Makardah Saraswat Library, Howrah

Parnaput Vol. 1, Ed. 5th

Roy, Sri Kalidas · 2009/08/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পর্ণপুট
১ম খণ্ড
শ্রীকালিদাস রায়
পঞ্চম সংস্করণ
রসচ-সাহিত্য-সংসদ
মূল্য পাঁচ সিকা

Published by P. Chatterji
SCHOOL BOOK SOCIETY
63, College Street,
Calcutta.
গ্রহকারের অন্যান্য গ্রন্থ
পর্ণপুট ২য় খণ্ড হৈমন্তী
ব্রজবেণু
আহরণী
বল্লরী
লঙ্কেশ্বর
ঋতুমঙ্গল গীতগােবিন্দ (চিত্রে)
লাজাঞ্জলি মহাভারত
ক্ষুদকুঁড়া
গীতালহরী
রসকদম্ব
সাহিত্য প্রসঙ্গ ১ম
চিত্তচিতা সাহিত্য প্রসঙ্গ ২য়
বঙ্গসাহিত্যের ক্রমবিকাশ
স্কুল বুক সােসাইটি
৬৩, কলেজ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রিন্টার শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ গুহ রায় বি-এ,
শ্রীসরস্বতী প্রেস লিঃ
১, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা

f. ১৩২১ সালের বৈশাখ মাসে পর্ণপুটের ১ম সংস্করণ প্রকাশিত হয়, বন্ধুবর কবি দেবকুমার রায় চৌধুরী, শ্রীযুক্ত শরচ্চন্দ্র ঘোেষাল ও অধ্যাপক শ্রীকৃষ্ণবিহারী গুপ্তের আগ্রহে ও আনুকূল্যে। ১৩৪১ সালে পর্নপুটের পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হইল। এ জীবনে ষষ্ঠ সংস্করণ দেখিতে পাইব কিনা সন্দেহ। পর্ণপুট ১ম সংস্করণের কবিতাগুলির সবই আমার ছাত্রজীবনের রচনা। বর্তমান সংস্করণে ঐ সংস্করণের ৩৭টি কবিতা গৃহীত হইল। অনেকগুলির নাম পরিবর্তন করা হইয়াছে এবং সবগুলিকেই ঈষৎ পরিমার্জিত করিয়া লওয়া হইয়াছে। ১ম সংস্করণের কয়েকটি কবিতা পর্ণপুট ২য় খণ্ডে দুইটি ব্রজবেণুতে এবং একটি ঋতুমঙ্গলে গিয়াছে। ধামশ্রেণী’ নামক দীর্ঘ গাথাজাতীয় কবিতা ২য় ও ৩য় সংস্করণে ছিল—৪র্থ সংস্করণেই বর্জিত হইয়াছিল। ৪র্থ সংস্করণ হইতে নিম্নলিখিত কবিতাগুলি বাদ দিয়া বাকীগুলি ৫ম সংস্করণে গৃহীত হইল।—১। বঙ্গবাণী ২। নবীনবঙ্গ ৩। কৃত্তিবাস ৪। দাশরথি ৫। রবীন্দ্র-বরণে ৬। দ্বিজেন্দ্র-স্মরণে ৭। চিত্তচিতা ৮। আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র ৯। চিত্তবিয়ােগে ১০। গঙ্গাধর-স্মরণে ১১। মৃত্যুশয্যায় রজনীকান্ত ১২। মানসী-প্রতিমা ১৩। বধূবরণ ১৪। কিশােরী বধূ ১৫। দুর্দিনের বরণ ১৬। মুগ্ধ আবাহন ১৭। হাফেজের আত্মদান ১৮। স্পর্শ ১৯। পােপ ২০। চন্দ্রমালা ২১। বিফল আয়ােজন ২২। প্রিয়া ২৩। ভুবনেশ্বর ২৪। বর্ধমানে ২৫। সপ্তগ্রাম। যদি কখনও গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হয়—এই কবিতাগুলি তাহাতে স্থান পাইতে পারে।

৪র্থ সংস্করণে ১২ পৃষ্ঠার একটি কুঞ্চিকা ছিল। তাহাতে দেখানাে
হইয়াছিল—সংস্কৃত সাহিত্য ও প্রাচীন সাহিত্যের সহিত কবিতাগুলির
কোথায় কোথায় যােগ আছে। এই সংস্করণে তাহা বর্জিত হইল।
যে সকল কবিতার জন্য কুঞ্চিকা সংযুক্ত হইয়াছিল, সে সকল কবিতাই
এই সংস্করণে লওয়া হয় নাই। ২৫টি কবিতা যেমন বর্জিত হইয়াছে—
অনেক নৃতন কবিতা তেমনই এই সংস্করণে সংযােজিত হইয়াছে—
কুঞ্চিকাংশ বাদ দেওয়ায় বারাে পৃষ্ঠার কবিতা তেমনই বাড়িয়াছে।
কবিতাগুলির নির্বাচনে আমার সুযােগ্য ছাত্র সুকবি শ্রীমান্
কৃষ্ণদয়াল বসু আমাকে যথেষ্ট সহায়তা করিয়াছেন।
রসচক্র-সাহিত্য-সংসদ
দক্ষিণ কলিকাতা
}
কালিদাস রায়
মুদিত আলাের কমল-কলিকাটিরে
রেখেছে সন্ধ্যা আঁধার-পর্ণপুটে
উতরিবে যবে নবপ্রভাতের তীরে
তরুণ কমল আপনি উঠিবে ফুটে।
রবীন্দ্রনাথ

সূচিকা কবিতার নাম পৃষ্ঠা ১ ••• ০ ০ ০ ০৩০ . ৪ আদিত্য দুৰ্ব্বাস। মথুরার দূত সূর্যমণি বিশ্বের প্রতি ••• st . ••• ০০০ ০০০ ১ ০ ০ ০ এ এ এ সত্য বিশ্বামিত্র বিশ্বরাজ রাজষি ভরত রূপ ও ধূপ দধীচি ১৪ • • • ০ ০ ০ ১৭ ••• ••• ১৮ মথুরা-যাত্রা শ্যাম বিহনে ০ ০ ০ ০ ০ ০ রাখালরাজ | ০ ০ ০ ০ ০ ২৫ . . । ০ ০ ০ মথুরার দ্বারে বৃন্দাবন অন্ধকার পাদমেকং নগচ্ছামি বঙ্গ-বধূ পল্লীবালা ০ ০ ০ ••• ••• ••• ২৮ ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ • পৃষ্ঠা ৮ । . ০ ০ ০ ০ ০ ০ কবিতার নাম পল্লীবধূ কুড়ানী কৃষকের ব্যথা কৃষাণীর ব্যথা হা-ঘরে ৩৭ • • • ০ ০ ০ ৪১ ৩ . . গ্রামপথে ৪। ••• মেঠো পথে ৪৫ ০ ০ ০ ••• ৪৭ ৫২ • • • ০০ ০ ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিনে বাল্য-সখী ভাদুরাণী এস ঘরে ভােজের ডাকে পল্লীকবি নীলকণ্ঠ পল্লীর ঘাটে ৫৪ . . . ••• ••• ভূতত বাড়ী ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৬৪ ৬৭ ০০০ বাল্য-সখা মজুরের গােহারি কুম-শয়ন প্রথম বিরহ কিশােরী প্রিয়া প্রত্যাবর্তন ••• ৭০ ৭১ ০ ০ ০ অলির প্রতি কুসুম १२ প্রেমের স্মৃতি ••• ৭৪ বয়ঃসন্ধি ০০০ পাহাড়িয়া প্রিয়া ৭৭ কবিতার নাম পৃষ্ঠা মুক্তি ••• ৭৮ ••• ০ ০ ০ ৮০ ০ ০ . ০ ০ ০ ৮২ ৮৫ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ••• ৮৭ ••• ৮৮ ০ ০ ০ • . . ••• ৮৯ ১০ ০ ০ ০ ••• ••• ০ ০ ০ ১২ ••• ০ ০ ০ ১৪ ০৪ ০ অপরাধ কার মিলনােৎকণ্ঠিতা যাত্রা দিনে ও রাতে সমস্যা চিরমিলন দেহের মিলন পূৰ্ব্বরাগ চোখের জল সম্পূর্ণতা বিরহ-তপের শেষ ব্যর্থ বিলাস প্রিয়ার কৈশাের কল্যাণী কুষ্ঠিত কুণ্ঠাহরণ শীক্ষেত্ৰমঙ্গল মন্দিরে না সিন্ধুনীরে আগ্রায় গিরিধির উশ্রিতটে পালামৌ নিদাঘে মহানদী-কুলে ধৰ্ম্মক্ষেত্র ১৮ ০ ০ # ০ ০ ১৯ ••• ১০১ ০ ০ ০ ১০২ ০ ০ ১০৫ ০০ ০ ৪০০ ০ ০ ০ ১০৮ ১১১ ••• ••• ১১৪ ০ ০ ০

কাঞ্চনথালি
নাহি আমাদের
অন্ন নাহিক জুটে,
যা কিছু মােদের এনেছি সাজায়ে
নবীন পর্ণপুটে
রবীন্দ্রনাথ

পর্ণপুট
আদিত্য
বৈদিক ঋষি পূজিল তােমারে তােমার নয়নে নয়ন রাখি,
অৰ্যমা, পূষা, আদিত্য, প্রভাকর,
তব তেজ মাঝে ভর্গেরে বুঝি হেরিল তাদের মনের আঁখি,
শ্রুতির সূক্তে সেই ধ্যান ভাস্বর ।
ত্রেতাযুগে এলাে রাজরাজন্য রচিল পুরাণ কল্পকথা,
কুলধারা-যােগে তােমা সনে তারা পাতাইল নব আত্মীয়তা,
যত তারকার বংশধরেরে শাসিল গর্বে আত্মহারা ;
জয়-হুঙ্কারে কম্পিল অম্বর,
রথধ্বজায় তােমার মূর্তি অরুণবর্ণে আঁকিল তারা।
তুমি শুধু তায় হেসেছিলে দিবাকর ।

পর্ণপুট
তারপর এলাে সৌরপন্থী তােমারে ভাবিল ব্ৰহ্মময়,
তােমার পূজাই সকল পূজার সার।
শৈব-শাক্ত-বৃন্দের সাথে যুবিয়া তাহারা লভিল জয়,
কভু পরাজয়ে বহিল লজ্জাভার ।
বিজয়-মত্ত সৌর ভূপতি রাজকোষ তার শূন্য করি’,
সিন্ধুর তীরে তব মন্দির গড়িল দ্বাদশ বর্ষ ধরি,
শত ভাস্কর দুষ্কর ব্রতে কলা-চাতুর্যে বিমণ্ডিত
করিল যতনে শােভামণ্ডল তার,
কোটী ভক্তের জয়ধ্বনিতে হলে ব্যোমলােক আন্দোলিত
ভাস্কর তুমি হেসেছিলে একবার।
জ্যোতিব্রহ্ম, জ্যোতির্বিদেরা আরাধিল তােমা আরেক রূপে,
বহাইল দেশে নবতন্ত্রের ধারা।
নবগ্রহের তুমি নিয়ন্তা, ভয়ে সম্রমে গ্রহের ভূপে
স্বস্তি বাচনে কত না পূজিল তারা।
সব শেষে এলাে জড়বিজ্ঞান ধ্রুব-স্বরূপ জেনেছে বলে,
এক চোখে চায় তােমা পানে রবি, তুমি হাস তায় কৌতুহলে।
কেহ আর তব দেউল গড়ে না, সৌরতন্ত্র লুপ্ত ক্রমে,
ইতু-ঘটে পূজা-পৰ্ব হয়েছে সারা।
আন-শেষে শুধু পল্লীবাসীরা একবার শুধু তােমারে নমে,
পাঁজির পাতায় হইয়াছ তুমি হারা।

আদিত্য
আজি নাই সেই পঞ্চতপারা, নাই কোণার্ক, সৌররাজ,
কোথা শিল্পীরা তাঁহার আজ্ঞাবহ ?
তব নাম যােগে নাম-গৌরবী হ’ল যারা তারা কোথায় আজ ?
আজি তুমি নও কারাে দূর পিতামহ।
মানুষের এই পূজা-পূজা-খেলা হেরি বিচিত্র, প্রদোষে প্রাতে,
যুগযুগ হ’তে সমান হাসিই হাসিয়া চলেছ উপেক্ষাতে।
মধ্যদিনের জকুটি তােমার কেন তাহা হায় কেই বা বােঝে ?
কৃপায় কৃপণ তুমি যে কখনাে নহ।
রবির রবিরে যাহারা নিত্য বিম্বের প্রতিবিম্বে খোজে,
তাদের মূঢ়তা তাও তুমি রবি সহ।
মানববাদয়ের আগে হ’তে তব নিত্য সেবার যে আয়ােজন,
হয় নি বিথ তার তিল-পরিমাণ ।
গিরিচূড়া তােমা বরিছে নিত্য, তােমার আপন চারণগণ
সাঁজে ভােরে গায় নীড়ে নীড়ে জয়গান।
যুগযুগ হতে মেঘেরা অরুণ কেতন উড়ায় তােমার রথে,
সমানই নিত্য উষসী সন্ধ্যা সিদূর ছড়ায় তােমার পথে,
চিরদিনই সেই সূৰ্য্যমুখীরা তােমা পানে চেয়ে ব্রতটি পালে,
কাল-পারাবার করায় তােমায় স্নান।
বসুধার শিরে কনক আশিস্ পাণি-সহস্র সমানই ঢালে,
যুগ যুগ হতে, লভে সে গর্ভাধান।

পর্ণপুট
দুর্বাসা
কোথা যাজ্ঞিক আজি আনমনে ভুলেছ নিত্যযাগ,
কোথা ঋত্বিক করনি সাধন আত্মকর্মভাগ,
কোথায় শিষ্য ভুলেছ ভাষ্য মাধবীর সৌরভে,
দুর্বাসা আসে দুৰ্বার বেগে, অবহিত হও সবে।
কোথা ঋষিবালা পুষিছ পরাণে মােহারুণ কামনায়,
অতিথি আসিয়া ফিরে যায় তবু হয় না চেতনা তায়,
তরুলতাগুলি পায় নি পানীয়, হরিণী শম্পদল,
দুর্বাসা আসে দুর্ভা মুখে, কোথায় পাজল ?
কোথা নরপতি লালসালালিত, পুষ্পবাটিকামাঝে
বিলাস-ব্যসনে আছ সারাবেলা হেলা করি রাজকাজে ?
কোথা শূরবর, ভুলেছ সমর প্রেয়সীর কর ধরি ?
দুর্বাসা আসে, দুর্বল চিত! জাগাে মােহ পরিহরি।
ভুলি দেবদ্বিজ পূজা, ব্রত, নিজ জনমের তিন ঋণ,
কোথা গৃহী হায় শফরীলীলায় বিলসিছ নিশিদিন ?
কোথা বধু গৃহধৰ্ম্ম ভুলেছ বিরহের বেদনায় ?
দুর্বাসা আসে জাগগা জাগাে সবে নিজ নিজ সাধনায়।
আসিছে মূৰ্ত ৰুদ্ৰশাসন, কুটীকুটিল মুখ,
শিরে জটাবন, নয়নে দহন, গহন বুক।
সাধনার ভার বহ আপনার, মােহের আঁধার নাশি,
জাগ্ৰৎ রহ, উগ্র তাপস কখন পড়িবে আসি'।
n

মথুরার দূত
মথুরার দূত
বিদায় চন্দ্রাননে,
এসেছে আজিকে মথুরার দূত আমার বৃন্দাবনে।
সাঙ্গ আজিকে বাঁশীরব-গান,
হলাে ব্ৰজে কলহাসি অবসান।
শেষ-অভিসার, মান, অভিমান, উচ্ছল রসাবেগ।
যদিও যমুনা ভরা টলমল,
নীপনিকুঞ্জ চারু চঞ্চল,
ময়ুর ময়ূরী রসঢলঢল, গুরু গুরু ডাকে মেঘ,
তবু হায় যেতে হবে,
বারতা বহিয়া মথুরার দূত গােকুলে এসেছে যবে।
ব’লাে সখাসখীগণে
এসেছে নিঠুর মথুরার দূত বঁধুর কুঞ্জবনে।
জলকেলি শেষ ঝপায়ে ঝপায়ে
কালীদহে তটবিটপী কঁপায়ে।
বৃথা বনফলে ভরিছ আঁচল মিছে গাঁথ বনমালা।
ফুলের ঝুলনা লুটিবে ভূতলে
ভাবিতে নয়নে সলিল উথলে।
যাই বুকে বহি রসরাস-দোল-ঝুলনের স্মৃতিভ্রালা।
মিছে আর মায়াভাের,
ভেসে যাক চলে যমুনার জলে সাধের বাঁশরী মাের।

পর্ণপুট
ব’লাে পাগলিনী মায়,
আজিকে তােমার প্রাণের দুলাল বাঁধন কাটিয়া যায়।
কে হরিবে আর ক্ষীরসর ননী ?
কে ধরিবে শিখিপুচ্ছ-পাঁচনি?
শত আঁচলের গ্রন্থি টুটাতে হিয়া ফেটে শতখান।
ব’লাে গােপীগণে,যমুনার ঘাটে,
সাঝে নদীতটে, দিনে দধিহাটে,
আজ হ’তে হলাে যত লাজ জালা যাতনার অবসান।
মিছে ডাক’ বারে বারে,
এসেছে আজিকে মথুরার দূত কানুর হৃদয় দ্বারে।
কেমনে হেথায় রহি
মথুরার দূত এসেছে নিদয় বিদায়নিদেশ বহি'।
ডাকিছে সত্য বিষাণ-বাদনে
জীবন-মরণ-রণ-প্রাঙ্গণে,
ডাকে মথুরার কাতর কাকুতি, আতুরের আঁখিলাের।
পাষাণ-কারার আকুল রােদন
করেছে সুপ্ত তেজের বােধন,
ভাঙিতে হয়েছে রাগের স্বপন, ফাগের রঙীন ঘাের।
মিছে আর আঁখিজল
মথুরার দূত করিয়া দিয়াছে অন্তর টলমল।

সূৰ্য্যমণি
সুৰ্য্যমণি
পুষ্পসভায় উৎসব-লীলা ফুরায়ে গিয়াছে যবে,
অবশ আলসে এলায়ে লুলিত ঘুমায়ে পড়েছে সবে।
রুক্ষ কাযায় বাসে
তুমি জাগিয়াছ রুদ্র তাপসী রৌদ্রবহ্নি পাশে।
তুমি চাও যারে মিলে না তাহারে উষার সরস সুখে,
তােমার বাসক-শয়ন রচিত নহে কিসলয়-বুকে,
চারিপাশে রচি কৃশানুকুণ্ড উর্দ্ধে মেলিয়া আঁখি,
দয়িতের লাগি তােমার সাধনা বুঝিতে কি আছে বাকি ?
বিনা তপােমহিমায়
কোন্ সাহসিকা চণ্ড ভানুর প্রেম-চুম্বন চায় ?
ভয়ে হ’ল কেহ পাণ্ডুর-দেহ আঁখি মুদি কেহ কাপে,
গরবিনী যত সােহাগিনী ঐ ঝলসি পড়িছে তাপে ।
জ্বালাময়ী সাধনার,
বহ্নিবেদনা বহিবে সহিবে তুমি বিনা কেবা আর ?
বালারুণ হেরি যে মেলে নয়ন, জ্যোৎস্না-বিলাসে যেবা,
তাদের মাঝারে কে করিবে মরু-মাৰ্ত্তণ্ডের সেবা?
কেহ বা বন্দে উষা-দেবতায়, সন্ধ্যারে কোন জনা,
ঊষা-সন্ধ্যার সে আদিনিদানে কে করিবে আরাধনা ?
তুমি জানিয়াছ সার,
সুর-বসন্তে সঙ্গী করিলে চরণ মিলে না তার।

পর্ণপুট
বিশ্বের প্রতি
কে বলে জড় বিশ্ব তুমি? তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ,
পাগল ভােলা, একি-এ লীলা-দৃশ্য হেরি দিবসরাত!
জ্যোছনাভাতি, তারকাপাতি—বিভূতিভূষা অঙ্গময়,
ভাঙের ঘােরে কক্ষ’পরে নৃত্যে তাল-ভঙ্গ হয়।
বারিধি-হ্রদে শারদ নদে ডমরু তুলে ডামর-তান,
দোদুল-জটা জলদ-ঘটা দামিনী-ছটা—দীপ্যমান।
ইন্দ্রচাপে সন্ধ্যারাগে কটিতে আটা কৃত্তিপট,
ধরেছ শাপ-দুরিত-তাপ-গরল গলে, রুদ্র নট,
ভােমার পাশে গৌরী হাসে বিতরি জীবে অন্নজল,
শস্যশিরে আঁচল উড়ে, চরণে ফুরে কমলদল।
তুমি ত জড় সৃষ্টি নহ-তুমি যে নিজে স্রষ্টা, নাথ,
পাগল ভােলা, একি-এ লীলা-লহরী হেরি দিবসরাত।
শিশিরকণ-মণিভূষণ বনবিতান-বল্লীচয়
আনতফণ ফণীর মত জড়ায়ে তনু প্ৰণত রয় ।
নর-করােটি তােমার করে, কণ্ঠে মহাশঙ্খ-হার,
ধবলগিরি-বৃষভ বহে শৃঙ্গে মেঘপঙ্ক-ভার।
ঈশান, তব পিনাকে ছুটে অশনি-শর কৃশানুময়,
বিষাণ-রবে ঝঙ্কা জাগে ঘােষণা করে ভীষণভয়।

প্রহলাদ
ত্রিশূল তব ত্রিতাপরূপে ত্রিকাল ব্যেপে ঘূর্ণমান,
অট্টহাসি-তুহিনরাশি তটিনী কোটি করিছে পান।
রােষ-ভীষণ ভাল-নয়ন,—নিদাঘ ভানু নির্নিমেষ ;
রতিপতিরে ঋতুপতিরে দহিয়া করে ভস্মশেষ।
তুমি-ত জড় বিশ্ব নহ—তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ,
পাগল ভােলা ! একি-এ লীলা-একি-এ খেলা দিবসরাত ।
সত্য
( ১ )
শিশুটীরে ফেল্লে যখন জলে,
ডুবল না সে, ঠেল কমলদলে,
বিস্ময়ে তাই দেখল হাজার আঁখি—
ঢেউয়ের’ পরে আছে হেলে দুলে।
ফেল্লে যবে হিংশ্রগণের পায়,
হর্ষে তারা খেল্পে নিয়ে তায়,
সিংহ তাহার চাটুল চরণ দুটি
হস্তী তারে পৃষ্ঠে নিল তুলে।

পর্ণপুট
চুল্লীতে তায় ফেল্লে অবােধ যত,
আগুন নিভে ইন্দ্রায়ুধের মত
তােরণ হয়ে জাগল তাহায় ঘিরে,
হরে’ নিল গায়ের যত মলা।
সত্য,—এযে প্রলাদ অবতার,
জল্লাদে তার করবে কিবা আর ?
আলাদে সে গাইবে হরির নাম
যতই কেন রােধ’ তাহার গলা।
নৃসিংহদেব জাগবে দানবপুরে,
মাণিক্যময় স্তম্ভ ভেঙ্গে চুরে,
দম্ভ-করীর কুম্ভ বিদারিতে
মিথ্যাসুরের রক্ত নিতে বলি ;
অন্ত্রগত ভ্রান্তি-নাড়ী ছিড়ে
উরুর তটে দলবে জঠর চিরে।
শেষকালে সেই সত্য হয়ে জয়ী
চেয়ে চেয়ে দেখবে কৃতাঞ্জলি।
১০

(২)
উত্তমই যায় ভাবছ মােহের ঘােরে,
বসায়ে আজ আদরে তায় ক্রোড়ে,
তাড়া’চ্ছ যে ধ্রুবেরে দূর বনে,
ধ্রুবের সাথে বিদায় নিবে শুভ।
অধ্রুবেরে চিত্তে ভজি’ ভজি’
সুরুচিতে নিত্য রয়ে’ মজি’
সুনীতিরে করবে কর দূর ;
দুঃখ কি তার পুত্রটি যার ধ্রুব।
ধ্রুব আপন কঠোর সাধন-বলে
উঠবে জিনে হরির পদতলে।
সুনীতি-ত হবেই শ্রেয়ােমাতা
সবার উচু পুণ্য ধ্রুবলােকে ।
ভােগের মােহে মরীচিকার জালে
মিটবে-নাক তৃষ্ণা কোন কালে,
চাইতে হবে ধ্রুবলােকের পানে
অশ্রু-অরুণ আৰ্ত্ত করুণ চোখে।
ধ্রুবের সেবা ভিন্ন কেবা কবে
বিশ্বে অশােক শাশ্বত লােক লভে ?
ধ্রুবের প্রভা ভিন্ন ভবার্ণবে
নাবিক তুমি হবেই পথহারা,

