Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Nabik-badhu Ed.1

Roy,dinendra Kumar · 2010/04/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পঞ্চম; ১৩২৪
শ্রীদীনেন্দ্রকুমার রায়-সম্পাদিত
হস্য-লহনী”
উপন্যাস-মালার পঞ্চবিংশ উপন্যাস
নাবিক-বধু
[ প্রথম সংস্করণ
“মানসী প্রেম
১৪এ, বামতনু বৰ লেন, কলিকাতা
শীতলচৰ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
এই খণ্ডের পূর্ণ অন্য এক টাকা চাদি ।

No text on this page.

উৎসর্গ
যাহার কণা, উদারতা ও সহানুভূতি
জীবনে ভুলিবার নহে,
প্রথম যৌবনে যাহার সাহচর্য লাতে
যে আনর্বচনীম আনন্দ লাভ কবিয়াছি
সেই সুখময় স্মৃতির নিদর্শনস্বরূপ
এই গ্রন্থ
বঙ্গসাহিত্যের হিতৈষী বান্ধব,
সেই
উদারচেতা, বংশালত
মহিষাদলাধিপতি
শ্ৰীযুক্ত রাজা সতীপ্রসাদ গর্গ বাহাদুরের
করকমলে
এত্ত হইল।

No text on this page.

নিবেদন ‘রহস্য-লহরী' উপন্যাসমালার পঞ্চবিংশতি উপন্যাস ‘নাবিক-বধু প্রকাশিত হইল। এই উপন্যাসখানি প্রকাশে অন্যায় বিলম্ব হওয়ায় আমরা ‘রহস্য-লহরী সদাশয় গ্রাহক ও পাঠক মহােদয়গণের নিকট অত্যন্ত অপরাধী হইয়াছি, এ এই ত্রুটির জন্য কৃতাঞ্জলিপুটে তাহাদের নিকট মার্জনা ভিক্ষা করিতেছি। যথা- সময়ে উপযুক্ত পরিমাণ কাগজ সংগ্রহে অসামর্থ্য এই বিলম্বে একটি কারণ হইলেও, ইহার প্রধান কারণ—নানা প্রকার ব্যয়ভারে এপীড়িত হওয়ায় আমাদিগকে অত্যন্ত বিপন্ন হইতে হইয়াছিল। আমরা এখনও এই বিপ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারি নাই , সুতর নানা ঝাটে বিব্রত হইয়াও আমরা যে রহস্য-লহী’র বর্তমান থও প্রকাশে সমর্থ হইলাম, ইহাই আমাদের পরম সৌভাগ্য মনে করিতেছি। এবার মহাপূজা উপলক্ষে ‘রহস্য-লহরী’র যে খণ্ড প্রকাশিত হইবে, তাহাতে কোন বৈদেশিক আখ্যায়িকা থাকিবে না। বাঙ্গালীর এই জাতীয় মহােৎসবকালে আমাদের পল্লী-জীবনের সুখদুঃখের ও হর্ষ-বিষাদের কতকগুলি চিত্ৰই এই গ্রন্থে প্রতিপাদ্য বিষয় হইবে। অজ্ঞাত ও উপেক্ষিত পল্লীজীবনের এই সকল মৰ্ম্মস্পর্শী মৌলিক কাহিনী,বঙ্গসাহিত্যে সংরক্ষিত হইবার যােগ্য, শিক্ষিত বঙ্গবাসিগণের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদের সম্ভাবনা নাই , সে সম্ভাবনা থাকিলে ‘পল্লীচিত্র ও ‘পল্লীবৈচিত্র্য বঙ্গীয় পাঠক সমাজে আশাতীত সার লাভে সমর্থ । হইত না। যাহারা পল্লী-সমাজের মেরুদণ্ড, তাহাদের দৈনন্দিন জীবনের আলেখ্য পল্লী-কথায় প্রকাশিত হইতেছে বটে, কিন্তু যদি এই আলেখ্যাঙ্কণে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়,তবে তাহা আমাদেৱই অঙ্কণ নৈপুণ্যের অভাববশতঃ ইয়াছে, ইহাই মনে করিতে হইবে। তথাপি আমাদের সুখ-দুঃখের ও হর্ষ-বিবাদের চিত্র আমাদেরই ঘরের জিনিস , সুতরাং আশা করি সহস্র অসম্পূর্ণতা সত্বেও তাহা মহাপূজার আনন্দ-অবসরে স্বদেশীয় পাঠক সমাজের সহানুভূতি ও করুণায় বঞ্চিত হইবে না। পল্লী-কথা’কে আমরা রহস্য-লহরী উপন্যাস-মালার অন্তর্ভুক্ত বরিয়া ইহার নামের অপপ্রয়ােগ করিতে ইচ্ছুক নহি , কারণ পল্লী-কথা বাঙ্গালীর পীজীবনের আখ্যায়িকা মাত্র, তাহা বৈদেশিক সমাজের বিভিন্ন স্তরের নানা লােমাঞ্চকর রহস্যজালে সমাচ্ছন্ন নহে। পরের কথা যদি পাঠক- সমাজে সমাদৃত হয়,তাহা হইলে আমাদের ঘরের কথা—আমাদেরই তুচ্ছ জীবনের কথা বলিয়া প্রত্যাখ্যাত হইবার কোনও কারণ দেখা যায় না। নিজেদের সুখ দুঃখ-বিডিত দৈনন্দিন ঘটনার সুতি কাহার-ন্য আদরণীয়?

নাবিক-বধু প্রথম পরিচ্ছেদ আফ্রিকার কেপ টাউনের ‘গবমেন্ট-হাউসে সেদিন বল-নাচের ধূম পডিয়াছিল। এই নৃত্যোৎসবে কেপ, কলােনিৰ বহু সম্রান্ত রাজকর্মচারী যােগদান করিয়াছিলেন , মহিলাবর্গ প্রজাপতির ন্যায় বেশভূষায় মজলিসের শশাভাবর্ধন করিতেছিলেন। মজলিসে আনন্দের স্রোত বহিতেছিল। সেই সান্ধ্য মজলিসে যে সকল ইংরাজ-যুবক উপস্থিত ছিলেন, তাহাদের মধ্যে ফিলিপ ডড়লে সর্বাপেক্ষা অধিক সুপুরুষ , বিশেষতঃ রমণীর মনােরঞ্জনে তাহার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এই যুবক নৌ-সেনাপতি এডমিরাল রেড় ফর্ণের অধীনে লেফটেনান্টের পদে নিযুক্ত ছিলেন। নিমন্ত্রিত নরনারীগণ লাট-প্রাসাদে সমাগত হইলে লাট সাহেব আগন্তুক- গণের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া এডমিরাল রেড়ফকে বলিলেন, “আজ যাহারা এখানে আমােদ-প্রমােদে যােগদান করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে একটি ছােকর চেহারা আমার বড় ভাল লাগিতেছে , উহারই নাম বুঝি ফিলিপ ডড়লে ? তোমার অধীনে ছােরা লেফটেনান্টগিরি করে না?” এডমিরাল রেডফর্ণ বলিলেন, “হা মহাশয়, উহারই নাম ফিলিপ উভলে। ছেলেটির যেমন রূপ, সেইরূপ গুণ। কালে ও একজন ভাল যােদ্ধা হইবে উন্নতিও করিবে। আপনি বুঝি উহার পরিচয় জানেন না ? কাপ্টেন জ্যা উলেকে আপনার মনে পড়ে ?—তাহার সহিত আপনার আলাপ ছিল।”

২ } F নাবিক-বন্ধু লাট সাহেব বলিলেন, “ভারতে সে কাপ্তেনী করিত? '৭১ অব্দে সেকন্দরা- বাদ নগর হইতে সে লর্ড বেলামীর মেয়েটিকে ফুলাইয়া বাহির করিয়া লইয়া গিয়াছিল না? আহা, বেচারা তেল-এ-কেবিরের যুদ্ধে মারা পড়িয়াছিল— একথা বেশ মনে আছে।” এডমিরাল রেডফর্ণ সােৎসাহে বলিলেন, “হা, ঠিক বটে , এ তাহারই পুত্র। লাট সাহেব বলিলেন, “বটে। বল কি ? হ, উভয়ের চেহারায় যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে বটে। উহার পিতা তাহার সমসাময়িক যােদ্ধগণের মধ্যে অত্যন্ত সাহসী বীরপুরুষ ছিল। বেচারার দুভাগ্যের কথা মনে হইলে দুঃখ হয়। ডড়লের কথা আমার বেশ মনে আছে। রেডফণ, ছেলেটিকে দেখিয়া আমার বড় মমতা হইয়াছে , উহার সহিত একটু আলাপ করিতে ইচ্ছ। হইতেছে।” এডমিরাল রেড ফর্ণ বলিলেন, “তবে ত তাহার বেশ সুযােগ উপস্থিত। বিলম্ব করিলে উহার সহিত সাক্ষাতের সম্ভাবনা অল্প, কারণ উহাকে অতি অল্প দিনের মধ্যেই সমুদ্রযাত্রা করিতে হইবে। লাট সাহেব বলিলেন, “তাহা হইলে আজই উহাকে আমার সহিত দেখা করিতে বলিব , উহার পিতার খাতিরে আমি উহার সহিত আলাপ কবিয়' উহাকে সম্মানিত করিব।” অনন্তর লাট সাহেব তাহার একজন এডিকংকে ডাকিয়া নিম্নস্বাব তাহাকে কি আদেশ করিলেন। তখন এক দফা নাচ শেষ হইয়াছিল। যে সকল যুবক-যুবতী দীর্ঘকাল নৃত্য করিয়া পরিশ্রান্ত হইয়াছিলেন, তাহারা গল্পগুজব ও বিশ্রাম করিবার জন্য বারান্দার দিকে যাইতেছিলেন।তাহাদের বিশ্রামের জন্য সেখানে আসনশ্রেণী নির্দিষ্ট ছিল। কয়েক মিনিট পরে পূর্বোক্ত এডিকং ডলেকে সঙ্গে লইয়া লাট সাহেবের নিকট উপস্থিত হইল। লাট সাহেব ডড লেকে দেখিয়া তাহার করমর্দন করিয়া সদয়ভাবে প্রথম পরিচ্ছেদ বলিলেন, “কি কে ছােরা। তুমি আছ কেমন ? আমি এইমাত্র এডমিরালের নিকট শুনিলাম তুমি আমার প্রিয় বন্ধু জ্যাক উড়লের ছেলে। তােমার চেহারা অনেকটা তােমার পিতার চেহারার মতই, তথাপি যে আমি তােমাকে পৃঝে চিনিতে পারি নাই, ইহাই আশ্চৰ্য্য । নৌ বিভাগের কাৰ্য্যে তােমার উন্নতি দেখিলে আমি বড়ই সুখী হইব , তুমি আমাকে তােমার মুরুব্বি বলিয়া মনে করিও। সে কথা যাক-তােমার মা ভাল আছেন ত ? ডডলে সবিষাদে বলিলেন, “না মহাশয়, আমার মাতার মৃত্যু হইয়াছে গত বৎসর শীতকালে কয়েক দিনের অসুখে তিনি মারা গিয়াছেন।” লাট সাহেব সহানুভূতিভরে বলিলেন, “কি দুঃখের কথা। আমি না জানিয়া তােমার মনে কষ্ট দিয়াছি, এজন্য কিছু মনে করিও না। অল্প বয়সে তুমি পিতামাতা উভয়কেই হারাইয়াছ। তােমার পিতা তােমার মাতার বড় গগৗরব করিতেন। যে নাচের মজলিসে তােমার মাতার সহিত তােমার পিতার প্রথম পরিচয়, আমি সেই মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তােমার মা বড়ই সুন্দরী ছিলেন , নৃত্যেও তাহার অসাধারণ পারদর্শিতা ছিল। ডডকে স্থায় প্রেমিক পুরুষ যে তার প্রেমে পডিয়াছিলেন, ইহাতে বিস্ময়ের কোন কারণ ছিল না। যাহা হউক, আমি আর দীর্ঘকাল তােমাকে আটকাইয়া রাখিব না। তুমি সময় পাইলেই মধ্যে মধ্য আসিয়া আমার সহিত দেখা করিবে। দু’জনে গল্প করিব। আবার নাচ আরম্ভের সময় হইয়াছে, এখন তুমি তােমার সঙ্গিনীর নিকট যাও , কিন্তু যাহার সহিত নাচ করিবে, তাহাকে হয়রাণ করিয়া মারিও না, স্মরণ রাখিও যুবতীদের হৃদয় তােমাদের যুদ্ধ জাহাজের মত দুভেচ্ছা নয় , আর যদি তাহা একবার ভাঙ্গিয়া যায়, তাহা হইলে তাহা মেরামতের জন্য ডকেও পাঠান যায় না।” লাট সাহেবের এই রসিকতায় যুবক বড কৌতুক বােধ করিলেন, কিন্তু ষ্টাচারের অনুরােধে তাহাকে স্য সংবরণ করিয়া লাট সাহেবের নিকট ায় লইতে হইল। তিনি লাট সাহেবকে অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিবেন, এমন সময় তাহার উপর ওয়াল এডমিরাল তাহার স্কন্ধে হস্তস্থাপন B নাবিক-বধূ করিয়া বলিলেন, “উড়লে, আমি তােমার আমােদ-প্রমােদে বাধা দিতে চাহি না, কিন্তু নাচের পর যদি তুমি সময় পাও,-তাহা হইলে একবার আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবে। তােমাকে এমন একটি খবর দিব—যাহা শুনিয়া তােমার আনন্দের সীমা থাকিবে না।” ডউলে বলিলেন, “আপনার আদেশ শিরােধার্য। আপনি যখন বলিবেন —সেই মুহূর্তেই সাক্ষাৎ কৰিব। এডমিরাল বলিলেন, “না, না, তােমার অত ব্যস্ত হইবার আবশ্যক নাই। সে কথা এখনই বলিতে হইবে—এরূপ মনে করি না , বিলম্বে বলিলেন কোন ক্ষতি নাই। এখন তুমি যাইতে পার , তােমার সুবিধা অনুসারে এক সময় আমার সহিত দেখা করিলেই চলিবে।” উড়লে প্রস্থান করিলেন, কিন্তু এডমিরাল কি সুসংবাদ দিবেন, তাহা বুঝিতে না পারিয়া তাহার মন কিঞ্চিৎ চঞ্চল হইল। যাহা হউক, তিনি মানসিক চাঞ্চল্য গােপন করিয়া বারান্দায় আসিলেন, এবং যে যুবতীর সহিত তাহার নাচিবার কথা, তাঁহাকে খুজিতে লাগিলেন। হঠাৎ কে একজন পশ্চাৎ দিক হইতে আসিয়া তাহার স্কন্ধে হস্থাপন করিলেন। উড়লে সবিস্ময়ে মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন, আগন্তুক তাহারই একটি বন্ধু,-- একজন টর্পেডো লেফটেনান্ট। আগন্তুক উড়লেকে সহাস্যে বলিলেন, “ব্যাপার কি হে ছােকরা।—অল্পক্ষণ পূর্বে তুমি দেবতাদের দলে মিশিয়া তাদের সহিত সমকক্ষের মত গল্পগুজব করিতেছিলে, দেখিয়া প্রথমটা ত আমার চক্ষুকে বিশ্বাস করিতেই পারি নাই । যাহাশমাদিগকে কীট- পতঙ্গের মত দেখে, তাহাদের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠতা, আলাপ আপাত ! তােমার সৌভাগ্য ত কম নয়, দেখিয়া আমাদের মত আদার ব্যাপারীর হিংসা'হয়। কিন্তু ভাই, সত্য কথা বলিতে কি-ঐ যে লাট বেলাটগুলো, উহার সােজ। চিজ, নয় , ও সকল কুসসর্গে নামেশাই ভাল। লাট সাহেব কি মংলৰ তােমায় ডাকিয়াছিল বল ত।" ভন্ডলে হাসিয়া বলিলেন, “টর্পেডাে লেফটেন্টের পদটি এবালি করা , প্রথম পরিচ্ছেদ ৪ উচিত কি না সেই কথা জিজ্ঞাসা করিতে ডাকিয়াছিলেন। বড় কর্তার বিশ্বাস-ঐ পদটি না থাকিলেও নৌ-যুদ্ধে জয়লাভের ব্যাঘাত ঘটিবে না।” টর্পেডে লেফটেনান্ট বলিলেন, “আমার পদের কোনও মূল্য আছে কি না তা সুযােগ পাইলে এক সময় তােমাকে বুঝাইয়া দিব। সমুদ্রের মধ্যে তােমাকে একবার পাইলে হয় , ডাঙ্গায় বসিয়া আমার পদের মহিমা তুমি বুঝিতে পারিবে না, বিশেষতঃ শান্তির সময়। সে কথা থাক, এটর্ণি- (জনারেলের হাত ধরিয়া পরীর মত সুন্দরী যে মেয়েটি আসিতেছে—উহাকে চেন কি ? কেপ টাউনের সকল সুন্দৰীকেই ত আমি চিনি, কিন্তু উহাকে । চিনিতে পারিতেছি না। পূর্বে কোন দিন উহাকে দেখিয়াছি বলিয়া মনে হইতেছে না। কি সুন্দর মুখখানি, কি চমৎকার অঙ্গসৌষ্ঠব। এরূপ সুন্দরী আজিকার এই মজলিসে আর একটিও নাই , উহার সহিত পরিচয় করিতে ইচ্ছা হইতেছে।” টর্পেডাে লেফটেনান্ট ডড লেকে ছাডিয়া আলােকরশ্মি কর্তৃক আকৃষ্ট পতঙ্গের ন্যায় সেই যুবতীর দিকে অগ্রসর হইলেন। যুবতীও ধীরে ধীরে ডলের দিকে আসিতে লাগিলেন। ডড়লে বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। সত্যই এমন অপরূপ রূপ তিনি জীবনে কখন দেখেন নাই। সেই দুর্লভ রূপরাশি দেখিয়া দেখিয়া তাহাব–“নয়ন না রিপিত তেল।” কিন্তু অধিকাল সেই যুবতীর দিকে একদৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিলে পাছে রূঢ়তা প্রকাশিত হয়, এই ভয়ে ভড়লে চক্ষু ফিরাইয়া লইয়া, যাহার সহিত তাঁহার নাচিবার কথা--তাহারই সন্ধানে চলিলেন। ইতিমধ্যে সেই সুবীর সঙ্গী এটর্নি জেনারেল ডড লেকে ডাকিয়া বলিলেন, “ডডলে, একটা কথা শুনিয়া যাও , কিন্তু সর্বাগ্রে তােমাকে আমার সঙ্গিনীর সহিত পরিচিত -ার। ইনি মিস্ এসাইন। মিস্ এরাইন, লেফটেনান্ট ডডলে আধুনিক নূতন নূতন ফ্যাসানের নৃত্যে অসাধারণ পারদর্শী, বিশেষতঃ প্রেমের অভিনয় নাবিক-বধূ ইহার মত সুযােগ্য ও সুরসিক অভিনেতা নৌ-কৰ্ম্মচারিগণের মধ্যে আর কেহ আছেন কি না তাহা জানি না।” এইরূপে মিস্ এরাইনের সহিত লেফটেনান্ট ডডলের প্রথম পরিচয় ইল।—এটর্ণি-জেনারেলের রসিকতায় ডড়লে যে বিশেষ দুঃখিত হইলেন এ কথা বলা যায় না, তবে তিনি একটু লজ্জিত হইলেন বটে। কিন্তু এই ভদ্র লােকটির রসিকতা একটু স্কুল হইলেও তিনি বউ সহৃদয় ও খােল। মেজাজের লােক—ইহা ডডলের অজ্ঞাত ছিল না, সুতরাং তাহার প্রগলভতায় তিনি বিরক্ত হইলেন না। ডডলে মিস্ এরাইনকে বলিলেন, “মিস্ এরাইন, আমার বােধ হয় আপনি এখন খুব ব্যস্ত। কিন্তু যদি আপনার বিশেষ অসুবিধা না হয়, তাহা হইলে আপনার সঙ্গে আমাকে একবার নাচিবার অনুমতি দান করিলে আমি কৃতার্থ হই।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “আমি এইমাত্র নাচের মজলিসে উপস্থিত হইয়াছি , এখন পর্যন্ত আর কেহ আমার সঙ্গে নাচিবার জন্য দরখাস্ত করে নাই, সুতরাং আপনার সঙ্গে নাচিয়া আপনাকে কৃতার্থ করিতে আমার আপত্তি নাই। কেপ টাউনে আমি তেমন পরিচিত নহি।” তৎক্ষণাৎ নাচের বন্দোবস্ত হইল। ডড লে মিস একাইনের কাড়ে নিজের নাম লিখিয়া বন্দোবস্তটি পাকা করিলেন , তাহার পর তিনি মিসের নিকট বিদায় লইলেন। ডডলে তৎপূর্বে যে মহিলাটির সহিত নাচিবার অঙ্গীকার আবদ্ধ হইয়া- ছিলেন, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হইলে তিনি তাহাকে মিস্ এরাইনের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। এই যুবতী মিস্ এরাইনকে চিনিতেন, তিনি বলিলেন, “এই যুবতীটির পিতা মাতা উভয়েরই মৃত্যু হইয়াছে, প্রায় ছয় মাস পূৰ্ব্বে সে ইংলণ্ড হইতে কেপ, কলােনিতে আসিয়াছে। তাহার পিতা গমেন্টে অঞ্চনে কন্টাক্টরের কার্য করিতেন। এই কার্যে তিনি ক্রমে লক্ষপাত , হইয়া উঠিয়াছিন। মিস্ এরাইন এদেশে আসিয়াই তাহার একটি সখীর প্রথম পরিচ্ছেদ সহিত দেখা করিতে উত্তরাঞ্চলে গিয়াছিল। সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া তাহার মামা ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের গৃহে বাস করিতেছে। এই মামা ভিন্ন সংসারে তাহার আপনার বলিতে আর কেহই নাই।—আপনি বােধ হয় ডাক্তার লাম্পিয়নকে জানেন ?” ডডলে বলিলেন, “তাহার সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানি না। একরাত্রে তিনি জাহাজের উপর আমার সহিত এক টেবিলে আহার করিয়াছিলেন ; এদেশে আসিয়াও তাহার সহিত আমার কয়েকবার সাক্ষাৎ হইয়াছে। যুবতী বলিলেন, “লােকটাকে বােধ হয় আপনার মনে ধরে নাই , সত্য কি না—ঠিক বলুন।” ডডলে বলিলেন, “তার সম্বন্ধে যখন বিশেষ কিছু জানি না, তখন তাহাকে মনে ধরিয়াছে কি না কি করিয়া বলি? তাহাকে অপছন্দ করিবার কি কোন কারণ আছে?” যুবতী বলিলেন, “এ আপনার মনের কথা নয়। দেখুন, আমি লোকের মনের কথা বলিয়া দিতে পারি।—আমার গণনা করিবার শক্তি আছে,আপনারও অদৃষ্ট-ফল গণিয়া বলিয়া দিতে পারি , আপনি কি তাহা জানিতে চাচ্ছেন? ডড়লে কৌতূহলভরে বলিলেন, “আপনি অদৃষ্টের ফলাফল বলিতে পারেন ?—আমার ভাগ্যে কি আছে তাহা জানিবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহ হইয়াছে। আপনি কি হাত দেখিয়া গণনা করেন? না, অন্য কোন উপায়ে ভাগ্যফল পরীক্ষা করেন ?” যুবতী বলিলেন, “আমি করতলের রেখা দেখিয়া অদৃষ্ট ফল-গণনা করি , আপনার হাত দেখি।” ডডলে যুবতীর সম্মুখে দক্ষিণ করতল প্রসারিত করিলেন । যুবতী মিনিট-দুই তাহার কররেখা পরীক্ষা করিয়া হাসিয়া বলিলেন, ‘আপনার বয়স অল্প, আর আপনি উচ্চাভিলাষী , দেশ ভ্রমণেও আপনার অত্যন্ত অনুরাগ। উড়লে হাসিয়া বলিলেন, “আপনি ত ভারি গণনা করলেন। ওকথা নাবিক-বন্ধু 'না গণিয়াই যে-সে বলিতে পারিত। আমার মুখ দেখিয়াই বলিতে পারা যায় আমার বয়স অল্প , আমি যে উচ্চাভিলাষী, তাহা আমার সামরিক পরিচ্ছদেই প্রকাশ। উচ্চাভিলাষ না থাকিলে কে নৌ-বিভাগে চাকরী করিতে যায় ? আর যারা এই চাকরী করে, তাহাদিগকে সমুদ্রে-সমুদ্রে ঘুরিয়া বেড়াইতে হয় ইহাই বা কে না জানে ?-না, আপনার গণনার সিদ্ধান্তে আমি সুখী হইতে পারিলাম না।” যুবতী বলিলেন, “কিন্তু আমার গণনা এখনও ত শেষ হয় নাই। দেখিতেছি ছদ্মবেশ ধারণে আপনার বেশ দক্ষতা আছে, কিন্তু এখনও আপনি সেই দক্ষতা প্রদর্শনের সুযােগ লাভ করেন নাই। আপনি সহজে নিরুৎসাহ হন না , আপনি যে কাৰ্যে হস্তক্ষেপণ করেন—তাহা শেষ না করিয়া ছাড়েন না।” ডলি বলিলেন, “আপনি অন্ধকারে ঢিল ছুডিলেন। এই দৈববাণীতে আপনার শক্তির কোন পরিচয় পাইলাম না। ভবিষ্যতে ঘটিবে—এমন বিশেষ কোন ঘটনার উল্লেখ করিতে পারেন ?” যুবতী আরও দুই মিনিট ডড়লের করতলে দৃষ্টি সংস্থাপিত করিয়া বলিলেন, “আপনি ইতিপূঝে কয়েকবার প্রেমে পড়িয়াছিলেন, কিন্তু ফাঁদে পা দেন নাই শক্ত জাল ছিডিয়া বাহিরে আসিয়াছেন। এখন আপনি বেশ নিচি আছেন , কিন্তু আপনার জীবনের গতি শীঘ্রই পরিবর্তিত হইবে। আপনি একটি দীর্ঘাকৃতি সুন্দরী যুবতীর প্রেমে পডিয়া হাবুডুবু খাইবেন। আপনার অবস্থা অত্যন্ত শশাচনীয় হইয়া উঠিবে, কিন্তু আপনি অশেষ মনােকষ্ট পাইলেও সেই যুবতীর প্রণয়লাভে সমর্থ হইবেন। প্রথম দর্শনের পর বিরহ, বিরহান্তে অদূরেই মিলন। তাহার পর প্রাণের আশঙ্কা , কিন্তু আপনি মরিবেন না। তবে পৃথিবীতে কেহই অমর নহে, আপনিও একদিন মরিবেন, কিন্তু খুব বড় লােক হইয়া অত্যন্ত ধূমধাম করিয়া মরিবেন। উড়লে বলিলেন, “আপনার শেষ গণনাটি শ্রুতিসুখকর বটে। যদি মরিতে হয় তবে বড়লােক হইয়া মরাই প্রার্থনীয়। কিন্তু তাহার 'পর ?—আপনার ৰিা বুঝি ঐ বৃন্ত। আর কিছু গণিতে পারেন না?”

প্রথম পরিচ্ছেদ যুবতী বলিলেন, “না, আমি আর কিছু বলিতে পারিব না। আপনার হাত দেখিয়া যাহা যাহা বলিবার ছিল, তাহা বলিয়াছি , এ বিদ্যায় আমার তেমন অধিক পারদর্শিতা নাই।” উড়লে বলিলেন, “আমার যে আরও গােটাকত কথা জানিবার ছিল। আপনি বলিলেন না—আমি যে যুবতীর প্রেমে পডিব—তিনি দীর্ঘাঙ্গী, সুন্দরী ? যুবতী বলিলেন, “আপনার করচিহ্ন দেখিয়া তাহাই বুঝিয়াছি।” উড়লে তাহার সঙ্গিনী যুবতীর এই দৈববাণী বিশ্বাস করিলেন কি না বলা যায় না, কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই তিনি এ সকল কথা বিস্মৃত হইলেন।-যথাসময়ে তিনি মিস্ এরকাইনের সহিত মহা উৎসাহে নৃত্য করিয়া তৃপ্তিলাভ করিলেন। নৃত্য-শেষে তাহারা পরিশ্রান্ত দেহে প্রাসাদ-বারান্দায় নব-নির্মিত একটি কৃত্রিম লতাকুঞ্জে বিশ্রাম করিতে চলিলেন। ডডলে মিস্ এরাইনকে বলিলেন, “আপনাকে ধন্যবাদ জানাইবার উপযুক্ত ভাষা আমার নাই , নাচিয়া এত আনন্দ আমি বহুকাল পাই নাই। আপনি বলিয়াছেন—কেপ, কলােনিতে আপনি অল্পদিন পূর্বে আসিয়াছেন। এদেশে কতদিন পূর্বে আসিয়াছেন জানিতে পারি কি ?” মিস্ এরাইন বলিলেন, “প্রায় ছয় মাস পূব্বে আসিয়াছি। আমি এখানে আমার মামা ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের বাঙ্গলােয় আছি।আপনি বােধ হয় তাহাকে চেনেন। উড়লে বলিলেন, “হ, দুই-একবার তাহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছে। চিকিৎসাবিদ্যায় হার বেশ সুনাম আছে শুনিয়াছি মিস এরাইন বলিলেন, “তিনি যে অসাধারণ বুদ্ধিমান—এ বিষয়ে সন্দেহ নাই , তিনি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। রাজনীতিতেও তঁাহার গভীর জ্ঞান। কালে তিনি পালিয়ামেন্টে প্রবেশের চেষ্টা করিবেন—এরূপ আশা করেন।–মিঃ ডড়লে, আপনি বােধ হয় উচ্চাভিলাষী ?” ডড়লে সবিস্ময় বলিলেন, “একথা কেন জিজ্ঞাসা করিতেছেন। আজ আর একজন আমাকে ঠিক এই কথাই বলিতেছিলেন। L নাবিক-বধু মি একাইন বলিলেন, “কথাটা নিশ্চয়ই মিথ্যা নহে , আপনার মুখ দেখিয়াই বুঝিয়াছি আপনি উচ্চাভিলাষী। উচ্চাভিলাষ থাকা ভাল। যে সকল যুবক কাৰ্য্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া উচ্চাভিলাষী না হয়, তাহারা তেমন উন্নতি করিতে পারে না। ভবিষ্যৎ-জীবনে খ্যাতিও লাভ করিতে পারে না। জীবন-সংগ্রামে জয়লাভ করা সামান্য সাধনার ফল নহে।-সেই গৌরব অর্জন করিতে পারা পরম শ্লাঘার কথা। উড়লে বলিলেন, “মিস্ এরাইন, আমি জীবন-সংগ্রামে জয়লাভ কৰি আপনি কি ইহা ইচ্ছা করেন ? কথাটা আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হয় ত অশােভন হইল , কিন্তু আমার বিশ্বাস, আপনার নিকট অনুকূল উত্তর পাইলে আমার সৌভাগ্যোদয় হইবে।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “হাঁ, আপনার জীবনের ব্রত সফল হউক, ইহাই আমার আন্তরিক ইচ্ছা। আমার বিশ্বাস-জীবনের যুদ্ধে আপনি জয়লাভ করিবেন। আপনার সম্মুখে বিশাল কাৰ্য্যক্ষেত্র উন্মুক্ত, অগ্রসর হউন, আপনার আশা পূর্ণ হইবে। কিন্তু ঐ শুনুন গান আরম্ভ হইয়াছে, এইবার আমার নাচের পাল, চলুন ‘ব-রুমে যাই।” উভয়ে বলরুমে প্রবেশ করিলে আবার কিছুকাল নৃত্য চলিল। মিস এরাইন অন্য একটি যুবকের সহিত নাচিলেন। এবার যাহার সহিত ডডলের নাচিবার কথা ছিল, নাচিতে-নাচিতে মণ মেঝের উপর পডিয়া তাহার পায়ে বড় আঘাত লাগিয়াছিল, এজন্য তিনি নৃত্যে যােগ দিতে পারিলেন না, ভড়লে এডমিলের সহিত আলাপ করিতে চলিলেন। এডমিরাল তখন মঞ্চের উপর বসিয়া লাট-পত্নীর সহিত গল্প করিতেছিলেন , ডলকে দেখিয়া এডমিরাল লাট-পত্নীর নিকট বিদায় লইয়া উঠিলেন, এবং ডড়লের সম্মুখে আসিয়া বলিলেন, “ডডলে, তােমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে, চল একটু নিরিবিলি যায়গায় গিয়া বসি। আমার কথা শেষ করিতে বেশী সময় লাগিবে না, সেজন্য তুমি চিন্তিত হইও না।” উভয়ে একটি নির্জন স্থানে আসিয়া বসিল এডমিরাল বলিলেন, “কথাটা প্রথম পরিচ্ছেদ ১১ আজ তােমাকে বলিবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু লাট সাহেব তােমার পিতার পরম বন্ধু, তিনি আমাকে বলিলেন, কথাটা আজই তােমাকে বলা ভাল। আমি তােমার উপর একটি গুরুতর কাৰ্য্যের ভার দিতে চাই , কিন্তু তুমি সে ভার গ্রহণ করিতে সম্মত কি না, সর্বাগ্রে তাহা জানা আবশ্যক।” উড়লে বলিলেন, “আপনার অধীনে এত সুদক্ষ কর্মচারী থাকিতে আমার উপর আপনি কোনও গুরুতর কার্যের ভার দিতে ইচ্ছুক হইয়াছেন। আমার পক্ষে ইহা পরম সৌভাগ্যের কথা।কিন্তু আমি সেই ভার গ্রহণের যােগ্য কি না তাহা ত জানি না।” এডমিরাল বলিলেন, “তােমার যােগ্যতায় আমার সন্দেহ নাই , আমি অযােগা পাত্রে কোনও ভার অর্পণ করি না। আমি তােমার বুদ্ধি-বিবেচনা ও শক্তি-সামর্থ্যের যথেষ্ট পরিচয় পাইয়াছি , তােমার কাৰ্যের উপরেও আমার তী দৃষ্টি আছে। এখন আমার কথা মন দিয়া শােন। আমার বিশ্বাস, যে কার্যে যথেষ্ট বিপদের সম্ভাবনা,—সেরূপ কার্যের ভার লইতে তােমার অত্যন্ত আনন্দ হয়। তােমার উপর আমি এইরূপ একটি কাৰ্যের ভার দিব। তুমি এদেশে অনেক দিন আছ—সুতরাং আমেদ বেন-সেনের নাম বােধ হয় তােমার অজ্ঞাত নহে।” উড়লে বলিলেন, “সে নিয়াস হ্রদের তীরবর্তী স্থানসমূহে ক্রীতদাসের ব্যবসায় করে না? আমরা ত তাহাকে বহুদিন হইতে ধরিবার চেষ্টা করিতেছি। তাহার নাম কে না জানে ?” এডমিরাল বলিলেন, “উত্তম কথা।—তাহা হইলে তুমি বােধ হয় এ কথা ও জান যে, আফ্রিকা দেশে তাহার ন্যায় দুব্বত্ত নরপশু দ্বিতীয় নাই। চাতুর্যে ও ফনী-ফিকিরে সে আমাদিগকে বহুবার পরাস্ত করিয়াছে। আজ সংবাদ পাইয়াছি, সে সায়ার নদী দিয়া এক চালান রাইফে লইয়া যাইবে। প্রথমে সে তাহা জাহাজ হইতে কিম্যানে নামাইয়া লইবার মনস্থ করিয়াছিল , কিন্তু সে সংবাদ পাইয়াছে—পটুগীজরা ইহাতে আপত্তি করিবে। এইজন্তসে কমােরো দ্বীপের অদূরে স্বয়ং উপস্থিত হইয়া গুলি-বারুদ' বন্দুক প্রভৃতি * ১২ নাবিক-বধু যাইবে। তাহার নিজের বোটে তুলিয়া লইবে, এবং গােপনে নিয়া দে লইয়া যে জাহাজে ঐ সকল মাল আসিতেছে—সেই জাহাজখানি আটক করিয়া তাহা খানা-তল্লাস করিতে পারিতাম,কিন্তু তাহা যে উহাই মাল, ইহার কোনও অকাট্য প্রমাণ পাই নাই বলিয়া জাহাজখানি আটক করা সঙ্গত মনে করি নাই। এই মাল গুলি কথন আমেদের বেটে নামাইয়া দেওয়া হয়, তৎপ্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে , পরে সেই বােট আমেদ কর্তৃক পরিচালিত হইতে দেখিলেই তাহা দখল করিতে হইবে। কিন্তু এদেশের কোনও লােকের উপর এই কার্যের ভার দেওয়া যায় না, সুতরাং আমার সৈন্যদল হইতেই যােগ্য লোেক প্রেরণ করা আবশ্যক। আমি জানি, তুমি ছদ্মবেশধারণে অসাধারণ দক্ষ, এতদ্ভিন্ন তুমি খাটী আরবের মতই আরব। কথা বলিতে পার, এইজন্য এ আর আমি তােমার উপরেই দিতে চাই । তুমি কার্যোদ্ধার করিতে করিতে পারিবে—এটুকু আমার বিশ্বাস আছে। যদি আমার যৌবন থাকিত, তাহা হইলে আমি স্বয়ণ সানন্দে এই কাৰ্যতা গ্রহণ করিতাম।” উড়লে বলিলেন, “আমি আনন্দের সহিত এই ভার গ্রহণে সম্মত আছি , আপনি এইভাবে আমাকে সম্মানিত করিলেন, এজন্য আমি আপনার নিকট আন্তরিক কৃতজ্ঞ রহিলাম। এরূপ বিপদের কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইতে আমার বড়ই আনন্দ। আমি কার্যোদ্ধারের জন্য চেষ্টা-যত্বের ত্রুটি করিব না , কৃতকার্য হইতে পারিব কি না বলিতে পারি না।” এডমিরাল বলিলেন, “সেজন্য তুমি চিন্তিত হইও না, তবে কাটা কঠিন বটে। কতবার সেই দুৰ্বত্তকে ধরি-ধরি করিয়াও ধরিতে পারি নাই , আশা করি এবার আর সে পলাইতে পারিবে না। তাহাকে ধরিবার জন্য সাবু বা অসাধু কোন উপায়ই উপেক্ষা করিলে চলিবে না। আমেদ যদি হ্রদ সন্নিহিত প্রদেশে গুলি-বারুদ বন্দুক প্রভৃতি লইয়া যাইতে সমর্থ হয়—তাহা হইলে আমাদের সেখানে স্বার্থরক্ষা করা কঠিন হইবে , গত পাঁচ বৎসর কাল অমর। খােনে যে কিছু কার্য করিয়াছি, সমস্তই পণ্ড হইবে। হবে প্রথম পরিচ্ছেদ উড়লে বলিলেন, “আমাকে কালই যাত্রা করিতে হইবে ?” এডমিরাল বলিলেন, “আগামী শনিবারের মধ্যে রওনা হওয়াই চাই , মধ্যে এখনও তিন দিন আছে। তুমি এ ভার লইতে রাজী আছ ত ? তুমি মনে করিও না-আমি তােমাকে এই কার্যে বাধ্য করিতেছি। ইচ্ছা কৰিলে তুমি ইহা প্রত্যাখ্যান করিতেও পার। তুমি এ ভার গ্রহণ না করিলে আমি বিন্দুমাত্র দুঃখিত হইব না।” উড়লে বলিলেন, “আমি স্বেচ্ছায় এ ভার গ্রহণ করিলাম , আমার অসম্মতির কোনও কারণ নাই। আপনি যেদিন বলিবেন,, সেই দিনই যাত্রা করিব , কিন্তু একটা কথা এখনও বুঝিতে পারি নাই , মনে করুন, আমি সৌভাগাক্রমে আমেদের বােটের উপর চড়াও করিলাম, কিন্তু আমেদ ও ত চারিদিকে দৃষ্টি রাখিয়া কায করিবে , বােটের মাঝি-মাল্লারাও তাহার অসু- গত। এ অবস্থায় কি কৌশলে বােটখানি দখল কৰিব ?” এডমিরাল বলিলেন, “আমি তাহার ব্যবস্থা করিব। তুমি মােজাম্বিকে উপস্থিত হইয়া সেখানকার ব্রিটীশ কন্সলের সহিত সাক্ষাৎ করিবে, সে তােমাকে যথাযােগ্য সাহায্য করিবে। তবে তােমাকেও অত্যন্ত সতর্ক থাকিতে হইবে, যেন হাসেন সন্দেহের কোনও অবকাশ না পায়। কাল এ সম্বন্ধে তােমার সঙ্গে আরও অনেক কথা হইবে , আজ আর তােমাকে আটকাইয়া রাখিব না, আজ প্রাণ ভরিয়া ঘূৰ্তি করিয়া লও,মােজাম্বিকে এ সকল আমােদ-প্রমােদের সুবিধা নাই।” ডডলে এডমিরালকে ধন্যবাদ দিয়া নাচের মজলিসে প্রবেশ করিলেন। তখন মিস একাইন অঙ্গ একটি যুবকের সহিত নাচিতেছিলেন। নৃত শেষ হইলে উড়লে তাহার সহিত পুনৰ্ব্বার বারান্দায় আসিয়া একটি নির্জন কোণে বসিয়া গল্প আরম্ভ করিলেন। কথাপ্রসঙ্গে উড়লে বলিলে, “মিস এসকাইন, আপনার সহিত আজ দৈবক্রমে আমার সাক্ষাৎ হইয়াছে। আবার কখন আমাদের দেখা ইৰে কি না, কে বলিতে পারে ? আপনি বােধ হয় শীঘ্রই ইংলণ্ডে ফিরিয়া যাইবেন ১৪ নাবিক-বধু মিস্ এরাইন বলিলেন, “হাঁ, দুই সপ্তাহের মধ্যেই ইংলণ্ডে যাত্রা করি। ডডলে বলিলেন, “আমি ও তিন দিনের মধ্যেই কেপ টাউন ত্যাগ করিতেছি।” মিস এরাইন বলিলেন, “বটে । আপনাদের নৌ-বহর কি তবে দক্ষিণ-আফ্রিকা ত্যাগ করিতেছে ?” ডডলে বলিলেন, “না, আমি বিশেষ কোনও কার্যভার লইয়া স্থানান্তবে যাইতেছি। ফিরিয়া আসিয়া আর বুঝি আপনাকে দেখিতে পাইব না।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “আশা করি, আপনার সময়টা বেশ আননে কাটিবে। ডড়লে বলিলেন, “আমি আমােক করিতে যাইতেছি না, গুরুতর কার্যের ভার লইয়া যাইতেছি , কিন্তু আপনার সহিত পুনৰ্বার দেখা করিবার জন্য আমার হৃদয় ক্রমাগত হাহাকার করিবে।—আপনার সহিত পুনৰ্বার সাঙ্গ; হইলে যে কত সুখী হইব—তাহা কি করিয়া বুঝাইব ? মিস্ এরাইন বলিলেন, “ইহা আমার পক্ষে বড় সৌভাগ্যের কথা , বি । আপনি আমার সহিত পুনৰ্ব্বার সাক্ষাতের জন্য এত উৎসুক কেন, বুঝতে পারিতেছি না। দুই ঘন্টা পূৰ্ব্বে ও আপনার সহিত আমার পরিচয় ছিল না বিশেষতঃ আপনি আমার সম্বন্ধে কিছুই জানেন না।” ডড়লে বিষন্নভাবে বলিলেন, “তা বটে, কিন্তু তথাপি মনে হইতেছে যেন কত দিনের আলাপ। সময়ে সময়ে এমন শুভ মুহূর্তে দুইজনের পরিচয় হইয়া যায় যে, জীবনে তাহা ভুলিতে পারা যায় না।”—উড়লে বােধ হয় আরও কিছু হৃদন্নেচ্ছাস প্রকাশ করিতেন,কিন্তু বাড়াবাডি করিতে তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না। মিস্ এরাইন লক্ষপতির দুহিতা না হইলে আরও দুই-একট কথা বলা চলিত, কিন্তু পাছে তাহার আগ্রহে কেহ কোনরূপ অভিসনি। আরােপ করে—এই ভয়ে তিনি জিদা সংযত করিলেন। এরাইন ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া মানের দিকে চাহিলেন, তাহার :

প্রথম পরিচ্ছেদ পর ডডলেকে বলিলেন, “ঐ যে মামা বােধ হয় আমার খোঁজেই এইদিকে আসিতেছেন। তিনি নৃত্যে যােগ দিতে ভালবাসেন না, বসিয়া-বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, শেষে বিরক্ত হইয়া বােধ হয় উঠিয়া আসিতেছেন। উড়লে ব্যথভাবে বলিলেন, “মিস একাইন, আমার শেষ কথাটা শুনুন, আপনার অধিক সময় নষ্ট হইবে না। আজই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ, সাক্ষাতের পরই বিদায়। হয় ত জীবনে আর আমাদের সাক্ষাৎ হইবে না। আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করিব, আপনি সরল ভাবে উত্তর দিবেন কি? নিস্ এসকাইন বলিলেন, “এ আর শক্ত কথা কি ? ভড়লে বলিলেন, “যদি ভাগ্যে থাকে ত ভবিষ্যতে-কথন-না-কখন আপনার সহিত আমার দেখা হইতে পারে।” মিস্ এরাইন বলিলেন “অসম্ভব কি ? মনে করুন দেখা হইল, তার পর ?” ডড়লে বলিলেন, “যদি আমার সে সােভাগ্য হয়, তাহা হইলে আপনি আমার সহিত আলাপ করিয়া সুখী হইবেন ?--আমার সহিত মিশিতে আপত্তি করিবেন না ত?” মিস এরাইন বলিলেন, “আপত্তি কি ?—আর আপনার মত রসিক সুজনের সহিত আলাপ করিয়া কেনই বা দুঃখিত হইব?--আমার কথা শুনিয়া খুসী হইয়াছেন ত ?—ঐ যে মামা আসিয়াছেন, এখন বাড়ী যাইব।” ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন সেই স্থানে উপস্থিত হইলে মিস এরাইন তাহাকে বলিলেন, “মামা, আপনি মিঃ উছলেকে চেনেন কি ?* ডাক্তার বলিল, “হাঁ, উহার সহিত পূৰ্বে দেখা হইয়াছিল। উভয়ে পরস্পরের মুখের দিকে চাহিল, কিন্তু উভয়েই পরস্পরকে সন্ধেহের চক্ষে দেখিল, যেন তাহাদের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন অসম্ভব। মিস এসকাইন উড়লের নিকট বিদ্রায় লইলেন , যাইবার সময় বলিলেন,, আশা করি পুনর্বার আমাদের সাক্ষাৎ হইবে, তখন আপনার গল্প শুনিব, আপনি যে কাৰ্যে যাইতেছেন তাহাতে সিদ্ধিলাভ করুন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পরদিন প্রভাতে উড়লে সংবাদ পাইলেন, সেইদিন বেলা এগারটার সময় এডমিরালের সহিত দেখা করিতে হইবে। ডডলে পূৰ্বেও নৌ-সেনাপতির প্রাসাদে পদার্পণ করিয়াছিলেন, কিন্তু এরূপ বিচিত্র কাৰ্যতার লইয়া তিনি আর কখনও সেখানে যান নাই। ডড়লে তাহার সহিত দেখা করিতে আসিলেন , তখন এডমিরাল বারান্দায় দাঁড়াইয়া একটা চুরুট টানিতে ছিলেন। এডমিরাল মহাশয় ডড লেকে দেখিবামাত্র তাহাকে সঙ্গে লইয়া একটি সুসজ্জিত কক্ষে প্রবেশ করিলেন, সহাস্যে বলিলেন, “কাল অনেক রাত্রি জাগিয়াছিলে, মনে করিয়াছিলাম তােমাকে ক্লান্ত দেখিব , কিন্তু দেখিতেছি তুমি বেশ স্মৃত্তিতে আছ। তােমাদের মত বয়সে উৎসাহটা এই রকমই থাকে বটে, তােমরা ক্লান্ত হইতে জান না।” অনন্ত কাষের কথা আরম্ভ হইল। উভয়ে প্রায় এক ঘণ্টা কাল মানচিত্র ও নানাপ্রকার কাগজ-পত্র লইয়া অনেক কথার আলােচনা করিলেন। সেই সময় ডড়লে তাহার কর্তব্য সম্বন্ধে সকল কথা জানিয়া লইলেন। কখন কি ভাবে চলিতে হইবে, কি করিতে হইবে—প্রভৃতি কোন বিষয় তাহা জানিতে বাকি রহিল না। অবশেষে এডমিরাল মহাশয় অত্যন্ত গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “আমার শেষ কথা ভাল করিয়া শুনিয়া রাখ। মােজাম্বিকে উপস্থিত হইয়া তুমি কোন বিষয়ে অতিরিক্ত চাঞ্চল্য বা উৎসাহ প্রকাশ করিও না। অসতর্কভাবে কোনও কাষে হাত দিও না। বিন্দুমাত্র ভ্ৰম-প্রমাদে সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইতে পারে। ইউসিদ্ধি না হইয়া অনর্থপাত হইতে পারে।” উড়লে বলিলেন, “আমি খুব সতর্ক থাকিব। আমি আমেদের বােট অধিকার করিয়া জাজিবারে যাত্রা কৰি, এবং বােটখানি কর্তৃপক্ষের জিম্বা দিতীয় পরিচ্ছেদ ১৭ করিয়া দিব , তাহার পর আমাদের জাহাজের জন্য সেখানে অপেক্ষা করিব।” এডমিরাল বলিলেন, “ঠিক। যদি বিশেষ কোনও বিঘ্ন না ঘটে, তাহা হইলে তুমি জাঞ্জিবারে গমনের পর সপ্তাহমধ্যে আমরা সেখানে উপস্থিত হইব, কিন্তু যদি দেখি তুমি তখন পর্যন্ত সেখানে পৌছিতে পার নাই, তাহা হইলে আমরা তােমার অন্বেষণে যাত্রা করিব। তােমাকে আর যাহা করিতে হইবে-তৎসম্বন্ধে লিখিত উপদেশ প্রদান করিব, তাহা তুমি অবকাশ কালে পাঠ করিয়া হৃদয়ঙ্গম কবিয়া রাখিবে। আমার প্রত্যেক উপদেশ তােমার হৃদয়ে মুদ্রিত হইলে তুমি সেই কাগজ গুলি নষ্ট করিবে। তাহা হইলে তাহা অন্যের হাতে পঙিবার আশঙ্কা থাকিবে না। আমার কথা বুঝিয়াছ ?" ভড়লে বলিলেন “তা আর বুঝি নাই ?” ভড়লের কথা শুনিয়া এডমিরাল খুসী হইলেন। তিনি ডড়লের অত্যন্ত পক্ষপাতী হইয়াছিলেন , এই যুবকের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় ও কাৰ্য্যতৎপরতায় তাহার বিলক্ষণ আস্থা হইয়াছিল। তাহার মনে পডিল, তিনিও যৌবনকালে ডউলের মত বুদ্ধিমান ও কম্মঠ ছিলেন, বিপদের কাৰ্য্যে মাথা বাড়াইয়া দিতে তাহারও অসাধারণ উৎসাহ ছিল , কিন্তু এখন তিনি প্রৌঢ়, প্রথম যৌবনের সেই উৎসাহ, উদ্যম, ক্ষিপ্রতা অন্তর্হিত হইয়াছে , যাহা তিনি হারাইয়াছেন তাহা এই যুবকের নিকট পাইয়া তাহার আনন্দের সীমা রহিল না। তিনি উঠিয়া ডডলের হাত ধরিয়া বলিলেন, “তুমি অবিলম্বে ম্যাথুজের সহিত সাক্ষাৎ কর। তাহার পর ‘ডিউসি অস্ আফ্রিকা’ নামক জাহাজের টিকিট লইয়া যাত্রার জন্য প্রস্তুত সেই জাহাজখানি আগামী শনিবার বন্দর ত্যাগ করিবে। ইতিমধ্যে যদি নিজের কাযের জন্য দুইদিন ছুটি চাও, তাহা পাওয়া কঠিন হইবে না।” ডডলে এডমিরালকে ধন্যবাদ জানাইয়া বিদায় লইলেন।তাহার দুইদিন ছুটি লইবার বিশেষ কোন আবশ্যক ছিল না, কিন্তু না চাহিতেই যে ছুটি। পাওয়া যায়, এমন যুবক কে আছে, যে তাহা প্রত্যাখ্যান করে ? সেইদিন অপরাহ্নকালে ঘুরিতে-ঘুরিতে উড়লে একটি ক্লাবে উপস্থিত হও।

