Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Chhaya

Pal, Shanti · 2010/01/2

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

জান্না
শান্তি পাল
দি বুক এজেন্সী
৩৬, কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট
কলিকাতা

প্রকাশক
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দত্ত বি-এ
৬, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দাম এক টাকা
বৈশাখ-১৩৪২
সেথ এণ্ড কোং, প্রিন্টিং হাউস
৮২নং বলরাম দে স্ট্রীট, কলিকাতা
এবিষ্ণুচরণ শেঠ বি-এ কর্তৃক মুদ্রিত

পরম শ্রদ্ধাপদ
স্বর্গীয় সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
শ্রীচরণারবিন্দে
সত্যেনদা, চিরটাকাল লাঠিবাজি, সাঁতার, বাচ, মুষ্টিযুদ্ধ,
করে কাটিয়েছি। তােমাকে অনেক কাছে পেয়েছিলাম, কিন্তু
কোনদিনই তােমাকে বােঝবার চেষ্টা করিনি। তােমাকে
জ্ঞানের মাপকাঠি দিয়ে দেখার ও বােঝবার ক্ষমতা আমার
নাই। তবে শ্রদ্ধা করবার, ভালবাসবার বা তােমার স্মৃতি
পূজা করবার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে, কেন না তুমিই
ছিলে আমাদের সুখের সুখী, দুঃখের দুঃখী ও খেলার সাথী। তুমিই
লিখেছিলে,-“এমন ক্লাবটি কোথায় খুঁজে পাবে নাক’ তুমি.••••
শান্তি-যুগল-প্ৰফুল্লের হুল্লোড়েরি ভুমি”—ইত্যাদি। তুমিই বালকের
মত আমাদের সঙ্গে মিশতে। কত দৌরাত্ম্য, কত আবদার হাসি
মুখে সহ করতে। একটি দিনের তরেও মুখ আঁধার কর নাই।
আমাদের সাঁতারের মূলে তুমিই ছিলে রস ; সে কথা আমরা
কোনদিনই বিস্মৃত হইনি, বা হব না। আজ তোমার আশীর্বাদ
মাথায় নিয়েই সামান্য গুটিকতক কথা তােমার চরণে নিবেদন
করলাম। ইতি
মেহদি
শান্তি পাল

No text on this page.

নিবেদন
জীবনটিকে সুন্দর করে গড়ে তােলবার ইচ্ছেটা ষােল
আনার জায়গায় আঠারাে আনা আছে; কিন্তু হয় কই ?
আমার মত একজন অসাহিত্যিক যে কবিতার বই প্রকাশ
করবে তা কোন দিন-ই কল্পনায় আনতে পারি নাই। বন্ধুরা
ছাড়বার পাত্র নন, বিশেষ করে আমার কনিষ্ঠ হরিপ্রিয়
আমাকে উদ্ব্যস্ত করে তুললাে। আজ এদেরই উৎসাহে
বইখানি সাধারণের নিকট অতি সঙ্কোচের সহিত হাজির
করলাম। এই কবিতাগুলির অধিকাংশই পূর্বে বিচিত্রা,
প্রবাসী,, বঙ্গশ্রী, বঙ্গলক্ষী, উদয়ন, আনন্দবাজার পত্রিকা,
দীপালী প্রভৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে।

No text on this page.

সূচী ছায়া ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪ পূজারী ছবি ৭ কদম তলে ১১ ০০০ প্রদোষে আমি চিনি তােমায় চিনি ••• ও ১০ স্যা ১৪ প্রবাসীর দুঃখ দিনের শেষ ০ ০ ০ Sb ::: ১৯ পরিচয় গড়াই ওরে মাঝি চেয়ে দেখ বর্ষা খেয়ালী . . . ২৬ ২৮ জয় রূপসী বিরহী ০ ০ ০ ৩৪ श्वरम উদ্বেগ সন্ধানে ৩৭

মাঠে মাঠে আর বাথানে বাথানে শৃগাল কুকুর নাচে,
বনের পাখীরা উড়িয়া উড়িয়া বসেনাক’ গাছে গাছে।
গাঁয়ের গােধন আধপেটা খেয়ে শুইয়া নদীর বাঁকে,
রাখালের লাগি কাঁদিয়া কাঁদিয়া হাম্বা হাম্বা ডাকে।
কৃষাণের মেয়ে একেলা বসিয়া ঘরের কোণেতে আজ,
আগেকার মত পাড়া পাড়া ঘুরে পরে না এয়াের সাজ।
নিরালা নিঝুম দুপুরের তাতে কলাবাগানের পাশে,
কাকালে বহিয়া মাটির কলসী তারা আর নাহি আসে।
খিড়কীর ঘাটে সখীদের সাথে খেলেনাক’ জল-খেলা,
এপার ওপার হয় না কেহই ভাসায়ে কলার ভেলা।
আঁচিল পাতিয়া, এলাইয়া চুল সিনানের ঘাটে বসে,
আত-রঙীন চরণ তাদের কেহ আর নাহি ঘসে।
বেউর বাঁশের বাঁশীতে বাজে না উতলা উদাসী সুর,
ভাঙা ঢেউ লেগে ভাসে না কলসী, যায় না সে বহুদূর।
কুমারী মেয়েরা বকুলের তলে করে নাক’ ছুটাছুটি,
সাঁঝের বেলায় জ্বালে না প্রদীপ তুলসীতলায় জুটি,
আঁধার মৌন ঘেরে চৌদিক, থামিয়াছে কলতান,
ঘরে ঘরে আর পড়ে না সন্ধ্যা, উঠে না সান্ধ্যগান ।
দেবতার ঘরে বাজে না শঙ্খ, ঘণ্টা নাহিক বাজে,
ঢাক, ঢােল, কঁসি বাজায়ে নাচে না কেহ আঙিনার মাঝে ।
নাহি শুনি আর বাউলের গান, তরজা পাঁচালি ছড়া,
কীৰ্ত্তন, ঢপ গাহে না কেহই কটিতে পরিয়া ধড়া।

ছায়া
কবিদের আর হয় না লড়াই ময়নাপাড়ার মাঠে,
এ-মাঠ ও-মাঠ একাকার আর হয় না গাঁয়ের বাটে।
সত্যপীরের পাঁচালীর কথা গ্রাম ছেড়ে গেছে চলে,
মনসা-ভাসান, মুস্কিলাসান আর নাহি কেহ বলে।
কথকতা, ব্ৰত, রূপকথা কই, বাস্তু দেবীর দান,
আউনী-বাউনী, কলার বরণ, কৃষ্ণলীলার গান ?
জারীর পালা যে শেষ হয়ে গেছে কণ্ঠ গিয়াছে বুজে,
কলকণ্ঠের কলহাসি আর পায় না কেহই খুজে।
গাঁয়ের বুকেতে আগুন লেগেছে, পুড়িয়া হয়েছে খার,
ধিকি ধিকি শুধু জ্বলিছে আগুন, নামিছে অন্ধকার।
আজ শুধু শুনি দুঃখের কথা ঘরে ঘরে ওঠে ওই,
পল্লী-মায়ের বুকভাঙা ডাক কেমন করিয়া সই ?
চারিদিক দেখি, শ্মশান বিরাজে, করে সবে হাহাকার,
উপােসে ও জ্বরে গাঁয়ের মানুষ হয়েছে অস্থিসার।
লােহা-পাথরের সৌধকিরিটী-সহরবাসিনী দেবী,
কি পেলাম আর কি যে হারালাম তােমার চরণ সেবি’!
গণিতে বসিয়া শিহরিয়া উঠি, দেখি মৃত্যুর ছায়া,
সহরের নেশা ছুটাও হে দেবী, বাড়কে গ্রামের মায়া।

পূজারী
ওগাে আমার মানস ছবি
গােপন হিয়ার মাঝখানে,
পূজবাে তােমার চরণ দুটি
সাজ সকালে আমনে।
শুবাে তােমার নূপুর ধ্বনি--
শুন্যাে পায়ের মধুর ভাষা,
নিখিল ব্যেপে উঠবে যে বড়
আমার বুকের স্পন্দনে।
দুঃখ ভরা বুকখানা মাের
পথের উপর দেবাে পেতে,
দাড়িও তুমি, অর্ঘ্য দেবাে
লাল আবীর আর চন্দনে।

ছবি
বহুদিন পরে কুড়ায়ে পেয়েছি
আমার হারান ছবি ;
যাহার লাগিয়া ঘুরে ছিনু আমি
উদয়-অন্ত-রবি।
নিশীথে তাহারে স্বপনে দেখেছি,
প্রভাতে রবির করে,
ঢল ঢল ঢল মুখের লাবনি,
আমারে পাগল করে
৫

=
এখনাে বয়সে নবীনা বালিকা,
এখনাে ফুটেনি কুসুম কলিকা,
এখনাে পরেনি বাসর-মালিকা,
বকুল মালতী ফুল,
নিভৃতে নীরবে বসে গৃহতলে
ম্লান হাসি হেসে কি যেন কি বলে ;
লাজনত কালাে আঁখি ছলছলে
নাহিকো তাহারি তুল।
এস সখি এস,নিবিড় অলকে
উছলিয়া রূপ ঝলকে ঝলকে
মাের বুকে এস গভীর পুলকে,
কালাে দু’টি আঁখি মেলে;
রূপে চারিদিক উলসিত করে
মণিময় দীপ জ্বালাে এই ঘরে,
নির্মম হয়ে আর দূরে দূরে
থেকো নাক’ অবহেলে।

