Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Chandidas-charit
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
চণ্ডীদাস-জরিত।
শ্রীব্রজসুন্দর সান্ন্যাল প্রণীত।
রাজশাহী
‘সমিতি’ প্রেসে মুদ্রিত ও বােয়ালি
সনাতন ধৰ্ম্ম-সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত
১৩১১।
মূল্য ১ এক টাকা।
No text on this page.
উৎসর্গ ।
পরমারাধ্য
শ্ৰীযুক্ত বরদাগােবিন্দ সান্ন্যাল
পিতৃদেব মহাশয়ের
শ্রীচরণে
ভক্তি ও কৃতজ্ঞতার চিহ্ন-স্বরূপ
এই ক্ষুদ্রপুস্তক অর্পণ
করিলাম।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। { বাঙলা প্রাচীন পুথি অনুসন্ধান করিবার কালে, আমি চণ্ডীদাসের কতক- গুলি নূতন পদ প্রাপ্ত হইযাছিলাম । তাহা হইতে এবং আর একখানি নাম শূন্য প্রাচীন অপ্রকাশিত পুথি হইতে চণ্ডীদাস, তাহার জনক জননী ও রামমণিৱ সম্বন্ধে অনেক নুতন তথ্য অবগত হই। এই সকল উপকরণ দ্বারা চণ্ডীদাস সম্বন্ধে একটু আলোচনা করিবার বাসনা জন্মে। তাহারই ফলে চণ্ডীদাস-চরিত প্রকাশিত হইল। ইহার প্রথম পাঁচটি প্রস্তাব নব্যভারত পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। অবশিষ্ট কয়টা নূতন লিখিত হইয়াছে। এই অকিঞ্চিৎকর পুস্তক প্রণয়নে আমি শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন প্রণীত ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, রামশতি ন্যায়রত্ন মহাশয়ের ‘বাঙ্গলা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব, এযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত প্রণীত ‘Literature of Bengal', শযুক্ত রমণীমােহন মল্লিক সম্পাদিত ‘চণ্ডীদাস প্রভৃতি গ্রন্থের সাহায্য গ্রহণ করিয়াছি, তজ্জন্য তঁাহাদিগের নিকট আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। বান্ধব’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘সাহিত্য', 'নবভা’ প্রভৃতি মাসিক পত্রে প্রকাশিত প্রবন্ধ বিশেষেরো সাহায্য লইতে আমাকে হইয়াছে, তজ্জন্য উক্ত পত্র সম্পাদকগণের নিকটও আমি কৃতজ্ঞ। পরিশেষে আমি বোয়ালিয়া ‘সনাতন ধৰ্ম্ম-সমিতি’র কর্তৃপক্ষগণের নিকট গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। ভঁহারা এই পুস্তক মুদ্রাঙ্কণে বিশেষ আনুকূল্য প্রদর্শন করিয়াছেন। অসমিতি = ঘোড়ামারা, রাজসাহী। লেপ সভe- ২১ আশ্বিন, ১৩১১।
No text on this page.
সূচীপত্র।
বিষয়।
পত্রাক
জন্মবৃত্তান্ত
রামীর প্রেম
বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ
বিদ্যাপতির সাক্ষাৎ
কবিত্ব
কাব্য
.
অন্তকাল
নানা কথা
উপসংহার
No text on this page.
চণ্ডীদাস-চলিত।
( প্রথম প্রস্তাব।
জন্ম-বৃত্তান্ত।
জগতের যে দিকে দৃষ্টিপাত করা যায়, সেই দিকেই
দেখিতে পাওয়া যায়, ধৰ্ম্মকে আশ্রয় করিয়া সংসার-প্রবাহ
প্রবহমান, কোথাও সে ধারা ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর, আবার
কোথাও বা বিশাল হইতে বিশালতর। দর্শন, বিজ্ঞান
প্রভৃতি অশেষ শাস্ত্র সমূহ মন্থন করিয়া ও এমন কোন ধর্ম
আবিষ্কার করা যাইবে না, যাহা হিন্দুধর্মকে পদানত করিয়া
স্বগর্বে মস্তকোত্তলন করিতে পারে। কপোলকল্পিত যত
কেন নব মতের অভ্যুদয় ইউক না, হিন্দুধৰ্ম্মের সহিত তুলনা
করিলে তাহার সত্ত্বাই অনুভব করা কঠিন হইয়া উঠিবে ।
হিন্দুধর্মের উপর দিয়া যত বাধা বিঘ্ন বিপত্তি বহিয়া গিয়াছে
তদ্রুপ আর কোন ধর্মের উপর দিয়া বহিলে এতদিন সে
ধর্মের নাম পর্যন্ত পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইত। হিন্দুধর্মকে
চণ্ডীদাস-চরিত্ব। ( ২ ) পরাজিত করিবার অভিপ্রায়ে,-নিকৃষ্ট প্রতীয়মান করিতে কত মহাত্মা যে মস্তিষ্ক আলােড়ন করিয়াছেন, ফল তাহার কি হইয়াছে ? যখন বৌদ্ধদিগের প্রবল প্রতাপে ভারতবর্ষ প্রক- ম্পিত, যখন ধর্মবীর বুদ্ধ অহিংসা পরম ধর্ম-ধ্বজা উড়াইয়া ভারতের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পৰ্যন্ত শিষ্য অন্বেষণ করিয়া বেড়াইয়াছিলেন, যখন কান্যকুজ ব্যতীত ভারতের অন্যান্য প্রদেশ বুদ্ধের সু-উচ্চ পতাকা মূলে আত্মসমর্পণ করিতে একান্ত উৎকণ্ঠিত, তখন কৰ্ম্মবীর, ধৰ্ম্মবীর শঙ্করাচার্য্য অবিভূত হইয়া হিন্দুধর্মের জ্বলন্ত মহিমাচ্ছটা প্রদর্শন করতঃ বোদ্ধ শিষ্যমণ্ডলীকে দেশ হইতে নির্বাসিত করিলেন । অন্যান্য প্রদেশে বৌদ্ধধর্ম অদ্যাপিও আস্তিত্ব রক্ষা করিতে পারিলে ও, যে ভারতবর্যে বুদ্ধের জন্ম, সেই ধৰ্ম্মক্ষেত্র ভারতভূমে আজ আমরা কয়জন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীকে দেখিতে পাই ? পূর্ণ- চএ-উদ্ভাসিত গগণপটে কি খদ্যোতের দ্যতি প্রকাশ পায় ? হিন্দুধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম, জ্ঞান ও ভক্তির ত্রিবেণী। এইরূপে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব মন্দীভূত হইতে আরম্ভ হইলে, হিন্দুধৰ্ম্মের এক শাখা অবলম্বন কবিয়া বৈষ্ণব ধন্ধু জগতে উচ্চ হইতে উচ্চতর প্রকোষ্টে অগ্রসর হইতে লাগিল। অবশেষে প্রেমাবতার শ্রী চৈতন্য অবতীর্ণ হইয়া প্রকৃত বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করিলেন,-যজ্ঞে পূর্ণাহুতি প্রদত্ত হইল। খৃষ্টীয় ত্রয়ােদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলার হিন্দু রাজত্বের লােপ হয়। এই সময় পর্যন্ত হিন্দু নরপতি, হিন্দু, সেনাপতি, ( ৩ ) চণ্ডীদাস-চরিত। হিন্দু, মন্ত্রী, হিন্দু, যােদ্ধা প্রভৃতি যাহ। প্রয়ােজন, তৎসমুদয় হিন্দদ্বারা নির্বাহিত হইত, হিন্দুর সমস্ত আশাই হিন্দুর দ্বারা পূরণ হইত। কিন্তু যেমনি দাসপতি বখতিয়ার বঙ্গে আসিয়া গ্রীবা উত্তোলন করিলেন, অনি হিন্দুগণ শাস্ত্ৰদ্বার উদঘাটন করিয়া প্রমাণ করিলেন যে: বঙ্গে যবনাধিকার শাস্ত্রসম্মত, হিন্দুনরপতির পলায়ন স্বসিদ্ধ। এই সময় হইতে বাঙ্গালী জাতি ও বাংলা সাহিণ্যের উপর মুসলমানগণ যত অত্যাচার করিয়াছে, বৈষ্ণবগণ যদি তাহা ধীরতার সহিত উপেক্ষা না করিত, তবে নিশ্চয়ই বঙ্গ-সাহিত্য মুকুলেই শুষ্ক হইয়া যাইত। বঙ্গ-সাহিত্যের প্রথমাবস্থায় কাব্যেরই প্রাদুর্ভাব ছিল। প্রথমাবস্থা বলিতে দুই এক শত বৎসর পূর্বের কথা বুঝায় , চসারের কবিত্ব-সৌরভে যখন ইংলও পুলকিত, তাহারে পূৰ্ব হইতে বঙ্গের ক্ষুদ্রপল্লী মাণিকচঁদি, জয়দেব, চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি প্রভৃতির কবিতায় মুখরিত । যাহারা বঙ্গ-ভাষাকে নবীন সাহিত্য বলিয়া উপেক্ষার চক্ষে দেখিয়া থাকেন, তঁাহারা একটু ধীর ভাবে আলােচনা করিলেই নিজের ভ্রম বুঝিতে পারিবেন। নিবিড় কাননাভ্যন্তরে যেমন মনাকর্ষণের একমাত্র উপাদান পুষ্প; বালক, বুদ্ধ, যুবক যুবতী সকলেই যেমন তাহার স্বাভা- বিক সৌন্দর্য্যে ও মধুরতায়মুগ্ধ, মানব সমাজের উপর কবিতারও তেমনি কার্যকারী মনোমুগ্ধকারিণী ক্ষমত। অন্তর্নিহিত আছে ।
চণ্ডীদাস-চবিত। ( ৪ ) কিন্তু পুষ্প যেমন দুইদিন পরেই শুকাইয়া ঝরিয়া পড়ে, কবি- তার তেমন শৈশব, কিশোর, বার্ধক্য দশা উপস্থিত হয়না,উহা চির-নবীনা, চিরসৌন্দর্য্যে টলটলায়মান। মানব সমাজকে বিমােহিত ও বিমুগ্ধ করিবার শ্রেষ্ঠ উপকরণ—এই কবিতা- ন্দরী । যে সমাজের এই কবিতগৌরব করিবার সৌভাগ্য ঘটিয়া উঠে নাই, সে সমাজের ন্যায় মন্দভাগ্য আর কাহার ? যে কয়জন মহাত্ম। এইরূপে বঙ্গীয় সমাজকে সৌভাগ্যশালী, গৌরবান্বিত করিয়াছেন, তন্মধ্যে কয়েকজন গীতি কাব্যকার বৈষ্ণব কবি বিশেষ উল্লেখ যােগ্য, তাহারাই আমাদের বরণীয় স্মরণীয় ও পূজণীয়। আমাদের অহঙ্কার করিবার আর কিছুই নাই, আছে কেবল কয়েকজন বৈষ্ণবগীতিকার। কেবল তাহাদের জন্যই আজ আমরা অন্যান্য প্রদেশীয়দিগের ব্যঙ্গোক্তি হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারিতেছি । এই গীতি-কাব্যকারদিগের মধ্যে যাহারা সৰ্ববাদিসম্মত সর্বশ্রেষ্ঠ, তাহাদেরই একজন আজ আমার আলােচ্য। বীরভূমির বড় সৌভাগ্য, যে সে কতকগুলি কবির জননী হইতে পারিয়াছে। কিন্তু তাহার প্রধান গৌরব, প্রেমবিহ্বল উন্মাদ চণ্ডীদাসকে বক্ষে ধারণ করিয়াছে বলিয়া। কবির সুমধুর সংগীত-ধারা “কাণের ভিতর দিয়া মরমে” প্রবেশ করে, তিনি বীরভূম জেলার ক্ষুদ্র পল্লী এনামুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। এই ক্ষুদ্র গ্রামের এক প্রান্তে বসিয়া প্রেমবিহল 'গ্রী বঙ্গবাসীকে প্রেমতরঙ্গে ভাসাইয়া হৃদয়ে যে ৫ যে স্বভাব- ( ৫ ) চণ্ডীদাস-চারত। প্রেমের উন্মাদকারী উচ্ছাস জাগাইয়াছিলেন, তাহার তুনা এজগতে কোথায় ? d 4 4 সিউড়ী বীরভূমের প্রায় পঁচিশ মাইল পূৰ্বেদিকে নান্নর গ্রামে চণ্ডীদাস জন্ম গ্রহণ করেন। নানুর সাকুল্লীপুর থানার অন্তর্গত, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অহম্মদপুর স্টেশন হইতে প্রায় কুড়ি মাইল পূৰ্বাংশে। চণ্ডীদাস যদি না রে জন্ম গ্র- হণ না করিতেন, তবে কয়জন সে গ্রামের নাম জানি?তাহাকে লইয়াই নানুরের গৌরব। না রের পশ্চিমদিকস্থ এক ক্ষেত্রে হলকর্ষণ কালে একটি পুরাতন চুল্লী পা ওয়াগিয়াছিল। ইহার দ্বারা অনুমিত হয়, এক কালে ঐ স্থানে লোকের বসতি ছিল। কালের কঠোর ধ্বংস-নীতির প্রভাবে এখন তাহ। জঙ্গল-প্রান্তরে পরিণত হইয়াছে। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন, বর্তমান সময়ে নাম রের যে অংশে লােকের বসিত , আছে, পূর্বকালে সে অংশে নিবিড় জঙ্গল হিংস্ৰজন্তুর অবা। সস্থান হইয়াছিল। চণ্ডীদাস নানুরের বিশালাক্ষী দেবীর পুরােহিত ছিলেন, মন্দিরটী এখনাে বিদ্যমান থাকিয়া অতীতের সুখ-খ্যাতি জাগা, ইয়া দিতেছে। মন্দিরের সম্মুখে ও দক্ষিণে অন্য কতকগুলি শিব মন্দির আছে, যে সকল মন্দির কতদিনের পুরাতন, তাহ সহজে নির্ণয় করা সুকঠিন, তবে দেখিয়া বােধ হয় যে, শতব- ৎসরের কম নহে। বিশালাক্ষীর মন্দির-সম্মুখস্থ শিবমন্দিরের , পশ্চাদ্ভাগে আরো অনেকগুলি শিবমন্দির আছে। তৎ- 4
চণ্ডীদা-চবিত ।
( ৬ )
য্যের কঙ্কাল নহে।
পশ্চাৎ একটি উচ্চ ভূমি—ইহা একটি অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ।
অনেকে বলেন, উহাই চণ্ডীদাসের আবাস বাটী । মধ্যে মধ্যে
ঐ স্থান হইতে পুরাতন মােহর প্রাপ্ত হওয়া যায়। শুনিতে
পাইলাম ও নাম রে প্রকাশ যে, ঐ ভিটা খনন কালে একটি
নর-কঙ্কাল বাহির হইয়াছিল, তাহা আধুনিক খর্বাকৃত মনু-
প্রত্যক্ষ দর্শনকারীদিগের কথা এই যে,
ঐ কঙ্কাল সপ্তহস্ত পরিমিত মানব দেহের কঙ্কাল। আমাদের
বিশ্বাস, ঐ স্তুপ খনন করিলে নানা অদ্ভুত রহস্য আবিষ্কৃত
হইতে পারে।
এখন চণ্ডীদাসের জন্মকাল নির্ণয় করা যাক। বৃন্দাবন
দাস, কৃষ্ণদাস, নরহরিদাস, বৈষ্ণবদাস, ভক্তমাল-প্রণেতা অনে
কানেক পুরাতন ও আধুনিক কবিগণের গ্রন্থে চণ্ডীদাসের
উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাতে অনুমান করা যায় যে
চণ্ডীদাস শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বহুপূর্বে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
এইরূপ অনুমানের আর একটি কারণ এই যে, চৈত্যন্যের
পর যত বৈষ্ণব কবির অভ্যুদয় হইয়াছে, সকলেই নিজ নিজ
গ্রন্থে ও পদাবলীতে অধিক বা কিয়ৎপরিমাণে তঁাহার গুণ
কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। চণ্ডীদাসের একটি পদে ও মহাপ্রভুর নাম
নাই। ১৪০৭শকে শ্রীচৈতন্য প্রভু জন্ম গ্রহণ করেন, সুতরাং
তাহারে পূৰ্বে চণ্ডীদাস জন্মিয়াছিলেন।
চণ্ডীদাস যে চতুর্দশ শতাব্দীতে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন,
তাহাতে আর সন্দেহ নাই। তাহার একটি পদ এইরূপ,
{
t
( ৭ )
Fণ্ডীদাস-চৰিত ।
“বিধুর নিকটে নেত্র,পক্ষ, পঞ্চ সাণ ।
নহু, হু রেস হই পরিমাণ।
পরিচয় সঙ্কেত অঙ্কে নি…।।
চণ্ডীদাস রস কৌতুক কি…।।
বিধু, নেত্র, পক্ষ, পঞ্চৰণে ১৩২৫শক হয়, ইহা ১৪৩০
খৃষ্টাব্দ। যদি ১৩২৫শকে তিনি এই পদটি রচনা করিয়া
থাকেন, তবে ইহারে।পূর্বে তিনি জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন,
এবং তাহাই আমার নিকট সমীচীন বলিয়া বােধ হয়। কারণ
বিদ্যাপতি পঞ্চগৌড়েশ্বরকে কপিত্ব-সৌরভে বিমােহিত করিয়া
১৪০১ খ্রীষ্টাব্দে (১৪২০শকে) বিসপী গ্রাম প্রাপ্তহন।* এই
সময়ে চণ্ডীদাসের সহিত তাহার কবিতা উপহার আদান প্রদান
হইত, তাহা যথা স্থানে বিবৃত করিব। এই পদটী যদি চণ্ডী-
দাস বিংশতি বর্ষ বয়ঃক্রম কালে ও লিখিয়া থাকেন, তবে ১৩০৫
শকে তঁাহার জন্ম ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। কবি-চরিতে
উল্লিখিত আছে যে, শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাব হইবার প্রায়
শতাধিক বৎসর পূর্বে বিদ্যাপতি অনেক বাঙ্গলা পদ রচনা
করিয়া গিয়াছেন। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি সমসাময়িক, সুতরাং
১৩০শেকে তাহার জন্ম বলিলে নিতান্ত অসঙ্গত হইনাে ।
পঞ্চগৌড়াধিপ শিবসিংহভুপ, কৃপা করি ল নিজ পাশ।
বিসপী গ্রাম দান করিল, মুঝে, রহতাহ রাজসন্নিধান । বিদ্যাপতি।
চণ্ডীদাগ-চবি ।
( ৮ )
যায় না ।
চণ্ডীদাসের পদাবলী পাঠে তাহার জনকজননীর নাম জানা
১২৮০ সালের ১০ই পৌযের, যােম প্রকাশে এক
ব্যক্তি লিখিয়া ছিলেন, চণ্ডীদাসের ১৩৩৯শকে জন্ম ও ৩৯৯
শকে মৃত্যু হয়। ইহার পিতার নাম দুর্গানাথ বাগছী, ইহরা
বরেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। ইহার রচিত গ্রন্থের নাম গীতচিন্তা-
মণি। লেখকের এই উক্তি সম্পূর্ণ সত্য নহে। চণ্ডীদাস
যে ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাহা নিস শয়রূপে প্রমাণ করা যাইবে ।
আমরা তাহার নিম্নলিখিত ভণিতাযুক্ত পদ পাইয়াছি।
(১) চণ্ডীদাস কয় ;
(২) কহে দ্বিজ চণ্ডীদাস ;
(৩) বড়, (ব্রাহ্মণ-কুমার) চণ্ডীদাস কহে।
(৪) কহে রতু চণ্ডীদাস।
(৫) রামু চণ্ডীদাস ভণে ।
(৬) কবি চণ্ডীদাস কহে। ইত্যাদি।
=
চণ্ডীদাসের নব—প্রকাশিত পদাবলীর এক স্থানে আমরা
‘দাস চণ্ডীদাস' ভণিত। পাইয়াছি ;
ইহার চরিত
দাস চণ্ডীদাস জার । *
বলা বাহুল্য এ ‘দাস’ জাতিবাচক নহে, হীনত্ব প্রকাশক।
আর একস্থলে ‘দাসী’ ও ব্যবহৃত হইয়াছে।
অদভূত রীত
+ সাহিত্যপরিষৎ-পত্রিকা
চণ্ডীদাস-চরিত। ১৩৩৯শকের পূর্বে যে চণ্ডীদাস জন্মিয়াছিলেন, তাহ। আমরা পূৰ্বেই দেখাইয়াছি। তাঁহার পিতার নাম দুর্গানাথ বাগচী ছিল কি না, তাহা বিশ্বাস করিবার কোনাে উপায় নাই। তবে তঁাহার নকুল নামে এক সহােদর ছিলেন। চণ্ডীদাস স্বীয় পদাবলীতে তঁাহার উল্লেখ করিয়াছেন। রজকিনীর প্রেম- পাথারে চণ্ডীদাস নিমগ্ন হইলে, যখন তাহাকে জাতিতে আটক করিল, তখন নকুল তাহাকে রজকিনীর প্রেমত্যাগ করিতে বিশেষ অনুরোধ করেন। আমি ১৩৭৩শকের লিখিত একখানি প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করিয়াছি। তাহাতে একস্থলে পাওয়া যায়, “ভবানী চরণ নামক এক ব্রাহ্মণের উরসে ভৈরবী নাম্নী এক কামিনীর গর্ভে চণ্ডীদাসের জন্ম হয়।” বীরভূমিস্থ জনৈক বন্ধু লিখিয়াছেন, ‘নায়ুরে বিশেষ অনুসন্ধান করিয়া জানিলাম, চণ্ডীদাসের পিতার নাম ভবানী চরণ রায়, ও জননীর নাম ভৈরবী সুন্দরী ছিল। খুব সম্ভবতঃ তাহার জন্ম ১৩০৮-১৫শকের মধ্যে হইয়াছিল।” পূর্বোক্ত প্রাচীন পুঁথির সহিত বন্ধুবরের কথা ঐক্য হওয়ায় আমার বিশ্বাস হইয়াছে যে, চণ্ডীদাসের জনক জননীর নাম ভবানীচরণ ও ভৈররী সুন্দরীই ছিল। পাঠকগণ একথা কতদুর বিশ্বাস করিবেন, জানি না। সাল দেখিয়া এই পুঁথি খানি চণ্ডীদাসের জীবন কালেই লিখিত হইয়াছে জানা B,
চণ্ডীদাস-চরিত
( ১০);
.
নানুরের মাঠে
বালী আদেশে
চণ্ডীদাসের পিতা বিশালাক্ষী দেবীর পূজক ছিলেন।
তঁাহার মৃত্যুর পর চণ্ডীদাস নিজে বাশুলী দেবীর পুরােহিত
নিযুক্ত হন ;--
পত্রের কুটির
নিরঞ্জন স্থান অতি।
চণ্ডীদাস তথা
ভজন করয়ে নিতি ।
নামুরের মাঠে নির্জন পত্ৰ কুটীরে থাকিয়া চণ্ডীদাস
ভজন সাধন করিতেন। চণ্ডীদাসের পদাবলীতে বহু স্থানে
বাশুলী দেবীর নাম পাওয়া যায়।
কহে রতু চণ্ডীদাস বাশুলীর বর।
হট, ফট, করে প্রাণ বঁধু নাহি ঘরে ।
বাগুবরে চণ্ডীদাস দাবলী লিখিতে আরম্ভ করেন।
এই বাশুলীর বরদান প্রসঙ্গ এস্থানে উল্লেখ করিলে বােধ হয়
অপ্রাসঙ্গিক হইবেনা। বিশালাক্ষীর অপভ্রংশ বাশুলী।
বাঁকুড়া জেলার অন্তঃপাতী শালতােড়া গ্রামে নিত্যা নাম্নী
বনদেবীর বাশুলী নাম্নী এক ডাকিনী সহচরী ছিল।
দেবীর ঝুমুর গানের প্রতি অতিশয় অনুরাগ ছিল। একদা
তিনি ঝুমুর শ্রবণে মুগ্ধ হইয়া সহচরীর প্রতি অনুজ্ঞা প্রদান
করিলেন যে, যাহাতে সহজ ভজন দ্বারা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীত
সর্বত্র প্রচারিত হয়, তাহার উপায় বিধান কর। বাশুলী দেবী
অজ্ঞা প্রাপ্তে নামুর গ্রামে যাইয়া নির্জন গৃহে চণ্ডীদাসকে
নিদ্রিত দেখিয়া তাহার পৃষ্ঠে ‘চাপড় মারেন। এই আঘাতে
( ১১ ) চণ্ডীদাস-চরিত । তঁাহার নিদ্রাভঙ্গ হইলে, বাশুলী তাহাকে গুরুর আশ্রয়ে রাধা -কৃষ্ণ-লীল। সংগীতে প্রকাশ করিতে উপদেশ দেন। শালতোড়া গ্রাম, অহি পিঠস্থান নিত্যের আলয় যথা । ডাকিনী বাশুলী, নিত্য সহচরী বসতি করয়ে তথা । চণ্ডীদাস কহে, সে এক বা গু• প্রেম প্রচারের গুর! তাহারি চাপড়ে, নিদ্রা ভঙ্গ পীরিতি হইল সুরু । : * নিত্যের আদেশে, বা খুশী চলি নানুর গ্রামেতে সহজ জানাবার তবে। এমিতে নিতে, প্রবেশ যাইয়া করে। বাণী অাসিয়া, চাগড় মারিয়া চণ্ডীদাসে কিছু কয় । সহজ ভান, করই বাজনা ইহা ছাড়া কিছু নয়। ছাড়ি জপ তপ, করহ অারোপ একতা করিয়া মনে। যাহা কহি আমি, তাহা শুন তুমি শুনহ চৌষট্টি সনে। বাশুলী বলিলেন, বিশেষ সতর্কতার সহিত মধুর রসের উপাসনা কর ; কখনাে দক্ষিণ দেশে যাইওনা, গেলে বিপদে
চণ্ডীদাস-চরিত।
( ১২ )
পড়িবে। ব্ৰজ ভাবানুসারে ভজনই শ্রেষ্ঠ, তুমি সেইরূপ
ভজন কর, রামিণী নাম্নী রজকিনী তােমারি হইবে।
বসুতে গ্ৰহেতে, করিয়া একত্রে, ভজহ তাহারে নিতি।
বাণের সহিতে, সাই যুক্তিতে, সহজের এই রীতি।
দক্ষিণ দেশেতে, না যাবে কদাচিত, যাইলে প্রমাদ হবে।
এই কথা মনে, ভাব রাত্রি দিনে, আনন্দে থাকিবে তবে।
রতি পরকিয়া, যাহারে কহিয়া,সেই সে আরােপ সার।
ভজন তােমারি, রজক ঝিয়ারি, রামিনী নাম যাহার।
( বাশুলীর উপদেশ শ্রবণে চণ্ডীদাস আশ্চর্যান্বিত হইয়া
বলিলেন, রজকিনীকে আমার করিলে আমি কোন্ বরণ’ (বর্ণ)
হইব ও কোন্ বৃন্দাবনে যাইব ? সে বৃন্দাবন কোথায় এবং
তথাকার কিশাের কিশােরীই বা কোথায় ?
প্ৰবৰ্ত্ত দেহের সাধনা করিলে কোন্ বরণ হব।
কোন্ কৰ্ম্ম যাজন করিলে কোন্ বৃন্দাবনে যাব।
নব বৃন্দাবনে নর নাম হয় সকল আনন্দময়।
কোন্ বৃন্দাবনে ঈশ্বর মানুষে মিলিত হইয়া রয়।
কোন বৃন্দাবনে বিরজা বিলাসে তরুলতা চারি পাশে।
কোন্ বৃন্দাবনে কিশাের কিশােরী অরূপ মঞ্জুরী সাথে।
কোন্ বৃন্দাবনে রস উপজয়ে সুধার জনম তায়।
কোন বৃন্দাবনে বিকশিত পদ্ম ভ্রমরা পশিছে তায়।
গেপতের পথ না হয় বেকত রসিক জনার সনে।
উপাসনা ভো যাহার হয়েছে সেই সে মরম জানে।
দ্বিজ চণ্ডীদাস না জানিয়ে তত্ত্ব কেমনে হইবে পার।
উত্তম কুলেতে লভিয়ে জনম ছিঃ নীচ সহ ব্যবহার।
(১৩)
চণ্ডীদাস-চয়িত্ত ।
wo
ছিঃ-ব্রাহ্মণ কুলে জন্ম গ্রহণ করিয়া নীচের সহিত প্রবর্ত
হইব? বাশুলী উত্তর করিলেন,
বাশুলী কহিছে শুনহ দ্বিগ।
কহিব তােমারে সাধন বীজ।
প্রথম দুয়ারে মদের গতি।
দ্বিতীয় দুয়ারে আসক স্থিতি।
তৃতীয় দুয়ারে কলপ রয়।
কনপ রূপেতে কৃষ্ণ কয়।
আসক রূপেতে রাধা কই।
মদরূপ ধরি আমি সে হই।
সাতাশী অখিরে সাধিবে তিনে।
একত্র করিয়া আপন মনে।
রতির আকৃতি আসকে রয়।
রসের আকৃতি কন্দপ হয়।
তিনটী আখরে রতিকে যজি।
পঞ্চম আখরে বাপকে ভঙ্গি।
দ্বিতীয় আসকে সামান্তা রতি।
তবে সে পাইবে বিশেষ স্থিতি।
চতুর্থ আখরে সামান্য রস।
তাহাতে কিশাের কিশোরী বশ
বাশুলী হয়ে এই সে সার।
এ রস বেদান্ত সমুদ্র পার ।
এই কথা শুনিয়া চণ্ডীদাস মূচ্ছিত হইলে বাশুলী সন্তর্ধান,
হইলেন।
চণ্ডীদাস প্রেমে মূর্হিত হইল।
বাশুলী চলিয়া নিত্যেতে গেল।
.
চণ্ডীদাস-চুরিই । ( ১৪ ) মুচ্ছাভঙ্গের পর চণ্ডীদাসের মন অতিশয় চঞ্চল হইল। উত্তম কুশেতে জন্মিয়। নীচের সহিত ব্যবহার করিতে হইবে, কে-ই বা তাহাকে সাধন শিক্ষা দিবে, এইরূপ ভাবনায় তাহার চিত্ত অতিশয় ব্যাকুল হইল। এমন সময় নানুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিশালাক্ষী তাহাকে রানীর সহিত রাধাকৃষ্ণ মহামন্ত্র দান করিলেন এবং তাহাদের শিক্ষারভার নিজেই গ্রহণ করি- লেন চণ্ডীদাস ও রামীর প্রেমের কথা আমরা পরে বলিতে চেষ্টা করিব। পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে যে, চণ্ডীদাসের পিতা বিশালাক্ষী দেবীর পূজক ছিলেন। দেবীর প্রসাদে পুত্র দীর্ঘায়ু ও খ্যাতি সম্পন্ন হইবে, এই ভাবিয়া। তিনি বােধ হয় পুত্রের নাম চণ্ডীদাস রাখেন। চণ্ডীদাসও নামের সার্থকতা রাখিতে পারিয়াছিলেন, তিনি সর্বাংশে চণ্ডীরই দাস ছিলেন। প্রত্যহ স্বহস্তে পুষ্প চয়ন করিয়া ভক্তি চিত্তে বিশ্বপালনী চণ্ডীর পাদপদ্মে অঞ্জলি প্রদান করিতেন। এখনাে এই দেবী-মন্দির বিদ্যমান আছে, কেবল নাম পরিবর্তিত হইয়া বাশুলীতে পরিণত হইয়াছে। দেবী প্রস্তরময়ী-চতুভুজা, মহাদেবের বক্ষোপরি সংস্থাপিত। পূৰ্বে তান্ত্রিক মতে তাঁহার পূজা ভােগাদি সম্পন্ন হইত, কিন্তু এখন মৎস্য ও ছাগশিশু ভিন্ন অর কোন তান্ত্রিক ভােগাদির আয়ােজন হয় না।* চণ্ডীদাসের স্মৃতি রক্ষার্থে এখন বেলাই গ্রামে চণ্ডীর গেল হইয়া থাকে। * বাশুলীর মদ্যমাংস ভোগের কথা প্রামাণিক বৈষ্ণব গ্রন্থেও দেখতে পাওয়া যায়। যথা-বাশুলী পূজয়ে কেহাে নানা উপহারে। ম্যমাংস দিয়া (কহাে যজ্ঞ পূজা করে। চৈতন্য ভাগবত।
চণ্ডীদাস-চবিত।
Ay
।
১,
চণ্ডীদাস অতি শৈশবে পিতৃ মাতৃহীন হন, কাযেই বিদ্যা-
ভ্যাস করিবার তাদৃশ সুবিধা ঘটিয়া উঠে নাই। বাল্যকাল
হইতে সংগীতের প্রতি তঁাহার বিশেষ অনুরাগ ছিল।
যেখানে গানের নাম শুনিতেন, সেই খানেই আহার নিদ্রা
ত্যাগ করিয়া গমন করিতেন।
‘সকল ছাড়িল যাহার তরে।
তাহারে ছাড়িতে সাহস করে ।
আদি চণ্ডীদাস চার সুবুলান।
দাউ উঠাইল যেমন মান॥
ইহার দ্বারা জানা যায় যে, চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণ লীলার
অাদি প্রণেতা। তিনি নিজেও একজন সুগায়ক ছিলেন,
তাহার সুমধুর কণ্ঠধ্বনিতে পশু পক্ষীও স্তম্ভিত হইত।
‘এই সে বঁাশীতে সঙ্কেত নিসান বাজই রসিক রায়।
তবু না ভাঙ্গিল মান অভিমান চণ্ডীদাস পুঃন গায়।
বাল্যকালে চণ্ডীদাসের আর একটি দ্রব্যের প্রতি বিশেষ
আসক্তি ছিল। তামাক তাহার অতি প্রিয় ছিল এবং এই জন্য
তিনি গ্রামবাসীগণের নিকট হইতে ‘চণ্ডে মাতাল’ উপাধি
পাইয়াছিলেন।
পিতৃ মাতৃ বিয়োগে চণ্ডীদাস ঘাের দুঃখে পতিত হন,
আহারের কোন সংস্থানই নাই। যে সুশীতল সুমধুর বায়ু ,
হিল্লোল তিনি মঙ্গলময় বিধাতার আশীর্বাদ-ধারা বলিয়া মনে
করিতেন, তাহাই এখন তাহার নিকট তীব্র অভিশাপের
জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। কিন্তু বেশীদিন
চণ্ডীদা-চরিত । ( ১৬ ) ) তাহাকে এই ভাবে থাকিতে হইল না, সহৃদয় গ্রামবাসী ভাবী কবির মস্তক মুণ্ডন পূর্বক গলদেশে যজ্ঞোপবীত দিয়া তাহাকে বিশালাক্ষীর পূজক করিয়া দিলেন। চণ্ডীর অশ্ন কষ্ট নিবারণ হইল। চণ্ডীদাস নারের নির্জন মাঠে পর্ণকুটীরে থাকিয়া ভজন সাধন করিতে লাগিলেন। অকস্মাৎ একদিন তাহার জীবন- স্রোত গতি অবলম্বন করিবার সুযােগ পাইল। রামি (রামমণি) নাম্নী এক দুঃখিনী রজকিনী কন্যা নিতান্ত অসহায় হইয়া চারিটী অম্নের আশায় বিশালাক্ষীর মন্দিরে চণ্ডীদাসের নিকট উপনীত হইল। রামণির বয়স অল্প, রূপও না ছিল তাহা নহে; বিশেষতঃ তাহার কাৰ্যে একটু পবিত্রতার গন্ধ পাইয়া গ্রামবাসীগণ তাহাকে মুন্দির মার্জন কার্যে নিযুক্ত করিলেন। তথায় থাকিয়া দেবীর প্রসাদা খাইয়া রামমণি দিনদিন শশী- কলার ন্যায় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। মন্দিরের কাৰ্য সে বিশেষ নিপুণতা দেখাইতে লাগিল, কাযেই সকলে তাহাকে প্রীতির চক্ষে দেখিতে লাগিল। দুঃখিনী রামিনী সেবাতে নিযুক্ত হল। চণ্ডীদাস কহে, শশীকলার ন্যায় ক্রমে বাড়িতে লাগিল। ‘অল্প বয়সে, রামিনী কামিনী, কাঞ্জেতে নিপুণ। সকলের প্রিয়তমা রামমণি এস্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র যাইতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিল এবং চণ্ডীদাসেরও ‘পীরিতি হইল সুরু। ম
( ১৭ )
চণ্ডীদাস-চরিত
-
রামমণির নাম লইয়া একটু মতভেদ দৃষ্টিগােচর হয়।
কেহ তারা, কেহ রামতারা প্রভৃতি আপ্যায় তাহাকে অভি-
হিত করিয়াছেন। শ্ৰীযুক্ত জগবন্ধু ভদ্রের সংস্করণে চণ্ডীদাসের
যে জীবনী প্রদত্ত হইয়াছে, তাহাতে ইহার নাম রামতারা’
বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। নরহরি তাহাকে ‘তারা ধুবিনী’
নামে উল্লেখ করিয়াছেন,
শুনি ভাবে মনে জানি পুন দেবি কহে কি চিন্তই চিতে।
সুখময়ী তারা ধুবিনী দরশে কুবিবে বিবিধ মতে ।
আমরা তারা ধুবনী বা রামতারা নাম প্রহণ করিতে
প্রস্তুত নহি। যদি ঐ নামই প্রকৃত হইত, তবে চণ্ডীদাস
তাহার কোনো না কোনাে পদে তাহার উল্লেখ করিতেন।
যাহার প্রেমে বিভাের হইয়া কবি, কুল মান সব পরিত্যাগ
করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন, সেই প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তমার
প্রকৃত নাম লিখিতে বে কবি বিস্মৃত হইবেন; তাহা অামাদের
বিশ্বাস হয়না।
না রে রামী যে বাড়ীতে বাস করিত তাহার ভিটা এখনাে
আছে। নাই কেবল রামী, তথায় এখন আর একজন আবাস
গৃহ নির্মাণ করিয়া বাস করিতেছে ।
বৈষ্ণব কবিদিগের মধ্যে যাঁহারা বরণ্য হইয়াছেন, চণ্ডীদাস
তাহাদের একতম ;
বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসো জয়দেবঃ কবীশ্বরঃ
লীলাকঃ প্রেমযুক্ত। রামনন্দুশ্চ নন্দদঃ |
শ্রীগোবিন্দ কবীন্দ্রোন্ত সিদ্ধ কৃষ্ণ কবীনক।
পৃথিব্যাং ধন্য ধন্যান্তে বর্ণান্তে সিদ্ধ রূপিন।
এ বিজ্ঞবর বন্দে সপ্তরিধিতুল্যকান্।
যেং সংস্মৃতি মানে সর্বসিদ্ধিঃ প্ৰজায়তে
দ্বিতীয় প্রস্তাব।
( রামীর প্রেম।)
;
কবি-হৃদয়ে প্রেমের অস্বাভাবিক স্ফরণ আশ্চর্যের বিষয়
নহে। পরম প্রেমিক প্রেমময় বিধাতার আশীর্বাদে প্রেম
সকলের হৃদয়েই প্রতিভাত ,তবে কাহারাে হৃদয়ে বা বেশী,
কাহারাে হৃদয়ে বা কম। মানুষ সেই প্রেমময়ের প্রেমের
অংশটুকু ক্ষুদ্র গণ্ডীর ভিতর আবদ্ধ করিয়া রাখিতে পারেনা।
সে প্রেম একের জন্য নহে,—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকলেরই তাহা
এজমালী ধন ; আপনা হইতেই তাহা বিশ্বসংসারে ছড়াইয়া
পড়ে,—চাপিয়া রাখিতে পারা যায় না। অহঙ্কারে মত্ত
হইয়া লােকে সেই প্রেমময়কেও বিস্মৃত হইতে পারে, কিন্তু
তাঁহার সেই প্রেমকণাটুকু সহস্র চেষ্টাতেও ভুলিতে পারেনা।
জীবনে মরণে তাহারই ‘চরণ সার।
‘ওরূপ মাধুরী, পাসরিতে নারি
কি দিয়ে করিব বশ।
তুমি সে তন্ত্র, তুমি সে মন্ত্র
তুমি উপাসনা রস।
( ১৯ ) চণ্ডীদাস-চরিত। innammann wwA ভেবে দেখ মনে, এতিন ভুবনে কে আছে অামার অার। বাশুলী আদেশে, কহে চণ্ডীদাসে ধােপানী চরণ সার। চণ্ডীদাসের প্রেমের গভীরতা আছে, ইহা কেবল মুখের দু’টী মধুর কথা নহে। তিনি বুঝিয়াছিলেন 'Love is Heaven and Heaven is love', atat ofco তঁাহার প্রেম যত নিন্দনীয় বলিয়াই না কেন লোকে ঢক্কা নিনাদে প্রচার করুক, মণিকাঞ্চনের ন্যায় স্বামীর সহিত তাঁহার সংযােগ না হইলে, তাহার প্রীতি ও কবিত্বের মূল প্রশ্ৰৰণ বিচ্ছুরিত হইত কিনা সন্দেহ। তঁাহার প্রেম যে স্বর্গীয় পদার্থ রামী যে সামান্য। স্ত্রী নহে, তাহা আমরা ক্রমে ক্রমে দেখা- ইতে চেষ্টা করিব । যে প্রেমিক রজকিনী প্রেমিকাকে বলিতে পারে-- ‘গুন রজকিনী রামি ! ওদুটী চরণ, শীতল জানিয়া শরণ লই আমি। যে বলিতে পারে- ‘তুমি রজকিনী অামার রমণী তুমি হও মাতৃ পিতৃ। ত্রিসন্ধ্যা যজন, তােমারি ভজন তুমি বেদ মাতা গায়ত্রি । সে রজকিনীপ্রেম নিশ্চয় ‘নিকষিত হেম। সে প্রেমিক এ জগতের নহে, আর সে রামীও সামান্য নহে।”
চণ্ডীদাস-চবিহ
( ২০ )
চণ্ডীদাসের সহিত রামমণির মিলন বড়ই আশ্চর্যের বিষয়।
রামী নিঃসহায় অবস্থায় ক্ষুন্নিবৃত্তির আশায় বিশালাক্ষীর
মন্দিরে দাসীরূপে নিযুক্ত হইল। পরে বাশুলীদেবী তাহার
সহিত প্ৰবৰ্ত্ত হইতে চণ্ডীদাসকে আদেশ করেন। চণ্ডীদাস
ব্রাহ্মণ হইয়া রজকিনীতে প্ৰবৰ্ত্ত হইতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিলে,
বাশুলী তাহাকে সার উপদেশ দেন। আবার এদিকে রামী-
কেও বাশুলী স্বপ্নে চণ্ডীদাসের সহিত প্ৰবৰ্ত্ত হইতে আদেশ
স্বপ্নাদেশ প্রাপ্তে রামী চণ্ডীকে সকল কথা বলিল,
চণ্ডী প্রথমে তাহা বিশ্বাস করিতে চায় না।
করেন ।*
রে
কহিছে রজকিনী রামী, শুন চণ্ডীদাস তুমি
নিশ্চয় মরম কহি জানে।
বাশুলী কহিছে সাহা, সত্য করি মান তা
বস্তু 'ছে দেহ বিদ্যমানে।
আমিত আশ্রয় হই, বিষয় তােমারে কই
রমণ কামােতে গুরু তুমি।
অামার স্বভাব মন,
তোমাব রতি প্যান
তেঞি সে তোমায় গুরু করি মান।
}
ইহার পর চণ্ডীদাস আর কোন আপত্তি করিলেন না,
বাশুলীর আদেশ ও রামীর উপদেশ শিরােধার্য্য করিয়া
‘ধােপানীচরণ সার’ করিলেন।
আহা কহি বাণী, শুনহ রামিনী, একথা ভুবন পার ।
চণ্ডিদাসনামে, অাছে একজন, তাহারে আরােপ কব ।
( ২০ )
চণ্ডদাস-চরিত
কেহ কেহ হয়ত বলিতে পারেন যে, চণ্ডীদাসের এতটা
করা কি ভাল হইয়াছে ? তুমি না হয় রামিনীকে খুব-ইভাল
বাসিলে, তাই বলিয়া কি তাহার চরণ মাথায় করিতে আছে ?
