Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Phooler Betha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ফুলের ব্যথা পৌষ, ১৩২৯
No text on this page.
ফুলের ব্যথা হেমেন্দ্রলাল রায়।
কলিকাতা, ৪৯এ মেছুয়া বাজার স্ট্রীট
বিচিত্রা প্রেস লিমিটেড
হইতে
ক্ষীরােদচন্দ্র সেন গুপ্তের দ্বারা
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
দাম এক টাকা
ভূমিকা ---- আমার যে কবিতাগুলাে প্রবাসী, ভারতী প্রভৃতি নানা মাসিকের পাতায় এতদিন ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল তারি গুটিকত কুড়িয়ে নিয়ে ফুলের ব্যথা গড়ে উঠল। এদের সঙ্গে দু'চারটে নূতন অপ্রকাশিত কবিতাও অবশ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কবিতাগুলো বাছবার ভার নিয়েছিলেন সাহিত্য- ক্ষেত্রে সকলের সুপরিচিত শ্ৰীযুক্ত প্রমথ চৌধুরী, বার-এ্যাট-ল। আগাগােড়া সবগুলাে কবিতা পড়ে তিনি এই বাছাই করে দিয়েছেন। তাঁর মত জহুরীর কষ্টি-পাথরের স্পর্শ লাভ করার সুযােগ যে এর পেয়েছে এইটেই আমি আশাতিরিক্ত সৌভাগ্য বলে মনে করি। প্রচ্ছদপটের ছবিখানির পরিকল্পনা আমার বন্ধু, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শ্ৰীযুক্ত চারুচন্দ্র রায়ের। এদের দু’জনার কাছে আমার যে ঋণ, শুষ্ক ধন্যবাদের ঝুলি ঝেড়ে তা আমি শেষ করে দিতে চাইনে—তা চিরদিন আমাকে এদের কাছে কৃতজ্ঞ করে রাখবে।
ভূমিকা
এ ছাড়া আরাে চার জনের কাছে এই
বই প্রকাশ নিয়ে আমি ঋণের ভার বাড়িয়েছি।
তাদের একজন আমার বাল্য-বন্ধু শ্ৰীযুক্ত বিজয়কৃষ্ণ
সিংহ, একজন “বিচিত্রা প্রেসের” ম্যানেজার
শ্ৰীযুক্ত ক্ষীরােদচন্দ্র সেন গুপ্ত এবং বাকী দু’জন
আমার
পরম স্নেহাস্পদ ক্রমান রমেশচন্দ্র সেন
ও শ্রীমান্ জ্যোতিষচন্দ্র রায়। এদের সাহায্য ছাড়া
এ বই আমার কখনাে প্রকাশিত হত কিনা সে
সম্বন্ধে যথেষ্টই সন্দেহ আছে।
আমার সব-শেষ কথা হচ্ছে এই, মনের দরদ
থেকেই কবিতার জন্ম। সেই জন্যেই কবিতা বিশেষ
ভাবে দরদীদের প্রাণের জিনিষ । আমার কবিতা-
গুলাে দরদীদের সত্যকার দরদের যায়গায় ঘা দিতে
পারবে কি না জামিনে। যদি পারে তবেই এগুলাে
সার্থক হবে।
পৌষ, ১৩২৯
শ্ৰীহেমেন্দ্রলাল রায়
ওগাে
আমার সকল দরদের
দরদী
•
তােমাকে দিলাম।
No text on this page.
ফুলের ব্যথা
পুষ্প আমি সুপ্ত ছিলাম কুঁড়ির আকারে,
গন্ধ আমার বন্ধ ছিল বুকের প্রাকারে,
এক নিমিষে আজ কে মােরে ফুটিয়ে দিল গাে ?-
গন্ধ আমার ছড়িয়ে গেল বায়ুর পাথারে !
নাই সে আমি নাই সে আজি কোনোও খানেতে,
নাই সে আমি হিয়ার মাঝে প্রাণের প্রাণেতে।
আমার ধনে বাতাস আজি বিশ্ব-বিজয়ী,
সর্বহারার ব্যথা ফোটে আমার গানে যে !
ডুরে ওঠে বক্ষে আজি গভীর বেদনা,
চিত্ত আমার চঞ্চলিছে ক্ষতির চেতনা,
চাদের চুমে বাণের মত মৰ্ম্ম বিধিছে--
যে গেল মাের জন্ম-যুগে ফিরবে সে তাে না ।
ফুলের ব্যথা
স্বর্গ আমার রিক্ত, তাহে দেবতা নাহিরে,
মনের মিতা-আজ সে কোথায় লুটায় বাহিরে।
আঁধার যে এ আলাের চেয়ে সুখের ছিল গাে,
বোজা আমার ভাল ছিল ফোটার চাহিরে।
গন্ধ ওগাে, বন্ধু আমার, চিত্ত-বিহারী,
হৃদয় আমার শীর্ণ আজি তােমায় সােঙারি ;
পাপড়িগুলাে পাংশু তাহার জীবন বোঁটাতে,
দুঃসাহসী মৃত্যু ঘােড়ার আজ সে সােয়ারী।
কান্না আমার আজ ঘিরেছি হাসির ছাঁদে যে,
বাজ বেঁধেছি বিদ্যুতেরি রূপের ফাঁদেতে।
গন্ধহারা পুষ্প কভু হাতে নারে গাে-
হাসির কাদা যেমন কাদে তেমন কাঁদে কে ?
মনের বসন্ত
গ্লানিহীন জ্যোৎস্নার হিরণ বসন—
সেদিন বসন্ত ছিল ব্যাপিয়া ভুবন।
লীলায়িত লাবণ্যের নিঝরের মত,
নিবিড় সৌন্দৰ্য্য সারা জগতে জাগ্রত।
আদি মানবের চির মুগ্ধ মনােবনে,
যে বেদনা সুপ্ত ছিল নিভৃতে নির্জনে,
অকস্মাৎ সে দিনের বসন্তের বায়
লক্ষ পুষ্পে ফুটিয়াছে চিত্তের বোঁটায়।
মানবের অন্তরের সেই পুষ্পগুলি,
নিজের করিয়া নেছে ধরিত্রীর ধূলি।
হৃদয়ের কুসুমের বর্ণ গন্ধ হাসি,
ধরার ফুলের দলে উঠেছে বিকাশি।
তাইতাে বুঝিতে হলে ফুলের বিস্ময়,
মনের পুষ্পেরে আগে জেনে নিতে হয়।
মনের বসন্তে যদি ফুল নাহি ফোটে,
বনের বসন্ত তবে মিথ্যা হয়ে ওঠে।
বরষায়
আজি এ বাদরে উদাসীন মন নাহি জানি কি যে চায় ।
ভিজে বকুলের গন্ধে আকুল ব্যাকুল বহিছে বায় ।
খুলে ফেলে সব আগল,
বাতাসে জেগেছে পাগল,
কি যেন কি দুরাশায় !
মরণ হয়েছে খােলা আজি ঐ নবীন মেঘের দলে,
ফণা বিথারিছে স্বর্ণ ফণীরা--মাথার মাণিক জ্বলে ।
ধারার ধোঁয়ায় ধূসর,
আকাশের নীল কেশর,
তা সে ঝঝলে।
এক নব ঘন নীরের মাঝারে মিশিছে দিগ্বিদিক,
প্রিয়ার পাখার ওড়না আড়ালে ঘুমায় মুখর পিক।
হাজার চিকের ফাঁকায়,
দিগধূরা তাকায়,
নয়ন নির্নিমিখ ।
বরষায়
বাঁশের কুহরে কুহরিছে আজ বেণুর সপ্ত সুর,
নীপ তরু হ’তে কেশর ঝরিয়া ‘য়ে লােটে ঝরঝর।
ঘাটে বাটে আজ পবন,
ছড়ায় মায়ার স্বপন,
একাকার কাছে দূর।
মরণ জাগিছে ঊর্ধে—আকাশে, জীবন জাগিছে কোলে,
ভূইচাপাদের পাতায় পাতায় হীরকের গুড়া দোলে।
ধরণী আজিকে তরুণ,
কার এ ভরসা করুণ,
কেতকীর খোপা খােলে ?
স্বর্গের সাতমহলায় আজি ফুটেছে হাস্নাহানা,
গন্ধ তাহার চোয়ায়ে গড়িছে বৃষ্টির মােতি দানা।
ঝর ঝর ঝরে বাদল,
মেঘেতে বাজিছে মাদল,
মশগুল ধরাখানা!
বরষায়
দখিণে বাতাস বহে নাহি আজ-পূবান বহিছে বায়,
জ্যোৎস্নার আয়ু ঢাকা পড়ে গেছে আঁধারের অচলায়।
হাজারে ফোটেনি জারুল,
গন্ধ ঢালেনি পারুল,
অবশ চাপার কায় ।
বসন্ত এতে নহে, তবু মন কেন এত উন্মনা,
হৃদয়ের রংমহালের দ্বারে এ কাহার আনাগােনা ?
আজিকে প্রাণের পাখায়,
ইন্দ্রধনু কে আঁকায় ?
জাগায় অশ্রু-কণা।
১৪
প্রিয়ার পথ
লাল সুরকির বাঁকা সে পথের মত,
হিজলের ফুল লুটায়ে পড়েছে কত।
সিক্ত আঁচল উচল বক্ষে টানি,
জলের কলসী কাখের উপরে আনি,
এই পথে গেছে আমার প্রেয়সী রাণী ।
পথের উপরে ধূলার পাদুকা গড়ি,
লঘু চরণের চিন্ সে রয়েছে পড়ি।
সজল মেঘের কাজল মদিরা পিয়া,
বকুলের বন নীরবে উঠেছে:জিয়া,
এই পথ দিয়া গিয়াছে আমার প্রিয়া ।
মেঘে মেঘে ঢাকা পড়েছে রবির রেখা,
জলের কিনারে বলাকা উড়িছে একা।
বাতাসে ভুলায়ে, নদীরে হেলায় ছলি,
ফুলটি নােয়ায়ে, তৃণটি চরণে দলি,
এই পথে মাের প্রেয়সী গিয়াছে চলি ।
প্রিয়ার পথ
অশােক এখনাে ফুটিয়া রয়েছে গাছে,
পায়ের ধূলায় শেফালি মরিয়া আছে।
গানে গুঞ্জনে অধীর আকুল শ্বাসে,
নূপুর আভাস বাতাসে ভাসিয়া আসে,
এই পথ দিয়া গেছে প্রিয়া মাের পাশে ।
লক্ষ্মী পূর্ণিমা
আজকে অই আকাশ হ’তে সােনার রথে ঝরলে কে ?
দিগ্বিদিকে ভাসিয়ে দিয়ে হাসির ঝােরা খুললে কে ?
খুলে কে অই গলা-মােতির লক্ষ নদীর ঝরণাটা ?
উড়িয়ে দিলে চূর্ণ হীরার রেণুর গড়া ওড়নাটা ?-
লক্ষীদেবীর আড়ত, আজি মুক্ত বুঝি আশ মানে,
ঝরঝরিয়ে ছড়িয়ে গেল তাই এ ধরার মাঝখানে।
ধরার মাঝে ঝরঝরিয়ে সুধার ধারা ছড়িয়েরে,
সকল ব্যথা ভুলিয়ে দিয়ে, দুখের মাথা মাড়িয়েরে,
মােচন করি মনের গ্লানি, নামিয়ে বুকের পাথরটি,
শুকিয়ে দিয়ে চোখের কোলে অশ্রুজলের সাগরটি,
পরীর দেশে ধরায় আনি, ধরায় করি পরীর গাঁ,
লক্ষমীমাতা জ্যোৎস্না ধারায় ধুলেন তারি জরির পা।
লক্ষনীমাতা পা ধুয়েছেন—ঝছে তারি জ্যোৎস্নারে,
ঘরের মাঝে আটকে তােরা বন্ধ বসে’ রােস্ নারে।
১৭
লক্ষী পূর্ণিমা
রােস্ নারে আজ বন্ধ হয়ে অন্ধ ঘরের মাঝখানে,
ঘর-বা’র সব একশা করে’ আয়রে ছুটে বা’র পানে।
জলের তলে এলিয়েছেরে ঢেউয়ের দলে লক্ষ গা’,
ঢেউয়ের তালে দুলিয়ে দেরে অচল তােদের বক্ষটা।
আজ লেগেছে রূপের মাতন নীলের কেতন গগন গায়,
আজ স্বপনে বন্দনা সে গাইছে টিয়ে চন্দনায়।
হাজার দলে আজ ফুটেছে পদ্মগুলােও সাঁঝরাতে,
রূপটা তারি চুনিয়ে কে আজ ঢালে ধরার মাঝ টাতে ?