১ নাবিক-বধু হইলেন, তিনি এই ক্লাবে মধ্যে-মধ্যে আমােদ-প্রমােদ করিতে আসিতেন। তিনি ধূমপানের কক্ষে প্রবেশ করিয়া একখানি বংশবিনির্মিত চেয়ারে উপবেশন পূর্বক খানসামাকে কিছু খাবার আনিতে আদেশ করিলেন , তাহার পর একটি সিগারেট ধরাইয়া লইয়া ধূমপান করিতে করিতে এড, মিলের উপদেশগুলি মনে মনে আলােচনা করিতে লাগিলেন। কয়েক মিনিট পরে তাঁহার পশ্চাদ্বর্তী একটি দ্বার খুলিয়া একজন লােক সেই কক্ষে প্রবেশ করিল। আগন্তুক ভৃত্যকে আহ্বান করিবার জন্য সজোরে ঘণ্টাধ্বনি করিয়া সেই কক্ষের এক কোণে উপস্থিত হইল, তাহার পর টেবিলের উপর হইতে কতক গুলি কাগজপত্র টানিয়া লইয়া তাহা নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। আগন্তুক একখানি চেয়ারে বসিয়া একখানি কাগজ পরীক্ষা করিতে-করিতে হঠাৎ ডডলেকে দেখিতে পাইল। আগন্তুক উডলেকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, “কে, মিঃ ডড়লে যে! কেমন আছেন ? আজ দিনটা ভারি খারাপ, নয় কি ?”—তাহার পর সে চেয়ারখানি ডডলের পার্শ্বে টানিয়া আনিয়া বলিল, “কাল রাত্রে লাট সাহেবের বাড়ীর নাচে খুব স্বৰ্ত্তি করিয়াছিলেন ? সেখানে অনেক লােক যুটিয়াছিল, কেমন ? ডডলে বলিলেন, “হাঁ, সচরাচর যেমন হয়, তার চেয়ে লােক কিছু বেশীই হইয়াছিল।—মি এসকাইন ভাল আছেন ত ?” আগন্তুক বলিল, “কৈ, কোনও রকম অসুখের কথা ত শুনি নাই। সে বড় চালাক মেয়ে , অনেককে দেখিয়াছি নাচিতে-নাচিতে এলাইয়া পডে, শেষে সেই ধাক্কা সামলাইতেই দু’দিন যায়, এরাইন তেমন মেয়ে নয়। আগন্তুক এরস্কাইনের মামা—ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন। সে আর কোন কথা না বলিয়া গম্ভীরভাবে কাগজ দেখিতে লাগিল। বস্তুতঃ উইলফ্রেড, ল্যাম্পিয়ন কিছু অদ্ভুত প্রকৃতির লােক। দক্ষিণ আফ্রিকার কল পােকেই জানিত-তাহার ন্যায় ধূর্ত সচরাচর দেখা যায় না। সকলেই তাহার বুদ্ধির প্রশংসা করায় তাহার মেজাজ 'কিছু গরম হইয়া উঠিয়াছিল। ডাক্তার ৫ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ছিল, ল্যাম্পিয়ন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ছিল, নিজের শক্তি-সামর্থ্যের উপর তাহার অসাধারণ বিশ্বাস ছিল। নিজেকে অন্য সকলের অপেক্ষা বুদ্ধিমান মনে করিয়া সময়ে সময়ে তাহাকে বিপন্ন হইতেও হইত। লােকটি সুবক্তা ও বাগী ছিল , সাধারণের নেতৃত্ব কৰিবার শক্তিও অল্প ছিল না। তাহার বিদ্রুপ-কশাঘাতে জর্জরিত হইত। কেহ তাহাকে সহজে ঘাটাইতে চাহিত না। অসাবহৃদয় হুজুগপ্রিয় রমণী-সমাজেই তাহার বিশেষ প্রতিপত্তি সেই শ্রেণীর পুরুষেরাও তাহার পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু অনেকেই তাহাকে কপট বলিয়া ঘৃণা করিত। লােকটি দীর্ঘাকৃতি, মস্তকের সম্মুখভাগে টাক, প্রশস্ত ললাট, খঙ্গের ন্যায় উন্নত নাসিকা,দাড়ি নাই, গোঁফজোড়াটা অত্যন্ত জম- কালাে। তাহার পােষাক-পরিচ্ছদেরও যথেষ্ট পারিপাট্য ছিল। বস্তুতঃ এৰূপ সৌখিন লােক সে অঞ্চলে অধিক ছিল না। লােকের প্রশংসালাভের জন্য ডাক্তার বেশ ভূষায় বিস্তর অর্থব্যয় করিত। যা হউক, এখন আমরা আলােচ্য বিষয়ের অবতারণা করি। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন আহাব শেষ করিয়া কাগজখানি পাঠ করিল, তার পর হাই তুলিয়া কাগজখানি মেঝের উপর নিক্ষেপ করিল, এবং ডড’লর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “আপনি শীঘ্রই দেশান্তরে যাইতেছেন? আপনার সৌভাগ্য দেখিয়া হিংসা হয়। কিন্তু বােধ হয় আপনি ইংলণ্ডে যাইতে পারিলে অধিকতর সুখী হইতেন।” উড়লে যে রাজকার্য্যে দেশান্তরে যাইতেছেন—একথা বাহিরের কোন লােক জানিত না, সুতরাং ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের কথা শুনিয়া তিনি অতান্ত বিস্মিত হইলেন। ডাক্তার হঠাৎ কেন এই প্রসঙ্গের অবতারণা করিল তাহাও তিনি বুঝিতে পারিলেন না। শেষে তাহার মনে হইল, তিনি পূর্বদিন নাচের মজলিসের বাহিরে মিস্ এরাইনকে তাহার বিদেশযাত্রার কথা বলিতেছিলেন, সেই সময় ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন তাহার তাগিনেয়ীর অদূরে দাড়াইয়া ছিল, সম্ভবতঃ ডাক্তার তাহার কথা শুনিতে পাইয়াছিল। উড়লে ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া উদ্ভর দিলেন, “এক বৎসর বা দেড় বৎসর ' ২০ নাবিক-ধু মধ্যে আমার বােধ হয় ইংলণ্ডে যাওয়া ঘটিবে না।-আমরা এদেশে অতি অল্প দিন আসিয়াছি।” ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন হঠাৎ কোন কথা না বলিয়া গম্ভীর ভাবে সিগারেট ঢানিতে লাগিল। তাহার পর সােজা হইয়া বসিয়া গোঁফে তা দিয়া বলিল, “আপনি পূর্বে কখন কি ‘ডিউসি অ আক্কিা’ লাইনে ভ্রমণ করিয়াছেন?” ডডলে অতি কষ্টে বিস্ময় দমন করিয়া বলিলেন, “ডিউসি অস্ আফুিক লাইনে ?-না, আমি আর কখন সে লাইনে ভ্রমণ করি নাই। আপনি কি এই জাহাজওয়াল-কোম্পানীকে জানেন ?” ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিল, “আমি গত বৎসর তাহাদের একখানি জাহাজে মােজাম্বিক পৰ্য্যন্ত গিয়াছিলাম, সেখানে গিয়া একজন লােকের সহিত আমার পরিচয় হইয়াছিল, তাহার নাম বাটন, সে ভারি বর লােক—যেন একটা হাতি। মাথার চুল গুলি সব লাল । সে ‘ডাক কন্টিনেন্ট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানীর এজেন্ট। উড়লে বলিলেন, “ত, তাহার সহিত আমারও একবার আলাপ হইয়া ছিল। তাহার সহিত আমার যখন দেখা হয়—তখন সে ছুটি লইয়া দেশে যাইতে ছিল।” ল্যাম্পিয়ন বলিল, “সে এখন ছুটি শেষ করিয়া ফিরিয়াছে। কয়েক দিন পূঝে আমি তাহার একখানি পত্র পাইয়াছি। তাহার সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইলে তাহাকে আমার কথা স্মরণ করাইয়া দিবেন।আমার এ অনুরােধ আপনার মনে থাকিবে কি ?” "ভুলে বলিলেন, “আপনার কি বিশ্বাস আমি আহ্নিকার পূর্ব উপকূলে যাইতেছি ? আপনার একপ ধারণার কারণ কি ?” ল্যাম্পিয়ন বলিল, “আমার এরূপ ধারণা কিরূপে হইল তাহা আপনাঃ বলিতে পারি না। আপনি বােধ হয় এ কথা আমার ভাগিনেয়ীকে বলিয়া- হিলেন, আমি তাহারই কাছে ইহা শুনিয়া থাকিব।” , দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ २५ কিন্তু ডড়লে কেপ টাউন হইতে কোথায় যাইবেন তাহা মিস্ এরকইনকে। নিশ্চয়ই বলেন নাই , এ বিষয়ে তাঁহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। গুপ্তকথা ব্যক্ত হইবার ভয়ে তিনি ইচ্ছা করিয়াই এ কথা প্রকাশ করেন নাই , তবে ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন এ কথা কাহার নিকট শুনিল ? ডড়লে কিছুই বুঝিতে না পারিয়া তীক্ষ দৃষ্টিতে ডাক্তারের মুখের দিকে চাহিলেন, কিন্তু ডাক্তারের মুখ দেখিয়া মনের ভাব বুঝিতে পারিলেন না। তবে তিনি এটুকু বুঝিলেন যে, তাহার গতিবিধির সন্ধান রাখিয়া ডাক্তারের লাভ আছে। নিশ্চয়ই কোনও গুপ্ত অভিসন্ধির বশবর্তী হইয়া সে সকল সন্ধান লইতেছে।কিন্তু তাহার অভিসন্ধি কি ? উড়লের এই অভিযানের সহিত ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের কি কোন সম্বন্ধ আছে ? ইতিমধ্যে ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন গাত্রোত্থান করিয়া বলিল, “আপনার যাত্রার যদি দুই চারিদিন বিলম্ব থাকে তাহা হইলে আগামী রবিবার আমাদের গৃহে আপনি ভােজন করিলে আমরা অত্যন্ত আনন্দ লাভ করিব। আমার ভাগিনেষী মিস্ এরাইন আপনাকে দেখিয়া যে অত্যন্ত সুখী হইবে—এ কথা বলাই বাহুল্য।” ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের কণ্ঠস্বরে কোনরূপ ছলনা বা চাতুর্যের আভাস ছিল না, কিন্তু ডড়লে তাহার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া দেখিলেন, ডাক্তারের চক্ষু দু’টি যেন অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে , সে চক্ষুতে তাহার মানসিক উৎকণ্ঠা ও ঔৎসুক্য পরিস্ফুট হইতেছিল। ডড়লে ধীরে ধীরে বলন, “আপনার নিমন্ত্রণ লাভ করিয়া আমি বড়ই সুখী হইলাম, কিন্তু নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে পারি কি না ঠিক বুঝিতে পারিতেছি না। যদি আমি সে দিন পর্যন্ত কেপ টাউনে থাকি—তাহা হইলে নিশ্চয়ই যাই , আমি আপনার নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে পারিব কি না তাহা আগামী কল্য আপনাকে বলিতে পারিব।” ভাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিল, “তাহাই হইবে। যদি আগামী কল্য আপনার নিকট হইতে কোন সংবাদ না পাই, তাহা হইলে বুঝিব আপনি নিমন্ত্রণ রা ২২, নাবিক-বন্ধু ৬ করিতে যাইবেন। বেলা দুইটার সময় আমরা আহার করি।—আপনি বােধ হয় আমার বাড়ী চেনেন ?” উড়লে সেদিনও সেই বাড়ীর পাশ দিয়া দুইবার যাতায়াত করিয়াছিল , এবং মিস্ এরাইনকে দেখিবার আশায় দ্বিতলের বাতায়নের দিকে বন- ঘন দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন, সুতরাং তিনি ডাক্তারের বাড়ী চেনেন না—এ কথা বলিতে পারিলেন না। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন আর কোন কথা না বলিয়া সেই কক্ষ ত্যাগ করিল। ডডলে একটি সিগারেট ধরাইয়া নানা কথা ভাবিতে লাগিলেন, কিন্তু ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের উদ্দেশ্য কি, তাহা বুঝিতে পারিলেন । ক্রমে মিস্ এরাইনের কথা তাহার মনে উদিত হইল। মিস্ এরাইন কি চমৎকার সুন্দরী। কথাগুলি কেমন মিষ্ট --তিনি কি কোন দিন এই কুবের-নন্দিনীর হৃদয় জয় করিতে পারিবেন, তাহাকে লাভ করা কি সম্ভব হইবে ?-যদি তাহাকে বিবাহ করিতে পারেন—তাহা হইলে তাহার জীবন ধন্য হইবে, দেশে তাহার যে পৈত্রিক সম্পত্তি আছে তাহাতেই বেশ সুখে চলিবে , কিন্তু এই সুখস্বপ্ন সফল হইবে কি? তিনি বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া এই সকল কথা চিন্তা করিতেছেন, এমন সময় দুইটি যুবক সেই কক্ষে প্রবেশ করিলেন , তাহাদের একজন টর্পেডো লেফ, টেনান্ট ব্রাডফোর্ড, অন্যটি এণ্ডোমেডা’ জাহাজের কর্মচারী পার্শিভাল , উভয়েই ডউলের বন্ধু। ব্রাডফোর্ড মিঃ ডড লেকে দেখিয়া উল্লাস ভরে তাঁহার পিঠ চাপড়াইয়া বলিলেন, “উড়লে, তুমি এখানে। আমরা তােমাকে কোথায় না খুঁজিয়াছি? এখানে তুমি কি করিতেছ ?” ডডলে বলিলেন, “একটু বিশ্রাম করিতেছি। আমি দু’দিন ছুটি পাইয়াছি, কাষেই সময়টুকু একটু আরামে কাটাইবার জন্য আগ্রহ হওয়া অস্বাভাবি নহে। আমাকে তােমরা খুজিতেছিলে কেন ? পার্শিয়াল বলিলেন, তােমাকে নিমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছি। ডি পয়েণ্ডার :

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ‘পন্টিাক্ট কাসল’ জাহাজে এখানে আসিয়াছে, অল্পক্ষণ পূর্বে পথে তাহার সহিত দেখা হইয়াছিল। সে তােমাকে ও আমাদের দুজনকে তার জাহাজে নিমন্ত্রণ করিয়াছে। যাইবে ত?” ডডলে বলিলেন, “নিশ্চয়ই যাইব। পয়েণ্ডার ছুটি পাইয়াছে ?” ব্রাডফোর্ড বলিলেন, “তাহাই ত বোধ হয়। আর ছুটিবই-বা অপরাধ কি ? বেচারা বার বৎসর পর দেশে যাইতেছে।কিন্তু সে বিস্তর টাকা জমাইয়াছে, টাকাগুলি ব্যবসায়ে খাটাইবে শুনিয়াছি। সেইদিন সন্ধ্যার পর ডাকের জাহাজে খানার আয়ােজন হইল , সে অতি বিরাট আয়ােজন। যিনি এই প্রীতিভােজের আয়ােজন করিলেন, তাহার নাম মান্যবর রিচার্ড পয়েণ্ডাৰ, তিনি অল অফ, উইম্পানের কনিষ্ঠ পুত্র। গত দ্বাদশ বৎসর কাল তিনি পূর্ব-আফ্রিকার সন্নিহিত কোনও দ্বীপে বিষয়কর্মে লিপ্ত ছিলেন। এই দীর্ঘকালে তিনি স্থানীয় অধিবাসিগণের ভাষা শিখিয়া- ছিলেন, তাহাদের রীতিনীতি আচার ব্যবহার সম্বন্ধেও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন। রিচার্ড পয়েণ্ডাৰ কথা প্রসঙ্গে তাহার বন্ধুগণকে বলিলেন, “আমি যে দেশে ফিরিতেছি, এ কথা বিশ্বাস করিতে এখনও প্রবৃত্তি হইতেছে না। আমার যে কত আনন্দ হইতেছে, তা আর কি বলিব ? তােমাদের লইয়া যাইতে পারিলে আমি আরও অধিক সুখী হইতাম—সে সৌভাগ্য হইবে কি? টর্পেডো লেফটেনান্ট দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, “আর সৌভাগ্য। কতদিন আমাদিগকে আটক থাকিতে হইবে তা কে বলিবে? যদি টাকার মানুষ হইতাম তাহা হইলে চাকরী ছাডিয়া দেশে গিয়া ফুর্তি করিতাম, কিন্তু টাকা ত নাই, বড় লােক হইবার কোন সম্ভাবনাও দেখিতেছি না, তবে যদি কোন লক্ষপতির কন্যা আমার কলপের মত চেহারা দেখিয়া বিবাহ করিয়া ফেলে—তাহা হইলে রাতারাতি বড়লোক হইতে পারিব।” গয়েশ্চার বলিলেন, “দেশে ত যাইতেছি, ইচ্ছা আছে দেশে গিয়া দেখিয়া শুনিয়া একটা বিবাহ করিয়া ফেলিব। আমি খুব বেশী বড়লােকের মেয়ে ২৪ নাবিক-বধু চাহি না , লাখ খানেক টাকা বার্ষিক আয় আছে—এ রকম কোন সুন্দরীর প্রেমে পড়িতে পারিলে কৃতার্থ হইব। ডডি, তুমি এমন সুপুরুষ, একটা শিকার যুটাইতে পারিতেছ না? রূপ দেখিয়া যদি কোন কুবের-নন্দিনী তােমার প্রেমের পাথারে হাবুডুবু না খাইল-ত এমন চেহারা কি জন্য ? টর্পেডাে লেফটেনান্ট বলিলেন, “ডডির কথা ছাডিয়া দাও, ছােকরার একটা মস্ত দাও ফকাইয়া গিয়াছে। কাল রাতে লাট-প্রাসাদে নাচেব মজলিসে ডডি এক যুবতীর প্রেমের তুফানে পডিয়া নাকানি-চুবানী খাইয়াছিল, -কিছু লােনা জলও পেটে ঢুকিয়াছিল। যুবতী যেমন সুন্দরী—তেমনি সশালাে, লক্ষপতির কন্যা । এমন শিকার হতে পাইয়াও ছাডিয়া দিলে হে। ধিক্‌, খােলা গরম থাকিতে থাকিতে বিবাহের ভিয়ান চাইলে না কেন? কথাটা পাডিতে কি ক্ষতি ছিল ? উড়লে বলিলেন, “ব্রাডফোর্ডটা প্রকাণ্ড গাধা। সেই যুবতী উহার মত টর্পেডো লেফটেনান্টকে গ্রাহও করে নাই, এইজন্য আপশােষ হওয়ায় হত ভাগাটা এই রকম প্রলাপ বকিতেছে। উহার অপেক্ষা সে আমার বেশী খাতির করিয়াছিল, এই হিংসায় মরিতেছে আর কি।” পয়েণ্ডার বলিলেন, “তােমাদের ভাগ্য ভাল, কিন্তু আমার অদৃষ্টে এ পর্যন্ত কোন লক্ষপতির কন্যা মিলিল না , চারে মাছ না আসিলে আর বড সি গিলিবে কে ? অগাধ সমুদ্রে ছিপ ফেলিয়া বসিয়া আছি, চুনােপুটিতে দুই একটা ঠোকর দেয়, সে সব নিতান্ত অগ্রাহ্য। যাহা হউক, যাহার প্রেমের তুফানে পডিয়া এতটা বেসামাল হইয়াছ—সেই ভাগ্যবতীটিকে জানিতে পারি কি?” ডড়লে কথাটা চাপ দিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু ব্রাডফোর্ডের নেশাটা বেশ জমিয়া আসিয়াছিল, তাহার তখন মহা স্ফুর্তি, সে কথা চাপা দিতে দিল ,সােৎসাহে বলিল, “ডডি সে কথা বলিবে না, পাছে শিকার হাতছাড়া হয়। কিন্তু আমার কাছে লুকাইবার চেষ্টা বৃথা।—সেই যুবতীর নাম মিস্ এস কাইন। মাস ছয়েক পূর্বে সে এদেশে আসিয়াছে। আঃ, কি চমৎকার তার রূপ ভাই, আর নিখুঁত গড়ন, তার উপর তার বাপের বিপুল ঐশ্বৰ্য্য।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পয়েণ্ডার বলিলেন, “বল কি। তবে আমি একবার উমেদারী করি- দেখিব না কি? তাড়াতাডি দেশে না ফিরিয়া মাসখানেক না হয় এখানেই থাকিয়া যাই , ভাগ্য প্রসন্ন হইলেও হইতে পারে। আমার এমন চেহারা তাহার মনে ধরিবে না? যুবতী-মনােরঞ্জনের শক্তিও আমার যে নাই তাও বলিতে পারি না।—এই পরীর এখানে আড্ডা কোথায় ? ডডলে বলিলেন, “তিনি তাহার মাতুল ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের বাড়ীতে থাকেন , ডাক্তার ল্যাম্পিয়নকে জানত?-ভারি টাকার মানুষ।” পয়েণ্ডার বলিলেন, “ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের ভাগিনেয়ী ? বল কি। ল্যাম্পিয়নটা ভয়ঙ্কর চতুর লােক, কিন্তু একদিন তার সমস্ত চালাকি বাহির হইয়া যাইবে। লােকটাকে শীঘ্রই ডুবিতে হইবে , তাহার সর্বনাশ অনিবাৰ্য।” ডুডলে সবিস্ময়ে বলিলেন, “তােমার কথার মর্ম বুঝিতে পারিলাম না। ব্যাপার কি, সকল কথা খুলিয়া বল।” পয়েণ্ডার বলিলেন, “দেড় বৎসর পূর্বে যকার পশ্চিমাংশে আরবদের বাট-সংক্রান্ত যে গােলমাল ঘটিয়াছিল—সে কথা কি তােমার মনে পড়ে ?” ডডলে বলিলেন, “বিলক্ষণ মনে পড়ে। সেই ব্যাপারের সহিত ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের কি সম্বন্ধ ?” কিন্তু হঠাৎ অন্য কথার প্রসঙ্গ উপস্থিত হওয়ায় কথাটা চাপা পড়িয়া গেল। আহারাদির পর তিন বন্ধু একত্র তীরে অবতরণ করিলেন। ডকের অদূরে একটি ছােট বাড়ী ছিল , যে সকল জাহাজ ডকে আসিত, সেই সকল জাহাজের নাবিক, 'ফায়ারম্যান প্রভৃতি অনেকে এই বাড়ীতে আড্ডা দিতে আসিত। সেখানে তাহাদের পানাহারেরও বন্দোবস্ত ছিল। পয়ের এই অট্টালিকায় প্রবেশের ইচ্ছা প্রকাশ করিলে উড়লে ও টর্পেডাে লেফটেনান্ট তাঁহাকে প্রতিনিবৃত করিবার চেষ্টা করিলেন, কারণ সেখানে জুয়া খেলাও চলি; তাহারা বুঝিয়াছিলেন, পয়োর সেখানে প্রবেশ করিলে জুয়ায় মাতিকেন, এবং তাহার হাতে যাহা কিছু ছিল--তাহা সমস্তই তাঁহাকে -- নাবিক-বধু ২৬, খায়াইতে হইবে। কিন্তু পয়েণ্ডার তাহার সঙ্কল্প ত্যাগ করিলেন না , সন্ধুদ্বয়ের চেষ্টা বৃথা হইল। তখন তাহারা অগত্যা পয়েণ্ডারের সহিত সেই জুয়ার আড্ডায় প্রবেশ করিতে বাধ্য হইলেন। উড়লে টর্পেডাে লেফটেনান্টকে নিম্নস্বরে বলিলেন, “লােকটার হতে যাহা কিছু আছে—আজ সমস্তই তাহা এখানে রাখিয়া যাইবে। উহাকে আমাদের সঙ্গে না আনিতেই ভাল হইত। পয়েণ্ডার সেকথা শুনিয়া ও শুনিলেন না, তিনি পাশের একটি সঙ্কীর্ণ দ্বার দিয়া সেই অট্টালিকায় প্রবেশ করিলেন। ডডলে ও টর্পেডাে লেফটেনান্ট তাহার সহিত অন্ধকারাচ্ছন্ন সঙ্কীর্ণ গলির ভিতর দিয়া দূরবর্তী একটি আলােকিত কক্ষে প্রবেশ করিলেন। সেই কক্ষে অনেক গুলি লােক জটলা করিতেছিল, তাহাদের উত্তেজনাপূর্ণ ভাবভঙ্গি দেখিয়া ও কথাবার্তা শুনিয়া তাহারা বুঝিলেন, দুই এক মিনিটের মধ্যেই তাহাদের হাতাহাতি আরম্ভ হইবে । সেই কক্ষটিতে খানদুই টেবিল, কয়েকখানি জীর্ণ আরামকেদারা সংরক্ষিত ছিল। তাহারা দেখিলেন, সেই কেদারাগুলি খালি পড়িয়া আছে , কিন্তু পরমুহুর্তেই একটি দীর্ঘাঙ্গী যুবতী পাশের একটি কক্ষ হইতে সেই কক্ষে প্রবেশ করিল। সে আগন্তুকগণকে তাহাদের প্রার্থিত পানীয় পরিবেশন করিতে লাগিল। হঠাৎ পয়েণ্ডারের প্রতি তাহার দৃষ্টি আকৃষ্ট হইলে যুবতী তৎক্ষণাৎ অস্ফুষ্টম্বর বিস্ময় প্রকাশ করিয়া হাতের বােতল নামাইয়া রাখিয়াই দ্রুতপদে সেই কক্ষ ত্যাগ করিল। পয়েণ্ডার বলিয়া উঠিলেন, “কি আশ্চৰ্য্য। আমি যে এই যুবতীকে চিনি, কিন্তু পূর্বে উহাকে কোথায় দেখিয়াছিলাম—মনে করিতে পারিতেছি না। স্ত্রীলেটি আমাকে চিনিতে পারিয়াছে—কিন্তু সে আমাকে চিনিবামাত্র সৰিয়া পড়িল কেন, সন্ধান লইতে হইতেছে।” পয়েণ্ডার কক্ষান্তরে প্রবেশ করিবার জন্য সেই দিকে চলিলেন , পাছে তিনি কোন বিপদে পডেন, এই আশঙ্কায় উড়লেও তাঁহার অনুসরণ করিলেন। কিন্তু পয়েণ্ডার সেই অন্ধকারের মধ্যে কোথায় অদৃশ্য হইয়াছেন, উড়লে তাহা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ২৭ বুঝিতে পারিলেন না। তিনি চলিতে চলিতে দেখিতে পাইলেন, একটি কক্ষের দ্বার কয়েক ইঞ্চি খােল। রহিয়াছে , তাহার ভিতর হইতে আলো দেখা যাইতেছে। ডড়লে সেই কক্ষের দ্বারে দাড়াইয়া, কক্ষ মধ্যে প্রবেশ করিবেন কি না ভাবিতেছেন, এমন সময় সেই কক্ষের অভ্যন্তর হইতে কাহার কণ্ঠস্বর তাহার কর্ণে প্রবেশ করিল।—তিনি বুঝিতে পারিলেন, তাহা মিস্ এর কাইনের মাতুল ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের কণ্ঠস্বর। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিতেছিলেন, “না, না, এ বড় ঝুঁকির কার্য । ইহাতে বিপদের আশঙ্কা অত্যন্ত প্রবল।” একজন মােটা গলায় বলিল, “যতবড় ঝুকির কাষই হউক-ইহাই তােমার একমাত্র সুযােগ। আর ইহাতে বিপদেই বা পড়িবে কেন? তুমিই ত বলিতেছিলে যেরূপে হউক-তােমার টাকা চাই।” ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিলেন, “টাকা, হাঁ, টাকা চাই বৈ কি। এই অর্থের উপর আমার জীবন-মরণ নির্ভর করিতেছে , উহা না পাইলে আমার ভবিষ্যতের সকল আশা-ভরসা বিলুপ্ত হইবে, আমার সর্বনাশ হইবে। লােকে সকল কথাই জানিতে পারিবে , আমি উন্নতির উচ্চতম সােপান হইতে অধঃপতনের শেষ সীমায় উপনীত হইব।—হ, টাকা চাই , কিন্তু কিরূপে তাহা পাইব ? দ্বিতীয় ব্যক্তি মােটা গলায় বলিল, “আমার মতলবে চলিলেই তােমার আশা পূর্ণ হইবে। উইলখানি যে তােমার সম্পূর্ণ অনুকূল, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই ত ? ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিল, “হ, আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস এই উইল আমার অনুকূল। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল, “তাহা হইলে আমি যাহা বলিব—তদনুসারে তােমাকে কাম করিতে হইবে, কিন্তু আমি পঞ্চাশ হাজার পাউণ্ড পারিশ্রমিক লইব, এ কথভুলিও না। এক পেনিও কম লইব না।”

২ নাবিক-বধু ভাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিল, “কিন্তু আমার দায়িত্ব কত অধিক তাহা ভাবিয়া দেখিয়াছ কি ?—তােমার আর এমন কি অধিক দায়িত্ব আছে ? দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল, “কিছু ত আছে, আমার পক্ষে তাহাই যে অনেক। হা হউক, অগ্রে দরজাটা বন্ধ কর। দরজা খােলা থাকিলে আমাদের পরামর্শ অতে শুনিতে পারে।” ঠিক সেই মুহূর্তে একজন লােক সেই দ্বারের নিকট আসিল, দেখিয়াই উড়লে-দরজার পাশে লুকাইলেন। তিনি দেখিলেন, লােকটি দ্বার খুলিয়া বিস্ফারিত নেত্রে একবার বাহিবের দিকে চাহিল।—সে ডডলেকে বা অন্য কাহাকেও দ্বারপ্রান্তে দেখিতে না পাইয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। ডড়লেও নানা কথা চিন্তা করিতে করিতে-যে কক্ষ হইতে সেখানে গিয়াছিলেন, সেই কক্ষে প্রত্যাগমন করিলেন, কিন্তু ব্যাপার কি তাহা বুঝিতে পারিলেন না, তবে কথাগুলি তাঁর স্মৃতিপটে অতি রহিল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ আফ্রিকা মহাদেশের পূর্বতীরবর্তী মােজাম্বিক দ্বীপের প্রাকৃতিক দৃশ্য বড়ই মনােহর। কর্তৃপক্ষের আদেশে এই দ্বীপের কোনও অধিবাসী তাহার গৃহের বহির্ভাগে চূণকাম করিতে পারিত না। এখানকার লাট সাহেবের প্রাসাদ, ভজনালয়, ব্রিটীশ কন্সলের আবাস, বিসপের বাসগৃহ, নূতন কষ্টম অফিস প্রভৃতি অট্টালিকা দ্বীপের একাংশে অবস্থিত। অট্টালিকাগুলি দেখিতেও সুন্দর। প্রাচ্য মহাদেশের বৈচিত্র্যই ইহাদের বিশেষত্ব।--কিন্তু অনেক বিষয়ে ইহা ইউরােপীয় দ্বীপের অনুরূপ একদিন অপরাহ্ন কালে ‘ডিউসি অস্ আফ্রিকা কোম্পানীর একখানি জাহাজ এই দ্বীপের সন্নিকটে উপস্থিত হইল। সেই সময় মিঃ ডডলে জাহাজের ডেকের উপর একখানি আরামকেদারায় বসিয়া অপরাহ্নের শােভা নিরীক্ষণ করিতেছিলেন , তাহার পাশে একটি বুদ্ধ পটুগীজ, পাদরী বসিয়াছিলেন। ডড়লে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছিলেন বটে, কিন্তু তখন তাহার মন নানা চিন্তায় পূর্ণ। তিনি যে কাৰ্য্যের ভার লইয়া এই দ্বীপে আসিতেছিলেন, তাহা সংসাধনের সম্ভাবনা কতটুকু, ধূও আমেদ হােসেনের বােটে তিনি উঠিতে পারিবেন কি না, তাহার শেষ ফল কি হইবে—ইত্যাদি বিষয় সম্বন্ধে তিনি চিন্তা করিতেছিলেন। প্রায় পনের মিনিট পরে জাহাজ- বানি নােঙ্গর করিলে ডড়লে তীবে অবতরণ কবিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। তিনি তার জিনিসপত্র গুছাইয়া লইয়া একখানি নৌকা ভাড়া করিলেন, এবং সেই নৌকায় লাট-প্রাসাদের অদূরস্থ জেঠিতে অবতরণ করিলেন। ‘াকে জাহাজ হইতে নামিতে দেখিয়া একদল দেশীয় কুলি তার লট-বহর লই টানাটানি আরম্ভ করিল।—তিনি তাহাদের ভিতর হইতে একটি নিরীহ-প্রকৃতির লােক বাছিয়া লইয়া অন্য সকলকে বিদায় করিলেন। যেই ২৩০ নাবিক-বন্ধু । কুলিটা তাঁহার আদেশে তাহার মালপত্র ঘাডে লইয়া ব্রিটীশ কন্সলের গৃহাভি- মুথে অগ্রসর হইল। মিঃ উড়লে ব্রিটীশ কন্সলের সহিত সাক্ষাৎ করিলে কন্সল তাহাকে লিলেন, “মিঃ ডডলে, তুমি কেমন আছ ? তােমাকে হঠাৎ এখানে দেখিবার আশা করি নাই, কিন্তু তােমাকে দেখিয়া অত্যন্ত খুসী হইয়াছি। আমার বিশ্বাস ছিল—এখন তুমি কেপ টাউনেই থাকিবে।” ডড়লে বলিলেন, “আমি আমাদের এডমিরাল রেডফর্ণের একখানি পত্র আপনার নিকট লইয়া আসিয়াছি। সেই পত্রখানি পাঠ করিলেই আপনি বুঝিতে পারিবেন—আমি হঠাৎ এখানে কেন আসিয়াছি।” ডড়লে এডমিরাল-প্রদত্ত পত্রখানি পকেট হইতে বাহির করিয়া কন্সলের হস্তে প্রদান করিলেন। কল্পল মহাশয় পত্রখানি খুলিয়া দুই তিনবার অতি সাবধানে তাহা পাঠ করিলেন। তিনি পত্রের মম্ম অবগত হইয়া পত্রখানি তাহাব টেবিলের দেরাজে বন্ধ করিয়া রাখিলেন। অনন্তর কম্বল গম্ভীরভাবে ডড লেকে বলিলেন, “তুমি যে কাযের ভার লইয়া আসিয়াছ, তাহা যেমন কঠিন, সেইরূপ সঙ্কটজনক। সত্যই ইহা অত্যন্ত বিপদের কাষ।” উড়লে বলিলেন, “তাহা কি আর আমি বুঝিতে পারি নাই ?—কিন্তু যতই বিপদের আশঙ্কা থাক—আমাকে সাবধানে এই কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইতেই হইবে। আপনি আমাকে যথাশক্তি সাহায্য করিলে অত্যন্ত বাধিত হইব। আমি এডমিরাল মহাশয়ের নিকট শুনিছি আপনি এই কাৰ্য্যে আমাকে সাহায্য করিবেন। কন্সল পূর্ণ একমিনিট কাল নিস্তব্ধ ভাবে বসিয়া থাকিয়া বলিলেন, “তোমাকে সাহায্য করা আমার প্রধান কর্তব্য, এ বিষয়ে মতভেদ নাই , আমি যে যথাশক্তি তােমাকে সাহায্য করিব এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তুমি কত বড় বিপদকে আলিঙ্গন করিতে যাইতেছ, তা বােধ হয় তােমাকে ঠিক বুঝাতে পারিব না। যে লােকটির সহিত তােমাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩ T হইবে , সে অতি ভয়ঙ্কর লোক। সে জানে তাহার সঙ্কল্প-সিদ্ধির অধিক বিল নাই , এখন যদি সে আমাদের হাতে ধরা পডে, তাহা হইলে তাহার সকল আশা-ভরসা বিলুপ্ত হইবে। যদি সে কোন কৌশলে তােমাকে চিনিতে পারে, তাহা হইলে তোমার প্রাণরক্ষার আশা থাকিবে না। ডডলে বলিলেন, “সে কথা আমার জানা আছে। বিপদের আশঙ্কা প্রবল বলিয়াই এই কাৰ্য্য সাধনের জন্য আমার অধিকতর আগ্রহ ও উৎসাহ হইয়াছে। যেরূপে হউক তাহাকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য আমি কৃতসঙ্কল্প।” কন্সল বলিলেন, “তাহা হইলে আমার আর কিছুই বলিবার নাই। অতঃপর কি করিতে হইবে, প্রথমে তাহার আলােচনা আবশ্যক। এডমিরালও লিথিয়া- ছেন—তেমন তাড়াতাডি করা সঙ্গত হইবে না, তাহাতে সকল চেষ্টা বিফল হইতে পারে। তােমাকে সাহায্য করিতে হইলে আমাকে অনেক ভাবিয়া- চিন্তিয়া কাযে হাত দিতে হইবে। প্রথমে ত তােমাকে মিসেস্ স্পরফিল্ডের সহিত পরিচিত করি , তুমি বােধ হয় পূর্বে তাহাকে দেখ নাই।” কন্সলের স্ত্রী অন্য একটি কক্ষে বসিয়া সূচীক করিতেছিলেন, কন্সল ডডলেকে সঙ্গে লইয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন। এই রমণী যেরূপ সুন্দরী সেইরূপ গুণবতী ,তাহার গুণের জন্য সে অঞ্চলের সকল লােকই তাহাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। তিনি কতদিন বিপন্ন ব্যক্তিকে গােপনে অর্থ- সাহায্য করিয়াছেন, কত রাগাতুরের সেবা শুশ্রুষা করিয়া তাহাদিগকে মৃত্যুবল হইতে রক্ষা করিয়াছেন তাহার সংখ্যা নাই। কন্সল তাহার স্ত্রীকে বলিলেন, “প্রিয়তমে, মিঃ ডড লেকে তােমার সহিত পরিচিত করিবার জন্য আনিয়াছি। ইনি কেপ টাউন হইতে এইমাত্র এখানে আসিয়াছেন। আমার অনুরােধে ইনি কয়েকদিন এখানে থাকিতে সম্মত হইয়াছেন।” জুড়লে মােজাম্বিকে কেন আসিয়াছেন, একথা জিজ্ঞাসা করিবার ইচ্ছা থাৰিলেও স্বামীর ইঙ্গিত বুঝিয়া মিসেস্ স্পরফিল্ড ডুডলেকে সে সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করলেন না। তিনি মধুর স্বরে ডডলেকে বলিলেন, “আপনি দুয়া নাবিক-বধু করিয়া কয়েকদিন আমাদের এখানে থাকিলে বড়ই সুখী হইব। यामद्र স্বদেশের কোন লােককে অতিথিরূপে পাওয়া আমি সৌভাগ্যের বিষয় মনে করি। আমাদের দেশের লোেক কয়জনই বা এখানে আসেন ? আপনি আজ পরাহ্নে ‘ডিউসি অস্ আফ্রিকা কোম্পানীর জাহাজে এখানে আসিয়াছেন বুঝি ?” ডডলে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়া পূৰ্ব্ব-আফ্রিকা-সম্বন্ধে নানা প্রসঙ্গের অব- তারণা করিলেন। দিবাকর অনেক পূৰ্বেই অস্তগমন করিয়াছিলেন, কন্সলের গৃহচূডা হইতে সান্ধ্যপ্রকৃতির সুন্দর শােভা নিরীক্ষণ করিয়া উড়লে মােহিত হইলেন। তিনি সেই স্থানে বসিয়া তালীকুঞ্জের তালীকুঞ্জের অন্তরালবর্তী সুনীল সমুদ্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। কত বিভিন্ন আকারের নৌকা, জাহাজ তাহার দৃষ্টিপথে পতিত হইল। ডডলে আহারান্তে কন্সলের সহিত গৃহচুডায় • প্রত্যাগমন করিলেন। গভীর রাত্ৰি পৰ্যন্ত তাহাদের গল্প চলিল। কল-পত্নীও তাঁহাদের গল্পে যােগদান করিলেন। কয়েক ঘণ্টার পর কন্সল-পত্নী বুঝিলেন—তাহার স্বামীর সহিত উড়লের গােপনীয় কথা থাকাই সম্ভব। সুতরাং তিনি তাহাদের নিকট বিদায় গ্রহণ করিলেন। তখন কন্সল তাহার চেয়ারখানি ডড়লের আরও নিকটে টানিয়া আনিয়া নিম্নস্বরে বলিলেন, “তুমি যে কার্যের ভার লইয়া এখানে আসিয়াছ, আমি ইতিমধ্যেই তাহাতে হস্তক্ষেপণ করিয়াছি। ডড়লে বলিলেন, “আপনি যথাসম্ভব ক্ষিপ্রতার সহিত কাৰ্যারম্ভ করিয়াছেন শুনিয়া আশ্বস্ত হইলাম , এসকল গুরুতর কাৰ্যে বিলম্ব না করাই ভাল , আপনি কতটুকু কি করিয়াছেন তাহা জিজ্ঞাসা করিতে পারি কি ? কন্সল বলিলেন, “নিশ্চয়ই পার। একজন লােকের সন্ধান লওয়া সর্বাগ্রে আবশ্যক বলিয়া, সে এখন কোথায় আছে আমি তাহারই খোঁজ লইয়াছি ৮৭ লােকটির সহায়তা গ্রহণ তােমার পক্ষে অপরিহার্য, অধিক কি, তােমার যের জন্য যে সকল লােকের সহায়তা চাই, এই লােকটি তাহাদের মধ্যে সর্বপ্রধান।”

তৃতীয় পরিচ্ছেদ ডডল বলিলেন, “আপনি ঠিক কযই করিয়াছেন, কিন্তু এই লােকটি কে, তাহা জানিবার জন্য আমার বড় আগ্রহ হইয়াছে।” কন্সল বলিলেন, “তাহার নাম সামওয়েলি , সে জাতিতে নিগ্রো এবং সােয়াহিলী দেশের লােক , বিষয়-কৰ্ম্মানুসন্ধানে সে আফিকার উপকূলে পরিভ্রমণ, করে। তাহার সাহায্য পাইলে তােমার যত উপকার হইবে—এরূপ আর কিছুতেই হইবে না। লােকটি বিশ্বাসী, বাধ্য, সাহসী এবং সাধুপ্রকৃতি, বিশেষতঃ সে আমেদ হােসেনকে অত্যন্ত ঘৃণা করে। আমেদ বেন্ মুসলমান বলিয়া যে সে ঘৃণা করে এরূপ মনে করিও না, তাহার এই বদ্ধমূল ঘৃণার অন্য কারণ আছে। আমি সামওয়েলিকে ডাকাইয়া পাঠাইয়াছি, আজ রাত্রে তাহার এখানে আসিবার কথা আছে , বােধ হয় শীঘ্রই আসিবে। সে আসিলে আমি সকল ব্যবস্থা করিয়া দিব। প্রায় দশ মিনিট পরে পূর্বোক্ত নিগ্রো কন্সলের গৃহে উপস্থিত হইলে ভৃত্য আসিয়া তাহার আগমন-সংবাদ জ্ঞাপন করিল। কন্সল তাহাকে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত করিবার জন্য আদেশ দিলেন। দুই মিনিটের মধ্যে সে কন্সলের সম্মুখে আসিয়া অভিবাদন করিল। ডড়লে সবিস্ময়ে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন, লােকটা ছয় ফিট দীর্ঘ, চুলগুলি কেঁকডান-উণার ন্যায়। মাথায় জাঞ্জিবারি টপী। শরীর যেন অনুরের শরীরের মত। সে হাসিয়া কন্সলকে অভিবাদন করিল। তাহার সেই হাসি শিশুর হাসির মত সরল। কন্সল স্পরফিল্ড ডড লেকে বলিলেন, “তুমি সােয়াহিলীদের ভাষা জানিতে ত ? ডড়লে বলিলেন; “হ, জানি এক রকম। মিঃ ফিল্ড বলিলেন, “ভাল কথা। আর না জানিলেও কোন ক্ষতি ছিল না , সামওয়েলি পৃথিবীর নানা ভাষায় কথা কহিতে পারে—বিশেষত জী ভাষা সে অনর্গল বলিতে পারে। যাহা হউক, এখন কায আরম্ভ কৰা উক-সামওয়েলি, তুমি বােধ হয় আমেদ বে-হাসেনের নাম শুনিয়াছ ?” সাম ওয়েলির মুখমণ্ডল হঠাৎ ভীষণ ভাব ধারণ করিল, তাহার চক্ষু কক্সবণ A নাবিক-বন্ধু হইয়া উঠিল, ডড়লে বুঝিলেন, সে আমেদ বেকে কেবল চেনে না, তাহাকে হাতে পাইলে কাটিয়া টক-টুকরা করে। মিঃ স্পৱফিল্ড বলিলেন, “সামওয়েলি, আমি সংবাদ পাইয়াছি, আমেদ বেন্ হাসেন কতকগুলি অস্ত্রশস্ত্র ও গােলা বারুদ লুকাইয়া হ্রদ-সন্নিহিত প্রদেশে লইয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছে। আমি তাহার এই চেষ্টা বিফল করিতে চাই,বুঝিয়াছ ?” সামওয়েলি অত্যন্ত খুসী হইয়া দাত বাহির করিয়া সিল, যেন কথাটা তাহার মনের মত হইয়াছে। মিঃ স্পরফিল্ড বলিলেন,“আমেদ বেন্ একখানি বােট লইয়া কমােনা দ্বীপে সন্নিকটে একখানি জাহাজের নিকট যাইবে স্থির করিয়াছে। সে সেই জাহাজ হইতে কতকগুলি অস্ত্রশস্ত্র ও গােলা-বারুদ তাহার নৌকায় তুলিয়া লইবে, তাহার পব নদীপথে তাহার আড়ার দিকে অগ্রসর হইবে, কিন্তু তাহাকে ইহা করিতে দেওয়া হইবে না। যদি তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া তাহার অশস্ত্রগুলি কাডিয়া লইতে পার—তাহা হইলে তুমি আশাতীত পুরস্কার পাইবে।—তাহার সেই বােটখানি এখন কোথায় এ সন্ধান জান কি?” সামওয়েলি বলিল, “না, তাহা জানি না হুজুর, কিন্তু এ বিষয়ের সন্ধান লওয়া তেমন কঠিন নহে। মিঃ রফিল্ড বলিলেন, “তবে যাও, অবিলম্বে এই সন্ধান লইয়া আমার সহিত দেখা করিবে।—কেবল তাহাই নহে, আমেদ বেনে কে কে সঙ্গী আছে, কোন্ সময়ে তারা জাহাজের কাছে যাইবে, তাহাও জানা চাই আমার এই বন্ধুটি আমার স্বজাতি, ইনিও আমাদের দেশের রাণীর চাকরী করেন , ইনি আমেদ বেনের নৌকায় যাইবেন। তুমি অমেদ বেনকে গ্রেপ্তার করিয়া তাহার নৌকা লইয়া জাঞ্জিবারে যাইবে। কিন্তু যদি আমেদ বেন কেন ক্রমে এই সকল ব্যাপারের সন্ধান পায়, তাহা হইলে সে নিশ্চয়ই তােমা- দিগকে হত্যা করিবে। তুমি এ সকল সংবাদ অতি গােপনে আমার নিকট । আসিবে। কার্যোদ্ধার করিতে পারিলে আমি তােমার পুরস্কারসম্বরে ঝিশষ বিবেচনা করি।-এখন যাও।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩৫ নিগ্রো মিঃ স্পরফিল্ডকে অভিবাদন করিয়া প্রস্থান কৰিলে মিঃ স্পরফি ডডলেকে বলিলেন, “তুমি স্বেচ্ছায় যে কার্যের ভার লইয়াছ, আমি তাহা লইতে কখন সাহস করিতাম না। সুখের বিষয়, তােমার জন্য সংসারে কেহ শােক করিবার নাই, তােমার উপর নির্ভর করিতেও কেহ নাই। যদি হােমর স্ত্রী-পুত্রাদি থাকিত, তাহা হইলে এরূপ সঙ্কটজনক কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইতে সাহস করা সঙ্গত হইত না।--রাত্রি হইয়াছে, এখন শয়ন কর , পরের চিন্তা পরে করিও।” মিঃ স্পরফিল্ড ডড লেকে একটি শয়নকক্ষে লইয়া চলিলেন। মিঃ স্পরফিল্ড তাঁহার নিকট বিদায় লইলে তিনি শয়ন করিয়া নানা কথা চিন্তা করিতে লাগিলেন , জুয়ার আড্ডায় ডাক্তার ল্যাম্পিয়নেব যে সকল কথা শ্রবণ করিয়া- ছিলেন, তাঁহার এই অভিযানের সহিত তাহার কোন সম্বন্ধ আছে কি না তাহা তিনি বুঝিয়া উঠিতে পারিলেন না। ক্রমে মিস্ এরকাইনের মােহিনীমূর্তি তাহার চিত্তপটে সমুদ্ভাসিত হইয়া উঠিল , কিন্তু চিন্তার বিরাম কোথায় ? অবশেষে তিনি বিবক্ত হইয়া দীপ নিৰ্বাপিত করিয়া মশারি ফেলিলেন। . কতক্ষণ তিনি ঘুমাইয়াছিলেন বলা যায় না, হঠাৎ নিদ্রাভঙ্গে তার বােধ হইল—কে তাঁহার মশারির ভিতর প্রবেশ করিয়া তাহার ক স্পর্শ করিতেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ লাফাইয়া উঠিয়া উভয় হস্তে তাহাকে আক্রমণ করিলেন। তখন তাহার আততায়ী তাঁহার বক্ষস্থল লক্ষ্য করিয়া ছুরিকা প্রয়োণ করিল , কিন্তু অন্ধকারে ছুরিকাখানি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইল। মুহূৰ্তমধ্যে ডডলে তাহার আততায়ীকে চীৎ করিয়া ফেলিয়া তাহার বুকে বসিলেন, এবং তাহার হাত হইতে ছোরখানি কাড়িয়া লইয়া তাহার কণ্ঠরােধের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। দুইজনে ধস্তাধ্বস্তি আরম্ভ হইল , শেষে উভয়েই খাটের উপর হইতে মেঝের উপর পভিয়া লুটাপুটি ও ঝটাপটি। উডলের আততায়ী যে-ই লােকটি যে দীর্ঘদেহ, বলবান ও হৃষ্টপুষ্ট, তাহা তিনি বুঝিতে পারিলেন। কি ডলে কাপুরুষ ছিলেন না, তাঁহার দেহেও অসুরের মত বল ছিল, তাহার উপর তিনি ব্যায়ামে সুদক্ষ ছিলেন। উভয়ে প্রাণপণে সুদ্ধ করিলেও তাতে কোন নাবিক-বধু we শব্দ হয় নাই। কিছুকাল নিঃশব্দে যুদ্ধ করিবার পর একটি টেবিলে উভয়ের দেহের ধাক্কা লাগিল। সেই ধাক্কায় টেবিলখানি হুড়মুড়-শকে উল্টাইয়া পড়িল। ডডলের আততায়ী নীচে পডিল, ভড়লে তাহার দেহের উপর চাপিয়া পডিলেন, এবং তাহার বক্ষস্থলে উপবেশন পূর্বক উভয় পার্শ্বে তাহার হাত দুইখানি এরূপ দৃঢ়রূপে ধরিয়া রাখিলেন যে,সে হাত নড়াইতেও পারিল না। -টেবিল পতনের শব্দে গৃহবাসিগণের নিদ্রাভঙ্গ হইল , কন্সল মহাশয় একটি বাতি লইয়া, ব্যাপার কি দেখিবার জন্য ব্যগ্রভাবে সেই কক্ষে প্রবেশ করিলেন। কন্সল উভয়কে তদবস্থ দেখিয়া মিঃ ডডলেকে সভয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ কি কাণ্ড! কাহার সহিত যুদ্ধ করিতেছ ?” উড়লে বলিলেন, “কি জানি মহাশয় । আমি ঘুমাইতেছিলাম, হঠাৎ জাগিয়া দেখি এই লােকটা আমাকে আক্রমণ করিয়াছে, বােধ হয় আমাকে খুন করিতেই আসিয়াছিল। আমি দুর্বল হইলে এতক্ষণ বােধ করি আমাকে জীবিত দেখিতে পাইতেন না। আপনি শীঘ্র দুইজন ভৃত্যকে আমার সাহায্যের জন্য পাঠাইলে ভাল হয়, নতুবা এই শয়তানটা আমাকে ঠেলিয়া উঠিয়া, পলাইবে। তেল মাখিয়া আসিয়াছে না কি? রাঙ্কেলটার শরীর কি পিচ্ছিল ।—বেটা যেন পাল মাছ !” কন্সল সাহেব তৎক্ষণাৎ সেই কক্ষের বাহিরে গিয়া দুইজন ভৃত্যকে আহ্বান করিবামাত্র তাহারা তাহার সহিত সেই কক্ষে প্রবেশ করিল। তাহাদের সাহায্যে ডড ল তাহার আক্রমণকারীকে ভূমিশয্যা হইতে টানিয়া তুলিলেন। সে দণ্ডায়মান হইলেও আলােকের অল্পতা বশতঃ কন্সল বা তাহার ভৃত্যের তাহাকে চিনিতে পারিল না , তখন আরও কয়েকটি প্রজ্বলিত বর্তিকা আনীত হইল। সেই আলােকে তাহারা আততায়ীকে পরীক্ষা করিয়া দেখিল,- নে একট। জোয়ান আরব , তাহার মুখখানি অত্যন্ত কুৎসিত। আবটা অবিলম্বে দৃরূপে রজ্জবদ্ধ হইল। অনন্তর কন্সল সাহেব বললেন, “ চল, ব্যাপার কি আমায় খুলিয়া বল।” ।

T তৃতীয় পরিচ্ছেদ จ উড়লে বলিলেন, “আমায় বিশেষ কিছুই বলিবার নাই, কারণ আপনারা যাহা দেখিতেছেন তদতিরিক্ত কিছুই আমি জানি না। প্রায় দশমিনিট পূর্বে হঠাৎ আমার নিদ্রাভঙ্গ হয়, এই রাঙ্কেলটা তৎপূৰ্বেই আমাকে আক্রমণ করিয়া- ছিল। উহার হাতে ঐ তীক্ষ্ণধার ক্রিচখানি ছিল , কিন্তু আমি আহত হই নাই, কারণ, আমি চকুৰ নিমিষে উহাকে আক্রমণ করিয়া উহার বুকে চাপিয়া বসি। তাহার পর উভয়ে ধস্তাধ্বস্তি করিতে করিতে খাটের উপর হইতে মাটীতে পড়ি। আমাদের শরীরের ধাক্কায় টেবিলখানি হুড়মুড় করিয়া পড়িয়া যায় , সেই শব্দে আপনারা এই কক্ষে উপস্থিত হইয়াছেন।” কন্সল সাহেব বলিলেন, “তােমার প্রাণরক্ষা হইয়াছে এজন্য পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ করিতেছি। তুমি এ যাত্রা বডই বাচিয়া গিয়াছ।” উড়লে হাসিয়া বলিলেন, “বােধ হয় পরমাযু ছিল--তাই বাচিয়াছি, নতুবা ঐ ছুরি যদি বুকে বিধিত, তাহা হইলে বাঁচিবার কোনও আশা ছিল না, যা হউক-এই লােকটা কে,কেনই বা আমাকে হত্যা করিতে আয়িয়াছিল, তাহা উহাকে জিজ্ঞাসা করিলে ভাল হয়। কন্সল সাহেব আৰবা ভাষায় আববটাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুই কে? কি জন্যই বা এই ভদ্রলােকটিকে খুন করিতে আসিয়াছিলি ?” কিন্তু আরবটা মিঃ শফিল্ডের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়া চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। ক্রোধে ক্ষোতে তাহার গােল গােল ভাটার মত চক্ষু হইতে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বাহির হইতেছিল।-যাহা হউক, বিস্তর পীড়াপীড়ির পর আরবটা মাথা নাডিয়া বুঝাইয়া দিল, সে তাহার কথা বুঝিতে পারিতেছে না। কিন্তু কোন্ ভাষায় প্রশ্ন করিলে এই দুৰ্বত্ত তাহা বুঝিতে পারিবে—মিঃ স্পরফিল্ড তাহা স্থির করিতে পারিলেন না। অতঃপর তাহাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করা নিষ্ফল বুঝিয় তিনি ডডলেকে বলিলেন, “আমার বােধ হয় এই ইভাগাটা চুরি করিবার উদ্দেশ্যেই এই ঘরে প্রবেশ করিয়াছিল। প্রথম তােমাকে সাবাড় করিয়া পয়ে নির্বিঘ্নে চুরি করিবে—এই মতলবেই শুরুবতঃ তােমাকে আক্রমণ করিয়া,িতােমার কিরূপ ধারণা ?” .

৩ নাবিক-বধূ ভড়লে বলিলেন, “আপনার অনুমান সত্য কি না আমি তাহা বুঝিতে পারিতেছি না, কিন্তু যদি চুরী করাই উহার উদ্দেশ্য হইত, তাহা হইলে কি আমার জিনিসপত্র লইয়া সরিয়া না পডিয়া প্রথমেই আমাকে আক্রমণ কৰিত ? আমি ঘুমাইতেছিলাম, সেই সুযােগে চুরী করিয়া চম্পট না দিয়া প্রথমেই আমাকে আক্রমণ করিল কেন?—আমার কোন জিনিস-পত্র চুরী যায় নাই। মিঃ স্পরফিল্ড বলিলেন, “অদ্ভুত ব্যাপার বটে। আমি এ বাড়ীতে আসিবার পর এরূপ ঘটনা আর কখন ঘটে নাই। আমি অবিলম্বে উহাকে পুলিশের হন্তে সমৰ্পণ করিব। তাহার পর কাল পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তদন্ত কৰিব। আমার বাড়ীতে চোর। আশ্চর্য ব্যাপার নহে? আমার বাড়ীতে আসিয়া তােমাকে এই প্রকার বিপন্ন হইতে হইল—ইহা অত্যন্ত ক্ষোভের বিষয়। তােমার শান্তিভঙ্গের জন্য আমিই কতকটা দায়ী। উড়লে বলিলেন “না, না, আপনি ও-রকম কথা বলিবেন না। আমার বিপদের জন্য আপনি বিন্দুমাত্র দায়ী নহেন। যাহা হউক, লােকটা শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া যে আপনাকে আক্রমণ করে নাই, ইহাই সুখের বিষয়। আপনার শয়নকক্ষে এই ব্যাপার ঘটিলে মিসেস্ স্পরফিল্ডের আতঙ্কের সীমা থাকিত না। আপনি আমার জন্য ভাবিবেন না, আমি আহত হই নাই, আমার শরীরে দুই একটা সামান্য ছড গিয়াছে মাত্র। আপনি এখন শয়ন করিতে যান। মিঃ স্পফিল্ড সেই কক্ষ ত্যাগ করিলে উড়লে পুনৰ্বার শয়ন করিলেন। অন্য কোন লােকের এরূপ বিপদ ঘটিলে সেই রাত্রে পুনর্বার তাহার নিদ্রাকর্ষণ হইত কি না সন্দেহ, কিন্তু ডড়লে এরূপ অনন্যসাধারণ মানসিক বলের অধিকারী ছিলেন ৰে, শয়ন করিবার পর দশ মিনিটের মধ্যেই তাহার নিদ্ৰাকৰণ হইল। &ি স্পরফিল্ড আরব আততায়ীকে পুলিশে চালান দেওয়ার জন্য লইয়া চলিলেন। ভূলে নিদ্রিত হইলেও সে-রাত্রে তাঁহার মুনিদ্রা হই না, রাত্রি-শৈষে তিনি এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখিলেন। তাহার নে হইল, তিনি একখানি দেশীয় তৃতীয় পরিচ্ছেদ বােটের উপর আমেদ হােসেনের সহিত মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তাহাদের ‘গ সিপের’র একখানি ছােট ঈমার অদূরে দাড়াইয়া ধূম্রোদিগণ করিতেছে , এবং সেই ঈমারখানির ডেকের উপর আধ ডজন খালাসী কয়লা ভাঙ্গিবার হাতুড়ী ও জ্বলন্ত কয়লা সরাইবার হাতা লইয়া দাঁড়াইয়া আছে, যেন সুযােগ পাইলেই তাহারা তাহাকে আক্রমণ করিবে।—এইভাবে উভয়ের যুদ্ধ চলিতে লাগিল , বােটখানিও মােজাম্বিক প্রণালীর অভিমুখে অগ্রসর হইল। হাঙ্গর- গুলা জল হইতে মুখ তুলিয়া নিৰ্ণিমেষ নেত্রে উভয়ের দিকে চাহিয়া রহিল, যেন উভয়ে যুদ্ধ করিতে-করিতে জলে পডিলেই তাহাদের ফলার। তিনি আরও দেখিলেন, তাহার প্রতিদ্বন্দ্বীর হস্তে একখানি তীর ছুরিকা দীপ্ত সূৰ্য্য-রশিতে ঝ-মক্ করিতেছে , অথচ একখানি হাতপাখা ভিন্ন আত্মরক্ষার কোন সম্বল তাহার নিকট নাই ।—তাহার মনে পডিল—তিনি মিস্ এরসাইনের হাতে সেই পাথাখানি দেখিয়াছিলেন। লাট সাহেবের বাড়ীতে নাচের দিন সেই পাখা তাঁহার হাতে ছিল।—পাখার হাতল সােণা-বাধা, তাহার উপর মিস এসকাইনের নাম খােদিত। হঠাৎ সেই আবটা বামহন্তে তাহার কণ্ঠনালি দরূপে আঁকড়াইয়া ধরিয়া দক্ষিণ হস্ত উর্ধে তুলিল,এবং তাহার হস্তস্থিত ছুরিকা- খানি তাহার করে নিম্নভাগে আমূল প্রােথিত করিল।সঙ্গে সঙ্গে উড়লের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তিনি দেখিলেন, ঘৰ্ম্মধারায় বালিশ ভিজিয়া গিয়াছে। আবার তিনি চক্ষু মুদিত করিলেন, এবার তা আসিতে-না-আসিতে আর এক উৎকট স্বপ্ন দেখিলেন। তিনি দেখিলেন দিগন্তব্যাপী অকূল সমুদ্রে এক- খানি বােট ভাসিতেছে। বােটখানি কোনও জাহাজের ডীঙ্গী। যতদূর দৃষ্টি যায় কোনদিকে কূল-কিনারা দেখা যাইতেছে না। কোনদিকে একখানি জাহাজ নাই। তিনি প্রথমে সেই বােটে কোন লােক দেখিতে পাইলেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ ঠাহর করিয়া দেখিবার পর—বােধ হইল, বােটের উপর একজন মানুষ হিছে। তিনি কৌতূহলের বশবর্তী হইয়া বােটের আরও নিকটে উপস্থিত্ব: হইলেন , তখন তিৰি বুঝিতে পারিলেন, লােকটি জীবিত নাই, মরিয়া গিয়াছে। —তিনি বােটে উঠিয়া সেই মৃতদেহটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখিতে লাগিলেন, কিন্তু J ৪০ নাবিক-বধু তাহার মুখখানি দেখিবামাত্র চীৎকার করিয়া উঠিলেন। তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। তিনি স্বপ্নে মৃত ব্যক্তির যে মুখ দেখিয়াছিলেন, সে মুখ যেন তাহারই মুখ। অকূল সমুদ্রে জন সমাগমশূন্য বােটে তাঁহার মৃতদেহ। তাহার মৃতদেহ বক্ষে ধরিয়া -বােটখানি অসীম সমুদ্রপথে নিরুদ্দেশযাত্রা করিয়াছে ।—নিদ্রাভঙ্গেও উড়লে প্রকৃতিস্থ হইতে পারিলেন না, তঁাহার সর্বাঙ্গে ঘৰ্ম্মের ধারা বহিতে লাগিল। তিনি উঠিয়া বসিয়া উভয় হস্তে চক্ষু মার্জনা করিলেন, তাহার পর উৎকণ্ঠিত চিত্তে একবার চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন , দেখিলেন, প্রভাত হইয়াছে, বাতায়ন-পথে প্রভাতের আলােক কমধ্যে প্রবেশ করিতেছে। নিদ্রাভঙ্গে তিনি প্রফুল্ল হইবার জন্য প্রচুর চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা হইল, তাহার চক্ষু হইতে উৎকণ্ঠা ও ভীতি-বিহ্বল ভাব বিদূরিত হইল । যাহা হউক, তিনি প্রভাতেই শীতল জলে স্নান করিলেন। স্নানান্তে তাহার শরীর অপেক্ষাকৃত সুস্থ হইল, মনের ভারও অনেকটা লঘু হইল। ঘণ্টাখানেক পরে মিঃ স্পরফিল্ড ডড লেকে লইয়া তাহার আফিসে গিয়া বসিলেন। দুইখানি চেয়ারে মুখােমুখী হইয়া বসিয়া কন্দল সাহেব উড়ালকে বলিলেন, “আমি গত রাত্রির দুর্ঘটনাটার কথাই ভাবিতেছিলাম, কিন্তু কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি নাই। উহাকে তােমার জিনিস-পত্র চুরি করিতে দেখিলে যদি প্রথমে তুমিই আক্রমণ করিতে, তাহা হইলে এই কাণ্ডের একটা সঙ্গত কারণ স্থির করিতেছারিতাম , কিন্তু ঘটনাটা যে উল্টা রকমের হইয়াছিল। সে যখন তােমাকে আক্রমণ করে—তথন তুমি নিদ্রিত, চুরি করিবার মতলব থাকিলে সে গৃহবাসী নিদ্রিত লোককে কেন আক্রমণ করিবে ? এইখানেই বুঝিবার গােল হইতেছে। যাহা হউক, পুলিশ কি রহস্যভেদ করে তাহা জানিবার জন্য বড়ই উৎসুক হইয়াছি, লােকটার পরিচয়ও তাহাদের জানা থাকিতে পারে। আমার বাড়ীতে এ রকম কাণ্ড।-বড়ই লজ্জার কথা।” '' মিঃ ডডলে বলিলেন, “ইহাতে আর লজ্জা কি ?—ইহা আবটার দুঃসা সেই নিদর্শন। আমাকে অত্যন্ত সাবধানে থাকিতে কইবে , আত্মগােপন করা -ভই আবশ্যক হইয়াছে। আমেদ বোসেন যদি আমার উদ্দেশ্য ঘুণাক্ষরেও তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৪১ জানিতে পারে—তাহা হইলে তাহাকে গ্রেপ্তার করা অসম্ভব হইবে।এবার সে পলাইতে পারিলে, আমরা আর কখন তাহাকে হাতে পাই না। কল সাহেব আডষ্ট ভাবে বলিলেন, “সে কথা বড় মিথ্যা নহে , দেখা যাউক, কোথাকার জল কোথা গিয়া দাড়ায়।” এক ঘণ্টা পরে কন্সল সাহেব ডড লেকে সঙ্গে লইয়া লাট-প্রাসাদে উপস্থিত হইলেন , লাট সাহেব তাহাদিগকে জানাইলেন, শীঘ্রই এই ব্যাপারে যথা- যােগ্য তদন্ত হইবে। মিঃ শফিল্ডের নিকট ডডলের পরিচয় পাইয়া লাট সাহেব সুখী হইলেন। কন্সলের গৃহে তাঁহার ন্যায় সম্মানিত অতিথি লাঞ্ছিত হওয়ায়, লাট সাহেব তাহার নিকট অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করিলেন , তাহার পর তিনি উড়লেকে বলিলেন,“এই দুৰ্বত্তকে যে যথাযােগ্য দণ্ড প্রদান করা হইবে, --এ কথা আপনাকে বলাই বাহুল্য। আমি স্ব উৎপীডিত হইলে ও এতদূর মৰ্ম্মাহত হইতাম না। আমার শাসনাধীন রাজ্যে—ব্রিটীশ কন্সলের গৃহে আবব হস্তে আপনার লাঞ্ছনা।-এ অত্যাচার অসহ। ডামিঙ্গো, আমার আদেশ পালন করিয়াছ? ডােমিঙ্গো লাট সাহেবের এডি-কং।-সে বলিল, “হ, আপনার আদেশ পালিত হইয়াছে। লাট সাহেব বলিলেন, “তাহা হইলে আসামীকে অবিলম্বে আমার সম্মুখে হাজির কর। মহাশয়, আপনারা একটু কফি পান করিয়া আমাকে পরিতৃপ্ত করুন, আর একটা চুট ?” কন্সল লাট সাহেব-প্রদত্ত কদলীবৎ স্থল চুরুটটি মুখে জিয়া তাহাতে অগ্নিসংযােগ কৰিলেন , তাহার পর তাঁহার মুখ-গহ্বর হইতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন দশম আরম্ভ হইল কয়েক মিনিট পরে বন্দী আরবটা সেই স্থানে আনীত হইল। তাহার বিকট চেহারা দেখিলে অত্যন্ত সাহসী ইউরােপীয় র পুরুষেরও বুক কাঁপিয়া উঠে । তাহার মুখখানি ডালকুত্তার মুখের মত তাহার চকুদু’টি সাপের চক্ষুর মত পিটু-পিট করিতেছিল, তাহার দৃষ্টি ক্র ক্রবত ? খলতাপূর্ণ। সে যেপারব—এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। গবর্ণর সাথে যে নাবিক-বধু 'তাহাকে আহাকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, কিন্তু সে একটি কথারও উত্তর দিল না , তালগাছের মত সােজা হইয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার মুখের দিকে মিটু- মিট করিয়া চাহিতে লাগিল।—সেই দৃষ্টিতে ভয়ের চিহ্নমাত্র ছিল না, বরং পর্ধা ও অবজ্ঞা প্রকাশ পাইতেছিল। তাহাকে নির্বাক দেখিয়া পটুগীজ গবর্ণরের ক্রোধসিন্ধু উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। তিনি গর্জন করিয়া বলিলেন, “তুই কি মতলবে রাত্রিকালে কন্সল সাহেবের ঘরে ঢুকিয়া এই ভদ্রলােকটিকে আক্রমণ করিয়াছিলি, তাের দলে কোন্ কোন্ লােক আছে,—এ কথা না বলিলে ছুরি দিয়া তাের যকৃত খণ্ড-খণ্ড করাইয়া ফেলিব।”—রাগে তাহার মােটা কাল গোঁফকোডটা ফুলিয়া উঠিল। কিন্তু আরবটা খাতির-নদার।ভয় প্রদর্শনে কোনও ফল হইল না। “তাহার মুখ হইতে একটা কথাও বাহির করিতে পারা গেল না। তখন গবর্ণর সাহেব বলিলেন, “এখন উহাকে লইয়া যাও, হতভাগা এখন কথা কহিতেছে না, কিন্তু চাবুকের চোটে উহার মুখে কথা ফুটিবে। পিঠে শপাশপ চাবুক পড়িবে, আর মুখে কথার থৈ ফুটিবে।তাহার পর উহার কি শাস্তি হয়—তাহা আপ- নারা নিতেই পাইবেন।” অনন্তর ডডলে কন্সলের সহিত তাহার গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন । অপরাহ্নকালে তিনি তাঁহার কক্ষে বসিয়া চিঠি-পত্র লিখিতে লাগিলেন। কিছুকাল পরে মিঃ স্পরফিল্ড হাঁপাতে হাঁপাইতে তাহার সম্মুখে আসিয়া ব্যগ্র- ভাবে বলিলেন, “বড়ই অদ্ভুত কাণ্ড হইয়া গিয়াছে। আসামীকে আজ সকালে জেলখানায় লইয়া যাইবার সময় সে পলাইয়াছে।—এ কথা শুনিলে লাট সাহেব চটিয়া আগুণ হইবেন, কিন্তু, উড়লে বলিলেন, “সব বুঝিয়াছি।যাহাদের ক্রটিতে আসামী পলাইয়াছে— তিনি তাহাদের ফাঁসি দিবেন, আসামীকে ধরিতে পারিলে তাহাকে জীবন্ত 'যারে পুতিবেন ,-সব হইবে,কিন্তু তাহাকে ধরিবার জন্য তিনি আন্তরিক চেষ্ট নিবেন কি? আসামী পলাইন্নাছে, সুতরাং এই ব্যাপার কি দুর্ভেদ্য রহস্য- রাচ্ছন্ন—তাহা আৰ জানিবার উপায় রহিল না।”

তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৪. মিঃ রফিড বলিলেন, “এই রহস্যজাল ভেদ করা বােধ হয় অসম্ভব হইবে। আমি গবর্ণরকে জানাইয়াছি, তিনি আসামীকে গ্রেপ্তার করিবার ব্যবস্থা কন।আমার একটা বড় ভুল হইয়াছে , সামওয়েলি এখানে আসিলে আরব- টাকে পুলিশের হাতে দিলেই ভাল হইত। সাম ওয়েলি নিশ্চয়ই তাহাকে চিনিতে পারি, তাহার সম্বন্ধে দুই-চারিটি কথা বলিতে ও পারিত। উড়লে বলিলেন, “সামওয়েলির সহিত কি আমাদের শীঘ্র দেখা হইবার মাশা আছে ? ক্রমেই বিলম্ব হইয়া যাইতেছে , আমেদ হােসেন আমাদের চক্ষুতে ধূলা দিয়া ইতিমধ্যে পলাইতে না পারে। মিঃ রফিল্ড বলিলেন, “এ বিষয়ে ভূমি নিশ্চিন্ত থাক, সামওয়েলি নিশ্চয়ই তাহার উপর দৃষ্টি রাখিয়াছে।” তাহার বাতায়ন-সন্নিকটে বসিয়া গল্প করিতেছিলেন, হঠাৎ রাজপথে একটি ফেরিওয়ালার আবিভাব হইল। তাহার কাধে একটি প্রকাও বোচকা, সেই বোচকায় নানা প্রকার পণ্যদ্রব্য ছিল। সে মিঃ স্পরফিল্ড ও উডলেকে শল্প করতে দেখিয়া তাহাদের জিজ্ঞাসা করিল,-“হুজুর, কিছু সওদা করিবেন। আমার কাছে নানা রকম মনােহারী জিনিস আছে।” মিঃ স্পরফিল্ড বলিলেন, “না, আমার কিছু কিনিবার আবশ্যক নাই।” উড়লে ফেরিওয়ালার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া মিঃ শফিকে নিম্নস্বরে বলিলেন, “উহাকে ভিতরে ডাকুন, আমরা উহার জিনিসগুলি কিনিব।” মিঃ শফিল্ড সবিস্ময়ে ডডলের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “হঠাৎ তােমার এ সথ হইল কেন?” মিঃ ডড়লে বলিলেন, “লােকটাকে চিনিতে পারিলেন না? এবে পাই সামওয়েলি।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ নহে। ফেরিওয়ালাকে তৎক্ষণাৎ ভিতরে ডাকিয়া আনা হইল। লােকটার পরি- ছদের বৈচিত্র্য ছিল , সে ফেরিওয়ালা হইলেও ভারতবর্ষীয় ফকিরের মত তাহার পরিচ্ছদ—তাহার অঙ্গে একটি প্রকাণ্ড আলখেল্লা, গলায় ফুতি ও স্ফটিকের মালা, মাথায় দরবেশের মত চুল ,অথচ কাধে পণ্যদ্রব্যপূর্ণ বোঁচকা। ডড়লে বলিলেন, “ফেরিওয়ালারা কখনও এরূপ পরিচ্ছদে বাহির হয় না , আমি দীর্ঘকাল ভারতবর্ষে ছিলাম,ইহার ফকিরের পােষাক দেখিয়াই আমার সন্দেহ হয় -~-এ কখন আসল ফেরিওয়ালা এতদ্ভিন্ন উহার চক্ষু দুইটি দেখিয়াও উহাকে চিনিয়াছিলাম।” সামওয়েলি তাহার কাঁধের বোঁচকা নামাইয়া রাখিয়া মিঃ স্পরফিল্ডকে অভিবাদন করিল , মিঃ স্পরফিল্ড তাহাকে বলিলেন, “সামওয়েলি, ছদ্মবেশে তােমাকে প্রথমে চিনিতে পারি নাই, তােমার বাহাদুরী আছে। তুমি শীঘ্র ফিরিয়াছ দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইয়াছি , আশা করি কোন নূতন খবর দিতে পারিবে। সামওয়েলি বলিল, “হাঁ, কিছু কিছু নূতন খবর সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছি বৈ কি। আমি অমেদ বেন্-হাসেনকে দেখিয়া আসিয়াছি, সেই কুত্তির বাচ্চা কি মতলব আঁটিয়াছে, তাহাও জানিতে পারিয়াছি।” স্পরফিল্ড বলিলেন, “বটে ---তাহার বােটনি এখন কোথায় নােঙ্গর কুরিয়াছে ?” সামওয়েলি বলিল, “তাহার ‘ধাও' (বােট) মাজাজিম উপসাগরে নোঙ্গ , করিয়া আছে।” উডলে বলিলেন, “সে যে মােজাম্বিক হইতে বহুদূর। সে এই অঞ্চল হইতে যাত্রা না করিয়া মাজাজিম উপসাগরে আজ্ঞা/ইয়াছে কেন বলিতে . চতুর্থ পরিচ্ছেদ ৪৫ পার? আমি তার গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াছি ইহা কি সে জানিতে। পারিয়াছে ? সামওয়েলি বলিল, “ইংাজের জাহাজ তাহার ‘ধাও আক্রমণ করিতে পারে, এই ভয়ে সে মুহিবিদিতে (মােজাম্বিকে) আসে নাই।” সামওয়েলির কথা শুনিয়া ডডল অতান্ত উৎকণ্ঠিত হইলেন , সে যদি মােজাম্বিকে না আসে, তাহা হইলে উহার সকল চেষ্টা বিফল হইবে। উড়লে ব্যগ্রভাবে সাম ওয়েলিকে বলিলেন, “মেদ হােসেন কি আমার মতলব জানিতে পারিয়াছে ? সামওয়েলি মাথা নাডিয়া বলিল, “ হুজুর, তাহা জানিতে পারে নাই , তবে সে এ সন্ধান পাইয়াছে যে, ইংরাজ মুহিবিদিতে উপস্থিত হইয়াছেন।” ডডলে বলিলেন, “আমি এখানে আসিয়াছি তাহা সে কিরূপে জানিতে পারিল ?* সামওয়েলি বলিল, “তাহা জানি না হুজুর!তবে সে যে ইহা জানিতে পারিয়াছে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। খােদার ফজলে আমরা এই কুত্তাটাকে ‘জবে’ করিব, এ কথা স্থির জানিবেন। হুজুর কি এখনও তাহার ‘ধাও’ ধরিতে সাইবার জন্য উৎসুক আছেন ? মিঃ ডড়লে বলিলেন, “হাঁ, তোমার কথা শুনিয়া ও আমার সকল ত্যাগ করি নাই। কিন্তু আমি এখানে আসিয়াছি শুনিয়া সে ত আর এ অঞ্চলে আসিতেছে না, এ অবস্থায় কিরূপে আমার আশা পূর্ণ হইবে ? সামওয়েলি বলিল, “আমি এখানে আসিতে-আসিতে সে কথা চিন্তা করিয়াছি , উপায়ও স্থির করিয়াছি। এই আমেদ বেন্-হাসেনটা একটা বেয়াকুক, বেয়াকুফের বেটা বেয়াকুফ। সে মনে করে তাহার মত। চতুলােক দুনিয়ায় আর কেহ নাই , কিন্তু শীঘ্রই সে জানিতে পারিবে— তার অপেক্ষাও চতুর লােক আছে। সে যখন তাহার ‘ধাও’ লইয়া যাত্রা করিবে—তখন সে দশজন খালাসী নইবে, আমি যে তাহায় খালাসীদের মধ্যে ৪৬ নাবিক-বধু একজন, তাহা সে বুঝিতে পারে নাই , কিন্তু আমাকে অতি সাবধানে এই কাযটি লইতে হইবে, নতুবা সকল চেষ্টাই বৃথা হইবে।” ডডলে বলিলেন, তুমি বেশ ভাল কথাই বলিয়াছ , কিন্তু আমি কি কৌশলে তাহার সঙ্গ লইব, তাহা ত বলিলে না।” সামওয়েলি বলিল, “সেজন্য আপনি চিন্তা করিবেন না, আমি সমস্ত ঠিক করিয়া দিব। আমেদ বে-হাসেন অদৃষ্টবাদী, তাহার কুসংস্কারের অন্ত নাই। ইহা আমাদের পক্ষে বড়ই সুবিধার কথা। আরবদের বিশ্বাস, যে সকল লােকের মাথা খারাপ, তাহাদের দেখিলে যাত্রা সফল হয় , আমেদেব ও এইরকম সংস্কার আছে।” ডডলে স্পরফিল্ডকে বলিলেন, “ব্যাপারখানা কতকটা বুঝিতে পারিতেছি। শুনিয়াছি আরবেরা কোন কার্যসিদ্ধির উদ্দেশ্যে যাত্রা করিবার সময় যদি পথিমধ্যে কোন উন্মাদ বা বিকৃতমস্তিষ্ক লােককে দেখিতে পায়, তাহা হইলে মনে করে তাহার আশা পূর্ণ হইবে। সামওয়েলি বােধ হয় সেই কথাই বলিতেছে।'—অনন্তর তিনি সামওয়েলিকে বলিলেন, “তুমি কি আমেদ বেন- হাসেনকে এ কথা বলিয়াছিলে ? সামওয়েলি বলিল, “হ। হুজুর, আমি দরবেশের ছদ্মবেশে সেই কুত্তাব সহিত দেখা করিয়াছিলাম , তাহাকে বলিয়াছি যাত্রাকালে কোন দেওয়ানব সহিত সাক্ষাৎ হইলে তাহার কার্যসিদ্ধি। আমাদের মতলব হাসিল করিবার জন্যই এই চাল চালিয়াছি।” উড়লে বলিলেন, “তুমি খুব ভাল চাল চালিয়াছ, ইহা অপেক্ষা ভাল ফন্দী আর কিছুই নাই , সামওয়েলি, তুমি বড় বুদ্ধিমান। তোমার মতলব বুঝিয়াছি, এবি পাগল সাজিয়া তাহার সম্মুখে ৰাই-ইহাই বােধ হয় তােমার ইচ্ছা। কিন্তু আমি কি করিয়া পাগল সাজিব? মিঃ শরফিল্ড, আপনি কোন উপ স্থির করিতে পারেন ? মিঃ স্পন্ডি বুলিলেন,“চতুর সামওয়েলিই সে কথা তােমাকে বলিয়া দিবে। এসকল বিষয়ে তার মাথা খুব পরিষ্কার।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ ৪। । পারিব। উড়লে সামওয়েলিকে এই প্রশ্ন কৰিলে সে বলিল, “কাষটা আপনার পক্ষে কিছুমাত্র কঠিন হইবে না, কিন্তু হুজুর যদি আরবী না জানেন, তাহা হইলে মুস্কিলের কথা বটে।” ভড়লে বলিলেন, “আমি আরবীতে কথা কহিতে পারি বটে, কিন্তু আমে বোসেনের মত তাড়াতাড়ি বলিতে পারি না, তবে পাগলের মুখ দিয়া যতটুকু আরবী বাহির হইতে পারে--তাহা কি করিতে হইবে ?” সামওয়েলি বলিল, “কোৱাণের কোন ‘বয়েং আপনার মুখস্ত আছে কি?” ডডলে তৎক্ষণাৎ আসল মৌলবীর মত দুলিতে-দুলিতে কোরাণের একটি বয়েৎ আবৃত্তি করিলেন। বয়েটি তিনি এরূপ শুদ্ধরূপে উচ্চারণ কৰিলেন যে, সামওয়েলি তাহাকে বাহবা না দিয়া থাকিতে পারিল না, মিঃ স্পরফিল্ড বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন , তাহার পর বলিলেন, “তুমি ত চমৎকার অভিনয় করিতে শিখিয়াছ। কোথায় শিখিলে? উড়লে বলিলেন, “কায়রো নগরে। আমি সেখানে মধ্যে মধ্য ভিক্ষাজীবি দরবেশদের গান শুনিতাম, এবং তাহা লিখিয়া লইয়া মুখস্ত করিতাম ।-কেমন সামওয়েলি ঠিক হইয়াছে ত?” সামওয়েলি বলিল, “ই। হুজুর, ইহাতেই চলিবে।-এখন ভােল বদলাইবার কি ব্যবস্থা হইবে বলুন। পােযাক আর চামড। এই দুইটিই বদল করা আবক।* ডডলে সবিস্ময়ে বলিলেন, “চামড়া বদল করিতে হইবে ?-ইহা ত সম্ভব নহে। সামওয়েলি বলিল, “ওয়াজুজুর (ইংরাজের) চামড়া বড শাদা, শাদা চামুচ লইয়া আপনি কিরূপে আমেদ বে-হাসেনের-ধাও’র উপর উঠিবেন ? পড়িবেন যে। আপনার রঙ কালো করিতে হইবে, এবং আরবের ছদ্মবেশ ধারণ করিতে হইবে।” উড়লে হাসিয়া বলিলেন, 'আমাকে পাগলা আৱৰ সাজিতে হইবে;

১৮ নাবিক-বধু ৮ ৫ 'তুমি কি আমাকে সাজাইতে পারিবে ?-রঙ চাই, পােক চাই, সে সকল ত জোগাড় করিতে হইবে। সামওয়েলি বলিল, “এ আর শক্ত কাষ কি? সে সব আমার কাছেই আছে, জামি সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছি , সামওয়েলি তৎক্ষণাৎ তাহার বোঁচকা খুলিয়া একটি ছিন্ন ও বিবর্ণ পবি- ছদের পুটুলি বাহির করিল, তাহার পর একটা বােতল বাহির করিল , বােতলে এক রকম কালো কারোক ছিল।—এই জিনিসগুলি সে ডডলের পদ- প্রান্তে রাখিয়া দিল। ডড়লে বলিলেন, “ছদ্মবেশ ধারণের ব্যবস্থা ত কৰিলে, কিন্তু অন্যান্য ব্যবস্থাও করিতে হইবে। আমেদ হােসেনের ‘ধাও’ যেখানে আছে—আমি সেথানে কিরূপে যাইব ? আর কিরূপেই বা তাহার অলক্ষ্যে সেই বােটে উঠিব ? সামওয়েলি বলিল, “একটা উপায় আছে। আপনি সমুদ্রের কূলে-কূলে চলিয়া ধার নিকট উপস্থিত হইবেন, এবং ধাও’খানি যখন নােঙ্গর তুলিবে তখন সাতাৱ দিয়া তাহাতে উঠিবেন। আমেদ বে-হাসেন খোদার দোয়া প্রার্থনা করিবে , আপনাকে তাহার ধাওর উপর দেখিলেই সে বুঝিবে, শালা তাহার প্রার্থনায় কর্ণপাত করিয়াছেন। আমি সে সকল ব্যবস্থা করিব।” মিঃ স্পরফিল্ড বলিলেন, “ওখান কোন্ সময়ে নােঙ্গর তুলিবে,অগ্রে তাহা জানা আবশ্যক , তদনুসারে উনি এখান হইতে যাত্রা করিবেন। সামওয়েলি বলিল, “সকালে বাতাস উঠিলে ধাও’ ছাডিবে।” মিঃ ডড়লে বলিলেন, “উত্তম , ঠিক সময়ে আমি সেখানে হাজির থাকিব। এখ'আর একটা কথা জানিতে চাই, অস্ত্রশস্ত্র কিছু সঙ্গে থাকা আবশ্যক, হাের কি ব্যবস্থা হইবে? আমেদ বেন্ হাসেন জাহাজ হইতে মালগুলি ধাও’ উপর তুলিলে আমাদের অন্ত্রের আবশ্যক হইবে।-তুমি বন্দুক চালাইতে জান? মিঃ স্পরফিল্ড বলিলেন, “সামওয়েলি পাকা গােলন্দাজ।—উহার লক্ষ্য ব্যর্থ। উহার হস্তে অনায়াসেই বন্দুক দিতে পার।” !

চতুর্থ পরিচ্ছেদ ডডলে বলিলেন, “তাহা হইলে এখনই উহাকে একটা বন্দুক দিয়া রাখি, ধাও’র উপরে গিয়া পুনৰ্বাৰ উহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইবে, তৎপূৰ্ব্বে । দেখা হইবার সম্ভাবনা নাই।” মিঃ ডড়লে তৎক্ষণাৎ একটি কক্ষে প্রবেশ করিয়া একটি উৎকৃষ্ট পিস্তল ও কতকগুলি টোটা লইয়া আসিলেন, এবং তাহা সামওয়েলির সম্মুখে রাখিয়া বলিলেন, “এগুলি তুমি লইয়া যাও , বেল্-হাসেন যেন জানিতে না পারে যে- তােমার কাছে হাতিয়ার আছে। খুব গােপনে রাখিবে। আমাদের আত্মরক্ষার জন্যও অস্ত্র-শস্ত্রের আবশ্যক হইতে পারে।” স্পরফিল্ড বলিলেন, “পরমেশ্বর তােমাকে নিরাপদে রাখুন। তুমি নির্বিঘ্নে জাঞ্জিবারে উপস্থিত হইয়াছ, এ সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত আমার মন স্থির হইবে না। সামওয়েলি, তুমি যদি কায হাসিল করিতে পার—তাহা হইলে তােমাকে অন্নবন্ত্রের জন্য আর কখন ভাবিতে হইবে না , একদম্ বড় লােক হইয়া বাইবে। কিন্তু যদি বিশ্বাসঘাতকতা কর—তাহা হইলে তোমার খােদাও তােমাকে রক্ষা করিতে পারিবেন না। খুব হুসিয়ার থাকিবে। নিমকহারামী করিলে কি রকম শান্তি পাইতে হয়, তাহা ত জান , বেনার কথা কি এত শীঘ্র ভূলিয়াছ ?” সামওয়েলি বলিল, “না, সে কথা ভুলি নাই , আপনাদের কোন ভয় নাই। আমেদ বে-হাসেন আমার কিরূপ শত্রু তাহা আপনারা জানেন না, তাহাকে জব্দ করিবার জন্যই আমি আপনাদের সাহায্য করিতে যাইতেছি। তবে আর নিমকহারামীর ভয় করিতেছেন কেন ?—সে আমার ভাইকে খুন করিয়াছে , আমি তাহাকে খুন করতে না পারিলে আমার মন স্থির হইবে না। আপনার দোস্ত মুহিবিদিতে ফিরিয়া আসিলে আপনি আমার বকশিশের ব্যবস্থা কবিধে, কন্তু স্থির জানিবেন, আমি বশিশের লােভে এ কাষে হাত দিই নাই প্রতিহিংসার আগুনে আমার কলিজা জ্বলিয়া যাইতেছে। * মিঃ স্পরফিল্ড বলিলেন, “তােমার কথা আমি বিশ্বাস করিলাম। যে অঙs অঙ্গ; চারের প্রতিফল দিতে না পারে সে কি মানুষ?

৫০ নাবিক-বধু • সামওয়েলি তাহাদের নিকট বিদায় গ্রহণ করিলে তাহারা নিস্তব্ধভাবে ধূমপান করিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ পরে মিঃ স্পরফিল্ড ডড লেকে বলিলেন, “ডডলে, তুমি ত সকল কথা শুনিলে, কাটা কত বড় বিপজ্জনক তাহাও বেশ বুঝিতে পারিয়াছ , এখন বল, এ সকল জানিয়া-শুনিয়াও কি এই কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতে তােমার আগ্রহ হইতেছে ?” উড়লে সােৎসাহে বলিলেন, “নিশ্চয়ই। আপনি কি মনে করেন—আমি যে ভার গ্রহণ করিয়াছি, প্রাণভয়ে তাহা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইব ? আমাকে সেরূপ কাপুরুষ মনে করিবেন না। বিপদই পুরুষের ভাগ্য-পরীক্ষার কষ্টি- পাথর। স্পরফিল্ড বলিলেন, “খুব সাবধানে থাকিও, অতিরিক্ত উৎসাহ প্রকাশ করিতে গিয়া অনর্থক বিপন্ন হইও না। আমেদ বেন-হাসেন অত্যন্ত নির, অতি ভীষণ প্রকৃতির লােক , যদি তােমার প্রতি তাহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়, তা হইলে সে অসঙ্কোচে তােমাকে হত্যা করিবে। মশা মাছি মারিতে যত- টুকু বিলম্ব হয়—সে ততটুকুও বিলম্ব করিবে না।” উড়লে বলিলেন, “তাহা আমি জানি , জানি বলিয়াই আমি যথাসাধ্য দক্ষতার সহিত পাগলের অভিনয় করিব। আশা করি তাহাতে কৃতকার্য হইব।” স্পরফিল্ড বলিলেন, “তােমার কথা শুনিয়া আশ্বস্ত হইলাম। বিদায়। তুমি শয়ন করিতে যাও, কিন্তু আমাকে অনেক রাত্রি জাগিতে হইবে, হাতে বিস্তর কায় আছে।” ডডলে স্পরফিল্ডের নিকট বিদায় লইয়া শয়ন করিতে চলিলেন। এখন পঞ্চম পরিচ্ছেদ । মিঃ উড়লে তাহার সামরিক পরিচ্ছদ কেপ টাউনে তাহার জাহাজে রাখিয়া আসিয়াছিলেন, তাঁহার সাধারণ পৰিচ্ছদও মােজাম্বিকে কন্সলের বাড়ীতে তঁাহার ব্যাগের ভিতর আবদ্ধ ছিল। তিনি ছদ্মবেশে মাজাজিম উপসাগরের কুলে আসিয়া দাড়াইলেন , তখন তাকে ইংরাজ বলিয়া কাহাচিনিবার সাধ্য ছিল না। তাঁহার দেহে ফকিরের পরিচ্ছদ, তাহার সৰ্বাঙ্গ কৃষ্ণবর্ণ। —তিনি উন্মত্ত ফকির সাজিয়া সমুদ্রকূলে আসিয়া দাঁড়াইলেন , সমুদ্রের অবিরাম স্কুলকল্লোল তঁাহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতে লাগিল। কোন দিকে অন্য কোন শব্দ নাই , কোন দিকে জনপ্রাণীর সমাগম নাই। ডড়লের বােধ হইল, তিনি আনন্দ ও আলােকপূর্ণ সুখস্মৃতির আগারস্বরূপ পুরাতন জগতের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া কোনও এক অপরিজ্ঞাত, উদ্বেগ-আতঙ্ক-সমাকুল নূতন জগতের সিংহদ্বারে আসিয়া দণ্ডায়মান হইয়াছেন—তিনি যতই সাহসী ও ধীর প্রকৃতির লােক হউন, সে সময় তাহার মন বে অত্যন্ত চঞ্চল ও উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছিল—এ কথার উল্লেখ বাহুল্যমাত্র। তাঁহার তখনকার মনের ভাব ভাষায় প্রকাশের চেষ্টা করা বাতুলতা মাত্র। পাগলের অভিনয় করিতে উদ্যত হইয়া তিনি প্রায় পাশলের মতই হইয়াছিলেন, কিন্তু এই সঙ্কটময় মুহূর্তেও মিস একাইনের মনােহারিণী মূর্তি তিনি ভুলিতে পারিবেন না, তাহার মনে হইল, “মিস এরাইন যদি এ সময় আমাকে দেখিতেন—তাহা হইলে তিনি নিশ্চয়ই আতঙ্কে অভিভূত হইতেন।—যাহা হউক, জলে নামিলে আমার ধুইয়া যাইবে না—ইহাই আমার সৌভাগ্য , নতুবা বােটে উঠিয়াই আমাকে ধৱা পডিতে হইত।” ‘ ধাও’থানি প্রায় দুই শত গজ দূরে নােঙ্গর করিয়াছিল। মিঃ ডডলে এস। ‘ধাও’ লক্ষ্য করিয়া জলে সাঁতার দিতে লাগিলেন। তার স্থায় সন্তরণ।

নাবিক-বধু বলিষ্ঠ যুবকের পক্ষে দুই শত গজ সন্তরণ কিছুমাত্র কঠিন নহে , কিন্তু তাহাতে যথেষ্ট বিপদের আশঙ্কা ছিল, কারণ উপসাগরটি অসংখ্য হাঙ্গরে পূর্ণ , বিশেষতঃ রাত্রিকাল।-হাঙ্গরের উদরে প্রবেশ করিতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। • ভড়লে অনেকক্ষণ পর্যন্ত সাঁতার দিয়া ধাও’খানির পাশে উপস্থিত হইলেন। তিনি লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, নােঙ্গরের কাছে পাহারার কোন বন্দোবস্ত নাই , ইহাতে তিনি অপেক্ষাকৃত নিশ্চিন্ত হইলেন, এবং অতি কষ্টে ধাও’র উপর আরােহণ করিলেন। অতঃপর তিনি সিক্তবস্ত্রে ধাওর এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া, কোথায় লুকাইবেন তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। ধাওখানি ক্ষুদ্র নহে, একখানি ছােট জাহাজ বলিলেই চলে , তাহা এক শত টন মাল বহিতে পারে। তাহার দুইটি মাস্তুল। ডড়লে সাবধানে দুই চারি পদ অগ্রসর হইলেন, কিন্তু মাঝি-মাল্লা একজনকেও দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি ধীরে ধীরে ডেকের উপর আসিলেন , সামওয়েলি কোথায়, এবং সে তার আগমন লক্ষ্য করিয়াছে কি না, তাহা তিনি বুঝিতে পারিলেন না। তিনি অত্যন্ত চঞ্চল হইলেন, বুঝিলেন, বদি দৈবাৎ ধরা পড়েন, তাহা হইলে আর রক্ষা নাই । সামওয়েলির সহিত কোথায় কিরূপে তাহার সাক্ষাৎ হইবে, তাহা অনুমান করিতে না পারিয়া তাহার উৎকণ্ঠা বর্ধিত হইল। তখন আর রাত্রি ছিল না। নৈশ-অন্ধকার ক্রমে তরল হইতে লাগিল, এবং প্রভাতকরা সৰ্ব্বরীর পাণ্ডুর আভা ক্রমে হ্রাসপ্রাপ্ত হইয়া উষার আলােকে চতুর্দিক ধীরে-ধীরে আলােকিত হইতে লাগিল। আকাশে যে কয়েকটি ক্ষীণ। প্রভ নক্ষত্র দেখা যাইতেছিল,তাহারা একে একে অদৃশ্য হইল , এবং পূৰ্বাকাশের বর্ণ প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তিত হইতে লাগিল। অবশেষে পূৰ্ব্বগগন নানাবণে সুরত করিয়া দিবাকরের হিরন্ময় কিরীটের উজ্জ্বল আভা দিগন্তে প্রসারিত 'ল। প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গে বাযুবেগ প্রবল হইল। বায়ুবেগে ধাওখানি । ল। দুলিতে আরম্ভ করিল। তাহা লক্ষ্য করিয়া নীচের ডেক হইতে কে একজন অপ্পোখিতের ন্যায় জডিতরে—সেলিম, নবক্স, কেফাৎ—প্রভৃতি মাল্লাদের নাম । মিয়া ডাকাডাকি করিতে লাগিল।--তাহার আদেশে মাল্লারা একে একে পঞ্চম পরিচ্ছেদ তাহার নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল , এবং তাহার ইঙ্গিতে সকলে পশ্চিমান্ত হইয়া নমাঙ্গে বসিল। মাঝি-মাল্লাদিগকে নমাজে প্রবৃত্ত দেখিয়া মিঃ ডড়লে মনে করিলেন, তাহা দের সম্মুখে হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করিবার ইহাই উৎকৃষ্ট অবসর। তাহারা নমাজ শেষ করিয়া উঠিবে—এমন সময় মিঃ ডড়লে জাহাজের উপরের ডেকে দণ্ডায় মান হইয়া মাল্লার মহিমাপক একটি ‘বয়ে’ উচ্চৈঃস্বরে আবৃত্তি করিতে লাশ লেন , সঙ্গে সঙ্গে তাহার উভয় হস্ত মাথার উপর সবেগে ঘুরিতে লাণি না। মাঝি মাল্লরা তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া ক্ষণকাল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হন দীর্ঘ ভাবে বসিয়া রহিল।—তাহার পর তাহাকে দেখিবার জন্য সেইৗক্ষিণ কূলে প্রসারিত করিল। তাহারা দেখিল, একটা পাগল ডেকের উপর হইল। তারস্বরে কোরাণ-সরিফের ‘বয়েৎ আওডাইতেছে।লােকটা কিরূকে ঘণ্টার উপর আসিল--তাহারা তাহা স্থির করিতে পারিল না।—পাগলটার সহিত কি, তাহার আকস্মিক আবির্ভাবের কি ফল—এতৎসম্বন্ধে তাহারা তর্কয়েলি করিতেছে, এমন সময় একটি বৃদ্ধ একটা কামরা হইতে বাহির হইয়া তাহাদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। বৃদ্ধ হইলেও লােকটা যে বেশ বলবান—তাহা বুঝিতে ডডলেব বিলম্ব হইল না। তাহার চক্ষু দুটির দিকে চাহিয়াই তিনি বুঝিতে পারিলেন, লােকটা অত্যন্ত ক্রর প্রকৃতি ও চতুর।–এই ব্যক্তিই ধে আমেদ বে-সেন, এ সম্বন্ধে তাহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রহিল না। তিনি মাথার উপর হাত ঘুরাইতে ঘুরাইতে পুনৰ্ব্বার আর একটি বয়েৎ তার স্বরে আবৃত্তি করিলেন। তাহার পর তিনি লাফাইতে-লাফাইতে আমেদ বে-হাসেনের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাহার পদপ্রান্তে নিপতিত হইলেন। তিনি অভিনয়ের চরমােৎকর্ষ প্রদর্শন কবিলেও তাহার বুকের মধ্যে কপিতেছিল , কারণ বুঝিছিলেন, যদি সেই ধূর্ত আরব কোনরূপে তাহার প্রতারণা বুঝিতে পারে তাহা হইলে মুহূৰ্তমধ্যে তাঁহার প্রাণান্ত হইবে।—তিনি তৎক্ষণাৎ উঠিয়া বসি 'লেন, এবং সম্মুখে ঝুকিয়া পড়িয়া ঘন-ঘন শিরঃসঞ্চালন করিতে করুিতে কোরাণের বয়েৎ আবৃত্তি করিতে লাগিলেন।

৫৪ সন্স করিয়া নাবিক-বধূ * আমেদ হোসেন এই দৃশ্য দেখিয়া কিয়ৎকাল স্তম্ভিতভাবে দাড়াইয়া রছিল, তাহার পর ছদ্মবেশী ডডলেকে জিজ্ঞাসা করিল, “তুই কোথা হইতে আসিয়াছিস্? আমার এই ধাওর উপরেই বা কি করিয়া আসিলি ?” পাগল বলিল, “কাহার হুকুমে লম্বা ঘাসের ভিতর দিয়া বাতাস বহিয়া যায় ? বােকা লােকের মুখ দিয়া কে জ্ঞানের কথা বাহির ইহান ?-খানা দে ও সাহেব, বড় ভুব লাগিয়াছে। আল্লা তােমার মঙ্গল আরাে , তুমি যেখানে যাইবে—তােমার নসিবে সােণা ফলিবে।” কোথায় লুক বুঝিলেন, সামওয়েলির কথা সত্য। তাহার কথা শুনিয়া আমেদ ছােট জাহাজর মুখ প্রফুল্ল হইল , সে বুঝিল, তাহার শুভযাত্রার নিদর্শন স্বরূপ দুইটি মাস্তুল পাগলটাকে আসমান হইতে তাহার ধাওর উপর নামাইয়া একজনকে আসিলেমেদ বে-হাসেন ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া বলিল, “আমি তােমাকে না, দিব, আশ্রয়ও দিব , আমার মনের বাসনা পূর্ণ হইলে তােমার সকল কৰিব। কিন্তু যদি আমার অমঙ্গল হয়, যদি তোমার কথার খেলাপ হয়, তাহা হইলে আমি তােমাকে জবে’ করিব।” ডডলে তাহার কথায় কর্ণপাত না করিয়া পূৰ্ব্ববৎ শিরসঞ্চালন পূর্বক কোরাণের আর একটি ‘বয়েৎ' আবৃত্তি করিতে লাগিলেন। তিনি মনে মনে খুসী হইলেও তাহার মানসিক চাঞ্চল্য দূর হইল না। কার্যোদ্ধারের যে এখনও অনেক বিলম্ব। ইতিমধ্যে কখন্ কি বিপদ ঘটিবে কে বলিতে পারে ? বায়ুর বেগ ক্রমেই প্রবল হইতেছে দেখিয়া, আমেদ হােসেন পাল তুলিয়া দিতে বলিল।-মাঝি-মাল্লারা নােঙ্গর তুলিয়া ধাও’র পাল খাটাইয়া দিল ধাওখানি হেলিয়া-দুলিয়া মুক্ত সমুদ্রের অভিমুখে অগ্রসর হইল । ভূলে ধাওর গন্তব্য-পথ লক্ষ্য করিয়া বুঝিলেন, তাহা জাঞ্জিবারের দিকে লিয়াছে। অনুকূল বায়ুপ্রবাহে ধাওখানি অতি দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল। ডলে যেখানে বসিয়া ছিলেন, সেখান হইতে উঠিলেন না , একইভাবে । গন্ধা নাড়িয়া কথন উচ্চৈঃস্বরে কথন-বা বিড়বিড় করিয়া বয়েৎ' আবৃত্তি অভাব দূর } } পঞ্চম পরিচ্ছেদ সে কয়েক ঘণ্টার করিতে লাগিলেন। আমেদ বেনের আদেশানুসারে কতকগুলি খাদ্যদ্রর তাহার সম্মুখে আনীত হইল , কিন্তু তিনি তৎপ্রতি দৃষ্টিপাতও করিলেন না। —তিনি সামওয়েলির সহিত সাক্ষাতের আশায় কয়েকবার আডচক্ষে ইতস্ততঃ চাহিলেন, কিন্তু তাহাকে একবারও দেখিতে পাইলেন না। মধ্যাহ্নে একবার মাত্র তিনি তাহাকে দেখিতে পাইয়াছিলেন। সে ছদ্মবেশে থাকিলেও তিনি তাহাকে চিনিতে পারিলেন, কিন্তু যে কারণেই হউক, সে তাহার সহিত কথা কহিল না। তাহাকে চিনিতে পারিয়াছে এরূপ ভাবও প্রকাশ করিল না। —তিনিও কোনরূপ আগ্রহ প্রকাশ করিলেন না। সায়ংকালে ধাওনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া পন্থা উপসাগরে প্রবেশ করিল। ইহার দক্ষিণ কূলে ‘নিয়ামজেজি’ নামক পল্লী। রাত্রির মত সেইস্থানে নােঙ্গর করা হইল। আমেদ হােসেন ধাও' হইতে নামিয়া তীরে উঠিল। মধ্যে ধাও’য়ে ফিরিল না। এই অবসরে মিঃ ডড়লে সামওয়েলির সহিত সাক্ষাতের সুযােগ পাইলেন।—তিনি যেখানে বসিয়াছিলেন, সামওয়েলি ধীরে ধীরে সেই স্থানে আসিয়া দাঁড়াইল। মিঃ ডড়ল কোরাণের বয়েৎ আবৃত্তি করিতে করিতে সামওয়েলির মুখের দিকে না চাহিয়াই নিম্নস্বরে বলিলেন, “আমেদ বেন আমাকে সন্দেহ করে নাই ত?” সামওয়েলি বলিল, “না , আপনার কোন চিন্তা নাই। কোন ইংরাজও ঠাহর করিতে পারিবে না যে, আপনি ইংরাজ।” মিঃ ডড়লে বলিলেন, “আমেদ বে-হাসেন কি ঠিক করিয়াছে, বল। বােট কখন নােঙ্গর তুলিবে ? কোথায় বা জাহাজের সঙ্গে দেখা হইবে ?” সামওয়েলি বলিল, “কাল সকালে নােঙ্গর ভােলা হইবে। পরদিন-মালে কমােরর দ্বীপের উত্তরে রাধাকুতে সেই জাহাজের সঙ্গে আমাদের দেখা হইলে • মিঃ ডড়লে বলিলেন, “পরশু ? আচ্ছা , পিস্তলটা তােমার সঙ্গে আছে ত? সামওয়েলি বলিল, “ঠিক আছে, আমি সুযােগ খুজিতেছি।আমি এখন যাই, অধিক বিলম্ব হইলে সন্দেহ করিতে পারে। সেলাম।”

৫৬ নাবিক-বধু ডউলে বলিলেন, “সেলাম। আবার সুযােগৰত দেখা করি। অল্পক্ষণ পরে আমেদ বেন্হাসেন সেই স্থানে উপস্থিত হইল।-সে মুসলমান হইলেও মুসলমান ধর্মের বিধি-নিষেধ পালন করিত না , সে মদ্যপান করিয়া টলিতে লাগিল। পা যে কোথায় পড়ে, তাহার স্থিরতা নাই। পরদিন প্রত্যুষে ধাওখানি নােঙ্গর তুলিয়া গন্তব্য পথে যাত্রা করিল। অদূরে কমােরো প্রদেশের তীরভূমি দুর্গম অরণ্যে সমাচ্ছন্ন। এই প্রদেশ ফরাসী,গমেন্টের অধিকারভুক্ত হইলেও স্থানীয় সুলতানের স্বাধীন নরপতি ন্যায় রাজত্ব করিতেন। স্থানীয় লােকের নৌকা লইয়া জাঞ্জিবার হইতে মােজাম্বিকের উপকূল পর্যন্ত ভূভাগে বাণিজ্য করিত। বড় বড় জাহাজ এ অঞ্চলে মাসে একবার মাত্র আসিত , কিন্তু তাহা মেয়টা ভিন্ন অন্য কোন বন্দরে ভিভিত না। রাসবাকু কমােরো দ্বীপের উত্তরাংশে অবস্থিত। এই স্থানটি পৰ্বতময়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আগ্নেয়গিরি সেখানে অনেক ছিল। সেইদিন সায়ংকালে নৈশ-ভােজন শেষ করিয়া আমেদ বে-হাসেন ছদ্মবেশী ডড লেকে ডাকিয়া পাঠাইল।—তিনি আমেদ বেনের সহিত দেখা কৰিতে চলিলেন। তিনি মনে মনে বলিলেন, “আমি যদি আরবী ভাষায় ভাল করিয়া কথা কহিতে না পারি, তাহা হইলে এ বেটা আমাকে সন্দেহ করিবে , একটু সন্দেহ হইলেই ত সর্বনাশ।—কাল রাত্রি পর্যন্ত উহার সহিত আমার দেখা না হইলেই ভাল ছিল।” উড়লে আমেদ হোসেনের কামরায় প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সে একখানি গালিচার উপর বালিশে ঠেস দিয়া বসিয়া আছে। সে উড়ালকে সাদরে আহ্বান করিয়া তাহার পাশে বসিতে বলিল। ফলে আরবীতে বলিলেন, “খােদাতালা আমেদ বেল্-হাসেনের মঙ্গল ন। তাহার ছেলেমেয়েরা সুখে থাক, তাহার শত্রুরা উচ্ছন্ন যাউক , আর বাহারা আমেদ বে-হাসেন বলিল, “থামরে পাগলা, খাম।আগে বল তুই কে,, «র কোথা হইতেই বা আসিতেছি।”

পঞ্চম পরিচ্ছেদ . কিন্তু ডড়লে কোন উত্তর দিলেন না, তিনি প্রথমে মনে করিয়াছিলেন, নিজের ও তাঁহার পিতার কল্পিত নাম বলিবেন , বাসস্থানও যেকোন একটা যায়গায় বলিবেন। কিন্তু হঠাৎ তাহার মনে হইল, আমেদ বেন্ যদি সেই অঞ্চলের লােক হয়—তাহা হইলে পরিচয় লইয়া গােল বাধিতে পারে , म জেরা আরম্ভ করিলেই সর্বনাশ।সুতরাং তিনি পাগলামির ভাণ করিয়া প্রলাপ-বাক্য উচ্চারণ করাই সুসঙ্গত মনে করিলেন । আমেদ বেনু-হাসেন তাঁহাকে নানা কথা জিজ্ঞাসা করিয়া কোন সদুত্তর পাইল না, তখন সে বিরক্ত হইয়া তাহাকে বিদায় করিয়া দিল।—তিনি স্বস্থানে উপস্থিত হই অন্যের অলক্ষ্যে গােপনে কিছু আহার করিলেন।-সামওয়েলি তাহাকে গােপনে কিছু খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করিয়া দিয়াছিল। জাহাজের মাঝি-মাল্লারা জানিত, এই পাগলাটা কিছুই খায় না, কেবলই খাদার নাম কীর্তন করে।—এজন্য তাহার প্রতি তাহাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি শতগুণ বর্ধিত হইয়াছিল। তাদের ধারণা হইয়াছিল, পাগলাটা নিশ্চয়ই কোন ছদ্মবেশী পীর। সুতরাং তাহাদের কেহই তাহাকে বিরক্ত করিতে সাহস করিল না। পরদিন মধ্যাহ্নকালে কমােরাে দ্বীপের তীরভূমি পরিলক্ষিত হইল। অবশেষে ধাওখানি রাধাকুর সন্নিহিত হইল। আমেদ হােসেন গভীর জলে নােঙ্গর করিয়া তীরে উঠিল। সেই অবসরে সামওয়েলি উড়লের সহিত পরামর্শ করিতে আসিল। মিঃ ডড়লে সামওয়েলিকে বলিলেন, “কাল সকালে ষ্টীমারখানি দেখা বাইৰে। সেই ষ্টীমারের মালপত্র ‘ধাও'র উপর নামাইয়া লওয়া হইলে ষ্টীমার বন্দর ছাডিয়া চলিয়া যাইবে , তাহার পর আমাদের কাষ অরন্ত করিতে হইবে। মধ্যাহ্নে যখন তাহার খানায় বসিবে—সেই সময়ই উৎকৃত সুয়ােগ । আমাদের ত সন্দেহ করে নাই, ত সন্দেহ করে নাই, সুতরাং তাহারা নিশ্চিন্তমনে। বসিয়া গিলিবে—তুমিও তাহাদের দলে থাকিবে, কিন্তু আমার ইঙ্গিতন্তই। তুমি লাফাইয়া একেবারে হাতিয়ার বাহির করিবে; তাহাদিগকে ৮ ৫৮ - নাবিক-বধু বলিবেনডিয়াছিস কি মরিয়াছি।'—ইতিমধ্যে আমি আমেদ হােসেনকে বন্দী করিব।—আমার কথা বুঝিছ ?” সামওয়েলি মাথা নাডিয়া জানাইল, সে ঠিক বুঝিয়াছে। তাহার পর আরও “দুই-চারিটি কথার পর সামওয়েলি প্রস্থান করিল। ডডলে সেই অন্ধকার- কোণে একাকী বসিয়া চিন্তাকুলচিত্তে উদ্ধাকাশের অগণ্য নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে চাহি রহিলেন। তাঁহার হৃদয় নানা চিন্তায় আন্দোলিত হইতে লাগিল। পরদিন অতি প্রত্যুষে ‘ ধাও’র মাঝি-মাল্লারা ব্যস্তভাবে চারিদিকে ঘুরিতে লাগিল, যেন তাহারা কি একটা পরিবর্তনের প্রত্যাশা করিতেছে ।—আমেদ বোসেন অত্যন্ত ব্যস্তভাবে ঘন-ঘন সমুদ্রের দিকে চাহিয়া দাডি চুলকাইতে লাগিল ,কিন্তু তখনও নােঙ্গর উঠিল না। বেলা একটু অধিক হইলে সকলের আহার শেষ হইল। অনন্তর নোঙ্গর তুলিয়া ধাও’খানি পুনর্বার গন্তব্যপথে যাত্রা করিল। তখন আকাশ বেশ পরিষ্কার, সমুদ্র স্থির , সূর্যের উজ্জ্বল রশ্মিজাল সমুদ্রবক্ষে প্রতিফলিত হইতে- ছিল। অনুকূল বায়ূপ্রবাহে ‘ধাও’ তীরবেগে ছুটিয়া চলিল।হঠাৎ ‘ধাও'র উপর কে অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া উঠিল , সঙ্গে সঙ্গে ‘ধপ,”করিয়া একটা শব্দ হইল। মিঃ ডড়লে বিপদের আশঙ্কা করিয়া একটু সরিয়া দাড়াইতে-না- দাড়াইতে হঠাৎ যেন তাহার মস্তকের পশ্চাৎভাগে হাতুড়ীর ঘা পড়িল। ব্যাপার কি বুঝিবার পূৰ্ব্বেই তিনি সেই স্থানে নিপতিত হইলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাহার সংজ্ঞা বিলুপ্ত হইল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ মস্তকে গুরুতর আঘাত পাইয়া ডড়লে ধাও’র ডেকের উপর মূৰ্ছিত হইবা , পর দীর্ঘকাল পর্যন্ত তাঁহার চেতনা-সঞ্চার হইল না। সংজ্ঞালাভ করিয়া যিনি সৰ্ব্বাঙ্গে অসহ্য বেদনা অনুভব করিলেন। তিনি উঠিয়া বসিবার চেষ্টা কেিলন, কিন্তু উঠিতে পারিলেন না, দেখিলেন, তাহার হস্তপদ দৃঢ়রূপে বক্ষুবদ্ধ। উঠিয়া * বসা দূরের কথা, তাহার নডিবার পর্যন্ত সামর্থ্য নাই। তখন মধ্যাহ্নকাল অতীতপ্রায়, সূর্যকিরণ তাঁহার মুখের উপর পডিতেছিল। প্রখর রৌদ্র- সম্পাতে তিনি চক্ষুতে অসহ জ্বালা অনুভব করিলেন। সৰ্বাঙ্গ যেন পুডিয়া বাইতেছিল। তাহার জিহ্বা ফুলিয়া আড়ষ্ট হইয়া গিয়াছিল। তিনি মাথা তুলিবার চেষ্টা করিয়াও কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। তিনি বুঝিতে পারি- লেন, তিনি ছদ্মবেশে যে ধাও’র উপর ছিলেন, তাহা হইতে তাহাকে স্থানা- স্তরিত করিয়া একখানি ক্ষুদ্র নৌকায় স্থাপন পূৰ্ব্বক নৌকাখানি সমুদ্রে ভাসাইয়া দেওয়া হইয়াছে।—নৌকায় মাঝি-মাল্লা কেহই নাই, অকূল সমুদ্রে নৌকাখানি ভাসিয়া চলিয়াছে।—তিনি বুঝিলেন, ইহা আমেদ বেন্ হাসেনেরই কাৰ্য। সে কোনরূপে তাহার গুপ্ত অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া বৈরনিৰ্যাতনের চন্ত এই পন্থা অবলম্বন কবিয়াছে।কিন্তু সে তাহাকে সেই স্থানে হত্যা করিল না কেন? তাহা হইলে ত মুহূর্তে সকল যন্ত্রণার অবসান হইত। বােধ হয় এই ভাবে যন্ত্রণা দিয়া হত্যা করাই তাহার অভিপ্রেত। হঠাৎ তাহার মনে পডিল, মােজাম্বিকে কন্সলের গৃহে যে দিন রাত্রিকালে অজ্ঞাতনামা আততায়ী কতৃক • আক্রান্ত হন—সেই রাত্রে তিনি যে দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, সেই স্বপ্ন আজ সফল , হইয়াছে। তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, তাঁহার মৃতদেহ একথানি খােল। নৌকায় .. অকুল সমুদ্রে ভাসিয়া যাইতেছে এখন পর্যন্ত তাহার মৃত্যু হয় নাই বটে কিন্তু তাহার যে আর অধিক বিলম্ব নাই—ইহা অনুমান করা কঠিন হইল না। .

