Dipsikha Library, Howrah

Cheledhara Circus

2010/04/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

DIPSET LIIK
DIP SHIKWA | IBRARY
KATOSANGRAH.
HO' HAH
Het
Diut. MORAH

No text on this page.

৫শধর
พงเม
PROTUL
BYNER)
RY
শ্রীশামুক
মহালয়া
১৩৪৮
বেসাহিত্য-সুজন
ঝামাপুকুর লেন, কলিকা

দেব সাহিত্য-কুটীর
২২৫, বি, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা হইতে
সুবােধচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক
প্রকাশিত
Ct 1
দাম দশ আনা
DIPSIKIA LIBRARY
Acc. No.
....Dt..k.8.88
প্রিন্টার-এস, মজুমদার
দেব রে
২৪নং ঝামাপুকুর লেন,
কলিকাতা

HAHAR
ITSHIRH
ES SDI-1848
DIPOS KSWR
WRANTE
T***
that you
V
KA

প্রদীপকুমার সেনকে

No text on this page.

=
সঙ্গে সঙ্গে দড়া দড়াম কবে পিস্তলেব আওযাজ—একবাব,—দু’বাব ।
—১০১ পৃষ্ঠ

ছেলেধৱা সার্কাস
প্লিবেন না।
DIPSIKHA LIBRARY
Acc, No. 29-DL....৪:৪৪
টেনী-লব-কুশ-বেবী
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ঘরের ভিতর ! দরজার বাইরে উঠানের দিকে
হারিকেন জ্বালা। ঘরে আবছা আলাে আবছা আঁধার। ভীম
দুৰ্যোধনের গদাযুদ্ধ-পাশবালিশ নিয়ে। ধপাধপ, শব্দ ও চাপা
হাসি। বেশীক্ষণ চেপে রাখা গেল না, যুদ্ধের রুদ্রমূর্তি আত্মপ্রকাশ
করলাে ভীষণ হুঙ্কারে।
উঠান থেকে পায়ের শব্দ এগিয়ে এল, আলাে আড়াল করে
দাড়ালাে ছায়ামূর্তি। যােদ্ধারা আন্দাজ পেয়েই শুয়ে পড়েছে মৃতবৎ,
যে যে অবস্থায় ছিল ;-নড়নচড়ন-নট-কিছু।
নিস্তব্ধ ঘরকে উদ্দেশ করে টেনী মুখস্থ বলে গেল,লব, কুশ,
বেবী, মা বললেন, রুটি সেঁকতে সেঁকতে যদি উঠে আসি ত’ কারুকে
আস্ত রাখবাে না।
কোন উত্তর পেল না, টু শব্দও নাকুরুক্ষেত্র নিথর নিস্পন্দ।
বিষম হাসি পাচ্ছিল, টেনী হাসলে না ; পা টিপে টিপে এগিয়ে
এল বিছানার উপর। মাঝখানে গিয়ে ঝুঁকেছে নিরীক্ষণ করে দেখবার
১

ছেলেধরা সার্কাস ; আশায়,বাস্, আর কি। ধপাধপ সুরু হ’ল আবার যুদ্ধ—এবারে "টেনী শুদ্ধ ! বােঝা যায় না কে কোন্ দিকে। সকলেই সকলকে সমান বিক্রমে আক্রমণ করছে। একটা ছেড়া বালিশের তুলল উড়ে উড়ে ঘর আরাে অন্ধকার করে দিল। সব নীচে কুশ, তার উপর এক বালিশ ; তার উপর বেবী ও বেবীর উপর আরেকটি বালিশ -এই অদ্ভুত সিংহাসনে বসে লব প্রচণ্ড যুদ্ধ চালাতে লাগলো, ভাবটা এই যে, টেনীকে হারালেই যুদ্ধজয় সুনিশ্চিত। হাতের বালিশ ফসকে ঠিকরে বেরিয়ে গেল হারিকেন যেন বুক পেতে নিল-কাচ ভাঙ্গার শব্দ, কেরােসিনের গন্ধ —আলাে দপ দপ করে নিভে গেল। মা তখন দরজার কাছে এসে পোঁচেছেন। আবার সব এক্কেবারে চুপ। মাও কি করবেন কয়েকমিনিট ভেবে পেলেন না। হঠাৎ বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বাবা ডাকলেন,-টেনী, টেনী দরজা খুলে দে শীগগির। মা রান্নাঘর থেকে আলাে নিয়ে দরজা খুলতে গেলেন । এরপর মিনিট দশেক যা চললল, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তা নয়—বকুনী- প বলা যায়—মহাভারতে এর কথা লেখা নেই। মাথা নীচু করে শুনতে হ’ল অনেক কথা। তার সারাংশ এই যে, এরকম ছেলেমেয়ে ঘরে রাখা বিপজ্জনক—কোনদিন যে সমস্ত বাড়িতে আগুন লাগাবে তা কে বলতে পারে ? আসছে নতুন বছরের সঙ্গে সকলকে বাের্ডিংএ পাঠিয়ে দেওয়া হবে ; চোখের আড়ালে যা খুশী করুক গে । বেবী ফুপিয়ে কঁদলাে, লবকুশের চোখ শুখনাে রইল না, ছেলেধরা সার্কাস টেনী সামলে ছিল অনেকক্ষণ, কি একটা বলতে গিয়ে প্রচণ্ড এক ‘চোপ’ শুনে হু-হু করে কেঁদে ফেললাে। এরপরে সকলকে চোখ মুছে বাইরের ঘরে গিয়ে আলাের চারপাশে গােল হয়ে বসে পড়তে হ’ল- ভারী গলার কোরাসে । খাবার সময় চুপ চাপ শান্তশিষ্টের মত সব খেল যেন অন্য মানুষ এরা ! যে যে জিনিষ ভালবাসে, না চাইতে বেশী করে পেল। মা যেন একটু বেশী মিষ্টি করে বললেন,“চুপ চাপ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়গে সব। টেনীর আধঘুম এসেছে, লব গড়িয়ে এসে কানের কাছে ফিসফি করে বললাে;-কাল পাহাড়ে যাওয়া হবে ? -না। -কালকে ছুটী যে ! লব নিজের বিছানায় ফিরে গিয়ে লেপটা কান পর্যন্ত টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাে। শেখপুরা দক্ষিণ বিহারে ছােট ষ্টেশন। অৰ্দ্ধচন্দ্রের আকৃতি পাহাড় ছােট সহরটিকে মায়ের মত বুকে জড়িয়ে লুকিয়ে রেখেছে। বাইরে থেকে দেখা যায়—শুধু রেলের লাইন, হলদে রংএর একতালা ষ্টেশন ও একটু দূরে কয়েকখানি দোকানঘরের সারি। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ওপারে মেলে বাড়ি-ঘর, দোকান-বাজার, স্কুল-আদালত সব কিছুই। পাহাড় খুব উঁচু নয়, বেশী চওড়াও না কিন্তু তবুও পাহাড় ত’! রকমের পাথরের তৈরী। পূব সীমানায় যেখানে বড় দীঘিতে শেষ ছেলেধরা সার্কাস হয়েছে—কাল কুচকুচে পাথর ঠিক আমেরিকার বাড়ির মত চৌকো গড়ন। এখানে ধােপারা হিস্ হিস্ শব্দ করে আছড়ে কাপড় কাচে, অনেক দূর থেকে শােনা যায়। আবার টেনীদের বাড়ির মাথার উপর উটের পিঠের মত ফুলে উঠেছে বাদামী রংএর পাহাড়। এর উপর থেকে সমস্ত শেখপুরা একসঙ্গে দেখা যায় দীঘির সবুজ জলটুকু পৰ্যন্ত। অন্য দিকে রেলের লাইন এঁকে বেঁকে কতদূর চলে গেছে ! শেষ পর্যন্ত দেখা যায় না, ঝাপসা হয়ে যায়। এ ছাড়া চারিদিকে দিগন্তপ্রসারী মাঠ মাঠ মাঠ—পৃথিবীর শেষে গিয়ে শেষ হয়েছে ! শেখপুরার ষ্টেশনমাস্টার টেনীদের বাবা। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে এদিকে এলেই প্রথম বাড়ি ওদের। ষ্টেশন থেকে আসতে যেতে এ কি তিন মিনিট লাগে। বড় মেয়ে টেনী বয়স তের। লব কুশ যমজ, এগায়ােয় পড়েছে। দুজনার চেহারায় এত বেশী সাদৃশ্য যে প্রায় সকলেই ভুল করে ফেলে কে লব, কে কুশ ! খুদে মেয়ে বেবী আট বছরের। খুদে হলে হবে কি, বিক্রম অনেক ! বড়দের সঙ্গে সমান তালে সব করবে,এরা যেখানে, উনিও সেখানে। ভয় পেলে বলে,—আমি ত’ ভয় পাই না। বােধহয় ঐ-কথা বলে বলে নিজেকে সাহস দেয়,ভূতের কথা মনে পড়লে ‘রাম’-নাম করার মত। ভাই বােনে ভাব খুব। সকল সময়ে দলটি একসঙ্গে থাকে। অবশ্য ঝগড়া যে হয় না তা নয়, তবে মিটে যেতে দেরী লাগে না। টেনী দলের সর্দার কিনা তাই বুদ্ধি ওর টনে। •