পর্ণপুট
সুলভ সুখের লােভ লালসা যত,
ক্ষণিকভাতি জোনাকপাতির মত ;
নিশাস্তে হায় নিভবে তাদের আয়ু
অনন্তকাল অর্বে ধ্রুবতারা
বিশ্বামিত্র
দেশে-দেশে ব্ৰহ্ম-ক্ষত্র, বিশ্বহােত্ৰী বিশ্বামিত্র, তব জাগরণ,
তব ঋকুমন্ত্রে, রথি, সুতরা’ নদনদী বিজিত ভুবন।
জন্মবলে নহে তব, পুষ্করে দুষ্কর তপে ব্ৰহ্মপদলাভ,
রাষ্ট্ৰজাতি নব নব যুগে-যুগে গড়ে তব তপের প্রভাব।
তব যােগভঙ্গলে চতুঃষষ্টি-কলাশিশু জন্মে কালে কালে,
শিল্পি-শকুন্তেরা যারে বক্ষপুটে স্নেহসারে পক্ষছায়ে পালে ।
প্রমূৰ্ত্ত পুরুষকার, তােমার ‘জম্ভক’ আজো অশিবে তাড়ায়,
তব রাজ-পরীক্ষার বহ্নিকুণ্ড জলে শত মণিকণিকায়।
অভিশপ্তা মুক্তি লভে যজ্ঞদ্রোহী মহাহবে পুড়ে দলেদলে,
দেশবৈরী সৃষ্টিত্রাস মাতৃ-হা’র দর্পনাশ তােমারি কৌশলে
আজো গায়ত্রীর সহ ‘অতিবলা বিদ্যা কহ তরুণ শ্রবণে,
‘সত্য-শিব’—‘শূরতী’—মিলনের প্রজাপতি রাজর্ষি-ভবনে।
১২

বিশ্বরাজ
বিশ্বরাজ
কেমনে চিনিব তােমা তুমি নাকি বিশ্বের ভূপাল ?
একমুষ্টি অ—তা’ও, ভিক্ষা চাও হে রাজ-কাঙাল।
চিতাভস্ম অঙ্গরাগ, পরিধানে হেরি গজাজিন,
ছত্ৰীভূত সর্পফণা জটা-কুচেঁ কিরীট নবীন ।
নিতান্ত বাতুল পেয়ে বৃষভে বসায়ে অবশেষে
কে তোমারে সাজাইল ও অপূৰ্ব্ব রাজেন্দ্রের বেশে?
দেবগণ নিল বাঁটি রাশি রাশি অমৃত ধবল,
অকুণ্ঠিত কণ্ঠে তুমি নিলে হাসি অসিত গরল।
বিলায়ে মন্দার কুন্দ অরবিন্দ তুলসী মধুরা
নিলে মহাশঙ্খ-কন্ঠী, বিল্বপত্র, বিষাক্ত ধুতুরা।
তেয়াগি লাবণ্যলতা রাজকন্যা তারুণ্যে অরুণা,
ব্ৰতজীর্ণা তপশীর্ণা অপর্ণারে করিলে করুণা।
হে রাজেন্দ্র, তব রাজ্যে তুমি শুধু চির অকিঞ্চন,
সকলে যা বিসর্জিল করিলে তা মৌলির ভূষণ।
সর্বভােগ্য ত্যজি রাজা যদি রও শ্মশান-প্রবাসে,
কেমনে সৌভাগ্য-সুখে রবে প্রজা সংসার-বিলাসে?
শবাসন ছেড়ে আজো ফিরিলে না তব সিংহাসনে
ছুটিছে নিখিল ভব তাই তব শ্মশান-সদনে।

পর্ণপুট রাজর্ষি ভরত পরিহরি পরিজন গৃহসুখ সিংহাসন, মৃগশিশু, তােরে ভালবেসে, হায় হায় শতশত বরষের তপ যত যাগ জপ যায় সব ভেসে। খেয়ে নিস্ তুই সব সােম চরু কুশ যব, কোশাকুশী হতে গঙ্গাজল। স্থণ্ডিলে সমিধ পরে ঘুমাইবি অকাতরে, কেমনে জ্বালিব হােমানল? একি অত্যাচার তোের, মন্ত্রপূত হবি মাের সুক হ’তে তুই নিস কাড়ি ; যােগে সমাহিত হলে আসিয়া শুইবি কোলে, স্পন্দহীন নাহি হতে পারি । তরল আয়ত চোখ ভুলাল’রে সূক্ত শ্লোক, দাতে ধরে টানি বাকল । সৰ্বাঙ্গ লেহন করি’ সব তপ নিলি হরি’ শেষে কিরে করিবি পাগল? পরিহরি ঘনসার কুঙ্কুম, বােচনাভার, কালাগুরু, উশীর, চন্দন, সুগন্ধ বিলাস সবি ছেড়ে এসে এ সুরভি মৃগমদে মজিল রে মন। ১৪

রাজর্ষি ভাত
রূপতৃষা, রসতৃষা
জয়তৃষা, যশ’তৃষা
সৰ্ব্বতৃষা গর্বে জিনি হায়,
কান্তারে প্রান্তরে ঘুরি’ ভ্রান্ত আজি পন্থা ঢুড়ি
মরুভ্রান্তি ‘মৃগতৃষ্ণিকায়।
ছিড়ে এসে মায়া তাের
ওরে মায়ামৃগ মাের
তাের লাগি ঘাের অধধগতি,
প্রতিহিংসা প্রকৃতির, এযে দণ্ড বিদ্রোহীর,
ভগবন্! দাও স্থিরমতি।
থাক তুই রে শাবক,
অঙ্কে মম, শুষ্ক থােক
চতুৰ্বর্গ-ফলের পাদপ।
জীবন্ত সবার চেয়ে
স্নেহ প্রেমে শিশু পেয়ে
হত্যা করি করিব কি তপ ?
যদি যােগ-তুষানলে
শাসন-শােষণ-বলে
রসলেশশূন্য সারা প্রাণ,
অন্তরে বাহিরে জটা, তবে মিছে তপােঘটা
বৃথা রস-ব্রহ্মের সন্ধান।
বৈরাগ্যের শ্যেন যদি
অনুসরে নিরবধি
প্রেম-শুক ত্রাণ কোথা পায় ?
সব ঠাই হ’তে তারে তাড়াইলে বারে বারে
মৃগবক্ষে বাঁধিবে কুলায়।

পর্ণপুট
রূপ ও ধুপ
ওগাে রূপ অপরূপ,
তােমার দেউলে দহিয়া মরিল কত না সুরভি ধূপ ।
অটল নিঠুর, চরণের মূলে,
তবু একবার চাহিলে না ভুলে।
পড়িল না ক্ষীণ রেখা, রসহীন ‘অশান’ পাষাণ বুকে
দম্ভ তােমার লুষ্ঠিত ভূমে।
দগ্ধ দেহের গন্ধিত ধূমে,
কালিমা মাখায়ে দেছে ধূপ তব কপটোজ্জ্বল মুখে।
ওগাে রূপ অপরূপ,
তব মন্দিরে মরণে বরিছে কত যে জীবন-ধূপ।
কও-কও কথা একবার ডাকি,
মেল, ও ইন্দ্রনীলমণি-আঁখি,
কত যে ভক্ত লােচন-রাজীব তুলি’ শরে দিল পায়,
হলাে না ও দেহে কৃপা শিহরণ ?
হানিল বক্ষে কেড়ে প্রহরণ
তব হােমানলে পূর্ণাহুতিতে সপিল যে আপনায়।
ওগাে রূপ, অপরূপ,
মেল’ একবার অন্ধলােচন, দহে মলাে কত ধূপ।

দধীচি
দধীচি
কোথা তপােবনে যজ্ঞকুণ্ডে পড়েনি পূর্ণাহুতি,
দেবের প্রসাদ আসেনি নামিয়া, থামিয়া গিয়াছে শ্রুতি।
আহিগ্নিক, হ’য়াে না নিরাশ দধীচি সপিছে প্রাণ,
অস্থি-শােণিত—ইন্ধন ঘৃত, দিতে হােমে বলিদান।
বৃষ্টি বিহনে রৌদ্র দহনে কোথা দেশ ছারখার,
ধূ-ধূ করে মাঠ, হু-হু করে প্রাণ, গৃহে গৃহে হাহাকার।
হে কৃষকবর, হয়ে না কাতর, দধীচি সপিছে প্রাণ,
শ্রাবণানন্দে বারিদমন্ত্রে নামে ইন্দ্রের দান।
সুরলােক কোথা রসাতলে যায় অসুরের পশুবলে,
গিরিগুহা-বনে, ঘুরিছে গােপনে দেবতারা দলে দলে,
উঠ দেবরাজ, ত্যজ দীনসাজ, হীনলাজ অবসান,
যােগাসনে ঐ বসেছে দধীচি করিতে অস্থিদান।
ধৰ্ম্মজগতে বিপ্লব কোথাকলুযের উপচয়,
সত্যের গ্লানি, পুণ্যের গ্লানি, নিরীহের নিতি ভয়,
সাধু মহারাজ, উঠ উঠ আজ, দধীচি সপিছে প্রাণ,
কুশে যাগে রণে মেরু-মরুবনে তঁার এ আত্মদান।
১৭

পর্ণপুট
মথুরাযাত্রা
কোথায় গােকুল ছেড়ে প্রাণবধু চলিলে,
ভাসাইয়া আশারাশি নয়নের সলিলে ?
এমন করিয়া হায়
চলে যাবে মথুরায়,
আগে হতে শ্যামরায় কেন নাহি বলিলে ?
অখলা অবলা মােরা কাননের হরিণী,
ছুটিয়াছি বাঁশী শুনে কখনাে ত ডরিনি,
বশী যে শায়ক হবে
কে কোথা ভেবেছে কবে ?
এমন করিয়া সবে হে নিঠুর ছলিলে ?
গােকুলে অকূলে ফেলে কি সুখে বা রহিবে ?
ব্ৰজের বিরহ ব্যথা ও বুকে কি সহিবে ?
সেথা উদাসীন রবে
ধূমরাশি হেরি নভে
যমুনার এই পারে দাবানল জ্বলিলে ?
রাধারে না হয় শঠ অবাধেই ছাড়িবে,
রাধা-নামে-সাধা বাঁশী ছাড়িতে কি পারিবে ?
রাসতলা হবে মরু
করিতে উৎসব ঘটা যাতে ফল ফলিলে ।
শ্বসিতেছে বেণুবন নুয়ে নুয়ে ভূতলে,
পথ রােধে ধেনুগণ চোখে নীর উথলে।
ফুলের বদলে শিলা
ছুড়ে শেষে একি লীলা ?
নিজ হাতে গাঁথা মালা রথতলে দলিলে।
শুকাইবে চূত-তরু
১৮

শ্যাম বিহনে
শ্যাম বিহনে
হলাে না বসন্ত এবার বৃন্দাবনের বনে,
প্রেমানন্দ বিহনে—শ্যামচন্দ্রমা বিহনে।
কোকিল এসে ডাল কুহু
বকুল-শাখায় মুহুর্মুহু
শুনে ব্যথার আহা-উহু ফিরল হতাশ মনে।
দখিণ পবন এসে সবায় গেল ছুঁয়ে ছুঁয়ে,
জাগল না কেউ, কীচককানন বাজল না তার ফুয়ে।
ললিত লবঙ্গলতা
হলাে না তায় রঙ্গর
চুততরু অঙ্গ হতে খল্ল পরশনে।
শীত অবসান ভেবে হঠাৎ পলাশ দিয়ে উকি,
দেখে ধূলায় লুটায় যত ব্ৰজের বিধুমুখী।
অনি সে মুখ লুকাইল,
গুরে দুখে শুকাইল,
ফোটা এবার হােল না তার রভস-রঙ্গনে।
শােণিতরাঙ্গা শাণিত সব শায়ক পিঠে বাধি,
এসেছিলেন অনঙ্গদেব ফিরে গেলেন কাদি,
অপিছল পথে পড়ি
ফুলের ধনু গড়াগড়ি।
যমুনা গায় বিয়ােগিনী আৰ্ত্ত আলােড়নে।
হােলীই যখন হবে না তার বৃথাই আয়ােজন,
ফুটতে গিয়ে গেল ফেটে নটকোনা রঙ্গণ।
গগন-বনের অরুণিমা
তরুলতার তরুণিমা
ধূসর হয়ে ধূমল হয়ে মিলায় দিগঙ্গনে।

পণপুট
রাখালরাজ
অবুঝ কানু কার মায়াতে ভুলে
গােকুল ছেড়ে চলে গেলি ভাই ?
সেথায় কেবল হাতী ঘােড়র মেলা,
তাের ত সেথা খেলার সাথী নাই।
কোথায় সেথা দূৰ্বাশ্যামল গােঠ,
রাখাল দলে খেলার হেন জোট,
ননীর মত কোমল ধবলদেহ
কোথায় সেথা এমন দুধল গাই ।
এমন রাখাল-রাজ্যখানি ফেলে
কেমন করে আছিস কানাই ভাই ?
ময়ূরনাচা এমন পাখীডাকা
হরিণচরা কোথায় সেথা বন ?
মাটাছোঁয়া কোথায় তরুশাখা
ঝুলবি কোথা দুলবি সারাক্ষণ?
ফুলবনে নাই ফুলের ছড়াছড়ি
ফুলের ভােরে কোথায় জড়াজড়ি?
ওঁজতে কানে মুকুল কোথা পাবি?
খুঁজতে গিয়ে আকুল হবে মন।
অবুঝ রাজা এমন বাঁশীবাজা
সবুজ তাজা কোথায় সেথা বন ?

রাখালরা
দুপুর রােদে সেথায় তরুর তলে
কোথায় পাবি মধুর মৃদু হাওয়া?
কোথায় সেথা কালিন্দীরি নীরে
কলিয়ে সাঁতার কেটে নাওয়া?
সেথায় কিরে গভীর কালীদ’য়
কমল কুমুদ নিত্য ফুটে রয়?
গায়ের ঘামেও ঘনায় ঘুমের ঘোের
কোথায় এমন ঘুমে নয়ন ছাওয়া?
রােদের তাতে তাতলে তন্ন তাের
গাছের ছায়ায় কোথায় পাবি হাওয়া?
তুলবে কেবা বেলের কাঁটা দিয়া
কুশের আঁকুর বিধলে রাঙা পায় ?
পড়লে খ’সে নূপুর ধড়া চূড়া
আবার কেবা পরিয়ে দেবে হায় ?
তমাল তলে বলে মেলি পা।
বাছুরটী আর চাটবে-নাত গা !
ক্লান্ত হলে চাইবি কারে জল
কার কোলে তুই এলিয়ে দিবি গায়?
ক্ষুধা পেলে আন্বে কেবা ফল
ঘামলে ও-মুখ মুছিয়ে দিবে তায়?

পর্ণপুট
সেথাও যদি উপদ্ৰবই করিস
তারা কি তাের সইবে আচরণ?
সেথাও যদি মাখন দধি হরি
তােয় যে কটু কইবে অকারণ !
বেণু যদি বাজা রাখালরাজ
কেমন করে’ করবে তারা কাজ ?
ববেনাত তাের বাঁশরীরবে
যদি বা হয় পরাণ উচাটন?
কলস যদি হরিস ঘাটে, তবে
হাসবে কি রে তথায় বন্ধুগণ ?
রাজা হওয়া যদিই এত সখ
রাজা ত তােয় করেছিলাম মােরা ;
ছিল ত তাের মন্ত্রী পরিষদ,
গােধন মৃগ,—তারাই হাতী ঘােড়া।
উইয়ের ঢিপির সিংহাসনের ‘পরি,
মাথায় দিলাম পাতার মুকুট গড়ি,
কণ্ঠে দিলাম গুঞ্জাফলের মালা
হস্তে বাঁধি রাঙা রাখীর ভােরা।
হেথায় ফেলি রাখালরাজের লীলা
কেমনে তুই থাকবি মাখনচোরা ?
२२

মথুরার দ্বারে
মথুরার দ্বারে
চরণে মিনতি প্রহরি তােমার, বসােনা অমন বেঁকে,
মােরা তােমাদের রাজারে হেরিতে এসেছি গােকুল থেকে।
ছেড়াধড়া পরা, পথধূলি ভরা শরীরে ঘামের রেখা ;
তাই বলে কিরে যেতে হবে ফিরে, পাব না কানুর দেখা ?
তুমিত জান না, প্রহরি, তােমার রাজাটি মােদের কে !
এই ধূলিমাখা বুকে মাথা রেখে মানুষ হয়েছে সে।
আমরা কাঙাল অবােধ গােয়াল, সে আজ অনেক বড়।
ও চরণে ধরি তােরণ-প্রহরী, তাড়ায়ােনা, দয়া কর।
আমাদের কানু, তার কাছে যেতে তাের পায়ে সাধাসাধি।
চোখে আসে জল মুখে আসে হাসি, তাইত হাসি কি কঁদি।
দাড়াইয়া ঠায় দ্বারে ধুলা পায়, কানু শুনে তাই যদি,
কত ব্যথা মরি পাবে সে, প্রহরি, আঁখিনীরে ব’বে নদী।
রাজার দণ্ড ধরেছে কানাই ছেড়েছে মােহন বাঁশী
সেই হ’তে তার বুঝি মুখ ভার, নাই খেলাধূলা হাসি।
আহা সে কত না পেয়েছে যাতনা কেঁদেছে মােদেরে ছাড়ি।
অমন করিয়া দিওনাক ঠেলি’, জকুটি করাে না দ্বারি !
কালীদহ হ’তে এনেছি তুলিয়া তার তরে শতদল,
যে বনে বেড়াত চরাত গােধন সে বনের পাকা ফল,
শাঙলীর দুধে মথিয়া নবনী, ধবলীর দুধে ক্ষীর,
এনেছি মালতীফুলে মালা গাঁথি যমুনার কালাে নীর।

পর্ণপুট
এনেছি পাঁচনি, শিখিচূড়া, ননী, কেঁচানাে রঙীন ধড়া,
বাঁশবন টুড়ি এনেছি বাশুরী যতনে ছিদ্রকরা।
গােটা গােকুলের আঁখিজলে ভেজা এসেছি আশিস নিয়ে,
ভাঙ্গা হৃদিভার রাঙ্গা আঁখি আর-একবার বল গিয়ে।
বলিস্ তাহার রােপিত লতাটি আজি ফুলে-আলােকরা,
ঘেরি নীপতল আসিয়াছে জল যমুনা দু’কুল ভরা।
যা ছিল মুকুল এখন তা ফল, চারা বাঁধিয়াছে ঝাড়,
আদরের বুধু হয়েছে ডাগর শিঙ উঠিয়াছে তার।
কোথা র’বে তার রাজসভা, দ্বারি, রবে না সে গৃহকোণে,
বুকে এসে ছুটে পড়িবে সে লুটে একবার যদি শশানে।
নয়ন রাঙায়ে দিও না তাড়ায়ে প্রহরী নিঠুরহিয়া,
দিব ক্ষীর সর ফলফুল তােরে,-একবার বল গিয়া।
২০

বৃন্দাবন অন্ধকার
বৃন্দাবন অন্ধকার
নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার,
চলেনা চল মলয়ানিল বহিয়া ফুলগন্ধভার।
জ্বলে না গৃহে সন্ধ্যাদীপ
ফুটে না বনে কুন্দনীপ,
ছুটে না কলকণ্ঠ-সুধা পাপিয়া-পিকচন্দনার।
ছোঁয়না তৃণ গােঠের ধেনু, ব্রজের বনে বাজে না বেণু,
করে না শ্যামরাধিকা লয়ে শারিকাশুক দ্বন্দ্ব আর।
পিয়ালফুলপরাগ মাখি’
আয়ত-তরলায়িত আঁখি,
হরিণী আজি লেহন করে চরণধাস্য কার ?
বৃন্দাবন অন্ধকার।
শিখীরা আর মেলিয়া পাখা করে না আলাে তমালশাখা,
কমলকলি ফুটে না, অলি লুটে না মকরন্দ তার।
কচে না কারাে নবনীসর,
হেলায় লুটে অবনী’পর,
করে না দধিমন্থ বধূ নাচায়ে চারু চন্দ্রহার।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
ফেনিল কেলি সলিলে নাহি, তটিনী আর ছুটে না গাহি’,
পাটনী কাদি’ তরণী বাঁধি করেছে খেয়াবন্ধ তার।
নৃপুর হার হারানাে ছলে
গােপীরা সাঁজে যমুনাজলে
করে না দেরী আজিকে হেরি হাসিটি শ্যাম-চন্দ্রমার।

পর্ণপুট
বাতাসে শ্বসি’ বেতসীবন
হুতাশে মরে হতাশমন,
রচে না কোলে ঝুলনদোলে মিলনপ্রেমানন্দ-হার,
সখারা শােকবিবশ বেশে
মুরছি পড়ে দিবসশেষে,
গাঁথে না মালা, ভরিয়া ডালা তুলে না ফুল বন্দনার ।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
গােপললনা নায়কহীনা
শােকশায়কে শায়িতা দীনা,
নয়ননীরে বাড়ায় ব্যথা-পাথার ভানুনন্দনার।
চিৎকুমুদী ঢুলিছে মুদি,
থেমেছে গীত কণ্ঠ রুধি,
গগাকুল মৃৎপিণ্ড হলাে, চলে না হৃৎস্পন্দ আর ।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
পাদমেকং ন গচ্ছামি
ব্ৰজের সখী, ব্ৰজের সখা, কঁাচ্ছ কেন আকুল রােলে ?
আমার সাধের গােকুল ছেড়ে কোথাও আমি যাইনি চলে।
রজের মাঝে পেয়ে আমায় শিহরে ঐ ব্ৰজের দেহ,
প্রতি হৃদয়স্পন্দে আছি, কেঁদ না ভাই তােমরা কেহ।
ব্ৰজের বাটে, ব্ৰজের ঘাটে, ব্ৰজের গােঠে, মাঠের মাঝে,
শম্পলতায় পুষ্পপাতায় আছি হেথায় নানান সাজে।
কাছ মিছে, নয়ন মুছে দেখ চেয়ে এই-যে আমি।
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি ।
বরণ আমার বিলীন হ’ল ব্ৰজের শ্যামল দূৰ্বাদলে,
শাঙন গগন মগন করি কালিন্দীর ঐ কালাে জলে।

পাদমেকং ন গচ্ছামি
ময়ূর-নাচা তমাল বনে সংশয়ে চাও মাঝে মাঝে,
ভুল তা’ত নয়, আমার চাচর চিকুর চুড়া সেথাই রাজে।
গােপাঙ্গনার অঙ্গটে আলিঙ্গিতে আহলাদিয়া
গলে’, গলে’ নামলাে গিয়া কালিন্দীতেই আমার হিয়া।
রসাল-শাখার শুক-শারিকা করছে আজো আমার নাম-ই,
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
বেণুর বনে বাজলে বাঁশী চমকে উঠ,—চেন’ নাকি ?
কালীদহের নীলােৎপলেও দেখনিকি আমার আঁখি?
কৃষ্ণসারের চরণ-পাতে থমকে দাড়াও চাও যে পিছে,
আমার চরণশব্দ সে ত,-একেবারে নয়ক মিছে।
বন্ধুজীবে রক্ত অধর,—কিসলয়ে নখর রুচি,
পদ্মদলে চরণ দুলে,কুন্দ ফুলে হাস্য শুচি,
চিনি-চিনি চিতে নার, চমকে উঠে চাও যে থামি,
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
পাটল অশােক-পলাশবাগে ফাঙ্কনে মাের রঙের মেলা,
পরাগরাগের হােলির ফাগে উচিত আমায় চিনে ফেলা।
বকুলডালে বেতস-বনে বাদল বায়ে ঝুলন করি,
ব্যাকুল চোখে চেয়েও থাকে যেন আমায় ফেলে ধরি।
দেখছনা ঐ চছে আমার রাসের লীলা চুপে চুপে,
হাজার ঢেউয়ে পৌৰ্ণমাসীর পূর্ণ শশীর হাজার রূপে।
উদাস বায়ুর পরশ দিয়ে বিবশ করি দিবসযামী,
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
২৭

পর্ণপুট
বঙ্গবন্ধু
আজি বন্ধু, তােমাদের শুভ নব বাসরের রাতি,
বৎসর চারিটি পরে পুনঃ জ্বলে উৎসবের বাতি,
সে যেন অনেক যুগ, যবে দুহু কৈশোের যৌবন
মিলিল প্রিয়ার অঙ্গে, গেলে তারে তেয়াগি তখন।
তারপর হতে নিতি দ্বিখণ্ডিত মৃণালের প্রায়
অবলম্বি’ তন্তুটুকু প্রাণরক্ষা আশায় আশায়।
মাঝখানে কত গিরি মরু হ্রদ নদী ব্যবধান,
অজ্ঞেয় বারিধি তার ভরিয়াছে রহস্যে পরাণ।
বর্ষার দুৰ্যোগ রাতে চমকেছে চপলার সনে
যেন এই উৰ্মিলার প্রাণকান্ত গিয়াছে কাননে।
নিশিদিন কত নদী সম্ভরেছে পিয়াসী অন্তর
নিরন্তর পার হলাে একা কত বিজন প্রান্তর।
বসন্ত নিশান্তে কত স্বপ্ন দেখে’ হয়েছে বিহ্বল
হারাই-হারাই শুধু আশঙ্কায় আঁখি ছল ছল ।
নিত্যগৃহ-কৰ্ম্মমাঝে নানা ছলে উন্মন চঞ্চলা
তােমারি বরণডালা সাজায়েছে তােমারি কমলা।
করবীভূষার লাগি কোনদিন তুলেনিক ফুল,
লিপির আশিস বিনা মাসান্তেও বাঁধেনিক চুল।
মধুটুকু বক্ষে পুষি কোনরূপে যাপিল শৰ্ব্ব
রজনীগন্ধার মত ক্ষীণ আশা-বৃন্তে ভর করি।
২৮