নাবিক-বধূ মিঃ ডডলে কাতরস্বরে বলিলেন, “হে পরমেশ্বর, আর আমাকে যন্ত্রণা দিও না, দয়া করিয়া এই মুহূর্তেই আমার জীবনান্ত কর। আর ত এ কষ্ট সহ্য হয় না। কিন্তু ইচ্ছা করিলেই ইহজীবনের অবসান হয় না, পরমেশ্বর তাহার প্রার্থনা পূর্ণ করিলেন না। তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করিতে লাগিলেন। সহসা নৌকাৰ খােলর ভিতর হইতে কে যেন অস্ফুটম্বরে আর্তনাদ করিয়া উঠিল । সেই আর্তনাদ তাহার শ্রবণবিবরে প্রবেশ করিবামাত্র তিনি সেই শব্দ লক্ষ্য করিয়া কাণ পতিয়া রহিলেন। তাহার মনে হইল, এই স্বর তাহার পরিচিত। কিন্তু সেই আর্তস্বর তিনি আর শুনিতে পাইলেন না, তখন ক্ষীণকণ্ঠে বলিলেন, “সামওয়েলি, তুমিও কি আমার মত এই নৌকায় বাধা আছ ?—সামওয়েলি।” ডডলের কণ্ঠস্বর সাম ওয়েলির কর্ণে প্রবেশ করিল, কিন্তু তাহার অবস্থা অধিকতর শোচনীয় হইয়াছিল , সে কোন কথাই বলিতে পারিল না, একবার গোঙাইয়া সাড়া দিল মাত্র।—ইহাতেই তিনি বুঝিতে পারিলেন, দুরন্ত আরব তাহাকে ও সামওয়েলিকে হাত-পা বাঁধিয়া এই নৌকায় তুলিয়া নৌকাখানি সমুদ্রে ভাসাইয়া দিয়াছে।-কয়দিন ধরিয়া তাহারা সমুদ্রে ভাসিয়া চলিয়াছেন কে বলিবে ?—উদরে অন্ন নাই, শরীর অতি দুর্বল, পিপাসায় ক শুষ্ক, হস্ত পদের বন্ধন এরূপ দৃঢ় যে, নডিবারও সামর্থ্য নাই , রজ্জ মাংস কাটিয়া বসিয়াছে, বন্ধন-স্থান ফুলিয়া উঠিয়াছে, শােণিত-সঞ্চালন রহিত হওয়ায় শিরাগুলি টন্টন করিতেছে, চক্ষু মেলিবারও শক্তি নাই। ডডলের মাথা ঘুরিতে লাগিল, বুদ্ধিভ্রংশ হইল , অবশেষে তাহার সংজ্ঞা বিলুপ্ত হইল। কিছুকালের জন্য সকল যন্ত্রণার অবসান হইল।—সাম ওয়েলির অবস্থা তাঁহার অবস্থা অপেক্ষাও শােচনীয় হইয়াছিল , দারুণ পিপাসায় অস্থির হইয়া সে ক্রমাগত জল জল করিয়া আর্তনাদ করিতেছিল। তাহার পর তাহারও চেতনা বিলুপ্ত হইয়াছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা এই ভাবে অতিবাহিত হইল, তাহার পর পুনৰ্বার উডলের তন'-সঞ্চার হইল। তিনি চক্ষু খুলিয়া উদ্ধাকাশে দৃষ্টিপাত করিলেন,সূর্যের প্রখর ফকিরণ তাঁহার চক্ষুর উপর প্রতিফলিত হইল, তিনি চক্ষু মুদিত করিলেন। সেই ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ অবস্থায় তাহার মনে হইল—তাঁহার চক্ষুর উপর কিসের ছায়া পড়িয়াছে। মেথ • কি ?-আকাশের কোন দিকে তখন ত মেঘ ছিল না।—তিনি চক্ষু মেলিয়া দেখিলেন, তাঁহার দেহের উপর একখানি বােটের প্রকাও পালের ছায়া পড়ি- আছে।—তিনি সােৎসুক-নেত্রে চাহিয়া দেখিলেন, কিছুদূর দিয়া একখানি ধাও ভাসিয়া যাইতেছে। দেখিবামাত্র চিনিলেন—ইহা আমেদ বেন্-হাসেনের ধাও! আমেদ বেন্ পূৰ্ব্ব-কথিত জাহাজ হইতে অস্ত্রশস্ত্রাদি অস্ত্রশস্ত্রাদি সংগ্রহ করিয়া আফ্রিকার উপকূল অভিমুখে প্রত্যাবর্তন করিতেছে। ধাওখানি হায় নৌকার এত নিকট দিয়া যাইতেছিল যে, তিনি তাহার দুই চাৰিজন মাল্লাকেও ছিনিতে পারিলেন। তিনি আরও দেখিলেন, তাহার শত্রু আমেদ বেন্ হাসেন বাওর এক পাশে দাড়াইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিয়াছে ; তাহার হাতে একটি বন্দুক। সে তাহাকে লক্ষ্য করিয়া গুলি করিল , কিন্তু গুলি তাঁহার দেহে বিদ্ধ হইল না, তাহার মস্তকের অদূরে পডিয়া নৌকার পাটাতনে বিদ্ধ হইল পাটাতনের খানিকটা কাঠ চটিয়া গেল।-ডডলে মনে মনে বলিলেন, “গুলিটা কেন আমার মস্তকে প্রবেশ করিল না ? তাহা হইলে ত এই মুহূর্তে আমার সকল ন্ত্রণার অবসান হইত।আমার ভাগ্যদোষেই উহার লক্ষ্য ব্যর্থ হইল।” ধাওখানি অদৃশ্য হইলে ডড়লে ক্ষীণস্বরে সামওয়েলিকে আহ্বান করিলেন, কিন্তু তাহার কোন সাড়া পাইলেন না। তখন তাঁহার ধারণা হইল, সামওয়েলি নিদারুণ যন্ত্রণায় প্রাণত্যাগ করিয়াছে , কিন্তু সে সত্যই মরিয়াছে কি না তাহা দেখিবার শক্তি হইল না। তিনি একইভাবে নৌকার উপর পডিয়া রহিলেন। ক্রমে দিবাবসান হইল । শ্রান্ত ববি ধীরে ধীরে পশ্চিম গগন-প্রান্তে অস্তগমন করিলেন। সূর্যাস্তের পর সমুদ্রের মুক্ত বক্ষের উপর দিয়া শীতল সমীরণ প্রবাহিত হইতে লাগিল। সেই সুশীতল সমীরণ-প্রবাহে ডড়লের বেদনা দেহ যেন অনেকটা সুস্থ হইল , স্নেহময়ী জননী যেন বেদনাতুর শ্রান্ত শিশুকে ধীরে ধীরে বীজন করিয়া তাহার সকল সন্তাপ দূর করিতে লাগিলেন। তখন চাহার চেতনা বিলুপ্তপ্রায় , সেই অবস্থাতেও তাঁহার হৃদয়ে নূতন আশার সঞ্চার হইল, মনে হইল, এত কষ্টেও যখন প্রাণ বাহির হয় নাই, তখন ভগবান নাবিক-বধু হয় ত তাহার প্রাণরক্ষা করিবেন। এই দারুণ সঙ্কট হইতে তিনি উদ্ধার লাভ করিবেন।আশা মায়াবিনী। ক্রমে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইল। জীব-কোলাহলশূন্য দিগন্তব্যাপী মহাসমুদ্রে সন্ধ্যা কি গম্ভীর! কি নিস্তব্ধ ।-দেখিতে দেখিতে গগনের নীল সরােবরে শত-শত শুভ্রজ্যোতি নক্ষত্র শ্বেতকমলের ন্যায় বিকশিত হইল। তাহারা যেন স্থিষ্টিতে সহানুভূতিভরে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।—আরও কিছুকাল পরে শশধর পূর্বাকাশে সমুদিত হইয়া সমগ্র প্রকৃতি বুজত-ধবল কিরণ-প্রবাহে প্লাবিত করিলেন। শুত্র-স্নিগ্ধ কিরণ সম্পাতে বিশ্ব-প্রকৃতি হাসিতে লাগিল । সঙ্গে-সঙ্গে নৈশ-সমীরণ-প্রবাহ প্রবল হইল। বায়ুবেগে ক্ষুদ্র নৌকাখানি উত্তাল সমুদ্র-তরঙ্গে আন্দোলিত হইতে লাগিল , নৌকার উপর দুই একবার জলও উঠিল। ডডলের মনে হইল, এইবার বুঝি ভরা ডুবিবে । কিন্তু নৌকা ডুবিল না, হেলিয়া-দুলিয়া জলের উপর দিয়া ভাসিয়া চলিল। ডডল বিস্ফারিত নেত্রে স্নিগ্ধজ্যোতি জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর দিকে চাহিয়া রহিলেন। তাহার মনে হইতে লাগিল,শত শত ভীষণ-দর্শন প্রেত সহসা সমুদ্রগর্ভ হইতে সমুখিত হইয়া তাঁহার ক্ষুদ্র তরণীখানি পরিবেষ্টনপূৰ্ব্বক উদ্দাম নৃত্য আরম্ভ করিয়াছে। বায়ু প্রবাহে তিনি তাঁহার উষ্ণ দেহে তাহাদের শীতল স্পর্শ অনুভব করিয়া শিহরিয়া উঠিলেন। ভয়ে কি ?—এখনও ভয়-মৃত্যুর অতলস্পর্শ অনন্তশয্যায় আশা- হীন, শান্তিহীন, অবলম্বনহীন, অবসাঙ্গ প্রসারিত করিয়া ও ভয় ?–মৃদু হাস্য তাঁহার শুষ্ক অধরপ্রান্তে আত্মপ্রকাশ করিয়া তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হইল , তিনি ধীরে-ধীরে চক্ষু মুদিত করিলেন। এবার তাহার মনে হইল- কে একজন আলােক-সামান্য রূপবতী নারী রূপের প্রভায় চতুর্দিক উদ্ভাসিত করিয়া এক ধ্বনি সুদৃশ্য হিরন্ময় তরণীতে আরােহণ পূর্বক ধীরে ধীরে চন্দ্রমণ্ডল হইতে তাহার দিকে নামিয়া আসিতেছেন। তাহার অঙ্গে প্রস্ফুটিত শুভ্র-কুসুমের পরিচ্ছদ, তাঁহার স্বর্ণাভ কেশদাম মান-মাল্যে সমাচ্ছন্ন, তাঁহার মুখে প্রসন্ন হাস্য , তাঁহার নয়নের স্নিগ্ধ দৃষ্টি হইতে যেন করুণা ও সমবেদনা ক্ষরিত হইতেছে - সেই রমণীমূর্তি ধীরে ধীরে তাহার শিয়র-প্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইলে তিনি চিনিতে - ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ৬ পারিলেন—রমণী তাহার স্বর্গবাসিনী পুণ্যবতী জননী। ডড়লে মা মা বলিয়া কাদিয়া উঠিলেন , তাঁহার মুদিত নেত্রের প্রান্তে অঞর উৎস উৎসারিত হইল। পাছে সেই মূর্তি মুহূর্তে অদৃশ্য হয়—এই ভয়ে তিনি চক্ষু মেলিয়া চাহিতে পারি- লেন না। বুমণী ধীরে ধীরে তাঁর মাথায় হাত বুলাইয়া কোমল কষ্টে বলিলেন, “ভয় কি বাছা।--আমি তােমাকে রক্ষা করিতে আসিয়াছি। এ বিপদ হইতে তােমাকে উদ্ধার করিব,—তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাও।”—ড়লে বিকারখােরে ঘুমাইয়া পড়িলেন। তাঁহার সকল জ্বালা যন্ত্রণা বেদনা অশুহিত হইল। পরদিন যখন তিনি চক্ষু খুলিলেন, তখন দেখিতে পাইলেন, তাঁহার হস্তপদ আর রজ্জবদ্ধ নহে, বন্ধন অপসারিত হইয়াছে। তিনি যে নৌকায় নিপতিত ছিলেন, সেই নৌকাখানিও আর দেখিতে পাইলেন না। তাহার বােধ হইল, তিনি একখানি বৃহৎ জাহাজে স্কুল ক্যাম্বিসের শষ্যায় শায়িত রহিয়াছেন। এ কি স্বপ্ন, না সত্য? তিনি চাহিয়া চাহিয়া দেখিলেন জাহাজের মাঝি মালার। তাহার চারিদিকে নানা কাৰ্যে বাস্তভাবে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। ঈমারের ঘনঘস শব্দ তাহার শ্রবণবিবরে প্রবেশ করিতেছে। জাহাজের মেট এক একবার উচ্চৈঃস্বরে নাবিকদিগকে আদেশ করিতেছিল—তাহা তিনি শুনিতে পাইলেন , তখন আর তিনি ইহা স্বপ্ন বলিয়া মনে করিতে পাবিলেন না। তিনি আবুলদৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিতে লাগিলেন। তাহাকে জাগরিত দেখিয়া একজন নাবিক উচ্চৈঃস্বরে কাহাকে কি বলিল , তাহা শুনিয়া শুভ্রবেশধারী একজন পাচক এক পেয়ালা ব্ৰথ, একখানি চাচে দিয়া নাডিত-নাডিতে তাহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল, এবং কোমল- স্বরে বলিল, “কিহে খােদার পােলা, তুমি যে জাগিয়াছ দেখিতেছি। কেমন আছ ? বড় কাবু হইয়াছ, নয় ?-আচ্ছা উঠিয়া বসিয়া এই ব্রথ টুকু থাই ফেল দেখি।-ওহে, তুমি বডই দুব্বল, তােমার ভাব দেখিয়া বােধ হইতেছে . উঠিতে পারিবে না। তা, না পার ক্ষতি নাই, তুমি একটু মাথা তুলিয়া হ'? কর, আমি এই চামচে দিয়া এক-একটু করিয়া খাওয়াইয়া দিতেছি।

৪ নাবিক-বন্ধু ডড়লে মাথা তুলিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না। তখন সেই পাচকটি তাহার মাথার কাছে বসিয়া সবটুকু ব্ৰথ, ধীরে-ধীরে তাহাকে পান করাইল। ব্ৰথটুকু সুস্বাদ না হইলেও তাহা পান করিয়া তাহার দেহে কিঞ্চিৎ বলাধান হইল। তাহার বাস্ফূৰ্ত্তি হইল। তিনি ক্ষীণস্বরে সেই পাচককে জাহাজের নাম জিজ্ঞাসা করিলেন , কিন্তু শরীর এতই দুর্বল যে, আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে পারিলেন না। তাহার অবস্থা বুঝিয়া পাচকটিও তাহাকে আর কোন কথা বলিতে দিল না , তাঁহাকে ঘুমাইতে বলিয়া সে প্রস্থান করিল।—ডড়লে অঘোের নিদ্রায় অভিভূত হইলেন। তাহার যন্ত্রণার অনেক উপশম হইয়াছিল। যখন তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল, তখন মধ্যাহ্নকাল। তিনি চক্ষু মেলিয়া দেখিলেন, জাহাজেব খালাসীরা তাঁহার অদূরে বসিয়া মধ্যাহ্ন ভােজনে ব্রত আছে। দীর্ঘকাল সুনিদ্রায় তাহার প্রান্তি ক্লান্তি বিদূরিত হইয়াছিল, দেহে যেন নবজীবনের সঞ্চার হইয়াছিল তিনি জাগিয়াছেন শুনিয়া পূর্বোক্ত পাচকটি কিছু লঘু খাদ্যদ্রব্য লইয়া তাঁহার নিকট উপস্থিত হইল, এবং সযত্নে তাহাকে ভােজন করাইল , তাঁহার আহার শেষ হইলে সে বলিল, “তুমি বাপু এ যাত্রা বড় বাঁচিয়া গিয়াছ । আমরা যখন তােমাকে ধরাধরি করিয়া নৌকা হইতে জাহাজে তুলিলাম—তখন মনে হইয়াছিল ঘণ্টা- খানেকের মধ্যেই তুমি অক্কা পাইবে।—তােমার শরীরে কিছু ছিল না, তাহার উপর যে শক্ত বাঁধন। বাহা হইক, এখন আর তােমার অধিক কথা কহিয়া কাষ নাই। তুমি আর একটু সবল হইলে তােমার বিপদের সকল কথা খুলিয়া বলিও ,তাহা শুনিবার জন্য আমাদের সকলেরই বড় আগ্রহ হইয়াছে। তােমাকে বাঁধিয়াছিল, কেন বাঁধিয়াছিল, ছােট নৌকাখানিতেই- তুচ্ছ কিরূপে উঠিয়াছিলে—এ সকল কথা আমরা শুনিতে চাই। কাল জাহাজে কাষ করিতেছি, এরকম কাও কখনও দেখি নাই ।-দেখিতেছি তুমি মুসলমান, আরব বা ঐ রকম কোন দেশের লোেক , ইংরাজী বলিতে পার ? অনেক- পরিচ্ছেদ ৬৫। এতক্ষণ পরে ডডলের মনে পড়িল-তখনও তিনি ছদ্মবেশেই আছেন, তাঁহাকে ইংরাজ বলিয়া জাহাজের কোনও লােক চিনিতে পারে নাই।—তিনি তৎক্ষণাৎ সেই পাচকের নিকট তাহার প্রকৃত পরিচয় দিতে উদ্যত হইয়াছেন, —এমন সময় পাচকটা কাহাকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া সসম্ভ্রমে অভি। বাদন করিল, তিনি আগন্তুকের দিকে মুখ ফিরাইয়া দারুণ বিস্ময়ে অভিভুত হইলেন। তিনি দেখিলেন, এই আগন্তুক তাহারই পূৰ্ব্ব-পরিচিত ডক্তার ল্যাম্পিয়ন,মিস্ এরাইনের মাতুল।ডাক্তার ল্যাম্পিয়নকে দেখিয়া তাহার মুখের কথা মুখেই রহিয়া গেল। ডড়লে দেখিলেন, ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের পরিধানে শুভ্র পরিচ্ছদ, এবং তাহার মুখে একটা প্রকাণ্ড চুরুট ও মশুকে একটা ছবি ওয়ালা সাদা টুপি। সে ডডলেকে দেখিয়া একমুখ ধোয়া ছাডিয়া পূর্বোক্ত পাচককে বলিল, “বাবুর্চি, আধ-মা ‘নিগর’টা এখন কেমন আছে ?” পাচক বলিল, “অনেকটা সুস্থ হইয়াছে, এ যাত্রা বােধ হয় বাঁচিয়া গেল কিন্তু ধাক্কা সামলাইতে এখনও সময় লাগবে। আরব কি না, ভারি কাঠ- প্রাণ, নতুবা রক্ষা পাইত কি না সন্দেহ।” ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিলেন, “বেটা নৌকার উপর মরিলেও কোন ক্ষতি ছিল না, উহার জন্য মিছামিছি বিস্তর হয়রাণ হওয়া গিয়াছে। উহাকে খােলা নৌকায় ভাসিতে দেখিয়া জাহাজের চৌকিদার উহার খোঁজ-খবর লওয়া আবশ্যক মনে করে নাই , কিন্তু আমার ভাগিনেয়ী কিছুতেই ছাডিল না, তাই উহাকে জাহাজে তুলিয়া আনিতে হইয়াছে।—সে-ই প্রথমে উহাকে নৌকার উপর দেখিতে পায়। মিস এরাইনও কি এই জাহাজে আছেন ?-ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের কথা শুনিয়া ভড়লের হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিয়া উঠিল। কথাটা হঠাৎ তাহার বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্ত হইল না। ছদ্মবেশেও পাছে ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন হাঁহাকে চিনিতে পারে—এই আশঙ্কায় তিনি মুখ ফিরাইয়া রহিলেন। ডাক্তার লাম্পিয়ন তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া অবজ্ঞাভরে বলিল, জানােয়ার (৬৬ নাবিক-বধূ আৰু কি? এই আরবগুলোর মত নিমকহারাম দুনিয়ায় নাই। উহাদেব যতই উপকার কর, সুবিধা পাইলেই তােমাকে ছােব মারিবে , কৃতজ্ঞতার সহিত উহাদের পরিচয় নাই। লাঠি না খাইলে উহারা সায়েস্তা থাকে না। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন আরব-বেশধারী ডডলেকে লক্ষ্য করিয়া আরও কিঞ্চিৎ নীতিকথার প্রচার করিত, কিন্তু আর একজন ভদ্রলােক সেই দিকে অগ্রস হইয়া তাহার সহিত আলাপ আরম্ভ করিতেই তাহার উচ্ছাস বন্ধ হইল। আগন্তুক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার রােগী কেমন, ডাক্তার ? বােধ হয় বেচারা বাঁচিয়া উঠিবে ? মিঃ ডড়লে আগন্তুকের কথা শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলেন এ কণ্ঠস্বর ত তাঁহার অপরিচিত নহে, কিন্তু কোথায় শুনিয়াছেন?—হঠাৎ তাঁহার মনে পডিল, তিনি মােজাম্বিক হইতে যাত্রা করিবার পূব্বে কেপ টাউনের সমুদ্র- তীরবর্তী একটি জুয়ার আড্ডায় ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের সহিত এই লােকটিকে কথা কহিতে শুনিয়াছিলেন।—ইহারা কি উদ্দেশ্যে কোথায় যাইতেছে ? সেইদিন অপরাহ্নে উড়লে মিস্ এরাইনকে জাহাজের ডেকের উপর রেলিংএর নিকট দণ্ডায়মান দেখিলেন। মিস্ এরাইনকে দেখিয়া ৰােধ হইল তিনি অত্যন্ত অসুস্থ , সে লাবণ্য আর নাই, শরীর যেন আধখানা হইয়া গিয়াছে, চোখের কোণে কালি পড়িয়াছে, মুখখানি সাদা কাগজের মত ফ্যাকাসে ! এত অল্প দিনে তাহার এই অদ্ভুত পরিবর্তনে উড়লে অত্যন্ত বিস্মিত হইলেন। কে জানিত এরূপ স্থানে এরূপ অবস্থায় পুনৰ্ব্বার তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবে ?--এখন যে তাহার আত্ম-পরিচয় দানেরও উপায় নাই।—তাঁহার আশঙ্কা হইল, মিস্ এসকাইন কোন দুর্ভেদ্য ষডব-জালে বিজড়িত হইয়াছেন, তাঁহার মনের সুখশান্তি নষ্ট হইয়াছে, এই জন্যই তিনি মনােকষ্টে এরূপ জীর্ণ- শীর্ণ হইয়াছেন। কিন্তু সেই ষডযন্ত্র কি, ইহাদের সমুদ্রযাত্রার উদ্দেশ্য কি, তাহ তিনি অনুমান করিতে পারিলেন না। মিস্ এরাইন কোনবীপে বপন্ন হইয়া থাকিলে তাহার উদ্ধারসাধনের জন্য তিনি প্রাণপণ করিতে কৃতসর হইলেন, কিন্তু নিজের শশাচনীয় অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ৬৭ । তাহাব হাসি আসিল।—তিনি ল্যাম্পিয়নের গুপ্ত অভিসন্ধির সন্ধান না লইয়া ছদ্মবেশ ত্যাগ করিবেন না—স্থির করিলেন। মিঃ ডড়লে মনে মনে বলিলেন, “যদি আমার বাবণা সত্য হয়, তাহা হইলে ল্যাম্পিয়নের স্থায় নরপ্রেত পৃথিবীতে দ্বিতীয় আছে কি না সন্দেহ কিন্তু আমি হয় ত অন্যায় সন্দেহের বশবর্তী হইয়া তাহার সম্বন্ধে মিথ্যা ধারণা পােষণ করিতেছি। আমার ভুল হওয়াও বিচিত্র নহে। মিস্ এরাইন এই জাহাজে কি জন্য আসিয়াছেন ?—তাঁহাকে এরূপ চিন্তাক্লিষ্ট ও জীর্ণ-শীর্ণ দেখিতেছি কেন?” ডউল বিস্তব চিন্তা করিয়াও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পাবিলেন না। মানুষের মনে একবার সন্দেহের উদয় হইলে, তাহা সত্য হউক, মিথ্যা হউক, সহজে দূর হয় না। তাঁহারও সন্দেহ বিদূরিত হইল না। ‘মস্ এরাইন ডেকের উপর হইতে প্রস্থান করিলেও তাঁহার উদ্বেগ-কাতব পাণ্ডুর মুখখানি পুনঃ পুনঃ ডড়লর মনে পডিতে লাগিল , তাহার মন অত্যন্ত অস্থির হইয়া উঠিল। তিনি মনে মনে বলিলেন, “একটা কিছু কবিতেই হইবে। আমি ভিন্ন বিপদ-সমুদ্র হইতে এই যুবতীকে উদ্ধার করিবার আর কেহই নাই , কিন্তু আমি এখন করি কি ? ল্যাম্পিয়নের নিকট আত্ম-পরিচয় দিয়া তাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করা বৃথা , তাতে বিপরীত Fল হইবে। কৌশলে উহাদিগের সঙ্কল্প বিফল করিতে হইবে, উহাদের মতলবটা কি তাহাই যে বুঝিতে পারিতেছি না।” অর্ধঘণ্টা পরে পূর্বোক্ত পাচক ডডলের জন্য আর এক পেয়ালা সুপ, আনিয়া তাহাব সম্মুখে উপস্থিত হইল। ডডলে তাহাকে ধন্যবাদ দিয়া উঠিয়া বসিলেন, এবং সুপ টুকু পান করিয়া আরবী ভাষায় তাহাকে দুই-একটি কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। পাচক তাহার কথা বুঝিতে না পারিয়া মাথা নাডিয়া বলিল, “তােমার মা আমি বুঝি না , ইংরাজীত তোমার মনের ভাব প্রকাশ করিতে পার ? ইংৰাজী কি আদৌ জান না?—তুমি কিরূপে নৌকার উপর হাত-পা বাঁধা L কিন্তু s নাবিক-বধু অবস্থায় পডিয়াছিলে, কে তােমায় সে-রকম দুর্দশা করিয়াছিল,-তাহা জানিবার জন্য আমার বড় আগ্রহ হইয়াছে। কেবল আমি নহি, জাহাজের সকল লােকই এ সকল কথা জানিতে চাহে।” ডড়লে কতক ইংরাজী, কতক আরবীতে যাহা বলিলেন, তাহার মৰ্ম্ম এই যে-জাঞ্জিবার হইতে পম্বা উপসাগরে একখানি ধাও’ বাইতেছিল , তাহার চাচা সেই ধার মালিক। এই চাচাটি বই লােভী ও হিংস্র প্রকৃতির, তিনি বিস্তর পৈতৃক অর্থের উত্তরাধিকারী হওয়াতে সে তার বডই হিংসা করিত, এবং যখন-তখন তাহার নিকট টাকা চাহিত। তিনিও সেই ‘ধা ওয়ে তাঁহার চাচার সহিত বাণিজ্যে যাইতেছিলেন। পথিমধ্যে কথায়-কথায় চাচার সহিত বচসা হয় , ইহাতে সেই দুৰ্বত্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাহার মস্তকে দণ্ডা- ঘাত করে। আঘাতে তিনি অজ্ঞান হইয়া পডিলে চাচা তাহাকে হাত-পা বাঁধিয়া একখানি নৌকায় তুলিয়া সমুদ্রে ভাসাইয়া দেয়। তাহার সঙ্গে তাহার একটি বিশ্বাসী ক্রীতদাস ছিল , পাছে সে এই অত্যাচারের কথা প্রকাশ করে, এই ভয়ে চাচা তাহাকেও প্রহারে অচৈতন্য করিয়া দড়ি দিয়া হাত-পা বাধিয়া সেই খােল। নৌকায় ফেলিয়া রাখে। নৌকাখানি তাহাদিগকে লইয়া অকুল সমুদ্রে ভাসিয়া চলে।—তাহার পর যাহা যাহা ঘটিয়াছিল তাহা বলা বাহুল্য মাত্র। পাচক বলিল, “দুনিয়ার সকল চাই প্রায় ঐ রকম। আমারও এক চাচা ছিল , আমি জাহাজে চাকরী লইবার পূর্বে সেই চাচা বেটার সঙ্গে একান্নে ছিলাম। সে আমার উপর বড় অত্যাচার করিত , হাতে কোন কাষ না থাকিলে আমাকে ধরিয়া ঠাইত। তাহার অত্যাচার সহ্য করিতে না পারি আমি বাডী ছাড়িয়া পলাই, এবং জাহাজে চাকরী লই। এখন বেশ আছি, কোন চাচা-কাচার ধার ধারি না তুমি যদি দেশে ফিরিয়া যাও, তাহা হইলে তােমার চাচা বেটার দেখা পাইলে তাহার দাড়িতে আগুন লাগাইয়া দিও; মুখ পােড়াইয়া না দিলে সে সায়েস্তা হইবে না।-মুগুর না খাইলে কি কুকুর জব্দ ম?

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ ডডলে বলিলেন, “চাচার ভাগ্যে যাহা হয় হইবে, কিন্তু তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে ভুলিয়াছি । আমার সেই চাকরটা আমার মতই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নৌকায় পডিয়াছিল। তােমরা আমাকে তােমাদের জাহাজে তুলিয়া আমার প্রাণরক্ষা করিয়াছ, কিন্তু আমার চাকরটাকে ফেলিয়া আসিয়াছ কেন?—আহা, বেচারা বেচারা আমার জন্য অনায়াসে জান্ দিতে পারি , এ রকম প্রভুভক্ত বিশ্বাসী নফর অনেক ভাগ্যে পাওয়া যায়।” পাচক বলিল, “সে বাচিয়া থাকিলে তাহাকেও জাহাজে তুলিয়া লইতাম, কিন্তু আমরা নৌকায় গিয়া দেখিলাম সে মরিয়া গিয়াছে। তােমারও বােধ হয় আর দুই-এক ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হইত। তুমি ধুকধুক কৰিতেছ দেখিয়া তােমাকে জাহাজে তুলিয়া লইলাম , নাকাখানি তাহার মৃতদেহ লইয়া সমুদ্রে ভাসিয়া চলিল। নৌকার উপর হইতেই সে বােধ হয় হাঙ্গরের পেটে গিয়াছে । আমরা তােমাকে উদ্ধার না করিলে তােমারও সেই দশা ঘটিত।* সপ্তম পরিচ্ছেদ • উড়লে অল্পক্ষণ পরে গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইলেন। পরদিন প্রভাতে তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। এই দীর্ঘনিদ্রায় তাহার শরীর বেশ সুস্থ হইল। আমেদ বেহাসেনের দণ্ডাঘাতে তাহার মন্তকে যে প্রদাহ উপস্থিত হইয়াছিল, তাহারও উপশম হইল।কিছুকাল চিন্তা কৰিলে বা কথা বলিলে তাহার মাথা ঘুরিয়া উঠিত, সে ভাবটা দূর হইল। মাথা বেশ পাতলা হইল। তখনও তাহার সর্বাঙ্গে কাল বাসি মাখানো ছিল , তিনি তাহা ধৌত কর' অযৌক্তিক মনে করিলেন। নিদ্রাভঙ্গে তিনি সমুদ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন , দেখিলেন, প্রভাত-রৌদে সমুদ্রের নীল জল ঝকমক করিতেছে , সমুদ্র স্থির, যেন একখানি মুকুর। মৃদু মন্দ শীতল সমীরণ প্রবাহিত হইতেছিল। সেই সুশীতল প্রভাত-সমীরণে তাঁহার সৰ্বাঙ্গ যেন জুড়াইয়া গেল। মিঃ ডডলে যে জাহাজে আশ্রয়লাভ করিয়াছিলেন, তাহা তেমন বৃহৎ জাহাজ নহে, তাহাতে প্রায় তিন হাজার টন বােঝাই ধৰিতে পারিত। জাহাজ খানিতে তেমন অধিক মালপত্র না থাকিলেও তাহা দ্রুত চলিতেছিল ন'। ডড়বে মধ্যাহ্নকালে ধীরে-ধীরে পূর্বোক্ত পাচকের নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে অভিবাদন করিলেন। পাচকটি হাসিয়া বলিল, “তুমি এতদূর হাটিয়া আসিতে পারিয়াছ ? ভাল, ভাল, তােমার শরীর সবল হইয়াছে দেখিয়া বড় খুসী হইলাম। তােমার জন্য কি করিতে হইবে বল , বেশ ক্ষুধা হইয়াছে ত?” পাচক তাহার উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই তাহাকে কিছু খাবার, আনিয়া দিল। তিনি তাহা আহার করিয়া, জাহাজের একপাশে দাঁড়াইয়া মুক্ত সমুদ্রের শােভা দেখিতেছেন, এমন সময় জাহাজের প্রধান মে তাহার সহকারীর সহিত হঠাৎ সেই স্থানে উপস্থিত হইল। মিঃ উভলেকে সেখানে সপ্তম পরিচ্ছেদ দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া প্রধান মে ক্রোধে আগুন হইয়া উঠিল , মুখ বিকৃত করিয়া বলিল,“এখানে এ কে ?—ইহাকেই আমরা বােট হইতে জাহাজে তুলিয়া- ছিলাম না?—জোয়ান মিলে, বসিয়া-বসিয়া খাইতে উহার লজ্জা হয় না? তিন বেলা খাইবে,অথচ কোন কার্য করিবে না, ইহা হইতেই পারে না। ওয়াট সন, উহাকে রীতিমত খাটাইয়া লইবার ব্যবস্থা কর, যদি অন্য কোনও কাষ করিতে না পারে ত উহাকে পিতলের সাজ-সরঞ্জামগুলা পালিশ করিতে দাও। হতভাগাটা খাটিয়া খাউক। কে উহাকে বসিয়া খাইতে দিবে ?” প্রধান মেটের সহকারী বলিল, “আমি শীঘ্রই তাহার ব্যবস্থা করিতেছি।” প্রধান মেটের অবজ্ঞাপূর্ণ উক্তি শুনিয়া ডলের মনে অত্যন্ত ক্রোধের সঞ্চার হইল। তাহার ন্যায় পদস্থ রাজকর্মচারীকে একটা ইতর ওলন্দাজ এভাবে অবমানিত করিতে সাহস করিল ? তাহাকে একটা সামান্য কুলির কাযে নিযুক্ত করিবার আদেশ দিল।—কিন্তু তাহার ক্রোধ স্থায়ী হইল না। তিনি ভাবিয়া দেখিলেন, ইহাতে তাহার সুবিধাই হইবে, তিনি অনায়াসে জাহাজের সকল স্থানে যাইতে পারিবেন, কাহাকেও কোন কৈফিয়ৎ দিতে হইবে না, এমন কি, সুযােগ পাইলে তিনি মিস একাইনের সহিত দেখা করিতে পারিবেন, হয়ত গােপনে তাহাকে সকল কথা বলিতেও পারিবেন।এই সকল কথা ভাবিয়া তাহার মন অপেক্ষাকৃত প্রফুল্ল হইল। অর্ধঘণ্টা পরে প্রধান মেটের সহকারী তাহাকে সঙ্গে লইয়া গেল,এবং ডেকের উপর, কেবিনের দরজায় যে সকল পিতলের সাজ, হাতল প্রভৃতি ছিল, তাহা পরিষ্কার করিতে বলিল—তিনি এই কাৰ্য্যে এরূপ তৎপরতা দেখাইলেন যে, জাহাজের কর্মচারীরা তাহা দেখিয়া অত্যন্ত খুসী হইল, প্রথম দিনেই তিনি প্রশংসা লাভ করিলেন। ইতিমধ্যে জাহাজের কাপ্তেন সেই স্থানে উপস্থিত হইল। ডড়লে তাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া বুঝিতে পারিলেন—এই লােকটিরই সহিত ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের পরামর্শ হইয়াছিল। অল্পক্ষণ পরে ল্যাম্পিয়ন একটি চুরুট টানিতে-টানিতে সেই স্থানে আসিয়া দাঁড়াইল। উড়লে লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন, ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন আজ যেন কিছু বিষন্ন—কিছু উৎকণ্ঠিত ৭২ নাবিক-বধু -ল্যাম্পিয়ন তখন এতই অন্যমনস্কভাবে চলিতেছিল যে, ডড়লে সেখানে বসিয়া কার্য করিতেছেন—তাহা সে দেখিতে পাইল না। সে ডডলের উপর হডি খাইয়া পড়িবার মত হইল, ডড লেকে লক্ষ্য করিয়া সক্রোধে বলিল, “ওরে কদাকার জানােয়ার, তুই এখানে কেন ? দূর হ এখান থেকে সঙ্গে সঙ্গে উড়লের পৃষ্ঠে এক প্রচণ্ড পদাঘাত। ডডলের ইচ্ছা হইল—তিনি তৎক্ষণাৎ তাহার মুখে এক ঘুসি মারিয়া তাহার এক-পাটি দাত উপড়াইয়া দেন , কিন্তু তিনি বিপুল চেষ্টায় ক্রোধ দমন করিয়া প্রকৃতিস্ত হইলেন, এবং পুনর্বার কার্যে মনঃসংযােগ করিলেন ল্যাম্পিয়ন সেখান হইতে সিডির নিকট গিয়া আর কাপ্তেনকে দেখিতে পাইল না, কাপ্তেন তখন স্থানান্তরে গিয়াছিল। ল্যাম্পিয়ন সিডির নিকট দাড়াইয়া জাহাজের মেট কে বলিল, “কাপ্তেন কোথায় ?--তাহার সহিত দেখা করিয়া বল, আমি দুই এক মিনিটের জন্য তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাই , বিশেষ কোন কথা আছে।” মেট, কাপ্তেনকে ডাকিয়া আনিলে, কাপ্তেন ডাক্তার ল্যাম্পিয়নকে বলিল, “গুড মর্নিং ডাক্তার। আজ সকালে আমি আমার কেবিনে বসিয়াই খাইয়াছিলাম, এজন্য পূর্বে আপনার সহিত দেখা হয় নাই , আবার গরম হইল না কি?” ল্যাম্পিয়ন এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়া কাপ্তেনের হাত ধরিয়া তাহার কেবিনের দিকে চলিল। ডড়লে কাপ্তেনের কথা শুনিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি তার কথার অর্থ বুঝিতে পারিলেন না। তাহার কৌতুহল বৰ্ধিত হইল। এই কাপ্তেনই ল্যাম্পিয়নের নিকট কোন কার্যের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার দাবি করিয়াছিল , কাষটা কি, তাহা জানিবার জন্য তাহার প্রবল আগ্রহ হইলেও তিনি এই আগ্রহ পূর্ণ করিবার কোন উপায় দেখিলেন না।—তিনি দেখিলেন, ল্যাম্পিয়ন কাপ্তেনকে সঙ্গে লইয়া তাহার কেবিনে প্রবেশ করিল। তাহাদের কি পরামর্শ হয়--তাহা শুনিবার জন্য তাহার মন অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল লম্পিয়ন কাপ্তেন সহ কেবিনে প্রবেশ করিয়া ভিতর হইতে দরজা বন্ধ করিল, উড়লে তথন অদুরে দাঁড়াইয়া কার্য করিতেছিলেন। তিনি তাহারে সপ্তম পরিচ্ছেদ গুপ্ত পরামর্শ শুনিতে পাইবেন, বা শুনিলেও তাহা বুঝিতে পারিবেন, এ সন্দেহ । ল্যাম্পিয়ন বা কাপ্তেন কাহারও মনে মুহূর্তের জন্য স্থান পায় নাই।—উড়লে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে কেবিনের দরজার নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি নিতে পাইলেন, কাপ্তেন ল্যাম্পিয়নকে বলিতেছে, “তুমি আমাকে তাড়াতাডি ডাকিয় পাঠাইয়াছিলে, খবর কি? ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন বলিল, “সে আজ ভাল নাই।” কাপ্তেন বলিল, “এই সামান্য কাযে তুমি এত সময় লইতেছ কেন, তাহা আমি বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। কেপ টাউনে যখন তােমার সহিত আমার বন্দোবস্ত হয়, তখন আমি মনে করিয়াছিলাম, খুব শীঘ্রই কাটটা মিটিয়া যাইবে।” ল্যাম্পিয়ন একটু উত্তেজিত স্বরে বলিল, “আমি তােমাকে সেই সময়েই বলিয়াছিলাম, তাড়াতাডি করিলে কোন ফল হইবে না। তুমি কি বুঝিতে পাবিতেছ না অতিরিক্ত তাড়াতাড়ি করিলে তােমার জাহাজের কর্মচারীদের, এমন কি, খালাসীগুলার পর্যন্ত মনে সন্দেহ হইবে ? তুমি কি আমাদের সর্ব- নাশের পথ প্রশস্ত করিতে চাও ? ঠিকানায় পৌছিয়া হাতে হাতকডি পরাই কি তােমার ইচ্ছা তােমার ব্যস্ততা দেখিয়া আমার ত তাহাই মনে হয়।” কাপ্তেন গম্ভীর স্বরে বলিল, “তুমি যে রকম ঢিমে তালে কাষ করিতেছ, তাহাতে মনে হয় নিজের পায়ে তুমিই কুডল মারিবার ব্যবস্থা করিতেছ। যদি তুমি তাড়াতাডি কায শেষ করিতে না পার, তবে আপাততঃ উহা মুলতুবি রাখিয়া দাও। তাহাতে বিপদের আশঙ্কা অল্প।” তাহার পর ডাক্তার নিম্নম্বরে দুই তিনটি কথা বলিল, ডড়লে তাহা শুনিতে পাইলেন না, কিন্তু তিনি বুঝিলেন—এ কথায় কাপ্তেনের বিলক্ষণ ক্রোধ হইয়াছে। সে উত্তেজিত স্বরে বলিল, “তােমার যা খুশী কর। তোমার ছাগল তুমি ল্যাজের দিকে কাটো, আমার হাতে ক্ষতিবৃদ্ধি নাই , কিন্তু যদি • শেষে কোন গণ্ডগােল হয়, তাহা হইলে আমার ঘাড়ে দোষ চাপাইও না। বােব কর, ইহাতে আমার কোন দায়িত্ব নাই। F আমি কোন ৭৪ নাবিক-বন্ধু এবার ল্যাম্পিয়ন একটু নরম হইয়া বলিল, “দেখ ভাই, আমাদের ঝগড়া করিয়া কোন লাভ নাই। যদি অনিষ্ট হয়, আমাদের উভয়েরই হইবে , সুতরাং আমাদের মঙ্গলের জন্য পরস্পর মিলিয়া-মিশিয়। এক পরামর্শে কায করাই সঙ্গত। এখন আর পিছাইবার উপায় নাই , যেরূপে হউক হাতের কায শেষ করিতেই হইবে।” কাপ্তেন বলিল, “কে তােমাকে পিছাইতে বলিতেছে ? বিপদের মধ্যে লাফাইয়া পড়িতেই-বা কে তােমার মাথার দিব্য দিতেছে ? দায়িত্ব ঘাডে লইতে রাজী নহি। তুমি মন স্থির করিতে পারিতেছ না, কায শেষ করিতে অনর্থক বিলম্ব করিতেছ এজন্য আমি ফাঁসের দডি গলায় পরিব- এরূপ তুমি আশা করিতে পারি না। সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকিয়াও যদি কাৰ শেষ করিতে না পার ত সে দোষ কি আমার ?” ল্যাম্পিয়ন বলিল, “কি যে বল তার ঠিক নাই। আমার সঙ্কল্প স্থির আছে ইহা ত তুমি জান।” কাপ্তেন বলিল, “তবে আর তর্কবিতর্কে কায নাই , এখন বল কায শেষ হইতে আর কয় দিন লাগিবে ? ল্যাম্পিয়ন বলিল, “আর তিন দিন। যদি কোনও ব্যাঘাত না ঘটে, তবে শুক্রবারই সব শেষ হইবে। কেমন, ইহাতে তােমার আপত্তি নাই ত?” কাপ্তেন বলিল, “বেশ কথা, আমি ইহাতেই রাজী।—আমরা বলবে উপস্থিত হইবার পূর্বেই গােলমাল থামিয়া যাইবে। ও কথা লইয়া আর কোন উচ্চবাচ্য হইবে না। এ সকল তুচ্ছ বিষয় লইয়া আন্দোলন-আলোচনার সুযােগ যত কম দেওয়া যায়, ততই ভাল।” ল্যাম্পিয়ন বলিল, “ব্যাপারটা বুঝি খুব তুচ্ছ হইল ?—কি সর্বনাশ — তুমি কি এ রকম কাষ পূৰ্বে আৰও করিয়াছ ?” কাপ্তেন হাসিয়া বলিল, “একম তুচ্ছ কাষ পূর্বেও আমার হাত দিয়া, ইয়ছে ছে—একথা কি তােমাকে বলিয়াছি তুমি আগামী শুক্রবার এই শুভ- সপ্তম পরিচ্ছেদ ৭৫ কার্য্যের দিন স্থির করিয়াছ, আমার হাতে আপত্তি নাই , কতক গুলা বাজে • কথা বলিয়া সময় নষ্ট কৰিবার আবশ্যক কি ?" উভয়ের একজন চেয়ার ছাডিয়া উঠিল—বুঝিতে পারিয়া ডডলে লঘুপদ- বিক্ষেপে দূরে সরিয়া গিয়া একটা পিতলের হাতল পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। মুহূর্ত পরে উভয়ে কেবিন হইতে বাহিরে আসিয়া ডড লেকে দেখিতে পাইল , কানে ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের মুখের দিকে চাহিয়া কুঞ্চিত করিল। ল্যাম্পিয়ন তাহার মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া বলিল, “ইংরাজী জানে না।”—তাহার উভয়ে অন্যদিকে প্রস্থান করিল। মিঃ উড়লে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ভাবে কিয়ৎকাল সেই স্থানে বসিয়া রহিলেন , তাহার সন্দেহ যে অমূলক নহে, এ ধারণা তাহার মনে বদ্ধমূল হইল। তিনি বুঝিলেন এই দুই নরপিশাচ মিস্ এসকাইনকে হত্যা করিবার জন্য ষড়যন্ত্র করিয়াছে। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন কোন প্রকার মৃদু বিষ প্রয়ােগে তিল তিল করিয়া তাহার প্রাণ নষ্ট করিবে , এবং আর তিন দিনের মধ্যেই তাহার সঙ্কল্প সিদ্ধ হইবে। তিনি ইহাও বুঝিতে পারিলেন যে, ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন নানা- প্রকার বদগ্নেয়ালে তাহার যথাসর্বস্ব নষ্ট করিয়া, তাহার মহাসমৃদ্ধ ভগিনী- পতির বিপুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারিণী মিস্ এরাইনকে এইভাবে হত্যাপূৰ্ব্বক অবৈধ উপায়ে তাহার সমস্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ করিবার সঙ্কল করিয়াছে , এবং জাহাজের কাপ্তেনটা এবিষয়ে তাহার সাহায্য করিতেছে। তাহাদের অর্থলালসা চরিতার্থ করিবার জন্য এই সংসারজ্ঞান-বিরহিতা, আত্ম- রক্ষায় অসমর্থ, সরলা যুবতীকে জীবন বিসর্জন করিতে হইবে।—এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা লইয়া যাহাতে কোন আন্দোলন-আলােচনা না হয়, বা কেহ তাহাদিগকে সন্দেহ করিতে না পারে,—এই উদ্দেশ্যে সমুদ্রবক্ষে জাহাজের উপর এই পৈশাচিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করিবার ব্যবস্থা হইয়াছে। মিঃ ভড়লে মনে মনে বলিলেন, “আমার দেহে জীবন থাকিতে আমি এই দুৰ্বত্তদের সঙ্কল সিদ্ধ হইতে দিব না ! আমি উহাদের অভিসন্ধি কতক-কতক বুঝিতে পারিয়াছি, দেখি,আমি মিস্ এসাইনকে রক্ষা করিতে পারি কি না, ।

নাবিক-বন্ধু মিঃ ভড়লে অতঃপর স্বকার্যে মনঃসংযােগ করিলেন। তিনি মিস্ এর কাইনকে ডেকের উপর দেখিবার আশায় বেলা দশটা পর্যন্ত সেই স্থান হইতে নড়িলেন না , অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে কলকজাই পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। কিন্তু সেদিন প্রভাতে মিস্ এরাইন ডেকের উপর আসিলেন । ডডলের সন্দেহ হইল, মিস্ এরাইন পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক অসুস্থ হওয়াতেই তাহার কেবিন ছাড়িয়া ডেকে আসিতে পারেন নাই।—উড়লে কোন কৌশলে। তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য অধীর হইয়া উঠিলেন।—এখন সতর্ক হইতে পারিলে বা মিস্ এরাইনকে সতর্ক করিতে না পারিলে তাহার জীবন- রক্ষার কোনও আশা থাকিবে না, সুতরাং আর একমুহূর্তও নষ্ট করা উচিত নহে। ডডলে একদিকের কায শেষ করিয়া জাহাজের অন্যদিকে কলকা পরিষ্কার করিতে চলিলেন।-এবার তিনি যে স্থানে বসিয়া কাম করিতে লাগি- লেন, সেই স্থান হইতে জাহাজের সমস্ত ভাগটা বেশ দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার অজ্ঞাতসারে যে মিস্ এরাইন ডেকের উপব যাইবেন, তাহার সম্ভাবনা হিল না। অপরাহ্নে তিনি দেখিতে পাইলেন, জাহাজের মার্ড একথানি ‘গ’ ও দুইটি পাতলা বালিশ লইয়া ডেকের দিকে চলিল। ইহা সে কাহার জন্য লইয়া যাইতেছে, তাহা তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিলেন। কয়েক মিনিট পরে মিস্ এরাইন তাহার মাতুলের স্কন্ধে ভর দিয়া অতি কষ্টে ডেকের দিকে চলিলেন। সেদিন তাহাকে অধিকতর অসুস্থ দেখাইতেছিল , তাহার মুখে কে যেন কালি মডিয়া দিয়াছে। তাহার জীর্ণ দেহের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া ডডলের সর্বাঙ্গ ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল, তাহার ক্ষোভের সীমা রহিল না , অতি কষ্টে তিনি আত্মসংবরণে সমর্থ হইলেন। তিনি কার্য করিতে-করিতে দেখিতে পাইলেন, দুৰ্বত্ত ল্যাম্পিয়ন তাহাকে একখানি ডেক-চেয়ারে বসাইয়া, তাহাকে দুই একটি মৌখিক সান্ত্বনার কথা বলিয়া ধীরে ধীরে সেখান হইতে চলিয়া গেল। তাহার চক্ষু’টি যেন হাসিতেছিল , কার্যোদ্ধারের আর অধিক বিলম্ব এই বুঝিয়া সে উৎসাহ ও প্রফুল্লতা গােপন করিতে পারিতেছিল না।

সপ্তম পরিচ্ছেদ ৭৭ বিধাতা যে তাহার অলক্ষ্যে তাহার দুষ্কর্মের প্রতিফল দানের জন্য জাল বিস্তার করিতেছেন,-তাহা তাহার অনুমান কবিবার শক্তি ছিল না। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন প্রস্থান করিলে মিস একাইন একখানি নভেল খুলিয়া তাহাতে দৃষ্টি সংযােগ করিলেন, কিন্তু তিনি তাহার দুই চারিছত্রও পাঠ করিতে পারিলেন না, হঠাৎ পুস্তকখানি তাহার অবসন্ন হস্ত হইতে খসিয়া ডেকের উপর পতিত হইল। তিনি পুস্তকখানি তুলিয়া লইবার চেষ্টা করিয়া উদাসীনভাবে সেইদিকে চাহিয়া রহিলেন। তাহার চক্ষু হইতে এক বিন্দু অশ্রু গড়াইয়া পডিল , বােধ হয় তিনি জীবনে হতাশ হইয়াছিলেন। এত চেষ্টাতেও তাহার শরীর সুস্থ হইতেছে না। মুক্ত সমুদ্রের নির্মল বাযু তাহার কোন উপকার করিতে পারিতেছে না।-হায়, তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নাই, ঔষধ বলিয়া তিনি যাহা প্রত্যহ যথানিয়মে সেবন করিতেছেন—তাহা ঔষধ নহে, বিষ। যাহারা তাহার রক্ষক, তাহারাই যে ভক্ষক। তাহার নয়নে অশ্রুবিন্দু দেখিয়া উড়লে কোনরূপে আত্মসংবরণ করিতে পারিলেন না। তিনি ভাবি- লেন, এই সুযােগে মি একাইনকে তার মনের কথা বলিতে না পারিলে এমন সুযােগ ই ত আর আসিবে না। তিনি একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চতুর্দিকে চাহিলেন, কিন্তু নিকটে কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি ডেকের ‘রেলিং পরিষ্কার করিবার ভান করিয়া ধীরে ধীরে মিস্ একাইনের নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি কি করিয়া আত্মপরিচয় জ্ঞাপন করিবেন তাহাই ভাবিতে লাগিলেন , কারণ ডডলের আশঙ্কা হইতেছিল—তাহার কথা শুনিয়া কিছু বুঝিবার পূর্বেই যদি মিস্ এরাইন হঠাৎ ভয় পাইয়া আর্তনাদ করিয়া উঠেন, তাহা হইলেই সর্বনাশ। কিন্তু অন্য উপায় ত নাই। ডড়লে ক্ষণকাল ইতস্তত করিয়া নিম্নস্বরে বলিলেন, “মিস্ এরসাইন, আপনি কি আমাকে চিনিতে পারিতেছেন ?” মিস্ এরাইন তখন আত্মচিন্তাস ৰিতাের ছিলেন, উড়লের মৃদু কণ্ঠস্বর তাহার কর্ণগােচর হইল না, সুতরাং ডডলে পুনৰ্ব্বার সেই কথা বলিলেন এবার হাৰ কথা শুনিয়া মিস্ এৱসাইন বিস্ময়বিহ্বল নেত্রে তাঁহার মুখের ৭ নাবিক-বধু দিকে চাহিলেন, কিন্তু তিনি কোন কথা বলিবার পূর্বেই ডড়লে পূৰ্ব্ববৎ মৃদু স্বরে বলিলেন, “মিস্ এরাইন, আপনি বেশী জোরে কথা বলিবেন না , অন্যে শুনিতে পাইলে বিপদ ঘটিবে।--অগ্রে বলুন,আমাকে কি চিনিতে পারিয়াছেন?” মিস্ এরস্কাহন বলিলেন, “তুমি আমার নাম জান দেখিতেছি। তুমি কে ? আমার নিকট তােমার কি আবশ্যক ?” ডড়লে বলিলেন, “আপনি আমাকে চিনতে পারেন নাই , লেফটেনান্ট ডড়লে। আমাকে ভাল করিয়া দেখিলে আপনি বােধ হয় আমার এই ছদ্মবেশে চিনিতে পারিবেন। মিস্ এরাইন বলিলেন, “ডডলো—আপনি?—ব্যাপার কি? আমি কি স্বপ্ন দেখিতেছি ?” ডডলে আর একবার চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, “না, মিস । স্বপ্ন নহে, সত্য। আমি আপনার প্রাণরক্ষা করিতে আসিয়াছি।—আপনার জীবন কিরূপ বিপন্ন হইয়াছে, আপনার বিরুদ্ধে কিরূপ ষড়যন্ত্র হইয়াছে, তাহা আপনি জানেন না, আব সে সকল কথা আপনাকে খুলিয়া বলিবারও সময় নাই। আপনার কেবিন কোন্ দিকে দয়া করিয়া বলিবেন কি? মিস এরাইন তাহার কেবিনের অবস্থান নির্দেশ করিয়া বলিলেন, “কিন্তু মিঃ ডড়লে, আমি যে—-” ডডলে বাধা দিয়া বলিলেন, “আস্তে মিস, খুব আস্তে কথা বলুন। বেশী কিছু না বলাই ভাল। আমাদের চারিদিকে শত্রু। আপনি আজ রাত্রে আপনার কেবিনের সমুদ্রের দিকের গবাক্ষ খুলিয়া রাখিবেন, আমি যেরূপে পারি আপনাকে সংবাদ দিব। আপনার মামা আপনাকে ঔষধ দিলে তাহা খাইবেন না , না খাইবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে যাহা খুসী উত্তর করিবেন; কিন্তু সাব- পন, ঔষধ যেন আপনার ওষ্ঠ স্পর্শ না করে। মিস এরাইন বলিলেন, “মিঃ ডডলে, আপনার কথা বুঝিতে পারিলাম : আপনার কথা শুনিয়া আমার মনে বড়ই আতঙ্ক হইল।—আপনি যে ভয়া- - কথা:বলিতেছেন। এখন .

