Majhu Public Library, Howrah
Shiksha Samalochana
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
JU. HOWR:#
শিক্ষা-সমালােচনা
PUBLIC
LIBRARIES
..AJU
-
-
শিক্ষা-বিজ্ঞান-প্রণেতা
শ্রীবিনয়কুমার সরকার এম, এ
অধ্যাপক-রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল কলেজ, কলিকাতা
কলিকাতা
১৫, কলেজ স্কোয়ার
চক্রবর্তী চাটাচ্চি এণ্ড কোং
১৯১২
মূল্য ১
টাকা মাত্র।
Printed by
R. C. Mittra, at the Visvakosha Press.
21|3, Santiram Ghose's Street, Bagbazar,
Calcutta.
THE EDUCATIONAL CREED OF Prof. Benoy Kumar Sarkar A. General 1. Aim and Criterion of Education twofold: the man must be (i ) intellectually, a discoverer of truths and pioneer of learning, (ii) morally, an organiser of institutions and leader of men. II. Moral Training to be imparted not through lessons culled from moral and religious text-books, but through arrangements by which the student is actually made to develop habits of self-sacrifice and devotion to the interests of others** by undertaking works of philanthropy and social service. III. To build up character and determine the aim or: mission of life (i) the 'design,' plan and personal responsibility of a single guide-philosopher-friend, and (ii) the control of the whole life and career of the student are indispensable. These circumstances provide the pre-condition for true Spiritual Education. IV. Educational Institutions and Movements must not be made planks in political, industrial, social or religious agitations and propagandas, but controlled and governed by the Science of Education based on the rational grounds of Sociology. B. Tutorial I. Even the most elementary course must have a Multiplicity of subjects with due inter-relation and co- ( 2 ) or lination. Upto certain stage the training must be wcyclopædic and as comprchensive as possible. II. The mother tongue must be the Medium of instruction in all subjects and through all standards. And if in India the provincial languages are really inadequate and poor the educationists must make it a point to develop and enrich them within the shortest possible time by a stem of patronage and endowinents on the 'protective principle.' III. The sentence, not word, must be the basis of Language-training, whether in Inflexional Analytical ngues—even in Sanskrit ; and the Inductive Method of proceeding from the known to the unknown, concrete to the abstract, facts and phenomena to general principles, is to Lt the tutorial method in all branches of learning. IV. Two Foreign languages besides English and at least two provincial vernaculars must be made rompulsory for all Higher Culture in India.“ C. Organisational I. Examinations must be daily. The day's work must be finished and tested during the day. And terms of academic life as well as the system of giving credit should be not by years or months but according to subjects or portions of subjects studied. Steady and constant discipline, both intellectual and moral, are possible only under these conditions. II. The Laboratory and Environment of studentlife must be the whole world of men and things. The day's routine must therefore provide opportunities for self-sacrifice, devotion, recreations, excursions, etc, as well as pure intellectual work. There should consequently be no long holidays or periodical vacations except when necessitated by pedagogic interests.
সূচী
বিষয়
পৃষ্ঠা
= = =
১
২১
E = ৫
৩১
মনুষ্যত্বলাভের সােপান
চিন্তায় মৌলিকতা
চরিত্রগঠনের উপাদান—মানবসেবা
আরােহ-পদ্ধতির অধ্যাপনা-প্রণালী
জাতীয়-শিক্ষা কাহাকে বলে ?
ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী
শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক
আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি
বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা
. . .
৭৯
৯৭
No text on this page.
ভূমিকা [ শ্ৰীযুক্ত বরদাচরণ মিত্র, এম, এ, সি, এস্ কর্তৃক লিখিত ] ইংলণ্ডের কোন কবি বলিয়াছেন, পূৰ্ব্ব পূৰ্বই, পশ্চিম পশ্চিমই উভয়ে মিলিবে না। কথাটা সত্য বলিয়া বােধ হয় না। প্রকৃতি- পুরুষে ন্যায় এতদুভয়ের ব্যবহারিক স্বাতন্ত্র্য থাকিলেও বস্তুগত সমতা আছে । মিলিবে না—যুগধৰ্ম্মের গতিবিধি যাহারা পৰ্যবেক্ষণ করতে সমর্থ, তাহারা এ কথা স্বীকার করিতে প্রস্তুত হইবেন না । অন্য কোন নিদর্শন দেখাইবার প্রয়ােজন নাই, পশ্চিম ইংলণ্ডের ঈশ্বর দিল্লির সিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়া রাজমুকুট গ্রহণ করিলেন, ইহার মর্মার্থ অনুধাবন করিলেই যথেষ্ট হইবে । পূৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমমুখে যাত্রা করিলে যাত্রার আরম্ভ স্থলেই ফিরিতে হয়। পরমকল্যাণাস্পদ অধ্যাপক বিনয়কুমার এই অবিসম্বাদিত অথচ অননুভূত সত্যের সার্থকতা কাৰ্যে উপলব্ধি করিতে ও অন্যকে অনুভব করাইতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন। আমাদের অবনতির কারণ সম্বন্ধে অনেকে অনেক কথা বলেন। বাল্যবিবাহ, পরাধীনতা, স্ত্রীজাতির কেতাবি শিক্ষার অভাব ও বৈধব্যে একাদশীর প্রভাব, শুষ্ক মাংসের পরিবর্তে ঝােলযুক্ত অর্ধতরল অন্ন ভােজন, মামলা মােকদ্দমা, ব্যবসা- y০ বাণিজ্যে অমনােযােগ, সমুদ্রযাত্রা স্বীকারের শাস্ত্রবিরুদ্ধতা, বৃদ্ধ মনুর প্রবর্তিত বর্ণভেদ, রঘুনন্দন, হাঁচি, টিকটিকি ও যােদশীতে বাৰ্তাকু-ভক্ষণের কুফল-জ্ঞাপন ও তাহাতে বিশ্বাস, ম্যালেরিয়া— “রুচীণাং বৈচিত্র্যাৎ”ইহাদের একটা না একটা, বা একাধিক, কারণ বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া থাকে। কারণগু।-র মধ্যে কোনটিতে আংশিক সত্য থাকিতে পারে। কোনটি সম্পূর্ণ অসত্য। আমাদের সকল প্রকার অবনতির মূলে—ব্রহ্মচর্যের অভাব। ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের ধ্বংসের মূলীভূত কারণ এই একই। ইচ্ছাশক্তির অভাব, বা নপুংসকবৎ দৌর্বল্য, এই ব্রহ্মচর্য্যের অভাবের সহিত কাৰ্যকারণ ভাবে নিগূঢ়-সম্বদ্ধ, অথচ সকল উন্নতির মূলে ইচ্ছাশক্তি। উন্নতি বলিলেই নিম্নস্তর হইতে উচ্চাদর্শে বর্ধলক্ষ্য হইয়া উচ্চস্তরে আরােহণ সূচিত হয়। পূর্ণ ও অখণ্ড আদর্শের সামীপ্য লাভ করিলে ইচ্ছাশক্তি পূর্ণতা ও নির্মলতা প্রাপ্ত হয়। তখন ইচ্ছাশক্তি সাত্ত্বিক, তথন উন্নতি অর্থহীন। তখন অবরােহণ হইতে পারে কিন্তু আরােহণ অসম্ভব ! উন্নতি যখন সার্থক, মানুষ যখন উন্নতির পথে, যথন চক্রবাল রেখার ন্যায় আদর্শ নিকটবর্তী হইয়াও দূরে সরিয়া যাইতেছে ও প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর করিতেছে,—সত্বানুবিদ্ধ হইলেও ইচ্ছা- শক্তি তখন কামনাবিজড়িত, রাজসিক, তমের অবসাদ ও নিশ্চলতা অভিভূত করিতে বহুলকাৰ্য্যতৎপর। আমাদের অবসাদ আসিয়া- ছিল। যুগধর্মপ্রবর্তক দেবতা তাহার নিরাকরণ-কল্পে নানা vo উপায়ে চেষ্টিত। এই সকল উপায়ের মধ্যে রাধাকুমুদ, বিনয়কুমার প্রভৃতি চিন্তাশীল, অক্লিষ্টকৰ্ম্মা, ব্রতধারী যুবকগণের অভ্যুদয় অগতম। বিনয়কুমার যে ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন, তাহার উদযাপন সময়- সাপেক্ষ। কিন্তু তার উৎসাহ, উদ্যম, অধ্যবসায়, চরিত্রবত্তা, উদ্দেশ্যের উচ্চতা ও সৌন্দৰ্য্য, প্রগাঢ় দেশহিতৈষণা ও কাৰ্যোপ- যােগী পাণ্ডিত্য ও অনুশীলন, বিপুল আশার সঞ্চার করে। পঁচিশ বৎসর বয়সে সাধারণতঃ মানুষের পরিপক্ক বহুদর্শিতা জন্মে না। চিন্তার আবেগ প্রসূত সিদ্ধান্ত বস্তুর স্থান অধিকার করে। সিদ্ধান্তের কতক অংশ পরে পরিত্যক্তব্য বিবেচিত হইলেও, চিন্তার আবেগ ও অন্তরের প্রেরণা ভুলভ্রান্তির ও উপহাসের মধ্য দিয়া তরঙ্গ-কুটির উপেক্ষাকারী অগ্নি-পােতের ন্যায় সত্যের বন্দরে নির্বিঘ্নে পৌছে । কোন না কোন কাৰ্য্য করে এমন লােক নাই বলিলেও হয়। সকল চেষ্টাও সফল হয় না। কিন্তু উৎসাহযুক্ত কাৰ্য্য ও অধ্যবসায়শালিনী চেষ্টার মিলনে উৎকর্ষ ও স্থায়িত্বরূপ ফলপ্রসব অবশ্যম্ভাবী। বিনয়কুমারের কাৰ্য ও চেষ্টার প্রকার দৃষ্টে সে আশা হয়। এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানিতে শিক্ষাসম্বন্ধীয় যে সকল বিষয়ের অবতারণা ও আলােচনা করা হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকের পুনরালােচনা এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য নহে। সকল সিদ্ধান্তই যে অভ্রান্ত, বা কার্যক্ষেত্রে সম্ভব, তাহাও বলিতে পারি না। তবে যু । শিক্ষা, শিক্ষাপ্রচার ও শিক্ষা-প্রচারকের যে আদর্শ চিন্তিত, চিত্রিত ও অনুসৃত হইয়াছে, তাহা অতি উচ্চ। উচ্চ আদর্শের বাস্তবীকরণ অনেক স্থলে অসম্ভব হইলেও, তাহার চিন্তা ও অনুসরণ মানবজীবনকে ধন্য করে, হৃদয়ে বলসঞ্চার করে, জড়তা বিদূরিত করে, কাৰ্যকুশলতার সহায় হয়। সহায় হয়। আদর্শ- তাই বাঙ্গালী-জীবনকে এত ফাঁপা করিয়াছে। দুইটি মােটা কথা সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ বলিতে ইচ্ছা করি। প্রথম কথা, এই পুস্তকে কৰ্ম্ম জ্ঞানের অঙ্গীভূত। কর্মের দ্বারাই জ্ঞানার্জন কর, আবার জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের প্রসার বৃদ্ধি কর ও প্রকার নির্বাচন কর। কর্মের দ্বারা জ্ঞান বদ্ধমূল ; জ্ঞানের দ্বারা কৰ্ম্ম সুচিন্তিত, বিস্তৃত ও বিচিত্র। কর্মবিরহিত জ্ঞান রক্তশূন্য হৃদ্যন্ত্র ; জ্ঞান-বিরহিত কৰ্ম্ম অন্ধকারে লােষ্ট্র-নিক্ষেপ। সামাজিক জীবনে চরিত্র-গঠন ; রাজনৈতিক জীবনে শক্তির পরিচালনা ; বিজ্ঞানের জগতে প্রকৃতির গুপ্তাগারে রক্ষিত রহস্য কাড়িয়া লইবার জন্য প্রকৃতির সহিত সম্মুখ-সমর। বিশ্বের নানাজাতীয় কুটিল গ্রন্থিচ্ছেদনপ্রয়াসীর অঙ্গের ধারও চাই, ভারও চাই। কথাটা কথঞ্চিং বিভিন্ন ভাষায় বলিলাম, কিন্তু বোধ হয়, পুস্তকের কতক অংশের মর্ম এই। কথাটা ভাল—উন্নতির জন্য, অর্থাৎ রাজসিক বিকাশের জন্য, হৃদয়ঙ্গম করিবার যােগ্য। পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিহাস ইহাই জ্ঞাপন করে। পুস্তক-বর্ণিত “শিক্ষার আরােহপ্রণালীর উদ্দেশ্য ও এই। ইউরােপীয় শিক্ষা-বিজ্ঞান-বিদেরা এই মতের সমর্থন করেন। ;
I/০ দ্বিতীয় কথা—বিদ্যমৃতমতে। “বিদ্যার অমৃত ভক্ষণ কর”, এই উপদেশমাত্র দিয়া বিনয়কুমার নিশ্চিন্ত নহেন। অমৃত ভাণ্ড যাহাতে অফুরন্ত হয়, ও সুব্যবস্থিত বন্টকের হস্তে আপামরসাধারণে যথাযযাগ্য পরিবেশন করা হয়, তাহার জন্য তাঁহার বিশেষ আগ্রহ। তাই শিক্ষাপ্রচার ও শিক্ষা প্রচারক সম্বন্ধে পুস্তকে অনেক সারবান্ কথার অবতারণা হইয়াছে। উদ্দেশ্য মহৎ ও সাধু।• কথঞ্চিং ফলে পরিণত হইলেও যথেষ্ট উপকার। অনেক স্থলে আধুনিক পাশ্চাত্য-শিক্ষাবিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত অনুসৃত হইয়াছে। ক্ষতি কি? আলােকের মত, জ্ঞানে সকলের সমান অধিকার। শিষ্যের নিকট লইতেই বা দোষ কি ? কিন্তু যদিও বিনয়কুমার পশ্চিমমুখে গমনশীল, তাহার উদ্দেশ্য সুৰ্যাস্ত- দেশের মণি-রত্ন আহরণ করিয়া নিজের ঘরে ফেরা। সকল জ্ঞান বঙ্গভাষাতেই অর্জন করিতে হইবে। সকল রত্নই বঙ্গসরস্বতীকে সমলস্কৃত করিবে। তারি শ্বেতশতদলবিন্যস্ত চরণে সকল অর্ঘ্য সমর্পিত হইবে। শুভ্রজ্যোতির্ময়ী তরি মূর্তি দিগন্ত উদ্ভাসিত করিবে। শুভ্রতড়িৎস্ফুরিত তারিকিরীট মধ্যগগন স্পর্শ করিবে। ধৰ্ম্মশিক্ষাসম্বন্ধে পুস্তকে যে আভাস দেওয়া হইয়াছে, তাহা যথার্থই আশাপ্রদ। ধর্মগ্রন্থপাঠ ধর্মশিক্ষার অবান্তর সহায় হইলেও মুখ্য উপায় নয়। তাহার জন্য কর্মের আবশ্যক, নিষ্ঠার আবশ্যক, সাধনার আবশ্যক, ত্যাগের আবশ্যক, ব্যক্তিগত জীবনের অশেষ বিচিত্রতার মধ্যে একটি চরম লক্ষ্যের জীবন্ত অনুপ্রাণনা ও সৰ্ব্ব- মুখী প্রভাবের আবশ্যক। সমগ্র জীবনই ধর্মের প্রতিষ্ঠা। তাহার
ly
০
অনুশীলনের ভিত্তি কোথায় ? গুরুগৃহে। তাহার অভিব্যক্তি
কোথায় বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রত্যেক জীবনের প্রত্যেক কার্য্যে।
সাধনা প্রত্যেকের পক্ষে ভিন্ন। সিদ্ধি সকলের এক। নৃণামেকে
গম্যমাস পয়সামৰ্ণব ইব।
বিনয়কুমারের সাধু চেষ্টা জয়যুক্ত হউক।
সিউড়ি, বীরভূম।
শ্রীবরদাচরণ মিত্র।
নিবেদন সৃষ্টি করিবার সামর্থ্য ও আনন্দই মানবের উন্নত অবস্থার পরি- চায়ক। এই সৃষ্টির বিকাশে সহায়তা করা ও তাহার পুষ্টিবিধান করাই মানবশিক্ষার চরম লক্ষ্য। এজন্য এরূপ ভাবে সমাজে শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত, যাহাতে মানুষ স্বকীয় শক্তি- পুঞ্জের দ্বারা জগৎকে প্রভাবান্বিত করিতে সমর্থ হয়। পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রে এইরূপ প্রতিষ্ঠালাভ দুই উপায়ে সাধিত হইয়া থাকে। প্রথমতঃ—মানসিক শক্তির যথোচিত অনুশীলনের ফলে মৌলিক ও স্বাধীনভাবে বিবিধ সত্য আবিষ্কার এবং নূতন নূতন আলােচনা-প্রণালী উদ্ভাবন দ্বারা চিন্তাজগতে আধিপত্য বিস্তার ; দ্বিতীয়ত-নৈতিক জীবনের যথােচিত বিকাশের ফলে বিবিধ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব গ্রহণ এবং স্বাধীন ভাবে বিচিত্র প্রতিষ্ঠানের গঠন ও পরিচালনা দ্বারা কর্মজগতে স্বকীয় বিশেষত্বের প্রভাব বিস্তার। শিক্ষার যেরূপ আয়ােজন করিলে এইরূপ আবিক্রিয়া-শক্তি সম্পন্ন এবং চরিত্রবান্ চিন্তাবীর ও কর্মবীরের উদ্ভব স্বতই হইতে পারে তাহার ইঙ্গিত করিয়া কতকগুলি প্রবন্ধ বিবিধ সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত করিয়াছিলাম। সম্প্রতি সেইগুলি একত্রে প্রচারিত হইল। আমাদের দেশে সত্যের আবিষ্কারক এবং কর্শের পরিচালক বহুবিধ লোকের প্রয়ােজন হইয়াছে। আশা করি, ( ২ ) সেইরূপ লােক সৃষ্টির আয়োজনকল্পে এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা কথঞ্চিৎ ' সাহায্য করিবে। সংসারে এই দ্বিবিধ প্রতিষ্ঠালাভের সঙ্গে কি উপায়ে প্রকৃত ধৰ্ম্মজীবন যাপন করা যায়, শেষ প্রবন্ধে তাহার আলােচনা করা হইয়াছে। দেখাইয়াছি গুরুগৃহে বাস, অধ্যয়ন ভিন্ন এই উদ্দেশ্য সাধনের যােগ্যতা লাভ হইতে পারে না। সুতরাং আধুনিক ভারতে পুনরায় গুরুগৃহবাস-রীতি প্রবর্তন আবশ্যক। পৃথিবীর অন্যান্য সমাজেও এই প্রথা অবলম্বিত হইলেই শিক্ষা- সমস্যার মীমাংসা হইবে এবং মানবজাতির সংস্কার সাধিত হইবে । ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ইংরাজী ও বাঙ্গালা ইতিহাসলেখক শ্ৰীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন এবং বিশ্বকোষ’ সম্পাদক ও বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস'লেখক শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়গণ এই গ্রন্থের প্রুফ- সংশােধনকালে স্থানে স্থানে ভাষাসম্বন্ধে আমাকে বিশেষ সাহায্য করিয়াছেন। এজন্য যাহাদের নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম । কলিকাতা চৈত্র ১৩১৮। বিনয়কুমার সরকার।
শিক্ষা-সমালােচনা মনুষ্যত্বলাভের সােপান আজকাল আমাদের দেশে শিক্ষা সম্বন্ধে নানা রকমের আন্দোলন চলিতেছে। শিক্ষাসমস্যা কেবল বিদ্যালয়ের চতুঃসীমার মধ্যে আর আবদ্ধ নয়। ইহার গুরুত্ব সকলেই ক্রমশঃ বুঝিতে ছেন, এবং ছাত্রজীবনের কর্তব্য, শিক্ষাপ্রণালী প্রভৃতি বিষয়ে মতামত প্রকাশ করিতেছেন। দেশময় এরূপ শিক্ষার আন্দোলন অতি আশাপ্রদ। ইহাতে বুঝা যায় আমাদের দেশের লােকেরা ছেলেদের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতি দৃষ্টি রাথিয়া শৈশবাবস্থা হইতেই তাহাদিগকে প্রকৃত মঙ্গলের পথে চালিত করিবার জন্য জাগ্রত হইয়াছেন, এবং এ জন্য দুই একজন শিক্ষকের হাতে শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করিয়া তাহারা নিশ্চেষ্টভাবে বসিয়া থাকিতে ইচ্ছুক নন; বরং নিজে নিজেই এই কঠিন বিষয়ের যতটুকু মীমাংসা করিতে পারেন, আগ্রহের সহিত তজ্জন্য সময় ব্যয় ও পরিশ্রম করিতেছেন।
২ শিক্ষা-সমালােচনা আমাদের অনেকেই শিক্ষাকে টাকা রােজগারের উপায় হইতে তফাৎ করিতে পারেন না। অর্থকরী না হইলে তাহারা বিদ্যার শিক্ষাপদ্ধতি ও অন্ন- মূল্য দান করেন না। তাহারা বিদ্যাশিক্ষাকে সংস্থানের ব্যবস্থা কেবলমাত্র অর্থোপার্জনেরই পন্থা মনে করেন। এজন্য সকল বিষয়ই ঐদি হইতে বুঝিতে চেষ্টা করিয়া থাকেন। কয়টা চাকরীর পথ আছে—কি কি ব্যবসায় অবলম্বন করার সুযােগ আছে—কোন্ কোন্ পথ অবরুদ্ধ নয়—কেবল এ সব প্রশ্নের বিচার করিয়া তবে শিক্ষার প্রশ্নে হাত দেন। কিন্তু এভাবে দেখিলে শিক্ষাপদ্ধতি অতি নীচ জিনিষ হইয়া পড়ে। ইহার প্রকৃত স্থান অতি উচ্চ। কেবল টাকা রােজগারই ইহার উদ্দেশ্য নয়। অথবা সমাজে বৈষয়িক উন্নতি ও প্রতিপত্তিই ইহার একমাত্র লক্ষ্য নয়। অবশ্য মানুষ যখন শরীরী তখন শরীরধারণের জন্য আর্থিক উন্নতি দরকারী বটেই। এইজন্য যে শিক্ষাপদ্ধতিই অবলম্বন করা হউক না কেন, তাহা শিক্ষার্থীর সমস্ত ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের সঙ্গে মিলা- ইয়া করিতে হইবে। বাল্যকালের শিক্ষায় যে ফললাভ হয়, তাহারই সাহায্যে যখন জীবনের সমস্ত কর্তব্যের জন্য উপযােগিতা লব্ধ হইয়া থাকে, তখন শিক্ষার ব্যবস্থার সঙ্গে ভবিষ্যতের খাওয়া পরার কথাটারও মীমাংসা হওয়া প্রয়ােজন। যখন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়া যাইতেছে, সেই অবস্থায়ই অর্থ রােজগারের উপায়টাও দেখা উচিত। সুতরাং ভবিষ্যতে জীবন কোন্ কাজে সমর্পণ করা হইবে, মনুষ্যত্বলাভের সােপান এই বিষয় স্থির করিয়া প্রত্যেককে শিক্ষার বিষয় স্থির করিতে হইবে;-তাহা না হইলে বিজ্ঞানে বা ইতিহাসে এম্ এ পাশ করিয়া অথবা গণিতের Research scholar হইয়া পরে ডেপুটী গিরি বা ওকালতী করার মত একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটিবে। যদি বিজ্ঞানচর্চাই জীনের লক্ষ্য হয় এবং তদ্বারাই যতটুকু বিষয়- সম্পত্তি হইতে পারে, তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকা যাইবে এইরূপ ভাবা মায়, তাহা হইলেছেলেবেলা হইতেই তাহার জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত। এ উপায়েই বিজ্ঞান কেবল একটা বাজে জিনিষ বা পুথি- গত বিদ্যা বা বিজ্ঞানাগারের পরীক্ষা মাত্র না হইয়া প্রকৃত জীবন্ত সত্যরূপে মনে স্থান পাইতে পারে। এই শিক্ষাই সুখপ্রদ- ইহাতে মস্তিষ্কের অল্প সঞ্চালনেই জ্ঞানভি অধিক হয়। অতএব টাকা পয়সা রােজগার বা খাওয়া পরার কথাটাকে একেবারে উড়াইয়া দিবার প্রয়ােজন নাই। বরং শিক্ষাকেই তাহার উপযােগী করিয়া তুলিতে হইবে। এজন্য ছাত্রজীবনকে পরজীবনের স্বাভাবিক সােপানের মত দেখিতে হইবে; যাহাতে বাল্য জীবনের সঙ্গে প্রবীণ বয়সে একটা ঘনিষ্ঠ ও স্বাভাবিক সম্বন্ধ থাকে, তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। এইরূপে শেষ লক্ষ্য স্থির করিয়া কাৰ্য্য আরম্ভ করিলে বিদ্যার্জনেও আন্তরিকতা থাকে , আর অর্থোপার্জনও মনের মত হয় না। যাহারা লেখাপড়াকে কেবল অর্থোপার্জন ও খাওয়াপরার সহায় মাত্ররূপে আদর না করিয়া মনুষ্যত্ববিকাশের উপায় বলিয়া মনে করেন, তাঁহারা শিক্ষা সম্বন্ধে যাহা বলেন, তাহা অনেক সময়ই ৪ শিক্ষা-সমালােচনা ; গ্রহণীয় বটে; কিন্তু মানুষের পূর্ণতা কিসে হয় তৎসম্বন্ধে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা আছে কি না সন্দেহ। সকাল হইতে আরম্ভ করিয়া সর্বদা বই পড়া, বা লেখাপড়ার আলােচনা করা, Debating clubএর জন্য রচনা, লেখা বা প্রবন্ধ পাঠ কর ইত্যাদি তাহাদের মতে ছাত্রদের একমাত্র কর্তব্য। কাজ করিবার শক্তির বিকাশ এবং বৃদ্ধি হওয়াও যে ছাত্র- জীবনেই দরকার তাহা অনেকের মনে থাকে না। কেব পঠদ্দশায় কর্মজগতে কতকগুলি সুন্দর ভাব গ্রহণ করিলেই কর্তব্য আধিপত্য বিস্তারের সাধিত হয় না ; অনেকের সঙ্গে মিলিয়া আয়ােজন মিশিয়া বহুবিধ বাধাবিপত্তি ও মতভেদ প্রভৃতির মধ্যে থাকিয়া স্থিরচিত্তে কাজ করিতে শিক্ষা করাও আবক। এজন্য প্রথম হইতে কার্যকরী শক্তিগুলির অনুশীলন করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে কার্যের ক্ষেত্র এবং স্বাধীন ক্রিয়া- শক্তির উপযুক্ত প্রয়ােগস্থল প্রস্তুত করিয়া দেওয়া শিক্ষাগুরুদের কর্তব্য। এই উপায়েই স্বভাব দৃঢ় ও কাৰ্যতৎপর হয়। প্রকৃত নৈতিক উন্নতি অন্য কোন উপায়ে হইতে পারে না। অনেকের সঙ্গে এক দলে প্রবেশ করিয়া একই উদ্দেশ্যে কাগ করিতে হইলে যত সহিষ্ণুতা, ত্যাগস্বীকার ও ধৈর্য্যের প্রয়ােজন হয়, আর কিছুতেই তাহা হয় না। পুঁথির সদুপদেশ বা বক্তৃতার বলে মানুষকে এ সব গুণ শিখান যায় না। এজন্য এমন কর্মক্ষেত্রের আবশ্যক, যেখানে বালকেরা স্ব স্ব অবস্থা ও সামর্থ্যানুসারে নিজ নিজ চিন্তা ও কর্ম দ্বারা কোন কিছু গড়িয়া তুলিবার সুবিধা পায়। এই মনুষ্যত্বলাভের সােপান পায়ে কাজ করিতে করিতেই ভবিষ্যতে দলবদ্ধ ভাবে কোন বৃহৎ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীন কৰ্ম্মের অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি প্রভৃতির জন্য শিক্ষার্থী প্রস্তুত হইতে পারে। বস্তুতঃ মানসিক বৃত্তিগুলি বাহিরের কর্মে প্রয়ােগ করিবার সুবিধা না থাকিলে মানসিক শক্তিরও বুদ্ধি হয় না। মন ক্রমশঃ হীনতেজ ও পঙ্গু হইয়া যায়। কর্মক্ষেত্র হইতে পােষণাপযােগী রস গ্রহণ করিতে পারিলেই মন সবল, দৃঢ় ও সজীব হয়। দায়িত্বের কাজ করিতে করিতেই দায়িত্বগ্রহণের শক্তি জন্মে। সুতরাং প্রকৃত শিক্ষা কেবল তাহাই, যাহাতে মনকে ভাবে পরিপূর্ণ করিবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভাবকে কার্যে পরিণত করিবারও ব্যবস্থা করিয়া দেয়। মনুষ্যজীবনে ত কেবল ভাবরই আদান প্রদান করিতে হয় না—অনেক কৰ্ম্ম ও করিতে হয়। পরিবারে ও সমাজে থাকিতে হইলে অনেক কষ্ট ও ক্ষতিস্বীকার করিয়া চলিতে হয়—অনেক পরােপকারের প্রয়ােজন হয়। সেই কঠোর কর্তব্যময় জীবনের জন্য যে অবস্থায় মানুষকে প্রস্তুত করা হতেছে—তখনই অর্থাৎ এই পঠদ্দশাতেই সংসারের যাবতীয় কাজে মানুষের মনােনিবেশ করান আবশ্যক। তাহা না হইলে ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত হওয়া যায় না-পরে ভুগিতে হয়—সামান্য সামান্য বিষয়েও পরমুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে হয়। আর ছাত্রজীবনেই কৰ্ম্ম করিবার সুযােগ পাইলে প্রধান লাভ এই হয়, যে প্রথম হইতেই স্বাধীন কর্মের আকাঙ্ক্ষা ও শিক্ষা হইয়া থাকে, এবং তাহার ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষা-সমালােচনা অনেক লােককে একমতে আনিয়া সকলের মধ্যে ঐক্য ও সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া বড় বড় কাজ করিবার যােগ্যতা জন্মে। আমাদের দেশের লােকেরা এই কাজ করিবার ইচ্ছা ও আকাঙ্কাকে তত আদর করেন না, এমন কি, ইহাকে শিক্ষার কোন অঙ্গের মধ্যেই গণ্য করেন না। এইরূপে শিক্ষা একেবারে অন্তঃসারশূন্য ও কষ্টজনক হইয়া পড়িয়াছে। এ জন্যই ইতিহাসের উপদেশে আমাদের মনে ঔৎসুক্য জন্মাইতে পারে না, ভূগোল অতি শুষ্ক নীরস বিষয় বলিয়া মনে হয়, সংস্কৃত শিক্ষার দরকার নাই অনেক ছাত্রেরই এরূপ ধারণা হইয়াছে। অনেকই হয়ত গণিতের *লেখা অঙ্ক”কে বাঘের মত ভয় করে। ফলকথায় বিদ্যা গ্রন্থগত জিনিষ হইয়া পড়িয়াছে—যেন জীবনের প্রতিদিনকার কাজের জিনিষ নয়। সর্বদা সকল সময়ে সকল সমাজে অর্জিত বিদ্যা ব্যব- হার করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে—কেবল পরীক্ষাগার আর গ্রন্থের সম্মুখে না বসিলে অথবা থাতা বা পুথির কোন জায়গায় আছে ঠিক localise” না করিতে পারিলে একেবারে মহাবিপদে পড়িতে হয়। ইহার অর্থ আর কিছুই নয়—জ্ঞান মনের অঙ্গীভূত হইয়া বাহিরে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আর বইপড়া সম্বন্ধেও অনেকের তত ভালরকম ধারণা নাই। লেখাপড়াই তাহাদের মতে ছাত্রদের একমাত্র তপস্যা হওয়া উচিত স্বাধীন চিন্তার সুযােগ বটে, কিন্তু কি উপায়ে তাহাই প্রকৃত বিধান শিক্ষার উপকরণ হইতে পারে, তাহা বুঝিতে অনেকেই চেষ্টা করেন না। স্বাধীন চিন্তা করিতে না মনুষ্যত্বলাভের সােপান ৭ পারিলে যে অন্যের দত্ত মনের ভাব নিজের মনে স্থান লাভ করিতে পারে না, তাহা বুঝা উচিত। কেবল উদরসাৎ করিলেই শরীরের পুষ্টিসাধন হয় না। শরীরকে পুষ্ট করিতে হইলে খাদ্যকে রক্তমাংসরূপে পরিণত করা চাই। শরীরকে সুস্থ ও স্বাভাবিক অৱস্থায় রাখা প্রয়োজন। তাই মনকে স্বাধীন ভাবে কাজ করিতে অবসর না দিলে বই-পড়া বা পরের উপদেশ গ্রহণও সম্ভবপর হয় না। এতদ্ব্যতীত, স্বাধীন চিন্তা করিতে না পাইলে মনােবৃত্তির বিকাশই হয় না। সৰ্ব্বদা যদি চৰ্বিতচর্বণ বা মুখস্থই আওড়াইতে হয়, তবে ধীশক্তির সঞ্চালন হয় কখন? তাই এরূপ ব্যবস্থা করা দরকার যাহাতে ছাত্রগণ নিজ নিজ মনের ভাব প্রকাশ করিয়া যথার্থ উপকার লাভ করিতে পারে। সে কেবলমাত্র অন্যে কি বলিতেছে—বা অমুক ব্যক্তির কি মত- শুধু ইহাই বুঝিয়া বা জানিয়া কখনও নিশ্চিন্ত হইয়া থাকা উচিত নয়। প্রত্যেক বিষয়েই—ভাষা, সাহিত্য, গণিত, ইতিহাস- প্রত্যেক জ্ঞাতব্য ব্যাপারেই মনুষ্যজাতির জ্ঞানভাণ্ডারে ‘আমারও কিছু অৰ্পণ করিবার আছে এই ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া বিদ্যালয়ে প্রবেশ করা শিক্ষার্থীর কর্তব্য। এইরূপ স্বাধীন চিন্তার উদ্রেক না করিয়া দিতে পারিলে শিক্ষার আয়ােজনকে প্রশংসা করা যায় না। তাহা ছাড়া নিজের দেশের, জাতির ও সমাজের সভ্যতা, ইতিহাস ও রীতিনীতি শুধু পরের কাছে বিদেশীয় গ্রন্থে পড়িয়াই সন্তুষ্ট থাকা উচিত নহে, ‘নিজে দেশের ইতিহাসকে সত্যভাবে পড়িব ও যথার্থ ইতিবৃত্তে ৮ শিক্ষা-সমালােচনা অনুসন্ধান করিয়া আমাদের এই স্বতন্ত্র সভ্যতা উদ্ধার করিতে যত্নবান হইব’–এ ভাব যদি ছাত্রদের না হয়, তাহা হইলে শিক্ষাকে প্রকৃত শিক্ষা বলা যায় না। যদি দাক্ষিণাত্যের কথা বা মহারাষ্ট্রীয় কবিদের রচনা বা তামিল ও তেলুগু, ভাষার প্রসঙ্গ ভারতবাসীর কাছে New Zealand এর বর্তমান সভ্যতা বা Peruর পুরাবৃত্তের মত বােধ হয়, তবে বতই দেশে Research scholarএর বৃদ্ধি হউক না কেন, যতই M. Sc. Ph D. হউক না কেন, যতই Political philosophy পড়া যাউক, দেশের শিক্ষা অসম্পূর্ণ, একথা বলিতে হইবে। তাই স্বাধীন ক্রিয়া ও স্বাধীন চিন্তাশক্তির উদ্রেক করিতে না পারিলে শিক্ষার উদ্দেশ্য সাধিত হয় না এবং শিক্ষাকে সম্পূর্ণ শিক্ষাপ্রণালীতে জাতীয় মনুষ্যত্ববিকাশের উপায় বলা যায় না। চরিত্রের মর্যাদা এজন্য সকল দেশের সকল সময়ের শিক্ষার ব্যবস্থাকে জাতীয় ভাবে গঠন করা প্রয়ােজন। ছাত্রের মনে যে স্বাভাবিক ভাবপুঞ্জ আছে তাহার সদ্ব্যবহার করিতে হইলে বিদেশীয় প্রথার বা একেবারে অপরিচিত বস্তুর ঘনিষ্ঠতায় উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। দেশের মধ্যে যে নিয়ম ও আদর্শ আবহমান কাল হইতে চলিয়া আসিতেছে, শিক্ষা প্রণালী তাহার উপযােগী না হইলে ছাত্রের মনে নীরসতার ভাব আসে। তাহাতে শিক্ষার বিষয় হৃদয়ের উপর আধিপত্য স্থাপন করিতে পারে না। জোড়াতালি দিয়া একটা কৃত্রিম শিক্ষার বােঝা চাপান হয় মাত্র। তাই দেশকে যত জায়গায় উপলব্ধি করা যায়—ধৰ্ম্ম, সমাজ, রীতিনীতি, তীর্থ, মনুষ্যত্বলাভের সােপান শিল্প, কারুকাৰ্য, মেলা, উৎসব, মহাপুরুষ—সকলের সঙ্গে সংযােগ রাখিয়া শিক্ষা দিতে হইবে। এজন্য আর একটা জিনিষের দরকার । দেশের লােকের দ্বারা শিক্ষা চালিত হওয়া উচিত। অন্য লােক যত শুভাকাঙ্ক্ষীই হউন না কেন, তাহাদের মনের গতির সঙ্গে শিক্ষাসঘগঠন আমাদের মনােবৃত্তির মিল কখনই এক হইতে পারে না। একজাতি অপর জাতির হৃদয়ের কথা ভাল রকম বুঝিতে পারে না। তাই হাজার সদিচ্ছায় কাজ আরম্ভ করিলেও পরে কাহারও কাজ করিয়া সুখ দিতে পারে না। স্বাধীনভাবে স্ব স্ব অভাব আপনারাই মােচন করিয়া লইতে না পারিলে মনের মত ফল পাওয়া যায় না। আর পরে করিয়া দিলে নিজের লাভই বা কি ? সমস্ত দেশের শিক্ষার ভার দেশের লােকের হাতে রাখিতে যে শক্তির দরকার, তাও ত একটা শিক্ষার প্রধান জিনিষ । তাই প্রকৃতভাবে শিক্ষা প্রদান করিতে হইলে বাল্যাবস্থায়ই ভবিষ্যতের লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হইবে এবং অতি স্বাভাবিক ও সহজভাবে গ্রহণীয় বিষয় গুলি শিক্ষা দান করিতে হইবে। এজন্য যে শিক্ষা শিক্ষার্থীকে সমাজের যাবতীয় চিন্তা ও কর্মের মধ্যে থাকিবার সুবিধা করিয়া দেয়, এবং তরুণ বয়সেই কর্মের উপর আধিপত্য স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা জন্মায় তাহারই প্রতিষ্ঠার স্ময়ােজন করা অবশ্য ক।
No text on this page.
