Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kurukhetre Dash Din Ed. 1

Chattopadhyay,jotindrachandra · 2009/10/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন
কাব্য
শ্ৰীযতীন্দ্রচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রণীত।
প্রথম সংকরণ।
মুর্শিদাবাদ।
সৈদাবাদ,-হিতৈষী-প্রে
১৩০৯।

হিতৈষী এসে ঐশশিভূষণ খো।

উৎসর্গ পত্র। উজল রতন বঙ্গভাষার উন্নতিকল্পে একান্ত তৎপর শ্ৰীযুক্ত বাবু রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহােদয়ের করকমলে। প্রশান্ত মুরতি স্বভাব সরল কোমল হৃদয় কবির মত ; বিজ্ঞান জগতে উন্নতি সাধন জীবন ব্রত। বঙ্গভাষা রূপ বিশাল সাগর ডুবিয়া ডুবিয়া হতেছ পার, তুলিছ যতনে মণি মুক্তা হিরা গাঁথিছ কতই নুতন হার ! নব আভাময় ‘প্রকৃতি, বিজ্ঞান ভাষার লালিত্য জড়িত কিবা, যেন ফোটা ফুল নিহার মাখিয়া ধরেছে হৃদয়ে ছাদের বিভা ; তােমার শুরুতে নবীন উল্লাসে ফুটিছে নিয়ত কুসুম দাম, রবে চিরলেখা সাহিত্য কাননে অমর অক্ষরে তোমার নাম। আমি চিরদিন মুগ্ধ স্নেহে 'ব জীবন জড়িত তােমার ঋণে, দিমু উপহার, ক্ষুদ্র কাব্য-হার ক্ষম দোষ যত অপিন গুণে। যতীন্দ্র।

No text on this page.

“কুরুক্ষেত্রে দশ দিন’
প্রথম সর্গ
দ্বিম অতীত য়, তমিস্র রজনী,
নিস্তব্ধ ধরণীতল,
কৌরব পাণ্ডবদল,
রণভূমি কুরুক্ষেত্র নিস্পন্দ এখন,
যার বক্ষে ভাগ্যদেবী করিবে নৰ্ত্তন।
নিভৃত কক্ষেতে একা করিয়া শয়ন,
আনন্দ সাগরে আজ, দেহ ঢালি কুরুরাজ,
মনােরম কল্লোদান রচি শূন্য পথে,
মিছেন তাহে হর্ষে বৃথা মনােরথে।

२
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
সেনাপতি গঙ্গাত, তাহে সমবেত
গজবাজি অগণন, রথ রথী বীরগণ,
ভাবিছেন নৃপ তাই হরিষ অন্তরে,
‘পিতামহ কালিতে পশিয়া সমরে
মুহূর্তে শিবে সেই দর্পী ধনঞ্জয়ে,
বন্দি করি যুধিষ্ঠিরে, সহ দম্ভী বৃকোদরে,
এ অনন্ত শােক জ্বালা নিবাবে আমার,
অশান্ত হৃদয়ে শান্তি দিবে আবার।
নৃপহৃদি মহার্ণবে চিন্তা তরঙ্গিত,
বিশাল সে চিন্তাবঙ্গে, মকর জলধি কক্ষে
আচম্বিতে উঠে যথা তরঙ্গ ভেদিয়া,
ভয়ঙ্কর ক্রোধমূৰ্ত্তি উঠিল জাগিয়া !
স্মরিয়া ভীমের উক্তি রােষে শিহরিয়া
মুষ্টিবদ্ধ করি করে, জলদগম্ভীর স্বরে
কহিতে লাগিল। নৃপ কঁপি থরথর
“এই উরু ভগ্ন এস কর বৃকোদর,
বুঝিব তােমারে, মূঢ়, কালি মহারণে,
দেখিব কেমনে তুমি
ত্যজিয়। সমর ভূমি
কোথায়, কাহার কাছে, করিবে গমন,
বসিয়া রয়েছে দেখ দুরন্ত শমন।

প্রথম সর্গ ।
যদিও, জলধিতলে পশিস্ দুৰ্ম্মতি,
মনেতে জানিস্ স্থির, চূর্ণ হবে তাের শির,
রক্ষিতে নারিবে তাহে দেবগণ আদি,
আমি রাজা দুর্যোধন তাের প্রতিবাদী!
সন্ধি ! সন্ধি ! সখ্যভাব! কভু নহে আর,
মনে যেন রহে তাহা প্রতিজ্ঞ। আমার যাহা
‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী,
যতক্ষণ রক্তস্রোত বহিবে ধমনী।
যুদ্ধ করি প্রাণপণে মিটাইব আশা,
-পিপাসু এ মম অসি তোমার হৃদয়ে পশি
মিটাবে শােণিত তৃষা, ঘুচিবে বিকার,
লভিবে অনন্ত শান্তি হৃদয় আমার।
সমরে অজেয়, বীর, অতুল বিক্রম,
তাটল প্রতিজ্ঞা তরে খ্যাত নাম চরাচরে,
যে জন ভার্গবজয়ী ক্ষত্রিয়-তপন,
ধনঞ্জয়ে রণাঙ্গণে করিবে নিধন।
রথি-কুল-রত্নবীর শল্য, কৃপ, দ্রোণ,
অগিবে আমার করে,
আনি রাজভেট তরে
নতমুখ যুধিষ্ঠিরে, বিজিতরতন,
তখন সমর সাধ হবে উদ্যাপন!

৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
যে পাবক হৃদি মম দহে অহরঃ
ডুবিলে হ্রদের জলে নিবে না, তবুও জ্বলে,
রণ-রক্তস্রোত বিনা নিবিবে কেমনে ?
নিষ্কন্টক হবে রাজ্য কালি মহারণে।”
আশার ছলনে মুগ্ধ হৃদয় গগনে
উদিল সৌভাগ্য রবি, হাসিল মােহিনী ছবি,
ভবিষ্য আকাশ পট নিৰ্ম্মল হইল,
চিন্তার তরঙ্গে নৃপ ভাসিয়া চলিল।
হেথা ভীষ্ম নিজ কক্ষে লভিছে বিরাম,
ক্রমশঃ বৃদ্ধের মনে, চিন্তাদেবী সঙ্গোপনে
ধীরে ধীরে তুলিতেছে ভাতের কথা,
খুলেন প্রকৃতি ধীরে উষামুখ যথা।
‘কালি রণ, কাল রণ করিব কেমনে।
পুত্রাপিক ধৰ্ম্মসনে ভেটিব কেমনে রণে ?
অর্জুনে কেমনে আমি করিব প্রহার ?
লক্ষ্মীপতি নারায়ণ সারথি বাহার।
কি করি, অশেষ জ্বালা অন্তরে আমার,
যদি নাহি ধনুঃ ধরি,
দুর্যোধন ক্ৰোধ করি
নাশিবে আপন প্রাণ মূহূর্তে এখন,
কি করে বুঝাব আমি অবােধ তখনি ।

প্রথম সর্গ।
ধীরে ধীরে চিন্তাস্রোতে নিদ্রা আবরিল,
স্বপ্নযােগে বীরবর
হেরে দৃশ্য মনােহর,
রতনে খচিত চারু কনক আসনে
আসীনা রমণী এক বিষন্ন বদনে।
কহ, দেবি শ্বেতভুজে! কে রমণী ওই ?
হেরিয়া সে মূৰ্ত্তি কেন গাঙ্গেয় বিকল হেন ?
বিস্তারি কহ, মা, দাসে, কহ, মা ভারতি,
বিশ্বরমে! কৃপা করি দাও গাে শকতি।
কেমনে বর্ণিব আমি এ সব কাহিনী।
কি গুণে ভাষার জলে ডুবিব ; মা, কোন বলে
তুলিব কুমুমদাম কাব্যের কাননে ?
প্রজ্ঞাহীন পুত্র তব এ মর-ভবনে।
ভাবসূত্র, বাক্যপুষ্প, নাহি, মা, সম্বল,
কেমনে গাঁথিব হার ? এ হৃদয় পারাবার
নীরস, কল্পনা সম্ভবে কেমনে?
যে নিধি জীবনীশক্তি কবির জীবনে।
তবে যদি দয়া কর এ দীনকিঙ্করে
ডুবিব জলধিতলে,
তুলিব, মা, অবহেলে
রত্নরাজি, চারুহার রচিয়া যতনে
পরাইব কুতুহলে তােমার চরণে।

৬
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
হেন সাধ্য নাহি কিন্তু, ভারতি, আমার,
গাঁথি আনি নব হারে, রত্নাকর তব বরে,
কালিদাস, কৃত্তিবাস, আর কবিগণ,
গাঁথিল যেমন হেম, শ্রীমধূসূদন।
কৃপা করি কহ, মাতঃ, অধম সন্তানে,
কেমনে মাতার সনে
দেখা করি, ফুলমনে
গাঙ্গেয় লইল শিরে আশীষ বচন ,
কহ, দেবি, এ দাসেরে যত বিবরণ।
কি ভাবিছে ভানুমতি শােকাকুল চিতে?
শুনি ভীষ্ম সেনাপতি যুধিষ্ঠির ব্যস্তমতি
কেন বা আইলা একা গাঙ্গেয় সদনে ?
কি চিন্তা উদিছে আজি পাঞ্চালীর মনে?
কি ভাবে বসিয়া পার্থ, বীর বৃকোদর ?
সুভদ্র। উত্তরা সনে কি ভাবিছে দুই জনে ?
কি চিন্তায় মগ্ন অজি চিন্তাহরী হরি ?
আর্জুনি কহিছে কিবা প্রিয়া কর ধরি ?
কি চক্রে রাখেন কৃষ্ণ পাণ্ডব জীবন ?
পার্থে শিক্ষা দিতে হরি, যবে সুদর্শন ধরি
ভীষ্মবধ হেতু যান প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া,
তাৰ্জ্জুন রােধিল কেন চরণ ধরিয়া ?

প্রথম সর্গ ।
৭
রণাঙ্গনে নিজ পণ করিয়া পালন,
বীরের আদর্শ ছবি, কৌরব-গৌরব-রবি
সায়ক শয়নে কেন মুদিল। নয়ন?
গঙ্গা কি করিলা শুনি পুত্রের শয়ন ?
কৌরব শিবিরে সুপ্ত ভীষ্ম মহারথ,
নিদ্রাবেশে হেরে বীর,
অচঞ্চল সুগম্ভীর
জননী বদন, রম্য, অপূৰ্ব্ব কথন,
স্নেহভরে পুত্রমুখে স্থাপিত নয়ন।
নীরবিন্দু স্থিরনেত্রে ভাসিয়া বেড়ায়,
নীলােৎপল-দলে জল
করে যেন টলমল;
সুগঠিত বিষধর স্পন্দিত সঘনে
বিষম স্নেহের ছায়া লক্ষিত বদনে।
জ্বলতা কম্পিত মৃদু, রক্তিম কপােল,
আলুথালু কেশপাশ, অবিন্যস্ত দেহবাস,
শিথিল সুগােল ভুজ, তনু স্পন্দহীন,
আকুল চিত্তের বেগ শােকেতে বিলীন।
নিরখি সতৃষ্ণনেত্রে তনয় বদন,
সম্বরি বিষাদনীর করি যত্নে চিত্ত স্থির,
কহিলা জানুবী তবে ধীর-ভগ্নস্বরে
‘প্রাণ কাঁদে বাছা মাের সদা তাের তরে ;

प
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
সায়াহ্নে কৈলাসে বসি ধ্যানেতে মগন,
হেনকালে গম দেহ যেন পরশিল কেহ,
নয়ন উন্মিলি আমি দেখিনু তখন,
দাঁড়ায়ে অদৃষ্টদেবী মলিন বদন।
জিজ্ঞাসিনু কেন, দেবি, সহসা এ ভাবে
উপনীতা মাের কাছে ?
কিবা নিবেদন আছে
কহ ত্বরা, শুনিবারে বাসনা আমার,
ঘটিল কি অমঙ্গল ত্রিদিবে আবার?
অদৃশ্য হইলা দেবী ছলিয়া আমায় ;
দেখিনু সম্মুখে মম বিশাল বারিধি সম
ভীষণ সমরক্ষেত্র প্রশস্ত প্রাঙ্গণ,
সমবেত গজ, বাজি, রণী অগণন ।
বাধিল
তুমুল যুদ্ধ
ভীম রণস্থলে ;
বাণের গর্জন ঘন,
হত রথী, অশ্ব, গজ, বিচূর্ণ স্যন্দন,
ধাবিত শোণিত-নদী, বিকট দর্শন।
ধূম, অগ্নি, উদগীরণ,
মুদি নয়ন ভয়ে থামিল আহব,
বিষাদে নিশ্বাস ফেলি, চাহিলাম আঁখি মেলি,
দেখিনু রথীন্দ্র এক ম্লান কলেবরে,
পড়িয়া মুদিতনেলে শরশয্যা’পরে।

প্রথম সর্গ ।
সহসা সমরবাদ্য বাজিল আবার,
বিস্ময়ে দেখিনু হায় ! স্মরি বুক ফেটে যায়,
এককালে সপ্তরথী মিলিত হইয়া,
ধনুঃকরে মহাবেগে চলেছে ছুটিয়া।
।
বৃহমাঝে শূরসিংহ ধন্য শূরকুলে!
ঘােড়শ বর্ষীয় যােধ,
যুঝে হর্ষে বিনারোধ,
অগ্নিময় দশদিশ তীব্র শরানলে,
রণঙ্গে সপ্তরথী ভঙ্গ দিয়া চলে।
গহন বিপিনে যথা ঘাের হুতাশন
তরু-গুল্ম-লতা নাশি মহাদম্ভে ছুটি আসি,
গরজে গম্ভীর নাদে শিখা উচ্চ করি,
নাদিল ভৈরবে যুবা ধনুঃ উর্দ্ধে ধরি।
ধাইল সমরে পুনঃ সপ্ত মহারথ,
আবার বাজিল রণ
খরশর বরিষণ,
প্রাণ ভয়ে রথিগণ রণে ভঙ্গ দিল,
অশনি নির্ঘোষে যুবা আবার নাদিল।
হেন মতে ছয়বার রণে পরাজিত
সপ্তরথী, যুক্তি করি কপট নিয়ম ধরি
লঙ্ঘিয়া রথীর প্রথা লাগিল চলিতে
ক্ষত্ৰকুলে, ছিছি, লাজ! অকীর্তি মহীতে।

১০
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বহদ্বারে সবিস্ময়ে দেখি চাহিয়া
অগ্নিমূৰ্ত্তি এক বীর শৈলসম রহে স্থির,
বিপক্ষ রথীন্দ্রকুল বৃথা যত্ন করে
ভেদিতে ব্যুহের মুখ, বালকের তরে।
কোদণ্ড টঙ্কার ঘন উঠিল আবার,
কেহ কাটে ধনুগুণ, কেহ ধনু, কেহ তুণ,
চর্ম, অসি, বৰ্ম্ম, অশ্ব, সৃন্দন, সারথি,
একে একে তীক্ষণে কাটে সপ্তরথী।
রিক্তহস্ত, ধরাপৃষ্ঠে, রক্তিম নয়ন,
বহে দেহে রক্তধারা,
তবু শূর-কুল-তারা,
যুঝিয়া বিক্রমে হায়! অকালে পড়িল,
প্রভাতে পঙ্কজ যেন নয়ন মুদিল।
অধীর বিষম শোকে জনক তাহার
স্বর্ণরথে ধায় সেথা তনয় পতিত যেথা,
কঁপিল ধরণী, ভয়ে নাদিল ভূচর,
ভূতলে নয়ন মুদি পড়িল খেচর।
মুহুর্মুহুঃ ভীম ধনুঃ টঙ্কারি সরাষে,
কহিল বীরেন্দ্র ভাষ দেবদৈত্যনরত্রাস
“বৃহমুখ রােধিল যে কোথায় সে এবে?
প্রতিজ্ঞা অমার কহি শুন রথী সবে,

প্রথম সর্গ।
১১
“শুনহে বসুধা তুমি, শুনহে পাতাল,
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, জীব, জন্তু, আছ যারা,
শুন স্বর্গ, শুন দেব, শুন জলনিধি,
সে পাষণ্ড মহারণে না বিনাশি যদি
“না ধরিব অস্ত্র আর এ মহীমণ্ডলে,
দেখাব মুখ ভবে, অগ্নিকুণ্ডে পশি তবে
ত্যজিব এ ছার প্রাণ”—তীক্ষ্ণ অসি করে
দংশিয়া অধর বীর ছুটিল সমরে।
বধিরি শ্রবণ মূল
আবার বাজিল রণ, টলিল বসুধা;
নাদিল সৈনিককুল,
ব্যুহ দ্বার-রােধকারী করিল শয়ন,
কোটি অশ্ব, নর, গজ, মুদিল নয়ন।
কণ্ঠে শূন্যগুণধনুঃ বসি এক রথী,
অরি তার অন্য বীর অসি হস্তে কাটে শিরঃ ;
আর এক বীরবরে দেখিনু পড়িয়া,
রথচক্র মহী তার লয়েছে গ্রাসিয়া।
আবার বীরেশ এক নখরে বিদারি
রিপুর্বক্ষ, তৃপ্তি তরে
উষ্ণ রক্ত পান করে ।
অদূরে হ্রদের তীরে দেখি এক জন
রাজরথী, ভগ্ন উরু! মুদিছে নয়ন।

১২
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অন্তর্হিত লীলাভূমি, ভাঙ্গিল চমক,
পুনঃ গাঢ় ধ্যানে পশি দেখিনু কৈলাসে বসি,
বহুসৈন্যসমাকীর্ণ কুরুক্ষেত্র ভূমি,
কুরুপক্ষে হইয়াছ সেনাপতি তুমি।
নারিনু তিষ্ঠিতে আর, আসিনু ছুটিয়া
কহিতে তোমারে ভাষ
ত্যজ রণ-অভিলাষ
কৌরব পাণ্ডব তব উভয় সমান,
হেন যুদ্ধে ঘুচাইবে কেন নিজ মান ?
অমঙ্গল যদি পাছে, অশুভ স্মরণে,
ঘটে বাছা, পাপ রণে যুঝিয়া পাণ্ডব সনে,
অমরী, হৃদয় জ্বালা ভুলিব কেমনে?
নরকুল ভুলে যাহা লভিয়া মরণে।”
এত কহি নিরবিল শৈলেনন্দিনী,
অনিমেষ নেত্র দ্বয় পুত্র মুখে চাহি রয়,
দুটি উষ্ণ অশ্রুবিন্দু, দুটি আঁখি দিয়া
দুখ ভরে পড়ে ধীরে কপােল বাহিয়া।
প্রণমি জননী পদে কহিলা গাঙ্গেয়-
“স্নেহতরে বৃথা ত্রাস, ত্যজ, মাতঃ, শোকাচ্ছ্বাস,
রুদ্রতেজপূর্ণতঃরুদ্ৰেন্দ্ৰগৃহিনী,
মহীতে শান্তনুজায়া, ভীষ্মের জননী,

প্রথম সর্গ।
১৩
দেবী তুমি, আজি কেন শােকেতে শিকল ?
ভাসাও বিস্মৃতি জলে স্বপ্ন তব, হৃদিতলে
জাগাও ভবেশ-জায়া ভবের খেলনা,
ভাবী শােক মিছে ভাবি কেনগাে বিমনা?
মাতা মম বিপথগা, শান্তনু জনক,
নিজে বীর রণপ্রিয়,
যুদ্ধক্ষেত্রে অদ্বিতীয়,
রামজেতা, ক্ষমণি, আমি দেবব্রত,
প্রাণভয়ে রণরঙ্গে হইব বিরত ?
করেছি অল পণ কৌর সদনে,
দশ দিন যুঝি রণে,
রক্ষিব সৈনিকগণে,
কক্ষচ্যুত হয় যদি চন্দ্র, সূৰ্য্য, তারা,
প্রাবৃটে শুকায় যদি প্রশ্রণিী ধারা,
আমার এ পণ তবু না হবে অন্যথা ;
তবে যদি রিপুকাল
বিস্তারে অশুভ জাল
সখে, তখনি আমি ত্যজিব সমর,
আমার প্রতিজ্ঞ এই খ্যাত চরাচর ।
খেলিব অপূৰ্ব্ব খেলা সমর-প্রাঙ্গণে,
বিস্ময়ে ক্ষত্রিয়গণ দেখিবে ভীষ্মের রণ,
কবি অমর হেরি শরশিক্ষা মম,
‘ধরাপরে ধবীর! শচীকান্ত সম'।

১৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
ভাগ্যদোষে যদি রণে জীবন হারাই,
শুর আমি, নাহি ডরি, জয়মাল্য শিরে পরি,
ক্ষত্রিয়-স্বরগে যাব চড়ি কীৰ্ত্তিরথে,
বীরবাঞ্ছা এক মাত্র এইগগা জগতে।
তব কৃপাদৃষ্টি মাত, সম্বল আমার,
দিয়া মাত্র পদছায়া,
আশীষগাে বজায়
দাও আজ্ঞা, যাই রণে, জিনিব সমর,
পিতৃবাক্যে ‘ইচ্ছামৃত্যু’ লভিয়াছি বর।”
আশীর্বাদ করি, বাছা, রণজয়ী হও।”
কুকণ্ঠে কহি ভাষ, ছাড়িয়া বিষাদ-খা,
নিরখি নয়ন ভরি তনয় বদন,
ধীরে ধীরে শৈলসুতা করিল গমন।
দূরে গেল স্বপ্নজাল, নিদ্রায় কুহক,
গাঙ্গেয় বিকলচিতে জননীরে নিরখিতে
চাহিল নয়ন মেলি, আঁধার শিবির
হেরিয়া মনের দুখে হইল অধীর।
নিশি শেষে অভিমন্য ত্যজিয়া শয়ন,
সময়ে বিদায় তরে,
প্রেয়সী চিবুক ধরে,
কহে ধীর মধুম্বরে
“কেনলো সরলে,
বিষাদের ছায়া আজি এ মুখ কমলে?

প্রথম পা।
অর্জুন তনয় আমি না ভরি সময়,
মম ধনু-শরক্টাস শকহৃদে দিবে ত্রাস,
চমকিবে রিকুল হেরি ভুজবল,
প্রাণ তরে হবে সবে আতঙ্কে চঞ্চল।
অবিশ্রান্ত ক্ষিপ্রহস্তে শরবৃষ্টি করি,
একালিয়া কৌশল আঁধারিব রণস্থল,
ঘাের ঘনরাশি যথা আঁধারে অন্তর,
বিস্ময় মানিবে তাহে মার নর।
মৃগে তাড়িত হয়ে যখ ফেরুপাল,
পলায় লাঙ্গুল তুলি, বিকীর্ণ করিয়া খুলি,
ধনুঃ হস্তে কুফে পলাবে তেমন,
অভিম-সিংহ-রণে পশিবে যখন।
ভাবনা কি থিয়তমে! আসিব সত্বরে,
আবার এ চাদ মুখ চুমিয়া লভিব সুখ,
আবার তােমারে হৃদে করিয়া স্থাপন,
মূৰ্ছাভাবে সচেতনে হেরিব স্বপন।
সাজে কি তােমারে, প্রিয়ে, সমরের ভয়?
হয়ে বীরপত্নী, কেন আজি প্রতি হেন?
অধরে নাকি হাঁসি, মলিন বয়ান,
ঝরিছে নয়নে নীর, একি অভিমান।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। ছেড়ে দাও, শশীমুখি, উদিছে অরুণ।” চাপিয়া হৃদয় আলা কহিল বিরাটবাগ- “মাদকতা কি, হে নাথ, সমরের হেন? নিঠুর তুমিহে বড়, প্রাণি নাশ কেন? শান্তি নাই, জলে বহি জীবের জীবনে। এই কি বীরত্ব তব ?. বিনাশি সতীর ধব অনন্ত পাবকে দহ তাহার অন্তর । বড় কীৰ্ত্তি লভে বীর করিয়া সমর। ধন্য বীর! বীর হিয়া পাষাণে নির্মিত, আচ্ছা, নাথ, সত্য বল, রণমুখে যবে চল, পড়ে কি উত্তরা বলে মনেতে তখন ? ভালবাস বুঝি ওহে নিকটে যখন! নহিলে, আমায় ফেলে পারিতে না কভু যাইতে সমরহুলে, ভুলায়ে আমারে ছলে পারিতে না, প্রাণনাথ, ঠেলিতে চরণে, উদিত না যাের-আম এ হৃদি গগনে। কি কব, সন্তান গর্ভে করেছি ধারণ, না হলে এখনি গিয়া নরে বিদরি হিয়া, ডুবিয়া সাগরে কিম্বা পশিয়া অনলে, নিবাতাম হৃদি জ্বালা, দেখিত সকলে।

প্রথম সন্ম।
১৭
রণে যাবে? যাও, তাহে করি না বারণ,
কিন্তু ভেবে দেখ মনে, জ্ঞাতি, বন্ধু, পূজ্যসনে :
দ্বন্দ করি, কিবা সুণ লভিবে সমরে ?
অধৰ্ম্ম, ভীষণ পাপ, তুচ্ছ রাজতরে !
সাবধানে যুঝে রণে, এ মিনতি পদে,
কঁপে হিয়া নিরন্তর, কাপে সদা কলেবর,
হারাই, হারাই পাছে, এই হয় মনে,
যে চাদে রেখেছি যত্নে হৃদয়-গগনে।”
*.
এতেক কহিয়া সতী কাদিলা নীরবে
পুতি:বুকে রাখি মাথা,
জুড়ায়ে মরম ব্যথা-
প্রেমভরে ধরি বামা পতির বদন,
সাদরে অপর প্রান্তে করিল চুম্বন।
নানা মতে প্রবােধিয়া চারু উত্তরায়,
সশর কবচ পরি
ধীরে চন্দ্রানন ধরি,
চুমিয়া সােহাগ ভরে প্রেয়সী অধর,
রণমুখে মহােলসে গেল বীরবর।
“রক্ষিবে তােমারে শঙ্কু সমর প্রাঙ্গণে।”
বহু কষ্টে এই কথা বলি চারু স্নেহলতা
ভূতলে পড়িয়া, হায়! কাতর অন্তর,
চিলি অশেষ চিন্তা, কদিল। বিস্তর।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
পূৰ্বাকাশে দিশরথে উদিল তপন,
বীবৃন্দ ত্বরা করি চৰ্ম্ম বৰ্ম দৃঢ় পরি,
অসি, ধনু, তূণ, শর, গদা, অস্ত্রবরে,
গুছায়ে লইয়া হর্ষে সাজিল সমরে।
দ্বিতীয় সর্গ।
উষাকোলে হেমকান্তি অরুণে হেরিয়া।
তিরােহিত আজি দুরে সে গাছ তিমির,
ছিল যাহা বিরাজিত এত দিন ব্যাপী
আচ্ছন্ন করিয়া নৃপ বদন মণ্ডল ;
উৎকণ্ঠা রূপিনী নিশি পলাইল দূরে ;
গেল উড়ি চিন্তাধুম রণের বাতাসে ;
ভাতিল নবীন আভা নৃপতি বয়ানে
মেঘমুক্ত শশী যেন উঠিল ফুটিয়া।
যে দুরন্ত হিংসানল জ্বলিয়া জ্বলিয়া
দহেলি বাল্যাবধি রাজেন্দ্র অন্তর,
নিৰ্বাপিত হবে বুঝি এ কাল সমরে।
অথবা, ধরণি-ভার ঘুচিবে বলিয়া,

দ্বিতীয় সর্গ।
স্থাপিলা কি ধাতা হাসি নরেন্দ্র অধরে
দেখাতে দেবতা হর্ষ ? কিম্বা, নৃপ বুঝি
রণানল প্রজালিত তেরি আনন্দিত,
পতঙ্গ হরিষ যথা দীপালােক হেরে ।
সাজিতেছে দেবব্রত, দ্রোণ, অশ্বত্থামা,
আর আর রথীগণ বীরমদে মাতি,
নাদিছে সৈনিকবৃন্দ অশনি নির্ঘোষে,
কহিছেন আশাদেবী নৃপতি শ্রবণে
ভাবনা কি যুবরাজ ! আজই সমরে
মজিবে পাওসকুল; হের, দেবব্রত
সাগিছে অহবে আমি সেনাপতি বেশে;
যদি না সমর তাজি পলায় পাণ্ডব,
হারাবে পরাণ সবে ; অথবা সকলে
প্রাণভয়ে ভীত হয়ে আসিবে ছুটিয়া
লইতে আশ্রয় তব!
তাই নৃপ আজি
মাতিয়া উন্মাদ-মদে ভ্ৰমিছেন বুঝি
ঘীরপদ সঞ্চালনে শিবির দুয়ারে,
প্রতিজ্ঞা করিয়া মনে রঞ্জিতে শোণিতে
কুরুক্ষেত্র রণক্ষেত্র। অসংখ্য জীবন
আহুতি দিবার তরে সমর অনলে

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। বদ্ধপরিকর হয়ে আনন্দিত রাজা, পাশে বুঝি বিনিময়ে বিজয় কেতন। ক্ষণেক চিন্তার পর ধনুর্বাণ করে উতরি গাঙ্গেয় পাশে কহিল রাজন- ©লােহিত বরণে ভানু উদে উষাসহ, চল ত্বরা রণাঙ্গণে, হে বীরপুঙ্গব । রথীশ্রেষ্ঠ ক্ষমাঝে, ক্ষত্ৰ-ইন্দু তুমি, ভৃগুরাম পরাজিত তব বাহুবলে, মনে দৃঢ় আশ মম, কহিনু তােমারে, পাণ্ডবের পরাজয় নিশ্চয় সমরে। দ্রোণ আদি বীরগণ সজ্জিত আহলে, সমর মদেতে মাতি গজ, বাজিরাজি, সজ্জিত হইয়ে কিবা আনন্দে নাচিছে, অচল শ্রেণীর ন্যায় স্থির সৈন্যদল, অপেক্ষা করিছে সবে তােমার নির্গম, সাজি সেনাপতি বেশে, সেনা অগ্রভাগে চল তাত, ভীম শঙ্খ বাজাও উল্লাসে মাজায়ে বীরের হিয়া বিপুল পুলকে।” সুসােধন বাক্য শুনি, শান্তনু তনয় ধনুঃ করে বাহিরিলা শিবির হইতে। সারথি সুন্দর রথ যােগাইল ত্বরী, কেশরি বিক্রমে ভীষ্ম বসিলা তাতে।

দ্বিতীয় সর্গ।
শোভিল কিরীট শিরে, অঙ্গেতে কবচ,
পৃষ্ঠদেশে ভীম তুণ পূর্ণ তীক্ষ্ণ শরে ;
স্বর্ণরথচুর উর্দ্ধে চুমিল গগন,
বিজয়ে পতাকা তাতে খেলিল নাচিয়া ।
চতুরঙ্গ সৈন্যবৃন্দ্রে পশ্চাতে করিয়া,
ভীম-শঙ্খ ঘােরনাদে কাঁপায়ে বাধা,
চলিতে লাগিল ভীষ্ম সমর সাগরে,
চলে ভগীরথ যেন গঙ্গারে লইয়া।
কৃপাচার্য্য, দুর্যোধন সহ শতভ্রাতা,
শল্য, দ্রোণ, অশ্বত্থামা, ভুরিশ্রবা আদি
ক্রমে ক্রমে উপনীত কুরুক্ষেত্ৰ ভূমে,
দেখতে অপূর্ব দৃশ্য ধরণী ভিতরে।
হেথায় অর্জুন, কৃষ্ণ, বীর বৃকোদর,
যুধিষ্ঠির, সহদেব, শৈব, কাশীরাজ,
উত্তমৌজা, ধৃষ্টদ্যুম্ন, নকুল, দ্রুপদ,
অভিম, যুধামনু, শিখণ্ডী, বিরাট,
দ্রৌপদীর পঞ্চপুল, কুন্তিভােজ আদি
সকলেই সমবেত কুরুক্ষেত্র মাঝে।
দুই মহা সৈন্য এবে সজ্জিত সমরে,
বিস্তীর্ণ সাগর সম, দাড়ায়ে দুধারে,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
শোভে তাহে খিচুড়, অখ, গজদেহ,
কেহ উচ্চ, কে নিম, তরঙ্গ যেমতি।..
মধ্যদেশে কুরুক্ষেত্ৰ-এশশু-প্রান্তর,
মল, ধবল কোখা, কোথাও অসম,
নর-পদ-চিহ্নে নহে এখন(ও) অঙ্কিত,
এখন(৩) রঞ্জিত নহে জীবরক্ত স্রোতে।
কুরুক্ষেত্র মহাক্ষেত্র এই সে প্রাঙ্গণ।
যেথায় ভারতভাগ্য কতবার, ৮ম ।
ফিরিয়াছে ক্রমান্বয়ে মহা পরীক্ষায়,
ভীষণ ক্রীড়ার ভূমি, বহু তীর্থ স্থল
সরস্বতী, দৃষদ্বতী, বহে ধরি ধরি,
দুই প্রান্তে, মুনিৰ্ম্মল বারি বক্ষে করি,
এখন(ও) রক্তিম নহে এই অম্বুরাশি;
এখনও সুনিল গগন মণ্ডল,
স্তম্ভিত বায়ুর বেগ, নিস্তব্ধ প্রান্তর,
নীরব বিহগ, ভীত ধরণী, কান্তার।
সহসা অম্বুজ ধ্বনি হইল তখন,
বাজিল দুন্দুভি, তুরি, পট, দামামা,
সৈন্যবৃন্দ মঙ্গোল্লাসে মাতি রণমদে,
করিল ভীষণ র উলঙ্গিয়া, অসি,
হেষিল তুরগরাজি উৎসাহে চঞ্চল,
বৃৎহিল বারণ উচ্চে গুণ্ড আন্দালিয়া ;