শারদে
কালাে হয়ে আসে সুদুর আকাশ
মাঠ ঘাট বাট ঢাকি;
কিচি মিচি করে কুলায় ফিরিছে
বনের যতেক পাখী।
গাঙচিলগুলাে নদীর ওপারে
বাতাসে মেলিয়া পাখা,
একে আর একে মগ ডালে বসে
দোলায় সবুজ শাখা।
সন্ধ্যা-সভা-রে শেষ করে দিয়ে
শকুন পাখীর দল
ঝাকে ঝাকে তারা তালীবন 'পরে
ঘুরিতেছে অবিরল।
বকের আবলী সারি দিয়ে বসে
নাঙলা বিলের ধারে
সবুজ পানায় সাদা ছােপ দিয়ে
ঘন ঘন পাখা নাড়ে।

মাথার উপরে উড়ে চলে যায়
বুনাে-শালিকের ঝাক
তারি সাথে ওড়ে চখা আর চখী
ডাহুক ডাহুকী কঁক।
রাখাল চলেছে গােধন লইয়া
গােখর ধুলায় ভরি
সারা ক্ষেতখানি রঙিয়া উঠেছে
অপরূপ বেশ ধরি।
রাখালীয়া মেয়ে পিছে পিছে ধায়
পচন-বাড়িটি হাতে,
কানে দোলাইয়া শিরিষের ফুল
কুরুবক পরে মাথে।
দূরে দাড়াইয়া আমনে দেখে
রাখাল ছেলের দল,
লাঠির উপরে দেহখানি রেখে
চেয়ে থাকে ছলছল।
কোন চাষী রােপে মাথা নীচু করে
ঘােট ঘােট ধান চারা,
কেহবা বসিয়া তামাকু টানিছে
নাহি তার কোন সাড়া।

ছায়া
কেই মাটি কেটে কোদাল পাড়িছে
রচিছে নূতন আল,
কেহবা তখনাে খ্যাড়া জমিতে
ক’সে চালাইছে হাল।
ক্ষেতের পথেতে কৃষাণ ক’ণেরা
আগাছার বােঝা নিয়া
সারি দিয়া সবে চলেছে রঙের
রঙীন আঁচড় দিয়া।
কেহবা পরেছে হলুদীয়া শাড়ী,
কেহবা পরেছে লাল,
কাহারাে পরণে আবরাঙা রঙ,
ধূসর মেঘের জাল।
গল্পে গুজবে হাসি
কুতুহলে
চলেছে সুদূর
শাঙন শেষের আবছায়া মাখা
“গ”-এ,
জল ভরা ঘন বায়ে।
দেখিতে দেখিতে আরাে কালাে হ’ল
সুদূর গাঁয়ের বাট,
সেই কালাে সব ছেয়ে ফেলে দিল
তেপান্তরের মাঠ।

ছায়া
কোথা দেখি আঁশু, কোথা দেখি পণ্ড
কোথায় ধূসর ঢঙ
তারি ফাকে ফাকে তখনাে চিকায়
কঁচা পাকা সােনা রঙ,
দূর গ্রাম পথে পল্লী দুলালী
কলসী লইয়া কঁাখে,
জল আনিবারে চলিয়াছে ধীরে
গেঁইয়া নদীর বাঁকে।
ওই যে দেখিছ উচু নীচু মাঠ
সরিষা অড়র ক্ষেত,
তারি পাশে ওই বাবলার বন
করে সদা সঙ্কেত,
তারি পাশে ঘাট,—সে ঘাটে নামিয়া
কলসী ভরিয়া জলে
পল্লী বালিকা হেলিয়া দুলিয়া
গৃহ পথে ফিরে চলে ।
বনের আড়াল হতে আড় চোখে
হেরি সে মােহন ছবি
সাথে সাথে চলে লুব্ধ হৃদয়ে
অচিন গাঁয়ের কবি।

কদম তলে
কেমনে যাব সই
কদম তলে ?
“ও পথে যেও নাক
ননদী বলে।
বঁধুর বাঁশীখানি
পাণ নিল টানি,
দেহেরে ঘরে রাখি
কিসের ছলে ?
কেমনে যাব সই
কদম তলে ?
ব্যাকুল বেণু বাজে
প্রভাতী সুরে ;
আমারে নিয়ে যায়
সুদূর পুরে
কাটিয়া সব বাধা
বাহিরে যাবে রাধা
ঢাকিয়া যত কাদা
অচিল তলে।
কেমনে যাব সই
কদম তলে ?
১১

প্রদোষে প্রেয়সী, তােমারে কি আজি করিব দান- অরুদ্ধ কণ্ঠের মম গান ? গান আজি মাের গলিয়া গলিয়া যায়। ছন্দে ছন্দে কুলহার বেদনায়- নাহি অবসাদ, নাই তার অবসান। প্রেয়সী, আমার গানের যতেক কথা, হয়তাে জাগাবে হৃদয়ের ব্যাকুলতা। হয়তাে তােমার পাষাণ মনের কোণে এক ফোটা জল দেখা দিবে অকারণে, শূন্যে কাঁপিবে অমূল-আলােকল। আঁধারে প্রােথিত যে তরুর দৃঢ় মূল, ঝড়ে ভাঙ্গে আর করে বার বার ভুল।

আমি চিনি তােমায় চিনি
আমি চিনি
তােমায় চিনি,
তুমি এসেছিলে আষাঢ়েতে
দুলিয়ে মাথার বিনি
আমি চিনি
তােমায় চিনি।
আমার সবুজ ধানের ক্ষেতে
চরণ নূপুর বাজিয়ে যেতে
শিউরে এ বুক উঠতে কেঁপে
করতে রিনিরিনি।
আমি চিনি,
তােমায় চিনি।
আসবে যখন আশিন শেষে
লুটিয়ে তখন পড়বাে হেসে,
শুবাে তােমার কঙ্কণেরি
মধুর কিনি কিনি ;
আমি চিনি
তােমায় চিনি।
১৩

সন্ধ্যা
আলাের রেখা মিলিয়ে এলাে
অস্তাচলের কোলে ;
বন-করবীর গন্ধ-আতুর
বাতাস আকুল দোলে ।
১৪

অসীম বিপুল সুনীল আকাশ
সােণার পরশ মাখে,
অচেনা গা”র গাঙের ধারে
সবুজ বনেব ফাকে।
আজ বঁধুয়া বিয়ের কনে
গলায় যুথীর হার
বলল চুপে এই নিরালায়
একলা চমৎকার।
আতা-রাঙা পা দুটি তার
সােণার কমল ঝলে,
উড়িয়ে দেছে আঁচল খানি
নীল আকাশের তলে।
টিপ পরেছে, সিদুর দেছে
ঝাপটা ঝালর খুলে ;
এলিয়ে গেছে ওই কালাে চুল
কখন মনের ভুলে।
সন্ধ্যা-রাণী পাতলাে আসন
আবছা আঁধার মাঝে
ঘরে ঘরে জ্বললাে প্রদীপ
সন্ধ্যারতি বাজে।
১৫

প্রবাসীর দুঃখ
চলে গেছ তুমি সুদূর প্রবাসে
স্মৃতিখানি পিছে ফেলিয়া,
শূন্য দেউলে বসে থাকি শুধু
সজল নয়ন মেলিয়া।
দিকে দিকে চাহি কত কাল রব,
এ বিরহ ভার কত বল স’ব।
বিফল জীবন যাপিব কি শুধু
মরীচিকা সাথে খেলিয়া

ছায়া
দিনের আলোেক ম্লান হয়ে আসে
সুদূরের পথে চাহিয়া,
আসে স্নানতর নিরাশা আঁধার
সে সুদূর পথ বাহিয়া।
নিশার তিমির দিবসে ভুলায়,
পাখী ফিরে চলে নীরবে কুলায় ;
উতলা সমীর বহে বনানীর
আৰ্ত্ত বেদন গাহিয়া ।
আকাশে আকাশে তারকার ছলে
তােমারি লিপি কি জ্বলিল ?
যে-কথা তােমারে শুধাইতে চাই
সে-কথা কি তারা বলিল ।
সমীরণ মাঝে শুনি কি তােমার,
গুঞ্জন-গীতি বিরহ ব্যথার,
অভিমান তব দূর
তটিনীর
কল্লোলে কল-কলিল ॥
১৭
০

দিনের শেষ
আকাশ আজ দিনের শেষে
বাউল সেজেছে,
পরাণ মাঝে উতল বাশী
আপনি বেজেছে।
আজকে দেখি পাগল বেশে
গেরুয়াখানি উড়িয়ে হেসে
নীলাকাশের অসীম শেষে,
এলিয়ে পড়েছে।
১

পরিচয়
সখা,
আমি,
আজি
নিভৃত মাধবী-কুঞ্জে
আধফোটা বনফুল,
অরুণ আলােক পুঞ্জে
দুলি যে দোদুল দুল,
আমি আধফোটা বনফুল।
দেখ,

ছায়া আজি ওই আমি প্রভাত পাখীর ডাকে, বন-বীথিকার ফাঁকে, নয়ন মেলিয়া দেখি শিহরিয়া বলি, একি । ওগো আহা হারায়ে মনের কুল, আমি আধফোটা বনফুল। আমি সাবের বাতাসে ফুটি ঘাসের বনেতে লুটি, অলস নয়ন ঢাকি রঙীন আখর আঁকি, এলায়ে নিবিড় চুল, আমি আধফোটা বনফুল মম সখা তুমি গভীর নিশীথে এসাে, আমারেই ভালবেসে ; যতনে তুলিয়া বুকে, ঘুমায়ে মনের সুখে ক’রনাক যেন ভুল, আমি আধফোটা বনফুল। থেক’ আহা २०

