দেখে রাজা একটু হাসলেন।
রণীর এন
রাণী জিজ্ঞাসা কল্লেন “তুমি হাসছ কেন?” রাজা
বল্লেন “সে আমি বলতে পারি না।” রাণী বল্লেন
“তােমায় বলতেই হবে।” তখন রাণীর চোখ দুটি
দিয়ে জল পড়তে লাগলো। তা দেখে রাজা একবারে
গলে গেলেন এবং হাত দিয়ে চোখ মুছিয়ে রাণীকে
কত আদর করূতে লাগলেন। কিন্তু ভৰি তােলবার
নয়। “কেন হেসেছিলে বলতেই হবে।” তখন
রাজা ব্যাপারটা সব খুলে বল্লেন—তিনি পশুপাখীর
কথা বােঝেন, কিন্তু যা শুনেছেন তা বলে তখনই
তার প্রাণ যাবে। রাণী কেঁদে কেঁদে বল্লেন স্থ
এই কথা বলে আবার প্রাণ যায় ? যদি যায়ই
তুমি তাে কতবার বােলছ, তুমি আমার প্রাণের
চাইতে বেশী ভালবাস—এইবার বুঝলুম তােমার মতন
মিথ্যাবাদী জগতে নেই।” রাজা কত বুঝালেন,

* গায়ে হলুদ *
রাণী কিছুতেই বুঝলেন না। কেবল কাদছেন আর
বলছেন—“থাক তােমার প্রাণ নিয়ে, আমি মরতে
বসলুম, আমার এ জীবনে কাজ কি? আমায়
তাে কেউ ভালবাসবার নেই। আজ হােতে কিছু
খাব না। না খেয়ে, এই প্রাণ দেব কি দেবে।”
তুমি শুনলে আশ্চর্য হবে, রাজামশায় উইল টুইল
কোরে মরুতে প্রস্তুত হেলেন। রাণী যখন
কিছুতেই ছাড়বেন না, তখন আর উপায় কি?
রাণীকে সে কথা শুনিয়ে মরুতে সঙ্কল্প কল্লেন।
এখন বুঝলে আদর দিলে কোন কোন সময়
লােক কতটা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হতে পারে।
তখন মনে হয় এসকল লােককে আদর না দিয়ে
ঠেঙ্গালে ভাল হত। এ সম্বন্ধে আর একটা
গল্প বলি শােন।

গায়ে হলুদ
বেড়ালকাতার গল্প
এক রাজপুত্র ও তার বন্ধু কোটালের পুত্র দুই
জনে দেশ ভ্রমণে বার হেয়েছেন। তাঁর পরম
রূপবান্। আর এক দেশের রাজার দুইটি মেয়ে
ছিল। রাজপুত্র ও কোটালের পুত্র সেই দেশে
গেলে রাজা তাদের পরিচয় পেয়ে তার দুইটি
মেয়ের সঙ্গে তাদের বিয়ে দিলেন।
তাদের অন্য দুইখানি সুন্দর বাড়ী তৈরি হােল,
এবং রাজপুত্র সন্ত্রক তার একখানিতে গিয়ে বাস
করতে লাগলেন। কিন্তু রাজকন্যা বড় আবদারে—সে
রাজপুত্রকে ঠিক তার একটি কর্মচারীর মত ব্যবহার
করতে লাগলাে। রাজপুত্রকে সেই বাড়ীর সীমানা
পার হতে দেওয়া যােত না। যা বলবে রাজকন্যা,
তাকে দ্বিরুক্তি না কোরে তখনই কতে হােত।
এই ভাবে তিন চার মাস চলে গেল।
পাখী আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল, তাকে খাঁচার মধ্যে
আটুকালে সে যেনি শুকিয়ে যায় এবং ধড়ফড়

* গায়ে হলুদ
কতে থাকে, আমাদের রাজপুত্রের হােত সেই
অব।
কোটালের কথা
অনেক অনুনয় বিনয় কোরে রাজপুত্র একদিন
দুই ঘণ্টার জন্য বাইরে বেড়াতে অনুমতি পেলেন।
বহুদিন পরে একটু বাইরে এসে
যেন তিনি
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। এমন সময় দেখুঁতে পেলেন,
কোটালের-পুত্র সেইখানে একটা ঘােড়ায় চড়ে
ড্রোচ্ছেন। তার চেহারায় দিব্য কান্তি ফুটে পড়ছে,
গাল দুটি আরও ভরে এসেছে ও লাল হয়েছে-
ইয়া দুই গোপের বাহার। তিনি রাজপুত্রকে
দেখে প্রথম চিনতেই পারেন নি। কোথায় গেছে
সেই হৃষ্টপুষ্ট সুন্দর চেহারা। সারেজের খােলর
মত শুকিয়ে, নুয়ে পড়েছেন। তাঁকে ভাল কোরে
নজর করে শেষে চিতে পেরে আশ্চর্য হয়ে
কোটাল-পুত্র বলে উঠলেন—ভাই, তােমার এই
হাঁড়ির হাল কেন হােল?” রাজপুত্র তাকে নিজের
৩০

গায়ে হলুদ
দুঃখের কথা খুলে বল্লেন, তিনি ঘর হােতে বার
হোতে পান না। এ ঘর থেকে ও ঘরে গেলে
রাজকন্যা বলেন-“কার হুকুমে এলে?” ভাবনায়
রাতে ঘুম হয় না,একবারে ক্ষুধা হয় ।
“জানতো ভাই, দু দশ ক্রোশ ঘােডার পিঠে ঘুরে
এলে সে দিনটাই শরীরটা খারাপ হয়ে
থাকতে—তা ভাই এমন বাঁধুনীর মধ্যে পড়ে
খাবার রুচি ও চোখের ঘুম দুইই চলে গেছে।”
কোটালের পুত্র গোঁপে চাড়া দিয়ে হো হো
করে খানিকটা খুব হেসে নিলে। রাজপুত্র বিস্ময়ে
তার দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর বল্লেন—“তুমিও
তত ভাই এক রাজকন্যা বিয়ে কোরেছ, তােমার
এরূপ স্ফূৰ্ত্তি কি করে হােল?”
“সে তাই অনেক কথা! বলছি শােন।
আমি একেতে কোটালের ছেলে, তারপর বিয়ে
কম রাজকন্যা, এরা হয়তো আমায় গ্রাহির মধ্যেই
নেবে না। তাই বিয়ের পর প্রথম দিন যখন
গিয়ে যেতে বসলুম, তখন আমার স্ত্রী ও বাড়ীর

* গায়ে হলুদ
অন্যান্য মেয়েরা সেইখানে ছিল ;
দেখলুম
একটা
বড় বোেল ধীরে ধীরে আমার থালার দিকে
এখছে। তখন কিছু না বোলে কোমর থেকে
তলােয়ার খানি বার কোরে একটি কোপ ঝেড়ে
দিলুম, বিড়ালটা দুই টুকরা হয়ে গেল। তার
আমায় অন্য একটা জায়গায় নিয়ে সােণারূপার
থালায় কোরে আবার ভাত বেলুন দিলে; কিন্তু
সেই যে তারা ভয় পেল, তদবধি আমায় দেখে
তারা ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকে, যা বলি তাই করে।”
রাজপুরের নকল করা
রাজপুত্তর ভাবলেন, বেশ একটা শিক্ষা হােল,
তার কোমরে তরােয়াল ঝুলােনই থাকতে। তিনি
সেদিন বাড়ী ফিরে যখন খেতে বসেছেন ও
পাতের কাছে একটা বেড়াল এসেছে, অমনই ঝ।
কোরে বেড়ালটাকে এক কোপে কেটে ফেলেন।
কিন্তু তিনি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন যে,
রাজকন্যা ও তার সখীদের তাতে ভয় পাওয়া

* গায়ে হলুদ *
দূরে থাকুক, তারা একত্র হােয়ে খিল খিল কোরে
হাসছে। রাজপুত্তর তাে অবাক, রাজকন্যা
বল্লেন-“বেড়াল মারুতে হােলে প্রথম রাতে
শেষে মালে কিছু হয় না।”
সুতরাং যাকে গােড়ায় অদির দেখিয়ে আবদারে
করে তোেলা গেছে—শেষে চোখ রাঙ্গালে তার
আর সংশোধন হয় না।
কিন্তু একথা সকলের পক্ষে খাটে না। কোন
কোন বউ এমন আছে যে আদরে তাদের প্রকৃতি
বড় মধুর হয়।
উষার কিরণ এবং হাওয়া গেলে
যেমন ফুলটি ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে ও বাগান
আলাে করে, আদর পেয়ে সেই সকল কনেবউএর
স্বভাবটি তেমনি যেন সােণার মতন সুন্দর হয়ে
ওঠে। নিজে আর পায় বােলে সে পরকে অনাদর
করে না; বরঞ্চ ভর দিকে সকলের যত্ন দেখে,
নিয়ে একটু
সংকোচ বোধ করে।
গুরুজন তাকে দিয়ে হয়ত কোন কাজ করিয়ে

গায়ে হলুদ *
নিতে চান না, তাই বােলে সে বােসে থাকে না
তার কাজের উৎসাহ যেন আরও বেড়ে যায়।
সে কাছে থাকতে যদি গুরুজন নিজ হাতে কিছু
কতে যান, সে তখনিই জাের করে তার হাত
থেকে সে কাজটি নিয়ে নিজে করে। এ যেন
সােণায় সােহাগায় মিলন হয়।
দেওয়া নেওয়ার হিসাব
তুমি এখন বুঝলে, কেউ যদি তােমার উপর
অবিচার করেন, তবে তােমার মাথা ঠিক রাখতে
হবে। কেউ অন্যায় করে প্রতিহিংসা দিয়ে তার
শােধ দিও না। পরের কাছে সেই কথা বলে
বলে রাগ বা ক্ষোভ প্রকাণ কোরো না। যে
দুষ্ট তার কাছে আছ বলে দুষ্টমি শিখ না। যে
ব্যক্তি যা তা বলে, তার কাছ থেকে যা তা বলতে
শিখ না।
যে কথায় কথায় রেগে ওঠে,

গানে সুদ উঠ না, তার দেখা দেখি কথায় কথায় রেগে কথায় কথায় তাকে ক্ষমা কোরাে, বুঝলে। এটা খেন, তুমি যদি তোমার সকল দুঃখ সয়ে সাঝ- সকালে ভগবানের নিকট এক ফোটা চোখের-জল নিয়ে উপস্থিত হােতে পার, তিনি তা হলে যে উপায়ে হােক তােমার সেই চোখের জল মুছোনে। হয়ত তুমি যে ভাবে ইচ্ছা কচ্ছ, সে ভাবে তিনি তােমার দুঃখ মােচন কল্লেন না, কিন্তু অন্যভাবে করবেন কি করবেনই। এটা ঠিক লেন, তুমি একা নও, তােমার পেছন পেছন তিনি আছেন। তিনি আমাদের মাতা, তিনি আমাদের পিতা। আমরা যখন নিজের হাতে বিচারের ভার লই, নিজের হাতে কর্তৃত্ব গ্রহণ করি, তখন তিনি অলি থেকে দেখেন। কত দুঃখ, কত লাঞ্ছনা যে তখন পাই, তা তিনি দেখে দুঃখিত হয়ে থাকেন। মা-বাপের কথা না শুনে যখন ছেলে বনে জঙ্গলে ঘুরে শেষে পায় কাঁটা বিধলে কাঁদতে থাকে, তখন তারা দুধ করা ছাড়া কি করতে পারেন । আমাদের ব্যাথা তার

* গায়ে হলুদ
এলে
প্রাণে বাতে, কারণ আমরা তাে তাঁর সন্তান ।
কিন্তু যাই নিজের বা ফুরিয়ে যায়, “তুমি এসে
আমায় ধরে তােল, আমি সইতে পাচ্ছি না বলে
তার শরণ নিই, তখন কি আর তিনি স্থির থাকতে
পারেন? উতলা হয়ে মায়ের মতন গামাদের
কোলে তুলে আঁচল দিয়ে জড়িয়ে নিতে আসেন।
একবার নিঃসহায় হয়ে কেঁদে তাকে ডেকে
দেখ,তখন বুঝবে তিনি কেমন করে
তােমার দুঃখ-মােচন করেন। তিনি সর্বব্যাপী
-সবারই মধ্যে আছেন, কি করে তা টের
পাওয়া যায়, তা দেখাচ্ছি।
এই যদি একটি ছােট্ট ছেলে পথ হারিয়ে
ফাতে থাকে, তবে সকলে গিয়ে তাকে আদর
কোরে কত কি জিজ্ঞাসা করে,—সব্বাই তাকে
আশ্রয় দিতে ব্যাকুল হয়, তার কান্না দেখুলে
সবারই প্রাণ কেঁদে ওঠে। এ দিয়ে কি বুঝতে
পার না যে মাতৃভাটি যদিও আকার ধােরে মা
হােয়ে তােমার সামনে একবার মাত্র ধরা দিয়েছিল
•

* গায়ে হলু
সত্য, কিন্তু তা
ঠিক সেই জায়গায়ই আব
হােয়ে রয় নি, সমস্ত বিশ্ব জুড়ে মাতৃস্নেহ পড়ে
আছে; তুমি যখন শিশুর মতন নিৰ্ম্মল, সরল
ও স্নেহাতুর হবে, তখন চারিদিক থেকে তার সাড়
পাবে। আর দেখ তােমায় তিনি তােলেন না।
বিশ্বজুরে কতকগুলি নিয়ম খাড়া করে দিয়ে তিনি
নিজকে তােমার কাছ থেকে দূরে রাখেন নাই।
এই দেখ না মায়ের শু—এটি তােমারই এক
হােয়েছিল—আর কাক জন্য নয়। তুমি না খেলে
সে শুন্য বৃথা হেয়ে যাবে। এ জিনিষটা সমস্ত
জগতের জন্য, কিংবা আর তার জন্য তৈরি হয় নি।
এটি ঠিক তােমারই কষ্ট হােয়েছে। তােমায় যেন
তিনি দেখে তােমায় রক্ষা করবার জন্য এটির
ব্যবস্থা কোরে রেখেছেন। যিনি তােমায় এমন
কোরে দেখেন, তিনি কি তােমায় ভুলতে পারেন।
তুমি তাকে ভুল না।
এখন এ সকল কথা শুনে বল দেখি তুমি
আদর পেলে আবদারে হবেনা লক্ষীটি হবে?
৪১

* গায়ে হলুদ *
তােমায় যাঁরা যত্ন করেন, তাঁদের কি তুমি যত্ন
ককূলে না হেলা করবে? তুমি নিয়ে দুঃখ পেলে
যে তােমায় দুঃখ দিযেছে, তাকে দুঃখ দিতে যাবে-
না মা কোরে কেঁদে এসে ভগবানের শরণ নেবে?
রাগের কথা মুখে এলে সেটাকে সামলে নিয়ে
মধুর কথা বলতে চেষ্টা করবে না চোখ রাঙ্গাবে
ও হাত পা ছুড়বে? আজ গায়ে হলুদের
দিনে
বলে যাও কি কবে—শশুর বাড়ীটা একটা তীর্থের
মতন ভেবে পুণ্য অর্জন করূতে যাবেন সেটাকে
তুমি তােমার একটা খেয়ালের জায়গা মনে করে
নিজের সুখ মনের মধ্যে প্রবল কোরে তুলে অপর
সকলের সুখ ছােট করে দেখবে।
সকলের আশা।
দেখ, সবাই তােমার মুখের দিকে চেয়ে
আনে। তােমার শর
শশুর বাড়ীতে যে নহবৎ
৫২

* গায়ে হলুদ
বাজছে, তাতে সে বাড়ীর সবাকার প্রাণ যেন
তােমায় ডাকছে। শ্বশুর শাশুড়ী ভাবছেন, লক্ষ্মী-
বউটি এলে আমাদের ঘর আলাে হবে। আমাদের
যখন হাতে বল পাব না, তখন ডান হাতের মত
সে এসে আমাদের সাহায্য করবে। মুখে তার
সঙ্গে উৎসব কো’ব, দুঃখে সে আমাদের চোখের
জল মুছােবে। সে আলতাপরা পায়ের নাম
মাটীতে ফেলে যখন হেঁটে যাবে, তখন আমাদের
উঠোনে যেন লক্ষীর পায়ের চিহ্ন পড়বে। সেই
নহবতের সঙ্গে তােমার শশুর শাশুড়ীর মনােবীণার
তার বেজে উঠবে। তাদের সেই বহু আশা ভঙ্গ
কোনাে না। সেখানে যেয়ে তারা যাতে সুখী
হতে পারেন—তাই কোরাে।
তােমার ছোট ছােট নন্দাই ও দেওর-তােমার
সঙ্গে খেলা কবে, আমােদ কবে—তােমার
কাছে বসে মনের সুখ দুঃখের কথা কইবে
এজন্য অপেক্ষা কোরে আছে। সানাইয়ের সুরের
সঙ্গে তাদের মনেও বড় যখের
বে
।

* গায়ে হলুদ *
উঠছে।
এমন যেতে পারে যে তাদের মা-বাপের
সব খানি মেহ ও আদর তুমি কেড়ে নেবে
আশঙ্কা কোরে তাদের মনে একটু ঈর্ষা লেগেছে।
কিন্তু তারা বড় আশা কোরে আছে। তার
তােমার কাছে এসে ছােট ভাই বােনের মতন
বসে থাকবে। তােমার হাতের বালা ও চুড়ি
টেনে দেখবে; কোনও সময় তােমার চুল মুখে
এসে বুকে পােলে তা সরিয়ে রাখুবে এবং
একশবার তােমার মুখের দিকে মেহের সঙ্গে
তাকিয়ে থাকবে। এমন সব স্নেহের জিনিষ,
তাদের তুমি মায়ের পেটের ভাই বােনের মতন
এত দিন ধধারে কোলে কঁাখে কোরে পাওনি,
হঠাৎ এসে একদিনে পেয়েছ। তাদের আশা ভঙ্গ
কোর না। বড় হােয়ে মনে
বড় হােয়ে মনে রেখাে তারা একা
আপনার অন—তারা যদি দুষ্টমি করে—তৰে
মায়ের মতন তাদের বুঝিয়ে ভাল করে তাদের
ছেড়ে দিও না।
বাড়ীর চাকরবাকরেরাও কত আশা কোরে

