Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Mantrashakti Ed.7
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মন্ত্রশক্তি অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
No text on this page.
মন্ত্রশক্তি
সূধা স্মৃতি লাইব্রেরী
১৩৫৭ সাল।
বেলগাড়িয়া - বসিরহাট।
৪ ন :
শ্ৰীমতী অনুরূপা দেবী প্রণীত
উপন্যাস হইতে
অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় কর্তৃক
নাটকাকারে রূপান্তরিত
আর্ট থিয়েটার কর্তৃক ষ্টার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত
অধম অভিনয় রজনীশনিবার ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৩৩৬
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০১১, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রাবণ, ১৩৪৫
সখ সংরণ নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ পুরুষগণ রমাবল্লভ রাজনগরের জমীদার মৃগাঙ্কমােহন নাট্য যুবক (রমাবল্লভের সম্পর্কীয় ভাগিনেয় ) আদ্যনাথ, অম্বরনাথ, সুধাকর, চাদমােহন, নবীন, হলধর টোলের ছাত্রগণ বিশ্বম্ভর ••• कौन কপরাম রমাবল্লভের দেওয়ান রমণীমােহন যামিনীমােহন সজনীমােহন ••• পল্লীষুবকগণ পরাণ মণ্ডল ••• জেলে মহেশ মণ্ডল চাষ রামশরণ জ্যোতিষী জগতিমােহন ডাক্তার মথুর মৃগাঙ্কমােহনের ভৃত্য ইয়ারগণ, ভৃত্য, আবােহিগণ, কুলিগণ, ডাক্তার ইত্যাদি
खौ
০ ০ ০
রমাবল্লভের পত্নী
কৃষ্ণুপ্রিয়া
বাণী
তুলসী
•••
ঐ কন্যা
ঐ প্রতিবেশিনী
...
মৃগাঙ্কের স্ত্রী
বাঈজী
•••
কেলাের মা
মপুরে পত্নী
দাসী ও প্রতিবেশিনীগণ
মন্ত্রশক্তি প্রথম অঙ্ক প্রথম দুখ রাজনগর-টোলের প্রাঙ্গণ সম্প্রতি এই টোলের বৃদ্ধ আচার্য জগন্নাথ তর্কচূড়ামণি লাভ করিয়াছেন। এই টোলের একজন নবাগত ছাত্র, গ্রামের জমিদারবাবুদের উইল অনুসারে এবং চূড়ামণি মহাশয়ের শেষ সম্মতিক্রমে, তাঁহার গৌরবান্বিত পদে নিযুক্ত হইয়াছে। এই নিলগ টালের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই মনােনীত হয় নাই ; তাহারা ইহাতে বরং একবার বদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে এবং ইহার এতিবিধানের জন্য জল্পনা করিতেছে। আদ্যনাথ, নবীন, চাকমােহন, সুধাকর, হলধর প্রভৃতি ছাত্রগণ আদ্য। মতিভ্রম—মৃত্যুকালে আচার্যের মতিভ্রম হয়েছিল; শান্ত নির্দিষ্ট কথা-বুঝেছ নবীন? মৃত্যুর ছ'মাস পূর্বে মানুষের বুদ্ধিভ্রংশ হয় এ ক্ষেত্রেও তাই। নীবন। হ, হতি পারে সৈম্ভব । আস্থ। নইলে এমন অজ্ঞানের মত কাজ জগন্নাথ তর্কচূড়ামণি করেন?
মন্ত্রশক্তি প্রথম অঙ্ক ? একটা অশ্রাচীন- যাকে বসুয়ে ব্রাহ্মণ বল্লেও বেশী বলা হয় না, ভাতের ফেন গেলে গেলে যার হাতের তিনপুরু ছাল উঠে গেছে, সেই হ’ল কিনা টোলের আচাৰ্য, ঠাকুর বাড়ীর পুরােহিত! অম্বর- অম্বা—অম্বে! আচ্ছা, আমিও আদ্যনাথ চক্রবর্তী, শুদ্ধশ্রোত্রীয়, আমিও দেখিয়ে দেব কত ধানে কত চাল। চাঁদ। আমার তাে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। কি অন্যায় দেখ দেখি। ঐএকফোটা ছেলে—ওর কাছে গিয়ে পাঠ নিতে হবে ? হল। এই এতবড় গোঁফ নিয়ে ? ছি ছি ছিঃ-গলায় দড়ি, আমাদের গলায় দড়ি। চাদ। মনে করেছিলেন এবার স্মৃতির পরীক্ষাটা দেব, তা দেখছি ইতি করতে হল। আদ্য। আরে অধ্যাপনার কথা ছেড়ে দাও, ও যে ঠাকুর বাড়ীর পূজারী হ’ল ও পূজাপদ্ধতির জানেই বা কি, শিখলেই বা কোথায় ? মুখস্য মূর্খ, নাস্তিক, ভণ্ড, অপােগণ্ড, গলা টিপলে দুধ বেরােয় ! নবীন। তাও গাব-দুগ্ধ নয়, বারায় মাতৃদুগ্ধ ! বােঝ ছনি চাংমােহন? ( বলিয়া চঁাদমােহনকে কনুয়ের গুতা দিল) হ হ । আর এও বুঝতে পারিনি দাদা, আপনি থাকতে আচাৰ্য্য ওরই বা এত বশীভূত হলেন কি করে? ও আর ক’দিন এ টোলে এসেছে ? বড় জোর মাস আষ্টেক। আপনার তো হ’ল প্রায় দ। আট বছর! হল। অার-আমার, এগার বছর। চাদ। আমাদের কথা না হয় ছেড়ে দিন। এও একটা প্রহেলিকা। নবীন। যাদু! বােঝছনি? যাদু! পাচীর মা’র খেল দেহায়ে দেলে!
প্রথম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
আমরা তো ইস্তক ঠাওর করছিলামগুরুদেব হিঙ্গা ফোবন আর
আইদ্য-দা আমাগাের আইচাৰ্য্য না হয়। পঠন পাঠন করব, মন্দিরে
বৈশ্যা ঘন্টা বাইদ্য করব। তা অইল ঘণ্টা! ও কাঙালের পুত
বােঝছনি চাদমােহন—আমার ই অয়, কি ঔষধ কৈরা, জারি
খাওয়াইয়া, আইচার্যের দফা এহেবারে গয়া করছে !
আচাৰ্য নেই, ও মিটমিটে সয়তান সব পারে ! নাস্তিকের
অসাধ্য কি ? বলে, আত্মা পরমাত্মা অভেদ! জন্ম মৃত্যুও ওর কাছে
অভেদ ? সেদিন সুধাকরকে বেদান্তদর্শন নিয়ে কি বােঝাচ্ছিল,
ওকেই জিজ্ঞাসা কর। বলে, “সং-খনিং ব্রহ্ম”। কীটপতঙ্গও
ব্ৰহ্ম! শঙ্করাচাৰ্য্য হ’ল একজন প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ, হিন্দুশাস্ত্রানুসারে দেবদ্বেষী
অনাচারী সন্ন্যাসী—আর ও মূর্খ বল্লে কিনা “শঙ্করাে শঙ্করঃ সাক্ষাৎ!”
কি বলনা হে সুধাকর ?
হল। উন্মাদ-উন্মাদ
সুধা। না, তা ঠিক নয় ; তবে কিনা, বয়স অল্প হলেও অম্বরের পাণ্ডত্য
অসাধারণ, এ কথা স্বীকার করতেই হবে। শঙ্করের মায়াবাদ
তো প্রতিষ্ঠা করলে ! যুক্তিতর্কে তােমরা তাে কেউ আত্মার বহুত্ব
প্রমাণ করতে পারলে না !
আদ্য। যুক্তিতর্ক ! ওর সঙ্গে যুক্তিতর্ক করব আমি? আমি ঘৃণায়
কথাই কইলেম না। আমি কেবল বসে বসে শুনছিলাম আর
ভাবছিলাম যে, কালে কালে হ’ল কি? বল্লে শঙ্করের কথা আঞ্চ
বাক্য! বল্লে “সোহহং”! ছি ছি কি পাপ! ও এ টোলে থাকলে,
দেখছি দু’দিনে চতুষ্পঠী হবে মিশনারি ইস্কুল।
নবীন। আর সুধাকর ভায়া চৈক্ষু বুইজ্যা কব “আলােয় আসছি,
মন্ত্রশক্তি প্রথম দৃ অন্ধকার অইতে আলােয় আসচি!” না: হিন্দু হৈয়। এ কহনন সৈহ করা উচিত নয়। বােঝ ছনি চাদমােহন? সুধা। তাতো নয়, কিন্তু কি করবে ? আদ্য। কি করব তা দেখিয়ে দিচ্ছি। আমি তাের মত খোসামুদে নই, বুঝলি সুধাকর, যে পুথি খুলে ঐ ছোঁড়াটার কাছে বুঝতে যাব–“বুদ্ধিসিদ্ধন্তু তদসৎ-এর মীমাংসা কি? আমরা ভণ্ডের সংসবে থাকতে ঘৃণা বােধ করি। আমরা এখনি এই জমীদার বাড়ী চল্লেম, দেখি এর প্রতীকার হয় কি না। আঁ! আত্মা পরমাত্মা এক? এই কৃমিকীটতুল্য হেয় মানুষ আর সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভেদ নেই মহাভারত! মহাভারত! অশ্রাব্য । এ গর্বি ও প্রলাপ একেবারেই অশ্রাব্য। তুমি না যাও, থাক সুধাকর-আমরা সবাই চল্লেম জমীদার বাড়ীতে; এস হে, এস, পাপীর সঙ্গে থাকলে পাপ বৃদ্ধি হয়। হল। ঠিক বলেছ নবীন। সৈত্য—অবিমিশ্র দৈত্য! শিষ্য উন্মোচন কর, চাণক্যের ন্যায় শিখা উন্মোচন কর-মাইদ্য-দা! ও চ্যাংরারে না খ্যায়ে অায় শিথা বাইব না! আদ্য। চল, দেখি কি হয়। আমি সহজে ছাড়াইনি। আমি ওকে দেশছাড়া করবই—ওর টোল ভাঙ্গব- কও তাে ওর মাথাটা ভাইঙ্গে, দূর হ’তি আঁধারে, পাতিলের চারা না মাইরে—হঃ বােঝ,ছনি চাকমােহন? চাদ। চল দেখা যাক-দুর্গা। সুধাকর ব্যতীত সফলের এনি নবীন। দুর্গা!
প্রথম অঞ্চ
महमति
সুধা। গতিক দেখছি ভাল নয়। এরা যে রকম ক্ষেপেছে, একটা কাণ্ড
বাধাবৈ। অম্বরের কিন্তু এদিকে কিছুমাত্র লক্ষ্য নেই, নিজের
খেয়ালেই থাকে। এতবড় একটা পদ পেয়েছে এই অল্প বয়সে, কিন্তু
তাতে একটুও গর্ধিত নয়; বরং পূৰ্ব্বাপেক্ষা যেন আরও নরম,
আরও বিনয়ী হয়েছে। সেই পূর্বের ন্যায় নিজের হাতেই সব
করে; টোলের ছাত্রদের ভাত রাধা, তাদের সুবিধে অসুবিধে
দেখা, কাট-কাটা, জল-তােল। পর্যন্ত দরকার হলে—কাউকে কোন
হুকুম নয়; এমন মহৎ চরিত, অথচ দেখছি, টোলশুদ্ধ তার শত্রু।
কি আশ্চর্য
পরাণ জেলের বেশ
পরাণ। দা-ঠাকুর কৈ গাে! দা-ঠাকুর! (সুধাকরকে প্রণাম করিয়া)
দণ্ডবৎ গাে ঠাকুর, দণ্ডবৎ। একা পেঁড়িয়ে আছ ? আমাদের
দা-ঠাকুর কোথা? শােনলাম দা-ঠাকুর আমার নতুন পুৎ মশাই
হয়েছেন, তাই দণ্ডবৎ কতি আসলাম। আহ! দা-ঠাকুর তত
একটা দ্যাবত! এমন মনিষি পিথিমিতে আর জন্মায়নি!
কিরে পরাণ, আবার পােটলা বেঁধে কি এনেছিস? তােরাই
দেখছি আমাদের জাত মারবি।
পরাণ। হ্যা-কি কও ঠাকুর! তােমরা
তােমরা বেরাহ্মণ-গাত
-তােমাদের জাত মারব আমরা-জেলে মালা? তােমাদের জাতটা
কি এতই ঠুনকো গো ? দা-ঠাকুর নেই বুঝি ? তাহলি আয় এক
সময় আসপ । দণ্ডবৎ-চাম এখন।
সুখ না, আর যেতে হবে না—ঐ তাের দা-ঠাকুর আসছে।
মন্ত্রশক্তি প্রথম পৃ অধরনাথের প্রবেশ পরাণ। হ্যা, তাই তাে গাে, ভাগ্যি আমার! দণ্ডবৎ গো দা-ঠাকুর- গুৰৎ। অম্বর। কিরে পরাণ, ভাল তো? তাের ছেলেপিলে, আদুরী সব ভাল আছে তাে ? আর এতেও ভাল থাকবনা দা-ঠাকুর? আপনার ছিচরণ কেমপায় পেরণগতিক সব এক পোকার ভালই যাচ্ছেন। অম্বর। কি মনে করে রে এই সকালবেলা? পরাণ। আর কি মনে করে। (হাসিয়া) তুমি পুৎ মশাই হয়েছেন, এতে যে এই তােমার এই ছিচরণের দাস পরাণ মণ্ডলের পেরাণডার মষ্টি কি কাণ্ড কত্তি নেগেছে, তা মুখ নােক কি করে ব্যাখান করি। শহুরের মুখে ছাই দিয়ে তুমি হলে এখন বড় ভটচার্জি ! ওঃ ধন্ম আছে, ধম্ম আছে? তােমার ছাওয়ায় বাড়াবার যুগ্যি নয়-খালি তােমার হিংসে করে মরে—এইবার তাদের বুক ফাটুক! আর তো তােমায় কিছু বলতি পারবেনা।এই নাও দা-ঠাকুর, কড়া বেলাতী আমড়া নতুন গাছে হয়েলাে, মনে ভাবলাম, দ্যাবতার ছিচরণ দেখতি যাব—খালি হাতে যাব—তাই নিয়ে আলাম কাপড়ে বেদে! পেরথম ফলগেরণ করে ভক্তের মনােবাঞ্ছা পূনরাও। অষয়ে পদতলে কতকগুলি বিলাতী আমড়া রাখিয়া এনাম করিল কি বলব মাছ মাংস তাে খাওনা, নলি এমন দিনি আর বড় বড় গল্প। চিংড়ে এনে ছিচরণে নিবেদন করতাম। অম্বর। নাঃ•••তােকে দেখছি আমি আর কিছুতেই শােধরাতে পা
প্রথম দৃ
মন্ত্রশক্তি
বাপু। না পরাণ, আর তুই আমায় কিছু দিনি। একদিন
তাের এ চড় নিয়ে কি বিভ্রাট তা তো তােক সবই বলিছি। সেদিন
টোলশুদ্ধ কারুর খাওয়া হয়নি—গুরুদেবেরও নয়। সেদিন গুরুর
নিকটে স্বীকার করেছি, শূদ্রের কাছ থেকে কোন খাবার জিনিস
নেব না। তুই কিছু মনে করিসনি বাপু। গুরুর কাছে কপা
দিইছি, এ জমে তা ভাঙ্গতে পারব না।
পরাণ। (দুঃখিত হইয়া) আমি আর কি মনে করব না-ঠাকুর?
আমরা হলাম বােকাসােক। মুরুগু মানুষ। তােমাদের যাতে ধন্মে
দাগ পড়ে, তাকি তােমরা আমাদের জন্যি করতি পার ? তােমায়
আর কি বলব দা-ঠাকুর, তুমি য্যামন ম্যাদামারা ভালমানুষ, তাই
তোমায়-নাকাল করে মারে। “শব্দ
রের দান!” কি আর
শদ্দর নইলি ধান রােয় কারা ? ফসল জন্মায় কোন্
ভচয্যি মশার বাড়ীতি ? শদ্দ র নইলি অরনােক মশাদের
যে নিজের হাতে কোদাল মাতি হত-দ্দর থাকত কোন
'থান্ডায় ?
অম্বর। তাের হাতে ধরছি পরাণ, তুই কিছু মনে করিসনি। তােকে
কি আর বলব—আমি-আমি-পরাণ, আমি নিতান্ত নিরুপায়-
তাের ধান এই আমি মাথায় রাখলুম—আমি এ নিইছি—এ আমার
নেওয়া হয়েছে।
এখন এ আমার আশীৰ্বাদ-তােকে আমি
আমার আশীর্বাদ দিচ্ছি—এগুলি তুই নিয়ে যা, তাের ছেলে
মেয়েদের দিস, তাহলেই আমার খাওয়া হবে। যা, পরা, যা
দুঃখ করিসনি, অভিমান করিসনি।
পণ। দাও, পায়ের খুলে দাও; ফিরিয়ে নিয়েই চল্লাম। তুমি আমার
বলব ?
মন্ত্রশক্তি
প্রথম অঞ্চ
স্তবতা তােমার কথায় কি রাগ অভিমান করতে পারি ? তোমার
আশীর্বাদেই যে পেরাণগতিকে বেঁচে আছি দা-ঠাকুর।
চক্ষু মুছিতে মুছিতে প্রস্থানােত
( ফিরিয়া ) তবে যাবার সময় একটা কথা তােমায় বলে যাই মনে
রেখ। তুমি ভচাষির জায়গা পেয়েছ বলে আদ্যি ঠাকুর বড়
রেগেছেন। ঐ যাতি-যাতি আর সব ঠাকুরদের বলছিল, ‘দেখি কত
বড় সাগ্নি যে আমার হকের ধন কেড়ে খায় ? ওরে থানছাড়া
মানছাড়া করব তবে আমার নাম আদ্যিনাথ! আমাদের এসব
কথায় কাজ কি ঠাকুর, আদার ব্যাপারী—জাহাজের ওপর নিয়ে কি
করব ? তবে কথাটা কানে শােনলাম, তাই তােমায় জানিয়ে
গেলাম। হুদ চো রেখেও সর্বনেশে নােক—সব করতি পারে।
সুধা। অম্বর, এ কুসংস্কারের কি কোন প্রতিবিধান নেই?
অম্বর। কি জানি, জানিনা। সবই জগদীশ্বরের ইচ্ছা! আমি স্বপ্নেও
ভাবিনি যে আচাৰ্য্য আমায় এমন বিপদগ্রস্ত করবেন। আমায়
মন্দিরের পূজারী করে গেলেন, চতুষ্পাঠীর অধ্যাপক করে গেলেন।
কিন্তু আমি পূজার কি জানি, অধ্যাপনার কি জানি? এ সব ভার
আদ্যনাথকে দিলেই ভাল হত।
ধা। বল কি, তােমারও ঐ মত ?
অম্বর। তােমায় সত্য কথা বলছি সুধাকর, আমারও আন্তরিক মত
এই। আমার এ দোকানদারির ঠাট ভাল লাগে না। তােমায় বল
কি ভাই, এ ক'দিন রাত্রে আমার নি নেই, আহারে আমার কচি
পাতা মােড়া ও হস্তান্তর নিষেধ।
এখন দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
নেই। নিত্য ইন্দ্রপুরী তুল্য দেব মন্দিরে পূজা করতে যাই, আর
হীরে-মাণিকে মােড়া ভগবানের রাজরাজেশ্বর মূর্তি দেখে মনে
পড়ে ঐ পরাণ মণ্ডলের মত দীনদুঃখী ক্ষুধাকাতর সব দরিদ্রের কথা।
একদিকে পূজার নামে বিলাস বৈভবের আড়ম্বর আর একদিকে
দারিদ্র্য রাক্ষসীর মানুষের হৃদয়-শােণিত শােষণ। ভগবান কোথায়
ঐ বিরল রাজপ্রাসাদে, না ঐ অগণিত গরীবের ভগ্ন কুটীরে ? কোথায়
জগতের নাথ। যারা দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায়না, তাদের
হৃদয় মধ্যে, না যারা রাজসিক পূজার মােহে বিহ্বল, তাদের অন্তরে ?
দেবতা কি মন্দিরের ? বিশ্বেশ্বর কি তিনি নন? প্রতিক্ষণেই মনে
হয় এ পূজার ভার আমার না পেলেই ভাল হত।
সুধা। তবে সব কথা খুলে বলি ভাই। এই পরাণ মণ্ডল যা বলে গেল
সব ঠিক। তুমি আসবার একটু আগে ওরা সব এই পরামর্শ-ই
কচ্ছিল। সব গেছে জমীদার বাড়ী তােমার নামে নালিশ করতে।
তােমার কাছে এরা কেউ পাঠ নেবে না, তােমার টোল ভাঙ্গবে,
নবীন তাে তােমার মাথা ভাঙ্গতেই চায়। ওরা অনেক কথাই রচনা
করে তােমাকে তাড়াবার ফিকিরে আছে, সেটা দেখছ না ?
অম্বর। ক্ষতি কি সুধাকর ? আমি স্বেচ্ছায় এ পদ ছেড়ে দেব।
?
ম
আমি গরীবের ছেলে, আমার
এ প্রতিষ্ঠায় কি হবে? এতে কেবল অহঙ্কার বাড়ে। এ
লেখক এরা সব জমীর
বাড়ী গেছে, ভালই হয়েছে। আমিও সেখানে চমে। আমি
নিয়েই আজ এ কাজে ইস্তফা দিয়ে চলে যাব। এরা যদি ইতিমধ্যে
মন্ত্রশক্তি
প্রথম ।
ফিরে আসে, তাদের বােলল তাদের উপর আমার হিংসা নাই ;
অতি-প্রতিষ্ঠাৱ-২াকতে চাই। আমি চল্লেম,
ফিরে এসে রান্না চড়াব, তুমি ভাই সব গুছিয়ে রেখ।
এমন মানুষেরও শক্ত হয় । কলিকাল একেই বলে আর কি!
এখন
দ্বিতীয় দৃশ্য
রাজনগর জমীদার বাড়ীর সংলগ্ন রাধাবল্লভজীর মন্দির
রমাবল্লভ, উকীল বিশ্বশুর, জ্যোতিষী রামশরণ
জ্যোতিষীর হস্তে বাণীর কোষ্ঠী, উকীলবাবুর হাতে উইল
রমা। ( জ্যোতিষীর প্রতি) কি দেখলেন ?
আমি যা দেখেছি তাই
ঠিক নয় ?
রাম। দেখুন হিসেবের গরু বাঘে খায় না ; এ কুষ্ঠ তাে আমারই
হাতে তৈরী—আপনিও যা দেখেছেন, আমি তাই দেখছি।
আজ ফান মাসের পনেরােই, আর পনেরাে দিন উত্তীর্ণ হলেই
আপনার কন্যা সতেরাে বর্ষে প্রবেশ করবেন।
রমা। হু। উকীলবাবু, শুনছেন?
বিশ্বম্ভর। হাঁ, শুনছি, আমিও দাগ দিয়ে রাখছি।
লাল পেন্সিল দিয়া উইলে দাগ দিলেন
রাম। (কাগজে গ্রহচক্র আঁকিয়া) না-তারিখ গণনার ভুল নাই;
তবে আপনার কন্যার বিবাহ-যােগ আগত প্রায় ১ কোষ্ঠির -
গণনায়-দেখুন, ষােল বৎসর পূর্বে আমি নির্দেশ করেছি।
রমা। কি সেইটাই তো আপনার ভুল হচ্ছে। বিবাহের কোন
স্থিরতাই তো নেই। পিতৃদেব আজ কয়েকবৎসর গত হয়েছেন, সেই
থেকে ক্রমাগত চেষ্টা করছি; কিন্তু কুলীনের ঘরে সৎপাত্র তে
পর্যন্ত আমি একটারও সন্ধান করতে পারলে না। আপনি
মত্রশক্তি
প্রথম অঞ্চ
বলছেন এই মাসেই বিবাহ হবে—যা ছ’বছরে পারিনি—এই
পনেরাে দিনেই হবে—এ অসম্ভব।
রাম। দেখুন, গুরু জানি বলুন। তবে
*ং চার্কে যুক্ত সাক্ষণে। এই ফাগুনে বৃহস্পতি
প্রবেশ করলেন কন্যার লগে, সপ্তমস্থানে তার পূর্ণ দৃষ্টি ; সপ্তম
বিচার-অনা গ্রহের ব্যঞ্জনায় এ তো স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়--
| কন্যার বিবাহ-যােগ যে উপস্থিত, তাতে সন্দেহে এব নাস্তি।
রম। তা হলেই তাে বঁচি, আমি তো কোনাে কূল-কিনারা দেখতে
পাচ্ছি না। আচ্ছা, তবে আপনি এখন আসুন, আমি উকীলবাবুর
সঙ্গে কথা কইব।
দুইটি টাকা জ্যোতিষীকে দিলেন
রাম। আপনার ন্যায় দাতার অনুগ্রহেই আমরা সংসারযাত্রা নির্বাহ
করে থাকি। আপনার জয়জয়কার হক! আপনি চিন্তা করবেন
না ! যােল বৎসর পূর্বে গণনা করেছিলেম, আজও গণনা করে
গেলেম। বিবাহের রাত্রে আসব—গরদের
রাত্রে আসব-গরদের জোড়, বৃহদাকার
পিতলের কলসী-হাঃহাঃ!
বিশ্ব। কন্যার বিবাহের যােগ থাক আর না থাক, আপনার কিছু অর্থ
লাভ যােগ ছি দেখছি, কি বলেন জ্যোতিষী ঠাকুর?
রমা। হাঃ হাঃ আপনারা ইংরাজী শিক্ষিত লােক, এইরূপ বিদ্রুপই
করে থাকেন। আপনাদের কল্যাণ হক।
शाम
রমা। উকীলবাবু, তাহলে এখন উপায়?
বিখ। যদি অন্য পাত্রের সন্ধান না থাকে, এই উইল অনুসারে পনেরো
পাতা মোড়া ও হত্যা নিষেধ। দ্বিতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি দিনের মধ্যে রাধারাণীর বিবাহ না হলে আপনার পৈতৃক সমস্ত ইটে উইলের এই মৃগাঙ্ক মােহনকে অর্শাবে। রমা। দেখুন দেখি ; বাবা কি সর্বনাশই করে গেছেন। বাণীর যখন ন’ বছর বয়েস, এই মৃগাঙ্কের সঙ্গেই তিনি তার বিবাহের স্থির করেন। তখন প্রতিবাদী হই আমি। সেই রাগে এই উইলের সৃষ্টি। জৰুৰr: বিশ্ব। এই উইল যখন কৰ্তা করেন, আমি তাকে নিষেধ করেছিলেম কিন্তু তিনি আমার কথাও শােনেন নি। তিনি হয় তাে বুঝেছিলেন যে আপনাদের স্বঘরের পাত্র সহজে মিলবে না, কাজেই বিষয় হাতছাড়া হবার ভয়ে আপনারা শেষে এই মৃগাঙ্কের সঙ্গেই কার বিবাহ দেবেন। ১: রমা। ঠিক তাই ; আমাদের জ করবার জন্যেই এই উইলের সৃষ্ট। এখন দেখছি তারই জেদ বজায় রইল। বকাটে বলে তখন যাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেম, আজ সর্বস্বান্ত হবার ভয়ে, তারই হাট ধরে কন্যা সম্প্রদান করতে হবে। উইলের আর একটা clause আছে না? সমান ঘরে না দিলেও আমি বিষয়চ্যুত হব। বিশ্ব। হাঁ; অবরে না দিলেও বিষয়চ্যুত হবেন, কন্যার বিবাহ না দিলেও বিষয়চ্যুত হবেন—উভয় ক্ষেত্রেই বিষয় অর্শাবে ঐ মৃগাঙ্ককে। রম। যদি গরীবের ঘরে, ভিখারীর ঘরেও, একটা সমান কুলমৰ্য্যাদা- সম্পন্ন বিদ্বান্ সচ্চরিত্র পাত্র পেতেম! দেওয়ান রুপমের প্রবেশ রূপ। টোলের ছাত্রেরা তে বই বিরক্ত করছেন একবার অাপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। তারা বলে আপনি যদি তাকে আরীন শােনেন, তাহলে তারা আজই টোল ছেড়ে চলে যাবে।
১৪ মন্ত্রশক্তি প্রথম অঙ্ক রমা। তাদেরও নালিশ তো তােমার মারফত আজ দু’দিন থেকে শুনছি। এই বিপদের সময় ভট্টচায্যিমশাই দেহ রাখলেন, ঠাকুর বাড়ী আর টোল নিয়ে মহা বিশৃঙ্খলা আরম্ভ হল। আচ্ছা, তাদের ডেকে দাও, তাদের বুঝিয়ে বলি, দু'দিন একটু নিরস্ত হক। রূপ। যে আজ্ঞে। এস্থান বিশ্ব। টোলের ছেলেরা আবার কি বলে ? রমা। আর বলেন কেন মশাই ? এক বার উইল নিয়ে নানাদিকে বিভ্রাট! বিগহের পূজা এবং টোলের ব্যবস্থা-এর উপর আমার কোন হাত নেই। বিশ্ব। হাঁ, উইলের সে clause তো সেদিন দেখা হল, যে দিন- জগন্নাথ তর্কচূড়ামণি মৃত্যুশয্যায়। পুরােহিত নির্বাচনের ভার তার ; টোলের অধ্যাপক নির্বাচনের ভার? তার। তাই নির্বাচনেই তো তারই শিস্য অম্বনাথ, না- রমা। ই, সেই নির্বাচন নিয়েও গােল ; টোলের ছাত্রের নির্বাচনে সন্তুষ্ট নয়। আদ্যনাথ এভৃতি ছাত্রগণের প্রবেশ এস, তােমাদের কথা দেওয়ানজীর মুখে সব শুনিছি। যিনি নতুন পুরােহিত তিনি যদি এতই অযােগ্য, তাহলে তােমাদের আচাৰ্য একেই বা মনােনীত করলেন কেন? আদ্য। আসন্নকালে তার বিপরীত বুদ্ধি ভিন্ন আর কি বলব বলুন? বিশ্ব। আপনাদের গুরুভক্তি তো খুব ! তার নির্বাচন আপনাদের
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
মনােমত হয়নি বলে অনায়াসে বল্লেন যে, আসন্নকালে তার
বিপরীত বুদ্ধি হয়েছিল?
আদ্য। আর মশাই, শাস্ত্রেই আছে মৃত্যুর ছয়মাস পূর্বে মানুষের
মতিভ্রম হয়। আচাৰ্য হলেও তিনি তাে মানুষ, আর শায়াক্যও
তো কখনাে মিথ্যা হতে পারে না।
বিশ্ব। আপনাদের শাস্ত্রে যে কি নেই তা তো বলতে পারিনি। শাস্ত্রেই
বলে গুরুবাক্য বেদবাক্য, আবার শাস্ত্রেই বলে তারও বুদ্ধিভ্রংশ
হয় ! শাস্ত্রের কোন্ কথাটা মা ?
অদ্য। এখানে ন্যায়ের আশ্রয় নিতে হবে।
বিশ্ব। কিন্তু এই উইল যে অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে আছে। আপনাদের
আচাৰ্য্য ন্যায়ই করে থাকুন আর অন্যাযই করে থাকুন, তার অন্যথা
করবার শক্তি কারও নেই। তার নির্বাচিত এই নতুন পুরােহিত
বা আচাৰ্য যদি স্বইচ্ছায় কর্ম পরিত্যাগ না করেন, কিংবা যদি
সাধারণের বিচারে তিনি অযােগ্য বলে প্রতিপন্ন না হন, তাহলে
তাকে কেউ তাড়াতে পারবেন না।
রমা। আমার যা উত্তর তা উকীলবাবুই দিয়েছেন, আমার আর বাবার
কিছুই নেই।
অঙ্গ।
তাহলে আমাদেরও নিবেদন শুনে রাখুন,আমরাও আজ থেকে
চতুষ্পাঠী পরিত্যাগ করলেন। একজন অর্বাচীনের অধীনে
থেকে আমাদের সম্মান, প্রতিষ্ঠা, ধৰ্ম্ম, ব্রাহ্মণত্ব, নষ্ট করতে
পারব না।
রমা। তা বাপু, তােমাদের যা সুবিধা হয় তাই করবে, আমি আর কি
বলব বল।
মন্ত্রশক্তি
প্রথম *
আদ্য। যে আজ্ঞে, অমর। তবে বিদায় হলেম।
আদ্যনাথ ও ছাত্রগণের স্থান
বিশ্ব। কলেজে আর টোলে দেখছি কোন তফাৎ নেই। এদেরও সব
মিলিটারী মেজাজ !
রম। কালধৰ্ম্ম।
বিশ্ব। তা হলে বেলা হ’ল, আজ আমি উঠি। উইল সম্বন্ধে আমার
যে Opinion সবই আপনাকে বলিছি। যদি এই মাসের মধ্যেই
স্ব-ঘরে কন্যার বিবাহ দিতে না পারেন, আপনাদের এ বৃদ্ধ বয়সে
পথে দাড়াতে হবে।
যম। পথেই দাড়াতে হবে—পিতৃয়োষ-আর উপায় কি?
বয়ার বেশ
কৃষ্ণ। উকীলবাবু কি বল্লেন ?
রমা। বৃদ্ধ বয়সে তােমার হাত ধরে, মেয়ের হাত ধরে, গাছতলায়
TITCH!
গিয়ে দাড়াতে হবে—মার কি বলেন আমাদের বড় আদরের
বাণী, ছবছরের মধ্যে তার জন্যে একটা সৎপাত্রের সন্ধান করতে
পারলেম না! যদি বিষয় রাখতে হয়,
যদি বিষয় রাখতে হয়, তাহলে যেমন করে পারি
মৃগাঙ্ককে এনেই কন্যা সম্প্রদান করতে হবে।
কৃষ্ণ। ঠাকুরেরও তো সেই ইচ্ছেই ছিল। দেখ, যদি তাই হয়-ক্ষতি
কি?-ও যার যা বর। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে—এ তো মানুষের হাত
নয়। তুমি ও নিয়ে অত ভেব না; মেয়ের বরাতে যদি থাকে, ঐ
মৃগাঙ্ক হতেই তার মুখ হবে।
রমা।...ার্থ ৰ বৰান। যে..ছেলে ছে না, মেয়ে আছে না, রক্তের
G/
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১৭
বিচার করে না, ধর্মের মুখ চায় না, চায়—আপনার গণ্ডা! যদি
বিষয় যায়, বুড়ােবয়সে পথে দাড়াতে হবে-এই না ভাবনা? এই
ভাবনাই না বল? শাস্ত্রে লেখে কন্যা “বায় বিদুষে দেয়া।
যেখানে স্বার্থের সঙ্গে যুংঘর্ষ, সেখানে শাবাক্য কথার কথা, তার
কোন মুল্য নেই।
কৃষ্ণ। তা যদি ও পাত্রের সঙ্গে তােমার এতই অমত, না হয় পথেই
দাড়াব—তাতেই বা অত ভাবনা কিসের? তুমি যা ভাল বুঝবে তাই
কারাে। ভাল ছেলে না পাও, না হয় বাণীর বিয়ে দিও না—এই
তাে আমার দুই পিসশাশুড়ীর বিয়ে হয়নি।
রমা। সে মনের জোর আমার নেই। মেয়ের বিয়ে দিতেই হবে।
এখনও ক’দিন সময় আছে, দেখি একবার শেষ চেকরে। না হয়,
শেষ আ-মৃগাঙ্ক।
কৃষ্ণ।
মেয়ের বিয়ে নিয়ে আমাদের আহার নিদ্রা নেই-মেয়ে কিন্তু
কোন ভাবনাই নেই—সে দিনরাত আছে তার ঠাকুরপুজো নিয়ে।
রমা । আমার এমন মেয়ে, তাকে জেনে এনে দেব একটা হাড়
বকাটেকে?
f
বাণীর প্রবেশ
কৃষ্ণ। এই যে বাণী কেমন রে, নতুন পুরুং এ ক’দিন কেমন পূজো
করলেন রে ?
বাণী। ছাই! ভারি তো পুরুৎ! অত ছেলেমানুষ ও আবার পুরুং।
কৃষ্ণ। ওমা তাই নাকি? খুব ছেলেমানুষ? আমি তােক’দিন মন্দিরে
আসিনি, দেখিও নি। কত বয়েস হবে ?
১৮
মন্ত্রশক্তি
প্রথম অঞ্চ
বাণী। আমি কি তার ঠিকুজী কুষ্ঠী দেখতে গেছি ? কত বয়েস কি করে
বলব? বড় জোর বছর কুড়ি হবে, আর কি?
কৃষ্ণ। ওমা তাই নাকি?
বাণী। নয় তাে কি? না আছে পূজোর ছিরি, না আছে ব্যবস্থা ! ওমা
আরতিটাও ভাল করে করতে জানে না ?
কৃষ্ণ। কি জানি না। যাই আর দেরী করব না, দেখি, যেটা দাড়িয়ে
করাব সেটা তো আর কারও দ্বারা হবে না। ( রমাবল্লভের প্রতি)
তুমি মিছে অত ভেবনা। আমাদের ধর্মের সংসার, আমাদের
কখনাে অকল্যাণ হবে না।
বাণী। নতুন পুরুৎটাকে কবে বিয়ে করবে বাবা?
রমা। কেন বল দেখি, ও-বেচারীকে হঠাৎ বিয়ে করতে চাস্ কেন?
বাণী। বাবা, তুমি বলছ কেন?, ওকে দেখেছ কি তুমি, কি রকম
সামাথ:-|
ছেলেমানুষ? জার্মার সঙ্গে এর একটুও বনবে না বাবা, তা আমি
তােমাকে বলে রাখছি।
এন
রমা। আমার এমন মেয়ে! সংসারের কিছুই জানে না, দিনরাত
ঠাকুর-পূলো নিয়েই থাকে, দেবকন্যার চেয়েও পবিত্র—কিন্তু তার
অদৃষ্ট কি এতই মন হবে? দেবপূজার পরিণাম কি এই ?
আবরনাথের প্রবেশ
র। নমস্কার।
মা। এস ঠাকুর, এস, এই তােমার কথাই হচ্ছিল
মন্ত্রশক্তি অম্বর। দেখুন, আপনার কাছে আমার কিছু নিবেদন আছে। রমা। কি বল ? অম্বর। আপনার গৃহদেবতার পূজা বা চতুষ্পঠী পরিচালন আমার বার যে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়, এমন ভরসা আমার নেই। আমার বক্তব্য, আপনি অনুগ্রহপূর্বক কোন যােগ্য ব্যক্তিকে এই কার দি। কেন বল দেখি? তােমার আচাৰ্য্য কি তােমাকে অযােগ্য জেনেই এই ভার দিয়ে গেছেন ? পুরােহিত নির্বাচনে সত্যই কি তার ভুল হয়েছিল ? অম্বর। ( কিছুক্ষণ নিরুত্তর থাকিয়া) তার ভুল হওয়া সম্ভব, এ কথা আমি মনে করতেই পারি না। হয় তো আমিই আমার নিজের শক্তি সম্বন্ধে অজ্ঞ ; কিন্তু এই দায়িত্ব গ্রহণে আমি নিজেই যখন ভয় পাচ্ছি, তখন এ ভার আপনি আর কাউকে দি। অত সহজে তােমায় নিষ্কৃতি দেবার ক্ষমতা আমার নেই। যদি সাধারণে তােমায় অনুপযুক্ত ও অক্ষম বলে মত প্রকাশ করে, তবেই আমি তােমায় নিষ্কৃতি দিতে পারি। যদি এ কাজে তোমার ইচ্ছাই থাকে, তবে এক কাজ কর না ঠাকুর। কাজের টী দেখাও, তোমার দোষ ধরবার লোকের অভাব হবে না। অম্বর। ( দৃঢ়স্বরে) সংসারে অনেক রকম পাপ আছে, তার মধ্যে নিজেকে ইচ্ছা করে অক্ষম প্রতিপন্ন করা মহাপাপ। আমি জেনে শুনে এ পাপ করতে পারি না। দ্বিতীয় কথা, আমি অক্ষম প্রতিপন্ন হলে আমার গুরুদেবকেই ছােট করা হবে। লােকে বলবে তার নির্বাচনে ভুল হয়েছিল, ক্রুটা হয়েছিল। শিষ্য হয়ে অহেতুক গুরুর উপর এ কলঙ্ক দেওয়ার যে পাপ, তার প্রায়শ্চিত্ত নেই। আমি রমা।
প্রথম,অঞ্চ
স্বেচ্ছায় এ ধন আর ছাড়তে পারব না। আমি গুরুর
আদেশই শিরােধার্য করলেম; বিগ্রহের সেবা পূজা আর অধ্যাপনার
কাজ আমি যথাসাধ্যই করবো।
রমা। হু; ভস্মাচ্ছাদিত বহি, ব্রাহ্মণের তেজ তােমার আছে দেখছি।
কিন্তু আর ক’দিনের জন্যেই বা পূজো, ক’দিনের জন্যেই বা টোল !
দু’দিন পরে আমাকেই সৰ্বস্ব ত্যাগ করে কোথায় যেতে হবে কে
জানে ? (লব তােক...দুঃখ, কষ্ট, লাঞ্ছনা সব সহ
করতে পারব,কিন্তু মেয়েটা কি হবে তার এই শাখ
পূজ-স-ঠাকুরবাড়ী, সাধের মূৰ ভেঙ্গে চুরমার হবে—এ
আষাত কি সে সইতে পায়ো কে জানে? কে জানে ?
তৃতীয় দৃশ্য
রাস্তার ধারে—একতলা পাকা বাড়ী
তুলসী ও আদ্যনাথ
•
তুলসী। আমায় তুমি কি করতে বল ?
আদ্য। তাই ঠিক করতেই তো তােমার কাছে আসা। আমিই যদি
বলবো, তবে তােমার পরামর্শ চাইব কেন? দাদাবজে.এক রকম
হয়ে গেছেন। তাঁর কাছে তো একটা যুক্তি পরামর্শ পাবার আশা
দেখিনে। এখন তুমি না দেখলে কে আমার দেখবে বল ?
তুলসী। তা, দেখবার লােক একটা তােমার দাদাকে দেখতে বলি
যুক্তি পরামর্শ দিতে না পাল্লেও এ কাজটা বােধ হয় তিনি খুব
পারবেন। তা এটা কি মাস—এ মাসে বিয়ের লগ্ন আছে তো?