গড়াই
গড়াই নদীর তীরে
পদ্মা যেথায় চকিতে চাহিয়া বাঁকিয়া গিয়াছে ফিরে,
ওই পারে চর, এই পারে চর, চারিদিকে ধূ ধূ বালি-
তারি মাঝখানে ছলছল জল, গড়াই চলেছে খালি।
যুগ যুগ ধরি’ একটানা চলে কোনাে দিকে নাহি চায়,
যত উঠে ঢেউ, কূলে আছাড়িয়া ভেঙে যায় নিরুপায় ।
মাস মাস আর বরষ বরষ, দিবস রজনী ধরি’
লুটিয়া টুটিয়া ছড়াইয়া হাসি গলে গলে যায় করি।
বাঁধ ভেঙে যেতে চায়,
দীরঘ দিনের বিরহ-বেদনা বুক ভরে নিয়ে যায়।
আহা রে। গড়াই কোথা ছুটে যাও আঁকা বাঁকা পথ ধরি’
নিত্য কালের মায়াবিনী সাথে মায়ার আখর পরি’?
মায়াবিনী নদী, তােমারে ছুইয়া বসে আছি আমি একা,
অচেনার মাঝে চেনা মুখখানি—যদি পাই তার দেখা।

ছায়া
প্রভাত হইল ওই,
ও-পার হইতে খেয়া দিয়ে তুমি আসিলে কি হেথা সই ?
পূবালী মেঘের রঙ মাখি ঠোটে, সােনালি ছবিটি আঁকি,
ওগাে মায়াবিনী, কেন এলে তুমি বনের গন্ধ মাখি’ ?
আমি তাে তােমারে ডাকি নাই দেবী, সােনার বালুর চরে,
মেঘটাকা মুখে সােনা ঝরে পড়া শুধু দেখিবার তরে।
বড় ব্যথা পেয়ে আসিয়াছি হেথা লুকাতে আঁধারে মুখ,
নির্মম হয়ে দুই পায়ে দলে ভেঙে দিয়ে গেলে বুক !
এমনি করিয়া ভেঙেছিলে তুমি কিশােরের খেলাঘর,
বুক হতে মাের ছিনাইয়া নিয়া করিয়াছ তারে পর।
আজি মনে পড়ে পুরাতন কথা, নিষ্ঠুর আচরণ,
তীব্র তাহার বিষের জ্বালায় পুড়িতেছি অনুখন !
তুমি চলে যাও দূর হতে দূরে ওই অসীমের পারে,
এই চরে আমি লুকাইব মুখ নিবিড় অন্ধকারে।
আলােকের দেখা পেয়ে,
গ্রাম ছেড়ে ওই আসিতেছে লােক পেঁয়াে পথখানি বেয়ে।
ভােরের বাতাসে পুলকে নাহিয়া কুহরিয়া উঠে পাখী,
ডাল হতে ডালে উড়িয়া বেড়ায় রূপালী মেঘেরে ডাকি।
খেয়াঘাটে দেখি মাঝি খেয়া দেয় পারের যাত্রী লয়ে,
ব্যাপারীরা দূরে পাল তুলে যায় পাটের নৌকা বয়ে।
কেহ দেখি ব’সে জাল বুনিতেছে গড়াই নদীর ঘাটে,
কেহবা কিনারে বাঁশুই দিতেছে গরু-দাবড়ের মাঠে।
কেহ দেখি ব'সে বেড়ার গায়েতে আঁটন-ছাটন বাঁধে,
কেহবা বসিয়া মৎস্য ধরিছে দোয়াড় লইয়া কাঁধে।
২২

ছায়া
রাখাল ছেলেরা একে একে জুটে বুড়াে অশথের তলে,
গরুগুলাে সেথা ছেড়ে দিয়ে সবে সাঁতারিতে যায় জলে।
দলে দলে তারা ভাসাইয়া ভেলা হইতেছে নদী পার,
আমি শুধু আজ নিরালায় বসে ঢেউগুলি গণি তার।
ওগাে গরবিণী, যদি এলে কাছে মেঘের কুহেলি ছিড়ে
নিয়ে যাও তবে আমারি রচা এ বেদনার গানটিরে।
বনলক্ষীরে মাের কথা বলে ক’র তুমি নিবেদন,
নিয়তির ডােরে আছি দোহে বাঁধা একটি তনু ও মন।
একবার ফিরে চাও,
আমার বুকের বেদনার বােঝ কিছু তুলি নিয়ে যাও।
কহিও তাহারে-“বড় ব্যথা পেয়ে বসে আছে একা তীরে,
ভাটির জলেতে উজাইয়া গেলে দেখিতে পাইবে ফিরে।
বসে বসে শুধু ভাসাইছে ফুল সারাদিনমান ধরি',
তােমার স্মৃতিটি বক্ষে লইয়া তােমারি মুখটি স্মরি।
কতনা দীরঘ দিবস যামিনী সে ফুল পাবার তরে
বালকের মত কাঁদিয়া কাঁদিয়া কূলে আছাড়িয়া পড়ে।”
কহিও তাহারে,-“সেখানে যাইয়া যদি দেখা নাহি পাও,
কিনারে কিনারে পদ্মার বাঁকে বাহিও তােমার নাও।
দেখিবে সেথায় সে বসিয়া আছে সােনার বালুর চরে,
আমনা কভু, অপলকে কভু, আশার হালটি ধরে।”
বুঝাইয়া তুমি বলিও তাহারে—“অপরাধ নাহি পায়,
মরণের আগে একবার যেন দেখা দিয়ে মােরে যায়।”
সে যে কভু মাের নিদয়া হবে না জানি আমি তাহা জানি,
শত অপরাধ ক্ষমিয়া আমারে বক্ষে লইবে টানি।

ছায়া
আমি শুধু জানি তােমার কবিরে ভাল যদি বেসে থাক,
মাের দেওয়া যত ফুলগুলি তবে আঁচলে বাঁধিয়া রাখ।
এ-ফুলের বাস বরষ বরষ হইবে না কভু বাসি,
সৌরভ তার বিলাইবে তুমি নিত্য নিয়ত আসি।
গড়াই নদীর ঘাটে,
এমনি করিয়া বসিয়া বসিয়া দীরঘ দিবস কাটে
ধূসর সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আসে শ্যামল বনের ছায়ে,
মঙ্গল দীপ, মঙ্গল শাখ মুখরিত হয় গাঁয়ে।
ওপার হইতে উড়ে উড়ে আসে শ্বেত বলাকার ঝাঁক,
গাঙশালিকেরা এ পার হইতে খেয়া দেয় লাখে লাখ।
আকাশ-বাতাসে খেয়া দেয় পাখী, নীচে খেয়া দেয় মাঝি,
হালখানি ধরে, মিহি সুরে গায়, ভাটিয়াল সুর ভাঁজি।
মহিষের পাল পাতারিয়া যায় নদীর অপর চরে,
গাঁয়ের বধূরা দলে দলে আসে সন্ধ্যা-স্নানের তরে।
এ-ঘাট ও-ঘাট সে-ঘাট করিয়া কলসী রাখিয়া তীরে
এক এক করে নামিল সকলে গড়াই নদীর নীরে।
কেহ মাথা ঘসে, কেহ চুল ঝাড়ে, কণ্ঠ ডুবায়ে জলে,
কেহবা সলিলে ঝাঁপাইয়া পড়ে, ভেসে থাকে কুতূহলে
কেহ চরে বসে বাসন মাজিছে—খোল মাখিতেছে গায়,
কেহবা বসিয়া উপলখণ্ডে ঝামা ঘসে দুটি পায়।
কুমারী মেয়েরা জল ছিটাইয়া হেসে হয় কুটি কুটি,
অমনি তাদের সােনামুখ হতে লাবণি পড়িছে টুটি।
নদীর কিনারে শত শত যেন ফুটিল কমলফুল,
মনে হেন লয় ভ্রমর হইয়া পাঁপড়িতে খাই দুল।
২৪

স্নান শেষ করে একে একে সব উঠিল বালুর চরে,
ভিজা চুলগুলি আলগােছে বেঁধে কলসী লইল ভরে।
লাজে নােয়াইয়া তনুলতাখানি ভিজা আবরণে ঢাকি
চলে যায় তারা বালুর চরেতে মায়ার আখর আঁকি।
চরণে নূপুর বাজে রুনুঝুনু, বাজিল তােড়ল মল,
অমনি তখন কলসী হইতে সােহাগে পড়িল জল।
বুনাে লতাগুলি বুঝি মায়াবশে পায়ে জড়াইয়া ধরে,
বিনাইয়া কহে,—“ওগাে বনদেবী, যেওনা গায়ের ঘরে ;-
তুমি এস সই, গেঁথে দিব মালা, কৃষ্ণচূড়াটি চুলে,
ওই দুটি পায়ে জড়াইয়া রব যুগ যুগ ধরি’ ভুলে।”
দূর-বন-ছায়ে সন্ধ্যা নামিছে, আকাশে তারকা ভাসে
মাথার উপরে দ্বিতীয়ার চঁাদ উলসিয়া মৃদু হাসে-
ওই হাসি মাঝে কত খুজিলাম পুরাতন চেনা মুখ,
নিরাশায় শুধু দগ্ধ হইয়া পাইলাম বড় দুখ।
দেখা যদি পাইতাম,
কোমল তাহার হাত দুটি ধরে কত কথা বলিতাম।
বলিতাম, “তুমি স্বর্ণলতা গাে, তুমি দেবী, তুমি মণি,
তােমারে হারায়ে ঘুরে ঘুরে মরি মণিহারা আমি ফণী।
তুমি এস সই, আর কতকাল আমারে ছাড়িয়া রবে,
শিয়রে প্রদীপ নিভিয়া আসিছে তুমি জ্বেলে দাও তবে।
এই পথ ধরি সহজেই এস, কোন কিছু নাহি ভয়,
আষাঢ়ের দিনে বাঁধ ভেঙে যায়—জ্যৈষ্ঠের দিনে নয়।
তুমি শুধু জান, আমি শুধু জানি, আর জানেনাকো কেউ,
কোন গাঙে আজ উঠিয়াছে ঝড়, কোন গাঙে ভাঙে ঢেউ।”
৪