* গায়ে হলুদ *
আছে। তারা ভাবছে, তাদের খাবার দাবার
দেবার অন্য মা ঘরে এলেন,তাদের কথা মনে
রেখাে।
তুমি মনে কোরাে না তুমি একলনের অন্য
যাচ। দশের ঘরে তুমি দশ জনের জন্য যাচ্ছ।
তাদের প্রত্যেকে
প্রত্যেকে তােমার এ আশা কোরে
অপেক্ষা কচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের আলা সাধ্যানু
সারে পূরণ কতে চেষ্টা কোরো। স্বামীর গৃহ
ও স্বামী—এই উভয়কে তফাৎ কোরে দেখ না।
ভালবাসার চোখে এ দুইই এক। যে বউ স্বামী
ও স্বামীর স্বজন—উভয়ের মন রক্ষা করে চলতে
পারে—সেই তাে প্রকৃত গৃহলক্ষী।
কোন্‌বেশ পবে
আজ ভাল কোরে সাজগােজ কর।
উমা কৈলাসে যাচ্ছেন। আর তার কোনে
৪৫

* গায়ে হলুদ %
খােপা বেঁধে দাও। খেজুর ছড়ি, লােটন, ডায়মন
কাটা, বেনে খােপ, প্রভৃতি যত রকমের খােপা
আছে, তার কোটিতে ভাল মানাবে, পরীক্ষা
দেয়। নীলাম্বরীতে কিংবা আসমানী
রঙ্গের শাড়ীতে ভাল দেখাবে, তার পর কর।
লালডুরে রেশমী শাড়ী, আনারসী ও গােলাপী
রঙ্গের শাড়ীর কোনটি পছন্দসই হবে দেখে নাও।
হয়ত তােমার বাবা বহু কষ্টে দামী দামী অলঙ্কার
সংগ্রহ করেছেন—তার ভাষায় তিনি অনেক
রাত ঘুমুতে পারেন নাই, সেরার দোকানে বাকী
পড়ে আছে। বড় দুঃখের এই গয়নাগুলি,
তুমি একবার পর। সেই গয়না পরা দেখলে
তার চোখ জুড়াবে—এত কষ্ট সার্থক হবে।
আ রূপের বাহার দেব। কামােপে
মেঘের মত এক রাশ চুল কেমন দেখাচ্ছে!
এইরূপ দেখে
বুঝি ঋষিবা মায়ের কালেরূপ
কল্পনা করেছিলেন,-রামপ্রসাদ ধ্যান কৰ্ত্তেন,
আর গান বাঁধতেন! এই রূপ এক হয় আসমানী
৪৬

গায়ে হলুদ
কি নয় ?
রঙ্গের গাড়ীতে সাজাও—কালোতে কালাে মিশে
পরূপ হবে-মেঘকে যেনি নীলাকাশ
ঘিরে রাখে, শাড়ীর ফিকে কালো আঁচল তেমনি
ঘিরে থাকবে। আসমানী না হলে কালাের
উপর নীল শাড়ীও মন্দ মানাবে না, কিন্তু তাৰ
আঁচল ও পাডটি হওয়া চাই সােণালী, তা হােলে
রূপটি ঝলমল করবে। চুল একবারটি ছেড়ে দিয়ে
দেখ। যােগীর ধ্যানে পাওয়া মায়ের রূপ এমনটি
তারপর চুল বেঁধে বেশী কোরে,
বেণী বেঁধে খােপ কোরাে।
তুমি যদি গৌরী হও, তবে সােণার ফুল-তােল।
রক্তবর্ণ জমির বারাণসী শাড়ী পর। সেমি
কামিজ ও সেই রঙ্গের হােক। ফিকে ফর্সা রং
হােলে হয়ত গােলাপী শাড়ীতে মানাবে ভাল।
গৌরী হলে তো তােমায় দেখে উমার কথাই
মনে হবে ; বিয়ের আসরে দুর্গোৎসবের মণ্ডপ হোয়ে
বাড়াবে; অতলী ফুলের সঙ্গে চােখ জুড়িয়ে যাবে।
লালশাড়ীতে সােণার আঁচলে সেই গৌর বরণ
৪৭

* গায়ে হলুদ %
ঝলমল করূতে থাকবে। এই রূপের পাই
তো বরের বাড়ীর সকলে বসে বসে কচ্ছেন।
চাঁপা ফুলের সঙ্গে রং মিলে গেলে তাে তুমি শ্বশুর
বাড়ী গেলেই জয়পতাকা উড়াতে পারবে।
তােমার জন্য তােমার বাবার বেশী ভাবতে হবে না।
রং দিয়েই তুমি “সুন্দর” খেতাব পাবে। তারপর
ভিতরটা রাংতা না সােণা, তার পরীক্ষা হবে ;
কিন্তু শুরুতেই তােমার জয় জয় কার।
আমি বলতে পারি না তােমার কালােরূপেই
সুন্দর দেখেছি না তােমার গৌরবরণ দেখে মুগ্ধ
হয়েছি, কিংবা তােমার শ্যামবর্ণ দেখে চোখ
জুড়িয়েছে।
কখনও মিশমিশে কালাে
রং ও একরাশ কালাে চুলের মত এমন সুন্দর
কিছু দেখি নি। কষ্টি পাথরের সাবেকী দেবীমুর্তি
দেখে কে সে কালো রূপের নিন্দা কবে?
আকাশের নীলিমা—যখন কালাে মেঘের বেণী
খুলে দিয়ে হাওয়ার ভরে থমকে থমকে চলে, তখন
কে সে রূপের নিন্দা করবে। আমাদের কৃষ্ণ
Fও
S

* গায়ে হলুদ
কালাে। সে কাতাের ব্যাখ্যা যে কত গান
আছে, তা কি তােমরা জান না?
শ্যামবর্ণে চোখ জুড়িয়ে যায়—সে যে প্রকৃতির
নিজের রং।
আকাশে, গাছ-পাতায় এলে বলে
জায়গায় যে সবুজাভ
শ্যামবর্ণের খেলা।
এই শ্যামা প্রকৃতির গায়ে আকাশের রােদ
সােণালী গুডনা হয়ে শােভা পাচ্ছে, এবং মাথায়
সােণার মুকুট পরাচ্ছে—লাল, সাদা কত রঙ্গের
ফুল শ্যাম বর্ণের গলায় মালা পরাচ্ছে।
কে নিন্দে কবে? এমন চোখ জুড়ানাে রং-
এমন রামচন্দ্রের গায়ের রং দেখে যে না ভুলে
গেল তার আবার চোখ কোথায় ?
গৌরণের কথা না বলাই ভাল, কারণ জ্ঞানে
হােক অজ্ঞানে হােক এই রংএর পায়ে তো
আমরা মাথা বিকিয়েছি।
বরের রং ও তােমার রং যদি ভিন্ন হয়, কালাে
যমুনায় ও সাদা গাঙ্গে মিশবে ভালমেঘের
কাছে বিদ্যুৎ, পদ্মের কাছে ভ্রমর, এ সকল মামুলী
৪১

* গায়ে হলুদ
উপমা তাে আছেই,তা বেমানান হবে না।
রাধা-কৃষ্ণের মত যুগল কোথায় পাব? যদি
দুই নেই রং কালো হয়, তা হলেই বা মন্দ
কি? কালাে আকাশের গায় কালো মেঘের
খােলা বেণী যখন লুটিয়ে পড়ে, তখন কেমন দেখায়।
নীল পথের পাশেও তত ভ্রমরটি বেশ দেখায়।
যার চোখ আছে সে সেরূপের গৌরব বুঝবে।
আর যদি দুই জনেরই রং ফর্সা হয়--তবে তো
সে হর-গৌরী মিলন, তার আর কি তুলনা দিব?
এখন তােমার এর কোনটি হল জানতে চাই।
শ্বশুর শাশুড়ী
বেশভূষা কোরে তাে তুমি চল্পে।
তােমার শ্বশুর দিনরাত খাটছেন—তাঁকে দেখবার
লােক নেই।
গিন্নী ছেলে নিয়ে ব্যস্ত তাকে দেখবার সময়

* গায়ে হলুদ ১ নেই। তিনি কাজ হােতে বাড়ী ফিরে এসে নিয়েই পাখা খানি খুজছেন। পায়ের একপাটি চটি পাওয়া গেছে, গেছে, আর একপাটি পান নাই—তাই খুজে খুজে হয়রাণ হােয়েছেন। হােয়েছেন। হয়তঃ তৃষ্ণায় হাতি ফেটে যাচ্ছে—কাছে কেউ নেই, নিজেই গ্লাসটি নিয়ে এল ভতে গেলেন। সারালিন খাটুনির পর একটু কৰার জায়গা খুঁজছেন- এখানে কাগজের ভূপ, ওখানে কাপড় চোপড়, চেয়ারের উপর কালীর দোত বা বইএর গাদা বিছানার চাদর খানি পাতা নেই—তাকিয়ার খােল বদলানাে হয় নি। কাকে বলবেন?-সবাই কাজে ব্যস্ত—ছেলের স্কুল কলেজে ৰা খেলতে গেছে; গিন্নি এক হয় রান্না কোচ্ছেন, না হয় আর তদ্বির কোচ্ছেন। তখন তিনি একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বহুদিন হােতে তােমার কথা ছিলেন। তোমার অন্য, আজ নয়, বহুদিন যেতে তিনি অপেক্ষা কচ্ছিলেন,একটু পাখার হাওয়া খাওয়ার স্য, তৃষ্ণার সময় এক গ্লাস জল পাবার জন্য গায়ে হলুদ তাঁর কাগজপত্র গুলি গুছিয়ে রাখার জন্য। তুমি যেদিন—আলতাপরা পায়ের মল-বাজিয়ে লাল চেলিখানি খস্ খস্ করতে করতে সম্মুখে এসে দাড়ালে, তিনি সেই দিন তােমায় বহুদিনকার তপস্যার ফল—দুল্লত সামগ্ৰী মনে কোরে একবারে নিজকে নিঃসহায় শিশুর মত তােমার হাতে ছেড়ে দিবেন;-দেখ যেন তাঁর সেবার ক্রটি না হয়। তিনি সেই সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট হােয়ে যে নিশ্বাসটি ফেলবেন, তাতে তােমার সমস্ত ভাবী অকল্যাণ কেটে যাবে। তুমি তার বহুদিনের প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখাে না। শাশুডী হয়ত সংসারের অনেক জালা যন্ত্রণা পেয়ে পুড়ে ঝুয়ে আছেন। বড় মেয়ে গুলি বিয়ে দিয়ে ফেলেছেন, হাতের লক্ষ্য নাই,—তার সুখ- দুখের কথা বলার লােক নাই। বহুদিন হােতে ভাবছেন, “বউ আমার খাওয়া দাওয়ার যত্ন করবে—আমাকে এসে দেখবে, আমার তাে কেউ নেই। চোখের জল ফেলে তিনি তপস্যা কচ্ছিলেন, ર

* গায়ে হলুদ
কবে তুমি আসবে! তুমি কে তা তো তিনি
জানতেন না কিন্তু তুমি যে হও সে হও—তার
তপস্যার ফল—আত্মীয় হােতেও আত্মীয়-এটি
তিনি ভেবে রেখেছেন। আজ মাথায় প্রথম
সির একে-লাল ঢেলী পয়ে, তাঁর পায়ে যে
প্রণামটি করবে সেই প্রণামে তার প্রাণ জুড়িয়ে
যাবে।
এমন স্নেহ-তপস্যার ধন তুমি, তাকে
সেবা হােতে, সান্ত্বনা দেওয়া হহতে বঞ্চিত
কোরো না।
যদি শশুর শাশুড়ীর সঙ্গে তােমার বাপের
বাড়ীর ঝগড়া বেধে যায়—সেটা বড়ই কষ্টের
কথা; কিন্তু দেওয়া থােওয়া নিয়ে এরূপ ঝগড
মাঝে মাঝে বেধে ওঠে। এতে তােমার কি
অপরাধ ? কিন্তু এই
এই ঝগড়াটার সমস্ত কষ্টই
তােমাকে ভােগ করতে হবে। তােমার মা বাপ
ততা আপনার জন, কিন্তু শশুর শাশুড়ী এখনও
ঠিক আপনার মতন হন নি। এজন্য মা বাপের
চাইতে শশুর শাশুড়ীর দিকটা তােমায় বেশী

গায়ে হলুদ
টানতে হবে। তা হােলে নূতন বাডীতে তোমার
আদর বেড়ে যাবে, এবং তাঁরা তােমার উপর
কোন জবরদস্তি (যেরূপ বাপের বাড়ীতে যেতে
দেওয়া প্রভৃতি) করতে সংকোচ বােধ কবেন।
বাপ মা তোমার অপরাধ নেবেন না। কারণ
তারা তাে সহজেই এ ক্ষেত্রে তােমার অবস্থসঙ্কট
বুঝতে পারবেন। সুতরাং যতটা
যতটা পার, ওর
বাড়ীর দিকে টেনে কাজ কোরে, কারণ এ বিষয়ে
প্রথম প্রথম সে বাড়ীর সকলেরই একটা সন্দেহের
ভাব থাকবে—দেখি বউ কোন পক্ষ নেয়। যখন
তারা বুঝতে পারুনে, তুমি বাপ মায়ের অপেক্ষাও
তাদের দিকে টেনে কথা কইচ, তখন তারা
তােমার একান্ত
আপনার জন মনে করূবেন।
এই অবস্থায় কৌশল খাটার উপদেশ দিচ্ছি না।
সরস প্রাণে কাজ কোরে যেও, মা বাপের জন্য
মেহ ও বেদনা বুকে চেপে রেখে শশুর শাশুড়ীর
প্রতি ভালবাসা বেণী দেখিও—এটিও বেশ সহজ
ও সরলভাবে হেতে পারে। কোন্ পক্ষ অধ্যায়
৫৪

* গায়ে হলুদ
কচ্ছেন—তার বিচার করূতে যেও না। তােমার
বয়স অল্প, তুমি সবে মাত্র শশুর বাড়ী পা
দিয়েছ, এমন সময় তােমার বিচার কেউ মাথা
পেতে নেবেন না। শেষে এমন একটা সময়
আসূবে যখন তুমি বুৰিলে শশুর বাড়ীর
সকলকে চালাতে পাবে, এবং শশুর হয়ত দিনের
মধ্যে দশবার নিয়ে এসে জিজ্ঞাস কবেন—এ
বিষয়ে বউমা, কি বলেন? কিন্তু এখন কতদিনের
জন্য নিজকে সংবরণ কোরে রাখাই ভাল।
ঘরের দেব
তুমি লক্ষীটির মত সাজ গােজ কোরে শশুর
বাড়ী চলে—তােমার রূপ ঘােরে স্বয়ং লক্ষীই
বাড়ীতে শুভাগমন কল্লেন—তার পরিচয় শুরু
থেকেই দিতে চেষ্টা কোরো। তােমার মেহের
গুণে-তােমার প্রাণের গুণে-তোমার সকলকে
৫৫

গায়ে হলুদ
আপন করার গুণে-যেন সকল ঝগড়া কলহ
মিটে যায়। দুই পক্ষের যত ক্ষোভ ও রাগ
যেন তােমাকে লঙঘন কোরতে না পেরে ব্যর্থ
হােয়ে ফিরে যায়। তুমি তাঁদের অভিমান ও
রাগের পথ স্নেহ দিয়ে আটকিয়ে রেখ।
নূতন বাড়ীতে যেয়েই একবার দেখ বাড়ীটা
পরিষ্কার আছে কিনা, ঘরের জিনিষপত্র গুছােননা
আছে কি না। বই টই থালা, বাসন, কাপড়,
তােড়, সিন্ধু প্রভৃতি কি ভাবে আছে। তার
পর তােমার সােণার বালা-পরা হাত দুখানি কাজে
লাগিয়ে দিও। কোন জিনিষটা কোথায় থাকলে
ভাল মানাবে, একবার ভেবে রেখ। বাড়ীর
খাটের তলায় আলাে নো ঢােকে কিনা, কিংবা
বাড়ীর এমন কোনাে আঁধার কোন আছে কিনা
যেখানে কীট পতঙ্গ গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে ,
বহুদিনের আবর্জনা কোন খানে জমে আছে কিনা
প্রত্যেকটি কোচ ও ঘরের মেয়ের প্রত্যেক
অংশে নােত ঝট পড়ে কি না; জিনিষপত্র যেমন

* গায়ে হলুদ *
কাঠ, লােহা প্রভৃতি অনেক দিন হােতে এক
জায়গায় সঞ্চিত হােয়ে আছে কিনা—এই সকল
বাড়ী ঢুকেই দেখতে থেকো, এবং তােমার দ্বারা
নূতন বউএর লজ্জা সংকোচ বজায় রেখে যতটা
হােতে পারে—পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে ততটা
মনোেযােগ দিও। কনে বউএর মত-মৃদুভাবে
কাজ করতে শিখ, বাহাদুরী দেখার উৎকট
চেষ্টা কোরো না—তা হােলে তােমার পায়ের
আলতার রং সত্যই লক্ষী ঠাকরুণের পদ্মাসনের
দেখাবে। তোমাকে দেখে সকলেই ভাবে
তিনিই বাড়ীতে এসেছেন।
আমি জানি এক বাড়ীতে এমনই এক কনে বউ
এসে সেই সংসারে একটা নূতন এ দেখিয়েছিলেন।
যে ঘরখানি হহয়েছিল, তার অল্প
জিনিষপত্র তাঁর হাতের গুণে এমনই সুন্দর হয়ে
থাকতো যে বাড়ীর অপর সকলে পরিচ্ছন্নতার
একটা নূতন আদর্শ পেলে; তার হাত দুখানি যেন
প্রদীপ ধােরে আঁধার ঘর কিরূপে আলো করা