সত্যিই তো, আর কতদিন ছন্নছাড়া হয়ে বেড়াবে।
আদ্য। এই দেখ, একে আমি মরছি নিজের জ্বালায়, তুমি আবার ঠাট্টা
আরম্ভ করে ? এ কি ঠাট্টা তামাসার সময়।
তুলসী। এটা ঠাট্টা হ’ল বুঝি? বিয়ে করাটা ঠাট্টা তামাসা? তা
হলে আমি যে তােমার দাদার ঘর করছি, আমিও একটা ঠাটা-
তামাসা! আবার তুমি পরামর্শ নিতে এসেছ আমার কাছে,
এই ঠাট্টা-তামাসার কাছে।
আদ্য। আর জালিওন বৌদিদি। যা হয় একটা বুদ্ধি দাও। আমার
মাথার ঠিক নেই। আমি ভেবে কিছুই ঠিক করতে পাচ্ছি নে।
২২ মন্ত্রশক্তি প্রথম অঞ্চ গুরুদেবের দেহত্যাগের পর থেকে কি রকম হয়ে গেছি। এ্যা, আমি আদ্যনাথ—শেষ বুড়ো বয়সে তাবেদারী করবে ঐ অম্বুয়ে ছোড়াটার ! প্রাণ থাকতেও তা পারব না। তুমি একটা বুদ্ধি কর বৌদিদি ! তুলসী। ঠাকুরপো, তুমি না কথায় কথায় বলতে স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী ! এমনিই তাে দেখছি ক’দিন তােমার মধ্যে প্রলয় চলেছে; এর উপর আমার বুদ্ধি শুনলে যে একেবারে মহাপ্রলয় হয়ে যাবে ! আদ্য। না ! কবে একটা কি কথা বলেছিলুম, দেখছি, সেইটাই তুমি গাঁট দিয়ে বসে আছ, আজও ভােল নি! এই আমি কর্ণ মর্দন করছি বৌদিদি, আর ঠাট্টা করেও তােমার কাছে অমন শৰ প্রয়ােগ করব না ! আরে ছিঃ! তুমি ঠাট্টাও বোঝ না। আর এ দিকে তাে এমন প্রখর-বুদ্ধি-শালিনী, দেশশুদ্ধ লােক বলে, তুমি আমার দাদাকে কান ধরে ওঠ বােস করাও! তুলসী। বলে নাকি? সত্যি? আচ্ছা—দেখি ঘরে কি মিষ্টি আছে, তােমায় মিষ্টিমুখ করাই? এমন সুখবরটা দিলে আহ! সখী কে বা শুনাইল শ্যামনাম- কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মাের প্রাণ - আমি নাকি ওঠাই বসাই ধরিয়ে তার কান। আচ্ছ। আরে চুপ কর, চুপ কর; বাইরের চণ্ডীমণ্ডপে টোলের ছাত্রেয়া সৰ ব'সে! তারা শুনলে কি মনে ভাববে বল তাে! ভাববে তােমার তৃতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি বুঝি হঠাৎ ভূতে পেয়েছে। এলুম মনের দুঃখে তােমার সঙ্গে পরামর্শ করতে, তা কথাটা তুমি কানেই তুলছে না। তুলসী। কানে তুলবাে না কেন? শুনলুম তো সব-ই ! কিন্তু আমি মেয়েমানুষ, আমি এর আর কি করবাে বল। আদ্য। আচ্ছা! তােমার সঙ্গে জমীরবাবুদের বাড়ীর মেয়েদের জানাশােনা আছে না? তুলসী। আছে; কেন? আদ্য। শুনেছি, জমীদারবাবুর মেয়ে খুব ধর্মপরায়ণ।। তুমি যদি তাকে একবার বুঝিয়ে বল, যে অন্তরে ছেড়টার শান্ত্রন নেই-ওটা নাস্তিক তা হলে বােধ হয়- তুলসী। (ঘৃণাপূর্ণ অনুযােগের সহিত) কি! আমি তােমার অম্বর- নাথের নামে তার কাছে লাগাতে যাব ? আদ্য। ঠিক তা নয় ; তার নামে কুৎসা করবার দরকার হবে না। সত্যিই সে পুরুত হবার যােগ্য নয় ; একথা বলায় মিথ্যা বলা হৰে তোএতে আর দোষ কি বল ? তুলসী। ( মৃদু হাসিয়া) দোষ বিলক্ষণ! কে না বুঝবে, তুমি আমার আপনার জন-তােমার জন্যই আমি নতুন পুরুতের নামে লাগাতে গেছি! আদ্য। (স্বগত) মেয়ে জ্যেঠা হলে তার অনেক দোষ! হাতাের। মেয়েমানুষের আবার ধর্মজ্ঞান। তুলসী। তবে এ কথাও তােমায় বলছি আমি, যদি তােমাদের নতুন পুরুত সত্য সত্যই কিছু না জানে—তা হলে তাকে বেশীদিন পুরু গিরি করতে হবে না। তােমার ও চোখ দুটোয় চেয়ে আরাে ২৪ মন্ত্রশক্তি প্রথম অঙ্ক দু’টো শক্ত চোখ তার কাজের উপর চৌকি দিচ্ছে। সে বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থেকো ঠাকুরপাে ! আঙ্গ। (সােল্লাসে) কে-কে? কার চোখ ? তুলসী। কেন, জমীদারবাবুর মেয়ে রাধারাণীরতার কাছে একটুও ফাকী চলবে না। বয়সে কম হলে কি হয়—তার যা ভক্তি- পূজা অর্চায় যা নিষ্ঠা-খুটনাটি পূজোর সব—এমন নিখুঁত জানে একদিন ভুল হলেই-রক্ষে রাখবে না আর সে। আদ্য। বল কি! জয় জনার্দন! আহা! এ সময় যদি একটু তুমি উসকে দিতে! বেটার টোল তো ভেঙ্গেছি-টোলের প্রায় সব ছাত্র এসে এখানে জুটেছে—এলাে না কেবল ঐ সুধাকরে—আর তার সঙ্গে দু চারটে খােসামুদে। আচ্ছা, দেখি ও কেমন করে পণ্ডিতি করে খায়? আমি অমনি ছাড়ছিনি! বলে-যার ধন তার ধন নয়, নেপােই মারে লই! কোথায় ছিলিরে বেটা এতদিন? আমি যে প্রায় আট বছর ধরে এই আশায় দোর কামড়ে পড়ে রইলুম- তুলসী। আহ ! ঠাকুরপাে ! দোর কামড়ে কেবল দাতই ভাঙ্গলো দরজা আর খুললাে না। তােমার দাদাকে বলি, যে ঠাকুরপাের একটা বে দাও-পরের দোর না কামড়ে নিজের দোর কামড়ে পড়ে থাকুক—এ সব ব্যারাম ভাল হয়ে যাবে, মাথা ঠাণ্ডা হবে ; তিনি তো কথা কানেই তােলেন না। আন্ত। নাঃ, আমায় দেখছি বিবাগীই হতে হ’ল; এ অবিচার সয়ে আমি এ দেশে থাকতে পারব না। তিনকুলে কেউ নেই, তুমি আপনার জন জেনে তােমার কাছে এলেম, তা তুমি ঠাট্টা তামাসা করেই উড়িয়ে দিলে! দাদা আক, বলে বিদায় হই।
তৃতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
২৫
তুলসী। বালাই বালাই ! বিদেয় হবে কেন? আমি যদি একবার
জমীদার বাড়ী গেলেই তােমার আত্তি মেটে, যাব কাল সকালে
একবার ; আমি কিন্তু ভাই কারও নামে কিছু লাগাতে পারব না;
তবে বাণীর মন বুঝে আসব, এই পর্যন্ত।
আন্ত। হ হ ওতেই হবে। একবার খবর নেওয়া পুরুৎ-গিরি কাজ
করছে কেমন। পা ধুতে ভুলে গিয়েছিল বলে নলের শরীরে
কলি প্রবেশ করেছিল। একটু ছিদ্র পেলে হয়, তার পর যা
করবার আমার মনেই আছে।
তুলসী। তা এখন সন্ধ্যে আহিকের জায়গা করে দিই, সন্ধ্যে ওতরায় ;
আল-হিজলে।
আঙ্গ। তাসন্ধ্যাহিক-জায়গা—তা দেবে দাও।
তুলসী। পুরুষমানুষের সােমত্ত বয়েসে বিয়ে না দিলেই যত রােগ!
অনুরাগের লােক না থাকলেই রাগ বাড়ে! যাই, তুলসীতলায়
প্রদীপ দিয়ে সন্ধ্যে-আহিকের জায়গা করে দিই। কাল সকালে
উঠে যাব একবার জমীদার বাড়ী।
ভুর্থ দৃশ্য
মৃগাঙ্কমােহনের বৈঠকখানা
কালরাত্রি দশটা
স-পারিষদ মৃগাঙ্কমােহন
বাইজী জহরা গান গাহিতেছিল
গীত
যমুনার তীরে কালা বাজায় বাঁশরী
কেমনে মন পাশরি ?
বাণী ডাকে আয় আয় আয়,
হ'লো কুল রাখা যে দায়,
কি স্কুলে যাইলো জলে ঘরে ভরা শাগরী।
ননদ না ছাড়ে পাশ
গলে বেড়ী পায়ে ফাঁস,
যদি, মিলনে এতই বাধা কেন না মরি ?
কত সালে নাগরী?
গান থামিল ইয়াগণ সকলে বাহবা দিল
রমণী। এটা কি পিনু।
মৃগাঙ্ক। থাম, আর বিদ্যে জাহির করিসনি; যা জানিসনি তা নিয়ে
মাথা ঘামা কেন?
চতুর্থ দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
২৭
রমণী। জানিনি বাবা, একি ধানচাল দিয়ে শেখা? বলে কত ওস্তাদ
হাঃ! আচ্ছা বাইজী, তুমিই বল তােত এটা পিলু নয় ?
জহরা। আজ্ঞে । আপনাদের এ পাড়াগেঁয়ে ‘পিলের বহিন
‘পিলু বটে !
মৃগাঙ্ক। কেমন ? হয়েছে মুখের মতন ? আর ওস্তাদী ফলাবে ?
জহরা। বাবু, তা হলে হুকুম করুন আজ উঠি, রাত অনেক হয়েছে।
আবার ইষ্টিশনে গিয়ে শেষ গাড়ী ধরতে হবে।
মৃগাঙ্ক। আবার কবে দেখা পাব ?
জহর। যখনি হুকুম করবেন । আপনাদের জুতো ফেরাবার জন্যেই তাে
আছি।
মৃগাঙ্ক। ঐ মথরো, আলাে ধর ; দেখ গাড়ী ঠিক আছে কিনা?
ষ্টেশনে যেতে হবে।
বাইজী ও তাহার সহচরগণ উঠিয়া দাড়াইল,
একটা হরিকেন লন লইয়া মথুয়ের প্রবেশ
বৃমণী।
মথুরবাবু, তার এয়েছেন।
মৃগাঙ্ক। তার?
। এসরাজের না বেহালার ?
মথুর। পিওন তার এনেছেন-রসৗদ চায়।
মৃগাঙ্ক। এত রাত্রে কোখেকে তার ? যা নিয়ে আয়। এদের অনিল
পর। রমণি, যামিনি- এদের গড়তে তুলে দিয়ে বাড়ী যেও।
ক্স । চলুন রমণীবাবু, রাস্তায় আপনাকে ‘পিলু’ শোনাতে শশানাতে
যাব।
মন্ত্রশক্তি
প্রথম অঙ্ক
সজনী। শােনাবে শুনিও, শেষকালে যেন পিলুড়ি বানিয়ে ছেড় না।
সকলের হাস্য
মৃগাঙ্ক ব্যতীত সকলের প্রস্থান
মৃগাঙ্ক। এত রাত্রে কোখেকে টেলিগ্রাম এল ? তিন কুলে তাে খবর
নেবার কেউ নেই। ভ্যাগিদ পতিপুত্রহানা এক দিদি ছিল আর
তার বিষয় ছিল, তাই জীবনটা এক রকম নিরুদ্বেগে কেটে যাচ্ছে।
হঠাৎ রাত দুপুরে আবার তারের খোঁচা কেন বাবা?
টেলিগ্রাম লইয়া মথুরের পুনঃ প্রবেশ
দে, দেয়। (সহী করিয়া দিল) যা দিয়ে আয়।
মধুর। তামুক দেব ?
মৃগাঙ্ক। হ। আগে এটা দিয়ে আয়।
মধুর। আজ্ঞে ।
মধুরের স্থান
টেলিগ্রাম পাঠ করিয়া
"Urgently needed, come immediately Ramaballav."
ওঃ এ যে জরুরি তলব! দূর সম্পর্কের মধ্যে এক মামা আছেন
এই রমাবল্পত। মামার বাড়া! তার কাছ থেকে এ জরুরি তলব
কেন? আমি তাে বিশ্ববখাটে বলে কেউ আমার খোঁজ রাখে না।
৩৫
আমিই বার বার ধারি? অতপরােমাটা কি যান যান
নাকি? উদেরও তো ঘরে ছেলে নেই, থাকবার মধ্যে
মেয়ে—বিষয় ও অগাধ। একটা গুরুতর কিছু হয়েছে, নইলে
আমাকে টেলিগ্রাম কেন?
মন্ত্রশক্তি
তামাক লইয়া মথুরের পুনঃ প্রবেশ
মথুর। ফুরসী বাড়ীর মন্দি দেব ?
মৃগাঙ্ক। বেটা নতুন হচ্ছ নাকি? বাড়ীর মধ্যে কবে তামাক খাই ?
তামাক এইখানে পে; আর দেখ, পাশের ঘরে বিছানা ঠিক
আছে কিনা।
মথুর। বিচানা-টিচান। সব ঠিক করে রেকিচি।
মৃগাঙ্ক। দেখ, খবর নে দেখি, দিদি জেগে আছেন কিনা। আমাকে
একটা জরুরি কাজে ভােরের ট্রেণেই এক জায়গায় যেতে হবে।
অত সকালে কারও সঙ্গে তাে দেখা হবে না, রাত্রেই তঁাকে বলে
রাখি। যা, দাড়িয়ে রইলি কেন?
দেখে
আয় ; আবার
দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘুমােয় ! কথা কানে ঢুকল? যা।
মধুর। এজ্ঞে তামুক তাে দেলাম।
মৃগাঙ্ক। তােমর গুষ্ঠির পিণ্ডি দিয়েছ! বেটার জ্বালায় অস্থির। বেটার
দাড়িয়ে দাড়িয়ে নাক ডাকে। এতক্ষণ কি বলুম, কানে ঢুকলো না।
মথুর। (কানে আঙ্গুল দিয়া) এজ্ঞে না, কানে তাে কিছুই ঢােকেন নি।
মৃগাঙ্ক। তা ঢুকবে কেন ? যা বেটা পাজী, গণিধেy ( ”
মথুর। এজ্ঞে শুদু দু গাল পাড়েন কেনে? আপনার যেমন দিকে
রাত্তিরির মন্দি নিদ্রে নেই, আমাদের মাষির শরীল তাে? (আবার
নাক ডাকিল)
মৃগা। নাঃ এই বেটাই আমাকে দেশ ছাড়াবে। ওরে মরে, ওরে
বেটা মথয়না!
মথুর। (চমক ভাঙ্গিয়া) এক্সে।
মন্ত্রশক্তি
প্ৰথম আৰু
মৃগাঙ্ক।
এজ্ঞে! একবার বাড়ীর মধ্যে গিয়ে দেখে এস দিদি জেগে
আছেন কিনা। দেখিস যেতে যেতে যেন ঘুমােত্ নি।
মধুর। এজ্ঞে তাও কি কখনাে হয়? তা যদি পাত্তা, তাহলি
আমারি পেত কিডা? সে অব্যেস ছাল আমার ছোটঠাকুন্দার।
তেনার এড্ডা ছােট্ট কান বালিস ছাল, সেডারে কাদির ওপর থুয়ে
তাতি মাতা রেকে ঘুমুতে ঘুমুতে ছ কোশ পথ মেরে দেতেন ;
তাদের পুণ্যাত। শরীল !
এস্থান
মৃগাঙ্ক তামাক টানিতে টানিতে গুন গুন করিয়া খাম্বাজ
আলাপ করিতে লাগিলেন
মৃগাঙ্ক। জহরা বেশ গায় ; কদিন আর ওর গান শােনা হবে ।
রাজনগর থেকে ফিরতে কত দেরী হবে, তা তাে আর সেখানে না
গিয়ে আন্দাজ করতে পারি না। সে ” ?
অৰ্ধানী অত্র দ্বারের নিকটে প্রবেশ করিল
মৃগা। (দেখিয়া) একি! তুমি কেন ? বন্ধু দিদি জেগে আছেন
কিনা খবর নিতে, রাস্কেলটা বুঝি তােমায় ডেকে দিলে? দিদি বুঝি
ঘুমিয়েছেন?
অলা কোন উত্তর দিল না
তাকে বােলাে আমি ভােরের গাড়ীতে বেরিয়ে যাব
বেরিয়ে যাব। তার সঙ্গে
দেখা হবে না বলে তিনি যেন রাগ না করেন।
চতুর্থ দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
অজা বার হইতে গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিল। তাহার বয়স সতের আঠার ; সে দেখিতে
বড় সুন্দরী ; সচরাচর এমন সুন্দরী চোখে পড়ে না। অজা
কথা শুনিয়া কোন উত্তর দিল না।
!
মৃগাঙ্ক। ( বিরক্তস্বরে) ওগো, শুনতে পাচ্ছ? তুমি আবার চোখ
চেয়েই ঘুমুচ্ছ নাকি? ওগাে! দিদিকে বলতে যেন ভুলাে না, আমি
বিশেষ দরকারে যাচ্ছি, ফিরে এসে তাকে সব বলব। এইমাত্র তারে
খবর পেলুমবােলাে, ভুলে যেও না। আরে, এ যে হাঁও বলে না
হু ও বলে না—কি ফ্যাসাদ! বলো, বুঝেছ; বলি ব’লবে তাে?
অজা। (অবেণীবদ্ধ কক্ষচুলের একটা গুচ্ছ ললাট হইতে অপসারিত
করিয়া, মুখ তুলিয়া মৃদুকণ্ঠে) কোথায় যাবে?
মৃগাঙ্ক। তবু ভাল, জেগে আছ।-একটা জরুরি কাজে যাব।
অজা। কোথায় ?
মৃগাঙ্ক। সে একটা জায়গায়।
অজা। জায়গায় তো বটেই, কোন্ জায়গায় ?
মৃগাঙ্ক। তুমি কি পৃথিবীর সব জায়গার নাম জেনে বসে আছ নাকি?
তােমার কাছে আমার সব কাজের হিসেব দাখিল করতে
আমিই বাধ্য।
অজ। মাত্র ঈষৎ হাসিল
ও হাস্য? মৃদু ? ও হাসির মানে আমি বুঝি; কিন্তু বন্ধু, তা যে
হবার যো নেই। ক’ বছর এ বাড়ীর শােভাবর্ধন করেছ?
কবছর হবে?
অজা। (মৃগাঙ্কের মুখের মিকে চাহিয়া) আমি ভুলে গেছি মনে নেই।
पक्षबलि প্রথম নষ্ট মৃগাঙ্ক। নাঃ, ভােলেনি, সে আমি তােমার চোখ দেখে বুঝতে পারছি। বলবে না। তা না বল, কথাটা আমার দিক দিয়ে মাঝে মাঝে তােমার মনে করিয়ে দেওয়া উচিত ; কেন না “দুর্বলতা অন্য নাম রমণী তােমার। লােকের কাছে বলতে কইতে দেখতে শুনতে শাস্ত্র লােকাচার মতে, তােমার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী সম্বন্ধ বটে কিন্তু সত্যের দিক দিয়ে আসল কথাটা তো তা নয়—কেমন? এ কথা স্বীকার কর ? অজা ঘাড় নীচু করিয়া হাসিল না না, হাসি নয়। ঐ রকম হাসি দেখেই কাপুরুষ পুরুষগুলাে ফাসি পরে মেয়েমানুষের গোলামী করে। কিন্তু ইস্কুল থেকেই আমার mooto হচ্ছে—“স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায় ? ফুলশয্যার রাত্রে তােমায় যা খুলে বলেছি, আর এই তিন বচ্ছর—এর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম দেখেছ কি-যে রাত দুপুরে হানা দিয়ে ফিক ফিক করে হাসছ, আমার কাজের কৈফিয়ৎ নিচ্ছ? তােমায় ত বিয়ের রাত্রেই আমার প্রাণের কথা খুলে বলেছিলুম যে, বাইরে আমরা স্বামী-স্ত্রীর মতন থাকব; কিন্তু আমাদের আসল সম্বন্ধ হবে “বন্ধুত্বের”। তুমি হবে আমার বন্ধু, আমি হব তােমার বন্ধু—ব্যস-কাজের খতম ; তােমার মা বাপের নিতান্ত জেদে, তাদের দায় উদ্ধার করার জন্যেই না তােমায় বিয়ে করা? সেটা ভুলে গেলে চলবে কেন? অজার মুখ অন্ধকার হইল, কিছু বলল না। মাত্র তাহায় কম্পিত অধর ঈষৎ কুরিত হইল ; নেপৰ আনত হইল
•
চতুর্থ দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
এ কি! মুখখানা এই লাল, এই কালাে! রৌদ্র আর মেঘ। এতে
কবির প্রেরণা আসতে পারে, আমার কাছে ও বেণুবনে মুক্তো
ছড়ান। আমি বন্ধু আছি বন্ধু থাকব। আমার ফুর্তির প্রাণ,
সাধ করে পায়ে বেড়ী পরতে পারবাে না। আর তােমারই বা
তাতে ক্ষতি কি বন্ধু ? গয়নাগাঁটী, কাপড়চোপড় যখন যা সখ হচ্ছে
পাচ্ছ, দিব্যি আরামে আছ; দিন রাত ইজি চেয়ারে শুয়ে নভেল
পড়, smelling salt (স্মেলিং সল্ট) শোকো, কোনাে বালাই
নেই! মুখ অমন কালো কোরাে না ও মুখ ভার আমি সইতে
পারিনি। কথায় কথায় রাত্তির পােহাতে চল্লো, আমি আর দেরি
করবাে না; তুমি দিদিকে বােলো, আমি ভােরের গাড়ীতে বিদেশে
যাব। যাও, ঘুমােও গে (বন্ধুটী আমার, আমি দেখি মথয়াে বেটা
আবার কোথায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘুমােচ্ছে।
এখান
অজা। পায়ে পড়ে বিয়ে করা ! দায়ে পড়েই তো! গরীবের
মেয়ে, আইবুড়ো নাম না খণ্ডালে জাত যাবে, তাই বাবা হাতে
পায়ে ধরে এখানে সম্প্রদান করেছেন। কল্লেনই বা আমায়
তাচ্ছিল্য। যিনি আমার মা-বাপের দায় উদ্ধার করেছেন, তার
কাছে তাচ্ছিল্যও যে আমার পুরস্কার! আমারই অন্যায় !
আমি জিজ্ঞাসা করতে গেলুম? কেন মুহূর্তের জন্যে ভুলে গেলুম?
বিবাহিত হলেও স্ত্রীর অধিকার তাে আমার কোনদিনই নেই। এবার
থেকে খুব সাবধানে থাকব, যাতে আর কখন এমন ধরা না পড়ি।
पशन
পঞ্চম দৃশ্য
মন্দির
এত মর্মর নির্মিত হ্য; প্রাচীরের পাথর কাটিয়া খচিত সুন্দর চিত্র, জন্ম হইতে
লয় পৰ্যন্ত গ্রীকৃষ্ণের বিচিত্র লীলায় পূর্ণ। উপর হইতে ফটিক ঝড় বিলম্বিত।
স্বরচিত পাত্রে পাত্রে নৈবেদ্য ; মুক্তাখচিত স্বর্ণপাত্রে যত্ন-সজ্জিত তামুল; বৃহৎ সুবর্ণ
লিপু পুষ্পরাশি। বৃহদায়তন সুবর্ণ পুৰলিকার হস্তস্থিত ধূপ-দীপ অগুরু ইত্যাদি।
মন্দিয়ের মধ্যস্থলে সুষ সিংহাসনে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার প্রতিমূর্তি—মণিমুক্তাখচিত ৰ
অফারে সজিত।
মশিয়ের দ্বারের সমুখে প্রস্তর নির্মিত বােয়াকে বসিয়া বাণী ফুলের
মালা শাবিতে পাখিতে আপন মনে গান গাহিতেছিল
গীত
{
(৮
মারি ফুলে সাজাব তােমারে সাধ মনে
গাখি মালা কত যতনে ।
তুফিনিখিল সুরতম,
দিছি তােমারে, নবীন জীবন মম ;
তােমাৰি এণয়-ই বিবি হৃদি গগনে,
লীন এ মম সদা লুণ্ঠিত তব চরণে।
গতাতে গান গাহিতে গাহিতে তুলসীর প্রবেশ
আর কতদিন একলা বসে গাৰি মালা এমন করে?
যদি কেউ না তারে আদর করে।
মানে গলার মালা শুকিয়ে যুৰি প'ড়বে ঝ'রে।
পঞ্চম দৃশ্য
यहमकि
মিলনের প্রথম বাধন ফুলের কলির ডােয়-
সে হারে বাধে মনচোর,
তাের মন কোথায় আর চোর কোথায় বল,
মালা দিবি করে বুকে ধরে ?
তুলসী। কি লাে চিরদিনই তো পাথরে গড়া ঠাকুরের জন্যে মালা গাঁথলি
তাের জন্যে দিনে রেতে আমার কিন্তু ঘুম নেই! কেবলি ভাবি, তাের
ঐ ঠাকুরের মতন পােষাক পরে তাকে
মালাকাত কবে এই সত্যিকার রাধারাণীর শ্রীকৃষ্ণ আসবে ?
সেই ভাবনা ভেবে ভেবে দেখ সই, আমি আধখানা হয়ে গেলাম।
বাণী। বলে “যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়াপড়শীর ঘুম নেই।”
আমার জন্যে তাের এত মাথাব্যথা কেন বল দেখি?
তুলসী। আহা, মাথাব্যথা হবে না? কাছে আর কি
বলতে পারিনি; আমার কিন্তু মনে, অমৃত কি একা খেয়ে সুখ?
পাচজনকে খাইয়ে খেলে তবে না আনন? এখন তো আর কচি
কিশােরীটা নও, দেখতে দেখতে যৌবনও যে এল; এখন কি আর
ও পাথরের কৃষ্ণে সাধ মেটে ?
বাণী। আমার মেটে। আমি একদণ্ড এই কৃষ্ণ ছাড়া নই। মি
একেই সেবা করি, আদর করি; আমার সমস্ত মনপ্রাণ সপে দিয়ে
একমাত্র এই হ'য়ে দিন রাত ঐ দুখানি পায়ের তলায় পড়ে
আছি। দেখ দেখি আমার কৃষ্ণকে কেমন সজিয়াছি ? তােরা
তােদের আমিকে কি এমন করে সাজাতে পারিনা এমন ভালই
বাসতে পারিস? তায়া পান থেকে চুন খসলে ঝগড়া করে,
মন্ত্রশক্তি
প্রথম অফ
মত খাটিয়ে নেয়; কিন্তু দু’টো ভাল কথা বলবার ফুৎ তাদের হয়
। তারা রােগে ভােগে, মরে ; কত রকমে জ্বালায় বল দেখি?
তুই মনে করি, আমি এই চির-কিশাের চির-নিরাময়, চিরজীব
জগৎ স্বামীকে ছেড়ে তােদের মত মানুষের দাসী হব? আমি যে
স্বয়ম্বরা হয়েছি।
তুলসী। বলিস কি ভাই, স্বয়ম্বরা হবার এত সাধ ? হাঃ হাঃ হাঃ বলিস
কি?
হাসিতে হাসিতে বাণীর গায়ে ঢলিয়া পড়িল, বার্ণর হাতে ছুচ ফুটিয়া গেল
বাণী। উহুঃ! কি করলি দেখ, দেখি ? হাতে ছুচ ফুটে গেল!
তুলসী।
গীত
তোর বুকের মাঝে কুলের কাটা
চুচ ফোটাতেকি জ্বালা বল ?
ঠোটের কোণে চাপা হাসি,
লােক-দেখানো চোখে জল !
পাখিস, মালা আপন মনে,
তোর মনের কথা | মন-ই জানে,
ছিলি কালকে কলি,
আজ যে শতদল!
কেন অচল দিয়ে তুষের আগুন
রাখিস বুকে করে ছল?
এলাে, স্বয়ম্বরা হবার যদি এত সাধ, তা আমায় এতদিন বলিসনি
কেন? তাের সয়া তাে ঘরেই ছিল। গোঁসাইটগুলি
পঞ্চম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
বাণী।
মে-
টেকনাফেক-একটা চুমােইনাস
হৰি এখনও না হয় , তােকে তোর ঐ মকুবের
তারিয়ে
নস্টালদিয়ে পাঠিয়ে দিই। সেই কেশৰে ৰে।
( রাগ করিয়া তুলসীকে ঠেলিয়া দিয়া, ঐ কুঞ্চিত করিয়া)
তুই ভাই ভারি ছেবলা; আমি কি তামাসা করছি না কি?
সত্যি সত্যিই যে আমি আমার দেহ মন প্রাণ সব আমার ঐ
কৃষ্ণকে এম সশ্রদলে বলে দিয়ে ফেলেছি। এ সবের
উপর আর কারও দাবী দাওয়া নেই, নিজেরও নয়। দেখিস তুই,
এ আর কেউ পাচ্ছেন না।
তুলসী। দেখা যাবে সাে, দেখা যাবে। এক মাঘেই কিছু শীত পালায়
। যিনি এই রূপসীর দেহমন প্রাণ পাবেন, তিনি গােকুলে
বাড়ছেন। আমি আর কিছু এখনি মরছিনি।
বাণী। বালাই মরবি কেন। এখন দেখ দেখি, মাল কি রকম হ’ল ?
তুলসী।
সুন্দর হয়েছে। কিন্তু হলে কি হয়, এ বেণুবনে মুক্তো
ছড়ানো।
। (সলিন্থ বরে) কেন-কেন ?
তুলসী। যে পুরুৎ জুটেছে তাই বলছি। হ্যালো, লােকটা পূজো-অর্চা
করছে কেমন ?
মন্ত্রত কিছু জানে না কেবল কোলাকুশী নেড়েই
বাণী।
সারে ?
ৰাণ নী; তাহার মুখ লাল হইয়া উঠিল
তুলসী। দেশ সবাই মিলে এই কাজটার জন্যে কত কি-ই না বলেছে।
ময়বার সময় বুড়ো ভটচায্যিমশায়ের নাকি ভীমরতি হয়েছিল, তাই
মন্ত্রশক্তি
এখন এ
তিনি হঠাৎ এই কাণ্ডটা ঘটিয়ে গেলেন। পূজা পাঠোনে
* অতিষ্ঠাকুরপােঝ শুনেছি, ও ছোড়া রয়ে
ভাখত। কধুনী ৰামুন, জাৎলেন ঠাকুরমশাই! এ যেন
লেখাটা পড়ে-~~ড়িয়ে চার-বেটাকে বলে
সুজগনীতে তা যাক ভাই, খরাণী তাের তো মনে ধরেছে
তা হলেই হল।
বাণী। মনে ধরেছে ছাই, ওর চেয়ে তােমার আদি ঠাকুরপাে ঢের ভাল।
পূজো করার যে ছিরি ? পাঁচ বছরের ছেলে যা জানে, ও তা জানে না।
তুলসী। কেন? কেন?
বাণী। কাল করেছে কি জানিস? কতকগুলাে রক্তজবা এনে ঠাকুরের
পা সাজিয়ে রেখেছে। মূর্থের এ জ্ঞান নেই যে, খামার ফুলে গামের
পূজো হয় না। আমি তো আর একে নিয়ে পারিনে। বাবাকেও সব
বলিছি; দেখি আরও ক'দিন!
তুলসী। (স্বগত) বুঝলুম নতুন পুরুতের আসন ট’লেছে। এখন এখানে
আবিঠাকুৱপাের একটা ব্যবস্থা হলে আমরাও ব্যক্তি থেকে কিছু
তেনেকু-াণ-দশজন হজ নিয়ে টোল
খুলে দেয়। আমাদেরও তে অবস্থা তেমন নয় যে তিন
বেলা এলোপােগাতে পার। 'খা আ এ নিয়ে
মেয়ে নেই। এ এনি, হন্ধে মা ও. আমি কেন
নিবে। ( প্রকাশ্যে) ওলে, কথায় কথায় বেলা
হ’ল ; তুমি তাে তোমার ঐকৃষ্ণের নৈবিঙ্কি সাজিয়ে বসে
আহ, আমার কষ্ণের নৈবিদ্যি সাজাতে এখনো বাকী। আর
ব’সব না, উঠি।
।
পঞ্চম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
বাণী। চল, আমার রাধারাণীর জন্যে নীল রেশমী শাড়ীর উপর কেমন
জরির ফুলপাতা তুলেছি, তােকে দেখাই চল।
উয়ের এ
অঙ্গ দিক দিয়া অরনাথের প্রবেশ
অম্বর। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় পূজা করতে আসি; কিন্তু এ পূজায়
মনের তৃপ্তি হয় কৈ? আমি যতই নিষ্ঠার সহিত, আগ্রহের সহিত
পূজা করি, এই পাষাণ বিগ্রহের পার্শ্বে মৰ্ম্মপ্রতিম অনুপম-মূর্তি ভক্তি
মতী পূজারিণীর সন্দিগ্ধ দৃষ্টি আমাকে নিয়তই সঙ্কুচিত করে। শৈe
-য়
তয় এই বিশাল
রে
কাছে নিয়েতিনিই হীন বলে মনে হয়। তার নিকাছে
আমারই হয় তাল আমি তাে শান্তিপূজা
গতিকেতিক করি না, তবু আমার এতি তাতত
কি যথার্থই কি পূজায় আমার কোন ভুল হয়।
কয় না; কিন্তু তার সেই তীব্র অনুসন্ধান-নিরত দৃষ্টি দেখে আমার
মনে হয় আমার পূজা তার মনঃপুত হয় না।
কলাপাতায় কতকগুলি মূল লইয়া মহেশের মণ্ডলের প্রবেশ
মহেশ। এই যে দাদাঠাকুর। আমার বেড়ার ধার দিয়ে যখন পাশ
কাটিয়ে চলে এস, কত যে ডাকলেম ‘দাদাঠাকুর গো, ফুলক’টা নিয়ে
যাবেন নি ? তা দাঠাকুর আমার এমনি বেহুস, একবার
রা কাড়লেন নি। দাদাঠাকুর আমার ভােলানাথ, ভুলেই আছেন!
এই নাও ঠাকুর, ফুলক’টা ভাবতার ছিচরণে দিও, তােমার আশীর্বাদে
জীবনটা সার্থক হক।
মত্রশক্তি
প্রথম স্ক
অম্বর। কিরে মহেশ, আজ আবার ফুল দিবি? আচ্ছা, দিয়ে যা।
এত বড় পঞ্চমুখী জবাফুল এ অঞ্চলে আর কারও বাগানে ফোটে না।
মহেশ। সেও আপনাদের ছিচরণের আশীর্বাদে দাঠাকুর ;
দাঠাকুর; নইলে
আমার আবার বাগান-হাঃ!
অর হাত পাতিল মহেশ আলগােছে পাতায় মােড়া ফুল ফেলিয়া দিল
একবার ঠাকুর পেন্নাম করে যাই আমারটা ঘুরে আসি।
ঠাকুর প্রণাম করিল, ও অস্বরকে প্রণাম করিতে যাইবে এমন সময়
অম্বর। থাক থাক আমার হাতে ফুল আছে, তােকে আর প্রণাম
করতে হবে না।
মহেশ। দাঠাকুর আমার যেমনি ছিরিমান্ তেমনি গুণেরও ওর নেই।
তােমায় দেখলে আমার সময় সময় কি মনে হয় জান দাঠাকুর?
অম্বর। কি মনে হয়?
মহেশ। তুমি বামুন পণ্ডিতির ঘরে না জন্মে যদি রাজার ঘরে জন্মাতে,
তাহলেই মানাত।
অথর। দূর পাগল।
মহেশ। আর পাগলই বল আর ঝাই বল, তােমার পেয়াণডা ঝে
রাজার চেয়েও বড়, তা আমরাও কি চিনিনে? তুমি কে আমারে
মতন গরীব দুঃখীর মা বাপ!
এখন
অর। কালও এই মহেশ ফুল দিয়েছিল। ফুটন্তু রক্তজবা যখন ঠাকুরের
চরণে অঞ্জলি দিলেম, সেই ফুল, মসৃণ মৰ্ম্মরভিত্তির গায়ে প্রতিফলিত
হল তখন মনে হল ঘরের মধ্যে কে যেন একমুঠো আৰীৰ ছড়িয়ে
০
পঞ্চম দৃ
महमति
১১
দিয়েছে। আগে মন আমার প্রতিমাপূজোর বিরোধী ছিল, কিন্তু
যত দিন যাচ্ছে ততই পূজার উপর আমার অনুরাগ বাড়ছে।
সিড়ি বাহিয়া মন্দিরের বােয়াকে উঠিবে এমন সময় বাণীর প্রবেশ
অম্বরের হস্তস্থিত পত্রপুট লক্ষ্য করিয়া কঠিন শরে বাণ জিজ্ঞাসা করিল
বাণী। ওতে কি?
অম্বর। ( সশঙ্ক অথচ মৃদুস্বরে ) ফুল।
বাণী। ফুল ? কি ফুল? ফুল আপনার যেখান সেখান থেকে ব’য়ে
আনবার দরকার কি? থালায় যে ফুল আছে, ঐ তো পড়ে থাকবে।
বাণীর অধরে শ্লেষের মৃদুহা ক্রীড়া করিয়া উঠিল
=
অধর। (অত্যন্ত অপ্রতিভ হইয়া কোনমতে উত্তর দিল । সে জন্য নয়।
একজন লােক বড়ই শ্রদ্ধা করে দিলে তাই ফেরাতে পারিনি।
যদি-
কে দিলে শুনি?
মহেশ মণ্ডল বলে একন।
বাণী। সে কি ? শূদ্রের ফুল নিয়ে আমার দেবতার পূজায় ? কি
ফুল ওগুলাে, খুলুন তো দেখি ?
বাণী।
এর পাতার মােক খুলিল
দুই পা পিছাইয়া গিয়া কু সিংহীর ন্যায় গর্জিয়া বাণী ডাকিল
বাণী। পুরুৎ ঠাকুর!
আর বি-বিমূঢ় হইয়া কেবল চোখ দুইটা তুলিল
৪২ ?
মত্রশক্তি
প্রথম
বাণী। পুরুং ঠাকুর, তুমি যে অত্যন্ত মূর্খ, তা জেনেও কোন মতে স’য়ে
যাচ্ছিলুম। কিন্তু আর নয়—যাও, এই মন্দির থেকে তুমি এখনি
৮N
রে যাও! কালও তুমি এই রক্ত জবা দিয়ে আমার ঠাকুরের
পূজা করেছ। যে ফুল শক্তিপূজায় লাগে, সেই ফুল বৈষ্ণবের
ঠাকুরের পূজা! কোন্ ফুলে কোন্ দেবতার পূজা করতে হয় যে
জানে না, সে পুরুৎগিরি করতে আসে কোন লজ্জায় ? তুমি যাও,
আমার ঠাকুর না হয় অনি থাকবেন সেও ভাল, তবু তােমার মত
মূর্ণ অনাচারীর পূজা আমি চাই না।
অনাথ নিভাবে বাড়াইয়া রহিল, কোন উত্তর দিল না
বাণী। কে আছিস?
किमि
বাণী। আমি ঠাকুরকে শিগগির ডেকে আন। বলি, যেন মান
করে পূজোর জন্যে তৈরী হয়ে আসেন ;-একে নিয়ে আমার
চলবে না।
দীপি!
बान
ৰাণী। (ফিরিয়া) দাড়িয়ে রইলেন যে, যান এখুনি।
!
* * * *
অরনাথ ধীরে ধীরে এন করিল
দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দখ মন্দির রমাবল্পত মন্দিরের দালানে বসিয়াছিলেন ; কৃপ্রিয়া তাহার পার্শ্বে বাড়াইয়া কৃষ্ণ। অনুরােধ করলেও থাকবে না? ব্রাহ্মণকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া। একে এই বিপন, তার উপর ব্রাহ্মণের অভিশাপে কিছু কি থাকবে ? মোৰ- আল-ই ক!পুতন নেই। -ভারতে কাজ দু’দিনিিপ্রয়ে নিলেইত। তুমি এক ছেলেকে বিয়ে পড়িয়-দেখাণীৰমত করলাম। বুমা। এ সব সর্বনাশের পূর্ব লক্ষণ! পিতার অবাধ্য হয়ে ছিলাম, তার ফল হতে হতে পাচ্ছি। আমি কোনমিক সা? ভন্ন নাম "সেই নিই। আর এই কটা নি আছে। বাণীর বিয়ের তাে কোন যােগাড় করতে না পেরে মৃগাঙ্ককে তার করলুম, সেও এল না। কৃষ্ণ। তার আসবার এখনও সময় যায় নি। রুমা। তা যায় নি ; আমি পথ চেয়ে বসে আছি। সে যদি বাকে বিয়ে করতে সম্মত না হয়, সপরিবারে গেলুম! কৃষ্ণ। তুমি আগে ছেলেটাকে ডাকিয়ে আর একবার বল। ব্রাহ্মণের নিখাসে যে কিছু থাকবে না।
৪৪
महमति
দ্বিতীয় অঙ্ক
রমা। কালই চলে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে বলে কয়ে একটা দিন
রেখেছি। এ রকম করে তাড়িয়ে দেওয়ায় যে আমারই অপমান,
মেয়েটা তাও বুঝলে না!—আমার পাগলী মেয়ে !
কৃষ্ণ। ঐ করে, করেই তো মাথায় তুলেছ !
ভৃত্যের প্রবেশ
বএন।
ভৃত্য। বাইরে আমাদের সেই পুরােনাে দাদাবাবু এসেছেন।
রমা।
ওগাে দেখ, বুঝি মৃগাঙ্ক এল।
ভৃত্য। হ্যা, হ্যা, সেই দাদাবাবুই বটেন।
রমা। যাই, দেখি,
যাই, দেখি, তাকে এইখানেই পাঠিয়ে দিচ্ছি, বিয়ের প্রস্তাবটা
তুমিই আগে করো। আমাকে
আজকে ভেঙ্গে গিঞ্জেলি।
এর মধ্যেই পূজা --হে। রকেই
ৰা ৰিলেৰােৱাই ?
রমাবত ও ভৃত্যর এখান
এমন বিপদেও মানুষে পড়ে ! না হক, মিছিমিছি এ কি উইল
বাপু? দেখছি, বিষয় থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল। না থাকার
এক জ্বালা, থাকার শতেক জ্বালা !
বাবর এবেশ
আয় বাণি, আমার কাছে আয়। একি! তাের চোখ রাজা কেন?
কাদছিলি বুঝি ) বােকা মেয়ে, কান্না কেন?
