Dipsikha Library, Howrah

Naba Joubaner Kunjabane

Ray,hemendrakumar · 2010/04/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

- * নব যৌবনের কুঞ্জবনে A . N . শ্ৰীহেমেন্দ্রকুমার রায় বিশ্বনাথ পাবলিশিং হাউস ৮, শ্যামাচরণ দে রীট কলিকাতা।

তুলসীচরণ তট্টাচাৰ্য্য ৮, শ্যামাচরণ যে এট, কলিকাতা। put; i;ARY Acc :১. J865 !.৭.৩০ মূল্য দুই টাকা প্রিন্টার-- মৃগেন্দ্রনাথ কোঙর উমার প্রেম ১২নং গৌরমােহন মুখার্জী ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

পঙন শর শিশুদের খেলাঘরে নয়, জরা-কাতর প্রাচীনের বিশ্রাম- শষ্যাতেও নয়, আজ নবযৌবনের কুঞ্জবনে করছি সকলকে আমন্ত্রণ। হৃদয়রক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে নবযৌবনের নামে, মানুষকে উন্মত্ত করে তােলে নবযৌবনের উদ্দামতা, বিশ্বের প্রাণে মাদকতা আনে নবযৌবনের নাম! জীবন তো জাগ্রত হয় যৌবনের আলিঙ্গনেই। নিখিল মানুষের মনের গতি চিরদিনই এগিয়ে গিয়েছে যৌবনের দিকে, তাই যুগে যুগে কবিরা গেয়েছেন যৌবনেরই প্রশস্তিগাথা, শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন যৌবনেরই বিচিত্র সৌন্দৰ্য্য ! যৌবনের বসন্ত জাগে প্রেমের স্পর্শে, তাই বিশ্বসাহিত্যের অধিকাংশ জুড়েই বিরাজ করেছে যৌবনপ্রিয় প্রেমের কাহিনী। সমালােচক যতই কুদ্ধ হােন যৌবনের প্রেমকে ত্যাগ করে পৃথিবীর সাহিত্য ও শিল্প কখনাে বাঁচতে পারবে না। কবি ও শিল্পী বাস করেন কল্পনাজগতে বটে, কিন্তু মানুষের প্রাণ এতই যৌবনলােভী ৰে, সেই অবাস্তবতার মধ্যে গিয়েও তার চিত্ত পায় বাস্তবতার খোরাক। কিন্তু আজ আমি এখানে এসে বসি নি কল্পনার ডালা সাজিয়ে। একটি প্রসিদ্ধ উক্তি আছে—“সত্য হচ্ছে কল্পনারও চেয়ে আশ্চৰ্য্য।” উক্তিটি যে কতখানি সত্য পাঠকরা তার পরিচয় পাবেন এই পুস্তকের পত্রে পত্রে। ভগবানের সত্যিকার সৃষ্টির মধ্যে গিয়ে শত কবির কল্পনাকেও হার মানতে হয়। কারণ কবিরা যে কাল্পনিক মানুষকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন, পৃথিবীর সত্যিকার মানুষ আত্মপ্রকাশ করে তার চেয়েও বিচিত্র কাপে, রণে, দুলে। এই পুস্তক থেকেই দৃষ্টান্ত দি। ধরুন, প্রাচীন যুগের ফ্রাই ও আধুনিক যুগের পলিন বােনাপার্টের কথা। কবি ও ঔপন্যাসিকরা অনেক ধ্যান-ধারণার পর যে কাল্পনিক আখ্যান-বস্তু গঠন করেন, এদের জীবন- কাহিনীর মধ্যে কি তার চেয়ে বেশী-কিছু পাওয়া যায় না? উপরন্তু কারণ [ ২ ] একালের কোন লেখক যদি ফ্রাই ও পলিনের মতন কোন চরিত্র চিত্রিত করেন, তাহলে সমালােচকরা কি তাকে অস্বাভাবিক বলে নিন্দা করতে উদ্যত হবেন না? আসল কথা হচ্ছে, পৃথিবীর ইতিহাসের কোথায় যে আরম্ভ হয়েছে সত্যের এবং কোথায় যে শেষ হয়েছে কল্পনার খেলা, এটা উপলব্ধি করা একেবারেই অসম্ভব। বরং আমি যদি বলি কল্পনাই হচ্ছে সত্য এবং সত্যই হচ্ছে কল্পনা, তাহলে কিছুই অন্যায় বলা হবে না। ভারতের মানুষ ছাড়া জীব নয়, এখানেও নিশ্চয় এই শ্রেণীর নানা কাহিনী সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু সে কাজ সহজসাধ্য নয়। পাশ্চাত্য দেশের শত শত লেখক এই ধরণের কাহিনীগুলিকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে যেমন আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, এদেশে তেমন আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায় না। তবু ভবিতে সে চেষ্টা করবারও ইচ্ছা আছে। যৌবনের এই শােভাযাত্রার মধ্যে স্পন্দিত হচ্ছে কত আলাে কত ছায়া, কত উদ্দাম প্রেম, কত বন্ত জীবন, কত দুর্বলতা, কত ভ্ৰম-প্রমাদ! মানুষ প্রাণপণে উপভােগ করতে চায় চঞ্চল যৌবনকে, হাসতে হাসতে এবং কাঁদতে কাঁদতে। দুরন্ত যৌবনজলতরঙ্গে গা ভাসিয়ে মানুষ কোনদিনই শােনেনি ঋষির বাণী, নীতির আদেশ। যতই বাধা দি, যতই নিন্দা করন, এইটেই হচ্ছে রক্তমাংসের সর্ব প্রধান ধর্ম। অশ্লীল বললেও এই পরম সত্যকে অস্বীকার করা চলবে না। কারণ যেখানে আছে সত্যের প্রকাশ, সাহিত্য-শিল্পীর কর্তব্য থাকে সেইখানেই ৷ স্বীকার করি সত্য অনেক স্থলে এমন কুৎসিত, মুখে যা উচ্চারণ করাও মহাপাপ। কিন্তু যে-সত্য নােংরা বা কুৎসিত নয়, শিল্পী সেখানেই পাবে সৌন্দর্য্যের সন্ধান। এর মধ্যে দুনীতি বা সুনীতির কোনই প্রশ্ন উঠতে পারে না। আমাদের সংগ্রহে আরাে অনেক জীবন্ত মানুষের কাহিনী আছে। কিন্তু উপস্থিত ক্ষেত্রে সব গল্প বলবার অবসর পেলুম না। এই বইখানি বলি পাঠকদের ভালো লাগে, তাহলে ভবিষ্যতে বাকি গল্পগুলিও বলবার চেষ্টা করব। হেমেন্দ্রকুমার রায় ''re.《མ– * মারী আঁতেলানে রাণীমারী আঁতােআনেৎ অs ফবাসীদের বাজা যােডশ লুই ও তার বাণী মাবি আঁতােআনেৎকে গিললাটিনে প্রাণ দিতে হত না। রাণী যদি নিজেব চুল-বাবার সখ একদিনের জন্যে কিঞ্চিৎ সংযত করতে পারতেন, তাহলে অপূর্ণ থেকে যেত গিলােটিনের রাজরক্তক্ষুধা। বড় বড় ইতিহাস বড় বড় কথা বলে, তাই এই ঘােট তথ্যটি তার অঙ্গে ঠাই পায় নি। বিদ্রোহী প্রজাবা যখন বাজা বাণীকে প্রাসাদের মধ্যে বন্দী করে বেখেছে, তখন তারা দেশ ছেড়ে পালাবার খুব বড় সুযােগই পেয়েছিলেন। তখন যদি ঠিক সময়ে তা পালাতে পারতেন, তাহলে পজাদের হন্ত কলুষিত হতে পারত না বাজবক্তে। পালাবার সব বন্দোবস্তও ঠিক হয়ে গেল। দেরি করবার এক মুহূর্তও সময় নেই। কিন্তু যাত্ৰা কৰাব পূৰ্বৰ্তে দেখা গেল, রাণীর Coffeur বা কেশ প্রসাধক তখনাে এসে হাজির হয় নি। (ফরাসী প্রত্যেক বিলাসিনী তখন নােটা মহিনায় পুরুষজাতীয় কেশ-প্রসাধক পুষতেন। আঁতােআনেৎ বেঁকে বসে বললেন, “বলকি। সে না এলে যাওয়া অসম্ভব। আমার মাথার চুল সাজিয়ে বেঁধে নেবে কে?

নব যৌবনের কুঞ্জবনে সকলে বললে, “রাণীজী, ঘড়ির কাঁটা ধরে প্রত্যেক ব্যবস্থা করা হয়েছে। দু-চার মিনিটের হের-ফেরে সব ওলট-পালট হয়ে যাবে । সুন্দরী রাণী অটল। প্রজা-বিদ্রোহের গুরুত্ব বুঝলে না লঘু নারীত্ব। কো-প্রসাধক যখন এল তখন শুভ-লগ্ন ৩। তবু রাজা-রাণী পালালেন, কিন্তু অসময়ে বেরিয়ে ধরা পড়লেন বিদ্রোহীদের হাতে। মাথার চুলের মান রাখতে গিয়ে আঁতােআনেৎ খালি নিজের গােটা মাথাটাই বলি দিলেন না, সঙ্গে সঙ্গে গেল স্ত্রৈণ রাজার মাথাও। খত নারী। দুই আমি যুবরাপের বিখ্যাত বহু বিলাসিনীর কাহিনী বলেছি। কিন্তু আঁতােআনেৎ ঠিক ও-শ্রেণীর বিলাসিনী ছিলেন না। আঁতােআনেৎ ছিলেন পরমা সুন্দরী রাণী। তাঁর রূপের খ্যাতি ফিরত য়ুরােপের দেশে দেশে, ললাকের মুখে মুখে। সাজ-পােষাকের দিকে তার ঝোক ছিল খুব, তেমন অসম্ভব দামী সাজ-পােষাক তখন বুরােপের আর কোন রাণীর ছিল না। কিন্তু সাজপােষাকের ভিতর দিয়ে আঁতােআনেৎ-এর কোন রুচিই প্রকাশ পেত না, সেগুলাে তিনি পরতেন অতি-অষকে, যার-পর-নাই এলােমেলাে ভাবে। ফুরােপের সবচেয়ে বিলাসী দেশের রাণীর হলে কি হয়, সুন্দরী তােমানেৎ দেহ-ধর্ম পালন করতেও ছিলেন নিতান্ত নারাজ। গানের ঘরে ঢুকতেন কালে-ভত্রে কদাচ। পাত পর্যন্ত মাজতেন না। তার মা, নার সঙ্গী এজতে পত্রে তাঁকে বহু ভৎসনা করতেন। কিন্তু সে সৰ কুৰি ফুৰুত না তার কাণে, রাণীমারি আঁতােআনেং কেবল আঁতােআনেৎ কেন, আঠারাে শতকের ফরাসী-সমাজই ছিল এজন্যে কুবিখ্যাত। তারও কিছুকাল আগেকার অবস্থা ছিল আরাে জঘন্য, আরাে ভয়ানক। রাজা চতুর্দশ লুই স্নান করতেন বছরে একবার মাত্র। তার গায়ের দুর্গন্ধে কাছে কেউ দাড়াতে পারত না। তখনকার ডাক্তাররাও ছিলেন অদ্ভুত! তারা বলতেন, “দেহকে বেশী মাজাঘষা করলে স্বাস্থ্যহানি হয।” অতএব প্রত্যহ সকালে মান ও শ্ৰীমতী শুকনাে তােয়ালে দিয়ে মুখ মুছেই করতেন স্বাস্থ্যরক্ষা। নিয়মিত দাত মাজারও কোন বালাই ছিল না। সুন্দরীর রূপে আকৃষ্ট হযে কাছে এলে মুখের ও গাযের গন্ধে ভুতও পৃষ্ঠভঙ্গ দিতে বাধ্য হত! তবে সুচতুবারা এসেন্স মেখে ভক্তদের কাছে কতকটা সহনীরা হ’তেন বটে। ঘেমে গায়ের ময়লার জন্যে মাথা ঘামাবার দরকার ছিল না, বঙচঙে রেশমী পােষাকের তলায় থাকত তা লুকানাে। মানের অভাবে দেহের যে মালি, তা দুর করত রুজ ও পাউডার। আঠারাে শতকের ফরাসী দেশে রুজ-পাউডার মাখার আর্ট উঠেছিল কেবল যৌবনকে তাজা রাখবার জন্যেই ও-দুটো জিনিষ ব্যবহৃত হ'ত না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে তখনকার ফরাসী-সমাজে বসন্ত-মহামারীর প্রাদুর্ভাব ছিল ভয়াবহ রূপে) এ রােগ গরীব-ধনী রাজা-প্রজা মানত না। ফরাসী দেশের রাজা ও আঁতােআনেৎ-এর শশুর পঞ্চদশ লুই পর্যন্ত মারা পড়েছিলেন বসন্তের আক্রমণে। উচ্চ- সমাজের অসংখ্য স্ত্রী-পুরুষের মুখ ছিল বসন্তের দ্বারা ক্ষতবিক্ষত । কাজেই রুজ পাউডারের পুরু প্রলেপ বিনা সে অপূর্ণতা ঢাকবার উপায় ছিল না। কিন্তু রাণী মারি আঁতেআনৎ-এর গায়ের ত্বক ও রং ছিল মনু ও অপুৰ্ব! নামজাদা চিত্রকররা প্রতিকৃতি আঁকতে বসে তার গায়ের রং ফোটাবার মত বর্ণ খুজে পেত না। চরমে।

নৰ যৌবনের কুবনে তিনি অন্যান্য ফরাসী বিলাসিনীদের মতন ফ্যাসানের দাসী ছিলেন । তখনকার ফ্যাসানের কড়া হুকুম ছিল, প্রত্যেক বড় ঘরের মেয়েকে এমন ভাবে আঁটসাট ‘কসেট পরতে হবে, কোমর যাতে দেখায় বােলতার মত সরু। আঁতােআনেৎ এ হুকুম মানেন নি। তিন কিন্তু আঁতােআনেৎ-এর সব চেয়ে সৌখীনতা প্রকাশ পেত কেশ- এসাধনে। তাঁর কেশ-প্রসাধকের মাহিনা ছিল আমাদের হাইকোর্টের জজের চেয়ে বেশী। চুল বাঁধতে যেত তার কয়েক ঘণ্টা। কেবল তিনি নন, তাঁর আশপাশের বিলাসিনীরাও সারাদিন চুল নিয়েই ব্যস্ত হয়ে থাকতেন। সে চুল বাধার কথা ভালাে করে খুলে না বললে বাংলাদেশের ‘আপ-টু-ডেট দেবীর দলও কিছুই আন্দাজ করতে করতে পারবেন না। তাঁদের চুল-বাঁধা ও কেশসজ্জা ‘ফাইন্ আর্ট রূপে গণ্য হতে পারে অনায়াসেই। তার জন্যে খরচও করতে হত হাজার হাজার টাকা এবং তার সৌন্দৰ্যও ছিল বিস্ময়জনক, অসাধারণ। মাথার উপরে সে যেন এক নূতন জগৎ! তাকে সম্পূর্ণ ও নিখুৎ করার জন্যে কেশ-প্রসাধককে স্থাপত্য, ভাস্ক ও চিত্রকলা সম্বন্ধেও আনসঞ্চয় করতে হত। একদিনের উৎসব সভায় দেখা গেল, আঁতােআনেৎ-এর মাথায় নাচছে তাজা গােলাপের উপর হীরা-পান্নামরকত প্রভৃতি দিয়ে গড়া রঙিন জড়ােয়ার পাখী। তারপরেই দেখা দিন এক রূপসী ডাচে তাঁর মাথার দিকে চেয়ে সবাই চমৎকৃত। শিল্পী কেশ-প্রসাধক তার মাথায় যে দৃশ্যের অবতারণা করেছে তার বর্ণনা এই রাণীমারি আঁতােআনে ; • অপূর্ব নিসর্গ-দৃশ্য! ঝা-বিক্ষুব্ধ সাগর; তীরের কাছে সন্তরণশীল হাঁসের দল ; জনৈক শিকারী বন্দুক তুলে গুলি করতে উদ্যত ডাঙার উপরে একটি Mill বা পেষণ-কলঘর ; তার অধিকারীর যুবতী স্ত্রী জনৈক পুরােহিতের সঙ্গে প্রেমলীলায় মত্ত ; এবং কাণের তলায় বিলম্বিত কেশরাজির উপরে দেখা যাচ্ছে, মিলের অধিকারী একটা গাধাকে তাড়না করতে করতে নিয়ে আসছে। সবাই মতপ্রকাশ করলে স্বামীকে লুকিয়ে কেমন করে পরকীয় প্রেমসাধনা করতে হয়, ফ্রান্সে ডাচেসের মতন আর কেউ তা জানে না। কেশকলায় ডাচেস তারই একটি প্রতীক দেখিয়েছেন। বলা বাহুল্য, কেশ-জগতের এমনি সব বহুমূল্য ও অপূর্ব সৃষ্টিকে সুন্দরীরা বহু সপ্তাহ ধরে ধ্বংস হতে দিতেন না। মাথার উপরে এরকম অনাসৃষ্টি নিয়ে তারা যে নড়তে চড়তে ভয় পেতেন এবং আরামে ঘুমাতেও পারতেন না, তাও অনায়াসে অনুমান করা যায়। উপরন্তু, কেশমার্জন বা মাথা দেওয়ারও উপায় থাকত না। তখনকার মেয়েরা মাথা ধুতেন বড়-জোর বছরে একবার। ফলে মাতার চুলের ভিতরে কিলি করত হাজার হাজার উকুন! আইন ছিল, প্রকাশ্য সমাজে কোন মহিলাই গা কি মাথা চুলকোতে পারবেন না! উকুনরা যখন কট কটু করে কামড়াতে, ফ্যাসানের মুখরক্ষার জন্যে রূপসীরা মুখ বুজে সেই নরক যন্ত্রণাও সহ্য করতেন! আর একবার বলা যাক, ধন্য নারী! চার ফরাসীদের বিশ্ববিখ্যাত প্রাসাদনগরী ভ্যাম্পায়, তার ঘরে ঘরে অতুলনীর সব শিল্প ও সাজসজ্জা, কেবল তারই বিনিময়ে রাজ্য কেনা যায়। এদেশে তেমন প্রাসাদ দেখলে লােক বলত আহষের নয়, বিশ্বকৰ্মায় গড়া। গত প্রথম মহাযুদ্ধে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐ প্রাসাদেই।

নব যৌবনের কুঞ্জবনে কিন্তু রাণী আঁতােআনেৎ-এর পরিচ্ছন্নতা ও যত্নের অভাবে সেখানকারও দুরবস্থা হয়েছিল অবর্ণণীয় এবং কল্পনাতীত আধুনিক রাজপথের আঁস্তাকুড়ও তেমন নক্কারজনক ও ভয়াবহ নয়! পৃথিবীর যতরকম নােরা জঞ্জাল তার সর্বত্র সর্বদা পুঞ্জীভূত হয়ে থাকত। রাজবাড়ীর শত শত ভৃত্য প্রভৃতি উঠানে ও সিড়ির চারিদিকে ব’সে অসঙ্কোচে মলমূত্র ত্যাগ করত। অতিথিরা সেখানে আসতেন যেতেন নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ও হাঁটুর উপরে পােক তুলে বিষম সাবধানে! রাজবাড়ীর ভিতরকার আবহ ছিল দুঃসহ দুর্গন্ধে বিষাক্ত! আঁতােআনেৎ এ সব দেখেও দেখতেন না, নিজের কেশ-প্রসাধন ও দামী দামী পােষাক আর গহনা কেনা নিয়েই তিনি ব্যতিব্যস্ত। ফরাসী রাজ পরিবারের নিজস্ব রত্নালঙ্কারের তুলনা তখন পৃথিবীর আর কোথাও ছিল না। কিন্তু সে-সবেও তার মন উঠত না, গহনা চাই পােষাক চাই নিত্য নূতন। পােষাকেই তিনি উড়িয়ে দিয়েছিলেন কোটি কোটি টাকা! হাতে টাকা না থাকলে ধার করে গহনা-পােষাক কিনতেও লজ্জিত হতেন না। এবং সেই ধার শােধবার জন্যে পারিবারিক বিখ্যাত মণি মুক্তা সস্তায় জলের দরে বেচে ফেলতেন। আঁতােআনেৎ-এর আর এক নেশা ছিল জুয়াখেলা। জুয়া খেলেও কত দিন তিনি লক্ষাধিক টাকা নষ্ট করেছিলেন এবং জুয়ার টেবিলেও তার যত টাকা উড়ে গিয়েছিল,কোন লােক তা পেলে কোটিপতি হতে পারত। রাজা হালকা আমােদমােদ ভালােবাসতেন না, রাজ-কাৰ্যেই নিযুক্ত হয়ে থাকতেন। রূপসী যুবতী রাণী আঁতােআনেৎ-এর তাই স্বামীসঙ্গ ভালাে লাগত না। রাজার এক ড-বখাটে ফুর্তিবাজ ভাইয়ের সঙ্গে সর্বদাই দেখা যেত দেশের রাণী আঁতােআনেৎকে যেখানে-সেখানে, হট্টমন্দিরেও। ফরাসী দেশে তখন অত্যন্ত কুবিখ্যাত ছিল যত সব ‘অপেরা- ৰলের নৈশ আসয়! বড় ঘরের কুলটা মেয়ে, তাদের উপপতি, যত আমার আলােআনেS দুশ্চরিত্র, দুরাত্মা ব্যক্তি, থিয়েটারের নট ও নিম্নশ্রেণীর গণিকার দল সেখানে অবাধে মিলে-মিশে ধরায় করত নরক সৃষ্টি! য়ুরােপের সব- চেয়ে সম্ভ্রান্ত রাণী মারি আঁতােআনেৎ সেখানেই গিয়ে নৃত্যলীলায় মেতে করতেন অফুরন্ত আনন্দের সন্ধান! লােকে বলত, নাচের সময়ে আঁতােআনেৎ-এর পা তালে পড়ত না! কিন্তু একে তিনি দেশের রাণী, তায় রূপসী নবযৌবনী। তাই যৌবনের দালালরা হাততালি দিয়ে তারিফ করে বলত, ‘নাচের সময়ে তালে পা পড়াই অন্যায়। ফরাসী-বিপ্লবের কোন কোন ঐতিহাসিক মারি আঁতােআনেৎ-এর পক্ষসমর্থন করেছেন। কিন্তু প্রজাদের পক্ষ নিয়েও বলবার কথা আছে অনেক। প তারপর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় সেই দিন। লক্ষ লক্ষজার অভিশাপ কুড়ােতে কুড়োতে রাজপথ দিয়ে চলেছেন মৃত্যুশকটে চড়ে দেশের রাণী বন্দিনী মারি আঁতােআনেৎ! সেদিন তিনি কেশ-প্রসাধকের জন্যে অপেক্ষা করেন নি, করবার দরকার ছিল না। কারণ কারাগারে যাবার পর কয়েক দিনের মধ্যেই আতঙ্কে ও দুর্ভাবনায় বিপথগামিনী অভাগিনীর মাথার সব কালাে চুল হয়ে গিয়েছিল ধবধবে সাদা? খাটো চুল, কারণ নিজের হাতেই তিনি কাঁচি দিয়ে চুল কেটে ফেলেছিলেন, ঘাড়ে গিলােটিনের খাড়া পড়বার সুবিধা হবে বলে ! অদৃশ্য তাঁর জড়োয়ার গহনা, অদৃশ্য তার অমূল্য পােষাক-পরিচ্ছদ! সাদা পােবাকের তলায় কালাে রঙের জীর্ণ ‘পেটি কোট, তার উপরে সাদা মসলিনের একখানি শাল! হাতদুখানি দড়ী দিয়ে পিছুমােড়া করে নৰ যৌবনের কুবনে বাঁধা! দেহের যৌবন ভয়ে পলাতক। শ্রান্ত মুখ মড়ার মতন সাদা- কিন্তু রাজী-মহিমায় প্রশান্ত। মৃত্যুর পূর্ব-শুহূর্তেও মারি আঁতােআনেৎ এতটুকু কাতরতা প্রকাশ করেন নি। তখন তিনি আর ক্ষুদ্র সাধারণ নারী নন, মৃতুজষী মৌনবাক মহিমময়ী মহারাণী ! শেষদিনেই আত্মপ্রকাশ করেছিল ভঁর অসাধারণ নারীত্ব! মাদাম দু’বারী একখানা ইংরেজী ছবির কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দেখি, চলচ্চিত্রে মাদাম দু’বারী আবার রূপ ধরেছেন। মাঝে মাঝে সিনেমায় ৰাই বটে । এবং অধিকাংশ সময়ে বাধ্য হয়েই), কিন্তু সেখানে আমার সঙ্গে এখনাে মাদামের দেখা হয়নি। সুতরাং ছবির জগতে তিনি কতখানি গােলমাল করতে পেরেছেন আমার তা জানা নেই। কিন্তু আঠারে শতাব্দীর ফরাসী দেশে আরাে কয়েকজন লােকের সঙ্গে দ্যু’বারী এমন বিষম গণ্ডগােল তুলেছিলেন যে, তখনকার য়ুরােপের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজ- সিংহাসনের ভিত্তি হয়ে গিয়েছিল শিথিল। ঐ দ্যু’বামীর সঙ্গে কেবল ফরাসী সাম্রাজ্য, ফরাসী সম্রাট ও ফরাসী বিপ্ন নয়, জনৈক বাঙালী যুবকের নাম ও অভিন্নসূত্রে গাঁথা আছে, এ কথা হয়তাে সবাই জানেন না। আঠারাে শতাব্দীর ফরাসী বিপ্লবের রক্তপ্লাবিত নাট্যশালায় এক বাঙালীর ছেলেও যে অভিনেতা রূপে অবতীর্ণ হয়েছিল, একথাও অনেকে হয়তাে বিশ্বাস করতেই পারবেন না। কিন্তু এটা সত্য কথা। তাই দু’বারীর নাম শুনলেই ঐ বাঙালী ছেলেটির কথা আমার মনে হয়। জানিনা, “ৰায়ী” চিত্রে তাকে কোন মুর্তিতে দেখানাে হয়েছে (7 মাধ্যম দ্যু’বারী এম. খােসা কি না। কিন্তু কোন-না-কোন মূর্তিতে তাকে না দেখালে চলবেই না, কারণ দ্যু’বারীর সঙ্গে সে থাকত ছায়ার মত, সৰ্ব্বদাই। ঐ বাঙালীর ছেলেটির কথা বলতে গেলে দু’বারীর কথাও কিছু কিছু বলতে হয়। কারণ সে দ্যু’বারীর সঙ্গে সঙ্গে ছিল বলেই সকলে তাকে চেনে। পৃথিবীর বিখ্যাত পটুয়ারা দু’বারী যে-সব প্রসিদ্ধ তৈলচিত্র একেছেন তার ভিতরেও দেখি দ্যু’বারীর সঙ্গে ঐ বাংলার ছেলে অমর হয়ে আছে। Jeane প্রথমে ছিল দাসী, তারপরে কাজ নেয় দরজীর দোকানে। তখন থেকেই তার অপরূপ রূপগৌরবে ও যৌবনপুষ্পসৌরভে আক হয়ে আসত বহু মধুকর, কিন্তু দুদিন পরেই অকূলে ভেসে যেত তার প্রবল যৌবনপ্রবাহে। সমাগত মধুকরদের চেয়েও তার মন ছিল বেশী চঞ্চল। তারপর এই রূপসীর দিকে দৃষ্টি পড়ল দ্যু’বারী নামে এক লম্পট সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির। তাঁর উপপত্নী রূপে সে রাজ্যের যত আমীর ও ওমরাওর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেললে। ক্রমে রাজা পঞ্চদশ লুই তাকে দেখলেন এবং দেখেই হৃদয় হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু সাধারণ গণিকাকে রাজবাড়ীতে এনে রাখলে আদব-কায়দা সহ করে না, অতএব রাজার হুকুমে ও বখসিসের মােহে কাউন্ট দ্যু’বারী Jeaneকে লােক-দেখানাে বিয়ে করে কুলীন সমাজে জাতে তুলে রাজার হাতে সমর্পণ করে নিজে সরে দাড়ালেন। সেইদিন থেকে তার নাম হ’ল দু’বারী। রাজার উপপত্নী হয়েও দু’বারী তার আগেকার প্রেমাস্পদ বন্ধুদের ভুললে না, রাজবাড়ীতে তারা অবাধেই আনাগােনা করতে লাগল। দ্যু’বারীর শক্ররা তার বিরুদ্ধে রাজার কাণে বিষম সব অপরাধের কথা তুললে। রাজা কিন্তু হেসে বললেন, “দ্যু’বারী হচ্ছে অসীম সুন্দরী ; তাকে দেখে আমি আনন্দ পাই, আমার পক্ষে সেইটুকুই যথেষ্ট।” মােট কথা, বুড়ো রাজা একেবারেই এই যুবতীর গােলাম হয়ে পড়লেন।