সপ্তম পরিচ্ছেদ ডড়লে বলিলেন, “আপনার প্রাণরক্ষার জন্যই একথা বলিতে হইয়াছে। আজ বাত্রে জাহাজের সকল লােক নিদ্রিত হইলে আপনাকে সকল কথা খুলিয়া বলিব । তখন আপনি বুঝিবেন, আমি আপনাকে ঔষধ খাইতে বারণ করিয়া ভালই করিয়াছি। ঔষধ ত খাইবেনই না, ইয়ার্ড ভিন্ন অন্য কেহ আপনাকে কিছু খাইতে দিলে তাহাও স্পশ করিবেন না। আমি ছদ্মবেশী, —ইহা প্রকাশ হইলে আমরা উভয়েই মারা পডিব। এই ছদ্মবেশের উপর আমাদের উভয়ের জীবন নির্ভৰ করিতেছে। ডডলে আর কোন কথা না বলিয়া ধীরে ধীরে ডেকের অন্য অংশে চলি- লেন। তিনি মিস্ এরাইনের নিকটে আর দুই-এক মিনিট থাকিলেই মহা বিপদে পডিতেন , হয় ত তাহার সকল সঙ্কল্প ব্যর্থ হইত। কারণ তিনি স্থানান্তরে ইবার অব্যবহিত পরেই ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন ও কাপ্তেন, মিস্ এরাইনের নিকট উপস্থিত হইল। মিস্ এরাইনের সহিত তাহাদের কি কথা হইল অদূরে দাড়াইয়া কায করিতে করিতে উড়লে তাহা শুনিতে পাইলেন। কাপ্তেন টুপি খুলিয়া মিস্ এসকাইনকে অভিবাদন করিয়া বলিল, “আশা করি আপনি এখন অনেকটা ভালই আছেন। এত চেষ্টাতেও আপনার শরীর সুস্থ হইতেছে না, ইহা আমাদের বড়ই দুভাগ্যের কথা । যাহা হউক, দুই চারি দিনের মধ্যে আপনি নিশ্চয়ই নীরােগ হইবেন। ল্যাম্পিয়ন বলিল, “আমি বড় গলা করিয়া বলিতেছি, এক সপ্তাহ মধ্যে মা আমার একদম্ সুস্থ হইয়া উঠিবে।-আহা, বইখানা যে ফেলিয়া দিয়াছ না। কুড়াইয়া দিই।” কি স্নেহা কণ্ঠস্বর।—ল্যাম্পিয়ান তৎক্ষণাৎ কেতাবখানি ডেকের উপর হইতে তুলিয়া মিস, একাইনের জানুর উপর রাখিয়া দিল , তারপর কোমল- *ষরে বলিল, “আজ সকালে তােমার ঔষধটা বদলাইয়া দিয়াছি, এবার ভাল ভাল ঔষধ,দিয়াছি, খাইয়াছ ত ? মিস্ এরাইন মৃদুস্বরে বলিলেন, “হা। ল্যাম্পিয়ন সােৎসাহে বলিল, “বেশ বেশ। ঐ ঔষধই তােমার রােগ যারিয়া নাবিক-বধূ যাইবে। ঔষধটা ফুরাইলে আর একশিশি ঔষধ প্রস্তুত করিয়া দিব।সেই শিশি খাইবার পর আর তােমাকে ঔষধ খাইতে হইবে না।” কথাটা সত্য। কথাটা শুনিয়া ডডলে মনে মনে হাসিয়া বলিলেন, “আর তােমার চালাকী খাটিবে না , বেটা ভণ্ড।” কথা শেষ করিয়া ল্যাম্পিয়ন কাপ্তেনের সঙ্গে অন্যদিকে প্রস্থান করিল। উড়লেও কায শেষ করিয়া সে-স্থান তাগ করিলেন। সমুদ্রের দিকে যে গবাক্ষ ছিল—তাহা দিয়া মিস একাইনের সহিত সাক্ষাৎ কর কিরূপ কঠিন, তাহা বুঝিয়া ডডল অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইলেন , কিন্তু মিস্ এসকাইনের সহিত সাক্ষাৎ করিবার অন্য উপায় ছিল না। দ্বারের দিক দিয়া যাইলে হঠাৎ ধরা পড়িবার আশঙ্কা ছিল। কেহ তাঁহাকে সন্দেহ না করিতে পারে—তাহাই তাহার প্রথম কর্তব্য, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। উড়লে বুঝিয়াছিলেন, জাহাজ না থামিলে তিনি সেই গবাক্ষের দিকে যাই- বার চেষ্টা করিতে পারিবেন না , চলন্ত জাহাজে সেরূপ চেষ্টা করিলে তাহার *মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। রাত্রি আটটার পর জাহাজের গতি মন্দীভূত হইলে মিঃ ডডলে অন্যের অলক্ষ্যে প্রধান ইঞ্জিনিয়ারের কেবিন অতিক্রম করিয়া প্রধান ডেক পার হইলেন, এবং সিডি দিয়া নামিয়া জাহাজের কিনারায় গিয়া একগাছি বজ্র বাহির করিলেন, তাহা রেলিংএর সঙ্গে বাধিয়া, সেই রক্ষ্ম অবলম্বন পূর্বক ঝুলিয়া পডিলেন।—আর দুই গাছি দড়ি দুই হাতে ধরিয়া ভারকেন্দ্র স্থির রাখি- লেন।সেই অবস্থায় মিস, এসকাইনের গবাক্ষপ্রান্তে মুখ রাখিয়া তিনি অতি মৃদুস্বরে মিস, একাইনকে ডাকিলেন। মিস, এসকাইন তাহার প্রতীক্ষায় জাগিয়াছিলেন। তিনি ডডলের কণ্ঠস্বর শুনিয়া গবাক্ষ-সন্নিকটে উপস্থিত হইলেন, মৃদুস্বরে বলিলেন, “মিঃ ডড়লে। আপনি কি সত্যই ডড়লে ?” ডড়লে বলিলেন, এ বিষয়ে আপনি সন্দেহ করিবেন না। আমি সত্যই ফিলিপ, ডডলে। আস্তে কথা বলিবেন। আমাদের কোন কথা কাহারও কর্ণ- গােচর হইলে আর আমাদের রক্ষা নাই। আপনাকে আমার অনেক কথা বলিবার আছে।

সপ্তম পরিচ্ছেদ ৮ T মিস, এস,কাইন বলিলেন, “আপনি ছদ্মবেশে কেন ? কিরূপেই বা এ জাহাজে আসিলেন? আপনি কেপ টাউনে আমাকে বলিয়াছিলেন, কোন জরুরী কার্যে শীঘ্রই আপনাকে দেশান্তরে যাইতে হইবে। মিঃ ডড়লে তাহার লােমহর্ষণ অভিযান সম্বন্ধে সকল কথাই সক্ষেপে মিস এরসাইনের গােচর করিলেন , তাহারই করুণায় তিনি তাহারই করুণায় তিনি মৃত্যুকবল হইতে রক্ষা পাইয়া এই জাহাজে আশয়লাভ করিয়াছেন, তাহাও জানাইলেন। শেষে বলিলেন, “এ সকল কথা পরে হইবে, আগে ত আপনার প্রাণরক্ষা হউক আপনার অনুগ্রহে আমার প্রাণরক্ষা হইয়াছে, আমিও প্রাণপণে আপনার প্রাণ- বক্ষা করিব। আপনি আর ঔষধ খান নাই ত?” মিস, এরাইন বলিলেন, “না, খাই নাই , কিন্তু আপনার কথা শুনিয়া- পর্যন্ত আমার যে কি দুশ্চিন্তা ও ভয় হইয়াছে তাহা বুঝাইতে পারিব না। আপনি সে সকল কথা বলিয়াছিলেন কেন? আমার বিরুদ্ধে কে কি যড়যন্ত্র করিবে ? আমি ত কাহারও অনিষ্ট কবি নাই।” মিঃ ডডলে বলিলেন,“সে কথা পরে শুনিবেন , কিন্তু আপনি মহা ধনবান কন্যা একথা ত ভুলিলে চলিবে না। আপনার আমার চরিত্র কিরূপ, আপনি বােধ হয় তাহা জানেন না, আপনি কি যথার্থ ই তাহাকে ভালবাসেন?” মিস, এসকাইন বলিলেন, “মামাকে আমি ভালবাসি কি না ? আপনি একথা কেন জিজ্ঞাসা করিতেছেন বলুন।” মিঃ ডডলে বলিলেন, “আপনার মামা অত্যন্ত অর্থপিশাচ। তাহার নিজের বাহা কিছু ছিল, সব সুরাইয়াছে , এখন তাহার বহুৎ টাকার দরকার, অথচ তাহা পাইবার উপায় নাই। আমি কেপ টাউন ত্যাগ করিবার পূর্বে হঠাৎ একটা জুয়ার আড্ডায় গিয়া পড়িয়াছিলাম, সেখানে আপনার মামার সহিত এই কাপ্তেন- টার গুপ্ত পরামর্শ শুনিতে পাইয়াছিলাম। ডাক্তার ল্যাম্পিয়নেব অনুকূলে উইল- খানি হইলে তাহার অর্থকষ্ট দূর হইবে—ইহাও জানিতে পারিয়াছিলাম। ঈশ্বর ন করুন, আপনার যদি মৃত্যু হয় তা হইলে আপনার সম্পত্তি কে পাইবে ? মিস, এসকাইন বলিলেন, “কাহারও কাহারও বৃত্তির ব্যবস্থা আছে, ৮২ নাবিক-বধু তদ্ভিন্ন সমস্ত সম্পত্তি মামাই পাইবে। এই সম্পত্তির লােভে মামা আমাকে বিষ খাওয়াইয়া মারিবার ষড়যন্ত্র করিয়াছে ? আপনি বলেন কি। না, না, মামা এতদূর পিশাচ নহে। আপনি অতি ভয়ানক কথা বলিয়াছেন।” মিস, এর কাইন আর আত্মসংবরণ করিতে পারিলেন না, তাহার একমাত্র অভিভাবক, তাহার জীবন ও সম্পত্তির রক্ষাকর্তা মাতুলের এই বাবহার ?- তিনি অশ্রুরােধ করিতে পারিলেন না, ফোঁপাইয়া-ফোঁপাইয়া কঁদিতে লাগি- লেন।তাঁহার ক্রন্দন-শব্দে ডড়লে অত্যন্ত ভীত হইলেন , ব্যগ্রভাবে বলিলেন, “মিস,, আপনি চুপ করুন, যদি কেহ আমাদের পরামর্শ শুনতে পায়, তাহা হইলেই সর্বনাশ। আমরা উভয়েই মারা পডিব। আমাদের অবস্থা অতি শঙ্কটজনক , সামান্য ত্রুটিতেই সব নষ্ট হইবে, আপনার প্রাণরক্ষার কোনও উপায় হইবে না। আপনার মামা মনুষ্যমূর্তিতে শয়তান, তাহার অসাধ্য কম্ম কিছুই নাই , আর এই জাহাজের কাপ্তেনটি আপনার মামার মতই ভয়ানক- প্রকৃতির লােক , শয়তানীতে কেহ কাহারও অপেক্ষা থাটো নহে। কিন্তু ৯২ানুগ্রহে আমি যখন এখানে আসিয়া পড়িয়াছি, তখন আপনার প্রাণরক্ষার উপায় হইবেই। আমি আপনার প্রাণরক্ষার জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতেও কুণ্ঠিত হইব না। কি উপায়ে আপনার প্রাণরক্ষা হইতে পারে-তৎসম্বন্ধে আলােচনা করা আবশ্যক। আমি এখানে আর অধিক সময় থাকিতে পারিব , আমি সমুদ্রের উপর শূন্যে ঝুলিতেছি, ধরা পডিবারও আশঙ্কা আছে। আমার প্রস্তাব মন দিয়া শুনুন।—প্রথমত, আপনি আর এক বিন্দু ঔষধ ও গলাধঃকরণ করিবেন না। আপনি ঔষধ খাইতে অসম্মত হইলে এই দুৰ্বত্ত- দের মনে সন্দেহ হইতে পারে। পাপীর মন সর্বদাই সন্দেহাকুল।—যাতে তাহাদের মনে কোন সন্দেহ না হয়, তার ব্যবস্থা করা আবশ্যক।—আপনাকে যে ঔষধ দিয়াছে তাহার বর্ণ কিরূপ ? মিস্ এৰাইন বলিলেন, “ঠিক জলের মত।” উড়লে বৱিলেন,“উত্তম,আপনি ঔষটা জানালা দিয়া ঢালিয়া ফেলিয়া শিশিতে জলপূরিয়া রাখুন। আপনার মামা তার সাক্ষাতে আপনাকে ঔষধ খাইবার সপ্তম পরিচ্ছেদ জন্য পীড়াপীডি করিলে আপনি সেই জল পান করিবেন , একবারে এক দাগের বেশী থাইবেন না। দ্বিতীয় কথা, আপনি কোথায় বসিয়া আহার করেন ?” মিস্ এরাইন বলিলেন, “আজ কাল আমার কেবিনেই খাবার দিয়া যায়।—ভােজনাগাবে যাইবার ত শক্তি নাই।” ডড়লে বলিলেন, “খুব ভাল কথা। আপনি সেই খাবারের কিয়দংশ জানালা দিয়া সমুদ্রে ফেলিয়া দিবেন, কিন্তু কিছুই খাইবেন না, আপনার মামা যেন বুঝিতে পারে ক্ষুধার অভাবে আপনি যৎকিঞ্চিৎ-মাত্ত আহার করিয়াছেন। কয়েক দিন বিস্কুট খাইয়াই কাটাইবেন , অন্য উপায় নাই।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “বিস্কুট আমার নিজের কাছেও আছে, তাহাই খাইব। কিন্তু তাহাতে আমার মনে সন্দেহ হইবে না ত ?” ডডলে বলিলেন, “ইহাও চিন্তার কথা বটে , যাহা হউক, আপনি যে অপেক্ষাকৃত সুস্থ হইয়াছেন, এ ভাব প্রকাশ করিবেন না। তাহাদিগকে বুঝিতে দিবেন যেন আপনার রােগ ক্রমেই কঠিন হইতেছে, তাহা হইলে তাহাদের সন্দেহের কারণ থাকিবে না।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “কিন্তু এভাবে কতদিন তাহাদের ভুইয়া রাখিব ?—আমি যে বড়ই সঙ্কটে পড়িলাম।” ডডলে বলিলেন, “আমার উপর নির্ভর করিয়া থাকুন, একটা উপায় হইবেই । বলিয়াছি ত আপনার জীবনরক্ষার জন্য আমি প্রাণবিসর্জনেও কুষ্ঠিত হইব না। আমি একটা মতলব করিয়াছি, তাহ' কার্যে পরিণত করিতে পারিলে আপনার জীবনরক্ষায় সমর্থ হইব। আপনি হতাশ হইবেন না। ভগবান আপনাবে রক্ষা করিবেন। আর কোন কথা নাই , এখন আমি বিদায় গ্রহণ করিলাম। মিস্ এরাইন বলিলেন, “পরমেশ্বর আপনার মঙ্গল করুন, আমার রক্ষা ভার আপনার উপর।”—অনন্তর মিঃ ডড়লে মিস এরাইনের প্রসারিত হব চুম্বন করিয়া স্পন্দিত বক্ষে নিঃশব্দে জাহাজের উপর উঠিলেন। D অষ্টম পরিচ্ছেদ । মিঃ ডডলে মিস্ এরাইনের প্রাণরক্ষার জন্য আত্মবিসর্জনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হইয়াছিলেন। স্বার্থপরতার বশবর্তী হইয়া তিনি ইহা করেন নাই , স্বার্থচিন্তা কাহাকেও মৃত্যুর পথে লইয়া যাইতে পারে না। মিস এস কাইনের প্রণয়লাভে সমর্থ হইবেন কি না--তাহাও তিনি চিন্তা করবেন নাই , কিন্তু একথাও সত্য, ভাল না বাসিলে কেহ আত্মবিসৰ্জন করিতে পারে । আত্মবিসর্জনে স্বার্থচিন্তার অবকাশ থাকে না। কোন্ আশায় তিনি এত বড় বিপদের মুখে আপনাকে নিক্ষেপ করিতেছেন, সে কথা তার মাথায় আসি। । মিস্ এরষ্কাইনের সহিত সাক্ষাতের পর তাহার শিতগুণ বর্ধিত হইল। তাহার মনে হইল,মিস্ এরাইনের অনুগ্রহেই তাহার প্রাণরক্ষা হইয়াছে, যিনি ক্ষা করিয়াছেন,প্রাণটা তাহারই জীবনরক্ষায় নিয়ােজিত হইয়া সার্থক হউক। এরূপ যাহার মনের ভাব ও প্রাণের আগ্রহ, তিনি সকল প্রকার দুঃসাহসিকতায় প্রবৃত্ত হইতে পারেন।—উড়লে কাৰ্যসিদ্ধির উপায় চিন্তা করিতে করিতে নিদ্রিত হইলেন। সমস্ত রাত্রির মধ্যে তাহার সুখ-সুপ্তির ব্যাঘাত হইল না। প্রভাতে নিদ্রাভঙ্গ হইলে পূৰ্ব্বরাত্রির সকল ঘটনার কথা তাহার স্মরণ হইল। প্রথমে মনে হইল তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছেন। ধীরে-ধীরে সকলই মনে পডিল। তাহার প্রথম চেষ্টা এত সহজে সফল হইবে, ইহা স্বপ্নেও ভাবিতে পারেন নাই।-এখন কয়েকদিন পর্যন্ত মিস্ এরাইনের জীবনের আশঙ্কা নাই, ইহা বুঝিয়া তিনি অপেক্ষাকৃত নিশ্চিন্ত হইলেন। তাহার আশা ইল- মিস্ এরসাইনের ঔষধের সহিত কিছুদিন বিষ প্রয়ােগ বন্ধ হইলেই তাহার শরীর অপেক্ষাকৃত সুস্থ ও সবল হইবে।” এই জাহাজ হইতে মিস এরকানকে সরাইয়া লইয়া যাওয়াই যে তাহার জীবনমার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়,-ডড়লে ইহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন , { অষ্টম পরিচ্ছেদ . এজন্য কি কৌশলে এই কঠিন কাৰ্য্য নির্বিঘ্রে সম্পন্ন করা যায়, তা তিনি কোন- মতে ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিতেছিলেন না। দিবসে এই চেষ্টা নিস্ফল হইবে , অধিক কি, তাহাতে জীবনরক্ষাও কঠিন হইবে। কিন্তু রাত্রিকালেই-বা তাহা কতদূর সম্ভব ? পলাইয়া যেস্থানে আশ্রয় লইতে হইবে—সেই স্থানটি তাহার পরিচিত হওয়া আবশ্যক , বিশেষত, সমুদ্রতীরের নিকটবর্তী কোন পবিচিত স্থানে উপস্থিত হইবার পূর্বে জাহাজ ত্যাগের চেষ্টা করাও মুক্তিসঙ্গত নহে।—তাহার স্মরণ হইল, ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন জাহাজের কাপ্তেনকে বলিয়াছিল, তিন দিনের মধ্যেই সে সকল ঝঞ্ঝাট চুকাইয়া ফেলিবে। অর্থাৎ তৃতীয় দিন—বৃহস্পতিবার রাত্রিকালই ঝঞ্জাট চুকাইবার শেষ মেয়াদ। -সেই দিন রাত্রিকালে জাহাজ কোন্ স্থানে উপস্থিত হইবে—ইহা জানিবার পূৰ্ব তিনি কোনও কার্যে হস্তক্ষেপণ করিতে সাহস করিলেন না। জাহাজে পথে ‘চাটখানি দেখা একান্ত আবশ্যক। এতদ্ভিন্ন আবও একটা ভাবিবার কথা ছিল।—তিনি কি কৌশলে জাহাজ হইতে বােট জলে নামাইবেন ?—যদিই-বা কোনও উপায়ে অন্যের অলক্ষ্যে তাহা জলে নামাইলেন, কিন্তু বােটে যে সকল সামগ্রী লওয়া আবশ্যক খাদ্য পানীয় প্রভৃতি অবশ্য-প্রয়ােজনীয় সামগ্রীগুলি তিনি কি উপায়ে সংগ্রহ কবিকেন?—তিনি উপযুক্ত খাদ্যদ্রব্যাদি, জীবনরক্ষার উপযুক্ত উপকরণাদি না কইয়া মিস্ এরসাইনের সহিত একখানি ক্ষুদ্র বােটে অকুল সমুদ্রে ভাসিতে পাবিবেন না। বাক্ষসের কবল হইতে তাহাকে রক্ষা কবিতে গিয়া তিনি কি তঁাহাক জলধিগভে বিসৰ্জন করিবেন?-জাহাজে বিশ্বাসঘাতক মাতুলের প্রদত্ত বিষে তিল তিল করিয়া মৃত্যুগ্রাসে পতিত হওয়া, অকূল সমুদ্রে বােটের উপর সামওয়েলির ন্যায় শােচনীয় মৃত্যু অপেক্ষা সহস্রগুণ অধিক প্রার্থনীয়। মিঃ ডড লে প্রাতর্তোজন শেষ করিয়া পিতলের কলকজা পালিশের যন্ত্রাদিসহ জাহাজের ‘হরিকেন ডেকে, উপস্থিত হইলেন। তিনি জাহাজের গন্তব্যপথের মানচিত্র (Chart) খানি আখিবার জন্য অধীর হইয়া উঠিলেন, কিন্তু অন্যের অলক্ষ্যে সেই কক্ষে প্রবেশ করিবার কোন উপায় দেখিলেন না।

৮৬ নাবিক-বধু তিনি কাপ্তেনের কেবিনের নিকট কাষ করিতে-করিতে ক্রমে সেই কক্ষের অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। সে সময় কাপ্তেন জাহাজের ‘ব্রিজের উপর ছিলেন। চাটরুমে’র নিকট তিনজন নাবিক জীবন-তরী’তে কাষ করিতেছিল , তাহারা কাৰ্যানুরােধে নীচে প্রস্থান করিলে ডেকের উপর তিনি ভিন্ন আর কেহই রহিল না। মিঃ ভড়লে তীক্ষ দৃষ্টিতে চতুর্দিকে চাহিয়া নিঃশব্দ-পদসঞ্চার ‘চাটরুমে প্রবেশ করিলেন, তিনি সেই কক্ষের টেবিলের উপর মানচিত্রখানি প্রসারিত দেখিলেন। এই মানচিত্রখানি তখন তাহার নিকট পৃথিবীর যাবতীয় ধনরত্ন অপেক্ষা মহার্ঘ বােধ হইল। তিনি করিওলেন’ জাহাজে ইহার অনুরূপ মাত্রচিত্র বহুবার দেখিয়াছেন , কিন্তু তাহা যে কোনদিন এ- ভাবে তাহার কাষে লাগিতে পারে—ইহা কখন কল্পনাও করেন নাই। যাহা হউক, তিনি অতান্ত ব্যগ্রভাবে তীক্ষ দৃষ্টিতে জাহাজের গন্তব্যপথ দেখিতে লাগিলেন। জাহাজখানি তখন কোন্ স্থান দিয়া চলিতেছিল—তাহা তাহার বুঝিতে কষ্ট হইল না। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত্রে জাহাজখানি কোন্ উপকূলের সন্নিকটে উপস্থিত হইতে পারে—তাহাও তিনি ঠিক করিয়া লইলেন। তিনি বুঝিলেন, তাহার আনুমানিক সিদ্ধান্ত সত্য হইলে জাহাজধানি সেই সময় লাম দ্বীপের সন্নিকটে উপস্থিত হইবে।—তিনি আশ্বস্ত হইলেন। তাঁহার আশ্বস্ত হইবার কারণ ছিল। মােসাব উত্তরে ‘লামু একটি সমৃদ্ধ নগর। এই নগর হইতে জাঞ্জিবাব ও মােজাম্বিকে টেলিগ্রাম প্রেরণ করিবার ব্যবস্থা আছে। ডডলে ইহাও জানিতেন যে,, ডিউসি-অ-আফ্রিকা ‘লাইনের জাহাজ গুলি বােম্বাই নগর হইতে মােম্বাসা ও জাঞ্জিবারে যাত্রা করিয়া ছয় সপ্তাহ অন্তর একবার লামু নগরে নােঙ্গর করে। সুতরাং তাহার বিশ্বাস হইল, যদি তিনি কোন উপায়ে মিস্ এরফাইনকে লইয়া এই নগরে ” আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারেন, তাহা হইলে তাহাদের বিপদের আশঙ্কা দূর হইতে পারে। কিন্তু তাঁহার এ আশা কি পূর্ণ হইবে ? আরও দুই একটি বিষয়ে তাঁহার সন্দেহ ছিল , সেই সন্দেহ নিরাকরণের অষ্টম পরিচ্ছেদ ৮৭ উদ্দেশ্যে তিনি সেই কক্ষের সেলফের উপর হইতে এডমিরালটি পাইলটু। নামক পুস্তকখানি লইয়া পড়িয়া আফ্রিকার উপকূল সম্বন্ধে কোন কোন জ্ঞাতব্য বিষয় জানিয়া লইলেন। হঠাৎ সেই কক্ষের বহির্ভাগে কাহার পদশব্দ শুনিয়া তিনি তাড়াতাড়ি পুস্তকখানি যথাস্থানে রাখিয়া চক্ষুর নিমিতে । মেঝের উপর বসিয়া পডিলেন, এবং ‘চাট টেবিলের পিতলের হাতল পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। পর মুহূর্তে জাহাজের প্রধান মেট, সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়া ডড লেকে দেখিয়া অত্যন্ত বিস্মিত হইল , তাহার পর ক্রুদ্ধ স্বরে বলিল, “তােকে এখানে আসিতে কে বলিয়াছে ?—চুরী করিবার মতলবে এই ঘরে ঢুকিয়াছিস বুঝি? এই মুহূর্তেই এখান হইতে চলিয়া যা, বিলম্ব কৰিলে জুতা মারিয়া পিঠ ফাটাইয়া দিব।” প্রধান মেট, সবেগে পা ছুডিল, কিন্তু তাহার বুট ডডলের অঙ্গস্পর্শ করিবার পূর্বেই তিনি সেই কক্ষ ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিলেন। প্রধান মেট, যে তাহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারে নাই বা তাহাকে মানচিত্রের প্রতি দৃষ্টি- পাত করিতে দেখে নাই, ইহা তিনি সৌভাগ্যের বিষয় মনে করিজেন। ধরা পডিলে তাহার কি দশা হইত, তাহা অনুমান করা কঠিন নহে। -বেলা আট ঘটিকার সময় ডডলে নীচের ডেকে নামিয়া আসিলেন। অপরাহ্নে মিঃ ডড়লে মিস এরাইনের সাক্ষাৎ লাভের আশায় উপরের ডেকে আসিলেন। তাহার বিশ্বাস ছিল, মিস্ এরাইন বায়ুসেবনের উদ্দেশ্যে কিছুকালের জন্যও উপরের ডেকে আসিয়া বসিবেন। প্রায় অর্ধঘণ্টা পরে মিস, এর কাইন তাহার মাতুল ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের স্কন্ধাবলম্বন করিয়া ধীরে-ধীরে ডেকে আসিয়া বসিলেন। সেদিনও মিস্ এরাইনকে অত্যন্ত দুৰ্বল বলিয়া বােধ হইল। তিনি অবসন্নভাবে চেয়ারে বসিয়া ইপাইতে লাগিলেন। তাহার কেবিন হইতে এইটুকু আসিতেই তিনি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত ইয়াছিলেন।—ডডলে দেখিলেন, ল্যাম্পিয়নের মুখ অত্যন্ত প্রফুল্ল। ল্যাম্পিয়ন তাহার ভাগিনেয়ীকে লিল, “কোন চিন্তা নাই, মা। গর? তুমি হাঁপাইতেছ। তােমার শরীর আজ অনেক ভাল বুলিয়াইত রে। } নাবিক-বধু, হইতেছে , কাল তুমি অনেকটা সুস্থ হইবে। তােমার যদি ইচ্ছা হয়—তাহা হইলে তােমার কাছে কিছুকাল বসিয়া তােমাকে নভেলখানা পডিয়া নাই।” মিস্ এরমকাইন মাথা নাডিয়া বলিলেন, “না, তাহার আবশ্যক নাই , আমি একটু নিরিবিল থাকিতে চাই।” ল্যাম্পিয়ন বলিল, “তােমার যেরূপ অভিরুচি , তবে আমি এখন চলিলাম । যদি আমাকে ডাকিবাব আবশ্যক হয় তাহা হইলে স্টুয়ার্ডকে বলিলেই সে আমাকে সংবাদ দিবে।” ল্যাম্পিয়ন অন্যত্র প্রস্থান করিলে মিস্ এরাইন চেয়ারে অর্ধশায়িত ভাবে বসিয়া চক্ষু মুদিত করিলেন।—তাহার পর চক্ষু খুলিয়া এক বার চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। ইত্যবসরে ডড়লে তাহার চেয়ারের অদূরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। ডডলে নিম্নস্বরে বলিলেন, “আপনার অবস্থা দেখিয়া আমার বউই ভয় হইয়াছিল , মনে হইতেছিল আজ আপনি আবও অধিক অসুস্থ হইয়াছেন।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “না, আজ আমি অনেকটা ভালই আছি। আপনার উপদেশানুসারেই আমি নামাকে বুঝিতে দিয়াছি—আজ আমি পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক অসুস্থ হইয়াছি।ভাল করি নাই ?” ডড়লে সােৎসাহে বলিলেন, “খুব ভাল করিয়াছেন। আপনি সত্যই কি আজ অন্যদিন অপেক্ষা ভাল আছেন ? আশা করি আপনি আজ একবারও ঔষধ থান নাই।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “ই, আজ অনেক ভাল। ঔষধ কি খাবার, কিছুই খাই নাই।”—অনন্তর তিনি ক্ষণকাল নীরব থাকিয়া বলিলেন, “আমার উদ্ধারের কোনও কৌশল আবিষ্কার করিতে পারিলেন কি? আপনি কি উিপায় স্থির করিয়াছেন?” ডডলে বলিলেন, “আগামী কল্য ত্রে এ জাহাজ ত্যাগ না করিলেই আপনি এজন্য প্রস্তুত আছেন কি ?”

অষ্টম পরিচ্ছেদ মিস্ এরাইন বলিলেন, “যখনই বলিবেন তখনই আমি আপনার সঙ্গে জাহাজ ত্যাগ করিব , আমার আর বিলম্ব সহ হইতেছে না। আমার জীবন নষ্ট করিবার জন্য যে ভীষণ ষড়যন্ত্র হইয়াছে, এ বিষয়ে আমার আর সন্দেহ নাই। -এখান হইতে পলাইতে পারিলেই বাঁচি। ডডলে বলিলেন, “যথাসময়ে আপনি সংবাদ পাইবেন। এখনও আমার উদ্যোগ-আয়ােজনের কিছু বাকি আছে , কিন্তু কালই পলায়ন করা স্থির। কাষটা অত্যন্ত কঠিন , কোন রকম ভুলচুক হইলে আর রক্ষা নাই।” উডল বােধ হয় আব ও কোন কথা বলিতেন, কিন্তু হঠাৎ ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন সেই স্থানে উপস্থিত হইল। তাহার হাতে এক পেয়ালা ব্ৰথ। সে তাহার ভাগিনেয়ীকে বলি, “মা, এই বণটুকু খা ও দেখি, শরীরে বল পাইবে।” মিস্ এরাই মাথা নাডিয়া ক্ষীণস্বরে বলিলেন, “না মামা, আমি উহা খাইতে পারিব না, আমার গা বমি-বমি করিতেছে। উহা খাইলেই বমি হইবে।” ল্যাম্পিয়ন 'সেই ব্রথ টুকু তাহাকে পান করাইবার জন্য কত অনুনয় বিনয় কবিল, শেষে ভ প্রদর্শনও করিল , কিন্তু মিস্ এরাইন তাহা পান করিলেন না। তখন ল্যাম্পিয়ন সেই পেয়ালাটি একটি গবাক্ষ রাখিয়া বলিল, “আমি ইহা এখানে রাখিয়া চলিলাম , এখন খাইবাব ইচ্ছা না হয়, খানিক পরে ব্ৰথ- টুকু পান কবিও। না খাইলে শরীরে বল পাইবে কেন ? রােগের সময় এত অবাধ্য হইলে কি শীঘ্র রােগ সারে ? ঔষধ পথ্য নিয়মমত খাইতে হইবে।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “আর রােগ সারিয়াছে।—এখন মরিলেই নাচি। এ যাতনা আর সহ্য হয় না। কিন্তু মামা, তােমার দয়ার জন্য আমি তােমার নিকট চিরকৃতজ্ঞ , তুমি আমার যেরূপ সেবাশুশ্রুষা করিতেছ, মা- বাপেও ততদূর করতে পারে না। তোমার স্নেহ-মমতা আমার মা স্বর্গ হইতে দেখিতে পাইতেছেন।” ১ ।

1
নাবিক-বধূ
ল্যাম্পিয়ন আর অধিকক্ষণ সেখানে অপেক্ষা না করিয়া নীচে চলিয়া
গেল।--ভাগিনেয়ীর কথা শুনিয়া সেই শয়তানের মনে লজ্জার সঞ্চার হইয়াছিল
কি না কে বলিবে ?
উড়লে মিস্ এরাইনকে একাকিনী দেখিয়া বলিলেন, “আমি আজ
রাত্রেই সকল বন্দোবস্ত শেষ কবিব । আপনি কাল আর ডেকে আসিবেন না ,
তাহা হইলে সকলে বুঝিবে আপনি আরও অধিক দুর্বল হইয়াছেন। আমি
কাল সন্ধ্যার সময় আপনাকে কোন কৌশলে সংবাদ দিব , সম্ভবতঃ গবাক্ষপথে
চিঠি ফেলিয়া দিব। তাহাতেই সকল কথা লেখা থাকিবে, আপনি তদনুসারে
কাষ করিবেন।”
মিস এসকাইন বলিলেন, “নিশ্চয়ই করিব।”
তখন ডড লে প্রফুল্লচিত্তে সেইস্থান ত্যাগ কবিলেন।

নবম পরিচ্ছেদ সেইদিন সায়ংকালে ডলে ডেকে বেলিংএর উপর ভর দিয়া সম্মুখে ঝুকিয়া পডিয়া সমুদ্রের দিকে চাহিতেছিলেন। এমন সময় পূর্বোক্ত পাচকটি তাহার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল, এবং তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, “কি চমৎকার সন্ধ্যা। ডড লে বলিলেন, “হাঁ, অতি চমংকাব সন্ধ্যা। পশ্চিম-আকাশে মেঘের সােনালী রঙের সহিত পাটল বর্ণের কি সুন্দর সমাবেশ। কিন্তু কলা আকাশের অবস্থা কিরূপ থাকিবে কে বলিতে পারে ?” হঠাৎ তাহার মনে হইল কথাটা বলিয়া ভাল করেন নাই।—বিশেষতঃ কপাট। তিনি পরিষ্কার ইংরাজীতে বলিয়া ফেলিয়াছিলেন। কি মারাত্মক প্রম।লােকটা তাহাকে সন্দেহ করিবে না ত ? তাহাৰ কথা শুনিয়া পাচকটা বলিল, “বাঃ, তুমি ত খাসা ইংরাজী বলিতে • পার হে। আরবের মুখে এরকম শুদ্ধ ইংরাজী আর কখনও শুনি নাই। তুমি আসল আরব না ছদ্মবেশী, ঠিক ঠাহর করিতে পারিতেছি না , কে তুমি?” মিঃ ডডলে বুঝিলেন, তিনি ধরা পড়িয়াছেন। পাচকের নিকট সত্য কথা গােপন করিয়া কোন লাভ নাই, বরং তাহাতে অনিষ্ট হওয়াই সম্ভব। লােকটি অসৎ লােক নহে, ইহা তিনি বুঝিয়াছিলেন , বিশেষতঃ, জাহাজের উপর তাহার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করিতে সে ভিন্ন আর কেহই ছিল না। এখন তাহার হস্তে আত্মসমর্পণ করা ভিন্ন তিনি অন্য কোনও উপায় দেখিলেন , অগত্যা তিনি নিম্নস্বরে বলিলেন, “তুমি আমাকে চিনিয়া ফেলিয়াছ, সুতাং তােমার নিকট আত্মগােপন করিয়া কোন লাভ নাই , আমি তােমার হস্তে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ কৰূিলাম। তােমার ইচ্ছা হইলে জাহাজের কাপ্তেনের নিকট আমাকে ধরাইয়া দিয়া আমার সর্বনাশ করিতে ৭ —আমার জীবন ও মৃত্যু এখন তােমারই হাতে।” ভুলে 1, উড়লে নাবিক-বধূ পাচক বলিল, “তুমি কি আমাকে এই রকম শয়তান মনে কর? আমি তােমার সর্বনাশ করিব।তােমাকে বিপদে ফেলিয়া আমার লাভ কি ?” ডড়লে বলিলেন, “এই জাহাজে যদি কেহ আমার বন্ধু থাকে--তবে সে তুমি।আমি কিরূপ বিপন্ন, তাহা তােমার নিকট প্রকাশ করিলে আমার হিত ভিন্ন অহিত হইবে না তাহা জানি, কিন্তু সাহস করিয়া এতদিন সে কথা তােমাকে বলিতে পারি নাই। তােমার নিকট আমার কোনও কথা গােপন করিব না।” পাচক বলিল, “বুঝিয়াছি, তুমি হঠাৎ ধরা পডিয়াছ বলিয়াই অগত্যা আমার কাছে তােমার গুপ্তকথা প্রকাশ করিতে উদ্যত হইয়াছ। তুমি আমাকে চেন না, আমিও তােমার পরিচয় জানি না, কিন্তু যেদিন আমি তােমাকে সেই জীর্ণ তরণী হইতে উদ্ধার করিয়াছি, সেইদিন হইতেই আমার সন্দেহ হইয়াছিল—তােমার জীবন কোন দুর্ভেদ্য রহস্যজালে সমাচ্ছন্ন। তবে আমার সন্দেহের কথা কাহাকেও বলি নাই। তােমার কোন অনিষ্ট হয়, ইহা আমার ইচ্ছা নহে। যদি তুমি আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিতে না পার, তাই। হইলে তােমার গুপ্তকথা প্রকাশ করিবার আবশ্যক নাই , তাহা শুনিবার জঙ্গ আমারও আগ্রহ নাই। তুমি এ কথা মনে করিও না যে,আমি উইলিয়াম ব্লেক গুপ্তকথা গােপন রাখিতে পারি না। তোমার গুপ্তকথা আমার নিকট প্রকাশ করিলে যদি তাের বা আমার বিপদের আশঙ্কা থাকে, তাহা হইলে সে সকল কথা আমাকে না বলাই ভাল। দেশে আমার স্ত্রী ও তিনটি মেয়ে আছে, আমি ভিন্ন তাহাদের প্রতিপালন করিবার কেহই নাই , সুতরাং আমি কোন রকম বিপদের সম্মুখীন হইতে ইচ্ছুক নহি। আমার সকল কথাই শুনিলে , এখন তুমি তােমার কর্তব্য স্থির করিতে পাব।” উড়াল অসঙ্কোচে বলিলেন, “আমি আমার কর্তব্য স্থির করিয়াছি। তামি বুঝিয়াছি, তুমি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাসের পাত্র। বিশেষতঃ, আমার যেরূপ কি অবস্থা, তাতে মনে হয় এ সময় আমার একজন বিশ্বাসী বন্ধুর বড় আমার যে কি বিপদ, তাহা তােমার অনুমান করিবারও শক্তি নাই।

নবম পরিচ্ছেদ আমি আমার সকল কথাই তােমাকে বলিব , তুমি দয়া করিয়া শুনিলে বড়ই অনুগৃহীত হইব। তোমার সামর্থ্যে কুলাইলে, আশা করি তুমি আমাকে সাহাযা করিতে কুণ্ঠিত হইবে না। যাহা ভাল বুঝিবে—করিও।” মিঃ ডড়লে পাচকের পাশে দাঁড়াইয়া সন্ধ্যার ধূসর ছায়া সমাচ্ছন্ন সমুদ্রের দিকে চাহিয়া, তঁাহার আত্মপরিচয় ও লােমাঞ্চকর অভিযান-কাহিনী পাচকের নিকট প্রকাশ করিলেন। মিস্ এরাইনকে হত্যা করিবার জন্য তাহার মাতুল কাপ্তেনের সহিত কি ভয়ানক ষড়যন্ত্র করিয়াছে, তাহাও তাহার গােচর করিলেন ।তাহার কথা শুনিতে-শুনিতে পাচকের মুখ সন্ধ্যার আকাশের স্থায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল। সকল কথা শুনিয়া সে বলিল, “তােমার কথা উপন্যাসের মত অদ্ভুত । এ সকল কথা সত্য হইলে এই জাহাজের কাপেনের মত নরপ্রেত দুনিয়ায় আর আছে কি না সন্দেহ।—কিন্তু তােমার কথা যে সত্য, তাহার প্রমাণ কোথায় ? ডডলে বলিলেন, “যা সত্য আমি তাহাই বলিয়াছি , কিন্তু তুমি ইহার অকাট্য প্রমাণ চাহিলে তাহা দেওয়া সহজ নহে।তবে দাড়াও, হ ত তােমাকে এখনই তার প্রমাণ দিতে পারব। আজ বৈকালে আমি ডেকের উপর কায় কবিতে-করিতে দেখিলাম, ল্যাম্পিয়ন তাহার ভাগিনেয়ীর জন্য পেয়ালা ব্ৰথ, লইয়া আসিল। মিস্ এসকাইন তাহা পান না করায়-ল্যাম্পিয়ন বথের পেয়ালাটা জানালায় রাখিয়াছিল। তাহা কি এখনও সেখানে আছে ?” পাচক বলিল, “য়াড' বােধ হয় এতক্ষণ তাহা লইয়া গিয়াছে , খাইয়া ফেলিয়াছে কি না কে জানে ?--কিন্তু তোমার অভিযােগ যে সত্য, ইহা এই ব্ৰথটুকু হইতে কিরূপে প্রতিপন্ন হইবে ?” ডডলে বলিলেন, “সেই ব্ৰথটুকু সংগ্রহ কবিয়া জাহাজের কোন বিলকে খাইতে দিলেই তুমি বুঝতে পারিবে আমার অভিযােগ সত্য কি না।-তুমি সেটুকু লইয়া আসিতে পার ?—হাতে-হাতে পরীক্ষা হইবে।” পাচক কৌতূহলপূর্ণ চিত্তে সেই 'পেয়ালাটা আনিতে গেল , পনের মিনিটের মধ্যে আর সে ফিরিল না। সে শূন্য হন্তে ফিরিয়া আসিলে,ডউলে ৯৪ নাবিক-বন্ধু দেখিলেন, তাহার মুখ বিবর্ণ হইয়াছে , তার চক্ষুতে উদ্বেগ ও আতঙ্কের চিহ্ন সুপরিস্ফুট । পাচক ডডলের পাশে আসিয়া নিম্নস্বরে কহিল, “তােমার কথাই সত্য। উঃ, কি ভয়ঙ্কর শয়তানী । মিস, একাইনের মত সুন্দরী সুশীলা সরল। যুবতীকে যাহারা এইভাবে বিষ খাওয়াইয়া মারিবার চেষ্টা করে, -তাহাব। মানুষ না পিশাচ ? ডড়লে বলিলেন, “আমার কথা যে সত্য, ইহা তুমি কিরূপে জানিলে ? তুমি ত সেই ব্রথের পেয়ালা আন নাই , ব্রথের গুণাগুণেরও পরীক্ষা হয় নাই।” পাচক বলিল, “সে পরীক্ষা হইয়া গিয়াছে ।—ভয়ঙ্কর ব্যাপার।” ডডলে কৌতূহল দমন করিতে না পারিয়া বলিলেন, “কি হইয়াছে শুনিতে পাই না ? পাচক গম্ভীর মুখে বলিল, “খানিক আগে ষ্টুয়ার্ড জানালা হইতে সেই ব্রথের পেয়ালাটি তার কুঠুরীতে লইয়া যায়। লােকটা ভয়ঙ্কর পেটুক, কিছুতেই তাহার পেট ভরে না। এক পেয়ালা ব্ৰখ ফেলিয়া দিবে—এমন পাত্র সে নহে। সে কুঠুরীতে ঢুকিয়াই এক চুমুকে ব্ৰথটুকু নিঃশেষ করে। আধ ঘণ্টা যাইতে-না-যাইতে বেচারার পেটে জ্বালা আরম্ভ হইল । সে যন্ত্রণায় ছটফট, করিতে লাগিল , আমাকে দেখিবামাত্র কঁদিয়া বলিল, “আর বুঝি বাঁচিলাম । আমি যে ব্ৰথ খাইয়াছি তাহা বিষ-মিশান ছিল। হাঁ, নিশ্চয়ই তাহা বিষাক্ত , নতুবা আমার এত যন্ত্রণা হইবে কেন ? আর দেশে যাইতে পারিলাম ন। হায়, হায়, লােভে পডিয়া কি কুকৰ্ম্মই করিয়াছি।'—বেচারা প্রাণভয়ে অস্থির হইয়া ল্যাম্পিয়নের নিকট ছুটিয়া গেল, তাহাকে বলিল, ডাক্তার, আমি বুঝি মরিলাম। আমি ব্ৰথ, খাইয়া বিষের জ্বালায় অস্থির হইয়াছি। দয়া করিয়া আমাকে একটা ঔষধ দাও , আমাকে বাঁচাও।” ডডলে ব্যগ্রভাবে বলিলেন, “ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন একথা শুনিয়া কি বলিল ?” পাচক বলিল, “য়ার্ডের কথা শুনিয়া ডাক্তারের মাথায় যেন বজ্রাঘাত নবম পরিচ্ছেদ হইল। তাহার মুখ চূণ হইয়া গেল।—কিন্তু কয়েক মিনিট পরে প্রকৃতিস্থ হইয়া সে ষ্টুয়ার্ডকে বলিল, কোন ভয় নাই , আমি ঔষধ দিতেছি, তাহা খাইলেই তুমি সুস্থ হইবে। তােমাকে এত ভালবাসি যে, তােমার অসুখের কথা শুনিয়া আমার মন অস্থির হইয়াছে।—যাহা হউক, তুমি বাপু এ কথা আর কাহারও নিকট • প্রকাশ করিও না। খাদ্যদ্রব্য কোন কারণে বিষাক্ত হইয়াছে শুনিলে জাহাজের সকল লােকের মনে অত্যন্ত আতঙ্ক হইবে, তাহা প্রার্থনীয় নহে। ডড়লে বলিলেন, “কিন্তু ব্ৰথটা কিরূপে বিষাক্ত হইল, সে সম্বন্ধে ডাক্তার কোন কথা বলিয়াছে ? পাচক বলিল, “হা বলিয়াছে , শয়তানটা আমারই ঘাড়ে দোষ চাপাইয়াছে। বলিয়াছে, বাবুর্চির দোষেই এ বিভ্রাট ঘটিয়াছে , সে বিষাক্ত টিন খুলিয়া ব্ৰথ, প্রস্তুত করাতেই তােমার এই দশা। যদি তােমার মৃত্যু হয়—তাহা হইলে সেজন্য বাবুর্চিই দায়ী।'—আপনার কাছে সকল কথা না শুনিলে ত মনে করিতাম আমিই এজন্য দায়ী।” ডড়লে বলিলেন, “মিস, এরস, কাইনকে হত্যা করিবার জন্য যে ষড়যন্ত্র হইয়াছে তাহা তুমি জানতে পারিয়াছ, একথা ৩ প্রকাশ কর নাই ?” পাচক বলিল, “আমি কি পাগল যে, সে কথা লইয়া আন্দোলন করিব ? আমি ত সকলই বুঝিতে পারিতেছি।যাহা হউক, ল্যাম্পিয়ন যতই বড় লোেক হউক, তাহাকে সায়েস্তা না করিয়া ছাডিতেছি না, বিষ দিয়া সে মানুষ মারিবার চেষ্টা করিতেছে। এতবড় শয়তানী ?” ডড়লে বলিলেন, “দেখ ব্লেক, ডাক্তাব ল্যাম্পিয়ন ও জাহাজের কাপ্তেন মিস, একাইনকে হত্যা করিবার জন্য কি ভীষণ ষড়যন্ত্র করিয়াছে, তাহার ত অকাট্য প্রমাণ পাইলে ?—আমার কথায় কি এখনও তােমার অবিশ্বাস আছে ? পাচক বলিল, “না মুহাশয়, আর কিছুমাত্র অবিশ্বাস নাই। আপনার সকল কথাই যে সত্য, তাহা বুঝিতে পারিয়াছি। আপনার কথা প্রথমে অবিশ্বাস করিয়াছিলাম, সেজন্য আপনি কিছু মনে করিবেন না।” উড়লে বলিলেন, “আমি তােমার নিকট নিজের পরিচয় দিয়াছি। আমি • নাবিক-বধূ |- বলিয়াছি আমি ইংলণ্ডেশ্বরীর নৌ-বহরের একজন কর্মচারী। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান সেনাপতি এডমিরাল রেড়ফর্ণের আদেশানুসারে আমি এখানে আসিয়াছি। আমি নৌ-বিভাগে চাকরী করিলেও আমার আর্থিক অবস্থা বেশ সচ্ছল। মিস, এসকাইন কোনও লক্ষপতির একমাত্র কন্যা, পিতার বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী।—এই সম্পত্তি আত্মসাৎ করিবার দুরভিসন্ধিতেই ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন তাহার ভাগিনেয়ীকে কৌশলে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র করিয়াছে , এবং কাপ্তেনটা কিছু টাকার লােভে তাহার সহায়তা করিতে সম্মত হইয়াছে। আমি জানিতে পাবিয়াছি, মিস, এসকাইনের মৃত্যুর পর, কাপ্তেন ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের নিকট পঞ্চাশহাজার টাকা পাইবে।অতঃপর আমি কি কবিব, তাহাই এখন শােন-আগামী কল্য রাত্রেই আমি মিস, এসকাইনকে সঙ্গে লইয়া অন্যের অলক্ষ্যে এই জাহাজ হইতে পলায়ন করিব , নতুবা তাব প্রাণরক্ষার কোনও আশা নাই। আমরা যাহাতে নির্বিঘ্নে জাহাজ ত্যাগ করিতে পারি, এ বিষয়ে যদি তুমি আমাকে সাহায্য কর, তাহা হইলে আমি লণ্ডনে আমার ব্যাঙ্কারের নামে তােমার হাতে একখানি পত্র দিব, তুমি সেই পত্র ব্যাঙ্কে দিলেই হাজার পাউণ্ড পাইবে। ইহাই তােমার পুরস্কার। এতদ্ভিন্ন মিস, এরস,কাইনও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তােমাকে আর একহাজার পাউণ্ড পুরস্কার দিবেন, এবিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। এখন বল, তুমি আমাদের সাহষ্য করিতে সম্মত আছ কি না। পাচক মুহুৰ্তকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া বলিল, “আপনি যে পুরস্কারের কথা বলিলেন, তাহা আমার পরিশ্রমের তুলনায় প্রচুর,—এমন কি, আশাতীত, ইহা আমাকে স্বীকার করিতেই হইবে। কিন্তু আমি যে‘উহা অপেক্ষা অধিক পুরস্কারের লােভে আপনার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিব না—পুরস্কারের চিঠিখানি হস্তগত করিয়া অবশেষে আপনার গুপ্তকথা ল্যাম্পিয়নের নিকট প্রকাশ করিব না, ইহা আপনি কিরূপে বুঝিবেন ? আমি ত ধৰ্ম্মজ্ঞানহীন সামান্য পাচক, আমার অপেক্ষা সহস্র গুণ অধিক সম্ভ্রান্ত লােকেও এ রকম বিশ্বাস- ঘাতকতা সর্বদাই করিয়া থাকে।”

নবম পরিচ্ছেদ ৯৭ বলিলেন, “তা করে, কিন্তু দীন দরিদ্র অশিক্ষিত লােক এরূপ মনে আছে, যাহারা সৃম্ভান্তবংশীয় শয়তানের তুলনায় দেবতা। অশিক্ষিত রিদ্র হইলেও তােমার হৃদয় মহত্বপূর্ণ, তুমি খাটি লোেক। আমি তােমাকে বিশ্বাস করি, তােমার। আমি বিপন্ন হইব না, ইহা বুঝিছি।” পাচক বলিল, “আপনার কথা শুনিয়া সুখী হইলাম। আপনি আমার নকট কিঞ্চিৎ উপকারের প্রত্যাশায় আমাকে বিপুল অর্থ পুরস্কার দিতে উদ্যত হইয়াছেন, কিন্তু আপনি স্থির জানিবেন, আপনি এই পুরস্কারের লােভ না দেখাইলেও আমি সাধ্যানুসারে আপনার উপকার করিতাম। মিল, এস, কাইন যে বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারিণী, সে সংবাদ পূর্বেই পাইয়াছি। জাহাজের কাপ্তেন ও ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন মিস, এসকাইনকে একেবারে নজরবন্দী কৰিয়া রাখিয়াছে, তাহাকে তাহাদের কবল হইতে উদ্ধার করা নিতান্ত সহজ হইবে না। যাহা হউক, আপনি তাঁহার উদ্ধারসাধনের কি উপায় স্থির করিয়াছেন বলুন , দেখি,-কথাটা আমার মনে লাগে কি না।” মিঃ ডড়লে বলিলেন, “কাল রাত্রে যেরূপেই হউক-আমাকে জাহাজের একখানি বােট সংগ্রহ করিতে হইবে। সেই বােটে যথেষ্ট খাদ্যদ্রব্য পানীয় প্রভৃতি লওয়া আবশ্যক , ইহা অপরিহার্য। আমরা সেই বােটে সমুদ্রকূলে যাইবার চেষ্টা করিব। এতদ্ভিন্ন, আমার এক সুট, পােষাক সংগ্রহ করাও আবশ্যক হইবে। কারণ, যদি আমি সৌভাগ্যক্রমে তীরে উঠিতে পারি, তাহা হইলে আমার এই বেশ দেখিয়া, আমার কথা সত্য বলিয়া কেহই বিশ্বাস করিবে না। তােমার শরীরের গঠন ও উচ্চতা আমারই মত, তুমি তােমার এক সুট, পােষাক আমাকে দিতে পার না? পাচক বলিল, “এ আর কঠিন কথা কি? আপনি অনায়াসেই তাহা পাইতে পারেন। কিন্তু বােটখানা সংগ্রহ করাই কিছু কঠিন হইবে। বোট এই জাহাজের সম্পত্তি, তাহা জাহাজ হইতে নামাইয়া লইয়া যাওয়ার অর্থ, বােটখানি চুরী করা। কিন্তু আপনি যেরূপ বিপন্ন, যে অবস্থায় একখানি বােট সংগ্রহ করিতে বাধ্য হইতেছেন,-তাহাতে এ রকম চুরীর যে সমর্থন করা যায় ৯ নাবিক-বধূ —ইহাও বলিতে পারি না। নারীহত্যায় বাধা দিতে হইলে বােট চুরী না করিয়া উপায় কি ? কিন্তু এ কাষে আপনার সাহায্য করা আমার পক্ষে সঙ্গত হইবে না। আমি জাহাজের কর্মচারী, জানিয়া-শুনিয়া জাহাজের জিনিস 'চুরীর সহায়তা করিতে পারিব না , টাকার লােভে বিশ্বাসঘাতকতা করিব না। এ কাষটা আপনাকে নিজের চেষ্টায় করিতে হইবে।” ডডলে বলিলেন “কিন্তু কিছু খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় সংগ্রহের কি উপায় হইবে ? যদি তুমি বােট-সংগ্রহে আমাকে সাহায্য না কব—তাহা হইলে খাগ- সামগ্রী সংগ্রহেই-বা কিরূপে সাহায্য কবিবে ?” পাচক বলিল, “তাহাতে কোন অসুবিধা হইবে না। মিস্ এরাইন ও জাহাজে তাহার খােরাকীর টাকা জমা দিয়াছেন ,“নিশ্চয়ই দিয়াছেন। সুতাং তিনি গন্তব্য স্থানে যতদিন না পঁহুছিবেন, ততদিন জাহাজের খাদ্য- সামগ্রীতে তাহার ন্যায়তঃ দাবী আছে। এ অবস্থায় তাহার থােক তাহার সঙ্গে দিতে আপত্তি কি ? উড়লে বলিলেন, “তুমি সঙ্গত কথাই বলিয়াছ। তাহা হইলে খাদ্য-সামগ্রী ও পানীয় সম্বন্ধে আমি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি।-বােটখানি সম্বন্ধে কি করিব শােন। আমি আত্মপরিচয় দিয়া কাপ্তেনের নামে তোমাকে একখানি পত্র দিব , সেই পত্রখানি তুমি এমন কোন স্থানে রাখিয়া দিবে-যেন কাপ্তেন সহজে তাহা দেখিতে পায়। আমি সেই পত্রে লিখিব—আমি বিশেষ প্রয়ােজনে বেটখানি ভাডা লইলাম, ইংলণ্ডেশ্বরীর যুদ্ধ জাহাজ ‘করিওলেনসে’র লেফটেনান্ট ডড লেব নিকট দাবী কৰিলেই ভাড়ার টাকা তাহার হস্তগত হইবে। ভাড়ার পরিমাণ যাহাই হউক, তাতে আপত্তি হইবে না।” পাচক বলিল, “হাঁ, এ রকম করিলে চলিতে পারে।–এরূপ করিলে বােট চুরী করা হইবে না, আমিও আপনাকে সাহায্য করিতে পারি। সকল কথা ত স্থির হইল , আমাকে আর কি করিতে হইবে ? ডলে বলিলেন, “বেটখানি জলে নামাইবার সময় তােমার সাহায্য চাই। “ কারু পর তােমাকে আর কিছু করিতে হইবে না।”

নবম পরিচ্ছেদ । পাচক বলিল, “সে সাহায্য আমার নিকট পাইবেন , আশা করি আপনি মিস্ এরাইনকে সঙ্গে লইয়া নিরাপদে স্কুলে উঠিতে পারিবেন। কাপেন ও ডাক্তারটার শয়তানীর কথা মনে হইতেছে, আর রাগে আমার সব্বাঙ্গ জ্বলিয়া যাইতেছে।” কথাবার্তা শেষ হইলে পাচক স্বস্থানে প্রস্থান করিল। মিঃ উড়লে মনে মনে বলিলেন, “এই লােকটাকে সকল কথা বলিয়া ভালই করিলাম। সে ইচ্ছা করিলে আমাদের সর্বনাশ করিতে পারিত , কিন্তু খাটি লােক, সে আমাদেব কোন অনিষ্ট করিবে না। যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া ত দেখি, রক্ষা পাওয়া না পাওয়া পরমেশ্বরের এক্তিয়ার।” মিঃ ডড়লে রাত্রে শয়ন কবিয়া তাহার সঙ্কল্পের কথা চিন্তা করিতে লা: লেন। দুইটি কাষ কিছু কঠিন বলিয়া মনে হইল , প্রথম, বােটখানি অন্যের অলক্ষ্যে সমুদ্রে নামাইয়া দেওয়া, দ্বিতীয়, মিস্ এরাইনকে অন্যের অজ্ঞাতসার তাহার কেবিন হইতে বাহির করিয়া আনিয়া সেই বােটে স্থাপন করা। এতছিল, তিনি কোন্ সময় জাহাজ ত্যাগ করিবেন, তাহাও মিস্ এসকাইনকে জানাই হইবে।-বিভিন্ন চিন্তায় তাঁহার ক্ষুব্ধ হৃদয় এরূপ আলােড়িত হইতে লাগিল যে, তাঁহার নিদ্রাকর্ষণ হইল না। তিনি মুদিত নেত্রে নিদ্রাদেবীর উপাসনা করিতে- ছেন, এমন সময় হঠাৎ তাহার পিঠে কাহার হাত ঠেকিল। তিনি সবিস্ময়ে চাহিয়া মৃদু আলােকে দেখিলেন, পাচক ব্লেক তঁাহার মাথার কাছে দাড়াইয়া আছে। প্রথমে তাহার মনে একটু ভয় হইল , লােকটা এত রাত্রে কি উদ্দেশ্যে তাহার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছে ? তিনি তৎক্ষণাৎ উঠিয়া বসিলেন , কিন্তু কোন কথা জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বেই পাচক বলিল, “আপনি ইচ্ছা কৰিলে আমার কুঠুরীতে গিয়া শুইতে পারেন , আপনি খুব সকালে উঠিয়া আসিল এ কথা হই জানিতে পাৰ্বিবে না।” মিঃ ডড়লে এ প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না। তিনি তাহাকে জানাইলেন, ইহাতে কোন লাভ নাই , অথচ জাহাজের কোন লােক তাহাদের ঘনিষ্ঠতার পরিচয় পাইলে বিপদের যথেষ্ট সম্ভাবনা।

নাবিক-বন্ধু পাচক বলিল, “আপনি সঙ্গত কথাই বলিয়াছেন, আমি অতখানি ভাবিয়া দেখি নাই। ডডলে বলিলেন, “তােমার সহৃদয়তার জন্য ধন্যবাদ।আর এক কথা, bয়ার্ডটা কেমন আছে?” পাচক বলিল, “তাহার অবস্থা অনেকটা আশাপ্রদ। আমি কয়েক মিনিট পূর্বে তাহাকে দেখিতে গিয়াছিলাম। শুনিলাম, ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন তাহার পেট ধুইয়া দিয়াছে। একজনকে মারিতে গিয়া শয়তানটা আর একজনকে মারিয়া ফেলিয়াছিল আর কি।” ভড়লে বলিলেন, “লােকটার পরমাযুর জোর আছে-তাই বাঁচিয়া গেল বােধ হয়। তবে সেই মৃদু বিষে বেচারা মরিত কি না ঠিক বলা যায় না। মরিলে কিন্তু ভয়ানক হৈ-চৈ পডিয়া যাইত , মধ্যে হইতে তুমিই হয় ত মরা পডিতে । যাহা হউক, আমি তােমার নিকট যে কতদূৰ কৃতজ্ঞ, তাহা বলিতে পারি না।” পাচক প্রস্থান করিলে তিনি আর একবার ঘুমাইবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু নানা দুশ্চিন্তায় সে রাত্রে তাহার নিদ্রাকর্ষণ হইল না। তিনি যতই চিন্তা করিতে লাগিলেন, ততই তাহার উদ্বেগ বর্ধিত হইতে লাগিল। জাহাজের সকল লােকে জ্ঞাতসারে পলায়ন করা কতদূর কঠিন, তাহা বুঝিয়া তাহার মানসিক উৎকণ্ঠা ও চাঞ্চল্যের সীমা রহিল না। যদি অন্ধকার রাত্রি হইত, তাহা হইলেও তেমন উৎকণ্ঠার কারণ ছিল না, কিন্তু সেদিন শুক্লপক্ষ, সমস্ত রাত্রেই পরিস্ফুট, জ্যোৎস্নলােক।—এ অবস্থায় নিৰ্বিয়ে সঙ্কল সিদ্ধির সম্ভাবনা কতটুকু? পরদিন প্রভাতে প্রাতর্ভাজনের সময় ডডলে পাচকের নিকট উপস্থিত হইলে সে তাহার সহিত তেমন মাখামাখি করিল না, অন্যান্য দিনের মত হাস্য পরিসও করিল না। সে অত্যন্ত গম্ভীরভাৰে তাহাকে বসিতে বলিল, তাহার পর চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া—নিকটে কেহ নাই দেখিয়া তাহাকে নিম্ন স্বরে বলিল, “কি করিয়া আপনার কাােজার করি, এই কথা ভাবিতে-ভাবিতে কাল রাত্রে ঘুমাইতে পারি নাই। আপনাকে এখন কি খাবার দিব বুঝিতে পূরিতেছি না। আপনার অনুমতি হইলে আপনার ভাতের মধ্যে লুকাইয়া নবম পরিচ্ছেদ কিছু ভাল খাবার জিনিস দিতে পারি , আপনি অন্যের অলক্ষ্যে তাহা বাহির করিয়া লইবেন। ভড়লে বলিলেন, “না, তার আবশ্যক নাই। পূর্বের মত যাহা আমাকে দিবে, তাহাই যথেষ্ট। ঈশ্বর করুন আজ রাত্রিই যেন আমার জাহাজ- বাসের শেষ রাত্রি হয়। যাহা হউক, আজ রাত্রে বােটের উপর খাদ্য-সামগ্রী রাখিবার কি ব্যবস্থা করিবে ? তুমি তাহা প্রস্তুত রাখিবে কি?” পাচক বলিল, “সে সকল আমি ঠিক করিয়াই ৰাখিয়াছি। আমার কুঠুরীতে খাটিয়ার নীচে একটা বাক্সের মধ্যে তাহা বন্ধ করিয়া রাখিয়াছি , যখন আবক হইবে, তখনই তাহা দিতে পারি। আপনি কোন্ বােটখানি লইবেন, তাহা স্থির করিয়াছেন কি ? ডডলে বলিলেন, “পােট-কোয়ার্টারের বােট। অন্যান্য বােট অপেক্ষা সেইখানিই সহজে জলে নামাইতে পাৰিব। আমি কি ভাবে কাষ করিব, তাহা তুমি শুনিয়া রাখ। রাত্রি দ্বিপ্রহরের পূর্বে আমি জাহাজ ত্যাগ করিব । আমি মিস্ এরসাইনকে সঙ্কেত কৰিলেই তিনি ডেকে আসিবেন। তাহার পর তাঁহাকে বােটের মধ্যে বসাইয়া বােটথানি জলে নামাইয়া দিব। ইহাতে তাহার একটু কষ্ট হইবে, কিন্তু উপায় কি ? বােটনি নামাইয়া দিয়াই আমি বুজুর সাহায্যে তাহাতে নামিয়া পড়িয়া বােট খুলিয়া দিব। জাহাজের কাপ্তেন যখন আমাদের পলায়নের সংবাদ পাইবে, তখন সে ক্ৰোধান্ধ হইয়া তােমাদের সকলকেই জিজ্ঞাসা করিবে-তােমরা কিছু জান কি না।” পাচক বলিল, “আমাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করিলে তাহাকে যাহা বলিতে কম বলিব, সেজন্য আপনার কোন চিন্তা নাই।” ডডলে বলিলেন, “তােমার কথা শুনিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম। এখন আর কোন কথার আবশ্যক নাই, দুই তিনটা খালাসী আমাদের দিকে চাহিয়া আছে, আমাদের কথাবার্তা শুনিতে না পাইলেও, আমার পলায়নের পর তােমাকে সন্দেহ করিতে পারে। কাপ্তেনকে হয় ত বলিবে, মাবুর্চির সহিত আৱৰটার পরামর্শ হইতেছিল—দেখিয়াছি।-আমি এখন চলিলাম।

নাবিক-বধু মিঃ ডডলে এক বাটী ভাত লইয়া সেই স্থান ত্যাগ করিলেন, তিনি যেখানে বসিয়া প্রত্যহ আহার করিতেন, সেই স্থানেই বসিয়া খাইতে মণিলেন। জাহাজের একটা খালাসীকে তিনি অত্যন্ত ঘৃণা করিতেন, সে অদূরে বসিয়া তাহার আহার দেখিতে লাগিল। এই ইংরাজ থালাসীটা তাঁহাকে কিছু সন্দেহের চক্ষে দেখে—তাহা তিনি বুঝিয়াছিলেন, সে হয় ত তাঁহাকে ছদ্মবেশী বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছে,—এই কথা ভাবিয়া তিনি উৎকণ্ঠিত হইলেন।কিন্তু তিনি কোনরূপ বাহিক চাঞ্চল্য প্রকাশ না করিয়া-যেন তাহাকে দেখিতেই পান নাই, এই ভাবে খাইতে লাগিলেন। আহারের পর তিনি তাঁহার দৈনন্দিন কাৰ্য্যে চলিলেন। তিনি জানিতেন, মিস্ এরাইন সেদিন আর ডেকে বেড়াইতে আসিবেন না। তাহার স্বাস্থ্য সম্বন্ধে তাহার মামা কাপেনের নিকট কি মন্তব্য প্রকাশ করে, তাহ। জানিবার জন্য তাহার অত্যন্ত কৌতূহল হইল। তাহাদের কথা শুনিবার জন্য কি কৌশল অবলম্বন করা যায়,—ইহাই তিনি ভাবিতে লাগিলেন। তিনি মনে করিলেন, কাপ্তেনের কেবিনে ভিন্ন অন্য কোথাও তাহারা এ সম্বন্ধে আলােচনা করিবে না, সুতরাং তিনি কাপ্তেনের কেবিনের নিকট গিয়া কাষ করাই কর্তব্য মনে করিলেন।তিনি সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া কায আরম্ভ করিলেন, কিন্তু ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন সেদিকে আসিল না। আটটার পর ল্যাম্পিয়ন হরিকেন ডেকে’র সিডি দিয়া মন্থর গতিতে সেই স্থানে উপস্থিত হইল। মিঃ ডড়লে তখন এঞ্জিন-ঘরের পিত্তলনিৰ্ম্মিত কয়েকটি ফ্রেম পরিষ্কার করিতেছিলেন, তিনি লাপিয়নের গতিবিধি লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। সে ধীরে ধীরে কাপ্তেনের কেবিনে প্রবেশ করিবামাত্র—ডড়লে তাহার অনুসরণ করিলেন, এবং সেই কক্ষের দ্বারপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইয়া—ভিতরে কি কথা হয়, শুনিবার জন্য উদ্যত কর্ণে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। তিনি তাহাদের অস্ফুট কখয়ে উদ্বেগের আভাস পাইলেন। কাপ্তেন বলিল, “আজ তােমার ভাগিনেয়ী কেমন আছে? অবস্থাটা প্রদ কি?