মােতির মালা আজ পরেছে ময়ূরকণ্ঠী গাছপালা,
আজ আধারের টুকরােগুলােয় জোনাক পােকার
দীপ জ্বালা।
সুড়ুত করে বেরিয়ে পড়, আঁধারের এই বাঁধ ভেঙে,
হাল্কা হাওয়ায় হেলিয়ে তনু হুরির দলের সাথ মেগে।
জ্যোৎস্না ধারায় মনের ভেলা ভাসিয়ে দেরে ভাসিয়ে দে,
রূপের বেচা-কেনার হাটে হৃদয়টারে বিকিয়ে নে।
১৮
লক্ষী পূর্ণিমা
মুঠ ভরে’নে হীরের গুড়ায়, মন ভরে’নে রূপ-মায়ায়,
হীরের গুড় জ্বলছে আজি লক্ষীমায়ের ধূপছায়ায়।
বয়ের দিকে চারে আজি, ডা’নেও চেতে ভুলিনে।
সামনে হ’তেও চোখ দুটোরে একেবারেই তুলিসনে।
কাশের ক্ষেতে আজ নেমেছে আকাশ হতে অপ্সরী,
হাজার তাঁবু বসিয়ে গেছে জরির তারে কাজ করি।
হাজার পরী আজ নেমেছে কেয়া ফুলের কেশরটায়,
চুমাের ঝুড়ি ছড়িয়ে গেছে নীল সায়রের সবুজ গায়।
কোজাগরের রাত্রি আজি, অজাগরের জাগর যে,
আজকে তবু ঘরের মাঝে ঘুমের ঘােরে বিভাের কে ?
লক্ষ রাজার সােনার ভাঁড়ার দেখেওনিকো চক্ষে যা,
মােতির ঝােরা হীরের গুড়া—বিকায় রাতে আজকে তা।
আয় ছুটে আয় মাঠের মাঝে, জেগে স্বপন দেখবি কে ?
হীরের গুড়া ঝরছে আজি—পা ঝেড়েছেন লক্ষী যে।
১৯
মদন ঠাকুর
মদন ঠাকুর, তােমার পায়ে হাজার নমস্কার,
অন্ধ, তােমার দৃষ্টি চমৎকার !
কদর যে চলে তাহার নাইকো ঠিকানা,
বিশ্ব তােমার আঁখির সীমানা।
ইন্দ্র শুধু হাজার চোখে চায়,
তােমার চোখের অন্ত কেবা পায় ?
ঠাকুর, তােমায় মেনে চলে সপ্তলোকের লােক,
হৃদয়—তােমার তারই পরে রােখ।
একটি অাঁখির ইঙ্গিতেই চিত্ত বিজয় কর,
কোন্ দেবতা তােমার চেয়ে বড় ?
তোমার তূণে ফুলের ক’টি বাণ,
অব্যর্থ তার অমােঘ সন্ধান।
খােস্-খেয়ালে চল তুমি পরম খেয়ালী,
চলন তােমার নিরেট হেঁয়ালি ।
খোড়সোয়ারের মনের সাথে ছােটে তােমার ঘােড়া,
দীপ্ত তুমি বিদ্যুতেরি ছাের।
মদন ঠাকুর
মায়ার জালে বােনা তােমার জাল,
তারই মাঝে কাঁপছে চির কাল।
আদিম ভােরে ছিলে তুমি নাইকো সন্দেহ,
আজো তােমার চির তরুণ দেহ।
রামধনুকের রঙ দিয়ে গাে তােমার তনু গড়া,
তুমি অরূপ রূপের পশরা।
ফাগুন লােটায় তােমার পথে পথে,
ঘুরে বেড়াও অকস্মাতের রথে।
তােমার পথে পুষ্প আছে-কঁাটাও আছে মেলা,
দুরন্ত সে জানি তােমার খেলা।
লজ্জাবিহীন নগ্ন দেহ নাইকো অঞ্চল,
রূপে রসে সদাই চঞ্চল।
অস্ত্র তােমার সুরা এবং সাকি,
মনের মদে ঝাপসা রাখ আঁখি।
শিব তােমারে দগ্ধ করে পানি পরিত্রাণ,
ফিরিয়ে ফের দিতেই হ’ল প্রাণ।
২১
মদন ঠাকুর
বৃন্দাবনের বনের মাঝে লক্ষ লীলাতে,
দাগ ফেলেছ মনের শিলাতে।
চিরজয়ীর মাল্য তােমার গলে,
নিলয় তােমার মনের অতলে।
তােমার বাণের দুঃখ কত নাইকো অজানা,
রুখতে তবু চাইনে নিশানা।
লাঞ্ছনা সে চিত্ত আমার সইতে রাজি আছে,
প্রসাদ যদি থাকে তাহার পাছে
ঠাকুর, তােমার প্রণাম করি পায়,
আবার প্রণাম-প্রণাম পুনরায় !
মুকুল ও পুষ্প
আমার এ জননীর স্নেহাতুর অঞ্চল আড়ালে
ওরে শিশু, ওরে বাছা, থাক্ আরাে আরাে কিছুক্ষণ;
রৌদ্র শুধু জাগিতেছে গগনের সীমান্তের ভালে,
ধীরে শুধু একবার ব’য়ে গেছে প্রভাত পবন।
জনমের ভাের হতে চেয়ে আছি তােরি মুখ পানে,
চেয়ে আছি নির্নিমেষ প্রতি পল, চির রাত্রি দিন,
সমস্ত হৃদয় মাের দৃষ্টি হয়ে ফুটেছে নয়ানে,
মিটেনি পিপাসা তবু, তৃষা তবু হয়নি বিলীন।
শিশু-মাতা মুকুলের অনিবার বুকের স্পন্দন,
কম্পিত চকিত ভাব অনর্থক শত আশঙ্কার,
হৃদয়ে চাপিয়া ধরা, আচম্বিতে অজস্র চুম্বন,
তুই তার কি বুঝিবি ওরে মাের কিশাের কুমার ?
বসন্তের এক বৃন্তে জেগেছিনু আমরা মুকুল,
নিদাঘের খর তাপে, প্রাবৃটের সঘন বর্ষণে
আর সব ঝরে গেছে ; সৃজনের একমাত্র ভুল--
আমি শুধু জেগে আছি তােরে ল’য়ে পল্লব শয়নে।
মুকুল ও পুষ্প
দীপ্ত রৌদ্রে তেতে গেছে সৰ্বসহা ধরণীর ধূলি,
পুষ্পের মুকুল আমি তখনও স্তব্ধ অচঞ্চল,
লক্ষ ঝঞা গর্জিয়াছে ক্রোধে ক্ষোভে লক্ষ ফণা তুলি’,
ক্ষুব্ধ বিশ্ব,—আমি শুধু পুষ্প-মাতা হইনি বিহ্বল।
বিন্দু এক বিন্দু করি দিনে দিনে লভেছ বিকাশ,
কোন্ দিন কোন্ বর্ণ,—দলে তার কতটুকু লেখা,
কবে পেয়েছিস্ কোথা কি গন্ধের অস্ফুট আভাস,
পরিপুষ্ট চিত্র সম চিত্তে মাের রেখে গেছে রেখা।
শিশির শীতল জলে প্রতিদিন করায়েছি স্নান,
হৃদয়ের রক্ত দিয়ে পলে পলে তুলেছি বাড়ায়ে,
সূৰ্য্য হ’তে রশ্মি টানি সৌন্দর্য্যেরে করায়েছি পান,
স্ফুট করে তুলিতেছি বসন্তের বিলসিত বায়ে।
চেয়ে আছি রাত্রি দিন, তৃষা তবু মিটে না তাে হায়,
পূর্ণ হয়ে উঠিতেছে উৎস সম জননীর স্তন ;
বাহিরে ডাকিছে বিশ্ব,“ওরে বাছা, আয় বুকে আয়,
জননীর তপ্ত বক্ষে থাক্ আরাে আরাে কিছুক্ষণ।
২৪
অবুঝ
শিশিরের বায় দুলিছে তরুর অধীর শাখা-
দুলিতেছে থর থর,
গুমরি’ উঠিছে হাজার ছন্দে কাতর ভাষা,
ব্যথিত কণ্ঠস্বর ।
দাড়ায়ে স্তব্ধ শিরে
খসা-পাতা তার গণিতেছে তরু,
কঁদিতেছে ধীরে ধীরে।
পাখী দেখে ডেকে কয়গাে,
আমারাে যে গেছে বুকের আধেক,
একা সে তােমার নয়গাে।
পথিক কহিছে ভাইরে,
আশ্রয় মাের তারি সাথে গেছে,
দাড়াবারো ঠাই নাইরে।
ওরে তরু তাের শােক নাই,
তাের যাহা গেছে পাখীরে যে গেছে,
পথিকেরাে যেরে গেছে তাই।
অবুঝ
শুধু তবু শুধু নীরবে
ভাবিছে সে হায় হায়,
তার যাহা গেল তারি গেল একা,
আর কারাে নাহি যায় ।
আকাশের গায় দুলিছে ভােরের শেষের ক্ষীণ
অধীর আলাের ধারা,
রজনীর চঁাদ রয়েছে বিভল বিবশ হয়ে
ধূসর পাগল পারা।
কেবলি দেখিছে চেয়ে,
চঁাদের নয়নে চেয়ে আছে রাতি
নয়নের জলে নেয়ে।
নদী দেখে ডেকে কয়গো,
দেখে যাও ওগাে হৃদয় আমার,
একা সে তােমার নয়গাে।
কুমুদ কহিছে ভাইরে,
কি গিয়েছে মোর কি করে জানাব।
ভাষা খুজে নাহি পাইরে।
অবুঝ
ওরে রাতি তাের শােক নাই,
তাের যাহা গেছে নদীররা যে গেছে,
কুমুদেরাে যেরে গেছে তাই।
শুধু তবু শুধু নীরবে,
ভাবিছে সে হায় হায়,
তার যাহা গেল তারি গেল একা,
আর কারাে নাহি যায় ।
প্রভাতের বায়ু দোলা দিয়ে গেছে গোপনে আসি
মুগ্ধ ফুলের বনে,
ফাটিয়া পড়েছে ফুলের বুকের মাধুরী রাশি
মদির গন্ধ সনে।
পাপড়ির ডানা দিয়া,
গন্ধেরে নারি বন্ধ করিতে
কঁদিছে ফুলের
হিয়া।
কানন ডাকিয়া কয়গো,
গৌরব মাের যা ছিল সে গেল,
একা সে তোমার নয়গাে ।
२१
অবুঝ
ভ্রমর কহিছে ভাইরে,
ক্ষণেকের তরে জুড়াব যে আসি
থাকিল না তারাে ঠাইরে।
ওরে ফুল তাের মােক নাই,
তাের যাহা গেছে কাননেরাে গেছে,
ভ্রমরেরা যেরে গেছে তাই।
শুধু তবু শুধু নীরবে,
ভাবিছে সে হায় হায়,
তার যাহা গেল তারি গেল একা
আর কারাে নাহি যায় ।
বাদল দিনের দুঃখ
বাদল ঝরিছে ঘন হুতাশে-
পাশে নাই প্রিয়া -ব্যথা ভরে হিয়া উদাসে
অলস আঁখি দু’টি,
হয়তাে আছে ফুটি
জানি তাহারাে কত কি আশে !