এদুত্তর আমরা পূর্বেই লিখিয়াছি, চণ্ডীদাস রানীকে সামান্য।
রমণী জ্ঞান করিতেন না। তিনি তাহাকে ‘বেদমাতাগায়ত্রী
বলিয়া গিয়াছেন এবং তাহারে পূর্বে একই জেলাতে অজয়
নদীতীরে বসিয়া আর এ জন সুমধূর স্বরে গাহিয়াছিলে,
‘র রিল খনং
মম শিরসি মন
দেহি পদ পল্লব মুদারং।
তঁাহারাে পূর্বে রামচন্দ্রের প্রণয় বর্ণণায় ভবভূতি গাহিয়া-
ছিলেন,-দেবি ! দেবি ! ভয়ংপশ্চিমস্তে রামশিরাপদ
পঙ্ক জা স্পর্শেঃ। দেবি ! তোমার যে চরণে রামের মস্তক
লুষ্ঠিত হইত, আজি এই তাহার শেষ। সুতরাং বলা যাইতে
পারে, প্রেমের শেষ পরিণতি পদ-সেবায় ।
চণ্ডীদাস সম্বন্ধে নানারূপ কিম্বদন্তি প্রচলিত আছে, তাহার
সত্যাসত্য নির্ণয় করা সুদুর। রামিনীর সহিত মিলনের
একটি জনশ্রুতি এইরূপ। একদা চণ্ডীদাস হাটে মৎস্য ক্রয়
করিতে যান। তিনি মৎস্য লইয়া দাঁড়াইয়া আছেন, আর
একজন লোক অনিয়া সেই মৎস্য বিক্রেতার নিকট হইতে,
তিনি যে পরিমাণ মৎস্য পাইয়াছিলেন, তদপেক্ষা অধিক মৎস্য
যমান মূল্যে ক্রয় করিল। ইহাতে চণ্ডীদাস কৌতুহলী হইয়া
সেই গেকিটীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, মহাশয়, আমার সমান
চণ্ডীদাস-চরিঙ্গ
( ২২ )
ক্রমে
মূল্য দিলেন, অথচ মৎস্য পাইলেন বেশী, ইহার কারণ কি?
লোকটী বলিল যে, মেছুনীর সহিত আমার প্রণয় আছে।
এই ঘটনার পর চণ্ডীদাস প্রেমমন্মত্ত হইয়া প্রেমিকা অন্বেষণে
বহির্গত হইলেন এবং নদীতীরে বিচরণ করিতে করিতে রামি-
নীর সাক্ষাৎ পাইলেন। চণ্ডীদাস তাহার অল্প বয়সও সৌন্দর্য্য
দেখিয়া বিমােহিত হইলেন। রামীর রূপ যেন ফুটে ফুটে
ফুটে না। তৎপর চণ্ডীদাস তাহাকে দেখিবার আশায়, সে
যে ঘাটে কাপড় কাচিত, সেই ঘটে মৎস্য ধরিবার জন্য প্রত্যহ
যাতায়াত করিতে লাগিলেন। স্বামীর রূপ-রস-গন্ধে চণ্ডীদাসের
মত্ত মন-ভৃঙ্গ যেন তাহা হইতে উঠে উঠে উঠে না।
ক্রমে রজকিনীর ও মন টলিল—উভয়ের মিলন হইল। এই
কিম্বদন্তি বিশ্বাস করিবার কোন উপায় নাই। তাহাদের
মিলনের প্রকৃত বৃত্তান্ত আমরা প্রথম পরিচ্ছেদেই ব্যক্ত
করিয়াছে ।
যাহা হউক ধােপানীর সহিত চণ্ডীদাসকে প্ৰবৰ্ত্ত হইতে
দেখিয়া নামুরবাসিগণ তাহাদিগকে বিশালাক্ষীর মন্দির
হইতে বিতাড়িত করিয়া দিল। অপবাদে দেশ রাষ্ট্র হইল।
পিরীতি করিল,
জগতে ভাসিল
ধােপানী দ্বিজের সনে।
জগতে জানিল,
কলঙ্ক ভাসিল
কণাকাণি লােক জনে।
চণ্ডীদাম মন্দির ত্যাগ করিয়া রজকিনীর আলয়ে আশ্রয়
গ্রহণ করিলেন, সেই খানেই নিয়ত বাস করিতে লাগিলেন।
০
( ২৩ ) চণ্ডীদাস-চরিত কাযেই গ্রামস্থ ব্রাহ্মণগণ তাহার উপর আরাে খড়গ হস্ত হই- লেন। তঁাহার। চণ্ডীদাসের ভ্রাতা প্রভৃতিকে সমাজচ্যুত করিলেন। সমাজচ্যুত হইয়া একঘরে অবস্থায় থাকার ভয়ে তাহার খুড়ি মাতা ও ভ্রাতা চণ্ডীদাসকে সৎপথে আনিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইলনা- চণ্ডীদাসের ‘ পিরীতে মজিয়াছে মন’ ‘ড়ী ডােম মানিবে’ কেন? অবশেষে চণ্ডীদাসের মাতৃ স্থানীয়। খুড়ি মতা, রজ- কিনীর বাড়ী যাইয়া পুত্র স্থানীয় দেবর পুত্রের হাত ধরিয়া বাড়ী আনিলেন। চণ্ডীদাসের ভ্রাতা নকুল বলিলেন, ‘ঘরে ঘরে সব কুটুম্ব ভােজন করিঞা উঠাব কূলে। কিন্তু চণ্ডীদাস ইহাতে সন্তুষ্ট হইলেন না, তিনি বলিলেন, শুনি চণ্ডীদাস, ছাড়িয়া নিশ্বাস, ভিজিয়া নয়ন জলে। ধােবিনী সহিতে, আমি যেন তাথে, উদ্ধার হইব কুলে। পিরীতি আলম্ব, পিরীতি, কুটুম্ব, পিরীতি সমুদ্র বিধি। পিরীতি উন্মাদ, পিরীতি আস্বাদ, পিরীতে পাইবে নিধি। পিরীতি আচার, পিরীতি ব্যভার, পিরীতে তােমরা ভাই। পিরীতের তরে, দুয়ারে দুয়ারে, আদর করিতে চাই। আমি বেশ জানি, ধােপানীর সহিতই কুলে উদ্ধার হইব। তুমি একি বলিতেছ ? আমিত তাহাকে ত্যাগ করিতে পারিব না। পিরীতিই আমার সর্বস্ব—পিরীতি কুটুম্ব, পিরীতি আচার, পিরীতি ব্যভার এবং পিরীতের জন্যই তোমরা ভাই। যাহা হউক চণ্ডীদাসের সে কথায় ফল হইল না। 'ঠাকুর নকুল, মনেতে বাড়িল, আমন্ত্রণ ঘরে ঘরে। নকুলকে ঘরে
চণ্ডীদাস-ছবি
( ২৪ )
ঘরে বেড়াইয়া নিমন্ত্রণ করিতে দেখিয়া গ্রামস্থ ব্রাহ্মণগণ অতি
শয় সন্তুষ্ট হইলেন। তঁাহার। নকুলকে ধরিয়া বলিলেন,
‘তুমি একজন মহাশয় ব্যক্তি, তুমি ভাল কায করিয়'ছ। পুত্র
পরিবার ত্যাগ করিয়া ধোবিনী আবেসে থাকা অতি গহিত
কায, তাহাকে ঘরে তানিয়া তুমি কুলের মুখ উজ্জ্বল কৰিলে।
ব্রাহ্মণ-নিমন্ত্রণ করিয়া আসিয়া নকুল ভ্রাতাকে অনেক
উপদেশ দিলেন। তঁাহাকে বকুল তলায় লইয়া যাইয়া বলি-
লেন, ধোপানীর সহিত সহবাস করা উচিত নহে, সে পিরীতিতে
তুমি কি ধন পাইবে ? চণ্ডীদাস বলিলেন,-
ক
ভজন মাজন, পিহি সাধন, পিরীতি সেবিলে পায়।
ভজিব পিঞ্জাতি, স্বভাব আরতী, পিরীতি পরাণ সার ।
পিরীতি করম, পিরীত ধর, এভবে পিরীতি সার।
চণ্ডীদাসের তন্ময়তা ও গভীর প্রেম দেখিয়া নকুলের শরীর
অস্থির হইল। তিনি নিঃশব্দে গৃহে আসিয়া কুটুম্ব ভােজনের
নিমিত্ত ‘জিলেফি, মালপা, চোরি অলিফা, পুরি, খিরি চিনি
কলা, পিরীতি ঔষধি’ প্রভৃতি খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করিতে
লাগিলেন।
খাদ্যাদির আয়ােজন করিয়া নকুল মানার্থে ঘটে যাইয়া
দেখেন জলে বসিয়া ধােপানী পিরীতি মন্ত্র জপ করিতেছে।
নকুল জলে নামিতেই ধোপানীর দৃষ্টি তাহার উপর পতিত
হইল। সম্মুখে নকুলকে দেখিয়া তাহার রুদ্ধ শােকাবেগ
( ২৫ )
চণ্ডীদারিত
VAA
উৎসারিত হইল। তাহার অতৃপ্ত, প্রেমমৃতবঞ্চিত, তৃষিত
হৃদয় কঁাদিয়া বলিল,
‘শুনি নাকি ভাস, পিরীতি নৈরাশ, কুটুম্ব ভােজনে মম।
ঠাকুর নকুল, হয়েই সফল, তুমি এক মহাজন।
তােমার চরিত্র, জগত পবিত্র, তোমার সাধু সে বাদ।
তুমি সে সকল, জাত্যে পাত্যে তােল, নীচপ্রেমে উন্মাদ।
বর্ণাশ্রম ছাড়, পিরীতিতে দড়, যাহার পিরীতি হয়।
এসব ভাবিয়া, যেজন করিল, সে কেন ভারতে রয়।
এই বলিয়া ধােপানী প্রস্থান করিল, নয়নের ধারায় তাহার
আবক্ষ ভাসিতে লাগিল, কোন মতেই মনকে প্রবােধ দিতে
পারে না। গৃহে যাইয়া শয্যায় আশ্রয় গ্রহণ করিলে তাহার
ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল, মস্তকের উপাদান অশ্রু-আ
হইল।
সে করযােড়ে ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিতে
লাগিল, ‘অগাধ, অসীম বিস্মৃতির বিরাট গহ্বরে তােমার
আসৃষ্টি আজ ডুবাইয়া দাও। অনেকক্ষণ পর কিছু সুস্থ হইয়া
ধােপানী আর একবার চণ্ডীদাসকে দেখিবার জন্য তাহার
বাটী অভিমুখে যাত্রা করিল। বাটীর নিকটস্থ হইয়া এক
বকুল তলায় বসিয়া কঁদিতে লাগিল। হঠাৎ সেই স্থান,
দিয়া নকুল যাইতেছিলেন তিনি তাহাকে তদবস্থায় দেখিয়া
ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।
তখন
‘নকুল পাএ, ধরি দুটী-হাতে, ধােপিনী কঁদিয়া বলে।
তুমি মহাজন, শুনহ ব্রাহ্মণ, পিরীতির কিবা মূলে।
D,
চণ্ডীদাস-চবিহু
( ২৬ )
আমি অতি হীন, পিরীতি অধীন, পিরীতি আমার গুরু।
এতন আর, হৃদয়ে সাহার, সে জন কল্পতরু।
পিরীতি ভজিল, পিরীতি সাধিল, পিরীতি একান্ত মনে।
চণ্ডীদাস সাথে, ধােধিনী সহিতে, মিশ্রিত একই প্রাণে ॥
নকল ধােপানীর আক্ষেপে অন্তরে বিগলিত হইলেন সত্য
কিন্তু কাৰ্যোদ্ধারের নিমিত্ত তাকে দূর, দূর, করিয়াতাড়াইয়া
দিলেন। তাহার পর নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণগণ উপনীত হইলে পত্র
দিয়া গেল, ব্রাহ্মণ বসিল, অম্ন আন চণ্ডীদাস। ব্রাহ্মণগণের
আদেশানুযায়ী চণ্ডীদাস দিঞা করতালি, হরি হরি বলি’ অন্ন
আনিতে গেলেন। চণ্ডীদাস অন্ন পরিবেশন করিয়া গেলেন,
পরে--
ব্যঞ্জন কটোরা,
শাক সূপ ভরা
ঝাল নাফরাদি আনে।
আনিল ঘন্টের
ব্যঞ্জন সকল
সুখে খায় দ্বিজগণে ।।
সুখে খাইতে খাইতে দ্বিজগণ ব্যঞ্জনের গুণ ‘
বখান’ করিতে
লাগিলেন এবং পুণরায় অম্ন আনিতে চণ্ডীদাসকে ডাকিলেন।
এবার চণ্ডীদাস যেই ব্যঞ্জন লইয়া উপস্থিত হইলেন, অমনি
ধােপানী তাঁহার সম্মুখে উপনীত হইয়া বলিল—“কিরে চণ্ডে !
তুই নাকি আমাকে ছেড়ে জাতে উঠছিস ? চণ্ডীদাসের স্ফ,
দমিয়াগেল, তার মাথায় যেন বজ ঘািত হইল ! তিনি ব্যঞ্জন
লইয়া চিত্র পুত্তলিকারন্যায় নিঃশ্চেষ্টভাবে পঁাড়াইয়া রহিলেন।
ব্রাহ্মণগণ দেখিতে পাইলেন, চণ্ডীদাসের দুই হাতে ব্যঞ্জনের
( ২৭ ) চণ্ডীদাস-চরিত থালা আবদ্ধই আছে, অথচ আর দুই খানি হাত বাহির করিয়া তিনি রজকিনীকে আলিঙ্গন করিলেন। রজকিনীর দেহ হইতে সেই সময়ে এক অনির্বচনীয় জ্যোতিঃ বহির্গত হইয়া দ্বি- গণকে বিমােহিত করিল। তাহার গৌর মুখমণ্ডল মধ্যাহ্ন- রবিকবে লাবণ্যময় হইয়া উঠিল। যাহারা জন্ম-মৃত্যু-পীড়িত, দুখঃ-বিষাদ-তাড়িত মানব-জীবনে কী রাগ হইয়া কুহেলিকা- বেষ্টিত সূত্র-ভায্যের পদানুসরণ করতঃ লােকালয় অপেক্ষা বনচর-সেবিত অরণ্য জীবনকেই শ্রেষ্ঠ বলিয়া ঘোষণা করিতেন, সেই বর্ণগুরু ব্রাহ্মণগণ তখন ‘রামীত সামান্য। নহে’ জ্ঞান করিয়া তাহাকেও পরিবেশন করিতে আজ্ঞা করিলেন। ব্রহ্ম জ্ঞায় রামী পরিবেশন করিতে প্রবৃত্ত হইলে, হঠাৎ তাহার অবগুণ্ঠন বায়ুতাড়িত হইয়। স্থান ভ্রষ্ট হইল। দেখিতে পাইলেন, সে যেন আরাে দুইখানি হাত বাহির করিয়া অবগুণ্ঠন টানিয়া দিল। এই অভূতপূর্ব ঘটনা অবলােকন করিয়া তঁাহারা চণ্ডীদাসের ভাতি মারিবার সংকল্পত্যাগ করি- লেন। পিরীতি হইল জয়ী। চণ্ডীদাস ও রামীর প্রেমে কাম গন্ধ নাই। চণ্ডীদাসের মানুষী প্রেম সীমা উল্লঘন করিয়া অমানুষিক প্রেম-রাজ্যের সামগ্রী হইয়াছে। তঁাহা যে পাশব প্রবৃত্তি চরিতার্থের জন্য মিলিত হন নাই, তাহা আমরা পূর্বেই বাশুলীর আদেশে জানিতে পারিয়াছি। তাহাদের রূপ যৌবনে উপভােগ লালসা ছিলনা; চণ্ডীদাস বলিয়া গিয়াছেন রজকিনী রাধা হয়। ব্রাহ্মণ চণ্ডীদাস-চরিত ( ২৮ ) - স্থানে স্থানে তিনি তাহাকে ‘পিতৃ মাতৃ’, ‘বেদমাতা গায়ত্রী বলিয়া অভিহিত করিয়াও পরিশেষে অঞ্জলি দিয়াছেন, আসক দিঞাসে, শুন রজকিনী রহিনু চরণ তলে। কি নিঃস্বার্থ অকপট প্রেম! এপ্রেম মূর্তি কি স্বর্গীয় প্রেমের স্বপ্ন বলিয়া অামাদের নিকট প্রতিভাত হয়না ? চণ্ডীদাসের ভাষার দিকে লক্ষ্য ছিলনা, কেবল হৃদয়ের গূঢ় অন্তস্তল হইতে প্রেমময়ী তৃষা বাহির করিয়া জগৎকে মাতাইয়াছেন। তাঁহার আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য ছিল কেবল,- পিরীতি নগরে বসতি করিব পিরীতে বান্ধিব ঘর । পিরীতি পরসি পিরীতি প্রিয়সী অন্য সকলি পর। পিরীতি সোহাগে এদেহ রাখিব পিরীতি করিব বল। পিরীতি বিকথা সদাই কহিব পিরীতে গােঙাব কাল । পিরীতি পালঙ্কে শয়ন করিব পিরীতি বালিস মাথে। পিরীতি বালিসে আলিস করিব রহিব পিরীতি সাথে। পিরীতি সাগরে সিনান করিব পিরীতি জল যে খাব। পিরীতি দুঃখের দুঃখিনী যে জন পরাণ বাটিয়া দিব। পিরীতি সেশর নাসাতে পরি রহিব বন্ধুয়া সনে। হৃদয় পিঞ্জরে পিরীতি থুইব দ্বিজ চণ্ডীদাস ভণে । যদি পিরীতি করিতে হয়, তবে যেন চণ্ডীদাসের মতই পিরীতি করি, যদি কলঙ্ক কিনিতে হয়, তবে যেন জন্ম জন্ম- স্তর্মে তাহারই ন্যায় প্রেম-কলঙ্ক পসরা শিরে বহন করিয়া আধু নিক কবি-কল্পনাপ্রসূত প্রো-উচ্ছাস, বিরহ প্রভৃতি একঘেয়ে আলোক হইতে দূরে সরিয়া সঁড়াইতে পারি।
( ২৯ ) চ গুদাস-চরিত। भामा যাহা হউক, ব্ৰহ্মণাদি ভােজন করাইয়া চণ্ডীদাস জাতিতে উঠিলেন। কিন্তু লোক গঞ্জনায় তাহাদিগকে অস্থির হইতে হইল। একদা রামিনী লােকগঞ্জনার কথা চণ্ডীদাসকে বলিয়া র ত্যাগ করিতে অনুরােধ করিল। চণ্ডীদাস তাহাকে সান্ত্বনা করিয়া বলিলেন,- ‘ইন্দ্ৰ আদি কার, সুর নর দান, তিনপুর জিনিল দশ মাথে। বিশ বাহুপর, বিজয় ধনুর্দ্ধর, নৃপতি নিশাচর নাথে । মণিময় কুণ্ডল, রত্ন সব আভরণ, শোভা করল দশমুখে। দ্বিগ্বিজয় করি, বিক্রম কেশরী, ছাত্র ধরল নব ধওে । সোহা লঙ্কাপতি, দৈবে হল মতি, বিপদ সময় ভব তেল। রতন মুকুট পর, বনচর বানর, চরণ ঘাত কত দেলা। হরি হরি, দৈব কি গতি নাহি জান। কভু সুখ সম্পদ, কবহু রাজপদ, কবহু গুরু অপমান। ভণয়ে চণ্ডীদাস ইহা বড় বাত। হানি,লাভ, জীবন, মরণ, সুখ, যশ, অপযশ বিধি হাত। কি সুন্দর উপদেশ! আমারা কয়জন এরূপ উপদেশ দিতে জানি ? চণ্ডীদাস প্রেমিকার চিত্তবিনােদনের নিমিত্ত ভাষার নিরাবিল পবিত্র দেহে কুরুচির কালিমা তুলিপাত করেন নাই- তিনি পুণ্যপুঞ্জময় পৰিত্ৰ সৌন্দৰ্য দেখাইয়াই তাহাকে সান্ত্বনা করিয়াছেন। অনন্ত বিশ্বের অনন্ত সৌন্দর্যের সারভৃত সৌন্দর্য্য সুধা তিল তিল করতঃ সঞ্চয় করিয়া প্রেমিকাকে উপঢোকন দিয়াছেন। এ প্রেমে কি কাম গন্ধ থাকিতে পারে ? তাহার পর চণ্ডীদাস বলিলেন, যদি লােকাপবাদ তােমার নিকট এতই অসহনীয় হইয়া থাকে, তবে আমাদের উভয়ের চণ্ডীদাস-চরিত ( ৩০ = স্থান পরিত্যাগের প্রয়োজন কি ? তুমি থাক, আমিই অন্যত্র যাইতেছি । তচ্ছ বনে রামিনী কাতর কণ্ঠে বলিলেন,- ‘কোথা যাবে অহ, প্রাণ বঁধু মাের, দাসিরে উপেক্ষা করি। দেখিয়া মুখ ফাটে মাের বুক, ধৈরজ ধরিতে নারি। বাল্যকাল হইতে এদেহ সপিনু মনে আন নাহি জানি। কি দোষ পাইয়ে মথুবা যাইবে বলহে যে কথা শুনি। তােমার শারথি ক্রুর অতিশয় বােধ বিচার নাই। বোধ থাকিলে দুঃখ সিন্ধুনীরে অবলা ভাসাতে নাই। পিরীতি জালিয়া যদি বা যাইবা কবো আসিবে নাথ। রামীর বচন করহ শ্রবণ দাগীরে করহ সাথ ।” আজ কাল রমণীগণ যেমন পদাহ অভিমানিনী কাল- সাপিনীর ন্যায় সামান্যতেই উদ্ধাশরে গর্জিয়া উঠে, রামিনীর সে রূপ তীব্র তেজে গর্জন নাই। তাহার সম্বলের মধ্যে কেবল ক্ষুদ্র হৃদয়ের প্রেমটুকু আর অশ্রু। তাই সে তাহার সংযত পবিত্র উদার হৃদয়ের সমস্ত প্রেমটুকু ঢালিয়া চণ্ডীদাসের করুণ। প্রার্থনা করিল। অতঃপর কলঙ্ক স্থাপনের নিমিত্ত তাহারা এক পরা- মর্শ স্থির করিলেন। চণ্ডীদাস পীড়ার ভাণ করিয়া তাঁহার পর্ণ কুটীরে শয়ন করিলেন। দুই দিবস যায়, চণ্ডীদাস কেবলই ছট ফট করিতেছে, তাহার শুশ্রুষায় লােক কেহই নাই। পিতা মাতা ইতি পূর্বেই স্বর্গারােহন করিয়াছেন। চণ্ডীদাস বিনীত ভাবে প্রতিবেশিদিগের নিকট একটুকু, জল প্রার্থনা 'করিতে লাগিলেন, কিন্তু কেহই তাহার কাতর প্রার্থনায় কর্ণ- পাত করিনা, দুই দিনের উপস-ক্লিষ্ট ব্রাহ্মণের অন্তরিক ( ৩১ ) চণ্ডীদাস-চরিত। প্রার্থণাটুকুও কেহ গ্রাহ্য করিলনা। পর দিবস কোন সাড়া শব্দ নাই। প্রতিবেশিগণ মনে করিল, চণ্ডীদাস বােধ হয় পঞ্চত্ত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে। তাই কোন কোন সহৃদয় গ্রামবাসী এক পা এক পা করিতে করিতে তঁাহার কুটীরে যাইয়া উকি মারিয়া দেখে, চণ্ডীদাস মরিয়া আছেন এবং তঁাহার গৃহ-প্রতি ষ্ঠিত বিগ্রহ উপবাসী হইয়। আছেন। অনন্তর ব্রাহ্মণগণ তাহার সৎকারের ও দেব সেবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। কতি- পয় ব্রাহ্মণ মিলিত হইয়া চণ্ডীদাসকে শ্মশানে লইয়া গিয়। চিতায় তুলিয়া যেমন অগ্নি সংযােগ করিবে, এমন সময়ে প্রেম- বিহ্বলা, আলুলায়িত কুন্তলা রামিনী উন্মাদিনীবেশে তথায় যাইয়া বিলাপ করিতে লাগিল। ‘তুগিদিবাভাগে, লীল। অনুরাগে, ভ্রম সদা বনে বনে। তাহে তবমুখ, না দেখিয়া দুঃখ, পাই বহু ক্ষণে ক্ষণে। ত্রুটি সমকাল, মামি সুজঞ্জাল, যুগতুল্য হয় জ্ঞান। তোমার বিরহে, মনস্থির নহে, ব্যাকুলিত হয় প্রাণ । কুটিল কুণ্ডল, কত সুনির্মল, শ্রীমুখ মণ্ডল শোভা। হেরি হয়মনে, এদুই নয়নে, নিমেষ দিয়াছে কেবা ।। যাহে সৰ্ব্বক্ষণ, তব দরশন, নিবারণ সেই করে। ওহে প্রাণপিক, কি কব অধিক, দোষ দিয়া বিধাহারে ।। তুমি যে আমার, আমি সে তােমার, সুহৃৎ কে অাছে অার। খেদে রামী কয়, চণ্ডিদাস বিনা, জগৎ দেখি অ ধার।। অন্তিমের এক মাত্র পথ মহাশ্মশানে পঁাড়াইয়া রামিনী বেশে রাধিকার এই বিরহ গীতি ধ্বনি যেন হতাশ্বাস বিষাদ ও অনন্ত ব্যাথার পারা লইয়া কোন্ দূর দূরান্তরের স্বপ্নরাজ্যে }
চণ্ডীদাস-চরিত
( ৩২ )
লইয়া যাইতেছে। রামিনীর বিলাপ শুনিয়া চণ্ডীদাস যেন
নিদ্রাভঙ্গের পর চিতা হইতে উত্থিত হইয়া বলিলেন,-চল,
এদেশ হইতে আর প্রস্থান করি, আর এখানে থাকিবনা।
চণ্ডীদাসের কথায় রাশিনীর অশ্রু শুষ্ক হইল, তাহারা আনন্দা-
তিশৰ্যে গাহিতে গাহিতে গৃহাভিমুখে অগ্রসর হইলেন।
শ্মশান বন্ধুগণ ভাবিলেন, চণ্ডীদাসকে ভূতে পাইয়াছে,
তাই তাহারা প্রাণভয়ে উদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিলেন। তাঁহা-
দের পলায়নে শিব। ও সারমেয় দল লুব্ধনেত্রে চাহিয়া চাহিয়া
ছুটিতে লাগিল। শীঘ্রই গ্রামে একটা হট্টগােল পড়িয়া গেল।
এদিকে বিনোদ রায়* নামক এক ব্রাহ্মণকে বাশুলী দেবী
স্বপ্নে বলিলেন, গ্রামবাসীগণ আমার সেবক ও সেবিকার
মিথ্যা কলঙ্ক রটাইয়া তাহাদিগকে অস্থির করিয়াছে। যদি
তাহারা চণ্ডীদাসের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা না করে, তবে তাহা-
দিগকে আমি সবংশে নিধন করিব । বিনােদ প্রত্যুষে স্বপ্ন
বৃত্তান্ত সকলকে জানাইল। রটনাকারীগণ স্বপ্নের বিবরণ
শুনিয়া ভীতঃ চকিত ও সন্ত্রাসিত হইয়া চণ্ডীদাসের নিকট
ভূয়ােভূয়ো ক্ষমা প্রার্থনা করিল। তাহার অলৌকিক কাৰ্য্য
সন্দর্শনে অনেকে চণ্ডীদাসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিল। বিননা
রায়ও তাহার নিকট রাধাকৃষ্ণ মন্ত্র গ্রহণ করিয়া তাহার
সেবায় নিযুক্ত হইল। এই সময় একদা রামিনী চণ্ডীদাসের
* বিনদ রায় বন্ধু বিনোদ রায়।
ভাল হ’ল ঘুচাইল পিরীতের দায়।
( ৩৩ )
চণ্ডীদাস-চরিত
নিকট হাসি মুখে যাইয়া বলিল, পাষণ্ডগণের প্রতি ভগবানের
করুণা-বর্ষিত হইয়াছে। ধােপানীর প্রেম যে অপবিত্র নহে
এখন তাহাদের জ্ঞান হইয়াছে।
চণ্ডীদাস উত্তর করিলেন,
“কুল অভিমান, নাহি মাের জ্ঞান, না দেখি যখন তােরে ।
তুয়ার আসকে, যতন করিঞা, বিরতি করা মােরে।
তুমার পারা, করিঞা আমারে, সঙ্গিনী ফরিঞা নিবে ।
তিলেক বিচ্ছেদে, শতবার মরি, চরণ একান্ত দিবে।
চণ্ডীদাসে কয়, মনে হেন লয়, বলিব কি আর তােরে ।
আসক দিঞাসে, সুন রজকিনী, রহিলু চরণ তলে।
“চণ্ডীদাসের গীতি-প্রেমের নিখুঁত ছবি এবং নির্ভীক উক্তি
যে সমাজে ব্রাহ্মণ ও ইতর বর্ণের অধিকার স্বর্ণ ও লৌহের
ভিন্ন ভিন্ন রেখায় নির্দেশিত, সেই সমাজের ক্ষুদ্র একজন পূজক
ব্রাহ্মণ—শুন রজকিনী, রহিলু চরণ তলে’ প্রভৃতি বন্দনা দ্বারা
অত্যাশ্চাৰ্য্য নিভকতা প্রদর্শন করিয়াছেন, একথা লিখিতে
তিনি সমাজের ভয়ে কিছু মাত্র কাতর হন নাই; কারণ প্রেমের
বলে পিপীলিকাও মত্ত হস্তীকে দলন করিতে পারে। একথা
লিখিতে তিনি লজ্জিত হন নাই,কারণ এ প্রেমে ‘কাম গন্ধ
নাই—ইহা তাহার উপাসনা রস’-ইন্দ্রিয় লিপ্লার উর্দ্ধে ;
ইহা স্বীকার করিয়া ব্রাহ্মণ গৌরবান্বিত হইয়াছেন। তিনি
লজ্জায় ম্রিয়মান হইয়া পড়েন নাই।”
* বঙ্গভাষা ও সাহিত্য।
G,
চণ্ডীদাস-চরিত
( ৩৪ )
?
