Makardah Saraswat Library, Howrah
Manche O Nepathye Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মনেথে
শ্রীমহেনাথ গুপ্ত ।
৪ার থিয়েটার
কলিকাতা
ঐশুরু লাইব্রেরী, ২০৪ কর্ণওয়ালিশ গুটি,
কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ ১৯৫৫ -প্রকাশক করতেশ্বর মজুমদার শ্রীগুরু লাইব্রেরী ২০৪, কর্ণওয়ালিশ স্ত্রী। পূণচন্দ্র দাস কাইন প্রিন্টিং ওয়ার্কস ৪৩এ, নিমতলা ষ্ট্রাট। ব্লক নেকাস- মেসাস দাস ব্রাদার্স ১৪, গরানহাটা দুট। ইম্পিরিয়াল আর্ট কটেজ ১এ, টেগোর ক্যাসেল ষ্ট্রীট। প্রচ্ছদ-পট শিল্পী বীরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ১১াই, তেলিপাড়া লেন। সস গ্রন্থকারের। দাম তিন টাকা “থিয়েটারের ষ্টেজের একেবারে ওপরে গােটা ষ্টেজ, জোড়া এক বিরাট ট্যাঙ্ক বসিয়ে দেওয়া হবে। তাতে অসংখ্য ছিদ্র থাকবে। ওপর থেকে পাম্পিং মেশিনে করে জল আসবে সেই ট্যাঙ্কে ; অসংখ্য ছিদ্রপথে সেই জল অনবরত কর ঝর করে বৃষ্টির কারে নীচে পড়বে। প্লাটফর্মের এক ধার ঢালু থাকবে; ল সেই দিকে গড়িয়ে যাবে। আর, প্লাটফর্ম জিনিষটা দেখতে কেমন বিশ্রী ! ঘাসের চাবড়া দিয়ে ঢেকে দিলে অনেকটা মাঠের মত স্বাভাবিক দেখাবে। এই ভাবে গাঁয়ের মাঠে বৃষ্টির দৃশ্য দেখান চলবে।”• • •এগুলি কোন সুদক্ষ দৃশ্য- শিল্পীর নিদ্দেশ নয় ; যখন ইস্কুলে পড়হুম.••এই ধরণের কত না আজগুবি, উছুট পরিকল্পনা, মাথায় আসতা! বসে বসে ভাবতুম থিয়েটারের সিন আঁকা, অভিনয় করা—এ সব ভাল করে শিখতে হ'লে কোন বইএর সাহায্য পাওয়া যায় না কি ? মফঃস্বল ইস্কুলের ছেলে,-খানিকটা ভয়ে খানিকটা সঙ্কোচের সঙ্গে, খানকতক পােষ্ট- কার্ড ছাড়লুকলকাতার কয়েকজন বড় অভিনেতার নামে। (তখন পৰ্য্যন্ত তাদের নাম-ই শুনেছি,-চোখে দেখিনি কাউকে) জবাব পাব আশা করিনি; কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে একদিন জবাব এল- যুক্ত নিৰ্ম্মলেন্দু লাহিড়ীর নিকট হতে। আমার কিশাের জীবনের স্বপ্ন বেন বাস্তব জীবনে সার্থক হয়—তিনি আমায় সেই শুভেচ্ছা পাঠালেন ; আর সেই সঙ্গে কতকগুলি বইএর নাম উল্লেখ করলেন। বইগুলি সবই ইংরাজী ; বাংলা ভাষায় রঙ্গালয় সম্পর্কিত শ্ৰীযুক্ত হেমেন্দ্রকুমার রায়ের নাচঘর” পত্রিকার সন্ধান পেলুম। নাচঘরের গ্রাহক হলুম ; তারই মারফতে বাংলা রঙ্গালয় সম্বন্ধে যতটুকু পারি, খবর সংগ্রহ করতে লাগলুম। মনে পড়ে, তার কিছুদিন বাদে-আমার জীবনে সেই প্রথম—কলকাতার কোনো প্রসিদ্ধ রঙ্গালয়ে অভিনয় দেখবার সুযােগ হ’ল। অভিনয় দেখে এসে নাচঘরে ৮.ব ৩০ লিখেছিলুম : নারদ মুনি পরেছেন পাতলা সিল্কের গেরুয়া ; তার ভেতর থেকে কামিজ দেখা যাচ্ছে ! হস্তিনা নগরের রাজপুরাঙ্গনাদের গানের সঙ্গে পিয়াণে অর্গান বাজছে!•••সে যুগে কি অমি করে পিয়াণে অর্গান বাজতো? কর্তৃপক্ষ কি দিশি বাদ্য যন্ত্রের প্রচলন করতে পারেন না? এই কি আমাদের রাজধানীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রঙ্গালয়ের নাটকাভিনয় ?”..তারপর প্রায় বিশ বছর অতীত হয়েছে; কিন্তু এমনি বিচিত্র—আজ আমি নিজে কলকাতার প্রকাশ্য রঙ্গালয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত থেকে ও নারদ মুনিকে সেই বিশবছর আগে- কার সিল্কের গেরুয়া ছাড়াতে পারি নি ! আজও হস্তিনার পুর-বধুর ঠিক তেমনি করে পিয়াগাে অর্গ্যানের সঙ্গে গান করেন । মনে হয়—এই বিশবছরে রঙ্গালয়কে দেখলুম যেন ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত কেবলই দোলা খাচ্ছে! যতটা সামনে এগুচ্ছে—আবার ঠিক সেই পরিমাণ পিছিয়ে যাচ্ছে। এই দেখলুম-Revolving stage হল, agon stage হল,...নূতন ধরণের আলােকসম্পাত চোখ ঝলসে দিল,...Black and whiteএর Scene, Dra]ery work-অগ্রগতির কত না আশ্বাস দিল !তারপরই আবার দেখলুম, রঙ-চটা ছেড়া Sceneএ মােগল পাঠান,” “বঙ্গে বর্গী”র অতি ক্লান্ত পদে মঞ্চ পরিক্রমা••• আমাদের টেম্পারেচার যখন ১•• ডিগ্রী উঠে যায়-জ্বরের ঘােরে তখন আমরা হাত পা ছুড়ে প্রলাপ বকি—'সংস্কার কচ্ছি, মঞ্চের উন্নতি কচ্ছি”; টেম্পারেচার পড়ে গেলেই—দারুণ অবসাদ, অপরিসীম ক্লান্তি! সীনের গাদা থেকে বেরিয়ে আসে তখন সেই ছেড়া সীন••• সিন্ধুক থেকে নামাই পাতা-ছেড়া পুরাণে বই! সুস্থ দেহ ও মন নিয়ে আমরা রঙ্গালয়ের সেবা করতে পাচ্ছি না। বদ্ধ ঘরে বাইরের আলো- হাওয়া আসছে না; যে টুকু আসছে, তাও এখানকার আবহাওয়ায় মিশে তার জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলছে।
• রঙ্গালয়ের বিভিন্ন শিল্পকলা সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য কোন বাংলা বই বিশবছর আগে আমি খুজে পাইনি এবং আজ পর্যন্ত সে ধরণের বইএর একান্ত অভাব রয়েছে জেনেই আমি এ কাজে হাত দিয়েছি। কৰ্ম্ম- ব্যস্ততার মধ্যে বক্তব্য বিষয়গুলি হয়তো সুশােভন ভাবে প্রকাশ করতে পারিনি। ভুল, ত্রুটি থাকাও খুব স্বাভাবিক। পুণমুদ্রণ হলে, তখন সেগুলি সংশােধন করবার চেষ্টা করব। “আমাদের মঞ্চ” পরিচ্ছেদের অনেকগুলি প্রবন্ধ পূৰ্বে বিভিন্ন মাসিক পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলি এক সঙ্গে গ্রথিত করবার সময় আবশ্যক মত পরি- বৰ্তন পরিবর্জন করে নেবার অবকাশ পাইনি; তাই হয়তাে দু একটা প্রবন্ধের স্থানে স্থানে একই বিষয়ের অবতারণা আছে। পরে এই ত্রুটি সংশােধনের চেষ্টা করব। বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে -“বিসর্জন” নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ এবং “ডাকঘর” নাটকের একটী দৃশ্যের ছবি ব্যবহারের অনুমতি আদায় করে দিয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতজ্ঞ শ্ৰীযুক্ত অনাদি দস্তিদার। আর সব ছবির জন্য All India Radioৰ শ্ৰীযুক্ত বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, এমপির যুক্ত বিমল ঘোেষ, কালিকা থিয়েটারের শ্রীযুক্ত প্রভাত সিংহ, নাট্যকার মন্মথ রায়, রূপমঞ্চ সম্পাদক কালীশ মুখােপাধ্যায় এবং রঙমহলের বিজয় মুখােপাধ্যায় প্রভৃতির নিকট আমি কৃতজ্ঞ। মুদ্রাকর প্রমাদ বশতঃ বইএর প্রথম পৃষ্ঠায় যুক্ত ব্রজেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস স্থলে বঙ্গীয় রঙ্গশালার ইতিহাস” ছাপা হয়েছে। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমি সত্যই লজ্জিত। ইতি ষ্টার থিয়েটার, কলিকাতা। মহেন্দ্র গুপ্ত ১৯৪৫
মঞ্চ ও শিল্পীর চির-শুভানুধ্যায়ী
ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
শ্রদ্ধাস্পদে
warea সুচিপত্র গােড়ার কথা re মঞ্চ-নাট্য নাটক ও কথাসাহিত্য—ক্রিয়া-নাটকের উপাদান সুস্পষ্ট অনুভূতি-অঙ্ক ও দৃঙ্গবিভাগ—বিশেষ নির্দেশ চরিত্রসৃষ্টি-সংলাপ-নাটক ও দর্শক--নাটকের রূপ। ৪৯ মঞ্চের শিল্পী পরিচালক-মঞ্চাধ্যক্ষ ও স্মারক-অভিনেতা-অভিনয়ের রূপ—রূপসজ্জা-দৃশ্যশিল্পী ও আলোকদক্ষ—আগামী- কালের মঞ্চ। ১০৭ ০ ০ ০ শামাদের মঞ্চ গিরিশচন্দ্র ও নাটমঞ্চ-দেশ ও নাটমঞ্চ-নাট্যকার ও নাটমঞ্চ—কোন্ নাটক চাই-নাটমঞ্চের ক'টা অভাব- ব্যবসায়ী মঞ্চ-অভিনেত্রী-বৰ্তমানের অভিনেতা- বিশ্ববিদ্যালয় ও রঙ্গমঞ্চ-স্বাগতম। গ্রন্থ-নির্দেশ ••• ১৫১ -- “বিসর্জন” নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ??? রবীন্দ্রনাথের “ডাকঘর” নাটকের একটা দৃশ্য গােড়ার কথা কালিদাস, ভবভূতি ভারতীয় নাট-মঞ্চের জন্যে নাটক তৈরী করে ছিলেন। সে যুগের অনুপম নাট-মঞ্চের স্মৃতি এখনও রামগড় পাহাড়ের গায়ে বিদ্যমান। কালিদাস, ভবভূতির অমর নাট্যকলা আজও জগতের কাছে পরম বিস্ময়ের বস্তু হয়ে রয়েছে। আমাদের অতীত সমৃদ্ধির কথা ভাবতে আমরা আনন্দ পাই, গর্ব অনুভব করি; কিন্তু তা বলে একথা ভুললে চলবে না যে আমাদের নাট-মঞ্চ বা নাট্য-সাহিত্যের সঙ্গে কালিদাস ভবভূতির যুগের কোনও সম্পর্ক নেই। মুসলমান যুগে কেমন করে নাট্যকলা অনাদৃত ও প্রায় অবলুপ্ত হ’লইংরেজ আমলে ইংরেজী নাটকের অনুকরণে আবার কেমন করে এদেশে ধীরে ধীরে নাট্য-সাধনার আরম্ভ হ’ল—সে সব কথার বিস্তৃত আলােচনা করবেন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক। যারা এ সব ঐতিহাসিক তথ্য জানতে চান—তাদের জন্যে সাহিত্য-পরিষদের প্রামাণিক গ্রন্থ “বঙ্গীয় রঙ্গশালার ইতিহাস আছে, এবং ডাক্তার হেমেন্দ্র দাস গুপ্তের “ভারতীয় নাট্যমঞ্চ” প্রকাশিত হয়েছে। আজকের দিনের ভারতীয় নাটমঞ্চ বলতে আমরা বুঝি বাংলার নাটমঞ্চ কারণ—সিনেমা প্লাবিত ভারতবর্ষের আর কোন প্রদেশে প্রকাশ্য রঙ্গালয় আছে বলে আমাদের জানা নেই। যদি বা আর কোন প্রদেশে কদাচিৎ নাট্যাভিনয় হয়, একথা সত্য, বাঙ্গালীর মত নাট্যকলাকে জীবনের • উপজীব্য হিসাবে আর কোন প্রদেশবাসী আজও গ্রহণ করতে পারেনি। তাই বলছিলুম, এ যুগের ভারতীয় নাটমঞ্চ বলতে—আমরা বুঝি•••বাংলার নাটমঞ্চ, বাঙ্গালীর নাটমঞ্চ। মঞ্চ-লােকের সঙ্গে যার সংশ্লিষ্ট তাদের প্রত্যেককেই বলা চলে মঞ্চের শিল্পী। এইসব শিল্পীদের মধ্যে অনেকে প্রত্যক্ষভাবে মঞ্চে অবতরণ করেন এবং অনেকে মঞ্চের নেপথ্যে থেকে মঞ্চাভিনয়ে সাহায্য ২ মঞ্চে ও নেপথ্যে করেন। নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, নট-নটী, সুরস্রষ্টা, আলােক- সম্পাতকারী, মঞ্চ-সজ্জাকর, রূপসজ্জাকর প্রভৃতি প্রত্যেকেই মঞ্চের শিল্পী। এক কথায়, যে সব শিল্পীর সমবেত প্রচেষ্টায় মঞ্চের অভিনয় সম্পূর্ণ হয়—অর্থাৎ দর্শকগণ যাদের সমবেত সাধনায় পরিপূর্ণভাবে নাট্যরস আস্বাদন করতে পারেন-তারাই মঞ্চের শিল্পী। এই সব শিল্পীর বিষয়ে ব্যক্তিগত আলােচনা অনেক হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। সে আলােচনা আমার উদ্দেশ্য নয়। নাটমঞ্চ হতে রসলিন্স, দর্শককে নাট্যরস পরিবেশন করতে হলে—শিল্পীর কোন্ কোন্ বিষয়ে অবহিত হওয়া প্রয়ােজন-এবং আমাদের বর্তমান নাটমঞ্চের গতি কোন দিকে–সংক্ষেপে সে বিষয়ে আলােচনা করব। একটা কথা, বিলাতী থিয়েটারের অনুকরণে আমাদের নাটমঞ্চের নুতন করে ভিত্তি পত্তন হয়েছিল—সে প্রায় দেড় শ বছর আগে। এই দেড় শ’ বছরে—আমাদের নাটমঞ্চে বিলাতী গন্ধ যে খুব বেশী লােপ পেয়েছে তেমন কিন্তু মনে হয় না। ভাবের দিক দিয়ে হয়তো খানিকটা স্বদেশী জিনিষ আমদানী হয়েছে-কিন্তু আমাদের নাটমঞ্চের বহিরাবর, এখনও সম্পূর্ণভাবে বিদেশী। অভিনয় দেখে গিয়ে—এক বন্ধু আমায় এক চিঠি দিয়েছিলেন ; তার খানিকটা অংশ এখানে উদ্ধত কলুম। ; থিয়েটারের (Theatre) বুকিং অফিসে (Booking Office) ভয়ানক রাশ (Rush)! যাহােক ফাষ্ট রাে (First Row)তে টিকিট (Ticket) মিলল। অডিটোরিয়ম (Auditorium, তখনও খােলেনি; গার্ড (Guard) লবিতে '(Lobby) বসতে বলল। আমি বল্লুম; আপনাদের হিরো আটিষ্টএর (Hero Artist)
মঞ্চে ও নেপথ্যে
৩ . এ
••সঙ্গে দেখা করব।•••তিনি আমায় গ্রীণরুমে (Green Room)
ডেকে পাঠালেন। দেখলুম-কেউ গ্রীজ, পেন্ট (Grease Paint)
কচ্ছে, কেউ কেবল পাউডার (Powder) ইউজ, (Use) কচ্ছে;
তবে সকলেরই রুজ, (Rouge) লিপষ্টিক (Lipstick) ও ভুরু
টানবার পেনসি(Pencil) রয়েছে। ম্যানেজার (Manager),
প্রােডিউসার (Producer), মিউজিক ডিরেক্টর (Music
Director) সবার সঙ্গেই আলাপ হল।•••মেকঅপ (Make
• up) শেষ হলেই ওয়ার্নিং বেল (Warning Bell) বাজল,
ইলেকটি স্যান (Electrician) ফুটলাইট (Foot light) খুলে
দিয়ে, স্পট লাইট (Spot light) নিয়ে রেডি (Ready) হল,
প্রম্পটার (Prompter) হুইসিল (Whistle) হাতে নিল,
শিফটাররা (Shifter) স্কাই (Sky), উইংস (Wings) এবং
ফাষ্ট অ্যাক্টের (First Act) ফ্ল্যাট (Flat) ও সেট সীন (Set
Scene) ঠিক আছে কিনা দেখে.••আগে এডভারটাইজমেন্ট
ড্রপ (Advertisement Drop) তুলল, পরে স্ক্রীন (Screen)
তুলতে গেল।••এখন কন্সার্ট (Concert) বাজে না, প্লের
(Play)র আগে ও ইন্টারভ্যালে (Interval) বাজে এপ্লি-
ফায়ার (Amplifier)...”
আমার বন্ধুরা এত বেশী ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করেছেন বলে তিনি
একা দায়ী নন ; যে সব কথা তিনি ব্যবহার করেছেন, এর কোনটির
বাংলা প্রতিশব্দ আমাদের চলতি নাটমঞ্চের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত
হয় না। দেড় শ বছর আগে বাংলার মাটিতে যে নাটমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত
হ’ল-তার এমন অপূর্ব বৈদেশিক রূপ-সজ্জা—আনন্দের বা দুঃখের
জানিনা—তবে মজার কথা সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে বিদেশী প্রভাব সম্বন্ধে এত কথা বলবার উদ্দেশ্য এই যে—আমি আমাদের নাটমঞ্চ সম্বন্ধে যেটুকু বিচার বিশ্লেষণ করব—তা অনেকখানি বিদেশী নাটমঞ্চের আদর্শ অনুসরণে। বর্তমান নাটমঞ্চের সঙ্গে কোন যােগ না রেখে যারা ভারতীয় সংস্কৃতিমূলক নূতনতর নাটমঞ্চ সৃষ্টি করতে চান—তঁার শক্তিমান, তাদের স্বাগত সম্ভাষণ জানাই। 'কন্তু আমার বর্তমান আলােচনা সে সব সৃষ্টিপন্থীদের জন্য নয়,সংস্কার পন্থীদের জন্য। বর্তমান নাট্য-জগতের সঙ্গে যারা যুক্ত রয়েছেন- তাদের বিষয়ে কয়েকটী দরকারী কথা বলব; 'আমার আলােচনায় তাই অনেক ইংরেজী শব্দ ও ঠাই পাবে। কারণ, আগেই বলেছি, নাট্যলােকে এমন অনেক ইংরেজী কথার প্রচলন আছে, যার বাংলা প্রতিশব্দ একমাত্র অভিধানে অথবা সাময়িক পত্রের প্রবন্ধে স্থান পেয়েছে, মঞ্চের শিল্পীদের দৈনন্দিন জীবনে নয়। সেই সব চলতি ইংরেজী কথা ব্যবহার না করে, অভিধান থেকে তার বাংলা প্রতি শব্দ খুজে এনে ব্যবহার করলে, যাদের জন্যে এ আলােচনা, তাদের অনেকের পক্ষেই খুব সহজ-বােধ্য হবে না। সহজে বুঝতে না পারলে আমার উদ্দেশ্য ও সফল হবেনা। এটা আমার সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস নয় ; নাট্য জগতের নিতান্ত ঘরােয়া গােটা কয়েক কাজের কথা বলা।
2B-all
No text on this page.
নাটমঞ্চে শিল্পীর সমাবেশ হয় নাটককে রূপায়িত করবার নাটককে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন শিল্পীর রস-সৃষ্টির প্রয়াস। তাই প্রথমে নাটকের রচনা রীতি (Dramatic technique) সম্বন্ধে আলােচনা করব। ইংরেজীতে একটা কথা আছে The Dramatist is born, not made ; নাট্যকার তৈরী হন না: নাট্যকার জন্মান। এর তৈর হয়তাে খানিকটা সত্য আছে, কিন্তু সবটুকুই নয়। নাটক লিখতে এমন কিছুর প্রয়ােজন আছে যা জন্মগত অধিকার রূপে পাওয়া যায় না,তাকে আয়ত্ব করে নিতে হয় অনুশীলন দিয়ে। তাই গােড়াতে সব নাট্যকারকেই কিছুদিন শিক্ষানবিশী করতে হয়। শিক্ষানবিশী জীবন সবচেয়ে সহজে ও সত্বর পেরিয়ে আসতে হলে একটা উপায় আছে ; সে হ'ল—নাটক রচনার মূল সূত্রগুলিকে আয়ত্ব করা। নাটক রচনার এই সব নিয়ম বা সুত্র কার মন- গড়া নয় ; দীর্ঘ অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং জন্মগত বিচিত্র প্রতিভার সাহায্যে যে সব নাট্যকার অমর নাট্য রচনা করে গেছেন—এগুলি তাদেরই রচনা কৌশল থেকে সঙ্কলিত। নাটক রচনার সূত্রগুলিকে তিনটা পৰ্য্যায়ে ভাগ করা চলে; (১) সার্বজনীন, (২) যুগধৰ্ম্মী এবং (৩) ব্যক্তিগত ; (Universal, Special and Individual); নাটক রচনার এমন কতকগুলি সাধারণ নিয়ম আছে যা সবদেশের এবং সবকালের নাটকের ভেতর মােটামুটি ভাবে পাওয়া যায়-এই নিয়ম গুলিকে সার্বজনীন সূত্র বলা যায়। যুগপরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারা, মানুষের কৃষ্টি—সব কিছুরই পরিবর্তন আসে। তাই যুগে যুগে নাটকের গঠন পদ্ধতিতেও পরি- মঞ্চে ও নেপথ্যে বৰ্তন আসা অবশ্যম্ভাবী। একশ’ বছর আগে যে দর্শকদের সামনে অথবা যে ধরণের নাটমঞ্চে কোন একটী নাট্য-কাহিনী রূপায়িত হয়ে ছিল—শতবর্ষ পরে ঠিক সেই নাট্য-কাহিনীটিকেই নাটমঞ্চে রূপদান করতে হলে সবার আগে এই কথাটা মনে রাখতে হবে যে... আজকের নাটমঞ্চ এবং আজকের দর্শক পূর্বযুগ হতে বহু বিষয়ে স্বতন্ত্র। তাই নাটকের রচনারীতিকেও যুগানুযায়ী পরিবর্তিত করে নিতে হবে। নাটক রচনার তৃতীয় সূত্রটাকে বলা হয়েছে—ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত রচনা কৌশলকে অনুকরণ করা চলে না। জগতের যারা শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর নাট্যকার, তারা অনেক সময় নাটকের সাধারণ রচনা রীতির সঙ্গে এমন এক একটা রচনা কৌশল সংযুক্ত করেন—যাকে বলা যায় সম্পূর্ণ ভাবে তাদের নিজস্ব রচনা-ভঙ্গী। অন্যের স্যুট ধার করে এনে পরলে যেমন বেমানান দেখায়—সেই ব্যক্তিগত রচনা রীতিকে আয়ত্তে এনে নাটক রচনার প্রচেষ্টাও তেমনি হাস্যকর হয়ে পড়ে। নাটক রচনা করতে হলে, আগে দরকার সাধারণ বা সার্বজনীন সুত্রগুলি বুঝে নেওয়া ; তারপর সমসাময়িক নাটমঞ্চ ও দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী রচনারীতির সংস্কার সাধন করা ; এবং তৃতীয়তঃ কারুর ব্যক্তিগত রচনারীতির অনুকরণ না করে নিজস্ব রচনা কৌশল প্রয়ােগ করা।
নাটক ও কথা সাহিত্য নাটকের যে একটা আলাদা গঠন পদ্ধতি আছে তা খুব সহজে বােঝা যায়, নাট্যকার আর কথাশিল্পী-এই উভয়কে তুলনা করে দেখলে। এদের উভয়ের কারবার একই ধরণের মালমশলা নিয়ে ; দু’জনেরই চাই গল্প, চরিত্র সৃষ্টি এবং কথা বা dialogue; অথচ এমনি মজা, যে কোন ভাল গল্প বা উপন্যাসকে নাটকে রূপান্তরিত করলে তা দর্শককে রস পরিবেশন করতে পারবে—তার কোন মানে নেই। যে গল্প পড়ে তৃপ্তি পেয়েছি—তার নাট্যরূপ দেখে তৃপ্তি পেলুম না-এর কারণ কি? কথা-সাহিত্যিক তার কাহিনী বর্ণনা করতে প্রচুর সময় পান, নিজের ইচ্ছামত তিনি পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদ বর্ণনা করে যেতে পারেন। কিন্তু নাট্যকারকে এমন এমন ভাবে কাহিনীটাকে সংক্ষিপ্ত ভাবে সাজাতে হবে, যেন দুই বা তিন ঘণ্টার মধ্যে সেই নাট্য- কথার অভিনয় সম্পূর্ণ হয়। 'অবকাশ মত বার বার পড়ে এক খানি উপন্যাস শেষ করা যায় ; কিন্তু দর্শকেরা নাটক উপভােগ করবেন—ঐ দুই ঘণ্টা বা তিন ঘণ্টা কাল বসে থেকে, একবারে। কথা-সাহিত্যিক তার কাহিনী বুঝতে নিজে আমাদের সাহায্য করেন। কেন তার কাহিনীর চরিত্রগুলি কোন বিশেষ গতিপথ বেছে নিচ্ছে•• ঔপন্যাসিক নিজের ভাষায় তা পাঠককে বার বার বুঝিয়ে দেবার অবকাশ পান। কিন্তু নাট্যকার তার সৃষ্ট চরিত্রের সম্পূর্ণ আড়ালে থাকেন। চরিত্রের মুখের কথায় এবং তার কাজ দেখে-তাকে বুঝে নিতে হয়। নাট্যকার একবারও সেখানে এসে তার চরিত্রের ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে এতটুকু মন্তব্য করবার অবকাশ পান না। শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক তার রচনায় সর্বদা সুপ্রকাশ থাকেন এবং শ্রেষ্ঠ নাট্যকার তার নাটকের মধ্যে সর্বদা থাকেন অপ্রকাশ।•• মঞ্চে ও নেপথ্যে কথা-সাহিত্য বা উপন্যাসের রস আস্বাদন করি আমরা চোখের সাহায্যে ; কিন্তু নাটক উপভােগ করি চোখ এবং কাণ—দু’য়ের সাহায্যে। মঞ্চের দৃশ্যপট, আলােক সম্পাত, সাজসজ্জা—নাটককে এমন সাহায্য করে—যার ফলে বহুপ্রকার বর্ণনা, যা নাকি উপন্যাসের পক্ষে একান্ত প্রয়ােজনীয় • নাটকে তা হয়ে দাড়ায় নিতান্ত অবান্তর। উপন্যাসকে বলা যায় ঔপন্যাসিকের একক বা ব্যক্তিগত সৃষ্টি পক্ষান্তরে নাটক হ’ল সমবেত সৃষ্টি। নাট্যকার, নট-নটী, নাট্য- পরিচালক—এদের সমবেত প্রচেষ্টার প্রচেষ্টার ফল—পূর্ণাঙ্গ নাট্য-রস-সৃষ্টি। যেহেতু নাট্যকার ব্যতীত আরও অনেক শিল্পী একখানি নাটককে সম্পূর্ণ করেন—তাই নাট্যকারকে বহু স্থলে তার সৃষ্ট চরিত্রের মুখে কেবল সামান্য আভাষ ইঙ্গিত রেখেই সরে দাড়াতে হয় ; নটনটী এবং অন্যান্য শিল্পীরা নাট্যকারের সৃষ্ট সেই অসমাপ্ত চরিত্রকে ভাবে, ব্যঞ্জনায় সম্পূর্ণ করে তােলেন। তাই উপন্যাসে কথা বেশী, নাটকে কথা অনেক কম। ; দেশের মুষ্টিমেয় সাহিত্য রসিকের নিকট থেকে সুখ্যাতি পেলেই ঔপন্যাসিক পরিতৃপ্ত ; কিন্তু নাটকের কারবার দেশের শুধু সেই একটা বিশেষ শ্রেণী বা গােষ্ঠীকে নিয়ে নয়—জনসাধারণকে নিয়ে। সর্বজন অথবা বৃহত্তম গােষ্ঠীকে তৃপ্তি দিতে পারলে তবেই নাটকের সার্থকতা।...উপন্যাস এবং নাটকের রচনা রীতিতে এত পার্থক্য আছে বলেই—শ্রেষ্ঠ উপন্যাস সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ মঞ্চ-নাটক হয়ে উঠতে পারেনি। নাটকের ঘটনার গতি উপন্যাসের চেয়ে হবে অনেক দ্রুত, সময় সংক্ষেপের জন্যে হবে অত্যন্ত সংহত, নাটকের প্রত্যক্ষ আবেদন থাকবে
মঞ্চে ও নেপথ্যে
১১
ঢের বেশী, নাটকের মধ্যে নাট্যকার নিজে থাকবেন সম্পূর্ণ প্রচ্ছন্ন
ভাবে, নাটক বহুশিল্পীর সমবেত সৃষ্টি, এবং নাটকের আবেদন বৃহত্তম
গােষ্ঠীর নিকট। সর্বকালের এবং সর্বদেশের নাট্যকার মােটামুটি
ভাবে নাটকের এই সূত্ৰকটী মেনে চলেছেন।
ক্রিয়া সব নাট্যকারের লক্ষ্য থাকে প্রথমত-দর্শকের মনযােগ যত শীঘ্র সম্ভব আকর্ষণ করা ; দ্বিতীয়তঃ–দর্শকের কৌতুহল শেষ যবনিকা পৰ্যন্ত ক্রমশঃ বাড়িয়ে তােলা। দর্শকের মনকে ধরে রাখা যায় নাটকের ক্রিয়া, চরিত্র সৃষ্টি এবং কথার সাহায্যে। আজকাল অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, নাটকীয় ক্রিয়া বা Action, চরিত্র সৃষ্টি বা Characterisation এবং কথা বা Dialogueএর ভেতর কোনটী দর্শকের মনােহরণ করবার পক্ষে বেশী মূল্যবান। নাটকের একেবারে গােড়র যুগে ক্রিয়া বা Action সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রাধান্য পেত ; তারপর Action এর সঙ্গে যুক্ত হ’ল চরিত্র সৃষ্টি। নাটকে Dialogue বা কথার কদর হল আরও পরবর্তী যুগে। সব যুগের সব শ্রেণীর দর্শক ক্রিয়া বা Action বহুল নাটককেই বেশী পছন্দ করে এসেছে। নাটকের ক্রিয়াকে বুঝতে সাহায্য করে, তাই চরিত্র ও নাটকের কথাকেও তারা আমল দিয়েছে। ক্রিয়া বহুল নাটক এত জনপ্রিয় হয়েছে বলে তাকে মেলােড্রামা (Melo Drama) নামক একটা বিশেষ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মেলােড্রামা নামক এই বিশেষ শ্রেণীর নাটক, যেখানে ক্রিয়াই মুখ্য এবং চরিত্র সৃষ্টি বা কথা নিতান্ত গৌণ•••সৰ্বশ্রেণীর দর্শককে সব চেয়ে বেশী আনন্দ দেয়। নাটকে ক্রিয়ার এত প্রাধান্যের কারণ কি ? নাটকের কাজ হল- দর্শক মনে বিভিন্ন ভাবধারার উদ্রেক করা। মানুষের মনে অতি দ্রুত নানাবিধ ভাবতরঙ্গ তুলতে পারে কে? ভাবুক অথবা কী ?...আমরা যা ভাবি বা বলি, সব সময় তা কাজে করিনা; যেটা করি তাই দেখে লােকে আমাদের বিচার করে। স্বদেশ সেবার বড় বড় বুলি আওড়ালুম; কিন্তু দেশের ঠিক সঙ্কট-মুহূর্তে দেশ সেবা ছেড়ে দার্জিলিংএ হাওয়া খেতে গেলুমতাহলে আর আমাকে কেউ স্বদেশভক্ত মঞ্চে ও নেপথ্যে বলবে না। তাই ইংরাজীতে একটা কথা আছে ; “Actions are louder than words” কাজ কথার চেয়েও জোরে কথা বলে। নাটকে এই জন্যে দর্শকমন action বা ক্রিয়া দ্বারা সর্বাপেক্ষা বেশী অভিভূত হয়। তবে এ কথাটা সৰ্ব্বদা মনে রাখতে হবে...শুধু ক্রিয়া বহুল নাটক মেলােড্রামা বা হাস্যরসাত্মক নাটকরূপে গড়ে ওঠে ; উচ্চ- শ্রেণীর নাটকে ক্রিয়ার বিশ্লেষণের জন্যে প্রয়ােজন, চরিত্র সৃষ্টি বা characterisation. শ্রেষ্ঠ নাট্যকারেরা সর্বদা লক্ষ্য রাখেন যে, নাটকে বহিমুখী ক্রিয়া থাকাটাই সবচেয়ে বড় কথা নয়, বড় কথা হল-দর্শকের মনে বিভিন্ন ভাবধারার সঞ্চার করা। এই ভাবধারার দ্রুত উদ্রেক সাধন করা যায়...ক্রিয়া, চরিত্রসৃষ্টি ও কথার সাহায্যে। যে নাটকে বহিমুখী ক্রিয়ার অভাব এবং চরিত্র সৃষ্টি ও কথাই বলবান—তাও অনেক সময় দর্শককে খুসী করে। তার কারণ, চরিত্র ও কথার অন্তরালে সেখানে লুপ্তধারা ফরমত, ক্রিয়া বরাবর অলক্ষ্যে থেকে দর্শকের মনে ভাব- ধারার উদ্রেক করে।
নাটকের উপাদান নাটকের মূল কাহিনী বা প্লট (plot) তৈরী করবার মালমসলা অনেক রকমে যােগাড় করা যায়। নাটক রচনার চিন্তা লেখকের মনে আসতে পারে কোন একটা ঘটনা, ভাব, কথা, দৃশ্য বা যে কোনো কাল্পনিক বস্তুকে অবলম্বন করে। তবে যারা কোন একটা কাহিনীকে কেন্দ্র করে নাটক রচনা আরম্ভ করেন—তাদের কাজ হয় খুব সহজ- সাধ্য ; কারণ নাটক রচনার মূলপ্রেরণা যে দিক থেকেই আসুক কেন-নাটকে একটা গল্প থাকা একেবারে অপরিহার্য। সাধারণ গল্প ও নাটকের মূল কাহিনীর মধ্যে তফাৎ আছে। সাধারণ গল্পকে নাটক রচনার অনুশাসন অনুযায়ী সংস্কার করে নিলে তবে তা থেকে তৈরী হয় নাট্য-কাহিনী। ; নূতন নাট্যকারের অনেক সময় অভিনবত্বের (Novelty) মােহ কাটিয়ে উঠতে পারেন না। তাই তারা নাটকের মালমসলা জোগাড় করতে চান নিছক কল্পনা বা হাওয়া থেকে। তারা এই কথাটী ভুলে যান যে, পৃথিবীর মাটিতে রসপুষ্ট সহস্র নাটকীয় উপাদান ছড়িয়ে আছে। তা থেকে প্রয়ােজন মত বেছে নিলে নাটকের অভিনবত্ব ক্ষুন্ন হয় না; বরং সেইগুলিই হল নাটকের প্রকৃত উপাদান এবং সর্বকালের নাট্যবিদ কেবলমাত্র তাদেরই গ্রহণ করে নাটক রচনা করে কীৰ্ত্তিমান হয়েছেন। মাতৃস্নেহ, বাৎসল্য, দাম্পত্য- প্রেম, উচ্চাশা প্রভৃতি পৃথিবীর আদিম এবং আধুনিকতম মানুষের মনের ভেতর বাসা বেঁধে আছে। এগুলি নিয়েই সেকালেও নাটক রচিত হয়েছে-এবং আজকের দিনেও হচ্ছে। তফাৎ, কেবল ঘটনা সন্নিবেশ নৈপুণ্যের বা নাটকীয় গঠন কৌশলের। একশ’ বছর আগে যুদ্ধে বীরত্ব দেখান যে ধরণের ছিল—আজকের বৈজ্ঞানিক যুগে রণ-কৌশল তার চেয়ে ঢের পরিবর্তিত হয়েছে। বীরত্ব নিয়ে মঞ্চে ও নেপথ্যে যুগে যুগে নাটক রচনা চলতে পারে; সে নাটক যুগে যুগে দর্শক- মনকে আলােড়িত করতে পারে—যদি তার গঠন পদ্ধতি হয় অভিনব বা মুগধর্মী। যা সত্য ঘটনা বা Fact, তাই যে সব সময় নাটকের উপাদান হবে একথার কোন মানে নেই। যা মিথ্যা বা নিছক কল্পনা তাকেও যদি এমন নাটকীয় কৌশলে সাজিয়ে তােলা যায় যে...অভিনয়কালে দর্শকের তাকে সত্য বা বাস্তব বলে মনে হবে-তা হলে সেই মিথ্যা বা কল্পনাও নাটকের উপাদান হতে পারে। নাটক হল-art of make believe ; যে কোনাে ভাব, কাহিনী বা কথাকে দর্শক সত্য বলে মেনে নিলেই—তা হবে নাটকীয়। “আমি একে সত্য বলে জানি”—নাট্যকারের বলবার অধিকার নেই ; নাট্যকার দেখবেন—তিনি যে ভাবে তাকে দর্শকের সামনে তুলে ধচ্ছেন- তাতে করে দর্শক তাকে অসঙ্কোচে সত্য বলে মেনে নিচ্ছে কিনা।
সুস্পষ্ট অনুভূতি নূতন নাট্য- নাটক রচনার সময় নাটকের বিষয়-বস্তু এবং ঘটনা সংস্থাপনের স্তর- গুলি সম্বন্ধে অত্যন্ত স্পষ্ট অনুভূতি থাকা প্রয়ােজন। কারেরা অনেক সময় নাটক রচনাতেই বেশী সময় অতিবাহিত করেন, রচনার পূর্বে যথাযথ উপাদান সংগ্রহ ও তাকে সুন্দর রূপে সাজিয়ে নেবার ধৈর্য্য তাদের থাকেন। তাই অনেক সময় নাটককে খুব ভাল Starting দিয়েও তারা শেষ রক্ষা করতে পারেন না। মাঝপথে এসেই খেই হারিয়ে ফেলেন। কাগজ কলমে রচনাকার্য আরম্ভ করবার আগে বিষয় বস্তু সম্বন্ধে সুস্পষ্ট অনুভূতির প্রয়ােজন এই জন্য যে,-গােড়ায় যে চরিত্র বা যে ঘটনাটী নাট্যকারের মনে অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় বলে বােধ হয়-কাহিনীটা খানিকদূর অগ্রসর হবার পর এমনও দেখা যেতে পারে যে, সেই বিশেষ ঘটনা বা চরিত্র নাটকের পক্ষে অপ্রয়ােজনীয় হয়ে দাড়িয়েছে। সুতরাং নাটক রচনা আরম্ভ করবার পূর্বে সেই অনাবশ্যক ঘটনা বা চরিত্রটাকে বাদ দিয়ে যে ঘটনা ও চরিত্রপুঞ্জ শেষ পর্যন্ত নাট্যকারের প্রয়ােজন সিদ্ধ করে, তাদের নিয়েই মূল কাহিনী গড়ে তুলতে হবে। নাট্যকার কোন্ চরিত্রের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণ করতে চান—এ বিষয়েও নাট্যকারের সচেতন থাকা দরকার। নইলে দর্শকের বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং তার ফলে নাট্যরস সৃষ্টি ব্যহত হয়। মােট কথা-নাটক রচনার পূর্বে-নাট্যকার যেন পরিষ্কার ভাবে জবাব দিতে পারেন—কোন চরিত্র তাঁর কাহিনীর নায়ক ;-তার নাটকের ঘটনা- প্রবাহের গতি হবে কোন পথে। নাটকে ক্রিয়ার ঐক্য (Unity of action) অথবা ঘটনা সমূহের এক- মুখী গতি অত্যন্ত প্রয়ােজনীয়। আর একদিকে নাট্যকারের দৃষ্টি মকবি গিরিশচন্দ্র
No text on this page.
মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৭ রাখা প্রয়ােজন—সে হ’ল শিল্পধর্মী ঐক্য বা Artistic unity। যে নাটক খুব গুরুগম্ভীর আরম্ভের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে, শেষ হয় হাস্য- রসে...অথবা যে নাটক অতি হাল্কা, অতিশয় লঘু পরিবেশের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে বিয়ােগান্ত পরিণতি লাভ করে—সে ধরণের নাটক সাধারণত দর্শককে তৃপ্তি দিতে পারে না। নাটক হাস্যরসাত্মক হবে— অথবা বিয়ােগান্ত হবে-নাটকের সূচনাতেই যেন দর্শক তার খানিকটা আভাষ পায়। তা নইলে হাস্যরস থেকে করুণরসে, কিম্বা করুণ হাস্যরসে নাট্যকার যদি তার সৃষ্টিকে টেনে নিয়ে যান নাটকের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সে দ্রুত পরিবর্তন দর্শক কখনও খুসীর সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেনা। যদি কোনও নাটকে নাট্যকার হাস্য- ब्रम এবং করুণরস দুই-ই রাখতে চান তাহলে হয় হাস্যরসকে প্রাধান্য দিয়ে করুণরসকে করতে হবে গৌণ, এবং নাটকের সমাপ্তিও করতে হবে হাস্যরসাত্মক, অথবা হাস্যরসকে করুণরসের অনুবর্তী রেখে যবনিকা ফেলতে হবে করুণরসের মধ্যে। থেকে আজকাল অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, নাটকে গল্পকে কতখানি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আগের কালে নাটকের প্রধান কাহিনীর অন্তর্গত আরও দুই তিনটি মিশ্র কাহিনী স্থান পেত। আজকাল দর্শকের বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই চান—মাত্র একটি প্রধান কাহিনীর নাট্যরূপ। বিভিন্নদেশের এবং বিভিন্নকালের মানুষের চাহিদাও বিভিন্ন ধরণের। যেমন, আজকের দিনেও আমেরিকা ও ইংলণ্ড...য়ুরােপের অন্যান্য দেশের চেয়ে নাটকের কাহিনীকে প্রাধান্য দেয় বেশী। ফরাসী, রাশিয়ান বা জাৰ্মাণরা চরিত্র সৃষ্টি নিয়েই ব্যস্ত ; নাটকে কাহিনী খুব সামান্য থাকলেই হল। এই অঞ্চ, কোন ফরাসী নাটক ইংলণ্ডে মঞ্চস্থ
১৮
মঞ্চে ও নেপথ্যে
করতে হলে, তাতে খানিকটা গল্পের সংমিশ্রণ করে নেওয়া দরকার
হয়ে পড়ে ; নইলে ইংরেজ দর্শকেরা তার অভিনয় দেখে পূর্ণ তৃপ্তি
পান না।
একথা খুবই সত্য যে, নাটকের গল্প জোরালো হলে নাটকের অন্যান্য
অনেক দৈন্যও চাপা পড়ে যায়। সাধারণ দর্শকের প্রধান আকর্ষণই
হ’ল গল্প।
এমন কি এই বিংশশতাব্দীতেও Shakespeare এর
Macbeth, Hamlet বা Tempest প্রভৃতি নাটক যে বিপুল দর্শক
আকর্ষণ করে তারা সবাই কাব্য ও চরিত্র সৃষ্টির দ্বারা আকৃষ্ট হয়
--তাদের আকর্ষণ করে ঐ সব নাটকের গল্পাংশ।
অঙ্ক ও দৃশ্য বিভাগ নয়। নাটকের ঘটনাকে অঙ্ক ও দৃশ্যে বিভক্ত করা হয় কেন? নাট্য- কারের কাজ হ’ল দর্শক মনে বিরতি-বিহীন-কৌতুহল সৃষ্টি। সুতরাং আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, নাটকীয় ঘটনার মাঝখানে অঙ্ক ও দৃশ্যের বিভাগ না এনে, যদি একটানা ভাবে ঘটনাকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বােধ হয় দর্শক নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ লাভ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা দর্শক-মনের ধারণাশক্তিরও একটা সীমা আছে, বিশ্রাম না দিয়ে বহুক্ষণ দর্শকের মনকে আটকে রাখলে–দর্শক মন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে। অভিনয় ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, এক ঘণ্টার চেয়ে বড় বিরাম বিহীন একাঙ্ক নাটক ( সমস্ত নাটকীয় গুণ থাকা সত্ত্বেও ) দর্শককে ক্লান্ত করে ফেলেছে। দর্শককে খানিকটা বিশ্রাম দেবার জন্যে নাটকে মাঝে মাঝে বিরতি ও দৃশ্য পরিবর্তনের প্রয়ােজন। নাটক যত বেশী ঘটনা বহুল হবে, তাতে যত বেশী চরিত্র সৃষ্টি থাকবে... তার অঙ্ক ও দৃশ্য বিভাগও সেই অনুপাতেই হবে। নাটকীয় ঘটনার স্থান এবং কাল যে নাটকে যতটা পরিবর্তিত হবে--তদনুযায়ী সেই নাটক তিন, চার বা পাঁচ অঙ্কে বিভক্ত হবে। তবে এই কথাটি সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, অঙ্ক মধ্যে দৃশ্য পরির্তন যত কম করা যায়—ততই ভাল। কারণ দৃশ্য পরিবর্তনে যতটুকুই সময় যাক না কেন—তার ফলে নাট্যকার যে ইন্দ্রজাল রচনা করে দর্শককে বিমুগ্ধ করতে চেষ্টা করেন—সেই ইন্দ্রজাল বা illusion খানিকটা কেটে যাবেই। অবশ্য আধুনিক কালে দৃশ্য পরিবর্তন অত্যন্ত দ্রুত করবার ST 8 Carany Revolving, Wagon 97: Sinking Stage [ 791, শকট ও ডুবরী (?) মঞ্চ ) প্রবর্তিত হয়েছে। আমাদের দেশে প্রথম দুইটি, অর্থাৎ ঘূর্ণী ও শকট মঞ্চে অভিনয় আরম্ভ হয়েছে। কিন্তু মঞ্চে ও নেপথ্যে তাহলেও নাট্যকারের উচিত-অঙ্কমধ্যে বিভিন্ন দৃশ্য বিভাগ যত দিয়ে নাটকীয় ইন্দ্রজাল সৃষ্টিকে অব্যাহত রাখা। অঙ্ক মধ্যে দৃশ্য পরিবর্তন না করে, প্রতি অঙ্কের বিরতি মধ্যে সম্ভব মত দৃশ্য পরিবর্তন করলে নাটক দর্শককে বেশী খুসী করে। অঙ্ক বিরতির মধ্যে দৃশ্য পরিবর্তন করলে, illusion নষ্ট হয় না তাছাড়া দশকের চোখও নূতন দৃশ্যের অবতারণায় অনেকখানি তৃপ্তি পায়। নাট্যকারকে ঘটনার সময় পরিবর্তন নিয়ে বড়ই বেগ পেতে হয়। কথাশিল্পী তাঁর উপন্যাসের ঘটনা সম্বন্ধে বলতে পারেন-“নায়ক নায়িকা বসে গল্প কচ্ছিল। গল্প করতে করতে এক ঘটা কেটে গেল।” কথাশিল্পী আধ মিনিটের কথায়...মাত্র দু’ট লাইনে...নায়ক নায়িকাকে দিয়ে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু নাটকের নায়ক যদি আধ মিনিট কথা বলেই তারপর বলে...এই তো এক ঘণ্টা ধরে কথা কইলুন”—তাহলে দশকের নায়কের সময়ের জ্ঞান দেখে হেসে উঠবে। কাজেই নাট্যকারকে এমন ভাবে ভাবে ঘটনা সংস্থাপন করতে হবে—এমন ভাবে চরিত্র সৃষ্টি করে কথার জাল বুনতে হবে যাতে করে মুগ্ধ-দশক-মন সময়ের ব্যবধান ভুলে যায়। এরূপ নাট্যকৌশল অত্যন্ত কঠিন। তাই অধিকাংশ নাট্যকার অঙ্ক বিভাগের বিরতির মধ্যে সময়ের পরিবর্তন করিয়ে নেবার চেষ্টা করেন। প্রথম অঙ্কের সামান্য পাঁচ মিনিট বিরতির পর, দ্বিতীয় অঙ্কের সূচনায় যদি বলা হয় সেই থেকে এক মাস কেটে গেছে”... তাহলে দর্শক সেই পাঁচ মিনিট বিরতিকেই এক মাসের ঘটনার ব্যবধান বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে না। সময়ের সমস্যা ছাড়া, নাটকীয় চরিত্রের বেশ বা রূপসজ্জা পরিবর্তনের অবকাশের জন্যও অনেক সময় অঞ্চ বিরতির প্রয়ােজন হয়।
মঞ্চে ও নেপথ্যে নাটকের কোন্ অঙ্ক কত দীর্ঘ হবে সে সম্বন্ধে কোন নিয়মকানুন বেধে দেওয়া চলে না। তবে সাধারণত নাটকের প্রথম এবং শেষ অঙ্ক-মধ্যবর্তী অঙ্ক বা অঙ্কগুলির চেয়ে অন্য রকম হয়। নাটকের প্রথম অঙ্ক কৌতূহল সৃষ্টি করে—মধ্যবর্তী অঙ্ক বা অঙ্কগুলি সেই কৌতূহলকে সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় বা বাড়িয়ে তােলে—শেষ অঙ্কে কৌতূহল একবারে চরম অবস্থায় উঠে যায় এবং নাটকের যবনিকা নেমে আসে। প্রথম অঙ্কে থাকে চরিত্রের অবতারণা, চরিত্রের যেটুকু অতীত ইতিহাস প্রয়ােজন সেইটুকুর বর্ণনা; এই প্রথম অঙ্ক থেকেই নাটকীয় চরিত্রকে হতে হবে একটা সুনির্দিষ্ট পথে গতি- এত কিছুর সমাবেশ করতে হয় বলেই-সাধারণতঃ প্রথম অঙ্কটা হয় সব চেয়ে দীর্ঘ। শেষ অঙ্কে নাটক অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চরম অবস্থায় এসে পৌছায় ; তাই শেষ অঙ্কটা হয় অন্য সব অঙ্কের চেয়ে ছোেট। শীল।
কয়েকটী বিশেষ নির্দেশ নাট্যকার কি ভাবে নাটক আরম্ভ করবেন এ বিষয়ে এ বিষয়ে তাঁকে যথেষ্ট ভাবতে হবে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। গােটাকতক ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক চরিত্র ব্যতীত নাটকে এমন বহু চরিত্র থাকতে পারে, যাদের কার্যকলাপ সম্বন্ধে দশক আগে কিছুই জানে না। সুতরাং নাটক আরম্ভ হবার সঙ্গে সঙ্গেই যত শীঘ্র সম্ভব-দর্শকদের জানিয়ে দেওয়া দরকার, চরিত্রগুলির পরিচয় কি, ঘটনার স্থান কোথায় এবং সময় কি, এবং তাছাড়া নাটকের চরিত্রগুলির অতীত ইতিহাস কি ; অর্থাৎ বর্তমানের সঙ্গে তাদের অতীতের কোন্ সম্বন্ধ নাটকীয় ঘটনার সঙ্গে বিজড়িত। ; নাটকে কোন্ চরিত্র বা ঘটনার ওপর জোর (enaphasis) দিতে হবে সে বিষয়ে নাট্যকার গােড়াতেই অবহিত হবেন। বার বার বলে, অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, অথবা বিশদভাবে বর্ণনা করে—উক্ত ঘটনা বা চরিত্রের প্রাধান্য এবং বৈশিষ্ট্য দর্শককে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। নাটক রচনার সময় নাট্যকারকে ভাবপ্রবণ হলে চলবে ।...কল্পনার স্রোতে ভেসে গেলে নাট্যকারের সৃষ্টি ব্যর্থ হবে। নিজের মন সম্পূর্ণ আয়ত্বের মধ্যে রাখতে হবে ; কোন্ চরিত্র বা ঘটনাকে কতটুকু প্রাধান্য দিতে হবে সে বিষয়ে নাট্যকার যদি সর্বদা সচেতন না থাকেন—পূর্ণাঙ্গ নাট্যরস-সৃষ্টি তাহলে কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না। চরিত্র, পরিস্থিতি (situation) বা কোনও বিশেষ কথার ওপর প্রাধান্ত আরােপ করবার একটা উপায় হল-উল্টো ধরণের (contrasting) চরিত্র, পরিস্থিতি বা কথাকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করে দেখান। কালাে পশ্চাৎ পটে রূপালী ছবি যেমন খােলে মঞ্চে ও নেপথ্যে তেমন আর কিছুতে নয়। মেলােড্রামায় এই সাদা কালাের পাশাপাশি সমাবেশ প্রায় আগাগােড়া দেখতে পাওয়া যায়। চরিত্রের বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে মেলােড্রামার কাহিনীর নায়ককে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তাই মেলােড্রামায় হিরো বা নায়ককে অনেক সময় দেখতে পাই—একেবারে আদর্শ চরিত্ররূপে, ভিলেন (Villain) হয় একেবারে মনুষ্যত্ব বজ্জিত, এবং নায়িকা হয়...পবিত্রতার প্রতিমূর্তি। উল্টোধরণের সিচুয়েশন বা পরিস্থিতির অবতারণা দ্বারা নাটককে বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় করা যায়। ধরুন, কোন নাটকের নায়কের বিবাহ স্থির হয়েছে। কিন্তু সহসা নায়কের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল অথবা সে এমন একটা সংবাদ পেল—যার ফলে তার পক্ষে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচিত পাত্রীকে বিবাহ করা অসম্ভব হয়ে দাড়াল। কন্যাপক্ষ এসব ব্যাপারের কিছু জানতে পারল না। তাদের আমরা পরবত্তী দৃশ্যে দেখতে পেলুম-মহা উৎসাহের সঙ্গে বিবাহের আয়ােন নায়ক তার দুঃসংবাদটী অর্থাৎ বিবাহে তার অস্বীকৃতির কথা জানাতে সেখানে এসে হাজির হল। কিন্তু কি করে সে কন্যাপক্ষকে সহসা এত বড় নিৰ্ম্মম আঘাত দেবে-কি ভাবে কথার অবতারণা করবে...বুঝতে না পেরে চুপ করে দাড়িয়ে রইল। কন্যার পিতা বা অন্য কোন নিকট আত্মীয় নিঃসন্দিগ্ধ মনে নায়ককে আশীর্বাদ করলেন—তাদের ভাবী বিবাহিত জীবনের সুখশান্তি কামনা কল্লেন। ভেবে দেখুন এরূপ পরিস্থিতি দ্বারা নাটক দর্শক মনকে কতখানি ভাবােদ্বেল করে তুলতে পারে। কষ্ট্রে। দর্শক মনে আগ্রহ (Interest) সৃষ্টি নাটকের একটা প্রধান গুণ। নাটক আরম্ভ হবার সঙ্গে সঙ্গেই আগ্রহ জাগবে—এরপর কি হবে ২৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে তা জানবার জন্যে। দৃশ্যের পর দৃশ্যে এই জানবার আগ্রহ বা interest ক্রমেই বেড়ে চলবে। একটী অঙ্ক শেষ হলে, পরের অঙ্ক কতক্ষণে আরম্ভ হবে-সে জন্য দর্শক সাগ্রহে প্রতীক্ষা করবে। নাটকের শেষ যবনিকায় এই আগ্রহ চরমে (Climax) পৌছে যাবে। যেখানে আগ্রহের অবসান-নাটকেরও সেখানেই সমাপ্তি। গােড়া থেকে আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত এই ভাবে আগ্রহকে বর্ধিত করে নেওয়ার মানেই, নাটককে আদ্যোপান্ত গতিশীল করা। অবিল্লাম গতি বা Movement নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই নাটকীয় গতি নির্ভর করে...নাট্যকারের বিষয়বস্তুর সম্বন্ধে সুস্পষ্ট অনুভূতির ওপর, যথাযােগ্য ঘটনা বা চরিত্রকে উপযুক্ত প্রাধান্য দেবার ওপর, এবং তৃতীয়তঃ আগ্রহ সৃষ্টির ওপর। পূর্বেই বলেছি, দর্শকের জানবার কৌতূহল বা আগ্রহকে শেষ যবনিকা পৰ্যন্ত বাড়িয়ে তুলে নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য কখনাে কখনো কতকগুলি বিষয় দর্শকের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়। তাই বলে, বিষয়গুলি দর্শকের কাছে আগাগােড়া ধোঁয়াটে করে রাখলে, দর্শক নাটকের কাহিনী অনুসরণ করতে পারেন না; তার ফলে নাটকের গতি প্রবল হওয়া দূরে থাকবরং জটিল এবং মন্থর হয়ে পড়ে। তাই সেই লুকোনাে ঘটনা বা কথা যথাযোগ্য স্থানে দর্শকের নিকট একে একে উপস্থাপিত করতে হবে। আগ্রহ ও বিস্ময় (Suspense and Surprise) উভয়ের অবতারণা দ্বারা দর্শককে চরম ভাবে অভিভূত করা যায়। যার সম্বন্ধে আগে খানিকটা জানা যায় বা আভাষ পাওয়া যায়, তাকে আরও বেশী করে জানবার জন্যেই আগ্রহের সৃষ্টি। সুতরাং আগ্রহ জন্মাতে মঞ্চে ও নেপথ্যে হলে, আগে থেকে দর্শককে খানিকটা প্রস্তুত করে রাখতে হবে। বিস্ময় বা Surprise নাটকের ভেতর আবির্ভূত হয় অতি আকস্মিক ভাবে। কোন দ্য হয়তাে নাটকের নায়ককে হত্যা করবার জন্য পাহাড়ের ওপর দিয়ে তার পিছনে ছুটে যাচ্ছে । খানিক দূর গেলে সামনে আর পথ নেই ; দ্য নায়ককে প্রায় ধরে ফেলবার উপক্রম করেছে ; নায়কের বাঁচবার আর কোন উপায় নেই। দর্শকের মন নায়কের বিপদে নায়কের বিপদে অতিশয় চঞ্চল হয়ে উঠেছে, হয়তো মনে মনে প্রার্থনা জানাচ্ছে, “হে ভগবান! কোন রকমে নায়ককে তুমি রক্ষা ঠিক সেই মুহূর্তে, পাহাড়ের সঙ্কীর্ণ পথে, পশ্চাদ্ধাবনকারী দ্য যদি পা পিছলে একেবারে নীচে গড়িয়ে পড়ে যায়,-দর্শকেরা আনন্দে কোলাহল করে ওঠে; নায়ক সেই অতর্কিত বিস্ময়ের আবির্ভাবে অর্থাৎ দর সেই অতর্কিত পদস্থলনে-রক্ষা পেয়ে যায়। নাটকে এইরূপ আবির্ভাবকেই বলা হয়, বিস্ময় বা Surpriseএর অবতারণা। মেলোড্রামায় Surprise এর স্থান খুব বেশী । উচ্চস্তরের নাটকে Surprise বা বিস্ময়ের পরিবর্তে বেশীর ভাগ থাকে Suspense বা আগ্রহ। ;
চরিত্র সৃষ্টি ঘটনার চমৎকারিত্ব সাধারণ দর্শককে অভিভূত করে ; মধুময় সংলাপ প্রশংসা অর্জন করে; কিন্তু নাটককে স্থায়ী মূল্য দেয় বা অমর করে রাখে...তার অনুপম চরিত্র সৃষ্টি। আজ পর্যন্ত যে কয়জন নাট্যকার জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন—তাদের সাফল্যের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে সবার আগে নজরে পড়বে-চরিত্র সৃষ্টির অসাধারণ দক্ষতা। নাটকে দুই রকমের চরিত্র পাওয়া যায় ; পূর্ণাঙ্গ চরিত্র এবং আংশিক বা জাতি-রূপ-বাচক চরিত্র (Type character)। মানুষের চরিত্রের নানাবিধ রূপ বা অংশ আছে। তার ভেতর থেকে, কোন একটি বা সমধর্মী একাধিক অংশকে বেছে নিয়ে যে চরিত্র সৃষ্টি করা যায়- তাকেই বলা যায় চরিত্রের জাতিরূপ ;-নাটকে সেই ধরণের চরিত্রকে বলি আমরা “টাইপ” চরিত্র। মেলোড্রামা এবং হাস্য-রসাত্মক নাটকের কারবার সাধারণতঃ “টাইপ চরিত্র নিয়ে। এই ধরণের চরিত্রে জটিলতা থাকেনা; পাপী যে, সে বরাবর পাপী ; পুণ্যশীল সৰ্ব্বদা যােল আনা পুণ্যশীল। তাদের ভেতর অন্য কোন বিপরীত হৃদয়- বৃত্তির আবির্ভাব হয় না, জীবনে তাদের বিভিন্ন চিত্ত ধৰ্ম্মের সঙ্গত সৃষ্টি হয় না। তাই টাইপ চরিত্র রচনা করাও যেমন সহজ, দর্শকের পক্ষে তার রূপ অনুধাবন করা এবং কাৰ্য কলাপ অনুসরণ করাও তেমনি সহজ। টাইপ চরিত্র যদিও দর্শককে প্রচুর আনন্দের থােক যােগায়- তাহলেও সত্যিকারের নাট্যস্রষ্টা কেবলমাত্র টাইপ চরিত্র রচনা করে তৃপ্ত হতে পারেন না। তার মনে প্রেরণা জাগে, মানব চরিত্রের এক একটা বিশেষ অংশ নিয়ে বিভিন্ন টাইপ চরিত্র সৃষ্টি করার পরিবর্তে, মঞ্চে ও নেপথ্যে ২৭ ; পূর্ণাঙ্গ চরিত্র সৃষ্টি করবার। বিশেষতঃ বাস্তব নাটকে টাইপ চরিত্র অাধুনিক দর্শককে আর তেমন খুসী করতে পারে না। কাহিনী যদি আমাদের বাস্তব জীবনের হয়-তাহলে সে নাট্য-কাহিনীর চরিত্র- গুলিকে আমরা আংশিক চরিত্র রূপে দেখতে চাইনা ; আমরা চাই তাকে রক্ত মাংসে গড়া মানুষ রূপে দেখতে। আমরা চাই এমন মানুষ...যার জীবনের মুহূর্তগুলি কখনাে আনন্দরসােদ্বেল, কখনও বা গভীর বেদনায় মুহমান ; সে মানুষ চলার পথে ভুল ভ্রান্তি করে, আবার শুধরে নেবারও চেষ্টা করে ; সে পূর্ণাঙ্গ দেবতাও নয়, দানবও নয়। ; সে আমাদের এই মাটীর পৃথিবীর নিছক মানুষ। নাটকে বাস্তব জীবনের কাহিনী বর্ণনা করতে হলে সে নাটকের চরিত্র গুলিকেও হতে হবে—সম্পূর্ণ বাস্তব। এই প্রসঙ্গে একটা কথা স্মরণ রাখা দরকার। পূর্ণাঙ্গ চরিত্র সৃষ্টি এবং মনস্তত্ব বােধ ঠিক এক জিনিষ নয়। পূর্ণাঙ্গ চরিত্র সৃষ্টি করতে হলে মানব চরিত্রের যে সব হৃদয় বৃত্তির সঙ্গে আমরা সর্বদা পরিচিত নাট্যকারকে সেই বৃত্তিগুলির সমন্বয় করে নিয়ে, তার সাহায্যে চরিত্র সৃষ্টি করতে হবে। মনস্তত্ববি-নাট্যকার শুধু সেই হৃদয় বৃত্তিগুলির সমন্বয় সাধন করেন না; তিনি মানব চরিত্রে এমন সব নূতন নূতন অংশের আবিষ্কার করেন—যা সাধারণ মানুষের জ্ঞান বা ধারণার বাইরে। অপূর্ব নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্যে, তিনি তার চরিত্রের এক একটা লুকোনাে অংশে আলোকপাত করেন—মানবচরিত্রের সেই অন্তর্নিহিত রূপটি দর্শকেরা তার আগে কখনাে কল্পনাও করতে পারে না। অধিকাংশ সুলিখিত নাটকে পুর্ণাঙ্গ চরিত্র সৃষ্টি দেখতে পাওয়া যায় ; কিন্তু মনস্তত্ত্ব বা Psychologyর সন্ধান পাওয়া যায়—কেবলমাত্র শ্রেষ্ঠ নাটকে।
২৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে চরিত্রের বিভিন্ন জটিল অংশ নাটকে সর্বদা স্থান পাবে কিনা এ বিষয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করেন। কোন নাটকের নির্বাচিত পাত্র পাত্রীকে মানবচরিত্রের গােটাকতক বিশেষ অংশ দিয়ে গঠন করলেই হয়তাে সেই নাটকের প্রয়ােজন সিদ্ধ হতে পারে। যেমন ধরুন- শচীন সেনগুপ্তের “ঝড়ের রাতে” নাটক। কাহিনীর নায়ক-আপন- ভােলা প্রফেসর প্রশান্ত। প্রশান্ত বই পড়ে, গবেষণা করে। ঘরে সুন্দরী স্ত্রী বিজলী। বিজলীর দিকে তার এতটুকু অশ্রদ্ধা বা বিতৃষ্ণা নাই, অথচ সে তার গবেষণা নিয়ে এমনি মত্ত যে বিজলীকে নারী হিসাবে তার প্রাপ্য—সে কখনও দেয়নি। ট্রাজেডী এইখানে! এবং এই ট্রাজেডীর সুযােগ নিয়ে অতর্কিতে তাদের জীবনে বিরাট আলােড়ন উপস্থিত করল...ঝড়ের রাতের অভ্যাগত বন্ধু প্রভঞ্জন। সদা-প্রশান্তচিত্ত প্রশান্ত’, ঝঙ্কারমত উদ্দাম বিলাতফেরৎ ‘প্রভঞ্জন, বিজলীর মত চোখ ধাঁধানো রূপ ও বুদ্ধির প্রখরতা•••এবং বিজলীর মতই তীব্র অন্তর্দাহময়ী নায়িকা বিজলী! চরিত্র সৃষ্টি হিসাবে এরা প্রত্যেকে সুন্দর হলেও, এদের ভেতর মানবচরিত্রের সবগুলি অংশের সন্ধান পাইনে। নাটকের পরিস্থিতি মধ্যে যে কয়টা অংশের অবতারণা বা অভিব্যক্তি প্রয়ােজন হয়েছে নাট্যকার শুধু সেই কয়টা বিশেষ চারিত্রিক অংশ দিয়ে এদের নিৰ্ম্মাণ করেছেন। যে নাটকে চরিত্র সৃষ্টিই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়—সেখানে নাটকীয় প্রয়ােজন অনুযায়ী চরিত্রের কয়েকটা বাছাই করা অংশের অবতারণা করলেই চলে; আর••একমাত্র চরিত্র-সৃষ্টিই নাট্যকারের উদ্দেশ্য হলে- চরিত্রের ছােটখাট সমস্ত দিকগুলিই নানাভাবে দেখাবার প্রয়ােজন হয়। জগদ্বিখ্যাত নাট্যকার Galsworthy এক যায়গায় বলেছেন- মঞ্চে ও নেপথ্যে ©Character is situation”–“চরিত্রই নাটকীয় পরিস্থিতি।” কথাটা খুব সত্য। পরিস্থিতির উদ্ভব হয় কোথা থেকে ? নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে?—পরিস্থিতি কখনাে আপন হতে তৈরী হয় না—তাকে তৈরী করে নাটকের চরিত্র। নিজের মনের বিভিন্ন বৃত্তির সঙ্গে, সমাজ-ধৰ্ম্ম বা পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে ; অথবা অন্য কোন চরিত্রের সঙ্গে তার যখন সঘাত উপস্থিত হয় সেই সভঘাতের ফলই হ’ল নাটকীয় পরিস্থিতি। তাই চরিত্রের সামান্য পরিবর্তন হলে, সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়ে যায়। চরিত্র সৃষ্টি নাটকের প্রাণশক্তির যে কতখানি—তা বলে শেষ করা যায় না। যে কোন প্রথম শ্রেণীর নাটকের কথা ভেবে দেখুন, তা থেকে চরিত্রের বিভিন্ন ব্যঞ্জনা বাদ দিলে নাটকের আকর্ষণ আর কতটুকু থাকে? উদাহরণ স্বরূপ, শরৎচন্দ্রের “দেনাপাওনার” নাট্যরূপ “যােড়শীর” কথা ভাবুন। যােড়শীর গল্পাংশ মুখে বলতে গেলে কত সামান্য বা অকিঞ্চিৎকর! সে গল্পের মাধুৰ্য কত- টুকু!...অথচ অপরূপ চরিত্রব্যঞ্জনা, অতুলনীয় মনস্তত্ত্ববােধ কাহিনীটীকে এমন দ্রুত তালে এগিয়ে নিয়ে যায় যে, সমস্ত দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মত শেষ যবনিকা পর্যন্ত অভিনয় দেখতে বসে থাকেন। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলছি ; শ্রেষ্ঠ চরিত্র-নাটক হিসাবে শরৎচন্ত্রের নাট্যকাহিনীর বিষয় উল্লেখ করলুম, অথচ রবীন্দ্রনাথের কোন নাটকের উল্লেখ করলুম না কেন—এই প্রশ্ন কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তার জবাব—আমি মঞ্চের সাফল্যমণ্ডিত নাটকের আলােচনা কছি; বিশ্বকবির নাটক মঞ্চসফল নাটক নয়। একমাত্র “চিরকুমার সভা” এবং “শেষরক্ষা ব্যতীত তার অন্য কোনও নাটকের রস দর্শক সাধারণ উপলব্ধি করতে পারেনি। তার একটা ০ মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রধান কারণ হয়তো এই-রবীন্দ্রনাথের অতি সূক্ষ্ম রসবােধ রঙ্গমঞ্চের দশক মনে রসের আবেদন উপস্থিত করতে পারে না। উপন্যাস, কাব্য প্রভৃতি পুনঃ পুনঃ পাঠ করে, তার রস আস্বাদন করা চলে ; কবি এবং ঔপন্যাসিক পাঠকের সঙ্গে থেকে দুরূহ স্থানগুলি নিজে বুঝিয়ে দেন। কিন্তু নাট্যাভিনয়ে সে অবকাশ নেই...একবার শােনা বা একবার মাত্র দেখার সঙ্গে দর্শক মৰ্ম্মোপলব্ধি করতে না পারলেই মঞ্চনাটক ব্যর্থ হয়ে যায়। সব দেশের সব কালের মানুষের বসবােধ সমান নয়...এবং একই দেশে একই কালে সব মানুষের বসবােধও সমান নয়। মঞ্চনাটক সৰ্বসাধারণের অথবা জনগণের বৃহত্তম অংশের বােধগম্য হওয়া দরকার। এই বিশেষ শ্রেণীর বােধগম্য নয় বলেই রবীন্দ্রনাথের বিরাট সৃষ্টি আমাদের মঞ্চে সাফল্য অর্জন করেনি। চরিত্র সৃষ্টির পূর্বে নাট্যকারকে কল্পিত চরিত্রটির যথার্থরূপ মনে মনে বিশদভাবে চিন্তা করে নিতে হয়। চরিত্রটির কোন্ কোন্ হৃদয় বৃত্তি দর্শকের সামনে বিশেষভাবে পরিস্ফুট করতে করতে হবে... সেই চরিত্রের কোন পরিস্থিতিতে কি কাজ করা স্বাভাবিক, কি কাজ করা অসঙ্গত, সে বিষয়ে নাট্যকারের পূর্ব হতেই সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়ােজন। নূতন নাট্যকারেরা চরিত্রের বিভিন্ন দিক খুব ভাল করে না ভেবেই, অনেক সময় তাদের নাটকের মধ্যে এনে ছেড়ে দেন। নাটকের চরম মুহূর্ত বা climax উপস্থিত হলে, দর্শকের মনে চুড়ান্ত উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, অনেক সময় চরিত্রটাকে দিয়ে এমন কথা বলা, বা এমন কাজ করা, যা নাকি চরিত্রটাকে যেভাবে গড়ে তােলা হয়েছে...তার পক্ষে যুক্তিসিদ্ধ নয়। উত্তেজনা- ময় নাটকীয় পরিস্থিতির মাঝখানে চরিত্রের সেই অসামঞ্জস্য সাময়িক মঞ্চে ও নেপথ্যে ভাবে হয়তাে বা দর্শকের চোখে না পড়তে পারে; কিন্তু নাট্য- কারের পক্ষে এটা যে সৃজন-ক্ষমতার দৈন্য • সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। নাটকে “প্রবেশ” ও “প্রস্থান” (exits & entrances) চরিত্র ব্যঞ্জনায় যথেষ্ট সাহায্য করে। নাটকের কোন চরিত্র কখন প্রথম দেখা দেবে—তা নির্ভর করে চরিত্রের গুরুত্বের ওপর...এবং সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তার সম্বন্ধে পূৰ্বে দর্শক মনকে কতটা তৈরী করে রাখা হয়েছে। নাটকের নায়ক নায়িকাকে সাধারণতঃ আগে চোখের আড়ালে রাখা হয় ; যখন দর্শক তাদের দেখবার জন্য অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে ওঠে, সেই নাটকীয় মুহূর্তে হয় তাদের প্রথম আবির্ভাব। যে চরিত্রের প্রাধান্ত যত বেশী, নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সে তত বেশী বিজড়িত থাকে। সুতরাং তাকে হাজির করবার আগে তার সম্বন্ধে দর্শককে বহুপূর্ব থেকেই যথেষ্ট সচেতন করে রাখতে হয়। বলা বাহুল্য যে, দর্শককে প্রধান চরিত্রের আগমন বিষয়ে সচেতন করে রাখে নাটকের পূৰ্বাগত অপরাপর চরিত্র তাদের কপার সাহায্যে•••তাদের কাৰ্য-কলাপে। “প্রবেশের” গায় “প্রস্থানও চরিত্র-রূপায়ণে যথেষ্ট সাহায্য করে। উদাহরণ স্বরূপ, Hamlet নাটকের Ghost Scene Hamletএর প্রস্থান কত- খানি সঙ্কেতময় ভেবে দেখুন। অথবা বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখরের” প্রতাপ যেখানে মৃদুহেসে “আমার প্রয়োজন আছে”•••শুধু এই কথাটি বলে প্রস্থান করে। সেই প্রস্থানের ইঙ্গিতটুকু মনে করে দেখুন। নূতন লেখকেরা নাটকে চরিত্র আমদানী করতে বিশেষ বাদ বিচার করেন না। একটা বা দুটা সাধারণ কথা বলবার জন্যেও নূতন নূতন মঞ্চে ও নেপথ্যে চরিত্রের অবির্ভাব হয়ে থাকে। এই সব অনাবশ্যক চরিত্র নাটকের সাবলীল গতির পথে কেবল বাধা জন্মায়। নাট্যকার একটু সতর্ক হলে, এই সব চরিত্র অনায়াসে বাদ দিতে পারেন এবং যে সামান্য দু’একটা কথা বলাতে তাদের নাটকে টেনে এনেছিলেন তা নাটকের অপরাপর চরিত্রের মারফতে প্রকাশ করতে পারেন। নাটকের প্রয়ােজন সিদ্ধির জন্যে যে কয়টী চরিত্রের অবতারণা একান্ত অপরিহার্য্য, শুধু তারাই নাটকে স্থান পাবে এবং সেও শুধু নাটকীয় প্রয়ােজন সিদ্ধির সময় টুকু পর্যন্ত। চরিত্রের প্রয়ােজনীয় কাৰ্য শেষ হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে নাটক থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।
নাট্যকার শচীনাথ নাট্যকার মন্মথ রায় নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচাৰ্য সংলাপ নাটকীয় সংলাপ বা dialogue এর প্রথম কাজ ••অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘটনা বর্ণনা করা। শ্রোতার নিকট সংলাপ স্পষ্টরূপে বােধগম্য না হলে, কাহিনী অনুসরণ করা সম্ভব হয় না; ফলে আগ্রহ ও কৌতুহল কমে যায়। অনেক সময় আবার এমনও দেখা যায় যে, সংলাপ হয়তো বােধগম্য হয়েছে•••কিন্তু কথার বাঁধুনি তেমন মনােরম নয় বলে- নাটকের রস পুরােপুরি উপলব্ধি করা যাচ্ছেনা। কাজেই, শুধু ঘটনার বর্ণনা করলেই তাকে নাটকের উপযােগী সংলাপ বলা চলে না; তাকে হতে হবে সুনিৰ্বাচিত, মনােরম। আগেই বলেছি, উচ্চাঙ্গের নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য—অনুপম চরিত্র সৃষ্টি। আমরা নাটকীয় চরিত্রকে বুঝতে পারি তার কথায় বা সংলাপে এবং কাজে। সংলাপ চরিত্রের আসল রূপটা আমাদের চোখের সামনে ধরে দেয় এবং সেই সঙ্গে নাটকের ঘটনাগুলি বুঝিয়ে দেয়। উচ্চাঙ্গের সংলাপ বলব তাকে.. যার মধ্যে ঘটনা বর্ণনার প্রচেষ্টা নেই; চরিত্র ব্যঞ্জনাই যার প্রধান লক্ষ্য। সংলাপে চরিত্র সার্থকভাবে অঙ্কিত হলে—সেই চরিত্রের ভেতর দিয়েই আমরা নিজেদের অজ্ঞাতসারে নাটকের ঘটনা যথাযথরূপে বুঝতে পারি। নাট্যকার যে সংলাপ রচনা করেন—সে তার নিজের কথা নয় ; তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির কথা। নাটকীয় চরিত্র ও নাটকের দর্শক- এদের দু’জনকার মাঝখানে নাট্যকার হলেন—ভাবের বাহক। চরিত্রের মনােভাবগুলি তিনি সংলাপের সাহায্যে দর্শক এবং শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। বর্তমান কালে সমস্যামূলক বা Problem Playর বহুল প্রচলন ৩৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে হয়েছে। এই সব সমস্যামূলক নাটকে এবং অতি আধুনিকতম তথাকথিত গণ-নাট্যে দেখা যায়—চরিত্রগুলি নানা বিষয় বিচার কচ্ছে, তর্ক কচ্ছে, অভাব জানাচ্ছে, দাবী জানাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই চরিত্রের এই সব বিচার বিতর্কের ভিতর নাট্যকারের নিজস্ব মতবাদ সুস্পষ্ট হয়ে হয়ে ওঠে। চরিত্র যা বলে তা তার চরিত্রোপযােগী নয় ; মনে হয় নাট্যকার কতকগুলি চরিত্র দাড় করিয়েছেন, তাদের মুখ দিয়ে কেবল নিজের কথাই বলাবার জন্যে। সমস্যামূলক নাটক বা গণনাটক দেশের যথেষ্ট উপকার করতে পারে সন্দেহ নাই। এ ধরণের নাটক রচনা করতে হলে নাট্য- কারকে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে ; সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ভাবে বিভাের হয়ে, তিনি চরিত্র সৃষ্টি করতে ভুলে না যান। চরিত্রের সংলাপ যেন ঠিক ভাবে চরিত্রের উপযােগী হয়। বর্তমানের চলতি ভাষায় নাটকের সংলাপ রচনা কৰ্তব্য—এই ভ্রান্ত ধারণা অনেক প্রতিষ্ঠাবান নাট্যকারের মধ্যেও রয়েছে। যে ধরণের ভাষা আধুনিক কালের সাহিত্যে ব্যবহৃত হচ্ছে অথবা নাট্যকার নিজে যেভাবে কথা বলতে ভালবাসেন—ঠিক সেই ভাষায় চরিত্রের সংলাপ রচনা করতে তারা প্রবৃত্ত হন। যিনি নিজে গুরুগম্ভীর ভাষার পক্ষপাতী , তার নাটকের রাজা মহারাজা থেকে আরম্ভ করে দূত, প্রতিহারী পর্যন্ত বিরাটকায় সমাসবদ্ধ ভাষায় কথা বলবে—এর চেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে? সভাপণ্ডিত যত খুসী সমাসবদ্ধ ভাষায় কথা বলুন, রাজা রাজোচিত ভাষায় বলুন, এবং দূত প্রতিহারী তাদের নিজস্ব সমাজের ভাষা ব্যবহার করুক- তবে তাে বলব তাকে নাটকীয় সংলাপ ! আমাদের দেশে চরিত্রের তারতম্য মঞ্চে ও নেপথ্যে অনুযায়ী সংলাপের তারতম্য মহাকৰি গিরিশচন্দ্রের নাটকে যত দেখা যায় তেমন বােধ হয় আর কোনো নাটকে নেই। “নীলদর্পণ” রচয়িতা দীনবন্ধু ও এইদিক দিয়ে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে রসরাজ অমৃতলাল বােসের “যাজ্ঞসেনী” নাটকের উল্লেখ কচ্ছি। এই নাটক রচনার সময় গুপ্ত-কবির অনুপ্রাস রসরাজকে এমন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে—তার মত দক্ষ নাট্যশিল্পীও চরিত্র সৃষ্টির চেয়ে প্রাধান্য দিয়ে বসেছেন—অনুপ্রাস বা Alliterationকে। যাজ্ঞসেনীর শকুনি বলছেন : “গান্ধার-সন্ধান শিখে নাই অবন্ধুর বাসী।” অর্জুন বলছেন : “উর্ধে, উর্ধে, উর্দ্ধে ততােধিক ভূলােক দ্যুলােক পারে গােলােক আলােকে কমলারে হেরি, যার অমল। তুলনা, চিরাভীষ্ট। সেই কৃষ্ণা- দৃষ্টির দীপ্তিতে উত্তপ্ত করিয়া মাের জীবনের শক্তি ইত্যাদি। অনুপ্রাস অমৃতলালকে এমন আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল বলেই—নিজে একজন শ্রেষ্ঠ নট, শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হয়েও—“যাজ্ঞসেনী” নাটকে তিনি দর্শকদের পরিপূর্ণ আনন্দ দিতে পারেননি। নাটকের সংলাপ রচনা করবার সময় বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে মিশে মঞ্চে ও নেপথ্যে গিয়ে তাদের ভেতর থেকে নাট্যকারকে কথা বলতে হবে। সংলাপে সাহিত্যিক-মূল্য আরােপ করবার লােভ সম্বরণ করতে হবে। কোন সাহিত্যিকের চরিত্র হলে-একমাত্র তারই মুখে শশাভা পায়...সাহিত্যিক-সংলাপ বা literary dialogue! সুস্পষ্ট সংলাপ নাটকের পক্ষে প্রয়ােজনীয়, সে কথা আগে বলেছি। স্পষ্টতার সঙ্গে ভাষার সংযম ও নাট্যকারকে বিশেষরূপে আয়ত্ব করতে হবে। প্রয়ােজনীয় কথা ব্যতীত আর কোন কথা নাটকে ঠাই পাবে না; একটা প্রয়ােজনীয় কথা বললে যেখানে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়—সে কথাটীর দ্বিরুক্তি করাও চবে। བ། | কথার ভারে নাটকের গতি যেন কোথাও মন্থর হয়ে না যায়। নাটকের চরিত্রের মঞ্চে রূপদান করবার জন্যে রয়েছেন নট-নটী। তাঁরা ভাবের অভিব্যক্তি দিয়ে—অথবা মূক অভিনয়ের সাহায্যে চরিত্র রূপায়ণে নাট্যকারকে যে সহায়তা করেন—কথাসাহিত্যিক সর্বদা সে সাহায্য হতে বঞ্চিত হন। তাই কথাসাহিত্যের চরিত্রের পক্ষে যে সংলাপ বিশেষ আবশ্যক--নাটকে তা ঢের বেশী সংক্ষিপ্ত হলে নাটকীয় চরিত্রের কোন ক্ষতি হয় না। Dumas এক যায়গায় বলেছেন-“নাটক লেখার সময় কতগুলি শব্দ ব্যবহার করতে হবে তা নিয়ে মুস্কিল নয়...মুস্কিল হ’ল কতগুলি শব্দ ব্যবহার করতে হবে —তাই নিয়ে।” দীর্ঘ স্বগত ও পরােক্ষ উক্তি (Soliloguy & Aside) নাটক থেকে প্রায় উঠে যাবার উপক্রম হয়েছে। কারণ এরূপ সংলাপ বড়ই অস্বাভাবিক। কোন চরিত্র পরােক্ষে উক্তি কচ্ছে, তার মানে এই যে, তার সংলাপ পার্শ্ববর্তী চরিত্রটা শুনতে পাবে না। অথচ এমনি মঞ্চে ও নেপথ্যে ৩৭ •০ বিচিত্র, অভিনেতাকে সেই সংলাপ প্রেক্ষাগৃহে সৰ্বশেষ আসনে উপবিষ্ট দর্শককেও শোনাতে হবে। দীর্ঘ স্বগত উক্তিও অস্বাভাবিক কারণ, একটা চরিত্র অনর্গল বলে যাবে—আর পার্শ্বের চরিত্রটা চুপ করে দাড়িয়ে থাকবে কতক্ষণে দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ হবে এই আশায় মানুষের জীবনে আমরা এরূপ ঘটতে দেখি না।••• সেকালে নাটকের স্বগত উক্তি বা পরােক্ষ সংলাপ চরিত্র ব্যঞ্জনায় যথেষ্ট সাহায্য করতে। সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু বাস্তব- জীবনে এরূপ উক্তি অস্বাভাবিক বলে—নাটকে এর পরিবর্তে মূক অভিনয় স্থান পেয়েছে। আগের কালে যেখানে স্বাগত বক্তৃতা চত...এখন সেখানে চরিত্রের মূক অভিনয় বা ভাব অভিব্যক্তির সঙ্গে প্রয়ােজন মত সামান্য দু’একটা হর্ষ বা বিষাদসূচক ধ্বনি (Exclamation) যােগ করে—একই ধরণের প্রয়ােজন সিদ্ধ হয়।
নাটক ও দর্শক দর্শকের রুচিকে উপেক্ষা করে মঞ্চ-নাটক অভিনীত হতে পারে না। দর্শক কোন্ জিনিষ পছন্দ করে—কোনটা করে না—এ জ্ঞান নাট্যকার মাত্রেরই থাকা প্রয়ােজন। এককালে নাটক পাঁচঘণ্টা কি তারও বেশী সময় অভিনীত হত, এখন সেখানে আড়াইঘণ্টা বা তিন ঘণ্টা দাড়িয়েছে। তার কারণ কি ? কারণ এই, যে—বর্তমানের দর্শক ওর বেশী সময় এক জায়গায় বসে অভিনয় দেখতে অস্বস্তি ও ক্লান্তি বােধ করেন। বেশী বড় নাটকের অভিনয় দেখতে দর্শকের আজকাল ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটে বলেই নাটকের কাহিনী আড়াই বা তিনঘন্টার মত সংক্ষিপ্ত হয়েছে। সুতরাং নাট্যকারকে দর্শকের চাহিদার ওপর নির্ভর করতে হয় অনেকখানি। কিন্তু তা বলে সৰ্বতােভাবে দর্শকের ইচ্ছানুযায়ী নাটকের নিজস্ব গতি নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। যে নাটকের স্বাভাবিক পরিণতি বিয়ােগান্ত বা tragic, দর্শকের ইচ্ছানুযায়ী তাকে জোর করে মিলনান্ত করা কোন নাট্যকারের পক্ষে শ্লাঘার বিষয় নয়। হয় তাে সাময়িকভাবে তখন দর্শকেরা খুসী হয়ে বাহবা দেবে ; কিন্তু তবু জোর করে মধ্যপথে বা শেষ অঙ্কে গতি ফিরিয়ে দেওয়া মানে নাটককে হত্যা করা ; আর্টকে হত্যা করা। নাটকীয় চরিত্রকে তার স্বাভাবিক ধর্মপালন করতে দিতে হবে। তার নাটক তখনই হবে বিয়ােগান্ত, যখন চরিত্রগুলি তাদের কাৰ্য্য প্রণালী দ্বারা সেই চরম বিয়ােগ বেদনার সৃষ্টি কচ্ছে; তখনই হবে নাটক মিলনান্ত, যখন চরিত্রগুলির মধ্যে সেই পরমতম মিলনের সুর ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। ; শ্রেষ্ঠ নাট্যকার কখনও দর্শক রুচির দাসত্ব করেন না। তবু দশকের মনােবৃত্তির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকা দরকার। সাধারণ দর্শকের শতকরা নব্বই জনই যে কোনাে নাটক দেখতে এসে মঞ্চে ও নেপথ্যে নাটকের ভাবের (idea) চেয়ে চরিত্রগুলিকে পছন্দ করে বেশ এবং চরিত্রের চেয়ে ঘটনা বা কাহিনীকে পছন্দ করে আরাে বেশী। কিন্তু তা বলে কোন একটা বিশেষ ভাব বা সমস্যা নিয়ে নাটক রচনা না করে নাট্যকার কেবল চরিত্র ও কাহিনী প্রধান নাটক লিখবেন –আমি একথা বলছি না। সাধারণ দর্শক, চরিত্র ও কাহিনী- প্রধান নাটক পছন্দ করে বলে—সমস্যামূলক নাটক রচনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সে ধরণের নাটক দর্শককে তৃপ্তি দিতে পারে যদি সেই বিশেষভাব বা সমস্যাটী চরিত্র বা কাহিনীর ভেতর দিয়ে সুকৌশলে ব্যক্ত করতে পারেন। নাট্যকার যে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছুতে চান তাকে সেখানে যেতে হবে:::দর্শক তাকে যে রায় যেতে বলছে সেই রাস্তা ধরে। নাট্যকারের হয়তাে কোন একটা চরিত্রকে সব চেয়ে ভাল লাগল। তিনি তাকেই নায়করূপে অঙ্কিত করলেন। কিন্তু ভাল করে ভেবে দেখা উচিত, তিনি যে চরিত্রটীকে নায়করূপে গড়ে তুললেন, দর্শকের পরিপূর্ণ সহানুভূতি তার দিকেই কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকছে কি না। হয়তাে এমনও হতে পারে, ধীর-গম্ভীর সেই নায়ক- চরিত্রের পাশাপাশি আর একটী এমন হাল্কা ধরণের চরিত্র রয়েছে যাকে নাট্যকার নায়করূপে গড়ে তােলেননি; অথচ সে তার হাসি, গান, আনন্দ দিয়ে দর্শককে অভিভূত করে ফেলল-নায়ক তলিয়ে গেল:: গােটা নাটকখানা ব্যর্থ হয়ে গেল। নাটকীয় চরিত্র যে সব কাজ কচ্ছে—তা সে কেন কচ্ছে, তার কাজের হেতু কি.কেন সে একাজ না করে অন্য রকম কাজ কচ্ছে —এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক সময় নাট্যকার এবং দর্শকের মধ্যে ৪• মঞ্চে ও নেপথ্যে মতান্তর ঘটে এবং তার ফলে নাটক মূল্যহীন হয়ে পড়ে। কাৰ্যকারণ সম্পর্কটা দর্শক যদি বুঝতে না পারে, সে নাটক কিছুতে অভিনয়ে জমতে পারে না। নাট্যকার হয় তাে মনে মনে জানেন—তার চরিত্র ঠিক কাজই কচ্ছে, সে একটুও ভুল পথে যায়নি—কিন্তু পরিষ্কারভাবে নাট্যকারের মনের এই সত্য সত্য ধারণাকে প্রমাণ করে দেখালে দর্শক তা মেনে নিতে রাজী নয়। সবাই যদি জানে “আমি মিছে কথা বলছি”—তখন “আমি সত্য বলছি” বলে বারবার প্রতিবাদ করবার যেমন কোনাে মানে হয় না; তেমনি দর্শকের কাছে কাৰ্য-কারণ সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিশ্বাসযােগ্যভাবে বর্ণিত না হলে চরিত্রের কোন কাৰ্যই সে সত্য বলে মেনে নিতে রাজী নয়। আগেই বলেছি দর্শক-রুচির দিকে লক্ষ্য রেখে নাটক রচনা এবং দর্শকের দাসত্ব করা এক কথা নয় ; নাট্যকার তঁার ভাবের দিক থেকে থাকবেন স্বাধীন ; সেই ভাবকে যে রূপ দেবেন—তা যেন হয় দর্শকের পছন্দ অনুযায়ী। কারণ, আমি যে নাট্যকারের বিষয় আলােচনা কচ্ছি তিনি মঞ্চের এবং মঞ্চ হ’ল দর্শকের।
নাটকের স্বরূপ
নাটকের স্বরূপ কী ? “নাটক” বলতে আমরা কি বুঝি? কোন্
বিশেষ গুণ থাকার দরুণ সাহিত্যের আর সব বিভাগ থেকে একে
একটা আলাদা পর্যায়ে স্থান দেওয়া হয় ?