দুই
বাড়ি পালাবার প্ল্যান
সকালে দলটি মুড়ি ও নারকেল নিয়ে পাহাড়ের সব থেকে উঁচু
পিঠে গিয়ে বসলাে। জরুরী মিটিং। কিউলে মেলা বসেছে, দেখার
কি করা যায়। বাবা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, সময় নেই। তাহলে
দেখা হবে না? জোড়া মানুষ এসেছে ; কাটামুণ্ডু কথা কয় ; কাঠের
ঘােড়ায় চাপলে ছুটতে থাকে, লাফাতে থাকে, সত্যিকারের ঘােড়ার
মত—এ সব দেখা হবে না? আর সাতদিন জোর থাকবে, তারপর
অন্য কোথায় চলে যাবে। সেই তিন বছর আগে এসেছিল, তখন
তারা কত ঘােট ছিল ! বেবী ত’ নাগরদোলায় উঠেই ভ্যা!
বেবী আধচিবানাে মুড়ি গিলে বল্লে,“হা কেঁদে ফেলেছিল,
বল্লেই হ’ল কিনা, আমি ত’ ভয় পাই না—তখন কত ছােট ছিলাম
মশাই!-নাক কুঁচকে, চোখ ছােট করে, ভারিক্কী চালে শেষ করে।
টেনী বলে,—আমার একটা প্ল্যান আছে, বলি শােন, কিন্তু
কারুকে বলতে পাবে না।
খাওয়া বন্ধ রেখে সব কাছে এগিয়ে আসে।
–কিউল ত’ খুব কাছেই, আমরা নিজেরা ট্রেনে করে গিয়ে দেখে
আসবাে ।
বাবা ?
—বুল হবে না, ফিরে এসে বললেই চলবে।

ছেলেধরা সার্কাস
বকুনি খেতে হবে যে ?
মজা করতে গেলে বকুনি খেতে হয়। আমরা ত’ সেখানে
থাকছি না, একদিনেই ফিরে আসবে।
চুপ করে সব ভাবে। বিষম সমস্যা। মেলা না দেখলে চলে
কি করে ? এদিকে মা বাবার বকুনি। না না, গিয়ে কাজ নেই।
অমনি মনে পড়ে,-জোড়া মানুষ, কাটা মুণ্ড, কাঠের ঘােড়া, আর
দেখবার, শােনবার, খেলবার, কত কত জিনিষ! যাওয়াই যাক,
বকুনি চুপ করে শােনা যাবে।
সেখপুরা থেকে কিউল মাত্র ষােল মাইল। কিউল ই-আই-আরের
বড় স্টেশন, জংসন। ভােরের ট্রেনে যাওয়া ঠিক হ’ল ।
সমস্ত দিন
দেখে শুনে, আমােদ-আহলাদ করে বিকালের গাড়িতে ফিরে আসা
যাবে। আরেকটি সুবিধা যে, মা তখন ঘুমাবেন আর বাবা এই
শীতের দিন মুড়ি-সুড়ি দিয়ে স্টেশন ঘরে ব্যস্ত থাকবেন। চুপচাপ
গাড়ীতে উঠে পড়লেই বাস্ !
টিকিট? বাবার কাছে টিকিট নেবে কি করে?—বেবী বলে।
একটু ভেবে টেনী উত্তর দেয়,—টিকিটের দরকার নেই। কিউলে
যখন টিকিট চাইবে, বাবার নাম বললেই সকলে ছেড়ে দেবে—বাবাকে
ওরা সকলে চেনে।
কথাটি লবকুশের বিশেষ মনে লাগে না, শেষে পুলিশের হাতে
ধরা পড়তে হবে। কিন্তু উপায় কি বাবার কাছে টিকিট কিনতে
যাওয়া আর মেলা দেখবার আশা একেবারে ছেড়ে দেওয়া সমান
কথা—তার চেয়ে যা হয় পরে হবে। নিমরাজী ভাবে সংস্কৃতি-দেয়।
৬

ছেলেধরা সার্কাস সব ঠিক হয়ে গেল। বুধবার মুসলমান পরবের ছুটি স্কুলে, ঐ দিই। ছুটির দিন মেলা নিশ্চয়ই খুব জমবে। খাওয়া শেষ হল এতক্ষণে। টেনী বলে,—চল পাহাড়ের উপর দিয়ে দিয়ে দীঘির দিকে যাই। সকলে উঠে পড়ে । পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে সারিবন্দী চলতে থাকে। কুশ পাথরের টুকরাে তুলে ছুড়ে দেয় খুব জোরে। কোথায় গিয়ে পড়ে দেখা যায় না, শুধু ঠক্ করে শব্দ হয়। টেনী হঠাৎ থমকে দাড়ায় ! বেবী বলে,-পায়ে লাগলাে বুঝি দিদি ? টেনী ফিরে দাড়িয়ে বল্লে,—বিশুয়া । আর কিছু বলতে হ’ল না। সকলে বুঝে নিয়েছে ব্যাপারটি কি। সত্যি ত’ এতক্ষণ এত আলােচনার মধ্যে বিশুয়ার কথা একেবারে মনে পড়েনি! তাইতাে বিশুয়াকে নিয়ে কি করা যায় ? ওর চোখ এড়িয়ে পালায় কার সাধ্যি ! শেষে বিশুয়া সব পণ্ড করে দেবে ? শেখপুরায় বিশুয়াকে চেনে না এমন লােক একটিও নেই। ষ্টেশনে গেলে সবপ্রথমে দেখা যাবে বিশুয়াকে। রােগা পাতলা কালাে রংএ মানুষ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ, মাথায় উখাে-খুসকো কাঁচা পাকা চুল। সামনের দুটো দাঁত নেই, বাকীগুলি পানের ছােপে গায়ে তালি মারা খয়ের রংএর মােটা সার্ট, গলায় লাল কাটার জড়ানাে চব্বিশ ঘণ্টা। কার্টারের একটি অংশ বা হাত ঢেকে ঝুলে থাকে। চলবার সময়, কাজ করবার সময় কম্ফার্টার এদিক ওদিক সরে গেলে দেখা যায় বাঁ হাত ওর নেই, শুধু বােম লাল । ৭ ছেলেধরা সার্কাস দেওয়া জামার আস্তিন ঝুলছে। অনেকদিন আগে রেলে কাটা পড়ে রেচারীর এই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এক হাতেই ও দশ হাতের কাজ করতে পটু। ট্রেন আসছে। বিশুয়া এক হাতে সিগন্যাল ধরে ঠেলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত শরীরের ভার দিয়ে শুয়ে পড়ে সিগন্যাল নামায় । এরপর ঘণ্টা বাজিয়ে তাড়াতাড়ি প্ল্যাটফরমের ধারে এসে দাঁড়ায়। কে নামলাে, কে উঠলো, কোথায় কি চুরি, ঝগড়া বা গণ্ডগােল হ’ল, বিশুয়ার চোখ সবদিকেই আছে। ওই যেন স্টেশনের আসল কৰ্ত্তা। সব সময়েই কিছু-না-কিছু করছে আর নয় ত’ চুপ করে প্ল্যাটফরমের বেঞ্চির উপর চোখ মিটমিট করে শুয়ে আছে। এই বিশুয়ার চোখে ধূলাে দিয়ে ট্রেনে চটাপ উঠে পড়া বেশ শূক্ত কাজ। লবকুশ আস্ফালন করে বলে,—হ্যা ধরবে ধরুক না, গাড়ি ঠিক ছাড়ে-ছাড়ে এমনি সময় এক-এক লাফে ভিতরে গিয়ে উঠবে। টেনী বললাে,--সে ত’ হয় জানি, কিন্তু বেবী ? বেবী অত জোরে দৌড়াতে পারবে না, লাফাতেও না। বেবী কঁদ-কাঁদ হয়ে বলে, আমি ভয় পাই না, পিরবাে, খুব পিরবাে--দেখাে তখন। টেনী বলে,--না বাবা, শেষে লাফাতে গিয়ে কেউ চাকার তলায় কাটা পড়ে যাবে। বিশুয়ার মত এক হাতে সব কাজ করতে হবে। মরেও যায় কত লােক। শেষে অনেক আলােচনার পর ঠিক হয়, লব-কুশ চারিদিকে