বন্ধু
নিত্য নিত্য লক্ষ পােত ভিড়িয়াছে তার চিত্ত-তটে
ধরিতে পারেনি এলে কোন্ পােতে সহসা নিকটে।
সংসার-প্রাঙ্গণ তলে এস বন্ধু, যােড়শ কলায়
অহিমধৌত ইন্দু উদি’ হেথা অমিয়া বিলায়।
যােল মধু পূর্ণিমার ফুল ফুলে যত্নে গাঁথা হার
আজি বন্ধু লহ কণ্ঠে,—পদে নমে যােড়শী তােমার।
হে প্রাজ্ঞ, হে সহৃদয়, আজি অজ্ঞা বঙ্গ-বালিকায়
হেরিতে হইবে শান্ত কৃপানেত্রে স্নেহের ছায়ায়।
ক্ষমিতে হইবে তার ত্রুটিময় প্রিয়বিনােদন,
ভাষায় ভূষায় ভাবে ভঙ্গিমায় দীন আয়ােজন।
কুড়ায়ে লইতে হবে ভূমি হতে দিতে গিয়ে পায়,
পুলকপ্রকল্পে অর্ঘ্য কর হতে যদি পড়ে যায়।
তুলসীবনের শারী কলরুত শিখেছে কেবলি
হৃদয়-পিঞ্জরে রাখি ক্ষমাে তার স্বভাব-কাকলী।
গুরু গুরু সুখমল ঘনস্পন্দে দুরু দুরু বুক,
ভিন্ন তনু তনিমায় বিলসিছে রােমাঞ্চ-কধুক,
সে আজিকে প্রাবৃটের কম্পমানা কদম্বের শাখা
ধীরে দিও পদভার, ওগগা শিখি, ধীরে মেলাে পাখা।
উপল-ব্যথিতা তন্বী তটিনীটি উপকণ্ঠে যদি,
মুরছিয়া পড়ে, তবে কণ্ঠে টেনে নিও প্রেমােদধি।
প্রেমাবেশে আত্মহারা, যদি নারে কহিবারে কথা,
নীরব বাগ্মিতা তার ক্ষমা কর’ স্তব্ধ কাতরতা।
২৯

পর্ণপুট
ভাবাবেগে রুদ্ধকণ্ঠ কুম্ভমুখে কলবিম্বসম
অসম্বন্ধ অসন্নদ্ধ অর্ধস্ফুট বাণী তার ক্ষম।
ক্ষমিও লুলিত দুটী মৃণালের ক্লান্তি অবসাদ
তরঙ্গপ্রহত আঁখি উৎপলের শতেক প্রমাদ।
হে বরেণ্য, হে স্নাতক, প্রেম তব পবিত্ৰ-সুন্দর
ব্রহ্মচর্য্যপূত শুচি শাপ-মুক্ত অমল ভাস্বর।
প্রেম-পৌরােহিত্যে আজি নবােদ্বাহ-কুশণ্ডিকা-যাগ
নিষ্ঠা শুদ্ধি জ্ঞানে দোহে রচ’ বন্ধু গৃহের প্রয়াগ।
ঢালাে পুণ্য মিলনের উষ্ণশীত আনন্দাশ্রুজল
অভিষেক করি তাহে গৃহে বসি লভি তীর্থফল।
পল্লীবালা
পড়িছে ঝলসি’ কুন্দ অতসী অনাদরে,
ব্যথিত গন্ধরাজ।
ঝরিয়া শুকায় শেফালিকা আজি নিরাশায়,
কুড়াত যে নিতি সে বালিকা আজি নাহি গাঁয়,
শ্রীফল-পত্ৰ আজি দেব-পূজা উপচার,
তুলসী মাত্র সাজ।
গৃহের লক্ষ্মী দুলালী গিয়াছে পরঘরে
এ-গৃহ আঁধার আজ।

পল্লীবালা
ঠাকুরের সেবা হয়ে গেছে আজ চুপি-চুপি,
সেটা নাহি বটে বাকী।
সরসীর পথে কলসী বাজে নি কনক্কন,
কোশাকুশী টাটে উঠেনিক ঘাটে খনখন।
প্রসাদী-কুসুম না পেয়ে বাছুর আসে ফিরে
নামায়ে কাতর আঁখি।
পিতা নিজে রচে পূজা আহ্নিক আয়ােজন,
চোখ মুছি থাকি থাকি।
খােকাখুকীদের হয়নিক আজ নাওয়া-ধােওয়া
কে তাদের ডেকে পুছে ?
ঘরে ঘরে আজ বাজেনিক মল ঝন-রন,
ভিখারী আসিয়া ফিরিয়া যেতেছে ঘন ঘন।
হরিনামঝােলা হয় না সেলাই ঠাকুমার,
সূতা যায় না যে চে,
খুকীটির গালে দাগ হয়ে আছে আঁখিজল,
কেবা দেয় বলাে মুছে ?
ধুলায় ধূসর ধবলী ফিরিছে ঘর-দ্বার
গােঠ হতে এসে ফিরে।
কাকে মাছ লয়, ছাগে খেয়ে যায় চাল-ধান,
পায়নিক দাদা আঁচাবার জল, সাজা পান,
ভুলাে পুষী মেনী ঘুরে ঘুরে কেঁদে হলে খুন,
গা’র লােম দুখে ছিড়ে ;
খাঁচার ময়না পায়নিক আজ জল-ছােলা
গেল গলা তার চিরে।
৩১

পর্ণপুট
বসেনি বাড়ীতে বেণী-বিনানাের বৈঠক,
আসেনি পাড়ার দল।
বালিশের তুলা, আকাচা কাপড় ঘরময়,
বাসন পাত্রে জিনিসপত্রে নয়ছয়,
আঙ্গিনার তরু পায়নিক আজ বৈকালে
একটী ফোটাও জল।
শিউলিছােপানাে শাড়ীখানি হেরি মা’র চোখে
ব্যথা ঝরে অবিরল।
ললিত কোমল ছােট দুটি ভুজলতা বটে,
কম কি ক্ষমতা তার ?
তারে পর-করা লােকে বলেছিল দায়-সারা,
ভাবেনিক কেহ অচল এ গৃহ সেই ছাড়া ;
সংসার পাত শিখিবার ছলে নিল সে যে
বহু জীবনের ভার।
আজি এ গৃহের শিশু পশু পাখী তরু লতা
করে সবে হাহাকার।
আহা সে যে কোন অপরিচয়ের মাঝখানে
বন্দিনী দিবা রাতি।
তথা গৃহভরা হাস্যোৎসব-কলরােলে,
আহত নিয়ত ফুলসম নদী-কল্লোলে।
অশ্রু মুছিছে অবগুণ্ঠন অঞ্চলে
নাহিক ব্যথার সাথী,
মা-হারা এ গৃহ কঁদে হেথা হায় লুটে লুটে
নিয়ে সাঁঝের বাতি।
৩২

পল্লীবধু
পল্লীবধু
না ধরিতে প্রাচী অরুণ বরণ, না ডাকিতে সব পাখী,
পাড়াপথে ঘাটে সাড়া না পড়িতে, ফুল না মেলিতে আঁখি,
কেগাে ঐ জাগি শয্যা তেয়াগি, দ্বারে দ্বারে ঢালে জল,
গােময় মাড়লী লেপনে জাগায় সুপ্ত তুলসী তল?
উঠান ছাড়িয়া না উঠিতে রােদ ঘরের পৈঠা 'পরে,
কলস ভরিয়া জল লয়ে কেবা স্নান করে ফিরে ঘরে?
বাড়িতে বেলা গৃহ-দেউলের বেদীমার্জন সারি’,
ধূসর বসনে কে পশে হেসেলে তসর শাড়ীটি ছাড়ি?
কার–লজ্জাশরমই সজ্জা পরম, অন্তর ভরা মধু?
সে যে-ভক্তি-নিষ্ঠা সেবায় শিষ্টা মােদের পল্লীবধূ।
ছেলেপুলেগুলি নাওয়ায়ে ধােওয়ারে খাওয়ায়ে করিয়া খুসী,
গুরুজনদের ভােজনের শেষে, অতিথি ভিখারী তুষি’,
দিনের অন্ন গ্রহণ করি কে সঙ্গিনীদের দলে,
হাসঝটপট খিড়কির ঘাটে মনের কথাটি বলে ?
করিয়া সেলাই মশারী দোলাই, সারি কাজ ঝট-পাটে,
পাড়ার মেয়ের খােপা বেঁধে দিয়ে চলে কে দীঘির ঘাটে ?
গৃহ-পারাবতে আহারে তুষিয়া খোপে খোঁপে কেবা থুয়ে,
সাজ দীপগুলি তেল সলিতায় রেখে দেয় মুছে ধুয়ে ?
কার–লজ্জাশরমই সজ্জা পরম অন্তর ভরা মধু ?
সে যে—দক্ষিণা দীনা, রুক্ষমলিনা মােদের পল্লীবধূ।
৩৩

পণপুট
সাঁজের বাতিটী আলিয়া আবার বাঁচায়ে আঁচল আড়ে,
তুলসীর মূলে দেবতা দেউলে ঘুরে কেগাে দ্বারে দ্বারে ?
উপকথা ক’য়ে, খেয়ে চুম, গেয়ে ঘুম-পাড়ানিয়া গান,
কোলের কুলায়ে আনে কে ভুলায়ে শিশুদের কলতান?
গুরুজনগণ-চরণ সেবিয়া লভি শুভাশিস শিরে
রুগ্নজনেরে ঘুম পাড়াইয়া চলে কে শয়নে ধীরে ?
শ্রান্ত শয়নে সেবার কেবা কান্তের পাদমূলে
ক্লান্ত নয়নে গভীর নিশীথে ঘুমঘােরে পড়ে চুলে?
কার–লজ্জাশরমই সজ্জা পরম, অন্তরভরা মধু ?
সে-যে—সন্তোষবতী কল্যাণী সতী মােদের পল্লীবধূ!
নাহি চাপল্য, মুখর ভাষণ, নাহি রাগ অভিমান,
আঁখিপুটতলে অশ্রুসলিলে সব ব্যথা অবসান।
গৃহ কোণে সদা শুভদা বরদা জানিতে পায় না পরে,
অজ্ঞাতবাসে আছেন দেবীরা দাসীবেশে ঘরে ঘরে।
কল্যাণ জপে মৌন মহিমা অবগুণ্ঠন-তলে,
কাহারাে অযথা তাড়নায় তার ধ্যান-ধীরতা না টলে ।
গৃহকাজে কর হয়েছে কঠোর, ক্ষয় হয়ে গেছে শাঁখা,
হলুদ কাজলে সিদূর তৈলে সতীর মাধুরী মাখা।
তার–লজ্জা-শরমই, সজ্জা পরম, অন্তর-ভরা মধু,
সেযে—প্রণয়ে সরলা বিনয়ে তরলা সুশীলা পল্লীবধূ।
৩৪

কুড়ানী
কুড়ানী
কুয়াসায় ভরা পাে’ষের বিষম হাড়-কনকনে জাড়ে,
অামীর চাচার খামারে মােরগ না ডাকিতে একেবারে,
চাটাই ছাড়িয়া উঠি তাড়াতাড়ি ছেড়া-কাঁথা গায়ে দিয়ে,
মাঠপানে ধাই ধান কুড়াইতে ছােট্ট ঝুড়িটি নিয়ে।
ক্ষেতে ক্ষেতে ঘুরি শামুকে করিয়া খুটে খুটে তুলি ধান,
গােটা শীষ যদি দেখি ভূয়ে পড়ে উথলিয়ে ওঠে প্রাণ।
হাঁটিয়া হাঁটিয়া এমনি করিয়া সারা হয় ধান খোঁজা,
নিয়ে যায় ঘরে পাড়ার লােকেরা আঁটিআঁটি বােঝ-বােঝ।
পিছু-পিছু যাই ঝুড়িটি লুকায়ে বা’র করি মাের ঝুলি,
যেটি পড়ে ভুয়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে সেটী খুঁটে লই তুলি।
ঠোট মুখ গাল জাড়ে জরজর পা'দুটা গিয়াছে ফাটি,
ছুটে আসি যাই কি করিবে বল’ মাঠের কুচল মাটি ?
ছােট্ট ঝুড়িটি হয় চুরচুর ভরে যায় মাের ঝােলা।
লােকে কয় “চাষে কি করিবি তাের? কুড়নী বঁধিবে গােলা।”
শীত যায়-যায়, ক্ষেতে নেই ধান, ধু-ধু করে সারা মাঠ,
মরমর করে শুনাে পাতায় গাছতলা পথঘাট।
ছােট্ট ঝুড়িটি রাখিয়া এবার বড় ঝকা লই কঁাখে।
শুনাে পাতায় উঠানে কোথাও জায়গাটুকু না থাকে।
দুপুরে গােবর-ঝুড়িটি লইয়া ফিরি রাখালের পাছে,
বাজে কথা ক’য়ে ঘুরি ফিরি গােৰুবাছুরের কাছে কাছে।
বিকালে বেরুই, কাঠ-খড়ি খুজি বনে-বনে মাঠে-মাঠে,
পড়শিরা কয়, “শশবে একদিন কুডুনী রূপাের খাটে।”

পর্ণপুট
বাল্লা লাগিলে পথে ঘাটে কাদা, নিভে আসে খর তাপ,
তালপাতা দিয়ে বাঁধা চালাটিতে জল পড়ে টুপটাপ ।
কাঠকুটো কিছু মিলে না কোথাও, জ্বলে না সহজে আখা,
আমার দুয়ারে আসেন সবাই হাতে লয়ে ঝুড়ি-ঝাঁকা।
নালীর ‘পাউযে’ জালিটি পাতিয়ে বসে থাকি আমি ঠায়,
চুনােপুটা দুটো আঁচলে গিঠিয়ে ফিরি কাদামাখা গায়।
বর্ষা ফুরায় লাউকুমড়ায় গােটা চাল যায় ভরে,
ডােবায় ডােবায় কলমী শুশুনী তুলে আনি ঝুড়ি করে।
নালাটি শুকায় কঁকড়া লুকায়, মাছ ঢুড়ে মরা মিছে,
গুগুলি শামুক কুড়িয়ে বেড়াই জেলেদের পিছে পিছে।
তালটি বেলটি কুড়ালে লােকেরা হা-হা করে আসে ছুটে,
মাের ভাগে থােয়, লােকে যা’না ছোঁয়, নিতে হয় তহাে খুটে ।
এমনি করিয়া তিলটি কুড়ায়ে তালটি করিয়া জড়,
কুড়ানাে ভাতে এ পেটটি ভরায়ে হয়েছিত এত বড়।
খোড়া মা আমার ঘরে পড়ে রয়, বাপমরা মনে নাই,
ঘরটি পুড়িলে পাড়া-পড়শীরা দেয়নিক কেউ ঠাঁই।
কাচা আ’লে কারাে দেইনা পা আমি, পাকা ধানে কারো মই,
চাকরী করি না ভিখ, ও মাগি না এমনি করেই রই ।
অনেক বকেছি কুডুনী বলিয়া ডেক’নাক মিছে পিছু,
মাঠে যে হাঁটিলে বুড়িটি ভরিবে, টুড়িলে মিলিবে কিছু।

কৃষকের ব্যথা
কৃষকের ব্যথা
এমন করে, কেমন করে আঁধার ঘরে আর
তােমায় ছেড়ে রইব আমি নিয়ে তােমারি ভার ?
দুয়ারে নেই জলের ছড়া-উঠানে নেই ঝটি,
বিহানে আর গােয়াল ঘরে করে না কেউ পাট।
গাইয়ের দুধ শুকায় বাটে হয় না গাই-দোয়া,
খামার-ক্ষেতে তােমার ধান-খড় যে বায় খােয়া।
গােয়ালে নেই সাঁজাল ধোয়া,পড়ে না ঘরে সাঁজ,
মাদুর পেতে কে দেবে? শুই গামছা পেতে আজ।
বারেক ফিরে এসে
লক্ষ্মী মাের লও গো ভার তােমার ঘরে হেসে।
একটী বাছা কঁাধে যে কাদে আরটি রয় কঁাখে,
তিলেক পিছু ছাড়ে না খুকী মাঠেও সাথে থাকে
ক্ষেতের ধারে খােকাটি হায় নালায় গড়াগড়ি,
সকল কাজে অবুঝ মেয়ে ঘাড়েই রয় পড়ি।
টোকায় করি বিহানে তারা পায় না মুড়ি লাড়ু,
নেইক নাওয়া সময়ে খাওয়া ঘুমটি নেই কারু।
দুপুর রাতে উপুড় হয়ে কঁদিয়া তােমা চায়,
উদুম গায়ে কাপে যে জাড়ে দোলাই নাহি পায় ।
বারেক ফিরে এসে
তােমার ছেলে লওগাে কোলে বদন চুমি’ হেসে।
৩৭

পর্ণপুট
নিড়ানী হাতে আখের ক্ষেতে কাদাতে রই বসে,
পায়ের চাপে ডােবে না দুনী কোদাল পড়ে খসে ।
কাদ-কাদ’ সে কাজল আঁখি মনে যে উঠে জ্বলি,
ধানের চারা উপড়ে ফেলি আগাছা ঝােরা বলি'।
বাড়ীতে ফিরে জিরানাে নাই, চড়াতে হয় হাঁড়ি,
যে-কাজ শুধু তােমারে সাজে আমি কি তাই পারি ?
হারাই হুস হেঁসেল-ঘরে কিছু না খুজে পাই,
ফেনে যে ঢালি নুনের সরা, ডালে যে ঢালি ছাই।
বারেক ফিরে এসে
হলুদপোঁছা শাড়িটি পরি’ হাতটি ধরাে হেসে।
শান্তিপুরে তােমার ডুরে আঁকড়ি চেপে ধরি,
চোখের জলে অঝােরে ভিজে মেজেয় রই পডি।
কার কোমরে সােহাগভরে পরিয়ে দেব গােট,
যার লাগিয়ে আর-ফাগুনে ধরিয়াছিলে খােট?
মনে যে আসে রােগের মাঝে সকল-সহা মুখ,
পায়ের ধুলাে মাথায় লওয়া গুরে উঠে বুক।
বাদলে ভিজে হাঁটিয়াছিলে উঠানে মাের লাগি,
ফুটিয়া আছে পায়ের দাগ গােলার পাশে জাগি।
বারেক ফিরে এসে
আতা পরাে আবশী ধরে খোঁপাটী বাঁধাে হেসে।

কৃষাণীর ব্যথা
কৃষাণীর ব্যথা
সুখের এ ঘর গড়িয়া তুলিয়া বুকের রক্ত দিয়া,
আজ কোথা তুমি চলে গেলে হায় সংসার আঁধারিয়া ?
ধানে ধানে আজ উঠান ভরেছে, ঠাঁইটুকু নেই আর,
মঙ্গলা আজি ঢালিতেছে দুধ বাছুর হয়েছে তার।
মাচান ছাপিয়ে লাউলতাগুলি ভুয়ে লুটে লুটে পড়ে,
পালঙের শীষে শাকের চাকড়া আগাগােড়া আজ ভরে।
সন্ধ্যামনিতে আলাে হয়ে আছে সারা আঙিনাটি ঐ,
আজ সংসারে সবি ভরপুর, হেন দিনে তুমি কই?
দুবেলা পাওনি পেট ভরে খেতে গিয়েছিল দেহ ভেঙে,
লুকিয়ে চোখের জল মুছে তুমি ভিক্ষা এনেছ মেঙে।
একমুঠো চাল চিবাতে চিবাতে রুইতে গিয়েছ চলি,
উপােষ করিয়া রাত কাটায়েছ ক্ষুধা নাহি মােরে বলি।
দুপুরের তাতে বাদলের ছাটে খেটে খেটে দিনরাত
মাঠে মাঠে ঘুরে কনকনে জাড়ে করেছ পরাণ-পাত।
সাঁঝের বেলায় হেঁটে হুটে এসে এলারে পড়েছু ঘুমে,
রাত্রি কাবার না হ’তে আবার চলেছ থােকারে চুমে।
বাকী খাজনার লাগি জমিদার দিয়েছে যাতনা কত,
মহাজন, দেনা সুদের জন্য গঞ্জনা দেছে শত।
চুপ করে সবি সয়েছ, আহা রে! দুটী হাত জোড় করে’
সকলের কাছে সময় নিয়েছ হাতে পায়ে ধরে পড়ে।

পণপুট
রােগে পড়ে, থেকে সংসার নিয়ে কতই দিয়েছি জ্বালা,
ক্ষুধায় কঁদিয়ে করেছে ছেলেরা কানদুটো ঝালাপালা ।
যাতনা দুঃখ কতনা সয়েছ কথাটি ছিল না মুখে
ফিরে এস আজ ঘরটী তােনার ভরিবে সােণার সুখে।
ঘনায়ে আসিছে সাঁঝের আঁধার নাহি মাের কোন কাজ,
এ ঘর দুয়ারে পড়েনিক ঝট জ্বলেনি এখনো সাজ।
চালের বার্তায় ঝি ঝি-পােকাগুলাে বুক চিরে চিরে ডাকে,
উঠিতে বসিতে টিকটিকি পড়ে ফাটা দেওয়ালের ফঁাকে।
ঐখানে আহা পীড়ের উপর শুইতে গামছা পাতি’
ঝুলিতেছে ঐ লাঠী, চোঙ, মই, মাথালী, তালের ছাতি ।
ঘাটের ধারের বাঁশবন পানে সারারাত চেয়ে কঁদি,
ঐখান হতে নিঠুর বাঁধনে লয়ে গেছে তােমা বাঁধি।
তেমনি পড়ে গাে কাল ছায়া ঐ ভরিয়া বকুলতল,
বৈকালে যেথা এলানাে শরীরে চাহিতে ঠাণ্ডা জল।
সাঁজে ভােরে সেই পাখী গুলাে ডাকে, প্রাণ আনচান করে,
বেলা হয় তবু গােরুগুলাে সব বাঁধা রয়ে যায় ঘরে,
পথ চেয়ে হায় বসে থাকি ঠায়, জ্বলে না দুপুরে চুলাে ।
আপন ছেলেরাে নাম ভুলে যাই মনটা হয়েছে ভুলাে ।
মালতী তােমার এসেছে ফিরিয়া শ্বশুরের ঘর থেকে,
খােকা যে তােমার হটিতে শিখেছে, একবার যাও দেখে।
৪০

হা-ঘরে
এত সব ফেলি জনমের মত চলে যাওয়া কিগো সাজে?
তবে কিগাে তুমি ‘প্রবাস’ গিয়েছ আমাদের কোন কাজে ?
নায়েব নগদী পাওনাদারের জোরজুলুমের ভয়ে,
চলে গেলে কিগো মনের দুঃখে কিছুই না বলে কয়ে ?
তাই যদি হয় ফিরে এস তুমি তােমারে সঙ্গে পেলে,
খােকারে লইয়া পালাই কোথাও ঘর-সংসার ফেলে,
ভিক্ষা মাগিব কাঠ কুড়াইব, ফিরিব না আর বাড়ী,
আঁচলের গিঁঠে বাঁধিয়া রাখিব তিলেক দিব না ছাড়ি।
হা-ঘরে
হা-ঘরে ঐ ঘুরে বেড়ায় সঙ্গে করে গৃহস্থালী,
জীবনজোড়া পুঁজি তাহার বাকঝুলানো দুটী ডালি,
কোলের ছেলে, সাপের ঝাঁপি, ভাতের হাঁড়ি, মাটির থালা,
ডুগডুগি আর তেলের চোঙা, সবুজ কাচের কণ্ঠমালা।
আশমানই তার ঘরের চালা রবিশশীর আলােকজ্বলা,
মাঠ-মরু তার বাড়ীর উঠান, প্রমােদ-ভবন গাছের তলা।
ঝােপের ভিতর জন্ম তাহার পান করে জল ঘাট আঘাটে,
সেইখানে তার রাতের ডেরা যেথায় রবি বসেন পাটে ।
৪১

পর্ণপুট
কোনাে রাজার নয়কো প্ৰজা দীনদুনিয়ার মালিক বিনে
মুখ চেয়ে সে রয় না কারো থাকে না সে কারাে ঋণে।
সকল বাঁধনহারা সে যে জানেনাক সমাজরীতি,
জীবনপথে লক্ষ্যহারা,মানেনাক স্বাস্থ্যনীতি।
আজকেরই তার মাত্র পুজি ভাবে না তা’ও কাল কি খাবে।
অশ্বমেধের অশ্বসম বিশ্বে আপন বশ ভাবে।
যায় না কোনো সদাব্রতে যায় না ধনীর দেউড়ি ঘরে,
তরুতলের অতিথ গাঁয়ে, তাও শুধু এক তিথির তরে।
একটি দিবস গাছের ডালে ঝােলে তাহার ভাতের হড়ী।
গাঁয়ের ছেলে দেখতে জমে একটি দিনের তাহার বাড়ী।
ভালুক তাহার হুকুম পেলে কেঁাক্টে করে জ্বরটি আনে,
সাপটি ফণা নত করে’ লুকায় ঝাপির মধ্যখানে !
জানেনাক ভিক্ষা মাগী চাকরি চুরি প্রবঞ্চনা,
প্রাণের অভাব সব চুকে যায় পেলে পরে একটি কণা।
জীবিকা তার সাপখেলানাে নানানরকম বাজীর খেলা,
মনে পড়ায় বাজীর ছলে বিশ্ববাজিকরের মেলা।
কোনাে শাসন রুক্ষ ভাষণ পারেনি তায় আনতে বাগে,
সকল আইন হদ্দ হয়ে হার মেনেছে তাহার আগে।
পথের সাথীর পতন দেখি থামে না সে যাত্রাপথে,
যুধিষ্ঠিরের মতন চলে স্বর্গে অটল চরণ-রথে ।
82