ৰা তাৰ মানের নিকটে গিয়া তার বুকে মুখ লুইয়া কাদিতে লাগিল
ছি মা, কাদিসনি; আয়াদু।
প্রথম দৃশ্য মন্ত্রশক্তি ৪ ণী। মা আমি মরব। কৃষ্ণ, বালাই বালাইও কথা কি বলতে আছে ? বাণী আমার জন্যেই! তােমাদের এই সর্বনাশ। আমায় নিয়েই না দাদবাবুর উইল ? আমি মলে ত আর সে উইল বলবৎ থাকবে না ? তা হল ত আর তােমাদের সর্বস্ব যাবে না? দাদাবাবু এত ভালবাসতেন, শেষে তার ভালবাসার এই পরিণাম হল ? এখন বুঝতে পাছি, দাদাবাবু আমায় কখ খনন ভাসতেন না—কথ খনন না-কখখনাে না। কৃষ্ণ। দেখ, বাকি অমন কথা বলিনি। ঠাকুর যে তােকে ভালবাসতেন না-তা নয় ; তাকে ভালবাসতেন বলেই, তাের ভালবাসায় অন্ধ হয়েই তিনি এই উইল করেছেন। তিনি একদিকে তােকে ভাল- বাসতেন, আর তৈমনি তেমনি ভাৱাসতেন তার বংশ-মৰ্যাদাকে। এ দুইয়ের মউকোনি খাটো করতে পারেন নি, তাই কারাের মুখ না চেয়ে এই উইল ক’ গেছেন। দেখ, মা, ভালবাসা নিতে গেলে, ভালবাসার অত্যারও সইতে হয়। বাণী। বাবা শুকনো মুখে যখন বুঝিয়ে বল্লেন যে আমি বিয়ে না করলে তাকে, তােমাকে পথেদাড়াতে হবে, তখন তার কাছে আমি বিয়ে করব বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন ; তার পর মা, যত দিন যাচ্ছে--ভেবে দেখেছি, বিয়ে করবার অধিকার আমার কৈ? আমি ত অনেক আগে থেকেই মাকে সমর্পণ করেছি আমাদের কুলদেবতা গােপীকিশাের ঠাকুরকে। এখন কি বলে আমি, যে দেহ দেবতাকে উৎসর্গ করেছি সেই দেহে অন্য মানুষের সেবা কর ? আমি বাবাকে সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারব না, তুমি তাকে বুঝিয়ে
৬
মন্ত্রশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
ঙ্গে-তিদিনশ্রেন, যেনে-য়ে-ফিলিখিতম’রব।
রিসী, ঋগেল।
মৃগাঙ্ক। (নেপথ্য হইতে) মামী কোথায় গাে?
গায়ে একে
মৃগায়। এই যে মামী, গড় করি গাে—আরে, ওটা কে? এ,
আমাদের সেই রাধু না? আরে, তুই এত বড় হয়েছিস ? তােক
যে আর চেনবার যাে নেই ?
কৃষ্ণ। আয় মৃগু, কেমন আছিস? হারে, আমাদের একেবারে ভুলে
গেলি? একটা চিঠি লিখেও তো খবর নিস না। শেষে ‘তার করে
তােকে আনতে হ’ল? ছেলেবেলায় কতদিন এখানে থাকতিস সে
সব ভুলে গেলি?
মৃগাঙ্ক। ভুলে গেলুম, এ সুখবর তােমাদের কে দিলে মামী? তোলবার
মতন অবস্থার পরিবর্তন আমার তাে কিছু হয়নি যে, ঝ। ক'রে ভুলে
যাব? আমি তােমাদের যে মৃগু সেই মৃগুই আছি। কিন্তু ব্যাপারটা
কি বল তো? হঠাৎ ‘র’ করা কেন? আমি তাে সাতখানা
ভেবেই মরি।
যখন এসেছিল, সবই শুনবি।
( মৃদুহাশ্যে ) তােকে একটা
পরামর্শের জন্যে ডেকেছি রে, একটা বড় পরামর্শ।
তা পরামর্শের এমন উপযুক্ত পাত্র আর পাবে না! দিদির
তিনকুলে কেউ নেই, তার অর্থ আর অল্প ধ্বংস করছি আর দিবা-
রাত্র পরামর্শ দিচ্ছি। সে রকম পরামর্শ আমি খুৰ দিতে পারব।
এখন কথাটা কি বল তাে?-কিরে ধু, তুই যে একটাও কথা
প্রথম
মন্ত্রশক্তি
ক’চ্ছিস নি, ঘাড় গুজে বসে আছিস! তাের তো দেখছি আজও বে
হয়নি। হাঁ মামী, ঘরে এতবড় আইবুড়ো মেয়ে তােমাদের গলায়
জল উলছে কি করে ? আজকাল কন্যাসমস্যা যে অসমতার
চেয়ে বড়।
ফ।
ওরে সেই পরামর্শ করবার জন্যেই তাে তােকে ডাকা
হয়েছে।
মৃগাঙ্ক। বটে! রাধুর বিয়েটা বুঝি আমার পরামর্শের জন্যেই আটকে
আছে ? তা বেশ, আমিও পরামর্শ দিচ্ছি। বিয়েটা—এটা কি
মাস? ফান? বা, এই ফানেই দিয়ে দাও।
কৃষ্ণ। তুই কি মনে করছিস শুধু এই পরামর্শটুকুর জন্যেই তােক
ডাকা হয়েছে ?
মৃগাঙ্ক। তাও তাে বটে; এ আর এমন শক্তটা কি ? এ পরামর্শের
জয়ে আমায় তাে না ডাকলেও চলত।
তবে ?
বাণ ধীরে ধীরে উঠল
কৃষ্ণ। বাণি, মা, মৃগাঙ্কের জন্যে খাবার নিয়ে আয়, এইখানেই।
বাণ এ
মৃগু, বােস স্থির হয়ে শােন। আমাদের বড় বিপদ, তাই তােক
ডেকেছি।
মৃগাঙ্ক। বিপদ। তােমাদের বিপদে পড়ে পরামর্শ নেবার জন্যে
পর্যন্ত আমাকে কেউ তাে ডাকেনি। অনেকদিন এখানে যাতায়াত
নেই, আমাকে তােমরা এত বড় মাতব্বর ঠাওরালে কি করে বল
সে হঠাৎ? এতো বড় বাধ্য।
৪৮ মন্ত্রশক্তি দ্বিতীয় অঙ্ক কৃষ্ণ। সত্যি বাবা, বড় বিপদ ; আর সে বিপদে রক্ষা করতে পার বাবা, কেবল তুমি! মৃগাঙ্ক। বল কি মামী? আমি? কথাটা বড় ভাল ঠেছে না ; কথা শুনে মনে হচ্ছে তােমাদের চেয়ে বিপদটা যেন আমারই বেশী। মােন্দাটা কি ? আর ধোকায় রেখ না। কৈ মামাবাবু তাে বাইরে কিছু বল্লেন না, কেবল তােমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কৃষ্ণ। তিনি লজ্জায় বলতে পারেন নি। আমার শ্বশুর এক উইল করে যান, তুই জানি? মৃগাঙ্ক। জানব কি করে? আমি তাে উকীল মােক্তার নই, আর তার ওয়ারিসও নই যে, আমায় জানতে হবে। কৃষ্ণ। তুই তার ওয়ারিশ। মৃগাঙ্ক। অ্যাঃ! উঠিয়া দাড়াইল কৃষ্ণ। উঠে দাড়ালি যে? মৃগাঙ্ক। দাড়িয়ে থাকলে হয় বসে পড়তুম, নয় মুচ্ছা যেতুম! তােমরা ‘তার করে ডেকে আনিয়ে ঠিক দুপুর বেলা যে রকম আরব্য উপন্যাস আরম্ভ করলে তাতে বসে থাকলে এই রকম দাড়িয়ে ওঠাই তাে সঙ্গত। তার পর আর খানিক পরে তােমার কথা শুনে, পাগল হয়ে না ছুটে বেড়াই । কৃষ্ণ। ঠাটা নয়, সত্যিই তুই তার ওয়ারিশ। তিনি উইল করে মান- যদি ষােল বছর বয়েসের মধ্যে বাণীকে আমরা আমাদের ধরে বিয়ে দিতে না পারি, তা হলে এ বিষয় অাবে তােক। বাণী ষােল বছর বয়েস পূর্ণ হতে আর সাতটা দিন আছে; কিন্তু এ পর্যন্ত তার
প্রথম দৃ
মন্ত্রশক্তি
১১
পারে কোন সন্ধান নেই। কাজেই সাতটা দিন গেলে এ বিষয়ের
মালিক হবে তুমি।
মৃগাঙ্ক। বাঃ! কেউ বিষয় খােজে, কাউকে বিষয় খোজে। এ যে
দেখছি আবুহােসেনকেও কাবু করে দিয়েছে! তা, এ উইলের
কথা কে জানে ?
কৃষ্ণ। কেউ জানে না। জানেন তােমার মামাবাবু, জানি আমি,
আর জানেন যে উকীল উইল লিখেছেন, তিনি।
মৃগাঙ্ক। উত্তম! উকীলবাবুই পােয়াবারো। তাঁকে কিছু মােটারকম
দক্ষিণে দিয়ে দাও, তাহলেই এ উইলের খবর আর কেউ জানবে
তার পর তােমাদের বিষয় তােমাদের থাকবে। আমি সব
সইতে পারব মামী, বিষয় সইতে পারব না।
কৃষ্ণ। তাও কি হয় বাবা ? এ যে ধর্মের সংসার।
মৃ+এসে+কামশায়ে সে হাতুরে হয়েছিল
এ হল কেউ কখনাে করে। এমন উইনের কথা তুমি
মাসে বই
কৃষ্ণ।..
নও৯. বলতে নেই; তিনি যা ভাল বুঝেছিলেন,
করেছিলেন ; আমরা তার বিচার করবার অধিকারী নই; আমরা
তখন মতেইখ্য। কিন্তু মৃগু, এর একটা উপায়
আছে, আর সে উপায় একমাত্র তােমারই হাতে।
মৃগাঙ্ক। বল কি মামী, আমারই হাতে। আমি কোন্খানটায় হাত
দিতে পারি? একবার এক—যাক!-মােদ্দা সাত দিনের মধ্যে ।
ল। সেই প্তে এক নিকষকুলীন জামাই তােমাদের চাই-ই, না
महमति
দ্বিতীয় এক
হলে তােমাদের বিষয় আশয় কিছুই থাকবে না এ মন ব্যবস্থা
নয়! কিন্তু আজকালকার বাজারে পাশ” বিক্রী হয় “কুল” তাে
আর বিক্রী হয় না। হুকুম দিলে পৌণে পনেরাে গণ্ডা বি-এ,
এম-এ তােমার দোরগােড়ায় হাজির করে দিতে পারি, কিন্তু ও
জিনিষটা যে বড়ই দুষ্প্রাপ্য।
কৃষ্ণ। কেন বাবা, তুমি তো আছ।
মৃগাঙ্ক। আমি? এতক্ষণ ছিলুম, কিন্তু এখন আছি বলে তাে মনে
হচ্ছে না! আমি—একটা নেহাৎ লক্ষ্মীছাড়া—আমায় নিয়ে কি
করবে তােমরা? নেহাত যাদের মেয়ের দর নেই, মেয়েকে টুপ,
করে জলে ফেলে দেয়, তারাই আমাদের তল্লাস করে।
কৃষ্ণ। শােন মৃগাঙ্ক, জগতে কোন জিনিসের দাম নেই বলে পড়ে
থাকে, কারও বা দর বেশী বলে বিকোয় না। আমরা এখন সেই
সব দর-নেই-মেয়ের মা বাপেরও বেহ । তােমার অমত
কিসে? আমরা যখন নিজেরাই দিতে চাচ্ছি।
মৃগাঙ্ক। আমার অমত কিসে? হরি হরি ! মতই বা কিসে? তােমার
ভাগ্নে আছি, জামাই হব? বল কি মামী, এ কি সাহেব-বাড়ী?
ভাই-বােনে বিয়ে?-আরে রামঃ ! !
কৃষ্ণ। তাতে বাধে না; কুলীনের ঘরে এ রকম তো প্রায়ই হয়ে থাকে,
আমি কত দেখেছি। তুমি এতে অমত করলে আমরা পথের
ভিখিরী হব সে কথা তােমায় আগেই বলেছি। আর এও তাে
তুমি জান ? আমার শশুর বেঁচে থাকতে তােমার সঙ্গে বাণীর
বের সম্বন্ধ করেছিলেন।
মৃগা। তাতে জানি। তখনাে যে বকাটে বলে বেহাওনি এখনও
প্রথম দৃশ্য মশক্তি তত সেই বকাটে ; অবস্থার তাে কিছুমাত্র পরিবর্তন হয়নি মামী! কিন্তু তােমাদের যদি মতের পরিবর্তন হয়, আমার কিন্তু বড় হাসি পাবে, সে ভারী বি। তুমি যখন বরণ করে বলবে “কড়ি দিয়ে কিনলুম দড়ী দিয়ে বাঁধসুম, হাতে দিলুম মাকু, একবার ভ্যা করতে বাপু-আমি তখন নিশ্চয়ই হেসে ফেলব। তার পরে, এই বাণীকে কত কোলে-পিঠে করেছি-সে যখন লাল চেলী পরে ঘােমটা টেনে আমার সঙ্গে করবে শুভদৃষ্টি—আরে ছি ছি! থিয়েটারে এ রকম হলে খুব মানাত বটে, লােকে হাততালিও দিত ; কিন্তু সত্যি- সত্যি-না—আমার দ্বারা তা হবে না। আমার ভারি হাসি পাচ্ছে। তা হাসি পায় হেসাে, আমি কিন্তু ওকে বলে আসছি তুমি বিয়ে করতে রাজী আছ। ভাবনায় উনি যে কি হয়েইনসে কথা কাউকে বলবার নয়।তুই যাসনে, বাণী পাবার আনতে গেছে, আমি এলুম বলে। কৃষ্ণুপ্রিয়ার প্রান মৃগাঙ্ক। একেই বলে “খোজে ভেড়ড়া, আর যাচে ভেড়ড়! নাঃ- সংসারে কেউ নিগুণ নেই দেখছি। একবার একজনের দায় উদ্ধার করে মাথা কিনিছি, আবার সামনে এক বিষম দায়! কিন্তু আমার দ্বারা তো এ দায়ের উদ্ধার হবে না। যাকে একদিন বােন্ বলিছি, তাকে বিয়ে করব ? আর বিয়েই যদি করব, যাকে বিয়ে কমিটি তাকেই বা বন্ধু বলে পাশ কাটাব কেন ? শেকল পরব না বলেই । এখানে আবার শুধু শেকল নয়; শেকলের ওপর সােণার বেড়ী-কামিনী ও কাঞ্চন দুই-ই! কাজ নেই আমার অর্বেক রাজকাে আর এক রাতে দিদি আমার বেচে থাক। জরই কলায় সরে
মন্ত্রশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
পর—একটু আধটু টানি, আর বাইরে জহরার দুটো একটা গজল
শুনি। এমনি করে হাতের নাে বজায় থাকলেই বাটি।
জলখাবার লইয়া বাণীর প্রবেশ
,
একজন দাসী আসন ও জল আনিয়া দিল, বাণ খাবার দিল
বাণী।
এস মৃগু, জল খাও।
মৃগাঙ্ক। তাতে পাচ্ছি, কিন্তু এদিকে আমায় ‘তার করে আনলে কেন,
তা কিছু শুনেছিস ?
বাণী। কাণাঘুষােয় কিছু কিছু শুনেছি। মৃগু, তুমি একা আছ,
ভালই হয়েছে, তুমি কখন এ বিয়েতে সম্মতি দিও না।
মৃগাঙ্ক। আমি যে সম্মত হব, সেটা তুই এরই মধ্যে আঁচলি কি করে?
বাণী। আমি কিছু আঁচিনি ; অবস্থা এখন এমন দাড়িয়েছে, আর কোন
কথাই চেপে রাখা চলে না। তাই তােমায় নিতান্ত লজ্জহীনার মত
ব’লছি। আমি এ জন্মে কখনও বিয়ে করব না প্রতিজ্ঞা করিছি-
মা বাবা তা বােঝেন না, তারা জোর করে আমার বে দিতে চান।
কিন্তু মৃগুণা, আমি বলে রাখছি-বে’র রাত্রেই আমি মরব
আত্মহত্যা করব।
মৃগাঙ্ক। আরে, তােদের এই গাধ বিষয়ের মালিক হব, এই কথাটা
শুনে যেমন আশ্চর্য হয়েছিলুম, তার চেয়েও আশ্চৰ্য্য করলি তুই !
মেয়েমানুষ, বিয়ে করবিনি কিরে পাগ? তবে আমার সঙ্গে যে,
তাের বে হবে না, এ তুই নিশ্চিলি থাক। কিন্তু তাের ব্যাপারটা কি
বল দেখি
?
বাণী। যে আমার হয়ে গেছে।
প্রথম দৃ
মন্ত্রশক্তি
মৃগাঙ্ক। হয়ে গেছে। সে কি! ‘তার করে এনে তােরা যে আমার
heart failএর যােগাড় করলি! মামী বলে সাতদিন পরে
তােদের বিষয়ের মালিক হব আমি, তােকে করতে হবে বে;
তুই বলিস্ বে’ হয়ে গেছে—অথচ মামা-মামী এ খবর কিছুই
জানে না ! হারে, তােদের বাড়ীশুদ্ধ সব ক্ষেপেছে না কি? তাের
বে’ হয়ে গেছে? কাকে তুই
বাণী। মৃগুদা, আমি আমাদের গােপকিশােরকে
মৃগাঙ্ক। গােপকিশাের! সে শালা আবার কোখেকে এল?
ছোড়া কে ?
বাণী। মৃগুদা, এইবার হাসালে। গােপীকিশাের, আমাদের ঠাকুর
গােপীকিশোেরর মন্দিরে তুমি ব’সে। আমি এই ভগবানকে
আত্মসমর্পণ করিছি।
মৃগাঙ্ক।(রাম বল-ঘাম দিলে জ্বর ছাড়ল ! নইলে—এই সৎ ব্রাহ্মণ
বংশে, আমি তাে জানি, তাের তো এতটা উচ্চশিক্ষা হয়নি যে, মা-
বাপের অজান্তে ঝ। করে এক শাল গােপাকশােরকে লুকিয়ে রে করে
ফেলবি। বটে? অ বেশ। কিন্তু এদিকে উইলের খবর রাখিস কি?
বে’ না করলে যে কেও গােপীকিশােরও থাকবে না, তােদর
বিষয় সম্পত্তি থাকবে না। বুড়ােবয়েসে মামাকে যে দেশান্তরী
হতে হবে। এই দেশজোড়া নাম, এই অগাধ সম্পত্তি-ভেবে দেখ
দেখি বাণি—বুড়ােৰয়েসে এসব হারালে মামা কি বাচবেন? মামী
কি বাচবেন, তখন তাের দশা কি হবে ? বে তে তােকে করতেই
হবে বােন। নইলে তাে দ্বিতীয় পন্থা নেই।
(কাঁদিয়া ফেলিল) মৃগুদা, আমায় রক্ষা কর, আমায় একটা
"
বাণী।
মত্রশক্তি
দ্বিতীয় ও
সৎপরামর্শ দাও। যে বাবা আমায় এত ভালবাসেন, বুড়ােবয়সে
আমার জন্যে তার এই সর্বনাশ হবে, আমার মা এই বাড়ী ছেড়ে
মৃগুদা, কেন আমি জন্মেছিলুম, কেন আমি হয়ে মরিনি—কেন
দাদাবাবু আমাদের সর্বনাশ করে গেছেন?
মৃগাঙ্ক। কাদিসনি বােন্ কাঁদিনি। স্ত্রীলােক জাতটাকে যদিও আমি
দেখতে পারিনি—কিছু মনে করিনি বােন—আমি পেট-আলগা
লােক রেখে ঢেকে কোন কথা বলতে পারিনি কিন্তু তবু আমি
তাদের এ কান্না সহ্য করতে পারিনি। বে’ করব না, বল্লে চলবে না,
বে’ তােকে করতেই হবে—বিশেষতঃ হিদুর ঘরে। শবলেছে,
শীলােক মেয়েকে পিতা ধীম, তারপর মীম, তারপর
মৃগয়-সাতখুন মা! বেই, আর সেই সুয়েতেই
আলম খো।
কাজ তে মেয়েকে এত তৎ?
S!
বাণী। তাহলে কি হবে? বে’ না করে বিষয় না হয়, এমন কি কোন
উপায় নেই।
মৃগাঙ্ক। রক্ষে হবার যে সদুপায় ছিল, তাতে মামীকে বলুম। আমি
বলেছিনু উইনবান ছিড়ে ফেলে গাও সৰ ল্যাঠা চুকে যাক!
কিন্তু তাতে যখন এ সম্মত নন, তখন আমি আর কি ক ক ?
তবে একটা উপায় তােকে বাতলাতে পারি যাতে তাের বে কাও
হয়, অথচ বে করাও হয় না।
প্রথম দৃ
মত্রশক্তি
বাণী। কি যে হেঁয়ালি বল তুমি মৃগুদা! বে’ করা হবে অথচ বে’ করা
হবে না—সে যে সােণার পাথরবাটী! তা কি কখনও হয় ?
মৃগাঙ্ক। ওরে, সংসারে যে কি না হয় তাতে এ বয়েস পর্যন্ত বুঝলুম না ;
বেও হবে, অথচ হবেও না-এও হয়—তার জাজ্জল্য প্রমাণ
এই আমি।
বাণী। তােমার কি বে’ হয়েছে মৃগুদা?
মৃগাঙ্ক। না হলে এমন অভিজ্ঞের মত তােকে উপদেশ দিতে পারি ?
হয়েছে বৈ কি। দস্তুর মত হয়েছে! বাঙ্গালায় কাদায় জিনিসটা
যে কি, তা কি এখনও বুঝিনি ? এ দায় বাড়ে চাপালে লােকের
যে দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না! এই দায়ে পড়েই না এক হতভাগ্য
বাপ-মার, আমার মত আঁস্তাকুড়েও কারত্ব ছড়াতে বাধেনি।
বাণী। সে কি ?
মৃগাঙ্ক। কি বলব বাে গেরাের কথা, বছর তিনেক হল আমি এক
কন্যাদায়গ্রস্তের দায় উদ্ধার করে ফেলেছি। ছেলেবেলা থেকেই
প্রতিজ্ঞা করেছিলুম বিয়ের বেড়ী কখনও পায়ে পরব না; কিন্তু মায়ে
পড়ে প্রতি তাতেই তখন বের রাত্রেই সেই কলা-
রত্নকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেম যে, এ জন্মে সে আমার উপর স্ত্রীর
অধিকার স্থাপন করবে না।
বাণী। সে তাতে সম্মত হল ।
মৃগাঙ্ক। (সহাতে। হবে না কেন বাের তার দায় তাে উদ্ধার হল।
খাও দাও পর, মুখে হলে থাকবাস। তার সঙ্গে সম্বন্ধ পাতাম
এখন এই তিন বছর ধরে বন্ধুত্বই চলছে; জীবনের বাকী
দিন কটা ঐ বন্ধ করেই কাটিয়ে দেব। বাইরের লােকে কিছু
বন্ধু।
মশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
জানলে না ; সাপও ম’ল, লাঠিও ভাঙ্গল না। হায়-হায়—তাের
যদি এই রকম একটা বে’র যােগাড় করে দিতে পারতুম। কিন্তু
বােন্, সংসারে সবই সুলভ, কেবল আমার মতন পাত্র পাওয়াই যে
দুর্লভ—তা আবার তােদর ঘরে মেলা চাই।
বাণী। মৃগুদা, তােমার কথা শুনে অন্ধকারে যেন একটু আলাে দেখতে
পাচ্চি। যদি এমন বে’ হয়—যার সঙ্গে বে হবে—বে’র রাত্রেই সে
প্রতিজ্ঞা করবে—সে কখনও আমার উপর স্বামীর অধিকার স্থাপন
করবে না, তাহলে আমি বে’ করতে পারি। আর এমন বে হলে
সব দিকই রক্ষে হয়।
মৃগাঙ্ক। তাতাে বুঝলুম ; তুইও পারিস, আর সব রক্ষেও হয়। কিন্তু
সাত দিনের ভেতর তেমন ছেলে পাই কোথায় ?
একজন দাসীর প্রবেশ
দাসী। দিদিমণি, তােমাকে মা ডাকছেন।
বাণী । চ—যাচ্ছি।
জসী। ( মৃগায়ের প্রতি) কাবাৰু আপনাকে বার বাড়ীতে আছেন।
বাণী। মৃগুদা, তুমি যা হয় একটা ব্যবস্থা কর। কোয়েল,
তােমারু সৰু কথা- বেনু তুমি ও কুৰিৰালো ; দেখাে,
তুমি যেন আমার এ বিপদ দেখে পালিও না।
মৃণা। পালা তাে না-কি উপায়ই বা করব কি ? উপায় নেই
তাে আর উপায় হয় না। আচ্ছা মেয়ে এই বাণী—গােপকিশােরকেই
আত্মসমর্পণ করে বসে আছে—পাগল কি আর গাছে ফলে।
প্রথম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
অধরনাথের প্রবেশ
আপনি?
এ কে! অম্বনাথ না?
অম্বনাথ না? সেই-তো! কিহে অম্বর, তুমি এখানে
কোখেকে ?
অম্বর। আমি—আমি কাশীতে পাঠ শেষ করে এখানে প্রায় মাস
আষ্টেক ছিলেম স্যায় পড়বার জন্যে। আচাৰ্য্যদেব সম্প্রতি স্বর্গারােহণ
করেছেন, এখান থেকে চলে যাচ্ছি। কর্তার কাছে বিদায় নেওয়া
হয়ে গেছে, যাত্রার পূর্বে ঠাকুর প্রণাম করতে এসেছিলেম, দেখছি
মন্দিরের দ্বার বন্ধ, তা বাইরে থেকে প্রণাম করেই যাই।
মৃগাঙ্ক। আরে আমি যে এ বাড়ীর ভাগ্নে। তােমায় যে কতদিন পরে
দেখলুম! আমাকে আর আপনি কেন? তুমি যখন আমাদের
দেশে তােমার ভগ্নিপতির টোলে ব্যাকরণ পড়তে তখন আমি পড়তুম
ইংরিজী স্কুলে। আমিও তাে তােমাদের টোলে মাঝে মাঝে উৎপাত
করতে যেতুম মুগ্ধবোেধ নিয়ে। তা এ ‘মুগ্ধের’ তত আর ‘বােধ হল
, তােমার তো ফোটা আর টিকি দেখে বুঝছি তুমি একজন বড়
পণ্ডিত হয়েছ। আমাকে আর আপনি’ নয়—“তুমি ; আমরা তাে
একরকম সতীর্থ। তা বিদেয় নিয়ে যাচ্ছ কোথায় ?
অর। তুমি তাে সবই জান ভাই, নিজের দেশ তাে আর নেই। ছেলে-
বেলায় মা-বাপ মারা যান, দাদার ওখানে থেকেই মানুষ হই
খানেই যাচ্ছি—তােমাদের দেশে। মনে করিছি সেইখানে গিয়েই
টোল করব।
মৃগা। বেশ বেশ। চল, এক সঙ্গেই যাওয়া যাবে। আজকের দিনটা
থেকেও না, আমি হয় তাে কালই এখান থেকে রওনা দেব।
র। না, আমার নাম থাকা-
।
মন্ত্রশক্তি
विजो बह
মৃগাঙ্ক। আরে চল চল, কথা কইতে কইতে তােমার বাসা দেখে আসি,
থাকা না থাকা পরে বােঝা যাবে। (স্বগত) বাণী তাে বলে গেল
অন্ধকারে আলাে দেখতে পাচ্ছি, আমিও যেন আলাে দেখা-দেখব
করছি। চল—তােমায় টোল করাচ্ছি ভাল করে! (প্রকাশ্যে)
আরে অমন ভ্যাবাগঙ্গারামের মত দাড়িয়ে কেন ? এস এস
তােমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
আরকে একরকম গনিয়া লইয়া এখান
বেশ
वृक्ष তাের ঘড়িকে ঘােড় ছছটে কেন, মৃগাঙ্কর, সঙ্গে বে’ হতে পারে
কেন ?
ৰাণী। হা মা, বিয়ের জন্যে সতীনের উপরও মেয়ে দিতে তােমাদের
বাধবে না'
কফ। সতন!
বাণী সতীন হয়তাে কি? তিন বছর আগে মৃদয় বে হয়ে গেছে।
কৃষ্ণ। 'বে’ হয়ে গেছে , কৈ, আমরা তাতে কিছু শুনিনি। চারে-
সত্যিনা ও মিছে কথা বলেছে,
বাণী। ওর মিছে কথা কলবার-দায়? এর সতীন না থাকলেও তবু ওকে
বে’ করতু না-ও যে স্ত্রীলোকের উপর ঘৃণা
কৃষ্ণ। এ যে আবার নতুন ভাবনায় পড়নু ! মৃঙ আসার পর,
একটু বুক বেঁধেছিলেন এ কথা শুনে তিনি যে একেবারে ভেজ
পড়বেন।
বাণী। আমায় নিয়ে তােমাদের যত আয়—আমার মরণ হয় না !
প্রথম দৃশ্য
मक्षनखि
কৃষ্ণ। দেখ, আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিস্ নি।
বাণী ঐ বা আসছেন, আমি তাকে আর এ মুখ দেখাব না।
কৃষ্ণ । বিপদে তো কূলকিনারা খৈতে পাই না! হে গােঋকিশাের,
তোমার মনে এই চি? আর জমে কি পাপ করেছিলুম, যে এই
সঙ্কটে ফেল্লে গকুর বিপদ তুমিই দিয়েছ, তুমিই তুলে নাও, নইলে
আম কী প্রাণ যে যাই
"রমাবল্পভৈর পুনঃ প্রবেশ
রমা। মৃগাঙ্ক গেল কোথায়? তাকে ডেকে পাঠানুষ, কৈ সে তো
এনেও নেই। তাকে বুঝিয়ে বল্লে ? সে সম্মত হ’ল
কৃষ্ণ। আর সম্মত! মৃগুর সঙ্গে বাণীর বে, হতেই পারে না।
রা। কেন?
কৃষ্ণ। মৃগুর বে’ হয়ে গেছে; তার সে বৌ এখনও বেঁচে ।
রমা। বে’ হয়ে গেছে। তাহলে উপায়?
কৃষ্ণবিয়া কাঁদিয়া ফেলিল
মেয়ের কে নিয়ে এমন যন্ত্রণা বােধ হয় সংসারের আর কারও
হয়নি; এই সবই আমার অদৃষ্ট।
!ি মাঝে আছে আর সাত দিন,
किस-किसा?
রমা। কি আর হবে। হয় রাস্তায় গিয়ে দাড়াতে হবে, না হয় সতীনের
উপরেই বাণীকে
কৃষ্ণ। না না, তা আমি কখনও পারব না আমি দীনদুঃখী গরীবকে
মেয়ে দিতে পারি-মেয়ের বে’ না হয়, সর্বস্ব হারিয়ে তােমায় নিয়ে
মন্ত্রশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
গােলপাতার ঘরে রাজরাণীর মত থাকতে পারি কিন্তু তবু সতীনের
উপর মেয়ে দিতে পারব না! তুমি অমন কথা মুখে ও এন না।
ম+------ধয়ে আমাকে আর আমি নেইমার
নিয়েছে। আমিই এই জেনেছি। এ অবস্থার
এসইলে ধি।
মৃগাহের পুনঃ প্রবেশ
মৃগাঙ্ক। এই যে মামাবাবু, আপনাকে বার বাড়ীতে খুজে পেলুম না,
এইখানেই এলুম। মামী, তােমার চোখ ছলছল করছে! বাণীর
কাছে আমার কথা সব শুনেছ বুঝি ?
কফ। হ বাবা।
রমা। মৃগা, বাবা যখন তােমার সঙ্গে বাণীর সম্বন্ধ স্থির করেন, তখন
তার কথা শুনিনি; এখন কড়ায় গণ্ডায় তার প্রায়শ্চিত্ত সুরু
হয়েছে। তুমি বে’ করেছ এ কথা তাে আমায় জানাওনি, তা হলে
তােমায় মিছিমিছি কষ্ট দিয়ে আর এখানে আনতুম না।
মৃগাঙ্ক। (স্বগত) আমার বিয়েটা তাে এমন শুভ সংবাদ নয় যে, সাত
থানা গাঁয়ে খবর দিতে হবে! ( প্রকাশ্যে ) মামাবাবু, মামীমা
আমি তো তােমাদের জামাই’ হয়ে উপকার করতে পারলুম না,
কিন্তু বােধ হয় ‘ভাগ্নে থেকেই একটা উপকার করতে পারি।
রমা। সে কথা বাবা তােমার মামীর কাছে শুনিছি। বিষয়ের উপর
তােমার লােত নেই। তুমি মহংতুমি উইল ছিড়ে ফেলতে
বলেছিলে। তােমায় বকাটে মনে করতুমবাটে হলেও তুমি
মাও। কি ৰাৰা, তােমার এ উপকার তাে আমরা নিতে পারব
না। বাবার চরম ইচ্ছা-এ যে পূর্ণ কতেই হবে।
প্রথম দৃ মন্ত্রশক্তি মৃগাঙ্ক। আজ্ঞে, তার চরম ইচ্ছা পূর্ণ করুন না। সেই কথাই তো আমি বলতে এসেছি। বুমা। কি বল। মৃগাঙ্ক। যদি আপনাদের স্বঘর হয়, আপনাদের পাটা কিন্তু-অবস্থা হয়-যাকে বলে অন্য ভক্ষ্য ধগুণ—এমন পাত্রে বাণীকে দিতে পারেন ? রমা। এমন পাত্রের সন্ধান আছে না কি? মৃগাঙ্ক। সন্ধান কেন ? এমন পাত্র আছে। আপনাদের এই হক সীমানার মধ্যেই আছে। তবে আপনাদের পছন্দ হবে কি না, সেইটেই হচ্ছে কথা । কৃষ্ণ। এখন কি পছন্দ-অপছন্দের সময় আছে বাবা? যদি সতীনের উপর না হয়, স্বভাব-চরিত্র ভাল হয়— রমা। আর লেখাপড়া মৃগাঙ্ক। একেবারে অত ফরমাস করলে পেরে উঠবাে না। স্বভাব-চরিত্র ভাল, দেখতে শুনতে কার্তিক-আর লেখাপড়া? তা—বি-এ, এম-এ নয় বটে, কিন্তু পণ্ডিত। রমা। তুমি কার কথা বলছ মৃগাঙ্ক ? আমাদের সীমানার মধ্যে মৃগাঙ্ক। ঐ রকমই হয় মামাবাবু! লণ্ঠনের নীচেটাই বেশী অন্ধকার কিনা; তাই আপনাদের নজরে ঠেকেনি। আপনাদের কাছে দূর- ছাইয়ের দলে যারা, তারা চিরদিনই ঐ দূর-ছাইয়ের দলেই পড়েথাকে। কৃষ্ণ। কে বাবা, কার কথা বলছ ? মৃগাঙ্ক। দেখে মামী, শুনেই নাক সিটকে না। তােমাদের যে নতুন পুরুৎ হয়েছিল—অরনাথ—তাকে পছন্দ হয় ?
মত্রশক্তি
দ্বিতীয় অং
রমা। অধরনাথ!
মৃগাঙ্ক। আজ্ঞে হ্যা, অম্বনাথ।
বা। রাম—ঐ গরীব পুরুৎটা-
মৃগাঙ্ক। কিন্তু মামাবাবু, এখানে ‘রাম’ বল্লে তাে আর উইলের ভূত
ছাড়ছে না! সাতদিনের মধ্যে যে স্ব-ঘরের ভেতর মেয়ের বে’
দেওয়া চাই-ই।
রমা। তাতে চাই, কিন্তু তা বলে ঐ
তাতে দোষ কি? যদি আমাদের খবর হয়-ছেলেটাও তে
দেখতে বেশ, নরম-সরম—আর পুরুৎগিরি করে? সেও তাে কিছু
অশু নয়; ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের কাজই তো ঐ। নাই বা হ’ল বি-,
এম-এ পাশ করা, একটা বিয়ে তো নেপণ্ডিত তো বটে? আর
শুনিছি, সব ব্রাহ্মণদের পূর্বপুরুষই তো ঐ পুরুৎগিরিই করতেন।
এখন যেন ইংরেজী শিখে চাল বদলে গেছে।
মৃগাঙ্ক। পায়ের ধূলাে ও মামী, পায়ের ধূলাে দাও, এই ঠিক বলেছ।
এই চালকলা বাধা বামুনদের ঘরে জন্মায়নি বলে যে নিজেদেরই গাল
দেওয়া হয়। কোন্ বামুনই বা গ্লাভষ্টোন কি বার্কের বংশধর?
আর কোন বামুনেরই বা পূর্বপুরুষ হৰড়ার পােল, নয়
মনুমেন্ট?
কৃষ্ণ। তুমি আর মত কোরাে না। দেখ যদি ভগবান অকূলে কূল
দেন; আমার এ পাত্রে কিছুমাত্র অমত নেই।
নেই
কেন বিতাড়িয়েছিলাম বলেও
প্রথম দু
মন্ত্রশক্তি
৩ অৰে ৰসেই মত্ত করবে না।
ই দায়বোমা কেউ নই ?
রমdr~-মৃগতিয়ার হে পড়ে?
। আপতন পে তা কি পারি? খাটে বলে
जमिनसैन ? पारित গনাদের কাছে
-বাকরুন.
নেগীনিকোেমাৰাবু, এতে আর অমত করবেন
, আমি তাকে এখনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
এস্থান
রমা। তোমার কি মনে হয় ?
কৃষ্ণ। আর মনে হওয়া-হ’য়ি নেই। আমি গােপকিশােরের পূজোর
টাকা তুলে রাখিগে। তুমি .তিন কে না। ছেলেটা
যথার্থ--পাত্র নিজেকে নিতে পারি-জেনা—
সেলে নিয়ে ভাগ্যি। এখন ঠাকুরের ইচ্ছেয় চার
হাত এলেই হয়। এর
রমা। শেষে এতদূর নামতে হ’ল! যে একদিন আগে আমার বাড়ী
সামান্য পুরুৎগিরি চাকরী করত, যে আমারই টোলে ভাত রাখত,
যমিলল লেইকন-~~-ক্তিতেও
ৱিজিক চেয়ে ভিক্ষুক-বিত রায়ের অগাধ সশক্তির
ইলি আমার একমাত্র আদরের কন্যা বাণীকে তারই হাঁটু
ধরে সম্প্রদান করব-অদৃষ্টের এত বড় পরিহাস আর কখনও
কারও ভাগ্যে হয়েছে কি না জানি না।
৪
মশক্তি
প্রথম পৃ
অন্যদিক দিয়া বাণী কমিয়ার পুনঃ এবেশ
বাণী। তােমরা কি ভেবেছ বল তো মা ?
কৃষ্ণ।
কেন ?
বাণী। আমি কি বাড়ীর একটা শেয়াল কুকুর? আপদ বালাই ?
আমাকে এই মন করে দয়ে খেতে কোদর এতটুকু
কেন বল্ দেখি বাণি, এমন কথা বলছিস? একে আমরা মরছি
এই আলায়, দেখছিস তো ভেবে ভেবে এই ক’দিনে উনি কি
হয়ে গেছেন।
বাণী। তাতে দেখছি সব, বুঝছি সব; কিন্তু মা, আমিও তো একটা
মানুষ, আমারও তাে প্রাণ আছে, আত্মসম্মান আছে, মা-ছে?
আমি হরিবল্লভ রায়ের পৌত্রী, আর আমার সঙ্গে তােমরা বেছে
বেছে বে’ দিতে যাচ্ছ যত দুনিয়ার হতভাগ্য হাড়হাবাতে দেখে!
কৃষ্ণ। বালাই বালাই, ও কি কথা? অমন কথা বলিস্ নি মা।
বাণী। প্রথমে তো সম্বন্ধ করলে একটা মাতাল বখাটের সঙ্গে , তার পর
যখন দেখলে যে তার বে’ হয়ে গেছে, তখন তারই কথায় একটা
পথের ভিখিরী—যাকে কাল সকালে আমার মন্দির থেকে দূর
দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি—তারই পায়ে আমায়
দিতে যাচ্ছ?
কৃষ্ণ। তুই সব শুনেছিস ?
বাণী। শুনি নি? মৃদা বাবাকে বলছিল, আমি সব নিছি। আমি
প্রাণ থাকতে কখনাে ওকে বে’ করব না।
কৃষ্ণ। কেন ওর দোষটা কি? গরীব বলে ? - লেখা
बम प्रय
ফতে মানি, জামাই ৰাৰে এইখানে, গরীব হল তে কি
বাণী। শুধু গরীব। একটা গণ্ড মূখ, যে সামান্য একটা পূজোর বিধি
জানেনা, যে গামার ফুলে শ্যামের পূজো করে-
কৃষ্ণ। এই? তা মা, ভুল কার না হয়। আর পূজো করতে জানে না
এটা কি একটা মস্ত দোষ? এর তত পূজো করতে জানেন না,
তা হলে ব, এরাও মূখ।
বাণী। মা, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! কার সঙ্গে কার তুলনা
কই? আমার বাবার সঙ্গে তুলনা-ঐ
তুলনা-ঐ একটা হতভাগ্য
ভিখিরীর ?
কৃষ্ণ। ছি বাণি, অকল্যাণ হবে, বার বার ও কথা বলিস নি, লেখাপড়া
শিখে দিনরাত পূজা-অর্চনা করে তাের এই জ্ঞান হ’ল? আর মূর্ণ
কিসে? একট...তে জানে, তাতে তো ও পণ্ডিত ; না হয়
ইংলিই জানে না। আর, বামুন পণ্ডিতয়া তো চিরদিনই গরীব,
তাতে কি তাদের সম্মানের পাথর হয় ?
বাণী। তুমি যাই বল মা, আমি কখনাে ওকে-না-না-আমি
কখনো তাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করতে পারব না, স্বামী বলতে
পারব না।
কৃষ্ণ। কেন পায়ৰি নি? আমরা যদি গরীৰ হতুম, আমাকে কি না
বসনি। আমাদের সঙ্গে সম্বন্ধ আখতিস নি। আমাদের
শাকি? ছি মা, মা ঠাণ্ডা করে বােঝ। বড় বিপদে
পড়ে, যাতে সব দিক রক্ষে হয়, এই জন্যেই আমরা এই বে দিতে
যাচ্ছি। এনএবিয়ে ভিন্ন যে আর উপায় নেই।
মত্রশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
ঝগ। ল বুঝতে পেরেছি, আমি নামলে তােমরা নিশ্চিন্ত হচ্ছ না!
আমি আত্মহত্যা ক’ কম বেৰুষ মা।
কৃষ্ণ। যা ভাল বােঝ, বল ওঁকে, উনি আসছেন ; আমি আর তােমাদের
কোন কথায় নেই বাপু।
রমাবল্লভের পুনঃ প্রবেশ
তােমার মেয়ের সঙ্গে তুমি বােঝাপড়া কগে, আমি হার মেনেছি।
এস্থান
বাণী। বাবা, এ কি রকম কথা উঠেছে ? তার চেয়ে তােমরা
চিত্রার জলে ভাসিয়ে দিতে পারতে না, সব ল্যাঠা চুকে যেত!
