Bally Sadharan Granthagar

Shakuntala Ed. 1st

De, Purnachandra Ed. · 2010/02/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শকুন্তলা
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত
3
কবিভূষণ শ্রীপূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন উত্তটাগর বি.এ. সম্পাদিত
প্রথম সংস্করণ
SAKUNTALA
BY
PANDIT ISWAR CHANDRA VIDYASAGAR,
EDITED BY
PURNACHẠNDRA DE,
* * * *
KAVIBHUSHAN, KAVYARATNA, UDDIATASAGAR, B.A.
MACMILLAN & Co., LTD.
294, BOWBAZAR STREET, CALCUTTA.
1916.

PRINTED AT
TIIE COTTON PRESS, 57 HAHILISON ROAT), CALCUTTA
BY JYOTISH CHANDRA GUOSH FOR
MESSRS. MACMILLAN AND CO. Ltd.

বিদ্যাসাগর-মহাশয়-কৃত প্রথম সংস্করণের বিজ্ঞাপন। ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান কবি কালিদাস-প্রণীত শকুন্তলা সংস্কৃত- ভাষায় সর্বোৎকৃষ্ট নাটক। এই পুস্তকে সেই সর্বোৎকৃষ্ট নাটকের উপাখ্যান ভাগ সঙ্কলিত হইল। এই উপাখ্যানে মূল গ্রন্থের অলৌকিক চমৎকারিত্ব সন্দর্শনের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে না। যাহারা সংস্কৃতে শকুন্তলা পাঠ করিয়াছেন এবং এই উপাখ্যান পাঠ করিবেন, চমৎকারিত্ববিষয়ে এ উভয়ের কত অন্তর, তাহা অনায়াসে বুঝিতে পারিবেন; এবং সংস্কৃতানভিজ্ঞ পাঠকবর্গের নিকট কালিদাসের ও শকুন্তলার এইরূপে পরিচয় দিলাম বলিয়া মনে মনে কত শত বার আমায় তিরস্কার করিবেন। বস্তুতঃ বাঙ্গালায় এই উপাখ্যান সঙ্কলন করিয়া আমি কালিদাসের ও শকুন্তলার অবমাননা করিয়াছি। অতএব হে পাঠকবর্গ! আপনাদের নিকট আমার প্রার্থনা এই, আপনারা যেন এই শকুন্তলা দেখিয়া কালিদাসের শকুন্তলার উৎকর্ষ পরীক্ষা না করেন। কলিকাতা। সংস্কৃত কলেজ। ২৫এ অগ্রহায়ণ। ১৯১১ সংবৎ। ঈশ্বরচন্দ্ৰ শৰ্মা

No text on this page.

সম্পাদক-কৃত বিজ্ঞাপন। বর্তমান সময়ের ৬১ বৎসর পূর্বে (১৯১১ সংবতে, ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে, ১২৬১ সালে, ২৫এ অগ্রহায়ণ ) পরম-পূজনীয় মহাত্মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় “শকুন্তলা-নামক এই গদ্য সাহিত্য-গ্রন্থ খানি বালকগণের পাঠোপযােগী করিয়া বাঙ্গালা ভাষায় রচনা করিয়াছিলেন। ইহা মহাকবি কালিদাস-কৃত অভিজ্ঞানশকুন্তল”-নামক সংস্কৃত নাটকের ছায়ামাত্র অবলম্বন করিয়াই অনূদিত হইয়াছে। এজন্য মূল সংস্কৃত গ্রন্থের অলৌকিক সৌন্দৰ্য্য এই অনুবাদে আশা করা বৃথা। বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং লিখিয়াছেন, “এই উপাখ্যানে মূল গ্রন্থের অলৌকিক চমৎকারিত্ব সন্দর্শনের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে না। যাহারা সংস্কৃত ভাষায় শকুন্তলা পাঠ করিয়াছেন এবং এই উপাখ্যান পাঠ করিবেন, চমৎকারিত্ব-বিষয়ে এ উভয়ের কত অন্তর, তাহা তাহারা অনায়াসেই বুঝিতে পারিবেন। বাঙ্গালায় এই উপাখ্যান সঙ্কলন করিয়া আমি কালিদাসের ও শকুন্তলার অবমাননা করিয়াছি”। ১৮৫৪ খৃষ্টাব্দে লিখিত “শকুন্তলার প্রথম সংস্করণকেই ভিত্তি-স্বরূপ গ্রহণ করিয়া এবং তৎপরবর্তি আরও কয়েক খানি সংস্করণ অবলম্বন করিয়া এই গ্রন্থ খানি সম্পাদিত হইল। বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বীয় “শকুন্তলার প্রথম সংস্করণ ৭টী “অঙ্কে” বিভক্ত করিয়াছিলেন। তদনুসারে আমিও মদীয় সংস্করণ ৭টী “অঙ্কেই” বিভক্ত করিলাম। এই গ্রন্থে যে যে বিষয়ে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করা হইয়াছে, তাহা নিম্নভাগে লিখিত হইল :- [ ৬ ] ১। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের “শকুন্তলায়” ‘হইবেক’, ‘করিবেক’, ‘যাইবেক’, ইত্যাদি ক-কারান্ত ক্রিয়াপদ প্রযুক্ত ছিল; কিন্তু বর্তমান সময়ে তাহা লেখক ও পাঠক-গণের রুচি ও প্রথা-বিরুদ্ধ বলিয়া আমি সেই সেই স্থলে ক-কার-বর্জন-পূৰ্ব্বক ‘হইবে’, ‘করিবে, ‘যাইবে’ ইত্যাদি ক্রিয়াপদ রাখিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছি। ২। এই গ্রন্থের প্রায় প্রত্যেক পৃষ্ঠেরই নিম্নভাগে অপেক্ষা- কৃত ক্ষুদ্রাক্ষরে দুরূহ শব্দের অর্থ, ব্যাকরণগত ব্যুৎপত্তি, বিশেষ্য, বিশেষণ, লিঙ্গ, কারক, সমাস ও সমাস-বাক্য ইত্যাদি নিরূপিত হইয়াছে। পরিশেষে বক্তব্য এই যে, সংস্কৃত-কলেজের ব্যাকরণাধ্যাপক, সুপ্রসিদ্ধ বৈয়াকরণ মদীয় কনিষ্ঠ-সােদর-প্রতিম পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত মন্মথনাথ বিদ্যারত্ন মহাশয় আমার জন্য পরম-প্রীতি-ভরে ও নিঃস্বার্থ- ভাবে এই গ্রন্থ-সম্বন্ধে বিশেষ যত্ন ও পরিশ্রম স্বীকার করিয়াছেন। এজন্য আমি তাহার নিকটে আজীবন কৃতজ্ঞ রহিলাম। ভদ্রকালী। ৫ আশ্বিন, বুধবার, ১৩২২ সাল। সত্যনারায়ণ-পূর্ণিমা। ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫ খৃষ্টাব্দ। সম্পাদক শ্রীপূর্ণচন্দ্র দে শকুন্তলা-সম্বন্ধে মন্তব্য। , “অভিজ্ঞানশকুন্তল”-নামক সংস্কৃত নাটক খানি মহাকবি কালিদাসের অমৃতময়ী লেখনী হইতে বিনিঃস্থত,—ইহা সংস্কৃত-সাহিত্যের পাঠক- বর্গের অবিদিত নহে। এই “অভিজ্ঞানশকুন্তল”-সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় যে মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন, তাহারই কিয়দংশ প্রথমতঃ নিম-ভাগে উদ্ধত হইল :- “অভিজ্ঞানশকুন্তল কালিদাসের সর্বপ্রধান দৃশ্যকাব্য। সংস্কৃত ভাষায় যত নাটক আছে, শকুন্তলা সে সকল অপেক্ষা সৰ্বাংশে উৎকৃষ্ট। এই অপূৰ্ব্ব নাটকের আদি অবধি অন্ত পৰ্য্যন্ত সর্বাংশই সৰ্বাঙ্গসুন্দর। যদি শতবার পাঠ কর, শতবারই অপূৰ্ব্ব বােধ হইবে। : ইহাতে হস্তিনাপুরের অধিপতি রাজা দুষন্তের এবং মহর্ষি করে পালিত-তনয় শকুন্তলার বৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে। মহাভারতের আদি পৰ্বে দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার যে উপাখ্যান আছে, তাহা অবলম্বন করিয়া কালিদাস অভিজ্ঞানশকুন্তল রচনা করিয়াছেন। উভয়বিধ উপাখ্যান দৃষ্টিগােচর করিলে বুঝিতে পারা যায়, কালিদাস মহাভারতীয় উপাখ্যানে কি অদ্ভুত কৌশল ও অলৌকিক চমৎকারিত্ব সমাবেশিত করিয়াছেন। ফলতঃ অভিজ্ঞানশকুন্তলে কালিদাসের চমৎকারিণী কল্পনাশক্তি ও চিত্তহারিণী রচনাশক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হইয়াছে। এই নাটক পাঠ করিলে সংস্কৃতজ্ঞ সহৃদয় ব্যক্তির অন্তঃকরণে নিঃসংশয় এই প্রতীতি জন্মে, মানুষের ক্ষমতায় ইহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট রচনা সম্ভবিতে পারে না। বস্তুতঃ কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল سا ; অলৌকিক পদার্থ। ধন্য কালিদাস ! ধন্য অভিজ্ঞানশকুন্তল! প্রলয়ের পূৰ্বে তােমাদের বিয়ের আশঙ্কা নাই। ধন্য বিক্রমাদিত্য। এই কালিদাস তােমার বয়স্য ও সভাসদ ছিলেন; এই অভিজ্ঞানশকুন্তল তােমার পরিতােষার্থে সর্বপ্রথম উজ্জয়িনীর রঙ্গভূমিতে অভিনীত হইয়াছিল”। “ভারতবর্ষীয়েরাই যে স্বদেশীয় কাব্য বলিয়া শকুন্তলার এত প্রশংসা করেন, এমন নহে, দেশান্তরীয় পণ্ডিতেরাও শকুন্তলার এই- রূপ, অথবা ইহা অপেক্ষা অধিক প্রশংসা করিয়াছেন। নানা বিদ্যা- বিশারদ অশেষ-দেশ-ভাষাজ্ঞ, সুবিখ্যাত স্যার উইলিয়ম্ জোন্স, শকুন্তলা পাঠ করিয়া এমন প্রীত হইয়াছিলেন যে, তিনি কালিদাসকে স্বদেশীয় অদ্বিতীয় কবি সেক্স পিয়রের তুল্য বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন ; এবং জাৰ্ম্মাণি দেশীয় অতি প্রধান পণ্ডিত ও অতি প্রধান কবি গেটি, শকুন্তলার স্যার উইলিয়ম্ জোন্স, কৃত ইংরেজী অনুবাদের ফষ্টর কৃত জাৰ্মাণ অনুবাদ পাঠ করিয়া লিখিয়াছেন :- ‘যদি কেহ বসন্তের পুষ্প ও শরদের ফল-লাভের অভিলাষ করে, যদি কেহ প্রতিজনক ও প্রফুল্লকর বস্তুর অভিলাষ করে, যদি কেহ স্বর্গ ও পৃথিবী এই দুই এক নামে সমাবেশিত করিবার অভিলাষ করে, তাহা হইলে, হে অভিজ্ঞানশকুন্তল! আমি তােমার নাম নির্দেশ করি ; এবং তাহা হইলেই সকল বলা হইল। “যদি বিদেশীয় লােক অনুবাদের অনুবাদ পাঠ করিয়া এত প্রীত ও এত চমৎকৃত হইতে পারেন, তবে স্বদেশীয়েরা যে সেই বিষয় মূল পুস্তকে পাঠ করিয়া কত প্রীত ও কত চমৎকৃত হইবেন, তাহা সকলেই অনুভব করিতে পারেন। “এই নাটক সাত অঙ্কে বিভক্ত। প্রথম অঙ্কে দুষন্ত ও শকুন্তলার সাক্ষাৎকার, দ্বিতীয়ে বিদূষকের সহিত রাজার শকুন্তলাবিষয়ক কথােপ- = ;

[ ১ ] কথন ও কণাশ্রমবাসী ঋষিগণ কর্তৃক রাজার নিকটে কতিপয়রাত্র আশ্রমে আতিথ্য-স্বীকার-প্রার্থনা। তৃতীয়ে দুষন্ত ও শকুন্তলার মিলন, চতুর্থে শকুন্তলার পতিগৃহে প্রস্থান, পঞ্চমে দুষ্যন্তসমীপে শকুন্তলার গমন ও প্রত্যাখ্যান, ষষ্ঠে রাজার বিরহ, এবং সপ্তমে শকুন্তলার সহিত পুনর্মিলন”। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই উক্তির সারবত্তা-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার কোনই কারণ নাই। এক্ষণে এই প্রশ্ন স্বতঃই মনােমধ্যে উদিত হইতে পারে যে, এই মহাকবি কোন্ সময়ে কোন্ প্রদেশে জন্মগ্রহণ করিয়া জন্মভূমির মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন? কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় যে, এই মহাপুরুষের সর্ববাদিসম্মত কোনও ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তাহার আবির্ভাব-কাল-বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণের মধ্যে বিলক্ষণ মতভেদ দৃষ্ট হয়। এ স্থলে সেই সকল মতামতের সমালােচনা করিয়া গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধি করা নিস্প্রয়ােজন। এক্ষণে এই মাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই বিষয়ে প্রধানতঃ দুইটী মত প্রচলিত আছে ;-(১) প্রচলিত কিংবদন্তীর অনুসারে কালিদাস খৃঃ পূঃ প্রথম শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিলেন। (২) কালিদাস ষষ্ঠ শতাব্দীর লােক ছিলেন। মহাভারতের আদি-পর্বে এবং পদ্মপুরাণের স্বর্গ-খণ্ডে শকুন্তলার উপাখ্যান বর্ণিত হইয়াছে। বােধ হয়, উহাই কালিদাস-প্রণীত অভিজ্ঞানশকুন্তলের প্রধান উপজীব্য। কিন্তু কালিদাস স্বীয় অসাধারণ বুদ্ধিকৌশলে নাটক খানিকে দেশ, কাল এবং পাত্রের উপযােগী করিয়া লইয়াছেন। এইরূপ করিতে গিয়া তিনি অদ্ভুত-রচনা-নৈপুণ্য এবং কল্পনা-শক্তির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন। দুর্বাসার শাপবৃত্তান্ত মহাভারতে নাই, পদ্মপুরাণে আছে। শকুন্তলা রাজসভায় প্রেরিত হইলে রাজা লােক-লজ্জা-ভয়ে সৰ্ব্ব-সমক্ষে পরিণয়-কথা অস্বীকার [ ১ ] করেন ; অবশেষে আকাশবাণী হওয়ায় লােকের বিশ্বাস বিশ্বাস হইলে তিনি ইহা স্বীকার করেন। ইহাই মহাভারতের কথা। কিন্তু কালিদাস যাহাকে আদর্শ নরপতি-রূপে চিত্রিত করিয়াছেন, তাহার পক্ষে এইরূপ ব্যাপার যে নিতান্ত বিসদৃশ, তাহাতে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। এই জন্যই পদ্মপুরাণ হইতে দুর্বাসার শাপবৃত্তান্ত গৃহীত হইয়াছে। ইহাতে দুষ্যন্ত-চরিত্রে কলঙ্ক- কালিমার স্পর্শও হয় নাই। যখন আশ্রমে উপস্থিত হন, তখন কণা ফলাহরণে বহির্গত হইয়াছিলেন এবং রাজা শকুন্তলার মুখেই তদীয় জন্মবৃত্তান্ত অবগত হন। ইহাই মহাভারতের বর্ণনা। কিন্তু অভিজ্ঞানশকুন্তলে ক শকুন্তলার দুর্দৈব-শান্তির নিমিত্ত সােমতীর্থে গমন করেন এবং অনসূয়াই রাজ-সমক্ষে শকুন্তলার জন্ম- বৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করেন। মহাভারতে প্রিয়ংবদার উল্লেখ নাই, কিন্তু পদ্ম- পুরাণে আছে। অনসূয়া কালিদাসের নূতন সৃষ্টি। মহাভারতের শকুন্তলা প্রগল্ভা ও মুখরা ;—স্বীয় গর্ভজাত সন্তান যদি পিতৃ-সিংহাসনের অধিকারী হয়, তাহা হইলেই তিনি দুষন্তকে বিবাহ করিবেন, নতুবা নহে। কালিদাসের শকুন্তলা লজ্জাশীল, তপােবনে প্রতিপালিত গৃহস্থ- কন্যা। পদ্মপুরাণে প্রিয়ংবদার উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু কালিদাস স্বীয় সুনিপুণ তুলিকা-দ্বারা উহা সম্পূর্ণ-বিভিন্নরূপে চিত্রিত করিয়া- মহাভারতের শকুন্তলা তপােবনেই পুত্র প্রসব করেন এবং পুত্রের বয়ঃক্রম যখন ছয় বৎসর, তখন তিনি পতিগৃহে প্রেরিত হন। কিন্তু কালিদাসের শকুন্তলা গর্ভাবস্থাতেই দুষ্যন্ত-ভবনে যাত্রা করেন। অভিজ্ঞানশকুন্তলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঙ্কে বর্ণিত বৃত্তান্ত কালিদাসের কল্পনা-প্রসূত। শকুন্তলার পতিগৃহে গমনকালে কণ-শিষ্য-গণই সঙ্গে গিয়াছিলেন, ইহাই মহাভারতের বর্ণনা। কিন্তু পদ্মপুরাণে বর্ণিত আছে যে, গৌতমী, প্রিয়ংবদা, শাঙ্গ রব এবং শারদ্বত সঙ্গে গিয়াছিলেন।

[ ১১ ] কালিদাস এই বিষয়ে প্রিয়ংবদাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন। পদ্ম পুরাণের মতে প্রিয়ংবদাই অঙ্গুরীয়ক হারাইয়া হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন। কিন্তু নাটকে শকুন্তলাই ইহা হারাইয়াছিলেন। ষষ্ঠ অঙ্কের কথুকী, সানুমতী এবং বিদূষকের ক্লেশ কালিদাসের সৃষ্টি। ফলতঃ মহাভারত ও পদ্মপুরাণের ছায়ামাত্র অবলম্বন করিয়াই কালিদাসের এই বিশাল ও রমণীয় সৃষ্টি। কোন কোন প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতের মতে পদ্মপুরাণ কালিদাসের পরবর্তী ; অতএব কালিদাস উহা হইতে কোন সাহায্যই প্রাপ্ত হন নাই। এইরূপ নূতন তথ্য সুধীগণের বিবেচ্য। দুষ্যন্তই অভিজ্ঞানশকুন্তলের নায়ক এবং শকুন্তলাই নায়িকা। কালিদাস দুষ্যন্তকে আদর্শ নরপতি-রূপে চিত্রিত করিয়াছেন। ন্যায়- পরতার সহিত রাজকাৰ্য-পৰ্যালােচন এবং প্রজা-রঞ্জনই রাজার সর্ব প্রধান কর্তব্য। সেই বিষয়ে দুষ্যন্তের কিছুমাত্র ঔদাসীন্য ছিল তিনি সচিব-গণের উপরি রাজ-কাৰ্য্যের ভারাৰ্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতেন না,—প্রণিধান-সহকারে স্বয়ং তাহা পৰ্যবেক্ষণ করিতেন; এবং রাজ-কৰ্ম্ম-চারিগণ কোথায় কিরূপ ভাবে কাৰ্য্য করিতেছেন, তাহাও স্বয়ং পরিদর্শন করিতেন। এজন্য তাহাকে বিলক্ষণ শারীরিক ক্লেশ ভােগ করিতে হইত ; কিন্তু তথাপি তিনি তাহাতে কিছুমাত্র ক্ষুব্ধ হইতেন না। তাহার বীরপুরুষােচিত শরীরে অসাধারণ সামর্থ্য ছিল। তপােবনে তপস্বিগণের বিঘ্ন-নিরাকরণে এবং স্বর্গধামে দেবগণের শত্রু-দলনে তাহার অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শিতা ও অদ্ভুত সমর-নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তাহার আকারে মাধুৰ্য্য এবং গাম্ভীৰ্য্য উভয়ই বিদ্যমান ছিল। তিনি প্রভাবশালী, সুচতুর ও মধুরালাপে সুনিপুণ ছিলেন। তাঁহার পােবন-বৰ্ণনা, রথের গতি- বর্ণনা, স্বর্গে মুনিগণের এবং সেস্থান হইতে অবতরণকালে প্রাকৃতিক [ ১২ ] দৃশ্যের বর্ণনা পাঠ করিলে তাহার সূক্ষ্মদর্শিতার সবিশেষ পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। তিনি চিত্র-বিদ্যাতেও সুনিপুণ ছিলেন। তাঁহার চিত্তের ঔদার্য্য এবং ধর্মপরায়ণতা সবিশেষ প্রশংসনীয়। তাহার উচ্চ অন্তঃকরণ ধৰ্ম্ম-বহিভূত প্রেমে কদাপি আসক্ত হয় না, এবং তাহার বিবেক-বুদ্ধিও কখনই অসৎপথে প্রধাবিত হয় না। এই জন্যই শকুন্তলা-দর্শনে তাহার হৃদয়ে অনুরাগ-সঞ্চার হইবামাত্র তিনি মনে করিলেন যে, “শকুন্তলা ব্রাহ্মণ-তনয়া হইলে, আমার মন তাহাতে কখনই আকৃষ্ট হইত না। সন্দেহের বিষয়ীভূত বস্তুতে সাধুগণের অন্তঃকরণ-প্রবৃত্তিই প্রমাণ। স্বরূপ হইয়া থাকে। এস্থলেও ঠিক তাহাই হইল। পত্নীর প্রতি পতির বিশুদ্ধ অনুরাগ, পুত্রের প্রতি পিতার নির্মল স্নেহ, দেবতা ও ব্রাহ্মণের প্রতি আন্তরিক ভক্তি, চিত্তের সংযম ও ধৈৰ্য,–এ সমস্ত গুণই তাঁহার চরিত্রে পরিস্ফুট হইয়াছে। এক্ষণে আমরা সংক্ষেপে শকুন্তলার চরিত্রের সমালােচনায় প্রবৃত্ত প্রথমতঃ স্বর্গীয় চন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের প্রণীত “শকুন্তলা-তত্ত্ব” হইতে কিয়দংশ এই স্থলে উদ্ধত হইল। “দুষ্যন্ত নানাগুণে গুণবান্ ; তাঁহার চরিত্রের বিস্তার অনন্ত সমুদ্রের ন্যায় অসীম বলিলেই হয়। শকুন্তল-চরিত্রের বিস্তার নাই। তাহাতে দুষন্তের বাহুবল নাই, শস্ত্র-নৈপুণ্য নাই, মৃগয়া-চতুরতা নাই, পাণ্ডিত্য নাই, উচ্চ বিচার- শক্তি নাই, অপরিমেয় কৰ্মশীলতা নাই, কাৰ্যদক্ষতা নাই। থাকিবার মধ্যে তাঁহার এক হৃদয় আছে। কিন্তু সে হৃদয়ের গভীরতা এবং অনন্ত সমুদ্রের গভীরতা উভয়ই সমান। দুষকে ভাবিতে ভাবিতে শকুন্তলা একেবারে জীবন-হীন প্রস্তর-মূৰ্ত্তির ন্যায় স্পন্দহীনা। কিন্তু অঙ্গুরীয়-পুনদর্শনানন্তর শকুন্তলাকে ভাবিতে ভাবিতে দুষ্যন্ত অধীর, অস্থির, অনেকটা গাম্ভীর্য-ভ্রষ্ট, এবং উন্মত্তের ন্যায় প্রগভ। শকুন্তলার হৃদয় অনন্তাধার ** *। দুষ্যন্তের হৃদয় পরিমিতাধার * * *।

[ ১৩ ] হৃদয়ের মােহে রমণী বাহ জগৎ ভুলিয়া যান, পুরুষ ভুলিয়া যান । শকুন্তলা *** সেই ভয়ঙ্কর শাপ শুনিতে পাইলেন না। কিন্তু দুষ্যন্ত বিহ্বল-হৃদয়, বিল-জ্ঞান এবং মুচ্ছিত হইয়াও বিপন্নের ভয়ার্ত-রব শ্রবণমাত্ৰ বীর-বিক্রমে উঠিয়া দাঁড়াইলেন। শােক-বিহ্বল দুষন্তের নিকটে বাহজগৎ প্রবল। নিমেষ-মধ্যে দুষন্তের শােক- বিহবলতা কৰ্ম্মশীলতায় পরিণত হইল । কিন্তু হৃদয়-মুগ্ধ শকুন্তলা ভয়ঙ্কর দুর্বাসা সত্ত্বেও হদয়-মুগ্ধা রহিলেন। বিলুপ্ত বাহজগৎ বিলুপ্তই রহিল। * * হৃদয়ের গুণেই স্ত্রীজাতি পুরুষ জাতি হইতে ভিন্ন। কালিদাসের শকুন্তলা সেই রমণী-হৃদয়-রহস্যের উজ্জ্বলতম প্রতিমা ; এবং সেই প্রতিমা পুরুষ-চরিত্রের তুলনায় উজ্জ্বলতম অপেক্ষা উজ্জলতর। এমন তুলনামূলক নারী-হৃদয়-প্রতিমা জগতের আর কোনও নাটকে নাই।” কালিদাস শকুন্তলাকে আদর্শ-নারী-রূপে চিত্রিত করিয়াছেন। শকুন্তলা মেনকা-গর্ভ-সম্ভুত, মানুষী-গর্ভজাত নহেন। সেই জন্য তাঁহার অলৌলিক রূপলাবণ্য রাজার রূপলাবণ্য রাজার মনােহরণে সমর্থ হইয়াছিল। রাজা স্বয়ং বলিয়াছেন “প্রভা-তরল জ্যোতিঃ কখনই বসুধা-তল হইতে উদিত হয় না।” অতএব বনলতা যে উদ্যান-লতাকে পরাভূত করিবে, ইহা বিচিত্র নহে। আশ্রম-স্থিত বৃক্ষ-লতাদির প্রতি শকুন্তলার সহােদর- মেহ ছিল। তাহাদের মূলে জলসেচন না করিয়া তিনি জলপান করিতেন না, এবং ভূষণপ্রিয়া হইয়াও স্নেহবশতঃ তাহাদের পল্লব-চ্ছেদ করিতেন না। বনতষিণীর সহিত সাক্ষাৎকার লাভ না করিয়া তিনি তপােবন পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই। তিনি অপত্য-নির্বিশেষে মৃগ-শিশুর লালন-পালন করিয়াছিলেন, এবং তাহার কুশ-সূচি-বিদ্ধ বদনে ইঙ্গুলী-তৈল-প্রদান-পূৰ্ব্বক ব্রণ শুষ্ক করিয়া দিতেন। পতি-গৃহ-গমন- কালে তাহার জন্য তাহাকে অশ্রুপাত করিতে হইয়াছিল। তৎকালে [ ১৪ ] আশ্রমটীও যেন শকুন্তলার চিরকালের জন্য আশ্রম-ত্যাগ মনে করিয়া শােকবিহবল হইয়া পড়িল। মৃগগণের মুখের কুশগ্ৰাস পড়িয়া যাইতে লাগিল, ময়ূর-গণ নৃত্য পরিত্যাগ করিল এবং লতা সকল পাণ্ডু-পত্ৰ-মােচন-চ্ছলে যেন অশ্রু-মােচন করিতে লাগিল। “পতির অপ্রিয়ভাজন হইলেও রােষ-প্রকাশ-পূৰ্ব্বক তাহার প্রতিকূলচারিণী হইও ”—কর্ণের এই উপদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করিয়া- ছিলেন। দুষ্যন্ত রাজসভায় তাহার সহিত পরিণয়-কথা অস্বীকার করিলে অনন্যগতি হইয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ কোপাবিষ্ট হইতে হইয়া ছিল বটে, কিন্তু তিনি এক ‘অনাৰ্য’ সম্বােধন ব্যতীত অন্য কোন রূঢ় শব্দ প্রয়ােগ করেন নাই। রাজা তাঁহাকে পরিত্যাগ করিলে তিনি স্বীয় ভাগ্যেরই নিন্দা করিয়াছিলেন, রাজার নিন্দা করেন নাই। তথাপি এই বিষয়ে সীতার চরিত্র শকুন্তলার চরিত্র অপেক্ষাও উন্নত বলিয়া বােধ হয়। কারণ সীতা নির্বাসিত হইয়াও পরজন্মে রামকেই পুনৰ্বার পতিরূপে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু শকুন্তলার মুখে আমরা সেরূপ কথা শুনিতে পাই নাই। দুষন্তের উক্তি হইতে জানিতে পারা যায়, শকুন্তলা, অনসূয়া এবং প্রিয়ংবদা—তিনটী সখীই সমবয়স্কা এবং রূপবতী। কিন্তু কথার ভাবে অনসূয়াকে অপেক্ষাকৃত অল্পবয়স্কা বলিয়াই মনে হয়। শকুন্তলা ও প্রিয়ংবদা যৌবনে পদার্পণ পদার্পণ করিয়াছেন। প্রিয়ংবদা অনসূয়া অপেক্ষা সুরসিকা, সুচতুর এবং কৌতুক-প্রিয়া। দুই জনেই শকুন্তলার প্রতি সমান অনুরক্তা এবং শকুন্তলার সমান হিতৈষিণী। প্রিয়ংবদা অপেক্ষা অনসূয়ার লজ্জা কিছু অল্প। এই জন্যই যখন শকুন্তলা এবং প্রিয়ংবদা লজ্জাবশতঃ রাজার সহিত প্রথম বাক্যালাপ করিতে পারেন নাই, তখন অনসূয়াই এই কাৰ্যে অগ্রসর হইয়াছিলেন। সত্যপরায়ণ সরলহৃদয়া নারীর হৃদয়ে যেরূপ সাহস থাকিতে পারে, নাই। পৃথক্‌ ব্যক্তি। [ ১৫ ] অনসূয়ার চরিত্রে তাহা পরিস্ফুট হইয়াছে। কিন্তু প্রিয়ংবদা তাহা অপেক্ষা অধিকতর বুদ্ধিমতী এবং সূক্ষ্মদর্শিনী ছিলেন। “শকুন্তলা-তত্বে” লিখিত হইয়াছে—“শকুন্তলা, অনসূয়া এবং প্রিয়ংবদা পরস্পরের প্রাণবায়ু, পরস্পর পরস্পরের নিমিত্ত প্রাণ পৰ্যন্ত দিতে পারেন। এমন সরল, পবিত্র এবং সুমিষ্ট সখ্যভাব আমরা আর কোথাও দেখি কিন্তু সকল বিষয়ে এক হইয়াও তিন জনে তিনটা * * * প্রিয়ংবদা রঙ্গ করিতে ভালবাসেন, শকুন্তলা রঙ্গ বুঝেন, কিন্তু রঙ্গ করিতে পারেন না ; অনসূয়া রঙ্গ করিতে শেখেন নাই। অনসূয়া কিছু বালিকা বালিকা রকম। অনসূয়াটী ফুলের কুঁড়ি—এখনও ফুটে নাই, কিন্তু ফোট ফোট। শকুন্তলা-ফুলটী ফুটিয়াছে—কিন্তু নব-বিকসিত-পদ্মের ন্যায় সে ফুলের সমস্ত গৌরব পাপড়ি-ঢাকা। প্রিয়ংবদা গােলাপফুলকুঁড়ি ফুটিয়াছে কিন্তু তাহাতেই চারিদিকে সুগন্ধ ছড়াইতেছেন। অনসূয়ার কিছু ভারি রকম প্রকৃতি—কিন্তু তাহার তুলনা আছে। প্রিয়ংবদা হাস্যময়ী ও চপলা-তাহারও তুলনা আছে। কিন্তু শকুন্তলার তুলনা নাই—তিনি নারী-প্রকৃতির প্রতিমা, অথচ একটী ভুবন-মােহিনী রমণী”। অনেক সমালােচকের নিকটে গৌতমীর চরিত্র উপেক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু প্রকৃত-প্রস্তাবে গৌতমীর চরিত্র উপেক্ষণীয় নহে। কণ-মুনির আশ্রমে যে সকল পুরুষ ও রমণী ছিলেন, গৌতমীই তাঁহাদের অধিনায়িকা। তিনি ধৰ্ম্ম-পরায়ণা বর্ষীয়সী নারী। তিনি সকলের মাতৃস্থানীয় ছিলেন। তাহার প্রকৃতি গাম্ভীর্যপূর্ণ। অভিজ্ঞান- শকুন্তলের পুরুষ-চরিত্র-সমুহ-মধ্যে করে আসন যত উচ্চ, স্ত্রী-চরিত্র- সমূহ-মধ্যে গৌতমীরও আসন তত উচ্চ। কণা শকুন্তলাকে অনেক শিক্ষাদান করিয়াছেন বটে, কিন্তু গৌতমীই শকুন্তলার প্রকৃত । [ ১৬ ] শিক্ষা-দায়িনী। “পুরুষ রমণীকে উপদেশ দিতে পারে, কিন্তু রমণী ভিন্ন রমণীকে রমণী করিতে পারে না। অভিজ্ঞানশকুন্তলে কথ-চরিত্রের কথ-চরিত্রের মূল্যও নহে। ইহা নাটকীয় বস্তুর প্রধান পরিপােষক। কথ এক জন চিরকৌমার- ব্রতাবলম্বী তপস্বী। তাহার শরীর “তপশ্চরণ-পীড়িত”। তিনি তপােবলে ভাবি-ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেন। তিনি বনবাসী হইয়াও “লৌকিকজ্ঞ”। শকুন্তলা যখন পতিগৃহে যাত্রা করেন, তখন তিনি তাহাকে যে সকল অমূল্য উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা হিন্দু-রমণীর চিরস্মরণীয়। সেই উপদেশ-সমূহই তাহার সাংসারিক কার্যে বিশিষ্টরূপ অভিজ্ঞতার পরিচায়ক। তপস্বীর ন্যায় তাহার হৃদয় স্নেহশূন্য ছিল না। শকুন্তলা তাঁহার পালিত কন্যা। এই পালিত। কন্যার প্রতি তাঁহার যেরূপ স্নেহ ছিল, তাহা সাংসারিক ব্যক্তির স্বীয় ঔরসজাত কন্যার প্রতি যেরূপ স্নেহ থাকে, তদপেক্ষা কোন অংশেই নুন নহে। এই হেতুই শকুন্তলার পতিগৃহে গমনকালে তিনি নিতান্ত শােকাকুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। “কন্যা পরকীয় অর্থমাত্র” তাহার এই অমূল্য-বচন কন্যার পিতার নিকটে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে দেদীপ্যমান থাকিবে। বৃক্ষ লতা পশু পক্ষী প্রভৃতি সকলের প্রতিই হার অনির্বচনীয় মেহ ছিল। “উদারচরিতানান্তু বসুধৈব কুটুম্বক”—এই মহাজন বাক্যের সার্থকতা তিনি স্বীয় কাৰ্য্যদ্বারা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন করিয়াছেন। শাঙ্গরব ও শারদ্বত দুই জনই কথ-মুনির শিষ্য এবং দুই জনই গুরুভক্ত ও ধৰ্ম্মানুরাগী। উভয়েরই জীবনের প্রণালী এক প্রকার, উভয়েরই শিক্ষা, আশা, এবং আকাঙ্ক্ষাও এক প্রকার। কিন্তু তাঁহাদের দুই জনের প্রকৃতির মধ্যে বিলক্ষণ পার্থক্যও দেখিতে পাওয়া যায়। শাঙ্গ রব উদ্ধত প্রকৃতির তিনি সামান্য কারণে সহসা ক্রুদ্ধ হইয়া মােক ; উঠেন।

[ ১৭ ] তাহার প্রকৃতিতে বিনয় ও গাম্ভীর্যের কিঞ্চিৎ অভাব লক্ষিত হয়। তাহার চরিত্রে অহঙ্কারেরও কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সাধারণ লােকের অপেক্ষা স্বীয় আসন অনেক উচ্চ বলিয়া মনে করেন। এই হেতুই দুষ্যন্ত রাজসভায় যখন তাহার কথার প্রতিবাদ করেন, তখন তিনি তপস্বি-জনােচিত সহিষ্ণুতা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক বিষধরের ন্যায় ভীষণ গর্জন করিয়া রাজার প্রতি রূঢ় ও নিদারুণ বাক্য প্রয়ােগ করিয়াছিলেন। শারদ্বতের প্রকৃতি ধীর ও গম্ভীর। তিনি তেজস্বী হইয়াও নিরহঙ্কার ও সহিষ্ণু। তিনি ধীরভাবে কাৰ্য্য পৰ্যালােচনা করিয়া কৰ্তব্য নির্ণয় করিতেন। তিনি সূক্ষ্মদর্শী বিচারকের ন্যায় বিলক্ষণ বুদ্ধিমান্ ও বিবেচক ছিলেন। “শকুন্তলা- তত্ত্ব”-প্রণেতা চন্দ্রনাথ বাবুর মতে শাঙ্গ রব বাবুর মতে পারব কিঞ্চিৎ বাহদর্শী। তপােবন হইতে রাজধানীতে আগমন-পূৰ্ব্বক তত্ৰত্য দৃশ্য-দর্শনে উভয়ের মনে বিভিন্ন-প্রকার ভাবের উদয় হইয়াছিল। সেই দৃশ্য শাঙ্গরবের মনে বাহ-জগৎ এবং শারদ্বতের মনে অন্তর্জগৎ প্রবল করিয়া তুলিয়াছিল। অভিজ্ঞানশকুন্তলে শাঙ্গ রব ও শারদ্বতের সহিত আমাদের অল্পক্ষণের জন্যই সাক্ষাৎকার হয়। এইরূপ অল্পক্ষণের জন্য উহাদিগকে আমাদের সহিত পরিচিত করিয়াও কবি অদ্ভুত নৈপুণ্য সহকারে তাহাদের চরিত্র এবং তদগত পার্থক্য যেরূপ পরিস্ফুট করিয়াছেন, তাহার পৰ্যালােচনা করিলে বিস্ময়াপন্ন হইতে হয়। সম্পাদক পূর্ণচন্দ্র দে।

No text on this page.

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন-চরিত। ; মেদিনীপুর জেলার অন্তঃপাতী বীরসিংহ-নামক গ্রামে ১৭৪২ শকে [ ১৮২০ খৃষ্টাব্দে | ১২ই আশ্বিন মঙ্গলবার দিবসে ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। ইহার পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বিশেষ সঙ্গতিপন্ন ছিলেন না। উত্তমরূপে বিদ্যাশিক্ষা করিয়া জীবন সার্থক করিব, এইরূপ ইচ্ছা শৈশবাবস্থা হইতেই ঈশ্বরচন্দ্রের মনে স্বতঃই আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। লােকের বাল্যকালের প্রকৃতিই এইরূপ। অর্থহীন পিতা জ্ঞান-পিপাসু পুত্রের বিদ্যাশিক্ষোপযােগি ব্যয়ভার-সম্পাদনে অক্ষম হইলে পুত্রকে যেরূপ কষ্ট ও দুঃখ ভােগ করিতে হয়, ঈশ্বরচন্দ্রকেও তাহা যথেষ্ট- পরিমাণে করিতে হইয়াছিল। কিন্তু অমিত অধ্যবসায়, আন্তরিক আগ্রহ ও অবিচলিত ধৈৰ্যপ্রভাবে তিনি সমস্ত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়াছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বীরসিংহ হইতে ঈশ্বরচন্দ্রকে কলিকাতায় আনিয়া ১৮২৯ খৃষ্টাব্দের ১লা জুন তারিখে বিদ্যাশিক্ষার্থ সংস্কৃত- কলেজে প্রথম প্রবেশ করাইয়া দেন। বাল্যকাল হইতেই ঈশ্বরচন্দ্রের বুদ্ধিমত্তা ও অনুসন্ধিৎসা-বৃত্তি বিশেষ বলবতী ছিল। তিনি যখন যে শিক্ষকের নিকট হইতে যাহা কিছু শিক্ষা করিতেন, তখনই তাহার মর্মভেদ না করিয়া ছাড়িয়া দিতেন না। শিক্ষকগণও তাহার জ্ঞান-পিপাসা বলবতী জানিয়া তাহাকে অধিক শিক্ষা দান করিতে অত্যন্ত [ ২ ] সমধিক যত্নবান্ হইতেন। সংস্কৃত-কলেজে প্রবেশ করিয়াই তিনি প্রথমতঃ গঙ্গাধর তর্কবাগীশের নিকটে ব্যাকরণ শিক্ষা করেন। পরে ব্যাকরণ-শাস্ত্রে সবিশেষ অধিকার জন্মিলে জয়গােপাল তর্কালঙ্কারের নিকটে সাহিত্য, প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের নিকটে অলঙ্কার, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যাবাচস্পতির নিকটে বেদান্ত, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের নিকটে স্মৃতি, এবং নিমাইচন্দ্র শিরােমণি ও জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চাননের নিকটে ন্যায় ও সাংখ্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। শিষ্য বুদ্ধিমান্ হইলে গুরুও তাহাকে শিক্ষা দান করিতে নিরতিশয় প্রয়াসবান্ হন। ঈশ্বরচন্দ্র যখন যে শাস্ত্র অবলম্বন করিতেন, তখন তিনি তাহার নিগূঢ় রহস্যভেদ না করিয়া তাহা পরিত্যাগ করিতেন না। ক্রমে ক্রমে উল্লিখিত সমস্ত শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করিলে, এই সকল শাস্ত্রের অধ্যাপক-গণ আহলাদিত হইয়া ঈশ্বরচন্দ্রকে “বিদ্যাসাগর” এই সম্মানসূচক উপাধি প্রদান করিলেন। ক্রমে ক্রমে বিদ্যাসাগরের যশােরশি চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত হইতে লাগিল। ১৮৪১ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তিনি ফোর্ট-উইলিয়ম কলেজে প্রধান পণ্ডিত নিযুক্ত হন। তাঁহার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য ও সুচারু অধ্যাপনা-কাৰ্য্য দর্শনে প্রীত হইয়া সংস্কৃত-কলেজের কর্তৃপক্ষ ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দের এপ্রেল মাসে তাঁহাকে উক্ত কলেজের সহকারী কাৰ্যাধ্যক্ষের পদ প্রদান করেন। কিন্তু তিনি পর-বৎসরেই উক্ত পদ হইতে অবসর গ্রহণ করিয়াছিলেন। ১৮৪৯ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে পুনঃপ্রবেশ করিয়া “হেডক্লার্ক” অর্থাৎ “প্রধান লেখকের” পদে নিযুক্ত হন। ফোর্ট উইলিয়ম্ অবস্থান-কালে কাপ্তেন মার্শাল সাহেব বিদ্যাসাগরকে ইংরাজী-ভাষা শিক্ষা করিতে অনুরােধ করেন; এবং তখন হইতেই তিনি ইহার শিক্ষা আরম্ভ করেন। তৎকালে সিভিলিয়ানদিগকে কলেজে [ ২১. ] পরীক্ষা করিবার জন্য হিন্দী ভাষা-শিক্ষার প্রয়ােজন হইত; এই হেতু বিদ্যাসাগরকে হিন্দী-শিক্ষাও করিতে হইয়াছিল। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে তিনি এরূপ কাৰ্যদক্ষতা ও কৰ্ম্ম-তৎপরতা দেখাইতে লাগিলেন যে, এই কলেজের তদানীন্তন অধ্যক্ষ সাহেব তাঁহাকে তদুপযুক্ত আর একটি বৃহৎ কাৰ্য্যের ভার অর্পণ করেন। ১৮৫০ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ইনি সংস্কৃত-কলেজের প্রধান সাহিত্যাধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন। নানা বিষয়ে ইহার প্রভূত পাণ্ডিত্য দেখিয়া তৎকালে এদেশীয় সমস্ত সংস্কৃতজ্ঞ সাহেব তাহার পক্ষপাতী হইয়া উঠেন। তঁাহাদিগের যত্ন ও অনুরােধে ১৮৫১ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত-কলেজের সর্বপ্রধান অধ্যক্ষ ও অধ্যাপক নিযুক্ত হইলেন। তাঁহার পূর্বতন অধ্যক্ষের সময়ে কলেজে অনেকগুলি কুনিয়ম ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই সকল কুনিয়ম দূরীভূত করিয়া তৎপরিবর্তে অনেকগুলি সুনিয়ম সংস্থাপন করেন। তৎকালে এদেশে বিদ্যালয়ের সংখ্যা অতি অল্প ছিল ; এবং যে কয়েকটি বিদ্যালয় ছিল, তাহাতে সুন্দর-রূপে শিক্ষা-কাৰ্য-প্রণালী অবলম্বিত হইত না। এজন্য গভর্ণমেন্ট ইহাকেই সাধারণ বিদ্যালয়- পরিদর্শনের ভার অর্পণ করেন। সংস্কৃত-কলেজে অধ্যাপনার সময়ে বাঙ্গালা গভর্ণমেন্টের তৎকালীন সেক্রেটারী হালিডে সাহেবের সহিত বিদ্যাসাগরের সবিশেষ আলাপ ও পরিচয় হয়। এই সময়ে এদেশে বাঙ্গালা ও সংস্কৃত ভাষার বহুল প্রচারের জন্য গভর্ণমেন্ট অত্যন্ত যত্নবান হইয়াছিলেন; এবং কিরূপ প্রণালী অবলম্বন করিলে শিক্ষার্থি-গণের উক্ত ভাষা দুইটিতে বিশেষ অধিকার জন্মে, তাহা জানিবার জন্য হালিডে সাহেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত পরামর্শ করিতেন। তাঁহারই যত্নে বিদ্যাসাগর “স্কুল ইনস্পেক্টর” নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তৎকালে বাঙ্গালা- ঐ সমস্ত [ ২২ ] প্রদেশান্তর্গত ৪টি জেলায় সর্বশুদ্ধ ২০টি “মডেল” অর্থাৎ “আদর্শ বিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছিল ; এবং এই সকল স্কুলের পরিদর্শনের ভার বিদ্যাসাগর মহাশয়েরই উপরি ন্যস্ত ছিল। তৎপূৰ্বে স্ত্রীশিক্ষার পরমােৎসাহী বেথুন সাহেব বাঙ্গালী বালিকাদিগকে শিক্ষাদান করিবার জন্য কলিকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া- ছিলেন, এবং কয়েক বৎসর পরে তাহার মৃত্যু হওয়াতে বিদ্যাসাগর ঐ বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। এই সময়ে ইনি হালিডে সাহেবের উৎসাহ-বাক্যে প্রােৎসাহিত হইয়া বাঙ্গালার স্থানে স্থানে প্রায় ৫০/৬০টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, গভর্ণমেন্ট এই কার্যে বিশেষ মনােযােগ করিলেন না। কিয়দিবস পরে বিদ্যাসাগর বালিকা- বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়াদির তালিকা পাঠাইয়া দিলে গভর্ণমেন্ট ঐ টাকা দিতে অসম্মত হইলেন। যাহার উৎসাহ-বাক্যে প্রােৎসাহিত হইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় বিপুল অর্থ ও কঠোর পরিশ্রম-সাপেক্ষ এই বৃহৎ ব্যাপারে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন, সেই হালিডে সাহেবও তখন এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ও নিরুত্তর রহিলেন। তখন বিদ্যাসাগর নিরুপায় হইয়া স্বয়ং এই সমস্ত ব্যয়ভার নির্বাহ করিয়া বিদ্যালয়গুলি কয়েক দিন চালাইয়াছিলেন। তৎকালে বিদ্যাসাগরের এক জন বন্ধু “তত্ত্ববােধিনী”-পত্রিকার কাৰ্যাধ্যক্ষ ছিলেন। কেহ কোনও বিষয় তত্ত্ববােধিনীর জন্য লিখিয়া পাঠাইলে তিনি তাহা দেখিয়া দিতেন ও পরে তাহা তত্ত্ববােধিনীতে প্রকাশিত বিদ্যাসাগর ঐ বন্ধুর নিকটে ইংরাজী-ভাষা আলােচনা করিতে যাইতেন, এবং তাহারই অনুরােধে তত্ত্ববােধিনীর প্রবন্ধাদি মধ্যে মধ্যে সংশােধন করিয়া দিতেন। ক্রমে তত্ত্ববােধিনীর লেখক-গণ বিদ্যাসাগরের পরিচয় পাইলেন । তত্ত্ববােধিনী-পত্রিকার হইত।