গ্রাম-পথে
গ্রাম-পথে
কোন কাজে মন লাগে না জ্বর আসে কাজ কাজের নামে,
নগর ছেড়ে গেলাম আজি বেড়াতে তাই একটি গ্রামে।
পথে যেতে শুতে পেলাম ছাপিটানাে ধ্বনির সাথে,
গলা ছেড়ে গান গেয়ে সব রাজ-রেজারা হর্ষে মাতে।
এগিয়ে যেতে ডাইনে দেখি ধূলােমাখা ক’জন কুলী,
‘হেঁইয়ো জোয়ান’ গান করে কি ভারী জিনিস্ ঠেছে তুলি
বাঁয়ে দেখি ঘাঘরা-পরা মেয়েগুলো ঘুরােয় জাঁতা,
গান ধরেছে সমস্বরে তালে তালে দুলায় মাথা।
গঙ্গাতীরে এলাম ক্রমে দেখতে দেখতে কাণ্ড হেন,
ঠাণ্ডা হাওয়া লাগলে গায়ে মনটা হলাে হাল্কা যেন।
নিলাম আসন ছইএর 'পরে তক্ষণি এক নৌকা ডেকে,
ইচ্ছা হলাে আজ বিকালে ঘুরে আসি বনগাঁ থেকে।
নেচে নেচে হেলে দুলে চল্ল সে না’ নদীর 'পরে,
গান ধরিল মনের সুখে পঁড়িমাঝি সমস্বরে ।
করাতীরা কাঠ চিরিছে নদীর ধারে গাছের তলে,
মনে হলাে নাচছে তারা উল্লাসে কাঠ চেরার ছলে।
গ্রাম ঢুকতে দেখি কে ঐ নেচে নেচে শাচে কাদা,
নেইক শরম দেওয়াল’ পরে হয়ত ব’সে তাহার দাদা।
গায়ে ঢুকে ডাইনে দেখি কামারশালে বাপবেটাতে,
লােহা পেটায়, পেটাক তারা, নাচছে কেন মুগুর হাতে ?
৪৩

পর্ণপুট
বায়ে দেখি বেড়ার ফাঁকে নাচ্চে বধূ টেকির 'পরে,
কাজ আজি তার লাজ হয়েছে, দুলিছে গােঠ তার কোমরে।
নাচের তালে বারবারই তার ঘােমটাখানি পড়ছে খসে,
পথের লােকে যাচ্ছে দেখে, শ্বাশুড়ী তার সামনে বসে।
মাঠের পথে দেখি কঁাখে ভরা কলস কঁাকণ-বাজা
পল্লী-বধূ চছে নেচে ঘােমটা মাথায়, দুলিয়ে মাজা।
মাঠে গেলাম সেথাও দেখি তফাৎ নাহি একটুখানি,
দুনীর পরে নাচছে চাষী, সিনী হাতে তার কষাণী
এ সব দেখে মনে হলাে,-কৰ্ম্ম শুধু ঘৰ্ম্ম নহে।
বিশ্বকর্মা বেজায় রসিক তঁায় বেরসিক মূর্থে কহে।
শ্রমের বুকে প্রেম নাচে গায়, কৰ্ম্মেরাে প্রাণ-মৰ্ম্ম আছে,
শুধুই সেত ঘামায় নাক, গাওয়ায় গাহে, নাচায় নাচে।
বিশাইঠাকুর শুধাই তুমি সবার বেলায় রসিক হেন,
আমার কাজে বেতালা আর বেসুরাে হায় করলে কেন?
৪৪

মেঠো পথে মেঠো পথে রাত্রি দুইটার ট্রেনে নেমে মেঠো এষ্টেশেনে তখনি ছাড়িয়া দিমু গাড়ী, ঘণ্টায় একটি ক্রোশ চলে যদি দুটি মোেষ, সকালেই বাড়ী যেতে পারি। ঠায় পায় চলে তারা পাচনির নেই তাড়া সারাপথ চালক ঘুমায়, আমি শুধু রাত্রি সারা বসিয়া রহিনু খাড়া, এ নিশীথ ভুলালাে আমায় সারাপথ অন্ধকার ক্ষীণ আলো তারকার মাঝ মাঠে তাহাই সম্বল, চারিদিকে সবই চুপ, প্রকৃতির কালােরূপ এ কান্তারে করিল বিহ্বল। ঠেলি ঘন আঁধিয়ারে বাতাস ছুটিতে নারে ঝিরি ঝিরি বহে সে মন্থর আউচ ফুটেছে কোথা দিয়ে যায় সে বারতা, ধীরে ধীরে সন্তরে প্রান্তর। কভু ওঠে কভু নামে কভু বা ঘুমন্ত গ্রামে নীরবে প্রবেশে মাের রথ, ধীরে-কর’ নাক শব্দ ইঙ্গিতে শাসিছে স্তব্ধ ঘনধূলাভরা শ্রান্ত পথ। তেঁতুল গাছের কোলে বেদিয়া বাদুড় ঝােলে তারা যেন আঁধারেরি ছানা, ৪৫ পর্ণপুট চাহিবারে উগ্ধপানে তারা মাের দৃষ্টি টানে, ভয় তারে করেন। ক মানা। পশ্চাতে প্রান্তর ফেলি নিবিড় তিমির ঠেলি বনপথে গাড়ী যবে ঢােকে, নিরুপায়ে মনে হয় অতল রহস্যময় পাতালে চলেছি নাগ-লােকে। বনফুল বাসধূপে সুরভিত শ্বাস রূপে টেনে লই যেন অন্ধকার, শুনি করে চেঁচামেচি বটগাছে পেঁচাপেঁচী থামাইতে ঝিল্লীর ঝঙ্কার। চন্দ্রালােকহীন নভঃ চন্দ্রাতপ তলে নব পরিচয় তমস্বিনী সনে। যেথা দিগদিগন্তরে একেশ্বরী রাজ্য করে, সে চিত্রটি রয়ে গেছে মনে। এমন মাধুরীময় আঁধার যে কভু হয়, স্বপনেও পাইনি সন্ধান, হেন রূপ তমসার কখনাে হেরিনি আর পূর্ণিমাও তার কাছে ম্লান। মিথ্যা কথা বলিব না ছিল গৃঢ় আশ্বাসনা প্রান্তরের সে তিমির তলে, সে যে সুপ্রভাতখানি গৃহাঙ্গনে দিবে আনি একখানি বদন-কমলে। ৪৬

ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিনে
ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিনে
তােমার ফোঁটাটি বিনে
ললাট আমার করে হাহাকার আজি এই শুভদিনে।
এক পরিবারে তােমার আমার জন্ম হয়নি বটে,
পাইলাম তােম। জীবনধারার প্রভাত-শৈল-তটে।
জ্ঞাতিজাতিকুলে কোন যােগ-ডােরী ছিল না তােমার সাথে,
তােমারি চিন্তা ললাটের তলে তবু জাগে আজ প্রাতে।
ছিলে—তুমি ত পাড়ার মেয়ে,
বাল্য-জীবনে কেবা ছিল তবু ‘আপন’ তােমার চেয়ে ?
আজিকে তােমারে স্মরি
স্বপ্নে বিভাের দুনয়ন মাের অশ্রুতে আসে ভরি’ ।
তােমার সাথে যে মনে পড়ে মাের পল্লী-জীবনখানি,
হাসিভরা চোখে সঙ্গীরা পুন দেয় মােরে হাতছানি।
উপায় থাকিলে ফিরিয়া যেতাম মিলিতে তাদের সনে,
করবীকুঞ্জে, নাটমন্দিরে, সন্ধ্যার অঙ্গনে।
আজি—একটি ফোটার প্রীতি
জাগায় এ মনে গােটা পল্লী ও সারা বাল্যের স্মৃতি।
আজি হায় অকারণে
কত না তুচ্ছ বাল্যবিনােদ একে একে পড়ে মনে।
মনে পড়ে বুড়ী দিদিমার ঘরে কুলের আচার চুরি,
লাটাইএর সূতা তুমি মেজে দিতে আমি উড়াতাম ঘুড়ি।
৪৭

পর্ণপুট পুতুলের বিয়ে ভেঙে দিয়েছিনু সে দিন কী তব শােক। মনে পড়ে সেই কাতর চাহনি তব ছল ছল চোখ। আমি—পাড়িতাম কত ফল গাছের তলায় কুড়াইতে তুমি ভরিতে নীলাঞ্চল। টানিতে কুয়ার দড়ি কত বার তুমি এলায়ে পড়েছ—আমি গিয়ে শেষে ধরি। মনে পড়ে তব মােলক দুলায়ে মুখখানি ভার করা, বিজয়ার রাতে নমিতে আমায় হাসিয়া লুটায়ে পড়া। প্রথম যে দিন রাধিতে শিখিলে আমারে খাওয়ালে ডেকে, এক দিন পাকা পেঁপে-ফল পেয়ে আনিলে আঁচলে ঢেকে। আরাে—এমনি কতই ছবি ললাটের তলে জাগে দলে দলে সহসা মুক্তি লভি। সব চেয়ে পড়ে মনে, আজিকার দিনে যে ফোটা কপালে দিতে চুয়া-চন্দনে শুচিতায় ভরা নব বাস পরা এলায়ে আর্ল চুল, ভঙ্গী তােমার মম শ্যামাঙ্গী পল্লীরই সমতুল, নাহি তারল্য, নাহি চাপল্য, সহসা শান্তরূপ- অন্তরে তব দহিত সুরভি কল্যাণকাম ধূপ- তারি—ধূম সৌরভ-ভার ঘন হয়ে তব আঙুলে এ ভাল পরশিত তিনবার। ৪৮

জাতৃদ্বিতীয়ার দিনে
স্মরি যে ভগিনী মাের
আমি যােগাতাম মালিকার ফুল তুমি যােগাইতে ভাের।
কোন’ ডাের আজি বাধে না তােমায় বাল্যজীবন সনে ?
মুকুলের স্মৃতি একেবারে গেল পরিণত ফল-বনে ?
সারা বৎসর ভুলে থাক বােন ক্ষতি নাই, ক্ষোভ নাই—
অজিকার দিনে স্মরিবে না—আরাে ছিল যে একটি ভাই ?
এই—বারাে বছরের সাথী
কেউ নয় তব-মিথ্যা স্বপ্ন বাল্যেরখেলা-পাতী ?
এ কেমন বােন রীতি
গােত্র-বদলে ভুলে যেতে হবে মৈত্রী-লােকের প্রতি ?
মিছে দ্বিধা ভয়—ভগিনী-হৃদয় হবে কি কঠোর অত ?
দুহিতারা তব মুকুলিত স্মৃতি জাগাইছে অবিরত।
যেখানেই থাক দ্বার-দেহলীতে ফোটা দিও মাের নামে,
স্মরণ-সরণী ধরিয়া সে ফোটা পৌছিবে যথাধামে ।
তব—চুয়ার পরশ স্মরি,
এ ললাট-মরু করে হাহাকার, হে স্বপ্ন-সহচরি ।
৪
৪৯

পর্ণপুট
বাল্যসাথী
শীঘ্রি তােমার বিয়ে হবে শুনে হলাে বড় আলাদ,
যেমন দুষ্ট, জব্দ হইবে, মিটিবে আমার সাধ।
কথায় কথায় কেবল ঝগড়া, খেলায় দিয়েছ ফাঁকি,
খেলার পুতুল ছুঁলেই অমনি রাঙায়েছ কালাে আঁখি।
বেশ হলাে এইবার
ঘােমটায় মুখ ঢেকে র’বে চুপ—শাস্তিটি পাবে তার।
বিয়ের দিনটি ঘনায়ে আসিল চারিদিকে আয়ােজন,
এয়ােদের হুলু কলরব শুনে মাতিয়া উঠিল মন।
নিজ পয়সায় পিচকারী এক বাজার হইতে কিনে,
রঙ খেলিলাম, ভূত সাজিলাম গায়ে হলুদের দিনে।
ডাকেনিক কেউ মােরে,
বিয়ে-বাড়ীতেই কাটিয়ে দিতাম তবু সারাদিন ধরে।
বিয়ের রাত্রে কত খাটিলাম লেখা-জোখা নেই তার,
পাত পাতিলাম লইলাম আম পরিবেষণের ভার।
আসর সাজানাে, বাসর সাজানাে,স্মরি হাসি পায় আজ,
ছােট্ট হলেও বড়দের চেয়ে বেশিই করিনু কাজ।
সেদিন প্রথম জানি
খাটায় আমােদ কতই, আমােদে খাটা যায় কতখানি।
পরদিন প্রাতে পাল্কী তােমার চলিল গাঁয়ের মাঠে,
চেয়ে চেয়ে তাই দেখিলাম ব’সে ময়না-দীঘির ঘাটে।

বাল্যসাথী
দৃষ্টির সীমা পার করে তােমা বাহকেরা নিয়ে গেল,
পাল্কীর বােল ক্ষীণ হ'তে ক্রমে ক্ষীণতর হয়ে এল।
কান্নার অধিকার
আছে যাহাদের এলাে তারা ঘরে আঁখি মুছি বারবার।
আমি ফিরিলাম অশ্রু-পাথার কষ্টে চাপিয়া ঠোঁটে,
তখনাে শানায়ে বারোয়ার সুর ফুপিয়ে ফুপিয়ে ওঠে।
নিমগাছতলে যেখানে তােমার খেলাপাতি আছে পাতা,
একলা পরাণ ভরে কঁদিলাম তরুমূলে রাখি মাথা,
আজিও যাইনি ভুলি,
সাক্ষী তােমার নীরব দরদী খেলার পুতুলগুলি।
জনমের মত খেলা শেষ হলাে, বাল্য ও হলাে শেষ,
ভাল ছেলে হয়ে পুথিপত্তরে করিনু মনােনিবেশ।
ঢাকিত তােমার ছবি মাঝে মাঝে গণিতের অঙ্কন,
প্রতি ছন্দেই শুনিতাম দূর শানাইএর ক্রন্দন।
খেলা পাতিটির সাথে,
মাের মুখরতা চপলতা তুমি মুছে গেলে নিজ হাতে।
ভুলিয়াছি ক্ৰমে কালের নিয়মে, তবু আজো মাঝে মাঝে,
বালক-বালারে খেলিতে দেখিলে কোন দূর ব্যথা বাজে।
চীনে করবীরা ফুটে যবে গাছে, ঘুঘু যবে ডাকে ছাদে,
বাল্যের খেলা-পাতিটির লাগি পরাণ আমার কাঁদে।
লক্ষ কাজের ভিড়ে
তােমাররা মনে কি পড়ে খেলা-সাথী বাল্যের সখাটিরে ?

পর্ণপুট
ভাদুরাণী এস ঘরে
নিয়ে তপন সারাটি গগন ঢেকে গেছে মেঘে মেঘে,
সঘনে গরজি বিজলি চমকে ভ্রুকুটি হানে সে রেগে ।
বাদল থেমেছে ভেবে মাঝে মাঝে পাখী কলতান ধরে
এহেন বাদরে আদরিণী মেয়ে ভাদুরাণী এস ঘরে।
টোপর-পানায় পুকুর ভরেছে কোন খানে নেই ভাঙা,
জলা বলে মনে হয় ডাঙাগুলো জলে মনে হয় ডাঙা।
ভুলে ভরা সব, কোথায় ফেলিতে কোথা সে চরণ পড়ে,
এহেন দুপুরে থেকনাক দূরে,ভাদুরাণী এসাে ঘরে।
ঘন বাড়ন্ত আখের পাতায় আলিপথ গেছে ঢেকে,
কঁকড়া শামুক মাছ ব্যাঙে ভরা নালী গেছে একে বেঁকে।
আজি পাট ক্ষেতে হাতী ডুবে যায়। মন যে কেমন করে,
কঁদিছে দাদুরী আদরিণী মেয়ে ভাদুরাণী এস ঘরে।
বনপথ-তল হয়েছে পিছল, ডুবেছে ঘাটের সিড়ি,
গােরুগুলাে বাধা গােহালে গােহালে কৃষাণ আসিছে ফিরি।
বাদলা বাতাসে ভূতের মতন ঝাউগাছগুলি নড়ে,
কি বিপদ আনে কখন কে জানে? ভাদুরাণী এস ঘরে।

ভাদুরাণী এস ঘরে
কুকুর ধুকিছে ঢেকিশালে শুয়ে ময়না ঝিমায় শিকে,
কুণ্ডলী বঁধি উঠে ঘন ধূম চাল ফুড়ে চারি দিকে।
বাবুইএর বাসা তালগাছ হ’তে ছিড়িয়া পড়েছে ঝড়ে,
যুঁইবন হায় কাদায় লুটায়, ভাদুরাণী এস ঘরে।
হাত পেতে আছে ছেলের, ভাজিছে মা তাদের তালবড়া,
বালিকারা মিলি আড়াআড়ি করি গাহিছে তােমার ছড়া।
ঘরের সাঙায় কপােত ঘুমায়, বসে না চালের’ পরে,
নীড়ের বাইরে কেউ নেই আজ ভাদুরাণী এস ঘরে।
আসিয়াছে ঢল, খেয়াঘাটে গােটা প্রহরে জমিছে পাড়ি,
পাল তুলে শত নৌকা চলেছে,—কোথা কোন দেশে বাড়ী ?
উচাটন মন তোমা সারা খন চারিদিকে খুজে মরে,
কোথা ডামাডােল বেধেছে কে জানে? ভাদুরাণী এস ঘরে।
৫৩

পর্ণপুট
ভােজের ডাকে
নেমতন্ন বােসেদের বাড়ী,
খুই যায় মধু যায়
ও পাড়ার যদু যায়
ঘােযেদের রাধু বিধু ছুটে তাড়াতাড়ি।
গ্রামের বনেদী ধনী
রায় বাবুদের ননী
আছে বসে নেমতন্নে যাবার আশায়,
রাত হ'তে, নেই ঘুম লাগায়েছে মহাধুম
দাপায়ে লাফায়ে কেঁদে সবারে হাসায়।
তিনটা বাজিয়া গেলে
দলে দলে সব ছেলে
চলিয়াছে ভােজবাড়ী, পড়িয়াছে ডাক ;
সাটিনের জামা গায়ে রাঙা জুতাজোড়া পায়ে
বাহির হয়েছে ননী করে বড় জাঁক।
হেন কালে হায় হায়
বাপ এসে ধমকায়,
‘বােসবাড়ী নেমতন্নে যাস্ তুই বুঝি,
ওরা কি খাওয়াবে আর? দিন চলা তাও ভার,
মাসে পঁয়ত্রিশ টাকা ওদের ত পূজি।
চলেছি সন্ধ্যাকালে মেতে যে ছেলের পালে?
দেখিনি এ রায়-বংশে এমন পেটুক।
বুঝেছি মেয়েরা তােরে পাঠায়ে দিয়াছে ধরে,
অবেলায় ভাত গিলে করুক অসুখ।
ভােজ পেলে ফের নাচা? বাড়ীতে কি নেই বাছা ?
বল দেখি পাক কি জিনিস খেতে?
৫৪

ভােজের তাকে
ফলমূল ক্ষীর ছানা নিত্যি কত খাবি খা’ না,
কাল ত পােলাও মাংস খেলি বাপু রেতে।
কি খেতে তুই না পাস পরের বাড়ী যে যা ?
রােজ-রােজ হয় ভােজ ভােদেরি বাড়ীতে,
রুইমাছ ঝুড়ি ঝুড়ি
রাশ রাশ লুচি পুরী
সন্দেশ আসিছে নিতি হাঁড়িতে হাঁড়িতে।
বিষম প্রমাদ গণি
কেঁদে গড়াগড়ি ননী
মাটিরে জানায় তার ক্ষুব্ধ কাতরতা,
পিসীমা আসিয়া তােলে বলে তারে লয়ে কোলে,
ছেলে মানুষের সাধ, যাক, সেকি কথা?
ননীর বেদনা যাহা কেহ নাহি বুঝে তাহা
কেন তার সাজগােজ এত ধুমধাম,
জোর করে ধরে যারে খাওয়াইতে হয় তারে
পিতা কিনা দেন আজ পেটুক দুনাম।
বেণেদের মধূ যায়
সেনেদের যদু যায়,
পাড়ার সবাই আজ যেতেছে যেথায়,
কি কারণে কি দোযেতে সেখানে পাবে না যেতে
ননী যে তাহার কিছু খুঁজিয়া না পায়।
সেখানে সবার সাথে মিলেমিশে কলা-পাতে
কড়কড়ে ভাত খাওয়া বসিয়া উঠানে,
সে আনন্দ সে উল্লাস
হৃদয়ের সে উচ্ছ্বাস
মিলিবে সে দিন কিগাে বাড়ীর দালানে ?

পণপুট
খাইয়া আপন ঘরে
নিত্য বটে পেট ভরে
কবে মিলিয়াছে হায় বুকভরা সুখ ?
সেথা চেয়ে চেয়ে খাওয়া না চাহিতে ঢের পাওয়া
চেয়ে না পাওয়ার মাঝে কত যে কৌতুক ।
সে সুখের মধু-স্মৃতি হৃদয়ে জাগিবে নিতি
বারােমাস রসনায় রহিবে সঞ্চিত,
সে আনন্দ সবে পাবে
ননী সুধু বাদ যাবে,
ननी
स्तू
বিনা দোষে রহিবে বঞ্চিত ?
কাণে গুজি দুটি পান
বড়ই দয়ার দান
এলানাে কেঁাচাটি তার বাম হাতে ধরে
পুকুরে আঁচানন হায়
কত যে আনন্দ তায়
ভােজের বাড়ীর গল্প মার কোলে চড়ে
একটি দিনেরাে তরে
বসিয়া ধুলির’ পরে
ঘুচায়ে বনেদী জাঁক বাধা ব্যবধান,
পাড়ার সবার সঙ্গে
মিলে মিশে রসঙ্গে
নিজেরে ভাবিতে পারা সবার সমান,
তাহাতে যে কত সুখ
নাচায় এ কচি বুক,
এখন পিতার তাহা স্বপনের মত,
সে কথাটি বুঝিবার শকতি নাহি যে আর,
সরল শৈশব তার বহুদিন গত।

পল্লী-কবি নীলকণ্ঠ
পল্লী-কবি নীলকণ্ঠ
পল্লীমা’র উল্লাসী দুলাল !
তব লীলানিকেতন বঙ্গপল্লীবৃন্দাবন।
কদম্ব, তমাল
নীরদমেদুর ব্যোম, ফুল্লকুঞ্জ, পূর্ণসােম, শ্যামসরােবর,
তােমারে করেছে কবি, কুনগুঞ্জনম নদীকলস্বর
শিখা’ল গাহিতে তােমা । নগরের জনসংঘে চাওনি আসন,
আদেশ ইঙ্গিতে রাজসংসদে করনি কভু ত্ৰিতন্ত্রী বাদন,
তবু তুমি শ্রেষ্ঠ কবি।
শ্যামা বঙ্গ-জননীর অন্তরঙ্গ জন
সকলেরি প্রতিবাসী, সন্ধ্যার সুহৃৎ কবি, একান্ত আপন।
যােগায়নি’ গ্রন্থ তােমা নিত্য নিত্য কবিত্বের বৈচিত্রসম্ভার,
তােমারি অঙ্গনতলে চিরমুক্ত নিসর্গের সুষমা-ভাণ্ডার।
নহ তুমি শিল্পিমাত্র, অনুশীলনের ফল করনি সঞ্চয়,
মধুখ-কুসুম নহে গীতি তব, দ্রোণ-পুষ্প,—সে যে মধুময়।
বিশ্বের ললাট ঘেরি কতবার ঘনঘটা ছেয়েছে প্রবল
চমকেনি তবু কভু তব কাব্যনভােনীল—চির অচঞ্চল।
জগতের জ্ঞানসত্রে মন্তোৎসবে করনিক তুমি যােগদান,
একতারা করে ধরি গঙ্গাতীরে করিয়াছ হরিনাম গান।
তােমার সঙ্গীত-রমা পরম্ব কৃত্রিম ভূষা করেনি সম্বল,
অমণ্ডিত অঙ্গে তার তরঙ্গিত নৈসর্গিক লাবণ্য তরল,
নাহি চন্দ্ররাজ্ঞীগণসম অঙ্গে অগণন ভূষণের ভার,
নীলকণ্ঠ-প্রিয়াসম আছে পূত সতীতেজোদৃপ্ত রূপ তার।