* গায়ে হলুদ
যায় তা দেখিয়ে দিলে; এতদিন যে
আবর্জনা সকলে দেখেও দেখতে পান নি, তার
উপর নূতন ভাবে দৃষ্টি পােলো,—তার ঘরটি
যেমন সাজ সজ্জায় সুন্দর দেখতে হােল—সবাই
তার অনুকরণ করিতে
করিতে লাগলাে; সামান্য একটু
সাবান দিয়ে বিছানার চাদর খানি ধবধবে করা
যায়; সামান্য একটি চোখের কঠোর ইঙ্গিতে
ছেলেরা ধূলাে মাখা পায় বিছানায় উঠতে ভয়
পায়, ঘড়ীটা বইখানা, ছুড়ি কাঁচি নিয়ে নাড়াচারা
কতে ভয় পায় ; সেই চোখের ইঙ্গিত কেমন
কোয়ে করতে হয়, কনে বউ তা জানতেন,
কিন্তু যারা তার চাইতে ঢের বয়সে বড়, এবং
যারা চোখের চাউনি দিয়ে শান না কোরে
এযাবৎ কেবল চুলের মুঠি ধরে পিঠে মাস দমাস
কিল মেরে ছেলেদের সংশােধন কতে পারেন নি,
তারা বিস্ময়ের সহিত দেখতে পেলেন, মৃদুস্বভাব
কনে বউ কথা না কোয়ে কেমন চোখ দিয়ে শাসন
করতে পারেন।
৫

* গায়ে হলুদ এ ছাড়া যদি বাড়ীর কে কি খেতে ভালবাসেন, কোন জিনিষটা কার মুখে ভাল লাগে না বুঝে শুঝে যদি গোড়া থেকেই রান্না ঘরের একটু তদ্বি কতে শুরু করে দাও, তা হােলে সকলেই বলবে ঘরে মা অন্নপূর্ণা এসেছেন। ঠিক কেন, তুমিই হ হিন্দুর ঘরের আসল দেবতা; তোমার রূপ ধ্যান কোরে ঋষিরা স্বর্গের দেবতা কল্পনা করেছেন ; তুমি যখন রান্না ঘরের ভার নিয়ে অন্ন দান করে—তাই দেখে অন্নপূর্ণার মন্দির তৈরি হয়েছে—তুমি কোন্ অচেনা ভব-সমুদ্রের নীচে ছিলে, হঠাৎ একদিন অলং কারের ঝাপি হাতে নিয়ে লাল তসর পরে, সির সিথিতে মেখে-গৃহস্থের ঘর আলাে করে এসে দেখা দিলে, তখনই ঘরে ঘরে লক্ষী পূজা শুরু হয়ে গেল। তােমার ছেলেকোলে করা রূপের ঘটা দেখে “গণেশ- জননীর”রূপ ধ্যানে পাওয়া গেল; তােমার নীরব শক্তি মত্তার প্রভাব অনুভব কোরে হিন্দুরা দশভুজার স্তোত্র পাঠ শিখলে। তুমিই হিন্দুর—এই দেৰ, সেই শ্লাঘ- নীয় পদটি ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষ হােয়ে যেওন।

গায়ে হলুদ *
দীক্ষা নেওয়া
এটি ঠিক জেন—কেউ নিতে খেতে এসেন,
কেউ পরকে খাইয়ে সুখী হন্। কেউ নিজের
স্বামী পুত্র নিয়ে বড় বাড়ীতে থাকবেন—মটর
হাঁকিয়ে চলবেন, দিনরাত্রি এই চিন্তা করেন। কেউ
বিদুরের খুদ সকলকে বিলিয়ে খাবেন, নিজে উপপাসী
থেকে সন্তানদের মত আত্মীয় স্বজন, গরীব দুঃখীকে
খাওয়াবেন—এতেই তার মহা সন্তোষ। মােট
কথা কেউ ভােগ করতে চান—কেউ ত্যাগের
আদর্শ দেখাতে ইচ্ছুক। কেউ স্বামীকে নিয়ে
উধাও হােয়ে—তার বাপ মায়ের ঋণ অগ্রাহ কোরে-
দূর দূরান্তরে মুখ খুলতে স্বাধীনতার আকাশে ছুটে
যান—ভাই, বােন বাচলো কি মরুলল তার খোঁজ
রাখেন না;কেউ সকলের মুখে নিয়ে সুখী
হন-তার দরুণ কারু প্রাণে এতটুকু জ্বালা না হয়,
তাই ভেবে ভেবে পরের পায়ে কোথায় কাঁটা
বাজবে—তজ্জন্য সংসার-পথের কাঁটা তুলতে থাকেন।

* গায়ে হলুদ তুমি এর কোন্ পথে যাবে—তা কি বলে দিতে মােট কথা ঋষির আশ্রমে যেয়ে ছেলেরা যেরূপ নূতন জীবনের দীক্ষা নিত, বিবাহিত জীবন তােমার পকে সেইরূপ দীক্ষা গ্রহণ। তোমার আর যাতে কোরে বল বৃদ্ধি পায়, যাতে দৈহিক সুখ- দুঃখ অতিক্রম কোরে তােমার ভিতরকার শক্তি পুষ্টি লাভ করতে পারে—বিবাহে সেই দীক্ষা গ্রহণ করবে। রূপকথা আমাদের দেশের কতকগুলি পুরাণে রূপ কথা আছে—সেগুলি প্রায় ১৩১৪ শত বৎসর যাবৎ এ দেশের মেয়েরা শুনে আসছে; ; তাদের মধ্যে মেয়েদের সেই সবাকার চাইতে বড় শিক্ষা কি রকমের যেতে পারে, তা গল্পচ্ছলে বুঝানাে হােয়েছে।

গায়ে হলুদ *
তার কতকগুলি তােমর দক্ষিণারঞ্জন বাবুর ঠাকুর
দাদার ঝুলিতে পাবে।
এই পুস্তকের একটি
গল্পের নাম মালঞ্চমালা, আমরা গল্পটি ছোট-কাল
থেকে শুনে এসেছি। গল্পটি মােটেই এখনকার
গLর মতন নয়। এতে স্ত্রীলােকের চরিত্রটা খুব
বড় কোরে দেখান হয়েছে। এটি সত্যিকার
কার মত একবারেই নয়। এতে মড়া মানুষ
সীমােনার কথা আছে। যার হাত পা কাটা গেছে
তার আবার হাত পা হেয়েছে, গল্পটিতে বাঘ-বাঘিনী
মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা কোয়েছে এবং পশুদের
প্রাণে বেশ দয়ামায়া আছে—এমন দেখান হােয়েছে;
তা ছাড়া ভূত-প্রেত-দানা এসে চিতার পাশে বসে
মড়া খেতে চেয়েছে, পক্ষীরাজ ঘােড় আকাশে
উড়ে চারদিনের পথ এক মুহূর্তে চলে গেছে;
আরও কত কি আজগুবি কথা আছে। তুমি হয়ত
আবছ—এতে আরব্য উপন্যাসের গল্পের মত
কানায় গড়া—এতে আবার সত্যিকার শিক্ষা কি
থাকতে পারে। এ সকল গল্প বােলে মায়ের

* গায়ে হলুদ
দুষ্ট ছেলেদের ঘুম পাড়ান-ভূতের কথা শুনতে
শুনতে ভয়ে চোখ দুটি বুজে আসে—শেষে ঘুমটি
বেশ পেকে যায়। একথাও ঠিক বটে, কেবল
ভয় দেখার কথা নয়, এই গল্পে শিশুদের কৌতুক
ও আমােক দেবারও অনেক কথা আছে। ধ ন
একটা জায়গা, যেখানে মালঞ্চমালা তাঁর শিশু
স্বামীকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য বড় ভাবিত
হােয়ে পড়েছেন, কেননা তার বয়স পাঁচ অতিক্রম
কোরেছে। মালঞ্চ-মালা বন ছেড়ে লােকালয়ে যাবেন
মনে মনে ঠিক কোরেছেন; তখন বুড় বাঘটা এসে
বলে পণ্ডিতের ভাবনা কি? এই বনে কত পণ্ডিত
সাজে সকালে ঘােরে, হুক্কা হুয়া করে, বল তাদের
একজনকে এনে দি। এই কথা শুনে ছেলের
দল হে হে কোরে হেসে উঠবে কি না। আবার
মালঞ্চ-মালা এক নগরে গিয়ে মালিনী মাসীকে
জিজ্ঞাসা কচ্ছেন এখানে পাঠশালা আছে কি?
* ঠাকুমার ঝুলি-মালঞ্চ-মাতার গল্প।

गाव मूल মালিনী বয়ে কেন রাজার বাড়ীর পণ্ডিত কত পড় পড়ায়। কুঁজো, সুজো, গেঁগাে, গােদা কত পড়ুয়া। আবার রাজার রাপুরও আছে। দিনরাত হিলিমিলি কিলিমিলি, কাকগের হাট। একথা শুনেও ছেলের দল হেসে উঠবে কি না সুতরাং দেখা যাচ্ছে এ শুধু আরব্য উপন্যাসের মত দৈত্য-দানা নিয়ে গল্প নয়। এতে ছেলেদের আমােদ দেওয়ার কথা অনেক আছে। কিন্তু আরব্য উপন্যাস তাে আর কচি ছেলে-মেয়ের হাতে দেওয়া যায় না। তার ভিতরে অনেক কথা এমন আছে মা ছেলে মেয়েদের অল্প বয়সে ন শোনাই ভাল। কিন্তু মালঞ্চ-মালার গল্পটা আগাগােড়া নিখুৎ- উহা ছেলেদের হাতে দেবার জিনিশ। কেবল তাই নয়, এই গল্পে যে উচ্চ শিক্ষা-দীক্ষার কথা আছে, তা পড়লে বুড়ােদেরও অনেক নূতন তত্ত্ব শেখা * ঠাকুরদাদার খুলিমালঞ্চ-মালা। ৬০

No text on this page.

Theelich গায়ে হলুদ হবে। এতে -পাড়াগেঁয়ে মেয়েদের যে ছবি আঁকা হােয়েছে, তার চাইতে মহৎ কিছু কল্পনা করা যায় না। এতে হৃদয়ের বল ও নিঃস্বার্থ ভালবাসার যে মূর্তি দাড় করান হয়েছে, তার কাছে সীতা সাবিত্রীও যেন ম্লান হােয়ে পড়বেন। এই গল্পটি অতি সংক্ষেপে বােলে তােমার কাছে এর গুণাগুণ পরে বিচার করবে। মালব-নালার পর বহু তপস্যায় এক আটকুঁডে রাজা দেবতাদের কাছে বর পেলেন, তার একটি ছেলে হবে। সমস্ত রাজপুরীটা সেই ছেলেটির জন্য মায়ের মতন পথ- পানে চেয়ে রইল। রাজপুত্র জন্মালেন। তার নাম হােল চন্দ্ৰমাণিক। কিন্তু ষষ্ঠীর দিন বিধাতা পুরুষ তার কপালে লিখে গেলেন, অমন সুন্দর ছেলের আয়ু মাত্র ১২ দিন।

* গায়ে হলুদ এই লেখার কথা প্রকাশ হয়ে পড়লো। রাজ- পুরীর সকল লোেক দেবতাদের কাছে ধন্না দিল—কি কোরে রাজকুমারের আয়ু বৃদ্ধি পায়, তার উপায় কোরে দাও। আদেশ হােল ঠিক সেই দিন যে মেয়ের বার বছর পূর্ণ হয়েছে-এমন একটি মেয়ের সঙ্গে যদি সেই আতুর ঘরের শিশুটির বিয়ে দেওয়া হয়, তবেই তার মিষ্টি কেটে যেতে পারে। তেমন ধারা রাজকন্যা ত পাওয়া গেল না, সুতরাং কোটালের বার বছরের পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল, তার সঙ্গেই অগত্যা শিশু- রাজপুত্রের বিয়ে হহয়ে গেল। কিন্তু রাজারও ইচ্ছা ছিল না, রাণীরও না, একটা কোটালের কন্যা সে হবে রাজ-ঘরের বউ। কোটালের স্ত্রী ছিল, রাজ পুত্তরের আয়ু সবে বারদিন। সে বল্প—“হােক না রাজপুতুব, আমি এখানে মেয়ে দেবাে না।” মালঞ্চ বােল্প “রলা যখন বলেছেন তখন আমায় বে দাও।

গায়ে হলুদ *
কিন্তু তিনি রাজাকে জিজ্ঞাসা কোরে পাঠালেন
রাজপুত্তর কোটালের বাড়ীতে আসতে অনুমতি
পাবেন কি না, রাজা-রাণী বউএর হাতের ভাত
খাবেন কি না, বউএরা বিয়ের সময় যে সকল
যৌতুক পেয়ে থাকেন, মালঞ্চকে তা দেওয়া হবে
কি না?”
ইহা ছাড়া মালঞ্চ আর এক সন্ত্র চাইলেন,
রাজপুত্তর যদি আতুর ঘরে মরে যান, তবে শব
মালঞ্চকে দিতে হবে।”
বউ নয় ডাইনি
রাজা বলেন-“বাসর ঘরে এ সকল কথা
স্বীকার করূবেন। কিন্তু মালঞ্চের বিয়ে হওয়ার
পরেই রাজপুত্তুর মারা গেলেন। রাজা বল্লেন—
“এত বউ নয়, এ ভাইনি।”
যা স্বীকার করেছিলেন মালঞ্চ একে একে সকল
কথা মনে করিয়ে দিলেন। রাজা রেগে তার হাত
৬৭

* গায়ে হলুদ *
কেটে ফেলেন,
চোখ উপড়িয়ে ফেল্লেন, তার
বাপকে কাটলেন। কিন্তু মালঞ্চ তথাপি যেন কিছু
হয় নাই, এমনি ভাবে বল্লেন,-“রাজা আমায় কথা
দিয়েছেন, মরা স্বামী আমায় দি।” রাজা মরা
রাজপুরের সঙ্গে ডাইনী মালঞ্চকে পুড়িয়ে
ফেনূতে আদেশ কল্লেন।
ধূ ধূ করে চিতা জ্বলছে—তার মধ্যে মরা স্বামী
কোলে করে মালঞ্চ বসে আছে। ভূত প্রেত দান
এসে কত ভয় দেখাচ্ছে, কত লােভ দেখাচ্ছে, মালঞ্চ
কিছুতেই স্বামীকে ছেড়ে দিলে না, সেই শিশু
স্বামীকে আঁকড়িয়ে ধরে বসে রইল।
আগুণ নিবে গেল, দানা ভূত বাতাসে মিলিয়ে
গেল। মালঞ্চ দেখলেন, তার ফুট ফুটে ছােট্ট স্বামিটি
কোলে নিয়ে তিনি মস্ত বড় একটা প্রান্তরে বসে
আছেন। দেবতার আশীর্বাদে তার চোখ হয়েছে,
তার চাপার মত আঙ্গুল গুলি ফিরে পেয়েছেন,
আরও আশ্চর্যের বিষয় সেই ছােট্ট রাজপুত্ৰটী
চোখ মেলে হাত পা নাড়ছে।

* গায়ে হলুদ
সম্মুখে রূপার কাজল লতা, ঘন ফোডের কথা,
সােণার উনুন, মুক্তোর ঝিনুক, শ্বেত সষের বালিশ,
মতির চামচ। তার পরে সেই ছােট্ট স্বামীকে নিয়ে
সেই প্রান্তরে তিনি কি ভাবে ছিলেন, তা সেই
আদত গল্প থেকে তুলে দেখাচ্ছি :-
“পতি হাসেন-মালঞ্চ হাসেন, পতি কাদেন
মালঞ্চ কাঁদেন, পতি কথা কয়, মালঞ্চ কথা কন।
পতি হাত পা নাডে, মালঞ্চ বসিয়া খেলা দেন।
মালঞ্চ চোখের জলে পতিকে নাওয়ান, মাথার
চুল গুছায়ে পতিকে মুছান, মুখের বাতাস দিয়ে
পতিকে শুকান, আঁচল খানা দিয়ে বেড়িয়ে পতিকে
বুকের মধ্যে করে বসে থাকেন। #
বাঘ মামা
কিন্তু দেবতার আশীর্বাদী দুধ টুকু ফুরিয়ে গেল,
চন্দ্ৰমাণিককে কি খাওয়াবেন,ভেবে ভেবে মালঞ্চ
আকুল।
* ঠাকুর দাদাৰ বুলি-গালমালার গল্প।
৬১

* গায়ে হলুদ
“এক ফোটা দুধ যদি প্রাণ দিলে পাই সেই
দুধ খাওয়াইয়ে স্বামীকে বাঁচাই। জন মানুষের
বসতি পাই, গাই বিয়ােনাে দুধ পাই।”
মালঞ্চ চল্লেন, “চলতে চলতে চলতে চলতে সেই
নিলক্ষ্যের চড়ায় শিশু সােয়মীর মুখে রৌ লাগে,
আঁচল দিয়ে ঢেকে নেন; বৃষ্টি মাথায় পডে, বুক
দিয়ে আবরিয়ে রাখেন , ধূলাবালী উড়ে আসে, চুল
ছড়িয়ে পাখা ধরেন—এই ভাবে চলতে চলতে দুই
পা যান, আর নামিয়ে নামিয়ে বাতাস করেন—চলে
চলে যােয়ামী নিয়ে মালঞ্চ এক গহন কাননে গিয়ে
লেন।”
মালঞ্চ এর পর বাঘ-বাঘিনীর রাজ্যে खाम
পড়লো,—তাদের দয়া হল; বাঘ-বাঘিনী মামা মামী
হল—চন্দ্ৰমাণিক বাঘিনীর খেয়ে মানুষ
হয়।
* ঠাকুরদাদার বুলি-মালঞ্চল।।