চণ্ডীদাস বিবাহ করেন নাই, আজন্ম কুমার থাকিয়াই অতি-
বাহিত করিয়াছেন। রামিনীর প্রেমে তাঁহার হৃদয়ে যে
মদিরাময় উল্লাস সঞ্জাত হইয়াছিল, তাহা ত্যাগ করিয়া অন্য
দ্বারপরিগ্রহের চিন্তাও কোন দিন তাহার মনে উদিত হয়।
নাই। । তাঁহার পদাবলীর অনেক স্থানে ‘বড়’ শব্দ পাওয়া
যায়,—ইহার এক অর্থে ‘কুমার’ বুঝায়।
চণ্ডীদাসের রজকিনী-প্রেম আমি নিন্দনীয় বলিয়া প্রকাশ
করিতে প্রস্তুত নহি। ভাল বাসার, রাজ্যে আবার হাড়ি ডােম
ভেদ কি ? প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে নাস্তি তেষু জাতি বিদ্যা
রূপকুল ধন ক্রিয়াদি ভেদ। তাহাদের মধ্যে জাতি, বিদ্যা,
রূপ, কুল, ধন এবং ক্রিয়ার ভেদ নাই। যেখানে ভেদ
দেখিতে পাইবে, সেইখানেই জানিবে অকপট প্রেমের অভাব ।
প্রেম রাজ্যে জাতি ভেদ, বর্ণভেদ স্থান পায়না। অতি অন্তজঃ
বর্ণ ও যদি তােমাকে প্রাণটী ভরিয়া ভালবাসে, তােমার সাধ্য
আছে কি তাহাকে পদদলিত কর ? আর তুমি যত বড় মহা
পুরুষই কেন হওনা, রজকিনী কেন, একটি চণ্ডালও কি
তােমাকে ভালবাসিতে পারেনা ? সে যদি তােমাকে প্রাণটী
ভরিয়া ভালবাসে, তবে তুমি কয়দিন তাহাকে উপেক্ষা করিয়া
কাটাইতে পার ? গুহক চণ্ডাল শ্রীরামচন্দ্রকে ‘ওরে হারে’
বলিয়া সম্বােধন করিতেন বলিয়া লক্ষণ তাকে হনন করিতে
উদ্যত হন। শ্রীরামচন্দ্র তখন কি বলিয়া অনুজকে নিরস্ত
করিয়াছিলেন? তিনি কি বলেন নাই,‘আমার বন্ধুর কোন
( ৩৫ } চণ্ডীদা স-চরিত্র দোষ নাই, ও যে প্রেমে বিহ্বল হইয়া আমাকে ‘ওরে হরে বলিয়া ডাকে! আমিও উহাকে অতিশয় ভালবাসি। শবরী চণ্ডাল-কন্যা। প্রেমের প্রভাবে সে পঞ্চবটি বনে শ্রীরামচন্দ্রকে উচ্ছিষ্ট ফল খাওয়াইতে পারেন নাই কি ? চণ্ডীদাস প্রেমের কবি, তিনি প্রফুল্ল কণ্ঠে প্রেম-সংগীত গাহিতে ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছিল,-সাহিত্যের পুষ্টি সাধন তাহার উদ্দেশ্য ছিলনা। তিনি বাঙালী ছিলেন, তাই বাঙলা ভাষায় গান গাহিয়া, হৃদয়ের অতৃপ্ত প্রেম-কাহিনী ব্যক্ত করিয়া- ছেন। তাহার প্রেমময় লেখনী-নিঃসৃত যে অমূল্য রত্নরাজি সাহিত্যভাণ্ডারে সঞ্চিত হইয়া উহার কলেবর শ্ৰীসম্পন্ন করিয়াছে তাহা তাহার অজ্ঞাতসারেই সংঘটিত হইয়াছে,—সাহিত্য উন্নত করার কল্পনা কোন দিনই তাহার মনে উদিত হয় নাই। তিনি নিজের মনে নিজের প্রাণে বিপুল উচ্ছাস সহকারে মরমের নিভৃত প্রান্ত হইতে যে প্রেম-সংগীত গাহিয়াছিলেন, তাহাই দৈবক্রমে বঙ্গভাষার—মাতৃভাষার অলঙ্কার স্বরূপ হইয়া গিয়াছে তাহারই পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া কত শত কবি- কোকিল বঙ্গীয় কবিতাকানন মুখরিত ও ঝঙ্কৃত করিয়াছে। ১৩৭ ৩শকের হস্ত লিখিত প্রাচীন পুঁথিখানিতে পাওয়া যায়, রামিনীর পিতার নাম সনাতন ও মাতার নাম লক্ষী ছিল। তাহার অন্য একটি ভগিনী ও দুইটী ভ্রাতা ছিল, কিন্তু তাহ- দের নাম জানিতে পারা যায় না। নানুরের তিন ক্রোশ উত্তর পূর্বে তেহাই নামক গ্রামে তাহাদের বসতি ছিল অল্প,
চণ্ডীদাস-চরিত।
'( ৩৬)
সময়ের মধ্যে রামিনীর ভগিনী ও দুইটী ভ্রাতাই এবং জননীর
কাল হওয়ায়, সনাতন সংসারের আসক্তি শূন্য হইয়া একাকী
গৃহ হইতে প্রস্থান করে। তাহার পলায়নের পর রামিনী
কিয়দিবস পৈতৃক ভিটাতেই বাস করে কিন্তু পরে খাদ্যাভাব
উপস্থিত হওয়ায় সে তেহাইর মমতা ত্যাগ করিয়া নারে
গমন করে এবং পরে বিশালাক্ষীর মন্দিরে দাসীরূপে স্থান
প্রাপ্ত হয়। তৎকালে তাহার বয়স পঞ্চদশ বর্ষ হইয়াছিল।
এই তেহাই গ্রামের সন্ধান আমরা জানিতে পারি নাই।
তৃতীয় প্রস্তাব। (বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ।) বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম হইতে শ্রেষ্ঠ ধর্ম আর নাই। যে ধৰ্ম্ম বৃক্ষের ন্যায় সহিষ্ণু, তৃণ হইতেও সুনীচ হইতে শিক্ষা দেয়, যে ধৰ্ম্ম অমানী ব্যক্তিকেও মান্য করিতে উপদেশ দেয়, সে ধৰ্ম্মশ্রেষ্ঠ না হইলে আর কোন্ ধৰ্ম্মকে শ্রেষ্ঠ বলিব ? আমরা প্রথম প্রস্তাবে বলিয়াছি, বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব মন্দীভূত হইতে আরম্ভ হইলে বৈষ্ণব ধর্ম মস্তক উত্তোলন করিতে আরম্ভ করে। ইহার আর , একটি প্রতিদ্বন্দীছিল—শাক্ত ধৰ্ম্ম। কিন্তু বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম কিরূপে তাহার এই সন্নিকট প্রতিবেশি এতিপক্ষকে পরাভূত করিয়া প্রাধান্য বিস্তার করিল তাহা বলিবার স্থান এখানে নাই। বৈষ্ণব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা প্রেমাবতার শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সময় হইতে বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের যশঃ সৌরভ দিগ, দিগন্ত বিস্তৃত হইয়া পড়ে। ইতিহাসজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই জানেন, শ্রীগৌরাঙ্গের পূর্বে ভার- তের ধম্ম রাজ্যের অবস্থা কি শােচনীয় হইয়াছিল। প্রতাপান্বিত পাঠান নরপতিগণের অমানুষিক অত্যাচার নিরন্তর সহ করিতে, করিতে গৌড় বঙ্গ, বিহার রাজপুতনা, উৎকল প্রভৃতি দেশ
চণ্ডীদাস-চবিত
( ৩৮ )
বাসীগণ কিরূপ দশা প্রাপ্ত হইয়াছিল, মোসলেমধম্মের প্রবল
বন্যার স্রোত কি ভাবে প্রবাহিত হইয়াছিল, তাহা আর তঁাহা-
দিগকে নূতন করিয়া বলিতে হইবে না। ভারতের এই ঘাের
দুর্দিনে ভগবান চৈতন্যদেব আবির্ভূত হইয়া যদি সকলকে
সমস্ত কদাচার হইতে মুক্ত না করিতেন, খােল করতালের
প্রান্মােদকারী নিনাদের সহিত হরিনাম কীর্ত্তন দ্বারা সেই
দুশ্চিকিৎস্য রােগ হইতে আর্য জাতিকে উদ্ধার না করিতেন,
তবে নিশ্চয়ই ‘আৰ্য’ শব্দ এতদিন বিস্মৃতির অতল-গহ্বরে
নিমজ্জিত থাকিত।
কিন্তু চৈতন্যদেবের সেই প্রিয় বৈষ্ণব ধর্মের অজ কি
দুর্দশা ! যিনি প্রকৃতির মুখ দর্শন করিতেন না, যিনি প্রকৃতির
নিকট ভিক্ষা লওয়ার অপরাধে প্রিয় শিষ্য হরিদাসকেও বর্জন
করিতে কুণ্ঠিত হন নাই, আজ সেই মহাপুরুষের দোহাই দিয়া
কত শত নরপিশাচ ‘মহাপ্রভুর গুপ্ত সাধন করিতে কত কুল
বতীকে কুলের বাহির করিয়া সমাজের ঘােরতর অবনতির
পন্থা সুপ্রশস্ত করিতেছে'—গাহস্থ্য সুখ শান্তিতে কণ্টক প্রদান
ও মহাপ্রভুর মতে কলঙ্ক আরােপ করিতেছে ! মহাপ্রভু
বৈষ্ণবের লক্ষণ বলিয়াছেন
====
‘প্রভু কহে যার মুখে শুনি একবার
কৃষ্ণনাম, পূজ্য সেই শ্রেষ্ঠ সবাকার।
এক কৃষ্ণ নামে করে সর্ব পাপ ক্ষয়।
নববিধ ভক্তি পূর্ণ নাম হৈতে হয়।
( ৩৯ ) চণ্ডীদাস-চরিত দীক্ষা পুরশ্চৰ্য্যাবিধি অপেক্ষা না করে । জিহ্বা স্পর্শে আচণ্ডালে সবারে উদ্ধারে । আনুসঙ্গ ফলে করে সংসারের ক্ষয়। চিত্ত আকর্ষয়ে করে কৃষ্ণ প্রেমােদয়। অতএব যার মুখে এক কৃষ্ণনাম। সেই বৈষ্ণব করি তার পরম সাধন। (শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত-মধ্যলীলা পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।) একবার কৃষ্ণনাম করিলে সর্বপাপের বিনাশ হয়, যে সেই কৃষ্ণনাম করে, তাহাকে বৈষ্ণব বলি। উৎকল খণ্ডে লিখিত আছে—যাহার জগতে সর্বদা পরের উপকার করেন, পরের কুশলে আপনার কুশল মনে করেন, পর দুঃখে কাতর হইয়া কেবল পরের ভাবনাই ভানে, তাদৃশ দয়াবান সদাশয় ব্যক্তি- গণই বৈষ্ণব বলিয়া বিখ্যাত। যাহার পরের সম্পদকে লােষ্ট্র বৎ জ্ঞান করেন, পর স্ত্রী ও কণ্টকাকীর্ণ শাল্মলীতে সমদশী, আপনার আত্মীয় বর্গ, সুহৃদ্বর্গ ও শত্ৰু বৰ্গকে সমান (আত্ম) জ্ঞান করেন, তাহারাই বৈষ্ণব বলিয়া প্রসিদ্ধ। যাহারা একা- গ্রভাবে সতত ভগবানে চিত্ত সমপন করিয়াছেন, গুণবান ব্যক্তির সমাদর করেন, পরের মর্মকথা গোপনে রাখেন, সৰ্ব্ব- দাই সকলের প্রিয় কথা বলেন, তঁাহারা বৈষ্ণব বলিয়া প্রসিদ্ধ। যাহারা ভক্তি ভাবে কংসহন্তা কৃষ্ণের মধুর পাপনাশী শুভনাম কীৰ্ত্তন এবং উচ্চৈস্বরে সর্বদা তাঁহার জয়ঘােষণা করেন, . তাহারাই,বৈষ্ণব বলিয়া প্রসিদ্ধ। যাহারা কায়মনােবাক্যে চণ্ডীদাস-চরিঙ্গ ( ৪০ ) হরিতে আত্ম সমর্পন করিয়া একাগ্রচিত্তে হরির পাদপদ্ম চিন্তা করেন, এবং সেই চিন্তাতেই বিভাের হইয়া সুখ দুঃখকে সমান জ্ঞান করেন, বিস্র বচনে হরির স্তব এবং পূজাতেই সর্বদা ব্যগ্র থাকেন, তঁাহারাই বৈষ্ণব বলিয়া প্রসিদ্ধ। (১) আজ আমরা কয়জন এরূপ বৈষ্ণব দেখিতে পাই ? যে ‘বৈষ্ণব সেবা’ কে শচীদুলাল মুখ্য ধৰ্ম্ম বলিয়া বারবার উপ- দেশ দিয়া গিয়াছেন, আজ কেন আমরা সেই ভক্তকে ভণ্ড মনে করিয়া দারােয়ান দ্বারা গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দেই? সেচ্ছাচারিতাই তাহার মূল। যে মহাপ্রভু, রঘুনাথকে মর্কট বৈরাগ্য’ দেখাইতে নিষেধ করিয়া গৃহে বাইয়া গৃহ ধৰ্ম্ম পালন করিতে উপদেশ দিয়াছিলেন, আজ সেই মহাপ্রভুর দোহাই দিয়া কত শত পাপাত্ম। পিতৃ মাতৃ জল পিণ্ডের আশা রহিত করতঃ বর্ণাশ্রম ধৰ্ম্ম উল্লম্মান করিয়া অজাত বৈরাগ্য হৃদয়ে বৈরাগীর ভেক গ্রহণ করিয়া গৌরাঙ্গের পবিত্র ধৰ্ম্মের মস্তকে পদাঘাত করিতেছে। আজ কত শত দুরাচারী সমাজ-কলঙ্ক ধৰ্ম্ম ধ্বজী স্বার্থপর উপদেষ্ট, বৰ্গ শাস্ত্রের কাব্যাখ্যারূপ বিষ প্রয়ােগ দ্বারা কলির দুর্বল মানবকে মুচ্ছিত করিতেছে—প্রচ- লিত পাপাগ্নিতে শুষ্ক ইন্ধন প্রদান করিতেছে, তাহার ইয়ত্ব নাই। কর্তাভজা, গৌরীদাস, ন্যাড়া, বাউল, আউল, সহজীয়া প্রভৃতি কত শত উপধৰ্ম্মী তাণ্ডব নৃত্যের সহিত বিকট কোলা- হল করিয়া বৈব ধৰ্ম্মের কঙ্কাল লইয়া টানা হেঁচড়া করিয়া (১) দশম অধ্যায়; যুক্ত পঞ্চানন তর্করত্ন সম্পাদিত।
( ৪১ )
চণ্ডীদাস-চরিত ।
আর্যভূমিকে প্রেতভূমিতে পরিণত করিয়াছে, তাহা ভাবলে ও
খ্রিয়মান হইতে হয়। বৈষ্ণব ধম্মের এ কলঙ্ক কালিম। কি
ধৌত হইবে না ?
যাহা হােক আমরা আলােচ্য বিষয় হইতে বহুদূরে
আসিয়া পড়িয়াছি। চণ্ডীদাস বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী ছিলেন।
তাঁহার
রাধার কি হলাে অস্তর ব্যথা।
বসিয়া বিরলে, থাকয়ে একলে, না শুনে কাহার কথা।
সদাই পেয়ানে, চাহে মেঘপানে, না চলে নয়নের তারা।
বিরতি আহারে, রাঙ্গা বাস পরে, যেমন যােগিনী পারা।
এলাইয়া বেণী, ফুলের গাঁথনি, দেখয়ে খসায়ে চুলি ।
হসতি বয়ানে, চাহে মেঘপানে, কি কহে দুহাত তুলি।
একাদঠ করি, ময়ুর ময়ূরী, কণ্ঠ করে নিরীক্ষণে।
চণ্ডীদাস কয়, নব পরিচয় , কালিয়া বধুর সনে।
পাঠে বৈষ্ণব ধর্মের কথাই মনে পড়ে।
শ্রীচৈতন্য প্রভুর কৃষ্ণপেমে এমনি আত্মহারা হইয়াছিলেন ।
চণ্ডীদাসের রাধিকার এভাব কি বৈষ্ণব সাধুদিগের কথাই স্মরণ
করাইয়া দেয় না ? ‘নীল নিচোল পরিহিতা রাধিকা মূর্তি
বৈষ্ণব সাহিত্যে সুলভ, কিন্তু রাঙ্গাবাস গেরুয়া)-পর। রাধিকা
এখানে সন্ন্যাসিনীর মত, তাহার পরিধানগেরুয়া এবং আহার
বিরতি (উপবাস আচরণ) ওমেঘ দেখিলেই কৃষ্ণভ্রমে করজোড়ে
সকাতর অনুনয়, একদৃষ্টে ময়ুব ময়ূরীর কণ্ঠ দেখিয়া বর্ণমাধুর্য্যে
চণ্ডীদাস-চরিত
' ( ৪২ )
মুগ্ধ হইয়া পড়া, এসকল বৈষ্ণব সাধুভক্তগণের কথাই স্মরণ
করাইয়া দেয়।
একে কুলবতী ধনী তাহে সে অবলা।
ঠেকিল বিষম প্রেমে কত সবে আলা
অকথন বেয়াধি এ কহা নাহি যায়।
যে করে কামুর নাম ধরে তার পায়।
পায়ে ধরি কঁাদে সে চিকুর গড়ি যায় ।
সােণার পুতুলি যেন 'ভূমেতে ললাটায়।
পৃছয়ে কানুর কথা চুল চুল আঁখি।
কোথায় দেখিলা শ্যাম কহ দেখি সখি ।
চণ্ডীদাস কহে কঁাদ কিসের লাগিয়া ।
সে কালা আছয়ে তাের হৃদয়ে জাগিয়া ।
‘এই স্বর্ণ-পুলি প্রেমিকার নয়ন-পুতলি কোন সুন্দরীর
ছবি বলিয়া মনে করিতে আমাদের প্রবৃত্তি হয় না। যিনি
ধূলিময় প্রাঙ্গণ ভূমিতে ইতর জাতির মুখেও হরিনাম শুনিলে
অবলুণ্ঠিত হইয়া তাহার পদে পড়িতেন, সেই স্বর্ণপুত্তলি গৌর
হরির ছবিরই পূর্বাভাস যেন এই পদে সূচিত হইতেছে।”
চণ্ডীদাসের রাগাত্মিক পদাবলীতে বড়ই কঠিন তত্ত্ব বিচিত্রভাবে
বর্ণিত হইয়াছে। পূৰ্বেই বলিয়াছি চণ্ডীদাসের সময়ে বৈষ্ণব ও
শাক্ত সম্প্রদায়ে ঘাের প্রতিদ্বন্দীতা চলিতেছিল। শক্ত
দিগের মাধন সংগীতাবলী প্রহেলিকাময় ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে।
তাহারই প্রভাবে চণ্ডীদাসও রাগাত্মিক পদাবলীতে ঐ রূপ
প্রহেলিকাময় ভাষা ব্যবহার না করিয়া থাকিতে পারেন নাই।
* বঙ্গভাষা ও সাহিত্য।
( ৪৩ ) চণ্ডীদাস-চরিত। তাহার এই সকল পদাবলী পাঠে অনুমান হয়, যে তিনি অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে ও বৈষ্ণব ধৰ্ম্মে নিগুঢ় আস্থাবান হইবার পূর্বে সে গুলি রচণা করিয়াছিলেন। কারণ কোন বৈষ্ণব কবিরই ভাষা এরূপ 'জটিল নহে এবং বৈরাগ্য ভাবা- পন্ন কোন কবিই তৎপ্রদর্শিত পন্থা অনুসরণ করিয়া কাব্যাদি প্রণয়ণ করেন নাই। চণ্ডীদাসের কথিত ‘সহজ সাধন’ অতীব কঠিন অল্প লােকেই তাহা সাধন করিতে পারেন। তাই কৰি গাহিয়াছেন- সহজ আচার, সহজ বিচার, সহজ বলিব কায় । জানি মরম, করে আচরণ, এ বড় কঠিন দায়। জানি ধরম, না জানি করম, আচরিতে করে আশ। ত্রিদিবের গাণ, শুনিয়ে যেমন, কাকে করে অভিলাষ। সুধাকর দেখি, খদ্যোত যেমন, সম তেজ হতে চায়। শত শত কোটী, করয়ে উদয়, তবু তার যােগ্য নয়। পারিজাত পুষ্প, দেবের দুর্লভ, কপিতে করয়ে আশ। শিব নৃত্য দেখি, ভূতগণ নাচে, দেবের সমাজে হাস। এমন যে জন, নিত্য সহজে ঘটায়, আচরিতে করে লাশ। বাশুলী আদেশে, ভনে চণ্ডীদাসে, নরকে হইবে বাস । (হস্তলিখিত প্রাচীন পুঁথি।) এই পুঁথি খানিতে চণ্ডীদাসের বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম গ্রহণ-সম্বন্ধে একটি গল্প বিবৃত আছে।—একদা তিনি সন্ধ্যার পর বিশা- লাক্ষীর মন্দির হইত রজকিনীর অবাসে যাইতেছেন। বাড়ীর নিকট একটি বকুল বৃক্ষ তলে দীপ হস্তে একটি রমণীকে দেখিয়া তিনি তাহার নিকট অগ্রসর হইয়া দেখেন, স্বয়ং দশ = চণ্ডীদাস-চরিত । ( ৪৪ ) ভূজা প্রদীপ হস্তে দাড়াইয়া আছেন। চণ্ডীদাস মহামায়ার চরণে প্রণত হইলে, দেবী তঁাহাকে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করিতে আদেশ দিয়া অন্তর্হিত হইলেন। পরদিবস চণ্ডীদাস মস্তক মুণ্ডন করিয়া তুলসী কাষ্ঠের মালা গলায় দিয়া যুগল মন্ত্র গ্রহণ করিলেন। শ্ৰীযুক্ত রমণীমােহন মল্লিক মহাশয়ের সংস্করণে এ সম্বন্ধে আর একটি গল্প স্থান পাইয়াছে। পাঠকগণের কৌতুহল চতা করিবার নিমিত্ত তাহা এস্থলে উদ্ধত হইল। বিজ্ঞ পাঠকগণ সত্যাসত্য নির্ণয় করিবেন। একদিন চণ্ডীদাস মানার্থে নদীতীরে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন একটি পদ্মকোরক "লে ভাসিয়া যাইতেছে। তিনি যত্ন সহকারে ফুলটি তুলিয়া ইয়া ভাবিলেন ফুলটি কি মনোহর। এইফুটি কি নির্মাল্য ?- না, নিৰ্ম্মাল্য হইলে ফুলটি প্রস্ফুটিত থাকিত। ফুলটি নিৰ্ম্মাল্য নহে সিদ্ধান্ত করিয়া, মনে মনে ভাবিলেন, আল্ড এই সুন্দর ফুলে মা বিশালাক্ষীর পূজা করিব। স্নান কাৰ্য শীঘ্র সম্পন্ন করিয়া তিনি বড়ই আনন্দ সহকারে মাতা বিশালাক্ষীর পূজা করিতে বসিলেন। চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ভগবতীকে ফুলটি অর্পণ করিতেছেন এমত সময়ে ভগবতী আবিভূত হইয়া চণ্ডীদাসকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, হে ভক্ত সাধকাগ্রগণ্য। অামার চরণে তুমি অপণ করিও না, ও ফুল, আমার মাথায় দেও।” চণ্ডীদাস সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিলেন, ভগবতী স্বয়ং সম্মুখে আবির্ভ । চণ্ডীদাসের আর আনন্দের সীমা রহিলনা। ও ফুল ( ৪৫ ) চণ্ডীদাস-চয়িত্ব। অমনই করযোড়ে বলিয়া উঠিলেন, মাগো, যােগী ঋষি কত যজ্ঞ, কত ব্ৰত, কত তপ করিয়া তোমাকে পায় না, আব্দ আমার কি সৌভাগ্য যে তুমি আমাকে দর্শন দিয়াছ । যাহা হউক না আমি ভক্তি সহকারে তােমার চরণে ফুটি অপন করিতেছিলাম কেন তুমি তাহা তােমার মাথায় দিবার জন্য আদেশ করিতেছ?” ভগবতী কহিলেন, 'হে ভক্ত শ্রেষ্ঠ। ফুলটিতে আমার গুরুর অর্চনা হইয়াছে, অতএব উহা আমার মাথায় দেও। চণ্ডীদাস উত্তর করিলেন, 'সে কি মা, তােমার আবার গুরু কে আছে ? ভগবতী বলিলেন,--‘বৈকুণ্ঠপতি শ্রীগোবিন্দ আমার গুরু। চণ্ডীদাস বলিলেন, “মাগাে, তিনি যদি তােমার পূজ্য হন, তবে আমি ও অতঃপর তাহাকে পূজা করিব। ভগবতী তথাস্তু’ বলিয়া অন্তৰ্হিতা হইলেন।” চণ্ডীদাস ইহার পর কৃষ্ণপরায়ণ হইলেন এবং তদ্বিষয়ক পদা- বলী রচণা করিতে আরম্ভ করিলেন । বৈষ্ণবদিগের মতে ব্রজভাবের উদয় না হইলে কৃষ্ণ প্রাপ্তি সংঘটন হয় না। ব্রজভাবে কৃষ্ণের ভজনা করাই শ্রেষ্ঠ সাধন। রাধা কৃষ্ণের নিগূঢ় রস ‘ব্রজ বিনা ইহা না জানে অন্য । গোপিনীগণ ভিন্ন সে মধুর রস আর কেহ আস্বাদন করিতে পারে না। তাই অনেক বৈষ্ণব ব্রজের গোণী হইয়া জন্মি- বার অভিলাষ করেন। রামাবতারে যে সকল ঋষিগণ, রাম- চন্দ্রের কাৰ্য-উদ্ধার্থে কপিরূপে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহারাই, কৃষ্ণলীলার গােপিনী দল। ভগবানের মাধুৰ্য রস চণ্ডীদাপ-চরিত ( ৪৬ ) গােপী ভাব ভিন্ন অনুভব করা যায়না বলিয়াই তাহাদের এইরূপ পরিবর্তন। চণ্ডীদাসও গাের্পী ভাব হৃদয়ে পােষণ করিতেন,—“দ্বিজ চণ্ডীদাসে কহে শুন শ্যামধন। কৃপাকরি এ দাসীরে দেহ চরণ।” বর্তমান সময়ে যে সকল ভ৩ তপস্বীগণ কপট বৈরাগ্য- ভেক গ্রহণ করিয়া পবিত্র বৈষ্ণবধৰ্ম্মের জ্বলন্ত কুকীর্তিস্তম্ভ হইতেছে, যে সকল অধর্মাচারী বৈষ্ণবগণ প্রকৃতি বিনা ‘গুপ্ত সাধন হয় না বলিয়া দুই তিনটি করিয়া প্রকৃতি বামে বসাইয়া বৈষ্ণব জন্ম সফল করিতেছে, যাহাদের কুকীর্তি ন্যাড়া-নেড়ির দরবার’ বলিয়া লােকে উপহাস করিয়া থাকে, তাহারা শৃঙ্গার রসের অর্থ যাহাই করুক না কেন, চণ্ডীদাস তাহার যে অর্থ করিয়াছেন তাহা অনেকেরই জ্ঞানের বহির্ভ ত । শৃঙ্গার রস বুঝিবে কে ? সব রস আর শৃঙ্গার এ । শৃঙ্গার রসের মরম বুঝে। মরম বুঝিয়ে ধরম যজে। রসিক ভকত শৃঙ্গারে মরা। সকল রসের শৃঙ্গার সারা। কিশাের কিশােরী দুইটি জন। শৃঙ্গার রসের মুরতি হন । গুরু বস্তু এবে বলিব কায়। বিরিঞ্চি ভবাদি সীমা না পায় । কিশাের কিশােরী যাহাকে ভলে। গুরু বস্তু সেই সদা যজে।।
( ৪৭ ) চণ্ডীদাস-চরিত্ত। চণ্ডীদাস কহে না বুঝে কেহ। য়ে জন রসিক বুঝয়ে সেহ৷ রসিক ভিন্ন এস অন্য কাহারাে বুঝিবার শক্তি নাই। উপ- ভােগ-লালসা ও প্রেম এদুইটি যে বিভিন্ন তাহা.উক্ত পদদীতে কবি বুঝাইয়াছেন। • প্রেমকে তিনি বড় উচ্চ অঙ্গের জ্ঞান করিতেন,—পিরীতি করিয়া ভাঙ্গয়ে যে। সাধন অঙ্গ.না পায় সে প্রেম ভঙ্গ করিলে তাহার সাধনা নষ্ট হয় , যাহার হৃদয়ে প্রেম বদ্ধমূল হইয়াছে, তাহার মন অন্য দিকে ‘টলিয়াও টলে না’ শাক্ত ও বৈষ্ণব, হিন্দুদিগের এই দুই সম্প্রদায়ই প্রধান এবং এই দুই সম্প্রদায়ের নিকটই বঙ্গভাষা সমধিক ঋণী। শাক্তদিগের কল্যাণে বাঙলা পদ্য জন্ম গ্রহণ করিয়া থাকিলেও বৈষ্ণবদিগের প্রসাদে উহা সম্পন্ন হইয়াছে। বৈষ্ণবগণ বাঙল। পদ্যে যে সরলতা, যে মধুরতা প্রদান করিয়াছেন, শাক্তগণ তাহা দিতে । পারেন নাই, তাহার কারণ বৈষ্ণবগণ সৌন্দর্য্যের উপাসক, ' শাক্তগণ ভীমকান্তির উপাসক। বৈষ্ণব গ্রন্থের তুলনায় শাক্ত- গ্রন্থ নগণ্য। শাক্তগণ ধ্যানে অনুরক্ত, বৈষ্ণবগণ সংগীতে তনু- রাগী। বৈষ্ণবগণ যে সমুদয় পদাবলী রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহা শ্রবণ করিলে প্রাণ আকুল করে । নিম্নোদ্ধত রাধি- কার বিরহ গীতিটি শ্রবণ করিলে কোন্ হৃদয়বান ব্যক্তিই না ব্যথিত হন । সুখের সায়রে, দুঃখ উপজিল, ভাঙ্গিল যৌবন মাের। আপনা তানিয়া, পিরীতি করিলাম, বন্ধুয়া হইল পর।।
চণ্ডীদাস-চরিত । ( ৪৮ ) সুজন দেখিয়া, পিরীতি করিলাম, কুজন বালবে কে? অমৃত বলিয়া, গল্পল ভক্ষিলাম, ঢলিয়া পড়ি সে। আপনা ভাবিয়া, পিরীতি করিলাম, পর কি আপনা হয়। মিছা প্রেম করি, কান্দি কান্দি মনি, দ্বিজ চণ্ডীদাস কয় ।। ( হস্ত লিখিত প্রাচীন পুঁথি।) শাক্তদিগের গ্রন্থ পাঠ করিলে, দেশের অতীত কালের কোন কথাই জানা যায় না, পরন্তু বৈষ্ণব সাহিত্য আলােচনা করিলে অনুন চারিশত বৎসর পূর্বেরও সামাজিক অবস্থা আচার ব্যবহার প্রভৃতি সুন্দররূপে অবগত হওয়া যায়। পুরা- তত্ত্ব হীনতার জন্য আমাদের চিরকলঙ্ক থাকিলেও বৈষ্ণব সাহিত্য পাঠ করিয়া বৈষ্ণব দিগের সম্বন্ধে আমরা যে টুকু জানিতে পারি, শাক্ত সাহিত্য হইতে শাক্তদিগের সম্বন্ধে সে টুকুও জানিবার কোন উপায় নাই। নবদ্বীপ, বৃন্দাবন প্রভৃতি বৈষ্ণব তীর্থ গুলি এখনো কোন সজীব, পরন্তু ক্ষীরগ্রাম, নল- হাটী, চণ্ডীপুর প্রভৃতি শাক্ত তীর্থ গুলি তেমনি নিজীব। বৈষ্ণব- গণ সুললিত পদাবলীর দ্বারা যেমন আমাদের কর্ণকুহর পবিত্র করিয়া গিয়াছেন, তেমনি প্রাচীন আচার ব্যবহার সম্বন্ধেও কথ- ঞ্চিৎ লিপি বদ্ধ করিয়া অতীত অন্ধকারের মধ্যে খদ্যোতের ক্ষীণ রশ্মি বিকীর্ণ করিয়া রাখিয়াছেন। এ অংশেও শাক সত্যি হইতে বৈষ্ণব সাহিত্য আদরণীয় ও উপকারী। লােক চিত্তের উপরও বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাব সামান্য নাই। চণ্ডী- দাস যখন বাশুলী-মন্দির হইতে বিতাড়িত হইয়া রামিনীর ( ৪৯ ) চণ্ডীদাস-চরিত । নানুরের সহিত তাহার আবাসে অবস্থান করিতে ছিলেন, তখন একদা রের একজন সুরাপায়ী সমাজ-কলঙ্ক দুষ্টবুদ্ধি ব্যক্তি তাহা- দিগকে বিড়ম্বিত করিবার অভিপ্রায়ে, তাহাদের শয়ন-গৃহে একটি অজগর সপ ছাড়িয়া দিবার মনস্থ করিয়া একটি মৃৎ পাত্রে একটি সপ ধরিয়া রজনীযোগে রজকিনীর গৃহাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিল! রজকিনীর গৃহের সন্নিকট উপস্থিত হইয়। সুরাপায়ী শুনিল, চণ্ডীদাস গাহিতেছেন- পরের বেদনা পর কি জানয়ে, পর কি আনের বশ। পরের পিরীতি আন্ধারে বসতি, কিবা সে জানিয়ে রস । রসিক হইলে রস কি ছাড়য়ে, সুদৃঢ় চতুর জনা । যত বড় তেঁহো রসের রসিক, সে সব গেলই জানা। ( হস্ত লিখিত পুঁথি।) পদগুলি তাহার কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ করিল। ভক্তের নিকট পাপীর পরাজয় হইল। তন্মুহুর্ত হইতে তাহার জীবন-স্রোত অন্যগতি অবলম্বন করিল! সে ঘঁাড়ী শুদ্ধ সপটি অদূরে নিক্ষেপ করিয়া চণ্ডীদাসের নিকট উপনীত হইয়া তাহার চরণ ধরিয়া অপরাধ উল্লেখ পূৰ্ব্বক বার বার ক্ষমা ভিক্ষা করিতে লাগিল। বৈষ্ণবদিগের প্রভাব সম্বন্ধে ভক্তমাল’ গ্রন্থেও অনেক অলৌকিক গল্প স্থান পাইয়াছে। আমরা তাহার একটি মাত্র এস্থলে পাঠকগণকে উপহার দিলাম।
চণ্ডীদাস-চরিত ( ৫ ) এক ব্যাধ পক্ষীবধের নিমিত্ত তীর ধনুক লইয়া এক সরো- বরতীরে গমন করিল। তাহাকে দেখিবা মাত্র সমস্ত পক্ষীগুলি উড়িয়া যঃ পলায়তি স জীবতি’ নীতির মর্যাদা রক্ষা করিল। সুযােগমত পুণরায় পাখী মারিবে এই আশায় ব্যাধ একবৃক্ষের অন্তরালে লুক্কায়িত আছে, এমন সময় এক বৈষ্ণব স্নানার্থে সরােবরে অবতরণ করিল। ভাহাকে দেখিয়া একটি পক্ষীও উঃ উয়। পলায়ন কিম্বা ভীতি চিহ্ন প্রকাশ করিল না। এই ব্যাপার সন্দর্শন করিয়া ব্যাধ ভাবিল, তবে আমিও বৈষ্ণবের পরিচ্ছদ গ্রহণ করি, তাহা হইলে অামাকে দেখিয়া ও আর পাখী পলাইবে না এবং এই উপায়ে আমি সহজেই বহুতর পক্ষী বধ করিতে পারিব । এইরূপ স্থির করিয়া ব্যাধ বৈষ্ণব বেশ ধারণ করিয়া সরােবরে অবতরণ করিল; এবার একটি পক্ষীও তাহাকে দেখিয়া পলায়ন করিল না। সে সুযােগ বুঝিয়া পক্ষী বধের নিমিত্ত যেমনি হস্ত প্রসারণ করিবে, অমনি কে যেন সহসা তাহার হৃদয়-মন্দিরে আবির্ভূত হইয়া তাহার হৃদয়-তন্ত্রী অন্য দিকে ফিরাইয়া দিল। তাহার আর পক্ষী বধ করা হইলনা, তাহার নয়ন-যুগল হইতে অবিরল ধারায় অশ্রু পতিত হইয়া আবক্ষ ভাসিয়া যাইতে লাগিল,—‘পাষাণ গলিল সে করুণার প্লাবনে। সে ভাবিল, সেবকের বেশ ধারণ করাতেই পক্ষী পশু প্রভৃতি এতদূর বিশ্বাস করিয়া আমার চতুর্দিকে বিচরণ করিতেছে, নাজানি প্রকৃতভক্ত হইলে তাহারা অবিরা কি বা করে ? হায় আমি এতদিন কি অন্ধ- ( ৫১ ) চণ্ডীদাস-চরিত। কারেই রুদ্ধ ছিলাম। যাহা হো আর আমি এ মধুর বেশ ত্যাগ করিব না। সেই হইতে ব্যাধ বৈষ্ণব হইয়া গেল। বৈষ্ণবদিগের সাধণ প্রণালী অতিব কঠিন, তাঁহাদের অনু- শাসন অতিশয় দুরূহ। বৈধ্বসাধু কামিনীকাঞ্চন বিষধরবৎ পরিহার করেন এবং প্রকৃত বৈরাগ্য জন্মিলে বিষয়ে আস- ক্তিও জন্মায় না। রামানন্দ রায়, রূপসনাতন, রঘুনাথ দাস প্রভৃতি জগৎ-পূজ্য বৈষ্ণবগণই ইহার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। প্রকৃতই যিনি সংসারের কোন সংবাদই রাখেন না, তাঁহার চরণ-মূলে রাজার রাজমুকুট ও বিলুষ্ঠিত হয়। বৈরাগ্য শতকে একযোগী কোন এক রাজাকে বলিয়াছিলেন যে, আমরা সামান্য বল্কল পরিধান করিয়া সন্তুষ্ট হই, তােমরা দুকূল পরিধান করিয়া পরিতােষ লাভ কর। কিন্তু উভয়ের পরিতােষই সমান, প্রভেদ এই যে আমরা দুকূল পাইলেও যেমন সন্তুষ্ট বল্কল পাইলেও তেমনি সন্তুষ্ট হই, পরন্তু বল্কল পরিতে তােমরা কষ্ট অনুভব কর। তাহার কারণ তােমাদের ভােগ লালসার নিবৃত্তি হয় নাই,দরিদ্র ব্যক্তির কখনো তৃষ্ণর নিবৃত্তি হয় না। মনকে লইয়াই সুখ দুঃখ। মন যদি সন্তুষ্ট থাকে তবে দরিদ্রই বা কে আর ধনীই বা কে ? বৈষ্ণবের মনে সদা সন্তোষ বিরাজ করে, কাযেই তাহার কিছু অভাব বােধ হয় না—সে ধনী। আর অবৈষ্ণব, অসাধুর মনে কখনাে ভূনানন্দের উৎপত্তি হইতে পারে না, সে মহাপ্রতাপান্বিত হইলেও তৃষ্ণা-পীড়িত, কবেই দরিদ্র। যাহার যত লালসা তাহার তত অভাব, বিনা অভাবে চণ্ডীদাস-চরিত। ( ৫২ ) তৃষ্ণা থাকিবে কেন ? যাহার লালসার নিবৃত্তি হইয়াছে, যার অভাব পূর্ণ হইয়াছে, তাহার তৃষ্ণারও চিরনিবৃত্তি হইয়াছে। কিন্তু ভােগের দ্বারা এ তৃষ্ণা নিবারণ হয় না,-যােগের দ্বারা, অভ্যাসের দ্বারা নিবৃত্ত হইয়া থাকে। যদি ভােগের দ্বারাই তৃষ্ণা বিদূরিত হইবার সম্ভাবনা থাকিত, তবে এত দিনেও কি আমাদের এ ঘাের পিপাসার উপশম হইত না! মনুর অনু- শাসনে ব্যক্ত, কাম ভােগ দ্বারা কখনাে কামের উপরতি হয় বরং অগ্নিতে ঘৃতাহুতি প্রদানের ন্যায় উজ্জ্বল হইয়া প্রজ্জ্ব- লিত হইয়া উঠে। ভােগের দ্বারা কামের বৃদ্ধিই হইয়া থাকে মাত্র। বৈষ্ণব মাত্রেই এই কামের প্রভাব হইতে বিনিমুক্ত। চণ্ডীদাস সংক্ষেপে যে তত্ত্ব কথা গাহিয়াছেন, তাহা উদ্ধৃত করিয়। আমরা এ প্রস্তাবের উপসংহার করিলাম। সদা বল তত্ত্ব তত্ত্ব কত তত্ত্ব এন। চব্বিশ তত্ত্বে হয় দেহের গঠন। পঞ্চভূত ক্ষেত্র তেজ মরুৎ বােম আপ। ষড় রিপু কাম ক্রোধ লােভ মদ মাৎসৰ্য দম্ভ। দশ ইন্দ্র ক্ষত তারা হয়ত পৃথক। জ্ঞানেন্দ্রিয় কৰ্ম্মেন্দ্রিয় দ্বিবিধ নামাত্মক। জ্ঞানেন্দ্রিয় জিহ্বা কর্ণ নাসাত্মক চক্ষু । কৰ্ম্মন্দ্রিয় হস্তপদ গুহ্যলিঙ্গ বপু মহভূত অহঙ্কার আর হয় জ্ঞান। এইত হয় চব্বিশ তত্ত্ব নিরূপণ। কিবা কারিকরের আজব কারি কুরি। তার মধ্যে ছয় পৰ্ম্ম রাখিয়াছে পুর।। ।
( ৫৩ )
চণ্ডীদাস-চারত।
সহস্ৰারে হয় পদ সহস্রক দল।
তার তলে মণিপুর পরম শিবের স্থল।
নাস। মূলে দ্বিদল পদ খঞ্জনাক্ষী।
কণ্ঠে গাঁথি ষোড়শ দল পদ্ম দিল রাখি।
হৃদ-পদ্ম নিম্মিত আছে শতদলে।
কুল কুণ্ডলিনী দশ দল হয় না।ভ মুলে ।
নাভির নিয় ভাগে প্রেম সবােবর।
অষ্টদশ পদ্ম হয় তাহার ভিতব ।
তস্য পরে নাড়ী ধরে সাদ্ধ তিন কোটি।
স্থূল সূক্ষ্ম বত্রিশ তারা কি বা পরিপাটি ।।
ঙ্গি মূলে বড় দল,ম্মুজ নিয়ােজিত।
গুহ মূলে চতুদ্দল পদ্ম বিরাজিত।
এই অষ্ট পদ্মা দেহ মধ্যেতে অছিয়।
মতান্তরে হৃদ পদ্ম দ্বাদশ দল কয়।
সহস্র দল অষ্টদল দেই মধ্যে নয় ।
এই দুই পদ্ম নিত্য বস্তুৰ আধার হয় ।
ষট চক্রের মূল মৃণাল হয় মেরুদণ্ড ।
শিরসি পর্যন্ত সে ভেদ করি অণ্ড।
দন্ত দুই পার্শ্বেত ঈড়া পিঙ্গলা রহে।
মধ্যে স্থিত সুষমণা সদ। প্রবল বহে ।
।
মুল চক্র হয় হংস যােগের অাধার ।
অষ্ট দল চক্রে লীলার সঞ্চা ।
দ্বিদল চক্রেতে হয় অমৃত নির্ভর।
আর পঞ্চ চক্রে পঞ্চ বায়ুর সঞ্চার ।।
প্রাণ, অপান ব্যান, উদান, সমান।
কণ্ঠা বধি চতুৰ্দলে অবস্থান।
চণ্ডীদাস-চারিত। ( ৫৪ ) ++ -- কণ্ঠ পরে উদান হৃদিতে বহে প্রাণ। নাভির ভিতরে সমান করে সাধন। চতুৰ্দলে অপান সৰ্ব্ব ভূতেতে ধ্যান। মুখ্য অনুলোম সিলোম সকল প্রধান। অজপা নামেতে তারা কুম্ভক রৈচক। অনুলােম উৰ্দ্ধ রেতা বিলােম প্রবর্তক । প্রবর্থ সাধন হৃদ-নাভি পদ্মের অশ্রয়। সিদ্ধার্থ সহস্ৰারে আছয়ে নিশ্চয়। রতি স্থির প্রেম সরোবর অষ্টদলে। সাধনের মূল এই চণ্ডীদাস বলে। মনে বৈরাগ্য উদয় না হইলে সাধনার সিদ্ধিলাভ ঘটে না ; সাধনার প্রথম স্তরেই বৈরাগ্যযােগ বা বিষাদযোগ। • সহজে উদয় হইতে পারে কিন্তু বৈরাগ্য সহজে উদয় হই- নার নহে। প্রিয় পুত্র দারাতের মায়া মমতা কি শীঘ্র ত্যাগ করা যায় ? ‘স্বাত্মতত্ত্বাভগ নং ভবতি প্রায়শােনাং। মুনে বিষয় বৈরাগ্যৎ কদার্থাদুপজায়তে।” আত্মতত্ত্ব বরং অল্লা- সে লাভ হয়, কিন্তু বিষয়ে বৈরাগ্য লাভ অতি কষ্টে ঘটে। ধন স্থায়ী করিতে হইলে বৈরাগ্যের আবশ্যক, আবার বৈরাগ্য স্থায়ী করিতে হইলে অতিশয় শ্রম স্বীকার করিতে হয়। বৈষ্ণবদিগের মধ্যে বৈরাগ্য স্থায়ী ভাবে থাকে বলিয়াই তাহাদিগকে শ্রেষ্ঠ বলা যায়।
চতুর্থ প্রভাব। ( বিদ্যাপতির সাক্ষাৎ ) জাতীয় সাহিত্য জাতীয় জীবনের প্রধান উপকরণ। সাহিত্য জাতিয়গৌরব-চিহ্ন। যে জাতির সাহিত্য যত উন্নত ও পরি- শুদ্ধ, সে জাতিও তত প্রতিষ্ঠান্বিত। জাতীয়-সাহিত্যই জাতীয় জ্ঞান, জাতীয় স্মৃতি, জাতীয় শক্তি। যে জাতি জাতীয় সাহিত্য উন্নত, পরিপুষ্ট করিতে পারে, সে জাতি এক অস্তি ঐশী শক্তি ভাবে জাতীয় প্রতিষ্ঠা অক্ষুন্ন রাখিতে পারে। সাহিত্যের এই চিরস্থায়ীত্ব গুণ আছে বলিয়াই জাতি বিশেষের সভ্যতার পরিমাণ—দণ্ডরূপে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। জাতীয় সাহিত্যের উন্নতি করা সর্বতােভাকে কর্তব্য। কারণ জীয় সাহিত্যের উন্নতিতে জাতীয় জীবন উন্নত হইয়া থাকে। জাতীয় সাহিত্যের উন্নতিতে দেশের উন্নতি-স্বজাতিরউন্নতি । অৰ্য । ভারত যে একদিন সভ্য জগতের শীর্ষস্থানীয় হইয়াফ্রি, তাহা কেবল সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব হইতেই। কবির রমণীয় ক; ব্য- লাপে. বৈজ্ঞানিকের বিশ্বব্যাপিনী প্রতিভায় ভারতবর্ষ শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিল। কিন্তু হায়! সে দিন কোথায় ? পূর্বে জাতীয় সাহিত্য বলিতে সংস্কৃত বুঝাইত, কিন্তু
| চণ্ডীদাস-চবিত
( ৫৬ )
এখন বঙ্গসাহিত্য আমাদের জাতীয় সাহিত্য; এখন তাহা যােবনে
পদার্পণ করিয়াছে। কিন্তু সর্বাঙ্গীন পরিপুষ্টি লাভ এখনাে
তাহার অদৃষ্টে ঘটিয়া উঠে নাই। তবে গত অর্ধ শতাব্দীর
মধ্যে বঙ্গ-সাহিত্য যেরূপ উন্নত হইয়াছে, তাহাতে পুনঃ
আশা হয় যে, হয়ত একদিন আমাদের জাতীয় সাহিত্যের
সম্পূর্ণতা সংশাধিত হইতে পারিবে। কিন্তু জাতীয় সাহিত্য
উন্নত করিতে হইলে, সাহিত্য-সেবীকে উৎসাহ দান করা
সর্বতােভাবে কৰ্ত্তব্য। পূর্বে অনেকানেক রাজা মহারাজাগণ
শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকে অশ্রয় দান করিতে, কিন্তু বর্তমান সময়ে
আমাদের দেশের ধনী সন্তানগণ মধ্যে সেরূপ প্রবৃত্তি ফুর্তি
লাভ করিতে পারে নাই। তাহা না হইলে কি দাতব্য চিকিৎ
সালরে মধুসূদন মরণের কোলে আশ্রয় লইতেন ? কবিবর
রাজকৃষ্ণ ও কৃষ্ণচন্দ্র অন্নকষ্টে জীন ত্যাগ করিবেন কেন ?