চিন্তায় মৌলিক ছাত্রজীবনকে ভবিষ্যৎ জীবনের সােপানের মত দেখা উচিত। অতএব পঠশাইঅন্যান্য শিক্ষার সঙ্গে জীবিকা অর্জনের শিক্ষাও হওয়া চাই। এদিকে কাজের অনুষ্ঠানের মধ্যে না থাকিতে পারিলে ক্রিয়া-শক্তির বিকাশ হয় না; এবং প্রকৃত নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের জন্য ক্ষতিস্বীকার ও স্বার্থত্যাগ করিবার আয়ােলন আবশ্যক। তাই সমাজ ও জাতির বিবিধ কাজে প্রত্যেক ছাত্রেরই মনােনিবেশ করা কর্তব্য। অতএব যাহাতে পরার্থে কিছু কিছু সময় দান করা যায়, এরূপ অনুষ্ঠানে যোগদান ছাত্রজীবনের শিক্ষার প্রধান উপকরণ। আবার কেবল পরের উপদেশ গ্রহণ করিয়া তাহাকে উদগীরণ করিতে পারিলেই সুশিক্ষা হয় না। নিজের চিন্তাশক্তি দ্বারা জীবনী শক্তির কাৰ্য্য ও নিজের উপযােগী করিয়া লইতে না শিথিলে পরিচয় বই এর কথা মনে লাগে না, আর বিদ্যা জীবনের জিনিষ না হইয়া বাহিরের জিনিষ বলিয়া বােধ হয়। কোন উপায়ে লেখাপড়া করিলে কেবল পরের কথা দ্বারা চালিত না হইয়া সেই সকলকে নিজের মত করিয়া বুঝিতে ও তাহাদের উপর স্বকীয় বিশেষত্বের ছাপ মারিতে পারা যায়, এবং নিজের চিন্তাশক্তির পরিচয় দিয়া স্বাধীন চিন্তার বিকাশ করা যায়, তাহার ব্যবস্থা করার প্রয়ােজন। আলােক উত্তাপ ১২ শিক্ষা-সমালােচনা প্রভৃতি বাহিরের যত শক্তি আছে জীবজগৎ যদি কেবল তাহাদের ক্রিয়া ও অভিনয়েরই বস্তু হয় এবং প্রতিক্রিয়া দ্বারা তাহাদিগকে রূপান্তরিত করিয়া স্বকীয় ব্যবহারে প্রযুক্ত করিতে না পারে, তাহা হইলে আর তাহা জীবন্ত বলা যায় না। কেবল আদান বা গ্রহণ করিতে পারিলেই যথেষ্টইল না। প্রকৃত জীবনের প্রধান লক্ষণ প্রদান করারও শক্তি। শিক্ষার্থীর বাহিরে যে ভাবরাশি রহিয়াছে, যত শক্তির অভিনয় হইতেছে, মনুষ্যত্ব বিকাশের যত উপাদান আছে, গ্রন্থ, পুস্তকাগার, প্রদর্শনী, মিউ. জিয়াম, সামাজিক জীবন—সকল গুলির সাহচর্যে ও সংঘর্ষে যথার্থ শিক্ষালাভ করিতে উপযুক্ত ও সমর্থ হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিজের মনকে কেবল মাত্র অপরের ক্রীড়াপুত্তলী না হইতে দিয়া, সচেষ্ট ভাবে এই সব শক্তি ও ভাবসঘষ্টির উপর কাজ করিতে পারা আবশ্যক। মনকে এরূপ কৰ্ম্মঠ ও সজাগ করার প্রধান উপায়—যখনই যা পড়ি বা শুনি, সেই পড়া বা শুনার জিনিষের প্রতি অকপট শ্রদ্ধা স্বাধীন চিন্তা বিকাশের থাকা। কেবল বিদ্যাভ্যাস কেন, পৃথিবীর উপায় সমস্ত কাজেরই সুসাধনের জন্য তৎপ্রতি আন্তরিকতা চাই। প্রত্যেক কাজকেই তাহার নিজের জন্য আদর করিতে না পারিলে তাহার প্রতি সমুচিত যত্ন করা যায় না। লেখাপড়াও যদি তাহার নিজের জন্যই আদৃত হয়, তবে ইহাতে প্রকৃত ভাবে চিন্তাশক্তির অনুশীলনের প্রবৃত্তি হয়। আমি ভাষা শিক্ষা করিতেছি, কিন্তু এই ভাষাশিক্ষার ফলে সমাজে চিন্তায় মৌলিকতা আমার কিরূপ স্থান হইবে অথবা ইহাতে যথেষ্ট অর্থ রােজগার হইবে কি না সৰ্ব্বদা যদি এইরূপই ভাবি, তবে ভাষায় বুংপন্ন হইতে যত চেষ্টা, যত পরিশ্রম ও যত ইচ্ছার দরকার তাহা কখনই হইতে (১) পারে না। এ স্থলে প্রকৃত প্রস্তাবে চাই আলােচ্য বিষয়ের প্রতি আমি মানসম বা টাকাপয়সা ;-ভাষাশিক্ষা আন্তরিক শ্রদ্ধা আমার উদ্দেশ্য নয়। যদি অন্য কোন উপায়ে । এসব জিনিষ পাওয়া যাইত, তবে ভাষাশিক্ষারূপ ধৃষ্টতা হয়ত ছাড়িয়াই দিতাম। এরূপ অবস্থায় ভাষার প্রতি অনুরাগ থাকিতে পারে না এবং নিজের একটু ভাবিবার প্রবৃত্তিও জন্মিতে পারে না। কারণ এশিক্ষার ফলাফলে আমার ভাল মন্দ কিছুই হয় না। কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাবার মত যথেষ্ট জ্ঞান হইলেই হইল,—তজ্জন্য আত্মশক্তির অনুশীলন যে করিতে হইবেই এমন কোন কথা নাই। তাই ইতিহাসই পড়ি বা বিজ্ঞানই পড়ি, এই ইতিহাস বা বিজ্ঞান জীবনের উদ্দেশ্য না হইয়া অপরবিধ উদ্দেশ্যের অধীন হইলে অন্যে যে ভাবে বুঝায় সেই ভাবেই বুঝিতে চেষ্টা হয়, নিজের মত করিয়া বুঝিবার দরকার আছে মনে হয় না, কারণ সে রকম বুঝায় বিশেষ কিছু লাভ নাই ; অথবা পরের উপদেশই শিরোধার্য্য করিয়া লইতে হয়, তাহার উপর যুক্তিতর্ক প্রয়ােগের পরিশ্রম কষ্টকর বােধ হয়। তাই যে বিষয়ই আলােচনা করিতে ইচ্ছা করা যাউক না কেন, সেই বিষয়ই ভবিষ্যতেও আলােচনা করিতে হইবে, এভাবে আরম্ভ করা উচিত। তবেই নিজের মৌলিকতা ও স্বাধীনতা রক্ষা করিবার ইচ্ছা হইবে। ইতিহাসকে নিজের চোখে দেখিতে চেষ্টা করিতে পারা ১৪ শিক্ষা-সমালােচনা • ঘাইবে। নিজে বৈজ্ঞানিক হইতে প্রয়াস জন্মিবে। বাহ জগতের সমস্ত দৃশ্য ও শ্রাব্য পদার্থের প্রতি চক্ষুকর্ণ ধাবিত হইতে থাকিবে, তাহাদের শৃঙ্খলা ও নিয়ম নির্ধারণ করিতে প্রবৃত্তি হইবে। স্বদেশের ইতিহাস সম্বন্ধে পরের মতের অপেক্ষা না করিয়া প্রকৃত সত্যনির্ণয় করিতে নিজেই যত্নবান্ হইতে পারা যাইবে। তাই লেখাপড়া শেষ করিয়া উকীল হইব বা ডেপুটি হইব’ এ ভাবে বিদ্যালয়ে প্রবেশ না করিয়া যে বিদ্যা আরম্ভ করা গেল, (২) তাহারই আলোচনায় জীবন কাটাইৰ এরূপ আলোচ্য বিষয়ই অন্ন- ভাবিলে শিক্ষণীয় বিষয়ের যথােচিত আদর সংস্থানের উপায় হওয়া করা হয়। আর এ উপায়ে যত অর্থ বােজ আবশ্যক গার হয়, তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকিব এরূপ ভাবিতে হইবে। অন্য উপায়ে খাওয়া পরার বন্দোবস্ত করিতে হইলে বিদ্যাশিক্ষা মনের প্রথম স্থান অধিকার করিতে পারিবে না। বাজে জিনিষের প্রতি মন আকৃষ্ট হইলে বা বড় বড় চাকরী বা অন্য কোন রূপ প্রলােভনের জিমিষ সর্বদা চোখে থাকিলে লেখা- পড়ার প্রতি মনােযােগ শিথিল হয়—মন চারিদিকে বিক্ষিপ্ত হয়, বিজ্ঞান বা সাহিত্য সমস্ত চিন্তাশক্তির কেন্দ্রস্থলে থাকে না। অতএব লেখাপড়াকে যদি অন্য কোন উদ্দেশ্য সাধনের উপায় মনে না করিয়া জ্ঞানবিকাশের উপায় মনে করা যায়, এবং এই জ্ঞানের দ্বারাই জীবনের সকল প্রকার সার্থকতালা হইল ভাবিতে পারা যায়, তাহাহইলেই বিদ্যাভ্যাসের সময় সকল বিষয়ে নিজের শিক্ষায় মৌলিকতা ১৫ 1 মতামত প্রকাশ করিয়া প্রকৃত সত্য নির্ণয় করিতে যে স্বাধীন চিন্তার প্রয়োজন, তাহার প্রয়োগ করা সম্ভবপর হয়। ‘ছাত্রজীবনে যে শিক্ষা লাভ করিলাম, সেই শিক্ষা দ্বারাই ভবিষ্যৎ জীবনের সকল প্রকার কর্তব্য সাধন করিব, এরূপ ইচ্ছা কাজে (৩) পরিণত করিতে হইলে শিক্ষার ব্যবস্থার কিছু পরীক্ষা পদ্ধতির বিশেষত্ব চাই। শিক্ষা-প্রণালীর মধ্যে পরীক্ষার বিশেষত্ব। পদ্ধতি একটী প্রধান জিনিষ। পরীক্ষার নিয়মের ভাল মন্দের উপর সুশিক্ষা কুশিক্ষা নির্ভর করে। যদি এরূপ হয়, যে সমস্ত বৎসর লেখা পড়া না করিয়া ও শেষ কয়েকমাস অত্যন্ত পরিশ্রম করিলেই বেশ খ্যাতির সহিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়, তাহাহইলে ফাঁকি দিবার প্রবৃত্তিকে সহায়তা করা হয়। এইজন্য প্রতিদিনকার বিদ্যাভ্যাস যে উপায়ে উৎসাহিত হয়, সেইরূপ বন্দোবস্ত করা দরকার। কেবল বংসরান্তে তিন চারি দিনের পরীক্ষাই প্রধান না করিয়া দৈনিক কাজের পরীক্ষার ফলও গ্রহণ করা আবশ্যক। ইহাতে ছাত্রের স্বাভাবিক ভাবেই নিয়মিত রূপ কাজ করিতে বাধ্য হয়। অনেক সময় আবার এরূপও হয় যে ছাত্রের বিদ্যাচর্চাকে উদ্দেশ্য না করিয়া পরীক্ষাকেই লেখাপড়ার লক্ষ্য করিয়া ফেলে। তখন প্রকৃত জ্ঞানের দিকে দৃষ্টি থাকেনা, পরীক্ষার প্রশ্ন প্রভৃতির প্রতিই মন আকৃষ্ট হয়। পরীক্ষা জ্ঞান ও বুদ্ধি মাপিবার একটা উপায় মাত্র না থাকিয়া বিদ্যালাভের প্রধান লক্ষ্য হইয়া পড়ে। রকম দোষাবহ পরীক্ষার নিয়মাধীনতায় নিজ শক্তির প্রতি মনাে- শিক্ষা-সমালােচনা যােগী হইতে সুবিধা থাকে না। আর, পরীক্ষা দ্বারা ঠকাইবার অভি- সন্ধি যদি থাকে, তাহা হইলে প্রকৃত জ্ঞানের বিচার করা হয় না। শিক্ষার্থীর যথার্থ শিক্ষা কতটুকু হইল, কেবল চর্বিত চর্বণই না করিয়া নিজে কিছু বলিতে বা লিখিতে পারে কি না, তাহ। স্থির করিতে হইলে পরীক্ষার ব্যবস্থা এরূপ হওয়া মাই যে ছাত্রের ভুল করিবার ভয়ে জড় সড় না হইয়া মন খুলিয়া নিজের বক্তব্য প্রকাশ করিতে পারে। এরূপ না হইলে পরীক্ষায় জ্ঞানালােচনার সহায়তা না হইয়া বাধাই হয়, “Out books'' পড়ায় আর text books পড়ায় একটা বিরােধ আছে মনে হয়। বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ থাকিতে প্রবৃত্তি হয়। একটুকু বাজে বই পড়িতে গেলেই ভয় হইয়া থাকে, পাছে পরীক্ষার পড়ার ক্ষতি হইল। কিন্তু বাস্তবিক মানসিক উন্নতির পক্ষে দুইই দরকারী। Class এর বই ছাড়া বেশী দু একখানা বই পড়িলে মনােবৃত্তির যে বিকাশ হয়, তাহা কেবল পরীক্ষার ফলের জন্য কেন, সকল সময়েই কাজে লাগে। একই মন নানা উপকরণে গঠিত হইতেছে। তবে আর এ বই ও বই, কাজের বই আর বাজে বই বলিয়া তফাৎ করি কেন? কিন্তু পরীক্ষার নিয়ম যদি এত খারাপ হয়, যে মনােবৃত্তির বিকাশের বিচার না করিয়া মুখস্থ করার শক্তিরই পরিচয় লওয়া হয়, সেই অবস্থায় text-book পড়াই একমাত্র লাভ- জনক paying study"বােধ হইবে; কিন্তু সুন্দররূপে পরীক্ষার প্রশ্ন করিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বয়সের উপযুক্ত যতটুকু বুদ্ধির শিক্ষায় মৌলিকতা ১৭ বিকাশ আশা করা যায়, সেই পরিমাণ বিচার করার সম্ভাবনা থাকে। এ নিয়মে text না পড়িয়াও, অথবা কিছু কম পড়িয়াও, বা পড়া থাকিলেও নির্ভয়ে, পরীক্ষায় উত্তম ফল পাওয়ার আশা করা যাইতে পারে। কিন্তু অনেক স্থলে পরীক্ষা বুদ্ধির বিচার না করিয়া স্মরণ- শক্তির প্রমাণ গ্রহণ করে বলিয়া মন সঙ্কীর্ণ হইয়া যায়, বাধা পথ ছাড়া নূতন পথে চলিতে ভয় হয়। অনেক সময় ছাত্রেরা যে বলিয়া থাকে “ঐ novelটা বা dramaটা পড়েছিলাম কিন্তু examine দেবার মত করে পড়িনি” —তাতে কেঝা যায়—যে পরীক্ষার জন্য পড়া আর জ্ঞানের জন্য পড়ার উপায় দুটি পৃথক্। এটা ভূল,-পরীক্ষার জন্য পড়ার কোন বিশেষত্ব থাকা উচিত নয়। যখন যাই পড়ি না কেন, সবই প্রকৃত জ্ঞানলাভের জন্য; তবে ইহার কোনটীতে যদি পরীক্ষাই দিতে হয়, তাহার জন্য বিশেষ প্রস্তুত হইবার প্রয়ােজন নাই। কিন্তু পরীক্ষার নিয়ম অন্ততঃ এরূপ হওয়া চাই, যাহাতে জ্ঞানেরই বিচার করা হয়। পরীক্ষায় কূট প্রশ্ন না করা বা কোন না কোন উপায়ে ঠকাই- বার মতলব না থাকা যেমন প্রকৃত বিদ্যচর্চার সহায় এবং স্বাধীন (৪) চিন্তার উদ্দীপক, তেমনি দুইখানা চারিপানা গ্রন্থ নির্দেশের পরিবর্তে বাঁধা বই ঠিক না করিয়া দিয়া বিষয়েরই বিষয়ের আলােচনায় উৎসাহ প্রদান আলােচনার সাহায্য করাও মৌলিকতা এবং স্বাবলম্বনের প্রধান উপায় । অবশ্য এ নিয়মে শিক্ষকের পারদর্শিতা অত্যন্ত আবশ্যক। কখন কোন বইয়ের কোন্ অধ্যায় পড়া উচিত, কোন্ বিষয়ের পর এবং কোন বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে কোন্ বিষয় ১৮ শিক্ষা-সমালােচনা আরম্ভ করা উচিত, এসব স্থির করিয়া শিক্ষক শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও বয়সানুসারে শিক্ষাদান করিলে তাহার বৃত্তিগুলি অতি স্বাভাবিক ও সহজভাবে প্রস্ফুটিত হয়, এবং মন বেশ কৰ্ম্মঠ ও চিন্তাশীল হয়। ইহাতে ছাত্র বিষয়টা প্রস্তুত না পাইয়া নিজেই ধীরে ধীরে তৈয়ার করিয়া লইতেছে, এরূপ মনে হয়। ও, উপায়ে জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়ও যেন শিক্ষার্থীর সম্মুখে ক্রমে বিকশিত হইতে থাকে। এ নিয়মে মুখস্থ করার প্রবৃত্তি আদৌ হইতে পারে না; বরং ধী-শক্তির সঞ্চালন ভিন্ন এক ধাপও অগ্রসর না হওয়ায় মন অতি স্বাভাবিক ভাবে ও সহজে দৃঢ় প্রাপ্ত হয় এবং স্বাবলম্বন শিক্ষা করে। আর বই পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বই কোন্ পদ্ধতিতে লিখিতে হয়, পুস্তক লিখিবার কৌশল, এবং কোন বিষয় আলােচনা করিবার শৃঙ্খলা, সমস্তই শিক্ষা হইয়া যায়। ইহাতে-এক বিষয়ের সঙ্গে অপর বিষয়ের কি সম্বন্ধ অতি সহজেই স্থির করা যায়। পৃথিবীর সমস্ত পদার্থই যে পরস্পর সম্বন্ধ এবং সমস্ত বিজ্ঞানই যে অতি স্বাভাবিক ভাবে সংলগ্ন ইহা প্রমাণিত হইয়া পড়ে। ইতিহাসের সঙ্গে জড় বিজ্ঞানে, রাজনীতির সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নির্ধারিত হয়। ব্যাপক ভাবে সমস্ত জিনিষ আলোচনা করিতে প্রবৃত্তি হয়, এবং তাহার সুবিধাও থাকে। তখন গণিত শিক্ষা না করিলেও চলে, কিংবা ইতিহাসে কেবল মারা- মারি কাটাকাটির কথাই থাকে, অথবা বর্তমান কালে সংস্কৃত সাহিত্য শিক্ষার দরকার নাই এরূপ অসঙ্গত কথা বলিতে পারা যায় না। তাহা হইলে ছাত্রেরা যতই দেখিতে পারে যে শিক্ষায় মৌলিকতা Burlkeএর French Revolution এ যে সত্য আছে, Political Economyতে এবং Psychologyতেও সে সত্যই আর একভাবে অন্য Context এ সন্নিবেশিত রহিয়াছে। তখন যে কয়টী বিষয় পড়া হইতেছে, তাহাদের মধ্যে কোন বিরােধ না দেখিয়া পরস্পর পরস্পরের সহায়তাই করে এরূপ বুঝিতে পারা যায়। বাস্তবিক text-book system উঠাইয়া দিলে অথবা কিছু হৃাস করিলে মনের যে চিন্তা শক্তির উদ্রেক হয় এবং যে স্বাবলম্বনের ইচ্ছা হয় তাহাতে কোন বিষয় এই বই এ পড়েছি বা ওই তথ্যটা অমুক বিজ্ঞানের অমুক অধ্যায়ে আছে মনে না হইয়া নিজের মনেরই অমুক স্থান অথবা মস্তিষ্কের অমুক প্রকোষ্ঠ অধিকার করিয়া আছে এবং অন্যান্য সত্যের সঙ্গে এই এই সম্বন্ধে গ্রথিত রহিয়াছে মনে হইবে। ইহাতে সমস্ত জ্ঞান এবং সকল প্রকার সত্যই নিজস্ব হইয়া যায়—পড়াবিদ্যা বা বইয়ের কথা বােধ হয় না। নিজের মনটাই এই বিশ্বের মত সমস্ত সত্যের মৌলিক ভাণ্ডাররূপে কাজ করে। স্বাধীন চিন্তাই এরূপ শিক্ষার প্রাণস্বরূপ। অতএব চিন্তায় স্বাধীনতা ও মৌলিকতার উদ্রেক করাইতে হইলে শিক্ষার বিষয়ের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ জন্মান চাই। এই জন্য ছাত্রের উচিত বিদ্যাশিক্ষাকে অন্য কোন জিনিষের উপায় মনে কয়িয়া তাহার নিজেরই জন্য আদর করা ; এই উদ্দেশ্যে বিদ্যা- লয়ের এরূপ ব্যবস্থা করা চাই যাহাতে শিক্ষাই ভবিষ্যতে পরিবার- পালন এবং জীবিকা অর্জন প্রভৃতি যাবতীয় কর্তব্য সাধনের সুবিধা করিয়া দেয় ; এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা এরূপ হওয়া আবশ্যক, যাতে শিক্ষা-সমালােচনা ছাত্রগণ জ্ঞানের ও বিদ্যারই পরিচয় দিতে পারে। আর নির্দিষ্ট বই না পড়িয়া বিষয়ে আলােচনা করিলে প্রকৃত জ্ঞানের প্রতি চিত্ত আকৃষ্ট হয়। এজন্য দুইখানা চারিখানা পাঠ্যপুস্তক নির্দিষ্ট করিয়া ছাত্রের হাত পা বাঁধিয়া না দিয়া, যে যে লেখকদিগের লেখায় আলােচ্য বিষয়টীকে নানা দিক হইতে বিচার করা হইয়াছে, তাহাদের পুস্তক- গুলি অনুমােদন মাত্র করাই সঙ্গত।
চরিত্রগঠনের উপাদান—মানবসেবা
আমাদের দেশের লােকেরা যে যে অবস্থায় আছে, প্রত্যেককে
সেই অবস্থার উপযুক্ত সমাজহিতকর কাজ করিতে হইবে। কেবল
অবিবাহিত, সন্ন্যাসী, ফকীর ও ভবঘুরের দলের দ্বারা সমস্ত কাজ
সাধিত হইবার নয়। ছাত্র, বৃদ্ধ, যুব সকলেরই এ সম্বন্ধে কর্তব্য
আছে।
“ছাত্ৰাণামধ্যমনং তপঃ” বটে, কিন্তু ছাত্র ত কেবল এক
আলমারি বই নয়! ছাত্রেরা কেবল ছেলে নয়, তাহারা মানুষ।
ছাত্র জীবনে অতএব বাল্যকালের কর্তব্যপালনের মধ্যে
পরােপকার, মনুষযাচিত কাৰ্যও করিতে হইবে। কষ্ট
এবং বিপদের মধ্যে থাকিয়াও স্বভাবকে অস্থির হইতে না
দেওয়া,নানা রকম লােকের সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া নিজের
খুট না ছাড়া, পরোপকারী হওয়া, বুড়ােদের মত ছাত্রদেরও
কর্তব্য।
আর ছাত্রজীবন ত চিরকাল থাকিবে না—অচিরেই প্রত্যেককে
সংসারে প্রবিষ্ট হইয়া পরিবার, সমাজ ও দেশের গুরুভার বহন
করিতে হইবে। সেজন্য ত ছাত্রাবস্থা হইতেই প্রস্তুত হওয়া
প্রয়ােজন। দেশসেবা যদি বৃদ্ধ বা প্রবীণদেরই কাল হয়,তাহার
জন্যও ত শিক্ষা দরকার। তাই পঠশা দশের কাজে মন দিলে
অধ্যয়নের কোন ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা নাই।
বরং ভবিষ্যৎ
૨
শিক্ষা-সমালােচনা
জীবনের জন্য প্রস্তত হইয়। অল্প বয়স হইতেই স্বার্থত্যাগ করিতে
অভ্যস্ত হইলে, সম্পূর্ণ মনুষত্ব বিকাশেরই সুবিধা পাওয়া যায় ।
অনেকে বলেন বিবাহিত লােকদের দেশহিতৈষিতা
পােষায় না, এ কথার যে মানে কি; তাহারাই বলিতে পারেন।
গৃহস্থের নিত্য
সংসারীদের ধর্ম কি কেবল টাকাপয়সা
পতি রােজগার করা, আর পৃথিবীর লােকসংখ্যা
বৃদ্ধি করা। নিজ ও নিজের পরিবারের ভাত কাপড়
যোগান ত কর্তব্যই। গরু ছাগলও এই ভাবে কাজ করিয়া
থাকে। সন্তান সন্ততির মঙ্গলকামনা, পশুমানুষ, দুই জীবই করে।
তবে মানুষের বিশেষত্ব থাকিল কোথায় ? যে লোেক পশুর সমান
হইয়া মানুষ হইতে চাহে, তাহার কর্তব্য নিজের পরিবার
পালনের সঙ্গে সঙ্গেই দেশের অন্যান্য লােকেরও যতদূর সম্ভব
হিতসাধন করা। “নিজেদের পেটই চলে না, তা আবার
পরােপকার,” এরূপ ভাবিলে নরজীবন সার্থক হয় না। অতি
সামান্য ধনাগম হইলেও, তাহারই) কিয়দংশ পরের জন্য গচ্ছিত
রাখা কর্তব্য। মানুষের দৈনিক কাজের তালিকায় এবং দৈনিক
খরচের হিসাবের খাতায়, পরের কাজে কিছু সময় দান ও
পরের সাহায্যে কিছু অর্থদানের ব্যবস্থা থাকা বানীয়। আগে
পরিবার পালন করা যাক, তাহার পর যদি সময় থাকে ও
বাঁচে দশের জন্য খরচ করা যাবে’–এরূপ ভাবিলে যত বড়
ধনীই হউন না কেন, পরের জন্য কিছু বাঁচাইতে পারা যাইবে না।
তাই সময়ে ও আয়ের কিয়দংশ পরে অন্য দিতেই হইবে ঠিক
কিছু
চরিত্রগঠনের উপাদান গঠিত, করিয়া সংসারকর্মে প্রবিষ্ট হওয়া দরকার। পারিবারিক জীবনের মত সামাজিক জীবনের জন্যও বাবস্থা করিতে প্রত্যেক মানুষই ধৰ্ম্মতঃ বাধ্য। সমাজ যখন সংসারীদেরই লইয়া তখন সমাজসেবা ত তাহাদেরই প্রধান কর্তব্য। আলা, যন্ত্রণা, অভাব, কষ্ট সংসারীদের সব্বা লেগ করিতে হলেও, এই অবস্থায়ই সমগ্র সমাজের ভবিষ্যৎ সুখস্বচ্ছন্দতার আশায় কিছু কিছু ত্যাগ- স্বীকার করিতে হইবে। ফকীরদের আবার দেশবিদেশ কি ? তাহারা “বিশ্বজগৎ আমারে মাগিলে কে মাের আত্মপর? আমার বিধাতা আমাতে জাগিলে কোথায় আমার ঘর? —এই ভাবিয়া সৰ্বত্ৰ সমদশী ও “আমাকা তল আর জমী। উপর নিজের ঘর মনে করিয়া থাকেন। তাহাদের কাছে জাতীয়তা-স্বদেশহিতৈষিতা ত আশা করাই সন্ন্যাসশ্রম ও স্বদেশ উচিত নহে। তাহারা সমস্ত মনুষ্যজাতির কল্যাণের জন্য দিনরাত ভগবানূের আরাধনায় নিমগ্ন। তাহারা নিম্নস্তরের এক ক্ষুদ্র গণ্ডী ছাড়িয় অনেকদূরে অবস্থিত। তবে সমগ্র দেশের ও সমাজের সংস্কারসাধন না হইলে ধর্মভাব লােপপাইবার সম্ভাবনা, এবং ক্রমশঃ মানুষ বিষয়ভােগাদির নীচচিন্তায় মন- প্রাণকে কলুষিত করিয়া সমস্ত উচ্চ আদর্শ বর্জন করিতে পারে, এই আশঙ্কায় অনেক সময়ে সন্ন্যাসাশ্রমের মহাত্মারা দেশের নৈতিক এবং বৈষয়িক আন্দোলনেও যােগদান করিয়া থাকেন এবং কার্য- ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া উন্নতির সহায়তা করিতে পশ্চাৎপদ হন না।
২৪ শিক্ষা-সমালােচনা স্বদেশের সকল কার্যে যেমন সকল প্রকার ও সকল অবস্থার লােকেরই সমবেত চেষ্টা প্রয়ােজন, তেমনই দেশের সর্বত্র সকল স্থানেই সেই চেষ্টার কার্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। বড় বড় সহরের কয়েক- জন ধনী বা শিক্ষিত লােকেরা সমাজের জন্য খাটিলে বা ভাবিলে বেশী ফল পাওয়া যাইবে না। প্রত্যেব জেলার প্রত্যেক গ্রামের পল্লী জীবনে নুতন নূতন প্রত্যেক লােকের মধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার আশা ও আকাক্ষা সঞ্চার উপায়ালােচনা প্রবেশ কমাইতে হইবে। কেবল যেখানে অধিক লােকের সমাগম হয় বা ব্যবসাবাণিজ্যের কলকোলাহল খুব বেশী, যেখানে সরকার বাহাদুরের বিবিধ আফিস ও কর্মকেন্দ্র লােকবৃন্দকে সর্বদা সতর্ক করিয়া রাখিয়াছে, কেবল সেই সকল জায়গায় শিক্ষার আন্দোলন বা শিল্প শিক্ষার ব্যবস্থা বা বিজ্ঞানচর্চা বা রাজনৈতিক শিক্ষা হইলে দেশের প্রায় সমস্ত লােকই এ সব বিষয়ে একান্ত অজ্ঞ থাকিয়া যাইবে। যেখানে অতি নিস্তব্ধ বৃক্ষচ্ছায়ায় বসিয়া গরুবাছুরদের সঙ্গে নিরীহস্বভাব লােকেরা শ্রমবিনােদন করিতেছে,যেখানে সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন সময়ই কোন চিন্তার ও উেেগর কারণ হয় না, সকলেই শান্তির সহিত নিত্যনৈমিত্তিক কৰ্ম্ম সমাধা করিতেছে, যেখানে সভ্যতার বাহাড়ম্বর এখনাে বেশী প্রবেশ করে নাই, যেখানে হিন্দু মুসলমান এমন এক প্রাণ হইয়া পাড়ার সমস্ত কাজই করিয়া থাকে, যেখানে সামাজিক উদ্ধৃঙ্খলতা এখনাে প্রবিষ্ট হয় নাই, সমস্ত লােকই পূর্বপুরুষদের চিরন্তন প্রথা প্রত্যেক সামাজিক ও পারি- বারিক কাজেই বজায় রাখিবার জন্য যত্নবান্, যেখানকার আম- চরিত্রগঠনের উপাদান ২৫ কাঠাল বনের দেবমন্দিব হইতে ভক্তি ও শ্রদ্ধা এখনও অপসৃত হয় নাই, সেই সুখের নীড়, শান্তির আধার, আমাদের পল্লীসমাজে নূতন নূতন কথা শুনাইয়া তাহাদের মনে এক অভিনব ভাব ঢালিয়া তাহাদিগকে ব্যাকুল করিয়া তুলিতে হইবে। হইবে। তাহাদের শান্তিময় কুটীরাবাসে উন্নতির আকাঙ্ক্ষা, কষ্টভােগ ও কাৰ্য্য করিবার বাসনা প্রবেশ করাইতে হইবে। সামাজিক ও অপরাপর সকল আন্দো- লন দ্বারা তাহাদের চিত্তের বিক্ষোভ জন্মাইতে হইবে। তাহাদিগকে শিখাইতে হইবে,দেশের কোথায় কোন্ চিন্তা, কোন্ কাজ হইতেছে। সকলের সঙ্গে সংযােগ রাখিয়া এই আধুনিক পৃথিবীর নূতন অবস্থার উপযুক্ত করিয়া গ্রাম্যজীবনকে সঞ্জীবিত করিতে হইবে। গ্রামের সঙ্গে সহরের যে বিরােধ কিছুকাল হইল ঘটিয়াছে এবং এজন্য পল্লীতে যে যে দোষ প্রবেশ করিয়াছে, সমস্তই প্রতীকার করিবার জন্য ঘরে ঘরে হিন্দু-মুসলমান, কৈবর্ত ব্রাহ্মণ, জোলাতাতী সকলকে শিক্ষাদান করিয়া স্বীয় অধিকারস্থাপনের চেষ্টা করিতে উপদেশ দিতে হইবে। এই নানা জায়গায় নানা লােকর এককালীন কাজ করিবার আমাদের দেশে এখন ও ভালরকম বন্দোবস্ত হয় নাই। সকল সমাজ সেবার বিবিধ কাজই যেন খাপছাড়া বা পরস্পর বিরােধী। সাধন দেশের সমস্ত লােককে সম্মিলিত করিবার চেষ্টা এখনাে করা হয় নাই। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মনের ভাব প্রত্যেককে জানাইবার জন্য সকলের মধ্যে আনাগােনা করিবার সুবিধা করিতে হইবে। পূৰ্ব্বকালে রেলগাড়ী টেলিগ্রাম, ডাকঘর, ২৬ শিক্ষা-সমালােচনা যখন ছিল না, তখন যেমন তীর্থযাত্রী, যেমন তীর্থযাত্রী, সন্ন্যাসী, ফকীর বা ব্যবসায়ীরা আমাদের দেশে ভাবের আদান প্রদান করিতেন এবং ঐ উপায়ে অতিদূর দেশের সংবাদ ও আচার ব্যবহার জানা যাইত, এখনকার রেলগাড়ী ও খবরের কাগজের দিনেও সেই রকম, “স্বদেশী” ছাঁচের চিন্তার আদানপ্রদান করা বাঞ্ছনীয়। এজন্য জেলায় জেলায় সমাজনীতিপ্রচারকের দরকার। তাহারা সহরের চিন্তা ও কাজের তালিকা পল্লীতে লইয়া গিয়া তাহাদের শিক্ষকতার কাজ করিবেন এবং পল্লীর অবস্থা সহরকে শুনাইয়া নূতন fact, নূতন আলােচ্য বিষয় ও অভিনব প্রচারক ও আচার্য্য সমস্যা প্রদান করিয়া উপযুক্ত লােকদের কাজে সহায়তা করিবেন। তাহারা সাময়িক পত্রিকার লেখাকে নিজেদের প্রাণের কথার সঙ্গে, হৃদয়ের আবেগের ও স্বভাবের দৃঢ়-- তার সহিত সামঞ্জস্য বিধান দ্বারা সজীব করিয়া তুলিবেন। প্রচলিত পত্রিকাসমূহ এ উপায়ে কেবল বই এপড়া জিনিষ বা দায়িত্বহীন মাথাপাগলা লােকের বিকারবচন না হইয়া এক মহাসত্যরূপে সকলের মনে স্থান পাইবে। আয় ইহাতে পাড়ার সঙ্গে পাড়ার, সহরের সঙ্গে গ্রামের, মুসলমানের সঙ্গে হিন্দুর সহানুভূতি ও একপ্রাণতা বর্ধিত হইয়া সমস্ত দেশ ও সমাজকে একীকৃত করিবে। তাহাতে কাহার কি কর্তব্য, কোন্ সামাজিক organএর কোন্ function, কোথায়, কোন্ বস্তুর অভাব, অতি স্বাভাবিক নিয়মেই স্থির হইয়া যাইবে। তাই সংবাদপত্র যদি উঠিয়া যায়, তাহাতে কোন ভয়ের বা দুঃখের কারণ নাই। এই পর্যটকেরাই আরও সুন্দর চরিত্রগঠনেব উপাদান উপায় অবলম্বন এবং হৃদয়গ্রাহিভাবে দেশের লোককে শিক্ষাদান করিয়া ঘরে ঘরে আন্দোলন লইয়া গিয়া সমস্ত জাতির হৃদয়ে নবশক্তি সঞ্চার করি- বেন। এ কাজ সকলের পক্ষেই সম্ভব—সন্ন্যাসী, সংসারী, ছাত্র- যুবা, বিবাহিত, অবিবাহিত, প্রত্যেকে এ কাজ অনায়াসেই করিতে পারেন। আর ইহাতে হৈ চৈ নাই, স্থিরভাবেই সকলের কৰ্তব্য উপদেশ দেওয়া যাইতে পারিবে। আর সর্বত্রই সভাসমিতি হওয়া বাঞ্ছনীয়। কাজ করিতে হইবে বটে, কিন্তু তাহা বলিয়া বক্তৃতা বা লােককে বুঝাইবার জন্য কোন আলােচনা অবলম্বন একেবারে ছাড়িয়া দিলে লোকশিক্ষা চলিবে না। দেশের সমস্ত লোেকই যদি কোনদিন কেজো হইয়া উঠেন, তবুও মিটিং করিবার দরকার থাকিবে। গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় দেশের বিচিত্র কথা বলিয়া বেড়াইবার ও পরহিতব্রতে সকলকে দীক্ষিত করিবার সুযােগ সৃষ্টি করিতে হইবে। বড় বড় সভাসমিতি বন্ধ হইয়া যাইতে পারে বটে, কিন্তু ঘরে ঘরে অসংখ্য সভাসমিতি ও সমাজের অবস্থা আলােচনা করিবার বন্দোবস্ত হইবে। ইহাতে বাক্যব্যয় কম হইলেও কাজ বেশীই হইবে। তাই অনেকে বলেন যে, meetingএ কেবল হৈ চৈ হয়, কাজ কিছুই হয় না, এ কথা বিশ্বাস করা যায় না। তাহাদের অধিকাংশস্থলেই দশের জন্য কোন কিছু করিতেই অপ্রবৃত্তি, এবং নিজের ছেলেদের স্বাবলম্বন শিক্ষা দিতে অনিচ্ছা। এই যে Congressটা কেবল তিন দিনের জন্য পয়সাওয়াল৷ উকীল ব্যারি- ২৮ শিক্ষা-সমালােচনা স্টারদের আমোদ প্রমােদ বা বিশ্রম্ভালাপের এক আড্ডা বলিয়া সৰ্ব্বদা তিরস্কার করা হয়, এই তিন দিনের meeting হইতেই, আর কিছু কাজ হউক্ বা নাই হউক, আমাদের যথেষ্ট শিক্ষা হইয়াছে, আমাদের অনেক উপকার হইয়াছে, আমরা আমাদিগকে চিনিবার উপযুক্ত অবসর পাইয়াছি, আমাদের কোথায় কে কি ভাবেন, কে কি করেন, কোন্ ব্যক্তির কত সাহস, কত কাৰ্য্যনৈপুণ্য, সব বুঝিতে সুযোগ পাওয়া গিয়াছে। এই মহাদেশের কাজটাকে সকলেরই নিজের কাজ বলিয়া বুঝিতে পারা যাইতেছে। আমরা একটা Indian Tublic opinion তৈরী করিতে সমর্থ হইতেছি, দেশের সমস্ত কাজেই এই প্রকাণ্ড দেশের জন-সাধারণ এক মত বা এক অমত প্রকাশ করিতে পারিতেছে। আর এ উপায়ে সমবেত চেষ্টায় কাৰ্য্য করিবার উপায় পরিষ্কার হইয়া আসিয়াছে। আজ কাল যে জেলাসমিতি হইতেছে, তাহাতে, বাজে কাজ, নিরর্থক বক্তৃতা অনেক হইলেও, সহরে পল্লীতে সংযােগ দৃঢ় হইতেছে, দুয়ে হৃদয়ের বাঁধন শক্ত হইতেছে। এই সকল আন্দোলনের ফল কিছুই হয় নাই,'এমন বলা যায় না। আধুনিক সময়ে কর্তৃপক্ষেরা ও আমাদের কথায় কর্ণপাত করিতে ইচ্ছুক হইয়াছেন। অবশ্য কেবল বক্তৃতা বা সভায় কাজ অগ্রসর হইবে না। তাহার জন্য দেশের সর্বত্র, নানা রকমের, নানা উদ্দেশ্যে কেন্দ্র চাই, বাহাদ্বারা বক্তার বা বইএর উপদেশ হাওয়ায় উড়িয়া না গিয়া কাজের ভিতর দিয়া অনুষ্ঠানের মধ্যে ধরিয়া রাখা যায়। কোথায়, চরিত্রগঠনের উপাদান ২৯ বা শিল্পোন্নতির জন্য, কোথাও বা সাধারণ লােকশিক্ষার জন্য, কোথাও বা সমাজসংস্কারের জন্য, কোথায় বা ধর্মচর্চার জন্য । এরূপ ছােট বড় অনেক দল বাঁধা চাই, এসব দলে সকলে মিলিয়া মিশিয়া কাজ করিতে অভ্যস্ত হইয়া একই উদ্দেশ্যে জীবন গঠন করিতে শিখে,—ইহাতে স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন কৰ্ম্মের ক্ষেত্র পাইয়া নিজের নৈতিক ও মানসিক বৃত্তি বিকাশের সুযােগ পায়। এসব স্থানে প্রধান শিক্ষা এই হয় যে, দলের বা সমিতির প্রত্যেক লোকেরই ইহার কার্য নির্বাহের জন্য স্ব স্ব নির্দিষ্ট কৰ্তব্যই আছে তাহা নহে, তিনি সর্ব বিষয়ে আলােচনা ও বিচার করিবারও অধিকারী।
No text on this page.