[ ২৩ ] তৎকালীন সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত স্বয়ং বিদ্যাসাগরের নিকটে গিয়া তাঁহাকে তত্ত্ববােধিনীতে প্রবন্ধাদি লিখিতে অনুরােধ করেন। এবং স্বয়ং যে সকল গ্রন্থ লিখিতেন, তাহাও বিদ্যাসাগর-দ্বারা সংশােধন করাইয়া মুদ্রিত করিতেন। বস্তুতঃ বিদ্যাসাগরেরই সাহায্যে অক্ষয়কুমারের রচনাপ্রণালী প্রাঞ্জল হইয়াছিল। অক্ষয়কুমার দত্তের অনুরােধে বিদ্যাসাগর মহাশয় মধ্যে মধ্যে তত্ত্ববােধিনীতে প্রবন্ধাদি লিখিতে লাগিলেন। ইনিই সর্বাগ্রে মহাভারতের বঙ্গানুবাদ তত্ত্ব- বােধিনীতে প্রকাশ করেন।* তৎকালে তত্ত্ববােধিনী-সভার সভ্যগণের অনুরােধে তিনি সেই সভার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হইয়াছিলেন; কিন্তু কিছুদিন পরেই কোন বিশেষ কারণে তত্ত্ববােধিনীর সংস্রব-ত্যাগ করেন। ইতঃপূৰ্বে ১৮৫৩ খৃষ্টাব্দে, বিদ্যাসাগর নিজ জন্মভূমি বীরসিংহে তত্ৰত্য দরিদ্র বালক-বালিকাগণের উপকারার্থ একটী অবৈতনিক বিদ্যালয় সংস্থাপন করেন। রাখাল বালকের দিবাভাগে অবকাশ পাইত না বলিয়া, তাহাদিগকে শিক্ষা দিবার জন্য রাত্রিকালেও বিদ্যালয় বসিত। বিদ্যালয়-স্থাপনের পরে তিনি নিজ গ্রামে একটী দাতব্য-চিকিৎসালয়ও সংস্থাপন করেন। বিদ্যালয় হইতে সংস্কৃত-শিক্ষা উঠাইয়া দিবার প্রস্তাব করেন। অনেক কৃতবিদ্য সাহেব এবং বাঙ্গালীও ঐ প্রস্তাবের পক্ষপাতী হয়েন। বিদ্যাসাগর মহাশয় এই অন্যায় কাৰ্য রহিত করিবার জন্য সবিশেষ সচেষ্ট হন। ইনি তৎকালীন এই সময়ে গভর্ণমেন্ট, * বিদ্যাসাগর-কৃত মহাভারতের বঙ্গানুবাদ সম্পূর্ণ হয় নাই। কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁহারই অনুবাদ দেখিয়া ও তাঁহারই পরামর্শ লইয়া পণ্ডিতগণের সাহায্যে মহাভারতের সম্পূর্ণ বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেন।

[ ২৪ ] অনেকানেক কৃতবিদ্য ব্যক্তির মত খণ্ডন করেন, এবং যাহাতে ভারতবর্ষে সংস্কৃত ভাষার বহুল প্রচার হয়, তদ্বিষয়ে তিনি গভর্ণমেন্টের নিকটে আবেদন করেন। বিদ্যাসাগরের আবেদনপত্র সাদরে গৃহীত হইল, এবং গভর্ণমেন্ট ভারতবর্ষের যাবতীয় বিদ্যালয়ে সংস্কৃত শিক্ষা প্রচারের আদেশ দিলেন। এই সময়, যাহাতে লােকে অনায়াসে সংস্কৃত-ভাষা শিক্ষা করিতে পারে, তদ্বিষয়ে বিদ্যাসাগর সহজ সহজ সংস্কৃত পাঠ্য-পুস্তক রচনা করেন। “বিধবা-বিবাহ”-প্রচলন-চেষ্টা বিদ্যাসাগরের জীবনের অন্যতম প্রধান ঘটনা। কিন্তু ইহার দোষগুণ বিচার করা এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধের অভিপ্রেত নহে। ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দে বিধবা-বিবাহ প্রচলন করিবার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর হন। তৎকালে সমস্ত স্মৃতিশাস্ত্র হইতে বিধবা- বিবাহ-বিষয়ে তিনি যে সকল ব্যবস্থা সংগ্রহ করেন, তাহাতে তাহার শাস্ত্ৰ-পারদর্শিতা বিলক্ষণ ব্যক্ত হইয়াছে। বিদ্যাসাগরের অনুসন্ধিৎসা- বৃত্তি যে কিরূপ বলবতী ছিল, তাহা তৎকৃত ব্যবস্থা-সংগ্রহে বিলক্ষণ অনুভূত হয়। এই সময়ে হিন্দুসমাজের অনেকানেক অনেকানেক নিরক্ষর, কৃতবিদ্য ও সম্রান্ত সকল শ্রেণীর লােকই বিদ্যাসাগরের প্রতি খঙ্গ- হস্ত হইয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর দেশীয় লােকের গ্লানি, কুৎসা ও নিন্দাবাদ অকাতরভাবে সহ করিয়া ও প্রতিবাদি-গণের মত খণ্ডন করিয়া স্বীয় গন্তব্য পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইলেন। তৎকালে স্মার্ত-কুল-ভূষণ ভরতচন্দ্র শিরােমণি ও অন্যান্য অনেকানেক কৃতবিদ্য অধ্যাপক বিদ্যাসাগরের সাহায্য করেন। তাঁহারই যত্ন ও চেষ্টায় গভর্ণমেণ্ট বিধবা-বিবাহ-প্ৰচলনাৰ্থ ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে ৫ আইন লিপিবদ্ধ করিলেন। বিদ্যাসাগরের যত্নে কয়েকটী বিধবা-বিবাহ সমাহিত হইল। এই সময়ে বিদ্যাসাগর সমাজের একটী সবিশেষ হিতকর কাৰ্য্যে মননানিবেশ করেন। এদেশে বহু-বিবাহ-রূপ কুপ্রথা বহুদিন হইতেই [ ২৫ ] চলিয়া আসিতেছিল। এই কুপ্রথায় হিন্দুসমাজের যে কত অনিষ্ট হইয়াছে, তাহা বর্ণনাতীত। এই কুপ্রথা উঠাইয়া দিবার জন্য বিদ্যাসাগর প্রাণপণে চেষ্টা করিয়াছিলেন। এই উপলক্ষে তিনি “বহু-বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না, এতদ্বিষয়ক বিচার”-নামক একখানি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, এবং প্রায় সমস্ত দেশীয় কৃতবিদ্য পণ্ডিত ও সন্ত্রান্ত ব্যক্তিকে বহু-বিবাহ রহিত করিবার জন্য উত্তেজিত করিয়া তুলেন। এই কাৰ্যে কৃষ্ণনগরের রাজা শ্রীশচন্দ্র, বিদ্যাসাগরকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছিলেন। কিন্তু তৎকালে সিপাহী-বিদ্রোহ উপস্থিত হওয়াতে গভর্ণমেন্ট বহু-বিবাহ রহিত করিবার আইন লিপিবদ্ধ করিতে পারেন নাই। ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে নানা কারণে বিরক্ত হইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃত-কলেজের অধ্যক্ষতা ও স্কুল-ইনস্পেক্টরের পদ পরিত্যাগ করেন। কিয়দ্দিন পরে তিনি নিজ তত্ত্বাবধানে নিজ ব্যয়ে মেট্রোপলিট্যান্-স্কুল নামক একটী ইংরাজী-বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই সময়ে গভর্ণমেন্ট-বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয় সাহেবগণ গৰ্ব করিয়া বলিতেন যে, বাঙ্গালীদিগের ইংরাজী কলেজ চালাইবার ক্ষমতা নাই। ইংরাজ ভিন্ন বাঙ্গালীর কলেজ রক্ষা করা অসম্ভব। বিদ্যাসাগর তাঁহাদিগের এই কথা অগ্রাহ করিয়া নিজ বিদ্যালয়ে বাঙ্গালীদিগের মধ্যে সর্ব প্রথমে কলেজ ক্ল্যাস খুলিলেন; এই কলেজ লইয়া বেলি সাহেবের সহিত তাঁহার অনেক কথা হইয়াছিল। বেলি সাহেব বলেন,—“বিদ্যাসাগর, আপনি কিরূপে নিজ কলেজ চালাইবেন ? ইংরাজ-সাহায্য ভিন্ন ইংরাজী কলেজ চলিতে পারে না।” বিদ্যাসাগর বলিলেন,-আমি আপন ছাত্রগণকে উত্তমরূপে ইংরাজী-বিদ্যা শিখাইতে ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করাইতে পারিব, ইহা নিশ্চিত।” ফলে তাহাই [ ২৬ ] হইল। এখন তাঁহারই বহুযত্নে স্থাপিত কয়েকটী বিদ্যালয় ও একটি কলেজ চলিতেছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পূর্বে বাঙ্গালা ভাষা সরল ও সুগম ছিল , এবং তখন ইহা বর্তমান সময়ের বাঙ্গালা ভাষার মত পরিশুদ্ধ হয় নাই। সাধারণ লােকে যাহাতে অনায়াসে বাঙ্গালা-ভাষা শিক্ষা করিতে পারে, তদ্বিষয়ে বিদ্যাসাগর অনেকগুলি বাঙ্গালা পাঠ্য-পুস্তক রচনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সামসময়িক অনেকানেক কৃতবিদ্য লােক ছিলেন বটে, কিন্তু কেহই বাঙ্গাল- ভাষার উন্নতি-সাধনে সচেষ্ট হন নাই। ইনি যে যে গ্রন্থ রচনা করেন, নিম্নে তাহার তালিকা দেওয়া গেল :- পুস্তকের নাম। রচনাকাল। ১৮৪৭ খৃষ্টাব্দ বেতাল পঞ্চবিংশতি বাঙ্গালার ইতিহাস জীবনচরিত ১৮৪৮ ১৮৫০ ১৮৫১ ১৮৫২ বােধােদয় উপক্রমণিকা ব্যাকরণ ঋজুপাঠ ( তিন ভাগ ) ব্যাকরণ কৌমুদী ১ম ভাগ ঐ ২য় ও ৩য় ভাগ ১৮ ৫২ ১৮৫৬ ১৮৫৪ ১৮৫৪ ১৮৫৬ শকুন্তলা বিধবা-বিবাহ ১ম ভাগ ঐ ২য় ভাগ। বর্ণপরিচয় (১ম ও ২য় ভাগ) ঐ * ঐ ঐ কথামালা [ ২৭ ] পুস্তকের নাম । রচনাকাল ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দ ১৮৫৭ ১৮৬০ সংস্কৃত সাহিত্য ও সাহিত্য-বিষয়ক প্রস্তাব চরিতাবলী মহাভারতের উপক্রমণিকা সীতার বনবাস ব্যাকরণ কৌমুদী ৪র্থ ভাগ আখ্যান-মঞ্জরী ১ম ভাগ ঐ ২য় গগ ১৮৬২ ১৮৬২ ১৮৬৪ ১৮৬৮ ১৮৬৮ ৩য় ভাগ ভ্রান্তিবিলাস বহু-বিবাহ ( রহিত হওয়া উচিত কি না ) ১৮৭০ ১৮৭১ বৰ্ত্তমান বিশুদ্ধ বাঙ্গালা-ভাষা যেরূপ আকার ধারণ করিয়াছে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ই তাহার সর্বপ্রধান নেতা ও প্রবর্তক। তাঁহারই ভাষা-প্রণালী অবলম্বন করিয়া যে বর্তমান বঙ্গীয় লেখকগণ নানারূপে ও নানাভাবে বাঙ্গালা গ্রন্থ রচনা করিতেছেন, তাহা বিদ্বজ্জন-মাত্রেই স্বীকার করিয়া থাকেন। গত কয়েক বৎসর হইতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্বাস্থ্য নষ্ট হইয়া আসিতেছিল। ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে তিনি ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে তিনি মিস্ মেরি কার্পেন্টারের সহিত উত্তরপাড়ার হিতকরী সভা ও বালিকাবিদ্যালয় পরিদর্শন করিতে যান, কিন্তু প্রত্যাগমন-কালে পথিমধ্যে গাড়ীখানি উল্টাইয়া যাওয়াতে তিনি দুরে তিনি দূরে নিক্ষিপ্ত হইয়া সংজ্ঞাশূন্য হইয়া পড়েন; ইহাতে তাহার সর্বাঙ্গে দারুণ আঘাত লাগে। বহু চিকিৎসার পরে তাঁহার অন্যান্য অঙ্গের আঘাতজনিত দোষ দূরীভূত হইয়া যায় বটে, কিন্তু তাহার যকৃৎ ও পাকস্থলীর দোষ : কিছুতেই । [ ২৮ ] দূরীভূত হইল না। ক্রমে ক্রমে তাঁহার পরিপাচিকা শক্তি অন্তৰ্হিতা হইতে লাগিল, এবং যথােচিত আহার করিতে না পারায় তিনি নিতান্ত দুর্বল হইয়া পড়িতে লাগিলেন। অবশেষে তিনি অনন্যোপায় হইয়া মফিয়া (আফিমের আরক) সেবন করিতে বাধ্য হন। এইরূপে কয়েক বৎসর নানাবিধ ঔষধ সেবন করিয়া আসিলেও তাহার অগ্নিমান্দ্য অপনীত হইল না ; অধিকন্তু তাহার নষ্ট স্বাস্থ্য আরও বিনষ্ট হইয়া আসিতে লাগিল। ১২৯৮ সালের ৩১ জ্যৈষ্ঠ দিবসে তাহার পৃষ্ঠের ও বক্ষঃস্থলের দক্ষিণ ভাগে অসহ্য যন্ত্রণা উপস্থিত হয়। একজন মুসলমান চিকিৎসক আসিয়া তাহার চিকিৎসা করেন, কিন্তু তাহার চিকিৎসা ফলবতী হইল না। অবশেষে কয়েকজন বাঙ্গালী ও ইংরাজ ডাক্তার আসিয়া তাহার ঔষধ সেবনের ব্যবস্থা করিয়া দেন। কিন্তু বিদ্যাসাগরের অন্তিম কাল উপস্থিত হইয়াছিল, এজন্য কাহারও চিকিৎসা ফলবতী হইল না। মাসাধিক কাল যন্ত্রণা সহ করিয়া ও অনাহারে থাকিয়া তিনি ক্রমে ক্রমে অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িলেন। অবশেষে ১৩ই শ্রাবণ তাহার জ্বর ভয়ঙ্কর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, এবং ঐ দিন রাত্রি ২টা ১৮ মিনিটের সময় তিনি চারিটী কন্যা ও একটী পুত্র রাখিয়া ইহলােক পরিত্যাগ করিয়া যান। মৃত্যুকালে তার বয়ঃক্রম ৭১ বৎসর হইয়াছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় দরিদ্রের সন্তান ছিলেন। দরিদ্রতার সহিত কঠোর সংগ্রামে তাহার সমস্ত বাল্যকাল অতিবাহিত হইয়াছিল। কিন্তু অগাধ পরিশ্রম, অনন্ত অধ্যবসায় ও অসীম ধৈৰ্য-প্রভাবে তিনি সমস্ত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়া সেই সংগ্রামে জয়লাভ করিয়া- ছিলেন। কোটীশ্বর পুরুষ অসামান্য ক্ষমতা ও অপরিমিত অর্থ প্রয়ােগ করিয়া যে সম্মানের অধিকারী হইতে পারেন না, বিদ্যাসাগর মহাশয় একজন নিরন্ন দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান হইয়াও সেই সম্মান [ ২৯ ] লাভ করিয়াছিলেন। ইহার একমাত্র কারণ এই যে, তাহার অমানুষী মানসী শক্তির সহিত তাহার মহীয়সী হৃদয়বত্তার সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য ছিল। ধনগর্বিত বা ক্ষমতাদৃপ্ত লক্ষপতির নিকটে তিনি যেরূপ প্রদীপ্ত মধ্যাহ্ন-তপনের ন্যায় শােভমান হইতেন, চির-দরিদ্র ও হীন- শক্তি অনাথের নিকটেও তিনি সেইরূপ সুস্নিগ্ধ শশধরের ন্যায় প্রশান্ত-ভাবের প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রদান করিতেন। এক দিকে তিনি যেরূপ মনস্বী ও স্পষ্টবাদী ছিলেন, অন্যদিকে তিনি সেইরূপ হৃদয়বা ও প্রিয়ভাষী ছিলেন। একাধারে এরূপ পরস্পর-বিরােধী বিভিন্ন গুণের অপূৰ্ব সম্মিলন বর্তমান সময়ে প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় না। দানশীলতা ও পর-দুঃখ-কাতরতা প্রভৃতি মনুষোচিত যাবতীয় সদগণ তাঁহাকে বিভূষিত করিয়া রাখিয়াছিল। তাঁহার পুস্তক-বিক্রয়ের বার্ষিক আয় ন্যূনকল্পে ৫০ সহস্র টাকা ছিল। তিনি স্বকীয় ভােগ-বিলাসের জন্য ইহার কপর্দক-মাত্র ব্যয় না করিয়া তদ্বারা বহুসংখ্যক নিরাশ্রয় ও নিঃসহায় দরিদ্রকে প্রতিপালন করিতেন। নিরন্ন, নির্বস্তু বা বিপন্ন ব্যক্তিকে ক্রন্দন করিতে দেখিলে তিনি অশ্রুমােচন না করিয়া থাকিতে পারিতেন না। তঁাহার আত্ম-পর-প্রভেদ ছিল না। এজন্য তাহার স্বার্থ কেবল পরার্থেই নিয়ােজিত হইত; অর্থাৎ সাধারণ লােকের হিতসাধন করিবার জন্যই তিনি এ সংসারে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। “মেট্রপলিট্যান ইষ্টিটিউস” বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অক্ষয় কীর্তি- । তিনি ইহার অনুষ্ঠান ও নির্মাণে যে কিরূপ পরিশ্রম, আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তাহা বর্ণনাতীত। এই বিদ্যালয়টী হইতে বাঙ্গালা-দেশের যে কত দূর উন্নতি-সাধন হইয়াছে, তাহা বলা যায় না। •

No text on this page.

সূচীপত্র
বিষয়
পৃষ্ঠ
০ ০ ০
প্রথম অঙ্ক
১
০ ০ ০
০ ০ ০
দ্বিতীয় অঙ্ক
৩০
88
৫ .
তৃতীয় অঙ্ক
চতুর্থ অঙ্ক
see
০ ০ ০
৮৬
পঞ্চম অঙ্ক
০ ০
ষষ্ঠ
•••
১০৮
nrn
১২২
সপ্তম অঙ্ক

No text on this page.

শকুন্তলা। প্রথম অঙ্ক। ; মৃগয়ার্থ দুষ্যন্তের বন-গমন ;-মৃগের প্রতি শরের সন্ধান ও তাহার প্রতিসংহার ;- ক-মুনির আশ্রমে প্রবেশ ;-পরিণয়-সূচক লক্ষণ-দর্শন;-অনসূয়া, প্রিয়ংবদা ও শকুন্তলার বৃক্ষে জলসেচন ;-শকুন্তলার রূপ-লাবণ্যে দুষ্যন্তের মনােহরণ ;-ভ্রমর-কর্তৃক শকুন্তলার উৎপীড়ন;—দুষ্যন্তের অভয়-প্রদান সখীত্রয়-কর্তৃক দুষ্যন্তের দর্শন, কথোপকথন ও আতিথ্য-সৎকার ;-শকুন্তলার পাণিগ্রহণে দুষ্যন্তের লালসা এবং দুষ্যন্তের প্রতি শকুন্তলারও অনুরাগ-সঞ্চার ;-আরণ্য-গজের উপদ্রব-নিবারণার্থ দুষ্যন্তের প্রস্থান। অতি পূর্বকালে ভারতবর্ষে দুষ্যন্ত-নামক এক সম্রাট ছিলেন। তিনি একদা বহুসংখ্যক সৈন্য-সামন্ত সমভিব্যাহারে লইয়া মৃগয়ার্থ গমন করিয়াছিলেন। এক দিন মৃগের অনুসন্ধানে বনমধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে তিনি এক হরিণ- ১ সম্রাট=“যেনেষ্টং রাজসূয়েন মণ্ডলস্যেরশ্চ যঃ। শাস্তি যাজ্ঞয়া রাজ্ঞঃ স সম্রাডভিধীয়তে।” যিনি রাজসূয় যজ্ঞ করিয়াছেন, যিনি রাজমণ্ডলের অধীশ্বর এবং যিনি আজ্ঞাদ্বারা রাজগণকে শাসন করেন, তিনিই প্রকৃত সম্রাট। সম্+রা+কিপ (কর্তৃবাচ্যে )=সম্রাজ, ১মার একবচনে সম্রাট। পুংলিঙ্গে সম্রাট, স্ত্রীলিঙ্গেও সম্রাট-সম্রাজী নহে, সম্রাজ্ঞীও নহে। সংস্কৃত মন্ত্রে “সম্রাজ্ঞী শ্বশুরে ভব” এইরূপ প্রয়ােগ আছে বটে, কিন্তু ইহা আষ। সম্রাট=সম্রাট,পূর্বোক্ত প্রসিদ্ধ অর্থ २ শকুন্তলা। শিশুকে লক্ষ্য করিয়া শরাসনে ১ শরসন্ধান করিলেন। হরিণ- শিশু তদীয় অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া প্রাণভয়ে দ্রুতবেগে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। রাজা রথারূঢ় থাকিয়া সারথিকে আজ্ঞা দিলেন, মৃগের পশ্চাৎ রথচালন কর। সারথি কশাঘাত করিবামাত্র অশ্বগণ বায়ুবেগে ধাবমান হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে রথ মৃগের সন্নিহিত ২ হইলে রাজা শর- নিক্ষেপের উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে দূর হইতে দুই তপস্বী ৩ উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, মহারাজ ! আশ্রম-মৃগ, বধ করিবেন না, বধ করিবেন না। সারথি শুনিয়া অবলােকন করিয়া কহিল, মহারাজ! দুই তপন্থী এই মৃগের প্রাণবধ করিতে নিষেধ করিতেছেন। রাজা তপস্বীর (রাজাধিরাজ ) বুঝাইলে ম্ স্থানে অনুস্বার হয় না; কিন্তু তদ্ভিন্ন অর্থে হয়, যথা—সংরাট (চন্দ্র)। কেহ কেহ কহেন, কহেন, রাজন্ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গে যে “রাজ্ঞী” হয়, তাহার সহিত সম্ এই অব্যয়ের সমাস করিলেই “সম্রাজ্ঞী” এই পদ হইতে পারে। কিন্তু ইহা ব্যাকরণ-সঙ্গত নহে। কারণ সম্রাজ্ঞী সন্ধি করিলে “সংরাজ্ঞী” হয়, “সম্রাজ্ঞী হয় না। ১ শরাসন=শর+অসন। অসন==নিক্ষেপ, অস্+অনটু। শরের, অসন হয় যাহা হইতে (বহু)= ধনুঃ। ২ সন্নিহিত = নিকটবর্তী। সম্+নি+ধ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে --সন্নিধান। ৩ তপস্বী= তপস+ বিন্তপস্বিন্ শব্দ, পুংলিঙ্গ, ১মার একবচন স্ত্রীলিঙ্গে—তপস্বিনী।

প্রথম অঙ্ক। উল্লেখ-শ্রবণমাত্র নিতান্ত ব্যস্ত হইয়া সারথিকে কহিলেন, সত্বর রশ্মি ১ সংযত করিয়া রথের বেগ-সংবরণ কর। সারথি, যে আজ্ঞা মহারাজ! বলিয়া রশ্মি সংযত করিল। এই অবকাশে তপস্বীরা রথের সন্নিহিত হইয়া কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! আশ্রম-মৃগ, বধ করিবেন না। আপনার বাণ অতি তীক্ষ্ণ ও বজ্রসম,—ক্ষীণজীবী স্বল্পপ্রাণ ৩ মৃগ-শাবকের উপরি নিক্ষিপ্ত হইবার যােগ্য নহে। আপনি শরাসনে যে শর সংহিত ৪ আশু তাহার প্রতিসংহার ৫ করুন। আপনার শস্ত্র আৰ্তের পরিত্রাণের নিমিত্ত,—নিরপরাধের ৬ প্রহারের নিমিত্ত নহে। রাজা কুণ্ঠিত হইয়া তৎক্ষণাৎ সংহিত শরের প্রতিসংহরণ- ? করিয়াছেন, ১ রশ্মি = প্ৰগ্ৰহ, লাগাম। অন্যাৰ্থ—কিরণ। সংযত = বদ্ধ, আকৃষ্ট। সম্+যম্‌+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে ২ সংযম। ৫ ৩ স্বল্পপ্রাণ =সু (অত্যন্ত) অল্প স্বল্প (কৰ্ম্ম ); স্বল্প হইয়াছে প্রাণ যাহার (বহু)। ৪ সংহিত= যােজিত। সম্+ধা+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষে সন্ধান। প্রতিসংহার =শরাসন হইতে গ্রহণ করিয়া তুণীরে পুনঃস্থাপন। প্রতি+স++ঘ, বিশেষ্য। বিশেষণে—প্ৰতিসংহৃত। ৬ নিরপরাধের =কৰ্ম্মে ৬ষ্ঠী, নিরপরাধকে প্রহার। নাই অপরাধ যাহার (বহু )। স্ত্রীলিঙ্গে—নিরপরাধ। ৭ প্রতিসংহরণ = প্রতি+সম্+হৃ+অনট। প্রতিসংহার (৫) দেখ।

৪ ১ হউন। শকুন্তলা। পূর্বক প্রণাম করিলেন । তপস্বীরা, দীর্ঘায়ুরস্তু বলিয়া, হস্ত তুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন, এবং কহিলেন, মহারাজ! আপনি যে বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, আপনার এই বিনয় ও সৌজন্য তাহারই উপযুক্ত বটে। প্রার্থনা করি, আপনি সত্বর পুত্রলাভ করুন, এবং সেই পুত্র এই সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধীশ্বর রাজা প্রণাম করিয়া কহিলেন, ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ শিরােধার্য্য করিলাম। অনন্তর তাপসেরা কহিলেন, মহারাজ! ঐ মালিনী নদীর তীরে আমাদের গুরু মহর্ষি করে আশ্রম দেখা যাইতেছে ; যদি কাৰ্য্যক্ষতি না হয়, সেই স্থানে গিয়া অতিথি-সৎকার গ্রহণ করুন। আর তপস্বীরা কেমন নির্বিঘ্নে ধৰ্ম্মকাৰ্যের অনুষ্ঠান করিতেছেন, ইহা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়া বুঝিতে পারিবেন, আপনার ভুজবলে ভূমণ্ডল কিরূপ শাসিত ২ ; ৩ ১ উহ দীর্ঘায়ুরন্তু = দীর্ঘ+ আয়ুঃ+অস্তু। দীর্ঘ হইয়াছে আয়ুঃ যাহার (বহু )=দীর্ঘায়ুঃ অর্থাৎ দীর্ঘজীবী। “ভবা” এই উহ পদের বিশেষণ। ভবান্ অর্থাৎ আপনি। অস্তু = অ ধাতু লােট, ১ম পুরুষের একবচন ; সমাপিকা ক্রিয়া, কর্তা “ভবা” অর্থাৎ হউন। দীর্ঘায়ুরস্তু অর্থাৎ আপনি দীর্ঘজীবী হউন। অথবা দীর্ঘ এমন আয়ুঃ (কর্মধা)। আয়ুঃ =জীবন-কাল। অস্তু =হউক। ( আপনার) জীবন-কাল দীর্ঘ হউক। ২ মালিনী =নদী-বিশেষ। ৩ শাসিত =শাণি+ক্ত। (শা+ক্ত= শিষ্ট)। বিশেয্যে শাসন।

প্রথম অঙ্ক। • २ হইতেছে। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, মহর্ষি আশ্রমে আছেন ? তপস্বীরা কহিলেন, না মহারাজ! তিনি আশ্রমে নাই ; এই মাত্র স্বীয়া তনয়া শকুন্তলার হস্তে অতিথি-সৎকারের ভারাপণ করিয়া তদীয় দুর্দৈব-শান্তির নিমিত্ত সােমতীর্থে প্রস্থান করিলেন। রাজা কহিলেন, মহর্ষি আশ্রমে নাই, তাহাতে কোনও ক্ষতি নাই। আমি অবিলম্বে তদীয় পােবন দর্শন করিয়া আত্মাকে পবিত্র করিতেছি। তখন তাপসেরা, এক্ষণে আমরা চলিলাম, ইহা বলিয়া প্রস্থান করিলেন। রাজা সারথিকে কহিলেন, সূত! ৩ রথ-চালন কর, আমি তপােবন-দর্শন-দ্বারা আত্মাকে পবিত্র করিব। সারথি ভূপতির আদেশ প্রাপ্ত হইয়া পুনর্বার রথ-চালন করিল। রাজা কিয়দ্র গমন ও ইতস্ততঃ দৃষ্টি-সঞ্চারণ করিয়া কহিলেন, সূত! কেহ বলিয়া দিতেছে না, তথাপি ইহা পােবন বলিয়া বােধ হইতেছে। দেখ! কোটর-স্থিত শুকের মুখভ্রষ্ট ও নীবার সকল তরুতলে পতিত রহিয়াছে ; তপস্বীরা যাহাতে ১ দুর্দৈব-শান্তি=দুরদৃষ্টের প্রতীকার। “পূৰ্বজন্মকৃতং কৰ্ম্ম তদৈব- মিতি কথ্যতে”। পূৰ্ব্ব-জন্ম-কৃত কৰ্ম্মকেই দৈব বলে। ২ সােমতীর্থ=তীর্থ-বিশেষ। সূত=সারথি। মুখভ্রষ্ট=মুখ হইতে ভ্ৰষ্ট (পতিত )—৫মী তৎ। ভ্ৰষ্ট=প্রশ+ ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যেভ্রংশ। নীবার =তৃণ ধান্য, উড়ি ধান। নি+বৃ+ঘ -ধান্য অর্থে উপসর্গের ইকার দীর্ঘ হয়। ৪ শকুন্তলা। ও ইদী-ফল ভাঙ্গিয়াছেন, সেই সকল উপল-খণ্ড তৈলাক্ত পতিত আছে; ঐ দেখ, কুশ-ভূমিতে হরিণ-শাবক সকল নিঃশঙ্কচিত্তে চরিয়া বেড়াইতেছে ; এবং যজ্ঞীয় ধূমের সমাগমে নব পল্লব সকল মলিন হইয়া গিয়াছে। সারথি কহিল, মহারাজ! যথার্থই বলিয়াছেন। রাজা কিঞ্চিৎ পথ গমন করিয়া সারথিকে কহিলেন, সূত! আশ্রমের উৎপীড়ন হওয়া উচিত নহে; অতএব এই স্থানেই রথ রক্ষা কর, আমি অবতীর্ণ • হইতেছি। সারথি রশ্মি সংযত করিল। রাজা রথ হইতে অবতীর্ণ হইলেন। অনন্তর তিনি স্বীয় শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, সূত। তপােবনে বিনীত-বেশে প্রবেশ করাই বিধেয় ; অতএব শরাসন ও সমস্ত আভরণ রাখ। ইহা বলিয়া রাজা সেই সমস্ত সূত-হস্তে ন্যস্ত ও করিলেন, এবং কহিলেন, অদ্য অশ্ব- গণের সাতিশয় পরিশ্রম হইয়াছে ; অতএব আশ্রমবাসীদিগের দর্শন-লাভ করিয়া প্রত্যাগমন করিবার পূর্বেই উহাদিগকে ; ১ ইক্ষুদী-ফল=তৈলময় ফল-বিশেষ। পূৰ্বকালে তপস্বিগণ এই ফলের তৈল ব্যবহার করিতেন। ইহার অপর নাম ইঙ্গুলী-ফল। ২ উপল-খণ্ড = প্রস্তরখণ্ড। তৈলাক্ত=তৈলদ্বারা অক্ত (মণ্ডিত )—৩য় তৎ। অনজ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—অঞ্জন। অবতীর্ণ=অব+কৃ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—অবতরণ। ন্যস্ত = স্থাপিত। নি+অ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে—স্যাস। ৪ == ৫

প্রথম অঙ্ক।
উত্তমরূপে বিশ্রাম করাও। সারথিকে এই আদেশ প্রদান
করিয়া রাজা তপােবনে প্রবেশ করিলেন।
তপােবনে প্রবেশ করিবামাত্র তদীয় দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত।
হইতে লাগিল। তপােবনে পরিণয়-সূচক লক্ষণ
দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন-ভাবে মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই
আশ্রম-পদ ও শান্ত-রসাস্পদ, থচ আমার দক্ষিণ বাহু
স্পন্দিত হইতেছে; ঈদৃশ স্থানে মাদৃশ ৬ জনের এতদনুযায়ী
ফল-লাভের সম্ভাবনা কোথায় ! অথবা, ভবিতব্যের ৮ দ্বার
সর্বত্রই থাকিতে পারে। মনে মনে তিনি এই আন্দোলন
৪
১ স্পন্দিত = কম্পিত। স্পন্দ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—স্পন্দন।
২ পরিণয়-সূচক = বিবাহ-জ্ঞাপক, অর্থাৎ যাহা বিবাহের বিষয়
জানাইয়া দেয়। পরিণয়ের সূচক (৬ষ্ঠীতৎ)। সূচক =সূচ+ণক ;
স্ত্রীলিঙ্গে-সূচিকা। কথিত আছে, যাহার দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত হয়,
তিনি রমণীয় স্ত্রীর লাভ করেন।
“বামেতরকরস্পলো বস্ত্ৰীলাভসূচকঃ।”
৩ আশ্রম-পদ = আশ্রমই পদ অর্থাৎ স্থান (কৰ্ম্মধা)।
• শান্ত-রসাস্পদ=শান্ত (শান্তিপূর্ণ ) এমন রস (কর্মধা), তাহার
আম্পদ অর্থাৎ স্থান (৬ষ্ঠী তৎ )।
ঈদৃশ = এরূপ। ইদম্+দৃশ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—ঈদৃশী ।
৬ মাদৃশ=আমার মত। অম্মদ+দৃশ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে-মাদৃশী।
৭ এতদনুযায়ী = ইহার অনুরূপ।
৬ষ্ঠাতৎ ।
অনু+যা+ণি।
স্ত্রীলিঙ্গে–অনুযায়িনী।
৮ ভবিতব্য = যাহা অবশ্যই হইবে। ভূ+তব্য (কর্তৃবাচ্যে)।

শকুন্তলা। জলসেচন করিতেছেন, এমন সময়ে, প্রিয়সখি ! এ দিকে, এ দিকে, এই শব্দ রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। রাজা ইহা শ্রবণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, বৃক্ষ-বাটিকার ১ দক্ষিণ-দিকে যেন স্ত্রীলােকের আলাপ শুনা যাইতেছে ;—ব্যাপার কি, অনুসন্ধান করিতে হইল ইহা বলিয়া কিঞ্চিদ্র গমন করিয়া রাজা দেখিতে পাইলেন, তিনটী অল্পবয়স্কা তপস্বি-কন্যা অনতিবৃহৎ সেচন- কলস লইয়া আলবালে ২ করিতে আসিতেছেন। রাজা তাঁহাদের রূপের মাধুরী-দর্শনে চমৎকৃত হইয়া কহিতে লাগিলেন, ইহারা আশ্রমবাসিনী; ইহাদের মত রূপবতী রমণী আমারও অন্তঃপুরে নাই। বুঝিলাম, আজি উদ্যান-লতা সৌন্দৰ্য-গুণে বন-লতার নিকট পরাজিত হইল। ইহা বলিয়া তরুতলে দণ্ডায়মান হইয়া রাজা অনিমিষ-নয়নে হাদিগকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। শকুন্তলা, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা-নাম্নী দুই সহচরীর সহিত বৃক্ষ-বাটিকায় উপস্থিত হইয়া আলবালে জলসেচন করিতে আরম্ভ করিলেন। অনসূয়া পরিহাস-পূর্বক শকুন্তলাকে কহি- বৃক্ষ-বাটিকা =উপবন, নিকুঞ্জ। বৃক্ষের বাটিকা (৬ষ্ঠী তং)। বাটিকা = আবৃত স্থান, বাড়ী। ২ আলবাল =বৃক্ষমূলে বেষ্টিত জলাধার। ৩ অনিমিষ-নয়নে=একদৃষ্টিতে। নিমিষ বা নিমেষ = নেত্ৰ-নিমীলন অর্থাৎ চোখের পাতা পড়া। নাই নিমিষ যাহাতে (বহু)। অনিমিষ হইয়াছে নয়ন যাহাতে (বহু ); ক্রিয়ার বিশেষণ।

প্রথম অঙ্ক। ; শকুন্তলা ঈষৎ লেন, সখি শকুন্তলে! বােধ করি, তাত কণ আশ্রম-পাদপ- দিগকে ১ তােমার অপেক্ষা অধিক ভাল বাসেন। দেখ, তুমি নবমালিকা-কুসুম-কোমলা ; তথাপি তিনি তােমায় আলবালে-জলসেচনে নিযুক্ত করিয়াছেন । হাস্য করিয়া কহিলেন, সখি অনসূয়ে ! কেবল পিতা আদেশ করিয়াছেন বলিয়াই জলসেচন করিতে আসিয়াছি, এমন নহে; ইহাদের উপরি আমারও সহােদর-স্নেহ আছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি শকুন্তলে ! গ্রীষ্মকালে যে সকল বৃক্ষের কুসুম হয়, তাহাদের সেচন সমাপ্ত হইল ; এক্ষণে যাহাদের কুসুমের সময় অতীত ৩ হইয়াছে, আইস তাহাদিগেরও সেচন আরম্ভ করি । অনন্তর সকলে মিলিয়া সেই সমস্ত বৃক্ষে জলসেচন করিতে লাগিলেন। রাজা দেখিয়া শুনিয়া প্রীত ও চমৎকৃত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই সেই কণা-তনয়া শকুন্তলা ! মহর্ষি অতি অবিবেচক ! এমন শরীরে কেমন করিয়া ৪ ১ পাদপ=বৃক্ষ। পাদ অর্থাৎ মূলদ্বারা পান অর্থাৎ রস আকর্ষণ করে যে ( উপপদ)। পাদ+পা+ড। ২ নবমালিকা-কুসুম-কোমলা-নবমালিকা=পুষ্পবিশেষ। ইহার অপর নাম নবমল্লিকা। নবমালিকা-নামক নবমালিকা-নামক কুসুম (মধ্যপদলােপী কৰ্ম্ম ) তাহার ন্যায় কোমলা (কর্মধা)। ৩ অতীত=অতি+ইত ; অতি+ই+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে -অত্যয়। ৪ অবিবেচক =ন বিবেচক (নঞ তৎ )। ন+বি+বিচ+ণক। স্ত্রীলিঙ্গে—অবিবেচিকা।

২ ; শকুন্তলা। তিনি বল পরাইয়াছেন! অথবা, যেরূপ প্রফুল্ল শৈবাল-যোগেও বিলক্ষণ শশাভা পায় ; যেমন পূর্ণ শশধর কলঙ্ক-সম্পর্কেও সাতিশয় শােভমান হয়, সেইরূপ এই সৰ্বাঙ্গসুন্দরী বল্কল পরিধান করিয়াও নিরতিশয় মনােহারিণী হইয়াছেন। যাঁহাদের আকার স্বভাব-সিদ্ধ সৌন্দর্য্যে সুশশাভিত, তাহাদের কি না অলঙ্কারের কাৰ্য্য করে । শকুন্তলা জলসেচন করিতে করিতে সম্মুখে দৃষ্টি-পাত- পূর্বক সখীদিগকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, সখি । দেখ সমীরণ-ভরে সহকার-তরুর নব পল্লবগুলি পরিচালিত হইতেছে ;-বােধ হইতেছে, যেন সহকার অঙ্গুলি- সঙ্কেত দ্বারা আমায় আহ্বান করিতেছে ; উহার নিকটে চলিলাম। ইহা বলিয়া তিনি সহকার-তরু- তলে গিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। তখন প্রিয়ংবদা পরিহাস করিয়া কহিলেন, সখি ! ঐ স্থানেই কিয়ৎক্ষণ থাক। শকুন্তলা জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন সখি ? প্রিয়ংবদা কহিলেন, তুমি দেখ, অতএব, আমি ১ প্রফুল্ল =বিকসিত। প্র+ফুল+ক্ত (নিপাতনে)। পাণিনির মতে প্র+ফুল+অচ। ২ শশধর =চন্দ্র। ধর =ধৃ+অন্। শশের ধর (৬ষ্ঠী তৎ)। ৩ সমীরণ=বায়ু। সম্+ঈর+অন। সহকার-তরু = আম্র-বৃক্ষ। “আশ্চতে রসালােহসৌ সহকাররা- হতিসৌরভঃ”। ৪ প্রথম অঙ্ক। ১১. ১. সমীপবর্তিনী হওয়াতে যেন সহকার-তরু অতিমুক্ত-লতার সহিত সমাগত ২ হইল। শকুন্তলা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, সখি ! এই জন্যই তােমায় সকলে প্রিয়ংবদা ৩ বলে। রাজা প্রিয়ংবদার পরিহাস-শ্রবণে সাতিশয় পরিতােষ প্রাপ্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ংবদা যথার্থই কারণ শকুন্তলার অধরে নব-পল্লব-শােভার সম্পূর্ণ আবির্ভাব ; বাহু-যুগল কোমল বিটপের বিচিত্র শােভায় বিভূষিত ; এবং নব যৌবন বিকসিত-কুসুম-রাশির ন্যায় সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া রহিয়াছে। অনসূয়া কহিলেন, শকুন্তলে! দেখ দেখ, তুমি যে নব- মালিকার বনতষিণী নাম রাখিয়াছ, সে স্বয়ংবরা হইয়া কহিয়াছে ; ; ৫ ১ অতিমুক্ত-লতা = মাধবীলতা। ইহার পুষ্প শুক্লহেতু মুক্তাকে ও অতিক্রম করে, এই জন্য ইহাকে অতিমুক্ত বলে। ২ সমাগত = মিলিত। সম্+আ+গ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে —সমাগম। প্রিয়ংবদা = প্রিয় অর্থাৎ মিষ্ট কথা বলে যে (উপপদ)। প্রিয়+ব+খ+স্ত্রীলিঙ্গে আপ। *প্রিয়ম্বদা” লেখা ব্যাকরণ-বিরুদ্ধ, কারণ বদ্ধাতুর ব অন্তস্থ বর্ণ। ৪ বিটপ=শাখা ৫ স্বয়ংবরা =স্বয়ং বরণ করে যে (উপপদ)। স্বয়ং পতিগ্রাহিণী। স্বয়ম্+বৃ+অ+আপ। “স্বয়ম্বর” এইরূপ লেখা ব্যাকরণ-বিরুদ্ধ, কারণ “বর” শব্দের “ব” অন্তস্থ বর্ণ ।

শকুন্তলা । ১ সহকার-তরুকে আশ্রয় করিয়াছে। শকুন্তলা শুনিয়া বন- ততষিণীর নিকটে গিয়া সহর্ষ-মনে কহিতে লাগিলেন, সখি অনসূয়ে ! দেখ ইহাদের উভয়েরই কেমন রমণীয় সময় উপস্থিত ; নব-মালিকা বিকসিত-নব-কুসুমে সুশশাভিত হই- য়াছে; এবং সহকারও ফলভরে অবনত ও হইয়া রহিয়াছে। উভয়ের এইরূপ কথােপকথন হইতেছে, এমন সময়ে প্রিয়ংবদা হাস্যমুখে অনসূয়াকে কহিলেন, অনসূয়ে ! কি জন্য শকুন্তলা সর্বদাই বনতােষিণীকে উৎসুক-নয়নে নিরীক্ষণ করে, জান ? অনসূয়া কহিলেন না সখি ! জানি না; কি বল শুনি। প্রিয়ংবদা কহিলেন, এই মনে করিয়া যে, বনতােষিণী যেমন সহকারের সহিত সমাগত হইয়াছে, আমিও যেন সেইরূপ স্বীয় অনুরূপ ৩ বর প্রাপ্ত হই। শকুন্তলা কহিলেন, ইহা তােমারই মনের কথা। ইহা বলিয়া শকুন্তলা অনতিদূরবর্তিনী মাধবীলতার সমীপবর্তিনী হইয়া হৃষ্ট-মনে প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, সখি! তোমায় এক প্রিয় সংবাদ দিই, -মাধবীলতার মূল অবধি অগ্ৰ পৰ্য্যন্ত মুকুল নির্গত হইয়াছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন, ১ সহর্ষ-মনে=হর্ষের সহিত বৰ্ত্তমান (বহু ), সহর্ষ হইয়াছে মন যাহাতে (বহু )। হৃষ্ট-চিত্তে। ২ অবনত = অব+ন+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—অবনতি। বিপরীত-উন্নত ৩ অনুরূপ = রূপের যােগ্য (অব্যয়ী)। তুল্য, যােগ্য।