দ্বিতীয় সর্গ।
২৩
ভীম কোলাহল ক্ষণে ব্যোম সহ মিশি
কম্পিত করি নভঃ সহ ভূমণ্ডল।
চলিতেছে দুই দল থমকে থমকে
সঙ্কীর্ণ হতেছে ক্ষেত্ৰ ক্ৰমশঃ ক্রমশঃ।
কোলে যুধিষ্ঠির হেরিয়া অদুরে
পিতামতে, পদব্রজে উতরিলা সেথা
যেথায় গাঙ্গেয় রথে সেনাপতি বেশে।
শােকাকুল ধর্মরাজ ভাসি অশ্রনীরে,
ভক্তিভরে প্রণমিয়া পিতামহ পদে,
দ্রোণ, কৃপাচার্যে বন্দি কহিলা কাতরে-
“পিতৃতুল্য তােমা সবে সমরে হেরিয়া
কাতর অন্তর মম, কাঁদিছে পরাণ
স্মরি পূৰ্ব্ব কথা, কেমনে, তা ধিক প্রাণে !
যুঝিবে পাণ্ডব আজি গুরুগণ সহ !
ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য অজেয় সমরে,
মিছে কেন যুদ্ধ-আশ আমার অন্তরে ?
যাইব সমর ত্যজি, পশিব কাননে।
আর যদি দয়া কর দীন যুধিষ্ঠিরে,
(সম-স্নেহপাত্র দেখ কৌরব পাণ্ডব )
কহ সবে নিজ নিজ নিধন বিধান।
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা গায়ে
চিরজয়ী হও রণে, বাছা ধৰ্ম্মরাজ,

২৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বড় প্রীত হইনুরে তাের ব্যবহারে,
ধৰ্ম্ম লক্ষ্য করি, বৎস, কর মরণ,,
লভিবে অক্ষয় যশঃ, জিনিবে ধরণী,
তব বলে ধর্মরাজ্য হইবে স্থাপিত ;
নিধন বিধান মােরা কবি সময়ে।”
নহ মুখে ধৰ্ম্ম গেল। নিজ রথােপরে।
দুই দলে মিশামিশি হইল অচিরে,
তরঙ্গে তরঙ্গে যেন ক্ষুভিত অর্ণবে।
মৃগেন্দ্র বিক্রমে পার্থ পশিয়া সমরে
গাণ্ডীব উদ্যত করি কহিলা কেশবে-
“ক্ষণতরে, হে অচ্যুত, রােধি হয় বেগ,
উভসেনা মধ্যস্থলে তিষ্ঠ একবার,
হেরিব বারেক আমি বিপুল সেনানী।
অৰ্জ্জুন বাক্যেতে হরি, অনিন্দ্য বিমান
রােধি কহিলা তখন, “হের, ধনঞ্জয়,
দুর্জয় কৌরব সৈন্ঠ তােমার সম্মুখে।”
নিরখি সেনানী মাঝে জ্ঞাতি, বন্ধু, পূজা,
বান্ধব সবারে, কাতর অন্তরে পার্থ
কহিল কেশবে-“হে কৃষ্ণ, হে সখে, হের,
অবসুন্ন কলেবর, রোমাঞ্চিত
বিকম্পিত দেই মুম, বিশু বয়ান,

দ্বিতীয় সর্গ।
২৫
খসিয়া পড়িছে দেখ গাণ্ডীব সহসা,
জাতি, বন্ধু, মিত্র, নাশি এ কাল সমরে
কি ফল লভিব আমি? কহ হে শ্রীহরি ;
যদি বল ‘জয় লাভ, বিজয় কামনা
নাহি মাের, নাহি আশ রাক্ষ মুখভােগে;
কি কাজ সমরে ? হে গােবিন্দ জনার্দন!
জীবনে কি ফল বল ? যাদের লাগিয়া
রাজ্যভােগ, সুখের কামন, তারা আজি
সমবেত রণক্ষেত্রে সবে রণ আশে !
ধরিব প্রহরণ স্বজনে নাশিতে
লভিতে শ্রিলােক রাজা, হে মাধব, তুচ্ছ
মহীতল লভিবারে চাহি না সংগ্রাম।
দুৰ্যোপনে বধি রণে কি বা ফল, হায় !
এর চেয়ে শতবার পশিব কাননে।”
ধনুঃ শর দুরে ফেলি, ব্যথিত অন্তরে
রথােপরি ধনঞ্জয় পড়িল বসিয়া।
হেরিয়া পার্থের দশা এ হেন সময়ে,
করুণার্জচিতে কৃষ্ণ কহিলা অৰ্জ্জুনে-
“সাজে কি তোমার মােহ এ হেন সঙ্কটে
গুড়াকেশ? ছিছি! অযােগ্য আর্ষের ইহা,
স্বর্গগতি রােধকারী, অষশঃ পূরিত
হেন কাতরতা, হায়! উচিত কি তব ?

২৬ কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। দেবেন্দ্র বাসবে যেই তুষিল সংগ্রামে, যাহার বিক্রমে তৃপ্ত দেব বিভাব এই কি গাণ্ডীবী সেই ? হায় রে কপাল! নিৰ্ব্বীৰ্য্য কাতর ভাব করি দুর এবে, ধর ধনুঃ, বীরবর, কর মহারণ।” শুনিয়া গােবিন্দ মুখে এ হেন বচন, সুভদ্রাবিলাসী তবে কহিল আকার- “পূজাস্পদ ভীষ্ম দ্রোণ, হে মধুসূদন ! বল না কেমনে রণে বিধিব তাদেরে, শেল সম তীক্ষ্ণ শরে? উপদেশ দানে কৃতার্থ করহে মােরে, আমি শিষ্য তব।” হাসিতে হাসিতে কৃষ্ণ উত্তরিলা তবে “নিরর্থক শােক কর কিসের কারণ হে পার্থ! পণ্ডিত তুমি কথায় কেবল, মৃত বা জীবিত জন্য কেন বৃথা ক্ষোভ। কৌমার, যৌবন, জরা, অবস্থা দেহীর, দেহান্তর একরূপ অবস্থা বিশেষ, বিচারি এ সব তত্ত্ব, ধীমান মানব অবিচল রহে সদা মুখ, দুঃখ, শোকে। পরিব্যাপ্ত যে অব্যয় সমগ্র জগতে কেহ না নাশিতে পারে সে সত্ব স্বরূপে।

দ্বিতীয় সঙ্গী।
২৭
আত্মা না িলন জন্ম, না হন পতিত
কভু মৃত্যুমুখে, বারম্বার জন্ম লভি
বৃদ্ধি নাহি তার, তিনি নিত্য, তিনি অজ,
শাশ্বত পুরাণ, শরীর পতনে কভু
তার নাশ নাই, পার্থ জানিয়া এ সব
কে কার বিনাশ বল পিরয়ে সাধিতে ?
জীর্ণ বস্তু ত্যজি যথা নব বস্তু পরে
নরগণ, দেহারে আত্মা লভে দেই
অভিনব রূপ; অগ্নি, শ, জল, বায়ু
দহিতে ছেদিতে পারে আর্জিতে, শোষিতে।
নিত, স্থির, সৰ্বব্যাপী, অচল, অনাদি,
আত্ম লভিতেছে বার বার জন্ম মৃত্যু
চিন্ত যদি, উচিত কি তব ক্ষোভ? জন্মে
মৃত্যু সুনিশ্চয়, মরিলে জনম পুনঃ,
পরমাত্মা বিচরে, সৰ্ব্বভূতে অমর,
অকারণ শােক তবে কেনহে অর্জুন?
সম্মুখ সমর করি, ক্ষত্ৰ বীরগণ,
লভে ধৰ্ম্ম, পাপভাগী কেন হও তুমি
রণ অবহেলি? অকীৰ্ত্তি ঘােষিবে ভযে
চির দিন, কি কহিবে দুর্যোধন আদি
বীরগণ ? কাপুরুষ কেিব তােমারে ?
দিবে করতালি সবে উপহাসচ্ছলে?
ছি! ছি! হেন অপবাদ কেমনে সহিবে?

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। বীর তুমি, ক্ষত্ৰকুলে ক্ষত্রিয় ভুষণ! সম্মুখ সমরে যদি তাজ দেহ তুমি, হবে স্বর্গবাসী, যদি রণজয়ী হও, সসাগরা ধরাপরে প্রভুত্ব লভিবে। অতঃপর ধর ধনুঃ, উঠ বীরবর জয়জয় লাভালাভে দিয়া জলাঞ্জলি। নিষ্কাম কৰ্ম্মের যােগ বিনাশ বর্জিত, বিচারি এ সব, পার্থ, কর কৰ্ম্ম তুমি ফলাফলে লক্ষ্য নাহি করি, ফলাকাজী হয় যেবা কৰ্ম্ম অনুষ্ঠানে, কৃপণ সে।” কর্মযােগ; জ্ঞানযােগ, সমাধি লক্ষণ আত্মজ্ঞান, ধ্যানযােগ, সন্ন্যাস নিয়ম, আর কত শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণিয়া বিস্তর, কহিলা অৰ্জ্জুনে হরি নিজ বিবরণ- “মহাবায়ে হে অর্জুন! কৰ্ম্মে রত আমি নিরন্তর, মানবের উপদেশ তরে; ক্ষিতি-অপ-তেজ-বায়ু-ব্যোম অহঙ্কার মন-বুদ্ধি-অষ্টবিধ-প্রকৃতি-আমার ; পদার্থ সমূহ স্থিত অবলম্বি মােরে সূত্রে মণি গাঁথা যথা; সত্ত্ব, রজম, বিকার আমার, কিন্তু বশীভূত নহি আমি এ সকলে, মােরে জানিবে অব্যয় ; সৰ্ব্বভূতে বিরাজিত আমি পূজ্য সদা ।

দ্বিতীয় সর্গ।
২৯
চৈতন্য বিশ্বের আমি, আমি নারায়ণ,
দিবাকর, শশধর, শঙ্কর, কুবের,
মরীচি মরুৎ মধ্যে, সামবেদ আমি,
ভূতের চেতনা আর মন ইন্দ্রিয়ের,
কার্তিকেয়, বৃহস্পতি, আশিই পাবক,
সাগর জলধি মধ্যে, দেশে বাস,
হিমালয় মহাচল, শবদে ওঁকার,
যজ্ঞ মধ্যে জপ আমি, মুনিশ্রেষ্ঠ ভৃগু,
বাসুকি সর্পের মধ্যে, বজ, কামধেনু,
অনন্ত, গরুড়, আর অর্যম, বরুণ,
রাম, যম, গঙ্গা আমি, আমিই এহাদ,
কেশরী মৃগের মধ্যে, আমি ঐরাবত,
অশ্বমধ্যে উচ্চৈঃশ্রব, নরমধ্যে রাঙ্গা,
গায়ত্রী ছন্দের মধ্যে, আমিই বসন্ত
ঋতুরাজ, অক্ষরে অ’, আমিই ঈশ্বর
পাণ্ডবগণের মধ্যে আমি ধনঞ্জয় ;
অসীম বিভূতি মাের, স্বল্প মাত্র সুধু
কহিনু তােমারে, পার্থ, সমগ্র জগৎ
একদেশ মাত্রে মম করিয়া ধারণ,
অবস্থিতি করিতেছি জানিও নিশ্চয়।”
আত্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা শুনি কেশব মুঙ্গে
হৃষ্ট মনে কৃষ্ণে পার্থ জিজ্ঞাসিলা তবে
শুনিয়া তােমার তত্ব পুলকিত আমি,
•

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
দূরে গেল মােহ মম, কিন্তু, হে গােবিন্দ,
গোগ্য বলি দয়া কর যদি এ অধীনে
দেখাও আমারে, প্রতো, তব
ঐশরূপ
পুরাতে অর্জুন বাঞ্ছা, ইচ্ছাময় হরি,
সতত ভক্তের হিত, দয়ার সাগর,
ধরিলা অদ্ভুত রূপ বিশ্বব্যাপী দেহ ;-
উর্জে মিশাইল তনু, মুখ-নেত্র কত!
ঝকে তাহে তীব্র ছটা, (কোথা রবিচ্ছটা );
বিদ্যমান তাহে অযুত আয়ুধগুঞ্জ,
গলে দোলে দিব্য মালা সাশ্চর্যময়,
স্থাবর, জঙ্গম, দেব, বিরাজিছে তাহে;
অন্ত মধ্য-আদি-শুন্য, অজ্ঞেয়, অপার,
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের-কারণ স্বরূপ!
অনন্ত বিস্তৃত মুখ,কত প্রাণি তাহে
প্রবেশিছে পলে পলে, পতঙ্গ যেমন
অগ্নিশিখামুখে ধায় মৃত্যুর কারণ ;
ভীষ্ম দ্রোণ আদি সবে বেশি সে মুখে,
দচাপে হইতেছে বিচুর্ণ মস্তক।
সবিস্ময়ে হেরি পার্থ সে ভীষণ রূপ
কহিলা অচ্যুতে—হে বিষ্ণো ! বিশাল তব
এই বিশ্বরূপে বহু বক্ত-নে-উরু-
বাহু-দন্তোদর, হেরি চরণ অনন্ত,

দ্বিতীয় সর্গ। ৩১ ভয়াকুল জীবকুল, ভীত অতি আমি ; হেরি তব নভােব্যাপী রূপ, বিস্ফারিত মুখপুঞ্জ, বহ্নিসম-তেজস্বী প্রদীপ্ত- বিশাল-নন্ত নেত্র, ধৈর্যচ্যুত আমি, জসীদ, হে জগন্নাথ, এ অধীন aতি ; কহ সত্য করি, কে তুমি অব্যক্তপী, প্রণিপাত করি, দেব, তোমার চরণে। কহিলেন ভগবান্ সম্বােধি অর্জুনে- “লােকক্ষয়কারী-কাল আমিহে কিরীটি, দুর্যোধন আদি সবে বিনাশ কারণ রত সদ্যঃ, দেখিলেত, নাশিয়া সে সবে রাখিয়াছি বহু পূৰ্ব্বে, হেতুমাত্র তুমি । ধর ধনু, ধনঞ্জয়, উঠ এইবার, নাশি অরি, বীরসর, লভ যশােরাশি।” অৰ্জ্জুন কহিল তবে কাপিতে কঁপিতে “হে কৃষ্ণ! হে সখে! হে যাদব! ক্ষম দাসে, অনুচিত কহিয়াছি কত তােমা প্রতি না জানি তােমার তত্ব, হে অনন্ত রূপ ! তুমি ধৰ্ম্ম, তুমি স্বর্গ, তুমি জাদিদেব, বিরাজিত সৰ্ব্বভূতে তুমি নিরস্তর ; অভিলাষী আমি, প্রভাে, হেরিতে তোমায় গদা-চক্রপাণি-রূপে, নিবারি এ মায়া ধর, নারায়ণ, পুনঃ চতুর্ভূজ রূপ।”

৩২ কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। সৌম্যমূৰ্ত্তি ধরি, হরি তুষিলা অৰ্জ্জুনে। ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগ, শ্রদ্ধা, মােক্ষযোগ, বিস্তারি বর্ণিয়া পরে কহিলা কেশব- “সমুচিত যাহা হয়, কর, পার্থ, এবে।” মােহ ত্যজি অলিন্থে পর্গ মারথ, দাপটে গাণ্ডীব পরি কহিলা তখন “তােমা বিনে কার শক্তি, হে মধুসূদন চক্রপারি! এ দুর্যোগে রক্ষে পাওবেরে, কর কৃপা, রাখ মান, এ ঘাের সঙ্কষ্টে, তব কৃপাবলে, ওহে কংশনিমূদন, আগণ্ডলে পরাজিতে পারি মহারণে, দেবব্রত সেনাপতি কৌরবের আজি নতে ভীত তাহে কভু বীরের এ হিয়া ; বুঝিব সমরক্ষেত্রে ভৈর বিক্রমে, রােধিব গাঙ্গেয়ে অদ্য সম্মুখ সংগ্রামে, মিটাইব রণতৃষা কৌরব শােণিতে, পালিব প্রতিজ্ঞ মন, দেখিবে ধরণী, বিজয় বিজয় লভি নিজ ভূজ বলে রাখিল অক্ষয় কীৰ্ত্তি কুরুক্ষেত্র রণে! পাপী দুৰ্যোপনে বধি সহ ভ্রাতৃগণ, ধরা ভার অপনীত করিবে পাণ্ডব, গাণ্ডীবের ভীমনাদ উঠিয়া সঘনে

দ্বিতীয় সর্গ।
৩৩
মাতাইবে সেনাবৃন্দে, চালাও বিমান
দ্রুতবেগে, হে অচ্যুত, দেখিব কেমনে
প্রাণ লয়ে অরিকুল ফিরে নিজালয়ে।
কপিধ্বজ রশ, আর কেশব সারথি,
অতিজব তুরঙ্গম, কাৰ্ম্মক গাণ্ডীব,
অক্ষয় তুনীর, তাহে নিজে মহারথ,
নে ধনঞ্জয়ে কেবা পরাজিবে রণে।
অর্জুন বচন শুনি পুলকিত মনে
চালাইলা রথ কৃষ্ণ, ধন ঘের রবে
চলিল স্পন্দন বেগে তড়িতা যেন,
নিষ্পেষি অযুত সৈন্য ভীম নেমি চাপে।
হেথা বীর বৃকোদর, দুর্দম সমরে,
কালান্তক যম যথা কাল দণ্ড হাতে,
গদা করে যুঝে ঘাের ; পদভরে মহী
কাঁপিছে সঘনে ভয়ে, অশ্ব, রথী, গজ,
মুহুর্মুহু ধরাপৃষ্ঠে হতেছে পতিত ;
৪ালয়ের মহাবাত, যবে আচম্বিতে
উপিড়য়ে মীরুহ-হ-গিরিশ্রেণী,
হাহাকার উঠে যথা জীবের সে কালে,
কৌরব সৈন্যের মাঝে উঠিল তেমতি।

৩৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
।
বজ্ৰপাণি, শচী, দেব, গন্ধৰ্ব্বনিকর
হেরতে অদ্ভূত যুদ্ধ আইলা সকলে
সুদূর বিমান পথে নিজ নিজ রথে।
হেরিয়া অর্জনমুতে দুর্জয় সমরে
হৃষ্টচিতে মাখণ্ডুল কহিল শচীরে
“পুলােমননিনি! হের বিজয়-নন্দনে,
অনুর মাঝারে যেন জয়ন্ত দুৰ্ম্মদ।
ধন্য শিক্ষা বালকের ধন্য বীরপণা!
কা’র অখ, কা’র গজ, সারথি কাহার,
অবিশ্রান্ত পাড়িতেছে ভূধর পৃষ্ঠেতে।
ঝ ঝ ঝরে যথা নিয়মের জল,
অবিশ্রান্ত শবৃষ্টি করিছে বালক।
ওই হের, দেবব্রতে করিয়া অস্থির
কাটিলা তার ধনুঃ নিশিত শায়কে।”
ধাইল শান্তনুত আর্জুনি মুখেতে,
আরক্ত নয়নে বাণ বর্ষিলা গাঙ্গেয় ;
নিমেষে সে শর রাশি করি খান্ খান
অভিমন্যু ভিধােপরি করিল সন্ধান।
দূর হতে ধনঞ্জয় করি নিরীক্ষণ
নিঃসহায় পুত্রবরে, রক্ষিতে তাহারে
ধাইল ভীষ্মের মুখে কপিধ্বজ রথে।

দ্বিতীয় সর্গ।
৩৫
প্রিয়ারে সম্বােধি পুনঃ কহিলা বাসব
“দেখ, বিয়ে, ধনঞ্জয় অপূৰ্ব্ব কৌশলে
শয় বলে করি পথ, মন্দিয়া কোরবে,
চলিয়াছে বায়ুবেগে অভিমন্যু পাশে,
নিষাদ কবলগ্রস্ত শিশুরে হেরিয়া,
শাল ল যেমতি ধায় দূর বন হতে,
দলি গুল্মলতা বন, লঘিয়া তটিনী।”
।
পিতামহে হেরি পার্থ, হয়ে দ্রবীভুত
কৃতজ্ঞতা ভক্তিরসে, কহিল কাতরে,
“বিধির নিৰ্বন্ধে কাজ, সমর প্রাঙ্গনে
ভেট হ’ল তব সঙ্গে, কেমনে, হে তাত,
যুঝিবে অর্জুন মূঢ় ? জগতে অজেয়
তুমি বীর রামজেতা! ও পদরাজীবে
নমে দাস ভক্তিভরে, আশীষ সাদরে,
কিন্তু হায়! রণসাজে হেরিয়া তােমারে
ব্যাকুল হৃদয় মম, কাতর অন্তর,
কেমনে হানিব অস্ত্র ও প্রবীণ দেখে ?”
এত কহি পাথরথী কঁাদিলা নীরবে
স্মরিয়া কৈশাের কথা।
ধন্য হে অর্জুন,
ধয় মাতা তব !” কহিলা গাঙ্গেয় ধীরে-

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
“সারথি তােমার কৃষ্ণ গােলােক-বিহারী,
জিনিয়াছ তুমি তায় দুরন্ত শমনে!
কি ভয় তােমার, বাছা, সামান্য এ রণে?
প্রতিজ্ঞায় বদ্ধ আমি, যুঝ মম সাথে।”
আকর্ণ পূরিয়া ধনুঃ টঙ্কারি সজোরে,
দুই বীরে মহাক্রীড়া আরম্ভিল ত্বরা ;
ভীষণ শায়কগুচ্ছ উঠিয়া শূন্যেতে
ছাইল আকাশপথ ঘাবলী যথা,
নিষ্প্রভ রবির কর হইল অচিরে।
ভীয়ে ছাড়ি অভিমন্ত করিয়া স্থান
ব্যতিব্যস্ত করে যত কৌরব বাহিনী।
ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির ( চিরস্থির রণে )
করিল ভীষণ রণ মদ্ররাগ সহ ।
বড় লজ্জা দিল আজি নকুল সুমতি
দুঃশাসনে, পরাজিয়া সম্মুখ সমরে।
দ্রোণ সহ ধৃষ্টদ্যুম্ন করিছে সংগ্রাম,
কভু কাছে, কভু দূরে, কভু বা অন্তরে,
দুই পক্ষীরাজ যেন যুঝিছে অম্বরে।
সমকক্ষ যে যাহার সে তার সৎ
করিছে বিষম রণ; নিরস্ত্র, দুৰ্বল,
শরণার্থ জমে ক্ষমি, ক্ষত্রবীরগণ,

দ্বিতীয় সর্গ।
৩৭
যথারীতি রণপ্রথা করিল পালন।
রথীতে রথীতে আর মাতলে মাতলে,
পদাতি পদাতিসহ, যুঝিল শিক্রমে।
গদাযুদ্ধ মাযুদ্ধ হয় স্থানে স্থানে,
অশ্বারূঢ় বীরগণ বিদ্যুতের গতি-
আমিছে ক্ষণে ক্ষণে বিপক্ষ সেনানী।
সমর অঙ্গন এবে সিক্ত রক্তস্রোতে,
অস্তাচলে দিনমণি রক্তিম বরণ,
প্রকটিত বৃক্ষচূড়ে রক্তবর্ণ আভা,
যেন বা দিনেশ রােষে আরক্ত নয়ন,
ছড়াইলা অগ্নিরাশি প্রকৃতির গায় ;
অথবা শশাণিত বর্ণ কুরুক্ষেত্র ভূমি
বিম্বিত প্রকৃতি অঙ্গে, ভানুর বয়ানে !
বীরবৃন্দ ভীমরোলে, অশ্ব হ্রেষারবে,
কম্পিত করিল ব্যোম; দামামা নিম্বন
উঠিল আকাশপণে জয়নাদ সহ ।
দেবব্রত নাশি দশ সহস্র সেনানী,
ভীষণ অম্বুজধ্বনি করিল। পুলকে।
উখিত কৃপাণ, গদা, গুণবদ্ধ শর,
রহিল নিশ্চলরূপে ক্ষান্ত রণ জানি।

৩৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কৌরব পাণ্ডব দল ফিরিলা শিবিরে,
ধীরপদ সঞ্চালনে, ক্লান্ত কলেবরে।
তৃতীয় সর্গ
উপনীতা সন্ধ্যাদেবী দীপালােক করে,
একে একে তারাগুলি, চাহিল ঘোমটা তুলি,
ফুটিল মধুর হাসি বধুর অধরে।
কুরুসৈন্য হৃষ্টচিত্তে করিয়া শয়ন,
চিন্তার লহরী সঙ্গে,
ভাসিতে ভাসিতে রঙ্গে,
নিদ্রাদেবী অঙ্কোপরি মুদিল নয়ন।
এখনও রণসাজে পাণ্ডব-নিকর
ভীম, পার্থ, যুধিষ্ঠির, অভিমন্যু আদি বীর,
সমরের দেবাৰ্তা কহে পরম্পর।
জিজ্ঞাসিলা কেশবের রাজা যুধিষ্ঠির
“কৃপা করি কহ হরি এ হেন দুর্জয় অরি
কেমনে নাশিব মােরা ? সহজে অস্থির

তৃতীয় পর্গ। అన ভীষ্মের শরেতে সবে সমর প্রাঙ্গণে ; দেখিলে ত নিজ চক্ষে, প্রহরি মদীয় পক্ষে, দেবব্রত নিজ সৈন্য রক্ষিলা কেমনে? অর্জুনে উপেক্ষা করি, বৃদ্ধ পিতামহ নিমিষে সন্ধান করি, বিনাশি অসঙ্খ্য অরি, সদর্পে ঘােষিলা জয় শঙ্খনাদ সহ।” এত শুনি ভীম কহে আর নয়ন- “ভ্রাত যার বৃকোদর আর পথ ধনুৰ্দর, সাজে কি তাহার মুখে এ হেন বচন? হে অগ্রজ ধৰ্ম্মরাজ, কি ভয় সময়ে ? অর্জুন গাবি করে যুঝে যদি ক্রোধভরে সমর্থ নাশিতে অরি পলক ভিতরে। তবে যে এখন (ও) অরি ভবে বিদ্যমান, সে শুধু ভীষ্মের তরে, যাঁহারে ভক্তির ভরে, পূঙ্গি মােরা, হেরি তারে পিতার সমান। কি কব, তােমার অজ্ঞা লঘিতে না পারি, নহে ধৈর্য উপেক্ষিয়া ‘সভাস্থলে ঝাপ দিয়া, নিতাম হৃদিজালা কৌরবে সংহারি।

৪০
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন ।
নগর, কান্তার, নদী, গৃহ, সরােবর,
মুহুর্তে বিলুপ্ত সবে, বত্নি-ধাতু মিশু যবে,
উগারে বিপুল বেগে আগ্নেয় দুপর !
নয়নে অনল জলি, যদি বৃকোদর
ছড়ায় পাবকরাশি, কৌরবে আতঙ্কে আসি,
অচিরে বিলুপ্ত
হয় অরাতি-নিকর।
প্রতিজ্ঞ আমার যাহা জানত সকলে,
একা আমি রণাঙ্গনে শত ভ্রাতা দুর্যোধনে
বিনাশিব একে একে ভীম গদাবলে।”
মন্ত্রপূত বিষধর গরজে যেমতি,
ভীমসেন সেই মত ছাড়ি শ্বাস অবিরত,
অচল নগেন্দ্র প্রায় ভীষণ মূরতি-
দাঁড়াইয়া স্থিরভাবে, দংশিছে অধরে ;
কভু বা কৃষ্ণের পানে কভু চাহে অন্য পানে,
কথায় কহিতে নারে যে আলা অন্তরে।
বুঝিয়া ভীমের ভাব কহে ধনঞ্জয়
“অগ্রজ তােমার বাণী যথাযথ অনুমানি,
ধর্মরাজ চিন্তিছেন অমূলক ভয় !”

তৃতীয় সর্গ।
৪১
অর্জুনের বাক্য বােধি কহিলা শ্রীহরি-
‘চিন্তা নাহি কর মনে,
ধর্মরাজ, কালি রণে,
বিরাট-নন্দন শঙ্খে সেনাপতি করি
অর্জুন করিবে কুরুসৈন্তের নিধন।”
এত কহি যদুপতি, শঙ্খে করি সেনাপতি,
সাত্যকিরে করিলেন সারথ্যে বরণ।
পুত্র সেনাপতি শুনি হরষিত মনে,
সঙ্গে লয়ে নন্দনেরে,
কৃতাঞ্জলি করি করে,
বিরাট করিল স্তব কেশব সদনে।
-
কহিলেন কৃষ্ণ তবে সম্ভাষি সবারে,
“রণসাজ পরিহরি, সকলে ভােজন করি,
নিদ্রা হেতু যাও চলি যে যার শিবিরে ;
লাঘব করগে সবে সমরের শ্রমে,
সুনিদ্রায় ক্লান্তি দূরি, প্রভাতে কৰ্ম্মক ধরি,
প্রবেশিতে হবে রণে দানব বিক্রমে।
হৰ্য্যক্ষ-দাপটে পশি অরাতি মাঝারে,
ভীম রবে মহােল্লাসে, শহৃদি পূরি ত্রাসে,
নাচিতে হইবে কালি তীক্ষ্ণ অসি. করে।”

৪২
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
প্রণমি গােবিন্দ পদে করিল গমন,
বীরবৃন্দ হৃষ্ট হিয়া, পানাহার সমাধিয়া,
বিরামদায়িনী অঙ্কে মুদিল নয়ন।
হেথায় উত্তরা নিজ শয়ন আগারে,
আকুল পরাণে কঁাদে, হেরিবারে প্রাণচাদে,
বিরহিণী রাধা যথা নিকুঞ্জ মাঝারে !
মর্মরিত পত্ৰশকে চমকে শিহরি,
বাতায়ন পথে গিয়া দেপে বালা নিরখিয়া
মনটদুখে বসে কভু পালঙ্ক উপরি ।
অৰ্দ্ধমুক্ত করি দ্বার কভু বা নেহারে,
কভু সখি কর ধরি,
কহে বালা “কৃপা করি
অবিলম্বে, ওলো সখি, বল না আমারে,
ক্ষান্ত রণ বহুক্ষণ সন্ধ্যা সমাগমে,
তবে কেন এতগণ
প্রাণকান্ত অদর্শন
কহিতে কহিতে বালা কাদিলা মরমে।
সখিগণ প্রবােধিছে বিরাট বালারে,
এ হেন সময়ে আসি, উত্তরাবিলাসী হাসি,
উপনীত শীঘ্রগতি প্রেম দরবারে।

তৃতীয় সর্গ।
মেভরে আণিজিয়া সে স্নেহ পুতলি,
চুমিয়া পরম সুখে,
বিরাট তনয়া মুখে,
অভিমন্যু থেয়সীরে অঙ্কে নিল তুলি।
আনি কলি পরে সম্বোধি প্রিয়ারে
“পরশি এ চারু কায়, সব জালা দূরে যায়,
মুখের তুফান বই হৃদয় মাঝারে।
হেরিলে তােমার মুখে বুক ভরা হাসি,
লভি স্বরগের সুখ,
পলায় যতেক দুখ,
অরুণ উদয়ে যথা অন্ধকার রাশি।
মনে হয় আলিঙ্গন কেন বা বাহিরে।
প্রাণের ভিতর, হায়! কেন নাহি বাহিরায়
শত বাহু, বাঁধি তাহে তােমারে অন্তরে।
প্রিয়তমে, চল যাই সুখের শয়নে।”
উত্তরা লাবণ্যহার,
তুলি যত্নে দেহ ভার,
আবার পড়িল বসি পতির চরণে।
হায় মরি। ছিন্ন যেন দিব্য পারিজাত।
কেন গড়েছিলি ধাতা, এ হেন স্নেহের লতা ?
হরিণী-গঞ্জন আঁখি যােগ অশ্রুপাত!