পাগল বহিছে বেগে বায়ুরে,
তারি তালে তালে দোলে মন, দোলে স্নায়ুরে
এ ঝড়ে চারিধার
বুঝি বা অনিবার,
আমারে খুজিছে তারাে বাহুরে ।
গুমরি কঁদিছে আজি দেয়া যে,
আমি নাই পাশে হায় কার কাছে সে আছে
বিধুর বুক টুটে'
যে চুমাে ওঠে ফুটে
রুদ্ধ তাহারাে দেয়া-নেয়া যে !
মানা
বিদায়ের বেলা সে তাে কথা কহি করে নাই মানা,
বেড়ে নাই পথখানি তুলি শীর্ণ কস্তু হস্তখানা।
তবু কিছু ছিল না কি তার সেই নির্বাক অধরে--
সকরুণ মানা যাহে ফুটিয়া উঠেছে থরে থরে ?
কিছু ছিল না কি তার ছল ছল আঁখি প্রান্তে লেখা,
মানারে ছাড়ায়ে যাহা দেগেছিল মরণের রেখা ?
অস্ফুট আগ্রহ ভরা ভাষাহীন শব্দহীন বাণী,
হাজার মিনতি দিয়া বেড়ে নাই মাের পথখানি ?
অনলের রেখা দিয়া যদি কেহ ঘিরে দিত পথ,
সে বাধা কি তার চেয়ে হ’ত কভু অল্য বৃহৎ ?
তবু তারে ছেড়ে গেছি—এমনই ছেড়ে যেতে হয়,
জগত দেখে না খুজে কোথা কঁাদে বিরহী হৃদয় !
বিরহী কোথায় কঁদে খোঁজে তার নাহি অবসর,
অচ্ছেদ্য কৰ্ম্মের গ্রন্থী সে শুধু গাঁথিছে পর পর।
যে নিশ্বাস দু’টি দেহ প্রাণ দিয়া প্রেম দিয়া কেনে,
বিপুল বসুধা তারে দূর হতে দূরে লয় টেনে।
মানা
দূর দূরে লয়, তাই বলে’ ব্যর্থ হয় সে কি ?
সে দেখা তাে দেখা নহে মােরা যাহা প্রতিদিন দেখি ।
প্রাণের নন্দন বনে এ নিশ্বাস রহে যে সঞ্চিত,
রস ভরে বেড়ে ওঠে—পুষ্প ভারে হয় বিলসিত।
জগতের বাধা গণ্ডী কতদিন—রবে কতদিন ?
জানি তা অটুট নহে—একদিন জানি হবে ক্ষীণ।
জানি এ নির্বাক বাধা-অশ্রু-খসা এ উচ্ছল মানা,
এ জীবনে ব্যর্থ হােক—পরকালে ব্যর্থ তা হবে না ।
অন্ধ এ ধরায় যাহা অনাদৃত উপেক্ষার ভারে,
স্বর্গে তাহা জমে আছে-উপেক্ষা সে করে নাই তারে
যে মানা করেছে ব্যর্থ হেথাকার বিচ্ছেদের ব্যথা,
চির মিলনের মাঝে স্বর্গে তার আছে সার্থকতা।
৩১
কোকিল
বসন্তের কোকিল ওরে
মায়ার মঞ্জরী,
হঠাৎ আজি কোথায় থেকে
উঠিলি গুঞ্জরি’ ?
কোন সে পরীর
বুকের মাঝে
স্বপন শয়নে,
গানের সাথে ঘুমিয়ে ছিলি
মদির নয়নে ?--
চুমাের সুরে হঠাৎ জেগে
সকল দিশেতে,
জাগার খবর পাঠিয়ে দিলি
হাজার শিযেতে ।
কালাে তুই নােস তাে ওরে
হৃদয় ভুলানন,
কালাে দুটি পাখার তলে
হীরক দুলানাে।
কোকিল
কালােতে যে গলে পড়ে
আলাের ঝরণা,
তােরে দেখার আগে সে তাে
হয়নি ধারণা।
ফুলের দলে ফুটিয়ে দিলি
আলাের ইঙ্গিতে,
আকাশ বাতাস ভাসিয়ে দিলি
সােনার সঙ্গীতে।
শীতের দানব ছুইয়ে ছিল
মরণ কাঠি গাে,
মরমে তাই মূচ্ছে ছিল
সবুজ মাটিও।
কোথা হতে জীয়ন জলের
স্পর্শ হানিয়া,
এক নিমিষে জীয়ায়ে দিলি
পাংশু দুনিয়া।
কোকিল
দিলি তারে নূতন গান,
নূতন ছন্দরে,
মর্মে তাহার জাগায়ে দিলি
প্রেমের স্পন্দরে।
কোন্ কুহকে আজকে চঁাদের
হৃদয় ভুলালি ?
কিসের কাজল দুটি চোখের
ভিতর বুলালি ?
হঠাৎ জেগে চেয়ে দেখি
পত্র-পল্লবে,
কাছের করে সাজিয়েছি
দূরের দুলভে।
চাইছে আকাশ নীল অখিটি
আলােয় আঁকিয়া,
স্বপনে যার আভাস দেখি
দেখছি জাগিয়া ।
১৪
কোকিল
রাজার বনে গােলাপ হাসে
ফোটার উল্লাসে,
বেড়ার ফাঁকে অপরাজিতা
হাসিয়া ফুল্লা সে।
দখিন বায়ু কোথায় ছিল,
নয়ন পালটি
চাইতে ফুল—চুমিয়া গেল
চাওয়ার আলােটি
রুদ্ধ করা হাজার দুয়ার
একটা চাবিতে,
কেমন করে খুলিস্ তুই
পারিনে বুঝিতে।
যেথায় লাগে জীয়ন জলের
পরশ রেখাটি,
জরার মাঝে জাগিয়া ওঠে
জীবন লেখাটি।
কোকিল
কালাের কুহু জাগিয়ে দিল
যুগের মরা যে,
সুরে সুরে নাচিয়ে দিল
বেসুর ধরা সে,
কালাে কোকিল নয় তাে কালাে
আলাের সবিতা,
সুরের ঝোরা বসন্তেরি
বুকের কবিতা ।
আদি কথা
সম্মুখেতে সীমাহীন স্তব্ধ ধরাখানি,
তারি মাঝে বাণীহারা শুধু দু’টি প্রাণী।
সীমাহীন প্রকৃতির নির্জন নিলয়ে,
আদি নর-নারী শুধু কঁপিছে বিস্ময়ে।
পরিপূর্ণ যৌবনের শতদল দলে,
নগ্ন নারী দাড়াইয়া মোন
কুতূহলে,
কুতূহলী চিত্তখানি দু’টি চক্ষে রাখি,
পুরুষ দাড়ায়ে স্থির নির্নিমেষ আঁখি।
দু’টি মুগ্ধ হৃদয়ের মৰ্ম্ম-কোষ টুটি,
কি যেন উঠিতে চাহে পুষ্প সম ফুটি!
নিস্ফল আবেগ, শুধু গভীর হতাশা
কোথা ভাষা—কোথা হায় প্রকাশের ভাষা ।
=
সহসা কণ্ঠের মাঝে একি গাে বিস্ময়
মানব মনের বাঞ্ছা তারি হ’ল জয় ।
প্রথম উঠিল গাহি আদি নারীর,
জগতের আদি কথা “সুন্দর সুন্দর”।
।
রজনী প্রহর যায়,
সব কাজ করি সায়
পা দিয়েছি পথের উপর,
সহসা কানের কাছে,
একেবারে প্রাণে বাজে,
এ কি কণ্ঠ করুণ কাতর।
সন্ধ্যা হতে মেঘে মেঘে,
শ্রাবণ ঝরিছে জেগে,
পবন করিছে আনাগােনা,-
আদ্র শীত বর্ষা-বায়ু
কাপায়ে তুলিছে স্নায়ু,
বিজলীতে ঝলিতেছে সােনা।
পথের নাহিক সাথী
জনহীন স্তব্ধ রাতি
ঝিমায়ে বুনিছে তাজাল,
পতিতা
সারা দিবসের চাপে
অবসন্ন হিয়া কাপে,
পায়ে মেতে উঠেছে মাতাল
আধ ঘুমে আধ জাগি,
চলেছি ঘরের লাগি,
কোনােমতে ভাঙি অবসাদ,
সহসা কানের কাছে
একেবারে প্রাণে বাজে
এ কাহার চাপা আর্তনাদ ?
কে আজি এমন রাতে,
এই বর্ষা বৃষ্টিপাতে
খুলে দেছে মনের দুয়ার ?
ঐ বরষারি মত
হােথাও কি মেঘ নত ?
ওখানেও জেগেছে জোয়ার ?
পতিতা
থমকি’ তাকায়ে দেখি,
ও হরি হেথায় এ কি-
পথে কে যে পড়িয়া বিকল ।
ফেলিতে প্রদীপালােক
অপলক দুটি চোখ ;
রূপপরে যে নেমেছে বাদল !
কোলে বিড়ালের ছানা-
ঘেরি ক্লান্ত দেহখানা
লাবণ্যের দুলিছে লহরী,
মেঘের ধারায় ভিজে
জমাট যৌবন নিজে
পথের উপরে আছে পড়ি।
অকস্মাৎ একেবারে
ঝুকিয়া পথের ধারে
যেমন টানিব দেহখান,
সেকি কান্না বুক-ভাঙা-
বেদনার রক্তে রাঙা
সে কি আৰ্ত্ত করুণ আহবান।
পতিতা
ভাৰিনু মনের ভ্রান্তি
সারা দিবসের শ্রান্তি
রচিয়াছে এত গুলাে ভুল,
ভালাে করে আঁখি মুছে’,
আবার দেখিনু খুজে
পথের সে ঝরা বন ফুল।
শ্রাবণের ধারাগুলি
মুক্তা সম আছে দুলি
ঘিরে ঘিরে কালাে কেশপাশ,
তখনাে মাথার পরে
বাদল পড়িছে ঝরে,
হা হা করে শ্বসিছে বাতাস।
। সব ভুলি,
দৃষ্টিহীন আঁখি তুলি
দাঁড়ায়ে রহিনু -তারপর
মুচ্ছিতারে তাড়াতাড়ি
একেবারে নিনু কাড়ি
কাদা হ’তে বুকের ভিতর।
৪১
পতিতা
বাহিরে মেঘের দোলা,
সমুখে দুয়ার খােলা,-
কে আছ গােকহিলাম হাকি-
হেথা এসে দেখ চেয়ে,
বুঝি তােমাদেরি মেয়ে
মরণের বেশী নাহি বাকি।
ঘরে ঘরে দ্বার বাঁধা,
আঁধারের আৰ্ত্ত কঁদা,
দিকে দিকে উঠিতেছে ফিকে,
ভাঙিয়া স্তব্ধতা সব,
মাের কণ্ঠ-কলরব
আঘাতিছে জানালার চিকে ।
ভাবিতেছি শূন্য গেই,
পােড়াে-বাড়ী নাহি কেহ,
কি যে করি ধিয়াইছি মনে,
সহসা দুয়ার ঘেসে
কে যেন দাড়াল এসে
আগুন ভরিয়া আঁখিকোণে।
৪২
'পতিতা ক কহিল—পারিনে ছাই- 'এমনাে তাে দেখি নাই, এ যে বাপু বড় বাড়াবাড়ি, সেই আজ কোন্ ভােরে বিড়ালটা গেছে মরে’- এখনাে মেটেনি জের তারি । শােনাে তবে কাণ্ডখানা, ঐ তাে বিড়াল ছানা, মানুষ করেছে ঐ বটে- সারাদিন তারি লাগি কঁদিয়া কেটেছে জাগি, বসে নাই ভাতেরাে নিকটে। কেঁদে কেঁদে শ্রান্ত যবে, ঘুমায়ে পড়েছে সবে, ছানাটারে চুরী করে আমি, জানালা গলায়ে পথে ফেলেছিনু কোনােমতে, এত সব তাহারি আকামী । ৪৩ পতিতা প্রাণ বলে কিছু নাকি আমাদের আছে বাকি ? দেহ বেচে মিটাই অভাব। বিড়ালের লাগি অত- মানুষ মেরেছ কত তারি কিছু রেখেছ হিসাব ? শয্যায় দেহটি থুয়ে, বারেক সমুখে মুয়ে ধীরে এসে দাড়ানু বাহিরে, কোনাে কথা নাহি বলি, খােলা দ্বারে এমু চলি বিস্ময় বহিয়া আঁখি নীরে। আ অজগরবৎ পড়ে আছে দীর্ঘ পথ, বাদলে বিকল চারিভিত, ৪৪
পতিতা
মাঝে মাঝে থেকে থেকে
হা হা বায়ু ওঠে হেঁকে,
নভতল চিরিছে তড়িৎ।
একই পথে বারে বারে
ঘুরিয়া ঘরের দ্বারে
অবশেষে দাড়ানু যখন,
তখনাে বুকের ভাঁজে
তেমনি করিয়া বাজে
তারি আর্ত করুণ বােদন ।
রূপের পশরা ব’য়ে,
দিন যার গেছে ক্ষ’য়ে,
দেহের বেসাতি করে যারা,
এই কি তাদেরি নারী ?