শেষ জীবনে অক্ষয়চন্দ্রকে আদি ব্রাহ্মসমাজের আশ্রয় লইতে
হইয়াছিল কেন ? বেশি দিনের কথা নয়, সেদিন আমরা
দেখিলাম, চক্ষুহীন হেমচন্দ্র দারিদ্র্যের তীব্র কষাঘাতে নিষ্পে-
ষিত হইয়া গেলেন! দেশে কি তাহাকে অভয়দান করিবার
একটি লোকও ছিল না? তাহাদের সেই ভাষাহীন অভি-
সম্পাতেই আমাদের সুখ শান্তি, কল্যাণ দূরে দাঁড়াইয়া
থাকিবে,--‘ভারত সুধু ঘুমাইয়া রবে।
ইংরেজ কবি সেক্ষণীয়র কতদিন হইল অমর ধামে প্রস্থান
করিয়াছেন, কিন্তু আজিও ইংরেজগণ তাঁহার স্মৃতির প্রতি
{ ৫৭ )
চণ্ডীদাস-চরিত।
naat ২ । "NM
**
কেমন সন্মান প্রদর্শন করিতেছেন, তাহার জন্মতিথিতে
স্ট্রাফোর্ড-অন-য়্যাভনে কেমন উৎসব করিয়া থাকেন, সেক্ষপী-
য়রের নামােল্লেখ করিয়া কেমন শ্লাঘা প্রকাশ করিয়া থাকেন।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ সেক্ষপীয়রের কথাই বলিলাম, অন্যান্য প্রতিভা
শালী সাহিত্যসেবীদিগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে ও
ইংরেজগণ কুণ্ঠিত নন। কিন্তু তাহারা যদি ইংলণ্ডে না
জন্মিয়া ভারতবর্ষে জন্ম গ্রহণ করিতেন, তবে তঁাহাদের
অবস্থা কিরূপ হইত ? নবরত্নের সার-রত্ন মহাকবি কালিদাস,
মিথিলার মনুমেন্ট বিদ্যাপতি, বীরভূমের বিজয়বৈজয়ন্তি জয়-
দেব ও চণ্ডীদাস, বাঙালীর জাতীয় জীবনের বিজয়স্তম্ভ কাশী-
দাস ও কৃত্তিবাস যে পথের পথিক হইয়াছেন, তঁাহাদিগকেও
সেই পথের যাত্রী হইতে হইত। ইহাদিগের ন্যায় তাহা-
দিগের জন্যও সহানুভূতির একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিতে কেহ
অগ্রসর হইত না! হায়, বাঙালী জাতি, কবে তােমাদের এ
কলঙ্ক দূর হইবে ? কবে তােমরা সাহিত্য-সেবীর পূজা
করিতে আরম্ভ করিবে ?
বাঙালী জাতি যদি গুণীর আদর করিতে জানিত, সাহিত্য
সেবীর স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে জানিত, তবে কি
আজ আমাদিগকে তাঁহাদের জীবনী আলোচনা করিতে
বসিয়া অন্ধকারের মধ্যে দিয়া লেখনী চালনা করিতে হইত।
আমরা যে জ্ঞান-সমুদ্রের তীর হইতে কত দূরে পড়িয়া আছি,
তাহা ভাবিলেও স্তম্ভিত হইতে হয়।
H.
চণ্ডীদাস-চরিত। ( ৫৮ ) চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি সম সাময়িক; উভয়েই চতুর্দশ শতা- ব্দীতে বর্তমান থাকিয়। কাব্য-সুধা বিতরণ করিয়া গিয়াছেন। বিদ্যাপতি মিথিলাধিপতির সভায় ও চণ্ডীদাস নাম্নরের বিশা- লাক্ষী দেবীর মন্দিরে থাকিয়া প্রেমসংগীত গাহিতেন। কিন্তু বিদ্যাপতির অপেক্ষা চণ্ডীদাস খাটিও শ্রেষ্ঠ প্রেমিক,গীতি, কাব্যে তঁহার অপেক্ষা উচ্চ স্থান আর কাহাকেও দেওয়া যাইতে পারেনা। তাহার ভাষা আড়ম্বরহীন, বহুলউপমা বজ্জিত। বিদ্যাপতিকেও আমরা প্রগাঢ় প্রেমিক ও ভক্ত বলিয়া বার বার প্রণাম করি, কিন্তু তাহার ভাষা উপমা বাহুল্য ও অনাবশ্যক আড়ম্বরে ভারাক্রান্ত ! “চণ্ডীদাসের কতিপয় অশ্রুশিক্ত-পদ কুসুমের সুরভির ন্যায় প্রকৃতি আপনা আপনি দ্বার উদঘাটন করিয়া প্রচার করিতেছে—শিক্ষার কর্ষণ আবশ্যক হয় নাই, তদীয় গীতি কবিতার সরস অক্ষরে কণ্টকাকীর্ণ কুসু- মের ন্যায় সুধাও বিষ মিশ্রিত প্রেমের কথা একত্র গ্রথিত রহি য়াছে ; কাব্যক্ষেত্রে চণ্ডীদাস প্রভু কৰ্ম্মক্ষেত্রে চৈতন্য প্রভুর ন্যায় অন্য এক প্রেমাবতার। বিদ্যাপতির কবিতা টীকা-টিপ্পনী দিয়া ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু চণ্ডীদাসের পদ যিনি নিজে আস্বাদ করিতে না পারিবেন, তাঁহার নিকট অপরাপর বৈষ্ণবীয় পদের সঙ্গে সে গুলি একই মূল্যে বিকাইবে। তাদৃশ পাঠকগণ সম্বন্ধে বিদ্যাপতির কথায় বলা যাইতে পারে, কাচ কাঞ্চন না জানিয়ে মূল। গুঞ্জা রতন করই সমতুল। -
( ৫৯ )
চণ্ডীদাস-চয়িত।
যাে কিছু কভু নাহি কলারস জান।
নীর ক্ষীর দুই করই সমান।”
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস সম সাময়িক হইলেও, বিদ্যাপতি
প্রথম প্রেম সংগীত গাহিতে আরম্ভ করেন, তাহার যশঃসৌরভে
চণ্ডীদাসের যশঃ সৌরভ চাপা পড়ায় তাহা বিস্তৃত হইতে
কিছু বিলম্ব হয় ও চলাচল পক্ষেও কিছু ব্যাঘাত করিয়াছিল।
কিন্তু চণ্ডীদাসের ভাব-সন্মিলন, অনুরাগ, স্বয়ংদৌত্য, খণ্ডিত
প্রভৃতিতে যে সৌন্দৰ্য্য ও কমণীয়তা আছে তাহা বিদ্যাপতিতে
নাই। অবশ্য বিদ্যাপতিও তাঁহাকে কোনাে কোনাে অংশে
পরাজয় করিয়াছেন। তাহার প্রবাস, মান, রসােদার, মাধুর
কল্পনার অমৃতময় সৌরভে টলটলায়মান। তাহাদের উভয়েরই
নায়ক সেই প্রেমকেলি মুরলীধারী শ্রী কৃষ্ণ এবং নায়িকা সেই
বিরহ দুঃখ-কাতরা পাগলিনী শ্রী রাধিকা। প্রভেদ এই যে
চণ্ডীদাসের অধিকাংশ পদ রাধা ভাবে ও বিদ্যাপতির অধি-
কাংশ পদ সথা ভাবে চিত্রিত। চণ্ডীদাস কেবল প্রেমিক
বিদ্যাপতি প্রেমিক ও ভক্ত। একজনের পদ তরল রসে ভর
পুর, সহজ ভাবে মনোজ্ঞ আর একনের পদ চমৎকারিতায়
মাতােয়ারা, গভীরতায় চিত্তহারা। বিদ্যাপতির কবিত্ব-শক্তি
ঈশ্বর প্রদত্ত—বিবিধ বিচিত্রভাব অঙ্কনে সুদক্ষ, চণ্ডীদাসের
কল্পনা স্বীয় নায়ককে কখনাে নাপিতানী, কখনো দেয়াসিনী
কখনাে বৈদ্য, কখনাে ডুবারু বেশে সাজাইয়া নাটকাভিনায়-
কের কৃতিত্ব দেখাইতে সক্ষম।
* বঙ্গভাষা ও সাহিত্য।
চণ্ডীদাস-চরিত।
( ৬০ )
বিদ্যাপতি মিথিলার শৈবধর্মাবলম্বী নরপতি শিবসিংহের।
প্রিয় সভাসদ ছিলেন। রাজা সময় সময় প্রঙ্গাগণের অবস্থা
দেখিতে বর্ধমান, বাঁকুড়া প্রভৃতি স্থানে যাতায়াত করিতেন।
চণ্ডীদাসের কবিত্ব-সৌরভ বিদ্যাপতির নাসারন্ধে, প্রবিষ্ট হইলে
ও রামীর সহিত তাহার অলৌকিক প্রেম-বন্ধন-সংবাদ কর্ণে
পেঁহুছিলে, তাহার সহিত দেখা করিতে বিদ্যাপতির প্রবল বাসনা
জন্মে। তিনি বাসনা চরিতার্থ করিবার অবসর অনুসন্ধান করিতে
লাগিলেন, দেখিতে দেখিতে অবসরও জুটিল। রাজা কোন
কাৰ্য্যোপলক্ষে বর্ধমান জেলায় গমন করিতে উদ্যত হইলে,
তিনি ও তাহার সঙ্গ লইলেন। যথা সময়ে বর্ধমানে উপনীত
হইয়া বিদ্যাপতি রূপনারায়ণ নামক এক ব্যক্তিকে সঙ্গে
লইয়া নানুর অভিমুখে যাত্রা করিলেন। চণ্ডীদাস এই সংবাদ
জানিতে পারিয়া তাঁহার অভ্যর্থনার নিমিত্ত লিখিত গ্রাম ত্যাগ
করিয়া বর্ধমানের রাস্তা বহিয়া চলিতে লাগিলেন। তৎকালে
তাহাদের মানসিক অবস্থা পদকল্পতরুর একটী গীতে ব্যক্ত
হইয়াছে।
চণ্ডীদাস গুনি, বিদ্যাপতি গুণ, দরশনে ভেল অনুরাগ।
বিদ্যাপতি তব, চণ্ডীদাস গুণ, দরশনে ভেল অনুরাগ।
দুহু উৎকণ্ঠিত ভেল।
সঙ্গহি রূপনারায়ণ কেবল বিদ্যাপতি চলি গেল ।
চণ্ডীদাস তব রহই না পারই চললহি দরুশন লাগি।
পন্থহি দুই জন দুহু গুণ গায়ত দুহু হিয়ে দুহু রহু জাগি।
দৈহি দুই দোহা দরশন পাওল লখই না পরই কোই।
দুহু দোহ নাম শ্রবণে তহি জানল রূপনারায়ণ গেই।
++
( ৬১ ) চণ্ডীদাস-চরিত। ক চণ্ডীদাস বর্ধমান অভিমুখে চলিতেছেন, বিদ্যাপতি বীরভূম অভিমুখে অগ্রসর হইতেছেন। পথিমধ্যে মধ্যাহ্ন সময়ে গঙ্গাতীরে এক বটবৃক্ষ মুলে উভয়ে উভয়ের সাক্ষাৎ পাই লেন। তথায় বসিয়া উভয়ে উভয়ের কবিত্ব, রসিকতা, পাণ্ডিত্য অনুভব করিতে লাগিলেন। চণ্ডীদাস বলিলেন,- সময় বসন্ত, যাম দিন মাঝ হি বটতলে সুবধুনী তীর। চণ্ডীদাস করি, রঞ্জনে মিলল, পুলকে কলেবর গীর। দুইজন ধৈরজ ধরই না পার। সঙ্গহি রূপনারায়ণ কেবল দুহুক অবশ প্রতিকার | ধু ধৈরজ ধরি উঁহু. নিভৃতে আলাপই, পুছত মধুর রসকি ? রসিক হইতে কিয়ে, রস উপায়ত, রস হইতে রসিক কোহি। রসিক হইতে, কিয়ে হোয়ত, রসিক হইতে রসিকা । রতি হইতে প্রেম, প্রেম হইতে রতি, কিয়ে কাহে মানব অধিক। পুছত চণ্ডীদাস, কবিরঞ্জনে, শুন উঁহি রূপনারায়ণ । কহ বিদ্যাপতি, ইহ র কারণ, লছিমা পদ করি ধ্যান। বিদ্যাপতির উত্তর- রসের কারণ, রসিকা রসিক কায়াটি ঘটনে রস। রসিক কারণ রসিক হোয়ত, যাহাতে প্রেম বিলাস । স্থূলত পুরুবে কাম সূক্ষ্ম গতিঃ স্থলত প্রকৃতি রতি। দুহুক ঘটনে, যে রস হােয়ত, এবে তাহা নাহি গতি। দু’হক যেটন, বিনহি কখন, না হয় পুরুষ নারী। প্রকৃতি পুরুষ যে কিছু হােয়ত, প্রেম পরচারি। পুরুষ অবশ প্রকৃতি সশ, অধিক রস যে পিয়ে। রাত সুখ কালে, অধিক সুখীহ তানাকি পুরুষে পায়ে । ইহুক নয়নে, নিকসয়ে বাণ, বাণ যে কামের হয়। রতির যে বাণ, নাহিক কানস, তবে কৈছে নকসয় । =
চণ্ডীদাস-চরিত
( ৬২ )
কাম দাবানল, রতি যে শীতল সলিল প্রণয় পাএ।
কুল কাঠ খড়, প্রেম যে আপেয়, পচনে পিরীতি না ।
পচনে পচনে, লোভ উপজিয়া, যব ভােল দ্রবময়।
সেই বস্তু এবে, বিলাতে উপরে তাহাকে রস যে কয়।
ভণে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাসতথি, রূপনারায়ণ সঙ্গে।
দুহু আলিঙ্গন, করল তখন, ভাল প্রেম তরঙ্গে।
উত্তর প্রদানান্তর দুই কবি দৃঢ় আলিঙ্গনে-বদ্ধ হইলেন।
পরে উভয়ের কুশল বার্তাদি জানিবার পর, তথায় অনেকক্ষণ
বসিয়া উভয়ে উভয়ের পাণ্ডিত্য রসিকতার পরিচয় পাইয়া একত্রে
নামুরে আগমন করিলেন। চণ্ডীদাস বিদ্যাপতিকে নিজের
ভ্রাতা নকুল ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের সহিত আলাপ পরিচয়
কারইয়া দিলেন। তাঁহার জনকঙ্গননী পূৰ্বেই স্বর্গারােহণ করিয়া
ছিলেন, তাহারা স্বর্গ হইতে কবিবর ‘বিষয়ি বারবিস্কী
বিদ্যাপতি ঠাকুরের চরণ স্পর্শে স্বীয় কুটি পবিত্র হইতে দর্শন
করিলেন। পথিমধ্যে সুরধুনী তীরে বটবৃক্ষ মূলে যেখানে
উভয় কবির প্রথম সাক্ষাৎ হয়, সেই স্থানেই তাহারা স্নানাদি
করিয়াছিলেন । সন্ধ্যার কিছু পূর্বে তাহারা নানুরে চণ্ডী-
দাস কুটীরে উপনীত হন। বিদ্যাপতির অভ্যর্থনার নিমিত্ত
চণ্ডীদাস পূৰ্বেই আয়ােজন করিয়াছিলেন। সন্ধ্যার
সময় রূপনারায়ণের সহিত তাহাকে পরিতােষ পূৰ্ব্বক অন্যান্য
ব্যঞ্জনাদির সহিত জিলেপি, মালপা, সীতামিশ্র আদি মিষ্টান্ন
আহার করাইলেন। আহারান্তে ভয় কবি অনেকক্ষণ
আলাপাদি কবিয়। শয্যার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন।
( ৬০ )
চণ্ডীদাস-চরিত।
পরদিবস প্রাতঃকালে উভয়ে শয্যা ত্যাগ করতঃ স্নান
করিয়া বিশালাক্ষীর মন্দিরে দেবী সর্শনার্থ গমন করিলেন।
চণ্ডীদাস নানা বিধ সুগন্ধী পুষ্প দিয়া সভক্তি চিত্তে বিশালা-
ক্ষীর পূজা করিতে বসিলেন, বিদ্যাপতি নিকটে বসিয়া ছল ছল
নেত্রে দেবীর প্রতি চাহিয়া রহিলেন। পূজা শেষ হইলেউভয়ে
একত্ৰে জগদ্ধাত্রীর রাতুল চরণে পুস্পাঞ্জলি প্রদান করিলেন।
মধ্যাহ্ন সময়ে আহারাদি করিয়া বিদ্যাপতি রামমণির
সহিত দেখা করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। চণ্ডীদাস প্রথমে
সে কথা উড়াইয়া দিলেন, পরে তাহার নিতান্তআগ্রহ দেখিয়া
তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া রজকিনীর আলয়ে গমন করিলেন।
বিদ্যাপতি রজকিনীর সহিত আলাপ করিয়া প্রীত ও তাহার
অকৃত্রিম প্রেম ও ভক্তিনিষ্ঠা দর্শনে বিস্মিত হইয়া বলিলেন,
রজকিনী সামান্য স্ত্রী নহে। রামমণির প্রতি চণ্ডীদাসেরও
অত্যধিক আসক্তি ও ভালবাসা দেখিয়া বিদ্যাপতির মনে
হইল, চণ্ডীদাসের কথাই সত্য , চণ্ডীদাস ‘মরিয়া হইবে
রঙ্গকের ঝি।
তৎপর তাঁহারা উভয়ে চণ্ডীদাসের কুটীরে প্রত্যাগমন
করিলেন। তথায় কিয়দ্দিস সুখে অবস্থান করিয়া বিদ্যাপতি
চণ্ডীদাসের নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া বর্ধমান যাত্রা করিলেন।
তাহাদের আর কখনো দেখা হয় নাই, তবে মধ্যে মধ্যে
উভয়ে উভয়ের সংবাদ লইতেন ও তাঁহাদের কবিতা আদান
প্রদান চলিত।
চণ্ডীদাস আজন্ম দুঃখে প্রতিপালিত, তাই তিনি দুঃখের
কবি। দুঃখের সহিত মনের ভাব গুলি সহজ ভাষায় ব্যক্ত
চণ্ডীদাস-চরিঙ্গ ( ৬৪ ) করিয়াছেন, তজ্জন্য তিনি প্রাচীন কবিকূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। চণ্ডীদাসের সুখ দুঃখে সমান জ্ঞান,—জগৎকে প্রেমময় বলিয়া জ্ঞান করিতেন। সুদীর্ঘ বিরহের পর মিলনেও তাঁহার সুখ নাই। তিনি দুঃখের মধ্যে সুখের অগ্নিশিখা অনুভব করিতেন ; দুঃখের মধ্যে সুখের শীতল কণা তাহার গাত্র- স্পর্শ করিত। তাহার সুখের মধ্যেও আশঙ্খ। অথচ দুঃখের প্রতিও অনুরাগ। বিদ্যাপতি সুখের কবি, অল্পতেই ধৈৰ্য- হারা হইতেন,-বিরহে কাতর হইয়া পড়িতেন। পৃথিবীর মধ্যে প্রেমকেই তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করিতেন। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস কতদিন হইল, এই নশ্বর জগৎ ত্যাগ করিয়া মহাপ্রস্থান করিয়াছেন, তাহাদিগকে স্মরণ করিবার কোন চিহ্নই নাই—কোন স্মৃতি স্তম্ভই ধরণীর মূক বক্ষে দায়- মান থাকিয়। অতীতের কথা স্মরণ করাইয়া দেয় না। কেবল তাঁহার কাব্যোদ্যানে যে অতুলনীয় সৌন্দৰ্য্য রাখিয়া গিয়া- ছেন, সেই সৌন্দর্য্যে, সেই সৌরভে অদ্যাপিও আমাদিগকে মুগ্ধ করিয়া রাখিয়াছে । বিস্মৃত হইতে গেলেই তাহাদের সেই অমর বীণার অমর কাব্য-রাগিনী আমাদের কর্ণে প্রবেশ করিয়া বিহাল করিয়া ফেলে। "Sweet Bidya pati ! Sweet Chandidas ! the earliest stars in the firmamept o Bengali literature ! Long, long will your strains be remembered and gung in Bengal !" * * Literature of Bengal-R C. Dutt.
পঞ্চম প্রস্তাব। ( কবিত্ব।) নিত্য পরিবর্তনশীল চিররহস্যাবগুণ্ঠিতা প্রকৃতির সুগভীর যবনিকাভ্যন্তরে নিমজ্জিত হইয়া, মানব যখন তাহার প্রবহমান আনন্দধারা আপন হৃদয়ে অনুভব করিতে পারে, তখন প্রকৃ তির ভাষা ব্যক্ত করিবার প্রবল আকাঙক্ষায় সহজেই সে উৎ কণ্ঠিত হয় । তাহার হৃদয়ের শিরায় শিরায়, প্রতি রােমকূপে সেই সৌম্য সৌন্দৰ্য্য যতই অভিসিঞ্চিত হয়, ততই প্রকাশ করিবার জন্য তাহার ব্যগ্রতা বর্ধিত হইয়া থাকে। প্রকৃতি দীপ্ত হৃদয়কে জগতে বিকশিত করিয়া তুলাই তাহার একমাত্র বাসনা হয়। এই আকাঙ্ক্ষা, বাসনার ফলেই সাহিত্যের (কাব্যও ইহার মধ্যে) সৃষ্টি। এইজন্যই কাব্যের বা সাহিত্যের আদিঅন্ত মধ্য কেবলই মধুর, কেবলই অনিন্দ। যে কাব্যে আনন্দের যত ঘূর্তি,-সে কাব্যও তত উন্নত, তত গভীর। কণ্ঠস্বর মােহন হইলেও শ্রবণেন্দ্রিয় ও মানব তৃপ্তির নিমিত্ত বাক্য সংযোগ প্রয়ােজনীয়। এইরূপ বাক্য সংযোগে ও বিভিন্ন প্রকারে বাক্যবিন্যাসের চতুরতায় গীতেরও কমণীয়ত। 1.
চণ্ডীদাস-চরিত ( ৬৬ ) রামায়ণে গান। সংশাধিত হয় এবং গীতের পূর্ণতা প্রাপ্তির ইহাই প্রধান উপায়। গীত কেহ ৰা রচনা করেন, কেহ বা গান করেন। যিনি রচণা করিবেন তিনিই যে গায়ক হইবেন, তাহার কোন কারণ নাই,কবি মাত্রেই সুগায়ক নহে। এই রূপে গীতি কাব্যের উৎপত্তি। সঙ্গীতেই জাতীয় চরিত্রের পূর্ণ বিকাশ। প্রাণের কথা, অন্তরের ব্যথা গান ভিন্ন আর কিছুতেই সুস্পষ্ট রূপে পরিব্যক্ত হয় না। তাই অমিদের বেদে গান, পুরাণে গান মহম্মদীয় কোরাণে গান, খৃষ্টীয় বাইবেলে গন, তাই জয়দেবে গান, চণ্ডীদাসে গান, তুলসীদাসে গান, প্রকৃতির প্রেমের কাহিনী প্রকৃতির প্রিয় শিয্যে গায়। তাই বুঝি পাপিয়ায় গান গায়, মলয় সমীরণে প্রকৃতির প্রশান্ত গম্ভীর সঙ্গীত প্রবাহমান। তাই বুঝি ইন্দ্রের অমরাবতীতে গান, কমলাপতির বৈকুণ্ঠে গান, ভােলানাথের কৈলাশ শিখরে বিল্ব- মূলে সঙ্গীতের মােহন তান ধ্বনিত হয়। সঙ্গীত বিষাদে সান্ত্বনা, বিরহে মিলন, শরতে জ্যোৎস্না, নিদাঘে সন্ধ্যা, অন্ধ- কারে অলােক। মনকে লইয়া সুখ দুংখ এবং সুখ দুঃখ লইয়াই সংসার। মনে সঙ্গীতের উৎপত্তি এবং সুখ দুঃখে তাহার পরিণতি। মানব জীবনের এই সাধারণ গন্তব্য পথে, প্রবল দুর্বলের এই সমানাধিকারে, বঙ্গীয় কবি নিঃসঙ্কোচে প্রাণের সঙ্গীত গাইয়াছেন। প্রকৃতি
( ৬৭ )
চণ্ডীদাস-চরিত।
অতুলনীয়। সৌন্দর্য্যে বিভূষিতা ,--ভাষা চিরাশ্রিতা দাসী,
দুঃখ দুর্দিনেরও অভাব নাই এবং প্রাণের কপাটও কেহ
অর্গল-বদ্ধ করিতে পারে নাই; কাযেই গীতিকাব্যের সাধারণ
নিয়মে প্রসূটিত হইবার পক্ষে কোন অন্তরায় নাই।
সুখ দুঃখ লইয়া সংসার হইলেও, সুখই জীবনের প্রধান
লক্ষ্য। এই সুখের দিকেই ধৰ্ম, অর্থ, কাম, মােক্ষ, নিরন্তর
প্রধাবিত। সকলেরই উদ্দেশ্য, সুখের অধিকারী হওয়া। যিনি
নিষ্কাম যোগী,সংসারের সকল কোলাহল হইতে নিজকে
স্বতন্ত্র করিয়াছেন, তাহারও, উদ্দেশ্য সুখ,—কারণ চরমকালের
পরমগতি সাযুজ্য বা মােক্ষ সুখেরই প্রকার ভেদ মাত্র। কিন্তু
এই সুখ সকল সময়ে পাওয়া যায় না, মন নিত্য নুতন সুখের জন্য
লালায়িত। সুখ ভিন্ন আর কিছুতেই মনের আসক্তি বা স্থিতি
নাই। এই সুখের পদার্থ কোথায় পাওয়া যায় ?-সৌন্দর্য্যের
রাজ্যে। সৌন্দর্যের প্রতি পদে মনের গতি, তাহার অণুতে
অণুতে মন মিশিয়া তাহাতেই বিলীন হইয়া যায়; এই জন্য
সৌন্দর্য্যেই মনের পূর্ণ আধিপত্য। এই আধিপত্যই তাহার
মুক্তি, স্বাধীনতা এবং সুখের শেষ সীমা।
সুখ সকলের উদ্দেশ্য হইলেও এ মলিন জগতে সুখ
কত টুকু ? বিশেষতঃ বঙ্গ ভাগ্যে দুঃখের হিসাবে সুখ ক্ষণস্থায়ী
বিদ্যুৎপ্রভা তুল্য। কাযেই দুঃখের গান অধিক—অনন্ত প্রায়।
এ হেন দুঃখ দারিদ্র্য ও যদি বাঙালী জাতি দুঃখের গান না
গায়, তবে কোন্ জাতি গাহিবে ? অধীনতা, উৎপীড়ন, অবি-
চণ্ডীদাস-চুরি ( ৬৮), । চারে যে জাতির জাতীয় চরিত্র সংগঠিত ; সে জাতির অসীম দুর্ভর জীবনের বিরাম বিস্মৃতি গীতি কাব্যে। শােকাকুল দুৰ্বল হৃদয়, কঁাদিয়া হৃদয়-ভার লাঘব করে এবং লাঘবের জন্যই গীতি কাব্য রচিত হয়। দুঃখে পড়িয়া যে কাদে না, সে হয় কঁদিতে চায় না, না হয় কঁদিতে জানে না। ক্রন্দনে দুর্বলতা প্রকাশ পাইলেও উচ্চতার দিকে লক্ষ্য থাকে। চণ্ডী- দাসের রাধিকা কৃষ্ণ বিরহে আত্মহারা হইয়া ‘গরল ভখিয়া’ আত্মবিসর্জন দিতে উদ্যতা। হস্তে বিষপাত্র, মুখে আর দিতে পারিতেছেন না, বুঝিবা আবার দেখা হইবে। যাহার জন্য অনেক সাধনা করিয়াছেন, বুঝিব। সেই ‘কালিয়া সােণা’কে আবার আমার করিয়া বক্ষে ধরিতে পাইবেন। এই জন্যই আমরা সংগীত শ্রবণ করিতে ভাল বাসি, এই জন্যই আমরা সংগীত শ্রবণে তৃপ্ত হই। কারুণ্য, নৈরাশ্য, অলসতা, উন্মত্ততা, কাতরতা, গীতিকাব্যে একসঙ্গে ফুটিয়া উঠে। দুঃখের জীবনে দুঃখের দিনে দুঃখ প্রকাশ করিতে গীতের জন্ম। দুঃখের সুদীর্ঘ সহবাসে উহার প্রতিকূলতা আত্মীয় স্বজনের নিগ্রহবৎ হইয়া উঠিয়াছে। ইহাই অনন্ত পতনের সূত্রপাত। যে পতনে পতনের জ্ঞান থাকে না, সে পতন হইতে উত্থানের আর অশাি কোথায় ? উদ্ধারের আশা রাখিতে হইলে পতনের স্বরূপ বুঝিতে হইবে,ইহার অভিব্যক্তি গীতি কাব্যে। গীতি কাব্য নিরাশার অশা। গীতে প্রাণে সাড়া পাই বলিয়া, প্রাণ অনুভব করি বলিয়া, তাহা এত আদরণীয়। সংগীত শ্রবণে
( ৬৯ )
চণ্ডীদাস- চরিত
পিঞ্জরাবদ্ধ-সংকীর্ণতা ভুলিয়া বিমুক্ত বায়ু সেবনে পরিতৃপ্ত হই।
রাধিকা শ্যামের মােহন বংশী রবে কুলের মানা, ধাম, করম
সব ভুলিয়। কৃষ্ণেরই অনুরাগিণী হইলেন। আত্মীয় স্বজন
তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন যে, তােয়ার জন্য আমাদের নির্মল
কুলে কলঙ্ক অর্শিল, অতএব তুমি যদি নিজ মঙ্গল কামনা কর,
তবে আর কৃষ্ণের মুখও দর্শন করিও না। বিরহিণী রাধিকা
সংকীর্ণতা ভুলিয়া গাহিলেন,
কাহারে কহিব, মনের মরম, কেবা যাবে পরতীত ?