৪৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
জগতের রূপরাশি গুছায়ে যতনে,
স্থাপিল। উত্তর দেহে, কেন তবে, বিধি ওহে,
দহিছ অবলা হৃদি দুরন্ত আগুণে !
ওরে চারুবালা, কি দুঃখ জাগিছে বল
কচি বুকে, আহা মরি! বুঝি প্রকাশিতে নারি,
কথায় মনের ব্যথা কঁাদ অবিরল।
কতক্ষণে অশ্রুবারি সম্বরি কাতরে,
কহিল। বিরাটলা চাপি যত্নে মনােজালা
“কি কাজ অমিয়পূর্ণ এ মিছে আদরে ?
জেনেছি নিঠুর বড় তােমার হৃদয়,
সমরেতে ঝাপ দিয়া
লভেছ পাষাণ হিয়া,
হলে পারিতে কভু ভুলিতে আমায়
এতক্ষণ ! ক্ষান্ত রণ সন্ধ্যা সমাগমে,
যামাৰ্দ্ধ অতীত প্রায়, একাকিনী আমি তায়
বসিয়া রয়েছি হেথা, উত্তরা অধমে
গড়েছিল বিধি বুঝি কঁদিবার তরে!”
নিরবিলা চন্দ্রাননী, ভাঙ্গা ভাঙ্গা মধুৰী
ঢালিয়া নাথের কাণে কাতর অন্তরে।

তৃতীয় সর্গ।
৪৫
“বৃথা গঞ্জ কেন মােরে ? ওলাে সুহাসিনি।”
এই কথা বলি পরে অভিম প্রতিভরে
তুলি নিল অঙ্কোপরি উত্তরা নলিনী।
ধরিয়া চিবুকে স্নেহে কহিল আবার
“দোষী নছি আমি, বিয়ে, সমরেতে ঝাপ দিয়ে
অনুতাপে দগ্ধ এবে হৃদয় সবার।
যুক্তিতরে সেই হেতু হয়ে সমবেত
ছিলাম বসিয়া সবে, কালি রণে কিবা হবে
এই আলােচনা লাগি রাত্রি হ’ল এত ;
মান ত্যজ, যুবদনি, এ সব বিচারি।”
শুনিয়া পতির কথা,
ভুলিয়া হৃদয় ব্যথা,
কহিল উত্তর। তবে–“আমিহে তােমারি,
সতীর জীবন পতি একমাত্র জানি,
চল যাই শয্যা’পরে,
আলিঙ্গয়া সমাদরে
সমরের ক্লান্তি তব দুরিব এখনি।”
রসিক দম্পতি মুখে হাসি দেখা দিল,
দুটি মুখে পাশাপাশি, দুটি মুখে সুধা হাসি,
এক বৃন্তে যেন দুটি কুসুম ফুটিল।

৪৬
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
ভাসিল নবীন প্রাণে প্রেমের হিল্লোল,
কভু বন আলিঙ্গন,
কভু চুল।
বরিষণ,
প্রাণে প্রাণে মাখামাখি বহিল কল্লোল।
সুভদ্রা নন্দন শ্রান্ত, নিদ্রিত ক্ষণেকে,
অভিমন্যু-হৃদিল, তরুদেহে যেন গতা,
জড়ায়ে পতিরে, সুপ্ত গাঁথি বুকে বুকে।

চতুর্থ
সর্গ।
ভাত সমীর লুটিয়া সুরভি
বহে ধীরি ধীরি কঁপায়ে প্রাণ।
ফুটন্ত কুসুমে
বসি অলিকুল
পরিমল পিয়ে করিছে গান ।
উষারে সম্ভাষি , গাছে গাছে পাখী
সুমধুর সুরে তুলিছে তান।
অাকাশের গায়
নক্ষত্র নিকর
একে একে একে হতেছে ম্লান।
তালে তালে তালে চারু উৰ্ম্মি-মালা
সরসী বক্ষেতে নাচিয়া যায়।
কুমুদিনী সতী নাথের বিরহে,
কাতরে পড়েছে ঢলিয়া তায় ॥
আবার কেমন স্বচ্ছ সরোবরে
খুলি রূপালি কমল ফোটে।
মধু লুটিবারে
গুন্ গুন্ করি পলকে ছােটে।
পাতায় পাতায় নিশির শিশির
টোপে টোপে কিবা ঝরিয়া পড়ে।
কত মধুর

৪৮ কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। বাধি বুকে বুকে দুৰ্ব্বাদলােপরি মুকুতার মত নিহারের বিন্দু কি শােভ ধরে । ফুল ডালা ধরি সুচারু লতিকা দুলিয়া যায়। মধুর দোলন মৃদুল পবনে! ভ্রমরার মন আকুল তায়। লইয়ে গােপাল যতেক রাখাল চলেছে গােঠেতে গাইয়ে গান। আৰ্য্য দ্বিজগণ বেদ উচ্চারিয়া জাহ্নবী সলিলে করিছে স্নান! জীবকুল আদি প্রফু অন্তরে ধায় ইতস্ততঃ আপন কাজে। প্রভাতের কাড়া দেবী দেবালয়ে শঙ্খ ঘন্টা সহ মধুর বাজে । লইতে আশ্রয় গুহার ভিতরে রজনীর শেষে ভানুর ত্রাসে। জগতের যত অন্ধকার রাশি ভয়াকুল হয়ে ছুটিয়া আসে। পুরব গগনে সােণার বরণ ভানুর বিমান প্রকাশে ঘটা । বসিলা তাহাতে দেব দিবাকর স্বর্ণতার সম অতুল ছটা !

চতুর্থ সর্গ।
অচল বা হয়।
ঝরিছে নিঝর
বাল-ভানু-ছটা খেলিছে তায়,
যেন মুক্তাফল
কত রাশি রাশি
খসিয়া পড়িছে তটিনী গায়।
লইয়ে সে সবে ধাইছে তটিনী
রাখিতে লুকায়ে সাগর কোলে ।
বুকভরা ধন
কুড়ায়ে কুড়ায়ে
তরঙ্গিণী দেহ আনন্দে দোলে !
সুদুর শূন্যেতে
এক চক্ৰ কিবা আদিত্য রথ।
তাহারে দেখাতে
কুরুক্ষেত্র রণ
আবাধে চলেছে বাহিয়া পথ।
অরুণে লইয়া
দিড়ি দিড়ি দিম্ বাঞ্জিল আবার ।
আবার কালি ধরা, ধরি মূর্তি ভয়ঙ্করা,
টলিল সমর স্থল,
নাচিল সৈনিক দল,
ধৈর্যচ্যুতি, উদ্বিগ্নতা, হইল সবার।
শঙ্খধ্বনি, জয়রব, উঠিল ক্ষণেকে,
বারণের বাদ
সহ বাজি হ্রেষানাদ,
শুনিয়া ভীরুর হিয়া কঁপিল চমকে।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন ।
সেনাপতি শঙ্খবীর করে হুহুঙ্কার,
পুলকে পাণ্ডব সব
করিছে ভীষণ রব,
শুনিয়া সে কোলাহল, কেশরি-শার্দল দল,
পশায় আঙ্গুল তুলি ছাড়িয়া কান্তার।
কৌরব সৈন্যের মাঝে উঠে কোলাহল,
বীরবৃন্দ-পদ-চাণে ধরণী তরাসে কঁপে,
বিশ্বচরাচর ডরে করে টলমল ।
মুহুর্ত্তেকে দুই দলে হ’ল সংঘর্ষণ,
কুরুপাসৈন্যদল,
ছাইল সমর স্থল,
চ ভন্ন প্রক্ষেপণ, দুই দলে হয় রণ,
ধূলিতে ধূলিতে ছন্ন হইল গান।
বিরাট তনয় ক্ষণে করি ঘাের রণ,
ভীষ্মের শরেতে ক্ষত হইলেন মূৰ্ছাগত,
সাত্যকি লইয়া তঁারে করে পলায়ন।
হেথায় অর্জুন ভ্রমে অরাতির দলে,
কেপালে যেন হরি ।
সদর্পে গাণ্ডীব পরি
অশ্ব গজ রথীগণে পতঙ্গ বিচারি মনে
নাশিছে, দেখিয়া ভীত কৌরব সকলে।

চতুর্থ সর্গ।
কুরুসৈন্য বিচলিত বিজয় প্রতাপে,
হেরি তা দুর্যোধন লয়ে সেনা লক্ষ জন,
সাহস করিয়া ধান গাণ্ডীবী সমীপে!
মুষল, মুদগর, শেল, অর্জুন উপরে,
এক কালে বরিষণ করে কুরুসৈন্যগণ,
যেন উল্কা রাশি রাশি পরাণ আতঙ্কে ত্রাসি
উজলিয়া দশদিশি ছুটিছে অম্বরে।
ক্ষিপ্রহস্তে পার্থখী সে সব নিবারি,
সন্ধানি অযুত বাণ কোদণ্ডে দিলেন টান,
পলাইল শক্তদল সহিতে না পারি।
সেনভঙ্গ হেরি ভীষ্ম ক্রোধেতে অধীর,
অর্জুন
সম্মুখ যান,
কার্মুকে জুড়িয়া বাণ,
“এই তব বীরপণা, অসাক্ষাতে মার সেনা ?
ধর ধনুঃ, ধনুর্ধর, হও দেখি স্থির ?”
এত কহি গঙ্গামুত এড়িলেন কাণ,
দিবা শর শূন্যে ধায় গ্রহ দেন ক্ষিপ্ত পায়,
অর্ধপথে পার্থ তাহা করে খান্ খান্।
দিব্য অস্ত্র এড়ে পুনঃ গঙ্গার কুমার,
যেন বারিধারা ধন, হয় অস্ত্র বরিষণ,
অঞ্জে অস্ত্র রোধে পার্গ সমরে দুর্গার।

২
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বােঝে ভীম ভীমসেন বিপুল বিক্রমে
সহ দুর্যোধন বীর
উভয়েই রণে স্থির ;
অশ্বত্থামা প্রাণপণে . যুঝে অভিমন্যু সনে,
বালকের সাথে বীর যুঝিছে সম্ভ্রমে।
শল্যরাজ সনে যুঝি উত্তর পড়িল,
হেরিয়া তনয় মুখ
বিরাট পাইল দুখ,
যােপবৃন্দ সবিস্ময়ে প্রমাদ গর্ণিল ।
চেতন লভিয়া ভি আইল তুরিতে,
করিল কঠোর রণ নাশি সেনা অগণন ;
হেরি তাহা দ্রোণ গুরু কহে-"কেন, ওরে ভীরু।
আসিয়াছ পুনরায় সমরে পশিতে ?
লজ্জা নাহি পায় চিতে করতে সমর ?
নিঃসহায় সৈন্যদল, তাই বুঝি এত বল !
কাপুরুষ কার্যে, হায় ! দুহেনা অন্তর ?
এত অহঙ্কার তাের বিরাট নন্দন!
সমরের সুকৌশল,
বুঝিবরে তাের বল,
শিখ নাই রণপ্রথা কেন অস্ত্র ধর বৃথা ?
সমর প্রাঙ্গণ ত্যজি কর পলায়ন!”

চতুর্থ সর্গ।
“পরিচয় পাবে গুরু ধর ধনুর্বাণ।”
কহিয়া বিরাট সুত, যত্নে করি মন্ত্রপূত,
দ্রোণেপরি শত বাণ করিল। সন্ধাণ ।
দ্রোণাচার্গ্য শীঘ্র হস্তে ধরি শরাসন,
শূন্যমর্গে থান্ থান্
করলা যতেক বাণ;
বিরাট তনয় হর্ষে অবিরল শর বর্মে
আবরি নয়ন পথ ছাইয়া গগন।
শঙ্খের তাপ গুক করি দরশন,
ব্ৰহ্ম অস্ত্র সন্ধানিয়া
বিঁধিলা শঙ্খের হয়,
বিষম আঘাতে বীর ত্যজিল জীবন ।
দোণপুত্র, শনা, কৃপ, সমরে অতুল,
ঞ্চাল-পুত্রের সনে যুঝছে প্রফুল্ল মনে
ভাঙ্গায় সমর হেরি, ভিমনু। বর করি
বাণে বাণে শত্রুগণে করিল বিকল ।
সুভদ্রানন্দনে হেরি ধাইল লক্ষণ,
অভিমন্যু হস্তোপরি নিমেষে সন্ধান করি
ধনুকের মুষ্টিদেশ করিল ছেদন।

৫৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
লঘুহন্তে অভিমনু অন্য চাপ নিল,
শরাসনে দিয়া টান,
এড়ে পঞ্চশত বাণ,
লক্ষ্মণ কাতর তায় হেরি দুর্যোধন ধায়,
আর আর নৃপকুল পশ্চাতে চলিল।
শৌর্য-বীৰ্য্য-সুসম্পন্ন আর্জুন তনয়
শূৱগণে পরিবৃত
তবু নহে ত্রস্তচিত,
যুঝিছে বালক যেন কৃতান্ত দুর্জয় !
রথিগণে সমাকীর্ণ হেরিয়া কুমারে,
ধনঞ্জয় ধায় সেথা অভিমনু স্থির যেথা,
প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র রক্ষিতে সমর ক্ষেত্রে,
ঘূর্ণিত নয়ন পার্থ দংশিয়া অধরে।
রোদমূর্তি ধনঞ্জয় সমর প্রাঙ্গণে
ছেদিতেছে উৰ্দ্ধকর, যোধবৃন্দ ধৃত শর,
অসি, গদা, পাস, চূর্ণ, চক্র, শরাসনে।
কেই না খাইতে পারে অর্জুন সাক্ষাতে,
সে জন সম্মুখে ধায়, ত্বরা যমালয় পায়,
রিঘ, মুদশর, চৰ্ম্ম, তােমর, কবচ, বয়,
পরশ্ব, ভিন্দিপাল, বিকীর্ণ ভূমিতে।

চতুর্থ সর্গ। কালান্তক যম সম অৰ্জ্জুনে নেহারি পলায় কৌরব-দল ত্যজিয়া সমর স্থল, মহা-শঙ্খধ্বনি করে বাসুদেব হরি। তীক্ষ্ণবুদ্ধি ভীষ্মীর আচার্য্যে কহিল- “অর্জুন অজেয় আজ, যুদ্ধে আর নাহি কাজ, ওহে হের, যােধগণ ভয়ে করে পলায়ন, অবহায় সৈন্যদলে উচিত হইল।” দিবাকর অস্তাচলে হইল মগন, কৌরব পাণ্ডব দল পরিরি রণস্থল, শিবিরের অভিমুখে করিল গমন। রজনীর অন্ধকার ছাইল ভুবন শিবগণ কুতুলে আইল সমরাস্থলে, হেরিয়া অস্য শব করিল আনন্দে রব, মুমুর্যর আর্তনাদে কাপিল গগন। সুষুপ্ত ধরণী এবে নিশার যতনে, মাঝে মাঝে শিবা রব, ঝিঝিটের ঝিঝি রব, সিংহ ব্যাঘ্র গরজন, পবনের স সন, নিস্তব্ধতা হরিতেছে, হায়, অকারণে।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
জাগে মাত্র তারারাজি সুদুর গগনে,
সরসী ক্ষেতে জাগে কুমুদিনী অনুরাগে,
পেচক বাদুর ভ্রমে খাদ্য অন্বেষণে।
যুবক যুবতী আর হত্যাকারী নয়,
তঙ্কর জাগিছে সুধু আর কলঙ্কিনী বধু,
বিরহিনী জাগে কোথা ব্যথিত অন্তর।
ঈর্ষা-বিষে জর্জরিত দগ্ধ কলেবর
দুর্য্যোধন জাগে ক্ষণে, ক্ষণে ভাবে ক্ষুন্ন মনে,
কুঞ্চিত ভুরুর রেখা ললাটে থাকিয়ে লেখা,
ব্যক্ত করে নৃপতির অশান্ত আন্তর।

পঞ্চম সর্গ।
নিদ্রাদেবী ধরি ধরি ত্যজিয়া’অবনী
চির সখি নিশি সাথে চলিল ত্রিদিতে,
বিরসবদনা চিন্তা সহ স্মৃতি সখি,
ছাইতে মানব মন উতরে মরতে ;
লুকাইল বনচর নিবিড় কাননে,
ভয়ে ভীত যারা দা উষার আগমে ;
বিহঙ্গ তাজিয়া নীড় উড়িল বিমানে
ঢালিয়া মধুর তান আকাশের গায় ;
লুটিতে সুরস মধু বঁধু অলিকুল
গুঞ্জরিল ফুলে ফুলে মাতি হামােদে ;
ললিত ললনা কাছে মদমত্ত নর,
সুপামাখা মৃদু কথা, যথা মেরে
লুটিতে যৌবন মধু, কহে চিত্তবেগে।
কুসুমের কাছে গিয়া পবন কুষিয়া
তাড়াইতে অণিকুলে, আরাস্তু রণ,
কপিল কুসুম বঁধু সমীরণ ভয়ে
দুষ্ট অলি তবু নাহি ছড়িল প্রসূনে।
ক্রোধেতে অধীর হয়ে মলয় তখন
চলিল বিটপি-পাশে, পল্লব-নিকর

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
হেলে দুলে গায়ে গায়ে ঢলিয়া সােহাগে
মৃদুভাষে পরস্পরে কলি পুলকে
‘আসিয়াছে প্রাণকান্ত নচি সখি দল।
উষাসহ হাসি হাসি উদিল তপন,
২শক কনকরূপে, সুসর্ণের আভা
খেলিল সোগবে, ক্ষণেকের তরে।
ধীরে ধীরে সূরণ চলিতে লাগিল,
আলোকে পুরিল বিশ্ব, আনন্দিত সবে।
কুরু পিতামহ বৃদ্ধ জয়াকাঙ্ক্ষী হয়ে
রচিলা অপূৰ্ব্ব বুহ ‘গরুড়’ নামেতে-
তুওস্থলে দেবব্রত রহিল আপনি ;
কৰ্ম্মা, দ্রোণাচার্য্য রচ চক্ষুদয়,
তাশখানা, কৃপাচার্য, লিগ, কৈকেয়,
রঙিলেন সাবধানে রচিয়া মস্ক ;
ভুরি, শল, শলা, ভগাদহ বীর,
জয়দ্রথ সঙ্গ সিন্ধু, সোবীর মদ্রক
গরুড়ের গ্রীবাদেশ করিল নির্মাণ
সহোদরগণ সহ র:জা দুর্যোধন
গরুড়ের পৃষ্ঠদেশ করিলা আশ্রয় ;
অবন্তি দেশীয় বিন্দ, অনুবিন্দ, শক্
শূরসেন দেশবাসী সৈনিক, কাম্বােজ
পুচ্ছদশ নিরমিয়া রহে অবস্থিত।
•••

পঞ্চম সর্গ ।
বাম পক্ষ রচে মঙু, বিকুঞ্চ করুষ ;
দক্ষিণ ক্ষেতে রহে মাগধ কালিঙ্গ।
হেরিয়া বিপক্ষ বুহ সব্যসাচি দেব,
ধৃষ্টদ্যুম্ন সাথে গিয়া পাণ্ডৰ ভিতরে,
রচিল। দারুণ বুহ অর্ধচন্দ্র নামে
দক্ষিণে রহিল ভীম সহ নৃপগণ ;
বিরাট, দ্রুপদ, নীল, চেদী, কাশীরাজ,
মহারথ ধৃষ্টকেতু, সুধীর করুষ,
পর পর রহে সবে ভীমের পশ্চাতে ;
ধৃষ্টদ্যুম্ন, ভদ্র, শিখণ্ডী, পাঞ্চাল,
সহ রাজা যুধিষ্ঠির রহে মধ্যস্থলে ;
দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, অভিমনু বীর,
ইরাবণ, ঘটোৎকচ, কৈকেয় সকল
বাম অর্ধবৃত্ত রেখা করিয়া পূরণ
অর্জুন পশ্চাতে স্থির প্রাচীর সদৃশ ;
পার্থ রহে বাম পক্ষে সহ জনার্দন ।
বাজিল দুন্দুভি, তুরী, পট, দামামা,
উঠিল সৈনিক রব, গগন বিদারি ।
জীবকুল ভয়াকুল প্রমাদ গণিল।
বারিধারা প্রায় তীক্ষ্ণ অস্ত্র বরিষণে
ভগ্ন পংক্তি হয় যত কৌরব পাণ্ডব।

৬০
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
ধূলিরাশি, অপুঞ্জ উঠিয়া বিমানে
আচ্ছাদিল দিবাকরে রাধিয়া গােচর,
সহসা তিমির যেন ভাস্করে গ্রাসিল।
কে কোথা যুঝিছে কিছু দেখা নাহি যায় ।
দ্রুঘণ, মুষল, ধ্বজ, তােমর, কাৰ্ম্মক,
পরিস্তোম, মাল্যদাম, কুণপ, অঙ্কুশ,
চিত্রিত করিল কিবা সমর প্রাঙ্গণ।
মৃত দন্তি, হয়, নর,-শােণিত কমে
অগম্য হইল শীঘ্র ঘাের রণস্থল।
ক্ষণপরে ক্ষিতিল সিক্ত রক্তস্রোতে,
শমতপাইল ধুলি,নিৰ্ম্মল চোদিক।
হেরিলে শালে
হেরিয়া অৰ্জ্জুনে রণে পার্থিব-নিকর
শত শত রথী সহ আক্রমিল তারে ;
লে সখা কিরাত নিকর
ঘেরে তারে এককালে তীক্ষ্ণ অস্ত্র করে ;
অথবা ভুজঙ্গে কভু, ভীষণ দংশক।
পাইলে প্রশস্ত ভূমে, মানব যেমতি
দণ্ড করে ক্রোধ ভরে আক্ৰমে তাহারে।
ফাল্গুন উপরে পড়ে মূষল, মুগর,
তীক্ষ্ণ শর, গদা, প্রাস, পরি, তােমর ;
প্রলয়ের কালে যথা ঝরে উল্কারাশি।

পঞ্চম সর্গ ।
৬১
পার্থরথী লঘুহতে, দিব্য অস্ত্র বলে,
ছেদিয়া বিপক্ষ অস্ত্র, তীক্ষ্ণ শরজালে,
আচ্ছাদিল নৃপবর্গে অদ্ভূত
কৌশলে
নৃপগণ শশাতে সেই অস্ত্রপুঞ্জ মাঝে,
লঘু-ঘন-পঞ্জাবৃত তারারাজি যথা ।
গন্ধর্ব, দানব, দেব, পিশাচ, রাক্ষস,
‘সাধু, সাধু বলি সবে বাখানে অর্জুনে
হিড়িম্বানন্দন যেন কালান্তক যম
ছুটিছে চৌদিকে রােষে প্রহরি সবারে।
সুভদ্রানন্দন নাশে অযুত সেনানী ;
ভীমসেন উব্ধ হস্তে গদা উত্তোদিয়া
পূৰ্ব্বাপর নাহি হেরি করিছে প্রহার,
গ-বাগিরথী’পরে বিপুল বিক্রমে।
এই দেখি দ্রোণ, ভীষ্ম, সহ দুর্যোধন
আসিল ত্বরিতে সবে ভীমের সম্মুখে।
হাসিতে হাসিতে ভীম করিল সন্ধান
তীক্ষ এক দিব্য শর দুর্যোধনােপরে ;
ধাইয়া সে খরশর পবন বেগেতে
সুবােধন বঙ্গোপরি পড়িল সহসা ;
মূচ্ছিত হইল রাজা রথের উপরে,
সারথি লইয়া তারে করিল স্থান ।
ভাস্কর-সদৃশ তেজে যুঝিছে অর্জুন,
কেহ না তিষ্ঠিতে পারে তাহার সম্মুখে ।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
;
দ্রোণ, ভীষ্ম বর্তমান, তবু সৈন্যদল
পলায় চৌদিকে বেগে না চাহি পশ্চাতে।
দুর্যোধন রণে পশি চেতন লভিয়া,
দেখিল সৈন্যের দশা; ভীষ্ম পাশে গিয়া
কহিল কাতরে—“সেনাপতি বর্তমানে,
কহ, পিতামহ, কেমনে পলায় সেনা
তাজিয়া আহব? বাধা নাহি দাও তুমি?
জানি আমি সুনিশ্চয়, পাণ্ডব ভিতরে
নাহিক এ হেন যােধ, নিবারে তোমায়
রণে ; দ্রোণ, অশ্বত্থামা অজেয় সংগ্রামে।
মিছ নিশ্চয় তুমি পাণ্ডবনিকরে
এই কি উচিত তব, হে বীর কেশরি ?
কেন তবে না কহিলে সমাগম কালে ?
‘পাণ্ডব সাত্যকি সহ না যুঝিব আমি,
তাহলে কর্ণের সহ পরামর্শ করি,
সিদ্ধান্ত নিশ্চয় এক করিতাম আমি।”
শুনি দুর্যোধন মুখে এ হেন বচন,
আর ক্ত নয়নে ভীষ্ম কহিলা তখন
“হে রাজ, বহুবার বলেছি তােমারে,
সবাসব দেবগণ সমরে পশিলে,
জিনিতে না পারে এই পাণ্ডবনিকরে ;
কি ছার মানব সাধ। জিনে ধনঞ্জয়ে।
যাও,, বাছা, সৈন্যবৃন্দে কর উত্তেজিত,

পঞ্চম সর্গ।
দর্শন!.
যথা সাধ্য এই বৃদ্ধ যুঝিবে সমরে,
তাহাতে সংশয় মাত্র করিও না তুমি।”
এত কহি ভীষ্ম রথী, রথিবৃন্দ সহ,
ধাইল পবনবেগে পাণ্ডব উপরে ;
বাপিল
তুমুল যুদ্ধ অপুর্ব
অসির ঝনি আর ধনুর টঙ্কার,
মুহুর্মুহুঃ শঙ্খধ্বনি সজয়নাদ
মাতাইয়ে রণাঙ্গন স্পর্শিল গগন।
‘তিষ্ঠ, আছি, স্থির হও, যেওনা, পলাও,
সৰ্ব্বস্থলে এইরূপ উঠিল নিনাদ।
হস্ত, পদ, ছিন্ন মুও খায় গড়াগড়ি ;
রুধির-বাহিনী-ঘেরা স্রোতােস্বতী-নদী
উখিত হইয়া সেথা বহিল বেগেতে।
গিরিশৃঙ্গ রূপে শােভে মাতঙ্গ শরীর
আবরি সমর স্থল ; ‘বধ, বধ, ধ্বনি
সহ ভীম আৰ্তনাদ উঠিছে সতত ;
পাণ্ডব সেনানী আর না পারে তিষ্টিতে,
বলিয়া বলিয়া ভীষ্ম করিছে হার।
ক্ষুব্ধচিতে কৃষ্ণ তবে কহিলা অৰ্জ্জুনে-
“শর সঞ্চালন, পাগ, কর ভীষ্মেপরে,
ওই হের, সৈন্য তব পলায় চৌদিকে,
ওই দেখ, রথীগণ ভয়েতে বিহ্বল,
মারথ দেবব্রত নাশিছে সেনানী
=

৬৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
মৃগেন্দ্র বিনাশে যথা ক্ষুদ্র মৃগযুথে।”
হেন মতে অভিহিত হয়ে ধনঞ্জয়,
কহিলা কেশবে রপ লইতে সত্বরে,
শান্তনুনন্দন যেথা বুঝে বীরদাপে।
ভীষ্ম অগ্রে উপনীত হয়ে পার্থরথী,
ছেদিল গাঙ্গেয় ধনুঃ তীক্ষ্ণ শর বলে ।
নিমিষে লইল ভীষ্ম অন্ত শরাসন,
অর্জুন ছেদিল তাহা পলক ভিতরে।
‘সাধু, সাধু, বলি ভীষ্ম, কহিল অর্জুনে
করিতে কঠোর রণ প্রকাশি বিক্রম।
অষ্ণ দিব্য শরাসন তুলিয়া তপন
শররাশি বরষিয়া শান্তনু তনয়
दिनिना
অচুতে আর তৃতীয় পাবে।
ক্ষত পাত্র বৃষ যথা শোভিল দুজনে।
যুধিষ্ঠির পক্ষ সেনা না পারে তিষ্ঠিতে,
ভীষ্মের শরেতে ক্ষত যত রাজগণ,
কর্তব্যবিমূঢ় পার্থ পিতামহ রণে।
মৃদু যুদ্ধ অর্জুনের নেহারি কেশব,
রােষকষায়িত নেত্রে, কহিলা গম্ভীরে
“কাজ নাই, পার্প, আর তােমার সমরে,
রাজগণ, যাও সবে ফিরিয়া ভবনে,
আমিই বধিব আজ দেবব্রতে, রণে।”
চক্রধারী লম্ফ দিয়া অবতরি
ভূমে

পঞ্চম
সর্গ
চলিল ভীষ্মের মুখে ; কঁপিল মেদিনী
থরথরে, বীরবপূঃ শােভিল সুন্দর,
সেনানী সাগরে যেন ভাসিল মৈনাক।
উৰ্দ্ধ হস্তে ঘুর কশা, রােষে কঁাপে তনু,
ধ ধ ধকে জ্বলে নয়নে অনল ;
বিশ্ববিনাশন মূৰ্ত্তি হেরিয়া কৃষ্ণের
যুক্তকরে ভীষ্মদেব কলি। অচুতে
“হে দেবেশ, জগন্নাথ, বমি চরণে ;
বড় প্রতি ভীষ্ম আজি এ সুখ মরণে।
ঙ্গে গােবিন্দ! গদাধর ! তুমি লােকপতি,
যুঝিবে তােমার সনে ভীষ্ম নন্দনত ।
এস, এস, বপ মােরে, বিলম্বে কি ফল ?
তল হাতে মৃত্যু হলে হইবে মঙ্গল।
ত্রিলােকে ঘুষিবে, প্রভাে, আমার বিক্রম,
পশিতে নারিবে মােরে কালান্তক বন ।
ধনু: শর দূরে ফেলি কৃতাঞ্জলি করি,
প্রণাম করিল। ভীষ্ম কৃষ্ণের চরণে।
ধনঞ্জয় শীঘ্রগতি ছাড়িয়া বিমান
ছুটিয়া কৃষ্ণের গাছে, ধরিলা চরণ।
দশম পাদেতে হরি হইয়া কর্ষিত
কঁপিতে লাগিল ক্রোধে আর নয়ন।
কাতরে কহিল পার্থ—পাণ্ডবভরসা!
সম্বরণ কর শী সংহার মুরতি,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কলঙ্কিত কর কেন নিজের গৌরব ?
মাতঙ্গ দন্দে কি কভু মশকের সনে?
কেশরী কোথায় কবে সন্তাষে শৃগালে
যুদ্ধহেতু ? সমকক্ষ কে তোমার, সখে ?
শপথ করিয়া, প্রভা, কহিনু তোমারে,
পবন প্রতাপে পশি অরাতি সাগরে
উদ্বেলিত করি, দেখ, সমগ্র কৌরবে।
কণ্ঠের প্রতিজ্ঞ শুনি, রষিত মনে
রথোেপরি উঠিলেন দেব নারায়ণ।
অর্জুন টঙ্কার দিল ভীম শরাসনে,
বিশাল গাণ্ডীব ধ্বনি ছুটিল চৌদিকে ;
কপিল কৌরব হিয়া বিপুল তরাসে
অকালে প্রলয় ভাবি। অবিরল ধারে
গাণ্ডীব নিম্মুক্ত বাণে ছাইল আকাশ।
ঝরিছে অগণ্য অস্ত্র কৌরব উপরে,
শিলাবৃষ্টি হয় যেন বরিষার কালে ।
ভীষ্ম আদি বীরগণ, অস্ত্রের প্রভাবে
নিবারে গাঞ্জীবি শর, পরম যতনে ।
এত দেখি ধনঞ্জয় ক্রোপেতে অধীর
সুবিশাল বাহুদ্বয়ে কর্ষিয়া কামুক
ভীষণ মাহেন্দ্র অস্ত্র করে প্রাদুর্ভূত।
ধুমকেতু সম সেই অস্ত্র আভাময়
উঠিয়া আকাশ পপে গরগে গভীর ;
;

পং ম সর্গ ।
হেন সাধ্য নাহি কার কোৱৰ ভিতরে
নিবারে সে অবরে ; ধ্বক্ ধ্বক্ জ্বলে
বিষম ইন্ত্রের অস্ত্র জাগ্নি বরষিয়া ।
বিনষ্ট হইল কুরু-শ্ব-গজরথী
দলে দলে, সৈন্তকুল পলাঃ রাসে।
রিয়া অর্জুন বীৰ্য্য, অস্ত্রের প্রভাব,
দিনমণি অস্তাচলে দিবা অবসানে,
দেবব্রত করিলেন সৈন্ত জাবহার।
কোঁৱব পাণ্ডবগণ ফিরিল শিবির।
শৃগাল কুকুর দল আসে পালে পালে
রণস্থলে ; মুম্ষুর উঠে আর্তনাদ
স্থানে স্থানে, মৰ্ম্মভেদী ; কহ সকাতরে
কেহ-পিতা, মাতা, ভ্রাতা, প্রেয়সী আমার,
দেখে যাও একবার এই অভাগারে ;
আবার কোথাও কেহ কহে ক্রোধভরে-
‘পামর! বধিলি মােরে, তাহে ক্ষতি নাই,
কিন্তু এ ভীষণ তাপ রহিলরে মনে
চিরকাল, না হেরিনু পতন তােমার ;
এই মর্মস্থলে জলে রাবণের চিতা,
নিবিবে না, কভু তাহা, সাগর সলিলে,
বিনা তাের রক্তস্রোতে সিক্ত নাহি হলে।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কোথাও মাতঙ্গ দেহ পর্বত প্রমাণ
পড়িয়া রয়েছে, হায় ! অশ্ব, নর দেহ,
বিচ্ছিন্ন মস্তক হয়ে যায় গড়াগড়ি;
ছিয়-নরশির শয়ে শৃগাল কুকুর
গেণ্ডুয়া খেলিছে সবে পরম কৌতুকে।
ষষ্ঠ সর্গ
বামনী পােহায় হেরি শয্যা পরিহরি,
সাজিল কোর দল ধনুর্বাণ ধরি,
জাইক্রোধ ভীষ্ম আসি কহে, ক্রোধভরে-
আকুলি পাণ্ডব হিয়া,
“শ্যালবু নিরমিয়া
রণরঙ্গে নত হয়ে চলছে সশর।
শঙ্খ ধ্বনি রণনাদে মাতাও ভুন,
প্রতিধ্বনি ক্রোড়ে রে বহুক পবন।
পদ ভরে বসুন্ধরা ফাপুক সনে,
কঁপুক জলধিজল কাপুক সমর স্থল,
কাপক পাগুৰ হিয়া চিন্তিয়া মরণে।”

