Makardah Saraswat Library, Howrah
Prajapataye
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
১৮১০
প্রও
G
গে65্য কুমত নষ্টও
No text on this page.
বিশু মুখােপাধ্যায়
প্রীতিভাজনেষু
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
এর অন্যান্য ছােট গল্পের বই :
টুটফুটা, ইতি, অধিবাস, অকাল বসন্ত, দিগন্ত,
রুদ্রের আবির্ভাব, নায়ক-নায়িকা, সঙ্কেতময়ী,
ডবল ডেকার, পলায়ন
সূচীপত্র
প্রজাপতয়ে
অবস্ত
খিল
সঞ্চয়
যথাপূর্ব
মাটি
চূড়ান্ত
পরাভূত
সিল্কের ব্যাণ্ডেজ
No text on this page.
প্রজাপতয়ে
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
১৩৪০
No text on this page.
আমি অবিবাহিত যুবক ; তদুপরি, মানে সর্বোপরি, উচ্চ পুচ্ছে সমাসীন, এবং নিজেই নিজের কথা বলি, একজন নামী লিখিয়ে। নামী লিখিয়ে, কিন্তু কত বড় যে নাম সেদিন বুঝলুম গােবিন্দপদবাবুর সঙ্গে কথা বলে। গােবিন্দপদবাবু একজন মস্ত কর্মচারী। মার্জনা করবেন, কোন জাতীয় কর্মচারী তা বলতে পারবােনা। পাটেরও ভাবতে পারেন, লাটেরও ভাবতে পারেন। তবে এইটুকু বলতে পারি যে, একজন দার্শনিক কর্মচারী, যাকে বলে সমতল জীবন ও উত্তুঙ্গ চিন্তা-প্লেন লিভিং য়্যাণ্ড হাই থিঙ্কিং—তারই তিনি শরীরী নিদর্শন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি রাখেন, দেশলায়ের কাঠিতে অনবরত দাত খোঁচান আর অপর্যাপ্ত ডাব খান। বিকেলবেলা বিছানায় শুয়ে দেয়ালজোড়া ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকিয়ে পরবর্তী লাল তারিখ খুজছিলুম, শুনতে পেলুম সিড়িতে জুতাের শব্দ। রােমাঞ্চিত হব কিনা ভাবছিলুম, দেখলুম, তার মানে শুনলুম, নেহাৎই টলটলে চটি-জুতাের শব্দ। আগেই বলেছি, আমার বাড়িতে পর্দাও নেই, সাইন-বাের্ডও নেই, কেননা আমি বিয়ে করিনি ; আর আপনারা, যারা পুরুষ, তাঁরা জানেন স্ত্রী-ই যেমন স্বামীর পর্দা তেমনি স্ত্রী-ই আবার স্বামীর সাইনবাের্ড। তাই যে-কেউ যে-কোনাে সময় যে-কোনােভাবে আমার বাড়িতে, দোতলায়, আমার শােবার ঘরে, বিনা-আয়াসে, বিনা-জিজ্ঞাসায় সরাসরি উঠে আসতে পারতাে। ‘ভায়া, আছ নাকি হে? এ-কথাটুকুও অন্তরাল থেকে জিজ্ঞাসা করবার দরকার মনে করতাে না। মনে করতাে, যখন একা আছি, তখন নিশ্চয়ই আর আমি লুকিয়ে নেই। একা থাকাই যে লুকিয়ে থাকা সেটা অন্তত দার্শনিক গােবিন্দ-দাদা বুঝবেন এটা আশা করেছিলুম। পৃথিবীতে এত লােকের মধ্যে গােবিপদ- বাবু এসেছেন আমার বাড়িতে, আমারই সঙ্গে আড্ডা দিতে, এটা প্রায় অলৌকিকের এলেকায়। তার সঙ্গে আমার প্রথম অমিলই বয়সে, প্রায় প্রজাপতয়ে ৪ দুই যুগের ব্যবধান। তিনি প্রস্তরযুগের লােক, আর আমি ঘােতর কলিকালের—যেমন বাচাল তেমনি উচ্ছজ্বল। বলা বাহুল্য এ-দুটো বিশেষণ গগাবিন্দপদবাবুরই উপহার। বিস্মিত হবার সময় না দিয়েই গােবিপদবাবু একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। কোনাে বাগাড়ম্বর না করে সােজা জিগগেস করলেন : “হ্যা হে, তুমি নাকি লেখ ? এটা ধমক না অভিনন্দন প্রথমটা ধারণা করতে পারলুম না। উঠে বসে একবার ঠোট চাটলুম। বললুম, “কী লিখি?” কী লেখ মানে? বুঝতে পাচ্ছ না? যদি বলি, তুমি নাকি টান, তবে বুঝতে পার না, কী টান?’ গােবিন্দপদবাবু গুদ্বয় গম্ভীর করে’ তুললেন। বললুম, ‘পারি না। কেননা মদও টানতে পারি, গাঁজাও টানতে পারি। তেমনি লেখ’ বললে হিসেবও লিখতে পারি, হস্তলিপিও লিখতে পারি।” ‘ন্যাকা। গােবিন্দপদবাবু বক্র ভঙ্গি করলেন। বললেন, ‘বই লেখ নাকি ? যেন কী দুষ্কর্ম করি এমনি একখানা পাপাত মুখ করে বললুম, “হ্যা, লিখি। কে বললে আপনাকে ? “আর সে-সব নাকি খুব খারাপ লেখা?’ গােবিপদবাবুর গলার স্বরটা নিখাদ থেকে ঋষভে নেমে এল। লেখা খারাপ না লেখাটা খারাপ প্রশ্নটা অনুধাবন করতে বেগ পাচ্ছিলুম। মানে, ভঙ্গি ও বস্তুর মধ্যে কোনটা নিন্দনীয়? গােবিন্দবাবু দ্বিধা করতে দিলেন না। বললেন, ‘নিজে লিখেছ, নিজে কান না !
প্রজাপতয়ে
‘খারাপ লিখি? একটু অবাক হবার চেষ্টা করলুম।
‘হা গাে, অশ্লীল। অশ্লীল লেখ তাে? আমাকে লুকিয়ে লাভ কী ?
কি, লেখ না ?
‘বন্ধুরা বলে বটে।
‘বন্ধুরা ?
‘হা, মুখরােচক সমালােচনা করে আমার নাম যারা প্রচার করছে
তাদের বন্ধু বলব না তাে কী! তাই তাে আপনি যে আপনি, আপনি
পর্যন্ত আমার নাম শুনেছেন।
ইঙ্গিতটা দাদা তলিয়ে দেখলেন না, এত ব্যস্ত। ষড়যন্ত্রীর মতাে
নিম্নস্বরে বললেন, আমাকে একখানা দিতে পারে পড়তে ?
কী বলবাে সেই মুহূতে কিছু ভেবে পেলুম না।
‘তােনার কিছু ভয় নেই, কেউ জানতে পারবে না।
‘জানতে পারলেই বা কী? বললুম অনেক কষ্টে, ‘সবাই তাে
জানেই।
‘না, তবু, বাড়িতে ছেলে-মেয়েরা রয়েছে, একটু সাবধান হয়ে পড়তে
হবে বৈ কি। গােবিন্দপদবাবু চেয়ারটা আমার বিছানার কাছে টেনে
আনলেন, অন্তরঙ্গের মতাে বললেন, “ওদের জন্যে তােমার কিছু ভয় নেই,
বই আমি ড্রয়ারের মধ্যে চাবি দিয়ে বন্ধ করে রেখে দেব।”
গগাবিন্দপদবাবুর ছেলে-মেয়েদের জন্যে যেন আমি কতই চিন্তিত এমনি
একখানা মুখ করে বললুম, “চাবি-বন্ধ করে রাখলে আর পড়বেন কখন ?
এক-আধ সময় বইখানা হাতে নিতে হবে তাে? তখন যদি ওরা কেউ
দেখে ফেলে?
‘ছোঁ মেরে কেড়ে তাে আর নিতে পারবে না? স্পষ্ট বলে’ দেব,
অশ্লীল বই, ভদ্রলােকের অস্পৃশ্য।
প্রজাপতয়ে মনে পড়লাে কলেজে এক প্রােফেসর আমাদের একবার দা-ভিঞ্চির ছবি দেখাতে এনেছিলেন। আমাদের হাতে য়্যালবামটা দিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ৪৮ পৃষ্ঠার ছবিটা দেখাে না, ভয়ঙ্কর অশ্লীল। বলা বাহুল্য সর্বাগ্রে আমরা সেই ৪৮ পৃষ্ঠার ছবিটাই দেখেছিলুম এবং আমাদের সহপাঠিনী দুটি মেয়ে বঞ্চিতের মতাে মুখ বিমর্ষ করে বসে ছিলাে দেখে তাদের দিকেও পরে চালান করে দিয়েছিলুম সেই ৪৮ নম্বরের প্লেট। গােবিন্দপদবাবু নিজের কথার জের টানলেন : ‘ছেলেমেয়েদের পক্ষে কোনটা ভালাে আর কোনটা মন্দ সে তাে আগে আমাকেই বিচার করে’ দেখতে হবে। ‘তা তাে বটেই। নির্লিপ্তের মতাে বললুম। ‘তাই, তােমার ভয় নেই, ওদের হাতে আমি পড়তে দেবে না, এমন কি তােমার বৌদিদির হাতে পর্যন্ত না। দুষ্টমি করে একটু হাসলুম। গােবিপদবাবু হঠাৎ অলক্ষ্যে আলােড়িত হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘এত যে ছাই-ভস্ম লেখ শুনি, কী নিয়ে লেখ বল তাে ? ‘কী নিয়ে আবার ! যা থেকে ছাই-ভস্ম হয়, সেই আগুন নিয়ে। দাদা দাত খোচাচ্ছেন আর হাসছেন। পরে অনুপ্রাণিত হয়ে বললেন, “নাও, দাও চট করে। বেশ ভালাে দেখে দিয়ে কিন্তু। “ভালাে! স্তম্ভিত হয়ে গেলুম। বললুম, এই না বললেন খারাপ বই চান ? ‘ঐ আর কি, মানে, খারাপের মধ্যে শ্রেষ্ঠখানা চাই। বুঝলুম দাদার ভালাের অম্বৰ্থ।
৭
প্রজাপতয়ে
গগাবিন্দপদবাবু নিকটের দেয়ালের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললেন,
এ-সব যে লেখ, বউ-মা আপত্তি করে না?
বুঝলুম দাদা ভয়ানক ভুল করেছেন, আর এই ভুলের কারণ দেয়ালে
টাঙানাে একটি যুবতীর ফটো। কেন না দাদার দৃষ্টি ছবিটার মতােই
নিষ্পলক।
বললুম, ‘আপত্তি করে আর কী করবে বলুন। লেখক জেনেই তাে
ভালােবেসে বিয়ে করেছে।
‘ভালােবেসে! দাদার মাথায় বজ্রাঘাত হলাে।
কথাটা মােলায়েম করে দিলুম : ‘ভালােবেসে মানে লেখাকে
ভালােবেসে।
‘এমন লেখাও কেউ ভালােবাসে নাকি ?
অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালুম দাদার দিকে। সে-চাহনির থেকে দাদা
সরে গেলেন। বললেন, ‘কর করেছে লেখা-পড়া?
‘ম্যাটিকও পাশ নয়। হিতােপদেশ ছেড়েই একেবারে উপনিষৎ!
একে অশিক্ষিত, তাই লাভ-ম্যারেজ করেছে, তা-ও কিনা এমন
একজন বটতলার লেখককে, গােবিপদবাবু আমার সেই কল্পিতা স্ত্রীর প্রতি
সরােষ-সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলেন। কী ভেবে ফটোটা রঞ্জুমুক্ত করে পেড়ে
আনলেন, তন্নতন্ন করে দেখতে লাগলেন সেটাকে। বললেন, “এমনিতে
দেখতে তাে বেশ পরিষ্কার।
‘বিলিতি ফটোগ্রাফারের তােলা, পরিষ্কার হওয়াই তাে উচিত।
‘সেই পরিষ্কারের কথা বলছি না। বলছি দেখতে বেশ সুন্দর।
‘ফটোতে সব মেয়েকেই সুন্দর দেখায়। সব কিছুকেই। আমার
বাড়িটার যদি ছবি নেন, মনে হবে যেন রাজাটালিকায় বাস করছি।
এমন কি আপনাকেও ছবিতে ঠিক ভ্যালেন্টিনাে মনে হবে।
প্রজাপতয়ে
৮
যে-কোনাে একজন সাহেবের মতো দেখতে হবেন তাইতেই দাদা
খুসি। বললেন, “তা হােক, কিন্তু বৌমাকে আনননি কেন এখানে?
আনননি বলেই তাে গুচ্ছের যতাে রাবিশ লিখে চলেছ। নাও, দেরি
কোরােনা, বার করে একখানা।
‘খুব ভালাে দেখে ! চোখে একটা হাসির ঝিলিক দিলুম।
‘হ্যা, সব চেয়ে যেটা ভালাে। গােবিন্দপদবাবুর আবার বিশেষণে
ভুল হয়ে গেল।
একটু গম্ভীর হলুম। বললুম, “কিন্তু দাম?
দাদার যেন কে গলা টিপে ধরলাে। বললেন, ‘দাম মানে ?
‘দাম মানে মূল্য। বই কিনবেন তার দাম দেবেন না?
‘কিনবাে
বললুম
কই,
বললুম, শুধু একটু পড়বে।
না-কিনলে পড়তে আপনাকে দেবাে কেন? সবরকম আনন্দেরই
দাম দেবেন আর এই পড়ার আনন্দটাই মাগনা?
গগাবিন্দপদবাবু ভর্জায়মান বেগুনের মতাে জ্বলে উঠলেন : “তুমি বলতে
চাও, তােমার এই ট্র্যাশ আমি কিনে পড়বে?
‘আর আপনিই কি আশা করেন আপনার মতো পাঠককে পড়াবাে
বলে’ বই লিখি ?
‘তােমার বই যদি পড়ি, তােমার সেটা সৌভাগ্য বলে মনে করা
উচিত। গােবিন্দপদবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।• চোখ গােল করে’
বললেন, ‘কিনে পড়বার বই ঢের আছে বাজারে।
‘হ্যা, বাজারে, আপনার বাড়িতে নয়। কেননা, পাঁজিখানাও
আপনি পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে আনেন। আমিও বিছানা থেকে
নেমে এলুম।
একটা প্রায় হাতাহাতির নমুনা।
প্রজাপতয়ে
সক্রোশে গােবিন্দবাবু কী বলতে যাচ্ছিলেন, চট করে’ বাস্কেটের ডালা
খুলে রঙচঙে-মলাটের একখানা আধমােটা বই বার করে ধরলুম। হাসি-
মুখে বললুম, আশ্বস্ত হােন, কিনতেও হবে না, ফেরাতেও হবে না, বইখানা
আপনাকে আমি উপহার দিচ্ছি।
রাগান্বিত মুখে পুরুষের হাসিটা ভালো দেখায় না। অন্তত রাগটা
শেষ হতে না দিয়েই দ্রুত হেসে ওঠাটা ভারি কুৎসিত। বুঝলুম, বইয়ের
থেকে বইয়ের জ্যাকেটটা দেখেই গােবিপদবাবু আনলোদ্ভাসিত হয়ে
উঠেছেন। প্রকাশকের রুচি যেমন বন্য, জ্যাকেটের উপরে তেমনি একটি
বন্য নারীমূর্তি।
প্রভাত দেখেই দাদা মধ্যাহ্নটা বুঝতে পেরেছেন। বললেন,
এটা কী ?
বললুম, জ্যাকেট।
দাদা নিজের মনেই রসিকতা করে উঠলেন : কোনদিন আবার
বইয়ের শুনবাে পেটিকোট। কিন্তু ভায়া, প্রেজেন্ট করেই তাে মুস্কিলে
ফেললে। এখন এটাকে লুকোই কোথায় ?
‘কেন, খবরের কাগজের একটা স্কাফ দিয়ে জ্যাকেটটা চাপা
দেবেন।
‘সে তাে বাইরেটা। কিন্তু ভিতরটা তাে আর ঢেকে রাখতে পারবে
না। প্রেজেন্ট নেয়া মানেই তাে এটাকে চিরস্থায়ী করে রাখা। দাদা
বিশেষ ভাবিত হয়েছেন দেখলুম। বললেন, ‘কোননা-না-কোনাে ফাঁকে
ছেলেমেয়েগুলাে ঠিক পড়ে ফেলবে দেখাে।
‘অতদিন ওটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন না, আপনার পড়া হয়ে গেলেই
ও স্বাহা বলে’ ভস্মসাৎ করে ফেলবেন।
“ঠিক বলছ ?
প্রজাপতয়ে
‘হা। কেননা বেঁচে থাকলে আপনার ছেলেমেয়েরাই একদিন
নিজের থেকে পড়ে নিতে পারবে। বই প্রেস থেকে আসে, একখানা
গেলে কী হয় ? ছেলেমেয়েরা তাে আর প্রেস থেকে আসে না।
‘ঠিক বলছ? পড়ে পুড়িয়ে ফেলবাে?
“নিশ্চয়ই। আপনাকে যখন দিয়েছি, তখন তাে ভস্মেই দিয়েছি।
এততেও দাদা হাসলেন। বললেন, ‘দাও, বেঁধে দাও বইটা।
জ্যাকেটের উপর একটা স্কাফ চাপিয়ে দিলুম।
সিড়ি দিয়ে নেমে যেতে-যেতে বললেন, “বৌমাকে শিগগির নিয়ে
এসাে। একা থাকাটা কোনাে কাজের কথা নয়।
, একা থাকাটা কোনাে কাজের কথা নয়।
দিন কতক পরে, আরেক বিকেলবেলা, সঙ্গীর অভাবে বিছানায় শুয়ে-
শুয়ে আয়নাতে নিজের মুখ দেখছি, হঠাৎ কার ছায়া পড়লাে। বেশ
একটি লীলায়িত ছায়া।
সেটা স্বপ্ন, কেননা আবিভূত হলেন মধুসূদন, আমার চাকর ও একমাত্র
পৃষ্ঠপােষক।
বললে, ‘গােবিপদবাবুর বড়ো মেয়ে এসেছে আপনার সঙ্গে দেখা
করতে।
মেয়ে, তায় বড় মেয়ে, তায় গােবিপদবাবুর বড় মেয়ে—ব্যাপারটা
কেমন হতভম্ব করে দিলে। যেন ভালাে করে শুনতে পাইনি এমনি
অমনােযােগের থেকে জিগগেস করলুম, কে ?
১১
প্রজাপতয়ে
‘আমি। দ্রুত পায়ে একটি মেয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাে :
নমস্কার।
আশ্চর্য, আমার আয়নাটা তা হলে মিথ্যা কথা বলেনি।
‘আমার নাম ব্রততী, এই রাস্তার মােড়েই আমাদের বাসা, আমার
বাবার নাম শ্রীগােবিন্দপদ—
‘কী আশ্চর্য, বসুন, বসুন এই চেয়ারটায়। ক্ষিপ্রহন্তে একটা
চেয়ার টেনে দিলুম। ভাবলুম, মধুসূদন ঘরের থেকে চলে যেতেই
ভাবলুম, আমি কি বাস্তব জগতে আছি, না এটা কোনাে একটা
উপন্যাসের পৃষ্ঠা !
মেয়েটি বসলাে। স্নিগ্ধ হেসে বললে, “আশ্চর্য তত হয়েছি আমরা।
আপনি, এত বড় একজন সাহিত্যিক, আমাদের এত কাছাকাছি
আছেন, অথচ জানতে দেননি একটুও। এত আত্মগােপন কি
ভালাে?
কার বেশি আশ্চর্য হবার কথা তা নিয়ে তর্ক করে লাভ নেই।
তক্তপােষের একধারে বসে’ বিনীত গলায় বললুম, “আজ তবে কী
করে জানলেন আমি এখানে, এই রাজবেশে ?
‘বাবার টেবলে আপনার একখানা বই দেখলুম অজ।
‘আমার বই ? বলেন কী ?
‘হ্যা, আপনার লেখা বই—“বহ্নিমতী”। কি, আপনার নয় ?
আপনি লেখেন নি ? আপনার নামের আর কোনাে ভদ্রলােক তার
লেখক? ব্রততী প্রায় ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় আর কি।
লিখলেও, লেখকত্ব মেনে নিতে হতে, এমন তাড়া। তাই
সবিনয়ে বললুম, ‘হ্যা, আমিই সেই বহ্নিমান।
ব্রততীর সঙ্গে ছােট্ট একটি চোখ চাওয়া-চাওয়ি হলাে। একটু নড়ে
প্রজাপতয়ে ১২ চড়ে বসে’ অন্যদিকে চেয়ে সে বললে, “দেখে তো নিতান্ত ভালােমানুষের মতােই মনে হয় ! ‘সেইটেই আমাদের দুর্ভাগ্য যে অন্য কিছু আশা করেন, কিন্তু হতে পারি না। এই জন্যেই আমরা আশা করি না কোনাে ভক্তের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়। কথার দুঃসাহসটা হাসি দিয়ে প্রচ্ছন্ন করলুম। ব্রততীর ঠিক জায়গায় লেগেছে দেখলুম। ভুরু কুঁচকে সে জিগগেস করলে : ‘কী করে বুঝলেন আমি আপনার ভক্ত? ‘ময়ূরের পেখম দেখে যেমন বুঝি আকাশে মেঘসঞ্চার হয়েছে। উপমাটার জন্যে মার্জনা করবেন, লেখক বলে’ ভাষার একটুখানি প্রশ্রয় চাই। সাহিত্যিক জেনে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন এটার মধ্যে আমার লেখার প্রতি আপনার এতটুকু মােহও কি কল্পনা করতে পারি না ? ‘না। ব্রততী কঠিন গলায় বললে, “আমি আপনার লেখার একজন তীব্র নিষ্ঠুর সমালােচক। আপনার লেখা আমি একদম পছন্দ করি না। অমন করেই বা বলি কেন ? আপনার লেখা আমি ভীষণ ঘৃণা করি। ‘ধন্যবাদ। সে-ঘৃণাও ভক্তিরই উপসর্গ। ‘রাবিশ! ব্রততী মুখ ফেরালে। পরমুহূর্তে চোখ বড়াে করে’ বললে, কিন্তু আপনার সঙ্গে নতুন আলাপ করতে এসেছি আপনাকে কে বললে? ‘আলাপ করতে আসেন নি ? কেমন অসহায় বােধ করলুম। ‘না। আপনার সঙ্গে আমার অনেক দিনের আলাপ। কি, চিনতে পারুেন না ? বলেই ব্রততী শব্দ করে হেসে উঠলাে। ষণ ফাপরে পড়লুম, তার চেহারা দূরের কথা, নামটা পর্যন্ত
প্রজাপতয়ে
মনে করতে পারি না। জীবনের ধূসর দিগন্ত পর্যন্ত তাকিয়েও শ্যামলিমার
আভাস পাওয়া গেল না, অথচ হাতের কাছের জলকেও মরীচিকা বলে
তাড়িয়ে দিতে মায়া করে। নিজে বলছে এতদিনের আলাপ, অথচ
আমি গোয়ারের মতাে সেটা অস্বীকার করবাে ? এই বা কোন
দিশি সৌজন্য ?
তবু, বিবেকের কামড়ে বােকার মতাে মাথা চুলকোতে লাগলুম।
বললুম, ‘কি-জানি কখন—
“কি-জানি কথন নয়, আজ দু’বৎসর আপনার সঙ্গে আলাপ।
দু’চোখে উজ্জল কৌতুক নিয়ে ব্রততী বললে, “এমন কি, গঙ্গার উপর,
ইস্টিমারে, এক টি-পাটিতে, সন্ধ্যেবেলায়
‘হবেও বা। স্পষ্ট অস্বীকার করতে জোর পাচ্ছিলুম না।
‘আশ্চর্য, অমন আশ্চর্য সন্ধ্যার কথা আপনার মনে নেই ? আমি
অন্তত ভেবেছিলুম, হাসির দমিত আভায় সুকোমল ব্রততীর কণ্ঠস্বর : ‘সেই
স্মৃতির সূত্রে আজ অন্তত এক পেয়ালা চা আমাকে অফার করবেন।
‘খাবেন আপনি চা ?”
‘অন্তত বাবা যদি এসে দেখেন আপনার এখানে বসে চা খাচ্ছি, তবেই
ছবিটা সম্পূর্ণ হবে।
‘আপনার বাবা! কেন না-জানি চমকে উঠলুম।
‘কেন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় নাকি? ব্রততী তির্যক দৃষ্টিক্ষেপ
করলে।
লজ্জিত হলুম বা লজ্জিত হবার ভান করলুম। বললুম, তিনি
আসবেন নাকি এ-সময় ?
‘আসাই ত উচিত। কেননা আমি বলে এসেছি, আপনার
বাড়িতেই যাচ্ছি, বহুদিনের বন্ধুতাটা একবার ঝালিয়ে নিতে। আমি যদি
১৪ প্রজাপয়ে বাপ হতুম আর আমার মেয়ে যদি অবাধ্য হতাে, মানে প্রগতিবাদিনী হততা, তবে তাকে ঠেকাতে না পারলেও তার বন্ধুকে অন্তত ঠেকাতুম। তৃতীয় চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে বসে থাকতুম সামনে। কথা কয়টা ব্রততী রাগে বলল না রসিকতায় বলল বােঝা গেল না। ও-কথার উত্তরে যা বলা যায় তাই আমি বললুম। বললুম, “পিতৃদেবের অবাধ্য হয়েছেন নাকি ? ‘কাজেকাজেই। কই, চা-টা দিন চট করে। এবার স্পষ্ট রাগ। ‘দিচ্ছি। কিন্তু কী হয়েছে আগে বলুন। গরম চা-ই তাে খাবেন, নিজে একটু জুড়িয়ে নিলে ক্ষতি কী ? ‘বলবাে বলেই তােত এসেছি। তবে শুনুন। ব্রততী মুখে শীর্ণ করে’ একটু হাসি টানলাে, টান হয়ে বসবার চেষ্টা করলাে ও বললে : ‘বিকেলবেলা ঘুরে-ঘুরে চুল বাঁধছি, দেখি বাবার টেবলের উপর রঙচঙে মলাটের একটা বই। টেবলের উপর যেখানে পঞ্জিকা আর উপনিষৎ পারিবারিক চিকিৎসা আর বেঙ্গল টেন্যান্সি য়্যাক্ট, সেখানে বইটা নিতান্ত বেমানান লাগলাে। হাতে নিয়ে দেখলুম, “বহ্নিমতী,” আপনার লেখা। বেণীটা আলগা হয়ে এলাে, বইটা তক্ষুনি পড়তে বসলুম। সদ্য-প্রকাশিত আপনার এই বইটাই শুধু পড়িনি। ‘আর-সব পড়েছেন? টিপ্পনি না কেটে পারলুম না। ‘সমস্ত। কোনটার পর কোনটা, কাকে কোন বই উৎসর্গ করেছেন, কোন বইয়ে কি-কি চরিত্র, নায়ক-নায়িকা থেকে চাকর-ঝি পর্যন্ত সব আমি নাম-ধাম অবিকল বলে দিতে পারি। বিশ্বাস না হয় জিজ্ঞাসা করুন। ‘সিনেমার যুগে এটা প্রায় রােমাঞ্চের মতাে মনে হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা শুধু জিগগেস করবাে যদি কিছু মনে না করেন।
প্রজাপতয়ে ‘করুন। ‘একখানা বইও কি কিনে পড়েছেন ? অনর্থক আঘাত করলুম। কিন্তু ব্রততী আহত হলাে না। বললে, ‘কিনে পড়িনি তা ঠিক, কিন্তু আপনার এ-বই আমি কিনবাে। বলতে কি, তাই কিনতেই আমি এসেছি। আছে তাে আপনার কাছে ? বলে সে কোন অদৃশ্য নেপথ্য থেকে ছােট একটি মনিব্যাগ বার করলো। জীবনে এই প্রথম সত্যিকার চমকালুম। বললুম, ‘কিনবেন ? ‘া, না কিনে তাে আর উপহার পাবাে না ! আর কিনবে যে, আপনার স-স্বাক্ষর কিনবাে, মানে অটোগ্রাফ-সহ। এবং তাতে যা আমি বলবাে তাই আপনাকে লিখে দিতে হবে। ভয় নেই, তারাে দাম দিতে আমি প্রস্তুত। ভয় নেই, এমন কিছু লেখাব না যাতে আপনার মর্যাদার হানি হতে পারে, আর আমার কাছে আপনার চেয়ে আমার মর্যাদার বেশি দাম। বলতে-বলতে সত্যিই সে টাকা বার করলাে। বাধা দিয়ে বললুম, ‘ব্যস্ত হবেন না। আগে সবটা শুনি। হাঁ, পড়তে বসলেন-তারপর ? তারপর, ব্রততী বলতে সুরু করলল, উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত নাটকীয়তা প্রয়ােগ করে’: ‘পিছন থেকে বাবা এসে হঠাৎ হাঁকলেন, কী পড়ছিস রে ওটা? বলেই ছোঁ মেরে হাত থেকে কেড়ে নিলেন বইটা। যেন চুরি করতে এসে সিধের মধ্যে সবে মাথা গলিয়েছি অমনি একটা লাঠির বাড়ি পড়লাে। অমন জোরে ছিনিয়ে নিলেন বইটা, এই দেখুন, এই চুড়িটাতে কেমন কেটে গিয়েছে!' কাটার চিহ্নটা দেখলুম কিনা নজরে পড়লাে না, একটি স্বল্প-উত্তোলিত সুগােল মণিবন্ধ দেখলুম।
প্রজাপয়ে
১৬
স্বীকার করলুম
বললুম, ভাগ্যিস পড়েন নি বইটা।
‘কে বললে পড়িনি ?
“ঐ যে বললেন আগে!
‘বলেছি নাকি? ব্রততী মৃদু হাসলাে : ‘কিন্তু বাবার কাছে তা
।
। তাঁকে
বললুম,
এইবার নিয়ে আমার প্রয়ােদশ বার
পড়া হতাে। তিনি তাে অত্যন্ত হতাশ হয়ে গেলেন, আমাকে আর
বাঁচাতে পারলেন না। বললুম, বি-এ ক্লাশে যারা পড়ে তারা এর চেয়েও
অনেক খারাপ বইই পড়ে, পড়তে হয়।
বি-এ ক্লাশ শুনে নয়, সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো বলেই সুইচ টেনে
তাড়াতাড়ি আলাে জালালুম। বললুম, তিনি কী বললেন ?
‘বললেন, বারাে বার পড়েছিস? বলে’ যা-নয় তাই বলে আমার
অবধাগতির একটা লুডি বর্ণনা দিলেন। ঝোঁকের মাথায় মুখের উপর
বলে বসলুম--কিন্তু, আমার চা কই ?
সাহস সঞ্চয় করে বললুম, আপনার জন্যে যে চা সেটা চাকরের
হাতে ছেড়ে দিতে ভরসা হয় না। তাই ভাবছি—আপনার গল্প শেষ হয়ে
গেলে আপনাকেই অনুরােধ করবাে চা-টা তৈরি করে নিতে।
‘চমৎকার আতিথেয়তা। ব্রততীও সাহসিক হাসিতে বললে, ‘তা
হলে একা নিজের জন্যেই ঠিক এক পেয়ালা ??
আপনি যদি নিজেকে এখন একা মনে করেন তবে তাই।
ব্রততী হঠাৎ উছলে উঠলাে। চঞ্চল হয়ে বললে, “ভালােই তাে হবে
দেখতে! আপনার চাকরকে বলুন গরম জল-টল পেয়ালা-ফেয়ালা সব,
নিয়ে আসতে। ঠিক একটা বালিগঞ্জী উপন্যাসের আরম্ভের মতাে
দেখাবে—যদিও শেষটা জানি নিমতলা।
শেষের ইঙ্গিতটা বুঝতে চাইলুম না। মধুসুদনকে বললুম যা বলবার।
১৭
প্রজাপতয়ে
‘হঁ্যা, তারপর, কী বললেন ঝোঁকের মাথায় ?
‘একটু বেশি বলে ফেললুন। বলে ফেললুম, বই পড়তে দিচ্ছেন না
কী! যে লােক লিখেছে এই বই, তার সঙ্গেই তাে আমার আলাপ–কত
দীর্ঘ দিনের আলাপ !
শেষের কথাটায় অনেক অর্থ ছিল, কিন্তু আমি সেখান দিয়ে গেলুম
। বললুম, তা হলে বলতে চান, লেখা খারাপ হলে লেখকও খারাপ
হতে বাধ্য ? যে নাস্তিক সে কাজে-কাজেই অসাধু?
‘জনমত তাই। যার জেল হয় সেই হয় দোষী। তাই হাতে-হাতে
ফল পেলুম। যদি বলতুম একটা বাঘ কি বনমানুষের সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে
আলাপ করে এসেছি বাবা ততটা চমকাতেন না। আমার হাত চেপে
ধরলেন, বললেন, কোথায় ? কী করে?
কী বলবাে খুজে পেলুম না। ভয়ে-ভয়ে তাকালুম ওর মুখের দিকে।
‘লিখতে পারি না, কিন্তু বানিয়ে বলতে পারি চমৎকার। তপ্ত,
ঈষৎ আরক্ত মুখে ও বললে, ‘শেষকালে স্টিমার-টিপের গল্পটা
বলে ফেললুম।
‘মাসটা আষাঢ়
‘তাই গল্পটাও আষাঢ়ে। ব্রততী হাসলাে।
‘তিনি কী বললেন?
“বললেন, মিথ্যা কথা। আপনার নাম করে বললেন, দু’বছর ধরে
ও এখানে। কিন্তু আপনি সবে এখানে তিন মাস, আমি বললুম। এই
দু’বছরে কবার উনি ছুটি নিয়েছিলেন তার আপনি কী জানেন ?
‘অত্যন্ত ভীতিপ্রদ প্রশ্ন।
‘সুতরাং আমাকে এখন আর আপনার চা না-খাইয়ে গত্যন্তর নেই
জ্যামিতিক উপায়ে বন্ধুত্বটা সপ্রমাণ করা দরকার।
প্রজাপতয়ে
১৮
কাঠের বারকোষে করে’ মধুসূদন সুমুতে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে
এলাে। জ্যামিতিক নিয়মে সেটাকে রাখলাে একটা বেতের টিপাইয়ের
উপর আর ওপারে ব্রততীর মুখখামুখি আরেকখানা চেয়ার রাখলাে। একটু
ঘুরে বসে’ বান্ধবিক তৎপরতায় ব্রততী পিরিচ-চামচ নিয়ে নাড়াচাড়া
সুরু করলে।
সেই অবসরে কমলার ফটোটা আমি ফের দেয়ালে টাঙিয়ে
রাখতে গেলুম।
ব্রততী অবহিত হয়ে একটু-বা বিরস গলায় বললে, “ওটা কার
ফটো ?
‘অনুমান করুন।
‘অনুমান করবাে কি, আমি যে ওকে চিনি। ত্বরিত ভঙ্গিতে ব্রততী
উঠে এলাে : ও তাে কমলা। মরে গেছে। তাই নয় ?
‘তাই। আপনি ওকে চিনলেন কী করে?
‘বা, আমাদের সঙ্গে পড়তে যে বেথুনে। আপনি ওকে চিনলেন কী
করে সেইটে তাে আমার প্রশ্ন। আমি যতদূর জানি, ওর তত বিয়ে
হয় নি।
‘না। বিয়ের সব প্রায় ঠিক হয়েছিলাে, এমন সময় টাইফয়েডে
মারা গেল।
‘আমরা শুনেছিলুম টি-বিতে। কিন্তু, ব্রততী আমার চোখের উপর
চোখ ফেললাে : ‘কার সঙ্গে বিয়ে হবে ঠিক হয়েছিলাে শুনতে পাই?
‘তাকে আপনি চিনবেন না।
‘তবু নামটা বলতে আপনার আপত্তি কী?
‘প্রশান্ত নামে এক ভদ্রলােকের সঙ্গে। আমারই এক বন্ধু। এই
সেদিন তার বিয়ে হয়ে গেল, নেমন্তন্ন খেয়ে এলুম।
১৯ প্রজাপতয়ে নামটা যে আমার নয়, শুনে ব্রততী হয়তাে একটু আশ্চর্য হলাে। বললে, “তবে ও আপনার কে ? ‘অনুমান যখন করতে পারছেন না, তখন বলি, ও আমার ঘােট বােন। ‘বােন! তাই বলুন। আমরা শুনেছিলুম- কী শুনেছিলাে জিজ্ঞাসা করলুম না। মনে হলাে ফটোর থেকে কমলা হাসছে। হালকা পায়ে ব্রততী তার চেয়ারে গিয়ে বসলো। সামান্য একটু নিচু হয়ে চা ঢালতে-ঢালতে বললে, “তবে তাে আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুতার একটা দাবি আছে। কমলার সঙ্গে আমার ভয়ঙ্কর ভাব ছিলাে। সক্ষেপে বললুম, “হ্যা, ভয়ঙ্কর ভাবগুলি মােটেই স্থায়ী হয় না। সস্মিতমুখে ব্রততী বললে, কিন্তু আপনার সম্পর্কে ভাবটা অত ভয়ঙ্কর না করলেও চলবে। ‘কেননা কমলার সম্পর্কে আপনিও আমার ছােট বােন। রসাভাস করলুম কিনা বুঝলুম না। কিন্তু তেমনি হাসিমুখেই ব্রততী বললে, “আমে! বাঁচিয়ে দিলুম আপনাকে। এর পর, স্বভাবতই, খানিকটা স্তব্ধতা উপস্থিত হলাে। এবং সেই স্তব্ধতার মধ্যেই আমরা চা খাওয়া শুরু করলুম। কিছু একটা বলা দরকার বিবেচনা করে বললুম, “কই, আপনার বাবা তাে এলেন না। নিচু হয়ে নিঃশব্দে এক চুমুক চা খেয়ে ব্রততী বললে, “দেখছি না তাে। বােধ হয় শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়েছেন। কিন্তু আর ভয় কি, চোখ তুলে আমার দিকে সে তাকালাে : ‘আমিই গিয়ে তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। মেল ট্রেনের ঘণ্টা দিয়েছে, পেয়ালার জন্যে অনলার কাছে লােক প্রজাপতয়ে ২০ আছে দাড়িয়ে, এমনি তাড়াতাড়ি চা খাওয়া সাঙ্গ করে’ ব্রততী উঠে দাড়ালাে। করজোড় করে বললে, “নমস্কার। এবার আমি পালাই। অনেক কথাই তাকে মনে করিয়ে দেয়ার ছিল, তার বই কেনা, আমার অটোগ্রাফ লিখে দেয়া এবং দুজনের নিমতলা পর্যন্ত অপেক্ষা করা। কিন্তু তক্ষুনি যা জরুরি বলে মনে হলাে তা হচ্ছে নিচে, সদর-দরজা পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিয়ে আসা ! সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে ব্রততী বললে, “যাক, আপনার সঙ্গে আলাপ করে’ খুসি হলুম। ‘আলাপ করার চেয়ে আলাপ ভালাে লিখতে পারি হয়তাে। ‘কি জানি, পড়বার কোনােদিন সৌভাগ্য হয়নি। অত্যন্ত নিব্যক্তিক গলায় সে বললে। তারপর আমাকে মুহূত মাত্র বিস্মিত হবার সময় না দিয়েই সে ফের বললে, “চলুন না, আমাকে রাস্তার মােড় পর্যন্ত একটু এগিয়ে দিয়ে আসবেন। সেইটেই শিষ্টাচার হততা, সন্দেহ কী। কিন্তু কোনােক্রমে চিহ্নিত হই, মফস্বলে সেটা আমাদের একটা বিভীষিকা। সুতরাং ভীরুতার বদলে বিনয় প্রকাশ করে বললুম, ‘একা এসেছেন একা যাওয়াটাই কি ঠিক নয় ? ‘আমেন। একটু টেনে কথাটাকে উচ্চারণ করে ব্রততী রাস্তায় নেমে গেল।
১৮১০ ব্রততীই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে কিনা কে জানে, পরদিন সন্ধেবেলা গগাবিন্দপদবাবু এসে আবির্ভূত হলেন। যেটা প্রায় অভূতপূর্ব, দাদার মুখমণ্ডল ভারি প্রসন্ন মনে হলাে। ‘কী চমৎকার লিখেছ ভায়া! দাদা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন : ‘ডিটেকটিভ উপন্যাস কোথায় লাগে । সেই এককালে পড়েছিলুম নীলবসনা সুন্দরী, আর এতদিন পরে তােমার এই বইখানা। কী যেন নাম রেখেই বইয়ের ? কাঠগড়ায় সাক্ষীর মত কান চুলকোতে-চুলকোতে দাদা বললেন, “দাত-ভাঙা কী যে তােমাদের আজকাল বাঙলা হয়েছে। কোনােই অপরাধ নিলুম না। বললুম, ‘পড়েছেন সবটা? ‘তা এখনাে শেষ হয়নি বটে ! লুকিয়ে-লুকিয়ে পড়তে হচ্ছে তাে। ‘সবটা না পড়েই বুঝলেন চমৎকার ? ‘বােঝা যায় হে বােঝা যায়! দাদা বিজ্ঞের মতাে চোখ দুটো একটু গােল করলেন : ‘সাক্ষীর ভাব-ভঙ্গি দেখেই বােঝা যায় ব্যাটা সত্যি কথা বলছে কিনা। এত বয়েস হলাে, এখনাে লােক চিনতে পারি না হে ? বললুম, “চমৎকারই যদি বুঝে থাকেন, তবে লুকিয়ে পড়ার দরকার কি! নিজের যুক্তিতে নিজেই ঘায়েল হয়ে দাদা খানিকটা অপ্রতিভ হলেন। সে-ভাবটা দূর করবার জন্যে সবেগে ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘না, কিছু দরকার নেই। না, আর দরকার কী! সত্যি, দরকার কিসের? দাদা পা দোলাতে-দোলাতে সূক্ষ্ম একটু হাসলেন।
প্রজাপতয়ে ২২ পাছে হাসির ভাবার্থ টা না বুঝি তাই তিনি একটু পরিষ্কার হলেন। বললেন, ‘ব্রততী তাে আগেই পড়েছে। যেন কিছুই জানি না এমনি একখানা নির্লিপ্ত মুখ করলুম। ‘কি, চিনতে পারলে না ব্রততীকে? আমার মেয়ে, বড়াে মেয়ে। এবছর বি-এ দেবে। “ও, হঁ্যা। কথাটা এমনভাবে বললুম যেন ইতিহাসের খুব একটা জানা তথ্যের পুনরাবৃত্তি করছি। আমার স্বরের শৈত্যটা দাদাকে স্পর্শ করলাে। তিনি ঈষৎ উত্তপ্ত হয়ে বললেন, “কেন, কাল আসেনি সে এখানে তােমার সঙ্গে দেখা করতে? ‘ও, হ্যা, এসেছিলাে। যতটা উৎসাহ প্রকাশ করা দরকার ততটা পারলুম না প্রকাশ করতে। তারপর দুজনে লিটারেচার নিয়ে অনেকক্ষণ গল্প করলে নাকি। চা খেলে— ‘হ্যা, লক্ষ্মীছাড়া হয়ে আছি, উপযুক্ত কিছুই অভ্যর্থনা করতে; পারলুম না। আপনার বাড়িতে গেলে কত নিশ্চয়ই খাওয়ান, কিন্তু আমি শুধু এক পেয়ালা চা দিয়েই বিদায় করলুম। বুঝতেই পাচ্ছেন, গিন্নি কাছে নেই, তাই কী অসুবিধে !’ শব্দ করে একটা নিশ্বাস ফেললুম। ‘বাদরামি রাখাে’ গােবিপদবাবু ধমক দিয়ে উঠলেন। পরে ঢাক গিলে বললেন, ‘এক পেয়ালা চা-ই যথেষ্ট। যা দিনকাল পড়েছে, ঐ ঢের। খরচ কমাতে শেখ। এই বয়েস থেকে মিতব্যয়িতা না শিখলে পরে যে হালে পানি পাবে না। আমি তাে শুধু একখিলি পান দিয়ে ভদ্রতা রাখি। পান না খাও, কিছু সুপুরি। সুপুরিও খাবে না, তবে অন্তত দাতে একটা লবঙ্গ কাটো।
প্রজাপতয়ে
দাদার হিতােপদেশটা মনে-মনে সম্ভোগ করছি, হঠাৎ তিনি
আমাকে একটা কুড়ােলের ঘা মারলেন। বললেন, “কেমন দেখলে
ব্রততীকে ?
ধাধিয়ে গেলুম প্রথমটা, প্রশ্নটা এমন খােলসা। বললুম, কেমন
দেখলুম মানে ?
‘মানে, প্রথম আলাপ, কেমন ইমপ্রেশন হলাে তােমার ?”
বােকার মত চুপ করে থাকলুম।
দাদা আরাে প্রাঞ্জল হলেন : “মানে, ইংলিশে ও অনার্স নিয়েছে
-তাই জিগগেস করছিলুম-লিটারেচার সম্বন্ধে আলাপ-আলােচনা
করেছিলে দুজনে—কেমন বুঝলে, সেকেণ্ড ক্লাশ অন্তত একটা
পাবে কিনা।
তবু সন্দেহ ঘুচলাে না। সাহস সঞ্চয় করে বললুম, এই প্রথম
আলাপ, কী করে জানলেন ?
‘প্রথম নয়?” গােবিন্দপদবাবু লাফিয়ে উঠলেন। কিন্তু স্পষ্ট
লক্ষ্য করলুম, তাঁর এই আস্ফালনের মধ্যে প্রতিবাদের চেয়ে প্রফুল্লতাই
যেন বেশি।
“না, ওর সঙ্গে আমার দু’বছরের আলাপ।
‘দু’বছরের।
‘হা। কেন, বলেনি আপনাকে ?