সহসা নিশ্বাস ছাড়ি
ক্ষণেক রহিনু মুগ্ধ পারা !
তারপর শয্যাখানি
কখন নিয়েছি টানি,
বালিসে বেঁধেছি আলিঙ্গনে,
৪৫
পতিতা
কখন চোখের কাছে
নিদ্রা নেমে আসিয়াছে,
এতটুকু নাহি তার মনে।
সমস্ত শ্রাবণ রাতি
করিয়াছে মাতামাতি
মেঘ আর মাতাল বাতাস,
কেবল তার মাঝে
কানে এসে বাজিয়াছে
তাদেরি কঠিন অট্টহাস।
কেবল ঘুমের ঘােরে
স্তব্ধ হৃদয়ের দোরে
মাঝে মাঝে হেনেছে অশনি,
একেবারে বুকভাঙা
বেদনার রক্তে রাঙা
পতিতার আৰ্ত্ত কণ্ঠধ্বনি।
৪৬
দুঃসহ শ্বশুর আমারে ভালােবাসে মানি, গালও খুব পাড়ে সে তাে, মধুর যেমন, আদর, তাহার শাসন তেমনি তেতাে। সে দিন কিসের চিঠি খান-কত এনে দিল মাের কাছে, ফিরে চেলাে যবে—কোথায় রেখেছি আর কি তা মনে আছে ? কি যে বকুনিটা পেয়েছি সেদিন মাের এই মন জানে, অশ্রু খসেছে—দুৰ্ব্বহ হয়ে তবু তা বাজেনি প্রাণে। শাশুড়ী আমারে পাড়ে কত গাল- সীমা-শেষ নাহি তার, পান থেকে যদি চুনটুকু খসে রক্ষা নাহিকো আর।
দুঃসহ
কদিন ভীষণ নেমেছে বাদল
সামলাতে নারি নিজে,
ভাঙা পেয়ালাটা পড়িয়া ভাঙি,
ব্যথা সে পেলাম কি যে ।
দুঃখে আমার আহাটি এল না,
পেয়ালা ভেঙেছি তাই,
কত কথা হল, অশ্রু খসেছে-
অসহ সে হয় নাই।
বিনা অপরাধে ননদী আমার
কত কি যে মােরে বলল,
বাপ মা’র খোঁটা হৃদয় ভেদিয়া
বেঁধে সে মৰ্ম্ম-তলে।
যখন যা বলে তাই করি তবু,
সদাই মুখটি ভার,
করি প্রাণপণ-এত করি তবু
মন তাে পাইনে তার ।
৪৮
দুঃসহ
খেতে খেতে যদি বেশী পেট ভরে
আমারেই ভৎসনা,
বড় বাজে বুকে—দুঃসহ তাহা
তবু মনে হয় তো না।
শুধু সেই কোনাে কথা কয়েছে কি
কোন্খানে যাবে আর
গুমরিয়া ওঠে সারাটা হৃদয়,
চোখে জাগে শত ধার।
নিজে কঁদি আর তাহারে কঁাদাই
ঠায় বসে একখানে,
ফাটিয়া টুটিয়া কি যে হয় হিয়া
মাের এই মন জানে ।
যত অভিমান তারি পরে শুধু,
যত রােষ তারি পর,
এত ভালােবাসে, তবু নাহি সহে
তারি কথাটির ভূর ।
s
দেহের মহিমা
তােমার যে টুকু খুলে রেখেছ বাহিরে,
সমগ্রের তুলনায় সে তত এতটুক,
তাই দিয়ে রাখিয়াছি চিত্তখানি ঘিরে,
দৃষ্টিরে করেছি চির উন্মুখ উৎসুক।
তােমারে ধরেছি বলে মনে করি যত,
জানি তার বেশী খানি পড়ে নাই ধরা,
যে টুকু পেয়েছি তারি গবে অবিরত,
যে খানি পাইনি তারে মিছে মনে করা।
সমস্তরে পেত যদি কি করিত মন,
সে কথা ভেবেও আজ পারিনে বুঝিতে।
দেহের দুয়ারে যদি এত প্রলােভন,
কে বলিবে কত আছে মনের নিভৃতে ?
মনের অতলে কোথা কে পেয়েছে সীমা ?
তাই সুখে দুঃখে গাহি দেহের মহিমা।
বসন্তের আগমন
সেদিন বসন্ত এল সুন্দর ভুবনে,
পত্রে পুষ্পে হাসে শাখী-উজ্জ্বল গগন,
নগ্ন ধরা স্নাত শুভ্র চঁাদের কিরণে,
অঙ্গে অঙ্গে ভাসে তার তরুণ যৌবন।
সেদিন বসন্ত এল তনু দেহে তব,
অশােক পড়িল ঝরি অধরে অলকে,
স্তনাগ্রে যৌবন জ্বালা-দীপ্তি অভিনব,
বসন বিবশ শ্লথ দুঃখহ পুলকে।
সে দিন বসন্ত এল—শূন্য করি তূণ
মদন ছড়ায়ে দিল পুষ্প-শর গুলি,
ফাগুনে উঠিল জাগি বানের আগুন,
ঘুমন্ত বাসনা বুকে ওঠে ফুলি দুলি।
সেদিন বসন্ত এল-আগমন তার
আমারে জানায়ে দিল সর্বাঙ্গ তােমার ?
শরতের এক মুঠো রোদ্ররে জমায়ে
যে পদ্ম উঠেছে বেড়ে,--তাই দিয়ে গড়া
দু’খানি মধুর অাঁখি, দুটি পক্ষম ছায়ে
সুগভীর সচ্ছলতা কূলে কূলে ভরা।
তারি মাঝে দৃষ্টিখানি করুণ কাতর
বাহু পুটে আলিঙ্গন মেলিয়াছে তার,
বেপমান দৃষ্টি বাহু-আত্মার অধর
পাঠায়েছে চুম্বনের চারু পুষ্পধার।
ব্যাকুল বক্ষের দোরে আসন্ন উদ্যত
অসমাপ্ত চিরন্তন দৃষ্টির চুম্বন
বিদ্যুৎ প্রবাহে চিত্ত মুগ্ধ মন্ত্রহত,
এত বল কোথা পেল’ ও ভীরু নয়ন ?
দু’টি আঁখি, একখানি দৃষ্টি—তারি মাঝে
নিখিল বিশ্বের লীলা নিঃশেষে বিরাজে।
আদি নর-নারী
কি হবে বসন দিয়া—কেন মিথ্যা লাজ,
দুটি শুভ্র নগ্ন আত্মা মিলেছে তাে বুকে,
এত আবরণ, এত ঢাকায় কি কাজ ?
সারা অঙ্গে সারা দেহ মিলা কৌতুকে।
মুক্ত করো দুটি বাহু—সুন্দর সবল,
লতায়ে, উঠু তাহে নগ্ন আলিঙ্গন,
অঞ্চলে যদি না ঢাকে বক্ষের অচল,
ছিন্ন হােক হৃদয়ের অাঁধার বন্ধন।
খসে যা বেশ-বাস--সেই ভালাে প্রিয়া,
মনে যদি কোনােখানে কিছু গুপ্ত নাহি,
কি হবে দেহেরে ঢাকি লাজ-বাস দিয়া,
বসনের ছলনায় বৃথা অবগাহি।
সেই ভালাে সৌন্দর্য্যের শােভায় নিলীন,
দুটি আদি নর-নারী সব লজ্জাহীন।
চুম্বন দু’টি ওষ্ঠ-ধীরে ধীরে একান্ত মিলন- পীনস্তনা উর্বশীর অরূপ স্বরূপ, সূচ্যগ্র শিহরি’ ওঠে প্রতি লােমকূপ, থর থর বক্ষ পুটে প্রখর স্পন্দন । দু’টি ওষ্ঠ-মদনের মিলন জোয়ার, কামের বিজয় চাপে স্ফুট শতদল, মেঘ-রৌদ্রে কোলাকুলি উচ্ছল চঞ্চল, প্রেম-মন্ত্রে বাঁধা দু’টি মায়াবী সেতার। প্রাণে প্রাণ নীরবে অঙ্কন, এক আত্মা ডুবে যায় আরেক আত্মায়, অমৃতের অন্তহীন আনন্দ মন্থন, চির স্বপ্ন জগতের জাগ্রত বেলায় । দু’টি ওষ্ঠ-“উচ্চকিত সরস চুম্বন, অনন্ত মিলিত শান্ত অধরের গায় । দু’টি ওষ্ঠ- ৫৪
==
আলিঙ্গন
তুমি জড়ায়েছ মােরে দু’টি বাহু দিয়া,
সবল সুন্দর দু’টি পুষ্প বাহু-পাশ,
নিখিলের লীলায়িত তরঙ্গিত হিয়া,
সে বন্ধনে শিহরিয়া ফেলিছে নিশ্বাস।
বুকে বুক মিশে গেছে-ঘন আলিঙ্গন,
কুসুম শিখর দু’টি নােয়ায়েছে শির,
অধরে অধরে জাগে অজস্র চুম্বন,
অগুন্ঠিতা ভাষা-বধূ বাহিরে বাহির।
মদনের মহােৎসব মনের আগারে,
আবির কুঙ্কুম পঙ্কে ধরা লালে লাল,
দু’টি আত্মা মিলিয়াছে দেহের দুয়ারে,
এক হয়ে মিশে গেছে আজ আর কাল।
লুপ্ত দেশ-কাল-পাত্র-শুধু চিরন্তন,
আছে বুকে বুক এক নগ্ন আলিঙ্গন।
নিঃশঙ্ক
হৃদয় মেলেছে বাহু হৃদয়ের পানে,
অধরে অধর করে অমৃত সৃজন,
বসন্ত এসেছে ফিরে পাপিয়ার গানে,
পবনে পড়িছে ঝরে’ সােনার স্বপন।
গেলাস ভরিয়া লহ গােলাপী সুরায়,
তরুণী প্রিয়ার তনু টানি লহ কোলে,
দুটি বাহু বাঁধা থাক্ গলায় গলায়,
চিহ্ন আঁকা পড়ে যাক্ অধরে কপােলে।
হৃদয় কাঁপিছে সখি ?—চাপ বুকে বুক,
নয়নে তােমার ওকি মদালস হাসি ।
পান-পাত্রে হানাে হানাে তৃষার্ত চুমুক
মৃত্যু আসে বসন্তের ঝরা ফুল রাশি।
ঝরা বসন্তের ফুলে বিছাও শয়ন,
বুকে প্রিয়া, মুখে সুরা কে ডরে মরণ ?