পর্ণপুট মহাসমিতির মাঝে গীতি তব শতকণ্ঠে হয়নি উদ্গীত, পাঠ্যশালা, নাট্যশালা, রঙ্গমঞ্চ, তব কাব্যে হয়নি স্তম্ভিত, তবু তুমি শ্রেষ্ঠ কবি। শুনি মােরা ভক্তিভরে দিবস-নিশীথে তব গীতি বাটে মাঠে গােপীযন্ত্রে, রাখালের বাঁশের বাঁশীতে পল্পীগােঠে হাটে ঘাটে গাে-শকটে জেলেদের তালডিঙ্গি’ পরে, ওগাে কণ্ঠ। কণ্ঠ তব ছুটে চলে গ্রামান্তরে কান্তারে প্রান্তরে। কৰ্মশ্রান্ত কৃষকেরা ও-গীতিধারায় নেয়ে হয় ক্লান্তিহারা, মাঠ হতে তব গানে পল্লীর প্রেমিক দেয় প্রেমিকারে সাড়া। ও-গানে অতিথ্য যাচি’ সান্ধ্য-পান্থ গ্রামপথে জানায় প্রবেশ, ভিখারীসম্বলধন কৃপণেরে বুকে করে কৃপার উন্মেষ। প্রফুল্ল মধুর মেধ্য অই গানে স্বেদসিক্ত ক্লেদতিক্ত শ্রম, খর্জুর-তরুর অঙ্গে ইক্ষুদণ্ড মাঝে হয় রসের উদগম। অন্ধকার বনপথে একাকী যাত্রীর ওযে একান্ত সহায়, দিনান্তের উপাসনা, গ্রামান্তের ঘরে ঘরে ডাকে দেবতায়। এ-বঙ্গের গােষ্ঠে গােষ্ঠে রচিয়া রেখেছ তুমি নব বৃন্দাবন, কণ্ঠে কণ্ঠে নেচে ঘুরে বেণুকরে নীলমণি নন্দের নন্দন। নীলকণ্ঠ, মণ্ডিয়াছ শিখণ্ডকে শ্রীকৃষ্ণের মােহন চূড়ায়, তােমার বিতত শিখাচ্ছিত্র ছায়ে বঙ্গভূমি সতত জুড়ায়। হে বিশ্বরাজের সভাগায়ক, চারণ-কবি, অর্চি ও চরণ, ভােমার অক্ষয় সুরে শুনি আমি এ বঙ্গের বক্ষের স্পন্দন।

পল্লীর ঘাটে
পল্লীর ঘাটে
একরাশি এঁটো বাসনের মাঝে একলা পা দুটি মেলে,
খিড়কির ঘাটে
নূতন
বৌটি নয়নের জল ফেলে।
বাসনের ভার সামলানাে দায়, নামিতে পিছল ঘাটে
পাথর বাটিটি পড়ে ভেঙে গেছে ঠেকিয়া তালের কাঠে।
দশ পয়সার পাথর বাটিটি বয়সে জীর্ণ এবে,
তায় কোণ ভাঙা তুচ্ছ জিনিস, একটু দেখিলে ভেবে।
দুইটি টুকরা জোড়া দিয়ে বধূ অঞ্জলি-পুটে ধরি ।
ঝাপসা চক্ষে চেয়ে আছে আহা মুখখানি নত করি ।
হেরিছে অভাগী জমা লাঞ্ছনা বাটির মুকুরপুটে,
অম্ল খাবার বাটিটি ক্রমেই লােনা জলে ভরে উঠে।
ভাবে বসে হায় লাগে নাকি জোড়া কোন মন্ত্রের বলে ।
কোন গুণী এসে সহসা যদি বা জুড়ে দেয় কৌশলে।
শ্বশুরবাড়ীতে আসিবার আগে কেন লয় নাই শিখে,
কি দিয়ে জুড়িলে জোড়া যায় ভাঙা পাথরের বাটিটিকে।
দেবতায় ডাকে অভ্যাস-বশে দেবতা বাঁচাবে যেন,
বাটিটা ভাঙিল, পড়িয়া তাহার মাথা ভাঙিল না কেন?
বড় অভিমানে দেবতার পানে চেয়ে অভাগিনী কঁাদে,
“বল ভগবান্ হাত কেঁপে গেল কোন গূঢ় অপরাধে ?”
একবার ভাবে নূতন একটি কিনে এনে এরি মত,
কোণা ভেঙে যদি চালানাে যাইত তাহলে কেমন হত।

পর্ণপুট
কোথায় পয়সা? কেবা দেবে এনে ? কোথায় মিলিবে বাটি ?
সময়ই বা কই? সকলি স্বপ্ন ভাঙাটাই
খাটি।
পুকুরের জলে ডুবিয়া মরিতে কেমন লাগিছে ভয়,
একবার ভাবে বাপের বাড়ীতে পালালে কেমন হয়।
কোন পথে যাবে? কারে সাথে পাবে ? না-না-তা অসম্ভব,
ভাঙা বাটি ঘেরি ভাবনা-জনতা তুলে নানা কলরব।
হাঁসগুলি ঘেঁষে ঘাট পানে আসে ঘনাইয়া মমতায়,
পাখীরা নীরব, বাঁশ বনে বেজি করুণ নয়নে চায়।
ভুলাে লেজ নেড়ে জানায় বেদনা জিভ ঝুলে পড়ে তার,
থম থম করে দুপুর বেলার খিড়কি পুকুর ধার।
ফুলের গরবে মাথা উচু করে ছিল যে কলমী লতা,
মুষড়িয়া পড়ে ঝলসিয়া সেও জানায় মমতা ব্যথা।
সবাই ব্যথিত, মা বলিয়া বালা ডাকে যারে ফিরি ঘুরি,
সেই শুধু তার হৃদয় চিরিতে শানায় রসনা ছুরি।
পাথরের বাটি ভেঙে যায় যদি একটু চরণ টলে,
পাথরের হৃদি ভাঙে না গলে না বধুররা নয়ন-জলে।

ভুতে বাড়ী
ভূতে বাড়ী
ওরে জীর্ণ পল্লীসৌধ, অঙ্গে তাের ধরেছে ফাটল,
কড়িগুলি পড়-পড়, কোন দ্বারে নাহিক আগল,
বুজে গেছে পাতকুয়া—ঘরে ঘরে জমাট জঞ্জাল
খসে গিয়ে চূণবালি প্রকটিত ইটের কঙ্কাল।
লুতন্তু-যবনিকা বাতায়নে করিছে বিরাজ,
অহি-নকুলের তুই সংগ্রামের রঙ্গভুমি আজ।
মেলেছে অশ্বত্থাবট মূলজাল বলভির’ পরে,
শিয়াল-কাটার বনে শিয়ালেরা ঐক্যতান ধরে।
দীর্ণবক্ষ শীর্ণদেহ কত বর্ষা ঝঞ্চাঘাত সহি,
এখনাে দাড়ায়ে তুই উৎসবের শতস্মৃতি বহি ।
গাত্রে বসুধারা দাগে, দেহলীতে সিন্দুর চন্দনে
মঙ্গল বাসরগুলি চিহ্ন রেখে গিয়াছে জীবনে।
কক্ষে কক্ষে বক্ষে তাের কত হাস্য প্রমােদের মেলা,
কত শঙ্খ-হুলুধ্বনি শিশুদের কত নৃত্য খেলা,
ধূপদীপে অধিবাস, নান্দীমুখ, বাসর শয়ন
কুট্টিমে কুট্টিমে কত তরুণীর নৃপুর নিক্কণ,
আজি সবি স্মৃতিসার বৃথা আর কার তরে শােক ?
যারা হেথা সুখে ছিল তারা আজ নগরের লােক।
উড়ে গেছে পারাবত, চামচিকা করিছে চীৎকার,
চলিয়া গিয়াছে লক্ষ্মী রেখে গেছে পেচকেরে তার।
জীবন্ত মানুষগুলাে গেছে তােরে অনাথ করিয়া,
মৃতেরা ফিরেছে বুঝি প্রেতরূপে, মমতা স্মরিয়া।
৬১

পর্ণপুট
বাল্য-সখা
ওগাে আমার বাল্য-সখা গুলি
কেমন করে তােমাদেরে আজকে থাকি ভুলি?
কেউ বা আছ লােকান্তরে ধরার ধূলায় কেউ,
কেউ বা কাতর জীবন্ম ত, গুণছে শশাকের ঢেউ।
কেউ বা আজি গাঁয়ের পুরুত, কেউ বা গাঁয়ের চাষী,
একবেলা কেউ পাচ্ছ খেতে কেউ বা উপবাসী।
কেউ বা পিওন পােঞ্চাফিসের, কেউ বা গেছ রেলে,
কেউ বসেছ মহকুমায় দোকানখানি মেলে।
সভ্য লােকের সখ্যে আজি হতাশ হয়ে মরি,
আজ তােমাদের স্মৃতির সুধায় নয়ন আসে ভরি।
তােমরা কেহ হওনি জানি বড়,
নামের শেষে পারােনি হায় করতে হরপ জড়,
পিতৃধনের শ্বশুরপণের হওনি অধিকারী
নাম তােমাদের বুক ফুলিয়ে করতে নাহি পারি।
তাই তােমাদের ভুলে গেলাম যৌবনের প্রাতে,
দোস্তি হলাে কেতাবী আর খেতাবীদের সাথে।
কেউ বা তাদের আজকে হাকিম, কেউ বা ব্যারিষ্টার,
কেউ এডিটর, কেউ নটবর, কেউ বা প্রােফেসার।
দিনে দিনে বুঝছি আজি বন্ধু কেহই নয়,
তােমাদের আজ স্মরণ করি’ চক্ষে ধারা বয়।

বাল্য সখা
আজকে বুঝি তােমরা ছিলে কি যে,
পূৰ্ব্বস্মৃতি কঁপছে শীতে আঁখির জলে ভিজে।
খালি পায়ে আদুল গায়ে গায়ের মাঠে বাটে
ছুটাছুটি, সাঁতার কাটা ময়না-দীঘির ঘাটে,
আটচালায় সেই পাঠশালাতে না ঘুষে মরা,
বর্ষাদিনে মেঘের ডাকে আঁকড়ে বুকে ধরা।
আম-কুড়ানাে শিল-কুড়ানাে যাত্রা-শুনার ধুম,
কোজাগরের রাতে কারো নেইকো চোখে ঘুম।
পল্লীপথের সঙ্গী সাঙ্গাৎ আজ তােমাদের স্মরি’
বকুল-ছায়ার মাধুরীতে পরাণ উঠে ভরি।
আজ তােমাদের বুকের কাছে পেলে,
হারানাে ধন আঁকড়ে ধরি আবার বাহু মেলে।
আমার মত শ্রমের ভারে ক্লান্ত শিথিল দেহ,
কেউ বা বােগে শীর্ণ কাতর কন্যাদায়ে কেহ,
বইতে নাহি পারি তবু সইতে পারি সাথে
বক্ষে করে রাখতে পারি দুঃখশােকের রাতে।
চাইনা খ্যাতি চাইনা খাতির, স্নেহের ফকীর আমি,
ভরসা আশার ভালবাসার কাঙাল অবিরামই।
লক্ষ্মীছাড়ায় ক্ষমা করি ডাক দিয়ে লও ফিরে,
ঝঞ্চাহত পাখীরে ঠাই দাও তােমাদের নীড়ে।

পর্ণপুট
মজুরের গােহারি
বাবু সাহেব দিচ্ছ ধুমুক,—দাও
আমরা তাতে মােটেই কাতর নই,
জুতাে মেলেও সইতে হবে তাও
নই ত কিছু জুতাের নফর বই।
মারাে ধরাে যতই বক’ কেন,
মজুরীটা কম করাে না যেন,
নগদ সেটা চুকিয়ে দিও, রাখলে বাকী সত্যি কাহিল হই,
ইচ্ছামত দিচ্ছ ধুমুক তাতে বাবু মােটেই কাবু নই।
সস্তা ছিল সত্যি বটে আগে
টাকায় ছিল মজুর গােটা ছয়,
একটাতে আজ এক আধুলি লাগে
এটা তােমার সহ কি আর হয় ?
জামা জুতাে- সাবান বােতল ঘড়ি,
চশমা চুরুট চেয়ার টেবিল ছড়ি,
গিন্নিমাদের গয়না এত,এ-কি সবই হালী রেওয়াজ নয় ?
পেটের দাবী সয় না শুধু ? নতুন নতুন খরচা এত সয় ?
এক টাকাতে চৌদ্দ পােয় দুধ
টাকায় যা’ হায় কিনতে বারাে সের ;
কর্জ নিলে লাগছে কত সুদ
অনেকে ত পাচ্ছ তারাে টের।
৬৪

মজুরের গােহারী
চাল ডাল তেল ময়দা চিনি নুন,
মাঘ্যি দ্বিগুণ কেউ বা চতুগুণ,
দাম দিয়ে ত কিনছ সবি, সবের তরেই করছ খরচ ঢের,
এতই যদি সয়, স’বে না পেটের দাবী কেবল আমাদের ?
ভাবছ বুঝি মুনিশ খেটে মােরা
মজুরীটা নিচ্ছি বেশী দরে,
ভাবছ, বুঝি কিন্ব হাতী ঘােড়া
কিংবা টাকা রাখব জমা ঘরে।
ভাবছ বুঝি পরব জুতাে জামা,
খাববা মিঠাই মােণ্ড ধামা-ধামা,
শাক-ভাত-মুন তাই জোটে না, রাক্ষুসে পেট কেমন করে ভরে ?
নাই ত বাগান জমি জমা, কিতে যে হয় সবই চড়া দরে।
বিচার করে একটু সদয় হয়ে,
ঘরের খবর ভাবলে এ বুক ফাটে-
পিঠে ছেলে পেটেও ছেলে ব’য়ে,
মেয়েগুলােও খাটছে মাঠে মাঠে
পেটের জ্বালায় রােগের জ্বালাও ভুলি’
আট বছরের ছেলের হাতে তুলি’
দিইছি পাঁচন, কঁাখে ঝুড়ি গােবর কুড়ায় বুড়ী মা মাের মাঠে,
তবু সবার পেট ভরে না, আধ-পেটাতে অনেক রাতই কাটে।

পর্ণপুট
দুধের ছেলে কাদলে বােয়ারই
ক্ষুদের মাড়ে ভুলাই আহা তাকে,
“কালকে খাবি” বড়গুলােয় কই
আধেক রাতে ক্ষিদেয় যখন ডাকে।
তাদের তরে লুকিয়ে রেখে ভাত,
‘বাড়ীর ওরা শুধুই কাটায় রাত,
ছল দিয়ে সে পেটের জ্বলা, গামছা দিয়ে লজ্জাটুকুন ঢাকে,
বলার কথা নয়ক এসব, ব’লে কি ফল ? বব বলো কাকে ?
বছ ‘ব্যাটা বেজায় ছােট লােক
সত্যি ছােট-‘টম’ও তােমার বড়,
বাবু তারাে জয় জয়কার হাে
মজুরীটার একটা রফা কর।
সারাটি দিন ফেলি মাথার ঘাম
চাচ্ছি কি তার বেজায় চড়া দাম?
আক্রা সবই, রইবে শুধু বুকের রক্ত সস্তা এমনতর?
সবই তােমার সহ্য হলাে, মানুষ হতে সবই হলাে বড়!

কুসুম-শয়ন
কুসুম-শয়ন
আজি সখি, আমাদের কুসুমশয়ন।
মধুগন্ধে ভরপুর
বায়ু বয় ফুরফুর,
হিয়া দুটি দুর-দুর,অলস নয়ন !
আজি সখি আমাদের বিলাস-শয়ন।
আজি যেন সৃষ্টিছাড়া,
সৰ্ববাধাবন্ধহারা,
রসাবেশে মাতােয়ারা আ-লুলিত তনু,
ভুলি সব দুখ জাল।
চৌদিকের ঝালাপালা,
অলির শিঞ্জিনী দিয়া রচ ফুলধনু।
কাটা যদি রয় ফুলে
ব্যথা তার যাও ভুলে,
কাননে কাঙাল করি কর লাে চয়ন ।
আজি প্রিয়ে আমাদের কুসুম-শয়ন।
কিংবা আজি রঙ্গভরে
কৌমুদী-তরঙ্গ’ পরে
বাহিয়া সেফালি-ঘন রাজহংস-তরী,
কল্প-সুষমার দেশে
চল সখি যাই ভেসে
যােজন-গন্ধার গন্ধ-পথ অনুসরি’,

পণপুট
আফিমফুলের ডাের
ঘনাইবে ঘুম ঘাের,
পরীরা পাখার বায়ে উড়াবে অলক,
বুলায়ে শিরীষ-ফুল,
ভুলাবে তন্দ্রার ভূল
নয়ন-পলাশে পুনঃ জাগাবে পলক।
বকুলমালিকা টুটি’
চুলে র’বে শির দুটি
কদম্বের উপাধান করিবে বহন।
আজি সখি আমাদের কুসুমশয়ন ।
মানস-কুমুদবনে
চলাে যাই সন্তরণে
সােমকান্তম্বি নীরে অচ্ছােদ-তড়াগে,
মিলাইব চখাচখী
বারিচর সখাসখী,
বউ কথা-কও গাবে সুরভি বেহাগে।
কিংবা চল দুলি গিয়া
তারাকুঞ্জদোলে, প্রিয়া,
আকাশকুসুম দিয়া দু’হাতে ছড়ায়ে।
চন্দ্রমল্পী-সীধুপানে
চকিত চকোর-গানে
বিধুপরিবেষ গায়ে পড়িব গড়ায়ে।
ত্যজি ধরণীর সাজ
এস সখি এস আজ ;
মুকুল-দুকূল দিব করিয়া বয়ন।
আজি সখি আমাদের কুসুমশন।
৬৮

প্রথম বিরহ
প্রথম বিরহ
তুমি চলে গেছ রাণি,
শেজখানি আজি হয়নিক ভােলা, শূন্য এ ফুলদানি।
কুন্তল-বন-সৌরভে তব এখনাে এ গৃহ ভরা,
জাগিছে তৈল আতায় তব দেহলী চিত্র-করা ।
সিদূর টীপের কৌটা আরশী সব খােলা আছে পড়ি,
চুলের ডােরীটি চিরুনী তােমার ভূয়ে যায় গড়াগড়ি।
তব পদরেখাআঁকা
এ আঙনে প্রতি রেণুকণা যেন তােমার মমতা মাখা।
আজি তুমি গৃহে নাই,
যে-কোন শব্দ শুনিলে লুব্ধ-নয়নে ফিরিয়া চাই।
দূরে রুনঝুনি যেন শুনি শুনি চারিদিকে তােমা খুঁজি,
মনে হয় সবি এলােমেলাে হেরি এখনি ফিরিবে বুঝি।
যবে কাছে ছিলে দণ্ডের মত প্রহর কেটেছে মম,
দণ্ড আজিকে এই বন্দীর প্রহরি-দণ্ডসম।
কেমনে বল গােরই
তােমার চরণচিহ্নে পাবন এ ভবনে তােমা বই?
তব স্মৃতি গৃহময়,
ঘর ছাড়ি তাই, তব স্মৃতি পুন সে ঘরেই টেনে লয় ।
আজি মনে হয় কত অবসর বৃথায় গিয়াছে চলি,
বলা হয় নাই, কত কথা হয়, করিয়াছি বলি-বলি।

পর্ণপুট
কপােতকুজনে গৃহখানি যেন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কঁদে,
হুহু করে উঠে ধুধু মনােমরু, ঘুঘু যত ডাকে ছাদে।
গৃহের লক্ষ্মি মম !
এ গৃহ বিজয়া পরদিনে যেন ব্যথিত দেউল সম ।
কিশােরী প্রিয়া
কিশােরি, করেছ যেন পলিত ধরারে পুন ললিতকিশােরী !
জাগে সে উল্লাসে ভরা, জড়তা জীর্ণতা জরা সকলি বিসরি ।
অজের মাধুরী অঙ্গে শাপ-মুক্তা হাসে রঙ্গে কুজার মতন।
সবি যেন রাঙা-রাঙা কচি-কচি ঢলঢল পেলব চিকণ ।
কুঞ্চিত শিথিল চৰ্ম্ম কাঞ্চন-মরীচি লভি লাবণ্যে মঞ্জুল,
গালভরা হাসি হেসে ধরা আজি সখীবেশে বাঁধে যেন চুল ।
কৈশােরের বেণুবীণে ভৈরবী বােধন, শুভ বিভাসী মূচ্ছনা,
জাগাল প্রেমের অর্ঘ্যে বনগিরিপ্রান্তরের অন্তর-ব্যঞ্জনা।
চললাস্যে কলহাস্যে ফেনিল উচ্ছল মম বাসনা অধীর,
তটভূমি চুমি চুমি সুরাতরঙ্গিণী সম করিল মদির।
কম্বাশ্রমে শকুন্তলা-সম যেন জরা ভেদি জাগিল যৌবন,
সমগ্ৰ নিখিল হলাে রসে গন্ধে ছন্দে অলিমুখর মৌ-বন,
আজিকে গিরিশ্ৰী যেন গৈরিক বসন ত্যজি বধূসজ্জা করে,
পরিয়া ময় রকণ্ঠী, আজি তার সব শিলা লীলারূপ ধরে।
৭০

প্রত্যাবর্তন
প্রত্যাবর্তন
তােমার সাথে মিতে হেথা, লাে কিশােরি, তোমার তরে
আবার আমি এলাম ফিরে ছেলেবেলার খেলার ঘরে।
কথায় কথায় মান অভিমান,
একটুতে বয় দুই চোখে বান,
কাদতে গিয়ে হেসে ফেলি তেমনি আবার লীলা-ভরে,
কাজের বােঝা হালকা হলে আবার তােমার খেলাঘরে।
যৌবনের এই শৈলপথে বছর দশেক এলাম নামি,
ধূলাখেলায় হেলাফেলায় তােমার পাশে গেলাম থামি ।
জ্ঞানগরবের গুল্মবাধা-
জটিলতার গােলকধাঁধা,
বিদ্যামােহের আলােকলতার বাঁধন ছিড়ে কেটে আমি
তােমায় নিয়ে খেলতে প্রিয়ে বছর দশেক এলাম নামি।
কুসুম আবার মূকুল হ’লজুড়াইল তৃষার জ্বালা,
দোলাইলে আমার গলে আবার কুমুদ-মৃণাল-মালা।
কুণ্ঠাদ্বিধা-চিন্তাবিহীন
সরল মধুর ফিল সে-দিন,
পিছন হতে চোখ টিপে মাের ধরলে যেদিন চপল বালা,
আবার কিশাের-কিশলয়ে ভরল বাণীর বরণডালা।
৭১

পর্ণপুট অলির প্রতি কুসুম এস কালােবধু মম গাহি গান, প্রিয়তম, নিশিদিন ডাকি যে তােমায়, ফুল-জীবনের সার তারুণ্য, লাবণ্য-ভার সুকুমার এ কৌমার দিতে তব পায়। রূপ আছে আছে রস, রয়েছে গন্ধের যশ, আছে স্পর্শ শীতল মধুর, নাহি সুর নাহি গান ম্লানমৌন মূক প্রাণ, রেণুঘন শ্বাসে তাই ব্যথায় আতুর । পাখার পরশ দিয়া দাও তনু কণ্টকিয়া কেশর-রােমাঞ্চে কর এ হৃদি চঞ্চল, গাহি গুন-গুন গান বিকল এ মূকপ্রাণ মুখর করহে সখা রভস-বিভল। তুমি বিনা সবই ছার যৌবন হয়েছে ভার লালিত্য, লুলিত তার ওগাে কালাের্বধূ, সৌরভ পীড়িয়া প্রাণে রৌরব যাতনা আনে কালকূট হয়ে দহে পরাণের মধু। কাব্যের বৈভব বহি আর কতকাল রহি কবি বিনা সবি যে বৃথায়। সঙ্গীতের উপাদান অঝঙ্কৃত মৌন ম্লান, দাও সুর দাও প্রাণ তায়। १२

অলির প্রতি কুসুম
নীরব এ নাট্যশালা,
বৃথা তায় দীপ জালা,
গান বিনা অলস স্বপন,
এত ঋদ্ধ আয়ােজন
বিনা হৃদ্য প্রিয়জন
তারাহারা যেন দুটী অরুণ নয়ন।
কালার বাঁশরী বিনা
পিয়ারী মলিনা দীন।
ফুলের দোলনা তার ধূলায় লুটায়,
কালাে জলদের বাণী
মাতালে হৃদিখানি
কলাপী রূপের ছটা বিলাপে গুটায়।
কালে কোকিলের গীতি বিনা, শিশিরের স্মৃতি
কে ঘুচাবে কাননের মৰ্ম্মের মৰ্ম্মরে ?
বিনা দুটা কালাে আঁখি,
শুধু লােধ রেণু মাখি
আরক্ত কপােল কভু প্রিয়-মন হরে ?
কালাে দীঘিটির বারি তাপজালাদাহহারী,
কালাে ছাড়া উপায় কোথায় ?
কুসুম-কৌমার-চোর,
এস কালােবঁধু মাের
আপনারে সঁপি তব পায়।

পর্ণপুট
প্রেমের স্মৃতি
কিশােরপ্রীতির মধুর স্মৃতি লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়,
চমকে উঠে যখন তখন, মানসতলেই সুপ্ত রয় ;
পেয়রাগাছের ফাকে ফাকে,
পায়রাগুলাের ঝাঁকে ঝাঁকে,
পল্লীপথের বাঁকে বাঁকে, বকবাতাবির কুঞ্জবনে,
পিউতানে, যুঁইশিউলিবাগে সে প্রেম জাগে গুঞ্জরণে।
কিশাের ভালবাসার আলাে লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়,
লতায় পাতায় বনের পথের যথায় তথায় গুপ্ত রয় ;
সাঁজপূজনীর শাঁখের ডাকে
নােলক নাকে, চপল আঁখে,
লুকোচুরি খেলতে থাকে দীঘির বাঁধা ঘাটটি ভরি’
বালকবালার খেলাধূলায় বেড়ায় পাড়ার বাটটি ধরি।
বােশেখ মাসের অশােকতলায় হােলীর দিনে রাসবাড়ীতে,
পাথর-পূজার পৌরােহিত্যে, শিশুপাঠের মাষ্টারীতে,
পূজার দিনে আটচালাতে,
দীপান্বিতায় দীপ জ্বালাতে,
সাঁজের দ্বারে জলঢালাতে যে বীজ বুকে উপ্ত হয়,
অঙ্কুরিত রূপটি তাহাব লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়।
৭৪