রমা। বাণি, মা আমার, সৰ্বস্বধন আমার। এ আমার পাপের
প্রায়শ্চিত্ত মা ! তাের চেয়ে এতে কি আমারই বেশী অপমান নয় মা?
কাদিয়া ফেলিলেন
বাণী। (স্বগত) এ কি বিপদ! মা কাদছেন, বাবার চোখে জল
আমার একটি কথায় এদের চোখের জল শুকোয়—কিন্তু আমি কি
করে—কাল যে আমার বাড়ী চাকরী করেছে-তাকে স্বামী বলে
স্বীকার করব, প্রভু বলে স্বীকার করব, তার দাসী হব?
রমা। বাণি, মা চুপ করে থাকলে হবে না, আজই এর যা হয় একটা
শেষ মীমাংসা করতে হবে। তোর কথা পেলে আমি তাকে
ডাকিয়ে তার মত জিজ্ঞাসা করব।
বাণী। (স্বগত) অসহ! তার আবার মত! এ অদৃষ্টে ছিল।
আমিকে অমন কৰিছি, এবার সে আমার উপর কর্তৃত্ব
ক েএ ক'রবে আমার অপমানের শােধ নেবে-এ’তে তো
তার মত হয়েই আছে।
==
প্রথম দৃ মশক্তি এক্স- রমা। তাের এতে মত নেই। তবে তাই হক মা, বুড়ােবয়সে তাের হাত ধরে গাছতলায় গিয়ে বাস করিগে! ও--আমার কপালে এও ছিল! এও ছিল ! এর পূর্বে আমার মৃত্যু হয় নি কেন? বাণী। (কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া) বাবা! কেন মা ? এ ছাড়া কি কোন উপায় নেই ? রমা। কোন উপায় নেই। বাণী। তবে বাবা, তাই হক, তাই হক ! তােমরা সৰ্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখিরী হবে—এ আমি কখনাে সইতে পারবাে না। রমা। বাণি, মা, তুই যথার্থ আজ আমার মার কাজ করলি। তােমায় কি বলে আশীর্বাদ করব মা-তুমি মনের সুখী হও—তুমি মনে রমা। বাণী। সুখী হও ! বাণী। কিন্তু বাবা তােমায় একটা কথা রাখতে হবে। রমা। কি বল মা ? বাণী। তুমিও এই প্রতিজ্ঞা কর যে, সে এখানে একেবারে থাকতে পাবে না। আমিও যেমন আছি ঠিক তেমনি থাকতে পাব; সে জন্মের মত এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে। রমা। চলে যাবে। এখানে থাকতে পাবে না? বাণী। না। না। তার সঙ্গে বে হবে এই পৰ্যন্ত—আমার উপর তার কোন অধিকার থাকবে না। আমি যেমন গােপীকিশােরের দাসী, তেমনি চিরদিনই গােপকিশােরের দাসীই থাকব—আর কারও নয়। রম। মা, তুই আমায় বাচালি মা ! আচ্ছা, তাই কথাই বলব। হবে, এই
मावलि
বিতীয়
বাণী।
। কত তপস্যায় তােমার মত বাপ পাওয়া যায় বাবা! দেখাে এ
কথা তুমি ভুলে যেও না কিন্তু।
রে না, একি ভুলে যাবার কথা ?—আচ্ছা মা, তুই একটু অন্যত্র
যা, আমি অম্বরকে এইখানেই ডাকতে পাঠিয়েছি, দেখি সে আবার
রমা।
কি বলে।
বাণীর এন
রমা। এখন অম্বর সম্মত হলে হয়। সম্মত না হবার তাে কোন কারণ
দেখিনি; হঠাৎ এত বড় সৌভাগ্যলাভ এক বাতুল ভিন্ন কেউ
প্রত্যাখান করে না। বাণীর প্রতিজ্ঞার কথাটা তাকে বলতে হবে ;
না বলা ঠিক নয়! সে গরীব, তার বিবাহ করা তাে টাকার জন্যে ?
তাকে বেশী করে টাকা ধরে দেব, সে অনায়াসেই এতে সম্মত হবে।
মৃগাঙ্ক ও অম্বরের প্রবেশ
মৃগাঙ্ক। মামাবাবু, আমি অম্বরকে সব কথাই বলিছি, কিছু লুকোইনি ;
এখন আপনারা কথাবার্তা ক’য়ে ঠিক করে নিন্। এতো এনে
একেবারে গাছ থেকে পড়েছে, কোন উত্তরই দেয় না।
( জনান্তিকে অম্বরের প্রতি) অম্বর, ভাই, চট করে রাজী হয়ে
পড়ো। এ পাঁচসাতটা দিন আমাকে এইখানেই কাটিয়ে যেতে
হবে ফলারের লােত ছাড়তে পারব না। প্রাণ খুলে কথা কও,
আমি এখন আসি।
রমা। অম্বর, মৃগাঙ্কের কাছে যখন সবই শুনেছ, নতুন করে বাবার
কিছু নেই। তবে আমার এই প্রথম অনুরােধ—কাল সকালে বাণী
এথম দৃ
মন্ত্রশক্তি
তােমার প্রতি যে আচরণ করেছে, ছেলেমানুষ বলে তােমাকে তা
ক্ষমা করতে হবে।
অম্বর। আমি বলছিলেন, আমার সম্বন্ধে যখন আপনাদের এই রকম
ধারণা
রম। তা থাক, কিন্তু তুমি বল যে তুমি ভুলে যাবে ? আমি যে,
তােমায় চিনি না, তা নয় ; তােমার কথার দর আছে এটা আমি
খুবই বিশ্বাস করি
অহর। আমায় একটু ভাববার সময় দি।
রম। সময় দেবার মত অবস্থা কৈ অম্বর ? প্রতিমুহুর্তে, যে বিষের
জ্বালা আমি অনুভব করছি তা কি তুমি বুঝতে পারছ না? অম্বর,
তুমি এ বিবাহে সম্মত না হলে আমি পথের ভিখিরী হব—আমার
আর গত্যন্তর নেই।
অম্বর। এত বড় একটা দায়িত্বপূর্ণ কাজ—আমি হঠাৎ এর কি উত্তর
দেব ? তার উপর, এইমাত্র আমার দীক্ষাগুরুর নিকট হতে এক
পত্র পেয়েছি। তিনি আসাম অঞ্চলে কতকগুলি চতুম্পাঠী স্থাপনের
উদ্যোগ করছিলেন, ফিহঠাৎ দীক্ষিত হওয়ায় তিনি যে তাঁর
অর্থ্য শেষ করতে পারবেন তার আশা নেই ;কারণ তিনি
লিখেছেন, এ পীড়া সাংবাতিক। পত্রে তিনি আদেশ করছে
কালবিলম্ব না করে আমি যাতে সেখানে উপস্থিত হই, তার এ
কার্য্যের সমস্ত ভার গ্রহণ করি।
রমা। বেশ ভাল কথা। কিন্তু এ কার্যের জয়ে তিনি অর্থের কোন
ব্যবস্থা করতে পেরেছেন কি না জান? সে কথা কিছু
লিখেছেন ?
মশক্তি
দ্বিতীয় অঞ্চ
সম্পত্তি দেব ;
অম্বর। সে কথাও তিনি লিখেছেন। অর্থ সংগ্রহ তিনি বিশেষ কিছু
করে উঠতে পারেন নি, সে ভারও আমায় নিতে হবে।
রমা। তবে তাে বাবা, গোপীকিশাের সব দিকেই অনুকূল দেখছি।
তুমিও একটা বড় কাজের ভার নেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, এতে
তােমার প্রভূত অর্থের প্রয়ােজন। তুমি যদি আমার কন্যাকে
বিবাহ কর, আমি তােমায় বাৎসরিক ১২০০০ টাকা আয়ের
এ ছাড়াও যদি এককালে উপস্থিত দশবিশ হাজার
টাকার প্রয়ােজন হয়, আমি তাও দিতে প্রস্তুত।
অম্বর। আমায় ক্ষমা করবেন, আমায় অর্থের লােভ দেখাবেন না।
বিবাহ আমার অসাধ্য। আমার আরও অনেক বাধা আছে, সে সব
কথা আমি আপনার কাছে বলতে পারব না।
রমা। (স্বগত)
(স্বগত) এ কি ঔদ্ধত্য। এ কি বাতুল ? আমি বল্লভ
রায়, আল দীন-দুঃখীর মত এই ভিক্ষুকের কাছে কৃপাপ্রার্থনার
এ অনায়াসে নামায় প্রত্যাখ্যান করছে! ( প্রকাশ্যে) অম্বর,
আমার প্রতি অবিচার করো না। তোমার আর কি কি বাধা বল।
কেন তুমি আমার অর্থ সাহায্যকে প্রলােভন মনে করছ ? আমার
জামাইয়ের সম্মানরূপে তো এটা ধরতে পার; আর তাও যদি না
ধর, মনে ভাব’-এ না হয় আমার সংকৰ্ম্মে দান।
এ যে দান নয়, এ তর্ক আমি তুলতে চাই না। আমার নানা
বাধার মধ্যে প্রধান বাধা, আমি গুরুদেবের কার্যভার গ্রহণ করলে
আমাকে অনির্দিষ্ট যমজ আসাম অঞ্চলে থাকতে হবে।
স্থান অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ; সেখানে পরিবার নিয়ে থাকা কোনমতেই
যুক্তিসঙ্গত নয়।
;
প্রথম পৃ মন্ত্রশক্তি ৭১ রমা। বেশ, এরও মীমাংসা আমি তােমায় করে দিচ্ছি অম্বর। (দেখছি বিবাহে তুমি অনিচ্ছুক। ভালই হয়েছে, আমিও তােমায় যে কথা বলতে যাচ্ছিলেম, সে প্রসঙ্গ তােমার দ্বারাই উত্থাপিত হ’ল । বিবাহের পর আমার কন্যার কোন ভারই তােমায় গ্রহণ করতে হবে না। আসামেই হ’ক কিংবা আর যেখানেই তুমি থাকতে ইচ্ছা কর, আমি তােমার সেখানেই স্বতন্ত্র থাকবার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি প্রতিজ্ঞা করবে যে, বিবাহের পর আমার কন্যার সঙ্গে তােমার কোন সম্বন্ধ থাকবে না। এতে কি তুমি স্বীকৃত আছ ? 'অম্বর। না। রমা। না ? কেন? এই তো একটু আগেই তুমি বল্লে বিবাহে তুমি ইচ্ছুক নও। অম্বর। বিবাহে আমার ইচ্ছা নাই সে কথা সম্পূর্ণ সত্য ; কিন্তু যদি বিবাহ করতেই হয়, শাস্তু-শাসন কখনাে ত্যাগ করতে পারব না। বিবাহের মন্ত্র আমায় অগ্নি, দেবতা ব্রাহ্মণ সাক্ষাতে কোন প্রতিজ্ঞা পাঠ করাবে? ইহ এবং পরজীবনের জন্য আমায় যে পবিত্র বন্ধন স্বীকার করতে হবে, যার সমস্ত সুখ-দুঃখের সঙ্গে এক হলেম বলে অঙ্গীকার করতে হবে, বিবাহের এই সমস্ত উদ্দেশ্য পালন করব না মনে রেখে, শুধু মুখে আমি সেই সব পবিত্র বেদমন্ত্র উচ্চারণ করব? পিতৃতুল্য আপনি, অন্নদাতা আপনি, আপনি আমায় এ আদেশ করবেন না। এতবড় মিথ্যাচরণ আমি কখনই করতে পারব না, আমায় আপনি ক্ষমা করুন। মা। অম্বর, তুমি যা বলছ সব সত্য। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এইটুকু মনে করবে আমি বিপন্ন, মনে করতােমার কাছে আজ আমি ৭২ মন্ত্রশক্তি দ্বিতীয় অঙ্ক সাহায্য-প্রার্থী, মনে---একফিনলে ছি, তােমার অত ছিল, সে তার সমস্ত গ, সমস্ত অহঙ্কার দিয়ে বিয়ে, তােমার করুণার ভিখারী। তােমার মন উচ্চ, পরের উপকারের জয় ও আত্মত্যাগ কি তুমি করতে পারে না? দেখ স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যােলন যদি বল—এর চেয়ে বেশী কৰ্তব্য পালন কে করতে পারে? তার বিষয় সম্পত্তি, তার পিতামাতার মান-সম রক্ষা, সবই তাে তুমি তাকে দেবে—এতে কি তােমার ধর্ম থাকবে না ? অম্বর। আমায় একটু ভেবে দেখতে দিন, একদিন সময় না দেন- একঘণ্টা। আমি একবার ভাল করে বুঝে দেখি। রমা। বেশ, তাই হক, তুমি ভেবেই উত্তর দিও। (স্বগত) কি স্পর্ধা! এ কি বুঝতে পারছে না যে, কার কাছে মাথা নীচু করেছি, কি অপমান সই করছে! যাক, অদৃষ্টই বলবা—অদৃষ্টই বলবান্ ! অম্বর। তাই তো, এ কি ভীষণ পরীক্ষায় আমায় ফেল্লে প্রভু? আমি তাে আজই এখান থেকে চলে যাচ্ছিলেম, কোথা থেকে মৃগাঙ্ক এসে আমার কাল হ’ল! না, এ কখনো আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। বিবাহ ? নিজের স্বাধীনতা বিক্রয় করে বিবাহ ? স্ত্রীর উপর অধিকার পরিত্যাগ করে বিবাহ ? এ অসম্ভব! গায়ে পুনঃ প্রবেশ মৃগাঙ্ক। কি ভাই, কথাবার্তা সব শেষ হয়ে গেল । অর। । মৃগায়। আমি আনি ও “হ” হতেই হবে। বাবা, কন্যাদায়-ঘাড়ে চাপলে তাে আর রক্ষা নেই। কবে দিন ঠিক হল ?
প্রথম মন্ত্রশক্তি মৃগাঙ্ক। ; অম্বর। মৃগাঙ্ক, আমি স্থির করেছি, আমি এ বিবাহ কবুবু না। মৃগাঙ্ক। আরে সে কি হে? তবে ঠিক হ’ল কি ? অম্বর। বিবাহ যে করব না এইটিই ঠিক হল। মৃগাঙ্ক। কেন বল দেখি? এত বড় একটা রাজত্ব, তার সঙ্গে এক অপরূপ সুন্দরী! রাজকন্যা বল্লেও চলে। তােমার আবার কি রােগে ধরল’? যার সঙ্গে দেখা হ তাই যে দেখি মৃগাঙ্কমােহনের ধাত! কেউ যে আর পরাধীনতার হীনতায় বাঁচতে চায় না। যাঃ বাবা! অম্বর। মৃগাঙ্ক, তুমি আমার বাল্যবন্ধু ; তােমার কাছে আমার কোন কথা, গােপন করা উচিত নয়। রমাবল্লভবাবু বলেন, আমি তার কন্যাকে বিবাহ করে অর্থ নিয়ে এদেশ থেকে একেবারে চলে যাই। ভাল কথা ; এতে তো অমত করবার কিছুই খুজে পাইনে। অম্বর। কিন্তু এত বড় মিথ্যাচার- মৃগাঙ্ক। মিথ্যাচারটা কিসের ? অম্বর। মিথ্যাচার নয় ? কি মন্ত্র পড়ে বিবাহ ক’তে হয় জান ? শালগ্রামশিলার সমক্ষে, অগ্নি সাক্ষ্যে, বেদমন্ত্রে, কঠিন প্রতিজ্ঞা করতে হয়। প্রতিজ্ঞা করতে হয়—“যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং মম।” প্রতিজ্ঞা করতে হয়-“ও মম ব্ৰতে তে হৃদয়ং দধাতু। চিত্তম চিত্তম্ভেহন্ত। ব্রাহ্মণবংশে জন্ম গ্রহণ করে, সম্মুখে ব্রহ্মরূপী অগ্নি ও ব্রাহ্মণমণ্ডলী-উন্ধে চির-অচঞ্চল ধ্রুবতারা-এদের সমক্ষে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে প্রতিজ্ঞা করব—“আজ থেকে তােমার সকল ভার আমার, তুমি আমার পাপ-পুণ্যের ভাগী, আমি তােমার পাপ-পুণ্যের ভাগী—আমাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই—আমরা দুইয়ে এক-এক প্রাণ একমন—পৃথক হ'লেও এক দেহ—আমাদের সাধনা এক, সিদ্ধি মম মশক্তি দ্বিতীয় আৰু এক-আমাদের সুখ-দুখ এক—আমাদের মুক্তি এক পথে”—আর পরমুহূর্তেই তার সঙ্গে সকল সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করে দেশত্যাগী হব? এতবড় মিথ্যাচার কি ধর্ম কখনো লইবেন? (a - t6a3k7 মৃগাঙ্ক। বল কি ? যা বাবা! বিয়ের মন্ত্রে এত ? এই রকম করে দিব্যি করে পরিবারের সকল ভার নিতে হয় ? ভযোমে বলে পরিবার পুরুষের বাসী। এ যে দেখছি ঠিক উল্টা! এ তাে দেখছি নানা রকম দিব্যি করে পুরুষকেই তো স্ত্রীর কাছে চিরদিনের জন্যে দাসখত লিখে দিতে হয়। এক মন, এক এল? তার হৃদয়টা আমার, আমার হৃদয়টা তার ? ওহে দিব্যি করে আমাকেও বিয়ের সময় এই সব বলতে হয়েছে না কি ? অম্বর। তা হয়েছে বৈকি ; সকল বিবাহের মন্ত্রই এক। মৃগাঙ্ক। তাহলে প্রতিজ্ঞা ঠিক রাখতে হলে, এই হৃদয় বস্তুটা তো আর কাউকে সমর্পণ ক চলে না। আচ্ছা, যদি “স্বামিত্ব” ছেড়ে স্ত্রীর সঙ্গে শুধু বন্ধুত্ব করা যায়, তাহলে? অম্বর। বন্ধুত্ব তাে একটা অংশ ; স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পরম বন্ধু, আবার পরস্পরের পরম অবলম্বন। উভয়ের আকাঙ্ক্ষা, প্রণয়- মৃগাঙ্ক। থাক থাক, ও-ও আমি বুঝে নিয়েছি, আর তােমায় বলতে হবে না। তােমায় বােঝাতে এসে তুমিও যে আমায় ভাবিয়ে দিলে। কিন্তু আমার যা হয় পরে করা যাবে, এদের এখন কি করি বল তাে? বিষয়টা বরবাদে যায়- অস্বর। কিন্তু পরের বিষয় দেখতে গিয়ে আমার ইহকাল পরকাল তাে বরবাদে দিতে পারি না । মৃগাঙ্ক। তা নিজের সঙ্গে প্রতারণা না করলে তাতে পাই না। অন্তত প্রথম দু মন্ত্রশক্তি মানুষের তা পারা উচিত নয়। বাবা, যেরকম ঘটা করে প্রতিজ্ঞা বহর দেখলে, তাতে আমারই যে প্রাণ আঁতকে উঠছে! কে জানে, তিন বছর আগে একদিন অন্ধকার রাতে কি বলে ফেলেছিলুম- তখন তো ততটা খেয়াল ছিল না। তাহলে মামাবাবুকে কি বলি বল তাে। অম্বর। তুমি ভাই, তাকে বুঝিয়ে বলগে, আমি কিছুতেই এ বিবাহ ক'ৰ না। তিনি আমার অন্নদাতা,প্রভু, আমি বারবার তার সামনে এ কথা বলতে পারি না। মৃগাঙ্ক, তুমি আমায় এ দায় থেকে রক্ষা মৃগাঙ্ক। (স্বগত) বাবা, ভেড়া বানাতে এসে নিজে ভেড়া বনে গেলুম নাকি ? আমিএখন কোন্ সুরে গাই? কোন্ শাল জাত যে বন্ধুত্বে এত বিপদ ? ( প্রকাশ্যে ) আমি আর মামাবাবুকে বলতে পারব না, মামীকে বলিগে, তিনি যা হয় করবেন। বুঝাই ? এখুনি হে মন্দিরস্থ দেবতা, আমার হৃদয়ে বল দাও! আমি চিরদিন অকপটে তোমার পূজা ক'রে এসেছি, তােমার কৃপায় যেন কর্তব্যপথ হতে ল না হই! বলে দাও দেব,এখন আমার কর্তব্য কি? আমি মনের দুর্বলতা এখনো বুঝতে পারছিনি। আমার এক একবার মনে হচ্ছে যে, এ বিবাহ করাই আমার কর্তব্য। মনে হচ্ছে—দেব- প্রতিমার নিত্য-সঙ্গিনী যে দেবীকে আমি শ্রদ্ধার চক্ষে দেখে এসেছি —যার ঐকান্তিক ভক্তি দেখে আমার বিরােধী স্বাক্ষতিপূর অনুরাগী হয়েছে-তাকে চির-দারিদ্র্যের অন্ধকারে ফেলে রেখে কাপুরুষের মত পালানাে আমার উচিত নয়। মনে হচ্ছে তার মন্ত্রশক্তি দ্বিতীয় জয় চিয়াকাষের মধ্যে কে প্রতিষ্ঠিত করে আত্মবিসর্জন করাই আমায়! কেন বাণীর ভাবী দুঃখের কল্পনা করে আমার অন্তর কেঁপে ওঠে? আমি কি নিজের অজ্ঞাতে তাকে ভালবাসি? কামনা ছায়া কি আমার চিত্তাধিকার করেছে। আর এ কি সুখপ্ত লহরী আমায় চিরশান্ত হৃদয়তলে অকাৎ সমুদ্র- কলেজেপীররে জেগে উঠছে। কৃষ্ণুপ্রিয়ার পুন: প্রবেশ কৃষ্ণ। অরনাথ। অম্বর। এ কি ম! আপনি ? বাবা, তুমি সকলের কথা ঠেলতে পারবে, কিন্তু আমার কথা ঠেলতে পারবে না। আজ আমি তােমার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসেছি—ভিক্ষা! আমি শুধু হাতে ফিরে যাব না। তােমায় বাণীকে গ্রহণ করতেই হবে। তোম। ভিন্ন আমাদের আর অন্য কোন নিই। কর বাণীর কথা কিছু মনে না ! সে তােমার সঙ্গে অনেক অসঙ্গত ব্যাভার করেছে-তার সে কথা নিজ গুণে ভুলে এ বিপত্তি থেকে আমাদের রক্ষা করে যথার্থ ব্রাহ্মণের ছেলের কাজ কর। অস৪: ৫৭, অম্বর। মা, আপনি এ কথা বলে আমায় প্রত্যয়ন করবেন ন', আমি আপনার সন্তান। কৃষ্ণ। শুধু মুখের কথা বল্লে হবে না; যথার্থই তােমাকে আমার সন্তান হতে হবে। আমি মেয়ে দিয়ে ছেলে পাব, এই ভরসায় তােমার কাছে এসেছি। আমি জানি তুমি ধার্মিক। তোমার মত পুকে আর যে গল"গর কেষ্টক কাশি খুশি। বল,
প্রথম স্থ
শক্তি
তুমি বাণীকে দাসী বলে গ্রহণ করবে ? তুমি যতক্ষণ বলবে,
আমি কিছুতেই যাব না।
অম্বর। ( চিন্তা করিয়া) আমি আপনার কথা রাখব।
কৃষ্ণ। তুমি রাজরাজেশ্বর হও! ঐ সামনের মন্দিরে আমাদের কুলদেবতা,
তারই সামনে তুমি আমাকে কথা দিলে। বাবা, আজ আমার
প্রাণে যে কি শান্তি কাঁদিয়া ফেলিল) তুমি যথার্থ ব্রাহ্মণের
ছেলে বটে।
অম্বর। মা, সন্তানকে আর অপরাধী করবেন না, আপনি ঘরে যা।
ছেলেবেলা থেকে কখনাে মার স্নেহ কি তা জানি না, আজ এক
মুহূর্তে আমার মাতৃস্নেহাতুর-হৃদয় আপনার চরণ-তলে আশ্রয় পেলে।
( প্রণাম করিল )
শক্তি কতটুকু
কৃষ্ণ। আমি আবার আশীর্বাদ করি—তুমি রাজরাজেশ্বর হও, মনের
৯. 1042 -
ফল হও!
কোথা থেকে কি হয়ে গেল! (মন্দিরের নিকট গিয়া) মানুষের
হে বিশ্বনাথ-আজ তুমি তা প্রত্যক্ষ করালে
প্রভু! মন্দিরের দ্বার বর্ষ-উদ্দেশ্যে তােমার চরণে কোটি কোটি
প্রণাম। সেখান তুলিশমকে পায়ে ঠে!
চলিয়া আসিতেছে এমন সময় মন্দিরের দ্বার খুলিয়া বাণীর প্রবেশ
বাণী। দাড়াও, যেও না ; আমার একটা কথা আছে।
অম্বর ফিরিয়া দাড়াইল
বাণী
। মা’র সঙ্গে তোমার যা কথা হয়েছে আমি শুনেছি; কিন্তু
আমারও বলবার একটা কথা ছিল।
৭৮
মন্ত্রশক্তি
দ্বিতীয় অঙ্ক
৩। 253।
অম্বর। কি বল ?
বাণী। মা যা বলেছেন, যদি তাই করতে হয়, তাহলে বিবাহের দিন
থেকেই আমি স্বতন্ত্র থাকতে ইচ্ছা করি। সেই একটা দিন ছাড়া এ
জন্মে আর দু’জনের মধ্যে দেখাশােনা হবে না। দুজনের কেউ কারও
খােজ খবর নেব না, এই আমার ইচ্ছা।
অম্বর। ( অল্পক্ষণ চিন্তা করিয়া) আচ্ছ। (বস।
বাণী। প্রতিজ্ঞা কর—এই মন্দিরের দেবতার শপথ বিবাহের দিন হ'তে
অম্বর। ( দৃঢ়স্বরে) না বিবাহের দিন হ’তে নয়; সমস্ত শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান
শেষ হবার পর থেকে।
বাণী। (স্বগত) এ কি! এ যে এখন থেকেই আমার প্রভুর মত
আদেশ করে! ( কোন মতে সংযত হইয়া) বেশ, তাই হবে।
বিবাহের পর থেকেই দু'জনের মধ্যে কোন সম্বন্ধ থাকবে না।
গম্বর। বেশ, শপথ ক'ল্লেম-বিবাহের পরে তােমার আমার মধ্যে কোন
সম্বন্ধ থাকবে না।
তৃতীয় অল্প
প্রথম দৃশ্য
রাজনগরের গ্রাম্যপধ
হলধর, নবীন, চালমােহন প্রভৃতি ছাত্রগণ
হল। যত গােল বাধালে এই পাপের ন'বনে। আমরা তো বেশ
ছিলেম রাজনগরের টোলে। অম্বর অধ্যাপক হয়েছিল, হয়েছিলই।
আমাদের কি ? আদ্যিনাথকে নিয়ে দল পাকিয়ে এখন রাস্তায়
রাস্তায় ঘুরে বেড়াও !
নবীন।-ই-পৗঁপে'রে ? ত অইছে কি? ইস্যে ক্যাবল আমাগাের
দোষ দেয় ! ‘আইদ্য-দা আইয়-দা’ কইরা তােমাগাের লাল গালে
তা আমি করবাে কি? কওনা চাদমােহন ?
চাদ। কইব আর কি ? তােরই তে উৎসাহ বেশী। তুই তো
পাতিলের চারা দিয়ে অম্বরের মাথা ভঙ্গি?
হলধর। পাতিলের চারাটা কি হে ?
চাদ। আরে হাড় ভাঙ্গার খােল।
হল। যাও, এখন কাল-হাড়ি মাথায় দিয়ে মুখ লুকোও। অম্বয়কে
পুরুতগিরি থেকে তাড়ালে, তার টোল ভালে—আর সেই এখন
রাজনগরের জমিদার বাড়ীর জামাই হতে চললো! আর যার জন্যে
এত কমে সেই আদ্যিনাথকেই খুজে পাচ্ছিনি। টোল বসাবে
मावलि
তৃতীয় অঙ্ক
বসাবে করে তার কি এক ভাইয়ের বাড়ীর চণ্ডীমণ্ডপ দখল করে
বসেছিল ;-এখন ?
চাদ। আমি দেখছি সুধাকরটাই বুদ্ধিমান্, সে ঠিক ভিড়ে রইল,
আমাদের দলে এল না। এখন অম্বর জামাই হলে তারই লাভ।
একটা ভাল চাকরী জুটিয়ে নেবে আর কি ?
নবীন। তা ইসে তােমারা ইর মধ্যে লঙ্কাগ করছে। ক্যান? জামাই
অলিই হল? কথাডা তাে রটনা। আগে হদিস হল জান,
পরে কথা কইও। জামাই হবন? জামাই হয় অনেক হাল!
হল। জানব আর কি? গা ছু, ঢি ঢি হয়ে গেল।
চাদ। আচ্ছা, অম্বরটা কোথায়? সে তাে আর টোল-বাড়ীতে নেই ?
হল। আরে তােমার যেমন বুদ্ধি। সে থােড়ো-বাড়ীতে থাকে ?
তাকে নিয়ে গিয়ে তুলেছে একেবারে তেতলায়! সেখানে বসে দুধের
বাটীতে ফু দিচ্ছে।
চাদ। ন'বনে, তুই এক কাজ কর, তুই জমিদার বাড়ীতে গিয়ে পাকা
খবর নিয়ে আয়, আমরা আদ্যিনাথকে খুজে দেখি, কোথা গেল।
শুনিছি সে নাকি পুরুংগিরিতে ইস্তফা দিয়েছে।
নবীন। হ, আমি খবর লতি যাই জমীদার বারী আর সিপুই দিয়া
ঠেঙ্গায়ে আমার দফাটা ইসে একেবারে সাইরে দিক। আমি আর ও
মুখা হই, তো আমি হালা।
যধামের এবেশ
সুধা। কি হে, তােমরা এখানে সব জটলা ক’? তােমাদের নতুন
টোলের খবর কি? আমি যে তােমাদের ওখানেই যাচ্ছিলুম।
প্রথম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
৮১
নবীন। (জনান্তকে দমােহনকে) মস্কয়াট। শুনেছ -বােঝছনি
চাকমােহন ?
চাদ। যাঃ শালা-বােঝছনি বােঝছনি করে আর গায়ের মাংস
আমার রাখলে না। কি হে সুধাকর, খবর কি?
সুধা। কিসের খবর ভাই ?
চাদ। এই তােমার, তােমার বন্ধু অম্বরের।
সুধা। আরে শােননি হে, আমি যে নিমন্ত্রণ করতে বেরিয়েছি; তােমাদের
ওই দিকেই যাচ্ছিলুমকালকে যে অম্বরের বিয়ে।
নবীন। তা হলে ইসে কথাডা ঠিক ? পাকা?
সুধা। আরে তােমরা শােননি আদ্যনাথের কাছে। সে যে এই খবর
শুনে রেগে পুরুৎগিরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে গেছে। এখন যে ঠাকুর
পূজো কচ্ছি আমি।
হল। তুমি যে বড় আমাদের ওদিকে যাচ্ছিলে?
সুধা। যাব না? বল কি হে? ধূমের বিয়ে । ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত বিদেয়
হচ্ছে। টোলের ছাত্রেরাও বাদ পড়েনি।
তাতে তােমাদেরই লাভ। আমরা তো টোল ছেড়ে দিইছি,
আমাদের কি বল ?
সুধা। তােমরা টোল ছেড়ে দিলেও জমীদারবাবু অতি সদাশয়! ফন্দে
তােমাদেরও নাম ধরেছেন। ফর্দ হয়েছে, টোলের ছাত্রদের বিয়ে
হবে, একখানা করে কাঞ্চন নগরের থালা, আড়াই সেব করে
সন্দেশ, আর দুটাকা করে নগদ।
নবীন। আরে কও কি। আমাগাের বােকা পাইচ! খ্যাপাইচ বটে ।
আমরা যা বুঝি না, কও তো চাকমােহন?
मानकि
তৃতীয় অঙ্ক
সুধা। না হেনা, মরা নয় সত্যি! আমি তােনাদেরই বলতে
যাচ্ছিলুম।
হল। কিন্তু আমাদের যাওয়াটা কি-কি বলহে সুধাকর ?
সুধা। আরে নাও-নাও—অমন হয়ে থাকে। তাতে আর কি! বরং
গেলে একটা কথা জন্মাবে। এ সব সামাজিক ব্যাপারে যাওয়াই
উচিত।
নবীন। উচিতই
উচিতই তাে—ঠিক কইচ কর—ঠিক কইচআমাগাের
যাওয়াই উচিত
চাদ। আদ্যিনাথকে না জিজ্ঞাসা করে-
নবীন। আরে রাইহে গাও তােমার আইন্যনাথ—ঐ হাল আইনাথের
হুমকিতে না ভুল্যা—কি কও হে সুধাকর-কাঞ্চন নগরের কাংস্য
থালি-আর মােখা কতখানি? কয় স্যার?
সুধা। আড়াই সের।
নবীন। আরে নগদা বিদায় ?
সুধা। আরে দু’টাকা হে দু’টাকা। তার ওপর ধুতি-চাদর।
নবীন। এই মারলাম ঝাৰু আইনাথের মাথায় ! তােমরা কেউ না যাও
আমি তো আগেই যাচ্ছি, ই-সব সামাজিক ব্যাপার! বােঝছনি
গমােহন।
চাদ। ওরে আঁটকুড়ির পুত, আমি অনেক দিন থেকেই বুঝে আসছি-
শালা গায়ের মাংস আমার রাখলে না। কি বল হে সুধাকর, তাহলে
আমাদেম যাওয়াই কর্তব্য।
সুধা। নিশ্চয়তােমাদের যেতে চলা হয়, আমার সঙ্গে এস।
চা। তালে, তাই চল, নেহাৎ তুমি যখন ছাড়বে না
মন্ত্রশক্তি
নবীন। হাজা—চল—চল-কাঞ্চন নগরে কাংস্য থালি। আমল
যদিন যাই আমরা শােব বােঝনি চাদমােহন ?
সকলের এন
দ্বিতীয় দৃশ্য
বাণীর শয্যা-গৃহ
ফুলশয্যার সমস্ত উপকরণে সজ্জিত
মৃগাঙ্ক ও কৃষ্ণপ্রিয়া
মৃগাঙ্ক। যাক, ভালয় ভালয় কাজটা মিটে গেল! বিয়ে হল।
কুশণ্ডিকে হ’ল-ফলার হলেই ব! জাতও বাঁচল, বিষয়ও রক্ষে
হল।
আজ তো ফুলশয্য, কিন্তু মামী, আমার তাে আর এখানে
থাকা চলে না। এসেছি অনেকদিন, বাড়ীর কোন খবর পাইনি,
আমার তাে এই রাত্রের গাড়ীতেই যেতে হচ্ছে।
কৃষ্ণ। তা আজকের দিনটা থেকে যা না। হয়ে, একটা রাত
মৃগায়। মা মা আর বােলাে না; আমি অনেক কষ্টে আমাকে
রাজী কয়িছি, তুমি কার গা দিও না; আমায় যেতেই হবে।
কৃষ্ণ। সে, বাবা, তাের কল্যাণেই এই অঘটন ঘটলেকে
হwেই। বেকনা কর। তােমার এই
মতন হে।
৮ঃ
মন্ত্রশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
মগ্র (গ) ই,
বজায় রেখে যতদূর সম্ভব । (একা)
গোয়া খুলে মাশী; আমি আসি।
কৃষ্ণ। যাবি বল্লেই যাবি ?—চল—একটু কিছু মুখে দিয়ে সারারাতটা
তাে গাড়ীতে যেতে হবে ?
মৃগাঙ্ক।
যে অবেলায় খেয়েছি মামী, আমার মােটেই ক্ষিদে হয়নি ;
এখন তিন দিন না খেলেও চলবে।
তা কি হয় রে? আয় ভাড়াড়ের দিকেই আয়, আমার আবার
ফুলশযয্যর নিত কিত, সব বাকী ।
মৃগাঙ্ক। (স্বগত) আমার যে অষুধ না খেলে ক্ষিদে হয় না, মামী তো
তা বােঝে না। যে কষ্টে এ ক’ দিন আছি! ( প্রকাশ্যে ) চল,
ছাদা বেঁধে দিও, গাড়ীতেই বসে বসে খাব।
কৃষ্ণপ্রিয়ার প্রস্থান
অপর দিক হইতে বাণীর প্রবেশ
বাণী। মৃগু-দা, কি আজই যাচ্ছ ?
মৃগাঙ্ক। হাঁ ভাই-মামী ব’ছিলেন আজকের দিনটাও থেকে যেতে,
তা আর পারলুম মা। আজই যাব।
বাণী। তা এখন যাবে বৈ কি। আমার গলায় ফাসী পরিয়ে দিয়ে
মৃগাঙ্ক। আরে ফাসী মনে কল্লেই ফাসী, নইলে হেসে উড়িয়ে দিলে ও
আর কি ? তবে একটা প্যাচ, অনেকগুলো দিকি করিয়ে নেয়।
আয় ঘন কুশণ্ডিকে হয়েছি, সৰ তত আর মন দিয়ে শুনিনি।
তাের বেলায় সৰ ৰ। আরে বাপরে! তুই আালতের
এ একেবারে কল কল মি টানাটানি! রেও
আননই! এই হিদুর বিয়েটা দেখছি ভারি আপুদে।
A
দ্বিতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি বাণী। হ্যা। আমিই কি এত জানতুম ? পৃথিবীতে যত রকমের দিব্বি আছে, নারায়ণ সাক্ষী রেখে সেই সব দিব্বি করে, ইহকাল পরকালের দাসী হওয়া বৈ তাে নয়। এ পুরুষদের এক-চোখে শাস্ত্র। মৃগাঙ্ক। না ভাই, ঠিক এক চক্ষু নয়, দুই চক্ষুই জ্বল জ্বল করছে! স্ত্রীর পক্ষে চিরকালের দাসী হওয়া, কি স্বামীর পক্ষে চিরকালের ক্রীতদাস হওয়া—এ ক্ষেত্রে কোটা যে বলবৎ তার নিরাকরণ করতে আমার বুদ্ধিতে কুলােয় না-ও যা শুনলুম তাতে মনে হলো—এ-ও ওর দাসী ও-ও ওর দাস ; জমা খরচে কৈফিয়ৎ কেটে থাকে শূন্তি! মন্তরের মানে দু’জনে নাকি এক হয়ে যায়। কারুর আর স্বতন্ত্র অস্তিত্বই থাকে না। যেমন জলে জল মেশা ! লে লেবার এখন আর তেৰে গা ধাপ করে গেল লাভ নেই। ও বলল ইলিরে থাকাই ভাল, বুবলি? আর কাল তাে আর চলেইলামবাবুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, ওতো এখানে থাকবে। হরে, এত শিগগির যে আসামে চললো—ব্যাপার কি ? বাণী। (হাসিয়া) আমি বিয়ের আগে যে, দিব্বি করিয়ে নি’ইছিলুম- বিয়ের পর এখানে একদিনও না থাকে। মৃগাঙ্ক। বাঃ! তাের মেধা তো দেখছি আমার চেয়ে ঢের ভাল। ােঝে আ শিয়রেছিনু তত! তুই যে, আমার উপরে টেকি! ভ্যালা মাের দিদি ! তা-ও যে বড় এক কথায় রাজী হােল? ওকেও বন্ধুত্বে পেয়েছে না কি ? বাণী। কি জানি, কেন এক কথায় রাজী হােল! যদি রাজী না হােত তা হলে কিছুতেই আমিও রাজী হতুম না মৃগু-দা! মৃগাঙ্ক। তা—এ কথা আর কে জানে?
मानसि
তৃতীয় অঙ্ক
বাণী। বাবার সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে। আমি শুনিছি।
মৃগাঙ্ক। মামী জানে ?
বাণী। তা ঠিক জানিনি। বােধ হয় না।
মৃগাঙ্ক। দেখ, মামী আবার গেল না বাধায়।
বাণী। তুমি যেন মাকে আগে থাকতে কিছু বােলো না। ওসব ব্যবস্থা
যা করবার বাবাই করবেন।
মৃগাঙ্ক। আরে রাম কহে ! আমি আর তােমাদের কোন কথায়ই নেই
ভাই। আর আমি তাে আগে থাকতেই স’ছি।
বাণী। মৃগু-দা!
তােমার বৌকে একবার এখানে আনবে ভাই ?
তােমার বৌ দেখতে কেমন ? তার সঙ্গে তােমার দেখা-শােনা
মৃগাঙ্ক। না হবে কেন ভাই ? তার তো আসামও নেই, কাছাড়ও
নেই। বৌ-মানুষ, ঘরেই তো থাকতে হয়। তা তাকে এখানে
আনৰার মালিক তাে আমি নই। বন্ধু-মানুষ, যদি ইচ্ছে করেন
আসতে পারেন! আচ্ছা বলে দেথবাে। আমি আর দেরী করবে।
, গাড়ীর সময় বয়ে যাবে।
বাণী। কি আর বলবাে! এস মৃগু-া।
এণাম করিল
মৃগাঙ্ক। ও ভারি ভক্তি যে! এ প্রণামটা কি ঘটক বিদেয়ের না কি?
বাণী। যাও, কি যে বল ?
মৃগাঙ্ক। ভাল ভাল, বিয়ে করে মাথা নােয়াতে শিখিছিস, ভাল ! এখন
৫
বন্ধুত্ব বজায় রেখে মনমুখী হও, এই আশীর্বাদ করি।
মত্রশক্তি
বাণী। আজ রাত্রি-আমার কালরাত্রি! কি যে করব কিছুই তেৰে
পাচ্ছিনি ; সী-বিয়ের সময় সে তো প্রভুর মতই হুকুম চালিয়েছে।
সে ফেটে ক তাই করতে হয়েছে। এখন খেয়ে
অমনি এ করবে নাকি? কি জানি ঠাকুরের সামনে প্রতিজ্ঞ
করিয়ে নিয়ে একি বাৰে ? কি রকম চরিত্রের
মানুষ কে বলতে পারে ? যদি এখান হতে চলে না যায় ?
তুলসীর প্রবেশ
তুলসী। অমন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালে তো ছাড়চিনি! বিয়ের রাত্রে
বাসরে কিছুই আমােদ হয়নি। বরটী তােমার নেহাৎ ভাবাগান;
অনু হয়েছে বলে পাশ ফিরে পড়ে রইল। সই আমার বোন
শাদার সেই মে তুলে আমাদের তাে আর বাসরোগতেই
মিলে না। কিন্তু আজ ? আজ যে ফুলশযয্য! আজ তাে আর
সহজে ছাড়ছিনি। আজ এই ফুলের গহনা দিয়ে এমন সাজাব।
বাণী। দিন দিন তাের ছেলেমানুষি বাড়ছে দেখছি; বয়েস কি আর
বাড়ছে না ?