ওরে মাঝি চেয়ে দেখ
(গান)
ওরে মাঝি চেয়ে দেখ
‘ওড়া’ বনে,
কালাে কালাে মেঘগুলাে
জমে কোণে।
চারিদিকে উচ্ছল,
জল করে ছল ছল,
বাতাস প্রবল হলাে
বনে বনে।
২৬

ছায়া
মাঝখানে বড় গাঙ,
দিয়ে আড়ি-
বেয়ে চলল বেয়ে চলাে
তাড়াতাড়ি ;
পাড়নেতে জল আসে
বাওড়েতে নাও ভাসে
মােরা সবে মরি ত্রাসে
মনে মনে।
মাঝি ভাই, দাড়ি ভাই,
দেরে পাড়ি,
বহুদূরে যেতে হবে
গাঙ ছাড়ি।
কলাগাছি সালখেয়া
খেড়শার বাঁক দিয়া
এই বেলা মারাে খেয়া
ভরা গােণে।
২৭

বর্ষা
আকাশের কোলে বরজ হানিছে
কঁপিছে সঘনে হিয়া
শাঙন-ধারার পুলক পরশে
উলসি উঠিছে প্রিয়া।
দাদুরী ডাকিছে পুকুরের পাড়ে,
ঝিঝির ঝাঁঝর বনের ওধারে,
জোনাকী-প্রদীপ পল্লব আড়ে
উঠিতেছে চমকিয়া ;
আকাশের কোলে বরজ হানিছে
কঁপিছে সঘনে হিয়া ।
২৮

ছায়া
খেজুর পাতার মাথালটি পরি’
কৃষাণ মেয়েরা কার মুখ স্মরি’
আঙিনার বুক ঝলমল করি’
দাড়াইল থমকিয়া
আকাশের কোলে বরজ হানিছে
কঁপিছে সঘনে হিয়া।
;
বকুল মালতী বাদলের জলে,
টুপটাপ ঝরে বনবীথি তলে,
ঘাসে ঘাসে তারা চুপি চুপি বলে ;--
আসিতেছে শাঙনিয়া
আকাশের কোলে বরজ হানিছে
কাঁপিছে সঘনে হিয়া।
;
বেতসের বনে পড়ে গেলাে সাড়া,
কদম কেতকী করিছে ইসারা—
আমারে কে যেন দেয় ঘন নাড়া,
বাহুদু’টি পসারিয়া ;
আকাশের কোলে বরজ হানিছে
কঁপিছে সঘনে হিয়া।
চারিদিক হেরি ঘন মসী কালাে,
কে মােরে শুধায়, ঘরে দীপ জ্বালাে,
এ-ঘাের বাদল লাগে কিনা ভালাে
কহিতেছে ফুকারিয়া ;
আকাশের কোলে বরজ হানিছে
কঁপিছে সঘনে হিয়া।

খেয়ালী
(গান)
ওরে ও খেয়ালী ।
তাের খেয়া ঘাটের খেয়াল তরী
কোথায় ভিড়ালি ?
আকাশ ভরে পাল তুলে দাও,
তীর বেগে আজ ছুটুক রে নাও;
ওরে, মন-মাঝি তাের বুকের মাঝে
জ্বলুক দীপালী।
ও খেয়ালী ।
দেয়া ডাকে গুরু গুরু,
কাপে হিয়া দুরু দুরু,
আজ, আকাশ ভুবন ছেয়ে ফেলুক,
বাজুক ভূপালী ।
ও খেয়ালী !
কে জ্বালিছে সন্ধ্যা-প্রদীপ
কেয়া বনের ধারে,
গােধূলির ওই রাঙা-রেখা
সিথির সীমার পারে,
আমায় পথ ভুলায় রে !
আমার মন ভুলায় রে!
আজ, পথের মাঝে কে বিছালাে
রঙীন আঁচলি ।
ও খেয়ালী ।

জয়
আজকে আমার জয়
ওরে আজকে আমার জয়।
বিজয়ীরে জয় করেছি
নাই রে এবার ভয়।
পথের বাধা কাটিয়ে দিয়ে,
ধূলার কুসুম কুড়িয়ে নিয়ে,
রাখবাে তারে বক্ষে ধরে
কিসের সংশয় !
"আজকে আমার জয়।
দৈবে যদি সে-ফুল আমার
ছিটকে পথে পড়ে,
পথ-চলা ওই পথিক দলের
চরণ-ঘাতে মরে ;
মরুকু সে ফুল তায়-
ক’ব না হায় হায় !
গন্ধটুকু থাকবে বুকে
স্নিগ্ধ মধুময় :
সেইখানে মাের জয় ।

রূপসী
ওরে ও রূপসী ।
রূপ সায়রে বাইবাে তরী
বৈঠা নিয়ে বসি।
চিকমিকিয়ে উঠবে জল
চলবে যখন তরী,
দুই কূলেতে ভাঙবে ঢেউ
ছলাৎ ছলাৎ করি’
মাটি পড়বে তখন খসি !
বর্ষা যখন অসূবে নেমে
এলিয়ে দিয়ে চুল ;
ঝিমিলিয়ে পড়বে খসে
খোঁপার কদম ফুল
ব’সে দেখব মুখশশী ।
১২

বিরহী
ওগো বিরহ-বিধুর পাখী,
কুহরিছ থাকি থাকি,
ওই পাতার আড়াল থেকে
কি যে কহিছ আমারে ডাকি
কভু
অশথ বটের ছায়ে
ডাক প্রভাত সাঁঝের বায়ে ;
এই শ্যামল স্নিগ্ধ গাঁয়ে
কোন্ বনের গন্ধ মাখি।
তুমি ফাগুনের মাঝে এসে
কেন যাও বরষার শেষে
কোন সুদূর অজানা দেশে
মরি মরম-বিদারী কি।
আজি গােধূলির রাঙা-রাগে
মোর পরাণ কি যেন মাগে ;
বুঝি মিলনের অনুরাগে
মম আঁখি দুটি আসে ঢাকি
আজি অন্তরে থাকি থাকি’
আমি তােমারে নিয়ত ডাকি,
সেই স্মৃতির আখর টানি
আহা প্রিয়ার ছবিটি আঁকি

ধবংস জাগিছে রুদ্রবীর, উদ্ধে তুলিয়া শির, বক্ষে ধরিত্রীর। ঝক্ষা অশনি পাতে, নিবিড় তামসী রাতে উড়িছে রক্তচীর- বক্ষে ধরিত্রীর। হের, রক্তবৃষ্টি। ধ্বংস হ’লাে সৃষ্টি চরণে ভৈরবীর- বক্ষে ধরিত্রীর। ৩৪

উদ্বেগ
(গান)
মাঝি বাইরে
ওই কিনার পাইনে লইয়ে চলো
পাড়ি মাইরে।
হিসনে সাড়া শকত কইরে,
গােলই মুড়ি কইসে ধইরে,
হেঁইয়া-হেঁইয়া-হেঁইয়া বলে
যাও ভাইরে।
দ্যা আজি বিরূপ হইল,
কড়র কড়র কি যে কইল,
চিক্ চিক্যাইয়ে চোখ রাঙ্গায়
দেখি তাইরে।
সামাল সামাল সামাল ভাই,
ঝুল দিয়ে নাও কক্ বােঝাই,
কিনার কিনার বাইয়ে চল
গুণ মাইরে।
ওই,

ছায়া
কাজল গড়ায় ওড়ার বনে,
চাইতক রবায় ঘনে ঘনে,
তু তুরাইয়ে ডাহুক নাচে
তাই-নাইরে।
নাঙলা বিলের আলের শেষে,
সরালের ঝকি যায়রে ভেসে;
চিতল কাতল উলটে পালটে
মারে ঘাইরে।
আষাঢ় ম্যাচে বাদল আইল,
আমারে আজ কি দুখ পাইল
সে কার লাগি কাইন্দা মরি
ভাবি তাইরে।
সব জে ধানের ক্ষেতের বাদে,
আমার পরাণ ওই না,—হাদে
চলে মাথালটি মাথায় দিয়ে
গাঁও ছাইড়ে।
চল, বাইয়ে নাও তাড়াতাড়ি
বিলম্বে মুখ হইবে হাঁড়ি
আথাল বিথাল ক’ছে জানি
মরি যাইরে।

সন্ধানে
কোথায় সে গ্রামখানি
কত সে দূরে ?
সন্ধান নাহি পাই
মরি যে ঘুরে।
ফিরিতেছি অবিরত
মাঠ ঘাট শত শত
চরণ কঁাটায় ক্ষত
রুধির ঝুরে ;
কোথায় সে গ্রামখানি
কত সে দূরে ?
৭

ছায়া
কোন্ পথে যাবাে আমি
বলে দে মােরে,
কে আছে সমুখে এসাে
আলোেক ধরে ;
আঁধার নামিছে ধীরে
ঘন বন তরুশিরে
ক্ষেতের কোটি ভিড়ে
পড়িছে ঝরে ;
কোন পথে যাবাে আমি
বলে দে মােরে।
পাগল বাতাস দেখি
চলেছে বেগে।
কে যেন পিঠেতে তার
মেরেছে রেগে ;
শোঁ-শোঁ-শোঁ বােলে
তালের বাগুড়া ঝােলে
মাছরাঙা তারি কোলে
বসিয়া জেগে ;
পাগল বাতাস দেখি
চলছে বেগে।