বয়ঃসন্ধি
বয়ঃসন্ধি
কৈশাের-কোরক হ’তে অয়ি প্রিয়ে সহসা কখন
যৌবনের শ্ৰীসম্পদে মধুমদে হলে বিকসিত !
কবে গেল ছদ-দল কেশরের কুষ্ঠিত কুঞ্চন
সৰ্ব্ব অঙ্গ অকস্মাৎ কণ্টকিয়া হলো হরষিত ।
জীবন-গহনে তব, পুষ্পময় ধনুখানি ধরি
সহসা পশিল কবে সংগােপনে প্রথম নিষাদ,
উঠিল চকিত বােল কোলাহল পােবন ভরি
একসঙ্গে বিহঙ্গেরা চমকিয়া ঘােযিল সংবাদ।
জানি না কখন কবে জীবনের গৃঢ় কক্ষতলে
সাফল্য সূচনা হলাে। সংগােপন পরাগের দলে।
অয়ি ইন্দ্রায়ুধময়ি, স্বপ্নঘােরে জানি না কখন
বর্ণ হতে বর্ণান্তরে বিলসিয়া করেছ প্রয়াণ।
সুসংবৃত হয়ে এল ও তনুর শিথিল বসন,
সংযত হইয়া এলাে চলগতি কলহাস্য-তন।
আত্মহারা চরণের চপলতা কবে সংগােপনে
হরণ করিল আঁখি সন্তর্পণে পারিনি ধরিতে ।
শিথিল বিতান কবে উন্মদ উদাস সমীরণে
মঙুল বর্তুল হ’লাে জানি না ও হৃদয়-তরীতে।
ক্ষীণ কবে হলে পীন, ধনী হলাে যাহা ছিল দীন,
একতারা কবে হলাে রাতারাতি সাত-তারা বীণ

পর্ণপুট
বুঝি সে ফান নিশা জ্যোৎস্নাময়ী। দক্ষিণ সমীরে
উড়িয়া পড়িয়াছিল হেলাভরে বক্ষের অঞ্চল,
সেই অবসরে পুরে নব নৃপ প্রবেশিল ধীরে
অতকিত কৈশােরের গেল তায় সকল সম্বল।
বিনা রণে নিল জিনে তার রাজদণ্ড-সিংহাসন,
লীলাসহচরগণ ত্রস্ত হয়ে দাড়াল সরিয়া,
লাজে ভয়ে সসঙ্কোচে অন্তঃপুরে নৰ্ম্ম-সখীগণ
লুকাইল ত্রস্ত পদে, ফুল-খেলা রহিল পড়িয়া।
ধরিতে নারিনু কবে বিদ্যাললাভী চোরের মতন
মৰ্ম্মের সুড়ঙ্গ-পথে অলক্ষিতে পশিল যৌবন।
যে দিন কৈশাের তব চিরতরে লইল বিদায়
তােমার জীবন-কুঞ্জে দৃশ্য আহা হইল কেমন ?
উঠিল কি হাহাকার শােকয়ােল বিরহ-ব্যথায়
মাথুর যাত্রার দিনে বৃন্দাবন বিধুর যেমন ?
সেদিন কি নেত্রে তব অলক্ষিতে ফুটেছিল জল?
অজানা রহস্য-ভয়ে অন্তর কি হইল আকুল ?
রচিতে রচিতে নব যৌবনের বরণ-মঙ্গল
কেবলি কি হতেছিল সেই দিন পদে পদে ভুল ?
জানি না কখন কবে কৈশােরের তৃষাহরা মধু
যৌবনের সীধু হলাে জ্বালাময়ী, অয়ি প্রাণ-বধু।
৭৬

পাহাড়িয়া প্রিয়া
পাহাড়িয়া প্রিয়া
ওগাে পাহাড়িয়া প্রিয়া,
হেথায় তুলসী-কুঞ্জে কি দিয়ে তুষিব তােমার হিয়া?
কোথা বীর-তরু তমাল নমেরু দেবদারু চারু নীপ ?
পলাশ-শ্রীর ললাটের ‘পরে কোথা সে চাদের টীপ?
শিরীষ-বালার অলক দুলায়ে পবন হেথা না ফুরে,
মহুয়ার বনে মাতিয়া হেথায় মৌমাছি নাহি ঘুরে ।
বনদেবী হেথা শৈলসােপানে এলায় না তার বেণী,
কোথা দিগন্তে তরঙ্গায়িত তুঙ্গ গিরির শ্রেণী ?
হেথা শিলাজ গলায়ে ঝরে না গেরুয়া উৎসবারি ।
সিকতা-হৃদয় বিদারি এখানে ভরেনাক কেহ ঝারি,
কোথায় উদার অবাধ জীবন ভূধরের পাদমূলে !
চপল চরণে কোথা ছুটাছুটি গিরিনদী-কূলে-কূলে ?
ওগাে পাহাড়িয়া প্রিয়া,
হেথায় বঙ্গ-অঙ্গনে তব কি দিয়ে তুষিব হিয়া ?
ওগাে পাহাড়িয়া বালা
বল্পীবলয় ভুজে তব, গলে কূটমল্লিকা-মালা।
প্রকৃতি হেথায় সুকৃতির রূপে বেঁধেছে কুটীরখানি,
আলিপনাআঁকা ছায়ামণ্ডপে এস গিরিবনরাণী
পূর্ণ কুম্ভ তব মেখলায় পাণি-বন্ধন যাচে,
কন্তু হেথায় তব চুম্বন আশায় আশায় আছে।
ফুল বক্সরী-ভূষা পরিহরি ভবন-ভূষণ পর
টান’ শির 'পরে লাজ-গুণ্ঠন, শঙ্খবলয় ধর।
৭৭

পর্ণপুট
আঁক’ সীমন্তে সিন্দুর-রেখা, বাধ’ কুন্তলরাশি,
হােক্ অচপল চরণযুগল, সংযত হােক্ হাসি
পিঞ্জরে হেথা পড়িয়াছ বাঁধা গিরিকুঞ্জের পাখী,
হরিণ-নয়নে ঘেরিয়া বেড়িল শত তরুণীর আঁখি।
ওগাে পাহাড়িয়া বধূ,
হরিত পর্ণপুটে আনাে গিরি-প্রকৃতি-হৃদয়-মধু।
মুক্তি
( ১ )
এস সখি মুক্তি-লােকে, রুদ্ধ গৃহ মাঝে
বাহিরে খুলিয়া যত সংসার-শৃঙ্খল,
হেথা এস মুক্ত শ্লথ সুষমার সাজে
বিগলিয়া কৰ্ম্মক্লান্ত যৌবন তরল।
এলায়ে গুষ্ঠিত কুণ্ঠা মুকুলিত লাজ,
ফুটে উঠ’ গ্রীবা-বৃন্তে চম্পার মতন।
রাখি উপাধানতলে সৰ্ব্ব ভূষাসাজ,
পর’ প্রেমকল্পতরু-সঞ্জাত ভূষণ।
হেথা হৈম সিকতায় মাণিক্য-সন্ধানে
মন্দাকিনী-তটে খেলা রসে হরষে,
৭৮

মুক্তি
কভু বা অঙ্গের ভূযা রাখিয়া সােপানে
অবিশ্রান্ত জলকেলি অচ্ছােদ-সরসে।
ইহ-স্মৃতি হা রাইয়ে, গৃহের নন্দনে
এস প্রিয়ে, লভ' মুক্তি নিবিড় বন্ধনে।
( ২ )
উঠ সখি জাগ’ জাগ’ পােহায় রজনী,
মৃদঙ্গে উঠিছে দূরে কুঞ্জভঙ্গ-গান।
ভােরের বৈরাগী পথে বাজায়ে খঞ্জনী
টহল গাহিয়া দিল টলাইয়া প্রাণ।
সুপ্তি-সুষমার সুখ-স্বপ্নপুরী হতে
গৃহাঙ্গনে ফিরে এস, ওগাে মায়াময়ি,
ভিড়াও মানস-তরী কৰ্ম্মতটপথে
বিলাস-তরঙ্গ ত্যজি, অসম্ব তা অয়ি।
আলােকে পুলকে মেলি আঁখির পলক
আলুলিত যৌবনেরে করিয়া সংহত,
মুছি তন্দ্রালস আঁখি, গুছায়ে অলক
শিথিল তমুরে কর শাসন-সংযত।
ধীরে ফেলি পাদযুগ লাজসঙ্কুচিত,
অলিন্দ অঙ্গন পুনঃ কর পঙ্কজিত।
৭৯

পর্ণপুট অপরাধ কার ? মিছে সখি ধরাে অপরাধ । না চাহি আপনা পানে মিছামিছি অভিমানে দোষ ধরে রােষভরে ঘটাও প্রমাদ। জান নাকি কোন দিন নহে অলি লােভহীন ? তপ আচরিতে সেত ঘুরে না কাননে। মধু-গন্ধে পুলকিয়া রূপ-ভাতি ঝলকিয়া কমল ফুটালে কেন অমল আননে? যেন পৰু বিম্বফল রসভরা ঢলঢল কেন এত মনােহর অধর রতন ? শুকের কি উপবাস? শুধু কি ভুখের শ্বাস? ক্ষুধা যে জীবন-ধৰ্ম্ম তাহা কি নূতন ? পড়িয়া জলের কাছে এ মীন কেমনে বাঁচে? সে কথা জানিয়া, সখি, কেন কর ছল? আঁখিপুট-তটভরা শান্তি-জ্বালা-ক্লান্তিহরা ছায়া-ঘেরা স্বচ্ছ বারি কেন টল মল ? এটা সখি কার ভুল ? চুয়ায়ে মহুয়া ফুল, লাবণ্যে আনিলে কেন বারুণীর বান ? যদি তায় অবশেষে এ মক্ষী যায়লাে ভেসে কেন দোষ ধর’? তার কতটুকু প্রাণ? মিছে দূষ’ অধীরতা কেন তব বাহুলতা সাতপাকে জড়াইল এই তরুশাখা ?

অপরাধ কার
চকোরে শাসিছ বৃথা,
গৃহ ভরি, শুচিস্মিতা
দন্তরুচি-চন্দ্রিকায় বিরচিয়া রাকা।
নিয়ত ঝক্কি য়মান
বাণী, বীণাবেণুতান,
মানস-কুরঙ্গ সেত অবােধ সরল,
অতিলােল প্রাণ তার
ও কটাক্ষ বজ্রসার,
হানে যে নিশিত শর নয়ন তরল।
নখের ভাতিতে যদি
ফুটে গুল নিরবধি
বুলবুল আঁখি মুদি বসিবে কি তপে ?:
সুলভ সম্মুখে তার
রূপশিখা অনিবার
শলভ সাধে কি আর তনু মন সঁপে?
দুৰ্বল দীনের ঘরে
এ সব কিসের তরে?
লিগার অপ্সরােলীলা কেন অনুখন ?
পদে পদে অপরাধ
নিতি যদি পরমাদ,
তবে কেন অকুণ্ঠিত মুগ্ধ আয়ােজন ?
৮১

পর্ণপুট
মিলনােকন্ঠিতা
চুলগুলাে সই অমন করে বাঁধিস না আজ টেনে
অমন খোপা বাসে না সে ভালো,
গঙ্গাজলী ডুরে-খানা দে’-না পুটী এনে
মানায় কি আজ দেহে বসন কালে ?
নখের’ পরে আলতার টিপ দিস্ না পায়ে ধরি,
পরতে যেন করেছিল মানা,
কাচপােকাটিপ কাজ নেই বােন সিঁদুরটিপই পরি,
কি চায় সে যে আছে আমার জানা।
বছর ধরে’ নেইক দেখা, হুস হলাে তার আজি,
হা সই আজি কখন হবে সাজ ?
ছ'মাস হতে গুণছি যে দিন, দেখছি শুধু পাঁজি,
মুখ তুলে কি চাবেন হরি আজ ?
ছ'মাস হতে যাচ্ছি যাবাে’, আচ্ছা নিঠুর স্বামী,
বলতাে লাে বােন কিসে জীবন ধরি ?
যতক্ষণ না দু’চোখ মেলি দেখছি তারে আমি,
ততক্ষণ তার ভরসা কি আর করি ?
প্রাণে কত ধুকপুকুনি,কত যে সংশয়
দেখে কি আর প্রাণটা কভু খুঁজে’?
দগদগি এ হিয়ার ভিতর নিত্য নূতন ভয়
পুরুষমানুষ ভাবে কি আর বুঝে ?

মিলনােৎকণ্ঠিত
যাকগে সে সব বুঝাব তায় আজকে নয়ন-জলে,
নারীবধের পাপীরে বােন পেয়ে,
মুখখানি আজ সারারাতি রেখে চরণতলে
তুলব না আর, দেখবনাক চেয়ে।
নইলে দিদি বলিস যদি কইব না তায় কথা
পিছু ফিরে মুখ ফিরায়ে রবে,
বে-দরদী,-বুঝে না যে অভাগিনীর ব্যথা,
তার কাছে, বােন, নরম কেন হবে?
বলছি বটে, তেমন করে কেমন করে রই ?
আসছে সে যে বছরখানেক পরে,
দূর প্রবাসে হয়ত বড় কষ্টে ছিল সই,
একবারে সে যদিই গলা ধরে ?
বলছি যে সব হয়ত কিছুই হবেই নাক কাজে,
কেমন যেন লজ্জা করে বড়,
অনেক দিনই হয়নি দেখা, হয়ত আবার লাজে
হবাে নতুন বউটি জড়সড়।
হয়ত অনেক রােগে ভুগে শরীরখানা ক্ষীণ,
ছুটী আগে পায়নি কোন মতে,
অনাহারে হয়ত আহা আসছে সারাদিন
হয় ত অনেক কষ্ট পেয়ে পথে।
৮৩

পর্ণপুট
আজকে আমার মাথায় যেন ঘুরছে হাজার জাতা,
প্রাণে বলক উঠছে এমন কেন ?
শােন্ না কেমন বুকের কাছে আন না সখি মাথা,
ঢেকির মুল পড়ছে বুকে যেন।
হাত-পা কাপে চলতে গিয়ে পড়ছি কেবল টলে,
রকম দেখে নিজেই মরি লাজে,
আয় ননদি, মাথা আমার রাখিলল তাের কোলে,
পায়ে ধরি ডাকি না আজ কাজে।
হাজার হাজার নৌকা যে আজ ভিড়ে মনের তটে,
কানের ভিতর হাজার হাজার গাড়ী,
প্রতি পায়ের শব্দে কেমন ভ্রান্তি কেবল ঘটে,
মা বলে অই এলােই বুঝি বাড়ী।
হাসি না বােন দাড়া আগে আসুকই সে ফিরে
আর কি শুধু আসার আশায় ভুলি,
হাসি এখন দেখিস যেন আমার নয়ন-নীরে
নাহি তিতে তােদের আঁচলগুলি।

যাত্রা
সুযাত্রা
তেরস্পশ রিক্তা মঘা একে একে সবত গেল চলে
যাত্রা করার আজ শুভদিন পাজি দেখে পুরুং গেলেন বলে।
সকাল হতে মনটা খারাপ বাক্স-তােষক হচ্ছে বাধা ছাঁদা,
ডাকাত যেন নিচ্ছে লুটে, ব্যস্ত হয়ে ঘুরছে বড় দাদা।
এত অসুখ, কেমন করে বলল
আজকে তােমার দিনটা শুভ হলাে?
জালাফাকে প্রিয়ার আঁখি ফিরায় মােরে কেবল পিছু ডেকে,
প্রণাম-কালে মা কেঁদে কন “এদুটে। দিন গেলি না বাপ থেকে?”
আধ’ আধ’ কথায় থােক বলে না-না আঁকড়ে ধরে’ ছুটে,
চাইতে পিছে সজল চোখে বুকটা যেন গুমরে গেল টুটে।
আজকে তবু সুদিন যদি হলাে,
হায় জীবনে কুদিন কারে বলো ?
বৃষ্টি কি ঝড় এমি কিছু একটা আসে, হয় না যাওয়া শেষে,
চলতে পথে ভরসা মনে ফিরায় যদি দৌড়ে কেহ এসে।
গাড়ী না পাই বাড়ী ফিরে শুনি হেসে প্রিয়ার পরিহাস !
গাড়ীটি হায় দাড়িয়ে আছে গেলই ছেড়ে আমায় করে গ্রাস।
পেলাম গাড়ী, দুৰ্যোগও না হলে,
সুদিন তবে কেমন করে বললা?
৮৫

পণপুট
দিনে ও রাতে
আমি—দিনের মরু পার হয়ে যাই কিসের আশে আশে ?
রাতে—চিকুর ছায়ার শান্তি তরে বাহু-লতার পাশে ;
ধূলায় মলায় ক্লিন্ন স্বেদে
সারাদিনের দুঃখ খেদে
ধৌত করে ফেলব বলে’ তােমার প্রেমােল্লাসে।
সারাদিনের প্রহর জুড়ায় আমার রাতের মধু যামে,
প্রিয়ে শ্রমের শিরে ভোেমার প্রেমের শান্তিধারা নামে।
বঞ্চনা ভুল দিবসভরা,
লাঞ্ছনা লাজ তপ্ত ত্বরা,
সবই উড়ে পলায় দূরে তােমার মলয়-শ্বাসে।
যদি-রাতে তােমার সােহাগ, তেজে প্রাণ নাহি দেয় ভরে,
খর—দিনের তাড়ন আলাের পীড়ন সই বা কেমন করে?
নিশার প্রবােধ পুরস্কারে
মােৎসাহ উষায় বাড়ে
রাতের চুমাই শ্রান্ত প্রাণের সকল ব্যাধি নাশে ।
যত-অরসিকের মেলায় দিনে এ কান ঝালাপালা,
রাতে—তােমার বাণীর সুধায় জুড়ায় তাহার ক্ষুধাভালা।
ঐ অধরের জ্যোছনা আশায়,
রৌদ্রে সহি রুদ্রতৃষায়,
দিনের দাহন সহি প্রেমে গাহন অভিলাষে।
৮৬

সমস্যা
সমস্যা
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
অঙ্গলতা গন্ধশােভায় আছেই সদা মুঞ্জরি'।
আতা কোথা পরবে তুমি ?
ধরণী—ওই চরণ চুমি,
শিউরে উঠে ভূই-স্টপাতে, ভ্রমর আসে গুঞ্জরি'।
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
চুম্বনাতুর বিম্বাধরে তাম্বলীরস সয় কি কেহ ?
অঙ্গরাগের ঠাইটি কোথা ? গুগই যে তােমার দেহ।
হিরণ ক্ষোভে হবেই মাটী
হােক না কঁাচা, হােক না খাটী,
কুণ্ঠা-লাজে কঁাকন চুড়ি কঁাদবে রুনু ঝু করি।
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
কাজল বৃথা পরবে কোথা, ও চোখে কি সাজবে ভালাে ?
কাজল হ’তে উজল আরাে যুগল ভুরু অনেক কালাে।
চঁচর চিকন
চুলে
প্রিয়ার
ঝাপটা সীথি মানায় কি আর ?
ধরার ভূষণ পরবে পরী অ-মৃত রূপ গুণ ধরি ?
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
৮৭

পর্ণপুট
চির মিলন
তােমার সনে নয়ক আমার নূতন পরিচয়,
অনন্তকাল বাছি ভালো এম্‌নি মনে হয়।
মােদের মিলন দেখেই বুঝি
কপিল ঋষি পেলেন খুজি,
সূত্র তঁাহার,—প্রকৃতি আর পুরুষ সমন্বয় ।
মােরা যখন ছিলাম শুধু মূচ্ছ না-সঙ্গীত,
মােদের পরিণয়ে ছিলেন ব্রহ্মা পুরােহিত।
তারপরে সে দেশবিদেশে,
নূতনরূপে নূতন বেশে,
জন্মে জন্মে হচ্ছে মােদের মিলন-অভিনয়।
যুক্ত ছিলাম হয়নি যখন পরিণয়ের প্রথা,
হয়ত তুমি মহীরুহ-হয়ত আমি লতা।
হয়ত চখা এবং চখী,
নয়ত বনের সখাসখী,
আজকে মােদের মানব-সমাজ পত্নীপতি কয়।
মানুষ মােদের ঘুচায়নি এই ক্ষণিক ব্যবধান,
মিলায়েছে সেই সনাতন চির যুগের টান।
সেই সৃজনের আদি হতেই,
হইনি ছাড়া কোন মতেই
‘তুমি’ বলেই ভালবাসি, স্বামী বলেই নয়।
৮৮

দেহের মিলন
দেহের মিলন
দেহের মিলন মাঝেই মােদের প্রেমের হলাে জয়,
এই মিলনই করল তারে অনন্ত অব্যয়।
অশরীরী চিত্তযুগল
জান্তনা আনন্দ অমল,
জানাক তৃপ্তি, ছিল কেবল তৃষাময়।
দ্বৈতবনের মিলনে আজ হরষধারা ছুটে,
হাজার হাজার রােমাঙ্কুরে কুসুম উঠে ফুটে।
যে সাধ ছিল কোন্ স্বপনে,
দুইটী দেহের আলিঙ্গনে
সফল সৃজন হয়ে তা আজ জাগাল বিস্ময়।
দেহের মিলন-মৃণালে প্রেম, কমল হয়ে হাসে,
চারি চোখের নীল গগনে চাদ হয়ে সে ভাসে,
মুক্তবেণীর ধারার মত
চলবে এ প্রেম অবিরত,
বিশ্বপ্রেমের পারাবারে শেষে তাহার লয় ।
অমর করে রেখে যাব এই মিলনের ফুল,
হাজার গানে মুখর হবে মিলন-মঙ্গল।
এই মিলনের ইতিকথা
তত্ত্ব-নিদান গভীরতা,
মনঃশিলায় লিপির রূপে রহিবে অক্ষয়।

পর্ণপুট
পূৰ্ব্বরাগ
কী আয়ােজন হলো সখী তােমায় পাওয়ার আগে,
সে সব কথার আলােচনা আজকে ভাল লাগে।
আঙ ল বেড়ি আঁচল খানি জড়াইতে হৃদয়রাণী-
সে কি নহে সাতটি পাকের জড়ানাে ইঙ্গিত?
আলতা পায়ের আঙ ল দিয়া মাটীর পরে দাগ কাটিয়া
কি লিখিতে? সে ভাষাজ্ঞান আছিল কিঞ্চিৎ ।
কি দেখিতে হাতের নখে নেওয়ায়ে নয়ন,
নখ-মুকুরে দেখতে মােদের এ ভাবী জীবন?
দিনের মধ্যে একশতবার নানা ছুতােয় দেখা,
সেই বয়সেই নানান ছলই ছিল মােদের শেখা।
সবার সাথে হইত কথা তােমার সাথেই নীরবতা।
অনেক বারই আঁচল বায়ের পরশ পেতাম গায়ে।
উচ্চগলা আসত নেমে উচ্চহাসি আসত থেমে
দৌড়ে চলা বন্ধ হতে বাধত আঁচল পায়ে।
সখীই হতাে তিরস্কৃত, ছিল আমার জানা
সখীর প্রতি সে কুটী আমার পানেই হানা।
ফিরতে তুমি ঘাটের পথে চরণ-চিহ্ন এঁকে,
পা ফেলিম সিক্ত মাটির দাগটী দেখে দেখে।
প্রতিপদক্ষেপেই রাণী শিউরে উঠত অঙ্গখানি,
তােমার আমার একঘাটেতেই আগে পিছে স্নান।

পূর্বরাগ
শিউলিগুলি জড়াে করে রেখে দিতাম অনেক ভােরে,
তাই ছিল মাের তােমায় আমার শরৎপ্রাতের দান।
সখীর কানে কি বলিতে কিছুই নাহি জানি,
ভঙ্গী দেখে বুঝে নিতাম প্রসন্নতার বাণী ।
প্রাণেপ্রাণেই চেনা ছিল তােমার শখের ধ্বনি,
সুপ্ত আমার প্রেম-দেবতার সে যে জাগরণী।
এক কথা বেশ আছে মনে ভুলব না তা এই জীবনে,
সাঝ পূজনির প্রসাদ-বিলি হেমন্ত-সন্ধ্যায় ।
দিতে আমায় হাতটী নড়ে গেল প্রসাদ ধুলায় পড়ে।
ঠেকাইলাম মাথায়, হেসে তুলে নিলাম হাতে।
নিশ্বসিত পরশ তােমার লাগল আমার গায়ে,
সারা রাতির ঘুম গেল মাের আনন্দে হারায়ে।
সখীর সাথে দাড়িমছায়ে খেলাপাতির ঘরে
পুতুলপালন করতে তুমি পরম সমাদরে।
তাহার মাঝে সানে পড়ি দিতাম রসভঙ্গ করি’
ফেলে তুমি পলাইতে সাজানাে সংসার,
কি বলিতে রুষ্ট বচন শুনতে আমি পাইনি তখন,
আজকে বুঝি কি অভিশাপ দিতে বারংবার।
তােমার সাথেই খেলাপাতি পাততে হলাে প্রিয়ে,
বাল্যখেলায় যােগ দিয়ে তাই দিচ্ছি পুতুলবিয়ে।

