Makardah Saraswat Library, Howrah

Namaskari

Bandyopadhyay, Kedarnath · 2009/08/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নমস্কাৱী
শ্রীকেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
মিত্র ও ঘােষ
১০ শ্যামাচরণ দে স্ত্রীট, কলিকাতা

—দুই টাকা চার আনা ম ও ঘােষ, ১, শ্যামাচরণ দে ষ্ট্রীট, কলিকাতা হইতে শ্ৰীগজেন্দ্রকুমার মিত্র কর্তৃক প্রকাশিত প্রভু প্রেস ৩০, কর্নওয়ালিস দ্রুট, কলিকাতা হইতে শ্রীরামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য কর্তৃক মুদ্রিত

আমার শ্রদ্ধেয় প্রিয় প্রীতিভাজন,
হাস্যরসিক
বিভূতিভূষণ মুখােপাধ্যায়-ভাগ্নাকে
সাদরে সমর্পিত
গ্ৰনুকার
পূর্ণিয়া
ব্ৰতপক্ষ, ১৩৫১

এই লেখকের
আইজি
উড়াে থৈ
ভাদুড়ী মশাই
আমরা কি ও কে
কোষ্ঠীর ফলাফল
দুঃখের দেওয়ালী
গুপ্ত-রত্নোদ্ধার
কাশীর কিঞ্চিৎ
রত্নাকর ( নাটক )
কবুলতি
সন্ধ্যাশঙ্খ
চীন-যাত্রী
পাথেয়।
পাওনা
এই বইখানিতে বাংলাদেশের প্রিয়তম দাদামশা’য়ের যে ক’টি লেখা ছাপা
- সব ক'টিই প্রায়, তার আশি বৎসর পার হবার পর লেখা।
আর নতুন করে গৌরব করার কিছু নেই, কিন্তু আমাদের গৌরব
ও আনন্দের কথা বলেই কথাটির এখানে উল্লেখ না করে পারলেম না ।
।

মাগুর মেজার গাঙলী বড় অফিসার, নীরব কর্মী। “আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখায়” এই ছিল তার প্রিসিপল। মুখে কিছু বলতেন না—নিজে করে দেখাতেন। কোনো এক ডিসেম্বরের বড়দিনে ‘পুত্র লাভ করেন। • কবি- ভাবাপন্নও ছিলেন। বিবাহাদির উপহার-পদ্য অনেক লিখেছেন। ছেলের বিবাহেও পদ্য লেখবার ইচ্ছা ও আশা দুই তার ছিল। অনেক ভেবে কাজ করতেন। ডিসেম্বরের সঙ্গে যাতে মিল হয়, তাই ছেলের নাম রেখেছিলেন নীলাম্বর-ডাকতেন “নীলেম্বর” বলে। তখন গল্প-কবিতার জন্ম হয়নি। কবিদের দুর্ভাবনার দিন ছিল। সেই ১ময়ে ছেলের মায়ের অনুরােধে গরম কাপড়ের একটি কোট বানিয়েছিলেন। অধুনা সেটি ধূমবর্ণ ধারণ করেছে এবং লােমশূন্যও হয়েছে, তার ‘উ বা গরমত্ব আর নাই, কিন্তু মায়ার শরীর বিধায়ে তাকে আগ করতে পারেন ও পারেন না। ছেলের মাও আর মেরামত করতে পারেন না। বলে, “এবার গুণ-চুঁচ না এনে দিলে সেলাই আর চলবে না।” নোর বলেনও কোটের কদর বুঝলে আদর করতে। ও আমার সাত মেয়ের সাক্ষী দি মেজার, মােটার, মান—ওরি দান ভুলে যাও কেন?” রাম। বার বলেন—“আহা ভুলবাে কেন? ছুঁচটা পর্যন্ত বােঝে, সে আর ধতে চায় না। যে এতো দিলে তার কি ঐ পাওনা! তাকে পেন্স তে সিন্দুকে শান্তিতে থাকতে দেওয়াই কি তােমার কর্তব্য নয়?” একটা ভাববার কথা বলেছ বটে! বিশ্বাসী বন্ধু যে, মায়া বাড়িয়ে রেছে। আচ্ছা-তাই হবে, আমার বেইমানী না হলেই হল।” এ-কথা এসে পড়ে। প ইতিমধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহের দুৰ্যোগ, অর্ধোদয়যােগের ভিড়নে পাঠিe টার টুরের বা “ঘুরে* অল্প নাই। বয়স বেড়েছে, শীতও বেড়ে t আপ ঢুকে-জা নমস্কারী ৫ --- সর্দিও সাড়া দিয়েছে ( কোট গায়ে দিয়েই গত নভেম্বরে ছেলের বিয়ে যশােহরে সমাধা করে এসেছেন। উপহার পথে তার চতুষ্পদ অলঙ্কার বিবাহ-সভা হ’তে ফাষ্ট নম্বর আদা করেও এসেছে। নতুন বেই ঠাট্টা করে বলেছিলেন—“লোমনাশক সাবানে গরম কোটও বেশ কাচা যায় দেখছি! জানতাম না তাে?” কথাটা মেজারের একটু লাগলেও তিনি মাত্র একটু হেসে বলেছিলেন- “শেখার কি শেয় আছে বেই। মন কিন্তু বলেছিল-“কোট একটা না করলে আর নয়! কতাে আর পড়বে—এটা তখন দশ টাকার মধ্যেই হয়েছিল, এখন না হয় পনেরই লাগবে, সায়েবগঞ্জে ফিরেই ভাগলপুর মথুরের ফার্মে ফতুর হ’তে যাব-নীলেম্বরের মার তাক লাগিয়ে দিতেই হবে।” বড়দের যে কথা সেই কাজ। আজ তিনি মুক্তহত। “বেই বধের নগদ পাঁচ হাজার টাকা সঙ্গেই রয়েছে। মেজার মরিয়া। গাঙুলী full heart-এ মােটরে start দিলেন--একেবারে ভাগলপুর। ঘরের মােটর রয়েছে কি করতে, সরকারী পেট্রল আর কোন বাজে লাগবে ? - গাড়ির শব্দ শুনেই মথুর-জয় মা কালী’ বলে খাড়া ব গিয়ে দাড়া রামায়ণ গাইতে গাইতে একদম বারান্দায় বেরিয়ে পড়ল। মথু; মুকিয়েই ছিল। একেবারে মাটি ছুয়ে দণ্ডবৎ। “নিত্য মনে হয়—কেমন হ.rছন। অনেক দিন এদিকে দেখিনি। ছেলেমেয়েরা সৰ ভালাে? একটু ৫. হয়ে গেছেন দেখছি। আর আপনাদের যে কাজ পড়েছে—ঘুরুনি এ বেড়ে থাকবে। তায় আপনি আবার যে রকম duty-র ভক্ত—যে । আনার ওপর রক্ত দিয়ে কাজ করেন। এ কথা সকলের মুখেই। ভগবানের কাছে খাটি থাকাই ত’ মনুষ্যত্ব। ঐটি যেন না ভুলি-আরা । “তাই করতেই ত’ এসেছি মথুর। একটা ভালাে গরম কোট ফলেই নয়। ওদিকে নজর দেবার ফুরসৎই পাই না। সায়কা নমস্কারী চিত দোকানে বেঁশা দায়। আমার কি দরদ করবার সময় আছে, তােমাদের কাছে তা ভাল দেখায় ? সবাই বােঝে না। গরম কাপড়ের টিগুলাে আরামসে গাঢ় হয়ে আলমারির মধ্যে শুয়ে আছে—ত সপ্তাহে প্তাহে তাদের গজ-আড়াই টাকা করে বেড়ে চলেছে। একেই বলে রা হাতি লাখ টাকা! পূজার পূর্বে যার গজ ছিল সাড়ে চার, গাঁটের মধ্যে জিয়ে এখন দাড়িয়েছে সাড়ে আঠারাে! আমাদের মথুর আছে বলে লৈ এসেছি।” “আসুন,আসুন—আপনারা যে আমাকে ভােলেন না, এই আমার রিম সৌভাগ্য। আমার মাল আপনাদের দয়ায় আলমারিতে শুতে পায় না, বি নতুন আভাঙা আমদানি••কলকেতা আর ভাগলপুরে তফাৎ নেই। নন* বলে-Navy-cua-এর টিনটা এগিয়ে দিলে।-“এই এক দুঃসময় সেছে মশাই, কি যে হবে জানি না, আপনাদের কাছে তাে সব খবরই মাছে। কতদিনে এ জালা চুকবে মশাই, খদ্দেরদের খুশি করতে পারি।” “তােমাদের যতদিন না আশ মেটে বােধ হয় তত দিনই চলবে,” বলে সলেন। “হরি আর হর দুজনেই ত’ সহায়।” “না মশাই—আমার সে সব হবার পথ রাখিনি, তাড়াতাড়ি তাই দীক্ষা, নয়ে এই কষ্ঠী ধারণ করে বসেছি। কি জানি, মানুষের মন না মতি, দুর্ব ঘি দখা দিতে কতক্ষণ তাই পথ মেরে নিশ্চিন্ত হয়েছি। কি শান্তি—কি রাম! গুরু রক্ষা করুন” বলে—উদ্দেশে নমস্কার করল। “কলকেতার গজের আট আনা গজের বেশী নিতে পারি না। এখন কি অনুমতি হয় বলুন।” আপাগল হলে নাকি মথুর। ওসব আমাদের আলাপের কথা। যাক- তি নয় মথুর- দরকার। ঠাণ্ডাটা চেপে পড়েছে, বাইরে ঘুরে বেড়ানই জানই তো, একটা কোট না করালেই নয়,যাতে গরমে ও আরামে ত পারি। বয়স হয়েছে, একটু অসাবধানেই—বুঝছ তাে।” কেয়ে গুরু” বলে উর্থে নমস্কার ঝেড়ে মধুর বললে-“আর বলতে হলে পাঠিঝি, আমিও ষাটের কোঠায়। দিন রাত দেখছি—তার কি মহিমা।

নমস্কারী সত্যই মহাজন বাক ভাগ্যবানের বােঝা ভগবান বন’, কি আশ্চৰ্য্য, গা শিউরে উঠছে। এই কালকের কথা—ব্রিগেডেয়ার সাহেব গরম । করাবেন, কাপড়ের জন্যে ছুটে এসেছিলেন। ভাগ্যে তা থেকে দু’ গ আসল কাশ্মীরা কেটে রেখে—থানটা বাইরে এনেছিলুম! এখন ভাবছি- ‘কেত রাখিয়েছিল। সাহেব না মেপেই লুফে নিলেন। একটু তােতল আনন্দ ফুকতে না পেরে বললেন—এ তুমি কোথায় পেলে, এযে re-re-r real-ho-ho-home spun | India-য় এখন এলাে কি করে ?” ঝট করে এ তাড়া নােট ফেলে দিয়ে Tha-Tha-করতে করতে রাস্তায় পৌছে Thank বেরুলাে, নিজেও বেরিয়ে গেলেন। আমি অবাক! কাপড়টা এতই দুষ্প্র আর ভালাে—দাম জিজ্ঞাসা দরকারই বােধ করলেন না। জিনিস চেয় কিনা! ভাবলুম,-আর খানিকটে কেটে রাখলুম না কেন? যাক ও বে আর যার তার জন্যে নয়। ওযে ভগবান আপনার জন্যেই রেখেছিলেন, এখ তা তা দিব্য দেখতে পাচ্ছি। কোট-ওয়েষ্ট’—দুই-ই হয়ে যাবে। অনন্ত, দেখতে আমার পাশের ঘরের চোর কুটুরির দেরাজের একদম সে পেছন দিকে ঠেলে রাখা আছে। এই নাও-চাবি—* এক তাড়া নােটের কথা শুনে পৰ্যন্ত গাঙলীর প্রাণ ড্যাংগুলীর ম পালাই পালাই করছিল, বললেন-“কত দিতে হবে মথুর?” “আপনি তো বেপরােয়া লড়ায়ে ব্রিগেডিয়ার নন, আপনি যা “না—তবু শুনি মথুর এদিক ওদিক চেয়ে “না কেউ বাইরের লােক নেই,”—গলা ১ এক নিখেসে চুপি সুরে-“আপনার জন্যে বায়ান্ন টাকা তের আনন two yards-not one. ভিক্ষা-কাতর স্বরে—“অন্যে যেন মেজর।” ক “রামে—একি লােকালয়ে বাবার কথা? আচ্ছা, এখন তােম কুরিতেই থাক—ভালাে থাকবে। Layman, অত গরম কই গৌরব ছাপা নমস্কারী সাহস হয়না। নিরাপদ কিনা একরার Dr. Mukherjee-কে consult করে নি। সকলের temperature তো সমান নয়, ওটা যে রকম গরম বলছে, দেহের contact-এ এলে দেহ সুদ্ধ, দপ করে ধরে উঠতে পারে। এটা আমার অনুমান মথুর। দেখনা—দামটা যা শুনছি, তাতেই বােধ হচ্ছে-ঐ শােনার গরমেই দু’টো শীত খুব কেটে যাবে। বড় উপকার করলে ভাই।” “Ta-Ta” বলতে বলতে একদম গাড়ি ও বাড়ি। মেজার মথুরের হাতে ফতুর হওয়াটা বাঁচিয়ে একদম বাড়ির গাড়ি- বারাণ্ডায় এসে মােটর থামালেন। “বাড়িতে এত গােল কিসের ? বেই বাড়ির জিনিসপত্তোর নিশ্চয়ই আগে পেীছে গেছে। কিন্তু কান্নার সুরের মত ঠেকছে কেন ? বউ তাে ছেলেমানুষটি নয়। আর এত শিগগির আপবে কি করে? কুশণ্ডিকে তাে সেইখানেই সেরে আসতে বলেছি।” ধীরে ধীরে একটু এগুলেন। কানে এলো-“বুড়াে বুড়ো মেয়ে হলি, বাপের দিকে চাসনা! বৃদ্ধ লােক তােমাদের মুখ চেয়ে এই শীতে হাড় বেরুনাে একটা কোট গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কোন্ দিন নিউমােনিয়া নিয়ে হাজির হবেন, সে ভাবনা চুলােয় গেলাে, তােদর চুলের পাটই হ’ল বড়! চুল কাটলে গজাতে তিন মাসও লাগেনা, মাষ. গেলে যে,-আয় বলছি নলিনী নলিনীর কান্নার সুর বেড়ে গেল,-“তােমার দুটি পায়ে পড়ি—বাবাকে আসতে দাও মা-* মেজার ব্যাপারটা বুঝতে না পারলেও আর থাকতে পারলেন না—দ্রুত ঢুকে পড়লেন। মেয়েরা এক সুরে বলে উঠলাে-“দেখনা বাবা, মা আমাদের সব চুল কেটে দেবেন, তারপর নিজে নেড়া হৰেন বলছেন, নাপিত জাতে পাঠিয়েছেন নমস্কারী * মেজার পরিবারে স্বকে ফিরে বললেন-“কি গাে, ব্যাপার কি? কিছু যে বুঝতে পারছিনা! এটা তো এয়াগ নয়— গিন্নি স্থির ভাবেই বললেন-“কিছুই নয়, রিকার পড়েছে তাই। বাড়িতে ক’দিন এক ফোটা তেল নেই, না রাধবা না মাখবার। আজকাল এ রকম তো ঘটছেই। কি করা যাবে—যখন যেমন তখন তেমন। রাজার দরকারে সব করতে হয়।” ময়শা তৈলী এলাে, বললুম-“এসেছিস-আঃ বাঁচালি বাবা বেঁচে থাক ঘানী অক্ষয় হােক—টানবার জীবের অভাব হবেনা দেখে নিস! শীতে গা হাত পা ফাটছে—অসােয়াস্তির এক শেষ। ঘরে এক ফোটা তেল নেই বাবা, সৰ্বাঙ্গ ফেটে বিড়বিড় করছে।” মহেশ পুরােনাে লােক, মানুষও ভাল, বুললে–নি মা কতাে নেবেন। বঁটা মাল নয়, একদম টাটক-ঝাঝকা! “সের কতাে করে বাবা? আজকালের দিনে জিজ্ঞেস করতে হয়, তাই করা।” মহেশ বলে-“সরসের তেলের দাম তো তেমন বাড়ে না, এখনো পাচসিকের মধ্যেই রয়েছে। নারকেল তেলের দরটা বাড়বে বলে ভয় পেয়েছিলুম মা। তা কই, এখনাে দেড় টাকার ওপরে উঠতে পারেনি নারকেল গাছ কেবল দেখতেই উচু।” “বলিস কি? থাক, অত ঝাঁঝ, আমাদের সইবেনা বাবা। গা হাত ফাটা তৰু সইবে, তাের দর শুনে যে বুক ফাটে রে—* সে চলে গেল। -“তােমার মেয়েদের চুল তো নয়—একেবারে-আষাঢ়ের পুঞ্জ মেঘ- বাধা বন্ধ হারা’, বেড়েই চলেছে। তাই কঁচি নিয়ে বসেছি—“বব’ করে দেব বলে। মাসে সতের টাকা রেকারিং খরচা বেঁচে যাবে। পরে, চুল গজাতে ক'দিন? সংসারের ভান্স তত ভাবনা-ভাবলেই পথ, মেলে। কেট কুড় জোর আর একটার দরকার হবে। কত লক্ষ কোট ভাৰত লক্ষ্য আর জমছে। তােমায় তো কিছু মনে থাকে না। এ শীতটে যাে-সাে করে ৭ নমস্কারী কাটালে, ছ’ পয়সায় কোট, ন পয়সার অভারকোট, পথে ঘাটে মিলবে। ভগবান যা করেন তা ভালর জন্যেই করেন—চাকরগুলাে তখন গায়ে দিয়ে বাসন মাজবে। সেবারে দেখনি-ভিখারির গায়েও;-মুষ্টি ভিক্ষে দিতে লজ্জা পেতুম। আমাদের ভাগ্যে সুবিধে মুকিয়ে রয়েছে, একটু সয়ে থাকো।” মেজর মূঢ় মেরে নির্বাক। মাথা চুলকে বললেন-“আচ্ছা মেয়েগুলােকে আজ দয়া করে ছুটি দাও, দশদিন পরে যা হয় কোরাে।” তারা সব ছুটে পালালাে। “ইসকরছি কি,চা নিয়ে আসি। সর্দি হয়েছে দেখছি—কোটের বােতামগুলাে খুলে দাও, হাঁচলে”—গম্ভীর মুখেই চলে গেলেন। মেজারের একটি কথাও আজ যােগাল না। আরাম-চেয়ারখানা টেনে নিয়ে আড় হলেন; নির্মম কশাঘাৎ গুলাে চোখ বুজে হজম করতে লাগলেন।-বিরাজ আঞ্জ:সত্য কথা গুলােই বলেছেন,-বড় জোর আর একটা কোট! আজ যেন ‘চৈতন্য চরিতামৃত' শােনা হ’ল। পুনর্জন্মে। বিশ্বাস ছিলনা তাও এসে গেল। কবিরাজ গােস্বামী আমার আয়েব ঘােচাতে কষ্ট করে জন্ম নিয়ে সাহেবগঞ্জে উপস্থিত। পুনর্জন্ম আছে বই কি!” “নাও—ভালাে করে দু’ কাপ চা খাও দিকি।” কেটলি থেকে চা ঢালতে ঢালতে—“চিনি কনট্রোলে গিয়ে গােলে ফেলেছে-মিষ্টি নেই- “তবে আর কেন—থাক।” “তা কি হয়, সরকার ভালর জন্যেই করেছেন,rew চা শুনেছি ভারি উপকারী, চীনেরা খায়।” “তা এনেছ দাও, আজ বেশ পারবাে, খুব পারবাে। হ্যা, উপকারী বই কি-মিষ্টি নাই বা হ’লঅনেক তাে পেয়েছি, চিরদিনই কি থাকবে, যখন যেমন,-দাও। তারতের ত্যাগই তাে ধৰ্ম্ম-* বিরাজ থমকে গেলেন।-“রােসাে দেখি যদি—বলতে বলতে ছুটলেন। মোর ভাবতে লাগলেন-কাণী যাই কি কোট বানাই।

', অপরূপকথা বেরদের আর কাজ কি.? আহারাদির পর ভুক-পৰ্বই ছিল তাদের শান্তিপর্ব সারা জীবন ন দেবায় ন ধৰ্মায়, পরসেবায় কেটেছে, এখন আর কেঁচে কিছু করবার উৎসাহও নেই। নিকটে কোথাও সত্যনারায়ণের কথা হলে কলাবতী’র কথা শুনে আসি, শিন্নিও খাই—তাতে যদি কিছু হয় । হাই উঠলে আপনিই নারায়ণ নারাণ বেরয়। পাঁচজনের পাল্লায় পড়ে কথা শুনতে গিয়ে হয় বস্ত্রহরণ না হয় লঙ্কাকাণ্ড শুনে আসি। কোনাে বীভৎস দৃশ্য দেখলে ‘রাম' 'রাম' বলি। ধর্মকর্মের মধ্যে এই থেকে গেছে। বরং যখন চাকরি করতুম বেরবার সময় নিত্যনিয়মিত দুর্গানাম স্বেচ্ছায় আসত, বা ডানকান সাহেব সেটা টেনে বার করতেন, তা যে কারণেই হােক। এতদিন কি আর আপিসের মূখ মেথরটা টেবিলের প্যাডখানা রেখেছে। তাতে দুর্গানামের ছড়াছড়ি ছিল। এখন আবার আঁপিসের সেই সব শুভানুধ্যায়ী মালিকদের কুইটের কথাও কানে আসছে—অর্থাৎ তােমরা দয়া করে বিদায় হও। কিন্তু বেইমানি করব কি করে—তাঁরা আমাদের জন্যে কি না করেছেন? ধর্মও করিয়ে নিয়েছেন! যাক—‘দিন আগত ঐ’, তাই মহাজাপক জয়ব্রহ্ম শৰ্মার শরণ নিয়ে একটা শর্ট-কাটের জন্য তাকে ধরেছিলুম। তিনি দয়া করে আদিত্যহৃদয় স্তোত্রটি সময়মত নিত্য আউড়াে-আর কিছু করতে হবে না বলে দিয়েছেন। সেই শটকাটটি বাগাতে তিনমাস লাগল। আহারের পর সেইটিই আওড়াবার চেষ্টা পাই, কিন্তু তার শেষটা পর্যন্ত পৌছবার অবসর কোনদিন পাই না-শুভাংসি বহু বিষ্মানি, চুল ধরে, ভুল ধরে, পাওনাদারেও এসে ধরে। আবার নিদয়ারাও আছেন-নাতনীরা বেলা তিনটের পর চুল বেঁধে দুল দুলিয়ে কোমর বেঁধে গল্প শােনবার দাবি নিয়ে হাজির হন। বিদারদের আবদার এড়াবার পথ নেই,-কোমলে কঠিনে মধুয়ে এ বিদ্যুৎ পর্ণারা সাক্ষাৎ পাহাড়ী ঝরনা। ধকর্মে ব্যাঘাত বহু। তারাই আজ ‘হাঁফ এ ভজন’ হাজির হলেন, প্রায়ই এ-দয়াটা করে থাকেন। #ণী ‘বিষুবরেখা’ অগ্রবর্তিণী হয়ে সাস-ভাষে বললেন, “আজ কি তােমার নমস্কারী আদ্যিকালের রূপকথা শুনতে আসিনি, তার জন্যে ক্ষান্ত মাসি এখনাে জ্যান্ত আছেন। আঃ বাঁচলুম, কিন্তু অর্ধশত বর্ষপরে এই কি বিদায়’? “বাঃ, বিদায় কে বলেছে?” তবে ? “সত্যি কথা—গল্প পড়ে পড়ে অরুচি ধরে যাচ্ছে। সবই যেন একচে ঢালা। মােটর, বাস, ট্রাম, সিনেমা আর গড়ের মাঠ, না হয় রেখে নি, তেহেরি বা দার্জিলিং। হিরােরা সব সিল্কের পাঞ্জাবি-ঢাকা ইউনিভার্সিটির উজ্জ্বল রত্ন। এ গরিবের দেশ বাংলায় এত কুবের-কুমারও ছিল। তা হােক, মিষ্টি জিনিসই বেশি মুখ মেরে দেয়, তাই আর তা ঘটতে ইচ্ছা হয় না। এদিকে সময়ও কাটে না।” তাই ত-বড় অশুভ সংবাদটা শােনালে দিদি। লাইব্রেরিগুলাে তােমরাই রেখেছ, তােমাদের মুখ চেয়েই তারা বাড়ে। উঠতি মুখে তাদের বসিয়ে দিওনা, দেশের প্রতি দয়া রেখো। শ্ৰীমতী তনুশ্রী বললেন, “বই আনাতেই হয়, হবেও, কিন্তু তাদের প্রথম অধ্যায় আর শেষ অধ্যায়টি দেখে নিলেই কাজ হয়ে যায়। তার পর কি নিয়ে থাকি?” শ্ৰীমতী বিষুব বললেন, “আজ, তােমার দেখাশােনা মজার কথা শুনব।” কেন আমাকে বিপদে ফেলবে, ভাই। “বিপদটা কিসের ?” সে কালও নেই, সে চালও নেই, এখন এটা জেন্টেলম্যানের যুগ, অর্থাৎ কৃত্রিমতার যুগ। মার্জিত নিৰ্বাচিত ভাষার চলন। মেয়েদের মহিলা, স্ত্রীকে ‘ওয়াইফ’ ও ‘তিনি’ বলতে হয়। তখন ওসব দুর্ভাবনা ছিল না। সেদিনের কথা সেদিনের ভাষাতে না বললে ভালও শােনায় না, রসও থাকে না, কিন্তু তােমাডোে তা রুচবে না । "আমরা সেদিনের ভাষাতেই শুনব।”

নমস্কারী আমিও যে তা ভুলে যাচ্ছি, ও ফ্যাসাদে আর ফেলাে না। “কেন, তােমার আবার ভয় কাকে ? তােমরা যা ভাবছ—যমকে পার আছে কিন্তু যুগ আর জেন্টলম্যানদের ভয় করতে হয়। হয় বইটই তাে পড় না, কেবল অধ্যাত্মের দৌরাত্ম নিয়ে থাক, তাই ভয় পাচ্ছ। একখানা এনে দেখাব ?” কি বিমাপ কর ভাই, বলছি। সে কালের সে ভাষা আমিও ভুলে গেছি, ভেজাল চলবে কিন্তু। “তথাস্তু। আজ কাল অভেজাল কিছু আছে কি-সে আমাদের সয়ে গেছে। তখনকার দিনে গৌরচন্দ্রিকা না করে, কোনো মঙ্গলকাৰ্য্য আরম্ভ করবার রীতি ছিল না। নারায়ণং নমস্কৃত্য ত ছিলই। সে সব বাজে ব্যাপার এখন আর নেই। এখন সময়ের মূল্য বেড়েছে। সংক্ষেপে বলি। তখনকার সমাজ সম্বন্ধে কিছু না বললে বােঝবার সুবিধা হবে না-সুতরাং গৌরচন্দ্রিকার বদলে অ্যাপলজি হিসেবে সেটা জানাই। -তখন অন্নকষ্ট বড় ছিল না, এখনকার মত অভাবে পেট মরে আসেনি বসে বসে গুরু আহারই ছিল অভ্যস্ত। দিবানিদ্রাটাও ছিল। সন্ধ্যার পর জমিদার বা বড়লােকের বৈঠকে আনন্দ-মজলিস বসত। গল্প, গুডুক, গান ও হহ হহ হাসি চলত—তবে তাদের ভাত হজম হত। বৈঠকের মধ্যে সকল রকমের লোকই থাকতেন। কেহ গল্পের, কেহ গানের, কেহ রসিকতার, কেহ সংবাদ সরবরাহের বা পরচর্চার ওস্তাদ। মপাশা-পড় পণ্ডিতেরাও থাকতেন। সালিসি ও সমাজ শাসনের আসনও খালি থাকত না। আসলে তা ছিল কিন্তু সময় কাটাবার ও সমাজ দুরন্ত রাখবার জন্যে আবার দুটি জমিদারদের মধ্যে কৌতুকচ্ছলে হারজিতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও চলত। তার ১১ নমস্কারী বিষয়-অনুসন্ধান ও উপায়-উদ্ভাবনের জন্যে সেরা সেরা ওস্তাদেরাও থাকতেন। এক কথায়, কাজের মধ্যে মজা ও আনন্দ নিয়ে থাকাটাই ছিল তাদের বড় কাজ। শেষটা কিন্তু প্রায়ই আকচে দাড়িয়ে যেত। —থাক্, তােমরা শিক্ষিত মেয়ে, এই পৰ্যন্তই যথেষ্ট, তোমাদের বুঝতে বাধবে না। “বাঁচলুম, ধন্যবাদ। এইতেই হাঁপিয়ে উঠেছি—গল্পে আবার এত হাবড়- হাটি চণ্ডীপাঠ কেন? আরম্ভ হােক না? পাতালের কথা, পদাজ ঘােড়র কথা বুঝতে পারি আর পাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত বেকারদের কথা বুঝতে পারব না? সে কি কথা—পারবে বই কি। তােমরা আবার বুঝতে পারবে না এমন কিছু আছে নাকি! তা বলছি না, তবে এটা রূপকথা নয় কিনা, তােমরা আজ ‘অপরূপ কথা শুনতে চেয়েছ যে। যাক—তবে শােনাে, একটা স্মরণ রেখো কিন্তু—বৃদ্ধেরা একটু বকেন বেশি, সেটা ক্ষেমাঘেন্না করে যেও —শিবকালীবাবু, আমাদের শিবুদা, ‘ডফের ইস্কুলে পড়ে গায়ের রত্নবিশেষ দাড়িয়েছিলেন। প্যারাডাইস লষ্ট’ মুখস্ত, কান্ট’ ‘হেগেল’ সড়গড়,-বিদ্যের জাহাজ বললে হয়। ডফ, সাহেব ছিলেন মেকেঞ্জি-লায়াল কোম্পানির সিনিয়ার পার্টনার। শিবুদাকে বড় ভালবাসতেন, নিজের আপিসে মােটা মাইনে দিয়ে—‘সে-মাস্টার করে নেন। মধ্যবিত্তের অবস্থা ফিরতে বিলম্ব হয়নি, সেই সঙ্গে নাম-ডাকও। দ্বিতীয় বর্ষেই বাড়িতে মা দুর্গার আবির্ভাব গ্রামস্থ ভােজ ও কাঙালী বিদায়। পয়সা হলে তখনকার দিনে এই সবই প্রধান কর্তব্য ছিল। স্বর্ণকারের নিয়মিত গতিবিধি, গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় বাস বা ছুটিছাটায় স্বাস্থ্যকর স্থানে হাওয়া বদলাতে সস্ত্রীক যাওয়ার চলন হয়নি। শিবুদা বরাবরই ছিলেন বিনয়ী, বাধ্য ও মিশুক এবং সকলের প্রিয়। বড় বড় ঘােট সকলেরই ভালবাসার পাত্র। পয়সা ও পদবৃদ্ধি হলেও তিনি পূর্বের মতই থাকতেন। তাই শ্রীনাথ বাবুর ( অর্থাৎ বড়দের) আসরে সকলে তাকে সাগ্রহে ও সমাদরে দলভূক্ত করে নিয়েছিলেন।.

নমস্কারী ১২ একটি বিষয়ে শিবুদা কিন্তু অন্যান্য সকলের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছিলেন। সেটা ইংরেজি ইলেমের দোষেই বােধ হয়। বয়স প্রায় ২৫/২৬ হলেও তখনাে তিনি বিবাহ কর্মটি করেন নি। প্রায়ই শুনতে হত—“সে কি হে, হিদুর বাড়ি সিদুরের ছাপ না থাকলে ধৰ্ম্মকর্মে দাবি থাকে না,-সস্ত্রীকে ধর্মমাচরেৎ বুঝেছ ইত্যাদি। অবন্তিকা বললেন, 'এ নিয়মটি তো বিশেষ মন্দ ছিল না, উঠে গেছে নাকি?” তােমত্রী অন্তরায় হলে যে? “কি সে-হাউ ?” তােমরা কোমর বেঁধে কলেজে ঢুকলে। ক্লাসে টিগােনােমট্রির ফরমুল। নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে মৃদুলা কেঁদে উঠলে তাকে মাই দেবে কে? একথাট। অসাবধানেই বেরিয়ে পড়ে,—ইনডিসেন্ট হ’ল, বলে সব মৃদু হাস্যে মুখ বাঁকালেন। -হ’ল ! আমি তাে আগেই সে কথা বলেছিলুম। তােমাদের তাে খাঁটি মাতৃভাষা আর রুচতে পারে না, ভাই। “আচ্ছা আচ্ছা বলাে, আর বাড়াতে হবে না” With your permission-তবে শােনো,-ওদিকে গঙ্গাপারের গাঁয়ের জমিদার কালীকিঙ্কর চৌধুরী শিবুদাকে ভগ্নিপতিরূপে পাবার জন্যে হন্যে হয়েছিলেন। তাঁরও মজলিস ছিল, দলও ছিল, এ গাঁয়ের সঙ্গে পরিচয় ও হারজিতের প্রতিযােগিতাও ছিল। সম্পর্ক-বদ্ধ হলে দুই গ্রামের আসর জমাবার উপায় বাড়বে ও বজায় থাকবে, তাই এ গ্রামের এরাও হামরাই হয়ে সাহায্য করেন,শিবুদার বিবাহও হয়ে যায়। শিবুদা এখন সংসারী। নৃত্যকালী বড়ঘরের মেয়ে, 'বাধসটাও সেই মেকদারের ; দুধ, ক্ষীর, রসগােল্লায় গড়া শরীর। দেখতে কার্তিকের মত একটি ছেলেও হয়েছে, কিন্তু ক্ষীর ছানা খাইয়ে খাইয়ে অধুনা সে গণেশে দাড়িয়ে গেছে। সকলে আদর করে তুলতুল বলে ডাকে। আলগােছে কোলে নয়—পাছে টোল খায়।

নমস্কারী নেত্তকালী সংসারের কাজকর্মে অভ্যস্ত নন, জমিদার-বংশের রীতি রক্ষা করে চলেন। অঙ্গে চুল বেঁধে দিলে পছন্দ হয় না বলেই সে নিষিদ্ধ কাজটি কিন্তু নিজে করেন। পানটা দিনরাত খান—সেটা চাকর দাসীদের দ্বারা মনােমত হয় না বলেই নিজে সাজেন। অভ্যাসবশে নিদ্রিতাবস্থাতেও পানের জাবর কাটেন। আর তাস খেলেন। বড় ঘরের এই ভাগ্যলব্ধ ঐশ্বৰ্যটি শিবুদা হাসিতামাসায় হজম করেন। দিনটা ছিল শ্রাবণের একটা ঝাপসা দিন-লেখাপড়া সম্ভব নয়, বাতি জেলে ক্ষতি মাত্র, তাহা বারটার পরেই সেদিন আপিস বন্ধ হয়ে যায়। বি- মাখা গরম মুড়ি ধানি লঙ্কা যোগে ভোগের ব্যবস্থা দিয়ে, হলঘরের মেঝেয় মাদুর পেতে, স্থূলাঙ্গী নেত্তকালী হাত-পা মেলে চিত হয়ে-Beg your pardon, I mean, ছাতমুখী হয়ে ঘুমুচ্ছিলেন। সকলে হেসে উঠল, “ভারি সামলেছ, দাদামশাই!” রমাপতিবাবু শিবুর জ্যাঠতুতো ভাই, পাঁচ-সাত বছরের বড়। ফাসিতে পণ্ডিত, মুর্শিদাবাদের নবাব-সরকারে চাকরি করেন। তাদেরই কাজে কয়েক দিনের জন্য কলকাতায় এসেছিলেন—বাড়িতে শিবুর কাছেই ছিলেন। খুব আমুদে মজলিসি পােক, হাসি তামাসা নিয়েই থাকেন। ফার্সি-পড়া লােক, গল্পের গুদোম। তার কাছে গল্প শোনবার জন্যে সকল আড়া থেকেই তার ডাক পড়ত। খােসপােষাকি সুপুরুষ, হাসিমুখতার কাছে ছােট ছেলে মেয়েদের সংকোচ ছিল না, তিনিও সকলকে ভালবাসতেন। পথে ঘাটে ছেলেপুলে দেখলে কোলে তুলে নিতেন, কেউ ভয় পেত না। এমন ভাবে এমন সুরে সুমিষ্ট কথা কইতেন যেন কত সুপরিচিত। তাকে দেখতে পেলে ছেলেরা মায়ের হাত ছেড়ে ছুটে আসত, এই তার পরিচয়। বেলা তখন তিনটে হবে—মেয়েদের সেটা নিশ্চিন্ত সময়—দু-তিন ঘণ্টা ছুটি। রমাপতিবাবু বারবাড়িতে শুয়ে শুয়ে আলিফ লায়লা'—অর্থাৎ আর নমস্কারী ১৪ উপন্যাস পড়ছিলেন। ওপাড়ার কর্তাদের আডডা থেকে রসময় এসে বললেন, ‘এই যে জেগে আছেন—ভালই হয়েছে। রমাপতিবাবু বললেন, যারা চাকরি করে তাদের ও বদঅভ্যেস পােয় না। রােগ না দয়া করলে দিনে ঘুম চলে না, দাদা। কেন বলুন দিকি- ব্যাপার কি ? সময় সুর বললেন, ‘নবীনবাবু (জমিদার) আজ আড্ডায় এসে হাজির, বললেন, এমন বাদলার দিনটে ঘুমিয়ে মাটি করব না, তাই চলে এলুম; খানসামা নফরাকে বলে এলুম—এক ধামা গরম মুড়ি আর মিঠে হাজারি গাছের গােটা দশেক নারকোলের ‘কুয়াে’ নিয়ে আসতে। আর আমাকে বললেন, চট করে রমাপতিকে ডেকে আন, মুড়ির সঙ্গে গল্পের মজলিস জমবে ভালো। ‘নারকোল আবার কুরে আনতে বললেন কেন?” ‘কর্তাদের দাতের দমক আছে কি? দাত থাকলে মাতব্বরদের মানায় না। ‘তা বটে, ওটা ভগবানের দয়া। ফোকলা না হলে কর্তা হয়ে সুখ নেই। ফকরটা ফস ফস করে বেরিয়ে আসে-ফাকি, ফন্দি, ফাড়া সহজেই বেরবার ফাক পায়, ফাসাদ ফুরােয় না, গ্রাম সায়েস্তা থাকে। আমারও ঢিলে মারছে দাদা, বড় জোর আর পাঁচ-সাত বছর। বসময় বললেন, না এখনাে ঢের দেরি। এখন উইন, সকলেই আপনার জন্যে উদগ্রীব। ‘এই যে, কাপড়টা ছেড়েই যাচ্ছি। খবর দিনগে, মিনিট পনেরাের মধ্যেই :হাজির হব। রসময় চলে গেলেন, রমাপতিও উঠলেন। শ্ৰীমতী আকস্মিক বললেন, “দাদামশাই তুমি বড় শা-খরচে দেখছি ওকথার পর রমাপতি বাবু উঠবেন না তো কি ঘুমুতে যাবেন ! আমরা ওটুকু বুঝতে পারি, অত কষ্ট পাবার দরকার নেই।” থ্য, ইউ দিদি, এই দয়াকেই দরদ বলে। আমার কষ্টটা সইতে পারছ না-লাগছে!