ছায়া
সহসা কাজল মেঘ
আকাশে ওঠে,
‘শাপলা’-মেয়েরা দেখি
জলেতে ফোটে ;
টুপ টাপ টুপ করে
চারিদিকে ফুল ঝরে
কতশত রঙ ধরে
ঘাসেতে লােটে।
সহসা কাজল মেঘ
আকাশে ওঠে।
উত্তরে দেয়া ডাকে
চিকুর ঝলে,
ক্ষেত খােলা ভেসে গেলাে
আষাঢ় জলে;
ঝন্‌ ঝন ঝন ঝন
কড় কড় বরিষণ
রননি ঘন ঘন
কি যেন বলে ।
উত্তরে ডাকে দেয়া
চিকুর ঝলে।

ছায়া
আশ মানি রঙ-করা
শাড়িটি পরে
বাথানের খুঁটিখানি
আঁকড়ি ধরে
কে গাে তুমি বনলতা
বাউরী বাতাসে হােথা
অকারণে পাও ব্যথা
কাহার তরে ?
আশ মানি রঙ-করা
শাড়িটি পরে।
আমার নয়ন পথে
যদি বা এলে
এমনি করিয়া তবে
যেওনা ফেলে,
থুয়ে গেনু গাথাখানি
অবসর মত আনি
নিরলে পড়িও রাণী
চলিয়া গেলে ;
আমার নয়ন পথে
যদি গাে এলে
৪

ছায়া
প্রাত্তর পার হয়ে,
বিরলে এসে
পুলকে ভরিয়া বুক
ভালাে সে বেশে,
দেবদারু বীথি তলে,
হেলাভরে কুতূহলে
আঁখি দু’টি ছলছলে
দাড়ানু শেষে,
ভেবেছিনু তুলে লবে
নীরবে হেসে ;
প্রান্তর পার হয়ে,
বিরলে এসে।
চলে গেনু নতশিরে—
ভাঙিল মেলা
;
পার হয়ে ক্ষেত খােলা
সাঁঝের বেলা।
আঁকা বাঁকা পথ দিয়ে
এ-গাঁও সে-গাঁও গিয়ে
অবশেষে ফিরি নিয়ে
কি অবহেলা।
চলে গেনু নতশিরে
ভাঙিল খেলা।
আঁধার নামিল ধীরে
বিজন বেলা ।
৪১

ধানের ক্ষেতে
সবুজ ধানের ঢেউ খেলে যায়
শিমুলতলীর ক্ষেতে,
পরাণ আমার মাতাল হয়ে
উঠল যে আজ মেতে ;
শিমুলতলীর ক্ষেতে।
একলা বসে মাঠের ধারে,
তালীবনের অপর পারে,
যেখান দিয়ে মেঘের জটা
লুটিয়ে পড়ে যেতে ;
আমার সবুজ ক্ষেতে।
মেঘের সাথে স্বপন-প্রিয়া
রাঙিয়ে দিয়ে সাঝের হিয়া
ব’ছে আমায় চুপে চুপে
আবাে গহন রেতে;
-আমার ধানের ক্ষেতে।
৪২

বনফুল
আমি বনফুল, বন-বিলাসিনী কোমল করুণ প্রাণ,
কেমন করিয়া সহিব সজনী, মানুষের আঘ্রাণ?
তাদের নিশাস অহিবিষে ভরা লাগে যদি মম দেহে
অরুণ অধর পাণ্ডুর হবে উদাস বিষাদে ছেয়ে।
নিষ্ঠুর তারা রঙীন নেশায় আমারে বেড়িয়া রয়
রঙ না ধরিতে নির্মম করে সকলি লুটিয়া লয়।
মাের-দেওয়া যত সৌরভ নিয়ে পুলকে ভরিয়া বুক,
মাধুরী নিঙাড়ি আন্-ফুলে যায় নূতনের অভিমুখ।
মাঝে মাঝে মােরে সম্মুখে থােয়, ভুলায় কত না জন,
পূর্ণ না হতে দেবপূজা করে পুণ্যের বিনাশন।
আমি আছি ভালাে পল্লব আড়ে, পান্থের মনােলােভা,
ইট-পাথরের প্রাসাদ-পুরীতে বাড়েনা ক’ মাের শােভা
৪৩

বাসন্তী
নীল নভতলে
নীল শাড়ি পরি’
নাচিতেছে দিগবালিকা,
রম্ভা, মেনকা, উর্বশী, রতি
গাঁথিছে কুসুম-মালিকা।
৪৪

উন্মনা ধায়
নব অভিসারে
উত্তর হতে দক্ষিণ দ্বারে ;
কুঙ্কুম চুয়া চন্দন ভারে
সাজায় অর্ঘ্য-থালিকা।
নাচিতেছে দিগবালিকা
ফান্ধনী-রথ ছুটিয়াছে বেগে,
বিপুল হর্ষ ভরে,
ঝঙ্কারি’ ওঠে মূচ্ছিত প্রাণ
নূতন চেতনা তরে।
এ কি মায়া তব
ওরে অভিনব,
স্বর্গের দান উজাড়িয়া সব
ধরণীরে বাসি ভালাে-
দুর্জয় শীতে দুই পায় দলি’
মহা উৎসবে দুৰ্দমে ছলি
পথে পথে মেলি’
—
হেম অঞ্জলি
সুরভির সুধা ঢালো,-
–নির্বাণ দীপ জ্বালাে।
৪৫

মানসী
চঁদিনী রাতে
আঁখির পাতে
এস গাে সজনী,
সাজাব তােরে
পরাণ ভরে
আজিকে রজনী।
ফুলের মালা
ফুলের বালা
পরাব প্রেয়সী,
মালতী মতি
নেহালী রতি
যুথিকা অতসী।
এবন মূলে
শিরীষ ফুলে
বাঁধি-ও গরবী,
নিবিড় কেশে
পরিও শেষে
কানন-করবী।
কাটাব রাতি
পুলকে মাতি
আমরা দুজনে,
জাগিব ভােরে
আলস ঘােরে
পাখীর কূজনে।

পতাকা
আজিকে এ শুভ মধুর লগনে,
বিজয়-পতাকা উড়িছে গগনে,
নিদ্রিত পুরী জাগিছে সঘনে
অলস নয়ন মেলিয়া।
ঘরে ঘরে ওই ধ্বনিছে শঙ্খ,
ঘন ঘন বাজে বিজয় ডঙ্ক,
ললাটের যত চির-কলঙ্ক,
আজি মুছিতেছে ফেলিয়া।
পাণ্ডু-সুতের বিজয় বাহিনী
উর্ধে তুলিছে গাণ্ডীবখানি
কুরুক্ষেত্রে পুণ্য কাহিনী
প্রাণে প্রাণে ওঠে খেলিয়া।
৪৭

নটরাজ আনন্দ আজ ধরার বুকে উঠলাে জেগে ওই কেমন করে বদ্ধ-কারায় আমরা আজি রই ? বাজরে বিষাণ বাজ- আসছে নটরাজ ত্রিশূলখানি হাতে নিয়ে নাচছে তাতা-থই। পাগলা ছেলে খেয়াল বশে খেলায় বুকে সাপ নন্দী ভৃঙ্গী বেতাল তাল মাছে কঁাটায় ঝাপ। বাজরে বিষাণ বাজ আসছে নটরাজ রক্ত-নিশান উড়িয়ে দেরে সিদ্ধি হলাে সাফ। ৪

মাঠিয়াল
( গান )
আজকে শুধু হেথায় বসে
গাইব মাঠের গান,
ও ভাই চাষী বঙ্গবাসী,
শােন ওরে কৃষাণ!
তােরা মােদের আশার আশা
তােরাই মােদের প্রাণ
তােরা মােদের দেহের বল যে
তােরাই জাতির জান।
ভুবন জুড়ে ধানের ক্ষেতে
চষি জমিন দিনে রেতে,
মাথার ঘাম যে পায়ে ফেলে
তােরাই বুনিস ধান।
আমরা শুধু ফসল খেয়ে
আহলাদে আটখান।
আমরা বড়, তােমরা কুটো,
সাচ্চা কথা বলছি দু'টো
জগন্নাথের দোহাই দিয়ে
গুড়ােই হাড় ক’খান
আর জুড়ী-মােটর হাকাই বসে
বানাই সােনার থান।
৪৯

ভিন্ গা’র চাষী
( গান )
ও ভিন্ গাঁয়ের চাষী--
ফসল কাটার সময় হলাে
চল, কাস্তে নিয়ে আসি।
মাঠের ফসল বােঝাই করে,
নিয়ে চল্ ভাই আপন ঘরে,
ওরে, কেড়ে নিয়ে যাবে রে সব
কবে সর্বগ্রাসী।
চেয়ে দেখ তাের গায়ের ঘর,
চালের বার্তায় নেইকো খড়,
হায়, রুয়াে, সলা, খসলাে চিপে
হাতনে গেলাে ফাঁসি
তাের গৃহলক্ষী শূন্য হাতে,
সােনার পরশ নেইকো তাতে,
এই সােনা দেশের সােনা গেছে
লবণ-জলে ভাসি।
চক্ষু মেলে দেখরে এবার
নেইকো ঘরে কিছুই দেবার
আছে শুধু বুকের কঁাদন
দুঃখ দৈন্যরাশি।