* গায়ে হলুদ যােনকি পাঁচ বছর পড়তে পড়তে স্বামীকে লেখাপড়া শেখাবার উপায় খুজতে মালঞ্চ—সেই আশ্রয় ছেড়ে এক রাজার রাজধানীতে এসে উপস্থিত হলেন। এক মালিনীর বাগানে শিশু চন্দ্ৰমাণিককে নিয়ে দাড়াতেই রূপে সে জায়গাটা আলােকিত হল। শুকনাে ডালে ফুল ফুটলো; শুকনো লতায় পাতা গজালো। মালিনী তাকে আদর করে বােঝি বলে বাড়ীতে রাখলেন। মালঞ্চের আঁচলে বাঁধা এক- খানি হীরা ছিল, তা দেবতারা তাকে দিয়ে ছিলেন, সুতরাং তার টাকার অভাব হােল না। তিনি মালিনীর বাড়ীতে বেশ কয়েক খানি ঘর করালেন, ও চন্দ্ৰমাণিককে রাজার বাড়ী পড়তে পাঠালেন। কিন্তু মালঞ্চ আর স্বামীকে মুখ দেখ না, পাছে ‘মা’ ডেকে ফেলে। তিনি বেঁধে বেড়ে চলে যান, মালিনী কাছে বসে খাওয়ায়, মালঞ্চ বেড়ার ফাক দিয়ে তাকে দেখতে থাকেন। ৭১ চ

* গায়ে হলুদ *
কাকীর কথা
ক্রমে চন্দ্ৰমাণিক বড় হ’ল। রাজকুমারী কাঞ্চী
তার সঙ্গে এক পাঠশালায় পড়ত, সে চন্দ্ৰমাণিককে
দেখে লেখাপড়া ছেড়ে দিল, তার ভাই সকল বলে,
“তুই পড়া ছাড়লি কেন?” কাঞ্চী বল্লে,-তােমর
আমার ছয় ভাই, আমি তােমাদের এক বােন,
আমার কথা রাখবে কি না, বল। আমাকে
চন্দ্রমাণিকের সঙ্গে বিয়ে না দিলে আমি প্রাণ
রাখব না।”
তারা দেখল এমদ। পরদিন চন্দ্ৰমাণিককে
বলে,-“দেখ, মালীর ছেলে, তুই এই ময়লা পোষাক
পরে এলে তােকে রাজবাড়ীতে ঢুকতে দেব না;
কাল বদি রাজপুরের মত পােষাক পরে না
আসতে পারি, তবে তােকে কেটে ফেল।”
চন্দ্ৰমাণিক বাড়ী ফিরে এসে উঠোনে উপুর
হয়ে পড়ে কঁদতে লাগল, মালঞ্চ বল্লেন,-“দেখ
তে মাসী ও কাদছে কেন?”
সব শুনে তিনি ভাল পােষাক কিনে এনে
१२

* গায়ে লু
চন্দ্ৰমাণিককে দিলেন। তাই পরে হাসীখুশী হয়ে
সে পাঠশালায় চলে গেল।
পরদিন আবার ছয় ভাই বলে,-“খুব ঘটা
কোরে দোলায় চৌদ্দলায় চড়ে না এলে তােকে
কেটে ফেলব।”
চন্দ্ৰমাণিককে মালঞ্চ সেই রূপ কোরে
পাঠশালায় পাঠালেন। তার পর রাজপুত্রের
বল্লে,-“তুই একটা ঘােড়ায় চড়ে সব্বা এর পেছনে
থাকবি, আমরা ছয় জনে ছয় ঘােড়ার পিঠে তাের
থেকে অনেক এগিয়ে থাকব, কিন্তু তুই বলি
সবার আগে যেয়ে রাজপুরীতে ফিরে না আসতে
পারি, তবে তােকে কেটে ফেলব।”
মালঞ্চ তিন দিনের সদ্য বিদায় নিলেন, শ্বশুর
বাড়ীতে এসে দেখেন সেখানে পক্ষীরাজ ঘােড়
পাগল হয়ে অনেক লোকজন নষ্ট করেছে।
ভয়ে সকলে দোর বন্ধ করে রেখেছে। তিনি পক্ষী-
রাজকে ডাকতেই সে ছুটে এল। তাকে নিয়ে এসে
মালঞ্চ চন্দ্ৰমাণিককে দিলেন।
৭

* গায়ে হলুদ *
ঘােড় দেখে ভয় পেয়ে মালিনী তার উপর
চন্দ্ৰমাণিককে চড়াতে কবুল হ’ল না। অনেক বছর
পরে অগত্যা মালঞ্চ স্বামীর কাছে এলেন, তার
জুতার ধূলো মােহাবার ছলে পায়ের ধূলো মাথায়
নিলেন, একবার স্বামীর মুখখানি চেয়ে দেখলেন
তার পর মাথা নােয়ালেন। চন্দ্ৰমাণিক বল্লে,-“তুমি
আমার কে? বাঁধ বাড়, কাছে এস না—তুমি কে?”
চোখ দুটি নত করে মালঞ্চ বল্লে,-“আমি
মালঞ্চ।
তার পর পক্ষীরাজের জোরে চন্দ্ৰমাণিক জয়ী
হল। সে রাজবাড়ীতে ফিরে আসতেই কাঞ্চী
তাকে মালা গলায় পরিয়ে দিল। সে রাজকন্যাকে
বিয়ে কল্পে।
দাঁতভাঙ্গা
ঘােড়া এসে মালঞ্চকে সব বল্পে।
মালঞ্চ দুঃখ
কল্লেন না। মালিনীকে বল্লেন,-“আজ
আজ আমার
বড় সুখের দিন,আজ আমার সব কাজ ফুরিয়েছে।”
৭৪

* গায়ে হলুদ
মালিনীকে তার যা কিছু ছিল সর্ব দিলেন।
ঘােড়াকে একখানি চিঠি দিলেন—তার শ্বশুরকে
দিতে। তাতে লিখলেন,-“তােমর ছেলে রাজকন্যা
কাঞ্চীকে বিয়ে করে সুখে আছে,আর আমার
কথা কি লিখব; যেদিন মহারাজ আমায় সাধু
সরােবরের পাড়ে প্রথম দেখেছিলেন, সেদিন আমার
বড় সুখের দিন ছিল। এই চিঠি পেয়ে দয়া করে
সেই সরােবরের জলে আপনার পা দুখানি ধুইবেন,
তাহােলেই আমি জুডােবাে।”
তার পর মালঞ্চ বাঘের রাজ্যে এসে তাদের
মুখে শুনলে, চন্দ্ৰমাণিক রাজকন্যাকে বিয়ে করেছে
সত্য, কিন্তু মালীর ছেলে রাজকন্যাকে বিয়ে কল্পে
তাকে ১২ বছর জেলে থাকতে হয়। আবার মালঞ্চ
উঠে দাড়ালেন, বাঘের যা মাথায় কোরে নিয়ে
অদৃশ্য হােয়ে রাজপুরীতে ঢুকলেন, চন্দ্রমাণিকের
পায়ে লােহার বেড়ি। সে ঘুমিয়ে আছে, তিনি
বেড়ীর এক একটা শিকল কাটতে আটুটি করে জাত
ভাঙ্গলেন। শেষ রাত্রে ৩২টী দাত বিসর্জন দিয়ে
৭৫

* গায়ে হলুদ *
তিনি বেড়ীর সব গুলি শেকল কাটলেন, তখন তিনি
অজ্ঞান হােয়ে পড়লেন—চন্দ্ৰমাণিক ঘুম ভেঙ্গে
দেখেন তার পায়ের বেড়ী খােলা,—আঁধারে মালঞ্চকে
দেখতে পেলেন না, তিনি বের হেলেন। এদিকে
চন্দ্ৰমাণিককে নিতে তার পিতা মহারাজ এসেছিলেন,
কিন্তু কাঞ্চীর বাপ তাকে যুদ্ধ কোরে হারিয়ে দিয়ে
বন্দী করে রেখে দিলেন। মালঞ্চের বাঘের এসে
কাঞ্চীর বাপ ভাই সবাইকে খেয়ে ফেলে, তখন
মালঞ্চ অজ্ঞান হােয়েছিলেন, তা জানতে পারেন
নি, তাদের জন্য কত কাদলেন। কাঞ্চীকে বাঘের
খেয়ে ফেলতে চেয়েছিল, তার চন্দ্ৰমাণিক তাকে
দিতে চেয়েছিল, কিন্তু মালঞ্চ তাদেরে অনেক মিনতি
করে বারণ করেন। চন্দ্ৰমাণিককে ও কাঞ্চীকে
নিয়ে রাজা নিজ পুরীতে গেলেন, পথে মালঞ্চ
কত কান্না কাটি কল্পে, কিছুতেই রাজা তাঁকে
নিলেন না। মন্ত্রীর কত বুঝাল, কিন্তু তিনি
বলেন, “রাজকন্যা পেলেম যে, কোটাল কন্যা
৭৬

* গায়ে হলুদ *
রাজবাড়ীতে
কাঁদতে কাঁদতে কাটা বন
কাটা বন তেলে
তেলে রাজপথ
ছেড়ে দিয়ে বিপথ দিয়ে মালঞ্চ তার শ্বশুরের পুরীতে
গেলেন। বাঘেরা অনুমতি চাইল, রাজাকে পান্তি
দিয়ে চন্দ্ৰমাণিককে তার হাতে দিতে। তিনি বলেন,
“এ কথা মুখে বলতে নাই, আমি ঘুটে কুড়িয়ে
খাব, তবুও শশুরের ভিটা আমার পবিত্র। আমি
যেখানে সেখানে পড়ে থাক, তবু এই পুরীর ওয়া
আমার গায়ে লাগবে।”
তিনি রাত দুপুরে পা টিপে টিপে রাজপুরের
ঘরে যেয়ে দেখেন সােণার দ্বীপ জলছে, চন্দ্ৰমাণিক
ও কাঞ্চী ঘুমােচ্ছ। তাদের রূপ দেখে তার চক্ষু
জুড়ালাে, তিনি নীরবে তাদের আশীর্বাদ কলেন
“এই রাজপুরীর চূড়া যেন অজয় হােরে থাকে।
রাজপুত্র, হে রাজকন্যা, তােমরা সুখে থেক। আমি
যদি পশু পাখী হয়ে থাকি, তবু আমি তােমাদের
সুখ দেখলে সুখী হােব।”
৭৭

* গায়ে হলুদ
নােজই এই রকম কোরে এসে একবার দেখে
যান এবং আশীর্বাদ কোরে যান, একদিন ধরা পডে
গেলেন; তখন তার শ্বশুর তাকে পুরী হােতে
নির্বাসন কোরে দিলেন।
নির্বাসিত হয়ে মালঞ্চ পুকুরে প্রাণ দিতে যান,
দেখেন শ্বশুর তার পাড়ে কাটার বেড়া দিয়ে
রেখেছেন। মালঞ্চ ভাবেন, আমার দুঃখ দিতেই বা
আর কে আছে? শ্বশুরের পায়ের উদ্দেশে প্রণাম
মালঞ্চকে তাড়া’বার পরে, রাজবাড়ীতে নানা
রূপ বিপদ হােল-কাঞ্চীর যে সকল ছেলে মেয়ে
হল, তা মরে গেল। রাজা শিকার কন্ট্রে গেলেন,
সেখানে তার সৈন্য সামন্ত বাঘে খেল। বড় তৃষ্ণার্ত
হয়ে রাজা দেখেন একটী পুকুর ধারে লক্ষী-
ঠাকরুণের মত সুন্দর স্ত্রী। রাজা এল চাইতে
মেয়েটি তাকে জল দিল, রাজা বল্লেন, “মা তুমি জল
দিয়ে আমায় বড় সুখী কল্পে, তুমি সুখী হও।” এই
কথা শুনে মালঞ্চ কেঁদে তার পায়ে পড়লেন, এবং
-

গায়ে হলুদ
বল্লেন, “আমার আর এর চাইতে কোন্ সুখ বেশী
হতে পারে। আজ আমি তােমার মুখে প্রথম মিষ্ট
কথা শুলেম।” রাজা মালঞ্চকে চিনতে পেরে তাকে
আদর করে বাড়ীতে ফিরিয়ে আনতে চাইলেন।
কিন্তু মালঞ্চ বল্লে—“এই বনে আমি তােমার মুখে
মিষ্ট কথা শুনলেম, এই বন আমার বাড়ী—এত সুখ
যেখানে পেলুম, সে জায়গা ছেড়ে যাই কি করে?
পাটরাণী আর ঠাকুরাণ
যাহােক, মালঞ্চ আর কয়েকদিন পরে শ্বশুর
বাড়ী যাবেন স্বীকার কোরে রাজাকে বিদায় দিলেন।
এই কয়েক দিনের মধ্যে তিনি কাঞ্চীর বাপের
বাড়ীতে যেয়ে তপস্যার দ্বারা মরী রাজকুমার ও
রাজাকে বাঁচালেন, মালিনীকে সঙ্গে নিলেন, বাঘেরা
সঙ্গে জুটুল। এদিকে রাজা মালঞ্চকে আদর করে
বাড়ীতে আনার জন্য আয়ােজন করতে লাগলেন,
রাজবাড়ীতে ডঙ্কা বেজে উঠল।
মালঞ্চ পুরীতে আসছেন, যিনি স্বামীকে শনি
৭৯

গায়ে হলুদ যেতে বাঁচিয়েছেন, যিনি রাজাকে কারাগার হােতে মুক্তি দিয়েছেন, যিনি মড় বাঁচিয়েছেন, সবার চাইতে যিনি শ্বশুরের শত অত্যাচার কথাটি না ক’য়ে সয়েছেন, তাকে ঘৃণার বদলে পূজা দিয়েছেন, সেই মালঞ্চের অন্য রাজবাড়ীতে নূতন এক সিংহ- দরজা উঠল, ঘরে ঘরে কলাগাছ পােতা হল। রাস্তায় সিদ্র চন্দনের আঁক পড়ল। যে যেখানে মরেছিল, তাদেরে বাঁচিয়ে মালঞ্চ, কাফীর পিতা ও খেয়েদের সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরের ভিটায় এলেন। রাজা প্রা একত্র হয়ে তার আদর অভ্যর্থনা কল্লেন। তার জন্য কাঞ্চী যে ফুলের মালা গেঁথে রেখেছিল, তা তিনি কাঞ্চীর গলায় পরিয়ে দিয়ে তাকে কনে পাটরাণী। আর রানের যত লােক তাকে করণ ঠাকুরাণী। গলের নীতি এই গল্পটি ছােট বেলা শুনেছিলুম। কিন্তু দক্ষিণা বাবু এটি ঠিক বুড় স্ত্রীলােকের মুখে যেমন

গায়ে হলুদ
শুনেছিলেন, তেমনি কোরে লিখেছেন। তা এমনই
চমৎকার হোয়েছে, যে পড়লে তুমি না কেঁদে
থাকতে পারবে না। আমি তাে অতি সংক্ষেপে গল্পটি
বলে গেলুম, তুমি আদত গল্পটি পড়। গল্পটি খুব
বড় এবং একখানি কাব্যের মত, হিন্দু স্ত্রী কত
সইতে পারে, দুঃখ স’য়ে কেমন করে দেবতা হােতে
পারে, এই গল্পটি পড়লে বুঝতে পাবে।
মালঞ্চ ঠিক তােমার আমার মতন লােক নয়।
সে জন্মেছিল দেখাতে যে শরীরটা মানুষের বল ও
সদ্গুণ দেখাবার একটা উপায় মাত্র।
সে কোটালের কন্যা, রাজা তাকে পুত্রবধূ কল্লেন।
সে রাজবধূ হবে, কিন্তু হেলা—শ্রদ্ধার পদ সে চায়
। সে ঐ পদের ভিখারী নয়। যদি রাজা তাকে
পুত্রবধূ করূবেন, তবে তাকে পুত্রবধূরসব খানি গৌরব
দিতে হবে।
রাজশংসারে যেয়ে যদি সে কাঠ
কুড়ােনির মত অনাদরে পড়ে থাকবে, তাহলে সে
সেই সংসারে যে কাজ করতে যাবে, সকলের হিত
কতে যাবে—সে কৰ্তব্য তাে রাজবধূর যােগ্য সম্পূর্ণ
৮১

* গায়ে হলুদ *
সম্মান না পেলে সে কর্তে পাবে না। তুমি যদি
তাঁকে বউ করে ঘরে নিবে তবে বউএর সম্মানটি
তাকে দিতে হবে। এজন্য সে বিয়ের আগে বলে
পাঠালে—রাজা তাকে বাসরের দান দেবেন কিনা, তার
হাতে পাবেন কিনা ইত্যাদি। যখন রাজা বিরক্ত হয়ে
তার হাত কাটলেন, চোখ উপড়লেন, তখনও সে
একটি একটি করে তার দাবীর কথা কইতে লাগলাে।
কিন্তু সে তাে আর তােমার আমার মত লােক নয়,
সে দেহটা মনের একটা বাহন বলে মনে করে,
দেহের সুখ দুঃখ গ্রাহের মধ্যেই নেয় না। যা ভাল
তা সে করবে-দেহ যাক আর থাক।
তার পর স্বামী নিয়ে যখন সে চিতায় উঠল,
তখন দৈত্য দানা এসে ভয় দেখালে, লােভ দেখালে।
তােমরা বড় হলে পড়বে, বুদ্ধদেব সিদ্ধিলাভ
করবার পূর্বে
এমনি লােত ও ভয়ের সব মূর্তি
দেখেছিলেন, তাতে তিনি বিচলিত হন নি।
মাথও হল না। যারা দেহকে অগ্রাহ করে
সত্যিকার জীবনের পথে যাত্রা করে—তাদের
২

১% গায়ে হলুদ
পেছনে অপদেবতারা এমনই করে উপদ্রব করে
থাকে।
মালঞ্চের চোখ গেছিল, তিনি চোখ পেলেন,
হাত গেছিল, হাত পেলেন—কেন জান? তিনি
স্বামীকে দেখতে চেয়েছিলেন, এজন্য দেখার শক্তি
হল। তার সেবা করতে চেয়েছিলেন, এ জন্য হাত
হল। মঙ্গলের ইচ্ছা নিয়ে যদি কেউ এমনই
তপস্যা করে উপায় খোজে, প্রাণপণে যদি কেউ
কিছু চায়, তা তার হাতে আসে। এই হচ্ছে ঈশ্বরের
বিধান, এটি কেমন করে যে হয় তা বলতে পারি না।
পীডাটা পায়ে দলিত হয়ে প্রাণান্ত কষ্ট যখন
নিবেদন করে, তখন ভগবান কি করে যে তাকে
দুটি পাখা দেন, তা বলতে পারি না। কিন্তু এরূপ
কোন আইন যে সংসারের সকলের চক্ষু এভিয়ে কাজ
কচ্ছে, তা আমার কাছে মােটেই অসম্ভব বলে
মনে হয় না।
সাংসারিক সুখ দুঃখ বা বিপদ মালঞ্চ মােটেই
গ্রাহ কৰ্ত্তেন না। তিনি পথে চলার জন্য পথে