প্রথম অঙ্ক। সখি ! পিতার মুখে আমিও তােমায় এক প্রিয় সংবাদ দিই, তােমার বিবাহ নিকটবর্তী হইয়াছে। শকুন্তলা শুনিয়া কিঞ্চিৎ কৃত্রিম । কোপ প্রকাশ করিয়া কহিলেন, ইহা তােমার কাল্পনিক কথা, আমি শুনিতে চাই না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি ! আমি পরিহাস করিতেছি না। শুনিয়াছি, তাই বলিতেছি, মাধবীলতার এই যে মুকুল- নির্গম, ইহা তোমারই শুভ-সূচক। উভয়ের এইরূপ কথােপকথন শুনিয়া অনসূয়া হাসিতে হাসিতে কহিলেন, প্রিয়ংবদে! এই জন্যই শকুন্তলা মাধবীলতায় এতাদৃশ যত্নসহকারে জল-সেচন ও ইহার প্রতি এতাদৃশ স্নেহ-প্রদর্শন করে। শকুন্তলা কহিলেন, সে জন্য নয়। মাধবী-লতা আমার ভগিনী হয়, এই হেতু ইহাকে আমি সতত সস্নেহ- নয়নে নিরীক্ষণ করি। ইহা বলিয়া শকুন্তলা মাধবীলতায় জলসেচন করিতে প্রবৃত্ত ৩ হইলেন। এক মধুকর মাধবীলতার অভিনব মুকুলে মধুপান করিতেছিল ; জলসেচন করিবামাত্র সে কৃত্রিম =কপট অর্থাৎ যাহা প্রকৃত বা আন্তরিক নহে। কৃ+ ত্রিম। স্ত্রীলিঙ্গে--কৃত্রিম। এতাদৃশ =এইরূপ। এত+দৃশ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—এতাদৃশী । ৩ প্রবৃত্ত =রত, নিযুক্ত। প্র+বৃৎ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে-- প্রবৃত্তি। বিপরীত—নিবৃত্ত । মধুকর =ভ্রমর। মধু+কৃ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—মধুকরী। ৫ সেচন=সিচ,+অন ; বিশেষ্য। বিশেষণে—সিক্ত। ৪ ১ ২ ৪ ১৪ *, শকুন্তলা। মাধবীলতা পরিত্যাগ করিয়া বিকসিত-কুসুম-ভ্রমে শকুন্তলার প্রফুল্ল-মুখ-কমলে উপবিষ্ট হইবার উপক্রম করিল। শকুন্তলা কর-পল্লব-সঞ্চালন ও দ্বারা নিবারণ করিতে লাগিলেন। তথাপি মধুকর নিবৃত্ত হইল না,-গুন্ গুন্ ধ্বনি করিয়া অধর-সমীপে পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। তখন শকুন্তলা একান্ত অধীরা হইয়া কহিতে লাগিলেন, সখি ! পরিত্রাণ কর, দুবৃত্ত মধুকর আমায় নিতান্ত ব্যাকুল করিয়াছে। তখন উভয়ে হাসিতে হাসিতে কহিলেন, সখি ! আমাদের পরিত্রাণ করিবার ক্ষমতা কি ; দুষন্তকে স্মরণ কর ; রাজারাই তপােবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও করিয়া থাকেন। উত্তরােত্তর ভ্রমর অধিকতর উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করিলে শকুন্তলা কহিলেন, দেখ এই দুবৃত্ত কোনও মতে নিবৃত্ত হইতেছে না ; আমি এখান হইতে যাই। ইহা বলিয়া দুই ১ মুখ-কমল = মুখ কমলের ন্যায় ( উপমিত কর্মধা)। ২ কর-ল্লব-সঞ্চালন=কর পল্লবের ন্যায় (উপমিত কর্মধা), তাহার সঞ্চালন (৬ষ্ঠী তৎ)। সঞ্চালন =সম্+চ+ণিচ+অনট, বিশেষ্য। বিশেষণে-সঞ্চালিত। দুবৃত্ত=দুষ্ট, দুরাচার। দুর অর্থাৎ দুষ্ট হইয়াছে বৃত্ত অর্থাৎ আচরণ যাহার ( বহু )। রক্ষণাবেক্ষণ : =রক্ষণ ও অবেক্ষণ (দ্বন্দ্ব )। অবেক্ষণ =অব+ ঈ+অন ; বিশেষ্য। বিশেষণে—অবেক্ষিত। নিবৃত্ত =বিরত। নি+বৃৎ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে- নিবৃত্তি। বিপরীত—প্রবৃত্ত। ৪ ; ৫

প্রথম অঙ্ক।
চারি পা গমন করিয়া কহিলেন, কি আপদ ! এখানেও সে
আবার আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছে। সখি! পরিত্রাণ
তখন তাহারা পুনর্বার কহিলেন, প্রিয়সখি! আমাদের
পরিত্রাণের ক্ষমতা কি ? দুষন্তকে স্মরণ কর, তিনিই তােমার
পরিত্রাণ করিবেন।
রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, ইহাদের
সম্মুখে উপস্থিত হইবার এই বিলক্ষণ সুযােগ ঘটিয়াছে।
কিন্তু রাজা বলিয়া পরিচয় দিতে আমার ইচ্ছা ২ হইতেছে
এখন কি করি! অথবা অতিথি-ভাবে উপস্থিত হইয়া
অভয়-প্রদান করি। ইহা স্থির করিয়াই রাজা সত্বর-গমনে
তাঁহাদের সম্মুখবর্তী হইয়া কহিতে লাগিলেন, দুবৃত্তদিগের
শাসনকৰ্ত্তা পুরুবংশােদ্ভব ও দুষ্যন্ত বিদ্যমান থাকিতে কোন্
ব্যক্তি মুগ্ধ-স্বভাবা তপস্বি-কন্যাদিগের প্রতি অশিষ্ট ব্যবহার
করিতে পারে ?
তপস্বি-কন্যারা সেই অপরিচিত ব্যক্তিকে সহসা সম্মুখে
উপস্থিত দেখিয়া সাতিশয় সঙ্কুচিত হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে
।
১ পরিত্রাণ =পরি+ত্রৈ+অনট্‌; বিশেষ্য। বিশেষণে—পরিত্রাত।
২ ইচ্ছা =ই+অ+আপ ( নিপাতনে); বিশেষ্য। বিশেষণে—
ইচ্ছ।
পুরুবংশােব=পুরুর বংশ (৬ষ্ঠী তৎ); তাহা হইতে উদ্ভব
অর্থাৎ উৎপত্তি যাহার (বহু)। উদ্ভব—বিশেষণে উদ্ভূত।
ও অশিষ্ট=অশান্ত। ন+শাস্+ক্ত। স্ত্রীলিঙ্গে অশিষ্টা।

১৬
শকুন্তলা।
।
অনসূয়া কহিলেন, না মহাশয় ! এমন কিছু অনিষ্ট-ঘটনা হয়
নাই। তবে কি জানেন, এক মধুকর আমাদের প্রিয়সখী
শকুন্তলাকে নিরতিশয় ব্যাকুল করিয়াছিল, তাহাতেই তিনি
কিঞ্চিৎ কাতর হইয়াছিলেন। রাজা ঈষৎ হাস্য করিয়া
শকুন্তলাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
নির্বিঘ্নে * তপােবনে তপস্যা-
কাৰ্য্য সম্পন্ন হইতেছে ? শকুন্তলা লজ্জায় জড়ীভূতা ও
নম্নমুখী ° হইয়া রহিলেন,—কোনও উত্তর দিতে পারিলেন
। অনসূয়া শকুন্তলাকে উত্তর-দানে পরাজুখী * দেখিয়া
রাজাকে কহিলেন, হ মহাশয় ! নির্বিঘ্নে তপস্যা-কাৰ্য্য সম্পন্ন
হইতেছে; এক্ষণে অতিথি-বিশেষের সমাগম-লাভ-দ্বারা ইহা
সবিশেষ সম্পাদিত হইল। প্রিয়ংবদা শকুন্তলাকে সম্বােধন
করিয়া কহিলেন, সখি! যাও, যাও, শীঘ্র কুটীর হইতে
অর্ঘ্যপাত্র ৩ লইয়া আইস, জল আনিবার প্রয়ােজন নাই;
১ নির্বিঘ্নে =নাই বিন্ন যাহাতে (বহু ); ক্রিয়ার বিশেষণ ।
জড়ীতা – জড়-পদার্থের ন্যায়। জড়+অভূত-তদ্ভাবার্থে ছি+ভূ
+ক্ত+আপ।
নমুখী=নম্র অর্থাৎ অবনত হইয়াছে মুখ যাহার ( বহু ),
স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ। স্ত্রীলিঙ্গে নম্রমুখ”ও হয়।
পরাজুখী =পরা অর্থাৎ পশ্চাদগত মুখ যাহার (বহু );
স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ। স্ত্রীলিঙ্গে পরাত্মখাও হয়।
৫ অর্ঘ্য=পূজা-সামগ্ৰী-বিশেষ। “আপঃ ক্ষীরং কুশাগ্রঞ্চ দধি সর্পি
সতণ্ডুল। যবঃ সিদ্ধার্থকশ্চৈব অষ্টাঙ্গোহর্ঘঃ প্রকীৰ্ত্তিতঃ”। জল, দুগ্ধ,
কুশাগ্র, দধি, ঘৃত, তণ্ডুল, যব এবং শ্বেত-সর্ষপ এই আটটা অর্থের
৪

প্রথম অঙ্ক। ১৭ ২ হইয়াছ, এই কলসে জল আছে, তাহাতেই প্রক্ষালন-ক্রিয়া সম্পন্ন হইতে পারিবে। রাজা কহিলেন, না না, এত ব্যস্ত হইতে হইবে না; মধুর সম্ভাষণ-দ্বারাই আতিথ্য-ক্রিয়া সম্পন্ন হইয়াছে। অনসূয়া কহিলেন, মহাশয়। তবে এই সুশীতল সপ্তপর্ণ- বেদীতে ১ উপবেশন করিয়া শ্রান্তি দূর করুন। রাজা কহিলেন, তােমরাও জল-সেচন-দ্বারা সাতিশয় ক্লান্ত কিঞ্চিৎ কাল বিশ্রাম কর । প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি শকুন্তলে! অতিথির অনুরােধ-রক্ষা করা উচিত। এস, আমরাও বসি। অনন্তর সকলে উপবেশন করিলেন। এইরূপে সকলে উপবিষ্ট হইলে শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন এই অপরিচিত ব্যক্তিকে নয়নগােচর করিয়া অবধি আমার মনে তপােবন-বিরুদ্ধ ভাবের উদয় হইতেছে ? ইহা বলিয়া তিনি তাহার নাম, ধাম, জাতি, ব্যবসায়াদির বিষয় সবিশেষ অবগত হইবার নিমিত্ত নিতান্ত অঙ্গ। অথবা “সাক্ষং সুমনােযুক্তমুদকং দধিমিশ্ৰিতম্। অর্ঘ্যং”। আতপ-তল, পুষ্প ও দধি মিশ্রিত জলকে অর্ঘ্য বলে। [ সামবেদীরা “অর্ঘ্যং” এইরূপ য-ফলা-যুক্ত ও ক্লীবলিঙ্গ ব্যবহার করেন, এবং অন্তবেদীরা “অর্ঘঃ” এইরূপ য-ফলা-শূন্য ও পুংলিঙ্গ ব্যবহার করেন ] ১ সপ্তপর্ণ==ছাতিম গাছ। প্রতিপর্বে সাতটী করিয়া পত্র থাকে, এই হেতু ইহার নাম সপ্তপর্ণ। বেদি বা বেদী=যজ্ঞাদি করিবার নিমিত্ত চতুষ্কোণ উচ্চ পরিষ্কৃত ভূমি। ২ ক্লান্ত = ক্ল+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে-ক্লান্তি। ২ ১৮ শকুন্তলা। ব্যবসায় ; উৎকণ্ঠিত হইলেন। রাজা তাপস-কন্যাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, তােমাদের সমান রূপ, সমান বয়স্, সমান এই হেতু তােমাদের সৌহৃদ্য ২ সাতিশয় রমণীয় হইয়াছে। প্রিয়ংবদা রাজার অগােচরে অনসূয়াকে কহিলেন সখি! এই ব্যক্তি কে? দেখ, ইনি কেমন সৌম্যমূৰ্ত্তি, কেমন গম্ভীরাকৃতি, কেমন প্রতাপশালী! একান্ত অপরিচিত হইয়াও মধুর আলাপ দ্বারা চির-পরিচিত সুহৃদের প্রতীতি জন্মাইতেছেন। অনসূয়া কহিলেন, সখি! আমারও এ বিষয়ে কৌতূহল * জন্মিয়াছে; ভাল, জিজ্ঞাসা করিতেছি । ইহা বলিয়া তিনি রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, মহাশয় ! আপনার মধুরালাপ-শ্রবণে সাহসিনী হইয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি, আপনি কোন্ রাজর্ষি-বংশ অলঙ্কৃত করিয়াছেন ? ৪ ন্যায় ২ ১ ব্যবসায়=উদ্যম, কাৰ্য্য অথবা অনুষ্ঠান। বি+অব+সাে+ ঘঞ; বিশেষ্য। বিশেষণে-ব্যবসায়ী, ব্যবসিত। সৌহৃদ্য =বন্ধুত্ব। সুহৃদয়+ষ্ণ্য। কিন্তু “সুহৃদ” শব্দের উত্তর “ষ্ণ” প্রত্যয় করিলে “সৌহার্দ” পদ নিষ্পন্ন হয়। সৌম্যমূর্তি-সৌম্যা (প্রীতিকরী) মূৰ্ত্তি যাহার (বহু)। সােম+ষ্ণ =সৌম্য। সুহৃদ=সু (শােভন) হৃদয় যাহার (বহু ); মিত্র-অর্থে নিপাতন-সিদ্ধ। কৌতুহল =ঔৎসুক্য, অভিলাষ। কুতূহল+স্বার্থে । “ম্যবস্তুসমালােকে লােল স্যাৎ কুতূহল”। রমণীয়-বস্তু- দর্শনের নিমিত্ত যে চাঞ্চল্য, তাহাকে কুতূহল বলে।

প্রথম অঙ্ক।
কোন্ দেশকেই বা
সম্প্রতি আপনার বিরহে কাতর
করিতেছেন ? কি নিমিত্তই বা এরূপ সুকুমার হইয়াও
তপােবন-দর্শন-পরিশ্রম স্বীকার করিয়াছেন ? শকুন্তলা শুনিয়া
মনকে প্রবােধ দিয়া কহিলেন, হৃদয়। এত উৎকণ্ঠিত হও
কেন? তুমি যে জন্য ব্যাকুল হইতেছ, অনসূয়া সেই বিষয়েই
জিজ্ঞাসা করিতেছে।
রাজা শুনিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, এখন
কিরূপে আত্ম-পরিচয় দিই; যথার্থ পরিচয় দিলে সমস্তই
প্রকাশ পাইয়া তিনি এইরূপ কিঞ্চিৎ ভাবিয়া
কহিলেন, ঋষি-তনয়ে ! আমি এই রাজ্যের ধর্মাধিকারে
নিযুক্ত; পুণ্যাশ্ৰম-দর্শন-প্রসঙ্গে এই তপােবনে উপস্থিত
অনসূয়া কহিলেন, অদ্য তপস্বি-গণের বিশেষ
সােভাগ্য; মহাশয়ের শুভাগমনে উঁহারা পরম পরিতােষ
প্রাপ্ত হইবেন। এইরূপ কথােপকথন চলিতে লাগিল। কিন্তু
পরস্পর সন্দর্শনে রাজা ও শকুন্তলা উভয়েরই চিত্ত চঞ্চল
এবং উভয়েরই আকারে ও ইঙ্গিতে ৩ চিত্ত-চাঞ্চল্য
স্পষ্টই প্রতীয়মান হইতে লাগিল। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা
যায়।
হইয়াছি।
হইল ;
১ যথার্থ=অর্থকে অতিক্রম না করিয়া ( অব্যয়ী)।
২ ধৰ্ম্মাধিকারে= বিচারকার্য্যে।
ইঙ্গিত = হৃদগত ভাব। “ইঙ্গিতং হৃদগতত ভাবাে বহিরাকার
আকৃতিঃ”।
প্রতীয়মান=প্রতি+ই+কৰ্ম্মবাচ্যে শান।
৪

শকুন্তলা।
;
উভয়ের ভাব বুঝিতে পারিয়া রাজার অগােচরে ’ শকুন্তলাকে
সম্বােধন করিয়া কহিলেন, প্রিয়সখি ! যদি আজ পিতা আশ্রমে
থাকিতেন, তাহা হইলে জীবন-সব-স্ব ২ দিয়াও এই অতিথিকে
তুষ্ট করিতেন। ইহা শুনিয়া শকুন্তলা কৃত্রিম-কোপ-প্রদর্শন
পূর্বক কহিলেন, তােমারা কিছু মনে করিয়া এই কথা
বলিতেছ; আমি তােমাদের কথা শুনিতে চাই না।
রাজা শকুন্তলার বৃত্তান্ত সবিশেষ অবগত হইবার নিমিত্ত
একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত। হইয়া অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে
কহিলেন, আমি তােমাদের সখীর বিষয়ে কিঞ্চিৎ জিজ্ঞাসা
করিতে বাসনা করি ; তাঁহারা কহিলেন, মহাশয় ! আপনার
এই অভ্যর্থনা * অনুগ্রহ-বিশেষ ; যাহা ইচ্ছা হয়, স্বচ্ছন্দে *
জিজ্ঞাসা করুন। রাজা কহিলেন, শুনিয়াছি,
মহর্ষি কণ
১ অগােচরে = অজ্ঞাত-ভাবে।
২ সৰ্ব্ব-স্ব = সকল ধন (কর্মধা)। ‘স্ব” শব্দ বিশেষ্য হইলে
তাহার অর্থ--আত্মা, জ্ঞাতি, ধন; কিন্তু বিশেষণ হইলে “নিজ”
অর্থ বুঝায়।
==
কৌতূহলাক্রান্ত=কৌতূহল কর্তৃক আক্রান্ত (৩য়তৎ)। আক্রান্ত
=আ++ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—আক্রমণ।
৪ অভ্যর্থনা = প্রার্থনা। অভি+অর্থ+অন+আপ। বিশেষণে—
অভ্যর্থিত।
৫ স্বচ্ছন্দে = স্ব অর্থাৎ আপনার ছন্দ অর্থাৎ অভিপ্রায় বা
অভিলাষ যাহাতে (বহু )।= স্বাধীনভাবে।

প্রথম অঙ্ক।
;
কৌমার-ব্রহ্মচারী, ধৰ্ম্ম-চিন্তায় ও ব্রহ্মোপাসনায় ।
একান্ত
রত; এ পর্যন্ত দার-পরিগ্রহ করেন নাই; অথচ তােমাদের
সহচরী তাহারই তনয়া; ইহা কিরূপে সম্ভবপর, তাহা বুঝিতে
পারিতেছি না।
রাজার এই কথা শুনিয়া অনসূয়া কহিলেন, মহাশয় !
আমার প্রিয়সখীর জন্ম-বৃত্তান্ত যেরূপ শুনিয়াছি, সেইরূপই
কহিতেছি, শ্রবণ করুন। শুনিয়া থাকিবেন, বিশ্বামিত্র-নামক
এক অতি প্রভাবশালী রাজর্ষি ৪ আছেন। তিনি একদা
গগামতী-নদীর তীরে অতিকঠোর তপস্যা করিতে আরম্ভ
দেবতাগণ সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া রাজর্ষির সমাধি-
ভঙ্গের নিমিত্ত মেনকা-নাম্নী অপ্সরাকে পাঠাইয়া দেন।
মেনকা তদীয় তপস্যা-স্থানে উপস্থিত হইয়া মায়াজাল বিস্তার
করিলে মহর্ষির সমাধি-ভঙ্গ হইল। বিশ্বামিত্র ও মেনকা
আমাদের সখীর
জননী।
নির্দয় মেনকা
সদ্যপ্রসূতা তনয়াকে অরণ্যে পরিত্যাগ করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান
করিলেন আমাদের সখী সেই বিজন বনে অনাথ হইয়া
করেন।
জনক
কৌমার-ব্রহ্মচারী=কৌমার অর্থাৎ বাল্যকাল। কুমার+ষ্ণ।
২ ব্রহ্মোপাসনা=ব্রহ্ম অর্থাৎ জগতের মূল কারণ পরম অক্ষর
অর্থাৎ অবিনাশি, তাহার আরাধনা।
দার-পরিগ্রহ –দার অর্থাৎ স্ত্রী, তাহার পরিগ্রহ অর্থাৎ গ্রহণ
বা স্বীকার।
রাজর্ষি = যিনি রাজা হইয়াও ঋষির ন্যায় আচরণ করেন।
৪

২২ শকুন্তলা। হইল। পড়িয়া রহিলেন। এক শকুন্ত কোনও অনির্বচনীয় কারণে স্নেহের বশবর্তী হইয়া পক্ষপুট ২ দ্বারা আচ্ছাদন- পূর্বক আমাদের সখীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল। দৈবযােগে তাত কণ পৰ্যটন-ক্রমে সেই সময়ে সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। সদ্যপ্রসূতা কন্যাকে তদবস্থায় পতিত দেখিবা মাত্র তাঁহার অন্তঃকরণে কারুণ্য-রসের ৩ আবির্ভাব তিনি তৎক্ষণাৎ তাহাকে আশ্রমে আনিয়া স্বীয় তনয়ার ন্যায় তাহার লালন-পালন করিতে আরম্ভ করিলেন; এবং প্রথমেই শকুন্ত লালন করিয়াছিল, এই হেতু তিনি সখীর নাম শকুন্তলা রাখিলেন। রাজা শকুন্তলার জন্ম-বৃত্তান্ত অবগত হইয়া কহিলেন, ইহা সম্ভব-পর বটে; নতুবা মানবীতে কি এরূপ অলৌকিক রূপ-লাবণ্যের এ সম্ভব হইতে পারে ? ভূতল হইতে কখনও জ্যোতির্ময়ী বিদ্যুতের উৎপত্তি হয় না । ইহা শুনিয়া শকুন্তলা লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রহিলেন। প্রিয়ংবদা হাস্যমুখে শকুন্তলার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া রাজাকে সম্বােধন করিয়া ১ শকুন্ত=পক্ষী। পক্ষপুট =পক্ষরূপ পুট অর্থাৎ আবরণ (রূপক)। ৩ কারুণ্য-রস=করুণা +স্বার্থে ফ্য=কারুণ্য ; অথবা করুণ+ষ্ণ (ভাবার্থে )। কারুণ্য রূপ রস (রূপক)। অলৌকিক=অসাধারণ। লােক+ফিক=লৌকিক ৫ লাবণ্য=সৌন্দৰ্য্য, কান্তি। “মুক্তাফলেষু ছায়ায়ান্তরলত্বমিবান্তরা। প্রতিভাতি যদঙ্গে তল্লাবণ্যমিহােচ্যতে”। ৪ ৪

প্রথম অঙ্ক।
২৩
;
কহিলেন, মহাশয়ের আকার ও ইঙ্গিত-দর্শনে বােধ হইতেছে,
যেন আরও কিছু জিজ্ঞাসা করিবেন। শকুন্তলা রাজার
অগােচরে প্রিয়ংবদাকে লক্ষ্য করিয়া ভ্রভঙ্গী ও অঙ্গুলি-
সঞ্চালন-দ্বারা তজ্জন করিতে লাগিলেন। রাজা কহিলেন,
বিলক্ষণ অনুভব করিয়াছ ; তােমাদের সখীর বিষয়ে আমার
আরও কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন, আপনি
সঙ্কুচিত ৭ হইতেছেন কেন ? যাহা ইচ্ছা হয়, স্বচ্ছন্দে
জিজ্ঞাসা করুন ।
রাজা কহিলেন, আমার জিজ্ঞাস্য এই,
তােমাদের সখী, যতদিন বিবাহ না হইতেছে, ততদিন পর্যন্ত
তাপস-ব্রত অবলম্বন করিয়া চলিবেন, অথবা যাবজ্জীবন
হরিণী-গণ-সহবাসে কাল-হরণ করিবেন। প্রিয়ংবদা কহিলেন,
তাত কণ সঙ্কল্প করিয়া রাখিয়াছেন যে, অনুরূপ পাত্র
পাইলে তিনি শকুন্তলার বিবাহ দিবেন না। রাজা শুনিয়া
নিরতিশয় হর্ষিত ৩ হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, তবে
আমার শকুন্তলা-লাভ নিতান্ত অসম্ভাবনীয় * নহে।
আশ্বাসিত ৫ হও, এক্ষণে সংশয়ের নিরাকরণ ৬ হইয়াছে; ইহা
হৃদয়!
২
১ তর্জন = ভয়-প্রদর্শন।
সঙ্কুচিত=সম্+কুচ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—সঙ্কোচ ।
হর্ষিত =আনন্দিত। হর্ষ+জাত অর্থে ইত।
অসম্ভাবনীয় =ন+স++ ণিচ,+অনীয়।
আশ্বাসিত =আশ্বাস+জাত অর্থে ইত।
নিরাকরণ =নিবারণ, দূরীকরণ। নির্+আ+কৃ+অনট।
৪

২৪
শকুন্তলা।
সুখ-স্পর্শ সুশীতল রত্ন; ইহাকে প্রদীপ্ত অগ্নি ভাবিয়া আর
শঙ্কিত হইবার আবশ্যকতা নাই।
শকুন্তলা কৃত্রিম-কোপ-প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, অনসূয়ে!
আমি চলিলাম; আর আমি এখানে থাকিব না। অনসূয়া
কহিলেন, সখি ! কারণ কি? শকুন্তলা বলিলেন দেখ, যাহা
মুখে আসিতেছে, প্রিয়ংবদা তাহাই বলিতেছে; আমি আৰ্য্যা
গােতমীর নিকটে গিয়া এই সমস্ত কথা বলিব। অনসূয়া
কহিলেন, সখি ! অভ্যাগত মহাশয়ের এ পর্যন্ত পরিচর্যা
করা হয় নাই। বিশেষতঃ, আজ তােমারই উপর অতিথি-
পরিচৰ্য্যার ৩ ভার সমর্পিত আছে। অতএব ইহাকে পরিত্যাগ
করিয়া তােমার চলিয়া যাওয়া উচিত নহে। শকুন্তলা কিছু
বলিয়াই চলিয়া যাইতে লাগিলেন। তখন প্রিয়ংবদা
শকুন্তলাকে ধরিয়া রাখিয়া কহিলেন, সখি
তুমি যাইতে
আমার এক কলসী জল ধার ; আগে শােধ
দাও, তবে যাইতে দিব । শকুন্তলা কিঞ্চিৎ কুপিত হইয়া
ঋণ-পরিশােধের নিমিত্ত কলসী লইয়া জল আনিতে উদ্যত ৪
পাইবে না ;
১
সুখ-স্পর্শ =সুখ অর্থাৎ সুখকর স্পর্শ যাহার (বহু )। যাহার
স্পর্শে সুখানুভব হয়।
২ অভ্যাগত = অতিথি। অভি+আ+গ+ক্ত।
বিশেষে
অভ্যাগম, অভ্যাগতি।
পরিচৰ্য্যা = সেবা। পরি+চ+ক্যপ+আপ।
৪ উদ্যত =উৎ+ষ+ক্ত, বিশেষণ। বিশেষ্যে—উদ্যম।

প্রথম অঙ্ক।
।
হইলেন। তখন রাজা প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, তাপস-কন্যে !
তােমার সখী জল-সেচন-দ্বারা
জল-সেচন-দ্বারা নিরতিশয় ক্লান্ত হইয়াছেন;
আর ইহাকে পল্ল ? হইতে জল আনাইয়া সমধিক ক্লান্ত
করা উচিত হয় না। আমি তােমার সখীকে ঋণমুক্ত
করিতেছি। ইহা বলিয়া রাজা স্বীয় অঙ্গুলি হইতে অঙ্গুরীয়ক
উন্মুক্ত করিয়া জল-কলসের
মূল্য-স্বরূপ ইহা প্রিয়ংবদার
হস্তে অৰ্পণ করিলেন।
অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা অঙ্গুরীয়কে
রাজকীয় নাম অক্ষরে
অঙ্কিত দেখিয়া চকিত হইয়া পরস্পর মুখ-নিরীক্ষণ করিতে
লাগিলেন ! অঙ্গুরীয়কে দুষ্যন্ত-নাম মুদ্রিত আছে, অর্পণ-সময়ে
তাহা রাজার মনে ছিল না । এক্ষণে তিনি আত্মপ্রকাশের
সম্ভাবনা-দর্শনে সাবধান হইয়া কহিলেন, রাজকীয়-নামাক্ষর
দেখিয়া তােমরা অন্যথা ভাবিও না।
আমি রাজপুরুষ;
রাজা আমায় প্রসাদ-চিহ্ন-স্বরূপ এই স্বনামাঙ্কিত ৩ অঙ্গুরীয়ক
পুরস্কার দিয়াছেন। প্রিয়ংবদা রাজার ছল বুঝিতে পারিয়া
সহাস্য-বদনে কহিলেন, মহাশয় । এই অঙ্গুরীয়ক
অঙ্গুলী-বিযুক্ত করা বিধেয় নহে; আপনার কথাতেই ইনি
৪
পল=ক্ষুদ্র জলাশয়, ডােবা।
২ ঋণমুক্ত=ঋণ হইতে মুক্ত (৫মী তৎ )।
স্বনামাঙ্কিত = নিজ-নাম-চিহ্নিত। স্ব নাম তদ্বারা অঙ্কিত
( স্ব=নিজ, কর্মধা ও ৩য়া তৎ )।
অঙ্গুলী-বিযুক্ত=অঙ্গুলী হইতে বিযুক্ত অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন (৫মী তৎ)।
৪

শকুন্তলা।
১
মনে
ঋণে মুক্ত হইলেন; পরে ঈষৎ হাসিয়া শকুন্তলার দিকে
চাহিয়া কহিলেন, সখি শকুন্তলে ! এই মহাশয় অথবা
মহারাজ তােমায় ঋণে মুক্ত করিলেন; এক্ষণে, ইচ্ছা হয়,
যাও।
শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এ ব্যক্তিকে
পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া আর আমার সাধ্য নহে; অনন্তর
প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, আমি যাই, না যাই, তােমার কি ?
রাজা শকুন্তলার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া মনে
কহিতে লাগিলেন, আমি ইহার প্রতি যেরূপ অনুরাগী, এ
আমার প্রতি সেরূপ অনুরাগিণী কি না, বুঝিতে পারিতেছি
। অথবা, আর সন্দেহের বিষয় কি? এ আমার সহিত
কথা কহিতেছে না; অথচ
আমি কথা কহিতে আরম্ভ
করিলে অনন্যচিত্ত হইয়া স্থির-কর্ণে ও শ্রবণ করিতেছে ;
নয়নে নয়নে সঙ্গতি ৪ হইলেই তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরাইয়া
লইতেছে; অথচ অন্য দিকেও অধিকক্ষণ চাহিয়া থাকিতেছে
অন্তঃকরণে অনুরাগ-সঞ্চার না হইলে কামিনী-গণের
কদাপি এরূপ ভাব উপস্থিত হয় না।
১
ঋণে=অপাদান কারক।
২ অনন্তচিত্ত = অন্য অর্থাৎ অন্যদিকে চিত্ত যাহার (বহু )=
অন্যচিত্ত। ন অন্যচিত্ত=অনন্যচিত্ত (নঞ তৎ)।
স্থির-কর্ণে =স্থির হইয়াছে কর্ণ যাহাতে (বহু )। ক্রিয়ার
বিশেষণ।
* সঙ্গতি = মিলন। সম্+গ+ক্তি। বিশেষ। বিশেষণে—সঙ্গত।
৫ অনুরাগ = অনু+র+ঘ; বিশেষ্য। বিশেষণে—অনুরক্ত।

প্রথম অঙ্ক। ২৭ রাজা ও তাপস-কন্যাদিগের এইরূপ আলাপ চলিতেছে, এমন সময়ে সহসা অনতিদূরে অতি মহান্ কোলাহল উথিত হইল ; এবং কেহ কহিতে লাগিল, হে হে তপস্বিগণ। মৃগয়া-বিহারী রাজা দুষ্যন্ত সৈন্য-সামন্ত-সমভিব্যহারে পােবন- সমীপে উপস্থিত হইয়াছেন ; তােমরা আশ্ৰমস্থ প্রাণি-সমূহের রক্ষণার্থ সত্বর ও যত্নবান হও; বিশেষতঃ, এক আরণ্যক ২ হস্তী রাজার রথ-দর্শনে নিরতিশয় চকিত হইয়া তপস্যার ৩ মূৰ্ত্তিমদ * বিঘ্ন-স্বরূপ ধৰ্ম্মরণ্যে প্রবেশ করিতেছে। তাপস-কন্যারা শুনিয়া সাতিশয় শঙ্কাকুল রাজা বিরক্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কি আপদ ! অনুযায়ী। লােকেরা আমার অন্বেষণে আসিয়া তপােবনের পীড়া জন্মাইতেছে। যাহা হউক, এক্ষণে সত্বর তাহার নিবারণ করা আবশ্যক। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা হইলেন। ৭ ১ ২ ৪ বিহারী=বি+হা+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে–বিহারিণী। আরণ্যক = বন্ত। অরণ্য+কণ, পাণিনি-মতে বু। ৩ তপস্যা =তপ+ক্য = তপস্য (নাম-ধাতু)+অ+আপ। মূৰ্ত্তিমদ= মূর্তি+অস্ত্যর্থে মতু। স্ত্রীলিঙ্গে মূর্তিমতী। পুংলিঙ্গে মূৰ্ত্তিমা। ৫ শঙ্কাকুল=শঙ্কাদ্বারা আকুল ; ভীতচিত্ত। (৩য় তৎ)। ৬ বিরক্ত = বি+জ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে–বিরক্তি বা বিরাগ। বিপরীত-অনুরক্ত। অনুযায়ী=অনু অর্থাৎ পশ্চাৎ যায় যে। অনু+যা+ণিম্। স্ত্রীলিঙ্গে—অনুযায়িনী। ৭ ২৮ শকুন্তলা। যেন २ কহিলেন, মহারাজ! আরণ্যক গজের কথা শুনিয়া আমরা সাতিশয় শঙ্কিত হইয়াছি ; অনুমতি করুন, কুটীরে যাই। রাজা ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, তােমরা কুটীরে যাও; আমিও তপােবনের পীড়া-পরিহারের ১ নিমিত্ত চলিলাম। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা প্রস্থান-কালে কহিলেন, মহারাজ। পুনর্বার আপনার দর্শন পাই। সমুচিত অতিথি-সৎকার করা হয় নাই ; এজন্য আমরা নিতান্ত লজ্জিত হইতেছি। রাজা কহিলেন, না না; তােমাদের দর্শনেই আমার যথেষ্ট সৎকার-লাভ হইয়াছে। অনন্তর সকলে প্রস্থান করিলেন। শকুন্তলা দুই চারি পা চলিয়া ছলনা করিয়া কহিলেন, অনসূয়ে ! কুশাগ্র দ্বারা আমার পদতল ক্ষত হইয়াছে; এজন্য আমি শীঘ্র চলিতে পারিতেছি না ; আর আমার বল্কল কুরবক-শাখায় ৩ লাগিয়া গিয়াছে, কিঞ্চিৎকাল অপেক্ষা কর, ছাড়াইয়া লই। ইহা বলিয়া বল্কল-মােচন-চ্ছলে বিলম্ব করিয়া শকুন্তলা সতৃষ্ণ- নয়নে রাজাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। রাজাও মনে ৪ ১ পরিহার = নিবারণ। পরি+হৃ+ঘঞ। কিপ ঘ, প্রভৃতি প্রত্যয় পরে থাকিলে কখন কখন উপসর্গের স্বর দীর্ঘ হয়। ২ যথেষ্ট =ইষ্ট অর্থাৎ অভিলষিত-পদার্থকে অতিক্রম না করিয়া (অব্যয়ী)। যথা +ই+ত। কুরবক = কুরবক অথবা কুরুবক-বৃক্ষ-বিশেষ, ঝিণ্টী বৃক্ষ । সতৃষ্ণ-নয়নে=উৎসুক-নেত্রে। তৃষ্ণার সহিত বর্তমান সতৃষ্ণ ( বহু ), সতৃষ্ণ হইয়াছে নয়ন যাহাতে (বহু )—ক্রিয়ার বিশেষণ । ৪

প্রথম অঙ্ক।
২৯
মনে কহিতে লাগিলেন, শকুন্তলাকে দেখিয়া অবধি আর
আমার নগর-গমনে তাদৃশ অনুরাগ নাই। অতএব তপােবনের
অনতিদূরে শিবির সন্নিবেশিত ১ করি। কি আশ্চর্য! আমি
কোনও মতেই আমার চঞ্চল চিত্তকে শকুন্তলা হইতে নিবৃত্ত
করিতে পারিতেছি না।
সন্নিবেশিত = স্থাপিত। সম্+নি+বিশ+ ণিচ+ক্ত।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
মাধবব্যর মৃগয়া-জনিত ক্লেশ :—দুষ্যন্তের নিকট হইতে তাঁহার বিশ্রাম-লাভের
আদেশ-গ্রহণ ;—সেনাপতির মৃগয়া-প্রশংসা ও তাঁহার প্রস্থান ;-শকুন্তলা সম্বন্ধে
মাধব্যের নিকটে দুষ্যন্তের মনােভাব-প্রকাশ;-ঋষি-কুমার-দ্বয়ের আগমন
রাক্ষস-গণ-কর্তৃক উপদ্রব-নিবারণের অনুরােধ করভকের আগমন ও বৃদ্ধা মহিষীর
আদেশ-জ্ঞাপন :--সৈন্যগণ সহ মাধব্যের রাজধানী-প্রস্থান :—দুষ্যন্তের তপােবনে
-
প্রবেশ।
রাজা মৃগয়ার্থ আগমন-কালে স্বীয় প্রিয়-বয়স্য মাধব্য-নামক
ব্রাহ্মণকে সঙ্গে আনিয়াছিলেন । রাজ-সহচর-গণ, নিয়ত
রাজভােগে কালযাপন করিয়া স্বভাবতঃ সাতিশয় বিলাসী ২
ও সুখাভিলাষী হইয়া উঠে। অশন, বসন, শয়ন, উপবেশন,
কোনও বিষয়ে কিঞ্চিত্র ক্লেশ হইলে ইহা তাহাদের একান্ত
অসহ হয়।
মাধব্য রাজধানীতে অশেষবিধ সুখ-সম্ভোগে
কাল-হরণ করিতেন। অরণ্যে সে সকল সুখ-ভােগের
সম্পর্ক ও ছিল না ; প্রত্যুত সকল বিষয়েই সবিশেষ ক্লেশ
জন্মিয়াছিল।
নিয়ত=নি+য+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—নিয়ম।
২ বিলাসী=বি+ল+ ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—বিলাসিনী।
সম্পর্ক =সম্+পৃচ+ঘ;
বিশেষ্য। বিশেষণে-সম্প ক্ত।

দ্বিতীয় অঙ্ক
এক দিবস প্রভাতে গাত্রোত্থান ১ করিয়া অত্যন্ত বিরক্ত
হইয়া মাধব্য মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই মৃগয়া-শীল
রাজার সহচর হওয়ায় প্রাণ গেল। প্রতিদিন প্রাতঃকালে
মৃগয়া করিতে যাইতে হয়, এবং এই মৃগ, ঐ বরাহ, এই
শাৰ্দল, এইরূপ করিয়াই মধ্যাহ্ন-কাল পর্যন্ত বনে বনে
ভ্রমণ করিতে হয়। গ্রীষ্মকালে পল ও
বননদী সকল
শুষ্কপ্রায় হইয়া আইসে; যে স্বল্প-পরিমাণ জল থাকে,
তাহাও বৃক্ষের গলিত পত্র সকল অনবরত পতিত হওয়াতে
নিতান্ত কটু ও কষায় হইয়া উঠে পিপাসা পাইলে সেই
বিরস বারি পান করিতে হয়। আহারের সময় নিয়মিত
নাই ; প্রায় প্রতিদিন অনিয়ত সময়েই আহার করিতে হয়।
আহার-সামগ্রীর মধ্যে অধিকাংশই শূল্য
তাহারও
প্রত্যহ প্রকৃতরূপ পাক করা হয় না। আর প্রাতঃকাল
অবধি মধ্যাহ্ন পৰ্য্যন্ত অশ্বপৃষ্ঠে পরিভ্রমণ করায় সর্ব শরীর
বেদনায় এরূপ অভিভূত হইয়া থাকে যে, রাত্রিতেও সুখে
নিদ্রা যাইতে পারি না। রাত্রিশেষে নিদ্রার সঞ্চার হয় ;
৪
;
মাংস ;
গাত্রোখান=গাত্র+উৎ+স্থান। উত্থান—বিশেষণে, উখিত।
২ মৃগয়া-শীল=মৃগয়া হইয়াছে শীল ( স্বভাব ) যাহার (বহু)।
সহচর =সহ+চ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে-সহচরী।
৪ পিপাসা =পা+সন্+অ+আপ। বিশেষণে—পিপাসিত বা
পিপাসু।
৫
শূল্য =শূলে সংস্কৃত। শূল+যৎ।

শকুন্তলা। ৪ শকুন্তলা-নাম্নী কিন্তু ব্যাধগণের বন-গমন-কোলাহলে অতি প্রত্যুষেই নিদ্রাভঙ্গ হইয়া থাকে। যে এই সকল ক্লেশের অবসান ১ হইবে, তাহারও সম্ভাবনা দেখিতেছি না। সে দিবস আমরা পশ্চাদ্ভাগে পড়িলে রাজা একাকী ২ এক মৃগের ৩ অনুসরণ- ক্রমে তপােবনে প্রবিষ্ট হইয়া আমাদের দুর্ভাগ্যবশতঃ এক তাপস-কন্যা নিরীক্ষণ করিয়াছেন। তাহাকে দেখিয়া অবধি তিনি নগর-গমনের কথা আর মুখে আনেন না। এইরূপ ভাবিতে ভাবিতেই রাত্রি প্রভাত হইয়া গেল, একবারও চক্ষু মুদ্রিত করি নাই। মাধব্য এই সমস্ত চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে দেখিতে পাইলেন, রাজা মৃগয়ার বেশ-ধারণ-পূৰ্ব্বক তৎ- কালােচিত সহচর-গণে পরিবেষ্টিত হইয়া সেই দিকেই আসিতেছেন। তখন তিনি মনে মনে এইরূপ বিবেচনা করিলেন, আমি বিকলাঙ্গের ন্যায় পড়িয়া থাকি; তাহা হইলে যদি আজ বিশ্রাম লাভ করিতে পাই। ইহা বলিয়া মাধব্য ভগ্ন-কলেবরের ন্যায় একান্ত বিকল-ভাবে পড়িয়া রহিলেন ; অবসান =সমাপ্তি। অব+সাে+অনট। বিশেষণে—অবসিত। ২ একাকী-এক+আকি। স্ত্রীলিঙ্গে—একাকিনী ও মৃগের = কৰ্ম্মে ৬ষ্ঠী। শকুন্তলা-নাম্নী =শকুন্তলা হইয়াছে নাম যাহার (বহু )। স্ত্রীলিঙ্গে শকুন্তলা-নামা” এরূপ পদও হইতে পারে। বিকলাঙ্গ=বিকল (অবশ) হইয়াছে অঙ্গ যাহার (বহু)। ৪ দ্বিতীয় অঙ্ক। ; ; পরে রাজা সন্নিহিত হইবা মাত্র সাতিশয়-কাতরতা-দর্শন- পূৰ্ব্বক কহিলেন, বয়স্য ! আমার সর্ব শরীর অবশ হইয়া আছে ;—হস্ত প্রসারণ করি, এমন ক্ষমতা নাই; অতএব কেবল বাক্য-দ্বারাই আশীর্বাদ করিতেছি। রাজা মাধব্যকে তদবস্থ দেখিয়া জিজ্ঞাসা ২ করিলেন, বয়স্য ! তােমার শরীর এরূপ বিকল হইল কেন ? মাধব্য কহিলেন, কেন হইল কি আবার ? স্বয়ং অস্থি ভাঙ্গিয়া দিয়া অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিতেছ? রাজা কহিলেন বয়স্য ! বুঝিতে পারিলাম না, স্পষ্ট করিয়া বল। মাধব্য কহিলেন, নদী-তীরবর্তী বেতস যে কুজভাব অবলম্বন করে, সে কি স্বেচ্ছাবশতঃ সেইরূপ করে, অথবা নদীর বেগ- প্রভাবেই করিয়া থাকে ? রাজা কহিলেন, নদীর বেগই তাহার কারণ। মাধব্য কহিলেন, তুমিও আমার অঙ্গ- বৈকল্যের ৩ সেইরূপ কারণ। সেইরূপ কারণ। রাজা কহিলেন, রাজা কহিলেন, সে কেমন ? মাধব্য কহিলেন, আমি আর কি বলিব ? ইহা কি উচিত হয় যে, রাজকার্য পরিত্যাগ করিয়া বনচরের ব্যবসায়- ৪ ১ তদবস্থ=তৎ অর্থাৎ সেইরূপ অবস্থা যাহার ( বহু )। ২ জিজ্ঞাসা = জ্ঞা + সন্ + অ + আপ ; বিশেষ্য। বিশেষণে— জিজ্ঞাসিত বা জিজ্ঞাসু। ৩ অঙ্গ-বৈকল্য = অঙ্গের বৈকল্য (অবশ ভাব )—৬ষ্ঠী তৎ। বিকল +ভাবীর্থে ষ্ণ =বৈকল্য। বৈকল্যের বিপরীত—সাকল্য। ৪ বনচর = বন+চর+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—বনচরী।