‘কই, না তাে! গােবিন্দপদবাবু কান চুলকোতে লাগলেন।
মাথাটা
ঘুরে গেল। বললুম, ‘কেন, বলেনি আপনাকে, গঙ্গার উপর
এক স্টিমার-পার্টিতে দু’বছর আগে আমাদের আলাপ হয়েছিলাে? ছুটি-
হাটায় কোলকাতায় গিয়ে
আমাকে বাধা দিয়ে গােবিন্দপদবাবু হাসিমুখে বললেন, ‘বলা উচিত
প্রজাপয়ে ২৪ ছিল, সন্দেহ নেই, কিন্তু বলেনি। এতে রাগের কিছুই নেই, কেননা বাপের কাছে মেয়েরা কি সব কথা খুলে বলতে পারে? যাকগে, সে তাে ভালাে কথাই, অনেক দিনের আলাপ। কিন্তু যাকগে, মােট কথা, ওকে তুমি কেমন বুঝছ ?” তবু, সন্দেহ-নিরসন না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিলুম না। বললুম, ‘আগে থেকে আলাপ, এমন কোনােই কথা হয়নি ? আশ্চর্য তত? ‘আশ্চর্য কিসের ‘একদম অনাত্মীয় অপরিচিতের বাড়িতে তাকে আসতে দিলেন ? ‘দিলুম বৈ কি। ও যে তােমাকে চেনে, ভীষণ চেনে। জানাে না তাে, ও একজন ভােরেশ্বাস রিডার—তােমার সব বই ওর পড়া, প্রায় মুখস্ত। হিস্টি র মতাে সন-তারিখ পর্যন্ত বলে দিতে পারে। ‘থাক।” ‘থাক নয়, সত্যি। বেশ, চলাে আমাদের বাড়ি, দেখবে। বলে হঠাৎ তিনি ছেলেমানুষের মতাে আমার হাত ধরে টানাটানি শুরু করলেন। হাত ছাড়িয়ে নিলুম। বললুম, ‘চেনে তাে বই পড়ে চেনে। কিন্তু সেইটেই কি যথেষ্ট ছাড়পত্র—যখন আপনি জানেন সম্প্রতি আমার গৃহিণী এখানে অনুপস্থিত। আমি তাে ভেবে কাঠ হয়ে যাচ্ছি, আপনি কি করে তাকে সজ্ঞানে অনুমতি দিলেন ? আপনার মাথায় আকাশটা ভেঙে পড়লাে না ? ‘আর তােমার মাথায় আকাশটা ভেঙে পড়লাে না যখন তুমি বলছ যে তুমি বিয়ে করেছ? জানতুম, এমনিভাবেই প্রশ্নটা প্রত্যপিত হবে। বললুম, কিন্তু সে তো ব্রততী আপনাকে পরে গিয়ে বলেছে। কিন্তু ওর আসবার সময় তাে তা আপনি জানতেন না। ৮ প্রজাপতয়ে ‘জানতুম হে জানতুম। গােবিন্দপদবাবু সূক্ষ্ম কুটি করলেন : “যেটুকু জানতুম না, সেটুকু এখন জানলুম তােমার কাছে। ‘ঘটনাটা কী ঘটেছিলাে কাল সন্ধেবেলা, আমাকে বলবেন পরিষ্কার করে ? মানে, সত্যি করে ? ‘বলবাে বৈ কি, যেহেতু কালকের ঘটনাটাই জানি। গােবিন্দপদবাবু হাসলেন : “দু’বছর আগের স্টিমার-পার্টির কথা তাে আর জানি না। ‘হ্যা, বলুন। ‘হয়েছিলাে কি, শােনাে- ‘া, একটুও অতিরঞ্জন করবেন না। Bare facts. ‘হা হে হা, অতিরঞ্জন করবে কোখেকে ? আমি কি প্রেমিক না সাহিত্যিক ? গােবিন্দপদবাবু আরম্ভ করলেন : ‘হয়েছিলাে কি, আমি গিয়েছিলুম একটু বাইরে, ফিরে এসে দেখি, বন্ধ ড্রয়ারের থেকে তােমার সেই বইটা খুলে নিয়ে ব্রততী পড়ছে— কোথায় যেন বাধলাে, তাই বাধা দিলুম : ‘বইটা টেবিলের উপর পড়ে ছিল না? ব্রততী তবে নিজে চাবি লাগিয়ে ডুয়ার খুললাে? কি করে’ ও জানলাে যে ড্রয়ারে বই আছে ? ‘আরে বাপু, ও-ই হয়েছে। আমি কি আর দেখতে গেছি কোখেকে পেলে ও বইটা? মােট কথা, এসে দেখলুম বইটা ও পড়ছে। হলাে ? ‘বেশ। পড়ছে। তারপর ? ‘তারপর, ঠাহর করে দেখলুম, তােমারই সেই বই। বুঝলে কিনা, প্রথমটা খুব রাগ করে উঠলুম। বললুম, খবরদার চুসনে ও-বই । একেবারে অখাদ্য। ঐ আর-কি। মােট কথা, খুব একচোট নিন্দে করলুম তােমাকে। আর ওকে শাসন করে দিলুম তােমার লেখা বই প্রজাপতয়ে যেন ও কোনােদিন না পড়ে। গােবিন্দপদবাবুর মুখ ভারি শুষ্ক ও শােকত দেখালাে। বললুম, “কেন, এই না বললেন, চমৎকার বই, তবে ও পড়বে না ‘আহা, তখন তাে আর সবটা পড়ে দেখিনি। ‘সবটা তত এখনাে পড়ে দেখেন নি। আচ্ছা, হলফ করে বলুন, কাল সন্ধেবেলা যতটুকু আপনার পড়া ছিলাে তার এক লাইনও বেশি আপনি আজ পড়েছেন ? ‘কী মুস্কিল, তুমি আমাকে জেরা করবে নাকি? তার চেয়ে ওঠো, আমার বাড়িতে চলল। দাদা আবার আমার হাত ধরে টানতে লাগলেন : “সেখানে তুতু, মানে ব্রততী, তােমাকে সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারবে। চলল, ওঠো। উঠছি। কিন্তু আগে আমার কথার উত্তর দিন। অত্যন্ত সােজা প্রশ্ন। তারপর পড়েছেন এক ছত্র ? ‘না। আর সময় পেলুম কোথায় ? তবে, কাল যা অত্যন্ত অখাদ্য ও নিন্দনীয় ছিল, আজ অপরাহ্রে হঠাৎ তা এমন চমৎকার হয়ে উঠলে কী করে? ‘বা, আমি মত বদলাতে পারব না? গােবিন্দপদবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, কিন্তু গলায় একটুও ঝাঁজ আনলেন না : ‘এ কী জুলুম তােমার ! সুরেন বড়ুযয্য মত বদলায়নি ? রামজে মাকডােনাল্ড মত বদলায়নি ? মত না বদলালে সূর্যই তাে আজ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়াতো। গােবিন্দপদবাবু নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন। খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলুম। পরে বললুম, ‘হ্যা, তারপর, নিন্দা গুলে ব্রততী কী বললাে ?
২৭ প্রজাপয়ে ‘স্রেফ জ্বলে উঠলাে।' সঙ্গে-সঙ্গে গােবিন্দপদবাবুর গােলাকার চক্ষুদুটিও জ্বলে উঠলাে : ‘বললে, তােমার মতাে ব্রিলিয়ান্ট রাইটার এ-দেশে এ-যুগে জন্মায়নি। তারপরে আমাকে বুঝিয়ে দিলে, সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল বলে কিছু নেই, যা আছে তা নাকি আর্টিস্টিক আর ইন- আর্টিস্টিক। যা আসলে অশ্লীল তা-ও নাকি শ্লীল করে, মানে আটিস্টিক করে লেখা যায়। এই বলে তােমার ব্রিফ নিয়ে পােশিয়ার মতাে ব্যারিস্টারি করতে লাগলাে। আমার কোনােকালে অনার্স-ফনার্স ছিলাে , টায়েটুয়ে কোনােরকমে পাশ করে গেছি—সাপ আর ব্যাঙ, সাহিত্যের কিছুই বুঝি না ছাই! ‘তা না বঝুন, কিন্তু ওর হাত থেকে বইটা আপনি সজোরে কেড়ে নিয়েছিলেন ? ‘ককখনাে না। ‘এমন জোরে কেড়ে নিয়েছিলেন যে, চুড়িতে ওর হাতের কজিটা খানিক কেটে গিয়েছিলাে। ওঁর ব্যবহারে ভীষণ প্রতিবাদ করছি, যেন এমনিই শােনালাে কথাটা। ‘পাগল ! অত বড় মেয়ের গায়ে আমি হাত তুলবাে? কেন, কী সন্দেহ করে’ গােবিন্দপদবাবু আমার মুখের দিকে তাকালেন : “কেন, ও তােমাকে তাই বলেছে নাকি? উত্তর দিলুম না। গােবিন্দপদবাবু স্বগতােক্তি করলেন : “পাগলি! তােমাকে একটু को মন্দ বলেছি তায় মেয়ের অভিমান হয়েছে। মনে এমন লেগেছে যে মনে করেছে শরীরে লেগেছে। পাগলি আর কাকে বলে ? বললুম, তারপর কী হলাে? ‘তারপর আমরা সে তােমার প্রশংসা করলাে। তুমি কত বড়ে প্রজাপতয়ে ২৮ লেখক তা হয়ে গেছে, এখন, তুমি কত বড়াে ছাত্র—তা নিয়ে। প্রতি পরীক্ষায় ফাসট হয়েছ, ভারি-ভারি গােল্ড-মেডেল পেয়েছ, স্কলারশিপ পেয়েছ—সেই কাহিনী ‘তারপরে চাকরিও পেয়েছি। একটু টিপ্পনি কাটলুম। ‘তা তাে জানেই। গােবিন্দপদবাবু বিচলিত হলেন না : ‘তারপরে, আসল খবরটাও ও-ই বললে যে, তুমি এখনাে বিয়ে করেনি। আমাকে একটা প্রকাণ্ড ধাপ্পা দিয়েছ কাল। ‘কখন বললে ?” ‘তখুনি। ‘সেই আলাপ-আলােচনার সময় ? এখানে আসবার আগে ? ‘হঁ্যা, কথায়-কথায় বেরিয়ে গেল। ‘কিন্তু কী করে জানলে সে ও-কথা ? “কী মুস্কিল, গােবিন্দপদবাবু আমাকে কোণায় এনে ফেললেন, ‘তােমার সঙ্গে ওর আজ দু’বছরের আলাপ, আর এই মূল্যবান কথাটাই ও জানে না? এমন বােকাও কেউ আছে ? আমি যে একজন আছি মুখমণ্ডলে তাই বােঝাবার চেষ্টা করলুম। পরে মুখে হাসি টেনে বললুম, “কিন্তু আপনি কেন তার প্রতিবাদ করলেন না ? ‘করেছিলুম আমার সাধ্যমততা, কিন্তু মেয়ে বিশ্বাস করতে না চাইলে করবেশকি ? বলে, তােমার বােন কমলার সঙ্গে ওর ভীষণ ভাব ছিলাে, মাত্র তিন মাস হলাে সে মারা গেছে। তােমাদের আলাপ-পরিচয়ের কথা ছেড়ে দি, বােনের মারফত দাদার সকল কৃতিত্বের কথাই ওর কানে আসততা, মানে তােমার সাহিত্য, তােমার বিদ্যাবত্তা, তােমার সবকিছু। আর যদি বিয়ে করতে, সে খবরটা সব চেয়ে সেই দামী খবরটা ওর কানে প্রজাপতয়ে পৌছুত না ভাবছ? এই হচ্ছে মেয়ের যুক্তি। তাকে খাবাে কী করে? গগাবিন্দপদবাবু শ্রান্ত সুরে বললেন, ‘তখনাে তাে জানি না দুটি বচ্ছর তোমাদের জানা-শােনা। ‘কেন বললেন না, কমলার মৃত্যুর পরও আমার বিয়ে হতে পারে? “বলেছিলুম বই কি। কিন্তু মেয়ে বিশ্বাস করতে না চাইলে উপায় কী বলল ? বলে, বােনকে তুমি এত ভালােবাসতে যে, তার মৃত্যুর এত অল্প পরেই নাকি বিয়ে করতে পারাে না। স্ত্রী মরলেই করে, তায় বােন! ‘কিন্তু তিন মাসই যদি হয়, তবে এই তিন মাসে তােমার বিয়ের কোনাে এভিডেন্স নেই। কেননা গত তিনমাসের মধ্যে তুমি ছুটি নাও নি, এবং এখানেও কোনাে বিয়ে হয়নি তােমার। এটুকু আমি খোঁজ নিয়েছি। ‘এতদুর! শেষ বাণ প্রয়ােগ করলুম : ‘আপনার যুক্তিটা দেখালেন কেন? দেয়ালের ফটো ? দেয়ালের দিকে তাকিয়েই দাদা বলে উঠলেন : “ননসেন্স। আমার যেমন বুদ্ধি, তা-ও আমি বলেছিলুম, কিন্তু ব্রততী ঘাড় নেড়ে বললে, হতেই পারে না। ও তুমি ভুল দেখেছ, বাবা । ও কমলার ফটো। বেশ তাে, আমি এক্ষুনি গিয়ে যাচাই করে আসছি, ও ফটো কমলার না আর কারাে। বলেই তাড়াতাড়ি সে তৈরি হয়ে নিল। তার মানে, ও আপনাকে জোর করে ঠেলে ফেলে দিয়ে আসেনি ? আপনার পরিষ্কার মত নিয়েই এসেছে ? প্রায় সেই রকম। কোথায় যে তাকে নিয়ে যাচ্ছি গােবিপদবাবু যেন বুঝতে পাচ্ছেন না। ‘আমি যে সম্পূর্ণ অবিবাহিত সেটা আপনি বিশ্বাস করেছিলেন?
প্রজাপতয়ে ‘মেয়ের যা চোট, বিশ্বাস করতেই হলাে। তারপর পাড়ায় দু’চার- জনের থেকে খোঁজ নিলুম, তারা সবাই তুতুকে সমর্থন করলে। হাসতে ইচ্ছা হচ্ছিলাে না তবু হাসলুম। বললুম, ‘এবং তা স্পষ্ট জানতে পেরেও আপনি ওকে বাধা দিলেন না কেন? বললেন না কেন, পাড়ার লােকের সাক্ষ্য-প্রমাণই যথেষ্ট, তােকে আর গিয়ে ফটো যাচাই করতে হবে না ? গগাবিন্দপদবাবু উদার গলায় বললেন, ‘বাধা দেব কেন, তােমার বােনের বন্ধু, তােমার একজন ভয়ঙ্কর ভক্ত—তায় এখন শুনছি দু’বচ্ছর তােমাদের জানা-শােনা, বাধা দিতে যাব কেন? আমি কি বর্বর ? ‘না, সামান্য একটা বই পড়তে বাধা দেন কিনা, তাই বলছিলুম।” গলার স্বরটা নরম করে আনলুম। বললুম, “তা হলে ধরে নিতে পারছি, আমার বইয়ের সামান্য কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে’ই রাতারাতি আপনি মুক্তদিগন্ত আকাশের মতাে উদার হয়ে পড়েছেন। গােবিন্দপদবাবু উচ্ছসিত হেসে উঠলেন, কথাটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারেননি। বললুম, ‘মুক্তদন্ত নয়, মুক্তদিগন্ত। গগাবিন্দপদবাবুর আরাে হাসি। এবং সেই উদারতায় আপনিই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ‘আমি পাঠিয়ে দেবার কে, সব ওঁর ইচ্ছে। বলে তিনি উপরের দিকে চোখের ইঙ্গিত করলেন। ‘কড়িকাঠের ইচ্ছে? কড়িকাঠ তার কী জানে? মানে, ভূমিকম্পে কড়িকাঠ তখন ভেঙে পড়েনি তাই বলতে চান ? গগাবিন্দপদবাবু হাসতে-হাসতে আমার কাধ চাপড়াতে লাগলেন। কড়িকাঠের উপরে আর কিছু দেখতে পাও না?
প্রজাপতয়ে ‘শূন্য দেখতে পাই। নিউইয়র্কে ১০২তলা যে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং তারও ছাদের উপরে সেই শূন্য। ‘তােমাদের সঙ্গে কথায় কে পারবে বলে ? গােবিন্দপদবাবু নতুন পরিচ্ছদে চলে এলেন : ‘এখন বাপু, আমার কথার উত্তর দাও। ব্রততীকে কেমন দেখলে ? পরিচ্ছেদটা অত্যন্ত সক্ষেপ করে দিলুম। বললুম : চমৎকার! বিশেষণটাতে গােবিন্দপদবাবু যেন বিশেষ তৃপ্তি পেলেন না, কণ্ঠস্বরে কোথায় বুঝি-বা একটু কৃত্রিমতা ছিল। তাই পুনরায় বললুম, “আপনার মুখে আমার বইয়ের যেমন সমালােচনা। ‘আরে, সেটা তাে প্রায় না পড়ে সমালােচনা, আর ব্রততীর সঙ্গে তােমার দু’বচ্ছরের পরিচয়। ‘দু’বছরের পরিচয়েও কোনাে মেয়েকে ঠিক পড়া যায় না।” টিপ্পনি কাটলুম। তবু, এক সময়ে যে চমৎকার বলেছি সেটা গােবিন্দপদবাবু ভােললননি। বললেন, ‘মানে, চমৎকার বলতে তুমি ঠিক কী বােঝ? ‘ইংরিজিতে না বললে বুঝি বােঝেন না?” গম্ভীর হয়ে বললুম, “বেশ ব্রাইট মেয়ে। ‘ঠিক বলেছ, একসিডিঙ্গলি ব্রাইট। দেখতে একটু কালাে বটে, কিন্তু ভারি উজ্জ্বল। কথায়-বার্তায় কী রকম? আপনার মত dull নয়। তাইতেই গােবিপদবাবু খুসী। বললেন, “আরে আমরা হচ্ছি ওল্ড ফগি, সারাজীবন তাে আর আমার সঙ্গে কথা কইবে না। তারপর, লেখা- পড়ায় কী রকম বুঝলে? ‘প্রাইভেট টিউটর রাখুন, ঠিকঠাক মত দিতে পারবাে।
প্রজাপতয়ে
‘সে তত ভয়ানক সুখের কথা। বি-এ, এম-এ, যতদূর কেননা তুমি
পড়াতে চাও।
‘কত মাইনে দেবেন ?
প্রশ্নটা ভেবেছিলুম খুব স্কুল ও পার্থিব শােনাবে, কিন্তু গােবিপদবাবুকে
সেটা স্পর্শ করলাে না। তিনি স্বাভাবিক মুখে বললেন, “যা ন্যায্য মনে
করাে তাই দেব। এই ধরাে, দশ হাজার।
বুকের মধ্যিখানে একটা হাতুড়ির ঘা খেলুম। কতক্ষণ কোনাে কথা
বলতে পারলুম না।
গােবিন্দপদবাবু আবার আমার হাত ধরে টানাটানি শুরু করলেন।
“চলাে, এখন একবার আমার বাড়ি চলল, তুতুর মা বিশেষ করে বলে
দিয়েছে ওখানে তুমি আজ একটু চা খাবে।
বেঁচে গেলুম কথা বলতে পেরে। বললুম, মার্জনা করুন দাদা,
জোরালাে জোলাপ নিয়েছি। আরেক দিন।
‘বেশ, তবে কাল রাত্রে আমাদের ওখানে খাবে। কেমন ?
‘হ্যা, ভুলে যেয়ােনা। বেশ, কাল আরেকবার মনে করিয়ে দেব’খন।
গগাবিন্দপদবাবু উঠলেন : এসব খাও তাে? ফাউল ? কিম্বা धौन
পিজান্? এমন একসেলেন্ট নােস্ট করতে পারে তুতু।
‘রক্ষে করুন। মাছ-মাংসই খাইনা।
দাদা হতভম্ব হয়ে গেলেন, ব্যাপারটা তার কাছে কেমন অনাধুনিক
নােলাে।
বললুম, ‘পৃথিবীর সব হােমরা-চোমরারাই নিরামিষাশী। গান্ধি,
হিটলার, ব্যারন হিনুমা, বার্নার্ড শ—সবাই।
‘তা বেশ, নিরিমিষ পাকেই ও রান্না করবে। এত সহজে পরাজিত
প্রজাপতয়ে হবেন না এমনিভাবে হাসতে-হাসতে গােবিন্দপদবাবু নিচে নেমে গেলেন। মান্য অভ্যাগতকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলুম। পরদিন সকালবেলা উপরওয়ালার কাছে গিয়ে ক্যাজুয়্যাল লিভ-এর দরখাস্ত করলুম। বললুম, আক্কেলদাত উঠছে, তীব্র যন্ত্রণা, কোলকাতা গিয়ে অপারেশান করাতে হবে। দরখাস্ত মঞ্জুর হলাে এবং গােবিপদ- বাবু দ্বারা পুনঃস্মারিত হবার আগেই স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরলুম। সােজা কোলকা, নিজের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে ঘােরর একটা অসুখ বাধালুমাত থেকে মাথায়। সব সময়েই একটা ভয়, এই কেউ ধরতে আসছে, মারতে আসছে, কাটতে আসছে—যাকে বলে মনােমানিয়া। ছুটি নিলুম একমাস, এবং ছুটতে ছুটতে গিয়ে শেষকালে নিজেই একজনকে গিয়ে ধরলুম, আর ভালাে হয়ে গেলুম একদিনে। এত সহজে, একদিনে, এক কথায় হয়ে গেল, বাড়ির সবাই বিস্ময় মানলে। তাকালুম কড়িকাঠের দিকে, এবং টিপ্পনি কাটলুম এই বলে যে মফস্বলে একা থাকাটা নিরাপদ নয়। চাকরি সেখানে একটা ভীষণ সম্পত্তি, তাকে পাহারা দেবার জন্যে ভালসিন্দুর একটি মেয়ে চাই। এক মাস ছুটি নেয়ার ফলে আগের জায়গাটা রদ হয়ে গেল। চলে এলুম সুদূর কক্সবাজারে। এবং যে ভদ্রমহিলাটিকে সঙ্গিনী করে’ নিয়ে এসেছি, বিশ্বাস করুন, তাঁর সঙ্গে শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে সাহিত্যিক তর্ক করিনা।
No text on this page.
অবসৃত
No text on this page.
চাপরাশি খবর দিল : ফটোগ্রাফার এসেছে। এ-পাশে ও-পাশে কাগজ ছড়িয়ে টেবিলের উপর ঝুকে পড়ে মিস্টার জগজ্জ্যোতি সরকার তন্ময় হয়ে কি লিখছেন। লিখছেন কতকগুলি গােপনীয়, ইংরিজি করে না বললে বােঝা যাবে না, কনফিডেনশ্যিয়্যল রিপােট, তার নিম্নতন কর্মচারীদের সম্বন্ধে। এক কে যাবে উপরে, এক কেতা থাকবে এখানে, টিনের বাক্সে, তার পরবর্তীর জন্য। কারু সম্বন্ধেই কিছু খারাপ না লিখতে হয়, অথচ প্রত্যেকটাতেই ভাষার বেশ তারতম্য থাকে, তারই চেষ্টায় তাকে একটু অসহিষ্ণু দেখাচ্ছে। কিন্তু অন্তত আজকের দিনে অসহিষ্ণু তিনি হবেন না। কেননা তিনি জানেন, জেনে এসেছেন, এই একটু ভাষার উনিশ-বিশেই একেকটা জীবনের আকাশ-পাতাল ঘটেছে। না, কাউকেও তিনি আজ ঘা মারবেন না, এমনকি নিরঞ্জনকেও নয়, সেই উদ্ধত বুদ্ধিদর্পিত ছােকরা, চিরদিন সমানে যে তার মুখের সামনে বসে সিগারেট টেনেছে, ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া প্যান্ট-কোটে কোনদিন যে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেনি, আর তারই এক হুকুমের বে-আইনিত্ব যে উপরওয়ালার কাছে একবার জাহির করে দিয়ে তার নাকালের একশেষ করে ছেড়েছিলাে, তারই উদগারিত হুকুমটা নিঃশব্দে তাকেই গলাধঃকৃত করতে হয়েছিলো শেষকালে। ইচ্ছে করলেই পারেন তিনি এখন তাকে বসিয়ে দিতে, কিন্তু বেদনার সঙ্গে করুণা মিশিয়ে তিনি ভাবলেন, দরকার কী! হঠকারী, দুর্বিনীত ছােকরা, বিস্তীর্ণ জীবন তার সামনে, আর তিনি চিরদিনের মতাে তল্পিতল্পা গুটিয়ে সরে পড়ছেন, কী হবে আর তাকে কলমের ডগায় খোঁচা মেরে ? আগে, অনেক আগে, যখননা তিনি এমন কার্পেটে-মােড়া খাসকামরা পাননি, তার মনে পড়লাে এবং
প্রজাপতয়ে
৩৮
;
মনে করে তিনি ঈষৎ হাসলেন, সমস্ত বছর কী তােড়েই
তিনি রাজ্যশাসন করেছেন, আর মেয়াদের শেষে তার বদলির
সময় তাড়িত প্রজারা যখন তাদের পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে এসেছে,
সবাইকে তিনি সেই শােকম্লান সুকোমল মুহূর্তে মুক্তার মত
ছােট-ঘােট সব সার্টিফিকেট দিয়েছেন
কাউকে বলেছেন সাধু,
কাউকে বলেছেন পরিশ্রমী, কাউকে বলেছেন অনুগত। খবরের কাগজের
obituary-র মত। সবাই ধার্মিক, সবাই দানশীল, সবাই চরিত্রবান।
কাল হাত থেকে তার রাজদণ্ড খসে যাবে, হাতের কলমটার দিকে
তাকিয়ে তিনি একটা ঘােট দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন, তবুও আজকে,
শেষ দিনে, কারু তিনি ক্ষতি করবেন না। না, কারু ক্ষতি তিনি
করেনওনি কোনাে দিন। খুনীকে পৰ্য্যন্ত দ্বীপান্তরে পাঠিয়েছেন,
ফাসি দেন নি।
চাপরাশির কথায় মিস্টার সরকারের চমক ভাঙলল। বুঝলেন সময়
ফুরিয়ে আসছে। কয়েক বছর ধরে তিনি সেটা অনুভব করছেন।
তবু সময় একেবারে ফুরােবার আগে কেউ কাঁদে না, এখনও কিছু বাকি
আছে। সদলবলে ফটো তুলতে হবে। তারপর পাটি আছে বিকেলে।
শেষ দস্তখত করে’ কাগজের দিকে খানিকক্ষণ তিনি তাকিয়ে
রইলেন : এই তার শেষ দস্তখৎ! কাল থেকে তার আর দস্তখৎ
নেই। কাল থেকে তার নাম জগজ্যোতি সরকার, ঠাণ্ডা, মৃত একটা
নাম, একান্ত অর্থহীন ; জ্বলন্ত জে, সরকারের এইখানেই সমাধি। কাল
থেকে তিনি আর মিস্টার নন, কাল থেকে আবার সেই বাবু। বুকের
ভিতর কেমন তার ফাকা-ফাঁকা ঠেকলাে। কাগজটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার
আরেকটা জায়গায় তিনি দস্তখৎ করলেন।
আর সবাই এসেছে?
অবত ‘দেখে আসি। ‘হা, সবাই এলে পরে আমাকে খবর দেবে। আর তােমাদের নতুন যে সব লিভারি এনে দেয়া হয়েছে সেই সব পরে নাও। আমি আসছি। মিস্টার সরকার পকেট থেকে কাচির প্যাকেটটা বার করে একটা সিগারেট ধরালেন। কাগজ-পত্রগুলাে ফাইলে পরিপাটি করে গুছােলেন- হ্যা, আর-সবাই এসে জড়াে হবার আগে তিনি সাত-তাড়াতাড়ি গিয়ে বসতে পারেন না ফটোগ্রাফারের লেনসের সমুখে, যার আসন প্রথমে তাকেই যেতে হয় শেষে, এই হচ্ছে সন্ত্ৰান্ততার পরিচায়ক। এবং, মনে রাখতে হবে, আজো তিনি সম্রান্ত। লাল ফিতে দিয়ে পরিপাটি করে বাঁধলেন তিনি ফাইলটা। তারপর সেটাকে বাক্সে রেখে শেষ চাবি দিলেন। টিপলেন কলিং-বেল। শব্দটা তার বুকে গিয়ে লাগলাে। কেননা, মনে হলাে, কাল থেকে তাঁর চাকর-বাকরকে গলা খুলে চেঁচিয়ে ডাকতে হবে। ‘বাক্সটা আপিসে দিয়ে এসাে। মিস্টার সরকার সাজ করতে উঠলেন, পরিপূর্ণ সাজ। মেয়ে সধবা মরলে যেমন করে তাকে সাজায়, তেমনি। আয়নায় কেমন যেন তাকে একটু বুড়ােটে দেখাচ্ছে। হয়তাে সেটা এ ক’দিনের দুশ্চিন্তা ও অনিদ্রার ফল। অন্যথা বুড়াে তাকে কে বলবে ? কাগজে-কলমে দু' বছর তার কম থাকলেও এ ক’ দিন খেটেছেন তিনি অসুরের মতাে, মেরুদণ্ডটা এক ইঞ্চি বাঁকা করেন নি। খাসকামরার এক প্রান্তে লম্বায়িত একটা ইজিচেয়ার পড়ে আছে, কোনাে শিথিল মুহূর্তে সেটাতে তিনি গা এলিয়েছেন কিনা মনে পড়ে না। সেই ভেবে এখন তাঁর অনুতাপ হলাে। কাল থেকে বাড়িতে যে তিনি ঢালা ফরাসে অপর্যাপ্ত গড়াগড়ি দিতে পারবেন সেই চিন্তায় তার সুখ নেই। নেপােলিয়নের মতাে ঘােড়ার পিঠে চড়ে ঘুমুতে না পারলে শান্তি কোথায় ?
প্রজাপতয়ে ৪ অনায়াসে আরাে পাচটি বছর তিনি পুরােদমে খেটে যেতে পারতেন, কিন্তু কে শােনে কার কথা ! এটেনশন-এর জন্যে দরখাস্ত করেছিলেন, গ্রাহ হয় নি। অথচ তার ফাইল ঘেটে দেখ, জীবনে ক'টা দিন তিনি ছুটি নিয়েছেন ! এত উন্মত্ত ছিলেন তিনি এই কাজ নিয়ে। এত ভালল- বাসতেন এই কাজ। এজলাসে বসে এক মুহূর্তের জন্যও তার ঘুম পায়নি। তাঁর মুখে কখনাে কেউ শুনতে পায়নি কাজ শেষ হয়েছে, কাজ কখনাে শেষ হয়। কাজ কেউ করতে-করতে শেখে, কেউ-বা শিখে এসে কাজ করে। উকিলের মুহুরিরা আগের দলে, আর তিনি পরের, তবু রাম- শ্যামের বেলায়ও যা, তার বেলায়ও তাই, সেই অনতিক্রম্য পঞ্চান্ন বছর। আঙুল দিয়ে শুভ্রাগ্র গোঁফগুলি তিনি একবার আঁচড়ে নিলেন। এই গোঁফে এমন একটা নজির প্রচ্ছন্ন ছিলো যে তিনি মিস্টার হয়েও সেটাকে উৎপাটিত করেননি। কিন্তু, মিস্টার সরকার আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, সবই ললাট। ‘মে আই কম্ ইন্, স্যর ? পর্দার ওপার থেকে কে বললে। “আরে, সুধাময় যে। এসাে, এসাে। আজকে কি আর মে আই কম্ ই মে ইট প্লিজ, ইয়াের-টিয়াের আছে ? সব ফুরিয়ে গেছে। ফুরােবার ভাব দেখিয়ে মিস্টার সরকার তার চেয়ারে বসে পড়লেন : ‘যাত্রদলের পােষাক ছেড়ে ভীম বসেছে এখন গাঁজা টানতে। সুধাময় এখানকার এক আধবয়সী উকিল, প্রায়-উদিত। তাকে সরকার একটু খাতির করতেন-নেপথ্যে। ‘কই, পােকও ছাড়েন নি, হাতেও সিগারেট। ভীমসেনত্ব তাে এখনাে জাজ্বল্যমান। ‘আরে ভাই, আসল যে গর্জন, তাই আর নেই। চার্জ দিয়ে দিয়েছি। কাউকে আর বসাতেও পারিনা, কাউকে আর খসাতেও পারিনা।
৪১
শুকননা গলায় সরকার হেসে উঠলেন। বললেন, “কি, ফটোতে যাচ্ছ
তাে সব ?
‘তা যাচ্ছি, সুধাময় আমতা-আমতা করে বললে, কিন্তু তার আগে
আমার একটা কাজ ছিল।
“কী কাজ ?
সুধাময় পকেট থেকে এক তাড়া কাগজ বের করলাে। বললে,
‘আমাকে একটা সার্টিফিকেট দিতে হবে। বেশ ভালাে করে।
‘সার্টিফিকেট। মিস্টার সরকার অবাক হয়ে গেলেন : “আমার আবার
সার্টিফিকেটের দাম কী ? কাল থেকে আমি যারপরনাই সাধারণ
জগজ্জ্যোতি সরকার। বাড়ির গায়ে নেমপ্লেটে নাম খােদাই করে না
রাখলে পৃথিবীতে কেউ আমাকে চিনতে পারবে না। আর চিনলেই বা
কি, মানবে না কেউ।
সেটা যে কী ভয়ঙ্কর দুঃখ সুধাময় তা বােঝবার ভান করলাে। বললে,
‘কাল থেকে। কিন্তু আজো আপনি স্ব-মহিমায় সমুজ্জ্বল।
‘চার্জ দিয়ে দিয়েছি যে। এই যে ছটা দেখছ সেটা সূর্য অস্ত যাবার
পরে সন্ধ্যাচ্ছটা।
“পাজির পাতায় লেখা থাকবে না সূর্য আজ কখন অস্ত গিয়েছিলো।
সুধাময় হাসলাে।
‘কিসের সার্টিফিকেট ?
‘আর কিসের! একটা চাকরির।
‘চাকরি! চাকরি করতে যাবে তুমি কোন দুঃখে ?
‘যে দুঃখে এই চাকরিটা আপনি আজ ছেড়ে যাচ্ছেন। সুধাময়
হাসলাে : ‘চাকরিটা লােভনীয়।
‘দেখি—
প্রজাপতয়ে ৪২ মিস্টার সরকার কাগজপত্রগুলি অভিজ্ঞ-অভ্যস্তের মতো নেড়ে-চেড়ে দেখতে লাগলেন। উড়িষ্যার কোন স্টেটে দেওয়ানের কাজ। মাইনেটা বেশ মােটা ও তৈলাক্ত। সাটিফিকেটও জোগাড় হয়েছে মন্দ নয়। মুরুব্বিও নাকি আছে। হবে ? মিস্টার সরকারের প্রশ্নটা সন্দেহসূচক। ‘দেখি চেষ্টা করে। কিছু বলা যায় না। , কিছুই বলা যায় না। নির্ভুল যা জিনিস তাও যে উলটে যায় এ তােত তাঁর নিজের জীবনে স্বচক্ষে দেখা। মামলায় লােকে যে কেন অদৃষ্ট- বাদী হয়, মন্দিরে পূজো আর দরগায় সিন্নি দেয়, এ বুঝতে তার আগে কষ্ট হতাে। পরে বুঝেছেন, কিছুই বলা যায় না। তার অদৃষ্ট মন্দ বলে’ আর কারু অদৃষ্ট প্রসন্ন হবে না এটা নিছক মিথ্যা কথা। আর, তার উপকার কেউ না করলেও অন্যের উপকার করতে তিনি এক চুলও কুণ্ঠিত হবেন না, যদি উপকার তাতে হয়। এখন হয়তাে সময় আছে। ব্লটিং-প্যাডের তলা থেকে তিনি একখানা চিহ্নাঙ্কিত চিঠির কাগজ বের করলেন। তারপরে যা লিখলেন, তাতে লেখককে যদি কোনাে মূল্য দেয়া হয়, তবে উড়িষ্যা ছেড়ে গােটা ভারতবর্ষেরই দেওয়ানিটা সুধাময়কে ছেড়ে দেয়া উচিত। কে এসে বললে, ‘সবাই এসেছেন। শুভঙ্গিতে সরকার উঠে পড়লেন। বললেন, “চলল হে চলো, রােদ চলে যাচ্ছে। পরের মুহূতে মুখ তার ভারি কাতর দেখালাে : “আর এই বােদটুকু চলে গেলেই তােত অন্ধকার। বড় কেমন সকাল-সকাল মনে হচ্ছে না? ‘কিন্তু আপনার এই অন্ধকারের অর্থ ই তাে আরেকজনের আলাে, সুধাময় হাসিমুখে অথচ নিষ্ঠুরের মতাে বললে, “আপনি চলে যাবেন মানেই তাে আরেকজন আসবে। পথ জুড়ে আর কত পড়ে থাকবেন? একটু নতুন বােদ, নতুন রক্ত আসতে দিন। বাইরে কত ছেলে দাড়িয়ে আছে। প্রথমে একটা দলবদ্ধ ফটো তােলা হলাে। মৃতা সধবার যেটুকু শােভা বাকি ছিল সেই ফুলের মালা উঠলাে গলায় । পরের ফটোটা মিস্টার সরকারের একলার, আবক্ষ। পাটির উদ্যোক্তারা কে ঘিরে ধরলাে, ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় যেতে হবে। সাড়ে ছটায় বায়স্কোপ কোম্পানির শশা, তার আগে হল তাদের খালি চাই। ‘দাড়াও, বাড়ি গিয়ে এগুলাে ছেড়ে ভদ্রলােক হই। সরকার গোঁফের আড়ালে স্নান একটু হাসলেন। পরে ঈষৎ বিরক্তির সুরে বললেন : “এত অল্প সময়ের জন্যে বায়স্কোপ-হল ভাড়া নিতে গেলে কেন ? কোথাও একটা শামিয়ানা টাঙিয়ে নিলেই হতাে। ঘুরে-ঘুরে এর-ওর সঙ্গে তিনি দেখা করতে লাগলেন। মুখ অসম্ভব বিষয়, চোখ বাষ্পকুল, ডান হাতের তালুটা ঘর্মাক্ত—সবাইকে তিনি ছেড়ে যাচ্ছেন বলে নয়, চাকরিটা ছেড়ে যাচ্ছেন বলে। বাড়ি যাবেন বলে তিনি তাঁর গাড়িতে এসে উঠলেন। আর ঘোড়ার গাড়ি নয়, দস্তুরমতাে স্ট্যাণ্ডার্ড—যদিও সেকেণ্ডহাণ্ড। দূর থেকেই তার পরিচয় পাওয়া যায় শুধু হর্ন শুনে। তাতে দুঃখ নেই, কেননা তার চেহারা দেখেও তত লােকে বুঝতে পারে যে চাকরিটাও তার সেকেণ্ডহ্যাণ্ড। দুঃখ হচ্ছে এই, গাড়িটা আর রাখা যাবে না। বাড়ির সামনে আসতেই বুকটা তাঁর ভেঙে গেল, এই বাড়ি তাঁকে কাল ছেড়ে দিতে হবে। কোলকাতার লেক-অঞ্চলে তিনিও বাড়ি করেছেন বটে, সেটা শুধু একটা বাড়ি, ইট কাঠ দিয়ে তৈরি, এরকম প্রজাপতয়ে ৪৪ একটা দুর্গ নয়, যা তৈরি ভয় দিয়ে ভক্তি দিয়ে সন্ত্রম দিয়ে। তার নাম শুধু বাড়ি, কুঠি নয়। আর, অদৃষ্টে সুখ না থাকলে, নিজের বাড়িও ভোগ করা যায় না। বাড়িটা তিনি ভাড়া দিয়েছিলেন এক মাদ্রাজীকে, অনেক টাকায়। নােটিশ দিলেও সে বাড়ি ছাড়ছে , বলছে আরাে কিছু দিন সময় চাই। মিস্টার সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, শেষকালে কিনা তাকেই বাদী হয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় গিয়ে দাড়াতে হবে। প্যাকিং প্রায় শেষ, শুধু নিচে ড্রয়িংরুম আর উপরে শশাবার ঘরটা ছাড়া। খাট খুলে ফেলে রাতের বিছানাটা মেঝেয় পাততে গৃহিণীর কষ্ট হচ্ছে। আর, এখন, যবনিকা পড়ে গেলেও, গ্রীন-রুমে কেউ-কেউ আসতে পারে ভেবে ড্রয়িংরুমটা গুটোনাে হয়নি। শ্মশানে পুড়িয়ে আসার পর লােক যেমন মুখে বাড়ি ঢােকে মিস্টার সরকারের তেমনি মুখ। তিনি ড্রয়িংরুমেই প্রবেশ করলেন। সমস্তই ঠিক আছে, পিতলের ডাববার থেকে ব্র্যানাের কৌটোটি পর্যন্ত। কেবল মাঝখান থেকে তিনিই বেঠিক হয়ে গেছেন। দুটো ছেলে, একটাও মানুষ হয়নি, একটা ঢুকেছে ফিমে, আরেকটাকে স্বদেশী ব্যাঙ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বহু টাকা আমানত দিয়ে, ব্যাঙ্কটি গণেশ উলটেছে, ছােট একমাত্র মেয়েটার যেখানেই সম্বন্ধ করতে যান, বিশ হাজারের কম কেউ হাঁকে না। এর পর তার বৈঠক খানা ঘরের কি চেহারা হবে কল্পনা করে বুক তার কয়েক ইঞ্চি দমে গেল। গৃহিণীর ইচ্ছে এসব আসবাবপত্র তিনি বিক্রি করে দিয়ে যান মায় মােটরগাড়ি, যেমন তিনি পুরােনাে খবরের কাগজ, কম্পাউণ্ডের ঘাস, বাগানের বাঁধাকপি বিক্রি করেন। নইলে এগুলাে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন, যখন তাদেরকে এখন ভাড়াটে বাড়িতে গিয়ে উঠতে হচ্ছে, ৪৫ অবত আর যখন এদের জন্যে কাণাকড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে না। তবু, কেমন খারাপ দেখায়, এদেরকে একেবারে ছেড়ে দিয়ে যেতে। কত আনন্দদায়ক স্মৃতি এতে জড়ানাে। তা ছাড়া পুরােনাে ল্যাবেলগুলাে এখনাে আঁটা আছে। গৃহিণী এরি মধ্যেই তার সাবেক মধ্যবিত্ততায় নেমে এসেছেন। দড়িদড়া নিয়ে তিনিই বাঁধছেন একটা ছালা যেটাতে এ মাসের উদ্বৃত্ত ঘুটে আর কয়লা রয়েছে সঞ্চিত। কবেকার ক’টা লণ্ঠন, কোন আমলের কটা শিশি। নতুন করে, আমূল নতুন করে, আবার যখন সংসার পাততে হবে, তখন কিছুই তিনি ফেলে যাবেন না। “কি গাে, যাবে নাকি পার্টিতে ? ‘আর পার্টি! গৃহিণী মুখবিবর দিয়ে বিরাট একটা নিশ্বাস ফেললেন। এটা নিতান্তই স্বাভাবিক, গৃহিণী এমন কাতর হয়ে পড়েছেন। স্বামীগৌরবে আলােকিত তার সৌভাগ্যশশী চিরদিনের জন্যে অস্ত যাচ্ছে। কোলকাতায় কে আর জানতে আসবে কত তার প্রতাপ ছিল! কে জানতে আসবে কত তিনি আপিল শুনেছেন, কত তিনি ইনস্পেকশন করেছেন, কত তিনি ফাস্ট-ক্লাশ টি-এ পেয়েছেন। হায়, আজ কিনা তাঁকে ইন্টার-ক্লাশে ফিরে যেতে হবে। মধ্যবিত্ত কি, মধ্যবিত্তেরাে অধম। আর তিনি ‘ব্যেরা বলে ডাকতে পারবেন না, তাকেও চাকর-বাকররা মেমসাহেব না বলে মা বলবে। ছেলেমেয়েদের জন্যে কাগজ-পেন্সিল কিনতে হবে। ডাক আসবে ডাক-পিওনের হাতে, কত দেরি করে। মালদা থেকে কেউ আম পাঠাবে না, সাতক্ষীরা থেকে নারকোলি কুল। দেখতে-না-দেখতেই সব শেষ হয়ে গেল। আর সভা ! কোলকাতার ফুল পুরস্কার বিতরণী সভায় আর তাকে কে ডাকবে মিষ্টি হেসে বই ‘ক’থানা এগিয়ে দেবার জন্যে ?
