Bally Sadharan Granthagar

Sadanander Bairagya

Bandyopadhyay, Sri Charuchandra · 2009/08/18

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সদানন্দের বৈরাগ্য
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
সুধাকৃষ্ণ বাগচি
১৪াবি ভুবনমােহন সরকার লেন
কলিকাতা

আখিন ১৩৪২
দুই টাকা
প্রকাশক কর্তৃক সর্বস সংরক্ষিত
মিটা-
শ্রীধাকৃষ্ণ বাগচি
মিহিরচয় ঘােষ
১৪১ বি, ভুবনমোহন সরকার লেন নিউ সাহা বেদ
কলিকাতা ২৩ শ চ্যাটারি , কলিকাতা

সদানন্দেৰ বৈরাগ্য

..
موت .. ابو بنيه ار -
maria
১২২
! محمد
---
.
- raو -
es
Y
২১
rel
polo
-Swien: elt
مربع
711
ماسی به

বাপ-মায়ে বড় সাধ করিয়া তাহার নাম রাখিয়াছিল
সদানন্দ। পাড়ার দুষ্টলােকেরা তাহাদের স্নেহের ভুলটাকে
সংশােধন করিয়া তাহাকে নিরানন্দ বলিত।
সে ছেলেবেলা হইতেই কেমন অনাবশ্যক গম্ভীর।
শৈশবে সে ‘তাই তাই’ করিয়া হাসে নাই। বাল্যে
পাঠশালায় গিয়া চঞ্চলতা প্রকাশ করে নাই। এজন্য
তাহার সহপাঠীরা তাহাকে গুরুমশায় বতি। এখন
সদানন্দ যৌবনপথের অনেকখানি অতিক্রম করিয়া
আসিয়াছে, এখন ত তাহার না হাসিবারই কথা।
সদানন্দ হাসে নাই, কিন্তু তাহার যথারীতি বিবাহ
হইয়াছে; এবং গুটিকত কলকাকলিতে তাহার গৃহ মুখর
হইয়া উঠিতেছে।
এইসব ব্যাপারগুলা সদানন্দের জীবনের সঙ্গে ঠিক খাপ
খাইতেছিল । প্রথম, বিবাহ ব্যাপারটাই তাহার

সদানন্দের বৈরাগ্য
গাম্ভীর্যের প্রতি নিষ্ঠর উপহাস-বাপ-মায়ের দারুণ
ষড়যন্ত্র। ছাদনাতলায় শালা-শালীতে কান মলিয়া,
বাসরঘরে বিদ্রুপ করিয়া, কথায় কথায় ঠকাইয়া সদাননের
গাম্ভীর্যকে টলটলায়মান করিয়া তুলিয়াছিল।
স্ত্রীটি ত অপরিবর্জনীয় উপদ্রব। খাও দাও থাক;
তা না, তাহার আবার সখ কত! হাসি চাই, ঠাট্টা চাই,
রসিকতা চাই। সদানন্দের প্রাণ এই এক কোথাকার-কে
-উড়িয়া-আসিয়া-জুড়িয়া-বসা অত্যাচারীর উৎপাতে ত্রাহি
ত্রাহি ডাক ছাড়িতেছিল। বেচারার বারবার মনে হইত
“স্ত্রীর চাইতে কুমীর ভালাে
বলে সৰ্ব্ব শাস্ত্রী।
কুমীর ধরলে ছাড়ে তবু,
ধরলে ছাড়ে না স্ত্রী।
বিবাহের দুচার বছর পরেই স্ত্রীটি নূতনতর
উপদ্রবের
পন্থা আবিষ্কার করিল। বছরে একটি করিয়া শিশুর
আমদানীতে ঘর ভরিয়া ফেলিবার উপক্রম। শুধু কি তাই।
শুধু তাই হইলেও ত সদানন্দ বাঁচিত। শিশুগুলা আবার
হাসে। তাহারা নাচে, গায়, বত্রিশ রকম মুখভঙ্গী করে,

সদানন্দের বৈরাগ্য
সদানন্দের ভীষণ গম্ভীর শ্মশ্রুবহুল মুখ দেখিয়া একটুও ভয়
করে না, বরং তাহাদের আক্রোশ তাহার দাড়ির উপরেই
অধিক। এইসব দেখিয়া শুনিয়া সদানন্দের গাম্ভীৰ্য্য রক্ষা
করা অনেক সময় দুঃসাধ্য হইয়া উঠিত।
গায়ের লােকেরাও কি কম উৎপাত করে। তাহারা
সদানন্দের অমন গাম্ভীর্য্যের কিছুমাত্র খাতির না করিয়া
কেহ বা তাহার মাথায় চঁটি মারে, কেহ বা গায়ে হুকার
জল ঢালিয়া দেয়, কেহ বা তাহার দাড়ি ধরিয়া টানে।
বাল্যাবধি লােকের অভদ্র উৎপাতে সদানন্দ মনে
মনে ভারি বিরক্ত হইতেছিল। ক্রমে তাহার গৃহ যখন
পাচ ছয়টি শিশুর ক্রন্দনে কোলাহলে আবদারে অতিষ্ঠ
হইয়া উঠিল, তখন একদিন সদানন্দ “ধুত্তোর” বলিয়া গৃহ
ছাড়িয়া প্রস্থান করিল।
সে গৃহ ছাড়িল, অদৃষ্ট কিন্তু তাহাকে ছাড়িল না।
সদানন্দ চায় বেশ একটি নিঃসঙ্গ নির্জনে সে আপনাকে
লইয়া গুম হইয়া জীবনটা কাটাইয়া দেয়। তাহার ভাগ্য
বিধাতা কিন্তু ব্যবস্থা করিয়াছিলেন অন্যরূপ। দূর হইতে
পৰ্বতের গুহা, গহন বন মনের মধ্যে বেশ একটা বিরাট

সদানন্দের বৈরাগ্য রকমের ভাবঞ্চার করে, কিন্তু বাস্তব জীবনে সেগুলার মধ্যে কবিত্বের অংশটা খুঁজিয়া পাওয় দুষ্কর। গুহার মধ্যে কাকর বা বনের মধ্যে ফলপাকড় খাইয়া ত জীবনটাকে অধিক দিন ঠেকাইয়া রাখা যায় না। ক্ষুধা জিনিষটা সদানন্দের অতবড় গাম্ভীর্যকে যে একেবারেই ভয় করিত না। সুতরাং সদানন্দকে লােকালয় ঘেসিয়াই এক গ্রামের সুদূর প্রান্তে একখানা কুঁড়ে বাঁধিতে হইল। আঃ ! সেখানেও কি কম জ্বালাতন! হাটের ব্যাপারী লােকগুলা তাহারই কুটীরে গিয়া তামাক খাইবার আগুন চায়, কৃষকেরা গান গাহিয়া শান্তি ভঙ্গ করে, ভবঘুরে ছেলেগুলো মরিবার আর জায়গা না পাইয়া তাহারই কুটীরের চারিদিকে ঘুরপাক খায়! আহারের সঞ্চয়ের জন্য মাঝে মাঝে তাহাকেও গ্রামে ঢুকিতে হয় । সেখানেও কি যত জঞ্জাল । গ্রামের কুকুর- গুলা খেউ ভেউ করিয়া তাহাকে নাচাইয়া তুলে, ছেলেগুলা সেই সঙ্গে হাততালি দিয়া ক্ষেপাইয়া দেয়, মেয়েরা পর্যন্ত ঘােমটার আড়াল হইতে সন্ন্যাসী মিনসের নাকাল দেখিয়া

সদানন্দের বৈরাগ্য
কটাক্ষ হানিয়া মুচকি হাসে—অত বড় গাম্ভীৰ্যটাকে একটুও
গ্রাহ না করিয়া সকলে মিলিয়া একেবারে নাস্তানাবুদ
করিয়া
তুলে।
সদানন্দের সে গ্রামে আর বাস করা পােষাইল না।
সে খুঁজিয়া খুজিয়া এক গ্রামের বাহিরে তেপান্তর মাঠে
শ্মশানের মাঝে আপনার আস্তানা গাড়িল।
শ্মশানডাঙায় কেহ তাহাকে বিরক্ত করিতে আসিত
কালেভদ্রে শব-সঙ্গীরা তাহার কুটীরে আশ্রয় লইত,
প্রতিদানে যাহা দিয়া যাইত সদানন্দের তাহাতেই কোনাে
রকমে দিন-গত পাপক্ষয় হইত।
এখানে সদানন্দ এক রকম মনের সুখেই নিশ্চিন্ত ছিল।
বেচারার ভাগ্যবিধাতা কিন্তু তখনাে নিশ্চিন্ত ছিলেন না।
একদিন কয়েকজন লােক একটি শব সৎকার করিতে
শ্মশানে আসিয়াছে। ভয়ানক বৃষ্টি আরম্ভ হইল। তাহার
তাড়াতাড়ি শবটাকে আনিয়া সদানন্দের কুটীরের বাহিরে
রাখিল এবং অভ্যর্থনার অপেক্ষা না করিয়াই সদানন্দের
কুটারের মধ্যে ঠেলিয়া ঢুকিয়া পড়িল।
ছােট কুটীর। তাহার মধ্যে পাঁচ-ছয়জন লােক ঢুকিয়া

সদানন্দের বৈরাগ্য
জটল্লা কলরব আরম্ভ করিয়া দিল। সদানন্দের তাহা অসহ
বােধ হইতে লাগিল। তাহার উপর তাহারা তামাকের
ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকাইয়া সদানন্দ বেচারাকে একেবারে
অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল। সদানন্দ আস্তে আস্তে পাশ কাটাইয়া
কুটীরের দ্বারের মুখে আসিয়া দাড়াইল।
মুষলধারে বৃষ্টি হইতেছে। শব বাহিরে পড়িয়া
ভিজিতেছে, সদানন্দ তাহাই দেখিতেছে। হঠাৎ তাহার
মনে হইল, শব যেন একটু নড়িল । দানায় পাইল
কি।
সদানন্দ ভয়ের বড় একটা তােয়াক্কা রাখিত না,
রাখিলে কি শ্মশান আপনার বাসস্থান বলিয়া বাছিয়া
লইতে পারে? সে দাড়াইয়া দাড়াইয়া রােমবহুল ঝাপালাে
জ্বর তলদেশ হইতে চক্ষু চাড়িয়া দেখিতে লাগিল বাস্তবিকই
শব নড়িতেছে। যাহারা শব আনিয়াছিল তাহার ঘরের
ভিতরে আপন মনে ধূমপানে ও গল্পজল্পনায় মত্ত ছিল আর
সদানন্দ ছিল দ্বার আগুলিয়া ; তাহারা বাহিরের ব্যাপার
কিছুই জানিতেছিল না।
সদানন্দ যখন দেখিল যে শব স্পষ্টই নড়িতেছে, তখন

সদানন্দের বৈরাগ্য
সে কুটীর হইতে বাহির হইয়া পড়িল। শববাহী একজন
বলিল, “কি ঠাকুর, জলে ভিজে কোথায় যাও?”
সদানন্দ কোনাে উত্তর দিল না। শবের কাছে গিয়া
মুখের ঢাকা খুলিয়া ফেলিল। শব তখন চক্ষু মেলিয়াছে,
আর বৃষ্টিধারা হাপাইয়া হাপাইয়া পান করিতেছে। সদানন্দ
শবের ম্যাচকা ধরিয়া হড় হড় করিয়া কুটীরের মধ্যে টানিয়া
লইয়া গেল। শববাহীরা কোলাহল করিয়া আপত্তির স্বরে
বলিল, “ওকি ঠাকুর, ওটাকে আবার এর মধ্যে ভরছ
কেন?”
সদানন এ কথায় কর্ণপাত না করিয়া শবের শুশ্রুষায়
নিযুক্ত হইল। সকলে সবিস্ময়ে দেখিল, শব চেতনা লাভ
করিয়া উজ্জীবিত হইয়া উঠিতেছে। সকলে ভয়ে বিস্ময়ে
অবাক আড়ষ্ট হইয়া গেল। সন্ন্যাসীবাবা সিদ্ধপুরুষ, তাহার
পুণ্যস্পর্শে মৃত শব সঞ্জীবিত হয়, ইহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ
পাইয়া তাহাদের রােমাঞ্চ হইল। সকলে ভক্তিভরে মহা-
পুরুষের পায়ের ধূলা মাথায় লইল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই গ্রামে রাষ্ট হইয়া গেল সন্ন্যাসী মরা
মানুষ বাঁচাইতে পারেন। গা ভাঙিয়া রাজ্যের নরনারী

সদানন্দের বৈরাগ্য আবালবৃদ্ধবনিতা সদানন্দের কুটীর ঘিরিয়া ভিড় জমাইয়া তুলিল। পীড়িতের আত্মীয়-স্বজন ভক্তি কৃতজ্ঞতায় সদানন্দের চরণে পড়িয়া গড়াগড়ি দিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে সদাননের খ্যাতি দাবানলের মতো ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। প্রতিদিন কত দেশের বাসি মড়া, গলিত কুষ্ঠ আসিয়া তাহার দ্বারে ধন্না দিতে লাগিল। শ্মশানডাঙায় মেলা বসিল, দোকান পসার হাটে জমজমাট কত দেশের কত লােক কত রকম মানসিক করিয়া সন্ন্যাসী- বাবার চরণে আসিয়া পড়িতে লাগিল। সদানন্দের কোনো পুরুষে কেহ বৈদ্য ছিল না, অথচ বেচারাকে ঘিরিয়া দুনিয়ার রােগীর সনির্বন্ধ করুণ প্রার্থনা দিবানিশি ধ্বনিত হইতে লাগিল । সদানন্দ যত সকলকে বুঝাইতে চেষ্টা করে যে তাহার বাস্তবিক কোনাে দৈব ক্ষমতা নাই, সে সিদ্ধপুরুষ বা যােগী মােটই নহে, সে একজন অতি সাধারণ রকমের সংসার- বিরক্ত সন্ন্যাসী, লােকের ভক্তি আগ্রহ ততই বাড়িয়া চলে। সকলে বলাবলি করে, “দেখেছ, বাবাঠাকুরের মহিমে । আজকালকার দিনে লােকে পসার জমাবার জন্যে কি না

সদানন্দের বৈরাগ্য
করে? কিন্তু বাবা খাটি মহাপুরুষ কিনা, তাই ধরা দিতে
চান না। কিন্তু বাবা ধরা ত পড়েছ, ভক্তকে ভাঁড়াতে
আর পারছ না।
তােমাকে ওষুধ
দিতেই হবে। যতদিন
ওষুধ না পাব শ্রীচরণ আঁকড়ে পড়ে থাকব। দয়া তােমাকে
করতেই হবে বাবা !
চরণ দুখানিকে অসংখ্য ভক্তের সাগ্রহ আক্রমণের
হাত হইতে বাচাইবার জন্য নাচার হইয়া সদানন্দ হাতের
মাথায় যাহা পায় তাহাই ঔষধ বলিয়া বিতরণ করিতে
আরম্ভ করিল। আর সকলে তাহাই ভক্তিভরে সেবন
করিতে কিংবা মাদুলী করিয়া ধারণ করিতে লাগিল।
অনেকের রােগ বিশ্বাসের জোরেই সারিতে লাগিল। আর
সেই সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসীবাবার খ্যাতি প্রতিপত্তিও বাড়িয়াই
যাহাদের রােগ সারিল না তাহারা দ্বিগুণ আগ্রহে
সদানন্দের চরণ চাপিয়া ধরিয়া বলিতে লাগিল, “হে
বাবাঠাকুর, কি পাপ দেখে আমার উপর দয়া হল না
বাবা।”
সদানন্দ বেচারা ভক্তির আতিশয্যে উত্যক্ত হইয়া।
সে সংসার ছাড়িয়া পলায়ন করিয়াছে বলিয়া
চলিল।
উঠিল।

সদানন্দের বৈরাগ্য বিশ্ববিধাতা আজ সারা সংসার ডাকিয়া তাহাই কুটীর- দ্বারে আনিয়া হাজির করিয়াছেন! এ কী ভীষণ শাস্তি। সদানন দেখিল এর চেয়ে সে নিজের গ্রামে নিজের গৃহে ঢের শান্তিতে, ঢের আরামে ছিল। অবশেষে তাহার বৈরাগ্যের উপর বৈরাগ্য আসিল ; একদিন সকালে সকলে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করিল- বাবা সিদ্ধপুরুষ অন্তর্ধান করিয়াছেন। সকলে হায় হায় করিতে লাগিল। সিদ্ধপুরুষের অন্তর্ধানে সরগরম শ্মশান- ভাঙা ক্রমে ক্রমে আবার শ্মশান হইয়া গেল। ১২

বরপণ
মহেশবাবুর একমাত্র পুত্র সতীশ যখন এম-এ পাশ
করিয়া ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট নিযুক্ত হইল তখন মহেশবাবু
পুত্রের বিবাহ দিবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
ঘটকেরা কত মেয়ের সংবাদ লইয়া আসে, মহেশবাবু
কত মেয়ে দেখিলেন, কিন্তু কোনােটিকেই তাহার আর
পছন্দ হয় না। ছেলে তাহার এম-এ পাশ করিয়া হাকিম
হইয়াছে, তাহার যােগ্য মেয়ে হওয়া চাই ত। মেয়েটি
প্রথমত নিখুত সুন্দরী হইবে, নতুবা ছেলের মনে ধরিবে
কেন ? তাহার বেশ লেখাপড়া জানা চাই, নতুবা সে
এম-এ পাশ করা হাকিম স্বামীর মর্যাদা বুঝিতে পারিবে
কেন ?
তাহার পিতার মেয়েকে গা-ভর। অলঙ্কার এবং
অন্তত পক্ষে হাজার পাঁচেক টাকা বরপণ দিবার সঙ্গতি

সদানন্দের বৈরাগ্য * - থাকা চাই, নতুবা তাহার পুত্রের বিদ্যার উপযুক্ত সম্মান হইবে কেন ? এমন রাজযােটক মেয়ে শীঘ্র মেলা দুষ্কর; সুন্দরী হয় ত লেখাপড়া জানে না; লেখাপড়া-জানা সুন্দরী হয় ত তাহার বাপ গা-ভরা অলঙ্কার এবং পাঁচ হাজার টাকা পণের দাবী শুনিয়া পিছাইয়া যায়। সতীশ একদিন আস্তে আস্তে পিতার কাছে আসিয়া বলিল—“বাবা, বিয়েতে পণ টন কিছু নিয়াে না।” মহেশবাবু অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন- “কেন?” সতীশ লজিত সম্রমে মাথা নত করিয়া মৃদুস্বরে বলিল “পণ নেওয়ার মানে ত ছেলে বেচা!” মহেশবাবু বিরক্ত হইয়া বলিলেন-“যা যা, জ্যাঠামি করতে হবে না! বেচা ত বেচা ! তাের ওপরে ত আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে, তােকে আমি বেচেই টাকা নেবাে। তােকে পড়াতে যে এক গঙ্গা টাকা জলের মতন খরচ হয়ে গেছে, সে আমি আদায় করে নেবাে মা ! চিরটা কাল পণ নেওয়া চলে আসছে আমাদের ১৫

সদানন্দের বৈরাগ্য
কুলিনের, এখন উনি দুপাতা ইংরিজি পড়ে বাপপিতমর
চাল সব একদিনে পাল্টে দেবেন ! তাের সঙ্গে শুধু বিয়ে
করার সম্বন্ধ। যেদিন বলব, টোপর পরে’ বাপের সুপুর
হয়ে বিয়ে করতে যাবি। আর কোনাে কথা আমি তাের
শুনতে চাইনে।
সতীশ মাথা নত করিয়া আস্তে আস্তে সেখান হইতে
চলিয়া আসিল।
তাহার বন্ধুরা তাহাকে ঠাট্টা করিতে লাগিল—“কি
হে সমাজ-সংস্কারক ভায়া ! লম্বা লম্বা বক্তৃতা করে’ শেষে
রাতারাতি পাঁচহাজারী মনসবদার হবার চেষ্টা! বক্তৃতার
চেয়ে দৃষ্টান্ত ভালােলােকে বলে। দৃষ্টান্তের বেলায় পঞ্চ
হাজার, বক্তৃতাতেও বাক্য দেদার!”
সতীশ অত্যন্ত অপ্রতিভ হইয়া বলে-“কি করব বল?
বাবার ওপরে ত আমি কথা বলতে পারিনে। আমার
যখন ছেলে হবে তখন আমি কথায় কাজে মিল থাকে
কিনা দেখিয়ে দেবাে।
সকলে তাহাকে পিতৃভক্ত রামচন্দ্রের সহিত তুলনা
করিয়া দস্তুরমতাে লাঞ্ছনা করিতে লাগিল।

সদানন্দের বৈরাগ্য
কিন্তু সতীশ পিতাকে আর কিছুই বলিতে পারিল না
তাহার মা মারা যাওয়ার পর পিতা যে কি কষ্টে তাহাকে
মানুষ করিয়া লেখাপড়া শিখাইয়াছেন তাহা ত সে জানে।
বাহিরের লােক ঠিক বুঝিতে পারিবে না, কিন্তু তাহার
উপর তাহার পিতার যে ষােল আনা স্বত্ব আছে তাহ। সে
কেমন করিয়া অস্বীকার করিবে ? তাহাকে লেখাপড়া
শিখাইতে তাহার মায়ের সমস্ত গহনা একে একে বন্ধক
পড়িয়াছে, প্রায় দু হাজার টাকা তাহার পিতার ঋণ।
তিনি যদি পুত্রকে বিক্রয় করিয়া ও ঋণমুক্ত হইতে চাহেন
তবে তাহার আপত্তি করা শােভা পায় না। সতীশ
নীরবে বন্ধুদের সকল বিদ্রুপ সহ্য করিতে লাগিল।
অনেক অনুসন্ধানের পর মহেশবাবুর মনের মতন
একটি মেয়ে মিলিল। তাহারই সহিত সতীশের বিবাহ
দেওয়া স্থির হইয়া গেল।
২
বিবাহের পরদিন সতীশের শ্বশুরবাড়ীতে মেয়ে জামাই
বিদায় করিবার ব্যস্ততা পড়িয়া গিয়াছে ; কিন্তু সতীশের
বাড়ী যাইবার জন্য কোনাে রকম ইচ্ছা বা উদ্যোগ প্রকাশ

সদানন্দের বৈরাগ্য
পাইতেছিল না—সে চুপ করিয়া এক জায়গায় বসিয়াই
ছিল।
পাক্কিতে বৌ তুলিয়া মহেশবাবু চীৎকার করিতে লাগি-
লেন—“সতীশ, সতীশ কৈ ?”
সতীশকে কাছাকাছি কোথাও দেখা গেল না।
'সতীশকে খুজিতে চারিদিকে লােক ছুটিল। দেখিল
সতীশ বিছানায় শুইয়া পায়ের উপর পা চড়াইয়া দিব্য
নিশ্চিন্তভাবে পা নাড়াইতেছে -যাহারা তাহাকে ডাকিতে
আসিয়াছিল তাহাদিগকে যেন বলিতেছিল, না, না, না।
তাহাকে শুইয়া থাকিতে দেখিয়া তাহার শ্বশুর ব্যস্ত
হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-“কি বাবা, অসুখ বিসুখ কিছু
করেনি ত ?”
সতীশ উঠিয়া বসিয়া বলিল-“আজ্ঞে না।”
শশুর বলিলেন—“তবে এস, তােমার বাবা তােমায়
ডাকছেন।
সতীশ দিব্য প্রশান্ত সহজ ভাবেই বলিল—“তাকে
বলুন গে আমি ত এখন বাড়ী যেতে পারছিনে। আমার
কিছুদিন এখন এখানেই থাকতে হবে।”
১৭

সদানন্দের বৈরাগ্য এই কথা শুনিয়া সতীশের শ্বশুর মনে করিলেন জামাই ও বেহাই দুজনে কিছু ঝগড়া-ঝাটি হইয়া থাকিবে বােধ হয়। তাই তিনি জামাতাকে আর কিছু না বলিয়া বেহাইকে গিয়া বলিলেন-“বেয়াই মশায়, সতীশ বলছে সে এখন বাড়ী যেতে পারবে না।” মহেশবাবু আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন- “কেন?” সতীশের শ্বশুর বলিলেন—“কেন, তা ত জানিনে, জিজ্ঞাসাও করলুম না। মনে করলুম হয় ত আপনার সঙ্গে কোনাে রকম ঝগড়া-টগড়া করে অভিমান করেছে ; তাই আপনাকে বলতে এলুম।” মহেশবাবু আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—“ঝগড়া? না। আমার সঙ্গে ঝগড়া করবার মতন ছেলে ত সে নয়। কি হয়েছে চলুন ত দেখি। কোথায় সে ?” মহেশবাবু বৈবাহিকের সঙ্গে সতীশের নিকট আসিয়া বলিলেন—“সতীশ, বৌমা পাল্কীতে বসে রয়েছেন, আর তুই এখানে বসে রয়েছিস? রকম কি! বাড়ী চ।” সতীশ বলিল—“আমি ত এখন কিছুদিন বাড়ী যেতে ১৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
পারছিন বাবা। তুমি তােমার বউ নিয়ে বাড়ী যাও,
আমি কিছুদিন পরে যাব।”
মহেশবাবু অতিমাত্রায় আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—“কিছু
দিন পরে যাবি কি ? হয়েছে কি তাের ?”
সতীশ মাথা নত করিয়া অতি মৃদু স্বরে বলিল-“আমি
এদের ক্রীতদাস হয়েছি—তুমি ত আমায় পাঁচ হাজার
টাকায় এদের বেচে গেলে। আমি রােজগার করে’
এঁদের পাঁচ হাজার টাকা সুদ সমেত শােধ করব আগে;
তারপর এরা আমাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিলে আমি
তােমার কাছে ফিরে যাব। তার আগে ত আমার যাবার
জো নেই।”
মহেশবাবু অবাক স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন
সতীশের কথা শুনিয়া তাহার শ্বশুরের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল
হইয়া উঠিয়াছিল। মহেশবাবু মনে মনে একবার কল্পনা
করিলেন তাহার সেই নিরানন্দ নির্জন পুরী—সেখানে
তাহার পত্নী নাই, সতীশ নাই, এক। তিনি আর তাহার,
বৌমাটি! এই বালিকা বধূকে যত্ন করিবার ও সঙ্গ দিবার
কেহ নাই, তাহার সতীশ পরের বাড়ীতে দাসত্ব স্বীদ্ধার

সদানন্দের বৈরাগ্য
করিয়া খাটিয়া খাটিয়া মাসে মাসে অল্পে অল্পে তাহার পণের
ঋণ শােধ করিতেছে। মহেশবাবুর মন ব্যাকুল
হইয়া
উঠিল—দুঃখে ক্ষোভে তাহার মন আলােড়িত হইতে
লাগিল। একবার সতীশের মুখের দিকে চাহিয়া তিনি
সতীশের শ্বশুরকে পাঁচ হাজার টাকার ভােড়া ফিরাইয়া
দিয়া বলিলেন—“বেয়াই মশায়, আপনার টাকা আপনি
ফিরিয়ে নিন, সতীশকে আমার সঙ্গে বাড়ী যেতে অনুমতি
করুন।”

সতীন
অনেক ঠাকুরের দুয়ার ধরিয়া, হাতে-কোলে পূজা
দিবার মানত করিয়া, মাদুলি কবচ ধারণ করিয়া, ঔষধ
খাইয়া নৃত্যকালীর যখন কিছুতেই একটি ছেলে হইল
, তখন সে জেদ করিয়া নিজে দেখিয়া শুনিয়া স্বামীর
আর-একটি বিবাহ দিল। একটি ছেলে না হইলে কি ঘর
সংসার মানায়!
স্ত্রীলােক যখন ত্যাগ করিতে ইচ্ছা করে তখন সে
অসাধ্যসাধন করিতে পারে। আজ বাইশ বৎসর যে স্বামী
তাহার ছিল, যাহার জীবনের সহিত তাহার সুখ দুঃখ
জড়াইয়া গিয়াছিল, সেই স্বামীকে নৃত্যকালী হাসিমুখে
প্রশান্ত মনে তরঙ্গিণীকে দান করিয়া, সেই নবীন দম্পতির
সেবা ও যত্নের ভার গ্রহণ করিল। নৃত্যকালী তরঙ্গিণীকে
ছােট বােটর মতন যত্ন করে, সখীর মতাে তরঙ্গিণীকে
প্রণয়ের দীক্ষা দেয়, নবযৌবনা তরঙ্গিণীর বৃদ্ধ স্বামীকে

সদানন্দের বৈরাগ্য
লইয়া রঙ্গ রসিকতা করে, তাহাদের দুজনের নূতন প্রণয়ের
ভাবলীল ও কুষ্ঠিত গােপন মিলন-প্রয়াস দেখিয়া কৌতুক
ও আনন্দ অনুভব করে।
তরঙ্গিণীও বাপের বাড়ী হইতে অকস্মাৎ বিচ্ছিন্ন হইয়া
দিদির যত্ন মমতায় একদিনের তরেও মুখ মলিন করিবার
অবসর পায় নাই। সে খাইতে না চাহিলেও নৃত্যকালী
তাহাকে “দিদি আমার, বােটি আমার, লক্ষ্মী আমার”
বলিয়া সাধিয়া সাধিয় বার বার বিবিধ সামগ্রী খাওয়ায়; সে
সাজিতে না চাহিলেও দিদি তাহার নিজের হাতে বিচিত্র
বস্তু অলঙ্কারে দিনের মধ্যে তাহাকে পাঁচবার পাঁচ রকম
করিয়া সাজায় ; নৃত্যকালী নিজের হাতে বিবিধ ছাদের চুল
বাঁধিয়া, টিপ কাটিয়া, আলতা পরাইয়া, তরঙ্গিণীকে জেদ
করিয়া জোর করিয়া দিনের মধ্যে পাঁচবার স্বামীর কাছে
পাঠাইয়া দেয়।
সংসারের এতটুকু কাজও তরঙ্গিণীকে করিতে হয় না ।
সংসারের সমস্ত সেবা ও কর্মের ভার নৃত্যকালীর ; হাসি
আনন্দ ও সম্ভোগের জন্যই যেন তরঙ্গিণীর জীবন
তাহার পর যখন তরঙ্গিণীর সন্তান সম্ভাবনা হইল তখন
;
२२

সদানন্দের বৈরাগ্য নৃত্যকালী যেন কৃতার্থ হইয়া গেল। তাহার এত দিনের সাধ এইবার তরঙ্গিণী হইতে পূর্ণ হইবে। সে একটি সােণার চাদ কোলে পাইবে। তাহার ঘর সংসার উহার হাসিতে আলো হইয়া উঠিবে। তরঙ্গিণীকে নৃত্যকালী এখন চোখে হারায়, সদাই তাহাকে সাবধান করিয়া রাখে, অনুক্ষণ তাহার সঙ্গে-সঙ্গে সে টিক টিক করিয়া বেড়ায়, কোনাে মতে যেন কিছু অনাচার না হয়, কাহারাে ছোঁয়াচ নজর না লাগে ; সু-ভালাভালি দুজন দুঠাই হইয়া গেলে সে বাঁচে। তরঙ্গিণী সন্ধ্যাবেলা মাথার ঘােমটা খুলিয়া থাকিলে বা এ-ঘর ওঘর করিবার সময় মাথায় একটা খড়কুটা গুজিয়া রাখিলে তাহাও নৃত্যকালীর নজর এড়ায় না, সে তরঙ্গিণীকে বলে—পেটের কঁাটাটা আমার কোলে একবার ফেলে দে, তারপর তাের যা খুশি তাই করিস, আমি আর তােকে তখন কিছু বলব না। যেদিন তরঙ্গিণী প্রসববেদনায় কাতর হইয়া নৃত্য- কালীকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিল—দিদি, আর আমি বাঁচব না।সেদিন নৃত্যকালীও সুখে ও দুঃখে তাহার : সহিত কঁদিয়া ফেলিল। এই বেদনার ভিতর দিয়া

সদানন্দের বৈরাগ্য
তাহাদের উভয়ের মাতৃত্ব আজ পরিপূর্ণ সার্থকতা লাভ
করিবে।
তরঙ্গিণীর একটি পুত্রসন্তান হইল। নৃত্যকালী সেই
আঁতুড় ঘরেই একরাশ করবীফুলের মতাে শাদা ধবধবে
খােকাকে কোলে করিয়া লইয়া অশ্রুসজল হাসিমুখে
তরঙ্গিণীকে বলিল—তরি, দেখ দেখ, আমার কেমন
খােকা হয়েছে।
তরঙ্গিণী মুখের গৰ্ব্বভরা হাসিমুখে বলিল—দিদি,
থােকা ত তােমারই ।
সেই দিন হইতে নৃত্যকালীর কাজ দ্বিগুণ বাড়িয়া
গেল। এতদিন সে একটি বৃদ্ধ থােকা ও একটি তরুণী
খুকিকে পরম যত্ন ও আগ্রহে মানুষ করিতেছিল, এখন
আর-একটি নূতন শিশু থােকার ভার তাহার উপর পড়িল।
খােকাকে তেল-মাখানাে, সেক দেওয়া, নাওয়ানাে,
ঘােয়ানাে, দুধ খাওয়ানো, কাজল-পরানাে সমস্ত তাহারই
ভার। খােকা সমস্ত দিনরাত তাহারই কাছে থাকে,
এক-একবার কেবল মাই দিবার জন্য সে খােকাকে
তরঙ্গিণীর কোলে দেয়। তখন তরঙ্গিণী হাসিয়া বলে
२४

সদানন্দের বৈরাগ্য —দিদি, তােমার খােকাকে আমি মাই দেবাে কেন ? নৃত্যকালী সুখের হাসিতে দুঃখ ঢালিয়া দিয়া বলে— কি করব বােন, বিধাতা আমায় বঞ্চিত করেছেন। নইলে কি আমি তােকে এ কষ্টটুকুও দিতাম। আমায় বিধাতা দুধ দেন নি, তাই তােকে আমার থােকার দুধ- মা রেখেছি ! নৃত্যকালীর স্বামী একদিন ঠাট্টা করিয়া তাহাকে বলিল -খােকাকে পেয়ে যে আমাদের একেবারে ভুলে গেলে? আমাদের দিকেও একটু দেখাে? নৃত্যকালী হাসিয়া বলিল—তােমায় দেখবার জন্যে ত তরিকে এনে দিয়েছি। স্বামী লজ্জিত হইয়া প্রস্থান করিল। তরঙ্গিণী একদিন হাসিয়া বলিল—দিদি, থােকা হয়ে অবধি তুমি আর আমার খোজও কর না, যে, তরি মরুল কি বাচল ! নৃত্যকালী তরঙ্গিণীর চিবুক স্পর্শ করিয়া নিজের হস্তাঙ্গুলি চুম্বন করিয়া বলিল—যাট ষাট, অমন কথা মুখে