নবম পরিচ্ছেদ ল্যাম্পিয়ন জড়িত স্বরে বলিল, “শেষ হইতে আর যে বেশী বিলম্ব আছে- এমন ত বােধ হয় না।*-সে ঝুপ করিয়া একখানি চেয়ারে বসিয়া পড়িল, সে শব্দও ডড়লে শুনিতে পাইলেন। কাপ্তেন বলিল, “ও কি । তুমি কঁপিতেছ কেন ?—তােমার মুখ শুকাইয়া, গিয়াছে । এত ভয় কিসের ? তুমি এরকম কাপুরুষ তাহা ত জানিতাম না।” কাপ্তেন সােডা খুলিয়া তাহা গেলাসে ঢালিল', উড়লে অনুমান করিলেন, তাহাতে খানিক ব্রাণ্ডিও ঢালিয়া দেওয়া হইল। অনন্তর সে ল্যাম্পিয়নকে বলিশ, “তুমি বড়ই দমিয়া গিয়াছ, এইটুকু খাইয়া মন চাঙ্গা কর।—কি বলিবার আছে বল।” ল্যাম্পিয়ন অক্ষুটস্বরে কি বলিল, তাহা ডড়লের কর্ণগােচর হইল না। কিন্তু সে-কথা শুনিয়া কাপ্তেন সক্রোধে হুঙ্কার দিয়া বলিল, “আমার কাছে মাতলামি করা চলিবে না। মাতাল হইয়া কি তােমার বুদ্ধিংশ হইয়াছে ?” ল্যাম্পিয়ন ভগ্নস্বরে বলিল, “কে বলিল আমি মাতাল হইয়াছি ? তুমি মিছামিছি আমার বাম করিতেছ। তােমার কথা মিথ্যা, ত' তােমার মুখের উপর বলিতেছি। তুমি আমার অপমান করিও না। আমি তােমার কাছে অপমানিত হইতে আসি নাই। খবরদার! ফের যদি আমাকে মাতাল বলিবে ত ভাল হইবে না। আমাকে দেখিয়া কি মাতাল বােধ হয়? আমার কথা গুলি কি মাতালের মত ? আর মাতাল হইলেই বা দোষ কি? তােমার চক্রান্তে পডিয়া যে কাষ করিয়াছি, অতি বড বেহেড, মাতালেও তাহা করে না। কাপ্তেন বুঝিল, ল্যাম্পিয়ন স্বকৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হইয়াছে, উত্তেজিত স্বরে বলিল, “তবে কি মেয়েটা মরিয়াছে ?-সে ত আনন্দেরই কথা। হ্যাম্পিয়ন বলিল, “না, মরে নাই , কিন্তু আর বেণী বিলম্ব নাই। উঃ- আমরা শয়তানেম অধম। শয়তানও এরকম অপকৰ্ম্ম করিতে লজ্জিত হইত।” কাপ্তেন বলিল, “বাহােবা তোমার এমন টনে ধৰ্ম্মজ্ঞান এ দিন ১০৪ নাবিক-বধু, কোথায় ছিল?-হয় ত ইহার পর বলিবে আমারই কুপরামর্শে একাষ করিয়াছ। পত্তিটা কি আমার দখলে আসিবে?" ল্যাম্পিয়ন বলিল, “কিন্তু কাষটা যে অত্যন্ত গর্হিত হইয়াছে, ইহা হাজার বর—দুহাজার বার বলিব। কাপ্তেন গৰ্জন করিয়া বলিল, “পাঁচ হাজার বল, তাহাতে আমার ক্ষতিবৃদ্ধি নাই, কিন্তু আমার ঘাড়ে দােষ চাপাইলে আমি তােমার জিত টানিয়া ছিডিব। মাতলামী করিবার আর জায়গা পাও নাই? আমি তােমার প্রলাপ শুনিতে চাহি না। তুমি মুখ বন্ধ না করিলে কোন্ দিন আমাদের দুজনকেই ফাঁসিতে ঝুলিতে হইবে। মেয়েটা মরিলে আমাকে সংবাদ দিও , তাহার পর যাহা কর্তব্য হইবে আমিই করিব।কিন্তু আমার বিনানুমতিতে তুমি এক ফোঁটা মদ খাইলেও আমি তােমাকে খাঁচায় পূরিব।” ডডলে যাহা শুনিলেন তাহাই যথেষ্ট , তিনি আর সেখানে না দাড়াইয়া তাড়াতাডি নীচেব ডেকে আসিলেন। তাহার পর ল্যাম্পিয়ন কাপ্তেনের কেবিন হইতে বাহির হইল। ডড়লের বিশ্বাস ছিল, মিস্ এরসাইন তার পরামর্শানুসারে কোন ঔষধ বা খাদ্যদ্রব্য স্পশ করেন নাই , তথাপি ল্যাম্পিয়নের কথা শুনিয়া তিনি অত্যন্ত উৎকন্বিত হইলেন। ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন কি মিস এরসাইনের চাতুৰ্যে প্রতারিত হইয়াছে ? ইহা কি সম্ভব ?—সে মিস একাইনের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা না কবিয়াই কি এই মারাত্মক সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে ? ভড়লে ডেকের এক পাশে দাঁড়াইয়া এই সকল কথা চিন্তা করিতেছেন, এমন সময় একজন লােক হঠাৎ তাহার উপর সজোরে হুমতি খাইয়া পডিল । ডডলের নে হইল, ইহা ইচ্ছাকৃত ঘটনা, আকস্মিক নহে। তিনি তৎক্ষণাৎ আত্মসংবরণ করিয়া আরবি ভাষায় বিস্ময়সূচক শব্দ উচ্চারণ করিলেন।-ভাগ্যে তার মুখ হইতে ইংরাজী কথা বাহির হইয়া পড়ে নাই। যে লােকটা এইভাবে তাহার উপর হুডি খাইয়া পড়িয়াছিল, সে পূৰ্ব্ব- থিত ধালাসী-যুবক; সে গৰ্জন করিয়া বলিল, “তবে রে হতভাগা! তুই , • নবম পরিচ্ছেদ উড়লে সেই আমার পথ বন্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকি? দা, তােকে ভালরকম শিক্ষা দিতেছি।”—খালালটা হঠাৎ তাঁহার মুখে এক ঘুসি মারিল। ঘুসি খাইয়া ঘুরিয়া পড়িলেন। তিনি কোন রকমে সাঙ্গাইয়া লইয়া তাহার আততায়ীকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এমন সময় ডডলের পাচক- বন্ধু ব্লেক তাহার কেবিন হইতে বাহির হইয়া উভয়ের মধ্যে আসিয়া পডিল, এবং সেই খালাসীটাকে বলিল, “টমকিন্স, তােমার এ কি-রকম ব্যবহার ? তুমি যদি পুনর্বার এরূপ অন্যায় কাষ কর, তাহা হইলে রীতিমত প্রতিফল পাইবে। লড়াই করিতে ইচ্ছা হয়, কোন গােরা আমীর কাছে যাও , জুতাইয়া লম্বা করিয়া দিৰে। এই গরীব অসহায় আর বেচারীর উপর বীরত্ব প্রকাশ করিতে তােমার লজ্জা হয় না? পুনৰ্ব্বার এরকম বেয়াদবী কৰিলে তােমাকে এমন শাস্তি দিব যে, সাত দিনের মধ্যে আর উঠিতে পারিবে না।” টকিন্স আর কোন উচ্চবাচ্য করিয়া তাদের উভয়কে বিড়বিড় করিয়া গালি দিতে-দিতে সরিয়া পড়িল। সে প্রস্থান করিলে পাচক ডড লেকে বলিল, “আপনি ক্রোধ সংবরণ করিতে না পারিয়া উহাকে প্রহার করিলে বডই বিভ্রাট ঘটিত। ঐ হতভাগা নিশ্চয়ই কাপ্তেনের কাছে গিয়া আপনার নামে নালিশ করিত। সে যে "প্রথমে আপনাকে মারিয়াছে, সে কথা উডিয়া যাইত , উহার অভিযােগই বলবৎ হইত। কাপ্তেন আপনাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া কয়েদ করিত। অবস্থানুসারে কিল খাইয়া কিল চুরী না করিলে চলে না। আপনারও এখন সেই অবস্থা। অন্তত মিস্ এরসাইনের প্রাণরক্ষার জন্যও এ সময় আপনার ক্ষমাণীল হওয়া কর্তব্য। বিশেষতঃ, ঐ খালাসীটা কাপ্তেনের বড় প্রিয়পাত্র , সে বোধ হয় কাপ্তেনকে খুশী করিবার জন্যই আপনার উপর গােয়ন্দাগিরি করিতেছে। ভাগ্যে সে আপনার ছদ্মবেশ বুঝিতে পারে নাই।” লে বলিলেন, “তােমার কোন ভয় নাই , আমি আর তাহার কাছে ঘেসিব না। কিন্তু যদি কখন তাহাকে ডাঙ্গায় পাই, তাহা হইলে আমার ঘুসির বহটা তাহাকে দেখাইয়া দিব। আর কয়েক ঘণ্টা না কাটিলে আমি স্থির হইতে পারিতেছি না। আমাকে একটা পেসিল, এক টুকরা কাগজ , t নাবিক-বধু একটু লম্বা দডি দিতে পার ?—একখানি চিঠি লিখিয়া মিস, এসকাইনের কেবিনে ফেলিয়া দিতে হইবে।” পাচক পেসিল কাগজ ও রজু আনিয়া দিলে, মিঃ ডড়লে তাহা তাহার ‘ জি’র নিচে লুকাইয়া রাখিলেন। অনন্তর তিনি অবসরকালে সেই কাগজে তাহার সকল ব্যবস্থার কথা লিখি, তাহা মিস, এসকাইনের কক্ষে নিক্ষেপের কৌশল চিন্তা করিতে লাগিলেন। তিনি এক টুকরা কাঠ পূৰ্বেই সংগ্রহ করিসা রাখিয়াছিলেন। সেই কাঠে তিনি চিঠিখানি জড়াইয়া তাহা দৃঢ়রূপে জুদ্ধ করিলেন । অনন্ত তিনি সেই রঞ্জুর অপর প্রান্ত ধরিয়া, তাহা গবাক্ষপথে মিস, একাইনের কেবিনে নিক্ষেপ করিবার জন্য নিঃশব্দ পদ- সঞ্চারে কেবিনের কিনারার দিকে চলিলেন। মিঃ ডডলে লক্ষ্য স্থির করিবার জন্য সেই বজ্র ধরিয়া আন্দোলিত করিতেছেন, এমন সময় সেই রঞ্জু ফস্ করিয়া তাহার হাত হইতে বাহির হইয়া কেবিনের দ্বারে গিয়া পড়িল। এই আকস্মিক ঘটনায় মিঃ ডডলে একেবারে মুহ্যমান হইয়া পড়িলেন, তাহার মাথা ঘুরিয়া উঠিল , তিনি কিংকর্তব্য স্থির করিতে পারিলেন না। তাহার মনে হইল, যদি ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন হঠাৎ সেই স্থানে আসিয়া পত্ৰাচ্ছাদিত সেই কাষ্ঠখণ্ড বজ্রবদ্ধ অবস্থায় পতিত দেখিতে পায়, তাহা হইলেই ত সর্বনাশ। সে নিশ্চয়ই তাহা কুড়াইয়া লইয়া পত্রখানি খুলিয়া পাঠ করিবে। তাহার পর যাহা ঘটিবে-সে কথা চিন্তা করিতেও ডডলের হৃৎকম্প হইল। তিনি অবসন্ন ভাবে বসিয়া পড়িলেন। কিন্তু তখন আর হা হুতাশ করিবার সময় ছিল না। তিনি বিপুল চেষ্টায় মানসিক চাঞ্চল্য দমন করিয়া নিঃশব্দ পদসঞ্চারে মিস, একাইনের কেবিনের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হইলেন, এবং রজুর প্রান্তভাগ ধরিয়া আকর্ষণ করিলেন ,-দেখিলেন, রঞ্জুর অপর প্রান্তে পত্রখানি বাধা নাই , তাহা অনুহিত হইছে।—নিশ্চয়ই কেহ তাহা খুলিয়া লইয়াছে।-পত্ৰখানি কাহার হস্তগত হইল, তাহা বুঝিতে না পারিয়া তাহার মানসিক উৎকণ্ঠা কিরূপ দুঃসহ কইল, ভাষায় তাহা প্রকাশ করা অসম্ভৰ।

দশম পরিচ্ছেদ চন্দ্রালােকিত রাত্রি। জাহাজের খালাসীরা তখনও স্ব-স্ব কম্মে ব্যস্ত ছিল। মিঃ ডডলে জাহাজের মাথার কাছে দাড়াইয়া উৎকন্ঠিত চিত্তে একবার মূব দিকে—একবার কাৰ্যনিরত খালাসীদের দিকে চাহিতেছিলেন। যাহার মনে হইতেছিল—জাহাজের সকল লােকই তাঁহার শত্রু , সকলেই বেন তাহাকে সন্দেহেব চক্ষে দেখিতেছে।—জাহাজখানি ফেনঃপুঞ্জ-মুকুটিত তরঙ্গরাশি বিদীর্ণ করিয়া তাহার গন্তব্য পথে ছুটিয়া চলিয়াছে। একজন কৰ্মচাৰী ‘ব্রিজের উপর পাহারায় নিযুক্ত আছে। সে একবার পদচারণ করি- তেছে, একবার দাড়াইতেছে , কখনও-বা তীক্ষ দৃষ্টিতে চারিদিকে দেখিতেছে। -ইঞ্জিনের অশ্রান্ত ঘস-ঘস্ শব্দ ভিন্ন কোন দিকে অন্য কোন শব্দ নাই। ক্রমে রাত্রি এগারটা বাজিল।—মিঃ ভড়লে মনে করিলেন, আর বিলম্ব করা সঙ্গত নহে। এতক্ষণ তিনি ডেক পরিত্যাগ করিতে সাহস করেন নাই , কিন্তু আর ত নিশ্চেষ্ট ভাবে বসিয়া থাকা চলে না। এখনও সকল কাষই বাকি। তিনি ধীরে-ধীরে পাচকের কেবিনের দিকে চলিলেন। কেবিনে দ্বার খােলা ছিল , তিনি মস্তক প্রসারিত করিয়া দেখিলেন, পাচক তাহার শয্যায় বসিয়া কি পাঠ করিতেছে।—ডডলে তৎক্ষণাৎ কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিয়া সাবধানে দ্বার রুদ্ধ করিলেন। পাচক পুস্তক বন্ধ করিয়া শষ্যা হইতে নামিল, এবং একটি বাক্স খুলিয়া এক সুটু পােক বাহির করিল। সে তাহা ডড লেকে দেখতে দিয়া তাকে বলিল, “আশা করি এই পােষাক আপনার অঙ্গে নিতান্ত বেখাপ, দেখাইবে না। আমাদের দুই জনেরই শরীরের গঠন প্রায় এক রকম। ভড়লে বিনাবাক্যব্যয়ে পােষাকটি পরিধান কৰিলে, তাহা, তাহার গাৱে মন্দ মানাইল না। সেই পােষাকে তাহাকে আর আরবের মত খোইল ০ . ১০ নাবিক-বন্ধু না; তাঁহার চেহারা পর্যন্ত যেন বদলাইয়া গেল।—তাহা দেখিয়া পাচক বলিল, “এখন আপনাকে ভদ্রলােকের মত দেখাইতেছে।” ডুড়লে বলিলেন, “পােষা ত মিলিল , এখন কাপ্তেনের নামে যে চিঠিখানা লিখিতে হইবে, তাহার কি ব্যবস্থা করা যায় ? পাচক তাহাকে দোয়াত কলম ও কাগজ বাহির করিয়া দিল।—উড়লে পাচকের বাক্সের উপর বসিয়া তাড়াতাড়ি একখানি পত্র লিখিয়া ফেলিলেন। সেই পত্রে তিনি নিজের পরিচয় জানাইয়া কাপ্তেনের অজ্ঞাতসারে বােটখানি গ্রহণ করিবার কারণ লিখিলেন। তিনি সেই পত্রে একথাও লিখিলেন যে, নিরাপদ স্থানে উপস্থিত হইয়া কাপ্তেনের ক্ষতিপূরণ করিবেন। তিনি পত্রখানি শেষ করিয়া উঠিবেন, এমন সময় কি মনে হওয়ায় পাচককে বলিলেন, “আরও একটা কাষ বাকি আছে।হাতে যখন কাগজ 1. কলম আছে, তখন ল্যাম্পিয়নকে দু'ছত্র লিখিতেই-বা দোষ কি? সে যে কত বড় শয়তান—তাহা তাহাকে জানাইয়া দেওয়া মন্দ নহে। হতভাগাটা ভয়ে ও দুশ্চিন্তায় আহার নিদ্রা ত্যাগ করুক ইহাই আমার ইচ্ছা। তিনি ডাক্তার ল্যাম্পিয়নকে ও একখানি পত্র লিখিলেন , পত্রখানি লেফাপায় বন্ধ করিয়া তাহার উপর ল্যাম্পিয়নের নাম লিখিলেন। ইতিমধ্যে পাচকটি সিন্দুকের তলা হইতে একটা পুটুলি বাহির করিয়া তাহাকে বলিল, “আপনি নিরাপদে তীরে উঠিলে আপনার কাযে লাগিতে পারে এ রকম কিছু সংগ্রহ করিয়াছি।--আপনি ইহা পাইয়া নিশ্চয়ই সুখী হইবেন।” মিঃ ডড়লে পুটুলিটি খুলিয়া দেখিলেন, কটের একটি উৎকৃষ্ট রিভলভার ও কতকগুলি টোটা।-তাহা দেখিয়া আনন্দে উৎসাহে তাহার চক্ষু উজ্জল হইয়া উঠিল। পাচক বলিল, “এগুলি আপনার কাষে লাগিবে -অথচ ইহা রাশিয়া আমার কোন লাভ নাই, উলটা ফ্যাসাদ ঘটিতে পারে। এগুলি লইয়া যান। ডুডলে বলিলেন, “ধন্যবাদ, শত-সহস্র ধন্যবাদ। তুমি যে আমার কি উপাৰ কৰিলে, তাৰলিবার শক্তি নাই। এরূপ মহামূল্য সামগ্রী আমি এ সময় দশম পরিচ্ছেদ কোথায় পাইতাম? আমার সঙ্গে যে পিস্তল ছিল, আমেদ বেন্ তাহা কাড়িয়া লইয়াছে। তােমর নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিলাম। আমার ব্যাঙ্কারকে চিঠি লিখিয়া দিই , তােমার লণ্ডনের ঠিকানাটা আমাকে বল।” পাচক মিঃ ডডলেকে আর একখানি কাগজ দিল। ডডলে পত্র লিথিয়া তাহার লণ্ডনস্থ ব্যাঙ্কারকে জ্ঞাপন করিলেন, এই পত্রবাহককে তাহার গচ্ছিত অর্থ হইতে যেন হাজার পাউণ্ড প্রদান করা হয়। তিনি পত্রখানি লেফাপায় মুডিয়া পাচকের হস্তে প্রদান করিলেন। এই অল্পবেতনভােগী পাচক হাজার পাউণ্ড—পনের হাজার টাকা জীবনে কখন একত্র দেখে নাই , সমস্ত জীবন চাকরী করিয়া তাহার এত টাকা সঞ্চয় করিবার আশা ছিল না। পত্রখানি পাঠ করিয়া আনন্দে, উৎসাহে, কৃতজ্ঞতায় তাহার হৃদয় পূর্ণ হইল, সে বলিল, “ধন্যবাদ মহাশয়। আমি জীবনে কখন এতগুলি টাকা একত্র দেখি নাই। না, ইহার সিকি টাকাও নহে। পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি আপনারা নিৰ্বিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় লাভ করুন। আমার এই কাড়খানি রাখুন , ইহাতেই আমার লণ্ডনের ঠিকানা লেখা আছে। আপনারা নিরাপদে আশ্রয় পাইয়াছেন কি না দয়া করিয়া আমাকে জানাইবেন। আপনার সংবাদ না পাইলে আমার দুশ্চিন্তা দুর হইবে না।” ডডলে বলিলেন, “সে খবর তুমি নিশ্চয়ই পাইবে। চল, এখন বােটনি সন্ধানে যাই।—কেহ আমাদিগকে দেখিতে না পাইলেই বাচি।রাত্রিও অনেক হইয়াছে। এখন সময় কত ?” পাচক ঘডি খুলিয়া বলিল, “বাটা বাজিতে বিলম্ব নাই।” ভড়লে বলিলেন, “পাহারা বদল না-হওয়া পর্যন্ত আমাদিগকে অপেক্ষা করিতে হইবে।—সকলে ঘুমাইলে আমরা নিঃশব্দে কাষ আরম্ভ করিব।” কথা শেষ হইতে-না-হইতে জাহাজের ঘণ্টায় R করি শারটা বাজিয়া গেল। প্রায় পাচ মিনিট পরে জাহাজের প্রধান কর্মচারী ও মেট শয়ন করিতে চলিল। তাহারা কল কামরায় প্রবেশ করিয়া দ্বার রুদ্ধ করিলে ডডলে পাচকের সঙ্গে তাহার কেবিন হইতেহিয় p ১১০ নার্বিক-বধু "; । হইলেন। একজনের হাতে পানীয় জলের কলসী, পিস্তল ও টোটার পুটুলি, অন্যের হস্তে খাদ্যসামগ্রীর ঝােতা।—উভয়ে অত্যন্ত সতর্ক ভাবে বােটের নিকট আসিলে উড়ল বােটের ক্যাম্বিসনিৰ্ম্মিত আববণ খুলি লাগিলেন, তাহায় পর বােটের ভিতর খাদ্য-সামগ্রীপূর্ণ ঝডাটা সংরক্ষিত হইল। মিঃ ডড়লে দেখিলেন, বােটের মাস্তুল, পাল, দাড প্রভৃতি সমস্তই বােটের ভিতর আছে। তিনি বােটখানি সমুদ্রে নামাইবার পূর্বে একবার দূর আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। নৌ-পরিচালন বিদ্যায় তিনি অভিজ্ঞ { ছিলেন , মেঘ বা বাতাসের কিরূপ পরিবর্তনের কি ফল—তাহাও তিনি জানি- তেন। আকাশের অবস্থা দেখিয়া তাহার ধারণা হইয়াছিল, বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একখানি কালো মেঘ পূর্ণ প্রায় শশধবকে ঢাকিয়া ফেলিল, সঙ্গে-সঙ্গে পরিস্ফুট জ্যোৎস্নালােক অন্তর্হিত হইল। হঠাৎ মেঘন্ধকার দেখিয়া উড়লে আনন্দিত হইলেন। ইহা তিনি দৈবানুগ্রহ বলি- যাই মনে করিলেন বটে, কিন্তু আফ্রিকার পূর্ব-উপকূলে শান্ত স্থির প্রকৃতি কত অল্প সময়ে সহসা মেঘাচ্ছন্ন হইয়া ঝটিকাবর্তে সংক্ষুব্ধ হইয়া উঠে, তাহা তাহার অজ্ঞাত ছিল না। হঠাৎ ঝটিকা আরম্ভ হইলে অকূল সমুদ্রে ক্ষুদ্র বােটে বন রক্ষা করা কঠিন হইবে বুঝিয়া তাহার সে আনন্দ স্থায়ী হইল না, কিন্তু আত্ম- রক্ষার অন্য কোন উপায়ও যে নাই।—“আত্মরক্ষার চেষ্টায়,বিপন্না নারীর উদ্ধারের চেষ্টায় মরিতে হয় ত মরি”-এই সঙ্কল্প করিয়া তিনি বােটখানি নামাইবার ব্যবস্থা করিলেন , তাহার পর মিস, এসকাইনের সন্ধানে চলিলেন।—তাহার পত্রখানি মিস, এসকাইনের হস্তগত হহয়াছে কি না তাহা বুঝিবার উপায় ছিল । যদি তাহা কোনরূপে ল্যাম্পিয়নের হস্তগত হইয়া থাকে তাহা হইলে আর কোন আশা নাই , কিন্তু পত্রখানি পাইলে ল্যাম্পিয়ন কি এতক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত ?-তাহর কাষ কি এতদূর অগ্রসর হইত? উড়লে সেলুনের সন্নিকটে আসিয়া নিম্বরে পাচককে বলিলেন, “তুমি সিড। পাশে দাড়াইয়া থাক, মিস, এসাইন আসিলে জিনিস-পত্র সহ তাহাকে নাম- ইয়া লইবে।তাহার পর উভয়ে ধরাধরি করিয়া তাহাকে বেটে তুলিয়া দিব।”

দশম পরিচ্ছেদ ডলে মিস, এসকাইনের কেবিনের দিকে অগ্রসর হইয়া তাহার আগ- মনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি আসিলেন না। এই ভাবে পাঁচ সাত মিনিট চলিয়া গেল। তখন ভড়লে অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত ভাবে বলিলেন, “তাহার এত' বিলম্ব হইতেছে কেন? ব্যাপার কি। তবে কি আমার সকল চেষ্টা বিফল হইল ? আমাকে এখানে হঠাৎ কেহ দেখিতে পাইলেই ত সৰ্ব্বনাশ। ক্রমে তাহার উৎকণ্ঠা অসহ হইয়া উঠিল।—আরও কয়েক মিনিট পরে মিস, একাইনের কেবিনের দ্বার খুলিয়া কে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে তার দিকে অগ্রসর হইল। ডডলে তাহাকে দেখিয়া কুদ্ধশ্বাসে বলিয়া উঠিলেন, “পরমেশ্বর, ধন্য তুমি । ঐ বুকি মিস, এসকাইন আসিতেছেন।”—ডডলে তাড়াতাডি কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া মিল, এসকাইনকে লইতে আসিলেন। আগন্তুক দ্রুতপদে তাহার দিকে আসিতে আসিতে ঠিক সেই মুহুর্তে অন্ধকারে হুডি খাইয়া পডিল, ও অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করিয়া উঠিল। উড়লে সেই স্বর শুনিয়া ভীত ভাবে বলিয়া উঠিলেন, “কি সর্বনাশ, এ যে দেখিতেছি ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন ! তবে ত হতভাগাটা সবই টের পাইয়াছে। আর বুঝি রক্ষা নাই।” ডডলের ইচ্ছা হইল তখনই দৌড়াইয়া গিয়া ল্যাম্পিয়নকে আক্রমণ পূর্বক তাহার কণ্ঠরােধ করেন , কিন্তু তিনি এই ইচ্ছা কার্যে পরিণত করিবার পূর্বেই পাচক আসিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিল, এবং স্থির ভাবে দাঁড়াইয়া থাকিতে ইঙ্গিত করিল। অগত্যা তিনি রুদ্ধ নিশ্বাসে পাচকের পাশে দাড়াইয়া রহিলেন, অল্পক্ষণ পরে দেখিলেন, ল্যাম্পিয়ন বহু কষ্টে উঠিয়া টলিতে-টলিতে ও পড়িতে-পডিতে তাহার কেবিনে প্রবেশ করিল।-সেবে রাত্রি বাটা পৰ্য্যন্ত মিস্ একাইনের শয়নকক্ষে বসিয়াছিল, উড়লে তাহা জানিতেন না। তিনি অস্ফুটস্বরে পাচককে বলিলেন, “লােকটা ভয়ানক মাতাল,হইয়াছে-এখন আমরা কি করি?”

১১২ নাবিক-বধু আঃ, পাচক বলিল, “আরও মিনিটকয়েক এইখানেই দাড়াইয়া থাকি, দেখি ব্যাপারটা কতদূর গড়ায়।—আমার বােধ হয় উহার ভয়েই মিস্ বাহিরে আসিতে বিলম্ব করিতেছিলেন।” ক্রমে দশ মিনিট চলিয়া গেল , কোনও দিকে কোন শব্দ নাই, মিস্ এরসাইনের দেখা নাই । ডডলে ছটফট করিতে লাগিলেন। তিনি ক্ষিপ্তপ্রায় হইলেন। এমন সময় একটি রমণীমূৰ্ত্তিকে ধীরে-ধীরে সিডির দিকে অগ্রসর হইতে দেখা গেল। দূরন্থ মৃদু আলােকে ডডলে চিনিতে পারিলেন, তিনি মিস্ এরাইন। উড়লে ব্যগ্রভাবে অগ্রসর হইয়া মিস্ এরাইনকে বলিলেন, “আপনি আসিয়াছেন? বাঁচিলাম।”—তিনি মিসের গাত্র-বস্ত্রখানি চাহিয়া ইয়া নিজের কাধে ফেলিলেন। মিস এসকাইন কোনও কথা না বলিয়া সিডি দিয়া তাহাদের সহিত উপরের ডেকে উঠিলেন।তাহার পর উড়লের ইঙ্গিতে ডেকের প্রান্তস্থিত ‘রেলিংএর উপরে উঠিয়া রেলিংএর পার্শ্বে দোদুল্যমান বােটে আরােহণ করিলেন।—তাহার রুগ্ন দেহে এত বল আছে, ডড়লে ইহা মনে করিতে পারেন নাই। উড়তে উৎফুল্ল চিত্তে বলিলেন, “এইবার আমরা বােটখানি জলে নামাইয়া দিব। আপনি ‘বাতা’ ধরিয়া বসিয়া থাকুন , ভয় পাইবেন না। বােট জলে নামিলেই আমি আপনার নিকট উপস্থিত হইব।” অনন্তর উড়লে পাচকের সাহায্যে বােটখানি ধীরে-ধীরে সমুদ্রে নামাইয়া দিলেন, কাছির শ-শ শব্দ শুনিয়া ডডলে বড়ই ভীত হইলেন। তাঁহার আশঙ্কা হইল, এই শব্দে জাহাজের সমস্ত লােক জাগিয়া উঠিয়া তাহাদের কাষ দেখিয়া ফেলিবে। যাহা হউক, দুই মিনিটের মধ্যেই তাহার বােটখানি জলে ভাসাইয়া দিয়া অপেক্ষাকৃত নিশ্চিন্ত হইলেন। পাচ বলিল, “আর কোন ভয় নাই , এখন দুই মিনিটের মধ্যেই আপনি নােটে গিয়া দাখিল হইতে পারিবেন।” ।

দশম পরিচ্ছেদ ১১৩ ভড়লে ডেকে রেলিংএ উঠিয়া দড়ি ধরিয়া ঝুলিয়া পড়িবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পাচক ব্লেক সভয়ে অস্ফুট আৰ্তনাদ করিয়া উঠিল ।—তাহা শুনিয়া উড়লে ঘুরিয়া-দাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্যাপার কি ?-কি হইয়াছে ?” কিন্তু পাচক কোন কথা বলিবার পূর্বেই একটি মঘমুর্তি তীরবেগে তাঁহার দিকে দৌড়াইয়া আসিল।—সে নিকটে আসিবামাত্র তুিনি চিনিলেন, লে খালাসী টকিন্স। টকিন্সকে দেখিয়া ডড়লে মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইলেন; তাহার মনে হইল, তিনি আর ইতস্ততঃ না করিয়া সেই মুহূর্তেই বােটে নামিয়া বােটখানি সমুদ্রে ভাসাইয়া দিবেন। কিন্তু তাহাতে কোন লাভ নাই তাহাও তিনি বুঝিলেন , জাহাজের সকল লােক মুহূর্তে তাহাদের পলায়নের কথা জানিতে পারিবে,তখন ধরা পডিতে বিলম্ব হইবে না। ডড়লে তৎক্ষণাৎ ডেকে নামিয়া টমকিন্সের সম্মুখীন হইলেন। টকিন্স তাহাকে দেথিয়া দাত বাহির করিয়া শ্লেষভরে বলিল, “কি খবর? পলাইবার চেষ্টা হইতেছে! তুমি আরব হও আর যাহাই হও, আমার চোখে ধূলি দিয়া পলাইতে পারিবে না।” টকিন্স চীৎকার করিয়া লােক ডাকিবার উপক্রম করিতেই ভড়লে তাহার কণ্ঠদেশ বামহস্তে দৃঢ়রূপে চাপিয়া ধরিয়া দক্ষিণ হস্তে তাহার মস্তকে এমন জোরে মুষ্ট্যাঘাত কবিলেন যে, টকিন্সের মগজ পর্যন্ত নডিয়া গেল।-সে আর চীৎকার করিবার অবকাশ পাইল না। সেই অবসরে তিনি তাহাকে ডেকের উপর চিৎ করিয়া ফেলিয়া পাচক রেককে বলিলেন, “শীঘ্র একগাছি দড়ি দাও, উহার হাত পা বাধিয়া ফেলি, হঠাৎ উঠিতে না পারে। উহার চেতন-সঞ্চার হইলেই চীৎকার করিবে ,একখানা রুমাল দাও, উহার মুখে গুজিয়া চীৎ- কারের পথ বন্ধ করি।” Bক দডি ও রুমাল বাহির করিয়া দিল। ডড়লে টকিরে হাত-পা ধিয়া ও তাহার মুখে রুমাল গুজিয়া তাহাকে ফেলিয়া রাখিয়া বলিলেন, “ব্লেক, আর দেখ কি ? তুমিও আমাদের সঙ্গে চল। এই খালাসীটা চেতনাগাড় ১১ নাবিক-বধু কৰিলেই আমার সহিত তােমার স্বযন্ত্রের কথা কাপ্তেনের নিকট প্রকাশ করিবে, তখন তােমার প্রাণরক্ষার বিন্দুমাত্র আশা থাকিবে । আমাদের সঙ্গে যাইবে ? পাচক ভগ্নস্বরে বলিল,জাহাজে থাকিলে সত্যই আমার নিস্তার নাই , কিন্তু কোথায় যাইব ? ডডলে বলিলেন,“তুমি দুঃসময়ে আমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছ , তুমিই আমার জীবন রক্ষা করিয়াছ। আমি তােমার নিকট অঙ্গীকার করিতেছি, যদি তুমি আমার সহিত যাও, তাহা হইলে চিরজীবন তােমার ভরণপােষণের ভাব গ্রহণ করিব। তােমাকে কখন কষ্ট পাইতে হইবে না।-কেমন যাইবে?” পাচক বলিল, “চলুন, আপনাদের সঙ্গেই যাই। এ জাহাজে আর আমার স্থান নাই , ইহা অপেক্ষা হাঙ্গর-কুম্ভীরপূর্ণ মহাসমুদ্র অনেক অধিক নিরাপদ।” ডড়লে বলিলেন, “তবে নামিয়া পড।”—পাচক ব্লেক তৎক্ষণাৎ দড়ি ধরিয়া জাহাজের পাশ দিয়া বােটে নামিয়া পডিল , ডড়লে তাহার অনুসরণ করিলেন। উভয়ে বােটে নামিয়া বােটের বন্ধন মােচন কৰিলেন।—বন্ধনমুক্ত বােটখানি জাহাজের পাশে সমুদ্র-তরঙ্গে দুলিতে লাগিল।

একাদশ পরিচ্ছেদ কয়েক মিনিট পর্যন্ত কেহ কোন কথা বলিতে পারিলেন না।—যিনি যেখানে বসিয়াছিলেন, জডের ন্যায় সেই স্থানেই বসিয়া রহিলেন। বােটখানি সমূদ্র- তরঙ্গে ভাসিতে-ভাসিতে কিছু দূরে চলিয়া গেল।হঠাৎ মিস্ এরাইন উভয় হস্তে মুখ চাকিয়া “মাগো, মা। মা আমার।”—বলিয়া উচ্ছসিত কণ্ঠে রোদন করিয়া উঠিলেন।—যেন এতক্ষণ পরে তিনি তাহার বিপদের কথা বুঝিতে পারিলেন। পাচক ব্লেক বাহ্যজ্ঞানশূন্য, স্তম্ভিত 'সে জাহাজে আছে, কি বােটে আছে, সে-জ্ঞান পর্যন্ত বিলুপ্ত হইয়াছিল। কেবল উড়লেই সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ ছিলেন, তিনিই সর্বপ্রথম কথা কহিলেন। ডডলে বলিলেন, “ব্লেক, একবার উঠিয়া মাস্তুলটায় হাত দাও ত, উহা খাড়া করিয়া বসানাে যাক। বােটে পাল তুলিয়া দিয়া আমরা যত শীঘ্র দূরে যাইতে ‘পারি—তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। জাহাজের লােকগুলা টের পাইলেই আমাদের পরিবার জন্য ছুটিয়া আসিবে, তখন আত্মরক্ষা করা অত্যন্ত । কঠিন হইয়া উঠিবে।” পাচক তৎক্ষণাৎ উঠিয়া মালটা খাড়া করিল , উভয়ের চেষ্টায় মালটি যথাস্থানে স্থাপিত হইলে তাহাতে পাল খাটাইয়া দেওয়া হইল। পালে বাতাস লাগিবামাত্র বােটখানি সমুদ্রতরঙ্গের উপর দিয়া নক্ষত্রবেগে ধাবিত হইল। ডডলে হাল ধরিলেন। কিছুকাল পরে জাহাজখানি সুদূর সীমান্তে মসীচিজের ন্যায় পরিলক্ষিত হইল। বােটখানি পশ্চিমদিগভিমুখে চলিতে লাগিল। 'এক্ষণ পরে ডলে মিস্ এসাইনকে বলিলেন,“মি এরাইন, আপনি মুলাভ করিয়াছেন, তাহা বুঝিয়াছেন কি?” মিস এরাইন মৃদুস্বরে বলিলেন, “হাঁ, পরমেশ্বরকে ধন্যবাদ। আমি মুক্তি- লাভ করিয়াছি। আপনার অনুগ্রহেই আমি আসন্ন মৃত্যুর কবল হইতে উদ্ধার 4 নাবিক-বধু লাভ করিয়া জীবনের রাজ্যে ফিরিয়া যাইতেছি।—মিঃ ডড়লে, আমি কি বলিয়া আপনার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কৰিব ?” সেই সময় শুভ্র চালােক খণ্ড-বিখণ্ড মেঘষয়ের ব্যবধান-পথে মিস একাইনের অপ্লাবিত মুখের উপর পডিয়াছিল। ডড়লে দেখিলেন, সে মুখ বড় সুন্দর। তাঁহার অপূর্ণ চক্ষুদু’টিতে গভীর কৃতজ্ঞতা পরিব্যক্ত হইতে- ছিল। ডড়লে তাহা দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন। তিনি সান্ত্বনা দানের অভি- প্রায়ে মিস একাইনকে বলিলেন, “মিস্ এরাইন, আপনি হতাশ হইবেন না , আপনার বিপদের মেঘ কাটিয়া গিয়াছে। আমরা যদিও এখন নিরাপদ নহি, কিন্তু জাহাজে আমাদের যে ভয় ছিল—সে ভয় এখানে নাই। আপনার মামা একটি নরপিশাচ, সে আপনাকে হত্যা করিয়া আপনার সমস্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ করিবার জনা যড়যন্ত্র করিয়াছিল , কিন্তু পাপিষ্ঠের সেই নিষ্ঠুর সঙ্কল আর সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা নাই , নারীহত্যা-পাতক হইতে সে নিস্কৃতি- লাভ করিয়াছে। আমার অনুমান, তীরভূমি এখান হইতে একশত মাইলের অধিক নহে। আমরা লামু-দ্বীপ লক্ষ্য করিয়া চলিয়াছি। সেখানে উঠিতে পারিলে আর আমাদের ভয় নাই। সেখান হইতে আমরা মেলবােটে জাঞ্জিবাবে উপস্থিত হইতে পারিব , তাহার পর কেপ টাউনে গমন করা কঠিন হইবে না।--আপনি উৎকণ্ঠিত হইবেন না।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “না, আমি উৎকণ্ঠিত হই নাই। আমি যে আপনার অনুগ্রহে মুক্তিলাভ করিয়াছি, এই চিন্তায় আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার হৃদয় পূর্ণ হইয়াছে , আমার অন্তরে অন্য চিন্তার স্থান নাই। আপনি আমাকে উদ্ধার করতে না পারিলে এতদিন আমি মৃত্যুমুখে পতিত হইতাম, তাহা বুঝিতে পারিয়াছি। আশা করি আমি শীঘ্রই প্রকৃতিস্থ হইতে পারিব।” ভড়লে পাচককে বলিলেন, “ব্লেক, তুমি জাহাজখানা আর দেখিতে, পাইতেছ কি? পাচ বলিল, “না মহাশয়, আর দেখা যাইতেছে না।—উহা যেন আর কখনও দেখিতে না হয়। জাহাজের লােকগুলা এতক্ষণে টের পাইয়াছে একাদশ পরিচ্ছেদ ১১৭ আমরা পাইতেছি। কাপ্তেনটা বােধ হয় রাগিয়া জাহাজ মাথায় করিয়াছে, আর আমাদের গালি দিতেছে। আর শয়তান ডাক্তারটা শিকার হাতছাড়া হইয়াছে দেখিয়া দুই হাতে দাডি ছিডিতেছে। কি মজা।” উড়লে হাসিয়া বলিলেন, “ডাক্তার ল্যাম্পিয়নের ত দাডি নাই।” পাচক বলিল, “তাও ত বটে। কথাটা ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তা দাডি না থাক, চুল ত আছে , দুই হাতে সে চুল ছিডিতেছে।” ডড লে দেখিলেন, মিস্ এরাইন অত্যন্ত বিষন্ন হইয়া বসিয়া আছেন, বােধ হইল, কি ভাবিতেছেন।--তাহার চিন্তাস্রোত বিক্ষিপ্ত করিবার জন্য ডডলে ব্লেককে বলিলেন, “বাবুর্চি, আমাদের খাবারের বােডায় ব্র্যাণ্ডি কি অন্য কোন রকম মদের বােতল আছে কি ?” পাচক বলিল, “হ, এক বােতল ব্র্যাণ্ডি দিয়াছি। মিকে আধ ছটাক খানেক ব্যাণ্ডি দিলে এ সময় তাহার অত্যন্ত উপকার হইত। মনটাও একটু চাঙ্গা হইত।” উড়লে বলিলেন, “তবে বােতল খােল, আর একটি গ্লাস বাহির কর।” পাচক তৎক্ষণাৎ এ্যাণ্ডির বােতল খুলিয়া অল্পপরিমাণ ব্র্যান্ডি ঢালিয়া সাহাতে জল মিশ্রিত করিল। মিস্ এরকাইন তাহা পান করিতে অত্যন্ত অসম্মতি প্রকাশ করিলেন , কিন্তু ডডলের আগ্রহাতিশয্যে তাহা তাহাকে পান করিতে হইল। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি অপেক্ষাকৃত সুস্থ হইলেন, তাহার মানসিক অবসাদ ও দূর হইল। অনন্তর ডড়লে রেককেও কিঞ্চিৎ পান করিতে অনুরােধ ককিল পাচক বলিল, “একটি মাত্র বােতল আনিয়াছি, ভবিষ্যতে আপনাদেরই আবশ্যক হইতে পারে ,এখন উহা অকাৰণ নষ্ট করিব না।" জুড়ুলে বলিলেন, “তুমিও অত্যন্ত অবসন্ন হইয়াছ, একটু খাও, আবল্য কুটলে আমাকে সাহায্য করিতে পারিবে।আমার বিশ্বাস, চৌদ্দ পনের ঘণ্টার মধ্যেই তীরভূমি আমাদের দৃষ্টিগােচর হইবে।—এখন রাত্রি কত? তাের সঙ্গে ঘড়ি আছে কি ? ৭ ১১৮ নাবিক-বধু পাচকের মণিবন্ধে বডি বাঁধা ছিল, সে ঘড়ির দিকে চাহিল , পরিস্ফুট চালােকে সময় দেখিবার অসুবিধা হইল না। সে বলিল, “এখন রাত্রি একটা বিশ মিনিট। মিস্ এরাইন বলিলেন, “তাহা হইলে কাল বেলা তিন চারিটার মধ্যেই আমরা তীরভূমি দেখিতে পাইব ?” ডডলে বলিলেন, “এই রকমই ত আশা করিতেছি।” পাচক বলিল, “আমরা এখন সমুদ্রের কোন্ স্থান দিয়া যাইতেছি, তাহা কিছু বুঝিতে পারিতেছেন ? ভড়লে বলিলেন,“সে কথা বলা বড় শক্ত। আমি সেদিন দুই এক মিনিটের জনা সমুদ্রের যে মানচিত্র দেখিবার সুযােগ পাইয়াছিলাম—তাহা হইতে অনুমান করিতেছি—কিহু (Kwhu Island) ও ফৰ্ম্মোজা উপসাগরের ভিতর দিয়া যাইতেছি , কিন্তু ইহা আমার অনুমান মাত্র। তবে এ নুমান অসঙ্গত নহে। আশা করি আমরা নিরাপদে লামুদ্বীপে পৌছিতে পারিব , তার ইতিমধ্যে কোনও চলতি জাহাজ আমাদিগকে বিপন্ন দেখিয়া তাহাতে তুলিয়া লইতেও পারে।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “তাহা হইলে ত বাচিয়া যাই। পরমেশ্বর কি এত লয়া করিবেন ? সকালে যদি সম্মুখে কোন জাহাজ দেখিতে পাই, তাহা হইলে আমাদের কি আনন্দই হইবে। ইতিমধ্যে পাচক রেক টিনে-অটা মাংসের একটি টিন খুলিয়া খানিক মাংস বাহির করিল, এবং তাহা দুই ভাগ করিয়া এক ভাগ মি ডভলেকে ও অপর ভাগ মিস্ এরাইনকে খাইতে দিল।পাচক নিজের জন্য কিছুই রাখিল না দেখিয়া ডড়লে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কৈ, তুমি ত কিছু লইলে না ? পাচক বলিল, “আমার জন্য আপনি ব্যস্ত হইবেন না। আপনাদের আহার শেষ হইলে আমি খাইব। আমার খাবার অন্য স্থান আছে।” ডড়লে বলিলেন, “এ কোন কাযের কথা নহে। তুমি তােমার বাবারও বাহির করিয়া লও, না হইলে আমরা কিছুই খাই না। - একাদশ পরিচ্ছেদ ১১৯ অগত্যা পাচকও খানিক মাংস বাহির করিয়া লইয়া খাইতে বসিল। ডড়তে একহাতে বােটের হাল ধরিয়া অন্য হাতে আহার করিতে লাগিলেন। সে সময় বােটের হাল ছাডিবার কোন উপায় ছিল না, কারণ তখন বায়ুঙ্গে অপেক্ষাকৃত প্রবল হওয়ায় বোটখানি তরঙ্গরাশির উপর দিয়া হেলিয়া-হুলিয়া অতি দ্রুতবেগে অগ্রসর হইতেছিল। মিস এসাইন অধিক কিছু খাইতে পারিলেন না। যাহা হউক, আহার শেষ হইলে উড়লে মিস একাইনের শাল খানির ভাজ খুলিয়া তদ্বারা তাহার সর্বশরীর ঢাকিয়া দিলেন। ডডলে মিস একাইনকে জিজ্ঞাসা করিলেন,“ঠাণ্ডা বাতাস আপনার শীত লাগিতেছে কি ? মিস্ এরাইন বলিলেন, “না , একটুও শীত লাগিতেছে না। আমার বেশ আরাম বােধ হইতেছে। আমার মনের ভার অনেকটা হালকা হইয়া গিয়াছে , বিশেষতঃ মামাকে যে নরহত্যা-পাতকে লিপ্ত হইতে হয় নাই, ইহাই আমার সর্বাপেক্ষা অধিক সুখের কথা। ডডলে বলিলেন, “আপনার কথা শুনিয়া একটা কথা মনে পডিল । भाना করি আপনি আমার কৌতূহল দূর করিবেন।—আপনি আপনার কেবিন হইতে ডেকে আসিবার পূর্বে আপনার মামা কি আপনার কেবিনে গিয়াছিল। মিস্ একাইন বলিলেন, “হাঁ, মামা আমার কামরায় গিয়াছিল বলিয়াই ত আমার বাহিরে আসিতে বিলম্ব হইয়াছিল। তাহার সম্মুখ দিয়া কি করিয়া আসি? রাত্রি নয়টার সময় মামা আমার কুঠুরীতে গিয়া আমাকে বলে, রাত্রি বারটার সময় আবার আসিবে। মামার কথা শুনিয়াই ত আমার চক্ষু স্থির। আমি বুঝিলাম, অদূরে কোন গুপ্তস্থানে আপনি আমার প্রতীক্ষায় দাঁড়াইয়া আছেন, আমার বিলম্ব দেখিয়া আপনি ছটফট করিতেছেন, কিন্তু উপায় কি? সে সময় আমার মনের অবস্থা কিরূপ হইয়াছিল, তাহা আপনাকে বুঝাইতে পরব না। সে কথা চিরজীবন আমার মনে থাকিবে। মামা আমার কামরায় ঢুকিয়া কি করিল–জানেন ? সে আমার খাটের উপর ঝুকিয়াপডিকা আৰু মুখের দিকে কটমট করিয়া চাহিতে লাগিল। দেখিলাম—তাহার সর্বশরীর ৭ ১২০ নাবিক-বন্ধু, কাঁপিতেছে, চক্ষু দু’টি জবাফুলের মত লাল! তাহার ভাব-ভঙ্গি দেখিয়াই বুঝি লাম—সে মদে চুর হইয়াছে। আমার ভয় তখন শতগুণ বর্ধিত হইল। সে একটা শিশি হইতে ঔষধ ঢালিয়া আমাকে খাইতে বলিল , আমি বলিলাম, আমি ঔষধ খাইব না , যদি আমাকে জোর করিযা খাওয়াইয়া দাও, তাহা হইলে আমি বাঁচিব না।'—মামা বলিল, না, তােমাকে খাইতেই হইবে , ইলে তােমার শরীর অনেক সুস্থ হইবে।'—আমি তাহার সে কথা গ্রাহ করিলাম না। তখন সে আমার ঘাড় ধরিয়া ঔষধটুকু আমার মুখে ঢালিয়া দেওয়াব চেষ্টা করিল, আমি মুখ বুজিয়া বসিয়া রহিলাম। মামাও ছাডিবাব পাত্র নহে , জোর করিয়া তাহা আমার মুখের ভিতর ঢালিয়া দিতে উদ্যত হইল । অগত্যা আমি তাহার হাতে এক ধাক্কা দিলাম,—সেই ধাক্কায় ঔষধ- টুকু বিছানার উপর পডিয়া গেল। তখন সে রাগ করিয়া বলিল, “কি, আমার অবাধ্য হইতেছি? ঔষধটা সমস্তই ফেলিয়া দিলি। আচ্ছা থাক তুই, ঔষধ গিলি কি না দেখিব। তুই সহজে না খাইলে জোর করিয়া খাওয়াইয়া দিব। ঔষধ না খাইলে ব্যায়াম সারে? একগুয়ে অবাধ্য মেয়ে।” মিস্ এরস্কাইনের কথা শুনিয়া ডডলে ক্রোধে গর্জন করিয়া উঠিলেন। বলিলেন, “লােকটা মানুষ, না জানােয়ার ? সে সময় আমি যদি তাহার পশ্চাতে লুকাইয়া থাকিতাম—তাহা হইলে সেই ধাডি বদমায়েসটাকে রীতিমত সায়েস্তা করিতাম। যাহা হউক, কাল সকালে যখন সে ঔষধ লইয়া আপনার কামরায় প্রবেশ করিবে—তখন দেখিবে পাখী উডিয়া গিয়াছে।” মিঃ ডড়লে পাচকের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “রেক, আমি তােমাব কুঠুরীতে যে চিঠি রাখিয়া আসিয়াছিলাম, সে চিঠি কোথায় ? তুমি সঙ্গে লইয়া আসিয়াছ কি ? পাচক বলিল, “না মহাশয়, আমার খাটিয়ার পাশে যে আলমারিটা, আছে, তাহার উপরেই তাহা পডিয়া আছে। আমি তাহাতে হাত ও দিই না.. যেখানে তাহা রাখিয়াছিলেন, সেইখানেই আছে। আমার কুঠুরীতে চকিলেই তাহারা তাহা দেখিতে পাইবে। দ একাদশ পরিচ্ছেদ ১২১ পাচক হােহােহা করিয়া হাসিয়া উঠিল। তাহার হাসি দেখিয়া ডড়লে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্যাপার কি কে? এমন কি মজা হইয়াছে যে, তুমি না হাসিয়া থাকিতে পারিলে না ?” পাচক আরও খানিকটা হাসিয়া বলিল, “বেটারা আচ্ছা জব্দ হইবে। জাহাজথানা যতদিন পর্যন্ত এডেন বন্দরে না পৌছিবে—ততদিন ক্ষুধার জ্বালায় সকলকে ছট্‌ফট্‌ করিতে হইবে। সাধে কি হাসিয়াছি ? মজাটা টের পাবেন বাছাধনের। জাহাজে আর বাবুর্চি নাই, আমার একটা জোগাড়দার আছে বটে, কিন্তু সে রাধিতে জানে না। কাপ্তেন দায়ে পডিয়া তাহাকেই বাঁধিতে বাধ্য করিবে। সে যাহা রধিবে, তাহা কি কেহ থাইতে পারিবে ? উপােষ মশায়, বিলকুল লােককে উপােষ করিয়া থাকিতে হইবে। শুকনাে রুটি, বিকিটু চিবাইয়া আর কয়দিন কাটাইতে পারা যায় ?-হা হা, হাে হে, হি হি।" পাচকের হাসি আর থামে না।—ডডলে গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “তােমার ভাবি যে হাসির ঘটা।—জাহাজে ত খাইবার জিনিসের অভাব নাই, একরকম কারয়া চালাইয়া লইবে।” পাচক বলিল, “হাঁ, চালাইয়া লইবে বই কি ? কিন্তু কি ভাবে চালাইবে তাহা ভাবিয়াই ত আমার হাসির ফোয়ারা খুলিয়া গিয়াছে। আমি আমার সেই জোগাভদারটাকে কতদিন বলিয়াছি, বাপু, একটু রধিতে শেখ।-কিন্তু সে কথা তাহার গ্রাহই হইত না, সে ক্রমাগত ফাঁকি দিত। এবার তার ফল পাইবে। এক জাহাজ লােক—খাই-খাই করিয়া তাহাকে জ্বালাতন করিয়া তুলিবে।” ভড়লে এ সম্বন্ধে আর কোন কথা না বলিয়া মি এসাইনকে বলিলেন, “আপনার বােধ করি ঘুম পাইতেছে। বােটের খােলের মধ্যে আপনার শয়নের ব্যবস্থা করিয়া দিব ? ব্লেক, দেখ ত উহার শয়নের কি ব্যবস্থা করা যায়। মিস, একাই বলিলেন, “না থাক, আমার ঘুম আহে নাই। আমার জন্য আপনাকে ব্যস্ত হইতে হইবে না।