৩৪ শকুন্তলা। অবলম্বন-পূর্বক তুমি নিয়ত বনে বনে ভ্রমণ করিবে। আমি ব্রাহ্মণের সন্তান ; সর্বদা তােমার সঙ্গে সঙ্গে মৃগের অন্বেষণে কাননে কাননে ভ্রমণ করায় আমার সন্ধি-বন্ধ সকল শিথিল হইয়া গিয়াছে, এবং সর্ব শরীর অবশ হইয়া পড়িয়াছে। অতএব বিনয়-বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি, অন্ততঃ এক দিনের জন্য আমায় বিশ্রাম করিতে দাও। রাজা মাধব্যের প্রার্থনা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, বয়স্য এইরূপ কহিতেছে ; আমারও শকুন্তলা- দর্শন অবধি মৃগয়া-বিষয়ে মন নিতান্ত নিরুৎসাহ হইয়াছে। শরাসনে শরসন্ধান করি, কিন্তু মৃগের উপরি নিক্ষিপ্ত করিতে পারি না; তাহাদের মঞ্জুল নয়ন নয়ন-গােচর হইলে শকুন্তলার অলৌকিক বিভ্রম-বিলাসশালি । নয়ন-যুগল মনে পড়ে। মাধব্য রাজার মুখে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, ইনি আর কিছু ভাবিতে লাগিলেন, আমি অরণ্যে রােদন করিলাম। রাজা ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, না হে না, আমি ; ২ ১ মঙুল=সুন্দর। বিভ্রম-বিলাসশালী = কামৌৎসুক্যকৃতাকারং রূপযৌবনসম্পদা । অনবস্থিতচেষ্টত্বং বিভ্রমঃ পরিকীৰ্ত্তিতঃ ॥” “ধীরসঞ্চারিণী দৃষ্টির্গতিগোবৃষভাঞ্চিতা। স্মিতপূৰ্বস্তথালাপ বিলাসঃ পরিকীৰ্ত্তিতঃ ॥” বিভ্রম-বিলাস =স্ত্রীলােকদিগের অঙ্গ-ভঙ্গী-বিশেষ, হাবভাব লাবণ্য কটাক্ষ ইত্যাদি।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
ত
অন্য কিছু ভাবিতেছি না; সুহৃদ্বাক্য লঙ্ঘন করা উচিত
নহে, ইহা বিবেচনা করিয়াই অদ্য মৃগয়ায় ক্ষান্ত হইলাম।
মাধব্য শ্রবণমাত্র নিরতিশয় আনন্দিত হইয়া, চিরজীবী হও,
বলিয়া চলিয়া যাইবার উপক্ৰম করিলেন। রাজা কহিলেন,
বয়স্য ! যাইও না, আমার কিছু বক্তব্য আছে। মাধব্য,
কি কথা বল, ইহা বলিয়া শ্রবণােম্মুখ ২ হইয়া দণ্ডায়মান
রহিলেন।
রাজা কহিলেন, বয়স্য ! কোনও অনায়াসসাধ্য
কৰ্ম্মে আমার সহায়তা করিতে হইবে। মাধব্য কহিলেন ;
বুঝিয়াছি, আর বলিতে হইবে না, মিষ্টান্ন-ভক্ষণে। সে
বিষয়ে আমি বিলক্ষণ নিপুণ, অতএব অনায়াসেই আমি
সম্পূর্ণ সহায়তা করিতে পারিব । রাজা কহিলেন, না হে
। ইহা বলিয়া দৌবারিককে আহ্বান করিয়া রাজা
সেনাপতিকে আনয়ন করিবার নিমিত্ত
নিমিত্ত আদেশ প্রদান
করিলেন।
দৌবারিক-মুখে রাজার আহ্বান-বার্তা শ্রবণ করিয়া
সেনাপতি অনতিবিলম্বে নরপতি-গােচরে উপস্থিত হইলেন,
এবং মহারাজের জয় হউক বলিয়া কৃতাঞ্জলি-পুটে নিবেদন
৪
মৃগয়ায় = অপাদান কারক।
শ্রবণণান্মুখ =শ্রবণ +উৎ+মুখ। শ্রবণে উন্মুখ (৭মী তৎ)।
৩ অনায়াসসাধ্য=আয়াস অর্থাৎ অতিকষ্টে সাধ্য ( ৩য় তৎ ),
ন আয়াসসাধ্য (ন, তৎ )।
৪ দৌবারিক=দ্বার+ ষ্ণিক = দ্বারবান্।

२
হইয়া থাক ;
করি ;
শকুন্তলা।
করিলেন, মহারাজ! সমস্ত উদ্যোগ ১ হইয়াছে; আর অনর্থক
কালহরণ করিতেছেন কেন, মৃগয়া করিতে চলুন।
কহিলেন, আজ মাধব্য মৃগয়ার দোষ-কীৰ্ত্তন করিয়া আমায়
নিতান্ত নিরুৎসাহ করিয়াছে। সেনাপতি রাজার অগােচরে
অনুচ্চস্বরে মাধব্যকে কহিলেন, সখে ! তুমি স্থির-প্রতিজ্ঞ ।
আমি কিয়ৎক্ষণ প্রভুর চিত্ত-বৃত্তির ৩ অনুবৰ্ত্তন
অনন্তর তিনি রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! ঐ
পাগলের কথা শুনেন কেন ? ও কখন্ কি না বলে ?
মৃগয়া অপকারী * কি উপকারী, মহারাজই বিবেচনা করুন না
কেন। দেখুন, প্রথমতঃ স্থূলতা ও জড়তা অপগত হইয়া যায় ;
শরীর বিলক্ষণ পটু ও কৰ্ম্মণ্য হয়; ভয় জন্মিলে অথবা
ক্রোধের উদয় হইলে জন্তু-গণের মনের গতি কিরূপ হয়,
তাহাও বারংবার প্রত্যক্ষ করা যাইতে পারে। দ্বিতীয়তঃ চল ৬
লক্ষ্যে শরক্ষেপ অভ্যস্ত হইয়া আইসে। মহারাজ! যদি চল
লক্ষ্যে শরক্ষেপ অব্যর্থ হয়, তাহা হইলে ধনুর্ধরের পক্ষে
তাহার অপেক্ষা অধিক শ্লাঘার বিষয় আর কি হইতে পারে ?
=
১ উদ্যোগ =উৎ+যু+ঘ। বিশেষণে—উক্ত বা উদ্যোগী
২ স্থির-প্রতিজ্ঞ = স্থিরা প্রতিজ্ঞা যাহার (বহু )।
চিত্ত-বৃত্তি মনের ভাব। চিত্তের বৃত্তি (৬ষ্ঠী তৎ)।
অপকারী=অপ+কৃ+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—অপকারিণী।
৫ কৰ্ম্মণ্য =কৰ্ম্ম-সমর্থ। কৰ্ম্মন্+যৎ।
৬ ঢল= চঞ্চল। চল+অন্।
৪

দ্বিতীয় অঙ্ক। ৩৭ যাহারা মৃগয়াকে ব্যসন-মধ্যে গণ্য করে, তাহারা নিতান্ত অর্বাচীন; বিবেচনা করুন, এরূপ আমােদ, এরূপ উপকার আর কোন্ বিষয়ে আছে ? ইহা শুনিয়া মাধব্য কৃত্রিম কোপ- প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, অরে নরাধম ! ক্ষান্ত হ, আর তাের প্রবৃত্তি জন্মাইতে হইবে না; আজ ইনি স্বীয় প্রকৃতি প্রাপ্ত হইয়াছেন। আমি দিব্য নেত্রে দেখিতেছি, তুই বনে বনে ভ্রমণ করিয়া একদিন নর-নাসিকা-লােলুপ ভল্লকের মুখে পড়িবি। উভয়ের এইরূপ বিবাদারম্ভ দেখিয়া রাজা সেনাপতিকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, দেখ, আমরা আশ্রম-সমীপে উপস্থিত আছি ; এজন্য তােমার মতে সম্মত হইতে পারিলাম । অদ্য মহিষেরা নিপানে ৩ অবগাহন করিয়া নিরুদ্বেগে ৪ জলক্রীড়া করুক; হরিণগণ তরুচ্ছায়ায় দলবদ্ধ হইয়া রােমন্থ অভ্যাস করুক; বরাহ সকল নিঃশঙ্কচিত্তে পল্বলে মুস্তা- ১ ব্যসন=কাম ও কোপ-জনিত দোষ—মৃগয়া, দূত, দিবানিদ্রা, পরনিন্দা, বেশ্যাসক্তি, নৃত্য, গীত, ক্রীড়া, বৃথাভ্রমণ, মদ্যপান এই দশ প্রকার ; এবং দুষ্টতা, দৌরাত্ম্য, ক্ষতি, দ্বেষ, ঈর্ষা, প্রতারণা, কটুক্তি, নিষ্ঠুরাচরণ, এই আট প্রকার। ২ অৰ্বাচীন= নির্বোধ, অধম। অৰ্বাচ, নিপান=কূপ-সমীপস্থ জলাশয়। ৪ নিরুদ্বেগে=নাই উদ্বেগ যাহাতে (বহু )। উদ্বেগ =উৎ+বিজ +ঘ। বিশেষণে—উদ্বিগ্ন। রােমন্থ=গিলিত-চর্বণ ; রােমন্থন। চ,+ঈন । ৫ শকুন্তলা। ১ করুক আর, আমার শরাসনও কিয়ৎকাল বিশ্রাম- লাভ করুক। সেনাপতি কহিলেন, মহারাজের যেরূপ অভিরুচি! ২ রাজা কহিলেন, তবে যে সমস্ত মৃগয়া-সহচর অগ্রেই বন-প্রস্থান করিয়াছে, তাহাদিগকে ফিরাইয়া আন ; আর সেনাসংক্রান্ত লােকদিগকে বিশেষ সতর্ক করিয়া দাও, যেন তাহারা কোনক্রমে তপােবনের উৎপীড়ন না জন্মায়। সেনাপতি, যে আজ্ঞা মহারাজ! বলিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলে রাজা সন্নিহিত মৃগয়া-সহচরগণকে মৃগয়া-বেশ পরিত্যাগ করিতে আদেশ প্রদান করিলেন। তদনুসারে তাহারা সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলে রাজা মাধব্য সন্নিহিত লতা-মণ্ডপে ৩ প্রবিষ্ট হইয়া শীতল শিলাতলে উপবেশন করিলেন। এই রূপে উভয়ে নির্জনে উপবিষ্ট হইলে রাজা মাধব্যকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, বয়স্য ! তুমি চক্ষুর ফল পাও নাই; কারণ দর্শনীয় বস্তুই দেখ নাই। বস্তুই দেখ নাই। মাধব্য কহিলেন, কেন তুমি ত আমার সম্মুখে রহিয়াছ। রাজা কহিলেন, তা নয় হে! আমি আশ্ৰম-ললাম-ভূতা ক-দুহিতা শকুন্তলাকে ১ মুস্তা =মুথা। ২ অভিরুচি = ইচ্ছা, বাসনা। ৩ লতা-মণ্ডপ =গৃহ-বিশেষ। ৪ দর্শনীয় = দেখিবার যােগ্য। দৃশ+অনীয়। ৫ ললাম-ভূতা =ভূষণ-স্বরূপ।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৩.
লক্ষ্য করিয়া কহিতেছি। মাধব্য কৌতুক করিবার নিমিত্ত
কহিলেন, এ কি বয়স্য ! তপস্বি-কন্যায় অভিলাষ ! রাজা
কহিলেন, বয়স্য! পুরুবংশীয়-গণ এরূপ দুরাচার নহে যে,
পরিহার্য । বস্তুর উপভােগে অভিলাষ করে। তুমি জান
না, শকুন্তলা মেনকা-গর্ভ-স্যুতা, রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের কন্যা ;
তপস্বীর আশ্রমে প্রতিপালিত হইয়াছে এই মাত্র, বস্তুতঃ
তপস্বি-তনয়া নহে।
শকুন্তলার প্রতি রাজার প্রগাঢ় অনুরাগ দেখিয়া
মাধব্য হাস্যমুখে কহিলেন, যেমন পিণ্ড-খজুর ভক্ষণ করিয়া
রসনা মিষ্টরসে অভিভূত হইলে তিন্তিড়ী-ভক্ষণে । স্পৃহা হয় ;
সেইরূপ পরম-সুন্দর-স্ত্রী-র-পরিভােগে ৩ পরিতৃপ্ত হইয়া তুমি
এই অভিলাষ করিতেছ ! রাজা কহিলেন, না বয়স্য! তুমি
তাহাকে দেখ নাই, এই হেতু এরূপ কহিতেছ। মাধব্য
কহিলেন, তাহাতে সন্দেহ : কি! যে বস্তু তােমারও বিস্ময়
জন্মাইয়াছে, তাহা অবশ্যই রমণীয়! রাজা কহিলেন, বয়স্য !
অধিক আর কি বলিব, তাহার মূর্তিখানি মনে করিলে আমার
বােধ হয়, বুঝি বিধাতা ইহা প্রথমতঃ চিত্রপটে চিত্রিত
১ পরিহার্য=পরিত্যাগ করিবার উপযুক্ত। পরি+হা+ঘ্যণ।
২ তিন্তিড়ী=তেঁতুল।
স্ত্রী-রত্ন-পরিভােগে স্ত্রী রূপ রত্ন (রূপক ), তাহার পরিভােগ
{ ৬ষ্ঠী তৎ )।
৪ সন্দেহ=সম্+দিহ,+অ। বিশেষণে—সন্দিগ্ধ বা সন্দিহান।

৪০ শকুন্তলা। ১ করিয়া পরে জীবন-দান করিয়াছেন; অথবা, অথবা, মনে মনে মনােমত উপকরণ-সামগ্রী সকল সঙ্কলিত করিয়া মনে মনে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলির যথাস্থানে বিন্যাস-পূৰ্ব্বক, মনে মনেই তাহার শরীর নির্মাণ করিয়াছেন; হস্তদ্বারা নির্মিত হইলে শরীরের সেরূপ মাৰ্দব ৩ ও রূপ-লাবণ্যের মাধুরীর সম্ভাবনা ছিল না,ফলতঃ, ভাই রে, সে এক অভূতপূর্ব ৩ স্ত্রী-রত্ন-সৃষ্টি। মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! বুঝিলাম, শকুন্তলা যাবতীয় রূপবতীদিগের পরাভব-স্থান। রাজা কহিলেন, তাহার রূপ অনাঘ্রাত প্রফুল্ল কুসুম স্বরূপ, নখাঘাত-বর্জিত নব পল্লব স্বরূপ, অপরিহিত নূতন রত্ন স্বরূপ, অনাস্বাদিত অভিনব মধু স্বরূপ, জন্মান্তরীণ পুণ্যরাশির অখণ্ড ফল স্বরূপ। জানি না, কোন্ ভাগ্যবানের ভাগ্যে সেই সুনিৰ্ম্মল রূপের উপভােগ আছে ! ই 6 সঙ্কলিত = সংগৃহীত। সম্+কল+ক্ত। বিশেষ্যে-সঙ্কলন। বিন্যাস=স্থাপন। বি+নি+অ+ঘঞ। বিশেষণে বিন্যস্ত। মাদ্দব =মৃদুতা, কোমলত্ব। মৃদু+ভাবার্থে, ষ্ণ। অভূতপূৰ্ব =পূৰ্বে যাহা হয় নাই। পূৰ্বে ভূত =ভূতপূৰ্ব (৭মী তৎ), পরে নঞ তৎ। * অনাঘ্রাত = পূর্বে যাহা আম্রাণ করা হয় নাই। ন+আ+গ্রা + ক্ত। নঞ তৎ। আড্রাত—বিশেষণ পদ; বিশেষ্যে—আঘ্রাণ। ৬ জন্মান্তরীণ =পূৰ্ব্ব-জন্মে কৃত। অন্য জন্মজন্মান্তর (নিত্য সমাস); জন্মান্তর+ঈন। ৭ অখণ্ড =সম্পূর্ণ।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪১
;
রাজার মুখে শকুন্তলার এইরূপ অলৌকিক-রূপ-বর্ণনা
শুনিয়া চমৎকৃত হইয়া মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! তবে শীঘ্রই
তাহাকে হস্তগত কর ; দেখিও, যেন তােমার ভাবিতে
চিন্তিতে এরূপ দুর্লভ-রূপ-নিধান ১ কন্যা-নিধান ২ কোনও
অসভ্য তপস্বীর হস্তে নিপতিত না হয়। রাজা কহিলেন,
শকুন্তলা নিতান্ত পরাধীনা ; বিশেষতঃ কুলপতি কণা এক্ষণে
আশ্রমে নাই। মাধব্য কহিলেন, ভাল বয়স্য ! তােমায় এক
কথা জিজ্ঞাসা করি, বল দেখি, তােমার উপরি তাহার
অনুরাগ কেমন ? রাজা কহিলেন, বয়স্য! তপস্বি-কন্যা-গণ,
স্বভাবতঃ অপ্রগম্ভ-স্বভাব ; তথাপি, তাহার আকারে ও
ইঙ্গিতে আমার প্রতি তদীয় অনুরাগের স্পষ্ট লক্ষণ লক্ষিত
হইয়াছে—যতক্ষণ সে আমার সম্মুখে ছিল, ততক্ষণ আমার
সহিত কথা কয় নাই ; কিন্তু আমি কথা কহিতে আরম্ভ ৪
করিলে অন্যচিত্তা ৫ হইয়া ইহা স্থিরকর্ণে শ্রবণ করিয়াছে ;
নয়নে নয়নে সঙ্গতি : হইলে মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে, কিন্তু
১
;
ত
নিধান=আধার ; বিশেষ্য। বিশেষণে—নিহিত।
২ নিধান=রত্ন।
অপ্রগম্ভ=সলজ্জ, লজ্জাযুক্ত, অনুষ্কত।
৪ আরম্ভ = আ+রভ+ঘ। বিশেষণে—আরব্ধ।
অনন্তচিত্তা নাই অন্যদিকে চিত্ত যাহার (নঞতৎ, বহু )।
স্থিরকর্ণে=স্থির হইয়াছে কর্ণ যাহাতে (বহু)।
সঙ্গতি = মিলন। সম্+গ+ক্তি। বিশেষণে—সঙ্গত।
৭

৪২ শকুন্তলা । অন্য দিকেও অধিকক্ষণ চাহিয়া থাকে নাই। আবার প্রস্থান- কালে কতিপয় পদ মাত্র গমন করায় কুশের অঙ্কুরে তাহার পদতল ক্ষত হইল ; তখন চলিতে পারি না, ইহা বলিয়া সে দাড়াইয়া রহিল ; আর কুরবক-শাখায় বল লাগিয়াছে, ইহা বলিয়াও বল্কল-মােচন-চ্ছলে বিলম্ব করিয়া আমার দিকে মুখ ফিরাইয়া সতৃষ্ণ-নয়নে বারংবার নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। এই সকল অনুরাগের লক্ষণ ভিন্ন আর কি হইতে পারে ? মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! তবে তােমার মনােরথ-সিদ্ধির অধিক বিলম্ব নাই। ভাগ্যক্রমে তপােবন তােমার উপবন হইয়া উঠিল। রাজা কহিলেন, বয়স্য ! কোনও কোনও তপস্বী আমায় চিনিতে পারিয়াছেন। বল দেখি, এখন কি ছলে কিছুদিন তপােবনে থাকি মাধব্য কহিলেন, অন্য ছলের প্রয়ােজন কি তুমি রাজা, তপােবনে গিয়া তপস্বীদিগকে বল, আমি রাজস্ব আদায় করিতে আসিয়াছি ; যতদিন তােমরা রাজস্ব না দিবে, ততদিন আমি তপােবনে থাকিব। রাজা কহিলেন, তপস্বি-গণ সামান্য প্রজার ন্যায় রাজস্ব দেন না,—তাঁহারা অন্যবিধ রাজস্ব দিয়া থাকেন ; তাহারা যে রাজস্ব দেন, তাহা রত্নরাশি অপেক্ষাও প্রার্থনীয়। দেখ, সামান্য প্রজাগণ রাজাদিগকে যে রাজস্ব দেয়, তাহা বিনশ্বর ২; কিন্তু ? ? ১ ; প্রার্থনীয় = বাঞ্ছনীয়। প্র+অর্থ+অনীয়। ২ বিনশ্বর =বিনাশ-শীল, অনিত্য। বি+নশ+র। স্ত্রীলিঙ্গে -বিনশ্বরী।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৩
তপস্বি-গণ তপস্যার ষষ্ঠাংশ-স্বরূপ ১ অবিনশ্বর রাজস্ব প্রদান
করিয়া থাকেন।
রাজা ও মাধব্যের এইরূপ কথােপকথন চলিতেছে, এমন
সময়ে দ্বারবান্ আসিয়া কহিল, মহারাজ। তপােবন হইতে
দুই ঋষি-কুমার আসিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান আছেন, এক্ষণে
কি আজ্ঞা হয় ! রাজা কহিলেন, অবিলম্বে তাহাদিগকে
লইয়া আইস। তদনুসারে ঋষিকুমারেরা রাজসমীপে উপনীত
হইয়া, মহারাজের জয় হউক, বলিয়া আশীর্বাদ করিলেন।
রাজা আসন হইতে গাত্রোত্থান-পূৰ্ব্বক প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন, তপস্বি-গণ কি আজ্ঞা করিয়া পাঠাইয়াছেন, বলুন।
ঋষি-কুমারের কহিলেন, মহারাজ ! আপনি এখানে আছেন
জানিতে পারিয়া তপস্বি-গণ মহারাজকে
এই অনুরােধ
করিতেছেন যে, মহর্ষি আশ্রমে নাই, এই হেতু নিশাচর
যজ্ঞের ৩ বিঘ্ন জন্মাইতেছে ; অতএব আপনাকে
তাঁহার প্রত্যাগমন পর্যন্ত এই স্থানে থাকিয়া তপােবনের
উপদ্রব-নিবারণ করিতে হইবে। রাজা কহিলেন, তপস্বি-গণের
গণ ২
১ ষষ্ঠাংশ = রাজার শাসনে তপস্বি-গণ নির্বিঘ্নে তপস্যা করিতে
সমর্থ হন, এই জন্য তপস্যায় যে ফল-লাভ হইয়া থাকে, তাহার
ষষ্ঠ অংশ রাজার প্রাপ্য। “সৰ্বত্ৰ ধৰ্মষড়ভাগাে রাজ্ঞে ভবতি
রক্ষণাৎ।
২ নিশাচর==নিশা অর্থাৎ রাত্রিতে চরে যে (উপপদ ),
রাক্ষসাদি প্রাণী। নিশা+চ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—নিশাচরী।
৩ যজ্ঞ=জ+ন। বিশেষণে—যজ্ঞিয়, যজ্ঞীয়, যাজ্ঞিক।

৪৪ ; শকুন্তলা। এই আদেশে অনুগৃহীত হইলাম। মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! মন্দ কি, এ তােমার অনুকূল-গল-হস্ত ! রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন ; অনন্তর দৌবারিককে আহ্বান করিয়া রথ প্রস্তুত করিতে আদেশ দিয়া ঋষিকুমারদিগকে কহিলেন, আপনারা প্রস্থান করুন ; আমি যথাকালে তপােবনে উপস্থিত হইতেছি। ঋষিকুমারের সাতিশয় আহলাদিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! না হইবে কেন ? আপনি যে বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, আপনার এই ব্যবহার তাহারই উপযুক্ত বটে। বিপদ্গ্রস্তকে । অভয়-দান করা পুরুবংশীয়গণের কুল-ভ্ৰত। ৩ ইহা বলিয়া আশীর্বাদ-পূৰ্বক ঋষিকুমারের প্রস্থান করিলে রাজা মাধব্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য ! যদি তােমার শকুন্তলা-দর্শনে কৌতূহল থাকে, তাহা হইলে আমার সঙ্গে মাধব্য কহিলেন, তােমার মুখে ৪ তাহার বর্ণনা শুনিয়া দেখিতে সাতিশয় অভিলাষ হইয়াছিল ; কিন্তু এক্ষণে চল ! ১ অনুকূল-গলহস্ত =গলে হস্ত-প্রদান অনুকূল না হইলেও যখন ইহা হইতে কোন প্রীতিকর কাৰ্য অনুষ্ঠিত হয়, তখন ইহা অনুকূল এস্থলে যজ্ঞ-বিঘ্ন-নিবারণের জন্য তপােবনে অবস্থান করা বিশেষ প্রীতিকর না হইলেও শকুন্তলার দর্শন-লাভ হইবে বলিয়া অনুকূল গলহস্ত”। গ্রস্তগ্রস+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে-গ্রাস। কুলব্রত=বংশের রীতি। মুখে =অপাদান কারক। বিশেষণে-মুখ্য বা মৌখিক। ৫ অভিলাষ=অভি+লষ + ঘ; বিশেষ্য। বিশেষণে—অভিলাষী বা অভিলষিত। 3

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৫
নিশাচরের নাম শুনিয়া সে অভিলাষ একবারে তিরােহিত
হইয়াছে। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন,
ভয় কি, তুমি আমার নিকটে থাকিবে। মাধব্য কহিলেন,
তবে আর নিশাচরে আমার কি করিবে ? উভয়ের এইরূপ
কথােপকথন হইতেছে, এমন সময়ে দ্বারপাল আসিয়া কহিল,
মহারাজ। রথ প্রস্তুত, আরােহণ করিলেই হয়; কিন্তু বৃদ্ধা
মহিষীর বার্তা লইয়া করভক এইমাত্র রাজধানী হইতে
উপস্থিত হইল। রাজা কহিলেন, উহাকে অবিলম্বে আমার
নিকটে লইয়া আইস। অনন্তর করভক রাজ-সমীপে আসিয়া
নিবেদন করিল, মহারাজ! বৃদ্ধা দেবী আজ্ঞা করিয়াছেন,
আগামী ১ চতুর্থ দিবসে ভঁহার এক ব্ৰত আছে ; সেই দিবস
মহারাজকে স্বয়ং উপস্থিত থাকিতে হইবে।
এ দিকে তপস্বি-গণের কাৰ্য, ওদিকে গুরু-জনের আজ্ঞা,
—উভয়ই অনুল্লঙ্ঘনীয় ; এই
হেতু কৰ্তব্য-নিরূপণে
অসমর্থ হইয়া রাজা নিতান্ত ব্যাকুল-চিত্ত হইলেন ; এবং
মাধব্যকে কহিলেন, বয়স্য ! বিষম সঙ্কটে পড়িলাম; কি
করিব, কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। মাধব্য পরিহাস
২
১ আগামী = আ + গম্+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—আগামিনী।
অনুল্লঘনীয় = অনতিক্ৰমণীয়, অপরিহার্য।
ন+উৎ+ঘ+
অনীয়। নঞ তৎপুরুষ সমাস।
নিরূপণ=নির্ধারণ। নি+রূপ+অনটু। বিশেষণে—নিরূপিত।
ব্যাকুল-চিত্ত=ব্যাকুল হইয়াছে চিত্ত যাহার ( বহু)।
৪

৪৬
শকুন্তলা।
••
করিয়া কহিলেন, কেন, ত্রিশঙ্কুর ১ মত মধ্য-স্থলে থাক।
রাজা কহিলেন, বয়স্য ! এখন পরিহাসের সময় নয় ; সত্য
সত্যই নিতান্ত ব্যাকুল হইয়াছি; কি করি, কিছুই স্থির
করিতে পারিতেছি না। তিনি কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া
কহিলেন, সখে! মা, তােমায় পুত্রবৎ পরিগৃহীত করিয়াছেন
তুমি রাজধানীতে ফিরিয়া যাও, এবং জননীর পুত্র-কাৰ্য
সম্পন্ন কর। তাঁহাকে কহিবে, তপস্বি-গণের কাৰ্যে সাতিশয়
ব্যস্ত আছি, এজন্য যাইতে পারিলাম না। মাধব্য কহিলেন
ভাল, আমি চলিলাম ; কিন্তু তুমি যেন আমায় নিশাচর
ভয়ে কাতর মনে করিও না ; ইহা বলিয়া মাধব্য কহিলেন,
এখন আমি রাজার অনুজ হইলাম; অতএব রাজার অনুজের
মত যাইতে ইচ্ছা করি। রাজা কহিলেন, আমার সঙ্গে অধিক
লােক রাখিলে তপােবনের উৎপীড়ন হইতে পারে ; অতএব
করেন।
ক্রুদ্ধ হইয়া
১ ত্রিশঙ্কু—সূৰ্য্যবংশীয় পৃথু-নামক রাজার পুত্র। ইনি সশরীরে
স্বর্গ-গমনের বাসনায় যজ্ঞ করিবার জন্য কুল-পুরােহিত বশিষ্ঠকে বরণ
ইহাতে বশিষ্ঠ নিজ অক্ষমতা প্রকাশ করায় ত্রিশঙ্কু অন্য
পুরােহিত নিযুক্ত করিতে ইচ্ছা করিলেন। ইহাতে বশিষ্ঠ
তাহাকে শাপ দিলেন। তাহারই ফলে ত্রিশঙ্কুর চণ্ডালত্ব-প্রাপ্তি হইল।
অনন্তর বিশ্বামিত্রের যজ্ঞ-প্রভাবে ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে উঠিতে আরম্ভ
করিলেন, কিন্তু দেবরাজের কোপে পতিত হইয়া পুনৰ্বার সেস্থান হইতে
পতিত হইতে লাগিলেন। তাহা দেখিয়া বিশ্বামিত্র স্বীয় তপঃপ্রভাবে
তাহার পতন-নিবারণ-পূৰ্ব্বক মধ্যপথে অন্তরীক্ষে স্থাপন করিয়া রক্ষা
করেন।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৪৭
অনুচরদিগকে তােমারই সঙ্গে পাঠাইতেছি। মাধব্য শুনিয়া
সাতিশয় আহলাদিত হইয়া কহিলেন, অদ্য আমি যথার্থ ই
যুবরাজ হইলাম ।
এইরূপে মাধব্যের রাজধানী-প্রতিগমন অবধারিত হইলে
রাজার অন্তঃকরণে এই আশঙ্কা উপস্থিত হইল যে, বয়স্ক
অতি চপল-স্বভাব ; ১ হয় ত, সে শকুন্তলা-বৃত্তান্ত অন্তঃপুরে
প্রকাশ করিবে, এখন ইহার কি উপায় করি; অথবা ইহা
বলিয়াই বিদায় করি ;-ইহা স্থির করিয়া তিনি মাধব্যের
হস্তে ধরিয়া কহিলেন, বয়স্য ! ঋষিগণ কয়েক দিনের জন্য
তপােবনে থাকিতে আমায় অনুরােধ করিয়াছেন, এই হেতু
রহিলাম, নতুবা যথার্থই আমি শকুন্তলা-লাভে অত্যন্ত
অভিলাষী * হইয়াছি, এরূপ মনে করিও না। আমি ইতঃ-
পূর্বে তােমার নিকটে শকুন্তলা-সংক্রান্ত যে সকল গল্প
করিয়াছি, সে সমস্তই পরিহাস-মাত্র; তুমি যেন ইহাদিগকে
যথার্থ ভাবিয়া একে আর করিও না। মাধব্য কহিলেন,
তাহাতে সন্দেহ কি ? আমি একবারও তােমার ঐ সকল
কথা যথার্থ মনে করি নাই। অনন্তর রাজা তপীদিগের
যজ্ঞ-বিঘ্ন-নিবারণাৰ্থ তপােবনে প্রবিষ্ট হইলেন; এবং মাধব্যও
যাবতীয় সৈন্য, সামন্ত ও সমস্ত অনুযাত্রিক
সঙ্গে লইয়া
রাজধানী-প্রস্থান করিলেন।
১ চপল-স্বভাব=চপল ( চঞ্চল ) হইয়াছে স্বভাব যাহার (বহু )।
২ অভিলাষী=অভি+লষ+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—অভিলাষিণী।
৩ অনুযাত্রিক =অনুচর, অনুগামী, সঙ্গী। অনু+(যাত্রা+ফিক ।

তৃতীয় অঙ্ক। শকুন্তলার নিমিত্ত দুষ্যন্তের ও দুষ্যন্তের নিমিত্ত শকুন্তলার উৎকণ্ঠা ;-অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার নিকটে শকুন্তলার মনােভাব-প্রকাশ;-শকুন্তলার প্রণয়-পত্রিকা-রচন ও সখীদিগের নিকটে তাহার পঠন ;-দুষ্যন্ত-কর্তৃক তাহার শ্রবণ ও উপস্থিতি; দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার পরস্পর প্রণয়-সম্ভাষণ ;-শকুন্তলার গমন ও মৃণাল-বলয়ের উদ্দেশে পুনরাগমন;—দুষ্যন্ত-কর্তৃক শকুন্তলার হস্তে মৃণাল-বলয়-পরিধাপন ও ফুৎকার দিয়া তাহার নেত্র হইতে কর্ণোৎপল-রেণুর দূরীকরণ ;-সখী-গণ-কর্তৃক শকুন্তলার আহ্বান এবং গৌতমীর সহিত তাহার প্রস্থান :-গান্ধর্ব-বিধানে দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার বিবাহ, এবং কিয়ৎকাল রাজার তপােবনে অবস্থান ও পরে রাজধানী-প্রস্থান। রাজা মাধব্য-সমভিব্যাহারে সমস্ত সৈন্য সামন্ত বিদায় করিয়া দিয়া তপস্বিকার্যের অনুরােধে তপােবনে অবস্থিতি করিলেন ; কিন্তু দিন-যামিনী ১ কেবল শকুন্তলা-চিন্তায় একান্ত মগ্ন ২ হইয়া প্রতিদিন কৃশ, মলিন, দুর্বল ও সর্বব- বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইতে লাগিলেন। আহার, বিহার, শয়ন, উপবেশন, কোনও বিষয়েই তাহার মনে সুখ ছিল কোন্ সময়ে কোন্ স্থানে গমন করিলে তিনি শকুন্তলাকে দেখিতে পাইবেন, ইহাই তাহার অনুধ্যান । ১ যামিনী=রাত্রি। যাম (প্রহর)+অন্ত্যর্থে ইন্+ঈ (স্ত্রীলিঙ্গে)। ২ মগ্ন =ম+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষে-মজ্জন। অনুধ্যান=চিন্তা। অনু+ধ্যৈ+অনটু। বিশেষণে—অনুধ্যাত।

৪৯ তৃতীয় অঙ্ক। অনুসন্ধান। কিন্তু পাছে পােবন-বাসি-গণ তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারেন, এই আশঙ্কায় তিনি সতত সাতিশয় সঙ্কুচিত থাকেন। এক দিন মধ্যাহ্ন-কালে রাজা নির্জনে উপবিষ্ট হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, শকুন্তলার দর্শন-ব্যতিরেকে আমার প্রাণ-রক্ষার অন্য উপায় নাই। কিন্তু তপস্বি-গণের প্রয়ােজন সম্পন্ন হইলে যখন তাহারা আমায় রাজধানী-প্রতিগমনের অনুমতি করিবেন, তখন আমার কি দশা হইবে ? এবং কিরূপে তাপিত ১ প্রাণ শীতল করিব ? সে যাহা হউক, এখন কোথায় যাইলে শকুন্তলাকে দেখিতে পাই। বােধ করি, প্রিয়া মালিনী-তীরবর্তী শীতল লত-মণ্ডপে আতপ- কাল অতিবাহিত করিতেছেন; সেই স্থানেই যাই, তাহাকে দেখিতে পাইব। ইহা বলিয়া তিনি গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্ন- সময়ে সেই লা-মণ্ডপের উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। এ দিকে শকুন্তলাও রাজ-দর্শন-দিবসাবধি দুঃসহ ৩ বিরহ- বেদনায় নিরতিশয় কাতর হইয়াছিলেন। ফলতঃ তাহার ও রাজার অবস্থার কোন অংশে কোনই প্রভেদ ছিল না। সে দিবস শকুন্তলা সাতিশয় অসুস্থ হওয়াতে অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা তাহাকে মালিনী-তীরবর্তি নিকুঞ্জ-বনে লইয়া ১ তাপিত = তাপ+জাতার্থে ইত। ২ আতপ-কাল=মধ্যাহ্ন-সময়। দুঃসহ =দুর+সহ+খল। ৪ শকুন্তলা। গেলেন; তন্মধ্যবর্তি শীতল শিলাতলে নব পল্লব ও জল- সিক্ত ১ নলিনী-দল ২ প্রভৃতি দ্বারা শয্যা প্রস্তুত করিলেন; এবং তাহাতে শয়ন করাইয়া অশেষ প্রকারে তাহার শুশ্রুষা ৩ করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে সেই নিকুঞ্জ-বনের সন্নিহিত হইয়া চরণ-চিহ্ন প্রভৃতি লক্ষণ দ্বারা বুঝিতে পারিলেন, শকুন্তলা সেই স্থানে অবস্থিতি করিতেছেন। তিনি কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া লতার অন্তরাল হইতে শকুন্তলাকে দৃষ্টিগােচর করিয়া অত্যন্ত প্রীত হইয়া কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ার দর্শনে আমার নয়ন-যুগল শীতল হইল। ইহারা তিন সখীতে কি কথােপকথন করিতেছেন, লতা-বিতানে ৪ ব্যবহিত ৫ হইয়া তাহা কিয়ৎ-ক্ষণ শ্রবণ করি। ইহা বলিয়া রাজা উৎসুক-চিত্তে সেই সকল কথা শ্রবণ সতৃষ্ণ-নয়নে তাহাদিগকে অবলােকন করিতে লাগিলেন। শকুন্তলার শরীর-সন্তাপ শতিশয় প্রবল হওয়াতে অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা শীতল সলিল-সিক্ত নলনী-দল লইয়া কিয়ৎক্ষণ আঃ! ১ জল-সিক্ত = জলদ্বারা সিক্ত ( ৩য়া তৎ)। ২ নলিনী-দল= পদ্ম-পত্র (৬ষ্ঠীতৎ)। ৩ শুশ্রুষা = ঞ+সন্+অ+ আপ; বিশেষ্য। বিশেষণে—শুধু। বিতান - চাদোয়া, পট-মণ্ডপ; অথবা সমূহ। ব্যবহিত = আচ্ছাদিত, অন্তরিত। বি+অব+ধ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে ব্যবধান। ৬ সলিল-সিক্ত=সলিল অর্থাৎ জল তারা সিক্ত (৩য়া তৎ)। ৪ ৫ তৃতীয় অঙ্ক। বায়ু-সঞ্চালন করিলেন, এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, সখি শকুন্তলে! কেমন, নলিনী-দল-বায়ু তােমার সুখ-জনক বােধ হইতেছে ? শকুন্তলা কহিলেন, সখি ! তােমরা কি বাতাস করিতেছ ? উভয়ে শুনিয়া সাতিশয় বিষন্ন ৩ হইয়া পরস্পর মুখ-নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। বাস্তবিক তৎকালে শকুন্তলা দুষ্যন্ত-চিন্তায় একান্ত মগ্ন হইয়া একবারে বাহ্য-জ্ঞান-শূন্য হইয়াছিলেন । রাজা শুনিয়া ও শকুন্তলার অবস্থা দেখিয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন, ইহঁকে অদ্য নিরতিশয় অসুস্থ-দেহা দেখিতেছি। কিন্তু কি কারণে ইনি এরূপ অসুস্থ হইয়াছেন ? গ্রীষ্মের প্রাদুর্ভাব-বশতঃ ইহার ঈদৃশ অসুখ, অথবা যে কারণে আমার এই অবস্থা ঘটিয়াছে, সেই কারণেই ইহারও এই অবস্থা? এ বিষয়ে আর সংশয় ৫ রাখিবার আবশ্যকতা নাই ; গ্রীষ্মদোষে কামিনী- গণের এরূপ অবস্থা কোনও মতেই সম্ভাবিত নহে। প্রিয়ংবদা শকুন্তলার অগােচরে অনসূয়াকে কহিলেন, সখি ! সেই রাজর্ষির প্রথম-দর্শন-অবধিই শকুন্তলার কেমন - ১ সঞ্চালন=সম্+চল+ ণিচ+অনটু। বিশেষণে—সঞ্চালিত। জনক=জন্+ ণিচ+ণক। স্ত্রীলিঙ্গে—জনিকা। বিষন্ন=বি+সদ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে-বিষাদ। বিপরীত -প্রসন্ন। বাহ=বহিস্+ষ্ণ। বিপরীত—আন্তরিক। ৫ সংশয়=সম্+শী+অল্ ; বিশেষ্য। বিশেষণে—সংশয়িত। ৪ ; শকুন্তলা। একপ্রকার ভাবান্তর হইয়াছে ; এই কারণে ত ইহার এরূপ অবস্থা ঘটে নাই ? অনসূয়া কহিলেন, সখি! আমারও এই আশঙ্কাই হয়; ভাল, জিজ্ঞাসা করিতেছি। ইহা বলিয়া তিনি শকুন্তলাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, প্রিয়সখি । তােমার শরীরের গ্লানি উত্তরােত্তর বলবতী হইয়া উঠিতেছে; অতএব আমরা তােমায় কিছু জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করি। শকুন্তলা কহিলেন, সখি ! কি বলিবে বল । তখন অনসূয়া কহিলেন, তােমার মনের কথা কি, আমরা তাহার বিন্দুবিসর্গও জানি কিন্তু ইতিহাস-কথায় বিরহী ১ জনের যেরূপ অবস্থা শুনিতে পাই, বােধ হয় তােমারও তােমারও যেন সেই অবস্থা ঘটিয়াছে। সে যাহা হউক, কি কারণে তােমার এত অসুখ হইয়াছে, বল ; প্রকৃত-রূপে রােগ-নির্ণয় না হইলে প্রতীকার- চেষ্টা ২ হইতে পারে না। শকুন্তলা কহিলেন সখি ! আমার যে কিরূপ ক্লেশ হইতেছে, এখন তাহা বলিতে পারিব না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, অনসূয়া ভালই বলিতেছে ; কেন তােমার মনের বেদনা গােপন করিয়া গােপন করিয়া রাখ ? দিন দিন কৃশ ও দুর্বল হইতেছ। দেখ, তােমার শরীরে আর কি আছে ? কেবল লাবণ্যময়ী ছায়া অবশিষ্ট রহিয়াছে। রাজা অন্তরাল হইতে শ্রবণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ংবদা যথার্থ কহিয়াছে ;-শকুন্তলার শরীর নিতান্ত কৃশ ১ বিরহী = বিরহ+অস্ত্যর্থে ইন্। স্ত্রীলিঙ্গে–বিরহিণী। ২ প্রতীকার =প্রতি+কৃ+ ঘঞ। উপসর্গের ইকার দীর্ঘ হইয়াছে ৪ ! তৃতীয় অঙ্ক। ও একান্ত বিবর্ণ হইয়াছে। কিন্তু কি চমৎকার! তাহার এই অবস্থা দেখিয়াও আমি মনের ও নয়নের অনির্বচনীয় ২ প্রীতিলাভ করিতেছি। অবশেষে শকুন্তলা মনের ব্যথা ও আর গােপন করা অসাধ্য বিবেচনা করিয়া দীর্ঘনিশ্বাস-পরিত্যাগ-পূর্বক কহিলেন, সখি! যদি তােমাদের নিকটে না বলিব, তবে আর কাহার নিকটে বলিব কিন্তু মনের বেদনা ব্যক্ত করিয়া তােমাদিকে বৃথা দুঃখভাগিনী করিব, অথচ আমার দুঃখের লাঘব হইবে না। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি! এই জন্যই ত আমরা এত আগ্রহ আগ্রহ প্রকাশ করিতেছি। তুমি কি জান না, আত্মীয় জনের নিকটে দুঃখের কথা কহিলেও দুঃখের অনেক লাঘব ৫ হইয়া থাকে। এই সময়ে রাজা শঙ্কিত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, যখন সুখে সুখী ও দুঃখে দুঃখী জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, তখন অবশ্যই শকুন্তলা স্বীয় মনের বেদনা ব্যক্ত করিবেন। প্রথম-দর্শন-দিবসে প্রস্থান-কালে সতৃষ্ণ-নয়নে ১ বিবর্ণ==বিগত হইয়াছে বর্ণ যাহার ( বহু)। ২ অনির্বচনীয়=ন+নি+বচ+অনীয়। ব্যথা=ব্যথু+ও+আপ; বিশেষ্য। বিশেষণে-ব্যথিত। ব্যক্ত=বি+ অজ+ক্ত। প্রকাশিত। বিশেষ্যে—ব্যক্তি। লাঘব=হ্রাস, লঘুতা। লঘু+ভাবার্থে ষ্ণ। বিপরীত—গৌরব। ৬ সুখে সুখী••••••= অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা শকুন্তলার সুখে সুখিনী এবং দুঃখে দুঃখিনী। ৫

৫৪
শকুন্তলা।
২
বারংবার নিরীক্ষণ করাতে অনুরাগের স্পষ্ট লক্ষণ প্রদর্শিত
হইয়াছিল ; তথাপি এখন তিনি কি বলিবেন, এই আশঙ্কায়
অভিভূত ও কাতর হইতেছি।
শকুন্তলা কহিলেন, সখি । যে অবধি আমি সেই
রাজর্ষিকে নয়নগােচর করিয়াছি—এই মাত্র কহিয়া তিনি
লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রহিলেন, এবং আর কিছুই বলিতে
পারিলেন না।
তখন তাঁহারা উভয়ে কহিতে লাগিলেন,
সখি ! বল, বল, আমাদের নিকটে লজ্জা কি ? শকুন্তলা
কহিলেন,—সেই অবধি তাহাতে অনুরাগিণী হওয়ায় আমার
এইরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে। ইহা বলিয়া তিনি বিষন্ন-বদনে
ও অশ্ৰ-পূৰ্ণ-নয়নে। লজ্জায় অধােমুখী হইয়া রহিলেন।
অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা সাতিশয় প্রীত হইয়া কহিলেন, সখি !
সৌভাগ্যক্রমে তুমি
অনুরূপ পাত্রেই অনুরাগিণী হইয়াছ;
মহানদী মহাসাগর পরিত্যাগ করিয়া আর কোন্ জলাশয়ে
প্রবেশ করিবে ?
রাজা শুনিয়া আহলাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া কহিতে
লাগিলেন, যাহা শুনিবার, তাহাই শুনিলাম ;-এত দিনের
পরে আমার পিত প্রাণ শীতল হইল।
অনুরাগিণী=অনুরাগ+অস্ত্যর্থে ইন্+ঈপ। পুংলিঙ্গে—অনুরাগী।
২ বিষন্ন-বদনে=বিষন্ন হইয়াছে বদন যাহাতে (বহু ); ক্রিয়া-
বিশেষণ।
৩ অশ্রু-পূর্ণ-নয়নে = অদ্বারা পূর্ণ (৩য় তৎ ), অশ্রু-পূর্ণ নয়ন
যাহাতে (বহু)। নয়ন=নী+অনটু করণ-বাচ্যে।
১

পারি না ;
তৃতীয় অঙ্ক।
শকুন্তলা কহিলেন, সখি ! আমি আর যাতনা সহ্য করিতে
এখন প্রাণ-বিয়ােগ হইলেই পরিত্রাণ হয়।
প্রিয়ংবদা শুনিয়া
শুনিয়া সাতিশয় শঙ্কিত ১ হইয়া শকুন্তলার
অগােচরে অনসূয়াকে কহিলেন, সখি ! আর ইহাকে সান্ত্বনা
করিয়া ক্ষান্ত রাখিবার সময় নাই ; আমার মতে, এখন
আর কালাতিপাত করা উচিত নহে; সত্বর কোনও উপায়
স্থির করা আবশ্যক।
তখন অনসূয়া কহিলেন, সখি !
যাহাতে অবিলম্বে ২ অথচ গোপনে শকুন্তলার মনােভিলাষ পূর্ণ
হয়, এমন কি উপায় আছে, বল । প্রিয়ংবদা কহিলেন,
গােপনের জন্যই ভাবনা, অবিলম্বে হওয়া কঠিন
নহে। অনসূয়া কহিলেন, কি জন্য, বল শুনি। প্রিয়ংবদা
কহিলেন, কেন, তুমি
কি দেখ নাই, সেই রাজর্ষিও
শকুন্তলাকে দেখিয়া অবধি দিন দিন দুর্বল ও কৃশ
হইতেছেন ?
রাজা শুনিয়া স্বীয় শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন,
যথার্থ ই আমি এরূপ হইয়াছি বটে। নিরন্তর ৩ অন্তর-তাপে
তাপিত হইয়া আমার শরীর বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে; এবং
আমি বিলক্ষণ দুর্বল ও কৃশ হইয়া পড়িতেছি।
প্রিয়ংবদা কহিলেন,
অনসূয়ে ! শকুন্তলার প্রণয়-পত্রিকা
সখি !
১ শঙ্কিত=শঙ্কা+জাত অর্থে ইত।
২ অবিলম্বে=নাই বিলম্ব যাহাতে (বহু)। ক্রিয়ার বিশেষণ।
নিরন্তর=নাই অন্তর ( অবকাশ বা অবসর) যাহাতে (বহু)।