হিয়ার মাঝারে, মরম বেদনা, সদাই চমকে চিত ।
গুরুজন আগে, দাড়াইতে নারি, সদা ছল ছল আঁখি।
পুসকে আকুল, দিক নোরতে, সব শ্যাম ময় দেখি ।
সখির সহিতে, লেরে যাইতে, সে কথা কহিবার নয়।
যমুনার জল, করে ঝলমল, তাতে কি পরাণ রয়?
কূলের ধরম, রাশিতে নারনু, কহিলাম সবার আগে।
কহে চণ্ডীদাস, শ্যাম সুনাগর, সদাই হিয়ায় জাগে ।
কেবল তাধীনতা জনিত বিলাপ ধ্বনিতেই গীতি কাব্য পূর্ণ
নহে। গীতি কাব্য (প্রম-ময়। মূলে আত্মপ্রেম না থাকিলে
অধঃপতনে বিকার উপস্থি ( হইবে কেন ? এই আত্ম-প্রেমের
চরম অবস্থা-আত্মদান। কৃষ্ণ-প্রেম এই জন্যই গীতি-
কাব্যের অবলম্বন। রাধিকার কৃষ্ণ-প্রেম-প্রেমের উচ্চ
সীমা। কৃষ্ণের অনাদরে রাধিকার মান হইয়াছে, কিন্তু মান
করিবার তাহার সাধ্য নাই। ইন্দ্রিয় অদি মুগ্ধ, মান করিবেন
কেমনে,-
চণ্ডীদাস-চরিত। ( ৭৮০ ) Anwar no | যুত নিবারিয়ে তায় নিবার না যায়। আন পথে ধাই তবু কানু পানে চায়। এছার রসনা মোর হইল কি বাম। যার নাম নাহি লব লয় তার নাম। এছার নাসিকা মুঞি কত কক্ষ বন্ধ। তবুত দারুণ নাসা পায় শ্যাম গন্ধ। সে কথা না শুনিব করি অনুমান। পর সঙ্গ শুনিতে আপনি যায় কাণ । ধিক রহু এছার ইন্দ্রিয় অদি সব। সদায় সে কালিয়া কানু হয় অনুভব । ইহাই প্রেমের পরাকাষ্ঠা-অপূৰ্ব তন্ময়ত্ব। রাধাকৃষ্ণ প্রেম অপেক্ষা প্রেমের উচ্চাবস্থা আর কিছু কল্পনার নিরঙ্কুশ পথে পতিত হয় কি ? যে ভালবাসার-আদ- রের-যত্নেরধন, সে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রাজা। এমন আদর্শ প্রণয়ীও প্রণয়িনীৰুে যিনি প্রকৃতির ক্ষুদ্রাংশভাবে দেখেন, তিনি প্রেমের মহত্ব হৃদয়ঙ্গম করিতে অক্ষম। কয়জন দেখিতে পান যে, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড প্রেমিক প্রেমিকার অনুরাগে অনুরঞ্জিত? প্রেমিকাকে জগন্ময় ভাবে কয়ন ভাবিতে পারেন ? এই তন্ময়ত্বই বিশ্ব- বিস্মৃতি প্রেমের পূর্ণ ফটো। নিখুঁৎ প্রেমে ব্যভিচার নাই। সকলে অক্লেশে তাহা ' লাভ করিতে পারেনা, কিন্তু কোন প্রকারে একবার আয়ত্ত করিতে পারিলে শত জন্মেও তাহা ছাড়িতে পারা যায় না। রাধিকার বহুবর্ষ ব্যাপী বিরহে তাহার আভাষ। কবিত্বই সর্ব সৌন্দর্য্যের নিদান; সুন্দরের সৌন্দৰ্য্য কবিত্বেই ( ৭১ ) চণ্ডীদাস-চরিত। অংশ। সৌন্দৰ্য-সংসারে কবিত্বই অদ্বিতীয় নিয়ন্তা। এই সৌন্দৰ্য্য ভাব দুই প্রকার —বস্তুগত সৌন্দর্য্য ও অবস্থাগত সৌন্দৰ্য। একটি প্রস্ফুটিত গোলাপের সৌরভে আমাদের প্রাণ পুলকিত হয়,-মন প্রফুল্ল হয়, এবং নরকের পূতিগন্ধময় দৃশ্যে সর্ব শরীর রােমাঞ্চিত হয়—মন তাহা হইতে দূরে পলায়ন করিতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেই গােলাপের সৌন্দর্য্য -যাহার সুরভি টুকুতে আমাদিগকে মাতাইয়া তুলে,—সেই সুগন্ধে হয়ত একটী নরকের কীট সঙ্কুচিত হইবে, নরকের দুর্গন্ধই তাহার অপার আনন্দ উৎপত্তির কারণ হইবে। এখানে গোলাপ মনুষ্যের পক্ষে সুন্দর কিন্তু নরকের কীটের পক্ষে তসুন্দর। কাযেই বস্তুর গুণের সহিত জীবের ইন্দ্রিয়গত সম্বন্ধেই বস্তুগত সৌন্দর্য্যের উদ্ভব। এবং যে বস্তু আমরা কখনাে পূৰ্বে দেখি নাই, তাহা সুন্দরই হউক বা অসুন্দরই হউক, তাহা দেখিবার জন্য মন উৎকণ্ঠিত হয় এবং দেখিয়াও তৃপ্তি লাভ করে। এই তৃপ্তিই সুখ ; এই নূতনত্ব অবস্থাগত সৌন্দৰ্য্য। অবস্থাগত সৌন্দর্য্যের ভাব প্রধানতঃ নয়টী-সাদৃশ নূতনত্ব, কল্পনা, ন্যায়সমাবেশ, বহুসমাবেশ, গুঢ়ানুসন্ধান, পূর্ণতা, স্মৃতি উদ্দীপনা এবং সমবেদনা উদ্দীপনা। গীতি কাব্যে কাল্পনিক সৌন্দৰ্য্য ; তাহা তিন প্রকার,- সাধারণ, অসাধারণ ও অসম্ভব। প্রকৃতির অনন্ত বিভবে যাহা সচরাচর আমরা দেখিতে পাই, অথবা কবির রচনা চাতুৰ্য্যে .
চণ্ডীদাস-চরিহ।
( ৭২ )
যাহা নিত্য নূতন বলিয়া প্রতিভাত হয়, তাহাই সাধারণ
সৌন্দর্য্য। রাধিকার সেই বিরহ-শেদ,---
শুন হে চিকণ কালা !
বলিব কি আর, চরণে তােমার, অবলার যত জালা ।
চরণ থাকিতে, না পারি চলিতে, সদাই পরের বল ।
যদি কোন ছন্সে, তব কাছে এলে, লোকে করে অপযশ।
বদন থাকিতে, না পারি বলিতে, তেঞি সে অবলা নাম।
নয়ন থাকিতে, সদা দরশন, না পেলাম নবীন শ্যাম।
অবলার যত দুঃখ, প্রাণ না থ! সব থাকে মনে মনে।
চণ্ডীদাস কয়, রসিক যে হয়, সেই সে বেদনা জানে।
সাধারণ সৌন্দর্য্য। কি অপূর্ব মাধুৰ্য, কি অসামান্য কবিত্ব ?
প্রত্যহ কতশত প্রণয়িনী প্রণয়ীর সহিত নব-প্রেমে বদ্ধ হইতেছে
এবং তাহাদের বিচ্ছেদ ঘটিতেছে, কিন্তু এরূপ তন্ময়ত্ব ভাব কয়
জনের হইয়া থাকে ? ‘বদন থাকিতে, না পারি বলিতে, তেঞি
সে অবলা নাম’–এই খানেই নূতনত্ব অথচ অসাধারণ বা
অসম্ভব কিছুই নাই।
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে যাহা সচরাচর আমরা দেখিতে পাই না,
কিন্তু সৃষ্টির নিয়মানুসারে তাহা সাধারণ বলিয়া অনুমিত হয়
এবং যাহা কেবল আমরা কল্পনায়, বাসনায় সাজাইয়া দেখি,
তাহাই অসাধারণ সৌন্দর্য্য। বাল্মীকির সীতা, পুরাণের
হরিশ্চন্দ্র, সেপীয়রের ডেসছিমন প্রভৃতিতে অসাধারণ
সৌন্দৰ্য্য । রাধিকার এই প্রেম-বিহ্বলতা ও বিরহ কাতর
তাতেও অসাধারণ সৌন্দৰ্য্য।
( ৭ )
চাল-চতি।
কি হৈল কি হৈল মাের কামুর পিরীতি।
আঁথি ঝরে পুলকেতে প্রাণ কঁাদে নিতি
শুইলে সােয়াস্তি নাই নিদ গেল দূরে।
ফানু কানু করি প্রাণ নিরবধি ঝুরে ॥
নবীন পানীর মন মরণ না জানে।
নস অনুরাগে চিত ধৈরজ না মানে।
এই রস যে না জানে সে না আছে ভাল।
হৃদয়ে রহিল মাের কানু-প্রেম-শেল ।
নিগুঢ় পিরীতি খানি আরতির ঘর।
ইথে চণ্ডীদাস বড় হইল কাকর।
যাহা সচরাচর আমরা দেখিতে পাই না, যাহা সম্ভবপরও নহে
এবং যাহার সহিত আকাঙ্ক্ষারও সংস্রব নাই, তাহাই অসম্ভব
বা অবাস্তব সৌন্দৰ্য্য। এই সৌন্দৰ্য্যই সর্বাপেক্ষা অধিক
মােহকরী ও তাহাতে বিশেষ আকর্ষণী-শক্তি আছে। ইহার
দ্বারা আমরা ভূত, ভবিষ্যৎ বৰ্তমান ভুলিয়া আত্মহারা, দিশে-
হারা হই। মন বাস্তব সৌন্দৰ্য্য ছাড়িয়া ক্ষণকালের জন্য
অবাস্তব সৌন্দর্যে বিমােহিত হইয়া স্বর্গরাজ্যে বিচরণ করে,
স্বর্গের অতুলনীয় সৌন্দৰ্য্য রাশিতে বিহ্বল হয়। তথায় যে
সৌন্দর্য্য দেখিতে পায় তাহা অপদার্থিব, অলৌকিক, অসম্ভব।
চণ্ডীদাসের কল্পনা তাদৃশ দুরূহ বিষয় লইয়া আললাচনা
করিলেও তাহাতে বাল-সুলভ চপলতা নাই, যৌবন-সুলভ
লঘুতা নাই। তাহাতে যুবতীর যৌন-সুলভ দোষের কথা
J,
চণ্ডীদাস-রিত ।
( ৭৪ )
*
থাকিলেও বারবিলাসিনীর কলুষ-কুটিল কটাক্ষ নাই, লােক
মােহকারী হাভাৰ নাই, পরন্তু তাহাতে যুবতীর রূপ ও নবীনত্ব
দেদীপ্যমান। রাধিকার বিরহ-অবস্থা বর্ণনকালে চণ্ডীদাসের
কল্পনা যেরূপ শোকাতুরা হইয়া সুর ভাজিয়াছে, তাহা অনেক
কবির বিরহেই দেখিতে পাওয়া যায় না। তাঁহার রাধিকা
যৌবনেই সন্ন্যাসিনী-শােকাকুলা, উন্মাদিনী কিন্তু দেবসেবায়
নিরত, ভক্তিতে পরিপূর্ণ। দেবলােকের ঐশ্বৰ্য্য চণ্ডীদাস
জীবলােকে আনয়ন করিয়াছেন, সে কল্পনা উষ্ণ হইলেও
উত্তাপ শূন্য।
পিরীতি সুখের, সাগর দেখিয়া, নাহিতে নামিলাম তায়।
নাহিয়া উঠিয়া, ফিরিয়া চাহিতে লাগিল দুখের বায় ।
কেবা নিরমিল, প্রেম সরোবর, নিরমল তার জল।
দুখের মকর, ফিরে নিরন্তর, প্রাণ করে টলমল ।
গুরুজন জ্বালা, জলের শিহালা, পড়সী জীয়ল মাছে।
কুল পানী ফল, কঁাটা যে সকল, সলিল বেড়িয়া আছে।
কলঙ্ক পানায়, সদা লাগে গায়, হঁাকিয়া খাইল যদি।
অন্তর বাহিরে, কটু কটু করে, সুখ দুখ দিল বিধি ॥
কহে চণ্ডীদাস, শুন বিনােদিনী, সুখ দুখ দুটি ভাই।
সুখের লাগিয়া, যে করে গিরীতি, দুখ যায় তার ঠাঞি ।
কি সুন্দর তুলনা, কি চমৎকার কবিত্ব শক্তি!
চণ্ডীদাসের কবিত্ব কখন শক্তিসঞ্চারিনী, কখন নিৰ্জ্জনার
পরিচায়ক। বিরহ-কাতরা রাধিকা যখন নৈরাশ্যের হাহাকার
রব উথিত করিতেছেন, তখন কবি তাহাকে উৎসাহবাক্যে
উদ্যমশীলতায় উপস্থাপিত করিতেছেন ; আবার কখনাে বা
ট
( ৭৫ )
চণ্ডীদাস-চরিত।
5৮ ৮৮
তাহার মর্মভেদী ক্রন্দনে বিগলিত হইয়া, সেই ক্রন্দন-সুরে ।
যোগদান করতঃ দুর্ভর শােকাবেগ প্রশমন করিতেছেন। চণ্ডী-
দাসের কবিত্বে দুন্দুভিনিনাদ বা জয়ােল্লাসব্যঞ্জক কিছুই নাই,
আছে কেবল মৃদুমন্দ সমীরণ-সঞ্চালনজনিত বৃক্ষপত্রের শন্ শন্
শব্দ এবং রুদ্র হুতাশের তপ্ত দীর্ঘশ্বাস।
কালি বলি কালা, গেল মধুপুরে, সে কালের কত বাকি।
যৌবন সায়রে, সরিতেছে ভাটা তাহারে কেমনে রাখি।
কি তীব্র নৈরাশ্যে উত্তেজিত হইয়া কবি রাধিকার মুখ দিয়া
এই কথাগুলি বাহির করিয়াছেন! বাঙালী কবি বীরত্বের
গান গাহিতে না পারিলে ও কান্নার গান গাহিতে বিশেষ
অভ্যস্ত। বীরত্বের গান, স্বাধীনতার গান বঙ্গের কবি সেই
একদিন গাহিয়া এখন নীরব হইয়াছে, পুনরায় তাহা গাহিবার
বঙ্গ-কবির অর অধিকার নাই ।
‘চণ্ডীদাসের কল্পনাশক্তি বিলক্ষণ দেখিতে পাওয়া যায়।
মানবতী রাধ। সমীপে শ্রীকৃষ্ণের নাপিতানী, মালিনী, বিদেশিনী,
বণিপত্নী প্রভৃতি বেশে গমন বিষয়ক যে সকল বর্ণনা আছে,
তাহাতে এবং অন্যান্য স্থলেও কল্পনাশক্তির বিলক্ষণ প্ৰাচুৰ্য্য
লক্ষিতহয়। কিন্তু বিদ্যাপতির গীতাবলীতে যেরূপ ভাবগাম্ভীৰ্য্য
ও বচন বৈচিত্র্য আছে, ইহার গীতে সেরূপ অতি কম পাওয়া
যায়। ইহার রচনা। সাদাসিদা সামান্য ভাব লইয়াই অধিক
বিশেষতঃ প্রায় সকল গীতই নিতান্ত আদিরস-সম্পৃক্ত হওয়াতে
প্রীতিকর- বােধ হয় না। কিন্তু তাহা হইলেও তাহাকে এক
চণ্ডীদাস-চরিত।
( ৭৬ )
জন প্রধান কবি বলিয়া অবশ্য গণনা করিতে হইবে।
কারণ
তিনি যে সময়ের লােক, সে সময়ে ঐরূপ ছন্দোবন্দে রচনা
করা সাধারণ ক্ষমতার কাৰ্য নহে। তিনি তৎকালে পরের
অনুকরণ করিতে অধিক পান নাই, যাহা কিছু রচনা করিয়া-
ছেন, তাহাই তাহার স্বাভাবিক শক্তি-সদ্ভূত বলিয়া বােধ
হয়।* তৎকালে চণ্ডীদাস অপরের অনুকরণ করিতে অধিক
পান নাই না বলিয়া অপরের অনুকরণই করেন নাই বলা
অামার মতে সঙ্গত। কারণ তৎপূর্বে, আর যে কেহ
পদাবলী রচনা করিয়াছেন, তাহা আমরা জানিতে পারি
নাই। চণ্ডীদাসের পূর্বে হিন্দুর ভারতী দেবী সংস্কৃত ভাষায়
ক্রীড়া করিতেছিলেন, চতুর্দশ শতাব্দীতে নিম্ন গাঙ্গেয় অধি
বাসীগণ দেবভাষা ছাড়িয়া বঙ্গভাষার আশ্রয় গ্রহণ করেন।
অজয় নদী-তীরস্থ কেন্দুবিশ্বের বৈষ্ণব কবি তরল সংস্কৃতে
গােবিন্দ লীলামৃত বিতরণ করিয়া অবসর গ্রহণ করিলে, ভাহার
দেশবাসী ও মৈথিলী শিষ্যদ্বয় তাহার পদানুসরণ করিয়া
বাঙলা কাব্যের সূচনা কনে। বিদ্যাপতির দুই একটী পদের
সহিত চণ্ডীদাসের পদের সাদৃশ্য আছে বটে, কিন্তু তাহা
বিদ্যাপতির অনুকরণ কি স্বভাবের অনুকরণ তাহা নির্ণয় করা
কঠিন।
আমরা নিম্নে বিদ্যাপতির একটী ও চণ্ডীদাসের
একটী পদ উদ্ধত করিলাম ; কে কাহার অনুকরণ করিয়াছেন
বিজ্ঞ পাঠকগণ তাহা বিবেচনা করিবেন। বিচার করিবার
* বাঙ্গলা ভাষা ও বাঙ্গলা সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব
( ৭৭ ) চণ্ডীদাস-চরিত। সময় তঁাহারা যেন স্মরণ রাখেন বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস সম- সাময়িক, ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বাস করিতেন এবং তৎকালে মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছিল না। বিদ্যাপতির পদ আজ কেন তােমায় এমন দেখি। সঘনে ঢুলিছে অরুণ আঁখি | তাঙ্গ মােড়া দিয়া কহিছু কথা। জ্ঞানি অন্তরে কি ভেল ব্যথা। সঘনে গগনে গণিছ তারা। দেব ‘অপধাত হৈয়াছে পারা। যাদ বা না কহ লােকের লাগে। মরমী জনার মরমে বাজে। আচরে কাঞ্চন ঝলকে দেখি। প্রেম কলেবর দিয়াছে মাখি। বিদ্যাপতি কহ এ কথা দড়। গোপত পিরীতি বিষম বড়। *এই পদটা সম্বন্ধে যুক্ত নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহাশয় বিদ্যাপতির প্রকাশিত ও প্রকাশিত পদাবলী’ প্রস্তাবে যা লিখছেন, তাহা প্রণিধানযোগ্য। আমরা এস্থলে তাহার নিজের কথাই উদ্ধত করিলাম-“এই পদটীকে মনে কোন দ্বিধা না করিয়া বিন! আপত্তিতে যদি কেহ বিদ্যাপতির পদ বলিয়া গ্রহণ করেন, তাহা হইলে তাহাকে বিদ্যাপতির বিশেষত্ব ও মৌলিকত্ব বুঝাইবার চেষ্টা করা। বৃথা। যে কয়েকটী সংকলনে এই পথ দেখিয়াছি, তাহার কোন একটিতে ইহার সম্বন্ধে কোন প্রকার অভিমত প্রকাশিত হয় নাই। বিশুদ্ধ অথবা অবিশুদ্ধ বাংলায় এখন যদি কেহ পদ রচনা করিয়া তাহাতে বিদ্যাপতির নাম জুড়িয়া দেয় তাহা হইলেও হয়ত সংকলনকার তাহাকে সংগ্রহ, ভুক্ত করিবেন। বঙ্গদর্শন-চতুর্থবর্ষ (নবপর্যায়)। *
( ৭৮ )
এ WP :
****
চণ্ডীদাসের রসােদগারের একটী পদ এই
রাই, আজু কেন হেন দেখি।
আঁখি ঢুলু ঢুলু, ঘুমেতে আকুল, জাগিয়ছ বুঝি নিশি।
রসের ভরেতে, অঙ্গ নাতি ধরে, বসন পড়িছে খসি।
স্বরূপ করিয়া, কহ না আমারে, মনেরমরম সখি ।
এক কাফতে আন কহিতেছে, বচন হইয়া হারা।
রসিয়ার (রসিকের) সনে, কিবা রস রঙ্গে, সঙ্গ হয়েছে পারা।
ঘন ঘন তুমি, মুড়িতেছ অস, সঘনে নিশ্বাস ছাড়।
স্বরূপ করিয়া, কহ না কহসি, কপট, কেন স কর ।
ভালের সিন্দুর, আধেক আছয়ে, নয়নে আধ কাজল।
চাদ নিঙ্গডিয়া, এমন করিয়া, কেবা নিলএ সকল ।
চণ্ডীদাসে কয়, যে সেই হয়, ভালে ভুলাইলে কাজ।
সঙ্গের সঙ্গিনী, বঞ্চিতে নারিবে, কিবা কর আর লাজ ।
স্থানে স্থানে উভয় কবির বাক্য প্রায় একরূপ। কোন্ পদটী
পূর্বে রচিত হইয়াছিল তাহা নিদ্ধারণ করতে পারিলে কে
কাহার অনুকরণ করিয়াছেন, তাহা জানা যাইতে পারে।
কিন্তু তাহা নির্ধারণের কি উপায় আছে ?
সের রচনা আদিৱস-সম্পক্ত হইলেও তাহা অপাঠ্য
বা অপকৃষ্ট নহে। পরবর্তীকালে রামপ্রসাদ বা ভারতচন্দ্র
আদিরসের তরল-বন্যায় যেমন ভাষা-সুন্দরীকে নিতান্ত দুর্দশা-
গ্রস্ত করিয়াছেন, তিনি তেমন কিছুই করেন নাই। তাহার
আদিরস-সম্পৃক্ত পদাবলী পরবর্তী বৈষ্ণব কবিগণ অতি আদ।
( ৭৯ )
চাল-চবিত।
বের সহিত আস্বাদ করিতেন। (১) তঁাহারা চণ্ডীদাসকে
‘রসশেখর’ উপাধি দিয়াছিলেন। (২) প্রেমাবতার কৃষ্ণ
চৈতন্য চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পদাবলী, স্বরূপ, রামানন্দের
সহিত পরম আনন্দে শ্রবণ করিতেন।
(১) জয় জয়দেব কবি নৃপতি, শিরােমণি বিদ্যাপতি রসধাম।
জয় জয় চণ্ডীদাস রসশেখর, অখিল ভুবনে অনুপাম ॥
বৈষ্ণদাস।
(২)
1.
জয় জয় চণ্ডীদাস দয়াময় পণ্ডিত সকল গুণে।
অনুপম যার যশ রসায়ণ গায়ত জগৎজন।
বিপ্র কুলোদ্ভদ ভুবনে পূজিত অতুল আনন্দ দাতা।
যার তনু মন রঞ্জন না জানি কি দিয়া করি পাতা।
সতত সে রসে ডগমগ নব চরিত বুঝিবে কে !
যাহার চরিতে ঝোরে পশু পাখী পিরীতে মজিল সে
রাধা গােবিন্দ কেলি বিলাস বাসল বিবিধ মতে ।
কবিবর চারু নিরুপম মহী ব্যাপিল যাহার গীতে ।
ঐনন্দ নন্দন নবদ্বীপ পতি গোরা আনন্দ হঞা ।
যাহার গীতামৃত আস্বাদ স্বরূপ রায় রামানন্দ লঞ।
পরম পণ্ডিত সঙ্গীত গন্ধৰ্ব্ব জিনিয়া যাহার গান।
অনুক্ষণ কীৰ্ত্তনানন্দে মগন পরম করুণাবান।
বৃন্দাবনে রতি যার তার সঙ্গ সতত সে সুখে ভাের।
রসিক জনার প্রাণধন গুণ বর্ণিত নাহিক গুর।
চণ্ডীদাস পদে যার রতি সে পিরীতি মম জানে।
পিরীতি বিহীন জনে ধিক বহু দাস নরহরি ভণে ।
চীদাস-চরিত । ( ৮০ ) চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি, রায়ের নাটক গীতি, কর্ণামৃত গীতগােবিদ। স্বরূপ রামানন্দ সনে, মহাপ্রভু রাত্রি দিনে, গায় শুনে পরম আনন্দে(৩)। বঙ্গীয় কাব্যোদ্যানে চণ্ডীদাসের ন্যায় মধুর কলকণ্ঠসুদুর্লভ। তঁাহার তুলনা কেবল বঙ্গসাহিত্যেই বিরল নহে, ইংরেজি, পারশি, আরবি প্রভৃতি অন্যান্য সাহিত্যেও তাঁহার সমকক্ষ মধুবর্ষী কবির দর্শন অতি বিরল। দীনেশ বাবু বলেন, তিনি ভাষার দিকে আদৌ লক্ষ্য করেন নাই, কিন্তু ভাষা চিরাশ্রিতা দাসীর ন্যায় তাহার ভাবের অনুসরণ করিয়া যে সাহিত্য সৃষ্টি করিয়াছে এবং সেই সাহিত্যে যে স্বভাব-সুন্দর চিত্র সুনিপুণ চিত্রকরের তুলিকা নিঃসৃতের ন্যায় উজ্জ্বল বর্ণে অঙ্কিত হইয়া আছে, সেরূপ পরবর্তী অন্য কোন কবিই চিত্রিত করিতে সক্ষম হন নাই। গোবিন্দ দাস ও চণ্ডীদাসের ন্যায় প্রেমিক ও সহজ ভাবের কবি ছিলেন, কিন্তু তাহা হইলেও তিনি চণ্ডীদাসের সমতুল্য নহেন। চণ্ডীদাসের পদ যেন স্বভাবের শান্ত শীতল সুনির্মল চরণ হইতে নিঃসৃত, তাহাতে না জানি কেমন একটা মাধুৰ্য্য ও মাদকতা মাখান আছে, যাহা অন্য কোন কবির পদে দেখিতে পাওয়া যায় না। এবং সে মাধুৰ্য নিজে আস্বাদন (৩) শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত; মধ্যলীলা--দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস গীত গােবিন্দ। এই তিন গীতে করায় প্রভুর আনন্দ। ঐ, মধ্যলীলা--দশম পরিচ্ছেদ। বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস গীত গােবিন। ভাবানুরূপ শ্লোক পড়ে রায় রামানন্দ। ঐ, অস্তলীলা-সপ্তদশ পরিচ্ছে।
( ৮১ ) চণ্ডীদাস-চলি । + । . করিলে অন্যে বুঝাইয়া দিতে পারে না। তাঁহার পদা- বলীতে এমন কি একটা ঐশী আকর্ষণী শক্তি নিহিত আছে যে, একবার কর্ণে প্রবেশ করিলে মন ভুলিয়া যায়, প্রাণ সুশীতল হয়, হৃদয়ে কি জানি কি এক অব্যক্ত প্রীতির উদয় হয়। পরবত্ত অধ্যায়ে তাহার পদাবলী সমালােচনার সময় আমরা এ বিষয় আরাে বিশদ করিবার চেষ্টা করিব। ভারতবর্ষ ভাগ্য-বিপৰ্যয়ের দৃশ্যস্থল, ভারত-সন্তান ভাগ্য- নিগ্রহের দৃষ্টান্ত স্থল। হিন্দুর সুখ-সৌভাগ্য পূৰ্বে কিরূপ ছিল, আর আজি বা কিরূপ ?—যেন স্বর্গ ও রসাতল! হিন্দুর অদৃষ্টনেমি ঘুরিতে ঘুরিতে সে সৌভাগ্যকে রসাতলে নিমজ্জিত করিয়াছে, এখন আর তাহার আবর্তন শক্তি নাই,-ঊর্ধে উঠা পরের কথা। কিন্তু বহু শতাব্দীর এ ভাগ্য-বিপর্যয়ে মধ্য দিয়াও, এ রোগ শােক দুঃখ দারিদ্র্য, বিপদ বিপত্তির মধ্য দিয়াও, এ পরপীড়ন-রুধিরাক্ত কলেবর ও ঘাের তিমিরাচ্ছন্ন শ্মশান-ভূমির মধ্য দিয়াও, সেই আর্য্য-হৃদয় প্রবাহিত হইতেছে; হিন্দুর আদি কবি প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমােহিত হইয়া বেদগান করিয়া গিয়াছেন, হিন্দুসন্তান পূর্বপুরুষের সকল হারাইয়া থাকিলেও, হিন্দুরান সেই কবি-কল্পনা, সেই কাব্যানুরাগ হইতে K,
চণ্ডীদাস-চরিত।
{ ৮২ )
. ভস"
15
WA
বিরত হয় নাই, হিন্দুর হৃদয়ে কবিত্ব-স্রোত, এমরুর নিম্নস্তর
বাইয়া এখনো প্রবাহিত হইতেছে। হিসন্তান বাহিক জীব
নের অগৌরব হইতে মুখ লুকাইবার জন্যই বুঝি, বাহ্কি জীব,
নের গ্লানি ও যাতনা ভুলিবার জন্যই বােধ হয়, অন্তরাভিমুখে
তাকাইয়া শান্তির স্থান অনুসন্ধান করিয়াছেন, করিতেছেন;
তাই বাহিরে জড়ত্ব প্রাপ্ত হইলে ও, অন্তঃস্রোত প্রবহমান রহি-
য়ছে। বালুকারাশির মধ্যে নৈরাশ্যের ছবি অঙ্কিত দেখিলেও
ফলগু যে অন্তঃসলিলা, হিন্দুসন্তানের, অন্ততঃ বঙ্গীয় যুবকের
কাব্যানুরাগে, কবি-কল্পনায় তাহা প্রতীয়মান হইতেছে। হিন্দু
সন্তানের অভ্যন্তরিন প্রবাহের বিরতি নাই, সংকীর্ণতা প্রাপ্ত
হইলেও অনবরুদ্ধগতিতে চলিয়া আসিতেছে।
পতনের মধ্যেও বাঙাকাব্যের গতি ও উয়তি আলােচনা করিলে
প্রতীতি হইবে, হিন্দুর—বঙ্গসন্তানের জীবনালোক একবারে
নিবিয়া যায় নাই। এই দেখিয়াই বােধ হয় সূক্ষাদশী বঙ্কিম
চন্দ্র বলিয়াছে,- “সাহিত্যালােচনাই, জাতীয় সাহিত্যের
উন্নতি সাধনই বাঙ্গালীর সভ্যজগতে গৌরব লাভের একমাত্র
উপায়।”
এই অধঃ-
• উৎসাহ।
( ৮০ )
চণ্ডীদাস-চরিত!
***
১
4. ^ ANANA + ০ +
s
৮ । ।
আর যে
‘বান্ধবের প্রবীন সমালােচক-প্রবর লিখিয়াছিলেন,--
‘লাভালাভ বিবেচনায় কবিতাকে প্রধানতঃ তিন শ্রেণীতে
বিভক্ত করা যাইতে পারে; যথা— অধম, মধ্যম ও উত্তম।
যে কবিতায় মনুষ্য-সমাজের নি, নীতি ও সুগ ব্যাহত হয়,
তাহাকে ধমকবিতা বল। যাইতে পারে; যে কবিতায় মনুষ্যের
জ্ঞান, নীতি বা সুখ এ তিনের একটীরও কিছু মাত্র হ্রাস বৃদ্ধি
না হয়, তাহাকে মধ্যম কপি। বলা যাইতে পারে ।
কবিতায় মনুষ্যের জ্ঞান, নীতি বা সুগ পরিপুষ্ট, পরিমার্জিত বা
পরিবর্ধিত হয়, তাহাকে উত্তম কবিতা এই আখ্যা দেওয়া যাইতে
পারে। যদি কবিতার এই রূপ শ্রেণীবিভাগ করিতে পারা
যায়, তবে চণ্ডীদাসের কবিতা কোন্ শ্রেণীভুক্ত হইবে, তাহা
পাঠকগণের বিচার্য। চণ্ডীদামের পদাবলী সম্বন্ধে আরো
পরে কিছু বলিব, সেই সময় পাঠকগণের রসাস্বাদনের অধিক
অসর হইবে। তবে এস্থানে ইহা বলিয়া রাখি যে, চণ্ডীদাস
সৰ্বাদিম ও সর্ব শ্রেষ্ঠ প্রাচীন কবি ও তাহার কবিতা প্রথম
শ্রেণীর উপরেও যদি কোন শ্রেণী থাকে, তবে সেই শ্রেণী
ভুক্ত। তাহার ন্যায় সহঙ্গভাসের কপি আর নাই, চণ্ডীদাসের
তুলনা কেবল চণ্ডীদাস।
মই প্রস্তাব।
( কাব্য।
১।—পদাবলী।
‘বান্ধবের সূক্ষদর্শী সমালোচক-প্রবর কবিবর হেমচন্দ্রের
দশমহাবিদ্যার সমালােচনার প্রারম্ভে বলিয়াছিলেন,
‘আমার এক বাল্যসখা সমালোচনার অতি সহজ ও সুন্দর
উপায় উদ্ভাবন করিয়াছিলেন। তিনি বলিতেন—‘মাইকেল
নবম শ্রেণীর কবি’, ‘গরি সপ্তম শ্রেণীর কবি’, ‘ভারত
চন্দ্র চতুর্থ শ্রেণীর কবি’, ‘বায়রণ ষষ্ঠ শ্রেণীর কবি। এইরূপ
যখনই আমার বাল্যবন্ধুকে কোন কবির কথা জিজ্ঞাসা করি-
তাম, তখন ই আমার বন্ধু যুগল ঈষৎ অকুঞ্চিং করিয়া,
নয়নদ্বয় কিঞ্চিৎ বিস্ফারিত করিয়া, নাসারন্ধ্র কিঞ্চিৎ বিস্তা-
রিত করিয়া, বদন মণ্ডলৈ পাণ্ডিত্যের ও গাম্ভীর্য্যের অলো-
কিক চিন্তা প্রকটিত করিয়া বলিতেন, এই কবি দ্বাদশ
শ্রেণীর বা ত্রয়ােদশ শ্রেণীর। এইরূপ সমালােচনায় সকল
পক্ষেই বিশেষ সুবিধা হইত। সমালোচক এক কথায়, তঁাহার
কাৰ্য্য সম্পাদিত করিতেন, কবির সম্বন্ধে আমারও বিশেষ
( ৮৫ ) চণ্ডীদাস-চরিত। জ্ঞান লাভ হইত এবং কবির প্রতিও কিছুমাত্র অন্যায় প্রদর্শন করা হইত না। ইয়ুরোপে ইহা অপেক্ষাও সমালােচনার আর এক সুন্দর ও সহজ উপায় আবিষ্কৃত হইয়াছিল। সম- লােক বলিতেন,- ‘কবির বিদ্য। ৫. কবির কল্পনা ৪, কবির ভাষা ৩, কবির বর্ণনাশক্তি ৫। এক কথায় পাঠক, সমালো- চক ও গ্রন্থকার সকলেই পৰ্যপ্তরূপে তৃপ্তিলাভ করিতেন।” দুর্ভাগ্য বশতঃ আমরা এরূপ কবি-সমালােচনার নিতান্ত অক্ষম। আমরা প্রথমতঃ কবির পদাবলীই সমালােচনা করিব । তৎপর তাহা দেখিয়া যদি আমরা বুঝিতে পারি প্রাচীন বৈষ্ণব-সাহিত্যে চণ্ডীদাসের স্থান কত উচ্চে, তবে না হয় তঁাহার একটী স্থান নির্ণয় করিব। বান্ধবের সমালােচক মহাশয় যেমন কবির সমালােচনা না করিয়া কবির দশমহা- বিদ্যারই সমালােচনা করিয়াছেন, এস্থলে আমরা সেরূপ করিতে পারিলাম না। আমরা কবির পদাবলী সমালো না করিয়া প্রাচীন সাহিত্যে তাহাকে একটি স্থান দিতে নিতান্ত উৎকণ্ঠিত। এবং সে স্থান যে কত উচ্চে বা কত নিম্নে হইবে, তাহার আভাষ পাঠক ইতিপূৰ্বেই পাইয়াছেন। আমি বাল্যকাল হইতেই চণ্ডীদাসের ভক্ত—তাহার নিতান্ত অনুরক্ত। সেই সময় হইতেই কবির পদ-সুরভিতে মুগ্ধ হইয়া তাহার পদে প্রেম-পুষ্পাঞ্জলি দিয়া আসিতেছি। সুতরাং আমার দ্বারা তাঁহার পদাবলীর সঙ্গত সমালােচনা না
চণ্ডীদাস-চরত
( ৮৬ )
হইলেও, অবস্থা বিবেচনায় আমার ত্রুটী মার্জনা করিতে
পাঠকগণ কুণ্ঠিত হইবেন না।
চণ্ডীদাসের ভাব-সন্মিলনের প্রশংসা করিবার শব্দ অভি-
ধানে নাই, বলিবার শক্তিরও ততােধিক অভাব।
তাহাতে প্রেমের যে সুগভীর মন্ত্র নিহিত আছে, তাহা অন্য
কোন বৈষ্ণব কবির পদাবলীতে নাই, অন্য কোন প্রেমপুস্তকে
নাই, এমন কি অনেক ধর্মগ্রন্থে ও দেখিতে পাওয়া যায় না।
বঁধু কি আর বলিব আমি।
মরণে জীনে, জনমে জনমে, প্রাণনাথ হৈয় তুমি।
তােমার চরণে, আমার পরাণে, বঁপিল প্রেমের ফাসি ।
জাতি কুশীল, সকল মঙ্গ, হইনু তােমার দাসী।
ভাবিয়াছিলাম, এ তিন ভুবনে, আর মোর কেহ আছে ?