প্রজাপতয়ে ৪৬ স্ত্রীর মনের ভিতরটা মিস্টার সরকার দর্পণের মতাে দেখতে পেলেন। কিছু না বলে চলে গেলেন উপরে, পােষাক বদলাতে। অনেকক্ষণ ভাবলেন, ধুতি-চাদর পরবেন না সুট পরবেন, কোনটা বেশি প্রাসঙ্গিক হবে। আজকের দিনে ধুতিটাই বােধ হয় বেশি সম্রান্ত, কিন্তু নতুন যে সুটটা তিনি সাহেবী দোকান থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছেন সেটা আজো পরা হয়নি। সে-কথা ভেবে তার মনটা শিশুর মতাে আকুলিবিকুলি করে উঠলাে। ইহজীবনে কবেই বা সেটা পরবেন, যদি আজ না পরেন ! চিতায় উঠে আরেকবার কি বেশ-বদল হয় না? ভাবলেন মিস্টার সরকার। সেই মামুলি পার্টি। রঙিন কাগজের শিকল, ফুলের মালা আর ফিরপাের কেক। শেষােক্তটা অবিশ্যি বড় টেবিলে যেটাকে ঘিরে সহরের গণনীয়েরা বসে, আর সব খুচরাে টেবিলে সিঙাড়া আর পান্তুয়া। সেই ওপেনিং সঙ্গ, বক্স-হামোনিয়ম বাজিয়ে, গানের বিষয়টা যেখানে সম্পূর্ণ অবান্তর। তারপরে সেই নিষ্প্রাণ বক্তৃতা, কাটা বা মুখস্ত করা, আর তার উত্তরে মিস্টার সরকারের কান্না-উপচাননা করুণ কাতরতা—সবাইকে তিনি ছেড়ে যাচ্ছেন, সবকিছুকে তিনি ছেড়ে যাচ্ছেন। তারপরে, মৃতের উপরে খঙ্গের আঘাতের মতে, আরেকটা গান, সভার পরিভাষায় যাকে বলে কনডিং সঙ্গ। সমস্ত রাত মিস্টার সরকার আর তাঁর জীবনসঙ্গিনী কেউই ভালো ঘুমুতে পারলেন না। ঘুম থেকে উঠলেন, তখন রােদ উঠে গেছে। জীবনে এই প্রথম ব্যতিক্রম, ঘুম থেকে উঠেই রােদের মুখ দেখা, বিস্বাদ নিরানন্দ রােদ। আজ আর জগজ্জ্যোতি আটটার সময় মান করলেন , পােষাক পরলেন না, হাত মুখ ধুয়েই যেমনটি ছিলেন তেমনি ভাবে পায়ের চটি ফটফটিয়ে নিচে নেমে গেলেন। এই তঁার ধুতিতে অবতরণ হলাে।
৪৭ দেখলেন নিচেটা শূন্য, কেউ কোথাও নেই, কেউ আসবেও না আর। সেই দিন থাকলে সামান্য সর্দি হয়েছে শুনেই কাতারে-কাতারে লােক আসতাে তাঁকে দেখতে। আর, আজ তাঁর এই দুঃসময়ে কারুরই টিকির ডগাটি পর্যন্ত দেখা গেল না। উপায় নেই, রিপাের্ট তিনি দিয়ে দিয়েছেন, তার আর রদবদল সম্ভব নয়। সংসার এমনই অকৃতজ্ঞ। সিগারেট ধরিয়ে বাসি খবরের কাগজটা কুড়িয়ে নিয়ে জগজ্জ্যোতি বসলেন তার ড্রয়িংরুমে। হঠাৎ জুতাের আওয়াজ শুনে চেয়ে দেখলেন সত্যপ্রকাশ। আজকের দিনে বিশিষ্ট বন্ধুকে সম্বর্ধনা করবার যে কী ভাষা, জগজ্জ্যোতি হঠাৎ খুজে পেলেন না। সত্যপ্রকাশ এখানকার একজন বয়স্ক উকিল, খ্যাতিসম্পন্ন। কালেজী জীবনে একসঙ্গে ছিলেন এক হােস্টেলে, এক ঘরে, প্রথম যৌবনের নির্বোধ প্রগল্ভতায় দু’জনের মধ্যে গভীর অন্তরঙ্গতা ছিল। তারপর কে কোথায় ছিটকে পড়লাে, একজন তক্তপােষের উপরে আরেকজন মেঝেয়। তবু কোনদিন, মানে এ ক’দিনের মধ্যে কোনােদিন, বন্ধুতার সুতাে ধরে সত্যপ্রকাশ কাছে আসতে চাননি, বরং যতদূর সম্ভব সুতাে ছেড়ে দিয়ে ব্যবধানটাকে তিনি বিস্তীর্ণ করে রেখেছিলেন। কিন্তু ঘুড়ি যখন আজ কাটা পড়েছে, তখন কী আসে-যায় সুতােয় মাঞ্জা ছিল কি । -ছিল! “কি হে, কোনাে অসুখ করেছে নাকি? ঘরে ঢুকতে-চুকতে সত্যপ্রকাশ জিগগেস করলেন। ‘কাল সমস্ত রাত ঘুমুতে পারিনি। বােধ হয় ব্লাডপ্রেসারটা বেড়েছে। গড়িয়ে রইলে কেন ? বােসস। সত্যপ্রকাশ একদৃষ্টে দেখছিলেন জগজ্জ্যোতিকে। খর্বাকার, প্রজাপতয়ে ৪৮ স্থূলােদর, পেশীবলিষ্ঠ সেই জগজ্জ্যোতি একদিনেই কেমন বুড়, জীর্ণ- বিজীর্ণ হয়ে গেছে। যেন উঠে এসেছে কোনাে শশাকের সমুদ্র থেকে, এক জনহীন তৃণগুল্মহীন মরুভূমিতে। এমনি একটা ব্ৰস্ত, আত চাহনি। সত্যপ্রকাশ মুখখামুখি একটা কৌচে বসলেন। বললেন, “আমি ভেবেছিলুম, গভীর আনন্দে কাল তুমি ঘুমুবে, ফুলশয্যার রাতের পরে এই আরেকটা তােমার রাত। সেই রাতটা ছিল জাগবার আর এটা ঘুমুবার। নিজের রসিকতায় নিজেই সত্যপ্রকাশ হাসলেন। ‘ঘুমুব? জগজ্জ্যোতি কথাটা এমন ভাবে বললেন যেন পিছন থেকে পিঠে তার কে ছােরা মেরেছে। ‘ঘুমুবে না? নাকে তেল দিয়ে ঘুমুবে। এতদিন প্রাণপণ পরিশ্রমে কাজ করেছ, এখন সসম্মান বিশ্রাম মিলেছে—এই তত ঘুমুবার সময়, এই তত জীবনের মুক্তি, জীবনের আরম্ভ। আমি হলে তাে হাত-পা তুলে নাচতুম, মুখ ভার করে জরদগবের মত বসে থাকতুম না। সত্যপ্রকাশ উচ্চশব্দে হেসে উঠলেন। জগজ্জ্যোতি নির্বোধের মতাে তাকিয়ে রইলেন। পরে, বহু দিনের রুগীর মতাে দুর্বল গলায় বললেন, “তুমি বলছ কী পাগলের মতো? আমার মনে হচ্ছে আমি এখন জলের বাইরে মাছ, যেন নিশ্বাস নিতে পাচ্ছি না। সমস্ত নােঙর আমার ছিড়ে গেছে। বলতে পারাে, আমার সময় কি করে কাটবে—আমার দিন, আমার রাত, সকাল আর সন্ধে ? পায়রা বলতে?” ‘খুব পারি। স্রেফ ঘুমিয়ে। সত্যপ্ৰকাশ আবার হাসির রােল তুললেন। পরে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ঘুমুতে না পারে, বেরিয়ে দেশ ছেড়ে। ফিলিপাইনসে চলে যাও, চলে যাও নিউ জেল্যাণ্ডে।
৪৯ তুমি এখন স্বাধীন, তােমাকে আর পায় কে! আমি হলে তাে ঠিক তাই চলে যেতুম। “তুমি কী যে বলাে ! জগজ্জ্যোতি মনে-মনে মানচিত্রটা কল্পনা করলেন, কিন্তু কিছুরই সন্ধান পেলেন না। ‘অতদূর না পায়রা, ভারতবর্ষটাই চষে দেখ। বাঙলার মফস্বলের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখ একবার এই চমৎকার দেশটাকে। কাজ, কাজের কি আর অন্ত আছে ? আর কিছু না পাও, একটা কিছু নেশা পরােনা, স্কুল অর্থে কিছু বলছি না, কেননা তােমার সেই স্নায়ুই আর নেই—নেশা ধরাে মানে, take to a hobby, একটা কিছুতে সখ করে ফেলবই কি বাগান কি শিকার কি ফটোগ্রাফি। নেহাৎ আর কিছু পারে, পুরীর সমুদ্রে গিয়ে ঝিনুক কুড়ােও। ঠিক বাঁচবে দেখাে, ঠিক ঘুমুতে পারবে। ‘আমি আর কোনাে কাজেরই উপযুক্ত নই। জগজ্জ্যোতি শশাকাচ্ছন্ন কণ্ঠে বললেন, জীবনের একটা জানলাও আর আমার খােলা ছিল না। আমি অন্ধকূপে বসে ছিলুম। আজ সব দরজা-দেয়াল ভেঙে যাওয়াতে এত আলাে-হাওয়া সইতে পারছি না, আমার দম আটকে- আটকে আসছে। “তবে আর কি, বাড়ি ফিরে গিয়ে ইস্কুলের একটা মাস্টারি নাও। এটার অসম্ভবনীয়তায় দুজনেই হাসলেন। অতি কষ্টে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস মদিত করে জগজ্জ্যোতি বললেন, “আমি জানি আমার কী করে সময় কাটবে। “কী করে? বাজার করে, পার্কে বেড়িয়ে আর রাস্তার ধারে দাড়িয়ে দোকানের রেডিয়াে শুনে। ৪ প্রজাপতয়ে সত্যপ্রকাশ হাসতে চাইলেন অথচ হাসতে পারলেন না। ‘আর দিনের পর দিন, প্রতিদিন দিন গুনে। আর, তারি মাঝে, মাঝে- মাঝে চিনির ওজন আর রক্তের চাপ দেখে। আর ঐ যা বললে, ঘুমিয়ে। কিন্তু জাননা, এ পর্যন্ত দুপুরে একফোটা ঘুমুইনি কোনােদিন। ভোেন্যাল খেতে হবে হয়তাে। ‘কেন, বই, বই নেই ? সত্য প্রকাশ উল্লসিত হয়ে বললেন। ‘বই ? জগজ্জ্যোতি তাকালেন একবার তার বুক-কেসের দিকে। সেখানে কয়েকখানা কি বই সাজানাে আছে, যা তিনি কোনদিন পড়ে দেখেন নি, যা তিনি আসবাব-রূপেই ব্যবহার করে এসেছেন। বই। কত বই এসেছে তাঁর বাড়িতে, চাপরাশির কঁাধে চড়ে, সমস্ত টেবিল আর মেঝে প্লাবিত হয়ে গেছে। আরাে বই, এখনাে বই-জগচ্চ্যোতির মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে একটা সূচ চলে গেল। পরে, কী মনে করে বললেন, “হ্যা, উপনিষৎ কয়েকখানা কিনে নিতে হবে। ‘উপনিষৎ ? ‘তবে কি তুমি ল-ডাইজেস্ট কিনতে বলল? উপনিষৎ ছাড়া আর পড়বার কী আছে এই বয়সে ? দেয়ালের ঘড়িটা এখনাে প্যাক করা হয়নি, আওয়াজ করে দশটা বাজলাে। নিজেরাে অজানতে চটি-জুততার মধ্যে পা ঢুকিয়ে জগজ্জ্যোতি ধড়মড় করে উঠে দাড়ালেন : “কী সর্বনাশ, একেবারে খেয়াল নেই, দশটা বেজে গেছে। সত্যপ্রকাশের সম্পূর্ণ খেয়াল ছিল, তাই তিনি কোনাে চাঞ্চল্য দেখালেন না। বললেন, “অত তাড়া কিসের? আজ থেকে তত তােমার আর চাকরি নেই। ও, হ্যা। জগজ্জ্যোতি বসে পড়লেন। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘তবু এতদিনের অভ্যেসটা ভাঙতে কেমন অসুবিধে লাগে। আচ্ছা, তুমি এখন চা খাবে? সত্য প্রকাশ স্বল্প হাসলেন। বললেন, “তােমার মতাে ছাড়া পেলে চা কেন আরো-কিছু হয়তাে খেতুম । কিন্তু মুখের রক্ত না ওঠা পর্যন্ত আমাদের মুক্তি নেই। সুতরাং দশটা বেজেছে বলে তােমাকে উঠতে হবে না, উঠতে হবে আমাকে। আজ বিকেলেই যাবে নাকি ? জগজ্জ্যোতিও উঠলেন : ‘হঁ্যা, বাছাদা এখনাে কিছু বাকি আছে। বিকেলে স্টেশনে এসে দেখলেন, কেউ নেই। না, লােক আছে বিস্তর, কিন্তু তারা তাঁর কেউই নয়। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের উপর দিয়ে অনেক পাতার গেট, ফুলের মালা, কাগজের নিশান, ছাপানাে চিঠি, পটকার শব্দ, চায়ের পেয়ালা, কেকের প্লেট, কই মাছের হাঁড়ি, ঘিয়ের টিন একাকার হয়ে তালগোল পাকিয়ে ছত্রখান হয়ে চলে গেল। ইন্টারক্লাশের ছােট একটা কামরায় তিনি মুখ লুকিয়ে বসলেন। কেউ যে আসেনি, ভালােই করেছে। এইখানেই পড়তে পারতাে যবনিকা, কিন্তু আরাে একটা ট্রেন আছে, সেটা চলেছে দক্ষিণে, মাস কয়েক পরে। ইন্টার-ক্লাশের কামরাটা জনাকীর্ণ। এতক্ষণ লক্ষ্য করেননি, কিন্তু গাড়ি অনেক দূর চলে আসার পর জগজ্জ্যোতির মনে হলো, কোণের ঐ লােকটিকে তিনি যেন কোথায় দেখেছেন। চট করে মনে করে ফেলবার কথা নয়, কেননা কত জায়গায় কত লােকের সংস্রবে তাকে আসতে হয়েছে, কত বৎসর ধরে। কিন্তু সব চেয়ে আশ্চর্য, সেই অধ-বিস্মৃত লােকটও তার দিকে চেয়ে আছে, অপলক দৃষ্টিতে। সুধাময়, অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে জগজ্জ্যোতির খেয়াল হলাে। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “আরে, সুধাময় না ? ০ প্রজাপতয়ে সুধাময় এক লাফে মাঝের বেঞ্চি পেরিয়ে তার কাছে উপস্থিত হলাে। বললে, “আপনাকে প্রথমটা একেবারেই চিনতে পারিনি। এ কী হয়ে গেছেন আপনি। চেনা কঠিন, জগজ্জ্যোতি তা নিজেই জানেন। কিন্তু সুধাময় সে-অর্থে বলেনি। চেহারা তাঁর আধখানা হয়ে গেছে, সেই অভিজাত পৃথুলতার চিহ্নও কোথাও নেই, দুই চোখে কেমন একটা শুষ্ক জ্বলন্ত দৃষ্টি। ‘আপনার শরীর কি খুব খারাপ? ‘হঁ্যা, ইনসােমনিয়া, ঘুমুতে পারি না। বসে থেকে-থেকে আর ঘুম হয় না। তবে চলেছেন কোথায় ? চেঞ্জে ? ‘হা। জগজ্জ্যোতি হাসলেন : “আর তুমি ? ‘সেই একটা চাকরির কথা আপনাকে একদিন বলেছিলুম না, যার জন্যে আমাকে আপনি একটা ব্রিলিয়্যান্ট সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন ‘হা, হা, জগজ্জ্যোতি শিউরে উঠলেন : কি হলাে সেটার ? পেলে ? ‘না, পাইনি এখন। সুধাময় হাসলাে : ‘তবে একটু আশা হয়েছে। জগজ্জ্যোতি তার দিকে অর্থহীন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। ‘সেখান থেকে ইনটারভিয়ুর চিঠি দিয়েছে। কাল ইনটারভিয়ু। তাই চলেছি। অনেক য়্যাপ্লিক্যান্ট, তবে খোঁজ নিয়ে জানলুম, বাঙলা দেশ থেকে আমিই একমাত্র নির্বাচিত হয়েছি। কৃতজ্ঞতায় বিগলিত হয়ে সুধাময় বললে, “যদি হয়, আপনার জন্যেই হবে। আপনার সার্টিফিকেটটাই কাজ করেছে। আপনার ঋণ এ-জীবনে শুধতে পারবাে না।
অবস্ত নীরক্ত মুখে মৃত গলায় জগজ্জ্যোতি বললেন, “যদি পাও, একদিন খাইয়ে দিয়ে। ট্রেন চলছে, জগজ্জ্যোতির মুখে আর কথা নেই। সুধাময় বুঝলে তিনি অত্যন্ত অসুস্থ, শরীরটা একটু বিস্তৃত করতে পেলে যেন বিশ্রাম পান। তাই যাত্রীদের বসার অনেক অদল-বদল করে জগজ্জ্যোতির জন্যে সে শশাবার জায়গা করে দিল, নিজে বসলাে গিয়ে একটা কার ট্রাঙ্কের উপর। বললে, “আপনি একটু শােন। দেখুন ট্রেনের আওয়াজে যদি ঘুম আসে। জগজ্জ্যোতি জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘না, এই বেশ আছি। কতক্ষণ পরে কি একটা স্টেশনে এসে গাড়ি থামলাে। দু’ দরজাতেই ভিড়, যত লােক নামে তার চেয়ে বেশি এসে জড়াে হয়। একটা কুলি ধরে জগজ্জ্যোতি জানলা দিয়ে তার মাথায় সুটকেস আর বিছানাটা চালান করে দিলেন, আর ভিড়ের মধ্যে আত্মগােপন করে নেমে পড়লেন গাড়ি থেকে। সুধাময়কে কিছুই বললেন না। কি-ই বা বলবেন! একমাত্র বলতে পারতেন যে, বাঙলা দেশ থেকে পদপ্রার্থী সে একা নয়, আর একাই সে ইনটারভিয়ুর নিমন্ত্রণ পায়নি। বলতে পারতেন, কিন্তু পারলেন না বলতে। কি জানি কেন, নতুন জায়গায় অপরিচিত স্টেশনে ইলেকটিকের আলােতে অসংখ্য জনসমাবেশের মধ্যে সুধাময়ের একটা কথা মুহুর্মুহু তাঁর মনে পড়তে লাগলাে : ‘পথ জুড়ে আর কত পড়ে থাকবেন? একটু নতুন বােদ, নতুন রক্ত আসতে দিন। কুলিকে একটা আলাের নিচে দাড় করালেন। নামিয়ে নিলেন মাল দুটো। তারপর তাকে বিদায় করে দিয়ে তাকালেন চারদিকে।
প্রজাপতয়ে
৫৪
কোটের ভিতরকার পকেট থেকে বার করলেন ভঁজ-করা সেই
ইনটারভিয়ুর চিঠিটা । তীক্ষ্ণ
চক্ষুতে একবার পরীক্ষা করে দেখলেন, আর
কোনাে দরকারী জিনিস কিনা। না, সেই চিঠিটাই। বারেবারে
পড়লেন, এ-পিঠ ওপিঠ দেখলেন, যেমন বহু দলিল তিনি দেখেছেন,
সেই চিঠিটাই, তার নাম, পােস্টাপিসের ডেট-স্ট্যাম্প, প্রেরকের
ঠিকানা-কোনােই ভুল নেই। এভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে দৃঢ়সিদ্ধান্ত হয়ে
চিঠিটা খণ্ড-খণ্ড করে ছিড়ে ফেললেন। সামনে তাকালেন অন্ধকারে,
ট্রেনের পিছনের আলােটা কোথাও দেখা গেল না।
থিল
No text on this page.
অভাবনীয়েরাে একটা সীমা থাকা উচিত। আপিসেই সুরজিৎ তার পেলাে, রাতে, বরিশাল এক্সপ্রেসে অশােকা আসছে। আশ্চর্য, অশােকা কি জানে না কিছুই ? ঘটনাটা তাে ঘটে গেছে আজ এক বছরেরাে উপর। তবু, রাতে, বেশ একটু আগেই সুরজিৎ স্টেশনে গেল। গাড়ি ঠিক রাখলো। এবং যতক্ষণ না বাকের মুখে ইঞ্জিনের হেড-লাইট দেখা যায় ততক্ষণ প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত চিন্তিত ভঙ্গিতে পাইচারি করলাে। ইন্টার-ক্লাশের মেয়ে-কামরা থেকে নামলাে অশােকা। বয়েস—বয়েস প্রায় ত্রিশের কাছে, এবং নিঃসম্বল ও নিরভিভাবক যখন সে আসছে, বুঝতে হবে সে কুমারী ও স্কুল-মিসট্রেস। আঠারাে ইঞ্চির একটা পাৎলা সুটকেস ছাড়া সঙ্গে আর কোনাে জিনিস নেই। শীতের রাতে বিছানাও নিয়ে আসেনি। মােটা সিল্কের একটা ব্লাউজ মােটে গায়ে-শীতের রাতে যার সংক্ষিপ্ততার চেয়ে হঠকারিতাটাই বেশি করে চোখে পড়ে। দু’জন পরস্পরের দিকে চেয়ে সংক্ষেপে হাসলাে। প্রায় দশ-এগারাে বছর পরে দেখা। কিন্তু চিনতে কারুরই দেরি হলাে না। যেন কিছু দিন আগেই আর কোথাও তাদের এমনি অপ্রত্যাশিত দেখা হয়েছে। ‘একেবারে তুমি যে আসবে তা ভাবিনি। অশােকা সলজ্জমুখে সামান্য হাসলাে : ‘ভেবেছিলাম আালি-চাপরাশি কাউকে পাঠিয়ে দেবে হয়তাে। ‘আর্দালি-চাপরাশি কেউ রাতে থাকে না। সুরজিৎ অশােকার হাতের ব্যাগটার দিকে তাকালাে। বললে, সঙ্গে আর কোনাে জিনিস নেই ? না। কুষ্টিত ভাবে হেসে অশােকা বললে, এক দিনের তাে মােটে মামলা।
প্রজাপতয়ে ৫৮ ; সুরজিৎ ব্যাগটা অশােকার হাত থেকে তুলে নিলাে। অশােকা আপত্তি করলাে না। কিন্তু সেটা তক্ষুনি সে কুলির মাথায় চালান দেবে জানলে নিশ্চয়ই আপত্তি করতে, জোর করলেও ছেড়ে দিতাে না। গাড়িতে উঠলাে দুজনে। অশােকা আগে-পিছনের সিটে ; সুরজিৎ মুখােমুখি। বাক্সটা গাড়ােয়ানের জিম্মায়। সংসারে জিনিস যার এত অল্প সে যে কতদূর দুঃসাহসী এই কথাটাই সুরজিৎ ভাবলল। প্রয়ােজন তার বেশি না প্রয়ােজন তার কম, এই কথাটাই সে বুঝে উঠতে পারলাে না। বললে, “আমার ওখানে যে চলেছ খুব অসুবিধে হবে। ‘কার ? আমার না তােমার ? ‘তােমার। জানাে তাে’, সুরজিৎ একটু থেমে বললে, “আমার স্ত্রী, জয়ন্তী বছর দেড়েক হলাে মারা গেছে। ‘া, কাগজে দেখেছিলুম খবরটা। গণ্যমান্যকে বিয়ে করলে স্ত্রীও গণ্যমান্য হয়। অশােক একটু হাসলাে কিনা বােঝা গেল না। সুরজিৎ বললে, “বাড়িতে একেবারে একা আছি। মেয়েছেলে কেউ নেই- “কেন, আমিই তাে আছি। অশােকা স্বচ্ছন্দভাবে বললে। “কিন্তু কে তােমার দেখাশুনা করে ! ‘আমি নিজেই করতে পারবে। এতদিন ধরে তাই করে এসেছি। একটুখানি কাটলাে। সুরজিৎ প্রশ্ন করলাে : ‘এখানে কেন এসেছ জানতে পারি ? ‘আশ্চর্য, তুমিও একটা কৈফিয়ৎ না পেলে সন্তুষ্ট হবে না? গাড়ির অন্ধকারের মধ্যে অশােকর চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল দেখালাে। “সমস্ত রাস্তা গাড়িতে এক ভদ্রমহিলার কাছে লম্বা জবাবদিহি দিতে হয়েছে।
খিল
কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কার বাড়িতে যাচ্ছি, সে আমার কে
হয়, সেখানে আর কে-কে আছে, ইস্টিশানে কে আসবে নিতে—এক
গাদা প্রশ্ন। উঃ, প্রাণ প্রায় যায়।
‘সবগুলি উত্তরই বেশ সন্তোষজনক হয়েছিলাে আশা করি।
‘অন্তত ভদ্রমহিলা তাই মনে করেছিলেন। অশােকা শব্দ করে
হেসে উঠলাে।
‘ও-সব প্রশ্নের বেশির ভাগ উত্তরই আমার জানা, শুধু একটা ছাড়া।
কেন এসেছ সেইটেই শুধু জানতে চাই।
‘এমনিতে আসতে পারি না?
‘কেউ পেরেছে বলে তাে শুনিনি এ পর্যন্ত।
‘কেউ মানে?
‘কেউ মানে বয়স্ক কুমারী মেয়ে। একাকী কোনাে পুরুষের আশ্রয়ে।
বলাে না, কেন, কী দরকারে এখানে এসেছ ?”
‘বাবাঃ, কী কোতুহল তােমার! অশােকা আঁচলটা একটু টানলাে,
চুলটা একটু অনুভব করলাে, গলার হারটা একটু আঙুল দিয়ে নাড়লাে।
বললে, “তােমাদের এখানকার মেয়ে-ইস্কুলে হেডমিসট্রেসের চাকরিটা পাবাে
বলে মনে করছি। কাল সকালে তারই ইন্টারভিয়ু।
‘সে ক্ষেত্রে, সুরজিৎ একটু কাশলাে : ‘মেয়ে-ইস্কুলের হস্টেলে ওঠাটাই
কি ঠিক ছিল না? কাল সকালে ইস্কুলের সেক্রেটারি যদি জিগগেস
করেন, কোথায় ছিলে, তা হলে তােমার মুখের জবাব শুনে খুব বেশি
তিনি খুসি হবেন বলে মনে হয় না।
‘প্রথমতত, তাঁর সে-কথা জিগগেস করাই উচিত হবে না, দ্বিতীয়ত,
অশােকা সহাস্য স্বাচ্ছন্দ্যে বললে, “তােমার মত এত ভীতু তিনি না-ও
হতে পারেন।
প্রজাপতয়ে এর উত্তরে সুরজিতের কথাটা কেমন গম্ভীর, একটু বা বােকাটে শােনালাে। সে বললে, ‘এক-আধটু ভীতু হওয়াটা মন্দ নয়। বিশেষ করে তার, যে চাকরি করতে বেরিয়েছে। ‘তােমার মতাে চাকরির জন্যে আমার অত মায়া নেই। নাই বা হলাে চাকরি। বলে অশােকা গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে গলাটা সামান্য উচু করে ধরলাে। কেমন যেন তাকে অত্যন্ত শ্রান্ত ও অসহায় দেখালে হঠাৎ। মনে হলাে যেন তার হাত-পা গাল-গলা শীতে নিদারুণ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। প্রথমে একটা সাদা গেঞ্জি, তার উপরে উলের গেঞ্জি, তার উপরে ফ্লানেলের পাঞ্জাবি, তার উপরে শাল-তবু সুরজিতের শীত মানছে না, ইচ্ছে করছে প্রকাণ্ড একটা লেপ জড়িয়ে বসে থাকে, অথচ এই গলিত শীতে ঐ তার চেহারা। এটা হতাশা না ঔদ্ধত্য তা কে বলবে। অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতে-থাকতে সুরজিতের চক্ষু কেমন কোমল হয়ে এলাে। বললে, ‘তােমার শীত করছে না ? না। সুরজিৎ অল্প একটু হাসলাে। বললে, ‘শীতের কাছে ভীতু হওয়াটা অশাস্ত্রীয় হবে না। আমার গায়ের কাপড়টা নাও। বলে শালটা গা থেকে খুলে নিয়ে অশােকার কোলের উপর সে রাখলাে। অশােকা চমকে উঠলাে। বললে, “দেখাে, তােমার না ঠাণ্ডা লাগে। আগে-আগে একটুতেই তােমার ঠাণ্ডা লাগতে—ব্রঙ্কাইটিসের দোষ ছিল। সে সব এখন সেরে গেছে, না ? ‘কিছুই সম্পূর্ণ সারে না। ‘তবে তুমিই গায়ে রাখে। একা-একা আছ, অসুখ-বিসুখ হলে মুস্কিল হবে।
৬১ খিল ‘তার চেয়ে আরাে মুস্কিল হবে যদি তােমার অসুখ করে। অশােকা আবার হেলান দিল। ক্লান্তরেখায় গলাটা আবার একটু উচু করলে। ‘কী, খুলে গায় দাও না।” ‘না, এই বেশ আছি। শালটা তেমনি রইলাে অশােকার কোলের উপর পড়ে। গাড়ি থেকে নামবার সময় কি মনে করে শালটা সে তাড়াতাড়ি গায়ে জড়িয়ে নিলাে। প্রকাণ্ড বাড়ি। একজনের পক্ষে অত্যন্ত বিসদৃশ। নিচে দু’খানা ঘর, একটাতে বৈঠকখানা, পাশেরটা ভাড়ার। চেয়ার-সােফা ও য়্যাশ- ট্রের আধিক্য দেখে বােঝা যায় বৈঠকখানায় প্রচণ্ড আড্ডা বসে। আর, পাশের ঘরে থাকে-থাকে থরেথরে জিনিস দেখে মনে হয় কী নিপুণ নিখুত গৃহস্থালি ! অথচ সব চাকর-ঠাকুরের হাতে। একটা ঠাকুর দুটো চাকর, কোথা থেকে কুটোটি কুড়িয়ে নেবে তারি জন্যে সর্বদা তটস্থ। ঘােড়দৌড়ের মাঠের মতাে অত বড় না হলেও প্রকাণ্ড উঠোন, তার এক পাশে আনাজের ক্ষেত, অন্য পাশে দিশি ক’টা ফুল-গাছ, কিন্তু কোথাও একটা শুকনাে পাতাও পড়ে নেই। বাবু যদি বলে তবে ওরা অনায়াসে প্রাণ দিতে পারে এমন একটা ভাব যেন ওদের মুখের উপর লেখা আছে। কোনাে জিনিসই যেন হাত বাড়িয়ে চাইতে হয় না, সব আগে থেকেই তৈরি। এতটা ভালাে নয়, যেন কেমন চোখকে পীড়িত করে—অশােকার মনে হলাে। কেননা যে একা আছে তার ঘর-দোর খানিকটা অগােছালাে এটাই সকলে প্রত্যাশা করে। এইটাই সকলের প্রত্যাশা করা উচিত। নিচে স্নানের ঘরে একটু উকি মেরে অশোেকা সুরজিতের সঙ্গে উপরে উঠে এলাে। উঠেই উত্তরের বারান্দা। পাশাপাশি দুখানি সমান মাপের ঘর, উত্তরে দক্ষিণে দরজা। দু ঘরের মাঝখানে একটা দরজা আছে প্রজাপতয়ে অবারিত খােলা,যেটায় কোনদিন এ পর্যন্ত খিল পড়েনি। প্রথমেই ডাইনে যে ঘর 'সে ঘরটা কিসের যে নয় অশােকা ভেবে পেলো না। বিশালকায় এক টেবিল, দেখলেই সন্দেহ হয় এ-টেবিলের চার পাশে বসেই রাউণ্ড- টেবিল-কনফারেন্স হয়েছিলাে কিনা। আফিসের বাক্স, বেতের বাস্কেট, ফ্ল্যাট- ফাইলে ফিতে-বাঁধা কাগজপত্রের স্তুপ, আইনি-বেআইনি মােটা-মােটা বই—কী যে তাতে নেই তা কে বলবে? কিন্তু সমস্তই অদ্ভুত রকমের গুছােনন। খােলা দুটো সেলুফে বেসাঘেসি করে বই সাজানাে রয়েছে; কিন্তু আশ্চর্য, দু’খানা বইয়ের মাঝখানে কোথাও একটু ফাক নেই, কোথাও একখানা বই বেঁকে বা হেলে বসেনি। ওদিকের দেয়াল ঘেসে লম্বা একটা কাঠের বেঞ্চি, তাতে ট্রাঙ্ক আর সুটকেস সাজাননা, একটার উপর একটা। ঘরে স্ত্রী না থাকলেও যে কেউ বাক্স-প্যাটরাগুলি রঙচঙে কাপড়ের ঢাকনি দিয়ে সযত্নে ঢেকে রাখে অশােকা তা কল্পনা করতে পারত না। পাশেই দেরাজ-টানাগুলােতে হয়তাে আপিসের পােষাক থাকে। তারই সন্নিকটে দেয়ালে ঝোলানাে লম্বা একটা আয়না । আয়নাতে শরীরের অনেকখানি দেখা যায় বলে অশােকার কেমন লজ্জা করে উঠলাে। দেরাজের উপরকার একটা ছবি দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি সেটা সে টেনে নিলাে। না, মৃত-জীবিত কোনাে মানুষেরই সেটা ছবি নয়, সেটা একটা সদ্য-উদ্ভিদ্যমান গােলাপের কুঁড়ি। আয়নার দু পাশে দুটো ছােট টেবিল, যদিও ডাইনেরটা অপেক্ষাকৃত বড়ো। বাঁয়েরটাতে প্রসাধনের জিনিস, ডাইনেরটাতে ওষুধ। দুটোই যেন ভীষণ বাড়াবাড়ি বলে মনে হলাে। খানিকটা অন্যায় কৌতূহলের মতাে দেখায় বলে অশােক বেশিক্ষণ সেখানে চোখ রাখলাে না। পাশেই আলনা আর দুটো ব্র্যাকেট, একটা কাপড়ও কোথাও একটু কুঁচকে বসেনি। আলনার শেষ তাকে সারা জুতাের লাইন, খিল ইলেকটিকের আলােয় চকচক করছে। এরি মধ্যে, এ-সবের মধ্যে, ঘরের মাঝখানে বেমানান একটা স্প্রিং-এর খাট। অশােকা জিগগেস করলাে : ‘এইখানেই শােও নাকি ? ‘না। শশাবার ঘর ঐ পাশে। পশ্চিমের ঘর থেকে পূবের ঘরে অশােকা এল, মাঝখানের দরজা দিয়ে। পশ্চিমের ঘরটা জিনিসপত্রে যেমনি জবরজঙ, পূবের ঘরটা তেমনিই ফাকা, নিরিবিলি। মাঝখানে প্রকাণ্ড খাট পাতা, বিঘৎ দুয়েক পুরু গদির উপর নরম তােষকে নিভাজ বিছানা করা রয়েছে। পায়ের দিকে লেপ রয়েছে ভাজ করা। একজনের পক্ষে যেন অনেক অপচয়, অনেক উন্নত্তি, তাকিয়ে থেকে অশােকার মনে হলাে। কিন্তু যতই সে শ্রান্ত হােক না কেন, এখুনি, রাত সাড়ে নটার সময় লেপ গায়ে দিয়ে সে শুয়ে পড়তে পারে না, এ কথাটা মনে হতেই সে চোখ ফিরিয়ে নিলে। পাশে একটা ইজি-চেয়ার, আলাের দিকে পিঠ করে। তার হাতের কাছেই ছােট টিপাইয়ের উপর টাইম-পিস ঘড়ি, কখানা ছ পেনি দামের হালকা বই আর কখানা রঙিন মলাটের চুটকি সাপ্তাহিক। একবার হাত দিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখলাে সে সেগুলি, যেমনি ছিল তেমনি আবার গুছিয়ে রাখলাে সন্তর্পণে। এ ঘরে ঢুকেই অশােক ভেবেছিলো দেয়ালজোড়া এনলার্জড একটা ফটোর সঙ্গে তার দৃষ্টির সঙ্ঘর্ষ হবে। কিন্তু আশ্চর্য, ঘরের চারদিকে কোথাও জয়ন্তীর একটুকরাে একটা ছবি নেই। অশােকার বুকের মধ্যে থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলাে। শব্দ শুনে নিজেই সে উঠলাে চকে, কেননা সে-নিশ্বাসটা যেন ঠিক দুঃখের মতন বলে মনে হলাে না। অন্য দিকে চোখ রেখে সুরজিৎ বললে, হাত মুখ ধপাবে না?
প্রজাপতয়ে ৬৪ ‘পুরােপুরি গা-ই ধােবাে। নইলে বড় ঘিনঘিন করবে। গরম জল পাবাে তাে ? ‘া, করেছে গরম জল। “দেখ, সাবান-তােয়ালে কিছু সঙ্গে আনিনি। অশােকা হাসলাে। ‘তা-ও পাবে। ‘সবই পাব। অশােকা বললে, নির্ব্যক্তিকের মতাে। পরে অনেকখানি হেসে : ‘কিন্তু যদি শাড়ি-সেমিজ চাই ? ‘তা দিতে পারবে না বটে, কিন্তু তার বদলে পাজামা আর ঢিলে পাঞ্জাবি দিতে পারবাে। পরে না, বেশ দেখতে হবে। অনেকেই তােত পরে আজকাল। একটু কি বিবেচনা করলে অশােকা। পরে নিতান্ত বালিকার মতাে খিলখিল করে হেসে উঠলাে। বললে, “তুমি কী যে বলল। বলে তার সুটকেসে চাবি পরালাে। নিচে, বাথরুমে এসে দেখলাে, সমস্ত কিছু তৈরি, প্রয়ােজনেরো অতিরিক্ত। প্রক্ষালন সমাপ্ত করে চাকর-ঠাকুরের সঙ্গে সে দুটো সাংসারিক কথা কইলাে নিতান্ত মেয়েলি কৌতুহলে। কিন্তু ভুলেও তারা একবার জিগগেস করলাে না, সে কে, কেন এসেছে, কেনই বা এতদিন আসেনি। উপরে গিয়ে দেখলাে, টেবিলের সামনে কিসব কাগজপত্র নিয়ে বসেছে সুরজিৎ। যেন কতদিনকার পুনরাবৃত্ত অভ্যাস, সুরজিৎ চেয়েও দেখলে না। খসখসে শাড়ির বহুবিস্তৃত বিশৃঙ্খলায় অশােকা যখন দ্রুত পায়ে উঠে সুরজিতের পাশ দিয়ে আয়নার কাছে এসে দাড়ালাে, তারাে মনে হলাে এমনি যেন আরাে কতদিন হয়ে গেছে এর আগে। নতুনত্বের তীব্রতার মাঝে জিনিসটাকে কখনাে-কখনাে অত্যন্ত পরিচিত ও প্রাত্যহিক
খিল
মনে হয়। হঠাৎ ময়ূর-সিংহাসনে গিয়ে বসলে মনে হয় এমনি যেন
কতদিনই বসেছি।
কিন্তু খটকা বাধলাে। অশােকা জিগগেস করলে : ‘তােমার মােটা
চিরুনি নেই ?
সুরজিৎকে তাকাতে হলাে এবার, আর তাকিয়ে সে ভয়ঙ্কর অবাক
হয়ে গেল। আর কিছুতে নয়, শাড়িটার চওড়া ঢালা লাল পাড়ে।
এই পাড়টা অত্যন্ত সেকেলে, আধুনিক
আধুনিক কুমারী মেয়েদের পছন্দের
বাইরে, এ-পাড়ের সঙ্গতির জন্যে কপালে ও সিথিতে যেন অনেকখানি
সিদুরের প্রত্যাশা করতে হয়। এ লালটা সন্তোগসৌভাগ্যের রঙ।
যেন বড় বেশি উদঘাটিত।
‘কী দেখছ, মােটা চিরুনি নেই ?”
‘চুল তাে আর ভেজাওনি, সরু চিরুনিতেই আঁচড়ে নিলে চলবে।
তা ছাড়া, সুরজিৎ হেসে বললে, ‘রুক্ষ চুলেই তাে বেশ ভালাে দেখায়।
চুল আঁচড়াবার আর দরকার হলাে না। নিজের থেকেই সুরজিতের
শাল গায়ে জড়িয়ে নিয়ে অশােকা বললে, “বাবাঃ, কী শীত এখানে।
‘তােমাকে এখন চা দেবে না একেবারে খাবে?
‘একেবারে খাবাে। অশােক অদ্ভুত করে হেসে উঠলাে।
‘কী খাবে? ভাত না লুচি?
‘তুমি ?
‘তুমি যা খাবে তাই।
‘আমি ভাতই খাবাে। ভাত না খেলে ঘুম হবে না। আমার সমস্ত
শরীর এখন ঘুম চাইছে।
‘তবৈ দিতে বলি ঠাকুরকে? সুরজিৎ চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেল।
‘দাড়াও, ব্যস্ত কী! অশােকা টেবিলের উপর দুই কনুই মেখে বুকে
প্রজাপতয়ে দাড়ালাে। বললে, “কাজ—এখনাে কাজ ? আমি এসেছি, তবু, আজকের রাতেও তােমাকে কাজ করতে হবে ? অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়ে সুরজিৎ কাগজ-পত্রগুলি দূরে সরিয়ে রাখলাে। বললে, ‘না, ঠিক কাজ নয়, একটু দেখছিলুম কাগজগুলাে। তারপর অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টায় একটু বা স্নানকণ্ঠে বললে, “তারপর “তারপর, এই তাে, ভাসতে-ভাসতে। উঃ, কী শীত এখানে! হাত দুটো আমার খেয়ে যাচ্ছে। মুঠ-করা দুই হাতের উপর চিবুক রেখে দাড়িয়েছিলাে অশােকা, হঠাৎ ডানহাতখানা দুর্বল ভঙ্গিতে সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, “এই দেখ না, যেন বরফ দিয়ে তৈরি। এক মুহুর্ত সুরজিৎ দ্বিধা করলে হয়তাে। তারপর সেই হাত সে একটু ছুলাে কি না-ছুলল। ব্যস্ত হয়ে বললে, গ্লাভস্ পরবে? আমার কাছে ভালাে গ্লাভস আছে। ‘আর মােজা ? অশােকা হাত সরিয়ে নিলাে এবং এবার রাখলাে তা শালের তলায়। ‘মােজাও দিতে পারি। খুব নরম, একটুও কুটকুট করবে না। “আর, কান-ঢাকা টুপি ? কার ? হাসতে-হাসতে অশােকা সরে গেল। বললে, ‘দস্তানা হাতে দিয়ে খাবার আমার অভ্যেস নেই। তুমি কাজ করে, আমি ঘুরে-ঘুরে তােমার বাড়ি দেখি। বলে সে নিঃশব্দে পাশের ঘরে চলে গেল। নিঃশব্দে, কেননা এত শীতেও এখন সে খালি-পা। কিন্তু কোথাও যেন তার এতটুকু আশ্রয় বা বিশ্রাম নেই। এমন একটুও কোথাও আগােছালাে হয়ে নেই যে সে গুছিয়ে দেয়। বিছানাটা পর্যন্ত পাতা হয়ে গেছে। ঘুরতে-ঘুরতে চলে এলাে সে দক্ষিণের বারান্দায়। দেখলাে সেখানে ৬৭ খিল কয়েকখানা বেতের চেয়ার পাতা রয়েছে। এখানে বুঝি কখনন-কখনন সুরজিৎ বসে, বসবার তার ইচ্ছে হয়, সব সময়েই তা হলে সে মন্ত টেবিলের সামনে খাড়া চেয়ারে বসে কাজ করে না। কিন্তু বাইরে কী কনকনে হাওয়া, এখানে এক মিনিট দাড়ায় এমন সাধ্য কার। কোথা থেকে কি একটা প্রচ্ছন্ন ফুলের ম্লান গন্ধ আসছে, তার উপর এমন চক্ষু- জুড়ানাে কালো অন্ধকার—কী ভেবে, শালটা গায়ের উপর আরাে ঘন করে টেনে নিয়ে অশােক একটা চেয়ারে ভেঙে পড়লাে। তারপর সুরজিৎ সত্যিই ফের কাগজ-পত্র নিয়ে বসেছিলাে। হু’স হলাে যখন ঠাকুর এসে বললে, খাবার জুড়িয়ে যাচ্ছে। ডাকলাে : ‘অশােকা। আশা ছিল দেখতে পাবে পাশের ঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে সে বই পড়ছে। কিন্তু আশ্চর্য, সেখানে সে নেই। বিছানাটাও অস্পৃষ্ট। দক্ষিণের দরজা খােলা দেখে চলে এলাে সে দক্ষিণের বারান্দায়। দেখলাে চেয়ারে শুয়ে অশােক ঘুমিয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে আলাে জ্বালাতে গেল, জ্বালালাে না। আলাের চেয়ে অন্ধকারেই অনেক জিনিস বেশি স্পষ্ট করে দেখা যায়। ডাকলাে : ‘অশােকা, ওঠো। খেতে যাবে না? গলার স্বরে গভীর অন্তরঙ্গতা, তবু কোনাে সাড়া নেই। হাত দিয়ে অশোেকর মাথায় সে মৃদু নাড়া দিলাে। তারপর কাধ ধরে ঝাকুনি। এ কি, ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি? তবুও অশােকাকে মুহমান দেখে দুই হাতে তার দুই বাহু ধরে সবল আকর্ষণ করে তাকে সম্পূর্ণ দাড় করিয়ে দিলাে। বললে সুরজিৎ একটু বা শাসনের সুরে : “তুমি পাগল হয়েছ নাকি? এই অসম্ভব শীতে পাৎলা একটা শাল গায়ে দিয়ে বাইরে পড়ে আছ ? নিমুনিয়া হবে যে! ঘুম পেয়েছে, বিছানায় শুতে পারেনি ?
প্রজাপতয়ে
লেপ তবে আছে কী করতে? চলে এসাে বলছি। বলে তার হাত ধরে
টেনে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলাে, আর দরজাটা দিল সজোরে বন্ধ করে।
এত ঝড়-ঝাপটার পর আশ্চর্য হেসে অশােকা বললে, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলুম
বুঝি ?
তারপর তারা নিচে খেতে গেল, টেবিলে, মুখখামুখি।
রাশি-রাশি খাবার। অশােকা বললে, “তুমি আমার ঘুমটা মাটি
করবে দেখছি।
‘কেন বলাে তাে ?