শকুন্তলা।
রচনা করা যাউক ; সেই পত্রিকা পুষ্পের মধ্যগত করিয়া
নিৰ্ম্মাল্য-চ্ছলে আমি রাজর্ষির হস্তে দিয়া আসিব। অনসূয়া
কহিলেন, সখি! এ অতি উত্তম পরামর্শ ; দেখ, শকুন্তলাই
বা কি বলে। শকুন্তলা কহিলেন, সখি ! আমায় আর কি
জিজ্ঞাসা করিবে ? তোমাদের যাহা ভাল বােধ হয়, তাহাই
তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন, তবে আর বিলম্বে প্রয়ােজন
নাই ; একখানি মনােমত প্রণয়-পত্রিকা রচনা কর। শকুন্তলা
কহিলেন, সখি ! রচনা করিতেছি; কিন্তু পাছে তিনি অবজ্ঞা
করেন, এই আশঙ্কায় আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে।
রাজা শকুন্তলার আশঙ্কা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন,
এবং তাহাকে উদ্দেশ করিয়া কহিতে লাগিলেন, সুন্দরি !
তুমি যাহার অবজ্ঞা-ভয়ে ভীত হইতেছ, সে এই হতভাগ্য
তােমার সমাগমের নিমিত্ত একান্ত উৎসুক হইয়া রহিয়াছে ;
তুমি কি জান না, রত্ন কাহারও অন্বেষণ করে না, সকলে
রত্নেরই অন্বেষণ করিয়া থাকে।
অনসূয়া ও
প্রিয়ংবদা শকুন্তলার আশঙ্কা শুনিয়া
কহিলেন, অয়ি আত্ম-গুণাবমানিনি ! কোন্ ব্যক্তি
১ অবজ্ঞা-ভয়ে=অবজ্ঞা হইতে ভয় ( ৫মী তৎ )।
আত্ম-গুণাবমানিনি= =যে আপন গুণের অবমাননা করে। অব+
মন্ + ণিন্ + ঈ =অবমানিনী—সম্বােধনে। পুংলিঙ্গে-অবমানী,
সম্বােধনে--অবমানিন ।

তৃতীয় অঙ্ক। ৫৭ ১ লিখি, আতপত্র দ্বারা শরৎকালীন জ্যোৎস্নার নিবারণ করিয়া থাকে ? শকুন্তলা ঈষৎ হাস্য করিয়া পত্রিকা-রচনায় প্রবৃত্ত হইলেন, এবং কিঞ্চিৎ পরে কহিলেন, সখি ! রচনা করিয়াছি, কিন্তু লেখন-সামগ্ৰী ২ কিছুই নাই, কিসে বল। প্রিয়ংবদা কহিলেন, এই পদ্ম-পত্রে লেখ। লেখন-সমাপন করিয়া শকুন্তলা সখীদিগকে কহিলেন, ভাল, শুন দেখি, লেখন সঙ্গত হইয়াছে কি না! তাহারা শুনিতে লাগিলেন ; শকুন্তলা পড়িতে আরম্ভ করিলেন,—হে নির্দয় ! আমি তােমার মন জানি না, কিন্তু আমি তােমাতে একান্ত অনুরাগিণী হইয়া নিরন্তর সন্তাপিত হইতেছি ;- এই মাত্র শুনিয়া আর অন্তরালে থাকিতে না পারিয়া রাজা সহসা শকুন্তলার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন, এবং কহিলেন, সুন্দরি ! তুমি সন্তাপিত হইতেছ, যথার্থ বটে; কিন্তু বলিলে বিশ্বাস করিবে না, আমি একবারেই দগ্ধ হইতেছি। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা সহসা রাজাকে সমাগত দেখিয়া সাতিশয় হর্ষিত হইলেন, এবং গাত্রোত্থান-পূর্বক পরম-সমাদরে স্বাগত-জিজ্ঞাসা করিয়া তাহাকে উপবেশন করিতে ১ আতপত্র= ছত্র। আতপ অর্থাৎ রৌদ্র হইতে ত্রাণ করে যে (উপপদ )। আতপ+ত্রৈ+ড। ২ লিখন-সামগ্রী=কালী, কলম, কাগজ প্রভৃতি লিখিবার দ্রব্য- সমূহ। সমগ্র+ষ্ণ+ঈ= সামগ্রী। স্বাগত-জিজ্ঞাসা = কুশল-প্রশ্ন। স্বাগত =সু+আগত; শুভাগমন।

৫৮ শকুন্তলা। অনুরােধ করিলেন। শকুন্তলা নিরতিশয় ব্যস্ত হইয়া গাত্রোত্থান করিতে উদ্যত হইলেন। তখন রাজা শকুন্তলাকে নিবারণ করিয়া কহিলেন, সুন্দরি ! গাত্রোত্থান করিবার প্রয়ােজন নাই; তােমার দর্শনেই আমার সম্পূর্ণ সংবর্ধনা-লাভ ১ হইয়াছে। বিশেষতঃ তােমার শরীরের যেরূপ গ্লানি, ২ তাহাতে কোন মতেই শয্যা ৩ পরিত্যাগ করা তােমার বিধেয় নহে। সখীরা রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ ! এই শিলাতলে উপবেশন করুন। রাজ। উপবিষ্ট হইলেন । শকুন্তলা লজ্জায় সাতিশয় জড়ীভূত * হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, হৃদয়! যাহার জন্য তুমি তত উৎকণ্ঠিত হইয়াছিলে, এখন তাহাকে দেখিয়া এত কাতর হইতেছ কেন ? রাজা অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, অদ্য আমি তােমাদের সখীকে সাতিশয় অসুস্থ দেখিতেছি। উভয়েই ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, মহাশয়। এখন ইনি সুস্থ হইলেন। শকুন্তলা লজ্জায় অবনত-মুখী । হইয়া রহিলেন। ১ সংবর্ধনা = অভ্যর্থনা। সম্ + বৃধ, + ণিচ, + অন + আপ; বিশেষ্য। বিশেষণে—সংবর্ধিত। ২ গ্লানি=গ্লৈ+ক্তি ; বিশেষ্য। বিশেষণে—গ্লান। ৩ শয্যা =শী+ক্যপ+আপ। জড়ীভূত=জড়+চি,+ভূক্ত। অবনত-মুখী=অবনত হইয়াছে মুখ যাহার (বহু) স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ। স্ত্রীলিঙ্গে “অবনত-মুখা”ও হয়। ১ ৫ তৃতীয় অঙ্ক। অনসূয়া কহিলেন, মহারাজ ! শুনিতে পাই, রাজাদিগের অনেক মহিষী থাকে, কিন্তু সকলেই প্রেয়সী ১ হয় না ; অতএব আমরা যেন সখীর জন্য অবশেষে মনােদুঃখ না পাই। রাজা কহিলেন, যথার্থ বটে, রাজাদিগের অনেক মহিলা থাকে। কিন্তু আমি অকপট-হৃদয়ে কহিতেছি, তােমাদের সখীই আমার জীবন-সব-স্ব হইবেন। তখন অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা সাতিশয় হর্ষিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ এক্ষণে আমরা নিশ্চিন্ত ২ ও চরিতার্থ ৩ হইলাম। শকুন্তলা কহিলেন, আমরা মহারাজকে লক্ষ্য করিয়া কত কথাই কহিয়াছি ; ক্ষমা প্রার্থনা কর। সখীরা হাস্যমুখে কহিলেন, যে কহিয়াছে, সেই ক্ষমা প্রার্থনা করিবে, অন্যের কি প্রয়ােজন ? তখন শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ ! যদি কিছু বলিয়া থাকি, ক্ষমা করিবেন; পরােক্ষে ৪ কে কি না বলে। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন। এইরূপ কথােপকথন হইতেছে, এমন সময়ে প্রিয়ংবদা লতা-মণ্ডপের বহির্ভাগে দৃষ্টি-নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, অনসূয়ে ! মৃগ-শাবকটি একান্ত মৃগ-শাবকটি একান্ত উৎসুক হইয়া ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত বােধ হয়, নিজ জননীর অন্বেষণ সখি ! ; করিতেছে ; ১ প্রেয়সী=প্রিয়তমা। প্রিয়+ঈয়সু+ঈপ। পুংলিঙ্গে—প্রেয়া। ২ নিশ্চিন্ত =নাই চিন্তা যাহার (বহু)। চরিতার্থ =কৃতার্থ। চরিত হইয়াছে অর্থ যৎ-কর্তৃক (বহু )। ৪ পরােক্ষে-চক্ষুর অগােচরে, অসাক্ষাদ্ভাবে।

শকুন্তলা।
;
নাথকে ২
করিতেছে ; আমি ইহাকে ইহার মাতার নিকটে দিয়া আসি।
তখন অনসূয়া কহিলেন, সখি ! মৃগ-শাবকটি অতি চঞ্চল,
তুমি একাকিনী ইহাকে ধরিতে পারিবে না; চল, আমিও
যাই। ইহা বলিয়া উভয়ে প্রস্থানােম্মুখী’ হইলেন। শকুন্তলা
উভয়কেই প্রস্থান করিতে দেখিয়া কহিলেন, সখি! তােমরা
দুই জনেই আমায় ফেলিয়া চলিলে, আমি এখানে একাকিনী
রহিলাম। তাহারা কহিলেন, সখি ! একাকিনী কেন, পৃথিবী-
তােমার নিকটে রাখিয়া গেলাম। ইহা বলিয়া
হাসিতে হাসিতে উভয়েই লতা-মণ্ডপ হইতে প্রস্থান
করিলেন।
তাহারা প্রস্থান করিলে শকুন্তলা, সত্য সত্যই সখীরা
চলিয়া গেল, ইহা বলিয়া উৎকণ্ঠিতার ন্যায় হইলেন। রাজা
কহিলেন, সুন্দরি ! সখীদের নিমিত্ত এত উৎকণ্ঠিত
হইতেছ কেন? আমি তােমার সখী-স্থানে রহিয়াছি ; যখন
যে আদেশ করিবে, তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদিত হইবে ।
শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! আপনি অতি মাননীয় ব্যক্তি,
এই দুঃখিনীকে অকারণে অপরাধিনী করেন কেন? ইহা
বলিয়া শয্যা হইতে উঠিয়া শকুন্তলা গমনােম্মুখী হইলেন।
১
প্রস্থানােম্মুখী=প্রস্থানে উন্মুখী (৭মী তৎ)। গমনােতা।
২ পৃথিবী-নাথ = রাজা। পৃথিবীর নাথ (৬ষ্ঠী তৎ)।
উৎকণ্ঠিত = চিন্তিত। উৎকণ্ঠা +জাত অর্থে ইত।
অপরাধিনী = অপরাধ+অস্ত্যর্থে ইন+ঈপ। পুংলিঙ্গে অপরাধী।
৪

এ কি কর;
তৃতীয় অঙ্ক।
রাজা কহিলেন, সুন্দরি !
একে তােমার
এইরূপ অবস্থা, তাহাতে আবার মধ্যাহ্ন-কাল অতি উত্তাপের
সময় ; এ অবস্থায় এ সময়ে লতা-মণ্ডপ হইতে বহির্গত
হওয়া কোনও মতেই উচিত নহে। ইহা বলিয়া হস্তে ধরিয়া
রাজা তাঁহাকে নিষেধ করিতে লাগিলেন।
শকুন্তলা
কহিলেন, মহারাজ! ও কি কর, ছাড়িয়া দাও, সখীদের
নিকটে যাই ; তুমি জান না, আমি আমারই বশে নহি।
রাজা লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হইয়া শকুন্তলার হাত ছাড়িয়া
দিলেন।
শকুন্তলা কহিলেন, মহারাজ! আপনি লজ্জিত
হইতেছেন কেন ? আমি আপনাকে কিছু বলিতেছি না,
দৈবের ১
তিরস্কার করিতেছি। রাজা কহিলেন, দৈবের
তিরস্কার করিতেছ কেন ? দৈবের অপরাধ কি? শকুন্তলা
কহিলেন, দৈবের তিরস্কার শত বার করিব ; সে আমায়
পরের অধীন করিয়া পরের গুণে মােহিত ৭ করে কেন ?
ইহা বলিয়া শকুন্তলা চলিয়া যাইবার উপক্রম → করিলেন।
রাজা পুনর্বার শকুন্তলার হস্তে ধরিলেন। শকুন্তলা কহিলেন,
মহারাজ! কি করেন, ঋষিগণ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছেন।
তখন রাজা কহিলেন, সুন্দরি ! তুমি গুরু জনের ভয়
১ দৈব =পূৰ্ব্ব-জন্ম-কৃত কৰ্ম্ম।
২ মােহিত = মুহ,+ণিচ+ক্ত। অথবা মােহ+জাত অর্থে ইত।
অণিজন্ত অবস্থায় মুগ্ধ ও মূঢ়।
উপক্রম =উপ+ক্রম+অল্। বিশেষণে—উপক্রান্ত।

শকুন্তলা।
১
করিতেছ কেন ? ভগবান্
কণ কখনই রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট
হইবেন না। শত শত রাজর্ষি-কন্যা গুরু জনের অগােচরে
গান্ধব-বিধানে ২
অনুরূপ পাত্রের হস্তগত হইয়াছেন, এবং
তাঁহাদের গুরু-জন-গণও পরিশেষে সবিশেষ অবগত হইয়া
তাহাতে সম্পূর্ণ অনুমােদন করিয়াছেন। মহারাজ ! এই
সম্ভাষণমাত্ৰ-পরিচিত ব্যক্তিকে ভুলিবেন না, ইহা বলিয়া
শকুন্তলা রাজার হাত ছাড়াইয়া চলিয়া গেলেন। রাজা
কহিলেন, সুন্দরি ! তুমি আমার হাত ছাড়াইয়া সম্মুখ হইতে
চলিয়া যাইতেছে, কিন্তু আমার চিত্ত হইতে চলিয়া যাইতে
পারিবে না। শকুন্তলা শুনিয় মনে মনে কহিতে লাগিলেন,
ইহা শুনিয়া আর আমার পা উঠিতেছে না। যাহা হউক
কিয়ৎ-ক্ষণ অন্তরালে থাকিয়া ইহার অনুরাগ ৩ পরীক্ষা করিব।
ইহা বলিয়া লতা-বিতানে আবৃত-শরীরা হইয়া শকুন্তলা
কিঞ্চিদ্দরে
রে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
রাজা একাকী লতা-মণ্ডপে অবস্থিত হইয়া শকুন্তলাকে
উদ্দেশ করিয়া কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে। আমি তােমা ভিন্ন
আর কিছুই জানি না; কিন্তু তুমি নিতান্ত নির্দয় হইয়া আমায়
১
রুষ্ট =ক্রুদ্ধ। রুষ+ক্ত ;
বিশেষণ। বিশেষ্যে-রােষ।
২ গান্ধৰ্ব্ব-বিধান = আপনার ইচ্ছানুসারে বর ও কন্যার পরস্পর
সংযােগ হইলে তাহাকে গান্ধর্ব-বিধানে (নিয়মে ) বিবাহ বলে।
৩ অনুরাগ = অনু+র+ঘঞ। বিশেষণে-অনুরক্ত বা অনুরাগী।
বিপরীত--বিরাগ।

তৃতীয় অঙ্ক।
একবারেই পরিত্যাগ করিয়া যাইলে ; তুমি বড়ই কঠিন।
তিনি কিয়ৎক্ষণ মৌনভাবে ১ থাকিয়া কহিলেন, আর প্রিয়া-
শূন্য লতা-মণ্ডপে থাকিয়া কি ফল ? ইহা বলিয়া তিনি
সেই স্থান হইতে চলিয়া যাইতেছেন, এমন সময়ে শকুন্তলার
মৃণাল-বলয় ভূতলে পতিত দেখিয়া তৎক্ষণাৎ সেই স্থান
হইতে তাহা উঠাইয়া লইলেন; এবং পরম-সমাদরে বক্ষঃস্থলে
স্থাপন-পূর্বক কৃতাৰ্থৰ্ম্ম-চিত্তে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া
কহিতে লাগিলেন, প্রিয়ে ! তােমার মৃণাল-বলয় অচেতন
হইয়াও এই দুঃখিত ব্যক্তিকে আশ্বাসিত করিল, কিন্তু
তুমি তাহাও করিলে না। ইহা শুনিয়া শকুন্তলা মনে মনে
চিন্তা করিতে লাগিলেন, আর বিলম্ব করিতে পারি না,
কিন্তু কি বলিয়াই বা যাই ? অথবা মৃণাল-বলয়ের ছল
করিয়া যাই;—এইরূপ ভাবিয়াই তিনি পুনর্বার লতা-মণ্ডপে
করিলেন। রাজা তাহার দর্শনমাত্র হর্ষ-সাগরে নিমগ্ন
হইয়া কহিলেন, এই যে আমার জীবিতেশ্বরী * আসিয়াছেন।
বুঝিলাম, দেবতারা আমার পরিতাপ শুনিয়া সদয় হইলেন,
১ মৌনভাবে= স্থিরভাবে। মৌন=মুনি+ভাবার্থে ।
২ কৃতার্থ = আপনাকে কৃতার্থ মনে করে যে (উপপদ)।
কৃতার্থ+মন+খশ।
৩ আশ্বাসিত =আ+খ+ঘ =আশ্বাস ; আশ্বাস+জাত অর্থে
ইত প্রত্যয়।
জীবিতেশ্বরী= জীবিত অর্থাৎ প্রাণের ঈশ্বরী।
জীব+ক্ত =
জীবিত (ভাববাচ্যে); “ঈশ্বর” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গে “ঈশ্বরাও হয়।
;
প্রবেশ .

৬৪
শকুন্তলা।
তাহাতেই পুনর্বার প্রিয়াকে দেখিতে পাইলাম। চাতক
পিপাসায় শুষ্ক-কণ্ঠ হইয়া জল-প্রার্থনা করিল; এবং তৎক্ষণাৎ
নব-জলধর ’ হইতে শীতল সলিল-ধারা তাহার মুখে নিপতিত
হইল । ২
শকুন্তলা রাজার সম্মুখবর্তিনী হইয়া কহিলেন, মহারাজ।
পথিমধ্যে স্মরণ হওয়াতে আমি মৃণাল-বলয় লইতে আসিয়াছি,
আমার মৃণাল-বলয় দাও। রাজা কহিলেন, যদি তুমি আমায়
যথাস্থানে নিবেশিত করিতে দাও, তাহা হইলেই তােমার
মৃণাল-বলয় তােমায় দিতে পারি, নতুবা দিতে পারি না।
শকুন্তলা অগত্যা সম্মত হইলেন। রাজা কহিলেন, আইস,
এই শিলাতলে বসিয়া পরাইয়া দিই। তখন উভয়েই
শিলাতলে উপবিষ্ট হইলেন। রাজা শকুন্তলার হস্ত ধরিয়া
মৃণাল-বলয় পরাইবার উদ্যােগ করিতে লাগিলেন। শকুন্তলা
একান্ত ব্যাকুল-হৃদয় হইয়া কহিলেন, আৰ্যপুত্র ! সত্বর হও,
সত্বর হও। রাজা আৰ্য-পুত্র-সম্ভাষণ-শ্রবণে নিরতিশয় প্রীতি
লাভ করিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, স্ত্রীলােক-গণ
স্বামীকেই আৰ্য-পুত্র-শব্দে সম্ভাষণ করিয়া থাকে ; বুঝি
এতদিনে আমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হইল। অনন্তর তিনি
১ নব-জলধর =নূতন মেঘ। ধর = ধৃ+অন্। জলের ধর (৬ষ্ঠীতৎ ),
পরে কৰ্ম্মধা।
২ চাতকের জল-প্রার্থনার সহিত রাজার শকুন্তলা-প্রার্থনার এবং বৃষ্টি
পতনের সহিত শকুন্তলার আগমনের সাদৃশ্য।

তৃতীয় অঙ্ক। বলয়ের সন্ধি ১ শকুন্তলাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, সুন্দরি! মৃণাল সম্যক্‌ ২ সংশ্লিষ্ট ৩ হইতেছে না; হইতেছে না; যদি তুমি সম্মত হও, তাহা হইলে প্রকারান্তরে সংযােজন করিয়া পরাইয়া দিই। শকুন্তলা ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, তােমার যা অভিরুচি । রাজা নানা ছলে বিলম্ব করিয়া শকুন্তলার হস্তে মৃণাল বলয় পরাইয়া দিলেন, এবং কহিলেন, সুন্দরি ! দেখ দেখ, কেমন সুন্দর হইয়াছে। শকুন্তলা কহিলেন, দেখিব কি আমার নয়নে কর্ণোৎপল-রেণু * পতিত হইয়াছে, এজন্য দেখিতে পাইতেছি না। রাজা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, যদি তােমার অনুমতি ৫ হয়, ফুৎকার দিয়া ইহা পরিষ্কৃত করিয়া দিই। শকুন্তলা কহিলেন, তাহা হইলে সাতিশয় উপকৃত হই বটে, কিন্তু তােমায় এত দূর বিশ্বাস রাজা কহিলেন, সুন্দরি ! অবিশ্বাসের কারণ কি ? ৭ হয় । २ " ১ সন্ধি =যােগস্থান, জোড়ের মুখ। সম্+ধ+কি। সম্যক্ =উত্তমরূপ। সম্+অ+কি। সংশ্লিষ্ট = সংযুক্ত। সম্+শ্লিষ+ক্ত। বিশেষ্যে—সংশ্লেষ। বিপরীত বিশ্লিষ্ট। • কর্ণোংপল-রেণু =কর্ণস্থিত উৎপল (পদ্ম ), তাহার রেণু ( ৬ষ্ঠী তৎ )। অনুমতি = অনু+ম+ক্তি। বিশেষণে-অনুমত। ৬ পরিষ্কত=পরি+কৃ+ক্ত। বিশেষ্যে-পরিস্কার। ৭ বিশ্বাস ==বি+খ+ঘঞ। বিশেষণে বিশ্বস্ত বা বিশ্বাসী।

শকুন্তলা।
নূতন ভৃত্য কি কখনও প্রভুর আদেশের অতিরিক্ত ১
করিতে পারে ?
শকুন্তলা কহিলেন, এই অতিভক্তিই
অবিশ্বাসের কারণ। অনন্তর রাজা শকুন্তলার চিবুকে ও
মস্তকে হস্তপ্রদান করিয়া তাঁহার মুখ-কমল উত্তোলিত
করিলেন । শকুন্তলা শঙ্কিতা ও কম্পিত হইয়া রাজাকে
বারংবার নিষেধ করিতে লাগিলেন সুন্দরি ! শঙ্কা কি,
ইহা বলিয়া রাজা শকুন্তলার নয়নে ফুৎকার প্রদান করিতে
লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে
শকুন্তলা কহিলেন,
তােমায় তার
পরিশ্রম করিতে হইবে না; আমার নয়ন পূর্ববৎ হইয়াছে ;
আর কোনও অসুখ নাই। মহারাজ! আমি সাতিশয়
লজ্জিত হইতেছি; তুমি আমার এত উপকার করিলে।
আমি তােমার কোনও প্রত্যুপকার করিতে পারিলাম না।
রাজা কহিলেন, সুন্দরি ! আর কি প্রত্যুপকার চাই ?
আমি যে তােমার সুরভি-মুখ-কমলের আঘ্রাণ পাইয়াছি,
তাহাই আমার পরিশ্রমের যথেষ্ট ও প্রকৃষ্ট পুরস্কার
হইয়াছে; মধুকর ও
কমলের আঘ্রাণমাত্রেই সন্তুষ্ট হইয়া
থাকে ! শকুন্তলা ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, সন্তুষ্ট না
হইয়াই বা কি করে!
এইরূপ কৌতুক ও কথােপকথন হইতেছে,
এমন
অতিরিক্ত=অতি+রিচ+ক্ত। বিশেষে—অতিরেক।
২ মধুকর=ভ্রমর। মধু+কৃ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে মধুকরী।

৬৭
তৃতীয় অঙ্ক।
সময়ে,—চক্রবাক-বধু ! রজনী উপস্থিত ; ?
এই সময়ে
চক্রবাককে একবার সম্ভাষণ করিয়া লও।
এই . শব্দ
শকুন্তলার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল । শকুন্তলা সঙ্কেত
বুঝিতে পারিয়া সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ!
আমার পিতৃম্বস ২ আৰ্য্যা গৌতমী আমার অসুস্থতার সংবাদ
শুনিয়া, আমি কেমন আছি, ইহা জানিতে আসিতেছেন ;
এই জন্যই অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা, চক্রবাক ও চক্রবাকীর
ছলে, আমাদিগকে সাবধান করিতেছে ; তুমি সত্বর লতা-
মণ্ডপ হইতে বৰ্হিগত ও অন্তর্হিত
হও। ভাল, আমি
চলিলাম, যেন পুনর্বার দেখা হয়, ইহা বলিয়া রাজা লতা-
বিতানে ব্যবহিত হইয়া শকুন্তলাকে নিরীক্ষণ করিতে
লাগিলেন।
৪
১ কথিত আছে, চক্রবাক ও চক্রবাকী এই উভয়ের রাত্রিকালে
বিচ্ছেদ হয়। এস্থলে গৌতমীর আগমন-বশতঃ দুষ্মন্তের নিকট হইতে
শকুন্তলাকে সরিয়া যাইবার জন্য অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা এইরূপ সঙ্কেত
করিল।
২ পিতৃভসা = পিতৃ অর্থাৎ পিতার
অর্থাৎ ভগিনী
(৬ষ্ঠী তৎ)। পিসী।
অন্তর্হিত =তিরােহিত, আবৃত। অন্ত+ধা +ক্ত। বিশেষ্যে—
অন্তধন।
৪ ব্যবহিত=অন্তরিত, আচ্ছাদিত। বি+অব+ধ+ক্ত। বিশেষ্যে
-ব্যবধান।

শকুন্তলা। সুস্থ শরীরে ১ কিয়ৎক্ষণ পরে শান্তি-জল-পূৰ্ণ কমণ্ডলু হস্তে লইয়া গৌতমী লতা-মণ্ডপে প্রবেশ করিলেন, এবং শকুন্তলার শরীরে হস্তপ্রদান করিয়া কহিলেন, বাছ! শুনিলাম, আজ তােমার বড়ই অসুখ হইয়াছিল ; এখন কেমন আছ, কিছু উপশম হইয়াছে ? শকুন্তলা কহিলেন, হাঁ পিসি! আজ বড়ই অসুখ হইয়াছিল ; এখন অনেক ভাল আছি। তখন গৌতমী কমণ্ডলু হইভে শান্তি-জল লইয়া শকুন্তলার সর্ব- শরীরে সেচন করিয়া কহিলেন, বাছা ! চিরজীবিনী হইয়া থাক। অনন্তর লতা-মণ্ডপে অনসূয়া অথবা প্রিয়ংবদা কাহাকেও সন্নিহিত না দেখিয়া গৌতমী কহিলেন, এই অসুখ, তুমি একাকিনী রহিয়াছ, কেহই নিকটে নাই। শকুন্তলা কহিলেন, না পিসি । আমি একাকিনী ছিলাম না,—অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা আমার নিকটে ছিল ; এইমাত্র তাহারা মালিনীতে জল আনিতে গেল। তখন গৌতমী কহিলেন, বৎসে! আর রৌদ্র নাই ; অপরাহু হইয়াছে, এস এখন কুটীরে যাই। শকুন্তলা অগত্যা তাহার অনুগামিনী ২ হইলেন। আর আমি প্রিয়াশূন্য আর আমি প্রিয়াশূন্য ৩ লতা-মণ্ডপে থাকিয়া কি করিব, ইহা বলিয়া রাজা শিবিরােদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। • চিরজীবিনী =চির+জীব+ণি+ঈপ। পুংলিঙ্গে—চিরজীবী ২ অনুগামিনী=অনু+গ+ ণি+ঈ। পুংলিঙ্গে-অনুগামী। প্রিয়াশূন্য = প্রিয়াঘারা শূন্য (৩য় তৎ )।

তৃতীয় অঙ্ক।
এই ভাবে কতিপয় দিবস অতিবাহিত হইল। পরিশেষে
গান্ধর্ব-বিধানে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ-সমাধান-পূর্বক ধৰ্ম্মরণ্যে
কিয়দ্দিন অতিবাহিত করিয়া রাজা নিজ রাজধানীতে প্রস্থান
করিলেন।
১
১ ধৰ্ম্মারণ্য=পােবন।

চতুর্থ অঙ্ক অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার দুশ্চিন্তা;-বিরহ-বিধুরা শকুন্তলার বাহ-জ্ঞান-শুন্যতা এবং দুর্বাসার আগমন ও শাপ-প্রদান ;-সখীদ্বয়ের ব্যাকুলতা ;-দুর্বাসার শাপ- সঙ্কোচন ;-সােমতীর্থ হইতে করে প্রত্যাগমন, দৈববাণী-শ্রবণ, সন্তোষ-লাভ এবং পতিগৃহে শকুন্তলার প্রেরণে উদ্যোগ ;-গমন-কালে শকুন্তলার ও অন্যান্য সকলের হৃদয়ভেদী বিলাপ;-শকুন্তলার প্রতি কণের উপদেশ-প্রদান;-সখীদিগের মুখে রাজাকে অঙ্গুরীয় দেখাইবার কথা শুনিয়! শকুন্তলার আশঙ্কা ;—শাঙ্গ রব, শারদ্বত ও গৌতমীর সহিত শকুন্তলার পতিগৃহে গমন। সখি ! ! রাজা দুষ্যন্ত প্রস্থান করিলে একদিন অনসূয়া প্রিয়ংবদাকে কহিতে লাগিলেন, শকুন্তলা গান্ধর্ব-বিধানে স্বীয় অনুরূপ পতি পাইয়াছে বটে, কিন্তু আমার এই চিন্তা হইতেছে, পাছে রাজা নগরে গিয়া অন্তঃপুরবাসিনী-গণের সমাগমে শকুন্তলাকে ভুলিয়া যান। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সে আশঙ্কা করিও না; তেমন আকৃতি কখনও গুণ-শূন্য হয় না। কিন্তু আমার অন্য চিন্তা হইতেছে,—না জানি, পিতা আসিয়া এই বৃত্তান্ত শুনিয়া কি বলিবেন। অনসূয়া কহিলেন, সখি! আমার বােধ হইতেছে, তিনি শুনিয়া রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবেন না ; ইহা তাহার অনভিমত । সখি ! ১ অনভিমত = অপ্রিয়। ন+অভি+ম+ক্ত। ন+অভিমত, নতৎপুরুষ।

৭১ চতুর্থ অঙ্ক। কৰ্ম্ম হয় নাই। কারণ, তিনি প্রথম অবধি এই সংকল্প করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, গুণবৎ ২ পাত্রেই আমি কন্যা- প্রদান করিব ; যখন দৈবই তাহা সম্পন্ন করিল, তখন তিনি বিনা আয়াসেই কৃতকাৰ্য্য ৩ হইলেন। অতএব ইহাতে তাঁহার রােষ বা অসন্তোষের কারণ কি? উভয়ে এইরূপ কথোপকথন করিতে করিতে কুটীরের কিঞ্চিৎ দূরে পুষ্প- চয়ন করিতে লাগিলেন। এ দিকে শকুন্তলা অতিথি-পরিচৰ্য্যার * ভার গ্রহণ করিয়া একাকিনী কুটীর-দ্বারে উপবিষ্ট আছেন ; দৈবযােগে দুর্বাসা ঋষি আসিয়া তাহাকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, আমি শকুন্তলা রাজার চিন্তায় নিতান্ত নিমগ্না হইয়া একবারে বাহ-জ্ঞান-শূন্য হইয়াছিলেন, এজন্য দুৰ্বসার কথা শুনিতে পাইলেন না। দুর্বাসা অবজ্ঞা-দর্শনে রােষ-পরবশ অতিথি। ১ সঙ্কল্প=ইচ্ছা। সম্+কৃ+অল্। বিশেষণে—সঙ্কল্পিত। ২ গুণবৎ= গুণ+অস্ত্যর্থে বতু, গুণবৎ। স্ত্রীলিঙ্গে-গুণবতী। বিশেষ্যে-গুণবত্তা। ৩ কৃতকাৰ্য=কৃত হইয়াছে কাৰ্য যৎকর্তৃক (বহু)। ৪ অতিথি-পরিচৰ্য্যা =অতিথির পরিচৰ্য্যা (৬ষ্ঠী তৎ)। অতিথি নাই তিথি ( দ্বিতীয়) যার (বহু)। পরিচৰ্যা=সেবা; পরি+চ+ ক্য+আপ।

|
१२
শকুন্তলা।
হইয়া কহিলেন, আঃ পাপীয়সি! তুই অতিথির ২ অবমাননা ৩
করিলি। তুই যাহার চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া আমায় অবজ্ঞা
করিলি—আমি অভিশাপ দিতেছি—স্মরণ করাইয়া দিলেও সে
তােরে স্মরণ করিবে না !
প্রিয়ংবদা শুনিতে পাইয়া ব্যাকুল হইয়া কহিতে
লাগিলেন, হায়! হায়! কি সর্বনাশ ঘটিল! শূন্য-হৃদয়া
শকুন্তলা কোনও পূজনীয় ব্যক্তির নিকটে অপরাধিনী হইল।
ইহা বলিয়া সেই দিকে দৃষ্টি-নিক্ষেপ করিয়া প্রিয়ংবদা
কহিতে লাগিলেন, সখি ! যে সে নয়, ইনি দুর্বাসা,
ইহার কথায় কথায় কোপ ; ঐ দেখ, শাপ দিয়া তিনি
রােষ-ভরে সত্বর প্রস্থান করিতেছেন। অনসূয়া কহিলেন,
প্রিয়ংবদে! বৃথা আক্ষেপ করিলে আর কি হইবে বল ।
শীঘ্র গিয়া পায়ে ধরিয়া তাহাকে ফিরাইয়া আন ; আমিও
এই অবকাশে কুটীরে গিয়া পাদ্য ৫ অর্ঘ্য প্রভৃতি প্রস্তুত
করিয়া রাখিতেছি। প্রিয়ংবদা দুর্বাসার পশ্চাৎ পশ্চাৎ
৪
১
পাপীয়সি = পাপ+ঈয়সু = পাপীয়+স্ত্রীলিঙ্গে ঈ = পাপীয়সী,
সখােধনেপাপীয়সি। পুংলিঙ্গে–পাপীয়ান্।
২ অতিথির = কৰ্ম্মে ৬ষ্ঠী। অতিথি-নাই দ্বিতীয়া তিথি যাহার
(বহু ); যে ব্যক্তি এক তিথির অতিরিক্ত-কাল অবস্থিতি করে না।
ও অবমাননা =অব+মান+অন+আপ। বিশেষণে-অবমানিত।
৪ ভর == অতিশয়, আধিক্য।
৫ পাদ্য = পাদ-প্রক্ষালনের নিমিত্ত জল। পাদ+যৎ।

ধাবমানা ১
হইলেন।
চতুর্থ অঙ্ক।
অনসূয়া কুটীরাভিমুখে প্রস্থান
করিলেন।
অনসূয় উপস্থিত হইবার পূর্বেই প্রিয়ংবদা তাঁহার
নিকটে উপস্থিত হইয়া কহিলেন ; সখি! জানই ত, দুর্বাসা,
স্বভাবতঃ অতি কুটিল-হৃদয় ; তিনি কি কাহারও অনুনয়
শুনেন ? তথাপি বহুবিধ বিনয়-বচনে কিঞ্চিৎ শান্ত করিয়াছি।
যখন দেখিলাম, তিনি কিছুতেই ফিরিবেন না, তখন তাহার
চরণে ধরিয়া কহিলাম, ভগবন্! সে আপনার কন্যা,—আপনার
প্রভাব, আপনার মহিমা সে কি জানে ? কৃপা করিয়া
তাহার এই অপরাধ আপনাকে মার্জনা করিতে হইবে।
তখন তিনি কহিলেন, আমি যাহা কহিয়াছি, তাহা অন্যথা
হইবার নহে; তবে কোনও অভিজ্ঞান ও দেখাইতে পারিলে
তাহার শাপমােচন হইবে;—ইহা বলিয়াই তিনি চলিয়া
গেলেন। অনসূয়া কহিলেন, ভাল এখন আশ্বাসের পথ
হইয়াছে! রাজর্ষি প্রস্থান-কালে শকুন্তলার অঙ্গুলিতে এক
স্বনামাঙ্কিত • অঙ্গুরীয় পরাইয়া দিয়াছেন। অতএব শকুন্তলার
শাপ-মােচনের উপায় রহিয়াছে। রাজা যদিও ভুলিয়া যান,
ঐ অঙ্গুরীয় দেখাইলেই তাঁহার স্মরণ হইবে।
১
ধাবমান =ধাব+খান+আপ ( স্ত্রীলিঙ্গে)।
মহিমা =মহৎ+ইমন্=মহিম, পুংলিঙ্গ ১ মার একবচন।
অভিজ্ঞান= স্মারক-চিহ্ন। অভি+জ্ঞা +অনটু।
৪ স্বনামাঙ্কিত =নিজ-নাম-চিহ্নিত।

৭৪
শকুন্তলা।
১
২
৪
এইরূপ কথােপকথন করিতে করিতে কুটীরাভিমুখে প্রস্থান
করিলেন ।
কিয়ৎক্ষণ পরে তাহারা কুটীর-দ্বারে উপস্থিত হইয়া
দেখিলেন, শকুন্তলা করতলে কপােল বিন্যস্ত করিয়া
স্পন্দ-হীনা, ৩ মুদ্রিত-নয়না, চিত্রার্পিতার ৫ ন্যায় উপবিষ্টা
আছেন। তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন, অনসূয়ে ! দেখ দেখ !
শকুন্তলা পতি-চিন্তায় নিমগ্না হইয়া একবারে বাহ-জ্ঞান-শূন্য
হইয়া রহিয়াছে ; ও কি অতিথির তত্ত্বাবধান করিতে পারে ?
অনসূয়া কহিলেন, সখি! এই বৃত্তান্ত আমাদেরই মনে মনে
থাকুক, কোনও মতে কর্ণান্তরিত করা হইবে না; শকুন্তলা
শুনিলে প্রাণে বাঁচিবে না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি ।
তুমি কি পাগল হইয়াছ? এ কথাও কি শকুন্তলাকে শুনাইতে
হয় ? এ সংসারে কোন্ ব্যক্তি উষ্ণ সলিলে নবালিকার
সেচন করে ?
কিয়দ্দিন পরে মহর্ষি কণ সােমতীর্থ হইতে প্রত্যাগমন
;
১ কপােল=গণ্ডস্থল। কিন্তু “কপাল” শব্দের অর্থ মাথার খুলি।
২ বিন্যস্ত = স্থাপিত। বি+নি+অ+ক্ত [ বিশেষ্যে—বিন্যাস ]।
স্পন্দ-হীনা = কম্পন-রহিতা বা চলন-শূন্য (৩য় তৎ)।
মুদ্রিত-নয়না=নিমীলিত-নেত্রা (বহু )।
চিত্রার্পিতা = চিত্রে অর্পিতা (লিখিত) ৭মী তৎ।
৬ দুৰ্বসার শাপের কথা শকুন্তলাকে বলিয়া তাহার মনে কষ্ট দেওয়া,
আর নব-মালিকার উপরি উষ্ণ-জল সেচন করা সমান কথা।
৪
৫

৭৫
চতুর্থ অঙ্ক।
করিলেন। একদিন তিনি অগ্নি-গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া হােমকাৰ্য্য
সম্পাদন করিতেছেন, এমন সময়ে এই দৈববাণী হইল,
মহর্ষে! রাজা দুষ্যন্ত মৃগয়ার উপলক্ষে তােমার তপােবনে
আসিয়া শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন, এবং শকুন্তলাও
তৎসহযােগে গর্ভবতী হইয়াছেন। মহর্ষি এইরূপে শকুন্তলার
পরিণয়-বৃত্তান্ত : অবগত হইয়া তাহার অগােচরে ও সম্মতি-২
ব্যতিরেকে এই পরিণয়-কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছে বলিয়া
কিঞ্চিন্মাত্র রােষ বা অসন্তোষ প্রদর্শন করিলেন না ;
বরং পরম প্রীত ৩ হইয়া তিনি কহিতে লাগিলেন, আমার
পরম সৌভাগ্য যে, শকুন্তলা এতাদৃশ ৪ সৎপাত্রে সন্নিবেশিতা
হইয়াছে। অনন্তর তিনি প্রফুল্ল-বদনে শকুন্তলার নিকটে
গিয়া সাতিশয় পরিতােষ-প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, বৎসে !
তােমার পরিণয়-বৃত্তান্ত অবগত হইয়া অনির্বচনীয় প্রীতি
প্রাপ্ত হইয়াছি, এবং স্থির করিয়াছি, অবিলম্বে দুই শিষ্য
ও গৌতমীকে সমভিব্যাহারে দিয়া তােমায় পতি-সন্নিধানে
পাঠাইয়া দিব। অনন্তর তদীয় আদেশক্রমে শকুন্তলার
প্রস্থানের উদ্যােগ হইতে লাগিল।
প্রস্থান-সময় উপস্থিত হইল। গৌতমী এবং শাঙ্গ রব ও
১ পরিণয় = বিবাহ। পরি+নী+অল্। বিশেষণে—পরিনীত।
* সম্মতি= সম্+ম+ক্তি। বিশেষণে—সম্মত।
• প্রীত = প্রী+ক্ত। বিশেষ্যে-প্রীতি।
* এতাদৃশ =এইরূপ। এত+দৃশ+টক। স্ত্রীলিঙ্গে—এতাদৃশী।

৭৬
শকুন্তলা।
১
२
;
শারদ্বত নামক দুই শিষ্য শকুন্তলার সমভিব্যাহারে গমনের
নিমিত্ত প্রস্তুত হইলেন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা যথাসম্ভব
বেশ-ভূষার সমাধান করিয়া দিলেন। মহর্ষি
শােকাকুল
হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, অদ্য শকুন্তলা যাইবে
বলিয়া আমার মন নিতান্ত উৎকণ্ঠিত হইতেছে। নয়ন
অনবরত বাষ্প-বারি দ্বারা পরিপূরিত হইতেছে ; কণ্ঠরােধ
হওয়ায় বাক-শক্তি-রহিত হইতেছি ; এবং জড়তায় নিতান্ত
অভিভূত হইয়া পড়িতেছি। কি আশ্চৰ্য্য ! আমি বনবাসী,
স্নেহ-বশতঃ আমারও ঈদৃশ ৩ বৈক্লব্য উপস্থিত হইতেছে ;
জানি, সাংসারিক লোকগণ এমন অবস্থায় কি দুঃসহ
ক্লেশই ভােগ করিয়া থাকে ? বুঝিলাম, স্নেহ অতি বিষম
বস্তু । অনন্তর তিনি শােকাবেগ সংবরণ করিয়া শকুন্তলাকে
কহিলেন, বৎসে ! বেলা হইতেছে, প্রস্থান কর; আর
অনর্থক কালহরণ করিতেছ কেন ?
ইহা বলিয়া তিনি
তপােবন-তরুদিগকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, হে সন্নিহিত
তরুগণ ! যিনি তােমাদের
যিনি তােমাদের জল-সেচন না করিয়া কদাপি
জলপান করিতেন না; যিনি ভূষণ-প্রিয়া হইয়াও স্নেহ-বশতঃ
সমাধান সম্পাদন। সম্ + আ + ধা + অন ; বিশেষ্য
বিশেষণে-সমাহিত।
২ শােকাকুল = শােকদ্বারা আকুল ( ৩য় তৎ)।
ঈদৃশ=এইরূপ। ইদম্+দৃশ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে = ঈদৃশী।
৪ বৈব্য =কাতরতা। বিব+ষ্ণ্য।

আৰ্যপুত্রকে চতুর্থ অঙ্ক। ৭৭ কদাপি তােমাদের পল্লব-ভঙ্গ ১ করিতেন না ; তােমাদের কুসুম-প্রসবের সময় উপস্থিত হইলে যাহার আনন্দের সীমা থাকিত না, অন্য সেই শকুন্তলা পতিগৃহে যাইতেছেন, তােমরা সকলে অনুমােদন কর। অনন্তর সকলেই গাত্রোত্থান করিলেন। শকুন্তল গুরুজন- গণকে প্রণাম করিয়া প্রিয়ংবদার নিকটে গিয়া অশ্রু-পূর্ণ- নয়নে কহিতে লাগিলেন, সখি ! দেখিবার নিমিত্ত আমার চিত্ত নিতান্ত ব্যগ্র হইয়াছে বটে, কিন্তু তপােবন পরিত্যাগ করিয়া যাইতে আমার পা উঠিতেছে না। প্রিয়ংবদা কহিলেন, সখি ! তুমিই যে কেবল অপােবন- বিরহে কাতর হইতেছ, এরূপ নহে, তােমার বিরহে তপােবনের কি অবস্থা ঘটিতেছে, দেখ ?—জীবমাত্রেই নিরানন্দ ২ শােকাকুল ; হরিণগণ আহার-বিহারে পরাজুখ হইয়া স্থির হইয়া রহিয়াছে ; মুখের গ্রাস মুখ হইতে পড়িয়া যাইতেছে ; ময়ুর ও ময়ুরী নৃত্য পরিত্যাগ করিয়া উৰ্দ্ধমুখ হইয়া রহিয়াছে ; কোকিল-গণ আম্রমুকুলের রসাস্বাদে বিমুখ হইয়া নীরব হইয়া আছে ; মধুকর ও ১ ভঙ্গ = ভজ+ঘ; বিশেষ্য। বিশেষণে-ভগ্ন বা ভঙ্গুর। ২ নিরানন্দ = নাই আনন্দ যাহার (বহু)। ৩ পরায়ুখ=অনিচ্ছু, বিমুখ। পরা+অ+কিপ=পরা, অর্থাৎ পশ্চাদগত মুখ যাহার (বহু )। স্ত্রীলিঙ্গে পরায়ু ও পরায়ুখী।

৭ শকুন্তলা। কণ মধুকরী-গণ মধুপানে বিরত হইয়া মনােদুঃখে গুন্ গুন্ ধ্বনি পরিত্যাগ করিয়াছে। কহিলেন, বৎসে! আর কেন বিলম্ব কর, বেলা হইতেছে। তখন শকুন্তলা কহিলেন, তাত! বনলতাষিণীকে সম্ভাষণ না করিয়া যাইব না । ইহা বলিয়া তিনি বন- তােষিণীর নিকটে গিয়া কহিলেন, বনতােষিণি ! শাখা-বাহু- দ্বারা আমায় স্নেহভরে আলিঙ্গন কর ; আজ অবধি আমি দূরবর্তিনী ৩ হইলাম । অনন্তর তিনি অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে কহিলেন, সখি ! আমি বনতষিণীকে তােমাদের হস্তে সমর্পণ করিলাম। তাহারা কহিলেন, সখি ! আমাদিগকে কাহার হস্তে সমর্পণ করিলে, বল। ইহা বলিয়া উভয়েই শােকাকুল হইয়া রােদন করিতে লাগিলেন। তখন কণ কহিলেন, অনসূয়ে! প্রিয়ংবদে! তােমরা কি পাগল হইলে ? তােমরা কোথায় শকুন্তলাকে সান্ত্বনা করিবে, না তােমরাই রােদন করিতে আরম্ভ করিলে। এক পূর্ণগর্ভা হরিণী কুটীরের প্রান্তে শয়ন করিয়াছিল। মধুপানে=অপাদান কারক। মধু শব্দের অন্য অর্থচৈত্রমাস ও দ্যৈত্য-বিশেষ। * বিরত = নিবৃত্ত। বি+র+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে—বিরাম বা বিরতি। বিপরীত—নিরত। দূরবর্তিনী=দূর+বৃৎ+ ণিন্+ঈপ (স্ত্রীলিঙ্গে)। পুংলিঙ্গে- দূরবর্তী। • শয়ন= শী+অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে-শয়িত বা শয়ান। ও ;