বালুচর
সােনার বালুর চর
কিনারে তােমার সুন্দর করে বাঁধিব পাতার ঘর।
ছনের ছাউনি, পাট-খড়ি-বেড়া, খেজুরছড়ির পাটি,
থাম খুঁটি দিয়া ভালকো বাঁশের নিরমিয়া পরিপাটি,
তারি চারিধারে বুনিয়া বুনিয়া ঘােট ঘােট ঝাউ-চার,
স্নিগ্ধ তাহার শ্যামল ছায়ায় ঘূরিব পাগল পারা।
যে বাঁশরী কবি হারাইয়া চরে ফিরে নাই আর গাঁয়ে,
সে বাঁশরী আমি কুড়াইয়া এনে বাজাব সাঁঝের বায়ে।
তারি সাথে সাথে কচি ঝাউ-চারা কাপিয়া উঠিবে দুলি’
কিশােরী মেয়েরা পথ হারাইয়া আসিবে ও-পথে ভুলি।
গায়ের গােধন আবার চরিবে সােনার বালুর চরে,
গােখর ধূলায় রাঙাইয়া পথ ফিরিবে গাঁয়ের ঘরে।
গােধূলির রাঙা রক্তিম-রাগে কৃষ্ণচূড়ার তলে,
সন্ধ্যা যখন ধীরে ধীরে এসে নমিয়া পড়িবে ঢলে ;-
ম্লান হয়ে যাবে ভাটিফুলগুলাে আঙিনার মাঝে যত,
রক্তকরবী লাজে নত হবে বিয়ের কনের মত,
ডালিমের ফুল ধূলায় লুটিয়া কেঁদে যাবে গড়াগড়ি,
স্নেহাবেশে তারে বুকে তুলে লবে বুনােল শতরী,
তারি মাঝে আমি বালকের মত কুড়াইব নানা ফুল,
প্রিয়ার লাগিয়া কত না ভূষণ গড়িব সে নির্ভুল।
বিনি সুতাে দিয়ে সুন্দর করে তিলফুলে গাঁথি মালা,
পঞ্চ-খোঁপায় পরাইয়া দিব আসিলে সে বনবালা।
বিনায়ে বিয়ে কতনা ছন্দে গাঁথিয়া চন্দ্রহার,
পিরীতির রসে ভিজাইয়া আনি’ তুলে দিব গলে তার।

ছায়া
বনফুল দিয়ে সাজাইব তারে যত কিছু মনে আছে,
বাঁশীটি এনে বাজাইব আমি সদা থাকি’ কাছে কাছে।
বড় ব্যথা পেয়ে তাই আসিয়াছি ফুল কুড়াইতে গাঁয়ে,
জুড়াইতে আহা তনু মনপ্রাণ কৃষ্ণচূড়ার ছায়ে ।
কোথা বিরহিণী সই,
আজি দেখে যাও বালুর চরেতে জল করে থই থই।
আষাঢ়ের জল আকুলি’ ব্যাকুলি’ দু’কূল প্লাবিয়া যায়
ঢেউগুলাে ভেঙে বিদরিয়া বাঁধ উপছিয়া উগরায়।
তারি সাথে সাথে ঝিনায়ের ফুল ভেসে আসে তীরে কত,
কদম-কেশর রজনীগন্ধা চম্পক শত শত।
আথালিয়া আমি সে ফুল তুলিতে হাতে বিঁধে গেল কাটা,
সেই ক্ষতখানি আজো শুকাল না এখনাে রয়েছে ঘা-টা।
জানিতাম যদি ওই ফুলগুলাে ঘেরা আছে কাঁটা দিয়ে,
কণ্টকগুলি নিৰ্ম্মল করি’ ফুল লইতাম গিয়ে।
কাহার খোপার ফুল সে যে ওগাে এমনি করিয়া হায়,
কূলেতে আসিয়া কূল না পাইয়া ভেসে যায় নিরুপায় ।
এ-দশা দেখিয়া ঝাউচারা গুলাে কেঁদে ভিজাইছে মাটি,
পাতা দোলাইয়া বেদনা জানায় মুখেতে নাহিকো “রা”-টি।
কলার বাগুরা আথালি বিহালি ঝি ঝির, করি’ দুলে,-
বনের পাখীরা সম-বেদনায় গান গেল সব ভুলে।
চকাচখী বক ডাহুক ডাহুকী সারস সারসী জলে,
সারি শুক শ্যামা দোয়েল কোয়েল কপোত কপােতী থলে ;
ডানার ভিতর মুখ লুকাইল—নির্বাক নিশ্চপ
কার ব্যথা গিয়ে বাজে কার বুকে—অদ্ভুত অপরূপ ।

शा
পাগল বাতাস উন্মনা হয়ে বারতা পাঠাল বনে,
গুরু গম্ভীরে আষাঢ় আসিল বাদলের বরিষণে ।
আবরিল সারা পথ,
অশােক নেহালী রঙ্গন মতি শ্বেত-জবা কত শত ;
বকুল মালতী কদম্ব কেয়া এ-ওর পানেতে চেয়ে,
তারাও আজিকে লুটাইছে পথে বরষার গান গেয়ে ।
ফুলে ফুলে আহা গলাগলি করি' চুপি চুপি কথা বলে,-
মাের মনে লয় ও-ফুলের সাথে ভেসে যেতে চায় জলে!
জলের মেয়েরা মৃণালে শুইয়া জলের সে আঙিনায়,
ছােট ঘােট পথ খুঁজিয়া খুঁজিয়া চারিদিকে বাহিরায়।
অমনি তখন পানা-ফুল বলে,-“কেন কেঁদে মরি ঝুরে ?
আমরাও আজ ঘর-ছাড়া হব জলের বুকটি জুড়ে।
পঙ্কিল জলে আমরা ফুটি-গগা সেওলা হাবড় মেখে,
তবুও আমরা গন্ধ বিলাই তারি মাঝখানে থেকে।”
রক্ত-শাপলা বাহু পসারিয়া শ্বেত-শাপলারে কয়,
“আজি হতে তবে ফুলগুলাে সই, করিব না অপচয় ;
যেদিন আসিবে বাঁশরীর গানে বনের দুলালী মেয়ে,
সেদিন আমরা আবরিয়া দিব সারা তনুখানি ছেয়ে।”
এস প্রিয়তম, আর কতকাল থাকিবে এমনি দূরে,
বাদলের দিনে খুঁজিতেছি মােরা সারা গাঁওখানি ঢুড়ে।
তুমি এস সই, আলুলিয়া কেশ, আষাঢ়ের মেঘে আজ,
আমরা বেড়িয়া বিজলীর মত পরাব কুসুম সাজ।
আর কতকাল এমনি করিয়া নিশীথ নয়ন জলে।
পল্লব ছায়ে মুখ লুকাইয়া ঝরে ঝরে যাব গলে?

ছায়া
আর কতকাল পরিজন মাঝে ম্লান হাসিখানি ঢাকি,
এমন করিয়া আড়ালে আড়ালে কেমনে বলনা থাকি ?
তুমি এস সই, আমরা আজিকে দোহে দোহা পানে চেয়ে,
আপনি ফুটিব, আপনি টুটিব বাদলের জলে নেয়ে।
কোথা তুমি প্রিয়তম,
ওগাে প্রাণময়ী, ওগাে মধুময়ী সুন্দর অনুপম।
একবার এসে এ-ঘাের বাদলে রঙের কুহেলি মেলে
বাহিয়া তােমার সােনার নাওটি উজাইয়া অবহেলে ।
আর কতকাল আমারে ছাড়িয়া থাকিবে এমনি দূরে,
বাঁশরী আমার ডুকারি কঁদিছে মরম বিদারী সুরে।
আর কতকাল স্বপনের জালে তােমারে লইয়া ঘিরি,
এমনি করিয়া উধাও হইয়া বাউলের মত ফিরি ?
আজি দেখে যাও কত যে আরতি কত আরাধনা করি,
বালুর চরেতে বসিয়া বসিয়া বালুর প্রতিমা গড়ি।
কি করিব সখী, মন যে বোঝেনা, তাই ডাকি বারেবার
সম্মুখে থুয়ে পুষ্প-অর্ঘ্য সম্ভার উপচার ;
কস্তুরী-মৃগ-কুঙ্কুমরাগ চন্দন-চুয়া লয়ে,
ফিরিতেছি আমি চর হতে চরে মাথায় করিয়া ব’য়ে।
আমি জানি তুমি ফুল ভালবাস, তােমার ফুলের প্রাণ,
তাই গড়িয়াছি ফুল-আভরণ-পাতার কুটিরখান।
তুমি এসো সই, তােমারি অঙ্কে উজাড়িয়া সব ভার,
বসে বসে শুধু বাঁশরী বাজাই, চরণ করিয়া সার।
আজি উতরােল আষাঢ়ের বায়, দিন হল অবসান
তুলে লও তবে ফুল-সম্ভার হক সব সমাধান।

অভিসারে
তােমার মনের গােপন কথা বলবে না-ক’ আজ-ও সখি ?
পাষাণ ও-মন গলবে কিনা—অবাক চোখে তাইত লখি।
অরুণ ঊষার আলাের মত পরাণখানি রঙিয়ে দিয়ে,
আশার লতা লালন করে পালিয়ে বেড়াও ঝিমিলিয়ে,
অসীম আকাশ, উদার আলো-একলা বসে পথটি ঘিরে-
পাব কি সই, বিদায় দিতে হেলায়-পাওয়া অতিথিরে ?
নেশায়-রঙীন বিভােল হয়ে দেখব শুধু শাখির তলে,
পলক-হারা থির-বিজুরী, মৃণাল-শিরে কমল দলে।
শিশির-ভেজা সােনার আলাে ঝ’রবে যখন পলব বেয়ে,
শিউরে ও-বুক চমকে যাবে—হরষে চোখ মেলবে চেয়ে।
আলস ভরে কইবে কথা, কিশাের প্রাণের গােপন বাণী
মনের নিবিড় নাগাল পেয়ে বিলিয়ে দেবে হৃদয়খানি,
পুলক-ছোঁয়া গভীর সে-সুর বাজবে যখন প্রাণের তারে"
হয়ত ভুলে আসবে হেথায় আবার তুমি অভিসারে।