‘এত সব খেলে আমার ঠিক অম্বল হয়ে যাবে। বুক জ্বলবে। ঘুমুতে
পারবাে না।
‘যদিও আমার কাছে ওষুধ আছে, তবুও তােমাকে অত খেতে বলবাে
। যা পারে তাই খাও।
‘আর তুমি-তুমি এতগুলি সব খাবে নাকি? অশােক অবাক
হবার ভঙ্গি করলাে।
“না, আমি রাত্রে অত্যন্ত কম খাই।
তবে এত সব করেছ কেন ?
‘আমি করিনি, ঠাকুর করেছে।
‘ঠাকুর করেছে! দুটো লােকের জন্যে দুশাে রকম খাবার! ওকে
এত সব বলেছে কে করতে? কী আক্কেল দেখ দিকি। এসব স্রেফ নষ্ট
হবে তাে ? অশােকা কর্তীত্বের সুরে বললে।
‘হােক নষ্ট। তবু তােমাকে বেশি খেতে বলে তােমার ঘুম নষ্ট হতে
দিতে চাই না। কিন্তু, ভাবাে দেখি, সুরজিৎ সহজভাবে বললে,“দৃশ্যটা
যদি উলটো হতো, মানে, তােমার ঘরে যদি আমি অতিথি হতুম, আর তুমি
যদি আমাকে খাওয়াতে, তা হলে দুশাে ছেড়ে দু’ হাজার পদ করতে, আর,
৬৯ খিল কিছুতেই আমাকে ছেড়ে দিতে না, জোর করে প্রতিটি গ্রাস আমার গলার মধ্যে গুজে দিতে, তাতে আমার অম্বল ছেড়ে পায়েস হয়ে গেলেও। বলল, তাই ঠিক নয়?? ‘ককখনাে না। চামচ দিয়ে খাদ্যদ্রব্যগুলির প্রথমাংশটা দু’ প্লেটে ভাগ করে দিতে-দিতে অশােকা বললে, “বরং আমার খাওয়ানােতে যদি তােমার অসুখ করতাে, রাত জেগে তবে তােমার আমি সেবা করতুম। যতক্ষণ না সুস্থ হতে ছেড়ে দিতুম না তােমাকে। বেশ তে', আজই তার পরীক্ষা হােক না। অশােকা চেয়ারটা সামনের দিকে আরাে টেনে আনলাে : ‘মনে করা যাক না, এ আমি তােমাকেই খাওয়াচ্ছি। তােমার বাড়ি, তােমার খরচ—ভেবে নিলেই হলো, আমার বাড়ি, আমার খরচ। খাও না তােমার যত ইচ্ছে। দেখ না, সেবা করতে পারি কি না। ‘মাঝখান থেকে আমার স্বাস্থ্যের সঙ্গে তােমার ঘুমটুকুও নষ্ট হয়ে যাবে। দরকার নেই সেই এক্সপেরিমেন্টে। ফেলে-ছড়িয়ে যা পারা যায় তাই খাওয়া যাক। খেতে-খেতে হঠাৎ নিম্ন কণ্ঠে অশােক জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা, তােমার ঠাকুর-চাকর আমাকে কী ভাবছে বলাে তাে? “কী ভাবছে জিগগেস করাটা যখন সমীচীন হবে না, তখন অনুমান করতে পারি মাত্র। সুরজিৎ সম্পূর্ণ করে তাকালাে একবার অশোেকার মুখের দিকে। বললে, “কোন আত্মীয়া—ছােট বােন-টোন ভাবছে হয়তাে।” ‘তাই হবে। নচেৎ আর-কেউ যে এমন একা বাড়িতে একা চলে আসতেপারি তা হয়তাে ওরা কল্পনাও করতে পারে না। আচ্ছা, গরসটা মুখের কাছে ধরে নির্নিমেষ চোখে সুরজিতের দিকে তাকিয়ে অশােক প্রশ্ন করলাে : ‘আচ্ছা, আমাকে তােমার মনে ছিলাে? তার যখন পেলে তখন চিনতে পেরেছিলে অশােকা কে?
প্রজাপতয়ে
৭০
এই সূত্রে অশােকা সুরজিৎকে টেনে নিয়ে গেল প্রায় দশ-এগারাে বছর
আগে এক বে-সরকারী মেয়ে-হস্টেলে। যখন সুরজিতের বয়েস পঁচিশ কি
ছাব্বিশ। যখন জয়ন্তীর সঙ্গে দেখা করতে এসে লুকিয়ে আরাে একজনের
সঙ্গে সে দেখা করতে। যখন একটা চাপা গুঞ্জন চলেছিলাে চারদিকে
শেষ মুহূর্তে কার সে হাত ধরে—জয়ন্তীর না অশােকার।
সে-পরিচ্ছেদটা নির্বিঘ্নে উত্তীর্ণ হয়ে সুরজিৎ হঠাৎ জিগগেস করলে :
‘কাল ইন্টারভিয়ুর পরই চলে যাবে নাকি?”
‘হা, হবিবিনা-অবস্থাতেই যাওয়া ভালাে। অশােক হাসিমুখে বললে,
‘প্রহারেণ পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আঁচিয়ে উপরে এসে দেখলাে সাড়ে-এগারােটা। কি-রকম আতঙ্ক
করে উঠলাে অশােকার।
টিপাইয়ের উপর পান রেখে গেছে।
সুরজিৎ বললে, “তুমি পান খাও?
‘তুমি ?
‘খাবার পর খাই এক-আধটা।
‘আমি খাই না। তবে তুমি যখন খাচ্ছ—অশােকা তুলে নিলাে
একটা পান।
‘পান খেলেও ঘুমুতে যাবার আগে দাত মাজি।
‘রক্ষে করে, রাত দুপুরে এখন আমি দাঁত মাজতে পারবে না।
অশােকা পান রেখে দিলাে।
কতক্ষণ পরে, ঘরের চারদিকে চেয়ে, জানলা-দরজা সব টুর্ট আছে
কিনা তাই হয়তাে পর্যবেক্ষণ করে সুরজিৎ জিগগেস করলে, তোমার
আর কি লাগবে? রাত্রে জল যদি খাও—
‘রক্ষে করাে। শীতের রাতে উঠে জল খাওয়া।
খিল
‘তবে দোর দিয়ে শুয়ে পড়াে আর কি!
‘আর তুমি ?
‘আমার দেরি আছে।
‘আমিও তবে দেরি করতে পারবাে। বলে হঠাৎ অশােকা জিগগেস
করলে : ‘বাড়িতে কফি আছে ?
‘খাবে তুমি ? আমি নিজেই প্রস্তাব করতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু তােমার
ঘুমের ব্যাঘাত হবার ভয়ে বলতে সাহস পাইনি।
“তবে বলে দাও না, কোথায় কী আছে, তৈরি করে নিচ্ছি।
‘কিন্তু খাবে যে, ঘুমুতে তােমার অনেক দেরি হয়ে যাবে।
‘হােক। এখন আর আমার ঘুম পাচ্ছে না। এখন জাগতে ইচ্ছে
করছে।
অশােক নিজের হাতেই তৈরি করলো কফি। সুরজিৎকে এক কাপ
দিয়ে নিজে নিলাে আর এক। সুরজিৎ বসেছে ইজিচেয়ারে, অশােকা
সামনে একটা লম্বা মােড়ায়—টিপাইটা দু’জনের মাঝখানে, বইগুলি মেঝের
উপর রেখে দেয়া। বেড়া-দেয়া রুটিনের বাইরে যেন তারা চলে এসেছে।
নিচে চাকরদের সাড়া-শব্দ আর পাওয়া যাচ্ছে না। বারােটা বেজে
কুড়ি মিনিট।
কফি শেষ হয়ে গেছে কখন। অনেকক্ষণ তাদের আর কোনাে কথা
নেই। আৰু যেন কিছুতেই তারা লঘু আর তরল হতে পারছে না।
প্রকাণ্ড একটা স্তব্ধতার ঢেউ পেরিয়ে গিয়ে সুরজিৎ বললে, আবার
সেই আগের কথা ; দোর দিয়ে এখন শুয়ে পড়।”
অশেকানাে মুখ দিয়ে সেই আগের কথাই বেরিয়ে এলাে :
“আর তুমি ?
‘া, আমিও শােবাে এবার। পাশের ঘরে আমার জায়গা হয়েছে।
প্রজাপতয়ে ৭২ মাঝের দরজা দিয়ে অশােক দেখলে একবার পাশের ঘরের চেহারা। দেখলাে সেই স্প্রিং-এর খাটে কখন একটা বিছানা করা হয়েছে- হাসপাতালের রুগীর মতো—পায়ের নিচে একটা মােটা কম্বলওয়াড়- ছাড়া। দরিদ্র, সঙ্কীর্ণ বিছানা। অশােকা বললে, ‘তা কি হয়? তােমার বিছানায় তুমি শােবে। ওখানে আমি শােব-একরাত্রির তাে মামলা। সুরজিৎ অস্ফুটভাবে হাসলাে। বললে, “পাগলামি করাে না। তুমি অতিথি, পথশ্রান্ত। ‘অত বড়ো খাটে শুলে আমার ভয় করবে। ঐখানেই দিব্যি আমি কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে পারব। ঘরময় অনেক জিনিস, ককখনাে একা মনে হবে না নিজেকে। ‘তােমার কিচ্ছু ভয় নেই, এমনকি আমাকে পর্যন্ত তােমার ভয় নেই। সে-ভয়ও যাতে না থাকে— সুরজিৎ সরে এলাে দু ঘরের মাঝের দরজার কাছে। বললে, “দরজার খিলটা তােমার দিকেই রইলাে। পরে স্বর অত্যন্ত লঘু করে বললে, “মশারি খাটানাে আছে, দরকার হলে ফেলে নিয়ে। মশা যদিও এখন নেই। আর রাত কোরাে না, কথায়-কথায় অনেকক্ষণ তােমাকে জাগিয়ে রেখেছি। বলে সুরজিৎ তার ঘরে অপহৃত হল। অমনি তার পিছনের দরজাটা আস্তে-আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। নির্ভুল একটা শব্দ হলাে—খিল-লাগানাের শব্দ। তারপর সুইচ অফ করার শুনতে পেলাে। তারপর, এ-ঘর থেকে দেখলাে সে ও-ঘরের অন্ধকার। অনেক রাতে সুরজিৎ একটা ভয়ের স্বপ্ন দেখলে যেন বাড়িতে আগুন লেগেছে। বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারছে সে, অথচ খুলছে না দরজা। অশােকাকে ডাকতে যাচ্ছে, গলায় ফুটছে না কোনাে স্বর। অথচ স্পষ্ট খিল সে দেখতে পাচ্ছে সে-আগুনের থেকে অশােক কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। এমনি একটা আতঙ্কের মধ্যে থেকে তার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাে, পাশের ঘরে আলাে জ্বলছে। যাক, আগুন নয়, আলাে। নিশ্চিন্ত হয়ে আবার সে ঘুমিয়ে পড়লাে। অন্যদিন ভােরবেলা জানলা দিয়ে ডেকে চাকর জাগিয়ে দেয়, আজ সে নিজেই উঠলাে, এবং সেটা অপ্রত্যাশিত প্রত্যুষে। মনে পড়লাে অশােকার কথা, এবং মনে হতেই নিঃসঙ্কোচে সে পাশের দরজা খুলে উত্তরের বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে পাশের দরজা দিয়ে অশােকার ঘরে ঢুকলাে। ঘরে অশােকা নেই, সেটা বেশি আশ্চর্য নয়, কিন্তু খাটজোড়া প্রকাণ্ড বিছানার এতটুকু কোথাও কোচকায়নি। সুরজিতের শালখানা ভাজ করে ইজি-চেয়ারের হাতলের উপর রাখা। তার সুটকেসটিও অন্তর্হিত। উপরে-নিচে সম্ভব-অসম্ভব কোনাে জায়গায়ই অশােকাকে পাওয়া গেল না। সুরজিৎ তারপর পথে বেরুলাে। আর কোথাও নয়, মেয়ে- ইস্কুলের সেক্রেটারির বাড়িতে। বিশ্বনাথবাবু বললেন, নতুন কোনাে মিসট্রেস নেবার কথা হয়নি, আর অশােকা মুখার্জি বলে কারুর ইন্টারভিয়ু দিতে আসার কোনাে কথা নেই। এর পর স্টেশনেও সে যেতে পারতাে—ভােরবেলা জলেস্থলে দু’দিকের পথই খােলা আছে। অতএব পণ্ডশ্রমের প্রয়ােজন নেই মনে করে সুরজিৎ বাড়ি ফিরলে। ফিরে এসে পরখ করে দেখলাে দু’-ঘরের মাঝখানের দরজা তেমন অটুট বন্ধ আছে। বন্ধ দি আছে, তবে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে পাশের ঘরে সে আলাে দেখলাে কেমন করে ? সমস্তটাই কি স্বপ্ন ?
No text on this page.
Ek
No text on this page.
গলা-বন্ধ কোটের পাঁচটি বােতামের একটিও যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ, উদার বক্ষে, সীতানাথবাবু সেটা গায়ে রাখেন। পঞ্চমতমটিও যখন বিদায় নেয়, তখন কিছুকাল কোটের ছিদ্রীকৃত মধ্যস্থল দুটি সাদা সুতাে দিয়ে বাঁধা থাকে। প্যান্টালুন যেহেতু জুতাের কাছেই এসে শেষ হয়েছে সেহেতু মােজা পরার কোন মানে হয় না, একটু অবহিত থেকে পায়ের উপর পা না তুলে বসলেই চলে যায়। আর, উদ্যত যম-মুষ্টির মতাে টুটি-টেপা কলার পরার চেয়ে উদ্বন্ধনে প্রাণ দেয়া সহজ। আরাে একটু বলি, ওঁকে চিনতে সুবিধে হবে। শীতে-বর্ষায় পায়ে তার একই ক্যাম্বিশের জুততা, তার সমতল জীবনযাপনের নিষ্কলঙ্ক উদাহরণ। নিষ্কলঙ্ক বলছি, কেননা জুতাে কেনার পর থেকে এ পর্যন্ত তাতে খড়ির দাগ পড়েনি। যেহেতু ওটার দাম চোদ্দ আনা সেহেতু ওটাকে চোদ্দবছর পদবাসে রেখেছেন বলে গর্ব করেন, আর বলেন, যত কড়াকড়ি পােক নিয়েই হয়েছে, জুততার উপর কেউ হাত দিতে পারে নি। কবিরাজ বলেছে বলে বাড়িতে কাঠের উনুনে রান্না হয়, এবং প্রত্যহ ভােরে উঠে তাঁর প্রথম প্রাতঃকৃত্য হচ্ছে রান্নার জন্যে ঠিক গুনে-গুনে দশখানি লকড়ি বের করে দেয়া। যজ্ঞের রান্নাও যদি রাধাে, দশখানির বেশি লকড়ি পাবে না। আর, মিষ্টি তিনি নিজে না খেলেও ছেলেপুলের সংসার থেকে সেটাকে সম্পূর্ণ বাদ দেয়া চলে না, তাই তিনি বাতাসা চালিয়েছেন। আর, সে-বাতাসা সংগৃহীত হতে বাজার থেকে নয়, কালীবাড়ি থেকে। মা- কালীর প্রসাদ সেই বাতাসা, ভারি সস্তায় তা বিকোয়, এক ধামা চার পয়সায়। মুঠো-মুঠো খেয়েও চলে প্রায় মাসখানেক। শান্ত, শীতল জীবন, বয়েসও প্রায় ছেচল্লিশ। শুধু দুটো জিনিসে তার ভয়, এক চিনি, আরেক উপলা। নতুবা বইয়ের পৃষ্ঠা উলটিয়ে যাওয়ার মতই তার দিনগুলি।
প্রজাপতয়ে ৭৮ এ হেন সীতানাথবাবুর স্ত্রী প্রভাতকুসুম। বয়েস ছাব্বিশ-সাতাশ, বেশ খটখটে আধুনিকা। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, বয়েসেই বােঝা যাচ্ছে। বােঝা যাচ্ছে, স্ত্রীর পরামর্শেই তার সমস্ত ব্যয়সঙ্কোচ, কেননা প্রভাতকুসুম সর্বক্ষণই এটা বােঝে যে লােকের অর্থের পরিচয় কী সে দেখায় তাতে নয়, কী সে লুকোয় তাতে। অতএব বেয়ারিং ইয়ার্কিতে খরচ না করে দুটো পয়সা এদিক-ওদিক সরিয়ে ফেলতে পারলেই আখেরে তার একটা হিল্লে হবার সম্ভাবনা। প্রভাতকুসুমের বােনঝির বিয়েতে সবাইকে নিয়ে সীতানাথবাবু কোলকাতা গিয়েছেন গল্পের সূত্রপাত এইখানে। মােটে চারদিনের ছুটি, বিয়ে দেখে সীতানাথবাবু একা ফিরে এসেছেন স্বস্থানে, ছেলেপুলে নিয়ে প্রভাতকুসুম থেকে গেছে তার বােনের বাড়িতে গল্পের এইখেনেই পরিণতি। খুচররা ছুটিতে যখনই কোথাও যান, পাড়ায় থাকে আপিসের যাকাউন্ট্যান্ট, কমলকৃষ্ণ, তার উপরে বাড়ির ভার থাকে। ঠাকুর- চাকরকে বিশ্বাস নেই। অথচ বাড়িতে তার কী-ই বা আছে, শুকননা একখানা গামছা, কোণছেড়া একটা ছাতা, আর, বড় জোর, কড়িকাঠের সঙ্গে ঝােলানাে লেপের ছালাটা। নচেৎ, সমস্ত অস্থাবর মালামালই তাে তিনি আপিসের মালখানায় বন্ধ রাখেন। তবু, একটা মগ খােয়া গেলেও তাে ছটা পয়সা গুনগার যায়। খাসকামরায় বসে একটু শথ-সুস্থ হবার আগেই গুগম্ভীর মুখে কমলকৃষ্ণ এসে উপস্থিত। ‘ঘর-দোর সব ঠিকঠাকই ছিলাে। মামুলিভাবে বললেন সীতানাথবাবু। ‘কিন্তু এদিকে একটা কাণ্ড ঘটেছে। কুষ্ঠিত ভঙ্গিতে কমলকৃষ্ণ সঞ্চয় ‘কী কাণ্ড? কোথায় ? ‘আপনার বাড়িতে। ‘আমার বাড়িতে? বলেন কী? কবে ?” সীতানাথবাবু খাড়া হয়ে উঠলেন। ‘এই ছুটির মধ্যে। তারপর কাহিনী যা বললে কমলকৃষ্ণ, সেটা কোনাে চুরি বা ডাকাতি নয়, ছছাটখাটো একটি উপন্যাস। কাহিনীটা এই : গত পরশু দুপুর বেলা, একটা কি দেড়টার সময়, দূরে হঠাৎ একটা চেঁচামেচি শুনে কমলকৃষ্ণ রাস্তায় বেরিয়ে আসে, যেন কোথায় দাঙ্গা বেধেছে এমনি গােলমাল। এগিয়ে এসে দেখে, সীতানাথবাবুর বাড়ির কাছেই সে চেঁচামেচি। অসংখ্য লােক ঢুকে পড়েছে তার কম্পাউণ্ডে, বেশির ভাগই হিন্দুস্থানী বাথুয়া, আশে-পাশে আলগা লােকও জমেছে মন্দ নয়। ব্যাপার কী? খোঁজ নিয়ে জানলাে কমলকৃষ্ণ, কেলেঙ্কারির একশেষ, বাথুয়াদের কার একটা মেয়ে রয়েছে নাকি বাড়ির মধ্যে লুকিয়ে, আর সীতানাথবাবুর ঠাকুরই নাকি তাকে বাইরে আসতে দিচ্ছে না। বাবুর বাড়ি বলেই ভিতরে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না কেউ, কিন্তু ভালাে চায় তত, তাদের মেয়ে এক্ষুনি ফিরিয়ে দিক, নইলে কাঠ আর কেরােসিন এনে আগুন ধরিয়ে দেবে তারা। ভিতরে গিয়ে খবর নিলাে কমলকৃষ্ণ, একটুও বানানাে নয়, বারান্দার এক কোণে দরজার আড়ালে জড়োসড়াে হয়ে বাথুয়াদেরই একটা মেয়ে রয়েছে দাড়িয়ে। ‘কী বাথুয়াবাথুয়া করছেন, সীতানাথবাবু হঠাৎ বিরক্তমুখে ধমক দিয়ে উঠলেন : “বাথুয়া বলে কাকে ? বাথুয়া হচ্ছে একরকম হিন্দুস্থানী মাঝি, চালানী নৌকোয় যারা দেশ- বিদেশে মাল বয়, আর যাদের অনুপস্থিতিতে স্ত্রী-কন্যারা দুধ বেচে শাক- প্রজাপতয়ে ৮০ সজি বেচে মুড়ি-চিড়ে বেচে অন্নসংস্থান করে—সবিনয়ে বুঝিয়ে দিলাে কমলকৃষ্ণ। বললে, আপনার বাড়ির কিছুটা পশ্চিমে ওদের বসতি। আন্দাজ তিরিশ-চল্লিশ ঘর আছে। ‘তারপর মেয়েটাকে চুলের ঝুটি ধরে তাড়িয়ে দিলেন কিনা বলুন। “ঠাকুরকে বললুম সােজাসুজি বার করে দিতে। মেয়েটা পাছে মার খায় তাই সে প্রথম সাহস পাচ্ছিলাে না।' পরে— ‘মার কেবল একলা মেয়েটাই খাবে সে ভেবেছে নাকি? সীতানাথ- বাবুর সর্বাঙ্গ রাগে রক্তময় হয়ে উঠলাে। ইচ্ছে হলে এখুনিই বাড়ি ফিরে পা থেকে জুতাে খুলে ঠাকুরের পিঠটা জর্জরিত করে তােলেন। জুতাের শক্তির কথা ভেবে একটু তিনি চিন্তিত হলেন হয়তত ; ভাবলেন, জুতাে ছেড়ে ছাতার শরণাপন্ন হওয়াটাই শােভনীয় হবে। কিন্তু প্রহারের প্রাবল্যে ছাতাটা ভেঙে গেলে অনুশােচনার অন্ত থাকবে না। অতএব, যা থাকে কপালে, রান্নার কাঠই একখানা কমবে না-হয় । ‘পরে, খিড়কির দোর খুলে চুপি-চুপি মেয়েটাকে বার করে দিলুন। ও-দিকটাতে জঙ্গল আর বাঁশবন, কোনাে লােক ছিল না। আর, লােক থাকলেই বা কী’, গুম্ফ প্রান্তে কমলকৃষ্ণ একটু হাসলাে, ‘ছাড়া পেয়েই মেয়েটা সােজা ছুট দিলল, এক নিশ্বাসে মিশে গেল হাওয়ায়। ‘ছুট দিলাে কী মশাই?” সীতানাথবাবু হতভম্বের মতাে বললেন, “মেয়েছেলে কখনাে ছুটতে পারে ? “ঠিক একটা হরিণের মতাে ছুটে পালালাে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতুম না। মনে হলাে যেন বরাদুরে একটা ধারালাে তলােয়ার ঝিলিক দিয়ে মিলিয়ে গেল হঠাৎ। ‘থাকেন তাে চালান আর পেমেন্ট-অর্ডার নিয়ে, এত কবিত্ব শিখলেন কোথায় ?
৮১
সঞ্চয়
কমলকৃষ্ণ লজ্জিত হলাে।
‘ছুটলাে যে, বয়েস কত মেয়েটার ?
‘আঠারাে-উনিশ হবে।
‘সে তত একটা ধাড়ি মশাই। নির্লজ্জের মতাে ছােটে কী করে?
‘কিন্তু ভারি ছিপছিপে আর পালা। তা ছাড়া, তখন তার ধরা
পড়ার লজ্জার চেয়ে মার খাবার ভয়ই বেশি।
‘আপনার তত তাকে মার খাওয়ানােই উচিত ছিলাে। খিড়কির
দোর খুলে দিয়ে পালাতে দিলেন কেন? সীতানাথবাবু বক্ত চোখে
জিগগেস করলেন।
নইলে কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত হতাে। তা ছাড়া, মেয়েটার অবস্থা দেখে
তখন একটু মায়াও যে না হয়েছিলাে তা নয়।
‘যান, যান, চাকরির মায়াটাই সর্বাগ্রে। হঠাৎ বিষয়বহিভূত ভাবে
বলে উঠলেন সীতানাথবাবু। পরের মেয়ের উপর বেশি মায়া দেখানােটা
ঠিক নয়।
কথাটা নির্ব্যক্তিক ভাবে বলা হলাে বলেই কমলকৃষ্ণকে স্পর্শ করলাে
। চলে যাচ্ছিলাে থেমে পড়ে সে বললে, ‘ও-ঠাকুরকে রাখা তত
নিশ্চয়ই ঠিক হবে না।
‘ঠিক? হারামজাদাকে আমি কাঠ-পেটা করে তাড়াবে।
“তাই আরেকটা ঠাকুর জোগাড় করে রেখেছি।
‘বেশ, পাঠিয়ে দেবেন।
সাধারণতাে ঠাকুর বললে যা বােঝয় সীতানাথবাবুর ঠাকুর তার
সংজ্ঞাভুক্ত নয়। তার নাম কিশােরীমােহন গঙ্গোপাধ্যায়। বাড়ি
বরিশাল জেলায়—ঝালকাঠি না নলচিঠিতে। থার্ড-ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছিলাে,
পয়সার অভাবে আর এগুতে পারেনি, অগত্যা বামুনের ছেলের পক্ষে
প্রজাপতয়ে সনাতন যে পথ, চলে এসেছে সে রান্নাঘরে, যােলবছর বয়সে। সীতানাথ- বাবু তখন ভােলায়, মােটর-টায়ারের স্যাণ্ডেল পায়ে একমাথা উস্কখুস্ক চুল নিয়ে কিশােরী যখন তার কাছে এসে হাত পাতে। ছ’ টাকা মাইনের উড়ে ঠাকুরকে এক কথায় বরখাস্ত করে তিন টাকা মাইনেতে কিশােরীকে তিনি বহাল করেন। তারপর বারাে-তেরাে বছর কেটে গেছে, কিশােরীর মাইনে এখন সাড়ে-সাত। তবু, সর্বসাকুল্যে, ওকে পেয়ে অনেক সুবিধে, কেননা মাইনের অতিরিক্ত একটি পয়সাও তাকে দিতে হয় না, দাড়ি কামাবার জন্যেও নয়। ভীষণ বাবু ছিলো কিশােরী। ধােপাবাড়িতে সীতানাথবাবুর যেত যেখানে তিনখানা, কিশােরীর যেত ছয়খানা। বালিশের ওয়াড়ও যে ধােপাবাড়িতে দেয়া চলে, এ শুধু সীতানাথবাবু কিশােরীকে দেখে শিখেছেন। কিছু বলতে পারতেন না, কেননা কিশােরীর আলাদা ধােপ। নাপিতের কাছে নখ কাটবার যখন সময় হতাে তখনই দাড়ি কামাতেন সীতানাথবাবু, কিন্তু কিশােরীর মুখটা নিমূল নির্মম হয়ে সব সময়েই ঝকঝক করছে। সাতশাে টাকা মাইনেতে তার একটা টাইম-পিস হয় না, থানার ঘণ্টা বা কোর্টের ঘণ্টা (এদের কোনাে একটার কাছে তিনি বাসা নেন ) শুনে তার কাজ চলে, আর মাত্র সাড়ে-সাতটাকা মাইনেতে কজিতে সে দিব্যি ঘড়ি বেঁধেছে। শােনা যায়, পকেট থেকে বার করে নাক-টেপা চশমাও নাকি পরে মাঝে-মাঝে এবং নিরাপদ দূরত্বে চলে এলে কথনাে- কখনাে তার হাতে একটা ছড়িও নাকি ঘুমান হয়। এখানে আসবার সময় হাতেবওয়া মাল-পত্র দিয়ে সীতানাথবাবু তাকে দু’দিন আগে পাঠিয়ে- ছিলেন, তার চিঠি পেয়ে যারা এসেছিলাে ইস্টিশানে, সবাই ভেবেছিলো সেই সীতানাথবাবু। নাজিরকে উজীরবাবু বলে সম্ভাষণ করার পর নাকি সবাইর ভুল ভাঙে। পরে নাকি সে সহরে বলে বেড়িয়েছে, সীতানাথবাবুর
সঞ্চয়
সে বড় ছেলে, আগের পক্ষের, এবং সেই হেতুই একটু বাবু ও বখা।
কেউই অবিশ্বাস করতে পারেনি।
‘ঠাকুর!’ বাড়ি ফিরে এসে সীতানাথবাবু আশ্বিনের মেঘগর্জন করলেন।
কিশােরী ভয়ে-ভয়ে সামনে এসে দাড়ালাে। ফাদে-পড়া ইদুরের
মতাে তার চাউনি।
‘যা শুনেছি তা সত্যি ?
কিশােরী মাথা নামিয়ে রইলাে।
‘কি, কথার উত্তর দিচ্ছ না যে? সত্যি?
‘সত্যি।
‘সত্যি! ধ করে সীতানাথবাবু কিশােরীর গাল, কান ও ঘাড়
লক্ষ্য করে প্রকাণ্ড এক চড় বসিয়ে দিলেন। উঠলেন হুঙ্কার করে :
‘তােমাদের জিম্মায় বাড়িঘর রেখে যাই এ সব কেলেঙ্কারির জন্যে ?
ভদ্রলােকের ছেলে, এ সব দুবুদ্ধি মাথায় ঢুকেছে? ছি ছি ছি!
কিশােরী চুপ করে রইলাে।
‘কে ওই মেয়েটা? পেলে কী করে?
কিশােরী কথা বললাে না।
‘নাম কী ?
‘দাসীয়া। অস্ফুটস্বরে কিশােরী বললে।
‘আমাদের দুধউলির মেয়ে বুঝি ?
না।
‘তবে কার মেয়ে ? ঠিক করে বলল। সীতানাথবাবু ধমক
দিয়ে উঠলেন।
জানি না।
জানাে না! সীতানাথবাবুর দুই পাটি দাত দৃঢ়সংযুক্ত হলাে এবং
প্রজাপতয়ে ৮৪ মুখের অভ্যন্তরে একটা বর্বর শব্দ উখিত হয়ে নির্ভাষ অবস্থাতেই মুখের মধ্যে মিলিয়ে গেল। পরে তার ঘাড়ে এক রদ্দা মেরে বললেন, ‘এখুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি ছেড়ে। কিশােরী কাকুতি করে বললে, ‘মুহূর্তের জন্যে একটা ভুল করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করুন। ‘ক্ষমা-টমা আমার নেই। আমি ক্ষমা করলেও তােমার মা কিছুতেই করবেন না। যাও, বেরিয়ে যাও। সীতানাথবাবু তার ঘাড়ে আরেকটা ধাক্কা মারলেন। আর বললেন এমন যে দুশ্চরিত্র সে যেন ভাঙা মাসের মাইনের কথা মুখ ফুটে না উচ্চারণ করে। এই নতুন ঠাকুর বহাল হলাে, আপাতত পাঁচ টাকায়, এবং কথা হলাে রান্না যদি সে ভালাে করে তবে তিন মাস পরে তার এক টাকা উন্নতি হবে। আসলে, তার দিক থেকে ব্যাপারটা লাভজনকই হলল, ভাবলেন সীতানাথবাবু, এবং প্রথম রাত্রি থেকেই নতুন ঠাকুরের রান্নার তিনি ক্রটি ধরতে লাগলেন। কিন্তু, কে জানে, অনেক রাত্রি পর্যন্ত চোখে তার ঘুম এলাে না। যেন হঠাৎ তার নিজেকে বড় বেশি একাকী মনে হলাে। এত বড়াে ফাকা বাড়িতে একলা থাকবার তার অভ্যেস নেই কোনােকালে, এত বড়ো তক্তপােষে। যেন দেয়ালে কিসের ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাইরে বারান্দায় যেন কার চাপা পায়ে আনাগােনা, যেন দরজার কাঠ দুটো আপনা থেকেই শব্দ করে উঠছে। তারপর অনেক রাতে যখন তার ঘুম এলে তিনি একটা অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন, এমন এক জায়গায় গিয়েছেন যেখানে পােস্টাপিস নেই। তার সাঙ্ঘাতিক অসুখ হয়েছে, প্রভাতকুসুমকে কোলকাতায় টেলি করা দরকার, কিন্তু কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না পােস্টাপিস। মাঠ-জঙ্গল পাহাড়-নদী পার হয়ে তিনি ছুটছেন, উৎসুক হয়ে ৮৫ সঞ্চয় তাকাচ্ছেন আকাশের দিকে, কিন্তু টেলিগ্রাফের তারের একটা তন্তুও তার চোখে পড়ছে না। সকালে বরাদ্দ ঘােল দিয়ে গেল চাকর। নথি-পত্র থেকে মুখ তুলে চশমাটা এক ঠেলায় কপালের উপর তুলে দিয়ে সীতানাথবাবু হঠাৎ জিগগেস করলেন, ‘তুই ঐ মেয়েটাকে চিনিস? ফেকুলালের বুঝতে মােটেই দেরি হলাে না। বললে, “না, হুজুর। ‘তুই তখন ছিলি কোথায় ? ‘আমি তখন পানের দোকানে গিয়েছিলাম পান কিনতে। ‘আমরা চলে গেলে বাড়িঘর তােরা এমনি করেই পাহারা দিস। কেন, পান খেতে দোকানে যাওয়া কেন, বাড়িতে জোটে না?” সীতানাথ- বাবু রুখে উঠলেন, ‘ফের যদি বাড়ি ছেড়ে যাবি কোনােদিন দুপুরে, ঠিক তাড়িয়ে দেব বলে রাখছি। হিন্দুস্থানী চাকর রেখে আমার কিছু লাভ নেই, আমি বাঙালী চাকর রাখবে। বলে তিনি পুনরায় নথিতে মনােনিবেশ করলেন। চশমাটা কপাল থেকে হাত দিয়ে নামাতে হলাে না, কপাল ও নাকের যুগপৎ আকুঞ্চনেই ওটা নাকের উপর আপনিই নেমে বসলাে। সান্ধ্যভ্রমণের পৃথিবীটা তার খুবই পরিমিত ছিলাে, কিন্তু সেদিন যখন তিনি পশ্চিমের গ্রাম্য ও বন্য পথের দিকে পা বাড়ালেন, পৃথিবীকে হঠাৎ যেন তার খুব বড় বলে মনে হলাে এবং স্পষ্ট অনুভব করলেন যে উত্তর- মেরুতে না গিয়েও উত্তরমেরু-আবিষ্কারের রােমাঞ্চটা দুষ্প্রাপ্য নয়। কিন্তু এক হাত রাস্তাও কি তার শান্তিতে চলবার উপায় আছে? প্রতি হাতে এক হাতে কারু আদাব, দুই হাতে কারু নমস্কার। প্রতি পদে তিনি চিহ্নিত, অনুসৃত, ভয়প্রাপ্ত। অদৃষ্টের কী বিড়ম্বনা, তার জন্যে একটুখানি কোথাও ফাঁকা জায়গা নেই, তাকে চেনেনা এমন একটিও কোথাও লােক প্রজাপতয়ে ৮৬ নেই কথা বলবার। তাঁর জন্যে সবাই যেন ভীষণ ব্যস্ত, ভীষণ জাগ্রত, হাই তুললে তুড়ি দেবার জন্যে ও হাঁচি দিলে জীব বলবার জন্যে সবাই এগিয়ে রয়েছে। আর কতদূর গিয়েছেন কি, কেউ অযাচিত বলে বসবে বাকি পথটা দুৰ্গম, কর্দমাক্ত, কেউ বলবে একজোড়া সাপ আছে এই ঝােপের মধ্যে, কেউ বা বলবে কাদের গােয়ালে গরুর বসন্ত হয়েছে। এ-অঞ্চলটার ভূগােল বা ইতিহাস নিয়ে কারু সঙ্গে যদি বা তিনি আলােচনা করেন সে এমন একটা ভাব দেখায় যেন বাথুয়ারা সমগ্র এশিয়া মহাদেশেরই বহিভূত। তবু, বলা বাহুল্য, সীতানাথবাবু গ্রামের সেই পাশ্চাত্ত্য পথটুকু ধরেই বৈকালিক আনাগােনা করেন। যেটুকু সম্ভব এর-ওর শশা বা চালকুমড়াে, পুইশাক বা ঢাড়ল নিয়ে উৎসাহ দেখান, গরুর চরবার জন্যে মাঠ কোথায় পাওয়া যায় সেই সমস্যায় আন্দোলিত হন, আবাদের মুখে ঠিক বৃষ্টি না পাওয়ায় ফসল কেমন পাওয়া যাবে তাই নিয়ে মাথা ঘামান। আর যখন বাড়ি ফিরে এসে অন্ধকার ঘরে চোখ বুজে ক্যানভাসের ইজি- চেয়ারে পড়ে থাকেন, রক্তের চাপ বাড়ার জন্যেই হয়তাে বােজা চোখের মধ্যে ছােট-ঘােট আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখেন, মনে হয়, বাইরে যেন অসম্ভব রােদ, আর সেই রােদে ঝিলিক দিয়ে উঠেছে একটা ধারালাে তলােয়ার। এত বড় বাড়ি ছেড়ে সীতানাথবাবুর হঠাৎ নদীর ওপারে ডাক বাংলােয় গিয়ে থাকবার ইচ্ছে হলাে। সামনেই বালির চর, বেশ নির্জন জায়গা। যেন সেখানে যেতে পারলেই তার ঘুম আসে। কিন্তু ডাক- বাংলাের মালী যখন তাঁকে জিগগেস করবে, বাড়ি ছেড়ে তিনি এই বনবাসে কেন, তিনি কী উত্তর দেবেন ? অসম্ভব। অগত্যা তিনি স্বদেশে নিধনং শ্ৰেয় কল্পনা করে ফেকুলালেরই শরণাপন্ন হলেন। বললেন, “তুই তাে একটা ভূত, তােকে দিয়ে কোনাে ৭ সঞ্চয় কাজই হবার জো নেই। পারবি, পারবি একটা ঠাকুর জোগাড় করে আনতে ? “ঠাকুর! ফেকুলাল ভ্যাবাচ্যাকা খেল। বললে, “কেন, আছে যে একটা ? ‘ওটা আবার রাঁধতে পারে নাকি ? টক রান্না করতে গিয়ে টকই দেয় না, ওটা তাে জাম্বুবান, তাের মাসতুতাে ভাই। শােন’, সীতানাথ- বাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, ‘যে করে হােক কিশােরী ঠাকুরকে ধরে আনতে হবে। ফেকুলাল আরাে ভ্যাবাচাকা থেল। বললে, “সে তাে কবে চলে গেছে। ‘সে চলে গেছে কিন্তু মেয়েটা তাে যায়নি। নিশ্চয় তার কাছে কিশােরী ঠাকুরের ঠিকানা আছে। নিশ্চয়ই তার কাছে সে চিঠি লেখে। নিশ্চয়। ওকে জিগগেস করলেই জানা যাবে ঠিক। ফেকুলাল ঢােক গিললাে। বললে, “আমি তাে মেয়েটাকে চিনিনা। ‘আমি চিনি। সীতানাথবাবু জোর দিয়ে বললেন। মেয়েটার নাম দুখিয়া। নাম জিগগেস করলেই ওকে তাের বার করতে দেরি হবে না। ‘কিন্তু ঠাকুরের ঠিকানা বললে আমি তা মনে রাখতে পারবােনা, হুজুর। ‘তুই যে একটা আস্ত গাড়ােল, মনে রাখবি কী করে? বেশ, মনে রাখতে না পারিস দুখিয়াকে বলিস আমার সঙ্গে যেন এসে দেখা করে। ফেকুলাল যেন নিজেকে অনেক হালকা মনে করলাে। বললে, ‘কথন বলবাে দেখা করতে ? “কী বলিহারি তাের বুদ্ধি! সকালবেলাটা তাে কাজকর্মেই থাকি, তখন সময় কোথায়? দুপুরে তােত আপিস, স্বচক্ষেই দেখতে পাস। বিকেলে বাড়ি এসে খবরের কাগজ পড়তেই লেগে যায় দু ঘণ্টা। বেড়িয়ে প্রজাপতয়ে ৮ ফিরে সন্ধের পর একটু যা ফাক পাই, তখনই দুটো যা কথা কইবার সময়। বুঝলি, তখনই আসতে বলবি। ফেকুলাল সম্মত হলাে। এবং তখুনি সীতানাথবাবুর মনে হল যেন সমন্তর কাছে তিনি ধরা পড়ে গেলেন। যেন সবাই শুনে ফেললাে তার কথা, শুনে ফেললল তাঁর চাপা দীর্ঘশ্বাস। যেন তার জুতাের ভিতর থেকে পায়ের কদর্য আঙুলগুলি রাস্তার মাঝখানে সবাইর সামনে হঠাৎ বেরিয়ে পড়লাে। ফেকুলালকে তিনি মূখ ভেবেছিলেন, কিন্তু গলার স্বর সে অনেক খাদে নামিয়ে এনেছে। তার মুখ দেখে উৎসাহ না পেলেও কণ্ঠস্বরে অনুপ্রাণনা ছিলাে। সে বললে, “দুখিয়া বলে কেউ ওখানে নেই হুজুর। ‘থাকলে আর তােমাকে সবাই ভূত বলবে কেন ? ‘আমি, হুজুর, তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। দুখিয়া এক ছিলাে, পঞ্চাশ বছরের বুড়ি, গত ছট-পরবের সময় কলেরা হয়ে মারা গেছে। ‘আর আশ্চর্য, তুই কিনা এখন বেঁচে আছিস। “তবে চারদিকে চেয়ে ফেকুলাল থামলাে। “তবে সীতানাথবাবু তাকে ধরিয়ে দিলেন। তবে লখিয়া বলে একজন আছে। হা, হ্যা, লথিয়া-সীতানাথবাবু আলােড়িত হয়ে উঠলেন, লখিয়া, লক্ষ্মীই মেয়েটার নাম। মামলার বাদিনী রাজলক্ষ্মী তার রায়ে রাজকুমারী হয়েছে বটে, জরিমননেছা হয়েছে করিমননেছা, কিন্তু এমন মারাত্মক বিপর্যয়ের সেখানে আশঙ্কা ছিলাে না। ফেকুলাল আপিল-আদালতের মতাে ভুল তার শুধরে নিয়েছে কিন্তু ডিক্রি নাকচ করেনি। নিলিপ্ত ঔদাসীন্যে সীতানাথবাবু বললেন, “হাঁ, কী বললে লখিয়া ?” ‘আসতে রাজি আছে কিন্তু টাকা চায়।
৮৯ সঞ্চয় “টাকা! কিশােরীর উপর প্রদত্ত চড়টা যেন দ্বিগুণ বিক্রমে সীতানাথ- বাবুর উপর ফিরে এলো। বহুবিস্মৃত ঝিনঝিনিয়া রােগে তিনি যেন হঠাৎ আক্রান্ত হলেন, মনে হলাে এখুনি যেন তার হৃৎপিণ্ডটা পাকা ফলের মতাে টুপ করে খসে পড়ে যাবে। • ঢালের যে একটা ও-পিঠ আছে সেটা তার যেন খেয়ালই হয়নি। উধ্ব চক্ষু হয়ে জিগগেস করলেন, “টাকা কিসের? ‘তা জানি না। ‘কিশােরী ঠাকুরের ঠিকানাটা এসে বলে যাবে তাতে টাকা লাগে কী করে! তুই কি লালাখ্যাপা নাকি? “কী করে বলব? ‘ক’ টাকা শুনি ? ‘এক-আধটা নয়, পচিশ টাকা। ‘কি, কী বললি? বল তাে শুনি আরেকবার-বলে কী শােনবার চেষ্টা করতে-করতে সীতানাথবাবু ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ারের মধ্যেই টলে পড়লেন। চাকর-ঠাকুর তাকে ধরাধরি করে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাে। লােজন ডাকতে যাবে এমন সময় চোখ চেয়ে সীতানাথবাবু তাদের বারণ করলেন। ঠাকুরকে বললেন, “আমাকে একটু মকরধ্বজ শুধু মেড়ে দাও। ঐ কাগজের বাক্সটাতে আছে, আর একটু গরম দুধ। ব্যস্ত হয়াে না তােমরা, চোটটা আমি খুব সামলে নিয়েছি। এর পর প্রভাতকুসুম আর দেরি করতে পারলাে না, দুদিনের মধ্যেই সদলে ফিরে এল। এসেই নতুন ঠাকুর দেখে সে ভয়ানক অবাক হয়ে গেল। বললে, এ কী, পুরােনাে ঠাকুর গেল কোথায়? দুর্ধর্ষ ঘৃণায় সীতানাথবাবু বললেন, “ওটাকে তাড়িয়ে দিয়েছি।
প্রজাপতয়ে সীতানাথবাবু পুঙ্খ পুঙ্খ করে সবিস্তার সে কাহিনী বললেন, যতটুকু শুনেছেন ও যতটুকু শশানেন নি সমস্তটুকু একত্র করে। তাঁর শরীরটা বিশেষ সুস্থ নয় ও অস্ত্র-আয়ুধগুলি খুব শক্তিমান ছিলাে না বলেই যে প্রহারটা বিশেষ পরাক্রান্ত হতে পারেনি তারও জন্যে একটু অনুতাপ করলেন। ‘আহাহা, তাতে কী হয়েছে? প্রভাতকুসুম বিদ্রুপ করে উঠলাে : ‘তারি জন্যে এত দিনের একটা tried handকে তুমি এক কথায় তাড়িয়ে দিলে? আসলে, অপরাধটা ও করেছে কী! তােমার সবতাতেই সাধুগিরি ফলানাে। কমলবাবুর তাে মেয়েটার জন্যে মায়া হলাে, আর ওর জন্যে তােমার একটুও মায়া হতে পারলাে না? তােমরা তাে বিচার করে al, butchery Faali কিশােরীকে না তাড়ালেই যে ভালাে ছিলাে তাতে সন্দেহ কী, কিন্তু ঘটনাটা প্রভাতকুসুম এমন তরল ভাবে গ্রহণ করবে সীতানাথবাবু তা কল্পনাও করতে পারতেন না। তাই তাকে খুসি করবার জন্যে বললেন, যাই হােক এই ফঁাকে আড়াই টাকা লাভ হয়েছে—নতুন ঠাকুরটার মাইনে মােটে পাঁচ টাকা। আরাে তাকে তিনি খুসি করতে পারতেন হয়তাে- কিন্তু পচিশ টাকা লাভের কথাটা শুধু অন্তর্যামীই জানুন।
যথাপূর্ব
No text on this page.