আবােহপদ্ধতির অধ্যাপনাপ্রণালী এতদিন আমাদের দেশে যে ভাবে ভাষা, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান, শিল্প প্রভৃতি গতি, বিষয়ে অধ্যাপনা কাৰ্য্য চলিতেছিল, নূতন প্রণালীর সংক্ষিপ্ত তাহার যথােচিত পরিবর্তন করিয়া উন্নত শিক্ষা- পরিচয় (১) আবিস্কার প্রণালীর অবতারণা করিতে হইবে। এক (২) আরােহণ কথায় বলিতে হইলে, সে প্রণালীতে শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক ক্রমবিকাশের সঙ্গেসঙ্গে শিক্ষা লাভ করিয়া পরিচিত সত্য হইতে ক্রমশঃ অপরিচিত ও অজ্ঞাত সত্যে উপনীত হইতে পারে ; বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই সত্য আবিষ্কারের পন্থা হৃদয়ঙ্গম, এবং নিজের উদ্ভাবনী শক্তি ও বুদ্ধিস্বাতন্ত্রের পরিচয় পাইয়া স্বকীয় সৃষ্টি ও মৌলিক চিন্তার আনন্দ উপভােগ করিতে পারে; এবং যে প্রণালীতে আলােচ্য ও শিক্ষণীয় বিষয়ের ক্রম- বিকাশ শিক্ষার্থীর স্বকীয় ক্রমবিকাশের অনুরূপ হইতে পারে, এরূপ শিক্ষা প্রণালীর প্রবর্তন করা আবশ্যক। বৈজ্ঞানিকেরা এবং নানাবিধ সত্যের আবিষ্কারকেরা ভ্রম আবিষ্কারকের জীবন সংশােধন করিতে করিতে অনেক অসম্পূর্ণ ও ও কার্যপ্রণালী আংশিক সত্য এবং অসত্যের দ্বন্দ্বের ভিতর অনুকরণীয় দিয়া, ধীরে ধীরে দুএকী খণ্ড সত্য সংগ্রহের পর শেষে সম্পূর্ণ সত্যের দুর্গ করতলগত করিয়া থাকেন। ছাত্রকেও ঠিক সেই ভাবে আবিষ্কার করিতে করিতে, অজানা পথের ভিতর দিয়া, অনেক ব্যর্থ প্রয়াসের পর সত্য লাভ করিতে চেষ্টা করিতে হইবে। অপর লোকেরা যে সকল সত্যের উপলব্ধি করিয়াছেন এবং সেই সত্যসমূহ অবলম্বন করিয়া যে শিক্ষা-সমালােচনা সকল পুস্তক রচনা করিয়াছেন, ছাত্রকে সেই সকল সত্য স্বীকার করাইয়া দেওয়ান এবং পুস্তক সকল আবৃত্তি করান শিক্ষকের কৰ্ত্তব্য নহে। তঁাহাকে কেবলমাত্র ছাত্রের পথ প্রদশকের ন্যায় থাকিয়া তাহার সত্য আবিষ্কারের প্রয়াসে সহায় হইতে হইবে। তবে শিক্ষার্থী ছাত্র এবং প্রথা আবিষ্কারকের মধ্যে এই প্রভেদ যে, প্রকৃত আবিষ্কারককে অসহায় ভাবে পৃথিবীর আদিম শিক্ষক শিক্ষার্থর অবস্থায় একাকী পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল, আবিষ্কার ব্যাপারে অন্ধকারে চলিতে যাইয়া অনেক ব্যর্থ চেষ্টা পথপ্রদর্শক মাত্র করিতে হইয়াছিল। জন্য বহুব্যক্তির জীবনব্যাপী, নিঃস্বার্থ ও ফললাভে নিরাকাঙ্ক্ষ কর্মের ফলে এক একটী সত্য আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং এই কারণে বহুজীবন নিরর্থক ব্যয়িত হইয়াছে। কিন্তু ছাত্রকে এরূপ ব্যর্থত্ন হইতে হইবে না। বহু জাতি ও বহু ব্যক্তির প্রয়াসপ্রসূত জড়জগৎ ও চিজ্জগতের সত্য সমূহ তাহার নিকট বিজ্ঞানাকারে সঞ্চিত ও পুঞ্জীকৃত রহিয়াছে। তাহার শিক্ষক এই ভাণ্ডারের অধিকারী হইয়া সৰ্ব্ব-বিদ্যারক্ষক ভাবে সর্বদা তাহার সহায়তা করিতেছেন। যে যে পন্থা অবলম্বন করিয়া বৈজ্ঞানিকেরা সত্য সকল উদ্ভাবন করিয়াছেন, সেই সকল উপায় এখন শিক্ষার্থীকে নূতন করিয়া উদ্ভাবন করিতে হইবে না। তাহার শিক্ষকের মনেই সেই প্রণালী গুলি সৰ্ব্বদা রহিয়াছে, সুতরাং বহুযুগে পৃথিবী যাহা লাভ করিয়াছে, ছাত্র এক জীবনেই এখন তাহা লাভ করিতে সমর্থ। ছাত্রের জীবন কোন কোন সুপণ্ডিতের জীবনের ন্যায় নির্থক হইবার সম্ভাবনা নাই।
আরােহপদ্ধতির অধ্যাপনাপ্রণালী শিক্ষার্থী আবিষ্কারক, কেবলমাত্র পাঠক নহে। গ্রন্থকার যে ভাবে নিজ নিজ পুস্তক রচনা করিয়া তথ্যনিৰ্বাচন করেন, শিক্ষার্থীকে শিক্ষা পদ্ধতিতে গ্রন্থ- ঠিক সেই ভাবে পুস্তক পাঠ অথবা বিষয়ের পাঠের স্থান আলােচনা করিতে হইবে না। সাধারণতঃ যে প্রণালীতে পুস্তক রচিত হইয়া থাকে, তাহাতে গ্রন্থকর্তার প্রয়াস- সমূহের বিবরণ থাকে না,—তিনি বহু গবেষণা করিয়া যে সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, সেই সিদ্ধান্তগুলি অন্যান্য ব্যক্তির সিদ্ধান্তসমূহের সহিত মিলাইয়া এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া তাহার পুস্তকে সন্নিবিষ্ট করেন। ইহাতে পুস্তকের শ্রীবৃদ্ধি এবং গৌরব সাধিত হয় বটে, কিন্তু শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত গুলি পাইয়া সন্তুষ্ট থাকিতে পারে না,—তাহার পক্ষে ফললাভ অপেক্ষা ফল লাভের উপায় অধিক আবশ্যক। এজন্য অতি সুপণ্ডিতরচিত পুস্তক ও শিক্ষার প্রথমস্তরে শিক্ষার্থীর উপযােগী নহে। বিবিধ কারণে গ্রন্থসমূহের সারমর্ম, রচনাকৌশল এবং লিখন- পদ্ধতির সহিত ছাত্রের পরিচিত হওয়া উচিত। কিন্তু কোন বিষয়ে ব্যুৎপন্ন হইবার জন্য ছাত্রকে যদি পুস্তক পাঠ করিতেই হয়—তাহা হইলে ছাত্রদিগের জন্য বিশেষ ভাবে পুস্তক রচনা করা উচিত। যে সকল পুস্তক দ্বারা ছাত্ৰ স্বকীয় উন্নতি অনুসারে স্বাধীন ভাবে ক্রমশ কঠিনতর ও জটিলতর প্রশ্নের মীমাংসা করিতে বাধ্য হয়, যে সকল পুস্তকে সঙ্কেতমাত্র নির্দিষ্ট হয়, উপায় ও পন্থা মাত্র বলিয়া দেওয়া হয়, এবং সকল কাৰ্যই শিক্ষার্থীকে নিজদায়িত্ব গ্রহণ করিয়া সমাধা করিতে হয়, সেই সকল পুস্তকই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছাত্রদিগের পাঠ করা উচিত।
৩৪ শিক্ষা-সমালােচনা আবিষ্কারকের প্রণালীতে শিক্ষালাভ করিলে স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন চেষ্টা, মৌলিকতা ও অনুসন্ধিৎসা স্বভাবসিদ্ধ হইয়া পড়ে। স্বাধীনচিন্তা বিকাশের এই উপায়ে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া মস্তিষ্কের সুযােগ সঞ্চালন করিলে মানসিক শক্তির বিকাশ ও পুষ্টি সাধিত হয়। অনুশীলনই শক্তির উপায় -কষ্ট ও সমস্যার ভিতর থাকিয়া ক্রমশঃ বিকাশ লাভ করিলেই শক্তি সঞ্চিত হইতে পারে। এজন্য অপরের আবিষ্কৃত সত্যের দ্বারা মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠগুলি পূর্ণ না করিয়া নিজে বিচার্য বিষয়গুলির জটিলতা ও দুরূহতা সরল করিবার চেষ্টা করাই প্রকৃষ্ট পন্থা। সত্য আবিষ্কার করিবার যে যে উপায় আছে, তাহার মধ্যে যাহা দ্বারা শিক্ষার্থীকে বহুবিধ বিশেষ বিশেষ তথ্য ও ঘটনা পৃথিবীর বৈচিত্র্য ও আলোচনা করিতে হয় সেই প্রণালীতে বিভিন্নতার পৰ্য্যা- শিক্ষালাভ করিতে হইবে। এইরূপ বিশেষ লােচনা বিশেষ আলােচনার পর তথ্যসমূহের অনৈক্য ও পার্থক্যের মধ্যে ঐক্য ও সামঞ্জস্য অন্বেষণ করিতে হইবে। এই আলােচনা-প্রণালীকে “ইণ্ডাটিভ,” বা “আরোহ” পদ্ধতি বলে। ইহাতে জ্ঞান একটা প্রকৃত স্থির ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ও পুষ্ট হইয়া প্রসার লাভ করিতে পারে। কারণ এই প্রণালীতে শিক্ষার্থী সর্বদা স্বাধীনভাবে চিন্তা করিয়া মস্তিষ্ক সঞ্চালন করিতে বাধ্য হয়, এবং বহু তথ্যের আলােচনায় রত থাকিয়া অনুসন্ধিৎসু ও নতথ্যের আবিষ্কারক হইবার সুযােগ প্রাপ্ত হয়। এই প্রণালীতে শিক্ষালাভ করিতে হইলে শিক্ষার্থীকে জানা আরােহপদ্ধতির অধ্যাপনাপ্রণালী "জনিযের উপর অধিক মনোেযােগ দিতে হইবে। অজানা বিষয়সমূহ পরিচিত বিষয়ের একেবারে শিক্ষকের নিকট শুনিয়া আবৃত্তি করিতে সমাহার হইবে না। ইহাতে বস্তুপরিচয় ও পদার্থবিচারের ঘনিষ্ঠতা প্রাধান্য থাকিবে। অনেকগুলি বিশেষ বিশেষ আলােচনার পরে সূত্ৰসমূহ এবং সাধারণ নিয়ম সকল তাহাকে আয়ত্ত করিতে হইবে। সমীপন্থ, পরিচিত এবং বর্তমান তথ্য ও পদার্থ- সমূহ নিরীক্ষণ করিতে করিতে জ্ঞানের বৃদ্ধির সহিত কল্পনাশক্তির প্রয়ােগ করিয়া ক্রমশঃ দূরস্থ, অপরিচিত, অতীত এবং ভবিষ্যৎ ভাব পদার্থসমূহের ধারণা করিতে হইবে। স্থূলতৰ সত্যসমূহের আলােচনা হইতে ক্রমশঃ সূক্ষ্মতর সত্যের উদ্দেশ্যে উন্নীত হইতে হইবে। সাহিতসংক্রান্ত বিদ্যাসমূহ এই প্রণালীতে আলােচিত হইলে ইহাদের মূলীভূত উপাদানগুলির প্রতি শিক্ষার্থীর দৃষ্টি বিশেষভাবে স্বতই আকৃষ্ট হইবে। প্রত্যেক আলােচ্য বিষয়ের মৌলিক সত্যগুলি আয়ত্ত হইতে হইতে তদ্বিষয়ে মনােবৃত্তিনিচয়ের সম্যক অনুশীলন বিবিধ শাস্ত্রের বিষয়ী- হইবে এবং প্রকৃত সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও দৃত সত্যগুলি আলাে- দার্শনিক শক্তিসমূহের বিকাশ সাধিত হইবে। চনা করিবার পন্থ নির্দেশ এই প্রণালীতে অধ্যাপনাকাৰ্য চলিলে গণিত এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসমূহেরও যথার্থ জ্ঞান লাভ হয় এবং গণিতজ্ঞ ও অনুসন্ধিৎসু হইবার সুযােগ পাওয়া যায়। যে সকল বৃত্তিসঞ্চালনে গণিতশাস্ত্রে অধিকার জন্মে, এবং স্বাভাবিক নিয়মগুলি অনুসন্ধান করিবার প্রবৃত্তি জাগরিত হয়, এই আয়ােহ পদ্ধতির আবিষ্কার প্রণালীতে সেই সকল বৃত্তি ও প্রবৃত্তির কাৰ্য্য হইয়া থাকে।
শিক্ষা-সমালােচনা মানববিষয়ক বিজ্ঞানসমূহের শিক্ষালাভ করিতে হইলে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাপ্রণালী ও ভাবসমূহ, কৰ্ম্ম ও চরিত্রের আদর্শসমূহ, মানবীয় জগতের বিচিত্র রীতিনীতিসমূহ, অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান- পরিচয় লাভ সমূহের আলোচনা করিয়া মানবের মনােজগৎ, সামাজিক জগৎ, রাষ্ট্রীয় জগৎ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন ক্রিয়াক্ষেত্রের বৈচিত্র্যের সহিত পরিচিত হওয়া উচিত। তেমনই প্রাকৃতিক ও জড় বিজ্ঞানসমূহের শিক্ষালাভ করিতে হইলে প্রকৃতি ও জড় জগতের বিভিন্ন শক্তিপুঞ্জ ও পদার্থ সমূহের সহিত পরিচিত হইয়া বাহ্য জগতের বিশালতা ও বৈচিত্র্য সম্বন্ধে সম্যক্ জ্ঞান লাভ করিতে হইবে। অনলে ভূতলে, পৰ্বতে জলে, ঋতু পরিবর্তনে, লতায় পাতায়, জীব জন্তুতে যে যে শক্তির ক্রিয়া হইতেছে, এই সকলের ফলে জগতের যত প্রকার পরিবর্তন ও বিপ্লব উপস্থিত হইতেছে, এবং এই সমুদয় ব্যবহার করিয়া মানব যত প্রকার সুখ ভােগ করিতেছে, সেই সকল বিভিন্ন পদার্থ ও বিভিন্ন শক্তিসমূহের বিবরণ সংগ্রহ করিতে হইবে। এইরূপে বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক জগতের নিত্যনব বিশেষ বিশেষ ঘটনাবলীর প্রতি মনােনিবেশ করিয়াই বাহ্যবস্তু সমূহের বাহজগতের সহিত স্বরূপ উপলব্ধি করিতে হইবে। চক্ষুঃ কর্ণ আত্মীয়তা প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা এই সকল পদার্থের যথার্থজ্ঞান লাভ করিতে হইবে, ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়ের সহিত ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর প্রকৃত সংযােগ বিধান করিতে হইবে। এই উপায়ে পৃথিবীকে বিশেষরূপে চিনিয়া ইহার সহিত কুটুম্বিত আবােহপদ্ধতির অধ্যাপনাপ্রণালী ৩৭ । স্থাপন করিতে হইবে। তাহা হইলে ইহার বিভিন্ন অভ্যাস ও ভাবগতিক সমূহ পরিষ্কার ভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যাইতে পারিবে; প্রকৃতি ও জড় জগতের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, হাব ভাব, কাৰ্য- প্রণালী ও প্রকাশের লক্ষণসমূহ অবগত হওয়া যাইবে; এবং প্রকৃতিকে প্রশ্ন করিয়া ইহার ভিতরকার কথাগুলি, অন্তর্নিহিত সত্যগুলি সহজে উদ্ধৃত করিতে পারা যাইবে। সাহিত্যিক বিষয়ে শিক্ষালাভ করিতে হইলে শিক্ষার্থীকে শিল্প ও ব্যবসায় যেমন নৈতিক ও মানসিক জগতের বিচিত্র জগতের বিচিত্র কর্ম সমস্যা সমূহের সম্মুখীন হতে হয়, বৈজ্ঞানিক কাণ্ড সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করিবার জন্য যেন বাহেন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক জগতের বিচিত্র ঘটনাবলী অবলােকন করিতে হয়, তেমনই আবিষ্কারের আরােহপদ্ধতির প্রণালীতে ব্যবহারিক শিল্পশিক্ষা করিতে হইলে জগতের যাবতীয় ব্যবহার্য পদার্থ প্রস্তুত করিবার প্রণালীর তথ্য সংগ্রহ করিতে হইবে। বিজ্ঞানাগার ও ল্যাবরেটরীতে কাৰ্য করা এবং প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করা যেমন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রধান পন্থা, মানবের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীন নিরীক্ষণ করা যেমন মনােবিজ্ঞান শিক্ষালাভের উৎকৃষ্ট উপায়, তেমনি ওয়ার্কসপ ও কারখানায় বস্তু বিচার করা, দ্রব্য নির্মাণে সহায়তা করা ও বিভিন্ন প্রণালী অবলােকন করাই শিল্পশিক্ষার প্রধান উপায়। এই জন্য পুস্তক ব্যবহার অথবা সুত্র মুখস্থ না করিয়া কারখানাকেই পুস্তক, শিক্ষালয় ও শিক্ষকরূপে বিবেচনা করিতে হইবে।
৩০ শিক্ষা-সমালােচনা ; শিক্ষার্থীরা কোনও বিষয়ে জ্ঞানলাভ করিবার জন্য সাধারণতঃ সূত্র ও formula গুলি পুস্তক হইতে আবৃত্তি করে এবং দৃষ্টান্ত বা প্রয়ােগ স্বরূপ কয়েকটি “Experiment'' করিয়া থাকে। এই নূতন প্রণালীতে পুস্তক, সূত্র ও নিয়মসমূহের স্থান গৌণ ; ল্যাব- রেটরী’ বিজ্ঞানাগার ও কারখানার স্থানই মুখ্য। পুস্তকের সূত্র ল্যাব- রেটরীতে আসিয়া মিলিয়াই লইতে হইবে না। ল্যাবরেটরী প্রভৃতিতে কৰ্ম্ম করিয়া যে তথ্যে উপনীত হওয়া যায়, তাহাই প্রকৃত সত্য বিবেচনা করিয়া ইহার সহিত পুস্তকাদির তথ্য তুলনা করিতে হইবে। এইরূপ প্রণালীতে শিক্ষা প্রদান করিতে হইলে বহু প্রকারের এবং নানাশ্রেণীর ভাব ও পদার্থ, চিন্তা ও কর্ম, ঘটনা ও পরিবর্তন, শিক্ষার্থীর সম্মুখে অনিয়ন করিতে হইবে। প্রত্যেকটিকে বহুদিক হইতে বিবিধ উপায়ে বিভিন্ন রকমের সামান্য ধর্ম ও সাধারণ পরীক্ষা করিয়া নানারূপ তথ্য সংগ্রহ নিয়মগুলি স্বীকাৰ্য করিতে হইবে। এই রূপে বহুতথ্য সংগৃহীত নহে,-প্রতিপাদ্য হইলে প্রত্যেক বিষয়ের সামান্য ধর্ম সকল, শ্ৰেণী সমূহ, নিয়মানুবর্তিতা, সাধারণ ক্রিয়াপ্রণালী, কাৰ্যকারণ- সম্বন্ধ এবং পারস্পৰ্যসমূহের ইঙ্গিত পাওয়া যাইবে। এই ইঙ্গিত- গুলি শৃঙ্খলাবদ্ধরূপে ব্যবহার করিতে পারিলে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক সততার ধারণা জন্মিবে, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যও সামঞ্জস্য প্রতীয়- মান হইবে এবং ক্রমশঃ সত্যগুলির মধ্যে অঙ্গাঙ্গিসম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত ইয়া বিজ্ঞান-প্রতিষ্ঠার সহায়তা করিবে।
জাতীয় শিক্ষা কাহাকে বলে ? ? কয়েক বৎসর হইতে বাঙ্গালা দেশের স্থানে স্থানে “বঙ্গদেশস্থ জাতীয় শিক্ষা-পরিষদের প্রবর্তিত নুতন শিক্ষাপদ্ধতি অনুসারে জাতীয় শিক্ষা সম্বন্ধে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা হইয়াছে। কিন্তু আংশিক ও দায়িত্বহীন জাতীয় শিক্ষার প্রকৃতি ও বিশেষত্ব সম্বন্ধে মতামত দেশের মধ্যে বিশেষ কোন আলােচনা হয় নাই। এজন্য এতৎ সম্বন্ধে যাঁহার যেরূপ অভিরুচি, তিনি সেইরূপ ধারণাই পােষণ করিয়া আসিতেছেন। যাহার কেবলমাত্র দুএকটা ছাত্র বা শিক্ষক অথবা দুই একটা জাতীয় শিক্ষালয়ের পরিচয় পাইবার সুযােগ পাইয়াছেন, এবং কোন ব্যক্তিবিশেষের মতের অথবা কার্যের উপর নির্ভর করিয়াই জাতীয় শিক্ষার লক্ষণ নির্ণয় করিয়াছেন, তাহাদিগকে অনেক ভ্রমে পতিত হইতে হইয়াছে। অনেকে জাতীয় শিক্ষার নামমাত্র শুনিয়া ভাবিয়া রাখিয়াছেন- হিন্দুধর্মশিক্ষা এবং সংস্কৃত-চৰ্চ্চার জন্যই জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এখানে ইংঙ্গাজী শিক্ষার কোন বন্দোবস্ত নাই এবং অন্য ধর্মাবলম্বী ছাত্রের কোন স্থান নাই। ইহা এক প্রকার টোলবিশেষ। অনেকে মনে করেন, কেবলমাত্র কারখানার কার্য শিক্ষা দেওয়াই জাতীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য। ইহাতে সাহিত্য, ইতিহাস প্রভৃতি সাধারণ উচ্চ শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই। সূত্রধর ও শিক্ষা-সমালােচনা কর্মকারের কর্ম এবং বয়নকাৰ্য্য প্রভৃতি বিবিধ শিল্পশিক্ষার দ্বারা অন্ন সংস্থানের সুবিধার জন্যই জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। সুতরাং যে সকল ছাত্র মেধাবী এবং যাহারা উন্নত উপায়ে জীবিকা অর্জন করিতে সমর্থ, তাহারা এই বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে না। সাধারণ শিক্ষা দ্বারা উপকার লাভের আশা যাহাদের অতি অল্প এবং যাহাদিগকে অতি বাল্যকালেই কোন একটা জীবিকার্জনের পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে, তাহাদের জন্যই জাতীয় শিক্ষার আয়ােজন হইয়াছে। আবার অনেকে ঠিক বিপরীত ধারণা পােষণ করিয়া থাকেন। তাহারা মনে করেন—কেবলমাত্র ধনবান্ ও অভাবহীন ব্যক্তি- দিগের সন্তানেরাই জাতীয় বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। জাতীয় বিদ্যালয়ে যে শিক্ষা প্রদান করা হয়, তাহাতে আর্থিক লাভের তেমন কোন প্রত্যাশা নাই। যাহারা কেবলমাত্র বিদ্যাচর্চার জন্যই বিদ্যলাভ করিতে চাহে, তাহারা যে বিদ্যা অর্থকরী নহে, সেই বিদ্যাগ্রহণেও ঔৎসুক্য প্রকাশ করিতে পারে। কিন্তু সাধারণ লােক অন্ন চিন্তায় জর্জরিত। তাহারা ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতি উদাসীন হইয়া সন্তানদিগকে কেবলমাত্র জ্ঞানলাভের জন্য এরূপ নিঃস্বার্থভাবে জাতীয় বিদ্যালয়ে প্রেরণ করিতে পারে না। কেহ কেহ মনে করেন, জাতীয় বিদ্যালয়সমূহে কতকগুলি অকর্মণ্য, বিদ্যাভ্যাসে অমনোেযােগী ছাত্র প্রবেশ করিয়াছে। যাহারা প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির নিয়মানুসারে শিক্ষা-লাভে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিতে পারে নাই, অথবা যাহাৱা সাধারণ বিদ্যালয় জাতীয় শিক্ষা কাহাকে বলে ৪১ সমূহ হইতে, কোন না কোন কারণে বহিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা- দিগকে স্থান দেওয়াই জাতীয় বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য। এখানে সচ্চরিত্র ও বিদ্যানুরাগী ছাত্র প্রবেশ করে না। আর যাহারা স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে জাতীয় শিক্ষাপরিষদের জন্ম হইয়াছে ভাবিয়াইহার প্রবর্তিত শিক্ষাপদ্ধতিকে কেবলমাত্র হুজুগ মনে করেন, তাঁহারা ভাবেন, কতিপয় হুজুগপ্রিয় ব্যক্তির সাময়িক চেষ্টা ও উত্তেজনার ফলে কতকগুলি অপরিণতবয়স্ক যুবক ও বালকদিগের পরকাল নষ্ট করিবার জন্য, দেশের স্থানে স্থানে কতকগুলি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ইহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিদ্যাদান বা শিক্ষাবিস্তার নহে—দেশের মধ্যে বিবিধ হুজুগে যােগ- দান করাই ইহাদের বিশেষ লক্ষ্য। ছাত্রেরা কেবলমাত্র বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করে। এই কেন্দ্র গুলিকে বিদ্যালয় বলা যায় না, শিক্ষকদিগের স্থিরতা নাই, ছাত্রদিগের প্রতি কোনরূপ শাসনের ব্যবস্থা নাই—প্রকৃত সুদৃঢ় নিয়মও শৃঙ্খত দ্বারা ছাত্রদিগকে সংযত ও সুচালিত করিবার কোন বন্দোবস্ত নাই। এতদ্ব্যতীত এই বিদ্যালয়গুলির স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সকলেরই সন্দেহ। অনেকের ধারণা, জাতীয় শিক্ষা গবর্ণমেন্টের পরিচালিত শিক্ষার বিরােধী হইয়া দেশের উপর কর্তৃপক্ষের কোপ ও বিরাগের বর্ধন করিতেছে। বিশেষতঃ, বােধ হয়, জাতীয় বিদ্যালয়ের পাঠ্যনির্বাচন ও কাৰ্যনিৰ্বাহ প্রণালী প্রভৃতি বিষয়ের সহিত বিবিধ রাজনৈতিক আন্দোলনের সংশ্রব আছে ! হয়ত, রাজদ্রোহ- প্রচারক পুস্তকাদি জাতীয় বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত হয়, এবং কোমলমতি ৪২ শিক্ষা-সমালােচনা শিশুদিগের হৃদয়ে অল্প বয়সেই রাজবিদ্বেষের বীজ বপন করিয়া দেওয়া হয় ; সুতরাং ইহা দ্বারা বালকদিগের ভাবী সর্বনাশের সূচনা এবং দেশে অনর্থক বিবিধ অমঙ্গল সৃষ্টির পথ করা হইতেছে। স্তবিক পক্ষে, কোন দেশের জাতীয় শিক্ষা কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় বিশেষের কোন এক লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জাতীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কোন কালে কোন প্রকৃত তত্ত্ব সমাজেই প্রকৃত জাতীয় শিক্ষা ধৰ্ম্মশিক্ষায় পর্যবসিত হইতে পারে না। যেখানে দেখা যাইবে যে, দেশের সন্তানসন্ততিদিগের শিক্ষা একমাত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠে পরিণত হইয়াছে, সেখানে বুঝিতে হইবে জাতীয় শিক্ষায় আবর্জনা পড়িয়াছে। জাতীয় শিক্ষায় শিল্পশিক্ষা বা জীবিকা অর্জনের উপযােগী শিক্ষা বুঝায় না। জাতীয় শিক্ষা রাজনৈতিক শিক্ষা নহে; জাতীয় শিক্ষার অর্থ সমরশিক্ষা বা শারীরিক শিক্ষা নহে,—স্ত্রীশিক্ষা বা লােকশিক্ষা নহে; জাতীয় শিক্ষার অর্থ স্বদেশহিতৈষণা শিক্ষাও নহে। সমগ্র সমাজের সর্ববিধ উৎকর্ষের বিকাশ সাধন করিয়া যে শিক্ষাপদ্ধতি জাতীয় প্রকৃতি ও বিশেষত্বের পরিণতি ও পূর্ণতা বিধানের সহায় হয়, সেই জাতীয় চরিত্রের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ- সাধনােপযােগী শিক্ষাই প্রকৃতপক্ষে জাতীয় শিক্ষা। যে নামেই অভিহিত হউক, আর যাহার কর্তৃত্ব ও নায়কতায়ই পরিচালিত উক না কেন, এই শিক্ষাই জাতীয় শিক্ষা নামে অভিহিত হইবার যােগ্য।
জাতীয় শিক্ষা কাহাকে বলে ৪৩। । মানুষ কতকগুলি বৃত্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করে। প্রকৃতির সাহায্য ও পারিপার্শ্বিক ভাব ও শক্তিসমূহের প্রভাবে সেই স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব সকলের বিকাশ এবং বৃদ্ধি হয়। পারিবারিক, বিকাশ প্রণালী সামাজিকও দেশের অন্যান্য শক্তির সংঘর্ষে তাহার কৈশােরযৌবনাদি অবস্থা স্বাভাবিক নিয়মেই গঠিত হইতে থাকে। সমাজে বিশেষ কোন সাহায্য না থাকিলেও, মানুষের মন ও শরীর আপনা আপনিই বহির্জগৎ হইতে নিজের উপযােগী উপকরণ সংগ্রহ করিয়া লইয়া পুষ্টিলাভ করিতে পারে। এইরূপে ব্যক্তিত্ব-বিকাশই জীবিত অবস্থার লক্ষণ এবং জীবনী শক্তির কাৰ্য। এই জীবনীশক্তির পুষ্টিসাধন করিয়া মানুষের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র বিকাশের সহায়তা করা, যথার্থ শিক্ষার উদ্দেশ্য । অতএব যদি আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৃত্তিনিচয়ের সম্যক্ স্ফুর্তিসাধনের জন্য কোন ব্যবস্থা করিতে হয়, তাহা হইলে শিক্ষাপদ্ধতি সেই ব্যবস্থাকে এই স্বাভাবিক জীবনগঠন- প্রণালীরই সহায় হইতে হইবে। মানুষকে স্বাভাবিক জীবনবিকাশ যদি শিক্ষাগার প্রস্তুত করিতেই হয়, তবে তাহাকে তাহার সমাজের, ধৰ্ম্মের ও দেশের পূর্বাপর সকল অবস্থা ভাবিয়া, তদনুকূল অতি সুসাধ্য ও সহজ ব্যবস্থা করিতে হইবে। তাহা না করিলে, নৈসর্গিক মনুষ্যত্ব বিকাশের বিঘ্ন উৎপাদন হইবে; এবং তাহার ফলে বিকৃত স্বভাব, অপ্রকৃতিস্থ লােক-সমাজের সৃষ্টি হইবে। এইজন্যই দেশভেদে ও কালভেদে শিক্ষার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা কর
শু৪
শিক্ষা-সমালােচনা
হইয়া থাকে। এক সমাজে এক সময়ে যাহা স্বাভাবিক ও সহজ,
সেই সমাজেরই অবস্থান্তরে তাহা অস্বাভাবিক
শিক্ষাপদ্ধতির বৈচিত্র্য
এবং ক্ষতিকর হইতে পারে। এক অবস্থার
প্রতীকার অন্য অবস্থায় ব্যাধির কারণ হওয়া অসম্ভব নহে।
সময়ের পরিবর্তনে সমাজের সকল বিষয়েরই পরিবর্তন হইয়া
থাকে; এই পরিবর্তিত অবস্থার উপযােগী না হইলে শিক্ষা-
পদ্ধতি সেকেলে থাকিয়া যায় । তখন সেই শিক্ষা-প্রণালী বেশ
সহজ উপায়ে পারিপার্শ্বিক নৈতিক ও প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ
হইতে উপকরণ সংগ্রহ করিতে পারে না; এবং এই জন্যই উহা
বিকৃত হইয়া অৰ্ধবিকশিত বা কৃত্রিম উপায়ে প্রস্ফুটিত পুষ্পের
ন্যায় অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করে।
চতুম্পার্শ্বস্থ অবস্থা হইতে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ দ্বারা
কোন বিষয়ের বিকাশ ও পুষ্টি লাভ করিতে হইলে, স্বাধীন
ভাবে সেই সকল উপদান ব্যবহার করিবার
শিক্ষায় স্বাবলম্বন
ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। শক্তির বিকাশ
স্বকীয় চেষ্টা ও দায়িত্বের উপর নির্ভর করে। এমন কি, অপর
কোন ব্যক্তি যদি কোন ব্যবস্থা করিবার উপযুক্ত অথবা
অধিকার প্রাপ্ত হয়, তাহাকে এই স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্রের
প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া এবং উহার সাহায্যগ্ৰহণ করিয়াই কাৰ্য্য
করিতে হইবে।
সুতরাং যে কোন দেশে এবং যে কোন যুগে শিক্ষার ব্যবস্থা
করিতে হইবে, সেই দেশের ও সেই যুগের শিক্ষাগুরুদিগকে
জাতীয় শিক্ষা কাহাকে বলে ৪৫. তদ্দেশোপযােগী স্বাভাবিক এবং তৎকালােচিত “আধুনিক” শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তন করিতে হইবে। সমাজের প্রকৃতি কি, কোথায় ইহার বিশেষত্ব, কোন্ কোন্ বিষয়ে ইহার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এবং তৎকালের যুগধর্ম কি, অর্থাৎ সেই যুগে পৃথিবীতে কোন্ কোন্ ভাব ও কৰ্ম্মসমুহ প্রাধান্য লাভ করিয়াছে, এবং এবং তাহার দ্বারা কিরূপ নুতন অবস্থা সংঘটন হইয়াছে, বা হইবার সম্ভাবনা আছে, এই সকল বিষয়ের আলােচনা না করিলে সকল শ্রমই পণ্ড হইয়া যায়। এইরূপ সমাজোপযােগী এবং তৎকালােচিত “আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিই স্বাভাবিক, এবং উহাকে জাতীয় শিক্ষা বলা হয়। ইহার দ্বারাই সেই জাতির তৎকালােপােগী জীবন বিকাশের সুবিধা ঘটে; এবং সমাজ স্বীয় কর্তব্য সাধন, করিতে সমর্থ হইয়া ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতির সহায়তা করে,ইহাতে মানব-সভ্যতার বিস্তৃতি ও বিকাশের পথ পরিষ্কৃত হইয়া উঠে। সেই সময়ে একদিকে যেমন পুরাতন প্রথার প্রচলন অথবা উহা স্থায়ী করিতে গেলে, জোর লরিয়া এক অনৈসর্গিক ক্রিয়ার স্বাভাবিক শিক্ষার অভিনয় করা হয়, তেমনই আবার পুরাতন ভিত্তির উপর দণ্ডায়মান না হইলে, বালুকার উপর অট্টালিকা নির্মাণের ন্যায়, প্রয়াস বিফল হইয়া যায়। সম্প্রদায়প্রবাহ, ধৰ্ম্মপ্রবাহ, কুলপ্রবাহ ও জ্ঞানপ্রবাহ প্রত্যেকেই প্রতিদিনকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবন প্রবাহের সহিত মিলিত হইয়া, যাহাতে জাতিপ্রবাহের অঙ্গীভূত হইতে পারে, শাস্ত্রকারদিগকে লক্ষণ শিক্ষা-সমালােচনা একদিকে প্রথমতঃ এরূপ ব্যবস্থা করিতে হইবে; তেমনই আবার অন্যান্য দেশের মনুষসমাজ এতদিনের কর্ম ও চিন্তাদ্বারা যে ফল প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহার সহিত উহার সংযােগ স্থাপনের চেষ্টাও “তাহাদিগকে করিতে হইবে। কোন দেশের শিক্ষাপদ্ধতিই জাতীয় চরিত্রের অনুরূপ ও উপযােগী না হইলে, জাতীয় চরিত্রের পরিপূর্ণতাবিধানে সহায় জাতীয় শিক্ষা হইতে পারে না। এজন্য জাতীয় প্রকৃতি সমাজোপযােগী ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের অভ্যন্তরে নিজের পারম্পর্য ও স্বাতন্ত্র রক্ষা করিয়া যুগে যুগে যে বিশেষত্বের অভিব্যক্তি করিয়াছে, সেই ইতিহাসগত বিশেষত্ব ও চরিত্রগত স্বাতন্ত্রের অনুসন্ধান ও সম্যক অবধারণ ক করিয়াই, সমাজের শিক্ষাতত্ত্ববিৎ ব্যক্তিগণকে শিক্ষাক্ষেত্রে চালকৰূপে অবতীর্ণ হইতে হইবে। সুতরাং জাতীয় শিক্ষার অর্থ জাতীয় চরিত্রের অনুবর্তনকারী অর্থাৎ স্বাভাবিক শিক্ষা। এজন্যই জাতীয় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাস প্রভৃতির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিয়া চলা জাতীয় শিক্ষার প্রধান অঙ্গ হইয়া পড়ে, এবং জাতীয় ভাষা এই সমুদয়ের প্রবেশদ্বার বলিয়া, সকল দেশের শিক্ষাপদ্ধতিতে সকল বিষয়ে মুখ্য স্থান অধিকার করে। মধ্যযুগে বিদেশীয় সাহিত্য, বিদেশীয় দর্শন প্রভৃতি শিক্ষালাত করিবার জন্য ইউরােপের ছাত্রের বিদেশীয় ভাষা ব্যবহার করি। সকলেই আজকাল স্বীকার করেন যে, সেই কারণে সেই সময়ে কোন দেশেই, কি সামাজিক, কি রাষ্ট্রীয়, কি শিক্ষা-সম্বন্ধীয়, জাতীয় শিক্ষা কাহাকে বলে ৪৭ কি বৈষয়িক, কি ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয় কোন বিষয়েই জাতীয় চরিত্র- স্বাতন্ত্র ও প্রকৃতি-পার্থক্য জন্মে নাই। জাতীয় সভ্যতা এবং জাতীয় ভাষা ও সাহিত্যই প্রকৃত জাতীয় শিক্ষার মূল উপাদান হইবার প্রধান কারণ এই যে, শিক্ষার ব্যবস্থায় মানবের জ্ঞান, মানবের ধারণা সকলই আত্মােপলব্ধির সুযােগ আত্মােপলব্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত। নিজের সহিত তুলনা সাধন ও পার্থক্য অনুভব করিয়াই মানব বিশ্বের উপলব্ধি করিতে পারে। মনােবিজ্ঞানের এই সত্যটির উপর শিক্ষা- বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত। এই কারণে স্বাভাবিক জাতীয় শিক্ষাকে প্রকৃত শিক্ষা বা বিজ্ঞানানুমােদিত শিক্ষা বলা যায়। জাতীয় চরিত্রের বিকাশ-সাধনােপযােগী শিক্ষা একদিকে সমাজানুরূপ, অপরদিকে কালােপযগী। পারিপার্শ্বিক ভাব ও শিক্ষাপদ্ধতি শক্তিপুঞ্জের সহিত মানবের সম্বন্ধ, এবং কালােপযােগী ইহাদের পরস্পর আদান প্রদানেই মানবের স্বভাব বিকাশপ্রাপ্ত হয় ; এজন্য প্রত্যেক জাতি স্বকীয় শিক্ষা- পদ্ধতিতে পারিপার্শ্বিক ভাবসমুহকে নিজের স্বতন্ত্র পুষ্টিসাধনের অনুকূলরূপে ব্যবহার করিতে চেষ্টা করে। এই কারণে জাতীয় শিক্ষাকে পারিপার্শ্বিকের উপযােগী শিক্ষা বলা যাইতে পারে। এই পারিপার্শ্বিক অবস্থা সমূহের কালে কালে পরিবর্তন হয়। এজন্য শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তিত না হইয়া চিরকাল একরূপই খাকিলে, পরিবর্তিত পারিপার্শ্বিকে ব্যবহার করিতে অনুপযুক্ত হয়, এবং এই কারণে অস্বাভাবিক হইয়া পড়ে। এজন্য জাতীয় শিক্ষা ৪৮ শিক্ষা-সমালােচনা পরিবর্তনশীল অর্থাৎ কালান্তবর্তী। বিশ্বের সভ্যতাশক্তির নূতন নুতন সমাবেশের ফলে যে দেশে বা যে সমাজে সামাজিক, আর্থিক, ও রাষ্ট্রীয় সকল বিষয়েরই পরিবর্তন হইয়াছে, অথচ শিক্ষাপদ্ধতি পুরাতন প্রথাতেই প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে, সেই দেশে ও সেই সমাজে জাতীয় চরিত্রের বিকাশসাধনে বিঘ্ন উপস্থিত হইয়াছে। সেই সমাজ পারিপাশ্বিক ভাব ও পদার্থসমূহকে নিজের উপযােগী করিয়া ব্যবহার করিতে অসমর্থ হইয়াছে, সুতরাং জীবনীশক্তি হারাইয়া বিশ্ব- সভ্যতার এক অতি নিম্নস্তর-প্রােথিত অস্থিকঙ্কালের ন্যায় নিস্পন্দ ও অসাড় হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। ইদৃশ শিক্ষা-পদ্ধতিকে আর জাতীয় শিক্ষা বলা যায় না। পারিপাশ্বিকের অনুবর্তিতা, কালোপযােগিতা ও পরিবর্তন শীলতা জাতীয় শিক্ষার লক্ষণ হইবার কারণ এই যে,—শিক্ষার শিক্ষার ব্যবস্থায় উদ্দেশ্য মানবের জন্য উপযুক্ত সুযােগ সৃষ্টি যুগ ধৰ্ম্মের প্রভাব করিয়া, ভিতরকার শক্তি গুলি প্রস্ফুটিত করিয়া দেওয়া। সেই সুযােগগুলি প্রাপ্ত হইলে মানবের বৃত্তিসমূহ স্বতই বিকশিত হইয়া পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু সুযােগসমূহের সহিত মানবের কোনরূপ বিরোধ বা বৈষম্য ঘটিলে, এই বিকাশের বিঘ্ন উপস্থিত হয়। যেখানে বিশ্বে বিবিধ সুযােগের সৃষ্টি হইয়াছে, অথচ কোন কোন সমাজে শিক্ষাতত্ববিদেরা অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাতার এত উদাসীন যে, সেই সকল সুযােগের উপযুক্ত ব্যবহার করিয়া শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করিতে উদ্যোগী হইলেন না, সেই সমাজে শিক্ষাপদ্ধতি অতি
জাতীয় শিক্ষা কাহাকে বলে
৪৯,
পশ্চাতে পড়িয়া রহিবে। নূতন যুগের নূতন সভ্যতার মধ্যে সেই
পথভ্রান্ত নির্জীব পুরাতন শিক্ষা কাহারও অবজ্ঞা, কাহারও
দয়ার পাত্র, অথবা বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সমালােচনার
উপযুক্ত পদার্থ মাত্র হইয়া থাকিবে। প্রাণবিজ্ঞানের এই সাধারণ
তবের উপর জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত।
কোন সমাজে জাতীয় শিক্ষা প্রবর্তিত হইয়াছে কিনা,
নির্ণয় করিতে হইলে, প্রধানতঃ এই দুইটা প্রশ্ন করিতে
হইবে—
[ ১ ] মনােবিজ্ঞানের প্রশ্ন—শিক্ষাপদ্ধতি জাতীয় স্বভাবের
উপযােগী কিনা-এজন্য
(ক) জাতীয় সভ্যতার বিবিধ অঙ্গের সহিত পরিচিত
হইবার সুব্যবস্থা আছে কি না; এবং
(খ) উচ্চতম শিক্ষার আয়ােজনে জাতীয় ভাষা
ব্যবহারের বিধান আছে কিনা?