এই বিষয়ে সামান্য
আলােচনা করে বর্তমান নিবন্ধ শেষ করব।
ফরাসী নাট্য সমালােচক ফাডিনা ব্রুতিয়ার ( Ferdinand
Brunetiere) রঙ্গমঞ্চের সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছেন :
“রঙ্গমঞ্চ মানুষের ইচ্ছাশক্তির প্রসারের ক্ষেত্র ; এখানে প্রতিকূল
দৈব, ঘটনা এবং অদৃষ্টের সঙ্গে লড়াই করে মানব-শক্তি বিস্তৃতি
লাভ করে।” নাটক সম্বন্ধে তিনি বলেছেন : নাটক বলতে আমরা
বুঝি মানুষের মনােবৃত্তির অবিরাম সংগ্রাম। মানুষ প্রতিনিয়ত সংগ্রাম
করে সেই সব অদৃশ্য বা প্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে—যে সব শক্তি
মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে সীমাবদ্ধ ও খর্ব করে রাখতে চায়। নাটকে
দেখিযেন আমাকেই, অথবা আমারই ঠিক পাশের আর একটা
মানুষকে মঞ্চের ওপর তুলে দেওয়া হয়েছে—সমাজনীতি, কুসংস্কার,
মূঢ়তা, সমস্ত কিছুর সঙ্গে অবিরা লড়াই করতে।
বহির্জগতের সমস্ত পারিপার্শিকের সঙ্গে, আবার
বহুক্ষেত্রে নিজের
মনের সঙ্গে।
এ সতঘর্ষ
স্কচ, নাট্য সমালােচক উইলিয়াম আর্চার (William Archer)
ব্রুতিয়ারের মতবাদ সম্বন্ধে সমালােচনা করে বলেছেন :
সতঘর্ষ বা condict অধিকাংশ নাটকের ভেতর থাকতে পারে ;
৪২
মঞ্চে ও নেপথ্যে
কিন্তু প্রত্যেক নাটকেই থাকবে তার কোন মানে নেই।
যে নাটকে
সঘর্ষ অর্থাৎ বিপরীত কোন শক্তির সঙ্গে লড়াই রয়েছে, সে নাটকে
প্রত্যেক দৃশ্যেই যে সঘর্ষ থাকতে হবে
হবে অথবা প্রত্যেক চরিত্রই
সতঘর্ষময় হবে—একথাও বলা চলে না।
সর্ষ মানুষের জীবনের একটা মস্তবড় নাটকীয় ব্যাপার এবং
প্রায় প্রত্যেক নাটকেই একভাবে বা অন্যভাবে সতঘর্ষ স্থান পেয়ে
আসছে।
কিন্তু তাই বলে নাটকমাত্রেই সঘর্ষ থাকা অনিবাৰ্য্য
অথবা সজর্ষ না থাকলে নাটকের কোনাে আবেদন থাকে না
ব্রুনতিয়ারের এই মত সত্য নয়।
নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা নিদর্শন হল সঙ্কটময় মুহূর্তের (Crisis)
অবতারণা। এক সমস্যার পর আর এক সমস্যায়, এক সঙ্কটের
পর আর এক সঙ্কটে, এক চক্রান্তের পর আর এক চক্রান্তে পতিত
হয়ে নাটকীয় চরিত্রকে চরমতম পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
সঙ্কটময় মুহূর্তগুলি নাটকের প্রধান উপাদান হলেও মানবজীবনের
সকল প্রকার সঙ্কটই নাটকীয় গুণ সম্পন্ন হয় না। মামলা মােকদ্দমায়
জড়িত হওয়া, ক্রমাগত রােগে কষ্ট পাওয়া, অথবা আর পাঁচজনকার
মত নিতান্ত মামুলী ধরণের বিয়ে করা—এ সব হয়তাে কারুর জীবনে
সমস্যা বা সঙ্কট
বা সঙ্কট হয়ে দাড়াতে পারে ; কিন্তু যেহেতু এগুলি
সত্যিকারের জীবনে “সঙ্কট” হয়েছে,
তাই বলে নাটকীয় “সঙ্কট”
রূপে এদের নাটকে স্থান দিতে হবে...তার কোনাে মানে নাই।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, নাটকীয় গুণসম্পন্ন বলতে কি বুঝব?
মঞ্চে ও নেপথ্যে বুঝব—সেই সব সঙ্কটময় মুহূর্তকে—যেগুলি সৰ্ব্বজনকে অথবা সৰ্ব্ব- জনের বিরাট অংশকে আগ্রহান্বিত, উৎকণ্ঠিত কিম্বা উত্তেজিত করে। ইংরেজ সমালােচক হেনরী আর্থার জোন্স, পূর্বোক্ত দু’টা মতবাদকে মিলিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। তার মতে নাটকে সঙ্কট ও সঘর্ষের অবতারণার অর্থ একই। আঠার নিজেই স্বীকার করেছেন যে, সকল প্রকার সঙ্কট বা সমস্যা, যা নাকি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়, তাকেই যে নাটকে স্থান দেওয়া যায় তার কোন মানে নাই। সব সঙ্কট নাটকীয় না হলেও সকল প্রকার সর্ম কিন্তু নাটকীয় হতে পারে। আর্চার কতকগুলি সঙ্কটময় পরিস্থিতিকে নাটকের প্রধান উপাদান বলেছেন। তিনি সঘর্ষ বা Condictকে আমল দেন নাই। যদি একটু তলিয়ে দেখতেন তাহলেই বুঝতে পারতেন, সঙ্কট বা সমস্যা এলেই তার সঙ্গে সঘর্ষও অনিবার্য। এই সংঘর্ষ কখনাে হয় বহিমুখী, কখনও বা অপ্রত্যক্ষভাবে নিজের কাজ করে যায়। যে সব নাটকে বা দৃশ্যে আর্চার কোন সম্ভবর্ষ নেই বলেছেন, সেখানেও সঘর্ষ আছে অন্তঃসলিলা ধারার মত চোখের আড়ালে। লােহার কাঠামাের ওপর ইট, সুরকী, সিমেন্ট চাপিয়ে বাড়ী তৈরী হলে ভেতরের কাঠামাে চোখে দেখা যায় না; কিন্তু তা বলে তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করলে বা সেই কাঠামােকে বাড়ীর পক্ষে অপ্রয়ােজনীয় মনে করলে-গােটা বাড়ীখানাই যে ধ্বসে পড়বে।
৪৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে কতিয়ারের “সতঘর্ষ” এবং আর্চারের “সঙ্কট”—এই উভয়ের সঙ্গে অবিভাজ্য সম্বন্ধ আছে। নাটকে এর একটা থাকার অর্থ ই আর একটা থাকা। এদের উভয়ের মতবাদকে মিলিয়ে নাটকের স্বরূপ নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা চলে । কোন নাটকীয় চরিত্র, জ্ঞাতসারে হোক, কিম্বা অজ্ঞাতসারে হােক, যখন অপর কোন চরিত্রের, পরিস্থিতির কিম্বা ভাগ্যের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাড়ায় তখনই হয় নাটকের সূচনা। নাটকীয় চরিত্রের চারিপাশে বিপদ কেমন ঘনীভূত হয়ে আসছে, কিম্বা তার অগ্রগতির সামনে বাধা কেমন দুর্লভঘ্য হয়ে উঠছে—এ খবর যখন দর্শকেরা জানতে পারে, বুঝতে পারে, অথচ চরিত্রটা নিজে সেই আসন্ন ঝঞ্চার কোন পূর্বাভাষ পায় না-নাটকের রস তখন আরাে বেশী জমাট হয়ে ওঠে। এই ভাবে নাটকের আরম্ভ হয় ; যতক্ষণ চরিত্র বা চরিত্রগুলি সম্মুখবর্তী সঙ্কটের কথা না জানতে পারে নাটক ততক্ষণ এগিয়ে চলে। এর গতি প্রবলতম হয়ে ওঠে, যখন বিরুদ্ধ- বাদী চরিত্র, পরিস্থিতি অথবা অদৃষ্টের ওপর প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়। এই প্রতিক্রিয়া বা সঘর্ষ হতে পারে বাহিক, মানসিক কিম্বা আত্মার। প্রতিক্রিয়া বা সঘর্ষ সমাপ্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই নাটকেরও গতিপথে নেমে আসে সমাপ্তির যবনিকা। নাটকীয় চরিত্রকে যে সব বাধা অতিক্রম করতে হবে, তা যদি আর একটী সম-বলশালী চরিত্রের ইচ্ছাতেই সৃষ্ট হয়ে থাকে তা হলে সেই উভয় চরিত্রের ইচ্ছাশক্তির সঙ্ঘর্ষ চরম উত্তেজনাময় মূৰ্ত্তি নেয়। এই প্রসঙ্গে নাটক ও মঞ্চ সম্বন্ধে হেনরি আর্থার জোন্স তিনটা অত্যন্ত দরকারী কথা বলেছেন; তার উল্লেখ করলুম :- = মঞ্চে ও নেপথ্যে (১) কোনজাতি সত্যিকারের নাটকের গৰ্ব্ব করতে পারে না। যদি সেই নাটক তার জাতীয় সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত না হয়। প্রত্যেক নাট্যকারের কর্তব্য, মঞ্চসাফল্যের সঙ্গে তার সৃষ্টি যেন সাহিত্যের আসরেও সাফল্যলাভ করে সেই দিকে লক্ষ্য রাখা। নাটক সাহিত্যের পর্যায়ে পড়লে, তার ভেতর দিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা মঞ্চের সঙ্গে পরিচিত হবেন এবং তার ফলে মঞ্চের যথেষ্ট উন্নতির সম্ভাবনা থাকবে। (২) নাটক জনগণকে আনন্দ দেবার জন্য ; কিন্তু এই আনন্দের ভেতর দিয়ে জুন-চেতনার উদ্বোধন করা প্রত্যেক নাট্যকারের চরম লক্ষ্য হওয়া উচিত। (৩) যে দেশে নাটক সম্পূর্ণভাবে মঞ্চের অধীন হয়—নাট্যকার যে দেশে মঞ্চের দাসত্ব করেন—সেখানে নাটকের অবনতি অনিবার্য। নাটক ও নাট্যকারকে যে দেশ ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে— যেখানকার নাট্যমঞ্চ নাটককে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে জানে সে দেশে নাটকের সঙ্গে নাটমঞ্চও পরম গৌরবান্বিত হয়।
No text on this page.
is het even
No text on this page.
| নাট্যাচার্য শিশিরকুমার
-
বাণীবিননাদ নির্মলেন্দু
দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিচালক পরিচালক ( Director) নাটকের পরিপূর্ণ মঞ্চরূপের নিয়ন্ত্র। নাট্যকার নাটক রচনা করেন। পরিচালক প্রথমে সেই নাটক পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পাঠ করেন। তার ভেতর চরিত্রাঙ্কণে যদি কোথাও কোন অসঙ্গতি পান, ঘটনার কাৰ্য-কারণ বর্ণনায় যদি কোথাও কোন অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করেন••অথবা সকল প্রকার সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও যদি কোথাও কোন বাহুল্য, বা অকারণ পুনরুক্তি থাকে, কিম্বা বক্তব্য বিষয়গুলি সৰ্ব্বত্র সুপরিস্ফুট না হয়ে থাকে—তিনি সেই সব ত্রুটী সংশােধন করে নেন। মােটকথা, নাটক মঞ্চে রূপায়িত হবার সময় সবচেয়ে সহজে এবং সবচেয়ে বেশী করে দর্শকের চিত্তাকর্ষক যাতে হয়—পরিচালক তাকে সেইভাবে সাজিয়ে নেন। তাই অনেক সময় দেখা যায়, শ্রেষ্ঠ কবি বা অতি উচ্চস্তরের চরিত্রাঙ্কণদক্ষ সাহিত্যিকের রচনাও পরিচালক অনেক স্থানে মঞ্চের প্রয়ােজন অনুযায়ী পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং পরিবর্জন করেন। এখানে সামান্য পরিবর্তনের একটা উদাহরণ দিচ্ছি : Lord Tennyson রচিত Becket নাটকের প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য পূৰ্বে এইভাবে ছিল : Enter Rosamund de Clifford, flying from Sir Reginald Fitz Urse, drops her veil. Becket. Rosamund de Clifford ! Rosamund. Save me, father, hide me-they follow me and I must not be known. Becket নাটককে মঞ্চে রূপদানের সময় Sir Henry Irving পূর্বোক্ত কথা কয়টীকে এইভাবে সাজিয়ে নিয়েছিলেন।
মঞ্চে ও নেপথ্যে Enter Rosamund de Clifford. Drops her veil. Rosamund, Save me, father, hide me. Decket, Rosamund de Clifford ! Rosamund. They follow me-and I must not be known. কথাগুলিকে এইভাবে সাজিয়ে নেবার আবশ্যকতা কি? Rosaund, নাটকে এই প্রথম দেখা দিচ্ছে, সুতরাং গােড়ায় তাকে দর্শকের সঙ্গে পরিচিত করে দেওয়া প্রয়ােজন। সে বিপদে পড়ে যখন ছুটতে ছুটতে মঞ্চে প্রবেশ করল দর্শকেরা হঠাৎ খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল, ভাবল ‘মেয়েটা কে? সে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই যদি Becket তার পরিচয় দেন “Rosamund de clifford”...তাহলে তার ছুটে আসবার ব্যস্ততার মধ্যে দর্শকেরা হয়ত Becketএর কথা ভাল করে শুনতেই পাবে না –মেয়েটীর পরিচয় সেই ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে যাবে। তাই Irving প্রথম কথা দিলেন Rosamundএর মুখে—“Save me, father, hide me.” “আমায় বাঁচাও বাবা, আমায় লুকিয়ে ফেল”।•••এই কথা কয়টী শুনে দর্শক মেয়েটীর বিষয়ে যখন আরও কৌতূহলী হল, তার পরিচয় জানবার জন্যে আগ্রহশীল হ’ল—ঠিক সেই সময়ে Irving, Becketকে দিয়ে, তার পরিচয় দেওয়ালেন—“Rosamund de Cliford!” এই সামান্য পরিবর্তনের দ্বারা পরিচালক নাটকের উদ্দেশ্য যে অনেক বেশী সফল কল্লেন তা বলাই বাহুল্য। নাটক যথাযথ ভাবে সাজানাে হয়ে গেলে, পরিচালক তার মঞ্চরূপ মঞ্চে ও নেপথ্যে কল্পনা করেন। নাটকের চরিত্রগুলিকে মঞ্চে রূপ দেন অভিনেতা ; দৃশ্য পরিকল্পনাকারী দৃশ্য যােজনা করেন, সুরশিল্পী, দীপক্ষ (Light Extert) প্রভৃতি শিল্পীরা নাটকের বিভিন্ন অঙ্গচ্ছা করেন। পরিচালক এদের কাছে নাটকের চরিত্র ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন, নাটকনিকে তিনি মঞ্চে কিভাবে রূপায়িত করে তুলতে চান— তা বিশদভাবে বর্ণনা করেন। অভিনেতা, সুরস্রষ্টা, দীপদক্ষ প্রভৃতি শিল্পী, পরিচালকের কাছ থেকে নাটকের সমগ্ররূপ এবং তাদের প্রত্যেকের ওপর নাটকের যে যে বিশেষ দিক রূপায়িত করবার ভার পড়েছে সেইগুলি বেশ ভাল করে বুঝে আত্মস্থ করে নেন। তারপর তারা তাদের সাধ্যমত রূপ সৃষ্টি করেন। পরিচালক বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন শিল্পীর সেই খণ্ড খণ্ড রচনাগুলি এক সঙ্গে গোঁথে নেন ; যতক্ষণে তার পরিকল্পিত নাটকের সমগ্র রূপটী চোখের সামনে ধরা না দেয়•••ততক্ষণ শিল্পীদের রচনাগুণির তিনি পুনঃপুনঃ সংস্কার করেন তাদের বারম্বার নির্দেশ দেন। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে পরিচালক নাট্যমঞ্চের প্রধান কর্ণধার। নাট্যকার, অভিনেতা, দৃশ্য-শিল্পী, সুর-শিল্পী, দীপদক্ষ প্রভৃতি প্রত্যেকেই তার অধীনে থেকে তার উপদেশ বা ইচ্ছানুযায়ী কাজ করেন। শিল্পী-মনের একটা বিচিত্র ধর্ম, নিজস্ব সৃষ্টির আনন্দে তারা আত্মহারা হয়ে পড়েন। “আমার কল্পনা সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে”—এই তাে সব শিল্পীর নিত্যকালের কামনা। কিন্তু নাটমঞ্চ বিভিন্ন মনীষীর প্রতিবােগিতার ক্ষেত্র নয়, দিগ্বিজয়ী নৈয়ায়িকের বিচার সভা নয়, অথবা মহারথীদের দ্বন্দ্বযুদ্ধের স্থান নয় ; নাট্যমঞ্চ হল, সমবেত সৃষ্টির মন্দির। এখানে যে রূপ-সৃষ্টি হয়, তাকে বলে Co-operative মঞ্চে ও নেপথ্যে creation! তাই, আত্মহারা খেয়ালী শিল্পীদের সৃষ্টির মধ্যে সমতা (balance) রক্ষা প্রয়ােজন, তাদের বিভিন্ন রচনাকে গ্রন্থিবদ্ধ করে নেওয়া প্রয়ােজন। পরিচালক সেই সমতা রক্ষা করেন, তিনি বহুকে একীভূত করেন বা গ্রন্থিবদ্ধ করেন। নাটকের ভূমিকা বণ্টনের সময় পরিচালককে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। কোন্ অভিনেতা বেশী মাইনে পাচ্ছেন, কে সবচেয়ে অধিক খ্যাতি অথবা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন—ভূমিকা বণ্টনের সময় এইগুলি পরিচালকের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। তাকে ভাবতে হবে- নাটকের বিশেষ বিশেষ চরিত্রের রূপ দিতে কোন্ কোন্ অভিনেতার চেহারা এবং কণ্ঠস্বর বা বাচনভঙ্গী সবচেয়ে বেশী উপযােগী হবে। আমাদের নাট্যমঞ্চে বহুক্ষেত্রেই কিন্তু এ নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা যায়। তরুণ নায়কের চরিত্রে প্রৌঢ় নটকে নির্বাচন চিরাচরিত প্রথা হয়ে দাড়িয়েছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারণ প্রৌঢ় নটের পূর্ব-খ্যাতি ও অভিজ্ঞতা আমাদের পরিচালকদের এমনই মােহ গ্ৰস্ত করে রাখে যে, বাইরের থেকে চরিত্রাপযােগী সুন্দর তরুণ অভিনেতা নির্বাচন করবার প্রচেষ্টা তাদের আর থাকে না। ফলে, নাটকও যথাযথ ভাবে রূপায়িত হয় না, নূতন শিল্পীও গঠিত হয় না। নাটকের মহলার (Rehearsal) সময় অভিনেতা কখন কোন্ কথাটীর ওপর কীভাবে জোর দেবেন—পরিচালক তা ভাল করে বুঝিয়ে দেবেন। কিন্তু সকলের বাচনভঙ্গী বা কোন কথার ওপর জোর দেবার ভঙ্গী ঠিক এক নয়। তাই পরিচালকের নিজের বলবার ভঙ্গীটী অভি- নেতাকে দিয়ে জোর করে আয় করিয়ে নেবার চেষ্টা অনেকস্থলেই পণ্ডশ্রম হয়। বক্তব্য বিষয়টা কীভাবে বলতে হবে—কোথায় কতটুকু মঞ্চে ও নেপথ্যে জোর দিতে হবে–পরিচালক অভিনেতাকে তাই বুঝিয়ে দেবেন এবং অভিনেতার নিজস্ব ভঙ্গীতে সেই কথাগুলাে আদায় করে নেবেন। মহলার সময়, প্রয়ােজন হলে, অভিনেতাকে দিয়ে বক্তব্যটা ঠিকভাবে বলাবার জন্যে নাটকের কথার সঙ্গে সাময়িকভাবে দু'চারটে কথাও যােগ করে দিতে হবে। যেমন, কোন অভিনেতাকে “আবার হাসছ” এই দুটামাত্র কথার দ্বারা এই অর্থ বােঝাতে হবে যে ‘তােমার হাসি শুধু আমার অপমান করবার জন্যে। ওভাবে হাসলে তােমায় আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না-এক্ষুনি অপমানের চরম শিক্ষা দেব।” এই অর্থ বােঝাতে হলে “আবার হাসছ ? ফের ইতরের মত হাসলে এক ঘুসীতে তােমার দাত ভেঙ্গে দেব”—এমনি ধরণের কথা যােগ করে অভিনেতাকে দুই চারদিন মহলা দেওয়াতে হবে। কথা বিশ্লেষণ করে বাড়িয়ে দেবার দরুণ অভিনেতার পক্ষে এইবার “আবার হাসছ” কথা দুটা ঠিকভাবে জোর দিয়ে বলা সহজ হবে। বলার ভঙ্গী তার আয়ত্ব হবার পর, বাড়তি লাইনগুলি কেটে দিয়ে—“আবার হাসছ” নাট্যকারের দেওয়া শুধু এই কথা দুটীকেই বলাতে হবে। মঞ্চের কোন বড় অভিনেতা যেভাবে চলেন, যেভাবে কথা বলেন- নবাগত অভিনেতারা বহুক্ষেত্রেই তাদের হুবহু অনুকরণ করতে প্রয়াস পান। কিন্তু প্রত্যেকের বলার বা চলার ভঙ্গী আলাদা; তাই সে অনুকরণ ব্যর্থ হবেই। আর যদি বা বহুক্লেশে কারুর পক্ষে অনুকরণ করা অনেকখানি সম্ভব হয়...পরিচালক অভিনেতাকে তেমন অনুকরণ বৃত্তি হতে নিবৃত্ত করবেন। কারণ, মঞ্চে যে কথা বলে বা চলে সে তত সেই লােকটী নয় ; সে হ’ল নাটকের চরিত্র। চরিত্রের রূপদান করতে যে ধরণের চলা বা বলা প্রয়ােজন, অভিনেতাকে, সেইভাবে চলতে বা বলতে হবে।
৫৪ মঞ্চ ও নেপথ্যে যারা মঞ্চের অভিনয়ে খানিকটা খ্যাতি অর্জন করেছেন—তারা অনেক সময় চান•••“দর্শকের দৃষ্টি সব সময় আমার ওপর পড়ুক”- এইভাবে দাড়াতে। পক্ষান্তরে যারা নবাগত—তারা অনেক সময় দর্শকদৃষ্টির সামনে ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েন এবং মঞ্চের এককোণে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরিচালকের এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়ােজন। যে চরিত্র যে দৃশ্যে, যে কাজের জন্যে এসেছে•••সেই কাজের গুরুত্ব অনুযায়ী পরিচালক অভিনেতাকে মঞ্চের ওপর দাড় করাবেন এবং ভীতত্রস্ত নবাগত নাতে ভয়ে পেছিয়ে না যায় কিম্বা “অতি অভিজ্ঞ নট মাঝখানে ব সামনে এগিয়ে এসে চরিত্রের চেয়ে নিজের প্রাধান্য দেখাবার সুযােগ না পায়—সেদিকে তিনি সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। নাটকের চরিত্রের মুখে যে কথা দেওয়া আছে, কোন কোন অভিনেতার তার চেয়ে দুএক লাইন বাড়িয়ে বলবার ঝোক দেখা যায়। অথচ তারা ভুলে যা, যে নাট্যকার একখানা গােটা বই লিখলেন- দু’চারটে বাড়তি কথার প্রয়ােজন থাকলে তিনি তা নিজেই বসিয়ে দিতে পারতেন। বিশেষ করে, নাটকখানি যখন পরিচালকের সন্ধানী দৃষ্টিতে পরীক্ষিত হয়ে মঞ্চস্থ হচ্ছে, তখন প্রয়ােজন বুঝলে, পরিচালকও সে কথাগুলি যােগ করে দিতে পারতেন। নাটকের নির্দিষ্ট সংলাপে একটা মাত্র শব্দ বাড়িয়ে নিলেও তাকে বলব, অভিনেতার ক্ষমতার দৈন্য। যেখানে যেটুকুন দেওয়া আছে তারই ভেতর থেকে একটা সমগ্ৰ চরিত্রসৃষ্টি যাতে সম্ভব হয়—পরিচালক অভিনেতাকে সেইভাবে নির্দেশ দেবেন। অনেক সময় সুলিখিত নাটকও তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারে —তার একটা প্রধান কারণ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র চরিত্রগুলির প্রতি মঞ্চে ও নেপথ্যে ; পরিচালক এবং অভিনেতা উভয়েরই অবহেলা। পরিচালকের অবহেলার দরুণ যাকে তাকে ছােট ভূমিকায় নামিয়ে দেওয়া হয় ; আবার দক্ষ অভিনেতাকে তেমন ভূমিকায় নামালে তিনি চরিত্রটাকে যথােচিত রূপদানে তাচ্ছিল্য করেন; পরিচালকও অনেক ক্ষেত্রে সেই আন্তরিকতার অভাব লক্ষ্য করেও বিশেষ কিছু বলেন না। কেবল এই দোষে বহু নাটক দর্শকের সমাদর লাভে বঞ্চিত হয়। মঞ্চে তারা চায় সমগ্রভাবে সুন্দরের প্রকাশ দেখতে—বে কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিকৃত হলে দর্শক ক্ষুব্ধ হয়। সেই একটা বিকৃত অঙ্গ সমস্ত সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টি ব্যর্থ করে দেয়। চরিত্রের যথােচিত রূপদানে আবহ-সঙ্গীত অনেকস্থলে অভিনেতাকে সাহায্য করে। তরুণ তরুণীর লজ্জা-নম্র প্রথম মিলন লগ্নে, অথবা আসন্ন বিরহের ধূসর সন্ধ্যায় •• দুটী বেপথুমান হৃদয়ের অন্তরালে অশ্রু হাসির যে বাঁশরী বেজে ওঠে...তাকে যদি যন্ত্রসঙ্গীতের ভেতর দিয়ে জীবন্ত করে তােলা যায়•••তাহলে অভিনেতা সেই চরম মুহূর্তগুলির আলেখ্য নিৰ্মাণে যে কতখানি অনুপ্রেরণা পান—তা বলে শেষ করা যায় না। উপযুক্ত নাটকীয় পরিস্থিতি রূপায়ণে পরিচালক আবহ- সঙ্গীতের উপর অনেকখানি নির্ভর করতে পারেন। কারণ আবহ- সঙ্গীত দক্ষ অভিনেতাকে অনুপ্রেরণা দেয় ; নবাগতের বহু ত্রুটী-বিচ্যুতি সুরের মায়াজাল রচনা করে দর্শকের দৃষ্টির আড়াল করে রাখে। অভিনেতা, দৃশ্য রচনাকারী, সুরস্রষ্টা, আলােকশিল্পী প্রভৃতি সকলকেই পরিচালক তাদের কাৰ্য্য সম্বন্ধে নির্দেশ দেন। তা হলেই বােঝ যাচ্ছে, পরিচালকের সকল বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়ােজন। কিন্তু একটী মানুষ সকল বিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হতে পারেন না। তাই প্রত্যেক বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তার নিয়মিত আলােচনা ও মঞ্চে ও নেপথ্যে পরামর্শ করা প্রয়ােজন। সব পরিচালক হয়তাে মঞ্চের বিভিন্ন শিল্পীকে একথা বলতে পারেন না, “আমাকে এই জিনিষগুলি ঠিক এইভাবে করে দাও”; কিন্তু প্রত্যেক পরিচালকের এ কথাটা বলতে পারা উচিত, “আমি ঠিক এই ধরণের জিনিষগুলি চাই ; যে ভাবে করতে হয়, তােমরা করে দাও”। যখন সমবেত শিল্পীদের সহযােগিতায় পরিচালক নাটকের অখণ্ড মঞ্চরূপটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে বুঝতে পারেন, অভিনয়ে, সঙ্গীতে, আলােকে, সজ্জায়, সকল বিষয়ে নাটকের রূপ যখন সুসম্পূর্ণ হয়েছে মনে করেন—তখনই তিনি নাটককে দর্শকের সামনে রূপায়িত করবার অনুমতি দেন; তখনই নাটকের শুভ উদ্বোধন হয়।
মঞ্চাধ্যক্ষ ও স্মারক মেশিন যখন চালু হয় অর্থাৎ নাটক যখন নিয়মিত অভিনীত হতে থাকে—সেই সময়টাতে পরিচালকের প্রতিনিধিত্ব করেন মঞ্চাধ্যক্ষ ও স্মারক (Stare manager and Prompter)। এরা দুজনেই মহলার সময় নিয়মিতভাবে উপস্থিত থেকে পরিচালকের ছােট, বড়...প্রত্যেকটা নির্দেশ অত্যন্ত মনোেযােগর সঙ্গে লক্ষ্য করেন এবং আবহসঙ্গীত, আলােক সম্পাত, নেপথ্য কোলাহল এবং প্রতি দৃশ্যে কোন্ কোন্ জিনিষ সাজিয়ে রাখতে হবে অথবা অভিনেতাকে সঙ্গে নিয়ে বেরুতে হবে—সব কথা নাটকের পাণ্ডুলিপিতে এবং অন্যত্র লিখে নেন। স্মারকের ইঙ্গিতে নাটকের যবনিকা ওঠে নামে, 'অভিনয়কালে তিনি অভিনেতার প্রধান সহায়। অভিনেতাকে কথা ধরিয়ে দেবার সময় স্মারক সৰ্ব্বদা এই কথাটা মনে রাখবেন—তিনি নটনটীকে কথা যােগাচ্ছেন, নিজে অভিনয় কচ্ছেন না। তার কণ্ঠস্বর মৃদু, সুস্পষ্ট এবং সম্পূর্ণরূপে ভাবাবেগ বর্জিত হওয়া উচিত। মঞ্চের ওপর থেকে অভিনেতা সেই নেপথ্যচারীর কাছে কণার যােগান পাবেন, মঞ্চে করণীয় কাজগুলি তার মনে না থাকলে সেগুলির নির্দেশ পাবেন ( যা নাকি স্মারক পরিচালকের নির্দেশরূপে পাণ্ডুলিপিতে টুকে রেখেছেন। অভিনেতা নেপথ্যে তাকে দেখতে পাবেন, তার কথা ও ইঙ্গিত বুঝতে পারবেন । কিন্তু দর্শকেরা তাকে দেখবেও না, শুনবেও না। মহলার সময় স্মারক তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ্য করবেন-কোন, অভিনেতার অভিনয় ও বাচনভঙ্গীর বৈশিষ্ট্য এবং ক্ৰটী বিচ্যুতি কোথায়। স্মারক পূর্ব হতে সেই বিষয়গুলিতে সতর্ক থাকলে অভিনয়কালে অভিনেতাকে ৫৮ মঞ্চ ও নেপথ্যে আর কোন অসুবিধা বােধ করতে হয় না ; অভিনেতাকে ঠিক জায়গায় সতর্ক করে দেন। স্মারকতা করতে হলে একটা বিষয় পুনঃপুনঃ চেষ্টা দ্বারা আয়ত্ব করে নিতে হয় ; সে বিষয়টা হল—কথা ধরিয়ে দেবার সময় বইএর দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ না রেখে অভিনেতার প্রতি লক্ষ্য রাখা। নির্দিষ্ট পাতার নির্দিষ্ট স্থানটাতে আঙ্গুল রেখে.. মাত্র এক তাকিয়ে পরের লাইনটী দেখে নিয়েই আবার অভিনেতার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে তাকে কথা ধরিয়ে দিতে হবে। স্মারকের ঠোট নাড়া দেখতে পেলেও অভিনেতা অনেক সময় তার বক্তব্য বুঝে নিতে পারেন, স্মারকের সামান্য ইঙ্গিতটুকু দেখতে পেলে তার করণীয় কাজটুকু মনে পড়ে যায়। বিশেষতঃ নূতন অভিনেতা স্মারককে দেখতে না পেলে অনেক খানি সাহস হারিয়ে ফেলেন। স্মারক নিজেও অভিনেতাকে দেখতে না পেলে তিনি মঞ্চের ওপর কখন কি বিপদে পড়েছেন- কোন বিষয়ে সাহায্য চাইছেন তা জানতে পারেন না। দর্শকের উপস্থিতিতে অভিনেতা যে সাহায্য চান্তাকে তা জানাতে হয় সামান্য চোখের ইঙ্গিতে, বা অতি সন্তর্পণে অঙ্গসঞ্চালন করে। তাই বলছিলুম, স্মারককে কাজ করতে হয় বেশীর ভাগ সময় বইএর দিকে না তাকিয়ে অভিনেতার দিকে চোখ রেখে। মঞ্চাধ্যক্ষ বা Stage managerএর দায়ীত্ব অতি কঠিন। আমাদের দেশে Stage nanagerএর কাজ হল : নটনটী সকলে এসে পৌঁছেছেন কিনা সেই সব খবর নেওয়া এবং এবং দৃশ্যপট সাজানাে হল কিনা যবনিকা ওঠবার আগে একবার মাত্র তার তদারক করা। কাজ আমাদের মঞ্চাধ্যক্ষের করেন না। প্রত্যেক দখে যে যে এর বেশী মঞ্চে ও নেপথ্যে টুকিটাকি জিনিষ লাগবে তা সরবরাহ করবার ভার থাকে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে, দায়ীত্ব বােধনি অতি সাধারণ আর একটা লােকের উপর। তাকে বলা হয়--দ্রব্য সরবরাহকারক বা Requisition a. দৃশ্যের আসবাব পত্র সাজাবার পূর্ণ দায়ীত্ব অশিক্ষিত Shifterদের উপর এবং অভিনেতার সঙ্গে যে যে জিনিষ থাকবে—তা দেখে নেবার ভার আপন-ভােলা অভিনেতার উপর। এই রকম প্রত্যেকটী ব্যাপারে লক্ষ্য রাখবার দায়ীত্ব কিন্তু আর কারও নয়—একমাত্র অথচ, মঞ্চাধ্যক্ষের। ছায়াচিত্রের পরিচালক বহু পরিশ্রমে একখানি ছায়াছবি নির্মাণ সম্পূর্ণ করলেন ; যে মুহূর্তে তার সৃষ্টি ষ্টুডিও থেকে মুক্ত হয়ে রূপালী পর্দায় প্রতিফলিত হল সেই মুহূর্ত হতে সেই চিত্রাভিনয় সম্বন্ধে কারও কোন দায়ীত্ব থাকলাে না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, ঠিক একই পরিবেষ্টনীর মধ্যে ছায়া-চরিত্রগুলি ঠিক একই ভাবে অভিনয় করে যাবে-- আলােকে, সজ্জায়, সঙ্গীতে, ইঙ্গিতে...কোথাও পরিচালকের নির্দেশ এক তিল ব্যতিক্রম হবার সম্ভাবনা থাকলাে না। কিন্তু মঞ্চ-জগতে ছায়া নেই•••এখানে কায়ার রাজত্ব। পদে পদে ভুল ভ্রান্তি এবং বাবা- ধরা পথ হতে ত্রুটি বিচ্যুতিই মানুষের স্বভাব-ধৰ্ম্ম। তাই মঞ্চ-জগতে এমন একজন সদা জাগ্রত প্রহরীর প্রয়ােজন, যিনি প্রত্যেকটি ভুল ভ্রান্তি লক্ষ্য করে তা শুধরে দেবেন এবং মঞ্চ-রূপায়ণ সার্থক...সুন্দর করে তুলবেন। এই জা গ্রত নির্দেশকারীর নাম Stage managger! 'আমাদের দেশে যত নাটক মঞ্চ-সাফল্য লাভ করেনি—তার জন্য অন্তত পক্ষে অর্ধেক দায়ী:•• দায়ীত্ববর্জিত মঞ্চাধ্যক্ষ। একটু অনুসন্ধান করলেই দেখা যাবে, পরিচালক তার শক্তি অনুযায়ী নাটককে মঞ্চরূপ দিতে চেষ্টার ত্রুটি করেন না; এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার মূল্য অল্প নয়। কিন্তু বেশীর ভাগ মঞ্চে ও নেপথ্যে নাটক দীর্ঘ আয়ুর সম্ভাবনা নিয়ে মঞ্চে প্রযুক্ত হলেও, কয়েক সপ্তাহ অভিনয় হতে না হতেই নানাদিক হতে অবহেলা ও অসাবধানতার পথ ধরে তার, মধ্যে অকালমৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসে । এ অকাল মৃত্যুর জন্যে প্রধানতঃ দায়ী মঞ্চাধ্যক্ষ নিজে। মঞ্চাধ্যক্ষের কর্তব্য, মহলার সময় পরিচালক নাটক সম্বন্ধে অভি- নেতাদের যে। যে নির্দেশ দিয়েছেন—তার প্রত্যেকটী খুটিনাটি মনে রাখা ; দৃশ্যের প্রয়ােজনীয় আসবাবপত্র এবং ছােটখাট জিনিষগুলির লিখিত তালিকা তৈরী করে নেওয়া ; প্রত্যেকবার যবনিকা ওঠবার সময় এবং পূর্ব-দৃশ্য অভিনীত হবার সময়...পরবর্তী দৃশ্যের সমস্ত জিনিষ গুলি যথাস্থানে রাখা হয়েছে কিনা, তা নিজের চোখে দেখে নেওয়া। অভিনেতা যখন মঞ্চে প্রবেশ করবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে এসে দাড়িয়েছেন, অমনি তাকে জিজ্ঞেস করবেন—“অমুক জিনিষটী নিয়েছেন ?” দৃশ্য শেষ হলেই অভিনেতার কাছ থেকে আবার জিনিষগুলি ফিরিয়ে নিতে হবে। নইলে, খেয়ালী অভিনেতার ভুলে জিনিষগুলি হারিয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা। অভিনেতার স্মরণ, মনন যা কিছু...সবই চরিত্র সৃষ্টি নিয়ে। জিনিষপত্র চেয়ে নিতে বা ফেরৎ দিতে তঁার পদে পদে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। তাই, সে বিষয়ে তাঁকে সাহায্য করবেন মঞ্চাধ্যক্ষ। পরিচালক নাটকের যে পূর্ণাঙ্গরূপটী পরিকল্পনা করেন এবং প্রথম রাত্রির অভিনয়ে দর্শকের সামনে যে ভাবে তাকে উপস্থাপিত করেন- পরবর্তী অভিনয়ে কোন দিন, কোন একমুহূর্তের জন্যও সেই পূর্ণাঙ্গরূপটা কোথাও এতটুকু পরিম্লান না হয়—সে দায়ীত্ব মঞ্চাধ্যক্ষের। তিনি পরিচালকের প্রতিনিধি ; অভিনয়ের, আলােকসম্পাতের, দৃশ্যসজ্জার, মঞ্চে ও নেপথ্যে আবহসঙ্গীতের কোন ক্ষুদ্র ক্ৰটীও তার দৃষ্টি এড়িয়ে যাবেনা। এমন কি, প্রয়ােজন হলে, তিনি কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করতেও সঙ্কুচিত হবেন । তাই কর্তৃপক্ষেরও উচিত, অভিনয়কালে মঞ্চাধ্যক্ষকে সৰ্ববিভাগের শিল্পীর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব দান করা। মঞ্চ-শিল্পের সাফল্য সমস্ত শিল্পীর সমবেত সাধনার ওপর নির করে ; একটীমাত্র শিল্পীর সামান্য ত্রুটীও সকলের সম্মিলিত প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। প্রতি অভিনয় রাত্রে যাতে কোথাও কারাে এতটুকু ক্ৰটী না হয়, সামান্য ভুলে নাট্য-রস সৃষ্টির প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ না হয় - এইই সদা-সতর্ক মঞ্চাধ্যক্ষের একান্ত প্রয়ােজন।