* গায়ে হলুদ
চলেন নাই, কোন একটা জায়গায় যেয়ে পৌঁছাবেন,
এজন্য পথে চলেছিলেন। সুতরাং একটু আরামের
জায়গা পেলেই যে তিনি থেমে পড়বেন—তা নয়।
এস দেখা যাচ্ছে, বাঘদের রাজ্যেতে যেয়ে ঘাের
বিপদের পরে তিনি মামা মামি সম্পর্ক পাতিয়ে বেশ
একটু সুখে ছিলেন, এমন কি তিনি তাদের সাহায্য
নিয়ে অনায়াসে রাজপুরী দখল করে স্বামীকে নিয়ে
ঘর-সংসার কর্তে পারতেন। কিন্তু যখন দেখলেন,
রাজপুত্রের সমস্ত দায়িত্ব তার উপর, তাকে শিক্ষা
দিতে হবে—তখন গড় ঘর ভেঙ্গে আবার নিঃসহায়
অবস্থা বরণ করে শিশুস্বামীকে নিয়ে যে দিকে
চোখ যায় সেই দিকে চল্লেন। তুমি দেখতে
পাচ্ছ না, এ মেয়েটি বড সহজ মেয়ে নয়। এ কারু
সঙ্গে ঝগড়া করে না, কেউ চোখ উপড়ে ফেল্পে
কথাটি বলে না। কিন্তু যা ভাল মনে করেছে,
তা সে করবেই। তাতে যে বিপদ আসুক না কেন,
সুখ দুঃখ সে গণনার মধ্যেই আনে না—সে সংসারকে
কৰ্তব্য করবার জায়গা বলে মনে করেছে, এখানে
8

* গায়ে হলুদ ত্যাগের সাধনা সে কবে, এটি তার কাছে তীর্থ। যেদিন সে শুনতে পেল যে কাঞ্চীর সঙ্গে রাজ- পুতুরের বিয়ে হয়ে গেছে, সেদিন সে এক হাতে চোখের জল মুছলে, অপর হাত উঠিয়ে তাদের আশীর্বাদ কলে। মালিনীকে বলে, “আজ আমার বড় সুখের দিন; আমি যার সুখের জন্য এত কলুম সে আজ সুখী হয়েছে, এর চাইতে আর সুখের বিষয় কি হােতে পারে ?” বাঘবাঘিনীকে যেয়ে বল্লে, “তােমরা আজ আমায় খাও; আমার জীবনের কাজ শেষ হয়েছে।” শশুরকে চিঠি লিখুলে,-“সাধু-সরােবরের জলে তােমার পা'দুখানি ধুয়ে তা হলে আমি কৃতার্থ হব।” সেই পুকুরের জল যে তার প্রাণের মত, সেখানে শশুরের পা-দুখানি পড়লে যেন তার প্রাণের উপর পড়ে সব জ্বালা জুড়িয়ে দেবে। কিন্তু তার কাজ একদিনের তরেও শেষ হয় নি। যেই শুনল চন্দ্ৰমাণিক বন্দী, সেই আবার ৫

গায়ে হলুদ
একি মুর্তি। সমস্তগুলি দাত বিসর্জন দিয়ে সে
সােয়ামীর পায়ের বেডী কেটে ফেল্পে। তুমি কি
দেখতে পাচ্ছ না, যে দেহটাকে মালঞ্চ কেবল
সংসারের শুভ করবার উপায় মাত্র মনে করেছে।
এর সুখে দুঃখে মােটেই তাকে পায় নাই। মেহের
ডাকে সে সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে সাড়া দিয়েছে। যখন
শ্বশুর বহু কষ্ট দিয়ে শেষে ঘোর বনের মধ্যে তাকে
প্রথম আদর কল্লেন; তখন সে বল্পে; “তুমি আমায়
আবার কোন রাজবাড়ীতে যেতে বলছ, এই বই
তাে আমার রাজবাড়ী। এখানে আমার রাজা-শ্বশুর
আমাকে জীবনে প্রথম দিন আদর কোরে ডেকেছেন।
এ আমার তীর্থের সমান, আমি এ বন ছেড়ে কি
করে যাব?” সুতরাং দেহ সম্বন্ধেও যা, বাহিরের
অট্টালিকা সম্বন্ধেও তা ;—এ মেয়েটি কেবল
আত্মার দিক দিয়ে সব দেখছেন।
কাঞ্চী ও চন্দ্রমাণিকের ঘরে নিঃশব্দে গিয়ে মালঞ্চ
তাদের যে সরল প্রাণে আশীর্বাদ করেছেন, সেরূপ
মালঞ্চ ছাড়া আর কে করতে পারতাে। কোথায় কে
৬

* গায়ে হলুদ * এমন শুনেছে বা দেখেছে? রাজপুত্র যখন তাকে ধরে ফেল্লেন, এবং জিজ্ঞাসা কল্লেন “তুমি কে এ ঘরে ঢুকেছ?” তখন মালঞ্চ তার অল্প কথায় একটা ছােট্ট উত্তর দিলেন, “কে ঘরে ঢুকেছে?—যে পারে ” রাজপুত্র বল্লেন, “তুমি যেন আমার কত কালের চেনা। স্বপ্নে মনে হয়, যেন আমি তোমার ঐ দুখানি কোমল হাতের যত্নে মানুষ হােয়েছি।” তাঁকে যখন রাজা রাজপুরীতে আনতে চেষ্টা কল্লেন, তখন তিনি গেলেন না। আত্মীয় পরিজন সকলের দুঃখ নিবারণ কতে না পালে তিনি নিজে সুখ খুজে রাজবধূ হােতে যাবেন না। সকলকে প্রাণ দিলেন, তখন সকলের সঙ্গে রাজ- পুরীতে এলেন। মালঞ্চ প্রথমই যদি রাজপুরীতে স্থান পেতেন, তবে কোটালের কন্যা রাজবধূ হােয়েছে, এই একটা খােটা থেকে যেত—এজন্য তখন তাকে রাজান্তঃপুরে আমরা না দেখে দুঃখিত হই নাই। যখন সকলে বুঝতে পাল্লেন, তিনি পৃথিবীর লোক নহেন—স্বর্গের वथन ৭

১ গায়ে হলুদ *
দেবী,—যখন তার নাম করে রাজডঙ্কায় কাঠি
পড়ল, তখন তার আগমন সার্থক হােল--আগে
আসলে তার আসা তার যােগ্য হােত না।
শেষের কথাটির মূল্য একটী হীরা, “তিনি নিজে
পাটরাণী হলেন না, কাঞ্চীকে পাটরাণী কল্লেন,”
কিন্তু এই ত্যাগের জন্য এই নিঃস্বার্থ স্নেহ-প্রেমের
জন্য, এই শত শত অমানুষী গুণের জন্য রাজ্যের
লােকেরা তাকে কল ঠাকুরাণী। পাটরাণীর পদ
লােক-শ্রদ্ধার নীচে পড়ে রইল।
মালঞ্চ ভােগর জন্য সংসারে আসেন নি ,
ত্যাগের এসেছিলেন। এইরূপ দেবতারা
সংসারের সুখ চান না এবং পান না, কিন্তু দেবতারা
যে পূজো পান, সমস্ত মানজাতি যাড হেঁট করে
তাদের সেই
পূজো দিয়ে থাকে। মালঞ্চ শত
অত্যাচার সয়ে কথাটি বলেন নি। ফুলকে হেঁড,
কাট, সে কি কিছু বলে না, তুমি তাকে পিষে ফেল,
তবু সে সুগন্ধ দেবে। যারা এত অত্যাচার করেছেন,
তাদেরেও মাল একদিনের জন্য ভালবাসতে ভুলেন

১ গায়ে হলুদ
নি। তিনি মেহের জন্য সংসারের কাজে নিজেকে
দিনরাত্র নিযুক্ত রেখেছেন, কিন্তু এমন কিছু করেন
নি, যাতে লােকের মনে জ্বালা উৎপন্ন করতে পারে।
তুমি আজ এই শুভদিনে মাথা হেঁট করে মালঞ্চকে
একবার প্রণাম করে নেও। সংসারে অনেক
রাংতা আছে, তা দেখে ভুল না।
এই খাটি সােণার
মূর্তির পায়ে প্রাণের পূজো দিলে নিজেও কতকটা
উন্নত হতে পারবে।
তুমি কি মনে কর মালঞ্চমালা আমাদের দেশে
একটা কল্পনার জিনিষ। সত্যিকার পৃথিবীতে এমনটি
হয় না? এ যদি বুঝে থাক তবে ভুল বুঝেছ, এটা
অবশ্য সত্য যে মালঞ্চ নামে কোন কোটাল-কন্যার
হয়ত চন্দ্ৰমাণিক নামক রাজপুরের সঙ্গে কোন
কালেই বিয়ে হয় নাই ,চিতায় উঠে কোন শিশু-
স্বামীকে সে বাঁচায় নাই, এবং বাঘের কথা, মালিনীর
কথা, এ সকল নিশ্চয়ই গল্প। কিন্তু মালঞ্চের দুঃখ
সইবার শক্তি, মেহের জন্য তার জীবনে কষ্ট ও
ত্যাগ-স্বীকার এ সকলই এক সময়ে আমাদের

* গায়ে হলুদ *
দেশের স্ত্রীলোকেরা নিজের জীবনে দেখিয়া গিয়ে-
যেন। মালঞ্চের মত শত শত মেয়ে এ দেশে
বিদ্যমান ছিল, যারা নীরবে সব দুঃখ সইত, এবং
যাদের স্নেহ-গুণে আমাদের সমাজ সরল ও জীবন্ত
হােয়ে ছিল, তাদেরই জীবনের ত্যাগের কথায়, ভক্তি,
প্রেম ও এক নিষ্ঠার কথায় বেহুলা, মালঞ্চ প্রভৃতি
মেয়েদের রূপ আমাদের দেশের প্রাচীন সাহিত্যে
অমর হহয়ে আছে। সূর্যের আলাে প্রতিফলিত
হােলে যেরূপ হীরার ঐ বেড়ে যায়, সত্যিকার
জগতের ছায়া পড়ে এই সকল গল্প-কথার এ
তেমনই বেড়ে গিয়েছে।
সহমরণ প্রথাটা ছিল বড় নিষ্ঠুর, সরকার বাহাদুর
এটা রদ করে খুব ভালাে কাজ করেছেন। কিন্তু
এই সহমরণের সময় আমাদের দেশের মেয়েরা কেউ
কেউ যেরূপ নিষ্ঠা দেখাতেন, তা দেখে সাহেবের
পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছেন। মিসার্স পােরষ্টান
নামা একটি মেম একজন সতীকে দেখে বিস্ময়ে
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই স্ত্রীলােকটি নিরুপমা

* গায়ে হলুদ
সুন্দরী ছিল এবং তার ধৈৰ্য্য ও নিষ্ঠা দেখে মেম
সাহেব বলেছিলেন, এর শরীর বলে যে একটা
জিনিষ আছে এবং তা যে সে কেয়ার করে এমন
বােধ হল না। আমাদের একজন ছােটলাট একটা
“সতী”কে যখন নানারূপ প্রবােধ দিয়ে ফিরাতে
পাল্লেন না তখন ভাবলেন, এ যে কি ভয়ানক
বিপদকে বরণ করে নিচ্ছে, তার বােধ হয় জ্ঞান নেই,
আগুনের তাপ গায়ে লাগলেই টের পাবে এখন।
এ কথা শুনে সতীর ঠোটে একটা ঘৃণার হাসি দেখা
দিল ও পরক্ষণেই সে হাসি মিলিয়ে গেল, তারপর
কিছু না বলে স্ত্রীলােকটি একজনকে একটা প্রদীপ
আনতে বলে, এবং দীপটি একখানে রেখে নিজের
আঙ্গুলটা তার শিখার উপর ধলে, আঙ্গুলটা একটা
সরু কাঠের মত পুড়ে ছাই হােয়ে গেল, স্ত্রীলােকটি
অবিচলিত ভাবে বসে রইল, যেন দীপশিখায় আর
কিছু পুড়ছে মােটেই তাতে তার কিছু আছে যাচ্ছে
। লাটসাহেব দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
আমাদের দেশের মেয়েরা দৈহিক সুখ-দুঃখ
১১

গায়ে হলুদ
এমনই ভাবে অগ্রাহ করে এসেছেন বলে তােমরা
বেহুলা ও মালঞ্চের মত এক নিষ্ঠার এমন সকল
নিখুৎ ছবি দেখতে পাচ্ছ। ভিন্ন দেশেও এরূপ
ত্যাগশীলা মেয়েদের দুই একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
“রাবেয়া” নাম্নী মেয়েটির কথা অনেকেই লিখেছেন,
কিন্তু আব্দুল জববার সাহেব এ চিত্র সম্বন্ধে যে
সুন্দর ছােট বই লিখেছেন তা তােমরা পড়ে দেখাে।
বসরা নগরে একটি স্ত্রীলােক জন্মগ্রহণ করে-
ছিলেন, তাহার নাম ছিল রাবিয়া। ইহা গল্প নয়
সত্যিকার কথা।
তার বাপের নাম ছিল ইসমাইল। রাবিয়ার
তাকে ছোট্ট রেখে মারা যান। বাপের মেহে
বাবিয়া মানুষ হােয়ে ওঠে।
কিন্তু ডাকাতের দল এসে বাপকে ধরে বেঁধে
নিয়ে গেল। রাবিয়া আজ এ বাড়ী, কাল ও
বাড়ী খেতেন, কিন্তু বার বাড়ীতে যেদিন খেতেন,
সেদিন যদিও তারা তাকে দয়া করে খেতে দিতেন,
তথাপি তিনি প্রাণ দিয়ে বাইতেন। রাত্রি হােলে

গায়ে হলুদ
নিজ কুটীর খানায় শুয়ে বাপের জন্য কেঁদে কেঁদে
ঘুমিয়ে পড়তেন।
তার বাবা ডাকাতের হাত থেকে পালিয়ে
মরুভূমির পথে ছুটে আসতে লাগল। বুডাের তৃষ্ণায়
ছাতি ফেটে যাচ্ছে, রোদে পা দগ্ধ হচ্ছে, বাতাস
আগুণের হাল্কার মত গায়ে এসে লাগগছে। তবু
সেই ঘাের পথে একমাত্র রাবিয়াকে দেখবার আশায়
ছুটে আসছে—কতদিন লাগলাে সেই মৰুভূমি পার
হোতে।
একদিন সন্ধ্যার পর শুয়ে শুয়ে রাবিয়া বাপের
জন্য কাঁদছেন, এমন সময় “মা” বলে ডেকে কে খপাৎ
করে বাড়ীর উঠানে এসে পড়ল? রাবিয়া এসে
দেখেন তার বাবা শুকিয়ে কাঠের মত হয়ে গেছে,
রাবিয়া বাবা বলে কেঁদে পায়ে পড়লেন। বুড়
একবার মাত্র তার দিকে চেয়ে বল্ল “মা বড় তৃষ্ণা,
জল।” রাবিয়া ঘটা হাতে কোরে জল আনতে
খানিকটা দূরে ঝরণার নিকট ছুটলেন। জল এনে
দেখেন, যে এল খাবে, সে দেহটি মাটীর উপর রেখে

* গায়ে হলুদ
চলে গেছে। রাবিয়া বড় শােক পেলেন।
দিকে চোখের উষ্ণল, আর একদিকে ঠাণ্ডা ঝরণার
জলে বাবাকে যেন ধূয়ে ফেল্লেন। “হায় এতদিন
পরে যে তাকে দেখবে বলে এসেছিল, একটু জল
চেয়েছিল, তাকে জল দিতে না পেরে মেরে ফেলুন।
এই অনুতাপে রাবিয়া দিন রাত
দিন রাত দগ্ধ হােতে
লাগলেন।
আবার খেটে খেটে এখানে ওখানে খেয়ে, সেই
কুটীরটুকুতে থেকে রাবিয়া বাপের জন্য কেঁদে দিন
কাটাতে লাগলেন। দস্যরা এসে আবার সেই
জায়গার অনেক লােকের সঙ্গে রাবিয়াকেও ধরে
য়ে গেল।
তারা এই ভাবে লােক ন ধরে নিত কেন
জান? দাস-দাসী করে তাদেরে তারা বিক্রী করুত।
রাবিয়াকে তারা এক মস্ত বড় ধনী লােকের কাছে
বিক্রী করে ফেল্লে।
সেই ধনী ব্যক্তির বাড়ীতে ছিল লেখা পড়া
জানা লােকের একটা আড্ডা, রােজ সন্ধ্যে বেলায়
১১

* গায়ে হলুদ
কবিতা,
সেই আড্ডায় বৈঠক হােত। কেউ ছিলেন আইনজ্ঞ,
আইন কানুন নিয়ে তর্ক কৰ্ত্তেন ; কেউ ছিলেন
ডাক্তার, শবচ্ছেদ করার কথা ও নানা পীড়ার কথা
আলোচনা করতেন, কেউ কবি ছিলেন নানারূপ
কবিতা আওড়াতেন, আর কেউ ছিলেন গাইয়ে, গান
কনে।
ধনী লােকটি ফরাসের এক ধারে
তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে বসে তাদের বিচার,
ও গান শুনতেন। রােজই খাবার তৈরী
হােত, এবং তারা সকলে মিলে সেখানে খেয়ে
আমোদ আহলাদ কতেন। রাবিয়া ও আর আর
চাকর-চাকরাণীরা সেই সকল খাবার জিনিষ এনে
পরিবেশন করত।
একদিন তাদের একজন একটা মাংসের হাড়
খাচ্ছিলেন, সেই হাডখানি পায়ের , তার সঙ্গে ছােট
শির দিয়ে আর একখানি হাড় কিরূপ ভাবে জোভা
ছিল, তা দেখে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করতে
লাগলেন।
উপস্থিত লােকদের মধ্যে একজন
বলেন,