পর্ণপুট
চোখের জল
প্রবাসে ফিরিতে হবে, একে একে ফুরাইল ছুটি
কাতর-নয়নে নব প্রেয়সীর ধরি করদুটি
কহিলাম,‘প্রিয়তমে, চলিলাম দাও গো বিদায়।
পাইতেছ বড় ব্যথা, নয় প্রিয়ে ? নাই যে উপায়
যেতে হবে, মনকষ্টে থেকনাক ফিরিব সত্বর
কাদিও না”। মনে পড়ে শুষ্ক কণ্ঠে করিলে উত্তর,
“কষ্ট কি? স্বচ্ছন্দে র’ব, পত্র শুধু দিও মাঝেমাঝে,
বধূর অঞ্চল ধরি পুরুষের থাকা কভু সাজে ?
বিদায় দিতেই হবে, তার তরে নাটুকে কঁাদন
আসে না আমার চোখে।” খুলে নিলে বাহুর বাঁধন
আবার বলি,—‘মনে মাঝে মাঝে পড়িবে-ত প্রিয়ে
মাের কথা? ‘তাহা আর পড়িবে না? কাজ কর্ম নিয়ে
সারাদিন র’ব ভুলে। পত্র কিন্তু মাঝে মাঝে দিও।
দুয়ারে তৈয়ারী গাড়ী, আর দেরী করিও না প্রিয়
মিছামিছি ! অই শােন বারবার ডাকিছেন মাতা,
ব্যস্ত ত্রস্ত পিতা দ্বারে, অই ঘরে আছে ঘটপাতা
প্রণাম করিয়া যেও।” এত বলি করিল প্রণাম
প্রিয়া মােরে।
ক্ষুন্ন মনে দীর্ঘশ্বাসে বিদায় নিলাম।
হায় রে নিষ্ঠুরা নারী। যাত্রাপথে দাড়ায়ে উঠানে
একবার চাহিলাম উপরের বাতায়ন পানে
শেষ দেখা দেখিবারে ! দেখি চোখে দরদর ধারে
ঝরিছে প্রিয়ার অ—মুছিতেছে তারে বারেবারে

ভুষণ
অঞ্চলের প্রান্ত দিয়ে। হেরি তাই এই ভগ্নবুক
নাচিয়া উঠিল হর্ষে। তাড়াতাড়ি ফিরাইয়া মুখ
প্রণমি পিতার পদে—করিলাম শুভযাত্ৰা মাের,
আনন্দ-পাথেয় হলাে প্রেয়সীর নয়নের নাের।
সম্বল তাহাই শুষ্ক এ প্রবাসে। সেই দৃশ্য স্মরি’
সৰ্ব্ব গ্লানি সৰ্ব্ব জালা সকল বেদনা দূর করি।
নিষ্ঠুর পুরুষ হায়, প্রেয়সীর তপ্ত আঁখি জল
উল্লাস গৌরব সহ দেয় তার সাধনায় বল।
ভূষণ
চেয়েছিলে ভূষণ, প্রিয়ে, ভূষণ সবি সঙ্গে আছে।
আছে হৃদয়-মঞ্জ যাতে আছে আমার অঙ্গে আছে।
আজকে বুকের রক্ত দিয়ে, আতা দিব পরাইয়ে,
সােহাগে সই দুলিয়ে দেব চুমার নােলক নাকের কাছে
2.
রচিব হার একটা হাতে, মেখলাটি অন্যটাতে
তােমার কাণে প্রেমের গানে রচিব দুল নূতন ছাঁচে।
পায়ে দিব হিয়ার নূপুর, বাজবে প্রিয়া ঝুমুর-ঝুমুর,
ভূষণ পরে দেখবে বয়ান আমার দুটী নয়ান-কাচে।

পর্ণপুট
সম্পূর্ণতা
গগনে কোটি তারকা হয়ে তােমার পানে চাহিয়া রই,
পরাণ ভরি নিরখি কোটি নয়নে,
গহনে কোটি কোরক হয়ে স্ফুটন-ব্যথা নীরবে সই,
তােমার তরে রচিতে ফুলশয়নে।
অযুত নদীলহরী হয়ে চরণে লুটি তাথৈ—থই,
চিকন চারু চিকুর হই ও-শিরে।
তােমারি স্বেদ অপনােদনে মধু-পবন-জীবন বই,
তনুতে অনুলেপন হই উশীরে।
অশ্রু হয়ে গণ্ডে দুলি,—হাস্যে ফুটি আসে অই
পুলকে উঠি কণ্টকিয়া হরষে,
ঘুমালে তুমি স্বপন হয়ে জাগিয়া তােমা ঘেরিয়া লই,
আবেশ মােহে মূরছি রই উরসে।
তােমার প্রতি অণুটি চাই। ইহ-জীবনে লভিনু কই ?
শরীরী হয়ে তােমারে, সতি, লভিনি,
বাসনা তাই তনুটি তব ভূষিতে পুড়ে ভস্ম হই,
মরিয়া লভি করিয়া তােমা যােগিনী।

কল্পলক্ষী
চির-তরুণী
তব মনােবন মাঝে কার বীণাবেণু বাজে ? বলগাে প্রিয়া,
কে তােমারে চুপে চুপে রাখে নব নব রূপে সঞ্জীবিয়া?
কোন চিরসুন্দরী নিতি তুলে মঞ্জরি’ প্রতিমা তব ?
অবিরত মধু ক্ষরে আলসে এলায়ে পড়ে অলি যে পিয়া।
সেই মুখে হাসি রাশি সেই ভালবাসাবাসি, মানসহরা,
একই সেই তনুমন একই কথা অনুখন আকুতি ভরা,
তবু যা যখন লভি, মনে হয় যেন সবি সরস নব,
কে রহি ও-অন্তরে সদ। ফুল-খেলা করে তােমারে নিয়া?
কল্প-লক্ষ্মী
‘চিত্রিত’ তব নেত্র জ-লতা বদনখানিতে, বধু,
দিল ‘সঙ্গীত’ বীণা-ঝঞ্ছত তােমার বাণীতে মধু।
চুম্বনে পেয় ও-অধরে ঘন কিবা কবিতার রস,
বিনােদ-বেণীতে ‘বয়ন’-বিলাস, গ্রীবা গায় তার যশ
গতি-ভঙ্গিতে, লাস্যের লীলা, সুন্দর করে গেহ,
যৌবনে ক্ষোদি’ ‘ভাস্কর-কলা বন্ধুর করে দেহ।
কারু-শৃঙ্খলা চারুকৌশল-মিলন-মেলার ভূমি,
নিখিল শিল্পে পরিকল্পিতা কল্প-কমলা তুমি।

পর্ণপুট বিরহতপের শেষ সে দিন ফাল্গুনে যবে মদকল পিকরবে অরণ্য জাগিল, ত্যজি রেণুঘন শ্বাস, রসাল-মুকুল-মুলে মল্লিকা বকুল ফুলে ছুটিল করীর কুম্ভে মদিরা উচ্ছ্বাস। সেদিন এলে না বঁধু সুরভি করবীমধু গড়ায়ে পড়িল ঝরি ধরণীর বুকে, বনশ্রী-কপােল’ পরে বসন্তের বিধারে চুম্বন উঠিল ফুটি অশােকে কিংশুকে। তােমারি আশায় আমি খেলি এ অঙ্গে আমি হােলীরঙ্গ দিবাযামী লাবণ্যের ফাগে, যতনে জালিনু দীপ পরিনু রতনটীপ অধর করিনু রাঙ্গা তাম্বুলের রাগে। জাগিনু চঁদিনী রাতি রাখিনু মালিকা গাঁথি নিচোল আঁচলে, পল্লবিনী বল্লীসমা ফুল্লপীনা মনােরমা, তরু আলিঙ্গন মাগি লুটিনু ভূতলে। যৌবনের ভরা কূলে মাধুরীতরঙ্গ দুলে, তনু রােমাঞ্চিত কেলি-কদম্বের প্রায়, সেদিন এলে না প্রিয়, দেহকান্তি কমনীয় হয়ে নীল হলাহল দহিল আমায়। কুসুম-শয়ন পাতি বিরহতপের শেষ অকস্মাৎ এলে যবে, ভস্ম করি মনােভবে পুন ধ্যাননিমীলিত রুদ্রের নয়ান, জীর্ণ পর্ণে মর্মরিত বনহৃদি জর্জরিত ঝলসিয়া শুষ্ক শীর্ণ ধরার বয়ান। শতগ্রন্থি বেশবাস, ধূসরিত কেশপাশ উড়ে যেন গৃধিনীর রুক্ষ পক্ষ জাল। যেন ধূ ধূ বালুকায় নিদাঘতটিনী প্রায় কোনরূপে রাখিয়াছি করােটি কঙ্কাল। তােমার করুণা লাগি বিরহ-মিনী জাগি অরুণ কোটরগত খঞ্জননয়ন। আশাতৃষা রসাবেশ, ধূপায়িত, পাংশুশেষ, অঙ্গার করেছে মর্ম মুৰ্ম্মর-দহন। সহসা আসিলে বঁধু, নাহি সুধা, নাহি মধু, নাহি কোনাে আয়োেজন ভাষায় ভূষণে, গৃহে নাহি দীপআলা গাঁথা নাহি বনমালা নাহি রসগহ্মডালা বরিব কেমনে ? বিরহ-তপের শেষ, এস এস হৃদয়েশ, এস নীলকণ্ঠ মাের, মন্মথমথন, আজ ভস্ম সবি মম, দহনে উজ্জ্বলতম শুধু হৃদে রাজে প্রেম-হেম-সিংহাসন। ลฯ

পর্ণপুট
ব্যর্থ-বিলাস
তব লাবণ্য-অচ্ছেদ-নীরে করেছি কেবল জল-খেলা,
লালসা-তাপিত এ তনু জুড়াতে কেটে গেছে মাের সারাবেলা।
সবােজ-সুরভি কলতরঙ্গে
এলায়ে দিয়াছি অলস অঙ্গে
হরষ রঙ্গে চল বিভঙ্গে নিখিল বিশ্বে করি হেলা ।
তব লাবণ্য-সরােবরে আমি করেছি কেবল জল-খেলা।
সাধক-সংঘ ডেকেছে তুৰ্যে, শঙ্খেমঠের পুরােহিত।
বিষাণ ডমরু বাদনে ডেকেছে জীবন-সমরে স্মরজিৎ।
কত অভিযান কত উৎসব
তুলিয়াছে দূরে কল কলরব,
ভাগ করে নেছে জয়-বৈভব মহামানবের মহামেলা,
তব লাবণ্য-সরােবরে আমি করেছি কেবল জল-খেলা।
যাত্রীরা সব পথে যেতে যেতে ডাকিয়াছে মােরে ‘আয় আয়,
শুনেও শুনিনি, প্রহর গুণিনি, বিভাের ছিলাম হায় হায় ।
বাণীরে ভুলিয়া মরালের তঁার
কণ্ঠ ধরিয়া দিয়েছি সাঁতার,
পদ্মরে ভুলে পদ্মে মজেছি আঁকড়ি ধরেছি ফুলভেলা।
তব লাবণ্য-সরােবরে আমি করেছি কেবল জল-খেলা।
৯৮

প্রিয়ার কৈশাের
প্রিয়ার কৈশাের
আজিকে বসন্তরাতে স্মরি তােমা, প্রিয়ার কৈশাের,
মম নবযৌবনের কুঞ্জবনে লীলাসহচর।
মনে পড়ে স্মিতরম্য কুণ্ঠান তােমার মূরতি,
আরক্ত আনত মুখে হর্ষে ভয়ে ব্যাকুল মিনতি।
স্মরি সে বাহিরে বাম, লজ্জাভীরু, অন্তরে দক্ষিণ
তােমার মধুর ভঙ্গি, সন্ধ্যাম্লান নয়ন-নলিন।
পদনখে ক্ষিতিচিত্র, অঙ্গময় প্রণয়-অঙ্কুর,
মম দৃষ্টিমহােৎসব লীলায়িত গঠন বন্ধুর,
লীলাভরে সাজাইতে ফুলধনু নব নব ফুলে
সুরভি কুসুমাসব উচ্ছলিত অধরের কূলে।
তরুতলে স্বিন্নাঙ্গুলে ফুলমালা গাঁথিতে যখন,
পিছু হতে ধীরে আসি রুধিতাম তােমার নয়ন।
আমার কিশাের-বন্ধু দিয়াছিলে অপূৰ্ব্ব জীবন,
তব সাহচর্যে মম সত্য হলাে স্বপ্নের ভুবন,
ইন্দ্রায়ুধময় হলাে শির’পরে অনন্ত আকাশ
অফুরন্ত পরিমলে ভরে গেল উন্মদ বাতাস।
মহােৎসবময়ী হলাে নৃত্যগীতে দানপত্রে ধরা,
সব পেয় হলাে সীধু সব ভক্ষ্য হলাে মধুভরা।
‘পঙ্কজে পঙ্কজে আহা ভরে গেল যেথা যত জল
ভূঙ্গে ভূঙ্গে ভরে গেল নিখিলের সকল কমল।
ลล

পর্ণপুট
গুঞ্জন করেনি হেন মধুব্রত ছিল না তখন
মানস হরেনি হেন কলগুঞ্জ করিনি শ্রবণ।
সুস্বপ্নে ভরিল সুপ্তি, মুক্তাফলে হৃদিশুক্তিতল,
অকাজে ভরিল দিন, বিভাবরী চন্দ্রিকা উজ্জ্বল।
ভরিল হেমন্তসন্ধ্যা রাস-রসে মাধুরী-উচ্ছ্বাসে,
সুখদ হইল শীত পরিরম্ভে উষ্ণ ঘন শ্বাসে !
বসন্ত ভরিল মাের ফাগে ফাগে হােলীর মিলনে
বরিষা ভরিয়া গেল নিশি নিশি ঝুলনে ঝুলনে।
কবিত্বে ভরিল চিত্ত, সব বাণী ভরিল সঙ্গীতে,
প্রকৃতি ভরিয়া গেল লীলায়িত প্রসন্ন ভঙ্গিতে।
আবার মাধবী নিশা কালচক্রে আসিয়াছ ফিরে।
বাজে না তােমার বাঁশী মম প্রেম-যমুনার তীরে।
পলাশে বিলাস নাই, রাশােক আজি শােকারুণ,
কোকিল পাপিয়া-কণ্ঠে বাজিতেছে বেহাগ করুণ।
শুষ্ক আজি শুক-কণ্ঠ, নাহি রস রসাল-মুকুলে,
আকুঞ্চিত চঞ্চলশ্রী নাহি বন-লক্ষ্মীর দুকূলে।
আজি ব্যর্থ রজনীতে দীর্ঘশ্বাস তেয়াগি কেবল,
প্রিয়ার কৈাশাের, তব মধু-স্মৃতি করিয়া সম্বল ।
১০০

কল্যাণী
কল্যাণী
কথা তুমি কোন দিনই কহনিক অকারণ, দিয়াছ উত্তর
মিত-ভাষে, স্মিতহাসে, প্রণয় প্রলাপে যবে হয়েছি মুখর !
পরম বাগ্মিত ভরে জটিল সমস্যা ববে করেছি ব্যাখ্যান,
দিয়াছ সংযত কণ্ঠে একটি কথায় তার মন্ত্র-সমাধান।
শুনিনি করিতে তােমা হাস্য পরিহাস কভু সখীজন সহ
কখনাে কাহারাে সাথে কোন ছল আছিলাতে করনি কলহ।
কাহারেও কোন দিন হইয়া মমতা হীন করনি ভৎসনা
নিন্দ। শুনে হাসিয়াছ, পরনিন্দা কলঙ্কিত করেনি রসনা।
মুখ ফুটে কোন দিন আপনার সন্তানেরে করনি সােহাগ,
মুখ পানে চেয়ে চেয়ে বুলায়েছ অঙ্গে তার স্নেহ অনুরাগ।
পীড়িত হয়েছি যবে করিয়াছি আর্তনাদ হওনি অস্থির,
অনাময় পাণি তব বুলায়েছ তপ্ত অঙ্গে অঙ্কে রাখি শির।
নিজে যবে রােগশয্যা গ্রহণ করেছ সখি রয়েছ নিৰ্বাক,
চাওনিক পরিচর্যা করেছ অসহ্য ব্যথা ধীরে পরিপাক।
কতদিন লাগিয়াছে বুঝিতে তােমারে, স্মরি আজি লজ্জা হয়,
ভালবাস’ কি না বাস’ কতবার মুঢ় মনে জেগেছে সংশয়।
তােমার তরল দৃষ্টি তােমার সরল ভঙ্গি স্নিগ্ধ স্পর্শখানি
একে একে ঘুচায়েছে আমার অবুঝ মনে সৰ্বদ্বিধা গ্লানি।
তব সেবা-শৃঙ্খলায় অসীম গভীর ধীর উদার সংযমে,
পরিচ্ছন্ন অবিলাসে ঘটাহীন বেশবাসে চিনিয়াছি ক্রমে।
ক্ষম সব পরমাদ চপলতা অপরাধ, হে মাের ইস্রাণি,
ধন্য আমি তােমা সেবি কারুণ্য-গম্ভীরা দেবি হে সতি কল্যাণি।
১১

পর্ণপুট
কুণ্ঠিতা
তুমি জ্ঞানী গুণবান,
তব সখী হ’তে নাই যে শকতি, তাই কাদে মম প্রাণ।
পূজিতে জানি না তােমার গরিমা, বুঝিনে তােমার ভাষা,
বচন-দৈন্যে বুঝাতে পারি না হৃদয়ের ভালবাসা।
তােমার যা প্রিয় আলােক-সাধনা, মাের তা অন্ধকার,
মম অস্বচ্ছ হৃদয়ে ফুটে না প্রতিবিম্বটি তার।
কৃপায় নীরবে চেয়ে চেয়ে যবে অলকে বুলাও কর,
লজ্জাকাতর সঙ্কোচে মাের কুষ্ঠিত অন্তর।
আমি এ অবােধ নারী,
তােমার চরণে লুটে-পড়া ছাড়া আর কি করিতে পারি?
তুমি যে কর্মবীর,
উন্নত-কায় উদার-হৃদয়, ভূধরের মত ধীর।
ক্ষুধিতে তুষেছ যােগায়ে অন্ন, তাপিতে ছত্র ছায়ে,
হে ত্যাগি ! কতই লাঞ্ছনা তুমি সয়েছ আমার দায়ে।
হৃদয়-রুধিরে শ্রমজল করে’ রাখিয়াছ সংসার,
ঝঞ্চা-ফেনিল তটিনী-বক্ষে অটল কর্ণধার ।
বুদ্ধির দোষে জঞ্জালজাল যতই জড়ায়ে তুলি,
নিশিদিন জাগি হাসিমুখে তুমি একে-একে দাও খুলি।
অমি এ অবলা নারী-
তব চরণের দাসী-হওয়া ছাড়া কি আর করিতে পারি ?
১০২

কুষ্ঠিত
তুমি যবে গাও গান,
আমি শুধু শুনি বুঝিনাক গুণি, রস-তাল-লয়-মান।
স্রোতােধারাসম কতদূর হতে শ্রোতা চলে আসে ছুটে,
সখ্যোপাের অৰ্ঘোপচার বহি অঞ্জলিপুটে ;
দেশ-বিদেশের কত অজ্ঞাত হৃদিগুলি লও জিনি,
আমার মাথায় যে মাণিক জ্বলে আমিই তাহা না চিনি।
এত গৌরব সৌরভ-রাশি কোখ। হ’তে নাহি বুঝি,
মৃগমদময়ী মৃগীর মতন মরি সারা বন খুঁজি।
আমি এ অবােধ নারী
প্রেমের কোরক ভক্তিতে ফুটে কেমনে রুধিতে পারি?
তুমি ভালবাস কত
পেলে এক কণা জুড়ায় বাসনা, ঢালো ঝরণার মত।
রােগের শয়নে অরুণ নয়নে জাগিয়াছ সারারাতি
পক্ষের পুটে অচ্ছাদি সবি নিয়েছ বক্ষ পাতি'।
অতিকরুণায় দিয়াছ লজ্জা, সজ্জা করি না তাই,
দেবি বলি ডাকো, দাসী-হওয়া ছাড়া মোর যে স্বস্তি নাই
লােহার আঘাত সহিয়া অঙ্গে বুলালে কনক-কর,
প্রতিদান দিতে ক্ষণেকের তরে দিলে কই অবসর ?
আমি দীন হীনা নারী
কেশ দিয়ে তব পদধূলি মূছি, আর কি করিতে পারি ?

পর্ণপুট
কুণ্ঠাহরণ
এ অধম রূপহীনে, হে সুন্দরি, করেছ সুন্দর,
অনলে অঙ্গার যেন চন্দ্রিকায় বন্ধুর ভূধর।
শােভিয়াছি পদ্মকোষে রেণুমাখা মধুপের প্রায়,
লজ্জারুণ গণ্ড’পরে কালাে আঁখি যেমন মানায়।
হে কমলা, এ নিধনে করিয়াছ কুবেরের মত,
রেণু হয় স্বর্ণরেণু তব পদ চুমিয়া নিয়ত।
তপে তুষ্ট বাণী মাের, মম ধ্যান ধারণার ছবি,
মূর্তিমতী এ মন্দিরে, এ মূর্যেরে করিয়াছ কবি।
গুঞ্জরি’ উঠিল প্রাণ, কিংশুকেও অর্পিলে সৌরভ,
কল্পলতা! বরষিছ কুসুমিত কবিত্ব-বৈভব।
আজিকে জীবন যেন অনুপ্রাস-ঝক্কত মূৰ্ছনা,
তােমারি মঞ্জীর-শিঞ্জে করে ছন্দ তােমারি অর্চনা।
হে নিৰ্মলা পূতশীলা, এ পঙ্কিলে করেছ নির্মল,
সংহত সংযত নত করি মাের যা ছিল চপল।
শঙ্খম্বনে সন্ধ্যাদীপে তব শুভ কঙ্কণ-নিকণে,
পুণ্যের বােধন হলাে শূন্য গৃহে কল্যাণের সনে।
সার্থকতা লভে দিব্য জ্যোতির্ময় তােমার নয়ন,
প্রতি পদপাতে মােরে নেতারূপে করিয়া শাসন।
১০৪

শ্রীক্ষেত্রমাল
শ্রীক্ষেত্ৰমঙ্গল
এযে-মহামিলনের ক্ষেত্র,
শত শত দলে মিলন-কমলে ফুটে হেথা জ্ঞান-নেত্র।
অসীমার সনে সসীম মিশেছে, চেতন মিশেছে জড়ে,
নীলিমার সাথে দেউল মিলেছে, কেতন মেতেছে ঝড়ে।
সিন্ধু-আকাশে বসুধা-ত্রিদিবে দিগন্তে কোলাকুলি,
মিলন-স্বপন হেরিছে তপন লহরী-দোলায় দুলি’।
এ যে—মহামিলনের ক্ষেত্র
ফুটে অনন্তে অন্তর হেথা, ছুটে দিগন্তে নেত্র।
এযে—পরম প্রেমের স্বর্গ
নর সহ শিলারূপে করে লীলা হেথায় অমরবর্গ।
অযুত কণ্ঠে বিভুবন্দনা স্বরসঙ্গমে ছুটে,
মিলনানন্দ-মধু-মূচ্ছনা জড় জঙ্গমে উঠে।
লক্ষ কমল-কুটাল জাগে প্রাঞ্জলি পাণিপুটে,
হৃদয়ের হ্রদে হেথায় নদীয়া-দের বিশ্ব ফুটে।
হেথা-মঠে মঠে রচি স্বর্গ,
সন্ন্যাস সহ সংসার মিলি বিতরিছে অপবর্গ।
হেথা-নাহি লাজভয়বন্ধ,
বাজিছে পাবন জীবন-শঙ্খে ভুবনবিজয় ছন্দ।
বিরাট বিশাল দেউলের ভাল রাজে নীলিমার তলে,
উজলিয়া বেদী বিরাটপুরুষ মহামহিমায় জলে।

পর্ণপুট
উদাস উদার হেথা পারাবার ভাতিছে বিশ্বরূপ,
তাহার কেশরে চরণ রাখিয়া নাচিছে বিশ্বভূপ।
হেথা—নাহি ক্ষতি ক্ষয় দ্বন্দ্ব,
স্বত নত হয় হেথায় হৃদয় নাহি অবিনয়-গন্ধ।
হেথা-এস নর মােহমত্ত,
ক্ষণেকের তরে ত্যজ তমােরজঃ ভজ শােকাহ সত্ত্ব।
জীবনের গ্লানি ধুয়ে
অভিমানী ছেড়ে এস কোলাহল,
পিও হরিণাম-শতদল-মধু পরিণামে সম্বল।
নামাও স্বিন্ন সংসার-ভার, জাগ’ ম্রিয়মাণ মন,
মেল বিলােচন ভজ’ অশােচন পাপ-বিমােচন ধন
এস-মম মন মদমত্ত,
ক্ষণেক এ ধামে মজ’ বিভুনামে, ভজ’ ভগবতন্তু।
হেথা—হের তুমি কত তুচ্ছ,
হের চারিধার অসীম উদার বিরাট বিশাল উচ্চ ।
সবি মায়া, এক মায়াধীশ ছাড়া ভবে নাহি কেহ আর,
ভেবে দেখাে মন, ফুটুক নয়ন, লুটুক ও-দেহভার।
সব ভয় লাজ করি জয় আজ জয়নাদ কর’ প্রেমে,
বিশ্বনাথের রথঘর্ঘরে ধুকধুকি যা থেমে।
হের—তুমি কত হীন তুচ্ছ,
বৈশ্বানরের খাণ্ডবদাহে তুমি শুধু তৃণ-গুচ্ছ।