ছেলেধরা সার্কাস
ভাল করে দেখে শুনে বেড়াতে বেড়াতে টুপ করে উঠে পড়বে।
টেনী বেবীর হাত ধরে এক ছুটে কামরার ভিতর।
মীমাংসা হতে যেন একটা দুর্ভাবনা কেটে যায়, কিন্তু মনে খচ,
খচ করতে থাকে—বিশুয়া ! বিশুয়াকে এড়ানাে বড় বিষম কথা ।
সকলে আবার দীঘির দিকে পা বাড়ালাে।

তিন বিছু বিশুয়া বুধবার সকাল হতে চায় না। টেনী কতক্ষণ থেকে জেগে আছে। এই বুঝি সকাল হয়ে যায়, ভেবে আসলে সারারাত ওর ভাল করে ঘুমই হয়নি। লব-কুশের নাক ডাকছিল, বাবার বেরিয়ে যাবার শব্দ পেয়ে টেনী গা’ নাড়া দিয়ে ডাকলে। ধড়মড় করে উঠে বসে বলে, কি ডাকছো কেন ?—এমন বােকা ! টেনীর রাগে মুখ লাল হয়ে গেল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিফিস্ করে বলতে তবে বুঝে ঠাণ্ডা হয়। অতি সাবধানে বেবীকে তােলা হল। শেষে ঘুম ভেঙ্গে কাদতে আরম্ভ না করে দেয়। রাস্তায় এসে যখন নামলাে চারিদিকে সবুজ ভােরের কিকে আলাে। একটি তার জ্বল জ্বল করে মাথার উপর জুলছে। পথে দু'একটি লােক, স্পষ্ট মুখ চেনা যায় না। হু-হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া কানে কানে বললে,--যেওনা যেওনা, উঃ বড়ড় শীত। কুঁকড়ে, জড়াজড়ি করে প্ল্যাটফরমের পূব দিকটায় ভয়ে ভয়ে যখন এসে পৌছালাে, গাড়ি আসার শেষ ঘণ্টা বাজছে। শাকসজীর বােঝা নিয়ে কত লােক তৈরী হয়ে দাড়ালাে। এক পাশে এক প্রকাণ্ড পুলকী হলদে ঘেরাটোপে ঢাকা। গাঁয়ের জমিদার-বৌ মেলা দেখতে যাচ্ছে নিশ্চয়ই। মাঝে মাঝে ঘেরাটোপ দু’হাতে ধরে এক জোড়া চোখ প্যাট্‌ পাট করে দেখে নিচ্ছে চারদিকের লােকজন। , ছেলেধরা সার্কাস পাল্কীর আড়ালে টেনীরা দাড়িয়ে উকি মেরে দেখতে লাগলাে। আহাউ করে বিরাট একটি হাই তুললাে বেবী, বেচারীর চোখ ঘুমে এখনাে জড়িয়ে আছে। হু-হু করে ট্রেন এসে দাড়ালো। মানুষের উঠাউঠি গােলমালে চারিদিক মুখর হয়ে উঠলাে। একটু আগে এত উত্তেজনা কোথায় ছিল ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। পালকীশুদ্ধ জমিদার-বৌকে গাড়ির কামরার কাছে নিয়ে যাওয়া হ’ল। টেনীরা এই সুযােগে আড়ালে আড়ালে টুপটাপ, কামরায় উঠে পড়লাে। এত সহজে হবে কেউ ভাবেনি। ভগবান্ যেন দয়া করে এদের সুবিধার জন্য পালকীশুদ্ধ জমিদার-বৌকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। টেনীরা এক কোণে জড়সড় হয়ে গায়ে গায়ে চুপ করে বসে পড়লাে। অন্য লােকেরা তখন নিজের নিজের মালপত্র গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত। সময় আর কাটতে চায় না। আজ যেন বেশীক্ষণ ট্রেন দাড়িয়ে আছে, ঘণ্টাও ত’ পড়ছে না। বিশুয়া ভুলে গেল নাকি? এই ত’ একটু আগে সিগন্যালের উপর শুয়ে পড়ে সিগন্যাল নামালো। ট্রেন ছড়িলে, আঃ—বাঁচা যায়। ঘণ্টা পড়লাে। ঢং ঢং ঢং—কড়াকং—কড়াকং—কড়াকং। প্ল্যাটফরম ফাঁকা হয়ে এসেছে। পাকী ঘেরাটোপ খুলে চারপায়ে দাড়িয়ে। একটা কুকুর গোড়াতে খোঁড়াতে ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে দেখে চলে গেল। উত্তেজনায় টেনীর বুক দুরদুর করছে, জানালা দিয়ে বাইরে দেখবারও সাহস.মেই। বেবী চুপিচুপি বলে,—এইবার যদি বাবা এসে পড়েন। ১১

ছেলেধরা সার্কাস
এতক্ষণে যে মালগাড়িটা দাড়িয়ে ছিল তার ইঞ্জিনে উঠে ষ্টীম্ ছাড়লাে
-মালগাড়ি এবার ছাড়বে। মালগাড়ি ছাড়বার কোন নির্দিষ্ট সময়
নেই। অনেক সময় রাত দুপুরে ছাড়ে, তখন টেনীর বাবা বিশুয়ার
উপর ভর দিয়ে ঘরে শুতে চলে যান, কোন হাঙ্গামা নেই—এত সহজ
কাজ।
তিরিশখানি গাড়ির সারি নিয়ে গাধাবােট
গাধাবােট মালগাড়ি ভীষণ
আওয়াজ করতে করতে গড়িয়ে চললাে। স্টেশনে বিশুয়া ছাড়া এত
রাত্রে আর কে থাকবে ! নিশান নিয়ে দাড়িয়ে বিশুয়ার হঠাৎ যেন
মনে হ’লশেষের যে খড় বােঝাই গাড়িটি তাতে কালােমতন একটা
কি, কাটা দরজা দিয়ে দেখা গেল। অন্ধকারে এক জোড়া চোখ যেন
জ্বলে উঠলাে। কুকুর বেড়াল হবে আর কি, এমন ত কত যায় !
শীতের রাতে খড়ের গাদায় কুকড়ে শুয়ে বেশ আরাম করতে করতে
চললল, খড় নামাবার সময় লােকেরা দেখতে পেলে লাফ দিয়ে
পালাবে।
প্রকাণ্ড এক হাই তুলে, এক হাতে গায়ের কম্বলটি ভাল
করে মাথা পর্যন্ত জড়িয়ে, বিশুয়া শােবার চেষ্টায় আবার বেঞ্চির
দিকে এগুলাে।
খড়ের গাদার এক পাশ থেকে টেনী ফিসফিস্ করে বললাে,
লব বলছি ওরকম করে ঝুকো না, আরেকটু হলেই ত’ বিশুয়া দেখতে
পেয়ে গিছলাে।
-এখন দেখে করবে কি ? গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে, ধরে কে?
-ধরে কে মানে? বিশুয়া ইচ্ছা করলে পরের স্টেশন থেকে
ট্রেন পিছু হটিয়ে আনতে পারে—জান?-কুশ বললাে।
১৪

ছেলেধরা সার্কাস
-হা পারে তােমায় বলেছে। সে শুধু বাবা পারে, বিশুয়া নয়,
বুঝলে বুদ্ধিমান্ ।
-চুপ কর। বাড়ি থেকে বেরুতে বেরুতেই ঝগড়া, নয় ? টেনী
থামিয়ে দেয়-এই যা একি হল?
—কি, কি দিদি ?—সকলে সমস্বরে বলে, বেবী পৰ্য্যন্ত।
–পয়সার থলিটা কোথায় পড়ে গেছে—কি হবে ?
পশমে বােনা সবুজ থলিটি টেনীর বড় প্রিয় । যখন যা পয়সা
পায় সযত্নে
ভিতরে
তুলে রেখে দেয়। বারবার গুণে দেখে ঠিক আছে
চকচকে সিকি দুয়ানি দেখলে নিজের সঙ্গে বদলে নেয়।
কেবল মাত্র মেলা দেখার লােভে সেটি সঙ্গে নিয়েছিল। যা তাড়াতাড়ি
আসা, রাস্তায় পড়ে যাওয়া আশ্চর্য নয় কিছু। উঃ, কি কষ্টে আসা
গেছে! নিতান্ত মেলা দেখার লােভে এত বড় দুঃসাহসের কাজ করা
কিনা।
সকালের ট্রেনে যেতে না পেরে ভীষণ দুঃখ হয়েছিল। অনেক
ভেবে চিন্তে ঠিক হ’ল যাত্রী-গাড়িতে যাওয়া অসম্ভব, বিশুয়ার চোখে
ধুলাে দিয়ে।
আবার যদি ধরতে পারে, বাবাকে নিশ্চয় বলে দেবে
এবং যাওয়া আর হবে না। লবের কিন্তু বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।
বললাে মালগাড়িতে যাওয়া যাক, তখন ষ্টেশনে কেউ থাকে না বড়
একটা, আর বিশুয়ার বুদ্ধিতে আসবে না যে মালগাড়িতে যাব।
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিশুয়ার কাছে জানা গেল, রাত বারােটায় এক
মালগাড়ি ছাড়বে। তাই তাই-ই সই। যেতে গেলে ভয় পেলে চলবে
না। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়লেন পাশের ঘরে। চারজন তখন এ-ঘরে