* গায়ে হলুদ
সময়
“আচ্ছা মানুষের পায়ের হাড় কি ঠিক এই রকম?”
একজন ডাক্তার বল্লেন—“ই, এই রকমের বটে,
কিন্তু ঠিক এই রকম নয়। মানুষের হাটবার ভঙ্গীটি
ঠিক পশুর হাটবার মত নয়, এজন্য তার হাতখানির
জোড়া লাগবার ধরণটায় একটু তফাৎ আছে, কোন
মানুষের পায়ের হাড় খুল্লেই তা দেখান যেতে
পারে।”
রাবিয়া খাবার জিনিষ কিছু
নিয়ে সেখানে এসে পড়লেন, আর ধনী ব্যক্তিটা
বল্লেন-“তা আপনাদের সেই হাড় পরীক্ষা করতে
হােলে এই দাসীর পায়ের হাঁডখানা তুলে নিয়ে
দেতে পারেন।” ক্রীত দাস দাসীদের সে আমলে
কেটে ফেলা যেতে পারত, কেউ কিছু বলতে
পাতত না।
গৃহস্বামীর আদেশ মাত্র আর আর দাস দাসীরা
রাবিয়াকে ধরূল এবং ডাক্তার একখানি ছুরি বার
করে রাবিয়ার কামুর উপরকার পেশী কেটে গ্রন্থির
হাড়খানি বার করে ফেলেন। সেই হাডখানি দেখে

* গায়ে হলুদ * তারা সৃষ্টিকর্তার কৌশলের অশেষ প্রশংসা কল্লেন। ক্রীত দাস-দাসী তো পশুর মত, রাবিয়ার উপর দয়া কোরে তারা একটা কথাও বল্লেন না। পরে হাড়খানি আবার জোড়া দিয়ে ভাল করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে রা ছেড়ে দিলেন, আর আব লােক জন এসে তাকে অপর একটা ঘরে শুয়িযে রাল। রাবেয়া যখন ছুরির বায়ে উৎকট যন্ত্রণা সহ্য কচ্ছিলেন, তখনও একটিবার কথা বলেন নাই। সেই পণ্ডিতদের মধ্যে একজন যখন তাঁর হাড- খানি দেখে বলেছিলেন “ঈশ্বরের কি অপার কৌশল —তখন যার নাম স্মরণ করে তিনি প্রাণান্ত কষ্ট সহ কচ্ছিলেন, তার অপার কৌশলের কথাটি তার কাণে পৌছিল; তার হৃদয় বীণাটি সেই সুরে বেজে উঠলাে, তিনি দেহের কষ্ট ভুলে গেলেন। যখন লোকজন তাকে একটি ঘরে শুয়িয়ে রেখে চলে গেল, তখন কেবলই ভগবানের দয়া মনে করে দুই চোখের জল ফেলতে লাগলেন। সেই ভয়ঙ্কর নির্দয়তার মধ্যে তিনি কি ভাবে ঈশ্বরের দয়ার খেলা ১৭

* গায়ে হলুদ
বেশী কোরে দেখতে পেলেন, তা ভক্ত ছাড়া কে
বুঝবে?
তিনি দিন রাত তাকেই ডাকতে লাগলেন, এবং
মনে মনে সেই ধনী ব্যক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে
লাগলেন। যদি তার হাড় মাংস কেটে তিনি এই
ভাবে কষ্ট না দিতেন, তবে ত রাবেয়া এমন কোরে
ঈশ্বরের শরণ নিতে পারতেন না!
তিনি ভগবানকে মধুরকণ্ঠে ডেকে ডেকে
লতেন, “যদি আমার সমস্ত দেহ খণ্ড খণ্ড কোরে
কাটলে কেউ একটু খুসী হন—তবে এই সমস্ত
বাড়াটা আমার রক্তধারায় লাল হহয়ে যাক না।
তাতেই আমার সুখ। প্রভু, তুমি যদি একবার
মাত্র আমার প্রতি অনুগ্রহ কোরে এই হৃদয়ে
এস, তবে এখানে সমস্ত বসন্তকালের উৎসব আর
হবে। পদ্মটাকে ছিড়ে ফেল্লেও সে সূর্যের দিকে
চেয়ে চেয়ে হাসে, তুমি সমস্ত ব্যথা দিয়ে আমার কাছে
এসে দাড়াও আমি তােমার মুখ দেখে তেমনই সব
ভুলে যেয়ে হাসবো। আমার যদি দুঃখ থাকে, তবে
১

* গায়ে হলুদ *
থাকুক না, পৰ্বতের মধ্যে অগ্নিকুণ্ড থাকলেও তার
লতা পাতা ফুল-পুষ্প নিয়ে কি হাসে না? তােমার
করুণা পেলে আমার সে হাসি বন্ধ করবে কে ?
এই সংসারে কত দুঃখ, সেই বােঝ। আমার মাথায়
দাও, সেই দুঃখের বােঝা আমি তােমার কণা
স্মরণ করে আনন্দে বই—তুমি জগতের কষ্ট
দূর কর।”
একদিন গৃহস্বামী দাসীর ঘর হােতে এক অতি
মিষ্ট সুরে প্রার্থনা শুনে দাড়ালেন, তখন রাত
অনেক হয়েছে। তিনি কাছে যেয়ে জানালার
পাশে দাড়িয়ে যা শুনলেন,-যা দেখলেন, তাতে
তার চক্ষু হেতে দর দর অশ্রু পড়তে লাগলো।
দেখলেন রাবিয়া জানু পেতে বসে হাত জোর
করে ভগবানকে ডেকে বলছেন,-“প্রভু, আমার বড়
কোরাে না। আমি পৰ্বত হােতে চাই না, আমায়
মাটী করে রাখ, সব্বা এর পা যেন আমার বুকের
উপর পড়ে, ক্ষুধিত এলে যেন আমাতে খাদ্য পায়।
আমি লবণ সমুদ্রের মত এত বড় হোতে চাই নে,

* গায়ে হলুদ * প্রভু আমায় ছোট্ট একটি ঝরুণা করে রেখ যে তৃষ্ণার্ত তার যেন তৃষ্ণা মিটাতে পারে, সব্বাই যেন আমার জলে পা ধুতে পারে। আমাকে বিশ্বজয়ী বীরের তরবারী খানির মত কোর না; আমায় এক- খানি লাঠি করে রাখ, যে চলতে না পারে সে যেন আমাকে অবলম্বন করে চলতে পারে।” রাৰিয়ার দুই চোখ হােতে জল পড়ছিল, তিনি আবার বলছিলেন—“আমার এই বাড়ীর প্রভুকে ভাল রেখ, তার প্রসাদে আমি খেয়ে পরে সুখী আছি। আমি যে যন্ত্রণা পেয়েছি, তার মধ্য দিয়ে তােমাকেই চিনতে পেরেছি,-এইজন্য ধন্যবাদ।” এর পরে তিনি সেই বাড়ীর সকলের জন্য এবং সর্বশেষ জগতের মঙ্গলের জন্য ভগবানের নিকট বারংবার প্রার্থনা জানালেন, তখনও তার চোখের জল পড়ছিল। গৃহস্বামীর মনে যে কি হয়েছিল তা আর কি ব? যাকে তিনি পশুর মত কষ্ট দিয়েছেন, সে তার জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা করছে ও

* গায়ে হলুদ *
কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। রাবিয়া তো মানুষ নহেসে
স্বর্গের দেবী।
তিনি রাবিয়াকে মুক্তি দিলেন। রাবিয়ার নাম
দেশময় রাষ্ট্র হয়ে গেল। এক প্রধান ফকির বলে-
ছিলেন—“কোনও রূপ শিক্ষা না পেয়ে রাবিয়া
আশ্চৰ্য্য বিশ্বাস বলে ধৰ্ম্মের সব গৃঢ়তত্ব বুঝেছেন।”
আজ গায় হলুদের দিনে তােমায় বলতে এসেছি,
সংসারের দুঃখ কষ্ট মাথায় করে নিয়ে তুমিও স্বর্গের
দেবী হােতে পার। এই মানব-ন্মই ত সাধনার মূল
-এটা যা মনে আসবে তাই কবার জায়গা নয়।
সীতবিত্রী-চিরথী
তুমি সীতার কথা শুনেছ, তঁার মত হােতে
কোন্ মেয়ের সাধ না যায় ? সতী-সাবিত্রীকে তুমি
ঘুম ভাঙ্গলে বােজ প্রণাম কোরে উঠ। তাদের
মত হাে’য়, এই আশীর্বাদ তাে তুমি বরাবর
শুনে আচ। কিন্তু তার জীবনে কি খুব সুখী
হােয়েছিলেন? সীতাকে তাে
সীতাকে তাে একরূপ আজন্ম

গায়ে হলুদ *
দুঃখী বলা যেতে পারে, সাবিত্রীও ত বনে বনে
স্বামীর সঙ্গে ঘুরে কত কষ্ট পেতেন। সত্যবান
যে কাঠ কেটে দিতেন, সাবিত্রী তা কুড়িয়ে ঘরে
তুলে রাখুতেন। এই দুই বাজার ঘরের বউএরইত
কত রকম দুর্দশা, তবু তােমার গুৰুজন এদেরই
মত হােতে বলেন কেন? কেন নুরজাহান কি
রিজিয়ার মত হোতে বলেন না ? কত শত
ভাগ্যবতী মেয়ে তো রাণী হােয়ে মাথায় সােণার
মুকুট পরে এই ভারতবর্ষে কত প্রতাপ কত
ঐহিক সম্পদ দেখিয়ে গিয়েছেন। তারা জীবনটা
আদরে আদরে কাটিয়ে গিয়েছেন, তাদের হুকুমে
রাত দিন হােয়ে গেছে, তাজমহল উঠেছে, যেখানে
बषि छिन সেখানে
নদী বয়ে
গেছে, নদী
ভরাট হয়ে ডাঙ্গা হেয়েছে, এমনি ছিল তাদের
প্রতাপ। হেলেনা ও ক্লিওপেট্রার মত সুন্দরী কে?
কিন্তু এসকল ভাগ্যবতী গৎ তরে থাকা
সত্ত্বেও যারা রাজ্য হারিয়ে বনে বনে ঘুরেছে,
তেতাে বন ফল খেয়ে বেড়িয়েছে, পায়ে কাঁটা

* গায়ে হলুদ
বিধেছে, যাদের কোন দিন উপােস কতে হয়েছে,
কোন দিন আধপেটা খেয়ে থাকতে হেয়েছে,
কত রাত গাছের তলায় ঘাসের উপর আঁচল
পেতে শুয়ে কাটাতে হােয়েছে, তার উপর আবার
কাক স্বামীকে যমে ধরে টানাটানি করেছে,
কাকে বা রাক্ষসে ধরে নিয়ে গিয়েছে, এই সকল
চিরদুখী মেয়েদেরে আমরা এত ভাল বাছি
কেন? তােমাদেরে আশীর্বাদ করবার সময় এদের
মত হবার কামনা করি কেন ?
এতেই বুঝতে পেরেছ আমাদের দেশ প্রকৃত
পকে বাইরের সম্পদ চায় না, তুমি সাংসারিক
জীবনে সুখে থাক কি দুঃখে থাক—এর দরুণ
আমাদের ততটা ভাবনা চিন্তার কারণ নেই।
তােমাকে ভগবান কতকগুলি মূল্যবান জিনিষ দিয়ে
পাঠিয়েছেন,—সেগুলি হচ্ছে, প্রেম, নিষ্ঠা,
ত্যাগ প্রভৃতি সদ্গুণ, এই গুণগুলি তুমি বুকের
ধন কোরে রাখতে পেরেছ কিনা তাই দেখবে।
কেউ যদি তােমার হাতে একখানি হীরা দিয়ে

* গায়ে হলুদ *
কোথায় পাঠিয়ে দেয়, আর তুমি যদি তা পথে
যেতে ভুলে হারিয়ে ফেল, অথচ রাস্তায় সােণার
ময়ুরপংখী ডিঙ্গিতে শুয়ে আরাম করূতে করতে
যাও, তা হােলে লােকে তােমায় অপদার্থ বলবে
কি না, বল? আর যদি কেউ সেই হীরে খানি
বুকে করে পখে চলে, কাটার আঁচরে পা ছিড়ে
যাচ্ছে, কােলে মাথা ফেটে যাচ্ছে, পথে ডাকাতের
হাতে পড়েছে, তবুও যদি সে হীরে পানি নিয়ে
যথাস্থানে পৌঁছিয়ে দেয়, তবে তাকে সবাই
প্রশংসা করে কিনা? ভগবান তােমার অন্তঃকরণে
যে সকল গুণ দিয়েছেন, শত শত বিপদে পড়ে,
প্রলােভনে পড়েও যদি তা রাখতে পার, তবেই
মনুষ্য জীবনের সার্থকতা হােল। তা না হলে কে
ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছে, কে শুধু নূন মাখিয়ে
খেয়েছে, কে হেঁটে পথে চলেছে, কে মােটরে
গিয়েছে, এসকল অতি ছােট কথা। এদেশের
লােক ধন দৌলত নিয়ে বড়াই করে নাই, হৃদয়
নিয়ে বড়াই করেছে। তাই চিরদুখী কৌশল্যা,
১০৪

* গায়ে হলুদ *
চিরদুঃখী বেহুলা, চিরদুঃখী সীতা, এরাই হচ্ছেন
হিন্দুর ঘরের দেবী; সূয়ো রাণীর উপর কারু
শ্রদ্ধা নেই, দুয়াে রাণীর কুড়ে ঘরখানিকেই আমরা
ভক্তি করে থাকি।
বেসরার গল্প
তােমরা শুনেছ, বাল্মীকি বহু প্রাচীন কালে
বামায়ণ রচনা করেছিলেন। খুব সম্ভব বাল্মীকিরও
অনেক পূর্বে বেসন্ত নামক এক রাজকুমারের
কথা কোন কবি লিখেছিলেন। সেই কাব্যে
দেখা যায় প্রজারা জুটে জোর কবে যুবরাজ
বেসন্তরাকে বনে পাঠাল। তার কোন দোষ
ছিল না।
তাঁর একটা শ্বেত হস্তী ছিল, সেই
হস্তীর গায়ে কোটী কোটী টাকার আসবাব ছিল,
তার হাওদা, তার গালিচা, তার মাথার মালা ও
মুকুট, তার লেজের গয়না এসকলের মাঝে হীরার

* গায়ে হলুদ *
ছড়াছড়ি ছিল। লােকের বিশ্বাস ছিল এই হাতী
বড় সুলক্ষণ, এর গতিকে রাজ্যে কোন বিপদ
আতে পারে না। কিন্তু বেসন্তরা ছিলেন ভারী
একন দাতা। তার নিয়ম ছিল, পূর্ণিমার দিন
যদি কোন বামুন তার কাছে কিছু চাইবে, তবে
তিনি সেটি না দিয়ে জল গ্রহণ করবেন না,
তা হােক না কেন তার সর্বস্ব। ভিন্ন দেশী
কয়েকটি বামুন জুটে পূর্ণিমার দিন যেয়ে বেসন্তরার
কাছে শ্বেত হস্তীটি দান চাইলে ; যুবরাজ সমস্ত
আসবাব সমেৎ সেই হস্তীটি তাদের দিয়ে দিলেন।
এখন প্রজারা এই খবর পেয়ে শেত হস্তীটির
অনেক দুঃখ কলো। তায় বুড়
তার বুড় রাখা
সঞ্জয়কে যেয়ে বলে, যুবরাজ আমাদের দেশের
সাক্ষাৎ মঙ্গল-স্বরূপ শ্বেত হাতীটি দিয়ে ফেলেছেন,
এ ভারি অন্যায় করেছেন, আমরা যেয়ে তাঁকে
বন্ধু, একি করেছেন। তার উত্তর হােল হাতী তো
হাতী, তারা আমার প্রাণ চেলে প্রাণ দিতুম।
আমরা যেয়ে তাঁকে বধ কব বলে ভয় দেখালু,
১০৬

* গায়ে হলুদ *
তিনি তাতে ভয় পেয়ে বল্লেন, “আমার জিনিষ
আমি দিয়েছি, এই অপরাধে যদি তােমরা আমায়
মাতে চাও, মারুতে পার।” এই বলে বুড রাজাকে
তার শাসিয়ে বলতে লাগলে, এখন মহারাজ
যদি যুবরাজকে বনবাস না দেন, তবে আমরা
সবাই মিলে আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়াব।
রাজা এই অবস্থার চক্রে পড়ে নির্দোষ বেসন্তরার
উপর বনবাস ও দিতে বাধ্য হহলেন।
বেসন্তরা বনে যাওয়ার পূর্বে তার স্ত্রী মাদ্দিকে
ডেকে বলেন, তােমাকে আমি বা কিছু হীরে
অহরৎ মূল্যবান উপহার দিয়েছি, তােমার বাবা
যা কিছু বহুমূল্যবান যৌতুক দিয়েছেন, তা ভাল
করে লুকিয়ে রাখ।
মাদি বলেন, “আমি সেগুলি ভাল করে লুকিয়ে
রাখবার জায়গা কোথায় পাব ? বেসৱা উত্তরে
কইলেন, যারা দীন, দুঃখী, তাদের হাতে দাও,
তােমার ধন নিরাপদে রাখবার এর চাইতে ভাল
জায়গা হাতে পারে না।

* গায়ে হলুদ * তার পর তিনি স্ত্রীকে সংসারে কি ভাবে চলতে হবে তার সম্বন্ধে অনেক উপদেশ দিলেন। মাদ্দি চমকে উঠে বল্লেন, “আজ এসব কথা কেন বলছেন? বেসন্তরা স্থির ভাবে বলেন- ‘আমাকে দেশের লােকেরা নির্বাসন দিতে স্থির করেছেন, আমায় একা বনবাস যেতে হবে।” মান্দি এই কথা শুনে উত্তেজিত সুরে বল্লেন- “প্রভু, এ হােতেই পারে না, প্রজারা তোমাকে কনবাস দিলে আমায়ও দিয়েছে; আমায় একা তােমার কাচ ছেড়ে থাকতে বল, নতুবা আগুণে ঢুকে মরতে বল, আমি আগুনে পুডেই মরুব, তােমার কাছ ছাড় হােয়ে থাকতে পারব না। দেখতে পাও না, হাতীর সঙ্গে হাতীনি যায়, ময়ুয়ের সঙ্গে ময়ুরী ঘুরে বেড়ায়, আমি সেইরূপ তােমার সঙ্গে বেড়াব। আমার ছেলেদের নিয়ে আমি তােমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবো। আমায় মানা কোরাে না।” তার পর মান্দি হিমালয়ের কথা বলতে লাগলেন, ১০৮