১২২ নাবিক-বধু উড়লে সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া পাচকের সাহায্যে বােটের খােলের মধ্যে কম্বল বিছাইয়া তাহার জন্য বিছানা করিয়া দিলেন। মিস, এরাইন বলিলেন, “আপনি আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দতার জন্য কত কষ্টই করিতেছেন।—আমি আপনাদের কোনও রকম সাহায্য করিতে পারিলে কৃতার্থ হইব। ভডল মিস, এসকাইনাকে সেই শয্যায় শয়ন করাইয়া বলিলেন, “আপ- নাকি নানা প্রকার অসুবিধা সহ করিতে হইতেছে।আপনি প্রফুল্ল চিত্তে এই সকল অসুবিধা সহ্য করিলেই আমরা আপনার নিকট যথেষ্ট সাহায্য পাইলাম মনে করিব।” অনন্তর উড়লে পাচককে বলিলেন, “ব্লেক, তুমি আর বসিয়া থাকিয়া কষ্ট পাও কেন? অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হইয়াছ গলুইয়ে মাথা রাখিয়া ঐখানেই শুইয়া পড। সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি রাখি, যদি হঠাৎ কোন দিকে জাহাজ দেখিতে পাও, তৎক্ষণাৎ আমাকে সে কথা জানাইও। কেমন, পারিবে ত?” পাচক বলিল, “এ কাষ আমি খুব পাৰিব , কিন্তু আপনিও একটু বিশ্রাম করিয়া লইলে ভাল হয়। ততক্ষণ আমি আপনার হাল ধরিয়া থাকিতাম।” ডডলে বলিলেন, “তুমি সে জন্য চিন্তিত হইও না, আমি ক্লান্ত হইলে তােমার হাতে হাল ছাডিয়া দিয়া বিশ্রাম কৰিব।-ঘুম আসিলে একটু ঘুমাইয়া লইও। আজ তুমি আমাদের যে উপকার করিয়াছ—তাহা আমরাই জানি।” পাচক বলিল, “ও কথা কেন বলেন ?—আমি আপনাদের সঙ্গে না আসিতে আমারই কি মঙ্গল হইত ?” পাচক গলুয়ে মাথা রাখিয়া শয়ন করিল। সে সমুদ্রের দিকে চাহিয়া, কোন কাজ সে দিকে আসিতেছে কি না তাই দেখিতে লাগিল , কিন্তু শীঘ্রই নিদ্রাভিভূত হইল। মিস, এরাইনও বােটের খােল পডিয়া ঘুমাইতে লাগিলেন। কেবল মিঃ ডড়লে এব-নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া সেই গভী, রাত্রে চন্দ্রালােক-বিত মহাসমুদ্রে নৌ-পরিচালিত করিতে লাগিলেন। মধ্যে- মধ্যে খণ্ড-বিখণ্ড মেঘ শুয়ে-শুরে নীলাকাশে ভাসিয়া যাইতেছিল, এবং সেই একাদশ পরিচ্ছেদ ১২৩ মেঘের ছায়া চঞ্চল সমুদ্র-তরঙ্গে অভ্রকান্তি বিকাশ করিতেছিল। ক্ৰমে ৰাধু- বেগ প্রবল হইয়া উঠিল। ইহা ঝটিকার পূর্বলক্ষণ মন করিয়া ডডলে অত্যন্ত ভীত হইলেন। তিনি বুঝিলেন, ঝটিকা আরম্ভ হইলে মুক্ত-সমুদ্রে ক্ষুদ্র বােট- খানি রক্ষা করা কঠিন হইবে। ডডলে আরও এক ঘণ্টা নৌ-পরিচালন করিলেন। তিনি সম্মুখে ঝুকিয়া পডিয়' পদপ্রান্তবর্তিনী মিস, এসকাইনের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। তিনি তখনও গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত। ডড়লে বােটের ‘গলুই’এর দিকে চাহিয়া পাচকের মাথা দেখিতে পাইলেন না, সুতবা তিনি বুঝিলেন, সে-ও ঘুমাইয়া পডিয়াছে। তিনি তাহার নিদ্রার ব্যাঘাত করিলেন না। রাত্রিশেষে পাচক একবার মাথা তুলিয়া নিদ্রালস নেত্রে ডলের মুখের দিকে চাহিল, এবং ডড়লে তখনও শয়ন করিতে পান নাই দেখিয়া লজ্জিত হইয়া বােটের হাল গ্রহণের জন্য উঠিতে উদ্যত হইল , কিন্তু ডডলে ইঙ্গিতে তাহাকে নিষেধ করিলেন, পাচক পুনর্বার শয়ন করিল। ডডলে পূর্ববৎ বােট চালাইতে লাগিলেন। ক্রমে পূর্বাকাশ উষালাকে আরক্তিম হইল , প্রভাতকা শৰ্বরীর তরল অন্ধকার যেন কোন্ ঐন্দ্রজালিকের মায়াদণ্ড স্পর্শে ধীরে-ধীরে অপসারিত হইল। বাবুর বেগ ক্রমে মন্দীভূত হইলেও ডডলে আশ্বস্ত হইতে পারিলেন না। সমুদ্রের পৰ্বত-প্রমাণ উচ্চ তরঙ্গের উপর সেই বােটখানি ক্ষুদ্র ঝিনুকের মত ভাসিতে লাগিল , তরঙ্গবেগে এবার তাহা বহু উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হয়, আবাৰ বহু নিয়ে নিপতিত হয়,—যেন মুহূৰ্ত্তমধ্যে সেই ক্ষুদ্র তরীখানি তাহাদিগকে লইয়া রসাতল গর্ভে প্রবেশ করিবে —ডডলে বহুদর্শী সুদক্ষ নাবিক ছিলেন, তাই ক্ষুব্ধ-তরঙ্গসঙ্কুল ভয়াল সমুদ্রে অতি দক্ষতার সহিত তরণী পরিচালনে সমর্থ হইলেন। নৌচালনে অসামান্য দক্ষতা না থাকিলে বেটখানি বন্ধ পাইত না। কয়েকবার উচ্ছসিত জলরাশি সেই বােটের উপর দিয়া চলিয়া গেল , জলের কৃপটায় ডডলের পরিচ্ছদাদি সিক্ত হইল। প্রভাতে মিস একাইন ও পাচক ব্লেকের নিদ্রাভঙ্গ হইল ছয়টার সময় তাঁহারা তর্ভোজন শেষ করিলেন। উড়লে অনুমান করিলেন-এই এক ] ১২৪ নাবিক-বন্ধু রাত্রেই তাহারা অর্ধপথ অতিক্রম করিয়াছেন। মিস্ এরাইন দীর্ঘ নিদ্রার পর বেশ সুস্থ ও স্বচ্ছন্দ বােধ করিতে লাগিলেন, এই নিদারুণ কষ্ট ও অসু- বিধায় তিনি বিন্দুমাত্র ক্ষোভ বা চাঞ্চল্য প্রকাশ করিলেন না। সকলের আহার ‘শেষ হইলে, ডড়লে পাচককে তাহার নিকট আহ্বান করিলেন, এবং বলিলেন, “তুমি কিছুকাল হাল ধরিতে পারিবে কি ? আমি ওদিকে গিয়া একটু বিশ্রাম করিব মনে করিতেছি। বােট যে ভাবে চলিতেছে—সেই ভাবেই চলিবে। ইর গতি পরিবর্তনের আবশ্যকতা নাই। তুমি বেশ সতর্কতার সহিত নৌকা চালাইবে, চারিদিকে দৃষ্টি রাখিবে।” মিস্ এসকাইন বলিলেন, “মিঃ ডডলে, আপনি গলুইয়ের দিকে যাইবেন , ওখানে শয়ন করিতে আপনার কষ্ট হইবে , আপনি বােটের খােলর ভিতর শয়ন করুন, আমি উঠিয়া বাহিরে যাইতেছি। আপনি আমার প্রস্তাবে আপত্তি করিবেন না, আমি কি আপনার ভারস্বরূপ হইয়াই থাকিব? কোনরূপে আপনার সাহায্য করিতে দিবেন না? এ বড় অন্যায়।” ডড়লে অগত্যা তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া বােটের খােলে মিস্ এর কাইনের শয্যায় শয়ন করিলেন , নিস্ এরাইন বাহিরে আসিয়া বসিলেন। উড়লে পাচককে বলিলেন, 'আমি বােধ হয় শীঘ্রই ঘুমাইয়া পডিব, তমধ্যে যদি আকাশে মেঘ উঠে, কি বাযুর বেগ প্রবল হয়—অথবা দূরে কোনও জাহাজ দেখিতে পাও, তাহা হইলে আমাকে জাগাইবে।” উড়লে শমনমাত্র গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইলেন। সমস্তরাত্রি জাগিয়া তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু তার ব্যবহারে বা কথায় ক্লান্তির লক্ষণ প্রকাশ পায় নাই। তিনি দীর্ঘকাল নিদ্রাসুখ ভােগ করিতে পারি- লেন না। পাচক বােটখানি চাইতে-চালাইতে হঠাৎ ঝুকিয়া পড়িয়া ভড়নের স্কন্ধদেশে হস্তাৰ্পণ পূর্বক ঝাঁকি দিল , ডড়লে তৎক্ষণাৎ উঠিয়া বসিলেন , বসিলেন বটে, কিন্তু তাহার চক্ষু মেলিয়া চাহিতে কষ্ট হইল। যাহা হউক, তিনি চক্ষু উন্মীলিত করিয়া একবার চতুর্দিকে চাহিলেন, কিন্তু প্রকৃতির কোন ভাৰান্তৰ বুঝিতে পারিলেন না, বােটখানি যে ভাবে চলিতেছিল, তাহারও কোন একাদশ পিরচ্ছেদ ১২৫ স ব্যতিক্রম দেখিলেন না , তখন তিনি পাচককে তাহার নিদ্রাভঙ্গের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেসে কিছু দূরে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল। ডডলে সেই দিকে চাহিয়া একখানি প্রকাণ্ড জাহাজ দেখিতে পাইলেন। জাহাজখানি এরূপ বৃহৎ যে, তাহা তিন চাবি হাজার টন মাল অনায়াসে বহন করিতে পারিত। উড়লে অনুমান করিলেন, তাঁহাদের বােট হইতে জাহাজখানির দূরত্ব একশত গজের অধিক নহে, এমন কি, জাহাজের নামটি ও স্পষ্ট পাঠ করিতে পারিলেন। —জাহাজখানির নাম, “ইউনাইটেড, ইটালী।” ডডল ব্যগ্রভাবে বলিলেন, “জাহাজখানি এই দিকেই আসিতেছে। যেরূপ বেগে আসিতেছে, তাহা দেখিয়া মনে হইতেছে আমরা সাবধান না হইলে উহা আমাদের বােটের উপর চাপিয়া পড়িবে, উহার ঢেউ লাগিয়াও আমাদের বােটখানি ডুবিতে পারে।”—তিনি শয্যা ত্যাগ করিয়া এক লম্ফে নৌকার হালের নিকট আসিলেন, এবং পাচককে সরাইয়া দিয়া ক্ষিপ্রহস্তে হ’ল গ্রহণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে জাহাজখানি বােটের পাশ দিয়া চলিয়া গেল , কয়েক মুহূর্ত মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ গজ তফাতে গিয়া পড়িল । বােটখানি তাহার তরঙ্গ-তাড়নে নাগরদোলাব 'মত দুলিতে লাগিল। নৌকা ডােবে আর কি।—ডডলে কষ্টে ধাক্কা সামলাইয়া লইয়া জাহাজখানির দিকে চাহিলেন , এবং বলিলেন, “জাহাজের লােকেরা আমাদিগকে দেখিতে পাইয়াছে , এখনই জাহাজ থামাইয়া আমাদিগকে তুলিয়া লইবে।পরমেশ্বব বুঝি আমাদের এত কষ্টের পর মুখ তুলিয়া চাহিয়াছেন। কিন্তু তাহার আশা পূর্ণ হইল না , দেখিতে-দেখিতে জাহাজখানি আরও দূবে চলিয়া গেল। জাহাজের লােকেরা হয় তাহাদের বােটখানি দেখিতে পায় নাই, না হয় তাহাদের জীবনরক্ষা করা আবশ্যক মনে করে নাই, কয়েক চিনিটের মধ্যেই জাহাজ অদৃশ্য হইল। তাহাদের হৃদয়ে যে ক্ষীণ আশা-দীপ প্রজ্জ্বলিত হইয়াছিল, সঙ্গে-সঙ্গে তাহা নিৰ্বাপিত হইল। নিৰ্বাপিত হইল। ডড়লে ক্ষুব্ধতাৰে বলিলেন, “জাহাজের লােকগুলা আমাদের বিপদ বুঝিতে পারে নাই। কিন্তু আমাদের নিরাশ হইলে চলিবে না। পৰমেশ্বর আমাদিগকে ত্যাগ করেন নাই, ;

১২৬ নাবিক-বন্ধু এ বিশ্বাস রাখিতেই হইবে। ভয় কি?—দুশ্চিন্তারও কোন কারণ নাই, আমার বােধ হয় তীরভূমি এখান হইতে ত্রিশ মাইলের অধিক নহে।” একথা শুনিয়া মিস্ এরসাইন বা ব্লেকের মুখ হইতে কোনও কথা বাহিব হইল না। সুশীতল জলপূর্ণ গ্লাসটি মূখের কাছে আনিবামাত্র তাহা হত হইতে খসিয়া পড়িয়া শতধা বিদীর্ণ হইলে তৃষ্ণার্ত পথিকের মনের ভাব যেরূপ হয়, তাহাদের মনের অবস্থাও তখন সেইরূপ শােচনীয়।--বােটখানি উঠিয়া পডিয়া হেলিয়া-দুলিয়া গন্তব্য পথে অগ্রসর হইল। পশ্চিক দিকই কর্ণধার ভড়লের লক্ষ্য, তিনি সেই দিক লক্ষ্য করিয়াই বােট পরিচালিত করিতে লাগিলেন। ক্রমে মধ্যাহ্নকাল উপস্থিত।-মধ্যাহ্নে বাযুর বেগ পুনৰ্ব্বার প্রবল হইল। ডউলে আশা করিলেন, ঝটিকারম্ভের পূর্বেই তাহারা লামু বা তৎসন্নিহিত কোন দ্বীপে উপস্থিত হইতে পারিবেন।একবার সেখানে পদার্পণ করিতে পারিলে ‘ডিউসি-অস-আফ্রিকা লাইনের জাহাজে মােখালায় এবং তথা হইতে জাঞ্জিবারে গমন করা বিশেষ কঠিন হইবে না। কোম্পানীর জাহাজ পাইতে বিলম্ব হইলেও আশ্রয় লাভের ব্যাঘাত হইবে না। মিঃ ডড়লে এই সকল কথার আলােচনা করিয়া অপেক্ষাকৃত আশ্বস্ত হইলেন, এবং পাচককে মধ্যাহ্নভােজনের আয়োজন করিতে বলিলেন। অল্পক্ষণ পরেই সকলে ভােজনে বসিলেন। মিস্ এরাইন পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক আহার করিতে পারিলেন দেখিয়া উড়লের বড়ই আনন হইল। এই অল্প সময়ের মধ্যেই মিস একাইনের গণ্ডে স্বাস্থ্যের লক্ষণ দেখিদে পাওয়া গেল। বিষে র্তাহার দেহ জর্জরিত হইতেছিল—তাহার প্রভাব অতিক্রম করিয়া তিনি ঘেন মূতম মানুষ হইলেন।-আহারান্তে ডডলে মিস, এসকাইনকে পুনৰ্ব্বার শয়ন করিতে অনুরােধ করিলেন। মিস, এসকাইন বলিলেন, “তাহাতে আমার আপত্তি নাই, কিন্তু তটরেখা দেখিবামাত্র আপনি আমাকে বলিবেন ত ? ডাঙ্গা দেখিতে না পাইলে আমার মন স্থির হইবে না।—দিবারাত্রি চারিদিকে কেবল জল! এ আর সহ্য হয় না।” { একাদশ পরিচ্ছেদ ১২৭ ডডলে বলিলেন, “তীর দেখা যাইলেই আপনাকে জানাইব, তবে কতক্ষণে এ আশা পূর্ণ হইবে—বলিতে পারি না। বােট কিছু ধীরে চলিতেছে।” তখন বাতাসের বেগ মন্দীভূত হইয়াছিল , বেলা তিন ঘটিকার সময় বাতাস পড়িয়া গেল। পালে আর বাতাস পাইল না। অপরাহ্ন পাঁচ ঘটিকার সময় । ডড়লের বােধ হইল, বহুদূরে পশ্চিম সীমান্তে মেঘাচ্ছন্ন গিরিশৃঙ্গের ন্যায় অস্পষ্ট তটরেখা দৃষ্টিগােচর হইতেছে। ইহা দৃষ্টিবিভ্রম কি সত্য, তা তিনি প্রথমে বুঝিতে পারিলেন না, কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাহার সন্দেহ দূর হইল। তিনি বুঝিলেন, উহা তটভূমিই বটে।—তিনি তৎক্ষণাৎ মিস, এসাইনকে এই আনন্দের সংবাদ জ্ঞাপন করিলেন । মিস্ এরাইন ব্যগ্রভাবে বলিলেন, “ঐস্থান এখান হইতে কতদূর?” ডড়লে বলিলেন, “অনুমান পাঁচমাইল।-না, নিশ্চয়ই তাহাব অধিক নহে , কিন্তু উহা কোন স্থান তাহা জানিতে না পারিলে ত এখানে বােট ভিড়াইতে সাহস হইবে না। তবে উহা লামু না হইলেও তাগৰ সন্নিকটবর্তী কোন স্থান হওয়াই সম্ভব।” ক্রমে বােটনি সমুদ্রতটের নিকটে উপস্থিত হইল। কিন্তু তটভূমি অত্যন্ত • দূরারােহ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ে পরিপূর্ণ। সমুদ্রতরঙ্গ গিরি-পাদমূলে ক্রমাগত প্রতিহত হইতেছিল।তথাপি ডডলে অতি সাবধানে নৌকা চালাইয়া তীরের দিকে অগ্রসর হইলেন। অপরাহ্নের লােহিতালােকে তিনি ভূখণ্ডটি সুস্পষ্ট দেখিতে পাইলেন।তিনি বুঝিলেন, দ্বীপটির নাম যাহাই হউক, উহা নিতান্ত ক্ষুদ্র নহে, তাহার অনুমান হইল, তাহা পনের বিশ মাইল দীর্ঘ , কিন্তু তিনি নিকটে বা দূরে গ্রামের কোন চিহ্ন দেখিতে পাইলেন ন'। প্রস্তর-কঙ্করপূর্ণ তভূমি অরণ্যাবৃত, অরণ্যে তিন্তিড়ী জাতীয় অসংখ্য বৃক্ষ, এবং দূরে দূরে রাশি রাশি নারিকেল তরু উন্নত মস্তকে দণ্ডায়মান। মিঃ ডড়লে নানাদিক দিয়া ঘুরিয়া বালুচর ও তরঙ্গের ঘূর্ণাবর্ত অতিক্রম করিয়া তীরে বােট ভিড়াইলেন, এবং উভয়ে নতজানু হইয়া পরমেশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিলেন। . } দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ডডল মিস্ একাইনের হাত ধরিয়া তাহাকে তীরে নামাইলেন, তাহার পর বলিলেন, “আমরা ত কূল পাইলাম , কিন্তু নিরাপদ হইলাম কি না, কে বলিবে? এখন আমাদের কর্তব্য কি, তাহারই আলোচনা করা আবশ্যক। চারিদিকের অবস্থা দেখিয়া মনে হইতেছে, এখানে আশ্রয় লাভের তেমন সুবিধা নাই। তবে দ্বীপের ভিতর অগ্রসব হইনে হয় ত মাথা রাখিবার মত একটা স্থান পাইতেও পারি। প্রথমে কিছু খাইয়া লওয়া যাউক , পরে কখন কোথায় কি জুটিবে-না-জুটিবে, কে বলিতে পারে ? আহারান্তে গ্রামের সন্ধানে যাত্র করিব ।এতবড দ্বীপে যে লােকালয় নাই, এরূপ ত মনে হয় না।” মিঃ ডডলের প্রস্তাবে কাহারও আপত্তির কারণ ছিল না।মিঃ ডড়লের ইঙ্গিতে ব্লেক বােটের উপর হইতে খাদ্যসামগ্রীগুলি নামাইয়া লইল , তাহারা একটি তালগাছের নীচে বসিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তি করিলেন । উডলে মনে মনে বলিলেন, “যদি কোন উপায়ে এই দ্বীপের নামটি জানিতে পারি—এবং এখান হইতে লামুর দূরত্ব কত—তাহা বুঝিতে পারি, তাহা , হইলেও আশ্বস্ত হওয়া যায়। কোথায় আসিয়াছি জানি না, কোথায় এই অরণ্যের শেষ, তাহাও বুঝিতে পারিতেছি না, কোন দিকে যাইলে যে একটু আশ্রয় মিলিবে, তাহা অনুমান করাও অসম্ভব। এ অবস্থায় কি করিয়া আশ্বস্ত হইব ? আহারান্তে ডলে মিস এরাইনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “নৌকাখানি এখানে রাখিয়া আমরা তিন জনেই যাইব, না আমরা দু’জনে যাইব, মেক নৌকার পাহারায় থাকিবে ? মিস, এরাইন বলিলেন, “অজ্ঞাত স্থান, কোথাও আশ্রয় মিলিবে কি না; তাহার স্থিরতা নাই; আমরা সকলেই নৌকা ছাড়িয়া চলিয়া যাইলে এই • দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ১২৯ দ্বীপের অধিবাসীরা যদি দৈবাৎ এখানে আসিয়া পডে ও নৌকাখানি চুরী করে-তবে বড়ই বিপদে পডিতে হইবে। আমার বিবেচনায় ব্লেক বােটের পাহারায় থাকিলেই ভাল হয়।” কিন্তু ব্লেক এ প্রস্তাবে আপত্তি করিল, সে বলিল, “যদি দ্বীপের লােকেরা বােট আক্রমণ করে, তাহা হইলে বােটখানি রক্ষা করা দুরের কথা—আমার পক্ষে আত্মরক্ষা করাই কঠিন হইবে । দূরে গিয়া আপনিও একাকী মিস, এরাইনকে লইয়া বিপন্ন হইতে পারেন, কিন্তু আমরা তিন জন একত্ৰ থাকিলে আত্মরক্ষার অনেকটা সুবিধা হইবে।” উড়লে এই প্রস্তাব সঙ্গত মনে করিয়া পাচক-প্রদত্ত বন্দুকটি কাঁধে ঝুলাইয়া নইলেন , এবং অবশিষ্ট খাদ্যদ্রব্যসহ অরণ্যে প্রবেশ করিলেন। মিস্ এয়াইন তাহার অনুসরণ করিলেন, পাচক ব্লেক তাহাদের পশ্চাতে চলিল। মিস এর- কাইন বলিলেন, “আশা করি আপনার বন্দুক ব্যবহার করিবার আবশ্যক হইবে না।—আর বেল নাই, অন্ধকার গাঢ় হইলে হয় ত জঙ্গলের মধ্যে আমরা হারাইয়া যাইব।—চলুন একটু দ্রুত যাই।” সেই দুর্গম অরণ্য ভেদ করিয়া দ্রুত চলিবার উপায় ছিল না।—একে কোন দিকে পথ নাই, তাহার উপর কন্টক-লতা ও কন্টকময় গুল্মে অরণ্য আবৃত। প্রস্তরাকীর্ণ মৃত্তিকাও অত্যন্ত বন্ধুর। যেখানে তাল ও নারিকেল বৃক্ষ ভিন্ন অন্য বৃক্ষ ছিল না, সেই স্থান দিয়াই তাহারা অপেক্ষাকৃত দ্রুত চলিতে সমর্থ হইলেন। কোন দিকে পথ-চিহ্ন না থাকায় ডড়লের আশঙ্কা হইল, এই দ্বীপে হয় ত মনুষ্যের বসতি নাই।—যে দিকে দুই চোখ যায়, সেই দিকেই তিনি নিরুৎসাহ চিত্তে, লক্ষ্যহীনভাবে চলিতে লাগিলেন। চলিতে-চলিতে মিস্ এরাইন অস্ফুট শব্দ করিয়া হঠাৎ থামিলেন।—ডডলের আশঙ্কা হইল মিস এসকাইন হয় ত সাপের ঘাডে পা দিয়াছেন। তিনি ফিরিয়া চাহিতেই মিস্ এরাইন পার্শ্বে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া তাহাকে কি দেখাইলেন। মিঃ ডডলে তীক্ষদৃষ্টিতে দেখিলেন—একটা সরু পথ বটে !—সেই সঙ্কীর্ণ পথ অরণ্য ভেদ করিয়া অকিয়া-বাকিয়া কিছুদূরে গিয়া অদৃশ্য হইয়াছে।

নাবিক-বন্ধু ভড়লে সেই পথটি দেখিয়া সােৎসাহে বলিলেন, “চলুন, ঐ পথ ধরিয়াই আমরা অগ্রসর হই , কিন্তু পথটি দেখিয়া মনে হইতেছে, অনেকদিন পর্যন্ত এ পথে লােক-যাতায়াত নাই , তথাপি এ পথ ছাডা হইবে না। যে জলে ডুবি- তেছে, সে সামান্য তৃণগুচ্ছও উপেক্ষা করে না। রেক বলিল, “এই পথে চলিয়া যদি আমরা কোন একটা সামান্য আশ্রয় ও পাই, তাহা হইলে রাত্রিটা কোনরকমে কাটাইতে পারি। বিশেষতঃ সন্ধ্যার অন্ধকার শীঘ্রই গাঢ় হইয়া আসিবে, আকাশে মেঘও ঘনাইয়া আসিতেছে , বৃষ্টি আসিলে বিপদের সীমা থাকিবে না। এ অবস্থায় যদি একখানি ভাঙ্গা কুটীরও দেখিতে পাই, তাহা হইলে সেখানে অন্ততঃ মাথাটাও বাচিবে।” তাহারা তিনজনে সেই সঙ্কীর্ণ পথ ধরিয়া চলিতে লাগিলেন , চলিতে- চলিতে তাহারা একটি অনুচ্চ পাহাডের সাদেশে উপস্থিত হইলেন। অল্পক্ষণ পরে সূৰ্যাস্ত হইল , অস্তমিত তপনের লােহিত রশ্মিজাল তাল নারিকেল বৃক্ষের পত্রে প্রতিফলিত হইয়া হরিদ্বর্ণ তৃণ-সমাচ্ছাদিত প্রান্তরভূমি চুম্বন করিতে লাগিল। সেই আলােকে পথ দেখিতে তাঁহাদের কোন অসুবিধা হইল না। চারিদিক নিস্তব্ধ , তাহাদের তিনজনের লঘু পদশব্দ ভিন্ন অন্য কোনও শব্দ তাহাদের কর্ণগােচর হইল না। ভড়লে চলিতে-চলিতে হঠাৎ থামিয়া একদিকে অঙ্গুলি প্রসারিত করিলেন, বলিলেন, “ঐ ওদিকে—জঙ্গলের ওপাশে সাদা মত কি দেখা যাইতেছে ?” মিস এরাইন বলিলেন, “একটা ঘরের সাদা দেওয়াল বলিয়া বােধ হইতেছে না ?-হ, ঘরের দেওয়ালই বটে।—এই পথ দিয়া ঐখানেই যাওয়া যাইবে। তখন সকলেই সেই অরণ্যান্তরালবর্তী ও প্রাচীর লক্ষ্য কৰিয়া চলিতে লাগিলেন। তাহারা সেইস্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, তাহা সেই দ্বীপবাসী, অসভ্য লােকের বাসগৃহ , মাটীর দেওয়ালের বহির্দেশ চূণকাম করা, উপরে খড়ের চাল ছিল, তাহা সংস্কারাভাবে ভাঙ্গিয়া খসিয়া পড়িয়াছে , চারিদিকে দেওয়াল মাজি দাড়াইয়া আছে। অরণ্যের অন্তরালবর্তী আলীকুবেষ্টিত সেই দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ভগ্নগৃহ গােধূলির অস্ফুট আলােকে তাহাদের নয়ন সমক্ষে পিশাচের লীলাক্ষেত্রবৎ প্রতীয়মান হইতে লাগিল। ডড়লে সেই বিধ্বস্ত প্রায় গৃহটি পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, “দেখিতেছি, এস্থান মনুষ্যবাসের অযােগ্য , এখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া কোন ফল নাই। কিন্তু ঐদিকে আরও কয়েকখানি ঘর দেখা যাইতেছে না?—চল, ঐ ঘরগুলি পরীক্ষা করিয়া দেখি, ওখানে রাত্রিবাস করা হয় ত অসম্ভব হইবে না।” কিছু দুরে আরও কয়েকখানি গৃহ ছিল, তাহারা তাহা পরীক্ষা করিতে চলিলেন। পাহাড হইতে নামিয়া প্রায় অর্ধমাইল দূরে আসিয়া তাহারা কয়েক খানি মৃৎকুটীর দেখিতে পাইলেন , এগুলির অবস্থা পূৰ্ববর্ণিত গৃহ অপেক্ষা কিছু ভাল। এই ঘরগুলিতে খডের চাল ছিল। ডডলে বলিলেন, “এই দ্বীপে ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আশ্রয় লাভের আশা নাই, বিশেষতঃ, সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছে। মিস্ এরাইন, আপনি কি এই কুটীরে রাত্রিবাস করিতে পারিবেন ?” মিস্ এরাইন বলিলেন, “আপনি সঙ্গে থাকিলে আমি যে কোন ভয়ানক স্থানে নির্ভয়ে বস করিতে পারিব।”-কথাটি বলিয়াই তাহার বড় লজ্জা হইল, তিনি মুখখানি লাল করিয়া অন্য দিকে সরিয়া দাড়াইলেন। কিন্তু মিস একাইনের কথা শুনিয়া ডলের হৃদয় আনন্দে উচ্ছসিত হইয়া উঠিল , সকল কষ্ট, যন্ত্রণা, পরিশ্রম তিনি সফল মনে করিলেন। তিনি স্থান, কাল সমস্তই বিশ্বত হইলেন। একথা যদি মিস্ এরাইনের অন্তরের কথা হয়, তাহা হইলে পৃথিবীতে কোন্ ভাগ্যবান পুরুষ তাহার অপেক্ষা অধিক সুখী ? তাহার মনে হইল, এই দ্বীপই তাঁহার নিকট ঋণ , ঐ জীর্ণ, অপরিচ্ছন্ন, ঐহীন পর্ণকুটীরগুলি সুখৈশ্বৰ্যপূর্ণ রাজপ্রাসাদ । কিন্তু তাহার এই সুখস্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী হইল না। পাচক রেক কুটীরের অভ্যন্তরভাগ পরিদশন করিয়া আসিয়া তাহাকে বলিল, “এসকল ঘরে কি ভদ্রলােকে বাস করিতে পারে ? কি জঞ্জাল। দুর্গন্ধে যে তিষ্ঠিবার যাে নাই। কুটীরগুলি সাপ, দুচো, বিছে প্রভৃতির আড্ডা। সন্ধ্যা না হতেই কিন্তু ব্রেক বিভিন্ন নাবিক-বধু } পােকায় সা-রে-গা-মা সাধিতে আরম্ভ করিয়াছে। গৃহস্থেরা বােধ হয় এ সকল বাড়ী বাসের অযােগ্য মনে করিয়াই ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে।” ডডলে বলিলেন, “ইহা অপেক্ষা ভাল ঘর যখন পাইবার উপায় নাই, তখন এখানেই কোন রকমে রাত্রিবাস করিতে হইবে। ব্লেক, তুমি নৌকা হইতে পা’লখানা খুলিয়া আনিতে পারিবে ?—তা মিস্ এরসাইনের শষ্যা- ৰূপে ব্যবহার করিতে হইবে , নতুবা উনি মাটীতে শুইবেন কিরূপে ? পাচক বলিল, “এ আর শক্ত কি ? আমি বােটের উপর হইতে পাল আনিতেছি। এখনও অন্ধকার তেমন গাঢ় হয় নাই, আমি অনায়াসে এখানে ফিরিয়া আসিতে পারিব।” পাচক রেক পা’ল আনিতে সমুদ্রকূলে চলিল, এবং মুহুৰ্তমধ্যে অরণ্যের অন্তরালে অদৃশ্য হইল। ডড়লে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, গৃহ- মধ্যে জঞ্জাল স্তুপীকৃত হইয়া আছে। একস্থানে কতকগুলি শুধ তালপত্র, এক কোণে মদের ভাঙ্গা বােতল, কোথাও ফর্সির একটা ভাঙ্গা নল पवर जक দিকে কতকগুলি শুষ্ক ত্বালানী কাঠ। ডডলে মিস্ এসকাইনকে ঘর হইতে বাহির করিয়া দিয়া ঘর পরিষ্কার করিতে আরম্ভ করিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেঝের জঞ্জাল অদৃশ্য হইল , তখন তিনি বাহিরে আসিয়া মিস্ এরকাইনের পাশে দাড়াইলেন, তাহাকে বলিলেন, “এদিকে ত সকল যােগাড শেষ, কিন্তু ব্লেক এখনও আসিতেছে না কেন? কোন বিপদে পডিল না কি ?-না, পথ ভুলিয়া বনের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে ?—এখন দেখিতেছি তাহাকে যাইতে না দিলেই ভাল হইত।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “আমার জন্যই সে বোধ হয় বিপন্ন হইয়াছে। আপনি কেন তাহাকে পাল আনিতে পাঠাইলেন? আমি মাটীতে অনায়াসেই শয়ন করিতে পারিতাম। উড়লে বলিলেন, “না, আপনার কোন দোষ নাই , আমার মনে হইতেছে -যদি তাহাকে না পাঠাইয়া আমি নিজে যাইতাম, তাহা হইলে আক্ষেপের কোন কারণ থাকিত না।” না দ্বাদশ পরিচ্ছেদ আরও দশ মিনিট চলিয়া গেল, ব্রেক ফিরিল না, তাহার প্রত্যাগমনের কোন চিহ্নও দেখিতে পাইলেন না। ডডলে অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিলেন। অনেকক্ষণ পরে কাহার পদশব্দে ডড়লে আত্মসংবরণ করিয়া উৎকৰ্ণভাবে দাড়াইয়া রহিলেন।—ডড়লে মিস্ একাইনকে বলিলেন, “এইবার বুঝি ব্লেক আসিতেছে।” মিস্ এরাইন বলিলেন, “সে-ই যে আসিতেছে, ইহা কিরূপে বুঝিলেন ? ঐ পদশব্দ স্থানীয় কোন লােকেবও ত হইতে পারে।” ভড়লে বলিলেন, “নিশ্চয়ই নহে। জুতার শব্দই বুঝিয়াছি ব্লেক আসিতেছে। স্থানীয় অসভ্য লােকগুলা জুতা পাইবে কোথায় ?-না, রেই আসিতেছে। কথা শেষ হইতে-না-হইতে পাচক ব্লেক তাঁহাদের সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল। তাহাকে দেখিয়া ডডলে উত্তেজিত স্বরে বলিলেন, “ব্লেক, তোমার এত বিলম্বের কারণ কি ? তােমার বিলম্ব দেখিয়া আমার যে কত দুশ্চিন্তা হইয়াছিল—তাহা তােমাকে বলিয়া বুঝাইতে পারিব না।” পাচক বলিল, “আমি পথ হারাইয়া। অন্যদিকে গিয়া পড়িয়াছিলাম। আমার বিলম্ব দেথিয়া আপনি উৎকণ্ঠিত হইবেন, তাহা কি আর বুঝিতে পারি নাই ? উড়লে বলিলেন, “কত রকম আশঙ্কাই মনে হইতেছিল—তাহা আর তােমাকে কি বলিব ?—যাহা হউক, যে কাযে গিয়াছিল তাহার কি হইল? তুমি ত বােটের পাল লইয়া আস নাই।” পাচক বলিল, “না মহাশয়, আমি বােটখানি খুঁজিয়া পাই নাই।—আপনি একবার এদিকে চলুন। ভড়লে বুঝিলেন, পাচক তাহাকে কোন গােপনীয় কথা বলিবে, মিস 'এরাইনের সাক্ষাতে সে তাহা বলিতে অনিচ্ছুক। তিনি মিস্ এসাইনকে বলিলেন, “মিস্ এরাইন, পাল ত পাওয়া যায় নাই , আজ রাত্রির মত এক- থানা কম্বল বিছাইয়াই মাটীর উপর আপনাকে শয়ন করিতে হইবে, অ কোন উপায় দেখি না।

১৩৪ t নাবিক-বন্ধু মিস্ এরাইন বলিলেন, “ইহাতে আর আপত্তি কি? বিপদের সময় সকলই করিতে হয়। আপনি লােকটাকে না পাঠাইলেই ভাল হইত , বেচারা অনর্থক হয়রাণ হইয়া আসিল।” মিস্ এরাইন সেই কুটীরে প্রবেশ করিয়া মৃত্তিকায় তাহার কম্বল প্রসারিত করিলেন।-ডডলে পাচককে একাকী পাইয়া নিম্নস্বরে বলিলেন, “ব্লেক, তােমার ভাব দেখিয়া বােধ হইতেছে, আমাকে তােমার কিছু বলিবার আছে। তােমার এত বিলম্ব হইবার কারণ কি ? কি জন্যই-বা নৌকায় পাল- পানি আনিলে না ?আমার বড় ভয় হইয়াছে, ব্যাপার কি বল।” ব্লেক বলি, “আপনি ঐদিকে চলুন, মিস্ একাইনকে সে সকল কথা জানিতে দেওয়া হইবে না। তিনি জয় পাইবেন। ব্যাপার বড় গুরুতর। এতই গুরুতর যে, তাহা শুনিল আপনি হতবুদ্ধি হইয়া যাইগেন। আমার ত মহাশয়, বুদ্ধি লােপ পাইয়াছে।” ডডলে পাচকের গত রিয়া তাহাকে কয়েক গজ দূরে টানিয়া লইয়া গিয়া উদ্বেগকম্পিত স্বরে বলিলেন, “বাপার কি কে? শীল।” পাচক বলিল, “ব্যাপার মতি সাংঘাতিক।ডাক্তার লাম্পিয়ন ও জাহাজের কাপ্তেন আমাদের অনুসরণ করিয়াছিল , আমাদের ধরিতে তাহারা এখানে পর্যন্ত আসিয়া পড়িয়াছে।” কথাটা শুনিয়া ডডলের হৃৎকম্প হইল ; তিনি অক্ষুটস্বরে বলিলেন, “সকল কথা খুলিয়া বল। তাহারা এখানে আসিয়াছে—ইহা কিরূপে জানিলে ?” পাচক বলিল, “আমি এই দ্বীপের অদূরে জাহাজখানা দেখিয়া আসিয়াছি। জাহাজ যেখানে নােঙ্গর করিয়াছে, সে স্থান এখান হইতে পাঁচ মাইলের অধিক নহে । আমি বােটের সন্ধানে পাহাড়ের উপর দিয়; সমুদ্রকুলের দিকে যাইতেছিলাম, হঠাৎ দেখিলাম, একখানা:জাহাজ আসিয়া দ্বীপের নিকট ভিডিল।' আমি জাহাজখানি দেখিয়াই চিনিতে পারিলাম। সে যে কেন আসিয়াছে— তাহাও বুঝিতে পারিলাম। আমার আর অগ্রসর হইতে সাহস হইল না। অতঃ পর কি হয়—তাহা দেখিবার জন্য আমি সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিলাম।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ১৫ কয়েক মিনিট পরে দেখিলাম, জাহাজখানি নােঙ্গর করিয়া একখানি বােট জলে নামাইয়া দিল। বুঝিলাম, ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন ও কাপ্তেন সেই বােটে আমাদের খুজিতে আসিতেছে।কিন্তু আমি হতাশ হই নাই , উহার যদি এই দ্বীপের কোন অধিবাসীর সাক্ষাৎ পায়, তাহা হইলেও তাহার নিকট অামাদের কোন সন্ধান জানিতে পারিবে না। আমরা যে এখানে আছি তাহা ত কেহই জানে না। সুতরাং উহারা নিশ্চয়ই জাহাজে ফিরিয়া গিন্ধা নােঙ্গর তুলিবে, এবং আমাদের সন্ধানে অন্যদিকে যাইবে, তাহা হইলে আর আমাদের ভয় কি ? ডডলে বলিলেন, “নে কথা সত্য কি জানি এখনও কি সেইখানে নােঙ্গর করিয়া আছে ? পাচক বলিল, “আছে বৈ কি।-ব্যাপার যাহা ঘটিয়াছে তাহা আরও গুরুতর। জাহাজের বােটখানি দ্বীপের কিনারায় আসিলে দেখিলাম—ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন ও জাহাজের কাপ্তেন সেই বােট হইব্দের সতি। অতপর কি কৰ্তব্য তাহাই ভাবিতেছি, এমন সময় এই দ্বীপের কয়েকজন লােককে জঙ্গলের ভিতর দিয়া সমুদ্রকূলের দিকে যাইতে দেখিলাম।—তাহাদের দুই তিন জনের মাথায় এক-একটা বােডা। তাহার। অন্যদিক দিয়া সমুদ্রের ধারে উপস্থিত হইল , সেই স্থানেই আমাদের বােটখানিবাধা ছিল। বােটখানি দেখি তাহারা যেন কি বলাবলি করিল, তাহার পদে তাহার পর্গ দেকটেইল বােটের মাস্তুল খাটাইয়া তাহাতে পাল তুলিয়া দিব ধড়ি টানিতে-টানিতে তাহার বোটখানি লইয়া চলিল। আমার ইচ্ছা হইল, আমি দৌড়াইয়া সমুদ্রকূলে উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে বােটখানি চুরী করিয়া লইয়া যাইতে নিষেধ করি, —কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হইল, তাহাদিগকে দেখা দেওয়া ভাল হইবে না, তাহারা আমাকে দেখিলেই সেকথা কাপ্তেনের কাছে প্রকাশ করিবে। যাহা হউক, তাহাৱা বােটখানি লইয়া জাহাজের দিকে চলিল,-আমিও আপনার নিকট ফিরিয়া আসিলাম। পাচকের কথা শুনিয়া ডলের মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইল। অতঃপর তিনি নাবিক-বধূ কি করিবেন, তাহা সহসা স্থির করিতে পারিলেন না। ল্যাম্পিয়ন মিস এসাইনকে হত্যা করিবার জন্য কাপ্তেনের সহিত যে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল— তাহা ডডলে জানিতে পারিয়াছেন, একথা ল্যাম্পিয়ন ও কাপ্তেন উভয়েই বুঝিতে পারিয়াছে , সুতরাং কথাটা গােপন রাখিবার উদ্দেশ্যে তাহারা যে তাহাদিগকে ধরিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিবে, এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। একবার যদি তাহারা তাহাদিগকে ধরিতে পারে, তাহা হইলে তাদের প্রাণরক্ষাব আশা নাই। তাহারা দ্বীপে আসিয়া তাহাদের অন্বেষণ করিতেছে। রাত্রিকালে ধরা না পডিলেও পরদিন তাহাদিগকে ধরা পডিতেই হইবে। -এখন কর্তব্য কি ? ডড়লে অস্ফুট স্বরে বলিলেন, “এখন আমি করি কি ? নেটিভ গুলা আমাদের বােটখানি লইয়া চলিয়া গিয়াছে। কাপ্তেনের সহিত তাহাদেব নিশ্চয়ই দেখা হইবে , এবং বােটের কথা তাহাকে জানাইলেই কাপেন ও ল্যাম্পিয়ন বুঝিবে আমরা এই দ্বীপেই আশ্রয় লইয়াছি।তখন আমাদিগকে খুঁজিয়া বাহির করা তাহাদের পক্ষে কঠিন হইবে না। এখানে ধরা পড়িলে আমাদের প্রাণরক্ষার কোন আশা নাই। বােটখানি থাকিলেও এই বাত্রে স্থানান্তরে পলায়নের চেষ্টা করিতাম, কিন্তু নেটিভগুলা বােটখানি লইয়া গিয়াছে। এই ক্ষুদ্র দ্বীপে সম্পূর্ণ নিরাশ্রয়ভাবে কয় দিন লুকাইয়া থাকিব ?” ডডলের অভিপ্রায় জানিবার জন্য পাচক উদ্বেগপূর্ণ দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।—ডডলে তাহাকে বলিলেন, “তুমি যে মিস্ এরাইনের সাক্ষাতে আমাকে এ সকল কথা বল নাই, ইহা খুব বুদ্ধিমানের কায হইয়াছে। তিনি এ সকল কথা শুনিলে অত্যন্ত ভয় পাইতেন, অথচ ইহাতে তাহার কোন উপকার হইত না।” পাচক বলিল, “সেটুকু বুদ্ধি আমার আছে। মি এসকাইন একেই ত অত্যন্ত বিপন্ন, তাহার উপর এ সকল কথা শুনিলে কি তিনি ধৈৰ্য্যধারণ করিতে পারিতেন? ন মহাশয়, প্রাণ গেলেও আমি এ সকল গােপনীয় কথা তাহার নিকট প্রকাশ করি না।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ১৩৭ ডড়লে বলিলেন, “সে বিশ্বাস আমার আছে। তুমি আমাদের বিপদের বন্ধু। আমরা বিপন্ন হইয়াছি, বিপদের মেদ আমাদের মাথার উপর ঘনাইয়া আসিয়াছে ; যে-কোন মুহূর্তে আমাদের মস্তকে বজ্রাঘাত হইতে পারে বটে, কিন্তু আমি এখনও হতাশ হই নাই। আশা আছে পরমেশ্বরের আশীর্বাদে এই ভীষণ বিপদ হইতে আমরা উদ্ধার লাভ করিতে পারি। অতঃপর আমাদের কি করা কর্তব্য, তাহারই আলােচনা করা যাউক।—এই দ্বীপের কোন দিকে লোকালয় আছে--তাহার কোন সন্ধান পাইয়াছ কি ?” পাচক বলিল, “আমার অনুমান দ্বীপের পশ্চিমাংশে গ্রাম আছে। জাহাজ- খানি সেই দিকে নােঙ্গর করিয়াছে বলিয়াই এরূপ অনুমান করিতেছি। ডুডলে বলিলেন, “তােমার অনুমান সত্য হওয়াই সম্ভব। এখন কথা এই যে, আমরা আপাততঃ এখানেই লুকাইয়া থাকিব, না –এই দ্বীপের প্রধান ব্যক্তির সহিত সাক্ষাৎ করিয়া অর্থদানে তাহাকে বশীভূত করিবার চেষ্টা করিব ?-সে আমাদিগকে আশ্রয় দান করিলে কাপ্তেন বা ল্যাম্পিয়ন আমাদের কোন অনিষ্ট করিতে পারিবে না। স্বীকার করি ল্যাম্পিয়নও তাহাকে উৎকোচ, দানে হস্তগত করিবার চেষ্টা করিবে, কিন্তু সে যে অধিক টাকা দিতে পারিবে, এরূপ বােধ হয় না। আমরা প্রাণরক্ষার জন্য তাহাকে অনেক অধিক অর্থ প্রদানের লােভ দেখাইলে সর্দার আমাদেরই পক্ষাবলম্বন করিবে। সে যদি আমাদিগকে মোম্বাসা বা জাঞ্জিবরে রাখিয়া আসিতে সম্মত হয়—তাহা হইলে আমি তাহাকে আশাতিরিক্ত পুরস্কার দিব।আমার প্রস্তাবে কি সে সম্মত হইবে না? একটা সিভ্য নেটিভকে বশ করা কি এতই কঠিন ? তুমি কি বল ?” পাচক বলিল, “আপনার এই প্রস্তাবই যুক্তিসঙ্গত বােধ হইতেছে।কিন্তু আপনি কি সেই নেটিভটার সঙ্গে কথা কহিতে পারিবেন ?—তাহার ভাষা বুঝিতে পারিবেন ? উড়লে বলিলেন, “চেষ্টা করিয়া দেখিব। পূৰ্ব্ব-আফ্রিকার বহু দেশেই ঘুরিয়াছি , সেই নেটিভ সর্দায়টা আরবই হউক, আর হাবসীই হউক,-অহাৰ কথা বুঝিতে পারি আমার মনের ভাবও তাহাকে বুঝাইতে পারি।

১৩ নাবিক-বধু, গ্রামখানি কোন্ দিকে—তাহা ঠিক জানিতে পাৰিলে, আমি এই মুহূর্তেই নেটিভ সর্দারের সহিত দেখা করিতে যাইতাম।” পাচক বলিল, “কিন্তু আপনি ত সেখানে মিস্ এরাইনকে আপনার সঙ্গে লইয়া যাইতে পারিবেন না। আপনি কি উদ্দেশ্যে কোথায় যাইতেছেন—এ কথা জিজ্ঞাসা করিলে মিস্ এরাইনকে কি বলিয়া বুঝাইবেন? এ সকল কথা তাহাকে খুলিয়া বলিলে ভয়ে তাহার মূচ্ছ। হইবে, আর না বলিয়াই বা উপায় কি? ভড়লে ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বলিলেন, “ভাবিয়া দেখিলাম—তাহার নিকট এ সকল কথা প্রকাশ করাই কর্তব্য। ঘরে আগুন লাগিলে নিদ্রিত গৃহবাসীকে সতর্ক না করা মূটের কাৰ্য।-তুমি এখন আমার সঙ্গে যাইও না, আমি একাকী গিয়া তাহাকে সকল কথা বুঝাইরা দিতেছি।” মিস্ এরাইন গৃহমধ্যে কম্বল বিছাইয়া ডড লের প্রতীক্ষায় দ্বারপ্রান্তে দাড়াইয়াছিলেন। উড়লে তাহার সম্মুখে আসিয়া বলিলেন, “মিস এরাইন, আপনার সঙ্গে আমার গােটাকত কথা আছে। আপনি এখন তাহা শুনিতে প্রস্তুত আছেন কি ? বড়ই জরুরী কথা।” মিস্ এরাইন তৎক্ষণাৎ বাহিরে আসিয়া ব্যগ্রভাবে বলিলেন, “কি কথা, বলুন। আপনি কথা বলিবেন, এজন্য আমার অনুমতির অপেক্ষা করিতেছেন কেন? আপনার ভাব দেখিয়া বােধ হইতেছে আপনি কোন দুঃসংবাদ পাইয়া- ছেন। আপনার কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা ফুটিয়া উঠিয়াছে। যতই দুঃসংবাদ হউক,বলুন, তাহা শুনিবার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি , আমি ভয়ার্ত বালিকা নহি যে, তাহা শুনিলে আমার মূচ্ছ। হইবে।” ডডলে মুহূর্তকাল ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন, “এ কথা বলাই বাহুল্য, আমি আপনার সাহসের পরিচয় যথেষ্ট পাইয়াছি। কিন্তু সত্য কথা বলিতে কি, আমরা বড়ই বিপন্ন , ইহা অপেক্ষা অধিক বিপদ আর কিছুই হইতে পারে না। আমি ব্লেকের নিকট অতি ভয়ঙ্কর সংবাদ পাইয়াছি।-আপনার মামা ও জাহাজের কাপ্তেন আমাদের অনুসরণ করিয়া এই দ্বীপে উপস্থিত হইয়াছে।”

৪ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ১৩৯, মিস্ এরসাইনের সাহস যতই অধিক হউক, তিনি রমণীমাত্র। মিঃ ডড়লের কথা শুনিয়া তাহার মুখ শুকাইল, মাথা ঘুরিয়া উঠিল। তিনি অতি কষ্টে আত্ম- সংবরণ করিয়া ভগ্নস্বরে বলিলেন, “ভয়ানক বিপদের কথা বটে। কিন্তু এ বিপদে অধীর হইলে চলিবে না। মৃত্যুকবল হইতে আপনি একবার আমাকে উদ্ধার করিয়াছেন, আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে—আপনার চেষ্টায় এ সঙ্কটেও আমার প্রাণরক্ষা হইবে।এখন আপনি কি কৰ্তব্য স্থির করিয়াছেন, বলুন।” মিঃ ডডলে উপস্থিত কর্তব্য সম্বন্ধে পাচককে যে সকল কথা বলিয়াছিলেন, মিস্ এর কাইনকেও তাহাই বলিলেন। তাহা শুনিয়া মিস, এসকাইন বলিলেন, “আপনার এই প্রস্তাবই সঙ্গত মনে হইতেছে। টাকার জন্য আপনি চিন্তা করিবেন না। আমি জানি আপনি নিঃসম্বল, কিন্তু আমি ত নিঃসম্বল নহি , আমার নিকট যাহা কিছু আছে—সমস্তই আপনার হস্তে প্রদান করিতেছি। আপনি নেটিভ সর্দারের সহিত সাক্ষাত করিসে যাহা চায়, তাহাই তাহাকে দান করিতে প্রতিশ্রুত হউন , তাহাকে বলুন—সে যদি আমাদিগকে মােসায় ব জাঞ্জিবারে নিরাপদে পৌছাইয়া দেয়, তাহা হইলে তাহাকে প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান করা হইবে। তাহাকে আগাম কিছু দিলেও ক্ষতি নাই , কিন্তু সে যে বিশ্বাসঘাতকতা করিবে না—এ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়া আবশ্যক।—আপনি কখন্ তাহার সহিত দেখা করতে যাইবেন? ডড়লে বলিলেন, “আজ রাত্রেই যাইব মনে করিয়াছি , কিন্তু সে কোথায় বাস করে অগ্রে তাহা জানা আবশ্যক, নতুবা এই রাত্রিকালে জঙ্গলে-জঙ্গলে তাহাকে কোথায় খুঁজিয়া বেড়াইব? এই দ্বীপে যখন লােক আছে-তখন নিশ্চয়ই তাহাদের বাসস্থান আছে, এবং তাহাদের একজন প্রধানও আছে। আপনি এখানেই থাকুন, ব্রেক আপনার পাহারায় থাকিবে। আমি কায শেষ করিয়া যত শীঘ্র পারি এখানে ফিরিয়া আসিব। মিস, এস,কাইন বলিলেন, “তবে আর আপনি বিলম্ব করিবেন না , পরমেশ্বর আপনার মনােৰা পূর্ণ করুন। তিনি অসহায়ের সহায়, বিপন্নের ১৪০ নাবিক-বধু আশ্রয়। আমার জন্য আপনি কোন চিন্তা করিবেন না।—আপনি যতক্ষণ না ফিরিবেন, ততক্ষণ আমার মন স্থির হইবে না।” অনন্তর উড়লে রেককে ডাকিয়া আহারের আয়ােজন করিতে বলিলেন। নিঃশব্দে আহার শেষ হইল । আহাৰ শেষ করিয়া ডডলে উঠিলেন, তিনি মিস, এসকাইনকে বলিলেন, “আমি নেটিভ সর্দারের সন্ধানে চলিলাম । আমি ফিবিয়া না আসা পর্যন্ত আপনি এখানেই থাকিবেন।” মিস, এসকাইন বলিলেন, “আপনিই আমার একমাত্র অবলম্বন, আপনাকে ছাডিয়া কোথায় যাইব? আপনার প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষায় এখানেই বসিয়া থাকিব, কিন্তু আপনি যেন অধিক বিলম্ব করিবেন না। আপনি ফিরিয়া না আসিলে আমার দুশ্চিন্তা দূর হইবে না।” ডডল বলিলেন, “যত শীঘ্ৰ পাৰআমি ফিরিয়া আসিব । আপনাকে এখানে ফেলিয়া রাখিয়া আমি কি অকারণ বিলম্ব করিতে পারি ?—আপনি ধৈৰ্য্যাবলম্বন করুন, হতাশ হবেন না।” মিস, এসকাইন বলিলেন, “আপনি সতর্ক থাকিবেন , সেই রকেল দুটো যেন আমাদের সন্ধান না পায়। পরমেশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। আপনি একটি নিরাশ্রয়া অভাগিনী রমণীর উদ্ধারের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করিয়াছেন, একথা স্মরণ করিয়া আপনি মনে বল পাইবেন।” ডড়লে বলিলেন, “ কথা কি আমি ভুলিতে পারি ?--ব্লেক, আমি যতক্ষণ ফিরিয়া না আসি, ততক্ষণ তুমি ইহার পাহারায় থাকিবে, ঘুমাইয়া পডি ও না। নিজের প্রাণ দিয়াও উহার প্রাণরক্ষা করিবে।-কায শেষ হইলেই আমি চলিল্লা আসিব।” ভড়লে সেই সান্ধ্য অন্ধকারে নির্জন অরণ্যপথে অদৃশ্য হইলেন। মিস এসকাইন উভয় হস্তে মুখ ঢাকিয়া নিঃশব্দে রােদন করিতে লাগিলেন।

এয়ােদশ পরিচ্ছেদ শায়ংকালে চন্দ্রোদয় না হওয়ায় সমগ্র প্রকৃতি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল , ডডলে যখন তমসাবৃত অরণ্য অতিক্রম করিয়া মুক্ত প্রান্তরে প্রবেশ করিলেন— ৩খন পূৰ্বাকাশে চন্দ্রোদয় হইল।--কিন্তু অন্ধকাবে অরণ্যমধ্যবর্তী পথে অগ্রসর ইতে তাহার কিরূপ কষ্ট হইয়াছিল—তাহা সহজেই অনুমান করিতে পায়। যায়। চতুর্দিকে ঘন বন, তাহার ভিতর দিয়া অতি সঙ্কীর্ণ পথ ,এক হাত দূরের বস্তুও দেখিতে পাওয়া যায় না। প্রতিপদক্ষেপে তাহার পদস্খলন হইতে লাগিল, নানাজাতীয় আরণ্য-লতায় তাহার পদদ্বয় বাধিয়া যাইতে লাগিল, কতবার তিনি পডিতে পডিতে সাইয়া লইলেন তাহা বলা যায় না। কষ্টেও যদি তিনি কার্যোদ্ধার করিতে না পারেন—তাহাহইলে মিস এর কাইনের অবস্থা কিরূপ শােচনীয় হইবে—ইহা চিন্তা করিয়া তাহার উৎকণ্ঠা শত গুণ বর্ধিত হইস। নিজের সঙ্কটের কথা একবারও তাহার মনে পডিল না। —সেই অরণ্যের মধ্যে ঘণ্টাখানেক ঘুরিয়াও তিনি দিভ্রান্ত হইলেন না, সমুদ্রতীর লক্ষ্য করিয়া চলিতে চলিতে মুক্ত প্রান্তরে পদার্পণ করিলেন । তথন চন্দ্রোদয় হইয়াছে, সুতরাং অসুবিধা অনেকটা দূর হইল , তিনি অপেক্ষা- কত দ্রুতবেগে সমুদ্রের দিকে চলিলেন।তিনি দেখিলেন, চতুর্দিক নিস্তব্ধ, যেন সমগ্র প্রকৃতি গাঢ় সুপ্তিঘােরে সমাচ্ছন্ন । সমুদ্র স্থির, গগনবিহারী নক্ষত্র- নিকলের শুভ্রজ্যোতি স্বচ্ছ মুকুরের ন্যায় নির্মল সমুদ্রবক্ষে প্রতিবিম্বিত হইতেছিল। ডড়লে দূরে দাঁড়াইয়া সমুদ্রতীরবর্তী জাহাজধানির দীপরশ্মি দেখিতে পাইলে ; কিন্তু জাহাজের কাপ্তেন ও দুৰ্ব্বত্ত ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন তখন জাহাজে আছে কি না, তাই তিনি বুঝিতে পারিলেন না। তবে তিনি অনুমান করিলেন, এই রাত্রে তাহারা জাহাজ ছাড়িয়া অপরিচিত দ্বীপ অজ্ঞাত পল্লীর সন্ধানে দুনিয়া বেডাইবে—তাহার সম্ভাবনা অঙ্গ। তিনি জাহাজের বােট চুৰী করিয়া আনিয়া- ১৪২ নাবিক-বন্ধু তাহার এই অপরাধ সে ক্ষমা করিবে—তাহার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না। তিনি কোন্ দিকে যাইবেন, সমুদ্রের অদূরে দাঁড়াইয়া তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। কয়েক মিনিট চিন্তার পর তিনি বাম দিকে ফিরিলেন, । এবং পাহাড়ের পাশ দিয়া গ্রামের অনুসন্ধানে চলিলেন। প্রায় অর্ধমাইল পথ অতিক্রম করিয়া একটা বাক’ ছাড়াইতেই চন্দ্রালােকে কতকগুলি সাদা দেওয়াল তাহার দৃষ্টিগােচর হইল।—তিনি বুঝিলেন, ইহাই স্থানীয় অধিবাসী- গণের বাসপল্লী। এইবার উড়লে অতান্ত সন্তর্পণে অগ্রসর হইলেন। গ্রামের নিকট উপস্থিত হইয়া বুঝিতে পারিলেন, গ্রামখানি নিতান্ত ক্ষুদ্র নহে। গ্রামে গৃহের সংখ্যা শতাধিক , কিন্তু তন্মধ্যে কোনটি গ্রামের প্রধান ব্যক্তির বাডী, তাহা তিনি অনুমান করিতে পারিলেন না। তিনি আরও কয়েক গজ অগ্রসর হইয়া সম্মুখে যে বাড়ীখানি দেখিলেন, সেইদিকেই যাইতে লাগিলেন। তাহার ইচ্ছা, কোনও লােকের সহিত দেখা হইলে গ্রামের প্রধান ব্যক্তির বাসগৃহের সন্ধান লইবেন। তিনি কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া একটা খােলা বাড়ীতে কয়েকটি লােকের কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি গুল্মের অন্তরালে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন , এবং অন্যের অদৃশ্য থাকিয়া-কাহারা কি বিষয় লইয়া আলােচনা করিতেছে, তাহা শুনিবার জন্য উৎকর্ণ হইয়া স্থিরভাবে দাড়াইয়া রহিলেন। ভড়লে শুনিতে পাইলেন, একজন লােক ইংৰাজীতে বলিতেছে, “তুমি ইহাতে ভাল করিয়া বুঝাইয়া বল—উহারা যে এই দ্বীপে আসিয়াছে, ইহা আমরা জানিতে পারিয়াছি, সুতরাং তার আর একথা অস্বীকার করা চলিবে । গল বেলা দুপুরের মধ্যে সে যদি তাহাদিগকে ধরিয়া আমার নিকট হাজির না করে—তাহা হইলে তাহাকে সপরিবারে গুলি করিয়া মাৰিব, তাহার পর তাহার ঘরে আগুন লাগাইয়া দিব। ল্যাম্পিয়ন, সে যেন মনে না করে আমি তাহাকে মিথ্যা ভয় দেখাইতেছি। তুমি ইহাকে এ সকল কথা ভাল করিয়া বুঝাইতে না পারিলে তােমারও দুর্দশার সীমা থাকিবে না। আমি যে ।