সদানন্দের বৈরাগ্য
আনুতে আছে! তুই আমাদের ঘরের লক্ষ্মী, সংসারের
সুখ! তুই আমাকে সােনারদ থােকা দিয়েছিস,
আমাদের এই আঁটকুড়াে নিরানন্দ সংসারে হাসি এনেছিস!
তুই যে আমার ছােট বােন তরি! তাের ঘরসংসার তুই
এখন চিনে শুনে নে—চিরকাল কি দিদির হাততােল
নিয়ে থাকবি? আমায় ছুটি দে, আমি আর সংসারের
কেউ নই, আমি আর থােক। এখন দুজনে মিলে খেলা
করবার ছুটি নিয়েছি, কাজ করবার অবসর এখন আর
আমার নেই। আমি দেখতে শুনতে পারিনে, তুই এখন
সব দেখ শােন। নিজের শরীরের যত্ন করিস, আর যে
বুড়ােটাকে তাের হাতে দিয়েছি, সেটাকেও একটু যত্ন
করিস।
তরঙ্গিণী লজ্জিত হইয়া বলিল—না দিদি, সে আমি
পারব না। তােমার কাজ আমি করতে যাব কেন? তুমি
আমায় না দেখলে আমার বড় কষ্ট হয়, আমার কিছু ভালো
লাগে না।
তরঙ্গিণীকে আবার চিবুক স্পর্শ করিয়া চুম্বন করিয়া
নৃত্যকালী হাসিয়া বলিল—তুই এখন বড়সড় হয়েছিস,

সদানন্দের বৈরাগ্য ? । এখনও দিদির হাততােলা হয়ে থাকলে লােকে বলবে কি বলবে, তাের ঘরসংসার আমি তোকে ঠকিয়ে দখল করে বসে আছি। তরঙ্গিণী দৃষ্টিতে তিরস্কার ভরিয়া নৃত্যকালীর দিকে তাকাইয়া বলিল—দিদি, যাও তােমার সঙ্গে আড়ি! ফের ওরকম কথা বলে আমি কেঁদে কেটে অনর্থ করব কিন্তু বলে রাখছি। বলিতে বলিতেই তরঙ্গিণীর চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া অভিমান গলিয়া ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। নৃত্যকালী তাহাকে কোলের কাছে টানিয়া আনিয়া গালে কপালে চুম্বন করিয়া সজল চোখে হাসিয়া বলিল- ছি পাগলী, এই তুচ্ছ কথায় কঁাদলি ! তরঙ্গিণী নৃত্যকালীর কোলে মুখ লুকাইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে দিতে অভিমান-ব্যথিত স্বরে বলিল- কেন তুমি আমাকে অমন কথা বললে ? বল আর কখনাে বলবে না ! নৃত্যকালী তরঙ্গিণীর পিঠে হাত বুলাতে বুলাইতে বলিল-চুপ কর লক্ষ্মীটি, চুপ কর। আমি আর কখনো २१

সদানন্দের বৈরাগ্য
বলব না। কিন্তু কখনাে যদি তাের সংসারের ভার হাতে
নেবার ইচ্ছে হয়, মুখ ফুটে আমায় বলতে লজ্জা করিস নে।
তুই বলবা মাত্তর তাের ঘরকন্না তােকে ছেড়ে দিয়ে আমি
সরে একপাশ হব। কেবল খোকাকে আমার কাছ থেকে
কেড়ে নিসনে।
তরঙ্গিণী অশ্রুত মুখখানি তুলিয়া নৃত্যকালীর দিকে
বেদনাভরা কাতরদৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল—দিদি, আবার ঐ
কথা ! আমি যে তােমার ভালােবাসায় কেনা দাসী ।
আমাকে ও-সব কী বলছ ?
নৃত্যকালী তাহার চোখ মুছাইয়া দিতে দিতে বলিল
—তুই আমার বােন, তুই আমার ঘরের লক্ষ্মী, তুই আমার
খােকার দুধ-মা ! তােকে আমি মন্দ ভেবে কিছু বলিনি।
তবু কথাটা বলে রাখলাম।
এমনিতর সুখের মিলনে হাসি আনন্দে তাহাদের
তিনটি প্রাণীর সংসার একটি শিশুকে ঘিরিয়া স্বচ্ছন্দে
চলিতে লাগিল। খােকা দিনে দিনে তাহার নব নব
আনন্দলীল প্রকাশ করিয়া সংসারটিকে আনন্দে হাসিতে
সুখে ভরিয়া তুলিতে লাগিল।
২৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
খােকার যখন বছর দেড়েক বয়স ; যখন সে চারটি
ধবধবে শাদা দুধের-দাত বাহির করিয়া নৃত্যকালীকে বলে
-জি, এবং তরঙ্গিণীকে তা-তি বলিয়া ডাকে; যখন সে
দুধ খাইতে ও কাজল পরিতে বিষম আপত্তি জানাইতে
শিখিয়াছে; এবং যখন সে হামাগুড়ি দিয়া ঘরের শিশি-
বােতল ভাঙিয়া মধু ও তেল একত্র মিশাইয়া পেটে মাথায়
মাখিয়া বাঃ বাঃ বলিয়া উল্লাস প্রকাশ করিতে পারিতেছে ;
তখন একদিন সন্ধ্যাকালে নৃত্যকালী দালানে বসিয়া
থােকার সহিত চাঁদামামার পরিচয় করিয়া দিতেছিল এবং
চদামামাকে থােকার কপালে একটি টি দিয়া যাইবার জন্য
ধান ভানিলে কুঁড়াে, মাছ কুটিলে মুড়ে, উড়কি ধানের
মুড়কির মােয়া দিবার লােভ দেখাইতেছিল ; থােকা তাহার
ক্ষুদে ক্ষুদে হাত দুখানি বিস্তারিত করিয়া কচি কলার ছড়ার
মতো আঙুলগুলি ঘন সঞ্চালিত করিয়া চঁাদকে ডাকিয়া
ডাকিয়া নিজের কপালে হাত ঠেকাইয়া বলিতেছিল-অ
আ চি !এবং এক-একবার মাতা নৃত্যকালীর দিকে
ফিরিয়া বলিতেছিল—জি! চি !-আরবার তরঙ্গিণীর
দিকে ফিরিয়া বলিতেছিল—তা-তি। চি!

সদাননের বৈরাগ্য এমন সময় উঠান হইতে কে একজন রমণী বলিয়া উঠিল—গেরস্তরা বাড়ী আছ গাে? নৃত্যকালী বলিল-কে গা? আগন্তুক রমণীকণ্ঠে উত্তর হইল—আমরা কুটুম গাে! নৃত্যকালী তরঙ্গিণীকে বলিল—রি, দেখ ত কে ? তরঙ্গিণী উঠিয়া দালানের ধারে গিয়াই বলিয়া উঠিল— ওমা, বামা যে! তুই কোখেকে, এলি ? বামা হাসিয়া গলায় আঁচলের খুটটা দিয়া ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল—মা ঠাকরুণের সঙ্গে গঙ্গা নাইতে এইচি। তরঙ্গিণী বলিল—মাসিমার সঙ্গে। কৈ মাসিমা কোথায়? বামা পশ্চাতে ফিরিয়া দেখিয়া উচ্চকণ্ঠে ডাকিল- মাঠাকরুণ, কৈ গাে এস না গাে। আর একটি রমণীমুর্তি অন্ধকার আবছায়া হইতে অগ্রসর হইয়া আসিল। তরঙ্গিণী তাড়াতাড়ি দালান হইতে উঠানে নামিয়া গিয়া দ্বিতীয় রমণীর পদধূলি লইয়া উচ্চকণ্ঠে ডাকিয়া বলিল—দিদি, আমার মাসিমা এসেছেন।

সদানন্দের বৈরাগ্য
নৃত্যকালী খােকাকে কোলে করিয়া দালানের ধারে
আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। সে তরঙ্গিণীর আহ্বানে উঠানে
নামিয়া গিয়া তরঙ্গিণীর মাসিমার পদধূলি লইয়া বলিল—
এস মা এস !
মাসিমা নৃত্যকালীকে লক্ষ্য না করিয়াই তরঙ্গিণীকে
বলিল—ত, এই বুঝি তাের থােকা?
এই প্রশ্নে তরঙ্গিণীর কেমন লজ্জা বােধ হইল। থােক।
কেবল তাহার, এ কথা সে নৃত্যকালীর সম্মুখে কেমন
করিয়া স্বীকার করিবে? খােক। যে তাহার অপেক্ষা
তাহার দিদিরই বেশি, ইহাও বা সে কেমন করিয়া একজন
আগন্তুক বাহিরের লােককে বুঝাইবে? তাহারা দুই
সতীন স্নেহ ও সখিত্বের যে মধুর সম্পর্ক পাতাইয়া
নিরুপদ্রবে খােকাকে লইয়া আনন্দে আছে তাহার মধ্যে
একজন অপর লােক আসিয়া উপস্থিত হওয়াতে তরঙ্গিণীর
মনের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি বােধ হইল। তরঙ্গিণীর
মনে হইল তাহারা বেশ ছিল, তাহাদের এই সুখনীড়ের
মধ্যে তাহার মাসিমা কেন আসিয়া পড়িল তাহার মাসিমা
কি তাহাদের ঠিক করিয়া বুঝিতে পারিবে ? তরঙ্গিণী

সদানন্দের বৈরাগ্য
আর মাসিমার দিকে চাহিতে পারিল না। সে কোনো
কথা না বলিয়া লজ্জিত মুখ নত করিয়া রহিল।
মাসিমা এই সলজ্জ নীরবতা তরঙ্গিণীর নব মাতৃত্বের
লক্ষণ মনে করিয়া হাত বাড়াইয়া থােকাকে বলিল—এস
দাদা বাবু, এস!
থােকা দুইহাতে নৃত্যকালীর বুকের ও পিঠের কাপড়
মুঠি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিয়া নৃত্যকালীর বুকের মধ্যে
সঙ্কুচিত হইয়া লাগিয়া গিয়া বলিল—জি, ভ!
নৃত্যকালী খােকাকে একটু ঠেলিয়া মাসিমার দিকে
আগাইয়া দিয়া বলিল—যাও লক্ষ্মী মাণিক আমার, যাও!
উনি দিদিমা ! ভয় কি ?
থােকা সে কথার প্রতিবাদ করিয়া বলিলভ।
বামা একমুখ হাসিয়া অগ্রসর হইয়া আসিয়া হাত
বাড়াইয়া বলিল-আমার ঠেঞে এসবে থােকাবাবু?
থােক তেমনি ভাবে নৃত্যকালীকে জড়াইয়া ধরিয়া
বলিশ-ত! ভ?
মাসিমা অপ্রতিভ হইয়া বলিল-অচেনা লােকের
কাছে যায় না বুঝি? এই নেও দাদামণি, দেখ ।

সদানন্দের বৈরাগ্য
মাসিমা দুটি টাকা বাহির করিয়া থােকার সম্মুখে
ধরিল। খােকা টাকা লইতে কিছুমাত্র উৎসাহ না দেখাইয়া
কেবলি বলিতে লাগিল—ভ! ভ !
তখন নৃত্যকালী তরঙ্গিণীকে বলিল—তরি, তুই নে
ত। তাের কাছে গিয়ে যদি মাসিমার কাছে যায়।
তরঙ্গিণী হাত পাতিল।
থােকা নৃত্যকালীকে জড়াইয়া থাকিয়াই তরঙ্গিণীকে
বলিল—তা-তি, ভ!
মাসিমা অপ্রতিভ হইয়া তরঙ্গিণীকে বলিল-তরু,
তাের ছেলে ত বাছা আমার কাছে আসবে না। এই নে
তাের বেটাকে সন্দেশ কিনে খাওয়াস। মিষ্টিমুখ হলে
যদি আমায় মিষ্টি চোখে দেখে।
তরঙ্গিণী একবার নৃত্যকালীর মুখের দিকে তাকাইয়া
আবার মাথা নত করিয়া দাড়াইল।
নৃত্যকালী বলিল—আবার টাকা কেন মাসিমা ?
পায়ের ধূলাে দিয়ে অমনি আশীৰ্ব্বাদ কর, আমাদের এই
কত দুঃখের গুড়ােটুকু বেঁচে থাক ! থােকা আমার কোল
বাছে না। অন্ধকারে দাড়িয়ে রয়েছ বাপু, ও মুখই দেখতে

সদানন্দের বৈরাগ্য পাচ্ছে না। এস দালানে এস! তরি, একখানা কিছু পেতে দে বসতে। মাসিমা নৃত্যকালীর কোনাে কথায় সাড়া না দিয়া তরঙ্গিণীকে জিজ্ঞাসা করিল–জামাই কোথায়, ওদিকে জামাই নেই ত ? মাসিমা যে নৃত্যকালীর সহিত কথা কহিতেছে না ইহা তরঙ্গিণীর মােটেই ভাল লাগিতেছিল না। কাজেই সেও মাসিমার কোনাে কথার জবাব দিতে পারিতেছিল না। নৃত্যকালী বলিল—না, উনি বাড়ীতে নেই। এস মাসিমা। তরি, মাসিমার পা ধােবার জল দে, ওঁর গরদ- খানা দে। মাসিমা কাপড় ছেড়ে জপ করে নিন, আমি থােকাকে ঘুম পাড়িয়ে জলখাবার করে আনি। তরঙ্গিণী মাসিমার কাছ হইতে সরিয়া পড়িবার সুযােগ পাইয়া যেন বাঁচিয়া গেল। কিন্তু যখন নৃত্যকালী জলখাবার আনিতে গেল তখন তরঙ্গিণীকে একাকী তাহার মাসিমার কাছে থাকিতে হইল। ইহাতে সে কেমন অস্বস্তি বােধ করিতে লাগিল। ৩৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
মাসিমা বলিল—তরু, ঐ তাের তীন ?
সতীন শব্দটা তরঙ্গিণীর কানে বাজিল। সে মৃদুস্বরে
বলিল—উনিই দিদি।
-তােকে খুব কষ্ট দ্যায় দেখছি।
তরঙ্গিণী বিরক্ত হইয়া বলিল—না মাসিমা, দিদি
আমায় খুব ভালােবাসেন।
মাসিমা বিজ্ঞতার হাসি হাসিয়া বলিল—আ নেকি, তুই
তেনি নেকিই আছিস এখনাে । একটা মিষ্টি কথা
বললেই ভুলে যাস! মিছরীর ছুরী মুখে মিষ্টি লাগে বলে
মনে করিস যে বুকে যখন বেধে তখনও তেমনি মিষ্টি
লাগে? ঐ বুঝি তাের ভালােবাসা। এসে বাড়ীতে পা
দিতেই ত বুঝতে পারছি, তুই বাড়ীর দাসী, আর বাড়ীর
গিন্নি ঐ ডাইনি মাগী! তরি যা পা দেবার জল দে, তরি
যা কাপড় দে, তরি যা বসতে দে ! আর আমি যাই
জলখাবার দি! তুই দাসীর খাটনা খেটে মরবি, কিন্তু
সংসারটা ওর মুঠোর ভেতর ! তাের সংসারে তুই পরের
হাততােলায় কেমন করে আছিস! আমরা হলে ত
একদণ্ড থাকতে পারতাম না।

সদানন্দের বৈরাগ্য
তরঙ্গিণী বিরক্ত হইয়া বলিল—এর আর হাততােল।
থাকা কি ? দিদি যদি অযত্ন করতেন ত কষ্ট হত। দিদি
নিজে না খেয়ে আমায় খাওয়ান, নিজে না পরে আমায়
পরান, দিদি আমার ছেলেকে মায়ের বাড়া যত্ন করেন।
মাসিমা হাসিয়া বলিল-ওরে তাইত কথায় বলে-
মায়ের চেয়ে যে ভালােবাসে তারে বলে ডান! ঐ ডাইনি
মাগী তােকে গুণ করেছে নিষ্যস। ছেলেকে অত ন্যাটো
করচে কেন তাও বুঝি বুঝতে পারিসনে হাবা মেয়ে! ছেলে
ওর ন্যাওটো হলে তােকে নাথি ঝাটা কোস্তা বাড়ন
মারলেও তুই ওর কিছু করতে পারবিনে ; ছেলের জন্যে
তােকে সব সয়ে থাকতে হবে। দুটো মিষ্টি কথা আর
লােক-দেখানাে আত্তি, এই দেখেই তুই ভুলেছিস! সতীন
সম্পর্ক কি কখনাে ভালাে হয়রে নেকি ! শক্ত হ, শক্ত হ,
এখনাে সময় আছে, ছেলেটাকে ডাইনির মায়া থেকে বাঁচা।
কথায় না বলে, বঁঝার আত্তি বাঘিনীর পথ্যি! তাতে এ
আবার বাঝা সতীন।
তরঙ্গিণী লজ্জায় ঘৃণায় বিরক্ত হইয়া উঠিল। সে ।
তাহার মাসিমাকে কেমন করিয়া বলিবে যে, যেদিন হইতে

সদাননের বৈরাগ্য সে এবাড়ীতে আসিয়াছে সেই দিন হইতে স্বামী সম্পূর্ণ তাহার, দিদি তাহার সতীন নয়। তরঙ্গিণী তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িয়া বলিল—দেখি জলখাবার হ’ল কি না। মাসিমা খুসি হইয়া বলিল-হ্যা, নিজের ঘরকন্না নিজে দেখ শােন, এই ত চাই তরঙ্গিণী মনে করিল সতীন সম্পর্কটা বড় খারাপ, সহজেই লােকে ভুল বুঝিয়া অবিচার করিয়া বসে। মাসিমা দুদিন থাকিলেই বুঝিতে পারিবে দিদি তাহার কেমন। মানুষ। দুদিন ছাড়িয়া চারিদিন গেল, মাসিমার ধারণার কোনো পরিবর্তন সে বুঝিতে পারিল না। মাসিমা ও তঁাহার সহচরী বামা নিরন্তর তাহার কানে বিষ উগিরণই করিতেছে। তরঙ্গিণী অতিষ্ঠ হইয়া একদিন নৃত্যকালীকে বলিল- দিদি, ওরা কবে যাবে? যােগ ফোগ ত চুকে বুকে গেল ; আর কতদিন গঙ্গা নাইতে হবে ? নৃত্যকালী হাসিয়া বলিল••কেন তরি, মাসিমা দুদিন আছেন তাতে তুই ব্যাজার হচ্ছিস কেন?

সদানন্দের বৈরাগ্য
তরঙ্গিণী নৃত্যকালীর হাসির সঙ্গে হাসিতে পারিল না।
সে গম্ভীর ভাবে বলিল—না দিদি, আমরা দুটিতে নিরিবিলি
বেশ ছিলাম, কোথা থেকে এক যােগ নয়ত গােযােগ
এসে জুটল! দিদি, পাজি পজিগুলো এত গােলযােগও
বাধাতে জানে !
নৃত্যকালী একটু তিরস্কারের স্বরে বলিল-ছি, অমন
কথা মুখে আনতে নেই। মাসিমা শুনতে পেলে কি
ভাববেন ? তাের বাড়ীতে ত আর ওঁরা চিরকাল থাকতে
আসেন নি। তুই অত ব্যস্ত হচ্ছি কেন?
তরঙ্গিণী কেমন করিয়া বলিবে সে কেন ব্যস্ত হইতেছে।
তাহার যে দু:খ তাহা সহিবারও নয় বলিবারও নয় ।
তরঙ্গিণী বলিল—ব্যস্ত হব না? থােকা হয়ে অবধি ও
তুমি আমায় আগের মতন যত্ন কর না; তার ওপর
মাসিমা এসে ত তােমায় একদণ্ড কাছে পাওয়াই ভার
হয়েছে। তুমি আর কারু বেশি যত্ন করলে আমার বড়
রাগ হয় !
নৃত্যকালী হাসিয়া তরঙ্গিণীর চিবুক স্পর্শ করিয়া
নিজের হস্ত চুম্বন করিয়া বলিল—হিংসুটে, ভয় নেই রে
৩৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
ভয় নেই, তাের দিদিকে তুই না ছাড়লে কেউ কেড়ে নিতে
পারবে না।
ইহার পর তরঙ্গিণী নৃত্যকালীকে আর কিছু বলিতে
পারিল না। সে আস্তে আস্তে গিয়া মাসিমার কাছে
বসিয়া বলিল—মাসিমা, তুমি কবে বাড়ী যাবে ?
বাড়ী ত শিগগির যাওয়া দরকার। বাড়ীতে সব
অবিলি করে ফেলে ছড়িয়ে রেখে এসেছি, ইদুরে বাদরে
কি করছে তার ঠিক নেই। কিন্তু তাের ঘরকন্নরও ত
একটা বিলিবন্দেজ না দেখে আমি নড়তে পারছিনে।
—আমার ঘরকন্নার বিলিবন্দেজ আমি করে নেব ;
তার জন্যে তােমার ঘরকন্না অবিলি করে থাকতে হবে না
মাসিমা।
-কেন, আমাকে তুই তাড়াতে পারলে যে বাঁচিস
দেখছি।
তরঙ্গিণী অপ্রতিভ হইয়া বলিল—না তা কেন। তবে
জামাইবাড়ী এতদিন এসে আছ, আমার ভারি, লজ্জা
করছে।
-জামাই কি কিছু বলেছে?
৩৯

সদানন্দের বৈরাগ্য
-না।
—তবে ঐ ডাইনি মাগী কিছু বলেছে বুঝি! যাই
দেখি একবার মাগীর ধুদ্ধড়ী ধুয়ে দিয়ে আসি! যত বড়
মুখ নয়, তত বড় কথা! আমি কি তার বাপের বাড়ীতে
এসেছি ?—এ আমার আপনার বােনঝির বাড়ী ! খুব
করব আসব ! এক বার কেন একশ বার আসব ! কোথায়
সে শতেকথােয়ারী হারামজাদী মাগী ।
তরঙ্গিণী বিরক্ত হইয়া বলিল-আঃ মাসিমা, কি কর?
দিদি কিছু বলেনি।
বামা হাসিয়া পরম বিজ্ঞভাবে বলিল—মুখে না বলুক
মনে মনে বলেছে। গুণ করে নিজের মনের কথাটা অ্যার
মনে চালান করে দিইচে।
মাসিমা বলিল—বামা, আজকে ত শনিবার আছে।
আজ সন্ধ্যেবেলা তাের সেই জলপড়াটা তরুকে দিস ত !
গুণ-টুন-গুনাে কেটে যাবে।
বামা বলিল—তাই খেয়ে দিদিমণি, তাই খেয়ে ।
বড় জর্বর জলপড়া। এ আমাদের গায়ের বিন্দে হাড়ি তুষ্ট
গয়লাকে শিখিয়েছিল ; তার ঠেঞে মাের শিক্ষে। এর
;
৪০

সদাননের বৈরাগ্য
ফল পেরতক্ষ হাতে হাতে দেখে নিয়ে। যেমন জলটুকু
খাবে এমনি বুক এস্তক হিম হয়ে যাবে, প্রাণ যেন
জুড়োবে ! আর যে নােক গুণ ওষুধ করেছে তাকে
একেবারে বিষ নজরে দেখবে।
দিনের পর দিন অহরহ ও অনুক্ষণ এইরূপ মন্ত্র জপ
শুনিতে শুনিতে ক্রমশ তরঙ্গিণীর মনও ভারাক্রান্ত হইয়া
উঠিতে লাগিল। সত্যই ত সতীন তাহাকে কেন ভালাে-
বাসিবে, সতীনকে কি কখনাে ভালােবাসা যায় ? যে স্বামীর
ভাগ কাড়িয়া লইয়াছে তাহাকে ভালোবাসা কি সােজ।
কথা? আর-একজন মেয়ে যদি মােলক পরিয়া মল
বাজাইয়া এখন তাহার স্বামীর হৃদয় জুড়িয়া বসে তবে কি
তরঙ্গিণী তাহাকে একদণ্ডও বরদাস্ত করিতে পারে? সে
তাহাকে নখে টিপিয়া মারিয়া তবে নিশ্চিন্ত হয়। নিজের
ছেলে হয় নাই বলিয়া নৃত্যকালী তরঙ্গিণীকে ঘরে
আনিয়াছিল ; এক্ষণে তাহার ছেলেটি দখল করিয়া সে
নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়াছে।
ছেলে হওয়ার পর হইতে
নৃত্যকালী ত বাস্তবিকই তাহাকে আর তেমন যত্ন করে না,
তাহার খাওয়া পরা সম্বন্ধে আগের মতাে খোজ খবর লয়
৪১

সদানন্দের বৈরাগ্য
। সমস্ত সংসার তাহার মুঠার ভিতর, সে হাত তুলিয়া
যাহা দেয় তাহাই তরঙ্গিণীর। পাছে তরঙ্গিণী নিজের
সংসার দেখিয়া শুনিয়া বুঝিয়া লয় তাই তাহাকে নৃত্যকালী
সংসারের একখানা কুটা ভাঙিয়া দুখানা করিতে দেয় না।
তরঙ্গিণীকে একটিও কাজ করিতে না দিয়া নৃত্যকালী যে
একাই খাটিয়া মরে, ইহা ত তাহার মমতা নহে, পূরাদস্তুর
স্বার্থপরতা! তরঙ্গিণীকে সমস্ত হইতে বঞ্চিত করিবার
ফন্দি ! সমস্তর না হােক, সে অর্ধেকের ভাগী ত ?
অর্ধেকেরই বা কেন? নৃত্যকালীকে অশ্রদ্ধা করিয়া ত্যাগ
করিয়াই না তাহার স্বামী তাহাকে বিবাহ করিয়াছে ?
তাহার স্বামীর যে পুত্রধনের অভাব নৃত্যকালী হইতে মিটে
নাই তাহা সেই না মিটাইয়াছে ? সমস্ত তাহার—স্বামী
তাহার, থােকা তাহার, ঘরকন্না তাহার ! অথচ তাহার
যেন কিছুই নয়—স্বামী যেন নৃত্যকালীর দয়ার দান, খােক।
বাজেয়াপ্ত, ঘরকন্না বেদখল ! ইহার প্রতিকার তাহাকে
করিতে হইবে।
এত কথা তরঙ্গিণী নিজে গুছাইয়া মনে ভাবিতে পারে
নাই। তাহার মাসিমা ও মাসিমার সহচরী বামা বিনাইয়া
82

সদানন্দের বৈরাগ্য
বিনাইয়া গুছাইয়া গুছাইয়া তাহার মনের সম্মুখে এই-সমস্ত
কথা দিনের পর দিন সাজাইয়া ধরিতেছিল।
তরঙ্গিণী মুখ ভার করিয়া থাকে। নৃত্যকালী যদি
জিজ্ঞাসা করে—তরি, তাের হ’ল কি ? অমন করে
থাকিস কেন?
তরঙ্গিণী বলেন, কিছু ত হয়নি। শরীরটা ভালাে
নেই।
প্রথম-প্রথম নৃত্যকালী মনে করিত যে মাসিমা এতদিন
আছে বলিয়া বােধ হয় তরঙ্গিণী কুষ্ঠিত ও বিরক্ত
হইতেছে। কিন্তু সে অল্প লক্ষ্য করিয়াই বুঝিল যে তাহার
অনুমান যথার্থ নয়; এখন তরঙ্গিণী সদাসর্বদাই তাহার
মাসিমার কাছে কাছেই থাকে ; তিনজনে মিলিয়া সৰ্ব্বদাই
ফিসফিস গুজগুজ হয়, নৃত্যকালীকে দেখিলেই চুপ করে।
নৃত্যকালী বুঝিল যে একটা কিছু ষড়যন্ত্র চলিতেছে, কিন্তু
সে তরঙ্গিণীকে কিছুই জিজ্ঞাসা করিতে পারিল না।
তরঙ্গিণীর মনে বদ্ধমূল ধারণা হইয়া গেল যে, নৃত্যকালী
এতদিন তাহাকে নিছক ঠকাইয়া আসিয়াছে। এখন
সংসারের ভার তাহার নিজের হাতে না লইলে নয়। তখন
৪৬

সদানন্দের বৈরাগ্য
তাহার মনে পড়িল যে নৃত্যকালী একদিন তাহাকে
বলিয়াছিল যে যেদিন তাহার ইচ্ছা হইবে মুখ ফুটিয়া
বলিলেই সে সংসার হইতে সরিয়া যাইবে।
তরঙ্গিণী আস্তে আস্তে গিয়া নৃত্যকালীর কাছে বসিল।
নৃত্যকালী একবার তাহার গম্ভীর মুখের দিকে চাহিয়া
বলিল—তরি, এতদিনে দিদিকে.মনে পড়ল? এখন আর
দিদির কাছে থাকতে ভালাে লাগে না, না ?
তরঙ্গিণী বাঁ হাতের বালা ডান হাত দিয়া ঘুরাইতে
ঘুরাইতে বলিল-দিদি, ভাঁড়ার-ঘরের আর সিন্দুকের
চাবিগুলো আমাকে দাও।
নৃত্যকালী তাহার কথার অর্থ না বুঝিতে পারিয়া
বলিল—কেন, কি নিবি?
তরঙ্গিণী মাথা নত করিয়া বলিল—কিছু নেব না।
-তবে?
চাবিগুলাে আমার কাছেই রাখব।
তা হলে সংসার থেকে আমায় এতদিনে ছুটি
দিচ্ছিস?
৪৪

সদাননের বৈরাগ্য
।
নৃত্যকালী হাসিয়া তরঙ্গিণীর মুখচুম্বন করিয়া বলিল—
আঃ! বাঁচলাম তরি! তাের ঘরকন্না তােরই ত দেখা
উচিত। এই নে চাবি। কিন্তু খােকাকে কেড়ে নিসনে,
লক্ষ্মী বােন আমার !
নৃত্যকালীর চোখ হইতে বড় বড় ফোটায় দরদর ধারে
অশ্রু গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।
তরঙ্গিণী সেখানে আর থাকিতে না পারিয়া উঠিয়া
পড়িল।
সে চলিয়া যাইতেছে দেখিয়া নৃত্যকালী .
তাড়াতাড়ি আঁচলে চোখ মুছিয়া বলিল—তরি, চাবি যে
পড়ে রইল
তরঙ্গিণী বলিল—না দিদি, চাবি আমার চাইনে।
তােমারই থাক।
কোথা হইতে মাসিমা তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া
চাবিগুলি হস্তগত করিয়া বলিল-তরু, বড় মেয়ে তােকে
চাবি দিচ্ছে, নে। কেমন মেয়ে বাছা, বড় মেয়ে চাবি
রাখবে না, তুই রাখবি নে, ত রাখবে কে? থাক তবে
আমারই কাছে।
মাসিমা চাবিগুলি লইয়া তরঙ্গিণীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ

সদানন্দের বৈরাগ্য প্রস্থান করিল। নৃত্যকালী অবাক হইয়া মাসিমার গমন- পথের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। মাসিমা গিয়া তরঙ্গিণীকে ভৎসনা করিয়া বলিল- ন্যাকা মেয়ে কোথাকার! ডাইনির চোখের মায়াকান্না দেখে অমনি গলে গেলেন ! ভাগ্যিস আমি কাছাকাছি ছিলাম ! বামা বলিল—সব ত লিলে, কিন্তু মাগীর প্যাটরাট। ত দেখলেনি। ঐটার মধ্যে ও সব লুকিয়ে রেখে দিইচে। মাসিমা বলিল—ভালাে বলেছি বামা! দেখ তরু, মাগীটার প্যাটরা একবার খুলে দেখে নিগে যা। তরঙ্গিণী জোরে ঘাড় নাড়িয়া দৃঢ়ম্বরে বলিল—সে আমাকে দিয়ে হবে না মাসিমা। তবে আমি বলিগে। -না মাসিমা, খবরদার ও রকম করে দিদিকে অপমান করলে আমি মাথায় কাটারী মেরে রক্তগঙ্গা হব। মাসিমা অমনি নাকি কান্নার সুরে বলিয়া উঠিলেন— ওমা, কি সর্বনেশে কথা বলিস তরু! যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর! কি জবর ডাইনি ও মাগী! তােকে

সদানন্দের বৈরাগ্য
একেবারে বশ করে’ ভেড়া করে রেখেছে ! তাের যা-খুসি
করগে যা ; কালকে আমি বাড়ী চলে যাব। কেন রে বাপু
নিজের সব বইয়ে চুইয়ে পরের জন্যে বুকের রক্ত জল
করা!
মাসিমা ক্রমশ ফেঁাস-ফোস করিতে করিতে চক্ষে অঞ্চল
আরােপ করিল। বামাও চোখ মুছিতে লাগিল।
তরঙ্গিণী শক্ত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল ; একটিও সান্ত্বনার
কথা বলিল না।
পর দিন মাসিমার বাড়ী যাইবার কোনাে উদ্যোগই
দেখা গেল না। বরং উল্টা মাসিমা ভাঁড়ার-ঘরের চাবি হাতে
পাইয়া সংসারের বিলিবন্দেজ করিতে মনঃসংযােগ করিল।
রােজ দুধ লওয়া হয় দুই সের—এক সের খােকা খায়, আধসের
খােকায় বাবা খায়, বাকি আধ সের নৃত্যকলী ও তরঙ্গিণী
খাইত। মাসিমা আসার পর নৃত্যকালীর দুধের ভাগ মাসি-
মার বরাদ্দ হইয়াছিল। সেই বরাদ্দই কায়েমী হইয়া গেল।
রাত্রে সকলেই লুচি খাইত; এখন নৃত্যকালীর জন্য ভাতের
বরাদ্দ হইল—এয়ােস্ত্রী মানুষের দুবেলা ভাত খাওয়াই ত
উচিত। মাসিমা বিধবা মানুষ তাহার লুচি ত না খাইলেই
•
৪৭

সদানন্দের বৈরাগ্য
নয়। বছরে চারখানা কাপড়ের বেশি কেনা বাজে খরচ,
ফোতাে নবাবী-নৃত্যকালীর বাক্সভরা কপড় আছে, পূজার
সময় তাহার আর নৃতন কাপড় কেনার দরকার নাই।
নৃত্যকালী দোক্তা খায় বলিয়া তাহার পানের খরচ বেশি
নেশা ভাঙ যাহার করিতে হয় সে নিজের খরচে করুক,
সংসার হইতে সে বাজে খরচের জন্য পয়সা কেন পাইবে?
বাড়ীতে দুজন দাসী ছিল, একজন সংসারের ঘরকন্নার কাজ
করিত, আর একজন দুই বৌ-এ কাজ করিত—এখন
একজনা ঘরকন্নার কাজ করিয়াই ছুটি পায় না, অপরজন
তরঙ্গিণীর কাজ করিয়া মাসিমার বাতে তেল মালিশ করিয়া
ও মাথার পাকা চুল তুলিয়া সময় পায় না।
নৃত্যকালী কিন্তু হাসিমুখেই এ-সমস্ত সহ করিতেছিল।
সে একদিনে দোক্তা আর পান খাওয়া ছাড়িয়া দিল ;
নিজের কাপড় সে নিজে কাচে; অশ্রদ্ধার দানও সে
হাসিমুখে গ্রহণ করে। কেহ তাহাকে কাজ করিতে
দেখিয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলে বলে—বাড়ীতে দুটি বৈ ত
ঝি নেই, কুটুম্ব মানুষ বাড়ীতে, পাছে তাহাদের কষ্ট হয়
তাই ঝিয়েদের ওঁদের কাছে-কাছেই থাকতে বলে দিয়েছি।
৪৮