যই সর্গ।
৬৯
চলেছে কোরব সেনা ভীষণ সমরে,
বেগবতী নদী যেন ধাইছে সাগরে ;
সেনাপতি ধনঞ্জয় করি নিরীক্ষণ
সসা বিপক্ষ বৃহ,
বর মাধশের সহ
নিজ পক্ষে ব্যালব্যুহ করিল সৃন।
শল্য, কৃপ, দ্রোণাচাৰ্য্য সহ দুর্যোধন
অর্জুন উপরে করে শর সঞ্চালন ;
সর্ব-অস্ত্র-পারদর্শী অৰ্জন নন্দন
দ্রোণাচার্য্যে হেরি রণে যু আসে তার সনে,
পিতার নিকটে শীঘ্র করিল গমন।
সুভদ্রা তনয় আর পার্থ পর,
অবিরল ধারে বর্ষে শাণিত শয়।
দুর্যোধন, দ্রোণ, শল্য, কৃপাচার্য বীর
যুঝিতেছে প্রাণপণে পার্থ অভিমন্যু সনে
বিষম বিপক্ষ শরে হইয়া অধীর।
সেনাপতি ভীষ্ম তাহা করিয়া দর্শন,
অর্জুন সমীপে ত্বরা করিল গমন।
তুরিষা, অশ্বত্থামা চলিল পশ্চাতে,
চিত্ৰসেন, দুর্ষণ, সত্যব্রত, দুঃশাসন,
ধাইল সকলে বেগে অর্জুনে নাশিতে ।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বাধিল তুমূল রণ কৌরব পাণ্ডবে,
পূরিল সমগ্র ধরা ভীষণ আরবে।
ধনুর টঙ্কার আর বানের গর্জন
শখ ভেরী গহাদ, সৈনিকের জয়নাদ,
উঠিল স্বরগ পথে ভেদিয়া গগন।
কৌরব পাণ্ড যুদ্ধ হেরিবার তরে,
আসিলেন দেবগণ বিমান উপরে ;
সুনীল গবাক্ষ খুলি আকাশের গায়
দেখেন পার্থের রণ তার শর-সঞ্চালন,
অশ্ব-গজ নর-দেহ লুণ্ঠিত ধরায় !
দ্বিতীয় পাণ্ডব আর হিড়িম্বা তনয়,
মিছে মমরে যেন কৃতান্ত দুর্জয়,
অগণিত কুরুসৈন্য করিয়া নিধন।
ভগদত্ত, দুর্যোধন, না পারে সহিতে রপ,
ভয়াকু যােধবৃন্দ করে পলায়ন।
রাক্ষসে ভীমাত্মজ অজেয় সমরে,
বিনাশি অসংখ্য সেনা সিংহনাদ করে।
দিবাকর অস্তাচলে হইল মগন,
“পাণ্ডবেরা জয়ী আজ, আর যুদ্ধে নাহি কাজ
এই কথা বলি ভীষ্ম করিল গমন

ষষ্ঠ সর্গ।
৭১
শিবিরের অভিমুখে শ্রান্ত কলেবরে,
হারায়ে অযুত যােধ চতুর্থ সমরে ।
সৈন্য অবর করি পাণ্ডুপুত্রগণ
দর্পহরি হরি সঙ্গে হাসিতে হাসিতে রঙ্গে
ধীরে ধীরে শিবিরেতে করিল গমন।
নিশাকালে দুৰ্য্যোধন শােকাকুল চিতে
ভীষ্মের শিবির মুখে চলিতে লাগিল।
জতুগৃহে অগ্নি দান করিয়া যে দিন,
নিষ্কন্টক ভাবি রাজ্য, মিত্ৰগণিসহ
সুখের হিল্লোলে ভাসি, এমােদ উদ্যানে
আনিলে নর্তকীবৃন্দ অপ্সরি-নিন্দিত ;
কিন্নরীর বিম্বাধরে সুমধুর হাসি,
অপনীত করি তব চিত্তের বিকার
বিমােহিল মন তব, সেই অধ’মুলে
বিষাক্ত-অমৃত পান করিয়া পুলকে,
মাতিলে মদন মদে উন্মত্ত হইয়া
হরিণী নয়ন কোণে বিলােল কটাক্ষ
চুরি করি প্রাণতৰ তুষিল তােমারে
ঘুরের মৃদু বােলে, সুমধুর তানে,
(কোকিল কাকলি তুচ্ছ করে যে সঙ্গীত
;

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অমিয় বর্ষণ করি শ্রবণ বিবরে
মােহিত করিল তােমা, উচ্চ কুচোপরে
চিকনি কঁাচলি আঁটি সেই বামাদ,
পয়ােধর আধছায়া দেখায়ে তােমায়
বাড়াইল কাম ক্ষুধা তােমার অন্তরে ;
সুঠাম নিতম্বে পড়ি সুবর্ণ মেখলা
নাচিল সােণাগ ভরে নর্তকীর সহ,
হেরিয়া কোটির ভঙ্গি আপনা ভুলিয়া
নাচাইলে তালে তালে তােমার উরস ;
বেণু বীণা মন্দিরার অদ্ভুত মিলনে
শিক্ষিত সুযন্ত্ৰী দল, সেই গৃহমাঝে-
যেথায় শোভিত যত বিলাসের ছবি,
ঝালরে মুকুতা পাতি দুলিয়া দুলিয়া
চুরি করি তারা কান্তি, ধাঁধিয়া নয়ন,
সুবৰ্ণ দীপের সেই উজ্জ্বল আলােকে
ঝকিত চঞ্চলভাবে ক্ষণপ্রভা যথা ;
মখমলে বিমণ্ডিত যেই গৃহতল,
বক্ষে করি বহমূল্য শয্যা উপাধান,
কাঞ্চনের কারুকার্যে বিচিত্রিত যাহা,
আলিজিত সমাদরে তােম। সবাকর,-
বিনােদিল চিত্ত তব মধুর বাজনে ;
সুখের শয়নে বসি মিত্রগণ সহ
অলসে বিভাের হয়ে শিথিল শরীরে

অষ্ঠ সর্গ
ভুলিয়া জগ, হায়! উপবিষ্ট ছিলে ।
ভাব নাই এ যন্ত্রণা ঘটিবে তােমার।
সেই দিন এই দিন চিন্তু একবার!
রে মত্ত দুৰ্য্যোধন! কঠোর নিয়তি
ভ্রমিতেছে চক্রাকারে, জান না কি তাহা ?
চাহিতে উচিত ছিল ভবিষ্যত পানে।
যে চিত্তে দম্ভের জ্যোতি ভাতিত উল্লাসে
আজি কেন সেই চিতে নিয়াশার ছায়া।
এই কি সে দুর্যোধন, দৰ্পের পুলি?
অশ্বপৃষ্ঠে নতশিরে যেতেছে চলিয়া!
ধীরে ধীরে দুর্যোধন বিমর্ষ বদনে,
উপনীত মন্ত্রিসহ ভীষ্মের সদনে।
বন্দিয়া গাঙ্গেয় পদ কহিল রাজন
‘আমার সন্দেহ, তাত, করুন ভঞ্জন।
দ্রোণ, কপ, অশ্বথামা, অজেয় আহবে,
ভুরিশ্ৰবা, ভগদত্ত মহারথ সবে,
বিলােক-বিখণত তুমি মহা ধনুর্দ্ধর,
বাস সহিতে নারে তোমার সমর,
পাণ্ডবের পদে পদে, তবুও কেমনে,
জয়যুক্ত হইতেছে, কার যতনে ?
মাগর আশ্রয়ে জয়ী-পাণ্ডুপুত্রগণ,
কই পিত, দয়া করি তার বিবরণ।

৭৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
ভীষ্ম কহিলেন-“ওহে বাছা দুৰ্য্যোধন,
মন দিয়া শুন তবে আমার বচন।
সন্ধি হেতু বহুবার কহিয়াছি আমি,
এখনও বলিতেছি সন্ধি কর তুমি ।
সন্ধিই আমার মতে উচিত তােমার,
সন্ধিতে মঙ্গল তব, মঙ্গল ধরার।
সখ্যতা পাণ্ডব সনে করিয়া স্থাপিত,
বান্ধবগণেরে তুমি কর আনন্দিত।
মুক্তকণ্ঠে নিবারণ করিলেও আমি,
পাণ্ডবের অপমান করিয়াছ তুমি।
হে রাজন! তার ফল ভুঞ্জিছ এক্ষণে,
নাহিক নিস্তার তব সখ্যতা বিহনে।
পাণ্ডব অবধ্য ইহা জানিও নিশ্চয়,
কুরুক্ষেত্র রণে হবে পাণ্ডবের জয়।
যাঁহার সাহায্যে জয় লভিছে পাও,
জানিবে তঁাহারে তুমি সচিৰ মাধব।
নররূপে নারায়ণ আসিয়া ধরায়,
ধৰ্ম্ম তরে হয়েছেন পাণ্ডব সহয়।
যথা ধর্ম তথা কৃষ্ণ জনিও রাজন,
বুখা ধর্ম তথা জয় শাস্ত্রের বচন
পাণ্ডব কৃষ্ণের সই যুঝিতে সময়ে,
মুনিগণ নিবারণ করিল তােমারে।
তথাপি, কি মতিভ্রম ঘটিল তােমার,

ঘষ্ঠ সর্গ।
৭৫
অগ্রাহ করিলে দম্ভে বচন সবার।
অর্জুন কৃষ্ণের দ্বেষ করিয়া রাজন!
মহা পাপ-পকে তুমি হয়েছ মগন।
বাদে বার্তা কিছু করিয়া শ্রবণ,
সন্ধি তরে তাঁর কাছে করহে গমন।
অব্যক্ত পরমব্রহ্ম কৃষ্ণ বিবরণ,
নারদ ব্যাসের মুখে করেছি শ্রবণ।
দেবের দেবতা কৃষ্ণ অচুত অব্যয়,
সমগ্র জগৎ নাশে নাহি তার লয় ।
জলেতে শুইয়া হরি সূজেন পর,
তাঁহার বিকার মাত্র বিশ্বচরাচর।
মহামনা বাসুদেব প্রভু নারায়ণ,
অগ্নি, বায়ু, বাণী, বেদ, করেন সুজন।
তিনি কৰ্ত্তা তিনি কাৰ্য জন্ম মৃত্যু গুণ:
ভবিষ্য নিয়ম তঁার ভূত বর্তমান।
তাঁহার নিয়মে চলে যত গ্রহগণ,
আকাশ করছে তার আদেশ পালন।
উষা, সন্ধ্যা, দিক আর স্থাবর জঙ্গম,
প্রাণপণে পালিতেছে তাহার নিয়ম।
সকলের শ্রেষ্ঠ হরি তিনি পিতা মাতা,
তিনিই, পরম গুরু তিনিই বিধাতা।
বদন হইতে বিপ্র করেন জন,
বাদ্বয় হতে লভে জন্ম গগণ,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বৈশ্য লভিলেক জন্ম উরুদ্বয় হতে,
শূন্দ্রের জনম স্থান ভঁহার পদেতে। •
হৃষীকেশ বলি তারে ডাকে মুনিগণ,
যুধিষ্ঠির লইয়াছে তাহার শরণ;
প্রণিধান করি বাছ আমার বচন,
তুমিও কৃষ্ণের পায় লগে শৰণ।”
এত কহি দেবব্রত করিল শয়ন,
দুর্যোধন নিজ কক্ষে করিল গমন।
শয্যায় শুইয়া রাজা ভাবে মনে মনে,
এ হেন সময়ে সন্ধি করিব কেমনে।
জগতে বিখ্যাত আমি মানি দুর্যোধন,
সঙ্কটে পড়িয়া জব কৃষ্ণের শরণ!
পাণ্ডব সহিত সন্ধি কভু নাহি হবে,
অকীৰ্ত্তি ঘােষিবে মাের চিরদিন ভবে।
যদি মৃত্যু সুনিশ্চয় এ কাল সমরে,
কাপুরুষ নহি তবু জীবনের তরে।
যা প্রাণ, হ’ কৃষ্ণ পাণ্ডব সহায়,
সমরে মরিয়া কীৰ্ত্তি রাখিব ধরায় ;
অামার প্রতিজ্ঞা দৃঢ় দেখুক ধরণী,
‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী।
এতেক চিন্তিয়া মানি রাঙা দুর্যোধন।
ক্ষুব্ধচিতে বিভাবরী করিল যাপন।

সপ্তম সর্গ।
ভাত হইল উদিল তপন,
দুই পক্ষে হয় রণ আমােগন।
চলে দুই দল সময় প্রাঙ্গণে,
জোৰ-বিকম্পিত অরক্ত নয়নে,
ভেটিতে সমরে অরাতি দলে।
খেন-বৃহস্থিত পাওস নিকর,
শোভয়ে যেমতি বিস্তৃত ভূধর।
হেরিয়া অদুরে দুর্জয় পাণ্ডব,
লইয়া ত্বরিতে বিপুল কৌরব,
গাঙ্গেয় রচি মকর বৃহ।
শ্রেষ্ঠ রথিগণে হয়ে সমাবৃত,
রক্ষিছে কৌরবে ভীষ্ম দৈবব্রত,
বিশাল উরস, সুবিস্তৃত তনু,
মু-কান্তি যেন প্রভাতের ভাই
পৃষ্ঠে ধই তুণ কোটিতে অসি

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
শেন ব্যহমুখে সমরে অটল,
গদা হন্তে স্থির ভীম মহাবল।
নয়নে শিখণ্ডী ধৃষ্টদ্যুম্ন বীর,
মস্তকে সাত্যকি রহিলেন স্থির,
গ্রীবাদেশে রহে গাণ্ডীবধারী।
বামপক্ষে রহে পাঞ্চাল পদ,
উরে যাহারা আপন বিপদ।
অক্ষৌহিনী সেনা সহ যুধিষ্ঠির,
বীরেন্দ্র-কেশরী অভিমন্যু বীর,
সদর্পে রক্ষিছে দক্ষিণ পাখা।
শায়ক ফলকে ভানুর কিরণ,
ঝঝকে ঝকি ঝলসে নয়ন।
সুবৰ্ণ কিরীটে প্রভাকর আভা
পড়িয়া ধরেছে অতুল বিভা,
তারকার জোতি নিশীথে যথা
বালি দুন্দুভি, টলিল মেদিনী,
উন্মত্ত পাণ্ডব কৌরব বাহিনী।
কঁপে দুই দল ক্রোধাবিষ্ট চিতে,
অপেক্ষা করিয়া সমর সঙ্কেতে,
শৃঙ্খলে আবদ্ধ মৃগেন্দ্র যথা।

সপ্তম স্বর্গ
শত শত শঙ্খ উঠিল বাজিয়া,
সৈনিক হৃদয় উঠিল কঁপিয়া,
উখিত হইল ভীম কোলাহল,
ছুটি কৌৱব পাণ্ডব সকল
তরঙ্গ নিকটে তরঙ্গ যথা।
শর সঞ্চালনে হইয়া সত্বর,
ভীষ্মের সম্মুখে গেল বৃকোদর,
গাঙ্গেয় তখন ধনু আকর্ষিয়া,
অরাতি হৃদয় আতঙ্কে পুরিয়া,
মােহিত করিল পাণ্ডবগণে।
ধনঞ্জয় পরে হয়ে তৃরমান,
গাণ্ডীব হেদায়ে ভীষ্মমুখে যান ।
অর্জুন নিক্ষিপ্ত শর অগণন,
ক্ষিপ্ত উল্কা য় হয় বরিষণ,
হেরি চমকিত কৌরব দল ।
পণ্ডল করে যেমন ধনুক,
অথবা যেমন মদন কার্মুক,
সুবর্ণ গাণ্ডীব ধনঞ্জয় হাতে,
আহা কি শােভে অতুল আভাতে!
আকাশে যেমন বিজলী হাসি।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
গাঙ্গেয় ধনুক মণ্ডল আকারে,
দুরিয়া চৌদিকে শর বৃষ্টি করে ।
অপুঞ্জ ধায় উগরি অনল,
বিষম আঘাতে করিয়া বিকল,
কৃষ্ণ ধনঞ্জয়ে অজেয় রণে।
কৃষ্ণের যাতনা বুঝিয়া অন্তরে,
মহাক্রোধে পার্থ প্রবৃত্ত সমরে,
বাছি বাছি লয়ে দিব্য হরণ,
ক্ষি হতে পার্প করিছে ক্ষেপণ,
কৌরব সেনানী অধীর তাহে।
আঁধার গগন, আঁধার অবনী,
স্বপক্ষ বিপক্ষ চেনে এই শুনি,
কে তুমি, যেওনা, আছি, থাক মার ;
গজ কাজ নদি, অস্ত্রের ঝঙ্কার,
দুন্দুভি, শঙ্খের নিন উঠে ।
'-
অবিরল ধারে পর বরিষণ,
দুর্গম করিল সমর প্রাঙ্গণ,
মৃত দস্তি, র, লুষ্ঠিত রায়,
রখচুড় অ, গড়াগড়ি যায়,
জীব রক্তস্রোতে তটিনী বহে।

অষ্টম সর্গ
রৌদ্রমূর্তি পার্থ সমরে ঘুরিছে,
শয়কে চপলা পুলকে খেলিছে,
তপন আপন ভবনে চলিছে,
পুরব এখন তিমিরে গ্রাসিছে,
হেরিয়া গাঙ্গেয় চলে শিবিরে।
বীর বৃকোদর সমরে দুৰ্ব্বার,
পায়ে গগন ছাড়ে হুহুঙ্কার ;
পদভরে, ধরযুভয়ে টুলিল,
পাণ্ডবনিকর শিবিরে ফিরিল,
নাশিল্পা.অসঙ্খ বিপক্ষ অরি।
অষ্টম সর্গ
সুনীল আকাশ গায় ধীরে ধীরে নেচে যায়,
তারার শর্বরী-ভূষণ,
সরােবর জলে উৰ্ম্মিসহ তালে তালে,
প্রতিবিম্ব করিছে নৰ্ত্তন।
হেমন্তের সুখ্যায়
পরশি যুবতী কায়
মিটাইছে জীবনের আশ ।
গােলাপ, কামিনি, বেলা, ছড়াইয়ে রূপ ডালা
সমীরণে বিলাইছে বাস।

৮২ কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। মধুর তানে কোকিল অমৃত ঢালিছে কাণে প্রাণ চুরি করিছে পাপিয়া। লতিকা লতিকা সনে বাঁধি দোহ প্রাণে প্রাণে, বায়ু-অঙ্গে খেলিছে দুলিয়া। ফার্ষিকী-পঞ্চমী-শশী রয়েছে গগনে বসি, প্রহরেক নিশীথ সময়ে ; কুমুদিনী ফুল্লমনে খেলে নৈশ-সমীরণে প্রাণনাথে সুদুরে হেরিয়ে। হর্ন তলে সখি সনে হতাশ ব্যাকুল মনে ভানুমতি রয়েছে বসিয়ে, শুকায়েছে দেহভার, অঙ্গে নাহি অলঙ্কার, পরিধেয় পড়িছে খসিয়ে । করতলে ন্যস্ত শির, নয়নে বহিছে নীর, কক্ষকেশ খেলিছে বাতাসে ; বয়ান বিশুদ্ধ প্রায় কালিমা পড়েছে তায়, আঁখিযুগে নিদ্রা নাহি আসে। শ্বাস ছাড়ি ক্ষণ পরে ধরি যত্নে সখি করে ভানুমতি কহিতে লাগিল- “বল ওলাে প্রাণসখি ! সত্য করি বল দেখি, হৃদে মাের কে বাজ হানিল? কত চারু চির আঁকা এই হৰ্ম্য অট্টালিকা কেন বল বাড়ায় যাতনা ?

অষ্টম সর্গ ।
'৮৩
ওই ফুল তক্ষরাজি নব কিশলয়ে সাজি
প্রাণে মম দিতেছে বেদনা।
সখিরে, ভুষণ মালা 1দেয় মাত্র প্রাণে আলা
তাই বলে ত্যজেছি সকল ;
খুলেছি চিকণ বেণী
খুলেছি কণ্ঠের মণি
আঁখি জল করেছি সম্বল।
এই যে সুন্দর কায়া ত্যজেছি ইহার মায়া,
চিন্তানল গর্জিছে অন্তরে,
নয়নেরে করি স্থির বলেছি বহিতে নীর,
শােকছায়া পুষেছি অধরে।
মনে হয় ওলো সখি, এখনি গরল ভখি
এ জীবন করি বিসর্জন ।
কিন্তু পুনঃ হয় মনে দেখা হবে পুত্র সনে,
প্রাণনাথে করিব দর্শন।
লক্ষ্মণ পিতার সনে গিয়েছে দুরন্ত রণে,
পুত্রস্নেহ কেমনে ভুলিব!
হয়, সখি, পুত্র মায়া বিষম মেহের ছায়া!
পুনঃ কবে তনয়ে হেৰিব।
কত দিনে পুনৰ্ব্বার, হবে কি সে দিন আর ?
পূর্ণ শশী উদিবে গগনে !
দুরন্তু সমর প্রায়
রণজয়ী প্রাণান্ত,
হাসি হাসি ফিরিবে ভবনে।

৮৪ ৮৪ কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। সখি, মিছে এ আশা। চাতকের এ পিপাসা মিটিবে না এ জীবনে কভু। ধরি যত্নে কর তার নিৰিছি কতবার, নারি বাক্য ঠেলিলেন প্রভু। সন্ধি তরে কতবার ধরেছি চরণ তঁার, কিন্তু তাহা বিফল হয়েছে, সখিরে, আমার মন কঁদে তাই অনুক্ষণ বুঝি মাের কপাল ভেঙ্গেছে ! তুর্জয় পাণ্ডব সহ যুঝিতেছে পিতাম, বৃথা এম হতেছে কেবল ; কেশব সহায় যার, কিসের অভাব তার শুধু তার অদর্শনে, পাণ্ডবেরা সমরে অটল। তারা হারা আঁখি যথা মণিহাৱা ফণি তথা পক্ষিশূন্য যেমন পিঞ্জর, সেইরূপ নাথ বিনে প্রাণশূন্য হয়েছে অন্তর। ভাই, সখি, শূন্য প্রাণে নিরখি আকাশ পানে, হৃদাকাশ মলিন হতাশে, এ জ্বালা যদিও ছাই নিদ্রায় ভুলিতে চাই, নয়নেতে নিদ্রা নাহি আসে। ধন্যরে কৌরব হিয়া। পাণ্ডবের লাঞ্ছনা করিলে? জতুগৃহ নিরমিয়া

অষ্টম সর্গ।
৮৫
কাল দূতক্রিড়া ছলে
শকুনির কুকৌশলে
পাণ্ডবের সর্বস্ব হরিলে।
সখি, কত দিন আর ভুগিব যাতনা ভার!
পূৰ্ব্বস্মৃতি উদিছে অন্তরে ;
অধর্মে কৌরব পুষ্ট, ধর্মই পাওব ইষ্ট,
জয়াকাঙ্ক্ষা করি না সমরে।
দ্রৌপদী-নিগ্রহ কালে সমবেত সভাস্থলে
ভীমের প্রতিজ্ঞা পড়ে মনে,
পড়ে মনে কি প্রকারে প্রতিজ্ঞা পালন তরে
পাণ্ডবেরা নিবসিল বনে।
ফেটে যায়,
ভীমের বচন, হায় ! স্মরি
বুক
পড়ে মনে অর্জুন বিক্রম,
গােধন উদ্ধার কালে একা পার্থ বাহুবলে
ভাঙ্গিললো কৌরব সন্ত্রম!
সারথি যাহার হরি, ভরে কি সে কুরু অরি ?
ধনঞ্জয় ভরে না অমরে।
অক্ষয় তুণীর আর গাণ্ডীব অভেদ্য বার
সেই বীর জিনিবে সমরে।
পাণ্ডবের কৃতদাস,
হইয়ে করিব বাস;
হা অদৃষ্ট ! এই কি বিচার ?
এ দেশ ছাড়িয়া যাব, বন ফল মূল খাব
না পড়িব শৃঙ্খল লােহার!

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
রাজরাণী ছিল যেই, ভিখারিণী হবে সেই ।
এ বারতা কাহারে কহিল !
এই জীবনের শেষ,
আগে সুখ পরে ক্লেশ,
ওলো সখি, কেমনে সহিব ?
স্নেহ, মায়া তেয়াগিয়া, পাষাণে বাঁধিয়ে হিয়া,
চিতানলে এখনি পশিব,
ভূবিব সাগর জলে, কিম্বা ফাসি দিয়া গলে,
এ পরাণ এখনি তজিব।”
এত কহি ভানুমতি, হয়ে অতি ক্ষুন্নতি
দ্রুতগতি উঠিয়া পলায়,
ও সখি চমকিয়া চকিতে নিকটে গিয়া,
পদ ধরি নিবারে তাহায়।
চিত্রিত পুলি যথা ভানুমতি স্থির তথা,
পদতলে সখি পদ্মাবতী ;
মরমে মাগিছে ব্যথা, মুখেতে নাহিক কথা,
মন দু’খে কাদে ভানুমতি,
গান্ধার বিকল চিত্তে, সরলারে প্রবােধিতে,
অবিলম্বে সেথায় আসিল,
অঙ্কেতে বধূরে তুলি মুছায়ে অঙ্গের ধূলি,
স্নেহভরে আনন চুমিল।
ধৈর্য্য ধরি ক্ষণপরে গান্ধারি কাতর স্বরে
কহে “কেন জীবনে হতাশ ?

অষ্টম সর্গ ।
[৭
রুক্ষ্মকেশ ক্ষীণ কান্তি, হৃদয়ে নাহিক শান্তি,
পরিধানে কেন জীর্ণবাস ?
‘পূর্ণ শশী নিরূপম
কোথা ভানুমতি মম ?
কোথা মাগাে রেখেছ তাহারে ?
মুখচন্দ্র হেরি তার
ঘুচাব যাতনা ভার,
প্রেয়সীরে দেখাও আমারে।”
দুর্যোধন এলে ঘরে কি বলে বুঝাব তারে,
ওই কথা যখন অধিবে;
গৃহলক্ষ্মী তুমি বন্ধু, ভুলি ফুৰু স্নেহমধু
এ জীবন কেমনে ত্যজিবে ?
দৈবাধীন যত নর,
দৈবাধীন চরাচর,
তাই বলি বধূরে আমার,
অদৃষ্ট অপেক্ষা করি, বহু যত্নে ধৈর্য্য ধরি,
চিত্ত স্থির করগো তােমার।
অজ্ঞেয় অদৃষ্ট ফল কেমনে জানবি বল,
মানবের বিচিত্র সকল,
তােমাদের এ বিভব,
অস্থায়ী, সার সব
সার মাত্র ঈশ্বর কেবল।
তাহার পদেতে মন
কর বাছা সমর্পণ,
শান্তি লাভ হইবে ত্বরায়,
পলাবে, যতেক দুখ, হৃদয়ে উদিবে সুখ,
ভুলে যাবে যাতনা, মায়ায়।
}

৮৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন
এই কথা বলি পরে, গান্ধারি যতন করে
বধূক্রোড়ে করিল শায়ন,
সখি পদ্মাবতী হেথা, চাপিয়া মনের ব্যথা,
কক্ষান্তরে করিল গমন।
নবম সর্গ ।
প্রভাত হইল নিশি,
উজলিয়া দশদিশি,
কৌরব পাণ্ডব দল সাজিল সমরে ;
ভীষণ দুন্দুভি শব্দ
ভুবন করিয়া স্তব্ধ,
ধায় উর্কে, চারিদিকে, নাচিয়া অম্বরে।
শূন্যপথে দেবগণ
হেরিতে অদ্ভুত রণ
নিজ নিজ রথােপরি আসিয়া বসিল,
চমকিল চরাচর,
কঁপে ধরা থরথর
শার্দূল চকিত প্রাণে বিবরে পশিল ।
সেনাপতি পিতামহ,
রছিলেন ক্রৌঞ্চ ব্যুহ,
পাণ্ডব মকর বুহ করিল গঠন,

অষ্টম সর্গ ।
আশ্ব গত শঙ্খনাদ
সৈনিকের ভীমনাদ
আলােড়ি সমরক্ষেত্র স্পর্শিল গগন।
গণতরে স্তব্ধ স,
আবার উঠিল রব,
দুই দলে পরস্পরে করিল প্রহর ;
চক্র, ভল, প্রগেড়ণ,
খড়শর বরিষণ,
অস্তুপুঞ্জ ধায় শূন্যে ভীষণ আকার ।
ভীমসেন ত্বরা করি
দৃঢ় শরাসন ধরি
দ্রোণের সম্মুখে গিয়া রলি রণ ;
দাপটে কাৰ্ম্মক ধরি
দ্রোণাচার্য্য লক্ষ করি,
নয় বাণ ভীম বক্ষে করিল বর্ষণ।
বৃকোদর ক্রোধভরে,
তীক্ষ এক দিব্য শরে
দ্রোণের সারথিররে নিল যম র ;
সারথি বিহীন রথ,
বাহিল বিপথ-পথ,
বৃহভেদ তরে ভীম হইল সত্বর।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। ভীমবল বৃকোদর, কোদণ্ডে যুড়িয়া শর প্রহারি বিপক্ষ দলে করিল বিকল, বিপক্ষ চমুর মাঝে, একা ভীমসেন যােঝে হেরিয়া অতিবৃন্দ ভয়েতে বিহ্বল। ধনুর্দ্ধর মহাবল শচীকান্ত আখণ্ডল নির্ভয় হৃদয়ে যেন দানব সমরে, কিম্বা মৃগযুথে হেরি, সহর্ষে নিনাদ করি কেশরী ভ্ৰমিছে যেন শিকারের তরে, অথবা যেমন ভানু প্রকাশিয়া রৌদ্রতনু গ্রহগণে পরিবৃত প্রলয়ের কালে, সেইরূপ বীরবর ভীমবল বৃকোদর ধনুঃকরে শােভমান অরাতির দলে। ভীমসেনে হেরি রণে দুৰ্য্যোধন ক্ষুব্ধমনে, সদ্যোধি ক্ষত্রিয়গণে কহিতে লাগিল-

নবম সর্গ।
৯১
“নীরবৃন্দ আজি রণে
যুঝে সবে প্রাণপণে,
হের ভীম যম সম সমরে পশিল,
বাতাহত গুল প্রায়,
সকলে নিধন পায়,
ওই হের, ধ্বজ, হস্তী ধরায় লুষ্ঠিত ;
ওই দেখ অশ্বগণ,
রথী, গজ অগণন
পলে পলে মৃত্যুমুখে হতেছে পতিত
যাও সবে ত্বরা করি,
নিবার দুর্জয় অরি,
তােমাদের সাথে আমি করিব গমন।
এত কহি দুর্যোধন,
সহ রথী অগণন,
বৃকোদরে অবিলম্বে করিল বেষ্টন।
ধৃষ্টদ্যুম্ন, ব্যস্তচিতে
ভীমসেনে নিরখিতে,
বিশােক সারথি পাশে আসি উত্তরিল ;
শূন্ঠরখ দেখি গিয়া
করতলে চাপি হিয়া,
সারথিরে সম্বােধিয়া কহিতে লাগিল,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। এ কি হ’ল অকস্মাৎ বিনামেঘে বজ্রাঘাত! রথ শূন্য করি কোথা গেল সহচর। প্রাণসম প্রিয়তম, কোথা ভীমসেন মম ? বিশােক! কোথায় বল সখা বৃকোদর ?” বাপা কুল নেত্র দ্বয় ধৃষ্টদ্যুম্ন চাহি রয় ; কৃতাঞ্জলিপুটে পরে বিপােক কহিল- “মহাল রথীবর গদাহস্তে বৃকোদর একাকী কৌরব বুহে প্রবেশ করিল, গমন করিতে মােরে, কহিল সুপ্রিয় স্বরে, ‘সারথে ! এ স্থানে তিষ্ঠ ক্ষণেকের তরে যাহারা আমার নাশ করিয়াছে অভিলাষ, তাদেরে নিপাত করি ফিরিব সত্বরে। এই কথা উচ্চারিয়া ভীম গদা উলঙ্কালিয়া প্রভু মম কুরুগণে করিছে অস্থির।”