শৰ যােবনের কুঞ্জবনে ভূপ। তার একটি দু’বারীর পাযের তলায় সমস্ত ফরাসী সাম্রাজ্যের ঐশ্বৰ্য্য এনে ছডিযে দেওয়া হল। তার প্রাসাদের চারিদিকে মণিমাণিক্যের চোখ ধাঁধানাে বাহার। সে ব্যবহার করে কেবল সােনার তৈজসপত্তর। কেবল তার ড্রেসিং টেবিলের সাজসজ্জাব জন্যেই আসে ন্য মণ সুবর্ণের ভঙ্গুর কফির পিলার দাম হাজাব হাজার টাকা। জামা-কাপড়ের জতে সে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। দ্যু’বারীর মুখের একটি কথাষ বড বড মন্ত্রীর চাকরি যায়। রাজার চেযেও তার শক্তি বেশী, কারণ তাকে খুশি করতে না পারলে কেউ রাঙ্গা গ্রহ লাভ করতে পারেনা। সে সমষে ফ্রান্সের বিলাসিনী ধনীর ঘরণীরা প্রত্যেকেই এক-একজন কাফ্রী চাকর পুষতেন—এখনকার বিলাসিনীরা যেমন লােমশ কুকুর পােষেন। মাদাম দ্যু’বারীও একজন বালক ক্রীতদাস রাখলেন। তখনকার ফিরিঙ্গী বােম্বেটে ও দাস-ব্যবসায়ীরা সাধারণত আফ্রিকা থেকেই এই সৰ ক্রীতদাসকে জোর করে অর্থাৎ চুরি করে ধরে আনত। এইজন্যে তখনকার অধিকাংশ ফরাসী লেখকই দ্যু’বারীর ক্রীতদাসকে কাফ্রী বলেই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তারপবে প্রকাশ পেযেছে, দ্যু’বারীব এই ক্রীতদাসের গায়ের রং কালাে হলেও সে মােটেই কাফ্রী নয, ফিরিঙ্গী বােম্বেটো ছেলেবসেই তাকে সুদূর বাংলাদেশ থেকে চুরি করে এনেছিল। ঐ কালাে ছেলেটির নাম আজ আর কেউ জানেনা। হয়তাে সবুজ বাংলাদেশে তার বাপ-মা তকে ‘কেলাে’ বা ‘ভুলাে’ বা ‘কানাই বা নিতাই’ বলে ডাকত, কিন্তু সেফরাসীদেশে নির্বাসিত হবার পর Prince de Conti তার নূতন নাম রাখলেন-“জামাের”! কানাই বা নিতাই আমাের হ’ল বটে, কিন্তু বাংলাকে যে ভুলে গেএমন অনুমান করবার কারণ আছে।

মাদান হ Yাম। জামােয়কে দ্যু’বারী এত ভালােবাসে যে একদণ্ড চোখের আড়াল করতে পারেনা। রাজা যখন দ্যু’বারীর সঙ্গে প্রেমালাপ করেন, তখন সেখানে রাজ্যের কোন প্রধান ব্যক্তিও আসতে পারতেন না, কিন্তু জামাের তখনাে দ্যু’বারী বা রাজার পায়ের কাছে বসে খেলা করত। পশুপক্ষীকে যেমন আমরা গ্রাহ করিনা, শ্বেতাঙ্গরাও নিগ্রোকে তেমনি মানুষ বলে গণ্য করেনা। নেপােলিয়ান বােনাপার্টের ছােট বােন সুন্দরী পলিনের উলঙ্গ দেহ একজন নিগ্রো ক্রীতদাস কোলে করে উচু মানের চৌবাচ্ছায় ঢুকিয়ে দিত । তাইতে পলিনের নামে কুৎসা রটনা হওয়ায় সে বিস্মিত হয়ে বলেছিল,“নিগ্রো কি আবার পুরুষ মানুষ ।” খুব সম্ভব জামােরকেও মানুষ বলে ধরা হতনা। কিন্তু সে বাঙালীর ছেলে, শত আদর-যত্ন পেয়েও তার মনুষ্যত্ব সম্বন্ধে দ্যু’বারীর এই নিব্বিকার ভাব দেখে সে যে মনে মনে দারুণ অপমানবােধ করত পরে সে প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। যার কৃপকটাক্ষ লাভ করার জন্যে ফরাসী দেশের সমস্ত আমীর- ওমরাওরা উন্মুখ হয়ে আছেন, জামাের সেই অদ্বিতীরা দু’বারীর আদরের দুলাল। রাজ প্রাসাদে তার অবাধ গতি, বড় বড় আমীর-ওমরাওরা পর্যন্ত ভয়ে তাকে খুশি রাখবার চেষ্টা করতেন। খাটি সােনার কাজ-করা রঙিন পােষাক পরে জামাের ঘরে ঘরে হেলে দুলে নেচে খেলে বেড়ায়। সুপ্রসিদ্ধ ফরাসী লেখক Goncourt লিখেছেন : "There was even a black servant, who was regarderi as a sort of huirán monstrosity, and handed round the dishes and refreshments, carried parasols, and turned somersaults-one of those little monsters so beloved by the exotic taste of the eighteenth century, which নব যৌবনের কুঞ্জবনে regarde:l the negro, so to speak, as a little two legged animal." জামােরকে মনে করা হত বিকৃতদর্শন, মনুষ্যত্বের নমুনা দু-পেয়ে জন্তুর মত। বাংলার ছেলে জামাের যে শ্বেতাঙ্গদের এই মনের ভাৰ বুঝে এত আদর-যত্নেরও সৌভাগ্যের মধ্যেই মরণাধিক যন্ত্রণা বােধ করত এবং সমস্ত ঐশ্বৰ্য্যই তার সর্বাঙ্গে বিধ কাটার মত, এটুকু কল্পনা করাও কঠিন নয়। রাজার ছিল অনেক প্রাসাদ এবং প্রত্যেক প্রাসাদেই সর্বময় কর্তারূপে থাকতেন একজন করে গভর্ণর। এই গভর্ণরের উচ্চপদে সন্ত্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ নিযুক্ত হতেন না। দু’বারী একদিন আবদার করে রাজাকে বললে, “Luciennes প্রাসাদে আমার জামােরকে গভর্ণর করে দিতে হবে।” রাজা সবিস্ময়ে বললেন, “বল কি প্রিয়তমে! দেশের লােক কি ভাববে? অন্যান্য সন্ত্রান্ত গভর্ণবেরা কি ভাববেন?” দ্যু’বারী বললে, “আমি তাদের ভাবনার ধার ধারিনা। আমি অন্যান্য গভর্ণরদের দেখাতে চাই, আমার চোখে তারা জামােরের চেয়ে বড় নয়।” দু’বারীকে অদেয় রাজার কিছুই নেই, রাজা বললেন--“তথা। সেইদিন থেকে জামাের হ’ল রাজা পঞ্চদশ লুইর পল্লীপ্রাসাদের গভর্ণর, তার মাসমাহিলা প্রায় চারশাে টাকা । সে যুগে চারশাে টাকার দাম ছিল এখনকার চেয়ে অনেকগুণ বেণী। কিন্তু এই অযাচিত অনুগ্রহের গুঢ় কারণ কি বাঙালীর ছেলে জামােরের কাছে অজ্ঞাত ছিল? সে কি বুঝতে পারেনি যে, এ অনুগ্রহ হচ্ছে নিগ্রহের ও এ গান হচ্ছে অসখানে নামান্তর। যে হচ্ছে - গণিকার কাছে পােষ কুকুর-বিড়ালের মতই আয়ের জন্য, তাকে উচ্চ- না ) I পদে বসিয়ে দু’বারী তার মনুষ্যত্বের ও ঘােগ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখালে না, রাজ্যের উচ্চপদস্থ সন্ত্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি অবতা প্রকাশ করবার জন্যেই তার ঘৃণ্য নগণ্যতাকে ব্যবহার করা হল। সেদিন তার কালাে চামড়ার তলায় মানুষের প্রাণ যে বদ্ধ আক্রোশে কতটা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল এবং প্রতিহিংসা গ্রহণের জন্যে, মনে মনে সে যে কী প্রতিজ্ঞা করেছিল, মনুষ- চরিত্রে যারা অভিজ্ঞ তারাই ত উপলব্ধি করতে পারবেন। কিন্তু জামােরের মুখ দেখে সেদিন কিছুই বােকা যায়নি! Goncourt কেবল ঈঙ্গিত করেছেন, “পল্লীপ্রাসাদ হ’ল জামােরের কাছে বনের পাখীর সােনার খাঁচার মত।” জামাের হচ্ছে সুদূর বাংলার শ্যামল বনভূমির দুলাল, সেখান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যারা শীতার্ত ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদে বন্দী করে রেখেছে, শত অনুগ্রহেও তাদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ হতে পারেনা। জামাের প্রতিহিংসার দিন গুণতে লাগল। পট পরিবর্তন হ’ল। লম্পট পঞ্চদশ লুই পরলােকে গেলেন। নূতন রাজা নূতন রাণী দু’বারীকে এক মঠে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তখনাে সে যুবতী এবং হাতে তার বিপুল বিত্ত। মঠ তার ভালাে লাগবে কেন, মঠ ছেড়ে বেরিয়ে এসে আবার সে বিলাসের স্রোতে ফুলের মালার মত লেসে চলল। এ সময়েও জামাের তার পােষা ছিল কিনা আমাদের জানা নেই। হ্যত রাজার মৃত্যুর পরেই জামাের সােনার খাঁচা থেকে অদৃশ্য হয়েছিল। পরে পরে কয়েক বৎসর কেটে গেল -ফরাসীদেশে বিপ্লবের বিজয়- ভেরী বেজে উঠল। রক্তের সাগরে ডুবে গেল রাজ-রাণীর মুকুটপর মাথা! এতদিন ধরে যারা গরীব প্রজাদের রক্তশােষণ করে তাদেরই জীবন্মত দেহের উপরে গড়িয়ে পৈশাচিক নৃত্য করে এসেছে, আজ নব যৌবনের কুঞ্জবনে তাদের জবাবদিহি করবার জন্যে ডাক পড়ল। ফরাসীরা দু’বারীকেও ভুললেনা, গরিবদের কষ্টার্জিত অর্থ আজও তার বিলাসের উপকরণ জোগাচ্ছে, তার আবদারে রাজা অনেক অবিচার অনেক অত্যাচার করেছেন। বন্দিনী দ্যু’বারী বিচারালয়ে গিয়ে সবিস্ময়ে ও সভয়ে দেখলে, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসেছে জামাের।••••• স্বদেশ-হারা জমাের, সােনার খাঁচায় বন্দী মানুষ জামাের, খেলার পুতুল, “দুপেয়ে জন্তু” জামাের। কিন্তু সেদিন তার পায়ে আর সােনার শিকল ছিলনা, সেদিন তার চক্ষে ছিল বাংলার জাগ্রত, অপমানিত, আহত মনুষত্ব! সে একে একে হ’বারীর সমস্ত কুকীৰ্ত্তি প্রকাশ করে দিলে। শেষ-অঙ্কের যবনিকা পড়বার আগে উঠল। রাজপথ দিয়ে চলেছে মৃত্যু-শকট, তার উপরে বিগতযৌবনা দ্যু’বারী-তার তীব্র ও তী আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠছে বিপুল জনতার ঘন ঘন অভিশাপ- বাণী ! সে উচ্চবংশীয়া বীর নারীর মত সগর্বে মরতে পারলে না, চীৎকার করে বললে, “জীবন, জীবন! আমার জীবন ফিরিয়ে দিলে আমার যথাসৰ্বৰ তােমাদের দান করব?” জনতার ভিতর থেকে কে নিষ্ঠুর ভাষায় জবাব দিলে, “তােমার যথাসর্বস্ব তত আমাদেরই নিজস্ব সম্পত্তি। সাংঘাতিক গিলােটিন তাকে গ্রহণ করবার জন্যে প্রস্তুত। জল্লাদ যত তাকে গিলােটিনের দিকে টেনে নিয়ে যায়, দু’বারী ভয়ে পাগল হয়ে ততই তাদের হাত ছাড়িয়ে—পালিয়ে আসতে চায়! যখন জোর করে তার গলা হাঁড়ি কাঠে ঢুকিয়ে দেওয়া হ’লতখন সে হাপুস চোখে কাঁদতে কাঁদতে চীৎকার করছে, “বাঁচাও, বাঁচাও! দয়া কর।” কিত কে সাহায্য করলে না, কেউ দয়া করলে না গিলােটিনের খঙ্গ নেমে এসে বিপথচারিণী হতভাগিনীর কণ্ঠ নীরব করে দিলে। যবনিকা পড়বার সময়ে জামাের কোথায় ছিল? যবনিকা পড়বার পর মাের কোথায় গেল? পায়ে সােনার শিকল পরে বাঙালী জামাের

No text on this page.

40 24h ইজাভােরা ডানকান ফরাসী চিত্রকলায় ও সাহিত্যে অমর হয়ে আছে, কিন্তু পায়ের শিকল খুলে সে কোথায় অদৃশ্য হ’লসে কথা নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামায় নি। ইজারাে ডানকান আধুনিক পৃথিবীতে গ্রীক নৃত্যকলা আবার যিনি ফিরিয়ে এনেছেন, এবারে সেই ইজাডােরা ডানকানের কথা হবে। ইজাডাের আত্মচরিত কিছুকাল আগে পৃথিবীর শিল্পী-সমাজে আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিল এবং তার মধ্যে তিনি নিজের কথা যতটা পারেন বেশ স্পষ্ট করেই বলবার, চেষ্টা করেছেন। তা পাঠ করে তার জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পী মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়েছেন, অনেক সাধারণ লােক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এরং অনেক নীতিবাগীশ লজ্জায় ঘৃণায় শিউরে উঠেছেন। তাঁর সম্বন্ধে আরাে নানা শ্রেণীর লােক এত কথা লিখেছেন যে, সে গুলিকে একত্র করলে বৃহৎ একটি সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে। কবি, লেখক, চিত্রকর, গায়ক ও অভিনেতা যিনিই তাকে দেখেছেন, তিনিই বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট হয়েছেন এবং এর দ্বারাই প্রমাণিত হয়, ইজাড়ােনার ব্যক্তিত্বের মহিমা ছিল কতখানি। তার শেষ-জীক সম্বন্ধে বিখ্যাত লেখক এবং সাংবাদিক জর্জ সেসে যে সুন্দর আলােচনা করে আম এখানে তারই কতকাংশ প্রকাশ করলুম। প্রথম যখন ইজাডােরা কাকে দেখি, তখন আমি শিশু। তখন থিয়েটারের সবকিছুই আমাকে বিস্মিত করত। সেদিন আমার তরুণ চোখের সামনে এসে দাড়িয়ে ছিলেন ইজাড়াের, প্রাচীন গ্রীসের দে ডায়না, ও ' ভেনাসের মত। সেই দিনই আমি এই আশ্চর্য মেয়েটির নৰ যৌবনের কূবনে প্রেমে পড়ে গেলুম। তার বহুদিন পরে দেখলুম ইজাভােয়াকে। বালিনের একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর হােটেলের একটি সস্তা ধরে তিনি তখন আশ্রয় নিয়েছেন, কিন্তু সেখান থেকে পালাবার উপায় তার নেই, কারণ পাওনা মিটিয়ে না দিলে হােটেলওয়ালা তাকে ছাড়বে না! সেদিন তার সৃষ্টি ক্ষীণ, দেহ মােটা, কথাবার্তা সুরা এলােমলাে ! এ পরিবর্তন আমাকে ব্যথা দিলে। আমি খবরের কাগজের রিপাের্টার রূপে গিয়ে ছিলুম। ইজাভােরা বললেন, আপনাদের কাগজ যে মেয়ে রিপাের্টার পাঠায় নি, এজন্যে খুশি হয়েছি। নারীরা অন্য নারীর উপরে নিষ্ঠুর হয় ; আর তাদের বিশ্বাস করা যায় না।•••••••••া, ভালাে কথা। আমাকে কিছু মদ আনিয়ে দিতে পারেন? ঘন্টা বাজিয়ে হােটেলের চাকরকে ডাকলুম। তার রকম-সকম দেখে বেশ বােঝা গেল, অনেকদিন বখসিস পায় নি বলে ইজা- ডােমার উপরে সে মােটেই খুসি নয়। ইজাভােরাকে জিজ্ঞাসা করলুম, কি আনাব? ওয়াইন, বিয়ার - ককটেল ? জাইেডারা বললেন, এক বােল জিন।” চাকর আমাকে জিক্স করলে, “দাম আপনি দেবেন তাে ?” -হ্যা। মদ এল। একেবারে বাস মদ ঢেলে নিয়ে সমস্তটা পান করে যখানে প্রথমেই বললেন, এমন কোন আঃ নেই যাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয় না।” তারপর একরাশ প্রেমপত্র দেখিয়ে বললেন, “দুনিয়ার এখন আমার নিজের বলতে আছে খালি ঐ প্রেমপত্রগুলি। কিন্তু এগুলােও বােধহয় আমাকে বেছে ফেলতে হবে! ••••••আমায় কে পত্রের সংখ্যা প্রায় ইজাড়ােরা ডানকান বারো হাজার। কিন্তু আজ আমার কোন বস্তু নেই। আগে আমার বাড়ীর দরজা সকলের জন্যে খােলা থাকত। আমার ঘরে বন্ধু আর ভক্ত ধরত না—অন্তত তাদের মুখে শুনতুম তারা আমার বা আমার ভক্ত। তারা আমার জয়গান করত; আমার পয়সায় মদ আর খাবার খেত। তাদের জন্যেই আমার সব টাকা উড়ে গেছে, কারণ আমি টাকার দাম জানতুম না। কিন্তু আজ আমাকে সাহায্য করবার কেউ নেই। আজ আমি গরিব। তাই আমি স্থির করেছি এই সব বিখ্যাত লােকের লেখা প্রেমপত্র বিক্রী করব। এগুলাে প্রকাশিত হলে অনেক নামজাদা লােকের খ্যাতি কাহিল হয়ে পড়বে। অবশ্য, তাদের মধ্যে যারা প্রতিভাবান, তাদের কোনই ক্ষতি হবে না। যেমন গর্জন গে, তার প্রেমপত্র বেরুলে তিনি গ্রাহই করবেন না। কিন্তু সবাই তো আর গর্জন ক্রেগ নয় !••••••••••••আপনি প্রেমপত্রগুলো দেখবেন? ইতালির কবি দারুনসিয়ে এবং বিলাতের শিল্পী ও সাহিত্যিক গর্ডন ক্রেগের প্রেমপত্র দেখলুম। গর্ভন ক্লেগের লেখা প্রেমপত্রগুলাে আর্টের নিদর্শন। ছবি আর কথা একসঙ্গে! আরাে অনেকের পত্র দেলুম - শিল্পী, কেউ কবি, কেউ ব্যবসায়ী। প্রত্যেকেই আবেগে উচ্ছসিত। এবং প্রত্যেকেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ইজাভােরাকে কেবল এই কথাই জানাতে চেয়েছেন যে, “প্রথম দিন তােমাকে যেমন সুন্দর ও অমূল্য নিখিজমতন দেখেছিলুম, আজও তােমাকে তেমনই দেখছি! পৃথিবীর মধ্যে তুমিই হই একমাত্র নারী, যাকে ভোগ করেও কামনার ক্ষুধা কমে না। আবার মদ্য পান করে ইজাভােরা বললেন “যে কেতাবে চিঠিগুলো বেরুবে তার কি নাম দেব জানেন—“প্রেম বলতে বিভিন্ন ব্যক্তি কিবােৰে? কবির প্রেম, নাট্যকারের প্রেম, ব্যাকওয়ালার প্রেম, গরিবের প্রেম, অলস এনীর প্রেম! এক এক পরিচ্ছেদে এক শ্রেণীর প্রেমপত্র থাকবে।