* গায়ে হলুদ
“সেইখানেই তো বনবাস হবে—ছেলেদের হাসি,
এলো মেনে কথা ও কৌতুক বনের মধ্যে
আমাদের ভুলিয়ে রাবে, তখন তুমি ভুলে যাবে
যে তুমি এত বড় রাজ্যের রাজা ছিলে।
“তারা যখন ফুল সাজে সেজে বন ফুলের
মুকুট পরে হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরূবে, তখন
তুমি কুঁড়ে ঘরে থেকেও ভুলে যাবে যে এত বড়
রাজ্যের রাজা ছিলে।
“যখন তারা বনের মধ্যে খেলতে থাকবে এবং
নিজেরা ছোট ছোট ফুলের চারা এনে কুঁড়ে
ঘরের পাশে উঠোনের এক কোণে বুনবে, তখন
তাদের মুখ দেখে ভুলে যাবে যে তুমি এত বড়
রাজ্যের রাজা ছিলে ।
“যখন বড় বড় হাতী ও মােযগুলি স্বচ্ছন্দে
ঘাের বনে ঘুরতে থাকবে, তখন তাদের প্রকাণ্ড
শরীর দেখে বিস্ময়ে ভুলে যাবে— —তুমি এত বড়
রাজ্যের রাজা ছিলে।
“যখন সেই ঘাের বনে হরিণ আশ্চর্য হয়ে

গায়ে হলুদ * বনের আমাদের মুখের দিকে চাইবে, ঝরণার ধারে বেঙ্গগুলি লাফিয়ে লাফিয়ে নাছবে, তখন তুমি ভুলে যাবে তুমি এত বড় রাজ্যের রাজা ছিলে। “যখন মেঘ দেখে ময়ুরী নাচবে, আকাশে ইন্দ্রধনু উঠবে, গণ্ডারগুলি বড বড ছবির মত এক কোণে দাড়ায়ে দুলতে থাকবে, যখন কোটর হতে পেঁচা গগা মরে ডেকে কালােয়াতের গলাকে যেন ঠাট্টা করুতে থাকবে, যখন ঘাের অরণ্য শীতের শেষে নূতন পাতা পরে—সবুজ হয়ে উঠবে, গাছে গাছে ফুলের বাহার হবে, পদ্ম তার দল- গুলি মেলে সূর্যের কাছে যেন তার প্রাণের ভালবাসা খুলে ধরুবে—তখন তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাবে, যে তুমি এত বড় জোর রাজা ছিলে!” স্ত্রী কেবল যে তার স্বামীর সঙ্গে চাচ্ছেন এমন নয়, তিনি তাকে আনন্দ দেবার মতন মনটির আভাস দিচ্ছেন; সেই ঘাের অরণ্যে নির্বাসন দণ্ড সত্ত্বেও স্ত্রী কাছে থাকলে তার কোন দুঃখের হবে না, বরং রাজ-সিংহাসন যেতে যেতে

* গায়ে হলুদ
সেই আরণ্যজীবন বেশ সুখের হবে—তা' দেখাচ্ছেন।
তিনি স্বামীর দুঃখের বােঝা বাড়াবেন না, তাঁকে
আনন্দ দেবেন, তার সঙ্গে থেকে সেই আনন্দ
উপভােগ করূৰেন—এইজন্য তিনি যেতে চাচ্ছেন।
এখানে তার ভালবাসা কঠোর ভাবে দেখা দেয় নাই,
অতি সহজ আনন্দের মধ্যে সুন্দর হােয়ে দেখা
দিয়েছে। বাল্মীকি হয়ত এই সকল কথা হােতে
সীতার উক্তিগুলি অনেক নিয়েছেন, কিন্তু তা
এখানে বলার দরকার নাই।
ভালবাসার দেওয়া নেওয়ার হিসাব নয়
সুতরাং দেখতে পাচ্ছ, পার্থিব সুখ দুঃখটা
কোন কালেই আমাদের মেয়েরা গণ্য করেন নাই।
অথচ তুমি এটি যেন মনে না কর যে, এই সকল
মেয়েরা বড় কাঠ খােট্টা। এরা আগুণে গড়ে
মতে জানে, এরা স্বামীর সঙ্গে যমের
পর্যন্ত যেতে জানে, এা শ্বশুর শাশুড়ীর অত্যাচার
অবিচার পাষাণে বুক বেঁধে সইতে জানে, কিন্তু

গায়ে হলুদ
এদের ভিতরে আকর্ষণী শক্তি কোথায়? এদের
মধ্যে কোমলতা যেন বড় গপা পড়ে গেছে, এর
আমােদ আহলাদ দিয়ে গড়া নয়, দুঃখ দিয়ে গড়া।
কিন্তু আমি বলবাে আমি দুঃখের গড়নকে
বড় ভালবাসি। এদের মধ্যে যে কোমলতা নেই,
তা কে বলে ? তুমি কি বলতে চাও, মা ছেলের
এত কষ্ট সহ্য করেন বলে তার মনে
আমােদ আহ্লাদ নেই? তুমি তাে শুনেছ গভীর
জল সহজে নডে না, ছােট একটী ঝরণা লাফিয়ে
লাফিয়ে চলে,-গভীর শান্ত বড় পুকুরটা কেমন
স্তব্ধ হির।
যে গভীরভাবে ভালবাসতে জানে, তার আনন্দ
প্রাণের ভিতর, তা সহজে সে দেখতে দেয় না। দুঃখের
কয়লার খনির মধ্যে ত্যাগের কঠোরতার মধ্যে সেই
আনন্দের হীরা লুকিয়ে থাকে।
ছেলেটিকে হাসতে দেখেন, ঝাপিয়ে কোলে আসবার
সময় তার মুখের আধবােল ৩তে থাকেন, তখন
তার সমস্ত পরিশ্রম শােধ হয়ে যায়, শত কষ্টের
মা যখন ঘুমন্ত
১১২

* গায়ে হলুদ %
পুরস্কার হাতে হাতে পান। সেই দেওয়ার মধ্যেই
ততা পারিশ্রমিক লুকিয়ে থাকে, বাইরে তা পাৰাৰ
লােভে যে হাত বাড়ায়, সে হতভাগা তো কিছুই
পেল না।
তরল আমাদের লােভে সেই গভীর আনন্দ
হােতে বঞ্চিত করে মনকে পথের ভিখারী করো না।
যার তার কাছে, সময় নাই অসময় নাই, হাত পেতে
কডা ক্রান্তি আদায় করবার চেষ্টা করাে না,-তা
হাে’লে তুমি যে ভিখারী সেই ভিখারীই থেকে যাবে।
তুমি যার জন্য সে টুকু করবে, তার দেনা-
পাওনার হিসাব সেইখানেই চুকে যাক্। অর্থাৎ
তুমি সেবা দিবে—হৃদয়ের ঘড়া একেবারে খালি
করে স্নেহের সুধা ঢেলে দিবে, কিন্তু প্রতিদানে কিছু
চাইবে না। পাওয়ার প্রত্যাশাও করে না, তা
হে'লেই তাে তুমি দাতা হতে পারবে। নৈলে তুমি
এক হাতে দিয়ে যদি দাম চেয়ে আর এক
হাত পাত, তবে তাে তুমি একটা বাজারে বেনে
হাে’লে। দেওয়ার মত দিতে পারলে, তুমি ত তখনই

* গায়ে হলুদ *
তার পুরস্কার পাবে, অর্থাৎ আনন্দ তােমার চোখের
কোণে এসে চোখ জলে ভরে দিবে—তার চেয়ে বড়
পুরস্কার আবার কোথায় পাবে? যাকে তুমি স্নেহ
মমতা দিয়ে সেবা করে সুখী কৰ্তে চেয়েছ, তাকে তুমি
আরও কি দিতে পার-হৃদয় ভাঙার খুলে আর ও
কি দিতে পারি—তাই দেখ, সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার। এই
নিঃস্বার্থ স্নেহ যত দিবে, ততই তার ভাণ্ডার বেড়ে
যাবে। তুমি কল্পতরু হয়ে সংসারের ইষ্ট করার
জন্য তােমার নিজের সব খানি বিলিয়ে দিয়ে দেখাে,
সে কি আনন্দ। যে দিয়ে আবার এক চোখে
চেয়ে দেখে, কতটা পেল,—সেই হতভাগা চিরজীবনটা
কেঁদে কেঁদে কাটায়। কে কি তোমায় দেয় নাই,
হিসাব-নিকাশের সময় সে কথা উঠবে না। তুমি কি
দেও নাই, তার জন্য তােমাকে জবাবদাহী হােতে
হবে, নে।
এখন বুঝলে সংসারে তােমায় কি ভাবে চলতে
হবে। ভাল পথে চলা সহজ হতে সহ-ত
বড় ভাগই কেন না হয়, তুমি যদি এই বয়স
১১৪

গায়ে হলুদ
হােতে তার দীক্ষা নেও—তা কর্তে তবে তােমার
কোন কষ্টই হবে না। ফুলটি যে ঝড় বৃষ্টি মাথায়
কোরে নিয়ে কেবলই হাসতে থাকে, তা কি সে
খুব করে হাসে। গাছটি যে তার শত্রুকে ফুল
ফল বিলিয়ে দেয় অর্থাৎ যে তার গােড়া কাটছে,
তার হাতেও ফুল ফল পড়ছে—তা কি সে কষ্ট
করে দেয়। তার স্বভাবটি এমনই হাে’য়ে গেছে
যে সে সেরূপ না করে থাকতে পারে না। তুমিও
যদি এখন থেকে ভাল হব, এই প্রতিজ্ঞা করে
স, তবে দেখবে ভাল হওয়া একেবারেই কষ্টকর
নয়। মনটাকে মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়া দিয়ে ঠিক
সোজা পথে রাখুবে—কতদিন পরে দেখতে পাবে
ভাল পথে চলা কত সহজ। কিন্তু যদি তােমার
অভ্যাসগুলি খারাপ হোয়ে পেকে যায়, শেষে
শােধূরাতে গেলে ভাজবে, তবু নােয়বে না।
মেয়েকের কর্তব্য
আগেকার দিনে কতকগুলি কর্তব্য ছিল,
এখনকার কাজ হয়ত ঠিক সেরূপ নয়, কিন্তু আমার
১১৫

* গায়ে হলুদ * তা সব খুটিনাটি করে বলবার দরকার নাই। স্ত্রী-পুরুষ মিলে মিশে সর্বদা সব জায়গায় সংসার চালিয়ে থাকে, কেউ বসে থাকতে আসেনি। এই দুয়ের মধ্যে যদি কেউ কাজ করে এবং কেউ ঘুমােয় তবে সংসার চলবে না। সে জাতি মরে যাবে। এক সময় ঋষিরা বেদের গান রচনা কৰ্ত্তেন- তাদের মেয়েরা হােমের আগুণ জ্বালিয়ে রাতেন। তার পরে পুরুষেরা এবং মেয়েরা একত্র হােয়ে সংসারের কাজ দেখতেন। পুরুষের যজ্ঞ করতেন, মেয়েরা পৈতা কাটতেন। পুরুষেরা ভাত বন্‌তেন মেয়েরা চরকা কেটে সূততা তৈরী করতেন। পুরুষ দেশ দেশান্তর হতে অর্থ আন্‌তেন, মেয়েরা সাঁঝের দীপ জ্বেলে সে গুলি বরণ করে তুলতেন। পুরুষেরা বাইরের সমস্ত কাজ করে যখন বাড়ীতে ফিৰ্ত্তেন- তখন দেখতেন ঘরের কাজ সমস্ত ছেয়ে আছে। তােমরা মনে করুছ, যা কিছু সন্দেশ মেঠাই, সে সকলের উৎপত্তিস্থান বাজার। ওগাে তা নয়। খাবার সমস্ত জিনিষ আগে ঘরে তৈরী হয়েছে, ১১৬

গায়ে হলুদ *
তবে বাইরে গেছে। মেয়েরা তাদের স্বামী, পুত্র,
অভ্যাগত সকলের ब ভেবে ভেবে নানা
রকমের খাবার সৃষ্টি করেছেন, সে গুলি মা বােন
ও স্ত্রীর স্নেহের দান। তা এখনকার মেয়েরা ভুলে
গেছেন। তােমরা যদি পুরাণে বাঙ্গলা বই পড়, তবে
দেবে শাক সবজী দিয়ে, গুড নারূকেল দিয়ে,
দুধ ও চিনি দিয়ে আমাদের দেশের মেয়েরা আগে
কতরকমের জিনিষ সৃষ্টি কৰ্তেন! কত খানি মেহের
রাজ্যে সেই সকল খাদ্যের জন্ম হো’ত, তা যদি
তােমরা জানতে? কই এ আমলে ত ঘরের বউ
কোন একটা নূতন খাদ্যের সৃষ্টি কর্তে পাল্লেন না।
তারা ধীরে ধীরে ঘর হােতে বাইরে সরে পচ্ছেন।
লক্ষীটি তুমি তা করাে না, ঘরের এ বজায় রেখে,
ঘরের উন্নতি করে।
তুমি শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়লে সংসার
চলবে না। পুরুষেরা যেদিকে যাবেন, তােমাদের
তাদের সঙ্গে সঙ্গে যেতে হবে-তা না হােলে তার
বল পাবেন কোত্থেকে? আজ দেশের যে অবস্থা, তাতে
১১৭

* গায়ে হলুদ
দরিদ্রের দুঃখ শুনে যখন তারা অমবিতরণের জন্য
ছুটবেন, তখন তাদের হাত ধরে আটকে রেখাে না,
তােমরা বল দিও, তোমাদের বল পেলে যারা মেযের
মত দুর্বল তারা সিংহের মত হেয়ে উঠবে। তােমর
ঘরে বসে দুঃখীর অন্য এক ফোটা চোখের জল
ফেল, তা হলে দেখবে বাড়ীর ছেলেরা ঝড় তুফান
মেনে দুঃখীর বােঝা মাথায় পেতে নেবে, ভাই
বলে কেঁদে তার হাত দুটি ধরবে। তুমি গহনার
জন্য কান্নাকাটি করে, বৃথা আমােদর জন্য টাকা
চেয়ে চেয়ে পুরুষের উদ্যম চেপে রেখে না।
তােমার চোখের সেই ইঙ্গিত দাও—যাতে করে পুরুষ
শের ভার মাথায় নিতে পাবে,—যেমন বিদ্যুতের
একটা ইঙ্গিত যখন আকাশে চমূকে ওঠে, তখন সেই
ইঙ্গিত সমস্ত মেঘের জলকে পৃথিবীর তাপ নিবারণের
জন্য পাঠিয়ে দেয়। তােমার একটি কথায় যে কাজ
হবে, সুরেন্দ্রবাবুর বক্তৃতায় ত’ হবে না, রবিবাবুর
লেখা পড়ে তা হবে না।
আজ কেন, তুমি আমাদের জন্য যাচ্ছ না। তুমি
১১

* গায়ে হলুদ
যেখানে যাচ্ছ সেখানে থেকে দশের উপকারের কাজ
সুরু হবে। তুমি অবলা নও, তােমার বলই
গৃহস্থের সম্বল। তুমি যে সংসার ভালবাসবে, সে
সংসার হিমালয়ের মত হয়ে দাড়াবে। তােমার
সােণার বালার একটু খানি দীপ্তিতে সেই সংসার
উজ্জ্বল হহয়ে উঠবে। পুরুষেরা তােমার চোখের
এল, তোমার হাসি, তােমার মুখের কথায় গা ঝাড়
দিয়ে উঠে কাজে লেগে যাবে। আর তুমি যদি
সংসারটি ভালবাসার চোখে না দেখলে, তবে সে
হতভাগা সংসারটা মরুভূমি হয়ে যাবে। গণেশের মত
লেখকের লিখুতে হাত কাঁপবে—বৃহস্পতির মত
বুদ্ধিমান সামান্য হেয়ালীর অর্থ করতে ঘেমে যাবে,
ও ভীমের মত সাধুচরিত্র লােক আড্ডায় পড়ে গড়-
গডি বাবেন। পৃথিবী যেমন ভিতরে ভিতরে কাজ
করেন-ফুলের মধ্যে নানা রং লিখে দিচ্ছেন, গন্ধ ও
মধুতে তার বুক ভরে দিচ্ছেন, শালগাছের সার তৈরী
কচ্ছেন, তাকে কোমলতা ছিচ্ছেন, কিন্তু কেউ
তো তাকে কাজ করতে দেখছে না, সব্বায়ের

গায়ে হলুদ *
চোখের আড়ালে তিনি কাজ কচ্ছেন, তােমাদের
কাজটা অনেকটা সেই ভাবের। তােমাদের সেই
অজানা ভেতরকার শক্তি,-মানুষগুলিকে গড়ে
তুলছে। কেবল মাতৃগর্ভে নয়,
মাতৃগর্ভে নয়,পৃথিবীতে এসেও
মানুষ তার বুকের রক্ত ও দেহের বল সবই তােমা-
দের কাছে থেকে পাচ্ছে, কেউ তা দেখছে না, কিন্তু
তা নিশ্চয়ই কাজ কচ্ছে।
ওগাে লাল চেলী-পরা বিয়ের কনেটি, একবার
গড় হাত কোরে ভগবানকে ডেকে যাও। চলেই
মস্ত বড় প্রকাণ্ড রাস্তায়--সে রাস্তাটা যেন তােমার
কাছে অলি গলির মত ছোট না হয়ে যায়। তুমি
সব জিনিষকে বড় করে দেখা হলে সেই বাড়ীর
সকলে সেইভাবে দেখবেন। এমন কথা বলাে না,
বা তােমার যােগ্য নয়, যাতে মানুষের মনে কষ্ট
যেতে পারে। এমন কাজ করে না, যার জন্য শেষে
অনুতাপ হতে পারে। নিজকে একা কত দিক
দিয়ে রক্ষা করবে। তা হলে ত তােমার সামর্থ্যে
কুলােবে না। তাই বলছি, তাকে ডাক, যিনি তােমায়

গায়ে হলুদ
সালিয়ে নেবেন; তােমায় তার রাজ পথে নিয়ে
যাবেন, পাপ-তাপ দূরে রেখে, তুমি ছােট্টটি হলেও,
তার অসীম দয়ায় তােমাকে হাত ধরে নিয়ে
যাবেন। তুমি তার স্নেহের দীপটি জেলে তা
দেখতে দেখতে লাল চেলীখানা পরে শুমনে
যাও, দেখছ না তােমার মাথায় তােমার মায়ের
আশীৰ্বাদী খান দুর্বা রয়েছে-ভয় কি?