নমস্কারী ০০০ আকস্মিক। “আহা আমার ভারি বয়ে গেছে । তাই বলাে-বাঁচালে। আমি বলি আমার কষ্ট দেখে “থামাে থামাে, ভারি গরজ কিনা।” আমি ত তাই জানতুম ভাই, রাগ কোরো না-ভুল হয়েছে। --‘রমাপতিও উঠলেন’ বলে ফেলেছি বটে ওটা অভ্যাস দোষ, বঙ্কিম বাবুরও ছিল—সেখজী তুমি বড় ঘামছ’ বলার পর দয়াময়ী, ঘিলা যে বাতাস করতে চায় সেটা কি আর তােমাদের বুঝতে বাকি থাকে। তবুও তিনি বাতাসের কথাটা লিখে ফেলেন। তােমাদের মত সূক্ষ্ম সমঝদার তখন ছিল বােধ হয় বিষুব। তুমি যা বলছিলে এখন বলল ত—কেবল হাবড়হাটি। হা—এই যে ভাই,আকস্মিকা হোঁচট খাওয়ালে কিনা, যাক- রমাপতি ছিলেন বাবু-লোক, একটু ছিমছাম না হয়ে বেরুতে পারেন না— সাজ বদলাতে গেলেন। দিনটা ঝাপসা তাে ছিলই, বাড়ি ঢুকতে অন্ধকার ঠেকল। হলঘরের মধ্যে দিয়েই যেতে হয়—ঢুকে পড়ে অভ্যাস মত সট নিজের ঘরে গিয়ে উপস্থিত। নেকালীর নাক ডাকার কথাটা আর তােমাদের কাছে বলব না। সেইটাই তাকে সাইরেনের মত সাবধান না করলে বিপদ ঘটত, ‘তুলতুল’ ঘুমােয়নি-চিনতে পারলে ছাড়ত না। রমাপতি কাপড়-কামিজ বদলাতে বদলাতে ভাবতে লাগলেন, তাই তাে বউমা ওঘরে ঘুমুচ্ছেন, রসময়কে ১৫ মিনিট বলেছি, কি করি। যেতে তো হবেই। কটকের ছড়িগাছটা ঠুকতে ঠুকতে, ‘তুলতুলতুলতুল কোথায় রে বাবা বলে আওয়াজ দিতেই তুলতুলের হুঙ্কারে তার মাও জেগে উঠলেন। তুলতুল হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করে এগুতেই পড়ে গেল—“আহা, আহা, এসাে’ বলে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বেরুবার মুখেই বাধা, অদূরে নিঃশব্দ মূর্তি হরপিসি দাড়িয়ে। রপতির ভূতের ভয় ছিল কিনা জানিনা, চমকে গেলেন।‘পিসি নাকি, নমস্কারী ভাল দেখতে পারছি না। এ সময়ে বেরিয়েছেন, এই সবে বেলা তিনটে যে। খবর ভাল তাে সব? ‘বিধবাদের আর ভালমন্দ কি বাবা, দিন কাটে না। রমাপতি। আপনার ওকথা শুনব কেন, আমি সব জানি। তিনবার গঙ্গাস্নান, দিনরাত পূজাহ্নিক নিয়েই কেটে যায়। কি সুন্দর অভ্যাসই করেছেন, পরমাণু চিন্তা সব চেয়ে কঠিন সাধনা,ক’জন পারে! পিসি-খুশি হলেন, বললেন, ‘ও কিছু নয়, কাশীনাথের বংশ, ওসব জন্মের সাথে পাওয়া। ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবার ত করাই উচিত, বাবা। কেউ করেন না এটি দুঃখ। পূজো থেকে উঠে ভাবলুম, সন্ধ্যে হয় বুঝি। 'সকলের খোজখবরও যে নিত্য নিত্য নিতে হয়, কে কেমন আছে, কার কি দরকার- সেবাটাও যে বড় ধর্ম বাবা,তিনি (স্বামী) বলে গেছেন- রমপতি। যে ক’দিন থাকেন গ্রামের মঙ্গল,-দেখে সব শিখুক। পিসি। ছাই শিখবে, কেবল ঘুমােননা আর পান খাওয়া। কোথাও বেরুচ্ছ নাকি ? রমাপতি। কারা ডেকে পাঠিয়েছেন পিসি। কিন্তু তুলতুল যে পেয়ে বসল। পিসির কোলে যাবি তুলতুল ? তুলতুল বুঝুক না বুঝুক, আঁকড়ে বুইল। = হঠাৎ মশ, মশ, করে জুতাের শব্দ। কে আবার বলে পিসি আবক্ষ- ঘােমটা টেনে পাশ কাটিয়ে দাড়াতেই-কাকে দেখে ঘােমটা দিচ্ছ পিসি বলতে বলতে শিবুর প্রবেশ !-দেখে ঘােমটা দিতে হয় এমন কেউ বেঁচে আছেন নাকি ? ‘ও মা শিবু। ষাট ষাটু-বেঁচে থাকবে না কেন-এড়েদার আছি, গাঙলিদের যাদু, বয়সে ছােট হলেই বা, মানী লােককে সই করতে হয়। এসব শিখতে হয়, বাবা। কেবল খ্যাকশালি আর মুরগির ভাকর কথা পড়ে ১৭ নমস্কারী আর কি শিখবি। আমি বলি, রমাপতির দেরি দেখে জমিদার নবীন মােড়ল এলেন বুঝি। তাকে ডেকেছেন কি না। তুমি আর দেরি কোরাে না রমাপতি—যাও, যাও। শিবু তুমি তুলতুলকে নাও,ওকে ছেড়ে দাও। শিবু। আয় রে তুলতুল, তােকে একটা সুন্দর পুতুল দেব.। কেমন ডাকে! আয় (সে রমাপতির কাধে ততই মুখ গুঁজে থাকে।) দাদাকে পেয়েছে, ওকি আসবে পিসি ? ‘পুতুলটা দেখলেই আসবে। পুতুলটা শিবুর পকেটেই ছিল, পিসির সামনে শিবু বার করতে পারছিল না,-শেষ বার করতেই হল। একটা চকচকে ঝকঝকে রংবেরংয়ের মুরগি। ‘সর্বনাশ! তাের একেবারে গেলি। হিন্দু মােছলমান তফাত রইল না। জাত-জন্ম গেল, আবার দুধের বাছাটাকে এখন থেকে না—আর আসা হবে না, এসে পড়েছি, দুটো কথা কয়ে যাই- সে কি পিসিমা, টিনের একটা রং করা পুতুল বই তো নয়। ‘ঐ টিনই একদিন জ্যান্ত হয়ে—দুর্গা দুর্গা। তবে আর কি বলব, যা বলতে দাঁড়ালুম—দেখেছি বলে মুখ নষ্ট করা হবে। ভবিষ্যতে গর্ভ থেকে আরাে কত কি রত্ন বেরুবে বলে বাবুদের বউয়ের ব্যথা খাচ্ছে- হরিই জানেন। তুলতুল পুতুল দেখে হাত বাড়লে। নাও এইবার কোলে নাও। পুতুলটা হাতে দিয়ে কোলে নিতেই সেটার পেটে চাপ পড়ায়—“কু কু কু ডেকে উঠল! পিসি কানে আঙুল দিয়ে পাঁচ পা সরে দাড়ালেন-ছোয়া-ছুই হয়। রমাপতিকে চলে যেতে ইশারা করলেন। রমাপতি বাঁচলেন, চিন্তিতভাবে চলে গেলেন। কুশােভা গোঁজ গোজ করছিল, বললে, “সেকেলে অভব্য গ্রাম্য কথাগুলাে কি আমাদের সামনে বলতে তােমার আটকায় না?” বড় ভুল হয়েছে, দিদি। আমি কিন্তু পিসির মুখের কথাটাই বলেছি, তঁাকে করেক্ট করবার সাদ্দি বিদ্যাসাগরেরও ছিল না, ভাই। যাক সাবধান হলুম। একটু চ্যারিটেবলি শােনন, ভাই।

নমস্কাৰী ১৮ সকলে তথাস্তু বলে হাসলেন। বিষুব বললে, “তােমার কাছে বহুৎ ক্ষেমাঘেন্না নিয়েই আমরা আসি।” Very very kind of you—এতক্ষণ গল্পটায় আখড়াই চলছিল নট-নটী পর্যন্ত। এইবার পালার সূত্রপাত-ব্যতীপিত বাদ দিয়ে শােননা ত বলি— “তার মানে ? শুনতেই ত এসেছি।” তবে প্রবণু-করাে- রমাপতিকে সরিয়ে দিয়ে পিসি বললেন, ‘শিবু আজ যে বড় সকাল সকাল ফিরবে? আপিসের খবর ভালাে তাে? একটু এদিক উদিক দেখলে যে মনটা চমকে যায়, পােড়া মেয়েমানুষের যে সর্বদাই তােমাদের জন্যে চিন্তা। শিবু হেসে বললে, ভাববেন না, আপনাদের আশীর্বাদে খবর সব ভালােই। দিনটা ধোয়াটে হয়ে রয়েছে, লেখাপড়ার কাজের সুবিধে হয় না কিনা, সাহেব তাই সকলকে আর ছুটি দিলেন। ‘পােড়ারমুকোদের বাতি জুটল না বুঝি? শিবু হাসিমুখেই বললে, ‘আসল কথা—ওদের দেশের দিনগুলি প্রায় এই রকমই, সুর্যের মুখ কমই দেখতে পায়। আজ দেশের মত দিন পেয়ে আমােদ প্রমােদ, খানাপিনা করতে গেল। ‘তা—চুলােয় যাক, পরের কথায় আমাদের কাজ কি। নিজের ঘর ঠিক থাকলেই হল। যায় না ক্ষ্যান যায়—কার পােষ মাস কারুর সর্বনাশ যেন লেগেই আছে। ভাবলুম নেত্তর সঙ্গে দুটো কথা কয়ে আসি,-আহা বউ-মানুষ বেরুতে পারে না ! কি কুক্ষণেই পা বাড়িয়েছিলুম বাছা, এতটা বয়সে যা দেখিনি তাই আজ দেখতে হ’ল। বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছি—ছি ছি, চোখ দুটো অন্ধ হ'লেই ছিল ভালো। ‘কেন পিসিমা কি হল ? ‘আর কি হ’ল। বড় ঘরের মেয়ে, কিছু তা রাখে না, তা বলে ধৰ্ম্ম তাে রেহাই দেবে না। ৫ নমস্কারী ‘কি হয়েছে পিসিমা, আমি তাে কিছু বুঝতে পারছি না, এখন তাে বাড়ি ঢুকিনি কোনাে কথাই তাে হয়নি। একটু আস্তে কথা কও, আমাকে যে সব দিক দেখতে হয়। বলে, দ্যালেরও কান আছে। ভাগ্যে আর কেউ না এসে আমি এসে পড়েছিলুম। আমার দেখাও যা, গাছপাথরের দেখাও তাই। ওপাড়ার মণি গিন্নি এলে আজ কি হত বল দিকি ? শিবু একদম থ। পিসি ছিলেন গ্রামের গেজেট, মন্দানা গলা। সেকেলে কবি গাইয়েদের দোয়ার হার মানত। শিবুর গলা সেখানে তলায় পড়ে থাকে, কথা ভোতা মেরে যায়। তবু বললে, কথাটা কি বলােই না পিসিমা। আমাকে যে ভাবিয়ে তুললে। ‘ভাবনার তাে কথাই—বলতে যে আমার গা শিউরে ওঠে, শিবু। আমার জঙ্গলের শরীর, জগবন্ধু দর্শনে গিয়েছিলুম, তাও গঙ্গাজল নিয়ে। শিবুদা আর পারছিলেন না-বিরক্তি আর ক্লান্তি আসছিল। শেষ বললেন, ‘তবে থাক, পিসিমা। যা বলতে আপনাকে শিউরুতে হয়, পাপ স্পর্শ করে, এমন কাজ আমি আপনাকে করাব কেন? আমাদের যা হয় হবে, তা বরং সইতে পারব। সে কি শিবু, আমি কি তােদের পর? তাই ভাবিস বুঝি! আমার অদেষ্ট রে, ভালাে ভেবে এলে মন্দ হয়ে দাড়ায়। নেত্বকে দেখতে এসে দোরে না মাথা গলাতেই যা দেখলুম তা বাপের জন্মে দেখিনি; মাথায় যে কে বাড়ি মারলে, মাথা ঘুরে গেল আর এগুইনি। নেত্ত বুঝি বড়-ঘরে মাদুর পেতে ছেলে নিয়ে শুয়েছিল। কে একজন লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ঘরে ঢুকতেই ভয়ে তুলতুল কেঁদে উঠল। সে খপ করে ছেলেকে কোলে তুলে নিলে। কে-র্যা বলতে যাচ্ছি, দেখি রমাপতি বেরিয়ে আসছে। বললে, ‘পিসিমা নাকি, ঝাপসায় ভালাে দেখতে পাচ্ছি না, আরাে সব কি। আমার তখন বি কান আছে—যেন পাহাড় থেকে খড়ে পড়ে গেছি।

নমস্কা। ২০ ‘কেন—হঠাৎ কি হ’লপিসিমা ? : ওমা এখনাে তাের মাথায় আসেনি, তােরা হলি কি? নেত্তও খুকিটি নয়, রমাপতিও ছেলেমানুষটি নয়—তায় ভাসুর ভাদ্দরবউ সম্পর্ক! এক বিছানা থেকে ছেলেকে তুলে নেয় কি করে ? নেত্তও তাে মাদুর ছেড়ে দূরে যেতে পারতো? হি দুর ঘরে কি কাণ্ডটা হ’ল বন্ দিকি ? ভাগ্যিস আমি এসেছিলুম। বলেছি তাে—আমার দেখা শােনা আর গাছপাথরের দেখা শােনা সমীন, পশুপক্ষীটিও জানবে না। নেত্ত যেন বড়মানুযের মেয়েই আছে, তা বলে সমাজ তাকে ছাড়বে কেন, খন্মে। তো ছাড়বেই না যাক—আর কেউ তো তো দেখেনি, চেপে গেলেই হবে। কিন্তু তুমি বাবা তাকে খুব সাবধান করে দিও, আমার এই কথাটি রেখাে। আমি ভেতরে আর যাব না, গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে যাই,-মা পতিতপাবনী। বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। দু’পা গিয়ে ফিরে বলে গেলেন, ‘ভাবিসনি,-একথা লােহার সিন্দুকে রইল। ‘পিসিমার আবির্ভাবটা যেন ভৌতিক ব্যাপার, তিনি ‘চ’ নাবিয়ে গেলেন। ছিলেন সকলেরই শুভানুধ্যায়ী, সকল বাড়িতেই একবার করে টহল দেওয়া ছিল তার নিত্যকর্ম। ভারতের সকল তীর্থের পবিত্র রজ, মাদুলিরূপে ছিল তঁার হস্তগত। তার এক একটির ইতিহাসের ব্রাসে মেয়েরা থাকতেন মেয়েরা মেয়েদের ভালাে চেনেন। পিসি বেশ জানতেন, কোনো আড়াল থেকে নেত্ত সবই শুনছে। তার উদ্দেশ্যও ছিল তাই। অবন্তিকা বলে উঠলেন, “ভারি ভুল বকছ দাদামশাই, কি নজিরে বললে- মেয়েরা মেয়েদের ভালাে চেনেন ?” নিজেদের নজিরে, ভাই—আমরা পুরুষদের যে- “না, আমরা তােমাদের চেয়ে পুরুষদের ভালাে চিনি।” উেরী গ্ল্যাড, দিদি, কবে থেকে? নিমন্ত্রণ পত্ৰ পাইনি তাে- তা না হলে বুঝি ! নমস্কারী বিষুব বললেন, “ও কথা পরে হবে অবন্তি, এখন গল্পটা একটু ইন্টারো স্টং ঠেকছে, শােনাই ভালাে।” খুব সামলে নিলে দিদি। (বিষুব হাসলেন।) শিবুদা প্রমাদ গুনলেন। পিসিমার আশ্বাসবাণীগুলো যে উলটো পথে চলে এবং সুবিধা বুঝে বেঁকেও চলে তা তিনি বিশেষ জানতেন। পিসি আবার দলপতিদের সম্মানিত এজেন্টও। শিবুদা শিউরে উঠলেন। তাকেও তারা সেই বলিষ্ঠ দলের মেম্বার করে নিয়েছেন। তারা এমন একটা-ধৰ্ম্মসংশ্লিষ্ট অকস্মাৎলব্ধ ঘটনা কারাে খাতিরে খােয়াতে পারেন না—সেটাও জানেন। পিসির সাক্ষ্য যে ফাইন্যাল তাও তার অবিদিত ছিল না। এতগুলি জানার দুর্ভাবনা তাকে অকুলে ফেলে দিলে। তিনি মূঢ়ের মত দাড়িয়ে রইলেন। নেত্তকালী দোরের পাশেই গা-ঢাকা ছিলেন ও সব কথাই শুনেছিলেন। তিনি বেরিয়ে এসে স্বামীর হাতটা খপ করে ধরে বললেন, আমি সব কথাই শুনেছি।-কি-হয়েছে কি ? অমন করে দাড়িয়ে রইলে যে বড়! এসাে, হাতমুখ ধুয়ে কিছু খাবে চল। কোন্ সকালে বেরিয়েছ,-আজ তাে আর আপিসে কিছু খাওয়া হয়নি,এসো। শিবুর মুখে কেবল একটু ম্লান হাসির রেখা না ফুটতেই মিলিয়ে গেল। নেকালী বলে চলল, ‘মিছে কুচ্ছ কুড়িয়ে আর কুচ্ছ বানিয়ে বেড়ানােই ওঁদের কাজ,-তা তো সবাই জান। ওঁর ওইতেই সুখ, এইতেই আনন্দ। বালবিধবা পিসির আর কোন সুখ আছে? ওঁকে সুখী করাও তাে আমাদের কাজ। উনি যাতে সুখী হন তাই করুন। এখন এসে। শিবনাথ নেওকালীর জন্যে আকাশ পাতাল ভাবছিলেন। তারই মুখে এমন অভাবনীয় মিষ্ট মুষ্টিযােগ শুনে বল পেলেন, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘নে, সত্যিই বড় খিদে পেয়েছে—চলাে। নেত্ত ঈষং সুরফের টেনে বললে, ‘এক ঘটি পবিত্র গঙ্গাজকেতেষ্ট। নয়তাে ?

নমস্কার উভয়েই হাসিমুখে ঘরে ঢুকলেন। হিল্লোলিনী হেসে হাততালি দিলে, “ব্র্যাভাে নেওকালী । চাকুরেদের প্রত্যুষে ওঠাই অভ্যাস। শিবুদা অভ্যাস মত দাঁতন করতে করতে বারবাড়িক্তে পায়চারি করছিলেন। বেকারের বেলা সাতটার আগে শয্যাত্যাগটা করেন না, আবশ্যকও হয় না। মহা চিন্তাকুল ভাবে আজ সহসা নিয়মভঙ্গ! হরিশ খুড়ে এসেই ‘শিবু কেমন আছ বাবা, শুনলুম কাল তিনটে না বাজতেই বাড়ি ফিরেছ ; মনটা খারাপ হয়ে গেল,—অসুখ বিসুখ নয় তো? -পিঠে পিঠে রাসুজ্যাঠা, আশুখুড়ো, অর্থাৎ সহানুভূতিশীল জ্ঞাতিরা উপস্থিত হলেন। গ্রামে থাকার সুখই এই, শহরে কে কার খবর নেয় ? আশু খুড়াে বললেন, ‘যা বাঁচলুম-বর্ষাকাল, একটুতেই শরীর বেগড়ায় কিনা, তাই শুধু সন্দেহ কেন, চিন্তাও হয়েছিল,-অমন অসময়ে তাে আস না। শিবু বললে, ‘কাল দিনটে মেঘ করে ঝাপসা হয়ে থাকায় সাহেবরা ছুটি দিয়ে গেলেন, তাই সকাল সকাল আসা ঘটেছিল। রাসুজ্যাঠা বললেন, তুমি ভালো আছ ব্য, তাহলেই হ’লতবে পিসি নাকি কি একটা—সে অমন কথা বলে কেন ? তাতে আমাদের বংশের যে- তিনি আমার গুরুজন, তার কথায় তো আমি প্রতিবাদ করতে যাব না জ্যাঠামশাই,-ক'রে ফলও নেই—তা সকলেই জানেন। সে কি কথা! তা হলে তার পরিণাম তত জান। সমাজে থাকতে হলে বৌমাকে যে আপনারা আছেন, শাস্ত্রও আছে, আমি তাে ও দুইয়ের বাইরে নই। এখন আমি স্নানে যাই, ছুটির এই সুখ, সকাল সকাল গিয়ে দু’দিনের কাজ মেটাতে হবে। হ্যা যাবে বইকি, বাবা, সেটা আগে। যাক, নিশ্চিন্ত হলুম, তুমি তো মক্কায়ী বংশের যােগ্য কথাই বলেছ, প্রাণ জুড়িয়ে দিয়েছ, দীর্ঘজীবী হও। পুরুষ বাচ্ছা-আমরা রয়েছি, ভেবে না ; সদ্বংশের মেয়ের অভাব হবে না। আশীৰ্বাদ করতে করতে ও দুষ্প্রাপ্য আশ্বাস দিতে দিতে সব চলে গেলেন। শিবুদাও গঙ্গাস্নানে গেলেন। যাবার পথে শুভানুধ্যায়ীদের অজ অভাব ছিল , তিনি সকলের সন্তোষ বিধান করে এসে আহারান্তে কুটীর পানসিতে গিয়ে ওঠেন । তাতেও নিস্তার ছিল না, ঐ কথারই অবতারণা ও করুণামাখা ক্ষোভ। শিবুদার নির্লিপ্ত ভাব ও বন্ধুবান্ধবদের উপর নির্ভরশীলতায় তাদের আন্তরিক আনন্দ উপভােগটা কোথাও তেমন জমে নাই। বাড়িতেও বলে গিয়েছিলেন, ‘আজকে কোনাে মাসি পিসির আসতে আর বাকি থাকবে না।—সমাদরে ক্রটি হয়। তাদের অবশ্যকরণীয় প্রশ্নাদির উত্তর স্বামীর কাছে নেত্তকালী শুনেই রেখেছিলেন এবং ধীরভাবে সে অগ্নিপরীক্ষাও দিয়েছিলেন। তবে মধ্যে মধ্যে তাদের মুখে নিৰ্বাসন শাস্ত্রের সঙ্কেতের সুমধুর ইঙ্গিত যে তাকে বিচলিত করেনি এমন কথা বলা যায় না। পিসির চেপে যাবার আশ্বাসবাণী গ্রাম হতে গ্রামান্তরেও ঢালা নিমন্ত্রণ ভাবেই পৌঁচেছিল—ইতর সাধারণও বঞ্চিত হয়নি। শিবুদা কৰ্ম্মস্থল থেকে ফিরে জল খেতে বসে মেয়ে-এজলাসের সব কথা শুনলেন,-নেকালীও পেট খালি করে বাঁচলেন। শিবু বললেন, ‘ভেবােনা, ঠিক হয়ে যাবে। আমি পণ্ডিতপ্রধান কৈলেশ বাচস্পতির কাছে হয়ে এসেছি। তবে গ্রামের দলপতিদের সম্মান রক্ষার্থে আমাদের ও তােমার দাদার কিছু করতেই হবে। জানইতো চিল পড়লে, ঝুটো হলেও কুটো নিয়ে ওড়ে। সেটা তার মেকি মান বজায়ের আনন্দ মাত্র। বিশেষ তােমার দাদাও দলপতি ও প্রতিপক্ষ, তাকে মিথ্যে কেঁদে ফেলাতেই এদের আত্ম- প্রসাদ, পরম সুখ। বুঝছ তাে । নমস্কার ২৪ নেকালী শুনে স্তম্ভিত। একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘গ্রামের দলপতিদের ঘরগড়া মিথ্যা আবদারে পরম সুখ। বেশ কথা, কিন্তু আমি ‘পরম’ চাচ্ছি না, সাধারণ সুখ দুঃখ তাে সবারই আছে, আমার সুখটা তাতে কোথায়? মিছে একটা অপরাধ মেনে নিতে হবে নাকি? তুলতুল বড়- ঠাকুরের সাড়া পেয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে দু’হাত তুলে মাদুর পেরিয়ে দাড়াতে গিয়ে, মেঝেতে পড়ে যায়, উনি কোলে করে নেন। সেটা এক বিছানা হল নাকি ? বিষুব আর সইতে পারলে না, ফোস করে উঠল, “কোয়াইট রাইট, মেয়েদের চরিত্র নিয়ে দেশময় মিছে একটা কুৎসা রটনা, আর শিববাবু স্বামী হয়ে তার সহায়ক! তা হলে তার এডুকেশনের মূল্য কোথায় ?” তা বলতে পার না ভাই, তার পার্চমেন্টে ছাপা পাকা ডকুমেন্ট রয়েছে, লােহার সিন্দুকে তার সার্টিফিকেট সযত্নে রাখা আছে,-সরকারী সেরেস্তায় কলেণ্ডারেও পাবে। বিষুব বললে, “শিক্ষা দীক্ষা সিন্দুকে বন্ধ করে টোড়া দলপতিত্বে সুখ খোজার চেয়ে—যা আমরা আর শুনতে চাই না— চটে গেলে চলবে কেন, আমি তাে আগেই বলেছি—সে এ যুগের কথা নয়, তােমরাও তাই শুনতে চেয়েছ, গল্প নয়, রূপকথা নয়, অপরূপ কথা। সেটা এ্যাংলাে-ভার্নাকুলার যুগান্তরের দিন, কিন্তু সমাজের সামনে সে শিক্ষার মাথা তােলবার শক্তি তখনো আসেনি। “বেশ, এখন তােমার শিবুদা নেত্তকালীর কথাটার কি জবাব দিলেন শুনে রাখি।” শিবু বললে, ‘নেত্ত, সে কথা শুনবে কে? পিসির কথা আর পার্লামেন্টের রায় যে সমকক্ষ। তােমার দাদাও তো একজন দলপতি, জবাবটা তাঁর কাছেই শুনাে। আমার আজ সময় নেই, আমি এখানকার আমাদের সমাজের পবিত্র যজ্ঞিডুমুরের কাঠগড়ায় হাজির হতে চললুম।” চলে গেলেন।

২৫ নমস্কারী দলপতিদের মজলিস সরগরম। যারা কখনাে কদাচ আসেন তারাও এসেছেন। মামলা সঙ্গীন, সকলেই শিবুর প্রতীক্ষায় উগ্রীব ছিলেন। শিবুদা গরম কোট গায়ে দিয়ে, পান চিবুতে চিবুতে হাসিমুখে ‘এতদিনে সম্বন্ধীকে বাগে পাওয়া গিয়েছে’ বলতে বলতে উপস্থিত। ‘এই যে, এসাে এসো ভায়া, আমরা তােমারি প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে ছিলুম। বিষয়টা যেমন জটিল তেমনি অপ্রত্যাশিত কিনা। সব খুলে বলো তাে। বুঝে বিচার চলে না। শিবুদা হাসিমুখেই বলিলেন, ‘যদি একটা সুযােগ পাওয়া যাচ্ছে, সেটাকে ঘেঁটে এলিয়ে ফেলে হালকা করা কেন? কথায় তো দোষ মিটবে না, কেবল সময় নষ্ট হবে। দোষ মেটাতে তাে আসা নয়, দোষ সাব্যস্ত করবার জন্যেই তত আমরা উপস্থিত।.. আমিও তাে দলছাড়া নই, আপনাদেরই একজন। দোষ যখন ধরে নেওয়া হয়েছে তখন আর বিচার কিসের। এখন সার কথাই আসল কথা। সম্বন্ধী কালীকিঙ্কর আমাদের বিরুদ্ধে দলপতি, সেই.. একাতলা যখন পড়েছে-কান টানলে মাথাও আসে, তার ভগ্নীও আসতে বাধ্য-না এসে পারে না। দোষ যখন স্থিরই করে ফেলা হয়েছে তখন তো আমাদের কাজ মিটেই গেছে, বাকি যা তার জন্যে শাস্ত্র রয়েছেন শাস্ত্রজ্ঞ রয়েছেন—তা সে জমিদারপুত্রের যতই খরচ হােক। গরিব নয় যে দয়ামায়ার , দরকার। আমি খুশি—প্রতিপক্ষ দলপতিকে কায়দায় পাওয়া গেছে বলে আর গ্রামের গৌরব বৃদ্ধি হবে বলে। এখন যা হলে ভালো হয় আপনারা ভাবুন বা করুন। আমার আর কেবল একটিমাত্র প্রার্থনা আছে—আমাদের গ্রামের ন্যায়পরতায় কেউ না দোষ দিতে পারেন। শিবুদা নীরব হলেন। তার কথা এতক্ষণ মাতব্বরেরা অবাক হয়ে শুনছিলেন,—বিস্ময়েরও অন্ত ছিল না। একি হল! তারা ইতিপূর্বে বহুৎ সলাপরামর্শ,বহু াওপ্যাচ ভেবে ও ভেঁজে মনে মনে সব উৎফুল্ল ও উন্মুখ ছিলেন,-শিবু কিন্তু সেদিক মাড়ালে না, দলের একজন বিশিষ্ট শুভকামী হয়ে পড়ল। সব মাটি, ব্যাপারটা বেশ করে ঘটা হল না। তাই শিবুর কথা নমস্কারী শুনে কেউই আশানুরূপ সুখ পেলেন না; মনমরার মত দু'একজন দুএকটি কথা মাত্র কইতে চেষ্টা করলেন—“হ্যা, একে বলে আপন লােক, নিজের গ্রামের মর্যাদা রক্ষার দিকে দৃষ্টি ষােলআনা, তবে কেউ বললেন—তা বলতেই হবে, তবে একজন বললেন, ‘শাস্ত্রে যা যা বলে, তা খুঁটিয়ে করতে পারলে বটে— ভেতর দিকের জানালার আড়াল থেকে চাপা গলায় একজন স্মরণ করিয়ে দিলেন, “দোষীর আস্পর্ধা তাে রয়েই গেল, তার কি করছ ? শিবুদা বলিলেন, ‘তাও হবে পিসিমা, ক্ষুন্ন হবেন না' ‘না তাই বলছি, কারাে ওপর অবিচারটা না হয়। দশরথের ব্যাটা- রামই তার নজির রেখে গেছেন কিনা। রামের চেয়ে তো শাস্ত্র বড় নয়- এতক্ষণে পণ্ডিতদের ধড়ে যেন প্রাণ এল। সব চাঙ্গা হয়ে নত টানলেন। মতি শিরােমণি বললেন, 'আমরা তাে শিবুকে গ্রামের রাম বলেই দেখি, তুমি ভেবাে না পিসি ইত্যাদি অভয়বাণী অনেকেই উচ্চারণ করলেন। শিবুদা হাসতে হাসতে বললে, এটা আমাদের দল, এবং তার সম্মানরক্ষার্থে যা যা দরকার সবই করতে হবে। আমি বয়ঃকনিষ্ঠ তাই আপনাদের মুখ থেকে উচ্চারণের অপেক্ষা করছিলুম। সুখ্যাতি বড়দেরই প্রাপ্য, তাতে আমি হস্তক্ষেপ করতে পারি কি ? ধন্য ধন্য পড়ে গেল, বেঁচে থাক, বাবা! ইতর ভদ্র অনেকেই কর্তাদের বিচার শুনতে বাইরে জড় হয়েছিল। বৃদ্ধ ছি-জেলে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে ফেলে, ‘চল চল—একি মানুষের গাঁ? ঘরের বৌ ঝি নিয়ে খেলা ভেতর থেকে দু-একজন মাতব্বর বলে উঠলেন, কে ? কেও ? কে বললে দ্যাখ, তাে রে! দীপালী দপ করে জ্বলে উঠলেন, বললেন, “ঐ ছােট লােকেরাই ভরসা। ভদ্র ছিলেন কেবল ভণ্ডামি করতে-তােমরা যে বড় চুপ করে রইলে সব?”