তুলসী। বয়েস বাড়ছে কি কমছে, সে ভাল জানে তােমার সয়া, সে
নিকেশ তাের কাছে কি দেব না। ভর্তির মাগ্নের ঝয়ে বার
বা?ি বুঝবি লাে বুঝবি-দু’দিন যাক।
বাণী। নে, আর বেহায়াপনা করিসনি। আমার তো ফুলশযয্য নয়
অতিশয্যে-
তুলসী। বালাই। বালাই! কেন, এত কেন? বর কি তাের মনে
ধরেনি।
মশক্তি তৃতীয় অঙ্ক বাণী। মনেই বা ধ’রবে না কেন? তুলসী। তবে ? বাণী। কি তবে ? তুলসী। ও সব বলছিস যে? ঐ যা বলি? ছিঃ—যা নয়, তাই ? বাণী। (হাসিয়া) মনে ধরেছে বলেই তাে বলছি। মনেই যখন ধরেছে তখন অনর্থক সেজে-গুজে কি হবে ? তুলসী। আরে বাপরে। আজ না সাজলে হয় ? আজ যে ফুলশযয্য ! মিলনের প্রথম রাত্রি । বাণী। শরশয্যে বল্লেও চলে। তুলসী। ওলাে, ঠিকই তাে, স্মরশয্যেই তাে বটে—মদন বাজার স্মরশয্যে। নে বােস, আজ মনের সাধে-সমর-সাজে সাজাই। তুলসী বাণীকে ফুলের গহনা দিয়া সাজাইতে সাজাইতে গাহিল গীত আজি সাজাব তােমারে সময় সাজে (ধনি) যেখানে যা সাজে। অলকে দিব লো অশোেক-ঝাপ- ভুবন উঠিবে কাপি! পর পর-শর মুহ ছুটিবে হৃভঙ্গে কারনে অপায়ে- দিব বিজয়-তিলক চার ললাট-মাকে। কুচ কবচে দিব চলনে ঢাকি, বাহতে বাধিব রাধী
দ্বিতীয় দৃশ্য
৮৯
(তুমি শুধু) অধরে ধরিও মৃদুল-হাসি
পরতে প্রেম-ফসি ;
বেণী দুলিবে বাধিতে অরি-রাজে।
দিব কুম-কিঙ্কিনি কেয়ুর কাঞ্চী
মদন-মান লাগি
দেখি আগুয়ান কেবা হয় রণে,
বীরাঙ্গনা চলে রণাঙ্গনে
দিতে লাজ স-সাজ বীর-সমাজে!
তুলসী একদৃষ্টে বাণীর দিকে চাহিয়া রহিল
বাণী।
এ কি! খেয়ে ফেলবি নাকি? অমন হাঁ করে চেয়ে আছিস কেন?
তুলসী। (চারিদিকে চাহিয়া) কেউ এখানে নেই তাে? দেখছি
আর ভাবছি—আজ সৃষ্টি থাকলে হয়।
বাণী। (হাত দিয়া তুলসীর মুখ চাপিয়া) আর ও-সব ঢংয়ে কাজ নেই।
ঢের হয়েছে—এখন থাম্ !
নিশ্বাস ফেলিল
তুলসী।
কেন আর নিশ্বাস ফেলিস ভাই ? জানি, তুই রাজার রাণী
হবার যােগ্য ; আমাদের মত ভট্টচায্যি বামুনের স্ত্রী হবার মত ন’স।
কিন্তু ভাই, জন্ম-মৃত্যু বিয়ে—এ তাে কারো হাত ধরা নয়। তার
পর, তাের বরটী—যা এক মােষ গরীব, নইলে দেখতে তো কার্তিকও
হার মানে! ঠিক যেন রূপকথার রাজপুত্র! এই টানা-টানা চোখ,
এই টিকলো নাক, গােলাপ ফুলের মত রং; সত্যি কথা বলতে,
এতে দুঃখ করবার এমন কি আছে ভাই ?
;
মশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
বাণী। তুই এ কি বলছিস? তুই কি মনে করি এ বিয়েতে আমি
দুঃথিত? তা নয়—তবে -
তুলসী। তবে?
বাণী। কি প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, কি হ’ল ! চিরজীবন কুমারী থাকব
চিরজীবন ভগবানের সেবা করব—চিরজীবন গােপীকিশাের ছাড়া
আর কারও দাসী হব না-সব ভেঙ্গে গেল। মনে হচ্ছে আগেকার
জীবনটা যেন একটা স্বপ্ন ; মনে হচ্ছে, যে বাণী হরিবল্লভ রায়ের পৌত্রী,
সে বাণী মরে গেছে; এ যেন আর কেও বাণী সেজে এসেছে।
আমার মত এমন পরাজয়ের অপমান বােধ হয় আর কাউকে কখন
সইতে হয়নি।
তুলসী। ( মৃদু হাসিয়া) এ পরাজয়ে যে কত সুখ-পরে বুঝবি।
।
ও মঞ্জরী, মেয়েরা তাে আজ আর ছাড়বে না। সেদিন বাসরে
কেউ আমােক’রতে পায় নি, আজ সব দল বেঁধে এসেছে।
তুলসী তাতা করবেই সইম, আজ ওদের কাউকে ঠেকানো যাবে না।
বাণী। কিন্তু, আমি বলে রাখছি, ও-রকম অসভ্য কাণ্ড করা হবে না,
তুমি কার রণ করে দাও!
শিদু সিলেন ও স্নেহে কহিলেন
কৃষ্ণ। বারণ করে শুনবে কেন মা! বিয়ের সময় সকলেই এমন করে
থাকে, ওতে ছিল নেই।
বাণী। সকলের যা হয়, আমার কি সেই রকমই হচ্ছে যে, সৰ সেই মতই
হবে? সকলের কথা ছে েও বাড়ীর চাক-মুনের সঙ্গে
;
দ্বিতীয় দৃষ্ট,
মন্ত্রশক্তি
ম
তাদের হৈ কারু আর বিয়ে হয় না। যার যেমন কপাল, তার তেমনি
ব্যবস্থা ! আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি না, ও-সব চলবে-ট’লবে না;
তাহলে আমি এখনি বাবার কাছে চলে যাব ; কে আমায় সেখান
থেকে উঠিয়ে নে দেখি?
কৃষ্ণ। ঐ আদরেই তাৈর পরকাল খেলে! আচ্ছা বাপু, বারণই না-হয়
করব। কিন্তু একটা কথা তােকে বলে রাখি বাণী, জামাইকে তুই
অয, অপমান কসিনি। ও যে কি রত্ন, তা এখন না বুঝি, এর
পর একদিন বুঝবি। যাই হক, তবু ও তাের স্বামী। বামীর
চেয়ে বড় জগতে মেয়েমানুষের আর কে আছে? দেখছি তাে,
আমি কখনও আজ পর্যন্ত এর কাছে মুখ তুলে কথা ক’য়েছি, কি
মুখের উপর একটা জবাব কৰিছি ?
বাণী। ওঃ—ফিসে আর কিসে!তােমার যেমন তুলনা দেওয়া-চাদে
আর বামনে। আমার বাবার সরে
কৃষ্ণ। কেনই বা নয়? বড়লােকে গরীবে সম্বন্ধও বদলে যায় না কি?
তুলসী। সই মা, তোমরা তাে কথা কাটাকাটি ক’ছ। এদিকে যে
রাত হ’লবরকে পাঠিয়ে দাও।
কৃষ্ণ। সে তো এখনাে বাড়ী ফেরেনি মা! পাড়ার নিমাই পণ্ডিতের
মেয়েটির কলেয়া হয়েছে, বাড়ীতে পুরুষ নেই, বাছা যেমন শুনেছে
অমনি ছুটেছে।
সে এলেই আমি পাঠিয়ে দিছি। তুলসী, মা, তুই
ফুলশয্যর জিনিসগুলাে সব সাজিয়ে রাখ।
তুলসী। ওমা! এমন অনাছিষ্টি তো কখনো শুনিনিফুলশয্যর দিন
আবার রুগী দেখতে যায়!
মন্ত্রশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
গণপকতটামানকে।
তুলসী। তুই একটু বােস ভাই, কোথাও যাস নি, মাথা খাস! আমি
ফুলটুল সব নিয়ে আসি—এই এলুম বলে।
এনি
বাণী। আমার ডাক ছেড়ে কাদতে ইচ্ছে করছে ; কোথাও ছুটে
পালাই। কিন্তু পালিয়ে থাকলে বাড়ীতে একটা হৈ হৈ কাণ্ড হবে
-সে আরও ঘৃণা! তার চেয়ে স’য়েই থাকি। আমার ভয়
তুলসীকে, কিছু অসভ্যপনা না করেও যে ছ্যাবলা।
রূপার ডিশের উপর রূপার বাটীতে ক্ষীর-মুড়কি লইয়া
তুলসীর পুনঃ প্রবেশ
?
তুলসী। কুঞ্জ তো সাজাচ্ছি, এখন নটবর এলে হয় । দেখতে দেখতে
রাতও হ’ল অনেক। কি লো, চোর ভাগবা না কি ?
বাণী। টীতে ও কি
তুলসী। ও ক্ষীর-মুড়কী ; আজ যে একপাত্রে খেতে হয়। তুই তাকে
খাইয়ে দিবি, সে তােকে খাইয়ে দেবে।
বাণী। দূর বালাই।
তুলসী। আহা বালাই কেন? এযে ফুলশয্যর নিয়ম। হাতের বাঁধন
খুলবে। সুন্দর হাতে তাের মুখে এই কী-মুড়কি তুলে দেবে, তুই
লজ্জায় চোখ দু’ট বুজে গােলাপফুলের পাপড়ীর মত ঠোট দুটা একটু
খুলে, হাপুষ করে গিলে ফেলবি। পারিস তাে তাের ঐ মুক্তোর মত
দাতে শালার আঙ্গুল দুটো কামড়ে দি।
বাণী। তুই সয়ায় আঙ্গুল কামড়ে দিয়েছিলি বুঝি?
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
তুলসী। সেই হাঁ করে আমার মুখ পানে চেয়ে অন্যমনস্ক আমার
আঙ্গুল কামড়ে দিয়েছিল।
বাণী। দেখ, এসৰ অসভ্যপনা আম হতে হবে না, ও রকম করিস্ তত
আমি এখনি পালাব।
তুলসী। পালাবে না আরাে কিছু! পালাবার বয়েস তােমার আর
নেই ; এদিকে যে ষােড়শী !
বাণী। তুই ভারি অসভ্য।
তুলসী। একশােবার! আজকে আমাদের সাতখুন মাপ।
নেপথ্য শাখ বাজিল
ওলল, ঐ বুঝি এসেছে।
বাণী । (উঠিয়া) আমিও পালাই, আর এখানে থেকে--না—ঐ যে
এসে পড়ল।
অবগুণ্ঠন টানিয়া নীচের বিছানায় একপাশে বসিল
তুলসী। ও হাত আপনি উঠে ঘােমটা টানে।
অম্বরের হাত ধরিয়া রমণীগণের প্রবেশ
রমণীগণ। ওলাে, চোর গ্রেপ্তার!
কৃষ্ণুপ্রিয়ার পুনঃ প্রবেশ
ওমা তুলসি, বাছাকে আজ আর জ্বালাতন করিসনি, বাছা বড়
ক্লান্ত হয়েছে। পণ্ডিতের মেয়েটা একটু ভাল আছে.আর পণ্ডিত
ঘরে ফিরেছেন তাই দেখে এই মাত্র চলে এল। বলছে শরীর
খারাপ, এতরাত্রে কিছু খেতে চায় না। তা থাক, কাজও নেই কিছু
খেয়ে, শুধু তােটা হাত থেকে খুলে ঘুমুতে দে!
১৪ মন্ত্রশক্তি তৃতীয় অঙ্ক তুলসী। বাবা বাবা! সইমা যেন কি? জামাই যা বলবে তাই? কেন গা? অত আর কিসের? আচ্ছা, তুমি যাও, আমরা এখনি তােমার জামাইকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে যাচ্ছি। কৃষ্ণ। দেখি বাছা, বেশী জ্বালাতন করিসনি। প্রস্থান তুলসী। বােসস ভাই, বােসস, এই আসনে বােসো।–কি লো, তুই যে বালিসের থােল হয়ে বসে রইলি? নিত কিত, যা আছে তাতে করতে হবে, উঠে আয়-এ যে সব লক্ষণ। বাণীকে টানিয়া আনিয়া অরনাথের বামে বসাইল নাও ভাই, হাত ধুয়ে ফলার মাখো। আজ আর লজ্জা নয়। অথর। আমার শরীর খারাপ, আমি আজ আর কিছু খাব না। তুলসী। না খেলেও একবার মুখে ঠেকাতে হয়। ২য়া নারী। সেদিন বড় ফাকি দিয়েছ, বাসরে আমােদই হয় নি ; আজ তার শােধ নেব। তুলসী। নাও ভাই, মাথাে-তুমি একটু মুখে দিয়ে ওর মুখে দাও- তুইও একটু মুখে দিয়ে ওর মুখে দে। নারী। হাঁ, আজ থেকেই প্রসাদ খাওয়া শুরু হােক। অম্বর। আমায় মাপ করবেন। সত্যই আমার শরীর বড় খারাপ। আমায় ও অনুরােধ আর করবেন না। তুলসী। ওসব যে করতে হয় ভাই- স নারী। সবাই করে—তুমি একলা নও। অ নারী। হাতের বাধন খােল! মনের বাঁধন তত হয়ে গেছে। আর সুতাের বাঁধন কেন?
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
অম্বর। বাঁধন আমি খুলে দিচ্ছি। কিন্তু খেতে আমি কিছুতেই
পারবাে না।
তুলসী। সেই এক কথা! এমন একগুয়ে তো কখনো দেখিনি! কি
লাে বাণী, এ বুনাে ঘােড়া বশ করতে পারবি তো?
সা নারী। তুমি শিখিয়ে দিও তুলসী দিদি ! নি, তােমার
লাগামের খুব জোর ৭-
=
তুলসী। দূর ছুড়ী! অলর বশ করতে আবার লাগাম লাগে নাকি?
বশ করতে হয়তাে লাগা ছেড়ে দিয়ে।
ৰাণী। (স্বগত) খাবে না—তবু ভাল! উঠে গেলে বাঁচি।
তুলসী। চুপ করে বসে রইলে যে! যা হয় একটা কর, না হয় বাঁধনই
খােল। (বাণীর সূতা বাঁধা হালুখানি টানিয়া আনিয়া অম্বরের
হাতের উপর রাখিল ও কক্ষ শঙ্খধ্বনি করিল)
অম্বর আনতনেত্রে গ্রন্থি খুলিল
এ নারী। এইবার খাটে উঠে বােস, আর একবার যুগলমিলন দেখি।
১ নারী। সেদিন ফাকি দিয়েছ, আজ কিন্তু তােমায় ভাই, একটা
গান গাইতেই হবে।
অম্বর। এটাও আমাকে মাপ করতে হবে। আমি গাইতে জানি না।
তারপর, সেদিনের চেয়েও আজ আমার শরীর খারাপ, আমায় দয়া
করে একটু ঘুমুতে দিন।
তুলসী। এই যে দিচ্ছি ভাল করে! তােমার রকম কি বল তাে? খেতে
বন্ধুম, খেলে না-গান গাইতে বছি, বলা হল জানি নে। আবার
ব’লছাে ঘুমুতে দিন; কেন—আমাদের এত অপমান কেন? একটা
গান গাও তাই, আমরা ভালমানুষের মত এখুনি চলে যাচ্ছি।
মন্ত্রশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
অম্বর। যা জানি না তাই করতে যদি হুকুম হয়—এমন হুকুম রাখি
তুলসী। তা বেশ, কিন্তু কি করে বসতে হয় সেটাও কি জান না !
অমন বেঁকে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছ কেন? কি লে, তােরও যে
ঘােষ্টা সরে না! (ঘােটা সরাইয়া দিল। অম্বর আর একটু
বাকিয়া বসিল, বাণী মুখ নত করিল )
১মা নারী। তুলসী দিদি ! কেবল কথায় কথায় রাত হয়ে যাচ্ছে।
বর গাইবে না, তুমিই একটা গাও ভাই।
তুলসী। আরে আমি তাে কোমর বেঁধেই আছি! কিন্তু এদের কি
বল দেখি! দুই কাঠের পুতুল! হ্যালো, শুভদৃষ্টির সময় কেও তেৱে
টেরে নেয় নি তে! আজকের এমন রাত-জীবনে এই একবার
আসে-বলে ফুলশয্যর রাত্তির—আরে রাতকে লাও
শুকোয়-কি এই রাতের বাতাসে যে ফুলের গন্ধ ভেসে যায়
সে যে, সারা জীবনটাকে ফিরেখে! এমন রাত্তিরটা এদের এমনি
ফাকা যাবে ?
গীত
এমন রজনী বৃথা পােহবে সজনি,
এ দুঃখ বলিব কারে?
ফুলে ফুলে ঘেরা, হাসি দিয়ে ভরা,
মৌন-মিলাবে আঁধারে।
সুরে বাঁধা বীণা ওগাে, রহিবে পড়িয়ে,
কেহ হাতটী দিবে না তারে !
মরমের গান মনি! মরমে গুমরি,
মুরহি পড়িবে হৃদয় দ্বারে।
দ্বিতীয় দৃশ্য মশক্তি (নেপথ্যে) কৃষ্ণ। ও-লে তুলসী! ইনি রাগ করছেন, বলছেন, অনেক রাত হয়েছে, জামাইয়ের শরীর ভাল নয়, বাছাকে একটু ঘুমুতে দে। তুলসী। যাচ্ছি সই মা! না বাপু, এরা সব আড়ে হাতে লেগেছে। আমাদের একদিনও আমাের করতে দিলে না। চল ভাই চ- আচ্ছ। আমরাও দেখ বাে কত রাত্রি ওজর করে কাটাও। মাঘে তো আর জাড় যাচ্ছে না। (বাণীর প্রতি জনান্তিকে) ভয় নেই, প্রাণ খুলে কথা কয়ে, আমরা কেউ আড়ি পাতব না। তুলসী প্রভৃতি রমণীগণের প্রস্থান বাণী খাটের একপার্শে মুখ ফিরাইয়া বসিয়া ছিল ; তাহাই পার্শ্বে অম্বর, একটু নড়িয়া বসিতেই বাণী আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিল এবং বিদ্যুতের মত বিপরীত দিকে সরিয়া গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের আচরণে লজ্জিত হইয়া সে দেখিল তাহার ভয় অমূলক ; অস্বর তাহার পার্কে নাই ; সে খাট হইতে নামিয়া দাঁড়াইয়াছে। বাণী ঈষৎ বিস্ময়ে তাহার পানে চাহিল। অম্বর। (বাণীর দিকে না চাহিয়া বেশ স্পষ্টস্বরে) অনেক রাত হয়ে গেছে, তুমি ঘুমােও। আমার খাটে শােয় অভ্যাস নেই, এখানে ঘুম হবে না, আমি নিক্টের ঘরে যাচ্ছি। এই কথা বলিয়া সে গমনােত হইলে হঠাৎ বাণী ব্যগ্রভাবে কিছু চাপারে বলিল বাণী। না না, এখন যাওয়া হবে না। এখনি যদি বাইরে যাও, লােকে দেখে কি মনে করবে ; সকলে ঘুমুক, তার পরেই যেও। অম্বর। ভাল, পরেই যাব ; তুমি খাটে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমােও, আমি নীচের এই আসনেই বসছি। বসিয়া দেয়ালে টাঙ্গানাে পঞ্চবটীবনে রামসীতার মূর্তি নিবিষ্টচিত্তে দেখিতে লাগিল মন্ত্রশক্তি তৃতীয় অঙ্ক বাণী । ( কিছুক্ষণ পরে একবার অম্বরনাথকে দেখিয়া স্বগত) না- মনে করেছিলুম তা নয়। স্বভাব নম্রই। একদৃষ্টে রামসীতার মূর্তি দেখছে; কিন্তু ঠিক সামনে ঐ বড় আয়নাখানায় আমার ছায়া পড়েছে, সেদিকে তাে একটাবারও ফিরে চাইছে না। বাণী একবার চিত্রের দিকে দেখিল, পুনরায় আয়নায় প্রতিবিম্বিত তাহার নিজের মুক্তি দেখিয়া নিজের অধর দংশন করিল। তাহার বিস্ময় ও কৌতূহল বাড়িয়া চলিয়াছে। সে বারবার অনুরের দিকে চাহিয়া দেখিতে লাগিল। বাণী। (স্বগত) অদ্ভুত মানুষ! এমন কিন্তু কখনাে দেখিনি, সেই এক ভাবেই বসে আছে। ছবিতে এত কি দেখছে ? বলধারী রাম কুটিরের সামনে বেদীর উপর বসে। আর তারই নীচে ঘাসের উপর শুয়ে সীতা দেবী-রামের মুখের পানে চেয়ে ! কাবাের আতরণ নেই কিন্তু তাতে যেন দু’জনেরই রূপ আরও ফেটে পড়ছে! যে সুন্দর, তাকে সকল অবস্থাতেই সুন্দর দেখায় ; রূপবান্ ভিখারীকেও ছদ্মবেশী রাজপুত্র বলে ভ্রম হয়। বােধ হয়, একমনে ওই ছবি দেখছে আর তাই ভাবছে। এমন সময়ে বাহিরের পেটা ঘড়ীতে একটা বাজিল। অম্বর চমকিয়া দৃষ্টি ফিরাইতেই বাণীর উৎসুক দৃষ্টির সহিত তাহার দৃষ্টি-বিনিময় হইল। বাণী হঠাৎ সলজ্জভাবে মুখ নত করিল; কিন্তু সে মনােভাবের প্রশ্রয় দিল না, লজ্জা করিয়াছিল বলিয়া জোর করিয়া সে লজা ত্যাগ করিতে চাহিল। কুণ্ঠা ছাড়িয়া সে স্বামীসম্ভাষণ করিল; স্বর সহজ। বাণী। তুমি কবে আসাম যাবে ? অম্বর। (একটু পরে) কাল। বাণী। কাল? কৈ, বাড়ীতে কেউ এখনও এ কথা শােনেনি তাে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
•
কাকেও তো এখনও বলা হয় নি। বাবা
বাবা শুধু জানেন; তিনি
বাড়ীতে নিজেই কাল বলবেন বলেছেন।
বাণী। ওঃ। (একটু পরে) কিন্তু মা হয়তো বাধা দেবেন; বলবেন
এখন যেতে নেই।
অম্বর। (সহজ স্বরে) তাকে একটু বুঝিয়ে বলতে হবে।
তাে চলবে না, চিঠি দেওয়া হয়ে গেছে। সেখানে সকলে আমার
প্রতীক্ষায় আছেন—যাওয়া চাই-ই।
বাণী। (স্বগত) যাকে মুখ পুরুত মনে করেছিলেন, কিছু জানেনা বলে
যাকে লাঞ্ছনার সঙ্গে তাড়িয়ে দিয়েছিলুম-এর কথা শুনে তাে সে
রকম মনে হয় না। আমার কাছে যা প্রতিজ্ঞা করেছিল, তার
সবই তো এখনো পর্যন্ত দেখছি এ পালন করেই চলছে।
অধর। ( স্বগত) আর বসে থেকে কেন ওর বিরক্তির কারণ হই।
আমি এখানে থাকলে ঘুমুতে পারবে না ! ( উঠিয়া প্রকাশ্যে ) আমি
এখন যাই, অনেক রাত হয়ে গিয়েছে! রাতজাগা তােমার অভ্যেস
নাই, অসুখ হতে পারে, তুমি ঘুমােও। আমাকে ভােরেই যেতে
হবে, গুছিয়ে গাছিয়ে নিইগে। (স্বগত) তােমাকে আশীর্বাদ
করবার অধিকারও আমার আছে কি না কে জানে!
ধীরপদে প্রস্থান
বাণী পা টিপিয়া টিপিয়া দরজা পর্যন্ত গেল ; উকি মারিয়া দেখিল, পরে অর্গল বন্ধ
করিল।
বাণী। না, বরাবর নীচে নেমে গেল, একবারও পিছন ফিরে তাকায়নি।
এমন সহজ সরল ভাবে যে আমায় নিষ্কৃতি দেবে তা আমি মনে
মত্রশক্তি তৃতীয় অঙ্ক করিনি। এতবড় যে একটা কাণ্ড হয়ে গেল, দেখছি এর মনে তার এতটুকু দাগ পড়েনি। যেন আমাদেরই উপকারের জন্যে বিয়ে করলে, আবার আমাদেরই জন্য দেশ ছেড়ে চলে। খাটের নিকট আসিয়া অবগুণ্ঠন খুলিল ; তাহার পর খাটের উপর হেলিয়া পড়িল বাণী। যাক হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম (স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিল। এতদিনে বিয়ে চুকলাে ! রাত পােহালেই ও চলে যাবে, তা হলেই একেবারে জন্মের মত নিষ্কৃতি পাব। সে আর কতক্ষণই বা? এদিকে তাের তাে হয় হয়। অল্পক্ষণের জন্য চোখ বুজিয়া শুইল ; তাহার পর চোখ চাহিতেই সম্মুখস্থ দর্পণের উপর দৃষ্টি পড়িল। সে নির্মিমেষ নেত্রে দর্পণে প্রতিবিম্বিত তাহার নিজের মূর্তির দিকে ক্ষণকাল চাহিয়া রহিল। চাহিয়া চাহিয়া হঠাৎ দীর্ঘ নিবাস ফেলিল । না, মাথা ঘুরছে। ঘুম হবে না! ( উঠিয়া বসিয়া পুনরায় আয়নায় নিজেকে দেখিয়) সকলে বলে আমি সুন্দরী। সুন্দরী। সামনের আয়নায় এ ছবিটাও তাে খুব মন্দ দেখতে নয়। আচ্ছা, ও কি রকম লােক? একবার ভাল করে কি আমার দিকে, কি ঐ আয়নায় দিকে চেয়েও দেখলে না? তা হলে আমি আর সুন্দর কি করে? সুন্দর জিনিস তাে দেকে চেয়ে দেখে ; এতক্ষণ তত বসে বসে ঐ ছবি দেখছিল। কিন্তু সে তাে একবারও ঐ আয়নার দিকে দেখলে না। যেন গ্রাহই কল্লে না এমনি তার উদাস ভাব। আমি ( উঠিল; আয়নায় নিজেকে পুনরায় দেখিয়া) কি এতই কুৎসিত যে, আমার দিকে একবার দেখবার ইচ্ছেও হল না! থাকৃগে- গয়নাগুলাে খুলে ফেলি, নইলে ঘুম হবে না। ধীরে ধীরে সমস্ত আভরণ খুলিয়া ফেলিল হস্তান্তর নিষেধ। দ্বিতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি বাণী। এগুলো বােঝা, আলো নিবিয়ে দিই। কি গরম, মাথার ভিতর যেন কেমন ক’চ্ছে ! টেবিল কেরােসিনের বাতি কমাইয়া দিল ; তাহার পর বিছানায় উঠিয়া ইল। নেপথ্যে বাহিরে তােরের সানাই বাজিল ; নহবৎ শুনিতে শুনিতে অৰ্ধতারত অবস্থায় বলিল বাণী। এ কি ! কে তুমি? নীল মখমলের শয্যায় শুয়ে, রক্ত-উত্তরীয় তােমার স্কন্ধে, তোমার অনাবৃত প্রস্তর-ধবল বক্ষে আমারই স্বহস্তে রচিত দেওয়া ফুলের মালা, প্রশস্ত ললাটে চন্দনের রেখা! কে তুমি ? তুমি কি আমার স্বামী ?—আর এ কি! সম্মুখে হবিস্নাত অগ্নিদেবতা; উর্দ্ধে যজ্ঞধুমে দিক আচ্ছন্ন, আর তােমার কণ্ঠে এ কি গম্ভীর বেদমন্ত্র- “ওঁ মম ব্রতে তে হৃদয়ং দধাতু মমচিত্তমমুচিত্তন্তেহস্তু”। ( হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিয়া বিছানায় বসিল ; সবিস্ময়ে বলিল) এ কি! কে আমায় মন্ত্র পড়ালে! আমি স্বপ্ন দেখছিলাম না কি ? ফে ময় পড়ালে? এখনও সে এ ঘরে আছে না কি? উঠিয়া আলাে বাড়াইয়া দিল , কেউ তাে নেই, সে চলেই গেছে। তবে কি স্বপ্ন দেখলুম! সকাল হয়ে গেছে যে! তবে আর আলাে কেন? (আলাে নিবাইল) ঘরের জানালা খুলিল আঃ কি মিষ্টি এই ভােরের বাতাস। (জানালা দিয়া দেখিয়া) গাড়ী দাড়িয়ে কেন ? গাড়ীর ছাদে বিছানা, মােট, ট্রাক, কাঠের সিন্দুক, আরও কত; এখনি চলে বাণী।
মন্ত্রশক্তি তৃতীয় অঙ্ক যাচ্ছে না কি? তাহলে তাে একটুও মিথ্যে বলেনি। এত মহৎ- এ যে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না ! নেপথ্যে দ্বারে করাঘাত নেপথ্যে কৃষ্ণ। বাণি, বাণি, ও মা এখনাে ঘুমাচ্ছি না কি? ওঠ ওঠ। ওগাে কোথায় আমার রামচন্দ্র রাজা হবে, নবাসে চললো গাে ! বাণী দ্বার খুলিয়া একপার্শে দাড়াইল রমাবল্লভ ও কৃষ্ণশিয়ার প্রবেশ কৃষ্ণ। বাণি, উঠিছিস্ মা, ও মা, এ কি শুনি মা; আমাকে লুকিয়ে তােরা এ কি কাণ্ড বাধিয়েছিস (রমাবল্লভের প্রতি) হগ, জামাই যে ফুলশয্যার পর দিনই চলে যাবে, কৈ তুমি তাে আমার কাছে একদিনও ভাঙ্গনি ? বাণী পাশের ঘরে গিয়া দাড়াইল রমা। অপ্রিয় কথাটা বিয়ের আগে আর বলিনি। কৃষ্ণ। তা বলে এই অনাথের মত যাবে সেই দূর বিদেশে, সেই আসামে কোথায়? এ আমি কখনাে প্রাণ থাকতে হতে দেব না। রমা। কি কৰ বল? একটা রাধুনী আর একটা চাকর সঙ্গে নিতে বন্ধু তা ও কিছুতেই রাজী হল না। ছেলেটার সব ভাল এক দােষ, বড় একরােখা। নিজের জয়ে একটা মাসিক খরচা প নেবে না। ক। ওগো, তা হলে বাছার চলবে কি করে? । এেতদিন যে কে চলেছে এখনও সেইভাৰেজলজে-খে
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
দেখি অনাগুষ্টি কথা? এখন তুমি আমার হরিজত রায়ের
নাতজামাই, তােমার এখন সেই মত থাকা চাই তাে ?
কসে কি। 'অরকে আজ আমি কোথাও যেতে দিতে পারব।
এডমি-কােথায় রইল, কি খেলে, তার ঠিক নেই। তা ছাড়ান
বিআইটা দিন কাটেনি, এখনি ৰাছা কোণ কৰে ?
রমা। মাসে দু’শো টাকা করে খরচ দিতে চাইলুম, তা কিছুতেই
রাজী হ’ল না। যাক, দু’দিন ঘুরেই আসুক।
কৃষ্ণ। তা তুমি বাছাকে একবার এইখানে পাঠিয়ে দাও। কাল থেকে
বাছা কিছু খায়নি। তার পর, যাত্রার তাে–উজ্জ্বগ করতে হবে।
ওমা, এমন বরাতও করেছিলুম !
রমা।
আচ্ছা, আমি তাকে এইখানেই পাঠিয়ে দিচ্ছি।
এবান
কৃষ্ণ। ওলো, ও সর্বনেশে মেয়ে, জামাইকে কি বলেছিস,কি করেছিস?
বাণী। আমি আবার কি বলতে যাব ?
কৃষ্ণ। ওমা, এমন তাে কখনো শুনিনি মা! হায় হায়, আমি এমন
পােড় বরাতও করেছিলুম।
বাী। কেন, তােমরা তো বিষয়ের জন্যে বিয়ে দিয়েছিলে—বিষয় রকে
তত হয়েছে-এখন কঁাদ কেন ?
নেপথ্যে। জামাইবাবু যাচ্ছেন।
অম্বরকে আসিতে দেখিয়া বাণ পুনরায় পার্শ্বের ঘরে সরিয়া গেল
অরে এবেশ
অম্বর। মা, আমি যাচ্ছি, আপনাকে প্রণাম করতে এলেম।
কৃষ্ণ। “যাচ্ছি বলতে নেই বাবা, ‘আসি’ বলতে হয়। কি বলবে
।
১•
মশক্তি
তৃতীয় অঙ্ক
বাবা, মনের সুখী হও; আমি যাই, তােমার যাত্রার উজুগ করিগে!
তার পর, কাল থেকে খাওয়া-দাওয়া হয়নি, আমি কি যে করি কিছুই
বুঝতে পাচ্ছিনি। বাবা ঐ ঘরে একবার যাও।
প্রস্থান
অম্বর। (স্বগত) ও ঘরে যাব? কেন ?
পরে গৃহমধ্য হইতে অলঙ্কারের শব্দ শুনিয়া সেই দিকে চাহিল। ঈষম্মুক্ত দ্বারপথে
বাণীর পরিহিত গােলাপী বস্তু দেখা যাইতেছে ও তাহার একখানি হাত দরজার বাটে
অম্বর। গৃহ-মধ্যে বাণী! ঐ তার সেই রক্তোৎপলের মত হাতও
হাত আমার পরিচিত। মন্দিরের দেব অঙ্গে এই হাতেই সে চামর
চুলাতো! কিন্তু আমার এখানকার পূজার শেষ !
বাণী মুক্তার আর একটু খুলিয়া মুখ বাড়াইল
অম্বর। না, কাজ নেই। একবার—জন্মের শােধ দেখা—তাই বা কেন ?
প্রতিজ্ঞা করেছি-দেবতার সমক্ষে, সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবার
* অধিকার আমার কৈ? নাই বা দেখলুম, মনে মনে বিদায় নিয়ে
জন্মের মত চলে যাই। ভগবান করুন, বাণী সুখী হােক!
ধীরে ধীরে এখান
দরজা খুলিয়া বাণ বাহির হইল। যে বাৰ দিয়া অম্বর চলিয়া গেল, সেই পর্যন্ত
গেল, মুখ বাড়াইয়া দেখিল। তারপর দরজা অর্গল ক করিল
বাণী। (জানালা দিয়া দেখিয়া ) ঐ যে গাড়ী ফটক পার হ’ল। মা কি
মনে কঙ্গে ওকে ফেরাতে পারতেন না ? কেনই বা ফেরাবেন ?
ওতত দুয়ে গেলেই আমার পক্ষে ভাল। একটা সামান্ত পুরুৎ আমার
দ্বিতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি স্বামী হয়ে এখানে থাকবে কি? এ কিছুতেই হতে পারে না। জমীদার হরিবল্লভ রায়ের পৌত্রী আমি, আমাকে কিনা একটা বার- তার হুকুম মেনে চলতে হবে? আমারি অম্নে প্রতিপালিত যে, সেই হবে আমার প্রভু? কিন্তু তাই কি? তা তাে নয়। বাবা তো বলে গেলেন, সে তাে আমাদের একটা কড়িও নেয় নি। তবে ? তবে আজ আমাদের যা কিছু আছে, সব কি ঐ ভিখারী পুরােহিতের দান? ঐ তো আজ আমার রক্ষাকর্তা, আমার অন্নদাতা, আমার স্বামী! আর আজ যে আমারই কথায়—আমারই আদেশেজন্মের মত এখান থেকে চলে গেল—এ জীবনে সে আর কখনও ফিরে আসবে না। গােপীকিশোের, তােমার এ কি ভীষণ বিচার। বিছানায় লুটাইয়া পড়িয়া কাদিতে লাগিল
চতুর্থ অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
মৃগাঙ্কমােহনের বাটা
সদর ও অন্দরের যােগ আছে এমন একটি দরদালান
মধুর ও তাহার শ্রী কেলাের মা
কেলাের মা। তা হলি আজও ঘরে যাবিনে?
মথুর। যাই কি করে বল দিনি। দেখিচিস তাে, এ ক’দিন কেমন
করে কাটলাে? এতবড় যে বাড়ী—এড়া মনিস্যি নেই ! ঝি,
চাকর, বামন, গিন্নীর ঝেমন দু চারবার ওলা আর নাবা—অমনি
কে ক’নে গেল, কারুর চুলির টিকিগাছটা আর দেখতি পালাম
না। সবাই মনে করলে—ধরলে বুঝি তাদেরও—ঐ—যমে! যেন
মা-ওলাই চণ্ডীর ঠ্যাং নেই –দৌভুয়ে গিয়ে কারুরি আর ধরতি
পারে না !
কেলের মা। পেরায় পাঁচ ছ’দিন ঘরমুখ হােস নাই ; কেলােডা,
তােরি না দেখি হামলে হামলে ওটে; ঘােরে ফেরে আর দৌডুয়ে
এসে আমায় সুদোয়—তােরে ঝা বলি ডাকে, সে ক’নে গেল,
কখন আসপে।
মথুর। কি বলে ডাকে সে বুজি আর বল্লিনে।
কেলাের মা। (একটু হাসিয়া) আমরণ ! আমি কত বুকুই
প্রথম দৃ
মন্ত্রশক্তি
;
আসপে—আসপে, আলো বলে, তা কি শশানে? ঘুমুয়ে ঘুমুয়ে
চোকি ওটে—তা একবারডি চ’না; তারে ভুলুয়ে আবার
আসপি! আর তুই ভালবাসিস—আজ আইরীর ডাল রেধেলাম
বেতের ডােগা দিয়ে-খাতি বসে এমন মিষ্টি নাগলো ---চোকির
জলে ভেসে মরি, আর খাতি পাল্লাম না তাের জন্যি খানিক তুলি
সে-
রাখলাম-মনে করলাম—ওপর বেলায় নিয়ে ধরে নিয়ে আসপো-
কড়কড়া ভাত দিয়ে দু’গাল খেয়ে য;-তা চ এবারডি তাের
নাম করে রেখেছি।
মথুর। আমার নাম করে তুই-ই খাস, তা হলিই আমার খাওয়া হবে!
যানি না বাবু বাড়ী আসছে ত্যাদ্দিন একপাও এখন সুতি লড়তি
পারবে না কেলােই হামলাক, আর তুই-ই হামলাস!
কেলাের মা। পােড়া কপালখানা, আমি কেন তাের জন্যি হামলাতি
গ্যালাম। কথার ছিরি দেখ ! ড্যাকুকরা!
।
মধুর।
হা-হা-হা! বড় পেরাণডার মদ্যি কচ, কছ, করছে মা?
অমন আইরির ডাল। তা কি করি বল? বাড়ীতি যে ঐ একরত্তি
কে ছাড়া আর কেউ নেই, আমি একদণ্ড বাড়ী ছাড়া হলি সে
ভূতির ভয়ই মারা যাবে ! গিন্নীর ব্যারামডাই না হয় মন্দ হয়েছে-
কিন্তু তারে দেখলি তাে আর মনিষি বলে চেনা জায় না। বিচানার
সঙ্গে মিশুইয়ে আচে—তার চোখ মুখ দেখলি আমারই ভয় নাগে-
মনে হয় বুঝি পেত্নী, দ্যাখলাম।
কেলোর মা। রাম-রাম ( মথুরের কাছে সরিয়া গেল )
মধুর। দেখিস, ঘাড়ে পড়িসনে যেন। রাম! রাম! পেত্নাতে পালে।
নাকি। সত্যি তাে আর নয়! দেখলি মনে হয়।
তা বৌমার
১০৮
মশক্তি
চতুর্থ অ
আমার কি সাওস-একা—ঐ রুগী নিয়ে দু হাতে তাই মুক্তো
করা-নাড়ী তে ছেড়ে গিয়েলাে—গরম জলের সেক, সুটীর গুড়ো
মালিস—ওষুধ খাওয়ান-কোনা নয় বল দিনি—তার ওপর
আবার পত্তি; আর সারাটাক্ষণ কাছে বসে এই গায়ে হাত বুলুচ্ছেই
-বুলুচ্ছেই-বুলুচ্ছেই! ও ভাল মানষির মেয়ে বটে! তবু বাবু
তাে একদিনও বাড়ীর মদ্যি লে না ; পেরাই দেকাই করে না;
পড়ে থাকেন ঐ বাইরির ঘরে—মদ মারেন আর যত শালা মােসায়েব
X6o
জুটে নাচন নাচায় ! আর সারারাত আমারও নিজে
নেই—খালি ম’থর—ম’থরাে—যেন শাদের বাবার চাকর আমি।
কেলের মা। বলিস কিরে? অমন ডর -ভাতার ব’শ ক’রতি
পারে না!
এ কোন গাশের মেয়ে ?
মথুর। তাের বাপের বাড়ীর দ্যাশের নয় সে খুব বলতি পারি, আর
কোন্ দ্যাশের তা কতি পারিনে! তা তুই এক কাজ করতি
পারিস?
কেলাের মা। কি ?
মধুর। আমায় যেমন ওষুদ ক’রিচিস-তুই ছাড়া আর কোন মেয়ে
মুকির দিকি চোক ওটে না—চোক মেলতি গেলেই—খালি
নিদ্রে—নিদ্রে নাক ডাকিল) তেমনি এড়া ওষুদ করি দিতি
পারিস, বৌমারে দিইবাবুরি দেয় খেওয়াবে, তা হলি আর
দ্যাকতি হয় না—খালে মুকিম
নয়নামি
( নাসিফাখণি)-কে শায় চা-চুটক
সামি
একবার মজাভা দেকি ! এটু ঘুমুরে বাঁচি।
কেলাের না। আমি তােরে কি করি ওষুদ কৰিটি তা জানিসনে ;
প্রথম দৃশ্য
মত্রশক্তি
মনে নেই বুজি ? আ অলপ্পেয়ে—আমি যে তােরে ওষুদ ক’রিচি
এই কীলির চোটি-ইলি তুই কি ছিলিমনে নেই?
c)
যে-টোগরী পােড়ারমুকী-দুদিৰ কেঁড়ে কালি নিয়ে শিশী
করে মাজে মাজে আসে তাের কাচে বাতের ওষুদ নিতি-~~আমি
কিচু বুজিনে বুজি-কছে
* ওষুদ ক’ল্লি আজ এ
কলিনির মন্দ্যি একবার যাবার ফুরসৎ হয় না? আমি আলাম এই
রাত্তির কালে ডাকতি
মথুর। আরে চুপ, চুপ—এড ভদ্দর নােকের বাড়ী-আরে ভাল
কত কতি গিয়ে কি আপদেই পড়লাম ! আরে ইরি মদ্দি আইরির
ভাল ভুলে গেলি বুঝি ? না: বাপু, আর চেঁচাসনে ; না হয় এক
ফাকে গিয়ে তাের ও আইরির ডাল খেয়ে আসলাে।
কেলের মা। তুই না খেলি তাে আমার ব’য়ে গেল।
করেচে ? ক’রিচিই তাে ; ঐ ভালমানুষির মেয়েরে শিকুয়ে দিয়ে
জাব, ভাতার বশ করার ওষুন—চুলির মুটো না ধরি দেবে কি
বসায়ে পাজর ভেঙ্গে, নয় কাটের চ্যালা দিয়ে দেবে ঠ্যাং খােড়া
করে-তারপর না হয় চুণি হলুদি দেবে স্যাও ভাল, দেখি কেমন
মিলে তার বশ না হয়? ও রােগের ওষুদই ঐ ! জাতে তােরে ঢিট
করিচি! ভদ্দর নােকর মেয়েরা ন্যাকাপড়া শিকি ঐ ওষুদ ভুলি গিয়িই
তাে নিজেদের সর্বনাশ করেছে। সােয়মী বারমুকে। হলিই হল।
মথুর। এ্যানি তত তেমন চিনতি পারিনি, চেনলাম এই অসুখ হতি।
কি করণই কল্পে !