বােধন
=
হর হর হর রুদ্ৰ হাঁকিছে,
বার্তা আনিল পবনে,-
লাঞ্ছিতা সীতা জনক দুহিতা ;
হর্যে কপিল সঘনে।
দিকে দিকে ওই পড়িল ডঙ্কা,
সাজে রথ রথী অযুত সংখ্যা,
দগ্ধ করিতে কনক লঙ্কা
ফান্ধনী শুভ লগনে।
পাষাণে বাঁধিয়া সেতু অপূর্ব
চলে অগণ্য ধানুকী,
রণ-উন্মাদে গজ্জিছে যেন
উদ্যত-ফণা বাসুকী!
ছুটিল সৈন্য কাতারে কাতারে,
সিন্ধু-শৈলশিখরের পরে ;
রাক্ষস চমু দেখিয়া উহারে
চম্পট দিল না রুখি।

ছায়া
শ্রীরামচন্দ্র চলিছে অগ্রে
লক্ষণ সাথে চলিল,-
সুগ্রীব আর মারুতি জাম্বু
কল্লোলে কলকলিল।
রাঘবীয় রিপু প্রবেশিল গড়ে,
স্বর্ণলঙ্কা টলমল করে,
দ্বার ছাড়ি’ দ্বারী ধায় উভড়ে
তােরণ-স্তম্ভ টলিল।
হৈম-দেউল শীর্ষ হইতে
হেরিল চক্ষে রাবণী-
কাৰ্ম্মকধারী সম্মুখে দুই
অঙ্গে ঝরিছে লাবণি ।
পিপীড়ার মত তারি পিছে চলে,
হয় হাতী ঠাট কত দলে দলে,
অস্ত্রে অস্ত্রে ঝলি’ ঝলমলে
সৈকত কুল প্লাবনি’!
মণিময় সভা উজ্জ্বল করি’
রাঘবারি ছিল বসিয়া
পুত্রের মুখে বারতা পাইয়া
দণ্ড পড়িল খসিয়া।
হুঙ্কারি’ ডাকে, কুম্ভকর্ণ,
বৰ্ত্তল আঁখি, রক্তবর্ণ,
রক্ষা কর এ লঙ্কা স্বর্ণ
গেলাে বুঝি সব ধ্বসিয়া।
৫৭

ছায়া
মধুপানে রাজা মত্ত হইয়া,
চলিল সীতার স্মরণে,
ত্রিভুবনজয়ী নিকষানন্দ
সতীর লজ্জা-হরণে।
কহে, দুরন্ত রাক্ষসী চেড়ী,
নিৰ্ম্মম হয়ে গলে দিয়া বেড়ী,
জানকীরে হেথা নিয়ে এসাে ঘেরি
চুৰ্ণিত কর চরণে।
শত সহস্র বজ্ৰধারিণী
দুৰ্ম্ম খা চেড়ী ফুকারি-
কুন্তল ধরি ঘুর্ণিত করি,
মারিতে উঠিল কুঠারি।
শােকে নিমগ্ন ক্রন্দন করে,
আলুলিত কেশ, চীর সংবরে,
ওষ্ঠ চাপিয়া কাপে থর থরে
অন্তর ওঠে ডুকারি।
অস্ফুটস্বরে কহিল জানকী
দুঃখের কত কাহিনী
ওরে নৃশংস, ওরে পাপীয়সী
ধর্ষিছ কেন, ডাইনী ?
চেয়ে দেখ ওই উত্তর দ্বারে
সিন্ধু-শৈল শিখরের পারে,
আসিছে সৈন্য কাতারে কাতারে
শত সহস্র বাহিনী।

দুৰ্ম্মতি ওরে নিশাচর বলী,
খেলিস না লয়ে সর্প,
উৎপীড়কের অত্যাচারীর
লাঞ্ছিত হবে দর্প।
এই পাপে তুই হইবি ধ্বংস,
নিৰ্ম্মল হবে রক্ষ-বংশ,
আসিয়াছে সেই বীরাবতংশ;
ত্বরায় আমারে অপ।
নলকুবেরের অভিশাপ-বাণী
বিস্মৃত দেখি হয়েছ,
স্পর্শ করিতে এ হেম অঙ্গ
তাই চেড়ীদের কয়েছ।
পরের রাজ্য লুণ্ঠন করি’
পরের বনিতা অঙ্কেতে ধরি,
রাঘবেরে আজি বঞ্চিত করি
মৃত্যুরে বরি লয়েছ।
উত্তোলি অসি, দশানন কহে,
মােষ প্রদীপ্ত নয়ানে,
শ্রীরামচন্দ্র পড়িয়াছে রণে
মৃত্যুশয্যা শয়ানে।
কলম্বকুল উড়িছে আকাশে,
রথ রথী ঠাট ছুটিয়াছে ত্রাসে,
মায়াবী রাবণ হাসি-উচ্ছ্বাসে
ধরিল মায়া সে বয়ানে।

ছায়া
সম্মুখে ধরি পৌন্তেয়
রামের ছিন্ন মুণ্ড,
কহে, দেখ দূরে হর-কাৰ্ম্মক
কুণ্ডলযুত তুণ্ড!
আজি মহারণে মৈথিলীনাথ,
যুদ্ধ করেছে করি’ প্রাণপাত,
মত্ত হস্তী হইয়াছে কাৎ
উর্দ্ধে তুলিয়া শুণ্ড!
উত্তাল ফেন-তরঙ্গ সম
উচ্ছাসি ভুয়ে লুটিয়া
বিষ্ণুপ্রিয়া সে বিষ্ণুরে স্মরি
মুচ্ছিত হলাে টুটিয়া ;
রাক্ষসী যত চেড়ীগণ মিলি
চৌদিকে ঘিরে করে কিলিবিলি,-
মধুপানে যেন রত মুখশিলি,
রক্ত পদ্মে জুটিয়া।
ক্ষণকাল পরে উদ্ধত বােষে
কহিতে লাগিল জানকী,
আরে রে রক্ষঃ, পর-পদলেহী
অবিধবা সীতা জান কি ?
ভাবিয়াছ মনে অটিয়া ফন্দী,
জনকতারে করিয়া বন্দী,
পূর্ণ করিবে পাপাভিসন্ধি
ভৎসিয়া তারে পাতকী ?

রাজা হয়ে তুই চৌৰ্যেতে রত
পরের রাজ্য বনিতা,
রাষ্ট্রের নামে কলঙ্ক আনি’
করিতেছ ভান ভণিতা।
অন্তরীক্ষে দেখে দেবতারা,
সাধ্বীর জয় বিশ্বে এ সারা,
কীটও যে হয় সর্পের বাড়া
দংশায় হলে দলিতা।
ওরে তস্কর দম্ভী দপী
সবেনা এ পাপ মহীতে,
দশস্কন্ধ লুটাবে এখনি
দশমুণ্ডের সহিতে।
বিক্রমে হেথা নাহি প্রয়ােজন
যারে পাষণ্ড কর গিয়া রণ,
রঘুরাজ সাথে যুঝি প্রাণপণ
আসিনে মােরে দহিতে।
দেখিতে দেখিতে রণিয়া উঠিল
শাণিত অযুত অস্ত্র,
সন্ স ওড়ে তড়িৎ-বসনা
মুক্তাখচিত বস্ত্র।
শেল জাটা জাঠি খড়গ কৃপাণ,
ডাস বােলক শূল খরষাণ,
ভল্লক ধনু মুদগর বাণ,
লক্ষ রক্ষঃ-শস্ত্র ।

দশানন বলী চলিল যুদ্ধে
শঙ্করে করি তুষ্ট,
গুরু গম্ভীরে তড্ডিয়া মারে
টঙ্কারি’ ধনু দুষ্ট।
স্বর্গ মর্ত কঁপে রসাতল,
চরণের ভরে ক্ষিতি টম ;
কুর বিধি হেরি করে হতবল
ব্ৰহ্মা বিষ্ণু রুষ্ট।
গােধূলির ম্লান অকাল বােধনে
মহামায়া হল ক্ষু,
শ্রীরামচন্দ্ৰ আসিল, অমনি
ধরায় নামিল পুণ্য।
ভাগ্যচক্র ঘর্ঘর ঘুরে
ব্ৰহ্মবাণ সে কোদণ্ডে জুড়ে
রঘুপতি হানে দশানন সুরে
অন্তর হ’লল শূন্য।
হর হর হর বৈদেহীনাথ
আদি অনন্ত স্বর্গ,
ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মােক্ষ
তুমি যে চতুর্বর্গ।
গৌ ব্রাহ্মণ সৰ্ব্ব কৃষ্টি-
বিশ্বস্রষ্টার সৃষ্টি
বর্ষি স্নিগ্ধ পুণ্যবৃষ্টি
লহ এ-দীনের অর্ঘ্য

আগমনী
আয় মাগাে, তুই আয় মা ক্ষেপে
লেলিয়ে দে তাের সিংহীরে,
ভূত প্রেত তাল যক্ষ রক্ষ
নন্দী বেতাল ভূঙ্গীরে।
তুলে নে তাের দশ প্রহরণ
লাগিয়ে দে মা দশ কাজে,
মরূচেগুলাে সাফ করে নে-
চণ্ডীতলায় ঢােল বাজে।

ছায়া
ক্ষুৎপিপাসায় অর্ধ মৃত
অশান হ’ল বাংলাতে,
তুই যদি না সংজ্ঞা আনিস,
পারবাে কি মা সালাতে ?
অন্ন-বসন নেইকো ঘরে
শূন্য ভাড়ার দেখছি সে
আসিস নে মা সদলবলে
পারুবাে না ম্যাও ধরতে যে !
লক্ষী গণেশ সরস্বতী
থাকুক এবার কৈলাসে
কার্তিককে-ও বুঝিয়ে বলিস
কাজ কি এসে পরবাসে ।
আয় মা উমা, মুক্তকেশী
অম্বিকে নগনন্দিনী
বুকটা যে আজ বিষিয়ে ওঠে
তােমায় দেখে বন্দিনী।
থাকিনে আর হিম-তুষারে
কালিয়ে যাবি ঠাণ্ডাতে;
কাত্যায়ণী নিস্তারিণী
আয় মা আমার বাংলাতে।
.
৬৪

ঝড় উঠেছে ভরা গাঙে { গান ) ঝড় উঠেছে ভরা গাঙে উড়লাে নেয়ের ছই, ডুবে গেলাে ঘাটের নেয়ে আমি শুধু রই । কেমন করে পার হবাে এই দুরন্ত নদী ; আর পাড়ি দিতে গিয়ে রে ভাই ডুবিরে যদি আহা পাবনা ক’ থই। মানস-তরী ভাসিয়ে দেবাে ধরে আশার হাল, ঝড়-তুফানে বাইবাে ক’সে উড়িয়ে রঙীন পাল- তরী হবে না বাশ্চাল, আমি নাচবােতাথৈ থই। রাঙা রবি উঠবে যখন প্রাণের পরশ পেয়ে এক ডুবেতে আনব রে ভাই মাের পার-ঘাটের নেয়ে কেন অগাধ জলে রই ?