২৭ নমস্কারী বিষুব বললেন, “এর পর দাদামশায়ের সঙ্গে বােঝাপড়া হবে।” সেই ভালাে ভাই, আগে কথাটা শেষ করতে দাও। এমন সময় বাহিরে বহু কণ্ঠে আওয়াজ দিলে, ‘ওপাড়ায় কোথায় আগুন লেগেছে,—উঃ উঃ কি অলছে, ইস্! শুনতে পেয়েই কে একজন এসাে এসাে বলতে বলতে খালি পায়েই ছুটে বেরিয়ে গেলেন। ‘শিববাবু না? চল চল, ভাই সব। ছােটো- লােকেরা তার সঙ্গ নিলে। ছুটল। কর্তারা তামাকের হুকুম করেছিলেন,—অপেক্ষায় রইলেন। একজন বললেন, ‘কার বাড়ি হে—সেটা আগে দ্যাখাে—ছোটোলােক ব্যাটাদেরই হবে। পিসি ছুটলেন—“আমার বুধির গলায় যে দড়ি বাঁধা গাে! কালই যে নতুন দড়ি গাছটা কেনা হয়েছে। কর্তারা তামাক টেনে যখন ‘অগ্নিদেবতা,—আমরা গিয়ে আর কি করবাে, ব’লে জুতাে খুজে পাচ্ছেন না, পা ঘষছেন, শিবুদ। তখন ছোটো-লােকদের সাহায্যে, জল-কাদা মাখা অবস্থায় আগুন নিবিয়ে ফিরছেন। আগুন নিবলে দেখি, কেবল শিয়ােমণির বাইরের চণ্ডীমণ্ডপখানিই গিয়েছে। অশক্ত বৃদ্ধ রাজকৃষ্ট দাদামশাই হতভম্বের মত আসরের এক কোণে বসে- ছিলেন। পিসিকে ত সকলেই চিননে,--অসম্বিতে তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল এই আরম্ভ হল। মিটিং আপনিই এ্যাড়জোড়, হয়ে গেল। মুলতুবি আসর আর তেমন জমে না। বিশেষ বিশেষ উৎসাহীরা এসে ফিরে যান। বাড়িতে আগুন লাগা পর্যন্ত শিরােমণির মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। গৃহিণী কথা কন না—একটা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বউমানুষের লাঞ্ছনা-ফের যদি ওখানে যাও, ইত্যাদি।

নমস্কারী ২৮ ‘পিসির না সংসার না স্বামী না পুত্র, তার ভাবম-নতুন দড়ি গাছটার, —আর তােমরা বুদ্ধির টেকি আছ- ‘প্রতাপ পণ্ডিত মধু জ্যাঠা প্রভৃতি চাইয়ের এত বড় ‘কে’ ছেড়ে দিতে পারেন না, এমন সুবিধা ভাগ্যে মেলে। শেষে কি সমাজটাকে ডুবুতে হবে ? হিদুর বাড়ি, শিবুর স্ত্রীর হাতে জল খেতে হবে নাকি ? শিবুদা এসে বললেন, আপনারা কি করবেন সত্বর করুন, পাঁচ ছ দিন হয়ে গেল, আমিতাে আর এক সঙ্গে থাকতে পারি না। আমি কাল না-হয় পরশু ওকে ওর বাপের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি গে—তারপর মধু-খুড়ো বললেন, তারপর তােমাকে ভাবতে হবে না, খাসা আভাঙা কুলীনের মেয়ে এনে দেব। ‘সে কথা থাক জ্যাঠামশাই, আর পাপ বাড়ানো কেন? শরও একটা কিছু দোষ পেতে কতক্ষণ। ‘আরে পাগল ছেলে, ওকি একটা কথা হ'ল। থাক, এখন যা করতে যাচ্ছ করে ফেলে। পরের কথা পরে আছে, বুঝলে! উমাচরণ বললেন, ‘সকল দিক বজায় রাখাই সমাজকর্তাদের কাজ। শুধু ছেড়ে দিলেই তাে হ’ল না, অপরাধীর ভালােটাও দেখা চাই—তবে না মহত্ত্ব। প্রায়শ্চিত্ত না করলে তার দেহশুদ্ধি হবে না, হাতের জল দেবতা ব্রাহ্মণে নেবে না তা সে যেখানেই থাক। তার নিজেরও তত ধৰ্মকৰ্ম্ম আছে-কি নিয়ে সে থাকবে, সেটাও তো দেখতে হয়। প্রায়শ্চিত্তটা বিধিমত করানাে চাই আর ব্রাহ্মণের মুখ দিয়েই দেবতারা খান। সম্বন্ধীর কিছু খসলে তুমিও তাে খুসি বলছিলে। কালীকিঙ্কর অজ্ঞানও নয়, অক্ষমও নয়। সবদিক বজায় হবে। শিবুদা বললেন, ‘আমিও তাে আপনাদের একজন, 'তাই সকলেরই ভালো যাতে হয় সেইটি খুজছিলুম। এই কালকের কথা, জগন্নাথঘাটে কৈলেশ বাচস্পতি মশার সঙ্গে দেখা। কারাে কাছে সব শুনে থাকবেন। বললেন ‘এসব বিধান দিচ্ছেন কে-বউমার যদি অপরাধই হয়ে থাকে, তা এক অপরাধে দুই সাজা কি রকম ? মল্লর বাড়া গাল নেই—যদি নির্বাসনই হ'ল ২৯ নমস্কারী তাে আবার প্রায়শ্চিত্ত কিসের—দরকারই বা কি? সে জন্যে অন্যের এত মাথাব্যথাই ধরে কেন ? ও করতে তো মানা নেই, ইচ্ছা হয় প্রায়শ্চিত্ত তিনি করতে পারেন কিন্তু মহাপাপটা তুমি যেন কোরাে না, শিবু। বলতে বলতে নৌকায় গিয়ে উঠলেন— বিপুলকায় হরকুমার বললেন, ‘ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও-বারাসাতের লােক, পতিতােদ্ধারিণী গঙ্গার দেশের লােকের কথা কি বুঝবে? পূৰ্ব্ব-পুরুষ প্রচলিত প্রথাই প্রবল। টিকিনাড়া শাস্ত্র সেখানে ট্যাকে না। ছিনাত ভায়া তো ‘জেলার’—স্বয়ং উপস্থিত। একটা বেগুন চুরিতেও চোরকে পাঁচ রকম সাজা ভােগ করতে হয়। কম্বলের জামা পরো, জাতা পেসাে, ঘানি ঘােরাও, আর বেত-খাওয়ও আছে। একটা সাজা হল নাকি? যত বাজে কথা। তুমি ভড়কে যেও না শিবু, কর্তব্য করা চাই। তার ভগ্নীর ভালো কালীকিঙ্কর দেখবে, তােমার কাজ তুমি করােগে। শিবুদা বললেন, “লে সম্বন্ধে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। বিষুব বলে উঠল, “স্বামী বটে ! মুখপোড়ারা বে করে মরে কেন?” সমাজ, সংসার, বংশরক্ষা যে ধর্মকর্মের মধ্যে, ভাই- শিবুদা ইতিমধ্যে সম্বন্ধী কালীকিঙ্কর বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে সকল কথা জানাতে গিয়ে বুঝলেন, তিনি সবই শুনেছেন।-হেসে বললেন, ‘ভয় পেয়েছ নাকি? কিছু ভেবােনা, অল্প দিনেই সব মিটে যাবে। তুমি নেত্তকে কালই এখানে রেখে যাও,—নির্বাসনে থাক হে!’ বলে আবার হাসলেন। ‘পূজোটার পরই আমার গােয় যাবার কথা আছে। তুমি মাতব্বরদের বলে দিও, নেত্তর কাশীতে থাকবার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। কয়েকদিন পরে বাড়িতে সাবিত্রী-চতুর্দশীর ব্রত উদযাপন আছে, নেত্তকে তাে সেই আসতেই হবে, না হয় দু দিন আগেই এল। যখন স্বীকার করেই নিয়েছ, আমাকে তাে ঘটার ভােজ দিতেই হবে—সেইটে হবে প্রায়শ্চিত্তের ভোজ হে! ওরা তাে সেইটেই চায়। তুমি কিন্তু নেত্তকে সব কথা বুঝিয়ে এনেগুঢ় কথাগুলো বাদ দিয়ে। বাকি যা তা আমার ওপর ছেড়ে দাও।”

নমস্কারী আরাে অনেক কথা হয়। শিববাবু সম্বন্ধীকে চিনতেন। সব কথা নেওয়ার ভার তাকে দিয়ে নিশ্চন্ত হয়ে ফিরলেন। নিজেও নেত্তকে যথাসম্ভব সব বুঝিয়ে এবং ব্ৰত-উদ্যাপনের কথাটি বিশেষ করে গােন রাখতে বলে পরদিন তাকে বাপের বাড়ি ত্যাগ করে এলেন। গ্রামে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। পিসির মত গঙ্গাজলের শরীর যাদের তেমন দু'চারটি ধাৰ্ম্মিকা ছাড়া মেয়ে- মহলে ক্ষোভের ও শিবুর প্রতি ধিক্কারের সীমা রইল না। পােড়ারমুকে বয়ারদের কথা তাে জানাই আছে, শিবুও সেই দলে ভিড়ল—সব সমান গাে? পােড়া কপাল। ইত্যাদি। - পাঁচজন নামজাদা পণ্ডিতের সাহায্যে নেও কালীর প্রায়শ্চিত্ত শাস্ত্রমত সমাধা হয়ে গেছে, এ সংবাদ সকলে পেয়েছেন।‘ভােজ এই বৃহস্পতিবার, সেন্স তত পরশু। সাড়াশব্দ নাই কেন,ইতস্তুত আছে নাকি? অনেকদিন পরে তাই আজ মজলিসে অনেকেই উপস্থিত, মতি শিরােমণিও এসেছেন। অতিকায় হরকুমার বক্তার আসন নিয়েছেন। রুক্ষ প্রকৃতি ও রুদ্র মূর্তির জন্য গ্রামে তিনি দুর্বাসা নামেই পরিচিত। বলছিলেন, “ব্রাহ্মণ হয়ে তারা কি জানে না-ব্রাহ্মণভােজন ও ব্রাহ্মণকে দক্ষিণদান ভিন্ন কাৰ্য্য মাত্রই নিষ্ফল ; ও প্রায়শ্চিত্ত সর্বথা অগ্রাহ ঠিক এই সময় সহ-শিবনাথ কালীকিঙ্করবাবু বিনীতভাবে করজোড়ে নমস্কার করতে করতে ঢুকলেন। সকলে চমকে গিয়েছিলেন; শ্রীনাথবাবু দাড়িয়ে উঠে বললেন, “এসাে এসাে, ভায়া, এসাে কষ্ট করে নিজেও বেরিয়েছ, ব্যাপার কি?” কালীকির বাবুও সবিস্ময়ে বললেন, ‘ব্যাপার কি? এর চেয়ে বিপদ ভদ্রঘরের আর কি হতে পারে দাদা, এখন আপনারা দয়া করে উদ্ধার করে দিন। আসল কাজ আপনাদের আশীর্বাদে শেষ হলেও দেবতারা এখনও নমস্কারী অভুক্ত, ব্ৰাহ্মণভােজন ভিন্ন সবই নিস্ফল। তাই আপনাদের অনুমতি প্রার্থনা করতে এসেছি। অপরাধিনীর দেহশুদ্ধিকল্পে দয়া করুন! দুর্বাসা উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, কিন্তু বামাল তাে আজো ঘরে পুষছ ! সে বাড়িতে ‘চাটুজ্জে মশাই, আমি এত বড় ভুলটা করতে পারি কি? ক্ষমা করবেন, বাবা অনাবশ্যক কতকগুলাে বাড়ি করে যাওয়ায় আমরা তার উপর বিরক্ত হই, কিন্তু এখন কাজ দিলে। ‘কতদিন কাজ দেবে শুনি? মনকে চোখ ঠারা নাকি?” ‘পূজোর পরই বেরুবার ইচ্ছা আছে। আসল কথা, নেত্তকে কাশীতে রাখার ব্যবস্থা করে আসা। ‘বেরুবার ইচ্ছা আছে নয়, বেরুতে হবে। যাক—রাত্রে নিমন্ত্রণ করতে আসা কি তােমাদের নিয়ম নাকি? এ বৈঠকী নিমন্ত্রণ নেবে কে? ‘আমি সস্ত্রীক এসেছি, দাদা। কাল সকালে আপনাদের বাড়িতে গিয়ে। প্রার্থনা জানিয়ে যাব। আমি মায়েদেরও চাই, নচেৎ আমার চলবেনা, দাদা। আমার লােকবল কম, আমি গ্রামের লােকের সাহায্য নেব না, মায়েদের না পেলে কৰ্মই পণ্ড হবে। এ অনুগ্রহ করতেই হবে, আমাকে হতাশ করবেন না। তাদের সাহায্য পাব এই সাহসেই পাঁচ সাতশাে লােকের আয়ােজন করে ফেলেছি, আমি বড় বিপন্ন। আপনাদের সব করতে হবে, শুদ্ধাচারে যাতে হয়। শ্রীনাথবাবু বললেন, ‘ইস, করেছ কি ? এত লােকের আয়ােজন! আচ্ছা কাল সকালে তােমর গিয়ে তাদের রাজি করতে পার ত আমাদের আপত্তি নেই।' হরকুমার ‘এখন তােমরা কথা কও আমার কাজ আছে—চললুম’ বলে উঠে গেলেন। মধুজ্যাঠা শ্ৰনাথবাবুর দিকে চেয়ে হাসলেন-থার্ড, নাইট কিনা? (তৃতীয় পক্ষ ) ?

নমস্কারী বিষুবর দিকে চেয়ে হিল্লোলিনী কল্লোলিনী হয়ে পড়লেন, বললেন, “সেসব চিত্তিরের পুথিতে আগুন লেগে গেছে বুঝি? ভাগ্যে মনু মরেছেন- নইলে আমাদের কি হত দিদি! ঘােমটা নেই, প্রাচিত্তির নম্বর ওয়ান ; চটি পায়, নম্বর টু; পুরুষদের সঙ্গে কথা, থি-ক্রমে -ক্রমে শটকে পাচার। প্রাচিত্তিরের পদাবলীতে কেবল মহিলা-বলি ! মিনসে কোন দেশের নীরে। ছিলেন দিদি।” তরুণীরা হেসে উঠলেন। বিষুব চাপা হাসির সঙ্গে রােষের রেখা টেনে বললেন, “ব্যবস্থার চাকা মারতে হয় না, সে আপনি ঘরে। এখন শুনতে দে।” আজ সেই প্রত্যাশিত বৃহস্পতিবার। মহাসমারোহ কাণ্ড। কালীকিঙ্কর- ভবন বা জমিদারবাড়ি লােকে লোকারণ্য। জাফরানের সুগন্ধে গ্রাম ভরপুর। দুইটি দ্বিতল চকমিলন বাড়ি-পারের লােক ও গ্রামের লােকের জন্য সুন্দর ব্যবস্থায় সুসজ্জিত। কোনােরূপ ত্রুটি বা অসুবিধার সম্ভাবনা নাই। বৈঠকে পান তামাক তাস, আনন্দ কোলাহল চলছে। কালীকিঙ্কর সকলের নিকট হাতজোড় করে ঘুরছেন। —দেখবেন দাদা, আমার ভরসা আপনারাই । শ্রীনাথ বাবু অভয় দিচ্ছেন, কিছু ভেবোনা, ভাই। আমি পরিবেষণের জন্য লােক ঠিক করে রেখেছি—সকলেই কুলীন ব্রাহ্মণ, আবার ও কাজে ধুরন্ধরতােমাকে কিছু দেখতে হবে না। আর শৃঙ্খলা-রক্ষার্থে স্বয়ং হরকুমার থাকবেন। কিন্তু আমার একটি কথা রেখােচকের চারটি কোণের বড়ঘরে চার রকমের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রেখে ভালােই করেছ। পােলাও ব্যঞ্জনাদি পুরুষদের হাতে থাকবে, কেবল মিষ্টান্নের ভাড়ার যেন ভালাে জানানাে বা আত্মীয় সধবা স্ত্রীলােকের হাতে থাকে। তাদের নিষ্ঠাভক্তিই স্বতন্ত্র। কালীকিঙ্কর বিনীতভাবে বললেন, আমি ত জাদা এ গ্রামের লােক নিচ্ছি ৩৩ নমস্কারী , কি জানি কে কেমন। আপাতত আপনার বউমা সে ঘরে সব গুছিয়ে রাখছেন। ব্রাহ্মণেরা আসন নিলে আপনি যাকে বেছে দেবেন তিনিই মিষ্টান্নের ভঁড়ারে থাকবেন। ‘বেশ কথা, মিষ্টান্নদি শেষ পড়বে, আমি তার পূর্বে আমার এক শক্ত সমর্থ সর্বকর্মকুশলা বউমাকে এনে দেব। বড়ঘরের মেয়ে-ক্রিয়াকর্মের মধ্যে মানুষ হয়েছে, কিছু দেখতে হবেনা, বলতে কইতে হবে না। ‘বাঁচালেন দাদা, আমি আর ভাবি না। পায়ের ধুলে নিলেন। আর একটি কথা—মেয়েদের মর্যাদা রক্ষার্থে এক মােট কোরা শান্তিপুরে শাড়ি আনিয়ে রেখেছি, মায়েরা সকলে পছন্দমত নিয়ে পরলে আমার মনটা শান্তি পায়। অনুমতি করুন আমি একবার সেই চেষ্টা পাই। ‘ইস, তুমি এ সব করছ কি,কেন? হরকুমারের কথায়— ‘না, তা কেন দাদা। মায়েরা আমার মুখ রক্ষা করেছেন, কষ্টস্বীকার করে এসেছেন, আমারাে ভাে- ‘তারা যে অনেকগুলি- ‘ত হােক, সকলে একসঙ্গে বেরুলে কি সুন্দর দেখাবে বলুন ত! ‘তােমার যা ইচ্ছা করােগে, আমি কিন্তু হরকুমারকে ডেকে দেখাব। গণ্ডারের কি কাণ্ডজ্ঞান হবে ?'—চলে গেলেন। ‘এ আবার কি, এ সব কেন, এ সব কিসের জন্যে ইত্যাদির মধ্যে জমিদারপত্নী সে কাজ আগেই সেরে রেখেছিলেন।-সকলকেই নূতন শাড়ি পরিয়েছেন। কালীকিঙ্কর দেখে সত্যকার একটা আনন্দ অনুভব করলেন। সকলের উদ্দেশ্যে একটি নমস্কার করে মায়েদের পেয়ে আজ আমার বাড়ি পবিত্র হল বলতে বলতে চলে যাচ্ছিলেন, একজন বর্ষীয়সী থাকতে পারলেন না, বললেন, ‘তুমি রাজা হও, আমাদের প্রাণে কিন্তু আজ সুখ নেই, বাবা।

নমস্কারী ৩৪ কালীকিঙ্কর দাড়ালেন না সবি তার ইচ্ছা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। উভয় পক্ষের কথাগুলির মধ্যে সত্য ছিল। হরকুমারকে দেখিয়ে শ্রীনাথবাবু চলে যাচ্ছিলেন। হরকুমার তখন বলছেন, এ তাে কর্তব্যই ছিল। সকলেই করে থাকে আমাকে যখন ভার দিয়েছেন একবার ভাড়ারগুলাে দেখে ‘আসি ব্রাহ্মণবসাবার সময়ও হল। পরিবেশকেদর নিয়ে ভাড়ারগুলি দেখে উপদেশাদি দিতে দিতে মিষ্টান্নের ভাড়ারের সামনে মেয়েদের জটলা দেখে দু-এক ধমকও দিলেন। এখানে এত বাজে লােকের ভিড় কেন? ভিতরে একজন পট্টবস্ত্র-চেলি-পরিহিতা স্ত্রীলােক সব গুছিয়ে রাখছিলেন।—কে উনি? শুনলেন এ বাড়ির গৃহিণী।—তা’ ভালো, তবে যারা ওপার থেকে এসেছেন, তাদের ২৩ জনও যেন থাকেন ওঁকে সাহায্য করতে। এ দিকে যারা, তারা সব বাইরে থাকতে পারেন, যাতায়াতের পথ যেন খােলদা থাকে।—নিম্নকঠে, তবে যে কিঙ্কর বলেছিল, এ গ্রামের কেউ বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। • এ বাড়ির প্রথা—বিশে শুদ্ধাচারে ভাঁড়ারে থাকতে হয়, তাই কিঙ্কর-পত্নী গঙ্গাস্নানান্তে চেলি পরে এসে ভাড়ারে ঢুকে সব গুছিয়ে রাখছিলেন, নূতন লােককে অসুবিধায় না পড়তে হয়। মিষ্টান্নের ভাড়ারের কাজ শেষের দিকে। ব্রাহ্মণ বসতে আরম্ভ হয়েছে শুনে তিনি কাজ সেরে বেরিয়ে গেলেন। ঘরের বাইরে এ গ্রামের মেয়েদের জমায়েত-মধ্যে শােনা গেল, ‘ঐ সাত হাত থামের মত লােকটা কে গা? ওর পরিবার এসে থাকে তাে বলে দিতে হবে, যেন মধু-সংক্রান্তির ব্রত করায়, একেবারে কাটখােটা। সকল গ্রামেই ২৪টি পিসি থাকেন, তারা কারাে তক্কা রাখেন না, কেবল জমিদারবাড়ি ও কালীকিঙ্করের অনুরােধে চুপ করে আছেন। হরকুমারের কথাবার্তা শুনে তাদের গা জ্বলে যাচ্ছে, মুখ নিসপিস করছে। ৰাহ্মণ ভােজন আরম্ভ হয়ে গেছে ধুরন্ধর পরিবেশকরা পােলাও ব্যঞ্জনাদি নিয়ে ছুটোছুটি করছেন, পদভরে বাড়ি কাপছে।

নমস্কারী এই সময় একটি সধবা, শ্রীনাথবাবুর নির্বাচিত হরকুমার-পত্নী বিমলা, চেলি পরে এসে ভাড়ারে ঢুকলেন। এ পারের মাসি পিসিরা সকলে মুখ চাওয়া- চায়ি করলেন। অর্থাভাসও অপরিচিতা, ওপারের কোনাে শুদ্ধচারিণী হবেন। তাঁরা আঁচল গুটিয়ে গা মেরে সরে দাঁড়ালেন পাছে স্পর্শদোষ ঘটে। বিমলা সব দেখে নিয়ে পর পর সাজিয়ে এগিয়ে রাখতে লাগলেন।. মধ্যে মধ্যে সকলের সঙ্গে হাসিমুখে কথাও চলল। পিসিদের একজন বললেন, ‘কথাতে ছোঁয়া লাগবে না ত?” নবাগতা বিমলা চমকে চাইলেন, বললেন, ‘মাপ করবেন দিদি, আমরা হুকুম পালবার দাসী, কৰ্ত্তার যা বলেন করতেই হয়, আপত্তি করলেই বিপত্তি। পণ্ডিতদের শাস্ত্রে প্রাচিত্তির পােরা, দয়া করে একটা ছাড়লেই দফা রফা। তারা সকলেই যে পীরের দরগার প্যায়দা দিদি। শুনে সকলে তুষ্ট হলেন, হৃষ্ট হাসি হাসলেন।বেশ মানুষ, আলাপ করতে হবে। পরিবেশক আসছেন আর নিজেরাই মিষ্টান্নের পরাত নিয়ে যাচ্ছেন। এমন শৃঙ্খলায় সাজানাে আছে চাইতে হচ্ছেনা। —আর শেষ হয়ে এসেছে, সন্দেশটা একবার দেখানাে উচিত, এদিকেও বােধ হয় বারবেলা পড়ে একজন পরিবেশক বললেন—“আমাদের বউমাকে দেখছি এইবার সকল ক্রিয়াবাড়িতেই ভাঁড়ারে থাকতে হবে। সাজানাের এমন পারিপাট্য কোথাও পাইনি।” চলে গেলেন। গ্রামের পিসিরা কথা কইতে যাচ্ছিলেন, একজন বললেন, চুপ করে সুকো পিসি, সেই সাতহাত লম্বা শয়তান তাড়াতাড়ি একজন তার গা টিপে বললেন, চুপ চুপ, (বিমলার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে। ওঁর স্বামী যে— “সত্যি নাকি! অঙ্গদের গলায় মুক্তোর মালা—এমন মেয়ের কি অভাগ্যি।

নমস্কারী রূঢ়কণ্ঠে ‘সরে যাও, সরে যাও—একটু বিবেচনও নেই’ বলতে বলতে হরকুমার দ্রুত এসেই ভাড়ারে ঢুকে পড়লেন ও চেলি-পরিহিতার সামনে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘পান্তুয়ার পাত্রটা আমাকে দাও তাে, মা! সুকো পিসি বলে উঠলেন, ‘আহা কি মিষ্টি কথা, কান-জুড়িয়ে গেল, ভালাে করে নে নে বউ-- শুনেই বিমলা চুপসে মড়ার মত হয়ে গিয়েছিল। স্বামীর দিকে একবার তীব্র কটাক্ষে চেয়ে ‘কাকে কি বলছ বলে ধমকে উঠলেন। ‘আঁ একি—তুমি নাকি! তােমাকে তত শান্তিপুরে পরতে দেখেছি, চেলি পরা ছিল ত বাড়ির গিন্নির,-কে বুঝবে বলল, তা হয়েছে কি- অজান্তে দোরগােড়া থেকে কে বলে উঠল, ‘তা ত ঠিকই, অজান্তে বিষ খেলে অমৃত হয়, ওপারের শাস্ত্রে আছে যে। পিসিদের এখন আর কে রােকে। সুকো পিসি বললেন, সত্যিই ত হমেছে কি। এত বড় প্রাচিত্তিরের ঘটা, এরা বাজনা আনেনি গা।-বাজাতে বল, বাজাতে বল।-ঢাক আছে ত? আমি দেখছি। ব’লে ছুটলেন। দশ মিনিটের মধ্যেই বিদ্যুৎগতিতে সুকো পিসির কথাটা সর্বত্র রাষ্ট্র হয়ে যায়। থিয়েটারের আখড়া ছেড়ে যুবকের কর্মবাড়িতে ভিক্ষুকের সাজে (বােধ হয় রূপচাদ পক্ষীরই হবে) একটি গান গাইতে গাইতে উপস্থিত ‘কেঁদোবাঘ পড়েছে জালে, পাপ চারপাে হলেই আপনি ফলে। কালীকিঙ্কর বা তাড়াতাড়ি সব থামিয়ে দেন। আমার কথাটি ফুলে- • বিষুব। খুব বেঁচে গেলে দাদামশাই, না হলে ঝগড়া আজ আর থামত । গায়ের জালায় ছটফট করছিলুম। বুনাে রয়ারটার বিষ দাত ভেঙে খুশি করে দিয়েছ। এইবার এপারেও প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা চলবে ত?

৩৭ নমস্কার কালীকির জমিদারবাচ্ছা, পালটা প্রায়শ্চিত্ত না করিয়ে ছাড়তে পারে কি? যা শিবুর সার্টিফিকেটগুলােও নেপথ্যে সিন্দুক ফুড়ে সার্থক হ’ল । নেকালীও বাড়ি ফিরে পিসির পায়ের ধুলাে নিয়ে পবিত্র হ’ল। তরুণীরা মুখ ঘুরিয়ে বলে গেলেন, “কি দুল্লভ যুগই খুইয়েছি, দাদামশাই -পায়ের ধুলাে দাও,-চললুম।” আমারও পেট ফুলছিল। তামাক সাজতে বসলুম। নিতাই লাহিড়ী বহুদিনের কথা। তখন উনবিংশ শতাব্দীর ১৮৮০-র কোঠার মাঝামাঝি। বাঙালী তখন শাস্ত্রীয় দশবিধ সংস্কারকে প্রমােশন দিয়ে একাদশেই সমধিক শ্রদ্ধান্বিত। সেটি হ’ল দাসত্ব, আমিও নূতন চাকুরি স্বীকার করে তার পুণ্য আস্বাদ আরম্ভ করেছি। দক্ষিণেশ্বর থেকে নিত্যনিয়মিত কলিকাতা-যাত্রার উপায় পূর্ববর্তী মহা- জনেরা করেই রেখেছিলেন, নৌকাযােগে গঙ্গা পার হয়ে বালির খালে ঢুকে পেপার-মিলের পূর্বপ্রান্তে নামা, সেটা প্রায়ই ট্রেনের সময় থাকতে হত না। স্টেশনে গাড়ি পৌছবার বংশীধ্বনি মাত্র মিনিট দুই আগে কানে পৌছত ও প্রাণে টান দিত। তখন যার যেমন দৌড়—পায়ের জোরেই ট্রেন ধরা। মান্থলি প্যাসেঞ্জারের টিকিট কেনার বালাই ছিল না, তাই রক্ষা। হাওড়া পৌছবার কিছু পূর্বেঘামটা ও হাঁপটা থামত। সুবিধামত কামরা বাছাইয়ের দুৰ্বদ্ধির অবসর থাকত না, চাকরি বজায়ের সুবুদ্ধিই কাজ করত। প্যাসেঞ্জার-পীড়াই সৃষ্টি করা হত। কেবল একটি সদাশয় লােক আমাদের দু-একজনের জন্য স্থান রেখে নাক বাড়িয়ে প্রতীক্ষা করতেন। উল্লেখের কারণ—তার দীর্ঘ ঋজু দেহের প্রত্যঙ্গে প্রধান ছিল নাকটি। সে হাঁক দিলেও নীরব ডাকের মত কাজ করত। নাকের ০ : মমারী ইনিই আমাদের নায়ক নিতাইবাবু। তাঁর আপিসের পােশাক ছিল, রেলির ( থান) উনপঞ্চাশের ওপর চাপকান ও চাদর, পকেটে পানের ডিবে ও কানে খড়কে গোঁজা। পায়ে চীনে-বাড়ির পেটেন্টলেদার পাদুকা। সবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হাসিমুখ, আমুদে ও মজলিসী লােক, তাই মনের মতন 'লােক খোঁজেন ও বােঝেন। ভাল মাইনের ভাল চাকরিই করেন ; বলেন, “আপিসে গল্প করাই আমার বড় কাজ, নিজেও কাজ করি না অন্যের কাজেও ব্যাঘাত দিই। হিন্দু ছেলে, পূর্বজন্ম মানতে হয়, নিশ্চয়ই ব্যাটারা পূৰ্ব্বঋণ পরিশোধের সুযােগ পেয়ে বেঁচেছে। চাকরি করাচ্ছে, বােঝে না আমাদের সেটা শাপে বর। তাই ফাকি দেওয়াটা আমার পাপ বলে মনে হয় না। আবার পর- জন্মে যাতে চাকরি জোটে, ফাকি দিয়ে তার উপায় করে রাখছি ভায়া।” এইরূপ সরস আলাপ নিয়েই থাকতেন। ওদিকেও একেবারে নিঃস্ব ছিলেন না, শুনেছি সম্পন্ন। বাড়ি-বাগান, চাকর-দাসী, মাঝে মাঝে মাসি- পিসিরও আবির্ভাব ছিল। রবিবারে ও ছুটির দিনে সুসজ্জিত বৈঠক পাঁচ- জমকে নিয়ে গল্পে গুডুকে গুলজার থাকত। বলতেন, “আমার পরিবারবর্গ বলবার জো নেই ভাই, শব্দার্থে বাধে, আছেন কেবল পত্নী আর একটিমাত্র কথা সুষমা। তবে পত্নীদেবীর ব্যাস ও পরিধি ধরে ‘বর্গ’ বললে সমঝদারদের কাছে ভুল না হতেও পারে। বুঝেছ ভায়া ?” “অনেক রসিকের সঙ্গ করেছি, কিন্তু একটিকে পেয়েছি যার জোড়া আর মেলে নি। দেখা নেই, সাক্ষাৎ নেই, কাজের ‘বুক-কিপার’, কাজেতেই তার পরিচয়। পূর্বেই বলেছি, হিদুর ছেলে, জন্মটার দু পিঠই মানি। আপিসে ফাকি দিই—ফিরে চট করে চাকরি পাব ব'লে, বেশি বেগ পেতে হবে না, কর্মফল ভুগতেই হবে, তার আটকে বাধা রইল। কি বল ভায়া ? “এই দেখ না ভায়া, যা কিছু আছে আর করছি, সবই তাে কর্মভােগ, পরের জন্যে। যাবে তাে গােত্রান্তরে। ছেলে নেই, তাই এই তাে সেদিন দেখে শুনে মেয়েটিকে মনের মত সুপাত্রে দিয়েছি যথেষ্ট খরচ করে, জামাই বি. এ. পড়ছে। পত্নী ড্যাম, খুশি, আমি অফুলি কৃতার্থ, অথচ একটা পিণ্ড নমস্কারী পাবার আশা নেই। কেন নেই? সেই রসিকচূড়ামণি ‘বুক-কিপারের নিভুল নিষ্ঠার খাতাই মাথা খেয়েছে, গতজন্মের কথা তাতে গাঁথা আছে যে ! এ তাে বড় দুষিখার খেয়াল নয় যে, তেহাই মারলেই রেহাই। তবু যে জেনে শুনে বেটাদের ফাকি দিই, সেটা ফিরে এসে এক মুঠো অন্নের ঘােগাড় করে রাখা, কেরাণী হতেই হবে, মুদী বেটাও উঠনাে দেবে। নয় কি ভায়া? “এই যে রমেশ, কোথায় ছিলি, এক যুগ অ্যাবসেন্ট ! আমি বলি,অমন টুকটুকে চেহারা, ডাকিনীতে চেলে নিয়ে গেল নাকি?” অবনী বললে, আপনি শশানেন নি দাদা, ও যে বে করতে গিয়েছিল। কোথায় ? মণিপুরে। রমেশের পিঠ চাপড়ে উচ্ছ্বাসের সহিত “ব্র্যাভাে, ইট অ্যামাউন্টস টু যা বলেছি। একেবারে ফণিমনসার মুলুক, কঁাটা ছাড়িয়ে ফিরে এলি কি করে? বাহাদুর ছেলে! বেঁচে থাক, একটা নৃসিংহ কবচ পরিস। যাক, এখন ‘হাফ,, দি ওয়ান্ড'হাতে এসে গেছে, বাঙালী-জন্ম সার্থক, বড় কর্তব্যটি সেরে ফেলেছিস, এতদিনে মানুষের কোঠায় উঠলি।” রমেশ একটু অপ্রতিভভাবে বললে, আপনাকে কষ্ট দিতে সাহস পাই নি। “আমিও দুঃসাহসী নই ভায়া। মণিপুর নাকের শনি, এ নাক নিয়ে ফিরতে পারতুম না, সেখানে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। এরই মধ্যে চেহারায় যে সিদুরের রং ধরেছে রে, হাই পাওয়ার রিফ্লেক্টার ঘরে এনেছিস দেখছি। সু-সংবাদটা বড় সাহেবকে প্রথম সেলামেই জানিয়ে দিতে ভুলাে না-ভেরি ভেরি গ্ল্যাড হবেন, ইয়ালি ইক্রিমেন্টের পথ খােলস থাকবে, ওরা জানে এমন ফ্যামিলিতে ইয়ার্লি ইনক্রিমেন্ট ইনফলিবল “বাড়িতে লক্ষ্মীর মেজাজ বুঝে চলাে, বেসুরাে বাত না বেরােয়। অসাবধানে দামী ল্যাম্পটা ভেঙে ফেললে, হাসি যেন ড্যাম্প না হয়, বললে, আপদ গেছে, একটা জুয়েল ল্যাম্প কেনবার ইচ্ছে অনেকদিনের ছিল? বাঁচলুম, সুবিধে হল, ওটা আমার দু চক্ষের বিষ ছিল।

নমস্কারী ৪০ “নিউটন সাহেব কত টন বুদ্ধিই ধরতেন, তাই টান সম্বন্ধে কি টনটনে জ্ঞানই দিয়ে গেছেন। এ পাশেও নয়, ও পাশেও নয়, মাথার দিকেও নয়, একেবারে প্রমাণ করে গেছেন, ‘পদানত হওয়াই ল, দুনিয়া তা মেনে নিয়েছে। এই অধমও সেই ল মেনে আজ বিশবছর সুখের সংসার করছে। আমাদের শিব আবার তারও তলায় ঢুকে পড়ে গ্যালারি চরম দেখিয়েছেন, দেবাদিদেব বনে কি সুখেই আছেন—একদম নিশ্চিন্ত। নান্য পন্থা। কেমন, মনে থাকবে তাে?” নিতাইবাবুর কথাবার্তাই ছিল এই ধরনের। বেশি উদাহরণ দিয়ে পাঠক- পাঠিকার সহিষ্ণুতা হরণ করব না। বহুদিনের কথা, সব মনেও নেই। ফল- কথা, তিনি আমােদপ্রিয় আলাপী লােক ছিলেন। ২ রসরাজের রেজিস্টারে কিন্তু একটানা কিছু নেই, রকমফের নিয়েই থাকেন। দুঃখের চ্যাপ্টারও আছে, নিটোলকেও চেপটে দেন, বােম্বাই- আমেরও আমসির অধ্যায় আসে। বেশ চলছিল, অকস্মাৎ নিতাইবাবুর দেখা নেই। ট্রেন আসে যায়, শাখের মত নাকের সেই ডিস্ট্যান্ট সিগন্যাল আর দেখতে পাই না। ব্যাপার কি ? অসুখে পড়লেন নাকি? বিরহ বিষম বাড়ছে। শেষ তাঁর এক গ্রাম-বন্ধু প্রতিবেশী সতীশবাবুকে বার করা গেল। তিনিও ছিলেন ডেলি-প্যাসেঞ্জার, বয়সের গাম্ভীর্য রক্ষা করে স্বতন্ত্র কামরায় থাকতেন। বললেন, ভীষণ দুঃসংবাদ, তার জামাইটি মারা গেছে। এই সেদিন মেয়েটির বিয়ে দিলেন, বারাে বছরের বড় আদরের সেই একটিমাত্র কন্যা, এখনও শশুরঘর করে নি। যেমন সুন্দরী, তেমনই অভাব, তার পানে কেউ চাইতে পারছে না। এ বিপদে সান্ত্বনার কিছু নেই। আমােদপ্রিয় নিতাই প্রাণশূন্য পাষাণের মত নিশ্চল নীরব। বােধ হয় ৪১ নমস্কারী দু-এক দিনেই কোথাও সব বেরিয়ে পড়বে, বাড়িতে কেউ আর থাকতে পারছে না, ইত্যাদি। সবই অপ্রত্যাশিত, অভাবনীয়, কিন্তু সত্য। ভেতরটা হায় হায় করে উঠলেও, মুখে কারও কথা সরলাে না—বিপদটা সম্যক উপলব্ধির অবস্থাও তখন চলে গেছে। চুপচাপ যে যার আপিসে গিয়ে ঢােকা গেল। মমের বাড়ি আর আপিসে আমাদের যেতেই হয়। দিন আসে যায়, আমরাও আফিসে যাই আসি। আমাদের রবিবার আছে ; রবির তাও নাই, ওইটাই বড় লাভ। দু-এক রবিবার নিতাইবাবুর প্রসঙ্গে কাটল, তারপর তাদের কল্যাণে মাস কাটতে লাগল। নিতাইবাবু আমাদের মনে ক্রমেই ফিকে মারলেন। এই নিয়ম। কয়েক মাস পরে হঠাৎ হাওড়া স্টেশনে সতীশবাবুর সঙ্গে দেখা।-“এই যে, তােমাদেরই খুজছিলুম, তােমরা নিতাইয়ের প্রিয় সঙ্গী ছিলে, ইন্টারেস্টেড। তিনি ফিরেছেন, গ্রামে নয়, কলকাতায় বাসা করে আপিস করছেন। কলকাতায় নানা রকম দেখবার শােনবার আছে-যাদুঘর, জু, সার্কাস, থিয়েটার, সমাজ প্রভৃতি। শুনেছি, মেয়েটির মন ভাল থাকবে বলে নিজে তাকে নিয়ে দেখিয়ে শুনিয়ে বেড়ান। সুষমা লেখাপড়ায় মন ছিল না, সেই দিকটায় তাকে উন্নত ও নিবিষ্ট করবার জন্যে ইংরিজী ও সংস্কৃত জানা ভাল একটি শিক্ষকও নিযুক্ত করেছেন। একটি পাকা কাজ করেছেন, এর ফল . আছেই, সন্থে মন একবার আকৃষ্ট করে দিতে পারলে, আপনিই সে পথ বুঝে নেবে, মন বশে আসবে। নিতাই বরাবরই বুদ্ধিমান ও উদার। মেয়েটির সুখের জন্যে সবই করতে প্রস্তুত। তােমাদের জানানাে আমার কর্তব্য ছিল, তাই— আচ্ছা, আজ আর নয়, বেলা হয়ে যাচ্ছে, চলি।” বলতে বলতে দ্রুত চলে গেলেন, আমরাও পা চালালুম। এতক্ষণ শােনাটা হচ্ছিল সংবাদ শােনার মতই আগ্রহে। সতীশবাবু আর বেশি বাড়ালে বােধ হয় ভদ্রভাবে ক্ষমা চেয়ে পা বাড়াতে হত। এইরূপই হয়ে থাকে এবং তাতেই নাকি প্রমাণ করে,-সময়ের হীলি এফেক্ট, শেষ সবই খাটিতে গিয়ে পৌঁছয়। অর্থাৎ জগতে এসব তাে নিত্যই নমস্কারী ৪২ হচ্ছে, ভগবানের ইচ্ছার ওপর কার হাত আছে বল? “রাজ-যােটক দেখেই তাে বিয়ে হয়, তবু এমনটা ঘটে কেন? মেয়েটির যেমন ভাগ্য, ও নিয়ে ভাবা মিছে। হাফ-ইয়ার্লি রিটানখানা ফিটিথ আগস্ট ভিউ, সেইটাই সত্য। আপিসে পেীছে তাই নিয়ে পড়া গেল। মিছে যা, তা মন থেকে মুছে গেল। ইতিমধ্যে কোথা দিয়ে কখন দু বছর কেটে গিয়েছে। কারুর মাইনে বেড়েছে, অনেকেরই ছেলেমেয়ে বেড়েছে। ট্রেনে এখন আর কামরা বাছাই নেই, যেখানে হয় ঢুকে পড়ি। এখন কেবল পাওয়া ও যাওয়া হ'লেই হ’ল। যেদিন যে কম্পার্টমেন্ট পেয়েছি, তাতেই বহুৎ আচ্ছ।। নিতাইবাবুর ব্যবস্থা আর নেই, সে কথা ভুলেও গিয়েছি। মানুষ চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকে না, এটা কেবল স্বার্থের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখে। ট্রেনে উঠেই নিতাইবাবুর বিস্মৃত নামটি কানে এল। চেয়ে দেখি, কাঁচা পাকা কেশের ও অলমােস্ট পাকা গোঁফের কয়েকটি প্রবীণ লােক, নিতাই- প্রসঙ্গে আতুর আগ্ৰহনিবিষ্ট। বক্তা বিজ্ঞতম ভঙ্গিতে বলছেন- “কই, দেশ ছেড়ে থাকতে পারলে না? মেয়ে বিধবা হলেই যে দেশ ছাড়তে হবে, এমন বিধান তো কোন শাস্ত্রে দেখি নি, কিছু কিছু ঘঁটি নি তাও তাে নয়। অমন ঘটনা তাে লােকের আকছার ঘটে, আমাদেরও কারও কারও ঘটে নি এমন নয়, তা বলে দেশ ছেড়েছে কে? ওসব টাকার ফুট, খোদার ওপর খােদকারি করতে যাওয়া। আবার তো আসতে হ’ল। বিশু, তুমি তাে বিশু নও, অনেক দেখেছ, কি বল ?” বিশু। শুধু কি আসতে হ’ল ! কত বড় প্যাজ-পয়জার হাসিল করে তা বল! ১ম বক্তা। তােমরাই বল না, শুনেছ তো সবই, সমাজ তাে আর একার নয়। ওই তো নিমাই রয়েছে, তার দশ রাত্রির জ্ঞাতি। কলকাতার বাসায় খোঁজখবর নিতে ওর যাতায়াতও ছিল। ওই বলুক না।