সদানন্দের বৈরাগ্য এইরূপ বিলিবজে করিয়া মাসিমা যখন দেখিল যে নৃত্যকালী কোনাে আপত্তি তুলিল না, জামাইয়ের কানেও এ কথা উঠিল না, তখন সে সাহস পাইয়া তরঙ্গিণীর কানে মন্ত্রজপ করিতে সুরু করিয়া দিল—দেখ তরু, তুই কি 'ভাব- ছিস জানিনে, আমি তােরই ভালাের জন্যে সংসারের খরচ কমিয়ে আনছি—যে দুপয়সা বাঁচবে সে তােরই, আমার কি বনা! কিন্তু মাগী কি সয়তান, টু শব্দটি করছে না। কি তুকতাক করবার মতলবে আছে। তাের সােয়ামীর কাছে (তার যে আদর সে তোের খােকার জন্যেই না? নইলে ও হ’ল গিয়ে ওর সময়ের বৌ, ওর ওপর সােয়ামীর যতখানি টান হবে ততখানি কিছু আর তাের ওপর হবে না। এখন খােকার কোনাে রকম ভালাে-মন্দ করতে পারলেই ওর মনস্কামনা সিদ্ধ হয়। এখন খােকাকে ওর ত্রিসীমানায় যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। দেখিসনে থােকাকে সামনে বসিয়ে একদৃষ্টে হা করে কেমন তাকিয়ে থাকে। তরঙ্গিণীর বুকের মধ্যে ছাত করিয়া উঠিল। বাস্তবিক ত সে দেখিয়াছে নৃত্যকালী খােকাকে সামনে বসাইয়া সদানন্দের বৈরাগ্য একদৃষ্টে তাহাকে দেখে। তাই সে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিল-অমন করে তাকিয়ে থাকলে কি হয় ? বামা বলিল-বুকের রক্ত শুষে লেয় গাে বুকের রক্ত শুষে লেয়। মন্তর পড়ে সাত দিন তাকালেই হাতি মালট খায়, ও ত একরত্তি বাচ্চা! আমাদের গায়ের ইচ্ছে বুড়ী অমনি করে আমার ভাসুর-পাের পেরাণডা শুষে খেয়েছিল -না গা মা ঠাকুরুণ, তুমি ত সব জান ! মাসিমা মুখ অত্যন্ত স্নান করিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল,- মা, জানি বলেই ত ভাবনা! কিন্তু তরু ত কথা শুনবে না। জামাইকে বলে ওকে এক্ষুনি বাড়ী থেকে বিদেয় করে দেওয়া উচিত। মাসিমার অবিশ্রাম মন্ত্র জপে তরঙ্গিণীর মন নৃত্যকালীর উপর বিরূপ হইয়া উঠিলেও সে একবার বাকিতেছিল, এক- একবার দিদির প্রাণঢালা স্নেহ স্মরণ করিয়া সমস্ত বিরূপ ভাব মন হইতে ঝাড়িয়া ফেলিতে চেষ্টা করিতেছিল; কিন্তু যখন তাহার বিশ্বাস জন্মিল যে তাহার সৌভাগ্যের নিদান বুক-চেরা ধন খােকাকে প্রাণে মারিবার জন্য নৃত্যকালী চেষ্টায় আছে, তখন তরঙ্গিণীর মন নৃত্যকালীকে একেবারে

সদানন্দের বৈরাগ্য
বিষের মতাে বােধ করিতে লাগিল। তাড়াতাড়ি ভূঙ্গিণী
স্বামীকে গিয়া বলিল—ওগাে শুনেছ, বড়গিন্নি আমার
খোকাকে রােজ তুক করে
০ ০ ০ ০ ০ ০
নৃত্যকালী কিছু না বলিলেও তাহার স্বামী অনুমানে
বুঝিতে পারিতেছিল যে মাসিমার ব্যবহার নৃতাকালীর
প্রতি বিশেষ হৃদ্যত নহেই, বরং নৃত্যকালী যেন কিছু
উৎপীড়িত হইতেছে। মাসিমা আডডা গাড়িয়া বসিয়া
তাহাদের সুখের সংসারের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ঘটানােতে
তরঙ্গিণীর স্বামী তরঙ্গিণীর উপরও একটু বিরক্ত হইয়াই
ছিল, মনে করিতেছিল সেই বােধ হয় মাসিমাকে ধরিয়া
বাড়ীতে রাখিয়াছে। তাই এখন তরঙ্গিণীকে নৃত্যকালীর
নামে লাগাইতে শুনিয়া তাহার কথায় বাধা দিয়া রাগ
করিয়া বলিয়া উঠিল—যাও যাও যাও, ওসব ছােটলোকের
মতন কথা শুনতে চাইনে।
ও বুকের রক্ত জল করে’
তােমার ছেলে মানুষ করছে কি না, তার এই
পুরস্কার ! কে তােমাকে এসব শেখাচ্ছে ? আগে ত
তুমি এমন খােলো ছিলে না। ফের ও রকম কথা মুখে

সদাননের বৈরাগ্য
আনলৈ ঝড়ে মুলে সবাইকে একদিনে একসঙ্গে দূর
করে দেবাে।
সূত্রপাতেই স্বামীর নিকট তিরস্কৃত হইয়া তরঙ্গিণী
কঁদিয়া গিয়া মাসিমার কাছে পড়িল। মাসিমা সব শুনিয়া
বলিল—এ-সমস্তই ঐ ডাইনি মাগীর খেলা; ও মস্তর
পড়ে তাের ওপরে জামাইয়ের মন চটিয়ে দিচ্ছে।
হয় নয় তুই ভেবে দেখ-জামাই কি কখনাে তােক
এমন করে একদিনও বকেছে ? তরঙ্গিণী দেখিল, সত্যই
ত, স্বামী শুধু সােহাগই করিয়াছে, তিরস্কার আজ এই
প্রথম এবং অতি অকস্মাৎ । তখন তরঙ্গিণী ব্যস্ত হইয়া
বলিল—তাইত মাসিমা, তবে কি হবে ?
মাসিমা গম্ভীর ভাবে বলিল—আমি ত বাছা কবে
থেকে পয় পয় করে বলছি যে বিষদাত চেপে বসবার আগে
সাবধান ই। এখন ও কামড়ে ধরেছে তাের কপাল
ভাঙতে আর দেরি নেই। সােয়ামীর মন কেড়ে নিলে,
ছেলে কেড়ে নিলে, তাের আর থাকল কি! আহা, ছেলে
নয় ত যেন রাজপুত্তর! রােগে ভােগে মরে, সই হয়, এ
আলটপকা গিলে খাবে গা।

সদানন্দের বৈরাগ্য সর্বনাশের সম্ভাবনায় শিহরিয়া উঠিয়া তরঙ্গিণী কাদিয়া মাসিমার পায়ে পড়িয়া বলিল—মাসিমা, আমার খােকাকে তুমি বাঁচাও ! মাসিমা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—বাঁচাই আর কে করে’ মা—মাগীর চোখের আড়াল না করলে শিবের সাধ্য নেই যে বাঁচায়। একেবারে মকৃথম কামড় কামড়েছে। ছেলে দিনকে দিন একেবারে নীলমূর্তি হয়ে উঠছে দেখছিস নে ? তরঙ্গিণী ব্যস্ত হইয়া বলিল—তবে মাসিমা আমি থােকাকে নিয়ে তােমার সঙ্গে পালিয়ে যাই চল। মাসিমা হতাশ ভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিল-না মা, তাতেই কি নিস্তার আছে! খােকার নাড়ী পোঁতা যে এখানে ! নাড়ীর টানে ঐ প্রাণপুরুষকে টেনে বার করে আনবে। তরঙ্গিণী ভয়ে একেবারে মূচ্ছিতপ্রায় হইয়া বলিল- “মাসিমা, তবে উপায় ? —উপায় একমার ঐ মাগীকে সরানো। কেমন করে সরাব ? ওঁকে বলতে গেলাম... বামা বলিয়া উঠিল—লা লা, অমন করে লয়।

সদানন্দের বৈরাগ্য
ডাইনিকে কি অমন করে সরায় ? তুক তরিবৎ করে।
সরাতে হয়।
তরঙ্গিণী ব্যস্ত হইয়া বলিল—তুই কিছু জানিস বামা?
বামা ঘাড় কাত করিয়া আতার বীচির মতাে মিশি-
দেওয়া কালো কালাে দাত বাহির করিয়া বলিল-হিঁ :
তেরােস্পর্শ দিনে তেমাথ। পথের ওপর ঘেঁট কল আর
নিব্বিষী দিয়ে ঘেটুঠাকরুণের পূজো করতে হবে ;
উপােয করে ভরসন্ধ্যেবেলা ঠিক যেই একটি তারা উঠেছে
অমনি একটা আফলা শিমুল গাছের কাছে এক পায়ে
দাড়িয়ে সাতটা পাতা তুলতে হবে, আর মন্তর বলতে হবে—
শিমূল, শিমুল, শিমূল !
শত শতুর নির্মূল !
আঠায় কাটায় ভরা গা,
শত শত্তরের মাথা খা !
আঠায় আঁটো
কঁাটায় বেঁধে,
যে আমার সঙ্গে শত্রুরতাই সাধে
তার সঙ্গে শত্ত্বরতাই সেধাে !
২
৫৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
তারপর সেই সাতটি পত্তর মাথায় করে নিয়ে গিয়ে উলুঙ্গু
হয়ে জলে যমের দুয়াের দক্ষিণমুখাে হয়ে একটা দিতে
হবে। পাতা সাতটি ভেসে উঠলেই বুঝবে যে নিব্বিষী
হয়েছে ; আর, একটি পাতাও যদি মাথায় লেগে থাকে
তবে বুঝবে যে কামড় তখনাে ছাড়েনি।
মাসিমা তাড়াতাড়ি বলিল—তাের সেই পাগলাকালীর
গুড়ােটা তরুকে দিস না ? যত-বড়ই ডাইনি হােক, মা
কালীর কাছে আর বড়াই খাটবে না।
বামা বলিল—হ্যা দ্যাখ! ডাকিনী যােগিনী হল গে
মা-কালীর দাসী, মা-কালীর কাছে তাদের আবার বড়াই
কি? বডিড মনে করেই মাঠাকরুণ ! সেই গুড়াের একরত্তি
দিলেই যত-বড় ডাইনি হােক চোখ উল্টে পড়তেই হবে।
সে গুড়ো কি আমি কম কষ্টে জোগাড় করেছি?
গয়েসপুরের কালীর মােহন্তকে একবােতল
ছিদাম মােড়ল এনেছিল—বললে না পেত্যয় যাবে,
অমাবস্যর রাত্রে চঁড়ালের মাথার খুলিতে চিতার আগুনে
মদ দিয়ে ঐ ওষুধ তৈরি! ওর কি কম মাহাত্তির ।
এই বলিয়া বামা করজোড়ে উদ্দেশে কি জানি কাহাকে
মদ দিয়ে

সদানন্দের বৈরাগ্য
প্রণাম করিল। দেখা-দেখি মাসিমাও প্রণাম করিল।
ভয়ে ভয়ে তরঙ্গিণীও করিল।
তরঙ্গিণী বলিল—সে কি গুড়াে? বিষ-টিষ নয় ত?
বামা বলিল—আরে রাম রাম ! বিয় লয়, বিষ লয়।
মা-কালীর পেরসাদ, চরণধূলি !
স্থির হইয়া গেল বামার উপদেশ অনুসারে তরঙ্গিণী
নৃত্যকালী ডাইনিকে ঝাড়াইয়া ভিটাছাড়া করিবে।
একাদশীর দিন সমস্ত তুকতাক করিয়া তরঙ্গিণী এক
বাটি দুধের সঙ্গে একটা শাদা গুড়ো মিশাইয়া রাখিল,
রাত্রে নৃত্যকালীকে খাইতে দিবে, সকালে সে চক্ষু উল্টা-
ইয়া পড়িয়া থাকিবে। তরঙ্গিণী বার বার করিয়া জিজ্ঞাসা
করিল–হ্যা বামা, ও বিষ-টিষ নয় ত ?
বামা বলিল—বিষ কেনে হবেক গাে? আমরা কি
মানুষ খুন করি?
তরঙ্গিণী ভয়ে বিবর্ণ শুষ্ক মুখে বলিল—দেখিস বামা,
হিত করতে যেন বিপরীত না হয়।
বামা জোর দিয়া বলিল—লা গােলা, তােমার কিছু
ভয় লেই।

সদানন্দের বৈরাগ্য ? সন্ধ্যার পর নৃত্যকালী রান্নাঘরে থােকার দুধ আনিতে গেল। তাহাকে রান্নাঘরে যাইতে দেখিয়াই তরঙ্গিী জিজ্ঞাসা করিল—দিদি, কি নেবে? খােকার দুধ। থােকার দুধ ঐ ক্ষিরে বাটিতে আছে। ঐ সরফুলে বাটির দুধ নিয়ে না যেন, ও দুধ তােমার জন্যে 'অেেছ। নৃত্যকালী বিস্মিত হইয়া ফিরিয়া বলিল—আমার জন্যে। আমি কি দুধ খাই তরঙ্গিণী থতমত খাইয়া অপ্রতিভ হইয়া বলিল- মাসিমার আজ একাদশী কি না, তাই একটু রেখেছি। নৃত্যালী আর কিছু না বলিয়া রান্নাঘরে গিয়া দু- বাটির দুধ এক করিয়া থােকাকে খাওয়াইতে লইয়া গেল। তরঙ্গিণী দেখিল যে নৃত্যকালী জগন্নাথী বাটিতেই দুধ লইয়া গেল। কিন্তু তাহার মন অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। সেই শাদাগুড়ো মা-কালীর চরণরেণু বলিয়া এতক্ষণ মনকে বােক বুঝাইবার চেষ্টা করিলেও, ভুলক্রমে থােকার তাহা খাওয়ার সম্ভাবনা মনে করিয়া তরঙ্গিণী ব্যস্ত ও চঞ্চল হইয়া

সদাননের বৈরাগ্য
উঠিল। সেই শাদা গুড়া যে বিষ, ইহা এখন সে নিজের
মনের কাছে কিছুতেই অস্বীকার করিতে পারিল না। সে
ভাবিতে লাগিল সাদা গুড়া মিশাইয়াছিল সরফুলে বাটিতেই
ত ঠিক ? শ্রীক্ষেত্রের বাটিতে ত নয়? ভাবিতে ভাবতে
তাহার সমস্ত গােলমাল ঠেকিতে লাগিল—একবার মনে হয়
ক্ষেত্রের বাটিতে গুড়া মিশাইয়াছে, একবার মনে হয়
সরফুলে বাটিতে। সে ব্যস্ত হইয়া রান্নাঘরে যে বাটি আছে
তাহাতে আঙুল দিয়া দেখিতে গেল তলায় গুড়া থিকাইয়’
আছে কি না। বাটিতে আঙুল দিতেই দেখিল বাটিতে
দুধ নাই, বাটির তলায় গুড়া কিচকিচ করিতেছে। তরঙ্গিণী
একেবারে পাগলের মতো হইয়া ঝড়ের বেগে ঘর হইতে
ছুটিয়া যাইতে যাইতে চীংকার করিয়া বলিয়া উঠিল—
দিদি, ও দুধ খােকাকে খাইয়ে না, থােকাকে ও দুধ
খাইয়াে না !
তরঙ্গিণী ছুটিয়া আসিয়া দালানে উঠিয়া দেখিল
নৃত্যকালী খােকাকে বিমুকে করিয়া দুধ খাওয়াইতেছে।
তরঙ্গিণী বাঘিনীর মতো ঝাপাইয়া পড়িয়া একহাতে
নৃত্যকালীর হাত চাপিয়া ধরিয়া অপর হাতে বাঢ়ি তুলিয়া
৫৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
এক নিশ্বাসে সমস্ত দুধটা নিজে খাইয়া ফেলিয়া বাটিটা
দূরে আছড়াইয়া ফেলিয়া দিল।
নৃত্যকালী হাসিয়া গড়াইতে গড়াইতে বলিল—আ মর
পােড়ারমুখী, তুই দিনকের দিন পাগল হচ্ছিস নাকি,
ছেলের দুধটা খেয়ে ফেলি, আমি এখন খােকাকে কি
খাওয়াই বল ত?
এতক্ষণে তরঙ্গিণী নিশ্বাস লইয়া উচ্ছ্বসিত হইয়, কঁাদিয়া
উঠিয়া নৃত্যকালীর পা ধরিয়া বলিল—দিদিগো, সয়তানীদের
কথা শুনে দুধে আমি বিষ দিয়েছিলাম তােমায় খাওয়াব
তার ফল আমি হাতে হাতে পেলাম। দিদি
তােমার খােকাকে তুমি বাঁচাও।
নৃত্যকালী তাড়াতাড়ি খােকার গলায় অঙল দিতেই
থােক। যে দু ঝিনুক দুধ খাইয়াছিল তুলিয়া ফেলিল। সুস্থ
সবল থােক। অল্পক্ষণ একটু অবসন্ন হইয়া থাকিয়া চাঙ্গা
হইয়া উঠিল। কিন্তু ডাক্তারের চেষ্টাতেও তরঙ্গিণী বঁচিল
। তরঙ্গিণী অজ্ঞান হইয়া পড়িতে পড়িতেও ক্ষীণকণ্ঠে
একবার জিজ্ঞাসা করিল-দিদি, খােকা বাঁচবে ?
নৃত্যকাশী তরঙ্গিণীর ভূমিলুষ্ঠিত মস্তক কোলে তুলিয়া
বলে।

সদাননের বৈরাগ্য
লইয়া কঁদিতে কাদিতে বলিল-বাচবে তরি বাঁচবে।
তুইও বেঁচে উঠে তাের থােকাকে তুই নে, আমি আর
তাের খােকার ভাগ নেব না।
তরঙ্গিণী আশ্বস্ত হইয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—আঃ।
দিদি, তােমার খােকা, তােমারই রইল ! আমার অপরাধ
ক্ষমা কোরাে! পায়ের ধুলো দাও দিদি ! একবার ওঁকে
ডাক, পায়ের ধূলাে নেব !
এমন সময় মাসিমা ডুকরাইয়া কঁদিয়া আসিয়া পড়িল
-ওরে তরু রে, এ কি সর্বনাশ হল রে !
তরঙ্গিণী নৃত্যকালীর দিকে বিষাবিষ্ট স্লান দৃষ্টি ফিরাইয়া
বলিল—আঃ দিদি ! ওদের এখান থেকে দূর করে দাও!

রামধনের কীর্তি
রামধন মণ্ডল বরিশালের কোনাে ক্ষুদ্র পল্লীগ্রামে জন্ম
গ্রহণ করে। দারিদ্র্য ও অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে করিতে
সে অজ্ঞাতনামা স্কুল হইতে এণ্টন্সি পাশ করিয়া দশটাকা
জলপানী পাইল; এবং কলেজে পড়িতে বরিশালে গেল।
তাঁহার পিতা তাহাকে কিছু সাহায্য করিতে পারিত
। অগত্যা তাহাকে ছেলে পড়াইয়া আরাে তিনটি টাকা
উপার্জন করিতে হইত। সুতরাং জলপানীর টাকাটা
দানাপানিতেই ব্যয় করিতে হইত ; জলপানী ব্যাপারটার
জল্পনা দরিদ্রের মনে স্থান পাইত না।
ত্রিসংসারে তাহার বৃদ্ধপিতা ভিন্ন আর কেহ ছিল না।
মৃত্যু যখন সেই একমাত্র আশ্রয়ও কাড়িয়া লইবার উপক্রম
করিতেছিল, তখন বালক রামধন বড় কাতর হইয়াছিল।
পুত্রকে রুদন্মুখ দেখিয়া বৃদ্ধ বলিল বাবা রামধন, ঠিক
আমার এই বিছানার নীচে তিনটা বােগনােভরা পাচ

সদাননের বৈরাগ্য । হাজার টাকা আছে, তারাই তােমার সহায় ও আশ্রয় হবে, ভয় কি বাবা। তুমি যদি বুঝে শুঝে চলতে পার, তােমার ভাবনা কি?” রামধন মনে করিল, ইহবিকারের প্রলাপ। সারাজীবন যে অন্নকষ্ট ও বস্ত্ৰকষ্ট পাইয়া জীর্ণ পর্ণকুটীরে লালিত হইয়াছে, সে একেবারে পাঁচহাজার টাকা প্রাপ্তির কথা প্রলাপ ও স্বপ্ন বলিয়া মনে করিবেই ত। তথাপি পিতার মৃত্যুর পর কৌতূহলবশে ঘরের মেঝে খুড়িয়া দেখিল, তিনটি পিত্তলের হাঁড়ির মুখে লােহার তাওয়া ঢাকা রহিয়াছে। ঢাকা সরাইতেই বরদ সহ- লােচন ইন্দ্রের মতো মুদ্রাগুলির সহিত রামধনের শুভদৃষ্টি হইল। প্রথম প্রণয়প্রসঙ্গ ভীতা নবােঢ়ার মতাে রামধনের অন্তরটা দুরুদুরু করিয়া উঠিল। রামধন স্থির করিল, এই টাকা লইয়া সে কলিকাতায় গিয়া ভালো করিয়া লেখাপড়া করিবে। যথা চিন্তা, তথা কাজ। বরিশালের কলেজ হইতে ট্রান্সফার লইয়া একেবারে কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে

সদানন্দের বৈরাগ্য
গিয়া ভর্তি হইল এবং হিন্দু-হােষ্টেলের ত্রিতলে একা একটি
ঘর লইয়া বাসস্থাপন করিল।
রামধন অতি অল্পকালের মধ্যে মহাধনবান বলিয়া
খ্যাত হইয়া উঠিল। সে কলেজের ব্যান্নাম বিভাগের
চঁদা দিয়া নিয়মিত ব্যায়াম করিত এবং ব্যায়ামান্তে পেস্তা
কিশমিশ বাদাম আখরােট চালগুজা সরভাজা পেট
ভরিয়া খাইত এবং সঙ্গাদিগকে খাওয়াইত। কারণ
ব্যায়ামান্তে পুষ্টিকর খাদ্যাহার শাস্ত্রের ব্যবস্থা !
অহােরাত্রে পাঁচবার চা খাওয়ার জন্য হােষ্টেলময় ধন্য
ধন্য পড়িয়া গেল। মৌতাতের সময় প্রসাদপ্রার্থী অনেক
বন্ধু জুটিত। বনমালী জলখাবার জোগাইয়া উঠিতে
পারিত না; ব্ৰজঠাকুর চপ, কটলেট ভাজিতে ভাজিতে
পরিশ্রান্ত হইয়া উঠিত ; রজনী বেচারার গােড়া লেমনেড
জোগাইতে দশবার তেতলা উঠানামা করিতে পায়ে বাত
ধরিয়া গেল। ভজহরির কুল্পিবরফ এবং বাথ গেটের
পাইপ পানীয় না হইলে রামধনের সান্ধ্য মজলিস
ভালাে জমিত না। প্রত্যহ চার পয়সার মাখনের
পাতামােড় ঠোঙা ঝুলাইয়া ভােজনাগারে যাইত এবং
;

সদানন্দের বৈরাগ্য
আপনার পার্শ্ব ও সম্মুখবর্তী বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কিয়দংশ
বিতরণ করিয়া দিত। এইরূপে রামধনের প্রসার ও
খ্যাতি খুব জমিয়া উঠিল।
রামধনের বিশেষত্ব সকল দিকে। হেয়ারকাটার চুল
ছাটিত ! লেডল কোম্পানি শার্ট জোগাইত ; নৃত্য ধােপ
তিন দিন অন্তর কাপড় কাচিত; এবং দন্তমঞ্জন হইতে
সাবান এসেন্স পর্যন্ত রামধনের চেরিরসমের প্রতি
পক্ষপাতিত্ব দেখা যাইত।
রামধন যখন সন্ধ্যার পর বেড়াইয়া ফিরিত তখন
বামহস্তের দিব্য ইস্ত্রিকরা চকচকে শার্টের কফের উপর
বেলফুলের কুণ্ডলিত মালা মৃদু স্নিগ্ধ গন্ধ বিতরণ করিত।
শনি-রবিবারে থিয়েটার কামাই যাইত ন'; এবং
বিলাসিনীদিগকে পুষ্পার্ঘ্য দিতে সে মুক্তহস্ত ছিল।
ম্যাকবেথ অভিনয় দেখিতে কাহাকেও পুস্পার্ঘ্য দিবার
অবসর না পাইয়া (লেডি ম্যাকবেথকে উপহার দিতে
তাহার বােধ হয় সাহসে কুলায় নাই) বিকৃতদর্শন ডাইনী
পিশাচীদের শ্রীশ্রীচরণকমলেষু পুস্পাঞ্জলি দিয়া দর্শকদের
রূঢ়ষ্যাহত হইয়া বেচারা বড় ব্যথা পাইয়াছিল; কিন্তু
•

সদানন্দের বৈরাগ্য
সে বুঝিয়াছিল “তােমরা সবাই ভালাে, কেউবা দিব্যি
গৌরবরণ, কেউবা দিব্যি কালো।”
রামধন হােষ্টেলে আসার পর অনেককে মনিব্যাগের
বন্ধন বড় একটা খুলিতে হইত না। কিন্তু রামধনের
ব্যাগ অনাসক্ত
অনাসক্ত নিত্যমুক্ত
নিত্যমুক্ত হইয়া মােক্ষপথে অগ্রসর
হইতেছিল। এবং বনমালী, ব্রজ, রজনী ও ভজহরির
ট্যাক যে পরিমাণে ভারী হইতেছিল, ঠিক সেই অনুপাতে
শ্ৰমান রামধনের ব্যাগ লঘু হইতেছিল।
রামধন দেখিল যে তৎপঠিত রসায়নশাস্ত্রে টাকার
উবায়ু সংজ্ঞা না থাকিলেও, টাকা নিতান্ত উবায়ু। বৎসর
ফিরিতে না ফিরিতে পঞ্চসহস্রের মধ্যে পঞ্চশত মুদ্রা রহিল
কি না সন্দেহ। তখন রামধন ধার লইতে আরম্ভ করিল।
বাজারে তাহার নামডাক যথেষ্ট। প্রথম প্রথম বেশ ধার
মিলিতে লাগিল।
কলেজের বেতন, হােষ্টেলের খাই খরচ, পরীক্ষার ফি
প্রভৃতি অবশ্য নগদ দেয় বিষয়ে খরচ করিতে করিতে অবশিষ্ট
অর্থও শী নিঃশেষের অভিমুখী হইল।
তখন বনমালী, ব্রজ, রজনী, ভজহরি, নৃত্য প্রভৃতি

সদানন্দের বৈরাগ্য
পাওনাদারেরা তাগাদা আরম্ভ করিল। তাগাদা প্রথমে
অনুরােধ, তৎপরে অনুযােগ, অবশেষে আস্ফালনে পরিণত
হইল। প্রথম প্রথম বন্ধুবান্ধবদের নিকট হইতে কিছু
কিছু হাওলাত লইয়া পাওনাদারদের থামাইল। কিন্তু
অবশেষে বন্ধুদের নিকটও ঋণ দুষ্প্রাপ্য হইল ।
চারিদিকে শাণিত-তাগাদা-শরবর্ষী চতুর্দশ রথীতে
আক্রান্ত হইয়া বেচারা রামধন একদা রাত্রে যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন
করিয়া একেবারে শিয়ালদহ ষ্টেশনে এবং সেখানে প্রথম
চলিষ্ণু ট্রেন ডায়মণ্ড-হারবারের দেখিয়া একখানা টিকিট
কিনিয়া তাহাতেই সওয়ার হইয়া একেবারে ডায়মণ্ড-হারবার
গিয়া উপস্থিত হইল। বেচারা পুলিশের ভয়ে এবং কি
এক অজ্ঞাত সঙ্কোচে লােকালয়ে যাইতে পারিল না।
গ্রামের বাহিরে এক বনের মধ্যে একটা অতি উচ্চ
দেবদারুর ঘনকুঞ্চিত পত্রান্তরালে লুকাইয়া রহিল ; সমস্ত
দিন অনাহারে ভয়ে ভয়ে কাটিয়া গেল।
সন্ধ্যার পূর্বে দেখিল এক বৃদ্ধ গলায় টুটি-আঁটা মাল।
পরিয়া এবং সর্বাঙ্গ ডেড লেটার-আপিশ-ফেরত চিঠির
মতাে নানাবিধ ছাপে ভরিয়া, সেই গাছের তলায় উপস্থিত

সদানন্দের বৈরাগ্য
হইল। সে ভয়ে ভয়ে চারিদিক নিরীক্ষণ করিয়া দেখিল ;
কিন্তু রামধনের সৌভাগ্যক্রমে উপরে চাহিল না। চারি
দিক জনহীন দেখিয়া বৃদ্ধ বস্ত্রান্তরাল হইতে একটা কাপড়
মােড় পুলিন্দা বাহির করিয়া ভূমিতে রাখিল, তারপর
সেই দেবদারু বৃক্ষটার পাদদেশে একটা ছােট শাণিত
খােস্তা দিয়া ব্ৰস্তহস্তে একটা গর্ত খুড়িয়া সেই পুলিন্দাটা
প্রােথিত করিল এবং গর্তটিকে বেশ করিয়া ভরিয়া দিয়া
তাহার উপর একটা আশশেওড়ার গাছ রােপণ করিল
এবং সেই গাছের আশ-পাশে ঘাসের চাপড়া বসাইয়া
দিয়া বৃদ্ধ স্থানটিকে যথাসম্ভব নিঃসন্দেহ করিল। তৎপরে
পাছে তাহার নিজের স্থান ভুল হইয়া গােলমান উপস্থিত
হয় বলিয়া সেই স্থানটাকে চিহ্নিত করিবার জন্য খােস্তার
কোণ দিয়া দেবদারু-গাত্রে ত্বক কাটিয়া লিখিল ‘ইহ'।
বৃদ্ধ নিশ্চিন্ত হইয়া প্রস্থান করিল। রামধন বৃক্ষচুড়
হইতে যখন দেখিল যে বৃদ্ধ বহুদূরে চলিয়া গেল, তখন সে
বৃক্ষ হইতে অবরােহণ করিয়া দেবদারুর একটা শাখা ভগ্ন
করিয়া তৎসাহায্যেই সেই গর্তের উপরকার আগা মাটি
খুড়িয়া বৃদ্ধপ্রােথিত পুলিন্দাটি বাহির করিয়া লইল।

সদানন্দের বৈরাগ্য
এবং পকেট হইতে রজসের একখানা ছুরি বাহির করিয়া
সেই পুলিন্দাজড়ানাে মােমজমা কাপড়ের সেলাই কাটিয়া,
ফেলিল। কাপড় ছাড়িয়া বাহির হইল একটা টিনের
চোঙ। টিনের চোঙের ঢাকনি খুলিয়া বাহির হইল একটা
লম্বা মােটা বাঁশের চোঙা। চোঙার ভিতরে দেখা গেল
কতকগুলি করেন্সি নােট। সেগুলি দেখিয়া রামধন
উৎফুল্ল হইয়া উঠিল ; নিমজ্জমান ব্যক্তির আশ্রয় লাভের
মতাে সে সেই চোঙাটিকে দ্বিগুণ আগ্রহে চাপিয়া ধরিল।
আশা আশ্বাসে তাহার প্রাণ ভরিয়া উঠিল। রামধনের
অদৃষ্টে গুপ্তধন-প্রাপ্তিযােগ যথেষ্টই ছিল।
রামধন নােটগুলিকে সজ্জিত করিয়া পূর্ববৎ চোঙার
মধ্যে গুপ্ত করিল, এবং ছুরি দিয়া বৃক্ষগাত্রে বৃদ্ধের লেখার
সঙ্গে ত্বক কাটিয়া লিখিল—
ইহ গুপ্ত কেহ,
বিপন্ন দুরূহ,
নিল এই ঋণ
শােধ্য পেলে দিন।

সদানন্দের বৈরাগ্য তৎপরে রামধন গ্রামে প্রবেশ করিয়া এক বাড়ীতে আতিথ্য স্বীকার করিল এবং কথাপ্রসঙ্গে সেই তিলমালা- ধারী বৃদ্ধের পরিচয় জানিয়া লইল। বৃদ্ধের নাম জগন্নাথ, জাতিতে স্বর্ণবণিক, ধৰ্ম্মে পরম বৈষ্ণব। সে বেশ সঙ্গতিসম্পন্ন ছিল, কিন্তু দুই দুবৃত্ত অনাচারী মদ্যপ পুত্রের অসাবধান ব্যয়ে বৃদ্ধের অবস্থায় ভাটা লাগিয়াছে, ইত্যাদি। রামধন বুঝিল পুত্রের কবল হইতে রক্ষা করিবার জন্যই এই ধনগুপ্তি। রামধন পরদিন প্রাতঃকালে উঠিয়া বৃদ্ধের বাড়ী গেল এবং বৃদ্ধের সহিত আলাপ করিয়া, তাহার করুণকাহিনী শুনিয়া, বহু সমবেদনা ও আশ্বাস দিয়া, বৃদ্ধকে পরম আপ্যায়িত করিয়া আসিল। রামধন কলিকাতায় ফিরিয়া গিয়া একখানা সেকেন্ড ক্লাশ গাড়ী ভাড়া করিয়া একেবারে হােষ্টেলে আসিয়া উপস্থিত। তাহার পলায়নে হােষ্টলময় হৈ চৈ পড়িয়া গিয়াছিল ; তাহার প্রত্যাবর্তনে হােষ্টেল সন্ধ্যাকালের কাক- সমাকুল বটবৃক্ষের মতো, লােষ্ট্ৰাহত মধুচক্রের মতাে মুখর

সদাননের বৈরাগ্য
ব্যস্ত হইয়া উঠিল। কেহ আসিয়া ‘হাণ্ডশেক করিল,
কেহ পিঠে চাপড় কষিল, কেহ নমস্কার করিল, কেহ কুশল
জিজ্ঞাসা করিল। শ্ৰীমান্ রামধন তাহার চিরায়ত্ত হান্তে
সকলকে প্রীত-আপ্যায়িত করিয়া আপনার কক্ষে আসিয়া
দেখিল, তাহার দ্রব্যাদি সমস্তই স্থানান্তরিত হইয়াছে।
জিজ্ঞাসায় জানিল যে পাওনাদারদের নালিশ অনুসারে
সমস্ত দ্রব্যাদি হােষ্টেলের আপিস-ঘরে লইয়া রাখা হইয়াছে,
এবং অদ্য বেলিফ আসিয়া প্রকাশ্য নিলামে সমস্ত বিক্রয়
করিয়া বিক্রয়লব্ধ টাকা ঋণানুপাতে সকল পাওনাদারদের
মধ্যে বণ্টন করিয়া দিবে। ইহা শুনিয়া রামধন অতিমাত্র
বিরক্ত হইয়া, নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া, স্বর্ণ চশমার স্বচ্ছ
অন্তরালে চকু ঘুরাইয়া বলিল, “ফোঃ ক্রাউণ্ডেলস! ফাই
আনগ্রেটফুল ব্রুট! তারা আমাকে এত ছােটলােক
মনে করে ?
কেহ কেহ তাহাকে এড়ভাইস গ্রাটীস’ দিল যে,
পাওনাদারেরা যে-রকম চটিয়াছে তাহাতে তাহাদিগকে
সহজে তুষ্ট করা যাইবে না। অতএব কোনাে ‘ডেঞ্জার
ভে’ না করিয়া তাহার ‘গা-ঢাকা দেওয়াই ভালো।