ছেলেধরা সার্কাস
উসখুস্ করছে। নিঃশব্দে জামা-কাপড় পরে, পা টিপে টিপে বেরি
আসা—সহজ কাজ নয়। অমন নিশুতি রাতে নিজের নিঃশ্বাসের শব
শুনেও চমকে উঠতে হয়। অলুক্ষুণে পেঁচার ডাক আরেকটু হতে
বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছিল। ভয় করে না? কি বিশ্র৷ আওয়াজ, বুকে
ধুকধুকুনি বন্ধ করে দেয় ! ভয়ে বেহুস হয়ে কোন রকমে খড়ে
গাদায় আশ্রয় মিললাে। বেবী ত’ সমস্ত রাস্তা চোখ বুজে এসেছে
চাদের আলোয় কত ছায়ামূৰ্তি ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
কিন্তু পয়সা-কড়ি না হলে হবে কি? এক টাকা সাড়ে বারাে
আনা ছিল মােট। কোথায় পড়ে গেল ? কাল সকালে কেউ না
কেউ কুড়িয়ে পাবে, ভারী মজা লাগবে তার।
টেনী বলে,--পয়সা না দিলে জোড়ামানুষ দেখতে দেবে না, কাঠের
ঘােড়ায় চড়তে দেবে না।
লব পকেট থেকে একটা দুয়ানি বার করে বললাে,-এই নাও
আর কিছু নেই।
শুধু দু’আনায় কি হবে—এতগুলাে মানুষ।
কুশ বলে,—ফিরে যাই চল । দেখতে যদি না পাই তবে গিয়ে
কি লাভ? আর এই রাত্তিরবেলা এসে আমরা ভাল করিনি।
বেবী বলে উঠলাে—দিদি, আমার হাত ধরে থাকে। আমি ত’
ভয় পাই না।
সত্যি কথা বলতে কি, টেনীরও খারাপ লাগছিল ! একে পয়সা
রানাের দুঃখ, তাছাড়া এই চলন্ত ট্রেন থেকে চারপাশের ধোঁয়ার মত
গাছপালা ক্ষেত-খামার দেখে গা যেন শিউরে শিউরে উঠে—কেমন

ছেলেধরা সার্কাস একটা থমথমে ভাব! কিন্তু হটে যাবার মেয়ে নয় টেনী। মনে যাই হােক, মুখে কিছুতেই প্রকাশ করবে না মরে গেলেও কেউ বলে দুঃখে ও লজ্জায় প্রায়ই কেঁদে ফেলে; কিন্তু ভয়ে টেনী কেঁদেছে, একথা শশানেনি কেউ। জোর গলায় টেনী বললো,-কিছু ভেবােনা, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবা কি বলেন মনে নেই ? বুদ্ধি যার আছে বলও তার ;-তার আবার ভয় কি ? চুপ করে বসে গাড়ির দোলায় দুলতে দুলতে এক এক করে সকলেই ঘুমিয়ে পড়লে সেই খড়ের গাদায় শুয়ে পড়ে। সারাদিনের ভাবনা ও ট্রেনে চড়ার উদ্বেগে সকলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বেবী টেনীর বুকের ভিতরে কুকড়ে ঘুমাতে লাগলাে যেন নিতান্ত ছােট্ট শিশু!

পাচ•
শ্মশানে ভূত
ঘণ্টাখানেক হবে বা তার চেয়ে কিছু বেশী । পাশ ফিরতে গিয়ে
লবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনে হ’ল—ট্রেন চলছে না ; দাড়িয়ে গেছে
আর অনেক লােকে মিলে ঝাঁঝর বাজাচ্ছে ঝমাঝম্‌, তাদের চারপাশে
ঘিরে !
স্বপ্ন? না—সত্যি ? ট্রেন চলছে না, দাড়িয়ে আছে নিঃসাড়ে
নিশ্চিন্তে ! চলবে বলেও মনে হয় না। ঝম্ ঝম্ শব্দ-বােধহয়
ঝিঝিপােকার ডাক, কানে তালা লাগিয়ে দেয়।
ধড়মড় করে উঠে বসে লব । উকি মেরে দেখে—কেউ কোথাও
নেই, একটা মানুষও না। চকচক করছে ওটা কি ? টিনের চাল
ছােট স্টেশন বােধহয়, একটা তেলের আলাে পৰ্যন্ত জানা নেই।
স্টেশনের ছােটবাড়ির দেওয়াল-একবার মনে হয় সত্যি ; আবার
মনে হয়—শুধু চাদের আলাে এসে পড়েছে ধবধবে সাদা, আর কিছু
একটা শিয়াল ডেকে উঠে,--কুক্কা হুয়া, কাঠাল কুয়া, কাঁঠাল
কুয়া।
চমকে অন্য দিকে ফিরে দেখে–দূরে একটা আগুন জ্বলছে।
চিতা? মড়া পােড়াচ্ছে ? শশানের. এত কাছে ট্রেন এসে দাঁড়ালাে
এমন গভীর নিঃস্তব্ধ রাত্রে ? ভূতের কারসাজি নয় ত ?
ভৌতিক ট্রেন!
নয়।
.
কেন ?

ছেলেধর। সার্কাস
শীতের রাতে লবের কপাল খামে ভরে গেল। চেঁচিয়ে ডাকতে
গেল, পারলাে না। কঁকুনি দিয়ে ঠেলতে লাগলাে যাকে পেল
সবাইকে।
উঠে বসে সকলের মুখে এক প্রশ্ন—ট্রেন থামলাে কেন ? এত
রাত্রে ?
উত্তর দেবে কে? নিজেদেরই ভেবে চিন্তে আন্দাজ করে
নিতে হয়—শশানের জুলন্ত আগুন চোখে পড়ে। ভয়ে মুখ
শুকিয়ে গেল—প্রশ্ন করা বন্ধ হয়ে যায় আপনি। বেবী মুখ গুজড়ে
আবার ধপ করে শুয়ে পড়ে। শােনা গেল, কাঁদছে ফুপিয়ে, দেখা
যায় না কিছু।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল এমনি ভাবে । কতক্ষণ কারাে হুশ,
নেই, হিসাব নেই কোন। সব সময়েই মনে হয় একটা কিছু ভীষণ
বিপদ এই এল বলে। চারিদিকের সমস্ত পৃথিবী একটা ঘােতর,
ষড়যন্ত্র করে তাদের শাস্তি দিতে আসছে, এই এল বলে।
দূরে যে আগুন জ্বলছিল, যে মড়াটা আগুনে পুড়ছিল,মনে হয়
এতক্ষণে সে উঠে দাঁড়িয়েছে, তার কঙ্কাল-দেহ নিয়ে ঝম ঝম্ ঝম
শব্দের তালে-তালে এগিয়ে আসছে খট-খটাখট ! লম্বা শুধু হাড়-
সাজানাে হাত বাড়িয়েছে, টুপ করে তুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে !
হঠাৎ চঁাদকে এক টুকরাে কাল মেঘ এসে ঢেকে দিল। অন্ধকার,
আরাে অন্ধকার, সে আর নয়, আৰু সহ করা অসম্ভব ?
এক ধাক্কা মেরে বেবীকে উঠিয়ে, হাত ধরে টেনে, এক লাফ
মারলাে টেনী। কত উঁচু, কোথায় গিয়ে পড়বে, সে সব কোন জ্ঞান