রাধা বল কেহ, সুধাইতে নাই, দাড়াব কাহার কাছে ?
একুণে 'কুলে, দুকুলে গােকুলে, তপিনা বলিব কায় ?
শীতল জানয়া, শরণ লইনু, ও দুটী কমল পায় ।
অবশ্য তখলে, নাঠেল চরণে, ক্রটার নাহিক ওর।
ভাবিয়া দেখিনু, প্রাণনাথ বিনে, গতি যে নাহিক আর ।
আঁখির নিমিখে, যদি নাহি দেখি, তবে যে পরাণে মরি।
চণ্ডীদাস কহে, পরশরতন, গলায় গাঁথিয়া পরি ।
কি বিহবলতা! কি একান্ত নির্ভরতা !
‘চণ্ডীদাসের ভাব-সন্মিলনের পদাবলী • স্তোত্ররূপে পাঠ
করা যায় ; ততােধিক প্রশংসা করিলে ও বােধ হয় অন্যায়
হইবে না, সে গুলির মত প্রেমের সুগভীর মন্ত্র ধর্মপুস্তকেও
( ৮৭ ) চণ্ডীদাস-চত। বিরল। “বঁধু কি আর বলি আমি’-- প্রভৃতি গান শুধু বৈষ্ণবের কণ্ঠে নহে, ঈষৎ পরিবর্তিত হইয়া শ্রাব্য মনোহর- সাহী রাগিণীতে ব্রাহ্ম গায়কের কণ্ঠেও ধ্বনিত হইয়া থাকে। (১)। শত কর পর রাধিকা বঁধুয়া পাইয়াছেন। তাকে হারা নিধি পাইলে যেমন হৃদয়ে তুলিয়া লয়, অন্যত্র রাখিতে অ- কাশ পায় না, রাধিক। ও মেনি বঁধুকে পাইয়া উল্ল। সিত হইলেন, উভয়ে,—দৃঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ হইলেন। রসরে দুহু ত, থর থর কঁাপ, * [পই দুহু দোহা আবেশে ভোর। দুইক মিলনে আজি, নিভাওল অনল, পাল বিরহক ওর। মিলনে উভয়ের শতবর্ষব্যাপী বিহানল নির্বাপিত হইল, বিরহের অবসান অবসান হইল । রত্নপালঙ্কে দুইজনে বসিয়া অতীত কালের সুদীর্ঘ ইতিহাস বলিতে আরম্ভ করিলেন। রাধিকা বলিলেন, বঁধু তুমি সে আমার প্রাণ। দেহ মন আদি, তোমারে সপেছি, কুল শীল জাতি মাম। অখিলের নাথ, তুমি হে ক'লয়া, যােগীর আরাধ্য সন। গোপ গোয়ালিনী, হাম অতি হানা, না জানি ন ন পূজন । পিরী রমেতে, ঢালি তনু মন, দিয়াছি তোমার পায়। তুমি মোর পতি, তুমি মোর গতি, মন নাহি আনাভার। কলঙ্কী বলিয়া, ডাকে সব লোকে, তাহাতে নাহিক দুপ। বঁধু তোমার লাগিয়া, কলঙ্কের হার, গলায় পরতে সুখ ।। , (১) বঙ্গভাষা ও সাহিত্য
চণ্ডীদাস-দাহ ।
( ৮৮ )
. * * * * * *
সতী বা অসতী, তােমাতে বিদিত, ভালমন্দ নাহি জানি।
কহে চণ্ডীদাস, পাপ পুণ্যময়, তোমার চরণ খানি।
তুমিই আমার সব, অমি তোমাকেই স্মরণ করিয়া এই সুদীর্ঘ
কাল যাপন করিযাছি। লােকে কত-নিন্দা করিতেছে, শ্যাম
কলঙ্কিনী বলিয়া কত উপহাস করিতেছে, কিন্তু তাহাতে
আমার দুঃখ নাই; তোমাকে পাইলে আমি সে কলঙ্ক হেম
হারের ন্যায় গলায় পরিতে পারি। আমি ভালমন্দ কিছুই
নি না, পাপমন্দ বিচার করি না,--কেবল তােমার চরণ
খানিই সার। তুমি এজন্মে আমাকে যত কষ্ট দিলে, ইচ্ছা
হয় যদি পর জন্মে আমি নন্দের নন্দন হই, আর তুমি রাধা
। তথন জানিবে সখা, পিরীতি কেমন জ্বালা।
বঁধু কি আর বলিব তােরে।
অলপ বয়সে, পিরীতি করিয়া রহিতে না দিলি ঘরে ॥
কামনা করিয়', সাগরে মরিব, সাধিব মনের সাধ ।
মরিয়া হইব, শ্রীনন্দের নন্দন, তােমারে কারস রাধা ।।
পিরীতি কারয়া, ছাড়িয়া যাইব, রাহব কদম্বতলে।
ত্রিভঙ্গ হইয়া, মুরলী বাজাব, যখন যাইবে জলে ।
মুরলী শুনিয়া, মােহিত হইবা, সহজ কুলের বালা।
চণ্ডীদাস কয়, তখনি জানিবে, পিরীতি কেমন জ্বালা
}
কিন্তু এত আত্মনির্ভরতা, এত প্রেম-বিহ্বলতা, এত তন্ময়তা
সত্ত্বেও বুঝি এই শতবৎসরের অদর্শনে রাধিকার বধুর উপর
একটু অবিশ্বাস হইয়াছিল। শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন ত্যাগ করিয়া
মথুরায় যাইয়া রাজাসন গ্রহণ করিয়াছেন। তখন বসন্তকাল
( ৮৯ )
চণ্ডীদাস-চরিত।
-রাধিকার বিরহ দশা। রাধিকার দিন আর যায় না,
সখীগণকে ধরিয়া কেবলি কঁদেন,
কালি বলি কাল, গোল মধুপুরে, সে কালের কত বাকি।
যােবন সায়রে, মরিতেছ, ভাটা, তাহারে কেমনে রাখি।
জোয়ারের পাণী, নারীর যৌবন, গেলে না ফিরিসে আর ।
জীবন থাকিলে, বঁধুরে পাইব, যৌন মিলন ভার ।
X
X
X
X
আমার মাথার কেশ, সুচারু অঙ্গের বেশ, পিয়া যদি মথুৱা হল ।
ইহ নব সেবন, পরশ রতন ধন, কাচের সমান গেল ।
রাধিকার বড় দুঃখ হইয়াছে—ীন থাকিলে একদিন না এক
দিন বঁবুকে পাইপ কিন্তু যৌন চলিয়া গেলেত আর ফিরিয়া
আসিবে না। আমার এ নব যৌবন-সাগরে যে ভাটা লাগি-
য়াছে, তাহার গতিরােধ কি করিয়া করা যায় ? যদি এই মধুর
বসন্তকালে, কোকিল-কূজন-মুখরিত কোলকুঞ্জে পিয়ার সহিত
মিলিত হইতেই না পাইলাম তবে এ সুচারু অঙ্গের বেশে,
এ চিকুরকুন্তলামে, এ মনােমােহন বেণীবন্ধনে, এ নব যৌবনে
কাষ কি ?
কোন সে নগরে, নাগর বহল, নাগরী পাইয়া ভাের।
কোন্ গুণবতী, গুণেতে বেঁপেছে, লুপ ভ্রমর মোর ।
বহুকাল কৃষ্ণের ! দর্শন না পাওয়ায় রাধিকার মনে একটা
সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে বুবি বঁধু আমার অন্য কোন নাগরীর
প্রেম-পাথরে নিমগ্ন হইয়াছে, বুঝি অন্য কোন গুণবতী অামার
‘লুধ ভ্রমর’কে প্রেমলিঙ্গনে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে।
u.
চণ্ডীদাস-চলিত
( ৯০ )
চণ্ডীদাস এইস্থানে রাধিকাকে সাধারণের চক্ষে একটু
থাটো করিয়া অঙ্কিত করিয়াছেন ! স্ত্রী কৃষ্ণের প্রতি এইরূপ
অবিশ্বাস এবং যৌন-সায়রে ভাটা লাগায় এইরূপ হা হুতাশ
কৃষ্ণগতপ্রাণ রাধিকার উপযুক্ত হয় নাই। রাধিকার এই
আক্ষেপ-উক্তির ছত্রে ছত্রে পাশৰ-প্রবৃত্তির তীব্র উচ্ছাস ক্ষরিত
হইতেছে। প্রেমিকের হৃদয় সর্বদ। ত্যাগের জন্য প্রস্তুত
থাকে, আত্ম-নিগ্রহেই তাহার আনন্দ হয়। ভােগ ও ত্যাগ,
আত্মসমর্পণ ও আত্মতৃপ্তি, ব্যাপ্তি ও পূর্ণা--সকলি এক
লেগে সংশাধিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ অরণ্যচারিণী অৰ্দ্ধচীর
বাস-ধারিণী রাজনন্দিনী দময়ন্তীর কথা উল্লেখ করা যাইতে
পারে। দময়ন্তীর মতন আর কয়জন ত্যাগ করিতে পারিয়া-
ছেন ?
চণ্ডীদাস রাধিকাকে উন্মাদিনী করিয়া সাজাইয়াছেন।
প্রেমই তাহার যথাসর্বস্ব ; তিনি প্রেম পাওয়ার জন্য তত
ব্যাকুলা নহেন, যতটা দিবার জন্য ব্যাকুলা। তিনি প্রাণ
বঁধুকে বুকের ভিতর ধরিয়া, সমস্ত হৃদয়ের প্ৰেম-সুধা ঢালিয়া
সুখী হইতে চাহেন। ইহার ব্যতিক্রম হইলেই তাহার জ্ঞান
থাকে না, তিনি ধৈৰ্য্য হারা হন ; তখনই ভাবেন—‘শিশু
কালে মরি গেলে হইত যে ভাল। তাহা হইলে আর এখন
এই পাপ পিরীতের জ্বালা সহ করিতে হইত না, তাহা হইলে
সাগর শুকাল, মাণিক লুকাল, অভাগীর স্বরন ফেরে।
( ৯১ )
Bীস-চরিত্ত
- - - - - - * *
আমার করম দোমেসাগর শুষ্ক হইত না, মাণিক ও লুকাইত
। তৃষ্ণার বারিতে। বজ্রপাত হইতেও দেখিতাম না।--
নিয়ম লাগিয়া, জলদ সোপনু, বজর পড়িয়া গেল ৷৷
তাহার পরই প্রেমের বিহবলতা;—নিজকে কৃষ্ণের অধীন
করিয়া আত্মার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হরণ করতঃ, কত বিনয়, কত
স্তুতি, কত মধুমাখা ক্রোধ ।
জনম অবধি, কালিয়া সদন, না ধুলি লাজের ঘাটে তে ।
ব্রজ গোপীদে' হতে, মথুন নাগরী, কতরূপে গুণে বটে হে ॥
কিম্বা কুবুণা, নামে কুবু'জনী, তো সে লেগেছে মনে।
আপনি সেন, ত্রভঙ্ক মুরারী, বিহি নিয়েছে জেনে।
এই ক্রোধের পর মান,
যতেক তাম'রে, পিরীতি করুক, তেমন পিরীতি হবে না।
রাধানাথ বিনে, কুজার নাথ, কেহ ত তে
তারপরই অশ্রু বরিষণ,
কি আর কবি, মানব সেন, কহিহ যে দুখ পাই।
চণ্ডীদাস কহে, কহিতে বোনা, পরাণ ফাটিয়া যায় ।
এই অশ্রু সম্পতি, দুঃখ নিবেদনের পর-সম্ভোগ-মিলন।
চণ্ডীদাস শ্যাম-রিহিনী, অচিন্ত্য-তত্ত্বরূপিনী, ব্ৰজকাব্য
বিলাসিনী, উন্মাদিনী রাধিকাকে শ্যাম-বিরহে সাপিত করিয়া
কখনো নয়নজলে ভাইয়াছেন, কখনো নবধরের মাধুৰ্য্য
দর্শাইয়া তাহার হৃদয়ে, মহামােহকরভাব জন্মাইয়াছেন; আবার
কখনাে নবদুৰ্ব্বাদল শ্যামের অপরূপ রূপের ঝলকে বিমােহিত
করিয়া ‘মরি কি পেখনু’ বলিয়া দেখিবার অতৃপ্ত পিপাসায়
কবে না ।
চণ্ডীপ-চবিত। ( ৯২ ) vWv044 অস্থির করিয়াছেন, আর সেই সঙ্গে প্রেমোন্মাদিনী রাধিকার মনের কথা বলতে গিয়া আমাদিগকে কঁদাইয়াছেন। এমন পাষাণ হৃদয় কাহারো নাই যে, আত্ম- ণিত। রাধিকার মনের কথা শুনিয়া ক্ষণকালের তরেও অশ্রু বর্ষ। না করে। আমা আর দুইটা পদ উদ্ধত করি। চণ্ডীদাসের সমস্ত কবিতাগুলিই মধুময়। প্রেমিক পাঠক নিজে আস্বাদ না করিলে, পরের মুখে অস্বিাদ করিয়া রসানুভব করিতে পারি। বেন না। রাধিকা সখী সম্বোধন করিয়া বকিতেছেন, ‘সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম ? কাণের ভিতর দিয়া, মরমে পশিল গো, ব্যাকুল করিল মাের প্রাণ। না জানি কতেক মধু, শ্যামনামে আছে গো, বদন ছাড়িতে নাহি পারে। জপিতে জপিতে নাম, অবশ করিল গো, কেমনে গাইব সই তারে । নাম পরতাপে যার, ঐছন করিল গো, অঙ্গের পরশে কিবা হয় । যেখানে বসতি তার, নয়নে দেখিয়া গে, যুবতী ধরম কৈছে রয়। পারিতে করি ননে, পাসরা না যায় গো, কি করিব কি হবে উপায়। কহে দ্বিজ চণ্ডীদাসে, কুলবতী কুলনাশে, আপনার যৌবন যাচায় । এই পদটী পূর্ব রাগের। কৃষ্ণের গুণ শ্রবণে রাধিকার মনমুগ্ধ হইলে তিনি খীকে ধরিয়া বলিয়াছিলেন। যুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় ইহার এইরূপ অনুবাদ করিয়াছেন ;- Fricud ! ah ! who hath named that name? Through my ear it steals, My heart it thrills, My life and soul it doth inflame = ।
( ৯৩ ) ৗস-চায় । Ah who shall toll What sweet doth dwell In that beloved sirain ! I name that name, My soul all flame! Oh! will he come again ? অনুবাদটী যে যথাযথ হয় নাই তাহা পাঠকগণ দেখিতে পাই- বেন, দত্তজ মহাশয়ও তাহা নিজে স্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলেন, -- * Injustice to the poet we are bound to confess, that we have spuilt the poem in translating, for the feeling in the original is so deep, so intense that no translation probably can adequately express it in English What we would point out to our readers, however, is the tooll want of figures or similes, a total ignoring as it were of all attempts of ornamentation. The puet strongly feels his subject and records it pathetically without any embellishment, without any attempts of adornment. কি বুকে দারুণ ব্যথা ! সে দেশে যাইব, যে দেশে না শুনিব, গপ গিরীতের কথা। সই কে বলে পিরীতি ভাল । হাসিতে হাসিতে, পিরীতি করিয়া, কান্দিতে জনম গেল । ফুলবতী হইয়া, কুলে দাড়াইয়া, যে ধনী পিরীতি করে। তুষের অনল, যেন সাজাইয়া, এমনি পুড়িয়া মর। হাম অভাগিনী, এ দুখে দুখিনী, প্রেমে ছল ছল আঁখি। চণ্ডীদাস কহে, যেমতি হইল, পরাণে সংশয় দেখি ।
চণ্ডীদাস-চরত ( ৯৪ ) 4 A । AA এটা পিকার বিরহকালিন কাতরােক্তি। দত্ত জ মহাশয়ের অনুবাদ A cruel throb is in my heart ! I'll leave my home, And thither ron, .Where never's known love's fatal art. I loved and smiled, My hearts beguiled, And what is left but life-long weeping ? For love should e'er a damsel sigb, । 0 ! spare ber shame, In fire and flame, A kinder death, O! let her die ! O! I have lelt this bitter grief My eye-balls shine, With ceaseless brine, Says Chandidas, O! for her lifo ! অমর চতুর্থ প্রস্তাবে বলিয়াছি, চণ্ডীদাসের ভাব-সন্মিলন, অনুরাগ, বিহ প্রভৃতিতে যে সৌন্দর্য্য ও কমনীয়তা আছে, বিদ্যাপতিতে তাহা নাই। দজ মহাশয় বলেন,—“Sofdom doth Bidyapati manifest such deep feeling any pathos. His strong point lies, as we have already pointed out, in fine imaginary and embellishment. Even while describing scenes of sadness and woe Bidyapati relieson his vivid fancy, and seldom approaches Chandidas in intensity of feeling," ( ৯৫ ) চ গুদাস-চারত চণ্ডীদাস ভাবুক, বিদ্যাপতি কবি। চণ্ডীদাসের কান্তার বহিঃ সৌন্দৰ্য,-সাজ-সজ্জা কিছুই নাই, কেবল স্বাভাবিক সৌন্দর্যই তাহার একমাত্র বেশভূষা, বিদ্যাপতির পদাবী বাহিক অলঙ্কার ও শব্দাড়ম্বরে বিচিত্রভাবে সজ্জত-পাঠে হৃদয়. উদ্বেলিত হয় কিন্তু ততটা দ্রবীভূত হয় না। দাসের ন্যায় বিদ্যাপতিও প্রতি কথায় প্রেমের গান গাহিয়া ছেন,-যে প্রেম, সৌন্দর্যের অনুভূতিতে প্রথম ভঙ্গুরত হইয়া প্রাণে অতি দুঃসহ লালসায় পরিবর্তিত হয়, তাদৃশ প্রেম-চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন। বিদ্যাপতি কোথাও রাধার ভাসে প্রেমের অর্চনা করিয়া, প্রেম-ভক্তির অশ্রুনিৰ্ম্মাল্য বর্ষণ করেন নাই। তিনি কেবল আমাদের হৃদয়ে ভাবের তরঙ্গ তুলিয়াছেন। ২{-অন্যান্য রচনা। ঐ রাধার কলঙ্ক ভঞ্জন। এই গ্রন্থখানি সম্প্রতি শ্রী যুক্ত আবদুল করিম মহাশয় আবিষ্কার করিয়াছেন কিন্তু এপর্যন্ত মুদ্রিত হয় নাই। গ্রন্থখানি অসম্পূর্ণ, মোট পত্র সংখ্যা ১১ কিন্তু প্রথম তিন পৃষ্ঠা বিলুপ্ত। ক্ষুদ্র পুস্তক, অতি কদৰ্য্য হস্তলিপি। অনেক স্থলে পাঠ অসম্পূর্ণ বলিয়া বােধ অনেকেই বলেন, চণ্ডীদাস যে, কেবল কতকগুলি সম্বন্ধ- বিহীন পদাবলী রচনা করিয়াই কবি-জীবন শেষ করিয়াছেন তাহা নহে, তিনি ধারাবাহিকরূপে কৃষ্ণচরিত বর্ণন করিয়াছেন।
চণ্ডীদাস চার
( ৯৬ )
বিগত কয়েক বৎসরের মধ্যে চণ্ডীদাসের যে সকল অপ্রকাশিত
পদাবলীর উদ্ধার হইয়াছে, তদৃষ্টে এই উক্তি যথার্থ বলিয়া
অনুমিত হয়। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় রাসলীলা বিষয়ক
অনেক গুলি পদ প্রকাশিত হইয়াছে; তাহাতে কৃষ্ণচরিত বর্ণিত
হইয়াছে। ইহার বিষয় পরে বলিব, আগে রাধার কলঙ্ক
ভঞ্জন’ সম্বন্ধে আমার বক্তব্য শেষ করি।
অবদুল করিম মহাশয় বলেন, রাধার কলঙ্ক ভঞ্জনার্থ
শ্রীকৃষ্ণের কপট মূচ্ছার অপনয়ন গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয়। অতি
মইজ দ্বিয়, সকলেই জানেন। আমার প্রকাশিত ‘রাধিকার
মানভঞ্জনে যে ছন্দ, এই গ্রন্থেও সেই ছন্দ, স্থানে স্থানে সামান্য
ইতর বিশেষ মাত্র। আবার বাসুদেব ঘােষের গোরাচরিত ’
বা ‘গৌরাঙ্গের সন্ন্যাস পটি’তেও এইরূপ ছন্দ দেখিতেছি।
চণ্ডীদাসের রচনার মত সহজ রচনা বঙ্গ-সাহিত্যে বিরল।
সমালোচ্য গ্রন্থেরও একটা অলঙ্কার—সহজ রচনা। নিম্নোদ্ধত
অংশ হইতে সে কথা সহজে সমর্থিত হইবে।”
রাণী বলে বৈদ্যরা আমি ত না চিনি।
কি ঔষধে ভাল হয় আমার নীলমণি। ধু।
রাণী বলে বৈদ্যরা নাম ধর।
নীলমণিকে রক্ষা কর ।
বৈদ্য বলে নন্দ রাণী কহি তোমার ঠাই।
কত ধন দিবা রাণী তাহা সেল চাই ।
রাণী বােলে নপুরে জন্ম রত্নমণি।
সকল দিলাম, আমি যাদব নিছনি ॥
(৯৭)
যালাস-চরিত
.
এই সব ধন দি মনে নাহি ধরে।
দাসী কর্য নিয়া যাও নন্দ যশোদারে ।
অঞ্চল পাড়িল আমি ।
বাছা ভিক্ষা দে তুহ্মি ॥
আরাে একটু দেখুন:-
রাধে কােলে কলম্বিনী হইয়াছি অামি
সব লােকের ঠাই।
কেমনে আনিব জল যমুনতে যাই। ধু।
নিবেদি তােমার ঠাই।
আমার সমান কলঙ্কিনী নাই ।
মনের দুঃখ নিবারিতে যাই যার ঘরে।
শ্যাম কলঙ্কিনী বলি খােটা সেহি মারে । ধু।
দুঃখ নিবেদিতে যাই।
বেলে অইল কলঙ্কিনী রাই।
তৃষাযুক্ত হৈয়া আমি যার ঠাই খুজি পানি।
সেহ কােলে ঐ আইল রাধা কলঙ্কিনী
যশােদাএ বোলে রাধা শুনহ বচন।
জল আনি রক্ষা কর কানাইর জীবন।
তুমি বহি কে মাের যাছে ।
কৈব দুঃখ কার কাছে।
এখন আমরা বলিতে পারি, এরূপ সহজ রচনা, এরূপ সরল
কল্পনা চণ্ডীদাসের লেখনীরই উপযুক্ত। চণ্ডীদাস' গ্রন্থের ও
সম্পাদক মহাশয় লিখিয়াছেন, যদি ও চণ্ডীদাসের কোন পৃথক
গ্রন্থ দেখিতে পাওয়া যায় না, তথ:পি তাহার রচিত কোন গ্রন্থ
,
চণ্ডীগস-চরিত
( ৯৮ )
ছিল, এরূপ অনু:নি অসঙ্গত নহে। এপর্যন্ত বঙ্গভাষায়
একাধিক চণ্ডীদাস কবির আবির্ভাব জানা যায় নাই, ইহাও
এ গ্রন্থকে চণ্ডীদাসের রচিত বলিবার পক্ষে একটা যুক্তি বাট ।*
শ্রীরাধার কলঙ্ক ভঞ্জনের ভণিতি এইরূপ:--
(২) চণ্ডীদাসে বোলে সার।
কৃষ্ণগতি সভাকার।
যশোদায় দিল কৃষ্ণ ঐ দামের কোলে।
রাধা কৃষ্ণ পানে চাহিয়া চণ্ডীদাস গােলে।
গ্রন্থখানির উপসংহার এইরূপ ।
রাণী কােলে গাে রাধে নেয় গোবিন্দরে।
তােমার ঘরেতে রইলে দেখিতাম তাহারে।
তােমার অধীন কৃষ্ণ দৈবে সে হইয়াছে।
দাস তুল্য হৈয়াছে তাহা কি নিয়া লৈয়ছে। ধু।
যদি তোমার দয়া থাকে।
পুত্র দান দেয় মোকে ।
শুনিয়া রাণীর বাণী,
কহে রাধে সুনী,
লৈয়া যাও তোমার গো নন্দন।
কৃষ্ণচন্দ্রের মুখ দেখি,
রাধার অন্তরে সুখী ;
করিলেক চরণ বন্দন।
শ্যামের বামে দাড়াইল,
দুই হরষিত হইল ;
দুই প্রেমে ছসিত হৈল সৰ্বজন। ধু।
সাহিত-পরিষৎ-পত্রিকা, ১ম ভাগ ।
( ৯৯ )
sীদাস-চয়িত।
এ রাধে গােবিন্দ পাইল,
ভক্তের আনন্দ হইল।
সণে হরি হরি শােল,
রাধে গোবিন্দ পাইল।
‘ইতি শ্রীরাধার কলঙ্ক ভঞ্জন সমাপ্ত। ইতি সন ১৮২ মঘী
তারিখ মাহে ১৮ ফাল্ডন রােজ বুধবার বৈকাল বেলা। এই
ধৈইর মালিক কাশীনাথ দেয় দাস পীচরে রামমােহন
চৌধুরী। একপানি সম্পূর্ণ হস্তলিপি সংগ্রহ করিয়া প্রাচীন
কবির এই অক্ষয় কীর্তি রক্ষা করিতে পারিলে সুখের বিষয়
হইবে।
৩। কৃষ্ণ চরিত। উইলসন সাহেব লিখিয়াছেন যে,
চণ্ডীদাস ও গোবিন্দ দাস উভয়ে ‘কৃষ্ণ কীৰ্ত্তন প্রণয়ণ করিয়া-
ছেন। চণ্ডীদাসও গােবিন্দ দাস একত্রে কৃষ্ণ কীর্তন প্রণয়ণ
করা অসম্ভব, কারণ তঁাহার সমসাময়িক ছিলেন না।
বৈষ্ণব-সাহিত্যে একাধিক গোবিন্দ দাসের অস্তিত্বের বিষয়
অবগত হওয়া যায়,—আমরা গোবিন্দ নাম ধারী এগার জন
বিভিন্ন বৈষ্ণব কবির বিষয় জানিতে পারিয়াছি। (১) কিন্তু
১। (১) ঝামটপুর নিবাসী গােবিন্দ চক্রবর্তী ; (২) বােরা কুলী নিবাসী
গােবিন্দ চক্রবর্তী, (৩) কাশ্মশ্বর ব্রহ্মচারীর শিষ্য উৎকলবাসী গােবিন্দ দাস ;
(৪) মহাপ্রভুর প্রধান ভৃত্য গােবিন্দ দাস ; (৫) গােবিন্দ দাসের কড়চা লেখক
কর্মকার কাজী গােবিন্দ দাস , (৬) গোবিন্দ আচাৰ্য্য; (৭) কীরনীয়
চণ্ডীদাস-চরিচ্ছ । ( ১০০ ) তঁাহাদেরকেহ যে চণ্ডীদাসের সমসাময়িক চিলেন তাহার কোন প্রমাণ প্রাপ্ত হই নাই । পুরাতন বান্ধবে’ ‘গােবিন্দ দাস’ ইতি শীর্ষক একটি প্রস্তাবে দেখান হইয়াছে যে, চণ্ডীদাস ও গোবিন্দ দাস সমসাময়িক, কিন্তু লেখকের যুক্তি সৰ্বাংশে গ্রাহণীয় নহে। কৃষ্ণ কীর্তন’ পুস্তক প্রণীত হইতে পারে, পারে কেন খুব সম্ভব হইয়াছিল কিন্তু উইলসন সাহেবের সহিত এক যােগে বলিতে প্রস্তুত নহি যে, তাহার প্রণেতা চণ্ডীদাস ও গোবিন্দ দাস। আমি কবিযশঃ কেবল চণ্ডীদাসের মস্তকেই বর্ষণ করিতে সম্পূর্ণ ইচ্ছুক। ‘সোম প্রকাশের পত্র প্রেরক লিখিয়াছিলেন যে, চণ্ডীদাসের পুস্তকের নাম ‘গীত চিন্তামণি। একথাও বিশ্বাস করিতে সহসা প্রবৃত্তি হয় না। কারণ গীত চিন্তামণির কথা কাহারাে মুখে শুনা যায় না। যাহা হোক্ চণ্ডীদাসের পুস্তকের নাম গীত চিন্তামণিই হউক বা কৃষ্ণ কীর্তনই হউক, তিনি যে ধারা বাহিক রূপে কৃষ্ণচরিত বর্ণন করিয়াছেন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই । গােবিন্দ দত্ত ; (৮) বাঘনাপাড়া নিবাসী গোবিন্দানন্দ ; (৯) গোবিন্দ কবিরাজ ; (১০) গােবিন্দ ঘােষ ; (১১) বুধরী গ্রামবাসী রামচন্দ্র কবিরাজের ভ্রাতা গােবিন্দ কবিরাজ। এতদ্ব্যতীত গতিগোবিন্দ নামক আর একজন পদ কর্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ইনি নিবাসচার্যের পুত্র ছিলেন।..
( ১০১ ) 5ণ্ডীদাস-চৰিত। . আমরা নিম্নে কৃষ্ণচরিত হইতে একটী পদ উদ্ধৃত করিলাম।-- সখি, কহিও তাহার পাশে। যাহারে চুলে, সিনান করিয়ে, সে মাের দেখিয়ে সে। কর শিরে হাত দিয়া। কদম্ব তলেতে, কি কথা কহিলে, যমুনার জলসা মোর বৃন্দাবন আছে সখি। আর এক হয়, যদি মনে লয়, কপােত নামেতে পাখী । একথা কহিও তারে। যে গুণ ঝুরিয়া, যে জন পরিশে, সে বধ লাগিবে তারে। দ্বিজ চণ্ডীদাস ভণে। যাহার লাগিয়ে, যে জন মরয়ে, সেতারে পাগরে কেনে। চণ্ডীদাস মানব চরিত্র কেমন বুবিয়াছিলেন, পাঠকগণ তাহার নমুনা দেখুন;-- ধরনী উপবে পরিবে ঢারি। তসে সে চিনিতে সুগন্ধ বারি। রাঙ্গ রূপ। চিনিবে গায়। কুটিল চিনিলে কোন উপায়। আগেতে কহে মধুর বাণী। পনের হৃদয় পাতিয়া আনি। আপন আশা পরকে দেই। চণ্ডীদাস কহে কুটিল সেই ॥ কৃষ্ণচরিতে কবি অদ্ভুত ত কণিত্ব-শক্তির পরিচয় দিয়াছেন, এবং রাধাশ্যামকে লইয়া প্রেমের নানা প্রকার ভাব দেখাইয়াছেন। কবি দেখাইয়াছেন যে, প্লট। সর্বদা নিঃস্বার্থ প্রীতির দর-
চণ্ডীদাস-চরিত ।
{ ১০২ )
vt. A • ৭ ৮৭
*** A/
দরিত ধারায় ঢালিয়া দিয়া পৃথিবীর প্রাণ সুশীতল করিলে
পৃথিবীর সকলেই তোমার হইবে, আর যাহাকে একবার প্রাণ
দিয়া ভাল বাসিবে, সে জীবনে মরণে তােমারই হইয়া
থাকিবে। 'কৃষ্ণচরিতে কপি স্বীয় নায়ককে, কখন নাপিতানী
কখন দেয়াশিনী, কখন বৈদ্য বেশে সাজাইয়া উৎকৃষ্ট নাটকাভি-
নায়কের কৃতিত্ব দেখাইতে সক্ষম হইয়াছেন। নায়কের এবেশে
তরল রসে ভরপুর।
৪। রাসলীলা। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় চণ্ডীদাসের
রাসলীলা বিষয়ক অনেকগুলি পদ প্রকাশিত হইয়াছে। শ্রীমদ্ভা-
গবতের দশম স্কন্ধে শ্রী কৃষ্ণের রাসলীলা বর্ণিত হইয়াছে।
চণ্ডীদাসের রাসলীলা ভাগবতের অবিকল অনুবাদ না হইলেও
সেই ভাব লইয়া রচিত। ভাবানুযায়ী রচিত হইলেও, যে
গুণের জন্য চণ্ডীদাস অপরাপর বৈষ্ণব কবি হইতে শ্রেষ্ঠ আসন
পাইয়া থাকেন, যে সহজ ভাবের জন্য তিনি বালক বৃদ্ধ, যুক
যুবতী সকলের হৃদয়ই অধিকার করতে পারিয়াছেন, সেই
অতুলনীয় মনােমুগ্ধকারিণী স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য, সেই প্রেমের
সুগভীর মন্ত্র তাহার প্রতি কবিতাতেই নিহিত আছে। অনেকে
বলেন যে, চণ্ডীদাস সংস্কৃত জানিতেন না। উক্ত মতাবলম্বী
দিগকে আমরা তাহার রচিত কৃষ্ণচরিত ও রাসলীলা পাঠ
করিতে অনুরােধ করি। ইহার স্থানে স্থানে কবি ভাগবতের
সুন্দর ব্যাখ্যা করিয়াছেন ! দৃষ্টান্ত স্বরূপ অমর রাসলীলা
হইতে একটী স্থান উদ্ধতকরিতেছি। রাস-অভিমারের নির্মিত
bাসার,
MV ,
শ্রীকৃষ্ণ কেলি-কুঞ্জে যাইয়া বংশীধ্বনি করিলেন, সেই ধ্বনী
মলয়-সমীরণে সঞ্চালিত হইয়া গােপ-বধূ-কর্ণে প্রবিষ্ট হইল।
গােপিনীগণ তখন,-
• কে বা অাছিল, শিশু কোলে করি, পিয়াইতে আছিল স্তন।
দুগ্ধ পোষ্য বালা, ভুমি ফেলি গেলা, ঐছন তাহার মন ।
চলিল গমন, সেই বৃন্দাবন, কালিতে লাগিল শিশু।
তেমত চলল, সব পরিহরি, চেতনা নাহিক কিছু।
কোন জন ছিল, পতির শয়নে, ঘুমে অচেতন হৈয়া ।
হেন বেলে শুনি, মুরলীর ধ্বনি, উঠিল চেতনা পা(ইয়া।
বিচিত্র বসনে, মুখানি মুছিয়া, চপল পতিরে ত্যজি।
পতি কোল সেই, ত্যজিল। তখনি, চলন বনেতে সাজি।
কোন গােপী ছিল, কোন কারণে, ত্যজিয়া তখনি চলে।
রসের আবেশে, কিছু নাহি জানে, কারে কিছু নাহি বলে।
কোন জনাছি, বেদনে দুঃখিত, অঙ্গেতে আছিল দোষ।
শুন বংশী গীত, অঙ্গ পুলকিত, সব দূরে গেল শেষ ।
চণ্ডীদাস বলে, কিবাসে দেখল, অপর অধল রাম।
তেইসে প্রেমেকে বন্ধন সবাই, গােপের রমণী জনা ॥
পাঠক এই অংশ টুকু ভাগবতের রাসলীলার সহিত মিলাইয়া
দেখুন, কবির অনুবাদ কিরূপ হইয়াছে।
রাসলীলা ব্যতীত চণ্ডীদাসের আরো কতকগুলি চতুর্দশ
পদাবলী’ আবিষ্কৃত হইয়াছে। উহার কোন কোন অংশ
অমরা, দ্বিতীয় প্রস্তাবে উদ্ধৃত—করিয়াছি।
অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন কৃষ্ণচৈতন্য নিমাই সন্ন্যাসী অবতীর্ণ
হইবার, প্রায় শত বৎসর পূর্বে চণ্ডীদাসের সংগীত লহরী গৌর
৬ীস-চরিঙ্গ ( ১০৪ ) AWAAA *** AA জনের চিত্ত-ক্ষেত্রে কৃষ্ণপ্রেম বারি সিঞ্চন করিয়াছিল, কৃষ্ণচৈতন্য স্বয়ং সেই কৃষ্ণপ্রেমপূর্ণ সঙ্গীত-সুধা পান করিয়া আনন্দে অধীর হইয়াছিলেন। যে সুধামাখা সঙ্গীতের তালে তালে তঁাহার মন প্রাণ নৃত্য করিত, সে সংগীতের অর্থ কি ? এই সকল প্রশ্নের সঙ্গত অর্থ পাইতে ইচ্ছা করিলে, বঙ্গ সাহিত্যের প্রথমাবস্থা আলােচনা করিতে হয়। বঙ্গ-সাহিত্যের প্রথমা- বস্থা, বৈষ্ণব-সাহিত্যের আন্তর্গত, সুতরাং বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের আবি- ভাব, বিকাশ ও বিস্তৃতি বঙ্গবাসী মাত্রেরই আলোচনা যােগ্য। আলােচনা করিলে এমনি একটা তৃপ্তি অনুভূত হইবে, যাহা অন্য কোন সাহিত্যে মিলেনা। শৈশবের বিলুপ্ত প্রায় স্মৃতি জাল ভেদ করিলে যেমন স্নেহময়ী জননীর অপূর্ব বাৎসল্যের প্রথম বিকাশ হৃদয়-দাবটে প্রতিফলিত হয়, তেমনি বঙ্গসাহি- ত্যের প্রথমাবস্থা আলােচনা করিলে বঙ্গীয় বৈষ্ণব কবিগণের মােহন সংঙ্গীতের অস্পষ্ট আলােক ভিন্ন আর কিছুই আমাদের দৃষ্টিপথে পতিত হয় না। আলােকরশ্মি অস্পষ্ট হইলেও, , চিত্র সুপরিস্ফুট না হইলেও কবিত্ব মনােহারী, প্রাণস্পর্শী ; সঙ্গীতের সুরে সুরে হৃদয় মাতিয়া উঠে । বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের বিকৃত ব্যাখ্যা করিয়া যাহারা তাহাতে অ- বিত্রতার আরােপ করেন; জঘন্য প্রণয় চিত্র ভাবিয়া যাহারা তৎপ্রতি কুটিল কটাক্ষপাত করিতে বিরত হন না, আমরা বলি তাহার। রসগ্রহণে-সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত, তাহাদের নিকট বৈষ্ণব সাহিত্য সম্বন্ধে আলােচনা করা-অরসিকে রসস্যনিবেদন। #
( ১০৫ )
চণ্ডীদাস-চরিত।
তাহাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন হৃদয়ে কখনাে বৈষ্ণব কবির প্রেম ও
ভক্তি প্রতিবিম্বিত হইতে পারে না।
সখিরে আজি কুদিন সুদিন ভেল।
মাধব মন্দিরে আওব ত্বরিতে, কপাল কহিয়ে গেল ।
শত বর্ষের বিরহখিন্ন জীবনের উপর সুধা বর্ষণ করিবার
অাজ এই মাহেন্দ্র যোগ সমুপস্থিত। কেহ বলে নাই, কেহ
সংবাদ পাঠায় নাই, তথাপি রাধিকা জানিতে পারিলেন,
মাধব মন্দিরে আও ত্বরিতে। ভক্ত ও প্রেমিক নিজে নিজেই
আসন্ন সুখ দুঃখের সম্ভানা নিজহৃদয়ে অনুভব করিতে পারেন।
তাই আজ কুদিন কাটিয়া গিয়াছে, সুদিনের সূত্রপাত রাধিকা
জানিতে পারিলেন। তঁাহার কুদিন যে কাটিয়া গেল, তাহা
কে বলিল ? কৃষ্ণগত প্রাণ প্রেমিকা রাধিকা বলিলেন,-
কপাল কহিয়ে গেল। কি বিচিত্র নির্ভরতা। অদৃষ্টের
দুজ্ঞেয় সত্বা অনুভব করিয়া রাধিকার বােধগম্য হইল, -মাধব
মন্দিরে আও ত্বরিতে,-মাধব শীঘ্রই আগমন করিবেন। এই
শুভ সংবাদদাতার নাম -কপাল’ । বৈষ্ণব সাহিত্যের
এবিকৃত প্ৰেমচিত্র কি ইংরেজি প্রেম কাহিনীতে পাওয়া যায় ?