নৰ বৌবনের কুঞ্জবনে আমি ঐ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি কিনতে চাইলুম। ইজাভাের লিখতে রাজি হয়ে বললেন, “কিন্তু কি করে আমি লিখব? আগে আমাকে খাবার দাও, মদ দাও। একজন সেক্রেটারি চাই—আমি বলব, সে লিখবে! আর আমি কাজ শুরু করব দুপুর রাতে! জীবন শুরু হয় দুপুর রাতেই। বাস্থ্যকর দিনের আলাে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর নিদ্রার জন্যে। ইডােরা আমার জন্য বই লিখতে আরম্ভ করলেন। তার সেক্রেটারি রণে একটি ইংরেজ মেয়েকে পাঠালুম। কিন্তু পরদিনেই সে এসে জানালে, “মতি জানানো নীতি আমি পছন্দ করি না। যে নাৰী জিন্ মদ খায়, তার কাজ করতে আমি রাজি নই।”-নূতন লােক পাঠালুম। ইজাভাের গৌরচন্দ্রিকা লিখে ফেললেন,কিন্তু তারপরই লেখা বন্ধ হল! হপ্তাখানেক পরে হােটেলে গিয়ে দেখি, ভারি ধুম-ধাড়াক্কা! নুতন ট্রায় এসেছে, দাসীরা জিনিসপত্র গুছোচ্ছে, ইলাভেরা হাসিমুখে তৰধান করছেন! ব্যাপার কি? ইহাভােরা বললেন, “আমি বায়ু পরিবর্তনে যাচ্ছি। আমি শরীর ভালো করতে চাই। আমি ম খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমি আবার কোন থিয়েটারে নাচ দেখা। আপনি দেখতে আসবেন। -“কিন্তু আপনার বই লেখার কি হল? -“ও, চুলােয় যা বই। আমার স্মৃতিকথা এখন প্রকাশ কর কেন? আপনি আমাকে কি ভেবেছেন? বুড়ী? মৃত? যারা জ্যায়ে মরা, স্মৃতি কথা বের করে তারাই। আমি যখন জ্যান্তে মরা হব, আমার স্মৃতিকথা লেখবার প্রচুর সময় পাব। এখন আবার সুদিন এসেছে- আবার আমি জীবন শুরু করব।••••••আমি ভিতরে ভিতরে খোঁজ নিয়ে আনলুম, ইজাজােৱা তার প্রেমপত্র প্রকাশ করবেন শুনেই কোন ইজারাে ডানকান ব্যক্তির টনক নড়েছে এবং তিনিই আবার তাকে কাজ জোগাড় করে দিয়েছেন। একদিন ইজাােেরার নাচ দেখতে গেলুম।••••••ইজভােৱা মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন প্রাচীন গ্রীক নারীদের ঢলঢলে পােষাক পরে। এ পােষাক তন্বী যুবতীর দেহে চমৎকার দেখায়, কিন্তু ইজাড়ােনার প্রকাণ্ড নত স্তন, কীত ভুড়ি ও বিপুল নিতম্বের পক্ষে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। একদিন তার সুন্দর বাহুর ভাবভিব্যক্তি চোখ দিত জুড়িয়ে, কিন্তু আজ তা স্থূল এবং আঁচিলে ও তিলে দাগী। তার মুখের মাংসও ঝুলে পড়েছে।•••••• তারপর নাচের বাজনা বাজল, নাচ শুরু হল। সঙ্গে সঙ্গে ইজাজােয়ার কী পরিবর্তন! রঙ্গমঞ্চের উপর আর সেই লাবণাহীনা নারীকে দেখতে পেলুম না—দেখলুম এক অদ্ভুত অতি-মানবীকে। গতি অতি, অতি মন্থর। কল্যাণসুন্দর মুখের ভাব সঙ্গীতের তানের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। বাহ, পদ, দেহ হেলে হেলে পড়ছে, মুখ উঠছে আর নামছে এবং চোখ দুটি দিয়ে এমন এক বিচিত্র স্বর্গীয় কিরণ বিকীরিত হচ্ছে, যা দেখলে পার্থিব, দুর্বল ও জরাগ্রস্ত নরদেহের স্মৃতি মন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় ! এ নাচ নয়, এ হচ্ছে সঙ্গীতের মােহনীয় ভাবের অভিব্যক্তি এবং এ দেখলে বােঝা যায়, নৃত্যকলাও সােফোক্কেসের গ্রীক ট্রাজেডির সমস্ত ভাব নিঃশেষে ফুটিয়ে তুলতে পারে।•••তারপর সঙ্গীতের বিরাম, ইজাভােরর বিরাম, ইন্দ্রজালের বিরাম! চারিদিক অন্ধ। আমরা এমন অভিভূত যে, প্রশংসা করতে যা করতালি দিতে পারলুম না। নাচর শেষে ইজাভােরর কাছে গেলুম। তিনি বললেন, “আমি আবার বাঁচতে মুক্ত করেছি।” তার পুস্তকের কথা মনে করিয়ে দিলুম। তিনি বললেন, আমি এখনাে মরিনি। যখন মরব তখন টাকার নব যৌবনের কুবনে এতে অতিকথা লিখব। এখন আমি সুখী। অসুখী না হলে বই লিখব না। এখন আমি খালি নাচ। আর এক বছর কেটে গেল। এবার অর্থহীন হয়ে ইজাভাের। একখানি বই লিখতে আরম্ভ করলেন, কিন্তু শেষ করতে পারলেন না। নারিসের রাজপথে হঠাৎ এক মােটর-দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর খবর শষ্যা যার রাজপথ ফ্রাইনকে চেনেন? যুগে যুগে কবি ও গীতী ৰায় গান গেয়েছেন, গ্রীসেব অতুলনীর ভাস্কর Praxiteles যার মুর্তি গড়েছেন এবং ফরাসী কবি De Musset যাকে এই বলে চিনিয়ে দিয়েছেন-“অশুদ্ধ ফ্রাই শয্যা আর রাজপথ ?” হঠাৎ আমার টেবিলের উপরে মেডিচি ভেনাসের মুক্তির দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হ’ল। শােনা যায়, এ মূর্তিটির আদর্শ হচ্ছে Praxitelesএর গড় ‘ভেনাস’ মুক্তি। এবং সকলেই জানেন Praxiteles দেবী ভেনাসকে আবিষ্কার করেছিলেন গণিকা জাইনের দেহের ভিতরেই অর্থাৎ ভার অসীমন্দের এক গণিকার দেহ গড়ে তাকেই দেবী ভেনাস নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন। কত শত বৎসর আগে সুন্দরী ফ্রাইনের নশ্বর দেহ পৃথিবীর সাধাৰণ ধূলােয় মিশিয়ে গেছে। কিন্তু শিল্পীর স্বর্গীয় প্রতিভার স্পর্শে গণিকার দেহ আজ পবিত্র ও অক্ষয় হয়ে বিরাজ কছে ঘরে ঘরে। খৃষ্টধর্শ্বের পুরােহিত পােপও তার প্রাসাদে গণিকার এই মূর্তিটিকে আদর করে সাজিয়ে রেখেছেন। আজ এই জাইনের গল্প বলব। একদিক দিয়ে ফাইন ছিল উচ্চশ্রেণীর বাববনিতা। কাৰ্যে, সঙ্গীতে নৃত্যে ছিল তার চমৎকার পটুতা। সাহিত্যিক,নাট্যকার, কবি, দার্শনিক ও শিল্পীরা সর্বদাই প্রকাশ্যে তার ঘরে আনাগােনা করতে লজ্জিত হতেন না। বিশেষ করে অমর তার Praxieles তাকে এতটা ভালােবাসতেন বে, ফাইনের অতুলনীয় দেহকে তিনি মৰ্ম্মপটে চিরস্থায়ী করে নিজের শিল্পী-প্রাণের গভীর অনুরাগের লন্ত নিদর্শন রেখে গিয়েছেন। এমন কি শয্যা যার রাজপথ ফ্রাইনের লালাভ করে পরিতুষ্ট হয়ে Praxiteles একদিন বললেন, “বান্ধবী! তােমাকে অদেয় আমার কিছুই নেই। আমার সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বৰ্য্য তোমার পায়ের তলায় বিলিয়ে দিতে পারি।” ফ্রাইন বললে, “বন্ধু, তােমার সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশ্বৰ্য্য বলতে আমি বুঝি তােমার হাতে গড়া মূর্তিগুলি। কিন্তু তার মধ্যে কোন্ মূর্তিটিকে তুমি সব চেয়ে ভালাে বলে মনে কর? শিল্পী বললেন, “আমার চোখে আমার সব মুর্তিই সমান সুন্দর। তার ভিতর থেকে যেটি খুসি তুমি বেছে নাও।” কিন্তু শিল্পীর এ উত্তরে চতুর ফ্রাইন ভুললেন না। তখন শিল্পীর চোখে কোন্ মূর্তিটি সব চেয়ে সুন্দর তা জানবার জন্যে তিনি এক কৌশল অবলম্বন করলেন। একদিন শিল্পী ও ফাইন দুজনে বসে আছেন, এমন সময়ে এক ভৃত্য ব্যন্ত ভাবে এলে শিল্পীকে ডেকে বললেন, “আপনার শিল্পশালায় আগুন লেগেছে! শিল্পী উৎকণ্ঠার সঙ্গেবি'লে উঠলেন, “খ্যাঃ! “বল কি ? যাও, যাও, শীগগির যাও, যেমন করে পায়রা আগে আমার Eros-এর মূর্তিটা বাঁচাও।” ফাইন হেসে বললে, “ভয় নেই ব, ভয় নেই ! আমারই অনুরোধে আগুন লাগার এই মিথ্যে খবর তােমাকে দেওয়া হয়েছে ! এতক্ষণে বােঝ। গেল, Eros-এর মূর্তিকেই তুমি সব চেয়ে সুন্দর বলে মনে কর। ৪ যুক্তিটিই আমার চাই।” আর একদিক দিয়ে দেখলে বলতে হয়, এইনের সঙ্গে সাধারণ বারানার কোনই তফাৎ ছিলনা। সত্যসত্যই তার শষ্যা ছিল রাজ- २३ নব যৌবনের কুঞ্জবনে পথের মত—সেখানে যে কোন পথিক অনায়াসেই আনাগােনা করতে পারত। টাকা পেলে যার-তার আলিঙ্গনেই সে নির্বিচারে আজান - একবার এক রূপাত্মাদের কাছে অনেক টাকা চাওয়াতে সে বললে, ‘সুন্দরী, অমুকের কাছ থেকে তো তুমি এর চেয়েও কম টাকা চেয়েছিলে।” ফ্রাইন বললে, “তবে যতদিন না আমি তােমার প্রেমে পডি ততদিন অপেক্ষা কর, তাহলে তােমার কাছেও কম টাকা চাইব।” এইভাবে দেহ বিক্ৰী করে ফ্রাইন বিপুল বিত্তের অধিকারিণী হয়েছিল। আলেকজান্দর Thebes ধ্বংস করেছিলেন। Thebesএর বাসিন্দাদের • কাছে ফ্রাইন প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, “আমি তােমাদের সমগ্র সহর নিজের টাকায় আবার নতুন করে গড়ে দিতে রাজি আছি এই সৰ্ত্তে, সহরের মাঝখানে একখানি শিলালিপিতে লিখে রাখতে হবে—এই সহ ধবংস করেছিলেন আলেকজান্দর। কিন্তু পুনর্গঠন করেছে গণিকা ফ্রাইন। বলা বাহুল্য, Thebesএর বাসিন্দারা এ প্রস্তাবে সম্মত হয় নি। ফ্রাইন একটা সত্যকথা জানত সৌন্দৰ্য্য বাস করে দেহের গােপনতার মধ্যেই। কারণ যা দেখা যায় না, বা অল্পই দেখা যায়, তাকেই ভালো করে পাবার জন্যে মানুষের প্রাণের ক্ষুধা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। সেইজতে নিজের দেহের নগ্নতা সে সহজে কারুর কাছে প্রকাশ করতে চাইত না। সেকালে গ্রীসের সাধারণ গানাগারে স্ত্রী-পুরুষ একত্রে নয় } २७ নব যৌবনের কুঞ্জবনে হরে মান করত। কিন্তু ফাইনকে কোন দিন সাধারণ মানাগারে দেখ যায় নি। দেহকে ঢেকে রেখে সে রূপপিয়াসীর প্রাণের পিপাসা আরাে বাড়িয়ে তুলত। কিন্তু অবশেষে যে কারণে ফাইনের দেহ গোপন রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল, তা অত্যন্ত বিচিত্র। এবং এই ব্যাপারের ভিতর থেকে প্রাচীন এক জাতির মতিগতির সুন্দর পরিচয় পাওয়া যায়। একবার ফাইনের কোন প্রেমিক খুৰ সম্ভব প্রত্যাখ্যাত হয়েই রাজদ্বারে তার বিরুদ্ধে অভিযােগ আনলে যে, সে হচ্ছে নাকি। প্রাচীন গ্রীসে এটা ছিল যার-পর-নাই গুরুতর অভিযােগ এবং এম প্রাণদণ্ড হত পৰ্যন্ত। বন্দিনী ফাইনকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হল এবং তার পক্ষে উকিল হয়ে দাড়ালেন Hyperides নামে এক ভদ্রলােক। উকিল নেক চেষ্টা করলেন, অনেক বক্তৃতা দিলেন—কিন্তু মামলা তবু ফ্রাইনের বিরুদ্ধেই ফ্রাইনের প্রাণও অনিবাৰ্য্য দেখে উকিল তখন যে আশ্চর্য উপায় অবলম্বন করলেন, পৃথিবীর আর কোন আদালতে আর কখনো তা দেখা যায় নি। Hyperides আচম্বিতে এক টানে ফ্রাইনের বুকের কাপড় ছিড়ে ফালা ফালা করে ফেলে বিচারকদের সম্বােধন করে বললেন, “দেখুন এর অপূর্ব সের্গেও যা দেখা যায় নি। এ দেহ যদি আপনারা ল করতে চান, তাহলে সৌন্দর্যের সৌন্দর্য্যের দেবী ভেনাসের অভিশাপে আপনাদের সর্বনাশ হবে।” সেই পীরগুনী যুবতীর নিটোল ও নগ্ন বক্ষে সৌন্দর্য দেখে বিচারকরা বিনয়-প্রশংসায় উলসিত হয়ে উঠলেন। এবং অনেকক্ষণ তৰ হরে ননানন্দ উপভোগ করে বললেন,-“এমন সুন্দর দেহ ধংস করা গ' * । . গ +h +++ । য, নাভা, , শয্যা যার রাজপথ পাণবটে। ক্রাইনকে আমরা মুক্তি দিলুম। কিন্তু তার এমন অনুপম দেহ লুকিয়ে রাখবার অন্ত নয়। অতএব প্রতি বৎসরে মিষ্টি এক উৎসবের দিনে এবার থেকে জাইনকে সর্বসাধারণের সামনে নয় দেহে দেখা দিতে হবে । আমাদের উর্বশীর মত গ্রীকদের রূপলী ভেনাসও পরিপূর্ণ যৌবন, নিয়ে সমুদ্রগর্ভ থেকে আত্ম প্রকাশ করেছিলেন। প্রতি বৎসরে একদিন করে গ্রীলের সমুদ্রতীরে রাজ্যের সমস্ত লোক গিয়ে জড়াে হত। এবং সেই দিনে ফ্রাইন উলঙ্গ দেহে ভেনাসরূণে সাগরের ভিতর থেকে উঠে আসত-অমল নীলিমার ভিতর থেকে জীবন্ত ও নির্মল একটি যেত ফলে মতন। তার নিখুঁত নিটোল গৌর তনুর উপর থেকে সূর্যকিরণ মেখে এলবিগুলি পরম পুলকে ঝরে ঝরে পড়ত এবং অনুপম নয় সৌন্দর্য্যের স্বর্গীয়তায় মুগ্ধ হয়ে সাগরতটের বিপুল জনতা ঘন ঘন জয়ধ্বনি দিয়ে নিবেদন করত প্রাণের আনন্দ। এই বিংশ শতাব্দীতে আমার ঘরে আজও ফাইনের সেই শিলাময়ী নগ্নমূর্তিই আমার চোখের সামনে দাড়িয়ে আছে। যেন একটা মৌন সঙ্গীত। এবং যখনই তাকে দেখি আমার মন আজও জানি না দিয়ে থাকতে পারে না। ..., হাওড় খাসালপু, এক রাতের মুল্য শিহাজার প্রাচীন যুগ ছিল গণিকাদের স্বর্ণযুগ। ভারত, গ্রীস, বাবিলন, মিশর রােম–কয়েক শতাব্দীর বনিকা তুলে যে কোন দেশের দিকেই সৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, বারাঙ্গনাদের চল যৌবনের অশ্রান্ত নৃত্য। সেকালের কোন সভ্য দেশেই গণিকাদের পিছনে ঠেলে রাখা হ’ —কেবল অলস বিলাসীদের লীলা-নিকেতন নয়, সেকালে গণিকার ছিল দেবমন্দির, রাজসভা এমন কি বিজনসমাজেরও সমুজ্জল অলকার ! দেড় শতাব্দী আগেও আমাদের বাংলাদেশ গণিকাদের এই স্বর্ণযুগের জের টেনে এসেছিল—দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর-সম্পাদিত পুরাতন “ভারতী” পত্রিকায় প্রকাশিত অগীয় উমানাথ রায়ের (সুবিখ্যাত জগদীশনাথ রায়ের অগ্রজ) প্রবন্ধে এ সম্বন্ধে সাক্ষ্য পাওয়া যাবে। মিশর ও য়ুয়ােপে চোখ ফেরালে দেখি, এক সময়ে গণিকা ওখানকার রাণী ও সম্রাজ্ঞীর সিংহাসন থেকেও বধিত হত না। কি ইংলণ্ডে অধুনাপ্রসিদ্ধ বই ডিউক, মাকুইস ও আল প্রভৃতির বংশ- তালিকা খুঁজলে দেখা যাবে, তাদের উৎপত্তির মূলে আছে গণিকারা ! এবং য়ুরােপের একাধিক বিখ্যাত রাজ ও সম্রাট ৰে জারজ, ইতিহাস সে- সন্ধে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিতে সঙ্কুচিত হয় নি। তবে আজ এ সত্যটা সকলকেই মনে রাখতে হবে যে, সেকালকার গণিকাদের একমাত্র সাল ছিল না সুন্দর দেহ। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্র, ৰ্য্য ও নৃত্য প্রভৃতি নানা ললিতকলায় অত্যন্ত দক্ষতা না থাকলে তখনকার গলিকা উচ্চতর সমাজের অভিনন্দন লা করতে পারত না। এমন এক রাতের মূল্য শিহাজার স্থানান্তরে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধে এ-বিষয় নিয়ে আমি বিশদ আলােচনা করেছি, অতএব এখানে পুনরুক্তির দরকার নেই। কিন্তু কোন যুগেই অধিকাংশ গণিকারই শেষ-জীবন আনন্দজনক হ'ত । আজ আমরা প্রাচীন গ্রীসের সাহিত্যে ও ইতিহাসে অমর গণিকা লাইসের একটি জীবনী-চিত্র প্রকাশ করছি, কারণ এরই মধ্যে বিশেষ ভাবে ফুটে উঠেছে, সাধারণ গণিকা-জীবনের আলাে এবং ছায়া। চতুর্থ শতাব্দীর কথা। লাইস ছিল সিসিলি দ্বীপের মেয়ে। বালিকা বয়সেই তার রূপের ছটা দেখে সেখান থেকে কারা তাকে বন্দী করে গ্রীসের করিন্থ, সহরে নিয়ে আসে। সে যুগ কোরি, সহর ছিল সর্বশ্রেণীর গণিকাদের জন্যে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ! চিত্রকর আপেলেস একদিন পথ দিয়ে যেতে যেতে দেখলেন, একটি কিশােরী ফোয়ারার সামনে দাড়িয়ে কলসে জল ভরছে। অপরূপ তার রূপমাধুরী, আশ্চৰ্য্য তার তনুর শীলা, মােহনীয় তার দেহের ভঙ্গিনা! সৌন্দর্য্যের উপাসক চিত্রকরের চোখ, তখনি দেখতে পেলে কিশোরীর আসন্ন যৌবনের স্বপ্ন। নাম তার লাইল। আপেলেস বালিকাকে নিমন্ত্রণ করে নিজের বাড়ীতে এক ভােজ- সভার নিয়ে এলেন। বারা হতাশ ভাবে বললে, “এ কি হে,এ কাকে নিয়ে এলে? এ যে একটা সামান্য বালিকা! আপেলেস মুখ টিপে হেসে বললেন আমাকে তিন বছর সময় দাও। এই সামান্যই হয়ে উঠবে অসামান্য সৌন্দর্যের মধুর উৎস!” চিত্রকরের ভবিষ্যণী মিথ্যা হ’ল না। লাইসের তনুতটে এসে চুম্বন করলে যেদিন তরুণ যৌবনের প্রথম জোয়ার, সেইদিনই তার দেহ হয়ে উঠল মূর্ব সঙ্গীতের মত ।

নৰ যৌবনের কুঞ্জবনে নতুন এক ফুল ফোটার খবর পেয়ে চারিদিক থেকে সাগ্রহে ছুটে এল সারা গ্রীসের রসিক ময়রা! তপ্ত যৌবন-মধুর গান পেয়ে ভক্তরা ভরিয়ে তুললে লাইসের বৃহৎ লৌহ-মা। তার গড়ে তার আর্মে মার প্রতিমা, সাহিত্যিকরা রচনা করে তার প্রশস্তি, গায়ক গায় তার সৌন্দর্যের জয়গীতি! শাইসের নাম পথে পথে লােকের মুখে মুখে। পৃথিবীবিখ্যাত অমর বক্তা ডিস্থেনেস, দার্শনিক ডায়ােজেনেস ও আরিপ্লিাস ( যার দার্শনিকতার মূলমন্ত্র হচ্ছে—“ভুত ভবিষ্যতের ভাবনা ভূলে বর্তমানে আনন্দ উপভােগ কর) প্রভৃতির মতন বিদ্বান ও বিজ্ঞ ব্যক্তিরাও লাইসের কোমল চকমলের তলায় হৃদয় পেতে কাটিয়ে কেন দিনের পর দিন । আমিত্তিপ্লাসের এক ভৃত্য তার কাছে এসে একদিন অভিযােগ করলে, “হতু, লাইসের জন্ঠে আপনি মুঠো মুঠো টাকা খরচ করেন, কিন্তু ডায়েজেনেস তার অনুগ্রহ পায় বিনামূল্যেই!” আরিঙিল্লাল হেসে বললেন, “কি হয়েছে তা ? লাইলকে আমি টাকা কি কেবল তাকেই উপভােগ করবার জন্যে, সেখানে অন্য লােকের আনাগােনা বন্ধ করবার জয় নয় ” এমন কি ডায়ােলেনের কাছে আরিতিদাসের উদার ব্যবহার বড় বেণী বাড়াবাড়ি বলে মনে হল। তিনিও একদিন প্রতিবাদ করে বললেন, “দেখ আরিস্তিগাল! একট। সাধারণ গণিকার সঙ্গে তােমায় মতন লােকের এতটা ঘনিষ্ঠতা করা উচিত নয়। আরিগিস বললেন, “যে বাড়ীতে অন্য লােক বাস করেছে সে বাড়ী গড়া নিতে কি তোমার লা হয়? না।” ২৮ এক রাতের মূল্য বিশহাজার -“নে জাহাজে অন্ত লােক চড়েছে সে জাহাজে চড়তে কি তােমার না হয় ? -তাহলে যে নারীকে আরাে অনেকে উপভােগ করেছে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা করতে আমারই ৰা লজ্জা হবে কেন? সেকালের এক দরিদ্র কৰি লাইসের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয় এই পংক্তিগুলি রচনা করেছিলেন। সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী লাইস যখন আমি জিজ্ঞাসা করলুম- এক রাত্রি তােমার সঙ্গে বাস কর, আমাকে দিতে হবে কত মূল ? তুমি বললে-ত্রিশ হাজার মুদ্রা। আমি ভাবলুম, অধঃপতনের জন্যে এত বেশী টাকা খরচ করা অসম্ভব।” দার্শনিক প্লেটো এবং এপিজেতেশ প্রভৃতি দেখিয়েছেন তাইসির শেষ জীবনের চিত্র। যৌবন পালিয়ে গেছে জয়ার কবলে লাইলের দেহকে সমর্পণ করে। পাছে জরার সঙ্গে চোখাচোখি দেখা হয়, সেই ওয়ে সে আর আসিতে নিজের মুখ দেখতে সাহস করে না। সারাদিন বসে বসে একলাই মদ খেয়ে প্রাণের বালা তােলবার নব যৌবনের কুঞ্জবনে চেষ্টা করে এবং তার চারিপাশে বসে-াড়িয়ে নেচে গেয়ে যায়। উদ্দাম যৌন-উৎসবে মত্ত হয়ে উঠেছে, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে নীরবে ৭ নেবে। আগে রূপ যৌবন ঐশ্বর্যের গর্বে রাজা-মহারাজাকেও সে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিত, কিন্তু আজ তার হাড়-কুৎসিত চেহারা দেখলে পথের মুটেও খুতু ফেলে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। আজ কেউ তাকে দয়া করে তাকে, সে ভাগ্য মেনে তার কাছে ছুটে যায়। পাঁচ টাকা আজ তার কাছে অতুল ঐশ্বৰ্য্য! আজ সে পােষা কুকুরের মত, একটু অনুগ্রহ পেলেই কৃতার্থ ।

DIPS:6:1 LIBRARY Acc ... 805 নিন.9 ছুরি লেনের মিষ্টি নেল “কমলা লেবু! কে আমার তাজা কমলা লেবু কিনবে?” বিলাতের পুরাতন ডুরি-লেন থিয়েটারে এ পরমা সুন্দরী কিশােরী কমলা লেবু বিক্রী করত—তার নাম নেল। গানের মতন মধুর গলার আওয়াজে সে যখন হাঁকত—“কমলা লেবু! কে আমার তাজা কমলা লেবু কিনবে তখন তার পানে তাকিয়ে এশংসায় ভরে উঠত সেকলেরই চোখ ! লেবু কেনবার জন্যে সকলেই ব্যগ্রভাবে তার দিকে ঝুকে পড়ত এবং দেখতে দেখতে লেবুর ঝুড়ী সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই হৃদয় খালি করে নেল সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যেত। সকলে আদর করে বালিকাকে মিষ্টি নেল” বলে ডাকত। দ্বিতীয় চাস তখন ইংলণ্ডের সিংহাসনে। এমওয়েলের লৌহ-শাসন থেকে মুক্ত হয়ে বিলাতে তখন আবার নুতন করে রঙ্গালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং ব্যমন্ট ও ফ্লেচার, সার চাল সেভিল ও ড্রাইডেন নব নব নাটক রচনা করছেন। ক্রমওয়েল অস্বাভাবিক ভাবে দেশকে সুনীতি ভক্ত করবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় চাললের সিংহাসন-প্রাপ্তির সঙ্গে-সঙ্গেই শুরু হল তার প্রতিক্রিয়া। পথে পথে আবার জনতায় পরিপূর্ণ তড়িখানা দেখা গেল, রাজা একা ভাবে উপপত্নী নিয়ে বেড়াতে লাগলেন এবং সভাসদরা ও সন্ত্রাক্ত ব্যক্তিরাও একা ভাবে কুমারী, সধবা ও বিধবা -সকল শ্রেণীর রমণীর সঙ্গেই অবৈধ স স্থাপন করতে প্রতি হলেন না। এই সময়েই নেল কমলা লেবু বিক্রী করত। তার পিতা কারাগারে, তার মা বারবনিতা ও ৰ মাতাল। এমন বাপ-মায়ের মেয়ে নেন সেই নব যৌবনের কুঞ্জবনে চরিত্রহীনতার যুগে যে সৎজীবন যাপন করবে তেমন আশা করা অন্যায়। কিন্তু তবু নেলের নাম বিলাতে আজও অমর হয়ে আছে এবং সকলেই ভালােবাসে তার স্মৃতিকে। নেলের প্রথম দুই প্রেমপাত্র ইচ্ছে চালস হার্ট ও জন লেলি নামে দুই অভিনেতা। তাদের তত্ত্বাবধানে নেল অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষালাত করে ডুবি-লেন থিয়েটারে যােগদান করলে। অন্নদিনেই নেলের আভনয়-খ্যাতি চারিদিকে প্রচারিত হয়ে পড়ল এবং তাকে দেখবার জন্যে মালয়ে ফলে দলে দর্শক সমাগম হতে লাগল। তারপর নেলের রূপ দেখে লর্ড বাকহাষ্ট তাকে উপপত্নীরূপে গ্রহণ দেন। এইভাবে কিছুকাল গেল। মালয়ে নেন একদিন অভিনয় কছে এবং বহু সন্তান্ত দর্শকের মধ্যে বসে আছেন ইংলণ্ডের রায় দ্বিতীয় চার্লস ; নেলকে দেখেই রাজা তার হৃদয় হারিয়ে ফেললেন। তার অনি পরেই শােনা গেল, ইংলণ্ডের রাজা দ্বিতীয় চাল নেলকে তার উপজীর পদ প্রান করেছেন। নেলের বয়স তখন সতেরো এবং চালসের আটত্রিশ। নেলের পূর্ব-প্রভু পাছে বাধা দেন, সেই ভয়ে চাল তাকে এক উচ্চপদ ও বাৎসরিক পনেরো হাজার টাকা বৃত্তি দিয়ে রাজকার্যের অছিলায় বিদেশে প্রেরণ কলেন। কিন্তু চালস কেবল নেলকে নিয়েই তুষ্ট ছিলেন না কারণ নেলের সঙ্গে তার আরো দুই বিখ্যাত উপপত্নীর নাম শোনা যায়-ডাচেস অফ জেভেল্যান্ড ও ডাচেস অফ পাের্টসমাউখ। এরা দুইজনেই শান্ত বংশে মহিলা। বাজার উপপঙ্গী হয়েও নেন তার কথায় স্বাধীনতা কিছুমাত্র ক্ষু ছুরি লেনের মিষ্টি নেল করেনি। মুখে যা আসত সে তাই বলত। তবু তার মধ্যে এতখালি মধুর রস খাত যে, রাজা বা অন্য কেহই তা শুনে রাগ করতে পারতেন না। রাজার দৌলতে নেলের সৌভাগ্যের আর সীমা ছিল না। वर्षम চার বৎসরের মধ্যেই সে নিজের হাত-খরচ নিয়ে ব্যয় করেছিল নয় লক্ষ টাকা। তার ঘরের একখানি খাটেরই দাম ছিল যােত হাজার টাকারও বেশী। নেল ও তার সন্তানদের জন্যে চালস বাৎসরিক পঁচাত্তর হাজার টাকার বৃত্তি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ১৬৭০ খৃষ্টাব্দে চালসের ঔরসে ও নেলের গর্ভে একটি পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হল। খােকার মুখ দেখে রাজা এত খুশি হলেন ৰে, নেলকে রাজ-সংসারে রাণীর মহলে একটি মহা-সম্মানের পদ প্রদান করলেন। পুত্রের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতেও রাজা ভুললেন না। পরে এই জারজ পুত্রই রাজ-পিতার অনুগ্রহে ডিউক অফ সেন্ট আলবান্স নামে সুপরিচিত হয় এবং তার বিবাহ হয় মহা-সন্ত্ৰাস্তবংশীয় আল’অফ অক্সফোর্ডেন সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণীর একমাত্র কন্যার সঙ্গে। জারজের ভাগ্যে এই কল্পনাতীত সৌভাগ্য য়ুরােপেই সম্ভবপর। রাজার অন্য যে দুইজন ডাচেস উপাধিধারিণী উপপত্নী ছিলেন, সন্ত্রা ও ভদ্র মহিলা হলেও তাঁরা রাজার বিশ্বাস রাখতে পারেন নি। তারা প্রকাশ্যভাবেই রাজা ছাড়া আরাে অনেকেরই উপরে অনুগ্রহ বৃষ্টি করতেন। কিন্তু বারবনিতার কন্যা ও নিজেও বারবনিতা হলেও রাজার অনুগ্রহ লাভ করবার পর নেল কোনদিন আর দ্বিতীয় ব্যক্তির নিকটে দেহ বিক্ৰী করেনি—এদিকে তার সতীত্ব ছিল অসাধারণ। রাজা তা জানতেন এবং বলতেন যে “আশ্চর্য! আমার বিশ্বাস, নেলি আমাকে সত্যিই ভালােবাসে।