[২] প্রাণবিজ্ঞানের প্রশ্ন—শিক্ষা-পদ্ধতি জাতীয় অভাব
নােচনের উপযােগী কি না, তৎকালীন বিশ্বের মধ্যে জাতিকে
সচেতনভাবে পরিপুষ্ট করিবার ব্যবস্থা আছে কিনা—অর্থাৎ শিক্ষা
যুগ-ধর্মের অনুরূপ কিনা?
লােক-শিক্ষা, স্ত্রী-শিক্ষা, ধর্ম-শিক্ষা, শিল্প-শিক্ষা, দেশ-হিতৈষণা
শিক্ষা প্রভৃতি সকল বিষয়ই জাতীয় শিক্ষায় গৌণ লক্ষণ।
এই সমুদয় প্রধান লক্ষ্য হইতে পারে না, ইহারা উপরি উক্ত
মুখ্য উদ্দেশ্যসমূহেরই অন্তর্গত। শিল্প, ধর্ম বা রাষ্ট্রনীতির প্রভাকে
৫০ শিক্ষা-সমালােচনা শিক্ষা-পদ্ধতি নিয়ন্ত্রিত না হইয়া মানব-বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং শিক্ষা-বিজ্ঞানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইলেই জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে। এইরূপ শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষানুরাগী অধ্যাপক সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনের দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যাইবে না। অভাবােপযােগী শিক্ষক তৈয়ারী করিয়া লইবার যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে হইবে। সে চেষ্টা না করিয়া কেবল গৃহপ্রতিষ্ঠা ও ভূমিক্রয়ে অর্থব্যয় করিলে, বিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপিত হইবে না। এতদ্ব্যতীত, কেবল মাত্র বেঞ্চ, টুলের স্বাতন্ত্রে, বিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্রে, বিদ্যালয়গৃহের স্বাতন্ত্রে ও পরিচালনা-সমিতির স্বাতন্ত্রে শিক্ষাপদ্ধতির শিক্ষাপদ্ধতির স্বাতন্ত্র স্পষ্টীকৃত হয় না। প্রথম প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইতেই ছাত্র ও শিক্ষকদিগের চিত্তে শিক্ষার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রের ধারণা বদ্ধমূল করিয়া দিয়া জ্ঞানানুশীলন, বিদ্যাদান, শিক্ষাবিস্তার, বিজ্ঞান-প্রচার, সাহিত্য-সেবা, পরােপকার প্রভৃতি প্রতি হৃদয়ের আসক্তি জন্মাইয়া দিবার ব্যবস্থা করিয়া দিতে হইবে। তাহা হইলেই প্রকৃত শিক্ষা-সমাজ প্রতিষ্ঠিত হইয়া দেশের চিন্তা ও কৰ্ম্মরাশি স্থির ভাবে নিয়তি করিতে সমর্থ হইবে।
ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী নানা কাবণে আধুনিক কালে শিক্ষণীয় বিষয়ের সংখ্যা বৃতি 'পাইতেছে। পূৰ্বে স্যজগতের এমন এক অবস্থা ছিল, যখন শিক্ষণীয় বিষয়ের কেবল ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষাই বহুল শিক্ষার্থীব একমাত্র সাধনা ছিল। ক্রমশঃ মানবসমাজ যে অবস্থায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, তাহাতে কেবলমাত্র ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষা করিলেই জীবনের সর্ববিধু অভাব মােন হয় না। এখন বাহ জগতের নিয়মগুলি আবি স্কার করিয়া বৈজ্ঞানিকেরা যে সমুদয় নূতন বিদ্যার প্রতিষ্ঠা করিতেছেন, সেই বিজ্ঞানসমূহের সত্যগুলি আয়ত্ত করিতে না পারিলে মানবের যথেষ্ট অজ্ঞতা থাকিয়া যায়। কাজেই বিজ্ঞান আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে ভাষা ও সাহিততার প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া পড়িয়াছে। এতদ্ব্যতীত, বর্তমান জগতের জীবনসংগ্রামােপযােগ বিবিধ অস্ত্রের অধিকারী হইবার জন্য আধুনিক শিল্প প্রথা এবং ব্যবসায়পদ্ধতিও শিক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। ফলতঃ বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীর পক্ষে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় সাহিতের সঙ্গে সমানভাবে প্রয়ােজন হইয়াছে। শিক্ষণীয় বিষয়ের সংখ্যা বাড়িয়াছে বটে; কিন্তু এই শিক্ষা করিবার উপযােগী সময় শিক্ষার্থীর পক্ষে সমানই রহিয়াছে। পূর্বে যে সময়ের মধ্যে ভাষা ও সাহিত্য প্রতি শিক্ষা করিয়া কিন্তু এই সমূহ শিক্ষা-সমালােচনা শিক্ষার্থী সংসারের জীবনসংগ্রামোপযােগী বিবিধ উপাদান সংগ্রহ অভিনব আলােচনা করিতে সমর্থ হইত, এখনও তাহাকে সেই প্রণালীর আবশ্যকতা পরিমাণ সময়ের মধ্যেই আধুনিক কালের অনুরূপ উপকরণসমূহ সংগ্রহ করিতে হয়। কাজেই অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার বিশিষ্ট উপায় উদ্ভাবন আধুনিক কালে চিন্তাজগতের প্রধান কাৰ্য্য হইয়া পড়িয়াছে। যে প্রণালীতে অল্প সময়ে বহু বিষয় আয়ত্ত করিতে পারা যায়, সেরূপ প্রণালী অবলম্বন না করিলে আজকাল জীবনের উন্নতি আশা করা বৃথা। আর বাস্তবিক, সময় লাঘব করিয়া মানবের শক্তিগুলি বহুবিধ কার্যে প্রয়ােগ করিবার সুবিধা সৃষ্টির জন্যই প্রাচীন ও মধ্য যুগের অধ্যয়নপ্রণালী ও চিন্তাপদ্ধতি পরিহার করিয়া নূতন নূতন শিক্ষা- প্রণালী আবিষ্কারের প্রয়ােজন উপস্থিত এবং প্রবৃত্তি জাগরিত হইয়াছে। সুতরাং অধ্যয়নের যে প্রণালী অবলম্বন করিয়া সংস্কৃত সাহি- ত্যের কোনও এক বিভাগ আয়ত্ত করিতেই চিরজীবন কাটিয়া ভাষা শিক্ষার নূতন যাইত, অথবা সাত বৎসরব্যাপী পরিশ্রমের প্রণালী পর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া রঘুবংশের সাত- সর্গ মাত্র কোনরূপে মুখস্থ করিবার শক্তি জন্মিত, সেই প্রণালী এখন আর কোন মতেই কালেপযােগী হইতে পারে না। এমন এক শিক্ষাপ্রণালী অবলম্বন করিতে হইবে, যাহার দ্বারা বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয়গুলিকে আয়ত্ত করিবার প্রয়াসের মধ্যে পরস্পর- সহায়ক স প্রতিষ্ঠিত হয়, যাহার দ্বারা ভাষা ও সাহিত্য পরা রচনা ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী “শিক্ষা করিবার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান ও ইতিহাসাদি শিক্ষা, এবং বিজ্ঞান ও ইতিহাসদি শিক্ষা করিবার সঙ্গে সঙ্গে ভাষা ও সাহিত্যে অধিকার লাভ হয়। ভাষা ও ভাবের সম্বন্ধ, ভাষার উৎপত্তি, প্রকৃতি এবং ক্রমিক বিকাশের নিয়মের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়াই ভাষাশিক্ষার প্রণালী অবলম্বন করিতে হইবে। কোন ভাষা শিক্ষা ক্ষুদ্র ও সরল বাক্য সমুহের রচনা হইতে করিতে হইলে বক্তব্য ও ভাবসমূহের প্রতিই আরম্ভ করিয়া ক্রমশঃ বিশেষ মনোেযােগী হইতে হইবে। এত প্ৰণালীৰ বাক্য,পরা- বাক্যরচনা ও পদযােজনাকেই এক- মাত্র উপাদান ভাবে গ্রহণ করিতে হইবে। বাক্যরচনায় নৈপুণ্য জন্মিলেই ভাষা আয়ত্ত হইতে পারে, নতুবা নহে। এজন্য অভিধান হইতে বাছিয়া বাছিয়া শব্দ মুখস্থ বা ব্যাকরণের নিয়ম আবৃত্তি করিবার আদৌ কোন প্রয়ােজন নাই। অধিক সংখ্যক শব্দ, বা উচ্চারণ করিতে কঠিন যুক্তাক্ষ বিশিষ্ট শব্দের অর্থ জানিলেই ভাষায় বুংপত্তি জন্মিতে পারে কারণ কেবলমাত্র কঠিন কঠিন শব্দেই ভাষা কঠিন হয় না। ভাব কঠিন হইলেই প্রকৃত পক্ষে ভাষা কঠিন হয়। সহজ ভাব প্রকাশ করিবার জন্য কঠিন শব্দ ব্যবহার করিলেও অনেক সময়ে ভাষার কাঠিন্য প্রতীয়মান হয় না; অথচ কঠিন ভাব প্রকাশ করিতে যাইয়া অযুক্তাক্ষরবিশিষ্ট অতি সরল শর ব্যবহার করিলেও অনেক সময় ভাষা কঠিনই থাকিয়া যায়। সুতরাং প্রথম হইতেই কঠিন বা বহুসংখ্যক শ-শিক্ষায় প্রবৃত্ত না হইয়া ।
শিক্ষা-সমালােচনা
শিক্ষার্থীর স্বীয় ভাবপ্রকাশােপযােগী বাক্যরচনা,
শিক্ষা করিতে আরম্ভ করা উচিত। ভাবসমুহ বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে
যেমন কঠিন ও জটিল হইতে থাকিবে তেমনি তাহাকে কঠিন ও
জটিল বাক্যের সাহায্য অবলম্বন করিতে হইবে, ক্রমশঃ সে ভিন্ন
ভিন্ন, পরস্পরবিচ্ছিন্ন বাক্যসমূহ পরিত্যাগ করিয়া শৃঙ্খলীকৃত ও
সম্বন্ধ এবং ঐক্যবিশিষ্ট বাক্যপরম্পরা অবলম্বন করিবে।
মাতৃভাষা শিক্ষা করিতে হইলে শিক্ষার্থীকে প্রথম হইতেই
তাহার আজন্মব্যবহৃত বাক্যরচন-প্রণালী
তৃভাষা শিক্ষা
তাহার সর্ববিধ মনােভাব প্রকাশে প্রয়ােগ
করিতে হইবে। এই প্রয়ােগ সম্বন্ধে কতকগুলি সাধারণ নিয়ম
নির্দেশ করা যাইতে পারে।
প্রথমত, সমগ্র জ্ঞেয় বিশ্ব তাহার মনােবৃত্তি-নিচয়ের
বিকাশের কারণ। সুতরাং কি প্রাকৃতিক, কি মানবীয় উভয়
১) জগৎই তাহার বাক্য প্রয়ােগের ক্ষেত্র। এ
ধরে যাবতীয় পদার্থ- তাহার বাক্যরচনা কোন এক পদার্থ বা
বিয়ে বাক্যরচনা
এক বস্তুতে আবদ্ধ না করিয়া সর্ব পদার্থ
এবং জগতের সর্ববিধ ঘটনাতেই '' প্রয়ােগ করিতে হইবে।
ইহাতে একদিকে তাহার ভাষার বৈচিত্র্য ও শৃঙ্খলা জন্মে,
দিক বিশ্বের বিবিধ সজীব ও নির্জীব পদার্থ সম্বন্ধে জ্ঞান
বিপক্ষে সহায়তা হয়। ইহার ফলে শিক্ষার্থী কেবলমাত্র
সবাই শিক্ষা করে না, ভাষার সঙ্গে সঙ্গে ভাব ও ধারণার সৃষ্টি এবং
ন বিকাশের উপযােগী বিবিধ বিদ্যা শিক্ষা করে। সুতরাং ভাব
ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী শিক্ষার সময়ে যদি শিক্ষার্থী অন্যান্য বিভাগের অধীত বিদ্যালব্ধ জ্ঞান প্রকাশ করিবার সুযােগ প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে সকল বিদ্যার মধ্যে পরস্পর সহায়তাবিধায়ক সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়। ইহাতে সময় ও পরিশ্রর লাঘব হয়, ভাষা শিক্ষা জীবন্ত হয় এবং অন্যান্য বিদ্যাবিষয়ক জ্ঞানের ভিত্তি দৃঢ় হইতে পারে। দ্বিতীয়তঃ, বয়সের তারতম্যানুসারে বাক্যরচনা প্রয়ােগের ক্ষেত্রের এবং বাক্যরচনা প্রণালীর তারতম্য হওয়া উচিত। সমগ্র জগৎই শিক্ষার্থীর জােয় বটে, কিন্তু (২) ভিন্ন ভিন্ন বয়সে বিভিন্ন সমগ্ৰটী একই বয়সে জ্ঞেয় নহে। এই জন্য পদার্থ বিষয়ক বাক্য, প্রত্যেক স্তরে শিক্ষার্থীর সুপরিচিত পদার্থ এবং বিবিধ রচনা এবং প্রয়ােজনীয় বিষয়সমূহেই বাক্যরচনা- बानो यवनपन প্রণালী আবদ্ধ রাখিতে হইবে। সুতরাং জ্ঞেয় পদার্থসমূহের মধ্যে বিভাগ ও বিশ্লেষণ সাধন করিয়া সুবােধ্য অংশগুলিকেই বাক্য-রচনার বিষয় করিতে হইবে। এই উপায়ে ক্রমশঃ বিশ্বের যাবতীয় পদার্থ শিক্ষার্থীর ভাষার আয়ত্ত করিতে হইবে। তৃতীয়ত, কোন পদার্থের বর্ণনা করিতে হইলে শিক্ষার্থী যে বাক্য কয়েকবার বচনা করিয়াছে, সেই অত্যন্ত বাক্য সমূহের বাক্যসমূহেরই সাহায্যে তাহার নূতন বাক সাহায্য গ্রহণ করিয়া রচনা শিক্ষা করিতে হইবে। যে বিষয়ে নূতন বাক্যরচনা কখনও কোন আলােচনা হয় নাই, তাহার সহিত পূৰ্ব্বপরিচিত বা আলােচিত বিষয়ের যদি কোনরূপ সম্বন্ধ ৫৬ s শিক্ষা-সমালোচনা না থাকে, তাহা হইলে সেই নূতন বিষয় সম্বন্ধে বাক্যরচনা করিতে চেষ্টা করা উচিত নহে। পূর্বের অভ্যাস অবলম্বন করিয়াই নূতন প্রয়াস করিতে হইবে। সুতরাং বাক্য হইতে বাক্যান্তরে গমন করিবার সময়ে ভাব হইতে ভাবান্তর গমনের স্বাভাবিকতা এবং সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে। চতুর্থতঃ, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীকে একেবারেই বহু বাক্য রচনা করিতে হইবে না। বাক্যসমূহ প্রথম অবস্থায় সরল ও অ-জটিল থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রথম প্রথমতঃ সরল ও সহজ অবস্থায় বাক্যসমুহ বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সূক্ষ্মভাব ব্যঞ্জক না হইয়া স্কুল গুণবাচক এবং সহজ বজ্ঞাপক হওয়া উচিত। পঞ্চমত, উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্ৰ ভাৰপ্ৰকাশশাপযােগী (৫) বিচিত্র বাক্য-রচনা শিক্ষা করিতে হইবে। প্রথমতঃ অসম্বন্ধ পৃথক্ জ্ঞেয় জগৎ সম্বন্ধে ক্রমশঃ সুম ও বিস্তৃতভাবে বাক্যরচনা বাক্য রচনা করিতে হইবে। এই উপায়ে বাক্যসমাবেশের নীতি, লিপিচাতুর্য ও রচনাকৌশল শিক্ষা করিতে করিতে প্রবন্ধাদি উচ্চ সাহিত্য রচনা শিক্ষা করিতে হইবে। এইরূপ বাক্যরচনাঘানা ভাষার প্রণালী আয়ত্ত করিতে অভিধান ও ব্যাকরণ পারিলে, শব্দ-সম্পদ বৃদ্ধি পাইবে। উচ্চ- সাহিত্য পাঠ করিবার জন্য অভিধানের সাহায্য বাক্যরচনা ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী গ্রহণ করিয়া প্রচলিত শব্দের সহিত পরিচিত হইতে হইবে এবং আলােচিত সাহিত্য হইতেই শব্দ বাছিয়া লইয়া প্রয়ােগ করিতে শিক্ষা করিতে হইবে। এই উপায়ে কথা বলিয়া এবং প্রবন্ধ লিখিয়া ভাষার প্রয়ােগ সম্বন্ধে নৈপুণ্য ও অভিজ্ঞতা জন্মিলে ভাষার অন্তর্নিহিত সূত্ৰসমূহ বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে হইবে। ভাষা ব্যবহার করিতে অভ্যাস করিয়া এবং ভাষার প্রয়ােগ দেখিয়া ভাষার মধ্যে যে বাক্য-রচনা-প্রণালী অবলম্বিত হইয়াছে, যুক্তিদ্বারা সেই প্রণালীর আলােচনা এবং তাহার নিয়মসমূহ ও বৈয়াকরণিক রীতি- গুলি আবিষ্কার করিতে হইবে। ব্যাকরণ ভাষার ন্যায়শাস্ত্র। ভাষা শিক্ষার জন্য ইহার কোন প্রয়োজন নাই। ন্যায়শাস্ত্রের বিশেষ এক অঙ্গ বলিয়া ব্যাকরণের সুতন্ত্র আলোচনা সঙ্গত। অন্যান্য ভাষা শিক্ষা করিতে হইলেও মাতৃভাষা শিক্ষার প্রণালীই অবলম্বন করিতে হইবে। সেই ভাষাকে মাতৃভাষার অন্যান্য ভাষা শিক্ষা ন্যায় মনে করিয়া, সকল বিষয়ে মাতৃভাষা बगानो শিক্ষা-প্রণালীগ্ৰহণ করিতে হইবে। সকলেই লিথিতে ও পড়িতে শিক্ষা করিবার পূর্বেই নিজ মাতৃভাষায় কথা বলিয়া ভাব প্রকাশ করে। অন্যান্য ভাষা শিখিবার সময়েও সেইরূপ সেই ভাষাতেই নিজ মনোগতভাৰ প্ৰকাশ করিবার চেষ্টাই প্রথম করিতে হইবে। যে ভাষা শিখিতে হইবে, তাহার শব্দ-শিক্ষা গৌণভাবে রাখিয়া প্রথম হইতেই সেই ভাষাতে কথা বলিতে শিক্ষা করিতে ৫ শিক্ষা-সমালােচনা হইবে। সেই ভাষার বর্ণমালার সহিত পরিচিত হইবার পূর্কেই সেই ভাষায় বাক্যগুলি শুনিয়া শুনিয়া উচ্চারণ করিতে হইবে । এবং কেবল পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ দ্বারা শব্দগুলি অভ্যস্ত হইলে, সেই সকল শব্দ লইয়া সেই ভাষায় বাক্যরচনা করিতে হইবে। সেই ভাষায় ভাব প্রকাশ করিবার যে বিশেষ প্ৰণাৰী আছে, যে উপায়ে সেই ভাষা ব্যবহারকারী ব্যক্তিরা বাক্যরচনা ও পদযােজনা করিয়া থাকে, ঠিক সেই প্রণালীর সহিত সম্যক্ পরিচিত হইয়া, তাহার সাহায্যে নিজের প্রয়ােজনমত বাক্যরচনার চেষ্টা নিজে করিতে হইবে। কেবলমাত্র কোন এক বিভাগের বাক্যরচনাতেই সেই প্রণালী- প্রয়ােগে সন্তুষ্ট না থাকিয়া, জগতের প্রত্যেক বিষয়েই তাহার ব্যবহার করিতে হইবে। প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, অসম্বন্ধ এবং স্থূল ভাৰ প্রকাশ করিতে অভ্যস্ত হইয়া ক্রমশ জটিল, সুসম্বদ্ধ ও সূক্ষ্মভাব প্রকাশ করিতে শিখিতে হইবে। এই উপায়ে ক্রমশঃ সেই ভাষায় বাক্য-পরম্পরা রচনা করিয়া প্রবন্ধ ও সাহিত্যে অধিকার লাভের চেষ্টা করিতে হইবে। এইরূপে ভাষায় প্রবেশলাভের পর ভাষার নিয়ম ও ইতিহাস এবং সাহিত্যের ইতিবৃত্তের সহিত পৰিচিত হওয়া আবশ্যক। কি মাতৃভাষা, কি অন্যান্য ভাষা, সকল ভাষাই শিক্ষা করিতে ইলে, সর্বদা বিশেষভাবে মনে রাখিতে হইবে যে, প্রথমত ভাষা ও সাহিত্য দুইটা স্বতন্ত্র পদার্থ। ভাষা শিক্ষা করা এবং সাহিত্য শিক্ষা করা এই বিষয় নহে। মনের ভাব প্রকাশ
ভাষা-শিক্ষা প্রণালী
।
হইবে।
করিতে পারিলেই ভাষার কার্য সিদ্ধ হইল। এই ভাব প্রকাশ
ভাষা শিক্ষার সাধারণ যে উপায়ে অতি সুন্দররূপে সম্পন্ন হইতে
নিয়ম পারে, সেই উপায়ই সর্বোৎকৃষ্ট ভাষা।
সুতরাং ভাষা-শিক্ষায় প্রবৃত্ত হইয়া শিক্ষার্থীকে
ভাষা সাহিত্য নহে সেই উপায়গুলির সহিতই পরিচিত হইতে
সর্বোৎকৃষ্ট প্রণালীতে মনের ভাব প্রকাশ করিতে
পারিলেই সর্বোৎকৃষ্টরূপে ভাষার ব্যবহারও করা হইল বলিতে
হয়। ভাষার উৎকর্ষ সাধিত হইলেই ভাবের উৎকর্ষ সাধিত হয়
। নিকৃষ্ট ভাবসমূহও উৎকৃষ্ট ভাষার ভিতর দিয়া প্রকাশিত
হইতে পারে।
এই ভাবসমূহই সাহিত্যের উপাদান। উচ্চ অঙ্গের উৎকৃষ্ট
করিলেই উচ্চসাহিত্য শিক্ষা করা হয়।
আবার, উৎকৃষ্ট ভাব হইলেই ভাষা উৎকৃষ্ট হয় না। অতি সুন্দর।
ভাবসমূহও নিকৃষ্ট ভাষায় প্রকাশিত হইতে পারে।
সুতরাং ভাবের ক্রমবিকাশের ফলে সাহিত্যের পুষ্টি, এবং
ভাব-প্রকাশের উপায়ের ক্রমবিকাশের ফলে ভাষার উৎকর্ষ
ভাষা ও সাহিত্যের গতি দুই বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করে।
দ্বিতীয়ত, ভাষা শিক্ষা করিবার জন্য বাক্যরচনা করিতে
(২) যাইয়া চিন্তাশক্তির বিকাশােপযােগী যে ভাব
ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্য সমূহ প্রকাশ করিতে শিক্ষা করা হয়, তাহা-
শিক্ষার স্বাতন্ত্র রক্ষা দ্বারা সেই সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যেও প্রবেশলাভ
করিতে হইবে
হইয়া থাকে। এইরূপ কিয়ৎকাল যুগপৎ
ভাবসমূহ শিক্ষা
শিক্ষা-সমালােচনা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার পরে, যে অবস্থায় ভাষায় ব্যুৎপত্তি জন্মিয়াছে বলিয়া আশা করা যায়, সেই অবস্থায় মুখ্যভাবে সাহিত্য- শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করিতে হইবে। তথন ভাষার নিয়ম ও ইতিবৃত্ত শিক্ষা করিবার ভিন্ন বন্দোবস্ত করা উচিত, এবং সঙ্গে সঙ্গে অভিধান ব্যবহার করিয়া শব্দ-সম্পদ বৃদ্ধি করিতেও চেষ্টা করা সঙ্গত। ইহার ফলে ভাষা ও সাহিত্যের স্বাতন্ত্র প্রথম হইতেই অনুভূত হইয়া থাকে। তৃতীয়তঃ, ভাষা প্রধানতঃ বাচনিক এবং মৌখিক। ধ্বনিই ইহার প্রাণ,কর্ণই ইহার বিজ্ঞাপক। সুতরাং ভাষা-শিক্ষায় ধ্বনি-প্রকাশক মৌখিক কথার অবলম্বনই লিখিতে পড়িতে ও প্রধানরূপে গ্রহণ করিতে হইবে। লিখিত বানান করিতে শিখি- হইলে ভাষা সম্পূর্ণ নূতন হইয়া যায়। ইহাতে বার পূর্বে ভাষা ব্য- ভাষার সার্থকতা নষ্ট হয়। সুতরাং শিক্ষার্থী হার করিতে হইবে ভাষা লিথিতে আরম্ভ করিলে, বুঝিতে হইবে, সে সম্পূর্ণ নূতন এক বিষয় শিক্ষা করিতে আরম্ভ করিয়াছে। লিখনদ্বারা অন্যভাবে ভাষা-শিক্ষার যথেষ্ট সাহায্য হয় বটে এবং ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই লিখিতে শিক্ষা করিবার প্রয়ােজনও আছে বটে; কিন্তু কেবলমাত্র ভাষা শিখিতে হইলে লিখন- প্রণালীর আদৌ কোন প্রয়োজন নাই। এজন্য লিখিতে শিক্ষা করিবার পূর্বেই মুখে মুখে ভাষা শিক্ষা করিতে হইবে। ইহাতেই ভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্য রক্ষা হইবে এবং এই প্রণালী জীবরূপে কাৰ্য্য করিবে।
ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী ভাব ও ভাষার প্রকৃতি আলােচনা করিলে ভাষাশিক্ষা-প্রণালী ভাষাশিক্ষার ক্রম- এই কয়েকটা সিদ্ধান্তে উপনীত বিভাগ হওয়া যায়। প্রথমত, বাক্য ভাষার প্রধান লক্ষণ ; সুতরাং লিখিতে, পড়িতে ও বানান করিতে শিক্ষা করিবার পূর্বেই বাক্য রচনা করিতে শিখিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, যে ভাষা ব্যবহার করা হইতেছে, বাক্য-রচনা ভাষা শিক্ষা সম্বন্ধে করিতে হইলে তাহারই বিশেষ প্রণালী কয়েকটি নিয়ম অবলম্বন করিয়া পদার্থ সমুহের সম্বন্ধ ব্যক্ত করিতে অভ্যস্ত হইতে হইবে। তৃতীয়ত, ভাষা শিক্ষা করিবার জন্য জগতের পরিচিত পদার্থ সমূহ হইতে আরম্ভ করিয়া ক্রমশঃ অপরিচিত পদার্থ সম্বন্ধে ভাব প্রকাশের নিমিত্ত বাক্য রচনা করিতে হইবে; এই উপায়ে অন্যান্য বিদ্যালাভের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিদ্যালব্ধ জ্ঞানবিষয়ে বাক্যের প্রয়ােগ শিক্ষা করিতে হইবে। ইহার ফলে ভাষা শিক্ষার সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ও আয়ত্ত হইয়া যাইবে। চতুর্থত, প্রথম অবস্থায় প্রত্যেক বিষয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন বাক্য রচনা করিতে অভ্যস্ত হইয়া ক্রমশঃ বাক্যপরম্পরা দ্বারা সামঞ্জস্যবিশিষ্ট ভাব প্রকাশ করিতে হইবে। পঞ্চমত, বিবিধ ভাব প্রকাশ করিবার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদার্থ সম্বন্ধে বিচিত্র বাক্য রচনা করিতে অভ্যস্ত হইয়া ভাষার বিশেষ পদ্ধতির সহিত সম্যক পরিচিত হইলে, সাহিত্য শিক্ষার স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত করিতে হইবে।
শিক্ষা-সমালােচনা
ষষ্ঠত, 'যে অবস্থায় সাহিত্য-শিক্ষার স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করা
হইবে, সেই অবস্থায় ভাষার অভিধান ব্যবহার শিক্ষা করিতে
হইবে।
সপ্তমত, তৎপরে ভাষার নিয়ম অর্থাৎ ব্যাকরণ এবং ভাষা
ও সাহিত্যের ইতিহাস শিক্ষা করিয়া ভাব ও ভাবপ্রকাশের
উপায়ের সহিত পরিচয় লাভ করিতে হইবে।
এই উপায়ে ভাষা আয়ত্ত করিতে হইলে,
ভাষাশিক্ষার পৰ্যায়
শিক্ষা প্রণালী কয়েকটা পর্যায়ে বিভক্ত
করিতে হইবে।
প্রথম পর্যায়-বাক্য-রচনা।
প্রথমত, বয়সের তার
তম্যানুসারে বিভিন্ন পদার্থবিষয়ক ; দ্বিতীয়তঃ, অসম্বদ্ধ হইতে আরম্ভ
করিয়া ক্রমশঃ প্রণালীবদ্ধ বাক্য পরম্পরা ব্যবহার। তৃতীয়ত,
স্বতন্ত্র সাহিত্যশিক্ষা।
দ্বিতীয়পৰ্য্যায়-অভিধান-শিক্ষা। প্রথমতঃ ভাষাতে
সমুদয় Ilion ও Phrase প্রভৃতি বিচিত্র শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়,
তাহাদের সহিত পরিচিত হইতে হইবে; দ্বিতীয়তঃ, সাহিত্যে যে
সমুদয় ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় উল্লেখ Allusions, References
প্রভৃতি সুপ্রচলিত, সেগুলির পূর্ণ বিবরণের সহিত পরিচিত হইতে
যে
হইবে।
তৃতীয় পর্যায়—ভাষার নিয়ম ও ইতিহাস শিক্ষা।
বাক্য-রচনা শিক্ষার ভাষাকে আয়ত্ত করিবার পর ভাষার
মৌলিক উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করিয়া, তাহার সাধারণ নিয়মগুলি
ভাষা-শিক্ষা-প্রণালী ত আবিষ্কার করিতে হইবে। চিন্তাশক্তির বিশেষ বিকাশ না হইলে, এই বিশ্লেষণ কাৰ্য্য সমাধা হইতে পারে না, কারণ প্রকৃত পক্ষে ইহা ন্যায়শাস্ত্রের কাৰ্য্য। যে বয়সে এবং যে পরিমাণ সাধারণ জ্ঞান বিকাশের পর ন্যায়শাস্ত্রে অধিকার জন্মিবার সম্ভাবনা, তাহার পূব্বে ভাষা-ঘটিত • ন্যায়শাস্ত্রেও, অধিকার জন্মিবার সম্ভাবনা নাই ; সুতরাং ততটা জ্ঞানলাভের পূর্বে ভাষার সূত্র বা ব্যাকরণ- শাস্ত্র শিক্ষা করা যুক্তিসঙ্গত নহে। বাক্য-রচনা শিক্ষা করিবার সময়েই ব্যাকরণের নিয়মগুলি অজ্ঞাতসারে ব্যবহার করিতে হইয়াছে বটে কিন্তু তখনও ব্যাকরণের নিয়মগুলি অভ্যাস করিবার প্রয়ােজনীয়তাই উদ্ভূত হয় না । কারণ দেখা যায় যে, একেবারে অশিক্ষিত ব্যক্তি এবং শিশুও ভাষা প্রয়ােগ করে, তাহারা অতর্কিতে ব্যাকরণের কতক গুলি সামান্য নিয়ম মানিয়া লইয়াই ভাষা প্রয়ােগ করে, তজ্জন্য তাহাদিগের ব্যাকরণের নিয়মসমূহ মুখস্থ করিবার প্রয়োজন হয় না; সেই সকল নিয়ম এত সহজ ও সরল যে তাহ শাস্ত্রোপদেশ ব্যতীত কেবল কথােপকথন দ্বারাই আয়ত্ত হইয়া যায়। শিক্ষা-প্রণালীতেও এই বাভাবিক নিয়ম স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। দ্বিতীয়তঃ, ভাষার ইতিহাস। ব্যাকরণের নিয়ম শিক্ষা করিতে করিতেই ভাষার ইতিহাস অনেক পরিমাণে আয়ত্ত হইয়া আসে। ব্যাকরণ শিক্ষার সময়ে ইহার ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি রাখিলেই এই কাৰ্য্য সহজে সাধ্য হইতে পারে।
৬৪
শিক্ষা-সমালােচনা
চতুৰ্থপৰ্য্যায়—সাহিত্যের ইতিহাস-শিক্ষা। যুগে যুগে
যে সকল প্রধান প্রধান ভাব ভাষার সাহায্যে প্রকাশিত হইয়া
সাহিত্যের বিকাশ, পুষ্টি ও বৈচিত্র্য সৃষ্টি করিয়াছে, সেই ভাবসমূহ
এবং তাদের প্রকাশকগণের বিবরণ গ্রহণ করিতে হইবে।
AJU PUB: IC LIBRAR ল Estd 1802 . শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক আমাদের সমাজে শিক্ষার যথেষ্ট অভাব। প্রথমত, নিম্নশ্রেণী এবং স্ত্রীসমাজ শিক্ষাভ হইতে, সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত রহিয়াছে বলিলেই চলে। ইহাদের জন্য কিরূপ শিক্ষা- শিকার বর্তমান অসুস্থ। প্রণালী উপযােগী হইবে তাহা এখনও বিশদ- ভাবে আলােচিত হয় নাই ; এবং কোন প্রণালীই বিস্তৃত বা সুশৃঙ্খলভাবে কাৰ্যে পরিণত করিবার আয়ােজন করা হয় নাই। নৈশ-বিদ্যালয়ে কিরূপ শিক্ষা প্রদান করা হইবে এখনও তাহার সুচারু বন্দোবস্ত করিবার সুযােগ ঘটিয়া উঠে নাই। যারা নিতান্ত দরিদ্র সমাজে নিঃস্ব এব যাহাদিগকে দিবাভাগের সর্বক্ষণই শিক্ষাবিস্তার শারীরিক পরিশ্রম করিয়া পিতামাতার সঙ্গে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করিতে হয়, কেবল তাহারাই নৈশ- বিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়া থাকে। সুতরাং ইহাদের পক্ষে দিনে দুই ঘন্টার বেশী সমর শিক্ষার জন্য ব্যয় করা অসম্ভব। সমাজে এই শ্রেণীর লোকসংখ্যা যত কম হয়, ততই জাতীয় মঙ্গল। অতি শৈশবকাল হইতেই বালকগণ শারীরিক পরিশ্রম করিতে বাধ্য হইয়া মানসিক ও নৈতিক উন্নতি সাধন করিবার সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইলে সমাজের মধ্যে একটা প্রধান অসম্পূর্ণতা থাকিয়া যায়। কিন্তু যতদিন দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি বিশেষভাবে না হয় এবং জাতীয় ধনভাণ্ডার বুদ্ধি প্রাপ্ত শিক্ষা-সমালােচনা হইয়া জনসাধারণের বৈষয়িক অবস্থার সচ্ছলতা আনয়ন না করে, ততদিন অভিভাবকগণকে শিক্ষার উপকারিতা, অথবা বিদ্যার অশেষ গুণ সম্বন্ধে বিশদরূপে বুঝাইয়া দিলেও এ দুঃখ ঘুচিবার সম্ভাবনা নাই। সুতরাং দেশের বর্তমান অবস্থায় কেবল মাত্র রাত্রিকালে দুই ঘণ্টা শিক্ষালাভ করিতে পারে, এরূপ এক সমাজ থাকিবেই ইহা মানিয়া লইয়া শিক্ষা-সমিতির নৈশ-পাঠশালার বন্দোবস্ত করা উচিত । এবং ইহাদের পৈতৃক ব্যবসায় ও দৈনিক কার্য্যের উপযােগী হয় এরূপ শিক্ষার ব্যবস্থা করা সঙ্গত। বর্তমান শিক্ষা-প্রণালীর দোষ পল্লীবাসিগণ বেশ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছেন। তাহারা বুঝিয়াছেন যে, যে নিয়মে শিক্ষা বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি চলিতেছে তাহাতে ছাত্রদিগের বহু সময় বৃথা সমাজের অনুপযােগী নষ্ট হয়। শারীরিক শক্তির হ্রাস হয় এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কর্ম করিবার শক্তি থাকে না। শিক্ষার ব্যবস্থায় অন্নসংস্থানের বিশেষ কোন সুবিধাও নাই ; তাহার উপর ছাত্রগণ জাতিগত ব্যবসায় ও গৃহস্থালীর প্রতি অমনােযােগী হইয়া বাবুয়ানা এবং বিলাস শিক্ষা করে,—পৈতৃক জীবিকা অর্জনের উপায় ভুলিয়া গিয়া উদ্যানের চিন্তায় অস্থির হইয়া পড়ে এবং সমস্ত পরিবারকে দুর্ভিক্ষের কবলে নিক্ষিপ্ত করে। অশিক্ষিত সমাজকে শিক্ষাগ্রহণ বিষয়ে উৎসাহিত করিতে হইলে সমালোপযােগী এরূপ শিক্ষাপদ্ধতি অবলম্বন করা আবশ্যক যে শিক্ষার লক্ষণ তাহাতে নিম্নলিখিত সুবিধাগুলি থাকে— (১) অল্পসময়ে অধিক শিক্ষা। আজকাল গ্রাম্য বিদ্যালয়ে শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক নয় দশ বৎসর না পড়িয়া বালকগণ ছাত্র বা মাইনর পরীক্ষার উপযুক্ত হতে পারে না। ঐ পরিমাণ শিক্ষা পাচ বৎসরের মধ্যেই সম্পন্ন হইয়া যাইতে পারে। (২) প্রথম হইতেই জাতি-নির্বিশেষে শিল্প ও ব্যবসা- (ক্ষা দি বার ব্যবস্থা। (৩) পুস্তকের সংখ্যায় অল্প তা। শিক্ষা-প্রণালীতে বন্ধু- ধ-রিচয়ের প্রাধান্য। (৪) ছােট-বড়, দীন-দরিদ, চাষা-ভদ্র সকলকে একই শিক্ষা-প্রদান এবং এই উপায়ে শিক্ষিত অশিক্ষিত সমাজদ্বয়ের মধ্যে অনৈক্য-নিবারণ ও সদ্ভাব-বন্ধন। (৫) শিক্ষাকে প্রতি গৃহস্থের প্রত্যেক বালকের আয়ত্ত করিবার জন্য অবৈতনিক, অবৈতনিক বা অল্পবৈতনিক করা। (৬) কেবলমাত্র দ্বিপ্রহরে ১১টা হইতে ৪টা পর্যন্ত বিদ্যা- শিক্ষার সময় নির্ধারণ না করিয়া সকাল হইতে রাত্রি ৯টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কাৰ্য্য চলিবার ব্যবস্থা থাকা। ইহাতে ব্যবসায়ীদের সন্তানগণের সুবিধা হয় এবং শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অবসর অনুসারে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে পারে। (৭) শারীরিক উৎকর্ষ সাধন এবং গ্রামস্থ নানাবিধ উপকার- সাধনের সুযোগ। বই পড়া এবং বিদ্যালয়ে যাওয়াই ছাত্রগণের একমাত্র কর্তব্যরূপে পরিণত না হওয়া। (৮) বিদ্যালয়ের পরিচালনাসম্বন্ধে গ্রামের সকলেরই মতামত প্রকাশ করিবার ক্ষমতা থাকা।