।
মাতৃ-বিয়ােগ ২
চতুর্থ অঙ্ক।
তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া শকুন্তলা কণকে কহিলেন,
পিতঃ! এই হরিণী নির্বিঘ্নে প্রসব করিলে আমায় সংবাদ
দিবে, ভুলিবে না বল। কণ কহিলেন, না বৎসে ! আমি
কখনই ভুলিব না।
কতিপয় পদ গমন করিবার পরে শকুন্তলার গতিভঙ্গ
হইল। আমার অঞ্চল ধরিয়া কে টানিতেছে, ইহা বলিয়া
শকুন্তলা মুখ ফিরাইলেন ।
কণ কহিলেন, বৎসে! যাহার
হইলে তুমি জননীর ন্যায় প্রতিপালন
করিয়াছিলে ; যাহার আহারের নিমিত্ত তুমি সর্বদা শ্যামাক
আহরণ করিতে; যাহার মুখ কুশের অগ্রভাগ-দ্বারা ক্ষত
হইলে তুমি ইহূদী-তৈল দিয়া ব্রণ-শােষণ করিয়া দিতে ;
সেই মাতৃহীন হরিণ-শিশু তােমার গতিরােধ করিতেছে।
শকুন্তলা তাহার গাত্রে হস্তপ্রদান করিয়া কহিলেন, বাছা!
আর আমার সঙ্গে আইস কেন, ফিরিয়া যাও ; আমি
তােমায় পরিত্যাগ করিয়া যাইতেছি। তুমি মাতৃহীন হইলে
আমি তােমায় প্রতিপালন করিয়াছিলাম ; এখন আমি
২
১ পাত=পতন। পত+ঘঞ। বিশেষণে-পাতী বা পতিত।
বিয়ােগ=বি+যুজ+ঘ।
বিশেষণে—বিয়ােগী বা বিযুক্ত।
বিপরীত—সংযােগ বা নিয়ােগ।
প্রতিপালন=প্রতি+পালি+অনট। বিশেষণে --প্রতিপালিত
৪ আহরণ=সংগ্রহ। আ+হৃ+অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে -
আহৃত।

শকুন্তলা।
তখন কণ
চলিলাম, অতঃপর পিতা তােমার রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। ইহা
বলিয়া শকুন্তলা রােদন করিতে লাগিলেন।
কহিলেন, বৎসে! শান্ত হও, অশ্রুবেগ সংবরণ কর, পথ
দেখিয়া চল ; উচ্চ নীচ না দেখিয়া পদক্ষেপ করাতে
বারংবার আঘাত পাইতেছ।
এইরূপ নানা কারণে গমনের বিলম্ব দেখিয়া শারব
কণাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, ভগবত্ ! আপনার আর
অধিক দূর সঙ্গে আসিবার প্রয়ােজন নাই ; এই স্থলেই
যাহা বলিতে হয়, বলিয়া দিয়া প্রতিগমন করুন। কণ
কহিলেন, তবে আইস, এই ক্ষীর-বৃক্ষের ছায়ায় দণ্ডায়মান
হই। তদনুসারে সকলে সন্নিহিত ক্ষীর-পাদপের ছায়ায়
অবস্থিত হইলে কণ কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া শাঙ্গ রবকে
কহিলেন, বৎস! তুমি শকুন্তলাকে রাজার সম্মুখে রাখিয়া
তাহাকে আমার এই আবেদন জানাইবে—আমরা
তপস্যায় ২ কালযাপন করি ; তুমি অতি প্রধান রাজবংশে
জন্মগ্রহণ করিয়াছ ; আর শকুন্তলা বন্ধুবর্গের অগােচরে
স্বেচ্ছাক্রমে তােমাতেই অনুরাগিণী
বিবেচনা করিয়া অন্যান্য সহধর্মিণীর ন্যায় শকুন্তলারও প্রতি
আঘাত =আ+হ+ ঘ; বিশেষ্য। বিশেষণে—আহত।
তপস্যা = তপ+ক্য = তপস্য (নাম-ধাতু)+অ+আপ।
সহধর্মিণী=সকল স্ত্রীকে সহধর্মিণী বলে না; যাহার সহিত
একত্র হইয়া ব্ৰতাদি ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম করিতে হয়, তিনিই সহধর্মিণী।
সহ+ধৰ্ম্ম+ইন্+ঈপ।
বনবাসী,
হইয়াছে ;
এই সমস্ত
৩
১

৮১ চতুর্থ অঙ্ক। স্নেহদৃষ্টি রাখিবে ;-আমাদের এই পর্যন্ত প্রার্থনা ; ইহার অধিক তাহার ভাগ্যে থাকে ঘটিবে, তাহা আমাদের বলিয়া দিবার নহে। মহর্ষি শাঙ্গ রবের প্রতি এই সন্দেশ • নির্দেশ করিয়া শকুন্তলাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, বৎসে! এক্ষণে তােমাকেও কিছু উপদেশ দিব; আমরা বনবাসী বটে, কিন্তু লৌকিক ২ ব্যাপারে নিতান্ত অনভিজ্ঞ নহি। তুমি পতিগৃহে গিয়া গুরু-জন-গণের শুশ্রুষা করিবে; সপত্নী-গণের ৩ সহিত প্রিয়-সখী-ব্যবহার করিবে; পরিচারিণী-গণের প্রতি সম্পূর্ণ দয়া-দাক্ষিণ্য ও প্রদর্শন করিবে; সৌভাগ্য-গর্বে গর্বিত হইবে ; স্বামী কাৰ্কশ্য-প্রদর্শন করিলেও রােষ-পরবশা প্রতিকূলচারিণী মহিলাগণ এরূপ ব্যবহার ; ৪ ৭ হইবে না; ; 8 সন্দেশ=বার্তা ; বিশেষ্য। বিশেষণে—সন্দিষ্ট। ২ লৌকিক = সাংসারিক। লোেক+ষ্ণিক ; বিশেষণ। বিশেষ্যে – লৌকিকতা। ৩ সপত্নী=সমান পতি যাহাদের (বহু)। পরিচারিণী =ভৃত্যা, দাসী। পরি। চন্+ ণি+ঈপ। ৫ দাক্ষিণ্য =আনুকুল্য। দক্ষিণ+ভাবার্থে ফ্য। ৬ কার্কশ =কাঠিন্য, কর্কশ-ভাব। কর্কশ+ভাবার্থে ফ্য। ৭ রােষ-পরবশ = ক্রোধের বশীভূতা। প্রতিকূলচারিণী =প্রতিকূল অর্থাৎ বিরুদ্ধ আচরণ করে যে (উপপদ)। প্রতিকূল+চ+ণি+ঈপ।

শকুন্তলা। করিলেই গৃহিণী-পদে প্রতিষ্ঠিত হয়। যাহারা বিপরীত ব্যবহার করে, তাহারা কুলের কণ্টক-স্বরূপ। ইহা কহিয়া কণা বলিলেন, দেখ, গৌতমীই বা কি বলেন। গৌতমী কহিলেন, বধূ-গণকে ইহা ভিন্ন আর কি বলিয়া দিতে হইবে ? পরে তিনি শকুন্তলাকে কহিলেন, বাছা! ইনি যাহা বলিলেন, তাহা সমস্তই মনে রাখিও। এইরূপে উপদেশ-দান সমাপ্ত হইলে কণ শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎসে ! আমরা আর অধিক দূর যাইব না ; আমাকে ও সখীদিগকে আলিঙ্গন কর। শকুন্তলা অশ্রু-পূৰ্ণ- নয়নে কহিলেন, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাও কি এই স্থান হইতে ফিরিয়া যাইবে ? ইহারা সে পর্যন্ত আমার সঙ্গে যাউক। কণ কহিলেন, না বৎসে ! ইহাদের বিবাহ হয় নাই ; অতএব সে পৰ্যন্ত যাওয়া ভাল দেখায় না ; গৌতমী তােমার সঙ্গে যাইবেন। শকুন্তলা পিতাকে আলিঙ্গন করিয়া গদগদ-স্বরে কহিলেন, পিতঃ! তােমায় না দেখিয়া সেখানে কেমন করিয়া প্রাণধারণ করিব! ইহা বলিতে বলিতেই তাহার দুই চক্ষুঃ হইতে অশ্রু-ধারা বহিতে লাগিল। তখন কণ অশ্ৰ-পূৰ্ণ- নয়নে কহিলেন, বৎসে । এত কাতর হইতেছ কেন ? তুমি পতি-গৃহে গিয়া ও গৃহিণী-পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া সাংসারিক ব্যাপারে অনুক্ষণ এরূপ ব্যস্ত থাকিবে যে, আমার বিরহ- অনুক্ষণ = সৰ্ব্বদা। ক্ষণে ক্ষণে (অব্যয়ী )।

জনিত ১
৪
চতুর্থ অঙ্ক।
শােক অনুভব করিবার অবকাশ পাইবে না।
শকুন্তলা পিতার চরণে নিপতিত হইয়া কহিলেন, তাত ।
আবার কত দিনে এই তপােবনে আসিব ? কণ কহিলেন,
বৎসে! সসাগরা ধরিত্রীর ২ একাধিপতির মহিষী হইয়া এবং
অপ্রতিহত-প্রভাব ৩ স্বীয় তনয়কে সিংহাসনে সন্নিবেশিত
ও তদীয় হন্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পিত দেখিয়া
পতি-সমভিব্যাহারে পুনরায় এই শান্ত-রসাস্পদ তপােবনে
আসিবে।
শকুন্তলাকে এইরূপ শােকাকুলা দেখিয়া গৌতমী কহিলেন,
বাছা ! আর কেন, ক্ষান্ত হও, যাইবার বেলা বহিয়া যায় ;
সখীদিগকে যাহা বলিতে হয়, বলিয়া লও; আর বিলম্ব করা
উচিত হয় না। তখন শকুন্তলা সখীদের নিকটে গিয়া
কহিলেন, সখি! তােমরা উভয়ে এককালে আলিঙ্গন কর।
তখন উভয়েই আলিঙ্গন করিলেন। তিন জনেই রােদন
করিতে লাগিলেন । কিয়ৎ ক্ষণ পরে সখীরা শকুন্তলাকে
১
বিরহ-জনিত=বিরহ কর্তৃক জনিত ( ৩া তৎ )। জনিত =জন্
+ণিচ+ক্ত।
২ ধরিত্রী=পৃথিবী। ধৃ+ই, স্ত্রীলিঙ্গে।
৩ অপ্রতিহত-প্রভাব=অপ্রতিহত হইয়াছে প্রভাব যাহার (বহু)।
অপ্রতিহত=ন+প্রতি+হন,+ক্ত।
* সন্নিবেশিত=(সম্+নি+বিশ+নিচ+ক্ত) স্থাপিত ; বিশেষণ।
বিশেষ্যে-সন্নিবেশ।

৮৪ শকুন্তলা। কহিলেন, সখি! যদি রাজা শীঘ্র চিনিতে না পারেন, তাহা হইলে তাহাকে তদীয় স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় দেখাইও। শকুন্তলা শুনিয়া সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া কহিলেন, সখি ! তােমরা এমন কথা বলিলে কেন, বল। তােমাদের কথা শ্রবণ করায় আমার হৃৎকম্প হইতেছে। সখীরা কহিলেন, সখি ! ভীত হইও না ; স্নেহের স্বভাবই এইরূপ অকারণে অনিষ্ট আশঙ্কা করে। এইরূপে ক্রমে ক্রমে সকলের নিকট হইতে বিদায় লইয়া শকুন্তলা গৌতমী-প্রভৃতির সমভিব্যাহারে দুষ্যন্ত-রাজধানীর উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। কণ অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা এক- দৃষ্টিতে শকুন্তলার দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে ক্রমে শকুন্তলা দৃষ্টিপথের বহিভূত হইলে অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা উচ্চৈঃস্বরে রােদন করিতে লাগিলেন। মহর্ষি দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন, অনসূয়ে! প্রিয়ংবদে! তােমাদের সহচরী দৃষ্টিপথের বহিভূত হইয়াছে ; এক্ষণে শােকাবেগ সংবরণ করিয়া - আমার সহিত আশ্রমে প্রত্যাগমন কর । ইহা বলিয়া মহর্ষি আশ্ৰমাভিমুখে প্রস্থান করিলেন, এবং তাহারাও তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। যাইতে যাইতে মহর্ষি E ১ পরিত্যাগ পরি + ত্যজ, + ঘ, বিশেষ্য। বিশেষণে- পরিত্যক্ত বা পরিত্যাগী। ২ সহচরী=সহ+চ+ট+ঈপ। পুংলিঙ্গে- পুংলিঙ্গে-সহচর।

৮৫
চতুর্থ অঙ্ক।
মনে মনে কহিতে লাগিলেন, স্থাপিত ধন ধন-স্বামীর হস্তে
প্রত্যর্পিত ২ হইলে লােকে যেরূপ নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বেগ ।
হয়, অদ্য আমি শকুন্তলাকে পতি-গৃহে প্রেরণ করিয়া
সেইরূপ নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বেগ হইলাম।
১ স্বামী=স্ব+মিন। স্ত্রীলিঙ্গে—স্বামিনী।
২ প্রত্যর্পিত = প্রতি+ঋ+ ণিচ+ক্ত; বিশেষণ বিশেষ্যে—
প্রত্যর্পণ।
নিরুদ্বেগ =নাই উদ্বেগ যাহার (বহু)। উদ্বেগ=উৎ+ বিজ +
ঘঞ; বিশেষ্য। বিশেষণে—উদ্বিগ্ন।

পঞ্চম অঙ্ক হংসপদিকার গীত-শ্রবণে দুষ্যন্তের চিত্ত-চাঞ্চল্য ;-শকুন্তলা সহ শাঙ্গ রব, শারদ্বত ও গৌতমীর রাজ-সমীপে আগমন ; দুষ্যন্ত-কর্তৃক সাদরে সম্ভাষণ শকুন্তলার দক্ষিণ-নয়ন-স্পন্দন ও অশুভ-চিন্তন ;-শাঙ্গ রব-কর্তৃক রাজার সহিত শকুন্তলার বিবাহ ও অন্তঃসত্বাবস্থা-জ্ঞাপন;-শকুন্তলার আশঙ্কা ; - বিবাহ সম্বন্ধে রাজার সম্পূর্ণ অস্বীকার ;-শকুন্তলার দুশ্চিন্তা;-রাজার প্রতি শাঙ্গরবের তিরস্কার ;- গৌতমী-কর্তৃক শকুন্তলার অবগুণ্ঠন-মােচন ;-রাজার প্রতি শারদ্বতের ক্রোধ-প্রকাশ ও অভিজ্ঞান-প্রদর্শনে শকুন্তলার প্রতি আদেশ ; রাজার প্রতি শকুন্তলার অভিজ্ঞান-প্রদর্শনের প্রস্তাব ;- অঙ্গুরীয়ের অদর্শনে শকুন্তলার ভীষণ লজ্জা ও যন্ত্রণা ;-শকুন্তলা-কর্তৃক রাজার মনে দীর্ঘাপাঙ্গের কথা স্মরণ করাইয়া দিবার চেষ্টা ;চেষ্টা-বৈফল্যে রাজার প্রতি শকুন্তলার তীব্র-রােষ-প্রকাশ ;-শকুন্তলাকে ত্যাগ করিয়া শাঙ্গ রব, শারদ্বত ও গৌতমীর প্রস্থানােদ্যোগ ;-শকুন্তলার ব্যাকুলতা ও তাহার প্রতি শাঙ্গ রবের কঠোর-বাক্য-প্রয়ােগ ;-কৰ্ত্তব্য-নিরূপণে পুরােহিতের সহিত রাজার পরামর্শ ;-পুরােহিত-গৃহে শকুন্তলার গমন ও পথিমধ্যে স্ত্রী-বেশ- পরিধায়ি-জ্যোতিপদার্থ-কর্তৃক তাঁহাকে লইয়া অন্তর্ধান ;-রাজার সভাভঙ্গ ও শয়ন-গৃহে গমন। •• •• এক দিন রাজা দুষ্যন্ত রাজ-কাৰ্য-সমাধানান্তে একান্তে ? আসীন ১ হইয়া প্রিয়-বয়স্য মাধব্যের সহিত কথােপকথন- রসে আপ্লুত হইয়া কালযাপন করিতেছেন, এমন সময়ে ১ একান্তে=নির্জনে । ২ আসীন=উপবিষ্ট। আস+শান পঞ্চম অঙ্ক। ৮৭ হইলেন; হংসপদিকা-নামা এক পরিচারিকা সঙ্গীত-শালায় অতি মধুর- এইভাবে গান করিতে লাগিল, অহে মধুকর ! অভিনব মধুর লােভে সহকার-মঞ্জরীতে তখন তাদৃশ-প্রণয়- প্রদর্শন করিয়া এখন কমল-মধু-পানে পরিতৃপ্ত হইয়া উহাকে একবারে ভুলিয়া গেলে কেন ? হংসপদিকার গীতি শ্রবণগগাচর হইবামাত্র রাজা অকস্মাৎ নিতান্ত উন্মনাঃ ২ কিন্তু কি হেতু উন্মনাঃ হইলেন, তাহার কিছুই অনুধাবন করিতে না পারিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন এই মনােহর গীত শ্রবণ করায় আমার চিত্ত এত আকুল হইতেছে ? প্রিয়- জন-বিরহ-ব্যতিরেকে মনের এরূপ আকুলতা হয় না; কিন্তু প্রিয়-বিরহও উপস্থিত দেখিতেছি না। অথবা, মনুষ্য সর্ব- প্রকারে সুখী হইয়াও রমণীয়-বস্তু-দর্শন কিংবা মনােহর- গীত-শ্রবণ করিয়া যে অকস্মাৎ আকুল-হৃদয় হয়, বােধ করি, অনতি-পরিস্ফুট ৪-রূপে জন্মান্তরীণ স্থির সৌহৃদ্যই তাহার স্মৃতিপথে আরূঢ় ; আপ। ১ পরিচারিকা=দাসী। পরি + চ+ক+স্ত্রীলিঙ্গে পুংলিঙ্গে—পরিচারক। উন্মনাঃ= উৎকণ্ঠিত-মনাঃ, ব্যাকুল-চিত্ত। অনুধাবন=অনু (পশ্চাৎ ) ধাবন (গমন); অনুসন্ধান। অনু+ধাব+অষ্ট। • অনতি-পরিস্ফুট=অতি স্পষ্ট নয় ; অস্পষ্ট ; অপ্রকাশ্য । আরূঢ় = আ+রুহ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—আরােহণ। ;

৮৮ শকুন্তলা। আসিয়াছেন; ত রাজা মনে মনে এইরূপ বিতর্ক করিতেছেন, এমন সময়ে কঞ্চুকী ? আসিয়া কৃতাঞ্জলি-পুটে নিবেদন করিলেন, মহারাজ। ধৰ্ম্মারণ্যবাসী তপস্বিগণ মহর্ষি কণের সংবাদ লইয়া এক্ষণে কি আজ্ঞা হয়। রাজা তপস্বি- শব্দ-শ্রবণমাত্র সবিশেষ আদর-প্রদর্শন-পূৰ্ব্বক কহিলেন, শীঘ্র উপাধ্যায় । সােমরাতকে বল ; তিনি যেন অভ্যাগত তপস্বী- দিগকে বেদবিধির অনুসারে সৎকার করিয়া অবিলম্বে আমার নিকটে লইয়া আইসেন ; আমিও ইত্যবকাশে তপস্বি- দর্শন-যােগ্য স্থানে গিয়া রীতিমত অবস্থিতি করিতেছি। এই আদেশ-প্রদান-পূৰ্ব্বক কথুকীকে বিদায় করিয়া রাজা অগ্নিগৃহে গিয়া অবস্থিতি করিলেন, এবং কহিতে লাগিলেন, ভগবান্ কণ কি জন্য আমার নিকটে ঋষি প্রেরণ করিলেন ? তাহাদের তপস্যার কি বিঘ্ন ঘটিয়াছে, কি কোনও দুরাত্মা কধুকী = “অন্তঃপুরচরো বৃদ্ধে। বিপ্রাে গুণগণান্বিতঃ। সৰ্ব্ব- শাস্ত্ৰাৰ্থকুশলঃ ককীত্যভিধীয়তে”। অন্তঃপুরচারী বৃদ্ধ গুণবান্ সৰ্ব্ব- শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণকে ককী বলে। উপাধ্যায়=সমীপে গিয়া যাহার নিকট হইতে অধ্যয়ন করা যায় ; বেদাধ্যাপক। উপ+অধি+ই+ঘঞ। স্ত্রীলিঙ্গে—“উপাধ্যায়ের পত্নী” এই অর্থে—উপাধ্যায়ানী, উপাধ্যায়ী। “বেদাধ্যাপিকা এই অর্থে—উপাধ্যায়ী, উপাধ্যায়। বেদবিধি =বেদোক্ত বিধি অর্থাৎ বিধান বা নিয়ম (মধ্যপদ)। ৪ দুরাত্মা=দুঃ (দুষ্ট ) আত্মা অর্থাৎ স্বভাব যাহার ( বহু ); বিশেষণ। বিশেষ্যে—দৌরাত্ম্য।

পঞ্চম অঙ্ক।
এই হেতু
তাহাদের উপরি কোনও প্রকার অত্যাচার করিয়াছে ? কিছুই
নির্ণয় করিতে না পারায় আমার মন সাতিশয় ব্যাকুল
হইতেছে। পার্শ্ববর্তিনী পরিচারিকা কহিল, মহারাজ ! আমার
বােধ হইতেছে, ধৰ্ম্মারণ্যবাসী ঋষিগণ মহারাজের অধিকারে
নির্বিঘ্নে ও নিরাকুল -চিত্তে তপস্যার অনুষ্ঠান করিতেছেন ;
প্রীত হইয়া মহারাজকে ধন্যবাদ দিতে ও
আশীর্বাদ করিতে আসিয়াছেন ।
এবম্প্রকার কথােপকথন হইতেছে,
সােমরাত তপস্বীদিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া উপস্থিত
হইলেন। রাজা দূর হইতে দেখিতে পাইয়া আসন হইতে
গাত্রোত্থান করিলেন, এবং তাহাদের উপস্থিতির প্রতীক্ষায়
দণ্ডায়মান রহিলেন। তদ্দর্শনে সােমরাত তপস্বীদিগকে
কহিলেন,
দেখুন, সসাগরা সদ্বীপ ।
পৃথিবীর অদ্বিতীয়
এমন
সময়ে
নিরাকুল=ভাব-প্রধান নির্দেশ ; অর্থাৎ ‘আকুল’ শব্দ বিশেষণ
হইলেও এস্থলে ‘আকুল-ভাব’ এই অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় ভাবার্থেরই
প্রাধান্য হইল। ফলতঃ ‘আকুল’ শব্দ এই স্থলে ‘আকুলতা এইরূপ
অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। নির (নাই) আকুল (আকুলতা) যাহার
—(বহু )
২ সদ্বীপা =জন্ধু, প্ল, শাল্মলি, কুশ, ক্রৌঞ্চ, শাক, পুষ্কর—এই
সাতটী মহাদ্বীপ ; এবং কুরু, চন্দ্র, বরুণ, সৌম্য, নগ, কুমারিক,
গভস্তিমান্, রুমা, তাম্রপর্ণ, কশেরু, ইন্দ্র—এই এগারটী উপদ্বীপ।
অতএব সৰ্বশুদ্ধ আঠারটী দ্বীপ।
অদ্বিতীয়=নাই দ্বিতীয় যাহার (বহু )। দ্বিতীয়=দ্বিতীয়।
স্ত্রীলিঙ্গে—দ্বিতীয়া।

শকুন্তলা। হয়। নম্রভাব অবলম্বন অধিপতি আসন-পরিত্যাগ-পূর্বক দণ্ডায়মান হইয়া আপনাদের আগমন-প্রতীক্ষা করিতেছেন। শারব কহিলেন, নরপতি- গণের এরূপ বিনয় ও সৌজন্য ১ দেখিলে সাতিশয় প্রীত হইতে হয়, এবং সবিশেষ প্রশংসা করিতে ও সাধুবাদ দিতে অথবা ইহা বিচিত্র কি-তরুগণ ফলিত হইলেই ফল- ভরে অবনত হইয়া থাকে। বর্ষাকালীন জলধরগণ বারিভরে করে ; সৎপুরুষ-সমূহেরও প্রথা এই, সমৃদ্ধিশালী হইলেও তাঁহারা উদ্ধত-ভাব ধারণ করেন না। শকুন্তলার দক্ষিণ চক্ষুঃ স্পন্দিত হইতে লাগিল। তিনি সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া গৌতমীকে কহিলেন, পিসি ! আমার দক্ষিণ চক্ষুঃ নাচিতেছে কেন ? গৌতমী কহিলেন, বৎসে। শঙ্কিত হইও না; পতি-কুল-দেবতা-গণ তােমার মঙ্গল করিবেন। যাহা হউক, শকুন্তলা তদবধি মনে মনে নানা- প্রকার আশঙ্কা করিতে লাগিলেন এবং নিরতিশয় ব্যাকুল-হৃদয়া হইলেন। রাজা শকুন্তলাকে দেখিয়া কহিতে লাগিলেন, এই অব- গুণ্ঠনবতী ৩ কামিনী কে ? কি জন্যই বা ইনি তপস্বীদিগের সমভিব্যাহারে আসিয়াছেন? পার্শ্ববর্তিনী পরিচারিকা কহিল, মহারাজ। আমিও দেখিয়া অবধি মনে মনে নানা বিতর্ক ১ ২ সৌজন্য = ভদ্রতা। সুজন+ভাবার্থে ফ্য। স্ত্রীলােকদিগের দক্ষিণ চক্ষুর স্পন্দন অশুভ-সূচক। অবগুণ্ঠনবতী=অবগুণ্ঠন (ঘােষ্টা+বতু+স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ, পঞ্চম অঙ্ক। ৯১ করিতেছি, কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। যাহা হউক, মহারাজ! এরূপ রূপ-লাবণ্যের মাধুরী কখনই কাহারও নয়নগগাচর হয় নাই। রাজা কহিলেন, এই কথা ছাড়িয়া দাও; পর-স্ত্রীতে দৃষ্টিপাত বা পর-স্ত্রীর কথা লইয়া আন্দোলন করা উচিত নহে। এ দিকে শকুন্তলা আপনার অস্থির হৃদয়কে ইহা বলিয়া সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন যে, হৃদয়। এত ব্যাকুল হইতেছ কেন ? আৰ্যপুত্রের তৎকালীন ভাব মনে করিয়া আশ্বাসিত হও ও ধৈৰ্য ১ অবলম্বন কর। তাপসেরা ২ ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত ৩ হইয়া, মহারাজের জয় হউক, বলিয়া হস্ত তুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন রাজা প্রণাম করিয়া ঋষিদিগকে আসন-পরিগ্রহ ৪ করিতে কহিলেন। সকলে উপবেশন করিলে রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, নির্বিঘ্নে আপনাদিগের তপস্যা কাৰ্য সম্পন্ন হইতেছে ? ঋষিরা কহিলেন, মহারাজ। আপনি শাসনকৰ্ত্তা থাকিতে ধৰ্ম্ম- ক্রিয়ার ৫ বিঘ্ন-সম্ভাবনা কোথায় ? সূর্যদেবের উদয় হইলে কি অন্ধকারের আবির্ভাব হইতে পারে ? রাজা শুনিয়া কৃতার্থম্মন্য হইয়া কহিলেন, অদ্য আমার রাজ-শব্দ সার্থক হইল। পরে অনন্তর ১ ধৈৰ্য্য = ধীরতা, স্থৈর্য। ধীর+ভাবার্থে ফ্য। তাপস =তপ+শীলার্থে ষ্ণ। স্ত্রীলিঙ্গে—তাপসী। সন্নিহিত=নিকটবর্তী। সম্+নি+ধ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে —সন্নিধান। ৪ পরিগ্রহ=স্বীকার। পরি+ গ্রহ+অল্। ক্রিয়া = কাৰ্য। কৃ+শ+আপ। ৫ শকুন্তলা। ১ তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবান্ করে কুশল ? ঋষিরা কহিলেন, হ মহারাজ! মহর্ষি সর্বাংশেই কুশলী। এই রূপে প্রথম-সমাগমমাচিত শিষ্টাচার-পরম্পরা পরিসমাপ্ত হইলে শাঙ্গ রব কহিলেন, মহারাজ ! আমাদের গুরুদেবের যে সংবাদ লইয়া আসিয়াছি, তাহা নিবেদন করি, শ্রবণ করুন,—মহর্ষি কহিয়াছেন, আপনি আমার অনুপস্থিতি কালে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন ; আমি সবিশেষ সমস্ত কথা অবগত হইয়া তদ্বিষয়ে সম্পূর্ণ ও সম্মতি প্রদান করিয়াছি; আপনি সর্বাংশেই আমার শকুন্তলার যােগ্য পাত্র ; এক্ষণে আপনার সহধর্মিণী অন্তঃসত্বা ৪ হইয়াছেন, তাহাকে গ্রহণ করুন। গৌতমীও কহিলেন, মহারাজ! আমি কিছু বলিতে চাই, কিন্তু বলিবার পথ নাই। শকুন্তলা গুরু-জন- গণের অপেক্ষা রাখে নাই; তুমিও তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর নাই; তােমরা পরস্পরের সম্মতিতে যাহা করিয়াছ, তাহাতে অন্যের কথা কহিবার কি আছে? শকুন্তলা মনে মনে শঙ্কিতা ও কম্পিত হইয়া কেবল ১ পরম্পরা = ধারা, সন্ততি। সম্পূর্ণ = স+পূর+ক্ত। বিশেষ্যে–সম্পূরণ বা সম্পূর্ণতা। [পূর্ণ =পূর+ ণিচ+কৰ্ম্মবাচ্যে+ক্ত (নিপাতনে)। পূরিত=পূর+ ণিচ্‌ +কর্মবাচ্যে ক্ত। পূৰ্ত্ত =পূ+কৰ্ম্মবাচ্যে ক্ত।] ৩ সম্মতি =সম্+ম+ক্তি; বিশেষ্য। বিশেষণে—সম্মত। ৪ অন্তঃসত্বা=গর্ভবতী। ( অভ্যন্তরে) সত্ব ( প্রাণী) যাহার (হু)। २ অন্তঃ

পঞ্চম অঙ্ক।
৯৩
ইহাই ভাবিতে লাগিলেন, না জানি আর্যপুত্র এখন কি
বলেন। রাজা দুর্বাসার শাপ-প্রভাবে শকুন্তলা-পরিণয়-বৃত্তান্ত
আদ্যন্ত ভুলিয়া গিয়াছিলেন ; এই হেতু এই সকল কথা
শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন হইয়া তিনি কহিলেন, এ আবার কি
উপস্থিত! শকুন্তলা একবারে মিয়মাণ ১ হইলেন। শাঙ্গ রব
কহিলেন, মহারাজ! লৌকিক ব্যবহার বিলক্ষণ অবগত
হইয়াও আপনি এরূপ কহিতেছেন কেন ? আপনি কি
জানেন না যে, পরিণীতা নারী যদ্যপি সর্বাংশে সাধুশীলা হয়,
তথাপি সে নিয়ত পিতৃ-কুল-বাসিনী হইলে লােকে নানা কথা
কহিয়া থাকে ;
এই হেতু সে পতির অপ্রিয়া হইলেও
পিতৃপক্ষীয় লােক তাহাকে পতি-কুল-বাসিনী করিতে চাহে।
রাজা কহিলেন, কই, আমি ত ইহার পাণিগ্রহণ করি
নাই। শকুন্তলা শুনিয়া বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন হইয়া মনে
মনে কহিতে লাগিলেন, হৃদয়। যে আশঙ্কা করিতেছিলে,
তাহাই ঘটিল ? শাঙ্গ রব রাজার অস্বীকার-শ্রবণে তদীয়
ধূর্ততার আশঙ্কা করিয়া অত্যন্ত কুপিত হইয়া কহিলেন,
মহারাজ !
জগদীশ্বর আপনাকে ধৰ্ম্ম-সংস্থাপন-কাৰ্য্যে।
১
२
ম্রিয়মাণা=মৃতপ্রায়। মৃ+শান+আপ।
সাধুশীলা =সাধু (সৎ) শীল (চরিত্র) যাহার—(বহু )
স্ত্রীলিঙ্গে।
৩ সংস্থাপন=সম্+স্থা+ ণিচ+অন ; বিশেষ্য।
বিশেষণে
সংস্থাপিত।

.৯৪ শকুন্তলা। প্রবৃত্ত হইলে নিয়ােজিত করিয়াছেন; অন্যে অন্যায় করিলে আপনিই দণ্ড-বিধান করিয়া থাকেন। এক্ষণে আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, রাজা হইয়া অনুষ্ঠিত কাৰ্য্যের অপলাপে ২ তাহাকে ধৰ্ম্মদ্রোহী ৩ হইতে হয় কি না ? রাজা কহিলেন, আপনি আমায় এত অভদ্র স্থির করিতেছেন কেন ? শাঙ্গ রব কহিলেন, মহারাজ ! আপনার অপরাধ নাই; যাহারা ঐশ্বৰ্য্য-মদে মত্ত হয়, তাহাদের এইরূপই স্বভাব ও এই- রূপই আচরণ হইয়া থাকে। রাজা কহিলেন, আপনি অন্যায় ভৎসনা করিতেছেন ; আমি কোনক্রমেই এরূপ ভৎসনার যােগ্য নহি। এইরূপে রাজাকে অস্বীকার-পরায়ণ ও শকুন্তলাকে লজ্জায় অবনত-মুখী দেখিয়া গৌতমী শকুন্তলাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, বৎসে! লজ্জিত হইও না ; আমি তােমার মুখের অবগুণ্ঠন খুলিয়া দিতেছি ; তাহা হইলেই মহারাজ তােমাকে চিনিতে পারিবেন। ইহা বলিয়া তিনি শকুন্তলার মুখের অবগুণ্ঠন খুলিয়া দিলেন। রাজা তথাপি শকুন্তলাকে চিনিতে ১ নিয়ােজিত=নি+যুজ,+ ণিচ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেযয্য- নিয়ােজন। ২ অপলাপ= অস্বীকার। অপ+ল+ঘঞ। ধর্মদ্রোহী = ধৰ্ম্মের দ্রোহী অর্থাৎ নাশক বা অনিষ্টকারী। দ্রোহী= হ+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—দ্রোহিণী। ৩

পঞ্চম অঙ্ক।
৯৫
পারিলেন না; বরং পূর্বাপেক্ষা অধিকতর সংশয়ারূঢ় ” হইয়া
মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন শাঙ্গ রব কহিলেন,
মহারাজ! এরূপ মৌনভাবে রহিলেন কেন ? রাজা কহিলেন,
মহাশয়! কি করি, বলুন ; অনেক ভাবিয়া দেখিলাম, কিন্তু
ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছি বলিয়া কোনক্রমেই আমার স্মরণ
হইতেছে না। অতএব কি প্রকারে ইহারে ভাৰ্য্যা ২ বলিয়া
পরিগ্রহ ৩ করি ? বিশেষতঃ ইনি এক্ষণে অন্তঃসত্বা হইয়াছেন।
রাজার এই বচন-বিন্যাস শ্রবণ করিয়া শকুন্তলা মনে
মনে কহিতে লাগিলেন, হায় কি সর্বনাশ ! একবারে পাণি-
গ্রহণেই সন্দেহ !
রাজমহিষী হইয়া অশেষ সুখ-সম্ভোগে
কাল-হরণ করিব বলিয়া যত আশা করিয়াছিলাম, তাহা
সমস্তই এককালে নিমুল হইল। শাঙ্গ রব কহিলেন,
মহারাজ! বিবেচনা করিয়া দেখুন, মহর্ষি কেমন মহানুভবতা ও
প্রদর্শন করিয়াছেন! আপনি
আপনি তাহার অগােচরে তাহার
অনুমতি-নিরপেক্ষ ৫ হইয়া তদীয় কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়া-
১ সংশয়ারূঢ় =সন্দিহান (২য় তৎ)। সংশয়
সংশয় = সম্+শী+অল্।
আরূঢ় = আ+রুহ +ক্ত।
২ ভাৰ্য্যা =ভৃ+ক্যপ+আপ ( নিপাতনে)= পত্নী।
পরিগ্রহ = গ্রহণ, স্বীকার। পরি+ গ্রহ,+অল্। বিশেষণে-
পরিগৃহীত।
৪ মহানুভবতা==উদারতা। মহান্ অনুভব (মহিমা) যাহার
(বহু)। মহানুভব+ভাবার্থে ত+আপ।
অনুমতি-নিরপেক্ষ—নাই অপেক্ষা যাহার (বহু )=নিরপেক্ষ,
অনুমতি বিষয়ে নিরপেক্ষ (৭মী তৎ)।

করিয়া তাদৃশ
.
শকুন্তলা।
ছিলেন; কিন্তু তিনি তাহাতে কিঞ্চিত্মাত্র রাষ-প্রকাশ বা
অসন্তোষ-প্রদর্শন না করিয়া বিলক্ষণ সন্তোষ প্রদর্শন করিয়া-
এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া কন্যাকে আপনার নিকটে
পাঠাইয়া দিয়াছেন। এক্ষণে প্রত্যাখ্যান ১
সদাশয় মহানুভবের অবমাননা মহারাজের কোন
ক্রমেই বিধেয় নহে। আপনি স্থিরচিত্তে বিবেচনা করিয়া
কৰ্তব্য-নির্ধারণ করুন।
শারদ্বত, শাঙ্গ রব অপেক্ষা উদ্ধত-স্বভাব ছিলেন; তিনি
কহিলেন, অহে শাঙ্গ রব! স্থির হও, আর তােমার বৃথা
বাজাল বিস্তারিত করিবার প্রয়ােজন নাই। আমি এক
কথায় সকল বিষয়ের শেষ করিয়া দিতেছি। ইহা বলিয়া
তিনি শকুন্তলার দিকে মুখ ফিরাইয়া কহিলেন, শকুন্তলে ।
আমাদের যাহা বলিবার ছিল, বলিয়াছি ; মহারাজ এইরূপ
বলিতেছেন; এক্ষণে তােমার যাহা বলিবার থাকে বল, এবং
যাহাতে উহার প্রতীতি ২
জন্মে, তাহাও কর। তখন
শকুন্তলা অতি মৃদুস্বরে কহিলেন, যখন তাদৃশ অনুরাগ
এতাদৃশ ভাব অবলম্বন করিয়াছে, তখন আমি পূর্ব বৃত্তান্ত
স্মরণ করাইয়া কি করিব ; কিন্তু আত্ম-শােধনের নিমিত্ত
কিছু বলা আবশ্যক। ইহা বলিয়া আৰ্যপুত্র! এই মাত্র
১
প্রত্যাখ্যান=অস্বীকার। প্রতি+আ+খ্যা +অনট; বিশেষ্য
বিশেষণে—প্রত্যাখ্যাত।
২ প্রতীতি=বিশ্বাস। প্রতি+ই+ক্তি। বিশেষণে-প্রতীত।

পঞ্চম অঙ্ক। ১৭ ! ১ সম্ভাষণ করিয়া শকুন্তলা কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন অনন্তর তিনি কহিলেন, যখন পরিণয়েই সন্দেহ জন্মিয়াছে, তখন আর আৰ্য-পুত্র-শব্দে সম্ভাষণ করা উচিত হইতেছে । এইরূপ এইরূপ বলিয়া তিনি কহিলেন, পৌরব আমি সরল-হৃদয়, মন্দ কিছুই জানি না। তৎকালে তপােবনে তাদৃশী অমায়িকতা দেখাইয়া ধৰ্ম্ম-প্রমাণ প্রতিজ্ঞা করিয়া এক্ষণে এরূপ দুবাক্য বলিয়া প্রত্যাখ্যান করা তােমার উচিত নহে। রাজা শুনিয়া কিঞ্চিৎ কোপাবিষ্ট হইয়া কহিলেন, ঋষি-কন্যে ! যেরূপ বর্ষাকালের নদী তীর-তরুকে পাতিত স্বীয় প্রবাহকে পঙ্কিল করে, সেইরূপ তুমিও আমায় আপন কুলকে কলঙ্কিত করিতে উদ্যত হইয়াছ। শকুন্তলা কহিলেন, ভাল, যদি ভাল, যদি তুমি যথার্থই পরিণয়ে সন্দেহ করিয়া পর-স্ত্রী-বােধে পরিগ্রহ করিতে শঙ্কিত হও, তাহা হইলে কোনও অভিজ্ঞান প্রদর্শন করিয়া তােমার সন্দেহ দূর করিতেছি। রাজা কহিলেন, এ উত্তম কল্প; ৫ ৪ ১ পৌরব =পুরু-বংশজাত। পুরু+ষ্ণ। ৭ অমায়িকতা = মায়াশূন্যতা, সরলতা। মায়িক =মায়া+ফিক। ন মায়িক (নঞ, তৎ )। অমায়িক+ভাবার্থে ত+আপ। ৩ পঙ্কিল=পঙ্ক+ অন্ত্যর্থে ইল। উদ্যত = উৎ+যম্‌+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—উদ্যম। == অভিপ্রায়। কৃপ+অল্। ৪ ৭

৯৮
শকুন্তলা।
কই, কি অভিজ্ঞান দেখাইবে, দেখাও। শকুন্তলা রাজ-দত্ত
অঙ্গুরীয় অঞ্চলের কোণে বন্ধন করিয়া রাখিয়াছিলেন ; এক্ষণে
ব্যস্ত হইয়া অঙ্গুরীয় খুলিতে গিয়া দেখিলেন, অঞ্চলের কোণে
অঙ্গুরীয় নাই। তখন তিনি বিষন্না ও ম্লান-বদনা ২ হইয়া
গৌতমীর মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। গৌতমী কহিলেন,
বােধ হয়, বন্ধন শিথিল থাকায় নদীতে স্নান করিবার সময়ে
পড়িয়া গিয়াছে।
রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, স্ত্রী-জাতি
সাতিশয় প্রত্যুৎপন্নমতি, ৩ এই যে কথা প্রসিদ্ধ ও
ইহা তাহার এক অতি উৎকৃষ্ণ উদাহরণ-স্থল।
শকুন্তলা রাজার এইরূপ ভাব-দর্শনে ম্রিয়মাণ হইয়া
কহিলেন, আমি দৈবের প্রতিকূলতা-বশতঃ অঙ্গুরীয়-প্রদর্শন
বিষয়ে বিফল হইলাম বটে, কিন্তু এমন কোনও কথা
বলিতেছি যে, তাহা শুনিলে পূর্ব বৃত্তান্ত অবশ্যই তােমার
স্মৃতি-পথে উপস্থিত হইবে। রাজা কহিলেন, এক্ষণে তাহা
অঙ্গরীয়
আছে,
বিষন্না =দুঃখিতা। বি+সদ+ক্ত+আপ। বিশেষ্যে-বিষাদ।
বিপরীত—প্রসন্না।
২ ম্লান-বদনা = ম্লান হইয়াছে বদন যাহার (বহু)। ম্লান=মলিন,
অপ্রসন্ন। +ৈক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—স্লানি।
৩ প্রত্যুৎপন্নমতি =প্রত্যুৎপন্না মতি যাহার (বহু)। প্রতিভা
শক্তি-সম্পন্না, উপস্থিত-বুদ্ধি-যুক্তা। প্রত্যুৎপন্ন=প্রতি+উৎ+প+ক্ত
বিশেষণ। মতি = মন্+ক্তি; বিশেষ্য। বিশেষণে—মত।
* প্রসিদ্ধ =প্র+সিধ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—প্রসিদ্ধি।

পঞ্চম অঙ্ক। ভাল, কৃত-পুত্র ১ শ্রবণ করা আবশ্যক; কি বলিয়া আমার প্রতীতি জন্মাইতে 'চাও, তাহা বল। শকুন্তলা কহিলেন, মনে করিয়া দেখ, একদিন তুমি ও আমি দুই জনে নবমালিকা-মণ্ডপে বসিয়াছিলাম। তােমার হস্তে একটি জল-পূর্ণ পদ্ম-পত্রের পাত্র ছিল। ইহা কহিয়া শকুন্তলা রাজার মুখের দিকে তাকাইলে রাজা কহিলেন, বলিয়া যাও, শুনিতেছি। শকুন্তলা কহিলেন, কহিলেন, সেই সময়ে আমার দীর্ঘাপাঙ্গ-নামক মৃগ-শাবক সেই স্থানে উপস্থিত হইল। তুমি সেই স্থানে তাহাকে সেই জল পান করিতে আহবান করিলে। তুমি অপরিচিত বলিয়া তােমার নিকটে আসিল না ; পরে তাহা আমি হস্তে লইলে সে আমার নিকটে আসিয়া অনায়াসে তাহা পান করিল। তখন তুমি পরিহাস করিয়া কহিলে, সকলেই সজাতিকে বিশ্বাস করিয়া থাকে ; তােমরা দুই জনেই জঙ্গলা, এজন্য সে তােমার নিকটে গেল। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, কামিনী- গণের এইরূপ মধু-মণ্ডিত প্রবঞ্চনা-বাক্য । বিষয়াসক্ত ১ কৃত-পুত্র =পুত্র-রূপে প্রতিপালিত। এ প্রবঞ্চনা=প্রতারণা। প্র+ব+অন+আপ; বিশেষ্য। বিশেষণে—প্রবঞ্চিত বা প্রবঞ্চক। বিষয়াসক্ত =বিষয়ে আসক্ত (৭মী তৎ)। আসক্ত =আ+ সজ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—আসক্তি। ত