নব যৌবনের কুবনে চালস যখন নেলকে কাউটেল অফ শ্ৰীণউইচ উপাধি গানের ব্যবস্থা করছিলেন, সেই সময়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তার পরে যিনি রাজা হবেন সেই ভ্রাতাকে, চাল মৃত্যুশয্যায় বলে যান, “দেখাে, নেলী- বেচারী যেন উপােস করে মারা না যায়। তার পরে দ্বিতীয় কেম—রাজার এ দেশ পালন করেছিলেন। চালসের মৃত্যুর পর নেল আর বেশীদিন বাঁচেনি। দু'হাতে সারা জীবন খরচ করেও মৃত্যুকালে সে পনেরাে লক্ষ টাকার সম্পত্তি রেখে গিয়েছিল। ৩৪ না, পােশাক প-ি ভােলােথি জর্ডনের কাহিনী ভােলােধি জর্ডনের নাম এদেশে পরিচিত নয়। কিন্তু এক যুগে সে ছিল বিলাতের সর্বশ্রেষ্ঠ হাস্যরসের অভিনেত্রী। তার যশ ও সৌভাগ্য দেখে বিলাতের অমর অভিনেত্রী মিসেস সিভন্স পৰ্যন্ত হিংসা প্রকাশ করতেন। গরিবের মেয়ে ডােয়ােথির অর্থ, রূপ ও যশের কিছুই অভাব ছিল না। কিন্তু তার শেষ জীবন হয়ে উঠেছিল অশ্রুজলে করুণ। তার বাপ-মা অভিনয় করতেন। তােৰােধি ও ডাবলিন শহরে প্রথম রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হয়। সে-রঙ্গালয়ের কর্তা ছিল রিচার্ড ডালি। ডােয়ােখির রূপ দেখে তার এমন মাথা ঘুরে যায় যে শেষটা সে জোর করে তার সর্বনাশ করে। অবিলনে তার সন্তান-সম্ভাবনা হল। নারী-জীবনের চরম অপমান এবং ডালির কবল থেকে মুক্ত হবার জন্যে ডােরােধি দেশ ছেড়ে ইংলণ্ডে পালিয়ে গেল। দেখতে দেখতে লণ্ডন শহরে তার অভিনয়-চাতুর্যের কথা শােকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। তার অসীম রূপ-যৌবনের লােভে অগুনতি প্রেমিকেরও অভাব হল না। ভােয়ােখি কিন্তু অটল রইল। এই সময় রিচার্ড ফোর্ড নামে এক ব্যারিষ্টারের সঙ্গে ডােয়ােথির পরিচয় হল। বিবাহ ও গার্হস্থ্য জীবনের লােজ দেখিয়ে তােরােথির হৃদয়ে সে একটি স্থায়ী আসন দখল করলে; ডােয়রাখিও তাকে স্বামীর নব যৌবনের কুঞ্জবনে ভালােবাসত এবং তার মাহিনা থেকেই কোর্ভ পরম আরামে জীবন করতে লাগল। ফোর্ড কিন্তু তােবােথিকে বিবাহ করলে না। অব ক্লারেন্স (পরে ইংলণ্ডের রাজা) ভােরােথির প্রেমে পড়লেন। অনেক অনেক দিন চেষ্টা এবং অনেক কাকুতি-মিনতির পর ডােয়ােথি আর যুবরাজকে উপেক্ষা করতে পারলে না। তখন দুটে গেছে তার বিবাহের স্বপ্ন। সে যুবরাজের উপপত্নী হ'ল। রাজার কাণে একথা উঠল। যুবরাজকে ডেকে তিনি বললেন “এ সব কি; এ সব কি ? তুমি নাকি একটা নটীকে বাধা রেখেছ?” -আজ্ঞে হ্যা ! -বটে! তাকে কত টাকা করে দাও শুনি? -“বছরে পনেরো হাজার টাকা। পনেরাে হাজার। বড় বেশী, বড় বেশী । সাড়ে সাত হাজার করে দিও। যুবরাজের চরিত্রহীনতার জন্যে রাজা কিছুমাত্র রাগ প্রকাশ করলেন , কেবল উপপত্নীর মাহিনা কমাতে বললেন। গত শতাব্দীতে ইংলণ্ডের নীতি-জ্ঞান ছিল এমনি থারাই। যুবরাজ ডােয়রীথিকে বৎসরে পনেরাে হাজার টাকা দেবার অঙ্গীকার করেছিলেন বটে, কিন্তু সে হচ্ছেঙ্গীকার মাত্র। কারণ যুবরাজের নিজের খরচ এত বেশী ছিল যে, টাকা দেওয়া দূরে থাক, ডােরােথি রঙ্গালয় থেকে, যা-কিছু রােজগার করত যুবরাজ তার সমস্তই গ্রহণ করতেন নিজের হাতে। এই ব্যাপার নিয়ে লােকের মুখে মুখে অনেক-রকম চড়া চলত। একটি ছড়ার নমুনা :- তােনােখি জর্ডনে কাহিনী *As Jordan's high and mighty squire Her playhouse profits deigns to skim, Some folk uda a ciously enquire, Does he keep her or she keep him ? ডােয়ােখি এমন মনপ্রাণ দিয়ে যুবরাজকে গ্রহণ করেছিল যে, আপনার ফার্জিত সমস্ত অর্থ তার হাতে তুলে দিতে কিছুমাত্র ইতঃস্ততঃ করত না। দীর্ঘ বিশ বৎসর কাল সে যুবরাজের সঙ্গিনী ছিল। এর মধ্যে একদিনের জতেও সে অবিশ্বাসিনী হয় নি। তার জীবন ছিল বিবাহিত জীবনের মতই পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক। তার চরিত্রের প্রভাবে যুবরাজের বিশৃঙ্খল জীবনও সংষত হয়ে উঠেছিল—এমন-কি যুবরাজ পার্লামেন্টে যে সব বক্তৃতা দিতেন তার ভিতরেও থাকত ডােয়ােখির হাত ও শিক্ষিত মনের প্রভাব। যুবরাজের পারিবারিক উৎসবাদিতেও ডােয়ােথি গৃহস্থাষিনীয় পদ অধিষ্ঠিত হয়ে ইংলণ্ডের সর্বোচ্চ সম্রান্ত ব্যক্তিগণকে অভ্যর্থনা করত। সুতরাং ডােরােথিকে যারা সাধারণ পণ্যাঙ্গনা বলে মনে করবেন, তারা ভুল করবেন। কিন্তু এমন একদিন এল যুবরাজ যেদিন বলতে লজ্জিত হলেন না- আজ থেকে আর আমাদের দেখা হবে না।' উত্তরে ভােয়ােথি যুবরাজকে একটিও কটুকথা বললে না। বুকের ভিতরে জ্বলন্ত চিতা নিয়ে ভােরাথি একান্তভাবে নাট্য- সাধনায় নিযুক্ত হন। কিন্তু এত-বড় দুর্ভাগ্যের আঘাতে যার মন থেকে সমস্ত আশা-আনন্দের আলো নিবে গেছে, সে কি আর অপরকে আনন্দ দিতে পারে ? অভিনয় আর তেমন জমল না। জীবনে কোনদিন সে টাকা জমাতে পারে নি, টাকার পূজা করে নি। কাজেই এখন তার অর্থকষ্টের আর সীমা রইল না। যুবরাজের ঔরসে ডােনথির হয়েছিল ছেলে-মেয়ে দশটি।

নব যৌবনের কুঞ্জবনে অধিকাংশই বড় বড় বংশে বিবাহিত হয়েছিল। এক মেয়ের বিয়ে হয়, আর্ল ফকল্যাণ্ডের সঙ্গে। আর দুই মেয়েও আল ও লর্তের ঘরণী হয়। তার এক ছেলে আল’ অব, মনষ্টার নামে বিখ্যাত। অর্থকষ্টে পড়ে ভােয়ােখি শেষটা যুবরাজের কাছে সাহায্য ভিক্ষা চাইলে। উত্তর কি পেলে জানি না; কিন্তু প্রকাশ যে, পাছে ভােরােথি তাকে বিরক্ত করে সেই ভয়ে যুবরাজ ভয় দেখিয়ে তাকে ফ্রান্সে নির্বাসিত করেন। সেইখানেই এক বৎসর মধ্যে (১৮১৬ অকে) পঞ্চান্ন বৎসর বয়সে অভাগিনী ভােরােথির মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে সে ভিখারিণীর মতন দারিদ্রের যাতনা ভােগ করেছিল। তার উপাধিধারী ছেলে-মেয়েরা টাকার কঁাড়ির উপরে বসেও মায়ের পানে ফিরে তাকায় নি! পরে ভােনােথর প্রপৌত্র ভিউক অব ফাইফের সঙ্গে রাণী ভিক্টোরিয়া তাঁর প্রপৌত্রী রাজকুমারী রয়েলের ( রাজা জর্জের সহােদর বিবাহ দেন। অদৃষ্টের পরিহাস। বেচারী ডােরােথির একমাত্র দোষ এই যে, সে বিশ্বাস করেছিল পুরুষের হৃদয়কে।

শিখা লাইব্রে হাওড়া সা, পােঃ-খোসান বিজয়িনী ৰােনা কাউসাড়া,পােঃ-খােলাল --- বিজয়িনী ‘বােনাপার্ট। ( ঐতিহাসিক রূপকাহিনী) ফরাসী বিপ্লবের পর এদেশে দিগ্বিজয়ের জন্যে অতুলনীয় হয়েছিলেন দুজন লােক—তারা হচ্ছেন পুরুষ ও নারী, ভ্রাতা ও ভগ্নী, নেপােলিয়ন ও পলিন। ভাই করতেন মানুষের দেশজয়, বােন করতেন মানুষের হৃদয়-জয়। ভাই ব্যবহার করতেন বন্দুক আর কামান এবং বােন ব্যবহার করতেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন অস্ত্র—অর্থাৎ ভুরুর ধনুক আর নয়ন-বাণ। পলিন বােনাপার্টের দুই বিবাহ। প্রথম স্বামীর নাম জেনারেল লেকুলা এবং দ্বিতীয়ের নাম প্রিন্স, বাের্বি। কিন্তু এখানে স্বামীদের নাম তােলা মিথ্যা, কারণ তাঁদের আবির্ভাব হয়েছিল কেবল রূপসী পলিনের জীবন-কবিতার পাদপূরণের জন্যে। পলিনের কথা আলােচনা করলেই মনে প্রশ্ন জাগে-মহিলায় ও গণিকায় তফাৎ কোথায় ? দশজনকে অবৈধভাবে দেহদান করলেই যদি গণিকা হয় তাহলে বলতে পারি, পলিন দেহদান করেছে অসংখ্য ব্যক্তিকে এবং সমাজের চোখের সামনেই। কিন্তু পলিনকে কেউ গণিকা বলতে সাহস করে না। কেন? দুৰ্দ্ধৰ সম্রাট নেপােলিয়নের সােদর। এবং “ঞ্জিলে ও চাচেল’ উপাধিধারিণী বলেই কি পলিন সমাজের কাছে ছাড়পত্র পেয়েছে। কিন্তু আঠারো ও উনিশ শতকের য়ুরােপে এমন হাজার হাজার লাধারণ নারী ছিলেন, যারা কেবল যাকে-তাকে কোনই করতেন না। দেহ দিয়ে টাকা নিতেন, কিন্তু তবু তায়া গণিকা নামে গণ্যা নন, ৩৯ নব যৌবনের কুঞ্জবনে ওদেশে আজও তঁাৱা মহিলা। বিলাতের মহা-সন্ত্রা ও বিখ্যাত স্যার রিচার্ড ওলির স্ত্রী চৌত্রিশবার বিভিন্ন পরপুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হবার পরে তাঁর স্বামী আর সইতে না পেরে বিবাহ-বন্ধন ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন! তবুও তিনি গণিকা নন! অবং এজন্যে প্রাচ্যের মাথাব্যথার কারণ নেই। প্রতীচ্যের সমাজ পতিরা দূরবীণের উল্টোদিক দিয়েই পৃথিবীকে দেখবার চেষ্টা করেন। ফ্রান্সের সম্রাট দুতীয় নেপােলিয়ন ছিলেন জারজ সন্তান। ইংলণ্ডের জনসাধারণ এক সময়ে এক গণিকা-পুত্রকে রাজসিংহাসনে বসাবার জন্যে মহা আন্দোলন উপস্থিত করেছিল। ইংলণ্ডের বহু ডিউক, মাকুইস, আর্ল ও ব্যারন প্রভৃতি উপাধিভূষিত সন্ত্রান্ত পরিবারের উৎপত্তি হয়েছে গণিকা-পুত্র বা অবৈধ সন্তানেরই দ্বারা। ইংলণ্ডের রাজবংশের সঙ্গেও তাদের অনেকে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। প্রাচ্য-সমাজবিধি প্রতীচ্যে অচল। যদিও মিস্ মেয়াের দল এবং বিলাতী ‘প্রপাগাণ্ডা এ-সৰ খদেশী সত্যকথা ভুলেও স্মরণে আনে না। এখন নীতির কথা রেখে পলিনের কথা বলি। সম্রাট নেপােলিয়ন বােনাপার্টের ছিলেন তিন বােন-এলাইস, পলিন ও ক্যারােলিন। চরিত্রে তিনজনেই ছিলেন বিচিত্র, অবৈধ ভাবে নিজের হৃদয় বিলিয়ে দিতে এবং পরের চিত্ত হরণ করতে তিনজনেই ছিলেন অতি-পটু। পুরুষজাতির পক্ষে তারা, বিপদজনক ছিলেন, কারণ তাঁরা তিনজনেই রূপলী। তিন বােনের ভিতরে আবার পলিন ছিলেন রূপে, লীলায়, চাপল্যে, বেহায়াপনায় ও নীতিহীনতায় অগ্রগণ্য। পলিনের রূপ এখন ইতিহাস- বিখ্যাত হয়েছে। নেপােলিয়নের রাজত্বকালে রাজধানী পালিনগরীতে পলিনের চেয়ে সুন্দরী আর ছিল না-ার মধু ভদু ছিল শিল্পীর আরাধ্য।

বিজয়িনী বােনাপার্ট সে-যুগের শ্রেষ্ঠ ভার ক্যানােভা পলিনের অর্ধনগ্ন তনুকে রূপলক্ষ্মী জেনাস রূপে অমর করে রেখেছেন। আধুনিক যুগে তেমন দেহ দেখা যায় । নেপােলিয়ন নিজে বলতেন-পলিনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রাচীন নােমর আদর্শ-সৌন্দৰ্য্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এক নারী অন্য নারীর রূপকে সহজে স্বীকার করে না। কিন্তু বহু নারী পলিনের সৌন্দৰ্য-কাহিনী বর্ণন করেছেন উচ্ছ্বসিত ভাষায়—এমন কি পলিনের বিরুদ্ধবাদিনীরাও। তাঁর এক শত্রু-জর্জেস দুজে, বলছেন : “পলিনের চেয়ে রূপসী মেয়ে জীবনে আমি দেখিনি। কারুর সাধ্য নেই, তার দেহের ভিতর থেকে এতটুকু খুৎ বার করে। কাউন্টে পােতােক বলছেনঃ “পলিনের সৌন্দৰ্য্য গ্রীক ভাস্কর্যের আদর্শ নারীমুর্তির মত। নিজের সৌন্দৰ্য্যকে তাড়াতাড়ি নষ্ট করবার জন্যে দেহের উপরে সে যথেষ্ট অত্যাচার করেছে, তবু যৌবন-সীমা অতিক্রম করবার পরেও সমবয়সী কেকোন সুন্দরীকে সে পরিম্নান করে দিতে পারত। তার দেহখানি ছিল বালিকার মত খুব ছােট্ট। যেমন তার তুলি টানে লেখা নাক-মুখ-চোখ, তেমনি তার পূরন্ত গড়ন-পিটন! সবচেয়ে লােভনীয় ছিল তার নিটোল বুক-অতি-ফিফিনে রেশমী আবরণ ভেদ করে যা অকমলের মত ফুটে উঠে চোখে আন্ত কবিতার গােলাপী আবেশ। নিজের পীবর স্তনকে সে সর্বদাই যতটা-লম্ভব আদুড় করে সকলকেই দেখাতে ভালােবাসত। এজন্যে পলিনের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযােগ করা চলে না। কারণ বিপ্লবের পর Directory যুগে ফরাসী-যুবতীদের মধ্যে চলতি খ্রীতি হয়েছিল, বুকের স্তন অনাবৃত রাখা। আঠারো শতাব্দীতে ইংলণ্ডের রূপসীরা বুকের উপরে স্বাভাবিক ঙে-মুঙীন মােমে-গড়া কৃত্রিম স্তন ধারণ করতেন, কিন্তু ফরাস-দিনীর নলকে বাতিল করে দেখাতে চাইতেন আমলকেই। ১ নব যৌবনের কুঞ্জবনে গ্রীক পুরাণের দেবতাদের মধ্যে একবার সৌন্দর্য্যের প্রতিযােগিতা হয়েছিল—পরীক্ষক ছিলেন পারিস, পুরস্কার ছিল একটি সােনার আপেল। অদ্বিতীয় সুন্দরীরূপে দেবী ভেনাস সেই আপেল হস্তগত করেন। ভাস্কর ক্যানােভার সাধ হল, পলিনের দেহ পরীক্ষা করবেন। শলিনের আপত্তি হ'ল না। দেহের সমস্ত পােক ফেলে দিয়ে আধুনিক ভেনাস পলিন উলঙ্গ হয়ে দেখা দিলে ভায়ের ক্ষুধিত দৃষ্টির সামনে। নগ্ন সম্রাট-ভগিনী! পরিতৃপ্ত ক্যানােভা পলিনের হাতে একটি সােনার আপেল উপহার দিয়ে স্বীকার করলেন-হঁ্যা, এ রূপের তুলনা নেই বটে। পলিনের জীবনের একমাত্র সাধনা ছিল দেহের সাধনা। তার অন্য দুই বােন ছিল রাণী হয়ে মুকুট পরবার জন্যে লালায়িত। কিন্তু পলিন বলত, “মুকুটে আমার রুচি নেই। ইচ্ছে করলেই আমি মুকুট পরতে পারি। কিন্তু আমার ও-উপসর্গে দরকার কি, মুকুট নিয়ে কাড়াকাড়ি করুক আমার আত্মীয়রাই।” আমাদের উর্বশী ও গ্রীকদের ভেনাস নাকি পূর্ণযৌবন নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মানবী পলিনের জীবনে প্রথমেই শৈশব এসেছিল বটে, কিন্তু চতুর্দশ বৎসর বয়সেই সে পরিপূর্ণ যৌবনকে লাভ করেছিল, শীতপ্রধান ফ্রান্সে যা সাধারণ নয়। এবং সেই বয়সেই পলিন পাড়ার ছোড়াদের মাথা এমন ঘুরিয়ে দিতে সুরু করলে যে, বুদ্ধিমতী মা লেটিজিয়া ৰােট তাঁর ছটফটে ফাজিল মেয়েটির জন্যে তাড়াতাড়ি বর সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সতেরো বছর বয়সেই পলিন জেনারেল লোকের বউ হ’ল বটে, কিন্তু তার প্রভাবের পরিবর্তন হল একটুও। সে দু'চোখে প্রেম শুরু করলে, যাকে দেখে তাকেই দয়া করে।

বিজলিনী বােনাপার্ট তারপর পলিন তার জাদরেল-বামীর সঙ্গে সম্রাট-ভ্রাতার আদেশে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ওয়েষ্ট ইণ্ডিজে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই বিধবা হয়ে দেশে ফিরে আসে। তারপর ইতালীর খুব বড়-ঘরের ছেলে ও মস্ত ধনী প্রিন্স ক্যামিলো বাের্ভিসের সঙ্গে হল পলিনের দ্বিতীয় বিয়ে। সে কেবল ‘প্রিন্সেস হল না, নেপােলিয়নের দয়ায় একটি ছােট-খাটো রাজ্য ও ‘ডাচেস’ উপাধিও পেলে—কিন্তু কয়লার ময়লা যাবার নয়, পলিন অপরিবর্তনীয়! গেমসমুদ্রের তরঙ্গে তরঙ্গে সে আগেকার মতই ভাসতে লাগল, তার দ্বিতীয় স্বামীর হয় বাধা দেবার শক্তি, নয় বাধা দেবার ইচ্ছা ছিল না; কারণ তাঁর জীবনের প্রধান কাম্য ছিল মাত্র দুটি—এচুর খাদ্য ও প্রচুর নিদ্রা ! এই দুটি পেলেই আর কোনদিকে তিনি ফিরে চাইতেন না। পলিন বা তার স্বামী প্রাপ্ত রাজ্য শাসন করবার জন্যে কোন উৎসাহই প্রকাশ করলে না—ডাচেস ব্যস্ত নিজের দেহ ও পরকীয় প্রেম নিয়ে এবং প্রিন্স ব্যস্ত উদরপূজা ও ঘুম নিয়ে ! ব্যাপার দেখে নেপােলিয়ন দান-করা রাজ্য আবার ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন—যদিও পলিনের ‘ডাচেস’ উপাধি ও আয় বজায় রইল। রাজ্যের রসিক-রুষরা দেখলে, পলিন তার স্বামীর আগে একটুও মাথা ঘামায় না, সে অসীমসুন্দরী এবং তার প্রেমে কোন বাছবিচার নেই, নিত্য-নূতন পুরুষ পেলেই সে খুসি। তখন তারা ধরায় অবতীর্ণ স্বর্গের দেবীর মত পলিনকে মাথায় করে নাচতে লাগল, তার সৌন্দর্য্যের বিজয়- সঙ্গীতে সমগ্ৰ ফ্রান্স বনিত হয়ে উঠল, অন্যান্য প্রত্যেক সুন্দরী প্রেমিকায় খ্যাতি তার কাছে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ল। প্রেম-পাগলী পলিনের আনন্দের আর সীমা নেই, সে তো এইই চায়। নানা শিল্পী, নানা সৈনিক-যুবক সর্বদাই তার দ্বার এবং তাদের এ পলিনের হৃদয়-বারও সর্বদাই উন্মুক্ত। প্রকাশ্য ভাবেই মনের মত পুরুষকে নিয়ে সে নিজের প্রাসাদ ৩ নব যৌবনের কুঞ্জবনে দিবারাত্র উৎসবময় করে তুললে—তার শয়নগৃহে কেবল একমাত্র ব্যক্তির প্রবেশ নিষিদ্ধ হল, তিনি হচ্ছেন তার স্বামী প্রিন্স বােসি। কেবল শন নয়, অনেক সময়ে যে-দেশে সে আসর বসাতে, পলিন তার স্বামীকে সে-দেশের ত্রিসীমানা মাড়াতে দিত না। নেপােলিয়নের চার ভ্রাতাই তাঁর কৃপায় দেশ ও জাতির শীর্ষস্থান অধিকার করেছিলেন। নিজের পরিবারে নেপােলিয়ন ছিলেন দোহনীয় কাময়র মত। কিন্তু সেজন্যে তারা কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নি, শেষ পর্যন্ত একমাত্র জোসেফ ছাড়া তাঁর কোন ভাইই তাঁর সঙ্গে ভালাে ব্যবহার করেন নি। নােপোলিয়ন নিজের দুই বােনকে সিংহাসনের অধিকারিণী করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতকতা, এমনকি ক্যানােলিন তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করবার জন্যে শত্রুদের সঙ্গে গােপনে ষড়যন্ত্র করতেও ছাড়েনি। ভাইকে ভালােবাসত কেবল পলিনই। সুধু নেপােলিয়নকে কেন সৰ ভাইকেই। এবং সে ভালােবাসা এত গভীর ও অসাধারণ যে, নিন্দকের তীব্ৰ চকু সেই নিঃস্বার্থ ভ্রাতৃপ্রেমের প্রতিও জঘন্য কটাক্ষপাত করতে সঙ্কুচিত হয়নি। কিন্তু তার উন্মত্ত প্ৰেমব্যাধির কথা ছেড়ে দিতে দেখিতে পাই, পলিনের অভাব ছিল সত্যই মধুর। এ সম্বন্ধে বহু প্রমাণেরও অভাব নেই। ১৮১৫ অব্দে নেপােলিয়ন যখন সাম্রাজ্য হারিয়ে ক্ষুদ্র এলবা দ্বীপে নির্বাসিত, তখন রাজ্যহারা সম্রাটের পাশে অন্য কোন ভাই-বােনকে দেখতে পাইনা, কেবল দেখি পলিন নিজের প্রজাপতি-জীবন ত্যাগ করে দাদার পাশে গিয়ে তার নির্বাসন-দণ্ডকে যথাসম্ভব সহনীয় করে তােলবার চেষ্টা চেষ্টা করছে। এই করছে। এই করুণা হচ্ছে পলিনের সব চেয়ে বিজয়িনী বােনাপার্ট পলিনের শিক্ষা, জ্ঞান বা বুদ্ধি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু রূপই ছিল তার শ্রেষ্ঠ শক্তি—“সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। বৈঠী আলাপের সময় সে এমন হাস্যমধুর উত্তর দিতে পারত যে, সকলেই তাকে বিশেষ বুদ্ধিমতী বলে মনে করত। বিলাসিতা ও সাজসজ্জাতেও পলিন ছিল অসম্ভবরূপে মুক্তহস্ত। দ্বিতীয়বার বিবাহের সময় পলিন প্রিন্স বােধিসের কাছ থেকে নগদ সাড়ে চার লাখ টাকা ও সাত লাখ টাকার জড়ােয়া গয়না যৌতুক পেয়েছিল। সমস্ত জড়িয়ে তার গহনার ভাণ্ডারে ছিল দেড় কোটি টাকার হীরা, পান্না, মরকত ও মুক্তা প্রভৃতি রত্ন। তার পােষাকের সংখ্যা ছিল ছয় শতেরও বেশী, সে-সবেরও দাম হবে কয়েক লক্ষ টাকা। তার জন্য প্রসাধনসামগ্রীর দাম দিয়ে একটি রাজ্য কেনা চলত। তার গাড়ীর সার, ঘােড়ার সার এবং দামী পােষাক-পরা সহি-কোচম্যান ও দাস- দাসীর সার দেখে সারা রাজধানী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আনাগােনা করত, তখন তার সাজ- পােষাক প্রভৃতি বহন করবার জন্যে সাত-আটখানা মালগাড়ীর দরকার হত। স্বামীর বিপূল আয়েও তার কুলাতো না, দাদার কাছ থেকেও সে লক্ষ লক্ষ টাকা মাসােহারা পেত, তার পক্ষে তাও যথেষ্ট ছিল না। নেপােলিয়ন তাঁর আত্মচরিতে” বলেছেন, “পলিন অত্যন্ত অমিতব্যয়ী। সে নিজেকে একেবারে বিলিয়ে দেয়। আমি তাকে এত সম্পত্তি দিয়েছি যে, তার অত্যন্ত ধনী হওয়াই উচিত। কিন্তু সে যতবার যা পেয়েছে, দু-হাতে উড়িয়ে দিয়েছে। মা তাই তাকে বকতেন ও বলতেন যে,-“তুই গরিব- খানায় গিয়ে মরবি। আঠারো শতাব্দীর ফরাসী রতির দল যতই সুন্দরী ও পােষাকী বিবি হােন, তাদের দেহের আবৃত অংশ ছিল আমাদের পক্ষে অসম্ভব নােং! সে যখন নব যৌবনের কুবনে কারণ তাদের কেউ কেউ গান করতেন নামে দুমালে এবং অনেকেই সারাজীবনেও গানের নাম মুখে আনতেন না। তাদের দেহের দুর্গন্ধ দূর করবার পক্ষে সুগন্ধ দ্রব্যই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়। এ জন্য রীতির পরিবর্তন হয় নেপােলিয়নের যুগেই। পলিন এমন নােয় ছিল না, প্রতিদিন স্নান করে সে দেহকে পরিষ্কার রাখত। এবং তার গানেও নূতনত্বের অভাব ছিল না। প্রাচীন রােমের বিলাসিনী পপ্পিা দুধে মান করত। রূপ-শিল্পী পলিনও নিজের জ্যোৎকার মত মাজা ও তাজা রং অমলিন রাখবার জন্যে প্রত্যহ প্রথমে গরম ও পরে ঠাণ্ডা দুধে তরা চৌবাচ্চায় শরীর ডুবিয়ে ফুটে থাকত দুধ-সায়রে জীবন্ত স্বপ্ন-পারিজাতের মত। একজন কার্জী একজন কাফ্রী চাকর তার রঙিন মােমের পুতুলের মত ছােট্ট নগ্ন দেহ দুইহাতে করে তুলে চৌবাচ্চায় চুবিয়ে দিত। সম্রাট-ভ্রাতা তার ভগ্নীর এই-সব যথেচ্ছাচারিতা সমর্থন করতেন না, তিনি যখন বিরক্ত হয়ে বলে পাঠালেন, তার মতন তরুণীর পক্ষে এ-ভাবে পুরুষমানুষের কোলে ওঠা উচিত নয়, পলিন তখন অতি সরলার মতন দুটি ভাগ আঁখি বিস্ফারিত করে বলে উঠল, “হ। ভগবান! কাফ্রীও আর পুরুষমানুষ নাকি।” ভাঙ্কর ক্যানােভার ভেনাল-মুর্তির আদর্শরূপে পলিন কয়েকদিন দেহের উপর্ক নগ্ন করে বসে থেকেছিল বলে রাজ্যময় আন্দোলন হয়েছিল, কিন্তু সে তা গ্রাহের মধ্যেও গণ্য করেনি। একজন প্রশ্ন করেছিল, “বুক-পেট আদুড় করে বসে থাকতে তােমার অস্বস্তি হয়নি। এখানে ‘অন্তি শকে ‘নারীসুলভ লজ্জাই বােঝাচ্ছে, যে বালাই পলিনের ছিল না। কাজেই তার মাথায় আসল অর্থ ঢুকল না, সে সহজ ভাবেই বললে, “ওমা, অস্বস্তি কেন? ঘরের ভিতরে আগুনের নাংরা ছিল যে বিজয়িনী বােনাপার্ট নগ্ন হতে পলিনের একটুও বাধত না। সারাদিনের অধিকাংশই কেটে যেত তার দেহচর্চায় এবং প্রায়ই সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে দাসীদের সামনে-রবীন্দ্রনাথের ভাষায় কেবলমাত্র সৌন্দর্য্যের নয় আবরণ পরে বিবস্ত্র হয়ে বেড়িয়ে বেড়াত। সে যখন স্নান-খয়ে থাকত, পুরু-অতিখিরা এলে সেইখানেই তাদের সঙ্গে দেখা ও আলাপ করত। কবির ভাষায় তাকে অনুরােধ করতে হত না-ফেল গাে বসন ফেল, ঘুচাও অঞ্চল, বিবসনা মুর্তিতে আবির্ভূত হয়ে লােকচক্ষুকে চকিত ও মােহিত করবার জন্যেই তার আগ্রহ ছিল বেশী। পলিন আর এক ফ্যাশানের প্রবর্তন করেছিল। ভােরবেলায় পুরুষ- বন্ধুরাও তার সাক্ষাৎপ্রার্থী হলে সে শয়ন-গৃহকেই বৈঠকখানায় পরিণত করে এবং শষ্যা থেকে গাত্রোখান না করেই সকলের সঙ্গে কথাবার্তা কইত-শীলায়িত ভঙ্গিতে কোমল উপাধানে ঠেসান দিয়ে। দেখাদেখি তখনকার আরো অনেক বিলাসিনী শষ্যা-বৈঠকের আয়ােজন করে এটাকে প্রথায় পরিণত করলেন। পলিনের প্রেম ছিল খালি মজার প্রেম, ভােমরার প্রেম, তা এককে নিয়ে কোনদিন খুশি হতে শেখে নি। কিন্তু সেই হালকা প্রেমও ছিল এমন মিষ্ট, যে একবার তাকে পেয়েছে সেও কখনাে তার উপরে মাগ করতে বা তাকে ভুলতে পারতনা। পলিনের অনুগৃহীত ও অনুগ্রহ-প্রার্থী বন্ধুরা যেমন তার জন্যে নিত্য নূতন প্রশস্তি রচনা করত, তার শত্রুদেরও বিষাক্ত রসনা তেমনি তার বিরুদ্ধে নিত্য-নুতন অভিযােগ সৃষ্টি করতে ক্ষান্ত হয় নি। কোন কোন অভিযােগ হত গুরুতর, এমন কি ভয়াবহ। বহু অশ্রুতপূর্ব ও একান্ত- কুৎসিত ব্যভিচারের জয়ে তাকে দায়ী করা হত। নেপােলিয়নের অল্পীদের মধ্যে পলিনই ছিল বেশী কুখ্যাত। কিন্তু এজন্যে তার সুন্দর মুখে ১৭ নব যৌবনের কুঞ্জবনে কখনাে একটিমাত্র বিরক্তির রেখা দেখা যায়নি, সব সে হেসেই দিত উড়িয়ে। নেপােলিয়নের হুকুমে মাঝে মাঝে তাকে স্বামীর সঙ্গে নােম ও টিউনিস প্রভৃতি শহরে গিয়ে বাস করতে হয়েছে এবং এইখানেই ছিল তার চরম আপত্তি। নিজের ও ধনকুবের স্বামীর বিপুল আয়ে রােম ও টিউনিস সহরেও তার কোন বিস্ময়কর আকাঙ্ক্ষাও অপূর্ণ থাকেনি বটে, কিন্তু তবু বিদেশে তার বন্য কল্পনা তুষ্ট হতে পারেনা, য়ুরােপীয় সভ্যতার আধুনিক লীলামঞ্চ হচ্ছে পারী-সহর, পশিনের সমস্ত দিবাস্বপ্ন সফল হ'ত কেবল সেইখানেই, তার উদ্দাম নিশ্চিন্ত জীবনের উপযােগী পৃষ্ঠপট প্রস্তুত হত কেবল সেইখানেই! কাজেই দুদিন পরেই আবার পারীনগরের বিপুল জনতা-প্রবাহের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়বার জন্যে সে সব ছেড়ে পালিয়ে না এসে পারত না। আর এক অদ্ভুত বাতিক ছিল এই আশ্চর্য মেয়েটির-হল্লোড় ও যৌবনােৎসবের মধ্য দিয়েই তার জীবন কেটে যেত বটে, কিন্তু তার সব-চেয়ে অনুরাগী বন্ধু ছিলেন উচ্চশ্রেণীর পুরােহিতরাই। তাই তার আনন্দ-সভায় যােগ দিতেন কার্ডিনালরা দলে দলে। ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে পলিনের মৃত্যু হয়। কিন্তু মরণ-কালেও তার স্বভাব বদলায় নি। প্রণের কাণে মৃত্যুর পদশব্দ শুনেই সে নিজের দেহকে প্রস্তুত করতে প্রবৃত্ত হ’লকারণ মৃত্যুও যে পুরুষ, থাবােগ্য বসনে- ভূষণে তার সঙ্গে দেখা না করলে চলবে কেন ? মৃত্যুকে ভয় করা যখন অসম্ভব, তখন সে যেন চাইলে তাকে মুগ্ধ করতেই। অতএব পলিন পরলে তার বাছা বাছা জমকালাে সাজপেযােক সব চেয়ে দামী দামী গহনা। দাসীদের হুকুম দিলে, “আমার চুল ভালাে করে আঁচড়ে দাও, মুখে ভালো করে রং-পাউডার মাখিয়ে দাও, সর্বাঙ্গে নানা পুপলারের ধাৱা ঢেলে দাও।” .