৪৩ নমস্কারী নিমাই। হ্যা, আমি যেতুম বটে, বাড়িখানা যদি বেচে, সুবিধেয় পাই। নিতাই তখন অতশত ভাবে নি, জানই তাে সে বরাবরই ছেলে-ছােকরা-ঘেঁষা। একটি ফুটফুটে সুশ্রী যুবা পেয়ে মাস্টার রেখেছিল। ছেলেটি অনারে ফাস্ট ক্লাস বি. এ. পেয়েছে, তখন ল পড়ছিল। শুনেছি তাতেও ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে। ১ম বক্তা। ( বিরক্তভাবে) আরে, রেখে দাও তােমার ফাস্ট ক্লাসের ফর্দ, আসল কথা কও। সে তত সকল বিষয়েই ফাস্ট ক্লাসের পরিচয় দিয়েছে। নিমাই। আসল কথা তাে নিতাই নিজেই স্বীকার করেছে, ঢাকবার তাে উপায় নেই। সুষমা আজ দু-তিন মাস বাড়ি-ছাড়া। অনেক খোঁজ করেও পাত্তা পাওয়া যায় নি, যাচ্ছে না। মাস্টার সুবিলাসও কলকাতায় নেই, সব চেষ্টা শেষ করে তবে নিতাই দেশে ফিরেছে, আশা থাকতে ফেরে নি। এখন যা বােঝ। ১ম বক্তা। শুনলে সব ? নিতাই তাে এলেন, এখন তার কর্তব্যগুলােও তাে সঙ্গে এসেছে। প্রায়শ্চিত্ত বলে জিনিষটি তো কেবল পুথির পাতা বাড়াবার জন্যে পণ্ডিতেরা লিখে যান নি, হাড়ী-মুচিতেও করে থাকে। চন্দর যে কথা কইছ না বড় ? বাগচী। ও আর বােঝাবুঝি কি দাদা, শাস্ত্রমত সব খুঁটিয়ে করা . চাই। অঘর্ষণে একচক্ষু জনার্দন শাস্ত্রীই পাকা লােক, তাকে ধরলেই হবে, চক্ষুলজ্জার চৌহদি মাড়ান না। নিমাই। জনাৰ্দনই ঠিক লােক, সমাজ-রক্ষার অমন তক্ষক মিলবে না, কিন্তু নিতাইয়ের ভাগ্য চিরদিনই ভাল। কথা জমাবার তেমন সুখ হবে না, সুবিলাস , ছেলেটা ব্রাহ্মণ হয়ে মরেছে, ধােপ হ'লে তােফা হত, চাপের চটক হত। ১ম বক্তা। যে এমন কাজ করতে পারে, তার আবার জাতের খবর কেন—রাঢ়ী-টারীও হতে পারে, সে খােজে লাভ কি ? নিমাই। না, তা বলছি না, কেবল কথা বলার একটু সুখ ছিল দাদা। • ১ম রক্তা। সে ভাবছ কেন, অনেক পাবে, অনেক বেরুবে।

নমস্কারী ৪৪ সব ভেবেছি। নাকে খত দিয়ে ওকে খাদা করে ছাড়ব, ও সেকেন্দরী নাক আর থাকবে না। আর কালবিলম্ব নয়, শুভস্য শীঘ্রম্। পরশু রবিবার বেলা আটটার আগেই যেন উমেশ ভাদুড়ীর বৈঠকখানায় সকলকে পাই। ট্রেন হাওড়া স্টেশনে থামল, কথাও থেমে গেল, সকলেই আপিস- মুখাে-ছত্রভঙ্গ। মনটা কিন্তু কেমন হয়ে গেল। পরচর্চার চেয়ে পরিচিতের চর্চা। যাক, স্বভাবের পরিচয়ে আর কাজ নেই। যে কারণেই হােক, ঔৎসুক্য রয়ে গেল। কাল শনিবার, যেমন করে থােক মাতব্বর সমাজ-প্রবীরদের গাড়িতে উঠতেই হবে, ফাইনাল রায় শােনাটা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। কেন যে এত আগ্রহ, তার কারণটা ঠিক না বুঝলেও তাতে একটু আনন্দ যে ছিল না, সেটা আজ অস্বীকার করতে পারি না। তবে মনে আছে, বন্ধু-বললেন, সমাজ- অভিজ্ঞদের এসব গুহ কথা শুনে রাখা ভাল, বহুদিনের চিন্তা চেষ্টা ও তালিমে আয়ত্ত হয়েছে, উত্তরাধিকারী মানে তাে কেবল ভিটেটুকু আর বাসন-কোসন নয়। সমাজ-শাসনের আসন তাে একদিন আপসে আসবে, তখন কার দারস্থ হব ভাই ? জানা না থাকলে শেষে কারও অনিষ্ট করে ফেলব নাকি? শুনে বললুম, ব্র্যাভাে বন্ধু! যে কারণেই হােক, জষ্টিসদের কামরায় ঢুকে পড়া গেল। গাড়িতে উঠে সেই পাকা পাচজনকেই পেলুম। কিন্তু এ কি ভাবান্তর ! চেহারা চিন্তাকুল, বিষন্ন। হ’ল কি ? সেই প্রথম বক্তা বিশ্বম্ভর ভাদুড়ী যেন ঘুম ভেঙে বললেন,-“ওর বাপ গুপী লাহিড়ী বলতেন, ও আমার লগ্নচাদা ছেলে।” তাই বটে, আমটি কোম্পানির ফাসির দড়ি ছিড়ে পড়ে। চনৰাবু ব্যগ্রভাবে ভ্রু কুঁচকে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপারটা কি, অমন মুষড়ে গেলে কেন ? কাল রাতটা পরিবারের কলিক নিয়ে ঘর-বার করে কেটেছে, মণ্ডপে তাই হাজির হতে পারি নি, এরই মধ্যে এমন কি ৪৫ নমস্কারী প্রথম বক্তা বিরক্তভাবে বললেন, কার পরিবারের কোটা নেই, একটা ছাড়লেই হল। যাক, এখন যে বাড়াতে ছাই পড়ল । চন্দরবাবু। একটু খােলসা করে বল দাদা। আমাদের সে যৌবনের দিন বহুদিন চলে গেছে, তখন ঠারে ঠোরে কাজ হ'ত, চোখের ভাষাই যথেষ্ট ছিল, -মনে পড়ে তাে,তেহি নাে দিবস গতা। এসব যে স্বতন্ত্র কথা, একটি কমায় কেস মাটি হয়। খুলে বল, তুমি অমন হলে চলবে কেন? তুমিই আমাদের ভরসা। ভাদুড়ী বিশ্বম্ভর হতাশভাবে বললেন, ভরসা ফরসা হয়ে গেছে। নিমাই বীইং প্রপার ম্যান, তাকেই পরামর্শ-সভার সন্ধাদি পাকা করে আসতে উমেশ জ্যেঠার কাছে পাঠিয়েছিলুম। তারপর যা, নিমাইয়ের মুখেই শােন। বল না হে নিমাই। নিমাই। কি আর শুনবেন দাদা? বিশ্বম্ভর দাদার উপদেশগুলি সারারাত মওড়া দিয়েছি, একটি কথা না ভুল হয়। সকালে উঠে সাতটা না বাজতে সব সেরে আগেই নতুন গাছের প্রথম ফল লাউটা কচাৎ করে কেটে নিলুম, শুধু হাতে যাব! উমেশ জ্যেঠার বৈঠকে মাথা না গলাতেই মাথা ঘুরে গেল। আটচল্লিশ বছরে যা দেখি নি, আটটার আগে যে ওঠে না, চা না খেয়ে দুর্গানাম করে না, সেই খােশ-পােশাকী নিতাই গলায় গামছা, মলিন বস্ত্র, জ্যেঠার , পায়ের ধূলাে নিয়ে কঁাদ-কঁাদ মুখে দাড়াল, জ্যেঠা তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, কল্যাণ হােক। “তিন রাত্রির ঘুম নেই জেঠামশাই, আমাকে বাঁচান। সব শুনেইছেন এই হতভাগ্যের কথা, এ জন্মের তত এই সাজা। চুলােয় যাক তারা। এখন আপনাদের এই হতভাগা ছেলের পরজন্মের উপায় করে দিন। বাপ- পিতামাের আর আপনাদের কুলাঙ্গার হয়ে থাকতে পারব না। আমার ব্যবস্থা করে দিন জ্যেঠামশাই। ওদিকে আপনার বউ কেবলই ফাক খুজছে ভাদুড়ী-পুকুরে ডুবে মরবার। আমি এখন কি করি? ছুটির কদিন হয় আগলালুম।আমাকে বাঁচান।বলে কঁদতে লাগল।”

নমস্কারী ৪৬ “রাম রাম, অপঘাতের কথা মুখে আনতে নে। হয়েছে কি, এমন ঘটনা তাে নতুন নয়, তার শাস্ত্রীয় ব্যবস্থাও রয়েছে, সেটি করে ফেললেই পরকালেও মুক্তি। তুমি রাজি হলেই হল।” আপনি যা হুকুম করবেন, তাই করব। রাজি আবার কি, আমি আপনাদের ঘরের ছেলে, আদেশের দাস। তবে আবার ভাবনাটা কি, তুমি বউমাকে দেখ গিয়ে, পাগলামি না করেন। বলো—আমি কথা দিয়েছি, সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আমাদের বাড়ির লক্ষ্মী বউ হয়ে অপবাদ না কেনেন, আমাদের মাথা নিচু না করেন। ব্যবস্থাদি আমি ঠিক করে দিচ্ছি। বিশ্বম্ভর, চন্দর সকলকেই ডাকাচ্ছি, যাও, তাকে দেখ গিয়ে, দরকার হয় আমি নিজেই যাব। যাও, ভেবাে না, কিছু খরচ হবে বটে। আপনাদের আশীর্বাদে সে— তবে আর কি! যাও, বউমাকে দেখ। ইত্যাদি। নিতাই তার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে, পায়ের ধূলাে নিয়ে চলে গেল। যাবার সময় চোখােচাখি হওয়ায় আমাকে বললে, দাদা, আমি বড় বিপন্ন, সকলেরই সাহায্যপ্রার্থী, আমাকে উদ্ধার করে দিন। আপনারাই আমার ইহলােক, আমার সব। দেখে শুনে পরজন্মের ভয়েও বড় ভীত হয়েছি দাদা। বলতেই হ’লকিছু ভেব না, সব ঠিক হয়ে যাবে, সকলেই তােমার পক্ষে। তােমাকে কে না চায়! নিতাই প্রণাম করে চলে গেল, আমারও কাজ ফুরিয়ে গেল। কথার মধ্যে জ্যেঠামশাইকে বললুম, নতুন গাছের এই প্রথম লাউটি দিতে এসেছিলুম, তা না তো বাড়িতে আপনার বউমার তৃপ্তি নেই। উত্তম হয়েছে, ভােরেই মেছুনী মাগী চিংড়িমাছও দিয়ে গেছে। বউমাকে আমার আশীর্বাদ জানিও। আমি ফেরবার চেষ্টা করতেই বললেন, যাচ্ছ কোথা? দাঁড়াও, ফিরলে চলবে না। শুনলে তাে সব। নিতাই ছোকরা বড় বিপন্ন, চিরদিনই ধর্ম- ৪৭ নমস্কারী ভীরু, পরকাল পর্যন্ত 'রছে, তার ওপর সতীলক্ষ্মী বউমা, সত্বর উপায় না পেলে, শুনলে তাে, আমি আর কথাটা মুখে উচ্চারণ করব না। সব শুনেছি জ্যেঠামশাই, আপনি যেমন বলবেন, তাই করা হবে। “সে তাে জানি, কিন্তু এটা সামাজিক কাজ। বিশ্বম্ভর, চন্দর, চিত্ত, তােমরা হলে আমার ডান হাত। কাল রবিবার সকালে সব এসে, সকলের মতামত ও পরামর্শ মত, কাজটির ব্যবস্থা করে দেওয়া চাই। নিতাই আমাদের ঘরের ছেলে, বাধ্য, কিছুতেই ‘না’ করবে না, বুঝলে? তুমি বাবা, এই ভারটি নাও, সকলকে আমার অনুরােধ জানিয়ে একত্রে সব হাজির হওয়া চাই।” আপনার আবার অনুরোধ কি, হুকুমই যথেষ্ট, তাই হবে। এই বলে চ'লে এসেছি। নিতাইয়ের নাকটিই কেবল বড় নয়, মাথাটিও মস্ত, দেখুন , কি অভাবনীয় গােলটা বাধিয়ে দিলে! উমেশ জ্যেঠা সমাজের প্রধান হ'লে কি হবে, প্রধানের মত পাচ জানেন না, তাকে আগে থেকে তােয়ের করে না রাখলে কবে আর তার দ্বারা কাজ পাওয়া গেছে। রাম উল্টো বুঝেই থাকেন। এখন যা হয় ভাবুন। বিশ্বম্ভর ভাদুড়ী। ভাববার আর কিছু পাচ্ছি না ভাই, থাকলে পেতুমই। গাঁথা মাছ খুলে গেছে, এখন হাতে কেবল গ্রামস্থ ফালাও পােলাও-কালিয়া আর বাগবাজারের নবীন ময়রার রসগােল্লা প্লাস ব্রাহ্মণপণ্ডিত বিদায় হইতে হাজারে ঘা পড়বে। হাওড়া স্টেশন এসে গেল, কারও মুখে হর্ষ ফুটল না, মনের ভাল’ বলতে বলতে সব বিমর্ষ ভাবে নেবে গেলেন। কেবল চন্দরবাবু উদাসভাবেই শুনছিলেন, নিশ্বাস ফেলে আপন মনেই বললেন, বেঁচে থাকাটা কেবল শিক্ষার জন্যে, ম্যান লিভ টু লান। এতদিনে নিতাইদার জয়ে মনের মধ্যে সিম্প্যাথির সাড়া পেলুম। হাস্যমুখে দাবৃত্তি করতে চললুম।

নমস্কারী ৪৮ পরিশিষ্ট সব জিনিসের পরিশিষ্টই মিষ্ট। ভুরিভােজনের পরও কেউ কেউ হাত চেটে থাকেন! নিতাইদা কাজে জয়েন করেছেন ; আমাদের গাড়ির আসর অবার জমে উঠেছে। সেদিন নিতাইদার প্ল্যাডষ্টোন ব্যাগ ফুড়ে আমিরী আতরের সুবাস গাড়িখানাকে বেগমমহল করে তুলেছে। ব্যাপার কি দাদা, ব্যাগের মধ্যে আতরের শিশি ভেঙে গেল নাকি? হেসে বললেন, খােলবার হুকুম নেই যে, আর একদিন দেখাব, আজ থাক। ওর মধ্যে খানকতক পেস্তার বরফি করে দিয়েছেন, মেয়ে-জামায়ের জন্যে।-বলেই এদিকে ওদিকে একবার চাইলেন। জামাই কথাটির প্রতিবাদ নয়, সমর্থ জানতে আগ্রহ হলেও সাহস হল না, পাছে ভদ্রতাবিরুদ্ধ হয়। দাদা বুঝতে পেরে বললেন, ভুল বলি নি ভাই। সেসর কথা। এর পর শুনলেই ভাল হয়। সেটা যে এখন আমাদের সাজার ব্যবস্থার মত হ’ল দাদা! তবে সংক্ষেপে একটু বলি, ভেরি কফিডেন্স্যাল কিন্তু, তােমাদের কাছে আমার অনিষ্টের ভয় নেই, তায় তােমরা গঙ্গাপারের ছােটখাট পল্লীর লােক, এন-বহুল স্থান নয়। জ্ঞাতিদের জানই তাে, তারা তো আমার কিছু খসিয়েই খুশি হন নি, মাইনাস অবশ্য উমেশ জ্যেঠা। অনেক বেছে মেয়ের মাষ্টার বার করেছিলুম, ওই উদ্দেশ্যেই-স্বঘর, কেষ্টনগরের ভাদুড়ী, রূপে গুণে রত্ন বলতে পার। এখন তাে সে হাইকোর্টে দশজনের মধ্যে একজন। তাতে তার শাশুড়ীটিকেও যেন সেকেণ্ড এডিশনের রাজসংস্করণরূপে পেয়েছি। তিনি এখন ঘােড়র চালে চলেন, বার্কের চালে বলেন, হিল্লোলের চালে হাসেন। আরে, কি বলতে কি বলছি, ভ্যাম্ ভাইগ্রেশন, থাক। দু বছর ফিরতেই নববিধানে বিবাহটা দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। জামাই সুবিশাস এখন সার্কাস নােড়ে বাড়ি করেছে, দুজন সেইখানেই থাকে।

৪৯ নমস্কারী সব গুছিয়ে দিয়ে, স্থি করে, বাড়ি ফিরেছি। মাঝে মাঝে দুজনেই যাই আসি। এই পেস্তার বরফিও সেই সেরেস্তায় চলেছে ভাই। থ, চিয়াস পড়ে গেল। বললুম, একটু পায়ের ধূলাে দিন দাদা, আমাদের বুদ্ধি বাড়ুক। বেয়ান বিভীষিকা ক্ষুদিরামপুরের গােপীনাথ চট্টো বা গুপী চাটুয্যে,সে যুগের আংলো ভার্ণে- কুলার স্কুলে পড়া ভাললাছেলে ছিলেন,—অর্থাৎ “ফাষ্ট বয় ছিলেন। তীক্ষ- বুদ্ধি ও চতুর। বাপের স্বাস্থ্য ভাল ছিলনা, প্রায়ই রােগ ভােগ করতেন, আর শুয়ে শুয়ে ভাবতেন—গুপীর স্কুলের পড়া শেষ হলেই, তাকে ক্যাম্বেল মেডিকেলে ডাক্তারী পড়তে দেবেন। ডাক্তারের দর্শনী আর বিলের টাকা, যােগাতে আর পারেন না। গােপীনাথ স্কুল থেকে বেরিয়ে কিন্তু মােক্তারির মােহে পড়ে গেল। জেলার আবহাওয়াই তাকে টেনেছিল। দেশে যত সুদৃশ্য বাড়ি বাগান, কমলা যেন শামাধারীদের দিয়ে রেখেছেন। বাপকে সহজেই বুঝিয়ে দিলে “দেশে ডাক্তারি করার চেয়ে ঝকমারি আর নেই বাবা। গ্রাম-জ্যাঠা খুড়ো, মাসি পিসিতে পাের। তখন আত্মীয়ের অভাব থাকবেনা। সকলের অবস্থাও তো জানেন,-ভিজিট তাে নিতেই পারব না, আর দেবেই বা কে? ওষুধের ‘বি’ করাই হবে, একটা আলমারি জোড়া করে তা ধরাই থাকবে। কিন্তু মােক্তারিতে নিত্য নগদ পয়সার মুখ দেখা যায়, আর পয়সা থাকলে ডাক্তারকে ঘরে বাঁধা যায়। আপনি ভাবছেন কেন, আশর্বাদ করুন- বছর না পার হতেই তার পরিচয় যেন দিতে পারি। বুঝছেন না,—ডাক্তার , হলে, অপয়ােজনেও পাশের গাঁয়ের গঙ্গাপিসি ঘরের ডাক্তারের কাছে ছুটে ।

নমস্কারী আসবেন—“শিগগীর ওঠ, বাবা আমার ননী কেমন করছে, হরি রক্ষা করাে- ষাট ষাট—গিয়ে যেন।”•••তখন পায়ে পায়ে যেতেই হবে। ননীর দুবার নাকি দান্ত হয়েছিল। গিয়ে কিন্তু তাকে পেয়৷ গাছে পাব! “ও কিছু নয়” বললে শশানে কে ? তারপর পিসির সঙ্গে শিশি হাজির । অদরকারেও ওষুধ চাই। যেহেতু আমার কাছে আবার দাম চাইবে কে? যাক, এখন আপনি যেমন বলবেন- গুপীর যুক্তির কাছে বুড়রাও টুপি খােলেন। বাপ আর কথাটি কইতে পারেন নি,আশীৰ্বাদই করেন। তখনকার লােকের আশীর্বাদ নাকি ব্যর্থ হ’তনা মােক্তারিত গুপীর অর্থ খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠালাভ বাধামুক্ত দাঁড়ায়। গ্রামের লােক, সকল কাজেই গুপীর পরামর্শ মত চলে! ধারণা—আইন জানা লােক সবজান্তা হয়, রাষ্ট্র পরিচালনার “রাস তাদের হাতেই থাকে- সব দেশেই। বুদ্ধির জন্যই বৃহস্পতির খ্যাতি। গুপীও বাল্যাবধি বুদ্ধিমান। এ হেন গুপী মােক্তার ডাবা হুকোয় নল লাগিয়ে, চিন্তাকুল অন্যমনস্কভাবে বেতালা ফুড়ুক ছাড়ছিলেন,-তামাক পুড়ে ধোয়া যে ফিকে মেরেছে সে দিকে লক্ষ্য নেই। গ্রামের অনেকেই তার বৈঠকে—কাজে বা অকাজে, নিত্য হাজির দেন, গুড়ক টেনে যান। আজও এসেছিলেন। নটু জ্যাঠা তাকে তদবস্থা দেখে, অসহিষ্ণুভাবে বললেন-“কি হয়েছে কি? একেবারে বেহুস যে? কাল তত বে-ই বাড়ি মেয়ের সংবাদ নিতে গিয়েছিলে শুনলুম। এত মনমরা ভাব কিসের, বােগটা কি? গুমােঢ় মেরে কেন? সব ঝেড়ে বলো,-দাও, হ'কোটা ছাড়ো। ডাবাটা যে বাঘের থাবায় পড়েছে। মতি মাষ্টার বললেন-“তা ভালােই বলাে আর মন্দই বলল, মণিমালার অসুখ শুনে যাচ্ছ, দিনটা মঘা হলেও ব’লে বাধা দিইনি ভাই। কেমন, সব কুশল তাে?” আশু খুড়াে মাঝে মাঝে ইংরিজি ক, বললেন—A man is known by the company he keepa=ছেলেদের সঙ্গে থেকে থেকে পণ্ডিতদের নমস্কারী বুদ্ধি ষাট বছরেও আঠারােয় আটকে থাকে। বলনি, তাে মঘার কথা আজ এখন শােনাবার কি তাড়াটা ছিল ?” মতি মাষ্টার অপ্রস্তুতভাবে-“তা তা, সে সময় তাে কেটে গেছে”- শম্ভুদা বললেন-“থামাে থামে—থাক্। সকলেরি মনটা খারাপ হয়ে রয়েছে, আগে গুপীর কথা শুনতে দাও—যে জন্যে আসা। আমার বেই- বাড়ি ‘পাঁচ’ পেরিয়েছে ও স্থান সম্বন্ধে আমার জানতে কিছু বাকি নেই ও আফগানিস্থানের বাবা! প্রায়ই ফৌজদারি আদালতের কাছাকাছি বা ‘ফাউ'। মঘায় নৌকাডুবি কি কোলিস হয় বটে, ওগুলি নিজগুণেই মঘার আচ্ছা—মিষ্ট কথার হুলে ভরা মৌচাক। তবে গুপী আমাদের পরম বন্ধু বুদ্ধিমান, ঢেউ কাটাবার “মুণ্ডি গণেশ”। বিশেষ দেখে শুনে কাজ করেছেন। সে দুর্ভাবনা নেই। এতক্ষণে গুপী মােক্তার—দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সােজা হয়ে বসলেন ও ভৃত্য পেল্লাদকে তামাক দিতে হুকুম করে বললেন-“তােমরা আমার বহুকালের বন্ধু, এক সঙ্গে খেলেছি, তালপাতায় লিখেছি, পাল্কী চড়ে বে করে এসেছি। এখন পৌঢ়ত্ব পেরিয়ে, চুল পাকিয়ে বৃদ্ধ হতে বসেছি। নাতী নাতনী নিয়ে সংসার করেছি। ছেলেদের মানুষ করেছি। মানুষ আর কাকে বলে, যেমন করে থােক দু পয়সা আনছে তাে? ছেলের প্রার্থনা আর কিসের জন্যে ? দু’পয়সা আনলেই জন্ম সার্থক,আর বিবাহ করে বংশরক্ষা করতে পারলেই বাহবা,—কি বলাে? তাও তারা মন্দ করছে না।” ধর্মদাস রায় গুড়ক টেনে খক খক্ করে কাসতে কাসতে বললেন- “বয়সের দোষে রে ভাই, শেষটা আর সয়না। ঘরে বাইরে লাঞ্ছনা! নাও আশু-খুড়ো, যে সর্বগ্রাসী নজর হাছ, তামাক আর তলবেনা, নাও।” -“ওতে আর কিছু রেখেছ কি–নচে ফাটা টান। বদ্ধমেনে গুরু- মশায়ের সর্দার-পােড় ছিলে, হবে বইকি! • দেরে পেল্লাদ-কলকেটা বদলে দে বাবা।-ই, যে কথা শােনবার জন্যে আমরা ব্যস্ত হয়ে রয়েছি, তুমি, তাে গুপী সে দিক মাড়াচ্ছন। যা আরম্ভ করেছ সে সবই ঠিক। ছেলেরাও ।

নমস্কারী লায়েক হয়েছে—ভারতচন্দ্রের মহাভারত কণ্ঠস্থ তাও ঠিক। সে অন্যদিন শুনব। অমন অস্বাভাবিক রকম ভোতা মেরে ছিলে, তাতে আমার যে পীলে চমকে দিয়েছ। আগে মণিমালার অসুখটা কি, সে কেমন আছে ইত্যাদি বে-ই বাড়ির সংবাদ শােনাও ।” গুপী মােক্তার তার ব্যবসাগুণেই বক্তার লােক। আজ শামলা মাথায় না থাকলেও, পাঁচজনকে পেয়ে অভ্যাসই কাজ করছিল, গােড়াপত্তন করে নিচ্ছিলেন। কঁচা পাকা গোঁফে দু’বার হাত বুলিয়ে বললেন, “শুনবে আর কি, সত্যনারায়ণের কথার মত সবি তােমাদের জানা কথা,-শম্ভুদা তাে বলেই দিলেন। কেবল “বেই বাড়ি, বেই বাড়ি” কথাটার প্রয়ােগ আমার Case ভুল হচ্ছিল। আমার বে-ই বাড়ি নেই—“বেয়ান বাড়িই” সুষ্ঠু প্রয়ােগ... “আঁ”—তা তো শুনিনি। বেই কবে-কতদিন-তার শ্রাদ্ধ তো দোরে খি দিয়ে হবার কথা নয়,-আঁ! গুপী সহাস ভাবে—“আরে না না শম্ভুদা, বে-ই বেশ আছেন, ভালো আছেন। বাল্যকালে সেই “লেনিজ গ্রামার” পড়া silent H.এর কথা মনে আছে তাে? সংসারে তিনি সেই ভাউয়েলটি মেরে আছেন। সাতেও নেই, পাচেও নেই, আছেন, কেবল আমার বেয়ানের কটাক্ষের আঁচে-ঝলসে ! আমার বেই হরিশমুখুয্যে শিবালয়ের ছােটখাটো ভূমিদার,—ঠিক জমিদার নন, বউমাষ্টারের যাত্রার ভাঙাদলের পত্তনাদার—ভালােমানুষ-শিবালয়ের শিব বললে হয়। পত্নীর আওতায় পড়ে মুষড়ে গেছেন। মাতঙ্গিনী দেবী হাতে বহরে ঢাকা খেদার আমদানী, গজাতও আছে। সেকেলে তিনমহল বাড়ির মধ্যে তার আওয়াজে সকলে তটস্থ। সৰ্ব্বদাই চুপি চুপি ধ্রুপদী কণ্ঠে লক্ষ নাম জপ করেন। পথের লােক চমকে যায়। হরিশ মুখুয্যে তখন ও পাড়ার রাসু-খুড়াের বাড়ি তামাক খেতে পান। বাড়ির লােকের “বিপদি ধৈর্য ছাড়া উপায় থাকেনা। দুর্গাপুরের দোয়ারীবাণু ধ্রুপদী, তিনি বলেন- ধ্রুপদের উৎপত্তিস্থান নাকি আমার বেয়ানের গর্ভে বা গলায়। নিন্দা ভেবনা, 'আমি প্রমাণ-সহ কথাই বলছি।”

! নমস্কারী নটু জ্যাঠা বললেন—“বলো, আমরা অবিশ্বাস করছিনা। তােমরা সত্যি ছাড়া মিথ্যা বলনা জানি, বলে। কিন্তু আসল কথাটা যে”... “হ্যা—এই যে। সেই বেয়ান ঠাকরুণের একখানি পত্র বা পরােয়ানা পরশু পাই। তার মৰ্ম্ম—তার কথাতেই বলছি। তােমার মেয়ে কয়দিনই বা,এখনাে আড়াই বছরও হয়নি—এ বাড়িতে এসেছে। জমিদার বাড়ির অন্ন খেয়ে সেই কাটি চেহারা দোহারা দাড়িয়েছে। আনলায় দোল খাওয়া বালা আর অনন্ত আঁট মেরেছে, না বদলালে নয়। যাক্, সে পরে দিও। তােমাদের মত এ বনেদী বাড়ির উঠোন আর বােয়াক তাে একসা নয়। তায় তােমার আদুরে মেয়ের গুণ অশেষ—অসাবধানীর একটি। ভাতের থালা নিয়ে ভােজ-বারাণ্ডায়’ আসতে পড়ে গিয়ে কর্তাদের আমলের কাঞ্চন- নগরের খাঁটি রূপসাই কাঁসার থালা ভেঙেছেন। তার আর আদায় নেই। তা চুলােয় গেলাে, আবার কেঁাতানি কি! বউমানুষের বেহায়াপনা খাে। সেই যে শুয়েছেন, আজো সেই হরিশয়ানেই আছেন। শুনেছি নাকি রক্ত আমাশা ছিল, তার ওপরে ঘুষঘুষে জ্বরও জুটিয়েছেন ! পেট কামড়ানির সত্যি মিথ্যে মানুষের ধরার তাে জো নেই! যে বাড়িতে রুই-কাতলা ছাড়া কোনােদিন পুটি চিংড়ি ঢােকেনি, গুণের বউয়ের পথ্যের জন্যে এখন কঁাড়ি- কড়ি পেঁড়িগুগলি ঢুকছে। এ অধম্মােও অদেষ্টে ছিল ! ঘেন্নায় আমার নন্দ বাড়ি ছেড়েছে। করতে তাে কিছু বাকি রাখছিনা? নায়েব কপিল শুনে বললে-রােগের নামটি যে দেশান্তরি”—ডিসেন্টি, মা ! যেমন ছোঁয়াটে তেমনি কুচুটে।” শুনে বললুম—“আসলে রক্ত-আমাশা তাে, তবু ভালাে। কেউতাে বলতে পারবেনা—বউকে না খাইয়ে নিরক্তে করে রেখেছিল, ভগবান আছেন লজ্জা নিবারণ করেছেন। এতে হাঘরের বাড়ি নয় কপিল,- হাঁড়ি চাচা কাড়ি ব্যবস্থা আর নয়।” এসে নিজে দেখে যা করতে হয় করাে, শেষ না বলে খবর দেয়নি। কখনাে ত’ আসা নেই, কেউতো তােমাকে ভদ্র লােকের চিরকেলে প্রথমত, কিছু হাতে করে আসতে মাথার দিব্যি দেয়নি। এখন দয়া করে একবার,পায়ের ধুলো দিলে কেতাখাে নমস্কারী ৫৪ হবে। সাবা মেয়ে দিয়েছ,সেই যে “বাবা বাবা বুলি ধরেছে—তা থামুক, আমরা বাঁচি। বাড়ির ওঁর যে ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে সে আক্কেলও নেই। মাঝে মাঝে উঠে শান্ত করতে যান। হু, সেই মেয়ে কিনা, সেই শিক্ষাই পেয়েছে কিনা, ইত্যাদি। পত্র পড়ে তাে আমার হাতে পায়ের খিল ঢিলে হয়ে গেল।” “বলো কি মােক্তারকোন মেয়ের বাপের ন যাবে ঘটোৎকচেরও যেত। এসব কথার কোনাে আভাস তাে এতদিন তােমার মুখে পাইনি। টাকা তত কম খরচ করনি গুপী,আমরা তাে সব জানি, নিজেরাই তাে দাড়িয়ে থেকে সব করেছি, একি! শিবালয় একটি বর্ধিষ্ট স্থান, সমাজও আছে, মানুষও আছেন “সবই আছেন, কাজ দেয়নি কেবল আমার নিজের বুদ্ধি, অর্থাৎ স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়। বাবার আদেশ ছিল—“শ্রেষ্ঠ কুল দেখে মেয়ে দেবে—আর কিছু দেখতে হবে না। তাতে ভগবানের আদেশ অমান্য করে নিজের নিধনং ডেকে আনা হয়েছে। এখন দেখে শুনে নীরবেই বিষ হজম করছি । তােমাদের নিয়ে ভুলে থাকি,—ও ভুল ত’ আর শােধরাবার নয়।” শুনে শম্ভদা বললেন-“ও দুঃখ কোনও দুঃখু কোরনা। আমরা অনেকেই ওর আস্বাদ ভােগ করেছি, করছিও। কে আর বলে বেড়ায় বলল। যা তারপর সেই বৈতরনী পার হলে কি করে ? “সে এক মহাভারত দাদা,—উদযােগ পৰ্বটাই নয় শোনাে।আমাদের ঘরের ডাক্তার রাজকুমারকে নিয়ে সারাপথ তালিম দিতে দিতে, ঘােড়ার গাড়ি করে হাজির হই, দুর্গানাম আর হৃৎকম্পও সঙ্গে ছিলেন কারণ একবার মেয়ে আনতে গিয়ে শুনে আসতে হয়—“কেন, মেয়ে জলে পড়ে আছে নাকি ? দু’বেলা কুলীনের অন্ন, পেটে যাচ্ছে—তা জানাে? তার ভালােটা এখন আমরা দেখব—তােমরা নয়”—ইত্যাদি। -“বেয়ানই এগিয়ে এলেনঘােমট। তঁার নথপর নাকের ডগা পর্যন্ত থাকে—বাক্য না বাধা পায়—সেটি জাত সাপের hood বা ফণার দ্যোতক।

র নমস্কারী বেয়ান পেন্টালুন পরী পরপুরুষ দেখে একটু থমকে গেলেন। আমি পরিচয় দিলুম,—“ইনি আমার পরম বন্ধু-কলকাতার স্বনামধন্য নীরদ ডাক্তার। একসঙ্গে পড়েছিলুম। আমি বিপন্ন তাই দয়া করে এসেছেন। এঁকে পাওয়াই কঠিন কলকাতার বাইরের লােক ক’জনই বা ওঁকে আনবার ক্ষমতা রাখে। -“বেয়ান আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে চাপা গলায় তিরস্কার করে বললেন ‘তিলকে তাল করা তােমাদের কেমন স্বভাব। নয়। বড়লােকদের ওট। হয় বটে। টাকার পরিচয় এই সব কাজেই পাওয়া যায়। কি হয়েছে কি এমন? এ দেখছি ঘটার অসুখ। তা এসেছ যখন, একবার দেখে যাও মেয়ের কান্না কমুক’—ইত্যাদি -“গিয়ে যা দেখা গেল, তার বর্ণনা শুনে ফল নেই। আমার ত’ মাথা ঘুরে গেল। তখনি বােধ করি একটা পাথর বাটী করে একটু ফিকে রংয়ের বার্লি এনে রাখা হয়েছে। মেয়েটা ছটফট করছে।—ডাক্তার থারমামেটারটা বার করে বেয়ান গিন্নির হাতে দিতে গেলেন। তিনি সাতহত সরে গেলেন-“আমার এখনাে জপ শেষ হয়নি।” —“বাড়ির ঝি দাড়িয়েছিল—“এখন ত’ সকলেই দেখতে জানে বলে ডাক্তার তার হাতেই দিলেন। -“কিন্তু আপনাকে যে চাই মা-বউয়ের পাশে একবার বসুন, আমি যে জায়গাটা দেখিয়েছি আপনি না হয় হাত দিয়ে দেখুন। সকালে ১০৩ জ্বর থাকবার তাে কথা নয়, কারণটা বুঝলে সেইমত ব্যবস্থা করতে পারি।” বেয়ান রুষ্ট মুখে বললেন-ও-সব এ বাড়ির রেওয়াজ নয়, এ সে বাড়ি নয়।” “তা বুঝতে পারছি না, কিন্তু caseটা গােলমেলে পাছে দাঁড়ায়...তখন... তা না হয় কোনাে মেয়েকে ডেকে দিন। শেষ আপনাদেরই বড় ভুগতে হবে যে, বেয়ান মনে মনে ভয় পেলেও একটু হাসি টেনে বললেন-“ওসব।