সদানন্দের বৈরাগ্য রামধন হাসিয়া তাহার সদ্যোগত গুক্ষে একটা পাক দিয়া প্রভুত্বের ভাবে বলিল, “মে ইওরসেলভস ইজি, মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ডস, আই অ্যাম কোয়াইট এ ম্যাচ, ফর, দে।” তারপরে চোঙার মধ্য হইতে নােটের তাড়া বাহির করিয়া বিস্ময়-বিস্ফারিতলােচন বন্ধুদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সম্মুখে ধরিয়া রামধন বলিল, “ডােন্ট ইয়ু থিঙ্ক, আইয়্যাম ওয়েল ইকুইপট।” তখন ‘হিপ, হিপ, হুরে’ এবং ‘থি চিয়ার্স ফর রামধন- বাবু’ শব্দে (তখন ‘বন্দে মাতরম্' ধ্বনি প্রচলিত হয় নাই ) হােষ্টল প্রকম্পিত হইয়া উঠিল। রামধন তাহার বিস্মিত জিজ্ঞাসু বন্ধুদিগকে বুঝাইল যে তাহার অলস কর্মবিমুখ পাজি নায়েবটা জমিদারী হইতে ঠিক সময়ে টাকা পাঠায় নাই বলিয়াই ত এত অনর্থ। সে নিজে গিয়া তাহাকে রীতিমত শাসন করিয়া দিয়া এই টাকা লইয়া আসিয়াছে। ইত্যাদি। রামধন সেইদিন সমস্ত পাওনাদারদের সতিরস্কার দেনা দিল। বগণ দেখিয়া আনন্দিত হইল যে, রামধন-বাবু অনারেবলী অ্যাকুইটেড।

সদানন্দের বৈরাগ্য
রামধন বন্ধুবৰ্গকে পরিতােষ করিয়া ভােজ দিল। সে
দিন ভজহরি পঁচিশ টাকার রােজবেনি-রসগােল্লার কুলপি-
বরফ বিক্রয় করিয়াছিল।
রামধন এক্ষণে ঠেকিয়া শিখিয়া বিশেষ মিতব্যয়ী ও
সংযমী হইল। সে বাহিরের দিকে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া-
ছিল বলিয়া এফ-এ কোনো গতিকে পাশ করিল। কিন্তু
তদনন্তর বিশেষ মেধাবী কৰ্তব্যনিষ্ঠ ছাত্র বলিয়া তাহার
নূতনতর খ্যাতি ও প্রতিপত্তি হইল। সে এম-এ ও বি-
এল পরীক্ষায় উচস্থান অধিকার করিয়া হাইকোর্টের
উকিল বিশ্বম্ভর বিশ্বাসের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ
করিল এবং শ্বশুরের আশ্রয়চ্ছায়ে ওকালতি আরম্ভ
করিয়া দিল
রামধন বিবাহ ও শশুরদত্ত টাকা বাঁধিয়া একদিন
ডায়মণ্ডহারবার অভিমুখে যাত্রা করিল।
ডায়মণ্ডহারবারে গিয়া বুড়া জগন্নাথের সহিত সাক্ষাৎ
করিয়া তাহাকে সকল কথা খুলিয়া বলিল। বুড়া ত
কাদিয়াই আকুল। তাহার হরিনামের ঝুলি রামধনের

সদানন্দের বৈরাগ্য মাথায় বার বার ঠেকাইয়া কত রকম শুভকামনা ও আশীর্বাদ করিল। পরে কিঞ্চিৎ সংবৃত হইয়া বলিতে ক্ষণেক লাগিল- “আমার গুণধর ছেলেরা আমার সর্বস্ব অপহরণ ও নষ্ট করছিল বলে বৃদ্ধবয়সের অভাবের দিনের জন্যে আমি সেই পাঁচহাজার টাকা সেই দেবদারুর তলায় লুকিয়ে রেখে এসেছিলাম। তখন আমার থলি শূন্য দেখে এক ছেলে অন্যত্র চুরি করে জেলে গেল; এবং অপরজন মদ খেয়ে একজন স্ত্রীলােককে খুন করে দ্বীপান্তরে গেছে। অন্য ছেলেটাও যদি দেশছাড়া হয়ে দ্বীপান্তরে যেত ত আমি একবারে নিশ্চিন্ত হতে পারতাম। যা হােক তবু কথঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত হয়ে অর্থের সন্ধানে গিয়ে দেখলাম সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি তৎক্ষণাৎ গলায় চাদর বেঁধে সেই দেবদারুরই ডালে ঝুলে সকল দুশ্চিন্তা, সম যন্ত্রণার অবসান কবুতাম ; কেবল তােমার

সদানন্দের বৈরাগ্য
‘ইহ গুপ্ত কেহ,
বিপন্ন দুই,
নিল এই ঋণ,
-
শােধ্য পেলে দিন।
আমাকে আশা ও আশ্বাস দিয়ে অকাল অপমৃত্যুর গ্রাস
থেকে রক্ষা করেছিল। এই শ্লোকের ঋণ’ ও ‘শােধ্য
এই দুটি কথা দুই বন্ধুর মতাে আমার দুই কানে
ক্রমাগত আশা ভরসা সান্ত্বনা আশ্বাস দিতে লাগল।
সেই দুটি কথার পরামর্শ-মতাে আমি অপেক্ষা করে
আছি ; এবং দারিদ্র-অনশন-ঋণে বিবিধ কষ্টভােগ করেও
অজ্ঞাত ঋণীর নিরন্তর শুভকামনা ও সুমতি প্রার্থনা
করেছি। বাপধন, তুমি আমারই ঐকান্তিক প্রার্থনাতে
এত বড়, এত সুশীল হয়েছ। যদি আশ্বাস দিযে না যেতে,
তবে বৃদ্ধের মনস্তাপে পলে পলে দগ্ধ হয়ে তুমি অধঃপাতে
য়েতে, একথা নিশ্চয়।
রামধন হাসিয়া অপ্রতিভভাবে ক্ষমা চাহিয়া সুদসমেত
শােধ করিল। তখন বৃদ্ধ জগন্নাথ রামধনকে
উকিল জানিয়া তাহা দ্বারা এক উইল প্রস্তুত করাইল।
৭;

সদানন্দের বৈরাগ্য
সমস্ত অর্থ গৃহপ্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ শ্যামসুন্দরের দৈনিক
সেবার ব্যয়ে নিয়ােজিত হইবে। পুত্রদ্বয় গৃহপ্রত্যাগত
হইলে পৈতৃক গৃহে বাস-অধিকার পাইবে এবং প্রত্যহ
দুই বেলা শ্যামসুন্দরের প্রসাদ পাইবে মাত্র। সম্পত্তির ট্রষ্টি
ও একজিকিটার নিযুক্ত হইলেন অন্য দুই জনের সহিত
হাইকোর্টের সুশীল ধৰ্মাত্মা উকিল শ্ৰীযুক্ত বাবু রামধন
মওল।

কব-ই-আশ সূক্ষ্মস্রোতা সরবৎ নদী তুর্কিস্থানের মরুপ্রান্তরে সরবৎ সদৃশ স্বাদু নীরধারা ঢালিয়া দিয়া সাগরে গিয়া আত্ম- বিসৰ্জন করিয়াছে। সরবৎ নদীর সিকতাময় পুলিন বেষ্টন করিয়া উত্তরে আখলাৎ গিরিমালা। গিরিসামুতে দ্রাক্ষাকুঞ্জ, খর্জুরবীথি। দক্ষিণকুলে শুধু সিকতার সীমা- হীন বিস্তার, মাঝে মাঝে পেস্তা চালগুজা প্রভৃতির ক্ষেত্রে হরিৎ শােভা। আখলাতের কোলে আদানা গ্রাম ; আখলাতের শীর্ষ-বিস্কৃত সরা নিঝরিণী আদানার বুক চিরিয়া নহত বহিয়া সরবৎ নদীতে গিয়া মিশিয়াছে। আদানা যেন বাঘার গঙ্গামৌলী মহেশের মতাে গম্ভীর সৌন্দর্য্যে মনােম। আমির আম্মন এই প্রদেশের অধিপতি। আদানায় তাহার পল্লীভবন। তাহার বয়স বত্রিশ বৎসর ; ক্রুর আরব মরুর মধ্যে মধুচরিত্র শামীপ। দিব্য গৌর, সদানন্দের বৈরাগ্য উন্নত, পেশপুষ্ট দেহ; পুষ্পপ্রফুল্ল কোমল মুখ : অংসবিলম্বী দীর্ঘ কুঞ্চিত বাবরি চুল ; পরিচ্ছদ সহজ সুন্দর ; দৃঢ়চরিত্র, নিষ্ঠাবান। গুলসুরৎ তাহার একমাত্র বেগম। গুলমুরং বাস্তবিকই “গুল-সুরৎ"। তাহার স্বামীর আদরের ডাক ‘গুল গুলাব”। বাস্তবিক সে গােলাপ ফুলের মতােই সুন্দর ; -গােলাপের লালিমা তাহার ওষ্ঠে ও গণ্ডে; গােলাপের কোমলতা তাহার দেহে ও মনে ; গােলাপের গন্ধ তাহার চরিত্রে ও ব্যবহারে ; গােলাপের কণ্টক কুর্দিস্থানের ঈর্ষাকাতর সুন্দরীদের চিত্তে । গুসুরৎ স্বামীতে নির্ভরশীল, তাহারই উদ্যানে বহন্তবর্ধিত শ্যামালতাটির মতো; সকলের প্রতি বিশ্বাস- পরায়ণা কপােতীর মত; অজ্ঞাতপ্রচ্ছন্নগুণ বস্তুরী মুগের মতাে; প্রকট চিসৌন্দর্য্যে গুপ্তদেশী কাঠালীচাপার মতো। সে প্রজ্ঞাবান চরিত্রবলী স্বামী পাইয়া গর্বিত নহে, ধন্যা; স্বামী তাহার মতাে ফুলটি পাইয়া মুগ্ধ। আদানা হইতে প্রায় এক ক্রোশ তফাতে গুলসুরতের এক ভগ্নীর বাড়ী। তাহার নাম মুরনেহার। মুরনেহার সদানন্দের বৈরাগ্য গুলসুরতের ভগ্নী অপেক্ষা সখীর স্থান অধিকার করিয়া- ছিল। সূর্যের স্বর্ণ আভা সার উচ্ছল জলে যখন সান্ধ্য- লালিমা দান করিত, যখন আখরােট-বাদামের ফুলের গন্ধে আদানা মত্ত হইয়া উঠিত, যখন বুলবুল দেওয়ানা হইয়া পড়িত; তখন গুলসুরৎ ঔৎসুক্য-ক্ষুব্ধ চিত্তে ভবন- জালায়ন মুক্ত করিয়া অপেক্ষা করিত, কখন তাহার বহিন নুরনেহার কুজপৃষ্ঠ উষ্ট্রের উপর দূর প্রান্তরে দেখা দিবে। ফিরােজা রঙের রেশমী বােরকা ভেদ করিয়া উৎসুক সখীর চঞ্চল দৃষ্টি গুলসুরৎ মনশ্চক্ষে অনুভব করিত; আপনার স্বাগতদৃষ্টি বহিনের প্রতি প্রেরণ করিত; উষ্ট্র হেলিয়া দুলিয়া দ্রুত চলিত। একদিন বৈকালে আমির আম্মন ভােজন-ভবনে বৈকালিক আহারের জন্য আসিয়াছেন। ঘরটি ‘কখাব’- আচ্ছাদিত; তাহার উপর গজদন্ত-নির্মিত মেজের উপর মখমলের আস্তরণ ; তাহার পার্শ্বে স্বর্ণরঞ্জিত বিচিত্র কারুচিত্রিত কেদারা, তদুপরি আমির আম্মন উপবিষ্ট। ঘরের চারিদিকে বড় বড় জানালা; জানালার উপর সূক্ষ্ম মসলিনের পরদা জানালাগুলিকে পদা জানালাগুলিকে অৰ্দ্ধাবৃত করিয়া সদানন্দের বৈরাগ্য রাখিয়াছে ; প্রতি বাতায়নাবকাশে একজন বাঁদি, দণ্ডায়মানা; তাহাদের নীল পেশােয়াজ, সবুজ ওড়না, লম্বিত বেণী, মেহদিরঞ্জিভ হস্ত, কললিপ্ত চক্ষু; সুন্দরী দের বিচিত্র বসনে বৈকালিক রৌদ্র ঝিকিমিকি খেলিতেছে ; দক্ষিণ বায়ু ব্যস্তসমস্ত ভাবে বাতায়নের আচ্ছাদনী ঠেলিয়া ঘরে ঢুকিয়া যুবতীর ওঢ় না উড়াইতেছে, আতরের গন্ধে আকুল হইয়া ছুটিয়া পলাইতেছে। বাঁদির হাতে খাঞ্চাভরা মিষ্টান্ন, কাহারাে হাতে রৌপ্যপাত্রে নানাবিধ মেওয়া, কাহারাে হাতে সরবং, কাহারো হাতে গােলাপপাশ, কাহারে। হাতে আতরদান, কাহারাে হাতে ময়ুরপুচ্ছের ব্যজন। গুরৎ স্বামীকে আহাৰ্য্য বিতরণ করিতেছে। তাহার আসমানি রঙের পেশােয়াজ, ফিরােজা রঙের ওঢ় না, স্বর্ণখচিত জরির জুতা, মস্তকে লম্বিত, বেণী বেষ্টন করিয়া মুক্তামালা, চোখের কোণে সরমা টানা, হাতের তলে জাফরাণের রং , গণ্ডে ওষ্ঠে অনিন্দ্য স্বাস্থ্যের লালিমা ; বৈকালের রৌদ্র যখন তাহার দেহ- চুম্বনের অবকাশ পাইতেছিল তখনই হাসিয়া উঠিয়া চক্ষে ঝিলিক হানিতেছিল, গুলসুরতের গণ্ডের লালিমা ৩ সদানন্দের বৈরাগ্য গাঢ়তর হইয়া উঠিতেছিল। গুলসুরতের সে দিকে লক্ষ্য ছিল না, সে স্বামীকে আহার করাইতে ব্যস্ত, কিন্তু আমির আম্মনের কৌতুহলী চক্ষু সে শােভায় মগ্ন হইয়া গিয়াছিল। গুলরৎ গােলাপের সরবৎ, মেওয়া ও মিষ্টান্ন একে একে স্বামীর সম্মুখে স্থাপন করিতেছিল, স্বামীর ভােজন- শেষ পাত্ৰ উঠাইয়া বাদিদের হাতে দিতেছিল। যখন আহার আরম্ভ হইল, তখন গুরং ওড়নাখানি গুটাইয়া লইয়া স্বামীর পার্শ্বে গিয়া বসিল এবং গজদন্ত- মণ্ডিত ময়ুরপুচ্ছের সন্দলী পাখা লইয়া বাতাস করিতে লাগিল। আম্মন প্রেয়সীর সরবৎ-মধুর স্নিগ্ধ রূপধারায় অতৃষ্ণ, গােলাপী সরবৎ তাহার নিকট অকিঞ্চিৎকর বােধ হইল। তিনি প্রিয়ার কিশলয়কোমল মসৃণ সুন্দর ছােট্ট হানি-ধরিয়া বলিলেন, “তােমার বহিনের আসার সময় হইয়াছে?” গুলসুরৎ বলিল, “না, এখনাে আসার সময় হয় নি। ঐ দেয়ালের রৌদ্রচিহ্ন যখন ঐখানে ফুটিবে, বুলবুল ডাকিবে, আমার বহিনের উট পেস্তার কেতে দেখা দিবে।” উঠিবে, তখন হেনা

সদানন্দের বৈরাগ্য
।
ভালাে ;
আম্মন প্রেয়সীর বর্ণনাবহুল কথা শুনিয়া হাসিয়া
বলিলেন, তােমার বহিনের এখানে আর না আসাই
হয় ছাহার আগমন বন্ধ করিতে হইবে, নয় তো
আমাদের আদান ছাড়িতে হইবে।”
গুলসুরৎ বিস্মি হইয়া বলিল, “আমার প্রিয়সখী ও
বহিনের প্রকৃতি মধুর ; সে তােমার নিকট এমন কি
অপরাধ করিল ?”
আম্মন কতকগুলি পেস্তা ও কিসমিস একত্র করিয়া
মুখে দিয়া বলিলেন, “তােমার বহিন আমার সঙ্গে আশক
করিতে উৎসুক।”
এই কথাতে গুরৎ বসােরার গােলাপ-ক্ষেতকে লজ্জা
দিয়া হাস্য করিয়া কহিল, “বহিনের স্বামীর প্রতি আসনাই
হওয়া ত স্বাভাবিক। যে আমাকে ভালােবাসে, তাহাকে
তােমাকে ভালােবাসিতে মানা কর না কি ?”
আম্মন আবজোসের বীচি ফেলিয়া বলিল, “না, তা
বারণ করি না, কিন্তু বেশি ভালােবাসিয়া ফেলিলেই
বিলক্ষণ ভয় হয়, কারণ তােমার স্বামী একটি বই ত নয়।”
এই কথাতে গুলসুরৎ “যাও” বলিয়া স্বামীর গায়ে
৮১

সদানন্দের বৈরাগ্য
ঢলিয়া পড়িয়া একটি ছােট রকম ধাক্কা দিল ; আম্মুনের
অঙ্গুলিধৃত আঙুরটি মাটিতে পড়িয়া অভিমানে ফাটিয়া
গেল।
দু’জনের হাসিকে বাধা দিয়া মুরনোর' বলিয়া উঠিল,
“তোমাদের আনন্দের শরিক আসিয়াছে।”
গুলসুরৎ হাসিতে হাসিতে উঠিয়া ভগ্নীর হাত ধরিল ।
পরদিন প্রাতে আম্মন একখানি পত্র স্ত্রীর হাতে দিয়া
বলিলেন, “দেখ, আমার কথা সত্য কি না।
গুলসুরৎ পড়িতে লাগিলঃ-
“হে আমার জান-বেহেস্তের ইঞ্জিল; গুলসুরতের কাছে
শুনিলাম যে আমার গােপনপূজা হৃদয়-দেবতার গােচর
হইয়াছে। ভালােই। জানাইবার জন্য আমার প্রাণ মধ্যে
মধ্যে, ব্যাকুল হইয়া উঠিত। সরলা গুসুরৎ মনে করে
আমি তাহারই প্রেমের আকর্ষণে উটে চড়িয়া, তপ্ত বালুকার
প্রান্তর ভাঙিয়া নিত্য আদানায় যাই! কিন্তু খামি, তুমি
জানিয়াছ, মুরনেহারের চক্ষুর সুর তুমি। এবং আমার নাম
অম্বৰ্থ হইয়াছে শুধু তােমাকে দেখিয়াই। কে আমার
৮২

সদানন্দের বৈরাগ্য
এই গুপ্তপ্রেম ব্যক্ত করিয়া দিল ? বুঝি মনােভব। আজ
আমার প্রেম বসন্তের প্রজাপতির মতাে বিচিত্রবর্ণের রঙিন্
পাখা মেলিয়া উড়িয়াছে, আয় ইয়ার, তাহাকে তােমার
চিত্তপুষ্পের প্রেমধু পান করিতে দাও। আমি বিধবা,
কিন্তু তুমি আমার ভগ্নীপতি হইলে কেন ? জানি আমি,
বহিন গুসুরৎ তােমার স্ত্রী থাকিতে তুমি আমায় নেকাহ
করিতে পার না। কিন্তু, তবু-তােমার প্রেম না পাইলে
আমার প্রাণসঙ্কট উপস্থিত হইবে। তুমি গুলসুরতের
প্রেমে মশগুল, কিন্তু তাহার ক্ষুদ্র প্রাণে এমন প্রাণপ্লাবী
প্রেম কোথায়? আমার মতো রূপ সে কোথায় পাইবে?
সে কি আমার বাদি হইবার যােগ্য ? যদি দয়া হয়,
তােমার বাগানে বৈকালে আমায় দেখা দিয়ে, আমার
অনেক কথা বলিবার আছে সন্ধ্যা পর্যন্ত তােমায় যদি
সেখানে না পাই তবে বুঝিব আদানায় আমার কবরেরও
স্থান হইবে না। একটি বর্ধিত প্রাণা রমণীর শুভাশুভ
তােমার উপর নির্ভর করিতেছে জানিয়াে। ফকত।
অভাগিনী মুরনেহার।
পত্র পড়িতে পড়িতে গুরতের গণ্ড বাহিয়া ধারা

সদানন্দের বৈরাগ্য বহিল, যেন বসােরার গােলপ-ক্ষেত্রে বারিবর্ষণ হইতেছে । জলভরা চোখ দুটি স্বামীর মুখের উপর তুলিয়া গুলসুরৎ বলিল, “খামিন, কি হবে? নেহার আমার বহিন না হইলে তােমায় সাদি করিতে বলিতাম। আমায় তালাক দিলে বিবাহ হয়, কিন্তু আমি তােমায় ছাড়িয়া কেমন করিয়া থাকিব! তুমি ও নেহার আমার যে ভুল প্রিয়।” আম্মন বলিলে, “প্রেয়সি, একনিষ্ঠতাই হজরৎ মহম্মদের অনুমােদিত, তাহা কি ভুলিয়া গেলে ? যে আপন দোষে দুঃখকে ডাকিয়া আনিয়া আপনার চিত্তদুর্গ অধিকার করিতে দেয়, তাহার দুর্গতি দেখিয়া কষ্ট বা শােক করা বৃথা। খােদা বহিনকে শুভমতি দান করুন! আম্মুনের ভবন-সন্নিহিত উদ্যানের বাদামতলায় অন্ধকার জমাট বাঁধিতেছে । আখরােটের গাছে আঙুরের লত বেড়িয়া উঠিয়াছে, একটা বুলবুল লতার শাখায় ঝুলিয় একটা আঙুরে এক-একবার চক্ষু বিদ্ধ করিতেছে আর এক- একবার মুখ উচু করিয়া সুধাসিক্ত কণ্ঠে মধুর শিশ দিয়া উঠিতেছে। পুষ্পবহুল বসন্তে হেনা বকুল চামেলি ও ৮৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
হইয়া মৃদু
গােলাপের গন্ধে সান্ধ্যসমীরণ ভারাক্রান্ত
বহিতেছে। উদ্যানের মধ্যে
পাষাণ-বেদিকা বিদীর্ণ
করিয়া সরার জল ফোয়ারা হইয়া রূপার তারগুলির মধ্যে
জলধারা তমসাচ্ছন্ন গুন্যে প্রেরণ করিতেছে; সে জল
নীচে পড়িয়া নহর বহিয়া, সরবৎ নদীতে গিয়া মিশিতেছে।
সরার বুকে সান্ধ্য সূর্যের শেষ স্বর্ণাভ নিভিয়া গেল।
আম্মন ও গুলসুরৎ ভবন-জালায়ন হইতে অস্পষ্ট দেখিলেন,
পুষ্পবিতানের মধ্য হইতে বাহির হইল নুবুনেহার ;
তাহার বােকা নাই, গুণ্ঠন নাই ; ফেরােজা রঙের
পেশােয়াজ, গােলাপী ওঢ় না, পৃষ্ঠে দোদুল্য বেণী ;-দীপ্ত
সৌন্দৰ্য উদ্যানে যেন দাবাগ্নি জালিয়াছে।
নুরূনেহার একবার চারিদিকে তন্ন তন্ন করিয়া চাহিয়া
লইল। প্রাসাদের দিকে চাহিয়া একটা বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস
ত্যাগ করিল, তারপর কঁচি দিয়া বেণী কাটিয়া ফেলিল,
চোখের সুরমা মুছিয়া ফেলিল, হাতের কুঙ্কুমরাগ নহরের
জলে ধুইয়া ফেলিল, ওঢ় না পেশােয়াজ ফেলিয়া মােটা
বােরকায় গুন টানিল ।
তারপর—পরিত্যক্ত প্রসাধন
একত্র করিয়া রাখিল। তারপর–দক্ষিণমুখে বদ্ধাঞ্জলি

সদানন্দের বৈরাগ্য
হইয়া দাড়াইয়া ভূলুণ্ঠিত হইয়া প্রণাম করিল। তারপর
ধীরে ধীরে খর্জুরবীথির অন্ধকারে মিশাইয়া গেল।
আম্মন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “নেহার গৃহে
ফিরিল না, বােধ হয় মক্কায় কাবাতে আপনাকে উৎসর্গ
করিতে গেল।”
এতক্ষণ গুলসুরৎ নীরবে অশ্রু বিসর্জন করিতেছিল,
এখন ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিয়া উঠিল । বিষাদিত দম্পতি
একটি শামাদান হাতে লইয়া বাগানের উদ্দেশে বাহির
হইলেন
আম্মন পরিত্যক্ত পােষাকের উপর একখানি কাগজ
দেখিয়া উঠাইয়া লইয়া শামা’র আলােতে পড়িলেন,
সুবনেহারের প্রার্থনা :-
“এই আদানায় আমার সকল গর্ব, সকল মােহ, সকল
পাপের কবর হউক। রে সয়তান, আমাকে আর প্রলুব্ধ
করিও না। হে পরমেশ্বর, মানুষের প্রেম আকর্ষণে ব্যর্থ
মনােরথ হইয়া তােমার শরণাপন্ন হইলাম, তােমার প্রেম
লাভেও যেন বঞ্চিত না হই। আমার চিত্ত, হে সােভা
আল্লা, তােমার প্রেমে পবিত্র হউক।”

সদানন্দের বৈরাগ্য
আম্মন। সে লিপিখানি মস্তকে রাখিয়া বলিলেন,
“আমেন”। বিষাদিত দম্পতি মক্কার দিকে arণাম
করিয়া গৃহে ফিরিলেন। গুরৎ বহিনের কর্তিত বেণী
ও পরিত্যক্ত পরিচ্ছদ একটি অশ্রুসিক্ত স্বর্ণপপটিকায়
সযত্নে রাখিয়া দিল। তাহার উপরে মিনার কাজে লিখিত
হইল “কবর-ই-আশ”।
৮৭

প্রেমের নিরিখ
দাক্ষিণাত্য প্রদেশে ভীমা ও নীরা নদীর সঙ্গমক্ষেত্রে
মহেন্দ্রবিদার নগরে রাজা দ্রৌণায়ণ রাজত্ব করিতেন।
দ্রৌণায়ণ রাজ্যলােলুপতার জন্য সমস্ত রাজন্যবর্গের ভীতি
ও অশ্রদ্ধার কারণ হইয়াছিলেন।
গজেন্দ্রগড়ের রাজা মল্লশূরই কেবল তাহাকে প্রতি-
হত কসিয়া রাখিয়াছিলেন। অকালে মল্লশূরের মৃত্যু হইলে,
তাহার বালকপুত্র পুষ্পহাসের রাজমন্ত্রী ঝল্লকণ্ঠ রাজকাৰ্য
পরিচালনা করিতে লাগিলেন ।
দ্রোণায়ণ কণ্টক দূর হইয়াছে মনে করিয়া পরম
উল্লসিত হইলেন ; গজেন্দ্রগড়-রাজপরিবারের
অশৌচান্ত না হইতেই মহারাজ মল্লশূরের রাজ্য আক্রমণ
করিলেন।
ঝল্লকণ্ঠ প্রভুরাজ্য রক্ষার জন্য সসৈন্য দ্রোণায়ণকে বাধা
এবং
৮৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
প্রদান করিলেন। এই যুদ্ধে দ্রোণায়ণের প্রধান সহায়
এবং সহচর ছিলেন তাহার পুত্র ভদ্রমুখ এবং কন্যা
ভদ্রলোেমা।
ঝল্লকণ্ঠ যখন সমরাঙ্গণে নিশিত বাণ ত্যাগ করিতে-
ছিলেন, তখন পুষ্পধশ্বর তিৰ্য্যকৃত ধনু ভদ্রসােমার
কুঞ্চিত জ্বতল হইতে দুই চারিটি খরকটাক্ষবাণ ছুটিয়া
আসিয়া ঝল্লকণ্ঠের হৃদয়ে বিশেষভাবে আঘাত করিয়া
গেল।
দৈনিক সমরাবসানে যখন ঝল্ল কণ্ঠ আপন শিবিরে
সন্ধ্যোপাসনা করিতেছিলেন, তখন তাহার অন্তরে
“তদ্বিষ্ণুর পরমপদ’-হলে ভদ্রসােমার ব্রীড়াবীৰ্য্যবঞ্জিত
ফুল মুখমল বারংবার উদ্ভাসিত হইয়া উঠিতেছিল।
তিনি কাতর হইয়া ইষ্টদেবতাকে নিবেদন করিলেন- “হে
মা ভবানী, একি হইল মা? চিরশত্রুর সহিত এ প্রীতি-
সম্বন্ধস্থাপনের লালসা মনে কেন উদয় হইল ? যাহাকে
শরবিদ্ধ করিতে হইবে, তাহার চরণনিম্নে আপনার
হৃদয় পাতিয়া দিতে সাধ হইতেছে কেন? যাহার হৃদয়রক্তে
কর্তব্যের তৰ্পণ করিতে হইবে, তাহারই চরণতল আমারই

সদানন্দের বৈরাগ্য সয়রক্তরাগে রঞ্জিত করিতে বাসনা হইতেছে। মদনদহন, আমায় বল দাও, এই চিত্তবিক্ষোভ প্রশান্ত কর” উপাসনা শেষ হয় নাই, দ্বাররক্ষক আসিয়া সংবাদ দিল—বিপক্ষশিবির হইতে জনৈক দূত তাহার প্রতীক্ষা করিতেছে। তাহার উপাসনা শেষ হইল না। কি এক অব্যক্ত কারণে মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। পুস্পধম্বা কত মধুময় আশার কথা কানে গুঞ্জরণ করিতে লাগিল। প্রবল বাসনাঝঞ্চা ক্ষীণ সংযমচেষ্টাকে কোথায় উড়াইয়া দিল। তিনিদূতকে প্রবেশের আজ্ঞা দিলেন। আসিয়া প্রণাম করিয়া তাহার হস্তে একখানি পত্র দিল।-. কম্পিত হন্তে আবরণ উন্মােচন করিয়া পড়িতে লাগিলেন- “স্বস্তি শ্ৰী সমরবিজয় শ্রী অভিনন্দিত গজেন্দ্রপুরাধীশ্বর- সচিবশ্রেষ্ঠ-ঝল্লকণ্ঠ-শ্ৰীকরকমলােপায়ন-পত্রিকা সমরকুশলী বীরশ্রেষ্ঠ, আবাল্য যে আদর্শীকৃত বীরমূর্তি হৃদয়-মন্দিরে পূজা করিয়াছি, তাহা আজ আপনাতে সদানন্দের বৈরাগ্য শরীরী দেখিলাম। শত্ৰুকন্যার পূজোপচার গ্রহণ করিলে কৃতার্থ হইব। নিবেদন ইতি—রাজকন্যা ভদ্রসােমা।” ঝলকণ্ঠ হর্ষাতিবেগস্তম্ভিত-হৃদয়ে লিপিখানি বারংবার পড়িতে লাগিলেন। আপনার চক্ষুকে বিশ্বাস হয় না, আপনার অনুভূতিকে প্রত্যয় হয় না। একি সত্য? একি সত্যই সত্য? উপহাস নহে, বিদ্রুপ নহে, ব্যঙ্গ নহে,-প্রকৃত সত্য? পিপাসাক্ষামকণ্ঠ পক্ষী জল চাহিতেই ধারাপ্রবাহ মূখে আসিয়া পড়িল? আজ আমি প্রকৃত জয়ী-রমণীর চিত্তজয় শতসাম্রাজ্য জয়ের তুল্য! আমি ধন্য, আমি জয়ী। ঝল্পকণ্ঠ রাজকন্যা ভদ্রসােমাকে উত্তর লিখিলেন- “মন্মথমৈত্রীবশীকৃত রাজকুমারী ভদ্রসােমা-শ্ৰীকরকমলােপ হৃতা-পত্রিকা “ভদ্রে, আপনি মন্মথের পুষ্পধনুর সম্মােহন শর! আজ আমি জিত কি জয়ী ঠিক বুঝিতে পারিতেছি না। আজিকার আনন্দ যেন আমার নিত্যোপভােগ্য হয়। নিবেদন ইতি মুগ্ধ ঝল্পকণ্ঠ।” পরদিন মন্ত্রী ঝল্পকণ্ঠের প্রস্তাবক্রমে উভয়পক্ষে সন্ধি সদাননের বৈরাগ্য হইয়া গেল। রাজা দ্রোণায়ণ মন্ত্রী ঝল্পকণ্ঠের সহিত কন্যা ভদ্রসােমার উদ্বাহ অঙ্গীকার করিলেন, এবং মন্ত্রী ঝলক বাধাপ্রদানের ভানমাত্র করিয়া ক্রমে ক্রমে গজেন্দ্রগড় রাজ্যের বহুলাংশ দ্রৌণায়ণকে অধিকার করিতে দিবেন, এইরূপ: গুপ্ত অঙ্গীকার স্বীকার করিলেন । কামােপহচেতা ঝল্লকণ্ঠ কৰ্তব্যভ্রষ্ট হইলেন। নীরা ও ভীমা নদীর সঙ্গমসম্মুখে রাজকুমারীর পুষ্প- বাটিকা! নীলাঞ্জনচ্যুতি ক্রীড়াশৈলের প্রত্যন্তদেশে সুরম্য কদলীকুঞ্জ, তন্মধ্যে মৰ্ম্মরশিলাপট্ট বেষ্টন করিয়া ক্ষুদ্র পুষ্পতরুর পদতলবাহিতা ক্ষীণ। নিঝরিণীর রজতসুত্রধারা নীরার নিৰ্ম্মল ক্রোড়ে গিয়া বিশ্রাম লাভ করিতেছিল। পর্যনীয়-স্নিগ্ধশিলাপটু-সমান্না ভদ্রগােমা ভূষণশিঞ্জিত হস্ততালে তাহার প্রিয় ময়ূরটিকে নাচাইতেছিলেন ; আর তাহার সখী পুষ্পিল। অশােকপলাশের অশােকপলাশের মালা গাঁথিয়া তাহার শিরােমুকুট গড়িয়া দিতেছিল। অশােকপলাশের রক্তস্তবক শুভললাটে পড়িয়া দেবকন্যা উষার ললাটতিলক অরুণের মতো শােভা পাইতেছিল। তি-আশ্রিত ;