বিজয়িনী ৰােনাপার্ট তারপর ব্যাখি-বশ খর-এর কশিত হতে একখানি আয়না নিয়ে সে টয়ে খুটিয়ে নিজের মুখ দেখলে। কেননা পয়লােক-ৰাত্রা হচ্ছে তার জীবনের স্মরণীয় সর্বশেষ শােভাযাত্রা। তখনাে—সেই চিরনিদ্রা ও চরম বিস্মৃতির পূর্ব মুহূর্তেও তার ভবিষ্য- চিন্তা। সে বললে, “মরবার পর আমার মুখ পুৰু ঘােমটায় ঢেকে দিও। মৃত্যুষতনায় বিকৃত মুখ কেউ যদি দেখে, এই ছিল তার ভয়। নিজের দেহই ছিল পলিনের সাধনার বস্তু, আয়নাতে নিজের মুখ দেখতে-দেখতেই তার চোখের সামনে ঘনিয়ে এল মৃত্যু-আঁধার। তাকে দেখে মৃত্যু বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল কিনা, মানুষের ইতিহাসে তা প্রকাশ পায়নি। তখন তার বয়স মােটে পঁয়তাল্লিশ বৎসর, এবং তখনাে সে সুন্দরী। নেপােলিয়ন বােনাপার্ট যখন অন্তিম শ্বাস ত্যাগ করেন, তার অনেক আগেই তার দিগ্বিজয়ের স্বপ্ন ফুরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু পলিন বােনাপার্ট তার তনু-পসরা সাজাতে সাজাতে পরলােকে বেড়াতে গেল সগৌরবে বিজয়িনী রূপেই।

একটি নাটকীয় দৃশ্য ক্যাথারাইন ছিলেন অপরের পত্নী। সুন্দরী ক্যাথারাইন! তাকে পছন্দ করলে ফসিয়ার সম্রাট পিটার দি গ্রেটের চোখ। পিটার দি গ্রেটের নাম সারা পৃথিবীর ইস্কুলের ছেলেরাও জানে। মনের শক্তি তার অমানুষিক, বুদ্ধি ও প্রতিভ। তার অতুলনীয়। আজ যে অৰ্দ্ধ-সভ্য রুশিয়া প্রতীচ্যের একটি প্রধান অংশ রূপে গণ্য হয়েছে, তার মূলে আছে পিটারেরই প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু আর একদিক দিয়ে পিটার ছিলেন পরও অধম। তিনি প্রাণ কাণ্ডে দণ্ডিত করেছিলেন নিজের একমাত্র পুত্রকে। এবং যখন তার কামের আগুন জ্বলে উঠত তখন তিনি বয়স বিচার করতেননা-এমনকি স্ত্রী-পুরুষ কারুকেই ছাড়তেন না! পিটার সর্বশক্তিমান সম্রাট। পছন্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্যাথরাইনকে গ্রহণ করলেন উপপত্নী রূপে। বাধা দেয় কে ? কিছুকাল পরে ক্যাথারাইনকে তিনি বিবাহ করলেন। একদিকে বর্তমান পিটারের স্ত্রী রুসিয়ার সম্র জ্ঞী ইউদোক্সিয়া ; এবং অন্যদিকে জীবিত কাথারাইনের স্বামীও। খৃষ্টানদের মধ্যে এমন বিবাহ অসম্ভব। কিন্তু রুসিয়ার সম্রাট পিটার ছিলেন এদিক দিয়ে ইংলণ্ডের রাজা অষ্টম হেনরীর মযিনি নিজের মেয়েকেও (অবশ্য উপপত্নীর গর্ভজাত) বিবাহ করতে ছাড়েননি! পাদরীয়া আসেন “অসভ্য ভারতবর্ষে আলােক বিতরণের জন্যে ; কিন্তু পিটাবের হুকুমে তারা দুই চোখে অন্ধকার দেখে এক্ষেত্রে বিয়ের মন্ত্র পড়তে কিছুমাত্র আপত্তি করলেন না।

একটি নাটকীয় দৃ

No text on this page.

একটি নাটকীয় দৃ পিটারের প্রথম স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ইউদোজিয়াকে পাঠিয়ে দেওয়া হল একটি মঠে বা ভিক্ষুণী সংথে সন্ন্যাসিনী রূপে। তার আসন অধিকার ককে ক্যাথারাইন। উপপত্নী হলেন সম্রাজ্ঞী। ইতিহাসে ক্যাথারাইনের অনেক সৎগুণের পরিচয় পাওয়া যায়। পিটারের মধ্যে যখন জেগে উঠত হিংস্র পশুত্ব ও রক্তপিপাসা, তিনি তা সংৰত করবার চেষ্টা করতেন যথাসাধ্য। আরো নানাদিকে তিনি ছিলেন গুণবতী। কিন্তু পিটারের মতন স্বামীকে বড়জোর দেহ দেওয়া যায়, মন দেওয়া অসম্ভব। দাবানলকে মানুষ ভয় করতে পারে, ভালােবাসতে পারেনা। ক্যাথারাইনের গার্হস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন মােয়েন। তিনি যুবক আর রূপবান। কাজের খাতিরে সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে মেয়েনের প্রায়ই দেখাশােনা ও কথাবার্তা হত। মৌখিক আলাপ কমে পরিণত হল আন্তরিক প্রেমে। রাজবাড়ীর ও রাজসভার সবাই ব্যাপারটা জানতে পারলে কেবল পিটার ছাড়া। তিনি একদিকে রাজকাৰ্য্য ও যুদ্ধবিগ্রহ এবং অন্যদিকে সুরা আর নারী নিয়ে ব্যস্ত। বাঘের গর্তে যে খরগােস বাসা বাঁধবে, হয়তো এতটা তিনি ধারণায় আনতে পারেননি। অবশেষে জাগ্রত হ’ল তার নেই। তিনি গুপ্তচর নিযুক্ত করলেন। তারপর একদিন আড়াল থেকে স্বচক্ষে দেখলেন প্রেমিক-প্রেমিকার সমস্ত শীলাখেলা। উন্মত্ত হয়ে উঠল পিটারের পশুত্ব। প্রথম ক্রোধের প্রচণ্ড আবেগে পিটার দুই অপরাধীকেই একসঙ্গে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু বুদ্ধিমান বা পরামর্শ দিলেন, “সম্রাট, এখন এদের বধ করলে সব যৌবনের কুবনে বারের সবাই এই কেলেঙ্কারির কথা জানতে পারবে। এ ব্যবস্থার সরকার। অঙ্গ ব্যবস্থাই হল। সকলে জানলে, সম্রাটের বিরুদ্ধে বড় করার অপরাধে মােয়েন ও তার ভগ্নী আনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখানে একথাও বলে রাখা ভালাে, আনীও ছিলেন পিটারের উপপত্নী। পাছে বন্দীদের মুখে কলঙ্ককাহিনী প্রকাশ পায়, সেই ভয়ে পিটার তাদের ত্রিসীমানায় আর কারুকে যেতে দিতেন না। সম্রাট স্বহস্তে নিয়ে যেতেন বন্দীদের খাবার। কিন্তু মােয়নের প্রেম ছিল খাটি। সম্রাজ্ঞীর লজ্জার কথা কখনােই সে প্রকাশ করতনা। কারণ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযােগকেই সে সত্য বলে স্বীকার করলে। পাছে সম্রাজ্ঞীয় নিল। রটে, সেই ভয়ে মােয়েন বললে, “হ্যা, আমি অপরাধী। সম্রাটের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছি। বিচারে মােয়নের হ’ল প্রাণদণ্ড। আনীকে বেত্রাঘাত করে সাইবেরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। বধ্যভূমি। চারিদিকে লােকারণ্য। শেৰ-দৃশ্যটা উপভােগ করবার এতে সম্রাটও উপস্থিত। আতকের কুঠার উঠত এবং নামল। হতভাগ্য মােয়নের মুহীন দেহ মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল। কিন্তু তবু পৰিপ্ত হলনা পিটারের নিষ্ঠুরতা। তিনি কুম দিলেন, *একটা খুঁটির ওপরে মুণ্ডটা বসিয়ে দাও।” খুঁটির উপরে মােয়নের রক্তাক্ত ছিন্নমুণ্ড দৃষ্টিহীন দৃষ্টি মেলে স্থির হয় রইল।

একটি নাটকীয় দৃশ্য পিটার বললেন, “সম্রাজ্ঞীকে ডেকে আনন।” ক্যাথারাইন সেখানে এসে দাঁড়ালেন। পিটার কঠোর হাসি হেসে বললেন, “সম্রাজ্ঞী, ওদিকে চেয়ে দেয়। আমার ইচ্ছা ঐ খুঁটির চারিদিকে তুমি একবার ঘুরে এস।” নীরব পাথরের মূর্তির মত ক্যাথারাইন দেহহীন প্রিয়তমের সেই চুনাম্পদ মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। পিটার তী-দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে লাগলেন, সম্রাজ্ঞীর মুখের উপরে নিদারুণ যন্ত্রণার কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় কিনা। কিন্তু ক্যাথারাইনের মুখ একেবারে শান্ত। ধীর অথচ দৃঢ় পদে তিনি খুঁটিটাকে প্রদক্ষিণ করে এলেন। বাইরের জগতের কেউ জানতে পারলে তার গোপন প্রাণের কলনের ইতিহাস। সম্রাট মনে মনে গুমরােতে লাগলেন, নিল আজোশে। এর পর পিটার আর কোনদিন ক্যাথারাইনের শয়নগৃহে প্রবেশ করেননি।

ডেভিড গ্যাৱিক ডেভিড গ্যানিক (১৭১৭-১৭৭৯) আল অমর হয়ে আছেন। বিয়ােগাল্ড নাটকে অভিনয় করে তিনি সমগ্র ইংরেজ জাতির এতখানি খাদ্ধা ও সম্মানের পাত্র হয়েছিলেন যে, ব্রিটানিয়ায় সুসন্তানরূপে তাঁর হে ওয়েষ্টমিনিষ্টার অ্যাবির জাতীয় সমাধি-গৃহে আশ্রয় লাভ করেছে, ইংলণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণীগণের সঙ্গে। কিন্তু পেগ ওফিংটনের নাম আজ কে জানে? সুন্দরী পেগ এক সময়ে ইংলণ্ডের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী রূপে সকলের সুপরিচিত ছিললােকর মুখে মুখে ফিরত তার নাট্যনিপুণতার আর প্রেমের কাহিনী। পেগ না থাকলে আজ গ্যারিককে কেউ চিনত না। কিন্তু পেগ ওফিংটনের নাম আজ বিশ্রাম করছে বিশ্বতির গর্ভে। আজ আমরা পেগের প্রেমের গল্প বলব। এই গল্পের ভিতরে গ্যাবিকের গুপ্ত চরিত্র ও হীন মনােবৃত্তির যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যাবে। যবনিকার অন্তরালে গ্যারিক যে কোন শ্রেণীর জীব ছিলেন এ কথা যারা জানতে চান, তাঁরা পেগ ওফিংটনের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু বয়স জীবনকাহিনী পাঠ করুন। কাজলকালাে চোখ, খনুকের মতন সুবমি ভুরু, সমুল লােহিত ও পিঙ্গল বর্ণ কেশদাম এবং প্রশ-রঙা ওষ্ঠাধর—এইগুলি ছিল পেগের অত্র। তার উপরে ছিল তার প্রাণ-পাগলকরা হাসি-মুর্ভেদ্য হয়- দুর্গও সে-হাসির চোট ভেঙে পড়তে বিলম্ব হত না। A ভেজিত গ্যালি ছুরি লেনের মিষ্টি নেলের গল্প আগেই বলেছি। তার মতন পেগও নিয়শ্রেণীর ভিতর থেকেই আত্মপ্রকাশ করেছে। আজ বয়স থেকেই পেগ ম্যাডাম ভায়ােলেটির acrobatic “তারকা নটীরূপে অভিনয় শুরু করে। বারাে বছর বয়সের ভিতরেই সে সকল রকম ভূমিকাতেই অভ্যস্ত হয়, এমনকি ঐ কচি বয়সে পেগকে বুড়ীর ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হতে হয়েছিল! নকল করবার শক্তি ছিল তার আশ্চর্য রকমের। তারপর পালােয়ানি প্যাচে ভরা অভিনয় ছেড়ে মিষ্টি নেলের মতন পেগও কিছুদিন যালয়ের প্রেক্ষাগারে কমলালেবু বিক্রয়ের কাজ করে। এই সময়ে তার মনে লণ্ডনের থিয়েটারে আসল অভিনেত্রী হবার সাধের উদয় হয়। মাত্র সতেরে শিলিং পকেটে নিয়ে পাড়াগা ছেড়ে সে লণ্ডনে চলে আসে। নানা রঙ্গালয়ে কর্ম প্রার্থনা করে। উনিশটি রঙ্গালয়ের কর্তৃপক্ষ তাকে বিদায় করে দেন। তারপর কভেন্ট গার্ডেন থিয়েটারে সে চাকরি পায়। প্রথম ভূমিকাতেই সে এমন কৃতিত্ব দেখালে বে, তার যশ জনসাধারণের মুখে মুখে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আর দিনের ভিতরেই সে বিলাতের একজন প্রধান অভিনেত্রী বলে গণ্য হ’ল। তখনাে তার বয়স আঠারাে-উনিশ পেরিয়ে যায় নি।••••••এর পর থেকেই তার জীবনকাহিনী উপন্যাসের মতন বিচিত্র। পেগের প্রেম নতুন নতুন ফুলে মধুচয়ন করতে লাগলষয়ের পর স্থায় তার চরণে উপহৃত হতে লাগল। তারপর হঠাৎ তার নাম এ নমহত্যার মামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। আক্তার নাম ছিল দেশের অনেক এণয়ীর ভিতরে একজন। কিছুদিন পরে পেগ শ্রান্ত হয়ে হালামকে বিদায় করে দিতে। সেই নব যৌবনের কুবনে রাগে পেগের নামে নানারকম গল্প রচনা করে হালাম চারিদিকে অটিয়ে বেড়াতে লাগল। মনের দুঃখে পানেত্রে পেগ, ম্যাকলিন নামে আর এক অভিনেতার (এবং সম্ভবত তার প্রণয়ী) কাছে গিয়ে বিপদের কথা বলল। তখন ডুয়েলের যুগ চলছে। ম্যাকলিন কিন্তু পিস্তল বা তরবারির জন্যে অপেক্ষা করলে না। কাঙ্গা হয়ে তখনি ডাক্তার হালামের বাড়ীতে ছুটে গেল এবং আলামকে বেশ ঘা-কয়েক দিয়ে বললে, ফের যদি সে পেগের দুর্গা রটার তাহলে দেখতে পাবে মজাটা ! ভাক্তারের কাছে ছিল তরবারি, সে তাই নিয়ে ম্যাকলিনকে আক্রমণ করলে। ম্যাকলিন পাশ কাটিয়ে আক্রমণ এড়িয়ে হাতের বেতের ছড়ী দিয়ে ডাক্তারের মুখে মারলে এক খােচা। ছড়ী ডাক্তারের চক্ষু ভাে করে একেবারে মস্তিষ্কে গিয়ে ঠেকল এবং তার তখনি মারা পড়ল। ম্যাকলিন বন্দী হল, কিন্তু আদালতের বিচারে পরে মুক্তিলাভ করলে। ঠিক এই ঘটনার পরেই পেগের সঙ্গে গ্যারিফের দেখা হয়। গ্যারিক একটি ছােটখাটো মানুষ—তার আকার কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ করত না। তৰে তার মুখ-চোখ ছিল মুত্র ও তার কবর ছিল মধুর। তিনিড়ী ছিলেন। এত লোক থাকতে পেগ নে তাকেই পছন্দ করে বেছে নিলে, এজতে তিনি নিজেই কম অবাক হন নি। গ্যারি মদের ব্যবসায়কে ঘণা করতেন। তাই শুনে পেগ তাকে যালয়ে আসতে অনুরােধ করলে। গারিক রাজি হলেন না। পেগ তখন তাকে বুঝিয়ে দিলে জনপ্রিয় অভিনেতার কত বেশ মানি পান। গ্যালিৰে পাৰ ছিল অত্যন্ত কৃপণ। টাকা লােগায়কেই তিনি জীবনের একমাত্র কাম্য বলে ভাবতেন। পেগের মুখে অগিনেজার ডেভিড় গ্যারিক মাহিনার পরিমাণ নেই তাঁর আর কোন আপত্তি রইল না, তিনি নট জীবন গ্রহণ করলেন। *পেগ তখন নিলেই গ্যারিকের অভিনয়-শিক্ষার ভার গ্রহণ করলে। পেগের শিক্ষাগুণে গ্যারিক অল্পদিনের ভিতরেই যশস্বী হয়ে উঠলেন। গ্যারিকের মতন স্বভাবের লােকের কাছ থেকে যতটা ভালােবাসা আশা করা যায়, ততটা ভালােবাসা থেকে পেগ অবশ্য বঞ্চিত হয় নি। গ্যানিক ৰখন চরম যশের শিখরে উঠেছেন, অসংখ্য নারী তখন তার প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু পেগ যতখানি ভালােবেসেছিল গ্যারিকে, তত ভালােবাসতে আর কেউ পারে নি। তারা দুজনে একসঙ্গে অনেক ভূমিকায় অভিনয় করলেন। তারপর তাদের আসন্ন বিবাহের সংবাদ প্রচারিত হল। কি বিবাহের নির্দিষ্ট তারিখ বারবার পিছিয়ে গেল-গ্যারিকের আপত্তির জয়। বিবাহ যেই আসন্ন হয় অমনি গ্যারিকেরও দুর্ভাবনা হ, বিবাহের জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে হবে তাে! সংসারের খরচ তারা পালা করে চালাতেন। এক মাস পেগের টাকায় সংসার চলত, আর এক মাস গ্যারিকের টাকায়। বাড়ীতে যে-সব অতিথি-অভ্যাগত আসতেন, সাধারণত তাঁরা ছিলেন গ্যারিক ও পেগ দুজনের বন্ধু। কিন্তু তারা এই ধরে ফেললেন গ্যালিক ও পেগের অতিথিশংকারের পার্থক্যটা। ফলে কিপ্টে গ্যারিকে পালার সময়ে বাড়ীতে সহজে অতিথি-অভ্যাগত আসতে রাজি হতেন না—তারা পেগের পালার অপেক্ষা থাকতেন। শেষটা বিবাহের দিন যখন আর পিছিয়ে দেওয়া চলে না, গ্যাব্রিক ন বাধ্য হয় পেগের একটি বিবাহের আংটি এ করলেন। কিন্তু নব যৌবনের কুখবনে এই আংটি কেন এত টাকা খরচ হওয়াতে গরিকের মনে কিছুমাত্র শান্তি ছিল না। আংটিটি পেগকে উপহার দিতে গিয়ে গ্যাবিক মনের কষ্ট ফোস করে এক প্রবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পেগের মেজাজ গেল চটে। সে বেঁকে বসে বললে, “তােমার মতন কিপ্টে লােককে, আমি কখনই বিবাহ করব না।” গ্যারিকের খড়ে যেন প্রাণ এল। তিনি বললেন, “তুমি আমাকে বাঁচালে পেগ! বিয়ের জন্যে আমি অত টাকা খরচ করতে পারব না। তুমি আমাকে মুক্তি দাও।” পেগ বললে, “বেশ, তাই সই। গ্যাৱিক বিদায় হলেন। তিনি যেসব উপহার দিয়েছিলেন, পেগ আবার তাকে সেগুলি ফিরিয়ে দিলে। কিন্তু পেগের কাছ থেকে তিনি যে-সব মুল্যবান উপহার পেয়েছিলেন, তার একটিও তিনি ছাড়তে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, “পেগ, এগুলি আমার কাছে থাক, কারণ এ-সব জিনিষ আমাকে তােমার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।” পেগ রাগের মাথায় বিদায়কালে গ্যারিককে সদর কথা বললে না, কঠিন সত্য কথাই বললে। তারপরে গ্যারিকের সামনে যখনই পেগের নাম উঠত, তিনি তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করতে ছাড়তেন না। অথচ এই পেগের জন্যেই তিনি সমস্ত যশ ও অর্থ অর্জন করেছেন এবং এই পেগের কাছেই তাঁর অভিনয় শিক্ষার হাতে খড়ি! গ্যারিকের ভক্তরাও পেগকে ছলা-কলাময়ী দুই নারী বলেই জানত। কিন্তু সেই দুর্নীতির যুগে একাধিক প্রণয়ীর জন্যে পেগকে দোষী করলে চলবে না-তখন একাধিক প্রণয়ী অনেকেরই ছিল। এ ছাড়া তার বিরু আর কোন অভিযােগ করা চলে না।

ডেভিড গ্যারিক গ্যারিকের পর এক রহস্যময় পুরুষ পেগেয় প্রেমাস্প হন। সম্ভবত তিনি কোন রাজকুমার। কিছুদিন পরে ইনি সমাজের কোন ভদ্রমহিরার প্রতি আসক্ত হন, কিন্তু পেগের কাছে আগেকার মতই মৌখিক ভালােবাসা জানাতে থাকেন। পেগ এ-ব্যাপারটা টের পেলে। জেনেও আর তার সাধারণ মেয়ের মতন সে কান্নাকাটি বা রাগারাগি করলে না। এক মুখােশপরা বলনাচের সভায় সে পুরুষের বেশে হাজিব হয়ে তার প্রতিযােগিনীর কাছে রাজকুমারের সম্বন্ধে এমন-সব ভয়ানক গল্প বললে যে, মহিলাটি শুনে মুজ্জিত হয়ে পড়লেন। তারপর রাজকুমার তার কাছে আর বেসতে পারেন নি। অভিনেত্রী পেগের যশসৌরভের সঙ্গে সঙ্গে ধন-দৌলতও বেড়ে উঠতে লাগল। কিন্তু তার যত্র আয় তত্র ব্যয় ! সে তার মাকে খুব সুখে রাখলে। তার বােন মেরীও তারই কাছে মানুষ হতে লাগল। এবং আর্ল অফ চোল মঙিলির পুত্র যখন মেরীকে বিবাহ করলেন, পেগ তখন তার ভগ্নীপতির ভার গ্রহণ করলে।••••••বিবাহের আগেই বুড়ে। আর্শ ছেলের কীত্তি শুনে রেগে তিনটে হয়ে পেগের কাছে এসেছিলেন, এই বিবাহের সম্বন্ধ ভাঙবার জন্যে। কিন্তু পেগের সামনে এসে তার রূপ দেখে বুড়োর মাথা এমন ঘুরে গেল যে তিনি এই ভাবতে ভাবতে খুলি হয়ে ফিরে গেলেন,আমার ছেলের যে এমন রূপসী শ্যালিকা হবে, এ একটা মন্তু গর্ব ও ভাগ্যের কথা। পেগের শরীর হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ল, কিন্তু তবু সে রঙ্গমঞ্চের মায়া ছাড়তে পারলে না। একদিন সে রােসালিও রূপে রঙ্গমঞ্চে আবিভূত হল--তাকে দেখে সমস্ত দর্শক আনলে হাততালি দিয়ে উঠল। সেদিন তার মােহিনী মায়ায় ভরা চোখদুটি আরাে সুন্দর দেখাচ্ছিল বটে, কিন্তু নব যৌবনের কুঞ্জবনে অভিনয় শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের ভাব কেমন অস্বাভাবিক হয়ে এল। তার দেহ কাঁপতে লাগল। তারপর সে ভয়-ভরা গলায় এই পংক্তি apture 17-When I make courtsy-bid me-bid me farewell",তারপরেই দু’হাত শুন্যে তুলে “Oh God* বলে চেঁচিয়ে উঠে টলতে টলতে ভিতরে চলে গেল। সকলে তখনি শুনলে, পেগ হঠাৎ পক্ষাঘাত রােগের বারা আক্রান্ত হয়েছে। চারিদিকে হাহাকার উঠল, কারণ সকলেই তাকে ভালবাসত।