নমস্কারী কলকাতায় করতে হয় বটে নইলে কদর থাকেন জানি। ঐ একটা কাচের কাটির কথা শুনে তােমাদের কাজ তাে ! গুরুর কথাতেই লােকে বড় বিশ্বাস করে।” ডাক্তার সবিনয়ে বললেন-“আমরা আপনাদের ছেলেপুলের মধ্যে, ধতটুকু জানি-রােগটা বুঝতে ওসব যে করতে হয় মা ! আর ঐ কাচের কাঠির কথা,-তা মা ওর সাহায্যেই আমাদের লাটের অসুখও দেখতে হয়।” “তুমি ভদ্রঘরের ছেলে দেখছি। না হয় আর একবার নাইবাে। এ বিছানায়” বলে ঠোট বেঁকিয়ে, সামলে—“রােগীর বিছানা কিনা?” ডাক্তার বললেন-“তা ত’ ঠিক কথাই। কষ্ট হবে তা বুঝছি মা। অনেক রুগী ফেলে বাল্যবন্ধু গুপী ভায়ার অনুরোেধ এড়াতে না পেরে এসেছি। আপনার অসুবিধে বুঝতে পারছি, বেড়ে গেলে এর পর আপনাদের বিব্রত হতে না হয়—তাই। আমি ত আর বার বার আসতে••। হ্যা, এই খানটায় একবার হাত দিন মা।” ‘মা’ বুলিটাই কাজ দিলে। বেয়ান সদয় হৃদয়ে নির্দিষ্ট স্থানে হাত দিতেই রােগী “মাগাে বলে কেঁদে উঠলাে।” “চুপ করা বেহায়া মেয়ে,-বাপ এসেছে কিনা ডাক্তার একটু গম্ভীর মুখে চুপ করে থেকে শেষ বললেন-“এখানে নিশ্চয়ই ভালাে ডাক্তার আছেন, কিন্তু•••* মণিমালা পড়েছিল সিড়ির ডান দিকে—তাতে একটা পইটের কোণ লাগে, তার তাড়সেই বেদনা ও জ্বর বৃদ্ধি। ডান দিকে লাগার আভাস ডাক্তার একটু পেয়েছিলেন। গুপীর মুখ থেকেও ধীরে right abdomen কথাটির সঙ্গে appendi পর্যন্ত নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে, আপনা আপনি ভাবার মত। ডাক্তার সজাগই ছিলেন—miss করেন নি। ডাক্তারের কথাই মাতঙ্গিনী দেবী একাগ্র শুনছিলেন। তাঁর রাঙা তিজেলের মত মুখ রং বদলাচ্ছিল, চক্ষুর চঞ্চলতা ছিল না। বললেন—“তুমি বাবা ঘরের ছেলের মত। আমার বয়েস হয়েছে,-কৰ্ত্তা মানুষ নন, নানা ঝাট মাথায় নিয়ে ঘর করি, সলতেটি নমস্কারী পর্যন্ত নিজে পাকাই,আবার উষা মেয়েটা সময় বুঝে বিউতে এসেছে। আমাকে খুলে বলল—তুমি আবার কিন্তু বলেই অমন ক'রে রইলে কেন? রক্ত-আমাশা তো হামেশা লােকের হয়, সেঁড়ি গুলির ঝােল আর আমরুলের রস খাওয়ালেই সেরে যায়, তাতে তােমার মত ডাক্তারের মুখে অমন কিন্তু বেরুলাে কেন ?” ডাক্তার বললেন-“আশ্চৰ্য্য, আমি আপনার মত বুদ্ধিমতী দেখিনি মা, ওটুকুও লক্ষ্য করেছেন। আপনার একটি কথাও বেঠিক পেলুম না। পেলুম না। রক্ত আমাশা সত্যিই তেমন মারাত্মক রােগ নয়—ভােগায় বটে। তার জন্যে “কিন্তু বেরয়নি মা। তবে বউ আপনার বেকায়দায় পড়ে গিয়ে বােধ করি মােক্ষম আঘাত পেয়েছিলেন, তার জন্যেই এই বিপদটি। সকালে ১০৩° জ্বর দেখেই চমকে গিয়েছিলুম। যা অনুমান করছি তা যদি হয়, ভগবান না করুন, হলে মেডিকেল কলেজ ছাড়া উপায় নেই, গ্রামে বা বাড়িতে তা যে সম্ভব নয়, তাই মুখ থেকে “কিন্তু বেরিয়েছিল মা। পেটে বােধ করি ফেঁাড়ার সূত্রপাত হয়েছে—যাকে “ঞপিণ্ডিসাইটি” বলে”— বেয়ান হঠাৎ বিচলিত ও রুষ্ট হয়ে বললেন —“তুমি কি বলছে ডাক্তার, এসব তাে বাপের জন্মে শুনিনি। না হয় যা হবার হত, কতো ত’ হচ্ছে। আমার মাথা খেতে আসা কেন ? বউকে কেইবা বেকায়দায় পড়তে বলেছিল। আর আমার এ-পিণ্ডির ব্যবস্থা করতেই বা কে বলেছিল। হাড়ে নাড়ে আলালে, এখানে যদি না হয় তােমাদের মেয়ে নিয়ে যাও তােমাদের রাজবাড়িতে। একটা বউয়ের জন্যে এ বাড়ির বংশ মর্যাদাতাে নষ্ট করতে পারব না—বাঁচাটাই কি...” “ও কি করছেন মাস্থির হােন্। আপনি এত বিচলিত হলেন কেন। ভাবনার কি হয়েছে? রাগ করেই বলুন আর মনের দুঃখেই বলুন—ভাল কথাই বলেছেন। এ অবস্থায় ওর চেয়ে ভালো ব্যবস্থাও যে আর নেই। ক্রোধের অবস্থায় বললেও শুনেছি যাদের পুজো পাঠের শরীর তাদের মুখ থেকে ভুল, বেরয় না। মেয়ে নিয়ে যাওয়াই ভাল-রােগটা এই সবে দেখা নমস্কারী ৫৮ দিয়েছে, ভগবানের দয়া হলে এখনাে বসে যেতে পারে-সেই চেষ্টাই করে দেখা চাই। তারাে অনেক ল্যাঠা আছে। উষা-মার (মেয়ের) আসন্ন প্রসবের অবস্থা শুনছি—আপনারা কম ল্যাঠা নেই। আপনাকে সব দিক দেখতে হবে তাে। যা বলেছেন, ও ভগবানের বানাে। এখন দু’ জায়গায় ঝঙ্কাটের ভাগ থাকাই ভালো মা। মাস তিনেক পরে, তখন বউ আনলেই হবে—কি বলেন? মাতঙ্গিনী দেবীর সে প্রলয়ঙ্করী ভাব, ডাক্তারী প্রলেপে ক্রমে শান্ত হয়ে এসেছিল—একটু হাসিটানাভাবে বলেন—“আমাদের আনাআনি নেই বাবা, বেইকেই সঙ্গে করে এনে রেখে যেতে হবে, এ বাড়ির নিয়ম ভাই। কিছু মনে ক’রনা বাবা, একা মানুষ কতদিক আর সামলাব-মাথার ঠিক থাকে না, যেন আগুন ধরে যায়। মুখ থেকে যখন বেরিয়েছে—নিয়েই যাও। আমিও মেয়েমানুষ—সব বুঝি তো-বাপ মার কাছে গেলে মন্দ হয় না। আমাদের কষ্ট হয় হােক—আপত্তি নেই বাবা। বাপ-মার কাছে সব কথা সহজে বলতে পারবে, এখানে তাে পারে না-বউমানুষ কিনা ডাক্তার বললেন—“দেখুন দেখি, আমার মায়ের চেয়ে এমন বিবেচনার কথা কে এমন বুঝবে। গুপী তাে ও প্রস্তাব করতে সাহস পায় না, তাই বােধ করি চুপ করে আছে।” “ওমাসে কি কথা। তবে মােক্তারি করেন কি করে? ওঁর মেয়ে উনি নিয়ে যাবেন তাতে আবার আমি তখন বলতে বাধ্য হলুম-“যে বাড়িতে কত চেষ্টা করে মেয়ে দিতে পেরেছি—সে বাড়ির মর্যাদা কতো তা’ত আমি জানি। তাদের সনাতন নিয়ম রক্ষা করাই আমার কর্তব্য, সেটা ভঙ্গ করতে সাহস কি করে পাব বেয়ান? তাই ওকথা মুখে আনতে পারিনি।” • “তা ঠিক কথাই বলেছ, কিন্তু তােমার মেয়ে যে অনাছিষ্টি করে বসেছেন। এ বাড়ি চিনতে ওর অনেক দেরী নমস্কারী “এটিও আপনার ঠিক কথা মা এখনাে ওঁর ঘর বুঝে নেবার—যা। মা যখন অনুমতি দিচ্ছেন, এখন তােমার তাে আর বাধা নেই ভাই।” “না—এখন আর আমার বাধা কি ডাক্তার। কিন্তু তুমি তাে ভাই বলে রেখেছ—এখান থেকে সােজা কলকাতায় পাড়ি দেবে ডাক্তার বললেন:“সেই কথাটাই ভাবছি ভাই। (বেয়ানের দিকে ফিরে )—কিন্তু সঙ্গে একজন ডাক্তারের পৌছে দিয়ে আসতে যাওয়ারও যে দরকার হবে না। দু একটা ওষুধও সঙ্গে থাকা চাই—ডাক্তারদের ওটা রাখতে হয়- *তােমার সঙ্গেও আছে নাকি?” “তা আছে বইকি মা, ডাক্তারদের দায়িত্ব যে অনেক, পাড়াগাঁয়ে পথে ঘাটে কারাে কিছু ঘটলে, কোথায় কি পাব”— “তা হলে বাবা—তুমি সঙ্গে থাকলে আমার দুর্ভাবনা থাকে না, সেটা আজ হতে পারে না কি ?” “আজ? শরীর ভয়ঙ্কর দুর্বল দেখলুম যে।” একটু চিন্তিত ভাবে আপনা আপনি—“দু একদিনে বেড়েও ত যেতে পারে—তখন আর “আচ্ছা, আমরা বাইরে গিয়ে বসছি। আপনি একটু আদা-আদি জল মেশান গরম দুধ-চামচ, চামচ, করে বউকে খাইয়ে দিতে বলুন। আমি আধ : ঘণ্টা পরে আর একবার দেখে যা হয় ব্যবস্থা করব।” “উভয়ে বাইরের বৈঠকখানায় এলুম।” —“একটা কথা বলতে ভুলেছি—বেয়ানের স্বহস্তে পাকানাে মার্বেলের মত আটটি তামাকের গুলিবরাদ্দ মত বেই নিত্য পেয়ে থাকেন। আমরা.. আসছি দেখে তামাক সাজবার জন্যে তিনি তার তিনটে গুলি একত্রে চটকাবার উপক্রম করছিলেন। নচেৎ তারা যে অগ্নিস্পর্শেই উপে যায় —“মাতঙ্গিনী দেবী, সঙ্গেই এসে পৌঁছেছিলেন গুড়ুকের দুর্গতি দেখে বললেন-“ও আবার কি হচ্ছে ?” হরিশবাবু থতমত ভাবে বললেন-- ভদ্রলােকেরা এসেছেন, তিনটে এক সঙ্গে না নিলে যে বেইয়ের নমস্কারী “বেইয়ের না তােমার ? আট ছিলিমও পার নেই-সংসারের শনি। আচ্ছা!*•••বাকিটা তার চক্ষুই বলে দিলে, আর ঐ “আচ্ছার মধ্যেই রইল। -“যাই দুধ খাওয়া হয়েছে বােধ হয়, দেখিগে।” ডাক্তার বললেন-“হ্যা মা-ওটা আগে।” -শোনা গেল, ভেতরে কে বলছে-বাড়িতে দুধ কোথায়?” একজন জিজ্ঞাসা করলে-“ব’য়ের সঙ্গে কি কি যাবে মা ?” বেয়ন বলছেন—“যাবে আবার কি? রােগ নিয়ে বাপের বাড়ি যাচ্ছে দু’খানা আটপৌরে কাপড় দিলেই হবে।” “আর গয়না টয়না?” “তােরা আমায় পাগল করবি”—আর শােনা গেলনা। হরিশবাবু ভবিষ্যৎ ভেবে সব কটা গুলি চুলিতে চড়িয়ে দিলেন। আমি বুঝলুম-“শুভস্য শীঘ্রম্।” ডাক্তারও সেই সঙ্কেতই করলেন। তামাক টানতে না টানতেই মাতঙ্গিনী দেবী হাজির। ডাক্তার বললেন—“মা, নিয়ে যাওয়াই ঠিক করলুম, এখন বাড়ের মুখ, কি জানি যদি“তখন আর আপনি গাড়িতে তুলে দিন, আমি শােকর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।” একি আসা হ’ল! দেরি-করতে বলতেও সাহস হয়না, হারামজাদা চাকরটা সেই গেছে-পথ চেয়ে রয়েছি। কিছু মুখে দিয়ে না গেলে যে “না মা, আজ এ অবস্থায়, বুঝতেই পারছেন•••আপনার আশীর্বাদই যথেষ্ট।” তারপর আর কি শুনবে দাদা! কাল রাতে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। সবই রাজকুমারেরই করা, নচেৎ সে যমপুরী থেকে বার করবার উপায় শত সাবিত্রীও করতে পারতেন না। বেয়ানের ভাবটা-“বউটা গেলেই লাভ।”-- হাজার দুই টাকার জিনিষ-হাতে রাখলেন। যা তােমাদের আশীর্বাদে আর ডাক্তারের কল্যাণে এখন মেয়েটা বাঁচলেই যথেষ্ট। রাজকুমার ডাক্তার বললেন-“গুপী ভায়া গাড়িতে যাবার সময় আমাকে নমস্কারী যেন পাখী পড়াতে পড়াতে গেছেন। সে রকম তালিম পেলে কার মামলা জিত, না হবে। উপদেশ ছিল বেয়ানকে বিনয়ে একেবারে “মা” করে নেওয়া চাই। মাথা নিচু করে বসেছিলেন বটে, কিন্তু দরকারে চোখের কোণ আর পায়ের তাল কথা কইছিল। ইঙ্গিৎগুলাের মানেও বুঝিয়ে রেখেছিলেন। বলেও ছিলেন—রক্ত আমাশায় সে বেয়ানের মন ভুলবেনা তখন ব্রহ্মান্ত্রের ব্যবস্থা—ওই ‘এ্যাপেণ্ডিসাইটিস। এ সব সারা রাস্তা শিখিয়েছেন। বড় মােক্তার ও ফাকি দিয়ে হয় নি–স্কুল থেকেই ওর বুদ্ধির পত্তন ছিল- তােমরাও তত জানাে। সে বাঘিনীর বাসা থেকে অন্য কোন মিয়াই মেয়ে আনতে পারতাে না—এ আমি শপথ করে বলতে পারি গােপীনাথ বললেন—“কিন্তু তােমার সাহায্য না পেলে পারতুম না ভাই। বড় বড় ধুরন্ধর পাপিষ্ঠ সাক্ষীদের ঘাবড়ে যেতে দেখেছি, তাদের ভুলে মামলাও হেরেছি, কিন্তু তুমি ভাই...” রাজকুমার"Thank you for the Certificate আর নয়, মাপ, করাে। তুমি উত্তরসাধক রূপে না থাকলে আমার সাধ্যও ছিলনা ভাই।” • “আমরা কিন্তু জেনে রাখলুম” বলে সকলেই হাসলেন। গােপীনাথ চিন্তিত ভাবে—এখন ভাই মেয়েটার ডাক্তার-ওর জন্যে ভেবনা, মণিমালা এক সপ্তাহেই সেরে উঠবে। আমি . ভাবছি তােমার বেচারা বেইয়ের জন্যে—তার গুডুকের গয়া হয়ে গিয়ে থাকবে। তুমি তার গুড়ুকের আডডায় মাঝে মাঝে সের পাঁচেক করে ভালাে তামাক পাঠিয়ে দিও ভাই—এইটি আমার অনুরােধ রইল।” গােপী—“নিশ্চয় দেব ভাই। উঃ কি দজ্জাল!” আশুখুড়াে বললেন-“নিজের জন্যে একটা প্রায়শ্চিত্ত করে ফেল গুপী, আর মেয়ের তরে স্বয়ন। শিবু আচাষিকে আজই ডেকে পাঠাও।” “সেই কথাই ভাবছি খুড়ো-দৈব ছাড়া বস্ নেই—পথও নেই।” নটু জ্যাঠা বললেন—“অমন হয়, অমন হয়, পুরুষদের হাঁকডাক্ চিরদিনই বাইরে-অন্দরে নয়। ছাঁদনা তলা থেকেই ওঁরা পুরুষদের কঁাধে চড়ে বড় নমস্কারী ৬২ হয়ে আসেন, ‘বর বড় না কনে বড়’র সাতপাকটা মনে নেই? সেই দাবীতেই আমাদের খাবিখাওয়ায়। ও ঝেড়ে দাও, যাক—এত কথা কইলে, কিন্তু “সােনা” ফেলে। তােমার জামাই-নন্দদুলাল নাম না? তার উল্লেখ পৰ্যন্ত যে পেলুম না। জামাই ভালাে হলে সব সয়ে যায়রে বাবা।” “ক্ষ্যামা দিন জ্যাঠামশাই-গরিবের ঘরে সােনা না ঢোকাই ভালাে। তিনি বেয়ানের মাদুলি-মােহন’-দেবতার দোরধরা ছেলে। অধুনা কলকাতার রূপদ পক্ষীর পেয়ারের শিষ্য-লক্ষ্মীর ধোঁয়ায় পাকছেন।” “দুঃখু করে আর কি হবে গুপী, দুনিয়াটাই এমনি। বেশী বয়সে বুদ্ধিমানদেরই পা খানায় পড়তে দেখি। তা না ত’ তুমি কুলীনের কবলে পড়! যাক, বলছিলে না—ছেলেরা লায়েক হয়েছে—মানুষ হয়েছে—অর্থাৎ কেরাণী হয়েছে। এইটিই আমাদের ধাতে সয়—“অমৃত-সমান” আর ভয় নেই। বাড়-বৃদ্ধি দু টাকা বছর, নজর বাড়তে দেবেন—বড় কুলীনের বা বড়দের কাছে ঘেঁষবেন। আশুগুড়াে বললেন—“Hear, Hear!” সুপ্তোন্ধার স্থান-কৈলাস উমা। জয়া, একবার দেখে আয় দিকি কৰ্ত্তা কি করছেন? ধ্যানস্থ কি? জয়া। তঁাকে আবার জালাতন করা কেন ? উমা। আমি একা আর কত জ্বালাতন হব, আমি যে গেলুম। দিনরাত “মা মা করে ছেলেরা যে অস্থির করছে। আবার কি হল? একটা না একটা লেগেই আছে। জয়া'। নতুন কিছু নয়, সে তো দুই-তিন বছর চলছে। উমা। দুই-তিন বছর? কই, তা তাে কিছু জানি না ?

নমস্কারী
জয়া। আমার নন্দীর কাছে শোেনা। তারা বহু দূরের, সেই অস্তগামীর
দিকে থাকে কিনা, “মা মা” করে না, তাই শুনতে পাও নি। তারা নিজেকেই
জানে, নিজের ওপর নির্ভর রাখে।
উমা। সত্য-যুগ আরম্ভ হয়ে গেছে বুঝি,-বেদান্ত-চর্চা করছে ? ভালই
হয়েছে-
জয়া। না, অতটা হয় নি, অহংকে আঁকড়ে ধরে মিথ্যাকে একদম সাফ
করে ফেলেছে, তাকে না সরালে সত্যের স্থান হয় না যে।
উমা। বলিস কি! ভেতরে ভেতরে ঠিক ভুলটি ধরেছে তাে। হবে না,
একদিন হতেই হবে, তা জানতুম। বড় আনন্দ পেলুম, বেঁচে থাক সব।
ভারত একদিন আচার্যের আসন নেবে বইকি। কিন্তু কি লজ্জার কথা
বল দিকি ? ওর অপেক্ষা কেউ করলে কি, কেউ পুছলে? কতদিন আর
সইবে? যাই, একবার শুনিয়ে আসি—( দ্রুত চলে গেলেন।
জয়া। (নিজে নিজেই ) তাই তো, নন্দীর কথা শুনে কি করলুম! সেও
তাে টানে, না টেনে ওঁকে দেয় না। মিছে হ'লে ধমক খেয়ে না আসেন।
যাই, বেলতলাটা ঝাট দিতে দিতে একটু শুনিগে। (প্রস্থান)
শিব আসনে বসে ঘন ঘন হাই তুলছেন,- চক্ষু বুজেই আছেন।
উমার প্রবেশ। তার গতিটা একটু তরস্থ ছিল, শব্দ শুনে নন্দী ভেবে
শিব। হারামজাদা, এখন তােমার হুস হল? আর না অমাবস্যা,
রাত আর কতটুকু আছে ? আমার সব কাজ বাকি-
উমা। রাত আবার কি? একপাের বেলা হয়ে গেছে। তিনটে
চোখেও কুলুচ্ছে না নাকি?
শিব। কে, উমা নাকি—এত রাজে? কার্তিক ভাল আছে তাে?
উমা। আবার রাত ? একবার চেয়েই দেখ না।
শিব। (হাই তুলে, চোখ না খুলেই) টুস, তাই তাে!
উম। (কভাবে আমার মাথা, চোখ বুজেই
শি। পারি না বুঝি, এই দেখ। (ভুরুটা কেবল কোচকালেন।)

নমস্কারী ৬৪ ট, উমা। তাই তাে, খুব হয়েছে। আর কাজ নেই, এদিকে যে শিবত্ব ঘােচ। শিব। ঠিক বলেছ, পঞ্চত্ব ওই হারামজাদাই পাওয়াবে। রাত পােয়ায় -বেটার হুস নেই। হাই তুলে তুলে হাঁ বেড়ে গেল। একবার দেখ না, বেটা ঘুমুচ্ছে বুঝি উমা। ফের—আবার রাত ? শিব। আহা, বুঝছ না-বেটা গণ্ডমুখ, “ন দিবা শাপি ও জানে না। একটা ইংরিজী-জানা লােক দেখে—ওকে নিয়ে আর উমা। ঐ ইংরিজী-জানা পণ্ডিতদের কথাই তাে বলতে এসেছি। শিব। আঃ, বঁাচালে দয়াময়ী! এত দিকে নজর রাখতে পার! শুনেছ বুঝি, এখন দারােয়ান পিওনদেরও ম্যাট্রিক পাশ করে চাকরি পেতে হয় ? দুর করে দাও, দুর করে দাও হারামজাদাকে, অভাব কি? এখন ভিখিরীও ভিক্ষে নিয়ে থ্যাঙ্কস দেয়, আর এ গর্দভ পােড় কলকে দেয়! বেইমান, এইবার বুঝবে বেটা- উমা। এখন তুমি বুঝলে যে বাঁচি। শিব। দেখে নিও। আমার এ “মরকি বাৎ”। উমা। ওদিকে মদ্দামি যে যায়! তােমার তেঁতােমি দেখে সুসভ্য শিক্ষিতেরা তােমার তক্কা না রেখে নিজেদের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করেছে, “পুরুষকায়ে পৌছে গেছে। বেদান্তের সরে পৌছে গেলে আমাদের আর পুছবে কে? তারা আর “বাবা বাবা”ও করে না, “মা মাও করে না স্বয়ং সিদ্ধ। নিজেকেই জানে, নিজের ওপরেই বিশ্বাস। বলে সায়েন্সই সবার বড়, বুদ্ধির জোরে তাকে হাত করতে পারলে, কোনও মিঞার পরােয়া রাখি না।কানের তাে পলক নেই—শুনছ ? শি। একটু আছে বইকি—ঐ জটাগুলো। উমা। আরও ঘটা করে বাঘ-ভাল্লুকের বাসা বানাও। শি। সাপগুলাে মাথায় উঠেছে, দিন কত আনন্দ করুক না। ওরা নিজের ছেন। নিজেরা খায়— ।

নমস্কারী উমা । কথাটা বুঝছ না, তুমি ধ্বংসের মালিক কিনা, এখন তারা তাইতে মাথা দিয়েছে ধ্বংসের কল বানিয়েছে—বানাচ্ছে। “গেল গেল” রব পড়ে গেছে দুনিয়াময় । শিব। আমার পরম সহকারী ভক্ত বল । উমা। সহকারী নয়—কীৰ্তিহারী। -কীৰ্তিহারী। তােমাকে বাতিল করাই উদ্দেশ্য— করেই দিয়েছে। বুঝেছ—দেবতা আবার কি? সব আমরা। আরও চোখ বুজে থাক—ভিক্ষেও মিলবে না। আমার কার্তিক— সুরটা ক্রন্দনের আওয়াজ দিল ) শিব। আহা, শােন না। আমার কাজের বাধা তাে তুমিই। সাধে কি চোখ বুজেছি? একবার ‘মা’ বললেই মাফ! ওদের ‘সায়েন্সে’ সেটি পারে না—শিশু-সুদ্ধ, মা সাফ। দোষী নির্দোষ নেই। দেখ দিকি, কেমন সােজা রাস্তা। একে বলে বুদ্ধি,—তাদের বৃদ্ধি হবে না? যাক, কাদের এত বুদ্ধি বাড়ল? ভারতবাসীর ? উমা। ওগগা না, তারাই তাে “মা মা করে আমায় জালাচ্ছে। শিব। এখনও মুখ খুরা আছে ? যেতে দাও না, দু নৌকোয় পা দিয়ে থাকা কেন, যাক না। বছর বছর বাপের বাড়ি যাও কি চোখ বুজে? কেবল আমাকেই চোখ বুজতে দেখ ? ওর যে আরাম কত, তা তো জান না। উমা। কেন আমি চোখ বুজে যাব কেন? বাড়ি, ঘর, রাস্তা ক্রমেই পাকা হয়ে যাচ্ছে—দেখব না কেন? তুমি একবার চক্ষু সার্থক করে এস না =মা কত বলেন- শিব। বটে, সব পাকা হয়ে যাচ্ছে। আর তাদের পিতৃপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত, আমাকে উৎসর্গ করা মন্দিরগুলাে সব ফাকা হয়ে যাচ্ছে। রাতে গােরুর গাড়ি করে কেউ আমার গঙ্গাজলী করে আসছে, কেউ পাকা বাড়ির ভিতে গাের দিয়ে বাড়ি পােক্ত করছে, না? পরের মুখে ঝাল খাওয়া বিদ্যে শিখছে—বুদ্ধি বাড়ছে, কমে পইঠে বানাবে, সেইটের অপেক্ষা করছি। পথ

নমস্কারী
পাও তাে এইবার দেখে এস—বাপের বাড়ি খুঁজে নিতে হবে কিন্তু। আর
‘কণকাগুলির লােভ যেন না থাকে।
সচকিত ভাবে কানঢাকা টাগুলাে সরিয়ে
বীণাবাদ্য না ?
বীণা হন্তে নারদের প্রবেশ
নারদ। এই যে, মাও উপস্থিত।
( উভয়কে প্রণাম )
উমা। এস, নারদ এস। অভীষ্ট লাভ কর।
শিব। এত রাত্রে যে ? সব মঙ্গল তাে?
উমা। আবার ঐ কথা ?
শিব। না, এত বেলায় যে ? (নারদের প্রতি) উনি বুঝতে পারছেন
, রাত কি দিন। (উমার প্রতি) হারামজাদাকে একবার ডেকে দাও না,
হাই তুলতে যে আর পারছি না।
কষ্ট হাতে উমার প্রস্থান
(নারদের প্রতি) দুনিয়ার হালচাল কি দেখে এলে, সব ভাল তাে?
নারদ। (মাথা চুলকুতে চুলকুতে) মরবার বয়স পেরিয়ে গেলুম, কিন্তু
ঐ “ভালর” অর্থটা মাথায় ঢােকে নি প্রভু। একজনের ভাল, আর একজনের
মন্দ না হলে তাে বড় দেখতে পাই না। কার কথা বলব—একটু খুট
ধরিয়ে দিন।
শিব। ধর—এই যেমন সায়েন্স।
নারদ। ও, ও তাে আপনার ডিপার্টমেন্টের কথা। তার প্রভাবই
ততা এখন পৃথিবীময়। প্রধান স্থান সেই নিয়েছে। বাহবা পড়ে গেছে।
আপনাকে আর আসন ছেড়ে উঠতে হবে না, কাজ আপসে চলছে ও চলবে।
তােফা জিনিস বানিয়েছে, একটা ছাড়লেই হাজার লােক ফিনিশ। দেবরাজের
বন্দ্র তার কাছে এখন চীনে পটকা--আপনার ‘টিকে ধরাবার কাজে লাগতে
পারে বটে।
শিব। বল কি হে নারদ-এমন ?

৬৭ নমস্কার নারদ। বলেছি আর কই, অমন কত কি করেছে ; একরকম তাে নয়। একটা কথা বললুম। ফলে আপনাকে আর ভাবতে হবে না। শিব। বাবাজীর নামটি কি ? নারদ। সেটা পরে শুনবেন, আমার সাহসে কুলুচ্ছে না। আর একটার কথা বলি। শিব। সে আবার কি, তাঁর কাজ ? নারদ। তিনি উভচর, যাতে ঠেকেন, তিনি আর টেকেন না তা জলেই কি আর স্থলেই কি। রাজপ্রাসাদকে স্পর্শ করলে দ পড়িয়ে হ্রদ বানায়, না হয় মরুভূমি। সমুদ্রে লৌহদেহ মানােয়ারি জাহাজে ঠেকেছে কি তিনি মাল-মানুষ সমেত তলসই। তার নাম ‘টরপেডাে'। একটা গ্রাম গ্রাস করতে একটিই যথেষ্ট। শিব। বড় সুখবর শােনালে নারদ। হ্যা, ঐ প্রথমটির নামটি যে শােনা হয় নি। নারদ। অভয় দিতে হবে কিন্তু, না অনুমতি নিয়ে একটা বড় অপরাধ করে ফেলেছি প্রভু। বয়স হয়েছে, মায়ু দুর্বল, সহজেই ক্রোধের উদয় হয়, সইতে পারি নি। শিব। সে তাে আমারও গো। এই দেখ না, নন্দী হারামজাদা আজ জুতাে খাবে দেখছি। ভাগ্যে তা নেই, তাই বেঁচে যাচ্ছে। আজ আর রাগের ভাগ অন্যে পাবে না, তুমি অসঙ্কোচে বলতে পার। দুনিয়ার খবরের জন্যে আমি উৎসুক নই, তারা স্বাধীন জাত, মারতে জানে, মরতে জানে, আমার কাজ সহজেই চালাতে পারবে। পেশন নেবার বয়স হয়ে গেছে, কেবল কার্তিকবাবুর খরচ যােগাবার জন্যে এক্সটেনশনে থাকতে হয়েছে। বেটার পােশাক এসেন্স আর চুল-ছটার বিলেই পিলে শুকুচ্ছে। আবার কে ‘পেলিটি’ আছেন, তিনিই ছেলেটির মাথা খেলেন। যাক, আমাকে ভারতের খবরটি শােনালেই হবে। নারদ। (স্বগত) ফেললে গাড়ি নামায়। ( মাথা চুলকে প্রকাশ্যে ) নমস্কারী ৩৮ সব চাক্‌রে কিনা, আফিসে অধিকাংশেরই কাপি করা কাজ, তাই সব বিষয়েই তারা অনুকরণপ্রিয়, দাগা বুলুতে দক্ষ হয়ে পড়েছে, দোষ বড় নেই। বিদেশীদের যা দেখে, তাই শেখে। তাই পূজাপাঠ উঠে গেছে, তাদের নেই কিনা। মন্দিরগুলােয় লােক ঢােকে না, ঢােকে ছুচো প্যাচা আর চামচিকে। শ্যাল-কুকুরের আড়াও হয়েছে। নাম আর করব না, সেদিন দেখি মন্দিরগুলো মিউনিসিপ্যালিটিকে বেচেছে, তারা মন্দির ভেঙে; আর শুনে কাজ নেই। শিব। (জটা খাড়া হয়ে উঠছিল) বল, বল, শেষ কর- নারদ। ( বল পেয়ে শেষ হবার দেরি নেই, আপনিই হবে। পূজো মনে মনেও চলে, চলতও, কিন্তু বম্বটা এক-একবার সাড়া দিত কোথাও তা কানে এল না, তখন প্রাণে এল রাগ, অপরাধ করে ফেলেছি প্রভু, ক্ষমা চাইতেই এসেছি। শিব। ( ক্রমােচ্চ স্বরে) তারপর, তারপর? ( বলতে বলতে তৃতীয় চক্ষু ধধ করে জ্বলে উঠল) বল, বল, তারপর ? নারদ। (কাপতে কাপতে, স্বগত) তাই তাে, করলুম কি? ( প্রকাশ্যে ) থাকতে পারলুম না প্রভু। সায়েন্টিস্টদের ঠিকানা জানি না। ঠিকানা জানি না। একে ওবে জিজ্ঞাসা করি, বুড়ো আর এই চেহারা দেখে সব পাগল ভাবে—কেউ লালবাজারের থানা, কেউ ধাপার মাঠ দেখিয়ে দেয়। ভাবছি ব্ৰহ্মার শর নিই, এমন সময় হঠাৎ এক বিকট কান্নার স্বর। বাঙালীদের কি দয়া শরীর, মেয়ে মদ্দে উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটছে, বোধ হয় সান্ত্বনা দিতে। ভ্যাবাচ্যাক লেগে গেল। কি গা, কি হয়েছে—কোথায়, কার ? কেউ কথা কয় না একজন পাজামা-পরা প্রবীণ আমাকে ধাক্কা মেরে বললে, সত্বর একটা বাড়ি মধ্যে ঢুকে পড়, সার্সিওয়ালা বাড়ি না হয়। বাইরে উঁকি মারবার চেষ্ট করে না—শিগগির। ছুটলেন। আর একজন আমাকে হিড়হিড় করে টেনে একটা বাড়িতে ঢুকিয়ে দিলে। সেটা বাইরের ঘর, আরও কজন ছিল সৰ কঁপছে আর ত্রাহি ত্রাহি দুর্গানাম। কথা কইলেই ধমক দেয়। তি নময়ার মিনিটেই আকাশ ফুড়ে উল্কা! চন্দ্র সূৰ্য্য যেন চারদিকে আলো করে নামছে, আবার তার আওয়াজ কি! বজ্রপাত মেঘগর্জন তার কাছে যােবা মেরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে শহরময় হৈ-চৈ-পরেই হাহাকার, গেল গেল রব। পরে শুনেছি, উনিই সেই প্রথম নম্বরের তিনি, নাম “বােম্”। শিব। ( উত্তেজনার সহিত) কিছু কাজ হয়েছে ? নারদ। কিছু হয়ে থাকবে বইকি, বস্তুটি কঁাচাখেগো কিনা। তবে ঠিক খবরটা কে রাখে ? যাদের কেউ গেছে, তারা রাখে বটে। শিব। যে নাম শােনালে সে অকেজো হতেই পারে না, যমের সঙ্গে ‘বমে’র অমন সুমিল যখন রয়েছে, কাজ করেছে বইকি। ধৰ্ম্মরাজের লিস্টখানা তলব করলেই পার। নারদ। শুনলুম, তারা যা ছেড়েছিল, তা নাকি কিছুই নয়, খেলাঘরের পটকা, লােককে একটু ভয় দেখানাে। এখনও আসল মাল ছাড়ে নি। শিব। (উৎফুল্ল হয়ে) শনৈঃ পন্থা। নারদ। আমার ঐতেই কাজ হয়ে গেছে প্রভু। এখন মেয়ে-মন্দ, এণ্ডা- বাচ্চা, বালক-বৃদ্ধ সবার মুখে দিনরাত ‘ব’ বেরুচ্ছে। বম্ ছাড়া কথা নেই। মােটর মেরে বাইরে বেড়ানাে থেমে গেছে। শিব। ওটা যে তেলের কাজ, তেল ফুরিয়েছে বুঝি—( অদূরে উমাকে ও পশ্চাতে নন্দীকে কলকেতে ফু দিতে দিতে আসতে দেখে) নারদ, কথা বদলাও, কথা বদলাও। তােমার ছিচকাহুনি মা-টি আসছেন। ওল্ড ফিমেল, বুঝেছ তাে, হােল্ড ইওর টাং। উমা এসে পড়লেন (নন্দীর প্রতি) আর ফু দিতে হবে না রাঙ্কেল। ওতে কিছু আছে কি? টেনে এনেছ তাে? কসকে নিয়ে একটানে চতুর্দিক ধুমাকার উমা। (চোখে মুখে আঁচল ঢেকে) ধোয়ে যে সব অন্ধকার হয়ে গেল। শিব। . হবে না? আগুনে জল পড়ল যে! কলকে নয়, বেটা ফায়ার T নমস্কারী ব্রিগেড এনেছে। হ্যা, নারদ, যা বলছিলে এইবাৰ বল, উনিও এসেছেন, শুনুন। চোখে তাে দেখতে পাব না, শুনেই সুখ। ওই তােমার দ্বারিক মােদকের দরবেশের কথাটা হে। নারদ। বললুম তাে। শিব। ছাই শুনেছি। তখন কি আমার শােনর অবস্থা ছিল ? .উমা। বল না নারদ, আমিও শুনি। নারদ মা, সে আর কি বলব, দ্বারিক মােদক এমন তােফা মিষ্টান্ন- ভাণ্ডার খুলেছে, আর এমন সব জিনিস বানাচ্ছে, আগেকার পান্নো, মােণ্ডা, মেঠাই, রসগােল্লা সব গােল্লায় গেছে, এখন তারা কেউ ‘পরিতােষ’, কেউ ‘পরিমল’, কেউ ‘পারিজাত। পার্শেলের প্যাকেট, সুটকেসের বাছারা বয়ে নিয়ে যায়। উমা। কোথায় ? নারদ। যেখানে বাঙালী আছে মা-পেশােয়ার, ফ্রন্টিয়ার সর্বত্র। তৃতীয় নয়নটি তাে খুলবেন না, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, ষষ্ঠীবাটার ঘটা যদি দেখতেন! একেবারে অমৃত বণ্টন হচ্ছে! চাটগাঁ পৰ্য্যন্ত তার সুগন্ধ পৌছেছে। রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি নিত্য বরাদ্দ। লােকের ভিড় কি! মােদকের দেরাজে প্রশংসা পদক আর ধরছে না, দেশের অবস্থা ভালই মা। পুরুষেও নাচে, বলে শিব নৃত্য। কই, বাবাকে তাে কোনদিন নাচতে দেখি নি। শিব। দেখবে দেখবে, দেখাব। উমা । তােমার বাবার তরে দুটো মিষ্টান্ন আনতে হয়। নারদ। লজ্জা দেবেন না মা, মনে যে হয় নি তা নয়। বাবুদের গান শুনিয়ে কিছু টিকিটও যােগাড় করেছিলুম। উমা। টিকিট। নারদ। সকলের পকেটেই ওই, তাইতেই পয়সার কাজ হয়, অথচ ছায়াটে বােগ চালান দেয় না। এমন সময় দেখি, আমারই মত পাকাদাড়ি একটি প্রবীণ রাস্তায় দাঁড়িয়েই একটা সরােজকলি’তে কামড় দিয়েছে