১০০
শকুন্তলা।
ব্যক্তি-গণের বশীকরণ মন্ত্র-স্বরূপ। গৌতমী শুনিয়া কিঞ্চিৎ
কোপ-প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, মহারাজ !
যে জন্মাবধি
পােবনে প্রতিপালিত,—প্রবঞ্চনা কাহাকে বলে, তাহা সে
জানে না। রাজা কহিলেন, অয়ি বৃদ্ধতাপসি ! প্রবঞ্চনা
স্ত্রী-জাতির স্বভাব-সিদ্ধ বিদ্যা,—বিনা শিক্ষায় তাহাদের
প্রবঞ্চনা-নৈপুণ্য ২ দেখিতে পাওয়া যায়।
দেখ, কেহই
শিখাইয়া দেয় না, অথচ কোকিলা-গণ কেমন কৌশল
করিয়া স্বীয় সন্তান-গণকে অন্য পক্ষি-দ্বারা প্রতিপালিত
করিয়া লয়।
শকুন্তলা রুষ্ট হইয়া কহিলেন, অনাৰ্য ।
তুমি স্বয়ং যেরূপ, সকলকেই সেইরূপ মনে কর । রাজা
কহিলেন, তাপস-কন্যে ! দুষ্যন্ত গােপনে কোনও কৰ্ম্ম করে
৩
२
১ বশীকরণ =বশ+ছি+কৃ+অনট।
প্রবঞ্চনা-নৈপুণ্য=প্রবঞ্চনায় নৈপুণ্য (মী তৎ)। নৈপুণ্য =
নিপুণ +ভাবার্থে ষ্ণ্য।
৩ অনাৰ্য=অভদ্র, যে আৰ্য নয়। ন+ঋ+ঘণ, অথবা ন+অৰ্য্য
+ষ্ণ। “কৰ্তব্যমাচরন্ কামমকৰ্তব্যমনাচরন্। তিষ্ঠতি প্রকৃতাচারে
যঃ স আৰ্য ইতি মৃতঃ।” “কুলং শীলং দয়া দানং ধৰ্ম্মঃ সত্যং
কৃতজ্ঞতা। অদ্রোহ ইতি যেতেৎ তানাৰ্য্যা সংপ্রচক্ষতে”। যিনি
সমগ্রূপে কৰ্তব্য কৰ্ম্ম পালন ও অকৰ্তব্য কৰ্ম্ম লঙ্ঘন করিয়া
প্রকৃত-ভাবে আচারবান্ হইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই “আৰ্য”-নামে
অভিহিত হন। অথবা, কুল, শীল, দয়া, দান, ধৰ্ম্ম, সত্য, কৃতজ্ঞতা
ও কলহ-শূন্যতা,—এই সকল গুণ যাহাতে বিদ্যমান আছে, তাহাকেই
“আৰ্য” বলে।

পঞ্চম অঙ্ক। ১০১ পাণিগ্রহণ ২ ৪ ; সে যেখানে যাহা কিছু করিয়াছে, তাহা সমস্তই সর্বত্র প্রসিদ্ধ আছে। কই, কেহ বলুক দেখি, আমি তােমার করিয়াছি। শকুন্তলা কহিলেন, তুমি আমায় স্বেচ্ছাচারিণী প্রতিপন্ন করিলে। পুরুবংশীয়-গণ অতি উদার-স্বভাব, এই বিশ্বাস করিয়া যখন আমি মধু-মুখ হলাহল-হৃদয়ের হস্তে আত্মসমর্পণ করিয়াছি, তখন আমার ভাগ্যে যে এরূপ ঘটিবে, ইহা বিচিত্র নহে। ইহা বলিয়া অঞ্চলে বদন আবৃত করিয়া শকুন্তলা নীরবে যােদন করিতে লাগিলেন। তখন শাঙ্গ রব কহিলেন, অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া কৰ্ম্ম করিলে পরিশেষে এইরূপ মনস্তাপ পাইতে হয়। এই জন্য সকল কৰ্ম্মই, বিশেষতঃ যাহা নির্জনে করা যায়, সবিশেষ পরীক্ষা করিয়া সম্পন্ন করা সর্বতােভাবে বিধেয়। পরস্পরের মন না জানিয়া মিত্ৰতা করিলে সেই মিত্ৰতা পরিশেষে শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। শাঙ্গরবের তিরস্কার-বাক্য শ্রবণ ১ স্বেচ্ছাচারিণী = আপন ইচ্ছানুসারে বিচরণ যে ; ব্যভিচারিণী, দুশ্চরিত্রা। স্বেচ্ছা+চ+ ণিন্+ঈ। পুংলিঙ্গে- স্বেচ্ছাচারী ২ প্রতিপন্ন =প্রতি+পদ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে-প্রতিপত্তি। মধু-মুখ=মধু মুখে যাহার ( বহু )। হলাহল-হৃদয়=হলাহল ( বিষ ) হৃদয়ে যাহার (বহু )। ৫ পৰ্যৰসিত =সমাপ্ত। পরি+অব+সাে+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষষ্য পৰ্যবসান। ৩ ৪ -

১০২
শকুন্তলা।
করিয়া রাজা কহিলেন, কেন আপনি স্ত্রীলােকের কথায়
বিশ্বাস করিয়া আমার উপরি অকারণে এরূপ দোষারােপ
করিতেছেন ? শাঈরব কিঞ্চিৎ কোপাবিষ্ট হইয়া কহিলেন,
যে ব্যক্তি জন্মাবধি চাতুরী শিখে নাই, তাহার কথা
অপ্রামাণিক; আর যাহারা পর-প্রতারণা ১ বিদ্যা বলিয়া শিক্ষা
করে, তাহাদের কথাই প্রামাণিক হইবে ? তখন রাজা
শাঙ্গ রবকে কহিলেন, মহাশয় ! আপনিই যথার্থবাদী। আমি
স্বীকার করিলাম, প্রতারণাই আমাদের বিদ্যা ও ব্যবসায়।
কিন্তু আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, ইহার সঙ্গে প্রতারণা করিয়া
আমার কি লাভ হইবে ? শাঙ্গ রব কোপে কম্পিত-কলেবর
হইয়া কহিলেন, নিপাত ! রাজা কহিলেন, পুরুবংশীয়-গণ
নিপাত লাভ করে, এ কথা অশ্রদ্ধেয়।
এই রূপে উভয়ের বিবাদার দেখিয়া
কহিলেন, শাঙ্গ রব! আর উত্তরােত্তর বাগবিতণ্ডায় প্রয়ােজন
নাই; আমরা গুরু-নিয়ােগের অনুযায়ি কাৰ্য অনুষ্ঠান
করিয়াছি; এক্ষণে ফিরিয়া যাই, চল। ইহা বলিয়া তিনি
রাজাকে কহিলেন, মহারাজ ! ইনি তােমার পত্নী, ইচ্ছা হয়
গ্রহণ কর, ইচ্ছা হয় ত্যাগ কর ; পত্নীর উপরি পরি-
২
১ প্রতারণা = প্রবঞ্চনা। প্র++ ণিচ+অন+আপ,
বিশেষ্য।
বিশেষণে—প্রতারিত।
অশ্রদ্ধেয় =শ্রদ্ধা অর্থাৎ বিশ্বাসের অযােগ্য। ন+শ্রৎ+ধ+য।
৩ নিয়ােগ=আদেশ। নি+যুজ+ঘ। বিশেষণে—নিযুক্ত।

পঞ্চম অঙ্ক। ১০৩ ; ণেতার সর্বতােমুখী প্রভু আছে। ইহা বলিয়া শাঙ্গ রব, শারদ্বত ও গৌতমী, তিন জনেই প্রস্থানােম্মুখ হইলেন। শকুন্তলা সকলকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া অশ্রু-পূর্ণ- লােচনে ও কাতর-বচনে কহিলেন, ইনি ত আমার এই করিলেন; তােমরাও আমায় ফেলিয়া চলিলে; আমার কি গতি হইবে; ইহা বলিয়া শকুন্তলা তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। গৌতমী কিঞ্চিৎ দূর গিয়া কহিলেন, বৎস শাঙ্গ রব! শকুন্তলা ক্রন্দন করিতে করিতে আমাদের সঙ্গে আসিতেছে ; দেখ, রাজা প্রত্যাখ্যান করিলেন, এখানে থাকিয়া আর কি করিবে বল। আমি বলি, শকুন্তলা আমাদের সঙ্গেই আসুক। শাঙ্গ রব শুনিয়া সরােষ-নয়নে মুখ ফিরাইয়া শকুন্তলাকে কহিলেন, আঃ পাপীয়সি ! স্বাতন্ত্র অবলম্বন করিতেছ? শকুন্তলা ভয়ে কাঁপিতে লাগিলেন। তখন শাঙ্গ রব শকুন্তলাকে কহিলেন, দেখ, রাজা যেরূপ ২ ১ পরিণেতা = স্বামী। পরি+নী+তৃ। সৰ্বতােমুখী=সৰ্ব্বতঃ (সকল দিকে) মুখ যাহার (বহু )। ও স্বাতন্ত্র্য = স্বাধীনতা। স্ব হইয়াছে তন্ত্র (প্রধান) যাহার (বহু)। স্ত্রীলিঙ্গে স্বতন্ত্রা। স্বতন্ত্রা+ভাবার্থে ফ্য। “পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্তা রক্ষতি যৌবনে। পুত্ৰশ্চ স্থবিরে রক্ষেৎ ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র- শাস্ত্রকার-গণের মতে স্ত্রীলােকের রক্ষণাবেক্ষণের ভার বাল্যকালে পিতার উপরি, যৌবন-কালে স্বামীর উপরি এবং বৃদ্ধ-কালে পুত্রের উপরি সমর্পিত। স্ত্রী-স্বাধীনতা একবারেই নিষিদ্ধ। মতি”।

১ २ ১০৪ শকুন্তলা। কহিতেছেন, যদি তুমি যথার্থ সেইরূপ হও, তাহা হইলে তুমি স্বেচ্ছাচারিণী হইলে; তাত কণ আর তােমার মুখা- বলােকন করিবেন না। আর যদি তুমি আপনাকে পতিব্রতা বলিয়া জান, তাহা হইলে পতিগৃহে থাকিয়া দাসীবৃত্তি করাও তােমার পক্ষে শ্রেয়ঃ । অতএব এই স্থানেই থাক, আমরা চলিলাম। তপস্বীদিগকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া রাজা শাঙ্গ রবকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, মুহাশয় আপনি উহাকে মিথ্যা প্রবঞ্চনা করিতেছেন কেন ? পুরুবংশীয়েরা প্রাণান্তেও পর- বনিতা-পরিগ্রহে ৩ প্রবৃত্ত হয় না; চন্দ্র কুমুদিনীকেই প্রফুল্ল করেন; সূৰ্য্য কমলিনীকেই উল্লাসিত করিয়া থাকেন। শাঙ্গ রব কহিলেন, মহারাজ! আপনি পরকীয় মহিলার আশঙ্কা করিয়া অধৰ্ম্ম-ভয়ে শকুন্তলা-পরিগ্রহে পরান্মুখ হইতেছেন; কিন্তু ইহাও অসম্ভাবনীয় নহে যে, আপনি পূর্ব- বৃত্তান্ত ভুলিয়া গিয়াছেন। ইহা শুনিয়া রাজা পার্শ্বোপবিষ্ট পুরােহিতের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, মহাশয়কে তখন ১ পতিব্রতা=পতিই ব্রত যাহার (বহু ), স্ত্রীলিঙ্গে। “আর্ভার্তে মুদিতে হৃষ্টা প্রােষিতে মলিন কৃশা। মৃতে মিয়েত যা পতৌ সা স্ত্রী জ্ঞেয়া পতিব্রতা * ॥ শ্রেয়ঃ = মঙ্গল। প্রশস্ত+ঈয়। বনিতা স্ত্রী। ২ পঞ্চম অঙ্ক। ১০৫ ২ ব্যবস্থা জিজ্ঞাসা করি, পাতকের লাঘব গৌরব বিবেচনা করিয়া উপস্থিত বিষয়ে কি কৰ্ত্তব্য বলুন । আমিই পূর্ব-বৃত্তান্ত ভুলিয়া গিয়াছি, অথবা এই স্ত্রীলােকই মিথ্যা বলিতেছেন ; এমন সন্দেহ-স্থলে আমি দারত্যাগী হই, অথবা পর-স্ত্রী-স্পর্শ- পাতকী হই। পুরােহিত শুনিয়া কিয়ৎক্ষণ বিবেচনা করিয়া কহিলেন, ভাল, মহারাজ ! যদি এরূপ করা যায়, তবে মন্দ কি ? রাজা কহিলেন, কি আজ্ঞা করুন। পুরােহিত কহিলেন, ঋষি-তনয়া প্রসবকাল পর্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করুন। যদি বলেন, এ কথা বলি কেন ? সিদ্ধ পুরুষ-গণ কহিয়াছেন, আপনার প্রথম সন্তান চক্রবর্তি-লক্ষণাক্রান্ত হইবেন। যদি মুনি-দৌহিত্র সেইরূপ হয়, তাহা হইলে ইহারে গ্রহণ করিবেন; নতুবা ইহার পিতৃ-সমীপ-গমনই স্থির রহিল। রাজা কহিলেন, যাহা আপনাদের অভিরুচি হয়, করুন। তখন পুরােহিত কহিলেন, তবে আমি ইহাকে প্রসবকাল পর্যন্ত আমার আলয়ে লইয়া রাখি। পরে তিনি শকুন্তলাকে বলিলেন, ৪ ১ পাতক=পাপ, বিশেষ্য। বিশেষণে-পাতকী। ২ লাঘব =লঘুত্ব। লঘু+ভাবার্থে ষ্ণ। ৩ গৌরব= গুরুত্ব। গুরু+ভাবার্থে ষ্ণ। * চক্রবর্তী=সম্রাট। “ভরতাৰ্জ্জুনমান্ধাতৃভগীরথযুধিষ্ঠিরা। সগরাে নহুষশ্চৈব সপ্তৈতে চক্ৰবৰ্ত্তিনঃ।” চক্র+বৃৎ+ণি। ৫ দ্রৌহিত্র =দুহিতৃ+অপত্যার্থে ষ্ণ। স্ত্রীলিঙ্গে-দৌহিত্রী।

সকলে
তখন
১০৬
শকুন্তলা।
বৎসে! আমার সঙ্গে আইস। পৃথিবী! বিদীর্ণ হও, আমি
প্রবেশ করি ; আর আমি এ প্রাণ রাখিব না,—ইহা বলিয়া
শকুন্তল বােদন করিতে করিতে পুরােহিতের অনুগামিনী
হইলেন।
প্রস্থান করিলে রাজা নিতান্ত উন্মনাঃ হইয়া
শকুন্তলার বিষয় অনন্য-মনে চিন্তা করিতেছেন, এমন সময়ে,
কি আশ্চর্য ব্যাপার । কি আশ্চর্য ব্যাপার । এই
আকুল বাক্য রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল ।
তিনি কি হইল ! কি হইল ! বলিয়া পার্শ্ববর্তিনী প্রতিহারীকে
জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। পুরােহিত সহসা রাজ-সমীপে
আসিয়া বিস্ময়ােৎফুল্ল-লােচনে ও আকুল-বচনে কহিতে
লাগিলেন, মহারাজ! এক অদ্ভুত কাণ্ড হইয়া গেল। সেই
স্ত্রীলোক আমার সঙ্গে যাইতে যাইতে অস্পর-স্তীর্থের
নিকটে আপন অদৃষ্টের দোষ-কীৰ্ত্তন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে
রােদন করিতে আরম্ভ করিল ; অমনি এক জ্যোতিষ্পদার্থ ও
স্ত্রী-বেশে সহসা আবিভূত হইয়া তাহাকে লইয়া অন্তর্হিত
১ বিদীর্ণ =বি+দ+ক্ত।
অনন্য-মনে =নাই অন্য দিকে মন যাহাতে (বহু)। ক্রিয়ার
বিশেষণ।
৩ অস্পর-তীর্থ=তীর্থ-বিশেষ।
৪ জ্যোতিঃ = তেজঃ। দ্যুৎ+ইস্।
আবিভূত =আবিস্+ভূক্ত। বিশেষে—আবির্ভাব।
অন্তর্হিত
= অদৃশ্য। অন্ত+ধ+ক্ত। বিশেষ্যে—অন্তর্ধান।
২

পঞ্চম অঙ্ক।
১০৭
;
হইল। রাজা কহিলেন, মহাশয় ! যাহা প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে,
সে বিষয়ের আলােচনায় আর প্রয়ােজন নাই; আপনি
আবাসে গমন করুন। পুরােহিত, মহারাজের জয় হউক,
বলিয়া আশীর্বাদ করিয়া প্রস্থান করিলেন। রাজাও শকুন্তলা-
বৃত্তান্ত লইয়া নিতান্ত আকুল-হৃদয় হইয়াছিলেন ; এজন্য
অবিলম্বে সভাভঙ্গ করিয়া শয়নাগারে প্রবেশ করিলেন।

ষষ্ঠ অঙ্ক। শকুন্তলার অঞ্চল-কোণ হইতে রাজদত্ত অঙ্গুরীয়কের জলে পতন, রােহিত- মৎস-কর্তৃক ভক্ষণ ও ধীবরের জালে পতন হেতু তাহার পুনঃপ্রাপ্তিঃ ;-ধীবর- কর্তৃক মণিকারের নিকটে বিক্রয়ার্থ গমন ;-নগরপাল-কর্তৃক ধীবরের ধারণ, নিপীড়ন, ও অঙ্গুরী সহ রাজার নিকটে গমন ;-ধীবরের রাজ-দত্ত পুরস্কার- প্রাপ্তি ;-অঙ্গুরীয়-দর্শনে দুষ্যন্ত-কত্ত্বক শকুন্তলা-বৃত্তান্ত-পুনঃস্মরণ ;-প্রমােদ-বনে মাধব্যের সহিত শকুন্তলা-সম্বন্ধে দুষন্তের কথােপকথন ও অনুতাপ ;-রাজার প্রতি মাধবব্যর সান্ত্বনা-বাক্য ;—চতুরিকা-কর্তৃক রাজসমীপে শকুন্তলার চিত্রায়ন ;- মাধব্য-কৰ্তৃক রাজাকে পুত্র-লাভ-সম্বন্ধে আশ্বাস-দান ;-ধনমিত্রের ধনে তাহার ভাবি-সন্তানের অধিকারিত্ব-সম্বন্ধে রাজার আদেশ ;-দুর্জয় দানব-গণের দর্প-দলনের নিমিত্ত দুষ্যন্তের নিকটে দেবরাজের অনুরােধ-জ্ঞাপন ও মাতলির আগমন এবং তাঁহার সহিত দুষ্যন্তের দেবলােকে গমন। ; ১ নদীতে স্নান করিবার সময় রাজদত্ত অঙ্গুরীয় শকুন্তলার অঞ্চল-কোণ হইতে সলিলে পতিত হইয়াছিল। পতিত হইবা- মাত্র এক অতি বৃহৎ রােহিত মৎস্য তাহা গ্রাস করিয়া- ছিল। সেই মৎস্য । কিয়দ্দিন পরে এক ধীবরের জালে পতিত হইল। ধীবর খণ্ড খণ্ড বিক্রয় করিবার মানসে ঐ মৎস্যকে বহু অংশে বিভক্ত করিতে করিতে তদীয় উদর- ৪ ১ গ্রাস= গ্রস+ঘঞ। বিশেষণে—গ্রস্ত। মৎস্য =স্ত্রীলিঙ্গে—মৎসী । ৩ বিক্রয়- বিক্রী+অল। বিশেষণে—বিক্রীত।

ষষ্ঠ অঙ্ক।
২
মধ্যে অঙ্গুরীয় দেখিতে পাইল। ঐ অঙ্গুরীয় লইয়া পরম
উল্লাসিত-মনে ? সে এক মণিকারের আপণে বিক্রয়
করিতে গেল। মণিকার সেই মণিময় অঙ্গুরীয় রাজ-নামাঙ্কিত
দেখিয়া ধীবরকে চোর স্থির করিয়া নগর-পালের নিকটে
সংবাদ দিল। নগরপাল আসিয়া ধীবরকে রক্ষ্ম-বদ্ধ করিয়া
জিজ্ঞাসা করিল, রে ধূর্ত চোর! তুই এই অঙ্গুরীয় কোথায়
পাইলি, বল। ধীবর কহিল, মহাশয় ! আমি চোর নহি।
তখন নগর-পাল কহিল, তুই তবে যদি চোর নহি, তবে
এ অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া পাইলি? যদি চুরি করি নাই,
সুব্রাহ্মণ দেখিয়া তােরে ইহা দান
করিয়াছেন ?
ইহা বলিয়া নগরপাল প্রহরীকে আদেশ প্রদান করিলে
প্রহরী ধীবরকে প্রহার করিতে আরম্ভ ৩
করিতে আরম্ভ ও করিল। ধীবর
কহিল, অরে প্রহরিন্! আমি চোর নহি, আমায় প্রহার
কেন? আমি কেমন করিয়া এই অঙ্গুরীয় পাইলাম,
বলিতেছি ! সে কহিল, আমি ধীবর-জাতি, মৎস্য ধরিয়া
ও তাহা বিক্রয় করিয়া জীবিকা-নিৰ্বাহ করি। নগরপাল
তবে কি
কর
১ উল্লাসিত = আনন্দিত। উল্লাস+জাত-অর্থে ইত।
২ আপণ =দোকান।
৩ আরম্ভ =আ+রভ+অল্। বিশেষণে—আরব্ধ।
জীবিকা-নিৰ্বাহ=জীবিকার নির্বাহ (৬ষ্ঠী তৎ)। জীবিকা:
জীব +ণক+আপ। নির্বাহ =নি+ বহ+ঘ।
৪

১১০
২
একটা বৃহৎ
;
শকুন্তলা।
শুনিয়া কোপাবিষ্ট হইয়া কহিল, আমি তাের জাতি-কুল
জিজ্ঞাসা করিতেছি না কি ? এই অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া
তাের হাতে আসিল, বল। ধীবর কহিল, অদ্য প্রাতঃকালে
আমি শচীতীর্থে। জাল ফেলিয়াছিলাম।
রােহিত মৎস্য আমার জালে পড়ে। মৎস্যটা কাটিয়া উহার
উদর-মধ্যে এই অঙ্গুরীয় দেখিতে পাইলাম। তৎপরে এই
দোকানে আসিয়া দেখাইতেছি, এমন সময়ে আপনি আমায়
ধরিলেন, আমি আর কিছুই জানি না ; আমায় মারিতে হয়
মারুন, কাটিতে হয় কাটুন ; আমি চুরি করি নাই।
ইহা শুনিয়া নগরপাল আঘ্রাণ লইয়া দেখিল, অঙ্গুরীয়
হইতে আমিষ-গন্ধ নির্গত হইতেছে। তখন সে সন্দিহান ৩
হইয়া প্রহরীকে কহিল, তুই এই চোরকে এই স্থানে
সাবধানে রক্ষা কর। আমি রাজবাটীতে গিয়া এই বৃত্তান্ত
রাজার গােছর করি। রাজা শুনিয়া যেরূপ অনুমতি করিবেন,
তদনুসারে কাৰ্য করা যাইবে। ইহা বলিয়া নগরপাল
অঙ্গুরীয় লইয়া রাজ-ভবনে গমন করিল, এবং কিয়ৎক্ষণ
পরে প্রত্যাগত হইয়া প্রহরীকে কহিল, অরে!
ধীবরের বন্ধন খুলিয়া দে, এ চোর নয়। অঙ্গুরীয়-প্রাপ্তি-
••
১
কোপাবিষ্ট=ক্রুদ্ধ। কোপদ্বারা আবিষ্ট (৩য় তৎ)। আবিষ্ট
=আ+বিশ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে—আবেশ।
২ শচীতীর্থ-তীর্থ =ঘাট।
৩ সন্ধিহান=সন্দেহ-যুক্ত। সম্+দিহ+শান।

ষষ্ঠ অঙ্ক
১১১
বিষয়ে সে যাহা কহিয়াছে, বােধ হইতেছে, তাহার কিছুই
মিথ্যা নহে। রাজা উহার অঙ্গুরীয়ের তুল্যমূল্য এই মহামূল্য
পুরস্কার দিয়াছেন।
ইহা বলিয়া পুরস্কার দিয়া নগরপাল
ধীবরকে বিদায় দিল, এবং প্রহরীকে সঙ্গে লইয়া স্বস্থানে
প্রস্থান করিল।
এ দিকে অঙ্গুরীয় হস্তে পতিত হইবামাত্র শকুন্তলা-বৃত্তান্ত
আদ্যন্ত রাজার স্মৃতিপথে আরূঢ় হইল। তখন তিনি
নিরতিশয় কাতর হইয়া নিতান্ত বিলাপ ১ ও পরিতাপ ২
করিতে লাগিলেন, এবং শকুন্তলার পুনদর্শন-বিষয়ে
একান্ত হতাশ হইয়া সৰ্ব্ব-বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ
হইলেন। আহার, বিহার, রাজকাৰ্য্য-পৰ্যালােচনা-প্রভৃতি
একবারেই পরিত্যক্ত হইল। শকুন্তলার চিন্তায় একান্ত
মগ্ন হইয়া তিনি সর্বদাই ম্লান ও বিষন্ন-বদনে কালযাপন
করিতে লাগিলেন ; লােমাত্রের সহিত বাক্যালাপ এককালে
রহিত হইল ; কোনও ব্যক্তির কোনও কারণে রাজ-সন্নিধানে
গতিবিধি একবারে প্রতিষিদ্ধ হইয়া গেল ;—কেবল প্রিয়
বয়স্য মাধব্য সর্বদা সমীপে উপবিষ্ট থাকিতে লাগিলেন।
;
৪
১
বিলাপ =বি+লপ+ঘ। বিশেষণে—বিলাপী।
এ পরিতাপ=পরি+তপ+ঘঞ। বিশেষণে—পরিতপ্ত।
পরিত্যক্ত=পরি+ত্যজ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—পরিত্যাগ
৪ প্রতিষিদ্ধ=নিবারিত। প্রতি + সিধ, + ক্ত;
বিশেষণ
বিশেষ্যে–প্রতিষেধ।

১১২
শকুন্তলা।
মাধব্য সান্ত্বনা-বাক্যে প্রবােধ দিতে আরম্ভ করিলে তাহার
শােক-সাগর উচ্ছলিত হইয়া উঠিত ও নয়ন-যুগল হইতে
অবিরত বাষ্প-বারি বিগলিত হইতে থাকিত।
এক দিবস রাজার চিত্ত-বিনােদনার্থ ১ মাধব্য তাহাকে
প্রমােদ-বনে লইয়া গেলেন। উভয়ে সুশীতল শিলাতলে
উপবিষ্ট হইলে মাধব্য জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য! যদি
তুমি পােবনে শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলে, তবে তিনি
উপস্থিত হইলে তুমি তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিলে কেন ?
রাজা শুনিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন,
বয়স্য ! এই কথা আর কেন জিজ্ঞাসা কর ? রাজধানীতে
প্রত্যাগমন করিয়া আমি শকুন্তলা-বৃত্তান্ত একবারে ভুলিয়া
গিয়াছিলাম। কেন ভুলিয়া গিয়াছিলাম, তাহার কিছুই বুঝিতে
পারিতেছি না। সে দিবস প্রিয়া কত প্রকারে বুঝাইবার
চেষ্টা করিলেন, কিন্তু আমার কেমন মতিভ্রম ২ ঘটিয়াছিল
যে, কিছুরই স্মরণ হয় নাই। তাহাকে স্বেচ্ছাচারিণী মনে
করিয়া কতই দুবাক্য বলিয়াছি, কতই অবমাননা করিয়াছি।
এই সকল কথা বলিতে বলিতে রাজার নয়ন-যুগল অশ্রু-ধারায়
পরিপূর্ণ হইয়া আসিল ; তিনি বাক্-শক্তি-রহিতের ন্যায়
কিয়ৎক্ষণ
হইয়া রহিলেন অনন্তর, মাধব্যকে
ত
•
চিত্ত-বিনােদনার্থ=মনস্তুষ্টি-সম্পাদনের জন্য। ক্রিয়ার বিশেষণ।
মতিভ্রম =মতির ভ্রম (৬ষ্ঠী তৎ )।
৩ স্তব্ধ=শুভ+ক্ত। বিশেযয্য-স্তম্ভ।
১

১১৩ ; কহিলেন, ভাল, আমিই যেন ভুলিয়া গিয়াছিলাম, তােমায় ত সমুদায় বলিয়াছিলাম ; তুমি কেন কথা-প্রসঙ্গেও কোনও দিন শকুন্তলার কথা উত্থাপিত ১ কর নাই ? তুমিও কি আমার মত ভুলিয়া গিয়াছিলে ? তখন মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! আমার দোষ নাই ; সমুদয় কহিয়া পরিশেষে তুমি বলিয়াছিলে, শকুন্তলা-সংক্রান্ত যে সকল কথা বলিলাম, সমস্তই পরিহাসমাত্র, বাস্তবিক ২ নহে। আমিও নিতান্ত নির্বোধ ; তােমার শেষ কথাই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছিলাম ; এই হেতু কখনও সে বিষয়ের উল্লেখ করি নাই। বিশেষতঃ প্রত্যাখ বিশেষতঃ প্রত্যাখ্যান-দিবসে আমি তােমার নিকটে ছিলাম না ; থাকিলে, যাহা শুনিয়াছিলাম, তাহা আবশ্যক বােধ হইলে বলিতে পারিতাম। রাজা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বাষ্পকুল-লােচনে শােকাকুল-বচনে কহিলেন, বয়স্য ! কাহার দোষ দিব, সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ। ইহা বলিয়া তিনি সাতিশয় শােকাভিভূত হইলেন। তখন মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! শােকে এরূপ অভিভূত * হওয়া তােমার উচিত নহে। দেখ, সৎপুরুষ-গণ ১ উত্থাপিত উৎ + স্থা + ণিচ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষষ্য- উত্থাপন। ২ বাস্তবিক=বস্তু+ষ্ণিক। উল্লেখ=উৎ+লিখু+অ ; বিশেষ্য। বিশেষণে—উল্লিখিত। অভিভূত-পরাজিত, কাতর। অভিভূক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—অভিভব । ৮

১১৪
শকুন্তলা।
শােক ও মােহের বশীভূত হয়েন না। প্রাকৃত
১ জনেরাই
শােকে ও মােহে হত-চেতন ২ হইয়া থাকে। যদি বৃক্ষ ও
পৰ্বত উভয়ই বায়ুভরে বিচলিত হয়, তবে তাহাদিগের
মধ্যে বিভেদ কি ? তুমি গম্ভীর-স্বভাব,—ধৈৰ্য্য অবলম্বন ও
শােকাবেগ সংবরণ কর।
প্রিয় বয়সের সান্ত্বনা-বাণী
সান্ত্বনা-বাণী ও শ্রবণ করিয়া রাজা
কহিলেন, সখে! আমি নিতান্ত অবােধ নহি; কিন্তু আমার
মন কোনক্রমেই প্রবােধ মানিতেছে না; কি বলিয়াই বা
প্রবােধ দিব। প্রত্যাখ্যানের পরে প্রিয়া প্রস্থান-কালে সাতিশয়
কাতরতা-দর্শন-পূর্বক আমার দিকে যে বারংবার বাষ্পপূর্ণ
দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন, সেই কাতর দৃষ্টিপাত আমার
বক্ষঃস্থলে বিষ-দিগ্ধ ৪ শল্যের ন্যায় বিদ্ধ হইয়া রহিয়াছে ।
আমি তৎকালে তাহার প্রতি যে ক্রর ব্যবহার করিয়াছি,
তাহা মনে করায় আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে।
মরিলেও আমার এ দুঃখ যাইবে না।
মাধব্য রাজাকে নিতান্ত কাতর দেখিয়া আশ্বাস-প্রদানার্থ
কহিলেন, বয়স্য ! এত কাতর হইও না; কিছুদিন পরেই
শকুন্তলার সহিত নিঃসন্দেহ পুনর্বার তােমার সমাগম হইবে।
১ প্রাকৃত =নীচ।
২ হত-চেতন=হতা চেতনা যাহার (বহু)।
৩ সান্ত্বনা-বাণী =প্রবােধ-বাক্য।
৪ বিষদিগ্ধ = বিষদ্বারা দিগ্ধ ( লিপ্ত)-৩য়া তৎ। দিগ্ধ = দিহ,+ক্ত।

ষষ্ঠ অঙ্ক।
১১৫
রাজা কহিলেন, বয়স্য ! আমি মুহূর্তের জন্যও আর সে আশা
করি না। এ দেহ-ধারণে আর আমি প্রিয়ার দর্শন পাইব
। ফল কথা এই যে, এ জন্মের মত আমার সকল
সুখই ফুরাইয়া গিয়াছে ; নতুবা তৎকালে আমার তেমন
দুবুদ্ধি ঘটিল কেন ? মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! কোনও
বিষয়েই নিতান্ত হতাশ হওয়া উচিত নহে। ভবিতব্যের
কথা কে বলিতে পারে ? দেখ, এই অঙ্গুরীয় যে পুনর্বার
তােমার নিকটে আসিবে, তাহা কাহার মনে ছিল
ইহা শুনিয়া অঙ্গুরীয়ে দৃষ্টিপাত-পূর্বক রাজা ইহাকে
সচেতন মনে করিয়া কহিলেন,
কহিলেন, অঙ্গুরীয় ! তুমিও আমার
মত হতভাগ্য ; নতুবা প্রিয়ার কমনীয় কোমল অঙ্গুলীতে
স্থান পাইয়া কি নিমিত্ত সেই দুর্লভ ও স্থান হইতে ভ্রষ্ট
হইলে ? মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! তুমি কি উপলক্ষে তাহার
অঙ্গুলীতে অঙ্গুরীয় পরাইয়া দিয়াছিলে ? রাজা কহিলেন,
রাজধানী-প্রত্যাগমন-সময়ে প্রিয়া অঞ-পূৰ্ণ-নয়নে আমাকে
হস্তে ধরিয়া কহিলেন, আৰ্য্যপুত্র! কত দিনে আমায়
নিকটে লইয়া যাইবে ? তখন আমি এই অঙ্গুরীয় তাহার
কোমল অঙ্গুলীতে পরাইয়া দিয়া কহিলাম, প্রিয়ে! তুমি
প্রতিদিন আমার নামের এক একটি অক্ষর গণনা করিবে;
১ কমনীয় =মনােহর। কম+অনীয়।
দুলাভ=দু+লভ+খল।
৩ ভ্রষ্ট=পতিত। প্রশ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যেভ্রংশ।
২

১১৬
শকুন্তলা ।
গণনা সমাপ্ত হইলেই আমার লােক আসিয়া তােমায় লইয়া
যাইবে। প্রিয়ার নিকটে সরল-হৃদয়ে এই প্রতিজ্ঞা করিয়া
আসিয়াছিলাম, কিন্তু মােহান্ধ হইয়া একবারেই তাহাকে
ভুলিয়া গিয়াছিলাম।
তখন মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! এই অঙ্গুরীয় কেমন
করিয়া রােহিত মৎস্যের উদরে
প্রবিষ্ট হইল।
কহিলেন, শুনিয়াছি শচীতীর্থে স্নান করিবার সময় প্রিয়ার
অঞ্চল-প্রান্ত হইতে ইহা সলিলে পতিত হইয়াছিল। মাধব্য
কহিলেন, হাঁ সম্ভবপর বটে, সলিলে পতিত হইলে রােহিত
মৎস্যে গ্রাস করে। রাজা অঙ্গুরীয়ে দৃষ্টি-নিক্ষেপ করিয়া
কহিলেন, আমি এই অঙ্গুরীয়ের যথােচিত তিরস্কার করিব।
তিনি কহিলেন, অরে অঙ্গুরীয় ! প্রিয়ার কোমল কর-পল্লব ২
পরিত্যাগ করিয়া জলে মগ্ন হওয়াতে তাের কি লাভ হইল
অথবা তােরে তিরস্কার করা অন্যায় ; কারণ অচেতন ব্যক্তি
কখনও গুণ-গ্রহণ করিতে পারে না; নতুবা আমিই কি
নিমিত্ত প্রিয়ারে পরিত্যাগ করিলাম ? ইহা বলিয়া রাজা
অশ্রু-পূৰ্ণ-নয়নে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন, প্রিয়ে।
আমি তােমায় অকারণে পরিত্যাগ করিয়াছি; অনুতাপানলে
?
৩
;
১ সমাপ্ত =সম্+আপ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—সমাপন বা
সমাপ্তি।
২ কর-পল্লব=কর (হস্ত ) পল্লবের ন্যায় (উপমিত কর্মধা)।
৩ অনুতাপানল=অনুতাপ-রূপ অনল (অগ্নি )—রূপক কর্মধা।

ষষ্ঠ অঙ্ক ১১৭ ১ ; এমন আমার হৃদয় দগ্ধ হইয়া যাইতেছে এক্ষণে দর্শন দিয়া আমার প্রাণরক্ষা কর। রাজা শশাকাকুল হইয়া এইরূপ বিলাপ করিতেছেন, সময়ে চতুরিকা-নাম্নী পরিচারিকা ২ এক চিত্র-ফলক আনিয়া দিল। রাজা চিত্ত-বিনােদনার্থ ঐ চিত্র-ফলকে স্বহস্তে শকুন্তলার প্রতিমূর্তি চিত্রিত করিয়াছিলেন। মাধব্য দেখিয়া বিস্ময়ােৎফুল্ল-লোচনে কহিলেন, বয়স্য ! তুমি চিত্র- ফলকে কি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন ৪ করিয়াছ। দেখিয়া কোনও মতে চিত্র বলিয়া আমার বােধ হইতেছে না। আহা মরি, কি রূপ-লাবণ্যের মাধুরী! কি অঙ্গ-সৌষ্ঠব ! কি অমায়িক ভাব! মুখারবিন্দে ৬ কি সলজ্জ ভাব প্রকাশ পাইতেছে ! রাজা কহিলেন, সখে ! তুমি প্রিয়াকে দেখ নাই, এই হেতু আমার চিত্র-নৈপুণ্যের এত প্রশংসা করিতেছ। যদি তাহাকে স্বয়ং দেখিতে, চিত্র দেখিয়া কখনই সন্তুষ্ট হইতে না। তাহার অলৌকিক রূপ-লাবণ্যের কিঞ্চিৎ অংশ ৪ দগ্ধ =দহ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে-দাহ। ২ পরিচারিকা =পরি+চ+ণক+আপ,। পুংলিঙ্গে—পরিচারক। নৈপুণ্য=দক্ষতা, পটুতা। নিপুণ + ভাবার্থে ফ্য। প্রদর্শন=প্র+দৃশ+ণিচ+অনট। বিশেষণে—প্রদর্শিত। অঙ্গ-সৌষ্ঠব=অঙ্গের সৌষ্টব (৬ষ্ঠী তৎ)। সৌষ্টব =উৎকর্ষ, সৌন্দৰ্য্য। সুষ্ঠু+ভাবার্থে ষ্ণ। মুখারবিন্দ = মুখ অরবিন্দের ন্যায় ( উপমিত কর্মধা)। অরবিন্দ= পদ্ম, অর+বিদ+শ। =

১১৮
শকুন্তলা।
মাত্র এই চিত্র-ফলকে প্রকাশিত হইয়াছে। তখন তিনি
পরিচারিকাকে কহিলেন,
চতুরিকে! বর্তিকা ও বর্ণােত্র
লইয়া আইস ; অনেক অংশ চিত্রিত করিতে অবশিষ্ট আছে।
ইহা বলিয়া চতুরিকাকে বিদায় করিয়া রাজা মাধব্যকে
কহিলেন, সখে ! আমি স্বাদু-শীতল-নির্মল-জল-পূর্ণ নদী
পরিত্যাগ করিয়া এক্ষণে শুষ্ক-কণ্ঠ হইয়া মৃগতৃষ্ণিকায়
পিপাসার শান্তি করিতে উদ্যত হইয়াছি ; প্রিয়াকে পাইয়াও
পরিত্যাগ করিয়া এক্ষণে চিত্র-দর্শন-দ্বারা চিত্ত-বিনােদনের
চেষ্টা পাইতেছি। মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! চিত্র-ফলকে
আর কি লিখিবে ? রাজা কহিলেন, তপােবন, ও মালিনী-
নদী লিখিব ; যেরূপে হরিণ-গণকে তপােবনে স্বচ্ছন্দে
ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে এবং
এবং হংস-গণকে মালিনী-নদীতে
কেলি করিতে দেখিয়াছিলাম, সে সমুদয়ও চিত্রিত করিব ;
আর প্রথম-দর্শন-দিবসে প্রিয়ার কর্ণে শিরীষ-পুষ্পের যেরূপ
আভরণ দেখিয়াছিলাম, তাহাও লিখিব।
এইরূপ কথােপকথন হইতেছে, এমন সময়ে প্রতিহারী
আসিয়া রাজহস্তে একখানি পত্র দিল। রাজা পাঠ করিয়া
সাতিশয় দুঃখিত হইলেন। মাধব্য জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য !
কোথাকার পত্র ? পত্র পড়িয়া এত বিষ হইলে কেন ? রাজা
১
বর্তিকা =তুলি।
মৃগতৃষ্ণিকামরুভূমিতে সূৰ্য-কিরণে জল-ভ্রম। মৃগের তৃষ্ণিকা
( ৬ষ্ঠী তৎ)। তৃষ্ণিকা=তৃষ্ণা+স্বার্থে ক+স্ত্রীলিঙ্গে অপ।
২

ষষ্ঠ অঙ্ক। ১১৯ করিত। ৪ হইল, কহিলেন, বয়স্য ! ধনমিত্র নামে এক সাংঘাত্রিক ’ সমুদ্রপথে বাণিজ্য সমুদ্রে নৌকা মগ্ন হওয়ায় তাহার প্রাণবিয়ােগ ঘটিয়াছে। সে ব্যক্তি নিঃসন্তান। নিঃসন্তানের ধনে বাজার অধিকার। এই হেতু অমাত্য আমায় তদীয় সমস্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ করিতে লিখিয়াছেন। দেখ, বয়স্য ! নিঃসন্তান হওয়া কত দুঃখের বিষয় ! নাম-লােপ হইল, বংশ- লােপ এবং বহু-যত্নে বহু-কষ্টে ও বহু-কালে উপাজ্জিত ধন ধন অন্যের হস্তগত হইল। ইহা অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি হইতে পারে । তখন রাজা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন, আমার লোকান্তর হইলে আমারও নাম, বংশ ও রাজ্যের এইরূপ গতি হইবে। রাজার এইরূপ আক্ষেপ শুনিয়া মাধব্য কহিলেন, বয়স্য ! তুমি অকারণে এত পরিতাপ কর কেন ? তােমার সন্তান-লাভ করিবার বয়স্ অতীত হয় নাই। কিছুদিন পরে তুমি অবশ্যই পুত্র-মুখ নিরীক্ষণ করিবে। রাজা কহিলেন, বয়স্য ! তুমি আমায় মিথ্যা প্রবােধ দিতেছ কেন ? উপস্থিত ১ সাংঘাত্রিক=পােত-বাণিজ্যকারী। সংযাত্রা+ফিক। ২ বাণিজ্য =বণিকের কৰ্ম্ম। বণিজ+ষ্ণ্য। ৩ অমাত্য =মন্ত্রী। অমাত্য। অমা=সহিত বা নিকট যে রাজার সহিত বা নিকটে থাকে। * আত্মসাৎ=আত্মসাৎ। • যত্ন==যৎ+ন ; বিশেষ্য। বিশেষণে—যত্নবান্।

১২০ শকুন্তলা। পরিত্যাগ করিয়া অনুপস্থিতের প্রত্যাশা করা মূঢ়ের ১ কৰ্ম্ম। আমি যখন নিতান্ত বিচেতন হইয়া প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছি, তখন আর আমার পুত্র-মুখ-নিরীক্ষণের আশা নাই। এইরূপে কিয়ৎক্ষণ বিলাপ করিয়া রাজা অপুত্র- নিবন্ধন শশাক-সংবরণ-পূর্বক প্রতিহারীকে কহিলেন, শুনিয়াছি, ধনমিত্রের অনেক ভাৰ্য্যা আছে ; তন্মধ্যে কেহ অন্তঃসত্বা থাকিতে পারে ; অমাত্যকে এ বিষয়ের অনুসন্ধান করিতে বল। প্রতিহারী কহিল, মহারাজ ! অযযাধ্যা-নিবাসী ২ শ্রেষ্ঠীর কন্যা ধনমিত্রের এক ভাৰ্যা। শুনিয়াছি, অন্তঃসত্বা হইয়াছেন। তখন রাজা কহিলেন, তবে অমাত্যকে বল, সেই গর্ভস্থ সন্তান ধনমিত্রের সমস্ত ধনের অধিকারী শ্রেষ্ঠি-কন্যা ৩ হইবে। এইরূপ আদেশ-প্রদান-পূৰ্ব্বক প্রতিহারীকে বিদায় করিয়া রাজা মাধব্যের সহিত পুনর্বার শকুন্তলা-সংক্রান্ত কথােপ- কথনের উপক্রম করিতেছেন, এমন সময়ে ইন্দ্র-সারথি মাতলি দেব-রথ লইয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। রাজা দেখিয়া আহলাদিত হইয়া মাতলিকে স্বাগত-জিজ্ঞাসা-পুরঃসর অসিন- পরিগ্রহ করিতে বলিলেন। মাতলি আসন-পরিগ্রহ করিয়া মূঢ় =মূখ। মুহ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—মূঢ়তা। ২ নিবাসী = নি+ব+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—নিবাসিনী। ৩ অধিকারী = অধি+কৃ+ণি। স্ত্রীলিঙ্গে—অধিকারিণী। ও পুরঃসর =অগ্রগামী। পুরস++ট। স্ত্রীলিঙ্গে—পুরঃসরী।

ষষ্ঠ অঙ্ক। ১২১ কহিলেন, মহারাজ! দেবরাজ যদর্থে ১ আমায় আপনার নিকটে পাঠাইয়াছেন, নিবেদন করি, শ্রবণ করুন। কালনেমির সন্তান দুর্জয় নামক দুর্দান্ত ২ দানব-গণ দেবতাদিগের দারুণ শত্রু হইয়া উঠিয়াছে ; কতিপয় দিবসের জন্য দেবলােকে গিয়া আপনাকে দুর্জয় ৩ দানব-গণের দমন করিতে হইবে। রাজা কহিলেন, দেব-রাজের এই আদেশে সবিশেষ অনু- গৃহীত * হইলাম ; পরে মাধব্যকে কহিলেন, বয়স্য ! অমাত্যকে বল, আমি কিয়দ্দিনের জন্য দেব-কাৰ্যে ব্যাপৃত ৫ হইলাম ; আমার প্রত্যাগমন পৰ্য্যন্ত তিনি তিনি একাকী সমস্ত রাজ- কাৰ্য্যের পৰ্যালােচনা করুন। ইহা বলিয়া সসজ্জ হইয়া রাজা ইন্দ্র-রথে আরােহণ-পূর্বক দেব-লােকে প্রস্থান করিলেন। ১ যদর্থে= যে কারণে। ২ দুদান্ত=দুষ্ট ; যাহাকে দুঃখে দমন করা যায়। দুরু+দ+ ক্ত। দুর্জয় =যাহাকে দুঃখে জয় করা যায়। দুর+জি+খ। অনুগৃহীত =অনু+ গ্রহ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—অনুগ্রহ। ব্যাপৃত = নিযুক্ত। বি+আ+কৃ+ক্ত। বিশেষ্যে—ব্যাপার। ।