বৃদ্ধ রােমিওর অশী জুলিয়েট আভা আইজ্যাক মেনকেনের নাম শুনেছেন? কবি ও শিল্পীর প্রেয়সী হয়ে যে-সব যুবতী আজ ইতিহাসে আপন আপন রূপযৌবনের অক্ষয় ছাপ, রেখে গেছে, মেনকে হচ্ছে তাদেরই একজন। দুর্দমনীয় যৌবন ও বিলাসিনী কল্পনা, মেনকেন ছিল এদেরই সেবাদাসী। তার যৌবনের বিচিত্র অভিযানে ক্ষণে ক্ষণে দেখা যায় জয় ও পরাজয়, বিবাহ ও বিবাচ্ছে, প্রেমের উত্থান-পতন-মেঘ ও রৌদ্র । চিত্ত ছিল কবিত্বে ভরা, তাকে অনায়াসেই উনবিংশ শতব্দীর ফ্রাই বলা চলে। আমেরিকায় তার জন্ম (১৮৩৫) এবং তার আসল নাম ডােলােরস আডিয়স্। প্রায় শৈশবেই সে রঙ্গালয়ে গীতিনাট্যাভিনয়ে নর্তকীর দলে মােগ দেয় এবং দু-দিনেই বিজ্ঞাপনের মহিমায় বিখ্যাত হয়ে ওঠে। মাত্র বারে বছর বয়সেই সে নাকি স্পেনীয় ও ফরাসী ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারত, লাটিন ও গ্রীক ভাষায় বই পড়তে পারত এবং গােটা ইলিয়খানা ইংরেজী ষায় অনুবাদ করে ফেলেছিল। কিন্তু তরুণ বয়সেই অর্জিত এই বিদ্যা, বুদ্ধি ও প্রতিকার সঙ্গে তার প্রেম ও যৌবন কোনদিনই তালরক্ষা করে চলতে পারে নি। তার নাচ দেখতে দেখতে পাই অগণ হইঞ্চির গেলাস উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত। সতেরাে-আঠার বা বিশ বৎসর বয়সে তার প্রথম বিবাহ হয়। কিন্তু কার সঙ্গে এবং কেন যে সে বিবাহবন্ধন স্থায়ী হয় নি, সে কথা করে। নব যৌবনের কুঞ্জবনে কেউ জানে না। তার দ্বিতীয় স্বামী হচ্ছেন একজন ইহুদী সঙ্গীতবিদ, নাম আলেকজাণ্ডার আইজ্যাক মেন। দুদিন পরে তিনিও ছায়ার ভিতরে মিলিয়ে গেলেন। এই সময়ে নর্তকীর দল থেকে নাম কাটিয়ে সে সাংবাদিকের জীবন প্রহণে উদ্যত হয়। কিন্তু তারপরেই আবার নিউ ইয়র্কে গিয়ে রঙ্গালয়ে অভিনেত্রী রূপে যােগ দেয় এবং পৃথবীবিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা জন সি হীনানকে তৃতীয় স্বামীর পদে বরণ তার অভিনয়-শক্তি উল্লেখযােগ্য ছিল না, তবু যে দর্শকরা তাকে সহ করত, সে কেবল তার লীনাচপল যৌবনের উগ্র মাদকতায়। কিন্তু নির্বোধের মত সে যখন “ম্যাকবেথ” ভূমিকা গ্রহণ করলে, মেকেনের লােভনীয় যৌবনও তখন তাকে আর দর্শকদের ক্রুদ্ধ ব্যঙ্গ বিদ্রুপ থেকে রক্ষা করতে পারলে না। সেক্সপিয়ারের নাটকে মাত্র রূপসুন্দর যৌবন কোনই কাজে লাগে না। বিখ্যাত অভিনেতা মার্ডক তাকে ডেকে বললেন, “তুমি উত্তেজক কোন কিছু করবার চেষ্টা দেখ। রঙ্গমঞ্চের উপরে কেবল আসবার সময় ছাড়া তুমি মুখ খুলো না।” এমন কোন কোন মেয়ে আছে, যারা সৎসেতে মেঘলা দিনকে একঘেয়ে মনে হলেইধ-করে বিয়ে করে ফেলে। যেকেনও হয়তো সেই দলের মেয়ে। তৃতীয় স্বামীকে পরিত্যাগ করে এবার সে ইংলণ্ডে গিয়ে নটী লীলা শুরু করলে। তার রূপের ঢেউ স্যাম্পেনের মত লণ্ডনের যুব জনদের হৃদয়কে উত্তেজিত করে দুল, কারণ সে প্রায়-নগ্ন দেহে মঞ্চের উপরে দেখা দিত। গুরুজনদের হিতােপদেশ ও চোখরাঙানি ব্যর্থ করে দলে দলে নবীন ও প্রবীণ রসিকের দশ তার হোটেল-বাড়ীর দরজার মুখে বিপুল জনতার সৃষ্টি করলে। এই ভিড়ের মধ্যে চালস ডিকেন্স, চাল নীছ, ওয়াটু ও জন অক্সফোর্ড প্রমুখ নামজাদা সাহিত্যিক ১ বৃদ্ধ রােমিওর তরুণী জুলিয়েট শিল্পীদেরও মুখ দেখা গেল। প্রেম-পাগলা কবি সুইৰাণ মহা উৎসাহে প্রণের সমস্ত আবেগ কলমের মুখে বর্ষণ করে মেকনের খাতায় সন্তে একটি কবিতা লিখে দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তার প্রেমে উন্মাদগ্রস্থ হ’ল সুইধার্ণের সেক্রেটারী টপ সন পর্যন্ত। কিন্তু এতগুলি বিখ্যাত হৃদয়ও মেনেকে ইংলণ্ডের মধ্যে বন্দিনী করে রাখতে পারলে না। সেখানেও সে চতুর্থ স্বামী গ্রহণ ও ত্যাগ করে বােধ হয় অন্যমনস্ক ভাবেই পঞ্চম বিবাহ করে ফেলেছিল। তারপর পঞ্চমকেও ভুলে সে ফ্রান্সে গিয়ে নতুন আসর পেতে বসল। ঔপন্যাসিক ডুমা চিরদিনই ছিলেন তার মনের মানুষ। সে প্রায়ই বলত, “আমি যদি ফ্রান্সে যাই তাহলে অসাধারণ মানুষ ডুমার উপপত্নী হব!” ফ্রান্সেও গতিয়ের প্রমুখ কবি ও লেখকের দল মেনেকে নিয়ে মেতে উঠলেন রীতিমত। তারপর একদিন রঙ্গালয়ে অভিনয় করতে করতেই সে তার বহু কামনার ধন ডুমার সাক্ষাৎ পেলে। ডুমার যৌবনের স্বপ্ন তখন ভেঙে গেছে--তার বয়স পইষটি, দেহ এমন মােটা যে তাকে দেখলেই মনে হয় যেন একটি পােষা-পরা হিপােপটেমাস। কিন্তু মেনকেনের প্রেমিক দৃষ্টি কদাকার বার্ধক্যকেও আমলে আনলে না, প্রায়- নগ্নদেহেই ছুটে গিয়ে সে নিজের পুষ্টশী পেলব বাহুলতা দিয়ে বুড়ো ডুমার মােষের মতন মােটা গলা জড়িয়ে ধরে তাকে প্রবল আবেগে আ,লঙ্গন করলে ! ডুম। ভারি খুসি! যৌবনীরা তার পাকা গোফ দেখে কাছে ঘেসে বলে বলেই তিনি এখন নজরকে সংযত ক'রে রেখেছেন, নইলে বহুহৃদয়জয়ী ভুমার তরুণ হৃদয় জয় করবার আশা তখনো মেটেনি। সুতরাং আত্মদান করতে তারও বিল হল না। আর সে কী আত্মান।

নব যৌবনের কুঞ্জবনে শত শত গুণী ধনী ও সুন্দর যুবককে কলা দেখিয়ে ভুমা তার নূতন প্রণয়িনীকে নিয়ে দেশান্তরে প্রস্থান করলেন এবং সেখান থেকে পুরকে (ছােট ডুমাও তখন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক) পত্র লিখলেন, “বুড়ো বয়সে আমি আমার শান্তিকে খুঁজে পেলুম। বৃদ্ধ পিতাকে আবার ছো রােমিওর ভূমিকায় দেখে ছোট ডুমার ক্রোধ ও লজ্জার সীমা রইল না! কিন্তু বুড়ো ডুমা নূতন প্রেমে অটল!•••••• অল্পদিন পরেই প্যারি শহরের পথে পথে এক অদ্ভুত ফোটো ফিরি হতে লাগল-এক গর্বময় হাসিমুখ বুদ্ধের মােটা দেহ জড়িয়ে এক তরুণী মৃদু মৃদু হাসছে। তলায় ডুমা ও মেনকেনের নাম লেখা। বৃদ্ধ সাহিত্যিকের এই অশােভন তরুণী-প্রতি দেখে সারা প্যারি শহর অট্টহাস্ট করতে লাগল এবং প্যারি লহর যখন অট্টহাস্য করে তখন তার প্রতিনিও ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র যুয়ােপে! সাময়িক কাগজ- ওয়ালাদের ব্যঙ্গনিপুণ কলমগুলো অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠল, কবি ভার্ণেল একটি ব্যঙ্গ-কবিতাও লিখতে ছাড়লেন না। তখন হতভাগ্যবৃদ্ধ প্রেমিকের হস হল । রাগ করে তিনি মেনেকে ছেড়ে চলে এলেন এবং যত নষ্টের-গােড় সেই ফোটোগ্রাফারের নামে মানহানির মামলা রুজু ক'রে দিলেন। ডুমাই তুলেছিলেন মেনকেনের প্রেমময় চিত্ত-বীণায় শেষ-কাদের ঝঙ্কার! তারপয়েই সে এমন এক শক্ত অসুখে পড়ল যে, তাকে নটী জীবন পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হ’ল। পাদপ্রদীপের তীব্র দীপ্তি নেই, জীবন- খারণের উপৰােগ অর্থ নেই, বুভুক্ষু যুবাদের প্রেম নিবেদন সেই লজ্জাহীন ছােট্ট একখানা ঘর, চারিদিকে আদুড় মলিন দেওয়াল, মাঝখানে নােগশয্যায় শুয়ে আর্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল একা-সুন্দরী মে।ে আপনি লাইনে বৃদ্ধ রােমিওর তরুণী জুলিয়েট প্যারি শহরের বিরাট, উদাসীন হৃদয়স্পন্দন কোনদিন থামেনি, কিন্তু নাগরিকদের দুলালী যুবতী মেকেনের হৃদয়স্পন্দন হঠাৎ একদিন থেমে গেলনগরের পথে পথে তখন উৎসবময় জনতা লুই নেপােলিয়নের বিজয়- ভেরীর বানা গুনে আনন্দগান গেয়ে ছুটে চলেছে! মৃত্যুর সময়ে মেকেনের বয়স হয়েছিল মাত্র তেত্রিশ বৎসর। হাওডু *খােলা তলতার "For a countess I'll make thee, My own pretty maid.* এদেশে নয়, বিলাতেব রঙ্গমঞ্চে যে সব রূপসী তরুণী অভিনয় বা নৃত্যাদি করেন, তাঁদের প্রত্যেকেই যে কোন মুহূর্তে আসল ডাচেস বা কাউন্টেসঅর্থাৎ রাজরাণী হতে পারেন। রঙ্গালয়ে সুন্দরীর নয়নবাণ, যােগ্য পাত্রের হৃদয় বিদ্ধ করতে পারলে কত মুকুট কৌলীন্যগর্ব ভােলে তার অনেক কাহিনী আগেই বলেছি। আরো একটি গল্প শুনুন। ফ্রান্সের অন্যতম দার্শনিক, নাট্যকার ও সাহিত্যিক ভতারের (Francois Marie Arout de voltaire ১৬৯৪০১৭৮৮) নাম নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে অজানা নেই। এই প্রেম-নাট্যের প্রধান নায়ক হচ্ছেন তিনিই। একদিন যতার এক চিত্রকরের সামনে বসে নিজের ছবি আঁকাচ্ছেন, এমন-সময় একটি তরুণী পরিচয়পত্র নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এল। উদীয়মান নাট্যকার ভর দেখলেন, তরুণীর জামা- কাপড়ের ভিতর দিয়ে ফুটে বেরুচ্ছে গরিবিয়ানার নীরব কান্না। কিন্তু তার মুখ! কেবল সুত্র বললেই তার বর্ণনা করা হয়না। লােহার যদি মন থাকত তাহলে সে-মুখ দেখলে তাও গলে যেত।

প্রথম দৃষ্টিতেই হৃদয় হারিয়ে তার তরুণীকে থােলেন, “কি চাও তুমি?” তরুণী বললে, “আমি থিয়েটারে ঢুকতে চাই।” ভয় বললেন, “বেশ, তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে। তুমি থিয়েটায়েই ঢুকবে, আর তােমার পৃষ্ঠপােষক হব আমি।” তরুণীটির নাম হচ্ছে আমােরা। দুদিন বাদেই দেখা গেল, তার করছেন অনােরর পৃষ্ঠপােষণ এবং অরােরা করছেন ভতারের চিত্তশােষণ। অরােরার পাশে না থাকলে ভতারের মুখে হাসি আর ফোটেনা। অরােরা হয়ে উঠল তার চোখের মণি—এমন কি তাঁর এই পূজার প্রতিমার সামনে বসেই ভতার তাঁর নাটক রচনার প্রেরণা পৰ্যন্ত লাভ করতে লাগলেন। কিছুদিন কাটল স্বপ্নের ভিতর দিয়ে। তার পরেই দেখা গেল আকাশে অন্ধ আঁধি। অরােরা সাবিত্রীর দেশেও জন্মায়নি—এমন কি গণিকা লক্ষহীরার পর্যায়েও তার নাম পড়েনা। হঠাৎ একদিন ভতারের আলিঙ্গনের ভিতর থেকে সে অদৃশ্য হ’ল ভয়েরই এক বন্ধুর সঙ্গে। যাবার সময়ে ভরকে এই মর্মে চিঠি লিখে গেল- তুমি মনে কোনাে আমি মরে গেছি। তুমি আমার সমাধি-স্তম্ভের জতে স্মারকলিপি রচনা কোরাে। আর যে ৰে-চটিজুতাে জোড়া আমি সবচেয়ে ভালােবাসি তুমি তা আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। তারপর কিছুকালের জন্যে অরোরার উদয় দেখলে লণ্ডন শহর। তার নব যেৰনের কুবনে নাম লােকের মুখে মুখে। কিন্তু এক ফুলে মধু খাওয়া মৌমাছির ভাৰ নয়। কাজেই ভয়ের বন্ধুর সৌভাগ্যও দীর্ঘকালস্থায়ী হ’লনা। হঠাৎ একদিন Marquis de Gouvernet নামে এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অনােরার কাছে ফুলের তােড়া ও বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এসে হাজির হ’ল। নটী অরােরা হল বাণী। মত। রাণী অপাের। আবার পারী সহরে ফিরে এল, সমাজের সেরা রত্নের কিন্তু তারের মন তখনাে অরােরার প্রতি বিমুখ হতে পারেনি। তার এই অভাবিত সম্মানের জন্যে হৃদয়ের আনন্দ নিবেদন করতে ভতার একদিন রাণী অরােরার প্রাসাদে এসে হাজির। কিন্তু রাণী তাঁর জমকালো পােষাক পরা দরােয়ানকে হুকুম দিলেন তারকে গলাধাক্কা দিতে। তারপর অতীত হল একটি আধটি নয়, পঞ্চাশটি বৎসর। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন—“বৎসরে কি কালের মাপ।” এত বৎসরেও ভতারের প্রেম-প্রদীপের শিখা-পরিম্নান হয়নি। অরােরার যৌবনের উপবনে আর রূপের ফুল ফোটেনা; তার জীবনের সবুজ বসন্ত চলে গেছে এবং শীত এসেছে তুষারের মত শুত্র কেশমালা তার শিয়রে দুলিয়ে। তারও এখন বৃদ্ধ। কিন্তু তাঁর খ্যাতি আজ সারা য়ুরােপে ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশের সম্রাট ও রাজা-রাজড়ারাও আজ তার স্তুতি-গীতা রচনা করে ধন্য হয়। অর্ধশতাব্দী আগে যে-প্রেমাস্পদকে অােরা দরজা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আজ সে আবার তাঁকে সাদরে গ্রহণ করতে চাইলে। ইনে দেখা হল।

ভলভার একজন বলেছেন, "Love at two-and-twenty is a terribly intoxicating draught; at two-and-eighty it is a soothing night-cap.* এবং প্যাকালের মত হচ্ছে। "Love has no age, as it is always renewing itself." প্রাচীন অনােরার হাতে একটি চুম্বনরেখা মুদ্রিত করে দিয়ে ভাল তার বললেন, “শ্রীমতী, এ ছাড়া এখন আর কিছুই আমার দেবার নেই। কিন্তু কোনদিনই আমি তােমাকে ভুলিনি। অয়ােরাও অভিনয় ভােলনি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, “হায়। এক ঘণ্টার জন্যেও অতীতের দিন যদি আবার ফিরিয়ে পাই, তবে তার বিনিময়ে আমার সমস্ত জমিদারী, সমস্ত ধনরত্ন, সমস্ত গাড়ী-ঘােড়া আমি বিলিয়ে দিতে পারি!*-কথায় ভরও কি হারবার পাত্র। তিনি বললেন, “শ্রীমতী, সেই অর্ধ শতাব্দী আগেকার একটিমাত্র চুম্বনের জন্যে আমার সমস্ত শশান-অমরতা এখনি আমি অকাতরে দান করতে পারি। সমাধির সামনে দাড়িয়ে এই পূর্ণমিলন! কয়েকদিন পরেই ভর্তার অন্তিম খাস ত্যাগ করলেন। এবং তারই ঘণ্টায় পরে অরােরার জীবননাট্যের উপরে যবনিকা টেনে দিলেন, মহাকাল।” বাংলা রঙ্গালয়েও যে ‘নােমাঙ্গ’ নেই তা নয়। শলিত কলার সকল ক্ষেত্রেই মদন-ঠাকুরের পদধ্বনি শােনা যায় ঘন ঘন। কিন্তু এখানকার প্রেমের ইতিহাস অপরাধের ইতিহাস এবং তা প্রকাশ করাও মস্ত অপরাধ। অবশ্য তার কারণ অনুমান করা কারুর পক্ষে কঠিন নয়।

নৰ যৌবনের কুবনে সব দেশেই জালয়ের ভিতরে নারীরা সাধারণত হর লীলাময়ী (ইংরেজী flirt শয়ে এর চেয়ে ভদ্র বাংলা আর পেলুম না)। এবং লীলাময়ী যে পুরুষের কামনাকে সহজে আগ্ৰৎ করে সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই। সেই কারণেই রঙ্গালয়ের মধ্যে পঞ্চশয়ের প্রভাব-প্রতিপত্তি এত বেণী। অনেক কবি আবার লীলাময়ী-নারীর অব করেছেন। Congreveএর এই চার পঙক্তিই তার নজীর :- "False though she be to me and love, I'll ne'er pursue revenge ; For still the charmer I approve, Though I deplore her change." লীলা হচ্ছে নারীদের নিজস্ব আনন্দ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অধিকাংশ তরুণীই এই লীলার দ্বারাই করে জীবনকে উপভােগ। একজন লেখক স্পষ্টই বলেছেন “All women flirt, except those unfortunate wretches who can't ; and they would if they could." এবং কবি Grey পর্যন্ত নারীজাতির এই লীলার কথা এই ভাষায় ব্যক্ত *Tis most certain, By their flirting, Women oft have envy shown ; Oft undoing, Others' wooing, Never happy in their own."

ভার এগলসূত্র ধরে এতখানি এগুলুম তো আর একটা দিকও একটুখানি খি। আমরা বলি, কেবল নারীকে দুশেই চলবেনা। দুনিয়ায় কেবল লীলাময়ী কেন, লীলাময়েরও অভাব নেই। অনেকেই বােৰ হয় জানা নেই যে, বিলাতী সাহিত্যক্ষেত্রে বিখ্যাত, অমন নে গভীর প্রকৃতির ডাঃ জনসন, মনে-প্রাণে ও ব্যবহারে তিনি পৰ্যন্ত বড় কম শীলাময় ছিলেন না—অবশ্য এর কারণ তার নট, নটী ও নাট্যশালার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কিনা জানিনা। ডাঃ জনসন তো স্পষ্টাস্পষ্টি স্বীকারই করেছেন যে, “If I had no duties and no reference of futurity, I would spend my life driving briskly in a post chaise with a pretty woman." এমনকি, বৃদ্ধ বয়সেও পাশে কোন রূপসী না থাকলে তিনি খুশি হতেন না। তার বুড়াে-বয়সে একবার এক যুবতী তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তিনি কেমন আছেন ? জনসন জবাবে বললেন, “শ্রীমতী, তুমি আমার পাশেই রয়েছ, তবু আমার শরীর বড়ই খারাপ,তাহলে ভেবে দেখ দেখি, তুমি যখন কাছে থাকবেন, তখন আমার অবস্থাটা কি-রকম দাড়াবে ? জনগণের জীবনী-শেখক Boswell, সঙ্গীতবিদ Beethoven, কবি Byron ও Shelley, সাহিত্যিক Swift ও রাজনৈতিক wilkes (Essay on Womanএর কুবিখ্যাত লেখক) প্রভৃতিও ছিলেন প্রথম শ্রেণীর লীলাময়। Wilkes জাক দেখিয়ে এমন কথাও বলতে ছাড়েননি যে, “ইংলণ্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যাণ্ডের ভিতরে আমি তাে সবচেয়ে কুৎসিত শােক। কিন্তু আগে আমাকে পনেয়ে মিনিট সময় গাও, সবচেয়ে ৭১ নব যৌবনের কুবনে.. পুরুষের অমুখ থেকে লক্ষ-চেয়ে সুন্দরীর হৃদয় আমি জয় করে আন।” এবং সত্যই তাঁর এ শক্তি ছিল। বিলাতে এক বিখ্যাত বিজ্ঞপ বা এ- যাও বড় কম লীলাখেলা করেননি। তিনবার বিবাহের পর তিনি যখন চতুর্থ কুমারীকে ভুলিয়ে বিবাহ করেন, তখন নববধূকে যে আংটিটি উপহার দেন তার উপরে এই দুই পংক্তি লেখা ছিল- "If I survive I'll make it five.* অর্থাৎ তােমার পরে যদি আমি বাঁচি, চারকে তবে করব আমি পাই।”

চিরষেবনী নিন নি, নিন। বিচিত্র নারী এই নিন! কাব্যে, পুরাণে বা ইতিহাসে তার তুলনা নেই। সােজা ভাষায় তাকে বারবনিতা ছাড়া কিছুই বলা যায় না। কিন্তু অসাধারণ হলে ঘৃণ্য দ্যও যেমন আলেকজান্দার, চেলীজ, তৈমুর, নেপােলিয়ন ও হিটলার প্রভৃতি গৌরবজনক ও অমর নাম অর্জন করে, নিননের নামও তেমনি ভাবে করে পৃথিবীর বিস্মিত দৃষ্টি আকর্ষণ! অতুলনীয় নিন! Sainte Beuve, Rousseau ও voltaire প্রভৃতি বিশ্ববরেণ্য অমর লেখকের কথা ছেড়ে দি, তারা তো নিননের নাম নিজেদের স্থ সাহিত্য চিরস্মরণীয় করে গিয়েছেন; কিন্তু নিনকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন নি, সতেরো শতাব্দীর ফ্রান্স দেশে এমন লেখক, কবি, শিল্পী বা সাংবাদিক বােধ হয় ছিলেন না। ফ্রান্সের রাজপ্রাসাদ থেকে জীর্ণ পর্ণ- কুটিরে—সর্বত্রই উঠত নিননের জয়জয়কার। দেহের ও মনের সৌন্দর্যের জয়জয়কার। এমন কি ধৰ্মচাৰ্য ও সাধবী নারীরা পৰ্যন্ত নিননের বকে অবহেলা করতে পারতেন না। নিনকে নিয়ে এত আলােচনা হত যে Voltaire বলেছেন –“এই ধারা যদি আরো কিছুকাল চলে, তাহলে শীঘ্রই নিননের ইতিহাস হয়ে উঠবে রাজা চতুর্দশইয়ের ইতিহাসের মতনই একাণ্ড! Rousseau বলেছেন-“অসতী নারীরা সব পাপ করতে পারে। কেবলমাত্র নিন আছেন এই দলের বাইরে। তিনি হচ্ছেন অলােক- নব যৌবনের কুবনে সামান্যা।' তিনি সতীত্বের মর্যাদা রক্ষা করেন না, কিন্তু লােকে বলে- আঁর এভাবে নাকি মা হয়ে উঠি সৎ । .Versailles রাজপ্রাসাদে আজও নিননের প্রতিকৃতি সষছে টাঙানো আছে। ছবিখানি দেখলে বােঝা যায়, সে মুর্তি মনােরম হতে পারে, কিন্তু পরমসুন্দর নয়। যারা তাকে দেখেছেন তারাও বলেন, নিননের দেহ প্রেমিককে খুশি করতে পারলেও রূপের চেয়ে তার প্রকৃতিইকরত বেশী মােহমায়ার সৃষ্টি। কেবল চেখের দেখা দেখেই ক্ষান্ত হলে অধিকাংশ পুরুষই তাঁর পায়ে দাসখৎ লিখে দিতে চাইত না। কিন্তু একবার যে তার সংস্পর্শে এসেছে এবং তার সঙ্গে আলাপ করেছে, হৃদয় সমপণ না করে আর সে ফিরতে পারে নি। ইতিহাস বলে, মিসরের রাণী ক্লিয়ােপেটাও সুন্দরী ছিলেন না। কিন্তু সীজার ও মার্ক অণ্টনীর মতন মহাবীর ও পুরুষশ্রেষ্ঠ বাধ্য হয়েছিলেন তার কবলে আত্মসমর্পণ করতে। তাই তাে বাংলার কবি গেয়েছেন “সুধু রূপে কি করে ? কিন্তু নিননের কেশমালা ছিল চেষ্টনা ফলের মতন সুন্দর কপিশবর্ণ, গায়ের রং ছিল জলশু, ওষ্ঠাধর ছিল রক্তের মত আরক্ত, কপােল দুটি টোল খেয়ে সুমধুর এবং দুটি কালাে চোখ স্বচ্ছ, আগুন-ভরা ও হাসি- রঙিন! এবং তার সর্বাঙ্গের উপর দিয়ে সর্বদা বয়ে যেত উৎফুল্ল জীবনের চঞ্চল প্রবাহ! এইবার নিননের জীবনের একটি চোট রেখাচিত্র দেবার চেষ্টা করব। ৭ সংগভী, শাখাস'। হাওড় দুই নিন হচ্ছে আদরের ভাক নাম। তার আসল নাম as ann de L'Enclos. ১৬১৬ খৃষ্টাব্দে ১৫ই মে তারিখে পারী সহরে তার জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন ভদ্রসন্তান, দ্বৈরথযুদ্ধে ওস্তাদ, চক্ৰী, সঙ্গীতবিদ এবং লম্পট। তার মা ছিলেন সাধারণ গৃহস্থ নারীর মত, কল্পনা বা কাব্যরসের কোন খায়ই পারতেন না। পনেরাে বছর বয়সে নিন হন পিতৃমাতৃহারা। নিন স্বাধীন হলেন, অসহায় হলেন না। তাঁর ছিল সুশিক্ষা, সুরুচি ও দুঃসাহস এবং অবাধ জীবনকে গ্রহণ করবার দুর্জয় শক্তি। ফ্রান্সে তখন সন্দেহবাদ ও এপিকিউরিয়ানের মতবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘মৃত্যুই হচ্ছে চিরনিদ্রা, অতএব জীবনের আনন্দ প্রাণপণে লুণ্ঠন করে নাও। সাহিত্যে ও সমাজে এ ছাড়া কথা ছিল না। “নারীর সতীত্ব হচ্ছে পুরুষের সর্বশ্রেষ্ঠ কাল্পনির উদ্ভাবন। এই উক্তি আধুনিক হলেও নিন মনে-প্রাণে মানতেন। পুরুষ ও নারীর চরিত্রের মাপকাঠি হবে ভিন্নরকম, এটা তিনি স্বীকার করতেন না। সম্ভোগের স্রোতে গা ভাসা দিয়ে নিন প্রথমটা এমন আত্মহারা হয়ে পড়লেন যে দেশের রাণীরও টনক নড়ল! তিনি নিনকে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু ফ্রান্সের এক বিখ্যাত রাজকুমার ( Prince de Conde) ছিলেন নিননের পুরাতন প্রেমিক। কাজেই শাস্তি দেওয়া শম্ভবপর হল না। নিনও নিজেকে সামলে নিলেন। চলতি পথ ছাড়লেন না বটে, কিন্তু নিজের উদ্দামতাকে করলেন সংযত এবং আনন্দকে করলেন নিয়মিত।