ছেলেধরা সার্কাস সব ছিল না-সময় কোথায় ? নীচে পড়েই সটাং উঠে দাড়িয়ে সােজা দৌড় যেন কুকুরে তাড়া করেছে ! স্টেশন বাড়ির দিকে ছুটলাে যেটা একটু আগে চাদের আলােয় চকচক্ করছিল। লব-কুশ এক সেকেণ্ড থ’ হয়ে বসে। তারপর বলে দিতে হ’ল না কি করতে হবে। প্রাণের ভয়ে টপাটপ লাফিয়ে ছুটে ওদের এগিয়ে বেরিয়ে গেল। হ্যা, ষ্টেশনই ত’, মাত্র দুখানি ঘর। ছােট্ট স্টেশন। পাশে টিনের চালের তলায় বস্তা করে কি সব রাখা আছে পাকার । দরজা বন্ধ, ভিতরে আলাে নেই, অন্ধকার। দমাদম্ কিল চড় লাথি মেরেও কোন সাড়া পাওয়া গেল না। কেউ নেই ভিতরে। বন্ধ করে যে যার ঘরে চলে গেছে, আসবে আবার সেই সকালে। ষ্টেশনের বাইরে একটা সরু পথ গাঢ় অন্ধকারে গিয়ে মিশেছে! কিচ্ছু দেখা যায় না, কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর ! শীতের কনকনে হাওয়া হু-হু করে বইছে। এ অবস্থায় করা যায় কি ? ভূতের পেটে যেতে হয়, যাওয়া যাবে। আশ্রয় যখন নেই কোথাও, তখন এছাড়া আর উপায় কি? পরিশ্রান্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বস্তার স্তুপের উপরে সকলে বসে পড়ে, ভাগ্যের উপর নিজেদের সঁপে দিয়ে,--যা হয় হােক এই ভেবে। দূরের আগুন তখনও জ্বলছে। শিয়ালের ডাক—মাঝে মাঝে ঝি ঝির ডাকের বুক চিরে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে, কখন বহু দূরে, কখনও বা অতি নিকটে। অভিভূতের মত সকলে বসে রইলাে । সময় গড়িয়ে যেতে লাগলাে। মুরগীর ডাকে সকলে আশ্বস্ত খুঁয়ে দেখে—পূব আকাশ ফিকে ছেলেধরা সার্কাস মেরেছে। একটু আলাে হতে কুশ চেঁচিয়ে পড়লাে ষ্টেশনের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা—সিরারী! আরে এ যে শেখপুরার পরের ষ্টেশন! মাত্র এইটুকু এসেছে ! —এ রকম করে গেলে কিউল পৌছতে তিন চার দিন লেগে যাবে-লব বলে। টেনী বললাে,-না না, কাল রাত্রি বলে বােধহয় বেশীদূর গেল না। আজ সকালে একটু পরেই আমরা পৌছে যাবে। কথা শেষ হতে না হতে বেবী বলে উঠলাে, দিদি, ঐ দেখ কারা আসছে রাস্তা দিয়ে। দেখলাে তিনচারজন মানুষ আসছে, তার মধ্যে কালকের সেই নীল পাজামা-পরা লােকটিও। -এবার ট্রেন ছাড়বে। চল চটপট উঠে বসিগে। এখানে লুকাবার অন্য জায়গা নেই ; দেখতে পেলে ধরে শেখপুরা পাঠিয়ে টেনীর কথামত সকলে সন্তর্পণে উঠে আড়াল দিয়ে দিয়ে মাল- গাড়ির কামরায় এসে উঠলাে। মুস্কিল হ’ল বেবীকে নিয়ে। অত উঁচু যে উঠতে পারবে কেন ? কিছুতে পারে না অনেক চেষ্টা করে। শেষে টেনী কোলে করে উচু করলাে আর লবকুশ দু’হাত ধরে টেনে হিচড়ে তুলে নিল। উড়ে যাচ্ছিল-এই বুঝি দেখতে পেয়ে যায় ! কিন্তু ভগবানের দয়ায় রক্ষা পাওয়া গেল, কেউ দেখেনি। আবার সেই পুরাণাে খড়ের গাদায় হাত পা ছড়িয়ে আরাম করে বসা গেল। ভয়ে প্রাণ, ছেলেধরা সার্কান সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে গেছে। সব উকি মেরে ঝুকে দেখছিল চারিদিকে, বললাে,-এইবার ট্রেন ছাড়বে, ইঞ্জিনের ধোয়া উঠছে । ড দেখা গেল সত্যি তাই। একটু বাদে গা’ নাড়া দিয়ে কঁাচ্-কেঁচ শব্দ করে মালগাড়ি মন্থর-গমনে চললাে। প্ল্যাটফরমের উপর সাইন- বাের্ডে লেখা ‘ সিরী’ ক্রমশঃ ছােট হতে লাগলাে। দূরে দেখা যায় দু'চারটি গরু বাছুর চরছে। খােড়াে ঘরের চাল ফুড়ে ধোয়ার কুণ্ডলী উঠছে। একটি আরামের নিঃশ্বাস ফেলে টেনী বললাে,আর এক ঘণ্টায় পৌছে যাব। সকলেই খুশী। কাল রাতের কষ্ট ও ভয়ের কথা মনে হলে হাসি পায়। বেবী চোখ বড় করে জিজ্ঞাসা করে,দিদি, জোড়া মানুষ এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠেছে ? টেনী বলে,-তা নিশ্চয়ই উঠেছে, আর আমরাও গিয়ে পৌছাচ্ছি, কিন্তু পয়সা কোথায় ? এত কষ্ট করে গিয়ে শেষে হয়তাে দেখতে পাবাে না, মুখ শুকিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে । বেবীর মুখ সত্যি শুকিয়ে গেল। কাল রাতের ভূতের ভয় এর চেয়ে কম কষ্টকর ছিল। ছিল। বললাে,-সত্যি দেখতে পাবাে না দিদি, তাহলে কি হবে? লব-কুশের কপালেও চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। টেনী বলে,-না না ভেবাে না কেউ। যা হয় একটা উপায় হয়ে ছেলেধরা সার্কাস যাবে। বাবা কি বলেন মনে নেই,ইচ্ছা থাকলে উপায় আপনি হয়ে যায়। ওদের বুঝিয়ে বলা যাবে পয়সা হারিয়ে গেছে, বাড়ি শিয়ে পাঠিয়ে দেবাে ;—কত আর পয়সা ! সকালের ঠাণ্ডা হাওয়া ঘুম পাড়িয়ে দেয়। চুপচাপ বসে কেউ বা দেখতে লাগলাে চারপাশের গাছপালা মাঠ, আর কেউ মাঝে মাঝে ঝিমাতে লাগলাে। মালগাড়ি ধীর গতিতে গড়িয়ে যেতে লাগলাে বলতে বলতে যাচ্ছি কোথা, যাচ্ছি কোথা! আর পারিনে, আর পারিনে।

কোথাকার জল কোথায় গড়ায় কিউল বড় স্টেশন, জংসন। এখান থেকে কত দিকে যাওয়া যায়, গাড়ি বদল করা যায়। দিনরাত সরগরম হয়ে আছে। কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে, কেউ বা মােটঘাট পুটলিপাটলা নিয়ে বসে আছে ট্রেনের আশায়। পানবিড়ি, কচৌড়ি, পুরী গরম প্রভৃতির চীৎকার কানে ঝালাপালা লাগিয়ে দেয়। অনেক সময় কথা শুনতে পাওয়া যায় না এমনি গােলমাল। স্টেশনের পশ্চিমের মাঠে অনেকখানি ভােলা জায়গা। সারি সারি তাবু পেতে ও নানা রং-বেরংএর সামিয়ানা খাটিয়ে মেলা বসেছে। কত রকম-বেরকমের জিনিষপত্র কেনা-বেচা হয়। মেলা ছাড়া ঐ সব অদ্ভুত জিনিষ আর দেখতে পাওয়া যায় না। একপাশে নাগর- দোলা, ঘােরাচাকা, গড়ানাে সিড়ি এইসব, ছােট ছেলেমেয়েদের ভিড় এদিকেই বেশী। অন্য পাশে লাইনের ধারে ঘেরা জায়গার ভিতর পশুপাখী -জন্তু জানােয়ার। হাতীর কুলাের মত কাননাড়া ও লম্বা শুড় আস্ফালন অনেক দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায়। একটা আবার উট এসেছে তার পিঠে দুটো কুঁজ ; ভারতবর্ষে এমন দেখা যায় না। সকাল দশটা বােধ হয় হবে। কে জানে ঘড়ি ত’ নেই কাছে! মালগাড়ি কিউলের কাছে এল। টেনী, লব, কুশ বেবী, মুখ বাড়িয়ে ২৪