শিক্ষা-সমালােচনা । কিন্তু বালিকা বিদ্যালয় এবং নৈশ বিদ্যালয় প্রভৃতি নুতন বিদ্যালয়-প্রতিষ্ঠা দ্বারা শিক্ষা-গণ্ডীর যে বিস্তার সাধিত হয়, তাহার অভাবই আমাদের শিক্ষার একমাত্র অভাব নহে। যাহাদের বর্তমান শিক্ষা-পদ্ধতি শিক্ষালাভ হইতেছে,তাহাদের শিক্ষাও অসম্পূর্ণ সর্বাঙ্গীন নহে ও একাঙ্গীন হইয়া থাকিতেছে। শিক্ষাপদ্ধতিতে জাতীয় ধৰ্ম্ম ও নীতিশিক্ষার কোন বন্দোবস্ত নাই ; এবং এরূপ অবৈজ্ঞানিক ও অস্বাভাবিকভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হইয়াছে যে, কোন ছাত্র হয়ত পাঠশালার নিম্নশ্রেণী হইতে কলেজের সর্বোচ্চ শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়াও সামান্য মাত্র ইতিহাস-শিক্ষা করিবার সুযােগ পাইল না, আবার কেহ হয়ত তৎপরিমাণ বিদ্যাশিক্ষা করিয়াও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ থাকিয়া গেল। অধিকন্তু, যাহরা উচ্চতম শিক্ষালাভ করিয়া সংসারে প্রবেশ করিলেন, তাহাদের শিক্ষারই বা পরিচয় কোথায়? অদ্ধ শতাব্দী উচ্চ শিক্ষিত পর্যন্ত এই সমাজে উচ্চশিক্ষার প্রভাব কাৰ্য্য সমাজের অবস্থা করিয়াছে, কিন্তু কয়জন উচ্চশিক্ষা-প্রাপ্ত ব্যক্তি অনন্তকৰ্মা হইয়া ইতিহাসালোচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন, কয়জন বিজ্ঞানচর্চায় মনােনিবেশ করিয়াছন, কয়জন স্বাধীনভাবে চিন্তা করিয়া জাতীয় জ্ঞানভাণ্ডারের পুষ্টিসাধন করিয়াছেন, উচ্চ- বিদ্যাসমূহ সমাজে সহজলভ্য ও সাধারণের উপযােগী করিবার জন্য কয়জন মাতৃভাষার শ্রীবৃদ্ধিসাধনে সমগ্র জীবন নিয়ােজিত করিয়াছেন, কয়জন শিক্ষিত ব্যক্তি শিক্ষাপ্রণালীয় আলােচনা করিয়া শিক্ষাবিস্তার কর্মে নিযুক্ত হইয়াছেন—বেশী চিন্তা না শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক ক্ষরিয়া ও এক নিঃশ্বাসে বলিয়া ফেলা যায়। আমাদের শিক্ষার অভাবের মধ্যে ইহা একটা কম অভাব নহে। কেবলমাত্র ৫ শিক্ষাবিস্তারের অভাব তাহা নহে, প্রকৃত উচ্চশিক্ষারও অত্যন্ত অভাব রহিয়াছে। সুতরাং দেশে শিক্ষার অভাব নাই—অথবা অন্তে অভাৰ যথাসাধ্য মােচন করিয়া দিতেছে ভাবিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিবার শিক্ষাবিষয়ক স্বতন্ত্র অবসর নাই। উচ্চশিক্ষা, নিশিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, আন্দোলন শিল্পশিক্ষা, লােকশিক্ষা প্রভৃতি শিক্ষার সকল বিভাগেই মহৎ অভাব উপলব্ধি করিয়া একমাত্র শিক্ষার জন্যই সমাজে এখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে আন্দোলন করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে। যত উপায়ে যদি হইতে যত বেশী লােক শিক্ষা- বিষয়ক আন্দোলনে যােগদান করিয়া শিক্ষায় পুষ্টি সাধন করিতে অগ্রসর হইবে,ততই দেশের উন্নতি হইবে। শিক্ষার দ্বারাই সমাজে নীতি, ধৰ্ম্ম, অর্থ প্রভৃতি সকল বিষয়েরই উৎকর্ষ সাধিত হইবে, এরূপ ভাবিয়া যাহাৱা কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইবেন, তাহারাই দেশের স্থায়ী মঙ্গলের পথ পরিষ্কার করিয়া দিবেন। শিক্ষাক্ষেত্রে যাঁহারা অবতীর্ণ হইয়াছেন, অথবা হইয়া অয়ে পথপ্রদর্শক হইবেন, তাহাদের বিশেষরূপে মনে রাখিতে হইবে যে, শিক্ষা বিষয়টার বিশেষত্ব এই যে, ইহার উন্নতি দেশের অভাব মােচ. নােপযােগী শিক্ষাবিস্তার বহুসময়সাপেক্ষ। যাহারা অতি শীঘ্ন ফল- বহালসাপেক্ষ লাভের আশা করেন, যাহারা ভবিষ্যতের এতি হইবার কারণ দুষ্ট রাখিয়া বর্তমানের সামান্য আন্তের মধ্যে শিক্ষা সমালোচনা নিজেদের সহিষ্ণুতা ও স্থৈর্য রক্ষা করিতে পারেন না, তাহার এই কাৰ্য্যের যােগ্য নহেন। বাঙ্গালা ভাষার উন্নতিসাধন দ্বারা ইহাকে সৰ্বভাবব্যঞ্জক করিয়া শিক্ষা-পদ্ধতির সকল স্তরে প্রচলিত করা দু’এক (১) মাতৃভাষার বৎসর বা দুএক জনের কাৰ্য্য নহে। বাঙ্গালা অসম্পূর্ণত। সাহিত্যের উৎকর্ষ অল্প শ্রমে সাধিত হইবে । বহু ব্যক্তির সমগ্র জীবনব্যাপী সমবেত চিন্তা ও আলােচনায় ফলেই এই কাৰ্য্য সাধিত হইতে পারে। শিল্প-শিক্ষার বন্দোবস্ত করিয়া উন্নত উপায়ে স্বাধীন অন্নের ব্যবস্থা করা এক পুরুষের সাধ্যাতীত। যে দেশে বৈজ্ঞানিক (২) স্বাধীন জীবিকার প্রণালীতে শিল্প প্রতিষ্টিত হয় নাই, সেই দেশের অভাব কতিপয় লােক , বিদেশ হইতে শিক্ষা লাভ করিয়া আসিলেই দেশে উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রণালীর সাহায্যে কারখানা প্রতিষ্ঠা, এবং শিল্পে লাভবান্ হইবার চেষ্টা ফলবতী হইবে না। কারণ যে দুই চারিজন লােকের সেই বিদ্যা আবদ্ধ কেবল মাত্র তাহাদিগকেই বিশ্বাস করিয়া দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ মূলধন ব্যয় করতে সাহসী হইতে পারেন না। এদিকে দেশের মধ্যে ব্যবসায় ও শিল্পের উন্নতি সাধিত না হইলে, সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-কারখানার সংখ্যা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি না পাইলে শিল্পশিক্ষার সুবিধা হইতেই পারে না এবং শিল্প-ও-ব্যবসায়-বিদ্যা- লমের আদর হইবে না। এই সকল কারণে শিল্প-প্রতিষ্ঠা ও শিল্প- মধ্যে শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক ৭১ শিক্ষা অল্পকালের মধ্যে এ দেশে প্রকৃত অভাব-মােচনোপযােগী হইয়া ফলদান করিতে পারিবে না। সমাজে বিজ্ঞানচর্চা এবং ইতিহাসালােচনার প্রতিষ্ঠা দেখিতে হইলেও বহু কাল অপেক্ষা করিতে হইবে। (৩) জ্ঞানানুশীলনে আন্তরিকতার অভাব যাহারা,এ সকল বিষয়ে অগ্রগামী হইয়াছেন, তাহাদের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত এবং অধিকসংখ্যক বিদ্যানুরাগী ছাত্র অনন্তচিন্তৰূপে সমবেত হইলেই কৃ ও বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার যুগ উপস্থিত হইতে পারে। এই সকল ক্ষেত্রের লােকাভাব শীঘ্র যে পূর্ণ হইবে এরূপ আশা করা যায় না। যাহা হউক, এতদুপযােগী লােকসংগ্রহ এবং কর্মী সৃষ্টি করা আবশ্যক। এজন্য ধুরন্ধর ও প্রবর্তকগণকে বিশেষ এক শিক্ষাপদ্ধতির শিক্ষা-বিস্তারকল্পে ব্যবস্থা করিতে হইবে। কোন কোন দেশে ‘কনসক্রিপস সমরবিভাগে কাৰ্য করিবার জন্য কনক্রিপসন্” প্রথা প্রচলিত আছে। তাহার ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি সামরিক জীবন গঠন করিয়া রাষ্ট্রের প্রয়ােজনানুসারে কাৰ্য্য করিতে বাধ্য হয়। আমাদের সমাজে শিক্ষাবিষয়ে সেইরূপ কোন প্রথা অবলম্বন করা যাইতে পারে কিনা ভাবিবার বিষয়। ইতিমধ্যে নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন দ্বারা বিশেষ এক শ্রেণীর শিক্ষক ও প্রচার প্রস্তুত করিয়া লইবার প্রয়ােজন উপস্থিত হইয়াছে। যাহারা এই পদ্ধতি অনুসারে জীবন গঠন করিতে চাহেন,তাহা- দিগকে সাধারণ শিক্ষার্থিগণের ন্যায় কোনও বিদ্যালয়ে যাইয়া লেখা- ৭২ শিক্ষা-সমালােচনা পড়া শিখিতে হইবে না। তাহাদিগের জন্য শিক্ষা-প্রচারক সৃষ্টি নানা কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিগণের নানা ভাবে শিষ্যত্ব-গ্রহণের ব্যবস্থা করিয়া দিতে হইবে। বিবিধ কার্যে যােগদান এবং বিচিত্র কাৰ্যাধ্যক্ষগণকে সাহায্য করিয়া তাহাদের শিক্ষা লাভ হইবে। অবশ্য এইরূপ কাৰ্য্য করিবার সময়েই অবসর- মত যথােচিত গ্রন্থাদি পাঠ করিতে হইবে। যে সমুদয় কর্মে সহায়তা করিয়া বিদ্যার্জন করিতে হইবে,নিমে তাহার একটি তালিকা প্রদত্ত হইতেছে ১। ল্যাবরেটরী ও বিজ্ঞানগৃহের কেরাণী, . স্ন্যাসিষ্টান্ট, ডিমন্ষ্ট্রেটর, হিসাবরক্ষক প্রভৃতির কাৰ্য্য ২। বিবিধ কারখানার ঐরূপ কাৰ্য্য ৩। উন্নত লেখক, গ্রন্থকার, সংবাদপত্রের সম্পাদক, ঐতি- হাসিক ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকারী,প্রত্নতত্ববিৎ প্রভৃতির সহায়তা- কামীর কাৰ্য্য ৪। অনুবাদ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রবন্ধলিখন, গ্রন্থাদির সারাংশ- সঙ্কলন, রিপাের্ট, বিবরণী-প্রকাশাদি সামান্য ও সহজ সাহিত্য- সংক্রান্ত কাৰ্য ৫। আফিস ও কাৰ্য্যালয়ের কোণী, হিসাবরক্ষক, পরিচালক এভৃতির কাৰ্য্য ৬। ব্যবসায়ী ও শিল্পীদিগের তত্বাবধানে বিচিত্র স্থানে ভ্রমণ ও বিচিত্র তথ্যসংগ্রহ ৭। লােকহিতকর বিবিধ সনুষ্ঠানে যােগদান শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক ৮। নিম্ন-বিদ্যালয়, নৈবিদ্যালয়, বালিকাবিদ্যালয় প্রভৃতিতে শিক্ষকতার কাৰ্য ৯। ছাপাখানা ও গ্রন্থপ্রকাশসংক্রান্ত বিবিধ কাৰ্য্য এই রূপ বিচিত্র কার্যের মধ্যে থাকিয়া সকলকেই শিক্ষিত হইতে হইবে। প্রত্যেককেই সৰ্ববিধ কাৰ্যে ব্যুৎপন্ন হইয়া অতি- এচারক সৃষ্টির ব্যবস্থায় জ্ঞতা লাভ করিতে হইবে। এই সকল কাৰ্য্যে জীবনের প্রাধা ননাশ্রেণীর দায়িত্ব গ্রহণ করিতে অভ্যস্ত হইতে হইবে। যাহাতে শিক্ষার্থীরা নিম্নপদ হইতে আরম্ভ করিয়া ক্রমশঃ উচ্চতর পদের অধিকারী হয় তাহার ব্যবস্থা করিয়া দিতে হইবে। প্রত্যেকেরই সকল বিষয়ে যাহাতে বিবিদিষা জন্মে এবং সকলপ্রকার কার্য করিবার প্রবৃত্তি ও শক্তি বিকশিত হয়, তৎপ্রতি দৃষ্টি রাখিয়া সকলের মধ্যে এই কাৰ্যগুলির বিভাগ ও পরিবর্তন সাধন করিতে হইবে। তাহাদিগকে ল্যাবরেটরী, লাইবেরী, ফ্যাক্টরী, কারখানা, ছাপাখানা, আফিস, বিদ্যালয় প্রতি কর্মকেত্রে বিবিধ কাৰ্য্য করিতে করিতেই মানসিক উৎকর্ষসাধনােপযােগ গ্রন্থপাঠ গ্রন্থপাঠ করিতে হইবে। এজন্য উপযুক্ত অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে অল্প কালের মধ্যে যাহাতে তাহাদের বই পরিমাণ শিক্ষালাভ হয় তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে; এবং বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রেরণ করিবার সময়ে যথােচিত পুস্তক ও ল্যাবরেটরী সাজ সরঞ্জমাদি প্রদান করিতে হইবে। এইরূপে যে সমূদয় বিষয় শিক্ষা করিতে হইবে নিয়ে তাহার তালিকা প্রদত্ত হইতেছে ৭৪ শিক্ষা-সমালােচনা সংস্কৃত সাহিত্য ২। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার গণিত পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন ৪। উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞান অঙ্কন ও চিত্রবিদ্যা ৬। প্রাচীন গ্রীস ও রোমের ইতিহাস ।। প্রাথমিক ধনবিজ্ঞান ৮। কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রশাসন প্রণালী ৯। ইংরাজী সাহিত্য ও তাহার ইতিহাস এই সকল বিষয়ে অত্যুচ্চ বা গভীর জ্ঞানের প্রয়ােজন নাই, ইন্টারমিডিয়েট মানের কিঞ্চিৎ উৰ্দ্ধ এবং বি, এ, পরীক্ষার কিঞ্চিৎ নূন পরিমাণ জ্ঞান লাভ হইলেই যঠেষ্ট। চারি বৎসর কাল এই ভাবে কাৰ্য্য ও গ্রন্থপাঠ করিতে হইবে। কোনও বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিবার প্রয়ােজন নাই। তাহার পর (গ) বিদেশে প্রেরণ করিয়া শিক্ষা-প্রদানের ব্যবস্থা বিদেশে জীবনযাপন করিতে হইবে। যাহারা ইংরাজী ভাষায় বিশেষ কৃতিত্ব দেখাইতে সমর্থ হইবে তাহাদিগকে জার্মানি ও ফ্রান্সে, এবং যাহারা ইংরাজীতে বিশেষ পারদর্শী হইবে না তাহাদিগকে ইংলণ্ড ও আমেরিকায় পাঠাইতে হইবে। বিদেশে তিন বৎসর কাল থাকিতে হইবে। সেখানেও কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীর ন্যায় শিক্ষা লাভ না করিলেও চলিতে পারে। উপযুক্ত পরিচালকের নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে লাই- শিক্ষার আন্দোলন প্রচারক ৭ ব্রেরীতে বসিয়া অথবা গৃহেই গ্রন্থাদি পাঠ করিতে হইবে। তবে যে সকল বিষয়ে হাতে কাজ করিলে ফল ভাল হয়, সেই সকল fascia gy special student, external candidate অথবা apprentice এর ন্যায় ল্যাবরেটরী, ওয়ার্কসপ প্রভৃতিতে কৰ্ম্ম করিলেই চলিতে পারে। এতদ্ব্যতীত কোন কোন বিষয়ের theoretical lessons এর জন্যই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে লব্ধ প্রতিষ্ঠ অধ্যাপকগণ শিক্ষা-প্রদান করেন, সেই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকৃষ্ট বক্তৃতাগুলিতে উপস্থিত থাকিয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষালাভ করিতে পারে এরূপ ব্যবস্থা করিতে হইবে। এই তিন বৎসরের মধ্যে শিক্ষার্থীকে কোনও বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, specialist বাexpert করিয়া তুলিবার চেষ্টা করিতে হইবে না। যাহাতে প্রত্যেকেই সকল বিষয়ে মনোযােগ করিয়া বিদেয় চিন্তা ও শিক্ষাপদ্ধতির বিশিষ্ট গুণগুলি হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে, কেবল তাহা বই বন্দোবস্ত করিতে হইবে। তবে সেই সঙ্গে কোন একটি বিশেষ শিল্প, ব্যবসায় বা বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালীর মূল কথাগুলি যাহাতে আয়ত্ত হয় তাহার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া শিক্ষণীয় বিষয় নির্ধারণ করা সঙ্গত। সেইসকল বিষয়ে কোনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া ডিগ্রি লাভ করিবার বিশেষ কোন প্রয়ােজন নাই। সাত বৎসর শিক্ষালাভের ফলে কোনও এক বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্য এবং অভিজ্ঞতা জন্মিবে না। শিক্ষাপ্রচারকে কর্ম কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন প্রয়ােজন সাধনােপযােগ ৭৬ শিক্ষা-সমালােচনা সাহস ও নৈপুণ জন্মিবে এইরূপ আশা করা যায়। তখন হইতে এইরূপে শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রচারকগণকে বিচিত্রস্থানে বিচিৰকাৰ্য্যের দায়িত্ব গ্রহণ করিতে হইবে। অল্পবেতনে উপযুক্ত কর্মীরা কাৰ্য করিলে বহুবিধ আন্দোলন এক সঙ্গে চলিতে পারিবে; এবং কার্যের ফলে কর্মীয় নিজেরও অভিজ্ঞতা লাভ হইবে। অধিকন্তু, সর্বসাধারণের মধ্যে অনন্যকৰ্মা ও নৈষ্ঠিক প্রচারকগণের কার্যাবলী প্রচারিত হইয়া কাৰ্য্য ও চিন্তার নূতন নূতন পন্থার প্রতি সমাজের বিশ্বাস সৃষ্টি করিবে। এই প্রণালীতে শিক্ষিত কগিণ দ্বিবিধ কৰ্ম্ম করিবেন। প্রথমতঃ তাহারা বিভিন্নদেশে এদেশবাসীর কৰ্ম্ম ও চিন্তা করিবার সুযােগ সৃষ্টির জন্য চেষ্টিত হইবেন; এবং হিন্দুসাহিত্য (1) বিদেশে ও দর্শন প্রচার করিবার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে আন্দোলন উপস্থিত করিবেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি প্রধান প্রধান পণ্ডিতগণের দৃষ্টি যাহাতে আকৃষ্ট হয় তাহার চেষ্টা করিতে হইবে; এবং ভারতীয় বিদ্যা- গুলি ও আমাদের সমাজের বিবরণ যাহাতে বিভিন্নদেশীয় ছাত্র- বৃনে অবশ্যপাঠ্যের মধ্যে নির্বাচিত হয় তাহার আয়ােজনকল্পে তত্ৰত্য সুধীমণ্ডলীর মধ্যে অবস্থিতি করিয়া বক্তৃতা, আলাে- চনা ও শিক্ষকতা করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, যে সকল নূতন বিদ্যা শিক্ষা করা হইয়াছে, বিদেশ- বাসের ফলে যে সকল বিষয়ে অভিজ্ঞতা (২) দেশে জন্মিয়াছে, এবং বিভিন্ন সভ্যদেশে দর্শন শিক্ষার আন্দোলন ও প্রচারক ৭৭: বিজ্ঞানাদি বিভাগে যে সকল উন্নত গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছে, সেই সমূদয় বিষয় মাতৃভাষায় আলােচনা, অনুবাদ, সঙ্কলন ও সমালো- চনা করিবার জন্য মনােযােগী হইতে হইবে। এতদ্ব্যতীত, এদেশে যে সমুদয় ব্যবসা, বাণিজ্য, কারখানা, বিদ্যালয়, ল্যাবরেটরী প্রভৃতি সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, এবং শিবিষয়ক অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের সূচনা হইয়াছে তাহাদিগকে রক্ষা ও পুষ্ট করিবার জন্য লাভালাভ নিরপেক্ষ হইয়া এবং সমা- জের সহানুভূতির আশায় বসিয়া না থাকিয়া কয়েক জনকে কর্ম করিতে হইবে। জেলায় জেলায় ভ্রমণ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী জাতির মধ্যে বাস করিয়া শিল্প, ব্যবসায়, বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রের বিভিন্ন কার্যকরী প্রণালীসমূহ হাতেকলমে পরীক্ষা দ্বারা দেখাইতে হইবে। এই উপায়ে সাময়িক প্রদর্শনীর ফলসমূহ স্থায়ী আকার লাভ করিবে। অধিকন্তু, মৌলিক অনুসন্ধান, স্বাধীন গবেষণা, বিজ্ঞানালাে- চনা, ইতিহাসের তথ্যসঙ্কলন এবং শিল্প ও ব্যবসায়-বিষয়ক পরীক্ষা প্রভৃতি কার্যের জন্যই কতিপয় লােকের সম্পূর্ণ শক্তি ও সময় নির্দিষ্ট করিয়া রাখিতে হইবে। এই সকল বিষয় সর্বদা মাসিক, সাপ্তাহিক, দৈনিক এবং অন্যান্য সংবাদপত্রে বিভিন্নভাষায় যাহাতে নিয়মিতরূপে প্রকাশিত হয় তাহার ব্যবস্থাও করিতে হইবে; এবং প্রয়ােজন হইলে স্বতন্ত্র পত্রিকা, পুস্তিকা, নিবেদনপত্র ও গ্রন্থাদি প্রকাশ করিয়া লােক- শিক্ষার সাহায্য করিতে হইবে।
No text on this page.
আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি
শিক্ষা সমাজ
সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মসম্বন্ধীয় অথবা আর্থিক কোন আন্দোলন,
অনুষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের সহিত কোন শিক্ষা সমিতি বা বিশ্ববিদ্যা-
বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য লয়ের কিছুমাত্র সংশ্রব থাকা উচিত নহে।
ও কার্যতালিকা
শিক্ষা-বিজ্ঞানের নিয়মানুসারে ও শিক্ষাতত্ববিদ
গণের পরিচালনায় বিদ্যাদান ও শিক্ষাবিস্তারই ইহার একমাত্র
উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ জন্য নিম্নলিখিত বিষয় গুলি ইহার
উদ্দেশ্যের মধ্যে পরিগণিত হইতে পারে
(ক) বিবিধ উপায়ে শিক্ষা বিস্তার করা,
(১) নিম্নশিক্ষাকে যথাসম্ভব অবৈতনিক করা,
(২) স্থানে স্থানে নৈশ-বিদ্যালয়, লাইব্রেরী, গ্রন্থশালা প্রভৃতি
স্থাপন করা,
(৩) বালিকাদিগের শিক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা,
(৪) সাহিত্য, বিজ্ঞান, ঐতিহাসিক অনুসন্ধান প্রভৃতি শিক্ষা
বিষয়ক প্রবন্ধ, পত্রিকা বা পুস্তিকাদি প্রকাশ করা,
(৫) শিক্ষা সম্বন্ধীয় বিষয়ে প্রবন্ধাদি পাঠ অথবা প্রবন্ধ
প্রতিযােগিতার দ্বারা সঙ্গে বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানানুশীলন
উৎসাহিত ও বিস্তৃত করা।
শিক্ষা সমালােচনা (খ) শিক্ষকদিগের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা—এই উদ্দেশ্যে নি লিখিত উপায় অবলম্বন করিলে সুফল লাভ হইতে পারে- (১) ইহাদিগকে বিভিন্ন দেশের পণ্ডিত ব্যক্তি বা সুধী- মণ্ডলী প্রভৃতি বিদ্যার জীবন্ত উৎস ও কেন্দ্রস্থানে প্রেরণ। (২) ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকার্যের জন্য উপযুক্ত ধুরন্ধরগণের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ। (৩), বিভিন্ন স্থানের বিদ্যালয়টির শিক্ষা প্রণালী ও কাৰ্য্য- নিৰ্বাহ প্রভৃতি পরিদর্শনের দ্বারা অভিজ্ঞতা লাভের ব্যবস্থা। (৪) বিদ্যালয়ের পুস্তকাগার ও বিজ্ঞানালয়ের উন্নতিসাধন করিয়া স্বক্ষেত্রে উন্নত চিন্তা ও গবেষণার সহায়তা বিধান। (৫) প্রধান প্রধান পণ্ডিত বাক্তিগণের শুভাগমনের বন্দো- বস্ত করিয়া তাহাদের উপদেশ ও পরামর্শ গ্রহণ। (গ) শিক্ষকদিগের দ্বারা নিজ নিজ আলােচ্য বিষয়ে মাতৃভাষায় পুস্তক রচনা করাইয়া অধ্যাপনা কাৰ্যেৰ সুবিধান এবং জাতীয় সাহিত্য ও জ্ঞানভাণ্ডারের পুষ্টিসাধন। মানসিক শিক্ষার পর্যায় (১) কিয়ৎকাল পর্যন্ত প্রত্যেক ছাত্রকে সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং শিল্প এই বিবিধ বিষয়ই শিক্ষা করিতে হইবে। এই সময়ের আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি ৮) মধ্যে কয়েক বিষয় বর্জন করিয়া অপর কয়েক বিষয় বাছিয়া লইতে দেওয়া উচিত নহে। নিশিক্ষা বহু বিষয় এইরূপ সর্বতােমুখী হইলেই ভিত্তি দৃঢ় ও বিস্তৃত হয়, এবং উচ্চশিক্ষা সুফল প্রদান করে। (২) ইহার পরে কিছুকাল পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থায় ছাত্র- দিগের কৃতিত্ব অথবা বিশেষ অভিরুচি অনুসারে পাঠ্যের বিষয় বাছিয়া লইতে দেওয়া উচিত, কিন্তু কেবল কয়েকটি বিষয় একটি মাত্র বিষয় গ্রহণ করিতে দেওয়া সঙ্গত নহে। যে ছাত্র সাহিত্যে নিপুণ তাহাকে সাহিত্যের সংশ্লিষ্ট এবং সহায়তাকারী, আরও দু'একটা বিষয় গ্রহণ করিতে হইবে। বিজ্ঞানে যাহার অভিরুচি তাহাকে ইহার সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকটা বিষয় গ্রহণ করিতে হইবে । (৩) সর্বোচ্চশ্রেণীতে কেবল মাত্র একটা বিষয় শিক্ষা করিতে হইবে। পূৰ্বে ছাত্রের যে সমুদয় বিষয় গ্রহণ করিয়াছে, কলেজশ্রেণীতে তাহার মধ্য হইতে বিশেষ একমাত্র বিষয় একটি বিষয় বাছিয়া লইয়া আলোচনা করিতে হইবে। শিক্ষাপ্রণালী মানুষের মন গঠনের ও বুদ্ধিবিকাশের প্রধান উপায় ছােট হইতে আরম্ভ করিয়া ক্রমশঃ বড় প্রশ্নের মীমাংসা করিতে চেষ্টা করা। বাধা ও কষ্ট দূর করিবার যত চেষ্টা করা যায়, মনের শক্তি এবং দৃঢ়তাও তত বাড়িয়া থাকে।
৮২ শিক্ষা-সমালােচনা ; তাই লেখা পড়া সম্বন্ধে এরূপ নিয়ম হওয়া উ‘চ ৩ যে, বই যে পড়ি: ইবে তাহা নহে -অ[েচ্য ‘বষয় গুলি ভাল করিয়া বিচার করতে পারলেই হইল। এই প্রণা- "বান হলোচনা লাতে যথেষ্ট স্বাধীনতা থাকে, এবং ইহাতে * 1 1 ; • পুস্তকের ধ্যে আবদ্ধ ন' থাকিয়া শিক্ষকের সাহায্যে ০ বার নানা উপায়ে নানা মতের ভিতর দিয়া বুঝ না দেখিবার বিধা পাওয়া যায়। এ প্রণালী অবলম্বত হইলে ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞান, ভয। ই এ সমস্ত বিষয়ই এক নূতন ভাবে মনে স্থান পায় ; এবং নিজেও কিছু কিছু চিন্তা করিবার সুযোগ থাকে বলিয়া এরূপ পড়ার ক ন দীর্ঘকাণস্থায়ী হয়। কেবল ভাব-জগতের কর্তা না হইয়া বাস্তবের প্রতি দৃষ্টি পড়ে। এইজন্য দেশবিদেশে ভ্রমণ, নানা প্রকার লোকের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান, বস্তু সমূহের সহিত পরিচয় ইত্যাদি নানা উপায়ে জ্ঞানকে সবল ও দৃঢ় করিবার প্রবৃত্তি হয়। অর দুই চারি খানি বাধা বই না পড়িয়া জ্ঞাতব্য বিষয়টা আয়ও করিতে চেষ্টা করিলে প্রধান লাভ হয় ছাত্রেরা যখন বই পড়ে, তখন তাহারা যে পড়িতেছে কেবল গ্রন্থ-নির্দেশ-রীতি বর্জন এভাব থাকেন। লেখক কি ভাবে লিথিয়া- ছেন –কোন্ বিষয়ের পর কোন্ বিষয়ের অবতারণা করা উচিত কত উপায়ে কোন্ কোন্ “contex:'এ একই বিষয়ের অব- তারণা করা যায় ইত্যাদি লেখার পদ্ধতি ও লেখকের মূল মন্ত্র গুলি গাদশ শিক্ষা-পদ্ধতি is Iশ । । এ তব ২২ শেখা পড়তে পড়তে ‘পবির : শক্তির উ: ক হয় । “কে ব গ্রহণই না করিয়া রফে ; ব’–এ উ৮ আশা মনে স্থান পায়। তখন অমু- সখি? ৫। জ্ঞানের অপেষণে ব্যাকুলভাবে ঘুরিয়া বেড়াইতে ৭ ; সন্মে। ২২ ••র ; ৩২াস, বিজ্ঞান, শাস্ত্র, সাহিত্য ইত্যাদি • 1 নন ৫ 5ে |খে না দেখা নিজের চোখে কিরুপ নখ - ২ , ৭ ও ৭ পর ৩ করতে উৎসাহ হয়। তখন 1:রর ৩৭. । নিসের যায় ম বা করা বা অপরের কথা। পর ম ম জ ৰা সন্তুষ্ট থাকতে পারা যায় না। - ও নবী, সকল প্রকার ১৪াস্ত্রো ৩ ও কম্মের ম" ( • Iন, এবং•সক | প্রকার দৃশ্য ও শ্ৰব্য বস্তুর •ধ্যে থাকিয়া ৭.নর 1 পনের দ্বারা মানব ও এ ; প্রক। ৩র | ৩ sণ্ডার ই স লা তথ্যের অধিকার করি: প্রয়াস হয়। যা সত্য নগ্ন করা এক একটা বিজ্ঞান করিবার না জন্মে। (द যথাসম্ভব পুস্তকের সাহায্য ব্যতিরেকে শিক্ষা দনের ব্যবস্থা করা উচিত। অবশ্য 'তানার জন্য উপযুক্ত সময়ে কয়েকটী সাহিত্য-স-যুক্ত পুস্তক মোথিক শিক্ষা ব্যবহার করা যাইতে পারে। তবে নিম্ন- শ্রেণীতে ভাষাসমূহের প্রধান প্রধান অঙ্গ গুলির সহিত পরিচিত করিয়া দিবার জন্য পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করা সঙ্গত নহে। মুখে মুখে ভাষা ব্যবহার করিতে করিতে ব্যাকরণের ৪ শিক্ষা-সমালােচনা নিয়মগুলি আয়ত্ত করিয়া দিবার চেষ্টা করিলে ফ ভাল হয়। ইতিহাস-বিষয়ে নিম্ন শ্রেণীতে কথকতার আকারে গল্পের ভিতর দিয়া সমগ্র ইতিহাসের অন্তস্বরূপ প্রধান প্রধান ঘটনা, আন্দোলন ও মহাপুরুষদিগের কাহিনী শিগ্নাইয়া দেওয়া উচিত, এবং উচ্চ শ্রেণীতে কেবল একটা মাত্র টেক্সট বুকের উপর নির্ভর না করিয়া—বিবিধ পুস্তকের সার-সঙ্কলন দ্বারা শিক্ষা প্রদান করা কর্তব্য। উদ্ভিদবিজ্ঞান, শরীর বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়ন- বিজ্ঞান এই চারি প্রকার বিজ্ঞানের প্রধান প্রধান বিষয়গুলি শিক্ষা দেওয়া উচিত। এজন্য আদৌ পুস্তকের ব্যব- হাতে কলমে কাজ হার করিতে হইবে না। ছাত্রের বিজ্ঞানালয়ে পরীক্ষা করিয়া উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গ স্বয়ং নিরীক্ষণ করিবে এবং জীব-শরীরের বিভিন্ন অবয়বের নমুনা দেখিবে। তাহাদিগকে ভেক- ছাগলাদির অঙ্গচ্ছেদও করিতে হইবে। অস্থি-বিদ্যা-বিষয়ক এবং জীবজগৎসম্বন্ধীয় মানচিত্র নিরীক্ষণ এবং চিত্র অঙ্কন করিয়া প্রকৃতির বিবিধ অভিব্যক্তির সহিত শিক্ষার্থিগণ সাক্ষাৎ সম্বন্ধে পরিচিত হইবার সুযােগ যাহাতে প্রাপ্ত হয়, তাহার ব্যবস্থা করা বিধেয়। সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা ছাত্রদিগকে চিত্র-বিদ্যা শিক্ষা করিতে হইবে। সাধারণ, বৈজ্ঞানিক ও অন্যবিধ চিত্র অঙ্কনের ব্যবস্থা প্রয়াে- নীয়। এতদ্ব্যতীত সুত্রধর এবং তন্তুবায়ের কর্ম শিক্ষা করিলে হস্ত চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের নৈপুণ্য জন্মিবার পক্ষে সুবিধা হয়।
আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি -৫ (খ) শিক্ষা-প্রণালীর গুণে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহের বাহুল্যে কোন শিক্ষায় বহুমুখীনতা অনিষ্ট সাধিত হয় না। বরং বিষয়গুলি পর- আখৰু শয় সম্বন্ধ বলিয়া উপকাই হইয়া থাকে। সময়-বিভাগ এমন ভাবে নির্ধারিত করা উচিত যাহাতে ছাত্রেরা অতি সহজেই বিষয় হইতে বিষয়স্তিয়ে মনােনিবেশ করিতে পারে। দৈনিক শিক্ষার জন্য সময় ব্যয় কিছু অধিক ভ্রমণ, অঙ্ক, কথোপ: কনজনিত আনন্দ হইলেও শিক্ষার্থীদের মানসিক শৈথিল্য জন্মে না। বিজ্ঞান-গৃহে বস্তুপরীক্ষা অথবা কারখানায় সমবেত হইয়া কৰ্ম্ম, চিত্রাঙ্কণে মনােনিবেশ, এবং ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্যপূর্ণ স্থানে ভ্রমণ অথবা তাহাদের বিবরণ শ্রবণ প্রকৃতি আমােদজনক বিষয় যদি শিক্ষা-ব্যাপারের প্রধান অঙ্গ হয়, তাহা হইলে গণিত এবং সাহিত্য-শিক্ষার সময়ে ছাত্রদিগের অবসাদ বা শিরঃপীড়া উপস্থিত হয় না। শিক্ষণীয় বিষয়ের সংখ্যাধিক্য হইলেও ছাএদিগের পক্ষে শিক্ষা- পদ্ধতি আনন্দদায়ক ও প্রীতিকর বােধ হইতে থাকে। পুস্তকের ভারে আক্রান্ত থাকিতে হয় না এবং মুখ बानबाज করিবার প্রয়ােজন হয় না বলিয়া তাহা বিছাভ্যাসে বিশেষ ক্লে বোধ করে না। বিদ্যারম্ভের কাল হইতেই বয়স ও ধারণার উপযােগ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান-শিক্ষার ফলে বাহগতের প্রকৃতি ও পরিবর্তনগুলি নিরী করিতে করিতে জ্ঞানেন্দ্রিয় সমূহের সম্যক্ অনুশীলন হইতে থাকে। মুদ্রিত পুস্তক আবৃত্তির পরিবর্তে প্রকৃতি-গ্রন্থপাঠ এবং বিজ্ঞানাগারে
শিক্ষা সমালােচনা
করে।
.