নব যৌবনের কুঞ্জবনে দেশের যত সম্রান্ত এবং প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন নিননের প্রেমিক। এবং নিননের শক্তি ও যাদুমন্ত্র ছিল এমনি আশ্চৰ্য্য যে সকলেই একসঙ্গে তার বন্ধুত্বকে স্বীকার করে নিলেন। তাদের পরস্পরের মধ্যে যে কোন রেষারেষি আছে, অন্তত বাইরে কেউ এমন ভাব প্রকাশ করতে পারতেন না। বাঘ ও সিংহকে একসঙ্গে কেমন করে পালন করতে হয়, নিননের কাছে সেটা জানা ছিল না। নিননের বাড়ীতে গেলে কারুর ভদ্রতায় আঘাত লাগবার বা সন্ত্রমহানি হবার সম্ভাবনা ছিল না। বরং তখনকার ফ্রান্সের বহুনিন্দিত সম্রান্ত সমাজে প্রচলিত কোন কুরীতিই নিননের আসরে প্রবেশ করবার পথ পেত না। সেখানে ছিলনা হট্টগােল, অট্টহাসি, ঝগড়া-ঝাটি, জুয়াখেলা, রাজনীতি বা ধৰ্ম্মনীতি নিয়ে তর্কাতর্কি। নিননের স্বাভাবিক সজীবতা ছিল এমন উজল যে সাদা জল পান করেই তার নেশা ও ফুর্তি যেন জমে উঠত। কোনদিন তিনি মদ হেন নি, মাতালকেও হাসিমুখে গ্রহণ করতে পারতেন না। তার কথা বলবার ও গল্প বলবার শক্তি ছিল অদ্ভুত! প্রত্যেক কথাটি ছিল বলে ভরা। শিক্ষার প্রসার ও বুদ্ধির তীক্ষ্মতাও ছিল অসাধারণ। জলন্ত কামনার নন-তিনি ছিলেন এমন উচ্চ মনীষীয় প্রতিমূৰ্ত্তি যে, Rousseau সন্দেহ প্রকাশ করে গিয়েছেন, এ-শ্রেণীর নারীকে চিত্তাকর্ষক উপপত্নীরূপে গ্রহণ করা সম্ভবপর কিনা। কিন্তু নিন কেবল মনীষার জন্যে বিখ্যাত ছিলেন না, বারবিলাসিনী রূপেও তিনি ছিলেন বিখ্যাত। নানা সৎগুণের জন্যে ভক্তেরা নিননের মধ্যে এমন দেহাতীত সৌন্দর্যের চিরযৌবনী সন্ধান পেতেন যে, বয়সের ভারে তার রূপ কোনদিন লুপ্ত হয়ে যায় নি। দেহ নিয়ে যারা ব্যবসা করে, যৌনলীমা পেরিয়েই তারা হয় সর্বস্বান্ত। গণিকা-খীবনের এই চিরন্তন ট্রাজেডি প্রাচীন গ্রীক ভাস্কর্যে অমর হয়ে পাছে। কিন্তু একমাত্র নিন সম্বন্ধেই বলা যায়, তিনি কোনদিন যৌবন হারান নি। তাঁর যৌবন ছিল জয়ার বন্ধু। নিন পঞ্চাশ পার হলেন, ষাট পার হলেন, সত্তর পার হলেন—কিন্তু তার আসরে সম্রান্ত ও যুবক প্রণয়ীর অভাব নেই। নিন আলী পার হলেন। কিন্তু তখনাে তার বাড়ীতে জনতা। নিননের বয়স নব্বই বৎসর। কিন্তু তখনাে বড় বড় ঘরের লােকেরা তার সঙ্গে আলাপ করবার জন্যে উন্মুখ! ভাবছেন রূপকথা? না সত্যকথা ! সারা ফ্রান্সে রটে গেল, নিন চিরযৌবনের গুপ্ত ঔষধ আবিষ্কার করেছেন। ঔষধের নাম জানবার জন্য সকলের আগ্রহের সীমা নেই। কিশাের ভর। বয়স তেরো বৎসর মাত্র। কবিতায় হাত পাকাচ্ছেন। তার ধর্মপিতা এক ধৰ্ম্মৰাজক। ধর্মপিতা একদিন ধৰ্ম্মপুত্রকে নিয়ে নিননের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেলেন। পৃথিবীর অঙ্কের হিসাবে নিনন, তখন বৃব্ধ। অতিবৃদ্ধা। কিন্তু নিননের দেহের বা মনের দৃষ্টি ঝাপসা হয়নি তখনাে। লােক চেনবার ক্ষমতা তিনি হারান নি। বালক তারের সঙ্গে অল্পক্ষ আলাপ করেই বুঝলেন, এ হচ্ছে স্পতির বীজ ! প্রায় শতাব্দীকাল পৃথিবীর আলোেক বাতাস গ্রহণ করে চিরযৌবনী নিন নিলেন মানুষের কাছ থেকে চিরবিদায়। তখন তার উইল খুলে নবযৌবনের কুঞ্জবনে ; দেখাে গেল ভলতারকে তিনি দুই হাজার ফ্রাঙ্কন করে গিয়েছেন। বিলাসের সামগ্রী কেনবার জন্যে নয়, বই কেনার জন্যে। তিন বিখ্যাত পুস্তক Gil Blas-এ নিননকে ছদ্মনামে পরিচিত করে একটি কাহিনী বলা হয়েছে। আমরা আসল নামই ব্যবহার করলুম। প্রাচীন নিন-চিয়তরুণী নিন। তার চারিদিক ঘিরে অতীতের যশােসৌরভ। বর্তমানও গাইছে তার প্রশস্তি-গান। মহাকাল হরণ করেছে তার যৌবনকাল, কিন্তু তখনো তার ফুটন্ত তনুকুসুমের মনমাতানো সুগন্ধ কেড়ে নিতে পারেনি। ভ্যালেরিয়ে নব্য যুবক। বয়স তার পচিশ বৎসর। নিননের প্রেমে সে পাগল। সে নিননের পিছনে পিছনে ঘুরতে লাগল ছায়ার মত। সুযােগ পেলেই নিজের প্রাণের উচ্ছ্বসিত আবেদন জানাতে ভােলে না। তার আবেগ, তার উদ্দামতা দেখে নিন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। অবশেষে তার উত্তাপ ঠাণ্ডা ও উৎপাত বন্ধ করবার জন্যে নিন এক উপায় অবলম্বন করলেন। নিননের আহ্বানে ভ্যলেরিয়াে একদিন তার শয়নগৃহে প্রবেশ করবার সৌভাগ্য অর্জন করলে। প্রাণে তার আনন্দ ধরে না। ভাবলে, এতদিনের বাসনা আজ চরিতার্থ হবে। টেবিলের উপরে একটি ঘড়ী। সেইদিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে নিন বললেন, “প্রিয় ভ্যালেরিয়ে, ঘড়ীতে কটা বাজল দেখছ?” -“দেখছি। ৭ চিরযৌবনী —“ঠিক এই সময়টিতে আমি প্রথম এসেছি পৃথিবীতে। সে আর পঁচাত্তর বৎসর আগেকার কথা। এখন তুমিই বল দেখি, এ বসে আমার পক্ষে আর কি প্রণয়চক্রান্ত শােভা পায়? বাছা, কুৎসিত ইচ্ছা দমন কর, এ-ব্যাপারটা কার পক্ষেই মানানসই নয়।” তবু ভ্যালেরিয়ো নাছােড়বান্দা। সে তখন উন্মত্ত, যুক্তির গান মানে না। আবেগৰুদ্ধ স্বরে বললে, “নিষ্ঠুর নিন, কেন তুমি এমন নিষ্ফল কথা বলছ? কেন তুমি ভাবছ যে, এই কথা শুনে আমি তােমাকে ভুলব? অসম্ভব! আমি তােমাকে যেমন দেখছি তুমি ঠিক তাই, কিংবা কোন যাদুমন্ত্রে আমার চোখ ভ্রান্ত হয়েছে, একথা আমি জানি না জানতেও চাই না। কিন্তু আমি তােমাকে ভালাে না বেসে পারব না। ভালােবাসব—চিরদিন তােমায় ভালােবাসব।” নিন গম্ভীরভাবে বললেন, “তাই নাকি? তাহলে শােননা ভ্যালেরিয়াে আজ থেকে আর আমি তােমার মুখ দেখব না। আজ তােমার সামনে আমার বাড়ীর দরজা হল বন্ধ।” কিন্তু তুচ্ছ দ্বার বা দ্বারবান ভ্যালেরিয়াের দুর্দান্ত প্রেমকে বাধা দিতে পারলে না। প্রেম তার কড়া মদের মত। সে উদ্দাম হয়ে উঠল অধিকতর। প্রত্যাখ্যাত হবার পরেও কাকুতি-মিনতির দ্বারা নিনকে বশীভূত করবার ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়তে পারলে না। তারপর সে মরিয়া হয়ে উঠল একেবারে। একদিন বেপরােয়ার মত নিননের সামনে গিয়ে বললে, “এতদিন অনুনয়-বিনয়ের দ্বারা যা লাভ করতে পারলুম না, আজ বাহুবলের দ্বারা তাই আদায় করতে এসেছি। আজ আর তােমার মুক্তি নেই। তারপরই আক্রমণের চেষ্টা। নিন তাকে বাধা দিয়ে বিকৃতকণ্ঠে বললেন, “ধষ্ট যুবক, ক্ষান্ত হও।

নৰ যৌবনের কুঞ্জবনে আর কোন কথা লুকবে না। কাকে তুমি আক্রমণ করতে চাও? আমি তােমারি গর্ভধারিণী মা। ভ্যালেরিয়ে। স্তম্ভিত। তারপর মাথা নেড়ে বললে, আমি বিশ্বাস করি না। নিন বললেন, “শােনো। ছাব্বিশ বছর আগে পেভ্রে ডি লুনার অর্থাৎ তােমার পিতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। তারই ফলে তােমার জন্ম। ভেবেছিলুম এ কথা আর কেউ জানবে না, কিন্তু তােমার অত্যাচারে আজ বাধ্য হয়েই আমাকে গুপ্তকথা প্রকাশ করতে হল। এর পরেও আমাকে যদি মা বলে ভাৰতে না পারে, তাহলে এখনি চিরকালের জন্যে বিদায় হও।” হতভাগ্য যুবক চিরকালের জন্যই বিদায় হল। বাড়ীতে ফিরে ভ্যালেরিয়া করলে আত্মহত্যা।

মেরিকোট বারাঙ্গনা বলতে আমরা সবাই বুঝি, কামাগ্নি নির্বাপিত বা বি- প্রজ্বলিত করতে পারে এমন কোন জীবন্ত যন্ত্র। কিন্তু বারাঙ্গনার মধ্যে যে মানুষের প্রাণ আছে, সে-প্রাণ কি জীবন- সংগ্রামের ক্ষেত্রে আর কোন কাজে লাগতে পারে না? মেরিকোট নামে একটি মেয়ের কথাই বলি। ইতিহাসে La Belle Liegeoise নামে সে অমর হয়ে আছে। সে এক সম্পন্ন গৃহস্থের মেয়ে। সম্রান্ত বংশের কোন যুবক তাকে ভুলিয়ে ঘর থেকে পথে বার করে আনে। তারপর এসব ক্ষেত্রে যা হয়, তাইই হল। সে যাকে ভেবেছিল রূপকথার রাজকুমার, একদিন দুঃস্বপ্নের মতই তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন কোথায় কে জানে ? কিন্তু মেরিকোর্ট ভীতু মেযে নয়—জীবন-সাগরের উত্তাল তরঙ্গ দেখে সে শিউরে উঠল না, তার ভিতবে নিজের তরুণ তনুর তরণী ভাসিয়ে দিলে হাসিমুখেই, অনায়াসে। তার তনু-তরণীর কত কর্ণধার একত কর্ণধার গেল। এ-শ্রেণীর নারীদের জীবন এই ভাবেই একটা নির্দিষ্ট, অসহায় পরিণামের দিকে এগিয়ে যায় এবং তার মধ্যে বৈচিত্র্য ও আনন্দ খুঁজে পায় কেবল শ্রেণীবিশেষের মানুষরাই। কিন্তু মেরিকোর্টের জীবনের ভিতরে নতুন কোন আগুনের ফুলিঙ্গ নব যৌবনের কুঞ্জবনে লুকিয়ে ছিল। তাই একটা মন্ত জাতিয় কথা বলতে বসেও Carlyle, Michelet ও Lamartineএর মতন বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিকরা পর্যন্ত এই ক্ষুদ্র ফরাসী গণিকাকে অবহেলা করতে পারেন নি। তাদের লিখিত ইতিহাসেই শেমিকোর্টের যথার্থ পরিচয় লিপিবদ্ধ আছে। মেরিকোর্টের যথার্থ রূপ আমরা প্রথম দেখতে পাই ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে, যখন জনসাধারণের প্রাণরক্ষা করবার জন্যে সে আক্রমণােস্থত ফ্লাণ্ডাস রেজিমেন্টের বন্দুকধারী সৈন্যদের পায়ের তলায় পড়ে নিজের বুক পেতে দিয়েছিল! ফরাসী বিপ্লবের সময়ে তার নাম ও বীরত্বের কাহিনী ফিরত লােকের মুখে মুখে। কুম্ভকর্ণের মতন ঘুমন্ত প্রজাশক্তি ফরাসী দেশে যেদিন প্রথম জাগ্রত হয় সেইদিন থেকে মেরিকোটকে সর্বদা সর্বত্রই দেখা যেত বিল্পবের মানস প্রতিমার মত ! সে সময়ে মেরিকোর্টের বুভুক্ষু অগ্নিশিখার মতন মূৰ্ত্তি তা-অতি বড় দেহের পূজারীরও হৃৎকম্প উপস্থিত হত। কারণ তখন তার দেহে নারীত্বের কোন চিহ্নই আত্মপ্রকাশ করত না!••• রক্তের মতন রাঙা পুরুষের পােষাক পরে, কোমরবন্ধে দু-দুটো পিস্তল ঙ্গে বিল্পবের বিপুল শোভাযাত্রার সঙ্গে বিকট স্বরে চীৎকার করতে করতে সে যখন ছুটে চলত, তখন কেউ তার সামনে এসে দাড়াবার ভরসা করত না। যারা বাস্তিলের বিখ্যাত কারগার ধবংস করেছিল, তাদের সর্ব প্রথম ফলের সঙ্গে ছিল এই অপূৰ্ব শক্তিরূপিণী গণিকা মেরিকোট। এখানে আশ্চৰ্য্য সাহসের পরিচয় দিয়ে সে সম্মানজনক এক সরকারী উপহার লাভ করেছিল। পারী সহরের পথে পথে যখন রক্তের বন্যা বইছে, তখন মেরিকোর্ট রাজশক্তির বিরুদ্ধে নাকি-বাহিনী চালনা করবার ভার পেয়েছিল মেরিকোটই। রাজা যখন দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে যায় মন, তখন অন্যান্য বিল্পববাদীদের সঙ্গে অশ্বারােহণে সেও রাজাকে বন্দী করে রাজধানীতে ফিরিয়ে এনেছিল। রাজসৈন্যদের অসংখ্য ছিন্নমুণ্ড বাংলায় বিধে যারা বীভৎস আনন্দে সহর তােলপাড় করে বেড়িয়েছিল, নারী হয়েও মেরিকোট তাদের সঙ্গে সমান উৎসাহে যােগ দিতে সঙ্কুচিত হয় নি। তার উত্তেজনাপূর্ণ ভীষণ বক্তৃতা বিপ্লববাদী পুরুষগণকেও আয়ো- বেণী রক্তপাগল করে তুলত। বিপ্লববাদীদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রস্তাবে নিজের দৃষ্টান্তে অন্যান্য নারীদের উৎসাহিত করবার জন্যে মেরিকোট তার গায়ের সমস্ত দামি গহনা খুলে দান করেছিল। সে-সময় জনসাধারণের উপরে তার জোর ছিল এত বেশী যে, তার একটি মুখের কথার উপরে লােকের মরণ-বচন নির্ভর করত। একবার সে অষ্ট্রিয়ানদের হাতে বন্দী হয়ে ভিয়েনায় গিয়েছিল এবং তাই শুনে অষ্ট্ৰীয়ার সম্রাট পৰ্যন্ত কৌতুহলী হয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই বিষয় নিয়ে তাকে প্রধান পাত্রী করে ১৯০২ অব্দে একখানি বিখ্যাত নাটক লেখা হয় এবং সেই নাটকের অভিনয়ে মেরিকোর্টের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন পৃথিবী প্রসিদ্ধ অভিনেত্রী সারা বার্ণাড স্বয়ং। বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে মেরিকোটেরও রক্ত-পিপাসা যেন বেড়ে উঠল। তখন কোথায় গেল তার দেহের ব্যবসা এবং কোথায় রইল তার পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার প্রবৃত্তি! বিপ্লবের উন্মাদনা ছাড়া এক মুহূর্তও সে স্থির থাকতে পারত না। তার প্রাণের ইচ্ছা ছিল, এই রক্তাক্ত বিপ্লব চিরস্থায়ী হােক।

নব যৌবনের কুবনে কি বিপ্লব তার মতন আরো অনেক নারীর জন্ম দিয়েছিল। ইতিহাসে তারা গিলােটিনের রায়বাঘিনী” বা “furies of the guillotine নামে বিখ্যাত। তাদের মুখের বুলি ছিল-“রক্ত—আরো রক্ত চাই। খুব সম্ভব সারা দেশে মেরিকোর্টের এই প্রতিষ্ঠা তাদের আর সহ হল না। একদিন তারা দল বেঁধে প্রকাশ রাজপথে মেরিকেটাকে ধরে, তাকে উলঙ্গ করে তার সর্বাঙ্গে নিষ্ঠুর ভাবে বেত্রাঘাত করলে। এ অপমান মেরিকোট সইতে পারলে না! বেত্রাঘাতের পরে পথের কাদা থেকে মেরিকোর্টকে তুলেই দেখা গেল, তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এর পর পাগলা-গারদের ভিতরে মেরিকোট বেঁচে ছিল বিশ বছর। পুর্বোক্ত নিদারুণ অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার জন্যে এই দীর্ঘ বিশ বৎসর সে আর জামা-কাপড় পরে নি । নিজের নগ্ন দেহকে গরাদের কাছে টেনে এনে, মাথার উস্কখুস্ক সাদা চুল দুলিয়ে, দু'খানা শুকনাে শীর্ণ হাতে গরাদে চেপে ধরে প্রায়ই সে এক কাল্পনিক জনতাকে সম্বােধন কবে চেঁচিয়ে উঠত, “রক্ত চাই—বিশ্বাস- ঘাতকের রক্ত।” গণিকা মেরিকোর্ট। কিন্তু সে খালি সাহিত্যে ও ইতিহাসেই স্থান পায় নি, ফরাসী জাতিও তাকে অযাচিত অভিনন্দন দেয়। তারা প্রায়ই গণিকা মেরিকোর্টের নামেই নিজেদের বালিকা-বিদ্যালয়ের নাম রাখে।

লা, * শিল্পী-চরিত্রের একদিক ফরাসী কবি Rimbaud বলছেনঃ- I say that one must become a Seer, make oneself visionary. The pɔet becomes a Seer by a vast, prolonged and reasaurd derangement of all the senses, The poet exhausts every form of experience from love to madness, and though the torment is great and social outlawry must result, he becomes finally the repository of the supreme wisdom : For he reaches the Unknown I Since he has cultivated his soul, richer to begin with than any other. And even if, r..addened, he should end by losing consciousness of his visions, he has seen them ! Though he collapse in his wild career among unheard-of and unnameable things, other horrible workers will come forward and they will set out from the horrizon where the other sank down." আমি কবি বলতে শিল্পীকেও ধরতে চাই। অধিকাংশ কবি বা শিল্পীর মনেই যে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ঐ রকম ভাবের উদয় হয়েছে, বহু প্রমাণ দেখে এমন সন্দেহ প্রকাশ করলে আয় হবেনা।

নব যৌবনের কুঞ্জবনে ফ্রান্সে ভিলন, ভ্যালেন, বােদলার, মুলে ও মােপাস প্রভৃতি লেখকগণ রীতিমত নরকে ঝাঁপ দিতেও কুণ্ঠিত হন নি। ইংলণ্ডের অস্কার ওয়াইন্ডকেও আমরা এই দলে নিক্ষেপ করতে পারি। এবং হিসাব করলে দেখা যাবে, পৃথিবীর অধিকাংশ শিল্পীই একেবারে নরক না হয়েও দুষ্ট বা বিকৃত বা অবৈধ প্রেমের জন্যে অল্পবিস্তর পরিমাণে কুবিখ্যাত হয়ে আছেন। যেমন প্রাক্সিতেলেস, মিকেলাঞ্জেলো, সেলিনি, দ্য ভিঞ্চি, গেটে, হাইনে, সেক্সপিয়ার, বাইর, যুগো, দুমা, সুইবার্ণজোলা ঝনুষ, স, জর্জ ইলিয়ট ও দামুনসিয়ো প্রভৃতি—কত আর নাম, করব? ঋষি টলষ্টয় পর্যন্ত এক সময়ে তপােবনে বাস করতেন না। ‘পিউরিটান বা উৎকট পবিত্রতাবাদী মিলটনকেও যৌবনে আমরা গণিকা-গৃহে কবিতা পাঠ করতে দেখেছি। ওয়ার্ডওয়ার্থও ছিলেন অবৈধ সন্তানের জনক। বিখ্যাত গণিকা অডা মেকেনের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্যে চালস ডিকেন্স ও চার্লস রীড লজ্জার মাথা খেতেও সঙ্কুচিত হননি। বােহমিয়া নামে পুরানাে দেশটি আজ জেকো-শ্লোভাকিয়ার অন্তর্গত। সেকালে ঐ বােহিমিয়া দেশে অনেক “জিপসি বা বেদে বাস করত। সবাই জানেন, সামাজিক জীব বলতে আমরা যা বুঝি, বেদেরা সে-শ্রেণীর মানুষ নয়। তারা যাযাবর, পৃথিবীর নানা দেশে তারা ভ্রমণ করে এবং তাদের মধ্যে আমাদের মতন সমাজ-বন্ধন নেই। বেদে-জীবনের এই অবাধ স্বাধীনতা য়ুরােপের লেখকদের দৃষ্টি করেছিল বিশেষভাবে আকৃষ্ট। য়ুরােপীয় সাহিত্যে তাই বেদে-জীবন নিয়ে রচিত মেলােড্রামা, গীতিনাট্য ও রোমান্সের সংখ্যা গুণে ওঠা যায় না।