অভিনেতা নাট্যকার চরিত্র সৃষ্টি করেন ; বইএর পাতার সেই চরিত্র কেমন করে মঞ্চে রূপ নেবে, সে বিষয় পরিকল্পনা করেন এবং নির্দেশ দেন পরিচালক ; অভিনেতার কাজ হ’ল, চরিত্রকে দর্শকের চোখের সামনে মঞ্চে জীবন্ত ভাবে রূপায়িত করা। অভিনেতা চরিত্রকে জীবন্ত করেন কথায়, ভাবব্যঞ্জনায়, অঙ্গভঙ্গীতে এবং কার্য্যে। দর্শক না থাকলে রঙ্গমঞ্চ চলে না ; দর্শকের জন্যেই নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা এবং মঞ্চ-সংশ্লিষ্ট সমস্ত শিল্পী। দর্শক, নাটকের চরিত্রগুলিকে চোখে দেখতে আসেন, তাদের কথা কানে শুনতে চান্। তাই অভিনেতার প্রথমতম কর্তব্য হল—কথা এমন স্পষ্টভাবে বলা, যাতে নিম্নতম শ্রেণীর দর্শকেরাও তা শুনতে পান। কথাকে সুস্পষ্ট করতে হলে, কি ভাবে এবং কখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়—সবার আগে প্রয়ােজন সেই কৌশলটী আয়ত্ত্ব করা। নূতন অভিনেতাদের প্রধান দোষ, ছােট ছােট কথাগুলিকে অবহেলা করা। অথচ সেই ছােট কথা বা কথার ভগ্নাংশগুলিকে যদি পূর্ণ মৰ্য্যাদা দেওয়া যায়--তা হলে বড় কথাগুলি আপনিই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেকে পূরো দম নিয়ে অভিনয় আরম্ভ করলেও কথার একেবার শেষ দিকটা অস্পষ্ট করে ফেলেন; আবার কেউ কেউ কথা ধরবার মুখে এমন তাড়াহুড়াে করে বলেন, যাতে সংলাপ মাঝামাঝি যায়গায় না আসা পর্যন্ত তিনি যে এতক্ষণ কথা বলছিলেন, দর্শকেরা তা বুঝতেই পারেন না। এক নিঃশ্বাস বেশী কথা বলার ফলেই এই অস্পষ্টতা। যথাযথ ভাবে বাক্যাংশ ভাগ করে নিয়ে প্রত্যেক বাক্যাংশ বলবার সময় নূতন নিঃশ্বাস নিয়ে এমন ভাবে কথা বলা অভ্যাস করতে হয়—যেন ।
মঞ্চে ও নেপথ্যে কথার মানে কোথাও পাল্টে না যার—অথচ প্রতেকটা বাক্যাংশ বলার পরও খানিকটা নিঃশ্বাস অবশিষ্ট থাকে। খুব চেঁচিয়ে কথা বললেই নে লােকে তা সব সময় শুনতে পারবে, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কথা স্পষ্ট ও শ্রোতব্য হয়—শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের কৌশল অনুযায়ী। অভিনেতার নিঃশ্বাস যে শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি করে, সেই তরঙ্গই কথাকে দূর দূরান্তরে বহন করে নেয়। সুতরাং খুব চেঁচিয়ে কথা বললেও তা বহু দূরে পোঁছুতে পারে না- যদি না তাকে বহন করে নেবার জন্যে...সঙ্গে থাকে-বক্তার সুনিয়ন্ত্রিত শ্বাস- প্রশ্বাস। এই নিয়ন্ত্রণ কৌশলটা যিনি আয়ত্ব করতে পারেন, তিনি অতি মৃদুস্বরে কথা বললেও বায়ু-তরঙ্গে ভেসে সে কথা যথা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পোঁছুবেই। নবাগত অভিনেতাদের একটী প্রধান দোষ মঞ্চের নায়ক বা “হিরাে” অভিনেতার বাচনভঙ্গী, এমন কি কণ্ঠস্বর পর্যন্ত হুবহু অনুকরণ করবার প্রচেষ্টা। প্রত্যেক চরিত্রের বাচনভঙ্গী স্বতন্ত্র। এমন কি, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একই চরিত্রের বাচন ভঙ্গীও বিভিন্ন প্রকার হওয়া উচিত। যে পরিস্থিতিতে যে চরিত্র...যে প্রকার মনােভাব প্রকাশ করতে চান—তার বাচন ভঙ্গীও তদনুযায়ী রূপান্তর গ্রহণ করবে। উদাহরণ স্বরূপ মিস্ জেনে ভাইভ, ওয়ার্ডের (Miss Genevieve Ward ) একটা বিখ্যাত একাঙ্কিকা থেকে সারাংশ উদ্ধার করে দিচ্ছি। নবাগতা অভিনেত্রী:..“এদিকে এস”•••মাত্ৰ এইদুটা কথার সাহায্যে বিভিন্ন মনােভাব কেমন প্রকাশ করতে পারেন-থিয়েটারের ম্যানেজার তাই পরীক্ষা কচ্ছেন। ম্যানেজার। মনে মনে কল্পনা করে মায়ের সামনে এসে দাড়িয়েছে ৬৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রেমিক প্রেমিকা ;—তারা চায় তার কাছে আসন্ন-মিলনের সম্মতি। নায়ক অতি দরিদ্র, কিন্তু নায়িকার মাতা আভিজাত্য গর্বিতা; এ মিলন প্রার্থনা তার মনে দারুণ সম্বৰ্ষ ঘটালাে। শেষ পর্যন্ত কিন্তু তিনি ওদের দু’বাহু বাড়িয়ে ডাকলেন--- অভিনেত্রী। এদিকে এসাে। ম্যানেজার। ছােট্ট মেয়েটা এমন একটা কাজ করে ফেলেছে যাতে মায়ের বিরক্তির অবধি নেই। তিনি ডাকলেন- অভিনেত্রী। এদিকে এসাে। ম্যানেজার। ঐ মেয়েটী যদি তার সপত্নী-কন্যা হয় তাহলে বলতেন- অভিনেত্রী। এ দিকে এসে। ম্যানেজার। ছােট মেয়েটা রাস্তায় গেছে, ঠিক সেই সময় খুব জোরে একখানি গাড়ী আছে। মায়ের বুক ভয়ে কেঁপে উঠল। তিনি ডাকলেন- অভিনেত্রী। এদিকে এসাে। ম্যানেজার। দেশের জন্য সংগ্রাম করতে গেছেন গৃহস্বামী। স্বদেশ তাকে চেয়েছে ; তাই চোখের জলে ভেসে তাকে বিদায় দিতে হয়েছে। আজ শূন্য গৃহে, নিরানন্দ সংসারে, একমাত্র সাত্বনা তার সন্তানগুলি। সেই সন্তানদের বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরেন ; তাদের ডেকে বলেন- অভিনেত্রী। এদিকে এসাে।
নরেশ মিত্র
--
শমী বাণীবালা
শ্ৰীমতী সরবালা
মঞ্চে ও নেপথ্যে ম্যানেজার। যুদ্ধ জয় করে অবশেষে বিজয়ী যােদ্ধা গৃহে ফিরে আসছেন। দূর থেকে তাঁকে দেখতে পেয়েই, আনন্দ-ব্যাকুল- কণ্ঠে ছেলে মেয়েদের ডাকলেন— অভিনেত্রী। এদিকে এসাে। ম্যানেজার। দীর্ঘ অদর্শনের পর আজ বিজয়ী স্বামীর সঙ্গে প্রথম মিলন। এ আনন্দের অংশ তিনি আজ আশে পাশে যারা আছে, সবাইকে বিলিয়ে দিতে চান্। তাই স্বামীর বিশ্বস্ত ভূতটীর প্রতি চোখ পড়তেই তাকে ডাকলেন- অভিনেত্রী। এদিকে এসো। ম্যানেজার। আগুণ লেগে যথাসর্বস্ব পুড়ে গেছে। পােড়াবাড়ীর দরজায় পাওনাদারেরা এসে ভীড় জমিয়েছে। ওদের চীৎকার শুনে উঠে দাড়াল অনাথা বিধবা ; তার স্বামীর অর্ধদগ্ধ মৃতদেহ এখনাে সামনে পড়ে। ওদের বৰ্ব্বর নিষ্ঠুরতাই অভাগিনীর স্বামীর মৃত্যুর কারণ। কিন্তু তবু এখনাে ওদের পৈশাচিক অত্যাচার ক্ষান্ত হ’ল না ! এখনাে বলে, “আমাদের টাকা দাও।” মেয়েটা জবাবে, এখন তার যা শেষ সম্বল, তার স্বামীর সেই মৃতদেহটা দেখিয়ে দিল ;-ওদের নিদ্রতা কেমন চরম সীমায় পৌঁছেছে তাই দেখিয়ে বলল- অভিনেত্রী। এদিকে এসাে। সামান্য দুটী শব্দ•••বাচনভঙ্গীর তারতম্য অনুসারে তারতম্য অনুসারে কত বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারে: • •একাঙ্কিকার উল্লিখিত অংশ তার চমৎকার উদাহরণ।
মঞ্চে ও নেপথ্যে নিজের ভূমিকা অভ্যাস করবার সঙ্গে সঙ্গে খুব ভালভাবে মনে করে রাখা দরকার-অপরের কথার সূত্র (Cue) আয়ত্ব না থাকলে ঠিক যে মুহূর্তে যে কথাটা বলা দরকার—তা সময় মত বলা হয়ে তার ফলে অভিনয়ের গতি অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়ে। মঞ্চাভিনয়ের দ্রুতগতি মানে দ্রুত কথা বলা নয়-কথার সূত্রগুলি খুব তাড়াতাড়ি ধরে নেওয়া। ওঠে না ; অভিনয় কালে প্রতি দৃশ্যে যে কয়জন অভিনেতা মঞ্চে উপস্থিত থাকেন তাদের সর্বক্ষণ কথা বলতে হবে। নাট্যকার যে চরিত্রের মুখে যখন কোনাে কথা দেননি- তাকেও তখন কথা বলতে হবে...চোখের সাহায্যে, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভেতর দিয়ে...ভাবাভিব্যক্তির দ্বারা। একটা চরিত্র যখন কোন কিছু বলছে, অন্য চরিত্র হবে তখন তার শ্রোতা। শ্রোতা যখন মুখে কথা বলে না—সে তখন মনে মনে নিস্ক্রিয় থাকতে পারে না। সেই মনের ক্রিয়াকেই তখন বাইরে ব্যক্ত করতে হবে, নির্বাক অভিনয়ে। কোন কোন অভিনেতার স্বভাব.••অভিনয়ের সময় দর্শকের দিকে তাকানাে•••এমন কি তাদের সম্বােধন করে এক আধটা কথা বলা। এ অভ্যাস অত্যন্ত নিন্দনীয়। অভিনয়ের সময় ভুলে যেতে হবে- সামনে দর্শক বসে রয়েছে। অভিনয়ের এক একটা দৃশ্য•••সে যেন নাটমঞ্চের ফ্রেমে বাঁধানাে এক একটা জীবন্ত-চিত্র। দর্শকের সঙ্গে সবাক অথবা নির্বাক কথা বলা মানে—ফ্রেমের বাইরে এসে দাড়ানাে ; তার মানে-গােটা ছবিখানিকে নষ্ট করে দেওয়া। আর একটা বিশেষ দরকারী কথা স্মরণ রাখতে হবে ; বিয়ােগান্ত মঞ্চে ও নেপথ্যে চরিত্র ফুটিয়ে তোেলবার জন্য করুণ রস সৃষ্টির “পষ্ট।" অভিনেতার সব সময় ত্যাগ করা উচিত। নাটকের চরিত্রের ভেতর যদি সত্যিই করুণ রস থাকে—তা অতি সহজে স্বাভাবিক ভাবে আপনিই প্রকাশ বে। তাকে চেষ্টা করে বাইরে আনবার কোনো ওয়ােজন হয় না। সংযত, ইঙ্গিতপূর্ণ অভিনয়ে নাটকের অন্তনিহিত কারুণ্য যেমন করে দশককে অভিভূত করে তেমন আর কিছুতে নয়। নিজে চোখের তুল ফেলে, বুক চাপড়ে হা-হুতাশ করে রসিক দশককে কাদানাে যায় না ; উল্টে বরং হাস্যরসেরই উদ্রেক হয়। কমেডি বা মিলনান্ত নাটকের বেলায়ও এই কথাই খাটে। যে চরিত্রে আননের উচ্ছাস বা হাসির ব্যাপার রয়েছে—তা আপনা হতেই দশককে হাসিয়ে অস্থির করবে। জোর করে হাসাবার চেষ্টাকে অভিনয় বলে না, তাকে বলে ভাড়ামাে । আগেই বলেছি, নাট্যাভিনয় Co-operative Creation-সমবেত সৃষ্টি। নাট্যকার, পরিচালক, নটনটী, সুরশিল্পী, দৃশ্যশিল্পী, আলােক প্রভৃতি সবাই মিলে অভিনয়কে সফল করে তােলেন। নাটকের প্রতিটী চরিত্র রূপায়ণে, প্রত্যেক নটনটীর পরস্পরের কথা ও কাৰ্যেৰ সঙ্গে সংযােগ রেখে চলা দরকার। কোন দৃশ্য• কোন একটী একক চরিত্রের নয় ; একাধিক চরিত্রের কার্যকলাপ দ্বারাই দৃশ্য সম্পূর্ণ হয়ে থাকে। তাই সত্যিকারের অভিনেতা বলব তাকে—যিনি তাঁর একার জন্য অভিনয় করেন না ; অভিনয় করেন নাটকের সমস্ত নটনটীর সঙ্গে মিলিত হয়ে...সমগ্রভাবে রসসৃষ্টির জন্য। অভিনেতা কখনও একক নন; তিনি তাঁর মঞ্চের সমগ্র অভিনেতৃগােছর।
Coquelin ও Elsie Fegertyএর কথা এক জাপানী অভিনেতার সম্বন্ধে একটা সুন্দর গল্প আছে। একদিন তিনি দেখলেন যে, তার ছেলে এক বুড়ীর পিছু পিছু যাচ্ছে তার চলাফেরা অনুকরণ করতে। ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে, তিনি জানতে পারলেন, যে, তার ছেলেটীর ইচ্ছা হয়েছে বৃদ্ধা স্ত্রীলােকের ভূমিকা অভিনয় করে যশ অর্জন করবে ; তাই সে বুড়ীর হাবভাব, চলাফেরা অমনি করে অনুকরণ কচ্ছিল। একথা শুনে তার বাপ অর্থাৎ সেই অভিনেতা ছেলেকে বললেন : “এভাবে তুমি সারাজীবন চেষ্টা করেও অভিনেতা হতে পারবে না। তােমার মনের ভেতর দৃঢ় বিশ্বাস আনতে হবে যে তুমি বুড়াে হয়েছ ; তা হলেই দেখবে বাইরের হাবভাব, চলাফেরা আপনা হতেই বুড়ােদের মত হয়েছে।” জাপানী অভিনেতার এই উপদেশ খুবই মূল্যবান। অভিনেতার প্রধান কর্তব্য হল•••একান্ত ভাবে চরিত্রের ধ্যান ধারণা ; মনের ভেতর রূপটী বসে গেলে—বাইরে তার প্রকাশ হয় – -স্বতঃস্ফুর্ত। নাট্যকারের মত অভিনেতাও জন্মায়—তৈরী হয় না। অভিনয় কারুকে শেখানাে যায় না ; এ বিদ্যার সৃষ্টি হয় অভিনেতার মনে। কিন্তু মনের ভেতর এই জ্ঞান আছে কি নেই—প্রতিভা যতক্ষণ নাটমঞ্চে পরীক্ষিত না হচ্ছে, ততক্ষণ কেউ তা বুঝতে পারে না। জন্মগত প্রতিভারও সংস্কার সাধন প্রয়ােজন। শুধু ইস্পাত কাজে লাগে না তাকে গড়ে পিটে অস্ত্র তৈরী করে নিতে হয় ; সৈ অস্ত্রকেও আবার মাঝে মাঝে শাণিয়ে নেওয়া দরকার। তবেই তাে ইস্পাত কাজের উপযােগী হবে। অভিনেতারও শিক্ষা প্রয়ােজন।
মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রথম শিক্ষার্থীদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তাদের ইচ্ছানুযায়ী চালিত হয় না, তাদের কণ্ঠস্বরকে তার ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না। নিয়ন্ত্রণ কৌশলটা সর্বাগ্রে আয় করা প্রয়ােজন। কণ্ঠ ও আঙ্গিক অভিব্যক্তি আয়ত্বে এলে..তাতে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আরােপ করতে হবে। আর, ইতিমধ্যে আর একটা জিনিষ যা শিখে নেওয়া দরকার-সে হ’ল অভিনয় নৈপুণ্যের একেবারে গােড়ার কথা – বিভ্রম (illusion) রচনা কৌশল। অভিনয় কলাকে বলা হয়-Art of make believe”. অভিনেতা যখন যে চরিত্রে রূপদান কচ্ছেন, দর্শকের মনে বিশ্বাস জন্মাতে হবে—তিনি যেন সত্যিই সেই চরিত্র ; তিনি যা কচ্ছেন, যা বলছেন, সবই যেন সত্যি ; তার ভেতর কোথাও এতটুকু মিথ্যার ছায়ামাত্র নেই। অভিনয় বিদ্যা কি? কি তার রূপ? অভিনয় বলব সেই কলাবিদ্যাকে- ঘা নাকি মানুষের সমস্ত সত্ত্বাকে এমন এক কল্পলােকে নিয়ে যায়.•• যেখানে মানুষের জীবন তার নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নব নব রূপ গ্রহণ করে। বাস্তব জীবনে মানুষের ইচ্ছা, মানুষের বাসনা কামনা কখনও স্বাধীন নয় ; অভিনেতার রচিত কল্পলােকে তার ইচ্ছাশক্তি অবারিত, সেখানে সে নিজের স্রষ্টা। অভিনয় কালে নিজেকে নূতন ভাবে সৃষ্টি করবার সুযােগ রয়েছে: আনন্দ রয়েছে: তাই মানুষ মঞ্চের পানে এমন আকৃষ্ট হয়। (২) আর্ট বা শিল্পকলা জিনিষটা কি? আর্ট বলি আমরা কবি-কল্পনা ও মহত্তর সত্যের সংমিশ্রণকে। মহত্তর সত্যকে কল্পনার প্রসাধনে সাজিয়ে ৭০ মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রকাশ করবার নামই আর্ট। চিত্রকর এ কাজটা করেন ক্যানভাসের ওপর রঙের তুলি বুলিয়ে, কবি তার বাক্য ও সঙ্গীত দিয়ে, স্থপতি •• মাটা আর যন্ত্রপাতি দিয়ে। যে ধরণের যন্ত্র বা উপাদানের সাহায্যে শিল্পী তার শিল্পকলা প্রকাশ করেন, সেই অনুযায়ী, শিল্পকলা বা আর্ট বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়। অভিনেতার শিল্পকলা প্রকাশের উপাদান এবং যন্ত্র-অভিনেতা নিজে। তার দেহ, তার জীবন তার শিল্পকার্যের উপাদান ; নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করে নিজের সত্ত্বা দিয়ে তিনি যা গড়ে তােলেন—সেই হল তার শিল্প-সৃষ্টি। প্রত্যেক অভিনেতার মধ্যে দুটী মানুষ রয়েছে ; একটাকে বলা যায় যন্ত্ৰী:অপরটীকে যন্ত্র। একজন সুরের পরিকল্পনা করে, আর একজনের সাহায্যে তাকে ঝঙ্কৃত করে তােলেন।•••প্রথম মানুষটা চরিত্র পরিকল্পনা করেন অথবা নাট্যকারের সৃষ্ট চরিত্রের সমগ্ররূপটী কল্পনা করেন ; দ্বিতীয় মানুষটী নিজে উপাদান হয়ে সেই কল্পনা নিজের মধ্যে রূপায়িত করে তােলেন। চিত্রকর ছবি আঁকবার আগে সামনে একটা মাডেল রাখেন- ••অথবা মনে মনে একটী মডেল সৃষ্টি করেন। সেই মডেলের প্রতিটা অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ কেমন, তার দেহের কোথায় কোন রেখাটা কেমন ভাবে রয়েছে: সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে তারপর তুলির সাহায্য ক্যানভাসের ওপর তার প্রতিরূপ অঙ্কণ করেন। অভিনেতার ভেতরকার প্রথম মানুষটী” আগে অমনি করে মডেলটীকে ধীরে ধীরে কল্পনা করেন। মডেলের পরিকল্পনা..ছােটখাট প্রত্যেক বিষয়ে যাতে নিখুত হয়- সে জন্যে বার বার করে তিনি নাট্যকারের তৈরী চরিত্রটা পাঠ করেন ; চরিত্রের প্রত্যেকটা কাজ, প্রতিটা কথা মনে মনে বিশ্লেষণ মঞ্চে ও নেপথ্যে ৭১ করেন। এমনি ভাবে নানাদিক থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করে—একেবারে সম্পূর্ণভাবে তাকে যখন আয়ত্বের মধ্যে আনতে পারেন—তখনই তার মডেল পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হয়। এইবার দ্বিতীয় মানুষটাকে তিনি সেই মডেলটী দিয়ে বলেন, “নিজেকে ঠিক এইভাবে রূপান্তরিত করাে।” দ্বিতীয় মানুষটী তখন নিজের মুখ, নিজের শরীর, নিজের সমস্ত সত্ত্বাকে নানাভাবে পরিবর্তিত করে, নিয়ন্ত্রিত করে সেই মডেল অনুযায়ী নিজেকে সৃষ্টি করেন। ভাস্কর যেমন করে পাথর কেটে পরিকল্পিত মূৰ্ত্তি গড়ে তােলেন –“দ্বিতীয় মানুষটাও তেমনি করে নিজের দেহের ভেতর থেকে প্রথম মানুষটীর” ইচ্ছানুযায়ী আর একটা মূর্তি গড়ে তােলেন। স্থপতি ও চিত্রকরের তৈরী মূৰ্ত্তি কথা বলে না ; “দ্বিতীয় মানুষটীর” তৈরী মূৰ্ত্তিকে কথা বলতে হয় ; এমনভাবে বলতে হয়, যেন সে স্বর, সে বাচনভঙ্গী সেই নবসৃষ্ট মূর্তি বা চরিত্রটার। এই জীবন্ত চরিত্রটী মঞ্চের ফ্রেমে বাঁধানাে জীবন্ত ছবি। তাঁকে এমনভাবে ঠিক মডেল অনুযায়ী হতে হবে...যেন তাকে মঞ্চে প্রবেশ করতে দেখে দর্শক কখনও না বলতে পারে—“অমুক অভিনেতা এলেন”; দর্শক বলবে, “Hamlet এলেন•••Macbeth এলেন. শাজাহান এলেন... রামচন্দ্র এলেন।” এ না হলে অভিনেতার সমস্ত প্রচেষ্টাকে বলব-নিস্ফল। ৬. অভিনেতার মনে এই দুটা মানুষ অবিচ্ছিন্নভাবে বাস করে ; এদের কারুকে আলাদা করা যায় না। তাহলেও “প্রথম মানুষটী”র অধীনে থাকে “দ্বিতীয় মানুষ”। প্ৰথমকে বলা চলে—আত্মা দ্বিতীয়কে-দেহ। আত্মার অনুশাসন মেনে দেহকে সর্বদা চলতে হয়। যার দেহ আত্মার ইচ্ছানুযায়ী যতখানি নিয়ন্ত্রিত হয় তিনি অভিনেতাও হন তত উচ্চস্তরের। সুতরাং অভিনেতার দেহ হওয়া চাই ইস্পাতের মত নমনীয়।
৭২ মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রয়ােজন হলে তাকে যেভাবে খুসী মােমের মত গালিয়ে নিয়ে কোন চরিত্রের ছাঁচে ফেলে নূতনভাবে তৈরী করে নেওয়া যাবে। কিন্তু তা বলে একথাটা ভুললে চলবে না। যে-নাট্যকারের রচিত চরিত্রটার ভেতরকার সত্যিকারের রূপ অনুধাবন করাই অভিনেতার সবচেয়ে বড় কর্তব্য। অবিশ্যি চরিত্রের বহিরাকৃতির রূপ দর্শককে যথেষ্ট আনন্দ দেয়। কিন্তু চরিত্রের মনােবিশ্লেষণ না করে শুধু বাইরের ছবিটী নিয়ে যারা মেতে ওঠেন—তাদের কখনও উচ্চাঙ্গের অভিনেতা বলা চলে না। অভিনয়ের একেবারে গােড়ার কথাটাই হল চরিত্র- অঙ্কণ বা চরিত্র সৃষ্টি। চরিত্রের মূল সুরটী কি তা ধরতে পারলেই অভিনেতার বেশীর ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেল। বাইরের রূপ মনের রূপ থেকে সৃষ্টি হয়। আত্মাই দেহকে সৃষ্টি করেন, দেহ আত্মাকে নয়। সুস্পষ্ট উচ্চারণ প্রত্যেক অভিনেতার শিক্ষা করা উচিত। আজকাল স্বাভাবিক অভিনয় ( Natural Acting ) এর দোহাই দেওয়া হচ্ছে ; তাই খাবার সময়, ট্রামে বা যাবার সময়, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প করবার সময়, আমরা যে ভাবে কথা বলি-মঞ্চেও ঠিক সেই ভাবে অভিনয় করবার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু একথা ভুললে চলবে না, যে-নাটমঞ্চ কারুর বাড়ীর ড্রইং রুম নয় ; দু’চারজন বন্ধুর সঙ্গে যেভাবে আলােচনা করা যায়—হাজার দর্শকের সামনে ঠিক সেভাবে কথা বলা চলে না। আওয়াজ জোর না হলে দর্শকেরা শুনতে পাবে ; উচ্চারণ সুস্পষ্ট না হলে তারা বুঝতে পারবে না। অভিনয়কালে নাটকের কাহিনীই দর্শককে সব চেয়ে বেশী আগ্রহশীল করে ; কাহিনী অনুসরণ করতে না পারলে দর্শক ক্ষুন্ন হবেই। সুতরাং কথা হবে
মঞ্চে ও নেপথ্যে
৭৩
সুস্পষ্ট এবং উচ্চ ; যে বাক্যে বা যে কথায় যতটুকু জোর দিতে হবে
প্রাধান্য আরােপ করতে হবে-অভিনতাকে তা যথাযথভাবে
সম্পন্ন করতে হবে।
চরিত্রের বাইরের রূপটি ফুটিয়ে তুলতে অভিনেতা যেটুকু পরিশ্রম
করেন, তার চেয়ে ঢের বেশী সম-সাধ্য কাজ কণ্ঠস্বরকে আহ্বাধীন
করা। অভিনেতার ভেতরকার “দ্বিতীয় মানুষটাকে” কণ্ঠস্বরের বৈচিত্র্য
সাধনের জন্য কঠোর সাধনা করতে হয়। চরিত্রের তারতম্য অনুযায়ী
কণ্ঠস্বরের বিবিধ পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। প্রেমিকের প্রেম নিবেদন
এবং বিচারকের দণ্ডাজ্ঞা জ্ঞাপন ঠিক এক রকম কণ্ঠস্বরে প্রকাশ পায়
প্রফুল্ল নাটকের যােগেশ, রমেশ এবং সুরেশ ঠিক একভাবে
কথা বলেনা ;
কারণ তাদের চরিত্রের পার্থক্য তাদের ভিন্ন ভাবে
কথা বলায়।
ভাবাভিব্যক্তির দিক দিয়ে অভিনেতার চোখ সব চেয়ে বেশী কাজ
করে। দর্শক অভিনেতার চোখের দিকে লক্ষ্য করেন ; চোখের ভাষা
পাঠ করতে চান। দৃষ্টি যদি অকারণ ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত হয় কিম্বা
তাতে যদি কোনাে অভিব্যক্তি না থাকে, নাটকের চরিত্র যা বলছে
বা যে কাজ কচ্ছেদৃষ্টি যদি তার অনুযায়ী না হয় – তাহলে দর্শকেরা
রস উপলব্ধি করতে পারেন না। অভিনেতাকে অন্যমনস্ক
তারাও বিরক্তি বােধ করেন। উদাহরণ স্বরূপ, নাটকের
কোন ঘটনা বা কাহিনী বর্ণনার কথা উল্লেখ করা যেতে
পারে।
বর্ণনা করবার
সময় অভিনেতার চোখের দৃষ্টিও এমন
হওয়া প্রয়ােজন••যেন বর্ণিত কাহিনীটী তিনি চোখের সামনে
ঘটতে দেখছেন। দর্শক, অভিনেতার চোখে সেই বর্ণিত কাহিনীটা
৭৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রতিফলিত দেখতে পাবেন। যিনি বর্ণনা কৰ্ছেন তার দৃষ্টি যেন একটা বিন্দুতে গিয়ে স্থির হয়ে দাড়াল ; তার চোখের দিকে তাকিয়ে দর্শকের মনে হল • নেন বর্ণিত ঘটনার কেন্দ্র স্থলে তিনি তাকিয়ে আছেন— সেখানে সব ঘটনা পর পর দেখতে পাচ্ছেন ! শুধু বর্ণনাকারী নয়, পার্শ্ববর্তী যে অভিনেতাকে সেই কাহিনী শােনান হচ্ছে•••তারও দৃষ্টি বর্ণনাকারীর দৃষ্টিকে অনুসরণ করা উচিত। তিনিও যেন ঘটনাটা নিজের চোখে দেখছেন। নইলে তার তঁার অন্যমনস্কতা দর্শককে ঘটনার গুরুত্ব সম্বন্ধে সন্ধীহান করে তুলবে। অবশ্য এটা একটা উদাহরণ মাত্র ; কাহিনী বর্ণনা এবং শ্রবণ করা নানাভাবেই চলতে পারে। অনেক সময় শ্রবণকারীর শ্রবণকারীর বাইরের বাইরের ঔদাসীন্যও দর্শককে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে তিনি খুব মনােযােগর সঙ্গে কথাগুলি শুনছেন। অর্থ হীন দৃষ্টিতে শূন্যপানে তাকিয়ে অথবা বই পড়বার ছল করেও অনেক কথা শুনে নেওয়া যায়। মােট কথা এই, অভিনেতার দৃষ্টি সৰ্ব্বদা নাটকের কাজের অংশ নেবে। শূন্য- দৃষ্টিতে তাকিয়েই হােক— বা চঞ্চল অথবা আগ্রহশীল রূপেই হােক— অভিনেতার চোখ দুটী যেন সৰ্ব্বদা নাটকীয় ক্রিয়াকে সাহায্য করে। আর্ট বা শিল্পকলার কাজ প্রতিরূপ রচনা করা। অনুকে কাঁদাতে হলে নিজেকেও কঁদতে হবে—অভিনেতার বেলা এ কথা খাটে না। এমনও হতে পারে, অভিনেতা সত্যিসত্যি চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলে, দর্শকেরা তার চেয়েও জোরে হেসে উঠবেন। অভিনেতা নিজে থাকবেন সমস্ত প্রকার ভাবপ্রবণতার উর্দ্ধে ; জলে ভাসা তেলের মত। অভিনয় করতে করতে অভিনেতা নিজেই যদি ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন নিজের মনের ওপর নিজের প্রভুত্ব হারিয়ে ফেলেন-তা হলে তার পক্ষে চরিত্র রূপায়ণ সম্ভব হতে পারে না। এ সম্বন্ধে একটা সুন্দর মঞ্চে ও নেপথ্যে কথা আছে। ও দেশের একজন বড় অভিনেত্রী এক সময় বলেছিলেন— “অভিনয় করবার সময় অভিনেতা যে জিনিষটী নিজে সত্যিসত্যি অনুভব না করে—তেমন কিছু সে তার কাৰ্যে প্রকাশ করতে পারে না।” একথা শুনে এক তরুণী প্রশ্ন করেছিল—“রঙ্গমঞ্চে যখন আপনারা মৃত্যুর অভিনয় করেন তখন ?...” অভিনয় কখনাে সম্পূর্ণ বাস্তব হতে পারে না, কারণ অভিনয় শিল্পকলারই অঙ্গীভূত। মঞ্চে বাস্তব-জীবন রূপ নেবে, কাব্যের সুরভি নিঃশ্বাস বায়ুতে, দেখবে সে আদর্শের স্বপ্ন। নিছক বাস্তবের অনুসরণ করা অভিনেতার পক্ষে মহা অন্যায়। স্বভাব বা প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কোন শিল্পকলা গড়ে উঠতে পারে না, তেমনি শিল্প-সৌন্দর্যকে বাদ দিয়ে রঙ্গমঞ্চে স্বাভাবিকের বা প্রাকৃতিকের কোন স্থান নেই। রঙ্গমঞ্চের প্রতিটা জিনিষ সত্য হতে উদ্ভূত হবে ; গতি হবে তার আদর্শের পানে। কমেডি (Comedy) নাটক মানুষের ভুল, ক্ৰটী, অন্যায়, অপরাধ সব কিছুর ওপর আলােক সম্পাত করে দর্শকগণকে আদর্শের পানে নিয়ে যায়। এই ভুল ত্রুটীগুলি চোখের সামনে বড় করে ধরা হয়.. হাস্য-পরিহাস, ব্যঙ্গ-কৌতুকের ভেতর দিয়ে। এই হাস্য পরিহাসের অবতারণা না করে যদি পাপের নগ্ন, বিভৎস রূপ চোখের সামনে বাস্তব আকারে ধরা হ'ত : তা হলে নাটক সৃষ্টি হত না। বিখ্যাত অভিনেতা c. Coquelin এক সময় অত্যন্ত ক্লান্ত অবসন্ন দেহে, ঘুমের দৃশ্য অভিনয় করতে গিয়ে মঞ্চের ওপর সত্যিসত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন ; সারা শরীর ভেঙ্গে তার এমন ঘুম এসেছিল যে ৭৬ মঞ্চে ও নেপথ্যে নাসা-ধ্বনি শােনা যাচ্ছিল। সেই দৃশ্য শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে ঘুমের অভিনয় করতে হবে; পরিবর্তে তিনি সত্যিসত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। নাটকের যবনিকা পড়লে দর্শকেরা মন্তব্য করলেন—আজ Coquelinএর ঘুমের অভিনয় মােটেই স্বাভাবিক হয়নি; তার নাসাধ্বনিও যেন কেমন অস্বাভাবিক বলে মনে হল। তঁার মত অভিনেতার পক্ষে এমন খারাপ ভাবে অভিনয় করা সঙ্গত হয়নি।•••অভিনেতাকে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, সত্যিকারের পাখীর ডাকে কোন শিল্প কলার পরিচয় নেই ; কলা নৈপুণ্য প্রকাশ পায়—মানুষ পাখীর ডাকের অনুকরণ করতে পারলে। যারা স্বাভাবিক অভিনয়ের দোহাই দেন, তারা বলেন—পরকে কাদাতে হলে নিজেকে কঁদতে হবে। তা যদি হয়•••ত হলে, মাতালের ভূমিকা অভিনয় করতে হলে প্রচুর মদ্যপান করা উচিত—একথাও তাে বলতে পারি! ঠিক স্বাভাবিক কাজ করলেই তাকে অভিনয় বলা চলে না ; একেবারে স্বাভাবিক জিনিষ দর্শকের মর্মস্পর্শ করে না। এর আর একটা উদাহারণ দেওয়া যায়... প্রসিদ্ধ অভিনেতা Jr. Edwin Boothএর জীবনের একটা ঘটনা উল্লেখ করে। The Fool's Revenge নাটকে নায়কের চরিত্রে তিনি একদিন নিজেকে হারিয়ে ফেলে অভিনয় করেছিলেন। নাটকের পরিস্থিতি, অন্তরস্পর্শী সংলাপ, তঁাকে এমন অভিভূত করে ফেলেছিল, যে তিনি নায়কের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভাবে মিশে গিয়েছিলেন ; অভিনয় করতে অভিনয় করতে করতে তার বুক-ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস পড়তে লাগল, দু'চোখ বেয়ে অনবরত জলের ধারা নেবে এল। তার মনে হল, এত সুন্দর অভিনয় বুঝি তিনি জীবনে আর কখনন করেননি। অভিনয় শেষ হতেই তার মেয়েটা বক্স, থেকে নেমে এসে জিজ্ঞাসা করল-“তােমার কি অসুখ করেছে বাবা?