পদার্থসমূহের গুণ-বিচার ও কৌতুকোদ্দীপক পরীক্ষার ফলে চিত্তের
স্ফ ৰ্ত্তি জন্মে।
প্রধানতঃ মাতৃভাষার সাহায্যে নিম্নশ্রেণী হইতে সর্বোচ্চশ্রেণী
পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করিলে শিক্ষা দুরূহ না হইয়া সহজ হয় ;
এবং যাহা শিক্ষা করা যায় তাহা কেবল বাক্য
মাতৃভাষায় সৌকর্য
ও ভাষাগতই থাকে না, ভাব ও বস্তুগত এবং
জীবন্ত হইয়া প্রকৃত বাস্তব জীবনের বিবিধ অভাবমােচনে সাহায্য
অধিকন্তু, শিক্ষা অল্পায়াস-ও অল্পসময়, সুতরাং অল্প ব্যয়-
সাধ্য হয়।
(গ) প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির নিয়মাসারে শিক্ষাথীরা বসরাতে
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারিলেই গৌরব প্রাপ্ত হয়। বংসরের প্রতি
দিন বিদ্যাভ্যাসে মনােযােগী না হইলেও ছাত্রদিগের কোন অসুবিধা
ভােগ করিতে হয় না। এই রীতি বর্জন করা উচিত।
যাহাতে ছাত্রের প্রতিদিনই প্রতিদিনকার পাঠ সমাধা করিয়া
ফেলিতে পারে তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করা কর্তব্য।
ছাত্রদিগকে দৈনিক কাৰ্যে মনােযােগী হইতে
দৈনিক পরীক্ষাপদ্ধতি
বিশেষ উৎসাহিত 'করিয়া তাহাদের চরিত্রের
মধ্যে বিদ্যাচর্চার অভ্যাস ও স্থির জ্ঞান-পিপাসা সৃষ্টি করিবার জন্য
দৈনিক পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
প্রতিদিন ছাত্রদিগের পাঠের ফল নির্ধারণ করিয়া একটি
পুস্তকে লিখিয়া রাখা উচিত। বৎসরান্তে এই দৈনিক পরীক্ষার
ফলসমুহ যােগ করিয়া বাৎসরিক পরীক্ষার সহিত মিলাইয়া দেওয়া
L
আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি ৮৭ শেষ পরী- যাইতে পারে। সুতরাং বৎসরান্তে ছাত্রদিগের উচ্চতর শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হইবার সময় উচ্চ-নীচ স্থান কেবল মাত্র ৩। ৪ দিনের ক্রমা- গত কয়েক ঘণ্টা করিয়া পরীক্ষা গ্রহণের দ্বারা নির্ধারিত না হইয়া বৎসরের সমগ্ৰ কাৰ্য-ফলের উপর নির্ভর করে। প্রতি বৎসরে বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের মধ্যে বাৎসরিক ফলা- সারে পারিতােষিক বিতরণ করা হয়। যে নূতন প্রণালী বিবৃত হইয়াছে তদনুসারে ফল নিরূপিত হইলে অনেক সময়ে শেষ বাৎ- সবিক পরীক্ষায় যে ছাত্রেরা উচ্চস্থান অধিকার করে, তাহারাই সর্বোচ্চ পারিতােষিকের অধিকারী হয় না। ক্ষায় নিম্নস্থান অধিকার করিয়াও যদি কোন ছাত্রের সমগ্র বৎসরের কার্যফল সন্তোষজনক হয়, তাহা হইলে ও তাহাকে উচ্চ প্রশংসা প্রাপ্ত হইবার অধিকার দেওয়া উচিত। এই পদ্ধতিতে শিক্ষকেরাই পরীক্ষক ভাবে সমাজে গৌরব ও মৰ্যাদা ভি করিতে থাকেন। যাঁহারা বিদ্যা দান করিতেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি তাহারাই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের নিয়ন্ত। পরিবর্তন এবং ভাগ্যগঠনের কর্তা হইবার সুযােগ প্রাপ্ত হন। ইহাতে ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট, প্রশংসাপত্র, ডিগ্রি অথবা অন্য কোনও সম্মান-বিজ্ঞাপক লিপি প্রদানের যথার্থ মূখ্য নির্ধারিত হইতে পারে ; এবং বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র পরীক্ষামন্দির না থাকিয়া প্রকৃত পাঠশালা ও শিক্ষালয়রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারে। (ঘ) সাধারণ শিক্ষাপদ্ধতির নিয়মে অভিভাবকেরা ছাত্রদগের শিক্ষা-সমালােচনা মানসিক উৎকর্ষের পরিচয় পাইবার সুযােগ প্রাপ্ত হন না। বৎ- সন্তে সন্তানদিগের উচ্চশ্রেণীতে উঠিবার অভিভাবক ও শিক্ষালয় কৃতকাৰ্যতা বা অকৃতকাৰ্যতা দেখিয়া যৎ- কিঞ্চিৎ ধারণা করিতে পারেন মাত্র। কিন্তু অভিভাবকদিগকে ছাত্রগণের শিক্ষার ফল জানাইবার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা উচিত। দৈনিক পরীক্ষার ফলসমূহ প্রতিমাসের শেষে অভিভাবক গণের নিকট একখানি মুদ্রিত বিজ্ঞাপন-পত্রে প্রেরণ করা কর্তব্য। বিদ্যালয়ের অধীনে ছাত্রদিগের একটী আলোচনা-সভা থাকিলে উপকার হয়। সপ্তাহে কয়েকবার বিদ্যালয়ের অবকাশকালে সম্মি- লনীর অধিবেশন হইতে পারে। শিক্ষকগণও শিক্ষক-ও ছাত্র-সম্মিলন ঐ সভায় উপস্থিত থাকিবেন। ছাত্রের ইতি হাস, বিজ্ঞান বা নীতিসম্বন্ধীয় কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে স্বচিন্তিত প্রবন্ধ পাঠ করিবে এবং শিক্ষকগণের এই বিষয়ে ছাত্রদিগকে মৌখিক বা লিখিত উপদেশ প্রদান করিতে হইবে। এই প্রবন্ধসমূহ সংগ্রহ করিল বিদ্যালয়ের অধীনে পাক্ষিক বা মাসিকপত্র চলিতে পারে। এব্যতীত এই সমিতির অধিবেশনে বিদ্যালয়ের পুরাতন ছাত্রেরাও যােগান পুরাতন ছাত্র করিয়া নিজ পঠন্দশার সুজ বৃদ্ধি করিবার সুবিধা প্রাপ্ত হইতে পারে। ইহাতে বিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রত্যেক হাতের জীবনব্যাপী সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত থাকিতে পারে। বাত- বিক ইহার ফলে বিদ্যালয়ই যে শিক্ষার্থীর ভাগ্য গঠনের কর্তা, আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি এবং বিদ্যালয়ের চতুঃসীমা ত্যাগ করিলেই শিক্ষার্থীর বিদ্যাচর্চা শেষ হয় না, এই ধারণা সমাজে বদ্ধমূল হইতে পারে। নৈতিক শিক্ষা চরিত্রগঠনের ব্যবস্থা করিতে হইলে ছাত্রকে ত্যাগের পথে “চলিতে শিক্ষা দিতে হইবে। যে যে কাজে কিছু ক্ষতিস্বীকার করিতে হয়, যে সমাজে থাকিলে পরের জন্য একটু একটু খাটিবার অভ্যাস জন্মে, যেখানে পরােপকার করিবার সুবিধা আছে, শিক্ষার্থীকে সেই সকল বেষ্টনীতেই থাকিতে হইবে। পূৰ্ব্বে আমাদের দেশে যে শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল, তাহাতে ছাত্রকে গুরুগৃহে বাস করিতে হইত। তাহার ফলে ব্রহ্মচারীরা কেবল শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত বা নৈয়ায়িক হইয়া বাহির প্রাচীন ভারতে শিক্ষা হইতেন না—সেখানে সংযম, শৌচ, কৰ্ত্তব্য- পালন ও কর্মনিষ্ঠা ইত্যাদি সকল প্রকার মানুষােচিত গুণলাভের সঙ্গে শরীর বলিষ্ঠ ও কর্মঠ হইয়া উঠিত। গুরুগৃহের হাওয়াতেই অহঙ্কারনাশ, ভক্তিশ্রদ্ধা ইত্যাদি নৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান বীজ থাকিত। আমাদের আজকালকার অবস্থায়ও হাদিগের জন্য এই সংযম- পালন ও পরার্থে জীবনযাপনের সুবিধা করিয়া না দিতে পারিলে স্বার্থত্যাগ শিক্ষাদা- বিদ্যাশিক্ষার ভিত্তিই গঠিত হইবে না। তাই নােপযােগ কর্মকে পঠদ্দশাতেই সমাজের বিবিধ কাজের প্রতি মন যাতে আকৃষ্ট হয়—সমাজের বিভিন্ন প্রকার অভাৰমােচনের শিক্ষা-সমালােচনা ছােট ছােট আয়ােজন যাহাতে শিক্ষার্থিগণ নিজেরাই করিতে পারে, এরূপ মনুষ্যত্ব-গঠননাপযােগী ক্ষেত্র ও সুযােগ সৃষ্টি করিয়া দিতে হইবে। নিঃস্বার্থ কাজই নৈতিক জীবন-গঠনের প্রধান উপকরণ এবং ধৰ্ম্মজীবনের অবলম্বন। মানুষকে সংসারে প্রবেশ করিয়া পরিবার-পালন, পরােপকার, ধর্মচিন্তা, সন্তানসন্ততির বিবাহাদি, ভিক্ষুককে অন্নদান, রােগীর শু°ষা ইত্যাদি অনেক প্রকার কাজ গৃহস্থের জীবন করিতে হয়। হয়। অর্থ-রােজগারই একমাত্র কৰ্ত্তব্য থাকে না। মানুষ কেবল ভােগীই নয় । অনেক সময় ইচ্ছায় হ’ক অনিচ্ছায় হক তাহাকে ত্যাগ স্বীকারও করিতে হয়। বা ধর্মই তাহার একমাত্র কৰ্ম্ম থাকে না। বৈষয়িক ব্যাপারেও মায মনােনিবেশ করতে বাধ্য হয়। তাহার মরুষত্ব কেবল শরীর বা কেবল আত্মা লইয়া নহে—সেজন্য একমাত্র উদরান্নের চিন্তা বা কেবল ধৰ্ম্মচর্চাই জীবনের ব্রত হইতে পারে । সমাজের সাধারণ মানুষকে সকল প্রকার কাজই করিতে হয়। অতএব যে বয়সে সেই ভাবী জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়া যাই তেছে, তখন হইতেই এই সৰ্ব্বতােমুখী কৰ্ম্মের দিকে লক্ষ্য করিতে হইবে। মানুষ যদি কেবল একপ্রস্থ কাপড় ছাত্র-জীবনের কর্তব্য বা একথালা ভাত বা কেবল জপমন্ত্র হইত, তবে পঠদ্দশায় কেবল টাকাকড়ির বিদ্যা বা ধৰ্ম্মশাস্ত্র পড়িলেই চলিত। কিন্তু মানুষ নানা প্রকার ইন্দ্রিয়ের ও প্রবৃত্তির সমবায়ে সৃষ্ট, তাই সকলকেই চরিতার্থ করিতে হয়। সেজন্য শিক্ষার আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি উদ্দেশ্য কেবল অর্থসংগ্রহই হইতে পারে না। মানুষকে ভবিষ্যতে সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মবিষয়ক, আর্থিক ইত্যাদি যত প্রকার কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইতে হইবে—ছাত্রাবস্থায় প্রত্যেকটীরই সাধনা হইলে শিক্ষাপদ্ধতিকে সম্পূর্ণ বলা যাইতে পারে। ভবিষ্যৎজীবনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে এরূপ শিক্ষা লাভ হইলে ছাত্র ও অভিভাবকগণ এখন হইতেই নিজ নিজ পথ বাছিয়া ইতে সমর্থ হয়। তাহা না হই। “এখন লেখাপড়া আরম্ভ ত ক রা যাক” এই ভাবিয়া লক্ষ্যহীন ভাবে বিদ্যারম্ভ করা হয় এবং অন্যের অভি- প্রায় মত শিক্ষা প্রাপ্ত হইয়া পরে দেখা যায় যে—না হইল শিক্ষা- লাভ, না স্বার্থসিদ্ধি। কিন্তু আদর্শ স্থির করিয়া দিলে ভবিষ্যতে একেবারে অধীর হইয়া পড়িতে হয় না। পরীক্ষার ফলাফলে জীবন সার্থক বা নিস্ফল মনে হয় না। দুটা একটা পাশে বেণী যায় আসে না। তখন জানা থাকে যে, যাই ফা হক না, সাধ্য অসারে চেষ্টা ত করা গিয়াছে, এখন শক্তি থাক বা না থাক জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সিদ্ধ করিতে চেষ্টা করা যাইবে । বিদ্যালয়ের শাসন বিদ্যালয় স্থানীয় সকলেরই সাধারণ সম্পত্তি হওয়া উচিত, এবং সকলেরই পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিগণগঠিত সমিতির হস্তে ইহার পরিচালনা ও শাসনভার ন্যস্ত থাকা সঙ্গত। পরিচালনা-সমিতি তাহা হইলে সকলেই ইহার উন্নতিবিধানে শিক্ষা-সমালােচনা বঙ্গ করিতে সুযােগ প্রাপ্ত হন। সকল বিষয়েই অভি- ভাবকগণ, জনসাধারণ এবং শিক্ষকেরা সম্মিলিত হইয়া কাৰ্য্য করিতে পারেন। এই উপায়ে ইহার ভবিষ্যতের জন্য সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব উপলব্ধি করিতে সমর্থ হন। বিদ্যালয়ের কাৰ্যনিৰ্ব্বাহ, আয়ব্য, বিধিব্যবস্থা প্রভৃতি সকল বিষয়েই কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকগণের মধ্যে সহযােগিতা থাকিলে পরস্পর পরস্পরের অনুকূল ও সহায় হইতে পারেন। ফণতঃ বিদ্যালয় সুশাসিত এবং ছাত্রগণ সুনিয়ন্ত্রিত হইতে পারে। যদি ছাত্র ও শিক্ষকদিগের একত্ৰ বাসের ব্যবস্থা না থাকে, তাহা হইলে ছাত্রদিগের সর্বাঙ্গীন উৎকর্ষ বিধান করিতে হইলে শিক্ষক ও অভিভাব- কর্তৃপক্ষকে অনেক বিষয়ে অভিভাবকদিগের সাহায্য গ্রহণ করিতে হইবে। এজন্য ছাত্র- দিগের গৃহের চরিত্র ও পাঠাভাস এবং গুরুজনের প্রতি আচরণাদি সম্বন্ধে অভিভাবকগণের হন্তে সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা এ সকল বিষয়ে শিক্ষকদিগের শাসন অথবা বিদ্যালয়ের বিধান বিশেষ ফলপ্রদ হইতে পারে না। কিন্তু যে সকল ছাত্র বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে শিক্ষকদিগের তত্ত্বাবধানে বাস করে, তাহাদের চরিত্রের জন্য বিদ্যালয় দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারে। সাধারণত ছাত্রদিগের চরিত্র ও শাসন সম্বন্ধে অভিভাবক মাণের নিম্নলিখিত নিয়ম পালন করা উচিত (ক) তত্ত্ববধানস্থ কোন ছাত্রকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিবার সময়ে কেম সংখা উচিত ।
আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি অভিভাবককে স্বহস্তে লিখিত অনুমতি পত্র প্রদান করিতে হইবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র পূর্বে কোন বিদ্যালয়ে পড়িত কি না, পড়িলে সেই বিদ্যালয়ের বেতনাদি সমস্ত প্রাপ্য দেওয়া হইয়াছে কি , এবং সেই বিদ্যালয়ে তাহার কিরূপ আচরণ ছিল ইং বিষয়ের সার্টিফিকেট প্রদান করা কর্তব্য। (খ) বিদ্যালয়ের অবকাশকালে ছাত্রের গৃহে কিরূপ আচরণ করে, অবকাশের পর বিদ্যালয় খুলিবার সময়ে অভিভাবকদিগের তদ্বিষয়ে মন্তব্য প্রকাশ করিয়া কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাপন করা কর্তব্য। (গ) স্থানীয় লােকহিতকর কোন কার্যে যােগদান করিতে হইলে, অথবা বিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে কোন কাৰ্য করিবার জন্য অথবা গ্রামান্তরে যাইয়া শিক্ষাপ্রচার বা অর্থসংগ্রহ করিবার জন্য অভিভাবকগণের অনুমতি গ্রহণ কর্তৃপক্ষগণের কর্তব্য। (ঘ) প্রতিমাসে অভিভাবকগণের নিকট ছাত্রদিগের যে দৈনিক পরীক্ষার ফল-বিজ্ঞাপনপত্র প্রেরিত হয় তাহাদিগের সেই ফল- বিজ্ঞাপনপত্রে গৃহের চরিত্র সম্বন্ধে মন্তব্য লিখিয়া কর্তৃপক্ষকে তাহা পাঠান উচিত। অধ্যাপক অধ্যাপকগণের একাধারে অনেক গুণ থাকা আবশ্যক। কেবল অধ্যাপকের গুণ মাত্র পাঁচ ঘণ্টা স্কুলে কয়েকটী বইএর অর্থ করিয়া ছাত্রগণকে মুখস্থ করাইয়া দিতে পারিলেই অধ্যাপকদের কর্তব্য শেষ হয় না। ইহাদিগকে প্রথমতঃ ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (১) শিক্ষক ৯৪ শিক্ষা-সমালােচনা ১, এবং সাহিত্য-সংলােচনা প্রভৃতি বিশেষ কোন এক শাস্ত্রানুশীলনে রত থাকিয়া প্রকৃত পণ্ডি ৩ভাবে সত্য আবি- (২) বিশেষজ্ঞ স্কারের জন্য বিদ্যাচর্চার জীবন অতিবাহিত -ফরিতে হইবে। তেমনি অপর দিকে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের পরিচানাবিষয়ক সকল প্রকার কর্ম, ছাত্রগণের চরিত্র গঠন, তাহাদের *ধ্যে শৃঙ্খলা আনয়ন, সাধারণের (৩) ধুন্ধর ধ্যে শিক্ষাবিস্তার, বিদ্যালয়ের পরিদর্শন প্রভৃতি বিবিধ শাসন কার্য্য করা ও তাহাদের কর্তব্যের মধ্যে পরিগণিত। তৃতীয়তঃ শিক্ষার্থীর বয়স ও প্রবৃত্তির বিকাশানুযায়ী কখন কোন্ বিষ্ঠা আলােচিত হওয়া যুক্তিসঙ্গত, তাহাকে কোন্ কোন্ বিষয় এবং কত বয়সে কোন্ বিষয়ের ফত অংশ শিক্ষা দেওয়া উচিত এই সমুদয় শিক্ষাবিজ্ঞান- (৪) শিক্ষাতত্ত্ব সম্বন্ধীয় বিষয়ে উপযুক্ত জ্ঞান লাভ করিবার জন্য সকল শাস্ত্র এবং সকল বিদ্যার প্রতি অনুরাগী থাকিয়া অধ্যাপকদিগকে প্রকৃত “এডুকেশনিষ্ট” বা শিক্ষাতত্বজ্ঞের মর্যাদা লাভ করিতে হইবে। পুস্তকের সাহায্য না লইয়া অধিকাংশ শিক্ষা প্রদান করিতে হইলে শিক্ষকদিগকে বিবিধ পুস্তকাদির সার- (৫) গ্রন্থকার সংগ্রহ করিয়া স্বাধীনভাবে শিক্ষণীয় বিষয়ের পাঠ প্রস্তুত করিতে হয়। ইহারা এই সকল বিষয় শৃঙ্খলীকৃত করিয়া পুস্তকাকারে লিখিতে বাধ্য হন।
আদর্শ শিক্ষা-পদ্ধতি ৯৫ এতদ্ব্যতীত, বিদ্যাদানই ধৰ্ম্ম মনে করিয়া যাহারা শিক্ষাবিস্তার কাৰ্য জীবনের বতস্বরূপ গ্রহণ করিতে পারেন না, তাহাদিগের দ্বারা শিক্ষাবিভাগের কাৰ্য সুচারুরূপে চাতে পারে না। কিন্তু সেরূপ শিক্ষক অতি বিরল। এই সকল কারণে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের কার্যোপযোগী শিক্ষক তৈয়ার করিয়া লইবার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এই উদ্দেশ্যে যে সকল ছাত্রের। কলেজেব উন্নত শ্রেণীতে পড়িতেছে এবং বিবাদানকার্যে অব্যাপকগণের শিক্ষা বাহাদের প্রকৃত প্রবৃওি আছে, এরূপ শিক্ষানু- রাগী অধ্যয়নশীল ছাত্রদিগকে অধ্যাপনাকার্যে নিযুক্ত করিলে ভবিষ্যতে সুফললাভ হইতে পারে। অবশ্য সেই ছাত্র-শিক্ষকগণের উচ্চতর শিক্ষার ভার গ্রহণ ও বিদ্যালয়ের পরিচালকগণের কর্তব্য। শিক্ষার্থীদের কথশি। মানসিক উংকৰ সাধিত হইবার পর সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সহিত যুগপৎ অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা কার্য সম্পন্ন যুগs অধ্যয়ন ও অধ্যা হইবার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। তাহা হইলে পনার অবশ্যকতা জ্ঞানানুশীলনে, উন্নতি সাধিত হয়। কারণ শিক্ষক তাকাৰ্যে বিদ্যালয়ের পরিচালনা ও শিক্ষা প্রণালী প্রভৃতি শিক্ষাপদ্ধতিসম্বন্ধীয় বিষয়সমূহে অভিজ্ঞতা জন্মে, স্বাধীনভাবে কৰ্ম্মকে গড়িয়া তুলিবার দায়িত্বগ্রহণে সাহস হয় এবং ক্রমশঃ নিজ নিজ বিশেষ আলােচ্য বিষয় বাছিয়া লইয়া কেবলমাত্র সেই বিষয়েই সম্পূর্ণ মনােযােগী হইবার সুযােগ পাওয়া যায়। অধিকন্তু, প্রয়ােগের ক্ষেত্র পাইয়া পূৰ্ব্বোপার্জিত
শিক্ষা-সমালােচনা
জ্ঞান অনেক বিষয়ে সম্পূর্ণতা লাভ করে, এবং সরস ও বদ্ধমূল
হয়। এতদ্ব্যতীত, সকল বিষয়েই স্বাধীন চিন্তাশক্তির বিকাশ
সাধিত হইতে থাকে এবং শিক্ষাপ্রচাররূপ লােকহিতকর কাৰ্য্যে
যােগদানের ফলে পঠদ্দশাতেই প্রকৃত নৈতিক চরিত্র গঠনের
সূত্রপাত হয়।
বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা প্রায় দুই পুরুষ কাল ইংরাজী ধরণের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবে ভারতবাসী শিক্ষিত ও দীক্ষিত হইয়া আসিতেছেন। এই শিক্ষা- ধর্মশিক্ষার আয়ােজনের প্রণালীর একটা অসম্পূর্ণতার দিকেও প্রথম জন্য আকাকা হইতেই সকলের দৃষ্টি পড়িয়াছে। সেটা বিদ্যা- চর্চায় ধর্মশিক্ষার অভাব। দেশীয় লােকেরা অল্পকালের মধ্যেই দেখিলেন, সমাজে ভক্তি ও প্রেমের বন্ধন চলিয়া যাইতেছে, শ্রদ্ধার সম্বন্ধ কমিয়া আসি তেছে। তাহা নিবারণের জন্য ভারতবর্ষের স্থানে স্থানে বিদ্যা- লয়ের বাের্ডিং-গৃহে নীতি ও ধগ্রন্থ পড়াইবার আয়ােজন হইল, এবং ছাত্রাবাসের মধ্যে দেবালয় ও মন্দিরপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলিতে লাগিল। ক্রমশঃ রাজপুরুষেরাও ভাবিলেন-সমাজের এইরূপ নীরব প্রতিবাদসমূহ কি একেবারেই অমূলক। শিক্ষিত সমাজে রাজদেষের ভাৰ, নরহত্যার প্রবৃত্তির জন্য যে ধর্মহীন শিক্ষাপদ্ধতিই দায়ী নয়, তাহা কে বলিতে পারে? ইতিমধ্যে জাতীয়-শিক্ষাপরিষৎ শিক্ষার আয়োজনে ধর্মের ব্যবস্থা করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন, আর এ জন্য দুইটা নূতন বিশ্ব বিদ্যালয়ই প্রতিষ্ঠিত হইতে চলিল। এই সকল কারণে বিদ্যার * চুচুড়া সাহিত্যসম্মিলনে পঠিত, ফান, ১৩১৮ ৭ ৯৮ শিক্ষা-সমালােচনা সঙ্গে ধর্মশিক্ষা হইতে পারে কি না গবমেটের শিক্ষাবিভাগও তাহার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তাহা ছাড়া সরকারের অধীনে একটা স্বতন্ত্র রিসার্চ ইনষ্টিটিউট বা উচ্চ বিদ্যালয়- প্রতিষ্ঠারও আয়ােজন হইতেছে। সেখানে আমাদের প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনের আলোচনায় বিশেষরূপ উৎসাহ ও সাহায্য দেওয়া হইবে। সুতরাং আশা করা যায়, শীঘ্রই দেশে ধৰ্ম্মশিক্ষার ব্যবস্থা হইয়া যাইবে। কিন্তু এই সঙ্গে আধুনিক ভারতের একটা বড় দুর্ভাগ্যের কথা মনে পড়িতেরে। আমাদের মঙ্গলের জন্য অনেক চেষ্টা হয় বটে, আধুনিক ভারতের কিন্তু আমাদের সমাজের অভাব ও স্বভাবের দুর্ভাগ্য সঙ্গে প্রায় কোন অনুষ্ঠানেরই যথার্থ সম্বন্ধ থাকে না। অন্যকালে বা অন্যদেশে হয় ত কোন অনুষ্ঠানে সুফল পাওয়া গিয়াছে। ভালরকম চিন্তা না করিয়াই তাহার প্রয়ােগ আমাদের সমাজেও চলিতে থাকে। এখানে কোনও আইন চালাইতে হইলে বিদেশ হইতে তাহার নমুনা আনা হয়, বিদেশেই তাহার খড়া প্রস্তুত হয়। ভারতবাসীর আর্থিক উন্নতিবিধান করিতে হইবে?—বড় বড় ফ্যাক্টারী ও কারখানা তৈয়ারী আরম্ভ হইল, অবাধ-বাণিজ্যনীতি প্রচলিত হইয়া গেল। নিম্নশ্রেণীকে শিক্ষা দিতে হইবে? অমনি জাতিভেদ ভাঙ্গিবার প্রয়ােজন বােধ হইল, অথবা অসংখ্য ম্যাজিক লণ্ঠন কেনা হইল! স্বাস্থ্যরক্ষা করিতে হইবে ? ফুটবল ডাম্বেলে বাজার ভরিয়া গেল। একতা বাড়াইতে হইবে। হিন্দু-মুসলমান
বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা
ব্রাহ্ম-খৃষ্টান এক টেবিলে খাইতে বসিয়া 'ভাই ভাই এক ঠাই
হইয়া গেলেন। বাস্তবিক শিক্ষাই হউক, বা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারই
হউক, সামাজিক আচার-ব্যবহারই হউক বা বৈষয়িক কাজকর্ম
হউক—যাহাতে উন্নতির প্রয়ােজন, তাহাতেই ব্যবস্থা করা হয়—
নিজেদের ‘ধাত’, নিজেদের গতি, নিজেদের অতীতের সম্যক
আলোচনা না করিয়া ।
এইরূপ অস্বাভাবিক ব্যবস্থার কারণ আছে। প্রায় সকল
বিষয়েই আমাদের চিন্তা ও কাৰ্য্য এবং উন্নতির প্রবর্তক—আমাদের
পাশ্চাত্য কর্মিগণের
শাসনকর্তারা। তাহাদেরই অধ্যাপক ও প্রচারক
নেতৃত্ব শিক্ষাব্যাপারে আমাদের নেতা। তাহাদেরই
এঞ্জিনীয়র ও চিকিৎসক আমাদের আধুনিক বৈষয়িক ও ভৈষজ্য
কৰ্ম্মে আমাদের পথপ্রদর্শক। সুতরাং তাহাদের পাশ্চাত্যজগতের
অভিজ্ঞতা এবং স্বদেশের জাতীয়শিক্ষার প্রভাব ছাড়া তাহাদের
নিকট আমরা আর কিছু আশা করিতেই পারি না।
আমাদের দেশের যাহারা তাহাদের দৃষ্টান্তে, অধ্যাপনায় ও উৎসাহে
কাজ করিতে আরম্ভ করিতেছেন, তাহাদের মধ্যে বেশী লােক
স্বাধীনভাবে চিন্তা করিয়া কৰ্ম্মে অগ্রসর হইতে সুযােগ পান নাই।
আমরা এখনও অনুকরণের যুগেই আছি, আমাদের বিশিষ্ট চিন্তা-
প্রণালী ও স্বাতবােধ বিকাশলাভ করে নাই।
বিশেষতঃ আমাদের অনেকেই কালাইল, হুইটম্যান, টলষ্টয়
প্রভৃতি আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাবীরগণের ভাবুকতা ও
অতীন্দ্রিয়তায় মুগ্ধ। তাহার এই আধুনিক আধ্যাত্মিকতার
আর
শিক্ষা-সমালােচনা
সন্ধান পাইয়াই প্রাচীন হিন্দু-সভ্যতার মর্মস্থল অধিকার করিয়া
ফেলিয়াছেন এইরূপ তাঁহাদের ধারণা। সুতরাং এখন পর্যন্ত
স্বদেশীয়গণের চিত্ত আমাদের প্রকৃত জাতীয় স্বাতন্ত্র, আমাদের
সংমােহন
সভ্যতার মূলমন্ত্র, আমাদের সামাজিক জীবনের
বৈচিত্র্য বুঝিবার জন্য কেহই 'চেষ্টা করিবার প্রয়োজনই বােধ
করেন না। উপনিষদ ও গীতার দুই চাৰিটা শ্লোক মনে রাখিলেই
হইল,আর বৈদান্তিক উপদেশ, আত্মার অমরতা, জীবনের
সাধনা প্রভৃতি আলোচনার জন্য ভাবনা কি? রুসসা, ব্রাউনিং,
এমাসন, সােপেনহয়ার ঘাঁটিলেই চলিতে পারে ।
আমাদের চিত্তে স্বাতন্ত্র্যবােধ এতই কমিয়া গিয়াছে যে, আমরা
আমাদের চারিদিক্কার অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থা বিচার করিতে
শিক্ষার ব্যবস্থায়
পারি না। আমাদের প্রকৃতির উপযােগী
সমস্যার মীমাংসা কোন অনুষ্ঠান আবিষ্কার করিয়া লওয়া
আমাদের পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব। ধৰ্ম্মশিক্ষার আয়ােজন
করিতে হইবে? অমনি পাশ্চাত্যসমাজের যুক্তিগুলি মনে পড়িয়া
গেল—তাহাদের সমস্যাগুলি আমাদের সমাজে টানিয়া আনিতে
আরম্ভ করিয়াছি। তাহাদের আশঙ্কাগুলিও মনের মধ্যে আধি-
পত্য বিস্তার করিয়া বসিয়াছে।
ইউরােপ ও আমেরিকার নেতৃবর্গ মনে করেন—বিদ্যা ও ধর্ম
পরস্পরবিৰােধী। বিদ্যালয়ের গভীর মধ্যে
ধর্মের প্রভাব বিস্তার করিলে বিদ্যার সর্বনাশ
আবার ধর্মের প্রতিষ্ঠানে বিদ্যৰ আধিপত্য
বিদ্যালয়ে ধৰ্ম্মাশিক্ষা ১০১ প্রতিষ্ঠিত হইলে ধৰ্ম্মভাব জলাঞ্জলি দিবার জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত। দুয়ে কখনই মিলিতে পারে না,—বিদ্যা আলােক, ধৰ্ম অন্ধকার। বিদ্যা যুক্তি ও তর্কের সন্তান, ধৰ্ম্ম শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের আশ্রিত। বিদ্যা পৃথিবীর উপর মানুষের অধিকার বাড়াইয়া দেয়, ধর্ম ঈশ্বরের অবতারণা করিয়া মানুষের শক্তিকে সংযত ও সঙ্কুচিত করিয়া ফেলে। বিদ্যায় ভবিষ্যংকে দখল করিবার প্রবৃত্তি জন্মে, ধৰ্ম্মে অতীতের প্রতি মমতা বাড়িতে থাকে। বিদ্যা মুক্তির উপায়, ধৰ্ম্ম বন্ধনের কারণ। সুতরাং আমরা 'সােণার পাথরবাটী’ অথবা কঁঠালের আমসত্ব’ বলিলে যেরূপ ধারণ করিতে পারি, পাশ্চাত্যজগতের বিচক্ষণ ব্যক্তিরা বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থায় সেইরূপই এক অসম্ভব অস্বাভাবিক সংযোগের ভায়ে এত হন। তাহাদের আর এক ভয়ের কথা—ধর্ম সম্বন্ধে বিভিন্ন মতবাদ এবং বিচিত্র ধর্মসম্প্রদায়। শিক্ষার ব্যবস্থায় ধর্মচর্চার আয়ােজন করিতে হইলে দেশের কোন্ সম্প্রদায়ের, কোন মতবাদের প্রশ্রয় দেওয়া হইবে? দলাদলি, সংগ্রাম ও বিরােধ যে তাহা হইলে সমাজে চিরন্তন হইয়া পড়িবে। পাশ্চাত্যজগতে ধৰ্মসংগ্রাম, ধৰ্মনিৰ্যাতন, ধৰ্ম্মকলহের ইতিবৃত্ত পুনরায় অভিনীত হওয়া কখনই শ্রেয়স্কর নয়। সুতরাং বিদ্যালয়ের আবেষ্টনের মধ্যে ধর্মের কথা তুলিয়া রাষ্ট্রীয় অনৈক্য ও মতভেদগুলি বাড়াইয়া তুলিবার প্রয়ােজন নাই। এই কুসংস্কার ও অনৈক্য-বৃদ্ধির ভয় আমাদের নেতৃবর্গকেও ১০২ শিক্ষা-সমালোচনা আক্রমণ করিয়াছে। কেবল তাহাই নহে। পাশ্চাত্যজগতে এই সমুদয় মীমাংসা করিবার যে কৌশল আবিস্কৃত হইয়াছে, আমাদের দেশেও তাহারই প্রচলন হইবার উপক্রম মীমাংসা হইয়া উঠিয়াছে। সেই সকল দেশে বিশ্ব- বিদ্যালয়ের অধীনে একটা ‘থিয়লজিক্যাল ফ্যাকলটি' বা ধর্মসমিতি গঠন করা হইয়া থাকে। যথাসম্ভব সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে একটা ‘রফা করিয়া কতকগুলি আইন করা হয়। ধর্মশিক্ষা যাহাতে অত্যুচ্চ জ্ঞানবিজ্ঞানের নিয়মেই চলিতে পারে, যাহাতে ইহার মধ্যে সঙ্কীর্ণতা, প্রাদেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করিতে না পারে, তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি থাকে। জগতের অন্যান্য বিভাগের তথ্য আলােচনা যে উপায়ে হইয়া থাকে, তাহাই অবলম্বন করিয়া ধৰ্ম্মজগতের সত্যগুলিও অনুসন্ধান করিতে বিধান করা হয়। এই উপায়ে বিদ্যা ও ধৰ্ম্মে একটা সামঞ্জস্য সৃষ্টি করিবার প্রয়াস চলিতে থাকে। অধিকন্তু, সম্প্রদায়ভেদে ধর্মমন্দির, ছাত্রাবাস বা পাঠাগারের আয়ােজন হয়। আর স্থানে স্থানে মতবাদের প্রাবল্য অনুসারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যালয়ই প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকে। অবশ্য পাশ্চাত্যসমাজের অভাব পূরণের উপযােগী বলিয়াই পাশ্চাত্য শিক্ষানীতি এইরূপ বিচিত্র ধর্মশিক্ষা-পদ্ধতি অবলম্বিত সমালােচনা হইয়াছে। ইহাতে তাহাদের প্রয়ােজন সিদ্ধ ইতে পারে বটে, কিন্তু এই এক বিধানের দ্বারা পৃথিবীর সকল সমাজেরই অভাব মােচিত হইবে এমন কোন কথা নাই।
বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা মানবজীবনে ধর্মের স্থান সম্বন্ধে পাশ্চাত্যগণের ধারণা বিচিত্র। তাহারা মনে করেন—ঈশ্বরচিন্তা, ভগবানের আরাধনা, ধৰ্মকৰ্ম্ম মানুষের বিশেষ কতকগুলি কাৰ্য,অন্যান্য কর্ম ও চিন্তা হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাহার মস্তিষ্কে ধর্মচিন্তার জন্য একটা বিশেষ প্রকোষ্ঠ আছে, তাহার হৃদয়ে একটা বিশেষ বৃত্তি আছে, তাহার চিত্তে এ জন্য একটা স্বতন্ত্র আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা আছে। ধৰ্ম্ম অনেক কাজের এক কাজ মাত্রজীবনের বিচিত্র বিভাগের মধ্যে একটি বিভাগ মাত্র। মানুষ ঘােড়ায় চড়িয়া শারীরিক আনন্দ উপভােগ করিল, অথবা বিদ্যালয়ে যাইয়া পদার্থবিজ্ঞানের বক্তৃতা শুনিল, কিম্বা সাহিত্যসভায় আসিয়া ভক্তিবাদ প্রচার করিল, অথবা রাষ্ট্র সভায় আলােচনা করিয়া দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত করিল, কিন্তু তাহাতে ধৰ্মকৰ্ম্ম করা হয় না। তাহাদের বিবেচনায় ইহাতে তাহার শারীরিক বৃত্তির, মানসিক শক্তির অথবা সামাজিক প্রবৃত্তি সমূহেরই অনুশীলন ও পুষ্টি হইল মাত্র। তাহারা মনে করেন, ধর্মের জন্য মানবকে অন্য কতকগুলি বৃত্তির অনুশীলন করিতে হইবে। এ জন্য তাহার কতকগুলি মতবাদ গ্রহণ করা আবশ্যক। ধর্মের বিষয়ীভূত বিশিষ্ট কয়েকটি শাস্ত্র আলােচনা এর মানবজীবনের আক। ধর্মচিন্তা ও ধর্মকর্মের জন্য বিশেষ বিভিন্ন বিভাগের একটি কোন সময় নির্দিষ্ট করিয়া রাখা আবশ্যক। বিভাগমাত্র ঠিক যখন সেই নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থগুলি পড়া হয়, অথবা নির্দিষ্ট দিনে ধর্মসভায় বক্তৃতা শুনা হয়, অথবা ধৰ্ম্মবিষয়ক সমালােচনায় যােগদান করা হয়, কেবল তথনই মানুষের ধর্মাচরণ ১০০ শিক্ষা-সমালােচনা করা হইল, এইরূপই তাহাদের ধারণা। সুতরাং সেই দিনে সেই সময়ে সেই গৃহে যাহা করা হয় হউক, তাহার সঙ্গে দিবসের অন্যান্য চিন্তা ও কৰ্ম্মের, জীবনের অন্যান্য বিভাগের কোনরূপ সংস্রব নাই। তাহারা বিবেচনা করেন, গৃহস্থের নিত্যকর্ম-পদ্ধতির মধ্যে ধর্মকে একটা বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু সমগ্র গার্হস্থ্য জীবনে, পারি- বারিক কার্যকলাপে, সৌজন্তশিষ্টাচারে, শিল্প ও ব্যবসায়ে, রাষ্ট্রীয় কর্মে স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র নীতিশাস্ত্র—অর্থনীতি, পরিবারনীতি, রাষ্ট্রনীতি মানিলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইতে পারে। এই সকল কাৰ্য্য ও চিন্তার ক্রমান্বয় ও পৌর্বাপৌৰ্য্য স্থির করিবার জন্য ধৰ্ম্ম আলােচনা করিবার কোন প্রয়ােজন নাই। আর, বাস্তবিক ধর্মশিক্ষায় তাহারা কতকগুলি আলােচনা, গবেষণা, গ্রন্থপাঠ, সাহিত্যচর্চা মাত্র বুঝেন। থিয়লজিক্যাল ফ্যাকলটির বিধানে শিক্ষার্থিগণকে তাঁহাদের ধর্মপ্রচারকদিগের ধর্মশিক্ষা ইতিহাস- জীবনী সংগ্রহ করিতে হয়। কোন্ কোন্ শিক্ষার এক অধ্যায় মহাত্মা তাঁহাদের ধর্ম-ইতিহাসের স্তম্ভস্বরূপ, কবে কোথায় কিরূপভাবে কোন এক মতবাদ বা অনুষ্ঠান বিকাশ লাভ করিয়াছে, কোন মহাপুরুষ কি উপদেশ প্রচার করিয়া গিয়াছেন, ইত্যাদি বিষয়ের ঐতিহাসিক অনুসন্ধান করা হইয়া থাকে মাত্র। ধর্মগ্রন্থ পাঠই ধৰ্ম্মজীবনগঠনের উপায় বিবেচনা করিলে ধৰ্ম্মের ইতিবৃত্তসঙ্কলনই ধৰ্মকৰ্ম্ম হইয়া পড়ে। ইহাতে জাতীয় ইতিহাস অনেকটা স্পষ্ট ও বিশদ হইতে পারে, ইতিহাস-শিক্ষা কার্যকরী ও বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা । এক অদ সুখদায়ক হইতে পারে। ইহাতে দেশীয় ধর্মের পৌৰ্ব্বাপৌৰ্য, জাতীয় ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের বিচিত্র অঙ্গগুলি হৃদয়ের উপর বেশ প্রবলভাবে অধি- কার লাভ করিতে থাকে। জাতীয় শিক্ষার সার্থকতার পক্ষে ইহা যথেষ্ট প্রয়ােজনীয়, কারণ ইহাতে সমাজের ও দেশের অতীত ও বর্তমান অবস্থার প্রতি শিক্ষার্থী অতি সহজ ও স্বাভাবিক ভাবেই আকৃষ্ট হইয়া পড়ে। এইরূপ ধৰ্ম্মগ্রন্থ পাঠে আরও একটা লাভ আছে। দেশের পূর্বপুরুষগণ কোন্ প্রণালীতে চিন্তা করিতেন, তাহাদের ধৰ্ম্ম-শিক্ষা দর্শন-শিক্ষার আচার্যেরা বিশ্ব, দেবতা, পূজা, মানবের ভবিষ্যৎ প্রভৃতি সম্বন্ধে কোন্ কোন্ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মতবাদের মধ্যে বৈচিত্র্য ও পার্থক্য কি উপায়ে সাধিত হইয়াছে, সেই মতবাদসমূহ সাহিত্যকে প্রভাবান্বিত করিয়াছে কি না, জাতীয় জীবনের অন্যান্য বিভাগের চিন্তা ও কর্মসমূহ কি ভাবে তাহার ফলে রূপান্তরিত হইয়াছে—ইত্যাদি দর্শন ও সমাজতত্ত্ববিষয়ক বিবিধ প্রশ্নেরও আলােচনা করিবার সুযােগ থাকে। এই উপায়ে দেশের পূর্বাপর চিন্তাসমূহ ছাত্রের মনের মধ্যে অঙ্কিত হইয়া যায়। তাহাতে দেশকে চিনিবার পক্ষে, সমাজের প্রকৃতি বুঝিবার পক্ষে ছাত্র- বস্থায়ই সুবিধা পাওয়া যায়। তাহা ছাড়া দর্শন ও মনস্তত্বের আর এক বিভাগ ও এই উপায়ে আয়ত্ত হইয়া আসে। বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা দ্বারা ধৰ্ম্ম-বিজ্ঞানের নিয়মগুলি ধরিতে পারা যায়। মানুষের আদিম ১০৬ শিক্ষা-সমালােচনা ধর্মভাব, মানুষের চিরন্তন ধৰ্ম্ম-প্রবৃত্তি এবং বিচিত্র ধর্মকর্মের মধ্যে কি সাধারণ লক্ষণ আছে, তাহা এই ধৰ্ম্ম-বিজ্ঞান আলােচনার মধ্য দিয়াই স্পষ্ট হইতে থাকে। যাহা হউক, এই প্রকার ধৰ্ম্ম-শিক্ষার আয়ােজনে গণিত, সাহিত্য, রসায়ন প্রভৃতি অন্যান্য বিদ্যার ব্যয় ধৰ্ম্ম একটি বিদ্যা মাত্র। ইহাতে ধর্মশিক্ষা ইতিহাস-শিক্ষার বিশেষ এক অধ্যায়- রূপে অথবা দর্শন-শিক্ষার এক স্বতন্ত্র অধ্যায় ভাবে শিক্ষা-পদ্ধতিতে মৰ্যাদা লাভ করে, ধৰ্ম্ম বিশেষ একটি শিক্ষণীয় বিষয় মাত্ররূপে বিবেচিত হয়। কাজেই গণিতের ফ্যাকলটি”,ইতিহাসের ফ্যাকলটি, চিত্রবিদ্যার ফ্যাকলটির ন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ধর্মালােচনার এক ফ্যাকলটি বা সমিতি প্রতিষ্ঠা করিলেই যথেষ্ট হয়। এই ধৰ্ম্ম- সমিতি বিবিধ উপদেশসংগ্রহ, ধর্মতত্ত্ব-সঙ্কলন, ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ-নিবাচন, ধর্মবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যা- ধর্মচর্চা-প্রণালী, ধৰ্ম্ম-শিক্ষার সময়-নির্দেশ, ধৰ্ম্ম- লয়ের একটি স্বতন্ত্র শিক্ষক-নিয়ােগ প্রভৃতি যাবতীয় উপায়ে বিধি- প্রকোষ্ঠ ব্যবস্থা করিয়া থাকেন। গণিত, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে ছাত্রদিগকে মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষা করা হয়। ধর্মশাস্ত্র বিষয়েও এইরূপ পরীক্ষা হইয়া থাকে। বিদ্যালয়ের মধ্যেই বিজ্ঞানালোচনার জন্য ল্যাবরেটরী আছে, শিল্পশিক্ষার জন্য ওয়ার্কসপ কারখানা আছে, পাঠের জন্য লাইব্রেরী, গ্রন্থশালা, রীডিংরুম আছে। ধর্মের জন্যও সেইরূপ ডিভিনিটি গৃহ, ধৰ্ম্মালােচনার মন্দির ও ডিভিনিটি বিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়। পরীক্ষার ফলে, এম, এ, পি, এইচ, ডি, প্রভৃতির অনুরূপ, বি, ডি, ডি, ডি, উপাধি পাওয়া বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা ১০৭ যায় । ধৰ্ম্মের এই ‘ডি-ডি’গণ বক্তৃতা করিবার শিক্ষা পান, প্রবন্ধ লিখিবার শক্তি লাভ করেন,তর্ক-যুক্তি দ্বারা মতবাদ প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হন, কি উপায়ে বিভিন্ন সমাজের মধ্যে ধর্ম প্রচার করিতে হয় তাহা শিখিয়া থাকেন, লােকের সঙ্গে, ছাত্রের সঙ্গে, বিভিন্ন সমাজের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করিলে সুফল লাভ হয় ও কাৰ্য্য সিদ্ধি হইতে পারে তাহার বিষয়েও যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করেন। এতদ্ব্যতীত পাশ্চাত্য ধৰ্ম্মশিক্ষা-পদ্ধতিতে আর একটা উপকার হয়। ছাত্র ও শিক্ষকেরা অনেক গুলি নূতন ক্ষেত্রে একত্র মিলিতে পারেন, ইহাতে তাহাদের সামাজিকতা ও লৌকিকতা বাড়িতে ধৰ্ম্মশিক্ষায় মানসিক পায়, সমবেত চিন্তা ও কর্ম করিবার শক্তি পুষ্ট উন্নতি-সাধন হইতে থাকে, পরস্পরকে সহায়তা করিবার সুযােগ পাওয়া যায়। কিন্তু যাহাই হউক, এই শিক্ষা-প্রণালীতে ধর্মশিক্ষা মানসিক শিক্ষারই একটি বিশেষ অঙ্গমাত্র। অন্যান্য বিদ্যা- শিক্ষার ন্যায় ধৰ্ম্ম-শিক্ষায়ও মস্তিষ্কেরই সঞ্চালন হয়, চিন্তা করিবারই ক্ষমতা বিকশিত হয়, দার্শনিক ও ঐতিহাসিক গবেষণার সাহায্য হয়, আর সামাজিক জীবনের পুষ্টি হয়, সেক্সপীয়র ও কালিদাসের কাব্য সমালােচনা করিয়া, মনুসংহিতা বা প্লেটোনীতি পাঠ করিয়া, ‘পিগ্রিম প্রােগ্রেস বা হিতোপদেশের ব্যাখ্যা মুখস্থ করিয়াও ছাত্রগণ এই সকল বৃত্তিরই বিকাশ সাধন করে, এই সমুদয় শক্তিরই অনুশীলন করে, এই সমুদয় বিষয়েই যােগ্যতা ও সামর্থ্য লাভ করে। জার্মানি, আমেরিকা এবং ইউরােপের অন্যান্য দেশের থিয়ল- .
১০৮ শিক্ষা-সমালােচনা জিক্যাল ফ্যাকাল্টি বা ধর্মসমিতি-গঠন, ডিভিনিটি-মন্দির-প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মশিক্ষাদানের অন্যান্য উপায়গুলি আলােচনা করিলে আর একটা বিষয় বুঝিতে পারা যায়। তাহাদের শিক্ষাতত্ত্বের মূল কথাটা ব্যক্ত হইয়া পড়ে। তাহারা মানুষকে অতি ক্ষুদ্র ও সঙ্কীর্ণ ভাবে দেখেন। মানুষকে বড় ভাবে, মহৎ ভাবে দেখিবার প্রয়াস তাহাদের মধ্যে থাকে না । ইহজগৎই মানুষের সমগ্র লীলাভূমি ও কর্মক্ষেত্র, এই জন্মেই তাহার সম্পূর্ণ বিকাশ। এই গণ্ডীর মধ্যেই তাহাকে চিন্তা করিতে হইবে, কৰ্ম্ম করিতে হইবে। ইহার অতীত, বর্তমান-ব্যতিরিক্ত, পাশ্চাত্য মানবতত্ত্ব ও শরীর-ছাড়া এবং এবং মন-ছাড়া আর কোন সমাজতত্ত্ব জগতের অস্তিত্ব নাই। আত্মা তাহাদের নিকট মস্তিষ্কের একটা অলীক ধারণামাত্র, অসীমের উপলব্ধি, আধ্যাত্মিক ক্রমবিকাশ প্রভৃতি বিষয় তাহাদের নিকট ভাষার একটা অলঙ্কার বা উপমামাত্র। এই খানেই মানুষের শেষ, এই জীবনেই তাহার চরম সিদ্ধি। কিন্তু সমাজের মধ্যে থাকিতে হইলে সকল বিষয়েই প্রতিদিন দ্বন্দ্ব, বিরোধ, কলহ, অনৈক্য আসিয়া জুটে। তাহা নিবারণ না করিতে পারিলে সংসারের সুখ কোথায় ? পৃথিবী যে দৈনিক সংগ্রামের বঙ্গভূমি হইয়া পড়িবে! কাজেই শারীরিক ও মানসিক অনৈক্যগুলি যথাসম্ভব কমাইবার চেষ্টাই পাশ্চাত্য সমাজের প্রধান লক্ষ্য। তাহাৱা ভাষা ছাটিয়া, বেশভূষার আইন করিয়া, চালচলনের রীতি বিধিবদ্ধ করিয়া, দলে দলে চুক্তি করাইয়া যথা- বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা ১৩৯ সম্ভব বৈচিত্র্যের উচ্ছেদ সাধন করিতে চেষ্টিত হন। জীবনের কোন্ কোন্ বিভাগের মধ্যে কোনরূপ দ্বন্দ্ব হইবার সম্ভাবনা নাই, কোন্ কোন্ অংশ বাদ দিলে জোড়াতালি দিয়া একটা সামঞ্জস্য বিধান করা যায়, কোন্ কোন্ বিষয়ে একটা চলনসই সন্ধিপত্র দাড় করান যাইতে পারে, এই সব আবিষ্কার করাই তাহাদের উদ্দেশ্য। পাশ্চাত্য-সমাজের অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে এইরূপে বসিয়া মালিয়া, কাটিয়া ছটিয়া, মাঝামাঝি করিয়া বিরােধ ঘুচাইবার, অনৈক্য দূরীভূত করিবার আয়ােজন যথেষ্ট দেখা যায়। রাষ্ট্রসভায়, বিদ্যালয়ে, ধর্মশালায় তাহাদের এই এক লক্ষ্য। পাশ্চাত্য-জগতের এই বিচিত্র মানবতত্ত্ব ও সমাজতই তাহাদের বিশিষ্ট শিক্ষাতত্বের মুল। তাহারা মানুষকে অতি ক্ষুদ্র ভাবে দেখিয়াছেন, সমাজকে এই সংসারের মধ্যেই আবদ্ধ করিয়া- ছেন। এই জন্য বিরােধের ভয়ে তাঁহারা এত বিত। এই জন্য জাগতিক একটা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করিতে না পারিলে তাহারা ব্যস্ত থাকেন। এই জন্য যে সকল বিষয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা অল্প সেই সকল বিষয়ে তাহাদের সাহস নড় কম। কিন্তু মানবকে আর একভাবে দেখা যায়। কারণ মানুষ কেবল শরীরীই নহে। অসীম অনন্ত তাহাকে ঘিরিয়া আছে। দুই অনান্ত জগতের মধ্যে তাহার অবস্থান। আর তাহার আত্মা তাহাকে অসীমেরই এক আত্মীয় করিয়া এত মানবতণ রাখিয়াছে। সুতরাং কেবল মাত্র সসীমের কথা ভাবিলে, কেবল ইন্দ্রিয়ের বিষয় জানিলে, কেবল সংসার ও ১১০ শিক্ষা-সমালােচনা ভােগের জ্ঞান জন্মিলে সমগ্র মানবকে জানা হইল না। অতীন্দ্রিয়কে বাদ দিলে, অমরতাকে প্রত্যাখ্যান করিলে মানুষের ইতিবৃত্ত অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। কাজেই সমগ্র, সম্পূর্ণ মানবের চরম সিদ্ধি এই এক জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে হইতে পারে না। কত শত যুগযুগান্ত ভাইয়া তাহার লীলা, কত শত জন্মমরণে তাহার আত্মার সম্পূর্ণ বিকাশ, তাহার হিসাব কে রাখিতে পারে ? ফলতঃ ইহ- জগতের বিরােধ, অসম্পূর্ণতা ও ক্ষুদ্রত্বই মানুষকে প্রকৃত প্রস্তাবে ক্ষুদ্র ও সঙ্কীর্ণ করিয়া ফেলিতে পারে না।হত্তর পূর্ণতা ও সমগ্রতার মধ্যে অসংখ্য পার্থিব সঙ্কীর্ণতাগুলির যথানিৰ্দিষ্ট স্থান আছে। ইহাতে সাময়িক অসম্পূর্ণতায় ও সামঞ্জস্যের এবং সৌষ্ঠবে। হানি হয় না। এই বৃহত্তর সমগ্রতার সংবাদ আনিয়া দেয়—ধৰ্ম্ম। মানবের চরশসিদ্ধি এবং আত্মার সম্পূর্ণ বিকাশের উপায় আবিষ্কার করিয়া দেয়—ধৰ্ম্ম। এই উদ্দেশ্যে প্রতিদিনকার ক্ষুদ্র ধর্মতত্ত্ব ক্ষুদ্র চিন্তা ও সঙ্কীর্ণ কৰ্ম্মরাশির মধ্যে ধর্ম যুগযুগান্তকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই অনন্তোপলব্ধিই জীবনের প্রকৃত সামঞ্জস্য ও সৌন্দৰ্য্য বিধান করে। তাহার ফলে পার্থিবজীবনের সকল বিভাগই, সংসারের সকল চিন্তা ও কই, ভােগের সকল অনুষ্ঠানই সেই বৃহত্তর সত্তা, সেই অতীন্দ্রিয়- জীবনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ধৰ্ম্ম এই উপায়ে সসীমে অসীমের প্রতিষ্ঠা করে, ভােগে ত্যাগের প্রবর্তন করে, জন্মে ও মরণে অমৃতের প্রভাব বিস্তার করে। ধৰ্ম্ম সকল কর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করে, জীবনের । অসীমকে, বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা ১১১ । সকল অবস্থায় অমরতার প্রবর্তন করে। সুতরাং ধৰ্ম্ম কখনও মানবীয় কোন বিষয়কেই বর্জন করিতে পারে না। এ জই মানবের কোন কৰ্ম্মই ধৰ্ম্ম-ব্যতিরিক্ত হইতে পারে না। জীবনের সকল চিন্তা ও কর্মই ধৰ্ম্মনিয়ন্ত্রিত, সমগ্র জীবনই ধর্মের ক্ষেত্র। মানুষ শরীরের সাহায্যে যাহা কিছু করে, যত কিছু চিন্তা করে, সকলই ধৰ্ম্মজীবনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান। অন্তরিন্দ্রিয়ের দ্বারা যাহা কিছু করা যায় তাহাও ধৰ্ম্মেরই বিবিধ অনুষ্ঠান। এই সমুদয়ের ফলে সংসার পুষ্ট হয়, পরিবার গঠিত হয়, দেবতত্ত্ব সৃষ্ট হয়, রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয় ও শিল্পের বিকাশ হয়। সুতরাং বৈষয়িক জীবন ও রাষ্ট্রীয়জীবন, পারিবারিক জীবন ও ব্যক্তিগত জীবন সকলই ধৰ্ম্মজীবনের বিবিধ অভিব্যক্তিমাত্র। কেবলমাত্র ধর্মগ্রন্থ- পাঠ বা দেবারাধনাই, মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মসভায় বক্তৃতা করাই ধার্মিকের সাধন নহে। বিবাহ, শ্রাদ্ধ, দান, উপাসনা, পূজা, আলােচনা, ভ্রমণ, ব্যায়াম ও আচার-ব্যবহার সকলই ধর্মের সাধন। ধৰ্ম্মজীবনের পক্ষে কোন কর্ম ও চিন্তাই অবজ্ঞেয় নহে। সুতরাং ইহাদের মধ্যে পরস্পর বিরেধ ঘটিতে পারে না। ধৰ্ম্মা- ষ্ঠানসমূহের মধ্যে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাই। প্রকৃত ধার্মিক জীবনের সকল অনুষ্ঠানকেই অতিপ্রাকৃত ও অতিমানবীয় ভাবের দ্বারা সুন্দর, মহৎ ও অমর করিয়া তুলিতে প্রকৃত ধৰ্ম্মজীবনের পারেন। তিনি তাহার নৈসর্গিক দ্রদের মধ্যে, বিচিত্র সাধন শারীরিক বন্ধনসমূহের মধ্যে, ইন্দ্রিয়গত চিন্তা ও কর্মসমূহের মধ্যে মুক্তি ও অতীন্দ্রিয় সত্যের প্রভাব উপলব্ধি ১১২ শিক্ষা-সমালােচনা করেন। তিনি ভােগকে, সংসারকে বর্জন করেন না, ইহাকে ত্যাগের দ্বারা, বৈরাগ্যের দ্বারা সংযত ও সুশৃঙ্খলীকৃত করেন। তিনি প্রবৃত্তির উচ্ছেদসাধন করেন না—সন্ন্যাসের দ্বারা শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত করেন। বাহ আচার তাহার উপেক্ষার বস্তু নহে, রূপকল্পনা তাঁহার অনন্যোপলব্ধির প্রতিবন্ধক নহে। তিনি এই সমুদয় স্বাভাবিক অসম্পূর্ণতার ভিতর দিয়াই অসীম অনন্তের উপলব্ধি করেন। এইরূপে তাঁহার জীবনের সকল কাজেই অনন্তমুখীনতা থাকিয়া যায় ; জীবনের সকল অবস্থায়ই, সকল স্তরেই সন্ন্যাস ও সংসারের, বাসনা ও নির্বাণের সামঞ্জস্য ও সমন্বয় সাধিত হইতে থাকে। দেহাত্মক বুদ্ধি’র ক্রমিক ললাপ- সাধন তাহার সমগ্ৰ কাৰ্যকলাপের উদ্দেশ্য, সমগ্র জীবনে ত্যাগের নিয়ম পালন তাঁহার একমাত্র সাধনা। সুতরাং জ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বিরােধ ঘটিতেই পারে না। আয়ুৰ্বেদই আলােচনা করা হউক, অথবা নাস্তিকতার সমর্থনই করা হউক, ভৈষজ্য প্রস্তুত করাই হউক অথবা রাসায়নিক পরীক্ষাই করা হউক, দর্শনচর্চাই করা হউক বা দেবতত্ত্বের তথ্য সঙ্কলন করাই হউক, পরমাণুবাদ আবিষ্কার করাই হউক, অথবা সমাজের নেতৃত্বগ্রহণই করা হউক, প্রাগ,ম্যাটিজ’ প্রতিষ্ঠা করাই হউক বা কোন কর্মকেন্দ্রের সৃষ্টি ও পরিচালনা করাই হউক, প্রকৃত ধার্মিকের সকল চিন্তা ও কর্মই অনন্তমুখী, সকলই এই ত্যাগের আকাঙ্ক্ষা, অমৃতের সাধনা, মুক্তির ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত, সকলই ধর্মশাসনে সুনিয়ন্ত্রিত। কাজেই ধৰ্ম কোন বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা চিন্তা বা কম্মেরই প্রতিবন্ধক নহে, কোন বিদ্যারই প্রতিদ্বন্দ্বী নহে, কোন বিজ্ঞানেরই বিরােধী নহে। অতএব ধম্মশিক্ষার জন্য মানবের সমগ্র জীবনের হিসাব রাখিতে হইবে। ভাবিতে হইবে--কি উপায়ে মানুষ ইন্দ্রিয়সুখকে প্রকৃত শৰ্ম্মশিক্ষার সমথের অধীন কবিতে পারে, শরীরকে উদ্দেশ্য আত্মার 'আয়ত্ত করিতে পারে, তাহার নৈসর্গিক ভােগপ্রবৃত্তিকে ত্যাগের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা শুদ্ধ, পবিত্র ও সংযত করিতে পারে, তাহাব স্বাভাবিক দুৰ্বলতাকে, ममोम ধারণাশক্তিকে, সঙ্কীর্ণ অনুষ্ঠানগুলিকে অতিপ্রাকৃত ও অসীম উদারতার দ্বারা পূর্ণ, পুষ্ট, সবল ও সজীব করিয়া তুলিতে পারে। ইহাই প্রকৃত ধর্মশিক্ষার যথার্থ উদ্দেশ্য। ‘কন্তু মানুষ একেবাবেই রমের ধারণা করিতে পাবে না, অসমের উপলব্ধি করিতে পারে না, সূক্ষ্মতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে না। তাহার সর্ববিধ ক্ষমতারই সীমা আছে, এ জন্য সকল বিষয়েই সে পঙ্গু। এই কারণে তাহাকে স্থূল সত্য, খণ্ডসত্য, আংশিক তথ্য সংগ্রহ করিতে করিতে অগ্রসর হইতে হয়। তাহার জীবনের সকল বিভাগেই তাহাকে এক প্রকার আরােহপদ্ধতি অবলম্বন করিয়া চলিতে হয়। উদ্ভিদসমূহের সাধারণ নিয়মগুলি প্রথমেই শিক্ষার্থীর আয়ত্ত আরােহপদ্ধতির হয় না। জড়জগতের পরিবর্তনসমূহের মধ্যে যে ধর্মশিক্ষা-প্রণালী কি সত্য নিহিত আছে, তাহা সে একেবারেই উদ্ধার করিতে পারে না। ধৰ্ম্মজীবনের সমগ্র সত্যও সেইরূপ ১১৪ শিক্ষা-সমালােচনা কোন মানবই প্রথম উদ্যমে অধিকার করিতে পারে না। তাহাকে অন্ধের মত, পঙ্গুর মত, নিঃসহায়ভাবে ক্রমে ক্রমে বিচিত্র পথে ভিতর দিয়া চলিতে হইবে। প্রথমত, দেহকে যত উপায়ে সম্ভব বশী- ভূত করিতে হইবে। শরীরই যখন সকল প্রকার কৰ্ম্মের ভিত্তি, তখন নানাবিধ সংযমের উপায় অবলম্বন কমিয়া ব্রহ্মচর্য্যের শাসন দ্বারা ইহাকে নিয়মিত ও শান্ত করিতে হইবে। এ জন্য দৈহিক বৃত্তিসমূহ নিরােধ করিবার বিচিত্র কৰ্ম্ম অভ্যাসের ব্যবস্থা দ্বারা চিত্তেব স্থিরতা, ধীরতা ও তিতিক্ষা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। তাহা হইলেই শারীরিক ও বৈষয়িক ভিত্তি প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার, ত্যাগ- মুখীনতার ও অতীন্দ্রিয়তার অনুকূল হইতে পারিবে। দ্বিতীয়ত, নানা উপায়ে পরােপকার, ও লােকহিতের বাসনা হৃদয়ে জাগরিত করিয়া দিতে হইবে। ত্যাগ ও সেবার বিচিত্র কৰ্ম্ম অভ্যাস করিতে করিতে হৃদয় হইতে স্বাভাবিক রূপেই অহঙ্কারের লােপ সাধিত হইবে। এই উপায়ে তাহার বহিরিন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয় শুদ্ধ হইয়া গেলে জগতের পরম সত্যের উপলব্ধি করিবার পক্ষে মানব যােগ্যতা লাভ করিবে। সেই অবস্থায় অতিমানবীয় ও অতি- প্রাকৃত জীবনের ঘটনাগুলি সে বুঝিতে পারিবে, সর্বদা অসীম ও অনন্তের মধ্যে অবস্থিতি করিয়া অমৃতের ও মুক্তির ভূমানন্দ উপভােগ করিতে পারিবে। সুতরাং বলা বাহুল্য কোন প্রকার ধর্মগ্রন্থপাঠ ধৰ্ম্মশিক্ষার প্রধান উপকরণ নহে। মহাপুরুষগণের জীবন-আলােচনা, ধৰ্ম্ম-ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের বিবৃতি অথবা ধৰ্ম্মতত্ত্বের
বিদ্যালয়ে ধৰ্ম্মশিক্ষা
বিশ্লেষণ ধর্মশিক্ষার মুখ্য উপায় নহে। এতদ্ব্যতীত নানা লােকে
মিলিয়া কোনও
ব্যক্তিকে গড়িয়া তোলা যায় না।
ধম্মশিক্ষার উপকরণ ও এ জন্য হৃদয়ের সম্বন্ধ প্রয়ােজন,
অনুকূল অবস্থা
ভক্তি ও স্নেহের যে বন্ধন আবশ্যক তাহা
কেবল ব্যক্তিগত আদানপ্রদানেই সংঘটিত হইতে পারে।
তাহা ছাড়া কোন ঐক্যবদ্ধ আইনকান এইরূপ ধৰ্ম্মশিক্ষার
ব্যবস্থা করিতে পারে না। কারণ সাধারণ কোন নিয় " দ্বারা সকল
•ের উপযােগী বিধি নির্দেশ করিয়া কোন ব্যক্তির ধৰ্ম্মজীবন
গঠন কবা যায় না।
চরমে তৈক ব্যক্তির স্বরাজ্যসিদ্ধির জন্য
ভিন্ন ভিন্ন সাধন অবলম্বন আবশ্যক।
তাহ। কোনও ধৰ্ম্মসমিতির
অনুশাসনে সিদ্ধ হইতে পারে না, আর এই জন্য কোনও বিদ্যালয়েই
প্রকৃত ধশিক্ষা দেওয়া যাইতে পাবে না।
পাশ্চাত্য দেশে যাহাকে 'ডে-স্কুল’ বলে আমাদের দেশের
আধুনিক বিদ্যালয় গুলি সেই শ্রেণীর অন্তর্গত। আর এক প্রকার
বিদ্যালয় আমাদের দেশে প্রচলিত করিবার চেষ্টা চলিতেছে, তাহাকে
সেই সকল দেশে ‘বাের্ডিংস্কুল’ বলে। সেখানে ছাত্র ও শিক্ষক
সৰ্বদ এক সঙ্গে বাস করে। আমাদের এখানে রেসিডেন্যাল
প্রথা নামে ইহা অভিহিত। এই দুই প্রথার বিরুদ্ধেই ইহাদের
জন্মস্থানে যুক্তও আছে। সে যাহাই হউক, ইহাদের কোনটিই
প্রকৃত ধর্মশিক্ষার অনুকুল নহে। দ্বিতীয় প্রথায় সামাজিকতার
কথঞ্চিং বিকাশ হয় বটে। কিন্তু ইহাতেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিচিত্র
ধৰ্ম্ম-জীবনের বিকাশ ও পুষ্টি সাধনের ব্যবস্থা হইতে পারে না।
শিক্ষা-সমালোচনা বৈচিত্রের মর্যাদা রক্ষা করিতে হইলে, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আয়ােন করা প্রয়ােজন। শিক্ষার্থীর প্রতিদিনকার প্রত্যেক কৰ্ম্ম ও চিন্তা তাহার শিক্ষকের চিতে স্থায়িরূপে প্রবেশ করা আবশ্যক। কাজ অফিসের কেরাণার রিপাের্টে সুসিদ্ধ হতে পারে না। মুদিত ফল-বজ্ঞাপন পত্রের সাহায্যে শিক্ষার সমগ্র জীবনের চিত্র অঙ্কিত ইতে পারে না। যদি কোন ব্যক্তির গুরু-গৃহ তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা সমবেত হইয়া তাহাদের সমগ্র জীবনের কর্তব্য শিক্ষার জন্য তাহার উপদেশের প্রার্থী হয়, যদি কোন ব্যক্তি শিক্ষার্থীকে উ’ সবে, রােগে, পারিবারিক কার্যকলাপে, সেবায়, শুশ্রুষায় সঙ্গী, সহায়, সেবক ও ভৃত্য ভাবে পরীক্ষা করিতে, তাহার প্রতি সমূহ নিয়মিত করিতে সুযােগ পান, যদি তাহার সম্পূর্ণ সাধনার জন্য সেই ব্যক্তি একাকী দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারেন তাহা হইলেই এরূপ অন্তর্মুখী, বৈরাগ্যমূলক ধৰ্ম্মজীবন গঠনের অনুকূল ক্ষেত্র প্রস্তুত হইতে পারে। এই প্রথাকে ‘ডােমষ্টিক’ বা গুরুগৃহবাসরীতি বল যাইতে পারে। অতএব যাহারা ধর্মশিক্ষার জন্য ব্যস্ত হইয়াছেন, তাহাদিগকে হয় প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করিতে হইবে, অথবা ধৰ্ম্ম- শিক্ষার চেষ্টা একেবারে পরিত্যাগ করিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষাপদ্ধতির আমূল কেবল মাত্র পরীক্ষামন্দির না রাখিয়া প্রকৃত পরিবর্তন আবশ্যক শিক্ষামন্দিরে, ‘টাচিং ইউনিভার্সিটিতে পরিণত করিলে জ্ঞানের মাত্রা বৃদ্ধি হইতে পারে, ত্যাগের আকাক্ষা বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা ১১৭ বিকশিত হইবে না। শিক্ষক ও ছাত্রের এক বাসের ব্যবস্থা করিলে একটুকু লৌকিকতা ও সৌজন্যশিষ্টাচার এবং সামাজিকতায় শিক্ষা হইতে পারে, কিন্তু জীবনের সাধনা খুঁজিয়া বাহির করিবার সুযােগ ঘটিবে না। নূতন নূতন বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির দিনে আমি যে অপরূপ প্রস্তাবের উত্থাপন করিতেছি, তাহাতে অনেকেই হাস্য সংবরণ করিতে পারিবেন কি না সন্দেহ। যে সময়ে পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ গড়িবার জন্য বড় বড় ফ্যাক্টরী’ খুলিবার বিপুল আয়োজন চলিতেছে, শিক্ষার বৃহৎ বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গঠন করিয়া এক সঙ্গে বহু ফল প্রসবের ব্যবস্থা হইতেছে, সেই উন্মাদনার যুগে পরিবার- বদ্ধ শিক্ষানীতি, গৃহ-গত বিদ্যদানৱীতি উপেক্ষিত হইবারই সম্ভাবনা। গুরুগৃহে কতটুকুই বা শিক্ষা হইতে পারে ? কয়জনই বা শিখিতে পারে, কয়টা বিষয়ই বা শিখান যাইতে পারে ? গুরু- শিষ্যে হৃদয়গত সম্বন্ধ না হয় প্রতিষ্টিত হইল, কিন্তু সমগ্রদেশের শিক্ষার ভার কি ইহার দ্বারা নির্বাহিত হইতে পারে ? ইহাতে যে ঘাের অনৈক্য ও বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করিবে। বিভিন্ন গুরুগৃহের পাঠ- চর্চা ও পরীক্ষা-প্রণবীর হিসাব রাখিবে কে? গৃহস্থ হইবার সময় সমাজ শিক্ষার্থীকে সম্মান করিবে বা তাহার বিদ্যা ও চরিত্রের মূল্য নির্ধারণ করিবে কি উপায়ে ? এই সকল প্রশ্নের উত্তর প্রাচীন ইউরােপ দিতে পারিত না, মধ্য যুগের এবং বর্তমান কালের ইউরােপ এই সমুদয় তত্ত্ব আলােচনা করিতে অসমর্থ। আমেরিকার শিশু সভ্যতা এই শিক্ষাপদ্ধতিকে ১১৮ শিক্ষা-সমালােচনা আদিম মানবসমাজের সরল-সহজ প্রতিষ্ঠান বলিয়া গায়ে হাত এই নুতন শিক্ষাপদ্ধতি বুলাইৰে মাত্ৰ। জগতের ইতিহাসে এই ভারতবর্যের পক্ষে সমুদয় সমস্যার মীমাংসা করিয়াছে—এক নূতন নহে ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষ যে বিচিত্র শিক্ষাপদ্ধতি আবিষ্কার করিয়াছিল, তাহাতে ধৰ্ম্ম ও জ্ঞানের মধ্যে পরস্পর- বিরােধের সামঞ্জস্য করিতে হইত না, তাহাতে ধৰ্ম্মের জন্য কোন গ্রন্থপাঠ একান্ত আবশ্যক ও একমাত্র উপাদান বোধ হইত না, তাহাতে ধৰ্ম্মের ব্যবস্থা করিবার জন্য দশে পাঁচে মিলিয়া কমিটি গঠন করিতে হইত না, তাহাতে ব্রহ্মচারীর ধর্মভাব উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য শিক্ষক-সম্মিলন, ‘টাচাসবাের্ড’ বা ছাত্রাবাস-শাসনসমিতি, হােষ্টল-সুপারিন্টেন্ডেন্টের প্রয়ােজন হইত না। শিক্ষাজগতের সেই অপূৰ্ব আবিষ্কার, ভারতবর্ষের সেই বিশিষ্ট দান উঠিয়া গেল কেন? সেই শিক্ষাপদ্ধতি দ্বারা কি ভারতীয় মানবের বিবিধ অভাব দূর হইত না? তাহার সাহায্যে কি ভারত-সমাজের স্বভাবােপযােগী বিধি ব্যবস্থা করা যাইত না? প্রাচীন ভারতে তাহার নিয়মে কি যুগপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা নূতন নূতন বিদ্যার, নতন নূতন বিজ্ঞানের, নূতন নূতন দর্শনের আলােচনা হইত না? তাহার নিয়মে কি প্রদেশভেদে, ভাষাভেদে বুদ্ধিশক্তির বিকাশভেদে শিক্ষণীয় বিষয়ের বৈচিত্রা অনুষ্ঠিত হইত হইত না,—অলােচনাপ্রণালী বিভিন্নতা সাধিত হইত না? তাহার প্রভাবে কি শিক্ষার্থীরা কেবল বৈরাগী ফকীর হইয়া গুরুগৃহ হইতে সমাবর্তন করিত।
বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা ১১৯ তাহাব ফলে কি সংসারের বিচিত্র ভােগ্য বস্তুর সৃষ্টি হইত না- ভােগব আকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত করিবার জন্য বিচিত্র শিল্পও ব্যবসায় অবলম্বিত হইত না ? তাহার দ্বারা কি রাষ্ট্রীয় কর্মে সহায়তা কবিবার উপযােগী জ্ঞান লাভ হইত না ? তাহার বিধানে কি শবচ্ছেদ করা হইত না ? উদ্ভিদবিদ্যা অধীত হইত না?—জড়- জগতের তথ্য সংগৃহীত ও আলােচিত হইত না?—রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলি পরীক্ষা করা হইত না ? হা না হইলে ভারতবর্ষে এতগুলি ধৰ্ম্মবিপ্লব হইল কি উপায়ে ? তাহা না হইলে ভারতসমাজে বিভিন্ন জাতি মিশ্রিত ও অঙ্গীভূত হইয়া গেল কি উপায়ে ? তাহা না হইলে ভারত মহা- দেশে এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত এক বিচিত্র সামাজিক ও ধৰ্ম্মজীবন প্রতিষ্ঠিত হই সকলকে শৃঙ্খলীকৃত ও ঐক্যবদ্ধ কবিল কি উপায়ে ? তাহা না হইলে আপামর জনসাধারণ ধৰ্ম্মেব কথা, নীতির উপদেশ, দেবদেবীর আরাধনা, সমাজ প্রতিষ্ঠা, পরিবাররক্ষা, বিষয়কৰ্ম্ম শিখিল কি উপায়ে ? নিম্নশ্রেণীর মধ্যে বিভিন্ন যুগে নূতন নূতন আকাঙ্ক্ষা জাগবিত হইয়া নূতন নূতন ভাষা, নূতন নূতন পুরাণ-তন্ত্র-সংহিতা, নূতন নূতন দেবতত্ত্ব সৃষ্টি করিল কি উপায়ে ? তাহা না হইলে চিকিৎসা, রঞ্জনশিল্প, বয়নকাৰ্য, মন্দির- প্রতিষ্ঠা, মূৰ্ত্তিগঠন, নৌবাণিজ্য, অস্ত্রশস্ত্রনির্মাণ প্রভৃতি জড়বিজ্ঞান- মূলক কাজ কর্ম চলিত কি উপায়ে ? তাহা না হইলে কি মহা- রাষ্ট্র ও পঞ্চনদ, আন্ধ ও বঙ্গদেশের অধিবাসিবৃন্দ বিভিন্ন ভাষায় কথা কহিয়া, বিভিন্ন সাহিত্যের পুষ্টি বিধান করিয়া, বিচিত্র রীতি- ১২০ শিক্ষা-সমালােচনা নীতি, বিচিত্র ধৰ্মকৰ্ম্ম, বিচিত্র সামাজিক প্রথা অবলম্বন করিয়াও সকলকে এতকাল একই সভ্যতা ও সমাজ-কলেবরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মনে করিতে পারি ? যুক্তিকে অবজ্ঞা না করিলে বলিতে হইবে—ভারতবর্ষের শিক্ষা- পদ্ধতি কালধর্মের অনুসারে নিজকে, গুছাইয়া লইতে পারিত। ইতিহাসের সাক্ষ্য বিশ্বাস করিলে বলিতেই হইবে—ভারতবর্ষে যুগে যুগে নব নব অবস্থা-সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকগণ উপযুক্ত ব্যবস্থা করিয়া লইতে জানিতেন। তাহারই ফলে ভারতবর্ষের বিদ্যালয়- সমূহ আজকালকার অক্সফোর্ড, বালি এবং আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষালয় হইতে পারিয়াছিল— ভারতবর্ষের পল্লীসমূহ সেই সময়কার চিন্তাজগতের রাজধানী হইয়া ভারতীয় শিক্ষা বিরাজ করিতেছিল। তাহারই ফলে ভারত- পাতির ফল বর্ষের শিল্পব্যবসায় ও কারুকার্য দেশের অভাবমােচন করিয়া পৃথিবীতে অন্ন, বিলাস ও সভ্যতা বিতরণ করিতে পারিত। ভারতীয় পল্লীর গুরুগৃহে শিক্ষাপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটগণ রাষ্ট্রগঠন করিতেন, বৈষয়িক জীবনের ধুরন্ধর হইতেন,সাম্রাজ্য-নীতির সংস্থাপন করিতেন, ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রবর্তক হইতেন। তাহারই ফলে তাঁহারা মহাভারতের, এবং ভারতবর্ষের বাহিরে বৃহত্তর ভারতের প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়া অশিক্ষিতকে শিক্ষিত, বর্বরকে সৌজন্যবান্, অসভ্যকে সুসভ্য করিয়া তুলিয়াছিলেন। তাহার ফলে তাহার সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্বে পারদর্শী হইয়া লােকের ধারণা- শক্তি ও প্রবৃত্তির বিকাশ অনুসারে সমাজে বিচিত্র ধর্মপ্রণালী, বিদ্যালয়ে ধর্মশিক্ষা ১২১ বিচিত্র পূজাপদ্ধতি ও বিচিত্র ধর্মানুষ্ঠানের প্রবর্তন করিয়াছিলেন। তাহারই ফলে আমাদের আদর্শ নরপতি “জুগােপাত্মানমত্ৰস্তো ভেজে ধর্মমনাতুরঃ। অগৃধুরাদদে সােহথমসক্তঃ সুখমম্বভূৎ ॥” তাহারই ফলে ভারতীয় প্রদেশসমূহের ভৌগােলিক ও ঐতিহাসিক বিভিন্নতা অনুসারে তাহারা ধৰ্ম্মবন্ধনেব ও সমাজব্যবস্থার বৈচিত্র্য রক্ষা করিতেন। আর এই জন্যই ভারতবর্ষে কথনও প্রতিভা- সম্পন্ন চরিত্রবান নরনারীর অভাব হয় নাই। আৰ্যযুগের বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র হইতে রামপ্রসাদ, রামকৃষ্ণ পর্যন্ত,—পাণিনি, চাণক্য হইতে চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার পর্যন্ত, মৈত্রেয়ীর কাল হইতে অহল্যাবাই, রাণীভবানী পৰ্যন্ত,-চন্দ্রগুপ্ত হইতে শিবাজী পর্যন্ত বিচিত্র কর্মক্ষেত্রের জন্য বিচিত্র চিন্তাবীর ও কর্মবীর আবিভূত হইয়া ভারতের জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করিয়া রাখিয়াছেন, ভারতবর্ষের সাধনাকে বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়াই অমর, অক্ষয় ও জীবন্ত করিয়া রাখিয়াছেন। আর আধুনিক যুগের মানবসমাজকে এই শিক্ষা প্রদান করিবার জন্যই ভারতবর্ষ এখনও বাঁচিয়া আছে। পৃথিবীতে যে সকল দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার ও সুযােগ আছে, তাহাদের শিক্ষাপদ্ধতিও ইহার দ্বারা সম্পূর্ণ করিতে হইবে। জার্মাণির শিল্প-বিদ্যালয়ে, আমেরিকার কৃষি-কলেজে, এই বিচিত্র বাণী প্রচারের জন্য ভারতবর্ষ এখনও তাহার বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র রক্ষা করিতেছে। এই শিক্ষাপদ্ধতি এখনও সম্পূর্ণ ১২২ শিক্ষা-সমালােচনা লুপ্ত হইয়া যায় নাই, কেবল যত্নাভাবে মলিন ও নিস্পন্দ হইয়া রহিয়াছে। ভারতবর্ষ তাহাকে সঞ্জীবিত করিয়া পুনরায় মানবের ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠিত করিবে। এই নূতন যুগের মানব- আধুনিকভারত জাতি অন্যান্য দেশে কয়েকটি বিদ্যা ও শিল্পের বিশেষ উৎকর্ষ সাধন করিয়াছে —তাহা এই দেশের পক্ষেও একেবারে নূতন নহে। সেই সমুদয় সত্যও এই শিক্ষাপদ্ধতি নিজের অঙ্গীভূত করিয়া লইয়া নিজের বিশিষ্ট উপায়ে এই সমাজে প্রচলিত করিবে। আমরা নুতুন নুতন শিল্পের সন্ধান পাইতেছি ; রেলগাড়ী, ষ্টীম- এঞ্জিন, ছাপাখানা, তড়িৎশক্তির প্রভাব দেখিতেছি; স্বায়ত্তশাসনের, রাষ্ট্রীয় ঐক্যের সংবাদ পাইতেছি। কিন্তু এই সমুদয় আসিয়া ভারত- বর্ষকে অভিভূত করিতে পারিবে না—ইহাদের উৎকট ক্ষমতার নিকট ভারতবর্ষ আত্মসমর্পণ করিবে না—ভারতবাস ইহাদের প্রভাবে স্বাতন্ত্র হারাইয়া বিশ্বকে দৰিদ্র করবে না। আমরা রেলগাড়ী আয়ত্ত করিব, মুদ্রাযন্ত্র গ্রহণ করি—তিদ্বন্দ্বিতা, অসাম্য এবং জীবন- সংগ্রাম বৃদ্ধি করিবার জ নহে, দ্রুতগতিতে সমগ্র পৃথিবী ভাবুকতার দ্বারা অভিভূত করিবার জন্য ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে দিগ্বিজয়ের সুবিধাষ্টির জন্য। আমরা শিল্পের উন্নতি বিধান করিব, নবাবিষ্কৃত বিজ্ঞানালােচনায় যত্ন করিব—পার্থিব সুখভােগের দাস হইবার জন্য নহে,নূতন নূতন নিষ্কাম কৰ্ম্মের পন্থা আবিষ্কারের জন্য । আমরা স্বদেশকে ভালবাসিব, জাতীয় সভ্যতার স্বাতন্ত্র রক্ষা করিব-বিরােধ ও বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দিবার জন্য নহে, মানবসমাজের বৈচিত্র্য ও বিদ্যালয়ে ধৰ্ম্মশিক্ষা ভগবানের ঐশ্বর্য প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য। আমরা বিজ্ঞানসম্মত শাসনপ্রণালী অবলম্বন কৰিব—ইউরােপের অনুকরণে সমাজগঠনের জন্য নহে, পাশ্চাত্য সমাজ-তত্ত্বের ‘বুনি’ লাগাইয়া জগৎকে বিজ্ঞান ও প্রকৃতিপুঞ্জের স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে ভক্তি, বৈরাগ ও প্রেমের অদ্ভুত সমন্বয় বুঝাইবার জষ্ঠ। আমবা দেখাইব যে সাম্য—যথেচ্ছাচারও অনৈক্যের নামান্তর মাত্র নহে, ভেদবুদ্ধি ও অসাম্য মাত্রই—ঐক্য, সহানুভূতি ও প্রেমের প্রতিবন্ধক হে,—আমরা জগৎকে দেপাইব যে সারা ভারতবর্ষের জীবন সংসারের কৰ্ম্মে ব্যয় করিয়াও বাণী যথাসময়ে সকল বাসনা ত্যাগ করা যায়, জড়জগতের তথ্য আলােচনা করিয়াও ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করা যায়, বিজ্ঞানে পণ্ডিত হইয়াও বিচিত্র নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান করিয়া আস্তিক্যবুদ্ধি রক্ষা করা যায় এবং গার্হস্থ্যাশ্রমে রাষ্ট্রের পরিচালক, সমাজের নায়ক ও বৈষয়িক ব্যাপারসমূহের ধুরন্ধর হইয়াও বার্ধক্যে মুনিবৃত্তি অবলম্বন করিয়া অবশেষে যােগাভ্যাস দ্বারা তমুত্যাগ করা যায়। হিন্দুসমাজ সেই উদ্দেশ্যেই বাঁচিয়া আছে। জগতে ভারতীয় প্রভাব বিস্তৃত হইলেই ইউরােপের ভারতে পদার্পণ সার্থক হইবে, কারণ তাহারই পরে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যসম্মিলনের প্রকৃত ফল ফলিতে আরম্ভ করিবে। আধুনিক যুগােপযােগী ভারতগঠনের অর্থ ইউরোেপর অনুকরণ নহে—ভারতের স্বকীয় আত্মপ্রকাশ, নিজ বিশেষত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।