হঠাৎ মনে পড়ে গেল কাল ইনটারভিয়ু। কেন এবং কী দেখে যে এখন এ-কথা মনে পড়ে গেল কে জানে। হয়তাে রাস্তায় দেখা গিয়েছিলাে একটি নারীমূর্তি। দুটো বাজতেই সমর নেমে গেল খাসকামরায়, সিগারেট ধরিয়ে দস্তখৎ ডাকলাে। কিন্তু আর্দালি এক পা এগিয়েই পিছিয়ে গেল দু পা। তারপর কামরার পর্দা সরিয়ে যখন সে পুনরায় প্রবেশ করলে, হাতে তার ভিজিটিং কার্ড। ছাপানাে নয়, কালাে কালিতে পরিচ্ছন্ন নাম লেখা : সরমা চৌধুরী। অনেক কারণেই বিস্ময়কর। প্রথমত পাত্রী, দ্বিতীয়ত স্থান, তৃতীয়ত নামটা। অবিশ্যি খাসকামরাটা তার স্ত্রীলােকের একেবারে অগম্য নয়, কেননা পর্দার আড়ালে কখনাে-কখনাে তাকে জবানবন্দি নিতে হয়েছে, আর সরমা নামটাতেও এমন কোনাে লােকোত্তরতা নেই। তবু মন যা বলে তাই ঠিক হয়ে দাড়ায়। এ-সম্বন্ধে সমরের খুব একটা চমৎকার নজির আছে। ( সবকিছুতেই আজকাল সে নজির খোঁজে!) অনেক বছর আগের কথা। সেবার সে ম্যাট্রিক দেবে। তার সমপাঠিনী একটি ভাগ্নী প্রায়ই তাকে শাসাতে যে তাদের ক্লাশের বাসন্তীর সঙ্গে কিছুতেই সে এটে উঠবে না। অনেকানেক নামের মধ্যে বাসন্তীর নামটাও সে শুনেছিলাে সেদিন! কী-জানি-কেন নামটা মুছে যায়নি। হয়তাে তার একটা কারণ ছিল এই যে সেই ভাগ্নীটি গিয়েছিলাে মুছে। বি-এ পর্যন্ত গেজেটের পৃষ্ঠায় বাসন্তীকে সে অনুসরণ করেছে, দেখেছে অনেক পিছে-পিছে আসতে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে। তবু পােস্ট-গ্রাজুয়েট ইংরেজি ক্লাশে—তখন সহ-শিক্ষাটা এমন দরকারী হয়ে ওঠেনি—প্রথম যে-মেয়েটি সেদিন অতি কুণ্ঠিত মুখে ঘরে ঢুকেছিলাে, তার দিকে চেয়ে সমরের মন নিঃশব্দে বলে উঠেছিলাে :
প্রজাপতয়ে
১৪
বাসন্তী! আকৃতি বা বয়স, সাজ বা ভঙ্গি কিছুরই সঙ্গে তার বিন্দুম
পরিচয় ছিলাে না, তবু মন যা বলেছিলাে তাই সত্যি, খোঁজ নিয়ে জানা
গেল সেই সে অচিহ্নিতা।
এই কথাটাই প্রবলভাবে ফের মনে পড়লে সমরের, যখন আগন্তুক
ঘরে ঢুকলাে।
নমস্কার। অতি মৃদু, ম্লান স্বর।
অভ্যাসবশতই সমর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালাে। যা ভেবেছিলাে
তাই। কিন্তু এটা কি ভয় না সুখ কিছু বুঝতে পারলাে না। বিবর্ণ মুখে
বললে, “এ কি, তুমি—আপনি, আপনি কোখেকে?
সরমা মনে-মনে হাসলাে। মুখে বললে, “দেখা করতে এসেছি।
অভ্যাসবশতই সমর পাশের একখানা চেয়ার দেখিয়ে দিল, যেমন আর
সবাইকে দেয়, একটু বা নির্লিপ্ততার সঙ্গে। সরমা বসলাে, কুষ্ঠিত হয়ে।
‘দেখা করতে এসেছেন। সমর এমন ভাবে বললে যেন কোনাে
আমলার সঙ্গে কথা কইছে : ‘তা বাড়িতে না গিয়ে এখানে?
সরমা এবারাে হাসলাে না। বাড়িটা চিনি না, এ-কথা সে অনায়াসে
বলতে পারতাে, কিন্তু মহীন দেশে এরশুকে চিনি না বললে বনম্পতির
অবমাননা হয়। তাই অপরাধীর মতাে সে বললে, ‘কথাটা অফিসিয়াল,
তাই এখানে বলতে এসেছি।
‘অফিসিয়াল ? কথাটা সমর সম্পূর্ণ ইংরিজি কায়দায় উচ্চারণ
করলে। একমুখ ধোয়া ছেড়ে বললে, কথাটা কী ?
‘গার্ল-স্কুলের
হেড-মিসূট্রেসের পােস্টের জন্যে আমি একজন
অ্যাপ্লিকেন্ট।
বাঙলা কথােপকথনে ইংরিজি শব্দ সমর মােটেই বরদাস্ত করতে
পারেনা। কাক কথার উত্তর দেবার আগে তাকে ইংরিজি শব্দগুলাের
যথাপূর্ব বাঙলা তর্জমা করিয়ে নিতে বাধ্য করে। প্রতিশব্দ না থাকে প্রতিশব্দ তৈরি করিয়ে নেয়। আর, প্রক্রিয়াটা যতক্ষণ না শেষ হয় ততক্ষণ বাক্যালাপ স্থগিত থাকে। বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রীর পদের জন্যে আমি একজন প্রার্থী বা আবেদনকারী—অভ্যাসবশত কথাটা সমর নিজেই তর্জমা করে নিল। তর্জমা করলাে বটে, কিন্তু আশ্চর্য, অর্থ সে কিছুই বুঝতে পারলাে না। লুকিয়ে, মানে তার অভ্যস্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে নয়,তাকালে সে একবার সরমার দিকে। হঠাৎ তার মন মােচড় দিয়ে উঠলাে। দেখলাে, সরমাকে কেমন ক্লান্ত, বিষন্ন দেখাচ্ছে। অনেক আগেও তাকে সে এমনি করে দেখতাে, কিন্তু সেটা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে। মানে, যে ভালােবাসে সে চিরদিনই বিষন্ন, যে পায় না তার চিরদিনের ক্লান্তি-এমনি একটা শেলীয়ান ভাবালুতা। কিন্তু শেলী ছেড়ে এখন সে আরেক যুগে এসেছে, তাই তার আজকের দেখাটা দূরবীক্ষণে নয় অণুবীক্ষণে। সরমা যে ক্লান্ত তা আজ দেখা যাচ্ছে তার শরীরের শীর্ণতায়, আর সে যে বিষন্ন তা তার নম্র, অনুচ্চারিত বেশবাসে। হাতে দু’ গাছি করে মােটে সৰু সােনার চুড়ি, গলার হার সঙ্কোচে অপ্রকাশমান। সাড়িটা অসামান্য রকমের সাধারণ। সমর একবার তাকালাে তার কপাল ও সীমন্তের দিকে, সেখানটাতে প্রখর, যেন-বা নির্লজ্জ শুভ্রতা। ‘তা, আমার কাছে কেন ? সমর তবু নির্ব্যক্তিক ভাবেই বললে। ‘তুমি প্রেসিডেন্ট, তােমার কাছেই তাে আসবাে। সরমা একটুও বিচলিত হলাে না। একরকম ছুটি হয়ে গেলেও আদালতের আনাচে-কানাচে এখনাে বহু লােক আনাগােনা করছে, চতুর্দিকে শ্রুতিমান দেয়াল, এরি মাঝে প্রত্যক্ষ
প্রজাপতয়ে
•
দিবালােকে, এ কী কেলেঙ্কারি! সমরের নিরপেক্ষ বিচারবােধে কে যেন
রূঢ় আঘাত করলে। লােকে শুনলে বলবে কী
তাই সে ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বললে, ‘নির্বাচন, কমিটি মানে পরিষদের
হাতে। একা প্রেসিডেন্ট, মানে অধ্যক্ষ কী করবে? আমার তাে আর
একটার বেশি ভােট নেই।
অত্যন্ত ম্লান, ব্যথিত গলায় সরমা বললে, কিন্তু তুমি বললে তােমার কথা
কেউ ফেলতে পারবে না। তুমি বললেই আমার এ চাকরিটা হয়ে যায়।
‘কেন ? ইংরিজি মার্জনা করবেন, বাঙলা প্রতিশব্দটা চট করে সমর
খুজে পেলােনা : ‘নেপটিজম নাকি ?
‘তা কেন?’ করুণ করে সরমা বললে, ‘আমি তো আর তােমার
আত্মীয় নই। বলেই যেন সে নিজেকে সংশােধন করলে : মানে, রক্তের
সম্পর্কে তােমার সঙ্গে তাে আমার কোনাে আত্মীয়তা নেই।
‘তা তাে বটেই। তবু গুণ অনুসারেই নির্বাচন হওয়াটা কি ঠিক নয়?
তােমাদের--আপনাদের ক’জনকে ডাকা হয়েছে ?
‘তিন জনকে।
‘সবাই গ্র্যাজুয়েট ?
'হঁ্যা।
কেউ বি-টি নয় ?
‘না।
‘তবে তাে চান্সে, মানে, সম্ভাবনা সবাই সমান। দু হাতের
মুঠোর মধ্যে মুখ নিয়ে সমর আরেকটা সিগারেট ধরালাে।
‘সমান নয়। তারি জন্যে তত তােমাকে আগে থাকতে একটু বলতে
এসেছি। সরম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাে। বললে : একজন অনার্স,
আরেকজন ডিটিঙ, আর আমি সাধারণ পাশ-কোস!
৯৭
যথাপূর্ব
খার অনাস তারই তাে পাওয়া উচিত।
এর মধ্যে আর কথা কী ?
গুণই পুরস্কৃত হবে। শেষের কথাটা ইংরিজিতে এসেছিলো, অতি কষ্টে
সেটাকে সমর বাঙলায় রূপান্তরিত করলে।
“কিন্তু আজকালকার চাকরির বাজারে গুণই কি সব? খাতির
খাতিরের কি কোনই দাম নেই ? কালাে চোখে সরমা কোমল একটি
কটাক্ষ করলাে।
‘তবে আপনি আমার কাছে ক্যানভাসিং, মানে তদবির করতে
এসেছেন?'
‘হা, যদি কানে-কানে বলতে পারতুম, বললুম, তাই, তদবির করতে
এসেছি। তুমি যে আমার মুরুব্বি, এই কি আমার ভয়ানক গুণ নয়?
সরমা সামান্য হাসল।
কতক্ষণ সমর কোনাে কথা বলতে পারলাে না।
চমক ভাঙলল সরমার পরের কথাটা শুনে। বিমর্ষ অথচ সস্মিত
গলায় সে বললে, “আচ্ছা, এতক্ষণ হয়ে গেল, আমাকে তুমি এখনাে আপনি
বলছ! আমি কি তােমার আপনি ?
হঠাৎ সমর কলিংবেলটার উপর হাতের তালু দিয়ে একটা বাড়ি
মারলো। এস্ত হয়ে ছুটে এলে আদালি। নিষ্ঠুর মুখে সমর বললে, বলে
দাও, দস্তখৎ আজ আর হবে না।”
আর্দালি চলে যাচ্ছিলাে, সমর আবার তাকে ডাকলাে।
‘গাড়ি এসেছে?
‘এসেছে।
“হ্যা’, কলার-পিষ্ট গলাটা একবার হাত দিয়ে একটু অনুভব করে সমর
বললে, এবার আমি বাড়ি যাবে।
সেই সেদিনের সমর! কি রকম ছিল, আর কী হয়েছে! চোখের
প্রজাপতয়ে ১৮ সামনে দেখেও সরমা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাে না। কি রকম দুর্বল ছিল, যখন তাদের বাড়িতে আসতে, কত ভীত, বিনীত, পৃথিবীর সব চেয়ে বড় দুঃখী। সেই সমর আজ কত অহঙ্কারী, কী ভীষণ নিষ্ঠুর, কী আশ্চর্য নিস্পৃহ। বােগা, বাজে-পােড়া চেহারা ছিল, এখন শরীরে বেশ একটু মাংস হয়েছে, কান্তি ফুটেছে, আর সব চেয়ে ফুটেছে একটা সচেতনতার আভা। সে যে একটা কিছু, তার মর্যাদায় আর প্রভুত্বে, এই কথাটা তার ললাটে উল্লিখিত। আগে কত দিন তার ট্রাম-ভাড়ার পয়সা নেই দেখে লুকিয়ে তার পকেটে টাকা ফেলে দিয়েছে সরমা, আর আজ তারই দুয়ারে সামান্য একটা চাকরির জন্যে সে মাথা কুটছে। আস্তে-আস্তে চারিদিক কেমন নিঃশব্দ হয়ে এলাে। লােকজন অনেক পাতলা হয়ে গেছে। আগে যদি বা ভিড় ছিল, এখন যেন বা নির্জনতার ভয়। সমর উঠে দাড়ালাে। বললে, এখানে কোথায় উঠেছ ? সরমা তেমনি বসে রইলাে। বললে, “আমার এক দূর সম্পর্কের মামার বাড়িতে। তােমারই কপিইস্ট। কিন্তু সেখানে থাকা চলবে না। ‘কেন ? ‘তিলধারণের স্থান নেই। ভাবছি ডাক-বাঙলাতে রিমুভ করবে। ‘নদীর ওপারে? সমর যেন একটা হোঁচট খেলল। বললে, আর সব ক্যাণ্ডিডেট, মানে চাকুরি প্রার্থিনীরা কোথায় ? তারাও কি ডাক- বাংলাতেই উঠেছেন নাকি ? ‘না, তাদের কেউ না কেউ এখানে আছে। তাদের অসুবিধে হচ্ছে না। ‘তুমি একা ডাক-বাংলায় থাকবে? “কি আর করা, নিম্নগলায় মৃদু হেসে সরমা বললে, “একাই যখন
৯৯
যথাপূর্ব
আছি। আর ভয় তোমাদের রাজত্বেই তাে থাকব। যদি দয়া
করাে, একটা না-হয় কনেস্টবল মােতায়েন রেখাে।
‘পাগল ! তার চেয়ে আমার বাড়িতে চলল। সমর ব্র্যাকেট থেকে
টুপিটা তুলে নিল। বললে, “আমার স্ত্রীকে তাে দেখনি।
‘না। সরমা চোখ নামালো।
‘বেশ ভালাে মেয়ে। তােমাকে দেখে খুসিই সে হবে।
সরমা হাসলাে। বললে, “তােমার স্ত্রী যখন, ভালােই তাে হওয়া
উচিত। আর, আমাকে দেখে খুসি হবে সেটাও কিছু আশ্চর্য নয়।
বেশ, যখন ডাকলে, তখন নিশ্চয়ই যাবে। তার পর উঠে দাড়ালাে
চেয়ার ছেড়ে।
সমর আরেকবার তাকে ভালাে করে দেখলাে। বললে, “কতদিন আছ
এখানে?”
যদি রাখাে তাে আর যাই-ই না।
‘রাখি মানে?
“রাখাে মানে যদি চাকরিটা পাইয়ে দাও। সরমা ঢােক গিললাে :
‘কাল রবিবার দুপুরে ইনটারভিয়ু, অ্যাপয়েন্টমেন্ট-লেটারটা যদি কাল
হাতে-হাতেই দিয়ে দাও, তবে আর যাই না, এখানেই থেকে যাই।
‘কিন্তু ইস্কুলে তাে এখনাে শিক্ষয়িত্রীদের জন্যে বাড়ি-ঘর তৈরি
হয়নি।
‘তা চাকরি যে দিতে পারে সে কি থাকবার একটা বাড়ি জোগাড়
করে দিতে পারবেনা ? একা একজনের মধ্যে অন্তত একটা একচালা ?
একা একজনের মতাে। কথাটা শেষ করে শেষ করতে গিয়ে সমর
থেমে গেল। বললে, ঐ গাড়ি।
গাড়ি শুনে সরমা প্রথম ভেবেছিলাে, মােটর গাড়ি। কিন্তু দেখলে,
প্রজাপতয়ে ১০ ০ অশ্ববাহিত। বুঝলল, গম্ভীর পদমর্যাদার দরুণ এই ট্যাক্সোটা সমরকে দিতে হচ্ছে। কিন্তু গাড়ির চাকা গুলাে এমন বক্র-স্থলিত হয়ে দাড়িয়ে আছে, সরমার ভয় হলাে ছুটতে গিয়ে গাড়িটা না দ্বিধা হয়ে যায়। তবু বসলাে সে সমরের মুখােমুখি। বললে, ‘মােটর কেন নি ? ‘মােটর? এখানে রাস্তা কোথায় ? ‘তা যেটুকু আছে, তাই মন্দ কী! রাস্তা না থাক, সঙ্গিনী তো আছে। সরমা আশা করেছিলাে এর উত্তরটা হয়তাে এই হবে, “সঙ্গিনী থাকলে ঝঝরে ঘােড়ার গাড়িই যথেষ্ট, কিন্তু উত্তর যা শুনলাে এই : ‘সঙ্গিনী যিনি আছেন তিনি অনেক রাস্তা পর্যন্তই আছেন, তাই ব্যস্ত নই। সরমা লক্ষ্য করছিলাে সমর মােটেই স্বস্থ বােধ করছে না। দুই পাশের কৌতুহলী জনতা তাকে যেন পীড়িত করছে। যে যেন এখানে বড়াে বেশি চিহ্নিত, দৃষ্টিবিদ্ধ। আর, অন্যের দৃষ্টির কাছে তার দৃষ্টি যেন অত্যন্ত লাজুক। সরমা বললে, “তুমি দুর্নামকে খুব ভয় করাে, না? সিগারেট সম্বন্ধে সমর একটু কৃপণ। তবু আবার আরেকটা সে সিগারেট ধরালাে। বললে, “কে না করে ? ‘আমি আগে খুব করতাম, কিন্তু এখন আর করি না। এখন উলটে তােমার কাঁধে এসে ভূত চেপেছে। অথচ এমন একদিন ছিল, সরমা চোখে ঝিলিক দিল : ‘দুর্নাম নিয়ে কত কবিত্বই না করেছ। একমুখ ধোয়া ছেড়ে সমর বললে, “চিরদিন মানুষের সমান যায় না। ‘এতক্ষণে একটা সত্যকথা বললে। সমানই যদি যাবে তবে আজ আমার এমন দশা হবে কেন ? কেন সামান্য একটা পঞ্চাশ টাকার চাকরির জন্যে উড়ে বেড়াবাে ?
যথাপূর্ব
‘কেন এমন দশা হলাে ? সমরের প্রশ্নটা শােনালাে ভীষণ প্রতিহিংস্র।
সহানুভূতির লেশমাত্র নেই।
‘বােধহয় একজনকে খুব দুঃখ দিয়েছিলাম, তার প্রতিফল।”
‘সেই একজনটি কে?
‘সেই একজন একজনই।”
সমরের বুকের ভিতরটা আবার হঠাৎ মােচড় দিয়ে উঠলাে। একটা
নিশ্বাস সিগারেটের ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিয়ে সে বললে, “কিন্তু তার মতাে
সুখী পৃথিবীতে তাে কাউকে আর দেখতে পাচ্ছি না।
‘তবু, আমার এমনি অভিশাপ, আমার অদৃষ্টে এককণা সুখ নেই।”
সরমার চোখ যেন আচ্ছন্ন হয়ে এলাে : ‘জীবনে এত সুখী হয়েও সে
আমাকে ক্ষমা করলাে না। তবু, ক্ষমা না হােক, মেহ না হােক, অন্তত
আজ যদি সে একটু করুণা করে, আমার চাকরিটা হয়ে যায়।
‘তােমাকে তাে বলেছি, সমরের সমস্ত মুখ কেমন কঠিন হয়ে এল :
‘এ চাকরি তােমার হবে না।
‘হবে না ?
‘না। আগে-আগে একেকটা কথা অনেকবার করে অনেক রকম
ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বলতাম। এখন যা বলি, একবারই বলি।
“তুমি কি যে বল, তা তুমি জান না। সরমা পাংশু মুখে বললে।
‘হয়তাে জানি না। কিন্তু তােমাকে এই চাকরি দেব জানলে কখনাে
ইনটারভিয়ুর আগে তােমাকে নিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় গাড়ি চাপতাম না।
আমি সম্পূর্ণ স্থির করেছি বলেই তােমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারছি।
নইলে যে বিচারক সেই আসামীর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে এটা অসহ।
‘অসহ। কিন্তু কখনাে তুমি এমন কথা বলতে না যদি জানতে
আমি আজ কী বিপদে পড়েছি। সরমার গলা ধরে এলো।
প্রজাপতয়ে
১০২
কথাটা যেন সমর উপভােগ করলে। বললে, “তা আমি কী করব?
আমাকে ত আমার বিপদ দেখতে হবে। তা ছাড়া যে-বিপদই হােক, কী
বিপদ তা আমি জানতে চাই না, তা তাে আর আমার তৈরি নয়।
‘যদি বলি, তােমার ?
‘আমার ?” সমর এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে স্থির চোখে তাকালাে সরমার
দিকে। তারপর শূন্য ভাষায় শব্দ করে হেসে উঠলাে : ‘শুনতে পারি
বিপদটা কী ?
নিজের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় সরমা বললে, “আমার এই অভাব,
দারিদ্র্য
‘অভাব? নিজের চোখে এতক্ষণ দেখেও যেন সমর এই প্রথম
দেখছে।
‘কুৎসিত অভাব না হলে কি কোনাে ভদ্র মেয়ে সামান্য পঞ্চাশ টাকার
চাকরির জন্যে এমন মিনতি করে? ইনটারভিয়ুতে রাজি হয় ?
‘অভাব—কিন্তু, কেন, তােমার তাে খুব বড় ঘরে বিয়ে হয়েছিলাে?
সাতকাণ্ড শেষ করে সমর এতক্ষণে বলতে পারলাে কথাটা।
‘হয়েছিলাে। সবই হয়েছিলাে। কিন্তু কিছুই আর হয় না। সরমা
স্তিমিত গলায় বললে, ‘বড়াে ঘরই দেখেছিলাম, কিন্তু ঘর যাতে বড় হয়
তার দিকে চেয়ে দেখিনি।
সেটা কী জিনিস সময় জানতে চাইলে না। শুধু বললে, “তারপর,
দাড়িয়েছে কী ?
স্বামী আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
‘তাড়িয়ে দিয়েছে! কেন?
সন্দেহ করে।
“কী সন্দেহ ?
যথাপূর্ব ‘যে একজনকে আমি ভালােবাসি। ‘কে একজন ? ‘বলেছি তাে একজন কখনাে দু’জন হয় না। আমিও তাই কিছু লুকোলাম না, সরমা আরক্ত মুখে বললে, “না অতীত, না বর্তমান, না অনন্ত ভবিষ্যৎ। ফলে, ছিটকে এই বেবিয়ে পড়েছি বাইরে, একেবারে নিঃসম্বল। তােমার হাত ধরে একটু কি দাঁড়াতে দেবে না? আবার সরমার মুখ ম্লান হয়ে এলো : ‘যাতে স্বাধীনভাবে দুটো খেতে পাই, শান্ত ভদ্রভাবে জীবনটা টেনে নিয়ে যেতে পারি। ‘ছেলেপুলে হয়নি? প্রশ্নটা বেখাপ্পা শােনালাে, কিন্তু জানা দরকার। অনেকটা ফাকা জায়গার পর গাড়ি আবার লােকালয়ের মধ্যে এসেছে। কিছুকাল চুপ করে থেকে সমাহিত উদাসীন গলায় সমর বললে, “কিন্তু ন্যায়ের দিক থেকে দেখতে গেলে তােমার চেয়ে সেই অনাস- পাশ ভদ্রমহিলার দাবিই কি বেশি নয় ? ‘ন্যায়-ন্যায় কি তুমি শুধু ঐখানেই দেখতে পাচ্ছ ? তােমার ন্যায়-অন্যায় সমস্তর উপর কি আর কিছু নেই? এই, রাখাে। সরমা হঠাৎ গাড়ােয়ানকে থামতে বললে। ‘এখানে ? “হ্যা, এইখানেই আমার সেই কপিইস্ট মামার বাড়ি। সরমা গাড়ি থেকে নামতে-নামতে বললে, “বিদেশে রাত্রিকালটা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকাই হয়ত ন্যায়সঙ্গত। সমরও নেমে পড়লাে। এগিয়ে দিয়ে এলাে দু পা। এবং প্রকা রাস্তাতেই বললে, “তুমি একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে না। আমি দেখব চেষ্টা করে। কালকে এসাে।
প্রজাপতয়ে ১০৪ ‘ধন্যবাদ।' বলে সে হাসিমুখে হালকা পায়ে বেড়া-ঘেরা বাড়ির মধ্যে অন্তধন করলে। বাড়ি ফিরে এসে সমর সকল কথা বৃত্তাকারে বললে শােভনাকে— ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ এবং বৃহৎ থেকে বৃহত্তর বৃত্তে কিন্তু আসল যেটা কেন্দ্র সেটাই গােপন করলে। যে-পরিচয়টা বলবার নয় তাই বললে, সরমা তার বৌদিদির মাসতুতাে বােনঝি। কোলকাতায় বৌদিদির বাপের বাড়ি গড়পারে উনিশ শশা কোন সালে যেন তাকে একবার দেখেছিলাে, আর এতদিন পরে দেখা, এই পেঁয়াে সহরে। কোথাকার জল কোথায় এসে দাড়ায়, আর কতটা ঘােলা হয়ে। বিয়ে হয়েছিলাে মস্ত ঘরে, কোন জমিদার না ব্যবসাদার না আড়তদারের সঙ্গে। বিয়ে হয়েছিলাে বছর তিনেক আগে, এই তাদেরই বিয়ের বছর। কিন্তু এত সুখ হজম করতে পারলাে না, স্বামীর সঙ্গে অবনিবনা হলাে। বি-এ পাশ মেয়ে, আত্মসম্মানটা একেবারে চুলের আগায়। শেষ পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। শক্ত পুরুষ, ফিরেও তাকালাে না, অনুতাপে একেবারে অনুত্তপ্ত। ফলে যা দাড়িয়েছে তা অত্যন্ত শশাকাবহ। সামান্য একটা শিক্ষয়িত্রীর চাকরির জন্যে এখানে এসে উপস্থিত। সামান্য জীবিকা নির্বাহটাই এখন সমস্যা। অবিশ্যি সমর চেষ্টা করলে চাকরিটা ইলেও হতে পারে, কিন্তু মুস্কিল এই, সরমার চেয়ে উপযুক্ততরে প্রার্থিনী আছে। শােভনা খােকাকে বােতলে করে দুধ খাওয়াচ্ছিলাে। গল্পের যেখানটায় তাকে বিধলাে সেইখানেই সে আঙুল রাখলাে। বললে, ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল কেন? ‘সব কথা ভেঙে বলতে চায় না। তবে যেটুকু বুঝলাম তাতে মনে হল, গায়ে ওর হাত তুলতাে।
যথাপূর্ব
শােনা একটা আতঙ্কের শব্দ করলে।
‘আর মনের উপর পীড়নটা অনেক সময় শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে
দুঃসহ।
‘তবে তাে ওঁকে চাকরিটা দিয়ে দেওয়াই উচিত। শােভনা
সহানুভুতিতে বললে।
“কিন্তু অসুবিধে হচ্ছে এই, ওর চেয়ে ভালাে পাশকরা মেয়ে আছে।
‘আহা, এ আবার কী কথা! এমন দুঃখে পড়েছে, আমাদের জানা-
শােনা মেয়ে, ওরই তাে পাওয়া উচিত একশ বার।
সমর মনে-মনে একটু বল পেলাে কিনা কে জানে। বললে, “কাল
এখানে আসবে বলেছে, তােমার সঙ্গে দেখা করতে।
‘আসবে। শােভনা উৎফুল্ল হয়ে উঠলাে : ‘চোখ তা হলে সার্থক
করি। বি-এ পাশকরা মেয়ের সঙ্গে কোনদিন কথা বলিনি। হেজিপেজি
লােক আমরা, ভয় করে।
এটা শােভনার বিনয়, কেননা এ সহরে সে যে মহিলা নম্বর প্রথম, সেটা
তার বিলক্ষণ জানা আছে। কতগুলি আর্দালি-চাপরাশি সে খাটাতে
পারে তা তার মুখস্ত। পাশ-টাশ না করলেও সভায় দাড়িয়ে, বক্তৃতা নয়,
পুরস্কার যে বিতরণ করতে পারে সে-গৌরবও তার হয়েছে।
‘ভয় তাে তার, সমর টিপ্পনি কাটলাে : ‘তােমার মত এমন একজন
প্রতাপান্বিতা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়। কেননা তােমার হাতেই
তার চাকরি।
‘বেশ তাে, নিয়ে এসাে না, প্রতাপটা দেখিয়ে দিই। শােভনা
হাসলাে : এখানে আছে কোথায় ?
“আমারই আপিসের এক নকলনবীশের বাড়িতে। কি রকম মামা
হয় নাকি সম্পর্কে।
প্রজাপতয়ে
১০৬
নকলনবীশ যে একজন খুব মর্যাদাবান ব্যক্তি নয় এটা শােভনা সহজেই
ধারণা করলাে। বললে, “এখানে উঠলেই তত পারত। আমিও তাে
সম্পর্কে তার মাসি হই।
সমর একটু সাহস পেলে হয়ত। বললে, “আমিও তাই বলেছিলাম।
কে জানে, কাল হয়তাে আসতে পারে।
কিন্তু কল একেবারে সকালেই আসবে এতটা সমর আশা করেনি।
আপিস-ঘরে বসে সে কাজ করছিলাে, দেখলে সরমা তার বাড়ি ঢুকছে,
সােজা অন্তঃপুরে।
ইনটারভিয়ুর আগে এখানে চলে আসাটা ভীষণ
বিসদৃশ। বিরক্তিতে মন সঙ্কুচিত হয়ে গেল।
প্রথম দেখাতেই বুঝতে পেরেছে শােভনা, এ কে। এবং আত্মপরিচয়
দিয়েই মুহূতে সরমা আত্মীয় হয়ে উঠলাে। পরে বললে, “আপনি যদি
ওঁকে একটু বলেন, আমার হয়ে যায় চাকরিটা।
অভয় দিয়ে শােভনা বললে, ‘আমি না বললেও হবে।
“কিন্তু উনি মােটেই রাজি নন। আমার চেয়ে ভালাে ক্যাণ্ডিডেট আছে
বলে তার আপত্তি। কিন্তু বলুন, নূনতম যােগ্যতা যখন আমার আছে আর
আমি যখন এমন অভাবগ্রস্ত তখন আমারই হওয়া কি উচিত নয় ?
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি এখুনি বলছি গিয়ে ওকে।
শােভনার কণ্ঠস্বরে প্রতাপ ফুটে উঠলাে। পরে অন্তরঙ্গতার সুরে বললে,
কিন্তু আপনি এ-বেলা আমার এখানে খাবেন, কেমন ?
‘খাবাে? এ তাে খুব ভালাে কথা। সরমা উৎফুল্ল হয়ে উঠলাে :
‘তবে খেয়ে-দেয়ে এখান থেকেই ইনটারভিয়ুতে বেরুতে পারবে। মেয়ে-
ইস্কুলটাতাে কাছেই।
ঐ যে দেখা যাচ্ছে। জানলা থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে শােভনা ফের
বললে, এর জন্য আবার একটা পরীক্ষা দিতে হবে নাকি ?
১০৭
যথাপূর্ব
‘া, ওঁরা সব আমাদের যাচাই করে নেবেন। বিয়ের বেলায়
একবার, চাকরি দেবার বেলায় আরেকবার।
‘এসব হাঙ্গামার কোনই দরকার ছিল না, যদি আমাকে একবারটি
লিখতেন আগে। শােভনা আবার আরেকটু প্রতাপ দেখালাে : ‘চুপচাপ
আপনাকে ঠিক ঢুকিয়ে দিতে পারতাম। আচ্ছা, আপনি একটু বসুন,
আমি ওঁর সঙ্গে একটা কথা বলে আসছি।
আপিস-ঘরে সচরাচর শােভনা আসে না। অনেকখানি ঢালা
বারান্দা পেরিয়ে তবে ঢুকতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানলাে ঘরে এখন
আর কেউ নেই। প্রতাপাম্বিত ভঙ্গিতে স্যাণ্ডেল ফটফট করতে-করতে
ঘরে এসে ঢুকলাে, বসলাে একটা চেয়ারে। আমূল চমকে উঠলাে
সমর, দেখনাে শােভনা।
শােভনা বললে, “উনি তাে এসেছেন—
‘চলে যেতে বলল। সমর কর্কশ গলায় বললে, ‘ইনটারভিয়ু, মানে
মৌখিক পরীক্ষার আগে এখানে এসেছে কেন? লােকে দেখলে বলাবলি
করবে যে।
“কী বলাবলি করবে ?
‘বলবে, আমারই কোন দূরসম্পর্কের আত্মীয়াকে জোর করে চাকরি
দিয়েছি, আর-সব উপযুক্ত প্রার্থীদের দাবিয়ে রেখে। একটা ভীষণ
কানাঘুষাে শুরু হয়ে যাবে। না, না, তুমি এখন ওকে চলে যেতে বলল,
সমর অসহিষ্ণু হয়ে উঠলাে : ‘যা-ও সম্ভাবনা ছিল এতেই তা আরাে নষ্ট
হয়ে যাবে। বলে দাও, ইনটারভিযু, মানে, ইনটারভিয়ুর পরে যেন আসে।
এখানে এসে যেন চা খায়।
‘চলে যেতে বলবাে কী! ওঁকে যে এখানে এবেলা আমি খেতে
বললাম।
প্রজাপতয়ে
১০৮
‘চমৎকার! তার মানে খেয়ে-দেয়ে একসঙ্গেই আমরা ইস্কুলে যাই
ইনটারভিয়ুতে। লােকে স্পষ্ট বুঝুক।
‘বুঝলেই বা। ক্ষতি কী ?
‘কেন, খাতির নাকি? কিসের খাতির? গুণ দেখতে হবে না?
, শুধু চেহারা দেখলেই চলবে ?
‘তা, ভালাে চেহারা দেখে খাতির না হয় একটু করলেই। শােভনা
ঠাট্টা করলাে।
‘আমার বয়ে গেছে।
‘ভালাে চেহারা মানে আমার চেহারা দেখে।
‘তােমার ?
“হ্যা, আমার চেহারাটা কি শিক্ষয়িত্রীর চেয়ে ভালাে নয় ?
সমর হাসলাে। পাছে হাসিটা না সম্পূর্ণ অর্থজ্ঞাপক হয়, বললে,
শতসহস্রগুণে ভালো।
‘তবে আমার এই চেহারা দেখেই চাকরিটা ওঁকে পাইয়ে দিতে হবে।
আমি ওঁকে কথা দিয়েছি।
‘তােমার কথা কমিটি শুনবে কেন ?
‘কমিটি না শুনুক তুমি শুনবে। সামান্য একটা চাকরি দিতে পারাে
, তবে এত ফুটুনি কিসের?
সমর আবার হাসলাে। বললে, কিন্তু তােমার এত ওকালতি কেন ?
‘তােমার হাত থেকে মামলাটা জিতবাে সেই আনন্দে। তা ছাড়া
আমি মােটা ফি পেয়েছি। সমর তাকিয়ে রইলাে।
হাসিমুখে শােভনা বললে, ‘প্রথমত আমার উনি সঙ্গী হবেন, দ্বিতীয়ত
আমাকে বাড়িতে এসে পড়াবেন বিনামূল্যে। কাছেই কোথাও তাঁর বাসা
হবে। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে সব সময়।
যথাপূর্ব
‘তবে, বেশ ভাে’, সমর ঢােক গিললো : ‘তােমার প্রাইভেট
টিউট্রেস, মানে গৃহশিক্ষয়িত্ৰী করেই রেখে দাও না ওকে। পঞ্চাশ
টাকা মাইনেই না-হয় দেয়া যাবে। কষ্ট করে হাত আর বাড়াতে হবে না।
নিজের থেকেই
‘ইস্! পঞ্চাশ টাকা। শােভনা ঠোট উটোললা: ‘টাকা অমনি
গাছে ধরে ?”
তা-ও তো ঠিক, সমর ভেবে দেখলে।
‘মােট কথা, চাকরিটা চাই। ওঁর খাতিরে না হােক, আমার খাতিরে।
বুঝলে? শােভনা উঠে দাড়ালাে।
‘তােমার যে দেখি ভীষণ দয়া।
“তােমারই বা হবে না কেন? টেবিলের ধারে একটু ঝুকে পড়ে
শােভনা বললে, ধরাে, আমি যদি অভাবে পড়ে তােমার কাছে এসে চাকরি
চাইতাম, তােমার দয়া হতাে না? দিতে না আমাকে ?