৭১
নমারী
একেবারে বেহাল, রসে দাড়ি ভেসে বসুধারা শুরু। মৌচাক যেন খোঁচা
খেয়েছে। লােকটি অপ্রস্তুত, ফেলে দিয়ে বাঁচে। তাই সাহস হ’ল না মা,
পাহাড়ী পথে-
শিব। হয়েছে, থাম, আর বর্ণনা বাড়িও না। (উমার প্রতি) ও আর
শুনবে কি, ওইসব কথায় এতক্ষণ আমার মাথা খাচ্ছিল, ভাগ্যিস এসে পড়লে।
উমা। (নারদের প্রতি) বেশ করেছ যে, আন নি বাবা, পথে বিপন্ন
হ'তে। গণশাকে যেন শুনিও না, একে পেটুক, তায় পেটের অসুখ লেগেই
আছে। ভালই করেছ। সেখানে ছেলেরা খাচ্ছে, তাতেই আমার তৃপ্তি,
তারা ভাল থাকুক। (শিবের প্রতি সহাস্যে) শুনেছ? ভারি মজা হয়েছে।
আশ্চয্যি কাণ্ড! তােমার তরে নন্দীকে বলতে গিয়ে দেখি, একমনে ইংরিজী
পড়ছে। হতভাগা তােমার সঙ্কলটা শুনলে কার কাছে ?
শিব। সেটা আমি জানি, যার মা আছে তার শােনবার অভাব থাকে
। কিসেরই বা থাকে ? (নন্দীর প্রতি) কি শিখেছিস, একটু শােনা
দিকি, এদিকে আয়।
নন্দী। Rile বলে বলুককে, Cannon হন কামান
বড় বড় কেল্লার গর্ব এক গােলাতেই থামান।
Shell হন তােপের গােলাগুলির ঠাকুরদাদা,
পাথরের আকার ভেঙে বানায় বালির গাদা।
Tommy gun তােপের বাচ্চা-কাজ সারেন দ্রুত,
দ্বাপরের অভিম—অর্জুনের সুত।
মাসতুতাে ভাই Machinegunহন হাজারীলাল,
ছারপােকার বংশ ছাড়েন-কামড়েতে কাল।
চাকায় চড়ে সর্দার আসেন-নাম তার Tank
অন্ত্রের গুদাম তিনি—সবার বড় Rank,
Torpedoও রাখেন পেটে—তার জলে স্থলে গতি
দুর্গ কি জাহাজের যম—ধ্বংসই নিয়তি।

নমস্কারী
৭২
Gunboat, Uboat fpszy Cruiser,
Destroyer হউন না কেন—স্পর্শেই পাচার।
Battleship সে সামনে পেলে Cattle সম মানে,
ডুব মেরে Submarineগুলো সহজে কাজ সারে।
নানাবিধ Gasও হাজির, নাকে ঢুকলেই জখম,
হাসায় কাদায় অক্কাও দেয়, আছে কত রকম।
হ্যা, Fire আগুনকে কয়, Steel ইম্পাৎ,
এই দুই কর্তা মিলেই বাধায় উৎপাত।
তার চেয়ে জানা ভাল Hemp মানে গাঁজ',
বলেন তত এক ছিলিম সেজে আনি তাজা।
শিব। ( উৎফুল্ল হয়ে) যা যা, শিগগির যা। চাকরির তরে আর
ভাবিস নি রাঙ্কেল, এখন সাতপুরুষ বাধামুক্ত, সরকারী ভাষার গুণই ওই ।
বেঁচে থাক।
কলকে নিয়ে আনন্দে নন্দীর প্রস্থান
(উমার প্রতি। তাই তাে গাে, বেটা দরকারী কথা সবই শিখে ফেলেছে
দেখছি। এমন ওস্তাদ মাস্টার পেলে কোথায় ?
উমা। তুমি তাে আমার গ্র্যাজুয়েট কার্তিককে দেখতে পার না।
শিব। বটে, তার এত বিদ্যে ? বিলেত যাক, বিলেত যাক। অমন
সােনার চাদ ছেলে এখানে মাটি হয় কেন ?
তাজা ছিলিম হাতে নন্দীর প্রবেশ
ওকে আজ দুখানা বিস্কুট খেতে দিও। যাও, এখন সব ছুটি। (নন্দীর প্রস্থান)
উমা। (যেতে যেতে নারদের প্রতি) না খেয়ে যেন যেও না বাবা।
নারদ। প্রসাদ না পেয়ে তা কি পারি মা? এখানে চাল কত করে
পাচ্ছ মা?
মা। (সহাস্যে) তােমার সে খোঁজে কাজ কি?
শিব। চারদিকে ঘােরে কিনা, খুব সস্তা দেখে এসেছে, এই সুযােগে

0 १७ নমস্কারী এখানে এনে ব্যবসা করতে চায়। ঢেকি তাে সঙ্গেই আছে। আমাদের কুটবে বােধ হয়। উমা। তােমার যেমন কথা! সস্তা শুনে স্বস্তি পেলুম, ছেলেরা পেট ভরে খাক। (চ'লে গেলেন) শিব। (নারদের প্রতি) কতদিন স্নান করা হয় নি মনেই নেই। চল, একবার মানস-সরােবরটা হয়ে আসি। রাজহাঁসগুলো কেমন সুখে সঁতার দিচ্ছে দেখে আসি, কদিন আর দেখতে পাব, কে জানে। নারদ। কেন, স্নান করেন নি কেন ? শিব। ( সহাস্যে) একটা অষ্টবজ যােগ খুজছি, একেবারে মুক্তিস্নানের ইচ্ছা, ছােটখাট বিয়ােগ-যােগ আর নয়, অনেক হয়েছে। সাপগুলােও মুখ চেয়ে থাকে, শীতে মরে, তাই পারি না। তাদের খুশি রাখতে হয়। নারদ। আহা! দেবতার দয়াতেই চলে যাচ্ছে। শিব। ওরাই তাে নিশ্চিন্ত করে রেখেছে, মাছিটি পৰ্য্যন্ত ঘেষতে পায় , লাফিয়ে কামড়ায়। ধ্যানের বড় সুখ। সুখে ডুবিয়ে রেখেছে। তেল মাখবে কি? বােধ হয় নেই। ( উভয়ের প্রস্থান) খুভাের পরলােক-দর্শন কালাচাদ-খুড়াে চিরকাল লিবারেল লােক। জাতিনিৰ্বিশেষে সকলেই তার আপন, ভিন্নভাব কাকে বলে, জানেন না। রহস্য-প্রিয় স্বভাব। মিশন স্কুলে পড়েছিলেন—যীশুখ্রীষ্টকেও নমস্কার করেন, তুলসীতলাতেও মাথা খোড়েন, মসজিদ দেখলেও সেলাম দেন। শােনাও ছিল এবং চাকুরি-শেষে ‘রিটায়ার’ করেও বুঝেছিলেন, ইংরেজেরা কিরূপ জীবতত্ত্বজ্ঞ—প্রাণনাড়ীর পাকা পণ্ডিত, সূক্ষ্ম হিসাবী। তাই পঞ্চান্নের পরে আদা-জয়ের ব্যবস্থা করে ছেড়ে দেন। দেহে তখন আর রসকস থাকে না, মস্তিষ্ক মেধাশূন্য—ব্যুনাে হয়ে খডুলি মের যায়। থাকে খটখটে শষ—পূর্বকথার স্তন। বড় বড় ব্যাঘ্রবধের বাহাদুরি।

নমস্কারী ৭৪ , আর নয়। বেড়া এগিয়ে জমি বাড়ানাে আয় কেন ? কিন্তু তার পরেও যে ছােবড়া ব'য়ে বাঁচতে হয়। খুড়োর পরলােকের চিন্তা এসে গেল। ‘সেও যে একটা কি আছে! খুড়াে মুশকিলে পড়লেন। তার জন্যে নাকি দেবতা বাছাই করে একটিকে ধরে পড়ে থাকতে হয়। মানুষে মানুষ দেখেই জ্ঞানার্জন করে, মানুষই নাকি ভগবানের ‘ইমেজ'। নমুনােই সব ঘুলিয়ে দেয় যে, ভীষ্মও আছেন, ভস্মলােচনও আছেন। কিন্তু বিরূপাক্ষই যে বহুত। আমি তাে যীশু থেকে বিশু বা বিশ্বনাথ, সকলকেই সমান ভাবি। কি ফাসাদ ! যে দেবতারা কথা কন, তাদের পরিচয় কিছু কিছু মিলেছে। যারা নির্বাক, তারাই নাকি আসল। বােধ হয়, দেবতার মধ্যে তারা ‘অভিজাত হবেন, কথা না কইলে বুঝব কি করে? শুনেছি, তারা জাগ্রত, তবে বােধ হয় বাজে কথা কন না। হতে পারে দেশময় প্রবল বক্তৃতার বাড়াবাড়ি তঁাদের অবাক করে দিয়েছে। তাই কথা বাড়ান না, কাজ না। , দেখতে হয়েছে। খুড়ে। তীর্থযাত্রাই স্থির করলেন। শুনে বাদল বললে, দাদামশাই, ভুল করছেন, আসল দেবতারা ঢের বেশী বুদ্ধি ধরেন, টু শব্দটি করেন না। জানেন, কথা কইলেই বিপদ, এটা চাই, ওটা চাই। এটা সভ্যতার যুগ, আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, ধারা আর কারাই সারা কাজ করে। ক্ষমা করবেন, ও বড়দের কথা এখন ছাড়াই ভাল, নদী- ভৃঙ্গীসহ কেউ বা পাহাড়ী বাবা। শিষ্যরা সজাগ, এগুতে দেয় না। আপনার কাছেই শিক্ষা, সাধকদের ধরে অর্থাৎ ছােট ধরে এগুতে হয়। আর একটা গােলমেলে কথাও রয়েছে যে, আপনার কাছেই শুনেছি, ধৰ্ম্ম ধরে জাত নয়, জাত ধরেই ধৰ্ম্ম। তাই আমার জাত জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আর আমাকে বােঝাবার জন্যে বলেছিলেন-এই যেমন আমি বাঙালী। খুড়াে বললেন, সেই সব বুঝি মনে করে রেখেছিস? তখন তাের শিক্ষানবিসির অবস্থা, তােকে শেখাচ্ছিলুম, জাতিধৰ্ম্মাদি বড় বড় কথা আয়ত্ত এবার বয়স তাের সেটা ছিল না, কথাগুলাে শুনে রাখবার জন্যে আভাস দিয়ে যেতুম মাত্র। আমার কাছে সব জাতই আমার জাত, সব ধর্মই আমার ধর্ম।

৭৫ . নমস্কারী ও কথা আজ কেউ শুনবেন না দাদামশাই। আপনি যে বাঙালী--এ কথা সকলেই জানেন। দাসত্বের সেবা যে অনেকেই পেয়েছেন। আমি আপনাদের অনেক পুথি যে ঘেঁটেছি। পরলােকের চিন্তায় দেবতা খুজছেন, আর আপনাদের দেশের দেবতাই তাে শ্রীচৈতন্য। বাংলার চৈতন্য কি লােপ পেলেন ? খুড়াে হাঁ করে অবাক মেরে শুনছিলেন, বললেন, এসব তুই কোথায় পেলি? আমার মাথা খেয়েছিস দেখছি। আমার গােয়াল ঘরের মাচাই ধৰ্ম্মের খাচা, ধৰ্ম্মের ব্রিডিং-হাউস পবিত্র গােবরের সারেই বাড়ে। ওসব গুহ গ্রন্থ প্রস-গােয়ালিনী রেখে গিয়েছে। ব’লে গিয়েছে প্রহিবিশনের দিন আসছে, পরিবেষণ আর চলবে না, আমার ওই গােয়ালের জীবগুলির মাথায় রইল যুগের প্রতীক্ষায়। তুই ইস্টুপিড তাদের ডিস্টার্ব করতে গেছিস কেন? দিশী ফ্যারাডে হবি নাকি? খবরদার, গােয়ালে আর ঢুকিস নি। বাদল বেজায় অপ্রতিতভাবে বললে, আমি জানতুম না, মাফ করবেন, খান দুই মাত্র দেখেছি। তাতে না আছেন দেবতা, না ধৰ্ম্ম, কেবল ‘আপ্ত’ বাক্যের নববিধান, জাত আর ধাত বুঝে তাদের আবশ্যক মত প্রয়ােগ। সর্বনাশ, সেইখানাই দেখে মরেছ। যাক ও সব বুঝতে পারবি নি, এই- টুকুই বাঁচোয়া। বীরভূমের লােকটিও মারা গিয়েছেন, অ্যানােটেশন বেরুবে না। তাতে একটা বড় মজায় কথা আছে দাদামশাই, সেইটে একটু বুঝিয়ে দিন, আমি আর কথা কইব না, বড় লােভ পড়েছে। চুপটি করে মৌনীবাবা মেরে ভাল ছেলে হয়ে পড়ে থাকলে দেবতা সকল ঐশ্বৰ্য্যই দেবেন। সত্যি নাকি দাদামশাই? এটা পারব, অনুমতি করেন তাে লেগে যাই। মােটর চড়তে বড় খুড়ে একদৃষ্টে বাদলের দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক চেয়ে থেকে শেষ দীর্ঘ- নিশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, মােটর চড়বি তাে দূর হয়ে যা। বেরাে; আর নয়- বাদল কঁাদকদ হয়ে পায়ে ধরে বললে আমি বুঝতে না পেরে, আপনার নমস্কারী কাছে কেবল জানতে চাচ্ছিলুম, বীরের মত চুপ থাকলেই সিদ্ধি ? সহজ কাজ বলেই লােভ হয়েছিল। খুড়াে বাদলকে পুত্রবং পালন করেছেন, ‘দূর হয়ে যা বলে ফেলে নিজেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। একটু মিষ্ট হাস্যে বললেন, লােভ মহাপাপ, খবরদার লােভ বাড়াস নি। উচ্চদরের সাধকদের আরও সহজ পথ আছে রে, সে সব ব'লে দেব, যেমন রােগীর সেবা, নিরন্নে অনুদান, প্রভৃতি অনেক আছে। আমার ওসব কিছু কাজ নেই দাদামশাই, আপনার সেবাই আমার সাধনা। বড় অদ্ভুত ঠেকেছিল, তাই মনের উত্তেজনায় জিভ পিছলে গিয়েছিল, এই কান মললুম। নে, তবে প্রস্তুত হ, পুটলি বাঁধ। আমি পরলােকের পরিচয় খুজতে বেরুব। পুটলি আবার কিসের ? হুকো, কলকে, টিকে তামাক, ছছাবড়, ছেড়া ন্যাকড়া, দেশলাই আর একটা হাঁড়ি। বঙ্কিমচন্দ্র তামাক খেতেন, জানিস ? তাঁর ‘কমলাকান্তখানি নিতে ভুলিস নি। আর আমার বাঁশের বাঁশিটে ? আচ্ছা, সেটাও নে। এখন চা খাওয়া দিকি। বাদল মহানন্দে চা বানাতে ছুটল। কালাচাদ যখন রাঁচিতে ওভারসিয়ারি করেন, সেই সময় তার বাদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ। জঙ্গলের মধ্যে সে ঢিল মেরে পাখি মারছিল, খুড়াে ঘোড়ার পিঠে বাসায় ফিরছিলেন। তিনি তাকে দেখে, বােধ হয় তার রং দেখে আষ্ট হয়েছিলেন, নিজের মতই পাকা আকৃষ্ণবর্ণ। তার পরিচয় জানবার লােভ সম্বরণ করতে পারেন নি। ঘােড় থামাতেই ছেলেটি তার দিকে চাইলে, ৫। ৭৭ নমস্কারী মুখেও একটু হাসির রেখা টানলে, ভয় নেই, ডর নেই। 'সুউজ্জল টানা চোখ দুটির সঙ্গে সােজা সুন্দর নাক, পৃষ্ঠস্পর্শী কেশ, বয়স আন্দাজ দশ-এগারে হবে। খুড়ে সস্নেহে প্রশ্ন আরম্ভ করেন, নাম কি ?বাদলা। কোথায় থাকিস —ঠিক নেই। বাপ মা ?—নেই। কি জাত-জানি না। খেতে দেয় কে, কি খাস ?-ডেকে কেউ দিলে খাই, না হয় শিকার করি, পাখি মারি, খরগােশ মারি, না পেলে এই তো জঙ্গলভরা ফল মূল পাতা রয়েছে। কাজ করিস না কেন ?—আমি যে বড় নই, কাজ কম হবে, কেউ দেয় না, তাই পাই না। কি কাজ জানিস ?—জমি কোপাতে পারি, কাঠ কাটতে পারি, আমার কোদাল কুড়ল নেই, কোথায় পাব ?-বলে একটু হাসলে। সে কি সুন্দর সরল হাসি ! খুড়াে মুগ্ধ হলেন। বললেন, আমার কাছে থাকবি, খেতে পরতে দেব।-কেন দিবি, কাজ দিবি না? এটা আমার দেশ নয়, ক্ষেত-ক্ষামার নেই, কি কাজ করবি ?-না, তবে যাব না। বলে মাখা নেড়ে হাসলে। গাছের ডগায় পাখি খুজতে মন দিলে। খুডাের প্রাণটা কেমন করে উঠল, দমে গেল, যেন দুর্লভ কিছু খােয়াচ্ছেন। কাজ না পেলে খাওয়া পরাও চায় না! খুড়ে তাকে ফেলে নড়তে পারলেন । কিছুক্ষণ অবাক হয়ে থেকে বললেন, কাজ আমার অনেক আছে রে বাদল, আমি একা মানুষ, সব কাজ করে উঠতে পারি না, সময়ও পাই না। বাদলা গাছের মাথা থেকে চোখ না নামিয়ে বললে, কি কাজ? আমার ঘর বার রােজ সাফ করবি, জল এনে দিবি, উনুন ধরিয়ে দিবি, বাসন মাজবি, ঘােড়ার ঘাস এনে দিবি, গরু চরাবি, আমি বাইরে গেলে বাড়িতে থাকবি, চৌকি দিবি, কাঠ চেলা করবি। যা না পারবি, আমি ক'রে নেব। বাদলা তার দিকে চাইলে, হাসিমুখে বললে, তুই করবি কেন, এ আর কি কাজ! কুড়ুল আছে? আছে। জমি আছে? বাসাবাড়ি—দুতিন কাঠা ফালতু প'ড়ে আছে। কোদাল আছে ?—আছে।

নমস্কারী ৭৮ -আচ্ছা, তৰে চল। জঙ্গল থেকে নিজের সম্বল বাঁশি আর একখানি লােহার বটের ছুরি তুলে নিয়ে খুড়াের সঙ্গে চলল। খুড়াের প্রাণমন তার প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়েছিল, তিনি যেন স্বর্গ হাতে পেলেন, বাচলেন, রাজ্যলাভ করে ফিরলেন। সেই পর্যন্ত এই অনাথ বালক খুড়াের কাছে তঁার আপনজনের মত আছে। তিনি তার বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি লক্ষ্য করে ক্রমে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন, বাংলা ও চলনসই ইংরিজী শিখেছে। কিন্তু বাড়ির কাজকর্ম সে ছাড়ে নি, বলে, আমি যে ওই করবার তরে কথা দিয়ে এসেছিলুম! সত্য যেন তার জন্মগত, আর তার জন্মগত, আর ভয় কাকে বলে সে তা জানে না। খুড়ো তাকে নিজের আপন বলেই জানেন, আবার খুড়ােকেও সে আপন বলে জানে, দাদামশাই বলে। বাদলের বয়স এখন একুশ। খুড়াে অনেক করে তাকে জামা আর জুতাে পরিয়েছেন। ওগুলােকে সে বাঁধন’ বলে, হাসে, বাড়িতে পরে না, অস্বস্তি বােধ করে। এই আমাদের খুড়াের পালিত বাদলের পরিচয়। কালাদ খুড়াে রিটায়ার করে পূর্ণিয়াতেই রয়ে যান দুটি কারণে। হােমিওপ্যাথির ওপর তার পরম শ্রদ্ধা থাকায় অসীম অধ্যবসায়ে তার ব্যবহার যথাসম্ভব আয়ত্ত করেছিলেন। নিত্য বহু গরিব-দুঃখীদের ঔষধ দান করতেন, তাদের একপ্রকার বাপ-মাই দাড়িয়ে গিয়েছিলেন, তারা সাবু-মিছরিও পেত। শিক্ষা সার্থক করবার এমন ম্যালেরিয়ার মালঞ্চ আর কোথায় পাবেন ? আবার বাদলকে পাবার পর সংসারীর মতই হয়ে পড়ায়, ভবিষ্যৎ-চিন্তাও এসেছিল ; ঘরবাড়িও বানিয়ে বদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। বললেন, আমার হােমিওপ্যাথির বাক্সটা নিবি। “ধর্ম কি দেবতার সঙ্গে আবার হােমিওপ্যাথি মেশাবেন? আপনি তো বনে, দু নৌকায় পা দিতে নেই।” ঠিক বলেছিস, থাক।

৭১ নমস্কারী গােরুগুলাে ? তাদের দড়ি খুলে দে, এটা বিরাটের এলাকা, দলে গিয়ে মিশুক, বুদ্ধি খেলিয়ে বেশ থাকবে। কাশীর ষাড় দেখিস নি, লােকের গলা থেকে মালা ছিড়ে খায় ? ওরা আমাদের মঙ্গলের বা শিবের বাহন, সুতরাং ধর্মেরও, তাই নমস্কার করি ; অহিংস স্বেচ্ছাসেবকও বলা যায়। ধর্ম শিক্ষার সহায়। কিন্তু শিং আছে যে ! বিধানে তার ব্যবহার নেই, ওটা আত্মরক্ষার্থে নৈতিক শক্তিপূতঃ। বুঝতে পারলাম না। ক্রমে বুঝবি, এখন চল। বাদল না আবার প্রশ্ন করে বসে, তাই মনে মনে ‘দুর্গানাম করে খুড়ে বেরিয়ে পড়লেন। কোন্ দিকে যাবেন ? সেই কথাই ভাবছি। বৈদ্যনাথের সংবাদ নিয়ে বীরভূম রওনা হব, কি বলিস? সেখানেই আছেন। এখন তাে তারাই জাগ্রত, কথা কন তাে তারাই করেন, শক্তি তারাই। দেবদেবী আমরাই বলি, ওসব বৈয়াকরণদের বিশুদ্ধ বুলি, আসলে সব এক, সবাই দেবতা রে। তবে তাই ভাল, আপনার দেবতা মেলা নিয়ে কথা। মনিহারিঘাটে পৌছে মা গঙ্গাকে নমস্কার করে খুড়াে ইষ্টিমারে উঠলেন। নিস্তার নেই, বাদল জিজ্ঞাসা করলে, কাকে নমস্কার করলেন, দেবতা পেলেন নাকি ? নমস্কার তত সকলকেই করা যায় রে, বড় বা মান্য হ'লেই করা যায়, বড়কে সম্মান দিতে হয়। মা গঙ্গাকে নমস্কার করব না, শক্তি দেখছিস? একূল-ওকুল-প্লাবিনী, খলখলহাস্যে কুল ভাঙতে ভাঙতে অসীম বেগে ছুটছেন।

নমস্কারী – নিমেষে ভাসাতেও পারেন, ডোবাতেও পারেন। নমস্কার করব না? তা বড় বড় পণ্ডিতেরা বলে গেছেন, ধর্মের জন্মই ভয় থেকে, ভয় থেকেই ভক্তি। ডাকাতদের কাছেও লােক হাতজোড় করে। দেশ যে মান্যমানে ভরা। আপনার পরলােকের চিন্তাও কি হ্যা রে, তাই। তা না তাে চিন্তা আসত কোথা থেকে। ভয়ই জগৎকে এত সুন্দর করেছে, মানুষের বুদ্ধি বাড়িয়েছে। শুনছিস না, এক বােমায় একটা গ্রাম ফরসা! কতবড় বিদ্যা-বুদ্ধির পরিচয়, ভয়ই সেই বুদ্ধির গােড়ায়। নে, এইবার পুঁটলি সামলা, সাহেবগঞ্জে এসে গিয়েছি। কেন বলুন দেখি, কেড়ে নেয় নাকি ? চুপ চুপ, মালিকদের নামের দোহাই দেওয়া জায়গা। বড়দের কড়াকড়িতেও ভব্যতা থাকে, আর্ট থাকে-হাতীর কদবেল খাওয়া দেখিস নি? এটা পকেটমারের পরীক্ষার ক্ষেত্ৰ-সিডিকেট। জানিস তো, গীতা বলে রেখেছেন—স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়। তবে আপনি আবার কোথায় কার কাছে কি খুজতে চলেছেন ? এখানে বাক্য বাড়ালে বস্তু কমে, যে রকম ফুকো মারছে, ইকোটা গেলে বাঁচব না। কেবল জেনে রাখ, সকল বিষয়েই গুরু দরকার আছে, এম. এ., বি. এ. পাস করলেই স্বধৰ্ম্মজ্ঞান হয় না, গুরু সেটা বুঝিয়ে দেন। দেন। সে অনেক কথা। এট। ক, এট। খ, তাও একজন বলে দিয়েছিলেন, যুগ-যুগান্তর ধরে ক-ও ছিলেন গ-ও ছিলেন এবং আছেন, তবু গুরুর দরকার হয়। আবার ফ্যালাও ধৰ্ম্মও আছে, যা কোন একটি দেশের কি জাতের কি লােকের নয়— জীবজন্তুরও। যা গােলামি, সেলামি কি দান হিসেবে জোটে না, কথায় কি লেখাতে মেলে না শুনেছি তাকে স্বাধীনতা বলে। তিনি সকলের মধ্যে থাকেন, সাধ্যে থাকেন না। নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ, সাধনায় তাকে পেতে হয়। বুদ্ধ নাকি পেয়েছিলেন। তবে সে আমাদের ফেলে ফ্যালাও হ’ল কি করে? আমরা কি সকল ছাড় ?

নমস্কারী তা কেন রে, যেমন পেস্তা না থাকলেও পােলাও হয়।' সে ফর্দতে আছে অর্থাৎ মনে ও জ্ঞানে কর্মে নেই। কিন্তু ও ধর্মের ভেতর-বার দুই না থাকলে সার্থক নয়। যেমন সাপ আছে বিষ নেই, কামড়ে কারুর কেয়ারও নেই। থাক, আর নয় রে, সিগনেল পড়েছে। পুটলি ? আছে। এই যে। ট্রেন এসে সবেগে প্ল্যাটফর্ম কঁপিয়ে ঢুকল। যাত্রীদের বিশৃঙ্খল ছুটোছুটি। বাদল এক স্থানে দাড়িয়ে গাড়ির ভেতরের অবস্থা দেখেছিল। খুড়ো বললেন, মাল সরাবার এই মােক্ষম মওকা, সাবধান। কে একজন সঙ্গীদের বলে উঠল, সব গাড়ি খালি রে, চল। সে দেখতে পায় নি যে সব শুয়ে। বাদল হাসলে, বললে, দাদামশাই, এক্সপ্রেস এখনও আসে নি, এখান। স্লিপিং সেলুন। না রে, এক্সপ্রেস এখনি বুঝতে পারবি। এক্সপ্রেস, মানে প্রকাশ করা, জানিস তাে? ঐ দেখ, ওদিকে এক্সপ্রেস আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। যে উঠতে যাচ্ছে ভেতরের লোেক তাকে ঠেলে, পিষে, ধাক্কা দিয়ে বার করে দিচ্ছে। পড়ল কি চাকার নিচে গেল, সে দুর্ভাবনা নেই। একে বলে এক্সপ্রেস অর্থাৎ ‘টু প্রেস আউট, ধাক্কা মেরে বার করা। উঃ, ঐ একটি মেয়েকে ঠেলে ফেলে দিল রে !-বলেই ছুটলেন। মেয়েটির বিধবা, বর্ষিয়সী মা কঁদতে:কঁাদতে তাকে তুললেন খুড়ােকে ছুটে এসে দাঁড়াতে দেখে, বললেন, কি হবে বাবা? বাঙালীই মেয়েটাকে ঠেলে ফেলে দিলে, তবে আর আমাদের যে না গেলে নয় বাবা, আমার ননীর যে বড় অসুখ, টেলিগ্রাফ পেয়ে ছুটেছি। আমাদের দয়া করে তুলে দিন বাবা। এস মা, আমার সঙ্গে এস। সব শুয়ে আছে কোনও গাড়িতেই, স্থান নেই, বােধ হয় দাড়িয়ে যেতে হবে- যেমন করে হােক, এখন যেতে পারলেই যে বাঁচি বাবা।

নমস্কারী ৮২ বাদল এসে পড়েছিল। সব শুনেওছিল। চোখ মুখ দেখে খুড়াে বললেন, খবরদার! একবার চট করে দেখে নে, এদের দুজনের মত স্থান হ'তে পারে না কি ? দেখেছি, স্থান থাকবে না কেন, চল্লিশ জনের স্থান আছে। প্রত্যেকেই যে এক এক বেঞ্চি দখল করে শুয়ে আছেন, আবার ট্রাঙ্ক, বেডিং দিয়ে দোর ঠেসেছেন। যারা মােট হালকা করে দেয়, তারা আপনার কোথায় ? আহা, রাগ করছিস কেন, সকলেই ভদ্রলােক, স্ত্রীলােক দেখলেই উঠে বসবেন, আমরা দাড়িয়ে যেতে পারব। ভদ্রলােক বটে, এখনই তাে দেখলেন, মেয়েটির চাকা-লােকের ব্যবস্থা করেছিল। আপনি তাে খুঁজছেন, দেখুন না, বােধ হয় দেবতাই হবেন। খুড়াে হাসি চেপে বললেন, সকলেই কি সমান হয় রে! আর সময় নেই, এদের যাওয়াই চাই। কিন্তু কারুর কোন কথায় কথা ক’স নি, সে ভার আমার রইল। ‘ফাস্ট বেল থামল, বাদল একখানা গাড়ির হাতল ঘুরিয়ে একটি ঠেলা দিতেই দোরের সঙ্গে মণ দুয়েক মাল স’রে গেল, বললে, স্ত্রীলােক দুটিকে তুলে দিন। তারা উঠে পড়লেন। খুড়ােও উঠলেন। বাদল ইতিমধ্যে মোট সরিয়ে বসবার সুবিধামত জায়গা পেলে, বেঞ্চি বানিয়ে মেয়েদের বসতে বললে। সকলেই বেশ নিস্তদ্ধ। কেউ কেউ আগাগােড়া মুড়ি-দেওয়া-লােক দু-তিন ইঞ্চি গুণ্ঠন মুক্ত করে দেখে নিয়েই মােড়ম্বা মুড়ি দিলে। কেবল একজন শাঁসালো-শরীর মডার্ন মূর্তি, ল্যাজা মুড়ে বর্জিত গুস্ফে, সপ্রতিভের (চেহারার) মত মুখ খুলে তীব্রকণ্ঠে আওয়াজ দিলেন, এটা কি মগের মুল্লুক ঠাউরেছেন, পরের জিনিস নিয়ে যা-ইচ্ছেতাই করা হচ্ছে, মানুষ, না কি। তা হলে এ গাড়িতে উঠব কেন ভাই-মেয়েদের একটু বসবার স্থান করে দেওয়া হচ্ছে- জানেন ওতে কি আছে ?

নমস্কারী শুধু হাতে তো হাত দুলিয়ে কেউ বাড়ি ফিরতে পারে না,শাড়ি, রাউজ-পিস, মখমলের ওপর জরির কাজ-করা পশুদ্ধি এই সবই হবে, আর ‘সেবল বসানাে পেটিকোটও থাকতে পারে। মস্ত বড় জা দেখছি ? ওর বেশি আর কি করে জানব ভাই; লােকে আত্মবৎই ভাবে। বলুন না কি আছে ? ঝুটো মুক্তোর মালা, কি জাপানী সিল্কের ফুল, যা নষ্ট হতে পারে, সাবধান হই, সরিয়ে রাখি। ওতে গয়ার শ্বেত পাথরের থালা, রেকাবি, বাটি সেটুকে সেট রয়েছে। বাদল সকল বিষয়েই নির্ভীক, কেবল ভূতের ভয়টা রাখে। সে বলে বসলে, ওরে বাপ রে, গয়া হতে আগমন। কোনটায় আছে বলুন, সরিয়ে রাখি। তা এ গাড়িতে মেয়েদের তােলা কেন ? ফিমেল কম্পার্টমেন্ট দরাজ খালি পড়ে আছে। দয়া করে একবার দেখিয়ে দিলে বড় উপকার করা হবে। দিন না, তিনবার উকি মেরেছি, বয়স হয়েছে, চক্ষু কাজ দিলে না। তা হলে আপনারাও পা মেলে জ্বালাতন! ওই—ওইটে, যার ওপর ইংরিজিতে- হ্যা বুঝেছি, যার ছেড়া হাতলটা ঝুলছে। সরিয়ে রাখতে গিয়ে দেখলেন # ব্যানার্জি, বি. এ., এ, জি, অফিস-ও তাই, ( মৃদু কণ্ঠে, লাউড থিঙ্কিং) বড় পদস্থ ! সব বেশ নিস্তব্ধ, ব্যানাজি ফুল লেংথে সটান মুড়ি দিলেন। এক পাশের আড়াআড়ি বেঞ্চিখানা জোড়া করে একখানা বাসন্তী রঙের ময়লা খদর মুড়ি দিয়ে যে ভদ্রলােক বেজায় নাক ডাকাচ্ছিলেন, পাশের গাড়িতে ট্রাভেলিং কু-র আওয়াজ পেয়ে, ধড়মড়িয়ে উঠে ‘টিকিটখানা চাকরের কাছেই রয়ে গেছে’ বলতে বলতে তিন লাকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। লম্বায় প্রায় ছ’ ফিট, বেঁড়ে গোঁফ, চড়ানে গাল, ব্যাকব্রাশ করা লম্বা চুল, যেম পশ্চাতের কৰ্ম্মবাড়ির ঘাসছােলা প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছেছে। একজন শুয়ে শুয়েই

নমস্কারী
৮৪
বললেন, সেই বাপের কুপুত্তর মিঃ বেন্টনট বেটার আওয়াজ। বলতে বলতেই
সাহেব হাজির। কাকেও ডাকতে হয় নি, সকলেই টিকিট বার করে উঠে
বসেছিলেন।
ভেরি ডিজায়ারেবল আর্লি গ্রুপ—এ দু ঝুড়ি কপি কার?
একজন বললেন, তিনি চাকরের কাছে থেকে টিকিটখানা আনতে গেছেন।
থ্যাঙ্কস ফর দি ট্রাবল।-বলে নেমে গেলেন।
ওর থ্যাঙ্কসই সর্বনেশে।
কই, তিনি ফিরলেন না তাে? নিশ্চয়ই থার্ড ক্লাসের টিকিট। আমাদের
দিকে চেয়ে বললেন, এখন তাে চারজনের জায়গা খালি, ঐখানে আরাম করে
বন না।
খুড়ো বললেন, থাক, ভদ্দরলােক এসে শােবেন। আর যে ভাবে গেছেন
বিছানায় মনিব্যাগট্যাগ কিছু ফেলে যেতেও পারেন। আরামে আর কাজ
নেই ভাই।
' তবে ভুগুন।-বলে তিনি ভাল করে শুলেন।
খুড়ে আর বাদল দাড়িয়ে। ট্রেন ছাড়ল। উভয়ে সহাস দৃষ্টি-বিনিময়
করলেন। দেখে শুনে স্ত্রীলােক দুটি ভয়ে জড়সড়। বিধবাটি খুড়ােকে
দাড়িয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তি ও লজ্জা বোধ করছিলেন, কিছু বলতেও সাহস
পাচ্ছিলেন না।
৪
খুড়ো আর বাদলের মনের অবস্থা অনুচ্চারিত থাকলেও, অনুমানে বােধ
হয় ভারসাম্যে এক ছিল না। দুটো স্টেশন সস পশ্চাতে পড়ে গেল।
শীতের রাতে মানুষ কতক্ষণ চুপচাপ জেগে শীত ভােগ করতে পারে? বাদল
কথা কইলে, খাস কামরায় ওঠা গিয়েছে, সকলেই আমাদের
চুপ, আস্তে, সাবধান, ব্যাঘাত হবে, অপরাধী হতে হবে।
সাধনা ?