জয়দেব
মাধবে সম্মুখে রাখি মদনের রণ,
শিখণ্ডীর অভিনয় কাব্যের দুয়ারে,
তূণে অস্ত্র সে কেবল চুম্ব-আলিঙ্গন,
নেমে আসে যেথা সেথা ধারার অাকারে।
যুবতী রাখিতে নারে বুকের বসন,
পবন শিথিল কেশে দোলা দিয়ে যায়,
সহসা শিহরি’ ওঠে ঘন পীন স্তন,
নীবি-বন্ধে খসে বাস কথায় কথায়।
মেঘের বিদ্যুতে জ্বলে আঁকা-বাঁকা লেখা,
ছায়া তার পড়ে আসি বেপমান বুকে,
অন্ধকার বন-পথ-বিরহিনী একা-
বঁধু তারে চাপি বুকে চুমে চোখে মুখে।
ছন্দ শরে দাগিয়াছে রভসের রেখা,
মদনের কবি রাখি মাধবে সমুখে।
বৈষ্ণব কবি
গগনে মেদুর মেঘ, ঘন গরজন,
বাতাসের বুকে দেয়া ঝরে ঝর ঝর,
বঁধু আসে অভিসারে-সজল শাঙন,
পড়ে পদ-ভূমে নহে, বুকের উপর ।
বঁধু আসে অভিসারে—গভীর আঁধার,
অধর উঠেছে ভরি কানায় কানায়,
বিদ্যুৎ আঁকিয়া যায় বাঁকা তরবার,
তারি ঘায়ে রেখা পড়ে হৃদয়ের গায় ।
কেতকী শিহরি’ ওঠে ঘন বন-পথে,
বঁধু আসে অভিসারে—উতলা পবন,
বিবশ বসন্ত ফুটে’ ললাটে মনােরথে,
মনােবায় উড়ে যায় বুকের বসন !
বৈষ্ণবের গান অাঁকে বিশ্বের পরতে,
যৌবনের তুলি দিয়া বিরহ-মিলন।
শ্রাবণের মেঘ
ওরে তােরা ঘরে কে আছিস্ বসে’, বাহিরে আসিয়া
দেখে যা,
শ্রাবণ মেঘের ঘন নীল লেখা চোখে মুখে বুকে
মেখে যা।
বাতাসের ঝােল তােলে কল্লোল মেঘের গভীর অতলে—
দিশেহারা ঐ বাতাসের বুকে বুকের আবেগ রেখে যা !
যার যাহা আছে সেরা সাজ আজ তাই পরে’ আয় বাহিরে,
ঐ ঘন ঘন দুরু দুরু মেঘ গুরু গুরু ওঠে গাহিরে।
ধানের আঁচলে উলসিয়া দোলে তরুণ রূপের মাধুরী
নবীন মেঘের মাঝখানে আজ জড়তার ঠাই নাহিরে।
ছাখ, চঞ্চল দোলে অঞ্চল অসন্থতার জঘনে,
দোলায় আজিকে দে দোল্ দে দো-হৃদয়
দুলিছে সঘনে।
সবুজ ঘাসের দীর্ঘশ্বাসের গন্ধ ঝরিছে বাতাসে
ভরপূর আজ ভূতল ভুবন—ফাঁক নাই সারা গগনে।
শ্রাবণের মেঘ
আজ কাজরীর কাজল আঁচলে কে তুলেছে গড়ে’ আঙিয়া,
আকাশের পায় নীলের সাগর ঢেউয়ে ঢেউয়ে পড়ে ভাঙিয়া।
তার পরণের জরি বসনের পাড়ে পাড়ে ঝলে বিজলী--
কে রহিবে ঘরে রভসে যখন হৃদয় উঠেছে রাঙিয়া !
-
ঐ ঝর ঝর ঝরিছে বাদর, দিকে দিকে ভরা কুয়াশা,
ওরে তােরা কেহ করিসূনে এর মায়া মথিবার দুরাশা।
যবনিকা তলে যে কাহিনী চলে, গােপন হয়েই থাক্ সে-
মেঘ-উৎসব সে যে অজানার মহারহস্য-হুতাশা।
দ্বিধা-বিতর্ক ছুড়ে’ ফ্যাল্ দূরে, কাজ নাই আজ বিচারে,
ঐ থই থই ধারার পাথারে বিছায়ে দে হিয়া বিছারে ।
ময়ুরের পাখে কি নাচন জাগে-ইন্দ্রধনুর চাদোয়া।
আজিকার দিন নহে নহে হীন—বৃথা নহে
নহে মিছারে।
ওরে তােরা আয়, রূপের লেখায় মনের ফলক একে নে,
নব ঘন কেশ, শ্যামল আঁচল নয়ন ভরিয়া দেখে নে।
ধরার এমন নব যৌবন মেঘ ছাড়া কেবা দেখেছে ?
হৃদয়ে-বাহিরে, দেহে-মনে এর মদিরার ফেনা মেখে নে।
পরিচিতা
তােমায় আমি চিনি ওগাে,
তােমায় আমি চিনি,
অজানা নয় তােমার পায়ের
নূপুর রিনিঝিনি।
সাঁ সাঁ করে ছুটছে ঘােড়া,
হা হা করে বায়ু,
ঘােড়ার পিঠে রাজার কুমার
অবশ বুকে স্নায়ু।
বন্-বনিয়ে ঘুরূছে মাথা
তেপান্তরের মাঠে
ঘনায় রাতি,-এলা সােয়ার
আর কেহ নাই বাটে।
পিয়াসে তার ফাটছে ছাতি,
কাঁপছে শ্লথ পাণি,
থেকে থেকে পড়ছে মনে
বাড়ীর স্নেহখানি।
পরিচিতা
হঠাৎ এ কি চোখের আগে
এ কার মায়া-কাঠি
ফুটিয়ে দিল রাজার বাড়ীর
সাত-মহলাটি
দ্বারে নাইকো দ্বারী কেহ,
নাইকো চলা-ফেরা,
সব দেশটা যেন কিসের
যাদুর জালে ঘেরা।
সােনার খাটে সােনার ছবি
একটি শুধু নারী,
সােনার কাঠি, রূপাের কাঠি
দুই পাশেতে তারি।
তােমায় আমি চিনি ওগাে,
তােমায় আমি জানি,
সেই একটি নারী তুমি
রাজকুমারের রাণী।
৬২
পরিচিত
তােমায় আমি চিনি ওগাে,
তােমায় আমি চিনি,
অজানা নয় তােমার হাতের
কঙ্কণ-কিঙ্কিণী ।
অরাজকের রাজ্য হতে
ছুটছে ঝড়াে-বায়,
দণ্ডখানি ধূলাের মাঝে,
মুকুট লােটে পায়,
বিচার ঘরে নাইকো বিচার,
মুখে নাইকো হাসি,
কাজের পরে উঠছে বেড়ে
অকাজ রাশি রাশি।
নুয়ে-পড়া মন্ত্রীমশাই
পড়েছে আরাে নুয়ে,
সেনাপতির তরবারি
লুটায় ভূয়ে ভূয়ে।
পরিচিতা
খালি পড়ে সিংহাসন
হাজার মণি-জ্বালা,
লক্ষ আলােয় রাজার সভা
হয়নি আজি আলা ।
রাজার হাতী পাগলা ক্ষ্যাপা
ছুটছে মাঠে পথে,
একটি রাজা—একটি রাণী
পায় না কোনােমতে ?
রূপসায়রে অঙ্গ মেজে
আসলে তুমি নারী-
হাতী তােমায় তুলে নিল
হাওদা-পরে তারি।
তােমায় আমি চিনি ওগাে
তােমায় আমি জানি,
হাতীর পিঠের নারী তুমি
অরাজ-দেশের রাণী।
৪
পরিচিত
তােমায় আমি চিনি ওগাে,
তােমায় আমি চিনি,
অজানা নয় তােমার প্রাণের
সুরের ঝিন ঝিনি।
আদি-কালের ভাের হতে সে
কতই খোঁজা-খুঁজি,
ছােট বড় কতই রাজ্য,
কতই গলি-খুঁজি,
সাত সমুদ্র তের নদী-
ঝা-ধারা কত,
মাথার পরে পপরিয়ে গেছে
বিপদ শত শত।
মনের মাঝে নাই সােয়ান্তি,
হাসি নাইকো মুখে,
একটি কে যে তারই লাগি
শােণি ত নাচে বুকে
পরিচিত। মুক্তি সে তাে চায় না হিয়া, বাঁধন সে যে চায়, বাঁধার মত একটি বাঁধন- কোথায় তারে পায় ? চোখের আগে মনের আগে হঠাৎ এ কার মায়া, জন্ম-যুগের ধ্যানের ধনের স্বপ্নঘেরা কায়া। সকল থেকে তফাৎ-করা একটি সে যে নারী, জীয়ন-কাঠি মারণ-কাঠি দুই পাশেতে তারি। তােমায় আমি চিনি ওগাে, তােমায় আমি জানি, ধ্যানের ধনের মূৰ্ত্তি তুমি, চিত্ত-মাঝের রাণী।
খেয়াল
পতির খড়মে সতী করিছে প্রণাম,
ছেলে কহে, “কি করিলি, আরে রাম রাম ।
ও যে মাটি-ভরা কাঠ, থাকে পা’র কাছে।”
মা কহিল, “বাবা তাের ওরি মাঝে আছে।”
“গালি দিলি,” ছেলে কেঁদে কহে মহা রাগে,
“আমার বাবারে তুই—আসুক সে আগে।”
এল বাবা, মা’র কীৰ্ত্তি ছেলে কহে সব ;
হর্ষ-মৌন মুগ্ধ পিতা, নির্বাক নীরব
লজ্জিতা লক্ষমীর মূৰ্ত্তি তুলে নিল বুকে,
চুমায় চুমায় তারে ঢেকে দিল সুখে।
হতবুদ্ধি ছেলে ভাবে--মা দিয়েছে গাল,
বাবা তারে চুমাে খায়—কেমন খেয়লি !
৬৭
চিঠি
আমায় কেন লিখছ নাকো চিঠি,
বল তত আমি থাকি কেমন করে ?
বুকের ব্যথা বুঝতে যদি সেটি,
এমন করে রইতে না তাে সরে’!
যে দিকে চাই কেবল ফাঁকা লাগে,
কাজের মাঝে পাইনে আমি দিশা,
এক মিনিটের কাজ ছিল যা আগে,
আজ তাহাতে কাটছে দিবা নিশা।
দু’টি ছতর লেখ—আমায় লেখ,
আজকে আমি হয়েছি কি যে দেখ !
বায়ু ব’য়ে আছে হু হু হু হু,
হা হা করে উঠছে আমার প্রাণ,
দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়ে কুহু,
আমার কাছেই মিথ্যে যে তার গান
সারা দিনটে কাটে কিসের টানে,
কি যে ভাবি নিজেই নাহি বুঝি,
চিঠি
এখন যার জলের মত মানে
একটু বাদে অর্থ তারই খুঁজি।
একটি চিঠি-ঘােট্ট ক’টি কথা,
তারই লাগি এমন কৃপণতা !
কত কি যে ভাবনা এসে পড়ে,
অমঙ্গল ফেলছে ছায়া কত,
দেই আমার উঠছে কঁপি ভরে,
ঝড়ের আগে স্তব্ধ পাখীর মত।
তােমার কিছু হয়েই যদি থাকে—
সে ব্যথা মাের কেমন করে সবে?
নানা আমি ভাবতে নারি তা যে
তােমার খবর কে আজ মােরে কবে ?
চিঠির লাগি সইতে হবে এত,
আজের আগে ভাবিনি কভু সে তো !
সে দিনের সেই মােদের ছাড়াছাড়ি
আজিও আমি-আজিও ভুলি নাই,
চিঠি
হাত দু’টোরে বুকের পরে কাড়ি,
বলে’ এলাম অনেক চিঠি চাই।
চোখের কোঠা ছাপিয়ে এল জলে,
কেঁদে তুমি বল্লে যে তাই হবে,
বুকের ব্যথা ফুটল আঁখি-তলে,
নিঠুর তুমি আজ কেন গাে তবে ?
চোখের পাতা ফেতে পেতে ভয়,
সেই তােমারি এ কোন্ পরিচয় ?
সাতটি দিন আছি চিঠির আশায়,
সাতটি যুগ হচ্ছে আমার মনে,
সইছি যা তার ভাষা নাইকো ভাষায়-
অভিমান জাগছে ক্ষণে ক্ষণে।
তুমিও আজ গিয়েছ মােরে ভুলে’
এমনতর কেমন করে হ’ল ?