MAJU, HOWNER ১২৪ শিক্ষা-সমালােচনা বিশ্ব-মানবের হৃদয়মধ্যে আকাঙ্ক্ষা জাগিয়াছে—যন্ত্র ও উপ- লক্ষ্যের অভাব হইবে না। PUBLIC LIBRARA RAJU Astd. 10 Opinions 1. MAHAMAHOPADHYAYA PANDIT ADITYA- RAM BHATTACHARYA, M.A., Fellow, Allaha. bad University; Late Professor, Muir College, Allahabad, author ot Riju Vyakarana :- "I write this in my appreciation of your effort to facilitate and popularise the study of Sanskrit. Your method to teach sanskrit without the learner's going through a first course of grammar merits trial. The old method has done its part so long and will remain inevitable in the case of higher and thorough study. But if quicker methods of acquiring languages, living or dead, be discovered and introduced, humanity will bless him whose inventive genius can succeed to achieve the object which every well-wisher of learning has at heart, At the very outset the attempt looks somewhat revolutionary. But in other fields it is such revolutionary departures from the old track that has hastened the advance of arts and sciences." 2. RAIBAHADUR BABU SRISH CHANDRA BASU, B. A., of the Provincial Civil Service, ( U.P.), author of the Ashtadhyayiot Panini,(M. A. Text- Book, London University) and Translator (and [ 2 ] 1 annotator) of Bhattaji Dikshita's Siddhanta Kaumudi, the Upanishads, Vedanta Sutra and the Mitakshara in the "Sacred Books of the Hindus Series' : "The scheme of Sanskrit works in Professor Benoy Kumar Sarkar's pedagogic series is based on the conception that any language, whether inflectional or analytical, living or dead, can be learnt exactly in the method in which the mothertongue is acquired. No preliminary training in the generalisations and definitions of grammar is therefore required, and the student may be at once introduced to the sentence as the unit of thought and expression. By a skilful and systematic application of this method, Professor Sarkar has been able to build up, through lessons and exercises in translation, conversation, questions and answers, and correc tion of errors, a text-book in Sanskrit which serves the double purpose of a guide to composition and a series of primers on Sanskrit literature. From this series of books the reader can master not only the necessary rules of Sanskrit Grammar, but also will be familiar with some of the most important passages of standard classtes e.g. Raghu-vansam, Kumar-sambhavam, Rame yanam and Manu Sanhita, adaptations or originals of which the author has incorporated in [ 3 ] his book as specimens of narrative, historical, poetical and other styles. In applying to the study of Sanskrit principles and methods that have been utilised in mo - dern languages in Europe, Professor Sarkar has demonstrated, through practical illustrations, lesson by lesson, that the most highly infectional languages may, with considerable economy of time and labour and other pedagogic advantages, be reduced to the same method of teaching and treatment, as those languages which are not bound hard and fast by Grammar. To all students of Sanskrit language and literature, Professor Sarkar's series cannot but he eminently useful and instructive ; and scholars interested in the art of teaching and the history of Sanskrit learning cannot but note the considerable improvement on the existing Readers and Primers that are in most cases mere imitations or occasional modifications of the really original works of Pandit Ishwar Chandra Vidyasagara, C. I. E.- whose genius suceeeded in simplifying and adap ting Panini for the use of students in Bengal. The method of the pioneer of Sanskrit learn. ing can no longer be profitably used under the altered conditions of the times; and it is desirable that the new method should have a fair trtal in our secondary schools in the interest of educational retorm."
} [ 4 ] ৩। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রন্থ বিশেষ অবস্থানের সহিতই আলােচনায় যােগ্য হই কাছে সন্দেহ নাই। বঁাহারা শিক্ষাব্যবসায়ী তাহারা এই বই যত্ন: করিয়া পড়িবেন ও উপকারলাভ করিবেন, এইরূপ আশা করি। বিনয়বাবু যে এত অবলম্বন করিয়াছেন, তাহা বিপুলবিস্তৃত ও দুঃসাধ্য। ইহা সম্পন্ন কৰিয়া তিনি দেশের মহৎ উপকার সাধন করুন এই আমি অন্তরের সহিত কামনা করি। ৪। শ্ৰীযুক্ত স্যার চন্দ্রমাধব ঘােষ শ্ৰীযুক্ত বিনয়কুমার সরকার শিক্ষাবিজ্ঞান সম্বন্ধে যে একটি। একাণ্ড গ্ৰন্থ এত কন্ধিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে, তাহার ভূমিকা। পাঠ করিয়া বিশেষ আনন্দলাভ করিম ও সঙ্গে সঙ্গে চমৎকৃত হইলাম। এ গ্রন্থ সম্বন্ধে সুপণ্ডিত যুক্ত হীৰেনাথ দত্ত যথার্থই লিখিয়াছেন যে, গ্রন্থে বিপুলতার কথা ভাবিতে গেলে মনে সহজেই সনে উপস্থিত হইতে পারে যে এই প্রকার বিপুল গ্রন্থ এক ব্যক্তি যারা সংগৃহীত হইতে পারে কিনা। কিন্তু পুস্তক-লেখক ভূমিকায় শীয় অভিজ্ঞতার, ক্ষমতার ও অধ্যবসায়ের যে প্রকায় পরিচয় দিয়াছেন, তাতে বিলশই আশা করা যাইতে পারে যে তিনি যথাসময়ে তাহার সন্নিত কাৰ্যে কৃতাৰ্য্য হইবেন। এই এই প্রাণিত হইলে ভারতবর্ষের শিক্ষাণীদিগের বিশেষ মঙ্গল সাধিত হইবেক, ও সেইউজেতে, আমায় বিবেচনায় কেবল বাঙ্গালা ভাষায় নয়, ইংরাজী ভাষাতেও পুস্তকখানি একাধিত হইলে ভারতবর্ষের সকল বিভাগের লােকের পাঠ করিতে পারিবে।
[ 5 ]
5. Dr. Satish Chandra Banerji, M. A. D. L.,
PRENCHAND ROYCHAND Scholar,
I entirely agree with you in thinking that the
inethods adopted for the study of languages in
this country are defective. Your own plan seems
to have been carefully thought out, and it has
heen admirably worked out. I have no doubt
that by following your nicthod our boys will be
able to pick up English and Sanskrit much more
quickly than they do af present.
.
6. Babu Sarada Charan Mitra, V, A. B. L.
PRENCHAND ROYCHAND Scholar.
I have gone through the books Ingraji
Siksha and Sanskrita Siksha and Prachin Greecer
Jatiya Siksha of your 'Siksha Bijnan Series' and
.am of opinion that they will be of great help to
those for whom they are intended. I am glad you
are doing a great service in the art of teaching.
৭। গৌড়দুত—এরাধেশচন্দ্র শেঠ, বি, এল,
শ্রীযুক্ত বিনয়কুমার সরকার এম এ, মহাশয় এক বিশাল কাধে
হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। বাঙ্গালায় শিবির সনে বি
কোন গ্রন্থ নাই বলিলে চলে। এদেশে জাতীয় শিক্ষা মন
জ বিলয় ও পনিষৎ গণিত হওয়ায় তাহার আফগলিক
দিন অনুভূত হইতেছে। বিষয়। বরং এই শিক্ষা অতী,
[ 6 ] সুতরাং তিনি এই বিশাল কার্যে বতী হইবার সম্পূর্ণ যােগ্য। সম্প্রতি এই বিরাট গ্রন্থের ভূমিকমাত্র প্রকাশিত হইয়াছে। এই গ্রহের বিশালতা দেখিয়া এক বিনয়বাবুর দ্বারা এই কাৰ্য সংসাধিত হওয়া অনেকে অসাধ্য মনে করিতে পারেন, কিন্তু তিনি ছাত্রাবস্থা হইতে এই কার্যের জন্য প্রস্তুত হইয়াছেন, এবং কেবল বয়ং প্রস্তুত নহে, অপর সহচর ও সাহায্যকারী ব্যক্তিও প্রস্তুত করিয়াছেন। সুতরাং এই বিশাল গ্রন্থের সম্পূর্ণতা সম্বন্ধে আমা- দিগের কোন সন্দেহ নাই। 8. The Leader, Allahabad, 13th October, 1911 Every lover of vernacular literature will wel. come the nice little pamphlet 'The Man of Letters' from the pen of Prof. Benoy Kumar Sarkar, Lecturer in the Bengal National Council of Education. It sets forth in a forcible manner a scheme for the fostering of vernacular literature in India. Prof. Sarkar holds that literature in common with everything else' requires protection in its infancy. He says that our literature is still in its non-age and it is due to this backwardness - and poverty of our language and literature that it has been only accorded a position of second language in the Government's scheme of higher education and has not been entitled to the dig - nity of the first language.
[ 7 ] But this can be achicred if learned bodies like the Bangiya Sahitya Parishad of Calcutta and Nagri Pracharini Sabha of Benares undertake to employ some of the best students of our country to work together for the development of our literature underthe guidance and control of such literary men as Dr. Seal of Bengal and Dr. Jha of our provinces. But to secure the services of these students it is essentially necessary that they should be free from all pecu. niary: wants. The Bangiya Sahitya Parishad of Bengal took up the suggestion of Prof. Sarkar and on the occasion of the fiftieth birthday anniversary of Babu Rabindra Nath Tagore, the greatest living poet of Bengal, have collected a decent fund the proceeds of which will be utilised in the manner indicated above. The Nagri Pracharini Sabha of Benares can do the same. The Sabha can raise funds or similar occasions and spend them likewise. It this can be done, perhaps it will not be then too much "to expect that in the course of teti years we can have the best literary treasures of the world in our own national literature that we can have the thoughts and investigations of Plato, Herbert Spencer, Guizot, Hegel and other European philosophers through the
[ ৪ ]
onediun of our own language, and that in no
time the education of these provinces can grow
into one that is natural and really national."
৯। প্রতিভঢাকা
বিনসহ সংস্কৃত শিক্ষাঙ্গন প্রণালীর প্রথম গ্রন্থাবলী।
ইতিপূর্বে আর এরূপ গ্রন্থ রচিত হয় নাই। মাতৃ-ভাষা শিক্ষা-
প্রণালীর সাহায্য প্রথম হইতেই বাক্যৰূচনা ও পদ যােজনা লইয়া
শিক্ষা আরম্ভ করিতে হইবে। ৩ বাকাগুলি সম্পূর্ণ আয়ত্ত
হইলে আজ যাকে শুদ্ধ করিবার প্রয়াস করিতে হইবে।
প্রথমতঃ কেবল গুজৰাৰ প্ৰয়ােগ করিয়া শিক্ষার্থী কর্ণকে শুদ্ধ
বাক্যের ধ্বনিতে অভ্যস্ত করিতে হইবে।
অধ্যাপক সাকানে এৰ্তিত পাঠসন্নিবেশে পাশ
বিজ্ঞানসম্মত এবং আরােহ-প্ৰণালীর প্রয়ােগমূলক। ব্যাকরণ
শিক্ষা ব্যতিরেকে এই প্রণালীতে শিক্ষাথ অতি সহজে সংস্কৃত
বা ৪ চনপদ্ধতি এবং সাহিত্যে এমষিক জানলা
করিতে পারিবে।
পাঠগুলি এই সুন্দর থাকাৰহিলাপে ও ব্যবহাৰিতাৰে বিত
ৰোকৰণের অতি 'টিল খুজনিতি এবং বিক্রিও কত
যত ভাষা অতি লঙ্গৰে (এবং রূপ-ও-ভিত্তিহীৰ গৰায় )
মাসে হইতে পারে। ইহা একালের বিশেষ অতি
ও তার পরিচায়ক।
সংশিক্ষায় নৌকসানে ব্যাপক সমাজে পুলিকা:
t
[ ৪ ]
জাতীয় আধুনিক গ্রন্থনিচয় অপেক্ষা ক উ ও আধুনিক
শিক্ষাপ্রণালীর কত উপষােগী তাহা শিক্ষিত ব্যবিত্রই অনুভব
করিতে পারিবেন। যুগধর্মের ও সামাজিক পরিবর্তনের সরে সরে
শিক্ষাপ্রণালীর পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী; সুতরাং শিগানে এচীন
প্রণাণী বর্তমানকালে আর প্রায় নহে। পণ্ডিতবর্গ ইবিলে
করিয়া অধ্যাপক সরকারের প্রবর্তিত বিজ্ঞানসন্মত এবাণী অনুসারে
শিক্ষাকার্য সাধন করিবেন, ইহা সর্বথা ৰানীয়।
গভর্ণমেট-প্রস্তাবিত প্রাচ্যবিদ্যা শিক্ষার উতি বিষয়ে এই
প্রণালী অৰলতি হইতে পারে কিনা তার বিচার হওয়া উচিত।
ইংরাজী শিক্ষা :—এরূপ গ্রন্থ ইংল্পী জবা বিল না
হইলেও মাতৃভাষায় সাহায্যে লিখিত ঈদৃশ গ্রন্থ সম্পূর্ণ মূত।
সংস্কৃত শিক্ষাদান প্রণালীয় ময় এগুলিও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত
পদ্ধতির প্রবর্তক এবং ধারণা ও স্মৃতিশক্তি হানিফ।
মৌখিক শিক্ষা হইতে শিক্ষার্থী এ বাক্যের ৩টি
বিচারে অগ্রসর হইবে। ইতিমধ্যে আপন পিন নেমে
এষােৰা ইংৰাজীশ বইয়া ইয়া বাক্যে সেই সেই শা
হায় শিক্ষা করিতে হইবে। এইরূপে বিল লেবিডি
সাধারণ পদার্থের সহিত পরিচিত হইয়া শিক্ষার্থী সমলৰাক্য মচলায়
*কৌশল আয়ত্ত করিবে। মৌণিক শিক্ষাকালেই এমো এ
আদেশ সময় বাক্যে শিক্ষা সভ্য ইনে।
পাৰিয়াসলি ব্যৱৰহিক ও বিক। এই এলীতে
শিক্ষাশ কৰিলে লালে লাইৰে। এসেছি
[ 10 ] অনুশীলনে উচ্চারণ-বিষয়ক পাঠগুলি প্রথম শিক্ষার্থীর বিশেষ উপকারে আসবে। অষ্টব্যাংশগুলি গ্রন্থকারের অভিজ্ঞতার পরিচায়ক এবং শিক্ষকের পক্ষে মূল্যবান্। 10. Empire-23rd September, 1911. All students of Sanskrit language and literature should note the impbvements made by Professor Sarkar, and educational authorities may see their way to give a fair trial to his method of teaching in the schools under their jurisdiction. The author's "Prachin Greecer Jatiya Siksha' is in some respects a unique production in Bengali. It contains an excellent introduction to the science of education. Then follows an account of the systems of education which obtained in Sparta and Athens. In the concluding chapter ancient Greece and India have been compared from several points of view. Professor Sarkar's volume is an important contribution to Bengali literature and should be bought in hundređs. We understand that all profits arising out of the sale of this book will go to the funds of the Bangiya Sahitya Parishad, the leading literary society of Calcutta. ১১। হিতবাদী—.৭ই আশ্বিন, ১৩১৭ সাল এ পুকে আলোচনাপদ্ধতি আমাদের ভাল লাগিয়াছে। গৰু ও বিধিবর্গের মধ্যে ইহার দম হইবে।
[ 11 ] 12. The Bengalee, September, 1910. A MONUMENTAL WORK. "Shiksha Bijnaner Bhumica" or Introduction to the Science of Education contains an appreciative prefade hy Babu Hirendranath Datta, is to be a comprehensive work treating of all the aspects of education, historical, theoreticaland practical. It is highly desirable that the New Method of Teaching inaugurated in his work should find its trial in our Public Schools and Colleges. Government is also alive to the cause of primary education. It is evident that we are in need of a number of educated men, like the present author, who can devote their lives to lift and leaven the general mass of the community. Slur is ofter flung at our graduates that they are not fit for any original work. We invite the public to take note of this comprehensive and original work on the Science of Education and to see if they can adopt its ideals and methods of cducation. The author deserves the most hearty thanka from the public for the long and steady efforts that are being made to the cause of educational Actorm.
[ 12 ] ১৩। প্রবাসী-ভাদ্র ১৩১৭ শ্ৰীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় ভূমিকায় এই গ্রন্থের পরিচয় দিয়াছেন—শিক্ষাবিজ্ঞান সম্বন্ধে গ্রন্থকার এক প্রকাণ্ড পুস্তক কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত করিবেন, তাহাতে শিক্ষাপদ্ধতির ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রণালীর আলােচ্য থাকিবে। সমস্ত প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যদেশের শিক্ষাপ্রণালীর তুলনামূলক আলােচনা কমিয়া শ্রেষ্ঠ আদর্শ স্থির করিবার চেষ্টা হইবে। শিক্ষার অন্তর্গত জগতের যাবতীয় বিষয় আলােচিত হইবে। সেই প্রতিপাদ্য । বিষয়ের সারমর্ম প্রকাশ করা এই পুস্তকের উদ্দেশ্য। গ্রন্থকার বিদ্বান্ ও শিক্ষাকর্মে ব্যাপৃত। তাহার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হইলে দেশের প্রভূত মঙ্গল সাধিত হইবে আশা কৰা যায়। পুস্তিকায় শেষে গ্রন্থকার যাহা লিখিয়াছেন, তাহা দেশ- হিতে চিন্তা ও অনুকরণের বােগ্য বলিয়া এস্থলে উদ্ধৃত করিয়া দিলাম-“শীঘ্রই বিন্যাদান এবং শিক্ষাবিস্তরই দেশসেবা ও সমা বিয়ের প্রধান এ ও লক্ষণ হইয়া দেশের মধ্যে বর্তমান সর্ববিধ লেনকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করিবে। আলােশনই সকল আন্দোলনকে গ্রাস করিয়া ক্রমশ গভীতর ও বিস্তৃততর হইতে থাকিবে। কর্ষিগণ এত নব্য-বিকাশে সহায়ক জ্ঞানমনিসমূহের প্রতিষ্ঠাকেই জীবনের ধর্ম মনে করি- সে এবং এই কই পূর্ণ শক্তি ও সময় গান করিয়া গীবনের সাধকতা উপলব্ধি করিবেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইত আশৰসীদের আন্তরিক আকাকা জন্মিবে। শিচাই, [ 13 ] সমীপবর্তী ভবিষ্যতের নূতন সন্নাস ইবে। শিক্ষকই নূতন সন্ন্যাসী হইবেন। এরূপ সন্ন্যাসী দেশে দেখা দিয়াছেন।* ১৪। বহুমতী –ভাদ্র ১৩১৭ গ্রন্থকার শিক্ষাবিজ্ঞান” নামক বিশখণ্ডে সমাপ্ত যে বিরাট : গ্রন্থ রচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন, এই ভূমিকা তাহারই পরিচয় ও নির্ঘটম্বরূপ লিখিত হইয়াছে। শিক্ষা-বিজ্ঞান গ্রন্থ বঙ্গভাষায় নাই। বলিলে অত্যুক্তি হয় না। গ্রন্থকার মাতৃভাষায় এই অভাব দূর করিবার জন্য তিন চারি বৎসর কঠোর পরিশ্রম স্বীকার করিয়া শিক্ষাত্রিজ্ঞানের অচনা। করিয়াছেন। সেজন্য তিনি সাধারণের ময়দাহ'। সংস্কৃত, ইংরাজী, উদ্ভিদবিজ্ঞান প্রভৃতি শিক্ষাবিজ্ঞানের অন্তর্গত চারি, পাঁচখানি পুস্তক ইতিমধ্যেই যন্ত্রস্থ ইয়াছে। এই রাজনীতিক আন্দোলনের দিনে শিক্ষাবিজ্ঞানের অনুশীলন প্রবৃত্ত হইয়া নবীন গ্রন্থকার শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ও একাগ্রতা পরিচয় দিয়াছেন। হীরেন্দ্রবাবুর সহিত আমরাও বলি—ধীমণ্ডলী। এই নূতন গ্রহের উপযুক্ত সমাদর করিবেন এবং শিক্ষাবিষয়ে নিজ নিজ চেষ্টা ও চিন্তার প্রয়ােগ করিয়া শিক্ষা সম্বন্ধে প্রকৃত বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা করিবে। ১৫। ভারতী-কার্তিক ১৩১৭ ভূমিকায় প্রসূ হীৰেনাৰ সন্ত মাশয় একা বােগ্যতা, অধ্যবসায় ও ঐকান্তিকতার প্রতি লক্ষ্যমাত্র নেয় সফলতাস, সবিশেষ শাৰিত, ও, [ 14 ) আশান্বিত। গ্রন্থকার শিক্ষাব্রতে আপনার সকল চিন্তা, সকল চিত্ত অৰ্পণ করিয়াছেন, শিক্ষাদান কার্যে তিনি নৈষ্ঠিক রহ্মচারী, সমগ্র ভারতবাসীর শ্রদ্ধাভাজন। শিক্ষাবিজ্ঞানের ভূমিকাপাঠ গ্রন্থকারের শক্তি সম্বন্ধে কাহারও সংশয় থাকিতে পারে না। এমন পাণ্ডিত্য ও তাহার সদ্ব্যবহার আজিকালকার এ স্বার্থের যুগে দুভ, প্রাচীন ভারতের কথা মনে পড়ে। বাঙ্গালীর গৃহে গহে এই গ্রন্থ বিরাজ করুক, শিক্ষার প্রকৃষ্টতর আদর্শে বাঙ্গালী উন্নতির পথে উঠিবে সে : বিষয়ে সন্দেহমাত্র নাই। 16 The Modern Review-October, 1910. The author is engaged in the preparation of a "Science of Education Series' which will be completed in twenty parts. The book under review is an introduction to the whole series. The author deserves our best thanks for the services he is doing to the cause of Educational Reform in our country, and we recommend this introduction to our teachers for perusal. ১৭। আৰ্যাব-কার্তিক ১৩১৭ আমাদের সমালােচ্য ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি অতি প্রকাণ্ড বিষয়ে পূর্বভাষ বা অবতরণিকা। তিনি যে জীবনব্যাপী মহাব্ৰত গ্ৰহ করিয়াছেন, ভূমিকায় তাহাই উােেখন হইয়াছে। বাঙ্গালা ভাষায় কেন, বােধহয় পৃথিবীর কোন ভাষায় শিক্ষ- বিজ্ঞানের এমন বিপুল, আয়োজন একজনের যাৱা অনুষ্ঠিত হই- আছে কিনা সন্দেহ। শেলার তাহায় মােয়তিদর্শনে; কোত, তাঁহার বিজ্ঞান-শ্রেণী বিভাগে যে একটা ভাৰসমগ্র এনি [ 15 ] করিয়াছেন, তাহাও এ শ্রেণীর সমগ্রতা নহে। শিক্ষাবিজ্ঞানের ভূমিকা প্রণেতা যে সমগ্রতাকে আদর্শস্বরূপ গ্রহণ করিয়াছে, তাহা সম্পূর্ণ করিতে হইলে বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ও জীবনাগিনী সাধনার প্রয়োজন ; জীবনব্যাপিনী সাধনায় সিদ্ধিলাভ কন্যা | কিনা সন্দেহ ভুমিকার ভূমিকালেখক হীরেন্দ্রবাবুও সে আর দিয়াছেন। অবশ্য শিক্ষাবিজ্ঞানের গ্রন্থকারের এই বিপুলার ল সঙ্কুচিত হইবার প্রয়ােজন নাই। সমস্ত জড়বিজ্ঞান ও সমস্ত অাত্মবিজ্ঞানই মানবনের সহিত অতিবনিষ্টভাবে জড়িত। বর্তমান যুগে মানৰে শিক্ষায় এই শ বিজ্ঞানেরই যথানির্দিষ্ট স্থান আছে। এই কথাটি বিবৃত হইলে শিক্ষায় সম্পূর্ণতা উপলব্ধি করা কখনও সম্ভবপর হয় না। কি বিজ্ঞান-মালােচনা-প্রয়াসী অধ্যাপক মহাশয় সাহিত্যে এই নূতন তবে অৰতাৰণা করিয়া, এই পূর্ণ আদর্শটি সাধারণের সময় ধারণ করিয়া বড় ভাল কাম করিয়াছেন। বাঙ্গালা ভাষার পলি এখনও সঙ্কীর্ণ, আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রণালী এখনও অতীতে জড়ত্ব পরিহার করিতে পারে নাই। পারিপার্থিক অবস্থাও এ সর্বতােমুখী শিক্ষার অনুকূল নহে; কিন্তু তাহা হইলেও একাদশ মহান্, সুন্দর এবং সার্থক, সুতরাং অবকাৰী যিয় সত্ত্বেও না নবীন লেখকের উদ্যমের সফলতা কামনা করি। বিষয়ের তুলনায় ভূমিকাটি নিতান্ত ক্ষুদ্র ; তাহা হইলে লেখক যেরূপভাবে তাঁর বক্ষ্যমান বিষয়ের আভাস মিয়াতে, তাহা হইতেই তীয় আয় ব্যাপারটায় ব্যাপক হৃদয় যায়। গ্রায়ের উপর আমাদের নির্ভর ও বিশাল এ তাহার মতাও আমরা পরিচয় পাইয়াছি। আমাদের কাষ তিনি নিতে সফলতা লাভ করিয়া জাতীয় সাহিত্যে ও • শিক্ষার ভাণ্ডার পূর্ণ করুন।
16 18. THE HINDUSTHAN REVIEW-Allahabad. Professor Benoy Kumar Sarkar's Economics in his Aids to GeneralCulture Series an exposition of the science as conceived in Europe from Adam Smith to Marshall, but the dast chapter "The Meaning of Indian Economics Different standpoints” is bound to prove not only interesting but instructive to students in the country. In this the author gives a lucid summary of the different standpoints from which the subject may be studied. He distinguishes between what passes for Indian Economics in the curriculum of our study of our present-day facts and phenomena relating to the industrial, financial and commercial organisation of the society and the position the tject should have as a contribution to the univexual science of Economics, which is yet in the making according to the principles of the induc? tive-philosophical method. According to thisview Indian Economics as an applied science should mean not an Economic History as set forth by Mr. Romeah Dutt or a summary of what is avai able in the Economic and Administrative section of the Imperial Gazetteer of India, but a study the methods and means of the socio-economic and economico-political advancement of India.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.