সপ্তম অঙ্ক। দেবলােকে দুষ্যন্তের কয়েক দিন অবস্থান প্রত্যাবর্তন-কালে মাতলির নিকটে তৎকর্তৃক দেবরাজের গুণ-কীৰ্ত্তন ও স্বীয় বিনয়-প্রদর্শন ;-মাতলির নিকটে হেমকূট- পর্বত-সম্বন্ধে পরিচয়-গ্রহণ ;-হেমকূটে কপ-মুনি-দর্শনে দুষ্যন্তের গমন ;-রাজার দক্ষিণ-বাহ-স্পন্দন ও ঔৎসুক্য ;—সিংহ-শিশুর উৎপীড়ক একটী শিশুকে দর্শন করায় ব্লাজার হৃদয়ে স্নেহ-সঞ্চার ;-শিশুর হস্ত হইতে দুষ্যন্ত-কর্তৃক সিংহ-শিশুর মুক্তি; রাজার নিকটে বালকের শান্ত-তাব-ধারণ ;-বালকের গাত্রস্পর্শে রাজার অনুপম আনন্দ ;-তাপসীর মুখে বালকের পরিচয়-প্রাপ্তি ও শকুন্তলার নাম-শ্রবণ ;-বালকের অন্বেষণে বহির্গত। বিরহ-বিধুরা শকুন্তলার সহিত দুষ্যন্তের সহসা সম্মিলন ও নানা পুরাতন-কথা-কীৰ্ত্তন ;-শকুন্তলা সহ কশ্যপ-সমীপে দুষ্যন্তের গমন ;-সপুত্রা শকুন্তলা ও দুষ্যন্তের প্রতি কশ্যপের আশীর্বচন -কপ-সমীপে দুষ্যন্তের অনুতাপ-প্রকাশ ;- রাজ-সমীপে কশ্যপ-কত্ত্বক দুর্বাসার শাপদান-বৃত্তান্ত-কথন;—দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার পুনমিলন-সম্বন্ধে ক ও মেনকার নিকটে কপ-কর্তৃক সংবাদ-প্রেরণ ;-সপুত্ৰা শকুন্তলাকে লইয়া দুষ্যন্তের রাজধানীতে প্রত্যাগমন। •• রাজা দানব-দলন-কার্যে ব্যাপৃত হইয়া দেব-লােকে কিয়দ্দিন অবস্থিতি করিলেন। দেব-কাৰ্য্য-সমাধান করিয়া মর্ত্যলােকে প্রত্যাগমন-কালে তিনি মাতলিকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, দেখ, দেবরাজ আমার যে গুরুতর সৎকার করেন, আমি আপনাকে সেই সৎকারের নিতান্ত অনুপযুক্ত জ্ঞান করিয়া মনে মনে সাতিশয় সঙ্কুচিত হই। মাতলি কহিলেন, মহারাজ! এরূপ সঙ্কোচ উভয় পক্ষেই সমান। আপনি

সপ্তম অঙ্ক।
কহিলেন,
দেবতাদিগের যে উপকার করেন, দেবরাজ-কৃত সৎকারকে
তদপেক্ষা গুরুতর জ্ঞান করিয়া সঙ্কুচিত হন ; দেবরাজও
স্বকৃত সৎকারকে মহারাজ-কৃত উপকারের নিতান্ত অনুপযুক্ত
বিবেচনা করিয়া স্বয়ং সঙ্কুচিত হইয়া থাকেন।
ইহা শুনিয়া রাজা
দেবরাজ-সারথে ! এমন
কথা বলিও না ; বিদায় দিবার সময় দেবরাজ যে সৎকার
করিয়া থাকেন, তাহা মাদৃশ ১ জনের মনােরথেরও অগােচর।
দেখ, দেবরাজ সমবেত-সর্ব-দেব-সমক্ষে আমাকে অৰ্দ্ধাসনে
উপবেশন ৩ করাইয়া স্বহস্তে আমার গলদেশে মন্দার-মালা
অর্পণ করেন। মাতলি কহিলেন, মহারাজ! আপনি সময়ে
সময়ে দানব-দলন করিয়া দেবরাজের যে মহােপকার করেন,
দেবরাজ-কৃত সৎকারকে আমি তদপেক্ষা অধিক বােধ করি
। বিবেচনা করিতে গেলে, আজ কাল মহারাজের
ভুজবলেই দেবলােক নিরুপদ্রব রহিয়াছে। রাজা কহিলেন,
অনায়াসে দেবরাজের আদেশ সম্পন্ন করিতে
পারি, সে দেবরাজেরই মহিমা ; নিযুক্তেরা প্রভুর
৪
আমি যে
;
১
মাদৃশ = আমার ন্যায়। অম্মদ+দৃশ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—মাদৃশী।
২ সমক্ষে =অক্ষির সমীপে (অব্যয়ী)।
উপবেশন=উপ+বিশ+অনট্‌। বিশেষণে—উপবিষ্ট।
৪ অর্পণ=ঋ+ ণিচ+অনটু। বিশেষণে—অর্পিত
মহিমা =মাহাত্ম। মহৎ+ভাবার্থে ইমন্।
নিযুক্ত=ভৃত্য। নি+ যুজ+ক্ত।
৫

১২৪ শকুন্তলা। ১ প্রভাবেই মহৎ মহৎ কর্ম সকল সম্পন্ন করিয়া উঠে। যদি সূৰ্য্যদেব স্বীয় রথের অগ্রভাগে না রাখিতেন, তাহা হইলে অৰুণ কি অন্ধকার দূর করিতে পারিতেন ? তখন মাতলি সাতিশয় প্রীত হইয়া কহিলেন, মহারাজ ! বিনয় সদ্গুণের শােভা-সম্পাদন করে,-এ কথা আপনাতেই বিলক্ষণ ব্যক্ত হইতেছে। এইরূপ কথােপকথনে আসক্ত হইয়া কিয়দ্দর আগমন করিবার পরে রাজা মাতলিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, দেবরাজ- সাথে ! ঐ যে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত পর্বত স্বর্ণ-নিৰ্ম্মিতের ন্যায় প্রতীয়মান হইতেছে, উহার নাম কি ? মাতলি কহিলেন, মহারাজ। ইহার নাম হেমকূট পৰ্বত ; ইহা কিন্নর অপ্সরােগণের বাসভূমি ; তপস্বী-দিগের তপস্যা-সিদ্ধির সর্ব- প্রধান স্থান ; ভগবান্ কশ্যপ ঐ পর্বতে তপস্যা করেন। তখন রাজা কহিলেন, তবে আমি ভগবাকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া যাইব ; এতাদৃশ মহাত্মার নাম করিয়াও তাঁহাকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ না করিয়া চলিয়া যাওয়া অবিধেয় । তুমি রথ স্থির কর, আমি এই স্থানেই অবতীর্ণ হইতেছি। ; ১ অরুণ=সূর্যের সারথি। ২ আসক্ত=অ+স+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—আসক্তি। কিন্নর =কুৎসিত নর ( নিত্য সমাস)। অশ্বমুখ-নর-শরীর বিশিষ্ট জীব ; বিশেষ্য। স্ত্রীলিঙ্গে—কিন্নরী। ৪ অবিধেয়=অকর্তব্য। ন+বি+ধ+য। (নঞ তৎপুরুষ)।

সপ্তম অঙ্ক। ১২৫ নহে; চলুন, আমি মাতলি রথ স্থির করিলেন। রাজা রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, দেবরাজ-সারথে ! এই পর্বতের কোন্ অংশে ভগবানের আশ্রম ? মাতলি কহিলেন, মহারাজ। মহর্ষির আশ্রম অধিক-দূর-বৰ্ত্তী সমভিব্যাহারে যাইতেছি। কিয়দ্র গমন করিয়া এক ঋষি- কুমারকে সম্মুখে সমাগত দেখিয়া মাতলি জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবান্ কশ্যপ এক্ষণে কি করিতেছেন ? ঋষি-কুমার কহিলেন, এক্ষণে তিনি নিজ-পত্নী অদিতিকে ও অন্যান্য ঋষি-পত্নী-গণকে পতিব্রতা-ধৰ্ম্ম শ্রবণ করাইতেছেন। তখন রাজা কহিলেন, তবে আমি এখন ভঁহার নিকটে যাইব না। মাতলি কহিলেন, মহারাজ ! আপনি এই অশােক- বৃক্ষের ছায়ায় অবস্থিত হইয়া কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষা করুন ; আমি মহর্ষির নিকটে আপনার আগমন-সংবাদ বিজ্ঞাপন করিতেছি। ইহা বলিয়া মাতলি প্রস্থান করিলেন। রাজার দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত হইতে লাগিল। তিনি নিজ হস্তকে সম্বােধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে হস্ত। আমি যখন নিতান্ত বিচেতন হইয়া প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছি, তখন আর আমার অভীষ্ট-লাভের ১ প্রত্যাশা নাই ; তুমি কি নিমিত্ত বৃথা স্পন্দিত হইতেছ ? রাজা মনে মনে এই আক্ষেপ করিতেছেন, এমন সময়ে, বৎস! এত অভীষ্ট = প্রার্থিত, বাঞ্ছিত। অভি+ইষ,+ক্ত ; বিশেষণ।

১২৬ শকুন্তলা। উদ্ধত ১ ২ হও কেন, এই শব্দ রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল! রাজা শ্রবণ করিয়া মনে মনে এই বিতর্ক করিতে লাগিলেন, এ অবিনয়ের স্থান নহে; এখানে যাবতীয় জীব জন্তু স্থান-মাহাত্ম্যে হিংসা, দ্বেষ, মদ, মাৎসৰ্য ৪ প্রভৃতি পরিত্যাগ করিয়া পরস্পর সৌহার্দে কালযাপন করে, কেহ কাহারও প্রতি অত্যাচার বা অনুচিত ব্যবহার করে না ; এমন স্থানে কে ঔদ্ধত্যপ্রকাশ করিতেছে ? যাহা হউক এ বিষয়ের অনুসন্ধান করিতে হইল । এইরূপ কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া রাজা শব্দানুসারে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখিলেন, এক অতি অল্পবয়স্ক শিশু সিংহ- শিশুর কেশর আকর্ষণ করিয়া তাহাকে সাতিশয় উৎপীড়িত করিতেছে, দুই তাপসী সমীপে দণ্ডায়মান আছেন। দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া রাজা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, তপােৰনের কি অনির্বচনীয় মহিমা ! মানব-শিশু সিংহ-শিশুর উপরি অত্যাচার করিতেছে ; সিংহ-শিশু অবিকৃত-চিত্তে সেই অত্যাচার সহ্য করিতেছে ! অনন্তর, তিনি কিঞ্চিৎ নিকটবর্তী ১ উদ্ধত =উৎ+হন্+ক্ত। বিশেষ্যে—ঔদ্ধত্য। ২ মাহাত্ম্য =মহাত্মন্+ভাবার্থে ফ্য। ৩ মদ = গৰ্ব ; বিশেষ্য। বিশেষণে-মত্ত। ৪ মাৎসৰ্য্য=অন্ত-শুভ-দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা। মৎসর+ষ্ণ ঔদ্ধত্য =উদ্ধত+ভাবার্থে ফ্য। অবিকৃত =অক্রুদ্ধ। বিকৃত = বি+কৃ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে- বিকৃতি বা বিকার। ৫ ;

সপ্তম অঙ্ক।
১২৭
হইয়া সেই শিশুকে নিরীক্ষণ করিয়া স্নেহ-পরিপূর্ণ-চিত্তে
কহিতে লাগিলেন, স্বীয় ঔরস পুত্রকে দেখিলে মন যেরূপ
স্নেহরসে আর্দ্র হয়, এই শিশুকে দেখিয়া আমার মন
সেইরূপ হইতেছে কেন ? অথবা, আমি পুত্রহীন বলিয়া এই
সাঙ্গ-সুন্দর শিশুর দর্শনে আমার মনে এরূপ স্নেহ-রসের
আবির্ভাব হইতেছে।
এ দিকে, সেই শিশু সিংহ-শাবকের উপরি অত্যন্ত
উৎপীড়ন আরম্ভ করায় তাপসীরা কহিতে লাগিলেন, বৎস!
এই সকল জন্তুকে আমরা
জন্তুকে আমরা স্বীয় সন্তানের ন্যায় স্নেহ
করি ; তুমি কেন অকারণে উহারে ক্লেশ দাও? আমাদের
কথা শুন, ক্ষান্ত হও এবং সিংহ-শিশুকে ছাড়িয়া দাও; সে
স্বীয় জননীর নিকটে যাউক। আর যদি তুমি উহাকে
ছাড়িয়া না দাও, সিংহী তােমায়
কষ্ট দিবে। বালক
শুনিয়া কিঞ্চিত্মাত্র ভীত না হইয়া সিংহ-শাবকের উপরি
অধিক উপদ্রব আরম্ভ করিল। তাপসীরা ভয়-প্রদর্শন-দ্বারা
তাহাকে ক্ষান্ত করা অসাধ্য বুঝিয়া প্রলােভনার্থ * কহিলেন,
বৎস! তুমি সিংহ-শিশুকে ছাড়িয়া দাও, তােমায় একটি
ভাল খেলার সামগ্রী দিব।
২
১ আবির্ভাব = আবিস্+ভূ+ঘঞ। বিশেষণে—আবিৰ্ভত।
মেহ=মিহ+অল; বিশেষ্য। বিশেষণে—মিগ্ধ ।
৩ ক্ষন্তি =ক্ষ+ক্ত;
বিশেষণ। বিশেষ্যে—ক্ষান্তি।
* প্রলােভন=প্র+লুভ+ ণিচ+অনট। বিশেষণে—প্রলােভিত।

১২৮ শকুন্তলা। রাজা এই কৌতুক দেখিতে দেখিতে ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া তাহাদের অতি নিকটে উপস্থিত হইলেন; কিন্তু সহসা তাহাদের সম্মুখে না গিয়া এক বৃক্ষের অন্তরালে থাকিয়া সস্নেহ-নয়নে সেই শিশুকে নিরীক্ষণ ১ করিতে লাগিলেন। এই সময়ে সেই বালক, কই কি খেলনা দিবে দাও, বলিয়া হস্ত-প্রসারণ ২ করিল। রাজা বালকের হস্তে দৃষ্টিপাত করিয়া চমৎকৃত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কি আশ্চর্য্য! এই বালকের চক্ৰবৰ্ত্তি-লক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। তাপসীদের সঙ্গে কোনও খেলানা ছিল না; এজন্য তঁাহারা তৎক্ষণাৎ তাহা দিতে না পারায় বালক কুপিত হইয়া কহিল, তােমরা খেলানা দিলে না, তবে আমি উহারে ছাড়িব না। তখন এক তাপসী অপর তাপসীকে কহিলেন, এই শিশু কেবল কথায় ভুলিবে না। কুটীরে একটী মাটির ময়ূর আছে, সত্বর তাহ লইয়া আইস। তাপসী মৃন্ময় ময়ূরের আনয়নার্থ কুটীরে গমন করিলেন। প্রথমতঃ সেই শিশুর দর্শনে রাজার অন্তঃকরণে যে স্নেহের সঞ্চার হইয়াছিল, ক্রমে ক্রমে সেই স্নেহ গাঢ়তর ১ নিরীক্ষণ =নির+ঈক্ষ + অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে-নিরীক্ষিত। প্রসারণ =++ ণিচ+ অনট। বিশেষণে—প্রসারিত। কুপিত = কুপ+ক্ত। বিশেষ্যে—কোপ। মৃন্ময় =মৃদ+ময়। মৃত্তিকা-নির্মিত। স্ত্রীলিঙ্গে—মৃন্ময়ী। উদয়, আবির্ভাব। সম্+চ+ঘঞ, বিশেষ্য। বিশেষণে—সঞ্চারিত বা সঞ্চারী। সখি ! ৪ ৫ সঞ্চার সপ্তম অঙ্ক। হইতে লাগিল। তখন তিনি মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন এই অপরিচিত শিশুকে ক্রোড়ে করিবার নিমিত্ত আমার মন এমন উৎসুক হইতেছে! পরের পুত্র দেখিলেও যে মনে এত স্নেহােদয় হয়, তাহা আমি পূর্বে জানিতাম না। আহা! যাহার এই পুত্র, সে ইহাকে ক্রোড়ে লইয়া যখন ইহার মুখ-চুম্বন করে ; হাস্য করিলে যখন ইহার মুখ- মধ্যে অর্ধ-বিনির্গত কুন্দ-সন্নিভ ১ দন্তগুলি অবলােকন করে ; যখন ইহার মৃদু মধুর অর্ধ-স্কুরিত কথাগুলি শ্রবণ করে ; তখন সেই পুণ্যবান্ জন কি অনির্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হয়। আমি অতি হতভাগ্য। সংসারে আসিয়া আমি এই পরম সুখে বঞ্চিত রহিলাম। পুত্রকে ক্রোড়ে লইয়া তাহার মুখ- চুম্বন করিয়া সর্ব শরীর শীতল করিব ; পুত্রের অর্ধ-বিনির্গত দন্তগুলি অবলােকন করিয়া নয়ন-যুগলের সার্থকতা সম্পাদন করিব ; এবং অর্ধোচ্চারিত মৃদু মধুর বচন-পরম্পরা-শ্রবণে শ্রবণেন্দ্রিয়ের চরিতার্থতা লাভ করিব ;-এ এ জন্মের মত আমার সে আশা-লতা নির্মূল হইয়া গিয়াছে। ময়ুরের আনয়নে বিলম্ব হওয়াতে বালক কুপিত হইয়া এখনও ময়ুর দিলে না, তবে আমি ইহাকে ছাড়িব ইহা বলিয়া সে সিংহ-শিশুকে সাতিশয় বল-প্রকাশ-পূর্বক কহিল, ; ১ সন্নিভ = তুল্য। সম্+নি+ভা+ড। ২ শ্রবণে=শুনিয়া। শু+ভাববাচ্যে অনট। ৩ শ্রবণেন্দ্রিয়=কর্ণ। শ্রবণ =+করণ-বাচ্যে অনটু। বিশেষণে— শ্রত।

শকুন্তলা। আকর্ষণ করিতে লাগিল। তাপসী বিলক্ষণ চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তদীয় হস্ত-গ্রহ হইতে সিংহ-শিশুকে কোন মতেই বিমুক্ত করিতে পারিলেন না। তখন তিনি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, এমন সময়ে এখানে কোনও ঋষি-কুমার নাই যে ছাড়াইয়া দেয়। ইহা বলিয়া পার্শ্বে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবামাত্র তিনি রাজাকে দেখিতে পাইয়া কহিলেন, মহাশয় ! আপনি অনুগ্রহ করিয়া নিরীহ ২ সিংহ-শিশুকে এই দুর্দান্ত বালকের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া দিন। রাজা তৎক্ষণাৎ নিকটে গিয়া সেই বালককে ঋষি-পুত্র-বােধে তদনুরূপ সম্বােধন করিয়া কহিলেন, অহে ঋষি-কুমার ! তুমি কেন তপােবন-বিরুদ্ধ । করিতেছ ? তখন তাপসী কহিলেন, মহাশয় ! আপনি জানেন না, এ ঋষি-কুমার নহে। রাজা কহিলেন, বালকের আকার দেখিয়া বােধ হইতেছে, সে ঋষি-কুমার নয় ; কিন্তু এ স্থানে ঋষি-কুমার ব্যতীত ৫ অন্যবিধ বালকের সমাগম-সম্ভাবনা নাই, এজন্য আমি এরূপ বােধ করিয়াছিলাম। ইহা বলিয়া রাজা সেই বালকের হস্ত-গ্রহ হইতে সিংহ- আচরণ ৪ ; ১ আকর্ষণ=আ+কৃ+অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে—আকৃষ্ট। ২ নিরীহ=শান্ত, নিশ্চেষ্ট। নির্ (নাই), ঈহা (চেষ্টা ) যাহার —বহু। বিশেষ্যে—নিরীহত। বিরুদ্ধ =বি+ধ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে—বিবােধ। ৪ আচরণ =আ+চ+অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে আচরিত। ৫ ব্যতীত=বি+অতি+ই+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—ব্যত্যয়।

সপ্তম অঙ্ক। ১৩১ শিশুকে বিমুক্ত করিয়া দিলেন, এবং স্পর্শসুখ অনুভব করিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, পরকীয় পুত্রের গাত্র স্পর্শ করিয়া আমার এরূপ সুখানুভব হইতেছে ; যাহার পুত্র, সে ব্যক্তি ইহার গাত্র স্পর্শ করিয়া কি অনুপম ১ সুখ অনুভব করে, তাহা বলা যায় না। বালক নিতান্ত দুর্দান্ত হইয়াও রাজার নিকটে একান্ত শান্ত-স্বভাব হইল, ইহা দেখিয়া এবং উভয়ের আকার-গত সৌসাদৃশ্য দর্শন করিয়া তাপসী বিস্ময়াপন্ন হইলেন! এই বালক ঋষি-কুমার নহে, রাজা ইহা অবগত হইয়া তাপসীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই বালক যদি ঋষি-কুমার না হয়, তবে কোন্ ক্ষত্রিয়-বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, জানিতে ইচ্ছা করি। তাপসী কহিলেন, মহাশয় ! এই শিশু পুরু-বংশীয় ; রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, আমি যে বংশে জন্মিয়াছি, ইহারও সেই বংশে জন্ম। পুরুবংশীয়- গণের এই রীতি বটে, তাহারা প্রথমতঃ সাংসারিক সুখ- ভােগে স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিয়া পরিশেষে সস্ত্রীক হইয়া অরণ্য-বাস ও আশ্রয় করেন। ১ অনুপম=অতুল। নাই উপমা যাহার (বহু)। সৌসাদৃশ্য =সুসদৃশ+ভাবার্থে ষ্ণ। বিপরীত—বৈসাদৃশ্য। ৩ সাংসারিক=সংসার+ষ্ণিক ; বিশেষণ। সস্ত্রীক = স্ত্রীর সহিত বর্তমান (বহু)। বহুব্রীহি-সমাসে ককারাগম। ৫ অরণ্য-বাস=অরণ্যে বাস (৭মী তৎ)। অরণ্য-বিশেষণে আরণ্য, অথবা আরণ্যক। ৪

শকুন্তলা।
পরে রাজা তাপসীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এ দেবভূমি
মানুষের অবস্থিতির স্থান নহে; তবে এই বালক কি
সংযােগে ? এখানে আসিল ? তাপসী কহিলেন, ইহার জননী
অপরঃ-সম্বন্ধে এখানে আসিয়া এই সন্তান প্রসব । করিয়া-
ছেন। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, পুরু-বংশ
ও অপরঃ-সম্বন্ধ, এই দুই কথা শুনিয়া অবধি আমার হৃদয়ে
পুনর্বার আশার সঞ্চার হইতেছে। যাহা হউক, ইহার
পিতার নাম জিজ্ঞাসা করি, তাহা হইলেই সন্দেহ-ভঞ্জন
হইবে।
ইহা বলিয়া তিনি তাপসীকে পুনর্বার জিজ্ঞাসা
করিলেন, আপনি
আপনি জানেন, এই বালক পুরুবংশীয় কোন্
ব্যক্তির পুত্র ? তখন তাপসী কহিলেন, মহাশয় ! কে সেই
ধৰ্ম্ম-পত্নী-পরিত্যাগী পাপাত্মার নাম-কীৰ্ত্তন করিবে ? রাজা
শুনিয়া মনে মনে কহিতে
মনে কহিতে লগিলেন, এ কথা আমাকেই
লক্ষ্য করিতেছে! ভাল, ইহার জননীর নাম জিজ্ঞাসা করি,
তাহা হইলেই এককালে সকল সন্দেহ দূরীভূত হইবে; অথবা
পর-স্ত্রী-সংক্রান্ত কোনও কথা জিজ্ঞাসা করা উচিত নহে।
২
১ সংযােগ = সম্+যুজ,+ঘ; বিশেষ্য। বিশেষণে—সংযুক্ত।
প্রসব= প্র+সূ+অল;
বিশেষ্য। বিশেষণে-প্রসূত।
৩ ভঞ্জন = ভজ+অনট; বিশেষ। বিশেষণে-ভগ্ন।
সংক্রান্ত =সম্+ক্রম্+ক্ত;
বিশেষণ। বিশেষ্যে–সংক্রমণ বা
সংক্রান্তি।
৪

সপ্তম অঙ্ক। করিয়াছি, আমি যখন মােহান্ধ হইয়া স্বহস্তে আশা-লতার মূল-চ্ছেদ তখন সে আশালতাকে বৃথা পুনরুজ্জীবিত করিবার চেষ্টা করিয়া পরিশেষে কেবল সমধিক ক্ষোভ ১ পাইতে হইবে; অতএব এ কথায় আর প্রয়ােজন নাই। রাজা মনে মনে এই আন্দোলন করিতেছেন, এমন সময়ে এক অপর তাপসী কুটীর হইতে একটি মৃন্ময় ময়ুর আনয়ন করিয়া কহিলেন, বৎস! কেমন শকুন্ত-লাবণ্য দেখ। এইবাক্যে শকুন্তলা-শব্দ শ্রবণ করিয়া করিয়া বালক কহিল, কই আমার মা কোথায় ? তখন তাপসী কহিলেন, বৎস! তােমার মা এখানে আসেন নাই। আমি তােমায় শকুন্তের লাবণ্য দেখিতে কহিতেছি। ইহা বলিয়া রাজাকে কহিলেন, মহাশয় ! এই বালক জন্মাবধি জন্মাবধি জননী ভিন্ন আপনার কাহাকেও দেখে নাই ; সে নিয়ত জননীর নিকটেই থাকে ; এই হেতু নিতান্ত মাতৃবৎসল শকুন্ত-লাবণ্য-শব্দে জননীর নামাক্ষর শ্রবণ করিয়া বালক উহার জননীকে মনে করিয়াছে। উহার জননীর নাম শকুন্তলা। সমুদয় শ্রবণ-গোচর করিয়া রাজা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, ইহার জননীরও নাম শকুন্তলা ? কি আশ্চর্য্য। ১ ক্ষোভ=চাঞ্চল্য, দুঃখ; বিশেষ। ক্ষুভ+অল্। বিশেষণে—ক্ষুব্ধ। শকুন্ত-লাবণ্য =শকুন্তের (পক্ষীর ) লাবণ্য (সৌন্দৰ্য)—৬ষ্ঠী তৎ। ৩ মাতৃ-বৎসল=মাতায় বৎসল (৭মী তৎ)। বৎসল=অনুরক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে-বাৎসল্য।

১৩৪ ১ সকল শকুন্তলা। উত্তরােত্তর কথাই আমার বিষয়ে ঘটিতেছে । এই সকল কথা শুনায় আমার আশাই বা না জন্মিবে কেন? অথবা আমি মৃগতৃষ্ণিকায় ভ্রান্ত ২ হইয়াছি; এজন্য নাম- সাদৃশ্য ৩-শ্রবণে মনে মনে বৃথা এত অন্দোলন করিতেছি ; এরূপ নাম-সাদৃশ্য শত শত ঘটিতে পারে। শকুন্তলা অনেক ক্ষণ অবধি পুত্রকে দেখেন নাই, এই হেতু সাতিশয় উৎকণ্ঠিত হইয়া অন্বেষণ করিতে করিতে সহসা সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। রাজা বিরহ-কৃশা মলিন-বেশা শকুন্তলাকে সহসা সেই স্থানে উপস্থিত দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইয়া এক-দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন, নয়ন-যুগল হইতে প্রবল-বেগে জলধারা বহিতে লাগিল; বাক্‌- শক্তি-রহিত হইয়া তিনি দণ্ডায়মান রহিলেন এবং একটিও কথা কহিতে পারিলেন না। শকুন্তলাও অকস্মাৎ রাজাকে দেখিয়া স্বপ্ন-দর্শনবৎ বােধ করিয়া স্থির-নয়নে তাহার দিকে চাহিয়া রহিলেন ; ও তাহার নয়ন-যুগল বাষ্প-বারি-দ্বারা ১ বিষয়=বি+ সি+অল; বিশেষ্য। বিশেষণে—বৈষয়িক বা বিষয়ী। “বিশব্দো হি বিশেষার্থঃ সিনােতেবন্ধ উচ্যতে। বিশেষেণ সিনােতীতি বিষয়স্তেন কথ্যতে” । যাহা বিশেষ-রূপে বন্ধন করে, তাহাই “বিষয়”। ২ ভ্রান্ত=ভ্রম+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—ভ্রম বা ভ্রান্তি। ৩ নাম-সাদৃশ্য =নামের সাদৃশ্য (৬ষ্ঠী তৎ)। সাদৃশ্য =সদৃশ+ ভাবার্থে ষ্ণ। সদৃশ =সমান+দৃশ+ট। স্ত্রীলিঙ্গে—সদৃশী। ৪ আন্দোলন = অনুশীলন। আন্দোল+অনট; বিশেষ। বিশেষণে —আন্দোলিত।

সপ্তম অঙ্ক। ১৩৫ পরিপ্লত ১ হইয়া আসিল। বালক শকুন্তলাকে বালক শকুন্তলাকে দেখিবামাত্র, মা মা করিয়া, তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইল এবং জিজ্ঞাসা করিল, মা ! ও কে, ওকে দেখে দেখে তুই কাদিস্ কেন ? তখন শকুন্তলা গদগদ-বচনে কহিলেন, বাছা ! ও কথা আমায় জিজ্ঞাসা কর কেন? আপনার অদৃষ্টকে জিজ্ঞাসা কর। কিয়ৎ-ক্ষণ পরে রাজা মনের আবেগ সংবরণ করিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন, প্রিয়ে। আমি তােমার প্রতি যে অসদ্ব্যবহার করিয়াছি, তাহা বলিবার নহে। তৎকালে আমার মতিভ্রম ঘটিয়াছিল, তাহাতেই অবমাননা-পূর্বক তােমায় বিদায় করিয়াছিলাম। কয়েক দিবস পরেই সমস্ত বৃত্তান্ত আমার স্মৃতিপথে উপনীত হইয়াছিল ; তদবধি আমি কি অসুখে কালহরণ করিতেছি, তাহা আমার অন্তরাত্মাই জানেন। পুনর্বার তােমার দর্শন পাইব, আমার আশা ছিল না। এক্ষণে তুমি তুমি প্রত্যাখ্যান-দুঃখ পরিত্যাগ করিয়া আমার অপরাধ ৪ মার্জনা কর। ৩ ; * পরিপ্লত=মগ্ন, চঞ্চল। পরি+প্ন+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে— পরিপ্লব। ২ জিজ্ঞাসা = জ্ঞা+সন্+অ+আপ; বিশেষ্য। অর্থ—জানিবার ইচ্ছ। বিশেষণে—জিজ্ঞাসিত বা জিজ্ঞাসু। ৩ প্রত্যাখ্যান-দুঃখ=পরিত্যাগ-জনিত-কষ্ট। প্রত্যাখ্যান=প্রতি+ আ+খ্যা+অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে-প্রত্যাখ্যাত। ৪ অপরাধ =অপরাধ,+; বিশেষ। বিশেষণে—অপরাধী।

শকুন্তলা।
••
প্রিয়ে।
ইহা বলিয়া রাজা উন্মুলিত তরুর ন্যায় ভূতলে পতিত
হইলেন। তদ্দর্শনে শকুন্তলা রাজাকে হস্তে ধরিয়া কহিলেন,
আৰ্যপুত্র! উঠ, উঠ ; তােমার দোষ কি ; সকলই আমার
অদৃষ্টের দোষ।
এত দিনের পরে দুঃখিনীকে যে স্মরণ
করিয়াছ, তাহাতেই আমার সকল দুঃখ দূর হইয়াছে।
ইহা বলিতে বলিতে শকুন্তলার নয়ন-যুগল হইতে প্রবল-বেগে
বারি বিগলিত হইতে লাগিল। রাজা গাত্রোত্থান করিয়া
বাষ্প-বারি-পরিপূরিত-নয়নে কহিতে লাগিলেন,
প্রত্যাখ্যান-কালে তােমার নয়ন-যুগল হইতে যে জলধারা
বিগলিত হইয়াছিল, তাহা উপেক্ষা করিয়াছিলাম ; পরে সেই
দুঃখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছিল । এক্ষণে
তােমার চক্ষের জলধারা মুছিয়া দিয়া সকল দুঃখ দূর করি।
ইহা বলিয়া তিনি স্বহস্তে শকুন্তলার চক্ষুর জল মুছিয়া
দিলেন।
শকুন্তলার শােক-সাগর আরও উচ্ছলিত হইয়া
প্রবল-প্রবাহে নয়ন ৩ হইতে বারি-ধারা বহিতে
লাগিল অনন্তর দুঃখাবেগ সংবরণ করিয়া শকুন্তলা রাজাকে
;
উঠিল ;
১
;
উলিত=উৎপাটিত। উৎ+ মূল+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষ্যে—
উন্মলন। বিপরীত—প্রােথিত।
২ উপেক্ষা=উপ+ঈক্ষ+অ+স্ত্রীলিঙ্গে আপ; বিশেষ্য। বিশেষণে
-উপেক্ষিত। বিপরীত—অপেক্ষা।
নয়ন=নী+করণ-বাচ্যে অনট। অর্থ—চক্ষুঃ।

সপ্তম অঙ্ক।
১৩৭
কহিলেন, আৰ্য্যপুত্র ! তুমি যে এই দুঃখিনীকে ১ পুনর্বার
স্মরণ করিবে, সে আশা ২ ছিল না। কি রূপে আমি
পুনর্বার তােমার স্মৃতিপথে উপনীত হইলাম, তাহা ভাবিয়া
স্থির করিতে পারিতেছি না। তখন রাজা কহিলেন, প্রিয়ে।
তৎকালে তুমি আমায় যে অঙ্গুরীয় দেখাইতে পার নাই,
কয়েক দিবস পরে তাহা আমার হস্তগত হইলে আদ্যন্ত
সমস্ত বৃত্তান্ত আমার স্মৃতিপথে আরূঢ় ৩ হয়। এই সেই
অঙ্গুরীয়। ইহা বলিয়া স্বীয় অঙ্গুলীস্থিত সেই অঙ্গরীয়
দেখাইয়া পুনর্বার শকুন্তলার অঙ্গলীতে পরাইয়া দিবার
চেষ্টা করিলেন। তখন শকুন্তলা কহিলেন, আৰ্যপুত্র ! আর
আমার এই অঙ্গরীয়ে প্রয়ােজন নাই ; ইহাই আমার সর্বনাশ
করিয়াছিল ; ইহা তােমারই অঙ্গলীতে থাকুক। আর ইহা
ধারণ করিতে আমার সাহস হয় না।
উভয়ের এইরূপ কথােপকথন হইতেছে, এমন সময়ে
মাতলি আসিয়া প্রফুল্ল-বদনে কহিলেন, মহারাজ !
দিনের পরে আপনি যে ধৰ্ম্ম-পত্নীর সহিত সমাগত হইলেন,
ইহাতে আমরা যে কি পৰ্য্যন্ত আহলাদিত হইয়াছি, তাহা
;
;
১ দুঃখিনী = দুঃখ+অস্ত্যর্থে ইন্=স্ত্রীলিঙ্গে ঈপ। পুংলিঙ্গে—দুঃখী।
২ আশা = আ+অশ+ও+স্ত্রীলিঙ্গে আপ।
আরূঢ় = আ+রুহ,
বিশেষণ বিশেষ্যে—আরােহণ।
৪ চেষ্টা =কায়িক ব্যাপার। চেষ্ট+অ+স্ত্রীলিঙ্গে আপ। বিশেষণে
-চেষ্টিত
ত
+ক্ত ;

১৩, শকুন্তলা। প্রিয়ে। বলিতে পারি না। ভগবান্ কশ্যপও শুনিয়া সাতিশয় প্রীত হইয়াছেন। এক্ষণে আশ্রমে গিয়া ভগবানের সাক্ষাৎকার লাভ করুন ; তিনি আপনার প্রতীক্ষা করিতেছেন। রাজা শকুন্তলাকে কহিলেন, প্রিয়ে! চল, অদ্য উভয়েই এক- সঙ্গে ভগবানের শ্রীচরণ-দৰ্শন করিব। শকুন্তলা কহিলেন, আৰ্যপুত্র ! ক্ষমা কর, আমি তােমার সঙ্গে গুরু জনের নিকটে যাইতে পারিব না। তখন রাজা কহিলেন, শুভ সময়ে একসঙ্গে গুরু জনের নিকটে যাওয়া দোষাবহ নহে। চল, আর বিলম্ব করিবার প্রয়ােজন নাই। ইহা বলিয়া রাজা শকুন্তলাকে সঙ্গে লইয়া মাতলি- সমভিব্যাহারে কশ্যপের নিকটে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ভগবান্ অদিতির সহিত একাসনে বসিয়া আছেন ; তখন সস্ত্রীক সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া তিনি কৃতাঞ্জলি-পুটে সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। বৎস! চিরজীবী হইয়া ২ ; ৪ ১ প্রতীক্ষা = প্রতি+ইক্ষ+অ+স্ত্রীলিঙ্গে আপ। ২ দোষাবহ = দোষের আবহ (জনক )—৬ষ্ঠী তৎ। আবহ=আ+ বহ+অস্। সাষ্টাঙ্গ=অষ্ট অঙ্গের সহিত বৰ্তমান (বহু )। “জানুভ্যাঞ্চ তথা পদ্ভ্যাং পাণিভ্যামুরসা ধিয়া। শিরসা বচসা দৃষ্টা প্রণামমাষ্টাঙ্গ ঈরিতঃ”। ৪ প্রণিপাত = প্রণাম। প্র+নি+পত+ঘ।

সপ্তম অঙ্ক। ১৯ অপ্রতিহত-প্রভাবে অখণ্ড ভূমণ্ডলে একাধিপত্য ২ ইহা বলিয়া কশ্যপ আশীর্বাদ করিলেন। অনন্তর তিনি শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎসে ! তােমার স্বামী ইন্দ্র-সদৃশ ও পুত্র জয়ন্ত-সদৃশ ; তােমায় অন্য আর কি আশীর্বাদ করিব ; তুমি শচা-সদৃশী হও। এইরূপ আশীর্বাদ করিয়া কশ্যপ উভয়কেই উপবেশন করিতে বলিলেন ! সকলে উপবিষ্ট হইলে রাজা কৃতাঞ্জলি হইয়া বিনয়-পূর্ণ- বচনে নিবেদন করিলেন, ভগব । শকুন্তলা আপনার সগােত্র ৩ মহর্ষি করে পালিতা তনয়া। করে পালিতা তনয়া। মৃগয়া-প্রসঙ্গে তদীয় তপােবনে উপস্থিত হইয়া আমি গান্ধব-বিধানে ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলাম। পরে ইনি যখন রাজধানীতে নীত হন, তখন আমার এরূপ স্মৃতিভ্রংশ ঘটিয়াছিল যে, ইহাকে চিনিতে পারি নাই এবং চিনিতে না পারিয়া প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। ইহাতে আমি মহাশয়ের ও নিকটে নিরতিশয় অপরাধী হইয়াছি! কৃপা করিয়া আমার অপরাধ মার্জনা করুন; এবং যাহাতে ভগবান্ কণ মহর্ষি কণের ৪ ১ অখণ্ড=সম্পূর্ণ, অবিভক্ত। ২ একাধিপত্য =এক (অদ্বিতীয়) আধিপত্য (প্রভুত্ব কৰ্মধা। আধিপত্য =অধিপতি+ষ্ণ্য। বিপরীতদাসত্ব। ৩ সগােত্র = সমান গােত্র যাহার (বহু )। সমান শব্দ স্থানে বিকল্পে ‘স আদেশ ; পক্ষে সমান-গােত্র। ৪ ভগবান্=ভগ+বতু। ষড়ৈশ্বর্যশালী। স্ত্রীলিঙ্গে-ভগবতী। ভগ=“ঐশ্বৰ্য্যস্ত সমগ্ৰস্য বীৰ্য্যশ্য যশস: শ্রিয়ঃ। জ্ঞানবৈরাগ্যয়ােশ্চৈব ষগ্নাং ভগ ইতি মৃত” ।

১৪০ ৪ শকুন্তলা। আমার উপরি অক্রোধ ১ হন, আপনাকে তাহারও উপায় করিয়া দিতে হইবে। কশ্যপ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, বৎস! সে জন্য তুমি কুষ্ঠিত হইও না। এ বিষয়ে তােমার অণুমাত্র অপরাধ নাই। যে কারণে তােমার স্মৃতিভ্রংশ ঘটিয়াছিল, তুমি ও শকুন্তলা উভয়েই অবগত নহ । এই হেতু আমি সেই স্মৃতিভ্রংশের প্রকৃত কারণ কহিতেছি ; ইহা শুনিলে শকুন্তলার হৃদয় হইতে প্রত্যাখ্যান-নিবন্ধন সকল ক্ষোভ দূরীভূত হইবে। ইহা বলিয়া তিনি শকুন্তলাকে কহিলেন, বৎসে ! রাজা তপােবন হইতে স্বীয় রাজধানীতে প্রতিগমন করিলে এক দিন তুমি পতি-চিন্তায় নিতান্ত নিমগ্ন হইয়া কুটীরে উপবিষ্ট ছিলে। সেই সময়ে দুর্বাসা গিয়া অতিথি হন। তুমি এককালে বাহ-জ্ঞান-শূন্য হইয়া- ছিলে, এজন্য তাহার সৎকার বা সংবর্ধনা করা নাই। তিনি কুপিত হইয়া তােমায় এই শাপ দিয়া চলিয়া যান যে, তুই যাহার চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া অতিথির অবমাননা করিলি, সে কখনও তােরে স্মরণ করিবে না। তুমি সেই শাপ শুনিতে পাও নাই। তােমার সখীরা ১ অক্রোধ=নাই ক্রোধ যাহার ( বহু )। ২ কুণ্ঠিত=সঙ্কুচিত। কুণ্ঠা+জাত অর্থে ইত, অথবা কুঠ+ক্ত। অণুমাত্র =অণু ( অতি অল্প ) মাত্রা (পরিমাণ) যাহার-বহু। ৪ ভ্রংশ =নাশ, পলায়ন। ভ্ৰশ+অল্। বিশেষণে—ভ্রষ্ট। ত সপ্তম অঙ্ক। ১৪১ २ শুনিতে পাইয়া তাঁহাকে চরণে ধরিয়া অনেক অনুনয় করিলেন। তখন দুর্বাসা কহিলেন, এ শাপ অন্যথা। হইবার নহে। তবে যদি কোনও অভিজ্ঞান প্রদর্শিত হয়, হা হইলে স্মরণ হইবে। অনন্তর কশ্যপ রাজাকে কহিলেন, বৎস! দুর্বাসার শাপ-প্রভাবেই তােমার স্মৃতিভ্রংশ ঘটিয়াছিল, তাহাতেই তুমি শকুন্তলাকে চিনিতে পার নাই। শকুন্তলার সখীর অনুনয়-বাক্যে ১ কিঞ্চিৎ শান্ত হইয়া দুর্বাসা অভিজ্ঞান-দর্শনকে শাপ-মােচনের উপায় নির্ধারিত করিয়া দিয়াছিলেন ; সেই হেতু অঙ্গুরীয়-দর্শনমাত্র শকুন্তলা-বৃত্তান্ত পুনর্বার তােমার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়। দুর্বাসার শাপ-বৃত্তান্ত শ্রবণ-পূর্বক সাতিশয় হর্ষিত হইয়া রাজা কহিলেন, ভগবন্! এক্ষণে আমি সকলের নিকটে সকল অপরাধ হইতে মুক্ত হইলাম। শকুন্তলাও শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এই জন্যই আমার এই দুর্দশা ঘটিয়াছিল ; নতুবা আৰ্যপুত্র এমন সরল-হৃদয় হইয়া কেন আমায় অকারণে পরিত্যাগ করিবেন ? দুর্বাসার শাপই ৫ ১ অনুনয় = অনু+নী+অল। বিশেষণে-অনুনীত। ২ নির্ধারিত==নি = ধৃ+ ণিচ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে নির্ধারণ। হর্ষিত =হর্ষ+জাত অর্থে ইত। আনন্দিত। = মুচ+ক্ত; বিশেষণ। বিশেষে–মােচন বা মুক্তি। ৫ পরিত্যাগ =পরি+ত্যজ+ঘঞ। বিশেষণে—পরিত্যক্ত বা পরি- ত্যাগী। ৪

১৪২
শকুন্তলা।
অদ্য
আমার সর্বনাশের মূল । এই জন্যই তপােবন হইতে
প্রস্থান-কালে সখীরাও যত্ন-পূর্বক আৰ্য-পুত্রকে অঙ্গুরীয়
দেখাইতে কহিয়াছিলেন।
ভাগ্যবশতঃ এই কথা
শুনিলাম; নতুবা আৰ্যপুত্র অকারণে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন
বলিয়া যাবজ্জীবন আমার অন্তঃকরণে ক্ষোভ থাকিত।
পরে কশপ রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, বৎস!
তােমার এই পুত্র সসাগরা সদ্বীপা
সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয়
অধিপতি হইবে, এবং সকল ভুবনের ভর্তা হইয়া উত্তর-কালে
ভরত-নামে প্রসিদ্ধ ১ হইবে। তখন রাজা কহিলেন, ভগবন্!
আপনি যখন এই বালকের সংস্কার ২ করিয়াছেন, তখন
ইহাতে কি না সম্ভবপর হইতে পারে ? অদিতি কহিলেন,
অবিলম্বে কণ ও মেনকার নিকটে এই সংবাদ প্রেরণ করা
আবশ্যক। তদনুসারে কশ্যপ দুই শিষ্যকে আহ্বান
করিয়া কুণ ও
মেনকার নিকটে সংবাদ-প্ৰদানার্থ প্রেরণ
করিলেন, এবং রাজাকে কহিলেন, বৎস! বহু দিবস হইল
রাজধানী হইতে আসিয়াছ, অতএব আর বিলম্ব না করিয়া
দেবরথে আরােহণ-পূর্বক পত্নী ও পুত্র-সমভিব্যাহারে প্রস্থান
তখন রাজা, মহাশয়ের যে আজ্ঞা, বলিয়া তাঁহাকে
৪
১ প্রসিদ্ধ=প্র+সিধ+ক্ত ; বিশেষণ। বিশেষ্যে—প্রসিদ্ধি।
২ সংস্কার =সম্+কৃ+ঘ,;
বিশেষ্য। বিশেষণে— সংস্কৃত।
৩ শিষ্য = শাস্+ক্য।
ও আহ্বান = আ+হে+অনট; বিশেষ্য। বিশেষণে—আহূত

সপ্তম অঙ্ক ১৪৩ প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া সস্ত্রীক ও সপুত্র রথে আরােহণ করিলেন, এবং নিজ রাজধানীতে প্রত্যাগমন-পূর্বক পরম- সুখে রাজ্য-শাসন ও প্রজা-পালন করিতে লাগিলেন সম্পূর্ণ ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shakuntala Ed. 1st

Author
De, Purnachandra Ed.
Title
Shakuntala Ed. 1st
File name
Shakuntala Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1916
Published
2010/02/20
Publisher
Macmillan
Language
Sanskrit
Pages
184
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Essay
Keywords
Bidyasagar, Ishwarchandra
DLI number
511375
Barcode
4990010018529.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
kxXJTK1rSZG
Download PDF

Shakuntala Ed. 1st