পরিশিষ্ট
তুমি প্রথম শশুর বাড়ী চলে, তারা তােমার
ব্যবহার দেখে যেন বেশ খুশী হােলেন। তুমি
বালিকা বিদ্যালয়ে না হয় পড়ে এসেছ, প্রাইজ
পেয়েছ; মেডেল ও বইগুলি দেখে তারা তােমার খুব
প্রশংসা করলেন। তুমি হয়ত শেলাই এর কলে বেশ
শেলাইটি শিখে এসেছ, তােমার হাতের কাজ তাে
পাকা-দেখবার আগেই তারা দেখেছিলেন। কিন্তু তা
ছাড়াও ত কিছু চাই। তাদের একটু মিষ্টি মুখ করে
খুসী কতে পারলে তাদের যত আনন্দ হবে, তার
চাইতে তােমার ঢের বেশি আনন্দ হবে। বাজারে
সব জিনিষই পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু নূতন বউএর
হাতের তৈরী জিনিষের সঙ্গে কি বাজারে জিনিষের
তুলনা হয়? কিসে আর কিসে?
আমি আজ তােমায় কয়েকটি জিনিষ তৈরী
করূতে শিখিয়ে দিচ্ছি। আমার বাড়ী ছিল ঢাকার
জেলায়, সেইখানের লােকেরা যা তৈরী করুতে পারেন,
তেমন কয়েকটি জিনিষেব কথা এখানে বলব।
১২২

* গায়ে হলুদ *
“ঢাকাই অমৃতির কথা তােমরা শােন নি? সেইটি
দিয়ে শুরু করব। বেশী জিনিষের কথা বলে তােমার
মাথা আজ ঘুলিয়ে দেব না। নূতন রান্না শিখবে-
আবার কালীঝুল মেখে চাদমুখখানি স্নান করবে, কি
হয়ত চেলীর পাড়ে আগুণ লেগে উঠে কি সর্বনাশ
ঘটতে পারে, এইজন্য আজ সামান্য কয়েকটি পদ
তোমায শিখিয়ে দেব। তুমি খুব সাবধানে উনুনের
ধারে বসবে, আগুন থেকে একটু তফাৎ থাকবে
এবং শাড়ীর আঁচলের দিকে নজর রাখবে। আর
এমন সকল বউ আছেন—আমি দেখেছি, যাঁরা
রান্নাঘর থেকে ঠিক দুর্গাপ্রতিমার মত বার হন,
রং যেন আরও ফুটে উঠে, কাপডে একটি কালীর
রেখ নেই। তুমি যে কাজ করূবে তা পরিস্কার
পরিচ্ছন্ন হয়ে করবে। রান্না ঘরে খাবার জিনিষ
থাকে, সুতরাং সেখানটা যতটা পার পরিষ্কার রাখবে
সকল জিনিষ যাতে ঢাকা থাকে-বেড়ালে মুখ না
দিতে পারে, পােকা, ধূলো কি আর কিছু না পড়তে
পারে-সেই দিকে লক্ষ্য রাখবে।
১২৩

গায়ে হলুদ
“ঢাকাই অম্বতি
একসের কলাই দাইন তিন সের জলে ভিজিয়ে
রাখ। সন্ধ্যায় ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে
দাইল ধুয়ে জলটা ফেলে দাও। একসের দাইল
ভিজে গিয়ে দেড় সেরে দাড়াবে। তার পর
শিলের উপর সেই দাইল খুব ভাল করে বেটে
কেল। সেই বাটা দাইল ফেনিয়ে মাখনের মত
কব, এবং একপােয়া এরাটের সঙ্গে মিশিয়ে ফেল।
এই মেশানাে জিনিষটার আধপাে আন্দাজ
একটা সা ন্যাকড়ার ভেতর পুরে নীচের দিকে
একটা ফুটো কর।
এদিকে একখানি তাওয়ায় বা কড়ায়ে পচপে
ঘি রেখে উনুনের উপর জ্বাল দাও। ঘি গরম হােলে
অর্থাৎ যখন তা থেকে ধোঁয়া উঠতে থাকবে, তখন
সেই এরারুট মেশানাে দাইল শুদ্ধ ন্যাকড়ার পুটলীটা
তার উপরে শক্ত করে ধরে আস্তে আস্তে টিপতে
থাক। তা হলে সেই ফুটো দিয়ে জিনিষটা ঘিয়ের
ওপর পড়তে থাকবে। প্রথমত একটা গােলাকার
২৪

* গায়ে হলুদ
রেখার মত করে ফেল। তারপর সেই রেখাটার
উপর বাঁ দিক হতে ডান দিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
জিনিষটা ফেলতে থাক। জিলিপির গােলরেখা ও
তার উপর প্যাচের মতন যেটা হয় তা তােমরা
সকলেই দেখেছ। আমি যে ভাবে লিখুলুম, সেই
ভাবে ঐ জিনিষটা তৈরী হবে।
অবশ্য স্যাডার পুটলীটার ভেতরকার জিনিষ
ফুকলে আবার আধপাে আন্দাজ তাতে দিয়ে নেবে।
একখানি তাওয়ায় একবারে মধ্যম সাইজের
৫১৬ খানি তৈরী হবে। এক পিঠ ভাজা হলে
একটা বাঁশের কাটি দিয়ে উল্টিয়ে দিতে হবে।
যখন তাওয়ার ঘিয়ের উপর প্রথম ছাড়বে, তখন
জিনিষটার রংটি থাকবে সাদা, তারপর সামান্য লালচে
রং হােলেই ভাজা শেষ হল বুঝতে হবে।
ঐ পরিমাণ জিনিষের অ—অর্থাৎ একসের
মুগ দাইল, একপে এরারুট ও পাঁচপাে ঘিয়ের
বরাদ্দে ৩২ সের সাফ চিনির দরকার, তা দিয়ে
রস প্রস্তুত করুবে।
১২৫

গায়ে হলুদ সের রস প্রস্তুত করার নিয়ম—সাড়ে তিন চিনিতে একসের জল দিয়ে উনুনের উপর জ্বাল দিতে থাকবে। আর একটা পাত্রে দুইসের জল ও আধপাে দুধ মিশিয়ে রাখবে। উনুনের উপর চিনি উথুলে উঠলে—অপর পাত্র হােতে দুধের জল এক এক বারে অল্প- পরিমাণে তাতে দিতে হবে। অ হলে রসের ওপর গাদ অবে—বাজরা দিয়ে সেই গাদ তুলে ফেলতে হবে। ক্রমাগত কয়েক বার, অর্থাৎ যে পৰ্যন্ত সেই দুইদের দুধের জল নিঃশেষ না হয়, এবং চিনির রস খুব পরিষ্কার না হয়—সে পৰ্যন্ত সেই দুধের জল দিয়ে দিয়ে ঝাঁজরায় কোরে গাদ তুলে ফেলতে হবে। যখন আঙ্গুলে কোরে দেখবে যে রস একটু আঠা আঠা হয়েছে—তখন বুঝবে রস ঠিক হয়েছে। এখন সেই অমৃতি বাঁশের কাঠিটিতে কোরে তুলে নিয়ে চিনির রসে ফেল। কিছুকাল রসে রাখলে অম্বতি বেশ, নরম হবে—তখন ঝরায় ১২৬

* পরিশিষ্ট *
কোরে তা তুলে রাখ ! পূর্বোক্ত পরিমাণে
জিনিষে মধ্যমাকৃতি ৪০/৪৫ খানি ভাল অমৃতি
তৈরী হবে।
বাজারে অমৃতি যে ভাবে প্রস্তুত হয়, তার
চাইতে এতে দাম একটু বেশী পড়বে—তার কারণ
হচ্ছে, বাজারে ঘি ভাল দেয় না এবং সেই
খারাপ ঘিয়ের সঙ্গে বাদামের তেল প্রভৃতি নানারূপ
ভেল চালিয়ে থাকে।
ক্ষীর শােহন
একসের ভাল ছানার সঙ্গে একপােয়া ভাল
ডেলা কীর (মেওয়া) একখানি কাঠের বারকোসের
উপর রেখে
খুব ভাল করে ডলে ফেল।
তার সঙ্গে একছটাক সুজি মেসাও এবং ফের
ডল। এই জিনিষটা তৈরী হলে তা দিয়ে এক
এক ছটাক পরিমাণ গুলি প্রস্তুত কর। তার পর
শুধু মীর ও ঘি মিশিয়ে ছােট ছােট লার
১২৭

* গায়ে হলুদ
কতকগুলি গুলি প্রস্তুত কর এবং সেগুলির এক
একটি আগের তৈরী একছটাক ওজনের বড় গুলির
এক একটির ভেতর পুরে ফেল।
চার সের চিনির রস পূর্বোক্ত ভাবে (অর্থাৎ
অতি তৈরী করার জন্য যেরূপ বলা হয়েছে
সেই ভাবে) প্রস্তুত কর। কিন্তু এই রস
খুব পাতলা হবে। ৪ সের চিনিতে ৪ সের আল
দিয়ে উনুনের উপর জ্বাল দিয়ে এই রস তৈরী
কতে হবে। পূর্বে যে ভাবে বলা হয়েছে সেই
ভাবে এবারও গাদ কাটতে হবে।
এই ভাবে প্রস্তুত হলে রস দুইভাগে পৃথক
করে ফেল।
তার দশ আনি একটা কড়াতে
ভিন্ন করে রেখে দাও। আর ছয় আনি উনুনের
উপর থাকুক।
পূর্বে যে গােল্লা তৈরী হয়েছে অর্থাৎ বড়
এক ছটাক ওজনের গুলির মধ্যে পােরা ঘােট ঘােট
গুলি )—সেই গুলির ৭৮ টি কোরে এক একবারে
উনুনের উপয় রসের মধ্যে ফেতে হবে।
১২৮

* পরিশিষ্ট ৬
এখন
ফেল্লে উথলে উঠে
গােল্লাগুলি ডুবে যাবে। ৩৪
মিনিট পরে একটু এল সেই রসের উপর ছিটিয়ে
দাও। তাতে রসের ফেনা কেটে যাবে।
গােল্লাগুলির উপর যখন ফুটোর মত ছােট ছােট দাগ
হবে—তখন বুঝবে সেগুলির পাক শেষ হয়ে
গেছে, তখন উসুনের উপকার গরম রস হতে
নাবিয়ে নীচেকার পাত্রের অপর-ভাগ বসে সেগুলি
ফেল্লে তা ক্ষীর-মােহন হবে।
পরেটা
যে মাল মলার ফর্দ দেওয়া যাচ্ছে, তাতে
১০ খানি ঢাকাই পরেটা তৈরী হবে।
মিহি ময়দা-আধসের।
আধ ছটাক ঘি দিয়ে সেই আধসের ময়দা
মেখে নিতে হবে।
ভাল করে সেই ঘিয়ের ময়ান হলে ফের
জল দিয়ে ভাল করে মাখতে হবে। মাখা শেষ

* গায়ে হলুদ *
কাট।
হলে সেই ময়দায় দশটা ডেলি তৈরী করবে।
এক একটা ডেলি চাকির ওপর ভাল করে
বেলুতে থাক। একবার বেলা হলে তারপর
ঘিয়ের হাত বুলিয়ে দাও। তারপর সেই গােলাকৃতি
জিনিষটার ঠিক মাঝখান হােতে একধার পর্যন্ত
সােজ। করে
এবং ঐ কাটা অংশটা।
ধােরে ক্রমে গুটুতে থাক। গুটুনাে শেষ হ'লে
দেখবে যে ঐ জিনিষটা একটা বড় পানের খিলি
বা মােচার আগার মত দেখাবে। সেই জিনিষটার
মাথায় আঙ্গুল টিপে চেপ্টা করে বসিয়ে দাও।
এই অবস্থায় উহা পুনরায় একটা ডেলির মত
হবে—তার ভেতর অনেক ভক্ত থাকবে। এই
ডেলিটাকে পুনরায় বেলে পুৰু লুচির মত কর।
এক খানা বড চাটুতে এক ছটাক ঘি জ্বাল
দাও। ঘি এলেকাচা লুচির আকৃতি জিনিষটা
আস্তে আস্তে ঘিএর মাঝে ফেল। তারপর
উহা খুন্তি দিয়ে উল্টিয়ে দাও। এই জিনিষের
কোন জায়গায় ফুলে না ওঠে, সেই দিকে লক্ষ্য

* পরিশিষ্ট *
রাখতে হবে, এবং তজ্জন্য চাপা দেওয়া যায়
এমন একটা কিছু দিয়ে চেপে চেপে দাও।
বিলের সূতাের যে কাঠটা থাকে সেই রকম
একটা কিছু দিয়ে ঘুরিয়ে চাপ দিতে হবে।
জিনিষের রং একটু লালচে হােলে নাবিয়ে নিয়ে
তাকে অনায়াসে পরেটা বলে পরিবেশন করতে
পারবে।
জা”
মাল-মসলা ২০ খানি গঙ্গার মত।
আধসের ময়দা আধ ছটাক ঘি দিয়ে বেশ
করে ভ’লে নিতে
তারপর আবার
জল দিয়ে নেবে, ঠিক পরেটার সময় যেরূপ
করেই।
এই মাখা ময়দাটায় ২০টি ডেলি তৈরী কর।
তারপর চাকির উপর রেখে বেলনা দিয়ে জিভের
আকৃতি কর। এক একটা জিতেতে সমান

* গায়ে হলুদ *
ব্যবধানে তিনটে ফুট কর। আধসের বি
কড়াতে করে জ্বাল দাও। ঘি এলে ঐ জিভ
৩৪ টা করে ফেল।
পাঁচপাে চিনির সঙ্গে একসের জল মিশিয়ে
জান দাও। রস খুব গাঢ় কর। হাত দিয়ে
ঘুটলে রসটা অনেকটা গাঢ় হবে।
এই রসের
ভিতর, আগে যে জিভ তৈরী করেছ, সেগুলি
ছেড়ে দাও। ছেড়ে দিয়ে চলে যেও না, অমনই
উঠিয়ে নাও। ঠাণ্ডা হলে খেতে দিও, নইলে
‘জিতে গজা খেয়ে জিভ পুড়বে।

রামায়ণী কথা
রায় বাহাদুর দীনেশ চন্দ্র সেন ডি, লিটু প্রণীত
রামায়ণের দশরথ, রাম, লক্ষণ, ভরত, শক্রয়, সীতা
প্রভৃতির চরিত্র সমালােচনা। আমাদের দেশে যে গার্হস্থ্য
আশ্রমের অত্যন্ত উচ্চস্থান ছিল, রামায়ণ তাহাই প্রমাণ
করিতেছে। গৃহাম আমাদের নিজের সুখের জন্য সুবিধার
জন্য ছিল না—গৃহাশ্রম সমস্ত সমাজকে ধারণ করিয়া রাখিত
ও মানুষকে যথার্থ মানুষ করিয়া দিত। রামায়ণ সেই
গৃহামের গ্রন্থ।
কবি রবীন্দ্রনাথ বলেন “কবিকথাকে ভক্তের ভাষায়
আবৃত্তি করিয়া দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় আপন ভক্তির
চরিতার্থতা সাধন করিয়াছেন। এইরূপ পূজাৰ আবেগ মিশ্রিত
ব্যাখ্যাই আমার মতে প্রকৃত সমালােচনা—এই উপায়েই
এক হৃদয়ের ভক্তি আর এক হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। যথার্থ
সমালােচনা পূজা-সমালােচক পূজারি পুরোহিত—তিনি
নিজের অথবা সর্বসাধারণের ভক্তিৰিগলিত বিশ্বয়কে ব্যক্ত
করে মাত্র। ভক্ত দীনেশচন্দ্র সেই পূজা মন্দিৱেৱ প্রাণে
দাড়াইয়া আরতি আরম্ভ করিয়াছেন।
মূল্য ১• দেড় টাকা মাত্র
ভট্টাচাৰ্য এও সন, ৬৫ নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা

গ্রন্থকার-সম্পাদিত
সচিত্র
১। কৃত্তিবাসী রামায়ণ
পঞ্চম সংস্করণ মূল্য ৪ চারি টাকা।
২। কাশীদাসী মহাভারত
ষষ্ঠ সংস্করণ মূল্য ৬ ছয় টাকা।
উভয় পুস্তকই বহু চিত্রে পরিশােভিত। উৎকৃষ্ট এন্টিক
কাগজে বড় বড় অক্ষরে ছাপা। পুস্তক দুইখানি ৰঙ্গ
প্রেসিডেন্সীর ডিরেক্টর বাহাদুর কর্তৃক লাইব্রেরী ও
প্রাইজের জন্য অনুমােদিত।
৩। কৃষ্ণকমল গ্রন্থাবলী
মূল্য দুই টাকা।
২১
ভট্টাচাৰ্য এ সন
৬নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Gaye Holud

Author
Sen,dinesh Chandra
Title
Gaye Holud
File name
Gaye Holud
Text
OCR done
Citation
1920
Published
2010/04/30
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
156
Library
Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Sen,Dinesh Chandra
DLI number
514701
Barcode
4990010016765.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
kEFC3V2tHrm
Download PDF

Gaye Holud