নবম সর্গ
৯৩
শুনিয়া বিশেক বাণি
সখাক্লেশ অনুমানি,
ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীম লাগি হইল অধীর।
শব রাশি, ভগ্নরথে
ভীমের চিহ্নিত পথে,
পৃষ্ণ-নন্দন ধরা চলিতে লাগিল;
মৃত অশ্ব, গজ, নর,
ছিন্ন নৃপ কলেবর,
সবিস্ময়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন কতই হেরিল।
বহু দূর গিয়া পরে,
ধৃষ্টদ্যুম্ন, খবরে
নিরখিল যম সম গদাহন্তে স্থির,
শরীঘাতে অক্ষত,
নাত দন্তদলিত
গিরি অঙ্গ করে যেন বমন রুধির।
ধৃষ্টদ্যুম্ন কাছে গিয়া,
ভীমসেনে আলিহিয়া,
অাপনার রথােপরি উঠায়ে লইল ;
পৃষ্ণ-নন্দন ধর,
সহ বৃকোদর বীর,
মধ্যাহ্ন-তপন যথা ভীষণ হইল।

৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
ধৃতরাষ্ট্র পুত্রগণ,
আর আর রথিগণ,
এক কালে বহু অস্ত্র করিল বর্ষণ,
ধৃষ্টদ্যুম্ন সুকৌশলে,
প্রমোনি অস্ত্র বলে
অরাতির প্রজ্ঞাশক্তি করিল হরণ।
চিত্রিত পুতলি যথা,
কৌরব নিশ্চল সেথা,
সবিস্ময়ে দ্রোণাচাৰ্য বিপদ ভাবিল,
দ্রুতগতি দেখা গিয়া,
প্রজ্ঞাঅস্ত্র সন্ধানিয়া,
মােহনাস্ত্র নিরাকৃত অচীরে করিল।
হেথা ভীমে বহুক্ষণ
নাহি করি দরশন,
যুধিষ্ঠির মনে মনে চিন্তিল বিপদ ;
ক্ষণে করি চিত্ত স্থির
প্রেরিল দ্বাদশ বীর
অভিমনু। আদি করি কেকয় দ্রুপদ
চলিল দ্বাদশ রখী
যেন বিদ্যুতের গতি
সূচি মুখ ৰূহ করি কুরু চমু, ভেদি,

নবম সর্গ ।
ভীম ভয়ে ভীত সব
কুরুসৈন্ত করে রব,
দ্বাদশ পাণ্ড চলে অরি মুণ্ড ছেদি।
বাধিল তুমুল রণ,
তীক্ষ অস্ত্র অগণন,
নিঝরের জল যথা অবিরল ঝরে,
পাণ্ডবের শর বৃষ্টি,
যেন বিনাশিছে সৃষ্টি,
টলমল করে ধরা শশঙ্কিত ডরে।
হেথায় ভীগের সঙ্গে
অর্জুন সমর রঙ্গে,
ইচাপ তুল্য ভীম গাণ্ডীব ধরিয়া
নাচিছে দানব দাপে,
কৌরব আতঙ্কে কঁপে,
কুরুসৈঙ্গ ধায় বেগে সমর ত্যজিয়া।
লােহিত বরণ কায়
দিনমণি অস্ত যায়,
হেনকালে হেরে ভীম নৃপ দুর্যোধনে,
সম্বােধিয়া নৃপবরে
কহে ভীম, ভীমশ্বরে-
“গান্ধারিতনয় আজি যুঝ মাের সনে,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বহুকাল আকাঙ্ক্ষিত
দিন আজি উপস্থিত,
ত্যজ না সমর, আজি তােগারে বধিব,
কুন্তি জননীর তাপ,
দ্রৌপদীর মনস্তাপ,
বনবাসজাত ক্লেশ আজই দূরিব।
হয়ে গর্বে হতজ্ঞান,
পাণ্ডবের অপমান
করেছিলে তার ফল ভুঞ্জ এইবার,
বিদারি হৃদয় যন্ত্রে
কর্ণ সৌবলের মন্ত্রে
কি লাঞ্ছনা করেছিলে পাণ্ডব সবার।
সন্ধি হরে কৃষ্ণ যান
করেছিলে অপমান,
উলুক মুখ কত কটুক্তি সহেছি ।
বান্ধবগণের সনে
বিনাশিয়ে তােরে রণে,
সে জালার প্রতিশােধ মনস্থ করেছি।”
এত কহি ভীমবল,
আলােড়ি সমর স্থল,
চারি দিকে শবৃষ্টি করিতে লাগিল,

নবম সর্গ।
দুর্শেধন ত্বরা করি
সদর্পে কাৰ্ম্মক ধরি,
সুকৌশলে শরবলে শর নিবারিল।
শূন্স মার্গ বাণাচ্ছন্ন,
অন্ধকার অপরাহ্ন,
এইরূপে দুই দণ্ড হয় ঘোর রণ,
বাণেতে বাণেতে ভিন্ন
কুরুরাজ ধ্বজ ছিন্ন,
সহসা ভূপর পৃষ্ঠ করিল চুম্বন ।
না হেরি নৃপের রথ,
হয়ে ভগ্ন মনােরথ
দুর্যোধন-সৈন্যগণ করে পলায়ন;
পশ্চাতে অর্জুন ধায়,
দুঃসহ পবন প্রায়,
অগ্রে সৈন্য ধূম সম করিছে গমন ;
কিম্বা সূর্যোদয় কালে,
যেমন, কোয়াসা জালে
অরুণ কিরণ দূর করে আচম্বিতে,
পার্থ তেজে সেই মত,
পলায় কৌরব যত,
না জিজ্ঞাসে কেহ কারে, না চাহে পশ্চাতে।

৯৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
ভীমশরে হয়ে ক্ষত,
সুযােধন মূচ্ছাগত,
সারথি লইয়া তারে করে পলায়ন ;
রক্ত-সিক্ত কলের,
ভীষ্ম আদি ধনুর্দ্ধর
সন্ধ্যা হেরি, শিবিরেতে করিল গমন।
দশম সর্গ।
দিব। দ্বিপ্রহর পাণ্ডব শিবিরে
দ্রৌপদী সুভদ্রা আর উত্তরা বসিয়া,
ভাবিছে সকলে, এ দুরন্ত রণে,
পাণ্ডব জিনিবে কবে, কেমন করিয়া ।
দ্রোপদীর মুখে, প্রতিহিংসা ছায়া
রক্তিম বরণে স্পষ্ট খেলিয়া বেড়ায়,
স্বভাব-সরলা উত্তরা নলিনী
করতলে রাখি শির, নিরখিছে তায়,
সুভদ্রা নয়নে খেলিছে ভরসা,
জানে সে মনেতে, কৃষ্ণ সহায় থাকিতে
ধরাধামে হেন বীর নাহি কেহ,
সম্মুখ সমরে শক্ত পাবে নাশিতে।

দশম সর্গ ।
ললাট হইতে সরায়ে কুন্তল,
ছাড়িয়া নিশ্বাস দীর্ঘ, ক্ষণকাল পরে,
কহিলা পাঞ্চালী,—“সুভদ্রা ভগিনি !
হবে না কি ধ্বংস কুরু এ কাল সমরে ?
হায় রে বি ধাতঃ, হায় রে কপাল!
কৌরব পাপের শাস্তি হবে না কি আর
দুষ্ট দুঃশাসনে বধিয়া সমরে,
বৃকোদর! অপনীত কর দুঃখ ভার।
সেই নরাধম পূর্ণ সভাস্থলে
একবস্ত্র রজঃস্বলা আমারে লইয়া,
ছি ছি! কি বলিব ভগিনি আমার
নিগ্রহ করিল কত, এ কেশ কর্ষিয়া ।
সেই হতে বেণী রয়েছে এমনি
বৃকোদর ! তব বাক্যে ত্যজেছি কবর,
প্রতিজ্ঞা তােমার, ভুল না, ভুল না,
দুঃশাসনে বিনাশিতে হ’ও হে সত্বর।
পাষণ্ড শােণিতে হত ক্ষালিয়া
এই মুক্তবেণী কবে দিবেহে বাঁধিয়া,
প্ররি পূর্ব জ্বালা, ফাটে দিতল,
নয়ন রক্তিম দেখ কঁদিয়া কাদিয়া।
পাপী দুর্যোধন যেই উরু’পরে

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
মহা দর্পে বসাইতে চাহিল আমারে,
ভীম গদাঘাতে ভাঙ্গি সেই উরু,
বৃকোদর ! রণস্থলে বধিও তাহারে।
শুনলো, সুভদ্রা, বনে বনে ভ্রমি
দ্বাদশ বৎসর ক্লেশ নিরবে সয়েছি,
তার পর, হায়! এক বর্ষ কাল
অজ্ঞাতে বসতি করি গােপনে ভ্রমেছি।
আবার যখন, জান ত সকলি,
চেয়েছিনু মােরা সুধু ক্ষুদ্র পঞ্চ গ্রাম,
দুর্যোধন বলে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি
সূচ্যগ্র মেদিনী দিব করিতে বিশ্রাম।
রাজা যুধিষ্ঠির এখন ভিখারী,
চণ্ডাল ভুঞ্জিছে এই বিপুল ধরণী ।
হায় রে দৃষ্ট! এই কি বিচার ?
রাজরাণী আমি, হায় ! আজি ভিখারিণী।
দুর্যোধন বসে হস্তিনা আসনে
যুধিষ্ঠির পতি মম ভ্রমে বনে বনে!
দানব হইল স্বর্গ অধিপতি,
আখণ্ডল ভ্রমিতেছে কাননে কাননে।
দেখ লে সুভদ্রা, উত্তরা বয়ান,
চিন্তাছবি নাচিতেছে বাছার নয়নে,

দশম সর্গ।
ভাবিয়া ভাবিয়া কাতরা সরা,
কালিমা পড়েছে দেখ সােণার বরণে!
ঘরিয়া সােহাগে বধুর বদন,
কহিব নাথেরে, তিনি আসিলে ফিরিয়া-
দেখ দেখ নাথ, সােণার কমল
অনুতাপে দগ্ধ হয়ে যেতেছে ঝরিয়া ।
“কব বৃকোদরে ধিক্কারি তাহারে,
নাহি কি সামর্থ তার বিশাল ভুজতে !
কৰ ধনঞ্জয়ে ত্যজিতে গাণ্ডীব,
ধৰ্ম্মরাঙ্গে কব পুনঃ পশিতে বনেতে ;
যুদ্ধকাৰ্য্য নহে ব্যবসা তাহার,
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম অনুষ্ঠান করিতে বলিব,
আমরাও সবে হয়ে তপস্বিনী,
বনে বনে ভ্রমি, শেষে জীবন ত্যজিব।”
নিৱব দ্রৌপদী কাতর অন্তরে,
কহিল সুভদ্র। তবে মৃদুমধু স্বরে
অচীরে কৌরব ডুবিবে তিমিরে,
পশুপ সহায় কৃষ্ণ যখন সমরে।
নিশি শেষে কালি, দেখেছি স্বপন,
বিজয়ী পাণ্ডব হর্ষে ফিরিল ভবনে,
কিন্তু কি বলিব, দিদিলে আমার,
হেরিনু বহিতে নীর নাথের নয়নে ;

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। কাতর অন্তরে সুধাইনু রে, ( সতত পতির দুঃখে এ দাসী কাতর। সমর বিজয়ী সুভদ্রাবিলাসি! লভিয়াছ বাহুবলে এ বিপুল ধরা, তবে কেন নীর বহিছে ময়নে ? কহ, নাথ, কেন আজি মলিন বদন ? ছল ছল আঁখি কহিলা প্রাণেশ- (পরদুঃখে দুঃখী সদা হৃদয় রতন ) ‘সত্য প্রিয়তমে, জিনেছি সমর, সসাগরা ধরা আজি আয়ত্ব আমার, কিন্তু পাপ রণে, হায়! কব করে ! পাইয়াছি অনুতাপ, যাতনা তাপার, বীর শূন্য হ’ল সােণর ভারত, জ্ঞাতি বন্ধু মিত্র কত ত্যজিল জীবন, শূন্য হ’ল কত জননীর কোল কেঁদে সারা হ'ল কত কুরঙ্গ নয়ন, কত পুত্র, হায়! হ’ল পিতৃহীন, হারাইল কত পিতা নয়নের মণি সােদর ত্যজিয়া গেল কত জন, কঁদে হাহারবে কত সুশীলা ভগিনী, রাজ্যলোভ মদে উন্মত্ত হইয়া হারায়েছি প্রাণ সখ কত শত জনে, -

দশম সর্গ।
প্রাণ চেয়ে প্রিয় অমূল্য রতন
আবার বহিল নীর নাথের নয়নে ;
‘প্রাণ চেয়ে প্রিয়, অমূল্য রতন
কি হয়েছে, বল নথি, ঘুচাও ভাবনা,
কহিয়া যেমন ধরিব চরণ
ভেঙ্গে গেল স্বপ্ন, হায়! বাড়িল যাতনা,
কি যে হবে তাই ভেবেই আকুল,
শান্তি নাই মনে, দিদি, ব্যাকুল অন্তর,
কবে যে থামিবে সমর তুফান,
নিষ্কণ্টক হবে কবে পাণ্ডব নিকর।
পঞ্চ পুত্র তব, অভি বাছা মম
দুধের বালক সবে করিছে সমর।
ফেটে যায় বুক স্মরিলে সে সব,
সবারে কুশলে যেন রেখাে হে ঈশ্বর।
দ্বিতীয় পাণ্ডব সমরে অটল,
অভির জনক যিনি অদ্বিতীয় রণে,
পিতা হতে শ্রেষ্ঠ অর্ধগুণ রথী
বাছা মাের, যুঝে গবে ; তবু যে কেমনে
এত দিন ধরি যুঝিছে কৌরব
পারি বুঝিতে কিছু, কত দিন আর
প্রচ্ছন্ন রহিবে অদৃষ্টের ফল,
কত দিনে শুকাইবে নয়ন আসার।

১০৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কবে যে উদিবে সৌভাগ্য তপন
তিমির শর্বরী কবে হইবে প্রভাত।
পাণ্ডবের কবে হবে সুখোদয়,
পাপ কুরুবংশ কবে হইবে নিপাত।
জয় লক্ষ্মী কবে পাণ্ডলে ভজিবে ?
দুঃখ বসানে সুখ কবে যে লভিব।
দয়াময় প্রভু কর নেত্রপাত,
কত দিন এই ভাবে যাতনা সহিব ?
যদি ধৰ্ম্ম থাকে, কহিনু নিশ্চয়,.
চিরে সুখের আলো পাণ্ডব উপরে
সুধাময় হাসে ভাতিবে নিশ্চয় !
নিশ্চয় ভাসিব মাের। সুখের সাগরে।
সুভদ্রার মুখে শুনিয়া বচন
উত্তরা সুষমা চারু সুকৃতির ছবি,
কচিকে রাখি সুকোমল কর
কহিল “বলমা কবে সে সৌভাগ্য রবি
উদিবে গগণে, যাহার কিরণে
স্বাধীন ভাবেতে মােরা, বিপুল পুলকে
ভ্ৰমিক, খেলিব, নাচিব, গাইল;
হাসিবে সুখদা আশা সে রবি আলােকে ;
কবে থেমে যাবে রণ রণ রব ।
কুসুম কাননে ভ্রমি তুলি ফুলকুল,

দশম সর্গ ।
গাথিব কবে যে মন মত খার।
বল ওমা, বল কবে, ভ্রমর আকুল
আসিবে ছুটিয়া ? তাড়িয়ে তাদের
ফুটন্ত কুসুমগুলি, মিছে ক্রোধ ভরে
কেড়ে সব জােরে ? তরুমূলে কবে
বিছাৰ আঁচল আমি আকুল অন্তরে ;
বল ওমা, কবে মিটিকে সমর ?
ওগুলো লাগে না ভাল, কত লােক মরে !
মা, তাের স্বপন হউক সফল,
রণ জয় করি যেন আসে সবে ঘরে!
শঙ্কর মস্তকে দিব অর্ঘ্য কালি,
কহিব তাহার পদে মিনতি করিয়া,
দাও শান্তি, শিব, এই রণনল
নিবাও, নিবাও, ত্বরা অধৰ্ম্ম দমিয়া।
তাের স্বপনের শেষ কথা গুলো
বড়ই চিন্তিত, ওমা, করেছে আমায়,
জনক ফিরিয়া আসিলে শিবিরে
সমরের বিবরণ সুধাব তাহায়।
ওরে বিধি ! দেখ, দারুণ যাতনা-
বালিকা উত্তরা কহে কত মত কথা,
হেনকালে এক হৈমবতী নামে
চির অনুগতা সখি দ্রুত আসি সেথা,
.
-

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কহে তীব্ৰস্বরে- “ওমা, একি আলা।
দিন নাই, ক্ষণ নাই, বসি তিন জনে,
কি যে সব বলে! কিছু নাহি বুঝি,
হাগা কি হয়েছে বল, তােমাদের মনে ?
উঠে তারাদল
দেখ আঁখি মেলি
গেছে অন্ত ভানু
উকি মারে অন্ধকার বসি তরু শিরে,
সন্ধ্যা আসে ছুটি
এখনি পাণ্ডবগণ ফিরিবে শিবিরে ;
যুদ্ধ করে তারা ক্লান্তদেহ সবে
তাদের লাগিয়া কিছু কর আয়োজন,
কি যে হ’ল সব, নাহি বাহ্যজ্ঞান,
সারাদিন যেন সব ধ্যানেতে মগন !
তাহাদের রণ বুঝিবে তাহার,
তােমাদের এত কেন মাথা ব্যথা বল ?
মেয়েদের কাজ কর মন দিয়া,
কোথা কি রাখিব সব দেখাইবে চল।
শুনি সখি বাণী, হেরি সন্ধ্যাকাল,
দ্রৌপদী উত্তরা আর সুভদ্রা তন,
উঠি ব্যস্তমতি দ্রুত পদক্ষেপে,
নিজ নিজ কর্মে সবে করিল গমন।

একাদশ সর্গ।
১৩৭
একাদশ সর্গ।
কাতরে বিহগ উঠিল ডাকিয়া
যামিনী সখির লাগি ;
রাজা দুর্যোধন শুনিয়া সে রব
উঠিল সহসা জাগি।
হেলাইয়া তনু দেখিল রাজন
সম্যক বেদনা ভয়,
ধীরে ধীরে ধীরে শয্যা পরিহরি
দুৰ্বল কম্পিত পায়,
চলিল নৃপতি পিতামহ পাশে
ব্যাকুল, চিন্তিত মনে ;
হ'য়ে উপনীত গাঙ্গেয় সকাশে
বন্দি তার শ্রীচরণে,
কহিল কাতরে, একি পিতামহ,
পাওস লভিছে জয়,
নিপীড়িত গম বিপুল সেনানী
নিত্যই পেতেছে ক্ষয় !
দুর্ভেদ্য মকর বুহেতে বেশি
ভীমসেন যম সম;
শর জালে শশঙ্কিত করিয়া সবারে
কবচ ভেদিল মম ;

১০৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
স্মরিয়া তাহারে এখনও দেখ
কম্পিত হৃদয়তল,
কিরূপে নিধন হবে, কহ তাত,
বৃকোদর মহাবল ?”
সুবােধন বাণি শুনিয়া গাঙ্গেয়
সহাস্যে রাজনে কয়-
“ন, মহারাজ, আজিকে সমরে
ঘুচাব তোমার ভয় ;
তব জয় লাগি করি প্রাণপণ
যুঝিব সমরে আমি,
দ্রোণ, কৃপ আদি শ্রেষ্ঠ ধনুর্দ্ধর
হবে মম অনুগামী ;
কিন্তু এক কথা শুন হে নৃপতি,
পাণ্ডব অজেয় রণে,
সচীবপ্রমুখ পাণ্ডব সক্ষম
যুঝিতে দেবতা সনে।
তথাপি রাজন, তব হিত লাগি
করিব দেহের ক্ষয়,
যা হয় হইবে, পাণ্ডবের জয়
নহিলে আমার জয়।”
এত কহি ভীষ্ম বিশল্যকরণী
নরেন্দ্রে করিল দান,

একাদশ সর্গ।
অপনীত শল্য হইল রাজার
করিয়া ঔষধ পান
প্রফুল্ল অন্তরে মানি দুর্যোধন
আদেশিল সৈন্যগণে,
করিয়া ত্বরায় যুদ্ধ আয়ােজন
প্রবেশিতে ঘোর রণে।
রথ, খ, গজ, পদাতিনিকর,
সমর মাতঙ্গরাজি,
নৃপ, রথিগণ, শােভিল সুন্দর
বিবিধ বরণে সাজি।
অশ্ব, গজ, নর রথ চালিত নিয়মক্রমে
ধীরে ধীরে কুরুক্ষেত্র ভূমে,
উক্ত ধূলির জাল উর্দ্ধে বালার্কে গ্রাসিল,
ভানু যেন আচ্ছাদিত ধুমে।
তপন কিরণে ফলি ঝকিতেছে অস্ত্রবাজি
নভ মাঝে দামিনী যেমন ;
সমুদ্র মন্থনে যথা সত্যযুগে ভীমনাদ
কুরুক্ষেত্রে উঠিল তেমন।
মুকুট। দর্পণে সূর্য দেখিল নিজের ছবি
খেলে রঙ্গে নৃপগণ শিরে,
দুন্দুভির ভীমাদ তরঙ্গিত ব্যোমসহ
বেশিল পাণ্ডব শিবিরে।

১১০.
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অভিমনু হেথা শুনিয়া সে রব
কহিল উত্তরা আঁচল। ধরি-
“দেখেছ, প্রেয়সি, উদেছে তপন,
দুরে গর্জিছে দুর্জয় অরি।
রাখ তব বীন, সাঙ্গ কর গীত,
সাজাও আমারে সমর সাজে,
শুন কাণ দিয়া অশনি নিনাদে
সাজ সাজ বলি পটহ বাজে।
কহিল উত্তরা-“হায়রে কপাল !
বীণার ঝঙ্কার, আমার গান
লাগিলনা ভাল ? দিম্ দিম্ দিম্
দুন্দুভি নিনাদ মজালে প্রাণ!
অৱসিক তুমি, ফেলে দিলে চুড়ি
বিনাটি আমার এমন করে।
যেতে ত দিব না সমরে তােমায়,
রােধিব তােমার চরণ ধরে ;
থাক্ ওরে বীন, থারে বাঁশরী,
ধরিব এবার নাথের পায়,
দেখিব কেমন ঠেলিয়া আমারে,
সমর প্রাঙ্গনে প্রাণেশ যায়।
ধরিল চরণ চারু মেহলত।
বলি তাহাতে নয়ন নীর,

একাদশ সর্গ।
১১১
যেন বিষ্ণুপদে চঞ্চলা জাহ্নবী
শীতল ভাবিয়া রহিল স্থির।
কি কর উত্তরা, কহে বীরবর,
“দাওলো আমায় ত্বরায় ছাড়ি,
এ কি এ, কঁদি যে! হরিণনয়নে
বহে কি কখন বিষদ বারি
হৃদয় মহিষি! কাদলে অমনি
সমরের কথা কহিনু যেই ।
হায়রে ললনা! বল দেখি মােরে
কঁদিবার বুঝি সময় এই ?
দুর ছাই,
সুধু কেঁদেই আকুল,
ভাবনা কিছুই নাহিক মনে।
বল দেখি মােরে, হয়ে ক্ষত্রবীর
কেমনে রহিব তােমার সনে?
স্ত্রৈণ বলি মােরে ডাকিবে সকলে
যদি না এখন সমরে যাই,
বীরপত্নী তুমি, কেমনে বল না
হেন অপবাদ সখিবে ছাই।
গগাবিন্দ মাতুল, সুভদ্রা জননী,
ধনঞ্জয় বীর জনক মম,
উত্তরা প্রেয়সী লাবণ্যের হার,
কেবা আছে বল আমার সম ।

১১২
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বীরেন্দ্র কুমার, নিজে মহারথ,
রণঙ্গে আমি বিরত হব!!
“কোথা ছিলে অভি ?” সুধিলে জনক,
‘ছিনু অন্তঃপুরে’ কেমনে কব ?
ওই দেখ, প্রিয়ে, পাণ্ডবনিকর
চলিয়াছে সবে সমর মুখে,
আমিও এখনি তাহাদের সনে
যােগ দিব গিয়া পরম সুখে ”
আত্মহারা হয়ে উত্তরা তখন
উর্ষ মুখে চায় পতির পানে,
অজ্ঞাতে তাহার, অভিমনু বীর
ধীরে ধীরে নিজ চরণ টানে।
খুলল চরণ-তখন ত্বরায়
চৰ্ম্ম বৰ্ম্ম দৃঢ় আঁটিয়া দেহে,
লয়ে শর ভূণ, ধনুক করেতে
চাহিয়িা পানে কহিল মেহে-
“আসি তবে প্রিয়ে।" চলিল বীরে,
তাড়াতাড়ি গিয়া জননী পাশে
কহে বীরবর,জননি, আমার
নমে দাস পায় বিজয় আশে।”
নমে অভিমনু সুভদ্রার পদে
জয়ন্ত যেমতি শচীর পায়,

একাদশ সর্গ।
১১৩
জননী অমনি শিরস্রাণ লয়ে
নেহময় অর্ঘ্য দিলেন তায় ।
সাদরে ক্রোড়েতে তনয়ে লইয়া
কহিল সুভদ্রা সােহাগ করে-
“ধন্য মাতা তব, বাছা অভি তোর,
লভিয়াছি নে নয়রে!”
চাহি পুত্র মুখ, (মেহের আকর)
গলিল মায়ের কোমল প্রাণ,
দুই হাতে ধরি তনয় বদন,
স্নেহমাখা চুম্ করেন দান।
পূর্ণেন্দু প্রতীম কুমারের মুখ
অতৃপ্ত নয়নে নেহারি পুনঃ,
চুমিয়া আবার কহিল সুভদ্রা-
*অভিরে, আমার বচন শুন।
“বীরপত্নী আমি, বাছা, বীরের জননী,
ভ্রাতা মম বাসুদেব বীরচূড়ামণি;
রণাঙ্গণে যাবে তুমি করিনা বারণ,
যাও রণে, সাপ বাছা, শত্রুর নিধন
তবে এক কথা, আমি জননী তোমার,
স্নেহতরে ভীত তাই অন্তর তামার,
কোমল বয়স্ক তুই, তাই তোরে বলি,
রণাঙ্গনে যত খেলা ভীষণ সকলি,
.

১১৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
সতর্ক রহিবে সদা, থেকো পিতা কাছে,
কি জানি কি ঘটে রণে, কত বিপ্ন আছে।
'যে আজ্ঞা’ বলিয়া বীর চলিল সমরে,
সারথি সজ্জিত রথ আনিল সত্বরে।
চলিল সুঠাম রথ অব্যক্তগতিতে,
ফেলিয়া পশ্চাতে বায়ু, নিন্দিয়া তাড়িতে।
কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গণে উপনীত ক্ষণে।
মিলিল অর্জুন সুত অর্জুনের সনে।
শোভিছে ভীষণ সাগর সম
ভীষণ মণ্ডলই গাঙ্গেয় রচিত,
তরঙ্গিত তাহে কত
উচ্চ
রথচূড়,
বিশাল মাতঙ্গ দেহ; ঘুরিছে পদাতি
চক্রাকারে চারিভিতে ক্ষুদ্র উৰ্ম্মি যা ;
কনক মুকুট শােভে নৃপগণ শিরে,
সূর্যকর গেলে তাহে ধাঁধিয়া নয়ন ;
রােধিত ভুজঙ্গ যথা উগত ফণা,
শােভিছে ধনুর অগ্ৰ ঈষং বঙ্কিম ;
বাজিছে দুন্দুভি, তুরি, পটহ, দামামা,
নাচিতেছে বাজি-রাজি আনন্দে মাতিয়া
বুহিবদ্ধ কুরুণ সঘনে গর্জিছে,
সাগর কল্লোল যথা লয়ের কালে।

একাদশ পর্গ ।
যুধিষ্ঠির দূর হতে করি নিরীক্ষণ
দারুণ মণ্ডলবুহ রচিলা গাঙ্গেয়,
নিজ পক্ষে বজ্রব্যুহ করিল নির্মাণ।
বসিয়া সঞ্জয় পার্শ্বে ধৃতরাষ্ট্র রাজা
শুনিছে অনন্ত মনে সমর বারতা।
লভিয়া জ্ঞানের চক্ষু সুধীর সঞ্জয়
প্রত্যক্ষ করিছে রণ, দেবের আদেশে।
কহিলেন দূরদর্শী সম্বােধি রাজনে,
শুন তবে, মহারাজ ! শুন মন দিয়া,
কুলক্ষয়কারী এই সমর বারতা,
দেখিতেছি যাহা যাহা বণিব তোমায়।
কুরুক্ষেত্রে সমবেত রিপু দুই দল
ওই চলিতেছে বেগে ; শুন মন দিয়া
কে কাহার সনে যুদ্ধে হয় অগ্রসর।
দ্রোণাচার্গ আক্রমিল মৎস্য মহারালে,
অশ্বত্থামা শিখণ্ডীরে করিল প্রহার,
দ্রুপদের সহ যুঝে রাজা দুর্যোধন,
নকুল শলের সনে, হার্দিক সহিত,
যুঝে বীর বৃকোদর, ধনঞ্জয় প্রতি
সমবেত রাজগণ হইল ধাবিত।
ঘটোৎকচ ভগদত্তে করিছে সংগ্রাম

১১৬
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
মদমত্ত দন্তী যেন ; অভিমন্যু সনে
চিত্রসেন দুৰ্ম্মৰ্ষণ আরলি রণ।
এইরূপে সর্বস্থলে হয় ঘাের রণ।
মহারাজ ! পার্থ শিক্ষা কতই অদ্ভূত
নিমিষে জিনিল ওই নৃপতি মণ্ডলে !
শুন যাহা কহে পার্থ সম্বােধি অচুতে ;
দেখ সখে, পিতামহ বৃহ নিরমিয়া
অসংখ্য বীরের সহ স্থির ওইখানে,
চল ত্বষা করি সেথা, এ সব মশক
নাশি কিবা ফল বল?' আস্ফালি গাণ্ডীব,
ইন্দ্র অস্ত্র সন্ধানিয়া, বীর ধনঞ্জয়,
ভূপালগণেরে বিদ্ধ করিল অচীরে
দেবর্ষি, গন্ধৰ্ব্ব, দেব, মানিল বিস্ময় !:
অনিল ক্ষুভিত যথা বিস্তৃত অর্ণব
ছিন্ন ভিন্ন হয় তথা বিশাল কোরব।
;
সারথি নক্ষত্রবেগে চালাইল রথ,
পাঞ্চজ শঙ্খনাদ করিতে করিতে ।
হেরিয়া অর্জুন মূর্তি, ভীষ্ম বীরমণি,
মহারথগণ সহ ভেটিল বিয়ে।
বাজিল তুমুল রণ; হে মহারাজ,
দ্রোণাচাৰ্য্য অগ্নিমুর্তি নাশে পলে পলে
পাণ্ডবপক্ষীয় বীরে ; শিঙী সহিত

একাদশ সর্গ।
১১৭
অশ্বথামা প্রাণপণে করিছে সংগ্রাম।
ওই শিখণ্ডীর অশ্ব সারথি পড়িল।
লক্ষ ছাড়ি নীরবর অবতরি ভূমে,
অসি চর্ম ধরি করে ভ্রমিতে লাগিল।
সাত্যকি সহিত যুঝি বীর অলঘুষ
পলাইছে ভয়ে দূরে ! এ কি হ’ল হায়!
ধৃষ্টদ্যুম্ন দুর্যোধনে পরাজিল রণে!
ক্রোধভরে হাস্য করি বীর বৃকোদর
পরাঙ্গিল অবহেলে কৃতবর্মা পূরে;
দণ্ডপাণি যম যেন, ধন্য ভীমসেন।
মহামার আরস্তিল কৌরব ভিতরে।
শোকার্ত হৃদয়ে রাজা ধৃতরাষ্ট্র কয়
“হে সঞ্জয়! ভাগ্য মম নিতান্ত কঠোর )
ভীষণ তরঙ্গাঘাতে নদীকুল যথা,
য় প্তি দিনে দিনে কুরুকুল হায়।
সঞ্জয়, দৈবই সব, বল তার পর।”
“তার পর?” আরস্তিল দূরদর্শী পুনঃ,
“এইবার দিনমণি পূৰ্ব অর্ধ ছাড়ি,
পশ্চিমার্জ পথে রথ করিল চালিত।
অহহ! এ কি দৃশ্য? কি ভীষণ দৃশ্য, হায়!
যুগান্তকালীন যথা তীব্র হুতাশন
জ্জলিত হয় বেগে নাশিতে ভূপর,