হৃদয় আমার উঠছে ফুলে দুলে
কেমন করে রয়েছ তুমি বল ?
छि
আমার বুকের ধড়ফড়ানির সুর,
পেীছে না কি তােমার অত দূর?
বন্ধুরা আজ আমায় চেয়ে হাসে,
বলে চিঠি—হায়রে ক্ষ্যাপা হায়
দু’দিন যদি দেরী করেই আসে
তাতে এমন কি-ই বা আসে যায় ?
শুনে আমি মরে যাই যে লাজে,
আবার ভাবি এই কেমন ধারা ?
এরা কি হায় পায় না চিঠির মাঝে
আপন জনের—প্রিয় জনের সাড়া ?
চিঠির আখর আমার আঁখি তলে—
সে যে তােমার হাসির মতই জ্বলে ।
চিঠি তাের—মিথ্যে সেততা নয়,
নয় সে কালীর হরপ দিয়ে গড়া,
তােমার মতই কথাও সে যে কয়,
মূর্তি নিয়ে দেয় সে মােরে ধরা!
किलिं
যে কথাটা জাগছে তােমার মনে,
চুমাের যে ফুল ফুটছে তােমার মুখে,
চিঠির কাগজ বাঁধলে আলিঙ্গনে,
ধারার মত ঝরে আমার বুকে।
মন-অতলে—তােমার যাহা নাই
চিঠির লেখায় দেয় যে ধরা তাই।
কেমন হয়ে গিয়েছি যেন আজ,
জলে জলে উঠছে ভরে আঁখি,
কাজের মাঝে হঠাৎ ভুলে’ কাজ,
অন্য মনে কোথায় চেয়ে থাকি।
আমায় কেন লিখছ নাকো চিঠি,
বলত আমি থাকি কেমন করে ?
বুকের ব্যথা বুঝতে যদি সেটি,
এমন করে রইতে না তাে সরে।
একটি ছতর লেখ—আমায় লেখ,
আজকে আমি হয়েছি কি যে দেখ !
৭২
পতিব্রতা
ঝিঝির কাঁদন থেমে আসে যবে, হিম হয়ে আসে বায়ু,
ক্ষীণ হয়ে আসে তারকার বুকে আলােকের পরমায়ু,
পূবের আকাশ ঠায় বসে’ যবে তিমিরের অচলায়,
মৃদু আলাে দিয়ে সরু পাড়খানি ধীরে ধীরে বুনে’ যায়,
গাঢ় ঘুম-ভাঙা সুস্থ শরীরে ছাৎ করে’ জেগে উঠি,
চোখে জল দিয়ে, গােয়ালের পানে তাড়াতাড়ি করে’ ছুটি।
গােরু বা’র করে’, গােবর ছড়ায়ে, দিয়ে থুয়ে ঘাস-জল,
ঘরে ফিরে দেখি, রাঙা হয়ে তবু ওঠে নাই নভতল।
অত ভােরে আমি কি করিয়া জাগি পোঁছে সবে
মাের কাছে---
আমি ভাবি
শুধু, ভােরে না জাগিয়া মানুষ কি
করে বাঁচে?
ঘরে ফিরে দেখি, সবে জেগে ‘ওরা বসিয়া তুলিছে হাই,
ঘুম-ভাঙা চোখে জড়তার জের তখনও ভাঙে নাই।
ককি সাজায়ে, হুকাটি ফিরায়ে, তামাক ধরায়ে ফুয়ে,
হাতে দিই যবে, হাসির জোছনা নুয়ে’ যেন পড়ে ভূয়ে।
পতিব্রতা
প্রভাতের দান—ভােরের হাসিটি, সকলের সেরা সুখ,
যতবার তাহা মনে পড়ে মাের—ভরে’ পূরে’ ওঠে বুক।
বসিবার পিড়ি, পা ধােয়ার জল, কয়লার গুড়াে আনি,
এমনি করিয়া সুরু হয়ে যায় দিবসের সেবাখানি।
আলাে-ঝিকিমিকি সূৰ্য্য ঠাকুর যখন গগনে নামে,
ভােরের ভ্রমর সহসা জাগিয়া ফুলের অধরে থামে—
ছেড়া ছাতাটারে
ঘুরায়ে
ফিরায়ে কভু ডানে, কভু
বঁায়ে-
এলো-মেলাে আ’ল ভাঙি দুই ধারে মিশে যায়
ভিগাঁয়ে।
বােয়াকে দাঁড়ায়ে উন্মনা, পথে কিছুকাল চেয়ে থাকি,
চমকিয়া লাজে গৃহ-কাজ মাঝে জেগে শেষে
পড়ে আঁখি।
বাসি আঙিনায় ঝাঁট দেই সুখে, তুলে ফেলি ছাইগাদা,
মুড়িতে করিয়া ধুয়ে মুছে ফেলি উঠানের ধূলাে-কাদা,
বিছানাখানিরে পাট করে রাখি, শপটি ভাঁজায়ে তুলি,
রায়ের পুকুরটি পাড়ে নিয়ে যাই এটো ঘটি বাটিগুলি,
৭৪
পতিব্রতা
সেইখানে শেষে স্নান করি শেষ, ভরা ঘট কঁাখে ল’য়ে
বাড়ী ফিরে আসি, দেড়প’র বেলা ধীরে ধীরে যায় ব’য়ে।
দুপুরের আগে রাঁধা-বাড়া যত সব সারা করে’ আনি,
সব কাজ মাের ভরে তােলে তার ভোরের সে
হাসি খানি?
গোড়াকার রােদ মাথার উপরে ঘন হয়ে জেগে ওঠে,
তেতে ওঠে মাটি, বাতাসের বেগে আগুনের
জ্বালা ছােটে।
তার চেয়ে বেশী মনের আগুন—আমি তারে ঢেকে রাখি,
দগ্ধ পথের প্রান্ত চাহিয়া ঠিকরিয়া পড়ে আঁখি।
দোরে না দাড়াতে দু’টি হাতে ধরে ঘরে তারে আসি নিয়ে,
রোয়াকে বসাই, মুছে দিই মুখ আঁচলের আগা দিয়ে।
ঘামটি শুকায়ে, তেলটুকু মেখে, হাতে দিয়ে গামছাটি—
মনে মনে ভাবি—হই নাই কেন ঘাটের পথের মাটি।
ডাল-শাক-পাতা যা জোটে যে দিন, যতনে খাওয়াই তারে,
শপটি বিছায়ে ছায়া করে দিই রােয়াকের পূব ধারে।
পতিব্রতা
“ওগাে খেতে যাওগড়ে গেছে বেলা-হাওয়া আর
লাগিবে না।”
“ঘুমােও গাে তুমি—মিছে কেন বকো ?”—“ঘুম সেকি
মাের কেনা ?”
অ-কেনা ঘুমেরে কিনে দিয়ে তারে, মুখে দুটো
গুজি সুখে,
দিবসের যত কাজের মাঝারে পুনরায় পড়ি ঝুকে।
ধান সে শুকায়ে ভেনে আনি তারে, ডাল ভাঙি,
চাল ঝাড়ি-
পূবের তপন পছিমের গায় ডুবে যায় তাড়াতাড়ি।
আপনার হাতে সাঁঝের প্রদীপ সাঁঝ হ’তে জ্বালি ঘরে,
জীবনের পথ আলাে হয়ে যাক্ লক্ষী মায়ের বরে।
রাত আধ-প’র পার নাই হতে খাওয়া দাওয়া করি সায়,
শ্রম-সকাতর গতরখানিরে ঢেলে দিই বিছানায় ।
শুতে না-ই শুতে কি যে ঘুম ঘােরে মুদে আসে
আঁখি পাতা,
কোথা দিয়ে রাত পার হয়ে যায় কোনােমতে
বুঝিনে তা।
পতিব্রতা
দু’টি বাহু-দু’টি স্বর্গের মাঝে এই রূপে থাকি মরে,
ভােরের হাসিটি স্বপনেতে শুধু মাঝে মাঝে মনে পড়ে।
গ্রীষ্ম দিনের কাঠফাটা রােদ বেশ মাের গায়ে সয়,
পউষ-শীতের হুমকুড়ি দেখে কখনাে করিনে ভয়।
শাঙনের দেয়া ঘন চরকায় জিরি জিরি ঝর ঝর
বােনে উপবাসভয়ে সারা ধরা, মাের শুধু নাহি ডর।
দিনে খেটে, রেতে নিঝুম ঘুমায়ে, মােটা খেয়ে
মােটা পরে,
দিনগুলাে মাের নেমে যায় সুখে ঝরঝরে খরূ-খরে।
সবল নিটোল নীরােগ শরীর, স্বামী মােরে ভালোেবসে,
সকলের সেরা ভােরের হাসিটি সব কাজে ভেসে আসে ।
৭৭
পতিব্রতা
“ওগাে খেতে যাও—গড়ে গেছে বেলা-হাওয়া আর
লাগিবে না।”
“ঘুমােও গাে তুমি—মিছে কেন বকো ?”—“ঘুম সেকি
মাের কেনা ?”
অ-কেনা ঘুমেরে কিনে দিয়ে তারে, মুখে দু'টো
গুজি সুখে,
দিবসের যত কাজের মাঝারে পুনরায় পড়ি ঝুকে।
ধান সে শুকায়ে ভেনে আনি তারে, ডাল ভাঙি,
চাল ঝাড়ি-
পূবের তপন পছিমের গায় ডুবে যায় তাড়াতাড়ি।
আপনার হাতে সাঁঝের প্রদীপ সাঁঝ হ'তে জ্বালি ঘরে,
জীবনের পথ আলাে হয়ে যাক্ লক্ষী মায়ের বরে।
রাত আধ-প’র পার নাই হ’তে খাওয়া দাওয়া করি সায়,
শ্রম-সকাতর গতরখানিরে ঢেলে দিই বিছানায় ।
শুতে না-ই শুতে কি যে ঘুম ঘােরে মুদে আসে
আঁখি পাতা,
কোথা দিয়ে রাত পার হয়ে যায় কোনােমতে
বুঝিনে তা।
পতিব্রতা
দু’টি বাহু—দু’টি স্বর্গের মাঝে এই রূপে থাকি মরে,
ভােরের হাসিটি স্বপনেতে শুধু মাঝে মাঝে মনে পড়ে।
গ্রীষ্ম দিনের কাঠফাটা রােদ বেশ মাের গায়ে সয়,
পউষ-শীতের হুমকুড়ি দেখে কখনাে করিনে ভয়।
শাঙনের দেয়া ঘন চরকায় জিরি জিরি ঝর ঝর
বােনে উপবাস-ভয়ে সারা ধরা, মাের শুধু নাহি ডর।
দিনে খেটে, রেতে নিঝুম ঘুমায়ে, মােটা খেয়ে
মােটা পরে,
দিনগুলাে মাের নেমে যায় সুখে ঝরঝরে খরূ-খরে।
সবল নিটোল নীরােগ শরীর, স্বামী মােরে ভালোেবসে,
সকলের সেরা ভােরের হাসিটি সব কাজে ভেসে আসে ।
৪
সিন্ধুর মাতৃত্ব
অনন্ত বিপুল সিন্ধু চলােৰ্ম্মি-মুখর
কল্লোলিয়া লুটিতেছে অনন্ত বেলায়,
হিল্লোলে হিল্লোলে ওঠে একাগ্র সুন্দর
ফেন-পুষ্প-পূত অর্ঘ্য দেবতার পায়।
দীর্ণ বক্ষবন্ধ টুটি ফোটে আর্তনাদ,
কহে—দেহ ফিরাইয়া অভাগীর ধন,
সমুদ্র মন্থন এ তাে নহে বিশ্বনাথ,
হায় এ যে জননীর অন্তর মন্থন !~-
উন্মাদিনী বিবসনা উৰ্ম্মি-বাহু তুলি,
তনয়ে কাড়িতে চাহে হৃদয়ে কৌতুকে ;
নিষ্ফল আবেগ শুধু দিগন্ত আকুলি’
আপনি ফিরিয়া আসে আপনার বুকে।
ঊদ্ধে গৃহ-হারা চন্দ্র পলক-বিহীন
আৰ্ত্ত মাতৃ-অঙ্ক চাহি আড়ষ্ট—তুহিন।
;
৭৮
নদীর প্রতি সিন্ধু
আয় ওরে ব্যথাতুর, ওরে গৃহহারা,
উপল-আহত-গতি তাপ-তপ্ত ধারা,
আমার অগাধ বুকে—অন্তরের মাঝে,
যেখানে সকল রাগে, সব ছন্দে বাজে,
সবার বেদনা-গীতি সমবেদনায়,
নিভৃত মুখর সেই বক্ষ মাঝে আয়।
যেথা হতে যত কিছু এনেছিস্ বয়ে’
যত দৈন্য, যত ক্লান্তি,—গ-ভরে সয়ে
মানবের যত গ্লানি, পশুর লাঞ্ছনা,
অভিশপ্ত ধরণীর যত আবর্জনা,
সমস্ত নামায়ে রাখ, নীরবে নির্ভয়ে
আমার বুকের পাশে নির্জন নিলয়ে।
তারপর গ্লানি-মুক্ত ঊদ্ধে যাও চলে,
সূৰ্য্যালােকে বিধাতার সিংহাসন তলে ।
৭৯,
সন্ধ্যায়
আকাশের গায় কুঙ্কুম ভেঙে ছড়িয়ে দিয়েছে কে,
আজ সন্ধ্যায় যা দেখি তাহা দেখিনি জীবনে যে ।
কূলে কূলে ভরা গঙ্গার ভাল,
মেঘের চুমােয় আজি লালে লাল,
ময়দানবের মায়ার মাধুরী আকাশে ভেরেছে রে,
কুঙ্কুম ভেঙে সন্ধ্যার গায় ছুড়িয়া মেরেছে কে ?