“তুমি হলে দিতাম বৈ কি। সমরও উঠে পড়লাে।
এ-ও তেমনি মনে করে। শিশুর মতাে শুভ্র সরলতায় শােভনা
হেসে উঠলাে। বললে, “মনে করতে আর দোষ কি! ওঁর ভেতর
থেকে আমিই না-হয় চাইছি চাকরিটা। দরজার কাছে গিয়ে সে
ঘাড় ফেরাললা : ‘সত্যি, দিয়াে কিন্তু। আমার প্রতাপটা একটু
দেখাই।
সমর বেরিয়ে পড়লাে ছড়ি নিয়ে। আর কোথাও নয়, দেখা করলে
গিয়ে গিরিশ মুদির সঙ্গে। গিরিশ তাে শশব্যস্ত। ব্যাপারটা কিছুই নয়,
সমরের বাঙলাের পিছে রাস্তার ওপারে ছােট যে'একখানি কাঠের বাড়ি
সে তৈরি করেছে সেটাকে ভাড়া দিতে হবে। গিরিশের ঘাড় সেই যে
কাৎ হলাে আর ওঠে না। হুজুর যখন চান। আর ভাড়া আট
প্রজাপতয়ে টাকার বেশি পাবে না। গিরিশের ঘাড় আর কঁাধ এক হয়ে গেল। হুজুর যা বলেন। ততক্ষণ, শােভনা যতক্ষণ সমরের আপিস-ঘরে, সরমা ঘুরে-ফিরে দেখতে লাগলাে বাড়ি-ঘর। সবকিছুতেই তার ভারি কেমন কৌতুক লাগছিলাে, সেদিনের সেই ছন্নছাড়া সমর কেমন এখন আঁকিয়ে বসেছে। ভাবলে কেমন অবাক লাগে। এটা তার ড্রয়িংরুম, যেখানে সরমা বসে আছে। গদি-আঁটা সােফা, মেঝেতে গালিচা পাতা। মাঝখানে ঢাকনি- দেয়া ছােট একটা গােল-মতাে টেবিল, তার উপর মিনে-করা ফুলদানিতে বাগানের ফুল, যত ফুল তার চেয়ে পাতা বেশি। এক কোণে একটা অর্গ্যান-পরিপাটি করে ঢাকনি দেয়া। যতটা না বাজনা তার বেশি আসবাব। শােভনা বােধহয় গায় আর সমর বােধহয় শশানে। শােনবার জন্যে কতটা আর শােনাবার জন্যে কতটা কে জানে। ছন্দ রেখে আরেক কোণে গ্রামােফোনও একটা আছে, তেমনি নিচ্ছিদ্র ঢাকনি দেয়া, রেকর্ড- গুলাে এনামেলের খাপে রাখা। সব ফিল্মের গান, সরমা যা ভেবেছিলাে। আর বই, যা ছিল সমরের কাছে বাঘের কাছে মানুষের রক্তের মতাে। তা-ও কয়েকখানা আছে দেখা যাচ্ছে, ঘুরন্ত বুক-কেসে। বেশ মােটা-মােটা দেখতে, রঙচঙে মলাটের। বেশির ভাগই ভূতের, ডাকাতের আর খুনীর কীর্তিকাহিনী। একখানি ছবির, বিদেশিনী পর্দাবিহারিণীদের। একখানা গয়নার বিচিত্রিত ক্যাটালগ। দেয়ালে নানা ছদের ফটো ঝুলছে, নানা জায়গা থেকে বদলি হবার আগেকার প্রহসন, চাপরাশ দেখিয়ে আর্দালি, চাপকান দেখিয়ে উকিল, আর সতরঞ্চি বিছিয়ে পায়ের তলায় আমলাবৃন্দ। বেশির ভাগ ফটোতেই সমরের গলায় ফুলের মালা। বেশ একটু সচেতন গর্বিত ভঙ্গিতে বসা, একটু কঠিন হয়ে, একটু ঘাড় উচিয়ে। এত দুঃখে না পড়লে সরমা একটু হাসততা। দু-একটা ফটো আছে সমরের একলার।
যথাপূর্ব একটাতে রাইফেল নিয়ে দাড়িয়ে আছে, পায়ের তলায় বাঘ নেই এই যা রক্ষে, আরেকটাতে লম্বা একটা পাইপ মুখে দিয়ে। চেনা যায় না, চিনলেও হেসে ওঠা সম্ভব নয়। আত্মহত্যার ধারে দাড়িয়ে যে একদিন কাপছিলো সে আজ বন্দুক নিয়ে রুখে দাড়িয়েছে। পাশের ঘরটা, খাবার-ঘর বললে বােঝা যাবে না, ডাইনিং-রুম। টেবিল পাতা। তাকের উপর থরেথরে বাসন-সাজানো, কঁচের বাসন, হাত ধােবার জন্যে বাটি পর্যন্ত। কফি খাবার ছােট-ছােট পেয়ালা। কাচের বদনা, কাচের কুঁজো। ছুরি-কাটা। ন্যাপকিন। সবই অল্প-বিস্তর আছে। সরমার মনে হলাে আজকাল নিশ্চয়ই সমর আর ডালের বড়া ভালােবাসে । মনে হলাে, আর তার ছেলেমানসিতে নিজেই হাসলাে মনে-মনে। শশাবার ঘরটা দেখতে হয়। ওটা ওপাশে। সেখানে ঢুকেই প্রথমে দেখতে পেলাে দোলনায় ঘুমুচ্ছে একটি খােকা। বেচা-বোচা মুখ, ফুলে- ফুলল। ভাবলে অবাক লাগে, সবাই এরকম থাকে, পরে বদলে যায়, দেখতে-দেখতে বদলে যায়, শেষে একদিন হঠাৎ বন্দুক নিয়ে তেড়ে আসে। দোলনায় একটু দোলা দিয়ে সরমা ঘুরে দাড়ালাে। কায়দা করে ঘরের দু- প্রান্তে দু’খানা খাট পেতেছে, বিয়ের জোড়া খাটটা ভেঙে নিয়ে। বিছানার উপরে ফুল-তােলা ঢাকা বিছানাে। মাঝখানে মেঝের উপর গালিচার একটা সেতু। আর আসবাবের মধ্যে গদি-মােড়া একটা প্রকাণ্ড ইজি- চেয়ার। আর যদিও বা কিছু থাকে সরমার চোখে পড়লাে না, চোখ চলে গিয়েছে তার দেয়ালের দিকে। সেখানেও রাশি-রাশি ফটো, বেশির ভাগই যুগল। কোনােটা গা ঘেসে পাশাপাশি দাড়িয়ে, কোনােটা চেয়ারের হাতলে বসে, কোনােটা বা সনাতন কাধে হাত রেখে। সরমার লজ্জা করতে লাগলাে। এরা সব নিশ্চয়ই শ্বশুরবাড়ির লােক, কাউকে সে চেনে না। এ মেয়ে-দুটিই বা কে! আর এই তেজী ভদ্রমহিলা।
প্রজাপতয়ে ১১২ এই সবই সে খুটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছিলল, এমন সময় পিছন থেকে শােভনা এসে বললে, “কিছু ভয় নেই, চাকরি আপনার ঠিক হয়ে যাবে। ‘বাঁচালেন। নিশ্বাস নিয়ে সামলালে সরমা। চাকরিটা যেন গৌণ, এমনি ভাব করে সে বললে, “আচ্ছা, আপনার বিয়ের আগের কোনাে ফটো নেই ? যখন ইস্কুলে পড়তেন, স্কিপ করতেন, কিম্বা যখন আস্তে-আস্তে বড়াে হয়ে উঠছেন। নেই একটাও ? ‘মার কাছে থাকলেও থাকতে পারে। কেন বলুন তাে ? “না, এমনি জিগগেস করছি। সরমা হাসলাে : ওঁর জানতে ইচ্ছে করে না, দেখতে ইচ্ছে করে না, কেমন ছিলেন আপনি ছােটবেলায় ? কেমন করে ওঁর জন্যে তৈরি হয়ে উঠলেন আস্তে-আস্তে ? শােভনাও হাসলাে। বললে, তখন তাে ভীষণ বােকা ছিলাম। কিছু বুঝতাম না। ‘তেমনি আপনারা কি জানতে ইচ্ছে করে না, দেখতে ইচ্ছে করে না, উনি কেমন ছিলেন ছেলেবেলায়, যখন কলেজে পড়তেন, যখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন “ওঁর কোনােদিন ছেলেবেলা ছিল বলে তাে বিশ্বাস হয় না। শােভনা একটু যেন গর্বের সঙ্গে বললে, “উনি বলেন মায়ের পেট থেকেই নাকি উনি কোট-প্যান্ট পরে হাকিম হয়ে জন্ম নিয়েছেন। হ্যা, পাশেই বাথরুম, ওটায় জিনিস-পত্র, ট্রাঙ্ক-সুটকেস, ওদিকে সাজ-ঘর, ভিতরে আবার এই বারান্দা, নিচেই কিচেন-গার্ডেন, কত বড় টোম্যাটো হয়েছে দেখুন, আর ঐখানে রান্না আর বাবুচি-বেয়ারা। চাকরি- বাকরি ভুলে গিয়ে সমস্ত সরমা গভীর মনােযােগর সঙ্গে খুটিয়ে-খুটিয়ে দেখতে লাগলাে। জিনিস হারিয়ে গেলে লােকে যেমন দেখে। তারপর দেখতে-দেখতে এতদুর গােপনে সে প্রবেশ করলে যে নিয়ে ১১৩ যথাপূর্ব বসলাে সে শােভনার মাদুরের ব্যাগটা যাতে সমরের চিঠি রয়েছে জমা করা। ও-গুলাে না দেখলেও সে পারত, দেখে তার মনে হলাে। মিথ্যা কথায় ভরা ছিল বলে তত নয়, কেননা স্ত্রীলােকের সম্পর্কে মিথ্যাকথাটা পুরুষের মজ্জাগত। যেটা লজ্জার সেটা হচ্ছে চিঠিগুলির আশ্চর্য স্কুলতা। আনাচে-কানাচে প্রত্যেকটি ধূলিকণা খুটে সরমা দেখলাে, সে কোথাও নেই, নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে। চারদিক দেয়ালের মতাে সাদা, চূণকাম- করা। নখের একটা আঁচড়ও কোথাও লেগে নেই। স্নান করে সে নিগ্ধ হলো। ভুরিভােজ করে সে তৃপ্ত হলাে। এবং ইনটারভিয়ু থেকে ফিরে এসে সে বুঝলাে চাকরিটা তার হবে না। মুক্তি। বিকেলে সমর এসে বললে, বিষয়টা এখন কমিটির, মানে পরিষদের কাছে পেশ হবে। সভাটা শিগগিরই ডাকাবাে। তারপর সেখানে যা শেষ নির্বাচন হবে জানাবাে আপনাদের। আপনি কি আজ সন্ধের ট্রেনেই ফিরে যাবেন ? অনুৎসুক মুখে সরমা বললে, “হ্যা। হাতে-হাতে চাকরিটা তাে আর দিতে পারলেন না। থাকি কোথায় ? কথাটা সত্যি। বলা যায় না যে গিরিশ-মুদির বাড়িটা তােমার জন্যে ভাড়া করেছি। ‘তা ছাড়া দিতেই যে পারবেন তার ভরসাও বিশেষ দেখছি না। সরমা হাসলাে : ‘আপনাদের সেক্রেটারি আমাকে যে-সব প্রশ্ন করেছিলেন আর আমি যে রকম কড়া-কড়া উত্তর দিয়েছি তাতে চাকরির আশা করি না। শােভনা ঝামটা দিয়ে উঠলাে স্বামীকে : ‘তুমি সেক্রেটারিকে ধমকে থামিয়ে দিতে পারতে না ? সমর হাসলাে। পরে সরমার দিকে চেয়ে বলল, “মফস্বলের প্রজাপতয়ে ১১৪ রাজনীতি ভীষণ জটিল। তবু আমি ছলে-বলে প্রাণপণ চেষ্টা করবাে আপনার জন্যে। ধন্যবাদ। আপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম। আমাকে একটা গাড়ি ডেকে দিন। মামার সঙ্গে একবারটি দেখা করে সােজা পিটটান দেব। সরমা মৃদু সরমা মৃদু হাসলাে : ‘চাকরি না পাই, শান্তি পেয়ে গেলাম অনেক। অনেক বাধা, অনেক বিবেচনা। সমর যেতে পারলাে না স্টেশনে। কেবলই মনে হতে লাগলাে ট্রেনটা যেন ছাড়ছে না, সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও লাইনের উপর আটকে থেমে আছে। আর, চলন্ত গাড়িতে, নিজের প্রচ্ছন্ন কামরাতে বসে সরমা ভাবছিলাে, প্রেম একটা কী ভীষণ অপচয় মানুষের জীবনে ! যা শিখে লােকে ভুলে যায় তার অবশেষটুকুই যেমন শিক্ষা, তেমনি যে প্রেম আভা রেখে অস্ত যায় তার অবশেষটুকুই তাে জীবন! এই কি সেই জীবনের ছবি, এই কি সেই বিস্মৃতির অবশেষ ? জীবনের যােগফলে সেই প্রেমের কি এতটুকু দান নেই? নূতন গৃহরচনার মাঝে সেই প্রেমের কি এতটুকুও ছায়া পড়বেনা? সমস্তটাই যান্ত্রিক, সমস্তটাই কৃত্রিম, সমস্তটাই অভ্যাস ? সরমা মনে-মনে হাসলাে। ভ্যানিটি-ব্যাগ খুলে দেখলাে একবার নিজের মুখ। ছল আর বল কিছুই প্রয়ােগ করতে সমর বাকি রাখলাে না। কমিটির কয়েকজন ঘাড়-বাকা, ঘিয়ের প্রলেপ দিলে তাদেরকে। সেক্রেটারির দল গেল হেরে। সেদিন এমন ভাবে সমর বাড়ি ফিরলাে যেন ঘােড়ায় চড়ে ফিরেছে। শােভনা উৎফুল্ল হয়ে বললে, আমার মানটা তা হলে রাখলে। আজই লিখে দাও।
১১৫ যথাপূর্ব টেলিগ্রাম করলে হয়। ততটা হয়তাে ভালাে দেখাবে না। সমর লিখতে বসলাে চিঠি। কলম চললাে না। লিখতে বসে লিখবে কিনা পঞ্চাশ টাকার একটা চাকরি দিয়েছি। দরকার কি। সেক্রেটারিই লিখবে। তার চেয়ে গিরিশ মুদির বাড়িটাই আগে থেকে ঠিক করে রাখা উচিত। শশাবার ঘরে আরেকটা জানলা ফোটাতে হবে। বাথরুমটা খুব ছােট। দূরে কাচা রান্নাঘর না রেখে বারান্দাই খানিকটা ঘিরে দিতে হবে। গিরিশের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে অনেক সে গবেষণা করলাে এবং শােভনাকে সেখানে ডেকে এনে সন্ধ্যাবেলায় চা খেলাে । যথাসময়ে চিঠি গেল সরমার কাছে, সেক্রেটারির লেখা। কিন্তু উত্তর নেই। কেটে গেল সাতদিন। তবু উত্তর এলাে না। শােভনা বললে, “নিশ্চয়ই অসুখ করেছে। ‘অসুখ! কোনােদিন অসুখ হয়েছে বলে তাে শুনিনি। বলেই সমর নিজেকে সামলে নিল : ‘চাকরির চিঠি পেয়ে অসুখ করে সেই চাকরি খােয়ানাে এই প্রথম শুনছি। দেখে তাে মােটেই হেলে পড়া রােগা-পটকা বলে মনে হয় না। কি বলল, হয় ? “তবে হতে কতক্ষণ? “কিন্তু অসুখ হলে জানাতে পারতাে না ? ‘আমার মনে হয় কি জাননা, শােনা উৎসাহিত হয়ে উঠলাে : ‘নিশ্চয়ই আর কোথাও পেয়ে গেছে। পেয়ে যাওয়া মুখের কথা ! কী কম্পিটিশ্যন, মানে প্রতিযােগিতা আজকাল। বস্তায়-বস্তায় বি-এ পাশ। পেলেই হলাে! কত কাঠ-খড় পুড়িয়ে তবে এটা জোগাড় করা গিয়েছিলাে। ওরই অদৃষ্ট মন্দ—আমার কী! সমর সিগারেট টানছে আর ঘর থেকে বারান্দায় পায়চারি করছে।
প্রজাপতয়ে ১১৬ উল বুনছে শােভনা। একটা ভুল ঘর ছাড়াতে-ছাড়াতে বললে, ‘ভালাে আরেকটা পেয়ে গেলে তুমি তাকে ঠেকাবে কি করে? “কিন্তু তার কৃতজ্ঞতা বলে কোনাে জিনিস নেই ? সমর ঝাজিয়ে উঠলাে : ‘ভালাে পেয়ে থাকে ভদ্রতা করে জানাতে পারে না সে কথা ? বুঝলে, কারু জন্যেই কিছু করতে নেই সংসারে। “আমার মনে হয় কি জাননা, শােভনা চোখ তুললাে : ‘তােমার সেক্রেটারি কিছুই তাকে লেখেনি। সব ধাপ্পা দিয়েছে। তুমি নিজেই খোঁজ নাও চিঠি দিয়ে। সমর বসলাে গিয়ে আপিস-ঘরে। প্যাডের থেকে ছিড়ে নিল একটা চিঠির কাগজ। বাংলায়-ইংরিজিতে অনেক কসরৎ করে খান-পাঁচেক কাগজ ছিড়ে সে উঠে পড়লো। শেষকালে ইস্কুল থেকে ফাইল চেয়ে এনে ঠিকানা সংগ্রহ করে প্রিপেড টেলিগ্রাম করে দিল। নিরুত্তর। এরপর স্ত্রীলােক যা বলতে পারে, শােভনা তাই বললে, “নিশ্চয়ই আবার স্বামীর কাছে ফিরে গেছে। সমর বাড়ি গিয়ে থ হয়ে রইলাে। গিরিশ, মিস্ত্রি আর জানলা নিয়ে বাইরে ছিল দাড়িয়ে, সেখানে ছুটে গিয়ে সে তীব্রভাবে ধমকে উঠলাে : কে বলেছে তােমাকে এখানে এসে বিরক্ত করতে? তােমার বাড়ির দেয়াল তুমি ভাঙ কি মাথায় করে রাখাে তার আমি কী জানি ? তারপর গােপনে সে লােক পাঠালে সেই ঠিকানায়। সে এসে খবর দিল সরমা বলে সেখানে কেউ থাকে না। ধীরে-ধীরে নেমে এলাে যবনিকা। অনাস-পাশ মেয়ে এসে চাকরিতে যােগ দিলে। কোথায় বাড়ি নিলাে সমর খোঁজও করলাে না। তার । ১১৭ যথাপূর্ব অশ্বশকট যেখান থেকে যেখানে তাকে নিয়ে যায় তার বাইরে আর তার কৌতুহল নেই। কেবল মাঝে-মাঝে ভিতরের বারান্দায় এসে দাড়ালে গিরিশ মুদির শূন্য বাড়িটা তার চোখে পড়ে। এর কিছুকাল পরে খবর পেলাে সদর থেকে বড় সাহেব বদলি হয়ে যাচ্ছেন। সে উপলক্ষ্যে ছােটখাটো একটা পাটি হচ্ছে স্থানীয় এক জমিদারের বাড়িতে। মহকুমার খুদে সাহেবদের সেইখানে নিমন্ত্রণ। দু ঘন্টার রাস্তা হলেও সমর ভেবেছিলাে যাবে না। কিন্তু খােদ সাহেবের ব্যাপার, যাবে না ভেবেও মনটা খুখুৎ করছিলাে। দ্বিধা করবার দরকার নেই। রবিবার, পাটির দিন, সকালবেলাই জমিদারের মােটর এসে হাজির। সমর ব্যস্ত হয়ে বললে, “সে কি, পাটি তাে বিকেলে। এত সকালে গিয়ে করবে কি সেখানে? জমিদারের লােক আমি বিনয়ে বললে, “যখন আপনার সুবিধে, তখনই যাবেন—এ গাড়ি একলা আপনার জন্যে। প্রত্যাখ্যান করার আর কথা ওঠে না। ঘড়ি দেখে সমর রওনা হলাে। পৌছে দেখলাে, ব্যাপারটা রােমহর্ষক। প্রকাণ্ড বাড়ি, দূর থেকে আলােয় আর আলােয় ঝলমল করছে। গাছে, ঘাসে, ফোয়ারায়, সম্ভব- অসম্ভব সমস্ত জায়গায় আলাের বুদ্বুদ। বাজছে একটা মেঘনাদ রেডিয়াে, আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আর কী ভিড় মােট-গাড়ির। একটা মফস্বলি সহরকে রাতারাতি কোন ময়দানব যেন বিলেত বানিয়ে ফেলেছে। কে যে যাচ্ছে না এই পার্টিতে সেইটেই জিজ্ঞাস্য। আর শাড়ির কি তরঙ্গিমা ! এসেন্সের পূতিগন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত। ‘আসুন। গেটের ও-প্রান্ত থেকে কে তাকে বললে, ‘আসতে রাত করে ফেলেছেন।
প্রজাপতয়ে ১১৮ আর কেউ নয়, সরম। দেখে চিনতাে না, কিন্তু গলা শুনে চিনলাে । সেই সরমাই নির্ভুল, যদিও এত বড় একটা প্রহসনেও সে একটুও চোখের দিকে চেয়ে হাসলো না। উজ্জ্বলন্ত শাড়ি পরেছে একটা সরমা। না, শাড়িই তার উজ্জ্বলন্ত দেহকে পরেছে বােঝা যাচ্ছে না। জরি দিয়ে মােড়া মােটা-করে-বাঁধা বেণীটা তার পিঠের উপর সাপের মতাে ফণা তুলে-তুলে নুয়ে-মুয়ে পড়ছে। চোখে পুরু করে সুর্মা টানা, ঠোট দুটো রঙে তৈলাক্ত, আর হাতে-গলায় বুকে-বাহুতে অন্ধ করে দেয় এমন সব মারাত্মক গয়না। যে ছোঁবে, সেই যেন ভস্ম হয়ে যাবে। যে কাছে এসে ঘ্রাণ নেবে সেই যেন পাথর হয়ে যাবে। যে তার হাসি শুনবে সেই যেন চূর্ণ হয়ে যাবে। এত সুখ, এত বেশি সুখ ! বড় টেবিলের এক কোণে সমরকে সরমা বসিয়ে গেল। কিন্তু কাজ তার অনেক। এর সঙ্গে একটু হাসা, ওর সঙ্গে ঝুকে পড়ে একটু ঠাট্টা করা, এ-টেবিল থেকে ও-টেবিলে গিয়ে ঝিলিক দিয়ে আসা। কখনন সাপের মতাে চলা, কখনাে রাজহংসের মতাে। আর যখনই কোনাে বিশিষ্ট ভদ্রলােক এসে উপস্থিত হয়, নিজেকে সে সবলে নিক্ষেপ করে, কেষ্ট-বিধুদের সঙ্গে একে-একে আলাপ করিয়ে দেয়, কখনাে বা, এমন কি, তার জমিদার স্বামীর সঙ্গে, আলস্যবশতই যে একটু অল্পবােধ, আলস্যবশতই যে অত্যন্ত ভদ্র। সাতেও নেই পাচেও নেই এমনি একটি স্থবির অকর্মণ্যতা। সব করিয়ে নিচ্ছে সরমা আর ম্যানেজার। এক কথায় একশােলােক খেটে বেড়াচ্ছে। সব চেয়ে এইটেই আশ্চর্য, এই অনড়ত্বের সংস্পর্শে এসেও সরমা মােটা না হয়ে পারলে কি করে? সামনে স্টেজ বাঁধা। এক পশলা নাচ হয়ে গেল। এবার শুরু হবে জাদুবিদ্যা।
১১৯
যথাপূর্ব
পাশের থেকে কে-এক ভদ্রলােক সমরকে বললে, ‘নিন, কিছুই নিচ্ছেন
না যে। বলে বাড়িয়ে দিলে কেকের প্লেট।
চমকে সমর টেবিলের দিকে তাকালাে। সবাই খেতে শুরু করে
দিয়েছে। অভ্যাসবশত সেও একটা-কিছু তুলে মুখে পুরলাে।
আর কারু সঙ্গে দেখা না হােক, মালা-গলায় খােদ সাহেবের সঙ্গে
চোখােচাখি হয়েছে, তাই যথেষ্ট। আগে চাকরি, আর্থিক উন্নতি, তার
পরে অন্য সব। অন্য সব আর কি, সমর ভেবে পেলাে না।
সরমাকে কতক্ষণ দেখা যায়নি। এবার অন্ধকারে সরে পড়তে হয়।
‘আপনি তত কিছুই খেলেন না। পিছন থেকে কে হঠাৎ বললে।
চেয়ে দেখলাে, সরমা। এবারকার শাড়িটা অসম্ভব নীল, গায়ের
গয়নাগুলাে অসম্ভব রকম নতুন।
‘না, খাওয়ার মধ্যে কী! সমর নির্লিপ্তের মত বললে, ‘খাওয়ার
জন্যেই তাে আর আসা নয়।
কিন্তু যাকে সে বলছে সে সেখানে নেই।
সে তখন আর-কতগুলাে রঞ্জিতনখো মেয়ের সঙ্গে খিলখিল করে
হাসছে।
সমর পিছলে বেরিয়ে পড়লাে এক ফাকে। যাবার আগে অভ্যাশবশতই
প্লেট থেকে একটা সিগারেট কুড়িয়ে নিল।
কিন্তু দুয়ারের সামনেই ধরলাে তাকে সেই মােটর।
‘এই যে, আপনার গাড়ি এইখানে।
সিগারেট ফুকতে-ফুকতে সমর বেরিয়ে গেল সােজা। বললে, ‘না,
আমি ট্রেনে ফিরবাে।
No text on this page.
OR
No text on this page.
দরজার কাছে কে-একটা লােক ঘুরঘুর করছিলাে। হেডমাস্টারবাবু খেকিয়ে উঠলেন : ‘কী চাই? লােকটা থতমত খেয়ে সরে যাচ্ছিলাে, হেডমাস্টারবাবু তাকিয়ে দেখলেন, সামনেই তার ইস্কুলের ছেলে আজিজুর রহমান। বললেন, “দেখ তাে লােকটা কে। এ সময়টা হেডমাস্টারবাবুর ভয়ের সময়। তিনবছর আগে মরােত্তমপুরে থাকতে তার বাড়ি পুড়ে যায়, ঝাঁকে-ঝকে বেনামী চিঠি তার হাতে আসে। এ জায়গাটা ঠিক পাড়াগাঁ না হলেও বলা যায় না কার কী অভিসন্ধি। দিনে-দুপুরে হলেও গা-টা ছমছম করে ওঠা আশ্চর্য নয়। ‘আমার ফাদার, স্যার। আজিজ কুণ্ঠিতমুখে বললে। এতটা গুরুদয়ালবাবু ভাবতে পারতেন না। যেন থমকে গেলেন। ছেলের পরিচয়ের সুতাে ধরে সাহসে ভর করে আমানত ঘরে ঢুকলাে। গুরুদয়ালবাবু যেন ফাপরে পড়লেন, আর কোনাে কারণে নয়, ছেলের সঙ্গে বাপকে কিছুতেই মেলাতে পাচ্ছেন না বলে। আজিজের পরনে ঢিলে পা-জামা, পায়ে স্যাণ্ডেল, গায়ে ডােরা-কাটা সার্টের উপর গরম কোট, বুকটা বিস্ফারিত খােলা, সার্টের কলারটা ইস্ত্রির কড়া শাসনে ফণা তুলে আছে। আর, আমানত প্রায় বুড়াে, পরনে খাটো পুরানাে লুঙ্গি, গায়ে ছিটের কোরা কুতা, কাঁধের উপর জ্যালজেলে একখানা দোলাই। কেন এসেছে, গুরুদয়ালবাবুর আন্দাজ করতে দেরি হলাে না। তবু, অভিভাবক যখন, বসতে দিতে হয়। ‘বসুন। ফাকা চেয়ার ছিলাে সামনে কিন্তু আমানত দরজার কাছে মেঝের উপরই বসে পড়লাে। হাত জোড় করে বললে, “ঐ আমার একমাত্র ছেলে। বাবু, আপনি না দয়া করলে প্রজাপতয়ে ১২৪ ছেলেকে কোথাও দেখা গেল না। বাপকে পৌঁছে দিয়েই সে গা-ঢাকা দিয়েছে। গুরুদয়ালবাবু বিরক্তমুখে বললেন, “আমরা দু’ সাবজেক্ট পর্যন্ত কনসিডার করেছি, কিন্তু আপনার ছেলে তিন সাবজেক্টে ফেল। ‘চাষাভুষাে মানুষ, অতশত বুঝি না বাবু। শুধু কৃপা করে ছেলেটাকে আমার- ‘কৃপা করে- গুরুদয়ালবাবু হাসলেন : “তা হলে ইস্কুলের বেঞ্চি- চেয়ারগুলােই বা কী দোষ করেছিলাে ? আপনার ছেলেকে এলাউ করতে হলে বেঞ্চি-চেয়ারগুলােকেও এলাউ করতে হয়। ‘ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই বাবু। এই যুক্তির সামনে গুরুদয়ালবাবু ভারি অসহায় বােধ করলেন। বাইরে বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। আমানত তার পিছু নিলাে। আগের কথাটার পুনরুক্তি করলাে। লিখিত পুনরুক্তিটা বিরক্তিকর, কিন্তু কথিত পুনরুক্তিটা কেমন কাতর শােনায়। ‘কী করেন আপনি? “আমি? গৃহস্থি করি। ‘গৃহস্থি মানে? চাষবাস ? ‘তা নইলে খাবাে কি করে বাবু? ‘প্রজাবিলি আছে ? না, খাসে রেখে আধি দিয়েছেন? একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে আমানত বললে, “জমিই মােটে এখন দশ বিঘেতে দাড়িয়েছে। তার আবার প্রজাবিলি না আধি! জমি তবে নিজেই চাষ করেন নাকি ? আর কে করবে বলুন। দু চারটে পাইট কখনাে খাটে, মাঝে- মাটি মাঝে দু’চার বিঘে কখনাে ফুন দিই, নইলে সব আমিই নিজ হাতে কারকিত করি। চলতে-চলতে গুরুদয়ালবাবু থেমে পড়লেন। কম করে গ্রাম্য একজন গাঁতিদার বা মহাজন ভেবেছিলেন, কিন্তু একেবারে নিজের হাতে লাঙল ঠেলে—এটা যেন তাকে ঘা মারলাে। আপাদমস্তক দেখলেন একবার আমানতকে। দেখে তার আর সন্দেহ রইলাে না, এ একেকরে একজন খাটি মাটির মানুষ। গুরুদয়ালবাবুর গলা থেকে সন্ত্ৰমের সুরটুকু উবে গেল। বললেন, ‘তােমার তবে এই ঘােড়ায়ােগ হলাে কেন? আমানত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাে। ‘বলি, ছেলেকে দিয়ে এই ঘােড়দৌড় খেলার সখ হলাে কেন তােমার ? হাল ছাড়িয়ে কলম ধরতে দেবার কী দরকার ছিলাে? আভাসে মর্মার্থ টা বুঝতে পেরেছে আমানত। স্নান চোখে ঔজ্জ্বল্য আনবার চেষ্টা করে বললে, “ও যে বড় হতে চায় বাবু। ‘যথেষ্ট বড়াে হয়েছে। গুরুদয়ালবাবুর গলায় একটু শ্লেষ ফুটে উঠলো কিনা আমানত ধরতে পারলাে না : ‘চাষার ছেলে ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়েছে, এতেই গায়ে পণ্ডিতি মিলে যাবে দেখাে। নিদেন রেজেস্টি-আপিসের ডিড- রাইটার তাে হতে পারবে। “না বাবু, অত ছােটতে ও রাজি নয়। আবার চকচক করে উঠলাে আমানতের চোখ : ‘ও বলে ও হাকিম হবে, মেম্বর হবে, মন্ত্রী ‘কিন্তু অত যে হবে, পড়ে না কেন? ‘পড়বে বাবু, ঠিক পড়বে। আপনি খালি এ-যাত্রা ওকে পাশ করিয়ে দিন। আমি ওর জন্য আলগা মাস্টার রেখে দেব।
প্রজাপতয়ে ১২৬ ‘তােমার যে দেখছি অনেক পয়সা। গুরুদয়ালবাবু বা চোখের কোণটা একটু কুঞ্চিত করলেন : ‘মহাজনি আছে বুঝি? ‘হায়রে বরাত? আমানতের মাথাটা ঝুকে পড়লাে মাটির দিকে, হতাশার ভঙ্গিতে। তবে, দশ বিঘে তত জমি, চালাও কি করে? জমা কত ? খানেওলা ক’জন ??। ‘দশ বিঘে তাে হালে বাবু, কিন্তু ছিলাে আমার সত্তর বিঘে। তিন মৌজায় ছড়ানাে। বেশির ভাগই তার কান্দর জমি, বিঘে প্রতি ধান হতে দশ-বারাে মণ। খলেনে যখন ধান এনে তুলতাম- আমানতের গলা ঝাপসা হয়ে এলাে। ‘সে সব গেল কোথায় ? ‘সব এই ছেলের পিছনে। খাইখালাসী বন্ধক নিয়েছে মহাজন, এতে লিখেছে জায়সুদি। শেষকালে আসল টাকার জন্য ডিক্রিজারি করে নিলেম করে নিয়েছে। হাশুনােটে টিপ দিয়েছি দশ টাকা বলে, পরে শুনি আজি করেছে একশাে টাকায়। দশের পিঠে একটা গােল্লা বসালেই নাকি একশাে হয়। লেখাপড়া জানি না বলেই তাে এই দশা। তাই মতলােব ছিলাে ছেলে আমার লেখাপড়া শিখে মানুষ হলে দলিলে-দস্তাবেজে আর কেউ ফাঁকি দিতে পারবে না। জমি-জিরাৎ সব সামলাতে পারবাে।” ‘দলিল পড়তে আর লাগে কী! ঢের হয়েছে তােমার ছেলের বিদ্যে। ‘আমিও তাই ওকে বলি বাবু, ঢের হয়েছে। কী হবে আর বিদ্যে নিয়ে? তুই চলে আয় আজিজ, বলি ওকে, বাপে-পােয়ে মিলে জমিতে লেগে যাই দু’জন। গােলা ভরে সােনা জমাই। আবার আমার সত্তর বিঘে ছাড়িয়ে নিয়ে আসি। আমানতের দুই চোখ আবার চকচক করে উঠলাে।
১২৭ মাটি ও কী বলে ? ‘রাজি হয় না বাবু। ‘তা কী করে হবে? গায়ে যে তিন পল্লা উঠেছে। গেঞ্জির উপর সার্ট, সার্টের উপরে কোট। বড়াে যে প্যাচ লাগিয়ে দিয়েছ। অত সব ছাড়ে কি করে ? গুরুদয়ালবাবু হাসলেন। আমানত এক মুহূর্ত চুপ করে রইলাে। বললে, ‘তাই আর ওর পাশ করা ছাড়া গতি নেই। দয়া করে দিন না ওকে বেরিয়ে যেতে। ‘এখন আর আমার হাতে নেই। তলার দিকটা সেক্রেটারিবাবুর হাতে। তাঁর সঙ্গে দেখা করাে গে। কী উঠেছে এবার তােমার ক্ষেতে?” ছােট্ট কুটি করে গুরুদয়ালবাবু কেটে পড়লেন। পালানে কিছু ঠাকুরি-কলাই করেছিলাে আমানত। ঝুড়ি করে তাই নিয়ে দেখা করতে গেল সে সেক্রেটারিবাবুর বাড়ি। ভুজঙ্গ হালদার শুধু ইস্কুলের সেক্রেটারি নয়, যৌথ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, তদুপরি অনারারি ম্যাজিস্টেট। বিকল্পে সবাই তাকে অনাহারী বলে। সেই কারণে সর্বত্রই তার গ্রাসটা কিছু উদ্যত। ফেরিওয়ালা ভেবে আমানতকে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন ভুজঙ্গবাবু, কিন্তু তার বক্তব্য শুনে ও ঝুড়িটার ওজন আন্দাজ করে কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হলেন। বললেন, ‘শেষ লিস্টি আমি কাল সকালেই টাঙিয়ে দেব। দেখি আর কে-কে আসে। শহর থেকে আমানতের বাড়ি প্রায় তিন ক্রোশ, দু’দুটো খাঁড়ি পেরিয়ে, মরালডাঙার গাঁয়ে। আজিজ থাকে ইস্কুলের হস্টেলে, সানকিতে করে পান্তা আর পেঁয়াজ খেয়ে নিত্যি সে পায়ে হেঁটে ইস্কুল করতে পারে না। আর তার সবেধন এই আজিজ। দু’দুটো জোয়ান ছেলে মরেছে জ্বরে কাপতে-কাপতে, রেখে গেছে কতগুলি মেয়ে, চাষার ঘরে যা অবান্তর।
প্রজাপয়ে ১২৮ ছেলের জন্যে বুড়াে বয়সে সেও নিকে করেছিলাে কিন্তু নেকজানের মা কেবল রােগে ভােগে। সকাল থেকে আমানতের মন খারাপ। আজিজ সব শুষে নিচ্ছে এই বলে নেকজানের মা তাকে সমস্ত রাত গঞ্জনা দিয়েছে। কোথায় ছিল আর কোথায় তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে আজিজ। আমানত বলেছে ; আর দুটো দিনবুর করাে নেকজানের মা, আজিজ আমাদের আবার সব ফিরিয়ে দেবে। নেকজানের মা বলেছে : ‘কচু! মান সেদ্ধ খেয়ে থাকতে হবে সবাইকে। নেকজানের মার আমলেও সে কম দেখেনি। আগে দলিজঘর ছিল, খলট ছিল যেন বেড়াবার মাঠ, দু’খানা ছিল গরুর গাড়ি, সাইকেল ছিল একটা, তিন-তিনটে ছিল হারিকেন। তার গায়েও দু’চার গাছ বাজু- খাড় উঠেছে। কিন্তু আজ সে সব কোথায় ? ঘরের টিন উড়ে গিয়ে ছন এসেছে, অস্থাবর করে গাড়ি-গৰু-সাইকেল ধরে নিয়ে গেছে মহাজন, খলটের জমি লেগেছে এখন খেতির কাজে। গাছ-গাছালিতে বাড়ির সীমানা ছােট হয়ে আসছে দিন-দিন। কিন্তু আশা ছাড়েনি আমানত। বাড়ির গায়ে হালটের উপর দাড়িয়ে আদিগন্ত তাকিয়ে এখনাে সে আন্দাজ করতে পারে কতদুর পর্যন্ত তার জমির সাবেক চৌহদ্দিটা প্রসারিত ছিল। তার ঠাকুর্দা এজাবুদ্দি সেখ— মুদাফৎ এজারদি সেখ আজো দেখা যাবে জমিদারের চিঠা-খতিয়ানে। ভয় নেই, সব আবার আজিজ ফিরিয়ে আনবে। বিয়ে করে ছেলে এনে দেবে তাকে এক পাল-নাতিতে-ঠাকুর্দাতে মিলে তারা চৌপহর আবাদ করবে। আকাশ কালাে করে বৃষ্টি নামবে ঝমঝম। মাঠে জল দাড়িয়ে যাবে একটু। মাঠ ছেয়ে তরতাজা ধান উঠবে গজিয়ে। ভাটিবেলায় আজিজ এসে হাজির।
১২৯ মাটি ‘নাম টাঙিয়ে দিয়েছে বাপজান। এক লক্ষ্মণ মণ্ডলের ছেলেটা পায়নি। লক্ষ্মণ বিনাটাকায় হ্যাণ্ডনােট কাটতে রাজি হয়নি, তাই। আমানতের খুসি হবারই কথা, কিন্তু কেন কে জানে চোখদুটো তার চকচক করে উঠলাে না। ছেলেকে কেমন যেন তার বিদেশী, বেমানান মনে হচ্ছে। যেন বড় বেশি এলেম, বড়াে বেশি চটক তার চেহারায়। সব কিছু কেমন বেজুত লাগে তার সামনাসামনি। ‘পাশ করলে, এক হাঁড়ি রসােগােল্লা নিয়ে আসতে পারলে না?” নেকজানের মা মুখ ঘুরালাে। আমানতের মনে পড়লো এমনি রসগােল্লা আনতাে সে সহর থেকে যখন ভালাে দর পেত সে ধানের। বলতাে : ‘খবর জবর ভালাে নেকুর মা, সরু-এলাইর দাম চড়েছে। কিনে এনেছি এই রসােগােল্লা। আর এই এক গােছ পদ্মপাতা। সবাইকে দাও পাতায় করে। সে সব দিন কি আর আছে ? ‘চাচা এই তিলকুট দিয়েছে নানী। গুড়ের তিলকুট। ‘গুড়ের নয় বােকা। আজিজ সংশােধন করে : ‘ওটা চকোলেট। সাহেবমেমের বাচ্চারা খায়। তিলকুটের স্বাদ বেড়ে যায়। তারপর তার মােড়কের কাগজ নিয়ে শিশুগুলাের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। ‘এলাউ তাে হলাম, কিন্তু ফি-ঠি জড়িয়ে লাগবে এখন প্রায় চল্লিশ- পঞ্চাশ টাকা। আজিজ আমানতকে মনে করিয়ে দেয়। ‘টাকা? আমানত যেন ভিতর থেকে ঝাঁকুনি খায় : ‘এত টাকা মিলবে কোথায় ? ‘না মিললে চলবে কি করে? শেষকালে পছু এসে ভরাডুবি হবে । নাকি?
প্রজাপতয়ে হলেও যেন ভালাে ছিল। আমানতের বুকের ভিতরটা হাজাশুখা জমির মত খা-খা করতে থাকে। ‘এবার ছাড়ান দে, আজিজ। ঐ দ্যাখ ঐ নদী পর্যন্ত আমার জমির সীমানা ছিলাে। দক্ষিণে দূর জলের রেখা যেখানে আকাশের সাদায় গিয়ে মিশেছে সেই দিকে চেয়ে আমানতের চোখ চকচক করে ওঠে : ‘সব হাতছাড়া হয়ে গেছে। আয়, দুজনে লেগে যাই লাঙল নিয়ে, সব আবার ছিনিয়ে নিয়ে আসি বুকে করে। আজিজ হেসে ওঠে : “তুমি কি পাগল হয়েছ নাকি ? নিশ্চয় সব আবার ছাড়িয়ে নিয়ে আসব। আমাকে মানুষ হতে দাও একবার। তুমি ভাবছ কী? থাকবে নাকি আর এই আউরের ঘর? সব পাকা ইমারত হয়ে যাবে দেখাে। আর তখন সব মধ্যস্বত্ত্ব কিনবাে-প্রজা বসিয়ে দেব, রায়ত আর কোলরায়ত—গায়ে মাটি মেখে লাঙল আর বাইতে হবে তােমাকে। তখন খাজনা নেব-নগদ আর ধানকড়ারি। ‘গায়ে মাটি মাখবাে না তবে বাঁচবাে কি করে ? জি আবার হেসে ওঠে: ‘সাবান মেখেও দিব্যি বাঁচা যায় বাপজান, ভাবনা কী? , দরিয়ার পারে এনে না’ ডুবানাে যায় না, কিন্তু কোথায় পাবে টাকা? মহালের মহাজনরা সব খুতির মুখ দিয়েছে বন্ধ করে, একপয়সা কেউ কর্জ দেয় না। সাদা খত দূরের কথা, রেহানী খতেও টাকা ছাড়তে কেউ রাজি নয়। তবু চেষ্টা করে দেখতে হবে। রেজাইখানা কঁাধে চাপিয়ে আমানত হাজীসাহেবের বাড়ির দিকে রওনা হলাে। আর্জি শুনেই হাজীসাহেব তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলাে : “আবার টাকা ধার করতে এসেছ কোন মুখে হে আমু মিয়া? দু দুখানা বন্ধকী তমসুক—দু’ বিবে আর তিন বিঘে—বাের্ডের কারসাজিতে বেমালুম
১৩১
মাটি
ছাড়িয়ে নিয়ে গেলে--আবার টাকা কিসের হে? অভ্যেস এখনাে
শােধরালাে না দেখছি।
‘ছেলের পরীক্ষার ফিস দিতে হবে, গােটা পঞ্চাশ টাকা চাই
হাজীসাহেব। খাইখালাসী নিন কটকবালা নিন—যা আপনার পছন্দ।
দু’বার করে তাে আর বাের্ডে যেতে পারবাে না।
‘অত সব ঘােরপ্যাচের মধ্যে নেই বাপু। সােজাসুজি সাফকবলা
করতে পারাে তাে দেখতে পারি।
‘কতখানি চাই কত টাকায় ? আমানত আড়ষ্টের মতাে জিগগেস
করলে।
“ঐ পাঁচ বিঘেই আমার চাই—যা তুমি তখন ফাকি দিয়ে কেড়ে
নিয়েছ। ঐ পাঁচ বিঘে আওল জমি বিক্রি করে তােত একশাে টাকা
দিতে পারি।
‘কিন্তু হালফিল একশাে টাকার আমার দরকার নেই। আমানত
যেন নিশ্বাস ফেললাে।
‘টাকার আবার দরকার নেই কার? এ যে নতুন বাত শােনাচ্ছ
মিয়া। খরচ করতে না চাও দর-পরদা রেখে দাও জমিয়ে।
‘কিন্তু কার জমি-বিঘে প্রতি দাম মােটে কুড়ি টাকা?
‘ঢােল-সহরৎ করে দেখলেই পারাে। না পােয় অন্য জায়গায় পথ
দেখ। আমি এক কথার গাহেক। খাতিরনাদারৎ।
‘দু বিঘে নিন না—দু বিঘেতে পঞ্চাশ টাকা ফেলে দিন। ফরমানি
করুন, হাজীসাহেব। আমানত মাটির উপর লুটিয়ে পড়লাে।
‘বলি, গরজটা কার হে, আনু মিয়া ? এক লপ্তে জমি চাই পাচ
বিদে—সবই তােমার এক কদরের জমি নয়, কান্দরের সঙ্গে ডাঙ্গাও কিছু
আছে—দাগ-খতেন আমার মুখস্ত। তােমার টাকার দরকার কম হতে
প্রজাপতয়ে
১৩২
আঙুলের টিপ দিয়ে
পারে কিন্তু আমার জমির দরকার কম নয়। রাজি থাকে। তাে কবলার
মুসাবিদা করে ফেলি। পরে আধি নিতে চাও তাে নিতে পারাে ফসল
যখন করা হয়ে গেছে। বুঝলে, এর বেশি মহকুফ চলবে না।
কী দমবাজ, কী দুদে-আমানত ভাবে, কিন্তু দাত ফোটাতে
পারে না।
উপায় কী—কোথায় নইলে টাকা! তার আজিজ নইলে মানুষ হয়
কী করে! সাত দিন পরে ফিস দেবার শেষ তারিখ, আজিজ তাগিদ
পাঠিয়েছে। ঘুরঘুট অন্ধকারে আমানত দিক-বিদিক দেখতে পায় না,
কলার গায়ে কোনাকুনি বাঁ হাতের বুড়াে
ফেলে ।
ধানের শীসে আগুনের শিস—সমস্ত মাঠ ভরে গেছে এখন সােনার
আমেজে। পাঁচ বিঘে চকবন্দী করে দিয়ে গেছে হাজীসাহেবের জমানবীশ।
গা-গতর ঢেলে চাষ করেও ফসলের অর্ধেক শুধু তার।
এই পঞ্চাশ টাকা তাের কাছে রেখে দে, নেকজানের মা।
‘কী, আমার পৈঁছে হবে নাকি? নেকজানের মা ঘুরে দাড়ায়।
‘ঢামালি করিস নে। মেজাজ আমার আজ রুঠা হয়ে গেছে।
‘কেন, হয়েছে কী? টাকা পেলে কি করে ?