১১৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
যুধিষ্ঠির মহারােষে প্রদীপ্ত তেমতি।
হেরি তাহ দেবগণ গণিছে মাদ।
প্রশমিত করি রােষ ধীর ধর্মরাজ
এড়িল নিশিত বাণ তায়ু উপরে ;
সারথি সহিত অশ্ব চুমিল ধরণি,
তায়ু পরাণ লয়ে পলাইব দূরে।
নিষ্কোশিত অসি করে কৃপ চেকিতান
করিছে অদ্ভুত ক্রীড়া, লাখে লাখে লাগে,
ঘুরে আসি অবিরত, পেলিছে বিজুলি
তাহে ধনিয়া নয়ন ; ঘুরে বীর দ্বয়,
কভু কাছে, কভু দূরে, কভু বা অন্তরে,
আমিছে দোহে দোহা বিপুল বিক্রমে ;
পরিশ্রান্ত দুই জনে ক্ষণকাল পরে,
পরিল ভূধর অঙ্গে হইয়া মুচ্ছিত।
করকর্ষ চেকিনে লইয়া রথেতে,
শকুনি কৃপেরে লয়ে করিল প্রস্থান ।
চিত্ৰসেন, দুর্ষণ বিকর্ণে লইয়া,
খেলিতেছে অভিম বিপুল পুলকে ;
পন্য শিক্ষা বালকের। কেন না হইবে
জনকের গুণাবলী তনয়ে লক্ষিত,
মৃগেন্দ্র শাবক ধরে মৃগেন্দ্রবিক্রম।
সুভদ্রা জননী যার বিজয় জনক,
'

একাদশ সর্গ ।
কেন না হইবে তার হেন পরাক্রম?
পুত্তলি লইয়া যথা খেলা করে শিশু,
ওই বীরত্ৰয় সহ খেলিছে আন্জনি।
তাহা দেখি সেনাপতি ভীষ্ম মহারথ
চালাইল রথ শীঘ্র অভিমমুখে।
বাপিল বিষম যুদ্ধ আর্জুনি সহিত।
ও কি, মহারাজ ! শত কুখী সহ
ঘুঝিছে আন্জনি এক অপূর্ব কৌশলে।
ওই ধায় ধনঞ্জয় রক্ষিতে কুমারে!
শিখণ্ডী চলেছে পাছে আর নৃপগণ
রক্ষিতে অর্জুন পৃষ্ঠ সমর প্রাঙ্গণে।
এইবার, মহারাজ, কি হয় সমরে!
একত্র মিলিত এবে বীরেন্দ্র সকল ;
শিখণ্ডী শান্তনু তে করিছে হার,
কাপুরুষ নপুংশক ভাবিয়া মনেতে
শিখণ্ডীরে ঘৃণা করি, ধাইল গাঙ্গেয়,
যেথায় কিরীটি স্থির কপিধ্বজ রবে।
দেবব্রতে হেরি পার্থ পুরিল সন্ধান ;
ভীষ্ম হতে
ভীম
ধনুঃ ঘুরে
অবিরত,
শায়কে চপলা খেলে থমকে থমকে।
ধায় অস্ত্র শূন্য মার্গে গরজি গম্ভীরে,
খও মুণ্ড সহ পুনঃ পড়িছে ধরায় ;

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
দেষদৈত্যনাস এ হেন সমর
কেমনে কহিব আমি? কহ হে রাজন!
বহিছে রুধির নদী, ভাসমান তাহে
ছিন্ন দেহ, ভিন্ন বর্ম, অশ্ব, রথ গজ।
ধূণিতে বাণেতে এবে আঁধার চৌদিক,
নিশ্চল বায়ুর বেগ সমর প্রাঙ্গণে,
ভানুমান অস্তাচলে করিল গমন,
কিছু না দেখিতে আর পেতেছি রাজন!
ওই যে শঙ্খের ধ্বনি উঠিল আবার
পাণ্ডব কৌরব দল ফিরিছে শিবিরে
অতিক্রমি প্রবাহিত রুধিরের নদী।”
সঞ্জয়ের মুখে শুনি সমর বারতা,
বসিলেন মৌনভাবে ধৃতরাষ্ট্র রাজা।
দ্বাদশ সর্গ।
প্রভাতে আবার উঠে কলরব,
সমরে চলেছে কৌরব পাণ্ডব,
কঁপিছে বিপুল ধরা বীর-পদ-ভয়ে
শৃঙ্গাষ্ট বুহি রচে যুধিষ্ঠির,
মহা ব্যুহ রটে গাঙ্গেয় সুধীর,

দ্বাদশ সর্গ।
১২১
কেবিব পাণ্ডব সেনা হেরে পরস্পরে,
শঙ্খধ্বনি শুনি ধনুর্বাণ করে,
প্রবৃত্ত সকলে ভীষণ সমরে।
ভুজঙ্গ সদৃশ শর ধায় অবিরত ;
গিরিশৃঙ্গ সম গদা হয় নিপতিত।
সমরে গাঙ্গেয় যেন কালান্তক যম,
রােধিতে তাহারে কেহ নহেক সক্ষম।
মহাবল ধনুর্ধর এক মাত্র বৃকোদর
সাহস করিয়া স্থির ভীষ্মের সমরে।
ভীষ্মক রক্ষিতে রণে, সােদরগণের সনে,
দুর্য্যোধন অবিরল শরবৃষ্টি করে।
ভীষ্মের সারথী পাইল নিধন,
রথ লয়ে অশ্ব করিল গমন,
অবসর লভি ভীম হইল সত্বর।
বশী সুনাভ আর পঞ্চজন,
ভীমের বাণেতে পাইল নিধন,
ভয়াকুক দুর্যোধন কাপে থর থর।
সাত ভ্রাতা হত দেখি রাজা দুর্যোধন।
ভীষ্মের সমীপে শীঘ্র করিল গমন।

১২২
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
শুনিয়া নৃপতি বাণি তার দুঃখ অনুমানি
ভীম মুখে দেবব্রত করিল গমন।
ভীম ভীষ্মে মহারণ,
নানা অস্ত্র বরিষণ,
রণস্থলে প্রতিহত হইল পবন।
তবু রণজয়ী ভীম মহাবল,
দিব্য শরে সবে করিছে বিক।
অভিমন্যু ঘটোৎকচ রাজা যুধিষ্ঠির,
ভীমের বিপদ হেরি হইল অধীর।
চলিল সকলে মিলি ভীমেরে রক্ষিতে,
বাধিল তুমুল যুদ্ধ অদ্ভুত দেখিতে।
অশ্বত্থামা, কৃপ, শল্য, ভদত্ত বীর,
বাণাঘাতে বৃকোদরে করিল অস্থির।
কিরীটি গীব করে,
ব্যাকুল ভীমের তরে,
কহিল কেশবে–“চল দাদার নিকটে,
রথীগণ, ওই স্থলে করে রণ,
গড়েছে অগ্রজ আজি বিষম সঙ্কট।”
যত কুরু
মহারথ ধনঞ্জয় আসিয়া সত্বরে,
ধরি শরাসন রােষে শরবৃষ্টি করে।
অস্ত্রপুঞ্জ, ধূলিজাল, চাইল গগন ;
পরাণ চমকে ওনি বার গর্জন,

দ্বাদশ সর্গ।
মহা কোলাহলে যেন ফাটিছে গগন,
এইরূপে প্রহরেক হয় ঘাের রণ।
অনন্তর দিনপতি গেলা অস্তাচলে,
শিবিরের অভিমুখে ফিরিল সকলে ।
নক্ষত্র ভূষিত গগন মণ্ডল,
জল, স্থল, ব্যোম নিস্তব্ধ সকল,
নিরব বিহগ ভয়েতে বিহ্বল,
কৌরব শিবিরে শােকেতে বিকল,
রাজা দুর্যোধন রয়েছে বসি।
কর্ণ, দুঃশাসন, শকুনির সনে,
মন্ত্রণায় রত ; “কি হবে এ রণে,
কহ কর্ণ সখা,” কহিল রাজন,
“কেন পাণ্ডবের করে না নিধন,
ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ সমরে পশি?”
দিন দিন মম সেনাবলক্ষয়,
কিরূপে হইবে আমাদের জয় ?
‘গাণ্ডব অবধ্য পিতামহ কয়,
মনেতে আমার উদিছে সংশয়,
বঞ্চিত বুঝি হইব রণে !
কহিল রাধেয় অহঙ্কারে তবে-
“বৃথা শােক করি কিবা ফল হবে ?

১৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
শুন নৃপবর, আমার বচন,
যদি রণ ত্যজে শান্তনুনন্দন,
বিনাশিব আমি পাণ্ডবগণে।
প্রতিজ্ঞ। আমার শুন, হে রাজন,
আমি শত্রুনাশ করিব সাধন,
ভীষ্ম কাৰ্য্য নয় অরাতি নিধন,
জয় পরাজয়ে নাহি তার মন,
সতত পাণ্ডবে করেন স্নেহ
গাঙ্গেয় সমীপে যাও মহাশয়,
অস্ত্র ত্যাগ তরে কর অনুনয়,
শবে পিতামহ ত্যজিবেন রণ,
আমি যবে রণে করিব গমন,
পাণ্ডবে রক্ষিতে নারিবে কেহ!”
কর্ণ বাক্য শুনি রাজা দুর্যোধন,
ভীষ্মের শিবিরে করিল মন,
হয়ে উপনীত গাঙ্গেয় সদনে,
প্রণাম করিয়া তঁাহার চরণে,
কহিল রান কাতর স্বরে-
“গুন পিতামহ দাসের বচন,
পাণ্ডবে নাশিতে করগো যতন ;

দ্বাদশ সর্গ ।
তব বাহুবল হইলে আশ্রয়,
দেবাসুরে পারি করিতে বিজয়,
ভাবি কি কখন পাণ্ডব তরে ?
পাঞ্চাল, কে কয়, আর যােধগণে,
পাণ্ডব নিকরে,—বিনাশিয়া রণে,
হও সত্যবাদী, উদ্ধার কৌরবে,
বাসব যেমন বিনাশি দানবে,
উদ্ধার করিল অমরণে ;
আর যদি তাত, মমতার তরে,
ক্ষম তুমি রণে পাণ্ডবনিকরে,
যুদ্ধ হেতু কর্ণে দাও অনুমতি,
তা হলে প্রভাতে কর্ণ মহামতি
নাশিবে পাণ্ডবে বান্ধব সনে।
দুর্যোধন বাক্যে ভীষ্ম মহাবলী,
ভুম সদৃশ কোপানলে জ্বলি
ছাড়িয়া নিশ্বাস ঘনে ঘনে ঘনে,
কহিল সরােষে-সমর আগুনে
এ ছাড়া জীবন তােমার তরে।
আহুতি দিতেছি, তবু এ কি কথা?
কেন বাক্যানলে দহ মােরে বৃথা।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বাতুল কর্ণের শুনে না বচন,
পাণ্ডব অজেয়, জেনাে হে রাজন,
নহে কেহ স্থির অর্জুন শরে
যখন খাণ্ডবে পরাজি বাসবে,
অর্জুন অগ্নির তৃপ্তি করিল সাধন,
দেখ বিচারিয়া দেখ হে রাজন
পার্থ বিক্রমের এই দিব্য নিদর্শন।
গন্ধর্বের। যবে বল প্রকাশিয়া
অবাধে তোমারে দেখ করিল হরণ,
শত ভ্রাতা তব, আর কর্ণ সখা,
করিল সকলে যবে ভয়ে পলায়ন;
একাকী অর্জুন নিজ ভূজবলে
করিল উদ্ধার তব করি ঘাের রণ,
দেখ বিচারিয়া, দেখ, হে রাও ন!
পার্থ বিক্রমের এই দিব। নিদর্শন।
বিরাট নগরে গো-গৃহে আবার
একাকী অর্জুন আসি আক্তমিল যবে,
ভীম, দ্রোণ, কর্ণ, কপ, অশ্বত্থামা,
শত ভ্রাতা দুর্যোধন, যুঝেছিল সবে !
অবাধে অৰ্জ্জুন পরাজি সবারে
একে একে করেছিল বসন গ্রহণ,

দ্বাদশ সর্গ।
১২৭
দেখ নরপাল ভাবি দেখ মনে
পার্গ বিক্রমের এই দিব্য নিদর্শন।
সমৱে কাৰ্জ্জুন তুষিয়া শঙ্করে ।
পাশুপত মহা অস্ত্র করেছে খ্রহণ,
এক রথে পা ইন্দ্রের অজেয়
নিবত কবচণে করেছে নিধন,
তুষ্ট দেবগণ দিয়াছেন তারে
কত অস্ত্র, কেবা তাহা করিবে বর্ণন!
দেখ বিচারিয়া দেখ হে রাজন
পার্গ বিক্রমের এই দিব্য নিদর্শন।
শঙ্খ চক্ৰধারি গােবিন্দ রক্ষক
হেন ধনঞ্জয় কেবা পরাজিবে রণে?
তথাপি ভাতে করি প্রাণপণ
দেখিবে বুঝিব আমি কিরীটীর সনে।
শিখণ্ডী ব্যতীত সােমক পাঞ্চালে
প্রেরিব সবারে কালি শমন সদন,
সুখে নিদ্রা যাও, বাছা দুর্যোধন,
করিব তােমার কালি আনন্দবর্ধন।”
কহিল নৃপতি ভীমে সম্বােধিয়া,
“শিখণ্ডীর সনে কেন না করিবেরণ ?
সেও কি অবশ্য? কিম্বা অন্যমত
শুনিতে বাসনা মম তার বিবরণ।”

১২৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
“রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া ভ্রাতারে
পলিনু প্রতিজ্ঞা মম ;
শুনিলাম এক দিন হয়ে স্বয়ম্বর
সরোজ কুসুম সম
আছে তিন চারু কন্যা কাশীর রাঙ্গার।”
গাঙ্গেয় কহিল তলে,
“বিচীত্রবীর্যের হেরি পরিণয় কাল,
ভাবি হরিতে হবে
অম্বালিকা, অম্বা, আর অম্বিকা কুসুমে
প্রকাশি বাহুর বল,
বীৰ্য শুল্ক সবে শুনি একেশ্বর আমি
চলিনু সমর স্থল।
আহুত নরেন্দ্রগণে কহিলাম আমি
‘গাঙ্গেয় হরিছে বলে
কাশীরাঙ্গ কন্যায়ে, উদ্ধার তোমরা
বধি মোরে রণস্থলে।
পরাজি নৃপতিবর্গে রথ পৃষ্ঠে আনি
কাশীরাজ-সুতাগণে ;
করিলাম আয়ােগন পরিণয় লাগি
কনিষ্ঠ ভ্রাতার সনে।
এত দেখি জ্যেষ্ঠা অন্ধ সলজ্জ হইয়া
কহিল বিযুক্ত করে

দ্বাদশ সর্গ।
১২৯
শারাজে মনে মনে করেছি বরণ
তিনিও আমার তরে
প্রতীক্ষা করেন সদ। এই সে কারণ
আমায় ছাড়িয়া দাও,
হে ভীষ্ম, শাস্ত্রজ্ঞ তুমি কোন্ বিধি মতে-
আমারে রাখিতে চাও?”
মম আজ্ঞা পেয়ে কাশীরাজ-বালা
সঙ্গেতে লইয়া ব্রাহ্মণগণে,
সৌভরাজ লাগি মন্থর গমনে
চলিতে লাগিল অনন্য মনে।
হ'য়ে উপনীত শারাজ পুরে
সম্রমে রাজার নিকটে গিয়া
কহিল ললনা,-“ওহে মহাবাহে !
ভুষিব তােমারে সে ধন দিয়া
আনিয়াছি তাহা, বরমাল্য লয়ে
এ ভা বালারে বরণ কর।”
হাসিয়া তখন কহিল নৃপতি-
“বৃথা আশা তুমি হৃদয়ে ধর !
হে বরবর্নিনি! অপূৰ্ব্বা তুমি,
ভাৰ্যারূপে তােমা কেমনে লব ?
গাঙ্গেয় যখন রিল তােমারে
উদে’ছিল প্রতি হৃদয়ে তক;

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অন্যপূৰ্ব্বা তুমি, বল কোন্ জন
স্বগৃহে তোমারে লইতে পারে ?
যে জন হরেছে বাহুবলে তোম।
বরণ করগে হরষে তারে।”
“অন্যপূৰ্ব্বা আমি ? কি কহ রাজন,”
কহিল ললনা গম্ভীর স্বরে,
“অন্তপূৰ্ব্ব। আমি ? যদি ইহা হয়,
অধ্যা নিজ প্রাণ বৃথাই ধরে ;
তোমার লাগিয়া ভাবি নিশি দিন
অন্যবর আমি ভাবি না কভু,
মস্তক চুইয়া করিনু শপথ,
সাদরে আমারে ভজুন প্রভু!”
তথাপি নৃপতি হইয়া কূপিত
অন্যপূৰ্ব্বা বলি-ত্যজিল তারে,
কুসুমে গঠিত বালিকা হৃদয়
আর কত ব্যথা সহিতে পারে।
কঁদিয়া তখন ধীরে ধীরে ধীরে
নগর ত্যজিয়া চলিল বালা
আহা মরি ।
কোথা বরমালা দুলিয়ে গলেতে,
জলিল হৃদয়ে আনল মালা।
জীবনের সুখ, বঞ্চিতা তাহাতে-
মিটিল না আশ জগতে তব ?
}

দ্বাদশ সর্গ । পাইলে না ভালবাসা? হায় মরি। ত্যজিল তােমার হৃদয় ধব! কি করিবে তবে? ভ্রমিবে কাননে ? ঝরিয়ে যাইবে তপন তাপে, যৌবন-কুসুম শুকাবে অকালে, এ যাতনা তব কাহার শাপে ? “চলিল ললনা, ঘুরিল নয়ন ভাতিল বয়ানে অপূর্ব ছায়া, জলিল পরাণে তীব্র হুতাশন, কপিল কুন্তল, কাপিল কায়! ধীরে ধীরে আসি তাপস আশ্রমে দু’খের কাহিনী কহিল বালা, তাপসেরা তবে কহিল তাহারে জুড়াতে তাহার প্রাণের আল- যাও বালা তুমি—জামদগ্ন পাশে কংগে তাহারে তােমার কথা, মাবল রাম দয়ার সাগর চীরে ঘুচাবে মরম ব্যথা ; 'হে হােত্ৰবাহণ ! মাতামহ তুমি এ ললনা তব রক্ষিত বটে, কালয়ে যাও ভার্গব নিকটে, সঙ্গে গেলে যদি সুবিধা ঘটে।”

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন । রাম পাশে আসি মাতামহ সনে কহিল ভামিনী কাতর স্বরে- “হে ঋষি সম! নিমগ্না শশাকেতে অবলা বালিকা পুড়িয়া মরে, রক্ষা কর প্রভু;” ধানস্থ ভার্গব বিস্ময়ে চাহিয়া বালিকা পানে কহিল গম্ভীরে-কি মাগ ললনা, কি শোক জাগিছে তােমার প্রাণে? আম্বা পিতামহ কহিল তখন কাশীরাজ-সুতা, দৌহিত্রী অামার = এই যে ললনা করিছে ক্রন্দন শুন কৃপা করি কাহিনী ইহার। ভাৰ্গলে তখন বৃত্তান্ত নিবেদি- জামদগ্ন পদ ধরিল বালা ; ভৃগু শ্রেষ্ঠ রাম কহিল তখন জুতাতে অবলা হৃদয় জাল- “সুমধামে ! তব উদ্দেশ্য মহৎ অবশ্য ঘুচাব তােমার ব্যথা, ভীষ্মের সদনে প্রেরি সন্দেশ গাঙ্গেয় শুনিসে আমার কথা কপিতে কাপিতে কাশীরাজ-সুতা- কহিল আবার করুণ স্বরে -

দ্বাদশ সর্গ।
“মহাব্ৰত মম বিপদের মূল
এ যাতনা মম ভীষ্মের তরে ;
হে ভৃগু শার্দল! ভীষ্ম বৈরী মম
রণ রঙ্গে ভেট তাহার সনে,
বিনাশ তাহারে, পুরন্দর যথা
বৃত্রে বিনাশিল সম্মুখ রণে।
এ প্রতিজ্ঞা তব ব্রাহ্মণ সমক্ষে
বিদিত জগতে শুনেছে সবে,
ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র মাঝে
ব্ৰহ্মদেষ্টা যেই হইবে ভবে,
মগ্র ক্ষত্রিয়ে পরাজিবে সেই
বিনাশিবে তুমি সম্মুখ রণে,
কহেছিলে আর রাখিবে বিপদে
শরণার্থী আর ভয়ার্ত জনে।
কুরুকুল ধুরন্ধর ভীষ্মও হয়েছে
বিজয়ী ক্ষত্রিয় রণে,
হে ভৃগুনন্দন রাম! ধনুর্বাণ ধরি
যুদ্ধ কর তার সনে ;
আমিও শরণাগত পদেতে তোমার
রক্ষা যােগ্য আমি ভু,
এ ক্ষুদ্র মিনতি, হায় !
তব পদযুগে
হয় কি নিষ্ফল কভু ?''

১৩৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
=
সঙ্গে ল'য়ে বিগণে
কাশীরাজ সুতা সনে
সরস্বতী তীরে রাম নিবিষ্ট হইয়া,
আমারে ডাকিয়া পরে কহিল গম্ভীর স্বরে
‘স্পৃহহীন হয়ে তুমি কেমন করিয়া
হরেছিলে এ ললনা ? পুনঃ পাতি কি ছলনা
তাজিলে ইহারে বল, কিসের লাগিয়া ?
তব স্পর্শ দোষ তরে এই রাজ পুত্রীবরে
ত্যজিয়াছে শরাজ সন্দেহ করিয়া
দুর কর অন্ত ভাব, স্বধৰ্ম্ম করুক লাভ
এ কুমারী, প্রতিগ্ৰহ কর এ বালারে।
‘অসম্ভব, হে ভার্গব । তােমার প্রয়াস সব’
কহিলাম আমি-“বৃথা সেধােনা আমারে,
ভয়, দয়া, অর্থলােভ,
আমার চিত্তের ক্ষোভ
পারিবে না প্রশমিতে, শুনহে ব্ৰাহ্মণ।
মাের প্রতি হ'য়ে বাম পৰ্যাকুল নেত্রে রাম
কহিল ‘আমার বাক্য করহে পালন,
নহিলে অদ্যই রণে । অমাতাগণের সনে,
বিনাশিব তােরে আমি কহিনু নিশ্চয় ;
ক্রোধ উপশম তরে কাতর বিনয় স্বরে
করিলাম কত আমি বৃথা অনুনয়।
বারম্বার বাক্য শরে জলিয়া কহিনু পরে
ক্ষত্রবীর আমি, খুন, হে শজতাপন!

দ্বাদশ সর্গ।
শাস্ত্রে কহে
“গুরোরপাবলিপ্ত কাৰ্যাকাৰ্য্যমজানতঃ।
উৎপথ প্রতিপন্ন পরিত্যাগে। বিধীয়তে।”
যুঝিব তােমার সাথে এই সে কারণ।
এয়ােবিংশ দিন যুঝি মাের সাথে
পরাজিত হইল ভার্গব ;
কাশীরাজ-বালা হেরিয়া তখন
রাম সাধ্য নিরর্থক সব,
আরম্ভিল ব্ৰত, মম ধ্বংশ তরে
তপস্যায় তুষিয়া শঙ্করে
পদের ঘরে শিখণ্ডিণী রূপে
জন্মে অম্বা তােষ বরে।
পুত্ৰ নিৰ্বিশেষে বিদ্যা বুদ্ধি দানে
শিবাদেশে পালিল বালায়,
দ্রুপদ-কুমারী ধনুৰ্বেদ আদি
করে শিক্ষা দ্রোণের কৃপায়
শিখণ্ডীর সনে দশর্ণ ভূপতি
তনয়ার দিল পরিণয়,
দশর্ণ নয়। কিছুদিন পরে
শিখণ্ডীর পেয়ে পরিচয়,

১৩৬
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
পাঠাইল দূতী পিতার সকাশে-
বিবরণ কহিয়া তঁাহায় ;
প্রবঞ্চনা তেরি দশর্ণ ভূপের
মাক্রোধ উপজিল তার।
গেরিল সন্দেশ দ্রুপদের কাছে
আদেশিয় সাজিতে সমরে ;
হিরণ্য বৰ্মার ভয়েতে দ্রুপদ
ব্যস্তমতি শিখণ্ডীর তরে।
লজ্জিত হইয়া পদ-তনয়া
প্রাণ নাশে সঙ্কল্প করিয়া,
স্কুণাকর্ণ নামে যক্ষের রক্ষিত
মহাবনে আসিল চলিয়া।
কিছুদিন পরে গেরিয়া বালায়
স্কুণাকর্ণ দয়ার্ল হইয়া,
নিজে নারী হয়ে দ্রুপদ কন্যারে
তুষিলেন পুরুষত্ব দিয়া।
এই সে শিখণ্ডী পদ তনয়
জন্মিয়াছে নাশিতে আমারে,
জামে রমণী এখন পুরুষ
ভেটিব সমরে, তাহারে।”

ত্রয়ােদশ সর্গ ।
পিতামহ বাক্য, শুনি রাজা দুর্যোধন,
মহা গর্বে কহিলেন- “হে শত্রুতাপন।
পদবংশের ধ্বংশ করিতে সাধন
জন্মিয়াছে অশ্বত্থামা, তবে কি কারণ
ভয় কর শিখণ্ডীরে ?
করি মহারণ
সােমক পাঞ্চালগণে করগো নিধন।”
কুরুরাজ ভীষ্মপদে করিয়া থামি
আপন শিবিরে গেলা করিতে বিশ্রাম।
ত্রয়োদশ সর্গ।
পূৰ্বাকাশ যেথা চুমে
ধরণী ললাট,
অরুণ বিমান সেথা শােভিল সুন্দর,
কত রঙ্গে বিচিত্রিত কে পারে বর্ণিতে ।
বসিল তাহাতে হাসি দেব অংশুমালি ;
অতিজব তুরঙ্গম তপনে লইয়া,
চলি বিমান পথে অচিরাংশু গতি ;
দেখাতে তারে বুঝি আজি মরণ !
প্রতিজ্ঞা করেছে ভীষ্ম, শিখণ্ডী ব্যতীত
সোমক পাঞ্চালগণে করিবে সংহার ।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অগাধ আনলে তাই ভাসি দুৰ্য্যোধন,
যেতেছে চঞ্চল পদে বীরগণ কাছে,
একে একে কহিবারে সাজিতে সমরে,
মাতিতে আহব-মদে নাচিতে উসে।
পূরকুল ইন্দু ভীষ্ম সাজিল সমরে
কার্তিকেয় যেন রণে, শােভিল সুন্দর
বিশাল অংসল বপু, বিস্তৃত উস,
অনিন্দ্য অঙ্গিকা তাহে রতনে খচিত ;
কোটিতে ভীষণ সি, হস্তে ভীম ধনু,
বামপৃষ্ঠে দীর্ঘ তূণ পূর্ণ কায়েমুখে।
চিন্তি ধৰ্ম্মরাজ মুখ কঁাদিল গাঙ্গেয়,
দুর্যোধনে ভাবি পুনঃ লভিল সান্ত্বনা।
ভীষণ তাম্বুজ ধ্বনি করিয়া তখন,
সৈন্যে আদেশিল ভীষ্ম চলিতে সমরে।
শ্রেণীবদ্ধ
কুরুচমু
দেখিতে সুন্দর
বামে চলে তুরঙ্গম, দক্ষিণে বারণ,
সম্মুখে পদাতি চলে প্রাচীর সদৃশ,
থরে থরে রথশালা চলে মধ্যভাগে
গত পতে উড়ে ধ্বজ বিমানের চুড়ে,
নীল, লাল, পীত, শুভ্র অদ্ভুত দেখিতে,
বিবিধ ফুলের মালা যেন শূন্য দেশে।

ত্রয়োদশ সর্গ ।
নিফোসিত অসি করে চলে বীরগণ,
সূর্যকর ফলি তাহে ঝকিছে অম্বরে,
সৌদামিনী খেলে যেন কাদম্বিনী কোলে।
নিশ্চল, নিস্পন্দ, স্থির পাণ্ডব-বাহিনী,
মহাতার পূর্বে মহার্ণব যথা।
ভীমাকৃতি ভীমসেন, ভীম গদা করে
দাড়ায়ে বুহের দ্বারে দণ্ডপাণি যেন ;
বীরবৰ্ম্ম শোভে দেহে, মস্তকে কিরীট,
চমকে চপলা তাহে, স্বর্ণ-পৃষ্ঠ-ধনুঃ
দুলিতেছে বামস্কন্ধে নিষঙ্গ সহিত,
কোষবদ্ধ তীক্ষ্ণ অসি কোটিতে লম্বিত।
কুরুক্ষেত্রে উপনীত কৌরব পাণ্ডব ;
অকস্মাৎ তিরােহিত হইল তপন,
অকস্মাৎ মহা শব্দে কাপিল মেদিনী,
খেচর নিনাদ করি ভ্রমিতে লাগিল
চতুর্দিকে, স্থলচর গণিল মাদ,
বহিল তুমুল ঝড় দিক আলােড়িয়া,
অশিব শিবার রব উঠিল সহসা,
দপে চারিদিকে জ্বলিল পাবক,
রুপির মিশ্রিত অস্থি, পাংশু রাশি রাশি,
মহােল্কা সুর্যের সাথে পড়িল ভূতলে ;

১৪০
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
গোমায়ূ, কুকুর, কাক ধাইল চোদিকে
ভীষণ নিনাদ করি, পাণ্ডব কৌরব
উঠিল কঁপিয়া ভয়ে, বনরাজি যথা
প্রবল পবনাঘাতে, অথবা যেমতি
বাতােদ্ধত মহার্ণব প্রলয়ের কালে।
কতক্ষণে স্তব্ধ ভাব ধরিল ভূধর,
আবার হাসিল ভানু দিক আলােকিয়া,
পাণ্ডব কৌরব দলে বাধিল সংগ্রাম।
মহারথ অভিমন্যু চড়ি হেম রথে
বিপক্ষ পক্ষীয় বুহ ভেদিল অচীরে।
অর্জুন তয় মুক্ত যমদণ্ডেপম
সুতীক্ষ কলম্বকুল, পাইয়া তাম্বরে,
(প্রজ্জ্বলিত আশীবিষ অন্তরীক্ষে যেন )
বিদীর্ণ করিল রথী, অশ্ব, গজ, নরে ।
বিদ্রাবিত হয় রিপু আৰ্জনির শরে,
প্রবল বায়ুর বেগে তুলারাশি যথা।
দেবগণ সবিস্ময়ে কহিতে লাগিল
“সাধু অভিমস্থ্য,
সাধু কিরীটি তনয় !”
নিয়া বিমান পথে আঞ্জুনি বিক্রম
ধৃতরাষ্ট্রে সম্বোধিয়া কহিল গান্ধারী
“মহারাজ, কাজ নাই আর এ সমরে,
নিবারণ কর ওভাের তােমার তনয়ে,

ত্রয়োদশ সর্গ ।
১৪১
অভি মনু। বালকের দেশ পরাক্রম,
স্বর্গ হতে দেবগণ দেয় সাধুবাদ,
পাগ হতে অর্ধগুণ রথী এ বালক।
আৰ্জ্জুন সহিত যবে মিলিবে অর্জুনি
কে তারে আঁটিবে রণে? বহু তরুরাজি
যুক্ত বটে. বনস্থলী, কিন্তু ভেবে দেখ,
পশে যদি দাবানল সে ঘোর বিপিনে,
আর যদি ভঞ্জন যােগ দেয় তাহে,
বাঁচে কি বিটপিকুল ? মজিল কৌরব,
কেহ না রহিবে আর বংশে দিতে বাতি।
শুনেছি, লঙ্কেশ দাপে ঝাপিত ভূতল,
দেবগণ শুচিত ছিল তার ভরে,
রাবণ ভয়েতে ভীত
ষড়ঋতুগণ
সেবিত তাহারে নিত্য ; ৰীরপূর্ণ ছিল
লঙ্কাপুরি, বাসব বিজয়ী ছিল পুর
মেঘনাদ, আর তার পুত্র কত শত
বিক্রমে অতুল
ছিল; কিন্তু যবে হয়।
পাপমতি দশানন হরিল জানকী
টলিল কনক লঙ্কা, গোল পলাইয়া
চিরবন্ধ রক্ষ লক্ষ্মী, তিমির গহ্বরে
ডুবিল লঙ্কার রবি লঙ্কা আঁধারিয়া ;
সবংশে মজিল পাপী রাঘবের হাতে।

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
-
রজঃস্বলা দৌপদীর করিয়া নিগ্রহ
মহা পাপপঙ্কে মগ্ন বাছা দুর্যোধন,
অবশ্য মজিবে মুঢ়, মজাবে সবারে ।
দাও প্রভো! পঞ্চগ্রাম প্রবল পাবে,
দুখিনীর পুত্রগণে রাখ এ বিপদে।”
কহে অন্ধরাজ তবে প্রিয়ারে সম্ভাষি-
নিজ কর্মদোষে মজে যে অবোধ নর
কে তারে নিবারে বল ? স্বেচ্ছায় যে জন
ভাঙ্গয়ে মঙ্গল ঘট চরণ ভাবাতে,
দম্ভে অবহেলে যেই গুরুজন বাণি,
শ্বাপদ হইয়া যেবা মাতঙ্গ মস্তকে
করে দর্পে পদাঘাত, কে রক্ষিত্রে তারে ?
শৃগাল যদ্যপি ভেটে শার্পলে সংগ্রামে,
ফিরে সেকি নিজালয়ে জীবন লইয়া ?
বিষপর পুচ্ছ ধরি টানে যেই জন
অবশ্য দংশয়ে তারে সে কাল ভুজগ !
দেবকুলে অবহেলা করে যদি কেই
লভে কি সৌভাগ্য কভু সেই মদ-মতি ?
বিধির ক্রোধাগ্নি এবে জ্বলিয়াছে হায় !
মরিবে পুড়িয়া তাহে দুষ্ট দুৰ্য্যোধন।”
চলিল অর্জুনি রথ বিপক্ষ মুর্দিয়া;
দুর্যোধন আসি ত্বরা গাঙ্গেয় সমীপে

ত্রয়ােদশ সর্গ।
কহিল সন্তপ্ত চিত্তে “হের পিতামহ,
অভিমন্যু ধায় বেগে ধরি ভীম শূল,
শিবশূল করে যথা বৃত্ৰ মহাশূর !
পলায় কৌরব যােধ ত্যজিয়া সমর
বৃত্ৰভয়ে ভীত যেন অমর সেনানী।
নিবারণ কর তাত, দুর্দম বালকে,
ছি! ছি! কি কহিবে শুনি পুরনারী-ব্র !
এ বারতা যবে হায়! পশিবে নগরে ?
মাতৃ অঙ্কে শিশুগণ হাসিবে ঘৃণায় !”
ধাইল গঙ্গার সুত অভিমন্যু মুখে ;
সহসা হেরিল পথে বীর বৃকোদরে
বজ্রসম গদা করে, ঘূর্ণিত নয়ন!
ছাড় পথ ভীমসেন” কহিল গাঙ্গেয়,
“ভেটিব সমরে আজি অভিমন্যু শূরে।”
হাসিয়া কহিল ভীম- বৃথা আশা তাত,
বৃথা এ সাধনা তব, সম্মুখে তোমার
অজগর বিষধর উর্ধগত শির
বিবর দুয়ারে বসি রক্ষিছে শাবকে,
বিনাশি তারে গ্রে, বলহে কেমনে
পশিবে বিবর মধ্যে নাশিতে শাবক ?
স্তনদানে পালে মাতা আপন তনয়ে
স্বেচ্ছায় জননী কভু দেয় কি তাহারে
.