সদানন্দের বৈরাগ্য মুক্তাগুচ্ছে সেই পুষ্পলালিমা প্রতিফলিত হইয়া শ্রুতিমূলে বিচিত্র পত্রলেখা রচনা করিতেছিল। গুঞ্জন্মধুপপুঞ্জ কেলিকুঞ্জে ব্রততীবলয়াসঞ্জনা কুরুবকশাখা হইতে কপােত- বধুর করুণধ্বনি কি এক তরল বিষাদ বর্ষণ করিতেছিল। সহসা মন্ত্রী ঝল্লক সেখানে উপস্থিত হইলেন। কপােতবধূ উড়িয়া গেল ; করকিশলয়মুগ্ধ নর্তমান ময়ুর সংবৃতনৃত্য হইয়া উড়িয়া গিয়া বকুলবৃক্ষে বসিল ; সখী পুষ্পিল সরিয়া দাড়াইল ; রাজকন্যা ময়ূরকণ্ঠী বসন- খানি অঙ্গে টানিয়া দিয়া, চলিত দুকুলের সূক্ষ্মসুবাসে কদলীবিতান পূর্ণ করিয়া, অবনতমুখী হইয়া দাড়াইলেন তাঁহার মুখভাবে লজ্জাসমের রেখামাত্র অঙ্কিত হয় নাই, বুঝি বিরক্তিমিা ঘৃণার ব্যঞ্জনা ব্যক্ত হইয়াছিল । তবু ভাবমুগ্ধ ঝল্লকণ্ঠ সেই লীলাচতুরার তদবস্থ ভাব দেখিয়া স্বর্গসুখ উপভােগ করিতেছিলেন। কতক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া, ভদ্রসােম আপনাকে উন্নত করিয়া তৃপ্তকণ্ঠে বলিলেন, “মন্ত্রি, এ পুরন্ধীর কেনিকুঞ্জ । রাজনীতিজ্ঞের উপযুক্ত স্থান নহে।” ঝল্লকণ্ঠ হাসিয়া দুই পদ অগ্রসর হইয়া বলিলেন,

সদানন্দের বৈরাগ্য
‘ছলকোপনে, আমাকে আসিবার অধিকার দিয়াছ,
তাই আসিয়াছি। প্রেমময়ি, আবেগতিশষ্যহেতু যদি
আচারের অতিক্রম করিয়া থাকি, অনুগত জনকে ক্ষমা
কর, আমি তােমারই ।” সম্বেদপুলককম্পিতঙ্গ মন্ত্রী দুই
পদ সরিয়া ভদ্রসােমার হস্তধারণের উপক্রম করিলেন।
রাজকন্যা পুচ্ছবিমর্দিতা সর্পিণীর মতাে গজ্জিয়া উঠিয়া
বলিলেন, “মন্ত্রি, পুরন্ধীর অমৰ্য্যাদা করিবেন না।”
ঝল্লকণ্ঠের বীরহৃদয়ও এই অর্জনে সঙ্কুচিত কম্পিত
হইয়া উঠিল। তিনি বিনীতকণ্ঠে বলিলেন, “আৰ্য্যে,
আপনি উৎসাহ দিয়াছিলেন বলিয়া এই ধৃষ্টতা করিতে
সাহসী হইয়াছি। এক্ষণে আপনার সত্য রক্ষা করিয়া
আমাকে আপনার প্রেমের অধিকার প্রদান করুন।”
ভদ্রসােমা পূৰ্ব্ববৎ তীব্রকণ্ঠে বলিলেন, “মন্ত্রি,
বীরত্ববিমুগ্ধচিত্তার শ্রদ্ধা যদি অন্য অর্থে গ্রহণ করিয়া
থাকেন, আমায় ক্ষমা করিবেন; আমি সম্পূর্ণ আপনার
অযোেগ্যা—যুদ্ধান্ত-প্রশান্তবুদ্ধিতে ইহা এখন আমি
বুঝিতেছি। আমি আপনার ধৃষ্টতা যেমন মার্জনা
করিলাম, আপনিও আমার প্রগতা মার্জনা করিবেন।”
১৪

সদানন্দের বৈরাগ্য বাক্‌হত ঝল্পকণ্ঠ একবার সেই লাবণ্যবিচ্ছুরিত মুখের দিকে চাহিলেন ; সেখানে অটলতা শাণিত খগের মতাে উদ্যত দীপ্ত রহিয়াছে, সেখানে করুণাশ্রদ্ধার লেশমাত্র নাই। ঝল্লক ধীরে ধীরে কদলীকাননের মধুরশীতল ছায়া হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া বিরহতপ্ত হৃদয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল তপ্ত পথে চলিয়া গেলেন। ঝল্লকণ্ঠ চলিয়া গেলে ভদ্রসােমা পুষ্পমুকুট ছিড়িয়া ফেলিলেন; মনােজ্ঞকুপাসকপীড়িতন্তনা দেবতী আপনার কঞ্চুলিকা ছিন্ন করিয়া তন্মধ্য হইতে ঝল্ল কণ্ঠের প্রথম প্রণয়ন্তীকল্লা লিপিখানি বাহির করিয়া, চুম্বনে চুম্বনে আচ্ছন্ন করিয়া, বিলাপ করিতে করিতে শিলাপট্টের উপর পড়িয়া লুটিয়া লুটিয়া ফুপিয়া ফুলিয়া কঁদিতে লাগিলেন- “এস এস ওহে দয়িত, তােমার অপমানক্ষত হৃদয় অপ্রলিপ্ত করিয়া দিব ; এস ওগাে এস দেবতা, প্ৰেমশ্রদ্ধার স্বচনে তােমার পূজা করিব; তােমার পূর্ণ গৌরবে এস গরব, আমার হৃদয়মন্দিরে, তােমার গৌরবকণিকা স্থলিত হইতে আমি দিব না; এস ওহে এস মনোহর, ও হে সৌম্য, আমার যৌবনবসন্তের প্রথম সদাননের বৈরাগ্য ; ; পুস্পাঞ্জলি তােমার চরণে দিব ; কোথা যাও, ও গাে- ফিরে চাও, ওহে দুরন্ত অভিমানী, অবহেলাহত অকুস্থ ভাঙিয়া গিয়াছে—রুদ্ধ কর হে সক্ষম, সে প্রবাহ রুদ্ধ কর ; কোথা যাও ও গাে ফিরে চাও, ওহে তেজস্বী, আমার অন্তরে আগুন লাগাইয়াছ, স্নিগ্ধ কর, ওহে সন্তাপহর, অন্তর শীতল কর ; ওহে প্রাণেশ্বর তুমি ফিরে এস, ওগাে ফিরে এস। অয়ি কঠোর, যশঃ কিল তে প্রিয়ং কিম্ অযশাে নমু ঘাের অতঃপরম্। কিম্ অভব বিপিনে হরিণীদৃশঃ কথয় নাথ কথং বত মন্তসে ।” রাজকন্যার বিলাপে ব্যথিতচিত্তা সখী পুষ্পিল। দৌড়িয়া গিয়া হৃদভারে মন্থরগতি ঝল্লকণ্ঠকে ধরিয়া বলিল, “মবির, রাজকন্যা আপনার জন্য কাদিয়া ব্যাকুল হইয়াছেন, আপনি আসুন, ওগাে সত্বর আসুন।” ঝলক শশাঙ্কদর্শনােচ্ছসিতহৃদয় সাগরের মতো উল্লাস- বিদ্রুতগতিতে কুঞ্জদ্বারে আসিয়া দেখিলেন, বিলুণ্ঠন- বিশ্লথবেশ ভদ্রসােমা করুণক্রন্দনে তাহাকেই আহ্বান করিতেছেন।

সদানন্দের বৈরাগ্য ভাববিহবল প্রতিপ্রফুল্ল ঝল্পকণ্ঠ স্নেহন্ধিকণ্ঠে বলিলেন, “প্রেয়সি, আমি আসিয়াছি, ওগাে দেখ, আমি প্রেমের অর্ঘ্য রচনা করিয়া চরণােপ্রান্তে আসিয়াছি—উঠ হৃদয়েরি, উঠ।” বাকশাহত কোপস্ফুরিতাধরা রাজকন্যা ত্বরিত উঠিয়া সংবৃত হইয়া বলিলেন, “তুমি কেন ওগাে, এখানে কেন ? যাও যাও তুমি চলিয়া যাও। অপমানের উপর অত্যাচার সংযােগ করিয়াে না। যাও তুমি লৌকিকাচারচর, চলিয়া যাও। এখানে ওগাে মন্ত্রী, তােমার কোনাে কাজ নাই, কোনাে কর্তব্য নাই।” বিস্মিত অবাক ঝল্লকণ্ঠ পুনরায় নিঃশব্দে বাহির হইয়া রমণীচিত্তের জটিল রহস্য জল্পনা করিতে করিতে চলিয়া গেলেন। সখী পুষ্পিল বিস্ময়ে অবাক হইয়া দাড়াইয়া রহিল। ভদ্রসােম আবার শিলাপট্টের উপর বিলুণ্ঠিত হইয়া, বিলাপ করিতে লাগিলেন, “এলে যদি, তবে যাও কেন, ওহে চিরবাঞ্ছিত তুমি আপনার পূর্ণগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হইয়া আমার চিত্ত- ৭

সদানন্দের বৈরাগ্য
ক্ষেত্রে খেলা কর। ওহে দুর্লভ, তােমায় পাইয়া আবার
হারাই কেন? ওগাে বল্লভ, অশিথিলপরিরম্ভে আমাকে
গ্রহণ কর।”
প্রত্যাখ্যাত ঝল্লকণ্ঠ পত্র লিখিলেন :-
“ভদ্রে, অজ্ঞান-অনিচ্ছাকৃত যদি কোনাে পাপ করিয়া
থাকি, যথেষ্ট শাস্তিভােগ করিয়াছি,ক্ষমা কর, আমায়
রক্ষা কর। ইতিত্বদর্পিতপ্রাণ ঝলকণ্ঠ।”
দূত রিক্তহন্তে ফিরিয়া আসিল-রাজকুমারী পত্রোত্তর
দেন নাই।
রাজকুমার ভদ্রমুখ ভগ্নীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বলি-
লেন “ভগ্নী সােমা, প্রণয়বিহ্বল সন্ধিমিত্র সচিব ঝল্লকণ্ঠকে
কেন নিগৃহীত করিতেছ? তােমার রূপগুণমুগ্ধ ঝল্লকণ্ঠ
তােমার সম্পূর্ণরূপে যােগ্য পাত্র।”
রাজকুমারী দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “তিনি আমার
যােগ্য হইতে পারেন, কিন্তু আমি বুঝিতেছি যে আমি
তাহার যােগ্যা নহি। তাহাকে আমার অস্থির প্রগলভতা
ভুলিয়া যাইতে অনুরােধ করিবেন।”
১৮

সদানন্দের বৈরাগ্য ব্যর্থদৌত্য রাজকুমার ফিরিয়া গেলেন। ভ্রাতাকে বিদায় দিয়া ভদ্রসােমার বাহকঠোরপ্রতীত প্রতীপগামী চিত্ত কঁদিয়া উঠিল— “ওগাে ! প্রেম যদি আসে, তবে যােগ্যতা লইয়া আসে না কেন? মন্মথমথিতমন যাকে চায়, তাকে নির্বিচারে গ্রহণ করা যায় না কেন? দোষ গুণ বিচারের প্রবৃতি আসে কেন? জগৎটা এই বিরাট ‘কেন সুত্রে প্রতিচ্ছন্ন,—ইহার মীমাংসা হইল না, বুঝি হইবে না।” রাজা দ্রৌণায়ণ স্বয়ং আসিয়া কন্যাকে বলিলেন, “বৎসে সােমা, সহসা একি বাতুলতা? ঝল্লকণ্ঠ তােমার পরিবর্তে আমাকে বিশাল রাজ্যের অধিকার দিবেন অঙ্গীকার করিয়াছেন। বারংবার ব্যর্থীকৃত সর্বপ্রচেষ্টা অনায়াসে সফল হইতেছিল, তুমি একি অনর্থপাত অকস্মাৎ আনয়ন করিলে ? বালচাপল্য ত্যাগ কর ; ঝল্লককে বিবাহ করিতে স্থিরমতি হও; তােমার বালসুলভ নিবুদ্ধিতার জন্য আমি হস্তগত বিশালরাজ্য ত্যাগ করিতে পারি না; তােমায় ঝল্লকণ্ঠকে বরণ করিতেই হইবে।” রাজকুমারী দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “পিতা, রাজ-

সদানন্দের বৈরাগ্য
শাসন চিত্তদমন করিতে নিতান্ত অক্ষম। কন্যার চিত্ত
বিক্রয় করিয়া রাজ্য অধিকার না হয় নাই করিলেন।”
পিতা বিফলচেষ্ট হইয়া প্রত্যাবৃত্ত হইলে ভদ্রসােম
কাদিয়া উঠিল— “হায় হায়, চিত্ত যদি রাজশাসনেও দম্য
হইত। আমার এ বিদ্রোহী চিত্তকে দমন করিতে কি
প্রকৃষ্ট বাহশক্তি বর্তমান নাই ? ওগাে কে বলিয়া দিবে,
প্রেম ও কর্তব্যের জীবনান্তক যুদ্ধ কিসে বিরামলাভ করিবে
-বিজয়লক্ষ্মী একপক্ষ অভিনন্দিত করুক,আমার চিত্ত শান্ত
হােক। বিষমঝটিকাবিক্ষুব্ধ জলধিতরঙ্গের মতাে বিপরীত
ভাবশ্রেণী আমার হৃদয়-বেলায় নিরাশ্রয়ভাবে আছাড়িয়া
দুধারি ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে ; ওগাে বিধাতা, শান্ত কর, ওহে
শান্তি দেও। প্রগ্রহে অশ্বের মতাে সবলে হৃদয়কে টানি-
তেছি ; জানি না তাহাতে কতগুলি তন্তু ছিড়িয়া-
খুড়িয়া যাইতেছে।”
৪
মন্ত্রী ঝল্লক আনায়ত্তীকৃত প্রভুরাজ্য দ্রোণায়ণ রাজার
নিকট ফেরত চাহিলেন। রাজ্যলােলুপ দ্রোণায়ণ প্রথমত
যেন শুনিলেন না; তারপর যেন ভালাে বুঝিলেন না;

সদাননের বৈরাগ্য
'তার পর ইতস্তত করিলেন; তারপর বলিলেন, “আমার ।
কন্যা সম্প্রদান করিতে তত প্রস্তুতই আছি, আপনি তাহাকে
সম্মত করুন।” বারংবার বিফলপ্রযত্ন নিরাশ্বাস ঝল্পকণ্ঠ এ
প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না, রাজ্যাধিকার ফিরাইয়া চাহিলেন।
তখন দ্রোণায়ণ বলিলেন, “স্বায়ত্তীকৃত রাজ্য কোন
নির্বোধ ত্যাগ করে। আমি উহা ত্যাগ করিব না।”
ঝল্লকণ্ঠ বলিলেন, “সামর্থ্য থাকে ফিরাইয়া লইব।”
দ্রোণায়ণ বলিলেন, “সেই ভালাে।”
ঝল্পকণ্ঠ বৈরনিশ্চিত হইয়া স্বদেশে চলিয়া গেলেন।
অপমানােদ্বেজিত ব্যর্থ প্রণয়লালস ঝল্লকণ্ঠ উদ্বোধিতাে-
স্রোশৌৰ্যসাহায্যে উপযুপরি যুদ্ধে পরাজিত করিয়া রাজা
দ্রৌণায়ণের কঠিন কবল হইতে সমস্ত নষ্টরাজ্য উদ্ধার
করিলেন। উদ্ধারব্রতে ব্যয়িত সমস্ত অর্থ স্বসঞ্চিত অর্ধ
হইতে দিয়া প্রায়শ্চিত্তশুচি তপঃকৃশ যাজ্ঞিকের মতাে দারিদ্র্য
বরণ করিয়া লইলেন। তৎপরে রাজকোষ হইতে অর্থ
লইয়া দ্রোণায়ণের রাজ্য যুগপৎ তিন স্থানে আক্রমণ
করিলেন।

সদানন্দের বৈরাগ্য দ্রৌণায়ণ এই অনুতাপদৃপ্ত প্রায়শ্চিত্তপ্রয়াসী মন্ত্রীর দুধর্য আক্রমণ আর সহ্য করিতে পারিতেছিলেন না। বারংবার পরাজিত হইয়া সন্ধির প্রস্তাব করিলেন। ঝল্পকণ্ঠ স্বশিবিরে বসিয়া আছেন। বিজয়ীর প্রায়শ্চিত্তশুদ্ধ ললাটে চক্ষে সন্তোষের জ্যোতি স্ফুরিত হইতেছিল। কুঞ্চিত কেশকলাপ আবেষ্টন করিয়া লাবণ্যবিচ্ছ রিকা মুক্তামালা বিজয়লক্ষ্মীর বরমাল্যের মতো শােভা পাইতেছিল। ক্রোড়ন্ত কোষবদ্ধ কৃপাণ বিজয়ীর শাস্তনিরুদ্বেগ প্রচার করিতেছিল। এবং ভদ্রসােমার প্রথম লিখিত একখানি- মাত্ৰ পত্ৰ অনিমেষনয়নে দেখিতে দেখিতে তিনি ভাবিতে- ছিলেন- স্নান জীবকুসুমস্য বিকাশনানি সন্তর্পণানি সকলেয়িমােহনানি। এতানি তানি বচনানি সরােহাক্ষ্যাঃ কর্ণামৃতানি মনস রসায়ননি।” তাহার চিন্তায় বাধা পড়িল। দ্বাররক্ষক আসিয়া সংবাদ দিল, “দ্রৌণায়ণ-রাজকুমার ভদ্রমুখ সন্ধিদূত হইয়া ১০২

সদানন্দের বৈরাগ্য
আসিয়াছেন।” ঝল্পক অগ্রসর হইয়া তাঁহাকে অভ্যর্থনা
করিয়া গ্রহণ করিলেন।
উভয়ে উপবিষ্ট হইলে, ভদ্রমুখ বলিলেন, “আপনার
স্বরাজ্য আপনি পাইয়াছেন, এক্ষণে আর বিরােধ কেন ?
সন্ধি করিয়া শান্তি ও মৈত্রী সংস্থাপন করিতে আমরা
ইচ্ছুক।”
ঝল্লকণ্ঠ বলিলেন, “রাজকুমার, আপনারা
ইচ্ছুক
হইতে পারেন, কিন্তু আমি ইচ্ছুক নহি। আমি যে উদ্বেগ
ও ক্ষতি স্বীকার করিয়াছি তাহার পূরণ ও প্রতিশােধ
আমি চাই।”
“তবে এই লও প্রতিশােধ” বলিয়া ভদ্রমুখ গুপ্ত
কৃপাণিকা আমুল ঝল্লকণ্ঠের বক্ষে বিদ্ধ করিয়া দিয়া বেগে
প্রস্থান করিলেন।
এমন সময় দ্বাররক্ষক প্রচার করিল; “রাজকুমারী
ভদ্রসােমার দূত আসিয়াছে।”
এই কথা শুনিয়া মর্মন্তুদ যন্ত্রণায় কাতর ধ্বনি নিঃসৃত
হইতে হইতে ক্ষান্ত হইল। কেহ জানিল না মন্ত্রীর কি
সাংঘাতিক অবস্থা হইয়াছে। তিনি সকল কষ্ট ভুলিয়া

সদানন্দের বৈরাগ্য
আবেগােচ্ছসিতকণ্ঠে বলিয়া উঠিলে, “কই, কই, সে দূত
কই? তাহাকে শীঘ্র আসিতে দাও।”
রাজকুমারীর দূত জলি প্রবেশ করিয়া মন্ত্রীকে
শােণিতাপ্লুত লুষ্ঠিত দেখিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল।
তাহার চীৎকারে বহুলােক সমবেত হইয়া মন্ত্রীকে তদবস্থ
দেখিয়া হাহাকার করিতে লাগিল।
মন্ত্রী সকলকে নিরস্ত হইতে আদেশ করিয়া, বাহিরে
যাইতে ইঙ্গিত করিলেন। সকলে অপসৃত হইলে জঘিলকে
নিকটে আহ্বান করিলেন।
দূত নিকটস্থ হইয়া রুদ্ধকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “মন্ত্রিশ্রেষ্ঠ,
এ কাৰ্য কে করিল ?”
মন্ত্রী হাসিয়া বলিলেন, “অদৃষ্ট!—উপলক্ষ্য রাজকুমার
ভদ্রমুখ।”
জভিঘল বলিল, “কেন কেন, তঁাহার এ দুৰ্ম্মতি কেন
হইল? বীর হইয়া এই গুপ্তহত্যা-প্রবৃত্তি কেন জন্মিল ?”
ঝল্প কষ্ঠ কষ্টনিঃসৃত কণ্ঠে বলিলেন, “এও অদৃষ্ট !
কৰ্তব্যভ্রষ্ট আমি নিজের স্বার্থের জন্য প্রভুরাজ্য বিক্রয়
করিয়াছিলাম ;—সে প্রায়শ্চিত্ত সম্পূর্ণ করিয়াও প্রতিহিংসা-
১০৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
প্রবৃত্তি আমাকে উত্তেজিত করিয়াছিল ;-বীর শর
প্রার্থিতসন্ধি উপেক্ষা করিয়া অদৃষ্টের প্রতিদান এই
পাইয়াছি।যাক সে কথা, এক্ষণে তুমি কি উদ্দেশ্যে
আসিয়াছ, শীঘ্র বল—আমার সময় সংক্ষেপ হইয়া
আসিতেছে।”
জঘিল আপনার উষ্ণীষাবরণ হইতে একখানি পত্র
মুক্ত করিয়া ঝল্লকণ্ঠের হাতে দিল।
ঝল্লকণ্ঠ সেই চন্দনকুঙ্কুমলিপ্ত সুগন্ধী লিপিখানি লইয়া
চোখের কাছে কিছুক্ষণ উল্টাইয়া পাল্টাইয়া পড়িবার চেষ্টা
করিতে লাগিলেন; কিন্তু মৃত্যুচ্ছায়সমাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে লিপি-
খানির একটি বর্ণও পড়িতে পারিলেন না। কাতর হইয়া
বুকে ললাটে চাপিয়া ধরিয়া চুম্বনাচ্ছন্ন পত্রখানি জঘিলকে
দিয়া বলিলেন, “জঘিল, ভগবান আমাকে প্রেয়সীর
হস্তাক্ষর দর্শনসুখেও বঞ্চিত করিয়াছেন; শ্রবণশক্তি
অবিকৃত থাকিতে থাকিতে তুমি ইহা পাঠ কর; আমার
দৃষ্টিতে আবিল্য আসিতেছে, মৃত্যুর প্রাণহীন শীতলহস্ত
আমার সৰ্বেন্দ্রিয় আচ্ছন্ন করিতেছে, সমস্ত মসীলিপ্ত
দেখিতেছি,তুমি পত্র পাঠ করিয়া শুনাও, শীঘ্র পাঠ কর।”

সদাননের বৈরাগ্য . জঘিল আবরণ উন্মােচন করিয়া পাঠ করিল- “ধৰ্মকৰ্ত্তব্যনিষ্ঠ গরিষ্ঠ সচিবশ্রেষ্ঠ ঝল্লকণ্ঠ শ্ৰীকর-- কমলােপায়ন— “ওহে দয়িত, ওহে বাঞ্ছিত, ওহে বল্লভ, তােমাকে বৰ্তব্যভ্রষ্ট স্বার্থান্ধ দেখিয়া মর্মাহত হইয়া নরক- যন্ত্রণা ভােগ করিয়াছি, পুটপাকপ্রতীকাশা অস্তগূঢ় ঘন- ব্যথা হৃন্মৰ্ম্মে অস্ফুটিত ব্রণের রূঢ় গ্রন্থির ন্যায় ঘনীভূত শােক নিশিদিন বিষদিগ্ধ শস্যের মতাে আলা দিয়াছে। তােমার আত্মাপলদ্ধি তােমাকে সগৌরবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছে দেখিয়া আজ আমার কৃতখণ্ডনব্যথ চিত্ত তাহার সমস্ত রুদ্ধ পূজা দিয়া তােমাকে অভিনন্দন করিয়া স্বাধিকারে আবাহন করিতেছে ;-এস ওগাে গৌরবদীপ্ত সুন্দর, ফিরে এস ; ওহে হৃদিরঞ্জন, হৃদয়মন্দিরে ফিরে এস ; ওগাে প্রত্যাখ্যাত, দ্বারােপান্ত হইতে ব্যর্থমনােরথ লইয়া ফিরিয়া গিয়া, ওহে প্রাপ্তসৰ্বগৌরব বীরশ্রেষ্ঠ, আমার চিত্তরাজ্য জয় করিয়াছ, তােমার স্নেহচ্ছায়ে উহাকে পালন কর। আমার মানস-আদর্শ তােমার ব্যবহারে কলঙ্কম্লান হইয়াছিল, আজ তােমার প্রায়শ্চিত্তপ্তচরিত্র তাহাকে রাহুমুক্ত শশাঙ্কের ন্যায় উজ্জলতর, ভাস্বরতর করিয়াছে—আমার মানসমুকুরে

সদানন্দের বৈরাগ্য
তােমার গৌরবমুকুটের দীপ্তচ্ছায়া দেখিবে, এস ওগাে এস ।
আমার অটল বিশ্বাস, আমাদের মধ্যে পূৰ্ব্বকার সরল
কোমল স্নেহবন্ধন অটুট অক্ষুন্ন ও প্রতিযােগ , অপরাজিত
রহিয়াছে। ওহে হৃদয়দেবতা, আমার সব্বরচিত বিচিত্র
অর্ঘ্য তােমার চরণে ঢালিয়া দিব, এ ওহে ফিরে এস।
ইতি-পূজার্থিনী ভদ্রসােমা।”
পত্র পঠিত হইলে ঝল্লক মরণরুদ্ধ কণ্ঠে বলিলেন,
“জলি, আমার হইয়া তুমি রাজকন্যাকে বলিয়াে, আমি
বলিতেছি—দেবি,
মূঢ়
আমি,-তােমায় পাইবার উপায়
ভুল বুঝিয়া কর্তব্যপথগ্ন হইয়া তােমায় পাইয়াও পাই
নাই।—মুঢ়তানুষ্ঠিত পাপ তােমার জন্যই করিয়াছিলাম--
ইহাই আমার সান্ত্বনা। তুমি আমাকে ক্ষমা করিয়াছ,
আমাকে তােমার পূজাধিকারে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছ,—ইহা
জানিয়া মরিতেও সুখ -মরণের পূর্বমুহূর্তে সৰ্বগ্লানিহরা
লিপিখানি আমার মৃঃসরণি সরল সুন্দর করিয়া দিল।
আমি ধন্য——আমি আজ সাৰ্থকপ্রেম জিলি, আমি
আজ এই মৃত্যুমুহূর্তে আমার অস্থলিত প্রীতির নিদর্শন
কি দিব ; তাহার প্রথম প্রণয়সম্ভাষমধুরা লিপিখানি আমার

সদানন্দের বৈরাগ্য
বক্ষে নিশি দিন রক্ষা করিয়াছি—তাহাই লইয়া তাহাকে
দিও।”
এই বালয়া ঝল্লকণ্ঠ অঙ্গরক্ষণীরে বন্ধনমুক্ত করিতে
আরম্ভ করিলেন, জঙ্ঘিল সসম্রম তৎপরতায় তাহাকে
সাহায্য করি। অঙ্গরক্ষা উন্মুক্ত করিয়া ঝলক দেখিলেন,
বক্ষবিদ্ধ কৃপাণিক পত্ৰখানির একাংশ ছিন্ন করিয়া বক্ষো-
মধ্যে প্রবিষ্ট করাইয়া দিয়াছে। তিনি সেই ছিন্ন রানুলিপ্ত
পত্রখানি চুম্বন করিয়া জঘিলের হাতে দিলেন। তার পর
বক্ষ হইতে সবলে কৃপাণিকাফলক নিষ্কাসিত করিয়া
জঘিলকে দিয়া বলিলেন :-
“যাও জলি,-আমার হৃদয়রক্তরঞ্জিত কৃপাণিকা
তাহাকে দিয়া বলিয়াে, এই কৃপাণিকা আমার শত্রু হইয়াও
হিতকারী-সে প্রেয়সীর প্রণয়নুপ্রাণিত হস্তাক্ষর আমার
বুকের মধ্যে পূরিয়া দিয়াছে,-প্রেয়সীর প্রণয়গর্ভ বাণী
আমি হৃদয়ে বহন করিয়া মরিব—আমাকে কেহ আর
তাহা হইতে বিচ্যুত করিতে পারিবে না,আমি সার্থক
প্রেমের পুষ্পক্রোড়ে মরিতেছি।আমি সুখী।—ভগবান,
পরকালে অপরিণত প্রণয়প্রসঙ্গ যেন পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়,
১০৮

সদানন্দের বৈরাগ্য প্রারম্ভমাত্ৰসাঙ্গলীলা ভদ্রসােমাকে সান্ত্বনা দিয়েহে ভগবান” বক্ষের ক্ষতমুখে রজোচ্ছাস হইল, মরণব্ধ মন্ত্রী ঝল্লকণ্ঠ শয্যায় অসাড় জড় পতিত হইলেন। প্রত্যাবৃত্ত জলি প্রণয়প্রাণ মন্ত্রীর সকল বাক্য যথাযথ নিবেদন করিয়া প্রগাঢ়শােকোগেস্তম্ভিত। রাজকুমারী ভদ্রসােমার চরণপ্রান্তে রক্তরঞ্জিত কৃপাণিক ও পত্রিকা দুখানি রাখিয়া দিল। ভদ্রসােমার শোেক উচ্ছাসতীত, অননুমেয়, অগাধ ; রক্তলিপ্ত উপহারগুলি দেখিয়া অক্ষিকোণে শুধু দুটি বিন্দু লাবণ্যবিচ্ছুরিত অশ্রু নিটোল মুক্তাফলের মতো দীর্ঘ নিবন্ধ পক্ষ্মাশ্রয়ে দুলিয়া উঠিল ; তিনি রক্তলিপ্ত পত্রিকার একখানি মস্তকে কবরীর মধ্যে, অপর খানি বক্ষাব- রণান্তরালে রক্ষা করিলেন; তার পর, দয়িতহৃদয়রক্তরঞ্জিত কৃপানিকাখানি চুম্বন করিয়া ললাটে মস্তকে স্পর্শ করিলেন; সীমন্তে ললাটে রক্তরাগদীপ্তি সধবার প্রিয়ানুরাগচিহ্নিত সিন্দুরশােভার মতাে উজ্জল হইয়া উঠিল। •• সেবিকা গৌড়নগরনিবাসিনী শ্ৰীমতী কুলীনকন্যা, কুলীনপত্নী, কৌলীন্যের অন্যতম প্রথম বলি। শৈশবে জ্ঞানবিকাশের পূৰ্বেই সামাজিক উপদ্রব বিবাহ নামক একটা উপসর্গ তাহার জীবনে জুটিয়াছিল; কিন্তু ঐ পৰ্যন্ত। সজ্ঞানে এক দিনের জন্যও স্বামী নামক অপূৰ্ব্ব জীবের শ্রীপদারবিন্দ- সন্দর্শন তাহার ভাগ্যে ঘটে নাই। স্বামীদেবতা বিস্মৃত হইয়াছিলেন বলিয়া, কাল তাহাকে ভুলিয়া ছিল না। কালে ফুল যৌবন তাহার নিতান্ত অজ্ঞাতসারেই তাহাকে বেষ্টন করিয়া ধরিল; পুষ্পস্তবক- বিভূষণা নবমল্লিকার মতাে তাহার তনুলতা সম্পদে দীপ্ত হইয়া উঠিল। নয়নে অলসমদিরভাব, চরণে সবিলাস গতি, সর্বাঙ্গে সরমসঙ্কোচ জাগিয়া উঠিল ; মানসক্ষেত্রে মনােব সমরতাণ্ডবে নাচিয়া উঠিল। সামাজিক শাস্ত্র প্রতিনিয়ত 'তাহার কর্ণরন্থে স্বামীদেবতার বিচিত্র মাহাত্মের সদানন্দের বৈরাগ্য দুন্দুভিনিনাদ করিতে থাকিলেও, বিষমসমরবিজার বিজয়নিশান প্রণয়াকাঙ্ক্ষা বিচিত্র বিভাবে বিস্তারিত/হইয়া পড়িয়াছিল। একদা বিহঙ্গসঙ্গীতনন্দিত পুষ্পবহুল বসন্তের অরুণিত প্রভাতে সে দেখিল গঙ্গাস্নাত কৌষেয়পরিহিত গােবিন্দ চক্রবর্তী হাতে সাজি ধরিয়া পূজার জন্য পুষ্পচয়ন করিতেছে ; নবারুণের লালিমতি তিলকত্ৰিপুণ্ডক- চর্বিত প্রশান্ত প্রশস্ত ললাটে মহেশের শশীনেত্রের মতাে জ্বলিতেছে। পুষ্পবনে দীপ্ত স্থলপদ্মের মতাে তাহাকে দেখিয়া শ্ৰীমতীর ভ্রমরকৃষ্ণ চক্ষু চঞ্চল হইল, মনােভব হাসিল, শ্ৰীমতীর প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল— ‘তুমি কে, তুমি কে গাে, এই দীপ্ত প্রভাতে পুষ্পবনে অরুণের মতাে জ্বলিয়া উঠিয়াছ ? তােমার বৈদ্যুতশক্তি যে আমার অন্তরের অন্তরে প্রস্ত হইয়া পড়িল। একি, ওগাে এ কি! আমার প্রাণে আজ মধুপঝস্কৃত শত শতদল বর্ণগন্ধগানে এক সঙ্গে কেন ফুটিয়া উঠিল ? এস, এস, ওহে শতদলবিহারী আমার অন্তরে এস, ভাব-রাগ-বাক- তানে তােমার পূজা করিব, এস এস হে।

সদানন্দের বৈরাগ্য
।
শ্ৰীমতী দাবদগ্ধা হরিণীর মতো সৰ্বসস্তাপহা শীতল
জাহ্নবীজলে গিয়া পড়িল, তবু চিত্তজ্বালা নিভিল না।
‘শিবায় নমঃ' বলিয়া ফুল দিতে গিয়া ‘গােবিন্দায় নমােনমঃ
বলিয়া অস্তরবিজয়ীর পূজা করিল। শ্ৰীমতী গহন মাঝে
দিক্‌বিদিক্‌ হারা হইয়া কঁদিয়া ফেলিল—
‘হে ভগবান, এ কি করিলে, এ কি হইল ? গােবিন্দ
চক্রবর্তীকে আবাল্য কতদিন কতবার দেখিয়াছি, কিন্তু
আজ এ কি কুক্ষণে বা সুক্ষণে সে আমায় দেখা দিল। হে
অন্তর্যামী, তার মধ্যে আজ এমন কি ঐশ্বৰ্য্য পরিস্ফুট
হইয়া উঠিয়াছে, যাহাতে তাহাকে আজ অতুল শােভায়
সজ্জিত দেখিলাম ; অথবা হে বিধাতা, আমার মনেই কি
এমন কিছু অঘটন ঘটনা ঘটিল যাহাতে সে আজ আবাল্যদৃষ্ট
অবিশেষকে সবিশেষ শােভন করিয়া গ্রহণ করিল ? এ
কোন্ অয়স্কান্তমণি, যাহার স্পর্শে লৌহ কনককান্তি লাভ
করিল, এ কোন্ স্পর্শমণি যাহার সংসর্গে মৃৎপিণ্ড রত্নতি
বিকীর্ণ করিল ? ও গাে এ কি, কি এ?
মতীর চিত্তবিপ্লব গােবিন্দের অন্তরে গিয়া আঘাত
করিতে লাগিল। গােবিন্দ বুঝিল, মনােভব সরভাবের
১১২