শিল্পী-চরিত্রের একদিক এই-সব মােমা ও মেলো-ড্রামা অত্যুক্তিপূর্ণ উজ্জ্বল বর্ণনায় বেদে জীবনকে এমন অবাস্তব ভাবে ও লােভনীয় রূপে দেখানো হয়েছে যে, যারা দুর্নীতিপূর্ণ সমাজ-ছাড়া জীবন যাপন করেতে চাইত, তাদের কাছে বেদেয়া হয়ে উঠল আদর্শ মানুষ। ফ্রান্স এই রকম উজ্জ্বল মানুষদের bohemien বলে ডাকা হত। এই মানুষগুলিই আধুনিক সাহিত্যিক বােহিমিয়ানদের অগ্রদূত। শিল্পীর পৃথিবীতে আজ এই নকল বােহিমিয়ানদেরই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বেদে জীবনের ভিতর থেকে যে অপ্রকৃত রােমান্স স্বপ্নবিলাসী লেখকের আবিষ্কার করেছেন, আদি ও অকৃত্রিম বােহিমিয়ারা-অর্থাৎ বেদেরা নিজেরাও তার সঙ্গে পরিচিত নয়। প্রাচীন ও আধুনিক যুগের উদ্ধৃঙ্খল শিল্পীদের মধ্যে পার্থক্য আছে কেবল এক জায়গায়। সেকালে কেউ “বােহিমিয়ান” বলে আত্ম- পরিচয় দিত না। পারী সহরের “লাটিন কোয়াটার বা বােহিমিয়ার অস্তিত্ব বােধ হয় আর নেই। কিন্তু আগে ওখান থেকে ফ্রান্সের তথা পৃথিবীর বহুবিখ্যাত শিল্পী আত্মপ্রকাশ করেছেন। দুর্ভাগ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তারা করতেন বােহিমিয়ান জীবন যাপন। বোহিমিয়ার ব্যভিচার আর অত্যাচারের ফলে অনেকের দেহও একেবারে ভেঙে গিয়েছে—যেমন গল্পলেখক মােপাল।। উনবিংশ শতাব্দীর নবীন ফরাসী লেখকরা বেলা না পড়তেই একটি কফিখানায় গিয়ে হাজির হতেন—সে জায়গাটি মারাত্মক অখাদ্য ও সুতীব্র মুরার জন্যে ছিল অত্যন্ত কুবিখ্যাত। সময়ে সময়ে জেলা প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত বয়স্ক লেখকরাও তাদের দলে গিয়ে ভিড়তেন। সেখান ৮৭ নৰ যৌবনের কুনে থেকেই সবাই নেশার ঘােরে বেরিয়ে পড়ে হট্টগােল করতে করতে মােপাসায় বাসায় গিয়ে হাজির হতেন। মােপাসার এই অদ্ভুত বাসাটি উল্লেখযােগ্য। এ বাসায় ঘর ছিল অনেকগুলাে। পুরুষ-ভাড়াটিয়া ছিলেন মাত্র একজন এবং তিনি হচ্ছেন মােপাসা। বাকী সবাই নিম্নশ্রেণীর গয়িকা! (একজন প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক প্রকাশ্যে এমন জায়গায় বাস করলেও ফরাসী-সমাজের নীতিবােধ আহত হত না, এটুকুও লক্ষ্য করবার বিষয়।) জোলার মত বয়স্ক লেখকরা যাণ সেখানে থাকতেন, নবীন সাহিত্যিকরা ততক্ষণ প্রাণপণে কিঞ্চিং ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। বয়স্করা অদৃশ্য হলেই ঘরের ভিতরে এসে দেখা দিতেন বাসার সুলত রং-পাউডার-মাখা ডানাকাটা পরীর দল এবং সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হ’ভ ঝটপটি, হুড়োহুড়ি মাতামাতি। গলা ফাটত, বােতল ভাঙত, গেলাস গুড়ো হত, ফুর্তির ফোয়ারা ছুটত। মােপাসাঁর পক্ষে এই বােহিমিয়ান জীবনের ফল হয়েছিল ভয়াবহ। মাত্র বারাে বৎসরের মধ্যেই তার প্রকৃত সাহিত্য-জীবনের আরম্ভ ও সমাপ্তি! তারপরে প্রায় যৌবনেই পাগলা গারদে গিয়ে তিনি অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এমনি উচ্ছল জীবন যাপন করে বাইর, ভ্যালেন, মুসে ও বােল্যারও অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাঙালী কবি মাইকেল মধুসূদন সম্বন্ধেও এই কথা বলা যায়। (প্রসঙ্গসুত্রে উল্লেখ (প্রসঙ্গসুত্রে উল্লেখ করছি, আমাদের বঙ্কিমচন্দ্র ও হেমচন্দ্রও বিশেষ শান্তশিষ্ট ছেলে ছিলেন না। এবং নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ও ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র তে। প্রথম জীবনে ছিলেন পুরােদস্তুর বােহিমিয়ান!) tt শিল্পী-চরিত্রের একদিক সাধারণত বােহিমিয়ার আনন্দই হচ্ছে অবাস্তব, কিন্তু তার ট্রাজেতি মিথ্যা নয়। অধিকাংশ বােহিমিয়ান মুখের হাসিখুসি দিয়ে আন্তরিক হাহাকার লুকোবার চেষ্টা করে। অমর ঔপন্যাসিক জেলা প্রথম জীবনে কিছুকাল বােহিমিয়ার অন্ধকূপে বাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন তার উদর থাকত অধিকাংশ দিনই উপুড়-করা থলের মতন খালি। তবু তিনি বিপুল উৎসাহে কবিতার পর কবিতা লিখে যেতেন। কোনদিন জামা-কাপড় বাধা দিয়ে, কোনদিন দু-চার পয়সা ধার করে উদরের শূন্যতা নিবারণ করা হ'ত। যখন ধার দিতে পারে এমন বন্ধুর এবং বাধা দেওয়া যায় এমন জামা-কাপড়ের অভাব, জেলা তখন ছাদের উপরে বসে ফাদ পেতে চড়াই পাখী ধরতেন। এবং সেদিন চড়াই পাখীর ‘রােষ্ট খেয়েই কবিতা রচনায় নিযুক্ত হতেন। অল্প-সমস্যা নিবারণের কি চমৎকার বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত কবিদের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট উপায় ! করছি! কিন্তু এমন অবস্থায় বহিমিয়ান হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অতএব জোলাও বােহিমিয়ানদের উপযোগী একখানি ঘর ভাড়া নিলেন। ঘরের পর ঘর-কোন ঘরে বখাটে ছাত্র, কোন ঘরে গণিকা, কোন ঘরে বােহমিয়ান শিল্পী : প্রত্যেক ঘরের মাঝখানে নিতান্ত পালা ‘পাটিশান এবং নিজের ঘরে বসে জোলা শুনতে পাচ্ছেন, এক ঘরে চলছে প্রেমের পালা বা ফুৰ্ত্তির হট্টগােল—বোতল খােলা বা বােতল ডাঙা হচ্ছে। আর এক ঘরে হয়তো কোন অসুস্থ গণিকা রােগের যাতনায় বিষম আর্তনাদ করছে; আর এক ঘর থেকে আসছে আনন্দের দীর্ঘশ্বাস, আদরের ভাষা ও চুম্বনের শব্দ। মাঝে মাঝে ভীষণ গােলমালে ঘুম ভেঙে যায়, গণিকারা নব যৌবনের কুঞ্জবনে বিষম চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে-পুলিস এসে হানা দিয়েছে তাদের কারুকে কাকে ধরে নিয়ে যাবার জন্যে। জোলার ভাগ্যেও এই জাতীয় একটি নারী-রত্ন জুটতে দেরি হ’লনা- বােহিমিয়ান কি একলা থাকতে পারে? এই সময়কার ঘটনা জেলা তার *Confessions of Claude নামক আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে লিপিবদ্ধ করে বলেছেন-“হায়, সেই অঘটনই ঘটল! আমি ব্যভিচারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলুম! আমার যৌবনকে বিপথগামী করলুম।” জোলার দুর্ভাগ্যের মধ্য থেকেই যেন কলঙ্কিনী প্রণয়িনী আত্মপ্রকাশ করলে। মাসের পর মাস তিনি তার সঙ্গে এক শয্যায় কাল কাটাতে লাগলেন, হয়তো তাকে ভালােও বাসলেন। কবিতা লেখা ও দিবাস্বপ্ন দেখার উপরে তার আর একটি বিলাসিতা হ’ল এই কাম বা প্রেম। কিন্তু তার উদরের অবস্থা হয়ে উঠল আরো শােচনীয়। দুনিয়ায় তিনি একা। ধার দেয়, এমন আর কোন বন্ধুও নেই। ভিক্ষুকদেরও অবস্থা তার চেয়ে উন্নত, কারণ তাদের ভিক্ষা করবার সাহস আছে তার যা নেই। জোলা বলছেন, “এমন দুর্ভাগ্য হচ্ছে নেশার মত। যেন কোন ওষধির প্রভাবে আমার দেহ ও মন আচ্ছন্ন হয়ে আছে,কতখানি দুর্গতি ও নগ্নতার মধ্যে বাস করছি সেটা আর অনুভূতিতেও ধরা পড়েনা। সবাই কী মিথ্যাকথাই কয়। দারিদ্র্য কোন দিনই প্রতিভার জনক নয়। নিরাশা যাদের প্রতিভাকে বিলুপ্ত বা ব্যাভিচারী করেছে, তাদের সংখ্যা গুণে দেখলেই এই সত্য ধরা পড়বে। একদিন হাড়-কাঁপানাে কনে শীত। ঘরে মুখে তােলবার মত কুদ-কুঁড়ােটি পৰ্য্যন্ত নেই। বন্ধুদের দ্বারে দ্বারে ধর্না দিয়ে খালি হাতে শিল্পী-চরিত্রের একদিক তিনি ফিরে এলেন। নিজের গায়ের জ্যাকেটটা খুলে প্রণয়িণীর দিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হতাশ ভাবে বললেন, “যাও, এইটে বাধা দিয়ে যা পাও নিয়ে এস। কেবল সাট পরেই উপর-উপরি শীতের কয়েকটা রাত কেঁপে কেঁপে কেটে গেল। তারপর তার শেষ ‘ট্রাউজার জোড়াও খােরাক যােগাবার জন্যে বাঁধা পড়ল। কিন্তু জোলার দুর্ভাগ্য-সঙ্গিনী তখনাে অটল। তার জন্যেই বন্ধুরা তাকে ধার দিতে চাইত না। তাদের যুক্তি হচ্ছে, যার উপপত্নী আছে তার আবার ভাবনা কি ? অবশ্য এই অভাগী সঙ্গিনীটিও তাকে সাহায্য করবার জন্যে যথাসাধ চেষ্টার ত্রুটি করতনা। ছেঁড়াখােড়া রংচঙে ন্যাড়া, জানলার পর্দা ও বিছানার চাদর কেটে শেলাই করে নিজের ও জোলার জন্যে সে অদ্ভুত সব পােক তৈরি করত। এবং সেই বিচিত্র পােষাক পরে তারা দুজনে রাজপথে অম্লানবদনে বেরিয়ে পড়ে, প্রথম শ্রেণীর বােহিমিয়ানের মতই অন্যান্য গণিকা ও সমশ্রেণীর জীবদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। তারপর এক শুভদিনে জোল। এক পিতৃবন্ধুর কৃপায় ছােট একটি চাকরি পেলেন। বিপুল আনন্দে তিনি বলে উঠলেন, “এতদিনে বােহিমিয়ার কবল থেকে মুক্তি পেলুম!” উনবিংশ শতাব্দীর যে লােকগুলির প্রভাবে য়ুরােপীয় কথা-সাহিত্যের আদর্শ বদলে গিয়েছিল এবং এখনাে অনেকের উপরে যাদের প্রভাব বিদ্যমান আছে, তারা হচ্ছেন ফ্লবেয়ার, টুর্গনিভ, জোলা, দোদে ও গনকোর্ট। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই এদের চেয়ে পরিচিত নাম বড় বেশী নেই। এমনকি বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজেও অনেক বাঙালী নব যৌবনের কুঞ্জবনে লেখকের চেয়ে এদের নাম বেশী বিখ্যাত। রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ হিসাবে এদেয় চরিত্রের একটা দিক নষ্ট করে দেখাতে চাই। ঐ পঞ্চলেখকই ছিলেন উদ-পূজায় অসাধারণ। তাদের খাবায় আসত দেশবিদেশ থেকে। হােটেলে ঢুকে সন্ধ্যা সাতটার সময়ে তারা খেতে বসতেন এবং রাত প্রায় এগারােটা পর্যন্ত চলত তাদের পানাহার। বয়’রা কান্নার ভিতরে ঢুকলেই সবাই উঠে তােড়ে যেতেন এবং ফ্লবেয়ারের ভারিকে গলার বিষম চীৎকারে সারা হােটেল কাপতে থাকত। পারী সহরের হােটেলওয়ালার। এই লেখক কয়জনকে যমের মত মদ্যের ও খাদ্যের প্রাচুর্য দেখে ভাবপ্রবণ জোলা এক-একদিন নিজের দুঃখ ও দারিদ্র্য পূর্ণ অতীত জীবনের কথা স্মরণ করে বালকের মতন কেঁদে ফেলতেন। সকলে মিলে অনেক কষ্টে তাকে আবার শান্ত করতেন। একদিন বিখ্যাত ফরাসী লেখক শাতােব্রিয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে তর্ক উঠল -ফ্লবেয়ার ও দোদে তার পক্ষে এবং জেলা ও টুর্গেনিড তার বিপক্ষে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত সে को তুমুল তর্ক। হােটেলের কর্তৃপক্ষ স্তম্ভিত, বয়’র ভয়ে তটস্থ, অন্যান্য খরিদ্দাররা হতভম্ব! মদের পিয়ালার পর পিয়ালা খালি হয়ে যাচ্ছে, তবু তর্কের অন্ত নেই—কি চীৎকার, কি গর্জন, কি অশান্তি !••••••••এমনি ভাবে তারা গােটা ফরাসী সাহিত্যকে ছিন্নভিন্ন করে দিতেন। একদিন উঠল প্রেমের প্রসঙ্গ। দোলা বললেন, আমার বয়স যখন দশ বছর তখন আমি এক দশ- ১২ শিল্পী-চরিত্রের একদিক বী মেয়ের প্রেমে পড়ি। সে ছিল ধনীর মেয়ে, মস্ত বাড়ীতে থাকত, বাসা পােষাক পরত,আর আমি ছিলুম একেবারে গরিব। প্রতি রবিবারে গীর্জায় তার সঙ্গে আমার দেখা হত। তার চিত নয় করবার জন্যে আমি হরেক-রকম ফন্দি আঁটুতুম । ৰারো কি তেরো বছর বয়সে আমার দেহে যৌবনের সব চিহ্নই ফুটে উঠল। প্রেম তখনাে চলছে। সব কথা ভদ্র-সমাজে ছাপার হরপে লেখা যায়না। টুর্গেনিভ বললেন, “আমি তখন ইতালীতে। পকেটে বেশী পয়সা নেই। একদিন সঁকোর উপরে দাড়িয়ে নদীর দৃশ্য দেখছ, হঠাৎ একটি অচেনা তরুণী পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমার গায়ে কনুইয়ের ওতো মারলে। চমৎকার সন্ধ্যা ! নদীর জলে হাঁসেরা খেলা করছে। ••• ••• ••• আমরা দুজনে আলাপ করতে লাগলুম। গল্প করতে করতে এগিয়ে চললুম। সেদিন আমি প্রেমের আবেগে যেমন উচ্ছসিত, উত্তেজিত ও বেপরােয়া হয়েছিলুম জীবনে আর কোনদিনই তেমন হইনি। আমরা একটি নির্জন গােরস্থানে গিয়ে ঢুকলুম। তরুণী একখানা বড় সমাধি-শিলার উপরে গা এলিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল ফ্লবেয়ারকে তখনকার নবীন লেখকরা গুরু বলে ডাকতেন। ফ্লবেয়ার বললেন, “প্রথম যৌবনে বন্ধুরা আমাকে কুস্থানে নিয়ে যেত। আমার মাথায় থাকত সিকের টুপী, মুখে থাকত চুৱােট। সামনে যে রমণীকে চারপাশে বন্ধুরা বাড়িয়ে থাকত, সেজন্যে কোন সঙ্কোচ হত না। এমন কি মাথায় টুপী মাথায় এষং মুখের চুৱােট মুখেই থাকত। তারপরেই অট্টহাস্য । ৫০০ পেতুম, তাকে নিয়েই নব যৌবনের কুঞ্জবনে লোকে বলে “ঝ নে, পুরুষদের কাছে তুমি হও নরবিদ্বেষী, আর মেয়েদের কাছে হও ভাবপ্রবণ।” ফ্লবেয়ার বললেন, “যা বলেছ! এমন কি যুবতী ঝীকেও আমি ছােট্ট পরী’ বলে না ডেকে থাকতে পারিনা। এগারাে বছর বয়সে আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলুম। উত্তর মিশর—রাত্রি যেখানে কয়লার মত কালো! দুদিকে নীচু নীচু কুঁড়েঘর, মাঝে পথ দিয়ে চলেছ তুমি। অন্ধকারের ভিতর থেকে কুকুররা এমন ক্রুদ্ধস্বরে গর্জন করছে, যেন তােমাকে ভক্ষণ করতে চায় ! চালে মাথা ঠুকে যায়—এমনি একখানা কুঁড়ের ভিতরে তােমাকে নিয়ে যাবে। সেইখানে গিয়ে দেখবে, মাটির উপরে শুয়ে আছে এক রমণী, গায়ে তার সেমিজ ছাড়া আর কিছু নেই—তার দেহের দুই পাশ বরফের মত ঠাণ্ডা-কন্কনে। এই রমণীর পাশে গিয়ে শয়ন কর, উপভোগের সময়েও সে স্থির হয়ে থাকে পাথরের মত। ••• অনুভব করে আনন্দ, অনন্ত আনন্দ !” উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী সাহিত্যের বস্তুতান্ত্রিক গুরুদেবের এই কথাগুলির পরে আর কোন কথা বলা চলে না। পৃথিবীর সব শিল্পীকেই কেউ একই গােত্রভুক্ত করতে চাইবে না। একসঙ্গে শিল্পী ও মানুষ হিসাবে অতুলনীয় অনেকেরও নাম করা যায়। এখানে অন্তত একজনের নাম করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ। ০ ০ ০ মন ১৪ নেপােলিয়নের বাণী সকলেই জানেন নেপােলিয়ন সাধারণ সৈনিকের মতন গোয়ার- গােবিন্দ ছিলেন না। পৃথিবীর ইতিহাসে তার মতন একাধারে যােদ্ধা ও বোদ্ধা পুরুষ দ্বিতীয় পাওয়া যায় না একমাত্র সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত ছাড়া। কেবল যুদ্ধনীতি নয়—রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, সাহিত্য ও আর্ট প্রভৃতি প্রত্যেক বিষয় সম্বন্ধেই তঁার চিন্তাশীলতা ছিল অসাধারণ। প্রেম, না, বিবাহ ও ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর নিজের যা মতামত ছিল, নীচে তার কতক-কতক তুলে দিলুম। এর সঙ্গে একালের অনেকেরই মন হয়তো সায় দিতে চাইবে না, তবু নেপােলিয়নের মতামত হিসাবে এগুলির মূল্য সামান্য নয়। নেপােলিয়ন বলছেন- প্রেম কি ? তীব্র মানসিক উত্তেজনা। যার বশীভুত হলে মানুষ সমগ্র বিশ্বকে ত্যাগ করে কেবল প্রেমাস্পদকেই দেখতে চায়।••••• এমন একপেশে মনোবৃত্তির পরিচয় দেবার জন্যে নিশ্চয়ই আমি গঠিত হই নি।...আমি কখনো সত্যিকার প্রেমে পড়তে চাই-ও নি, পারি-ও নি। প্রেম সৃষ্ট হয়নি আমার মতন চরিত্রের জন্য। আমার উপরে আছে রাজনীতির পরিপূর্ণ দাবি। আমার রাজসভায় আমি কখনো বাড়ী-ভর্তি নারী দেখতে ইচ্ছা করি না। নারী-প্রীতির জন্যে চতুর্থ হেরি ও চতুর্দশ লুই যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

নব যৌবনের কুলবনে নারীর সঙ্গে আর বড়-বেশী ভালাে ব্যবহার করি। এবং তার ফলে সব নষ্ট করে ফেলি। নারীদের পুরুষের সমান অধিকার দিয়ে আমরা অত্যন্ত অন্যায় করেছি। আমাদের চেয়ে প্রাচ্য দেশের বাসিন্দাদের সুবুদ্ধি আছে, তাই তারা নারীকে পুরুষের সম্পত্তি বলে মনে করে। প্রকৃতি যে নারীকে পুরুষের দাসী রূপেই গঠন করেছে, এটা হচ্ছে পরম সত্য কথা। যার রুচি বিকৃত, কেবল সেই-ই নারীর শাসনে আত্মসমর্পণ করতে পারে। নারীদের আমরা যেটুকু সুযােগ দি, আমাদের বিপথে নিয়ে যাবার ও গােলামে পরিণত করবার জন্যে তারা সেই সুযােগের অসদ্ব্যবহার করতে ছাড়ে না। মাঝে মাঝে হয়তো এমন এক একজন নারী দেখি, যারা পুরুষের হিতসাধন করে; কিন্তু তার বদলে দেখা যায় এমন শত শত নারী, যাদের প্রভাবে পড়ে পুরুষ অন্যায় কাজ করে পদে পদে। পুরুষ, নারীকে পেয়েছে সন্তান প্রসব করবার জন্যে। কিন্তু কোন পুরুষের পক্ষে কেবল একটি নারী এই কাজের জন্যে যথেষ্ট নয়। নারী যখন গর্ভবতী বা পীড়িত হয় বা স্তন্যদান করে, তখন সে আর পত্নীরূপে গণ্য হতে পারে না। যখন সে সন্তান প্রসবে অক্ষম হয়, তখনাে তাকে পরী বলে মনে করা যায় না। নারীদের অভিযােগ করবার কি হেতু আছে ? তাদের যে আত্মা আছে, এ-কথা তাে আমরা অস্বীকার করি না—যদিও কোন কোন দার্শনিক এ সম্বন্ধেও সন্দিহান। তারা আমাদের সমান অধিকার চায়। কিন্তু এ হচ্ছে পাগলের দাবি। নারীরা আমাদের সম্পত্তি—আমরা তাদের নই। আমাদের জন্যে তারাই সন্তান প্রসব করে, কিন্তু তাদের জন্যে আমরা করিনা। অতএব পত্নী হচ্ছে স্বামীর নিজস্ব সম্পত্তি—যেমন ফলের গাছ নেপােলিয়নের বাণী হচ্ছে বাগানের মালিকের সম্পত্তি। যখন কোন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে অবিশ্বাসী হয়, তখন সে অবশ্য স্ত্রীর কাছে নিজের দোষ মেনে দুঃখপ্রকাশ করিবে। স্ত্রীর রাগ জল হয়ে যাবে, স্বামীকে ক্ষমা করে আবার সে ঘর- সংসারের কাজে নিযুক্ত হবে। কিন্তু স্ত্রী যদি অবিশ্বাসিনী হয়, তাহলে সেটা স্বতন্ত্র কথা। সে দোষ মানতে ও দুঃখ প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু তবু, তারপরেও এখানে চিরদিনের জন্যেই একটা কিন্তু থেকে যায়। নারী মানুষের জান্তব বাসনার অভাব পূরণ করে। নারী হচ্ছে পুরুষের স্বাভাবিক জীবনসঙ্গিনী এবং কেবল পুরুষের জন্যেই নারীর সৃষ্টি। সুতরাং পুরুষের উচিত হচ্ছে, নারীকে কেবল নারীত্বের জন্যেই গ্রহণ করা এবং তার প্রতি একান্ত ভাবেই আসক্ত হয়ে থাকা। সে যদি তাকে আপনারই অপরাংশ বলে মনে করে এবং তার কাছে নিজের হৃদয়কে অকুণ্ঠিত ভাবে উন্মুক্ত করে দেয়, তবে তারা দুজনেই দুনিয়ার বিশৃঙ্খল লালসার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রাণ নিয়ে দাঁড়াতে এবং জীবনের সমস্ত মাধুর্যকে উপভােগ করতে পারবে। যৌনমিলনের মােহিনী-মায়া কল্পনাকে সুন্দর, দুঃখ-যন্ত্রণাকে শান্ত ও জীবনের আনন্দকে সুবিচিত্র ও মধুরতর কয়ে তােলে। যে-সব হতভাগ্য অথচ নিস্পাপ প্রাণী সারা জীবন অপমানের বােয্য বহন করে, সেই অবৈধ সন্তানদের অবস্থা উন্নত করবার জন্যে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করে এসেছি। কিন্তু এদিকে অতিরিক্ত ঝোক দেওয়া উচিত নয়, কারণ তাহলে বিবাহ-বিধির মূল আলগা হয়ে পড়বে। কেননা, বিবাহ না করলেও সন্তান যদি বৈধ বলে বিবেচিত হয়, তবে খুব কম লােকেই বিবাহ-বন্ধনে বাঁধা পড়তে রাজি হবে।

নব যৌবনের কুঞ্জবনে ইতিহাসের সব যুগেই দেখা যায়, গণিকাদের বিরুদ্ধে মানুষ অশ্রান্ত ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে এসেছে। পৃথিবীতে তবু কোনকালেই গণিকার অভাব হয় নি। হওয়া উচিত নয়। কারণ গণিকার অভাব হলে, পথে সুচরিত্র নারী দেখলে পুরুষরা তাকে আক্রমণ করতে ছাড়বে না। (অর্থাৎ গণিকায়া কামুক পুরুষদের লালসাকে কতকটা প্রশান্ত রাখে এবং সেই জন্যেই তারা সমাজের পক্ষে উপকারী)। এই বিশ্বে যা-কিছু দেখা যায়, সমস্তই ইঙ্গিতে ভগবানের অস্তিত্বকে জানায় একথা খুব-ই সত্য। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত ধর্মই যে মানুষের সৃষ্টি, এটাও খুব স্পষ্ট। পৃথিবীতে কেন এত বিভিন্ন ধর্ম? কেন আমাদের ধর্ম চিরদিনই এখানে প্রচলিত ছিল ধর্ম সৃষ্টির আগে পৃথিবীতে যেসব মানুষ বাস করত, তাদের অদৃষ্টে কি হয়েছে ? প্রচলিত প্রত্যেক ধর্মই পরস্পরকে কলঙ্কিত করবার চেষ্টা করে কেন? তারা কেন সব দেশেই চিরদিন পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে এসেছে? এথেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, মানুষের প্রকৃতি সব দেশেই সমান এবং ধৰ্ম্মযাজকরা সব দেশে সব সময়েই জাল-জুয়াচুরি ও মিথ্যার কারবার না করে পারে নি। কোথা হতে আমি এসেছি, কোথায় আমি অবস্থান করছি, এবং কোথায় আমরা চলেছি? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের ধারণার মধ্যে ধরা পড়েনা। তবু ঐ প্রশ্নই হচ্ছে সব। আমি হচ্ছি কৰ্মীর হাতের কাজ, অামাকে নিয়ে কি করা হবে কর্মীই তা জানেন—আমি জানি না। তবু ধৰ্ম্ম-ভাব এমন সানাদায়ক যে, যার তা আছে সে স্বর্গের আনন্দ বহন করে। ১৮ নেপােলিয়নের বাণী এই সব নানা কারণে, সিংহাসনে আরােহণ করেই আমি ধর্মকে আবার প্রতিষ্ঠিত করেছি। (ফরাসী-বিপ্লবের পর ফরাসীরা দেশ থেকে ধৰ্ম্মকে নির্বাসিত করেছিল)। ধর্মকে আমি মূলের মত, প্রাথমিক ভিত্তির মত ব্যবহার করেছি। আমার চক্ষে ধৰ্ম্ম হচ্ছে সুনীতি, সত্য ও বিশ্বাসের রক্ষক। এবং মানুষের মন এমন ভাবেই গঠিত যে, অনন্ত ও অলৌকিকের প্রতি আস্থা স্থাপন করতে না পারলে সে সুখী হয় না। কিন্তু যারা ধর্ম পচারের ভার নেয়, তাদের অন্যায় আচরণ দেখে ও হাস্যকর কথা শুনে মানুষের ধর্মবিশ্বাস সুদৃঢ় হবে কেমন করে? আমার চারিদিকে যে-সব প্রচারক রয়েছেন, তাদের মুখে সর্বদাই শুনছি তার এই হীন পৃথিবীর কেউ নন, অথচ ঐহিক সুখ-সুবিধা লাভের জন্যে অষ্ট- প্রহরই তাদের লালায়িত হয়ে থাকতে দেখি। পােপ হচ্ছেন স্বর্গীয় ধর্মের সর্ব প্রধান পুরুষ, কিন্তু সবসময়েই তিনি পৃথিবীকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকেন! (এই সব নানা কারণে পােপের পবিত্রতার উপরে নেপােলিয়নের একটুও বিশ্বাস ছিল না বলেই তিনি একাধিকবার তার রাজমহিমার সামনে পােপকে মাথা নত করতে বাধ্য করেছিলেন!) আমি কি বিশ্বাস করি ? আমি বিশ্বাস করি যে, সূৰ্য্যকরের দ্বারা উত্তপ্ত এবং বৈদ্যুতিক প্রবাহের দ্বারা একত্রে বদ্ধ মাটির তাল থেকে মানুষের উৎপত্তি। গরু, ছাগল প্রভৃতি জন্তুদের দেহ কি রাসায়নিক যৌগিক পদার্থের দ্বারা গঠিত নয়? মানুষের দেহও যখন ঐ ভাবেই গড়া, তখন অনায়াসেই বলা চলে যে, মানুষের দেহও হচ্ছে পঞ্চভূতাত্মক বস্তু, কেবল অন্যান্য জন্তুর চেয়ে তাদের গঠন অধিকতর নিখুঁত। ভবিষ্যতে মানুষের চেয়েও নিখুঁত দেহ নিয়ে অন্যকোন জীব পৃথিবীতে আত্মপ্রকাশ করবে না, এ-কথা কে বলতে পারে ?

নব যৌবনের কুঞ্জবনে শিশুর আত্মা কোথায়? আত্মা তত দেহের অনুগমন করে ;-শিশুর বয়সের সঙ্গে সে বর্ধিত হন এবং বন্ধক্যের ক্ষয়ের সঙ্গে সে ক্ষুদ্রতর হয়। আত্মা অমর ও অক্ষয় নয় । তবু ভগবানের ধারণা হচ্ছে সবচেয়ে সহজ। এই বিশ্ব নিখিল কে সৃষ্ট করলে ? এই প্রশ্ন এবং উত্তরে মাঝখানে যে বিপুল রহস্যের বিরাট যবনিকা দুলছে, তার ওপারে যাবার শক্তি আমাদের আত্মার এব ধারণার মধ্যে নেই। এখানেই উচ্চতর শক্তির আভাস পাওয়া যায়। •• সৈনিকরা কি ভগবান মানে? তাদের চারপাশে এত মৃত্যুর ছড়াছড়ি। Nartes-এর বিপকে আমি সুখিয়েছিল, মরণের পরে জানোয়ারা কোথায় ? এবার গোনােয়ামে মা হচ্ছে আর এক কমে, তাই তাদের জন্যে বিশেষ এক নরকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পৃথিবী-সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই যদি ধৰ্ম্ম সৃষ্ট হত, তাহলে আমারও ধর্মে আস্থা থাকত। কিন্তু Sociates, Plato, Muses & Mohammed-এর মতামত পড়ে আমি ধম্ম-বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। বন্ম মানুষের কল্পনা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Naba Joubaner Kunjabane

Author
Ray,hemendrakumar
Title
Naba Joubaner Kunjabane
File name
Naba Joubaner Kunjabane
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2010/04/29
Publisher
Biswanath Publishing, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Dipsikha Library, Howrah
Classification
History Of Europe
Keywords
Madam Dubaree
DLI number
515080
Barcode
4990010016799.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ktiT8bORM90
Download PDF

Naba Joubaner Kunjabane