‘লুটতরাজ করে। নাউড়ে হয়ে এবার ডাকাতি করতে বেরুবাে।
আমানতের চোখ ছলছল করে ওঠে।
বলল সত্যি করে, টাকা কে দিলাে।
‘আর কে দেবে, নেকজানের মা ? আমার এই জমি আমার এই
জায়দাদ ছাড়া আর কে ছিলে আমার? আমি একটা আহাম্মক, সব
ভুট করে দিলাম।
‘কী, জমি বিক্রি করেছ বুঝি? কতখানি? এবার কি সব তবে
মাটি
ভুকসানি হয়ে মারা যাবে নাকি? নেকজানের মা চোখে আঁচল
চাপা দিল।
‘ভয় নেই নেকজানের মা, আমাদের আজিজ আছে। রহমান
আছেন। আবার সব ফিরে পাবাে।
ধান কেটে খলেনে ভাগ হয়ে গেল। গাড়ি বােঝাই হয়ে গেল
হাজীসাহেবের। আউড়ের কুটোটি পর্যন্ত সে কুড়িয়ে নিলে। আমানতের
দেহে যেন আর জোর নেই, জেল্লা নেই, শিটা হয়ে আসছে দিন-দিন ।
মজুদ পঞ্চাশ টাকা রাখা গেল না সরিয়ে—উড়াল দিয়ে চলে গেল।
আজিজ যাবে সহরে পরীক্ষা দিতে। রাহা-খরচ আছে, খােরাকি আছে,
জামা-কাপড় আছে—ফরদা সে খরচের ফর্দ। এদিকে ধূলধেকড়া সব
ছেলেপিলেদের পরনে। তবু, যতটা পেরেছিলো রেখেছিলো আমানত
হাতের মুঠ আঁট করে, শােনা গেল মাস্টারসাহেবের দু' মাসের পাওনা
বাকি আছে কুড়ি টাকা।
“ফকির-ফোকরা হয়ে বেরিয়ে যাবে নাকি শেষকালে ? নেকজানের
মা ঝামটা দিয়ে ওঠে।
“কী যে বলিস তার ঠিক নেই। আজিজ আমাদের মসনদে বসাবে।
তুই থাকিস ইমারতে, নেকজানের মা, আমি আমার ভুইয়ে বুক দিয়ে পড়ে
থাকবে।
আরাে পাঁচ বিঘে এখনাে আছে। ঝা ঝা করে আকাশ, মেঘের
ছিটেফোটা নেই আনাচে কানাচে। আমানত আকাশের দিকে
তাকায় আর লাঙ্গল ঠেলে। পানিপশালা এবার আর হলাে না
এ-তল্লাটে।
আধপেটাও বুঝি আর জোটে না। এবার বােধহয় নগদা মজুরিতে
পাইট খাটতে হয়।
প্রজাপতয়ে ১৩৪ , রহমান আছেন। টেনেবুনে আজিজ পাশ করেছে। চাষার ছেলে আজ তাকে আর কে বলে। বদলে গেছে তার নামনিশানা। “কী করবি, আজিজ ? জিজ্ঞাসা করতেও যেন সন্ত্রম হয়। ‘পড়াবার তাে আর মুরােদ নেই তােমার, এবার তাই চাকরি নেব।” চাকরি আছে গােটাকতক। আদালতের আমলা। প্রাথমিক একটা পরীক্ষা হবে লােকদেখানাে। জেলার সেরেস্তাদারকে যে ভারি হাতে খাওয়াতে পারবে তারটাই অবধারিত, আর সব খারিজ। একশাে টাকায় রফা হয়েছে, বাপজান। ‘আবার টাকা। কিন্তু চমকে ওঠার কিছু নেই। নৌকো শুধু পাড়ে ভিড়ালেই চলবে , নােঙর নামাতে হবে। টাকা দেবার জন্যে জমি রয়েছে এখনাে নিটুট পাঁচ বিঘে। দোয়াত-কলম স্ট্যাম্প-ইসানি নিয়ে হাজীসাহেব এসে হাজির। পত্র- মিদং কাৰ্যঞ্চাগে—বাকি পাঁচ বিঘেও লােপাট হয়ে গেল। সদর থেকে আজিজ চাকরির খবর নিয়ে এলেও আমানতের কান্না, থামলাে না : ‘একেবারে ফৌত-ফেরার হয়ে গেলাম, নেকজানের মা। বাপ-পিতামাের ভিটেটুকুই শুধু আছে। কিন্তু কী হবে তার এই বাস্তু দিয়ে যদি আর তাতে বস্তু না থাকে এক কণা ! আজিজ সবাইকে সহরে নিয়ে এলাে, তার কর্মস্থলে। ত্রিশ টাকা মাইনেতে টায়েটুয়ে সে চালিয়ে নেবে সংসার। এদিক-ওদিক আছে কিছু উপরি—ঘাতৰ্ঘোত সে এরি মধ্যে দোরস্ত করে নিয়েছে। এলেমদার ছেলে সে-কাউকে পরােয়া করে না। কিন্তু ছিলিম খেয়েও আমানত আর আগের স্বাদ পায় না, প্রান্তদেহে মাটি তামাকের সে-ধার। দু দিনেই তার গতুরে শরীর কেমন ধসকে গেছে, বাত জমে উঠেছে গাঁটে-গাঁটে। মেজছেলের বৌটা আলাদা হয়ে গেছে, বড়ােছেলের বৌটাও যাব-যাব করছে। নেকজানের মা রয়েছে এখন তাকে আঁকড়ে। কিন্তু একেক সময় ইচ্ছে করে আমানতের, তাকে তিন-তালাক দিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে আবার তার মাটির আকর্ষণে কঁচা-সােনা-গা নয়লী যৌবনী কাউকে সাদি করে ফের বুড়াে বয়সে, এক ফৌজ সৃষ্টি করে সে মাটির উপর, দিগন্ত পর্যন্ত সে সবুজের তরঙ্গ তুলে দেয়। তার দিন আর কাটে না। অনড় হয়ে আসে তার হাত-পা। খাবার পর ভেঁকুর ওঠে। তাই আজিজ তাকে বাজারে একটা খােপরি ভাড়া করে দিয়েছে। আমানত সেখানে বসে চোখে চশমা লাগিয়ে সেলাই কল চালায়। ফতুয়া বানায়, কুর্তা বানায়, সার্ট বানায়। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যবসা। আমানত আর চাষা নয়, খলিফা। আজিজ আর চাষার ছেলে নয়, খলিফার ছেলে। অনেক নরম লাগে শুনতে। কিন্তু যেদিন আকাশ কালাে করে টিনের চালের পরে বৃষ্টি পড়ে ঝম্ঝম্ • করে, আমানতের পা-কল কেমন আপনা থেকেই থেমে যায়—বৃষ্টিটা মনে হয় যেন কান্নার শব্দ ; আর সেই শব্দে ভেসে আসে তার মাটির ডাক। তার মাটি তাকে ডাকে—ডাকে—অনেক দূর পর্যন্ত ডাকে। বলে, আমানত, চলে আয়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
একে একে বহু লােকের সঙ্গে পরিচিতীকৃত হলুম, কিন্তু সব চেয়ে দু’জন আমাকে বেশি আকর্ষণ করলাে। এক দাদা, আরেক ব্যারিস্টার। দাদার নাম দুঃখহরণ গুহ নিয়ােগী, নিবাস বীরশ্রী ওরফে বিরিছিরি, ব্যবসায় সর্বজজ। আর ব্যারিস্টার-সাহেবের নাম-ধাম যাই হােক, এটুকু জানলেই যথেষ্ট হবে যে, সে আসলে ওকালতি করে। তার এই নামকরণের অনেকগুলি কারণ আছে। প্রথমত, সে নাকি মনে করে তার ঠিক ব্যারিস্টারের মতাে চেহারা, দ্বিতীয়ত, সে নাকি বম্বে থেকে ঘুরে এসেছে, তৃতীয়ত, সে নাকি য়্যাকসেন্ট দিয়ে ইংরিজিতে সওয়াল-জবাব করে, আর চতুর্থত, এইটেই প্রাণান্তকর—ব্যারিস্টার কপাটা সে উচ্চারণ করে বেরিস্টার বলে। সেদিন যখন সে আমাকে বললে, এখানে টেক্সি পাওয়া যায়, আমি তখন ভেবেছিলুম, এর নাম ট্যাক্সি রাখা হলাে না কেন ? দাদাকে সত্যিই পেয়েছি দুঃখহরণরূপে। সােনার হৃদয় নিযে এমন মাটির মানুষ দেখিনি সংসারে। শীর্ণকায়, ছােটখাট দেখতে, মাথায় সুশীতল একটি টাক, মুখে চিরলিপ্ত একটি প্রসন্নতা। যেমন নিজে হাসেন তেমনি অন্যকে হাসান। সরল, সদাশিব, আত্মভােলা। আর ব্যারিস্টারকে পেয়েছি উত্তরাধিকারসূত্রে। কখন কোন পূৰ্বাধিকারী একে দলে সংগ্রহ করেছিলাে, সেই থেকে ক্রমান্বিতভাবে এক বংশ থেকে আরেক বংশে হস্তান্তরিত হয়ে চলেছে। আমার পরে আপনি যখন যাবেন তখন দেখবেন আবার এই ব্যারিস্টারকে। বৈকালিক আড়াটা আমার বৈঠকখানাতেই বসতত। তার চতুর্বিধ কারণ ছিল। প্রথমত, আমি অবিবাহিত, দ্বিতীয়ত, আমার বাড়িটার মধ্যস্থতা, তৃতীয়ত, সােফা-সেটির বদলে ঢালা ফরাস, আর চতুর্থত, ঢালাও প্রজাপতয়ে ১৪০ তাম্রকূট। আর কেউ আসত বা না আসততা দাদা ও ব্যারিস্টারের কোনােদিন কামাই হতাে না। আমার বাড়িতে প্রথম আড্ডাটা সেদিন বিরাটভাবে জমেছে, আর আমি প্রত্যেকের এককেন্দ্রিকতাগুলি লক্ষ্য ও উপভােগ করছি। আমাকে শােনাবার জন্যে প্রচলিত পুরােনাে গল্পগুলিরই পুনরায় অবতারণা হচ্ছে। ‘দাদা, আপনার ছােট ছেলেটির বয়েস কত? দলের মধ্যে থেকে মুখফোড় ষড়াননবাবু জিগগেস করলেন। দাদা হাসতে হাসতে বললেন : ‘কেন, কতবার করে শুনতে হবে ? আমাকে লক্ষ্য করে ষড়াননবাবু বললেন : “ত্রিলােচনবাবু শশানেন নি। আমার দিকে চেয়ে ততােধিক হাসতে হাসতে দাদা বললেন : ‘ছ’ মাস। বলেই দাদা ত্বরান্বিতভাবে যােগ করে দিলেন : ‘ভুল বুঝাে না ভায়া, ছমাস ভূমিষ্ঠ। রাধাবল্লভবাবু জিগগেস করলেন : “এটি আপনার কততম? ‘চতুর্দশতম। ‘কোন পক্ষীয় ? ‘শত্রুপক্ষীয়। দাদা উহাস্য করে উঠলেন। বললেন : ‘বােসাে ভায়া বােসস। সবাই শুনেছে, তুমি আর বাকি থাক কেন? মানে হয়েছে কিনা, আমার দ্বিতীয় বার পদস্থলন হয়েছে। তােমার প্রথম বৌদিদি মারা যাবার পর মতিচ্ছন্ন হয়ে পুনর্বার দার পরিগ্রহ করেছিলুম। তিনি ছ’টি সন্তানের জননী ছিলেন, ছােটটি বছর খানেকের। তােমার দ্বিতীয় বৌদিদিকে ঘরে এনে বললুম : ‘তুমি এদের সবারই মা হলে, কেমন ? তিনি দেখলুম তাতে মােটেই সম্মত নন, বললেন : “ককখনন । ও তােমার একার সন্তান, একতরফা, ও-সবের আমি সরিক নই।
১৪১
চূড়ান্ত
তারপর যােল আনা স্বত্ববতী হয়ে এই ষােল বছরে একাদিক্রমে তিনি
আটটি সন্তান প্রসব করেছেন।
‘কথাটা তেমন আজ জমাটি করে বলতে পারলেন না, দাদা। বললেন
যােগজীবনবাবু।
‘আরে ভায়া, বুঝতে পেরেছ তাে?
তা হলেই হলাে। এক কথায়
দুর্বলের উপর প্রবলের অত্যাচার আর কি।
‘কথাটা ঠিক হলাে না, দাদা। বললেন ষড়াননবাবু।
‘কৃতিত্ব যদি কিছু দিতে চাও তত নিতে পারি। দাদা অমায়িকভাবে
বললেন : “আর যাই হােক কয়েক দশমিক পার্সেন্টেজ বাড়াতে
পারাটাও তাে কম নয়।
‘তার পর দরকার হলে আবার তৃতীয় পক্ষ করবেন তাে? একটু
রাগত গলায় প্রশ্ন করলেন ব্যারিস্টার।
এত বড় একটা কঠিন প্রশ্নেও দাদা বিচলিত হলেন না। বললেন :
‘পিত্তিরক্ষার জন্যে করতেও হতে পারে। জানাে তো, বিবাহ তৃতীয় পক্ষে,
সে কেবল পিত্তি রক্ষে। বলে দাদা বিকশিত দন্তে হাসতে লাগলেন।
ব্যারিস্টার আমার কানের কাছে মুখ এনে গম্ভীর নিম্নকণ্ঠে বললে :
‘নিজের স্ত্রী নিয়ে কী অন্যায় রসিকতা দেখুন। অসহ্য। বলে আমার
সন্নিহিত হবার চেষ্টায় পকেট থেকে পােল্ট ফ্লেকের একটি অপচীয়মান টিন
বের করে আমার হাতে একটি সিগারেট দিয়ে বললে : “আমার স্ত্রী
বলেন আমার নাকি সিগারেটেই মাসে বত্রিশ টাকা খরচ হয়। ফ্রাইটফুল।
আপনার ?”
লজ্জিত বিনয়ে বললুম : ‘কি করে বল এখন
এখনাে আমি
অস্ত্রীক।
কিছু একটা রসিকতা করেছি মনে করে ব্যারিস্টার ঘাড় ঝাকাতে-
প্রজাপতয়ে ১৪২ ঝাকাতে প্রতীচ্য পদ্ধতিতে হাসতে লাগলাে এবং লক্ষ্য করলুম সিগারেট আর একটাও বিতরিত হলাে না। মনে হলাে, আমি যে কঁচি খাই এ যেন তারই উপর একটা তীক্ষ্ণ কুটি। ওদিকে রাধাবল্লভবাবু দাদাকে আবার অতীতস্মর করে তুলেছেন। ‘দাদা, কোর্টে গাড়ি চড়ে যান না কেন? ‘কতবার শুনবে বলাে দেখি ? ‘ত্রিলােচনবাবু তাে শােনেননি। তা ছাড়া, ও সব গল্প কি কখনাে পুরােনাে হয় ? ‘সেই আমার দুই নম্বরের অনুশাসন। “সে কি কথা, তা তাে বলেননি এত দিন। যােগজীবনবাবু আপত্তি করলেন : “বলেছেন যে রাস্তার পাশে মহেশ উকিল মক্কেল নিয়ে দাড়িয়ে থাকে, আর আপনার গাড়ি আসতে দেখে মক্কেলকে বলে : ‘এই দ্যাখ আমার সঙ্গে কত খাতির, এক লাফে গাড়ির মধ্যে কেমন চেপে বসবে। বলে আপনার গাড়ি থামিয়ে আপনার পাশে বসে চেঁচিয়ে মক্কেলকে বলে : ‘কেমন, দেখলি?” এ শান্তি এড়াবার জন্যেই তাে আপনি গাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন শুনেছি। ‘আরে ভায়া, ছমাস আগে তাই ছিলাে, কিন্তু গাড়ি ছেড়েছি চতুর্দশ তমটির আবির্ভাবের পর থেকে। গিন্নি বলে দিয়েছেন পােস্টাপিসে পাশ-বই খুলে গাড়ির ঐ দশ টাকা প্রতি মাসে থােকার জন্যে জমাতে হবে। তারপর যখন পঞ্চদশতমটির আবির্ভাব হবে, তখন ? ষড়াননবাবু, টিপ্পনি কাটলেন। ‘তখন-তখন হয়তাে সেই গামছা-চুরি-যাওয়া লােকটার মত দাড়ি রাখবাে। বলেই দাদা অনর্গল হেসে উঠলেন।
১৪৩
চূড়ান্ত
ট্রে-তে করে বাটি সাজিয়ে চাকর চা নিয়ে এলাে।
দাদা বললেন : “আমি উঠি।
“সে কি কথা, একটু চা খেয়ে যান। বললুম মিনতি করে।
‘এদেরকে জিগগেস করে দেখ, চা আমি খাই না। কাকে ক
কাকে কখন কী
তার কারণ বলে থাকবাে মনে নেই, আসল কারণ হচ্ছে এই, খেলেই
খাওয়াবার একটা দায় ঘটে। মানে, তুমি আজ থাইয়ে কাল আশা করবে
আমি তােমাকে খাওয়াব। তােমার বৌদিদি সেটা ঠিক ধরে ফেলেছেন।
তাই স্ট্যাণ্ডিং অর্ডার দিয়ে দিয়েছেন যেন কোথাও জলটুকুও না ছুই।
বললুম : “তাতে কি, নাই বা খেতে দিলেন আপনি
‘আরে ভায়া, তা কি হয়? এই কথাটুকু বলতেই তােমার গলায়
কেমন একটু অভিমান বেজে উঠলাে। খাঁটি কথা কি জাননা? চা-টা
এখন খেলেই দু’ গ্রাস কম খেতে হবে, তার পরিপূরক হিসেবে এতটা
গালাগাল খেতে হবে যে, হজম করতে পারবাে না।
‘হজম না করেই বা আপনার সাধ্য কি ? রাধাবল্লভবাবু গলায়
একটু ঝাল মেশালেন।
‘আরে ভায়া, সেই জন্যেই তাে এই কবচটা সম্প্রতি ধারণ করেছি।
বলে দাদা তার জামার ভিতর থেকে লাল সূতােয় বাঁধা তামার কবচ
বের করে দেখালেন। বললেন, “এর নিষেধই হচ্ছে পান্ন গ্রহণ করা।
‘তবু ভালল। ষড়াননবাবু ফোড়ন দিলেন, ‘তৈলমাংসাদি যে নিষিদ্ধ
হয়নি।
আমি কুষ্ঠিত হয়ে বললুম : ‘চা তাে আর অন্ন নয়।
“আরে ভায়, স্লট যেমন আপিলের অন্তর্ভুক্ত, গৃহ যেমন গৃহিণীর
অন্তর্ভুক্ত, চা-ও তেমনি অম্নেরই সামিল।
‘এ কবচের নাম কী? ষড়াননবাবু জিগগেস করলেন।
••
প্রজাপতয়ে ১৪৬ প্রথম পক্ষের বড় মেয়ে লক্ষ্মী থাকে তার মামার বাড়িতে, কাটাপুকুরে। মেয়েটাকে একবার দেখে আসবার ইচ্ছে ছিলাে, গিন্নি বলে দিয়েছেন : ‘ট্রাম-ভাড়া পাবে না, মিড-ডে ফেয়ারও নয়। এই লক্ষ্মীর সঙ্গেই গিন্নির এতটুকু বনিবনা নেই, চক্ষের কোণে দেখতে পারে না মেয়েটাকে। আরে ভায়া, ট্রীম-ভাড়া দেবে না, কিন্তু পায়ের দড়ি তাে এখনাে ছিড়ে পড়ে নি। হেঁটে মেরে দিতে পারব না? নইলে, কোলকাতা যাব অথচ লক্ষ্মীকে দেখে আসবাে না এ কখনাে সম্ভব ? বলে কথার সুরের সঙ্গে পারম্পর্য রক্ষিত হলাে কিনা বিবেচনা না করেই দাদা অনর্গল হেসে উঠলেন। ‘তারই রিহার্সাল দিতে বুঝি এমনি জোরকদমে হাঁটছিলেন ? “আরে, না ভায়া, এ হাঁটার কদমও গিন্নির হুকুমে। ম্যাদামারার মতাে হাঁটি, একদম বুড়াে হয়ে গেছি, প্রতিমুহূর্তে গিন্নি গঞ্জনা করতেন। শেষে একদিন ফতােয়া জারি করলেন যে, বুক চিতিয়ে মিলিটারি কায়দায় হাঁটি তত বরের মধ্যে তিনি আমাকে তালাবন্ধ করে রাখবেন। উল্টো প্ৰতিশােধ, একেবারে রংফুল কনফাইনমেন্ট ! বিল গলায় দাদা হেসে উঠলেন : “এমনিতে সুন্দরী ভীষণ পর্দানসিন, কিন্তু আমি যখন কোথাও বেরুবাে, ঠিক জানলা খুলে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবেন, হাঁটায় ঠিক আমার মহিষমনি ভঙ্গিটা ফুটে উঠছে কিনা। বলে আরেক পশলা হাসি। এমনি একটা হাসির গল্প শুনছি, নির্ব্যক্তিক নির্লিপ্ততায় আমিও হাসলুম। স্টেশনে এসে দেখি অনেকেই যাচ্ছে। লম্বা একটা ইন্টার ক্লাস কামরাতে তুমুল গুলতানি চলেছে। ব্যারিস্টার উৎফুল্ল হয়ে আমাকে প্রশ্ন করলাে : “আপনিও যাচ্ছেন নাকি কেলকাটা ? বললুম : ‘া। আপনি?
১৪৭ ‘আমি যেতে পারি রাত্রির গাড়িতে। আমার স্ত্রী বললেন নাইট- জার্নিটাই বেশি কম্ফার্টেবল। নিন একটা সিগারেট। বলে সদ্য-ক্রীত গােল্ডফ্লেকের টিনটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলাে। দেখলুম আমার প্রতি আজ আর তার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব নেই, কেন সবাইকে এই একই সিগারেট ইতিপূৰ্বে বিতরণ করা হয়েছে। ব্যারিস্টার আমার মুখের সিগারেটটা ধরিয়ে দিতে দিতে জিগগেস করলে : ‘কেলকাটায় থাকবেন কোথায় ? থাকবাে কালীঘাট, কিন্তু বললুম : ‘হেরিসন রােড। এ ট্রেনে যাবে না অথচ স্টেশনে এখন এসেছে কেন ব্যারিস্টার সম্বন্ধে এই প্রশ্নটা আমাকে নাড়া দিচ্ছিলাে। পূৰ্বাভিজ্ঞ দাদাদেরকে জিগগেস করে জানলুম,কোনাে ট্রেনেই নাকি সে যায় না অথচ যে কোনাে ট্রেনে যে কোনাে অফিসারই যখন যায় তাকে সে নির্ঘাৎ ‘সী-অফ করতে আসে, আর ভিড় বুঝে প্যাকেট বা টিন কিনে মুক্তহস্তে সিগারেট বিলােয়। এটা নাকি তার একটা প্রথার মতাে দাড়িয়ে গেছে। আরেকটু অপেক্ষা করাে, গাড়িটা ছাড় ক, দেখবে বকের পাখার মতাে বিলিতি কায়দায় সে রুমাল নাড়বে। এ জায়গার সঙ্গে সে যে ভীষণ বেমানান এমনি একটা কুঞ্চিত বিরক্তি তার নাসিকাগ্র লিপিবদ্ধ ছিল। আমরা যখন পরিহাসচ্ছলে এ-জায়গার নিন্দা করতুম তখন অবিমিশ্রভাবে দলে পেতুম ব্যারিস্টারকে। সে ছাড়া আর সবাই যে ঘাের তমসাচ্ছন্ন সেটা সে অতি সহজেই প্রতিপন্ন করতে শুধু এই ইঙ্গিত করে যে, তার মতাে আর কেউই আমাদের সঙ্গে মেশে মেশবার উপযুক্ত নয়। কালচারের ‘ক’ জানে না কেউ-সে-ই প্রথম এখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী আরম্ভ করে। তার স্ত্রী বােলপুরের মেয়ে, জয়ন্তী হয় না শুনে তাে তড়িতাহত। বলেন : ‘এ-দেশটা কি পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসেররা বাইরে নাকি?
প্রজাপতয়ে ১৪৮ এর পর আমার জন্যে একটি পাত্রী নির্বাচনের কথা উঠেছিলাে। আমি বললুম : ‘যদি বিয়ে করি তাে, হাওড়া জেলার পানিত্রাস গ্রামের একটি মেয়ে বিয়ে করবাে।” সবাই সমস্বরে বলে উঠলাে : “কেন, কেন ? ‘নইলৈ শরৎ-বন্দনা কে করবে ? বস্তুত স্ত্রীর একটু অভাব বােধ করছিলুম সম্প্রতি। নতুবা দাদার ও ব্যারিস্টারের স্ত্রীদ্বয়ের রহস্যভেদ আর কে করতে পারবে? সহােদর দাদা ও খুড়তুতাে দাদাদের কারুর কাছ থেকেই কোনাে হদিস পাওয়া গেল না। তার কারণ দুঃখহরণবাবুর স্ত্রী এখানে পরে এসেছেন এবং এ-পর্যন্ত কারু বাড়ি পদার্পণ করেননি বলে মেজ-সেজ-ন’ বৌদিদিরাও কেউ যাননি তাঁর বাড়িতে। আর, বােলপুর বা ঢােলপুরের মেয়ে হােক, কোনাে উকিলের স্ত্রীর কাছে আগাম যাওয়াটা এদের পক্ষে বােরর বিধর্মিতা। আগের দিন আড্ডায় দাদা আসেন নি বলে পরের দিন আডডা বসবার আগেই তার সন্ধানে বেরুলুম। বাড়ির সামনে ছােট্ট একটু বােয়াক, বৃষ্টি না থাকলে ওটাই দাদার বৈঠকখানা। চাকরের মতন দেখলুম কাকে দরজার কাছে। পাছে দাদা বললে ঠিক না চিনতে পারে, বললুম : ‘এই, দুঃখবাবু বাড়ি আছেন? ‘দুঃখবাবু নয় হে ভায়া, দুঃখীবাবু। বলতে বলতে দাদা হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন বাইরে। কেঁচার খুটটি গায়ে জড়াননা, বুকের উপর সদ্যলব্ধ সেই শিশু। তার মুখের চেহারা দেখে কেমন খটকা লাগলাে, মনে হলাে হাসিটা তার অভ্যাসের হাসি, অনায়াস হাসি নয়। বললুম, ‘বেরােননি যে ? ‘শরীরটা ভালো নেই। বােধহয় জ্বর হয়েছে।
১৪৯ চূড়ান্ত শরীর খারাপ হয়েছে তাে খালি গায় বাইরে এসেছেন কেন ? ‘আরে ভায়া আমার শরীর নয়, শরীর। দাদা হাসতে গেলেন, কিন্তু পরের কথাগুলিতে সে উদ্যত আভা অন্তধন করলাে। বললেন : ‘গৃহিণী বিছানা নিয়েছেন, তার শাসনে বর্তমানে একটা শুধু চাকর—কোন দিক যে সামলাই তার ঠিক নেই। ঘর-দোর গুছিয়ে বিছানা-পত্র পেতে এখন এই ছেলেটাকে নিয়ে বসেছি। বুঝতেই পারাে, নিরুপায়, তাই রবার দিয়েছি চুষতে। পরে হাসি থামিয়ে নিষ্প্রভ মুখে বললেন : “কিন্তু যাই বলল, একদিন ঠিক বিদ্রোহ করব। ‘কী উপায়ে ? ‘সেইটেই ঠিক এখনাে মাথায় আসছে না। আমাকে অত উনি তরুণ বানাচ্ছেন, ইচ্ছে করছে তৃতীয় পাণিগ্রহণ করে ওর জাঁকটা একবার ভেঙে দিই। এইবার তাঁর হাসিতে সেই পুরােনাে সারল্যের কিঞ্চিৎ আভাস পেলুম। ভাবলুম এই সব অতিশয়ােক্তি কি সত্যিই বিশ্বসনীয় ? এর কিছু দিন পরে শুনলুম, দাদা হঠাৎ এজলাসে ভির্মি খেয়েছেন। ‘ছুটে গেলুম সবাই। বিশেষ কিছু নয়, সামলে নিয়েছেন চটপট। পায়ের নিচে ক্ষুদ্র একটি ভূমিকম্প টের পেয়েছিলেন আর চোখে দেখেছিলেন হরিদ্রাভ ক’টা তারার ফুলকি। কঠিন বসুন্ধরা তাকে প্রত্যাহার করেছে। দাদার সে কী বর্ণনােচ্ছাস। তবু সেদিন তাকে আর কাজ করতে দেয়া হলো না। একটা ঘােড়র গাড়ি ডাকাতে চেয়েছিলুম, দাদা বললেন রিকসা আনাতে। জনান্তিকে আমাকে বললেন : ‘চার গণ্ডা পয়সা প্রায় বেঁচে যাবে। ধমক দিয়ে উঠলুম। দাদা গম্ভীর হয়ে বললেন, “আরে ভায়া, কিছু হয়নি আমার, দিব্যি হেঁটে যেতে পারি ইচ্ছে করলে। চেহারা দেখলে লােকে প্রজাপতয়ে বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে, আমার অসুখ! ভাববে গাড়ি চড়াটাই ব্যারাম হয়েছে। একে ভুগছেন কোমরের বাতে, গাড়ি দেখে সবাই তার অসাড় হয়ে যাক আর কি। ও দুবুদ্ধি দিয়ােনা ভায়া, দু’আনা দিয়ে একটি রিকসা ডেকে দাও, একদিন উপােস করে থেকে সহজেই হিসেব মিলিয়ে দিতে পারবাে। ডেকে দিলুম রিকসা, কিন্তু সবাইর সঙ্গে সেদিন প্রথম সম্মত হলুম যে, দাদার ঐ ভণিতাটা তার বদ্ধমূল কৃপণতার বর্বর ছদ্মবেশ। তবু বিকেলে গেলুম তার স্বাস্থ্যের খোঁজ করতে। তার বৈঠকখানায় অর্থাৎ বাইরের বােয়াকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার সঙ্গে আলাপ হলাে। ‘পত্রপাঠ ছুটি নিন, দাদা। যড়াননবাবু বললেন। দাদা হাসলেন, অত্যন্ত ম্লান হাসি। বললেন : ‘ক্যাজুয়েল লিভ আর পাওনা নেই। ‘কেজুয়েল লিভ-এ আর চলবে না। ব্যারিস্টারও টিপ্পনি কাটলাে, ‘লম্বা প্রিভিলেজ লিভ নিয়ে চেঞ্জে চলে যান কোথাও। ‘হ, ওয়ার্নিংবেল পড়ে গেছে, আর দেরি করবেন না। বললেন রাধাবল্লভবাবু। আমাকে নবাগত বা অনভিজ্ঞ বিবেচনা করে ব্যারিস্টার হঠাৎ আমাকে একটা উপদেশ দিয়ে বসলেন : ‘ন’টার পর ককখনাে রাত জাগবেন না। মােকদ্দমার কাগজপত্র দেখতে দেখতে যদি কোনােদিন তন্ময় হয়ে পড়ি, ঠিক আমার স্ত্রী এসে আলগােছে টেবল-ল্যাম্পের পলতেটা ডুবিয়ে দিয়ে যান। তিনি বলেন : “রাত্রে তেল পােড়ানাে আর শরীর পােড়ানাে এক কথা। কিন্তু ব্যারিস্টার-পত্নী কী বলেন তার চেয়ে দাদার গৃহিণীর উক্তিটাই বেশি ক্ষতিরুচিকর।
চূড়ান্ত ‘ছুটি নেয়ায় তােমাদের বৌদিদির মােটেই মত নেই। ছুটি নিলে মাইনেটা খানিক কমে যায় আর চেঞ্জে চিকিৎসায় অনাবশ্যক খরচ যায় বেড়ে, তাইতেই তার আপত্তি। দু’টো পয়সা উপরি-পাওনা নেই, মাঝের থেকে ন্যায্য মাইনেতে কিনা টান পড়বে। যাদের টেনে-বুনে চলে তাদের অত বাবুয়ানা মানায় না। এমন কথাও কেউ শুনেছে ? আমরা পরস্পরের চোখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলুম। রহস্য তেমনি দুষ্প্রবেশ হয়ে রইলো। তবু বললুম সাহস করে, স্ত্রী অবুঝ বলে কি আপনি অকালে মারা পড়বেন নাকি ? ‘না হে না, তেমন কোনাে অসুখ নয়। গিন্নি বলেছে মালবিকাগ্নিমিত্র তেল মাখলেই নাকি সেরে যাবে। “কী তেল ? “ঐ একটা কি নাম বললে কটমট। তার মামার নাকি সেরে গেছে। ‘আপনি যখন মামা নন তখন ও তেলে কিচ্ছু হবে না আপনার। বিরক্ত মুখে বললেন ষড়াননবাবু। দাদা অবিশ্রান্ত হাসতে লাগলেন। বললেন : “আমার স্রেফ মর্নিং * ওয়াকেই সেরে যাবে। বলে কি ভেবে আমার কাধ ধরে হঠাৎ তিনি ক’টা দুর্বল ঝাঁকুনি দিলেন। পরদিন ভােরে ঘুম ভাঙতেই বুঝলুম যে ঝাঁকুনির অর্থ কী। অর্থ হচ্ছে এই আমাকেও তার সঙ্গে প্রাতভ্রমণে বেরুতে হবে। একদিন ফিরছি বেড়িয়ে, দেখি ব্যারিস্টারের বাড়ির সামনে প্রকাণ্ড ভিড় আর গােলমাল। ব্যারিস্টারের বাড়ি না বলে দিলেও চিনতে পারবেন। কেন না, বাড়ির সামনেকার জমিতে একটুখানি ফুলের বাগান আর বেড়ার গায়ে কাঠের ফ্রেমে বাড়ির যে জানালা তাতে ফুল-তােলা ছিটের পাতলা পরদা ঝুলছে।
প্রজাপতয়ে ১৫২ হয় বাড়িতে চুরি হয়েছে শেষরাত্রে, নয় তাে কারুর ঘােরতর অসুখ, বললুম দাদাকে। কিন্তু খবর নিয়ে জানলুম একেবারে উলটো। জানলুম, স্ত্রীর উপর আজ প্রত্যুষের প্রহরটাতে ব্যারিস্টার প্রচণ্ড নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। কান দুটোকে তীক্ষ করে যেন শুনতে পেলুম, একটা ক্ষীণ মেয়েলি কণ্ঠের কান্না আর একটা আস্ফালয়মান পুরুষের প্রবল সিংহধ্বনি। বলবাে কি, বিস্ময়ে পাংশু হয়ে গেলুম একেবারে। দাদা দিব্যি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। বললেন : দীনবন্ধু । “সে কি দাদা? ‘ঈশ্বরকে স্মরণ করলুম ভায়া, যে, এমন পুরুষও তিনি সৃষ্টি করেছেন যে ঠিকমতাে প্রতিশােধ নিতে পারে। আহা, দেখে ভারি তৃপ্তি পেলুম, দেহ- মন জুড়িয়ে গেল। “কী বলছেন আপনি? অত্যাচারী স্বামী স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবে আপনি সেটা সমর্থন করেন ? আরে ভায়া, স্ত্রী চাচাতে পারে বলে জগৎসংসারে স্বামীর অত্যাচারটাই বিঘােষিত হয়, তার দুয়ার পর্যন্ত সিভ্যালরি আর সহানুভূতি ভিড় জমিয়ে তোেল। আর পুরুষ বেচারা কাঁদতে পারে না বলেই ঘরে-ঘরে সমস্ত স্ত্রী দেবী, মহীয়সী। তবু ব্যস্ত হয়ে উঠলুম। বললুম : ‘যাই একবার ‘যাই একবার ভেতরে। ব্যারিস্টারকে ডাকি। দাদা আমার হাত ধরে ফেলে বাধা দিলেন। বললেন : “মিছিমিছি ওকে আর কষ্ট দিয়াে না। কষ্ট ? ‘হা, পাশবিক রাগ থেকে হঠাৎ এক্সপ্রেশন বলে অপর্যাপ্ত খুসি হওয়ার খােসামুদে ভঙ্গি করাটা খুবই কষ্টকর। এরকম ভঙ্গি বদলাতে চূড়ান্ত নার্ভের উপর কী ভীষণ স্টেইন হয়, ভুক্তভােগী আমি, মর্মে-মর্মে জানি। সাধে কি আর বলেছে, দি ওয়াল্ড ইজ এ স্টেজ ! দাদা আমার হাত ধরে টানতে টানতে এগুতে লাগলেন। ঘড়িতে সাড়ে ন'টা, কাজ থেকে উঠবাে-উঠবাে করছি, শুনতে পেলুম গলির মােড় থেকে কে একটা লােক আপন মনে বকতে-বকতে এগিয়ে আসছে। নতুন কোনাে পাগল আমদানি হয়েছে হয়তাে। কিন্তু আমার জানলার কাছে আসতেই চিনলুম, কবিরাজ-মশাই। আমাকে দেখে তাঁর বাক্যস্ফুতি আরাে বেড়ে গেল। বললুম : ‘ব্যাপার কী? ‘আর মশাই ব্যাপার! এমন কথা আপনার কখনাে শ্রুতিগােচর হয়েছে, কবিরাজ-মশাই রাস্তা থেকে ঘরে উঠে এলেন : “যে, ঔষধের সঙ্গে অনুপানের ব্যবস্থা করতে পারব না ? শুদ্ধ পুরুষে কী করবে যদি প্রকৃতি না সহায় থাকে, তেমনি একাকী ঔষধে কি কোনাে ক্রিয়া হতে পারে যদি অনুপান না অন্তরঙ্গ হয় ? ‘বাঙলা করে বলুন, ব্যাপারটা একটু বুঝি। কবিরাজ-মশাই যা বললেন তার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এই যে, দাদার চিকিৎসাৰ্থ তাকে ডাকা হয়েছিলাে, কিন্তু তার অনুপানের ব্যবস্থাটা একটু বিস্তৃত বলে বৌদিদি ঘােরতর আপত্তি জানিয়েছেন, প্রথমত সে সব পত্র-মূল মূল্য ছাড়া সংগ্রহ করা যায় না এবং সামান্য কতগুলি লতা-পাতার জন্যে অর্থব্যয় করতে তিনি মােটেই সম্মত নন। দ্বিতীয়ত সে-সবের প্রস্তুতিতে এত শ্রম ও আয়াস দরকার যে, বৌদিদি তাতে সৰ্বাঙ্গীন পরাঘুখ। ‘একবার বুঝুন অবস্থাটা। কবিরাজ-মশাই বিস্ময়াহতের মতাে বললেন : “তুচ্ছ ক’টা শিকড়-পাকড়ের পিছে সামান্য দু’চার পয়সা খরচ করতে যার হাত ওঠে না নিজের সােয়ামীকে সে বাঁচাবে কী করে?
প্রজাপতয়ে ১৫৪ বললুম : ‘ওসব আপনার দুঃখী বাবুর মুখে শােনা কথা তাে? সব সব ওঁর চালাকি। নিজের কৃপণতাটা স্ত্রীর বেনামে চালিয়ে দিয়ে লােকের সহানুভূতি কুড়ােনাে। ওসব আপনি ককখনাে বিশ্বাস করবেন না। ‘কী বলেন, বিশ্বাস করবে না? স্বয়ং দুঃখিনী বাব্বীর সঙ্গেই যে আমার কথা হলাে। কবিরাজ-মশাই দুর্বাসার মতাে ভঙ্গি করে দাড়ালেন : “ঠিক একটা বিয়ন্ত বাঘিনীর মতাে গরজাতে লাগলাে, কী জাহাবাজ মেয়ে ! বললে : বাজারে পটল নেই, তার এখন পাতা পাবাে কোথায় ? তার চেয়ে বরং কচু পাতার অনুপান দিন। মূঢ়ের মত তাকিয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। কয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। মনে হলাে কবিরাজ-মশাই হয়তাে বা দাদার প্রােপাগ্যাণ্ডিস্ট। এর পরে ব্যাপার আর বেশি দূর গড়ালাে না। দ্বিতীয়বার যে দাদা ভিরমি খেলেন, একেবারে পড়লেন মুখ থুবড়ে আর উঠলেন না। ধরাধরি করে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া লাে এবং আশ্চর্য, আমাদেরর জন্যে আজ আর কোনাে শাসন-ত্রাসন টের পেলুম না। টের পেলুম না। বােয়াকের বৈঠকখানায় আজ আর স্থান নির্দিষ্ট হলাে না, সটান চলে এলুম তাঁদের সরিকি শশাবার ঘরে। মৃত্যু আজ মুক্ত করে দিয়েছে সমস্ত দরজা, সমস্ত বাধা-নিষেধ। এক থেকে যােল বছরের মধ্যে এ পক্ষের আটটি নাবালক। ছেলে- মেয়েরা কেউ-কেউ হাউ-মাউ করে কাঁদছে, কেউ-কেউ ফ্যালফ্যাল করে আছে তাকিয়ে, আর দাদার দেহ আঁকড়ে ধরে বপুষ্মতী একটি মহিলা তারস্বরে শােক করছেন নিম্নের তপশীল বর্ণিত হিসাবে : ‘তােমাকে আমি ছুটি নিতে দিইনি, তােমাকে আমি চিকিৎসা করাতে দিইনি, তােমাকে আমি গাড়ি চড়তে দিইনি, কত চা খেতে ভালােবাসতে, চুড়ান্ত চা বন্ধ করে দিয়ে লেবুর রস মিশিয়ে তােমাকে গরম জল খেতে দিয়েছি, দু’বেলা বাজার করিয়েছি, চাকর না থাকলে রাস্তা থেকে বালতি করে জল টানিয়েছি, বিছানা পাতিয়ে নিয়েছি, কত তুমি ভালাে ছিলে, কত তুমি ভালােবাসতে আমাকে, আমাকে ছেড়ে কোন সুখে তুমি ঘুমিয়ে আছ ! ব্যারিস্টার বললে : ‘আপনারা সব এরেঞ্জ করুন, আমি আমার স্ত্রীকে এখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এ সময় স্ত্রীদের সব আসা উচিত। আমার স্ত্রী বলেন মেয়েদের ধৈর্যের আসল পরীক্ষাটাই এ সময়। বুঝলুম, ব্যারিস্টার সটকালাে। কাজেকাজেই আমাদের সব জোগাড়যন্ত্র করতে হলাে। দূরস্থিত আত্মীয়-স্বজনদের জানাবার কোনাে সুযােগ ঘটেনি, অপােগণ্ড শিশুগুলাে তত নিতান্ত নিরবলম্ব, আর বৌদিদি তাে অকূলশােকাকুল। সুতরাং, কিয়ৎকাল নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে মাইনের স্কেল অনুসারে চাদার হার ঠিক করে ফেললুম। দাদার শেষকৃত্যে—মায় ফুল আর ফটোগ্রাফ—আমাদের ছত্রিশ টাকা সাড়ে ন’আনা খরচ হলাে। ছেলেরা যদি কোনদিন মানুষ হয় ও মনে রাখে !
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
‘ওকে আসতে বারণ করে দিতে পারে না, মা? মেয়ের মুখে কথাটা অত্যন্ত অদ্ভুত শােনলল। স্নেহলতা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। বললেন, ‘তাের বন্ধু, তুই বারণ করলেই তাে পারিস। ‘তবু তুমি অভিভাবক, মা। বারণ করাটা তােমারই শশাভা পায়। ‘আমি তাে এতে বারণ করার কিছুই দেখতে পাই না। স্নেহলতা য়্যালকোহলে তুলাে ভিজিয়ে ইনজেকশানের সূচ মুছতে লাগলেন : “তােকে যদি তার ভালাে লেগে থাকে, সে তাে ভালােই। ‘ভালােই ? মায়ের চোখের মধ্যে অণিমা তীক্ষ্ণ চক্ষু ফেললাে। শূন্য থেকে খানিকটা হাওয়া মুখে করে নিয়ে বললে, ‘অত্যন্ত লজ্জার কথা মা, অত্যন্ত বিশ্রী। স্নেহলতা এগিয়ে এসে জিগগেস করলেন, এর আগেরটা কোন হাতে দিয়েছিলি ? অণিমা তার ডান বাহুটা বাড়িয়ে ধরলাে। বেঁধা জায়গাটা ডলে দিতে দিতে স্নেহলতা বললেন, ‘বিয়েটাই একমাত্র বাকি আছে। কে জানে, ঈশ্বরের ইচ্ছায়, দিন ফিরেও যেতে পারে বা। ব্রজলাল আজ বিকেলবেলায় এসেছে। ইচ্ছে ছিলাে অণিমাকে নিয়ে কোথাও যদি বেরুনাে যায় বেড়াতে। দোতলার ফ্ল্যাট। উঠেই খানিকটা বসবার জায়গা, গােল করে কয়েকখানা চেয়ার সাজানাে। পিছনে দেয়াল, সামনে দু’থানা ঘর, পাশাপাশি। দরজায় পুরু পর্দা ঝুলছে। পশ্চিমের ঘরটাতে স্নেহলতা রুগী দেখেন। পূবেরটা শােবা, মা ও মেয়ের জন্যে আলাদা খাট পাতা। দুটোর একটাতেও ব্রজলাল এখনাে ঢােকেনি। বাতাসে পা উড়ে প্রজাপতয়ে। ১৬০ যাবার সময় যা একটু দেখেছে এই বাইরে বসে। ওদের পরে আর কী কোথায় আছে সে অমনি করতে পারে মাত্র। আজ চোখে পড়লাে পূবের ঘরের পর্দার পিছনে দরজা খিল-দেয়া। মেঘলা পেয়ে গা ঢেলে খুব একচোট ঘুম দিচ্ছে বুঝি অণিমা। ঝি এলাে বেরিয়ে পশ্চিমের ঘর দিয়ে । ‘দিদিমণি আছে ? ‘আপনাকে বসতে বললে। ‘কী করছে ? ঝি একটু হাসলাে। বললে, ‘সিগরেট খাচ্ছে। ব্রজলাল থ হয়ে গেল। পাঞ্জাবির যে পকেটে তার সিগারেটের প্যাকেট ও দিয়াশলাইর বাক্স থাকে সেটা সে একটু অনুভব করলাে হাত দিয়ে। অন্যমনস্কের মতাে ধরালাে একটা সিগারেট। ভাবলল, সামনা- সামনি খেতেই বা লজ্জা কী! চেয়ার টানা থেকেই অণিমা বুঝেছে কার ঐ শব্দ। সিগারেট ধরিয়ে একটা টান সে সবে দিয়েছে, মুখের থেকে ধোঁয়াটা তখনাে নেয়নি বুকের মধ্যে। সিগারেট একটা শেষ হতে অণিমার পনেরাে মিনিটের কমে হয় না। রয়ে-সয়ে জিরিয়ে-জিরিয়ে একটু-একটু করে খাবার ওটা জিনিস, এক ঢেকে গিলে ফেলার মতাে নয়। একবার ধরিয়ে নিবিয়ে ফেলার কথা ভাবলেও কষ্ট হয়। কিন্তু পনেরাে মিনিট তাকে বাইরে বসিয়ে রাখতেও মায়া করে। টানটা দীর্ঘ করতে গিয়ে অণিমার চোখে জল এলাে, তাকালাে একবার দরজার দিকে। ভাগ্যিস, বুদ্ধি করে আগেই বন্ধ করেছিলাে সেটা। যতদূর সম্ভব গিলে গিলে সিগারেটটা অণিমা শেষ করলাে। হ্যা, ওটা সম্পূর্ণ খেয়ে না নিলে মােটেই সে সুস্থ বােধ করতাে না। সিগারেটের পরাভূত শেষ অংশটুকু ফেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি সে মুখ ধুলাে সুগন্ধি একটা মাউথ- ওয়াশে। কজি পর্যন্ত হাতা গলা-বন্ধ ব্লাউজ পরে শাড়িটা দ্রুত বিক্ষেপে বদলে নিলাে। চুলটা ঠিক করলো কি না-করলো। সন্দেহ হলে চোখের কোলে কালি পড়েছে, মাে ঘষে-ঘষে সেটাকে একটু ফিকে করলাে। ঘাড়ে ও গলায় বুলােলাে একটু সেন্ট। শশাবার ঘরের দোর খুললল না, বেরুলাে পাশের ঘর দিয়ে। ‘অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি আপনাকে। শিথিল ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে অণিমা হাসলাে। বসলাে একটা চেয়ারে, একটু বা দূরে। চেয়ারের হাতলে দুই হাত রেখে, একটু টান হয়ে। ‘কিন্তু আর বসবাে না। ব্রজলাল অস্থির গলায় বললে, “চলুন, এখুনি বেরিয়ে পড়ি। যে ডাকে সমস্ত শরীর শিহরিত হয়ে ওঠবার কথা সে ডাকে অণিমা ভয় পেলল। ঈষৎ নিচু গলায় বললে, ‘মা বাড়ি আছেন যে । উত্তরটা ব্রজলাল একেবারেই প্রণিধান করতে পারলাে না। মা বাড়ি আছেন—থাকবেনই তাে বাড়ি—অনেক দিন ধরেই তাে আছেন। কত-কত দিন সে আরাে এসেছে, কোনােদিন মেহলতা ছিলেন, কোনােদিন ছিলেন না, একনজর কোনােদিন দেখেছেন, কোনােদিন বা লক্ষ্যের মধ্যেই আনেন নি। একদিন তাে দস্তুরমতো অভ্যর্থনা করে বসিয়েছিলেন মনে আছে। ‘আপনার সঙ্গে আমার মেলামেশাটা তিনি পছন্দ করছেন না। অণিমা চোখ নামালাে। ব্রজলাল কালাে একবার অণিমার বেশবাসের দিকে, হাওয়ায় শুকলে বা একটু তার গায়ের গন্ধ। বললে, “আপনি করছেন তাই যথেষ্ট।
প্রজাপতয়ে
১৬২
2
“কিন্তু মার আশ্রয়ে মার বাড়িতে যত দিন আছি-
‘সেই জন্যেই তাে বলছি হাওয়া বদলাতে চলুন বাড়ির বাইরে।
অণিমা কথা বললাে না। শান্তের মতাে ঘাড় ফেরালে।
..কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ক্ষুন্ধের মত ব্রজলাল প্রশ্ন করলে :
‘চাকরিটা আপনি ছাড়লেন কেন ?
সেই দিন যা উত্তর দিয়েছিলাে আজো তাই বললে অণিমা। বললে,
‘মা বলেন, চাকরি করার দরকার কী। যত দিন আমি আছি তাের
খাবার-পরবার ভাবনা নেই।
‘তবু তাে করেছিলেন কয়েক মাস।
‘কি জানি খেয়াল হয়েছিলাে। একটু চেষ্টা করে দেখতে
গিয়েছিলুম। সারা দিন কেমন ফাকা-ফাকা ঠেকতত। কাউনসিলর
প্রভঞ্জন মল্লিক মার চেনা, কর্পোরেশনের ইস্কুলে জুটিয়ে দিলেন
মিসট্রেসি, নিয়ে নিলুম। মাস আষ্টেক ছিলুম বােধ হয়। কিন্তু,
অণিমা ভাসা-ভাসা চোখে তাকালাে : ‘চাকরির কথা জিগগেস
করছেন কেন ?