মন্দিরে-না-সিন্ধুনীরে
মন্দিরে-না-সিন্ধুনীরে ?
মন্দিরে কি সিন্ধুনীরে কোথায় আছ, জগন্নাথ ?
পুরীধামে এসে তােমায় কোথায় করি প্রণিপাত ?
দেখলে ভেবে রয় না দ্বিধার ধুকধুকুনি বুকটিতে।
বন্ধমাঝে তেমনি আছ—যেনি আছ মুক্তিতে।
হেরি হেথায় সকল ঠায়েই কি তারকা, কি গ্রহে,
অনন্তনীল মহিমাতে, দেবালয়ের বিগ্রহে।
অসীম হতে সসীম পথে নিত্য তােমার যাতায়াত,
সিন্ধুতীরে—শ্রীমন্দিরে তােমায় নমি জগন্নাথ।
শিল্প-শােভায় তেম্নি আছ যেমন আছ নিসর্গে,
আছ তুমি সংসারেতেও যেমন বিরাগ-বিসর্গে।
রণােন্মাদে তেমনি আছ, যেমন আছ শান্তিতে,
রুদ্রে আছ, ভদ্রে’ আছ, উত্তালতায়—ক্ষান্তিতে।
সৃষ্টি পালন লয়ের মাঝে সমান তােমার অধিষ্ঠান,
চক্রগদায় ধ্বংস করাে, পদ্মশঙ্খে, পরিত্রাণ ।
অন্ন দিয়ে পালন করাে, বন্যা দিয়ে সমুৎখাত।
স্তব্ধ তুমি, ক্ষুব্ধ তুমি তােমায় নমি জগন্নাথ।
শান্তসাকার, তুমি আবার অপ্রশান্ত নিরাকার,
বাঙমানসাতীত তবু ‘যােগক্ষেমের’ বইছ ভার ।
মহােৎসবের উপচারে লুপ্ত তােমার পদদ্বয়,
প্রচণ্ড তাণ্ডবে আবার ঠেলছ পায়ে অর্ঘ্যচয়।
১০৭

পর্ণপুট
শ্ৰীমন্দিরে তােমার পাতা মধুপুরীর সিংহাসন,
উদ্বেল উদ্দণ্ডলীলায় সিন্ধু তােমার বৃন্দাবন।
মানব তােমার চামর ঢুলায়, দানব দুলায় ঝঙ্কাবাত,
দারুব্রহ্ম-বারি-ব্রহ্ম,—তােমায় নমি জগন্নাথ ।
আগ্রায়
কোথা আজি মহারাজ,
রাজ-সমারােহে নিতি উৎসব, মমতার মমতাজ?
তােমার রচিত কনকখচিত মীনার স্তম্ভচূড়া
করে উপহাস, তােমার বিলাস রাজগৌরব গুড়া।
কালের সে রথ থামে না কখননা, নিঠুর চক্রতলে
হুজুর মজুর আমীর ফকীর সবারে পিষিয়া চলে।
রাজার প্রাসাদ দীনের কুটীর সমান দাগাই পায়,
গম্বুজে ব্যথা করে গমগম’, মাঠে মাঠে, হায় হায়।
বাদশা তাহার বেগম হারায়, কৃষক কৃষাণী তার,
রাজা ও রায়তে একঘাটে আনে বুকফাটা হাহাকার।
গরীব কাদিলে গােরের মাটিই তিলে তিলে যায় টুটে,
বাদশা কাদিলে মণিমুক্তাতে তাজখানি গড়ে উঠে।
প্রাণ কঁাদে পথে পথে,
বেদনা কিছুতে পড়েনাক ঢাকা ঘটাছটা-দৌলতে।
১০৮

গিরিধির উস্রিতটে
গিরিধির উতিটে
উশ্রিতটের বাড়ীগুলি পানে চেয়ে চেয়ে আজি হায়,
কল্পনা মাের মহাপথ দিয়া অনন্ত পানে ধায়।
শীর্ণ শিকের বাতায়নগুলি,বসি হােথা সাঁঝে ভােরে
মহাযাত্রার স্বপ্ন দেখেছে কত জনই ঘুমঘােরে
মৃত্যুজয়ের মন্ত্র জপিয়া বসিয়া বসিয়া তারা
অসীমের সনে রচিয়া গিয়াছে মনােময় যােগধারা।
তীর্থও বলা যায়,
মরণপথের পান্থশালা এ উরি কিনারায় ।
রুগ্ন শয়ন বড় অসহন কিছুতে স্বস্তি নাই,
বৈকাল হ'তে জানালার পাশে আসন লয়েছে তাই।
জানালারি পাশে গাছে গাছে পাখী খেলিয়াছে ঝাঁকে ঝাঁকে,
দিবসের বােদ এসেছে পড়িয়া শালবীথিকার ফাকে ।
দিনের আত্মা অস্ত গিয়াছে দূর গিরিটির পাশে, ,
নিভিয়া এসেছে সকল আলােক তাহাদের নিশ্বাসে।
পাখীগুলি তুলি তান
ধূসর গােধুলিরূপী মরণের গেয়েছে বিজয়গান।
গােণা ক’টি দিন, তাদেরি একটি হইয়াছে যবে শেষ,
কি ভেবেছে তারা দিগন্তপানে চেয়ে চেয়ে অনিমেষ ?
তাদের ধ্যেয়ানে কি ভাবে কে জানে জাগিয়াছে মহাপথ,
অজানা সে পথে কতদূর গেল তাহাদের মনােরথ ?
১০৯

পর্ণপুট
ভেবে ভেবে তারা ও পারের কিছু পেয়েছে কি সন্ধান ?
তাদের মনের রক্তসন্ধ্যা পেয়েছিল নিৰ্বাণ?
দেখেনিকি থেকে থেকে
উরি তটে তাদের চিতাই জ্বলিতেছে একে একে ?
সুদূরের পানে চেয়ে চেয়ে তারা হয়নি কি উন্মনা ?
বিধির হৃদয় সিক্ত করেনি তাদের অশ্রুকণা ?
কত প্রিয় মুখ জেগেছে মানসে কত আঁখিজলধারা,
কি বলে তাদের বিদায় দিয়েছে, বিদায় নিয়েছে তারা?
বসে বসে তার চিরবিদায়ের কি করিল আয়ােজন ?
অশেষ পথের কি পাথেয় তারা করেছিল আহরণ ?
কোন আশ্বাস হায়
কোন সান্ত্বনা পায়নি কি তারা অসীমের ভাবনায়।
হােথা ব’সে-বসে ফেলিল কি তারা সব বন্ধন থুলি ?
ফেলিল কি মুছে অশ্রুসলিলে জীবনের মলা ধূলি ?
ধবার মমতা গেল কি ভাসিয়া অসীম চিন্তাস্রোতে ?
চিরশান্তি কি হ’লাে বরণীয় বােগ-যন্ত্রণা হতে?
কি বলে বুঝায়ে মনটিকে রাতে ঘুমাতে পারিত তারা?
শ্রীহরির পায় সপি আপনায় পাইল কি কোন সাড়া?
আজি মনে জাগে সাধ
শুনিতে তাদের বিদায়-পথের হৃদয়ের সংবাদ ।
১১০

পালামৌ
জানালার শিক শীর্ণ হয়েছে তাদের হাতের ঘামে,
তাদের হেলানে দাগ ধরে আছে দেওয়ালের চুণকামে।
তাদের তপ্ত নিশ্বাস ফেঁসে আজও শালবনমাঝে,
শুষ্ক পাতায় তাদের মৰ্ম্ম-পীড়া মরমরে বাজে।
আজি তারা মাের পরমাত্মীয়, কালাে ছায়া ছবিসম,
তাদের ভাবনা জাগে পর পর আজি অন্তরে মম।
আজিকে সবার শােক
জাগায় এ মনে জ্যোতিঃহারা শত আয়ত কাঙাল চোখ।
পালামৌ
ঐ যে গিরির গায় শােভিছে গিরি,
তমাল পিয়াল ছায় রয়েছে ঘিরি’
নীলাকাশে দিক্ শেষে
ধূমাইয়া ঠিক মেশে।
দ্যুলােক-দেশের পথে সাজানাে সিঁড়ি।
স্বপনপুরীটি বুঝি মায়ায় গড়া,
পালক দুলানাে শত পরীতে ভরা
কাছে ভাবি যাও যত,
আরাে দূর, দুর কত?
নীল মরীচিকা যেন বুদ্ধিহরা।
১১১

পর্নপুট
যেখানে আঙুল দিয়ে বালুকা খুড়ে,
জলপান করে. রাহী আঁজুল পূরে।
যে নদী শুকানাে মরা,
দেখিবে দু’কূলভরা
পার হয়ে কিছু পরে আসিতে ঘুরে।
পাষাণ চিরিয়া যেথা ফোয়ারা ঝরে,
কোলবালা সাজে যেথা সিনান করে।
কোমরে দু’হাত দিয়ে
নারী ফেরে জল নিয়ে,
তিনটী গাগরী রাখি মাথার’ পরে।
কালাে পাথরের ছবি নিখুঁত হেন
কিশােরী চলেছে ছুটে যমুনা যেন ।
কে বলিবে ঝােপে ঝাড়ে
উজান বহাতে তারে
বাঁশরীটি বারে বারে বাজিছে কেন?
আপনার বাহুবল, প্রাণের প্রভু,
তরুণী এ দুটী সার, ভূলে না কভু,
পতিরে বিধিতে এলে বুকে তীর ধরে ফেলে ; ;
প্রেম সে মাতাল বটে, অটল তবু।
বকুলের বালা পরে বালক-বালা,
গলে শােভে লালনীল স্ফটিকমালা।
পাখীর পালখ চুলে,
পুঁতির মােলক দুলে,
মহুয়ার ছায়াতলে নাট্যশালা।
১১২

পালামৌ
মহুয়ার মদে চোখ ঘােরাল ভারি,
জোরালাে জোয়ান কোল ধনুকধারী,
ভালুকে ধরিয়া কাণে
গুহা হতে টেনে আনে,
বালক ঝাঁপিয়ে পড়ে পৃষ্ঠে তারি।
চকিত চটুল মৃগ আয়ত-আঁখি
ছুটেছে পিয়ালরেণু গায়েতে মাখি ।
রঙীন-স্বপন-আঁকা
শিখীরা ছড়ায় পাখা,
একসাথে ধরে ন হাজার পাখী।
মহুয়ার ফুলে সুরা চুয়ায়ে পড়ে,
মাদলে শিরীষ ফুল বাদল ঝরে।
দাড়ালে বকুল-মূলে
পা দুখানি ডুবে ফুলে,
রূপ-অভিমানে নীপ শিহরি’ মরে।
নদীতটে জ্যোছনার ফিনিক ফুটে,
মাণিক উজলে বনরাণীর মুঠে;
এলায়ে চিকন চুল
দু’কাণে রতন দুল,
জোনাকী-চুমকি-খচা অচল লুটে।
ঢেউএর উপরে ঢেউ শােভিছে গিরি,
যেথায় নাহিয়া দিঠি আসিছে ফিরি,
নাগবালাদের দেশে
নিয়ে যায় দূতী এসে,
ঐ খানে আছে তার সুড়ঙ সিড়ি।
১১৩

পর্ণপুট
নিদাঘে মহানদীকূলে
বড় আশা করে আজি আসিলাম চিরতৃষাতুর,
মহানদি, তব জলে তৃষ্ণাজ্বালা করিবারে দূর।
বড় সাধ ছিল এই তৃষাশুষ্ক আঁখিযুগ দিয়ে
অমল অমেয় তব বারিরাশি নিব সবি পিয়ে।
নদী মধ্যে রাজ্ঞীগণ্যা মহামান্যা তুমি মহানদী
ভেবেছিনু তপ্ত তৃষা যাবে চ'লে দেখা পাই যদি।
কিন্তু দেবি একি দেখি ধূধূ শুধু বালুকা-কঙ্কাল
তৃষ্ণাহরা কোথা শান্তি ? কোথা রসভাণ্ডার বিশাল ?
মুর্তিমতী তৃষ্ণা তুমি শুষ্ককা আজি ভিখারিণী,
দাউ দাউ জ্বলে জ্বালা-মৃগতৃষা অনলবাহিনী।
কোন সুধাসিন্ধু লাগি অগস্ত্যের তৃষা বহ হায় ?
কোন্ মন্ত্র জপিতেছ, মহাশ্বেতা, অক্ষমালিকায় ?
বড় আজ দিনু লাজ প্রার্থী হয়ে ওগাে মনস্বিনি,
তপস্বিনী তুমি দেবি নিঃস্বা আজি, আগে তা জানিনি।
অতিদানরিক্তা আজি ফিরাবে কি তুমি প্রার্থিজন ?
মৃৎপাত্রে আতিথ্য বয়ে আনিবে না রঘুর মতন ?
তুমি অন্নপূর্ণা, শুনি আসিলাম তােমার সকাশ,
কিন্তু একি মূর্তি তব ? এত তব নহে মা কৈলাস।
শ্মশানবাসিনী তুমি, অট্টহাস্য মুখে অবিরল,
নৃ-কঙ্কাল-ভস্মমুষ্টি ভিক্ষা দিতে তােমার সম্বল ;
১১৪

ধৰ্ম্মক্ষেত্র
হিমগিরি তব পূজা-মন্দির, সােপান-বেদিকা শৈলমালা,
দেবের পাদ্য নদীর কোশায়, কেদার-কানন, অর্ঘ্য-ডালা।
কুঞ্জ-কুজনে কল গুঞ্জনে পূজা শুরু গৃহে নিত্য নব,
মহাসিন্ধুর দুন্দুভি-নাদে জীমূতমন্দ্রে আরতি তব ।
গৃহ-প্রাঙ্গণ ভরা আলিপনে, শুকানাে প্রসাদী ফুলের স্তপে,
তব ঘাট ভরা কুশাঙ্গুরীতে, তব বাট ভরা দগ্ধ ধূপে।
ধ্যানযােগজপে জ্ঞানগতপে প্রতি রেণু পূত তিলকামৃত,
তােমার মাটিতে হাঁটিতে সতত ভব-ভয়ে তনু কণ্টকিত।
গােন তােমার করেছে পােষণ তাপস-জীবন, দেবের যাগ,
নৃপের ঋদ্ধি,—ধাত্রী বলিয়া লভেছে শ্রদ্ধা-সেবার ভাগ।
নীবার-দর্ভে তৃপ্ত শ্বাপদ যজ্ঞে প্রহরী হয়েছে বনে,
আশ্রমশিশু বিক্রমে দমি' যেথা কেশরীর দশন গণে।
বেণুকর-ধনে নাচিয়া নাচায় ফণিরাজ নিজ ফণার’ পরে,
রচে দেবতার কৃত্তি-মেখলা, সিন্ধু-শয্যা,ছত্র ধরে।
শাখামৃগ তব সতীর ভক্ত, রথীর রথের চূড়ায় রহে,
দেবীপাদপীঠ সিংহের শির, মকর গঙ্গাদেবীরে বহে।
দেবের ব্যজনে লােমশ পুচ্ছ দিয়াছে তােমায় চমর-বধু,
তুচ্ছ জীবন করে সমুচ্চ মধুমক্ষিকা বিতরি মধু।
মৃগমদ-রস-গন্ধবিনােদে বলে দেবীরে গন্ধসার,
দ্বিরদ,কুম্ভ, শুক্তি,-মৰ্ম বিদারি’ দিয়াছে মুক্তাহার।
১১৫

পর্ণপুট
শিলা, কুঙ্কুম-সিন্দুর, দিল কঙ্কালমাল-টঙ্কে ভেদি,
কুশশমী নিজ হৃৎপঞ্জরে পিঙ্গল করে যজ্ঞবেদী।
হৃদয়-তন্তু দিয়া কীট তব বুনেছে দেবীর ক্ষৌমপট,
বক্ষোরুধির-লাক্ষাধারায় রাতুল করেছে চরণ-তট।
‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ রাম-রাম’ বিনা শুক-মুখে নাই অন্য বুলি,
ক্রৌঞ্চ আপন বঙ্গোরুধিরে রামায়ণী ধারা দিয়াছে খুলি।
তিত্তিরি তব তপােবনে বসি উপনিষদের তত্ত্ব কয়,
কৃতকপুত্র শিখি-করি-মৃগ করিল মাতৃ-মমতা জয়।
অটবী পেলেছে ঋষিগণে বট-অশােক-বি-কুঞ্জছায়,
হােমধূমে তার কষায় নয়ন অরুণ কুসুমপুঞ্জে ভায়।
ঋষির হবিতে সমিধ যােগায়ে তরুগণ তব যজ্ঞরত,
জটা-বল্কল অমালিকা ভৃঙ্গার ধরে ঋষিরই মত।
দারু তৃণ চারুশিলায় মিলিয়া দিল দেবতায় সুরভি রস,
দেউলে দহিয়া মরিয়া লভিল ধূপ-গুগগুলু অমর যশ।
বহে শুভাশিস দূৰ্বার শীষ, মঙ্গলমৃং, মৃগ-রােচনা।
ধান্য তােমার অন্নদা মা’র অঞ্চলঝরা কনক-কণা।
বৈশাখী ঝারা জাহ্নবীধারা পুণ্যতরুর গাত্রে ঢালে,
তুলসী-কুঞ্জ সান্ত্বনা-বাণী গুঞ্জরে মহাযাত্রাকালে ।
স্বরগের ঘাটে নিতি খেয়া দিতে ভীষ্মমাতারে করেছ ব্রতী
স্নাত পাতকীর পাপ হরে রেবা সরযু কাবেরী সরস্বতী।
১১৬

ধৰ্ম্মক্ষেত্র
সত্ত্বমধুর পুলকাঙ্কুর-সঞ্চার সম ভক্ত-দেহে,
শতেক তীর্থ, মঙ্গলপীঠ জাগিয়া উঠিল তােমার গেহে
অম্বুধি কোটি ককণ্ঠে মঠমন্দিরে গাহিছে জয়,
যাগসম্ভব অমুদ তব ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে বন্দী রয়।
ব্রাহ্মী উষায় জাগি মৃদঙ্গে মঙ্গলারতি-শঙ্খতানে,
তব সুত চায় ভক্তসভায় রক্ত তরুণ অরুণ পানে।
স্নানপথ হতে সিক্ত বসনে ডেকে আনে গৃহী অনাথজনে
‘ভােগে’, দেবতার ক্ষুধা হরে বলি’ রন্ধনে গৃহযজ্ঞ গণে।
পঞ্চযজ্ঞ সারি তব গৃহে অভ্যাগতরে তুষিয়া নিতি,
তৃতীয় প্রহরে আমিষশূন্য হবিষ্যান্ন-গ্রহণ-রীতি।
সাধিয়া নিত্য সন্ধ্যাকৃত্য সুপ্তি তোমার ক্লান্তিহর,
নৃপ পালঙ্কে স্বপ্নে নেহারে জটা-করঙ্ক-দণ্ড-ধরা।
নিশাতমঃ দূর আরতি আলােকে, ভােজ্য তােমার পূজার ভােগ,
দেউল-সােপানই শয্যা তােমার, তুলসীর মাটি বিনাশে রােগ।
হরিনাম-লেখা তিলকই ভূষণ, তীর্থের ধূলি অঙ্গরাগ,
গার্হপত্য মরণের চিতা, সেই অনলেই নিত্য যাগ।
পূজাফুলে দিন গণে বিরহিণী, হরি বলি ফেলে উষ্ণশ্বাস,
তনয়ার নাম ‘শিবকিঙ্করী”, তনয়ের নাম ‘দুর্গাদাস'।
জননী তােমার অন্নপূর্ণা, জনক, শ্মশানে বিরাগী যােগী,
তব অপত্য ইহ-পর-শুভ-মিলনের সুফলভােগী।
১১৭

পর্ণপুট
মঠ-মন্দির-প্রতিমাগঠনে পরিকল্পিত শিল্পকলা,
সঙ্গীত তব পূজারই অঙ্গ-ভক্তি তরল নয়নে-গলা।
তব সাহিত্য সতীর সতের সত্যশূরের কীর্তি গায়,
ধ্রুববাণী ছাড়া অন্য বারতা ইতিহাস নাহি বহিতে চায়।
গৃহীর ভক্তি সাধুর সাধনা মিলিয়া যােগীর জ্ঞানের সাথে,
শিলা-বিগ্রহে দারু-পুলে জাগ্রত করে জগন্নাথে ।
জননী জানিয়া গৃহে গৃহে গৃহী পূজে নির্ভয়ে রুদ্রাণীরে,
হেরি রুদ্রের দক্ষিণ মুখ ডরে না শিহরে, দাড়ায় ঘিরে।
কর্মে তােমার শুধু অধিকার বিভুপদে-পা কৰ্ম্মফল,
মরণ মিথ্যা, অমরাত্মার সে’ত নব বাস পরার ছল।
মােহ-মেঘে প্রেম রহিলে মগন নিখিল ভুবন বিস্মরিয়া,
অভিশাপ আসে উদ্যত জটা বিদ্যুচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া।
পতির চিতায় শােয় তব নারী নিখিল-শিয়রে মা হয়ে জাগে,
ব্ৰহ্মচারিণী, ব্রহ্মবাদিনী, শাশ্বত বিনা কিছু না মাগে।
এ-নর-জনম,-প্রােষিত জীবন, ভােগসুখ-পূতি-পিশিতক্লেদ,
গৃহদাহে দ্বিজ আর সব ফেলি খুজে ফিরে নিজ যজুৰ্বেদ।
ধর্মাচরণে পরিণয় তব, উজলিতে কুল চাও যে সুত।
বর্জন তরে অর্জন তব, আনমার্জনা, হইতে পূত।
কর্মবলের লাগি যৌবন অতিথিরই তরে গঠিত গেহ।
পুনর্জন্ম জিনিতে জনম, আত্মারই লাগি দেহীর দেহ।
১১৮

ধৰ্ম্মক্ষেত্র
যােগের লাগিয়া স্বাস্থ্য স্বস্তি, তপের লাগিয়া কঠোর যােগ।
শুধু প্রবৃত্তি-পরিপাক তরে নিবৃত্তিমুখী অচির ভােগ।
তব ব্রতকৃশ ঋষি-শিষ্যের ক্ষীণ তর্জনী-হেলন-ভরে,
রথীর কিরীট, উদ্ধত বাজি, উদ্যত অসি নমিয়া পড়ে।
নৃপতি তােমার প্রকৃতির পিতা, জনক শুধুই জম্মহেতু।
প্রাসাদ, অটবী এ-পার-ও-পার, মাঝখানে চির ত্যাগের সেতু।
আৰ্ত্তে তারিতে, সত্যে সেবিতে, ক্ষাত্রশক্তি অস্ত্র ধরে,
‘শির’ হতে ‘সারে’ বড় গণি প্রাণ সঁপে প্রাণাধিক ব্রতের তরে।
দীন ভিখারীর ক্ষুদের লাগিয়া বাধা ভগবান কুটীর-দ্বারে,
দৈন্য তােমার মধ্যমাণিক লক্ষ নিধির কণ্ঠহারে।
হরিনামামৃতে গীতাঞ্জলিতে আত্মার নিতি করাও স্নান,
কূলে কূলে ভরা প্রেমবন্যার কুলুকুলু তানে জুড়াও কাণ।
স্তন্যের সহ দিলে এ কণ্ঠে পাপতাপহর হরির নাম ;
আশিস তােমার বরেরই সমান, সতত পূরায় মনস্কাম।
শিখালে ক্ষমিতে চির বৈরীরে, বীরবৈরীর নমিতে পায়,
কীৰ্ত্তন-পথ-ধূলি তুলি হাতে দিলে সস্নেহে মাথায় গায়।
অঞ্জলি দিলে কুসুমে ভরিয়া, প্রণিপাতে দিলে নােয়ায়ে শির,
বক্ষ ভরালে মােক্ষ-আশায়, চক্ষে ঝরালে ভক্তি-নীর।
তুমি যে মােদের ধর্মক্ষেত্র, ভারতমাতার কর্মভূমি,
ধন্য জনম, তােমার জীবন-মরণ-শরণ-চরণ চুমি।
১ম খণ্ড সমাপ্ত।
১১১

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Parnaput Vol. 1, Ed. 5th

Author
Roy, Sri Kalidas
Title
Parnaput Vol. 1, Ed. 5th
File name
Parnaput Vol. 1, Ed. 5th
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2009/08/17
Publisher
P. Chatterjee, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
138
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Poetry. Poems. Verse. Ballads
Keywords
Poetry
DLI number
513039
Barcode
4990010020055.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
lk0DM2nbOEr
Download PDF

Parnaput Vol. 1, Ed. 5th