তাহার পর--
চিকুর ফুরছে, বসন খসিছে, পুলক যোধন ভার ।
বাম অঙ্গ আঁখি, সঘনে নাচিছে, দুলিছে হিয়ার তার ।
-কেবল যে কপাল’ বলিয়া গেল, মাধব আসিতেছেন তাহা
নহে; রাধিকা আরো উৎকৃ টতর প্রমাণ পাইয়াছেন। তাহার
N,
চণ্ডীদাস-বি
( ১০৬ )
;
এক প্রমাণ,অপূৰ্ব আনন্দভরে ‘চিকুর ফুরিছে’, অঙ্গের বসন
খসিয়া পড়িতেছে ; আর—আর যে নবযৌবন এতদিন তাঁহাকে
দেহের ভারের ন্যায় পীড়িত করিতেছি, আজ সেই নবযৌবন
পুলকে উচ্ছসিত হইয়া উঠিতেছে । ইহা কি উৎকৃষ্টতর প্রমাণ
নহে যে, মাধআসিতেছেন ? ইহাই শেষ প্রমাণ নহে, আরাে
প্রমাণ আছে ; আজ রাধিকার বাম অাখি ঘন ঘন নাচিতেছে
এবং তাহার বক্ষ বিলম্বিত হ্যর স্পন্দিত হইতেছে। ইহাতে ও
কি বুঝা যায়না যে, কৃষ্ণ আসিতেছেন ?
প্রভাত সময়ে, কাক কোলাহল, (১) আহার বাটিয়া খায়।
পিয়া আসিবার, নাম শুধাইতে, উড়িয়া বসিল তায়।
অন্যান্য দিন প্রভাত সময়ে যখন কাককূল কোলাহল করিয়া
অহার বাটিয়া খাইত, তখন যদি রাধিকা উহাদের পাশে
যাইয়া কৃষ্ণের সংবাদ জিজ্ঞাসা করিতেন, তবে উহারা উড়িয়া
পলায়ন করিত, আজ কিন্তু উহারা ও বিপরীতাচারণ করিতেছে।
আজ কৃষ্ণের সংবাদ জানিবার জন্য উহাদিগের নিকট গেলে,
আর উহারা উড়িয়া পলাইল না। ইহাতেও কি জানা যায়না
যে, কৃষ্ণ আজ এ বৃন্দাবনে আসিতেছেন ? যদি ইহাতেও
তুমি সন্তুষ্ট না হও, তবে সর্বোৎকৃষ্ট ও শেষ প্রমাণ দেখ,
মুখের ততুল, খসিয়া পড়িছে, দেশের মাথার ফুল।
কহে চণ্ডীদাস, সব সুলক্ষণ, বিহি ভো অনুকূল।
(১) বিদ্যাপতিও এইরূপ অবস্থা বর্ণন করিয়াছে
সাহি কোকিল, অবলাশ ডাক ডাকুই, লাখ উদয় ক চ ।
পাচবাণ অব লবণ হউ, মলয় পবন তহু মম।
( ১০৭ ) চণ্ডীদাস-চার। সহায় অঙ্গ হর্ষভরে মুখের তাম্বুল ও দেবের মাথার ফুল মাটিতে পড়িতেছে, ইহাতে রাধিকার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ। ইহাতেই রাধিকা বুঝিলেন, মাধ বৃন্দাবনে আসিতেছেন। ‘আমার নিকট চণ্ডীদাসের পদটী এক অভিনব সৌন্দর্য্যে মণ্ডিত বলিয়া বোধ হইয়াছিল। মনে হইয়াছিল, যেন কত দুঃখ ও যন্ত্রনার জন্য জীবের সংসারে অশা,–এই জীবন পঙ্ক- দিগ্ধ কমলদলের ন্যায় অবস্থার বিড়ম্বনায় কলুষিত। প্রার্থনা করিয়া অনির্দেশে যাহার নিকট সান্ত্বনার জন্য উপস্থিত হইতে চাই তিনি দূর হইতেও দূরে' বাক্য মনের অগোচর। নিরাশায় কতবার নিতান্ত দুর্বল ও অনাশ্রয় হইয়া পড়িয়াছি, সজল চক্ষে কাহার পানে তাকাইয়াছি, তিনি তাশ্রুধারা মুছাইয়া দেন নাই,—'দেহি সংসার মোক্ষংমে’ বলিয়া যাহাকে আশ্রয় সরূপ বরণ করিতে গিয়াছি, মনে হইয়াছে যেন সে অব লম্বন মরিচীকা বালুর স্তম্ভ, উঁইতে গেলে ভাঙ্গিয়া যায়, অনি- দ্দেশে কাহাকে খ, জিয়। মরিয়াছি, ঋণে ক্ষণে অবিশ্বাসের ছায়ায় চিত্ত আঁধার হইয়া গিয়াছে, তিনি আসেন নাই। কিন্তু মুমূর্ষ শয্যায় ‘কুদন সুদিন ভেল’, মৃত্যুর দিন সমস্ত পার্থিব বন্ধন কাটিয়া যাইতেছে, আজ চক্ষের স্বপ্ন ঘোর চলিয়া যাইতেছে— যেন কোন অপূর্ব অলোকময় মহাশ্ৰভূত সুহৃদুত্তমের খোজ পাইয়া চক্ষের জলে মুখ মণ্ডন প্লাবিত হইয়া পড়িতেছে, আজ মুমুর্ব শয্যায় বাকরােধ হইয়াছে, কিন্তু মনে হইতেছে-- শ্রবণহু, শ্যাম নাম করু গান। শুইতে নিকউ কঠিণ পরাণ । ৪ 'চণ্ডীদাস-চরিত ( ১০৮ ) আজ বহির্মুখী চক্ষুস্থির এবং দৃষ্টিহারা হওয়া সত্ত্বেও কোন অকারণ পুলকে স্পন্দিত হইতেছে । শেষ নিশ্বাস নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও রুদ্ধ-পায় বক্ষ প্রদেশ কোন শুভ দেবতার সন্মি- লন আশায় কম্পিত হইতেছে, হিয়ার হার দুলিয়া উঠিতেছে, যে শান্তির জন্য আত্মহারা হইয়া বুকভরা দুঃখ লইয়া কাতর ও ব্যাকুল নেত্রে নিশি দিশি খোজ করিতেছি—সে শান্তির নিকেতন যেন আজ অদূরে দৃষ্টি পথবৰ্ত্তী, পক্ষীকুল কাকলি দ্বারা সেই অনাস্বাদিত সুখের অপূৰ্ব পূর্বাভায বিজ্ঞাপন করিতেছে। আজ অদৃষ্ট আমাকে সত্য সত্যই বণিয়া গেল- ‘কুদিন সুদিন ভেল’ । মুমূর্ষ শয্যায় এই মহাসুখ-সন্মিলন কল্পনা করিয়া চণ্ডীদাসের এই পদটী আমার নিকট মধু হইতেও মধু- তর হইয়াছে। ভগবানের নিকট প্রার্থনা যে দিন শেষ মূহত্ত প্রকৃতই উপস্থিত হইবে, সে দিন যেন শুভ পুৰ্ব্বাভাষ বিজ্ঞাপী অভাবনীয় মহাসুখের প্রশ্রন স্বরূপ এই গানের সৌন্দর্শে মুগ্ধ হইয়া প্রাণবায়ু বহির্গত হয়।* ভাবুক পাঠক একবার স্থির চিত্তে এই পদটী পাঠ করুন দেখি। চণ্ডীদাসের এপদটী অপিন গৌরবেই ভাতুলনীয়। কবিত্ব বুঝাইবার বিষয় নহে, ভাবিবার বিষয়। যাহারা বৈষ্ণব-সাহিত্য আলোচনা করিনে, তঁাহারা বৈষ্ণব কবিদিগের অতুলনীয় চিত্রে ও তাহাদের ধর্ম শিক্ষায় অমনােযােগী হইতে কিছুতেই সক্ষম হইবেন না। * নিৰ্ম্মাল্য।
( •৯ ) চণ্ডীক্ষাস-চন্তি। আমরা কালিন্দী-উপকূলে বৃন্দাবনের কবি কল্পিত দৃশ্য কখনো দর্শন করি নাই ;-‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল- গো, আকুল করিল মাের প্রাণ বলিয়া কোনাে নামের প্রভাবে আমাদের হৃদয় বি-লিত হয় নাই। আমাদের হৃদয় অন্য উপা- দানে গঠিত, আমরা ইংরেজিতে শিক্ষিত, আমাদের অস্থি মজ্জাতে সাহেবিয়ানা, কাযেই আমরা বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের আলোচনা করিতে গিয়া নাসিকা কুঞ্চিত করি। বলি, অশ্লীলতা কি বৈষ্ণব সাহিত্যে, না আমাদের মনে? সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র লিখিয়াছেন,‘অশ্লীলতা সকল সভ্য সমাজেই ঘৃণিত। তবে, যেমন লোকের রুচি ভিন্ন ভিন্ন, তেমনি দেশ ভেদে ও রুচি ভিন্ন ভিন্ন প্রকার। এমন অনেক কথা আছে যাহা ইংরে জেরা অশ্লীল বিবেচনা করেন,আমরা করি না; আবার এমন অনেক কথা :ছে যাহা আমরা অশ্লীল বিবেচনা করি, ইংরে- জেরা করেন না। ইরেজের কাছে প্যানটালুন বা উরুদেশের নাম অশ্লীল,—ইরেজের মেয়ের কাছে সে নাম মুগে আনিতে নাই। আমরা ধুতি, পায়জামা বা উরু প্রভৃতি শব্দ গুলিকে অশ্লীল মনে করি না। মা, ভগিনী বা কন্যা কাহারাে সম্মুখে ঐ সকল কথা ব্যবহার করিতে অমাদিগের লজ্জা নাই। পক্ষা- স্তরে স্ত্রী পুরুষের মুখ চুম্বনটা আমাদের সমাজে অতি অশ্লীল ব্যপার। কিন্তু ইংরেজের চক্ষে উহ। অতি পবিত্র কাৰ্য্য মাতৃ পিতৃ সমক্ষেই উহা নিৰ্বাহ হইয়া থাকে। এখন আম- দের সৌভাগ; বা দুর্ভাগ্য ক্রমে, আমরা দেশী জিনিষ সকলই - চণ্ডীদা-চরিহ ( ১১০ ) হেয় বলিয়া পরিত্যাগ করিতেছি। বিলাতী জিনিষ সবই ভাল বলিয়া গ্রহণ করিতেছি। শিক্ষিত বাঙ্গালী এমনও আছেন, যে তাহাদের পরস্ত্রীর মুখ চুম্বনে আপত্তি নাই; কিন্তু পরস্ত্রীর অনাবৃত চরণ, আলতা পরা মলপরা পা! দর্শনে বিশেষ আপত্তি। ইহাতে আমরা যে কেবলই জিতিয়াছি, এমত নহে। একটা উদাহরণ দ্বারা বুঝাই। মেঘ দূতের একটা কবিতায় কালিদাস কোন পৰ্বত শৃঙ্গকে ধরণীর স্তন বলিয়া বর্ণনা করি- য়াছেন। ইহা বিলাতি রুচি বিরুদ্ধ। স্তন বিলাতি রুচি অনু- সারে অশ্লীল কথা, কাযেই এই উপমাটি নব্যের কাছে অশ্লীল। নব্যবাবু হয়ত ইহা শুনিয়া কানে আঙ্গুল দিয়া পরস্ত্রীর মুখ চুম্বন ও করস্পর্শের মহিমা কীর্তনে মনােযােগ দিবেন। কিন্তু অামি ভিন্ন রকম বুঝি ; আমি এই উপমার অর্থ এই ব বুঝি যে পৃথিবী আমাদিগের জনী, তাই তাকে ভক্তি ভাবে, স্নেহ করিয়া ‘মতি। বসুমতী” বলি; আমরা তাঁহার সন্তান ; সন্তা- নের চক্ষ, মাতৃস্তনের অপেক্ষা সুন্দর, পবিত, জগতে আর কিছুই নাই—থাকিতেও পারে না। ইহাতে যে অশ্লীলতা দেখে আমার বিবেচনায় তাহার চিত্তে পাপ চিন্তা ভিন্ন কোন বিশুদ্ধ ভাবের স্থান হয় না। কবিতা এখানে অশ্লীল নহে;—এখানে পাঠকের হৃদয় নরক। এখানে ইংরেজি রুচি বিশুদ্ধ নহে-- দেশী রুচিই বিশুদ্ধ।” কথাগুলি অক্ষরে অক্ষরে সত্য, চির- স্মৰণীয়। যাহারা বঙ্কিমচন্দ্রের এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারিবেন, তাহারাই যেন বৈষ্ণব সাহিত্যের মৰ্ম্মেঘা- টনে প্রবৃও হন, নতুবা বৈষ্ণব ধর্মের সুগভীর মন্ত্র তাহারা কোন দিনেও জানিতে পারিবেন না।
সপ্তম প্রস্তাব। ( অন্তকাল।) রাঢ় ও উৎকল রাজ্যের মধ্যবর্তী সুবিস্তৃত দেশকে মল্ল ভূমি বলিত। পূর্বকালে মল্লজাতি উহার অধীশ্বর ছিল। “বর্তমান মানভূমি, সিংহভূমি, শিখরভৃমি, শূরভূমি প্রভৃতি প্রাচীন কালে মন্নদেশের অন্তর্গত ছিল এবং মগণ দ্বারা অধুসিত ও শাসিত হইত। মান, সিংহ, বীর, শুর, বরা, ধল প্রভৃতি আধুনিক মল্লগণের উপাধি দেখিয়া ও তাহার উপলব্ধি হয়। মেগেস্থিনিস উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন যে, সমুদ্রের উপকূলে কলঙ্গি জাতির বাস ; তদুদ্ধে মণ্ড ও মল্লী, যাহাদিগের গঙ্গাতীর পর্যন্ত বিস্তৃত দেশে মলস নামক পৰ্ব্বত (Trag I. VI)। ইউল সাহেবের মতে মলস পৰ্বত বর্তমান দামােদর সন্নিকটবর্তী পরেশনাথগিরি ( Ind. Ant Vol vi P. 127)। ইহা পঞ্চকোটের শৈলমাল। ও সুনীয়ার পাহাড় হওয়া অসম্ভব নহে। পরেশ নাথ, পঞ্চকোট এবং সুশু- নীয়ার বর্তমান মল্লভূমির বহির্ভূত। সুতরাং মােগেস্থিনিসের সময় ভূমি প্রত্যয়ান্ত মন ভূমি, বীর ভূমি ইত্যাদি প্রদেশ সমূহ মলদেশের অন্তর্গত ছিল, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।” (১) (১) ঐতিহাসিক চিত্র।
চীফস-চুরি ( ১১২ ) ; বীরভূমের সর্ব প্রথম হিন্দু নরপতি—বীর সিংহ। ইনি খৃষ্টীং দ্বাদশ শতাব্দীতে ৯ীবিত ছিলেন। ঘণ্টার সাহেব বলেন যে , বীরসিংহ নিজ বাহুবলে বীরভূম বা{সদিগকে পরাজিত কাওয়া নিয়ে শাসনাধীনে আনয়ন করেন। রাজ্য দখল করার পর তিনি নিষ্কণ্টক হই৷ার অভিপ্রায়ে স্বীয় ভ্রাতাকে নিত্যজিত করিয়া রাজশক্তির পরিচয় স্বরূপ বীরসিংহ’ #গর প্রতিষ্ঠি • করেন । বীরসিংহ রাধাণীতে অভেদ্য দুর্গ, নন, রম প্রামাদ ; উপবন প্রভৃতি নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। শিউ- ড়ির তিন ক্রোশ পশ্চিমে সেই সকলের ভগ্নাবশেষ এখনো ধরণীর মূকবক্ষে পতিত পাকিয়া অতীত কীর্তির সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। জীবন ও সুখ ক্ষণস্থায়ী, অধিকন্তু চির দিন সমান থাকে না। বী সিহ এই শাশ্বতীনীতির অনুসরণ করিয়া মােসলমান সংগ্রামে প্রবৃত্ত হন এবং স্বীয় অমূল্য বন ডালি দিয়া রণক্ষেত্রে অনন্ত নিদ্রায় নিদ্রিত হন। তাঁহার পত্নী যবনের অপবিত্র সংস্পর্শে কলুষিত হইবার আশঙ্কায় সরােবর-নীরে আত্মবিসর্জন দিয়া পতির অনুগমন করতঃ হিন্দু সতীর কর্তব্য পালন করেন। এই সরোবর অদ্যাপি বিদ্যমান আছে, আজিও লােক উহাকে ‘রাণীদহ’ বলিয়া থাকে। বীর- সিংহ বলধানীর অনতিদূরে কাননভান্তরে গোপাল নামক দেব-মূর্তি এবং উক্ত বিগ্রহের চতুঃপার্শ্বে পুৰাণ বণিত বৃন্দাবন কুঞ্জের ন্যায় একটী কুঞ্জ রচনা করিয়াছিলেন। ও কুঞ্জে নাম বৃন্দাবন’ ছিল । আজি ও উহা দীন দশায় অবস্থান করিতেছে।
( ১১৩ ) চণ্ডীদাস-বিত। 4 হন। তৎপর চণ্ডীদাসের সময় অর্থাৎ খ্ৰীষ্টিয় চতুর্দশ শতাব্দীতে বীরভূমি মগধ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। বিদ্যাপতির নানুর ত্যাগের পর হইতে চণ্ডীদাস জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া অন্য কোথাও গিয়াছিলেন কি না তাহা জানা যায় না। স্ত্রী যুক্ত রমণীমােহন মল্লিক মহাশয় লিখিয়াছেন, ‘চণ্ডীদাস জীবনের শেষ দশায় এনামন ধামে গমন করিয়া সেখানেই সমাধিস্থ আজ পর্যন্ত তাহা সমাধি বৃন্দাবনে বিদ্যমান আছে জানিতে পারা যায়। রামমণিও ঐ পথ অনুসরণ করেন। মল্লিক মহাশয়ের একথা কতদূর বিশ্বাস করা যায় তাহা পাঠকগণ বিবেচনা করিবেন। চণ্ডীদাসের পদাবলীর কোনােস্থানে তাহার বৃন্দাবন বাসের কথা দেখা যায় না। ইহার পরেই রমণী বাবু লিখিয়াছেন, ‘ চণ্ডীদাস নানুরের নিকটবর্তী মতিপুর কীৰ্ত্তন করতে গিয়াছিলেন তথায় নাট- মদির গতিত হওয়ার তাহার ও রামমণির মৃত্যু হত্ন। উল্লিখিত ঘটনা গুলি কিন্তু বিশ্বাস যোগ্য নহে। আমাদের নিকট এই ঘটনাগুলিই সত্য বলিয়া বােধ হয়। চণ্ডীদাস বৃন্দাবনে দেহ ত্যাগ করেন, শুনিতে পাইয়। রমণী বাবু, তঁহাকে বৃন্দাবনে সমাধিস্থ করিয়াছেন। আমার বিশ্বাস চণ্ডীদাস পূৰ্বোল্লিখিত রাজা বীরসিংহ স্থাপিত বৃন্দাবনে’ সমাধি মগ্ন হন। বীরন্থ লোর কীণহা হইতে প্রকাশিত বীরভৃমি পত্রিকায় প্রকাশ যে, বীরভূমি কার্যালয়ের তানতি দূরে একটী প্রকাণ্ড ইষ্টক স্তুপ অাছে। তাহার শিরােদেণে নানা ০, চণ্ডীদাস-চবিভ ( ১১৪ ) জাতীয় বৃক্ষলতা অপূর্ব শােভা বিস্তার করিতেছে । স্তুরে পাদদেশে একটা বৈরাগীর আশ্রম । প্রবাদ এই যে, চণ্ডীদাস গান করিতে করিতে মন্দির পতনে ঐস্থানেই সমাহিত হন। লােকে ঐ আশ্রমকে ‘চণ্ডীদাসের আখড়া’ বলিয়া থাকে। মূলে কিছু সত্য নিহিত আছে, কেন না ''নহ মূল। জন শ্রুতি”। চণ্ডীদাস সম্বন্ধে কবি গােবিন্দাস লিখিয়াছেন, চণ্ডীদাস চরণ, চিন্তামণিগণ, শিরে করি সৃষা। শরণাগত জনে, চীন আকিঞ্চনে, করুণা করি পুরব আশা। হরি হরি তব মঝু অকুশল যাব। রসিক মুকুটমণি, প্রেম -ধনেহি ধনী, কৃপা নিরমিল যৰ পাস। ধু। হৃদয় শুপি মােহে, ঐছে প্রবোধিস, যৈছে ঘুচয়ে উঁধিয়ার । শ্যামের গেরি, বিলাস রস কিঞ্চিত, মঝু চিতে করু গরচার। দুইক চরিত, বদন ভরি গাওস, রসিক ভকতগণ পাশ । ক্ষম অপরাধ, সাপ নয় পূরহ, ঋহে দীন গােবিন্দ দাস। চণ্ডীদাসের আদর যে এই কালে হইয়াছে, তাহা নহে ভৎ- কালেও তিনি যশঃ সনে মণ্ডিত হইর!ছিলেন এবং তিনি যে কেবল কবিতাই লিখিতেন তাহা নহে, fণ গদ্যে ও পুস্তক দি লিখিয়াছেন । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ভাহার কোন গদ্য পুস্তক আমাদের দৃষ্টির অধিকারে আসে নাই। জয়দেব কবি নৃপাত শিরোমণি বিদ্যাপতি রাখা। জয় জয় চণ্ডীদাস রণশেখর অখিল ভুবনে পান যা কর রচিত মধুর রস নিবমল গদ্য পাস শীত। প্রভু মোর গৌরচন্দ্র আস্বাদল রায় স্বর্গ সহিত । বৈষ্ণব দাস।
( ১১৫ ) চণ্ডীদাস-চরিত ইহাতে জানা যায় চণ্ডীদাস গদ্য পদ্যময় গীত রচনা করিয়া- ছিলেন, কিন্তু গদ্য পদ্যময় গীত কিরূপ তাহা বুঝিতে পারা যায় না। ন্যায়রত্ন মহাশয় লিখিয়াছেন, 'বৈষ্ণবদাসের ও লেখার উপর আস্থা স্থাপন করা হয়না। বিশেষতঃ ইহা এক সাধারণ নিয়ম বলিয়া বোধ হয় ,য, সকল দেশেই গদ্যের পূর্বে পদাই গম রচিত হয়। গ্রী:দশে তিন আকিয়, মিউ জিয়ম্ কােমর এবং ইটালী ভাগ, রে!মে লিবিয়ন পভৃতি কবিগণ সৰ্ব্বপ্রথমে পদ্যেই রচনা করিয়াছিলেন। সংস্কৃতেও বেদ, * সংহিতা, রামায়ণ প্রভৃতি পদ্য গ্রন্থের প্রম সৃষ্টি হয় অতএব বাঙ্গালাতে সে, সে নিয়মের ব্যভিচার হইবে, তাহার কোন কারণ ন ই। পদের মধ্যেও গীতই প্রথমে রচিত হয়। লােকে চি বিনোদনার্গ গরসংযোগে গান গাইতে গাবুব হইয়াই কবিত্ব শক্তির প্রথম অঙ্কুর রােপন করে। এই সকল গান প্রথমতঃ লিপিবদ্ধ থাকে না--বহুকাল পর্যন্ত জনগণ রসনালীই থাকে । গরে ক্রমশঃ লিপিবদ্ধ হইতে আরম্ভ হয়। পূর্বোক্ত লিন হেমারাদির রচনা এবং বেদ রামায়ণাদি সকলই উপ গীতায় । * এস বাঙ্গালার আদ্যকালে পূর্বোক্ত কবি দ্বয়ের অথবা তাদৃশ অন্য কোন কবির গীতময় রচনাই যে, প্রথমে প্রকাশিত হইবে, তাহাই সম্ভবপর শােধ হয়। ন্যায়রত্ন মহাশয়ের মত সমীচীন বলিয়াই মনে হয়। বঙ্গ- সাহিত্যের প্রথমাবস্থায় কাব্যেরই প্রাদুর্ভাব ছিল। শৈশবে গদ্য রচনা সম্ভবপর নহে। বৈষ্ণবদাস অতিরিক্ত মাত্রায় স্তুতি করিতে গিয়া ঐরূপ প্রশংসা কীর্তন করিয়াছেন। ‘বেদকে আপাততঃ গদ্য বলিয়া বােধ হয়, কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। উহাতে এক প্রকার ছন্দ আছে এবং উদাও, তনুদা, স্বরিত নামক তিন স্তরের দ্বারা উহা উচারিত হয়, অতএব উহাও পদ্য ও গীত গ্রন্থ মধ্যে পরি- গণিত।'--বাঙ্গলা ভাষা ও বাঙ্গলা সাহিত্য।
চণ্ডীদাস-চরিত । ( ১১৬ ) AAMAN যাহা হউক চণ্ডীদাস গীত রচনা করিয়া যে, কেবল স্বগ্রাম- বাসীগণেরই কর্ণের তৃপ্তি সাধন করিতেন তাহা নহে, তিনি সখের পলা বাঁধিয়। স্থানে স্থানে গান গাহিয়া বেড়াইতেন। তাঁহার স্বর যে সুমিষ্ট ছিল, তাহা আমরা পূর্বেই লিখিয়াছি। রামমণিও তাহার সঙ্গে থাকিতেন, তিনিও সঙ্গীত বিদ্যায় অপটু ছিলেন না। রামমণি নিজে সঙ্গীত রচনা করিতে ও গাহিতে পারিতেন। আমরা ইতিপূর্বে রামমণির রচিত একটা পদো- দ্রুত করিয়াছি। চণ্ডীদাসই যে সর্ব প্রথম সখের দলবাধিয়া গান গাহিয়া বেড়াইতেন, এরূপ অনুমান করা নিরাপদ নহে। তিনি রাধা কৃষ্ণলীলার আদি প্রণেত হইতে পারেন কিন্তু তাই বলিয়া তিনি প্রথম গায়ক কিম্বা সঙ্গীতের সৃষ্টি কৰ্ত্তা নহেন। তাহার পূৰ্বেও ভারতবর্ষে বঙ্গ ভাযায় না (উক, দেব ভাষায় সঙ্গীতের প্রচলন ছিল, যথা সাগবে। এবং বত্তমান সময়ে হারমণি, কাউন্টারপইন্ট প্রভৃতি যে সকল বিচিত্র ব্যাপার সৃষ্ট হই- য়াছে, তাহাও প্রকার ভেদে বিদ্যমান ছিল। 'It is true that Hindu music abounds in melody but it is not void of harmony. The following quntation from Narada's work will best explain our meaning' গানস্থ দশবিধগুণ বৃত্তি শুদ যথা, রক্ত পূর্ণ যতং প্রসন্ন ব্যপ্তং বিকুষ্ঠুং শ্লং সমং সুকুমারং মধুরমিতি গুণা। তত্র রং নাম রেণুবীণাদি ঘরানামেকীব রক্ত মিত্যুচ্যতে ।
( ১১৭ )
চণ্ডীদাস-চৰিত ।
an"।
Aft
AAAAAAC, F
সৃষ্টিকার
But of all.o them are not to our present purpose : only
serves onr purpose well, and its defination is as follows: jos is
that which is produced by a combination of the sounds o all
stringed instruments, wind instruments, and those of other kinds
This is harmony: (১)
এদেশী সঙ্গীতের উৎপত্তির কারণ
অনুসন্ধান করিতে যাওয়া বুিদ্ধিতার পরিচায়ক। পুরাণাদি
পাঠে অবগত হওয়া যায় যে, দেবাদিদেব মহাদেব সব প্রথম
সঙ্গীত সৃষ্টি করিয়া প্রজাপতি ব্রহ্মাকে শিক্ষা দেন। তিনি
আর নারদ ঋষিকে শিখান, এইরূপে ক্রমে ক্রমে সঙ্গীতের
প্রচলন হয়। পুরাণের সকল কথা বিশ্বাস করিতে হইলে,
একথাও বিশ্বাস না করিয়া গত্যন্তর নাই। কিন্তু মহাদেব
সৃষ্টিকর্তা হইলেও, তিনি কিম্বা তাহার শিষ্য প্রশিষ্য দ্বারা
তাহার উৎকর্ষত, সংধিত হয় নাই। মােসলান নরপতিগণের
সময়েই সঙ্গীত পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
চণ্ডীদাসের পূর্বে মাজ্জিত ভাষায় রাধা কৃষ্ণ লীলা বিষয়ক
সংগীতাদি না থাকিলেও, আমাদের দেশের নিরক্ষর কৃষক
গণ ক্ষেত্রে কাৰ্য করিতে যাইবার সময় স্কন্ধদেশে হল লইয়া
ও এক হস্ত দ্বারা বলবর্দীর লাঙ্গুল ধৃতকয়াি মনের আনন্দে
গ্রাম্যসঙ্গীতাদি গাহিতে গাহিতে যাহত এবং দম রাত্রিতে
স্রোতস্বিনীবক্ষে তরণী ভাসাইয়া মাঝিগণ সে অন উপভােগ
Patriot, ,
(১) সঙ্গীতদর্পন ad অদ্ভূত রামায়ণ । (vide Hindu
7th Sep 1894-Qroled by Vaba Pravu,
চণ্ডীদাস-চুদি ( ১১৮ ) + + , vA www, vvvvv ৫ করিতে পশ্চাৎপদ ছিল না। এই সকল সঙ্গীতই বাংলার আদি সঙ্গীত। ইহাতে ভিন্ন সমাজের আচার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। 'I think most Europeans who take the whole trouble to compare them (i.e boatman's songs ) with the best specimens in Sangit Sara ( 779 712 ) etc will readily credit my Statement in my letter of 17th May 1875 (addressed to the director of Public Intruction ) viz, that while all Hindu musiciaus speak with contempt and almost abhorrance of the boatman's songs. I have heard many Europeans declare that the boatman's chants are the only muric in Bengal that can properly be called music.' (Ⓡ) যাহা হােক এখন ছন্দ ও ভাষা সম্বন্ধে দুই একটা কথা লিখিয়া, এই প্রস্তাব শেষ করি। চণ্ডীদাস কেবল পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দ ব্যবহার করিয়াছেন। বৰ্ত্তমান সময়ের ন্যায় তিনি অক্ষর গুণিয়া কবিতা রচনা করেন নাই বা মিলের দিকেও দৃষ্টি রাখেন নাই! স্বরের মিঠুতার জন্য তিনি আবশ্যক মত পদ দীর্ঘ বা হ্র করিয়াছেন এং সুবিধা জনক স্থানে যতি দিয়াছেন। চণ্ডীদাস অনেকটা ও মদেবের অনুকরণে পয়ার ও ত্রিপদী লিখিয়াছেন । ত্রিপদী সংস্ক ত কথা, উহার নিটিী করিয়া পদ থাকে। “পয়ার এই শব্দটী কোথা হইতে উৎপন্ন হইয়াছে, তাহা নিশ্চয়রূপে বলিতে পার। { by (3) Calcutta Review ---Mr. C. B. Clarke, Quoted Nabaprava, , ( ১১৯ ) চণ্ডীদাস-চবিত যায় না, কিন্তু বোধ হয় ‘পাদ’ শব্দের অপভ্রংশে পায়া বা পয়া শব্দ উৎপন্ন হয়,—যথা সেপায়া, খাটের পায়া ইত্যাদি। ঐ পায়। হইতেই পয়ার শব্দ সঙ্কলিত হইয়াছে, অতএ। পয়ার শব্দের অক্ষর পদ (চরণ) বিশিষ্ট। ক্রমশ: উহা নির্দিষ্টকাপে ছন্দোবোধর্থ যােগরূঢ় হইয়া উঠিয়াছে। (৩) চণ্ডীদাস খুব সম্ভবতঃ ১৩০৮-১৫শকের মধ্যে পরলােক গমন করেন। লােকে বীরভূমেরকীর্ণ হরের নিকট তঁাহার সমাধি নির্দেশ করিয়া থাকেন। চণ্ডীদাসের কবিত্ব অতুলনীয় ছিল। কবি প্রসাদ দাস লিখিয়াছেন, কিবা অপরূপ, কবিতা মাধুরী, অখির পিরীতি মাখা। অাময়। ছানিয়া, দিল বিতরিয়া, অনুপ বচন ভাখা। বরজ যুগল, পিরীতির খনি, সে মুখ শরদ শশি । কবিতা পঠনে, হেন লয় মনে, চিত যায় যেন খসি। বাশুলী আদেশে, যুগল পিরীতি, গাইল। সে কবি চন্দ। রস কবিকুল, মত্ত মধু কর, পিয়ে ঘন মকরন। নিতাই আদেশে, পরসাদ দাসে, গাইবে ব্ৰ বিলাস। চরণ সরোজে, শরণ লইনু, সফল করহ আশ । কবি কানুদাস লিখিয়াছেন, কবিকূলে রবি, চণ্ডীদাস কবি, ভাবুকে ভাবুক মণি। রসিকে রসিক, প্রেমিক প্রেমিক, সাধকে সাধক গণি॥ উজ্জল কবিত্ব, ভাষার লালিত্য, ভুবনে নাকি হেন। হৃদে ভাব উঠে, মুখে ভাষা ফুটে, উভস অধীন যেন। সরল তরল, রচনা প্রাঞ্জল, প্রসাদ গুণেতে ভরা। যেই পশে কাণে সেই লাগে প্রাণে, গুনমাত্র আত্মহারা । রামতার। ধনী, রাপা স্বরূপিণী, ইষ্টবস্তু যার হয় । যাহার দরশে, চণ্ডা রসে ভাসে, কবিতার স্রোত বয় ॥ হয় নাই কেন, না হইসে পূনঃ, (হন রসদ ভবে। দীন কানুদাসে, রাখ পদ পাশে, নামের ঘাষণা রবে । (৩) বাঙ্গলা সাহিত্য।
অইন প্রস্তাব। ( নানাকথা।) ১৩০৯ সালের শ্রাবণ মাসের ‘বীরভ মি’ পত্রিকায় ‘চণ্ডী- দাসের জন্মস্থান কোথায় ছিল ? বলিয়া একটা ক্ষুদ্র মন্তব্য প্রকাশিত হয়। তাহাতে লিখিত ছিল, “সকলেই জানেন, টণ্ডীদাস বীরভূম জেলার অন্তর্গত নানুর গ্রামে বাস করতেন। নানুর যে তাহার বাসস্থান, এ সম্বন্ধে মতদ্বৈপ হইতে পারে না, ইহা তাহার পদ হইতেই প্রমাণ হইতেছে। তবে নানুর যে তাহার ন্মস্থান ছিল, একথাও কেহ নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারেন না। কেন না, একথার কোন বিশিষ্ট প্রমাণ নাই। চণ্ডীদাসের জ্ঞাতি কি কুটুম্ব কেহ নানুরে নাই । চণ্ডীদাস কোন্ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন, তা কেহ বলিতে পারেন না। এরূপ অবস্থায় তঁাহার জন্মস্থান সম্বন্ধে যদি কোন কথা শুনতে পাওয়া যায়, তাহা হইলে সহজেই তাহা সম্ভস বলিয়া বােধ হয় । একজন মিথিলা দেশবাসী গণ্ডিত মধ্যে মধ্যে কীৰ্ণহারে অাসিয়া থাকেন। তিনি বলেন, চণ্ডীদাস মিথিলা- বাগী ছিলেন। মজঃফরপুর জেলায় উচ্চৈট, গ্রাম তাহার জন্মস্থান ছিল। তথায় তাহার জ্ঞাতিবর্গ এখন রহিয়াছে। তাহার পিতা ও জ্যেষ্ঠভ্রাতা সুপণ্ডিত ছিলেন। চণ্ডীদাস কিন্তু মুখ ছিলেন। এই জন্য তিনি সময়ে সময়ে ঞ্ছিত হইতেন। একদিন অতিমাত্রায় লাঞ্ছিত হওয়ায় তিনি সরস্বতীর আরাধনা করিয়া সিদ্ধিলাভ করেন। ক্রমে চণ্ডীদাস অসাধারণ পণ্ডিত হয়েন। কিছু দিন পরে তিনি পুরুষোত্তম যাত্রা করেন। আর দেশে ফিরি- লেন না। মিখাৰু বৰ্তমান লেকে চণ্ডীদাস সম্বন্ধে এই পর্যন্ত জানে।
( ১২১ ) চণ্ডীদাস-চরিত! ** * * তাহারা জানে না। তাহ র পর তিনি যে মধুর সঙ্গীতে বঙ্গদেশ মাতাইয়া তুলিয়াছিলেন, তাহা তাহারা না জানুক, তাহাদের পূর্ব পুরুষগণ যে জানিতেন, তাহার অব নেদহ নাই। না জানিলে চণ্ডীদাসের স্মৃতি মিথিলা হইতে বিলুপ্ত হইত। পাত্যে লােক তামর হয় না, কবিত্ব হয়। তবে এক কথা এই উঠিত পারে, চণ্ডীদাস যদি মিথিলবাসী হইলেন, তবে তঁাহার পদাবলী বিশুদ্ধ বাঙ্গালায় রচিত কেন ? একথার ছ জ উমর এই চণ্ডীদাস বহু দিন এদেশে থাকিয়া বাঙ্গালী ইয়া গিয়াছিলেন, সুতরাং তিন যে বাঙ্গাশীর বােধগম্য ভাষায় কবিতা রচনা কৰিপেন, ইহা স্বাভাবিক। আমরা আজ এই পৰ্য্যস্ত লিশিয়া নিরস্ত কম। মন কথাটা উঠিল, তখন সুধীমণ্ডলীর কম্য ইহার সত্যাসত্য নিদ্ধারণ করা।” ইহার পর অর দুই এক সংখ্যার বীরভূমি তমার হস্তগত হইয়াছে তাহার পর আর হয় নাই, সম্ভবতঃ পত্রিকা খানি উওর। গিয়াছে, কাবেই চওঁদাম সম্বন্ধে আর কোনো কথা উহাতে আলোচিত হয় নাই। পূর্বোক্ত মিহলা-পণ্ডিতের এই উক্তি বিশ্বাস করিতে হইলে সর্ব প্রথম আমাদিগকে উচ্চৈট, গ্রামে যাইতে হয় কিন্তু তথায় যাইয়াও বিশেষ কোনো ফল হয় নাই। তদ্দেশ- বাসীগণ চণ্ডীদাস নমথেয় এক কবিকে তাহাদের দেশে টানিয়া আনে বটে কিন্তু নানুরের কপিই তে সেই, তাহা তাহার সাহস করিয়া বলিতে পারে না। সুতরাং আমরা চণ্ডীদাসকে মিলি বাগী বলিয়। শীকার করতে সম্পূর্ণ নারাজ। গিল। বাসা কেহ কেহ যে চণ্ডীদাসকে তাহাদের স্বজাতীয় ও স্বদেশী কবি বলির। প্রকাশ করে তাহার কারণ, চণ্ডীদাসের P.