মপে ও নেপথ্যে ৭৭ তুমি এত অস্বাভাবিক অভিনয় করবে আমি কল্পনাই করতে পারি নি।” Booth অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন–মেয়ের মুখের পানে। Diderotএর ভাষায় বলা যায় দর্শকের মন ভাবাবেগে আকুল করতে হলে, অভিনেতার আবেগ-চঞ্চল হওয়া উচিত নয় । ক পরিস্থিতির মধ্যেই অভিনেতার নিজের মনের ওপর ক থাকা প্রয়ােজন। অনেক সময় প্রশ্ন শােনা যায়, চরিত্র রূপায়ণে অভিনেতার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পাবে কিনা! হাঁ, প্রতিভাধর অভিনেতা তার অভিনীত চরিত্রে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আরােপ করে থাকেন। এ কথার মানে কিন্তু এ নয় যে, অভিনয় দেখার সময় চরিত্রের চাইতে অভিনেতাকেই বেশ করে দেখা যাবে। অভিনেতা নিজের ব্যক্তি চরিত্রের সঙ্গে এমন ভাবে মিশিয়ে দেবেন, যাতে করে, অভিনয় দেখার সময় দর্শক একবারও বুঝতে না পারে যে অভিনেতা কোথাও চরিত্রকে ছাপিয়ে উঠেছেন। অথচ নাটকখানি পড়বার সময়, কিম্বা অন্য কোন অপেক্ষাকৃত কম শক্তিমান অভিনেতা সেই চরিত্রে অভিনয় করবার সময়, দর্শকের বার বার মনে হবে—“এ হ’ল না! অমুক অভিনেতা যে চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন—তা কিছুতেই আর কারু দ্বারা সম্ভব হবে না।” দর্শকের মনে যখন অভিনয় দেখে এইরূপ দৃঢ় প্রত্যয় জাগবে—তখন বলব তার অভিনয়ে ব্যক্তিত্বের সংমিশ্রণ ছিল।
রূপসজ্জা মানুষের জন্মগত সংস্কার—সে যা নয়...যা হতে পারেনি নিজেকে সেইরূপে কল্পনা করা বা তেমন রূপ সজ্জা গ্রহণ করা। এমন কোন বালক নেই, যে নাকি ছেলেবেলায় নিজের মনের খেয়ালে নিজেকে সাজাতে চেষ্টা করেনি। সাজবার স্পৃহা মানুষের মনকে কল্পনাপ্রবণ করে ; সে যখন যে আদর্শ অনুযায়ী নিজেকে সাজায়, কল্পনার চোখে সে তখন নিজেকে সত্যিসত্যিই সেই আদশ হতে ভিন্ন মানুষ ভাবে না। মঞ্চাভিনয়ে রূপসজ্জা গ্রহণের প্রধান প্রয়ােজনীয়তা•• অভিনেতাকে নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলিয়ে রাখা এবং তার মনকে কল্পনাপ্রবণ করা। রূপসজ্জা দ্বারা অভিনেতা তার গৃহীত চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে একীভূত করে এবং দর্শকের চোখেও মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষ বর্তমানকে ভুলে দর্শকেরা কাহিনীর মায়ালােকে প্রবেশ করেন। অভিনেতা নিজে কখনও দর্শকের সামনে উপস্থিত হন না; তাকে অবলম্বন করে নানা আকৃতির মানুষ দর্শককে দেখা দেয়। এই মানুষগুলি হল—নাট্যকারের রচিত বিভিন্ন চরিত্র। সুতরাং রূপসজ্জা বা makeup গ্রহণের পূর্বে অভিনেতাকে বার বার পড়ে নাটকীয় চরিত্রকে সম্যক বুঝে নিতে হবে। চরিত্রের বাইরের আকৃতি বা চেহারা কি ধরণের হলে তার অন্তরের রূপটা পরিস্ফুট হবে—সেদিকে লক্ষ্য রেখে অভিনেতা রূপসজ্জা গ্রহণ করবেন। অন্তরের রূপ বাইরে প্রকাশ করাই রূপসজ্জার প্রধান উদ্দেশ্য। প্রশ্ন উঠতে পারে- তাহলে ভণ্ড চরিত্র যেমন সাধুর বেশ কিন্তু আসলে সে শয়তান এরূপ চরিত্রের রূপসজ্জা কি হবে ? এর জবাব : মানুষ পােষাক পরিচ্ছদে বা অন্য যে কোন দিক দিয়ে নিজেকে লুকোবার চেষ্টা মঞ্চে ও নেপথ্যে ৭৯ করুক না কেন—তার চোখের চাউনিতে তার আসল রূপটা প্রকাশ পাবেই। চোখকে বলে মনের মুকুর। তাই চোখের রূপ-সজ্জা দ্বারা ভেতরকার মানুষটীকে প্রকট করে তুলতে হবে। রূপসজ্জা করবার পূর্বে অভিনেতাকে দুটী বিষয় মনে রাখতে হবে । রূপসজ্জা প্রধানত নির্ভর করে Auditorium বা প্রেক্ষাগৃহের আয়তন এবং আলােক সম্পাতের ওপর। প্রেক্ষাগৃহ যত বড় হবে এবং মঞ্চের আলাে যত জোরালাে হবে • অভিনেতাকে তত বেশী প্রাথমিক রঙ দিয়ে রূপসজ্জা করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে : রূপসজ্জা এমন হওয়া দরকার, যেন প্রথম লাইনে যে সব দর্শক বসেছেন.. তারা অভিনেতার মুখের রঙ, রেখা প্রভৃতি অস্বাভাবিক রকম বেশী হয়েছে, এইটে মনে না করেন...অথচ শেষ লাইনের দর্শকেরাও যেন অভিলষিত চরিত্রের যথাযথ রূপটী দেখতে পান। প্রেক্ষাগারের পেছন দিকের দুই তৃতীয়াংশ স্থানে বসে যদি অভিনেতার রূপসজ্জা যথােচিত বােধ হয়•••তাহলেই গােটা প্রেক্ষাগারের সকল আসনের দর্শকের চোখে রূপসজ্জা নিখুত বােধ হবে। রূপসজ্জার কয়েকটা সাধারণ সঙ্কেত মােটামুটি ভাবে এইবার বর্ণনা কচ্ছি : রূপসজ্জা করবার আগে হাত মুখ বেশ ভাল করে সাবান দিয়ে ধূয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। তারপর খুব হাল্কা করে খানিকটা “কোল্ড, ক্রীম” মুখে মাখাতে হবে। আগে ক্রীম মেখে নেবার কারণ, ক্রীম লােমকুপগুলাে বন্ধ করে দেয় এবং সেইজন্যে চামড়ার ভেতরে গিয়ে রঙ, কোন রকম ক্ষতি করতে পারে না। ক্রীমের দ্বিতীয় ৮০ মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রয়ােজনীয়তা-ক্রীম মুখের সব জায়গায় রঙকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয় এবং তৃতীয়তঃ, ক্রীম মেখে নিলে অভিনয়ের পর রঙ, তুলে ফেলতে একটুও অসুবিধা হয় না। প্রাথমিক রঙ, এবার মুখের প্রাথমিক রঙ,। প্রাথমিক রঙ, হিসাবে আজকাল প্রায় সর্বত্রই গ্রীজ পেণ্ট (Grease paint) বা তেল রঙ ব্যবহৃত হয়। চিত্রকর ছবি আঁকবার সময় যেমন Sketch ( নক্সা) তৈরী করে তাতে প্রাথমিক বর্ণ প্রলেপ দেন এবং অতঃপর সেই প্রাথমিক বর্ণের ওপর ওপর রেখা বা আলাে ছায়ার লীলা ফুটিয়ে তুলে তার চিত্রটীকে সম্পূর্ণ করেন•••অভিনেতার রূপসজ্জাও তেমনি সম্পূর্ণ করতে হয়, প্রাথমিক বর্ণ প্রলেপকে ভিত্তি করে। মুখের ওপর আগে আঙুলের ডগায় করে গ্রীজপেন্ট কতকগুলি ফোটার মতাে লাগিয়ে নিতে হয় তারপর সেই ফোটা টেনে টেনে মুখময় সমানভাবে মাখাতে হয় । ফোটাগুলি মুখে মাখাবার সময় বারবার আঙুলের ডগা জলে ভিজিয়ে নেওয়া উচিত; তা হলেই রঙ, মুখের সব জায়গায় বেশ সমানভাবে লাগবে । রঙ মাখাবার সময় জোরে রগড়াতে হয় না, মুখের মাঝখান থেকে পাশের দিকে আঙুলের ডগা খুব আলগােছে টেনে যাওয়া, উচিত। মুখে প্রাথমিক বর্ণ প্রলেপের সময় অভিনেতা এই কথাটা মনে রাখবেন-রঙ, খুব বেশী মাখনাে অত্যন্ত বিপজ্জনক। রূপসজ্জা চরিত্র ব্যঞ্জনার জন্য ; বেশী রঙ, মাখালে মুখের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি চাপা পড়ে গিয়ে কারিগরের গড়া পুতুলের-মুখের মত দেখায়। তবে, অনেক সময়, অভিনেতার স্বাভাবিক বর্ণের তারতম্য এবং প্রেক্ষাগারের আয়তনের পার্থক্য অনুযায়ী প্রাথমিক বর্ণপ্রলেপের তারতম্য ঘটাতে হয়।
সিরাজদ্দৌলা : নির্মলেন্দু। গােলাম হােসেন : রবি রায়। দণ্ডায়মান—“অভিযান” নাটকে মহম্মদ তােঘলক বেশে নির্মলেন্দু
- গজus
“মহানিশায়” রবিরায়
সাম সি
“টিপসুহান নাটকে 'ভূমেন রায়
আলাে ছায়া প্রাথমিক রঙ, করা শেষ হলে, মুখে আলাে ছায়ার ( Light and Slade) সৃষ্টি করতে হবে। নারী, পুরুষ, বালক, বৃদ্ধ, যুবক, প্রভৃতি প্রত্যেককে স্বাতন্ত্র্য দান করে মুখের আলাে ছায়া। চরিত্রের বয়স বা স্বভাব অনুযায়ী মুখের যে সকল অংশকে প্রাধান্য দেওয়া রকার সেই সকল অংশে হাল্কা রঙ এবং যে অংশকে অপ্রধান করা প্রয়ােজন সেই অংশে অপেক্ষাকৃত গাঢ় রঙ দিয়ে আলােছায়ার সৃষ্টি করতে হয়। এই প্রক্রিয়ার নাম Higli light ও Low light make up. যে সব অভিনেতার গাল তােবড়ানাে—তারা চোয়ালের হাড়ের ওপর গাঢ় রঙ, এবং নীচের দিকে মানে গালের তােবড়ান অংশে খুব হাল্কা •••অথবা শাদ। কিম্বা হলদে গ্ৰীজপেন্ট মাখিয়ে—তােবড়াননা গাল ভরাট করতে পারেন। মােটা নাককে সরু করতে হলে, নাকের মােটা অংশ গাঢ় রঙ দিয়ে চেপে দিতে হবে এবং নাকের যে অংশকে উঁচু বা প্রধান করে দেখান দরকার, সেই অংশে হাল্কা রঙ মাখাতে হবে। ঠিক এইভাবে, হাতের আঙুলকে সরু দেখাতে হলে, আঙুলের ডগা পর্যন্ত হাল্কা রঙের লাইন টেনে দুপাশ গাঢ় রঙে আবছা করে দিতে হবে। আলাে ছায়া রচনার সময় অভিনেতাকে লক্ষ্য রাখতে হবে • গাঢ় এবং হাল্কা রঙ যেন বেশ স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে এসে মিশে যায় ; যেন দুটী রঙের দুটা স্বতন্ত্র লাইন কিম্বা প্যাচ, (patch) বলে মনে না হয়। আস্তে আস্তে আঙুলের ডগা দিয়ে টেনে নিলেই আলাে ছায়া চমৎকার ভাবে ফুটে উঠবে। কপাল, গাল, হাত যে কোন যায়গায় বর্ণপ্রলেপ দেবার সময় এই নির্দেশটা অভিনেতা মনে রাখবেন-High light make upএর প্রয়ােজন প্রাধান্য দেবার জন্য এবং Low light make up-প্রাধান্য লুপ্ত করবার জন্য।
চোখ চোখ মনের মুকুর। সুতরাং চোখের রূপসজ্জা করবার সময় চরিত্রের স্বরূপ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট অনুভূতি থাকা প্রয়ােজন। সাধারণতঃ যুবকের চোখ আঁকতে হলে, চোখের পাতার ওপর হাল্কা নীল রঙ, বা রুজ, খুব সামান্য করে টেনে মিলিয়ে দিতে হয়। চোখের ঠিক নীচে গাঢ় নীল বা কাল রঙের একটী রেখা প্রান্ত পর্যন্ত আঁকতে হয়। এই রেখাটী অনেকে চোখ আঁকবার পেনসিলের সাহায্যও একে থাকেন। রেখাটী চোখের নীচের পাতার যত কাছে হয় ততই ভাল। একটু নেমে গেলে চোখের নীচের পাতাটী ফুলে উঠেছে বা ঝুলে পড়েছে মনে হবে। কেউ কেউ চোখের চাউনিকে উজ্জ্বল করবার জন্য চোখের ভেতরে ঠিক দুইকোণে সামান্য দুটী লাল রঙের বিন্দু একে থাকেন। অভিনেতাকে স্মরণ রাখতে হবে, বয়সের সঙ্গে মুখের, গালের, চোখের সকল জ্যোতি ম্লান হয়ে আসে ; যৌবনের ঔজ্জ্বল্যের ওপর একটা ম্লান তামাটে রঙের ছাপ পড়ে। চোখের রূপসজ্জা তাই বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে নিষ্প্রভ করতে হবে। ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সের মধ্যে চেহারার যে পরিবর্তন আসে•••তা আলাে ছায়ার সমাবেশে কিম্বা চোখের কোণে বর্ণ বিন্যাসের তারতম্যে ফুটিয়ে তােলা অত্যন্ত কঠিন। এই সময় মানুষ ধীরে ধীরে একটু প্রশান্তমূর্তি ধারণ করে ; তার আচরণে,, কথা বার্তায় অপেক্ষাকৃত ধীর-গভীর ভাব দেখা যায়। সুতরাং এই বয়সের পরিবর্তন দেখাবার জন্য, বাইরের রূপসজ্জার ওপর বেশী প্রাধা না দিয়ে অভিনয়ের দ্বারা সে পরিবর্তন ফুটিয়ে তােলবার চেষ্টা করতে হয়।
ঠোট কথা না বললেও মানুষের চোখ মুখের ভঙ্গী বহু ক্ষেত্রে তার মনের কথা প্রকাশ করে দেয়। তাই চোখের মত, ঠোটকেও মানুষের মনের মুকুর বলা চলে। একটু খানি বাঁকানাে ঠোট, একটু খানি কেঁপে ওঠা ঠোট•••এমন অনেক কথা প্রকাশ করতে পারে—যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। ঠোটের রূপ-সজ্জার প্রতি অভিনেতার তাই বিশেষ মনোেযােগ দেওয়া উচিত। যারা জীবনে বহু ঝড়-ঝাপ্টা সয়েছে, তেমন লােকের ঠোটের দুই কোণ সাধারণতঃ নীচের দিকে খানিকটা ঝুলে পড়ে ; যাদের দুনিয়ায় কোন ভাবনা চিন্তা নেই, যারা মনের আনন্দে স্ফুৰ্ত্তি করে বেড়াচ্ছে, ••তেমন লােকের ঠোটের কোন্ দুটি ওপর দিকে তােলা দেখতে পাওয়া যায়। ঈষৎ চাপা পাৎলা ঠোটকে বলি আমরা সৌন্দর্যের প্রতীক, পুরু ঠোট প্রধানত নির্বোধের লক্ষণ। রুজ (Rouge) বা লিষ্পষ্টিক দিয়ে ঠোটে রঙ করবার পর, প্রয়ােজন অনুযায়ী ঠোটের দুই প্রান্তে দুটি রেখা ওপরের দিকে টেনে দিলেই, ঠোট ওপরে ওঠা এবং নীচের দিকে টেনে দিলে, নীচের দিকে ঝুলে পড়া দেখা যায়। পুরু ঠোটে অপেক্ষাকৃত গাঢ় লাল রঙ এবং যদি কোন একটি ঠোট অপেক্ষাকৃত ছােট থাকে তাতে অপর ঠোটের চেয়ে একটু বেশী হাল্কা রঙ লাগালেও দুটি ঠোট সমান হয়ে যায়। বড় ঠোটকে ঘােট এবং পাতলা দেখাতে হলে ঠোঁটের খানিকটা অংশ, মুখে যে রঙ বা পেন্ট ব্যবহার করা হয়-তাই দিয়ে ঢেকে দিতে হয় এবং ঠোট যেটুকু দেখান দরকার সেই টুকুতে রুজ বা লিপষ্টিক লাগাতে হয়।
পাউডার প্রাথমিক বর্ণ-বিন্যাস, আলােছায়ার দ্বারা মুখের যথাযথ স্থানে প্রাধান্য দান, চোখ এবং ঠোটে বর্ণ প্রলেপ এই ক’টি কাজ শেষ হবার পর গােটা মুখে পাউডার-পাফ, (IPuf ) দিয়ে পাউডার লাগাতে হয়। মুখের গ্রীজ পেন্ট, যেটুকুন পাউডার মুখে লাগা দরকার...মুখে আকর্ষণ করে নেয় ; তারপর আলগােছে ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে ফেললেই বাড়তি পাউডার পড়ে যায় এবং রঙের কাজ তখন একেবারে নিখুত হয়। পাউডার লাগাবার পর জিভ দিয়ে ঠোটের ওপরটা যদি খুব সাবধানে মুছে নেওয়া যায় তা হলে ঠোঁটের লাল অনেক বেশী বাহার হয়। রঙের ভ্র এবং চোখের পাতা পাউডার করা শেষ হবার পর আর দুটি প্রধান কাজ বাকী থাকে । ঐ আঁকা এবং চোখের পাতাকে ইচ্ছানুরূপ আকৃতি দেওয়া । আঁকার ছাচে রঙ মাখিয়ে সেই ছাচ জ্বর ওপর চেপে ধরলে সুন্দর জ্ব তৈরী হতে পারে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে মঞ্চের অভিনেতার ছাপ ব্যবহার না করে, ঐ টানবার পেন্সিল দিয়ে ইচ্ছানুযায়ী জ্ব একে থাকেন। রাগী লােক, বদমাস, খুনী, স্বপ্নবিলাসী, চতুর বা শান্তি- প্রিয় লােকের জ্বর আকারের যথেষ্ঠ তারতম্য লক্ষিত হয়। পেন্সিলের সরু শিস্ দিয়ে অভিনেতা তার প্রয়ােজন মত জ্বর চুলগুলি পর্যন্ত এঁকে নিতে পারেন। চোখের পাতায় লাগাবার জন্য ঘন, দীর্ঘ, নানা প্রকারের নকল পল্লব কিনতে পাওয়া যায়। পছন্দমত চোখের পল্লব কিনে এনে, তাকে চোখের পাতার মাপে কেটে, গদ দিয়ে ওপর ও নীচে দুটী পাতায় লাগিয়ে দিলেই অতি চমৎকার চক্ষু পল্লব রচিত হয়। অবশ্য পুরুষ শ্রীমাতী শান্তি গুপ্তা শ্ৰীমতী মলিন
!:
T
*
মঞ্চে ও নেপথ্যে ৮৫ অভিনেতাদের চক্ষু-পল্লব ব্যবহার করার বেশী প্রয়ােজন হয় না, কিন্তু মেয়েদের পক্ষে এ জিনিষটি নিতান্ত দরকারী। সৌন্দৰ্য যাদের উপাসনা–চোখ তাদের সৌন্দৰ্য্য উপাসনায় বিকশিত পদ্মল। চরিত্রাভিনেতার রূপসজ্জা কোন বিশেষ চরিত্রে” কিম্বা “টাইপ চরিত্রে অভিনয় করতে হলে, অভিনেতা উপরে বর্ণিত উপরে বর্ণিত রূপসজ্জার সাধারণ নির্দেশগুলি ব্যতীত প্রয়ােজন অনুযায়ী বিশেষ বিশেষ রূপসজ্জার সাহায্য নেবেন। কপালে, গালে, নাকের ডগার পাশ থেকে ঠোট পৰ্যন্ত...যেসব রেখা সাধারণতঃ দেখা যায়, সেইগুলিকে ভাল করে ফুটিয়ে তুলবেন। মূখের বিভিন্ন অংশ সঙ্কুচিত করলে এই রেখাগুলি দেখা দেয় ; রেখার ওপর ব্রাউন পেন্সিলের দাগ টেনে, পরে আঙ্গুল দিয়ে আস্তে আস্তে রেখার ধারগুলি মিলিয়ে দিলেই বৃদ্ধের রূপসজ্জা সুন্দর হয়। নাক, থুতনী বা মুখের অন্য যে কোন অংশ খুব মােটা বা সৰু করে দেখাতে হলে নােজ পেষ্ট (Yose paste) লাগিয়ে বিশেষ সুফল পাওয়া যায়। দাত কালাে হলে “শাদা টুথ, এনামেল” এবং শাদা দাতকে খানিকটা বা সম্পূর্ণ ভাঙ্গা দেখাতে হলে প্রয়ােজন মত যথাস্থানে “কালাে টুথ, এনামেল” লাগালে অভিনেতার প্রয়ােজন সিদ্ধ হয়। গোফ দাড়ী ছােট বা বড় যেমন ইচ্ছা, “ক্রেপ হেয়ার” দিয়েই সব চেয়ে ভাল তৈরী হয়। তুলিতে করে “স্পিরিট গাম্” দিয়ে আগে চিবুকে এবং ওপরের ঠোটে গোঁফ দাড়ী এঁকে নিতে হয় ; গাম্ প্রায় শুকিয়ে এলে তখন ক্রেপ হেয়ার তার ওপর চেপে ধরলেই লেগে যায়।
৮৬ মঞ্চে ও নেপথ্যে শরীরের যে কোন স্থানে আঘাত লেগে ফুলে উঠেছে বা কাল দাগ পড়ে গেছে•••এ রকম দেখাতে হলে “নােজ পেষ্ট লাগিয়ে তার ওপর শাদা আর নীল রঙ মাখাতে হয়। ক্ষত চিহ্ন গভীর দেখাতে হলে, যথাস্থানে Non Flexible Collodion তুলি দিয়ে লাগাতে হয়। রূপসজ্জার উপকরণ কোল্ড ক্রীম, গ্রীজ পেন্ট, রুজ, লিপষ্টিক, পাউডার, পাউডার- পাফ, ঐ টানবার পেনসিল, টুথ, এনামেল, নােজপেষ্ট, কলােডিয়ন, বাদামী রঙ, কালি, ব্লু রঙ, ক্রেপ হেয়ার, স্পিরিট গা, তুলি, চিরুণী, কাচি, ভােয়ালে প্রভৃতি।
দৃশ্য-শিল্পী ও আলোেক-দক্ষ নাটক অভিনয়ে দৃশ্যপট যােজনা ও আলােক সম্পাতের উদ্দেশ্য কি? নাটকের উপযুক্ত পরিস্থিতি রচনা করা, চরিত্র রূপায়ণে সাহায্য করা, এবং সমগ্র নাটকখানিকে গতি (Movement) দান করা। তিনটি কাৰ্য সুসম্পন্ন হলেই illusion বা মায়া-বিভ্রম সৃষ্টি হয়। দর্শক, সুরচিত দৃশ্যপটের সামনে•••আলােছায়ার লীলার মধ্যে যা দেখতে পায়, তাকে তখন সত্য বলে বিশ্বাস করে; নাটকীয় চরিত্রের প্রিয়-মিলনে তারা আনন্দিত হয়•••তার বিচ্ছেদ-বেদনা দর্শকের মনকেও অপরিসীম বেদনায় বারবার দোলা দিয়ে যায়। নাটকীয় চরিত্রকে রূপায়িত করতে...নাটকের ঘটনাকে গতিশীল করতে—দৃশ্যপট ও আলােক সম্পাত। সুতরাং দৃশ্যশিল্পী ও আলােক- দক্ষকে•••যারা নাটকের চরিত্র রূপায়িত কচ্ছেন, তাদের সহায়তা করবার জন্যই সমস্ত শিল্প-কৌশল প্রয়ােগ করতে হবে। তারা দর্শকের জন্য নন্-অভিনেতার জন্য। যখনই কোন অলৌকিক দৃশ্য দেখে দর্শক হাততালি দিয়ে ওঠে, সে দৃশ্য রচনায় দৃশ্য-শিল্পীর যত বাহাদুরীই থাকুক না কেন—মঞ্চ-শিল্পের দিক হতে, তাকে বলব সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ, নাটকীয় চরিত্র বা ঘটনাকে ছাপিয়ে সেই দৃশ্যটা মাথা তুলে দাড়িয়েছে-নাটকের একমুখী গতি, কাহিনীর বিভ্ৰম- সৃষ্টির প্রয়াস সে ব্যাহত করেছে-নাটক থেকে আলাদা হয়ে সে দর্শককে নিজের দিকে টেনে নিতে চাইছে। তাই বলছিলুম, দৃশ্য- সজ্জা, আলােক সম্পাত-অভিনেতার জন্য,-দর্শকের জন্য নয়। অভি- নেতা যদি বােবেন, কোনও বিশেষ দৃশ্য বা আলােক সম্পাত তার চরিত্র রূপায়ণের অনুকূল হয়েছে—তবেই সে দৃশ্য রচনা, সে আলােক সম্পাত সার্থক হল। Sir Henry Irving এই মত পােষণ করতেন; তাই একদিন wingsএর খানিকটা যায়গায় রঙ লাগানাে ৮৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে হয়নি বলে তিনি শিল্পীকে ডেকে পাঠালেন। দৃশ্য-শিল্পী বললেন : “ও অংশটুকু প্রেক্ষাগার থেকে দেখা যায় না; তাই ওটুকুতে রঙ লাগাইনি।” জবাবে Sir Irving বললেন : “দর্শকেরা না দেখুক, আমার অভিনেতারা তাে দেখতে পাবে ? অভিনয় কালে ঐ রঙ- ছাড়া যায়গাটুকু চোখে পড়লে, অভিনেতাদের চরিত্র-রূপায়ণে একা- গ্রতা নষ্ট হতে পারে।” তিনি পূরাে ১vings তাই রঙ করিয়ে নিলেন। ঠিক এন্নি ধরণের গল্প শুনেছিলাম---চলচ্চিত্রে Cleonetra বইএর পােষাক সম্পর্কে। (Cleopetraর পােষাক তৈরী হ’ল অজস্র অর্থ- ব্যয় করে—নীল-নদীর রঙের তনুরূপ মহার্ঘ্য সিল্কের কাপড়ে। পরিচালককে একজন জিজ্ঞাসা করলেন : “অত দামী সিল্ক এবং সামান্য সিল্ক বা সাটিনের রঙ যদি ঠিক এক হয়—ক্যামেরাতে তাে এক রকমই দেখাবে। Cleopetraর পােষাকের জন্য এত টাকা যে খরচ করা হল—ছবি দেখবার সময় দর্শক তা জানবে কি করে ? তারা তাে ওকে সামান্য সিল্ক বা সামান্য সাটিনও মনে করতে পারে ?” পরিচালক জবাব দিলেন : “দর্শক না জানুক—আমার অভি- নেত্রী জানে তার পােষাকের দাম। এই পােষাক তার মনের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করবে—Cleopetraর চরিত্র রূপায়ণে তাতে তার যথেষ্ট সুবিধা হবে।” পােষাক, দৃশ্যপট, আলােকসম্পাত, সকল বিষয়েই Cleopetra-পরিচালকের এই যুক্তি প্রয়ােগ করা চলে। অভিনেতাকে কেন্দ্র করেই এই সকল বিভাগের শিল্পীদের কলা নৈপুণ্য দেখান উচিত।
মঞ্চে ও নেপথে। ৮৯ ঘূর্ণীমঞ্চ, শকটমঞ্চ এবং ডুবরী (?) মঞ্চ (Revolving, Tagol and Sinking Stage) প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফ্ল্যাট সীনের (Flut Scene) রেওয়াজ এক রকম উঠে গেছে। ঐ সকল মঞ্চে দু' তিনটী:দৃশ্য, আগে থেকে, এক সঙ্গে সাজিয়ে রাখা যায় । তাই প্রায় প্রত্যেক দৃশ্যেই সেক্সী (Set Scene) ব্যবহার করা হয়। তবে, আমাদের দেশে সর্বত্র Revolving Stage বা ঘুর্ণী মঞ্চ নেই : বর্তমানে Vagon Stage আমাদের কোন রঙ্গ-গৃহে ব্যবহৃত হয় না; এবং Sinking Stageএর প্রবর্তন আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে একেবারেই হয়নি। যাদের Revolving stage নেই, তারা•••মঞ্চের পিছন দিকে যখন Set scene সাজানাে হয়-তখন বাধ্য হয়ে সামনের দিকে Flat scene ব্যবহার করেন। মােট কথা Flat sceneএর কদর আমাদের দেশেও কমে গেছে। এক দৃশ্যে একটী নাটক অভিনয় করবার সুবিধা থাকলে কোন রঙ্গমঞ্চই এখন আর Flat Scene ব্যবহার করতে চান্ না। নাট্য-নিকেতনে অভিনীত একটি দৃশ্যে সম্পূর্ণ “ঝড়ের রাতে” নাটকে, মঞ্চ-শিল্পের প্রশংসনীয় পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। Set scene তৈরী করতে চিত্রশিল্পীর সঙ্গে স্থপতির নােগাযােগ হয়। বাড়ী ঘরের দরজা, জানালা, খিলান, Set sceneএ শুধু রঙের তুলি বুলিয়ে আঁকা হয় না•••স্থপতি তার সম্পূর্ণ অবয়বটি গড়ে তুলতে চিত্র-শিল্পীকে সাহায্য করেন। চিত্রশিল্পী ও স্থপতির সমবেত প্রচেষ্টায় যখন একটা দৃশ্য রচিত হয়- আলােকশিল্পী বিচিত্র আলােক সম্পাত নৈপুণ্য দ্বারা তার যথাযথ রূপটা সম্পূর্ণ করে তােলেন। কি ভাবে আলােক নিয়ন্ত্রণ করলে...দৃশ্যটীর নাটকের প্রয়ােজন অনুযায়ী রূপ ফুটে উঠবে-সে বিষয়ে আলােক- শিল্পীর যথেষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়ােজন।
মঞ্চে ও নেপথ্যে কোন দৃশ্যের পিছন দিকটা অন্ধকার, মাঝখানটা উজ্জ্বল এবং সামনের, অংশ অপেক্ষাকৃত আবছা করে রাখলে-দৃশ্যটীর যথেষ্ট depth আছে মনে হবে। ঘরের দেওয়াল, চওড়া জানালা প্রভৃতির ওপর জোর আলাে ফেলে সামনের আসবাবপত্র ঈষৎ অন্ধকারে রাখলেও ঘরের depth বােঝান যায়। তেমনি আবার দৃশ্যের মধ্যে যেখানে curve বা গােলাকার অংশ আছে, আলােকসম্পাত দ্বারা সেই অংশগুলি বেশী উজ্জ্বল করে তুললে•••দৃশ্যটীর Roundness চমৎকারভাবে ফুটে উঠবে। 3' Set Sceneএ ঘর বাড়ী দেখাতে হলে অধিকাংশক্ষেত্রেই Box Sct তৈরী করা হয়। ঘরের চারদিকের চারটী দেওয়াল ; দর্শকের সামনের দেওয়ালটী শুধু ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে ; বাকী তিনটী দেওয়ালসহ ঘরের যে চেহারা হয়—Box Sceneএর ঘর আমরা ঠিক সেই ধরণের দেখতে পাই। তিনটী দেওয়ালের পরিবর্তে ছােট বড় অনেকগুলি কোণ (Angle) বার করা•••চার, পাচ বা তদূর্ধ ছােট, বড় দেওয়াল দিয়ে Angle Set তৈরী করা যায়। গতানুগতিক Box Setএ অভিনয় করবার চাইতে, Angle Setএ অভিনয় করতে অভিনেতা অনেক বেশী তৃপ্তি পান। Box Sceneএ ঠিক মাঝখানে কিম্বা ডাইনে বা বায়ের দরজা দিয়ে চলাফেরা করতে হয় ; Angle Setএ অভিনেতার সুবিধা অনুযায়ী মঞ্চের যে কোন দিক থেকে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা চলে। তা ছাড়া Angle Setএ দৃশ্যের depth যত চমৎকারভাবে দেখান যায়-Box Syeneএ তেমন সভব নয়। মঞ্চের সীমাবদ্ধ স্থানের মধ্যে কোন বিরাট দৃশ্যের অবতারণা করবার মঞ্চে ও নেপথ্যে প্রয়ােজন হলে, দৃশ্যটা সম্পূর্ণ না দেখিয়ে, তার বিরাটত্বের গােটাকতক বৈশিষ্ট্যমূলক ইঙ্গিত দিলেই দর্শকেরা সম্পূর্ণ দৃশ্যটা কল্পনা করে নেন্। যেমন, মঞ্চে কোন জাহাজ দেখাতে হলে –নােঙ্গর, চাকা, দড়ি এবং প্রকাণ্ড মাস্তুলের খানিকটা অংশ সুকৌশলে সাজিয়ে দিতে হয়। একটা বড় খেলনার মত সম্পূর্ণ জাহাজের চেয়ে—ঐ কটী বস্তু দ্বারা অনেক ভাল করে বড় জাহাজের ইঙ্গিত দেওয়া চলে। রঙ? কাঠ, কাপড় প্রভৃতি দৃশ্য রচনার উপাদানগুলি প্রচুর পরিমাণে হাতে পেলে, ভাল দৃশ্য রচনা করা যায় না—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। দৃশ্য- শিল্পী প্রথমে ভাববেন : কোন ধরণের দৃশ্য নাটকের চরিত্রের কাৰ্য- কলাপের সম্পূর্ণ অনুকূল হবে। তারপর ভাববেন : নাটকীয় চরিত্রের উপযুক্ত পশ্চাৎপট হিসাবে সেই দৃশ্যকে কি উপায়ে সব চেয়ে সহজে ও সুন্দর করে তৈরী করা যাবে। যেখানে অর্থাভাবে উপযুক্ত উপাদানগুলি সংগ্রহ করা যায় না, সেক্ষেত্রেও দৃশ্য শিল্পীকে হতাশ হলে চলবে না। নিউ ইয়র্ক (New york)-এর Theatre Guild এক সময় ছিল অতি দরিদ্র সৌখীন অভিনেতাদের নাট্যশালা। সীন আঁকবার পয়সা নেই ; তাই বর্ণ-নিরপেক্ষ (neutral-coloured) কাপড়ের টুকরাে জুড়ে, তাই সীনের মত করে তারা পিছনে টাঙিয়ে দিলেন। সেই কাপড়ের ওপর নানাপ্রকার রঙীন আলাে ফেলে গাছপালা, ঘরবাড়ী প্রভৃতি দৃশ্যের আভাষ দিলেন। অপরিসীম দারিদ্র্যের পীড়নে তারা সেদিন neutral coloured কাপড় ব্যবহার করেছিলেন পরবর্তীকালে সেই neutral coloured কাপড়ই প্রত্যেক দেশের রঙ্গমঞ্চে Sky cloth হিসাবে সমাদর পেল, তা দিয়ে মঞ্চে plaster wall তৈরী হল। অর্থাভাবে এককালে যারা মঞ্চের গতানুগতিক পথে চলবার অধিকার না পেয়ে–নূতন মঞ্চে ও নেপথ্যে নূতন পথ আবিষ্কার করবার সুযােগ পেয়েছিল—সেই দরিদ্র শিল্পীদের Theatre Guild আজ সারা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যশালা, আমেরিকার ধনকুবেররা আজ তার পৃষ্ঠপােষকতা করছেন। আজকাল কোন কোন মঞ্চে drapery workএর প্রচলন হয়েছে। রঙীন পর্দা দিয়ে ঘর তৈরী হচ্ছে ; সেই পর্দা কুঁচিয়ে, গােল করে, ইচ্ছামত সাজিয়ে, তার দ্বারা মােটামােটা থাম, দরজা, জানালা প্রভৃতি দেখান হচ্ছে। Drajpery workএর সঙ্গে আঁকা সীন, বা কাঠের তৈরী দরজা, জানালা-মােটেই মানানসই হয় না। সত্যিকারের দরজা বা আঁকা দরজার চেয়ে•••রঙীন পর্দায় খানিকটা ফাক রেখে দিলেই তা দরজা হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। Drapery worlkএর পশ্চাৎপটরপে শুধু Neutral Coloured Sky ব্যতীত, অন্য কিছু ব্যবহার করা উচিত নয়। শচীন্দ্রনাথের “ধাত্রী পান্না” ও “রাষ্ট্র বিপ্লব” নাটকের অভিনয়ে অঙ্কিত দৃশ্যের পরিবর্তে JDrapery workএর সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। রঙীন পর্দার সাহায্যে অভিনয় করতে হলে, পর্দার রঙ, বেছে নেবার সময় একটা কথা মনে রাখতে হবে : যে দৃশ্যে যে ধরণের রস দর্শককে পরিবেশন করতে হবে—সেই দৃশ্যের পর্দার রঙও যেন সেই রসের অনুযায়ী হয়। শৃঙ্গার রসে শাদা.. বীররসে হলদে, করুণরসে ঈষৎ পাটলবর্ণ.. হাস্যরসে শাদা এবং কালাে•• ভয়ানক রসে নীল••বীভৎস- রসে ধোঁয়াটে...অদ্ভুত রসে কালাে•••এবং রোদ্ৰরসে লাল রঙের পর্দা ব্যবহার করা উচিত। তা ছাড়া, কেবল লাল রঙ, সব রসেরই অনুকুল বলে—সব দৃশ্যে ব্যবহার করা চলে।
বিভিন্ন রূপসজ্জায় : নটসূৰ্য্য অহীন্দ্র চৌধুরী “নার্সিংহমে” রাণীবালা, অহীন্দ্র চৌধুরী ও জহর গাঙ্গুলী মঞ্চে ও নেপথ্যে মঞ্চে আলােকসম্পাত করা হয়, অভিনেতা মাত শােন ভাবে নাটকের চরিত্রকে রূপায়িত করতে পারেন, সে বিষয়ে তাকে সাহায্য করবার জন্য। কিন্তু তা বলে, কোন্ বিশিষ্ট অভিনেতাকে, তিনি যত জনপ্রিয়ই হােন্ না কেন-নাটকের আর সবাইকে ছেড়ে, তাকে প্রাধান্য দেবার জন্য আলােকসম্পাত করা অত্যন্ত অসঙ্গত। আলােক-শিল্পী লক্ষ্য রাখবেন, কি উপায়ে সমস্ত নটনটাকে দিয়ে সমগ্রভাবে নাটকের রূপটা ফুটিয়ে তুলতে পারা যায়। ঐক্যতান বাহনের মত অভিনয়ে সমস্ত শিল্পীর একটী সংহত এবং সমবেত সুর সৃষ্টির প্রয়াস থাকবে। নাটকের যা মূল সুর-আলােকসম্পাতও হবে তদনুযায়ী। ভাবগম্ভীর নাটকের আলােকসম্পাত হবে অত্যন্ত সংযত ; মেলােড্রামায় মৃদু আলােকসম্পাতে থাকবে আলাে ছায়ার লীলা এবং হাস্যরসাত্মক বা মিলনান্ত নাটক আলাের প্রাচুর্যে রৌদ্রকরােজ্জ্বল দিনের মত ঝলমল করবে। আলাের ইঙ্গিত, নাটকের সূচনাতেই দর্শককে নাট্যরসের স্বরূপ সম্বন্ধে সচেতন করবে ; তাদের মন সৌন্দৰ্য্য-উপলব্ধির আশায় উন্মুখ হয়ে থাকবে।
আগামী কালের মঞ্চ মঞ্চরূপ পরিকল্পনায় যার মত বিরাট প্রতিভা আজ পর্যন্ত আর আবির্ভূত হয় নি-সেই এডওয়ার্ড গড়ন জেগের (Edward Gordon Craig) কথা বলব। আদর্শ রঙ্গমঞ্চের যে রূপ তিনি পরিকল্পনা করেছেন—হয়তাে সেভাবে মঞ্চলােককে রূপায়িত করা কোন দিনই সম্ভব হবে না। তিনি তার পরিকল্পনার কথা বলেছেন- “আমার স্বপ্নকে আমি সারা জগতের সামনে কথায় প্রকাশ করেছি সে স্বপ্ন বাস্তবলােকে মুৰ্ত্তি নেবে কি নেবে না—তা ভাবুক ভাবী- কাল।” গর্ডন ক্রেগের সেই আদর্শ পরিকল্পনার মূলে রয়েছে Ulper Marionette•••অভিনেতার পরিবর্তে পুতুল দিয়ে অভিনয় করান•••সে অভিনয়ে নাটক হবে কথাবিহীন। যে পরিকল্পনা কোন দিন বাস্তবজগতে রূপ রূপ নেবে কি না- সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে-তার কথা এখন না-ই বা বললাম। আজকের মঞ্চ সুসংস্কৃত হয়ে আগামী কাল যে মূর্তি নেবে, সেই আগামী কালের মঞ্চের স্বরূপ সম্বন্ধে এখানে সংক্ষেপে আলােচনা করব। আমরা গর্ডন ক্রেগের পরিকল্পিত আগামী কালের মঞ্চ বিষয়ক মতবাদ আংশিকভাবে গ্রহণ করেও আমাদের বর্তমানের মঞ্চলােক সেই অনুযায়ী সংস্কার করে নিতে পারব কি ? অভিনয় ? থিয়েটারের আর্ট বলতে কি বুঝব? ;•••অভিনয় থিয়েটারের আর্টের একটি অংশ। নাটক? না•••নাটক সাহিত্যের একটি বিশেষ শ্রেণী। থিয়েটারের আর্ট দৃশ্যপটও নয়, নৃত্যগীতও নয়। তবে ? থিয়েটারের আর্ট–অভিনয়, নাটক, দৃশ্যপট ও নৃত্য- গীত যে সব উপাদানে তৈরী—তাদের সমন্বয়ে। Action বা ক্রিয়া নিয়েই অভিনয়, বাক্য নিয়ে নাটক, বর্ণ ও রেখা নিয়ে দৃশ্যপট মঞ্চে ও নেপথ্যে এবং ছন্দ নিয়েই নৃত্য গঠিত হয়। ক্রিয়া, বাক্য, বর্ণ, রেখা এবং ছন্দ-এদের সমম্বয় হলে তখনই আমরা দেখতে পাই থিয়েটারের আর্ট। আর্টের এই সম্মিলিত উপাদানের কোনটিকে উপেক্ষা করবার উপায় নেই; চিত্রকরের ব্যবহৃত বিভিন্ন রঙের মত মঞ্চের পূর্ণাঙ্গ চিত্রের জন্য এরা সকলে প্রয়ােজনীয়। তবে এক হিসাবে বিচার করলে—Action বা ক্রিয়ার মূল্য সব চেয়ে বেশী। রঙীন ছবির সঙ্গে মূল রেখাচিত্রের (Drawing) যে সম্পর্ক, থিয়েটারের আর্টের সঙ্গে ক্রিয়ারও ঠিক সেই সম্পর্ক। ক্রিয়া, গতি ও নৃত্যের মাঝখান থেকেই উদ্ভব হয়েছে থিয়েটারের আর্ট। থিয়েটারের জন্যই নাটক রচিত হয়। সুতরাং নাটক পড়বার জিনিষ নয় ; দেখবার জিনিষ। এবং দেখবার জিনিষ বলেই, তাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্রিয়া (Gesture) বর্তমান থাকবে। নৃত্যবিদের কাজ হল, বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্রিয়ায় বা ছন্দে••ভাবের অভিব্যক্তি। সুতরাং নৃত্যবিদ হতেই নাট্যকারের উদ্ভব। আদিম নাট্যকার শুধু কথা দিয়ে নাটক রচনা করেননি; তার নাটকে ছিল - ক্রিয়া, বাক্য, বর্ণ, রেখা ছন্দের সম্মিলন। সুকৌশলে এই পাঁচটির সমন্বয় সাধন করে, তিনি মানুষের চোখ এবং কাণ এই দুটি ইন্দ্রিয়ের পথ ধরে, রূপ-রসের ক্ষুধা মিটিয়েছিলেন। আদিম ও বর্তমানের নাট্যকারের মধ্যে তফাৎ কোথায় ? আদিম নাট্যকার বাইরের জগৎ থেকে পরিব্রাজকের মত মঞ্চললাকে আসেননি-মঞ্চজগতের ভেতরই হয়েছিল তার অত্যুদয় ; পিতৃপুরুষের রক্তধারার মত তার দেহের অনুপরমাণু জুড়ে ছিল মঞ্চ-চেতনা। আধুনিক নাট্যকারের মঞ্চজগতের সঙ্গে সে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ নেই।
মঞ্চে ও নেপথ্যে তাই আদিম নাট্যকার জন্মগত সংস্কারের মত মঞ্চললকের এমন কতকগুলি তথ্য সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন, যা আজকের দিনের নাট্যকার এখনও আয়ত্ত করতে পারেননি। আদিম নাট্যকার জানতেন, তঁার কল্পিত চরিত্রগুলি দর্শকের সামনে উপস্থিত হলে- দর্শকেরা, চরিত্র যা বলবে তা শােনবার চেয়ে, চরিত্র যা করবে তাই দেখবার জন্যে অনেক বেশী আগ্রহ প্রকাশ করবে। তিনি এই সাধারণ সত্যটি জানতেন যে•••মানুষের আর সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের চেয়ে চোখকেই সব চেয়ে তাড়াতাড়ি অভিভূত করা যায়। চরিত্র তথা অভিনেতা, মঞ্চে এসে দাড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই, সবার প্রথমে তাকে স্বাগত সম্ভাষণ জানায় হাজার হাজার কৌতুহলী, রূপ- পিয়াসী চক্ষু। উৎসুক, জিজ্ঞাসু সহস্র চক্ষুর সঙ্গে তাঁর রচিত চরিত্রগুলি.. গদ্যে হােক্, পদ্যে হাে-যা কিছু কথা বলবে•••সবই ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। গদ্য-ক্রিয়ার নাম অঙ্গভঙ্গী বা Gesture এবং পদ্য-ক্রিয়ার নাম নৃত্য। আজকের দিনের নাট্যকার বড় মুখর ; রচনা তঁর কথা-প্রধান ; তার নাটকের আবেদন চোখের চেয়ে কাণের ভেতর দিয়ে। তবু আজও দর্শকেরা থিয়েটারে যায়—থিয়েটার দেখতে.. থিয়েটার শুনতে নয়! নাটক পরিবর্তিত হয়েছে-নাট্যকার পরিবর্তিত হয়েছে—কিন্তু দর্শক আজও সেই আদিমকালের শাশ্বত মানুষটি !•••নাটক দেখবার জন্য, নাটক পড়তে গেলেই তাকে অসম্পূর্ণ বােধ হবে। Shakespeareএর নাটকের কথা স্বতন্ত্র। Hamlet পড়বার সময় যে আনন্দ পাই—অভিনয় দেখে ঠিক তেমনটি কখনও পেতে পারি । অভিনয় দেখে মনে হয়, “না, Shakespeareএর Hamlet ঠিক এ জিনিষ নয়।” যখন কোন সৃষ্টিকে সম্পূর্ণ করবার জন্য