ভাদরে বাদল নেমেছে আজ- ঝর ঝর ঝর ঝরিতেছে জল পড়িছে সঘনে বাজ। আজিকে ভাদরে মেঘের মেয়েরা জল ভরনেতে যায়, নীলাম্বরীর আঁচল লুটায় আকাশের সারা গায়। ঝুম ঝুম ঝুম পায়জোর বাজে নটিনীর মত চলে, হাতে নিয়ে ঝারি, ঝিলমিল করে, যৌবন-মদে ঢলে। পূব হ'তে স’রে উত্তরাকাশে কাজলা মেঘঘরে ডাকে, বাদলের সাথে দ্বন্দ্ব করিয়া লুকায় তাহারি ফাঁকে। প্রকৃতির সব সম্পদগুলাে লুটে নিয়ে যেতে চায়, ঘােট ঘােট মেঘ জড় করে থােয় ঈশানের নীলিমায়। অবশ আবেশে নেচে নেচে আসে বিরহ-বিধুরা মেয়ে এলাইয়া বেণী, আলুথালু বেশে, চঞ্চল পদে ধেয়ে।

ছায়া
তমাল বনের ছায়ে,
তরুলতা যেথা জড়ায়ে ধরেছে অপরাজিতার গায়ে ;
সেইখানে বসে পাখীগুলাে আজ পাতার আড়ালে থেকে,
ওষ্ঠে ওষ্ঠ মিলাইয়া তারা আকাশের জল মেখে
পুলকে নাচিয়া শুনাইছে কত বাদল-বিরহ গান
হে মাের বন্ধু, হয়ােনা অধীর, হয়ােনাক’ ম্রিয়মাণ।
ওই দেখ দূরে পূবের আকাশে বিরহী মেঘের বালা,
তােমারে তুষিতে আসিতেছে তারা সাজায়ে মেঘের ডালা।
তেপান্তরের মাঠে,
রাখাল চলেছে গরু তাড়াইয়া সুদূর গাঁয়ের বাটে।
একহাতে নিয়ে পাঁচন-বাড়িটি আর হাতে নিয়ে বাঁশী,
কাহার কথাটি ভাবিয়া ভাবিয়া বরষার জলে ভাসি’ ;-
বাবড়ি চুলের মাঝখানে গুজে কতনা মাঠের ফুল,
বাঁশের বাঁশরী ফুকারি ফুকারি গাহিতেছে নিভুল !
মাঠ হ’তে মাঠে বাজাইয়া বাঁশী ফিরিছে গাঁয়ের ঘরে,
সে বাঁশীর সুর ভাসিয়া বাতাসে আমারে উতলা করে।
সে বাঁশীর সুরে মেলিয়া তাহার মধুর স্বপন খানি,
বিরহ-কাতর দু’জনার মাঝে আমারে লইল টানি।
দুরু দুরু করে প্রাণ।
বাদলের দিনে কেন শুনাইলে অতীতের সেই গান ?
মাঠে মাঠে আর কাননে কাননে পড়ে গেলে কত সাড়া,
কদম্ব-কেয়া নব অতিথিরে করিল যে ঘর ছাড়া।
আমি ছিনু ভালাে জড়সড় হয়ে পল্লবঘন ছায়ে,
তুমি ছিলে দূরে পূবের আকাশে অসীম শূন্যবায়ে,
৬৭

ছায়া
ওগাে মধুময়ী, কল্পনালােকে নূতনেরে অবহেলে
মেঘের সাথেতে জড়ায়ে জড়ায়ে রঙীন স্বপন মেলে'-
কমল পায়ের কোমল আখর আমার বক্ষে আঁকি,
কেন চলে যাও সাপিনীর মত কনকের আভা মাখি’ ?
বাদলের বরিষণ
কূলে কূলে জল ফেঁপে উঠে লাগে ভাঙনের মহারণ।
এ-কূল ভেঙেছে ও-কূল ভেঙেছে ভাঙিয়াছে মাের বুক,
ঘর-ও ভেঙেছে বার-ও ভেঙেছে ভেঙে গেছে সব সুখ।
কূল যদি ভাঙে বাদলের জলে কূল পায় সেই নদী,
বুক যদি ভাঙে অকারণে আহা, কঁদে বুক নিরবধি
যুগ যুগ ধরি’ ভাঙনের পালা উছলায় সদা জল
থই নিতে গিয়ে তলাইয়া যাই পাইনা ক’ সেথা তল।
কোথা সেই নদী দুকূল যাহার ভাঙে নাই ফাটে নাই,
ওগাে প্রেমময়ী হাত ধরে মােরে নিয়ে চল সেথা যাই।
কোথা সেই নদী, এক টানা চলে খেলে না জোয়ার ভাটা
কমলের কলি কুড়াইতে যেথা বিঁধেনা ক’ হাতে কাটা।
হেলিয়া পড়িছে বেলা,
অয়ি কল্পনে, প্রিয় সখী মম, সাঙ্গ কর এ খেলা।
মালতী-মেয়েরা ডাকিতেছে মােরে, বলে, তাের পায়ে পড়ি
দাঁড়াও ক্ষণেক এখুনি ফুটিয়া অঞ্চল দিব ভরি।
শরতের আজ বিয়ে হবে শুনি হেমন্তিনীর সাথে,
কণ্ঠে পরিবে তারকার মালা সিন্দুর দিবে মাথে।
ভাল করে তবে সাজাইয়া দাও মনের মতন করি,
চির জনমের সাথী হয়ে রব নূতন চেতনা ভরি’ ।
৬৮

স্মৃতি
সােনার প্রতিমা ভাসায়ে দিয়াছি অশ্রুমতীর জলে,
প্রাণের বাসনা বলি দিছি সব যূপকাষ্ঠের তলে।
প্রাণ-উৎপল শুধু পড়ে আছে শূন্য বেদীর মূলে,
চাদমালা খানি রহিয়া রহিয়া বাতাসে উঠিছে দুলে।
আর নাহি বাজে প্রভাত প্রদোষে আরতি ঘণ্টাধ্বনি,
বেদের মন্ত্র মুখরিত হয়ে উঠেনাক রননি।
কোশাকুশী ঘট পঞ্চ-প্রদীপ ছড়ান দেউল দ্বারে,
নিখিল বিশ্ব আবরিল ঘন নিবিড় অন্ধকারে।

ছায়া
বিজয়া দশমী পাণ্ডুর চঁাদ মাথার উপরে ভাসি
আবছায়া মাখা নগ্ন আকাশে চলে গেলাে মৃদু হাসি
মানুষ যখন বাঁধিল মানুষে বাহুর বাঁধন দিয়া,
দেউলের দ্বারে কঁদিয়া উঠিল একটি বিভল হিয়া।
#
আজি মনে পড়ে পুরাতন কথা প্রথম মিলন রাতি,
শত বেদনায় শত উৎসবে উন্মুখ হয়ে মাতি,-
ঝাপায়ে পড়িত আমারি বক্ষে সবারে আড়াল দিয়া,
শঙ্কিত চিতে ছুটে পলাইত সান্ত্বনা বুকে নিয়া।
ব্যাকুল হ’য়ােনা—কহিত আমারে, বিদায় বেলার কালে,
স্নিগ্ধ-নয়নে ফিরিয়া চাহিত প্রাণের অন্তরালে।
কতনা সুষমা কতনা মাধুরী কতনা সুরের ডােরে,
কল্পলতারে বুনিয়া যাইত আমার আঙিনা ভ'রে।
আজি মনে পড়ে সেই মুখখানি মদির নয়ন দু’টি,
আমার মাঝারে নিয়ত ফুটিয়া লতায়ে পড়িছে লুটি।
সেই স্মৃতি নিয়ে বসিয়া বিজনে মরণ-মরুর মাঝে,
জীবনের পাতা উলটিয়া দেখি কত ব্যথা বুকে বাজে
বন্ধু-বিহীন অন্ধ-রজনী মৃত্যুর জ্বালা নিয়া,
আনমনে কভু উচ্ছসি উঠি কহি,—প্রিয়তমে-প্রিয়া,
এসাে আর বার অভিমান ত্যজি বিদায়-বাসর ছায়,
জীবন-ধারা যে গলিয়া গলিয়া ছলিয়া চলিয়া যায় ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Chhaya

Author
Pal, Shanti
Title
Chhaya
File name
Chhaya
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2010/01/2
Publisher
Purnachandra Dutta, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
86
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Pal, Shanti
DLI number
510993
Barcode
4990010018182.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
kb9mfYFyN7Q
Download PDF

Chhaya