৮৫ নমস্কারী, হ্যা, বলছি। এ জাতটি প্রকৃতিগত বিষম সেন্টিমেন্টাল-ভাবপ্রবণ। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে বাংলায় কি যুগই এসেছিল ! কলি তাে বহুদিন এসেছে, আবার খুড়াে বাধা দিয়ে বললেন, শােন না, subযুগও আছে, যেমন আছে বাই- প্রােডাক্ট, যার নামকরণ হয়েছিল স্বদেশী-যুগ-বিদেশের বদ হাওয়া থেকে মুক্তিসাধনার যুগ। পরে বিদেশীবর্জন পর্যন্ত আসে। তাতে দেশের মানুষ দেশের জিনিস সব ভাল, সব আপন দাড়িয়ে গিয়েছিল। প্রাচীনদের বাচ্চা কথাটার পরিবর্তে ভাই ভাই ভেদ নেই, কানে, শুধু কানেই কেন, বােধ হয় অনেকের প্রাণেও একটু এসেছিল। তাই বিদেশী মালের আমদানিও কমতে আরম্ভ হয়। ট্রেনে যাতায়াতের তখন কি সুখই ছিল ! ছেলেরা থেকে উনপ্রৌঢ়েরা পর্যন্ত মেয়ে যাত্রীদের কি বৃদ্ধদের বিপন্ন দেখলে নিজের ডেকে নিতেন, তাদের স্থান দিয়ে নিজেরা দাড়িয়ে থাকতে গর্ব ও আনন্দ অনুভব তাতে আমাদের রাজদর্শন পর্যন্ত মিলেছিল। সে সব অনেক কথা, থাক। সেন্টিমেন্ট জিনিসটার প্রথাই কম, সে এক বস্তুতে বদ্ধ নয়। কখন কোষ্টা নিয়ে চাপে বা জাগে, তার নিয়ম নেই। ভাব নিয়ে তার খেলা বা কারবার, হাউইয়ের মত সেঁ করে উঠে ফুল কেটেই নিবে যায়। সাধনা শক্ত জিনিস। স্বর্গরাজ বিচলিত হলেই বা বেগতিক দেখলেই উৰ্বশীকে দিয়ে ভাবের বা সাধনার ঘরে সিঁদ কাটাতেন। সেই সেন্টিমেন্টই ‘আহা, আর কেন, আর নয়' বলে একদিন সব থামিয়ে দিলে। বাংলার রামপ্রসাদের বাণীই সার্থক হ’ল ‘যা ছিলি রে তাই হবি ভাই নিদানকালে। সিদ্ধ লােকের কথা। স্বদেশী আবার মােড় ফিরল। ভাব তাকে বিলিতী কুমড় খাওয়া পর্যন্ত ছাড়িয়েছিল, সে আবার টোম্যাটোর প্রেমে পড়ল । বাদল ‘নিন’ বলে হুকোটা খুড়াের হাতে দিয়ে বললে, আপনি পরলােবে ভয়ে ধৰ্ম্ম না দেবতা একটা কিছু খুজতে বেরিয়েছেন। আমি তাে দেখছি ‘গ্রহ-দেবতা' আপনার সঙ্গেই ছিলেন বা রয়েছেন। তিনি পরলােক দেখিয়ে নমস্কারী আপনার চিন্তার কারণ চুকিয়ে বা নাকচ করে দিলেন। পরলােক পেলে কেবল দাড়িয়ে থাকতে হয় বই তাে নয়। এখন ফেরাই ভাল, কি বলেন ? রামপুরহাট আর দুটো স্টেশন বই তো নয়। সেখানে পৌছে বাসে বসতে পাওয়া যাবে। বাসে আবার কোথায় ? কেন আপনার কাজ তো হয়েই গেছে ? এতদূর এসে, বাবা বৈদ্যনাথকে না দেখে ফিরব ? আবার দৈবতা কেন ? এক দেবতাই একটু কাজ আছে রে,—তিনি ব্যাধি-মুক্তির মহাত্ম। সেখানে বিপন্নের হত্যে দেয়। আমি একখানা পিটিশ পেশ ক'রে ফিরব। চাকরির? দোহাই, আর চাকুরের দল বাড়াবেন না। পিটিশন্ তাে তাদেরই পরমার্থ, আপনার তো পরলােক। রামপুরহাট পেীছে বাসে বসে বাঁচলাম। পরে বৈদ্যনাথদর্শনান্তে তেরাত্তির কাটিয়ে প্রত্যাবর্তন। তামাক যে পুড়ে গেল, অমন অন্যমনস্ক হয়ে কি ভাবছেন দাদামশাই ? দেখ, বাদল—জাতের গৰ্ব জ্যাত্যাভিমান যায় না, বড় লেগেছে রে। বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধি বলে একটা আছে। বলে একটা আছে। এত বড় ইন্টেলিজেন্ট জাতটা, মহামান্য গােখলে যাকে কত বড় সম্মান দিয়ে গেছেন, সেই জাতের শিক্ষিতদের মধ্যে এ কি নৈতিক অধঃপতন শুরু হ’ল ! আমাদের পায়ােনিয়ার বাঁড়ুজ্জে মশাই থেকে বড় বড় দেশ-প্রাণেরা ‘ইউনিটি ইউনিটি' করে শেষে কি পরলােক বানালেন। এখন দেখছি, শ্রদ্ধেয় ইউ. এন. মুখার্জি মশাই-ই সত্যদর্শী। আপনি দু-চারটে লােক দেখে এত বিচলিত হচ্ছেন কেন, তারা তো সৰ্ব- জাতের মধ্যেই আছেন এবং চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। সব গাড়িতেই তাে বাঙালী ছিলেন না, মাড়ােয়রী ও স্থানীয় সকলকেই তো হরি-শয়ানে সিদ্ধ দেখলুম। আমি নিজের ভায়েদের কথাই ভাবছি- ৮৭ নমস্কারী বলেছিলেন না—সব জাতই আমার জাত ? তা তাে এখনও ভাবি। ঠাকুর বলতেন, নারকোলগাছের বালদো খসে গেলেও একটু দাগ থাকে, এটাও বােধ হয় আমার তাই। তামাক খান, দেমাক ঠাণ্ডা করুন। সেই ভাল। বিদ্যুৎবরণ বিদ্যুৎবরণ ছিল সার্থকনামা ছেলে,-গুণে তাে বটেই, রূপেও। সে প্রকৃতিগুণে সকলের প্রিয় ছিল। অল্পভাষী হলেও মিশুক, উচ্চ তর্ক বিতর্কে, সতর্কে সায় দিত। এরূপ ছেলের বিবাহে বিলম্ব হয় না,সহজেই তারা অরক্ষণীয়া কন্যার কোঠায় পড়ে যায়। প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা আর সইল না। বাপ মা কর্তব্যকৰ্ম্ম সমাধা করে ধৰ্ম্ম রক্ষা করেন। তখনকার হিসাবে বয়স্থা দ্বাদশ বর্ষীয়া রমা,বোমা হয়ে আসেন, সুশ্রী ও সুন্দরী। ছেলেকে স্থিতু করার বছর দুই পরেই বাপ মা কর্তব্য শেষের সান্ত্বনা নিয়ে ইহলােক ত্যাগ করেন। তাতে জাতির খ্যাতি রক্ষার সুযােগ পেয়ে তাদের কৰ্তব্যও ভােলেন নি–রমাকে ক্ষমা করতে পারেন নি—“কি অপয়া বউই এনেছিলেন। জ্ঞাতির শােকে নিজেদের সান্ত্বনার উপায় করে নেন—দুটি শ্রাদ্ধে বিদ্যুৎকে সৎপরামর্শ দানে সর্বস্বান্ত করে।—“ইহা—সুস্থ হও, বেঁচে থাকো বাবা, এই তো ভাল কাজ। তাদের আর কবে পাবে—পরে এই কথা। বিদ্যুৎ উপদেশ মত পরপহরণের পাপ থেকে মুক্তি পে-েবাপের দেওয়া অম্নোপায় চল্লিশ বিঘা নিষ্কর জমিটুকুও তাদের কাজে তাদের সঙ্গেই চলে গেলো। “জুমি কত হবে বাবা-দুনিয়া জুড়ে পড়ে রয়েছে।” জ্ঞাতির নমস্কারী ৮৮ মিথ্যা বলেন না। তারা বিদ্যুতের বাপের গড়গড়ায় ঘন ঘন গয়ার তামাক পুড়িয়ে অভাবের জ্বালাটা জুড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন। পোড়ার জ্বালাটা পরে আরম্ভ হয়ে থাকে। এখন সংসারে কেবল বিদ্যুৎ। এক বিধবা পিসি, রমা আর একটি আসন্ন আগন্তুক। দাসদাসী ছুটি পেয়েছে। নীরব চিন্তাই কেবল সংসার জুড়ে আছে। মাঘ মাসে ধানে মরাই ভরে যেতাে। ধান আর এবার বাড়িতে ঢোকেনি। পিসিমা কয়েক মাস কোনরূপে চালিয়ে—এদের কষ্ট দেখতে না পেরে কাশী গিয়ে সঙ্কটমােচনের দ্বারস্থ হয়েছেন। বিদ্যুৎকে সকলে চায়, কিন্তু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কম—বন্ধু বান্ধবের বড়ই অভাব অনুভব করছে, বিরক্তও হচ্ছে। কারণ থিয়েটারের সেই বড় পুঁজি, মুখপাত। এবার আবার রাজধানীতে ‘নন্দবিদায়’। উঃ ডােবাবে নাকি। সে বরাবর মেয়েদের পার্ট করেছে—অনেক বাহবা পেয়েছে, এখন আর গোঁফ কামাতে রাজি নয়। যুবকদের তখন গোঁফের দরদও ছিল। এবার সে aero-রেগুলার রিহার্সেল দেওয়া উচিত নয় কি তার ? তার মানসিক অবস্থার ও সাংসারিক বিপন্নতাটার খােজ খবর কেই বা রাখে। সে সব তাে সকলেরি থাকে। ও বয়স প্রবাহের বয়স,-বাপ থাকলে -বাণ ডেকেও চলে। বিদ্যুতেরও ডাকতো-অন্তঃশীলা, আওয়াজ দিত না। সে জোয়ারের সীমা শেষ হয়ে একটানায় পড়ে এখন থমথমে মেরেছে। বিদ্যুৎ আয়ােড়ে পড়ে নানা ধান্দায় ঘােরে-মাসিক চাদা কিন্তু সবার আগে দিয়ে যায়। তখন অধুনালব্ধ ‘প্রগতি’ কথাটির জন্ম হয় নি। প্যারিবাবুর প্রিয় ভ্রাতা হরি চট্টো কিন্তু প্রগতির প্রতিমূৰ্ত্তি ধরেই অগ্রদূতের মতই দেখা দেয়। কাশী- পুরের স্কুলে সেকেণ্ড ক্লাসে দু বছর বাসি’ হয়ে নব-আগন্তুক ছেলেমহলে সেকেণ্ড হণ্ড মাল হয়ে থাকাটা লাইক করতে না পেরে-কলকাতায় চলে যায় পড়তে যায়। মাঝে মাঝে মােজা পায় দিয়ে গাঁয়ে আসে-বলে পাড়াগাঁয়ের পাঠশালায় আবার ইংরিজি পড়া! উচ্চারণই আসে না নমস্কারী oxford-এর একসেন্ট কোথায় পাবে? সহরের ইংরিজি শুনলে ধমণীতে রক্ত- স্রোত জাগে,-তাকে বলে ইংরিজি। এক এক্সট্রাভাগাঞ্জা শুনলে ভ্যাবাগঙ্গা মেরে যাবি,-যেন গড়ের বাদ্যি ইত্যাদি। মধ্যে মধ্যে উভচরের মত ভিলেজ দেখতে আসে—পুকুর দেখলেই সিল্কের সুগন্ধি রুমাল নাকে দেয়। তার কে একজন আত্মীয় ‘বেঙ্গল থিয়েটারে ছিলেন—ফ্রি পাসে সেও তার সঙ্গে যায়। তার লম্বা ছন্দ, মৈনাক নাসা দেখে আর একসেন্ট দুরস্ত আওয়াজ পেয়ে—বেহারীবাবু পছন্দ করে ফ্যালেন—ক্লাইভের পর্ট করতে দেন। বলতো—সে ট্রেনিং কি !! এই মুষ্টিমেয় সৈন্য লয়ে’ কথা কয়টির ‘মুষ্টি ও মােসেন’ দেখতে সাহেবের তিন রাত আসেন, অডিয়েন্স উন্মত্ত, পটহ বিদারী ক্ল্যাপ ! সমঝদারের স্থান বটে। তারি উৎসাহ উত্তেজনায় গ্রামের এই থিয়েটারের সূচনা ও রাজধানীতে অভিনয়ের আহ্বান হয়েছিল। আসল কথা-সে তামিল দিতেই আসতো- পড়াশােনা ঐ extravaganzaতেই থেমে গিয়েছিল। অন্য সময়ে গােপালদাই দেখতেন শুনতেন। আজ বিদ্যুতের অবহেলা-ভাব নিয়ে জল্পনা কল্পনা চললাে। হরি চট্টো বললে “সে কি! মল্লিকদের মেডেল এবার সে আনবেই আশা করছি যে ! সেটা যে-সে সম্মান নয়। তার হ’ল কি ? আমরাও তাে বিয়ে করেছি। অমন হেনপেক্ট হই নি বাবা। কুলীনের ছেলেকে অমন কুল ছাপিয়ে যেতে তাে শুনি নি?” হেম বললে-বাড়িতে কেউ নেই, বাপ যাওয়ায় সংসার চিন্তাও চেপেছে••••••* “হেম তুই থাম, তাের ক্ষেম যথেষ্ট তা জানি। জানিস না শুনিস নং- মিছে বকিস নি,—ওর আবার সংসার চিন্তা। টাকায় বাঘের চক্ষু মেলে। কোম্পানীর কাগজগুলাে কি চুলাে ধরাবার জন্যে নাকি! রাসুড়ে ওর আত্মীয়, হাঁড়ির খবর রাখেন। তার চেয়ে ওদের আপনার কে আছে ? দেখিসনি দাদার পারলৌকিক মঙ্গলের জন্যে—নিজে দাড়িয়ে থেকে শাস্ত্র মত নমস্কারী খুটিয়ে সব করালেন। নিজের গুরুদেব কুষ্টের কুড়ােরাম ন্যায়পঞ্চাননকে আনিয়ে তবে ছাড়লেন,-রূপাের গাড়, রূপাের ঘড়া দেওয়ালেন। কে করে ? কার এতো মাথাব্যথা! তার কাছে শুনিস”- —“অমন ধান জমিটে— “বাজে বকিস নি। বিদ্যুৎ বাপের এক ছেলে–মােটা টাকার মালিক, সে রােদে জলে মাটির পেছনে ছােটলােক আব নাঙল নিয়ে পাগল হয়ে বেড়াবে—আর খুড়ে। তাই দেখবেন, তােমার কি বুদ্ধি বাবা।” “অতাে টাকার কথা তো শুনিনি দাদা- “টাকার কথা কে কবে জানে,ওটা শুনিয়ে বেড়াবার জিনিস নাকি। চোর আছে, ডাকাত আছে, Income Tax আছেন, আবার তার বাড়া ন্যায্য দাবীদার আছে। নইলে রাখুড়াের আজ এ দুর্দশা কেন, ওটা আপিঙের জাত রে—যে একতাল খায় সেও বলে সরষে ভাের।” যােগীন বিরক্ত হয়ে বললে—“বালকের সঙ্গে এত বকচো কেন, তুমিও যে, পাগল হলে। ও দুনিয়ার কি দেখেছে। ভাল চাও তাে বিদ্যুতের পাট। অমূল্যকে দাও। ওকে আকরে টেনেছে,-মাল সামলাচ্ছে। দেখে নিও বাপের ওপরে যাবে। রামুখুড়াে ধর্মভীরু লােক। তাই দাদার কাজটা প্রাণপণে বুকদে পড়ে করিয়ে দিয়েছেন। বিদ্যুতের আশা ছাড়ো, মেঘে যার জন্ম শেষ বজ্র হানে সেই। হরি চট্টো বললে—“তাই তাে ভাবালে যে হে—আমি তাে অতটা ভাবিনি। মাস না যেতেই তো চাদা দিয়ে যায়...* যােগীন বললে-“হেম সাংসারিক চিন্তার কথা বলছিল না? টানাটানির নমুনাে বটে।” সকলে হাসলে। অমূ্য রাজার পার্ট পাবার ইঙ্গিতে সােজা হয়ে গলা বাড়িয়ে সুযোগ খুঁজছিল, বললে—“আর দিনই বা কোথায়, যা করবে করাে। তায় রাজধানীতে বাক্য দান করা হয়েছে, সেটা মুস্তফি সায়েবের এলাকা—অভিনেতার আচ্ছা, ৯১ নমস্কারী সবাই ওস্তাদ। পাঁচ বছরের ছেলে “হা রেরে পাষণ্ড” ব’লৈ আহিরীটোলায় আমার আট বছরের ভাগ্নেটা মেছুনিদের ডাকে ‘মতি বিবি’ বলে।” “আর মাথা খারাপ করে দিও না বাবা, ওর পার্টটা ভালাে করে গােপালদার কাছে দেখে শুনে নিয়ে মুখস্ত করে রাখাে অমূল্য। আমাদের গরিবের ধাতে বড়লােক সইবে না, সমানে সমানেই ভালাে গােপালদা ছিলেন বয়সে সকলের বড়, তায় নদের বন্দ্যো কুলােদ্ভব- পণ্ডিত বংশাবতংস। সাধু ভাষায় কথা কইতেন,—অমরকোষ তার কণ্ঠস্থ মাইকেলের মেঘনাদবধের ভাষা অনায়াসে বধ করতেন। মধুসূদনের “অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুড়া হয়ে” লাইনটির “গুড়া” স্থলে “চূর্ণ বলতেন। শিব কেটে ধূর্জটি বসাতেন, বলতেন, দেবাদিদেবকে অত ছােট করলে দেবতাকে ক্ষুন্ন করা হয়, এক পয়সায় হীরে মেলেনা।” সকলে অবাক হয়ে শুনতে শ্রদ্ধাও কবুত। নচেৎ কলকাতা-ঘঁাশ হরিচট্টো কাকেও পাঠ শিক্ষার মর্যাদা সহজে দেবার বান্দা ছিল না। গােপালদা বললেন-“কিন্তু প্রকৃষ্ট প্রস্তুতির পূর্বে রাজধানীতে উদ্ধঝম্প উচিত হবে না, স্বগ্রামে একবার সেজেগুজে Dress rehearsal দেওয়া সমীচীন বােধ করি।” হরিচট্টো ও আর আর সকলে প্রস্তাবটি অনুমােদন করল—অবশ্য Extra খরচের চিন্তাও চাপলাে। সভা ভঙ্গ হ’ল। অমূল্যও হরিচট্টোর সঙ্গ নিলে। গােপালদা আর দু’তিনটি “প্রবেশনার মাত্র রইল। গােপালদা কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক। তার thinking aloud আরম্ভ হ'ল—মাঝে মাঝে হােত। “উহু রাজধানীতে অচল, রাজার নিষ্কোণ অক্ষি, বর্তুলানল, আপ্রান্ত বদন, পার্শ্ব পরিসর ভগ্নচুড় মাংসল নাসা, মার্জনী সদৃশ অশাস্ত্রীয়, উহু!” গোপালদা উঠলেন। যারা ছিল, মুখ চাওয়াচায়ি করলে একজন বললে ওঁর দেবভাষা ভালাে বুঝলুমনা। হেম বললে “না বুঝলেওঁ খুসি হয়েছি,-চ।”

নমস্কারী ৯২ ২ গােপালদা বরানগরের বাজারে গিয়েছিলেন—বাজার করে ফিরছিলেন বেলা আন্দাজ ন'টা। সহসা বিদ্যুতের কণ্ঠ কানে যাওয়ায় দাড়িয়ে গেলেন। এদিক উদিক লক্ষ্য করতেই তাকে বাগচীদের বৈঠকখানায় দেখতে পেয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে দু পা এগিয়ে যেতেই বিদ্যুৎ বেরিয়ে এলাে। “একি সকালে তুমি এখানে যে, বাজারে যাবে বুঝি ? গ্রামে তােমাকে কেউ বড় দেখতে পায় না, সকলেই তােমায় খোঁজে...” বিদ্যুৎ তার স্বভাব সুলভ সলজ্জ বিনয়ে, একটু হাসি টেনে বললে—“আমি যে সকাল ছটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি, এ বাড়িতে দুটি ছেলেকে পড়াই, আর এক বাড়িতে একটিকে। তাকে পড়িয়ে এসেছি। সাড়ে নটায় ছেড়ে দি-ওরাও স্কুলে যাবে কিনা... “ও-বেলাও আসতে হয় নাকি?” ‘হা—তা হয় বইকি দাদা। সন্ধ্যায় আসি ফিরি রাত দশটায়।” গােপালদা অবাক হয়ে তাকে দেখতে লাগলেন। শেষে মূঢ়ের মত বললেন—“খাটুনি যে অতিরিক্ত, এতে কেন ? তােমার তো...” বিদ্যুৎ চুপ করে রইলাে কথাটা কয়ে গােপালদা নিজের অভব্যতায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, বললেন- “তােমার স্বাস্থ্যরক্ষার কথাটা ভেবেই...” “আপনি ভাববেন বইকি, আর কে ভাববে দাদা!” গােপালদার কষ্টে নির্বাহের সংসার স্বভাবতই তিনি সহানুভূতিশীল। এ ক্ষেত্রে বিস্ময় আসা সত্ত্বেও, তার প্রাণট। মােচোড় খেলে। বললেন-“বাপ-মা চিরদিন থাকে না ভাই, ভগবান পুরুষকে তাই পৌরুষের অধিকারী করে দিয়েছেন সেটা নিজে অর্জন করতে হয়। যে চায়, চেষ্টা করে তিনি স্বয়ং তাকে এগিয়ে দেন। এই তাে খাটবার বয়স, এখন না খাটলে কবে খাটবে। কাজ কর; এখন চললুম।” ।

নমস্কারী গােপালদা আর দাড়ালেন না, দ্রুত বেরিয়ে পড়লেন, যেন আঘাত খেয়ে। অনেকদিন পরে একটু সহানুভূতির স্নেহ মধুর সাড়া পেয়ে বিদ্যুৎ অশ্রু সামলে —ছেলে পড়াতে ঢুকলো। হরিচট্টো ও যােগীন প্রভৃতি সেদিনকার কথাগুলাে বিরক্তিকর ব্যথার মত গােলদাকে বিধতে লাগল।-“যত সব জুগুপ্সা নিমজ্জথ পরনিন্দা-প্রিয় গহকারী যৌবন কলঙ্কী!”—উত্তেজনা এলে তার সাধু ভাষাই বেরুতে। সেটা কি একটা ছুটির দিন ছিল, শ্রীনাথবাবুর বাড়ি সকলের নিমন্ত্রণও ছিল। তিনি গ্রামের প্রধানদের মধ্যে ছিলেন একজন। তার বাড়ির কাজ- কৰ্ম্মও ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে বিদ্যুৎকে পরিবেষণ করতে দেখে যােগীন বলে—“কবে এলে ?—এই যে দেশে আছ দেখছি।” “কোথায় আর যাব ভাই- “না তাই বলছি,—আমাদের বৈঠক ঘরটা চিত্রকূটে বুঝি ?” একজন বলে,-“ধামা ধরতেও পারাে যে “দরকার হলে সবই পরতে হয় ভাই।” “কই গরীব হারাণ চাটুয্যর বাড়ি বৌভাতে তাে দেখলুম না?” শুনে বিদ্যুৎ মাত্র একটু হাসি টেনে চলে যায়। সন্ধ্যার বৈঠকে সেই প্রসঙ্গই চলছিল। গােপালদা এসে ঢুকলেন। হরিচট্টে। বলে উঠলো-“তা হলে আসছে রােববারের পর শনিবারেই Dress rehearsalটা দেখা যাক দাদা-তারপর মাত্র দেড় মাস হাতে থাকে,—দিন আর কই। একবার সব দেখে শুনে নিন। বড় পার্ট-অমুল্যকে খাটতে হবে খুব গোপালদা বললেন-“ঐ কথাটি আমিও ভাবছিলুম। আসন্ন সময়ে এত বড় পরিবর্তন,—তায় রাজধানীতে প্লে, সেখানে তােমার পরিচয়, প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি যথেষ্ট-সেটা রক্ষা করে আসা চাই- নমস্কারী ১৪ চট্টো বললে, “কিন্তু উপায় কি দাদা—বিদ্যুৎ যখন এলাে না, তার পায়ে তেল দিতে তাে পারি না—দরকার হলে নিজেই নেবে যাব,-কি করবাে। তবে সেটা ভালো দেখায় না-বেঙ্গল থিয়েটারে ক্লাইবের পার্ট প্লে করে যে মরিচি, ক্যালকাটার ক্লাইব হয়ে পড়েছি—ছেলে বুড়াে চেনে। বেহারীবাবুই বা কি ভাবেন। অমূল্য বেশ পারকৈ-আপনি একটু জোর দিন।” “অমূল্য পারবে না কেন—সময় কম বলেই ভাবছি। তুমি নাবলে তো কথাই ছিল না, না চাহিতে জল,কথাই উঠতাে না। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না, তােমরা কিছু না মনে করাে তো বলি।” “বলুন না, আপনার কথায় আবার *বিদ্যুৎ কি বলেছে—পারবে না?” যােগীন উত্তেজিতভাবে বলে উঠলাে-“তবে কি করে বলবে? তিন চারটে ছেলে এলােইনা, তার মানে কি কাকেও বলে দিতে হয়।” “ঠিক বলেছ যােগীন, তবে সেটা অনুমানে বুঝে নেওয়া। আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল আমি তাে বুঝলুম সে খুব করবে—প্রস্তুতও, কেবল সময় পায় না বলেই আসতে পাচ্ছে না—বরানগরের বাগচীদের বাড়ি মাসাধিক থেকে সকাল সন্ধ্যা ছেলে পড়াতে যায়, তাই একজন বলে উঠলাে—“প্রাচীনেরা অনেক দেখেই বলে গেছেন—“যার যত থাকে তার তত খাই”—আশা মেটে না। বেঁচে থাকুক!” কয়েকজন হেসে সমর্থন করলে। হরিচট্টো বললে—“সে কি তবে সরাসরি কলকাতায় গিয়ে আমাদের উদ্ধার ক'রে আসতে চায়?” গােপালদা ধীরভাবে বললেন—“তােমাদের অভিমানটা খুবই স্বাভাবিক, হতেই পারে। সে বাল্যবন্ধু—সকলে তাকে ভালবাসে—চাও’ তার প্রমাণই এই অভিন্নান। মনােমালিন্যের অন্য কোনাে কারণও ঘটেনি—পূর্বের মত আসতে না পারাটাই হয়েছে তার অপরাধ, সন্দেহ নাই। সম্প্রতি কোননা বিশেষ ব্যক্তিগত কারণেই তাকে অনুপস্থিত হতে বাধ্য করে থাকবে। তার নমস্কারী সঙ্গে আমাদের কারাে ঝগড়া বিবাদ তত নয়। রোববার তার ছুটি থাকবে, সে আসবে, সেই দিন তার পরীক্ষা নেবাে বলেছি। শুনে নিয়ে তারপর তােমরা যেমন বলবে তাই করা হবে। অমূল্য তো আছেই—আমিও আছি। এখন তােমরা যেমন বলে।” হরিচট্টো বললে-“এতে আর আপত্তি কি? কেমন হে ?” “তবে কোনাে খুৎ থাকলে তাকে আপনাকেই সেটা স্পষ্ট করে বলতে হবে কিন্তু। খাতির বা চক্ষু লজ্জা চলবে না” – “তুমি যখন রয়েছ, কারাে জন্যে ইতস্তত করবার তো কারণ নেই। তুমি থাকলে সেটা ভাবতে হত, আমি স্পষ্ট বলে দেব—চলবে কি চলবে না। কাজটা তাে শুধু আমাদেরি নয়—খারাপ হলে গ্রামের বদনাম আছে।” মনে যার যাই থাকুক—সকলে ‘বেশ’ বলে চুপ করে রইল, ভাবটা “মিছে সময় নষ্ট করা। গােপালদা আর কথা বাড়ালেন না। রবিবারও এলো, বিদ্যুৎও এলাে—সেই পূৰ্বভাব। গোপালদা সকলকেই বলে রেখেছিলেন—“আমরা পূৰ্বেই যেমন ছিলুম সেইভাবেই যেন চলতে পারি,—আজ আমাদের সকলেরি পরীক্ষার দিন ভাই। মন্তব্য ও সমালোচনাদি পরে করা যাবে।” ক্রমে বৈঠক ভরে উঠলো। বােধ হয় সমঝদার শ্রোতাদেরও ডাক পড়ে থাকবে,--হুকো হাতে করে তাদের আবির্ভাবও হােলো। কেবল অমূল্য আসেনি। হরিচট্টো বললে—“অমূল্যের আসা যে বড় দরকার ছিল। বিদ্যুতের পার্ট যে প্রায় আগাগােড়াই,অনেক সময় নেবে। আর তো অপেক্ষা করা চলবে । আবার কো-একটারও......” বিদ্যুৎ বললে—“হ্যা ভাই—তা হলেই আমার সুবিধা হয়।” হরিচট্টো বললে—“সেটা বুঝি বলেই তো বলছি রে?”

নমস্কারী ৯৬ । গােপালদা নিজেই প্রমটার—পরীক্ষা আরম্ভ হয়ে গেল। সকলে নিস্তব্ধ। বিদুৎ সহজ স্বাভাবিকভাবে আরম্ভ করলে গতিভঙ্গী ও বিনয়বিজড়িত কণ্ঠের উখানপতন সকলকে মুগ্ধ করে চলল। সমঝদারদের হুকোর আওয়াজ থেমে গিয়েছিল, শব্দের মধ্যে ছিল কেবল “বা ভাই।” যােগীনও অসম্বিতে দু’বার Capital বলে ফেলেছিল। ফলে সকলেই মুগ্ধ হয়েছিল। শেষ হতে অনেক সময় নিলেও সকলেই স্থিরভাবে উপভােগ করেছিল। হরিচট্টো এতই খুসি হয়েছিল যে, বিদ্যুৎকে জড়িয়ে ধরে বলে-অমৃত মিত্রের কণ্ঠ, ধরন ধারণ, খেচ খচ এ পাড়গায়ে কোথায় পেলে? তুমি ভাই রবিবার রবিবারেই এসো—শনিবারের বদলে রবিবারই আমাদের রিহার্সেল ডে (day) রইলাে। ত্রৈলােক্যবাবু বলে গেলেন—“a born actor”— সমঝদারেরা বলে গেলেন—“আর কারুর মুখে ও পার্ট শুনতে ভালই লাগবে -লাগতে পারে না।” ইত্যাদি বাইরের লােক বিদায় হলেন, বিদ্যুৎও সকলের সঙ্গে কথাবার্তা আলাপের পর চলে গেল। গােপালদা বললেন,—“এইবার সব বােসস দিকি, যার যা বলবার আছে শোনা যাক—এখন বাজে কেউ নেই। দায়িত্ব আমাদের।” চট্টো বললে—“ওর ওপর বলবার আর কি থাকতে পারে—কোথাও একবারও বাংলােও না। চোখ বুজে শুনলে মিত্তিরকেই মনে পড়ে। সেদিন তাকে আমি আনবই-তাকে শােনাবই।” সকলে বললে—“নাঃ ওই করবে, ওর চেয়ে ভালাে আর কি করবে?” যােগীন বললে—“একটি সম্বন্ধে কিছু বলার নেই, ও একটিং করতেই জন্মেছে —তাই ভয় হয়।” গােপালদা চট্টোর দিকে চাইলেন। চট্টো বুঝতে পেরে বললে—“থিয়েটার আমাদের একটিং নিয়ে কাজ,-সেটা ভালাে হলেই হ’ল ভাই।” যােগীন বললে—“ওই করবে বইকি—ভালই করবে বলে মনে হয়। তবে আমরা সমাজে থাকি তাই—অন্য কথাও ভাবতে হয় ৯৭ নমস্কারী “বেশ তাে—খুব ভাবিস,আমি বর দিচ্ছি তুই দলপতি হবি।” সকলের কলহাস্য মধ্যে সভা ভঙ্গ হ’ল। গােপালদা একটি কথাও কননি, যাবার সময় কেবল হরি চট্টোকে একটু সতর্ক থাকতে বলে গেলেন। রাসবিহারী খুড়াে দাওয়ায় বসে থেলো-হুকোয় তামাক টানছিলেন। মতিবাবুর কাছে বললেন—“দ্যাখ,তােরা চেয়ে দ্যাখ,--আমার বুকটা আজ দশহাত হয়েছে কিনা ! রক্তের টান লুকোবার জো নেই। বিদু দাদার আমার লগ্নাদা ছেলে, ও যাতে হাত দেবে তাতেই সােনা ফলবে-আশীৰ্বাদ করি, করিতে নিত্যই—ও দীর্ঘজীবী হােক—রাজা হােক। দুধভাত তো খায়ই, মাঝের কদিন যেন ঘি-ভাতও খায়,ওটা দরকার। বড় কষে চনে তােমরা বলে দিও, তােমাদের কথা শুনতে পারে।” আজ ড্রেস রিহাসেল। হর ভটচাৰ্য্যি-মশা’র বাড়ির দক্ষিণে দীর্ঘ পােড়। জমিতে প্রকাণ্ড ম্যাপ বাঁধা হয়েছে, ষ্টেজ বাধা চলছে। ছেলের পপাল মহােৎসাহে খাটছে। হুকুমের জন্যে সবাই উমেদার। কেউ দড়িটে এগিয়ে দিতে বললে,-বিশজন ছােটে! দুখানা গাঁয়ের দেবদারু গাছগুলাে যেন মুণ্ডনান্তে প্রয়াগ থেকে ফিরেছে। জমিদারদের সেজবাবু লোকজন সঙ্গে ঝাড়লণ্ঠন এনে টাঙাচ্ছেন। গ্রামের ছােট বড় সকলেই উৎসাহে যােগ দিয়েছেন। তখন ছেলেদের আনন্দে বড়রাও যােগ দিতেন—উৎসব আনন্দ খুঁজতেন। তখন এমন অর্থগ্রাসী ফাকা বহিঃসজ্জার বিদেশী প্রবাহ আসে নি—অন্নচিন্তাও তাই কম ছিল। ক্যালকাটার ক্লাইভ হরিচট্টো বহুৎ সিন এনে ফেলেছে, নিজের তত্ত্বাবধানে টাঙাচ্ছে, গলায় ‘কারে’ হুইসিল ঝুলছে। যারা বাঁশী শুনে সিন তুলবে, ফেলবে তারাও এসেছে। সাজাবার লােকও এসেছে-মহাসমারােহে Local এর মধ্যে কেবল স্থানীয় ক্ষেত্ৰ-নাপিত—সেও রসজ্ঞ অধুনা-প্রবীণদের নমস্কারী বিদ্যাসুন্দরের যাত্রায় ভিস্তির সং দিত। গােপীদের গোঁফ কামাবার জন্য প্রস্তুত। দুঃখ করে বলছে—“তিনপুরুষের গোঁফ কামাতেই দিন গেল—টাকা কামাবার আর ফাক পেলুম না।” তখনকার দিনের কথা,-অভিনয় আরম্ভ হবে রাত ১১টায়, শেষ হবে ভােরে। আহারাদির পর সব আসবে-উষার আলােয় ফিরবে। কিন্তু সন্ধ্যা থেকেই ভিন্ন গায়ের লোক সমাগম আরম্ভ হয়ে গেছে! তখন আদর আপ্যায়ন ছিল তামাক দিয়ে, দেশে সিগারেটের সাড়া পৌছয়নি। সেজবাবু তার খানসামা নফকে দু’জন সহকারীসহ সে কাজে নিযুক্ত রেখেছেন। ‘ডুপ’ পড়েই ছিল। দু’জন সাপুড়ে তার উপর তুবড়ি বাজিয়ে সাপ খেলাচ্ছিল। ব্যবস্থামত ড্রপ দুলছিল তাতে সাপের ও সাপুড়েদের গতি জীবন্ত দেখাচ্ছিল। আবার উইংসের অন্তরালে থেকে হাবু-মাস্টার তুবড়ি বাজিয়ে- সেটাকে সত্যের রূপ দিচ্ছিল। সকলে অবাক ! ‘ঘণ্টা পড়ল—ড্রপও উঠল—দর্শকেরা ধীর স্থির নিস্তব্ধ। প্লে আরম্ভ হয়ে গেল। লােকে লােকারণ্য কিন্তু টু শব্দ নেই। কোলের ছেলে কাদলেই চট্টো ষ্টেজের সামনে এসে আংটী-পর হাত জোড় করে সবিনয়ে বলছে—“মায়েরা দয়া করুন।” সঙ্গে সঙ্গে হুইসিল। ড্রপ উঠলেই সব নিস্তব্ধ। কৃষ্ণ, বলরাম আর বিদ্যুৎ বেরুলেই সকলেই হংসগ্রীব। বিদ্যুতের রূপে, সাজে, মুক্তার মালায় আর মধুরকণ্ঠে সকলকে চিত্রার্পিত করে রাখে। ঘন ঘন করতালি আর Beautiful ফোটে। বলরাম ও শ্রীকৃষ্ণেও সবাই আকৃষ্ট। যােগীন কুজা, বেশ মানিয়েছে। গােপালদা কিন্তু মাঝে মাঝে চাপা গলায় বলছেন—যা বলছি শুনে বলনা—পা কাপে কেন ? সেটা সকলের কানে পৌছা। চট্টো বলছে—“কি হয়েছে—মাটি করবি নাকি—ষ্টেডি।” কখন রাত ৪ |ট হয়ে গেছে, ভােরের বাতাস দিয়েছে কেউ লক্ষ্যও করেনি। প্লেও এই গর্ভাঙ্কেই শেষ হবে। বিদ্যুৎ প্রাণ ঢেলে দিয়েছে, নিজের চোখেও ৯৯ . নমস্কারী জল-দর্শকদেরও কাঁদাচ্ছে। মধু ডাক্তার গায়ের ভক্তকবি ও ভাবুক, তার ফেঁপানি শােনা যাচ্ছে। তিনি তখন মথুরা থেকে বৃন্দাবনে গিয়ে পড়েছেন রাধার ব্যথা ও গােপিকাদের কথা তাঁকে ব্যাকুল করেছে। এই সময় বিদ্যুতের প্রাণ স্পর্শী বিচ্ছেদবিধুর বাণী চরমে উঠে সকলের মরমে আঘাত করেই—সহসা নিস্তব্ধ। হঠাৎ তার অভাবনীয় পতন “কি হেলাে—কি হােলাে’-হরি চট্টো ছুটে গিয়ে দেখে, স্পন্দন নেই- মূচ্ছা-“ড্রপ ফেলনা, ড্রপ ফেলনা” বলতে বলতে মধু ডাক্তারের কাছে হাজির, “ডাক্তারবাবু উঠুন—শিগগির আসুন, বিদ্যুৎ মূচ্ছ। গেছে।” ডাক্তার তখন বৃন্দাবনে। বিরক্ত হয়ে বললেন—যাবে না—একি মানুষে সইতে পারে। এখানে তাে মূচ্ছা গেছে—সেখানে যে সব মরবে।” চট্টো তাকে টেনে তুলে ফেলেছে,-কাতর কণ্ঠে বলছে—“ডাক্তারবাবু দয়া করুন।” দর্শকদের দিকে ফিরে বললে—“অভিনয় শেষ হয়ে গিয়েছে, আপনারা এখন বাড়ি যেতে পারেন। বিদ্যুতের পায়ে একটা পেরেক ফুটেছে, আমরা এখন বড় ব্যস্ত। সকলে ক্ষমা করবেন।” সে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে ষ্টেজে উঠলাে। তিনি তখনও চোখ মুছছেন। ৪ মধু ডাক্তারের ছেলে রাজকুমার ক্যাম্বেল থেকে নূতন ডাক্তার হয়ে বেরিয়েছে। আলমবাজারের অতুল ডাক্তার অভিনয় দেখতে আহ্বান পেয়ে এসেছিলেন। তিনিও ষ্টেজে হাজির হয়ে পড়েছেন। মধু ডাক্তারকে সকলেই শ্রদ্ধা করেন—তিনি স্বনামখ্যাত বঙ্গবিত দুর্গাচরণ ডাক্তারের অন্তরঙ্গ বন্ধুও। অতুল ডাক্তার নাড়ি টিপেই বললেন, “ডাক্তারবাবু আপনি দেখুন—Serbus বলেই ঠেকছে। Extreme weakness-* মধুবাবুর ভাব ভাঙলো-“আঁ বলল কি–দেখি।” দেখেই নিৰ্বাক- নমস্কারী ১০০ বিবর্ণ,-“নাড়ী যে কনুয়ের ওপর! দ্যাখে দ্যাখাে-ভাবে না ‘অভাবে, পেট দ্যাখো।” অতুল ডাক্তার পেট টিপে বললেন,—সত্যিইতো, ষ্টমাক যে একেবারে empty 1 মধুবাবু এতক্ষণে চারিদিক চেয়ে—‘শিগগির একটু গরম দুধ আর—আর মকরধ্বজ। পওয়া যাবে তাে ? —এক্ষুণি চাই—ইস—প্রাণ দিলে নাকি?” সকলে চমকে গেল। স্ত্রীকণ্ঠ কানে এলাে—“আমি এখুনি আনছি।” বলেই একটা গৌরবর্ণ। দীর্ঘাঙ্গী দ্রুত চলে গেলেন। ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন—“নিশ্চয়ই থাকো',—ঠিক পাওয়া যাবে। তােমরা ততক্ষণ মাথায় কপালে চোখে—গােলাপজল দাও,ইস তাইতাে...” অতুলবাবু বললেন—একটা Prescription ••মধুবাবু বললেন- “গিলবে কে? সবাই নিস্তব্ধ, কারাে মুখে কথা নেই। হৈ হৈ শব্দে কাদতে কাদতে রামুখুড়াে উপস্থিত,-“আমাদের বংশের তিলক বাঁচান ডাক্তারবাবু”- “চুপ করাে—চুপ করে গোল করােনা, ভাবগ্রাহী শ্ৰীকৃষ্ণ আছেন, তারি দায়...” গরম দুধ, মধ্বজ, খ, আঙ্গুর, বেদানা নিয়ে ন” হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির,-“এই নিন ডাক্তারবাবু, মা বিদ্যুৎদের বাড়ি গেলন”। হরিচট্টে। কাঠ হয়ে দাড়িয়ে। গােপালদা ততােধিক। অতুল ডাক্তার দুধ খাওয়াবার চেষ্টা পাচ্ছেন, প্রায় সবি কস বেয়ে বাইরে, পড়ছে, রাজকুমার মকরধ্বজ মাড়ছে। মধু ডাক্তার বলছেন ওই ভাবেই দিয়ে যাও-ঐতেই কাজ হবে।” বিদ্যুতের ছেলেকে নিয়ে থাকো এসে হাজির, ছেলেটি তার কোলে নেতিয়ে আছে। আপনাদের বলা দরকার তাই এলুম—আজ ৬৭ দিন == ১০, নমস্কারী ওরা খাটি জল সাবু খেয়ে আছে, বাড়িতে রান্নার পাট নেই। কেন ট্যান জিজ্ঞাসা করবেন না। এখন বিদ্যুতকে নিয়ে থাকুন, এর পর বােধ হয় এই বাচ্চাকেও দেখতে হবে—শুধু মাই টেনে বেঁচে আছে। মেয়েরা মরে না— বউ ঠিক বাঁচবে। অতুলবাবুকে ছাড়বেন না ডাক্তারবাবু, আমি একে নিয়ে চললুম-” অতুলডাক্তার বললেন,-“খবরদার খাটি দুধ ওকে দেবেন না।” মধুডাক্তার বললেন—“ওকে কিছু বলতে হবে না অতুল।” থাকে। আর দাড়াননি। অতুলডাক্তার-“কে বলুন দিকি ?” “থাকতে ওর পরিচয় নেই, গেলেই গ। মাতৃহীন।” চিন্তা ও দুর্ভাবনার মধ্যে নীরব বিষন্ন মুখে সবার সময় কাটতে লাগল। হরিচট্টো ডাক্তারদের চা ও জিদ করে কিছু জল খাওয়ালে। বিরল হলেও গ্রামে তখন চা প্রবেশ করেছে। রাসুখুড়ো কথা কইতে না পাওয়ায়—“আমার সর্বনাশ আর ওঁরাই যেন সব! ‘কষ্টর দায়’ বলে খালাস! জানে না আমরা শাক্ত, নাড়ীজ্ঞান কতত।” বলতে বলতে সরে পড়লেন। বেলা আন্দাজ দশটা-বিদ্যুৎ চোখ চাইলে। ওষুধ আনাই ছিল, অতুল- বাবু মধুডাক্তারের দিকে চাইলেন। তিনি বললেন-“ওটা” প্রতি খােরাকে চার ফোটার বেশী নেইতো?”—“না-কিছু কমই আছে।”-“দাও। ভয় নেই।” সকলের বুক থেকে যেন পাথর সরে গেল-বদ্ধ নিশ্বাস ছাড়া পেলে। বেলা একটার পর বিদ্যুৎকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে ব্যবস্থাদি দিয়ে ডাক্তাররা বিদায় নিলেন। থাকোর ব্যবস্থায় সেখানে তখন সবই প্রস্তুত-বাড়িতে কিছুর অভাব নেই। ছেলে তার মায়ের কোলে খেলা করছে। থাকো মধুডাক্তারকে বললেন- “সন্ধ্যার পরে আপনাকে একবার দেখে যেতে হবে কিন্তু।”