ছেলেধরা সার্কাস
উদগ্রীব হয়ে দেখলাে
মেলার জায়গাটি।
বেশ লােজন জমেছে,
নানারকম চীৎকার করে বেচাকেনা হচ্ছে। ঐ একটা লােক মুখে
কালিঝুলি মেখে বােধ হয় ম্যাজিক দেখাচ্ছে, হাতের পায়রাটি এবার
উড়িয়ে দেবে। বাজনা বাজিয়ে ঐখানে লােক জড় করছে, এটা
বােধ হয় জোড়ামানুষের তাবু ! কি রকম দেখতে কে জানে?. সমস্ত
শরীরটা জোড়া? দুটো মাথা, চারখানা পা? আর একটু বাদেই
দেখে সন্দেহ ভঞ্জন করা যাবে।
লব মনে মনে ঠিক করে নিল কি ভাবে কাকুতি-মিনতি করে
বােঝাবে, পয়সার জন্য যদি ঢুকতে না দিতে চায় ।
এই স্টেশনে ট্রেন ঢুকলাে। একটু লুকিয়ে থাকা যাক কেউ
দেখতে না পায়। ট্রেন থামলে কি ভাবে অন্য দিক থেকে নেমে
ঐদিকে যাওয়া যাবে, টেনী ফিফিস্ করে সকলকে বলে দেয়।
কিন্তু একি ? ট্রেন দাড়ায় না কেন? ওমা এযে স্টেশন ছেড়ে চলে
যাচ্ছে ! ঐ ত’ বিশুয়ার মত একজন সবুজ নিশান নাড়ছে ! ট্রেন
থামবে না ? লব-কুশের চোখে দুঃখে জল এসে গেল। বেবী
বােকার মত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাে। টেনীর ইচ্ছা হচ্ছিল
ঝাঁপ দিয়ে লাফিয়ে পড়ে,-মাথা ফেটে যায় যাক ! মেলা দেখতে না
পাওয়ার চেয়ে সে অনেক ভাল।
মালগাড়ি তেমনি গড়াতে গড়াতে নির্বিকারভাবে মন্থর গতিতে
চলতে থাকলাে। কিউল স্টেশনের শেষ সিগন্যাল দেখা যেতে যেতে
আকাশে মিলিয়ে গেল।
কুশ রাগে ফোস ফোস করতে করতে বলে,তােমার জন্যই দিদি

ছেলেধরা সার্কাস
এখন
•
এই সব। বলেছিলাম লবের বুদ্ধি নিয়ে মালগাড়িতে এস না ; কোথায়
থামবে, কোথায় থামবে না—এর কিছু ঠিক থাকে না।
কি হল?
সত্যি তাই, মালগাড়ির চলাফেরার কোন ঠিকঠিকানা নেই।
কোঁ৭ছােট স্টেশনে দাঁড়িয়ে রইলাে সারারাত সারাদিন ; আবার
বড় বড় স্টেশন পেরিয়ে গেল এক মিনিটও না থেমে, কোন ভ্রুক্ষেপ
করে।
টেনীরও রাগ কম হয়নি। বল্লে,“আমি কি সব জানতাম আগে
থেকে ? সব গাড়িই ত’ কিউলে দাঁড়ায়, বিশুয়া বলতে শােননি?
এখন আমার উপর যত দোষ।
বেবী বললাে না কিছু। মনে মনে ভাবলাে এদের সঙ্গে এসে
উচিত কাজ হয়নি। মেলা দেখা হল না, এদিকে ক্ষিদে পাচ্ছে বেশ।
মার কাছে থাকলে এতক্ষণে তিন চারবার টুকিটাকি খাওয়া হয়ে যেত।
সকলে গোঁজ হয়ে বসে রইলাে কোন কথাবার্তা না বলে। ইচ্ছা
হচ্ছিল মালগাড়ির কামরার লােহার দেওয়ালে ঘুসি মেরে মেরে ভেঙ্গে
ট্রেন থামিয়ে দেয়। এত কষ্ট, এত দুঃখ করে শেষে এই!. এ
আপশােষ রাখবার জায়গা কোথা ?
রাগ কমলে ক্রমশঃ ভয় ও ভাবনা শুরু হয়। কি হবে ? কোথায়
কতদূরে গিয়ে থামবে ? সেখান থেকে ফিরবে কি করে ? যদি
সে অনেক দূরে নিয়ে যায় ? নতুন জায়গা, একটি চেনাজানা:
মানুষও নেই, কেউ হয়তাে ধরে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে বন্ধ করে
রেখে দেবে। ভাবলে আতঙ্কে শিউরে উঠতে হয়।

ছেলেধরা সার্কাস মালগাড়ি, ধরে টানবার, গাড়ি থামাবার, সতর্ক-চেনও নেই। প্রাণপণে চীৎকার করলেও শুনতে পাবে না। আর পারিনে, আর আর পারিনে, যাচ্ছি কোথা, যাচ্ছি কোথা, সেই একই কথা একই সুরে বলতে বলতে মালগাড়ি ছুটে চলেছে। তার একটি কামরায় যে, চারটি মানুষ মাথা খুঁড়ে মরছে একটু থামবার জন্য, কিউলে মেলার কাছে ফিরে যাবার জন্য, সে কথা জানবে কে ? স্টেশনের পর স্টেশন উড়ে উড়ে চলে গেল ট্রেন থামলাে না। দুঃখে, খিদের কষ্টে চারটি ভাইবােন এসে বসে দুশ্চিন্তায় ক্লান্ত হয়ে পড়লাে। দু'চারবার লাইনের পাশে মানুষ দেখে চীৎকার করে ডাকলাে, ট্রেন থামাতে বললাে, সেকথা কেউ শুনলাে না। লব কুশ বেবী, অবসাদে ক্লান্তিতে বসে থাকতে পারলাে না; খড়ের গাদায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাে। টেনী অনেকক্ষণ চুপ করে বাইরের দিকে চেয়ে বসে রইলাে। মনে মনে নিজেকে দোষ দিতে লাগলো কাজটি ভাল হয়নি। এভাবে বাড়ি থেকে চলে আসা, এদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা উচিত হয়নি। সত্যি দোষ তারই বেশী। এখন উপায় কি হবে? কোথায় কি ভাবে গিয়ে ট্রেন থামবে সমস্তটাই অজানা! দুঃখে বুকের ভিতরটা মােচড় দিয়ে উঠলাে। এক ভাবে চেয়ে চেয়ে চোখদুটো জ্বালা করতে লাগলাে। চোখ বুজে দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়লে জানতে পারলাে না।

সাত
ছেলেধরা সার্কান
শুনেছে।
একঘনা দৌড়ে এসে ট্রেন যখন থামলাে তখন সন্ধ্যা হয় হয়।
টেনী দেখলাে লেখা আছে—মধুপুর ।
এই সেই মধুপুর, কলকাতায় মামার বাড়ি যাবার সময় এই
ষ্টেশন ছুঁয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। বাবার কাছে অনেকবার
ওঃ শেখপুরা থেকে 'কতদূরে এসে পড়েছে। যে জায়গাই
হােক, পৃথিবীর যত দুর্গম স্থানই হােক, না নামলে আর প্রাণ বাঁচে
। খিদে তেষ্টায় সব আধমরা হয়ে গেছে। বেবী চোখ বুজেই
পড়ে আছে, মুখ শুকনাে, আপেলের মত তােবড়ানাে—চুল উসকো
খুসকো। আহা বেচারী, কত ছােট, কষ্ট হয় না ।
জাহান্নামে যাক এই মালগাড়ি, আর যদি জীবনে কোন দিন
এর ত্রিসীমানায় আসে! প্ল্যাটফরমের অন্য দিকে নেমে পড়ে তারের
বেড়া টপকে ষ্টেশনের বাইরে এসে তারা দাঁড়ালাে, সেই প্রকাণ্ড কুল
গাছটার নীচে—যার মাথায় হাজার হাজার পাখী একসঙ্গে কিচিরমিচির
করে গান গাইছে। দেখলল—একটু দূরে একটা খাবারের দোকান ;
দেখেই যেন শরীরে শক্তি ফিরে আসে !
কাছে গিয়ে লব বলে,—গরম জিলিপি খাওয়া যাক দিদি।
—কি করে-হবে ভাই, পয়সা যে বড় কম ! জিলিশিং খেলে পেট
ভরবে না, খিদেয় সকলে মরে যাচ্ছি।