‘চাকরি ছেড়ে দিয়েও তত ফের ফঁাকা-ফাকা লাগা উচিত।
‘তা তাে উচিত। অণিমা ম্লান চোখে হাসলাে।
‘টিউশনি দুটো আছে ?
সকালেরটা দূরে, ছেড়ে দিয়েছি। সন্ধেটা পড়াতে আমি যাই না,
মেয়েটিই আসে। ও সব দিন নয়। অণিমা আবার ভয়ে-ভয়ে
তাকালাে। কিন্তু এসব কথা কেন ?
ব্রজলাল গম্ভীর গলায় বললে, “দেখছি বাড়ি থেকে আপনার বেরুনােই
একদম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
‘প্রায় তাই।
পরাভূত
‘বাইরে যদি না পাই তবে কোথায় আপনার সঙ্গে দেখা হবে ?
‘কেন, এইখানে। মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেল অণিমার। পরে
শুকনাে গলায় সে একটা ঢােক গিললল : দিন-ক্ষণ জানিয়ে আপনাকে
আমি চিঠি দেব। সেই অনুসারে
‘কিন্তু ও-ছাড়া অন্য দিন যদি দেখা করতে ইচ্ছে করে ?
অণিমা উত্তর দিলাে না।
‘বােজ যদি ইচ্ছে করে ?
এবারাে কোনাে জবাব নেই।
‘মা কাৰু চিরকাল থাকে না। হঠাৎ খাপছাড়ার মতাে ব্রজলাল
বলে উঠলাে ।
‘কেউই আমরা চিরকাল নেই। আবার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল
অণিমার।
প্রথম দুই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তৃতীয় প্রশ্নের এই নিস্পৃহ
জবাবে ব্রজলালের রাগ হলাে। দ্রুত ভঙ্গিতে উঠে দাড়িয়ে বললে,
‘আমি তবে যাই।
চেয়ারের হাতল থেকে অণিমার ডান হাতটা শিথিল হয়ে খসে
পড়লাে। বললে, “না, যাবেন না, বসুন।
ব্রজলাল বসলাে। বললে, “কিন্তু আপনার মা রয়েছেন যে।
‘যখন একবার দেখে ফেলেছেন তখন তাে দেখেই ফেলেছেন। এখন
আরাে খানিকক্ষণ থেকে গেলে ক্ষতি কী ?
“ওঁর এবেলা কল্ নেই ?
হয়তাে রাতের দিকে আছে, জানি না। ফিরেছেনই তাে প্রায়
দুটোয়।
‘কোথায় উনি ?
প্রজাপতয়ে
১৬৪
‘ও-পাশের ঘরে বসে কী পড়ছেন দেখলুম। কিন্তু চোখ কেবল
বইয়েতেই নয়।
ব্রজলাল হাঁসফাস করতে লাগলাে। বললে, “যেতেও বলছেন থাকতেও
বললে এই অবস্থায় কী করি কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।
‘গল্প করুন।
ব্রজলাল পকেট থেকে প্লায়ার্সের প্যাকেটটা বের করে অণিমার
দিকে এগিয়ে ধরলাে। বললে, অত্যন্ত সহজ নির্লিপ্তভাবেই বললে, ‘নিন,
খান একটা।
‘সিগারেট ? মুহূর্তে অণিমার মুখ শুকিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
বললে, এ আবার আমি কবে খেতে গেলুম! কোনাে ভদ্র মেয়ে
খায় নাকি এই সব ?” বলে সে শব্দ করে হাসলাে। কেমন রুগ্ন,
অস্বচ্ছন্দ হাসি।
ব্রজলাল গুটিয়ে নিলাে হাত এবং সেই সঙ্গে আপনাকেও। বুঝতে
বাকি রইলাে না, সমস্তই আগাগােড়া মিথ্যা, একটা প্রকাণ্ড ভণ্ডামি।
‘হ্যা, আমার মাইনে অত্যন্ত কম, মােটে একশাে টাকা, আর
চাকরিটাও বলে বেড়াবার মতাে নয়। তাই আপনার পছন্দ হচ্ছে
শেষ পর্যন্ত। তাই যদি মনে ছিলাে তবে আগে এত কাছে
ডেকেছিলেন কেন? এটাই বা কোন ভদ্র মেয়ের ব্যবহার ? আর,
আমি ছাড়া কেই বা সাড়া দিতে আপনার ডাকে? নিজের দিকেও
তাকিয়ে দেখবেন একবার। ঐ তাে চেহারা—ঐ তত—
ব্রজলাল বেরিয়ে গেল।
রাস্তায় ট্রাম-স্টপের কাছে উত্তেজিত পদক্ষেপে সে পাইচারি করছিলাে
যতক্ষণ না ট্রাম একটা আসে। উঠতে যাবে, দেখলাে ট্রাম থেকে স্নেহলতা
নামছেন, হাতে তার ডাক্তারি ব্যাগ আর স্টেথিসকোপ।
১৬৫ পরাভূত ব্ৰজলালের ইচ্ছে হলে চলন্ত ট্রাম থেকে নেমে স্নেহলতার পিছু পিছু আবার সে উপস্থিত হয় সেখানে। আরাে কতগুলি স্পষ্ট, কঠিন ও নির্লজ্জ কথা শুনিয়ে দিয়ে আসে। স্নেহলতা উপরে এসে দেখেন অণিমা চেয়ারের কঁাধে দুই হাত রেখে মাথা গুজে বসে আছে। বুকের পাশটা ঘন-ঘন ওঠা-নামা করছে। উচু-হিলের আওয়াজ শুনে অণিমা চোখ চেয়ে দেখলাে, মা। ‘ওকে বারণ করে দিয়েছিস বুঝি আসতে? স্নেহলতা তিরস্কারের ভঙ্গিতে জিগগেস করলেন। ‘বারণ করলেও শুনতে চায় না, মা। অণিমা শিথিল পায়ে চলে গেল তার শােবার ঘরে। আলাে জ্বলবার মতাে সময় হয়েছে কিন্তু সুইচে হাত দিতে সাহস হলাে না। পাছে চকিতে আরশিতে সে নিজের মুখ দেখতে পায়। ঐ তাে চেহারা ! আস্তে-আস্তে বসলাে গিয়ে তার চেয়ারে, জানলার ধারে। টেবলের উপর সিগারেটের বাক্স। বাক্স থেকে সিগারেট একটা নিয়ে একটুখানি ভাবলাে এখুনি ধরাবে কি না। আরাে কতক্ষণ যাক। আরাে যতক্ষণ যায়। আরাে একটু রাত হােক। টেবলের উপর মাথা গুজে তন্দ্রাচ্ছন্নের মতাে অণিমা বসে রইলাে। ৫ ঐ তো চেহারা। তবু দু’দিন যেতে না যেতেই ব্রজলাল উপস্থিত। তেমনি বিকেল। শােবার ঘরের দরজা ভিতর থেকে খিল-দেয়া। পশ্চিমেরটা খােল, পর্দা ঝুলছে। চেয়ার টানার শব্দ থেকেই বােঝা গেল। বেরিয়ে এলেন নেহলতা।
প্রজাপতয়ে
‘অণিমা কোথায় ?
তবু
ওঁর সঙ্গে একটা শেষ কথা ছিলাে। অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে
ব্রজলাল বললে।
‘ওর শরীরটা আজ ভালাে নেই।
খানিকটা অবাক হলাে ব্রজলাল। কোনােদিন ভাবতেই পারেনি
অণিমার সম্বন্ধে এমন কথা কখনাে শুনতে হবে। যতটুকু সে দেখেছে,
শরীর সম্বন্ধে অণিমা বড়াে বেশি হুসিয়ার ।
কেউ অসুস্থ শুনলেই মনটা নরম হয়। ব্রজলাল জিগগেস
করলে : ‘কী অসুখ ?
এই সর্দি, কাশি-জ্বর।
এ-সময়টা হচ্ছে বটে জ্বরজারি। ব্রজলাল ঈষৎ দ্বিধা করলাে :
‘আমি ওঁকে দেখতে পারি না একটু ?
তবে এত কাছে ডেকেছিলেন কেন ? কথাটা মনে পড়লাে
ব্রজলালের। আশ্চর্য, কোনােদিন তার বিছানার পাশটিতেও সে
বসেনি। দুই চেয়ারের মাঝখানে ছিলাে সর্বদা একটা টেবলের ব্যবধান।
তারা সন্ত্রান্ত তােতাদের তাে বয়েস হয়েছে।
কাছে ডাকা মানে কি শরীরের কাছে ডাকা? সান্নিধ্য মানে কি
সামীপ্য ?
ভাসা-ভাসা ওর সঙ্গে আলাপ, দিন গুনে দেখলে এক বছর এই
এসেছে। আগেতে বাইরে, ইদানি বাড়িতে। ছিন্ন ক’টি মুহূর্ত। তবু,
এত তারা শ্রান্ত, এত দিনের আলাপ বা প্রতীক্ষার কোনাে দরকার ছিলাে
। ব্রজলাল সাইত্রিশ, অণিমা ত্রিশের ধারে।
ব্রজলাল তাকালাে দরজার দিকে।
১৬৭ পরাভূত স্নেহলতা সাদাসিধে গলায় বললেন, ‘অনেকক্ষণ পরে এখন ও একটু ঘুমুচ্ছে। ‘অনেকক্ষণ পরে ! খুব মাথা ধরেছিল বুঝি ? কেমন ছেলে- মানুষের মতাে বললে ব্রজলাল। কারু মাথা ধরলে যে তার মাথা টিপে দেয়া যায় এমন একটা কথা অনেক আগে, ছেলেবয়সে, কোথায় যেন সে পড়েছিলাে। ‘বলতে পারি না। অথচ, এ বাড়িতে আসে ব্রজলাল দেখেনি আর এমন কাউকে। এলে বলতে বাধা ছিলাে না অণিমার। অন্তত না-বলার অর্থ ছিলাে না কোননা। এ বয়সে যা লাগে তা আঘাত নয়, শূন্যতার অভ্যস্ত একটু আস্বাদ। ব্রজলাল স্নেহলতাকে একবার দেখলাে। এই গরিব লেডি-ডাক্তার আর তার গ্র্যাজুয়েট মেয়ে—এরা কারা ? ‘দেখুন, ব্রজলাল উঠে দাড়ালাে : ‘ওর যখন ঘুম ভাঙবে ওঁকে বলবেন আমি ওঁর কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছিলুম। স্নেহলতা থমকে গেলেন। ‘সেদিন ওঁকে কতগুলাে অন্যায় কথা বলেছিলুম আমি। বলবেন সে-সব ভুলে যেতে। যেন খানিকটা আলাে ঠিকরে পড়লােব্রজলালের মনে হলাে যেন হঠাৎ শােবার ঘরের দরজা খুলে অণিমা বেরিয়ে এসেছে। চমকে চাইলে পিছনে, আলােও গেল মিলিয়ে । পড়ন্ত রােদ তার চশমার কাচে লেগে দেয়ালে পিছলে পড়েছে। রাত্রে একটা ট্রেনের ঠিকানা দিয়ে স্টেশনে দেখা করতে বলে চিঠি দিয়েছে অণিমা। দিন-ক্ষণ জানিয়ে আপনাকে আখিঠি দেব, সেই প্রজাপতয়ে ১৬৮ অনুসারে ব্রজলাল চঞ্চল হয়ে উঠলাে। এত দিন পরে একসঙ্গে কি তারা পালিয়ে যাবে নাকি ? আপিস কামাই করে দুপুরবেলাতেই সে সমাগত। একটু নতুন রকম মনে হচ্ছে—সময়টাই নতুন রকম। শশাবার ঘরের দরজা এখন খােলা, পর্দাটাও উত্তোলিত। পিছন থেকে ঘরের মধ্যে অণিমাকে সে চিনতেই পারতাে না যদি না দেখতে চেয়ারে বসে সে সিগারেট খাচ্ছে। ধোয়ার একটা উৎকট কদর্য গন্ধ তার নাকে এলাে। মড়া পােড়ার গন্ধ। এ সিগারেট ইজিপ্টের না দক্ষিণ আফ্রিকার তামাকের কিছু সে হদিস পেলাে না। শেষ না হতেই হাতের সিগারেটটা হঠাৎ ছুড়ে ফেলে দিয়ে অণিমা ডেকে উঠলাে : মা। যেন স্বাভাবিক ডাক নয়। বেদনায় বিকৃত। জলমগ্ন। সে-ডাক শুনে এলেন না স্নেহলতা। ঝিটা সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, ঐক্ষেপ করলাে না। ব্রজলাল ঢুকে পড়লাে ঘরের মধ্যে। ঘুরে দাড়িয়ে একেবারে অণিমার সামনা-সামনি। হলদেটে চোখ তুলে অণিমা দেখলে ব্রজলালকে। যেন চিনতে পারলাে। শূন্য থেকে খানিকটা হাওয়া মুখে করে নিয়ে বললে, “আপনি ইনজেকশান করতে পারেন? তবে শিগগির— কথাটা শেষ করতে পারলাে না। ব্রজলাল আতঙ্কে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। অনড়, অথব। এমন কোনদিন দেখেনি সে অণিমাকে। কল্পনার বাইরে এ অণিমা। চেয়ারে বসে হাতল দুটোর উপর দু' হাতের ভর রেখে গলা তুলে সে শূন্যে বাতাস খুঁজে বেড়াচ্ছে আর তার বুক হাপরের মতাে উঠছে আর পড়ছে অনবরত। পেটটা সেধিয়ে যাচ্ছে গর্ত হয়ে।
১৬৯ পরাভূত ‘কী দাড়িয়ে আছেন হাঁ করে?’ অণিমা দমকে-দমকে বললে, “টেবলের থেকে ইনজেকশানের সিরিঞ্জটা নিন, ওখানেই য়্যাড্রিনেলিনের শিশিটা আছে, দাগ দেখে এক সি-সি তুলে নিয়ে আসুন। একটা ইনজেকশান দিতে হবে। মা বাড়ি নেই। কল থেকে এখনাে ফেরেন নি। ব্রজলাল চোখে অন্ধকার দেখলাে। অস্থিরের মতাে বললে, ‘আমি এক্ষুনি একজন ডাক্তার নিয়ে আসছি। না, না, ডাক্তার লাগে না। ও আমিই পারি। আমিই দেব। এখন টান খুব উঠে গেছে বলে টেবলটা পর্যন্ত যেতে পাচ্ছি না। ভীষণ কষ্ট। দয়া করে নিয়ে আসুন ঐ সিরিঞ্জ আর ওষুধের শিশিটা। কী করছে কিছুই না বুঝে ব্রজলাল টেবল থেকে সিরিঞ্জে করে এক সি-সি য়্যাড্রিনেলিন তুলে আনলাে। সামান্য একটা সেমিজ শুধু গায়ে ছিলাে অণিমার। তাই অনায়াসে বাম বাহুটা ব্রজলালের দিকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে বললে, “তলার দিক থেকে জোরে চেপে ধরুন হাতটা। আমিই গ্রিক করছি। দেখছেন, ফুড়ে-ফুড়ে দুই হাতে আর আমার জায়গা নেই। ব্রজলাল এক মুহূর্ত দ্বিধা করলো : “য়্যালকোহল দিয়ে জায়গাটা একটু মুছে নিলে হতাে না ? ‘অত বাবুগিরির সময় নেই। কোনােরকমে সেরে ফেলতে পারলেই হলাে। প্রাণ আমার যায়। হ্যা, এবার হাত দিয়ে একটু ডলে দিন জায়গাটা। বুক আমার খুব দপদপ করছে-ও করে। আমাকে একটু হাওয়া করুন। বিছানা থেকে হাত-পাখাটা কুড়িয়ে নিয়ে এসে ব্রজলাল হাওয়া করতে লাগলাে। তার ভয় করতে লাগলাে মুহূর্তে না-জানি কী অঘটন ঘটে যা, এক্ষুনি।
প্রজাপতয়ে
১৭°
শ্রান্তের মতাে চোখ বুজলাে অণিমা।
ক্রমেই যেন শান্ত হয়ে আসছে ঝড়। ক্রমেই যেন অণিমা ফিরে
আসছে। এখন তার মুখের যে ভাব সেটা কষ্ট নয়, লজ্জা।
ইসারায় বললাে হাওয়া লাগবে না। এলোেমলাে চুলগুলােকে খোঁপায়
নিয়ে গেল, বেশবাসের শৈথিল্যকে শাসন করলে। গলার হারের সঙ্গে গাঁথা
মাদুলিগুলাে বেরিয়ে পড়েছিলাে, সেগুলাে পাঠিয়ে দিলে সেমিজের অন্তরালে।
আস্তে-আস্তে উঠে দাড়ালাে চেয়ার ছেড়ে। আলনা থেকে ব্লাউজটা
তুলে নিয়ে ব্ৰজলালের দিকে পিঠ করে দাড়িয়ে পরে নিলাে—সেই কজি-
পর্যন্ত-হাত গলা-বন্ধ ব্লাউজ। ব্রজলাল ভেবেছিলাে এবার বােধহয় বিছানায়
বে, কিন্তু দাড়ালাে গিয়ে আয়নার সামনে। তােয়ালে দিয়ে মুছে
তাড়াতাড়ি একটু পাউডার বুলিয়ে নিলাে।
রাশি-রাশি ওষুধে আকীর্ণ হয়ে আছে টেবলটা, দেখলে ভয় করে।
তার ভিতর থেকে সিগারেটের বাক্সটাই ব্রজলালকে বেশি আকর্ষণ করছে।
লক্ষ্য করে দেখলাে এ তামাকের সিগারেট নয়, ধুতুরার। প্যারিস থেকে
এসেছে।
সম্পূর্ণ তৈরি এখন অণিমা। এত তৈরি, চমৎকার সে হাসতে
পারছে পর্যন্ত।
বললে, “আসুন বাইরে। আর বাইরে এসেই ঘরের পর্দাটা সে
ফেলে দিলাে।
ওটা যেন রঙ্গমঞ্চের পৃষ্ঠপট। ভাবলে ব্রজলাল।
বললে, এখন কেমন আছেন?
নিশ্চিন্ত, একটু বা নিষ্ঠুর গলায় অণিমা বললে, ‘ভালাে।
‘এখন গিয়ে তবে একটু শােন। বড় কষ্ট পেয়েছেন। ব্ৰজলালের
কঠে
শুধু এখন করুণা। শারীরিক করুণ।
১৭১
পরাভূত
‘আর আপনি? হাওয়া করবেন পাশে বসে ? কালাে চোখে অণিমা
একটু ঝিলিক দিলাে।
‘করতে পারি, কিন্তু আপনার মা এসে দেখে ফেলেন সে ভয়।
ব্রজলাল উঠে দাড়ালাে।
‘চললেন? ইনজেকশানের জায়গাটা যে ভীষণ ব্যথা করছে।”
ও তত আর আপনার নতুন নয়। মুনের পুটলি করে সেক দিতে
বলুন ঝিকে। এখন আর কথা বলবেন না, চুপচাপ একটু ঘুমােন।
ব্রজলাল চলে গেল।
এবং
রাত্রের ট্রেনের কথাটা ব্রজলালের মনে পড়লাে বাইরে এসে।
রাত্রে কেমন আছে জানবার জন্যে যেতেই হবে স্টেশনে। না যায়, বাড়িতে
গিয়েই তবে খোঁজ নিতে হবে।
স্নেহলতা বললেন, ‘ঐ আসছে ব্রজলাল। সিগারেটটা ফেলে দে।
অনেকগুলি ধোঁয়া ফুসফুসের মধ্যে নিয়ে অণিমা বললে, “ওঁকে আর
লজ্জা নেই, মা।
গাড়িগুলির মধ্যে থেকে ব্রজলালের তাই চিনে নিতে দেরি হলাে না।
‘কেমন আছেন এখন?’ ব্রজলালের কণ্ঠে শুধু উদ্বেগ।
‘বেশ ভালােই আছি।
‘একা নাকি?
যদিও গাড়িতে অসম্ভব ভিড়। আপনিও আসুন
। এমন ভাবে বললে অণিমা, তার চোখের দিকে চাইতে হলাে
ব্রজলালকে।
‘আসুন না, ব্রজলালবাবু। ওপার থেকে স্নেহলতা মুখ বাড়িয়ে
বললেন, আপনি আসবেন বলে মেয়েদের গাড়িতে উঠিনি।
‘ভীষণ।
প্রজাপতয়ে ১৭২ ‘এই যে, নমস্কার। পরে অণিমাকে লক্ষ্য করে ব্রজলাল বললে, ‘ভারি আশ্চর্য তােআমি যাবাে, আর ওঁর আপত্তি হবে না? ‘না, হবে না। আপনি আসুন। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে অণিমা ব্রজলালের হাত ধরলাে। ‘বা, আমি যাব কোথায় ? ব্রজলাল উঠলাে হেসে। ‘কিন্তু আমি কোথায় যাচ্ছি একবারাে জিগগেস করলেন না? অনেক স্তব্ধতার পর, গাড়ি যখন ছাড়াে-ছাড়াে, জিগগেস করলে অণিমা। “কোথায় ? ব্রজলালের মনে হলাে প্রশ্নটা অবান্তর নয়। ‘চিত্রকূট। ‘সেখানে কী? ‘সেখানে কোজাগরী পূর্ণিমারাতে শিশিরে-ভেজা পায়েস খাবাে। ‘সে আবার কী ? ‘ওষুধ। দেখবেন আমি ভালাে হয়ে যাব একেবারে। আমার এই আজন্ম-কালের রােগ এক রাত্রে সেরে যাবে। দেখবেন- চলন্ত গাড়ির জানলা থেকে অণিমা হাসিমুখে স্কুলের মেয়ের মতো তরল গলায় বলতে লাগলাে : ‘আমি আর এমনি থাকবাে না। হয়তো তখন একেবারে চেনাই যাবে না আমাকে। দেখবেন—ততদিন— ব্রজলাল একই জায়গায় নিশ্চলের মতাে দাড়িয়ে।
সিল্কের ব্যাণ্ডেজ
No text on this page.
আপনি যদি শােনেন যে আপনার প্রতিবেশী তার স্ত্রীকে ধরে ঠ্যাঙাচ্ছে, আপনি, যদি মানুষ হন, তবে নিশ্চয়ই ছুটে যাবেন তার ক্রুদ্ধ প্রতিবিধানে, আর যদি তা না পারেন অন্তত আপনার রসনাটা বিষিয়ে উঠবে, কিন্তু যদি শােনেন যে মূখ, গোয়ার, দজ্জাল স্ত্রী স্বামীকে প্রহার করছে, আপনি কিছুই করবেন না, কেননা এমন কথা কর্ণগােচরই হবে কোনােদিন। কেননা যে স্ত্রী মার খায় সে চাচায় আর যে স্বামী মার খায় সে হাসে। কান্নাটাই শােনা যায় আর হাসিটা মনে-মনে। বাইরে থেকে কে বলবে ওরা আদর্শ দম্পতি নয়, বিভূতি আর অরুণ! এখন যদি তাদের কেউ দেখে, বিলের জলে সান্ধ্য নৌ-বিহার করছে। মাঝিটা চুপ করে আছে বসে, পদ্মের দল ঠেলে বিভূতি দুই হাতে দাড় টানছে, আর গুন গুন করে গান গাইছে অরুণা। আমরা তাে এইটুকুই শুধু দেখি, অন্তরাল দেখেন অন্তর্যামী। ‘তুমি সন্ধে না হতেই ঘরের দরজা এমনি বন্ধ কোরাে না বলছি। বিভূতি বললে। “নিশ্চয়ই করবাে। নইলে যে ব্যাঙ ঢােকে। বললে অরুণা। ‘ব্যাঙ তত ঢুকেই আছে ঘরে। সঙ্গে কিছু হাওয়া ঢুকুক। দরজাটা খুলে গেল। কথাটা বিভূতি তরল গলায়ই বলেছিলাে, কিন্তু বলা-কওয়া-নেই, অরুণা হঠাৎ পা দিয়ে লাথিয়ে বিভূতির আপিসের এক পাটি জুতো বাইরে ফেলে দিলাে। তারপর ব্যাপারটা যেখানে এসে থামলাে সেখানে অরুণার মাথাটা জায়গায়-জায়গায় ফুলে গিয়েছে আর বিভূতির দুই হাত তীক্ষ্ণ নখরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।
প্রজাপতয়ে
১৭৬
এখানেও হয়তাে থামতে না যদি সে-সময় গণেশ নৌকো নিয়ে
আসতাে।
‘নৌকো নিয়ে এসেছি, দিদি। বাইরে থেকে বুড়ােটে গলায়
কে বললে।
দশ আঙুলে অরুণা তখন বিভুতির টুটিটা নখরবিদ্ধ করেছে এমন সময়
আত গলায় বিভূতি শব্দ করে উঠলাে : ‘নৌকো ! নৌকো !
‘কে, গণেশ-দাদা নাকি? মুহূর্তে শিকার ছেড়ে দিয়ে অরুণা ত্রস্ত
হাতে বস্ত্রাঞ্চলে দ্রুত বিন্যাস এনে বাইরে বেরিয়ে এলাে।
এ-এলেকায় জমিদারের যে কাচারি আছে সেখান থেকে এসেছে এ
নৌকো। অরুণার মামা সে-জমিদারের নায়েব।
এ-অঞ্চলে বদলি
হয়ে এসে অবধি মামাকে সে চিঠি লিখছে নৌকো পাঠাতে—গ্রীন বােট।
এমন এখানে বিস্তীর্ণ হাওড়। এখন বর্ষার সময় নদীর মত ঢেউ, অথচ
কচুরিপানার বদলে পদ্মপাতায় ভরা।
প্রথম লিখেছিলাে ক্ষণাংশিক একটা প্রেমের মুহূর্তে। পরে যে-গুলি
লিখেছিলাে সেগুলি প্রশ্নোত্তর-পরম্পরায়।
গণেশ এ-কাচারির হালসাহানা। স-কর্ণধার নৌকো নিয়ে এসেছে।
‘চলাে দিদি, দেরি কোরাে না।
‘না, আর দেরি কিসে! বিভূতি বললে ।
‘আমার পাঁচ মিনিটো লাগবে না। বললে অরুণা।
বিভূতি ক্ষতাক্ত জায়গাগুলিতে আইডিন ছুইয়ে দিতে লাগলাে
অরুণা এক বালতি জলে এক শিশি অডিকোলন ঢেলে মাথা
ধুতে বসলাে।
তারপর বিভূতি পরলাে ফিনফিনে সাদা, আর অরুণা পরলাে
ঝলমলে জর্জেট।
১৭৭ সিল্কের ব্যাণ্ডেজ তারপর তারা যখন নােকো ছাড়লো তখন ঘাটে কত লােক দাড়িয়ে তাদেরকে দেখলাে সুদূর সম্ভ্রমে আর সবিস্ময় ঈর্ষায়। আর এখন তাে গলা ছেড়েই অরুণা গান ধরেছে ও বৈঠার ঘায়ে বিভূতি জলে দিচ্ছে তাল। সেদিনের ঝগড়াটা হয়েছিলাে আরাে তুচ্ছ কারণে। ভর্জিত বেগুনের আকারের শীর্ণতা নিয়ে। বিভূতি বললে, “এ তত ভাজার বেগুন নয়, এ বেগুনির বেগুন। উত্তরে অরুণা যা বললে তার প্রাঞ্জল অর্থ হচ্ছে এই যে বিভূতির পিতা-পিতামহ চিরকাল আলুপােড়া খেয়েছে, বেগুন খায়নি। কথাটা যে সমানুপাতিক হয়নি, নিরপেক্ষ কেউ প্রশ্ন করলে অরুণা হয়ত মানতে কিন্তু সেই সঙ্গে এও বলতাে যে পুরুষ হয়ে কেন সে এমনি তুচ্ছ মুলাে-বেগুন নিয়ে আলােচনা করবে। বিভূতি বলবে, যাই কেন না বলি .ও বাপ তুলবে কেন। বেগুন নিয়ে বলি ও কুমড় নিয়ে বলুক। এর কোনাে মীমাংসা হয় না যতক্ষণ না ডাক্তার ডাকা হয়। আর ডাক্তার ডাকা হয় বিভূতির জন্যে। কেননা অরুণা বুঝেছে অত বড় একটা মােটা বই বিভূতির বুকে ছুড়ে মারাটা ঠিক হয়নি। ‘ঠাকুর, ঠাকুর! বিভূতি বিছানায় গড়াতে-গড়াতে গোঁ গোঁ করে উঠলাে : ‘শিগগির এক ছুটে মহেশ-ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এস। আমার বুকটা কেমন করছে। অরুণা ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে রইলাে। পরে বিছানার পাশে এসে স্বামীর গায়ে হাত দিয়ে বললে, ডাক্তার এলে কী বলবে?
প্রজাপতয়ে
১৭৮
‘কী আর বলব! যন্ত্রণায় কাতর মুখে বিভূতি বললে, “কী আর
বলতে পারি? বলবাে, বলতে হবে, ঘুমের মধ্যে খাট থেকে পড়ে
গিয়েছিলাম।
আশ্বস্ত হয়ে অরুণা এলাে বুকে হাত বুলিয়ে দিতে।
“যেটুকু নিশ্বাস এখনাে আছে সেটুকু এখনি বন্ধ করে দিতে চাও
নাকি? বলে বিভূতি স্ত্রীর হাতটা ছুড়ে দিলাে।
অরুণা খাট থেকে এক ঝটকায় এলে নেমে। বললে কিছু হয়নি,
অম্বলের ব্যথা হয়তাে, তা করছে কী দ্যাখ না।
হন্তদন্ত হয়ে হাফ-প্যান্ট-পরা মহেশ-ডাক্তার এলাে ছুটে।
“কী হলাে হঠাৎ ? স্টেথিস্কোপ উচিয়ে মহেশ খাটের কাছে
সরে এলাে।
বিভূতি সহজ গলায় বললে, “আমার রাডপ্রেসারটা একটু দেখাবাে
বলে ডেকেছি। যন্ত্রটা নিয়ে এসেছেন?
‘ঠাকুর বললে বুকে কী ব্যথা উঠেছে হঠাৎ!
‘সুপুরি খেয়ে বিষম লেগেছিলাে, তাই ঠাকুরের একটা ব্রেন-ওয়েভ
হয়েছিলাে মনে হচ্ছে।”
মহেশ-ডাক্তার স্টেথিস্কোপ গুটোতে-গুটোতে বললে, “যন্ত্রটা তো
আনিনি।
‘তা কাল সকালে দেখলেই হবে। একরাত্রেই আশা করি রগ ছিড়ে
মারা পড়বে না।”
সেদিনের ঝগড়াটা ধােপার হিসেবের যােগফল নিয়ে। হবে কুড়িখানা,
অনেক কাটাকুটি করে পাঞ্জাবিকে সার্ট বানিয়ে অরুণা লিখেছে বাইশ।
আর যায় কোথা!
অরুণার দাদা যে ইস্টিমারের বুকিং-ক্লার্ক, যােগ দেয়া, যে সে তাঁরই
১৭৯ সিকের ব্যাণ্ডেজ কাছে শিখেছে এ নিয়ে বিস্তৃতি টিপ্পনি করে। আর বিভূতির দাদা যে টোলের পণ্ডিত, যােগ-বিয়ােগেরই যে সে ধার ধারে না এ চিমটি কাটতে অরুণা কসুর করে না। বিভূতির অভিযােগ হচ্ছে শালা-সম্বন্ধে এমন একটা রসিকতা করলে সাধারণ স্ত্রীরা সহজেই চেপে যায়, ভাসুর নিয়ে আলােচনা করে না। আর অরুণার অভিযােগ হচ্ছে এই যে পুরুষের পক্ষে ধােপার হিসেবের খাতায় উকি মারাটা বর্বরতা। সমাধান হয় না যখন বিচারক নেই। অতএব বিভূতির হাতঘড়িটা গুড়াে হয়ে যায় আর অরুণার কপালের একটা পাশ ছােট্ট একটা পেপার-ওয়েট হয়ে ওঠে। অরুণার চুলগুলি তখনাে বিভূতির হাতের মুঠোয়, হঠাৎ অরুণা মাথায় ঘােমটা টানবার সচেষ্টতায় স্বাভাবিক গলায় বললে, “ছাড়াে, মুন্সেফবাবুর বৌ আসছে। নিমেষে হাত ছেড়ে দিয়ে বিভূতি বললে, “আমি ঘরটা গুছিয়ে দিচ্ছি, তুমি শাড়িটা বদলে নাও। পদাশ্রিত, এমনি একখানা ভাব থাকার জন্যে বিভূতি মুন্সেফ-গিন্নির সামনে বেরিয়ে থাকে। আপ্যায়িত হতে-হতে ঘরে এনে বসালাে। দিলাে চেয়ার। ‘আপনার স্ত্রী কোথায় ? মুন্সেফ গৃহিণী জিগগেস করলেন। ‘এই তত উঠলেন ঘুম থেকে। পুকুরে গেছেন মুখ ধুতে । কতক্ষণ পরেই ভেজা মুখে অরুণা এলাে মুখে ভদ্র হাসি টেনে। বিভূতি তখন আর সেখানে নেই। “কী, ঝুলন দেখতে যাবেন না? মুন্সেফ-গৃহিণী মাথার কাপড়ের নিচে খোঁপাটা অনুভব করতে-করতে জিগগেস করলেন।
প্রজাপতয়ে
১৮০
‘যাবাে বৈ কি!
‘যাবেন তত এখনাে ঘুমুচ্ছেন কী?
ছুটির দিন—যেন কী-একটা গূঢ় রসিকতা করছে এমনি ভাবে
অরুণা হাসলাে।
ও মা, আপনার কপাল অমন ফুলে উঠলে কি করে?
‘আর বলবেন না, বাথরুমের দরজাটা হয়েছে ছােট, তাড়াতাড়িতে
বেরিয়ে আসতে চৌকাঠের সঙ্গে ধাক্কা।
“দেখেছ ? মুন্সেফ-গৃহিণী শিউরে উঠলেন। বললেন, “তবে যাবেন
কি করে ঝুলনে ?
‘কেন, কপাল ফুললে যাওয়া যায় না?
‘আমার তাে মুখে একটা ব্রণ উঠলেও বাইরে বেরুতে লজ্জা করে।
‘এতে আর লজ্জার কী! ঘরের কাজ-কর্ম করতে গিয়ে একটা
ব্যথা পেয়েছি, এতে লুকোবার কী আছে।
‘তবে চলুন।
“দাড়ান, চুলটা ঠিক করে বেঁধে নি।
সেদিনের ঝগড়াটা নির্মম মধ্যাহ্নে।
চোখের উপর বােদ এসে পড়েছে, বিভূতি মুখােমুখি জানলাটা
দিয়েছিলাে বন্ধ করে। খাটে শুয়ে অরুণা উপন্যাস পড়ছিলাে, হঠাৎ
তার আলাে কমে যাওয়াতে রসভঙ্গ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরেই
এই জানলা বন্ধ করা নিয়ে বচসা চলছিলাে। জানলা একটা বন্ধ
হলেই ঘরের আলাে একেবারে নিবে যায় না-এ বলে বিভূতি।
জানলা একটা খােলা থাকলেই ঘুমের কোন ব্যাঘাত হয় না—এ
বল অরুণা।
অতএব, শেষকালে যখন বিভূতি জোর করেই জানলা বন্ধ করে দিলাে,
১৮১ সিল্কের ব্যাণ্ডেজ অরুণা হাতের উপন্যাসখানা টুকরাে-টুকরাে করে নস্যি-বেচার কাগজে রূপান্তরিত করলে। উপন্যাসটা একটা ছােকরা-লাইব্রেরির। ব্যাপারটা যেখানে এসে থামলাে সেটা অরুণার বৈধব্যের কাছাকাছি। অর্থাৎ বিভূতি কঠিন দুই হাতে অরুণার মণিবন্ধ নৃশংস চেপে ধরলল, পাঁচগাছি করে পাৎলা সােনার চুড়ি গেল বেঁকে, দুমড়ে, কিম্ভুতকিমাকার হয়ে। আর সবই বােধ হয় সওয়া যায় গয়নার এই অপমান ছাড়া। দুই টানে ঢলঢলে চুড়িগুলি হাত থেকে খুলে ফেলে অরুণা ক্ষিপ্র বেগে মেঝের উপর ছুড়ে মারলাে। ক্ষণলীন বিদ্যুতের জিহ্বা মেলে স্বর্ণচ্ছটাগুলি কে কোন দিকে মিলিয়ে গেল বােঝা গেল না। জেলে যাওয়ার জন্যে তত নয় যত লােক-জানাজানির ভয়েই বিভূতি অরুণাকে খুন করতে পারলাে না। নিচু হয়ে চুড়িগুলি কুড়িয়ে নিতে নিতে বললে, “আর কী। দু’হাত খালি করেছ, এবার রাস্তায় বেরিয়ে গেলেই তাে চলে। কথাটা কিছু ভেবে বলেনি বিভূতি। কিন্তু অরুণা হঠাৎ গায়ে একটা 'জামা আঁটলাে ও স্যাণ্ডেলটা পায়ে দিয়ে সােজা রাস্তার মুখে বেরিয়ে গেল স্পষ্ট দিনের আলােয়, সহরের মধ্যে। লােক-জনের যাওয়া-আসা, পাঁচ-সাত মিনিটের পথ রেললায়ে-স্টেশন। লােকে বলবে কী! এমন ভাবে চলেছে যেন সতীদাহে যাবে, কিম্বা ঘণ্টা বাজিয়ে-দেয়া ট্রেন ধরতে হবে, কিম্বা স্বামীকে মৃত্যুশয্যায় ফেলে বেরিয়েছে সে ডাক্তারের খোঁজে। ভীষণ বিশ্রী দেখায়, শুধু এই ওজুহাতে বিভূতিও বেরিয়ে পড়লাে। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে নয়, শুধু তার সন্নিহিত থাকার জন্যে, নইলে রাস্তায় একাকিনীকে ভালাে দেখায় না।
প্রজাপতয়ে ১৮২ যতই ছুটুক, বসনায় না পারলেও পায়ে অরুণাকে বিভূতি ধরে ফেললাে। কাগজিবাগিচার উপেন মােক্তারের সঙ্গে দেখা। বললে, “এখুনি যাচ্ছেন ? স্পেশ্যাল ট্রেনটা তাে রাত্তির এগারােটা পর্যন্ত আছে। কিছু না বুঝেই বিভূতি বললে, ‘এখনই তাে ভালাে। ব্যাপারটা বুঝলল সে স্টেশনের কাছাকাছি এসে, নতুন রকমের ট্রেন ও অগুনতি মানুষ দেখে। পূজোর বাজারে ব্যবসায়ীরা কোলকাতা থেকে নানান রকম দোকান সাজিয়ে স্পেশ্যাল ট্রেন ভাড়া করে এসেছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় একদিন থেকে আরেক দিন ঘুরে বেড়াবে। বিভূতি বললে, “চলল, দেখে আসি। অরুণা কোনাে আপত্তি জানালাে না। প্রথমেই চোখে পড়লাে কি না একটা জুয়েলার্সের দোকান। সম্রান্ত ও সার্ধাঙ্গ ভদ্রলােক দেখে দোকানিরা কী আপ্যায়নটাই না করলে ! ডায়মনকাটা এই প্যাটার্নের চুড়িই অরুণার পছন্দ। আট-আট যােল গাছ। এই বারাে-গাছ চুড়ি বদল যাবে—বলে পকেট থেকে ব্যাকানাে চুড়িগুলি বিভূতি বার করে দিল। ‘আর ঐ নেকলেসটা। এমন অদুরে ভঙ্গি করে অরুণা বললে যা ফিল্মে ভােলার মতাে। বিভূতি দ্বিরুক্তি করলে না। বললে, “আমার সঙ্গে কাউকে পাঠিয়ে দিন বাড়িতে, আমি চেকে পেমেন্ট করবে। এ আর বলতে! লােক এলাে সঙ্গে। বিভূতি চেক কাটলে। যাক, ফাঁকতালে কিছু গয়না হলাে? অম্লান খুসিতে উছলে উঠে অরুণা বললে। নিজের বাক্স খুলে তিনটে টাকা বার করে বললে, “নাও,
১৮৩
সিল্কের ব্যাণ্ডেজ
নাও এই তিন টাকা, আমার জমানাে থেকে দিচ্ছি, লাইব্রেরিকে ঐ
উপন্যাসটা কিনে দিয়াে। শুধু-শুধু কারু আমি ক্ষতি করতে চাই না।
বলেই সে একটু হাসলাে।
কিন্তু কতক্ষণ!
এই বর্তমানের সঙ্কীর্ণ চূড়ার উপর দাড়িয়ে বিভূতি একবার নিচের
দিকে চাইলাে, যেখানে গভীর গহ্বর আছে মুখ মেলে আর যার নাম হচ্ছে
ভবিষ্যৎ।
তারপর সেদিন রাত্রে যখন আবার অরুণা বেরিয়ে গেল ঘরের থেকে
বিভূতি আর তাকে অনুসরণ করলে না।
মরা জ্যোৎস্নায় নিঃসাড় রাত, খিল খুলে অরুণা গেল বেরিয়ে।
সাজগােজ করলাে না, স্যাণ্ডেল পরলাে না, ছােট টর্চটাও নিল না সঙ্গে।
বিভূতি স্তব্ধ হয়ে রইলাে।
যাক যেখানে খুসি। এত রাত্রে ট্রেন নেই, এত রাত্রে বন্ধুও নেই
কোথাও জেগে। তবে একমাত্র মরতে যেতে পারে-নদীর জলে।
সে একটা ভয়ানক জানাজানি হয়ে যাবে বটে, কিন্তু যে মরবে সে তাে আর
‘কিছু জানতে আসবে না। দু’জনে বেঁচে থেকে যে জানাজানি সেইটেই
খারাপ। আর, তবু, খুনের চেয়ে তাে সেটা ভদ্র !
বিভূতি লণ্ঠন জেলে তার টেবিলে এসে বসলাে। পেড়ে নিলাে একটা
বই। যেন রাত জেগে কী একটা গভীর গবেষণায় সে ব্যাপৃত।
কতদূর যেতেই সারদা-পিওনের বাড়ি। দেখতে পেয়েছে সারদা-
পিওনের বউ।
‘এত রাত্রে বাইরে, মা ?
“দেখছ না কী গুমােট করেছে। বাইরে তাই একটু ঘুরে
বেড়াচ্ছি।
প্রজাপতয়ে
১৮৪
‘একলা কেন? বাবু আসেন নি সঙ্গে ?
‘এসেছেন বৈ কি। ঐ এগিয়ে পড়েছেন খানিক।
লজ্জায় জিভ কেটে ঘােমটা টেনে সারদা-পিওনের বউ জানলা থেকে
সরে গেল।
যেন বাবুকেই ধরতে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলেছে অরুণা।
কোথায় যাচ্ছে, জানে না—একবার ভাবছে স্টেশনে, একবার ভাবছে
থানায়, আরেকবার ভাবছে নদীর জলে। স্বামী যে তাকে আজ
ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে এই কথাটার সে আজ চরম ঘােষণা
করবে।
কাছেই দেখলাে ঝলমল করছে নদী। কী ভেবে ঢাল বেয়ে জলের
দিকেই সে নেমে গেল।
সেখানেও নিস্তার নেই।
সেখানে মাখন-জেলে মাছ ধরছে।
‘এখানে মা, এত রাত্রে !
“আর বােলল না, তােমার বাবুর ভীষণ পেটে ব্যথা, একটা শিকড়
খুঁজতে বেরিয়েছি।
“কী শিকড় ? মাখন ব্যস্ত হয়ে উঠলাে।
‘নাম বলতে নেই। নাম বললেই গুণ চলে যায় ওষুধের। সামনের
একটা ঝােপ-ঝাড়ের দিকে অরুণা অগ্রসর হলাে : ‘মাঝরাতে উঠে
স্ত্রীকে গিয়ে উপড়ে তুলে আনতে হবে। পরে বেটে খাওয়াতে হবে
রুগীকে।
‘আলাে নেই, খুঁজে বার করবে কী, মা? শিকড় ভেবে শেষকালে
সাপ-ধােপ
‘সত্যি— অরুণা রাস্তায় উঠে এলাে।
---
১৮৫
সিল্কের ব্যাণ্ডেজ
তার মধ্যে
তারপর কোন দিকে না-জানি তাদের বাড়ি। অরুণা অন্ধকারের
উপর অন্ধকার দেখলে।
কে-একটা লােক তার পিছু-পিছু আসছে। চেয়ে দেখলে চেনে না
লােকটাকে।
অরুণার ভয় করতে লাগলাে। সামনে একটা গলি পেলল,
গেল ঢুকে। আশ্চর্য, লােকটাও তার পিছনে।
মুহূর্তে অরুণা রুখে দাড়ালাে। বললে, “কী চাই আপনার?
‘মনে হচ্ছে আপনি যেন কোথায় যাবেন, খুঁজে পাচ্ছেন না। কোথায়
যাবেন আপনি? পিছন থেকে লােকটা প্রশ্ন করলে। ব্যবহারটা ঠিক
পরিচ্ছন্ন না হলেও কথার স্বরটা বেশ বিনীত।
‘আমি বিভূতিবাবুর বাড়ি যাবে।
‘সেটা ও দিকে কোথায়? আসুন এদিকে। বলে সে-গলির
মধ্যেই লােকটা অরুণাকে হঠাৎ আকর্ষণ করলে।
অসহায় আতঙ্কে অরুণ চঁাচাতে যাচ্ছিলাে, বিভূতি তাকে সবলে
পাশ্বসংলগ্ন করে অস্ফুটগলায় বললে, “চেঁচিয়াে না, লােক-জানাজানি হয়ে
যাবে যে।
মুদ্রাকর ও প্রকাশ এগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য—ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.