নমস্কারী “আর দরকার হবে না, তবে তােমার ইচ্ছা যখন—আসবে বইকি মা।” বাড়ির গাড়ি প্রস্তুতই ছিল—ডাক্তাররা উঠলেন। থাকে। অতুলডাক্তারের দিকে চেয়ে বললে-“কিছু বলতে পারছি না যে ডাক্তারবাবু-- “আমি মাকে কোনােদিন দেখিনি—শােনাই ছিল, দেখে গেলুম—আজ আমার”...গাড়ি ছেড়ে দিলে। স বাইরে তখন দলের সবাই উপস্থিত,কথা বঁাধ মুক্ত হয়েছে—ভিড় করে বেরুচ্ছে। গােপালদা বলছেন-“আমি তিনপুরুষে বনেদী দুঃখী দুর্দশাগ্রস্ত। বাগচীদের বাড়ি বিদ্যুতের সঙ্গে কথা কইতে গিয়ে—আমার অন্তর তার অন্তরটাকে তার মুখের উপর ফেলে শিউরে গিয়েছিল, আজ তার প্রমাণ পেলুম।-“সবাই বলচো—কী চাপা ছেলে বাবা” তা বােধ হয় নয়, মধ্যবিত্ত সংশের ভদ্রসন্তানদের ওটা প্রকৃতিগত,—সবাই চাপা,-হাসি ঢাকা হতভাগ্য তিলে তিলে মরে—দয়ার পাত্র-কপার পাত্র হতে পারে না। তাদের সাহায্য কেবল তারাই করতে পারেন, যার ছােটো হতে পারেন...আপনার হতে পারেন—কথায় যাদের বিজ্ঞতা নেই—উপদেশের কাটা নেই”- ••• একজন বললে—“তবে যে শুনলুম, (যার তার কাছেও নয়),-“বিদ্যুৎ বাপকা বেটা, তাকে আকরে টেনেছে। পরে দেখতে পাবে—কোম্পানীর কাগজে উনুন ধরায়”.. গােপালদা কেবল বললেন—“ভগবান করুন—তাই যেন সত্য হয়, আমার অনুমান যেন ভুল হয়। তােমরা সকলেই প্রায় সমবয়সী, কোম্পানীর কাগজ কি রংয়ের ধোঁয়া ছাড়ে তা হলে নিশ্চয়ই একদিন দেখতে পাবে। সকলের মঙ্গল হক, বিদুৎ ভাল হয়ে উঠুক। আমি বিচুলিটে কিনে রেখে আসি।” চলে গেলেন। অনেকেই স্বস্তি বােধ করলে—“এত বেলায় আবার তার আসা কেন?”

১০৩ নমস্কারী ভিতরে থাকো তখন রমাকে খাইয়ে বলছে—“আমি এই বেলা বাড়িটে চট করে হয়ে আসি। রাতে এই বাড়িতে তােদের পেসাদ পাবে-তাের কাছে তাের পাছতলায় আজ শােবাে- —“বিদ্যুৎ ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে ডাকি টাকিসনি”— -মঞ্জুর গল্প রাণাঘাটের মহারাণা শ্ৰীযুক্ত কালাচঁদ-খুড়ে আজ পাঁচ বৎসর না-পাত্তা। Sunday-সভা “মরা গাঙের” মত জরাগ্রস্ত,তার সে জুৎ নেই, ভূতের আডডায় দাড়িয়েছে। সাহিত্যের প্রসিদ্ধ পীঠস্থান বলেই সাহিত্যকেরা জোটে, কিন্তু মােটেই পূর্বের সে উৎসাহ দেখা দেয় না। কেবল উদীয়মান উৎসাহী লতানে লেখকেরা খাটি বাস্তব গদ্য-কবিতা অদম্য বেগে শুনিয়ে সাহিত্যের “ক্ষীণ বলবতী নাড়ীর” লক্ষণ দেখিয়ে যান। ভক্তেরা বহু অনুসন্ধানের পর হতাশ হয়ে এখন কৰ্তব্য-নির্ণয়ে মন দিয়েছে। কুশপুত্তলিকা দাহান্তে ঘটা করে শ্রাদ্ধ করবার প্রস্তাবও পড়েছে--তাই নাকি হবে খুড়োর যোগ্য জয়ন্তী। সতীনাথ সৰ্বাধিকারী তার প্রিয় ভক্ত, তার কিন্তু মন সরছে না। সে একটা সংশােধন প্রস্তাব পে করেছে, বিরাটের প্রসিদ্ধ প্রদেশ খোঁজা হলেও, তিনি আত্মগােপন করতে পারেন একমাত্র সঁওতাল পরগণায়,—সেটাও আমাদের দেখা উচিত। তদ্ভিন্ন এখন মলমাস চলছে, এখন জয়ন্তীর মত ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম বােধহয় শাস্ত্র-বিরুদ্ধও হবে। তায় আমাদের এ কাজটি একপ্রকার মারণ- তন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত দাঁড়াচ্ছে,-আমরা আবার Non-violent নীতিগ্রস্ত। আমাদের মধ্যে বড়দলের মাতব্বর বিশুদ্ধ সভ্যও আছেন। নীহারের ভগ্নীর দুটি পেয়ারের কোকিল ছিল। তাদের চক্ষু রক্তবর্ণ বিধায়, সে বিদায় করে দিয়েছে। বলে ‘খুনীর’ আভাস দেয়।

১৩৪ নমস্কারী ভাবুক কবি-সাহিত্যিক সরােজ গুনে গম্ভীর ভাবে বললে-“কথাটি ভাববার, অর্থহীন নয়। ওদের মিষ্ট স্বরে আমরা মুগ্ধ হই বটে, কিন্তু কাজে Sex-নির্বিশেষে চিরদিনই বহু সামাজিক অনর্থ ঘটিয়ে আসছে। “ভাষাই তো ফাসায় রে, সেটা কি আজ বুঝলি না কি ? নে—তামাক সাজ। এই যে-সব মূর্তিই বেঁচে আছিস দেখছি, কারাে উপকার করতে পারিসনি” সকলে সচকিত হয়ে দেখে—খুড়ে হাজির। Three Cheers পড়ে গেল। সবার মাথা খুড়াের পায়ে পৌছে গেল। সতীনাথ শঙ্খধ্বনি করলে। আনন্দে ও বিস্ময়ে কারাে মুখে কথা যােগায় না। খুড়ো। কিরে, দলে ‘দয়াল’ দেখা দিয়েছে নাকি! কথা কইছিস না যে..... সতীনাথ। অভয় না দিলে... খুড়াে। পাঁচ বছরেই পর হয়ে গিয়েছি নাকি... সতীনাথ। একটা পউনে-অপরাধ হয়ে গিয়েছে। ভাগ্যে এসে গেলেন। খুড়াে। কি বল দিকি,-খােলদা হ'•••••• “জয়ন্তী-শ্রাদ্ধের” কথাটা শুনে খুড়াে খুসি হলেন। বললেন, “তােরা জ্ঞান- পক হয়েছিস দেখেই সরে পড়েছিলুম—ততাদের ভুল হতে পারে না,—ঠিকই হয়েছে—সেরে ফ্যাল, শুভ কাজ ফেলে রাখতে নেই। শুনিসনি......ভিলেজের রাজাবাহাদুরের ছেলেরা বাপের শ্রদ্ধে লাখ টাকা খরচ করে। মেহগ্নির ব্ৰস, পােলাওয়ের পিণ্ড, গোলাপ জলের তর্পণ ; ইহুদি বাইয়ের নাচ পর্যন্ত বাদ যায় নি। তাতেও ছেলেদের সুখ হয়নি, ঐ পউনে দোষ পৌচেছিল। বড়ছেলে বন্ধুদের গলা জড়িয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বলেছিলেন—সবই বৃথা হল ভাই–বাবা দেখতে পেলেন না। তােদের সে দুঃখের কারণ থাকবে না। সরজমিনে আসামী হাজির। যা তােদের Sunday-সভার সাহিত্য-চৰ্চ্চা কেমন চলছে? দেখিসওইটিই বাংলার ভরসা, ওকে বাঁচিয়ে রাখিস। ঠাকুর’ কৃপা করে তাকে যৌবনে পৌছে দিয়েছেন-এই তার নজর লাগবার বয়স।”

Sul নমস্কারী নন্দ। তা মন্দ চলছে না, সকলেই বই লিখতে আরম্ভ করেছে- খুড়াে। এই মাথা খেয়েছে। কাদের জন্যে ! পাঠক আছে তাে? নন্দ। লেখকে ভাববে, আবার দুর্ভাবনাও বইবে নাকি? সে বুঝবে পাবলিসারে- খুড়াে। তা বটে, তবে আর কি–খুব লেখ। এটা সাহিত্যের ‘সত্যযুগ -Spade কে Spade বললে কারুর কথা কবার মুখ থাকে না। বাড়ের সুযােগ ! সত্য কথার মার নেই,খুব লেখ। বাস্তবে Brain-এর বালাই কম। মানস-সুন্দরী নিয়ে আর ফানস বানাতে হবে না—বেঁচে গিয়ে- ছি। তবে যে সত্যাগ্রহীর মােশাফিরখানায় শুনে এলুম-বাংলায় সত্যাগ্রহী বিরল ; শুনে মনটা দমে গিয়েছিল। তাও কি হয়।-তােরা বেঁচে থাকতে সে দুর্নামের ভয় নেই দেখছি।” সতীনাথ বাধা দিলে। আপনার কাছে পাঁচ বৎসরের পাওনা। আগে সে সব শুনতে হবে। এখন স্নানাহার সারুন। খুড়ো। সে যোগাড়ও আছে নাকি? তবে আর সাহিত্যিক হবি কি করে? ও থাকলে ধৰ্ম আর সাহিত্য বাড়ে না। নন্দ যে বললে—সবাই বই লিখছে! দুর্দিনেই ত’ ওরা বাড়ে-আহারের যােগাড় রয়েছে যে!.... স্থির হ’ল—আজ বৈকালী বৈঠক বসবে। খুড়াের adventure-এর কথা শুনতে হবে। বিমল গল্প লেখক, সে বললে—“কিন্তু একটা গল্পও চাই।” খুড়ো। ফ্যাসাদ ডাকিনে বাবা। গল্প, মিথ্যা না হলে জমে না—তােরা সত্যাগ্রহী, আর পাপ বাড়িয়ে কাজ কি? সতীনাথ বিমলকে আশ্বাস দিলে—ভাবচো কেন, খুড়াের এডভেঞ্চারের মধ্যে বহুত মাল এসে যাবে। Plot এর পন্থায় আছ বুঝি ? খুড়ে। ওঃ সে-তাে সকলেরই চাই,বাপ-পিতামো যা রেখে গিয়ে- ছিলেন তার তো আর পাত্তা নেই। বিমল। সে Plot নয়—গল্পের•••••• নমস্কারী ১৬ খুড়ো। তবু ভালাে, দরকারি বটে। যতক্ষণ আছে—পেটে কিছু দিবি চল। [ সকলে উঠলেন ? খুড়াে। বলচি, তামাক সাজ... সরােজ। এই যে ready—নিন— খুড়াে। শেষের দিকটাই আগে বলি। বিমল শুনে রাখ, আজকাল নব- নিয়ম তাই।—শেষে টেনেছে,—যাক। শ্রাদ্ধ-জয়ন্তীর শাস্ত্রীয় প্রথাও পাবি, " ন •• -কাশী নয়, বৃন্দাবন নয়, ওয়ার্দা থেকে ফর্দায় এসে ট্রেনে উঠলুম। পােশাকে কি মূর্তিতে জাতের মার্কা ছিল রাণাঘাট নামটাও নিরাপদ দেশ নির্দেশ করে না--যেমন ডিম বললে পাখির বালাই নেই ; যাত্রাটা নির্বিঘ্নেই শুরু হয়। মাথায় কিন্তু চিন্তার বিরাম নেই, ওটা নাকি বুদ্ধি থাকলেই সঙ্গ নেয়,বাড়ে। ফলে, আমার রেহাই ছিল না। তাই নানা চিন্তা নিয়ে খানা জংসন পৌছে বাঙালীর মুখ দেখে দুটো কথা কইতে গিয়ে ফংসনের ফ্যাসাদে পড়ে গেলুম। তাঁরা মেদিনীপুরে যাবেন—বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মূর্তি-প্রতিষ্ঠাদি নানা অনুষ্ঠান আছে। বাংলা দেশ function-এর দংশনে বিব্রত,-তাই নিজের বাপমার শ্রাদ্ধ তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। যা সংবাদটা শুনে চমকে গেলুম, কর্তব্যবােধ দ্রুত এগিয়ে এলো।—তিনি যে আমার সাক্ষাৎ গুরুস্থানীয়, সর্বাগ্ৰেই যে আমার যাওয়া উচিত! “সত্য- নারায়ণের কথা আছে” শুনলেই যেতে হয়—নিমন্ত্রণ নিরপেক্ষ। বাল্যে বর্ণ- পরিচয় তার দয়াতেই হয়েছিল,-তবে বড় ভুগিয়েছেন। বর্ণ ছত্রিশ নয়, সে জাত আর রাগিণী। জ্ঞান হয়ে এখন প্রমাণ-শুদ্ধ নিত্য সত্যের সাক্ষাৎ ঘটেছে। বুঝেছি-বর্ণ দু’টি মাত্র সাদা আর কালাে। যাক—উৎসাহী যাত্রীদের সঙ্গ নিলুম। তারা একটু আশ্চর্য হলেন, বললেন—“আপনি যাবেন নাকি?” বললুম- “কেন, মানা আছে নাকি?—তিনি সাঁওতালদেরও আপনার ছিলেন।” পরে বিপুল আগ্রহে কথা আরম্ভ হ'ল। একজন তার চশমা-পরা বন্ধুকে .

১০৭ নমস্কারী বললেন—“তােমার বক্তৃতার খােরাক।” তৎপূৰ্বেই বন্ধুটির পকেট থেকে নােটবুক আর পেন্সিল দেখা দিয়েছিল। ভাবলুম বাংলাদেশে পৌছে গেছি বটে। মেদিনীপুর পৌছে যাওয়া গেল। সঙ্গীদের একটু কেমন বিচলিত ভাব দেখলুম।—এখানে তাদের নাকি বিশেষ আত্মীয় আছেন, তারা expect করবেন। সেখানে না গেলে ভালাে দেখায় না। শুনিয়ে ও দলেন— “অনুষ্ঠানক্ষেত্রে আগন্তুকদের জন্য সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে তদ্ভিন্ন মিলন ও আলাপের আনন্দও সেইখানেই সমাধিক। কি করা যায়—আপনাকেও ছাড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না”—ইত্যাদি। বললুম-“সে কি কথা, যা ভালো দেখায় সেইটাই তাে করা উচিত। জগৎটা তথা সংসারটা দুটি কথার ভারকেন্দ্র-সামলে চলবার চিন্তা ও চেষ্টায় সৰ্ব্বদা ব্যস্ত। বুদ্ধিজীবীরা বেড়ার ওপর বসে সেই কসরৎই করে আসছেন অর্থাৎ লােকে কি বলবে’ আর ‘কি-সে ভালো দেখাবে এইটাই বুদ্ধিমানের বড় চিন্তা। ঐ দুইটি কথাই তাদের মধ্যে অনুচ্চারিত শাসনের কাজ করে। বললুম—“যা ভালাে দেখাবে, তা করবেন বই কি। আমরা জন্মপদাতিক, আমি একটু ঘুরে-ফিরে বাংলার পীঠস্থানটায় প্রণাম করে যাব।” তারা বলেন, আমিও বাঁচলুম। তাদের সুটকেস দেখেই বুঝেছিলুম শশুরালয়েই চলেছেন। Shaving-অ্যাটাচি বার করে—যাতে ভালো দেখায় তা করতে বসলেন, আমি পথে পা বাড়ালুম। রাজপ্রাসাদে প্রণাম সেরে, বাংলার সনাতন সংস্কার-বিরল পুষ্করিণী, বাড়িঘর, বাঁশবন উত্তীর্ণ হয়ে শ্রদ্ধেয় শাশমল-সৌধে নমস্কার সারলুম। লম্বা পাড়ি, দ্রুত চলতে হয়েছে। সনাতন বা পুরাতন প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন চিহ্ন মধ্যে মধ্যে রয়েছে, জীবন্ত স্ত্রীপুরুষের মুখে কিন্তু প্রফুল্লতা নাই, দৃঢ় সহিষ্ণুতায় যেন জীবন বহন চলেছে। তাকে কৰ্ত্তব্যের বন্ধনী বেশনে রেখে, কাজকর্ম করছে। । ৩ নমস্কারী ১০৮ নানা চিন্তায় অন্যমনস্ক করে দেওয়ায় কখন একটা লােক-বিরল কাচা রাস্তায় ঢুকে পড়েছি। সহসা স্ত্রীকণ্ঠের বেদনা-করুণ মৃদু সুর কানে আসায় চমকে দিলে। সেটা যেন সৰ্বদেহে কি একটা অস্ফুট আবেদনের মত ওলট- পালট খেতে লাগলো। গতিবেগে, বাধা দিলে। দেবতার কাছে সে কি প্রাণ উজাড় করা বিনয়-ব্যাকুল বেদনা প্রকাশ ! লােকে বলে—কথাটা বললেই কাজ হয়। তাতে নয়, তাতে কেবল অর্থ বােধে সাহায্য করে—কাজ করে ‘সুর। মানুষের মৰ্ম্মে বােধ হয় তার কেউ পরমাত্মীয় আছে—যাকে সে ব্যাকুল করে। থাকতে পারলুম না, বিচলিত হয়ে বলে ফেললুম-“কি গা বাছা, কি হয়েছে তােমার ?” মূঢ়ের অযাচিত প্রশ্ন! না চেয়েই সে সেই সুরেই বললে “ওগাে আমার ব্যথা কেউ বুঝবে না গো-ঠাকুরও বুঝচেন না যে•••••* “কি বলল দিকি ?” মাথা তুলে চাইলে। পাগলের মত দৃষ্টি ।আবার আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলাে—“একি ক্ষান্ত নাকি ! তুই এখানে ?” "আমি বুঝতে পারছি না যে! সত্যি কি মেজদাদাবাবু এসেছ?” এই বলে আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আমার বিপদ, আমাকে বাঁচাও—আমি যে আর পারছি না গাে•••••• “ছাড়—কি হয়েছে বল দিকি ?” তার স্বামী মাধব আমাদের বাড়ি মালির কাজ কোরত, ক্ষান্ত-ঝির মতাে ছিল। তােমরা তাদের দেখেছ। সাত বছর পুর্বের কথা-“মার বড় অসুখ” বলে ক্ষান্তকে রেখে মাধব মাকে দেখতে দেশে যায়। বছর ফিরে গেল, চিঠি পত্ৰও দিলে না—ফিরলও না। ক্ষান্ত শেষ শ্রীক্ষেত্রের যাত্রীদের সঙ্গী পেয়ে চলে যায় । শুনলু-ফিরে এসে ক্ষান্ত দেখে মেদিনীপুর সহরে মাধব আবার বিয়ে করেছে।-নীচ জাতের মেয়ে, কিন্তু তিনবছর মেয়েইস্কুলে ইংরিজি পড়েছে—ছােট ছােট মেয়েদের পড়ায়-আট টাকা মাইনে পায়, তাতে তার

নমস্কারী
নিজের কাপড়-জামা জুতাের খরচই পােষায় না। মাধব তাকে চা করে দেয়,
রেধে খাওয়ায়। মুখনাড়া আর গালাগালি খেয়েই তার নিজের পেট ভরে।
পরিচয় দেয় মাধব তার ‘চাকর স্বামী নয়।
বললুম-“তাতে তাের কি ?”
ক্ষান্ত বললে-“সে যে আমার বিয়ে করা, ধৰ্ম্মসাক্ষী করা স্বামী গাে,
আমি যে তাকে ভালােবাসি গাে।” আবার সেই কান্না।
বললুম-“সে তাে তােকে ভালোবাসেনা”
-“তা নাই বা বাসলে—আমি তাে বাসি। তার খাবার কষ্ট, তার অযত্ন
আমি কি দেখতে পারি। তাকে যদি দেখে দাদাবাবু—চিনতে পারবে না,
খেয়ে খেয়ে আবার কঁাদে।
“তা তাের এসব দেখার দরকার কি, তার কাজের ফল সে ভােগ
করবে; করছেও-”
“আমি যে তার বিয়ে করা,সুখ দুঃখে আমরা যে এক”
“তা তাে আর নেই...”
“আছে দাদাবাবু আছে, ধর্মের কাছে আছে, মনের মাঝে আছে। পুরুষের
অমন ভুল হয়...”
নিজের কাছে হারছিলুম, তবু বললুম তাকে ছেড়ে দিকনা...”
“সে নাকি হবার উপায় নেই। বলে রেখেছে, সরকার তার সহায় আছে,
•••জেলে দেবে”•••আবার কান্না!
বললুম...*ওসব বাজে কথা••আপনিই উপায় হয়ে যাবে•••কাদিসনি, এ
বেশীদিন চলবে নারে•••আমার সময় কম—কাজে এসেছি, দু’এক জায়গায়
ঘুরে ফিরবে দিনকতক দেরি হবে।”
আবার পা জড়ায়•••“আমার একটা উপায় করে যাও দাদাবাবু, আর আমি
তার কষ্ট দেখতে পারছি ন•••সে বাঁচবে না...”
তাকে একটু আশ্বাস না দিয়ে নড়তেও পারি না। বললুম-“কোনো
কিছুই একেবারে মন্দ নয় ক্ষান্ত। মাধবের আকেল হবার জন্যেই ভগবান

নমস্কারী ১১০ ওটা ঘটিয়েছেন। তুই দেখিস—সে মেমসাহেব, ওর কাছে বেশীদিন থাকতে পারে না।” ক্ষান্তর মুখে একটু হাসি ফুটলো, বললাে, “তাই বলে। দাদাবাবু••ওর প্রাণটা বাঁচুক।” “আর তাের ?” “আমার কপালে যা আছে হবে,•••সে তাে ভালো থাকবে•••তা হলেই হােলাে।” “ঠিক বলছিস?” “হ্যা, ঠিক বলছি দাদাবাবু। তুমি ব্রাহ্মণ, আমার দেবতা। একটি কথা কেবল জান না। মেয়েমানুষের স্বামী না থাকলে তার কেউ থাকে না ; পিথিমী থাকে না। আছে এইটিইই তার বড় কথা বড় ঐশ্বৰ্য্যী। ভগবানকে কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু তিনি আছেন। তার নাম করে লােক বাঁচে আশায়ও থাকে। আমি ঠিক করে বলতে পারছি না দাদাবাবু আমার দেরী হয়ে যাচ্ছিল, কথা বাড়ালুম না; কেবল বললুম-তবে আর কি, তাের সব ঠিক হয়ে যাবে। যা বলবার ভগবানকে বলিস। এখন চললুম-ফেরবার পথে দেখে যাব।” তাকে কোনো প্রকারে আশ্বাস দিয়ে, বেরিয়ে পড়লুম। একদমজয়ন্তী- ক্ষেত্রে ! সে কি বিরাট ব্যবস্থা। যেখানে আহার করতেই হােললা,দরকারও হয়েছিল। ধূপ, , ধুনাে, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, বন্দেমাতরম, ছােট-বড় মেয়েদের নাচগান, পুরুষদের স্তবপাঠ, প্রবন্ধ-পাঠ, কবিতাবৃত্তি, বিরক্তি ধরিয়ে দিলে। তারপর প্রধানদের লম্বা লম্বা বক্তৃতা। মধ্যে মধ্যে মেয়েদের গান। প্রােগ্রাম ফুরােয় না। আপনা আপনিই মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল—শরৎবাবু ঠিক বলতেন- ‘থামতে শেখাটা বড় দরকার।' কয়েকজন আমার দিকে কঠিন কটাক্ষ করলেন। সাওতাল ভাবায় বােধ হয় সে তাল সামলালাে। শেষ হ'তে ১১১ নমস্কারী অনেক রাত হয়ে গেল। বড় ক্লান্ত ছিলুম, না খেয়েই শুয়ে পড়লুম। আধার কাল আছে। থাক্‌-আর নয়- ভােরে উঠেই গুরুদেবকে প্রণাম করে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লুম। ঝাড়- গ্রামে ‘বােধনার ব্যবস্থা ও শিক্ষাপদ্ধতি দেখবার আগ্রহ ছিল। দেখে খুব আনন্দও পেলুম, উপভােগ্য বলা চলে। মনে হলাে—বাংলার গ্রামে গ্রামে হলেই ভালাে হয়। তারপর তমলুক, ময়ুরভঞ্জ প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান ঘুরে ফিরতে প্রায় তিনমাস কেটে গেল। ক্ষান্তকে কথা দিয়ে এসেছি ফেরার পথে দেখে যাব। তার বেদনা, তার কথা, মধ্যে মধ্যে মনেও হয়েছে। সেই পথই ধরলুম। কোথায় থাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি তাে, সেই বটগাছ তলার কাছেই হবে। সেই ইংরিজি-পড়া মাষ্টার মেয়ের উল্লেখই কাজ দিলে। তিনখানি মেটে চালা। বাইরেও চাল-ঢাকা বসবার ব্যবস্থা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন,সদ্য নিকোনো। আগাছ। কোথাও মাথা তােলবার সুযােগ পায় ! হ্যা, শিক্ষায় রুচি একটু মার্জিত হয়ই। কিন্তু তুলসী-মঞ্চ ও তার সমাদর দেখে আশ্চর্য হলুম। সংস্কার একেবারে যায়নি তা হলে•• পটল ভাজার গন্ধ আসছিল। কি বলে কাকে ডাকি? মাধব নিশ্চয়ই রান্না ঘরে। স্ত্রীলােককে সম্মান দেওয়াই ভালাে, অভ্যাস-দোষে বেরিয়ে গেল-“মেমসাহেব ঘরে আছেন কি ?” দেখি, মাথার কাপড় টানতে টানতে খুন্তি হাতে ক্ষান্ত হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে আমাকে দেখেই ভুমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলে, মুখে একগাল হাসি। ঠোটে আঙল দিয়ে, নিম্ন কণ্ঠে বললে—“ও কথা আর বলবেন না দাদাবাবু, ‘এ’ লজ্জায় মরে আছে, বড় বাজবে-দেখা করতে পারবে না। আমার কান যে দেবতার গলা শােনবার জন্যে দিনরাত বাইরেই পড়ে থাকে। তুমিই তো দেবতা-তােমার সব কথা মিলে গেছে দাদাবাবু, বলছি, ভিতরে আসুন।” হাত ধুয়ে দাওয়ায় তাড়াতাড়ি একখানি নতুন মাদুর বিছিয়ে দিলে, বললে-“নতুন-কাকেও বসতে দিইনি।” মাধব ঘরের মধ্যে লুকিয়ে ছিল নমস্কারী ১১২ তাকে ইসারায় কি বললে সে চোরের মত এসে প্রণাম সেরে বেরিয়ে গেল। ক্ষান্ত কেবল বললে—“শিগগীর।” “ব্যাপার কি বল দিকি ?” “তুমি দেবতা যা বলেছিলে তাই। নােগার পতিটে নামিয়ে আসি।” নামিয়ে এলাে। যা বললে, সংক্ষেপে তা এই :—“তুমি চলে যাবার পাঁচদিন পরে ওর গায়ে মায়ের অনুগ্রহ হ’ল। দেখেই সে ইংরিজি-পড়া মেয়ে, নিজের যা কিছু ছিল নিয়ে এ বাড়ি ছাড়লে, আর এ মুখখা হ’ল না। বলেও রােগ ‘রূপ নষ্ট করে দেয়। আমি রুগীর সেবা করি, আর মা শীতল- তলায় হত্যে দি, কাদি। ভেতর-বার ভরে গিয়েছিল। জল গিলতে পারে না। মাকে বললুম-এর রােগ আমায় দাও, ও সেরে উঠুক। আমার যে আর হাত পা আসছে না মা। সাধ্যে যা দিয়েছিলে তা শেষ হয়েছে, আমি আর পারছি না, তােমার জিনিস তুমি নাও, যা ইচ্ছা করে। আমার কঁদিবার শক্তিও নেই, দাড়াবার বলও গেছে। ওকে তোমার পাদপদ্মে। দিলুম।' মেজেয় পড়ে যাই আর আমার জ্ঞান ছিল না। ভাের হয় হয় হবে, ‘খ্যান্তোখ্যান্তোকানে গেল, ধড়মড় করে উঠে পড়লুম। কোথা থেকে, কি করে বল পেলুম-জানি না। স্বপ্ন নয় তত ! ‘খ্যান্তো আমাকে একটু জল দে—ভাবিসনি। পাগলের মত ছুটে জল গড়িয়ে ঝিনুকে করে খাওয়ালুম। মাগো বলে কেঁদে উঠলুম। বললে—“কাদিসনি, অপরাধ হবে, চুপ কর। সতেরাে দিন ভােগের সে চেহারা দেখে তুমি ভয় পেতে; একলা কি করে যে ছিলুম জানি না। মাকে সঙ্গী করে কাটিয়েছি।” কঁদতে লাগলাে। “ভাবতুম তিনি তো রয়েছেন। তার পর সাত দিনে সব পরিষ্কার। কেবল দুর্বল, দাড়াতে পারে না। এখন সব পারে। বলে-“কি কোরে চলছে, কাজের খোজ করি, বললুম ‘তােমার টাকাতেই চলছে, তুমি পইচে দিয়েছিলে—ব্যস্ত হয়াে না, এখনাে চার পাঁচ টাকা আছে। মাষ্টার-বউয়ের খোঁজ করলুম। শুনলুম সে আর একজনের সঙ্গে পালিয়েছে,

১১৩
নমস্কারী
ঝাড়গায়ে কাজ পেয়েছে। বাইরে বাইরে ও সব শুনে থাকবে, মুখে অ্যানে
—আমিও বলি না। পাছে নজ্জা পায়।”
দেখি মাধব নতুন হুকোয় জল ফিরিয়ে নতুন কলকেয় তামাক সেজে এনে
দিলে। টেনে বাঁচলুম। দূরে দূরে সরে থাকে, ডেকে দু’একটা কথা কইলুম।
রসগােল্লাও খেলুম।
তারপর—দুধ, চিড়ে, চিনি আর রম্ভার লম্বা ফলার করিয়ে ক্ষান্ত মা-
শীতলার চরণামৃত আনতে গেল,তখনাে মুখে জল দেয়নি। আমি আড়
হয়ে গুড়ক চালালুম।
বেলা তিনটার পর আমার রওনা হবার সময়। ওদের আহারাদি শেষ
হবার পর, ক্ষান্তর সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে বললুম-“রাণাঘাট যাবি
বলেছিলি, প্রস্তুত হ”—
“ওমা আজই নাকি!”
“তুই যে বলেছিলি !”
“তখন,--••••তা তুমি আমার দেবতা, তুমিই তো সব দিলে তুমি
বললে••••••
“মন হচ্ছেন ভগবান, তাের মন কি বলে ?”
ঢোক গিলে বললে-“এখন থাক দাদাবাবু।” মুখে আঁচল দিয়ে হাসে।
“তবে একটি কথা-এত দয়া করলে, একটি আশীর্বাদ করে যাও—আমি যেন
ওর আগে যেতে পারি।”
“চাওয়াটা আন্তরিক হলে, আর তাতে কারো অনিষ্ট না হলে তিনি তা
দিয়ে থাকতে পারেন না। আবার তাও দেখেন—সে চাওয়ার মধ্যে তার
নিজের অনিষ্ট নেই তাে-মানুষ তাে অজ্ঞান।”
“অত কথা কি আমি বুঝতে পারি। আজি চাই, তাতে বলছি না, ওর
আগে যেন যেতে পারি এইটুকু।”
ব্ৰত সামান্য যখন—তা। তিনি শুনবেন, আন্তরিক হলেই শুনবেন।”
“বাস—তুমি বলেছ, আন্তরিক তাে আমার হাতে।”

নমস্কারী ১১৪ ১. ; বাঁচলুম। মাধবকে বললুম-“এই তাের লক্ষ্মী রইলাে।” ক্ষান্ত সরে গেল। “এই তাের লক্ষ্মী রইলাে খবরদার•••মনােকষ্ট দিলেই খােয়াবি ; ভাত- কাপড়ের কষ্টের কথাই বলছি না। মনে রাখবি।” মাধব “আমাকে ক্ষমা করে যান”, বলে ভূমিষ্ঠ হ'ল। সত্যি কথা বললেই ভগবান ক্ষমা করেন। ক্ষান্ত, আমি এখন চললুম।” ছুটে এসে সে প্রণাম করে—“আমার জন্যেই এসেছিলেন বলে কাঁদতে লাগলাে। ও যেন ভালাে থাকে? তার হাতে কিছু দিয়ে “পৈঁচে ছাড়িয়ে আনিস” বলতে বলতে দ্রুত বেরিয়ে পড়লুম। তার দু’টি কথা কেবল মনে হতে লাগলো “এখন থাক দাদাবাবু” বলে সলজ্জ হাসি আর শেষ কথা—“ও যেন ভালো থাকে।” মহামায়ার জাত ওদের চিনতে পারলুম না-নমস্কার করি থাক—আজ রাত হয়েছে। সতীনাথ মনে রাখিস-শ্রাদ্ধে নাচ কিন্তু চাই। আগেও ছিল-সহচরীর’ কীৰ্ত্তন। ওরা একটা বড় আইটেম্ বাদ দিয়ে ভুল করেছে, এত সত্বর ঢিলে দিলে কেন? সাঁতারটা দেখা হল না। বড় দরকারি জানিস্ তত—উপায় না পেয়ে বিদ্যেসাগর সারা রাত সাঁতরে দামােদর পার হয়েছিলেন—মায়ের কাছে) যাব’ বলেছিলেন বলে। তাের। যেন আমাকে ডােবাসনি বৈতরণী-পারের উপায় করে দিস। সহাতে বৈঠক ভঙ্গ হল । যেতে যেতে সরােজ বিমলকে বলে—“শুনলি তাে-ভালােবাসা, প্রেম প্রচুর রয়েছে•••••* বিমল বললে—“ধেSituation বড় weak, Strategic নয়। বাস, মােটর, সিনেমা কি পার্কের Scope না থাকলে আলােক- পাতের সুবিধে হয় না। না বারাণ্ডা, না পাের্টিকো, না পেলেটি না প্লেট চিড়ের ফলার !

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Namaskari

Author
Bandyopadhyay, Kedarnath
Title
Namaskari
File name
Namaskari
Text
OCR done
Citation
1944
Published
2009/08/17
Publisher
Gagendra Kumar Mitra, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
512978
Barcode
4990010020000.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
kpC1YPIhviR
Download PDF

Namaskari