কেলাের মা। বাবু গেল কমনে? তারে চিটি নিকে আনালে না কেনে ।
মথুর। আরে আমার পােড়। দশা! চিটি নিকে খবর দেবে কারে।
বলে ওষুদ
১১০
মশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
কন
বাবু কি যাবার সময় বলে গিয়েছেন, কোথায় যাচ্ছেন। কোলকাতার
কোন্ নচ্ছার বাড়ী পড়ে আমানী লােসচেন, আর এখানে
বাড়তি যে, যমে-মানষি টানাটানি—কেউ মলল কি বাচলে কে
কার খপর রাকে? যে সুমুন্দিরা এখানর মাটী কেমড়ে দিনরাত
পড়ে থাকতাে, গিন্নিমার ব্যাম হ’তি, তাদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে অপর
দ্যালাম—তা কেউ একবার ভুলেও উকি মারলে না! আসুক বাবু
একবার বাড়ী, তারপর আমিও একবার বােজাপড়া করবে।
কেলাের মা। তা আমি এখন উটি—তুই এক ফাকে যাস, মাতা খাস
নইলি ছেলেটা বড় কাদাকাটা করে।
মগুর। ঈবনে একবার বৌমারি ব’লে ; গিন্নি মা একটু ভালও
আছেন! চ’; তােরে সদরডা অবধি একটু এগুয়ে দিয়ে আসি।
কেলের মা। না, তাের আর জাতি হবে না। আমি জাবনে! হ্যা,
ভাল কতা; তাের জন্যি দু’টো খাজুর এনেলাম—এই পিণ্ডী
খাজুর—খেয়ে এক ঢোক জল খাস !
মধুর। খাজুর পালি কোয়ণে? তাের কোন বুনুই দিয়েছে ?
কেলাের। আমার বুনুই নয়, নােলাই দিয়েচে ; ভ্যাবলার বাপ,
কোলকাতাখে আলােনা আজ-এনেলে ; তাই থােকারে খাতি
দিয়েলে—তাখে দু’টো তাের জন্য এনেলাম।
মথুর। (খেজুর গই। গালে গিয়া) ওষুদ তুই এমনি করিই করিচিস—
কিলীর গুতােয় নয়; খাজুর খাওয়াইয়ে—ক্যামন রে ?
কেলাের না। (ঈষৎ হাসিয়া) দেকি,যেন আল্লাদে আটা গলায় বাদে না।
;
মধুর। হাতের ভর নােকের কেঁতায় আগুন ; এমন পরিবার, ঘরের
প্রথম দৃশ্য মন্ত্রশক্তি ১১১ -ঐ পাচ ইস্ত্রি-যে খুজে খুজে এসে খাজুর খাওয়াইয়ে যায়, তারে ফেলে কিন-রাত কাটায় . কুকুরির পাতচাটা নেপথ্যে মৃগাঙ্কমােহন ডাকিল ম’থরাে, মথরো! আমলে সব গেল কোথায়-বাইরে অন্ধকার ( প্রবেশ করিয়া ) মৃগাঙ্ক। কোন দিকেই জনমানব নেই-- মখুর। এই যে বাবু আলেন! আঃ বাচলাম। প্রণাম করিল মৃগাঙ্ক। এই যে, জেগে আছ ? বাইরে এসে যে এত হাঁকাহাঁকী করছি—দরওয়ান লােকজন সব গেল কোথায় ? সব যে অন্ধকার, পালানে বাড়ী হয়ে গেছে দেখছি এ ক’ দিনে? দরওয়ান দরওয়ানগাড়ী থেকে ট্রাঙ্ক বিছানা নামিয়ে আন- মধুর। (শশব্যস্ত হইয়া) বাবু একটু আস্তে-অমন করি-এজ্ঞে মৃগাঙ্ক। অমন করে? এঙ্কে ? বড় মজা পেয়েছিলে এ ক’ দিন ; আমি বাড়ী ছিলাম না—কেমন সব ঘুমিয়ে কাটিয়েছে! আচ্ছা, দেখাচ্ছি মজা সব—যা-ট্রাঙ্ক বিছানা নাবাগে যা। মথুর। যে এজ্ঞে মপুরের স্থান মৃগাঙ্ক। দরওয়ান-দরওয়ান- যার প্রবেশ অার মাথায় কাপড় নাই কোমরে আঁচল জড়ানাে হাতে একখানা দুধ জাল দিবার হাত অজা। আন্তে-অত নয়! বাড়ীতে ডাকাত পড়া চীৎকার করাে না। মৃগাঙ্ক। মানে ?
১১২
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
অজা। অত মানে বলবার আমার সময় নেই, আমি বালি চড়িয়ে
এসেছি। মানে শােনবার দরকার থাকে গােল না করে আস্তে
আস্তে আমার সঙ্গে রান্নাঘরে এস।
অজ। ফিরিল
মৃগাঙ্ক। আহা-হা শােন না।
অজা ইতিমধ্যে বাঁ হাত দিয়া মাথায় আঁচিল টানিয়া দিল ও ফিরিয়া পাড়াইল
অজা। কি ?
মৃগাঙ্ক। এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি। হাতে উদ্যত হাতা, মালসাটা নয়
কোমরে আঁচলপাট বটে। রান্নাঘরের চার্জে নিয়েছ দেখছি,
ব্যাপারখানা কি।
দিদি কোথায় ? তুমি রাধছ কেন? বামুন
ঠাকুরের কি হয়েছে ?
অজা। চলে গেছে।
মৃগাঙ্ক। কে চলে গেছে। দিদি ?
অজা। না, তিনি ওপরে শুয়ে আছেন, বামুনঠাকুর চলে গেছে।
মৃগাঙ্ক। কেন, দিদি ঝগড়া করে বামুনঠাকুরকে তাড়িয়েছে বুঝি ?
( মৃদু হাসিয়া) না, না, সে নিজেই গেছে। দিদির কলেরা
হয়েছিল কিনা, সেই সময় ভয় পেয়ে সবাই পালিয়ে গেল।
গা। দিদির কলেরা হয়েছিল? এখন কেমন ? সেরেছেন তাে?
মজা। সেরেছেন ; ওদিকে আমার বালি বুঝি ধরে যায়।
बयान
গা। আরে, এ যে এলে মিলিটারী, চলে গেল মিলিটারী,
ব্যাপারখানা কি?
প্রথম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
মধুরের প্রবেশ
হারে মথরাে, দিদির কলেরা হয়েছিল, তা আমায় খবর দিসনি কেন ?
মথুর। এজ্ঞে—আপনি কলকাতায় কোন্ বাইজীর বাড়ীতে গান শুনতি
গিয়েলেন সে ঠিকানাড়া তত বৌমার কাচে রেকে জাননি, খপর দেবে
কি করে ?
মৃগাঙ্ক। হতভাগা! আমার বুঝি ত্রিসংসারে আর কাজ নেই, আমি
কেবল বাইজীর বাড়ী গান শুনেই বেড়াই এই বুঝি জেনে রেখেছে।
মথুর। এজ্ঞে লড়ায়ে ঘােড়া আস্তাবলে না থাকলিই লােকে খোজে গড়ের
মাটে; আর শুনিচি বাবুর বাড়ীতে ঠিকানা না রেকে যদি বোেন,
তঁাদেরও খোজ নিতি হয় ঐ রকম বাড়তি—যেকানে নাচন গাওন
হয়, আর গিয়ে
মৃগাঙ্ক। থাম ব্যাটা! আর গিয়ে ! ব্যাটা সব জেনে শুনে বেদব্যাস হয়ে
বসে আছে! তা লােকজন, বামুন, দরওয়ান সব পালিয়েছে-
মথুর।
মৃগাঙ্ক। তা তুমি পালাওনি কেন? দয়া করে এখনও যে বড় আছ।
নচ্ছার ব্যাটা। হারামজাদা ব্যাটা!
মথুর। এজ্ঞে আমি পালালি, এমন ভাল ভাল গালাগালগুলাে আর কারে
দেতেন ।
মৃগাঙ্ক। নে চল আলাে ধর ! দেখি দিলি কেমন আছে।
মধুর। আর থাকবেন কেমন! সেরে গিয়েছেন, কিন্তু বাবু! একতা
বলে রাখচি যে, বৌমা আমার না থাকলি, এবার তিনি সারতেন না,
সতেন। ও ধন্যি মেয়ে বটে! কি করণাই করেছে! মায়েগা,
১১ঃ মত্রশক্তি চতুর্থ মঞ্চ ত্যামনডা পারে না, আর পেটের মেয়েরও তেমনভা করবার সাদ্যি নেই। মৃগাঙ্ক। আচ্ছা চল তােকে আর বক্তৃতা করতে হবে না। উভয়ের প্রস্থান দ্বিতীয় দৃশ্য রমাবল্লতের বাটী মন্দির-প্রাঙ্গণ রমা। দেখছি অদৃষ্টই বলবা। মেয়ে সুখে থাকবে, বিষয় রক্ষা হবে, এই মনে করে বে’ দিলুম, মেয়ে যা বল্লে সেই সৰ্তেই বে’ দিলুম, কিন্তু তাতে অশান্তি দূর হ’ল কই ? হ’ল কই ? ভেবেছিলুম বিয়ের পরে মেয়ে জামাই তাদের প্রতি আপনারাই ভাঙ্গবে ; কিন্তু বছর ঘুরতে চললাে তা হলাে কই? ফুলেমেয়েজামাইয়ের না তেৰে গিল্পী কঠিন ব্যায়ামে পছলেন। ডাক্তার কবিরাজ তত স্পষ্টই বলে গেছে তার দিন সংল; এ কথা বাড়ীর কেউ জানে না কেবল আমি নি; বােধ হয় কবিও তা মনে মনে বুঝেছে। দিনরাতের ভেতর চোখের জল শুকোয় না। কি অশুভক্ষণেই বাবা উইল করেছিলেন, আর কি অশুভক্ষণেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলুম। বিষয় তো রা হল- কি কৃষ্ণপ্রিয়াকে কি রাখতে পারব? মেয়ের চিরলীনের মুখ, চিরজীবনের শাভি-কাৰি-ৰা কি করব?
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১১৫
কৃপ্রিয়ার প্রবেশ
কৃষ্ণ। হ্যাগাে! আজকের ডাকে কোন চিঠিপত্র এলো, বাছার খবর
কিছু পেলে ?
মা। এ কি! তুমি আবার উঠে এসেছ ? কিছুতেই বারণ শুনবে
না? কবিরাজে কি বলে গেছে তা জান তো।
কৃষ্ণ। কবিরাজে অমন বলে ; আর যা বলে গেছে তাই যদি হয়, তাতেই
বা ক্ষতি কি। তােমাকে রেখে যাব, বাণীকে রেখে যাব, সে তত
আমার ভাগ্য। কিন্তু অম্বরকে না দেখে মলে, আমি যে, পরলােকে
গিয়েও শান্তি পাব না। হাঁ গা, আজও তার কোন খবর আসে নি ?
রমা। ডাক এসেছে, অম্বরের কোন চিঠি পাই নি, তবে একখানা খবরের
কাগজে তার খবর পেয়েছি।
কৃষ্ণ। কি গা ? কি খবর? বাছা আমার ভাল আছে তো?
রমা। হ—ভাল আছে। কাগজে কি লিখছে শুনবে? শােন-সে
এখন আসাম অঞ্চলে চারটা চতুম্পাঠী খুলেছে। লিখছে—অম্বনাথ
যায়, সাখ, যােগ ও বেদান্ত চারি বিষয়ে চারিটী চতুপাঠীকে
পরস্পরের তুলনীয় করিয়া তুলিয়াছেন; নিজেও তিনি পরম পণ্ডিত।”
আরও অনেক কথা আছে—শেষে লিখেছে—“অনাথ আর্কের পিতৃ-
স্থানীয় অম্বর নিজে সম্পদস্বর্গে প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র-জীবন
যাপন করিয়া থাকেন। ইহাতে তাহার সুখ এবং এইটি তার সর্বা-
পেক্ষা বিশেষত্ব।
কৃষ্ণ। কৈ দেখি, দেখি! ( রমাবল্লভের হাত হইতে খবরের কাগজ
লইয়া) আহা! আমার এমন জামাই ঘরবাসী হল না। গা,
১১৬
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
তাকে আসতে লিখলে কি লেখে-কবে আসবে—তাকে ফিরিয়ে
আনছ না কেন?
রমা। সে এখন আসবে কি! দেখছ ত ? সে এখন চারিটী চতুম্পাঠী
খুলেছে; তার কত কাজ।
কৃষ্ণ। বল কি ? একলা সে চারটে টোলে পড়ায়? এত খাটলে তার
শরীরে কি কিছু থাকবে ? ওগো! তুমি বাছাকে—মামার কাছে
আনিয়ে দাও।
কমা।
আনানে কি মুখের কথা! তুমি তো জান, তাকে এখানে
আসবার জন্য কত চিঠি লিখেছি। লােক পর্যন্ত পাঠিয়েছি, কিন্তু
সে বলে সেখানকার কাজ শেষ না করে সে আসবে না।
কৃষ্ণ। বাছার সব ভাল, কিন্তু কি জানি কেন এ রকম একগুয়ে।
কাগজখানা আমার কাছে থাক—বাণীকে দেখাব। সে মনে করে
অম্বর বড় মুখ, বড় বােকা-
বগ। রাখ। তাকে দেখিও। সেও তাে লিখতে পারে অম্বরকে এখানে
আসবার জন্যে! ( দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) যাক, যেখানে থাকে ভাল
থাক। আমি আজকের ডাকে তাকে একখানা ভাল করে লিখে
দেব। যা রাধাবল্লভের মনে আছে তাই হবে।
সমাবতের একান
কৃষ্ণপ্রিয় কাগজখানা উল্টাইয়া পাল্টাইয়া পুনঃ পুনঃ পড়িতে পড়িতে
কৃষ্ণ। এ যা লিখেছে সবই তো তার গৌরবে ভরা ; এমন জামাই পাওয়া
ভাগ্যের কথা। কিন্তু বাছা আমার আসে না কেন? বাণীকেও তো
কখনো কোন চিঠি লেখে না। কেন এ কি অভিমান? বাণী কি
তাকে মর্মান্তিক কিছু বলেছে? মেয়ে আমার একটু কে আহ্বরে
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১১৭
কিন্তু মন তাে তার ছোট নয়; সে কি এমন মর্মান্তিক কিছু বলতে
পারে ?
বার্ণর প্রবেশ
বাণী।
কৃষ্ণ। হারে। অম্বর তোকে কোন চিঠি দেয় না কেন বল দেখি?
বাণী। আমি তার কি জানি ?
কৃষ্ণ। তুই বুঝি তাকে চিঠি লিখতে বা আসতে মানা করেছি?
করে থাকি তো করেছি—খুব করেছি। আমাকে কে চিঠি
লিখলে বা না লিখলে সেই ভাবনায় তো আমার ঘুম হচ্ছে না।
তােমার যে, কি হয়েছে মা, দিন রাত কেবল ঐ এক কথা! আমি
এখন যেন তােমায় আপদ বালাই হয়েছি, কেবল ঐ একজনের দিকেই
তােমার যত টান। তার চেয়ে তুমি সেইখানেই কেন যাও না?
আমায় তত আর একটুও তুমি ভালবাস না !
কৃষ্ণ। তা বলবি বৈকি ? মা কি আর সন্তানকে ভালবাসে। তাকে
যে এত ভালবাসি সে কার জন্যে রে বাণী! তুই মনে ভাবি
অম্বরের কোন গুণ নেই। কিন্তু দেখ দেখি, কাগজে কি লিখেছে
–পড়ে দেখ, এই এক বছরে তার নাম হয়েছে, লােকে তাকে
কত ভাল বলছে ? তুই শুধু তাকে ভাল চোখে দেখলি নি, এই
আমার বড় দুঃখ রয়ে গেল।
বাণী সকৌতুহলে কাগজখানি লইয়া তাহাতে চোখ বুলাইতেই অম্বরের নাম দেখিয়া
তাহ অগ্রাহভাবে ভূমে নিক্ষেপ করিল এবং তাচ্ছিল্যভাবে বলিল
বাণী। তুমি থাম মা! ওসব মােসায়েবের দল থেকে বিজ্ঞাপন বের
১১
মশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
করা বৈ আর কিছুই না। পণ্ডিত! ওঃ বড় তাে পণ্ডিত। তাই
একটা উপাধিও কেউ দয়া করে দেয় নি।
কৃষ্ণ। ততার সঙ্গে কথা কওয়াই আমার ঝকৃমারী।
কৃষ্ণলিয়ার প্রস্থান
বাণী এদিক ওদিক দেখিয়া কাগজখানি কুড়াইয়া লইল এবং পড়িল
“দরিদ্র জীবন যাপন করেন।” আঃ বড় কীৰ্ত্তিই করেন। কেন-কি
জকে করতে বলেছে ? এত তেজ, এত অহঙ্কার। শকি
এই পর। আমার বাপ কি আর কেউ নন্। আর তাই যদি হয়,
গরীব ব্রাহ্মণ তত চিরকাল পরের অয়েই প্রতিপালিত হয়ে থাকে,
“রিদ্র জীবন” উ সে বড় কষ্ট। এখানে সাতটা বঁধুনিতে বাধে
সেখানে হয় তো নিজে রেধে খায় । হয় তো গরম ফ্যান পড়ে হাতে
ফোস্কা পড়ে। পরণে হয় তত গুণ চটের মত মােটা ময়লা কাপড়
তাতে হয় তাে একটু মানায় না। তাতে আর ক্ষতি কি ! কেই
দেখছে। অসুখ হলে মুখে জল দিতেও বােধ হয় কেউ নেই
(পুনরায় পাঠ) “প্রশান্ত সুন্দর মূর্তি তা সত্য, সুন্দর! খুবই
সুন্দর! এত সুন্দর যে, পুরুষমানুষ হয়, এ ধারণা আমার কখনাে
ছিল না। লিখছে—“প্রশান্ত, স্থির, ধীর”। তাই বা নয় কেন?
এতটা যে বিদ্বান কেই বা তা মনে করত। আমি কি স্বপ্নেও
জানতুম যে, সে এত ভাল, এত বড়! বাবাকে মাঝে মাখে
চিঠি লেখে,
আমাকে ত লেখে না; কেনই বা
ঠিক তার প্রতিজ্ঞা পালন করে চলেছে। আচ্ছা! কেন সে
আমায় বিবাহ করতে সম্মত হল? এ যেন একটা হেঁয়ালী। এ
লিখবে?
মন্ত্রশক্তি
কি তার দয়া? না-না, দয়া নয়—দয়া নয়, দয়া
করে থাকে, সে কি মহৎ ?
তো মহতেই
বাণীর হাত হইতে খবরের কাগজখানা ইতিমধ্যে পড়িয়া গেল
যা হবার হয়ে গেছে, আর সে কথা ভাবব না; এখন দু’জনেই
প্রতিজ্ঞা রেখে চলতে পারলেই মঙ্গল।
বাণ ধীরে ধীরে অন্তঃপুরের দিকে চলিল, হঠাৎ ফিরিয়া এদিক ওদিক দেখিয়া
কাগজখানি কুড়াইয়া লইয়া বুকের মধ্যে চাপিয়া দ্রুত চলিয়া গেল
অপর দিক দিয়া কৃষ্ণপ্রিয়ার প্রবেশ
কৃষ্ণ। বাণী চলে গেল ? কি যেন কুড়িয়ে নিয়ে গেল না? কি ?
অমন ক'রে গেলই বা কেন ? কৈ ? কাগজখানাও তো ফেলে
যায় নি! নিয়েই গেছে। তবে আমার সামনে যে, অমন করে
ফেলে দিলে সেটা কি লােক-দেখান ?
কি এদের ব?
মেয়েও তো আর কচিটি নয় ; দু’জনের মধ্যে কিছু হয়েছে
নিশ্চয়ই; কি একটা ভুল করেছে। আমারও তো দিন শেষ হয়ে
আসছে, আর তাে অন্ধকারে থাকা ঠিক নয়। কে আছিস রে?
(১৫-
এনে
কি। আমায় ডাকছো মা।
ঝি। শিখিঠেঙীকে।
কৃষ্ণ। শীত
একবার বাণীকে ডেকে সে তাে রে।
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
*কি। আচ্ছা মা !
১৭
বি এস্থান
কৃষ্ণ। কি জানি মেয়েটার ভাগ্যে কি ঘটবে! আমারও তাে দিন
ফুরিয়ে আসছে ; এই সাজান সংসার ফেলে যেতে হবে ; মরবার
আগে যদি মেয়েটাকে সুখী দেখে যেতে পারতুম। দেখি, সদাই
যে অন্যমনস্ক, আগেকার মত তার সেই হাসি নেই, পূজায়ও আর
তেমন আগ্রহ দেখি না। কেমন যেন মনমরা কেন এমন হল?
গােকিলাের। “সকল সুখের সুখী করেছিলে, দেবতার মত
স্বামী, তার অগাধ ভালবালা দেবার মত মেয়ে, অতুল ঐশ্বর্ণ,
কিছুরই অলৰ বাখনি। পচিশ বৎসরেজরাণীর মত এই
সংসাহে, যাবার আগেই ব্যথা নিয়েই যেতে হ’ল কি
পেতে গুৰু! কি-পাপে? আমি গেলে উনি বড় কাতর
হবেন। সেই দশ বছর বয়সে এ সংসারে এসেছি আর একটানা
এই এত বছর-একটা দিনের জন্য ও কথন ছাড়াছাড়ি নেই ! যাব
মনে কল্লেই যে বুকটা খালি খালি হয়।
বাণীর পুনঃ প্রবেশ
বাণী। মা! আমায় ডেকেছ ?
কৃষ্ণ। হ্যা! শােন ! আমার কাছে আয়।
বাণী। কি বল।
রাণীর মাথা বুকের মধ্যে লইয়া
কৃষ্ণ। বাণি! মা আমার; বল আমার কাছে কিছু সুকোবিনি।
আমি যা জিজ্ঞাসা করব তার উত্তর দিবি?
•
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
বাণী।
এ কথা কেন বলছ মা? কি হয়েছে ?
কৃষ্ণ। আমায় সত্যি করে বল দেখি বাণী ! অম্বর আসে না কেন ?
ততাকে পত্র লেখে না কেন? কি হয়েছে তােদের ? আমার
কাছে লুকোস নি, সে কি আর আসবে না ?
বাণী। না মা, সে আর আসবে না।
কৃষ্ণ। আসবে না ? কেন আসবে না ? আমায় বল বাণী ; সে তো
তেমন নয়, তুই কি তাকে আসতে বারণ করেছিস?
বাণী। আর তােমার কাছে কিছু লুকোবাে না। বারণ কেন
প্রতিজ্ঞা করেছি এ জীবনে কখনো আর আমার সঙ্গে তার
দেখা হবে না।
কৃষ্ণ। হু-বুঝলুম ! ভাল করনি মা! বড় অন্যায় করেছ। তা
হােক—ছেলেমানুষ না বুঝে যা করে ফেলেছ তার তো আর চারা
নাই ; আমায় সব কথা বল্লে কোন্দিন এ সব মিটে যেতো; কিন্তু
মা, আমি তাকে জানি, আমি আশীৰ্বাদ করছি সে তােমায় ক্ষমা
করবে। তুমিও তাকে ডেকে ক্ষমা চেয়ে।
বাণী। (দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া রুদ্ধ কণ্ঠে) সে যে হবে না মা, আমরা
যে প্রতিজ্ঞা করেছি, এ জমে কেউ কারো সঙ্গে কোন সম্পর্ক
রাখব না !
কৃষ্ণ। পাগল মেয়ে স্ত্রীলােকের স্বামী ত্যাগের প্রতিজ্ঞা আবার
প্রতিজ্ঞা কি ? যা করেছ তাতে মহাপাতক হয়েছে। আজন্ম
তার সেবা করে, তার বাধ্য হয়ে এ মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত কর।
সে বড় ভাল ; একদিন তুমি বুঝবে সে কত ভাল। কেঁদ না মা,
যেমন করে পার অম্বরকে ফিরিয়ে এনে। জেনে-স্বামী ছাড়া
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
মেয়েমানুষের আর কিছুই বড় নেই। অন্য সুখ, অন্য কামনা, এমন
কি অন্য দেবতাও তার থাকতে নেই
বাণী তাহার মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল
কৃষ্ণ। আমার মুখের দিকে চেয়ে কি দেখছিস? আমি যা বলছি, এর
এতটুকুও মিথ্যে নয় বাণী ! এ সত্য; এতবড় সত্য মেয়েমানুষের
কাছে আর কিছু নেই। আমি চলে যাব, চিরকাল কিছু থাকব
নকি তুই--যত দিন যাবে ততই, তেত্রিশকোটী দেবতা
এক দিকে আর স্ত্রীলােকের স্বামী অন্য দিকে ; স্বাক্ষর চেয়ে বড়
শুলােকের-জার নেই, আর থাকতে পারে। আমি আবার
আশীৰ্বাদ ক’চ্ছি মা, তুমি যেন এই স্বামীকে চিনতে পার, তার
পূজা করে, তার সঙ্গে যে অন্যায় ব্যবহার করেছ, তার প্রায়শ্চিত্ত
করবার ভাগ্য তােমার হয়।
•
কৃষ্ণপ্রিয় বাণীর মুখচুম্বন করিয়া ধীরে ধীরে প্রদান করিল
বাণী। ( বাণী ধীরে ধীরে কাগজখানি বুকের মধ্য হইতে বাহির করিয়া
একবার নিবিষ্টচিত্তে দেখিয়া, পরে বলিল) তবে, তবে সত্যই কি তুমি
আমার দেবতা। সত্যই কি আমার অন্য আরাধ্য থাকতে নেই? তাই
যদি হয় তাহলে গােপকিশাের! এখন আমার উপায় ?
তৃতীয় দৃশ্য মৃগাঙ্কের বাটী—দ্বিতলের গৃহ অজার শয়নকক্ষ খাটের উপর ধবধবে বিছানা, শয়ন কক্ষের সমস্ত সরঞ্জাম, চেয়ার, টেবিল, আলমারী, আয়না ইত্যাদি :- অজা চেয়ারে বসিয়া গান গাহিতেছিল পথপানে চেয়ে চেয়ে কেটে গেল বেলা- সাঙ্গ হ'ল না মাের জীবনের খেলা। তৃষিত কণ্ঠ ওগাে, বৃথায় শুকাল পােহাতে মিশি আলােক নিবিল সুখ সাধ আশা নিরাশে ভরিল- যদি জ্যোতিহার আঁখিতারা তবে কেন অাখি মেলা ? অজা। ক’দিন একটুও জিরুতে পাইনি, আজ নতুন বামুনঠাকুর এসেছে—মনে করলুম সকাল সকাল শুলেই ঘুমিয়ে পড়ব, কিন্তু কৈ, ঘুম তত আসে না; রাত্তির জেগে জেগে মাথা গরম হয়েছে বােধ হয়। (ডিকেটার হইতে গােলাপজল লইয়া মাথায় দিল ও ঘরের জানালা খুলিয়া দিল) বা-দিব্যি জ্যোৎ! বাইরে এখুনি হয় তাে গান বাজনার হল্লা উঠবে। কি জানি, আজ কদিন কেন সে সব বন্ধ আহে। (জানালার নিকট হইতে ফিরিয়া আসিয়া বিছানায় বসিল) লে একঘেয়ে জীবন! মুখও নেই, দুঃখও নেই। সুখ ? এর চেয়ে
১২৪
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
সুখ তো না থাকাই উচিত ; গরীবের মেয়ের আবার এর চেয়ে সুখ
কি ? দু’টা খেতে পরতে পেলেই তাে গরীবের সুখ ; বাবাও
তো এই দুই দায় থেকেই উদ্ধার পাবার জন্য বিয়ে দিয়েছিলেন
দূর হ’ক। ভেবেই বা কি করব ।
দেখি যদি ঘুম
আসে। ( শয়ন)
•
কিয়ৎক্ষণ পরে ধীর পদে মৃগাঙ্কের প্রবেশ
মৃগাঙ্ক। বাড়ী যেন খা খা ক’চ্ছে। সব নিস্তব্ধ, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
এরাও ঘুমিয়েছে কি ? (পা টিপিয়া টিপিয়া কিয়দ্র অগ্রসর
হইলেন) চোরের মত পা টিপে টিপেই বা চলছি কেন ? কোন
পরস্ত্রীর ঘরে তো ঢুকিনি? না, কাজ নেই, দিব্যি ঘুমুচ্ছে, ফিরেই
যাই; কিন্তু যাব কোথায় ? বাইরের আমােদ আলাদও তো বন্ধ
করে দিয়েছি। আজ তাে বন্ধু-বান্ধব কেউ আসবে না। আর
জহর—দূর ছাই! এরাও তো উঠে না, এতই কি ঘুম ! (আর
একটু অগ্রসর হইয়া) ওঃ-গােলাপের গন্ধ ভন্ ভর করছে।
সখটুকুও বেশ আছে! কিন্তু কাজকর্মেও তো পেছপাও নয়,
রান্না-বান্না বেশ করে, আর কি যত্ন করেই খাওয়ার। এই
(4 मत मारत नाही बदल ? शास्त्र नभ, घारा
জাৰে। কি করে! শতা খেতে বসলে কোনদিন বাতাসও
শি, আর নিজের হাতে কোনদিন মাছের ঝােল রেখে খাওয়া
শি, বরং আমিই সৰু-আরে দূর! ঘুরে ফিরে—চোরের
ভাসাবো, বালিসেইজ...এ পেকে ধু ঐ বন্ধুত্ব করেই
থাকাের ইতি) থাকজ আর তুলে কাজ নেই ঘুমুচ্ছে
তৃতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি ঘুমুক, সমস্ত দিন খেটেছে তো, হাজার হ’ক ছেলেমানুষ, যাই দিব্যি জ্যোৎস্না-ছাদে একটু পায়চারি করিগে। এস্থান অজা পাশ ফিরিয়া শুইল অজা। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ! কতটুকু ঘুমিয়েছি ? পাখাখানা? ( পাখা লইয়া) একটুখানি তন্দ্রা এসেছিল, স্বপ্ন দেখছিলুম, যেন ফুলশয্যায় রাত্তিরে লুকিয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে–লজ্জায় ভাল করে তাে মুখ তুলতে পারিনি—তখনকার সেই কুমারী হৃদয়ের যা কিছু সাধ, আল্লদ, ভালবাসা, সবই তাে মনে মনে নিবেদন করে দিয়েছিলুম তার পায়ে ; কিন্তু সে আশার রাগিণী আজ কোথায় মিলিয়ে গেল। আমি পাগল ! এই চিন্তার ভার নিয়ে কি কখনাে ঘুম আসে! কোথা থেকে কাল-বােশেকির ঝাপ্টা এসে আমার সাজান বাগানের ফুটফুলের লতাকুঞ্জকে এলােমেলো করে দিয়ে গেল! তখন কি জানতুম যে, আমার আশা কেবল দুরাশাই হবে। তখন মনে করেছিলুম আমার স্বামীর হৃদয় কত না সুন্দরই হবে। কিন্তু এখন দেখছি তার হৃদয় বলেই তো কিছু নেই। কেবল ঐ চিন্তা ! না আর ভাববো না, চুপ করে শুয়ে থাকি, দেখি যদি ঘুম আসে ( আবার ঘুমাইবার চেষ্টা ) ক কিয়ৎক্ষণ পরে মৃগাঙ্কের পুনঃ প্রবেশ মৃগাঙ্ক। ( প্রবেশ করিতে করিতে) জ্যোৎসাই হক আর অমাবস্যাই হক একা কতকক্ষণ পায়চারি করা যায় ? একা ‘ করে ছাদের মাঝখানে দাড়িয়ে চাঁদের সুধা খাওয়াও আমার পােব না
মন্ত্রশক্তি
বা! ছাদের চেয়ে এ ঘরই ভাল ; তবু মার উপর একটা
আচ্ছাদন আছে। এই নিস্তব্ধ রাত্রে নীল আকাশের পানে চাইলে
প্রাণটা যেন হুহু করে ওঠে। আরে বাঃ! এই যে, এই পাশ
ফিরেই শুয়েছে ! মুখে আর ঘােমটা নেই, চুলগুলো মুখের ওপর
এসে পড়েছে। তার ওপরে জ্যোৎস্নার আলো! এই এতক্ষণে মনে
হচ্ছে ভাল Background না পেলে, ও জ্যোৎস্নাই বল আর
পূর্ণিমার চাঁদের কিরণই বল, কাহাের কিছু কেরামতি নেই; কেউ
ফোটেন না। বন্ধুটা আমার রূপসী বটে! উনুনশালে ফুটন্ত ভাতের
হাড়ী নামাবার সময় মুখখানি দেখেছিলুম টুকটুকে লাল, সে
মুখখানিও বেশ লেগেছিল ; আর আজ এই সাদা ধবধবে বিছানায়
শুয়ে—ঐ লাল টুকটুকে মুখের ওপর ধবধবে জ্যোৎস্নার আলাে
( অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে) বা সত্যিই সুন্দর।
অজা। ভীতকণ্ঠে) কে? কে? মা গাে! ( উঠিয়া বসিয়া নামিতে গেল )
মৃগাঙ্ক। (হাত ধরিয়া) আমি—আমি—অজ। আমি ।
অজা। কে তুমি! কে আছ ? চোর! চোর!
মৃগাঙ্ক। আরে কি বিপদ-আমি!
অজা। তুমি-
(নেপথ্যে মথুর)। “
কিরে এক মত এবার নি,
বৌমার ঘরে চু!ি কিডারে?”
মধুর লাঠি লইয়া প্রবেশ করিল। অজা একটু সরিয়া গিয়া আল উস্কাইয়া দিল
-ছি-
মৃগাঙ্ক। আরে:দেখ দেখি কি বিভ্রাট! ছিঃ-
অজা। (ঘঘামটা দিয়া) ওমা তাই তো?
তৃতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
মথুর। আরে রাম কহে, চোর নয় ! এ যে আমারই বাবু! আঃ-
এমন ঘুমডােও মাটী করলে। (হাই তুলিয়া)
মৃগাঙ্ক। ব্যাটা লাঠি নিয়ে এসেছে। সত্যি চোর হলে তাে পালাতে ?
মথুর। তা কেমন করে বলবাে, আমি তাে আর মিথ্যে বলে আসিনি।
সত্যি জেনেই এয়েলাম। তা বাবু, আজ এই বাড়ীর মদ্দিই কি
ফুরসিতে তামুক দেবে?
মৃগাঙ্ক। যা যা আর তামাক দিতে হবে না, তুই যা ঘুমুগে যা।
মধুর। এজ্ঞে ( যাইতে যাইতে ) কেলাের মা আলো ককন? ককনই
বা বৌমারে ওষুধ ক’রতি শেকালে ? আজ ক’ বছরের মদ্দি তো
এমন অঘটন একদিনও দেকিনি। বাবু-রাত্তিরি বাড়ীর মন্দি
বৌমার ঘরে!
মৃগাঙ্ক। যা—যা-যা-
মথুর।
এখন
মৃগাঙ্ক। ছি ছি দেখ দেখি, হঠাৎ চেঁচিয়ে কি করলে?
অজা। তা তুমি তাে আমায় ডাকলেই পারতে!
মৃগাঙ্ক। আরে ডাকতে যাব মনে করেছি এমন সময় তুমি যে
অজা। চেঁচিয়ে উঠলুম? তা ভয় করে না?
মৃগাঙ্ক। একবার চেয়ে দেখে ভয় করতে হয় যে, মানুষটা কে, চোখ
বুজেই ভয়।
অজা। (একটু হাসিয়া) তা তুমি? তুমি যে বড় আজ এখনও
বেড়াতে যাওনি?
মৃগাঙ্ক। না, দিদির কাছে শুনেছিলেম তােমার নাকি অসুখ করেছে,
১২৮
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
তাই বাড়ী থেকে বেরুই নি; কি অসুখ করেছে, বড্ড অসুখ কি ?
ডাক্তার ডাকব কি ?
অজা। ডাক্তার-না না ডাক্তার কি করবে ?
মৃগাঙ্ক। ডাক্তার কি করবে? বল কি! আমি তো অনেকক্ষণ থেকেই
দেখছি তুমি চোখ বুজে শুয়ে আছ, অথচ ঘুমােওনি? মুখখানাও
ত দেখছি বড় শুকিয়ে গিয়ে লাল হয়েছে। ( অঞ্জা লজ্জায় মুখ
নত করিল )
অজা। (স্বগত) অনেকক্ষণ দাড়িয়ে আছে ? ভাগ্যি মনের কথা
কেউ টের পায় না।
মৃগাঙ্ক। অসুখ না করলে কি কেউ অমন চুপ করে শুয়ে থাকতে
পারে। দেখি জ্বর হয়নি তো (বলিয়া মৃগাঙ্ক অজার কপালে হাত
দিতে গেল।
অজা সরিয়া খাটের উপর বসিল)
অজা। না- না, দেখতে হবে না, আমার গা গরম হয় নি।
মৃগাঙ্ক। ঠিক বলছ ?
অজা। হ্যা, সামান্য একটু মাথা ধরেছে, ও কিছুই নয়, এমনই সেরে
যাবে।
মৃগাঙ্ক। তা হলে ডাক্তার ডাকাই ভাল।
অজা। না, না, মাথা ধরায় ডাক্তার ডাকা আমাদের সেখানে অভ্যাস
ছিল না, খুব বেশী জ্বর হলে তখনি ডাক্তার আসতো।
মৃগাঙ্ক। এখন তাে আর সেখানে নেই, এখন এইখানের মত ব্যবস্থা
হক না।
অজা। (অভিমান চাপিয়া) কোন দরকার নেই, ও এখনি সেরে
যাবে। আমি যাই—দেখি, দিদি কি ক’চ্ছেন।
তৃতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১২৯
এই বলিয়া খাট হইতে নামিতে গেল। মৃগাঙ্ক সামনে যাইয়া
তাহাকে বাধা দিল
মৃগাঙ্ক। দিদি ঘুমুচ্ছে, আমি দেখে এসেছি। দেখ অজা, আজ আর
বেড়াতে গেলুম না, তা তুমি তাে তাতে কই খুসী হও নি ? কই
কিছুই বললে না তো?
অজা। ( বালিসের ঝালর নাড়িতে নাড়িতে মুখ নীচু করিয়া) তারা
এখানে আসবে তাে ?
মৃগাঙ্ক। যদি না আসে।
অজা। (অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মৃগাঙ্কের মুখের দিকে চাহিয়া) একদিনও না ?
মৃগাঙ্ক। যদি একদিনও না আসে?
অজা। তা হলে বেশ হয়।
মৃগাঙ্ক। ( অজার নিকট একটু সরিয়া আসিয়া) শুধুই বেশ হয়, তুমি
খুসী হও না।
অজা। হই।
মৃগাঙ্ক। কেন খুসী হও?
তা জানি না-বােধ হয়-
মৃগাঙ্ক। (খাটের আরও নিকটে আসিয়া খাটের দাণ্ডা ধরিয়া) হাসলে
কেন? বােধ হয় কি?
অজা। বন্ধু—তাই।
মৃগাঙ্ক। বন্ধু! বন্ধু কি বলছ, বুঝলুম না।
অজা। (মৃদু হাসিয়া সলজ্জতাবে) আমরা বন্ধু
नई
মৃগাঙ্ক। ও-সেই কথা বলছ! (হাসিয়া অজার গায়ে গড়াইয়া
পড়িল)
-
মন্ত্রশক্তি
চতুর্থ অঙ্ক
অজা। (সরিয়া বিপন্ন স্বরে) কেউ শুনতে পাবে যে, আমি যাই।
ব্যস্তভাবে খাট হইতে নামিয়া বাড়াইল
মৃগাঙ্ক। ( উচ্চ হাস্যে পথরােধ করিয়া) হা-হা, শুনতে পাবে? শুনতে
পেলেই বা, ক্ষতি কি? যাবার জন্য অত ব্যস্তই বা কেন? একটু
দাড়ালে ক্ষয়ে যাবে না তো। আর আমিও তাে সত্যি বাঘ নই যে,
টপ করে তােমায় গিলে ফেলব। হা-হা, শুনতে পাবে! আচ্ছা,
শুনতে পেলে লােকে কি বলবে ? হ্যা অজা!
অজা। লােকে ভাববে না যে, এরা খালি খালি এত হাসছে কেন?
মৃগাঙ্ক। বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে হাসে না? আচ্ছা হাসলে যদি তােমার নিলে
হয়, আর হেসে কাজ নেই। তা হলে একটা কাজের কথাই বলি
শােন, মনে করেছি দিন কতক একটু হাওয়া খেয়ে আসা যাক।
অজা। তা বেশ, আমি তােমার সব গুছিয়ে রাখব, তােমার কি কি
চাই আমায় বলে দিও।
মৃগাঙ্ক। শুধু তাে আর আমি যাব না। সকলকে যেতে হবে।
অজা। সবাই ?
মৃগাঙ্ক। হ্যা সবাই—দিদি, তুমি, আমি
অজা। কিন্তু আমি তো যাব না।
মৃগাঙ্ক। কেন?
বলা। না।
মৃগা। কেন?
অজা। আমার ইচ্ছে নেই।
মৃগায়। কেন ইচ্ছে নেই ?
তৃতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১১
অজা। (স্বগত) তােমায় কি বলবাে, আমি যে, উত্তর খুঁজে পাই না।
(মুখ নত করিল)
মৃগাঙ্ক। আমার উপর রাগ করেছ অজা? (তাহার হাত ধরিল,
এবার আর অজা বাধা দিল না) চল, দিন কতক বাইরে ঘুরে
আসি। বাইরের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরেরও পরিবর্তন হবে।
যাবে না? আমার ওপর রাগ ?
অজা। (ধীরে ধীরে হাত ছাড়াইয়া মুনমুখে জোর করিয়া হাসিয়া )
বন্ধুর ওপর কি বন্ধু কখনও রাগ করে ?
মৃগাঙ্ক। (আরক্ত মুখে) তবে যাবে না কেন?