ছেলেধরা সার্কাস শেষ পর্যন্ত হিসাব করে দু’আনার মুড়ি ও পাটালী কেনা হ’ল। দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে খেয়ে জল খেয়ে মুখের হাসি আবার ফিরে এল। দোকানী দু’চারটি প্রশ্ন করে এদের ব্যাপার জানবার চেষ্টা করে ; কিন্তু টেনীর চোখের ইসারায় স্পষ্ট জবাব দিল না কেউ। বাইরে বেরুলে হুসিয়ার না হয়ে উপায় নেই। টেনী বলে, চল একটু ঘুরে দেখা যাক ও ভাবা যাক কি করা যাবে। লব বললাে,—এখানে যদি একটা মেলাটেলা হয় ত’ ভারী মজা। দেখে শুনে বাড়ি ফেরা যাবে । স্টেশনের সামনে থেকে সােজা রাস্তা চলে গেছে। সেই পথে । তারা চললাে। রাস্তার দু'ধারে সুন্দর সুন্দর বাগানওয়ালা বাড়ি, খেলবার পার্ক। চারিদিকে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে আলাে জ্বলে উঠছে। কোথা থেকে শখ বেজে উঠলাে, তিনবার। বেবী টেনীর হাত ধরে চলছিল, বললাে,-মাও এখন শখ বাজিয়ে তুলসী-তলায় আলাে দিচ্ছে, না দিদি ? টেনী ছােট্ট একটি ‘হু' দিয়ে পথ চলতে লাগলাে । কিছুদূরে এসে সামনে আঙ্গুল দেখিয়ে কুশ হঠাৎ চীৎকার করে উঠে, দেখ দেখ ওটা কি ? সকলে দেখে এক প্রকাণ্ড মাঠে একটি বেশ বড় সাদা তবু ফেলা। গেটের সামনে মঞ্চের উপর ব্যাণ্ড বাজছে আর লােজন আসা-যাওয়া করছে। চারিদিকে আলােয় আলাে। একটি ছেলে চাকরের সঙ্গে বেড়াতে না কোথায় যাচ্ছিল। টেনী

ছেলেধবা সার্কাস
চেনা না থাকলেও তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে,ঐখানে কি হচ্ছে
ভাই ?
সে পরম বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে উত্তর দেয়,—তোমরা জান
? এখানে থাকে না বুঝি ? থানার মাঠে সার্কাস এসেছে।
সার্কাস ! সার্কাস দেখবােলব কুশ বেবী লাফিয়ে উঠে।
এতক্ষণে মনে হয় কিউলের মেলায় ট্রেন না থেমে ভালই হয়েছে ।
সার্কাস ত দেখা যাবে।
লব খুব উৎসাহে জিজ্ঞাসা করলাে ছেলেটিকে,—বাঘ সিংহের
খেলা হয় ?
পরশু আমি দেখে এসেছি। সিংহের মুখের ভিতর
একটি মেয়ে মাথা ঢুকিয়ে দেয় ; হাতীর উপর বাঘ, তার পিঠে ছাগণ—
খেয়ে ফেলে না। জানাে আমরা যেদিন গিছলাম, একটা বড় বাঘ
আগুনের ভিতর দিয়ে ঝাপ খেতে গিয়ে খেপে গেল। আরেকটু
হলে বাইরে বেরিয়ে আসতাে, ইলেকটি_কের চাবুক মেরে ঠাণ্ডা
করলাে। আবার একদিন যাবাে।ছেলেটি এক নিঃশ্বাসে বলে
যায়।
টেনীর হাত ধরে টানাটানি চলে ; চল, চল না দিদি, এক্ষুণি !
টেনী ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করে,—টিকিট কত করে ?
--চার আনা থেকে পাঁচ টাকা সবরকম আছে। আচ্ছা তােমরা
দুজন একরকম দেখতে কেন ? যমজ ভাই
যমজ ভাই বুঝি? কি মজা হবে
তােমরা যদি সার্কাস কর।—দুষ্টামীর হাসি হেসে শেষ করে।
লব কুশ একসঙ্গে বলে উঠল, ধেৎ! আমরা যে স্কুলে পড়ি।

ছেলেধরা সার্কাস
ছেলেটি চলে গেল। এরাও সার্কাসের তাবুর দিকে রওনা হল।
যেমন করেই যােক দেখতে হবে আজ।
সার্কাসের সামনে বেশ ভিড। লােকজন দাড়িয়ে উকি মেরে
দেখছে। কেউ বা আসা-যাওয়া করছে। আর হতে দেরী আছে।
লাল পাজামা ও গলাবন্ধ কোট পরে পাঁচজন লােক ব্যাঙ বাজাচ্ছে
মঞ্চের উপর। দু’গাল ফুলিয়ে মুখ লাল করে মাথা নেড়ে নেড়ে বাঁশী
যে বাজাচ্ছে তার উৎসাহটাই বেশী। কত লােক টিকিট
কিনে
ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঢুকছে, আগে থেকে ভাল জায়ু
ভাল জায়গা বসবার
আশায়।
এরা উসখুস করতে লাগলাে। কি করে ঢোকা যায় ?
লব পরামর্শ দেয়—পিছন থেকে কোন কঁাকে ভিতরে যাওয়া যাক।
কুশের মনঃপূত হয় না, শেষে ঘাড় ধরে বার করে দেবার সম্ভাবনা
আছে, লজ্জা রাখবার জায়গা থাকবে না। তার চেয়ে সােজাসুজি,
বলাই ভাল।
লব টিকারি কেটে প্রশ্ন
কেটে প্রশ্ন করে,—বলবে কে ?
করে,—বলবে কে ? বললেই যদি
ঘাড়টি বাগিয়ে ধরে, তখন ?
কৃশ রেগে উত্তর দেয়, হ্য। সে বলতে রাজি আছে যা হয়
হোক গে ।
বেবী হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠেসেই ভাল ; এক্ষুণি বলে
ঢুকে পড়া যাক।
কিন্তু কাকে বলতে হবে ? লালশাল মােড়। প্রবেশপথ তৈরী
হয়েছে। পাশে চেয়ার নিয়ে দুজন মানুষ টিকিট দেখে নিচেছু।
DIPSIKHA LIBRARY
ACC. No ..........8

ছেলেধরা সার্কাস আরেকজন দাঁড়িয়ে কথা বলছে। যে দাড়িয়ে, তার সাজ-পােষাক দেখে মনে হয় সে ঘােড়র খেলা দেখায়। কালাে ব্ৰিচে পরা কিনা, আর সেই লম্বা টেন্ কোট, সেই যে মােটা ল্যাজের মত পিছনে ঝুলে থাকে। ওকে বললেই হবে। ঘােড়ার খেলা যে দেখায়, সে ত’ বড় কেউ-কেটা নয়, তার কথার দাম নিশ্চয় আছে। গুটি গুটি কুশ এগুতে লাগে, টেনীও দল ছেড়ে পিছন নেয়। ঠিক এই সময় আরেকজন মােটাসােটা মানুষ ভিতর থেকে এসে এদের কাছে দাঁড়াতেই, সকলে উঠে দাড়ালো—কি কথাবার্তা চলতে লাগলাে। এই লােকটিকে সত্যি দেখবার মত-বিশেষ করে তার ম গোঁফজোড়া। বেশ মােটা লােক, ঘাড়ে গর্দানে। ব্রিচেস্ পরাতে জালার মত পেটটি আরাে ফুলে উঠেছে। কালাে কুচকুচে রং বার্ণিশ করা, দাত- গুলি সেই তুলনায় তেমনি সাদা ঝকঝকে বড় বড়। আজব বটে গোঁফজোড়া। মােটা দড়ির মত ঘন গোঁফ দুপাশে বেঁকে নীচের দিকে ঝুলে পড়েছে । দাড়ি-কামানাে মুখের উপর যেন হামাগুড়ি দিচ্ছে! কোটের উপর বুকের দুপাশে অনেকগুলি সােনা ও রূপার মেডেল, দূর থেকে ঝম করছে। কুশ ও টেনী কাছে গিয়ে ভালাে। হাসি পাচ্ছিল লোকটিকে দেখে। সবচেয়ে মজা লাগছিল ওর গলার আওয়াজ শুনে। ঐ প্রকাণ্ড দৈত্যের মৃত মানুষ ত', কিন্তু গলার আওয়াজ একেবারে সরু পিনপিনে হাসি পায় না ? কুশ হেসে ফেললাে শেষ পর্যন্ত । লােকাট জিজ্ঞাসা করলো,—কি চাও তােমরা?