সদানন্দের বৈরাগ্য দিব্য সরণি নিৰ্মাণ করিয়া উভয়ের চিত্তসংযোেগ সাধন করিয়াছেন। গােবিন্দের প্রাণও কাদিল- ‘হে মনােমথ, তােমার এ কি খেলা? তােমার মােহনস্পর্শে আমার চিত্তে যে অসংখ্য ভাবকুসুম প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, হে অঘটনঘটনপটু, তাহা সার্থকতা লাভ করিবে কোথায় হে, ওহে কেমন করিয়া ? এক্ষণে মন্মথ যদি বাদ সাবিল, তবে তাহাদের সহজ দৃষ্টিমিলন প্রথমে চকিত হইল, ক্রমে সলজ্জ, অবশেষে করুণ হইয়া উঠিল। যখন দুটি প্রাণ প্রণয়ের আকর্ষণে পরম্পরাভিমূখী হয়, তখন কি জানি কেন আন্তরিক নৈকট্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাহিরে দূরত্ব আসিয়া পড়ে। এক্ষণে শ্ৰীমতীর স্বামীদেবতার কাল্পনিক পদারবিন্দ অপেক্ষা তাহার প্রতিবেশী গােবিন্দ চক্রবর্তীর ফুল্ল মুখারবিন্দ অধিক তৃপ্তি সান্ত্বনা ও স্বর্গ সুখের আভাস দিতে লাগিল। পল্লীধুরন্ধরগণের ইহা বুঝিতে বিলম্ব ঘটিল না— প্রণয়ের ধর্মই প্রকাশ। কটাক্ষ বিদ্রুপ তিরস্কার তাহাদের সঙ্কুচিত দুটি প্রাণকে সহানুভূতির গৃঢ়স্রোতে অতি দ্রুত সদানন্দের বৈরাগ্য অতি দৃঢ় মিলিত করিয়া দিল। উভয়ে উভয়কে বলিল— ; ‘এস এস ওগাে বাঞ্ছিত, আমার নিগ্রহনিভিন্নহৃদয়ে তােমার মধুমূরতি বরণ করিয়া লই। তুমি দুঃখরূপে এস আমাকে অধিকার কর, ওগাে আচ্ছন্ন কর ! শ্ৰীমতীর বিফলপ্রেম রত্নমালার মধ্যমণির মতাে গগাবিন্দের বক্ষ উজ্জ্বল করিয়া জ্বলিয়া উঠিল ; গােবিন্দের প্রণয় চন্দনপ্রলেপের মতো শ্ৰীমতীর জ্বালাময় হৃদয় শীতল করিল। মিলনের প্রথম উল্লাস ও উন্মাদনা যখন শ্লথ হইল, তখন শ্ৰীমতী দেখিল, সমাজ সমাজ, সে একের সুখদুঃখের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না। সে বেশ বুঝিল, তাহাদিগকে নিগৃহীত লাঞ্ছিত গৃহতাড়িত পতিত ঘৃণিত পরিত্যক্ত করিবার বিপুল আয়ােজন উদ্যোগ হইতেছে। তখন শ্ৰীমতী চিন্তা করিতে লাগিল- ‘সমাজ, তােমার প্রবল ইচ্ছার কাছে আমরা কি কিছু নহি ? হৃদয় প্রেম বাসনা ইচ্ছা স্বাধীনতা বলিয়া কি সম্মানযােগ্য কিছু নাই ? আমার চিত্ত যাহাকে চাহে, সে আমার কেহ নয় ; তুমি যাহাকে দয়া করিয়া দিবে, সেই ; ১১৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
প্রসাদ পাইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে? আচ্ছা বেশ!
প্রবলের জয় হউক। আজ আমি একজনকে ভালাে
বাসিয়াছি বলিয়া তােমার গাত্ৰজ্বালা উপস্থিত হইয়াছে ;
এমন দিন আসুক আমার জীবনে, হে ভগবান, যখন
সমাজের প্রত্যেককে আমি গােবিন্দের মতাে ভালােবাসি,
অথচ লােকে আমার জয়গান করিবে। এখন যাহারা
আমায় দেখিয়া ঘৃণায় নাসিকাকুঞ্চন করিতেছে, তাহারা
আমার প্রসাদলাভের জন্য লালায়িত হইয়া উঠিবে।
তদবথি শ্ৰীমতী আত্মসংবরণ করিল।
গােবিন্দ চক্রবর্তী শ্ৰীমতীকে দেখিয়া বিস্মিত হইল,
স্তব্ধ হইল, সম্রমে মুহ্যমান ও সঙ্কুচিত হইল। যে তাহাকে
দেখিয়া শ্ৰীমতীর তুষারকুলেন্দু-মৃণালরজতভ শুভ্র-শীতল
হাসিখানি মেঘবেষ্টনী বিদ্যুতের মতাে তাহাকে আলিঙ্গন
করিয়া ধরিত, জলবিন্দু লােলচপল দৃষ্টি তাহাকে অভ্যর্থনা
করিত, কপােলরাগ অরুণিত হইয়া উঠিত, সেই তাহাকে
দেখিয়া সেই শ্ৰীমতীর মুখের একটি ক্ষুদ্রতম পেশীও বিচলিত
হইল না। শুধু চিত্তজয়ের অনবদ্য বিরাট আনন্দ তাহার
চক্ষু হইতে ছুরিত হইতে দেখিয়া গােবিন্দ শ্রদ্ধাসম্রমে

সদানন্দের বৈরাগ্য পুলকাঞ্চিত হইল, মনে মনে শ্ৰীমতীর সংযমশক্তিকে প্রণাম করিল। এইরূপে দিন গেল, মাস গেল। আচারের ব্যতিক্রম ঘটিল না। গােবিন্দ শুধু সপ্রশংসদৃষ্টিতে পূজা দান করে ; শ্ৰীমতীর প্রশান্ত দৃষ্টি তাহাকে কি বলে, সে তাহা ঠিক বুঝিতে পারে না। শ্ৰীমতীর •ে • - ৯ শুধু তরল প্রেম ক্ষরিত হইত, তাহা লইয়া রীক্ষা করিয়া দেখিয়াছে, এখন তাহা তাহার একলার নিজস্ব নহে, তাহা সকলেরই, তাহা সাধারণের। সেই অ দৃষ্টিতে গােবিন্দ তাহার জন্য বিশেষ কিছু ,তবু গােবিন্দ তাহা হইতে নি* প্রীতি লাভ স্কুচিত না পাইত করিত। সমাজ অগত্যা শান্ত হইল। বুঝি পূতসংযমশীলা শ্ৰীমতীর কাছে নতি স্বীকার করিল। শ্ৰীমতী সৰ্ব্বদা প্রার্থনা করিত, তুমি একের প্রীতি সকলকে বঁটিয়া দিলে ; সেই ও র আসুক- সকলে ইহা ভােগ করুক, আমার জীবন সার্থক হােক। তুমি আমার জীবনে সেই শুভ মুহূর্ত আনিয়া দাও, যখন সদানন্দের বৈরাগ্য ম আমি দ্বিধা-বিরহিত হইয়া সকলকে প্রাণের প্রতি পরিবেষণ করিয়া দিতে পারি। তুমি গােবিন্দকে আশ্রয় করিয়া প্রীতিরূপে আমার চিত্তমন্দিরে প্রকাশিত হইয়া- ছিলে, এখন বিশ্বরূপে যদি ব্যাপ্ত হইয়া পড়িলে, তবে, হে সেই বিশ্বরূপের পূজার অবকাশ দাও; শরণীয় শ্রেয় ও প্রেয় পন্থা নির্দেশ স। সে প্রার্থনা অবশেষে পূর্ণ করিলেন। গৌড়- নগরে ২ ই উপস্থিত হইল। প্রত্যহ শত বলিত হইতে লাগিল। যত সম্পন্ন গৃহস্থ নগর ছাড়িয়া -লায়ন করিল। শ্ৰীমতীর পিতা সনাতন বন্দ্যোপাধ্যায় পলায়নের উদযােগ শেষ করিয়া যখন শ্ৰীমত আহ্বান করিলেন, তখন শ্ৰীমতী বলিল- ‘আমার ** নর শুভ মুহূর্ত আজ আসিয়াছে, ওগো আজ আসিয়াছে। আজ আমি বিশ্বজনের সেবা করিয়া ধন্য হইব, পবিত্র হইব, পূর্ণ হইব। আমার ব্যর্থ জীবন রক্ষার জন্য কেন পলাইব ? সেবা-উৎসর্গিত জীবন আমার ব্যক্তি মৃত্যু ১১৭

সদানন্দের বৈরাগ্য
সার্থক, ওগাে সার্থক হউক। শুভাকাঙ্ক্ষী যে কেহ থাক
আশীৰ্বাদ কর, ওগাে আশীৰ্বাদ কর।
শ্ৰীমতী রহিল।
আর রহিল নগরত্যাগসক্ষম গােবিন্দ
চক্রবর্তী। তাহারা পীড়িত ও আর্তের সেবা ও যত্নে
আপনাদিগকে ঢালিয়া দিল।
নিপুণ সেবিকা শ্ৰীমতী নিত্য দ্বারে দ্বারে ঔষধ ও সেবা
লইয়া ফিরে, গােবিন্দ তাহার নিরাপত্ত মুক অনুগত
আজ্ঞাবহ। শ্ৰীমতীর বিশ্বসেবায় যে সুখ, সেবিকার সাহায্যে
গােবিন্দের সেই আনন্দ—অনাবিল, অনবদ্য।
যাহারা কিছুদিন পূৰ্ব্বে শ্ৰীমতীকে তাড়িত লাঞ্ছিত
করিবার ষড়যন্ত্র করিয়াছিল, তাহারাই এখন তাহার
সঙ্গলাভের জন্য অধিক ব্যস্ত। এবং তাহার সাক্ষাৎ
পাইলে এখন তাহারা কাতরকণ্ঠে বলে, “থাক মা থাক,
শরীরিণী শুশ্রুষা বিধাতার শুভ আশীৰ্বাদের মতাে আমাদের
রােগক্লিষ্ট শিয়রে বসিয়া থাক !
যাহারা তাহাকে অসতী বলিয়া বিশেষভাবে নাসিকা-
কুঞ্চন করিয়াছিল, তাহারাই এখন বলে, তুমি পুণ্যবতী,
ওগাে সতী সাধ্বী।
১১৮

সদানন্দের বৈরাগ্য ক্রমে গােবিন্দের পালা আসিল। সে রােগগ্রস্ত হইয়া কাতর হইয়া পড়িল , সে কাতরতা রােগযন্ত্রণায় নহে, শ্ৰীমতীকে মহৎব্রত উদযাপনে সাহায্য কবিতে বঞ্চিত হইয়া। তপিষ্ঠা শ্ৰীমতী গােবিন্দের শয্যাপাশ্বে দিব্য প্রশান্ত মুখে আসিয়া দেখা দিল। গােবিন্দ প্রথম মুহূর্তে সুখাতি- শয্যে একটু বিচলিত হইল, তাহার ভাবভারী অগ্নিপুট নিমীলিত হইল। কিছুক্ষণ পরে বলিল- শ্রী, ওগো শ্ৰী, তুমি এখানে কেন ? কত অনাথ তােমার সেবালাভের জন্য জন্য সােৎসুক প্রতীক্ষা করিতেছে ; তুমি তাহাদের কাছে যাও, আমার কাছে থাকিয়াে না। শ্ৰীমতীর মুখ সহাস নহে, অথচ প্রদীপ্ত । এ দিব্য শ্ৰী সেই তপ:কশা কোথায় পাইল ? সে অকম্পিত কণ্ঠে বলিল, ‘গােবিন্দ, তুমি মনে করিয়াে না, যে, আমি অধিক প্রীতি লইয়া তােমার সেবা করিতে আসিয়াছি। তুমি নগরের দরিদ্রতম ভিক্ষুক হইলেও এখন আমি আসিতাম; এখন তােমার সেবার পালা; আমার কর্তব্য শেষ হইলেই ১১৯

সদাননের বৈরাগ্য
অন্যের সেবায় চলিয়া যাইব। গােবিন্দ, হীনতম নাগরিক
আমার যতখানি প্রিয়, তুমিও ততখানি, এখন একটুকুও
বেশি নও। একটু কৃতজ্ঞতার ঋণ শুধু তােমার নিকট
আছে ; ভগবান তােমাকেই উপলক্ষ্য করিয়া আমার
রুদ্ধ-চিত্তের গুপ্তভাণ্ডার বিশ্বের নিকট উন্মুক্ত করিয়া
দিয়াছেন।
গােবিন্দের মৃত্যুচ্ছায়াসমাচ্ছন্ন চক্ষু প্রশংসা সন্ত্রম প্রীতি
ভক্তিতে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে উচ্ছসিত কণ্ঠে বলিয়া
উঠিল ‘ঈশ্বরের করুণা ও প্রেম ধন্য, শ্ৰীমতী তুমি ধন্য, আর
তােমাদের দয়াতে আমিও ধন্য। ঈশ্বরের চরণে কোটি
নমস্কার, তােমার চিত্তজয়ের বিরাট শক্তিকে শত শত
নমস্কার, দেবি, তােমার অপূৰ্ব বিশ্বপ্রীতিকে সহস্রবার
নমস্কার, সাধ্বি, তােমার চরণে বার বার নমস্কার।
আবেগ-উত্তেজিত প্রেমিকের উখিত মস্তক শয্যায়
লুণ্ঠিত হইয়া পড়িল। শ্ৰীমতী ডাকিল, ‘গােবিন্দ।
মরণাহত প্রেমিক উত্তর দিল না। অবিকম্প অনিস্পন্দ
কঠে শ্ৰীমতী আশীৰ্বাদ করিল, ‘তুমি আজ ভগবানের

সদানন্দের বৈরাগ্য
চরণ-সদাব্রতে চিরঅতিথি হইলে, যাও, তােমার আত্মার
কল্যাণ হোক।
তারপর শ্রীমতী মরণাক্রান্ত অপরগৃহে চলিয়া গেল,-
গগাবিন্দের জন্য একটি দীর্ঘনিশ্বাসও বুঝি নির্গত
হইল না।
১২১

চুড়িওয়ালা
“বেলােয়ারী চুড়ি চাইয়ে, কঁাচের পুতুল খেলেনা চাইয়ে,
গেলাস বাটি ফুলদান চাইয়ে।”
দুপুর বেলা যখন রােদ ঝা-ঝ। করিতেছে, গলির
পথে লােক চলিতেছে না, ঘরে ঘরে গৃহিণীরা কাজকর্ম
সারিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া একটু গ'-গড়া দিতেছেন, তখন
নিজের পসরা মাথায় করিয়া পথে পথে চুড়িওয়ালা
হাঁকিয়া ফিরিতেছিল—“বেলােয়ারী চুড়ি চাইয়ে, কাচের
পুতুল খেলেনা চাইয়ে, গেলাস বাটি ফুলদান চাইয়ে।”
গলির ধারে একটি জানলা অল্প একটু খুলিয়া একটি
কিশােরী মেয়ে ডাকিল—“ও চুড়িওলা, চুড়িওলা, এই
বাড়ীতে এস।”
চুড়িওয়ালা ফিরিয়া দুই হাতে মাথার ঝুড়ি উচু করিয়া
তুলিয়া ধরিয়া উপরে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—“কনে,
কে ডাকছ গাে ?”
১২২

সদাননের বৈরাগ্য
কিশােরী বলিল-“এই যে এই বাড়ীতে।”
চুড়িওয়ালা দেখিল একটি তন্বী সুন্দরী কিশােরী
একখানা চৌড়া লাল পেড়ে শাড়ীতে মাথায় আধঘােমটা
দিয়া দাড়াইয়া আছে—শাড়ীর চৌড়া লাল পাড়টি মাথার
মাঝখানে সিদুরের মতাে টকটক করিয়া যেন জ্বলিতেছে।
কিশােরীর নাকে একটি নােলক, কানে দুটি দুল—গায়ের
রঙের সঙ্গে সেগুলি যেন মিশিয়া লুকাইয়া গিয়াছে।
তাহাকে দেখিয়াই বুড়া আলিজানের মনটা খুসী হইয়া
উঠিল এমন মধুর রূপ সে আর কখনাে দেখে নাই ;
অনেক সুন্দরীকে সে চুড়ি বেচিয়াছে, কিন্তু কাহাকেও
দেখিয়া তাহার প্রাণ এত খুসী হইয়া উঠে নাই ।
হাতের বােঝা মাথায় নামাইয়া বাড়ীর উঠানে আসিয়া
দাড়াইল।
কিশােরীটি নামিয়া আসিয়া চুড়িওয়ালার সামনে
দাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল—“লাল চুড়ি আছে চুড়িওলা?”
চুড়িওয়ালা হাসিয়া বলিল—“আছে মা লক্ষ্মী ! কার
হাতের চাই ? তােমার হাতের ?”
কিশােরী ঘাড় কাৎ করিয়া বলিল—'হঁ্যা।”
।
১২৩

সদানন্দের বৈরাগ্য
বুড়া আলিজান মাথার মােট নীচে নামাইয়া উপরের
ঢাকা খুলিতে খুলিতে হাসিয়া বলিল—“তা লাল চুড়ি ত
তােমার ও লাল হাতে মানাবে না মা লক্ষ্মী রঙে রঙে
মিশে যাবে যে ? ঐ রাঙা হাতে কালাে চুড়ি ভালাে
মানাবে। কালাে চুড়ি দেবাে?”
কিশােরী লজ্জায় লাল হইয়া হাসিমুখ নত করিয়া বলিল
—“না, লাল চুড়ি বা’র কর।”
বুড়া চুড়িওয়ালা হাসিয়া বলিল-“মা আমার লালির
ভক্ত! এস ত মা হাত দেখি ?”
কিশােরী লজ্জিত হইয়া বলিল—“না, তুমি চুড়ি দাও,
আমি দেখে নিচ্ছি।”
চুড়িওয়ালা বলিল-“তােমার হাতে পরায়ে দেবাে না
মা ?"
কিশােরী বলিল-“না, আমি মার কাছে পরব।”
বুড়া চুড়িওয়ালা হাসিয়া বলিল—“না মা, তা হবে
না; ও রাঙা হাতে রাঙা চুড়ি আমি পরায়ে দিয়ে যাব।
তা যদি না দাও ত মুই চুড়ি বেচব না”
বুড়া মনে করিতেছিল এই ব্যবসা অবলম্বন করিয়া সে
১২৪

সদানন্দের বৈরাগ্য • ত কত বাড়ীতে কত মেয়ের হাত নিজের হাতের মধ্যে লইয়া চুড়ি পরাইয়া দিয়াছে। কত স্পর্শ তাহাকে ক্ষণিকের জন্য একটু বিচলিত করিয়াছে, কিন্তু তাহাকে কেহই ত মুগ্ধ করিতে পারে নাই। আজ বুড়ার মনে হইতে লাগিল এই সুন্দরী কিশােরীটির হাতে যদি সে চুড়ি পরাইয়া দিতে না পারে, তবে তাহার এই ব্যবসা মিথ্যা পণ্ডশ্রম হইয়া যাইবে ; এই হাতখানিরই সন্ধানে সে সমস্ত জীবন রােদে রােদে গলিতে গলিতে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বাড়ীতে বাড়ীতে খুঁজিয়া খুজিয়া তাহার বয়স কাটাইয়াছে, তাহার কঁচা চুল পাকাইয়া ফেলিয়াছে। তাই যখন সেই কিশােরী তাহার কাছে চুড়ি পরিবে না বলিল তখন বুড়া বলিয়া বসিল-“তা যদি পরাতে না দাও ত মুই চুড়ি বেচব না।” এই কথায় কিশােরীর ভারি লজ্জা বােধ হইল । আর কোনাে কথা না বলিয়া আস্তে আস্তে আগাইয়া আসিয়া বুড়ার কাছে বসিয়া তাহার সুন্দর সুকোমল হাত- খানি বাড়াইয়া দিল—তাহার মুখে লজ্জার আভাস শাড়ীর লাল পাড়ের ছায়ার মতাে ফুটিয়া উঠিয়াছিল। চুড়িওয়ালা মৃণালসংযুক্ত পদ্মের কলির মতো কিশােরীর ১২৫

সদানন্দের বৈরাগ্য
হাতের মুঠিটিকে নিজের দুই হাতের মধ্যে ধরিয়া একবার
হৃদয়ের সমস্ত স্নেহের আবেগ দিয়া চাপিয়া চুড়ির মাপ
ঠিক করিয়া লইল। বুড়ার মনে হইতেছিল যদি সে এই
সুন্দর সুকোমল পদ্মের কলির মতো হাতখানি চোখের
জলে ধুয়াইয়া চুমায় চুমায় একেবারে আচ্ছন্ন করিয়া দেয়,
তারপর নিজের পসরাটি উজাড় করিয়া দিয়া রিক্ত হস্তে
ফিরিয়া যায়, তবেই তাহার উচ্ছ্বসিত স্নেহের আবেগ
কথঞ্চিৎ চরিতার্থতা লাভ করিয়া শান্ত হইতে পারে।
চুড়িওয়ালা কিশােরীর হাত দুখানিকে নিজের হাতে
ধরিয়া টিপিয়া টিপিয়া লাল চুড়ি একগাছির পর একগাছি
করিয়া পরাইয়া দিতে লাগিল। বেদনায় কিশােরীর মুখ
একটু কুঞ্চিত হইলে সে বেদনা সহস্রগুণ হইয়া বুড়ার বুকে
গিয়া বাজিতেছিল, আর বুড়া বলিতেছিল—“বড় কি
লাগতিছে মা? একটু সহ্য কর মা, তা হলি এ চুড়ি
তােমার হাতে চাপে বস্যা যাবে, সে যা মানাবে মা !”
কিশােরীর চোখ ছলছল করিতেছিল, তবুও সে বুড়ার
কথা শুনিয়া মুখ লাল করিয়া তুলিয়া হাসিল—হাসিতে
দুটি গালে দুটি টোল পড়িল।
।

সদানন্দের বৈরাগ্য
চুড়ি পরাইয়া দিয়া চুড়িওয়ালা আপনার বুড়ি হইতে
বাছিয়া বাছিয়া ভালাে ভালাে পুতুল, কড়ি-বসানাে বাক্স,
খেলনা, ফুলদান বাহির করিল।
কিশােরী তাহা দেখিয়া বলিল—“ওসব আমার কিছু
চাইনে।”
বুড়া হাসিয়া বলিল—“তােমার না চাই, খােকারে
দিয়ে।”
কিশােরী লজ্জায় আপাদমস্তক লাল হইয়া উঠিয়া মাথা
নত করিল।
তাহার শাশুড়ী সেখানে আসিয়া দাড়াইয়াছিলেন।
তিনি হাসিয়া বলিলেন—“বৌমার এখনাে ত খােকা হয়নি,
ও-সবের দরকার নেই।”
চুড়িওয়ালা তাহার ঝুড়ির উপর ঢাকা চাপা দিয়া দড়ি
দিয়া বাধিতে বাঁধিতে বলিল—“তা না হােক, আমার
মা-ই ত এখনাে খুকি আছে, মা-ই খেলিবে।”
কিশােরী
বধূর
শাশুড়ী বলিলেন-“ওগুলোর কত
দাম ?”
১২৭

সদানন্দের বৈরাগ্য চুড়িওয়ালা ঝুড়ি মাথায় তুলিয়া দাঁড়াইয়া বলিল- ও-সব আমি মাকে অমনি দেলাম।” শাশুড়ী বলিলেন—“ওমা, সেকি কখনাে হয়। ওগগা চুড়িওলা, তুমি যেয়াে না, দাড়াও গো, দাড়াও, দাম নিয়ে যাও।” ততক্ষণে চুড়িওয়ালা পথে বাহির হইয়া পড়িয়া খুসি মনে হাসিমুখে হাঁকিতে হাঁকিতে যাইতেছে-“বেলােয়ারী চুড়ি চাইয়ে, কাচের পুতুল খেলেনা চাইয়ে, গেলাস বাটি ফুলদান চাইয়ে।” সেই দিন হইতে চুড়িওয়ালা নিত্য দুপ্রহরে সেই গলির মধ্যে চুড়ি বেচিতে আসিতে লাগিল। চুড়ি ত আর নিত্যকারের প্রয়ােজনীয় নয়, তাহাকে কেহ আর ডাকিত । কিন্তু তাহার ডাক শুনিলেই সেই কিশােয়ী বধুটি একবার জানলার কাছে আসিয়া দাঁড়াইত, আর বুড়া চুড়িওয়ালা দুই হাতে ঝুড়ি উচু করিয়া তুলিয়া ধরিয়া একবার তাহাকে দেখিয়া লইত ; দুজনে চোখখাচোখি করিয়া সলজ্জ হাসির ভিতর দিয়া আপনাদের একটি দিনের ক্ষণিক পরিচয়ের গভীর প্রীতির সম্পর্কটি স্বীকার করিয়া যাইত। ১২৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
কিশােরী বধূর শাশুড়ী হাসিয়া বলিতেন—“কি বৌমা,
তােমার থােকা এসেছে বুঝি? খাসা তােমার পাকা-
দাড়িওলা খােকাটি বাছা!”
কিশােরী বধূ আনন্দের লজ্জিত হাসি হাসিয়া জানলা
হইতে সরিয়া যাইত।
চুড়িওয়ালা ভাবিত সে যদি চুড়ি বেচা ছাড়িয়া দিয়া
আলু পটল কি কেরােসিন তেল বেচিতে আরম্ভ করে
তাহা হইলে রােজ তাহার মায়ের বাড়ীতে যাওয়ার সুবিধা
হইতে পারে। কিন্তু চুড়ি না বেচিলে ত সেই পদ্মকলির
মতাে মুঠিটি দুই হাতের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া হৃদয়ের সমস্ত
আনন্দ ও স্নেহের ধারা মুক্ত করিয়া দিবার সুযােগ ঘটিবে
। সেই সুদূরের সুযােগের প্রত্যাশাতেই বুড়া চুড়ির
পসরা মাথায় করিয়া দুপ্রহরের রৌদ্রে গলিতে গলিতে
হাঁকিয়া ফিরিত—“বেলােয়ারী চুড়ি চাইয়ে, কঁাচের পুতুল
খেলেনা চাইয়ে, গেলাস বাটি ফুলদান চাইয়ে।”
কিছুদিন পরে হঠাৎ সেই কিশােরী জানলায় তাহার
নিয়মিত হাজরী বন্ধ করিয়া দিল। বৃদ্ধ চুড়িওয়ালা হাকিয়া
হাঁকিয়া ক্লান্ত হইয়া ফিরিয়া যায়, উপরের সেই গরাদে-

সদানন্দের বৈরাগ্য দেওয়া জানলার ফাকে সেই সুন্দর মুখখানি আর লজ্জিত স্মিতহাস্যে উদ্ভাসিত হইয়া উকি মারে না। বৃদ্ধ দীর্ঘ- নিশ্বাস ফেলিয়া ফেরি সারিয়া ফিরিয়া যায়, কিন্তু ফিরিতে তাহার মন চাহে না, পা চলে না। কিছুদিন ব্যর্থ প্রতীক্ষায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া হাঁকের পর হাঁক দিয়াও যখন আর সেই জানলায় সেই মুখখানি কিছুতেই দেখা দিল না, তখন একদিন চুড়িওয়ালা সাহসে ভর করিয়া বাড়ীর দরজায় দাড়াইয়া উচ্চ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল-“মাঠাকরণ, চুড়ি লেবেন?” বাড়ীর মধ্য হইতে রমণীকণ্ঠে উত্তর হইল—“না গাে।” চুড়িওয়ালা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিয়া স্তব্ধ হইয়া কিছুক্ষণ দাড়াইয়া রহিল। তারপর আস্তে আস্তে অগ্রসর হইয়া বাড়ীর উঠানে দাড়াইয়া কুষ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল-মাঠাকরুণ, আমার মা কনে গা?” ঘরের মধ্য হইতে আবার রমণীকষ্ট্রে উত্তর হইল— “এখানে নেই গাে।” সহস্র প্রশ্ন করিবার ইচ্ছা হইলেও আর তাহার সাহসে কুলাইল না, সে ধীরে ধীরে বাহির হইয়া চলিয়া গেল—সে

সদানন্দের বৈরাগ্য
ম্রিয়মাণ, গতি তাহার মন্থর, পথে পথে সে আর “চুড়ি
চাই” বলিয়া হুঁকিলও না।
এখানে নাই। কিন্তু কবে আসিবে তাহারও ত
হিরতা নাই। প্রতিদিন আশা বহিয়া চুড়িওয়ালা সেই
গলিতে আসিয়া উচ্চস্বরে হাঁকে—“বেলােয়ারী চুড়ি চাইয়ে,
কঁচের পুতুল খেলেনা চাইয়ে, গেলাস বাটি ফুলদান
চাইয়ে!” একবার, দুবার, তিনবার !
তারপর সেই
শূন্য জানলাটির দিকে ছলছল দৃষ্টি তুলিয়া একটি দীর্ঘ
নিশ্বাস ফেলিয়া সে আবার ফিরিয়া যায়। পরদিন আবার
আসে।
এমনি করিয়া কত মাস গেল। পূজা আসিল। আজ
ঘরে ঘরে চুড়ি কেনার ধূম পড়িয়া গিয়াছে—সধবা, কুমারী,
তরুণী, বালিকা, সবাই মনের মতন চুড়ি বাছিয়া বাছিয়া
কিনিতেছে ; চুড়িওয়ালা তাহাদের মুঠি হাতে লইয়া চুড়ির
পর চুড়ি পরাইয়া দিতেছে! কিন্তু তাহার চিত্ত কিছুতেই
প্রসন্ন হইতেছে না, প্রবােধ মানিতেছে না। তাহার
মায়ের মতন সুন্দর হাত আর কাহারাে না, তেমন নরম

সদানন্দের বৈরাগ্য মুঠি আর কাহারাে না, তেমন মধুর হাসি আর মিষ্ট কথা কাহারাে না। অপেক্ষা করিয়া করিয়া বুড়া ক্লান্ত হইয়া আবার এক- দিন সে বাড়ীর সামনে গিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বারবার করিয়া হাঁকিল-“বেলােয়ারী চুড়ি চাইয়ে, কাচের পুতুল খেলেনা চাইয়ে, গেলাস বাটি ফুলদান চাইয়ে !” কিন্তু কাহারে সাড়া পাইল না, কেহ তাহাকে জানলা হইতে ডাকিল না-“ও চুড়িওলা, চুড়িওলা, এই বাড়ীতে এস!” সেই জানলা তেমনি শূন্য, তেমনি নিরানন্দ ! তখন আস্তে আন্তে অগ্রসর হইয়া উঠানে দাঁড়াইয়া চুড়িওয়ালা ডাকিল-- “চুড়ি লেবেন মাঠাকরুণ ?” একজন ঝি বিরক্ত হইয়া তীব্র কণ্ঠে উত্তর করিল—“না গে। না, একশ দিন বলেছি চুড়ি চাইনে, তবু কেন জ্বালাতে আস বল দিকিন? দরকার হয় রাস্তা থেকে ডেকে নেব।” চুড়িওয়ালা ভয়ে লজ্জায় অপ্রতিভ হইয়া এতটুকু হইয়া গেল। সে চোরের মতাে ফিরিয়া যাইবে, এমন সময় দেখিল সেই কিশােরী বধূর শাশুড়ী ঘর হইতে বাহিরে আসিলেন। তাহাকে দেখিয়া থতমত খাইয়া বৃদ্ধ চুড়ি- ১৩২

সদানন্দের বৈরাগ্য
ওয়ালা জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিল—“মাঠাকরুণ, আমার মা
কি এহনাে আসে নাই ?”
শাশুড়ী মুনিমুখে উদাস ভাবে চুড়িওয়ালার দিকে
চাহিয়া বলিলেন-“এসেছে।”
চুড়িওয়ালা একমুখ হাসিয়া আনন্দ-গগদ স্বরে
বলিল—“মাঠাকরুণ, একবার তানাকে দেখতি পাই না ?
মারে আমার কতকাল দেহিনি—দেখতি আসি আসি
ঘুরি যাই, দেখতি পাই না!” শাশুড়ী কিছুক্ষণ স্তব্ধ
হইয়া দাড়াইয়া রহিলেন। দেখিতে দেখিতে তাহার চোখ
দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। তিনি
চোখ মুছিয়া স্থির কণ্ঠে বলিলেন-“না বাবা, তার সঙ্গে
আর দেখা হবে না।”
বুড়ার আনন্দ-প্রদীপ্ত মুখ একেবারে নিষ্প্রভ হইয়া
যেন নিবিয়া গেল। সে ব্যথিত ছলছল দৃষ্টিতে একবার
বধূর
শাশুড়ীর দিকে চাহিয়া হতাশ মনে গমনে অনিচ্ছুক
পা দুখানিকে টানিয়া লইয়া ফিরিয়া চলিল।
পূজার সময় বাজার ঢুড়িয়া সব চেয়ে ভালাে এক জোড়া
চুড়ি পছন্দ করিয়া আনিয়াছিল তাহার সুন্দরী মাটির হাত
সে এই

সদানন্দের বৈরাগ্য
নিজের হাতে ধরিয়া পরাইয়া দিবে বলিয়া। কিন্তু যেখানে
ভালাে বাসিবার অধিকার আছে, পাইবার দাবী করিবার
অধিকার নাই, সেখানে সে কেমন করিয়া জোর করিবে ?
সেই কিশােরী বধূটি যদি তাহার কন্যা হইত, তবে কি
তাহার শাশুড়ী তাহাকে এমন করিয়া বিমুখ করিয়া হতাশ
করিয়া ফিরাইতে পারিত? বুড়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া
পতনােম্মুখ অশ্রু গামছায় মুছিয়া ফেলিল। সদর দরজা
পৰ্যন্ত ধীরে ধীরে গিয়া চুড়িওয়ালা থমকিয়া দাঁড়াইল।
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। একবার ঘাড়
ঘুরাইয়া পিছু ফিরিয়া দেখিল। তার পর আবার ফিরিয়া
মন্থর কুষ্ঠিত পদে বাড়ীর উঠানে আসিয়া দাঁড়াইল।
চুড়িওয়ালা দেখিল বধূর শাশুড়ী তখনাে রােয়াকের
উপর দাড়াইয়া আছন। চুড়িওয়ালা গলায় গামছা দিয়া
দুই হাত জোড় করিয়া মিনতি-বিগলিত স্বরে বলিল—
“মাঠাকরুণ, মুই চুড়ি বেচতি আসি নাই। এক বার
মায়েরে মাের দেহি যাতাম।”
এই বলিতেই বুড়ার চোখ দিয়া টপ-টপ করিয়া বেদনা-
ভরা মিনতি অশ্রুজলে গলিয়া ঝরিয়া পড়িতে লাগিল।
১৩৪