১৪৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কৃতান্তের কাল ক্রোড়ে? রুদ্ধদ্বার গৃহে
আছে রত্ন, পশ গৃহে, (তস্কর যেমতি)
ভাঙ্গিয়া বিক্রমে এই ভীষণ তােরণ ;
যুঝ অর্থে বীরবর, ভীমসেন সাথে,
উপার শাল্মলী তরু নিজ ভুবলে,
পরে সে ভেটিবে রণে অভিমন্যু শুরে
এস দেখি, বৃদ্ধযুবা, ধর কত বল।”
বাধিল ভীষণ যুদ্ধ ভীষ্ম বৃকোদরে ;
উঠিল শিঞ্জনি ধ্বনি রােধিয়া শ্রবণ,
ছুটিল শায়কগুচ্ছ দিক আঁধারিয়া।
বিক্রমে,
হেনকালে ধনঞ্জয় কপিধ্বজ রথে
উত্তরিল দ্রুতবেগে ভীমের নিকটে ;
“শীঘ্রগতি হে অগ্রজ,” কলি অর্জুন,
“যাও অভি পাশে, মহা মহা রথী সহ
যুঝিছে একাকী বীর
অতুল
আমি নিবারি আজি বৃদ্ধ পিতামহে।”
ভীমের সৃন্দন বেগে ছুটিল সেথায়
যেথায় যুঝিছে অভি বসি হেম রথে
ভগদত্ত, দুঃশাসন, জয়থ সাথে ।
যুঝিতেছে পার্থ হেনা দেবব্রত সনে
মৃদুগতি, চিতভ্রম হতেছে সর্বদা ;
ভাবিছে অর্জুন মনে ‘এই পিতামহ।

ত্রয়ােদশ সর্গ ।
১৫
স্নেহের পুতলি সম আদরে যে জন
পালিত অঙ্কেতে তুলি মুছাইয়া ধুলি!
আপনার ভােক্ষদ্রব্য বিভক্ত করিয়া
সাদরে বদনে তুলি দিত যেই জন,
পিতা বলি ডাকিলে যে কথিত আদরে
‘পিতা নহি আমি তাের ওরে যাদুমণি,
পিতা বলে মেরে তাের জনক জননী।
অস্ত্রশিক্ষা কালে যেই কহিত আমারে
‘অদ্ভুত ল’ভেছ শিক্ষা, তােমার বিক্রমে
শহীন হবে ধরা, শচীকান্ত যদি
ধনুঃ করে ভেটে রণে তােমারে বাছনি।
পরাজিত হয় ইন্দ্র ; ক্ষত্রিয় রতন !
ক্ষত্রিয়ের মান তুই রাখিবি ধরায়।
হায়! শত্রু আজি সেই পিতামহ মম।
নিঃশত্রু করিব ধরা বধিয়া তাহারে ?
ক্ষত্রিয়-ভূষণ আমি এই কাৰ্য্য তরে ।
পি মােরে, ধিক শিক্ষা, ধিক্ বাহুবল!
অতল অম্বুধি জলে ডুবিলে যেমতি
রুদ্ধশ্বাস গতণ হয় নরগণ,
সমর-সাগরে ডুবি পার্থও তেমতি।
খসিয়া পড়িছে কভু গাণ্ডীব সহসা,
কভু স মুছিছে বীর নয়নের নীর।

১৪৬
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
জর্জরিত ভীষ্মশরে, গােবিন্দ তখন
হেরিয়া অৰ্জন-যুদ্ধ, আরক্ত-নয়নে
কহিল ভৎসনা করি- “ছি ছি ! ধনঞ্জয় ।
এই কি বীরের রণ? হে বীরপুঙ্গব ।
নাহি কাজ যুদ্ধে আর তােমার অর্জুন,
আমিই নাশিব আজি শুর দেবব্রতে।”
এতেক কহিয়া কৃষ্ণ কশা হস্তে করি,
লক্ষ ছাড়ি দাড়াইলেন মেদিনী উরসে ;
আতঙ্কে কাপিল ধরা কৃষ্ণ পদ চাপে;
কপিল বৈকুণ্ঠ-দ্বার, কপিল বাসুকি ;
বসিয়া চরণতলে সেবিছেন রমা
বিষ্ণুর কোমল পদ, দেব পূজনীয়,
সহসা কাপিল তার কমনীয় কায়া ;
কহিলা কমলা সতী বিষ্ণুপদ ধরি
এ কি নাথ! কেন অজি কাপে মম দেহ।
বৈকুণ্ঠ তােরণ দেখ কঁপিছে এখন (৩)
তােমার শীতল দেই কেন উষ্ণ আলি ?
কেন বা রক্তিম অব কমল-লোচন?
কমল-লোচন! অভাগিনী কাতরা ভয়েতে,
পশিল কি দৈত্য কোন পুনঃ স্বর্গপরে ?”
কহিলা গােলােকপতি মধুমাখা স্বরে
‘ভয় নাই, প্রিয়তমে, নহে অন্য কিছু

ব্রয়ােদশ সর্গ।
১৪৭
কৃষ্ণরূপে এক অংশে অবতার আমি
মহীতলে, কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডব সহায় ;
দেবব্রত সনে পার্থ করিছে সমর
মৃদুভাবে, পার্থে শিক্ষা দিতে আমি
ভাক্ত ক্রোধভরে, এবে কশা হস্তে ধরি
ধাইতেছি ভীষ্মবপে, চাই মৰ্তপনে।”
দেখিলা কমলা দেবী কুরুক্ষেত্রে চাহি,
বিশাল নগেন্দ্র সম, ভীষণ মূরতি
দাড়াইয়া কশা-করে দেব নারায়ণ ;
বিস্ফারিত আঁখিযুগ উগারে অনল,
সঘনে কম্পিত ওষ্ঠ, নাসারন্ধে শ্বাস
বাগিরিছে ঘনে ঘনে, কুঞ্চিত যুগ,
পদতলে পার্থরথী ধরিয়া চরণ
করিছে শপথ, রণে যুঝিতে বিক্রমে।
হেরিছে কমক্ষি রমা অদ্ভুত সে খেলা,
হেনকালে বসুন্ধরা কাপিতে কাঁপিতে
কমলার পার্শ্বে আসি, কৃতাঞ্জলি পুটে,
কমলাবিলাসী পদে কহিতে লাগিলা-
“গােলােকবিহারি । তব এই কি বিচার ?
কুরুক্ষেত্রে সমবেত কত মহারথ,
ধ্বজোপরে কপিবর অর্জুনের রথে,
দেব-দত্ত রথ তাহে সারথি স্বয়ং,

১৪৮ কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। কত অশ্ব, গজ কত ধীর কত কোটি ভ্রমিতেছে বীর দাপে আমার উরসে, একেই কাতর তাহে অভাগিনী রাণ, হের, ক্ষত বক্ষ মম, বিদীর্ণ ললাট, বহিছে কধির স্রোত নিঝরের ধারে ! কেন প্রভু তবে পুনঃ দুঃখ দিতে মােরে অবতীর্ণ রণস্থলে বিশ্বম্ভররূপে ? লাগে কি এতই ভাল দলিতে এ হিয়া বারম্বার? সেই দিন মিটে নাই সাধ- তৃতীয় দিবসে যবে এইরূপে তুমি দলিলে এ হিয়া মম? ক্রমশঃ দুলা হ’তেছে এ দাসী, প্রভো, নিত্য নিত্য হয়। কেমনে সহিব আমি দুরন্ত যাতনা, পারিব না আমি আর ধরিতে মেদিনী।” এত কহি বসুন্ধরা কঁদিনা মরমে, হাসিয়া কহিলা বিষ্ণু কলাবল্লভ “দেশি! যাও শীg, পুনঃ ধরগে মেদিনী, আর অবতীর্ণ আমি হ’ব না সমরে, দিব না যাতনা আর, অচীরে মজিবে দুর্জয় কোরববৃন্দ, কালি মহারণে পড়িবে শান্তনু-সুত শরশয্যাপরে হইবে কৌরব রণ নয় দিন আর

ব্রয়ােদশ সর্গ ।
১৪৯
বিধির বিধান ইহা কহি তােমারে,
করিতেছি দেখ অামি রথে আরোহণ।”
আইলা ধরিত্রী দেবী পুনঃ মহীতলে,
অর্জুন মিনতি শুনি দেব গদাধর,
আলিয়া বসিলা পুনঃ বিমান পৃষ্ঠেতে।
মােহ ত্যজি ধনঞ্জয় ধরিয়া গাণ্ডীব
আরম্ভিল মহারণ মহাব্ৰত সনে।
মহাশব্দে ধায় শর ভীষণ আকার ;
অর্ধপথে বাণে বাণে হয়ে সর্মণ
উঠিছে অনল-শিখা অন্তরীক্ষে যেন
চমকে চপলা মালা মেঘের ঘর্ষণে !
সুতীক্ষ্ণ কলম্বকুল উঠিয়া শূন্যেতে
ধরিছে বিবিধরূপ অদ্ভুত আকার,
ছায়াবাজী হয় যেন নীল নতঃস্থলে ।
অহিরূপে কোন শর উর্ধগত ফণা,
কেহ বা গরুরূপে ভক্ষিছে তাহারে ;
কোন শর উগরিছে বহি রাশি রাশি,
বারিধারা বর্ষে কেহ নিৰ্বাপিতে তাহা ;
পরিঘ, মুগর, শেল, ঘণ, মুশল,
মহাশব্দে ধরা-পৃষ্ঠ হতেছে পতিত,
চূর্ণ তাহে কত অশ্ব নর গজশির।
বিকট সমর হেরি দেব দিবাকর
}

১৫০
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অস্তাচল চূড়ে বসি মুদিলা নয়ন,
পশ্চাতে রজনী করি আইল গােধুলি,
পাণ্ডব কৌরব দল ফিরিল শিবিরে।
চতুর্দশ সর্গ।
জ্বলিতেছে তার মালা সুদূর গগনে,
তারা মাঝে সুধানিধি বসি ফুল্লাননে,
সেফালিকা দলে যেন কনক কমলা
অলিতেছে দীপমালা প্রতি ঘরে ঘরে
রজনীর সমাগমে, সম্ভাষিয়া তারে ।
বিরামদায়িনী নিদ্রা ফিরিছেন একা
শান্তিবারি বরযিয়া অশান্ত হৃদয়ে
হরিয়া দুখীর দুঃখ; সাধিছেন বৃথা-
যুবক যুবতীগণে মত্ত প্রেম-মদে ।
দারুণ সমর-ক্লান্ত রাঙ্গা ধৰ্ম্মরাজ,
প্রশান্ত মুরতি, ধীর, গম্ভীর বদন,
( ধরমের শুভ্র ছায়া ফলিত তাহাতে)
উপবিষ্ট স্থিরভাবে করলগ্ন শিরে ;
অলস অবশ কায়া, রক্তিম কপােল,

চতুর্দশ সর্গ ।
বহে তাহে স্বেদবারি তিতিয়া বসন,
কপিছে কুঞ্চিত ভুরু, চিন্তার হিল্লোলে,
দীর্ঘশ্বাস ক্ষণে ক্ষণে বহিছে বেগেতে।
দ্রৌপদী ব্যজন ধীরে করে সঞ্চালন
মুছায়ে অঙ্গের ঘর্ম ; হৈমবতী সখি
যতনে ঔষধ লেপ করে গত মুখে।
কতক্ষণে শান্তিলাভ করি যুধিষ্ঠির
কহিল হতাশ কণ্ঠে- “বৃথা শ্রম গিয়ে,
বৃথা আশা জয় লাভ কুরুক্ষেত্র রণে,
ধন্য বীর দেবব্রত! ধন্য শিক্ষা তার ।
শিঞ্জিনীর ক্রীড়া তার কতই অভূত!
অবিরত চক্রাকারে ভ্রমে তার ধনুঃ,
তার মাঝে রোষার পিতামহ মম,
আদিতমণ্ডল যেন দেব তিষাম্পতি,
বসেন আরক্ত নেত্রে, ব্রাসিয়া পাবে।
না পারি হেরিতে তারে, ছিদ্র নাহি পাই
সমরে তাহার কভু, না পারি বুঝিতে,
তুণীর হইতে শর লইয়া কখন,
লঘু হস্তে সন্ধানিয়া করেন নিক্ষেপ।
নারিনু পুরাতে, প্রিয়ে, তােমার কামনা,
নারিনু বসাতে তােমা হস্তিনা আসনে,
তােমার নিগ্রহ তরে প্রতিশােধ দানে

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অক্ষম তােমার স্বামী, অক্ষম পাণ্ডব,
দুৰ্য্যোধনে, দুঃশাসনে, না শাস্তি সন্ত্রাসে,
ফিরিতেছি নিত্য নিত্য তােমার সদনে,
ধিক্ মােরে, ধিক্ পার্থে, ধিক্ বৃকোদরে !
চল, প্রিয়ে, যাই চলি গহন কাননে,
পরিব অজিন বাস, ফলত কাছে
মাগিব সুমিষ্ট ফল উদর পূরিতে,
বসিয়া তরুর মূলে অভাগা দুজনে,
( অভাগার সহবাসে তুমি অভাগিনী !)
মনজ্বালা সমীরণে কব উচ্চৈঃস্বরে,
প্রতিধ্বনি ঘুরে ঘুরে পর্বত সমীপে
নিবেদিবে মম দুঃখ, গাইবে বিহঙ্গ
আমার বিষাদ গান কঁাপায়ে গগণ,-
নিঝরিণী কাছে গিয়া বসিয়া বিরলে
বাহির নয়ন নীর, দেখাইব তারে
আমার দুখের বারি বহে তীব্রতর।
হে কৃষ্ণ তুমিও বুঝি-” বলিতে বলিতে
বৃকোদর সহ কৃষ্ণ পার্থ, সহদেব,
নকুল সুধীর আসি, প্রণমিল সবে
ধৰ্ম্ম পদে, যুধিষ্ঠির আশীষিকা সবে।
পাঞ্চালী সখির সনে গেলা কক্ষান্তরে।
কহিলেন ধৰ্ম্মরাজ অ্যুতে সম্বােধি
-

চতুর্দশ সর্গ।
ভীম পরাক্রম-ভীষ্মে দেখিলে মাধব ?
সর্দিত করিলা ভীষ্ম আমার সেনানী,
দন্তী যথা অবহেলে দলে নল বন ;
হুতাশন রােমে যবে ভ্রমেণ গাঙ্গেয়
চারি ভিতে, হয় দগ্ধ সৈন্যকুল মম
সে অনলে, (তরুকুল যথ। দাবানলে !)
ধাবমান, বিষপূর্ণ, ভীষণ তক্ষকে,
হেরিয়া, যেমতি নর, পলায় চৌদিকে,
মহাতঙ্কে প্রাণ লয়ে, না চাহি পশ্চাত,
সমরে গাঙ্গেয়ে হেরি ধাইতে তেমতি
পলায় সেনানী মম ত্যজিয়া আহব।
নিরর্থক কেন কৃষ্ণা পায় এত ক্লেশ।
শূর ভ্রাতৃগণ মম কেন অকারণ
রশ্রান্ত নিত্য নিত্য বৃথা জয় আশে ?
সম্ভব দেবেন্দ্র ইন্দ্রে পরাজিতে রণে,
অসম্ভব ভীষ্মদেবে ভেটিতে সংগ্রামে।
হে কৃষ্ণ তুমিও বুঝি বাম মাের প্রতি ?
যাব আমি দূর বনে, পৰ্বত করে,
না পারি সখিতে আর এ সব যাতনা।”
এত কহি নিরবিলা প্রথম পাণ্ডস।
“হে ধৰ্ম্মনন্দন” কহিলা মাধব তবে-
“আপনার ভ্রাতৃগণ দুর্জয় সমরে,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
সমর্থ শাসিতে তারা দেবাসুরগণে,
মহেন্দ্র বিক্রম তুলা বিক্রম আমার,
সম্বন্ধে অাবদ্ধ আমি অর্জুনের সাথে,
আপনার শত্রু যারা মম সরি তারা;
প্রতিজ্ঞা করেছে, পার্থ উপপ্লব গ্রামে
বধিবে সে দেবব্রত সম্মুখ সমরে,
বিরত সংগ্রামে আমি এই সে কারণ,
এত দিন ভীষ্ম তাই জীবে ধরাধামে,
মাগি আজ্ঞা, কালি ভীষ্মে বধিব নিশ্চয়।”
কহিলেন ধীর কণ্ঠে রাজা যুধিষ্ঠির
“মাধব! পুরুষসিংহ তুমি মহাবাহু,
শােভে বটে হেন উক্তি তােমার মুখেতে,
এই চরাচর বিশ্ব একত্র হইলে,
পারে কি সহিতে কভু তব বল বেগ ?
কি চার গঙ্গার সুত, তোমার ইচ্ছায়
মুহূর্ত বিলুপ্ত হয় স্থাবর জঙ্গম,
কিন্তু কি কাজ সে কাজে ? কহেছিলে তুমি-
না পরিবে প্রহরণ কুরুক্ষেত্র রণে,
সকল হউক তব সে সতাবার।”
নিরবিলা ধৰ্ম্মরাজ এতেক কহিয়া।
তারক নিধন লাগি যথ। দেবগণ
পদ্মগােনি আলয়েতে বসি স্থিরভাবে

চতুর্দশ সর্গ ।
১৫৫
হইনি, ধ্যানমগ্ন, নিশ্চেষ্ট, নিরব,
তেমতি পাওবগণ, বসিয়া সকলে
ভীষ্মের বিনাশ তরে বিকল মানসে।
চিত্রিতগুলি যথা অনিমেষ আঁখি
চাহিয়া রয়েছে সবে কৃষ্ণের বয়ানে।
প্রশান্ত, গম্ভীর, ধীর হিমানী যেমন,
উপবিষ্ট স্থিরভাবে দেব নারায়ণ
তর্জনি চিবুকে স্থাপি চিন্তাকুল চিতে।
সমীরণ ভয়ে ভয়ে মৃদু সঞ্চালনে
ধীরে ধীরে হেলাইছে নিবিড় কুন্তল।
কতক্ষণে ধৰ্ম্মরাজ কহিল আবার
“চক্রপাণি, এক কথা হয়েছে স্মরণ,
বলেছেন পিতামহ আমার সকাশে,
সুমন্ত্রণা দান তিনি করিবেন মোরে,
সঙ্কটে পড়িব সবে আমরা যখন ;
যাইব কি এবে সবে তাহার নিকটে ?”
“উপযুক্ত যুক্তি বটে,” কহিলা মাধব
“চলুন সকলে যাই দেবব্রত পাশে,
তঁাহা. অনুজ্ঞাক্রমে যুঝিব আমরা।”
বাসুদেবে অগ্রে করি অশ্বে আরােহিয়া
আয়ুধ কবচ তাজি, পাণ্ডুপুরগণ,
(বাসব প্রমুখ যেন দেবতা নিকর, )

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
চলিতে লাগিল। সবে ভীষ্মের শিবিরে।
কিছু দুর গিয়া পরে সমর শ্মশান!
জোছন। আলােকে সবে বিস্ময়ে হেরিলা,
(যতদূর চলে দৃষ্টি নিশিথে নরের)
ছিঃ নরদেহ, মুণ্ড, মাতঙ্গ শরীর,
তাসহ অশ্বারােহী, রণরণিণি,
শায়ক, কাক, চক্র, অসি, গদা, তূণ,
স্ত, পাকারে চারিভিতে রয়েছে পড়িয়া ;
শোণিত কমে নামি শৃগাল, কুকুর
উল্লাসে ভক্ষিছে মাংস পূরিয়া উদর ।
শােভিছে
অদূরে
কিবা কৌরব কটক
কত চন্দ্রাতপ তাহে উত্তোলিত হয়ে
খেলিতেছে চন্দ্রাতপে সমীরণ সনে।
কৌরব শিবির পঞ্চ যোজন বিস্তার,
ভ্ৰমিছে হরী লক্ষ চারিভিতে তার,
করে ধনুঃ পৃষ্ঠে তুণ, কোটিদেশে অসি।
পূরব দুয়ারে জ্বলে দ্বীপ সারি সারি,
শত দৌবারিক সেথা, ভীমাকৃতি সবে,
উলঙ্গ কৃপাণ করে জাগে সাবধানে।
কতক্ষণে পূৰ্ব্বদ্বারে আসি উত্তরিল।
কৃষ্ণসহ পাণ্ডুগণ, আসিল ধাইয়া
অসি করে দ্বারী এক গর্জিয়া সরোষে

চতুর্দশ সর্গ । ১৫৭ == “শিবির দুয়ারে কেন এ হেন নিশিথে ভ্রম সবে? অশ্বারূঢ়, ভীষণ আকৃতি কে তােমরা? পরিচয় দাও ত্বরা করি, নহলে প্রেরি সবে শমন সদন।” “পাণ্ডব আমরা সবে” কহিল । অর্জুন- “নহি ছদ্মবেশী মােরা, না চাহি সংগ্রাম, নাহি অস্ত্র কার কাছে, নাহিক কবচ, মিত্রভাবে দেশব্রতে ভেটিব শিবিরে, ছাড় দ্বার দ্বারপাল বিলম্ব না সহে, বল দেখি, সেনাপতি-শিবির কোথায় ? হাসিয়া কহিল তবে ধূৰ্ত্ত দৌবারিক “কোটী কোটী কুরুচম্ বিরজে হেথায়, নিঙ্গোষিত অসি করে ফিরে রক্ষীদল, কেমনে পশিবে সবে ভীষ্মের শিবিরে ? “কৃপা করি হে হরি” কহিলা কেশব- “দেখাও কোথায় ভীষ্ম করেন বিশ্রাম । ৫ চিন্তি ক্ষণকাল পরে কহিল রক্ষক-- “আচ্ছ। এস সসে” কহি চলিল প্রহরী অগ্রে অগ্রে, পাছে কৃষ্ণ পাণ্ডব সংহতি, তুরঙ্গম ত্যজি সবে চলে পদব্রজে। চলিতে চলিতে পথে কহে দ্বারপাল- “ওই দেখ দপ্তীমালা বাধা বারি মাঝে । ১৪

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অসংখ্য ঘোটক হের শেভিছে তা দূরে ;
ওই যে দেখিছ দুরে অলিতেছে দীপ
দীর্ঘ চন্দ্রাতপ তলে, নিত্রাগত সেথা
পদাতিনিকর, এবে রণ শান্ত সবে ।
শােভিছে দক্ষিণে হের রথ অগণন,
পশ্চাতে তাহার, ওই শােভিছে শিবির
সারি সারি, নিদ্ৰাগত তাহে রথীগণ ;
মধ্যদেশে হের ওই উচ্চগৃহ-চুড়,
বিজয় পতাকা যার শােতে বিােদেশে,
বিরাম লভেন সেথা রাজা দুর্যোধন
আর আর ভ্রাতা সনে, চল দ্রুতগতি
পশ্চিম বিভাগে, যেথা ভীষ্ম সেনাপতি
অক্ষোহিনী সেনা সহ লভেন বিরাম।”
চলিল সকলে বেগে পশ্চিম মুখেতে।
বহুদূর গিয়া পরে অতি সাবধানে
গাঙ্গেয় শিবির দ্বারে উরিলা গবে।
অর্ধ নিদ্রাগত ভীম কোমল শয়নে,
হেনকালে দ্বারপাল বেশি শিশিরে,
দাড়াইয়া যুক্ত করে, ভীম পাদদেশে
প্রণমি কহিলা, ধীরে ভয়াকুলচিন্তে-
“ক্ষম দাসে, সেনাপতি, আমি দ্বারপাল।”
শুনিয়া প্যারির বাণি নয়নি লি

চতুর্দশ সৰ্ণ । কহিলেন দেবব্ৰহ- “কিরে দৌবারিক, কি বারতা আছে তব ? দিলাম অভয় কহ জরা” শীরে ধীরে কহিল রক্ষক- প্রহর অতীত প্রায়, পূরব দুয়ারে ছয় জন অশ্বারােহী, বীর অবয়ব, আসিয়া কহিল মােরে, ‘ছাড় দ্বার, দায়ি, পাণ্ডব আমরা সবে, আজি এ নিশীথে মিত্রভাবে দেবতে ভেটিতে শিবিরে আসিয়াছি ; দেখ, দেহে নাহিক কবচ, না চাছি সমর মােরা, নহি ছদ্মবেশী, বল দেখি সেনাপতি শিবির কোথায় ? কৌশলে সঙ্গেভে লয়ে বীর ছয় জনে আনিয়াছি, দ্বারদেশে উপনীত সবে, বাহ আজ্ঞা হয় প্রভাে’ কহুন কিরে।” ব্যস্তমতি কহিলেন কুরু সেনাপতি ‘বাও ত্বরা, দৌবারিক, মিষ্ট সম্ভাষণে আন যত্নে বীরগণে অামার সদনে। উরি গাঙ্গেয় পাশে বীর ছয় জুন, প্রণমিল ভক্তিতরে দেবব্রত পদে। আলিলিয়া একে একে সমাদরে সবে পিতামহ দেবব্রত কহিতে লাগিল। স্বাগত, হে কৃষ্ণ, এস বাছা ধৰ্ম্মরাজ,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বৃকোদর, ধনঞ্জয়, অমিরে নকুল,
সহদেব এস ভাই নিকটে আমার ;
আহা মরি । বাছাগণ, কতই যাতনা
সহিছ তােমরা সবে, নিয়তি বিধানে।
জুড়াইল আঁখি মম, কেশব সংহি
হেরিয়া তােদেরে সবে ; কি হেতু নিশীথে
বৃদ্ধের শিবির মাঝে আজিকে সকলে?
কহিলেন ধর্মরাজ করি যুক্তকর
“পিতামহ, কৃপা করি বলুন আমারে,
কেমনে লভিৰ জয় এ দুরন্ত রণে?
ক্ষয়প্রাপ্ত দিনে দিনে সেনা বল মঙ্গ,
তরঙ্গ আঘাতে যথা অর্ণবের কুল ;
দিবাকর তেজে যবে, হে শক্রতাপন,
পশেন আপনি রণে ধনুর্বাণ করে,
কি সাধ্য দেবেন্দ্র ইন্দ্র সহ দেবগণ
সহিতে সক্ষম হন সেই তেজোরাশি।
পাণ্ডৰ মশকবৃদে কি কাজ নাশিয়া ?
কহুন উপায় তাত, কেমনে সময়ে
পরাজিয়া দেবতে লভিব বিজয়।
শুনিয়া পৰ্ম্মের বাণী ভীষ্ম মহারথ
চিলি। নিবিষ্টচিত্তে ক্ষণেকের তরে ।
এই মতে যদি আমি করি মহারণ,

চতুর্দশ সর্গ।
পাণ্ডবের রাজ্য আশা ঘুচিবে নিশ্চয় ;
ধর্ম মতে অন্ধ রাজ্যে ধৰ্ম্ম অধিকারী,
দুর্যোধন সেই রাজ্য আত্মসাৎ তরে
বহু কষ্ট দিয়াছেন পাণ্ডব অন্তরে,
নাশিতে পাণ্ডবগণে যথাসাধ্য তিনি
করিছেন বহু যত্ন,বিফল সকল।
উপযুক্ত সুসময় উপস্থিত এবে,
অযােগ্য রাজার নামে পাপী দুর্যোধন,
সমরে তাহারে নাশি, পাণ্ডব নিকর
ভুক ধরী, ধৰ্ম্ম হ’ক সংস্থাপিত।
অর্থ দাস, অন্ন দাস, এই ঋণ তরে,
ন্যায় মত দশ দিন তঁাহার লাগিয়া,
যুঝিস সমরে আমি করিয়াছি পণ ;
কালি হবে দশ দিন, শেষ দিন মম,
সমরে জীবন ত্যজি-পা বের লাগি
ায় মৃত ধৰ্ম্ম কাৰ্য্য করিব প্রভাতে।”
এই মতে চিন্তি পরে কলি। গাঙ্গেয়---
‘যা কহিলে সত্য তুমি, বাছা ধৰ্ম্মরাজ,
যত দিন কুরুপক্ষে করিব-সমর,
বৃথা আশ পাণ্ডবের রাজ্যসুখ ভোগে ;
প্রতিজ্ঞ। আমার যাহা হয়েছে সফল,
দশ দিন হবে কালি পূর্ণ দিন মম,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন। আমার নিধন বিধি কহি শুন তবে- বিমুক্ত কবচ, ভীত, শত্যাগী নর, পুত্রহীন, এক পুত্র, স্ত্রীজাতি পতিত, রমণী নামেতে খ্যাত, পাপী, পলাতক, হাবিব অস্ত্র কভু তাদেরে বধিতে, হােমার সৈন্যের মাঝে, শিখণ্ডী যে জন জমে রমণী সেই, এখন পুরুষ, মহারথ হইলেও, না বধিব তারে, না তাজিব অস্ত্র কভু তাহার উপরে, শিখণ্ডীরে অগ্রে করি বীর ধনঞ্জয়- বধিবে আমারে রণে, কহিনু সঙ্কেত।” বন্দি পিতামহ পদ, পৃথা পুত্রগণ, কেশব সহিত সবে চলিল শিবিরে। বহুদূর গিয়া পরে অচুতে সম্বােধি সলজ্জ, সন্তপ্তহৃদে কহিল অর্জুন- “সমুচিত নহে মম, এ হেন নিয়মে যুঝিতে সমর ক্ষেত্রে, পিতামই সনে, ধুলি ধূসরিত গাত্রে কৌমারে যখন ক্রীড়া ত্যজি ভীষ্ম অঙ্কে উঠিতাম আমি, কতই আদর হয়করিতেন তিনি। ডাকিতাম আমি যবে পিতা বলি তারে,

চতুর্দশ সর্গ ।
১৬৩
কহিতেন তিনি নহি পিতা আমি তাের,
অৰ্জ্জুন, পিতার পিতা আমিরে তােমার,
সেই পিতামহে আমি বধিব আহবে?
না, মাধব, ভেটিব না সমরে তাহারে।”
বীর চুড়ামণি, ওহে ক্ষত্রিয়তপন,
কহিলা কমলাপতি কললােচন,
“ভুলিলে কেমনে বল প্রতিজ্ঞা তােমার ?
কুরুকুল রত্ন! তব এই কি উচিত?
ভুলিলে কি পাঞ্চালীর দুঃখের কাহিনী ?
জন্ম তব কোন কুলে কে তুমি, ভুলিলে ?
ভুলিলে কেমনে হায় ! ভাতা ধৰ্ম্মরা !
প্রতিজ্ঞা পালিতে আজ বিরত গাণ্ডিবী !
বিতৎসু! জীবন ভয়ে ভীত নাকি তুমি?
পিতাম সনে যুদ্ধে এ হেন নিয়মে
জ্বাভাস যদি চিতে, ওহে বীরবর,
তা হলে অতল জলে ডুবায়ে সবারে,
যাও চলি যেথা ইচ্ছা ; ভবিতব্যলিপি
কেমনে খণ্ডিবে তুমি? নে মৃত্যুবিধি
লিখিল। ভীষ্মের ভালে, হেতু মাত্র তুমি;
প্রকৃত শিখণ্ডী, ভীষ্ম বধের কারণ
গুরুবধ পাপ নাহি স্পর্শিৰে তােমারে।”