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ ১৪৩ - উহাদের ভাষা জানি না, উহাদের ভাষা আমার জানা থাকিলে আমাকে তােমার মত অপদার্থের সাহায্য গ্রহণ করিতে হইত না। বক্তা যে জাহাজের কাপ্তেন, ইহা বুঝিতে উড়লের বিলম্ব হইল না। —কাপ্তেন ল্যাম্পিয়নকেই লক্ষ্য করিয়া এই সকল কথা বলিতেছিল। ল্যাম্পিয়ন বলিল, “এত ব্যস্ত হইলে চলিবে না , এখন আমাদিগকে ধীরভাবে কার্য করিতে হইবে। লােকটাকে ভয় দেখাইয়া বিশেষ কোনও লাভ হইবে না, আমাদের উদ্ধত আচরণে সে যদি একবার বাকিয়া বসে, তাহা হইলে তাহার দ্বারা কার্যোদ্ধার করা সহজ হইবে না। বল অপেক্ষা কৌশলে অনেক সময় বেশী ফাষ হয়। আমি আগে কৌশল খাটাইয়া দেখিব।” ডড়লে দেখিলেন, একজন বলবান হাবসী লাম্পিয়নের অদূরে দাড়াইয়া আছে। ল্যাম্পিয়ন সেই হাবসীটাকে লক্ষ্য করিয়া দেশীয় ভাষায় বলিল, আমার দোস্ত বলিতেছেন, সেই তিনজন লােককে কাল সকালে যেরূপে হউক আমাদের নিকট হাজির করাই চাই। তােমাদের সর্দার তাহা পারিলে আশাতীত বকশিশ পাইবে। তাহারা এই দ্বীপে আসিয়াছে—ইহাতে কোন সন্দেহ নাই কারণ, তােমাদের লােকেরা তাহাদের বােটখানা পাইয়াছে। কাল রাত্রে তাহারা জাহাজ হইতে বােট চুরী করিয়া তাহাতে পলাইয়া আসিয়াছে। বোধ হয় তাহাৱা আজ বৈকালে এখানে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। তাহারা চোর, মানুষ মারিয়া এখানে পলাইয়া আসিয়াছে। এই সকল চোর ও খুনী আসামী যাহাতে শী ধরা পড়ে, তাহার উপায় করা তােমাদেরও কর্তব্য বটে। তাহাদের সঙ্গে একটি লিােক আছে, সে আমারই ঘরের মেয়ে। চোরেরা তাহাকে চুমী কবিয়া আনিয়াছে। তাহাকে বাড়ী ফিরাইয়া লইয়া যাইতে না পারিলে আমার মান- সন্ত্ৰম সমস্তই নষ্ট হইবে।” হাবীটা বলিল, “সর্দারের যাহা সাধ্য তাহার ক্রটি হইবে না, আপনাদের দুমনেরা যদি এই দ্বীপে আসিয়া থাকে—তাহা হইলে তাহাৱা নিশ্চয়ই ধরা পডিবে। ইহার অধিক আর কি বলিতে পারি ? কাপ্তেন ল্যাম্পিয়নকে জিজ্ঞাসা করিল, “লােকটা কি বলিতেছে ? -- ১৪৪ নাবিক-বধু } ল্যাম্পিয়ন বলিল, “ও বলিতেছে—যদি তাহারা এই দ্বীপে আসিয়া থাকে, তাহা হইলে সর্দার তাহাদিগকে নিশ্চয়ই ধরিয়া দিতে পারিবে।-আমি কিন্তু একটা মতলব ঠিক করিয়াছি। ল্যাম্পিয়ন অপেক্ষাকৃত মৃদুমরে কাপেনকে কি বলিল। ডডলে বুঝিলেন, সে তাহার মতলবের কথাই বলিল , কিন্তু তিনি অনেকটা দূরে ছিলেন ল্যাম্পিয়নের মতলবটি কি তাহা শুনিতে পাইলেন না। তবে ল্যাম্পিয়নের মতলবটি যে তাদের অনুকূল নহে, ইহা তিনি বুঝিতে পারিলেন। ডডলে সেই গুল্মের অন্তরালে আরও কয়েক মিনিট দাড়াইয়া রহিলেন। অল্পক্ষণ পরে তাহারা সেই স্থান ত্যাগ করিলে তিনি গুন্মান্তরাল হইতে বাহিরে আসিয়া মনে মনে বলিলেন, “এভাবে যে উহাদের পৰামর্শ শুনিতে পাইব—ইহ পূৰ্বে আশা করি নাই। পরমেশ্বরের অনুগ্রহেই ইহা সম্ভব হইয়াছে। আমি এই রাত্রেই হাবসী সর্দারটাকে খুঁজিয়া বাহির করিব। আমার হাতে বন্দুক আছে—সুতরাং ভয়ের তেমন কারণ নাই। যদি সে অসদিচ্ছা-প্রণােদিত হইয়া আমাদের সাহায্য করিতে অসম্মত হয়, তাহা হইলে আমাকেও কৌশল খাটাইতে হইবে , লোভ দেখাইয়া তাহাকে আমার পক্ষে আনিতে হইবে।-সে কাহার বশীভূত হয় শীঘ্রই তাহাব পরীক্ষা হইবে।” ল্যাম্পিয়ন ও কাপ্তেন পূর্বোক্ত হাবসীটার সঙ্গে যেদিকে চলিতেছিল, উড়লেও তাহাদের অলক্ষ্যে সেইদিকে চলিতে লাগিলেন। তিনি বুঝিলেন, এই হাবসী যুবক তাহাদের সর্দারের সহিত দেখা করিতে যাইতেছে, তাহার অনুসরণ করিলেই তাহার আশা পূর্ণ হইবে। ডুডলে দেখিলেন, সমুদ্রতীরে আসিয়া ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন ও কাপ্তেন এক- খানি খােট উঠিয়া জাহাজে ফিরিয়া গেল , কিন্তু হাবসী যুবকটা আর এক পথ ধরিয়া একটি বাড়ীর দিকে চলিল। ডডলে অদূরবর্তী একটি বসিয়া রহিলেন। হাবসীটা বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল। কয়েক মিনিট পরে একটি বিপুলকায় বৃদ্ধ হাবসীকে সঙ্গে লইয়া সেই বাড়ীর বাহিরে আসিল , সেখানে কিছুকাল নিয়ে উভয়ের কি কথাবার্তা হইল, তাহার পর পূর্বোক্ত L একটি বৃক্ষমূলে যােদশ পরিচ্ছেদ ১৪৫ হাবসী যুবক বৃদ্ধের নিকট বিদায় লইয়া অন্যপথে চলিয়া গেল। ডড লে এইবার সেই বৃক্ষমূল হইতে উঠিয়া লঘু-পদবিক্ষেপে বৃদ্ধ হাবসী সর্দারের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন, এবং তাহাকে সেলাম করিয়া গভীর স্বরে বলিলেন, “আন্না আপনার ও আপনার পরিবারবর্গের মঙ্গল করুন।-আমি আপনার সহিত দেখা করিবার জন্য বহু দূর-দেশ হইতে এই দ্বীপে আসিয়াছি । আপনি দয়া করিয়া আমার দু’টি কথা শুনুন। হাবসী সর্দার সবিস্ময়ে ডডলের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “তুমি এখানে আমার সহিত আলাপ করিতে আসিয়াছ । কে তুমি? তােমার মতলব কি? তুমি জান আমি এই দ্বীপের মালিক, এখানকার প্রধান পােক ? ডড়লে সবিনয়ে বলিলেন, “হ, তাহা জানি, জানি বলিয়াই ত আপনার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছি। কিন্তু আমি কে, তাহা আপনি জানেন কি ? হাসী সর্দার বলিল, “তাহা কিরূপে জানিব ? মেঘ হইতে বৃষ্টি পডে, সেই বৃষ্টিতে গর্ত পূর্ণ হয় , কিন্তু মেঘ কি জানে তাহার করুণা-ধারায় কোথায় কোন্ গর্ত পূর্ণ হইতেছে, বা কোন্ নীরস তরু সরস হইতেছে ? তবে অন- মানে বুঝিতেছি—জাহাজের লােকেরা যাহাদের ধরিবার জন্য আমার সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছে-তুমি তাহাদেরই একজন। তােমাদিগকে ধরিয়া কাল সন্ধ্যার পূর্বে উহাদের হাতে দিতে হইবে, এইরূপ কথা আছে।-কেমন আমার কথা সত্য কি না ? উড়লে বলিলেন, “ই, একথা সত্য, কিন্তু উহাদের আশা পূর্ণ হইতে দেওয়া হইবে না। উহারা অত্যন্ত বলােক, উহারা আমাদের শত্রু। আমার প্রণয়িণীকে উহারা হত্যা করিবার জন্ত অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। হাঁ, তাহাকে হত্যা করিয়া অবশেষে উহার আমাকেও হত্যা করিবে। তাহাদের এই দুরভিসন্ধি পূর্ণ করিবার জন্য আপনি কি তাহাদের সাহায্য করিবেন। আমরা বিদেশী লােক, বিপদে পডিয়াছি , এই দ্বীপে আসিয়া আপনার অতিথি হইয়াছি। আপনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছি—আমাদিগকে আমাদের শক্ত হতে সমর্পণ করা কি আপনার উচিত ? আপনি যদি আমাদিগকে রক্ষা করেন ১৪৬ নাবিক-বন্ধু তাহা হইলে আপনি বিস্তর খেলাৎ ও বকশিশ পাইবেন, এবং আমাদের দেশের রাণী আপনার কাৰ্যে অত্যন্ত সুখী হইবেন, কারণ, আমি তাহারই চাকরী করি। আপনি আমাদিগকে লামুতে রাখিয়া আসিবার ব্যবস্থা করুন। আপনি আমার প্রস্তাবে সম্মত হইলে যাহা চাহিবেন তাহাই পাইবেন। আমি প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতেছি আমার কথার খেলাপ হইবে না। উড়লে নীরব হইলেন, এবং হাবসী সর্দারের উত্তরের আশায় রুদ্ধনিশ্বাসে দাড়াইয়া রহিলেন। তিনি বুঝিলেন, তাহাব উত্তরের উপর তাহাদের তিন- জনেরই জীবন নির্ভর করিতেছে। হাবসী সর্দার ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বলিল, “ওহে বিদেশী, তুমি বিপদে পডিয়া আমাকে যথেষ্ট লােভ দেখাইতেছ, কিন্তু আমি আসল কাষের কথা শুনিতে চাই। তুমি বলিতেছ তােমাকে সাহায্য করিলে আমাকে ভাল রকম বকশিশ দিবে, কত টাকা দিবে—তাহা ত বলিলে না? অঙ্গীকার করা অতি সহজ, কিন্তু তাহা পূর্ণ করাই কঠিন। তােমাদের প্রাণরক্ষা করা আমার পক্ষে কঠিন নহে , কিন্তু বকশিশের পরিমাণ জানিতে না পারিলে, আমি তােমাকে কোনবকম আশা দিতে পারিতেছি না।” ডডল বলিলেন, “আপনি কত টাকা বকশিশ পাইলে সুখী হইবেন—তাহা আমার জানা আবশ্যক। আপনি যাহা চাহিবেন, তাহাই পাইবেন। প্রাণের তুলনায় অর্থ নিতান্ত তুচ্ছ সামগ্রী, প্রাণরক্ষার জন্য অর্থব্যয়ে আমরা কুষ্ঠিত নহি।-আমাদের স্বর্ণমুদ্রা সম্বন্ধে আপনার কোনও ধারণা আছে কি ? হাবসী সর্দার দাডি নাভিয়া দাত বাহির করিয়া বলিল, “তা আর নাই ? আমি কতবার জাঞ্জিবারে গিয়াছি , তােমাদের দেশের সােণার টাকা লইয়া বাণিজ্য করিয়াছি। আমি সব জানি। আমি বুড়া মানুষ, আমার দাডি পাকিয়া সাদা হইয়া গিয়াছে। আমি মিথ্যা কথা বলিতে শিখি নাই। আমার সকল কথাই সত্য। বল, তুমি আমাকে কত টাকা বকশিশ দিতে রাজী আছ।” ডলে বলিলেন, “আপনি যদি আমাদিগকে অবিলম্বে মুদ্বীপে লইয়া গিয়া নিরাপদে সেখানকার গৰৰ্ণরের বাড়ী পৌছাইয়া দিতে পারেন, তাহা হইলে ৫ ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ ১৭ . আমি আপনাকে পাচশত গিনি পুরস্কার দিব।—আপনি এই প্রস্তাবে রাজী আছেন ?” হাবসী সর্দার তাহার পাগডী খুলিয়া একবার মাথাটা চুকাইয়া লইল , তাহার পর ডডলেকে বলিল, “হ, ইহাতে চলিতে পারে বটে, কিন্তু বডই । ঝুকির কাষ। তবে আমি তােমাদিগকে সেখানে পৌছাইয়া দিলে তুমি যে আমাকে পাঁচশত গিনি গণিয়া দিবে—তােমার এ কথা আমি কি করিয়া বিশ্বাস করি। সেখানে গিয়া গিনি না দিয়া যদি আমাকে ফাঁকি দাও ? ভড়লে বলিলেন, আপনি আমাদের প্রাণরক্ষা করিবেন, আর আমি আপনাকে প্রতিশ্রুত অর্থ না দিয়া ফাঁকি দিব ?-না, আমি সেরূপ ‘বেইমা নহি। আপনি নিশ্চয়ই পাঁচশত গিনি পাইবেন, আমার শির জামিন। ইহার অধিক আর কি বলিব ? এতগুলি টাকা একসঙ্গে পাইলে আপনি কিরূপ ধনবান হইবেন, আপনার ব্যবসায়-বাণিজ্যের কত সুবিধা হইবে, তাহাও ভাবিয়া দেখিবেন।” হাবসী সর্দার বলিল, 'যাহারা জাহাজ লইয়া তােমাদিগকে ধরিতে আসিয়াছে আমি তাহাদিগকে কি জবাব দিব ?” ডডলে বলিলেন, “আপনি বলিবেন, 'আমি তাহাদিগকে খুঁজিয়া পাইলাম , তাহারা এ দ্বীপে নাই।'—আপনার কথা তাহারা অবিশ্বাস করিতে পারিবে না।” হাসী সর্দার বলিল, “আচ্ছা, আমি কথাটা ভাবিয়া দেখিব। এখন তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়ী চল , তােমার মুখখানি ভাল করিয়া চিনিয়া রাখা দরকার। ডড়লে দৃষ্টিতে পকেটস্থিত পিস্তলটি ধরিয়া হাবসী সর্দারের অনুসরণ করিলেন। তিনি হাম্বী সর্দারকে বলিলেন, “আমি আপনার সঙ্গে যাইতেছি বটে, কিন্তু আপনি যদি আমার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করেন, তাহা হইলে আপনি ত প্রতিশ্রুত পুরষ্কার পাইবেনই না, অধিকন্তু আমাদের দেশের রাণীর যুদ্ধ-জাহাজ আসিয়া আপনাকে সবংশে বংশ করিয়া যাইবে।

১৪ নাবিক-বধু, T হাবসী সর্দার বলিল, “না, আমি কোনরকম নিমকহারামী করিব না। আমাকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছ না কেন?” অল্পক্ষণ পরে ডড়লে পাহাডের ধারে হাবসী সর্দারের গৃহদ্বারে উপস্থিত হইলেন। ডডলে তাহার সহিত গৃমধ্যে প্রবেশ করিলে, সর্দারের আদেশে একটি ক্রীতদাস প্রজ্বলিত ‘চেরাগ লইয়া আসিল। সেই দীপালােকে ডডলে সর্দারের চেহারাটি ভাল করিয়া দেখিয়া লইলেন। লােকটি মােটা, বেটে , তাহার মুখখানি গােল, মুখে বসন্তের দাগ, চক্ষুদুটি বাঘের চোখের মত । তাহার দৃষ্টি অত্যন্ত কুর, তাহাতে সরলতার চিহ্ন মাত্র নাই । সর্দার তাহার ফরাসে বসিয়া ডডলেকে তার পাশে বসিতে অনুরােধ করিল। তিনি পকেট হইতে হাতখানি বাহির করিলেন না, পিস্তলটি বরিয়াই রহিলেন। তিনি সর্দারের পাশে উপবেশন করিলে সর্দার তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার দলের লােকজন কোথায় আছে ডড়লে প্রথমে মনে করিলে, তাহাদের আশ্রয়স্থানের সন্ধান দিবেন না । কিন্তু ইহাতে তাহার সন্দেহের উদ্রেক হইতে পারে, এবং তিনি তাহাকে অবিশ্বাস করিতেছেন—ইহা বুঝিতে পারিলে সে-ও বিশ্বাসঘাতকতা করিতে পারে ভাবিয়া, তিনি সত্য কথা বলাই সঙ্গত মনে করিলেন। যাহার অনুগ্রহে সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে হইবে—তাহাকে অবিশ্বাস করিয়া লাভ কি ? সর্দার তাহাদের আশ্রয়স্থানের ঠিকানা জানিতে পারিয়া বলিল, “তােমরা বেশ ভাল ষাগাতেই আশ্রয় লইয়াছ , আপাততঃ ঐখানেই থাক। তােমার শকরা সেখান হইতে তােমাদিগকে খুজিয়া বাহির করিতে পারিবে না। আমি তােমাদিগকে নির্বিঘ্নে লামুতে পৌঁছাইয়া দিলে আমাকে পাচশত গিনি ঠিক দিৰে ত ?—তােমার কথার নড-চড হইবে না ত ?" উড়লে বলিলেন, “আমরা লামুতে পৌছিয়াই আপনাকে চকচকে পাচশত গিনি গণিয়া দিব।কিন্তু আমাদের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা কৰিলে একটি কাণ কডিও পাইবেন না। সর্দার তাহার দীর্ঘ বাড়ির ভিতর ক-চালনা করিয়া বলিল, “মােয়াহিনীর এরাে পরিচ্ছেদ ১৫১ , পুত্র মঙ্গহােব নিমকহারামী করিবে? তােবা। আমার যে কথা--সেই কা। যাহা হউক, এখন তুমি তােমার আজ্ঞায় যাও, খােদা তােমালের নিরাপদে রাখুন। কাল তােমাদিগকে মুতে লইয়া যাইবার উপায় স্থির করিব। যতক্ষণ এই দ্বীপ ত্যাগ করিতে না পারিতেছ—ততক্ষণ সাবধানে লুকাইয়া থাকিবে।” ডড়লে হাবসী-সর্দারের নিকট বিদায় লইয়া যথাসম্ভব দ্রুতগতি তাহার আড্ডায় প্রত্যাগমন করিলেন , চন্দ্রালােকে পথ দেখিতে এবার আর তেমন কষ্ট হইল না। তিনি চলিতে-চলিতে ভাবিলেন, “এই অপরিচিত লােভ হসীটাকে বিশ্বাস করিয়া কি ভাল কৰিলাম ? কিন্তু বিশ্বাস না করিয়াই বা উপায় কি ?—না, লােকটা বােধ হয় বিশ্বাসঘাতকতা করিবে না, অন্য কাৰণ না থাকিলেও সে এতগুলি টাকার লােভ ছাডিতে পারিবে না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করিলেই আমাদের সর্বনাশ।” ডডলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম পূর্বক শ্রান্তদেহে আড্ডায় প্রত্যাগমন করিলেন তিনি মিস্ এরাইনকে বলিলেন, “আমি এই দ্বীপের সর্দারের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছি। জাহাজেব কাপ্তেন ও আপনার মামাকেও দেখিয়াছি। তারা আমার প্রায় পাশ দিয়াই চলিয়া গেল , কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমাকে দেখিতে পায় নাই। আমি সর্দারের সঙ্গে তাহার বাড়ী পর্যন্ত গিয়াছিলাম। মিস্ এরাইন ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তাহার সহিত আপনার কি কথা হইল ? হাবসী সর্দারের সহিত তাহার যে সকল কথা হইয়াছিল, তাহা তিনি সমস্তই মিস এরাহনের গােচর করিলেন। তাহা শুনিয়া মিস্ এরসাইন বলিলেন “লােকটা আমাদের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিবে না ত?” ডডলে বলিলেন, “তাহা কিরূপে বলিব ? তবে সে যে এতগুলি টাকার লােভ ত্যাগ করিতে পারিবে -এরূপ বােধ হয় না, কিন্তু আমি যে তাহাকে এত টাকা নিশ্চয়ই দিতে পারিব-তাহার মনে এ বিশ্বাস উৎপাদনের কোন উপায় দেখিতেছি না। লামুতে উপস্থিত হইয়া আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করিতে ১৫০ নাবিক-বধু যেরূপ পারিব কি না—এ সম্বন্ধে তার কিছু সন্দেহ আছে। আপনার মামা কাপ্তেনটাকে সঙ্গে লইয়া এই দ্বীপে আসিয়াছে। সে সর্দারকে অনুরােধ করিয়াছে—যেরূপে হউক আমাদিগকে ধরিয়া দিতে হইবে; কিন্তু তারা সদারকে যে অধিক টাকার লােভ দেখাইয়াছে—এরূপ বােধ হয় না। ব্যবস্থা হয়--কাল কর যাইবে , আপনি এখন শয়ন করুন। আমরা গৃহৰে বসিয়া সমস্ত রাত্রি আপনার পাহারা দিব। মিস্ এরাইন কৃতজ্ঞ হৃদয়ে তার দক্ষিণ হস্ত ডড়লের সম্মুখে প্রসারিত করিলেন, তিনি তাহার হাতখানি চুম্বন করিলেন। তাহার ইচ্ছা হইল তাহাকে বক্ষে ধারণ করিয়া হৃদয় শীতল করেন , কিন্তু তিনি এই ইচ্ছা দমন করিলেন, মনে মনে বলিলেন, “আমি তােমাকে কত ভালবাসি তাহা তুমি জান না, তােমার প্রাণরক্ষার জন্য আমি হাসিতে-হাসিতে এ প্রাণ বিসর্জন করিতে পারি।-হয় ত একদিন তুমি ইহা বুঝিতে পারিবে।” মিস্ এরাইন অল্পক্ষণ পরেই নিদ্রিত হইলেন , ডডলে কতক রাত্রি জাগিয়া কতক রাত্রি বা ঢলিয়া কাটাইলেন। পাচক কেও ঘুমাইয়া-জাগিয়া পাহারা দিল।পরদিন প্রত্যুষে মিস, এসকাইন সেই মৃৎকুটীরের বাহিরে আসিলেন, সুনিদ্রায় তাহার প্রান্তি দূর হইয়াছিল, এবং তাহাকে বেশ প্রফু দেখাইতেছিল। তাহার ভাব দেখিয়া ডড়লে মনে হইল, তাহার কিছু বলিবার আছে। ডডলের এই অনুমান মিথ্যা নহে।—মিস, এরাইন মুহূর্তকাল ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন, “মিঃ ডড়লে, আপনি কাল রাত্রে আমাকে বলিয়াছিলেন, মাসী সর্দার আমাদিগকে নিরাপদে লামু দ্বীপে পৌছাইয়া দিলে আপনি যে তাহাকে প্রতিশ্রুত অর্থ দিতে পারিবেন, এ কথা তাহাকে বিশ্বাস করাইতে পারেন নাই। কিন্তু কথাটা তাহাকে বিশ্বাস করাইতেই হইবে , কারণ, ইহার উপর আমাদের শুভাশুভ নির্ভর করিতেছে। আমাদের কাছে নগদ টাকা নাই বটে, কিন্তু আমরা বে দরিদ্র নহি, ইহা সর্দায়কে বুঝাইবার ব্যবস্থা উচিত। তাহাকে কিছু লােভ দেখাইতে হইবে। আমি তাহাকে কি এয়ােদশ পরিচ্ছেদ দিতে পারিব—তাহা জানিবার জন্য আপনার আগ্রহ হওয়াই সম্ভব। আমি স্ত্রীলোেক,—আমরা জীবন অপেক্ষা অলঙ্কারকে মূল্যবান মনে করি—এ কথা মিথ্যা নহে। আমি যখন জাহাজ ছাডিয়া আপনার সহিত পলাইয়া আসি- সেই সময় আমার সমস্ত অলঙ্কারই লইয়া আসিয়াছি। সেই সকল হীরক- জহরতের মূল্য নিতান্ত অল্প নহে। আমার কাছে যে হীরকখচিত ব্রেসলেট আছে তাহা মূল্যবান অলঙ্কার—আপনি ইহা লইয়া গিয়া হাবসী সর্দারকে দিয়া আসুন, তাহা হইলে লােকটা হাতছাড়া হইবে না।” মিস্ এরসাইন তাহার পকেট হইতে একছডা দ্যুতিমান হীরকখচিত ব্রেলে বাহির করিয়া ডডলের হন্তে প্রদান করিলেন। ডডলে বলিলেন, “এ যে মহামূল্য অলঙ্কার।ইহা দেখিলে হাসী সর্দারের মুখে লাল পড়িবে, কিন্তু এরূপ মূল্যবান অলঙ্কার তাকে দিতে আপনার কষ্ট হইবে না ত?” মিস্ এসাইন বলিলেন, “জীবন অপেক্ষা অলঙ্কার মূল্যবান নহে। জীবনরক্ষার জন্য তাহাকে আমার যথাসঝৰ দিতেও কুণ্ঠিত হইব না। আপনি ইহা লইয়া যান , আবশ্যক হইলে বলিবেন--আমার সঙ্গে যাহা কিছু আছে সমস্তই দিব। ডভলে দিবাভাগে সর্দারের গৃহে গমন করা নিরাপদ মনে কৰিলেন না, তিনি বুঝিয়াছিলেন, সর্দারই তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিবে। তাহার এই অনুমান মিথ্যা হইল না। বেলা একটু অধিক হইলে হাবসী সর্দায় একজন অনুচরসহ সমুদ্রের দিক হইতে তাহাদের আড্ডায় উপস্থিত হইল। হাবসী সর্দার ডড লেকে বলিল, “তােমার মঙ্গল হউক। আমি অনেক পূৰ্বেই তােমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিতাম, কিন্তু তােমার শত্রুরা আমার সহিত দেখা করিতে আসায় আমার এখানে আসিতে বিলম্ব হইয়া গিয়াছে। তাহারা তােমাদের অনুসন্ধানে বাহির হইয়াছে। আমি তাহাদিগকে মিথ্যা- কথায় না ভুলাইলে তাহাৱা এতক্ষণ এই দিকেই আসিয়া পড়িত এবং তােৰা- দিগকে দেখিবামাত্র বন্দী করিত।

নাবিক-বধু উড়লে সর্দারের কথা বিশ্বাস কৰিলেন কি না বলা যায় না, কিন্তু তিনি তাহার কথা শুনিয়া তাহাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিলেন, এবং বকশিশের কথাটা আর একবার শুনাইয়া দিলেন । হাবসী সর্দার বলিল, “হ, টাকাগুলি অৱ নহে স্বীকার করি , কিন্তু তােমার যে তত টাকা দেওয়ার শক্তি আছে ইহা কিরূপে বুঝিব?—পাঁচশত গিনি ত আমাকে বকশিশ দিবে, কিন্তু দাম পর্যন্ত তােমাদের লইয়া যাইতেও অল্প টাকা খরচ হইবে না, সে টাকার কি ব্যবস্থা করিবে?” ডলে বলিলেন, “সে টাকাও আমি দিব।-আপনাকে এত টাকা দিবার শক্তি আমার আছে কি না তাহা আপনি জানিতে চান।—ইহার প্রমাণস্বরূপ আপনাকে একখানি বহুমূল্য অলঙ্কার দিতেছি।” ভড়লে পকেট হইতে মিস্ এরাইন-প্রদত্ত হীরকখচিত ব্রেসূলেট, বাহির কয়া সর্দারকে দেখাইলেন , তাহা দেখিয়া লােভে তাহার চক্ষু উজ্জল হইয়া উঠিল। ডডলের হাত হইতে ছোঁ-মারিয়া লইয়া সে তাহা লুব্ধনেত্রে দেখিতে লাগিল। প্রভাতের সূর্যালােক হীরকখণ্ড গুলিতে প্রতিবিম্বিত হওয়ার তাই। ঝকমক করিতেছিল। সদ্দার জিজ্ঞাসা করিল, “এটি কি জিনিস ?” ডডলে বলিলেন, “উহা হীৰকালঙ্কার, উহার মূল্য একশত গিনির ও অধিক। ঐ অলঙ্কার আমি আপনাকে উপহার দিলাম।—এই অলঙ্কার দেখি- যাই আপনি বুঝিতে পারিতেছেন—আমরা দরিদ্র নহি , লামুতে উপস্থিত হইয়া আপনাকে অনায়াসেই পাঁচশত গিনি দিতে পাৰিব। সর্দার ব্রেসলেট খানি তাহার অঙ্গরাখার মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া দীর্ঘ দাডি নাডিয়া বলিল, 'হ, এবার তােমার কথা বিশ্বাস হইয়াছে, তবে এ গহনা- খানির এত অধিক মূল্য কি না সন্দেহ। কি না সন্দেহ। যাহা হউক, আমি সুযােগ পাইলেই তােমাদিগকে লামুতে লইয়া যাইব। সেখানকার গবর্ণর আমার উপর যাহাতে খুসী — খুশী থাকে—তার ব্যবস্থা করিও, আর টাকাগুলি দিও। তােমাদের প্রাণ- রক্ষার জন্য আমাকে বিস্তর ঝাট সহ করিতে হইবে।

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ উড়লে বলিলেন, “টাকা সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।এখন বলুন, কথন আমাদের যাত্রা করিবার সুবিধা হইবে।” সর্দার বলিল, “সে কথা তােমাকে এখন ঠিক বলিতে পারিতেছি না। আগে ত তােমাদের শত্রুদের ভূলাইয়া এখান হইতে বিদায় করি ,-কাষটা বড় সহজ হইবে না।” সর্দার তাহাদিগকে লুকাইয়া থাকিতে বলিয়া ডডলের নিকট বিদায় লইল। সর্দার তাহার অনুচরসহ প্রস্থান করিলে ডড়লে, মিস্ এসাইন ও পাচক ব্লেকের সহিত পরামর্শ করিতে বসিলেন।-মিস্ এরাইন বলিলেন, “লােকটার ভাবভঙ্গি দেখিয়া সন্দেহ হয়। এই লােভী নেটিভটা বিশ্বাস- ঘাতকতা করিবে কি না কে বলিতে পারে ? আমাদের কাছে যাহা কিছু আছে—সমস্ত কাডিয়া লইয়া আমাদিগকে শক্তহস্তে সমর্পণ করাও উহার পক্ষে অসম্ভব নহে।" ডডলে বলিলেন, “ইহা যে তাহার পক্ষে অসম্ভব একথা কি করিয়া বলি? —কিন্তু অন্য কোনও উপায়ও ত দেখিতেছি না।” ব্লেক বলিল, “আমার মাথায় একটা ফন্দি আসিয়াছে , কিন্তু তাহা কার্যে পরিণত করা কতদূর সম্ভব তাহা বুঝিতে পারিতেছি না।-আমরা যদি কোন উপায়ে আমাদের বােটখানি হস্তগত করিতে পারি, তাহা হইলে উহাদের অজ্ঞাত- সারেই এই দ্বীপ ত্যাগ করিয়া লামুর দিকে যাত্রা করিতে পারি।” উড়লে বলিলেন, “বােটখানি পাইলে তােমার প্রস্তাবানুসারে চাষ করা যাইতে পারে, কিন্তু তাহা পাইব বলিয়া বােধ হয় না। সম্ভবতঃ, কাপ্তেন তাহা জাহাজে লইয়া গিয়াছে।স্থানীয় অধিবাসীদের কোন একখানি নৌকা সংগ্রহ করিয়া তাহাতে উঠিয়া পলায়নের চেষ্টা করা যাইতে পারে,--কিন্তু তাহাও যথেষ্ট বিপজ্জনক , দৈবাৎ ধরা পডিলে আর নিস্তার নাই।—এ অবস্থায় হাবসী সর্দারের উপর নির্ভর করাই সঙ্গত, যদি বুঝিতে পারি সে বিশ্বাসঘাতকতা করিবে—তখন যথাকৰ্তব্য স্থির করা যাইবে। মধ্যাহ্নে আহারে বসিয়া ডডলে দেখিলেন, খাদ্যসামগ্রী যাহা, ১৫৪ নাবিক-বধূ তাহাতে সেই বেলা কোনরকমে চলিতে পারে।-ডলে বলিলেন, “এ বেলাটা ত চলুক, পরে হাবসী সর্দারের সহিত দেখা করিয়া তাহার নিকট কিছু খাবার চাহিয়া লইব। সন্ধ্যার পর তাহার সহিত দেখা করিব।” সন্ধ্যার অন্ধকারে বনভূমি সমাচ্ছন্ন হইলে, ডড়লে হাবসী সর্দারের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চলিলেন , এৰাৰ পথ চিনিয়া যাইতে তাহার তত কষ্ট হইল ।—তিনি সর্দারের গৃহের অদূরে উপস্থিত হইয়া, তাহার গৃহে প্রবেশ করিবেন কি না একটি বৃক্ষের আড়ালে দাড়াইয়া তাহাই ভাবিতে লাগিলেন।-কাঞ্চন ও ল্যাম্পিয়ন সর্দারের সহিত দেখা করিবার জন্য যদি সেখানে আসিয়া থাকে- তাহা হইলেই ত সর্বনাশ।তৎক্ষণাৎ তাহাকে ধরা পড়িতে হইবে। হঠাৎ একজন লােক উডলের সম্মুখে আসিয়া ডাইল।—তাহাকে দেখিয়া তিনি অত্যন্ত ভীত হইলেন, এবং তৎক্ষণাৎ পিস্তলে হাত দিলেন। আগন্তুক নিম্নস্বরে বলিল, “গােল করিও না, চুপ করিয়া আমার কথা শােন।--আমি আজ অনেকবার তােমার সহিত দেখা করিবার চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু দেখা করিতে পারি নাই। পথে তােমাকে আসিতে দেখিয়া তােমার অনুসরণ করিয়াছিলাম। এখানে তােমার সহিত দেখা না হইলে তুমি নিশ্চয়ই আজ রাত্রে ধরা পডিতে। ভডলে বলিলেন, “তুমি কে? তােমার মতলব কি? আগন্তুক বলিল, “আজ সকালে আমি আমাদের সর্দ্যর মহােবাের সঙ্গে তােমাদের আড্ডায় গিয়াছিলাম , আমাকে চিনিতে পারিতেছ না? মহােবাে তােমর সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিবে, তােমাদের ধাইয়া দিবে,—এ কথা জানিয়া তােমাকে সতর্ক করিতে আসিয়াছি।একটু গােপনীয় স্থানে চল, সকল কথা শুনিবে। উড়লে আগন্তুকের কথা শুনিয়া উৎকণ্ঠিত চিত্তে নিঃশষে তাহার সঙ্গে চলিলেন। তাহারা উভয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে উপস্থিত হইলে আগন্তুক লিল, “ আমার নাম মেগবাণী, মঙ্গহেব আমার চাচাত ভাই , আপনি কাহাকে বলিয়াছেন-সে আপনাদিগকে নিৰ্বিয়ে লামুতে পৌছাইয়া দিলে পাঁচ ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ ১৫৫ শত গিনি বকশিশ দিবেন। কিন্তু আজ রাত্রে আপনার শত্রুর জাহাজ হইতে নামিয়া উহার সহিত দেখা করিতে গিয়াছিল। ভাই আপনাদিগকে তাহাদের হস্তে সমর্পণ না করায় তাহারা রাগিয়া আগুন হইয়াছে। আমার ভাইয়ের একটি ছেলে আছে, তাহারা তাহাকে জাহাজে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, বলিয়া গিয়াছে— আপনাদের ধরিয়া দিতে না পারিলে তাহাৱা কাল তাহাকে গুলি করিয়া মারবে।—এ কথা শুনিয়া মহােবাে অত্যন্ত ভীত হইয়াছে। টাকা বড় না ছেলে বড় ?—টাকার লােভে সে তাহার ছেলেটির প্রাণের আশা ত্যাগ করিতে পারিবে না, এই জন্য সে স্থির করিয়াছে, কাল আপনাদিগকে আপনাদের শক্ত- হস্ত সমৰ্পণ করিবে।আমি তাহাদের পরামর্শ শুনিছি। আপনা- দিগকে লামুতে লইয়া যাইবার ছলে নৌকায় তুলিবে—কিন্তু লামুর দিকে না গিয়া অদূরবর্তী আর একটা দ্বীপে উপস্থিত হইবে। আপনার শত্রুরা জাহাজ লইয়া সেখানে লুকাইয়া থাকিবে, আপনারা সেখানে যাইবামা-বুঝিয়াছেন?” আগন্তুকের কথা শুনিয়া ডডলের সর্বাঙ্গ ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিল। তিনি যে কি বলিবেন, কি করিবেন তাহা স্থির করিতে পারিলেন না। তবে বুঝি- লেন, কথাটা সত্য হইতেও পারে, পাচশত গিনি বকশিশের লােভেই এই লােকটা তাঁহাদের সাহায্যের প্রস্তাব করিতে আসিয়াছে।কিন্তু ইহার কথা কি সত্য? ইহাকে কি বিশ্বাস করা যায় ? এই সকল কথা চিন্তা করিয়া ডডলে বলিলেন, “তােমার সকল কথা শুনিলাম। তােমার কথাগুলি অসঙ্গত নহে , কিন্তু তুমি কি আমাদের সাহায্য করিতে পারিবে ? আমাদিগকে লামুতে রাখিয়া আসিতে পারিবে ? যদি পার—তাহা হইলে তােমার ভাইকে যে পাঁচশত গিনি দিতে চাহিয়াছি, তুমিই তাহা পাইবে। যে বিশ্বাসঘাতকতা করিবে—সে টাকা পাইবে না, অধিকন্তু আমাদের রাণীর জাহাজ আসিয়া তােপে তাহার ঘর-বাড়ী উড়াইয়া দিবে, আও-বাচ্চা একগড় করিবে।” আগন্তুক বলিল, “আমি নিমকহারাম নহি, সচ্চা লােক। তােদর অসহায় অবস্থা দেখি আমার বড় দয়া হইয়াছে, আমার খুব দর শরীর ০ নাবিক-বধূ আমি তােমাদিগকে নির্বিঘ্নে লামুতে রাখিয়া আসিব, কিন্তু আজ সকালে তুমি আমার ভাইকে যে বক চকচকে চিজ, দিয়াছিলে, ঐ রকম চিজ, আমি ও চাই। ডডলে বলিলেন, ‘নৌকা আনিয়া আগে আমাদের সঙ্গে রওনা হও, তাহার পর তুমি তাহা অপেক্ষা অনেক উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান অলঙ্কার পাইবে। তোমাৰ 'ধা ও কোথায় ? আগন্তুক বলিল, “সমুদ্রের ধাবে বাধা আছে। আমার ধাও খুব সরেস নৌকা, একেবারে নৃতন। তােমাদেব লইয়া পাখীর মত উডিয়া যাইবে । আমি লামু যাইবার পথ জানি , আমার সঙ্গে আজ রাত্রেই চল, তােমাদিগকে গােপনে লইয়া যাইব। ডুডল বলিলেন, “তােমার প্রস্তাবে রাজী হইলাম, এখন আর এক কপা— তুমি বাড়ী গিয়া আমাদের জন্য কিছু খাবার লইয়া এস, আমাদের খাবার ফুরাইয়া গিয়াছে।-খাবাব আনিয়া দিলে বকশিশ পাইবে, বুঝিয়াছ ?--শীঘ্র যাও।” আগন্তুক বলিল, “তুমি এইখানে অপেক্ষ' কর, আমি শীঘ্রই আসিব।” আগন্তুক প্রস্থান করিলে ডড়লে উৎকন্বিত চিত্তে একখানি কাঠের গুডব উপর বসিয়া রহিলেন।—তিনি স্থির করিলেন, যেরূপে হউক, রাত্রেই দীস ত্যাগ করিতে হইবে। বিশ্বাসঘাত সর্দার প্রভাতে তাহাদিগকে ধরাইয়া দিতে পারে। প্রায় পনের মিনিট পরে হাবসীটা কতক গুলি খাবার ইয়া ডডলের নিকট উপস্থিত হইল। তিনি সাগ্রহে তাহা গ্রহণ করিলেন। হাবসী বলিল, “আমি যে খাবার দিলাম, তাহা ছয় জন লােক পাইয়াও ফুরাইতে পারিবে না।আমার বকশিশ কোথায় ? ডডল পকেটে হাত প্রয়া তাহার রিভলভারটি বাহির করিলেন, এবং হাবীটাকে তা দেখাইয়া বলিলেন, “বকশিশ হবার পূর্বে তােমাকে আর একটা কাষ করিতে হইবে। আমরা এই দ্বীপে আর এক মুহূর্ত নিরাপদ নহি, এয়ােদশ পরিচ্ছেদ ১৫৭ এজন্য আমি স্থির করিয়াছি অবিলম্বে এ স্থান ত্যাগ করিব। আমার হাতে তুমি যে হাতিয়ার দেখিতেছ, ইহার সাহায্যে আমি এখনই তােমাকে সাবাড় করিতে পারি।—যদি ভাল চাও, তবে আমাকে তােমার নৌকায় লইয়া চল। আমরা সেই নৌকায় অবিলম্বে লামুতে যাত্রা করিব। সেখানে উপস্থিত হইয়া তােমাকে বকশিশ দিব।” লােকটা এই প্রস্তাবে আপত্তি করিল, বলিল, “অনেকদূর যাইতে হইবে, যােগাড়যন্ত্র করিয়া লইতে কিছু সময় লাগবে। এই মুহূর্তেই কি করিয়া রওনা ডডল বলিলেন, “না, কোন যােগাডষম্বের আবশ্যক নাই , আমার সঙ্গে চল, সঙ্গীদের লইয়া আসিয়া তােমার নৌকায় উঠিব।-আমার প্রস্তাবে অসম্মত হইলে তোমাকে প্রাণের আশা ত্যাগ করিতে হইবে।” হাবসীটা মুহূর্তকাল চিন্তা করিয়া বুঝিতে পারিল, এই শ্বেতাঙ্গ বিদেশীর কথার প্রতিবাদ করিয়া কোনও লাভ নাই , সুতরাং অগত্যা তাহাকে সম্মত হইতে হইল।—ডডলে তাহাকে সঙ্গে হইয়া তাহাদের আড্ডায় উপস্থিত হই- লেন, এবং মিস্ এরাইন ও পাচক রেককে সক্ষেপে সকল কথা বলিলেন। উভয়ে সেই মুহূর্তেই তাহার অনুসরণ করিলেন। চাৰিজনে নিঃশব্দে নৌকায় উঢ়িলে হাবসী নৌকার পাল খাটাইয়া নৌকা ছাডিয়া দিল। অন্ধকার রাত্রে নৌকাখানি অনুকূল বায়ুপ্রবাহে মূক্তপক্ষ বিহঙ্গের ন্যায় লামু অভিমুখে ধাবিত হইল । নৌকায় বসিয়া জুড়লে মিস্ এরাইনকে হাবসী সর্দারের বিশ্বাস- ঘাতকতার কথা জ্ঞাপন করিলেন। অনন্তয় তিনি মেগবাণীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই দ্বীপ হইতে লামু কতদূর?” মেগবাণী নৌকার হাল ধরিয়া বসিয়াছিল, সে বলিল, “যদি বেশ জোর বাতাস পাই, তাহা হইলে কাল এক সময় আপনাদিগকে লামুতে নামাইয়া দিতে পাৰিব।” ক্রমে রাত্রির অবসান হইল, এতে তাহাৱা লামুর পথে বহুদূর অগ্রসর ১৫৮ নাবিক-বধু হইলেন। সমশুদিন নৌ-পৰিচালনের পর অপরাহকালে ডড়লে দেখিলেন, তাহারা একটি সমৃদ্ধ নগরের সান্নিধ্যে উপনীত হইয়াছেন।—প্রকাণ্ড অট্টালিকা- শ্রেণী দ্বীপের উপর মাথা তুলিয়া দাড়াইয়া আছে। ডডলে বুঝিলেন, ইহাই লামু নগর। তিনি মিস একাইনের হাত ধরিয়া সােৎসাহে বলিয়া উঠিলেন, “আমাদের বিপদ কাটিয়া গিয়াছে, এতদিনে আমরা রক্ষা পাইলাম। পরমেশ্বর । তুমিই ধন্য , তােমার করুণায় শক্রকবল হইতে মুক্তিলাভ করিলাম নিরাপদ- স্থানে ফিরিয়া আসিলাম। কি আনন্দ। কি আনন্দ।'—উড়লে হঠাৎ মিস একাইনের পদ প্রান্তে মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। এতদিন ধরিয়া তিনি যে দুঃখ কষ্ট, দুশ্চিন্তা, অনিয়ম, ক্লান্তি নীরবে সহ্ন করিয়া আসিয়াছিলেন, বিপদেব অবসানে তাহা তাহার দেহ ও মনের উপর এরূপ প্রতিক্রিয়া আরম্ভ করিয়াছিল যে, তিনি আর কোন মতে আত্মসম্বরণ করিতে পারিলেন না। মিস একাইন ক্রোডের উপর তাহার মস্তক তুলিয়া লইয়া সযত্নে তার পরিচর্যা করিতে লাগিলেন , পাচক ব্লেক ব্রাণ্ডির বােতল খুলিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ ব্র্যাণ্ডি পান করাইল।—তাহার পর মিস একাইনকে অত্যন্ত ভীত পদেখিয়া বলিল, “মিস, আপনি স্থির হউন, শীঘ্রই উহার মুচ্ছ ভাঙ্গিবে , ভয়ের কোন কারণ নাই।” কয়েক মিনিট পরে ডলের মূচ্ছ। ত হইল, তাহাকে সচেতন দে খয়া মিস্ এরাইন গদগদ কণ্ঠে বললেন, 'হঠাৎ আপনার মূচ্ছ। হওয়ায় আমার বড় দুশ্চিন্তা হইয়াছিল , এখন আপনি কেমন আছেন ?” ডড়লে তৎক্ষণাৎ গাত্ৰোথান করিয়া বলিলেন, “না, আমার জন্য আপনি উৎকন্তিত হইবেন না , আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়াছি। বিপদের শেষে এভাবে ভাঙ্গিয়া পড়া বড়ই লজ্জাস্কর হইয়াছে।” নৌকাখানি নগরের প্রান্তভাগে উপস্থিত হই। ডডলে 'মিস এস- কাইনকে বলিলেন, “আমাদের সকল বিপদ কাটিয়া গিয়াছে, আপনি কি ইহা বিশ্বাস করিতেছেন না? তাই আমরা এখন নিরাপদ। মিস, এসকাইন অপূর্ণ নেত্রে বলিলেন, “এতদিনে আমরা নিরাপদ ক ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ হইয়াছি তাহা বুঝিয়াছি। অতীত ঘটনাগুলি দুঃস্বপ্ন বলিয়া মনে হইতেছে , কিন্তু মিঃ ডড়লে, আপনার অনুগ্রহেই আমি পুনঃ পুনঃ মৃত্যুকবল হইতে রক্ষা পাইয়াছি। আপনার এ ঋণ আমি কি করিয়া পরিশােধ করিব ? কি করিয়া আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিব ?” ডউল তাহার হাতখানি নিজের হাতের মধ্যে টানিয়া লইয়া, তাহার অশ্রু প্লাবিত মুখের উপর গভীর প্রেমপূর্ণ দৃষ্টি স্থাপন করিয়া বলিলেন, “মেরী, बागि যেদিন তােমাকে প্রথম দেখিয়াছি, সেই দিনই মন প্রাণ দিয়া তােমাকে ভাল- বাসিয়াছি। তােমার অদৃষ্টের সহিত আমার অদৃষ্ট যেন একসূত্রে গ্রথিত। আমি যে তােমাকে কত ভালবাসি-পরমেশ্বরের অনুগ্রহে তুমি তাহার কিছু কিছু পরিচয় পাইয়াছ। যদি আমার প্রতি তােমার বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও অবকাশ থাকে—তাহা হইলে তুমি আমাকে বিবাহ করিয়া আমার ঋণ পরিশােধ করিতে পার। আমি বােধ হয় তােমার প্রেমের নিতান্ত অযােগ নহি। কিন্তু আগে বল, তুমি কি সত্যই আমাকে ভালবাস? মিস্ এরাইন কম্পিত স্বরে বললেন, “ক”, আমি তােমাকে ভালবাসি তুমি ভিন্ন আমার আপনার বলিতে এ সংসারে আর কেহই নাই । তুমি আমাকে দয়া করিয়া গ্রহণ কর, তাহা হইলে আমি তােমাকে বিবাহ করিয়া চিরসুখী হইব।” প্রণয়ীযুগল পরস্পরের হাত ধরিয়া মৌনভাবে নৌকার উপর দাঁড়াইয়া রহিলেন। নৌকাখানি ক্রমে তীরের নিকট উপস্থিত হইল। তখন ডউলে পাচককে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “রেক, আমরা তােমার নিকট কতদূব ঋণী, তাহা বলিতে পারি না। তােমার সহায়তা ভিন্ন আমরা দুৰ্বও লাম্পিয়নের কবল হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিতাম না। তােমার মত হিৰৈী বন্ধু জীবনে কখন পাইব না, তােমার উপকার জীবনে ভুলিব না। জীবিকানির্বাহের যথাযােগ্য ব্যবস্থা করিয়া দিব।” কে কোন উত্তর দিল না, কিন্তু তাহার চক্ষু অপূর্ণ হইল।—সে মুখ ফিরাইয়া চকু মুছিল।—নৌকা দশ মিনিটের মধ্যে তীরে ভিডিল। যদি ।

নাবিক-বধূ তারা তিনজনে লামুৰ গবর্ণরের গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন।-গবর্ণর এডমিরাল রেকর্ণের নিকট পূঝেই ডডলের অভিযান-বার্তা শ্রবণ করিয়াছিলেন। ডডলোকে সুস্থদেহে প্রত্যাগমন করিতে দেখিয়া তাহার আনন্দের সীমা রহিল না। তিনি মেগবাণীকে যৎকিঞ্চিৎ পুরস্কার দিয় বিদায় করিতে চাহিলেন, কিন্তু ডড়লে তাহাতে সম্মত হইলেন না। তাহাকে প্রতিশ্রুত পুরস্কার দিয়াই বিদায় করা হইল। মিস এরাইন তাকে একখানি মূল্যবান অলঙ্কাব দিলেন । সেইদিন সায়ংকালে ডলের বন্ধু লেফটেনান্ট ব্রাডফোড় করিলেনস’ জাহাজে লাম দ্বীপে উপস্থিত হইলেন। সেখানে গবর্ণরের গৃহে মিঃ ডডলকে দেখিয়া তিনি যে কত আনন্দিত হইলেন তাহ' বলিবার নহে। অনেকক্ষন ধরিয়া উভয়ে সুখদুঃখের অনেক কথা হইল। এডমিরাল উড়ালকে আমে- বেন্ হাসেনের ন্যায় মহাপরাক্রান্ত দুৰ্ব্ব ও দশকে ধরিবার জন্য পাঠাইয়া কিরূপ অনুতপ্ত হইয়াছিলেন, ডডলে বাড়ফোর্ডের নিকট তাহাও শুনিতে পাইলেন। ব্রাডফোর্ড পরদিন মধ্যাহ্নকালে ডাক্তার ল্যাম্পিয়ন ও তাহার ভাড়াটে জাহাজের কাপ্তেনকে ধরিবার জন্য সমুদ্র-যাত্ৰা করিলেন , কিন্তু তাহাদিগকে বরিতে পারিলেন না।—ডডলে মিস এরসকাইনকে লইয়া মেগবাণীর নৌকায় পলায়ন করিলে ল্যাম্পিয়ন বুঝয়াছিল, তাহারা লামুতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন, সেখানে তাহাদের অনুসরণ করা নিরাপদ নহে। তাহার ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ হইল জেলে যাইবার সম্ভাবনা আছে বুঝিয়া ল্যাম্পিয়ন কাপ্তেনের সহিত পরামর্শ করিয়া এডেন অভিমুখ পলায়ন করিতে থাকে।এডেনে আসিয়া ল্যাম্পিয়ন কোথায় নিরুদ্দেশ হয়—তাহা কেহই জানিতে পারে নাই। সেই জাহাজের কাপ্তেন সৈয়দবন্দরে উপস্থিত হইয়া জাহাজ ছাডিয়া পলায়ন করে, তাহার ও কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। মেগবাণী সিঃ ডডলের নিকট প্রতিশ্রুত পুরস্কার লাভ করিয়া মােম্বাসায় বাস করিতে আরম্ভ করিল। সোবসী সর্দারের ভয়ে তাহার স্বদেশে যাইতে সাহস করে নাই।-মােম্বাসায় কায়-বাণিজ্য করিয়া সে ধনবান হইয়াছে।

যােদশ পবিচ্ছেদ ১৬১ 4 মিঃ ডডলে মিস, এরাইনকে লইয়া লামু দ্বীপে উপস্থিত হইবার এক- পক্ষ পরে জাঞ্জিবারের ভজনালয়ে মহাসমারােহে তাঁহাদের পরিণয়োৎসৰ সুসম্পন্ন হইল। এডমিরাল রেড়ফর্ণ কন্যাকৰ্ত্তা হইয়া মিস, এসাইনকে ডডলের হস্তে সম্প্রদান করিলেন। ব্রাডফোর্ড বৰকৰ্তাৰ কাৰ্য্য করিলেন। বিবাহের পর ডড়লে চাকরী ছাডিধা সস্ত্রীক স্বদেশে প্রত্যাগমন করিলেন। তাঁহার পৈত্রিক সম্পত্তি নিতান্ত অল্প ছিল না, তাহার উপর তাহার স্ত্রীর বিপুল পৈত্রিক সম্পত্তি তাঁহার হস্তগত হওয়ায়, তাঁহার আর চাকরী করিবার আবশ্যকতা ছিল না। উড়লে কিছু দিনের মধ্যেই লণ্ডনস্থ সান্ত-সমাজে বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠাপন্ন হইয়া উঠিলেন , কিন্তু তিনি তাহার বিশ্বস্ত পরিচারক ও বিপদের বন্ধু রেককে ভুলিলেন না, কিছু টাকা দিয়া তাহাকে একখানি হোটেল খুলিয়া দিলেন। সেই ব্যবসায়ে সে যথেষ্ট লাভ করিতে লাগিল। ডডলের গুণবতী পত্নী মেরী অবসর কালে তাহার বন্ধুগণকে তাঁহার লােমহর্ষণ বিপদের কাহিনী শুনাইয়া স্তম্ভিত করিতেন। তিনি সেই ভীষণ বিপদ ও অদ্ভুত উপায়ে তাহা হইতে মুক্তিলাভের কাহিনী স্মরণীয় করিয়া রাখিবার জন্য সকলেরই নিকট আপনাকে নাবিক-বন্ধু” বলিয়া পরিচিত করিতে অত্যন্ত আনন্দ ৬ গর্ব অনুভব করিতেন। সম্পূর্ণ।

বিশেষ দ্রষ্টব। রহস্য লহবী উপন্যাস মালাব ষড়বিশ পণ্ডে কোনও বৈদেশিক আথা - যিকা প্রকাশিত হইবে না। শারদীয় মহাপূজার আর অধিক বিলম্ব নাই , পূজার পূব্বেই এই খণ্ড প্রকাশিত হইবে। স্য-লহরীর শুভাকাঙ্খী বহুসংখ্যক পৃষ্ঠপোষক ও গ্রাহক মাহাদয় আদিগকে লিখিয়াছেন, আমাদের এই জাতীয় মহােৎসবের অবকাশ কালে হারা আমাদের বাঙ্গালী-জীবনেব সুখ-দুঃখ ও বিৰুহ মিলনের অনতিরঞ্জিত চিত্র প্রাপ্ত হইলে নিরতিশয় আনন্দ লাভ করবেন। 'বৃহস্য-লী’র অবকাশ গ্রাহক ও পাঠক মহোদয় তাহদেব এই অভিমতেব সমর্থন করিবেন, এই আশায় এবার আমরা পল্লী-কথা” নামক পলীকাহিনী প্রকাশের সঙ্কল্প করিয়া তাহাবই মুদ্রাঙ্কণর ব্যবস্থা কবিলাম । পল্লী-কথা প্রকাশিত হইলে তাহা যথাসময়ে অনু গ্রাহক গ্রাহ মহােদয়গণের নিকট প্রেরিত হইবে। আশা করি বাঙ্গালীর দৈনন্দিন জীব, সুখদুঃখ বেদনা-বিষাদ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার এই অনতিরঞ্জিত চিত্রগুলি বয় পাঠক সমাজে এই অকিঞ্চন গ্রন্থকার-রচিত ও বহুপূব্ব প্রকাশিত 'পল্লীচিত্র ও পল্লীবৈচিত্র্যের ন্যায় সমাদৃত হইবে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Nabik-badhu Ed.1

Author
Roy,dinendra Kumar
Title
Nabik-badhu Ed.1
File name
Nabik-badhu Ed.1
Text
OCR done
Citation
1917
Published
2010/04/22
Publisher
Manasi Press, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Roy,Dinendra Kumar
DLI number
515091
Barcode
4990010016800.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
kmWtj50b7wM
Download PDF

Nabik-badhu Ed.1