৮ ।
মনােরঞ্জন ভট্টাচার্য্য
প্রভাত সিংহ ও শরৎ চ্যাটাচ্ছি
শৈলেন চৌধুরী
ii
(১) “কঙ্কাবতীর ঘাটে” বীণা, ধীরেন দাস, শিবকালী।
(২) অভিনয়ের অবকাশে বীণা, অপর্ণা।
(৩) অভিনয়ের অবকাশে সিধু গাঙ্গুলী, পঞ্চানন বন্দ্যোঃ, ভূপেন চক্র।
(৪) “কঙ্কাবতীর ঘাটে” ঘূথিকা, পঞ্চানন, কমল, বীণাপাণি, জয়নারায়ণ মুখার্জি
মঞ্চে ও নেপথ্যে ৯৭ আর কিছুর সাহায্য প্রয়ােজন হয় না—তখন সেতাে নিজেই সম্পূর্ণ shakespeare যখন Hamletএর শেষ লাইনটি লিখেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তার সৃষ্টিও সম্পূর্ণ হয়েছিল। তাই তার সঙ্গে অঙ্গভঙ্গী, দৃশ্যশােভা, সজ্জা অথবা নৃত্য সংযুক্ত করবার কোন প্রয়ােজন হয় না। আগামী কালের শিল্পী কেবল কি সুসম্পূর্ণ নাটকের ভাষ্যকার রূপে বেঁচে থাকতে চায়? তার মনের ভেতর নিজস্ব সৃষ্টির প্রেরণা কি কোন দিন জাগবে না? তা যদি জাগে, তবে তাকে আগামী কালে এমন নাটক অভিনয় করতে হবে, যা পড়লে সম্পূর্ণ হয় যে নাটক পূর্ণতা লাভ করবে কেবল মাত্র রঙ্গমঞ্চে এসে। মঞ্চললকের শিল্পী তাকে ক্রিয়া দেবে, বর্ণ ও রেখা দেবে, গতির ছন্দ দেবে, দৃশ্যশােভায় সজ্জিত করবে..তারপর সে নাটক হবে পূর্ণাঙ্গ। ; মঞ্চলােকের যা নিজস্ব শিল্পকলা—আধুনিক নাট্যজগত তা হারাতে নাট্যজগতের অধােগতি হয়েছে। শুধু নাট্যজগতের নয়... দর্শকেরও অধােগতি হয়েছে, নইলে তারা রঙ্গমঞ্চে এসে পূর্ণ আনন্দ লাভ করে কি করে ? কেন তারা অতৃপ্ত হয়ে ফিরে যায় না? কেন শ্রেষ্ঠতর, মহত্তর সৃষ্টির দাবী জানায় না ? অবশ্য, এ জন্য দর্শককে দোষী করা চলে না; সুরলােকের সন্ধান তারা পায়নি তাই অসুরলােকেই তারা স্বর্গগঙ্গার কলধ্বনি শুনছে মনে করে। রঙ্গমঞ্চে সত্যিকারের নাট্যকলার সাধনা নেই—তার কারণ এ নয় যে-দর্শকেরা সে বস্তু চায় না। শিল্পীর অভাবে নাট্যকলার অবনতি—সে কথাও স্বীকার করা চলে না। শক্তিমান শিল্পী ১৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে আছে-কিন্তু সে জানে না তার শক্তির পরিমাপ...জানে না কোন উপাদানে, কেমন করে গড়ে তুলবে নাট্যভারতীৰ মৰ্ম্মর-সৌধ ; শিল্পীকে সে বিষয়ে নির্দেশ দেবে কে ? কে তাকে চালিত করবে ? আধুনিক মঞ্চললকে অভাব সেই শক্তিমান নেতার—অথবা পরি- চালকের। পরিচালকের সঙ্গে শিল্পীদের সম্পর্ক-অধিনায়কের সঙ্গে অর্কেষ্টার মত-পুস্তক প্রকাশকের সঙ্গে মুদ্রাকরের মত। নাট্যকারের হাত থেকে পরিচালক যখন নাটক গ্রহণ করেন তিনি নাট্যকারকে এই প্রতিশ্রুতি দেন, যে...নাটকখানিকে তিনি যথাযথভাবে মঞ্চে রূপায়িত করবেন। নাটক পড়বার সঙ্গে সঙ্গে নাটকের বর্ণ, সুর, গতি এবং ছন্দ, তার মনের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাট্যকার যদি কোথাও দৃশ্যের বর্ণনা, বা মঞ্চাভিনয় সম্বন্ধে নাটকে কোন ইঙ্গিত দেন—পরিচালক সে সব ইঙ্গিত নিয়ে একটুও মাথা ঘামান্ না। নাটকীয় চরিত্রের ভেতর থেকে পরিচালক যা কিছু ইঙ্গিত সংগ্রহ নাট্যকারের নিজের কোন ইঙ্গিত দেবার অধিকার নাই।. খারাপ অভিনয় করার অর্থ অভিনেতা শক্তিহীন। কিন্তু অভিনেতার সব- চেয়ে বড় অপরাধ-নাটকের কথা বাদ দেওয়া, অথবা নাটকে নিজের কথা বসিয়ে নেওয়া। নাট্যকার কর্তৃক কথার সর্বসত্ব সংরক্ষিত ; মঞ্চরূপ পরিকল্পনা বিষয়টা পরিচালক কর্তৃক সংরক্ষিত। একজন কর্তৃক অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করাই অপরাধ। বারম্বার নাটক খানিকে পাঠ করে যে সব বর্ণ, ছন্দ, গতি, পরি- চালকের কল্পনা নেত্রে সুস্পষ্ট আকার ধারণ করেই নিয়ে তিনি মঞ্চে ও নেপথ্যে তাঁর প্রাথমিক কাজ আরম্ভ করেন। আধুনিক কালের রঙ্গমঞ্চে নাট্যশিল্পের অবনতির একটি প্রধান কারণ...পরিচালক নাটকের বিভিন্ন রূপের পরিকল্পনার দায়ীত্ব বিভিন্ন শিল্পীর ওপর ছেড়ে দেন। তিনি নাট্যকারকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাটক গ্রহণ করেছিলেন ? তার প্রতিশ্রুতি ছিল নাটকের, কথাকে আমি সুর দেব, ছন্দ দেব । ভাবকে রেখাচিত্রে, রঙের স্পর্শে প্রত্যক্ষ মৰ্ত্তি দেব; নাট্যকারের সৃষ্টিকে আমি কোথায়ও এতটুকু ক্ষুন্ন করব না,-অতিক্রম করব না। এই যে প্রতিশ্রুতি—একে যথাযথ ভাবে রক্ষা করতে হলে-সমস্ত দিককার পরিকল্পনা পরিচালকের নিজের করা উচিত। তার একার মনে যে পরিপূর্ণ রূপটা জাগবে—ভিন্ন ভিন্ন শিল্পী নাটককে ইচ্ছানুযায়ী রূপায়িত করলে—তাতে বিভিন্ন রুচীর সঘর্ষ বাধবে ; বর্ণ ছন্দকে ছাড়াবে—ছন গতিকে অতিক্রম করতে চাইবে। পরিকল্পনায় ঐক্য থাকবে না -ফলে নাট্যরস সৃষ্টির প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাবে। মঞ্চে কি ভাবে নাটক রূপায়িত করবেন, তার নমুনা তৈরী করতে বসে-পরিচালক কেবল ঐতিহাসিক সত্যের দিকেই লক্ষ্য রাখেন না। সবার আগে, নাটকের মূল সুরের সঙ্গে যার সামঞ্জস্য আছে—ঠিক সেই রঙটা তিনি বেছে নেন্। সেই রঙ দিয়ে তিনি চিত্রপট তৈরী করেন-নাটকের প্রয়ােজন অনুযায়ী তাতে দরজা, জানালা, আসবাব- পত্র যেখানে যেমনটি দরকার সেই ভাবে স্থাপনা করেন। তার পর একে একে সেই চিত্রপটে নাটকের চরিত্রদের নিয়ে আসেন তাদের প্রতিটি গতি, তাদের প্রত্যেকটি সাজ-সজ্জা চিত্রপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। এই ভাবে নাটকের কথাগুলির চিত্র-রচনা সম্পূর্ণ হলে তিনি সুদক্ষ শিল্পীর সামনে সেই নমুনাটি তুলে ধরেন। দৃশ্য-শিল্পী তাই দেখে দৃশ্য রচনা করেন, পরিচ্ছদ নিৰ্মাতা পরিচ্ছদ তৈরী করেন।
মঞ্চে ও নেপথ্যে তৈরী হ’ল, পােক হ’ল—তবু, তখন পর্যন্ত, পরিচালকের চিত্রকে বলা চলে—স্বপ্ন-চিত্র। সেই স্বপ্ন-চিত্রকে মূৰ্ত্ত করেন অভিনেতা। নাটকের নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালক প্রয়ােজনীয় চরিত্রকে যথাক্রমে মঞ্চে নিয়ে আসেন। এইবার তিনি দৃশ্য ও মুক্তিকে আলােক উদ্ভাসিত করবার দিকে নজর দেন। প্রত্যেক নাটকের চরিত্রের জন্য পােক . এবং দৃশ্যের জন্য বর্ণবিন্যাস যেমন স্বতন্ত্র ধরণের হবে--আলােক নিয়ন্ত্রণ কৌশলও হবে তেমনি সেই নাটকের পক্ষে সম্পূর্ণ নিজস্ব। নাটকের মূল-সুরের সঙ্গে সমতা রক্ষা করেই রঙ, পােষাক ও আলােক নির্বাচন করতে হবে। অনেকে প্রশ্ন করবেন—পরিচালককে কি তা হলে বিশ্ব প্রকৃতির সমস্ত কিছুই অনুসন্ধিৎসু বিদ্যার্থীর মত অধ্যয়ন ও পৰ্যবেক্ষণ করতে হবে ? আলােক শিল্পীকে তিনি কি বলে দেবেন—এখন মধ্য-দিনের সূর্য উঠেছে ; সুতরাং তার আলাের গতি এবং ব্যপকতা হবে ঠিক এই ধরণের ?•••এ প্রশ্নের জবাব,-পরিচালক কখনও প্রাকৃতিক আলােককে যথাযথ ভাবে অনুকরণ করবার চেষ্টা করেন না। সে চেষ্টা করা ধৃষ্টতা মাত্র। তিনি জানেন—প্রকৃতি কখনও মানুষের কাছে সম্পূর্ণ ভাবে ধরা দেয় দেয় না এবং তাকে সম্পূর্ণ ভাবে অনুকরণ করতেও দেয় না। তিনি প্রকৃতির দেখা দেখি আর একটি নূতন প্রকৃতির রাজ্য সৃষ্টি করবার স্পর্ধা রাখেন না—তার কল্পনার রূপলােককে তিনি, আলােকোজ্জ্বল করেন•••প্রকৃতি থেকে বেছে নেওয়া কয়েকটি জীবন্ত উজ্জল রূপের ইঙ্গিত দ্বারা। সাধারণতঃ মঞ্চে যে ভাবে আলােক সম্পাত করা হয়—সে বিষয়ে আলােচনা করতে হলে সবার আগে লক্ষ্য পড়ে, পাদপ্রদীপ বা মঞ্চে ও নেপথ্যে ১০১ foot light এর ওপর। কেন মঞ্চের সামনে কতকগুলি 73 sf foot light সাজিয়ে রাখা হয় ? ওভাবে অভিনেতার পায়ের সামনে এক সার আলাে বসিয়ে দেবার প্রয়ােজনীয়তা কি ? যারা মঞ্চের আলােক-সম্পাত চেয়েছেন, তাদের সকলের মনেই এই প্রশ্নটি জেগেছে—কিন্তু এর জবাব পাননি; তার কারণ, এ প্রশ্নের কোনাে জবাব নেই। আলােক সম্পাতের উন্নতি করতে হলে—সর্ব প্রথম কাজ হ’ল-ঐ foot light এর সার মঞ্চ থেকে তুলে দেওয়া। কেউ কেউ বলেন, foot light না থাকলে অভিনেতার মুখের নীচে ছায়া পড়ে দেখতে অত্যন্ত বিশ্রী হবে। একটু ভেবে-চিন্তে অন্যদিক থেকে আলােক সম্পাত করলে•••অনায়াসে সে ছায়া দূর করে দেওয়া যায়। অভিনেতাদের অনেকের অভিমত••• foot light সরিয়ে দিলে দর্শকেরা তাদের মুখের ভাভিব্যক্তি দেখতে পাবেন না। Sir Henry Irving অথবা Elenora Duse এ কথা বললে, তবু তার খানিকটা মানে হত। সাধারণ অভিনেতাদের মুখে আবার ভাবাভিব্যক্তি কোথায় ? তাদের কার মুখে থাকে ' অভিব্যক্তির বাড়াবাড়ি ; আবার কারুর মুখ একেবারে অভিব্যক্তি- বর্জিত পটুয়ার ছবির মত। ভাবাভিব্যক্তির কথা যদি তারা তােলেন, তাহলে শুধু foot light কেন তাদের অভিনয়ের সময় সব কটা আলাে নিবিয়ে দিতে পারলে ভালাে হত।•••প্রসঙ্গক্রমে, foot lightএর সূচনা সম্বন্ধে M. Ludovic Celler যে অভিমত পােষণ করেন, তার উল্লেখ করা যেতে পারে। আগের কালে প্রকাণ্ড সব আলাের ঝড় মঞ্চর ওপর দিকে টাঙিয়ে দেওয়া হত•• অভিনয় কালে ওপর থেকে সেই আলাে অভিনেতার মাথার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ত। M. Ludovic Celler বলেন ঃ ছােট ঘােট রঙ্গমঞ্চগুলি অত দামী আলাের ঝাড় কিনে ব্যবহার করতে পারত না ; তাই তারা মঞ্চের সামনের মঞ্চে ও নেপথ্যে দিকে অর্থাৎ অভিনেতাদের পায়ের সামনে সারি সারি মােমবাতি জালিয়ে দিত। সেই থেকে হ’ল foot lightএর জন্ম। দৃশ্য, পােষাক এবং আলােক নিয়ন্ত্রণের কথা ছেড়ে দিয়ে—এইবার জীবন্ত মূর্তিগুলির কথা এবং কাজ কি ভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে—সেই আলােচনায় আসা যাক্। জীবন্ত মূৰ্ত্তি অর্থাৎ অভিনেতাকে নিয়ন্ত্রিত না করলে—পরিচালক এত চিন্তা, এত সাধনার পর যে পূর্ণাঙ্গ চিত্র রচনা আরম্ভ করেছেন অভিনেতা নিজের অজ্ঞাতসারেই তা নষ্ট করে দেবেন। অভিনেতার অসুন্দর কিছু সৃষ্টি করবার ঝোঁক তা বলছি না ;—পরিচালক যে ভাবে রেখাঙ্কন করেছেন—যেটুকু সীমার মধ্যে থাকলে সৌন্দৰ্য্য পূর্ণভাবে প্রকাশিত হবে—সে সীমারেখা অভিনেতাকে দেখিয়ে না দিলে, বুঝিয়ে না দিলে—তিনি তাে সীমার বাইরে চলে যাবেনই। যিনি যত বড় অভিনেতা বা অভিনেত্রী হবেন-পরিচালকের নির্দেশ তাকে তত বেশী করে মানতে হবে। কারণ, বড় অভিনেতা বা অভিনেত্রীরাই—পরিচালক মঞ্চ-চিত্রের যে নক্সা তৈরী করেন-তার মাঝখানে থাকেন•••ার একটুখানি নক্সার বাইরে গিয়ে পড়লেই—সর্বনাশ ! অভিনেতা নিজের , অনুভূতি দ্বারা এক মুহূর্ত চালিত হবেন না; তিনি চলবেন সমগ্র নাটকীয় রূপের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে—ঐক্য বজায় রেখে। •• অনেকে ভাববেন : অভিনেতা কি তা হলে পরিচালকের হাতের পুতুল মাত্র ! অনেক অভিনেতার মনেও, পরিচালক যখন, তাদের নিয়ন্ত্রিত করেন—তখন এ প্রশ্ন জাগে। তাঁরা মনে করেন : সূত ধরে যেমন করে পুতুলকে নাচানাে হয়—পরিচালকও তাদের সেইভাবে নাচাচ্ছেন। এই মনােভাবের সৃষ্টি হয় বলেই তারা আহত, ক্ষুব্ধ হন্। মনের ভেতর অসন্তোষের ধােয়া জমে ওঠে বলে—তাদের চরিত্র রূপায়ণও সার্থক মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৩ হয় না। সীমার মধ্যে থেকেও তারা কতখানি স্বাধীন, নিজ নিজ শক্তির বিকাশ তারা কতখানি দেখাতে পারেন সে বিষয়ে তাদের কোনাে ধারণা নেই বলেই—এই অসন্তোষের সৃষ্টি। কোনও জাহাজের কথা ভাবুন। জাহাজে অনেক সুদক্ষ কৰ্মচারী ও যন্ত্রনায়ক থাকেন। নিজ নিজ যন্ত্রের পরিচালনায় তাদের নৈপুণ্য অপরিসীম। কিন্তু তবু তারা কেউ ক্যাপ্টেন (Captain) নির্দেশ ব্যতীত কোন কাজ করেন না। ক্যাপ্টেন যখন যেভাবে তাদের নিজ নিজ যান্ত্রিক বিভাগ পরিচালনা করতে নির্দেশ দেন- তারা ঠিক সেইভাবে কাজ করে যান—এবং কাজ করেন সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। স্বেচ্ছায় কারুর বশ্যতা স্বীকার করবার নামই হল— Obedience বা বাধ্যতা। বহু কৰ্মী, বহু, যন্ত্রীকে নিয়ে রঙ্গমঞ্চ ; তাকেও তুলনা করা যায়, জাহাজের সঙ্গে। মঞ্চেও প্রয়ােজন ঠিক ঐ ধরণের স্বেচ্ছাপ্রণােদিত বশ্যতা স্বীকার। জাহাজের কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বা অবাধ্যতার সৃষ্টি হলে কঠোর হস্তে শাসনের ব্যবস্থা আছে ; রঙ্গমঞ্চে তা নেই। মঞ্চের সমস্ত বিভাগের, সমস্ত শিল্পীর মনে..তাদের দায়ীত্ব, তাদের বশ্যতা স্বীকারের গুরুত্ববােধ জাগ্রত থাকা একান্ত আবশ্যকীয়। 'অবশ্য মঞ্চ-শিল্পীদের অন্তরের মাধুর্যের তুলনা হয় না। তারা পরি- চালকের অবাধ্য হন শুধু তখনই—যখন তাদের বিচার-বুদ্ধিতে ভুলের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধ-জাহাজের কোন কর্মী শত্রুর সঙ্গে গােপনে যােগ দিলে-গােটা জাহাজখানা বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে। বিচারবুদ্ধির দোষে মঞ্চের কোন একজন শিল্পীও যদি শত্রুপক্ষের সঙ্গে সামান্য যােগা- যােগ স্থাপন করেন তাহলে মঞ্চের শিল্পকলা র প্রয়াসও তেমনি বিপন্ন হয়ে পড়ে। মঞ্চের শত্রু কে?—মঞ্চের শত্রু-নিম্ন শ্রেণীর ১৪ মাঞ্চে ও নেপথ্যে অভিনয়, নিম্ন স্তরের জনমত, এবং দন্তপূর্ণ মূঢ়তা। এই তিনটি শই বেশীর ভাগ শিল্পীকে বশীভূত করতে চেষ্টা করে। অভিনেতাদের মধ্যে কেউ নাট্যপরিচালনা করতে পারেন কিনা-এর জবাব : না, করা উচিত নয়। জাহাজের কোন যন্ত্র-দক্ষকে যদি ক্যাপ্টেনের পদে উন্নীত করা হয়, তা হলে তিনি শুধু ক্যাপ্টেন হিসাবে কাজ করবেন, নিজের হাতে যন্ত্র ঘােরাবেন না, দড়ী টানবেন না। তেমনি, একসঙ্গে অভিনয় ও নাট্যপরিচালনা করা উচিত নয়। যদি কোন অভিনেতা নাট্যপরিচালক হন-তা হলে একথা খুবই স্বাভাবিক, যে...তিনি নিজেকেই সকলের কেন্দ্রস্থলে রাখবার চেষ্টা করবেন। নাটকের জন্য তিনি থাকবেন না,-নাটক থাকবে তাকেই ঘিরে। সমগ্রভাবে নাটকের রূপ কল্পনার পরিবর্তে তিনি তার নিজের গৃহীত, অংশটাকে সর্বপ্রধান করে তুলতে চাইবেন। নাটকের ঐক্য ব্যাহত হবে, রস সৃষ্টির সমস্ত প্রচেষ্টা ক্ষুন্ন হবে। নিজে অভিনয় করবেন এবং সেই সঙ্গে নাটকের সকল দিক্কার ঐক্য বজায় রাখবেন—তেমন অভিনেতা-পরিচালক কেউ হতে পারেন কি না জানি না। নাট্যকারও পরিচালক হতে পারেন না; তার একটী প্রধান কারণ তিনি থাকেন স্বতন্ত্রজগতে; তার রক্তের সঙ্গে মঞ্চের সংস্কার মিশ্রিত থাকে না। নাট্যকার যখন অভিনয়, দৃশ্য রচনা, আলােক নিয়ন্ত্রণ এবং নৃত্যশিল্পের বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেন—শুধু বই পড়ে নয়, মঞ্চজগতের সঙ্গে অচ্ছেদ্যরূপে সংযুক্ত থেকে—একমাত্র তখনই হতে পারেন তিনি নাট্য-পরিচালক। কিন্তু নাট্যকারের পক্ষেও এ কাজ অত্যন্ত দুরূহ।
NICHEZ
No text on this page.
গিরিশচন্দ্র ও নাটমঞ্চ মতের নাট্যশাস্ত্র: সংস্কৃত যুগের রঙ্গালয়•••তার সঙ্গে বাংলা থিয়েটারের সম্বন্ধ নেই। প্রাচীনকালে যে নাটক ও রঙ্গালয় গড়ে উঠেছিল কালিদাস, ভবভূতি প্রভৃতি মহাকবির বিরাট প্রতিভার সংস্পর্শে—সে যুগের সে নাট্য-রসধারা যদি বহতা নদীর মত বয়ে আসতে পারতাে কালের পরিধি অতিক্রম করে—তা হলে হয়তো আমাদের রঙ্গজগতকে রস-সমৃদ্ধ করতো—সেই গতিশীল, বহমান, বিচিত্ররূপ রস-প্রবাহিনী। পাহাড়, পর্বত পেরিয়ে, দেশের দেশ পিছনে ফেলে যে নদী বয়ে চলেছে-তার গতি পরিবর্তন, রূপ- বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব মন-ভূমিতে করে বিচরণ করে•••বহু সঙ্ঘাতের ভিতর দিয়ে অতীত যুগের সে নাট্য-রসধারাও আজকের যুগে সম্পূর্ণ নূতন মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করতাে•••কিন্তু তবুও তাকে বলতুম আমরা সংস্কৃত নাটকেরই দুহিত। ব্যাকরণের সন্ধি সূত্রের নাগপাশে বেঁধে দিয়ে সংস্কৃতকে করা হল “মৃত ভাষা”।•••অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনকে বিধিনিষেধে আবদ্ধ করে দেওয়া হল ; নদীর প্রবাহ বাধা পেল সেখানেই হ’ল তার সমাপ্তি! তাই কালিদাসের সৃষ্টিকে আজ আমরা দূর হতে সবিস্ময়ে দেখি তাজমহলের মত সে যেন এক মৰ্ম্মর সৌধ ! বিধিনিষেধের গণ্ডীতে সংস্কৃত ভাষাকে বেঁধে না দিলে..কালিদাসের কাব্যপ্রতিভা যুগে যুগে নূতন মূর্তি নিয়ে দেখা দিত আমাদের নাট্য-সাহিত্যে আমাদের জাতীয় প্রমােদ-ক্ষেত্রে। সংস্কৃত যুগের সঙ্গে আমাদের নাট্য-সাহিত্যের একটা ধারা শেষ হয়ে গেল। তারপর এক বিরাট অন্ধকার যুগ ! বহু শতাব্দীর ব্যবধান। মুসলমান শাসনকালে যে কারণেই হােক নাট্য-সাহিত্যের নূতন করে পত্তন হল না...বিকাশ হল না। তারপর এল ইংরেজ আমল।
১০৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে শ্রীরামপুরের খ্ৰীষ্টান মিশনারীগণ, হয়তাে খানিকটা স্বার্থ-প্রণােদিত ছুয়ে অর্থাৎ খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম দেশের জনগণের মধ্যে প্রচারিত হবে•••এই আশা নিয়ে, বাংলা ভাষার চর্চায় মনোেযােগ দিলেন-দেশে মুদ্রাযন্ত্র ও সংবাদপত্রের প্রচলন হ’ল। পরােক্ষভাবে তার ফলে বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিস্থাপন হ’ল•••দেশে নূতন নূতন প্রতিভার বিকাশ হ’ল। বাংলা ভাষার উন্নতির মূলে যেমন ছিল এই খ্ৰীষ্টান মিশনারীদের প্রচেষ্টা, বাংলা নাটকের নূতনভাবে পত্তন হয়েছিল সেও এই বিজাতীয়দের সংস্পর্শে এসে। এরাই এদেশে Shakespeare-এর নাটকাভিনয় কল্লেন এদের দেখাদেখি সংস্কৃত নাটক অনূদিত হয়ে অভিনীত হল•••নূতন বাংলা নাটক রচনার প্রেরণা এল. • নাট্যশালা স্থাপনের উদ্যোগপৰ্ব আরম্ভ হল। যারা এই নাট্যসাহিত্য রচনা ও রঙ্গশালা স্থাপনের উদ্যোক্তা তাদের কাছে আমরা চির-ঋণী সন্দেহ নাই...কিন্তু ব্যাপকভাবে, স্থায়ীভাবে, বিরাট সম্ভাবনাময় বঙ্গীয় রঙ্গশালার প্রধান স্থাপয়িতারূপে আজ আমরা প্রণাম করি মহাকবি গিরিশচন্দ্রকে। পূর্ববর্তীগণ এনেছিলেন কল্পনা•••এনেছিলেন উপাদান...গিরিশচন্দ্র নির্মাণ করলেন বাংলার স্থায়ী নাট্য-মন্দির। নাট্যচাৰ্য বা নাট্যকার গিরিশচন্দ্রের প্রতিভা বিচারের পরিসর এ প্রবন্ধে নেই। গিরিশচন্দ্র স্থাপিত বাংলার নাট্যশালা আজ পর্যন্ত কতখানি অগ্রগামী হয়েছে, তারই সামান্য আলােচনা করিতে চাই এখানে। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র নাটকীয় ভাবধারায় এবং techniqueএর দিক দিয়ে প্রধানতঃ Shakespeareকে অনুসরণ করেছেন। ভাবের দিক দিয়ে বর্তমান যুগের ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক নাটকগুলি অনেকটা Shakespeare-এর নাটকেরই অনুসরণে রচিত। Technique-এর দিক হতে বরং খানিকটা সে যুগ ছাড়িয়ে অগ্রসর হয়েছে স্বগতােক্তি, সুদীর্ঘ মঞ্চে ও নেপথ্যে dialogue, কাব্যের বাহুল্য অনেক পরিমানে হ্রাস পেয়েছে এবং অভিনয়ের সময় সংক্ষিপ্ত সাধারণত: আড়াই ঘন্টায় দাড়িয়েছে। সামাজিক নাটকের প্রতি এখনকার দর্শকদের আকর্ষণ পূৰ্বযুগ অপেক্ষা অনেকটা বেশী হয়েছে । Technique-এর দিক হতে বর্তমানের সামাজিক নাটকগুলির কতকগুলিকে Shakespeare-এর technique-এরই পরিমার্জিত সংস্করণ বলা চলে ; আবার দু’চার খানা Ibsen-এর নাট্যগঠন পদ্ধতি অনুসরণেও রচিত হয়েছে। সামাজিক নাটকের ক্ষেত্রেও অভিনয়ের সময় সংক্ষেপ করা হয়েছে। গিরিশ যুগের অভিনয় ধারার খানিকটা পরিবর্তন হয় নাট্যাচার্য শিশিরকুমারের আবির্ভাবে। শিশিরকুমারের নাট্য-মন্দির স্থাপনার সঙ্গে এবং আর্ট থিয়েটারের প্রচেষ্টায় নাটকের প্রয়ােগপদ্ধতিরও খানিকটা উন্নতি হয়। এলিজাবেথান যুগের ভেলভেটের পােষাক, পটে আঁকা scene প্রভৃতি বহুলাংশে বর্জন করা হয়েছে ; রঙ্গমঞ্চে মঞ্চস্থপতি অনেকখানি প্রাধান্য পেয়েছে। আমেরিকা-প্রত্যাগত সতুসেন রঙ্গমঞ্চে আলােক সম্পাতের উন্নত-প্রণালী প্রবর্তন করেছেন—বিশেষ করে “ঝড়ের রাতে” এবং “বিষ্ণুপ্রিয়া” নাটকে আলােক সম্পাত সত্যই প্রশংসনীয়। দুঃখের বিষয়, নবযুগ প্রবর্তক শিশির-প্রতিভা আজ অন্তোন্মুখ • •এবং আরও দুঃখ এই যে-বড় অসময়ে, বড় অতর্কিতে অস্তোন্মুখ। তার জন্য দায়ী কে—সে বিচার কব্বার ক্ষেত্র এ নয়।••• • এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য শুধু রঙ্গমঞ্চের বর্তমান পরিস্থিতি আলােচনা। শিশিরকুমারের পর এমন কোনাে বড়ড়া প্রতিভা বাংলা রঙ্গজগতে আসেনি—যাকে যুগস্রষ্টা বলা চলে। তাই, এখনকার রঙ্গমঞ্চের tendency অনেকটা • নিছক “teamwork”-এর দিকে। নাটকে যদি কিছু বস্তু থাকে এবং অভিনয়ে যদি team-work” থাকে-তবেই দর্শকেরা সন্তুষ্ট। তাই বর্তমান বঙ্গজগতকে “গণতান্ত্রিক”বলা চলে।
১১০ মঞ্চে ও নেপথ্যে এখন মােটামুটিভাবে ভেবে দেখা যাক্-গিরিশ-যুগে যে রঙ্গশালার স্থাপনা হল—এতদিনে তা কতখানি রূপ-পরিবর্তন করেছে। নাটকের দিক দিয়েই বলুন—বা অভিনয়ের দিক দিয়েই বলুন—আমার বিশ্বাস, বঙ্গীয় রঙ্গশালা “এলিজাবেথান” যুগ ছাড়িয়ে খুব বেশী দূর অগ্রসর হতে পারেনি। যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা নিছক্ যুগ- ধৰ্ম্মের পরিবর্তন-প্রতিভার সংস্পর্শে এসে নয়। বিদেশী নাটক অনু- সরণে বাংলা নাটকের সূচনা; কিন্তু যেখানে আমরা এগিয়ে এসে Ibsenকে অনুসরণ কচ্ছি-techniqueএর সঙ্গে বেমালুম অনুসরণ কর্জি:••Ibsen-এর ভাবধারাকে! আর, নাটকের অভিনয় এবং প্রয়ােগপদ্ধতি? ওদেশের মনীষা আজ এতদূর এগিয়ে এসেছে যে, তাদের মনে সন্দেহের সূচনা হয়েছে রক্ত-মাংসের মানুষ সত্যিকারের অভিনয় করতে পারে কি না—এই নিয়ে মানুষ-অভিনেতার ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ, রােগ, শােক, হর্ষ, বিষাদ রয়েছে; তাই নাটকীয় চরিত্রের রূপদান কালে তার শরীরের মাংসপেশী, তার অন্তরের ভাবাভিব্যক্তি•••••হয়তাে প্রতি অভিনয় রজনীতে নাটকের প্রয়ােজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে না। ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ প্রভৃতি হবে তার চরিত্র রূপায়ণের অন্তরায়। তাই না Gordon (Craig পরিকল্পনা করলেন Uber marionette”-এর। মানুষ অভিনেতার স্থান অধিকার কৰ্বে “কাঠের পুতুল”। অনেকে বলল-Craigকে পাগল। জগতের শ্রেষ্ঠ মণীষা—যারা সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য—তাদের অনেক সময় পাগল আখ্যা পেতে হয় বৈকি! 6. Craig এর পরিকল্পনার কথা আমি এখানে উল্লেখ করলুম শুধু এইটুকু দেখাতে, যে-য়ূনরাপীয় বঙ্গজগত আজ সৃষ্টির নব নব প্রেরণায় কতখানি চঞ্চল! আর আমরা ?
মঞ্চে ও নেপথ্যে ১১১ রজগতের উন্নতির জন্য বহুল পরিমাণে আলােচনা প্রয়ােজন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে-যারা এ বিষয়ে মাঝে মাঝে প্রবন্ধাদি লিখে থাকেন—তাঁরা কেউ রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন! এবং যারা রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে জড়িত থাকেন—তা ভুলেও একবার এ বিষয়ে আলােচনা করা দূরে থাক্-যে সব প্রবন্ধাদি অন্য লেখকেরা লিখে থাকেন, সেগুলিও পড়ে দেখবার অবকাশ পান না। কাজেই, রঙ্গমঞ্চের অবস্থা রইল সেই এক প্রকার। গিরিশচন্দ্র ইংরেজী নাট্যশালার অনুসরণে যে নাট্যশালার স্থাপনা করেছিলেন—ইংরেজীর অনুকরণবৃত্তি তার ভেতর বর্তমান থাকা স্বাভাবিক। সংস্কৃতযুগে এখন আর ফিরে যাওয়া চলে আমাদের নাট্যশালাকে চলতে হবে বিদেশীয় রঙ্গজগতের দিকে লক্ষ্য রেখে। বিলাতি ফুল এদেশে আমদানী হয়েছে ক্ষতি নেই; কিন্তু টবে পুতে রাখলে তার আয়ু কতদিন ? দেশের মাটীতে তাকে বসিয়ে দিন, বাংলার মাটী থেকে তা রসসংগ্রহ করুক। তারপর হয়তো একদিন দেখতে পাবেন—সে গাছে যে ফুল ফুটেছে, তা আর খাটা বিলাতি নয়। বাংলার মাটীর রসে, বাংলার সজল সিগ্ধ পরিবেষ্টনীর মধ্যে, এক নূতন ধরণের পুষ্পস্তবকে সে গাছ ছেয়ে গেছে। তখন তাকে বাংলার নিজস্ব ফুল বললে কি নিতান্তই অন্যায় বলা হবে ? না;
দেশ ও নাটমঞ্চ বিলাতি থিয়েটারের অনুকরণে বাংলাদেশে রঙ্গালয় স্থাপিত হয়েছে। তাই অনেক কাল পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানী জামা, কাপড়, সৌখীন আসবাবপত্র প্রভৃতির সামিল ধরা হ’তরঙ্গালয়কে। ও যেন কেবল সৌখীন সম্প্রদায়ের নিছক বিলাসের ক্ষেত্র। তাই, স্বদেশী ভাবের প্রেরণা যখন এদেশে জাগল-রঙ্গালয়কেও বিদেশী মালের মত বর্জন করবার একটা ধূয়া উঠল। বড় বড় কংগ্রেসনেতা জেলে যেতে শুরু করলেন- বিলাতী কাপড়ের সঙ্গে থিয়েটারের সামনেও অমনি পিকেটিং আরম্ভ হন। অনেক ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে; কলকাতা থেকে আমাদের দেশে মেলায় থিয়েটার গেছে। কত নামজাদা অভিনেতা, অভিনেত্রী গেছেন; তাদের অভিনয় দেখব বলে আনন্দে, উত্তেজনায় চার পাঁচ রাত ভাল করে ঘুমুতে পারিনি ! যেদিন অভিনয় শুরু হবে•••সেদিন সকালবেলা আমাদের শহরের একজন কংগ্রেস নেতা ধরা পড়লেন। আর যাবে কোথায় ? সমস্ত সমস্ত স্কুলের ছেলেরা এবং তাদের পাড়ার উদ্যোগী দাদার দল ছুটলেন•••মেলায় থিয়েটার বন্ধ করে দিতে। 'বন্দেমাতরম্”, “গান্ধিজী কি জয়” ধ্বনি তুলে আমিও এসে যােগ দিলুম তাদের দলে। তারপর সে কি পিকেটিংএর ধুম! ফলে থিয়েটার- ওয়ালাদের যথেষ্ট আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে কলকাতায় ফিরে আসতে হ’ল। যে দু’চারজন চেনা ছেলে পিকেটিং অগ্রাহ্য করে থিয়েটার দেখেছিল—তাদের আমরা মনে করলুম দেশের পরম শত্রু বলে। থিয়েটার দেখার মহা অপরাধে তাদের আমরা যে দণ্ডের ব্যবস্থা করেছিলুম-অপরাধ করে জেলে গেলেও জেল-কর্তৃপক্ষ তার চেয়ে অধিক শাস্তি তাদের দিতে পারতেন কিনা সন্দেহ। থিয়েটার উগ্র-গন্ধী বিদেশী বস্তু, এই যে অদ্ভুত মনােব•••এ অবশ্য কালের গতির সঙ্গে অনেকটা পাল্টে গেছে। কিন্তু তা হলেও এখন শ্ৰীমতী সাবিত্রী শ্ৰীমতী পূর্ণিমা মঞ্চে ও নেপথ্যে পর্যন্ত থিয়েটার দেশের মাটীতে তার ভিত্তি স্থাপন করতে পারেনি। জাতির উন্নতি ও অবনতির মান-যন্ত্ৰ হ’ল জাতির রঙ্গালয় ; জাতির চিন্তাধারা কোন্ পথে চলেছে তা রঙ্গালয় এমন প্রত্যক্ষভাবে দেখিয়ে দিতে পারে, যা নাকি অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশে প্রথম থিয়েটার স্থাপিত হয়েছিল বিলাতী থিয়েটারের অনুকরণে, একথা আগেই বলেছি। কয়েকজন মিশনারী ও ইঙ্গ-বঙ্গ সম্প্রদায়ের শিক্ষিত লােক বিলেতে রঙ্গালয় আছে, তাই দেখে এদেশে ও রঙ্গালয় স্থাপনার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই হ’ল থিয়েটারের আদিপধ্ব। কিন্তু তাই বলে থিয়েটার দেশের নিজস্ব বস্তু হতে পারে না, এ ধারণা বড়ই অদ্ভুত। তাকে গঠন করে নিতে হবে স্বদেশীয় ভাব দিয়ে...সভ্যতা দিয়ে সংস্কৃতি দিয়ে। তারপর দেখতে পাবেন—থিয়েটারের ভেতর দিয়ে দেশ-সেবার, জাতি জাতি গঠনের, কি বিরাট সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন রয়ে গেছে। আমাদের গােড়ার গল কোথায় জানেন ? আমাদের দেশে দশক সমাজ এককালে যেমন থিয়েটারকে বিদেশী জিনিষ মনে করতেন যারা থিয়েটার পরিচালনা করতেন বা থিয়েটারের সঙ্গে অন্য দিক দিয়ে সংশ্লিষ্ট থাকতেন•••তারাও অনেকটা ওই ভাব পােষণ করতেন। স্বদেশীযুগে বিলাতি মালের দোকানদারের মত তারাও সৰ্ব্বদা তটস্থ থাকতেন,-পেটের দায়ে যেন দেশের কাছে অপরাধমূলক কাজ কচ্ছেন অনেকটা এই রকম ভাব। নাট্যশালার বিরাট দায়িত্ব, জাতিগঠনের অপরিসীম সম্ভাবনার পরিকল্পনা করা দূরে থাক—তারা রঙ্গালয়কে সত্যি সত্যিই করে তুললেন ধনিকের বিলাস কেন্দ্র।
১১৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে আত্ম-বিস্মৃত রঙ্গালয়ের এমন অবনতি ঘটল, যে... নৈশপানাগারে যে বীভৎস উল্লাসে মদমত্ত নর-পশু মেতে ওঠে•• রঙ্গালয় যােগাতে লাগল অনেকটা সেই স্তরেরই প্রমােদ-বিলাস! অবশ্য মহাকবি গিরিশচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, পণ্ডিত ক্ষীবােদ প্রসাদ প্রমুখ দু’চার জন তাদের নাট্য- সাহিত্য ও সাধনা দিয়ে রঙ্গালয়কে এই দুষিত আবহাওয়া থেকে অনেকটা উন্নত করতে প্রয়াস পেয়েছেন। আর, ওদের প্রচেষ্টা না থাকলে অনেক আগেই বাংলার রঙ্গালয়ের অপমৃত্যু ঘটত। কিন্তু তবু একথা সত্যি, যে, আজ পর্যন্ত বাংলার রঙ্গালয়গুলি সর্বতােভাবে বাঙালীর রঙ্গালয় হতে পারে নি। তার কারণ রঙ্গালয়কে জাতির প্রাত্যহিক জীবনক্ষেত্র থেকে বরাবর আলাদা করে দেখা হচ্ছে । রঙ্গালয় শুধু প্রমােদ-গৃহ হয়ে থাকছে! শুধু রঙ্গ, তামাসা ! দু’ ঘণ্টা নাচে, গানে, বর্ণবৈচিত্র্যের মাঝখানে খানিকটা আপনা ভুলে থাকবার যায়গা-ব্য, এই পর্যন্ত । বাঁচতে হলে মানুষের খানিকটা আমােদ প্রমােদের দরকার বৈকি। প্রাণ খুলে হাসতে পেলে জীবনীশক্তি বৃদ্ধি পায়, এমন কথাও শােনা যায়। তাই রঙ্গালয়ের খানিকটা প্রমােণ বিতরণের জন্যও বেঁচে থাকা দরকার। তবে কি জানেন, আসল কথা হল, রঙ্গালয় যে বর্ণ- বৈচিত্র্যে আমাদের মনের ওপর প্রলেপ দেবে—সে যেন আমাদের মনকে বিকৃত না করে বরং খানিকটা ঔজ্জ্বল্য দান করে। নিছক আনন্দ পরিবেশনের জন্য রঙ্গালয়ের এই যে প্রয়ােজনীয়তা, সে-ও কেবল দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে; আর রঙ্গালয়ও প্রমােদ বিতরণের দায়িত্ব নিতে পারে তখনই যখন সে তার নিজের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে পেরেছে। কারণ, প্রমােন পরিবেশন বড় কঠিন ব্যাপার।
মঞ্চে ও নেপথ্যে ১১৫ অত্যন্ত হুসিয়ার হয়ে না চললে প্রমােদ থেকে প্রমাদ ঘটতে বিলম্ব হয় না। জাতি যখন সুস্থ রঙ্গালয় যখন সুপ্রতিহিত ও বিকার- মুক্ত"• শুধু সেই অবস্থাতেই নিছক আনন্দের পারস্পরিক আদান প্রদান হতে পারে। অন্য অবস্থায় নয়। বিশেষত: দেশের বর্তমান সঙ্কটজনক পরিস্থিতি ! এ সময়ে শুধু বিমল আনন্দ-পরিবেশনের উদ্দেশ্য নিয়ে রঙ্গালয় পরিচালনা করা যুক্তিযুক্ত নয়। দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্গত নরনারী অন্নাভাবে যে দেশে হাহাকার করছে, সে জাতির জীবনে বিমল আনন্দ-সম্ভোগেরই বা অবকাশ কোথায় ? আগে দেশকে বাঁচাতে হবে, জাতিকে বাঁচতে হবে-জাতি সুস্থ সবল হলে-তখন তাে আনন্দ-সম্ভোগ ! তাই আজ রঙ্গালয়কে যদি বাচতে ইয়—তাকে জাতির দুঃখদুর্দশার অংশ নিয়ে বাঁচতে হবে-জাতিকে আশ্বাস দিতে হবে, সাহায্য করতে হবে, মৃত্যুর মুখ হতে জাতিকে ফিরিয়ে আনবার জন্য দেশব্যাপী প্রেরণা জাগাতে হবে। রঙ্গালয় প্রত্যক্ষভাবে যে আবেদন উপস্থিত করতে পারে-হাঙ্গার সভা সমিতি তা পারে না। এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, দেশের সমস্ত দুঃখ-দৈন্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে বিজড়িত হয়ে—রঙ্গালয় যদি দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়ােগ করতে পারে—তাহলেই আজ রঙ্গালয়ের বাঁচবার সার্থকতা আছে। নতুবা-আজ একথা বলা অন্যায় হবে না, যে... প্রমােদ-সৰ্বস্ব রঙ্গালয়-আজ দুর্ভিক্ষপীড়িত নরনারীর আহাৰ্য্য অপহরণ করে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই শোষণকারী রঙ্গালয়কে আপনারা ধ্বংস করুন-জাতির দেহে বিষদুষ্ট ক্ষতের ন্যায় তাকে বর্জন করুন।