১৬৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
অনিচ্ছায় পার্থ রণে দিলেন সম্মতি ;
ছুটিল শিবির মুখে তুরঙ্গম সবে।
ত্রিযামা অতীত প্রায়, বহে স্নিগ্ধ বায়,
নবমী চন্দ্রমা অন্তে গিয়াছেন চলি,
কুমুদিনী হেটমুখ সরোবর কোলে,
খি কোলে মাথা রাখি সিরহিনী যেন
কঁদিছে নাথের লাগি তাপি মনস্তাপে।
সরসে সরসীরুহ নাচিছে পুলকে,
প্রাণে আশা উষা কোলে হেরিবে তপনে।
শৰ্বরী ভূষণ তারা,
হীন ভ
সবে,
উষার রূপের তেজে, হীনপ্ৰভ যথা-
কণ প্রভা-প্রভা কাছে ক্ষীণ দীপালোক।
এ হেন সময়ে রাজা মানি দুর্যোধন
শয্যা ত্যজি বাহিরিলা শিবির হইতে,
কহিতে হরিগণে সৈন্ত জাগাইতে।
সংসা। বিমানপথে নিরখি নৃপতি-
দেখিল নক্ষত্ররাজি পড়িছে খসিয়া,
ঝর ঝরে, রক্তস্রোত করিছে মন
ঝলকে ঝলকে, এ দণ্ডী দীর্ঘকায়,
শুইয়া আকাশ কোলে, নিকটে তাহার,
বসি এক গাজরাজ তরুণলোচন,
বাহিরিছে বত্নিরাশি সে আঁখি হইতে,

চতুর্দশ সর্গ।
১৬৫
পুড়িয়া মরিছে তাহে কত লক্ষ প্রাণী।
উঠিল প্রবল ঝড় সেই উৰ্দ্ধদেশে,
কোথায় ভাসিয়া গেল সে চিত্র মাধুরী!
চমকি হেরিলা নৃপ বা মূর্তি এক,
পরিধানে শুভ্র বস্তু, চারু অবয়ব,
বিভূষ ভূষিত অঙ্গ, দিব্য ছটা তাহে,
কৃষ্ণবর্ণ কেশগুচ্ছ চুমিছে চরণ।
দেখিয়া সে দিব্যমূর্তি, কৃতাঞ্জলিপুটে
কহিল নৃপতি কে তুমি, রমণিরত্ন ?
স্বর্গীয় রূপের ছটা খেলিছে শরীরে।
শুভ্র বস্ত্র পরিধান, স্বর্ণবর্ণ কায়া,
সুদিব্য ভূষণে শোভে চারু অবয়ব,
চরণে নূপুর শােভে, কোটিতে মেখলা,
পারিজাত পুষ্পমালা লম্বিত গলেতে,
মণ্ডকে মুকুট কিবা খচিত রতনে,
ঢলিয়া পড়েছে কেশ চরণের মূলে,
পদ্ধহস্ত, তাহে যেন অলক্ত লেপন,
স্থলপদ্ম সম কিবা চরণ যুগল,
ভাসিয়া যেতেছে শূন্যে অব্যক্তগতিতে।
কে তুমি? বল মা, মােরে, কি জানি কেন যে
তােমারে হেরিয়া আমি কাতর অন্তর ।”
পশ্চাৎ ফিরিয়া হাসি, রাজনে সম্ভাষি,

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কহিলা চঞ্চলা সতী অধুনয়না-
“কুরুলক্ষ্মী আমি, নৃপ ছাড়িনু তােমারে,
মহা পাপ-পঙ্কে মগ্ন তুমি মলমতি,
দেবদ্বেষ, হিংসা গৰ্ব্বে, পূর্ণ তব দেহ;
বিরাজে কমলা কভু তােমার অগারে ?
কলির শরীরে ধৰ্ম্ম বিরাজেন কভু ?
পঙ্কিল সলিলে কভু ফোটে কি কমল?
কনক আসন ত্যজ দেবেন্দ্রানী শচী-
ইচ্ছায় পশেন কভু দানব আলয়ে ?
আশ্রয় করিব তারে ধৰ্ম্মে রত যেই।
চেয়ে দেখ, ওই হে, ভয়ঙ্কর রাহু
গ্রাসিতে কৌরব রবি আসিছে ছুটিয়া।”
এত কহি লুকাইলা নারায়ণ লিয়া।
দেশিলা নৃপতি চাহি আকাশ পটেতে
ভীষণ মূরতি রাহু বদন ব্যাদানি-
ধাইছে গ্রাসিতে এক বণীণ তপনে,
রাহু ভয়ে ভীত ভানু আসিয়া আপনি,
প্রসেশিল ধীরে ধীরে সে মুখ গহ্বরে।
লুকাইল শূন্যপটে সে মায়া দর্শন।
ক্ষণ তরে স্থিরতাকে দাড়ায়ে নৃপতি
দমিয়া ক্লাসের বেগ দম্ভের আশ্রয়ে
কহিলা গম্ভীর স্বরে বাহু আস্ফালিয়া-

চতুর্দশ সর্গ।
উঠ উঠ রথীকুল, সাজহ সমরে,
মাতাও সৈনিক খিয়া উৎসাহ বচনে ;
ত্বরিতে বিমানশালা যােগা, সারর্থী,
বাজাও, বাদিত্রদল, পটহ, দামামা
ক্ষত্রিয়কুলেতে জন্ম ব্যবসা সমর,
রণ রঙ্গে সুখী মােরা খ্যাত চরাচরে,
উপারিব বাহুবলে অটল ভূধর,
গ্রহগণে বিদ্ধ করি সামক ফলকে
পারিব ধরণি পৃষ্ঠে দেখিবে দেবতা,
আমি রাজা দুৰ্যোধন, ভীষ্ম সেনাপতি,
দেবেন্দ্র বাসবে শারি পরাজিতে রণে।”
চাহিয়া আকাশপানে কহিলা আবার
“দেবকুল, মায়াদৃশ্যে মুগ্ধ নহি আমি,
চন্দ্র বংশ গকুলে জনম আমার,
ডরিব সমর আমি? রণের পিপাসা,
মিটাব সমরক্ষেত্রে, জীব-রক্তস্রোতে;
অসম্ভব রণরঙ্গে হইবে বিরত
ক্ষত্রবীর দুর্যোধন, যতক্ষণ দেহে
এক বিন্দু রক্ত মাত্র বহিবে ধমনি,
দেখিবে ত্রিদীবাসী, দেখিবে ধরণী,
‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী'।”
কেশরী নিনাদ শুনি আতঙ্কে যেমতি

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
নিশীথে জাগ্রত হয় বনচরগণ,
তেমতি সৈনিককুল, দুর্যোধন স্বরে
চকিতে জাগ্রত হয়ে উঠিল সকলে।
বাজিল দামামা, ভেরী, বৃংহিল বারণ ;
নিত্যকর্ম সমাধিয়া, বীরবৃন্দ সবে,
সমর সাজেতে ত্বরা লাগিল সাজিতে।
উঠিল আদিত্য-রথ পূরব গগনে ;
চলিল কৌরব যােধ-ক্রীড়াভূমি মুখে।
হেথায়-পাণ্ডবগণ উল্লাসে মাতিয়া
জয় নাদে বায়ু ব্যোম কম্পিত করিয়া
সমর প্রাঙ্গন মুখে ধাইল সকলে।
৫
সর্বশত্রু নিবহণ বুহ নিরমিয়া
কহিলেন যুধিষ্ঠির শিখণ্ডীর প্রতি
দ্রুপদদন, আজি সেনাপতি পদে
বরিনু তােমারে আমি, তােমার প্রসাদে,
বনসী, রাজভ, দীন পৰ্ম্মরাজ,
লভিবে বিজয় আজি, তে বীর পুঙ্গ,
ভীষ্মের নিধন ভার, তােমার উপরে
নির্ভর করিছে মধু, বিনাশি তাহারে
রাখহে অতুল যশঃ এ মহা আহবে ;
পাণ্ডবাহিণী অগ্রে তুলিয়া নিশান,

চতুর্দশ সর্গ।
১৬৯
শঙ্খ, ভেরী, মৃদঙ্গের নির্ঘোষে মাতিয়া
চল রণে, বীরবর, তোমার পৃষ্ঠেতে-
বৃকোদর ধনঞ্জয় রহিবে সতত।”
নিষঙ্গ দুলায়ে পৃষ্ঠে, কোটীদেশে অসি,
গুণবদ্ধ শরাসন ধরি বাম করে,
ধাইল শিখণ্ডীশূর ভীষ্মের সম্মুখে।
দ্রুপদ-নন্দনে হেরি, শান্তনুনন্দন
ফিরাইল রথবেগ অমঙ্গল ভাবি।
শিখণ্ডী কোদণ্ডমুক্ত, তীক্ষ্ণ শররাশি,
অকুষ্টিত চিতে ভীষ্ম লাগিল সহিতে।
“দেহ রণ দেশব্রত” কহিল শিখণ্ডী,
“ক্ষত্রিয়কুলেতে জন্ম মহারথ তুমি,
উচিত কি তব, হায়! ত্যজিতে সমর?
রণের পিপাসা মম মিটাও ধীমান।”
‘ইচ্ছাক্রমে হান অস্ত্র, হে বীরবর,”
হাসিয়া কহিলা ভীষ্ম- “তুমি শিখণ্ডিনী,
তােমারে সময়ে কভু না ভেটিব আসি,
আমার প্রতিজ্ঞা অাছে খ্যাত মহীতলে,
অমঙ্গলধ্বজ যার হেরিব মরে
হানিব প্রহরণ, তাহার উপর।
হিলেন সব্যসাচী দ্রুপদ-নন্দনে-

কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
“মহাবাহো হে শিখণ্ডী! এই ত সমূয়
নাশ ভীমে, বীরবর, বিলম্বে কি ফল ?.
রবি তােমারে আমি; রােখিব আহকে,
দ্রোণ, কৃপ, অশ্বত্থামা আর রথীগণে,
‘বেলাভূমি নিবারয়ে মহার্ণবে যথা।”
অর্জুন বচন শুনি, দ্রুপদ-তনয়
অভিদ্রুত হইলেন ভীষ্মের উপরে।
ভীমবল দেবব্রত, নিশিত শায়কে
মন্দিত করিয়া বহু পাণ্ডব-সেনানী,
ভ্রমিতে লাগিলা রণে হুতাশন তেজে।
দুঃশাসন, দুর্যোধন জয়দ্রথ আদি
থাকিয়া ভীমের পাছে করিছে সমর,
কম্পিত করিয়া যত পাপ-সেনানী।
এত দেখি ধনঞ্জয়, মহাধনুর্ধর,
ব্রাসিয় বিপক্ষগণে লাগিল যুঝিতে ;
ঘন সিংহনাদ ছাড়ি, শায়ক বিক্ষেপে
পীড়িত করিল পার্থ কুরুবীরগণে।
দুর্যোধন কফিনে গাঙ্গেয় সকাশে
“পিতামহ; ওই হের বীর ধনঞ্জয়ে,
উহার তেজেতে দগ্ধ সৈন্যকুল মম,
দগ্ধ যথা মহাবন ঘাের দাবানলে !
মৃগকুল পণ্ডনাথে হেরিলে যেমতি,

-
চতুর্দশ সর্গ।
১৭
মহাতঙ্কে ধায় বেগে ত্যজিয়া কানন,
পার্থে হেরি,- সৈন্য মম পলায় তেমতি,
ত্যজিয়। সমর স্থল, না চাহি পশ্চাত।
ওই হের, বৃকোদর, সাত্যকি, নকুল,
বিদ্রাবিত করে মম বিপুল সেনানী ;
অভিমন্য্য, সহদেব, ঘটোৎকচ আদি,
ঘুরিতেছে চক্রাকারে মর্দিয়া কৌরবে,
নিবারণ কর প্রভু, ওই বীরগণে।”
কহিলেন গঙ্গাসুত সম্বােধি রাজনে-
“ভয় নাই, নৃপবর, করিনু শপথ
পাণ্ডবেরে বিনাশিয়া আজি মহারণে,
অথবা, শয়ন করি কুরুক্ষেত্ৰ-ভূমে,
ভর্তৃদত্ত অন্ন-ঋণে বিমুক্ত হইব।
প্রখর সূর্যের কর, যেমন চৌদিকে
সন্তাপিত করে জীবে প্রলয়ের কালে,
রােষারক্ত ভীষ্মতেঙ্গ সমরে তেমতি-
সন্তাপিত করে যত পাণ্ডব নিকরে।
দুই লক্ষ পদাতিক, অযুত আরােহী,
সমরে বীরেন্দ্র ভীষ্ম করিলা নিধন।
মহারথ ধনুর্দ্ধর সৃঞ্জয় পাণ্ডব,
ভীষ্মবধ হেতু সবে আসিল সেথায়।
মেঘকুলে সনাবৃত সুমেরু যেমন

১৭২:
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
শােভিলেন দেবব্রত বোধগণ মাঝে।
ধাইল কৌরবদল ভীষ্মে রক্ষা হেতু,
বাধিল তুমুল যুদ্ধ
ভীষণ দর্শন।
মৃত হস্তী, অশ্ব, নর, রথী কত শত
চুমিল ধরণী-পৃষ্ঠ, রুধিরের ধার -
তিতিরা মেদিনীতল লাগিল বহিতে।
ধনঞ্জয় দুঃশাসনে করি পরাজয়
দেবব্রতে শরজালে আচ্ছাদিল ত্বরা,
ভীষ্মবল ভীষ্মরথী শায়কে শায়কে
নিবারিতে লাগিলেন বিজয়ের শর।
শিখণ্ডী সুতী বাণে, পলকে পলকে,
গাঢ়বিদ্ধ করিলেন বৃদ্ধ দেবব্রতে।
জয়দ্ৰথ, ভুরিশ্ৰবা, শল, শল্য, দ্রোণ,
কৃতবর্মা, ভদন্ত আদি ধীরগণ,
ভীয়ে প্ৰাপীড়িত হেরি- লাগিল সকলে
রােধিতে অর্জুনে রণে ; কিরীটি তখন
দিব্য অস্ত্রে সনাচ্ছা করি সবাকারে
ক্ষ বাণে ছেদিলেন ভীমের ধনুক।
পলকে ধনুক পুনঃ লইলা গাঙ্গেয়,
ছেদিল। বিজয় তাহা নিমেষ ভিতরে ;
অশরাসন পুনঃ ধরিলা বীরেশ, ...
পলকে গাণ্ডিবী তাহা করিলা ছেদন
ভয়াবহ মহাশক্তি ছাড়িলা গায়ে,

চতুর্দশ সর্গ।
১৭৩
কাটিলা সে ভী-শেল পার্থ মহারথ।
দেবব্রত চিন্তিলেন বিফল মানসে,
ধনুর্দ্ধর ধনঞ্জয়, কেশ সারথি,
অবধ্য পাণ্ডব তাহে শিখণ্ডী সম্মুখে !
সমরের সাধ মম ঘুচাই এবার,
ইচ্ছামৃত্যু বর মােরে দিয়াছেন পিতা,
ত্যজিব জীবন আমি, আজি রণভূমে।
।
আনন্দ দুন্দুভিধ্বনি, কিন্নরীৰ্ত্তন,
ঘন ঘন জয়রব হইল ত্রিদীবে ;
ভীষ্মেপরে পুষ্পবৃষ্টি হইল সহসা।
শুনিলেন দেবব্রত শূন্যে দৈববাণী-
‘আতবে নিবৃত্ত হও, ওহে বীরবর,
আকাশস্থ ঋষিকুল দেবগণ সবে
প্রীত আজি, অভিলাষ তােমার ধীমান্,
দেবগণ অভি৫োত। শুনি দৈববাণী-
অসিচৰ্ম্ম হস্তে ধরি ক্রোধাকুল চিত্তে
উত্তরিতে লাগিলেন ভস্ম রথ হতে
হেনকালে শিখণ্ডীরে
সম্মুখে
করিয়া
কাটি সেই অসিচৰ্ম্ম পার্থ মহাথ
শামুনন্দনে বাণে লাগিল বিধিতে ।
দুঃশাসনে সম্বােধিয়া কহিলা গাঙ্গে-
অর্জুনের বাণে বিদ্ধ, কলেবর মম

১৭৪
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কাঁপে, হের, থরথর, পার্থ শূরবরে,
বজ্ৰপাণি আখণ্ডল নারে পরাজিতে ;
এই দেখ, দুঃশাসন, এই তক্ষশর,
অশনি সমান যাহা আঘাতিল মাের
বটে ইহা অর্জুনের, নহে শিখণ্ডীর ;
কবচ ভেদিয়া মম, অন্তস্থলে পশি,
এই যে সুতীক্ষ্ণ শর দহিল আমারে,
গাণ্ডিবীর শর ইহা নহে শিখণ্ডীর ;
লেলিহান বিষধর যথা ভয়ঙ্কর,
ওই যে কলম্বকুল আসিছে ছুটিয়া
কিরীটির বটে উহা নহে শিখণ্ডীর ;
দুঃশাসন, ধর মোরে, সহিতে না পারি।”
অপরাহ্ েভীষ্মদেহ পূৰ্ব্ব শির করি
পড়িল ধরণী-পৃষ্ঠে বিমান ত্যজিয়া।
হাহাকার চতুর্দিকে উঠিল সহসা ।
ধ্যানস্থ ধূর্জটি বস কৈলাস শিখরে
অকস্মাৎ জটাজাল উঠিল কাপিয়া,
ঘাের ভূকম্পনে যথা লড়ে বসুন্ধরা,
গৱগিল শিরে গঙ্গা নাদে ভয়ঙ্কর।
কহিলেন, মহাদেব মধুর বচনে-
কেনলো জাহ্নবী। এত বিকল হইলি ?
জটারাশি. আজি মাের উপারিবে বুঝি ?

চতুর্দশ সর্গ।
১৭৫
কোন্ জন আজি তোমা করিল স্মরণ ?
শান্ত হও, সুবদনি! ক্লান্ত অতি অমি।”
‘ধূর্জটি ! জাননা?” কহিলা জাহ্নবী রােষে,
“জান না কিসের লাগি বিচলিত। আমি ?
তৃপ্ত নই, হে মহেশ, এখন কি তুমি ?
দিয়াছ বহুল ক্লেশ, সয়েছি নিরবে
কিন্তু হায়! আজি এই দারুণ বেদনা,
দহিল অন্তর মম চিতানলে যেন!
এই কি উচিত তব, ওহে আশুতোষ ?
পূজিত শঙ্কর তুমি এই সে কারণ !
যা ছিল সম্বল মম ঘুচালে অকালে !
অহো ! কি যাতনা ! হায় কোথায় জুড়াই!
কে ডাকিবে, মা, মা, বলে আর বিশ্বমাঝে
।
ভীস্মতা নাম মম ডুবিল এবার ;
তব ধরে পুষ্ট দেহ দুষ্ট। কাশী সুতা-
শিখণ্ডীরূপেতে পশি, কুরুক্ষেত্র রণে,
রােধিল তনয়ে মাের, পাষণ্ড কার্জুন
নাশিল বাছারে আজি কপট সংগ্রামে।
ছাড় মােরে আশুতোষ, কর দয়া আজি,
দেখিব কেমন সেই পুত্রহস্তা মম
প্রাণ লয়ে ফিরে ঘরে কাহার আশ্রয়ে।
“কি কর, কি কর, গঙ্গা!” কহিল শঙ্কর
।

১৭৬"
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
বিধির বিধান বল কে পারে খণ্ডিতে?
ধৈৰ্য্য বর, শৈলসুতা, ধর মাের বাণি; .
অষ্টবসু মধে। এক বনু গুণ তব,
এত দিন ছিল মর্তে শাপভ্রষ্ট হয়ে,
উদ্ধার হইল তার, জান ত সকলি,
পশিবে স্বরগে ধীর তাজিয়া অরনী
যাহাতে বাঞ্ছিত গতি, লভে দেবব্রত,
তাহার বিধান প্রিয়ে, করহ এখন ;
অন্যায় সমরে পার্গ নাশিল গাঙ্গেয়ে,
অবশ্য অন্তর তার দহিবে অচীরে
পুশশাকে ; অশ্বত্থামা বধিবে দ্রুপদে ; *
না দিব যাইতে তােম। কুরুক্ষেত্ৰ-ভূমে।”
“অবশ্য অন্তর তার দহিবে অচীরে
পুত্রশােকে;” শিব-বাক্য ছুটিল চৌদিকে।
উত্তরার বামের নয়ন নচিল,
সুভদ্রার করতল স্পশিল ললাট,
অর্জুনের হৃদিতল উঠিল কঁপিয়া।
শিবের বচনে সতী যত্নে ধৈর্য্য ধরি
পাঠাইলা ঋষিগণে পুত্রের মদনে
হংসরূপে, কহিবারে মরণ বিধান
বসুগণ গঙ্গাদেশে গিয়া মৰ্ত্ত ভূমে
ভীষ্মদেবে কহিলেন-“এ বীর শয়নে
দ্রুপদ-এখানে পদ বংশ।

চতুর্দশ সর্গ
।
খাক, হে যশস্বী, তুমি যত দিন নাহি
দক্ষিণ অয়নে যান দেব অংশুমালি,
মাতৃ আজ্ঞা, বীরবর, পালহ যতনে,
ইচ্ছামৃত্যু, জান তুমি, আয়ত্ত তােমার।”
অন্তর্হিত হইলেন ঋযি কয় জন
পূরিল সে রণক্ষেত্র স্বর্গীয় সৌরভে।
মাতৃ বাক্য শিরে ধরি ভীষ্ম বীরবর
রহিলেন স্থির চিত্তে শরশযয্যাপরে ।
দূর হতে দুর্যোধন, পিতামহে হেরি
থচুত, তপদে আসিয়া নিকটে
আক্ষেপিলা দুঃখভরে- “অন্তিম শয়নে
কেন, হে বীর কেশরি ? কেন অকস্মাৎ,
বজ্রাঘাত বিনা মেঘে ! মধ্যাহ্নে তপন
গেল চলি অস্তাচলে? অসম্ভব হায়,
এ শয়ন, বীরবর, তােমার এখন,
রণজয় এখনও নহেক, ধীমান্,
এখনও পাণ্ডবেরা সমরে অটল ;
কৌরব কুলের গর্ব, উজ্জ্বল রতন,
তুমি ক্ষত্ৰকুলে বীর, ক্ষত্ৰ-চূড়ামণি ।
মুদিলে নয়ন তুমি মজিবে কৌরব,
কে রাখিবে মান গৰ্ব এ হেন সঙ্কটে
কৌরব গৌরব রবি গেলে অস্তাচলে

১৭৮
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কলঙ্কী রঙ্গনী আসি গ্রাসিবে এখনি,...
মরিব সবংশে মোরা, কে রক্ষিবে বল ?
কেমনে ভুলিলে মােরে? কহ, পিতামহ,
তুমি যে ভরসা মম, ডুবালে কেমনে
আশ্রয় তরণী এই সমর সাগরে ?
দেখ চেয়ে, দুঃশাসনে আর ভাতা পানে,
মলিন সকলে এবে তােমার বিহনে,
মলিন যেমতি নিশি সুধাকর বিনা
থবাহু, বলহীন, বিরস বদন,
আহা মরি ! দেখ চেয়ে, কুরুবীরগণে;
দাহে না কি হিয়া তব হেরিয়া এ সব ?
উঠ, উঠ, পিতামহ, ধর ধনুৰ্ব্বাণ,
পাঠাও পাণ্ডবগণে শমন ভবন।
কার সাধ্য রােধে তােমা সমর প্রাঙ্গণে ?
প্রাক্তনের গতি, হায়, কে রােপেছে কবে ?
এ কি, এ কি, নৃপবর! কেন তব মুখে
হেন ভাষ? কোথা দন্ত তোমার এখন?
এ খেদ, হে নরবর ! কোথায় শিখিলে?
পড়িয়াছে দেবব্রত কি ক্ষতি তােমার ?
আর না সাপবে কেহ মােরে, রাজন,
সন্ধি হেতু; ডাক কর্ণে, চির-সখা তব,
এপনি আসিবে বীর নাচিয়া উল্লাসে ;

চতুর্দশ সর্গ।
১৭৯
বেশিবে মহেশ্বাস কালি রণাঙ্গণে,
বীরদর্পে হুহুঙ্কারি ধরি শরাসন
অব্যর্থ পার্থের শর করি ব্যর্থ রণে
বৃকোদর সহ তারে মুহূর্তে নাশিবে ;
বন্দি করি যুধিষ্ঠিরে, তোমার সনে
লবে বীর, চিরকাক্ষা মিটিবে তােমার।
-
কহিলেন দেবব্রত চাহি দুর্যোধনে-
“হের, বৎস, লুটে শিরঃ উপাধান বিনা।
সসব্যস্তে কুরুরাজ পিতামহ লাগি
সুকোমল উপাধান সহস্তে আনিলা ।
হাসিয়া কহিলা ভীষ্ম-“তুমি নরেশ্বর,
যতনে পালিত দেহ কোমল তোমার,
হেন উপাধান বটে উপযুক্ত তব !
শয্যা মম তীক্ষ্ণ শর, আমি ক্ষত্ৰ বীর,
সুকোনল উপাদানে কিবা প্রয়ােজন ?
না বুঝ সময় ? ছিছি ! ধিক্ বুদ্ধি তব!”
পদপ্রান্তে নত শিরে, পাণ্ডবনিকর,
চিত্রিত পুলি যথা দাড়ায়ে সকলে,
নিশ্চল নিস্তব্ধ ভাব ; ঝড়িছে নয়ন,
দরবিগলিত অশ্রুসিক্ত বক্ষস্থল ;
ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস বহিছে নাশায়,
গভীর বিষাদক্লিষ্ট শুষ্ক ওষ্ঠপুট

১৮০
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কঁপিছে সঘনে, স্বেদ বহিছে ললাটে ;
তীব্ৰ মনস্তাপ তাপে মলিন বয়ান,
ফুলকুল ম্লান যথা নিদাঘ উত্তাপে।
ধনঞ্জয়ে সম্বোধিয়া কহিলা গাঙ্গেয়-
*হের বৎস, লুটে শির উপাধনি বিনা।”
পিতামহ আজ্ঞা লভি পার্থ মহাবল,
ধীরে নেয়াইলা ধনুঃ; আরােপি শিঞ্জিনী
টঙ্কারিলা মহেশ্বাস ভীষণ কাৰ্ম্মক।
সুতীক্ষ্ণ শায়ক তিন লইয়া বীরেশ
নিক্ষেপিল লক্ষ্য করি ভীমের মস্তকে।
দুই বাণ কর্ণমূল, তৃতীয় ললাটে,
ভেদিয়া প্রোথিত হ'ল ভূপর অঙ্গেতে।
গঙ্গত পার্থ যত্নে লভি শিরােধান,
হর্ষচিতে দুর্যোধনে কলি আবার
নরেশ, 'ঘুচাও তৃষা, তৃষাতুর অামি।”
সুবাসিত বারিপূর্ণ সুবর্ণ ভৃঙ্গার,
গাঙ্গের সমীপে ত্বরা আনিলা নৃপতি।
কহিলা গাঙ্গেয় হাসি-কাঞ্চন ধরে,
সুবাসিত হেন বারি না চাহি এখন।”
নিরখি অৰ্জ্জুনে পুনঃ কহিলা গাঙ্গেয়-
“অৰ্জন, মিটাও তৃষা, তৃষাতুর আমি।”
ােয়ে গাখীৰ পা, যুড়ি তীবাণ
।

চতুর্দশ
গর্গ।
বিক্রমে ভূধর অজে করিলা নিক্ষেপ।
গাণ্ডীব নিম্মুক্ত বাণ বিদারি মেদিনী
ভোগবতী গঙ্গাজলে করিল প্রবেশ।
শায়কচিহ্নিত পথে ভােগবতী পয়ঃ
বেগে উৰ্দ্ধগত হয়ে ক্ষিপ্ত শূন্যদেশে ;
পড়িল সে পুতবারি গঙ্গামুত মুখে।
স্তম্ভিত দর্শকবৃন্দ, স্তম্ভিত নৃপতি,
পার্গের বিক্রমে মুগ্ধ দেব ঋষিগণ,
জানলে শান্তনুনুত করি বারি পান
দুৰ্যোধনে সম্ভাষিয়া কহিলা তখন
“দেখিলে হে কুরুরাজ ! বিজয় বিক্রম?
তোমাতে অর্জুনে হের কত যে প্রভেদ,
তুমি কাচ, পার্থ মণি ; কিম্বা ধনঞ্জয়
স্বরগের পারিজাত, তুমি যে কিংশুক,
শামরীচিকা ভ্রান্ত তুমি রে অবােধ,
তা না হলে কভু, হায় ! হেরিয়া এ সব
অজ্ঞান-তিমির তর না পায় যিলয় !
দেখ চেয়ে-ধৰ্ম্মরাজ, ধর্মের আকর,
বীরশ্রেষ্ঠ বৃকোদর, অজেকিরীটী,
সহদেব সনে স্থির নকুল সুমতি;
নে ভ্রাতৃগণে কেন কর অবহেলা?
অথবা, রাখাল করে শালগ্রাম শিলা,

১৮২
কুরুক্ষেত্রে দশ দিন।
কাপালের হাতে মণি, সামান্য স্তর।
দুষ্টজনে উপদেশ বৃথা বাক্যব্যয় !
মরুভূমে বীজ নাহি ধরে কলেবর ।
তব হৃদে বাক্য মম বিফল নিশ্চয় ;
শত ধিক তােমা, নৃপ সাধিতে কাজ
কি না করিয়াছ শেষ ? ভাবি দেখ মনে,
বৃকোদরে পানতরে তীব্র লাহল,
ভেবে দেখ জতুগৃহ, ভীষণ চাতুরী ।
দেখ ভেবে দ্রৌপদীর বস হরণ,
পাশের বনবাস চিন্ত একবার।
;
কি না করিয়াছ শেষ ? ক্ষমেছে পাণ্ডব,
সয়েছে দারুণ ব্যথা ধৰ্ম্ম অনুরোধে ;
চেয়েছে কেবল মাত্র ক্ষুদ্র পঞ্চ গ্রাম,
ক্ষুদ্র ভিক্ষা দাও নৃপ, রাখ কুল মান ;
ভাই ভাই এ বিরোধ উচিত কি কভু ?
আর যদি নাহি শুন বৃদ্ধের বচন,
মজিবে সবংশে, মূঢ়, কহিনু নিশ্চয়।
কে তোরে রক্ষিপে বল, গাণ্ডিবী রুষিলে ?
দেবদত্ত দিব্য রথ, কুড়ে কপিবর,
অক্ষয় কুণীর আর অভেদ্য কাৰ্ম্মক,
কেশব সারথি রথে, এ হেন সম্পদ
কার কাছে ? সমর কৌশল দক্ষ

চতুর্দশ
সর্গ ।
১৮৩
নিবাতকবচ-জয়ী-অজেয়-
বিয়ে
পরাজিবে ? বৃথা আশা কেন হে রাজন ?
যাও বৎস, সন্ধিতরে ধর ধর্ম কর,
দয়ার সাগর তিনি ক্ষমিবেন তােম।"
ঈদৃশ গাঙ্গেয় বানি করিয়া শ্রবণ
দুর্যোধন ঈর্ষা-বিষে লাগিল জ্বলিতে।
বহু যত্নে ধৈৰ্য্য ধরি রাজা দুর্যোধন
ভীষ্ম লাগি বস্তুগৃহ, করিতে নির্মাণ
দেশিলা ভৃত্যবর্গে ; স্থাপিলা নৃপতি--
শত মাত্র দৌবারিক ভীষ্মে রক্ষা হেতু।
শোকাকুল পাণ্ডুগণ সন্তপ্ত হৃদয়ে
শরশযগত ভীষ্মে প্রদক্ষিণ করি,
যথাবিধি ভক্তিভরে চরণ বন্দিয়া,
ধীরে ধীরে নতশিরে চলিল। শিবিরে।
দুর্যোধন ভীঘ্ন পদে করিয়া প্রণাম
চিন্তাকুল চিত্তে ত্বরা করিল স্থান।
শিবির দুয়ারে আসি হেরিশা নৃপতি,
হাসি মুখে কণবীর রয়েছে দাড়ায়ে ।
আবার নৃপের হৃদি উৎসাহে নাচিল,
দুর্গোধনে আশা পুনঃ কহিল গম্ভীরে-
‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিবে সূচ্যগ্র মেদিনী।”
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

-

No text on this page.

Kurukhetre Dash Din Ed. 1

Author
Chattopadhyay,jotindrachandra
Title
Kabya
File name
Kurukhetre Dash Din Ed. 1
Text
OCR done
Citation
1902
Published
2009/10/16
Publisher
Hitoishi Press,murshidabad
Language
Sanskrit
Pages
198
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Bhim
DLI number
512842
Barcode
4990010019877.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
lgZJwH1b7CO
Download PDF

Kurukhetre Dash Din Ed. 1