অজা উত্তর দিল না, আঁচলের চাবি লইয়া নাড়া চাড়া করিতে লাগিল
বুঝিছি! তােমায় আর বলতে হবে না, আমি বুঝিছি অজা,
আমার জঘন্য চরিত্র বলে আমার সঙ্গে যেতে তােমার ঘৃণা হয়।
অজা। ঘৃণা ! না-না, ঘৃণা নয়, ও কি কথা, ও কথা বলাে না।
মৃগাঙ্ক। সত্য অজা? সত্য বলছ-ঘৃণা হয় না ?
অজা। না-না, ঘৃণা হয় না, একটুও না।
মৃগাঙ্ক।
তবে কি ভয় হয় ?
।
অজা। হ্যাভয় হয় ? বন্ধুর ওপর বন্ধুর কি কেবল ঘৃণা আর
ভয় হয়? আর কিছু হয় না?
মৃগাঙ্ক। (আগ্রহে) তবে কি কষ্ট হয় ? (অজার হাত ধরিয়া নিজের
দিকেঈষৎটানিয়া অতি আদরের সহিত) অজা! (অজা দুষ্টামী করিয়া
মৃগাঙ্কের হাত হইতে নিজেকে ছাড়াইয়া অনেকখানি দূরে দাড়াইয়া)
অজা। হ্যা তাই। কষ্ট হয় না? বন্ধুর জন্য বন্ধুর মনে কষ্ট হয় না ?
মন্ত্রশক্তি চতুর্থ মৃগাঙ্ক। বন্ধু বন্ধু দুত্তোর বন্ধু। খালি ঐ এক কথা, বন্ধু! কে তােমার বন্ধু? অমন বন্ধুত্বে আমার দরকার নেই; ও ছাই বন্ধুত্বের খবর আমায় চব্বিশ ঘণ্টা শুনিয়াে না। এই আমি তােমায় বলে রাখছি) আজ থেকে আমি আর তােমার বন্ধু নই। সবেগে দ্বার ঠেলিয়া এহান অজা। তুমি রাগ করলে, কর-আমি কি করব। বন্ধুই হও, শত্রুই হও, তুমি আমার স্বামী-দেবতা ! আজ তােমার হঠাৎ এ পরিবর্তনে আমি সুখী নই, আর তুমি যে রাগ করে চলে গেলে তাতে আমার দুঃখও নেই। আমি জহরা নই, আমি তােমার স্ত্রী। যদি কখনও যথার্থ তােমার স্ত্রী হতে পারি, সহধর্মিণী হতে পারি, তবেই আমার দেহ মন প্রাণ, আমার সর্বস্ব তােমার পায়ের তলায় ঢেলে দিয়ে আমার নারী-জীবনকে সার্থক করব, নচেৎ আমি যে দুঃখিনী সেই দুঃখিনী।
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
বাণীর কক্ষ
বাণী ও তুলসী
,
তুলসী। কোথায় যাবি ঠিক করেছিস?
বাণী। তা জানিনে-যে দিকে দু চোখ যায়। এখানে আর থাকতে
পাচ্ছিনে; এক বছর হ’ল মা চলে গেছেন, তাঁর এই বছরিক শায়ে
অন্য আটকেছিলুম; কিন্তু যত দিন যাচ্ছে—তুলসি! আমার বুকের
মধ্যে কেবল খাঁ খাঁ ক’চ্ছে। একণাকে বেশ
ঠিক বুঝতে পারি না। ৰাৰৰল্লেন, দেশ-বিদেশে ঘুরষে-মনটা
বে। আশায়া-থেকে বাবার
এবার ভেগেছে: এরখায় বলে উম মী
ফিরতে পারে।
তুলসী। যদি উচিত কথা বলি রাগ করবি নে ?
বাণী। না !
রাগ আমার নেই। তুই। কৰি তা বুঝতে
প্রেসছি। বলবি, আমার দোষ, কিন্তু তুলসি ! দোষ কি কেবল
আমারই ? তখন আমার কতই বা বয়েস, কি-ই বা বুঝি? বােষ কি
আর কার নয়?
তুলসী। দুই কখনাে তাকে চিঠি লিখেছিলি?
?
১ঃ
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
বাণী। না।
তুলসী। সেও লেখেনি নিশ্চয় ?
বাণী। না, আমিই তাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলুম, আমাদের বিয়ের
পর কোন সম্বন্ধ না রাখে। বাবা চিঠি লেখেন, তার উত্তর সে দেয়।
তুলসী। তুই লিখিনি কেন?
বাণী। প্রতিজ্ঞা যে আমিই করেছিলুম ভাই-- সব খব না!
সেভিজ্ঞ ভাবে কি করে? মনকে যে বােঝাতে পারিলে!
অনেকরি চিলিখব, কি পরক্ষণেই তাৰি, আমার সন
দের উৎসর্গ করে নিয়েছি, তখন তাকে চিঠি লিখব কি বলে?
তাকে ক্ষমাও পাপ, তারও পাল)।
তুলসী। দেখ, তাের মত লেখাপড়া জানিনে-গরীব গেরস্তর মেয়ে, বই
পড়া বিদ্যে ঝ নেই, তবেশীঠাকুরমা,-কি
শখেশুমেই যা শিখেছি, তাতে ছেলেকে কে--এই খুদে
এলছি মন্তর পড়ে থাকে স্বামীই বন্ধু তাকেই তো
বি! যা দেবতাকেই সব নিয়ে থাকিস, তবে
করে পড়লি কেন একবার বল্লি গােপকিশাে আবার
বলিকারখা; এখন তা হয়েছে কি পানি দেড়
এতেও পাচ্ছিনেপেছুতেও পাচ্ছিনে। কিন্তু আমি বলব
এটী সবই তােমার অহঙ্কার!
বাণ। অহঙ্কার।
নয়? অহঙ্কায়ই তাে। কে বাম পায়ে গঙ্গা-
গেশন
বৈড়ে চড়ে বসেন-দুঃশেলেখকেপট
অল্প দিতেনেধনের দিযেমন-তেমনি
ধাম
প্রথম দৃশ্য মন্ত্রশক্তি পড়ে থাকে তৃপ্তি করে খেলে কিনা বুঝতে পারলে; যে আমায় আর কম্যেঙ্গ করেন, অন্যায় করলে কেঝগড়া করেনা- তাকে অহঙ্কারের বোন আত্মসমর্পণ করে বসে আছি দাষে মতল-তাণও দেবতা ফেলে তাের অহঙ্কার বলে, ঠাকুরকে দেহ মন প্রাণ দিইছিস, অহঙ্কারই বলে ভাত-রাধা, না হয় পূজোরি বামুন-তাের আবার স্বামী হবে কি! নয় ? বাণী। আমি ঠিক বুঝতে পারিনে। যদি আমার অহঙ্কারই হয়, ভুলই হয়, তা হলে সে আমার চেয়ে লেখাপড়া জানে, সে তত পণ্ডিত, সেই বা আমার ভুল ভেঙ্গে নেয় না কেন ? তুলসী। নিজের ভুল নিজে না ভাঙ্গলে পৃথিবীতে এত বড় পণ্ডিত কেও নেই যে সে ভুল ভাঙ্গতে পারে। নিজের ভুল তুইওয়ে মনে করলেই হতে পারি। কিসের অভিমান বিযে.অহঙ্কার? দেবতাকে এ দেহ মন প্রাণ দিয়েছিস! দিলিই ! যা দেবকে দিয়েছি তা মানুষকে দিলে কি পাপ? সেদিন তোমাতেই তোবকতা ছিল! তুইও তে শুনেছিমনে-এই কি? গানই তত: বলেছেন-“দেয়প্রতিমায় প্রতিষ্ঠার ম.ে আসি; কিন্তু মানুষের দেহ-ঐতিকার আফিবাই এলছি। -মানুষ- দেবতায়-আমার কপ কমনা করে আমার পূলে নিশ্চয় জেলে পাইবো ভেবে দেখ দেখি, কাটা ঠিক কি? ফিক-ঐ পাথরেশ-শাকি, এই-যে শরীরের মধেতিনি। তবে গােলকিপার ভেবেই পুকঝবি নন- বর্ণ হিনুর মেয়ে যারা সতী, তা তোমার কেরেলাপীকিশােনরই-সেবাকরে
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
অয়েলি তাে অস্বীকার করে তা-কিপিলখ,
wেউত্তর দেয় ।
বাণী। কিন্তু—আমার না হয় যাই হক, তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করাব ?
তুলসী। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করালেই ! তে কমেছি ৰে
পাপহবে ? কত নাগুলিলি, কুরুক্ষেত্রে-যুবতী
তপন-এতি ভেঙ্গেছিলেন ভক্ত ভগবানের প্রতিজ্ঞা তাে
চিরকালেই ভেঙ্গে আসছে। তুই অম্বরকে সত্যই ভালমনে
করি তাহলে প্রতি ভালোেভক্তিরতর।
বাণী। আর সে যদি তার প্রতিজ্ঞা না ভাঙ্গে?
তুলসী। তাহলে জানবাে সে শালা পণ্ডিত নয়, মহামুখ! ভক্তের
মান বাড়াতে জানে না।
বতের প্রবেশ
রমা। না মা বাণী, সে আর এলো না। তাকে এত করে লিখলুম, এই
দ্যাখ, সে লিখেছে।
চিঠি থানা ফেলিয়া দিলেন, তুলসী কুড়াইয়া লইল
রা।
তুলসী। অম্বর এখন কোথায় আছে মেলােমশায় ? কি সুন্দর তার
হাতের লেখা, যেন মুক্তো সাজিয়ে রেখেছে। (বাণীকে চিঠি দিল)
অম্বর আছে ঐ আসাম অঞ্চলেই না। তােমার মাসীমার শ্রদ্ধে
এলাে না, বাৎসরিক প্রাদ্ধে শােক পাঠালুম, তাও এলো না। যে
লােক গিয়েছিল সে দেখে এসেছে তার শরীর অসুস্থ ; ওদিকে যে
ম্যালেরিয়া কালার-আমার ভয় হয় মা, শেষে কি হতে
কি হবে।
প্রথম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
তুলসী। তা আপনি বাণীকে নিয়ে একবার যান না সেইখানে, সে যেখানে
থাকে।
রমা সে তাে এক জায়গায় থাকে না মা, কখনাে আসাম অঞ্চলে, কখনাে
চন্দ্রনাথের ওদিকে নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। কোথায় নিয়ে
বনলতা মৰে ৰাণীকে চিনি-তার কােন ভয়
ফেলে মিলপি অস্বর !- কী-ও ছেলে পঞ্চম
অপরাধ করেছি আমি! ৰাণীকে গ্রহণ করে তুমি আর
অব মাফর। এ যে মা, শুধু বাণীর উপর অভিমান তা
নয়, অভিমান তার আমার উপর। অন্যায় আমারই।
রমাবতের এন
বাণী অক্ষরের চিঠিখানি দেখিতেছিল এবং তাহার চোখ দিয়া জল গড়াইতেছিল
তুলসী। কি লিখেছে ? (বাণী উত্তর না দিয়া মুখে কাপড় দিয়া
কাঁদিতে লাগিল) কাদিস কেন ? চুপ কর। ছি, কঁদলে তার
অকল্যাণ হবে।
বী তুলসী,আজ মার জন্য মন কেমন করছে, আজ যদি পর্ব
তুলসীমালীকালে এ মেৰ বেকেটে যেত ।
মায়ের চিরকাল থাকে না দিচ্ছি ।
মেয়ে তপস্যা করে তার মা বাবাকে ফিরিয়ে এসেছিলেন বিশ্রী।
তুইশোন্ত স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে পান? খুব পারবি।
কি?
বাণী। তুমি বাবাকে বলগে, আমি আর কোন তীর্থে যাব না, আমি
চােখ দেখতে যাব।
মন্ত্রশক্তি পঞ্চম অঞ্চ তুলসী। বেশ তাই যেও। দেখ, যদি বাবা চন্দ্রনাথের কৃপায় তােমার হৃদয়ের চন্দ্রনাথকে পাও। আমি যাচ্চি, এখনি মেলােমশাইকে বলছি। ; বাণী। তুলসী ভাই, তুই আমাদের সঙ্গে যেতে পারবি নি ? তুলসী। ইচ্ছে তো খুব যাই; কিন্তু যাই কি করে বােন! তার পর আমার গােপকিশােরের নিত্যভােগ, সে ভারই বা কার ওপর দিয়ে যাব। তুলসীর প্রস্থান বাণী। তুলসী! তুমিই সুখী! দেখছি, তােমার পূজাই সার্থক। আমি কোন পূজারই অধিকারিণী নই। না আমার মন্দিরের গােপী- কিশােরের, না আমার-আমার এখনকার সর্বক্ষণের চিন্তা, সর্বক্ষণের ধ্যান—এই হৃদয়ের গােপকিপাের আমার স্বামীর। হে জগৎস্বামি! নিতান্ত অসহায় আমি, মূখ আমি, আমায় বলে দাও চিরকাল তােমার পূজা করেও—তােমায় পেয়েও আজ মানব স্বামীর জন্য আমার এ ব্যাকুলতা কেন? বলে দাও দেব, এ আমার পাপ, না পুণ্য ; এ আমার বন্ধন, না আমার মুক্তি ?
দ্বিতীয় দৃশ্য কালরাত্রি। মৃগাঙ্কের বাটীর বৈঠকখানার সম্মুখ মধুর তামাক খাইতে খাইতে গুন্ গুন্ করিয়া গান গাহিতেছিল ! মধুর। কাজ হয়েছে ভাল, সারাক্ষণ বসে বসে মােসাহেব তাড়াই। আর ইদিরই বা কি! মাষির চামড়া গায়-একটু নাজ-নজ্জা নেই। যত সব কুড়ে ছাগলের দল, নম্ব কেঁচা, ইয়া সােজ। ট্যাড়া, পরের পয়সায় ইয়ারকি মেরে বেড়ান। খুব জন্ম হয়েছে মেনে। বাবু তাে ঢালাও হুকুম দিয়েলো যে কারুর বৈঠকখানার দরজা খুলি দিসনে ; আমুও চোর চায় ভাঙ্গাবেড়া, যে বাবু আসছে তারে অমনি বলে দিচ্চি তােমাদের ঘুঘুর বাসা পুড়ে গিয়েছে, আর কারুর ভিটে খুজে নাও। ও আমার উপর বাবুগাের যা রাগ। রাস্তার উপর একখানা গাড়ী দাড়াল কার? আবার গাড়ীতি আলাে কিভা। রমণী, যামিনী, সজনী প্রভৃতি গ্রাম্য যুবকগণের প্রবেশ বুমণী। দেখ, মথরে ব্যাটা ঠিক বসে আছে; কি বৈঠকখানার দরজায় চাবি বন্ধ । আজ যে ফাদ পেতেছি, দেখি, যাদু কেমন করে উড়ে যান। ওরে মথরো ( মথুরের তখন নাক ডাকিতেছিল) ওরে ব্যাটা! সন্ধ্যে রাত্রেই যে নাক ডাকাচ্ছিস। ওরে ! মধুর। (গ) ভ্যালা আপদ! (প্রকাষে ) এজ্ঞে কি বলছো? রমণী। বলবে আর কি রে ব্যাটা, বাইরে বসে ঘুমুচ্ছিস কেন? ওঠ-
১৪০
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম আৰু
মথুর। এজ্ঞে যে সব নচ্ছার চোরের আমদানী হয়েছেন, তাই বাইরি
বসে চৌকী দিচ্চিলাম, ঘুমুতি দেখলে কোন্ খানডায় ঠাকুর
যামিনী। তা বেশ চৌকী দিচ্ছিলি, নে এখন ওঠ, বৈঠকখানার চাবি
খো।
মধুর। (স্বগত) এই আমি খোল্লাম, এই আমার কলাভা।
যামিনী। হু হু আজ আর চালাকী নয়, বুঝেছ সজনি, আজ যে ফা
পাতা গেছে যাদুকে আজ আর ওজর করে পাশ কাটাতে দিচ্ছি না।
সজনী। হ্যা, হ্যা, বাবা, আমাদের সঙ্গে চালাকী! আমরা বনেদি
ইয়ার; যাদু মনে করেছেন ফস্ করে ঘরমুখাে হবেন, আর
আমাদের এমন বাধা আড় উঠে যাবে ।
রমণী। তবু তাে তোর নিজের পয়সা নয়, মজা ওড়াস তত বােনের
পয়সায় ; ভাগ্যিস্ বড়লােকের বিধবা ঐ বােনটা ছিল।
যামিনী। আরে তাও তে Life Interest গিন্নী মলেই তো যাদুকে
এ বাড়ী ছাড়তে হবে।
সজনী। দেখ, মথুরো ব্যাটা বদমায়েসী করে বসে রইল-মেগাকে
খবর দিলে না, ওরে মােথরো!
মধুর। আঃ—কি বলচে গো আপনার!
রমণী। বলছি, তােমার বাবুকে খবর দাও—যে আমরা এসেছি।
মথুর। এসেছেন তা তাে চমচকি দেখতি পাচ্ছি! তা এসেছেন বেশ
করেছেন,যে পথ ধরে এয়েছেন—য়া করে সেই পথ ধরি চলে যান।
রমণী। বলি কিরে ব্যাটা? দেখলি যামিনী, দেখলি, যেটায় আলেটা
দেখলি, ব্যাটা বলে কি না চলে যান! জানিস ব্যাটা, ঘুষিয়ে
মুখ ভেঙ্গে দেব।
দ্বিতীয় দৃ মন্ত্রশক্তি ১৪১ ৩ মথুর। তা বাবুরা গরম হও ক্যান? ঘুষাে বড়নােকের বাড়ী মদনছাপার মত সস্তা নয়, যে ক’সে মাল্লেই হল। আমি বাবুর বাড়ীর চাকর, কারুর ভিটীর পেজা নই, ঘুষো অমনি মারলিই হ’লমার দিনি দেখি, তােমার ঘুমাের কেমন বহর। সজনী। ওরে মণি, সরে আয়, স’রে আয়-তােরও যেমন, তুই গেলি ঐ ঘােটলােক ব্যাটার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করতে। আচ্ছ আবুলেন্সী, রাঙ্কেকে মজা দেখাচ্ছি। নী। গেল সজনি,-ভাগাড়ীখনা.. দূৰুে- আছে-শুনতে পানেনইলে কি মনে করতো বললি? সজনী। ব্যাটা না যায় না যাবে—আমরা এইখান থেকেই ডাকছি- ওহে মৃগাঙ্ক! ওহে মৃগাঙ্ক- মধুর। (স্বগত) আরে এ যে সন্ধ্যিবেলা ফেউ নাগলো। সজনী। আমাদের এমনি করে অপমান করা চাকর দিয়ে- Fামিন। আরে চুপ চুপ–আরে শুনতে পাবে গাড়ীর মধ্যে। আমি ডাকছি ইসারা করে। (শিস দিল) মথুর। (স্বগত) এ নচ্ছারেরা যে শিঙ্গে ফুকতি আরম্ভ করলে—আঃ কি বালাই- সকলে। ওহে মৃগাঙ্ক আমাদের এমনি করে ভিতর হইতে মৃগাঙ্কর প্রবেশ মৃগাঙ্ক। কি ভাই কি, এ হে হে তােমরা কতক্ষণ এসেছ? আমি ভাই—খিড়কীর বাগানে একটু পায়চারি ক’চ্ছিলুম, অনেকক্ষণ এসেছ বুঝি?
১৪২
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম স
ক
। পায়চারী করছিলে বেশ ক’রছিলে। কিন্তু এ কি। আমরা
ভদ্র লােক তো বটে।
মথুর। (স্বগত) কোন পুরুষি নয়-
মৃগাঙ্ক। কেন ভাই কি হয়েছে ?
রমণী। কি হয়েছে ! তােমার ঐ চাকর দিয়ে আমাদের অপমান করা।
মৃগাঙ্ক। আরে ছি ছি, সে কি কথা ভাই—সে কি কথা, কিরে ম’থরাে
কি করেছিস?
মথুর। এজ্ঞে করিনি তাে কিছু।
সনি। ব্যাটা ভিজে বেড়াল! করিনি তত কিছু ? ব্যাটা স্বচ্ছন্দে
বললে কিনা তােমাদের ভিটের প্রজা নই, দরজা খুলবাে না।
মৃগাঙ্ক। ব্যাটার আক্কেল হচ্ছে। ভদ্রলােকের সঙ্গে কথা কইতে
জান না !
মধুর। এজ্ঞে
মৃগাঙ্ক। যাক ভাই যাক, ওর কথা ধরে না, একটা Idiot—ওর কথা
ধরে! যা-দরজা খুলে দে, চাবি নিয়ে আয়।
মথুর। (কোমরে হাত দিয়া দেখিয়) এজ্ঞে চাবি বুঝি বাড়ীর মন্দি
থুয়ে এসেছি।
মৃগাঙ্ক। বেশ কয়েছ, এখন গুটি গুটি করে গিয়ে নিয়ে এস।
মধুর। এজ্ঞে হুকুম কলিই আনি
মৃগাঙ্ক। তা যাও—হুকুম তাে শুনলে ?
মথুর। এজ্ঞে, ( যাইতে যাইতে) চাবি খোলাম আর কি, হালে
চাবি তো আমার কাছেই আচে-এই কসির মদি; দাড়াও আমি
মজা পাচ্ছি ভাল করে।
দ্বিতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১০৩
মৃগাঙ্ক। যা-
মধুর।
সজনী। কি, তােমার ব্যাপারখানা কি বল দেখি? শেষকালে তুমি
এমন বেরসিক হলে।
রমণী। এই উঠতি বয়সে মাগের ভেড়ুয়া।
ছি, তুমি
এমন বােকে
যাবে তাতো মনে করিনি।
যামিনী। একেবারে উচ্ছন্ন গেলে।
মৃগাঙ্ক। ভাই না, ব’কেও যাইনি—উচ্ছন্নও যাই নি, তবে কি জান,
শরীরটা বড় খারাপ হয়েছে, ডাক্তাররা একজামিন করে বলেছে ও
এ্যালকোহল আর আমার চলবে না, শেষকালে কি লিবার
এ্যাবসেস হয়ে মারা যাব।
রমণী। ও সব ন্যাকা বােঝাচ্ছ কাকে ? আমরা কি বুঝি না হেগান
শুনলেও কি লিবার এ্যাবসেস হয় না কি ?
মৃগাঙ্ক। না ভাই, বলেছিই তো, গান বাজনা করলে দিদি বড় বকাবকি
করেন, ও সব আর এ বাড়ীতে
যামিনী। সে পরের কথা পরে, উপস্থিত দেখছে। ঐ রথ ?
মৃগাঙ্ক। তাই তাে হে, গাড়ী কেন ?
সজনী। দরজা খুললেই আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাবে। তুমি বড় চালাক
—না ? গাড়ীর ভেতর জহর।
মৃগাঙ্ক। অহরা?
১০গলদo
সজনী। তুমি ইয়াকি বন্ধ করেছ, ক্রমশঃ তত গেমপুর আর আমােল
দাও না, তাই আমরা ক'টা বন্ধুতে প্ল্যান করে তােমার নাম
১৪ মন্ত্রশক্তি পঞ্চম অঞ্চ A করে অহরাকে এনেছি, দেখি ৰাৰা আর কি করে পাশ কাটাও? রমণী। নাও বৈঠকখানা খুলতে ল, মেয়েমানুষকে আর কতক্ষণ গাড়ীতে বসিয়ে রাখব। মৃগাঙ্ক। তাই তো হে, আমায় না বলে কয়ে জহরাকে—না না এ বাড়ীতে আর ও সব—তােমরা ভাই ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। - মিন। আরে ছ্যা। সমনি, 'এ মৃগু একেবারে গােল্লায় গেছে! বাবা ট্রেণ ভাড়া করে প্রেম নিবেদন করতে এলো কোলকাতা থেকে সেই জহর, আর তুমি কি না তাকে বাড়ীর দরজার গােড়া থেকে বিদেয় করবে এমনি বাসিমুখে! Cowrad। মৃগাঙ্ক। না ভাই, আর ওসব নোৱ গান শুনবে না বলেই প্রতিজ্ঞা ২২) বেশ্যা! বল কি মৃগা, জেলা মুহিল ? কে? বই নেকি প্রাণ নেই-কি মানুষ নয় ? কে বল নারী- রমণী ! জগতের সমস্ত বেদনা স্বেচ্ছায় আত্মসাৎ করে অন্তরে সমুদ্র মন্থনের বিষ, মুখে হাসি, চোখে জল, যে সব মহীয়সী প্রেমােন্মাদিনী বিশ্বের কলুষ হরণ করেন, তাদের তুমি কোলে উপেক্ষা কচ্ছ। ছি ছি, নারীত্বের এমন অপমান বােধ হয় তােমার মত এ যুগে আর কেউ করেনি। Moral wreck! মৃগাঙ্ক। তা যাই বল ভাই, আমি কিন্তু আর ও সবে নেই। আমি উচ্ছন্ন গেছি, গােল্লায় গেছি স্বীকার করে নিচ্ছি, তােমরা আমায় মাপ কর। এ বাড়ীতে আর ও সব••• শী। আচ্ছা এ বাড়ীতে না হয়, কুচ পরােয়া নেই, কম বড়য্যেদের করেছি। ০৯। 6 দ্বিতীয় দৃশ্য মন্ত্রশক্তি ১৪৫ পােড়া বাগান বাড়ীটায় আজকের রাতটা আড্ডা জমান যাক। তারপর কাল থেকে তােমার সঙ্গে না হয় নাই মিশব। মৃগাঙ্ক। নানা-আমি-আমি—আর নয় সকলে। (হাত ধরিয়া) আরে তাও কি হয়—তােমায় যেতেই হবে। খুব ব্যস্ততার সহিত মধুরের প্রবেশ মথুর। বাবুবাবু মৃগাঙ্ক। কিরে কি ? মথুর। শীগগির আসেন, বৌমার তড়কা হয়েছেন তিনি খাবি খাচ্চেন। গিন্নিমা ক’লেন আপনারে ডাক্তার ডাকতি। মৃগাঙ্ক। সে কিরে। মথুর। আর সে কিরে, তড়কা তো আমার হাতধরা নন। মৃগাঙ্ক। ভাই-দোহাই ভাই, আমায় ছেড়ে দাও, আমি যাই, শুনছে। তাে বিপদ! যামিনী। (জনান্তিকে) মাটা করলে দেখছি এই ব্যাটা মখয়রা। মৃগাঙ্ক। তােমাদের হাতে ধরছি ভাই, কিছু মনে করো না, আমি যাতে উচ্ছন্ন না যাই, তােমরা তার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছ, তােমাদের ধন্যবাদ, আমায় বিদায় দাও। রমণী। তাতে দিচ্ছি, কিন্তু একটা কথা। মৃগায়। কি ভাই-বল। রমণী। আমরা যে চাদা করে গাড়ী ভাড়া দিয়ে অহরাকে এনেছিলুম, আবার যে, ফিরিয়ে নে যাব তার খরচা এখন কে দেয় ? তারপর এহরার fees-
মধুর।
১৪৬
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
মৃগাঙ্ক। তা—তার জন্য ভাই কিছু ভাবনা করাে না। (পকেট হইতে
মণিব্যাগ বাহির করিয়া) এই নাও-এই নগৰ মূল্য একশত টাকার
নােটখানি জহরাকে দিয়ে বলে, তার শেষ দক্ষিণ এই, আর যেন
সে আমার কাছে কিছু আশা না রাখে।
কিছু আশা না রাখে। আর এই পঞ্চাশটা টাকা
তার রাহা খরচ—আর তােমাদের আজকের রাত্তিরের মাইকেলের
যৎকিঞ্চিৎ কাঞ্চন মূল্য)
সজনী।
চল—চল বাড়য্যেদের পােড়ো বাগানে গিয়ে ওঠা যাক।
মধুর মৃগাঙ্ক ব্যতীত সকলের প্রস্থান
মৃগাঙ্ক। কিরে, কি অসুখ হয়েছে ? দিদি ডাক্তার ডাকতে বললে ?
এঞ্জে বাবু, সব মিছে কতা বলেলাম ; দ্যাখলাম ওরা জোকির
মত এসে ধরেছে, তাই ঐ জেকির মুকি নুন দেলাম , বৌমা ভালই
আচেন।
মৃগাঙ্ক। ও ব্যাটা, আমি মনে করি তুমি কেবল নাক ডাকিয়ে ঘুমােও
এদিকে তো বুদ্ধি খুব আছে।ভাগ্যিস তুই ও কথা না বললে ওরা
তাে টেনে নিয়ে যেত।
মথুর।
এম্ভে বুদ্দি না থাকলি আর মনিব বাড়ী চাকরী করি খাই
তবে চাকরের কপাল,মনিবেরা মনে করে বুজি তাদের কিছু বুদ্দি নেই।
মৃগাঙ্ক। আচ্ছা আর বকামাে করতে হবে না, আয় তামাক দে-
গায়ের প্রস্থান
মধুর। ( সােল্লাসে) হা-হা-বলে বুদ্দি নেই; বুদ্দি না থাকলি আর
কেলাের মা খুজি খুজি এসে খাজুর খাওয়ায়ে যায়? আজ যে কি
আহলাদ হচ্চে নচ্ছার ব্যাটাদের তেড়িয়ে তা কি আর বলব।
তৃতীয় দৃশ্য
গােলকগঞ্জ ষ্টেশন—ওয়েটিং রুম
কাল—সকাল
ওয়েটিং রুমের দরজা দিয়া ট্রেণ দেখা যাইতেছে। ফেরিওয়ালারা হাঁকিতেছিল
গরম গরম হিন্দু-চা; পান, বিড়ি, সিগারেট ; চাই জলখাবার, রুটি, গােস্ত, ইত্যাদি।
আরােহিগণ মােট ঘাট লইয়া চেঁচাইতেছিল
•
রমাবল্লভ ও বাণীর প্রবেশ
রমা। আয় মা বাণী, এই ওয়েটিং রুমটায় বসে একটু জিরিয়ে নিই,
এখনও কলিকাতায় যাবার ট্রেণ ছাড়তে দেড় ঘণ্টা দেরী আছে।
বাণী। ঐ যে বাবা দেখে এলুম, আর একখানা ট্রেণ দাড়িয়ে আছে।
রমা। ও গাড়ীটা আমাদের না, ওটা যাবে আসামের দিকে। আমাদের
মােটঘাট সব রইল প্লাটফরমের ওপরই, আমি একবার প্লাটফরমটায়
ঘুরে পাটা ছাড়িয়ে নিই, কালকের সারাটা দিন ষ্টীমারে, সারাটা
রাত ট্রেণে। একটু গরম জলের যােগাড় করে নেয়ে নিতে
পারলেই হত, ঠাণ্ডা জলে নাইতে ভয় করে। যে দেশ, চারিদিকে
ম্যালেরিয়া কালার হাঁ করে আছে।
বাণী। শীগগির এস বাবা, দেরী করো না।
রমা। না না দেরী কিসের, আমি এলুম বলে।
বাণী। (ওয়েটিং রুমে বেঞ্চিতে বসিয়া) বৃথাই আমার তীর্থ। এ মন
নিয়ে কি কখনও তীর্থ হয় ; মনমেছিল পাচটা বেশ বোলে
পাচটা দেখলে মল-শান্তি পাব। কিন্তু তা বু কই মত
১৪৮
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
দিনই অতিমালা ততই যেন বাড়ছে ? এ অতিশষ
কেয়? যে গোপীকিশােরকে আত্মসমর্পণ করেছিলুম, যাকে এক
মুহূর্তও ছেড়ে থাকতে হবে মনে হলে শিউরে উঠতুম, আজ সে
গােপীকিশােরই বা কোথায় আর আমিই বা কোথায়? সব দিকেই
অপরাধী হয়ে রইলুম! কতদিন-কতদিন আর এমনি করে কাটাবে।
নেপথ্যে রমাবল্লভ। আরে ও কেও—অম্বর না, হ্যা, অম্বরই তো!
অম্বর অম্বর, আরে তুমি এখানে, এস, এস, ভাল আছ তাে?
নেপথ্যে অম্বর। আজ্ঞে হ্যা ভালই আছি।
বাণী । ( তাড়াতাড়ি উঠিয়া) এ্যা, বাবা কাকে ডাকলেন, কার
কণ্ঠস্বর? তবে কি জানালার পর্দা সরাইয়া) এসেই তে ।
বাণ প্রায় পড়িয়া যাইবার মত হইয়াছিল। নিজেকে সামলাইয়া বেঞ্চিতে বসিল
নেপথ্যে রমা। না, না, কই তেমন ভাল আছ ? বড় রােগা হয়ে গেছ যে,
চেহারা একদম খারাপ হয়ে গেছে, কুলি, কুলি, এই রামসিং, বিলে,
ওরে তেওয়ারী,ওরে জামাইবাবুর হাত থেকে মােটটা নাবিয়ে নে না।
রমবাত ও অবরে এবেশ
রমা। মা দুর্গা তােমায় মিলিয়ে দিয়েছেন, এ তাে আমরা আশা করিনি।
বস বাবা, ব’স। দেখ দেখি তােমার চেহারা কি ছিল, কি হয়ে
গেছে! হায় হায় এমন দেশে মানুষ থাকে। বাবা, এত কি অভিমান
তােমার শাশুড়ী মৃত্যুর পূর্বে তােমায় একবার দেখবার জন্য কত
দেবতার কাছে যে মাথা খুঁড়েছেন—তা বাবা, আমাদের অপরাধের
কি মানা নেই।
তৃতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
১৪৯
অম্বর। না, না, এ কথা বলে আমায় পাপের ভাগী করবেন না, আমি
নিতান্তই অভাগ্য! নইলে এমন করুণাময়ী মায়ের স্নেহ উপভােগ
করতে পেলুম না।
রমা। আর বাবা, আমারই বা আর ক’দিন, তােমাদের সব দেখে শুনে
নিয়ে তােমরা আমায় ছুটী দাও। তিনি জুড়িয়েছেন আমিও গিয়ে
( রমাবল্লভ নিজেকে সামলাইবার জন্য উঠিলেন, এবং প্রায়
রুদ্ধক) বস বাবা, বস, আমি একবার—ওরে বিনে আমার
ব্যাগটা—আমি এলুম বলে, আমি না এলে যেন—আমি এখুনি
আসছি।
এখান
অম্বর, বাণী যে বেঞ্চিতে বসিয়াছিল তাহার সমুখের একখানি চেয়ারে বসিল; বাণ
তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্য ইচ্ছা করিয়াই নিজের আঁচলে বাঁধা চাবির থােলােটা
সশলে ফেলিয়া দিল পরে খলিতাঞ্চল যথাস্থানে রাখিল ; অম্বর অন্যমনস্ক, সে কোন দিকেই
ফিরিল না। বাণী একবার দাড়াইল তখনি আবার বসিল
বাণী। (স্বগত) আমিই বা আত্মহারা হব কেন? কত লােক তো
চিরজীবন কেঁদে কাটায়, আমারও জীবন না হয় কেঁদেই যাবে।
অম্বর। (স্বগত) কতদিন-কতদিন পরে দেখা। এত আশা
করিনি। এরা কেন এখানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হ’ল না। শ্বশুর
মশাই তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। বাণীর সঙ্গে কথা কইবার অধিকার
আমার আছে কি? কেন? কি কি ইব?
নীয় হওগইমত্ব, সংসারতত পরীক্ষারই ক্ষন।
মমতা থেকেই বেরক্তি প্রতিজ্ঞালকে যে পাক এশ্চিত
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
বাণী। (স্বগত) কার ওপরই বা অভিমান, কার ওপরই বা রাগ! সে
প্রতিজ্ঞা তো আমিই করিয়েছি ; সে প্রতিজ্ঞা যদি না ভাঙ্গে? কেনই
বা ভাঙ্গবে? যদিই ভাঙ্গে তাতে কি আমি সুখী হতে পারব?
অম্বর। (স্বগত) ইচ্ছা হচ্ছে জিজ্ঞাসা করি কেন এখানে? আমার
জন্য নিশ্চয়ই নয় ; বোধ হয় এদেশে কোন আত্মীয় আহ; আয়,
***ইবা কি ? আমাদের দুজনের মধ্যে পাহাড়ের ব্যবধান,
মৃত্যু ভিন্ন এ ব্যবধান সবার সামর্থ্য আর কারও নেই।
বাণী। (স্বগত) আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন—( খুব কঁদিলেন, পরে
হঠাৎ উচ্ছসিত কণ্ঠে) উঃ-মাগো
অম্বর। (উঠিয়া) এ কি, কি হয়েছে ? তােমার চোখ লাল-জল
পড়ছে ।
ট্রেণ থেকে কতক্ষণ নেমেছ ? ট্রেণে চোখে কয়লার গুড়ো
পড়েছে বুঝি? দাড়াও, দেখছি, এখানে জল নেই ? এই যে,
জলের কুঁজো। (অম্বর) কুঁজা হইতে জল লইয়া সন্তর্পণে বাণীর
চোখে জলের ঝাপ্টা দিল এবং কিছুক্ষণ পরে) কয়লার গুছােটা
কি এখনও আছে ?
বাণী। (ঘাড় নাড়িয়া উত্তর দিল) না ।
;
বাণী খুব জোরে বুকটা চাপিয়া ধরিল পাছে চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া ফেলে।
পুনরায় গিয়া নিজের আসনে বসিল।
অম্বর। (স্বগত) ও-ও তাে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেই চলেছে ও ঘাড় নেড়ে
উত্তর দিলে ‘না’ কথা তো কইলে না।
এমন সময় ষ্টেশনে ঘণ্টা পড়িল, অম্বর সহসা উঠিল
(প্রকাশ্যে )। আমি যে গাড়ীতে যাব, তার এই প্রথম ঘণ্টা
তৃতীয় দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
পড়লাে, আমি তো আর অপেক্ষা করতে পারছি না, আমাকে যেতেই
হবে। বাবা তাে এখনও এলেন না; বাবা এলে বলাে, তিনি যেন
কিছু মনে না করেন। এবার ট্রেণে সাবধান হয়ে বসে। এঞ্জিনের
দিকে মুখ করে বসে না, তাহলে চোখে আবার কয়লার গুড়াে
পড়তে পারে।
বলিয়া যেমন চলিয়া যাইবে, একজন আরােহী প্রবেশ করিল
আরােহী। আরে অম্বর যে—এখানে কোথায় ?
অম্বর। একটু কাজ ছিল।
আরােহী। সঙ্গে স্ত্রীলােক—
অম্বর। হ্যা, উনি আমার স্ত্রী।
আরােহী। তােমার স্ত্রী। ও-তীর্থে এসেছিলেন বুঝি ?
নেপথ্যে। হ্যা, আমার স্ত্রী।
উভয়ের উভয় দিকে প্রস্থান
বাণী। আমার স্ত্রী-আমার স্ত্রী! এ কি কণ্ঠস্বর ! কি মধুর! আমার
স্ত্রী-আমার স্ত্রী! এ কথা উচ্চারণের সময় সত্যই কি তার গলা
কেঁপেছিল, না আমার মনের ভ্রান্তি ? ওগাে! কোথায় গেলে ?
আর হয় তাে এ জীবনে তােমায় দেখতে পাব না। একবার এই
হয় তাে আমাদের শেষ দেখা! একবার—ক্ষণেকের জন্য দাড়িয়ে বলে
যাও ঐ দু’টা কথা—আমার স্ত্রী—আমার স্ত্রী
চতুর্থ দৃশ্য
মৃগাঙ্কের বাটীর দরদালান
কাল-অপরাহু
মৃগাঙ্ক। আমার কপালই দেখছি মন্দ, যার জন্য সঙ্গীদের ত্যাগ করলুম,
মদ ছাড়লুম, কোন বদখেয়ালিই আর করি না, সে তাে ডেকেও
একটা কথা জিজ্ঞাসা করে না। আজ লক্ষ্মীপুজো ; সবাই কাজে
ব্যস্ত, তাকে তাে কোথাও খুঁজেও পেলুম না। এখন কি করি?
তার নয় ; দেশ ছেড়েইবাই। নী
দাও করেছিলুম, উত্তর এসেছে যার জন্য । এখানেন
থাকবার চেয়ে, ও চ-িতে যাওয়াই ভাল।কতদিনই
আর বসে বসে দিদির অথবংস করবাে? অজাকে মুকিছু
-পারব না, একখানা চিঠি লিখে রেখে যাব। সে তো
জামর ব্যথা বুঝলেনা। ( দেখিয়া ) ঐ যে আলপনা দিচ্ছে,
একবার এদিকে আসে না? নিরিবিলি পেলে একবার সামনা-
সামনি—এই যে এসে পড়ল! একটু আড়ালে থাকি। হঠাৎ দেখতে
পেলে পালিয়ে যেতে পারে।
অন্তরালে গমন
অভার এবেশ
হাতে আলপনা, বাটা, বাটাটি হাতের উপর রাখিয়া
যখন বাপের বাড়ী ছিলুম,-আইবুড়াে বেলায় কত আলপনাই
দিইহি এই সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপূজায় পাড়ায় মেয়েরা সব কত মাটির
চতুর্থ দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
প্রদীপ জ্বালাত। আজ এত বড় বাড়ীর মধ্যে একা—লক্ষ্মীপূজো
কেমন ফাকা ফাকা মনে হচ্ছে। মা নেই, বাপ নেই, বাপের
বাড়ীর কেইবা আছে—আছে শুধু তাদের স্মৃতি !
মৃগাঙ্ক ধীরে ধীরে আসিয়া পিছন হইতে তাহার চোখ টিপিল
তাজা। কে ?
মৃগাঙ্ক। (হাসিয়া) আরে ছিঃ-চিনতে তাে পারলে না ?
অজা। ( বিরক্তির ভাব দেখাইয়া) যাও এ আবার কি, আমি এ সব
ভালবাসি না।
মৃগাঙ্ক। কেন ভালবাস না অজা! আমি কি এতই অপরাধী ? আমার
অপরাধের কি মার্জনা নেই ?
অজা। তােমার কোন অপরাধের কথা তো আমি কোনদিনই বলিনি।
তবে ও কথা বলছ কেন ?