নাট্যকার ও নাটাও প্রায়ই অভিযােগ শোনা যায়, বাংলা রঙ্গমঞ্চে ভালো নাটকের অভার । তা যদি হয়, তার জন্য দায়ী কে? নাট্যকারের রচনা শক্তির দৈন্য কিম্বা রঙ্গমঞ্চের কর্তৃপক্ষের নাটক নির্বাচনে দূরদৃষ্টির অভাব? নাট্য- কার হিসেবেও বটে এবং রঙ্গমঞ্চের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশেষ ভাবে সংশ্লিষ্ট থেকে – আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দিক হতে•••অ' এ সম্বন্ধে দু’চারটি কথা বলতে চাই। রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের জন্য যে সব নাটক আসে—তার শতকরা নব্বই খানারও বেশী আসে অতি অক্ষম লেখকের নিকট হতে—যাদের কাছে এতটুকু নাট্য-স-বোধের 'আশা করা দূরে থাক—ভাষাজ্ঞান পৰ্য্যন্ত যাদের নেই। রায়ের প্রেক্ষাগৃহে হাজার হাজার দর্শক নিম্মম বিচারকের মত বসে রয়েছেন—এতটুকু অভাব বিচু্যতি তার ক্ষমার চক্ষে দেখবেন না•••তাদের বিচারের মানদণ্ডে তারা নাট্যকারের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় শােধ করে যাবেন- ( কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নাট্য কারের অনেক সময় ধরে ব্যবসা হয় বটে, কিন্তু মজা এমনি, দশকগণ নাট্যকারের পাওনা মেটান অভিনয়ের প্রতি অঙ্কে, নাটকের প্রতিটা কথা ওজন করে )। যেখানে হাজার যেখানে হাজার হাজার জীবন্ত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎভাবে—“লেন-দেন”, অবাক হই এই ভেবে, যে•••সেই নাট্য- সাহিত্য সৃষ্টিকেই যেন তথাকথিত লেখক-গােষ্টী ভাবেন সবচেয়ে সহজসাধ্য সাহিত্য সাধনা। যারা ঔপন্যাসিক, গল্পলেখক বা প্রবন্ধ-রচয়িতা রূপে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন, তেমন প্রতিভাবান লেখকের নিকট হতে যে মাঝে- মাঝে দু’একখানি নাটক রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের জন্যে না আসে এমন নয়। ঈদের কয়েকজনের নাটক রঙ্গমঞ্চে অভিনীতও হয়েছে, এবং রঙ্গমঞ্চের মঞ্চে ও নেপথ্যে ১১৭ কর্তৃপক্ষ লাভবানও হয়েছেন—সে নাটকের অভিনয়ে। কিন্তু তবু শক্তিমান সাহিত্যিকের রচিত মঞ্চে অভিনীত নাটকের সংখ্যা খুবই সামান্য। মঞ্চের কর্তৃপক্ষের নাটক নির্বাচনে সুবিবেচনার অভাব বা গতানুগতিক পথে চলবার প্রইি নাকি সাহিত্যিক গােষ্ঠীকে রঙ্গমঞ্চ থেকে দূরে রেখেছে—অনেকে এমন অভিযােগও করেন শুনতে পাই। কিন্তু এ অভিযােগের মুলে কতখানি সত্য আছে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। দেশে এমন অনেক কথা- শিল্পী আছেন—যাদের রচনাভঙ্গী, চরিত্রসৃষ্টি কৌশল.. অতি উচ্চস্তরের। সাহিত্যিক হিসেবে তাদের আমি যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি তাদের লেখা গল্প, উপন্যাস পড়ে প্রচুর আনন্দ পাই। তাদের লেখার ভেতর যে ব্যক্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, অনেক সময় রঙ্গমঞ্চে অভিনীত নাটকে সেই ব্যক্তিত্বের ব্যঞ্জনাই হয় প্রধান অন্তরায়। কথাটা শুনতে হয়তো একটু অদ্ভুত লাগছে। এর মানে এই নয়, সে••নাট্যকারকে ব্যক্তিত্বহীন হতে হবে...। তার ব্যক্তিত্ব সর্বাংশে থাকবে প্রচ্ছন্ন। ব্যক্তিত্বের প্রকাশ হলেই-সেখানে এসে যায় আত্ম-মতবাদ। ব্যক্তি বিশেষের মতবাদ শােনবার মত পাঠকের অভাব হয়তো বাংলাদেশে নেই...কিন্তু রঙ্গমঞ্চের দর্শক সাধারণ সেভাবে এখনো তৈরী হয়নি। এবং সত্যিকথা বলতে কি...উপন্যাসে, গল্পে, প্রবন্ধে যারা লেখকের মতবাদ আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন—তাদেরও অধিকাংশ লােক রঙ্গমঞ্চে তা ঠিক নিতে পারেন না। তবে কি রঙ্গমঞ্চের কাজ নিছক আমােদ প্রমােদে লােককে ভুলিয়ে রাখা? তা নয়। শুধু এইটুকু আমি নিবেদন করতে চাই, যে, রঙ্গমঞ্চে যে নাটকের অভিনয় হবে সে নাটককে রঙ্গমঞ্চের “টেকনিক” অনুযায়ী গঠিত হতে হবে এবং দেশের সৰ্বসাধারণের হৃদয়াবেগকে কুত্রাপি ১১৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে ক্ষুন্ন করা চলবে না। এই দু’টা দিকে লক্ষ্য রেখে শক্তিমান সাহিত্যিকেরা যদি নাটক রচনা করেন, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত নাটক উচ্চশ্রেণীর সাহিত্য হিসেবে নিশ্চয়ই মৰ্যাদা পেতে পারে। এইসঙ্গে রঙ্গমঞ্চের কর্তৃপক্ষকেও দু’একটা কথা বলতে চাই। তাদের মধ্যে অনেকেই নাট্যকারকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে এখনো শেখেন নি। নাট্যকার তাদের চক্ষে কৃপার পাত্র। ভালাে নাটকের সংখ্যা খুবই কম-সে তাে আগেই স্বীকার করেছি। কিন্তু যে দু’চারখানা ভালো নাটক রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়েছে এবং রাতের পর রাত কর্তৃপক্ষের পকেট ভর্তি করেছে সেই ক’খানি নাটকের নাট্যকারকে কি তারা যথাযোগ্য ( টাকার কথা তাে ছেড়েই দিলুম) মৰ্য্যাদা দিয়েছেন? নাটকে নাট্যকার নিজের কথা একবর্ণ বলতে পান্ না, কথা বলে তার সৃষ্ট বিভিন্ন চরিত্র ; নাট্যকার নিজে থাকেন সৰ্বাংশে সৃষ্টির অন্তরালে। কর্তৃপক্ষও কি তাই নাট্যকারের অস্তিত্ব বেমালুম ভুলে যান? নাটকের “জুবিলি” উৎসবে আর্টিষ্ট থেকে আরম্ভ করে বিজ্ঞাপন লেখক এবং হিসেব লেখক পৰ্যন্ত মূল্যবান পুরস্কার পেয়েছেন অথচ নাট্যকার নিজে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সেই উৎসবে তাকে দু’টো মুখের কথায় পর্যন্ত সম্মানিত করেনি—এমন রঙ্গালয় ও এখনাে এই বাংলা দেশে আছে ! স্রষ্টাকে যারা সংক্ষুব্ধ করে তাদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে যে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে—এ কথা বলাই বাহুল্য।
কোন্ নাটক চাই ? কোন্ শ্রেণীর নাটক এ যুগের বাঙালী দর্শকেরা চান্? কোন্ নাটক ভাল? পৌরাণিক ? ঐতিহাসিক ? না সামাজিক ? একট। হ’ল অতীত কথা, আর একটা হ’ল বর্তমান ও ভবিষ্যত। অনেকে বলেন—এটা প্রগতির যুগ ; আমাদের কারবার বর্তমান বিশেষ করে••• ভবিষ্যতকে নিয়ে। সুতরাং তাদের মতে শুধু সামাজিক নাটকই অভিনীত হওয়া প্রয়ােজন। আমিও নবীনের দাবী স্বীকার কচ্ছি ; কিন্তু তা বলে প্রাচীনের দাবীকে অবহেলা করতে রাজী নই। অতীত আর বর্তমান যে অচ্ছেদ্য বন্ধন-সূত্রে আবদ্ধ রয়েছে, তাকে যখন অন্বীকার করা চলে না—তখন তার প্রাপ্য শ্রদ্ধা না দিই কেমন করে ! বর্তমানের সবুজ পাতা আর ভবিষ্যতের রঙীন ফুলকে আদর করব; কিন্তু তা বলে অতীতের শেকড়গুলিকে অপ্রয়ােজনীয় বলে কি কেটে বাদ দেওয়া চলে? পৌরাণিক আর ঐতিহাসিক নাটকে পাই এক একটা বিরাট আদর্শ, এক একটা বিরাট ব্যক্তিত্বের সন্ধান। তাদের অলৌকিক কার্যাবলীর সঙ্গে হয়তাে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছােটখাটো ঘটনার কোন সাদৃশ্য দেখা যায় না। কিন্তু তা বলে আমাদের মন কখনও বিরূপ • হয় না। তার একটা কারণ—আমাদের দেশের মাটীর সঙ্গে, আমাদের সংস্কারের সঙ্গে আমাদের রক্তের সঙ্গে ধৰ্মভাবের একটা বিচিত্র সংমিশ্রণ রয়ে গেছে। আর একটা কারণ ;-রক্তমাংসের মানুষের ভুলভ্রান্তি আছে ; সে কখনো আইডিয়াল” হতে পারেনা; কিন্তু “আইডিয়ালে” পৌছুবার জন্যে যে অবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম—তাই নিয়েই মানুষের মনুষ্যত্ব। তাই আমরা নিজের আদর্শ না হলেও-আদর্শকে ভালবাসি ; এবং এই জন্যই পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি আমাদের মত না হলেও, তারা আমাদের প্রিয়। এ হিসেবেও পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক নাটকের যথেষ্ট প্রয়ােজনীয়তা আছে।
১২০ মঞ্চে ও নেপথ্যে আর সামাজিক নাটক? সমাজ নিয়েই মানুষের বাস সুতরাং সামাজিকের মূল্য তাে আছেই। তবে বক্তব্য এই যে, যাকে সামাজিক বলে চালাব, সে যেন আমারই সমাজের প্রতিবিম্ব নিয়ে গঠিত হয়। রঞ্জনরশ্মিপাতে যেমন করে বৈজ্ঞানিক জীবদেহের আভ্যন্তরীণ ক্ষতকে ধরে ফেলেন, তেমনি করে কুশলী নাট্যকার অপূর্ব দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে সমাজ-দেহের সমস্ত ত্রুটি বিচ্যুতি সুপ্রকাশিত করেন—তার সংশােধনের জন্য। এখানেই সামাজিক নাটকের সার্থকতা। তাই বলছিলুম, সামাজিক নাটক মানে, বাঙালীর পােষাক পরা বাঙলা ভাষায় কথা বলতে জানা সাহেব-মেমদের নিয়ে লেখা নাটক নয়। আমাদের সামাজিক নাটক বলি তাকে—যার ভেতর ভুলত্রুটি, পাপপুণ্য নিয়ে গড়া সত্যিকারের বাঙালীর জীবন-নাট্য দেখতে পাই। তবে একটা কথা, সামাজিক বলুন কি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক নাটক বলুন-এদের সবার মূলে রয়েছে রস-সৃষ্টি। নাটকের বিভিন্ন শ্ৰেণী মানে রসসৃষ্টির বিভিন্ন ধারা। সেই রসসৃষ্টি করতে হলে মানুষের জীবন থেকে নাটকীয় মুহূর্তগুলি বেছে নিয়ে তাতে খানিকটা কল্পনার রঙ ফলিয়ে নিতে হবে। সেই নাটকই রস-লিঙ্গ, দর্শকের কাছে প্রিয় হয়-যাতে নাটকীয় মুহূর্তগুলি শিল্পীর অনুপম কল্পনার স্পর্শে বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে। প্রশ্ন করবেন—বর্ণবিন্যাসের মূল্য কি? তার সার্থকতা কোথায় ? জীবনের নাটকীয় মুহূর্তকে কিছুমাত্র রঙ, না ফলিয়ে হুবহু বর্ণনা করে গেলেই তাে যথেষ্ট। •••যথেষ্ট নয়। ফটোগ্রাফ আর শিল্পীর আঁকা ছবি একবস্তু নয়। অবিকল প্রতিচ্ছবি পেলেই যদি মানুষের মন তৃপ্ত হত, তা হলে এতদিনে শিল্পীকে নামিয়ে দিয়ে তার আসনে বসত ফটোগ্রাফার।
নাট-মঞ্চের ক’টা অভাব এই প্রবন্ধে বাংলা থিয়েটারের দু’একটী অভাব-অভিযােগের বিষয় আলােচনা করব। কলকাতায় বর্তমানে রঙমহল, ঐ রঙ্গম, মিনাভা, ষ্টার ও কালিকা এই পাচটা থিয়েটার চলছে। অগুন্তি সিনেমা হাউসের তুলনায়—থিয়েটারের সংখ্যা সামান্য। অথচ সিনেমা হাউস- গুলি বাংলার এবং গলে বােই অঞ্চলের ছবি দেখিয়ে বেশ দু’ পয়সা অর্জন কচ্ছে, আর 'অল্পসংখ্যক থিয়েটার হাউসগুলি প্রায়ই হাত-বদল হচ্চে। (যুদ্ধের বাজারে কঁচা পয়সা আমদানীর দিকটা এ প্রবন্ধে ধরা হয়নি; কারণ প্রবন্ধটীতার আগে লেখা।) থিয়েটারের এই দুর্দশার কারণ অনেকে বলেন, সিনেমার সঙ্গে প্রতিযােগিতা। কিন্তু আমি সে কথা স্বীকার করি না। সিনেমা ও থিয়েটারের মূল উদ্দেশ্য জনসাধারণকে আনন্দ পরিবেশন করা ; এদিক দিয়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের পরস্পরের মধ্যে মিল থাকলেও থিয়েটার চলে জীবন্ত রক্তমাংসের মানুষ নিয়ে, আর সিনেমা চলে মানুষের ছায়া নিয়ে। দুই প্রতিষ্ঠানের আবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। গন্তব্যস্থান এক হলেও পথ দু’জনকার 'আলাদা। সুতরাং প্রতিযােগিতার প্রশ্ন এখানে উঠতেই পারে না। বর্তমানে অধিকাংশ থিয়েটার যে অল্পায়ু হয়ে পড়ছে, তার কারণ, সেই সব থিয়েটারের জীবনী শক্তির অপ্ৰাচুৰ্য্য অর্থাৎ তাদের অভ্যন্তরীণ দৈন্য। বিশেষ ভাবে এই অভাবগুলি বিশ্লেষণ করে দেখাতে যাওয়া অল্প-পরিসর প্রবন্ধে সম্ভবপর নয়। তবে মােটামুটি ভাবে দু'একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই; সেগুলি বিবেচনা করলে কলকাতার থিয়েটারগুলির কর্তৃপক্ষ হয়তাে বা লা- বান হতে পারেন। থিয়েটারের পিছনে মােটা ক্যাপিটাল থাকা, সরকারী সাহায্য লাভের প্রচেষ্টা প্রভৃতি অনেক বড় বড় বিষয় নিয়ে এর আগে অনেকে অনেক আলােচনা করেছেন। ওসব যারা পান বা পাবার আশা রাখেন, তারা ভাগ্যবান। বড় বড় বিষয় বাদ দিয়ে, মঞ্চে ও নেপথ্যে আমি বলব ছােট দু’একটা কথা, যা...ইচ্ছে কল্লেই থিয়েটারগুলো একসঙ্গে মিলে গঠন করে তুলতে পারেন। প্রথম অভাবের কথা হল : থিয়েটারগুলাের মধ্যে ব্যবসাগত ঐক্য। চিত্র প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমবায় আছে ; সেখানে তাদের সাধারণ অভাব-অভিযােগের আলােচনা হয় এবং অভাবগুলির প্রতিকারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কলকাতার থিয়েটারগুলাের কোনাে সঘবদ্ধ মিলন কেন্দ্র বা Association নেই। এই দুর্মুল্যের বাজারে পাবলি- সিটির জন্যে থিয়েটারগুলির কম পয়সা খরচ হয় না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বলুন কিম্বা পােষ্টার, ফ্লাইসী ছাপানাে বলুন, সবদিক দিয়েই থিয়েটারকে নির্ভর করতে হয় কাগজওয়ালা বা ছাপাখানার নির্ধারিত মূল্যের উপর। থিয়েটারগুলাে সজ্যবদ্ধ হলে কি এদিক দিয়ে খানিকটা সুবিধে পাওয়া যায় না? পাবলিসিটির বিষয় আমি উল্লেখ করলুম একটা উদাহরণ হিসাবে। এ ছাড়া, থিয়েটারের এমন অনেকগুলি ব্যবসাগত অভাব-অভিযােগ আছে, যেগুলি একটা সঘবদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র গঠন কল্লে অনায়াসে দূর হতে পারে। মঞ্চ-সংশ্লিষ্ট সমস্ত শিল্পীর জন্য Provident Fund বা ঐ ধরণের কোনও “ফণ্ডের ব্যবস্থা করা সব থিয়েটারের একান্ত কর্তব্য। অপরিমিত ব্যয়ের ফলে শেষ জীবনে অধিকাংশ শিল্পীকে যে কি দুঃখ দুর্দশা ভােগ করতে হয় তা আমরা কতবার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। শিল্পীর অকালমৃত্যুতে শােক সভা করেই যেন আমাদের সকল দায়িত্ব শেষ না হয়। মুতের পিছনে যারা পড়ে রইল—জীবন্ত মৃত্যুর যাতনা সইতে—তাদের আর্থিক ক্লেশ লাঘব মঞ্চে ও নেপথ্যে নাই। করবার খানিকটা দায়িত্ব রঙ্গমঞ্চকে নিতে হবে বৈকি ? মঞ্চ যদি শিল্পীকে সে প্রতিশ্রুতি দেয়—তাহলে মঞ্চের লাভ ছাড়া ক্ষতি প্রত্যেক মঞ্চের শিল্পী তাহলে নিজ নিজ কম্মস্থলকে—নিজের জিনিষ বলে ভাবতে শিখবে। বাইরের প্রলােভন তাকে তার মঞ্চ হ’তে সহসা অন্যত্র টেনে নিতে পারবে না। এবং মঞ্চের সঙ্গে শিল্পীর এই যে একাত্মবােধ-শিল্প-সৃষ্টির পক্ষে এর মূল্য অনেকখানি। আর একটা বড় অভাব...ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বটে এবং কলা- কেন্দ্র হিসেবেও বটে, সে হ’ল, থিয়েটারের সঙ্গে থিয়েটারের সঙ্গে দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষার সংযােগ স্থাপন। নাটক নিৰ্বাচন, নাট্য-পরিচালনা, নাটকের দৃশ্যপট নির্মাণ, অভিনেতার রূপ-সজ্জা, নাটকের চরিত্র রূপায়ন প্রভৃতি প্রত্যেক বিষয়ে থিয়েটারের কর্তৃপক্ষ যদি শ্রেষ্ঠ প্রতিভার উপদেশ ও সাহায্য পান, তার ফলে, থিয়েটার যে কত রকমে লাভ- বান হয় সে কথা বলাই বাহুল্য। এককালে ষ্টারে আট থিরেটারের আমলে এবং শিশিরকুমারের নাট্য-মন্দিরে এইরূপ প্রতিভা-সমাবেশের কথা শুনেছি। থিয়েটার হয়েছিল তখন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও গুণীর মিলনতীর্থ। তারা সকাল-সন্ধ্যায় থিয়েটারে সমবেত হয়ে শিল্পকলা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান কতো বিষয়ে আলােচনা করতেন। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সংযােগে থিয়েটারে একসঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতীর মিলন হােতাে। এখন দু’জনকার মিলন হওয়া তাে দূরে থাক, দুজনেই যে বিদায় নিতে বসেছেন! থিয়েটারে দেশের মনীষা-সম্মিলন কি এমনই কষ্টসাধ্য ব্যাপার- যার জন্য আজ থিয়েটারগুলাের এই দুর্দশা হয়েছে ? আর একটি অভাবের কথা উল্লেখ করে এ নিবন্ধ শেষ করতে চাই।
১২৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে সে হল থিয়েটারের আভ্যন্তরিক সমিতি—যে সমিতিতে শুধু প্রস্তাব উত্থাপন ও সমর্থনের বাহ্যিক আড়ম্বর না রেখেথিয়েটারের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল বিধানের আলােচনা হবে। প্রত্যেক থিয়েটারে সপ্তাহে অন্তত এক আধ দিন ছুটির ব্যবস্থা আছেই। সেইদিন যদি থিয়েটারের কর্তৃপক্ষ, অভিনেগণ বা অভিনয়েছু ব্যক্তিগণ একসঙ্গে মিলিত হয়ে সাময়িক অভাব অভিযােগের বিষয় আলােচনা করেন, তা হলে প্রত্যেকেই লাভবান হতে পারেন। এ ছাড়া সম-সাময়িক সাফল্য- মণ্ডিত নাটক বা চলচ্চিত্রের সাফল্যের কারণ নির্ণয়, নবাগত নট- নটীকে শিক্ষা দান প্রভৃতি বিষয়ের আলোচনাও সেই সমিতিতে হতে পারে। বদ্ধ আবহাওয়ার ভিতর দিনের পর দিন থিয়েটার সংশ্লিষ্ট লােকদের কোন রকমে “দিন-গুজরাণ” করতে হয় ; এই রকম একটা পারস্পরিক মিলন-কেন্দ্র স্থাপিত হলে—তাঁরা সবাই পৃথিবীর মুক্ত হাওয়ায় খানিকটা নিঃশ্বাস নিতে পারেন, বৃহত্তর পৃথিবীর যেটুকু সুৰ্য-কিরণ তারা লাভ কৰ্বেন, তাতে তাদের পরমায় বৃদ্ধিই হবে।
ব্যবসায়ী-মঞ্চ ব্যবসায়ের দিক থেকে থিয়েটার সম্বন্ধে দু'একটা কথা বলব। যুদ্ধের বাজারে অনেকে প্রচুর কঁচা পয়সা রােজগার কচ্ছেন। পয়স। তঁাদের কাছে আসছে যেমন জলের ত...খরচ হতে চাইছেও তেমনি জলের মত। তাদের ভেতরে অনেকে বুকেছেন থিয়েটার খুলতে। কলকাতা শহরের সব বড় বড় রাস্তায় থিয়েটারের জন্য বাড়ী খোজ- বার ধুম পড়ে গেছে। সারা ভারতবর্ষের মধ্যে এই কলকাতা শহর দে হার কোথাও প্রকাশ্য রঙ্গালয়ে নিয়মিত অভিনয় ব্যবস্থা নেই। এই শিল্পকে, এই ব্যবসায়কে বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙ্গালী। শিল্পচর্চা হিসাবে এবং জীবনের বৃত্তিরূপে শুধু বাঙ্গালীর কাছেই অভিনয়কলা অবিভাজ্য রূপ নিয়েছে। তাই গােটা ভারতবর্ষের মধ্যে এক কলকাতা শহরে পাঁচটি প্রকাশ রঙ্গালয়ে নিয়মিত অভিনয় হচ্ছে। এটা আমাদের গৌরবের কথা। এই পাঁচটী থিয়েটার ব্যতীত আর ও নূতন নূতন থিয়েটার যদি কণা- কাতায় স্থাপিত হয়, তাতে আমাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। যেখানে অগুন্তি সিনেমা হাউস রঙ্গামােদা দর্শকগণের এক বিরাট অংশ টেনে নিচ্ছে, সেখানে যদি পাঁচটী পিয়েটারের সঙ্গে আর দু’ চারটী নূতন থিয়েটার যােগ দেয়—তাহলে সমষ্টিগত ভাবে থিয়েটার পূৰ্ব্বাপেক্ষা অনেক বেশী দর্শক আকর্ষণ করবে—থিয়েটারের বল-বৃদ্ধি হবে। তাই বলছিলুম-থিয়েটার সংখ্যায় যত বেড়ে যাবে ততই আমাদের আনন্দের কথা, আশার কথা। থিয়েটারের সংখ্যাবৃদ্ধি হলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্বারা সব থিয়েটারগুলি দুর্বল হয়ে পড়বে—ব্যবসায়ের ক্ষতি হবে—যারা এই যুক্তি দেখান, তাদের আমি সমর্থন করতে পারি না।
মঞ্চে ও নেপথ্যে তবে এ বিষয়ে ভাববার কথা আছে। নূতন থিয়েটার খুলতে গেলে আগে বর্তমানের পাঁচটা থিয়েটারের আভ্যন্তরিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। যাদের মস্তিষ্কে নূতন থিয়েটার পচিালনার কল্পনা জেগেছে-তারা নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছেন যে, শহরের পাঁচটা রঙ্গালয় বর্তমানে পূৰ্ব্বাপেক্ষা বেশী দর্শক আকর্ষণ কচ্ছে, থিয়েটারগুলির অবস্থা অনেকটা সচ্ছল হয়েছে। থিয়েটার-ব্যবসায়ে লাভবান হওয়া যায় এ ধারণা মনে না এলে...তারা নিশ্চয়ই এ ব্যবসায়ে নামবার পরি- কল্পনা করতেন না। কিন্তু আসল ভাববার কথা এই যে—এখন- কার পাঁচটি থিয়েটার পয়সা পাচ্ছে, সুতরাং আমরাও পাবাে এই যুক্তি অনুসরণ করে তারা ব্যবসায়ে নামতে চাইছেন কিনা। তা যদি হয় তাহলে তাদের আমি এ বিষয়ে একটু অবহিত হতে বলি। এখন থিয়েটারগুলির বুকিং অফিসে আগের চেয়ে বেশী ভীড় হচ্ছে- একথা আগেই বলেছি। কিন্তু এই আর্থিক সচ্ছলতার মূলে কি ? থিয়েটার কি দু’চার বছর আগের চেয়ে এখন সুপরিচালিত হচ্ছে ? আগের চেয়ে ভাল নাটক অভিনীত হচ্ছে? অথবা অধিকতর শক্তিশালী নটনট থিয়েটারে যােগ দিয়েছেন? কেন, কিসের জন্য থিয়েটার হঠাৎ “রামে” হয়ে উঠল ? আমার মনে হয়, থিয়েটারের বর্তমান আর্থিক সচ্ছলতার জন্য থিয়েটার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব প্রচেষ্টার চেয়ে•••অনেক বেশী দায়ী বর্তমান পরিস্থিতি। এক টাকার মাল আজ দশ টাকা হয়েছে; অর্থাৎ আগের এক টাকা এখনকার দশ টাকার সমান। কাজেই অস্বাভাবিক ভীড় দেখে থিয়েটারওয়ালারা হঠাৎ বড় মানুষ হয়ে গেল, এ ধারণা করা অন্যায় হবে। এর পর যখন দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে, তখন এই জোয়ারের শেষে মঞ্চে ও নেপথ্যে ১২৭ ভাটার টানে সব থিয়েটারগুলি হবে টালমাটাল ! অতি বিচক্ষণতার সঙ্গে অতি নৈপুণ্যের সঙ্গে—অত্যন্ত সতর্কভাবে, তখন থিয়েটারকে বাঁচ- বার জন্য লড়াই করতে হবে। কলকাতার পাচটি থিয়েটারের ভিতর কটা থিয়েটারের অস্তিত্ব যে বজায় থাকবে তখন—সে আজ বলা শক্ত। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সময় যাদের অর্থ আছে•••রা নূতন থিয়েটার না খুলে, যদি বৰ্তমান থিয়েটার গুলির সঙ্গে যােগ দিয়ে, ভাবীকালের বিপদের হাত থেকে তাদের বাচতে সাহায্য করেন, সেই হবে সব দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত। থিয়েটারের দুদ্দিন আসছে। তার কারণ আগেই বলেছি । বৰ্ত্তমান স্বাচ্ছল্য থিয়েটার-কর্তৃপক্ষের নিপুণ ব্যবসায়-বুদ্ধি দ্বারা ঘটেনি...এ অস্বাভাবিক স্বাচ্ছল্যের মুলে রয়েছে দেশের বর্তমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তবে, হ্যা, আর একটা কথা। যারা থিয়েটারের দায়িত্ব বহন কচ্ছেন-তারা সকলেই বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চেষ্ট বসে আছেন- ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন না—এ বললে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন, থিয়েটার তার যাত্রা- পথের গতি পরিবর্তন করেছে; অন্তত পরিবর্তনের একটা প্রয়াস জেগেছে। ক’বছর আগের কথা ভাবুন—কোনো থিয়েটার হয়তো অভিজাত সম্প্রদায়” বলে নিজেদের জাহির করতেন—কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখতে পেতেন—বিলাতী সন্তা নাটকের ব্যর্থ অনুকরণ ; মমম- সাহেবকে সাড়ী পরিয়ে বাঙালী মেয়ে বলে চালাবার হাস্যকর প্রচেষ্টা। আবার কোনাে কোনাে থিয়েটার নিজেদের বলতেন—“আদর্শ সনাতন- পন্থী”—সেখানে গিয়ে দেখতে পেতেন-চমকপ্রদ দৃশ্যপটের ভে, আদিরসাত্মক হাস্য-কৌতুকের প্রাচুৰ্য্য বা স্রেফ ভাড়ামী ! নাট্য- ১২৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে সাধনার নামে থিয়েটারের পরিচালকদের চিত্তবৃত্তির এই যে অবনতি —এ থেকে বর্তমানের থিয়েটারগুলি অনেক পরিমাণে যুক্ত হয়েছে। কি অভিজাত আসর, কি সনাতনপন্থী আসর-সকলেই আজ বুঝতে পেরেছেন—সত্যিকারের অভিজাত কিম্বা সনাতনপন্থী হতে হলে- নিজ নিজ চিত্ত-বৃত্তির শুদ্ধি প্রয়ােজন। দর্শকের চিত্তবৃত্তিকে আমরা নিঃ- গাণী বলে ভাবতুম ; তার কারণ আমাদের চিত্তবৃত্তিই ছিল নিম্নগামী। দশক-সমাজ অনন্ত সমুদ্রের মত ; চোখে যে রঙের কঁাচ লাগিয়ে আমরা তাদের দেখব, মনে হবে, সেই তাদের স্বাভাবিক রঙ। বৰ্তমান থিয়েটারের পক্ষে আশার কথা এই যে, তারা প্রত্যেকে এ বিষয়ে সচেতন হয়েছে। সব কটা রঙ্গালয়েই দেখুন—আজ এমন নাটক অভিনীত হচ্ছে, যা পরগাছাও নয়—আগাছাও নয় ; দেশের মাটী থেকে তারা রস সংগ্রহ করেছে ; জাতির জীবনের ঠিক কে- স্থলেই তাদের মূল ভিং গেড়েছে। থিয়েটারের দোষ-ত্রুটি এখনো যথেষ্ট আছে; কিন্তু তাদের মূলের গলদ যে তারা বুঝতে পেরেছে দোষ-ত্রুটি এড়িয়ে সামনে এগুতে চেষ্টা কচ্ছে-এইটিই হল সব চেয়ে আশার কথা। বর্তমানের এই প্রচেষ্টা যদি কোন থিয়েটার পরিমান হতে না দেয়—আভ্যন্তরিক গােযােগ অথবা বুদ্ধি বিপর্যয় দ্বারা এই প্রচেষ্টায় যদি শৈথিল্য না আসে...তা হলে ভাবী-কালের দুর্বিপাক থেকে থিয়েটারগুলি মাথা তুলে দাড়াতে পারবে...এরূপ আশা করা একটুও অসঙ্গত হবে না। অর্থবান যার, নাট্য-রসে-রসিক সজ্জন যারা, থিয়েটারের এই গতি পরিবর্তনের সময় তারা অর্থ নিয়ে, অভিজ্ঞতা নিয়ে ও সহানুভূতি নিয়ে যদি বর্তমান রঙ্গালয়গুলিকে সাহায্য করেন, তাহলে বাংলার রঙ্গালয় তার গতিপথে যে অনেক খানি অগ্রসর হতে পারবে...একথা সুনিশ্চিত।
বিশ্ব-বিশ্রুত নৰ্তক উদয়শঙ্কর শ, নৃত্যছন্দা সাধনা বােস অভিনেত্রী বর্তমানে মঞ্চজগতে অভিনেত্রী সমস্যা একটা বড় সমস্যা। মঞ্চজগতে অভিনেত্রী নেই—মাত্র দু’একটা বাদে। “রিক্রুট” করবার লােকের অভাব-এর একটা বড় কারণ। তথা কথিত অভিজাত সম্প্রদায় থেকে অভিনেত্রী রিক্রুট” করবার লােকের অভাব নেই—কিন্তু সেই সব অভিজাত সম্প্রদায়ের মেয়েরা পাদপ্রদীপের আলােকে দেখা দেবার চাইতে ঢের বেশী পছন্দ করেন ছায়ালােকে বিচরণ করতে। (যারা যত বেশী “রিয়ালিষ্টিক” তারা তত বেশী পক্ষপাতী “মিটি- সিজিমের”—এ থেকে এই কি প্রমাণ হয় না?)••পূর্বোক্ত সমাজ বাদ দিলে অভিনেত্রী নির্বাচনের আর যে সব ক্ষেত্র রইল-তার মাঝখান থেকে সত্যিকারের প্রতিভার সন্ধান পাওয়া বড়ই দুরূহ। তা ছাড়া সুন্দরী, সুকন্তি ও প্রতিভাময়ী তরুণী রঙ্গমঞ্চ থেকে যে পারিশ্রমিক পাবেন—জীবন-যাত্রার পথে সমাজ-বন্ধনের বাধা নিষেধ যদি তিনি না মানেন--তা হলে রঙ্গমঞ্চের নিকট থেকে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের তুলনায় অনেক বেশী টাকা রােজগার করতে পারবেন অন্য পথে। তাই মঞ্চললাকে অভিনেত্রীর এত অভাব। • পরবর্তী শ্রেণী (যাদের ভেতর থেকে বর্তমান রঙ্গমঞ্চের সাড়ে পনের আনা অভিনেত্রী নির্বাচিত হন)—তাদের বিষয়ে প্রথমে দু একটা কথা বলতে চাই। বাইরের জগতের ঐশ্বর্যের প্রলােভন এড়িয়ে যদি তারা বেশ কিছুদিন রঙ্গমঞ্চে টিকে থাকবার ধৈৰ্য্য অবলম্বন করতে পারেন তা হলে অভিনেত্রী-জীবন বেছে নিয়েছিলেন বলে পরে তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করবেন। আসল কথা হল, অভিনয়ের স্পৃহা জাগিয়ে তােলা। যার মধ্যে প্রতিভা আছে, এ স্পৃহা তাঁর মনে জাগবেই-কারুর দু’দিন আগে, কারুর বা দু'দিন পরে। অভিনয়ের আকাঙ্খা নিত্য নূতন চরিত্র রূপায়নের স্পৃহা--এ এমনি ১৩০ মঞ্চে ও নেপথ্যে দুর্দমনীয় যে, এই রস উপলব্ধির পর বাইরের হাজার রকম প্রলােভন, এলেও অভিনয়-গঞ্চ হতে কোনাে নট বা নটীকে কেউ সরিয়ে নিতে পারে না। রঙ্গমঞ্চ তার শিল্পীকে জীবিকা নির্বাহের জন্য যা কিছু সরে দেয় সেই পারিশ্রমিক হয়ে দাড়ায় শিল্পীর কাছে সর্বাপেক্ষা অপ্রধান বস্তু অভিনয় করা, দর্শককে রস পরিবেশন করা—সেই হয় তখন তার জীবনের চরম লক্ষ্য। সমাজ-বন্ধন-হীন জীবন যাদের সেই শ্রেণী থেকেই অভিনেত্রী নিৰ্বাচন করেছিলেন নটগুরু গিরিশচন্দ্র। বাইরের সহস্র ঘূর্ণাবর্ত... পঙ্কিল পথের অসংখ্য বিচ্যুতি থেকে তাদের বাঁচিয়ে তােলবার প্রচেষ্টা ছিল তার অন্তরে। রঙ্গমঞ্চের আড়ালে ছিল সর্বতােভাবে সমাজ সংস্কারের প্রচেষ্টা। আজ মঞ্চজগৎ প্রধানত ব্যবসাকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই গিরিশ-যুগের সে সাধনা আর নেই—এ কথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। মঞ্চজগতের এ পরম অধােগতি- তার জন্য তাকে ফলভােগও করতে হচ্ছে। রঙ্গমঞ্চ আবার তার বিস্মৃত সাধনায় ব্ৰতী হাে•••এ কামনা অন্তরে পােষণ করি। তবে রঙ্গমঞ্চের তরফ থেকে অন্য অন্য পক্ষকে এই কথাটি বলতে চাই' যে, রঙ্গমঞ্চ যদি পূর্বের মত প্রতাক্ষ ভাবে তাদের শিক্ষা দীক্ষায় ব্ৰতী নাও হয়, তবু, হতবু রঙ্গমঞ্চের সংস্পর্শে এসে পরােক্ষভাবে তারা যে বিত্ত লাভ করবেন•••ত বন্ধনহীন জীবনের পথে অনেক বড় অবলম্বন হয়ে রইবে । আর, অভিজাত সম্প্রদায়ের অভিনেত্রী! রঙ্গমঞ্চের ভেতরকার আব- হাওয়ায় তাদের শুচিতা রক্ষা করে চলা যতখানি কঠিন বলে তারা মনে করেন••এইটুকু ভরসা তাদের দিতে পারি...এখানকার হাওয়া মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৩১ ঠিক ততখানি দূষিত নয়। (মাফ কোরবেন.•••এমন অনেক সান্ধ্য- সম্মিলন বা ওরিয়েন্টাল ডান্সের ক্লাবে—যােগ দিতে তাদের অনেকের অপরিসীম ঔৎসুক্য দেখা যায়...যার তুলনায় পাবলিক থিয়েটারকে মন্দির, গীর্জার সামিল বলা চলে।) নিজের মর্যাদা বাচিয়ে চলবার ক্ষমতা যার আছে, তাকে লড়তে হয় অনেক ক্ষেত্রে সেই মৰ্যাদা রক্ষা কববার জন্য। কিন্তু রঙ্গমঞ্চে এলে তার জন্যে লড়তেও হয় না রঙ্গমঞ্চের নট-নটী আত্মমর্যাদা সচেতন নারীকে প্রণাম করে দূরে সরে দাড়ায়—সেরূপ নারীকে সন্ত্রম দেবার শিক্ষা মঞ্চের শিল্পীদের আছে। হ্যা, এ কথার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি অভিজাত সম্প্র- দায়ের মেয়েদের প্রলুব্ধ করে আনতে চাইছি রঙ্গমঞ্চের দিকে। সত্যিকারের অভিনয়-প্রতিভা দেখাবার ক্ষেত্র রঙ্গমঞ্চ কি চিত্রলােক, সে বিষয়ে আলােচনা করবার অবকাশ বা সুযােগ এ প্রবন্ধে নেই। মােটামুটি ভাবে বলতে পারি-রঙ্গমঞ্চের দাবী এ বিষয়ে ' ছায়ালােকের চেয়ে কম নয়। সুতরাং সুতরাং আমি রঙ্গমঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি—অভিজাত সমাজের সেই সব তরুণীদের, যাদের প্রতিভা আছে, দেহসৌষ্ঠব আছে, অভিনয়ের স্পৃহা আছে—আর সব চেয়ে বড় কথা—সেই সঙ্গে আছে, প্রখর আত্মমর্যাদা বােধ।
বর্তমানের অভিনেতা গিরিশ-অর্ধেন্দু-অমৃতলাল-দানীবাবুর যুগ চলে গেছে। তারপর অভি নেতৃ জীবনে নবযুগ এনেছিলেন নাট্যাচায্য শিশিরকুমার। শিশির- কুমারের সমসাময়িক যুগের অভিনেতা অহীন্দ্র-নিম্মলেন্দু-রাধিকানন্দ নরেশ-তিনকড়ি-দুর্গাদাস-মনােরঞ্জন-বিশ্বনাথ-বােগেশ-বি-ভূমেন -জীবন- শৈলেন-শরৎ-প্রভাত-সন্তোষ-জহর-জয়নারায়ণ প্রভৃতি। এদের কেউ বা সংসার রঙ্গমঞ্চ হতে অবসর নিয়েছেন ; কেউ বা নাটমঞ্চের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবসর যাপন করছেন কেউ বা মঞ্চ-লোকের সঙ্গে বিজড়িত থেকে শুধু পূৰ্ব্ব-গৌরবের অস্তাচল পানে স্মৃতি-ভারাতুর হৃদয়ে তাকিয়ে আছেন। এদের মধ্যে যারা মঞ্চলোকের সঙ্গে আজও সংশ্লিষ্ট রয়েছেন, হয়তাে তাঁরা অনেকেই আমার এ উক্তিতে প্রীত হবেন না। কিন্তু তাদের কাছে আমার অনুরােধ, তারা আমায় ভুল বুঝবেন না; তঁাদের সকলেরই যে অভিনয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে সে কথা আমি বলি না। আমি বলছি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বয়সের জন্য, কেউ বা উপযুক্ত সুযােগ সুবিধার যােগাযােগ না ঘটবার দরুণ যে কোন কারণেই হােক না কেন,-দু’চার বছরের মধ্যে এমন কোন চরিত্র রূপায়িত করতে পারেন নি••• নাকি তার অভিনেতৃ জীবনের পূর্ব- গৌরবকে ম্লান করে দিতে সক্ষম হয়েছে। •• পূৰ্ববর্ণিত অভিনেতাদের বিষয়ে আমার কোন নালিশ নেই। তাদের অনেকেই শক্তিমান, রজগতের অভিনয় ধারা তারা অনেকখানি পরিবর্তিত করেছিলেন; উপযুক্ত সুযােগ পেলে হয় তো তাদের অনেকে এখনাে শক্তির বিকাশ দেখাতে পারবেন। আমার এ আলােচনা তাদের জন্য নয়,-এ আলােচনা পরবর্তী যুগের অভিনেতাদের সখন্ধে।
মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৩ত কিন্তু কৈ ? কোথায় অভিনেতা ? (ছবিবাবু প্রভৃতি আমায় মাফ করবেন , Every Law has its exception. একটা বা দুটা অভিনেতার আবির্ভাবকে accidentএর পর্যায়ে ফেললে বােধ হয় দোষ হবে না। আমার অভিযোেগ ব্যক্তিগত নয়-সমষ্টিগত ভাবে মঞ্চের আধুনিকতম অভিনেতৃ গােষ্ঠি সম্বন্ধে।) আধুনিকতম অভিনেতা- দের বিষয়ে যদি কেউ বলে যে তাদের অনেকেই ক্লাইভ ফুটের মনাে- ভাব নিয়ে কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, রাজকিয়ণ ঈীট বা বিডন ষ্ট্ৰীটে আশ্রয় নিয়েছেন, তা হলে কি খুব অন্যায় বলা হবে? সেই দশটা পাঁচটার মনােভাব, সেই মাসকাবারের টাকার হিসাব, কোম্পানীর সেই মামুলি অবিচারের বিষয়ে জটলা, অন্য কোম্পানীর বােনা ও বেতন বৃদ্ধি বিষয়ে উদারতার কল্প-কথা-এইতাে আধুনিকতম শিল্পীর গবেষণার বস্তু। নাট্যশিল্পীর মনের মধ্যে বসে যদি কেরানী-শিল্পী কেবল লেজার (Icdger) বইএর পাতা ওল্টায়—তা হলে রঙ্গমঞ্চের আর্ক ল্যাম্প, স্পট লাইট, ফুট লাইট...সমস্তগুলি আলাে একসঙ্গে জেলে দিলেও কারও সাধ্য নেই সে মঞ্চকে আলােকিত করে। অমল, ভূপেন, সিধু, মিহির, পঞ্চানন, জীবেন...এরা ঠিক এই যুগের অব্যবহিত পূৰ্ব্বে এসেছেন, এরা তবু খানিকটা শক্ত বনিয়াদের ওপর দাড়াতে পেরেছেন। ভয় হয় শুধু তাদের কথা ভেবে, ( যদিও তারা সংখ্যায় এক আধ জনের বেশী নন্) যারা শিল্পী মন নিয়ে এই অন্ধকারের মধ্যে দৈবাৎ এসে পড়েছেন। এই আকাশ জোড়া অজ্ঞানতার অন্ধকারে, কে জানে,-তারাও কখন শিল্পী-মনের জ্যোতিটুকু হারিয়ে ফেলবেন। অভিনেতা কে ? কি তার স্বরূপ? সে স্রষ্টা, সে ১৩৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে আপনাকে সে সৃষ্টি করে বহু বার, বহু রূপে, বহু ভাবে। রূপের ধ্যান না করলে রূপ-সৃষ্টি হয় না। তাই অভিনেতার প্রয়ােজন••• নিষ্ঠা, একাগ্রতা, সাধনা এবং সব চেয়ে বেশী করে প্রয়ােজন, নিজের শিল্পকলাকে অন্তর দিয়ে ভালবাসা। শুধু কি তাই? নাট্যশালা তার সাধনার মন্দির ; এ মন্দিরের প্রতিটা ইট, পাথরকে পর্যন্ত নিজের বলে ভালবাসতে হবে। নাট্যমন্দিরের সঙ্গে অভি- নেতার এই অছেদ্য একাত্মবােধই তার রূপ-সাধনাকে সিদ্ধির পথে অগ্রসর করে দেবে। কিন্তু আজ সে নিছার অভাব, রঙ্গমঞ্চকে শিল্পীর সাধনা মন্দির-জ্ঞানে ভালবাসার অভাব। নাটমঞ্চে প্রদীপ জ্বলবে কেমন করে ? কোনাে নাটকে পার্ট পেলে বাড়ীতে সে পাট উন্টে দেখবার আগে খবরের কাগজ উল্টে দেখবেন, থিয়েটারের বিজ্ঞাপনে নাম বেরিয়েছে কি না ? নাম কার আগে পড়ল? কার নামের নীচে পড়ল ? নামের হরফ কত বড় ? স্মল পাইকা, পাইকা, না গ্রেট টাইপে... ? গৃহীত ভূমিকার রূপ সম্বন্ধে নিজে কখনও চিন্তা করা দূরে থাক্- রিহার্সেলে বসে লাষ্ট ট্রাম চলে গেল কি না—সেই চিন্তা, আর সেই ধ্যান। রূপসজ্জা করতে বসে-সজ্জার চেয়ে বেশী দৃষ্টি সজ্জার উপকরণের ওপর। কোম্পানী কাকে বেশী পাউডার দিল,•••ব্রাশ, লিপষ্টিক, ভােয়ালে, বসবার চেয়ার, সাজবার আয়না••এগুলাে কার তুলনায় নিকৃষ্ট হয়ে গেল—এই তো রূপসজ্জার প্রধানতম লক্ষ্য করবার বিষয় !..সৈনিক সেজে মঞ্চে দাড়াতে জানেন না বলে, যে ব্যক্তি দর্শকের কাছে তাড়া খেয়ে এলেন, ভেতরে এসে তিনিই বলবেন, “পার্টে কিছু নেই ; আমাকে এ পাটে নামানাে হয়েছে শুধু লােক হাসাবার জন্য।” অশিক্ষাকে ক্ষমা করে চলে•••কিন্তু অশিক্ষার মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৩৫ দম্ভকে নয়। এই দম্ভ, এই vanity, এই মূঢ়তা,-সব চেয়ে মম্মান্তিক। মঞ্চশিল্প যদি সমবেত সৃষ্টি না হত—এই রূপ-লােকে যদি একক সৃষ্টির অবকাশ থাকতো তা হলে এতখানি ভয়ের কারণ ঘটত না। অনধিকারীর মঞ্চলােকে এই স্পর্কিত পদক্ষেপ-সমস্ত শিল্পপূজারীর প্রচেষ্টাকে অশুচি করে দিচ্ছে। তাই বলছিলুম, মঞ্চের প্রদীপ নিভে যাচ্ছে । চরিত্র রূপায়ণ করবার জন্য যে ধ্যান ধারণার প্রয়োজন•••তা এদের নেই। চরিত্রের প্রতি কথা, প্রতি কাৰ্য্য কেন এ রকম হচ্ছে, কেন অন্য রকম হচ্ছে না—সে বিষয়ে এদের অধিকাংশই ভেবে দেখবার প্রয়ােজন বােধ করেন না। গৃহীত চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করবার চেষ্টা নেই ; চরিত্রকে জামার মত গায়ে চাপিয়ে দিলেই হ’ল ! চরিত্রের বহিরাবরণটুকু ধরবার চেষ্টা-তাও কি এদের নিখুঁত হয়? উঁদনীর কেনা জামার মত কোনটার হাত লম্বা, কোনটার ঝুল কোমর পর্যন্ত উঠেছে কোনটা বা হাঁটু অবধি নেমে এসেছে। পরমাননে এই অপরূপ রূপ নিয়ে তারা মঞ্চের ওপর চলাফেরা কচ্ছেন, বিজ্ঞাপনে নামের হরফ ছোট হলে কোম্পানীকে পদত্যাগের নােটশ দিচ্ছেন। অনেক সময় আধুনিকতম অভিনেতাদের স্যশক্তি বা “টিম ওয়ার্কের” দোহাই দিতে শােনা যায়। মঞ্চে “টিম ওয়ার্কের” মানে কি ?••• সমবেতভাবে রূপসৃষ্টির প্রয়াস ; সবাই মিলে ছন্দ, গতি সকল দিক দিয়ে অসামঞ্জস্য আনবার প্রয়াস নয়। আগের যুগেই বলুন, বা আজকের যুগেই বলুন, “টিম ওয়ার্ক” ব্যতীত কোন নাটকই যথাযথ ভাবে অভিনীত হতে পারেনি। নাট্যকার যে চরিত্রকে মঞ্চে ও নেপথ্যে যতটুকু প্রাধান্য দিয়েছেন, সেই চরিত্রের রূপায়ণে অভিনেতার ঠিক তদুপযুক্ত প্রাধান্য আরােপ করবার নামই অভিনয়ের টিম ওয়ার্ক। নাট্যকার যাকে নায়করূপে অঙ্কিত করেছেন—অন্য চরিত্রকে তার অনুবর্তী হয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রহরী পিছনের মঞ্চ ছেড়ে রাজার সঙ্গে কথায়, চালচলনে-সমান তালে এগিয়ে আসবার নাম—নাটকীয় ক্রিয়ার সাম্য রক্ষা নয়। এই সহজ সত্যটুকু উপলব্ধি করতে পারলে “টিম ওয়ার্কের দোহাই দিয়ে নিজেদের দৌর্বল্য ঢাকবার হাস্যকর প্রচেষ্টা হতে আধুনিকতম অভিনেতা হয়তাে বিরত থাকতেন। শিশিরকুমারের অপরূপ চরিত্র বিশ্লেষণ অথবা চরিত্র সৃষ্টি,...নট-সূৰ্য্য অহীন্দ্র চৌধুরীর অতুলনীয় রূপ-সজ্জা এবং সর্বশ্রেণীর দর্শককে মঞ্চমায়া বা illusionএ অভিভূত করবার অপূর্ব দক্ষতা,-বাণী-বিনােদ নির্মলেন্দুর শিশুর সারল্যের সঙ্গে অপরাজেয় বাদশাহী dignity এবং ধীরােদাত্ত কণ্ঠের অননুকরণীয় বাচন ভঙ্গী! তার সঙ্গে আধু- নিক অভিনেতাদের শক্তির তুলনা করতে চাই না। ফিরীঙ্গী চরিত্রের রূপদানে ভূমেন রায়ের অসাধারণ নৈপুণ্য এবং আধুনিক যুগের শিল্পী ছবি বিশ্বাসের বাচন ভঙ্গী ও ভাবাভিব্যক্তির অপূৰ্ব সংযম ! এদের অভিনয় শক্তির সঙ্গেও আধুনিক যুগের অভিনেতার শক্তির তুলনা করব না। তুলনা মূলক বিচার ছেড়ে দিলেও, প্রত্যেক অভিনেতা অভিনয় কলা সম্বন্ধে সাধারণ-জ্ঞান আয়ত্ব করবেন এবং নিজেদের শিল্পী বলে ভাবতে শিখবেন•••অন্ততঃ এটুকুও কি আশা করা চলে না ? অভিনয়ের সাধারণ জ্ঞানের সব চেয়ে সাধারণ কথা...বাচন ভঙ্গীর মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৩৭ স্পষ্টতা এবং ভাব-বাহকতা। কবিতা আবৃত্তি তো অভিনেতা-সমাজ হতে লুপ্ত হতে বসেছে। অথচ প্রতিদিন যদি মাত্র এক পৃষ্ঠা করেও রবীন্দ্র-কাব্যের আবৃত্তি অভ্যাস করা যায়—তাতে অভিনেতার বাণী শুদ্ধি তো হবেই এবং সেই সঙ্গে কবিগুরুর ভাব-তরঙ্গিত অপূর্ব শব্দ-ঝঙ্কার অভিনেতাকে শব্দ বৈচিত্র্য দ্বারা পােব ব্যঞ্জনায় যথেষ্ট সাহায্য করবে। এই সহজ কথাটা যদি আধুনিক অভিনেতা মেনে চলেন, তাহলে আর কিছু না হােক, দর্শকেরা অভিনয় দেখতে এসে অন্তত কর্ণ-পীড়া বােধ করবেন না। মঞ্চে আজ শিল্পীর অব ; তার (চয়েও বেশী অভাব শিল্পী মনের। বাইরের জগৎ থেকে অভিনয় কলা সম্পূর্ণ আয়ত্ব করে, সুদক্ষ অভিনেতার দল মঞ্চে অবতরণ করুন—এমন অদ্ভুত প্রত্যাশা রঙ্গ- মঞ্চের নেই। রঙ্গমঞ্চ চায় তেমন শিক্ষিত তরুণদের...যাদের দেহ মঞ্চের উপযােগী, সুগঠিত যারা স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন এবং অভিনয় কলাকে যারা ভালবাসেন। পূর্ণাঙ্গ চরিত্রাভিনেতা, অথবা “টাইপ চরিত্রে রূপদান-দক্ষ শিল্পী প্রত্যেক রঙ্গমঞ্চেই হয়তো এখনাে দু’একজন আছেন; কিন্তু সুদর্শন, তরুণ, নায়ক চরিত্রের রূপদান করবার উপযুক্ত শিল্পীর আজ যে কতখানি অভাব.••তা প্রতিটি প্রঙ্গমঞ্চ মর্মে মর্মে উপলব্ধি কচ্ছে। হয়তো দৈবাৎ একটা চেহারা পাওয়া গেল, কিন্তু কষ্ট পাওয়া গেল না ; হয়তাে কণ্ঠ মিলল, চেহারা মিলল না ; কদাচিৎ হয়তাে দৈবক্রমে কান্তি ও কণ্ঠ দুইই মিলল ; কিন্তু তার ভেতর শিল্পীর অন্তরটী খুজে পাওয়া গেল না। কান্তি, কণ্ঠ ও শিল্পী-মন এ যার আছে-রঙ্গমঞ্চ তাকে আমন্ত্রণ জানায় সাদরে, পরম আগ্রহের সঙ্গে। হয়তাে এমনও হতে পারে- র- মঞ্চের কেন্দ্রস্থলের একটী আসন শুধু তার জন্যই শূন্য পড়ে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও রঙ্গমঞ্চ নাট্যকলার উন্নতির জন্য এবং রঙ্গমঞ্চকে নূতন ভাবে গড়ে তােলবার জন্য যে পরিমাণ শিক্ষা-দীক্ষার প্রয়ােজন-আমাদের দেশে আজ তার একান্ত অভাব। এ বিষয়ে যাদের উৎসাহ ও সহযােগিতা প্রয়ােজন-নাট্যাচাৰ্য শিশিরকুমারের নাট্য-মন্দির লুপ্ত হবার পর তারা আর রঙ্গমঞ্চের সংস্পর্শে আসেন নি। নাট্য রচনা, প্রয়ােগ- পদ্ধতি, অভিনয়, সঙ্গীত, নৃত্যকলা—প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে যারা প্রকৃত অনুশীলন করেছেন বা এখনাে কচ্ছেন- তারা যদি সেই বিদ্যা রঙ্গমঞ্চকে সুসংস্কৃত করবার জন্য প্রয়ােগ না করেন তা হলে তাদের অধিগত বিদ্যায় নাট্য-ভারতীর কতটুকু সেবা হবে ? ; এই সব সুধী, নাট্যামােদীগণ রঙ্গমঞ্চে কৃষ্টির অভাব দেখে ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত করলে—শিল্প-সাধনা নেই বলে একে বয়কট করে চললে-নাট্যশাল। নব-চেতনা লাভ করবে কোথা হতে? রঙ্গমঞ্চের বাইরে দাড়িয়ে রঙ্গমঞ্চের উন্নতি করা যায় না; মাসিক পত্রিকায় অথবা রবিবাসরীয় দৈনিকে প্রবন্ধ রচনা করেও নয়। যত বড় চিকিৎসকই হন্ না কেন-রােগীর কাছে এসে রােগীকে নিয়মিত পরীক্ষা না করে, কেউ তাকে রােগমুক্ত করতে পারেন না। মঞ্চের কোথায় কি গলদ ঘটল•••দিনের পর দিন শিল্পীর গতি-পথে কত নূতন বাধা বিপত্তি পাহাড় প্রমাণ হয়ে উঠল-রঙ্গমঞ্চে এসে সেগুলি প্রত্যক্ষ না করলে মঞ্চের সংস্কার কার্য কি প্রকারে সম্ভব হবে ? যারা এককালে অপরিসীম আগ্রহ নিয়ে রঙ্গমঞ্চের শিল্পীদের উপদেশ ও পরামর্শ দিতে এসেছিলেন••শুনতে পাই, তাদের অনেকে নানা কারণে মর্মাহত হয়ে, অনেকে বা হতাশ এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে, এর সংস্পর্শ ত্যাগ করে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা প্রত্যেকে মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৩৯ নাট্য-কলার অনুরাগ...অথচ একটি কথা বুঝে উঠতে পারি না যার সঙ্গে প্রীতির সম্পর্ক, অন্তরের সম্পর্ক—তাকে সৰ্ব্বতােভাবে ত্যাগ করা যায় কি করে ? রঙ্গমঞ্চের আবহাওয়া যদি তারা সত্যই দুষিত মনে করে এর মধ্যে আর না আসতে চান-তা হলেও নাট্য. কলার প্রতি তারা তো অনুরাগ বজ্জিত হতে পারেন না। নাট্যকলা বিষয়ক দু'একটি সাময়িক প্রবন্ধ লিখে সে অনুরাগ যথােচিত প্রদশিত হ’ল এবং তাদের দায়িত্ব শেষ হ’ল...এই কি বিশ্বাস করতে বলেন ? বিভিন্ন দিক থেকে নাট্যকলার উৎকর্ষের জন্য Aristotleএর যুগ থেকে আরম্ভ করে আজও পর্যন্ত য়ুরোপে কত না অালােচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। একমাত্র নাটক রচনা পদ্ধতি বিষয়ক আলাে- চনার কথা ভাবুন; আদিযুগে Aristotle, Horace, Donatus, Dante ; fotita Renaissance fist Danielio, Minturno), Castelvetro, Scaliger: 781217 Renaissance 755-Sebillet, De la Taille ; 670947-Cervantes, Lope de Vega, Tirso ile Molina ; 896e-Sidney, Jonson, Dryden, lymer, Farquhar, Addison, Coleridge, Lamb, Hazlitt, Pinero, Jones, Shaw, Archer ; 78737 থেকে ফ্রান্সে-Chappelain, Corneille, Moliere, Racine, Boileau, Voltaire, Diderot, Hugo, Dumas, Sarcey, Zola, Brunetiere, Maeterlinck ; ostatco - Lessing, Schiller, Goethe, Schlegel, Wagner, Freytag.•••এ রকম কত মনীষী নাটক রচনা সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছেন। দুঃখ হয়, লজ্জা হয় এই ভেবে যে—বাংলার নাট্যমঞ্চগুলিতে প্রতি বৎসর সৰ্বশুদ্ধ প্রায় ২০২২ খানা নাটকের প্রয়ােজন হয়, অথচ বাংলাভাষায় নাটক রচনাকৌশল সম্বন্ধে আজ পর্যন্ত কেউ একখানা ১৪০ মঞ্চে ও নেপথ্যে পুস্তক রচনা করবারও প্রয়ােজন বােধ করেন নি। শুধু নাটক সম্বন্ধে নয়,-অভিনেতা, আলােকশিল্পী, দৃশ্যশিল্পী-এদের নিয়েই বা এই দেড়শ বছরে বাংলায় কথা বই লেখা হয়েছে ? যাদের এসব বিষয়ে উৎসাহ, অনুরাগ আছে, তারা কি মঞ্চের এই সকল বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে যথেষ্ট কার্যকরী আলােচনা করতে পারতেন না? বাংলা রঙ্গমঞ্চের সংস্পর্শে না আসুন-মঞ্চবিষয়ক যে সব ইংরাজী বই রয়েছে, অন্ততঃ তার গােটাকতক বইএর অনুবাদ করলেও বুঝতাম, তঁারা দূরে থেকে নাট্যকলার বৃদ্ধি কামনা কচ্ছেন। ০ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সাধারণ রঙ্গমঞ্চের আওতায় কখনাে আসেন নি। কিন্তু দূরে থেকেও তিনি বাংলার রঙ্গমঞ্চকে যে বস্তু দিয়ে গেছেন তার তুলনা হয় না। বিশ্বভারতীর পক্ষ হতে শান্তিনিকেতনে এবং কলকাতায় ফাষ্ট এম্পায়ার প্রভৃতি মঞ্চে কবিগুরুর নেতৃত্বে ও শিক্ষায় বিসর্জন, বাল্মীকি-প্রতিভা, রাজারাণী, নটীর পূজা, তাসের দেশ, চণ্ডালিকা প্রভৃতি নাটকাভিনয় হয়েছে। মঞ্চ-সজ্জায় ও পােষাক পরিচ্ছদ পরিকল্পনায় অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু...সঙ্গীতে সুরভাণ্ডারী দীনেন্দ্রনাথ প্রভৃতি কবিগুরুর সহযােগিতা করেছেন। কবি নিজেও কখনো কখনো নাটকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। সাধারণ রঙ্গমঞ্চে (তার দু'একখানি নাটক অভিনয় ব্যতীত কোন ভাবে সংশ্লিষ্ট না হয়ে—তিনি নিজস্ব নাট্য-সম্প্রদায় গঠন করে- ছিলেন। অবনীন্দ্র, গগনেন্দ্র, দীনেন্দ্র, নন্দলাল প্রভৃতি শিল্পীর সহযােগে তিনি যে সব নাটক রূপায়িত করেছিলেন-তাতে বাংলার নাট্যরসিক সমাজ এক নূতন রসের সন্ধান পেয়েছিল। সাহিত্যে, চিত্রে, সঙ্গীতে, নৃত্যে, বাঙ্গালীর বিভিন্ন শিল্পকলায় রবীন্দ্র-প্রতিভার প্রভাব যেমন সুস্পষ্ট-নাট্যকলার দিক থেকেও সে প্রভাব তেমনি মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৪১ : সুস্পষ্ট বলা চলে। কি ভাবে ? আর সব কথা ছেড়ে দিলুম : বর্তমান রঙ্গমঞ্চের যুগ-প্ৰবৰ্ত্তক নাট্যাচাৰ্য শিশিরকুমার রবীন্দ্র প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন বলেই এতখানি সমুজ্জ্বল। শিশিরকুমারের অভিনীত যে কোনাে নাটকের কাব্য ভাবাপন্ন সংলাপ আবৃত্তির কথা ভাবুন- সে কি বারম্বার রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়নি ? নাট্যকলার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ও সাধারণ দর্শক- এই দু’য়ের মাঝখানে দৌত্য করেছেন শিশিরকুমার। তবে তিনি কেবল সাধারণ দূত নন্ ; তাই রবীন্দ্র-প্রতিভা তার সংস্পর্শে রূপান্তরিত হ’ল—সাধারণের আস্বাদ যােগ্য হল-শিশির প্রতিভারূপে। বিরাট কোনাে প্রতিভার আবির্ভাব হলেই—তার প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্ববিশ্রুত নৰ্তক উদয়শঙ্করের অপরূপ নৃত্যছন্দের মাধুর্যে সারা পৃথিবী বিমুগ্ধ। উদয়শঙ্কর কখনাে বাংলার মঞ্চে তার নৃত্য-লীলার বিকাশ দেখান নি। কিন্তু তবু তার প্রভাব রঙ্গমঞ্চে বিস্তার লাভ করেছে। অজন্তা ইলােহার প্রস্তর গাত্র হতে নিপুণ ভাস্কর রচিত মূর্তিগুলি যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়শঙ্করের দেহে, শঙ্করের মৃত্যছনে। উদয়শঙ্কর অবলুপ্ত নৃত্যকলার পুণরুজ্জীবন করবার পর, আজ সারা দেশ জুড়ে ভারতীয় নৃত্য-আন্দোলন বন্যার মত প্লাবন তুলেছে। অবশ্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নৃত্যের দোহাই দিয়ে ব্যর্থ অঙ্গভঙ্গী ঠাই পেলেও-কোন কোনাে শিল্পী যে সত্যিকারের ভারতীয় নৃত্যকলার অনুশীলন আরম্ভ করেছেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। মঞ্চে তখনই উদয়শঙ্করের প্রভাব বুঝতে পারি, যখন দেখি, সারা মঞ্চ জুড়ে ১৪২ মঞ্চে ও নেপথ্যে অজস্র কুরূপা নর্তকীর পরিবর্তে মাত্র একটা সুতনু নর্তকীর আবেদন অনেক বেশী। নিম্নস্তরের সস্তা বিলাতী নাচ ভেঙ্গে যে পাঁচমিশালী নাচ তৈরী করে এককালে দর্শকের বাহবা কুড়ােনো যেত- আজকের দিনে সেই “থিয়েটারী” ঢংএর নাচ তৈরী করলে দর্শকেরা যখন অপরিসীম বিরক্তি বােধ করেন—তখনই বুঝতে পারি—মঞ্চের দর্শকের ধ্যে এ নৃত্য-চেতনার মূল উৎস-উদয়শঙ্কর। মঞ্চে না এসে এই ভাবে যারা মঞ্চের শিল্পীদের যাত্রাপথে আলোেক- সম্পাত করেছেন—তাদের দেখাদেখি দেশের আর কোন মনীষী কি দূর থেকে নাট্যমঞ্চকে সহায়তা করতে পারেন না? প্রত্যেক শিল্প-কলার উৎকর্ষের জন্য শিক্ষা ও সাধনা প্রয়ােজন। নাট্যকলার ক্ষেত্রেও এই কথাই প্রযুজ্য । পথভ্রান্ত বাংলার নাট-মঞ্চকে নির্দেশ দেবার জন্য যে শিক্ষায়তন প্রয়ােজন আমার মনে হয়, তা গড়ে উঠতে পারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে। ইংলণ্ড, আমেরিকা, রাস্তা প্রভৃতি দেশের নাটমঞ্চের জন্য কোটীপতি ধনকুবেরগণ মুক্তহস্তে অর্থ ব্যয় কচ্ছেন। আমাদের নাটমঞ্চের সে রূপ সাহায্যের আশা করাও আজ বাতুলতা মনে হয়। তাই আমাদের নাট-মঞ্চ নুতন কিছু experiment করতে ভরসা পায় ; বাধা-ধরা পথে কখনো এগুচ্ছে, কখনাে পিছু হটছে। নাট- মঞ্চ আজ ব্যবসা ক্ষেত্র, ব্যবসায়ে লােকসান হলে শিল্পীকে কেউ ঘর থেকে এনে খেতে দেবে না। ওদেশে তা দেয় বলেই নাট-মঞ্চে নূতন experiment সম্ভব হয়। শুধু নাটমঞ্চে নয়-নাটমঞ্চের বাইরে Universityতে পৰ্যন্ত মঞ্চ-শিল্পের কার্যকরী শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। আমাদের রঙ্গমঞ্চ ব্যবসাক্ষেত্র হলে ও—বিশ্ববিদ্যালয় তা নয়। ইংরাজী, মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৪৩ বাংলা-খানকতক নাটক পাঠ্যতালিকাভূক্ত করে, অথবা গিরিশ 678573173 (Girish Lecturer) নিযুক্ত করে—মহাকবির জীবনী আলোচনা করিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন নাট্য- কলার উন্নতি কল্পে তাদের সমস্ত করণীয় কাৰ্য শেষ হয়ে গেল- তা হলে তার চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছু নেই। শুধু নাটক ও নাট্যকারের জীবনী না পড়িয়ে—তাদের উচিত নাটক-রচনা কৌশল (Technique in Drama ) 780 শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা। অভিনয়, দৃশ্যরচনা, মঞ্চের আলােকসম্পাত প্রভৃতি বিষয়ে সুদক্ষ শিল্পী- দের দিয়ে মাসে মাসে আলােচনার ব্যবস্থা করা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খুবই অসম্ভব ? কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মঞ্চ রয়েছে যূনিভার্সিটি ইন্সটি- টিউট (University Institute). বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে যে নাটক রচিত হবে—বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনাতেই Institute হবে সেই নাটকের অভিনয়। বাংলার সাধারণ রঙ্গমঞ্চগুলি সেই শ্রেষ্ঠ মনীষী গণের বহু অনুশীলন সঞ্জাত নাট্যাভিনয় দেখে—গঠন করবে নাটক- প্রবর্তিত করবে নূতন অভিনয় ধারা। তা না করে University Institute যদি সাধারণ রঙ্গমঞ্চের অভিনীত নাটক খুজে বেড়ায় সাধারণ রঙ্গমঞ্চের শিল্পীদের অনুকরণে অভিনয় করে—তা হলে বাংলার অন্ধকার রঙ্গমঞ্চের পথের দিশারী হবে কে ? কলকাতা শহরে অগুন্তি নাচের ইস্কুল আছে, গানের ইস্কুল আছে। বিল্ডিং আর্কিটেক্ট (Building Architect) থেকে আরম্ভ করে ছুতাের মিস্ত্রির কাজ পর্যন্ত শিক্ষা দেয়—এমন ধরণের টেকনিকাল {Technical) ইস্কুলের অভাব নেই। অথচ নাট্য-শিল্প বিষয়ক ১৪৪ মঞ্চে ও নেপথ্যে শিক্ষার জন্য মাত্র একটা বিদ্যালয়ও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। হাজার হাজার দর্শকের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে দাড়িয়ে তাদের প্রত্যেককে সমভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবার কলাকৌশল কি এতই সহজ-সাধ্য যে তার জন্য কোনও শিক্ষার আবশ্যকতা নেই ? রঙ্গালয় শিল্পীকে শিক্ষা দিতে পাচ্ছে না ; তার প্রধান কারণ, মঞ্চে এসেই শিক্ষার্থী রাতারাতি ভােল্ পাল্টে বসেন। তিনি আর শিক্ষার্থী থাকেন ; দাবী করেন পুরােদস্তুর শিল্পীর মর্যাদা অর্থ। যশ, পদমর্যাদা, মঞ্চের সমস্ত লােভনীয় বস্তুগুলি তঁার চারিপাশে অকস্মাৎ একটা আরব্য- রজনীর সুখস্বপ্ন বিস্তার করে। যে পথে চলতে শেখেন নি•••যে রাজ্যের ভাষা পৰ্যন্ত জানেন না—সেখানে নিজেকে কল্পনা করে বসেন সর্বাধিনায়ক রূপে ! অধিকাংশ নবাগত শিক্ষার্থী অকস্মাৎ বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েন বলেই রঙ্গমঞ্চে শিল্পী তৈরী হচ্ছে না ; এবং শিল্পী তৈরী হচ্ছে না বলেই মঞ্চ আজ বিভ্রান্ত ও দিশেহারা। চোখের সামনে কেউ ডুবে যাচ্ছে দেখে আমরা হা হুতাশ করব ; অথচ শক্তি থাকতে তাকে টেনে তুলবার জন্যে হাত বাড়িয়ে দেব ! ডুবন্তকে অসাবধানতার জন্য তিরস্কার করব ; শক্তিহীন বলে উপেক্ষা করব; সে আশ্রয় ভিক্ষা করলে নিস্ক্রিয় থেকে বলব “উপায় নেই—আমরা যে পরাধীন।” বিদ্যার পীঠভূমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বাংলার বিপন্ন রঙ্গালয়গুলি অবশ্য এ ধরণের জবাব প্রত্যাশা করে না; বরং আশা রাখে, বিশ্ববিদ্যালয় নূতন নাট্য-বিদ্যালয় গড়ে তুলে—বাংলার জাতীয় সংস্কৃতিকে সকল দিক দিয়ে পূর্ণতা দান করবেন।
字 “কঙ্কাবতীর ঘাটের” একটী দৃশ্য। পিছন থেকে আলাে ফেলা হয়েছে। মহেন্দ্র গুপ্ত স্বাগতম পুরাতন শেষ হয়ে এসেছে,তবু নূতনের পদধ্বনি কৈ? “If winter comes• • •can spring be far behind :”—এ কবি-বাণীর সার্থকতার আভাস মাত্র যদি আজকের জরাজীর্ণ রঙ্গমঞ্চে দেখতে পেতুম তা হলে পুরাতনকে বিদায়-অভিনন্দন জানাতে মনে এতটুকু দ্বিধা জাগত না। পুরাতনের শূন্য আসনে অভিষেক করম আমরা সগৌরবে, পরমােৎসাহে সেই নবীন শিল্পীকে। কিন্তু কোথায় সে শিল্পী ? নতনের আবির্ভাব হয়নি; তাই আজও হৃত-স্বাস্থ্য, বয়ঃ-ম্লান, নাট্যা- চার্য শিশিরকুমার যে কোনাে ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে-বাংলার নাট্যরস-পিপাসু-হৃদয় চঞ্চল হয়ে ওঠে তার অফুরন্ত মধুচক্রের রস আস্বাদন করতে। বিশ্রাম-বিহীন কত দীর্থ বৎসর অতীত হয়ে গেল ; বাংলার রসিক সমাজ তবু, “নট-সূৰ্যকে” আজও অস্তাচলে পা বাড়াতে দেবে না; আজও বন্দনা কচ্ছে তাকে কীত্তির উদয়াচলে বসিয়ে । নিভৃত পূজা-মন্দিরে বসে “বাণী-বিনােদ” আজ মেঘমন্দ্র ধ্বনিতে দেব- স্তুতি পঠে ব্যাকুল ; বাংলার রস-পিপাসু-চিত্ত, তবু আজও মুক্তি দেবে না তাকে নাটমঞ্চ হতে; অমন উদাত্ত গম্ভীর কণ্ঠে নাট্য-ভারতীয় আরাধনা করবে-তেমন নিষ্ঠাবান পুরােহিত আজও এল না যে। সত্য বটে, যা কিছু প্রাচীন তার দিকে মানুষের একটা প্রকৃতি গত মােহ থাকে। কিন্তু তা বলে আমাদের যুগে যেমনটি হত—এ যুগে তেমনটী হয় না”-চোখ বুজে এ কথা যারা বলেন, আমি তাদের দলে নই। শিশির-অহীন্দ্র-নির্মলেন্দুর যুগের বন্দনা না গেয়ে, যদি বর্তমানের স্বতি গান করতে পারতুম, তা হলে মনে মনে অনেক বেশী গৌরব ও আনন্দ বােধ করতুম। কারণ বর্তমানের শিল্পী আমারই সমসাময়িক আমার দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত হয় তাদেরই সুখ দুঃখের অংশ হয়ে।
১৪৬ মঞ্চে ও নেপথ্যে আজকের দিনেও পুরাতনকে প্রশংসা কচ্ছি বলে হয় তাে এ যুগের। শিল্পী-বন্ধুরা কেউ কেউ ক্ষুঃ হবেন। হয়তো বা বলবেন : পুরাতন বৈচিত্র্য হারিয়েছে, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে গেলেও তাদের নব-সৃষ্টির মাঝখানে পূৰ্বাভিনীত চরিত্রের ছায়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। পূর্ব- যুগ সম্বন্ধে হয়তো কারাে কারাে এই রকম অভিযােগ উপস্থিত হবে। কিছুমাত্র প্রতিবাদ না করে—যদি তাদের এ অভিযােগ সত্য বলে মেনে নিই তাতেই বা দোষ কি?-নূতন কিছুর প্রতাশা করব কার কাছে ? যারা দীর্ঘকাল নানা উপচারে নাট্য ভারতীর পূজা করে আজ পুরাতন হয়ে গেছেন—তাদের কাছে...না যৌবন-দৃপ্ত নবীনের কাছে ? একথা অস্বীকার করবার উপায় নাই—আধুনিক- তম যুগের কোনো শিল্পী আজ পৰ্য্যন্ত এমন কোনাে চরিত্র রূপায়িত করতে সক্ষম হন নি–যা দেখবার জন্যে পাঁচ বৎসর পর—দশকেরা অপরিসীম আগ্রহ নিয়ে রঙ্গমঞ্চে ছুটে আসবে। এ যুগের কোনাে সু-অভিনীত নাটক পাঁচ বৎসর পর আবার অভিনীত হলে হয়তাে দর্শক আসবে “টিম ওয়ার্ক” দেখবার জন্য••• অথবা নুতন শিল্পী-সঙ্ঘ নাটককে কি নব-রূপ দিচ্ছেন—তাই দেখবার জন্য। কোনো বিশেষ অভিনেতা কোন একটা বিশেষ চরিত্র রূপায়ণে এমন অপরূপ দক্ষতা প্রকাশ কল্লেন—যার ফলে চরিত্রটা classicalএর পষ্যায়ে স্থান পেল—এ ধরণের অভিনয় করতে আধুনিকতম কোনাে অভিনেতা আজ পর্যন্ত সক্ষম হয়েছেন কি? শিশিরকুমারের জীবানন্দ, আলমগীর, রঘুবীর, দিগম্বর,—অহীন্দ্র চৌধুরীর সাজাহান, আবন, সেলুকস্ (এমন কি এই পরিণত বয়সের ডক্টর ভােস, ভােলা মাষ্টার —নিৰ্ম্মলেন্দুর চন্দ্রশেখরের নবাব, শিবাজী, কংস, সিরাজ, নরেশ চন্দ্রের কাত্যায়ণ, শাইল, ব্যারিষ্টার জিতেন-ভূমেন রায়ের অ্যান্টিগােণাস, রডা,কার্ভালল -কত নাম করব?-এই সব চরিত্র রূপায়ণ দেখতে আজ পর্যন্ত দর্শক মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৪৭ সমাজের যত অগ্রহ-তেমন আগ্রহ সৃষ্টি আধুনিক যুগের কোন “শিল্পীর অভিনয়ে সম্ভব হয়নি—রূঢ় হলেও এ কথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। আধুনিক যুগে মঞ্চে যােগ দান করলেও একমাত্র ছবি বিশ্বাস সম্বন্ধে এ অভিযােগ খাটে না। ঋজু, সুঠাম দেহ •••এবং সংহত, সুন্দর,নিজস্ব অভিনয় ধার.. তাকে আজ বহু দশকের প্রিয় করে তুলেছে। ভাবী কালের মঞ্চ তার কাছে অনেক কিছু দাবী করে। মঞ্চ জগতের সঙ্গে বর্তমানে যাদের যোগ রয়েছে-সেই সব অভি নেত্রীদের বিষয় আলােচনা করতে গেণে। গ্রে নাম করতে হয় সরযুবালার। যেখানে শিল্পীকে শুধু চরিত্র রূপায়িত করতে হয় না— নিজস্ব সৃষ্টিরও যেখানে অনেকখানি অবকাশ আছে-সেই ধরণের চরিত্রাভিনয়ে সরবালা শুলনীয়। তার সুস্পষ্ট বাচন ভঙ্গ—যে কোনাে প্রথম শ্রেণীর শিল্পীর পক্ষে গৌরবের বিষয়। সামাজিক, ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, সঙ্গীত মুখর, সকল শ্রেণীর নাট্যাভিনয়ে বিশেষতঃ “ইমােশনাল” (Finotional) চরিত্রাভিনয়ে রাণীবালা অসামান্য। আভিজাত্য-গর্বিত। আধুনিকার চরিত্রে শান্তি গুপ্ত যথেষ্ট নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। সরসপুষ্ট চরিত্রে সুহাসিনীর অভিনয়কে ও প্রশংসা করা চলে। মলিনা, সাবিত্রী, পুর্ণিমা এই তিন জন কায়ালােক অপেক্ষা ছায়ালােক-প্রিয়া। মঞ্চে নাম করতে আর বাকী রইলেন—ফিরােজা, বীণা, অপর্ণা, বেল, বন্দনা, উমা, রাজলক্ষ্মী—ব্যস এই পর্যন্ত। সে যুগের প্রভা এবং নিভাননী এই দুইটা প্রথম শ্রেণীর অভিনেত্রী- যদিও এখনও মঞ্চের সঙ্গে যােগ রেখেছেন—উল্লেখ যোগ্য কোনাে ভূমিকায় এদের শীঘ্র দেখতে পাওয়া যায় নি। উল্লিখিত অভি- নেত্রীদের মধ্যে যে দু তিন জন অভিনেত্রী শীর্ষস্থানীয়া•••তারা শিশির, অহীন্দ্র, নির্মলেন্দু, দুর্গাদাস অথবা নরেশ চন্দ্রের শিক্ষায় শিক্ষিতা।
১৪৮ মঞ্চে ও নেপথ্যে সুতরাং তারাও পুরাতন যুগের। অবশিষ্ট যারা রইলেন, তারা অভিনয় কচ্ছেন সত্য; কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের কাছে স্মরণীয় কিছু পাওয়া যায় নি। মঞ্চের অভিনয় তাঁরা নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন, এই টুকুই সান্ত্বনার কথা। তঁাদের মঞ্চ-প্রীতিকে প্রশংসা করি, শ্রদ্ধা করি ; কিন্তু তবু বলি,-বাংলার দর্শক তাদের মধ্যে অসামান্য প্রতিভার আভাস আজও দেখতে পায় নি। আধুনিক যুগে মঞ্চ-জগতে শিল্পী তৈরী হ’ল না,—উপযুক্ত শিক্ষার অভাব এর প্রধান কারণ—কেউ কেউ এমন কথা বলেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শিক্ষার অভাবের চেয়েও এর জন্য ঢের বেশী দায়ী শিক্ষার্থীর নিষ্ঠার অভাব। অসুস্থ দেহ নিয়ে শিশিরকুমার এখনো শিল্পী তৈরী করতে পরিশ্রম করেন। উপযুক্ত শিক্ষার্থী পেলে নিম্মলেও পরিশ্রম করবেন না—একথা বিশ্বাস করতে পারি না। অহীন্দ্র চৌধুরী আজ পর্যন্ত নূতনকে তৈরী করতে যে অমানুষিক পরিশ্রম করেন—তা নাট্য-জগৎ সংশ্লিষ্ট কোন শিল্পীর জানতে বাকী নেই। কিন্তু কৈ? তবু শিল্পী তৈরী হচ্ছে কোথায়? নাট্য-জগতে শিক্ষার চেয়ে বেশী অভাব প্রতিভার, এবং প্রতিকার চেয়ে আরও বেশী অভাব নিষ্ঠার। অনেকে মঞ্চে আসেন আকাশ জোড়া আমিত্বের দম্ভ বা ego নিয়ে : দূতের স্তর থেকেই উল্লম্ফনে রাজ-সিংহা- সনে উঠে বসতে চাইবেন। রাজার আকস্মিক অনুপস্থিতিতে দৈবক্রমে এক রাত্রের জন্যও তাঁকে যদি সিংহাসনে বসান হয়—চিরজীবনের মত তিনি কায়েমী সম্রাটত্ব দাবী করবেন। আর কোন দিন দৌত্য- ক্রিয়া তাে করবেনই না, এমন কি সেনাপতির পদে বরণ করলেও হয় তো কাৰ্যে ইস্তফা দিয়ে চলে যাবেন।•••বিগত দুই তিন বৎসর মঞ্চে ও নেপথ্যে ১৪৯ যাবত মাঝে মাঝে আর এক শ্রেণীর শিল্পী মঞ্চে দেখা নিচ্ছেন। ‘ঠাদের সংস্কৃতি, সৌজন্য সকলকে অভিভূত করে। Vanity বা দম্ভ বলে কোনাে পদার্থ আমি তাদের মধ্যে দেখতে পাইনি। তাদের সম্বন্ধে অনেক আশা পােষণ করেছি এবং হয়তাে এখনও করি। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে সংশয় জাগে -ঠারা সকলে মঞ্চকে অন্তরের সঙ্গে ভালবাসেন না মঞ্চের প্রতি অপরিসীম আকর্ষণ বােধ তাদের মঞ্চ-লােকে আসবার হেতু নয়। নাটমঞ্চে দাড়িয়ে জনসমাদর লাভ করে--প্রতিষ্ঠা অর্জন করে—তারা ছুটে যেতে চান চিত্ররাজ্যে। ছায়া-কুঞ্জের দ্রাক্ষাগুচ্ছ নাগালের বাইরে ; তাই মঞ্চকে ব্যবহার করেন তারা ‘ই’-এর মত। মই-এর সাহায্যে ওপরে উঠে, দ্রাক্ষা- লতা অবলম্বন করে তারপর মই ছেড়ে দিলে—জানি না। শেষ পর্যন্ত তারা কত মধু আস্বাদন করতে পারবেন। তবে, সে সব সত্যি- কারের রস গ্রাহী মঞ্চকে অবলম্বন করে আজ ও দাড়িয়ে আছেন-ছায়া- কুঞ্জের দ্রাক্ষালতা তাদের কাছে কিন্তু আপনি নইয়ে পড়ে তার প্রমাণ বিরল নয়।•••আর এক শ্রেণীর শিল্পীর কথা ভাবতে দুঃখ অনেক উদ্যম, অনেক আশা নিয়ে তঁার মঞ্চের সেবা করতে আসেন। অতর্কিতে কোথা হতে এসে জোটে “শুভাগী” গুণমুগ্ধের” দল। তঁারা দয়া করে শিল্পীকে আত্মশক্তিতে অসম্ভব রকম সচেতন করে তোলেন। শিল্পী অমনি আবিষ্কার করেন, মঞ্চ তঁাকে ধারণ করে নি...তিনিই মঞ্চকে ধারণ করে রয়েছেন। আলাের চেয়ে ছায়াকে তখন দীর্ঘতর বােধ হয় ; ধ্বনির চেয়ে প্রতি ধ্বনিকে অনেক বড় বলে মনে হয়। কিন্তু আলো না বললে ছায়া ফেলবে কে ? ধ্বনি না জাগলে প্রতিধ্বনি জাগবে কোথা হতে? এই সহজ সত্যটি বােঝাতে শিল্পীর আশে পাশে একটা শুভার্থী বা একটা বন্ধুকেও খুজে পাওয়া যায় না।
মঞ্চে ও নেপথ্যে নাট্যমন্দিরে নাট্য-বেদজ্ঞ পূজারীর অভাব তত পাপ আনে নি- যত পাপ এনেছে—নিষ্ঠাহীন পূজারীর দল। দেবতাকে ব্যঙ্গ করার চেয়ে দেবতার পুজা বন্ধ রাখা অনেক কল্যাণকর। নিষ্প্রদীপ মন্দিরেও হয়তাে দেবতা যুগ যুগ প্রতীক্ষায় বসে বসে থাকবেন—কবে নিষ্ঠাবতী পূজারিণী আসবে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালাতে, কবে আসবে নিষ্ঠাবান তরুণ পুরােহিত পুষ্পচন্দনে দেবার্চনা করতে। রঙ্গনাথের মন্দিরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে—সামনে চলু-তারকা-লুপ্ত আঁধার রাত । এ রাতে কেউ অশ্রদ্ধা নিয়ে, স্বার্থলুব্ধ অশুচি মন নিয়ে এ মন্দিরের পথে পা বাড়িও না। নটরাজের তৃতীয় নেত্র নিমিলিত রয়েছে••• তাকে নিমিলিত থাকতে দাও। পূজারী আসুক,—পূজারিণী আসুক-ভোলা-দেবতা আমাদের সব অপরাধ ভুলে যাবেন তাদের পূজায়। প্রীতি-প্রসন্ন নটরাজের নয়নজ্যোতি সে দিন রাত্রিশেযে নব প্রভাতের সূচনা করবে। আমরা সেই দিনের প্রতীক্ষা করব ; নটরাজের নব পূজারীর আশা-পথ চেয়ে বলব—স্বাগতম—স্বাগতম্।
ale-Fatamani নাটক ও নাটমঞ্চ সম্বন্ধে যারা আরো বেশী করে জানতে চান এই বইগুলি তাদের কাজে লাগবে : Inside the Moscow Art Theatre-O. M. Sayler The Truth About Voice-Prof, E. Feuchtinger The English Stage-M. Augustin Filon Dramatic Opinions and Essays-G. Bernard Shaw Study and Stage-William Archer About the Theatre - William Archer Studies in Stagecraft-Clayton Hamilton Revolt in the Arts--O. M. Sayler Towards a New Theatre-E. Gordon Craig Scene-Edward Gordon Craig The British and American Drama of Today- Barrett H. Clark The Theatrical World-William Archer XXth Century Stage Decoration- W. R. Fuerst & S. J. Hume The Art of the Theatre-C. Coquelin Practical Stage Craft for Amateurs-J. B. Thomas The Art of Make-up--George W. Luft & Co. The English Stage of Today-Mario Borsa Plays, Acting, and Music-Arthur Symons The Continental Drama of Today-B. H. Clark Play Writing-W. Archer On the Art of the Theatre-E. G. Craig
মঞ্চে ও নেপথ্যে
A Complete History of the Stage-Charles Dibdin
The Development of Dramatic Art-D. C. Stuart
Players and Playwrights I Have Known-J. Coleman
The New Spirit in Drama and Art-H. Carter
Play-house Impressions-A. B. Walkley
Dramatic Technique--Baker
Acting of the Drama-B. Mathews
How to Produce Amateur plays-B. H. Clark
Play Production for every one-Monica Ewer
Stage Lighting for "Little" Theatres-C. Hardi Ridge
Problem of the Actor -Louis Calvert
The Art of Makeup-Helen Chambers
My Life in Art-C. Stanislavasky
Modern Theatre-Irving Pichal
Drama and Mankind-Halcott Golven
The People's Theatre-Romain Rolland
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.