সদানন্দের বৈরাগ্য বধূকে একজন নিঃসম্পর্ক পথের লােকের সামনে বাহির করিবার পক্ষে যেটুকু আপত্তি ছিল, বৃদ্ধ চুড়িওয়ালা তাহা চোখের জলে নিঃশেষে ধুইয়া মুছিয়া ফেলিল। চোখের জল এই বৃদ্ধ মুসলমান চুড়িওয়ালার সহিত কিশােরী বধূর একটী প্রাণের টানের নিকট-সম্পর্ক এক নিমেষে প্রমাণ করিয়া দিয়া গেল। বধূর শাশুড়ী এক মুহূর্ত তাহার দিকে তাকাইয়া অক্ষিপল্লব হইতে কম্পমান অশ্রুবিন্দু মুছিয়া অপূর্ণ স্বরে ঝিকে বলিলেন—“মােক্ষদা, বৌমাকে এক- বার ডেকে দে।” কিশােরী বধূ ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত জড়িত পা ফেলিয়া চুড়িওয়ালার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। চুড়িওয়ালা এক- মুখ হাসিয়া কেঁাচার খুট হইতে কাগজের বাক্স খুলিয়া এক জোড়া বিচিত্র বর্ণের জড়ােয়া কাচের চুড়ি বাহির করিয়া বলিল—“মা, হা দ্যাহ, তােমার জন্যি মুই জুবিলি চুড়ি আন্যাছি!” চুড়িওয়ালা হাসিমুখ তুলিয়া চুড়ি জোড়া কিশােরী বধূর হাতে দিতে গিয়া দেখিল, কিশােরীর হাতে কোনো গহনা নাই! তাহার লাল হাত হইতে তাহার অত সখের ১৩৫

সদানন্দের বৈরাগ্য
;
লাল চুড়ি সে ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে ; সিথি হইতে সিদুর
মুছিয়া ফেলিয়াছে ; মাথার উপর কস্তা-পেড়ে শাড়ীর
চৌড়া লাল পাড় আর হাসিতেছে না; পায়ে লাল আলত।
নাই; ঠোঁটে লাল পান নাই ; নাকে নােলক নাই; কানে
সে সুন্দর দুল নাই ; মুখে সে ভুবন-ভুলানাে হাসিটুকুও নাই।
একখানি শুভ্র থান তাহার যুথির মতাে শুভ্র সুন্দর স্নান
মূর্তিখানি কুষ্ঠিতভাবে জড়াইয়া যেন মূচ্ছিত হইয়া আছে ।
এই মূর্তিমতী শােকের মূর্তি দেখিয়া চুড়িওয়ালা চুড়ি-জোড়া
আছড়াইয়া মাটিতে ফেলিয়া দিয়া সেই চূর্ণিত চুড়ির মতােই
ভাঙা বুকের মধ্য হইতে ডুকরিয়া কঁদিয়া উঠিয়া দুই
হাতে চোখ চাপিয়া ধরিয়া বলিয়া উঠিল—“মা রে, এ মুই
কী দ্যাখলাম ! অ্যার আগে মুই মলাম না ক্যান!”
কিশােরী মাথা নত করিয়া ধীরে ধীরে সেখান হইতে
সরিয়া চলিয়া গেল, তাহার শাশুড়ী চোখ মুছিতে মুছিতে
ঘরে চলিয়া গেলেন। আর বুক-ভাঙা বুড়া চুড়িওয়ালা
দুর্বল কম্পিত হস্তে পসরা মাথায় তুলিয়া আস্তে আস্তে
বাড়ীর বাহির হইয়া গেল।

পিঞ্জরের বাহিরে
ভাই ললিতা,
অনেক দিন তােমার কোনাে খবর পাই নি ; আমিও
তােমায় চিঠি লিখিতে পারিনি। আমার জীবনের ওপর
দিয়ে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে ; আমি অনেক রকম
নৃতন অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। সেই-সমস্ত খবর তােমায়
ছাড়া আর কাকেই বা বলি? তাই তােমায় সব কথা খুলে
বলবার জন্যে মনটা আমার ব্যাকুল হয়েছে।
আমার বাবার মৃত্যু হয়েছে। এখন আমার মা, আর
ছােট ভাই-বােন দুটির অভিভাবক আমিই। এখন বুঝতে
পারছি মেয়েমানুষ বাস্তবিকই অবলা। কবিরা তাদের
লতার সঙ্গে তুলনা করে-সদাই দুৰ্বল, পর-নির্ভর; একটু
তাত লাগলেই আমলে নেতিয়ে পড়ে, একটু আঁচ লাগলেই
মুষড়ে যায়; একটু ধাক্কা খেলেই ধূলায় লুষ্ঠিত হবার
আশঙ্কা। আমি তাদের নদীর স্রোতের সঙ্গে তুলনা করি-
১৭

সদানন্দের বৈরাগ্য
তটের বন্ধনের মধ্যে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই তার গতি
শােভন সুন্দর ; ততক্ষণই প্রাণের ও প্রাচুর্যের, আনন্দের
ও সৌন্দর্য্যের হাস্যধারা; ততক্ষণই তার সম্মুখে অনন্তের
সঙ্গে মিলনের সম্ভাবনা; কিন্তু যেই সে কুল ছাড়িয়ে উপচে
ছড়িয়ে পড়ে , অমনি সে নিজেকে ত হারায়ই, পরকেও
ডােরায়,-চারিদিককার আনন্দ, সৌন্দৰ্য্য, প্রাণের খেলা
নষ্ট ভ্রষ্ট করে ফেলে। এমনই অক্ষমতা নিয়ে আমরা
জন্মেছি, বিশেষ ত এই বাংলা দেশে। আমার মতন এমন
একজন অক্ষমার ঘাড়ে একটি অসহায় সংসারের ভার
ভগবান চাপিয়ে দিয়েছেন। আমাকে সংসারের সঙ্গে সংগ্রাম
করতে হবে, পরের উপর নির্ভরের আশা ছেড়ে পরের ভর
সইতে হবে !
অম্নের সন্ধানে আমাকে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরুতে
হয়েছে। কিন্তু কোথায় অন্ন, কেমন করে সংগ্রহ করতে
হয়, আমি কি ছাই জানি ? আমরা অন্নপূর্ণা ততক্ষণই
যতক্ষণ পুরুষেরা অন্নে ভাণ্ডার পূর্ণ করে রাখে। আমরা
চিরকাল পিঞ্জরের ভিতর বন্ধ থাকি, যারা আমাদের পােযে
তারা তাদের খেয়াল-মত যখন খুসি একটু ছাতু ছােলা
১৩

সদানন্দের বৈরাগ্য
দুধ জল দিয়ে যায়, আর আমরা দিব্য নিশ্চিন্ত হয়ে মধ্যে
মধ্যে শিশ দিয়ে গান করি আর গানের সমের ঘরে চুমকুড়ি
দি। পিঞ্জরের ভিতর বন্ধু থেকে প্রাণটা যে হাঁপিয়ে না
ওঠে এমন নয় ; শিকের ফাকে ফাকে মুক্ত আকাশের নীল
চোখের ইসারা আর তরুপল্লবের হাতছানি দেখে মনটা
খুবই উড়ু উড়ু করে। কিন্তু কোনাে দিন খাঁচার দরজা
খােলা পেলেও উড়তে সাহস হয় না, বুক দুরদুর করে,
পাখা যেন অবশ হয়ে আসে। যিনি আমাদের খাচার
মালিক, তিনি যদি কোনাে দিন দয়া করে খাঁচার দরজা
খুলে ধরে’ উড়ে যেতে বলেন তখন মালিকের উদ্দেশ্য
সম্বন্ধেও সন্দেহ হয়। ভয় হয় অত বড় ফাকা জায়গায়
আমি এতটুকু ভীরু প্রাণী কোথায় পাব একটু আশ্রয়,
আর কোথায় পাব ক্ষুধার অন্ন তৃষ্ণার জল। অপরিচয়ে
সােজা পথটাকেও বাঁকা লাগে, নিরীহ জিনিষটাকে দেখেও
ভয় লাগে, স্বাভাবিক ঘটনাকে বিপদের সূচনা বলে আশঙ্কা
হয়। তাই যদি কোনাে দিন আমাদের মালিকের অভাব
হয়, অমনি আমরা পিজরের ভিতর বসে বসে ঠায় শুকিয়ে,
মরি, বাইরে বেরিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করতেও পারিনে।
১৩৯

সদানন্দের বৈরাগ্য
আমি ভাই, অসাধ্যসাধন করে ফেলেছি, বাইরে
বেরিয়ে পড়েছি।
বাইরে বেরিয়েই আমার সব চেয়ে বেশী ভয় লেগেছিল
ঐ পুরুষগুলােকে দেখে। নিঃসম্পর্ক পুরুষের সঙ্গে ত
আমাদের মােটেই পরিচয় নেই। বাপ-খুড়ােদের কোলেই
আমরা জন্মাই, আর ভাই-ভাইপােদের আমরা কোলেই
পাই ; তাদের সঙ্গে পরিচয় আমাদের পাতাতে হয় না।
পরিচয় পাতাতে হয় যে-একটি অচেনা লােকের সঙ্গে,
তাকে দেখে প্রথম-প্রথম ভয় লাগলেও সে একলা বলে
সাহস থাকে। কিন্তু একেবারে পুরুষের হাটের মধ্যে
ছেড়ে দিলে আমাদের দশাটা হয় সিংহের খাঁচার মধ্যে
রােমান গ্লাডিয়েটরের মতন—যত বড়ই বীর আর সাহসী
তােক, মৃত্যু তার অনিবাৰ্য, পরাভব তার জানা কথা।
আমার ভারি আশ্চর্য লাগে যে সেকালের রাজকন্যারা
কেমন করে স্বয়ম্বর-সভায় নিজেদের বর বাছাই করতে
যেত ! ভ্যাবাচ্যাকা লেগে যেত না? দাড়ি আর চৌগোপ্পা
চুমরে চারিদিকে আমিষ-লােলুপ মার্জারের মতন
অতগুলো পুরুষ প্যাটপ্যাট করে চেয়ে রয়েছে, তার মধ্যে
১৪০

সদানন্দের বৈরাগ্য
দাড়িয়ে বাছাই করব কাকে? ভয়ে লজ্জায় সেদিকে ।
তাকাতেই ত পারা যাবে না! অথচ তারা প্রত্যেকে লােলুপ
হয়ে আমার দিকে তাকিয়েই আছে! আমার ত মনে
করতেই গা শিউরে ওঠে! সত্যি ভাই, পুরুষগুলাে কি
বিচ্ছিরি করেই যে তাকায়!
আমি শেয়ালদা ষ্টেশনে টিকিট বিক্রী করবার একটা
চাকরী পেয়েছি। সামান্য মাইনে। রােজ ত আর গাড়ী
করে আপিসে যেতে পারিনে, কাজেই ট্রামে করে আপিসে
যেতে হয়। যেদিন ভাই প্রথম ট্রামে করে আপিসে যাব
বলে বেরুলুম, সেদিন মনের অবস্থা যে কি হয়েছিল তা
অন্তর্যামীই জানেন। ফাশীকাঠে চড়বার সময় মানুষের মন
বােধ হয় এমনি করে।—পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল, ঠোট
শুকিয়ে উঠছিল, মুখ অকারণ লজ্জায় কেমন ক্ষণে ক্ষণে
লাল হয়ে পড়ছিল, বুক দুরদুর করছিল। আমি জোর
করে’ ত নিজেকে এক রকম টেনে নিয়ে গিয়ে ট্রাম থামবার
থামের কাছে ফুটপাথের ধারে রাস্তার দিকে মুখ করে’
দাড়ালুম।
পথিক পুরুষদের মধ্যে অমনি একটা চঞ্চলতার ঢেউ
১৪১

সদাননের বৈরাগ্য
জেগে উঠল। ভাগ্যিস ভগবান মাথার পেছন দিকে চোখ
দেননি। সামনে পেছনে পুরুষদের বাঁদরামি লক্ষ্য করতে
হলে একেবারে ক্ষেপে উঠতে হত। একদিকে যে অনেক
খানি অদেখা থেকে যায় সেটা মস্ত বাঁচোয়া!
ট্রামে উঠেও কি ছাই নিস্তার আছে? আমি ট্রামের
পাদানে উঠবামাত্রই, টামযাত্রী পুরুষগুলাে অমনি উদ্গ্রীব
হয়ে ওঠে, আমি কোন্ কামরায় না-জানি ঢুকি।
পুরুষগুলাে ভাই এমনই হাস্যকর জীব যে তাদের দেখে
আমাদের গাম্ভীর্য্য রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে ওঠে; তার ওপর
আবার ওরা নানা রকম ভঙ্গী করে লােক হাসায় যে কেন
তা বলতে পারিনে।
প্রথম নজরেই তাদের বিকট মূর্তির বিচিত্র রূপ ভারি
কৌতুককর মনে হয়। কারাে মুখে গোঁপদাড়ির নিবিড়
জঙ্গল, তার ভেতর চোখ দুটো বনবিড়ালের মতো ও
পেতে বসে থাকে। কারাে দাড়ি কামানাে, শুধু গোঁপ
জোড়া একজোড়া ঝাটার মতাে মুখের দরজার মােটা কপাট
জোড়ার ওপর ঝােলানাে রয়েছে, যেন কুনজর না লাগে।
কেউ বা দাড়িগোপ সমস্ত চেঁছেছুলে নিৰ্ম্মল করে’
১৪২

সদানন্দের বৈরাগ্য
!
আমাদের মুখের অনুকরণ করতে চায় কিন্তু ও চাষাড়ে
চেহারা শুধু দাড়িগোঁপ কামালেই বা মােলায়েম হবে কেন?
কাউকে কাউকে মন্দ দেখায় না বটে, কিন্তু অধিকাংশকেই
মাকুন্দ মতন বিশ্রী লাগে। কারুর বা দাড়িগোঁপ দুই
ছাটিয়া মাফিকসই করিয়া রাখা-তাদের তত মন্দ লাগে
। পুরুষ বেচারারা দাড়িগোঁপগুলো নিয়ে যেন মহা
গণ্ডগােলে পড়ে গেছে, ঠিক করেই উঠতে পারছে না
জঙ্গলমহাল রাখবে, ছাঁটবে, না কাটবে।
তারপরে মাথার টেড়িরই বা কত রকম রূপ ! তােলা,
লতানাে, ঢেউখেলানাে, কেঁকড়ানাে ; সিথি মাঝে, ডাহিন
দিকে, বা দিকে ; কারুর সারা মাথায় টাক, সামনের দুটি-
বানি পাতলা চুলেই টাক ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টায় টেড়ির
ক্ষীণ আভাস দেখা যায় ; কাহারাে মাথায় সামনে টেড়ি,
পশ্চাতে টিকি। এই দৃশ্যটি দেখে আমার এমন হাসি
পেয়েছিল যে অসভ্যগুলাের মধ্যে আমিও আর একটু হলে
অসভ্য হয়ে পড়তুম।
পােষাকেরই বা কত রকম বিচিত্রতা। ওরা এখনাে
ঠিক করতেই পারেনি কেমন সজ্জ। ওদের ঠিক মানায়।
!
১৪৩

সদাননের বৈরাগ্য কারাে পূরাে দস্তুর সাহেবী সজ্জা—কিন্তু পাজামাটা হয়ত সরুতে, কোটটা ঢলঢলে, টাইটা বাঁকা, কলারটা শার্ট ছেড়ে ঠেলে উঠে পড়েছে, হাটটা কতককেলে পুরােণাে ময়লা তবু সাহেব সাজতে হবে ! কারাে ধুতির ওপর চাপকান, তার ওপর চাদর, মাথায় কিছু নেই; কারাে গায়ে কোট, কারাে শার্ট, কারাে পিরান। কারাে জামা ঘামে তেলে একেবারে জরে উঠেছে, দুর্গন্ধে পাশের লােককে অতিষ্ঠ করে তুলছে, ছেড়ে ধুতে দেবার তাড়া নেই; কারাে জামায় কাপড়ে পানের পিক ছিটিয়ে পড়েছে, কানে গোঁজা দত- খােটা খড়কের মুখে চিবানাে পানের কুচি আর ছােপ লেগে আছে। ওরই মধ্যে দুএকজনকে বেশ ভদ্রলােকের মতন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, দেখা যায়। কিন্তু তাদেরও দুটি শ্ৰেণী আছে—এক একেবারে ফুলবাবু, আতিশয্যে উগ্র ; অপর শ্রেণী সাদাসিধে, বেশ শান্তদর্শন। ট্রামে যখন উঠি তখন একটু সরে বসে আমায় একটু জায়গা দেওয়া যে দরকার, এ বােধটাও পুরুষ বৰ্ব্বরদের থাকে না, সবাই হাঁ করে দৃষ্টি দিয়ে যেন আমায় গিলতে থাকে ; আমি যেন সদ্য চন্দ্রলােক থেকে নেমে এসেছি । ১৪৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
ওদের চোদ্দ পুরুষে কখন যেন মেয়ের মুখ দেখেনি।
পুরুষ গুলাের তখনকার সেই গদগদ আত্মবিস্মৃত চঞ্চল
ভাব দেখলে আমার সেকালের স্বয়ম্বর-সভার একটি
পরিষ্কার ছবি মনের সামনে ফুটে উঠে। কালিদাস ইন্দু-
মতীর স্বয়ম্বর-সভার বর্ণনায় একটুও যে অত্যুক্তি করেন নি,
তা আমি এখন বেশ ভালাে করেই বুঝতে পারছি।
লােকগুলােকে ঠেলেঠুলে জায়গা করে যদি বসা গেন্স
তবেই যে নিষ্কৃতি পাওয়া গেল তা নয়; পরে যারা ট্রামে
চড়তে আসে তাদের মধ্যেও নানা রকম মনস্তত্ত্বের খেলা।
দেখিতে পাওয়া যায়। কেউবা যে কামরায় আমি থাকি
ঠিক সেই ভরা কামরাতেই ভিড় বাড়াতে আসে, অন্য
কামরা খালি থাকলেও সেদিকে যেতে চায় না ; কেউবা
সামনের কামরায় উঠে এমন জায়গা বেছে নেয় যেন ঠিক
আমার সামনাসামনি মুখখামুখী হয়ে বসতে পারে ; কেউবা
ঠিক পিছনের কামরায় উঠে ঠিক আমার পিঠের কাছে
বসে নানান ভঙ্গিতে হেলান দেবার দুশ্চেষ্টা করিতে
থাকে ; কেউবা গাড়ীতে উঠেই এমন একটা অতিসম্রমের
তটস্থ ভাব দেখিয়ে ছিটকে তফাতে গিয়ে ঘাড় গুজে বসে,
১৫

সদানন্দের বৈরাগ্য
যেন স্ত্রীজাতিটার প্রতি তারা এমন অতিসম্রমশীল যে
প্রায় উদাসীন বললেও হয়—যেন এক-একটি শ্ৰীচৈতন্যের
অবতার! তাদের সেই অশােভন ব্যবহার দেখে আমার
হাস্যসংবরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। অতি ব্যাপারটাই
যে খারাপ ! যারা অসম্ভম প্রকাশ করে তারা যেমন
পুৰুযচরিত্রের বর্বরতার একটা দিক, অতিসম্রমশীলেরা
তেমনি ভণ্ডামির আর-একটা দিক প্রকাশ করে
মাত্র! কদাচিৎ দু-একজনকে দেখতে পাওয়া যায় যারা
নারীকে দেখতে যে তাদের ভালো লাগে, নারীর সঙ্গ
যে তাদের মধুময় লাগে, তা লুকোতেও চেষ্টা করে
, অথচ কদৰ্য্য অশােভন ভাবে প্রকাশও করে না,
তারা নারীকে ভালােও বাসে, সন্ত্রমও করে।
পুরুষের কথা পরে বলব, সে লােকটিকে আমার লেগেছে
ভালাে। ভালাে লেগেছে শুনে তুমি হাসছ বােধ হয়? কিন্তু
ভালাে লাগা ভালােবাসা নয়, এটা আমি আগে থাকতেই
তােমায় বলে রাখছি।
ট্রামে চড়বার সময় যেমন, নামবার বেলাও তেমনি
আমাদের দেখে পুরুষদের অশেষ রকম লীলা-চতুরতা
এমন একটি
১৪৬

সদানন্দের বৈরাগ্য প্রকাশ পায়। কেউবা আমার কাছ দিয়ে যাবার সময় আমার পায়ের উপর দিয়ে কেঁচার ফুলটি বুলিয়ে চরণ- ধূলির নিছনি নিয়ে যায় । আমি যখন নামি তখনও ওদের নানারকম লীলা লক্ষ্য করি। আমি নেমে গেলে সকল জানলা থেকেই মুখ ঝুকে পড়ে, দেখতে চায় আমি কোন্ পথে কোথায় যাই—আমার চারিদিকে যেন একটা মস্ত রহস্য জড়িয়ে আছে, সকলেরই চেষ্টা উকি মেরে সেই লুকানাে কাহিনীটা জেনে নেবে। পুরুষগুলো যে অমন তার জন্যে প্রকৃতিই দায়ী। প্রকৃতিদত্ত প্রবৃত্তিগুলােকে প্রকৃতিস্থ করতে পারেনি বলে বেচারাদের ওপর করুণা হয়, রাগ করা চলে না। বিশেষত আমাদের দেশের পুরুষদের ওপর। বেচারীরা অপরের বাড়ীর স্ত্রীলােকদের মুখ ত কখনাে দেখতে পায়ই না, নিজের স্ত্রীরও যে খুব বেশী পায় তাও ত মনে হয় না। দুষ্প্রাপ্য জিনিসের প্রতি লােলুপতা ত স্বাভাবিক। পুরুষ যে নারীর প্রতি অতিমাত্রায় অনুরাগী ও মনােযােগী এতে নারীরা মুখে পুরুষের ওপর যতই চটুন, মনে মনে কিন্তু বেশ সন্তুষ্টই হন; কারণ তারা যে বন্দিতা, ১৪৭

সদানন্দের বৈরাগ্য
আরাধিতা, এ কথা জালে খুসি হওয়া স্বাভাবিক। আমি
যে খুসি হই তা আমি স্পষ্টই স্বীকার করছি। পুরুষের।
যে আমাদের অতটা শ্রদ্ধা সন্ত্রম দেখায় তার আর-একটা
কারণ আমার মনে হয় যে, তারা প্রবল আমরা দুৰ্বল,
তার আশ্রয় আমরা আশ্রিতা ; সংসারের সঙ্গে পদে পদে
বােঝাপড়া করে আপােষ-মীমাংসা করে চলতে হয় বলে
তাদের একটা সহগুণ আর ভদ্রতা চরিত্রগত হয়ে গেছে
বলেও কতকটা। একটা আমরা বিশেষ ভাবে অনুভব
করি যখন আর-একজন অপরিচিত স্ত্রীলােকের সঙ্গে
আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সে আমাকে গ্রাহও করে না।
কিন্তু সে যদি পুরুষ হত তা হলে আমাকে দেখতে পেয়েই
সে কৃতার্থ হয়ে যেত। পুরুষের এই ভদ্রতা যে শুধু
আমাদেরই বেলায়, তা নয় ; সে স্বজাতির প্রতিও যথেষ্ট
খাতির দেখিয়ে চলে। যেখানে অনেক অপরিচিত মেয়ে
একত্র হয়, সেখানে একটু গায়ে গা ঠেকলে কি কাপড়
মাড়িয়ে ফেললে আর রক্ষা থাকে না; যার ক্রটি সেও
ক্ষমা চাইতে জানে না, যার অসুবিধা ঘটেছে সেও ক্ষম।
করতে পারে না; অতি তুচ্ছ কারণে কোন্দল বাধিয়ে
১৪৮

সদানন্দের বৈরাগ্য
কলরব করতে লেগে যায়। কিন্তু ট্রামে আকসারই দেখি,
একজন পুরুষ হয়ত অপরের পা মাড়িয়ে ফেললে, কিংবা
অপরের গায়ে টলে পড়ল, তাতে সে ব্যক্তি শুধু একটি
নীরব নমস্কার করলেই সকল গােল মিটে যায়। এক
বাড়ীতে দুজন রক্তসম্পর্কে পরমাত্মীয় স্ত্রীলােক থাকলে
ঝগড়ার চোটে চালে কাগ চিল বসতে পারে না; কিন্তু
এক-মেস নিঃসম্পর্ক পুরুষ দিব্য বনিবনাও করে’ মানিয়ে
সমূলে থাকে দেখা যায়। এত যে তারা ভালাে মানুষ,
পরস্পরের সঙ্গে ভাব করে থাকে, 'সান একটি মেয়ে--
লাক Prডাল আর খ. কার ? •—ভাই
সঙ্গে সব বার। পারে না। বাস্তবিক মন
তাৰ ঘৰ ভা' সৃীলাক যত
পুরুষ
সে বিষয়ে রমণীর কুখ্য, এবা'ে জ’ জোড।
নেক সুনা? ক দেখেই ", পুরুষকে ধে
খুব খাতির ক’ চলে তাও নয়। যতটুকু দয়া দে সেন
Te='কে একটি বাচ্ছীল্যর দান। এতে
আমাদের
* ৫~-পুরুষগুলো আমাদের কাছে
১৪৯

সদানন্দের বৈরাগ্য
চিরকালই ভিখারীর মতন অবনত হয়েই ওঙে থাকে—
কিন্তু গৌরর নেই।
তারা অতৃপ্ত বলেই আমাদের কথা, আমাদের চিন্তা
তাদের জীবনের সম্বল ; আমাদের একটু দেখতে পাওয়া,
একটু মিষ্টি কথা শােনা; তাদের পরম লাভ বলে মনে
হয়। দুজন আলাপী পুরুষ এক সঙ্গে মিলেছে কি অমনি
আমাদেরই কথা। মানুষ মাত্রেরই জীবনের কতকট।
অংশ যে গােপন রাখা দরকার, এই সামান্য বুদ্ধিটুকুও ঐ
গোয়ারগােবিন্দগুলাের ঘটে নেই। রবিবাবু যে তার
স্বজাতির জবানীতে স্বীকার করেছেন যে
“আমরা মুখ কহিতে জানিনে কথা,
কি কথা বলিতে কি কথা বলিয়া ফেলি!”
সেটা কবির অত্যুক্তি একটুও নয়, একেবারে খাঁটি
স্বরূপপাক্তি। ওদের ব্যবহার দেখে লজ্জা যেন লজ্জা পেগ্নে
বিদায় নিয়েছে । কিন্তু আমি লজ্জায় মারা যাই। ওরা যদি
কোথাও বেশ সহজ হতে পেরেছে ! ওরা রেল-ষ্টেসনে
টিকিট নেবার ঘুলঘুলি দিয়ে এমন হা করে তাকিয়ে থাকে
যে, ট্রেন ছেড়ে যাবে, কি কেউ পকেট কাটবে, তার

সদানন্দের বৈরাগ্য
খেয়ালই থাকে না। অনেক বাবুকে দেখি আমার হাত
থেকে টিকিট কিনে নােট-ভাঙানি টাকা পয়সা ফেরত
নিতে ভুলে যান। মূর্খগুলাে জানে না যে ওতে ওদের
আমরা ঘৃণাই করি।
পুরুষদের আর একটি ভারি মজা দেখি যে তার
আমাদের কোনাে একটু তুচ্ছ কাজ করে দিতে পেলে যেন
বৰ্ত্তে যায়। আমার সঙ্গে যদি কোনাে দিন কিছু জিনিষ
পত্তর থাকে, তা হলে আমি নামবার সময় অন্তত চতুভুজ
উদ্যত হয়ে ওঠে; তার মধ্যে যে ভাগ্যবান আমার সেবা
করবার অধিকার পায় তার তখনকার কৃতার্থ মুখের ভাব,
আর অন্য সকলের তার দিকে সপ্রশংস অথচ ঈর্ষা-আকুল
চাওয়া বাস্তবিক দেখবার জিনিষ ।
এমনি করে একটি লােক তার সহযাত্রীদের ভারি
ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছে।
এই ঈর্ষাটা পুরুষচরিত্রের ভারি একটা চিরন্তন দিক।
পশুজগৎ থেকে আরম্ভ করে’ মনুষ্য-জগৎ পৰ্য্যন্ত সর্বত্র
দেখতে পাওয়া যায় যে রমণীর করুণ। যে পায় তার সঙ্গে,
ব্যর্থ যারা তারা সকলে এককাট্‌ঠা হয়ে লাগে। কিন্তু গোঁয়ার

সদানন্দের বৈরাগ্য
গােবিন্দগুলাে বােঝে না যে একজন ছাড়া আর সকলের
নিরাশ ত হতেই হবে; যে ভালােবাসা পেয়েছে সে না
পেয়ে আর-একজন পেলেও সেই একজনেরই লাভ। ইন্দু
মতীর স্বয়ম্বরে অজ বেচারাকে ইন্দুমতীর ভালাে লেগেছিল
বলে’ সমস্ত রাজাগুলাে একেবারে ক্ষেপে মারমুখখা হয়ে
উঠল ! কেন রে বাপু? বেচারার অপরাধ? সে যদি
শ্রীকৃষ্ণের মতন রুক্মিণী-হরণ বা অৰ্জ্জুনের মতন সুভদ্রা-
হরণ করত তাহলে না হয় ওরা বলতে পারত যে অজ
অন্যায় করেছে, ইন্দুমতীকে পছন্দ করবার সুযােগ দিলে
, হয়ত তার শ্রীহস্তের বরমাল্য তাদের কারাে গলায়
পড়তে পারত। কিন্তু ইন্দুমতী ত তাদের সে ক্ষোভটুকু
করবারও অবসর রাখেনি।
আহাম্মকেরা এটুকুও বুঝতে পারে না যে যাকে তার
প্রার্থিত রণীর সম্ভাব্য ভালােবাসা থেকে দূরে রাখতে যায়,
তাকে নির্যাতিত দেখে সেই রমণীর অসম্ভব ভালােবাসাও
করুণায় যে সম্ভব হয়ে আসে। তাকে দূর করতে গিয়েই
তাকে আরাে নিকট করে তােলে।
এমনি করেই ওরা ভাই, দশচক্রে আমায় একজনের
১৫২

সদানন্দের বৈরাগ্য অনুরক্ত করে তুলেছ। এই অনুরাগট। বিপন্ন আশ্রিতের প্রতি করুণা ছাড়া আর কিছু নয় ; ভালােবাসা মনে করলে ভুল করবে। এ আমার ট্রামের সহযাত্রী। প্রায় রােজই ট্রামে দেখা হয়। হঠাৎ একদিন দুজনে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠবার কারণ ঘটে ‘গয়েছিল। একদিন আমার আপিস যেতে বড় বেলা হয়েছিল। যখন ট্রাম ধরতে গেলাম তখন আপিসে যাবার ঠিক মুখখামুখী সময়। ট্রামগুলাে একেবারে লােকে লােকারণ্য। লােকগুলাে পাদানের ওপর দাঁড়িয়ে ঝুলতে ঝুলিতে চলেছে। অমন গাছে ঝােলা অভ্যাস ত আমাদের নেই; পুরুয গুলে পূৰ্ব্ব রুষের যে নিকট প্রতি গোপ- দাড়ি " জা ন্যমাঃ এমাণ. অ' । দিন এসেছি , অরা প ন গ + র + : না, পরাগ ও লজ্জা নামক মনুষ্য স্মটা আমাদের গুর মা এতেই ছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একখানা ট্রামে কেউ ঝুলছে না দেখে একটা কামরায় উঠে পড়লাম। একটিও যায়গা খালি নেই। মনে করলাম, পুরুষগুলাে রমণীর সেবা করবার কাঙাল, এখনি কেউ-না-কেউ উঠে সদাননের বৈরাগ্য আমায় জায়গা করে’ দেবে। কিন্তু একটাও একটু নড়ল না ! কেউ উঠল না দেখে যখন আমি ভয়ানক অপ্রস্তুত হয়ে কি করব ঠিক করতে পারছিনে, তখন দু কামরা দূর থেকে একটি তরুণ যুবক দাড়িয়ে উঠে চেঁচিয়ে বলে—আপনি এইখানে আসুন, আমি উঠে দাঁড়াচ্ছি। তার কথায় আমার যে কি আরাম হল তা আর বলতে পারিনে। আমি যেন এক-খাচা বুনাে ভালুকের কবল থেকে অব্যাহতি পেয়ে বেঁচে গেলাম ! ট্রামের ঘণ্টা বাজিয়ে ট্রাম থামিয়ে সে আমাকে নিজের জায়গাটিতে নিয়ে গিয়ে বসালে এবং নিজে গাড়ীর পিছনে গিয়ে দাড়াল। তার মুখ তখন একগাড়ী লােকের ওপর জয়ের আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠেছে। আর বাকি লােক- গুলােও তার দিকে এমন করে তাকাতে লাগল যেন বলতে চাচ্ছে—এ ! বডড জিতে গেল !—এ জিত ত তারাও জিততে পারত। কিন্তু যারা থাকে সুযােগের টিকি ধরবার জন্যে, তাদের সুযােগ ফস্কেই যায় ; যে বুদ্ধিমান, সে সুযােগের সামনের ঝুটি ধরেই সুযােগকে কাবু করে ফেলে । ১৫৪

সদানন্দের বৈরাগ্য
এ দেশটা কেবলই পেছু ফিরে তাকিয়ে তাকিয়ে টিকির
মমতা করেই গেল !
এখন আমি টীমে উঠবার সময় একবার সব কামরায়
উকি মেরে দেখি সে আছে কি না। যদি তাকে দেখতে
পাই তাহলে সে যে কামরায় থাকে সেই কামরায় গিয়ে
উঠি, আর কেউ যায়গা না দিলেও সে আমায় জায়গা ছেড়ে
দেবে, মাত্র এই আশায়। আমি যে রােজ তারই কামরা
বেছে উঠি, এটা সে বােধ হয় বুঝতে পেরেছে ; আমি
উঠবামাত্রই সে একমুখ হাসি নিয়ে ধী ও শ্ৰীর জ্যোতিতে
ভরা চোখ দুটি আরতির যুগল প্রদীপের মত আমার দিকে
একবার তুলে ধরে, পরক্ষণেই নিজের হাতের বইখানির
উপর নামিয়ে রাখে। এইখানে আসল পুরুষের পরিচয়
পেয়ে আমিও আমার দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা সাজিয়ে ধরি ।
ওদের একটি দল আছে ভারি মজার। ওরা জগৎ
সংসারের কাউকে রেয়াৎ করে ছেড়ে কথা কয় না—
সকলেরই নিরিখ কষতে ব্যস্ত। এরা বােধ হয় সাহিত্যিক,
কারণ সাহিত্যের আলােচনাই বেশী শুনি। এদের একজন
নাকি কবি। তার দুনিয়ার দুচার জন লােক ছাড়া আর