চণ্ডীদাস-চরিত।
( ১২২ )
অলৌকিক কবিত্ব-গৌরব। চণ্ডীদাসের ন্যায় কবি যে দেশে ও
যে জাতিভে আবির্ভূত হন, সে দেশ ও সে জাতি ধন্য। বাঙালীর
গৌরবকরিবার কি আছে? আছে কেবল ‘কবিরাজ-রাজি মুকুট।-
শৎকার হীরক স্বরূপ ’ কয়জন বৈষ্ণব গীতি কাব্যকার। ইহা
দিগকে বঙ্গবাসী কিছুতেই ত্যাগ করিতে পারে না, ইহারা
তাহাদের হৃদয় আড়াইয়া বসিয়া আছে।
জয়দেবের পূর্ব হইতে বঙ্গ দেশে যে বিশ্ব-জননী প্রেম ও
ভাতৃভাবের অঙ্কুর হইয়াছিল, নিমাই চঁাদের সময় তাহাই
দেশময় ছড়াইয়া পড়ে। শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের বহু দিন
পূর্ব হইতে বঙ্গবাসীর হৃদয়-কদরে বৈষ্ণবীয় প্রেম ও ভক্তি
সঞ্জাত হইয়াছিল, রাধা কৃষ্ণ লীলা গীতিতে গৌড় জনের
চিত্ত-ক্ষেত্র কৃষ্ণ-প্রেম বারিতে অভিষিক্ত হইয়াছিল। চণ্ডীদাস
সেই মধুর লীলা স্তরভেদে বর্ণন করিয়াছেন। এক্ষণে আমরা
সেই স্তরের প্রকার ভেদ বিশ্লেষণ করিতে চেষ্টা পাইব।
চণ্ডীদাসের পদাবলী নিম্ন লিখিত রূপে বিভক্ত করা
যাইতে পারে।
(১) ভাব ;-সংস্কৃত সাহিত্যে ভাবের অর্থ এইরূপ করা
হইয়াছে ।
শুদ্ধ সত্ব বিশেষত্মা প্রেম সূৰ্যাংশু সাম্যডাক্।
কচি ভিশ্চিত্ত মসৃণ্য হৃদসৌভাব উচ্যতে ।
( ১২৩ )
চাঙ্গাস-চরিত।
প্রেম সূর্যের রশ্মি রূপ শুদ্ধ স্বত্ব বিশেষের সার যাহার স্বরূপ, রুচি এবং সোহৃন্দ
দার। চিহের প্রশস্ততা সম্পাদক যে ভাব বা ভক্তি তাহাকেই ভাব বলা যায় ৪
যথা,
আজু কে গো মুরলী বাজায়।
এত কভু হে শ্যাম রায়।
ইহার গোব বরণ করে আলা ।
চুটী বাধিয়া কেবা দিল।। ইত্যাদি। (চণ্ডীদাস ॥
(২) রাগ
দুঃখ প্যধিক চিন্তে সুত্বেসৈবরজ্যতে।
যত প্রণয়ােৎকৰ্ষাৎ ল র ইতি কীত্ত্যতে।
যে এণয়ের উৎকর্ষ হেতু সমধিক দুঃখ যাহা চিত্তে সুৰ উৎপাদন করে তাহাকে
রাগ কহে। ৪
বৈষ্ণব সাহিত্যে পূর্ব রাগেই আধিক্য। উহা আবার
দুই প্রকার,--নায়িকার পূর্বরাগ ও নায়কের পূর্বরাগ।
কৃষ্ণের গুণ শ্রবণ করিয়া মিশনের পূর্বে রাধিকার হৃদয়ে যে
ভাবের উদয় হইয়াছিল, তাহাকে নায়িকার পূর্বরাগ বলে
এবং এই প্রকারে কৃষ্ণের হৃদয়ে যে ভাবের উৎপত্তি হইয়াছিল
তাহাকে নায়কের পূর্বরাগ বলে।
সঙ্গমের পূর্বে যেই দেখিয়া শুনিয়া।
জনয়ে রাগ লাভ হৃদয়ে পশিয়া।
সেই পূধ্ব রাগ x
ভক্তমাল।
মৎসম্পাদিত এ অদ্বৈত মঙ্গল।
চণ্ডীদাস-চরিত ।
( ১২৪ )
‘সই কে বা শুনাইল শ্যাম নাম’-নায়িকার পূর্পরাগ এবং
গির বিজুরি, বদনা গৌৰী, পেখমু ঘাটের কূলে।
কানভু। ছাদে, কবরী বান্ধে, নব মলিকার শাল।
সই মরম কহিনু তেরে।
ইত্যাদি নায়কের পূর্বরাগ।
(৩) অনুরাগ
সদানুভূতমপি যঃ ঈর্ষাসনবং প্রিয়ং।
রাণতন্ননবঃ সোহনুরাগ তীর্যতে।
যে রাগ বদ্ধিত হইয়া প্রিয় বন্ধুকে নিত্য নতুনভাবে অনুভব করায় তাহাকে
1
নুরাগ বলে।
অনুরাগও নায়ক নায়িকা ভেদে দ্বিবিধ। নায়িকা কখনাে
সখী সম্বোধনে অনুরাগ প্রকাশ করিয়াছেন, কখনো আতু প্রতি
অনুরাগ প্রকাশ করিয়াছেন ।
সুখের লাগিয়া, এ ঘর খা,ি আগুণে পুড়িয়া গেল।
অমিয়া সারে, মিনান করিতে, সকল গরল ভো।
সব ! কি মোর কপালে লেখি ইত্যাদি
সখী সম্বোধনে নায়িকার পূর্বরাগ এবং
কালিয়া কালিয়া, বলিয়া বালা, জনম বিফ পাই।
হিয়া দগদাগ, পরাণ পোড়ন, ‘মনের অনলে গৈ ।
ইত্যাদি পদে আত্ম প্রতি অনুরাগ কাশ পাইয়াছে।
(৪) প্রেমবৈচিত্ত;--
সথা ধবংস রহিতং সত্যপি ধ্বংস কারণে।
যাব বন্ধনংহ্যানো: সপ্ৰেমপরিকীৰ্ত্তিতঃ ।
বাহার ধ্বংসের কারণ থাকিলে ধ্বংস হয় না, এইরূপ ভাববন্ধনকে প্রেম বলে।
( ১২৫ ) চণ্ডীদাস- চত। - । AAA A A = = = AN ] প্রিয়র নিকটে বাস প্রেময়ী পনী । লেমের বিহবল প্রিয় কোথা; মনে ণ ি॥ চৌদিকে নেহারি কান্দে হ'শে। প্ৰেম বৈচিত্ত ইহ হেরি রি হাসে। উত্তশাল। প্রিয়তমের নিকটে বলিয়া ধণী মহুবলা হইয়া প্রিয়- তমকে দেখতে পায় না এবং বিরহ অতু খুব কায়া ঢাণিদিকে ছল ছল দৃষ্টিতে চায়, এই ভাবকে প্র-পৈচিও কহে। যথা- সুখের লাগিয়া, পিরীতি করিনু, শ্যাম বন্ধুর সনে। পারণামে এত, দুঃখ হবে বলে, কোন্ অভাগিনী জানে। সই পিরীতি বিনম মানি। ইত্যাদি । (চণ্ডীদাস) (৫) বাসক সঞ্জ। ;- প্রিয়ার সহিত বিলাসের ন্যাশা করি। গৃহশয্যা মাল তাল । বারি । চন্দনাদি মাল। গন্ধ বসন ভূষণ। সাজায কারয় সাধ প্রিয়ার কারণ। প্রিয়তমের সহিত বিলাসের নিমিত্ত মিলনের পূৰে শয্যা মাল্য. তাম্বুল প্রভৃতি সজ্জিত কাযা রাখাকে বাসক সজ্জা বলে। যথা- রাধিকা আদেশে, মমের হবযে, কুসুন রচনা করে । মল্লিকা মালতী, আর জাতি যূথ, সাজাইছে থরে থরে । অঙ্গ রচয়ে বাসক শেদ। ( চণ্ডীগ।) (৬) বিপ্রলব্ধ ;- সখীর আশ্বাসে ধনী স্থির করি মন। প্রিয় আগমন পথ কার নিরীক্ষণ ও
চণ্ডীদা-চবিহ
( ১২৬ )
বৃক্ষের পত্রে পত্রে যদি শব্দ হয়।
এই আইসে প্রিয় বলি উঠি। বৈঠয় ।
দূতী পাঠায়া দিলা প্রিয়ার কারণে।
ফিরিয়া আইলা দূতী বজ্ৰ হেন মানে।
এইরূপ বিচ্ছেদ বিষাদে নিশি যায়।
ভাগ।
প্রিয়তমের আগমন পথ চাহিয়া আছেন, কৈ তিনিত
আসিতেছেন না? একটু বায়ু বহিলে, একটু পত্রের শন্ শ
শব্দ হইলে ভাবেন, ঐ বুঝি তিনি আসিতেছেন ? কিন্তু
বৃথা আশা ! প্রিয়তমের অনুসন্ধানের নিমিত্ত সখী পাঠাইলেন,
সেও বিফল মনােরথ হইয়া প্রত্যাবৃত্ত হইল। বিরহের এই
অংস্থাকে বিপলব্ধ বলে। যথা,-
দুকান পাতিয়া, ছিল এতক্ষণ, বঁধু পথ পানে চাই।
পরভাত নিশি, দেখিয়া অমনি, চমকি উঠিল রাই।
পাতায় পাতায়, পড়িছে শিশির, সণীরে কহিছে ধনী।
বাহির হইয়া, দেখলো সজনি, বঁধুর শবদ শুনি।
পুন কহে রাই, না আসিল বঁধু, মরমে বহল ব্যথা।
কি বুদ্ধি কারব, পাষাণে ধরিয়া, ভাগিব আপন মাথা।
( চণ্ডীদাস। )
৭) খণ্ডিত ;-
অন্য নায়িকা ভোগ করিয়া নায়ক।
আইসে অঙ্গেতে নখ চিহ্লাদি যাবক।
দেখিয়া কুপিত মনে ভৎসনাদি করি ।
উপেক্ষা করখেণ্ডিতা বৰ্ণতা নারী। ভক্তমাল।
( ১২৭ ) চণ্ডীদাস চাপ , va - নায়ক অন্য নায়িকার সহিত বিহার করিয়। অঙ্গে খত চিহ্ন দি লইয়। উপস্থিত হইলে, নায়িকা খণ্ডিতা ভাবে নায়ককে উপেক্ষা ও ভৎসনা করিয়া থাকে। যথা- ছুইও না ছুইও না বন্ধু ঐখানে থাক। মুকুর লইয়া চাদমুখ খানি দেখ। নানের কাজর, বয়ানে লেগেছে, কালর উপরে কাল । প্রভাতে উঠিয়া, ও মুখ দেখিলাম, দিন যাবে আজ ভাল ! (৮) কলহান্তরিতা ;- মান অন্তে বিয়ের বিচ্ছেদে যে সূচন। অনুতাপে সেই কলহস্তরিতার লক্ষণ। মানভরে প্রিয়তমাকে তাড়াইয়া পশ্চাৎ অনুতপ্ত হওয়া ও সণীকে তিরস্কার করাকে কলহন্তারতা কহে। যথা,- আসিয়া নাগর, সমুখে দাড়াইল, গলে পীতবাস লৈয়া । সে চান্দ বদনে, ফিয়ি না চাহলি, তাে বড় নিঠুর মায়া ॥ সো শ্যাম নাগর, গত দুল্ল ভ, কিসের অভাব তার। তােম। হেন কত, কুলবতী সতী, দাসী হইয়াছে যার। ( চণ্ডীদাস।) (৯) প্রবাস - প্রিয়সী ছাড়িয়া প্রিয় দু দেশে যায় । তাহাকেই রীত এই প্ৰশাস কহয় । ( ভক্তমাল ।) প্রিয়তমাকে ত্যাগ করিয়া প্রিয়তমের দূর দেশে যাওয়াকে প্রবাস বলে। যথা, কৃষ্ণের মথুরা ও দ্বারকা বাস। রাধিকার তৎকালীন অবস্থা ভাবিয়া কবি অনেকগুলি পদ রচনা করিয়া- ছেন। একটীর কিয়দ্দংশ, সখিরে, বরষ শহিয়া গেল, সসস্ত আঃল, ফুটল মাধবী লতা। কুহু কুহু করি, কোকিল কুহরে, গুঞ্জরে ভ্রমরী যত। -
সি শ্রীদাস-বিত
।
( ১২৮ )
আমার মাথার কেশ, সুচারু অঙ্গর বেশ, গিয়া যদি মথুরা রহিল।
ই নয় 10, রশ রতন পা, কাচের সমান ভেল।
(১১) মধুর ;-- প্রবাসে প্রিয়তমের অনুসন্ধানকে
মাগুর বলে।
।
হে কুবুম্বার বন্ধু ।
পাসছে রাত-মুখ-লু।
হে পাগধারী।
পাবেছ নবীন কিশােরী।
রাই পাঠাল মােরে ।
দ। সখ ত দেখাবার তরে,
& রাধিক। নায়কের অন্বেষণে র্থী পাঠাইয়াছেন। সর্থী
খুজতে খুঁজতে থুরা যাইয়া কুনুজার’ ঘরে নাগরকে
পাই: লন।
নায়ক নায়িকাকে পূর্বে যে দাস খত লিখিয়া
দিয়াছিলেন, সখী তাহাই দেখিতে চাহিলেন। माम ত
খানি এই,
ইয়াদ্দিকি, গুণ সমুদ্র শত সাধু শ্রীরাধা।
সছুদার চরিত তস্য পূবাই মন সাধা।
তস্য খাতক হরিনায়ক বসত ব্ৰজপুরি।
কষ্য কর পত্র মিদং লিখলাম সুকুমার ।
ইহাব সভ্য পাইবা ভব্য বাঞ্ছা তিন করিয়া ।
সদ সমে ৩ শাধ করিব সব কলিযুগ ভরিয়া
এই করে রাই তােমারে খত দিলাম লিখ।
লালতাদি মুঞ্জর সখী রইল ইহাতে সাক্ষী ॥
(১১) ভাব-সন্মিন। বহুদিনের বিচ্ছেদ পর নায়ক
নায়িকার মিলনকে ভাব- সম্মিলন বলা যায়। ভাব-সম্মিলনের
( ১২৯ }
চণ্ডীদাস-চরিত।
, ২ । "
= ১
৭। 1,1P4 0 1
পদ পূর্বে আমরা অনেক গুলি উদ্ধৃত করিয়াছি, সুতরাং
এখানে আর উদ্ধত হইল না।
(২) রাগাত্মিক। লােভ পরবশ হইয়া ভক্তি মর্গে
ভজনকে রাগমগ বা রাগভক্তি কহে।
ইষ্টে স্বারসিক রাগঃ পরমাসিষ্টতা ভবেৎ।
তন্ময়ী যাভবেদ্ভক্তিঃ সাত্ৰরগাত্মিকা দিত।
ইষ্ট বস্তুতে স্বাভাবিকী পরমাবিষ্টতার নিমিত্ত প্ৰেম-মাধুৰ্যময়
পিপাসাকে রাগ, বলা যায়। সেই রাগযুক্ত ভক্তিকে রাগা-
ত্মিকা ভক্তি বলে। রাগাত্মিক। ভক্তি মুখ্যা ব্রজবাসী জনে’
এই ভক্তি ব্যতীত ব্ৰজ লাভ ঘটে না। “রাগমার্গে কৃষ্ণ পাই
ব্ৰজেন্দ্র নন্দন। রাধিকার সহ কৃষ্ণ ব্রজ আস্বাদন। রসিক
ভক্ত দিগকে ‘রাগানুগ’ ভক্ত ও তাহাদের ভজন প্রণালীকে
'রাগ!ত্মিক’ বলে।
তৃতীয় প্রস্তাবে আমরা বহুতর রাগাষ্মিক পদাবলী উদ্ধত
করিয়াছি, বাহুল্যবােধে এখানে আর উদ্ধত করিলাম না।
(১৩) মান ;-মান কাহাকে বলে তাহা আর বুঝাইবার
প্রয়োজন নাই।
মা হে কি আর বলিব অন্?
তোহরি চরণে, শরণ সে হরি, অবহু না নিটে মান।
গোবর্ধন গিরি, সাম করে ধরি, যে কৈল গােকুল পর।
বিরহে সে ক্ষীণ, করের কঙ্কন, মানয়ে গুরুয়া ভার। ইত্যাদি।
(চণ্ডীদাস।)
৫.
চণ্ডীদাস-চবিত ।
( ১৩০ )
(১৪) সম্ভোগ-মিলন ;-বিচ্ছেদের পূর্বে
—বিচ্ছেদের পূর্বে অর্থাৎ প্রথম
সন্মিলনকে সত্তেগি মিলন বলা যায়।
পরাণ বঁধুকে, স্বপনে দেখিনু, বমি শিয়র পাশে।
নাসার বেশর, পরশ করিয়া, ঈষৎ মধুর হালে ।
পিঙল বরণ, বসন খানি, মুখানি আমার মুছে ।
শিথান হইতে, মাথাটী বাহুতে, রাখিয়া শুতল কাছে। ইত্যাদি।
(চণ্ড দাস।)
( (১৫) দৌত্য ;-শ্রীকৃষ্ণ কথনাে বিদেশিনী, কখনো
দেয়। শিনী, কখনাে বৈদ্য, কখনো ভিণারি প্রভৃতি সাজিয়া
মানবতী রাধিকার সমীপে উপনীত হইতেন। ইহাকে
দৌত্য বলে।
ধরি নাপিতানী সেশ, মহলেতে পরবেশ, সেখানেতে বসিয়াছে রাই।
হাতে দিয়। দরপনী, খােলে নশ রঞ্জনি, বেল বৈস দেই কামাই। ইত্যাদি ।
চণ্ডীদাসের পদাবলীতে স্লী রাধা কৃষ্ণের এই সকল লীল।
বর্ণিত আছে । এতদ্ব্যতীত কবির শ্রীকৃষ্ণের অপ্ত দূতী,
রাই রাখাল গােষ্টবিহার, রসােদগার প্রভৃতি সম্বন্ধীয় অনেক
গুলি পদও আছে। ফলে চণ্ডীদাস শ্রী রাধা কৃষ্ণের যাবদীয়
লীলাই সংক্ষেপে বর্ণনা করিয়াছেন।
পূৰ্ব্বকালে বাঙলা ভাষার সহিত অনেকেই হিন্দি ক।
মিশ্রিত করিতেন। বিদ্যাপতির অধিকাংশ গাই হিন্দি ও
ব্রজবুলির জন্য সাধারণ পাঠকের নিকট দুর্বোধ্য ; চণ্ডী-
দাসও সে লোভ একবারে ত্যাগ করিতে পারেন নাই। কিন্তু
তাহা হইলেও বিদ্যাপতির তুলনায় তাহার পদাবলীতে হিন্দি
( ১০০ ) চণ্ডীদাস-চরিত। ও ব্রজবুলির সংখ্যা অল্প। আবার বিদ্যাপতির দুই একটী পদে হিন্দির গন্ধও নাই, পক্ষান্তরে চণ্ডীদাসের এক অদটী পদ হিন্দিতে কটমট হইয়া আছে। এতদুভয়ের ভাষা এরূপ বিসদৃশ হইবার কারণ কি ? তৎকালে যে হিনি মিশ্রিত ভাষা প্রচলিত ছিল তাহাই ব বিশ্বাস করা যায় কিরূপে? বিদ্যাপতিও চণ্ডীদাসের পরবত্তী কবি গোবিন্দদাসের প্রায় অধিকাংশ গদেই হিন্দি মিশ্রিত ভাষা। কিন্তু হার সব গুলিই যে খ টি গিন্দি তাহা নহে,ব্রজবুলি ও আছে। পূর্ব- কালের সব রচনাই রাগ! কৃষ্ণ বিষয়ক । ভাষায় এইরূপ ব্ৰহ্ম- বুলি মিশ্রণের কারণ দেখা যাইতেছে যে,- “কৃষ্ণচরিত বর্ণনে ব্রজ ভাষ। মিশ্রিত রচনাই অনেকের অধিকতর প্রীতিকর হয়। বোধ হয় ব্ৰজ ভাষার মাধুর্য্য ইহার একমাত্র কারণ নহে, পবিত্রতা বােধ ও কিছু কারণ হইতে পারে। যে সকল কৃষ্ণ পরায় ভক্তেৱা গরম পবিত্র শোপে ব্ৰজের মৃত্তিকা পর্যন্ত ভক্ষণ করিয়া থাকেন, তাহাদিগের পক্ষে ব্ৰজের ভাষাকে ০৪প সমাদর করা অসম্ভব নত। পর্ধে গোবিন্দ দাসের যে গীতা উদ্ধও হইয়াছে, তাহাতে ব্ৰজ ভাষার কহে পুন, গৌর কিশাের। লিখত মহিমণ্ডল অবনত মাথে, নয়নে গলয়ে ঘন লোর। কণক বরণ তন্ম, কামর ভেল এ লাগবে নিদ নাহি ভয়। যেই পরশে পুন, তাক বদন ঘন ছল ছল লােচন চায় ধেন শেনে বদন, পানিতলে ধারই ছোড়ই দীঘ নিশা।
চণ্ডীদা-চয়িত ( ১০২ ) শব্দ অনেক আছে। গোবিন্দদাস চৈতন্যের পরবর্তী লােক। তঁাহার সময়ে এবং তাহার পরে ও জ্ঞানদাস, রাধামােহন দাস, কবিশেখর, রামানন্দ প্রভৃতি যে সকল কবিগণ সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন, তঁাহাদিগের রচনাতে ব্ৰজ ভাষার কথা অনেক আছে-কিন্তু সেই সময়েই অথবা তাহারই সন্নিকট সময়ে চৈতন্য চরিতা- মৃত, চৈতন্য ভাগবত, জীব গোস্বামীর করচা প্রভূতি সঙ্গীতময় নহে, এরূপ যে সকল গ্রন্থ রচিত হইয়াছে, তাহাতে ব্ৰজ ভাষার ভাগ অতি অল্পই দেখা যায়। সুতরাং ইহা এক প্রকার সিদ্ধান্ত হইতেছে যে, বিদ্যাপতির সময়ে ও কৃষ্ণ বিষয়ক সঙ্গীতময় রচনাতে ব্ৰজ ভাষা বা হিন্দির সংস্রব যেরূ" অধিক ছিল, তৎকালের সাধারণ ভাষাতে সেরূপ সংস্রব ছিল না। যে সময়ের ভাষাতে ব্রজভাষার সংস্রব, কিছু মাত্র নাই, ইহা আমরা প্রত্যক্ষ করিতেছি। সে সময়ের ২১ জন কবি যখন সাধ করিয়া ব্ৰজ ভাষা মিশ্রিত গীত লিখিয়া গিয়াছেন, তখন বিষয়ে আমাদের আর কিছুই বক্তব্য নাই। (১) ঐছন চরিতে, তারল সব নর নারী বঞ্চিত গােবিন্দ দাস। (১) বাঙ্গলা ভাষা ও বাঙ্গলা সাহিত্য।
নবম প্রস্তাব।
( উপসংহার।)
এখন,আমার বিদায়ের পালা। এই প্রস্তাবে চণ্ডীদাসের
সময়ে তদ্দেশের আচার ব্যবহার, পরিচ্ছদ অলঙ্কার প্রভৃতি
সম্বন্ধে পদাবলী হইতে যতদূর জানিতে পারিয়াছি তাহাই
সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করিয়া পাঠকগণের নিকট হইতে অবসর
লইব। ভবিষ্যতে যদি ভাহাদের সহানুভূতি লাভ করিতে
পারি এবং অামার ভগ্ন স্বাস্থ্য ফিরিয়া পাই, তবে আর একঙ্গন
প্রাচীন বৈষ্ণব কবিকে লইয়া তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইল।
চণ্ডীদাস শ্রীরাধাভাবে তঁাহার অধিকাংশ পদ রচনা করিয়া-
ছেন, পুরাণবর্ণিত মধুর লীলার অনুকরণে শ্রীরাধিকাকে লইয়া
সামাজিক কান্নাকাটি করিয়াছেন। সুতরাং শ্রীরাধিকা
আচার ব্যবহার। ও তাহার সখীগণ যে প্রকার কাৰ্য্য করিয়া-
ছেন, তৎকালে যে ঐরূপ ক্রিয়াকলাপ সাধারণ স্ত্রী-সমাজে
প্রচলিত ছিল তাহা বিশ্বাস করা যায় না। তিনি ব্রজবধূ-
গণকে দিয়া ‘গোঠে গরু চরাইয়াছেন। ব্ৰজের স্ত্রীলােক
অদ্যাপি গোচারণ করিলেও বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমানের গৃহস্থ
ঘরের স্ত্রীলােকগণ তদ্রুপ করে না। তৎকালে
স্ত্রী পুরুষে নটর্চা (চন্দ্র) ও ইন্দ্রপূজা
করিত। এখনো এই দুই উৎসব বীরভূম, বাঁকুড়া জেলায়
উৎসব।
চণ্ডীদাস-চরিত ( ১৩৪ ) *** * = আচরিত হয়। নষ্টচন্দ্র এদেশেও হইয়া থাকে। ইন্দ্র পূজা সম্বন্ধে চণ্ডীদাস লিখিয়াছেন,- গােকুল নগরে ইন্দ্র পূজা করে, দেখি আইল যত নারী। নগর ভিতর মা কলরব, নাগর হইল পরী। ইন্দ্র পূজার কথা মনুসংহিতা ও বেদেও উল্লিখিত হইয়াছে। চণ্ডীদাস রমণীগণের পদে মল্লতাড়ল ( মল, পশ্চিমদেশীয় রমণীগণ এনে। পায়ে দেয় ) ও কিঙ্কিণী ( ঘুঙুর ), হস্তে অঙ্গদ, রমণীগণের অলঙ্কার নাকে বেশর পরাইয়াছেন। বলয়, পরিচ্ছদাদি। মঞ্জীর, কঙ্কণ প্রভৃতি আরো দুই এক টী পরিচিত অলঙ্কারের নাম পাওয়া যায়। রমণীগণ বৈলান জাল দিয়া কবরীবন্ধন ও আমলকী দ্বারা মাথা ঘসিত। গিরিমা টী দ্বারা অঙ্গ লােহিত করতঃ পায়ে যাবক (আলতা) দিত, শিখায় সিন্দুর ও আবীর পরিত। তৎপর নীল শাড়ি পরিধান করিয়া বাহার দিত। কঁচুলি ও পট্টবস্ত্রেরও প্রচলন ছিল। চণ্ডীদাস কতকগুলি শব্দ প্রয়ােগ করিয়াছেন, যাহার সব- গুলি একালে প্রচলিত নাই। যথা,-চেট্টে নেটে (তরুণী বধূ ; এখনাে ঐদেশে প্রচলিত আছে ), নাসা (নিচু জমি ), কাড়া (সাপ), বড়, নিছনি ; নিছিয়া (জলাঞ্জলী) বিহি ( বিধি, নাছ ; ইত্যাদি। “চণ্ডীদাসের কবিতা দেরী নানা ভূষণে ভূষিত নহেন। ব, ভাব ও ভঙ্গী তত নাই, রূপে চক্ষু ঝলসিয়া যায় না, কিন্তু স্বাভাবিক শােভায় শােভিতা। সেই শোভা কেবল নয়ন মােহিত করিয়া ক্ষান্ত হয় না, হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং তথায় থাকিয়া অস্তরা- ত্মাকে আনন্দ রসে প্লাবিত করে। তদীয় চরণবিক্ষেপ নর্তকীর চরণচালনার স্থায় তালবিশুদ্ধ নহে, কিন্তু চঞ্চলা বালিকার ন্যায় দ্রুত, লঘু, অনায়াসসাধ্য ও স্বাভাবিক। তদীয় বাক্য সুশিক্ষিত মহিলার বাক্যের ন্যায় সংস্কৃত নহে, কিন্তু ; ভাষা। ।
( ১৩৫ )
চণ্ডীদাস-চরিত
বালিকার অপ আপ ভাষার ন্যায় হৃদয়গ্রাহী ও মধুময়। তদীয় কণ্ঠস্বর শিক্ষা
সিদ্ধ নহে, কিন্তু বনচারী পীযুষ কণ্ঠ কোকিলার ন্যায় স্বাভাবিক ও শ্রুতি সুখাবহ
চণ্ডীদাসের বিশেষ গুণ এই যে, তিনি যখন যে বিষয় বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাতে
এরূপ মগ্ন হইয়াছেন যে, চণ্ডীদাসকে বর্ণিত বিষয় হইতে স্বতন্ত্র করা দুষ্কর।
তাহার রসনুভাবকতা এত বলবতী যে, ঠিক যেন তিনি ভাবে উন্মত্ত হইয়াছেন।
এই গুণ থাকাতেই তিনি পাঠককে উন্মত্ত করিতে সক্ষম হইয়াছেন।
বিদ্যাপতি সহস্র চেষ্টা করিয়াও আপনাকে তদীয় বর্ণিত বিষয় বা ব্যক্তি হইতে
অভিন্ন রাশিতে পারেন নাই। ফলতঃ অন্যের আনন্দ উংপাদন করা বিদ্যাপতির
ভিপ্রায় ছিল, চণ্ডীদাস স্বয়ং আনন্দে মাতিয়া জগৎ মাতাইয়াছেন। বিদ্যা-
পশির কবিতা সমুদ্র-গর্ভ-নিহিত অমূল্য রত্ন, চণ্ডীদাসের কবিতা সরসীর উরসে
ভাসমান সৌরভময়-সরােজিনী-সদৃশ।”
হাট বাজারে দ্রব্য বিনিময়ে কেনা বেচা চলিহ। গো।
বিনিময়।
বুড়ি, কাহন সংখ্যক কড়ি দ্বারা ও ক্রয়
বিক্রয় হইত। ব্ৰজ ভূমিতে এখনাে কড়ির প্রচলন আছে ।
তৎকালে খাদ্যসামগ্রীর একটি তালিকা আমর। দ্বিতীয়
খাদ্য সামগ্রী
প্রস্তাবে দিয়াছি । তাহার অনেক গুলির
কথা জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্য মঙ্গলেও পাওয়া যায়।
যাও, চণ্ডীদাস যাও। অনন্ত প্রেমময়ের অনন্তবিস্তৃত
প্রেমরাজের কাব্যোদ্যানে স্বর্ণসংহাসনে বসিয়। সুধাময় কণ্ঠে
অনন্তকাল কূ নন কর। তুমি এই নশ্বর জগতে যে অতুলনীয়
সৌন্দর্য্য রাখিয়া গিয়াছ তাহাতেই তুমি বঙ্গাসীর হৃদয়ে
সর্বদ। শুভ দেবতার ন্যায় বিৱাঙ্গ করিবে। বাঙালীর যত
দিন ভাব ও ভাষা থাকিবে, বাঙালী যত দিন বাঙালী বলিয়া
$ গৌরপদ-তরঙ্গিনী ।
'চণ্ডীদাস-চরিহ
( ১৩৬ )
পরিচয় দিবে, তত দিন তােমাকে বিস্মৃত হইতে পারিবেনা ।
আশীৰ্বাদ কর, যখন মুমূর্ব শয্যায় কণ্ঠরােধ হইবে তখন যেন
মনে হয়,
এবণ হু শ্যাম নাম করু গান।
নইতে নিকউ কঠিন পরাণ ।
2.
সমা
শুদ্ধি পত্র। পত্র। ছত্র। অশুদ্ধ। শুদ্ধ। ১ উচ্ছাস উচ্ছাস। উরসে ঔরসে । ২ 6 এর উন্নঘন উপটোকন এ দুর। উলতঘন। উপঢৌকন। পারেন পারে। হইয়াছিল গৌড় ইসছলেন গৌড় । কুণ্যাখ্য। হেঁচ ভা। ৪ ০ কুব্যাখ্যা ৪ ৫ হেঁচড়া ১ পণুক ধনুক । माभन। পণ জাতিয় জাতীয় । যোপনে ােেসন। স্মাৰ হিস নি ৮২ মান। হিন্দু সন্তান। সঙ্গীতের । সংঙ্গীতের
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.