ও কাহার পা’র আর ধার জলে ঐ পড়ে গলে
অথির বিজুরী থির হয়ে হােথা নাহিতে নেমেছে জলে।
ফেনে ফেনে ফোলা মদিরার ধারা,
লহরীর দলে নাচে দিশেহারা,
রূপের মাতাল কূলে কূলে তার ককলে ছ-ছলে,
মনের স্বপ্ন মূর্তি ধরিয়া ফুটেছে জলে স্থলে !
স্বেচ্ছায় আজি পথ-হারা পাখী—সােনা ঝরে গায়ে তার,
রঙের পাথারে ঢেউ তােলে তার কণ্ঠের ঝঙ্কার।
৮০
সন্ধ্যায়
গাছের মাথায়, চমকিয়া দিক
চমকি ঠোকে হাসির ঝিলিক,
মণির খনিটে খুলেছে তাহার গােপন মৰ্ম্ম-দ্বার,
স্বর্গে মর্ত্যে মুক্ত আজিকে কুবেরের ভাণ্ডার।
ছােট নাও খানি ঐ আসে পারে—আলাে জ্বলে
তার পালে,
দাড়েরে ঘেরিয়া হীরের চূর্ণ চুমার চুমকি জ্বালে।
এ পারের পানে ওপারের ভাষা,
জল-কাটা পথে করে যাওয়া-আসা,
তরী দোলে সুখে বিরহী বুকের বেদনার তালে তালে
বিরহের ছায়া বিছায়েছে মায়া আজি এ সন্ধ্যা-ভালে।
আকাশে জেগেছে রূপের জোয়ার-ধরায় দিয়েছে ধরা,
বে-হুস নৃত্যে সুধার কলস ভাঙিয়াছে অপ্সরা !
মেঘ হ’তে ঐ হানে পিচকারী,
চোখে মুখে বুকে স্বর্গের নারী,
তালে তালে তালে বাজে তাহাদের বেতাল সপ্তস্বরা ;
আজি সন্ধ্যায় রূপের জোয়ার ধরায় দিয়েছে ধরা।
৮১
সন্ধ্যায়
আজি সন্ধ্যায় মত্ত লীলায় অাকাশে পরীর দল,
তাদেরি শাড়ীর জরি পাড় ঐ মেঘ-শিরে ঝলমল।
মদের মতন গাঢ় এ পুলক,
ভুলায়ে দিয়েছে সব দুখ, শােক,
আলাের ভেলারে দোলা দিয়ে দোলে মেঘ-পাথারের জল
নীল সাগরের দীপে দীপে আজ উজল নভস্তল।
কবে গঙ্গার রজত ঝর্ণা ঝরেছিল ধরা বুকে,
দেখিনি কি শােভা সাড়া দিয়াছিল সেদিন সে ধারা মুখে।
আজ দেখিতেছি শুধু আঁখি ভরে
সােনার গঙ্গা ধারে ধারে ঝরে,
অই থই থই-অগাধ-অবাধ-ঝরিয়া নামিছে সুখে--
চোখে দেখি আর মূক হয়ে থাকি--বিস্ময়ে কৌতুকে ।
১২
মাঠের গান
ঐ যেখানে নীলের মাঝে সুরের হাওয়া সন্তরে,
সবুজ ঘাসে পুষ্প ফোটে মৌমাছিদের মন্তরে
বিলিয়ে দে তাের মন্-প্রাণে,
রস-ধারার চির তরুণ সেই মাধুরীর মাঝখানে !
মাঠের মাঝে ঐ খানেতে আনন্দের সঙ্গীতে,
বেণুর রবে ধেনু চরে রাখালদেরি ইঙ্গিতে।
ধেনুর সাথে চরে বেড়ায় নিত্য গাে,
ঐ খানেতেই চির-রাখাল সুন্দরেরি চিত্ত গাে।
ঐ খানেতেই পাখী ওঠে খােস-খেয়ালে গুণ গুণি,
নদীর ধারা ছুটে চলে কলতানের জাল বুনি।
মোন মেঘের অঞ্চলে,
আলাের মালা খােলা হাওয়ার হিন্দোলতে সঞ্চলে
মাঠের গান
পরিশ্রমের আনন্দেরে মূৰ্ত্তি দিয়ে বাঞ্ছিত,
প্রাণের বেগে গাহে হােথায় কৃষক চির লাঞ্ছিত।
আপন মনে দেয় ধরা,
সেই গানেরি মূচ্ছনাতে সফলতার অঙ্গরা।
ওরে ক্ষ্যাপা, ওরে পাগল, রসের মাতাল আমনা,
ঐ মাঠেরি মিঠে সুরে প্রাণের দু’টো গান শােনা।
ভুল যদিই হয় ছন্দরে,
তবুও তাতে রবেই প্রাণের প্রচুরতার স্পন্দরে।
৮৪
দ্বিধান্বিত ভুলহীন, ওরে দ্বিধা-লীন, টিপে টিপে এত চলিলি যে পথ কত সুখে তাের গেল দিন ? পথ শেষ যেথা, হয়তাে রে সেথা শুধু তাই আছে—শুধু তাই, চলিতে চলিতে পেরেছ যা নিতে, বেশী নাই—তার বেশী নাই। যদি মাপা পড়ে তবে হয়তাে রে, সুখের দুখের তুলনায়, সুখ হতে তার বেদনারি ভার ভারি হবে-হবে বেশী হয় ? কেন মিছে তবে বাঁধাগতি ? লাগামখানিরে ছেড়ে দে বারেক- হবে না হবে না কোনাে ক্ষতি। যদি ভুলে যা পথের আভাস, ঘনাইয়া যদি আসে ঘাের,
দ্বিধান্বিত
পথের মাঝারে
মিলে যেতে পারে
দুই-চারি ফোঁটা আঁখি-লাের।
সে ফোঁটার মাঝে মিশে আছে লাজে
হয়তাে রে কত মধু হাসি,
হয়তাে রে আছে।
সে ফোঁটার মাঝে
অরুণ কিরণ রাশি রাশি।
যেথা হবি থির
হয়তাে সমীর
সেখানে মদির
মধুময়,
ফুলের অধরে
সুধা হাসি ভরে
সুরভি সে করে অভিনয়।
হয়তাে সেথায়
পথ-ভােলা বায়
ছেয়ে আছে বন উপবন,
হয়তো রে হয়
সেথা পরিচয়
গানে আর প্রাণে অনুখণ।
দ্বিধান্বিত মিছে কেন তাের কাতরতা ? মুক্তির মাঝে যত সুখ আছে, বাঁধনে সে নাই জানা কথা ! ঊষার আকাশে, উদার বাতাসে, অসীমের মাঝে উড়ে চলা- মাপা সুখ ভার- কাছে লাগে তার ? -মিছে কেন তবে মনছলা ? ভুল যদি হয়, ভয়—নাই ভয়, ভুলের পথের কাছে কাছে, নবীন তরুণ কান্ত করুণ অরুণ অধর আছে—আছে। অথই,গভীর পাথার নিবিড় মেঘের মতন ভেসে চল, শীত বায়ু জাগে যদি আঁখি আগে, খানিকটা ঝরে যাবে জল ।
দ্বিধান্বিত
জল-ভার-হারা
জলদের পারা
উড়ে যেতে যদি থেমে যাস্ ,
চমকি’ নিমেষে
দেখিবি রে হেসে
জড়ে গেছে গলে বাহু-ফস্ !
ভয়ে-ভরা ওরে দ্বিধা-টুক,
বােঝা-পড়া মাঝে এত মধু আছে--
আছে কিরে তায় এত সুখ ?
বাঁধা তার ঘাট,
সােজা তার বাট,
হাসা-কঁদা তার জানাশােনা,
সহসা সুখের,
অজানা দুখের
নাহি তাে সেখানে আনাগােনা।
অসীমের বুকে,
অগাধের মুখে,
চল্ তবে ছিড়ে দ্বিধা-পাশ,
হয়ত রে আছে,
হতভাগা, তুই যারে চা!
ভুল পথ মাঝে
৮৮
শীতের দিনের গান
সূৰ্য্য ঠাকুর, সূৰ্য্য ঠাকুর, কোথায় তােমার ঘর?
সাত সমুদ্র, তের নদী, তেপান্তরের পর ?
অন্ধকারের মাঠের শেষে, আলাের আবর্তে ?
ময়দানবের মরীচিকা-মায়ার রাজত্বে ?
নিত্যি কোথাও যাও ? মুখটি তুলে চাও,
বেশী না হােক একটি রেখা—একটি রেখা দাও।
বেশী না হােক একটি রেখা—একটি রেখা দাও,
আজকে এই শীতের ভােরে মুখটি তুলে চাও।
কৃপণ তুমি নয় তা জানি, দরাজ তােমার হাত,
দরাজ হাতে বিকাও তুমি হাজার আশীর্বাদ।
দুখের নসিব গরীব মােরাই পড়ব শুধু বাদ !
ততটুকুই নেবাে মােরা, যতটুকু দেবে,
বেশী করে চাইব নাকো—কেউ বেশী না নেবে ।
কম হােক্ কি বেশীই হাে, শীতের ভােরের বেলা
যাহা কিছু দেবে তারেও কব নাকো হেলা।
মেয়েরা সব জড় হবে অন্দরের ছাতে,
পুরুষেরা দৌড়ে যাবে বাহির আঙিনাতে।
=
শীতের দিনের গান
মিথ্যে যদি বলি-না হয় যেয়াে চলি,
হয় তুমি আগুন সম রেগেই উঠো জুলি।
থরথরিয়ে থরথরিয়ে কাঁপছে আমার গাও,
সুৰ্য ঠাকুর, সােনার ঠাকুর, মুখটি তুলে চাও।
কুজটিকার ধূসর ধোঁয়া তফাৎ করে’ দিয়া,
দুর্বাদলের বুকের মাঝের বাষ্পরে শুষিয়া,
এস তুমি হাওয়া ঘােড়ায় বন্ধুটি কষিয়া !
সূৰ্য্য ঠাকুর, সূৰ্য্য ঠাকুর, কোথায় তােমার ঘর ?
সেকি সেই মগ-মুলুকের পাহাড়গুলাের পর ?
স্মৃৰ্ত্তি—শুধু স্মৃৰ্ত্তি সেথায়-আলাে আর আলােক ?