সদানন্দের বৈরাগ্য কারো লেখা বড় একটা ভাল লাগে না—সে এমনি খৎ- যুতে আর একগুঁয়ে যে, যা গোঁ ধরে তা ওর বন্ধুরা শত যুক্তি তর্কেও টলাতে পারে না। এরা দেখি সবাই স্ত্রী-স্বাধীনতার পক্ষপাতী, কিন্তু কবিটির মত ভারি অদ্ভুত ধরণের ; উনি বলেন বাইরে বেরুবে শুধু সুন্দরী তন্বীরা ; মােটা, কালাে, কুৎসিত যারা তাদের অবরােধে বন্ধ থাকাই উচিত। একথা শুনে আমার মিল্টনের কোমাসের যুক্তি মনে পড়ল, -Beauty is nature's brag, প্রকৃতির গর্বের ধন সৌন্দৰ্য্য, যাদের তা আছে তারা লুকিয়ে থাকবে না; ঘােমটায় মুখ ঢাকবে যারা কুংসিত। কিন্তু যিনি একথা বলেন, তিনি যে খুব সুপুরুষ তা ত মনে হয় না। মানলাম না হয় উনি কবি, সৌন্দর্য্যের উপাসক। কিন্তু সৌন্দর্য্য কি শুধু চোখেই ধরবার জিনিস? রমণী কি শুধু ফুলের মতােই রমণীয় না হলে সুন্দর বলে স্বীকৃত হবে না? ইংরেজীতে একটা কথা আছে—স্বাস্থ্যই সৌন্দর্য্য। রূপসী হলেও ত সুন্দরী হতে বাধে না। যাদের রং বা চেহারা দৈবগতিকে নয়নরঞ্জন হয়নি তাদের কি পৃথিবীটা দেখে জানবার শিখবার আনন্দ পাবার দরকার নেই? জগতের

সদানন্দের বৈরাগ্য
সংস্পর্শে সংঘর্ষে না এলে তারা মানুষ হবে কেমন করে'-
দেহ ও মনের স্বাস্থ্য বল সঞ্চয় করবে কোথা থেকে ?
আমার মনের প্রশ্নটাই যেন কেড়ে নিয়ে তার এক বন্ধু বলে
—“ৰে তােমার আমারও বাইরে বেরুনাে উচিত নয় ;
তুমি যেমন মেয়েদের বলছ, মেয়েরাও ত তেমনি বলতে
পারে—হেঁদলকুৎকুতে রকমের পুরুষদের মুখদর্শন আমরা
করব না।” কবির যুক্তি-“তা কেন? আমরা চিরকাল
বাইরে আছি, বাইরেই থাকব, বিশেষত আমাদের যখন
জীবিকা অর্জন করতে হয়। আহা কি আনে যুক্তি।
যদি রােজগারের কথাই বলেন, তা হলে আমাদের দেশের
কত মধ্যবিত্ত গরীব ঘরের মেয়ে উপবাসে থাকে, তাদের
কি বাঁচবার জন্যে বাইরে বেরুতে হবে না? তারা বাইরে
বেরুতে পারে না, সকল মেয়েই বাইরে বেরােয় না বলে,
বৰ্বর পুরুষগুলাের চোখে নারী জাতির স্বাধীনতা সয়ে
যায়নি বলে’! পুরুষদের ভালাে লাগে না বলে তারা খাচায়
বন্ধ থেকে অনাহারে মরে, তবু বেরােয় না। তারপর
অসহ্য হলে তারা যখন বেরােয় একেবারেই বেরােয় ! পথে
বাড়ীর মেয়েরা বেড়ালে আমাদের দেশের পুরুষপুঙ্গদের

সদানন্দের বৈরাগ্য
মাথা হেঁট হয় ! কিন্তু তারা যখন অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে’
অবলাকে পথে বসান, তখন মাথাটা খুব উচু করেই চলতে
পারেন বােধ হয় ! বেহায়াদের এই-সব কথা অগ্রপশ্চাৎ
ভেবে বলতে একটুও লজ্জা করে না।
এই নিয়ে ওদের প্রায়ই খুব তর্ক বেধে যায়। আমার
বন্ধুটি-বন্ধু বলছি শুধু নাম জানিনে বলে, এটা
লােকটাকে বুঝাবার জন্যে একটা সংজ্ঞা বা চিহ্ন মাত্র, অন্য
কিছু ভেব না যেন!—বন্ধুটি একেবারে জ্বলে ক্ষেপে উঠে
খুব জোর দিয়ে বলে-“মেয়েরা যদি বাইরে না বেরােয় ত
মরুভূমিতে আর কতকাল চরা যাবে ?” সে যে আমাকে
শুনিয়েই কথাটা বলে তা আমি খুব বুঝি। আমি যেন
তার কাছে স্ত্রী-স্বাধীনতার অগ্রদূত। বন্ধুর কথা শুনে
তার বন্ধু একটি তরুণ সুকুমার যুবক একদিন বলে উঠল—
আমাদের লােককে বলবার কোনাে অধিকার নেই।
আমরা নিজেরা স্ত্রী-স্বাধীনতার জন্যে কিছু কি করছি ?”
আমার বন্ধু অমনি বলে উঠল—“আরে এখন করব কি ?
আগে স্ত্রী হােক তারপর ত স্বাধীনতা দেববা! বিয়ে হােক
আগে, তখন দেখবে আমাদের দৃষ্টান্তে পঁচিশ বছরের মধ্যে
১৫৮

সদানন্দের বৈরাগ্য পথঘাট সুন্দরীতে ছেয়ে যাবে !” বােঝা গেল বন্ধুর বিয়ে হয়নি। সুন্দর যুবাটি বলে উঠল-“আরে পঁচিশ বছর পরে যখন চোখে ছানি পড়ে যাবে তখন সুন্দরীতে পথ ছাইলেই বা আমাদের কি!” তখন ব্যাপারটাকে চট- পট আগিয়ে আবার পরামর্শ চলতে লাগল। সেই সুন্দর যুবাটি বল্লে-“এস এক কাজ করা যাক। রবিবাবুর ‘আমরা ও তােমরা’ গানটা গেয়ে নগরসঙ্কীৰ্ত্তনে বেরিয়ে পড়া বা ক ! সুন্দরীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে করুণ আর্তনাদ করে বলা যাক- ‘তােমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি, কোনাে সুলগনে হব নাকি কাছাকাছি। মেয়েদের একবার বিদ্রোহী করে তুলতে পারলে একদিনে সব অবরােধ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া যাবে !” বন্ধু বললে—“বিদ্রোহ করবে মেয়েরা? পুরুষদেরই বড় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আছে, তা আবার মেয়েদের।” পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের ছােট করে দেখার ভাবটা আমার ভালো লাগল না। এর জন্যে আমরাই অনেক খানি দায়ী। আমরা পুরুষের সমকক্ষ হতে কি চেষ্টা ১৫৯

সদানন্দের বৈরাগ্য
করেছি ? যা আমাদের হকৃ, তা আমরা দাবী করে আদায়
কবতে কি জানি? আমরা অবলা, পিঁজরের পাখী ।
আমাদের পরে যে-সমস্ত মেয়ে অবরােধের বাইরে
বেরিয়ে স্বাধীন হবে, তাদের অবস্থাটা আমরা অনেক
সহজ ও নিষ্কণ্টক করে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কণ্টকবেধের
বেদনা আমাদের সর্বাঙ্গে দারুণ লজ্জার লালিমায় ফুটে
ফুটে উঠছে! অগ্রদূতের ভাগ্যই এই রকম, দুঃখ কর।
বৃথা।
আজ তবে আসি ভাই, পত্র বিরাট ও ডাকের সময়
নিকট হয়ে এল। ইতি
তােমার স্নেহাসক্ত লাবণ্য
ভাই লাবণ্য,
তাের মজার চিঠি পড়ে আমি এমন হেসেছি যে
তাের পিতৃবিয়ােগের দুঃখটা অনুভব করবার অবসরই
পাইনি। তুই পুরুষদের যে চিত্র একেছিস সেটা এমন
মজার হয়েছে যে পুরুষগুলােকে না পড়াতে পারলে আমার

সদানন্দের বৈরাগ্য
তৃপ্তি হচ্ছে না। মনে করছি চিঠিখানা নকল করে’
প্রবাসীতে পাঠিয়ে দেবাে-তোর বন্ধুর সাহিত্যিক দল
দুনিয়ার লােকের নিরিখ পরখ করে ফেরেন, তাদের
নিজেদেরও নিরিখটার পরখ হয়ে যাওয়া ভাল।
তুই অবলা মানুষ, পুরুষের ভিড়ে জীবন-সংগ্রামে
লিপ্ত হওয়া কি তােকে সাজে। এক কাজ কর না, তাের
বন্ধুর শরণাপন্ন হ না। তােরও ভালাে লেগেছে তাকে,
তারও ভালো লেগেছে তােকে ; তােদের বিয়েও এক
একটা করতে হবে ; তবে না হয় শুভ কাৰ্যটা তােরা
দুজনেই সেরে নিলি। একটু সাহস করে আলাপটা করে
ফ্যাল! বলে দিচ্ছি দেখে নি, তাের বন্ধু মােটেই গররাজী
হবে না। কথায় বলে না যে, ক্যাঙলা ভাত খাবি ?”
ক্যাঙলা বলে পাতা পাব কোথায়? তাের বন্ধু ত পাতা
পাতবার জন্যে প্রস্তুত হয়েই আছে, তুই একবার ভাত খাবে
কি না, জিজ্ঞাসা করলেই হয়। এই পত্রের উত্তরে সুখবর
শােনবার প্রত্যাশায় রইলুম। ইতি
তাের ললিতা।

সদাননের বৈরাগ্য ভাই ললিতা, তাের উপদেশ পাবার আগেই আমার বন্ধুর সঙ্গে এক- দিন দৈবগতিকে আলাপ হয়ে গেছে। কি ভাই বেহায়া লােক, ছি। একদিন আমি টিকিট-ঘরে বসে আমার সহকর্মী আর- একজন মেয়ের সঙ্গে গল্প করছি, এমন সময় ঘুলঘুলি দিয়ে হাত বাড়িয়ে একটি টাকা দুই আঙুলে ধরে’ কে একজন বলে উঠল—“আমায় একখানা দমদমার টিকিট দিন ত।” সেই স্বর শুনে চমকে উঠে যেমন সেই দিকে তাকিয়েছি অমনি দেখি ঘুলঘুলির ভিতর দিয়ে সে-ই উকি মেরে হাসছে। আমাকে ফিরতে দেখেই কিছুমাত্র সঙ্কোচ না করে অন্য দশজন লােকের সামনেই জিজ্ঞাসা করে বসল- “আপনি কি এখানে কাজ করেন ?” দেখেছ কি রকম দুষ্টবুদ্ধি ! কেবল ইচ্ছে করে আমাকে অপ্রস্তুতে ফেলা। দেখছ ত আমি টিকিট-ঘরে রয়েছি, সেখানে কাজ করতে ত কি নেমন্তন্ন খেতে গেছি ? এ যেন সেই রকম কাষ্ঠ লৌকিকতা—তেলমেখে ঘাটে আছে দেখেও লােকে

সদানন্দের বৈরাগ্য
জিজ্ঞাসা করবে, নাইতে এসেছ ? কিম্বা বাজারে মাছ
তরকারী কিনছে দেখেও জিজ্ঞাসা করবে, বাজার করতে
এসেছ? যদি সন্দেহ থাকে, হয় চশমা নেও গিয়ে, নয়
বুদ্ধি বাড়াবার জন্যে কবিরাজের ব্রাহ্মী ঘৃত খাও গিয়ে,
অমন বােকার মতাে প্রশ্ন করে’ লােক হাসিয়াে না।
যখন আমায় জিজ্ঞাসা করলে আপনি এখানে কাজ করেন ?”
তখন সত্যি ভাই, লজ্জায় আমার মাথাটা যেন কাটা
গেল। আমি এই সামান্য কাজ করি এ ত নিত্য হাজারাে
পুরুষ দেখে যাচ্ছে, কিন্তু ও দেখলে বলে আমার অমন
লজ্জা হল কেন কি জানি। আমি যে লেখাপড়া জানি,
গাইতে ও বাজাতেও পারি, জগৎব্যাপারের হাল নাগাদ
খোঁজ রাখি, তাকে এ কথা জানাবার অবসর ঘটল না ;
অবসর ঘট ল কিনা তার দেখে যাবার যে আমি ষ্টেশনে যত
রাজ্যের র্যাজলা লােককে টিকিট বেচি! আমি লজ্জায়
জড়সড় হয়ে মুখ লাল করে শুধু বলতে পারলাম “হ্যা।”
এই আমাদের প্রথম কথা কওয়া।
এর পর থেকে ভাই, ওর প্রায়ই দমদমায় যাওয়া দরকার
হয়ে উঠল। দমদমায় যাওয়া ত নয়, দমবাজি। টিকিট

সদানন্দের বৈরাগ্য নিতে এসে কত যে অনাবশ্যক প্রশ্ন করে তার আর ঠিক- ঠিকানা নেই। নাইনটিন ডাউন পেসেঞ্জার কোন প্লাটফরমে আসবে, সেভেন আপ, ক’টার সময় ছাড়বে—ব্যারাক- পুরের রিটার্ন টিকিটের দাম কত, উঈক-এণ্ড টিকিটে মঙ্গলবারে ফেরা যায় কি না—এমনি সব অকেজো প্রশ্ন। এমন গুছিয়ে প্রশ্নটি করে যে এক কথায় উত্তর দেওয়া যায় , আমায় বকিয়ে বকিয়ে মারে। কিন্তু কি যে বলছি তাই কি ছাই মন দিয়ে শশানে? হাঁ করে আমার মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে। লােকে যে লক্ষ্য করচে সেদিকে ভ্রক্ষেপও নেই। কি বেহায়া লােক ভাই। ! পূজোর ছুটি হয়ে গেছে। আপিস আদালত বন্ধু। কলকাতা ভোঁ-ভো! সবাই ছুটি উপভােগ করছে, আমার কিন্তু নিত্য হাজরি দিতে যেতে হয়। সে লােকটির সঙ্গে আর দেখা হয় না—ট্রামেও না, দমদমাও যায় না। আপিস হয় বন্ধ, দমদমা ত বন্ধ নয়, মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতে কে মানা করে? পুরুষ মানুষ কিনা, বাইরে বেড়িয়ে বেড়িয়ে এমন অরুচি হয়ে যায় যে ছুটি পেলেই ঘরের কোণ ১৬৪ সদানন্দের বৈরাগ্য আঁকড়ে পড়ে থাকে। আমরা হলে ছুটির দিনেই বেশী করে বেড়াতে যেতুম। সেদিন একে ছুটি, তায় রবিবার, তায় দুপুর বেলা। ট্রামে জনমানব নেই। কেবল এক কামরায় দেখি শ্যাম- সুন্দর বসে আছেন। আমাকে দেখেই এক গাল হেসে ফেললে। আচ্ছা, হাসলে কি বলে’ ভাই একজন অচেনা মেয়েকে দেখে ?-ওর হাসি দেখে আমিও হাসি সামলাতে পারলুম না। ভারি বদ লােক ও, অমন করে পথে ঘাটে মেয়ে মানুষকে হাসানাে কি উচিত? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সারা গাড়ীটা খালি থাকতেও উঠে পড়লুম ওরই কামরাটাতে। গাড়ীতে উঠে পড়ে আমার হুস হল। ভারি রাগ হল ঐ লােকটার ওপর। একবারটি আমায় বারণ করতে পারলে না! আমি না পারি তখন নামতে, আর না পারি বসতে। কটমট করে ওর দিকে চেয়ে দাড়িয়ে রইলুম, আর ও কিনা দিব্যি বসে বসে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। এমন সময় টামটা চলতে সুরু করলে, আমি হুমড়ি খেয়ে একেবারে পড়ে গেলুম ঐ লােকটার গায়ে ! ও অমনি খপ করে আমায় ধরে ফেললে।

সদাননের বৈরাগ্য
আমি তাড়াতাড়ি ওর সামনেই বসে পড়লুম। ও কিন্তু
তখনাে আমার হাত ছাড়েনি—হাত ধরেই জিজ্ঞাসা করলে
-“আপনার লাগেনি ত?” আমার রাগে গা জ্বলে গেল
আমার লাগুক না-লাগুক তাের অত মাথাব্যথা কেন ? আমি
সে কথার কোনাে উত্তর না দিয়ে বল্লুম, “আপনার গায়ে
পড়ে গেছি, মাপ করবেন।” বেহায়াটা বলে কিনা আমার
মুখের ওপর “এ সৌভাগ্যের জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।”
রাগের চোটে আমি একেবারে ভুলেই গেলুম যে আমার
একখানা হাত বৰ্বরটার দু হাতের মধ্যেই রয়ে গেছে। ওর
কি আমায় মনে করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল না। ও আমায়
বলতে লাগল “দেখুন, আপনিও আমাকে অনেক দিন
থেকে দেখছেন, আমিও দেখছি, অথচ দুজনের পরিচয় না
হওয়াটা কি ভালাে? আমি আপনার পরিচয় সংগ্রহ
করেছি—আপনার নাম লাবণ্য, নামটি আপনার রূপের
উপযুক্ত বটে, রামমণি হলে মােটেই মানাত না। আপনাদের
হরিশ পরামাণিকের গলিতে বাড়ী পর্যন্ত আমি দেখে
এসেছি; লজফুষ দিয়ে আপনার বােন পুষি আর ভাই
নর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েও ফেলেছি। এখন আমার

সদানন্দের বৈরাগ্য
পরিচয়টা আপনার জানা দরকার।” ওর পরিচয় জানবার
জন্যে ত আমার ঘুম হচ্ছে না! আমি কিছু না বলে চুপ
করে রইলুম, বকে মরছে বকুক, আমি ত আর শুনতে
চাইনে। আমি শুনি আর না-শুনি সে সটান বলেই গেল
-“আমার নাম দীনেশ, বাড়ী কাঁসারীপাড়ায়, শালবনি
টি ষ্টেটের কলকাতার আপিসের ম্যানেজারের কাজ করি,
মাইনে পাই মােটে আড়াই শ টাকা। বাড়ীতে আমার
আপনার বলতে কেউ নেই ; চাকর বামুনের অনুগ্রহে
নির্ভর করে কোনাে রকমে বেঁচে আছি। আমি খুঁজছিলুম
যদি তেমন একজন মনের মতন লােক পাই যে আমার
এই অগােছালাে জীবনটার একটা বিলি ব্যবস্থা করে দিতে
পারে। মাপ করবেন আমার ধৃষ্টতা, আপনাকে বলতে
কুষ্ঠিত হচ্ছি, আপনি যদি কিছু না মনে করেন তবে দয়া
করে আমার গৃহস্থালির ম্যানেজারীটা নিয়ে আমার একটা
উপায় করলে আমি বেঁচে যাই।” কথা শুনে পা থেকে
মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেল-আমি কি ওর কাছে চাকরীর
উমেদারী করতে গিছলুম যে ও আমায় চাকরী দিতে চায়।
১৬৭

সদানন্দের বৈরাগ্য
আমি মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলুম, হা কি
না কিছুই বলতে পারলুম না।
লােকটা ভাই ভয়ানক নাছােড়বান্দা রকমে ধরে
বসেছে, যে, তার একটা বিলি ব্যবস্থা আমায় করে দিতেই
হবে। মাও তারি পক্ষে। পুষি আর নরও খুব তাগাদা
দেখছি—নিশ্চয় লজঞ্চুষের ঘুষের খাতিরে ! আমি ভাই
একেবারে নাচার হয়ে পড়েছি। আমার কিছুমাত্র আগ্রহ
আছে মনেও ভেবাে না। পাঁচজনের অনুরােধে মানুষ
এমন বিপদেও পড়ে।
পােষ পাখী উড়ে গেলে খাঁচা দেখালেই আবার ফিরে
এসে খাচায় ঢােকে। সে বুঝতেই পারে না খাচার
বাইরে স্বাধীনতার আনন্দই ভালাে, না খাচার মধ্যে
নিশ্চিন্ত দানাপানির ব্যবস্থাটাই আরামের। পিজয়ে-ভাঙা
পাখীর গতি কি, বল ত ভাই। ইতি-
তােমার লাবণ্য।

শ্ৰীমতীবনলতা দেবী প্রণীত লক্ষীশ্রী Approved as a prize books for Schools book for girls in School in Bengal, & prize & Library No 3766 G 2 B 3/84_S 24 ১৩৪২ সালে ৫ম সংস্করণ সংশােধিত ও পরিবর্তিত হইয়া প্রকাশিত হইল কিন্তু মুল্য বাড়িল না। পুস্তকখানি অনিন্দ্যসুন্দর ত-তকে ঝক ঝকে। অত্যন্ত কার্যকরী উপহার গ্রন্থ। বাজে বই নয়। এই পুস্তকখানি প্রত্যেক কুল-মহিলার পক্ষে কিরূপ অত্যাবশ্যকীয় তাহা সামান্য বিজ্ঞাপনের দ্বারা বুঝানো অসম্ভব! সামান্য অন্ন-বন্ধন হইতে পােলাও, কালিয়া, মাংস, পিষ্টক, সন্দেশ, মিঠাই প্রভৃতি প্রস্তুত প্রণালী আধুনিক ধরণে বর্তমান সময়ােপযােগী করিয়া খুব সহজ ভাবে লিখিত ও সন্নিবেশিত হইয়াছে। এ পর্যন্ত যত প্রকার দেশী ও বিলাতী রন্ধন প্রচলিত হইয়াছে তাহার প্রয়ােজনীয় সমস্তই ইহাতে সহজ ভাষায় বিশদরূপে লিখিত হইয়াছে। তন্মধ্যে কতকগুলির নাম নিম্নে প্রদত্ত হইল, তাই পাঠক কতকটা বুঝিতে পারিবেন ! সহজ অন্ন-বন্ধন-প্রণালী, ঘত অন্ন, হলদে ভাত, মিষ্ট-অন্ন, খিচুড়ী প্রস্তুতকরণ, ভুনি,খিচুড়ী,ভাজা ভাত, শাকের ঘণ্ট মােচার ঘণ্ট কড়াইশুটীর ঘন্ট, শুক্তা, মুগের ডাউল প্রস্তুত প্রণালী, ওলের ডালা, ইচড় বা কঁাটালের ডা', কঁাটালের চপ ও কাটলেট,নিমের ঝােল, কাচা পেঁপের ডাল্লা, বাঁশের কেঁড়ার ভাল্লা, বাঁধাকপির ডালা, ছানারডাল্লা, ফুলকপির ডাল্লা, করােলার দোলমা, টলের দোলমা, কড়াইটীর ডাল্লা, বঁধাকপি ও দুধের পায়স ও বাবড়ি, ওলভাজা, নিরামিষ অমু, খেজুর রসের অম্ল, নলেন গুড় ও বীর পায়েস, মৎস্য ও মাংস রন্ধনপ্রণালী, মাছের বড়া, মুড়ীর ঘন্ট, মাছের ঘন্ট, বাঁধাকপির সহিত কৈমাছের তরকারি, কই মাছের প্রলেহ মাছের ঝােল ও মাছের ভর্তা, ওলকপির সহিত চিংড়ি মাছের প্রলেহ বাঁধাকপির সহিত কৈমাছের ব্যঞ্জন, নানাপ্রকারের মাছ পােড়া ও ভাতে মাছ সিন্ধ ; দৈ মাছ, কুমড়ার নানাবিধ পায়, কঁাচা (অপক্ক) কলার রুটি, মানের রুটাও পায়স, চিংড়িমাছের কাটলেট চিংড়ীমাছ পােড়, ইলিশমাছ ভাতে ও সিদ্ধ, মাছের কোপ্তা, মাছের দম নিরামিষ পােলাও, ছানার দধি পলা, পোলাও, আনারসের পােলাও, ফুলকপির পােলাও, মাছের পােলাও, মাংসের পােলাও, চিতল মাছের কোপ্তা, মাছের পুরী, মাছের ঝুরিভাজা, গলাচিংড়ির রসবড়া, চিংড়িমাছের সহিত বুটের ডাল, তেল ঝােল, হেঁচড়া, ডিমের প্রলেহ, ডিমের মলিদা, ডিমের মােহনভােগ, ডিমৃত, ডিমের কাটলেট, ডিমের বড়া, ডিমের পুরী ও ডিমের মধুরাম, মাংস প্রকরণ, পাটার কারি বা ঝোল, মাংসের ভর্তা, মাংসের কোপ্তা ও মাংসের অন্ন, মাংসের কাটলেট ও চপ, মাংসের রােষ্ট, মাংসের গেরেল, আনারসের চাটনি, আলুর চাটনি, পুদিনা শাকের চাটনি, আলুবখরার চাটনি, পায়, ফুলকো লুচি, খাস্তার লুচি, ও কচুরি, বড় কচুরি ও সিঙ্গেড়া প্রস্তুত প্রণালী, পাঁপর ভাজিবার প্রণালী, ও ঝালবড় প্রস্তুত, নিমকি, পাটনাই নিকি গজা ও বালুসাই প্রস্তুতপ্রণালী, বঁদে ও মিঠাই প্রস্তুত, মিহিদানা, জিলাপী, অমৃতি, ছানাবড়া, ছানার মালপােয়া ও সমাধুরী প্রস্তুত প্রণালী, নিখুঁতি করণ, খাজা প্রস্তুত। প্রণালী, মুগের বরফি, গােলাপী চন্দ্রপুলী, মাড়ােয়ারী হালুয়া, কমলালেবুর বরফি, ক্ষীরের গুজিয়া, ক্ষীরের বরফি, গােলাপী চমচম, ক্ষীরের আপেল কীরের লুচি, চন্দ্রমাছ, চানন, খৈচুর, সরপুরিয়া, রসবড়া, রসগােল্লা *ীমােহন, লেডিক্যানি, চম্ প্রস্তুত প্রণালী, ক্ষীরের মনােরঞ্জন, ক্ষীরের ছাঁচ, তাল ক্ষীর, বরফি, গােলাপী রসগােল্লা, পাকা আমের বদে ও কুমড়ার মেঠাই, সীতাভােগ, ছানার মুড়কি ও ছানার পায়স ছানার মালপােয়া, কিসমিসের মােহন ভােগ, রাড়ী, খাসা মােণ্ডা, ও কস্তুরাে সন্দেশ, নূতন গুড়ের সন্দেশ, তালশাঁস সন্দেশ, আম সন্দেশ, সর চুর্ণ, ক্ষীরের পানতুয়া, পেস্তার বরফি, খেজুর রসের পায়স ও বদের পায়স, মানকচুর কী ও পায়স, চিড়ার পিঠা, ভাজা মুগের বরফি ও পিঠা, গােকুল পিঠা এবং কলার পিঠা, গােপালভােগ পিঠা, পরিশিষ্ট মােরা, নানাবিধ জেম জেলী, চাটনী, সাগু এবােট ও মানণ্ড, খৈ ও যবের মণ্ড ও সুজির চটী, মাংসের জুস, কুলের আচার ও বেগুনের আচার, তেঁতুল, কুল, আমড়া, লেবু আদা প্রভৃতির আচার ইত্যাদি ইত্যাদি।

পাক-প্রণালী বহু আছে- তবে “লক্ষীশ্রী কিনিবেন কেন ? কারণ- -ইহাতে ত সর্বপ্রকার রন্ধন ও জলখাবার তৈয়ারী শিক্ষা আছেই, তব্যতীত ইহাতে কোন মাসে কি কি আনাজ তরকারী রােপণ করিতে হয়, সর্বপ্রকার ফল ও চারা রােপণ প্রণালী, সার দেওয়া, পরিচর্চা প্রভৃতি চাযের বিস্তারিত বিবরণ, রােগী চর্চা, রােগীর পথ্য তৈয়ারী, গৃহকাৰ্য্য গৃহ-শৃঙ্খলা, পত্র লিখন-প্রণালী, ধােপার হিসাব, জমা খরচ প্রভৃতি, সাংসারিক খুটিনাটি বিষয়, সময়ের সদ্ব্যবহার শিক্ষা, পিতামাতা, একান্নবর্তী পরিবার, শ্বশুর-শাশুড়ী, গুরুজন, আত্মীয়-স্বজন দাসদাসী প্রভৃতির সহিত কৰ্তব্য ও ব্যবহার, ডিপথিরিয়া, হাম, পাঁচড়া, কৃমি, দাত উঠা, সর্দি কাসি, আসা, শিশুপালন, রােগীর সেবা ইত্যাদি এত অধিক শিক্ষণীয় বিষয় কুললক্ষ্মীদিগের জন্য আর কোনও বাংলা পুস্তকে লিখিত হয় নাই। একখানি লক্ষ্মীশ্রী থাকিলে সংসার লক্ষ্মীশ্ৰীতে ভরিয়া উঠিবে। প্রত্যেক বধূকে প্রকৃত গৃহিণীতে পরিণত করিবে। যে কোন বইর দোকানে বসিয়া এই শ্রেণীর অন্যান্য পুস্তকের সহিত দেখিয়া সুচীপত্র মিলাইয়া তুলনা ও গুণ বিচার করিয়া কিনিলে অর্থব্যয় সার্থক হইবে। মেয়েদের উপহার দিতে - পূজার বাজারে—বিবাহের উপহারে “লক্ষ্মীশ্ৰী” অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুস্তক আর নাই ইহার কাছে বাজে উপন্যাস কিছুই নহে ছাপা-কাগজ-বাঁধা-প্রথম শ্রেণীর সুবৃহৎ পুস্তক মূল্য ২১ দুই টাকা মাত্র শ্ৰীযুক্ত শ্রীপতিমােহন ঘােষ প্রণীত পুস্তকখানির নামেই গুপ্ত কথা ব্যক্ত করিয়া সিতেছে। রাত্রি কালে পা টিপে টিপে অভিসারিকা নারীর গােপন-কাহিনী পাঠ করুন। রুচি বাগীশ- দের অপাঠ্য। মূল্য ১• সিকা। অভিসার .

প্রাণনাথ মল্লিক.ও ব্রাহ্মসমাজ * স শ v শ্ৰীমতী বনলতা দেবী তদীয়া দাদাখশুরের এই জীবনচরিতখানি লিখিয়া দেশের প্রভূত উপকার করিয়াছেন। ইহাতে প্রায় ১০ বৎসরের পূর্বকার ব্রাহ্মসমাজের ও ক্ৰাহ্মদিগের বহু অবশ্য জ্ঞাতব্য ঘটনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন যাহা ৫০ বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার ছিল কিম্বা আর কিছুকাল পরে সংগ্রহ করা সম্পূর্ণই অসম্ভব হয় ত হইয়া পড়িত। প্রাণনাথ মল্লিকের চেষ্টা যত্ন ও উদ্যোগে ইহার জ্ঞাতি ও স্বজন মিলিয়া প্রায় ১০ • ঘর বাগআঁচড়া নিবাসী ব্রাহ্মণ, পবিত্র ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। তার ব্রাহ্মসমাজের যে মহা উপকার ও পুষ্টিসাধন হইয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। পূর্বে ব্রাহ্মসমাজে উপনয়ন সংস্কার ও জাতিভেদ প্রথা বর্তমান ছিল। ৩ প্রাণনাথ মল্লিকই ব্রাহ্মদিগের উপবীত ত্যাগের ও বেদীতে বসিয়া অব্রাহ্মণের পক্ষে আচার্যের কাৰ্য্য করার অধিকার সম্বন্ধে ব্রাহ্মসমাজে আলালন ও বিপ্লব আনয়ন করেন। স্ত্রী স্বাধীনতা ও ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় যােগদান এবং প্রকাশ্যে চলাফেরা তার বাটীর মেয়েরই সর্বপ্রথম করেন। স্ত্রী-স্বাধীনতার পথ প্রদর্শক তিনিই। প্ৰবৰ্ত্তকে এ সম্বন্ধে প্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল তবর্ষ ২য় সংখ্য! ১১• পৃষ্ঠা ও ৪র্থ সংখ্যা (২৬ পৃষ্ঠায় লিখতেছেন:-বাতাচড়া হইতেই ব্রাহ্মসমাজে প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রামের সুত্রপাত প্রাণনাথ মল্লিক এক জন অগ্রণী ব্রাহ্ম ছিলেন। তিনি কহিলেন ‘উবীত র কপটতর চিহ্ন ও মহাপাপ কলিকাতা ব্রাহ্ম সনজের পাচার্য দোস্তবাগীশ মহাশয় ও বেচারাম বাবু উপবীত পরিত্যাগ না করিয়া বেদীর কাৰ্য কনে কেন ?” কথাটা গােস্বামী মহাশয়ের ধর্মবুদ্ধিতে যাইয়া অযত করিল। তিনি মনে মনে স্থির করিলেন যদি ব্রাহ্মসমাজের এই কুরীতি, স"শােধিত না হয়, তাহা হইলে যে সমাজ অসত্যের প্রশ্রয় দেয় তাহার সহিত যােগ দিব না।” ইহার পরই বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয় উপবীত ত্যাগ করিলেন। উপবীতধারী আচার্ধের ব্রাহ্মসমাজের বেদী হইতে ব্রহ্মে পিন বা ধৰ্ম্মোপদেশ দেওয়া কর্তব্য নহে অমনি তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক মহাশয়কে এই কথা লিখিয়া জানাইলেন। ব্ৰহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র তখন কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ছিলেন। এই প্রতিবাদ পত্রে গােসাই কেশবচন্দ্রকে ইহাও জানাইলেন যে, যদি কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের উপাচার্যগণ উপনীতধারী হন, তবে তুমি অসতের আলয় বলিয়া সমাজকে পরিত্যাগ করিব।” কেশবচন্দ্র গোস্বামী মহাশয়ের প্রতিবাদ পত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে দিলেন। মহর্ষি গােস্বামী মহাশয়ের মতের অনুমােদন করিয়া * গােস্বামী মহাশয় এবং অন্নদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় ব্রাহ্মসমাজের উপাচার্য মনােনীত হইলে সমাজের আচাৰ্যগণের পক্ষে উপবীত ধারণ নিষিদ্ধ হইল।” (বিজয়কৃষ্ণ গােৰামীর জীবনী, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জীবনী, সদগুরুসঙ্গ, বিজয় কথামৃত প্রভৃতি অষ্টব্য) এই বহিতে সেকালের বহু ঘটনার সঙ্গে প্রবীণ লেখক লেখিকাদের লিখিত অনেক .লেখা যােগ করা হইয়াছে, যেমন—প্রাণনাথ মল্লিকের পুত্র রজনীকান্ত মন্ত্রিক সম্বন্ধে গ ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sadanander Bairagya

Author
Bandyopadhyay, Sri Charuchandra
Title
Sadanander Bairagya
File name
Sadanander Bairagya
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/08/18
Publisher
Sri Sudhakrishna Bagachi, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
184
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Other Genres.
Keywords
Short stories
DLI number
513188
Barcode
4990010020189.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
kvHnLNwycsP
Download PDF

Sadanander Bairagya