মৃগাঙ্ক।
বলব না ? তুমি কি আমার অন্তর বােঝ না? তুমি কি
বােঝ না
জা। আমার অতো বুঝতে গেলে তাে এখন চলবে না। আমি
এসেছিলাম আলপনা দিতে, তুমি এখানে আছে জানলে-
মৃগাঙ্ক। আসতে না ! আমাকে এখনও তুমি ঘৃণা কর—আমি জানি ;
ঘৃণা করাই তােমার উচিত, কেন না আমি ঘৃণার পাত্রই ছিলেম।
কিন্তু আমার আক্ষেপ এই, আমার আগেকার আমি নেই জেনেও
তুমি আমায় ভাল চোখে দেখলে না।
অজা। আমি খারাপ লােক কি না, তাই।
মৃগাঙ্ক। না, তা নয়; সেটুকু আমি বুঝি ; আমার ওপরে তােমার রাগ
আজও যায় নি।
১৫৪ মন্ত্রশক্তি পঞ্চম অঞ্চ অজা। যদি তাইই বল, তাতে তােমার ক্ষতিই বা কি, যদিও আমি জানি তােমার ওপর আমার রাগও নেই—ঘৃণাও নেই। মৃগাঙ্ক। সেটা তােমার মুখের কথা। অজা। তা হক, সর এখন, আমার কাজ আছে। মৃগাঙ্ক। কাজ, কাজ, কাজ! বেশ, তুমি তােমার কাজ নিয়েই থাকো, আমিও একটা কাজ পেয়েছি অজা! বেশীক্ষণ না থাকে, একটুখানি থেকে আমার যা বলবার শুনে যাও; কি জানি, যাব বিদেশে আর আসতে পারি না পারি। অজা। (স্বগত) তােমার মুখ দেখলে কষ্ট হয় বটে, কিন্তু বুনো বাঘ বশ করতে ফাসও চাই শক্ত। দেখি তােমার দৌড়। মৃগাঙ্ক। শােন অজা, আমি চাকরীর জন্য দরখাস্ত করেছিলাম, তার উত্তর এসেছে, আমি কালই এখান থেকে চলে যাব। অজা। কালই যাবে? মৃগাঙ্ক। হ্যা,যাব বলেই তো স্থির করেছি, কেন যাব না? কে আমায় যেতে বারণ করবে? আমার কে আছে ? অজা। ( ঈষৎ হাসিয়া) ভাল কাজে কি বারণ করতে আছে ? মৃগাঙ্ক। তা তো বটে,তবু আত্মীয় স্বজন আপনার লােক থাকলে এমনও তাে বলে—দুদিন পরে যেও, নয় তো বলে—আমাদেরও নিয়ে চল ; যার কেউ নেই তার গেলেই হল। তারপর বিদেশে একটি ব্যায়াম হক, অসুখ হক হাসপাতালে যাই, আর যাই হক কারই বা কি ক্ষতি। তােমার শুধু সিথের সিঁদুরটুকু মুছতে হবে বৈততা নয়, আর ঐ হাতের নােয়াগাছা, তা হক, তাতেও তােমায় মন দেখাবে না; একাদশী তােমায় করতে হবে না। আর মাছ- চতুর্থ দৃশ্য মন্ত্রশক্তি অজা। (হাত ধরিয়া) ওসব কি বল, ছি-ও সব কথা কি বলতে আছে ? তুমি অমন করে আর বলাে না, ওতে আমার মনে বড় কষ্ট হয়। তার চেয়ে তুমি যেমন ছিলে সেও ভাল, না হয় চাকরী নাই করলে, ভাল নাই হ'লে—এইখানেই থাকো ! মৃগাঙ্ক। না বলে কি করি বল ? একলা যাব শুনে তুমি তাে একবার মুখের কথাও বললে না যে, আমি তােমার সঙ্গে যাব। অজা। তা তুমি যদি আমার যাওয়ার দরকার মনে কর, কেন যাব না? কিন্তু মৃগাঙ্ক। কি—কিন্তু, বল না ? অজা। (হাসিয়া) লােকে যখন জিজ্ঞাসা করবে যে, কে এ-তখন কি বলবে ? বন্ধু ? মৃগাঙ্ক। হাত্তোর বন্ধুত্বের কথায় আগুন, আবার সেই বন্ধু ! আমি তাে বলেছি, আমি তােমার বন্ধুত্ব চাই নি। অজা। তবেই তাে মুস্কিল। যখন বন্ধুত্বই চাও না, তখন আমিই বা যাই কি ভরসায় ? মৃগাঙ্ক। ভরসায়-কেন, আমার সঙ্গে যাবে ? অজা। হাঁ, তাই তাে বলছি, একটা সম্বন্ধ ধ'রে তো যেতে হবে, লােক- জনের কাছে তাে পরিচয় দিতে হবে ? মৃগাঙ্ক। কেন-লােককে ব’ব ইনি আমার- অজা। বন্ধু ? মৃগাঙ্ক। আবার বন্ধু! না-না-বন্ধুত্বে আমি জলাঞ্জলি দিয়েছি, আমি তােমার বন্ধুত্ব চাই নি, আমি চাই তােমায়। আমি চাই—আমার এই জীবনের অটুট বন্ধনে তােমায় বাঁধতে।
प्रालि
পঞ্চম অঙ্ক
=
অজা। ওদিকে আমার লক্ষ্মীপুজোর সময় বয়ে যায়—আমি আসি।
মৃগাঙ্ক। না-যেও না আজ আর আমি তােমায় যেতে দেব না।
আজ আমার সব মােহ কেটে গেছে, তােমার পুণ্যে আমার মনের
অন্ধকার দূর হয়েছে, আজ আমার জীবন-প্রভাত
জা। ওগাে না, এ যে ভর সন্ধ্যেবেলা! আজ যে প্রদোষেই লক্ষ্মীপূজো,
তাও জান না ?
মৃগাঙ্ক। হাঁ অজ। ঠিক বলেছ ; আজ প্রদোষেই লক্ষ্মীপূজো বটে!
তুমিই আমার লক্ষ্মী ; এস, কাছে এস, তােমার কাছে আমায় টেনে
নাও। আজ থেকে আমার লক্ষ্মীপূজো আরম্ভ হােক।
অজা। তবে সত্যই আজ থেকে বন্ধুত্বে জলাঞ্জলি ?
মৃগাঙ্ক। তােমার এখনও অবিশ্বাস?
অজা। অবিশ্বাস—তােমায় কোন দিনই করিনি, এখনও করি না।
সাক্ষী-এই তােমার পায়ের ধূলে।
প্রণাম করিল
মৃগাঙ্ক। তবে এস আমার জীবনের লক্ষ্মী, আমার বুকে এস।
অজা। ছি—এখুনি দিদি এসে পড়বে।
মৃগা। এলেনই বা, যদি আসেন তিনি মনে করবেন তার লক্ষ্মীছাড়া
ভাই আর লীলাভ করলে। আমার লীলাভ আজ যথার্থই
সার্থক হল।
- থাকব।
এমন সময় নেপথ্যে পাক বাজিল
পঞ্চম দৃশ্য
রমাবল্লভের বাটী
অন্তঃপুরের কক্ষ
রমাবল্লভ ও দেওয়ান
রমা। কিছুতেই এলো না?
দেও। না।
রমা। কি রকম দেখলে ?
দেও। অবস্থা অত্যন্ত খারাপ, দেখলে আর আগেকার মানুষ বলে চেনা
যায় না! জ্বর বােধ হয় ২৪ ঘণ্টাই থাকে। কালাজ্বর সকালের
দিকে একটু কমে, সেই সময় চিঠিপত্র লেখেন, কাজকর্ম দেখেন।
তা অতি সামান্য ক্ষণের জন্য ; আমায় ফিরে যেতে বল্লেন ; বলেন
ডাকে চিঠি দিয়েছি, মুখে বলবার আর কিছু নেই।
মনে হ’ল কি? এ যাত্রা রক্ষা পাবে না?
দেও। রক্ষা পাওয়া সঙ্কট। সে দেশে থকেলে ত নয়-ই। তবে যদি স্থান
পরিবর্তনে কিছু উপকার হয় তাে বলা যায় না।
রমা। ইচ্ছে করে জীবনটাকে বিসর্জন দিলে—কেবল আমাদের উপর
অভিমান করে। কি প্রতিজ্ঞাই কর্তে বলেছিলুম, শেষে ব্রহ্মহত্যার
ভাগী হলুম, মেয়েটার বৈধব্য ঘটালুম!
দেও। আপনি অমন কথা বলবেন না, মানুষ তাে মৃত্যুমুখ হতেও
রমা।
বাড়ে!
১৫৮
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
রমা। সে অদৃষ্ট আমার নয়। তাই যদি হবে, তবে বিষয়ের লােভে
আমারই বা সে দুৰ্ম্মতি হবে কেন ? যাক-তুমি এক কাজ কর,
আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে পারব না। আমাকে তার
কাছে যেতেই হবে, তার মৃত্যুশয্যার পাশে বসে
দেও। থাক–থাক, আপনি অতটা উতলা হবেন না। রাধারাণী মা
এ কথা শুনলে
রমা। শুনুক-তার শােনাই দরকার। তার অবিমৃষ্যকারিতা—তার
পিতার অবিমৃষ্যকারিতা—মানুষের চেয়ে ঐশ্বৰ্য্যকে বড় করে
দেখেছিলাম—তার প্রায়শ্চিত্ত ভােগ করতেই হবে। তুমি যাও,
এখনি আমাদের যাত্রার উদ্যোগ করগে। আর এক মুহূর্ত এখানে
থাকতে পারব না, থাকা উচিত নয়।
দেও। যে আজ্ঞা—কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যাত্রা—বৈষয়িক নানা
জটিল ব্যাপার সানে।
রমা। এখনো বিষয় ? বিষয় যাক—সৰ্বস্ব যাক—যদি অম্বরকে পাই
তবেই সব, নইলে বিষয় নয় রাস্তার ধূলোঐশ্বৰ্য্য নয়, নর্দমার
পচা পাক-এর কোন মূল্যই নেই।)
দেও। যে আয়ে-যাত্রার উদ্যোগই করিগে।
রমাবল্লতের এখান। পশ্চাৎ পশ্চাৎ দেওয়ানের প্রধান
অন্য দিক হইতে বাণীর প্রবেশ
বাণী অম্বরের পত্র পড়িতেহিল :-
“এখন বিদায়, আমার মনে কোন অতৃপ্তি নাই, তােমাদের গােয় এ
জীবনে অনেক পাইয়াছি। ঈশ্বর জানেন, আমি তােমাদের নিকট
পঞ্চম দৃশ্য মন্ত্রশক্তি ১৫৯ কত ঋণী ! আমার মৃত্যুতে তােমার দুঃখিত হইবার প্রয়ােজন নাই। শুধু একজন বিখালী শুভার্থী—আমার সম্বন্ধে এইটুকু কখনও কখনও আমায় মনে পড়িলে স্মরণ করিও। তােমার বিশ্বাস রক্ষা করিতে পরিয়াছিতো? আমার মরণে লােকে তােমায় না বুঝিয়া বিধবা বলিবে—হয় লেকেশাচালক্রমে কিছু ক্লেশভােগও অনিৰ্য্য ! কিন্তু আমি জানি তুমি চির-সধবা। ভগবানে যে প্রাণ সপিয়াছে তাহার কথন বৈধব্য ঘটিতে পারে না। তােমার কাছে আমার শেষ অনুরোধ, পিতৃদেব যদি তােমায় সঙ্গে লইয়া আসিতে চাহেন, তুমি কোন মতেই আসিও না। ইহলােকে আর কখনও কোন অনুরােধ করি নাই—করিবও না। এই একমাত্র প্রার্থনা। ঈশ্বর তােমায় সুখে রাখুন। চিরমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী অম্বর।” বাণীর চক্ষে জল ছিল না, তাহার শরীরের সমস্ত রস যেন শুকাইয়া গিয়াছিল। শুষ্ক কঠে এই কয় ছাত্র পড়িয়া সে বসিয়া পড়িল, চিঠিখানি তাহার হাতে রমাবল্লভের প্রবেশ রমা। বাণি! এ কি মা! এমন করে বসে কেন ? এ কি! বাণি! বাণি! ( বাণী ধীরে ধীরে তাহার মুখের দিকে চোখ ফিরাইল) কেন মা! কেন মা ! মুখ যে একেবারে শাদা ! তবে শুনেছিস ? ও চিঠি কার? তবে কি অম্বর তােকেও লিখেছে? আমিও যে তােকে তার চিঠি শােনাতে এসেছিলুম মা! (বাণীর পাংশু ওষ্ঠ কাপিয়া কাপিয়া উঠিতেছিল) না মা, আর এখানে নয়, (শিশুর মত কাদিয়া উঠিয়া) চল মা, আমরা তার কাছে যাই, তার কাছে যাই । ও কি।
মশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
বাণী । (শুক স্থির কণ্ঠে) আমার যে যাবার উপায় নেই বাবা! তুমি
যাও।
কেন মা ! যেতে বাধা কি? না-না, আমি আর কোন কথা
শুনবাে না-তােকে যেতেই ( স্বগত) এ কি! আমি কি বাণীর
চেয়েও দুর্বল? আর যে কথা কইতে পাচ্ছিনে, কণ্ঠ যে রুদ্ধ হয়ে
আসছেনা মা-যেতেই হবে, যেতেই হবে, যেতেই হবে।
এস্থান
বাণী। যাব—যাব, কোথায় যাব? ওগগা। তুমি কি ততদিন বেঁচেও:
ভগবান! এ কি নিষ্ঠুর বজ্রাঘাত! জন্মের মত চলে যাবে, জেনেও
যাবে না যে, এই হৃদয়হীনা পাষাণী আজ তােমায় কত ভালবাসে।
আজ তুমিই যে আমার সর্বস্ব, আমার ইহকাল পরকালের) একমাত্র
ও একমাত্র প্রার্থিত তুমিই তো বলেছ, উচ্চকণ্ঠে আমায় শুনিয়ে
বলেছ—আমি তােমার স্ত্রী। তবে আমাকে স্ত্রীর অধিকার থেকে
বঞ্চিত রাখলে কেন? আমায় যেতে বারণ করেছ কেন? তােমার
প্রতি যে অত্যাচার করেছি একি তারি শাস্তি ? তাই হক, তােমার
শান্তি আমি মাথা পেতে নেব। তােমার শেষ আজ্ঞা আমি পালন
করব। আমি যাব না-যাব না—যাব না-
বাণ-বিজা হরিণীর স্থায় ছুটিয়া চলিয়া গেল
আসাম অঞ্চলের গ্রাম্যপথ সুধাকর ও অম্বর সুধাকর। আমি না হয় তােমার সঙ্গে যাই, এতটা দূর পথে তুমি যাবে, একা—আর এমন অসুস্থ। অম্বর। না আমায় মাপ কর সুধাকর, এ সময় তুমি গেলে চলবে না। তাহলে যার জন্যে প্রাণপাত করলেম, সে সবই পণ্ড হবে, আমার সাধের চতুষ্পঠী উঠে যাবে। তুৰিজামায়...একথা, কোল- কাতা-টিকিট কিনে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসো, আর তােনার কিছু করতে হবেনা। সুধা। তােমার তাে দেখছি এখনও জ্বর। মাঝে মাঝে জ্বরের ধমকে অজ্ঞান হয়ে পড়, পাচ সাত ঘণ্টা হুসই থাকে না। পথে যদি সে রকম হয়, কে দেখবে। শেষে বেঘােরে মারা যাবে। অম্বর। মরা বাচা এই (কপালে করাঘাত) সেজন্য তুমি ভেবাে না, তুমি আমার কি না জান, যখন একা রাজনগর থেকে চলে এলেম, পথে তুমি আমার সঙ্গ নিলে। তােমায় না পেলে কি এত অল্প দিনে এত কাজ করতে পারতুম। সুধা। তবে আজ এই বিপদের সময় আমায় সঙ্গে নিচ্চো না কেন? অম্বর। না, এবার আমি একা যাবআমার প্রাণ টেনেছে। সুধাকর, আমি আর বাচব না; কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে একবার রাজনগরে যাব। #জনগর-সেই মন্দির প্রাঙ্গণে, সেই গােপীকিশােরের সামনে। শেষ নিশ্বাস ফেলবার আগে একবার বাণীকে বলবো-কমন, ১২ মন্ত্রশক্তি পঞ্চম অ মরতেই তােমার বিশ্বাস রাখতে পেরেছি তো? আর্মি মতেই চাই—ভাই, আমি চাই; তবে এখানে নয়-সেখানে-যে দেবতার সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম সেই প্রতিজ্ঞা ৰক্ষার পূর্ণ ফল তারই চরণে নিবেদন করে দিয়ে। সুধা। ছি ভাই, ছি, মৃত্যুর কথা বলে যাবার সময় আর আমায় কষ্ট দিও না, অম্বর! তুমি কি বুঝতে পাচ্ছ না। এ অবস্থায় তােমায় একা ছেড়ে দিতে আমার যে কি যন্ত্রণা হচ্ছে। অম্বর। বুঝতে পাচ্ছিনে! তােমার মতন বন্ধুর হৃদয় যে ৪ মহৎ তাকি বুঝতে পাচ্ছিনে। কিন্তু ভাই, তুমি আমার মাপ কয়। এই জনাকীর্ণ সংসারে চিৰদিনই যে একা কাটিয়েছি—একা, মা নয়, বাপ নয়, ভাই নয়। এমন নয়। জীবনে এই ক'বছরে পেয়েছি কে তােমায়, -কী এই+তে য়েছি হঠাৎ মনিভাবে, তাকে; কিন্তু--প্রতিজ্ঞার খােজনাঞ্চন আর ও আমার মধ্যে যে, ইচ্ছাকষ্টি করতে বাধ্য হয়েছিলাম। বিবাহের পরেও তো একা, নিঃসঙ্গ থাকার আনন্দ, পলে পলে প্রতি মুহূর্তে ভােগ করেছি! এখন এমনি একাই তো মরতে চাই; নইলে কি জানি দুৰ্বল জ্বলু, যদি প্রতিজ্ঞা রাখতে না পারি? এষে" মুথা। তুমি বেঁচে থাকলেও তােমার ব্রত উদযাপনে ব্যাঘাত হবে না। তােমার ন্যায় সাধু, তােমার ন্যায় সংযমী, তােমার ন্যায় ব্রতধারীর সাধনা কখনও নিস্ফল হয় না ভাই। কেন মিছে ভয় কচ্ছ কেন তার অঙ্গ এমনি করে ইচ্ছায় মৃত্যু কামনা কচ্ছ। মৃত্যুর কামনা করাও তত পাপ!
সপ্তম দৃশ্য
মস্ত্রশক্তি
অম্বর। পাপ পুণ্যের অতীত স্থানে গিয়ে দাড়িয়েছি ভাই! এখন আর
সে বিচার নয়, এখন কোনও রকমে এই দেহটাকে টেনে নিয়ে সেই
রাজনগর পর্যন্ত পৌঁছিতে পারলে হয়।
তুই তুলে
Ratta-State-मस्काना
আমি এক-এসেছিতেচাই ! ভগবান করুন, যেন
তাকে একবার দেখে, অশাল যেতে পারি।
অকিঅফেচাৰ খাৰুকে আমার আর কোন
আকাঙ্কা নেই! তুমি এস ভাই, এস আর দেরী করো না।
সুধা। চল, কি করব—তােমার কথাই রাখব, তােমার কাজ নিয়ে
এইখানেই থাকব।
উভয়ের প্রস্থান
সপ্তম
শিয়ালদহ ষ্টেশন—প্লাটফরম
একখানি প্রথম শ্রেণীর গাড়ীর হালে ধরিয়া ডাক্তার জগতিবাবু ও রমাবল্লভ দাড়াইয়া
আছেন; গাড়ীর ভিতরে বেঞ্চে বসিয়া বাণী
জগতি। এই ঝড় জলের দিন না বেরিয়ে, একটা দিন অপেক্ষা করে
গেলেই হত।
রম। যদি একটা দিনও অপেক্ষা করবার মত সময় থাকত, তাহলে কি
ঐ কচি মেয়ে নিয়ে এই দুর্যোগে মেঘনা পদ্মা পার হতে বেরুই ?
তারপর মেয়েটাকে আবার রেখে যেতে হবে চাদপুরে-ওর মাসীর
বাড়ীতে, তারপর আমি যাব আসামে।
১৬৪
মত্রশক্তি
পঞ্চম তা
জগতি। কেন, বাণীকে সেখানে নিয়ে যাবে না।
রমা। কি করে নিয়ে যাব, কোথাই বা নিয়ে যাব। তার শেষ চিঠিতে যা
লিখেছে,তাতে মনে হয় এতদিনে সে আছে কিনা তারই বা ঠিক কি।
জগতি। তা বাণীকে আমার ওখানে রেখে গেলেই তাে পারতে ? যদি
বাণী সেইখানেই না যায় তো মাঝখানে চাদপুরে রেখে যাওয়া কেন ?
মােৱ সকতদিন পরে দেখাই হয় বলে
একরাত্তির ও যে আকাঙ্গী গিউঠেছিনততে যে আমার
দিন হয়েছে—তা উপভােগ করতেই পাগলু না তােমাদের
এই বিপদের কথা শুনে। যাক-ভগবান মঙ্গল করুন-অম্বরকে
সুস্থ দেখে তাকে নিয়ে ফেরবার মুখে আমার ওখানে গিয়েই উঠো।
র। তাই বল ভাই, তাই বল, তাকে সুস্থ দেখে যেন ফিরিয়ে নিয়ে
আসতে পারি; কিন্তু আমার এমন অদৃষ্ট কি হবে? আমাদের ট্রেণের
আর কত দেরী ?
এখনাে ঢের দেরী—প্রায় একঘণ্টা। তুমি যে ব্যস্ত হয়ে
বেরিয়ে পড়লে, নইলে আমার বাড়ী তত এই হারিসান রােডে
দু’মিনিটে আসা যায়।
রা। ব্যস্ত না হয়ে কি করি ভাই, মেয়েটার মুখের দিকে যে আর
চাইতে পারিনে।
(নেপথ্যে কোলাহল)। এই হট যাও-ই যাও
জগতি।
ব্যৰে এজন লােরে একেশ
শােক। তাই তো-এখানে কি কেউ ডাক্তার নেই। হায়-যায়, লােকটা
বেঘােরে মারা যাবে। রেলোভা কেন।
সপ্তম দৃশ্য মন্ত্রশক্তি ? রমা। ও হে, কে ডাক্তার খোঁজে দেখ। জগতি। তাই তাে, ও মশায় শুনুন, শুনুন, ডাক্তার কেন,কোন accident হয়েছে কি লোক। না মশায় accident নয়, একজন প্যাসেঞ্জার- জগতি। কি হয়েছে তার ? লােক। থার্ডক্লাস কম্পার্টমেন্টে ছিল মশায়, সঙ্গে কেউ নাই। চাদপুরের ‘মেল’ এলাে না, ঐ প্লাটফরমে—সেই গাড়ীতে, আছে কি নেই সন্দেহ -বােধ হয় ব্যারামে ভুগছিল। ধরাধরি করে নামান হয়েছে। মূর্দো বলে নিয়ে যাচ্ছিল morgue, আমি রুকিছি, কি জানি-বেঁচে পাকতেও তাে পারে ? হায়-হায়, একখানা চোর আর একজন ডাক্তার হলে—যদি বেঁচে থাকে, গরীব হলেও মানুষ তাে, কি বলেন জগতি। ডাক্তার? ডাক্তার খুঁজছেন, চলুন দেখে আসি। তােক। মশায় ডাক্তার! চলুন—চলুন—আঃ ভগবান রক্ষা করেছেন- আমুন-আনুন- উভয়ের প্রস্থান রমা। আমিও যাব নাকি ? জগতি। ( যাইতে যাইতে) না—না, তুমি এইখানেই থাক। খা। দেখ, ভাগ্যি জগতি ছিল, তবুও একটু সাহায্য পাবে; তগবানের খেলা, বােধ হয় পরমায়ু আছে। নইলে এমন সংযোেগ হবে কেন। বাণী। বাবা, ট্রেণ ছাড়তে আর দেরী কত ? রমা। ঐ তো শুনলে মা, তােমার কাকাবাবু বল্লেন এখনও ঘণ্টা খানেক দেরী আছে।
মন্ত্রশক্তি পঞ্চম অঞ্চ হ। বাণী। লোকটা বললে না-চাদপুরের ‘মেলে’ এলে ? রমা। বাণী। আমরাও তাে যাব সেই চাপুরে। রমা। হাঁ মা, তােমায় সেখানে রেখে আমি যাব আসামে গুরুগ্রামে। ( স্বগত) আমায় তুমি যেতে বারণ করেছ কিন্তু আমার প্রাণের ভেতর কে যেন বলছে বাবার সঙ্গে যেতে, ও এক এক মুহূর্ত যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন এক একটা যুগ। বাবা, বাবা, একটু প্লটফরমে বেড়াব? এখনাে তত ট্রেণের দেরী আছে ? রমা। না মা, কাজ নেই, তুমি বসেই থাক। বাণী। (স্বগত) আর যে বসে থাকতে পারিনে। গতির পুনঃ প্রবেশ রমা। কি হে, কি দেখে এলে ? জগতি। একজন থার্ডক্লাশ প্যাসেঞ্জার, young boy, বাইশ চব্বিশ বছর বয়স হবে। চেহারা চেহারা দেখে বােধ হ’ল-ভদ্রলােকের ছেলে; কিন্তু অবস্থা বড়ই খারাপ—অনেক দিন থেকেই রােগে ভুগছিল। রমা। আছে ? জগতি। হঠাৎ দেখলে মনে হয় নেই, কিন্তু এখনও আছে—আমি হাসপাতালে পাঠাবার কথাই বলে এলুম-ঠিক ঠিক চিকিৎসা হলে বাচতেও পারে। এমন অবস্থাতেও রুগী ফিরেছে দেখেছি। নেপথ্যে। এই হট যাও—হট যাও- নেপথ্যে। এই ধীরেসে-রেসেসিয়ার-বহুত হসিয়ার গতি। এ নিয়ে আসছে।
সপ্তম দৃশ্য
মন্ত্রশক্তি
কতিপয় লােকের স্ট্রেচারে করিয়া অম্বরকে সইয়া প্রবেশ
১ম লােক। আস্তে ভাই, আস্তে । ডাক্তারবাবু বলে গেছেন এখনাে
চিকিৎসা হলে বলতে পারে, চল—কাছে Campbeil সেইখানে
নিয়ে গিয়ে তুলি-
২য়-লোক। একটুবাই মশাই হাতটা ভেঙ্গে গেছে
১ম লােক। বেশ-ভাই ॥ নাও।.. মূৰ্দাৰলে কোন কুলি ঘেঁষলেন,
নাই আসুক, ভাইয়েছে, দেখছো গলায় পৈত? ব্রাহ্মণ
আমির ধাইলেই ভাল।
২য় লােক। ওহে চোখ চাইচেনা ? দেখ দেখ, কি যেন বলবার
চেষ্টা করচেনা ?
১ম
লােহ ঘঁ, তােক মনে হচ্ছে কাচবে।
বাণী। (গাড়ী হইতে) বাবা। বাবা! ও কে বাবা—দেখ—দেখ—
রমা। সেই লােকটা মা!
বাণী গাড়ী হইতে হঠাৎ পাগলিনীর মত নামিয়া সেইদিকে দুটিল
জগতি। কে
কে-মা ?
বাণী। স্বামী ! কাকাবাবু•••আমার স্বামী।
অণতি। তোমার স্বামী?
বাণী। হ্যা আমার স্বামী, এতদিন পরে আমার কাছে ফিরে এসেছে-
আমার স্বাম! আমার স্বামী !
এই বলিয়া অম্বরের বুকে ঝাপাইয়া পড়িল
অষ্টম দৃশ্য ।
জগতিবাবুর বাড়ী
রমাবল্লভ ও জগতিবাবু
রমাবল্লভ অস্থির অবস্থায়
জগতি। মানুষের যা সাধ্য তার কোন ত্রুটা হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত
জ্ঞান ফিরে না আসে ততক্ষণ রুগীর ঘরে তােমারও যাওয়া হবে
—বাণীরও যাওয়া হবে না।
জগতি।
রমা। তা হােক। কি বুঝছ ? ফিরে পাব?
সে কথা এখন কেউ বলতে পারে না, না ফেরাই সম্ভব,
কি-আশার কথা এই, এই অবস্থা থেকেও রুগীকে ফিরতে দেখা
গিয়েছে।
অম্বর যদি না ফেরে বাণীকেও আর আমি ফিরে পাব না। ওঃ!
কি জোর বরাতই করেছিলুম, এক সঙ্গে মেয়ে জামাই হারাম।
মহা পুণ্যবতী তিনি—এ সব দুর্দৈব সহ্য করতে হবে না, তাই
আগেই স্বর্গে চলে গেলেন, রেখে গেলেন মহাপাতকী আমাকে
এই বৃদ্ধ বয়সে এই যন্ত্রণা ভােগ করবার জয়।
রমা।
অ একজন ডাক্তারের প্রবেশ
২য় ডাঃ। ইনজেশনের সবই ঠিক করা হয়েছে।
গতি। পালস-সেই রকমই তাে?
* এই দৃশ্যটা অভিনয়কালে পরিত্যক্ত হয়
অষ্টম দৃশ্য মন্ত্রশক্তি জগতি। চল। আর কাউকে ভাবার দরকার হবে ? ২য় ডাঃ। সরকার, বােধ হয় না। দু’জন Nurse এর জন্যে তাে phone করা হয়েছিল, তারাও এসে পড়েছে। এদিকে মেয়েটা তো বড় জিদ ধরেছে রুগীর ঘর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। জগতি। কিন্তু তা বল্লে চলবে না। রুগীর ঘরে এখন কাউকে নয়। মহা মুস্কিল ; আমার বাড়ীর মেয়েরা কেউ নেই। রমাবল্লভ! আমি বাণীকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি বাণীকে একটু বুঝিয়ে তাকে আটকে রেখ; এই সময় নির্মম না হলে তো উপায় নেই। রমা। Nurseএর চাইতে বাণী কি জগতি। ওহে, হে না—সেটা তােমার চাইতে আমরাই ভাল বুঝি। রমা। কিন্তু জগতি। এতে আর কিন্তু নেই। ডাক্তাররা বড় নির্মম না ? যদি ভগবান করেন, আমিই আবার বাণীকে পাঠিয়ে দেব। বুঝলে? প্রস্থান রমা। আর ভগবান যদি করেন! ভগবান যা করবেন দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। যাই হক, তবু তার অসীম করুণা যে এই অবস্থায় অম্বর আমাদেরই কাছে এসে পড়েছে—আর ভাগ্যে জগতির এখানে উঠেছিলুম- ধীরে ধীরে বাণীর প্রবেশ বাণী। বাবা ! বাবা ! আমায় যে ও-ঘরে থাকতে দিলেন না। ব্যস্ত হলে কি হবে মা ! এ সময় ডাক্তাররা যা বলেন তাই তো করা উচিত। রমা।
১৭০
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম স্ক
বাণী। না বাবা! আমি কারুর কথা শুনব না। আমি কাছে
থাকতে তার সেবা করবে ‘না’! কাকাবাবু আমায় চেনেন
না—আমায় জানেন না। মনে করেন আমি ভেঙ্গে পড়ব-না-
আমি পাথরের চেয়েও শক্ত। তুমি বুঝিয়ে বল—আমি ও-ঘর ছেড়ে
কোথাও থাকতে পারব না।
রমা। বলার কি অপেক্ষা আছে মা! রোগীর সম্বন্ধে ওদের এখন
রুণ সন্দেহ। তােমার কাকাবাবু তাে স্পষ্টই বলে গেল । যতক্ষণ
crisis না কাটে ততক্ষণ রােগী কারুর নয়—সে তাদেরই। এখন
তাদের অবাধ্য হলে তো ভুলবে না : প্রাণ নিয়ে টানাটানি।
বাণী। কিছু না। কাকাবাবু বুঝতে পারেন নি; কেউ বুঝতে পারবে
না। কাকাবাবুকে জিজ্ঞাসা করলুম—তিনি বল্লেন হয় তাে তার
চেতনা ফিরতে পারে। হয় তো কেন, যিনি এ অবস্থায় তাকে আমার
কাছে এনে দিয়েছেন, তিনি ইচ্ছা করলে কি না হয়। সাবিত্রী
তার মৃত স্বামীকে ফিরে পেয়েছিলেন কার দয়ায় ? ভগবানের।
সে দয়া কি আমি পাব না? কেন পাব না? তােমার পায়ে পড়ি
বাবা, তুমি কাকাবাবুকে বুঝিয়ে বল আমি তার সেবা করব।
দ্বিতীয় ডাক্তারের পুনঃ প্রবেশ
২য় ডাঃ। (বাণীর প্রতি ) ডাক্তারবাবু আপনাকে ডাকছেন।
বাণী। আমাকে?
২য় ডাঃ। হা—আপনাকে।
রম।
এখন কেমন?
২য় ভা। পরে সবই জানবেন।
বার্ণ চলিয়া গেল
অষ্টম
মন্ত্রশক্তি
১৭১
রম। এখনাে আছে কি?
২য় ডাঃ। আপনি আসুন, রােগীর ঘরের পাশেই জগতিবাবু আপনাকে
অপেক্ষা করতে বল্লেন।
রমা। আমি একটু রাস্তায় পায়চারি করে আসি, আমার বড় গরম
বােধ হচ্ছে।
২য় ডাঃ। নাঘরে fan আছে। বিপদের সময় অতটা nervous
হলে কি চলে? আপনার বয়স হয়েছে, আপনার মেয়ে তাে
দেখছি আপনার চেয়ে শক্ত।
রমা। ডাক্তারবাবু জানেন কি—আমার বুকের ভেতর-(কাদিয়া
ফেলিলেন)
২য়। আসুন-আসুন-স্থির হােন।
উভয়ের স্থান
দৃশ্যান্তর-রােগীর কক্ষ
ঠিক হাসপাতালে যে ভাবে রােগীরা থাকে, সেই ভাবেই একখানি শয্যার উপরে
অম্বনাথ শায়িত, ঘরে টেবিলে ইনজেকশনের সমস্ত যন্ত্র সাজান। গৃহের এক প্রান্তে
জগতিবাবু বাণীর সঙ্গে কথা কহিতেছেন
জগতি। যতক্ষণ জ্ঞান না ফেরে আশ্বাস দেবার কিছুই নেই। তবে
আমরা এখনো হাল ছাড়িনি; কিন্তু মা, রক্ষাকর্তা ভগবান। তুমি
স্থির হয়ে বােস। Nurse দু’জন পাশের ঘরে রইল, তারা মাঝে
মাঝে দেখে যাবে। আমরাও সতর্ক রইলেম-এই ইনজেকশনের
ফল কি হয় দেখবার জন্যে ; হয় তত জ্ঞান ফিরতেও পারে।
জগতির প্রস্থান
১৭২ মন্ত্রশক্তি পঞ্চম অফ বাণ ধীরে ধীরে শষ্যার নিকটে অগ্রসর হইল এবং অম্বরের পাশে নতজানু হইয়া বসিয়া সেই সংজ্ঞাহীন শীতল দেহ ধীরে, অতি সন্তর্পণে, নিজের বুকের কাছে টানিয়া তাহার উপাধানহীন মশুক নিজের বাহুতে তুলিয়া অঞ-ব্যাকুলতা শূন্য স্থির চক্ষেঅম্বরের মুখের পানে চাহিয়া প্রতীক্ষা করিতে লাগিল আমি এ কোথায় ? রাজনগর আর কতদূর? ( স্বর অতি ক্ষীণ। কি বলিল কিছুই বোেঝা গেল না। বাণী। আমি কি ভুল শুনলাম? এ ঠোট কি নড়েছিল? দোহাই গােপকিশাের ! আশা দিয়ে নিরাশ করে না। আবার বল- আবার বল। অম্বর। ( অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার স্বরে) রাজনগর-রাজনগর-আর কতদূর? বাণী। কি ? কি ? অম্বর। আমি এ কোথায় ? রাজনগর--আর কতদূর? বাণী । ( ধীরে-স্থির কণ্ঠে ) আর তত দূরে নেই। তুমি যে আমার তােমার বাণীর কাছে আছ। বুঝতে পারছ না ? অথর। কোথায় ? কার কাছে ? বাণী। তােমার বাণীর কাছে ? অম্বর। আমার বাণী—আমার বাণী । বাণী। হা—তােমারই বাণী। তােমারই স্ত্রী-তােমার দাসী। তােমারই সহধর্মিণী ! ওগাে ! আর একবার চেয়ে দেখ, আমার যা বলবার, না শুনে চলে যেয়ো না। তােমার চিঠি আমি পেয়েছি; তুমি জানতে চেয়েছিলে তােমায় ভালবাসি কি না, শােন-আমি তােমায় ভালবাসি ভালবাসি—ভালবাসি।
অষ্টম
মন্ত্রশক্তি
১৭৩
বাণী।
অম্বর। তুমি আমায় ভালবাস বাণী ?
বাণী। বাসি! তােমায় আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি, তবু তুমি আমায়
স্ত্রী বলে স্বীকার করেছ, আমায় ভালবাস বলে স্বীকার করেছ।
আমি তােমার শিষ্যা, তােমার দাসী, আমার অপরাধ তুমি ক্ষমা
করবে না কি?
অথর। আবার বল-তুমি আমায় ভালবাস ! এখন আমার মৃত্যু যে
কি আনন্দের—কি শান্তির
না ও কথা নয়। আর মৃত্যুর কথা কেন ভাবছ ?
অম্বর। কেন ভাবছি-আমায় যে যেতেই হবে বাণী ? বেঁচে থাকলেও
তত সেই দূরে—তােমায় ছেড়ে–কোথায় সে আসাম, কোথায় সে
অরণ্য-নদী-পৰ্বত—আমাদের মাঝখানে ব্যবধান রেখে—তার
চেয়ে এই তাে—এত কাছে-ভােমার বুকে মাথা রেখে--তােমার
এই ভালবাসা সুখস্মৃতি নিয়ে পরলােকের যাত্রী হওয়াই তাে ভাল।
বাণী। আবার কেন দূরে যাবে ? কেন ? এখনো কি অভিমান !
এখনাে কি আমার অপরাধ ক্ষমা কর নি ? মঙ্গলময়ের অশেষ দয়ায়
তােমায় এ অবস্থায় পেয়েছি, এখন অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের তাে
আর সম্বন্ধ নেই ! এ নব জীবনে তুমি যে আমারই।
অম্বর।
সত্য বাণী ? সত্য?
বাণী।
এর চেয়ে সত্য যে কি, তা তাে জানি না; এ নতুন জীবন যে শুধু
তােমার—তা তো নয়, আমারও যে আজ নতুন জীবন। তােমার
কণ্ঠে উচ্চারিত সেই বিবাহের বেদমন্ত্র যে দিনে দিনে, পলে পলে,
তিল তিল করে আমায় ভেঙ্গে চুরে, আমার সৰ্ব্ব পাপ, সৰ্ব্ব
অহঙ্কার, সকল অভিমানকে ভাসিয়ে দিয়ে, আমায় নতুন করে
;
১৭৪
মন্ত্রশক্তি
পঞ্চম অঞ্চ
গড়ে তুলেছে। যে তােমায় শপথ করিয়েছিল, সে বাণী তত আর
বেঁচে নেই। আমি এক জমের জন্যই শপথ করেছিলুম, জন্ম
জন্মান্তর তো বাধা দিই নি ? এ নতুন জন্মে মৃত্যুর কাছে ভিক্ষা করে
তােমায় ফিরিয়ে এনে আমি তােমায় আমার করব।
অম্বর। পারবে বাণী ।
পারবে ?
বাণী। পারব না ? কেন পারব না ? কেন? আমি কি সতী স্ত্রী
নই? না, আমার শরীরে আমার সতীলক্ষ্মী মা, ঠাকুরমায়ের রক্ত
বইছে না ?
অম্বর। বাণী !—আমার বাণী—আমার বাণী
যবনিকা
মুদ্রাকর ও প্রকাশক-গােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য,ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস,
২০১১, কাওয়ালিস জীট, কলিকাতা
প্রথম অভিনয় ৰজনীৰ পাত্র-পাত্রীগণ সংগঠনকারিগণ অধ্যক্ষ ও শিক্ষক সঙ্গীত শিক্ষক বংশীবাদক তবলাবাদক ঐ অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় শ্ৰীভূতনাথ দাস ঐ অমৃতলাল ঘােষ সতীশচন্দ্র বসাক শ্ৰীধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীকালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ চক্রবর্তী শ্রীমাণিকলাল দে হারমােনিয়মবাদক স্মারক বঙ্গপীঠ সজ্জার রমাবল্লভ মৃগাঙ্কমােহন আদ্যনাথ অম্বনাথ সুধাকর চাদমােহন পাত্র-পাত্রীগণ কুঞ্জলাল চক্রবর্ত্তী শ্ৰী অহীন্দ্র চৌধুরী নরেশচন্দ্র ঘােষ শ্রীইন্দুভূষণ মুখােপাধ্যায় বিশ্বনাথ চক্রবর্তী শ্ৰীধীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় শ্ৰধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীজহরলাল গঙ্গোপাধ্যায় শ্রীজীতেন্দ্রনাথ ঘােষ ননীগােপাল মল্লিক বিভূতিভূষণ রায় হণধর নবীন বিশ্বম্ভর রামশরণ রূপরাম ( ২ ) রমণীমােহন যামিনীমােহন সজনীমােহন পরাণ মণ্ডল মহেশ মণ্ডল জগতিমােহন মথুর বিনে জনৈক আরােহী যাত্রিগণ শ্ৰীধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীবীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় শ্রীজহরলাল গঙ্গোপাধ্যায় শ্রীতুলসীচরণ চক্রবর্তী শ্ৰী প্ৰবােধচন্দ্র দত্ত শ্ৰীশরৎচন্দ্র বসু তিনকড়ি চক্রবর্তী শ্ৰীযতীন্দ্ৰনাথ দাস সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্ৰীসত্যেনবাবু, হরিপদবাবু, কমলবাবু, তুলসীবাবু, যতীনবাবু, রাইমেহনবাবু, শশীবাবু, জীতেনবাবু, গিরীন্দ্রবাবু, ননীবাবু, কার্তিকবাবু, রবীন্দ্রবাবু ইত্যাদি ঐবিজয়কৃষ্ণ মুখােপাধ্যায় শ্ৰীমতী কুসুমকুমারী শ্ৰীমতী কৃষ্ণভামিনী শ্ৰীমতী সুবাসিনী শ্ৰীমতী সুশীলাবাল শ্ৰীমতী রাজলক্ষ্মী শ্ৰীমতী সুবাসিনী (ছােট) মতী সরােজিনী মতী মতিবালা, হিঙ্গলবালা, উষাবালা, পটলমণি, চারুশীলা ইত্যাদি কৃষ্ণপ্রিয়। বাণী তুলসী 7 জহরা কেলাের মা मामो প্রতিবেশিনীগণ
No text on this page.
প্রসিলাতকার
—অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় প্রণীত পুস্তকাবলী
बीरगोजाम
বিল্লাহি
না
: : : * * * * *
जपान
ভক্তিমূলক নাটক
নাটক
সামাজিক নাটক; চতুর্থ সৎ
সামাজিক নাটক; তৃতীয় সংরণ
পৌরাণিক নাটক ; তিীয় সংণ
সামাজিক নাইক; অংশ
প্রেমভকি নাটক ; তুর্থ সংরণ
পৌরাণিক নাটক তৃতীয় সংস্করণ
পৌরাণিক নাটক
কৌতুক নাটিকা
সামাজিক না; তিীয় সংৰণ
ঐলিক টক
ঐজিসিক টক; তৃতীয় সং
গতি-নাটিকা
গার্হস্থ্য উপন্যাস
গীতিনাট্য
পৌরাণিক নাটক; তৃতীয় সংখল
কৌতুক নাটক
গা
अपिना
শাড়ি,
و و و
খুঁকি
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.