কাজের মাঝেও ঝরে সেথায় স্বপ্ন-পাখীর পালক ?
ভরা বুঝি সবি সেথায় গন্ধে এবং গানে ?
জলেও নহে, স্থলেও নহে, মেঘের মধ্যখানে
কোথায় তুমি থাকো ? পা-ই বা কোথায় রাখাে?
ভীত তােমায় করে নাকো বজ-মেঘের ডাকও ?
ক-কনিয়ে আসছে ছুটে পৌষ মাসের বাও,
সূৰ্য্য ঠাকুর, করুণ ঠাকুর, মুখটি তুলে চাও।
শীতের দিনের গান
মস্ত বড় রাজা তুমি, মস্ত বড় লােক,
হাজার ঘােড়ার রথটি তােমার লক্ষ ঘােড়ার হােক,
বারেক শুধু মােদের পরে পড়ুক্ তােমার চোখ !
একশ’ মাণিক জ্বালা তােমার সােনার টোপরে,
ঝঝলিয়ে উঠছে হীরা পায়ের উপরে।
শর্ষে খেতের উপর দিয়া বামন-বাড়ী ছাড়ি,
বাঁশের ঝাড়ে পিছন করে', এস মােদের বাড়ী।
তরুণ হাতে করুণ স্রোতের মাপকাঠিটি নিয়ে,
ঝর্ণাঝরা আলো তােমার উঠাও গাে ফেনিয়ে।
জামা কিনে পরি, নাইকো কানাকড়ি,
জামার মত ছেয়ে ফেলে। আলাের রথে চড়ি।
মাঘের শীতে কাঁপছে দেহ কঁপছে আমার পাও,
সূৰ্য্য ঠাকুর, দয়ার ঠাকুর, মুখটি তুলে চাও।
তােমার চাকা সােনায় ঢাকা-আগুন দিয়ে ঘেরা,
সেগুন কাঠের আগুন সে যে-সব আগুনের সেরা।
রাত দুপুরেও খেলুক সেথা আলাের বালকেরা।
অতীতের স্মৃতি
সেদিন ভােরের আলােকের রেখা ছায়ার আঁধার তলে,
একটির পর নেয়ে যেতেছিল একটি সে কালাে জলে।
মান-অবসানে সিক্ত বসন—তুমিও দাঁড়ালে আসি,
ঊষার আভাস চমকিয়া যেন দেখিল সে রূপরাশি।
সারা প্রান্তর স্তব্ধ নিঝুম, স্তব্ধ গগনতল,
ঢেউগুলি সেও তােমারে হেরিয়া ভুলে’ছিল কোলাহল।
দু’ একটি পাখী কচিৎ কখনাে ঘুম-ঘােরে দিশাহারা,
ঝাপটিয়া পাখা, আলােড়িয়া শাখা দিতেছিল শুধু সাড়া।
বিস্তৃত দিক-চক্রের মাঝে হেথা আমি, তুমি হােথা,
তুমি আমি দু’টি—শুধু দু’টি প্রাণী—আর কেহ
নাহি কোথা ।
একটিও কেহ কোথা নাহি আর চাহে তব মুখ পানে,
আমি একা শুধু কি যে দেখিলাম মাের মন তাহা জানে ?
জল-ভারে ঋজু চিকুর চোয়ায়ে ঝরিতে ছিল সে বারি,
শিহরিতে ছিল চরণের তলে মুগ্ধা ধরার নাড়ী !
অতীতের স্মৃতি ছােট একখানি আকাশ গলায়ে সজল মেঘের ভার- ফোঁটে ফেটে যেন ঢেলে দিতেছিল বরষার বারিধার। দূর হ’তে আমি দেখেছিনু তব অপরূপ রূপরাশি, দেখেছিনু তব দেব-দুর্লভ অধরের মৃদু হাসি। সাদা মেঘখানি যেমন করিয়া বাতাসে মিলাতে চায়- তেমনি করিয়া মিশে যেতে ছিল রূপ সে তােমারি গায়। আজি বাতাসের দুরু দুরু বুকে বিরহ উঠেছে জেগে, ধারায় ধারায় মন জানা-জানি, কানাকানি মেঘে মেঘে। ধবল পাখার পালক উড়ায়ে বলাকা দিয়েছে সাড়া, চঞ্চুর সাথে চঞ্চু জড়ায়ে পাখীরা আত্মহারা। দূরে থেকে সে যে কত কাছে আজ-কাছে থেকে কত দূর- ধরিতে পারি না, রূপে আর রসে তবু মন ভরপুর। স্বপ্নের ছায়া কোথা মিশে গেছে—কোথা গেছে তার মায়া, অতীতের কথা মনে পড়ে তবু শিহরিয়া ওঠে কায়া ?
কালাে মেঘ
প্রজাপতির পাখার মত
হাল্কা সাদা মেঘের পাড়া,
তারি মাঝে হারিয়ে গেল
আমার দু’টি নয়নতারা।
হারিয়ে গেল হৃদয় আমার,
হারিয়ে গেল চিতল,-
রূপ-সায়রে ঢেউ তুলেছে
সাদা মেঘের পদল ।
পাঠিয়ে দিনু ডাকের লিপি
ওরে সাদা সফেদ মেঘ,
হাওয়া ঘােড়ার সােয়ার ওরে,
ওরে চপল নিরুদ্বেগ,
ও দেমাকী, খেয়াল-ভরা,
ওরে মােহন, নোরাম,
নামের পাথার উজাড় করে
দিলেম তারে হাজার নাম।
কালাে মেঘ
হঠাৎ হােথায় চেয়ে দেখি
আগুন-ঘেরা রূপের ছবি,
দিগ্বিদিকে জ্বালিয়ে দিয়ে
প্রলয় হাসি হাসছে রবি,
মুড়ে গেছে বনের মাথা,
শস্যদলের শুরু শির,
চমকে উঠে রইনু চেয়ে
চোখের কোলে জাগল নীর!
এক নিমিষে পড়ল মনে
কালাে মেঘের মায়ার কথা,
তাহার অতল অশ্রুসজল
বিকল ব্যথার বিহ্বলতা।
পড়ুল মনে--পরের তরে
নিঃশেষে তার নিজকে দান,
কালাে মেঘ সে-বক্ষে তাহার
কি ব্যাথারি বজ-গান !
কালাে মেঘ
করুণ কালাে স্নিগ্ধ নব
হে মেঘ, তুমি কোন্খানে ?
বিশ্ব পুড়ে ছাই যে হল
দাড়াও তােমার আশ মানে?
দাড়াও তােমার আকাশতলে
চোখে টানি স্বে-কাজল,
দাও বিছিয়ে দাও এলিয়ে
নীলাম্বরীর নীল আঁচল।
এস শােভন, নেত্রলােভন
শীতল-করা হৃদয়-হরা,
সাদা মেঘের ভুল ভেঙেছে—
দগ্ধ ধরায় দাও গাে ধরা ।
অক্ষমতা
হাজারতর দোষ হয়েছে, বহু রকম ত্রুটি,
এবার আমায় মাপ করাে মা, ধরি চরণ দু’টি।
শিষ্ট ছেলে নই মা তােমার, সুবােধ নহি মােটে,
কাজের বেলা তাই তাে আমার হাজার বাধা জোটে।
ওমা আমার এমনিতর বিবশ ভােলা মন,
সামনে যেতে পেছন টানে মিছের প্রয়ােজন।
ভয়ে ভয়ে পায়ে তােমার ছুটে এলাম ওমা,
এবার আমায় মাপ করাে গাে, করাে আমায় ক্ষমা ।
তাও বলি মা, তােমার কোকিল এমন যদি ডাকে,
ফুলগুলাে সব ফুটে ওঠে পাতার ফাঁকে ফাঁকে,
ফাগুন হাওয়া দেয় যদি মা, মাঘের বায়ে সাড়া,
পঞ্চমীতে উছলে ওঠে জ্যোৎস্না-গাঙের ধারা,
স্বপ্ন যদি দৃষ্টিটারে আগলে বসে রয়,
আপনারে মা, সামলে রাখা সহজ সেতাে নয় !
আমার একার দোষ নহে তাে আজের
সকল ত্রুটি,
এবার আমায় মাপ করাে মা, ধরি চরণ দু’টি।
অক্ষমতা
ফুলের নেশা রঙিন হয়ে মাঠ ফেলেছে ছেয়ে,
চোখ যে আমার ফেরে না মা, মাঠের পানে চেয়ে।
ঐ দেখাে মা, আমের গাছে আজ ধরেছে বােল,
আমের মুকুল বুকের মাঝে বাধায় বুঝি গােল ।
বসন্তেরি বিভল ভাষা ঐ যে পথে ঘাটে,
হৃদয় আমার বিকালে এই প্রাণ হারানাের হাটে।
পথ যদি মা, ভুলেই থাকি, নয় সে আমার দোষ,
এবার আমার মাপ করাে মা,-করিস্ নে মা রােষ।
দণ্ড যদি দিস্ মা তবে আজ মানিনে ক্ষতি,
নজর আমার নাই কো মােটেই দুঃখ সুখের প্রতি
অনেক ক্ষতি হয়েছে মা, আরাে অনেক হবে,
অনেক আশা জানি মা গাে স্বপ্ন হয়েই রবে।
জানি আমি, সাধ্যমত দিইনি তােরে ফাঁকি,
তবু তোরে দেওয়ার মত অনেক আছে বাকী।
অভয় ও তাের পায়ের কাছে ছুটে এলাম ওমা,
এবার আমায় মাপ করাে গাে-করাে আমায় ক্ষমা
১৮
দুঃসাহস
রাতের নাচন শেষ করে দিয়ে
অপ্সরী গেছে চলে,
লঘু চরণের মঞ্জীর তার
পড়ে আছে ধরাতলে ।
উন্মাদ তারে তুলে
নিয়ে
কহে,
-মাের ঘা’য়ে বাজিবি না,
অয়ি নটিনীর নিপুণ পায়ের
মুখরা মুগ্ধ বীণা ?--
-মােরে তুলে নিবে নাকি ?-
লােভা পাগলের মুখ পানে চাহি
মঞ্জীর কহে ডাকি।
#
দুঃসাহস
ঘন ঘন ঘন কঠিন আঘাতে
মঞ্জীর ওঠে বাজি,
প্রতি শিঞ্জিতে পাগলের চিতে
এ কি উল্লাস আজি ?
বাহিরে জগতে কত উপহাস
গুমরিছে কত ঠাঁই,
ফিরে দেখিবারাে অবকাশ তার
নাই আজ-নাই-নাই ।
সে শুধু ভাবিছে মনে,
প্রাণের কথাটি ফুটিবে কখন
নূপুরের নিক্কনে।
সূচী
ফুলের ব্যথা
৫
মনের বসন্ত
১২
•••
১৭
+ + টি
বরষায়
প্রিয়ার পথ
লক্ষী পূর্ণিমা
মদন ঠাকুর
মুকুল ও পুষ্প
অবুঝ
বাদল দিনের দুঃখ
মানা
কোকিল
আদি কথা
পতিতা
২৩
২৫
০ ০ ০
৩২
৩৭
৪৭
দুঃসহ
দেহের মহিমা
•••
সূচী r বসন্তের আগমন দৃষ্টি আদি নর নারী ০ ০ ০ ৫৪ ••• ৫৫ . এ ... ৫৭ a r০ + ss ••• • * ০ ০ ০ চুম্বন আলিঙ্গন নিঃশঙ্ক, জয়দেব বৈষ্ণব কবি শ্রাবণের মেঘ পরিচিত খেয়াল চিঠি পতিব্রতা সিন্ধুর মাতৃত্ব নদীর প্রতি সিন্ধু সন্ধ্যায় মাঠের গান ••• ••• ৭৮ ০ ০ ০ ৫ ••• ৭৯ ••• . . . ২
সূচী
০ ০ ০
দ্বিধান্বিত
শীতের দিনের গান
অতীতের স্মৃতি
৮৯
০ ০ ০
কালাে মেঘ
০ ০ ০
•••
৯৪
৯৭
০ ০ ০
দুঃসাহস
•••
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.