ছেলেধরা সার্কাস
কুশ হাসি থামাতে গিয়ে মুখ লাল হয়ে গেল, উত্তর দিতে
পারলাে না।
টেনী বললো,-সার্কাস দেখতে চাই।
তা যাও, টিকিট কিনে আন।
-পয়সা নেই, এমনি দেখতে দিন।
লােকটি ও অন্য যারা ছিল বিস্ময়ে অবাক হয়ে যায় । দেখে মনে
হয় না এরা গরীব বা ভিখারী ; অথচ সার্কাস দেখতে এসেছে পয়সা
নিয়ে ।
হামাগুড়ি গোঁফওয়ালা মানুষটি আবার জিজ্ঞাসা করে,-পয়সা
আন নি কেন ?
বাড়ি থেকে আসবার সময় রাস্তায় পড়ে গেছে—এবার কুশ
উত্তর দেয় ।
যাও নিয়ে এসগে।
—অনেক দূরে বাড়ি, গেলে আর ফিরে আসতে পারবাে না।
এসব কি বলে রে বাবা! গেলে আর ফিরে আসতে পারবে না ।
ধমক দিয়ে বললাে,-বাড়ি কোথায় ?
টেনীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে কুশ চল্প উত্তর দেয়,
শেখপুরা।
“শেখপুরা ! অতদূর থেকে এসেছ সার্কাস দেখতে ? কার
সঙ্গে এসেছ ?
এতক্ষণে লব ও বেবী কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
-একলা এসেছি আমরা ক’জন।

ছেলেধরা সার্কাস
লব যােগ দিয়ে বলে,—আমরা কিউলে মেলা দেখতে বেরিয়ে-
ছিলাম কিন্তু ট্রেন থামলাে না সেখানে, সােজা এখানে এসে থেমেছে ;
তাই দেখতে এলাম সার্কাস। আপনাদের অনেক জন্তুর খেলা আছে
? আমরা শুনলাম এই মাত্তর ।
অবাক কাণ্ড ! ওরা সব বলে কি ? ভূ-ভারতে এমন কেউ
শুনেছে ? শেখপুরা থেকে ট্রেনে উঠলে কিউলে মেলা দেখতে যাবে
আর সােজা এসে ট্রেন থামলাে মধুপুরে, থানার মাঠে সার্কাসের তাবুর
সামনে! এ যেন সেই
‘এখান থেকে মারলাম তীর লাগলাে কলাগাছে, উরুত বেয়ে
রক্ত পড়ে চোখ গেল রে বাবা!
অন্য সকলে হাে হাে করে হেসে উঠলাে। চারপাশে মানুষ জমে
গেল। এ আরেকটি নতুন মজার খেলা। কেউ কেউ বলাবলি
করতে লাগলাে,
—দেখেছ ছেলেদু’টি কেমন একরকম দেখতে । ওদের সার্কাসে
নামালে ‘ফাইন পেয়ার' হবে।
মােটা লােকটি হাসেনি, চারদিকে দেখছিল। ও কপাল কুঁচকে কি
ভেবে নিল।
হাত নেড়ে সকলকে সরিয়ে বললাে,—এস আমার সঙ্গে, সার্কাস
দেখতে দেবাে।
কুশ আড়চোখে-লমে দিকে তাকিয়ে টেনীকে বলে,—দেখলে দিদি,
কার কথা ঠিক হ'ল? বললাম ভাল করে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয় দেখতে
দেবে। আর লবটা বলছিল কিনা পিছন থেকে—যত চুরি বিছে ওর।
৩৪

ছেলেধর। সার্কাস
লব একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, টেনী থামিয়ে মােটা লােকটিকে
বললাে, আমাদের যেখানে থােক বসতে দেবেন, ভাল জায়গা
চাইনা।
লােকটি ঘাড় নেড়ে বড় তাবুর ভিতর দিয়ে অন্য একটি ছােট
তাবুতে নিয়ে গেল। ছােট তাবুতে একপাশে একটি ক্যাম্প খাটে
বিছানা পাতা, অন্য দিকে চেয়ার টেবিল সাজানাে। এদের
বসিয়ে বারবার ভাল করে জিজ্ঞাসা করে নিল নামধাম, বাড়ি, বাবা
কি করেন ইত্যাদি। এরা খুসী মনে স্পষ্ট উত্তর দিল।
ভয়ের কি
এমন ভাল মানুষ এক কথাতেই সার্কাস দেখতে দিতে
রাজি হয়ে গেল, একে মিছে কথা বলার দরকার কি ?
সব শুনে লােকটি বললাে, তােমরা এখানে বসে থাকো, আমি
যাচ্ছি, সার্কাস আরম্ভ হলে ডেকে পাঠালাে।
লােকটি এদের বসিয়ে রেখে চলে গেল ।
আছে ?

আট সার্কসের খেল। সার্কাস আরম্ভ হল। একেবারে ধারে একটি খালি বক্সে এদের বসতে দিয়েছে। এর মধ্যে কিছু জলখাবারও খাওয়া হয়ে গেছে। পরম আরামে ঠেসান দিয়ে বসে প্রােগ্রাম পড়ে টেনী বুঝিয়ে দিতে লাগলাে কার পর কি খেলা হবে। বেবী ত’ আনন্দে বেহুশ ! বেচারী আগে কোনদিন সার্কাস দেখেনি। লব কুশ মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে তর্ক করছে খেলার দোষগুণ বিচার করে। টেনী নির্বাক নিশ্চিন্ত ভাবে বসে। মনের খুশী চোখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে, অনেক কষ্ট করা সার্থক হ’ল। সত্যি সার্কাসটি উচুদরের। সুন্দর খেলার কায়দা খুব কমই দেখা যায় । সব রকমের মানুষ ও নানা রকমের জন্তু-জানােয়ার নিয়ে দলটি যে সম্পূর্ণ অভিনব, একথা অস্বীকার করা যায় না। বােগা হলদে রংএর চীনেম্যান, চ্যাং দেখালাে নানা অবস্থায় হাড়গােড় ভাঙ্গা শােয়বসা, নাকের উপর বলের ব্যালান্স, আর পাঁচটি ভীষণ বিপদজনক ভােলা ছুরি শূন্যে ছুড়ে দিয়ে নানা ভাবে লুফে নেওয়া। সব সময়ে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি চকচকে ছুরির ফল। শরীরে বিধে যায়। কিন্তু যায়নি একবারও। প্যারালাল-বার ও রিংএর খেলা দেখালাে সুজিৎকুমার ও টিপু। টিপু মানুষ নয়, গরিলা ! প্রথমে এসে যখন টকলাে, মনে হ’ল দুটি

ছেলেধরা সার্কাস
গরিলা আসছে, একটি কালাে—একটি ফস। সুজিৎকুমারের দেহ যেন
পাথরের তৈরী। বেঁটে গাট্টা-গােটা মানুষ, চোয়াল, উচু, বিশাল
বুকের ছাতি-অবিকল গরিলার মত দেখতে। আর টিপু ? গরিলার
চেহারা—কিন্তু সম্পূর্ণ মানুষের বুদ্ধি। কেউ যেন ওকে শেখায়নি
সব আপনি করে যাচ্ছে ! এমন চমৎকার খেলা স্বপ্নেও দেখা
যায় না।
ঘােড়া, হাতী ও উটের নানারকম খেলা দেখালে সেই কালাে
ব্রিচেস্ ও টেন্ কোট পরা লম্বা লােকটি, মস্ত এক চাবুক নিয়ে।
চাবুকের পটাপ শব্দে ঘােড়া, হাতী, উটের কতরকম দৌড় ঝাঁপ, পা
তুলে দাঁড়ানাে, ব্যাণ্ডের তালে তালে নাচ।
এরপর এক লম্বা তার খাটানো হ’ল আর তাবুর সেই উঁচু ছাদের
নীচে একটি দোলনা। দেখলেই বােঝা যায় কি হবে। বেবী নড়ে
চড়ে তৈরী হয়ে বসলাে, আর ওর চোখের পাতা পড়বে না।
লব বলে,—ঐ উপর থেকে যদি পড়ে একবার ত’ ছাতু। কুশ,
পারবে তুমি ?
-নীচে জাল থাকবে মশাই, জান না কিচ্ছু, পড়লেই টুপ করে
ধরে নেবে। দিদি ?
-হ্যা।
—নিজে পার কি, বল না ? লব এক গোঁজা মেরে ফিরে প্রশ্ন
করে। উত্তরে কুশ এক থাপ্পড় তুলেছিল। টেনী থামিয়ে বলে উঠে,
দেখ দেখ কে আসছে, কি সুন্দর!
একটি পরীর মত মেয়ে জাপানী ছাতা কঁাধে নাচতে নাচতে
==

ছেলেধরা সার্কাস
এগিয়ে এল। বাদামী রংএর গেঞ্জীর আঁটসাট পােষাক, ব্লু জাঙ্গিয়া,
থায় লাল টুকটুকে প্রজাপতি ‘বাে। খােলা ছাতার উপর কত রংএর
পাহাড়-পর্বত নদী গাছপালা আঁকা। সামনে এসে মাথা নীচু করে
অভিবাদন জানিয়ে টুক করে উঠে পড়ে তারের উপর । ব্যাণ্ডের সুর
বদলে মিষ্টি নাচের বাজনা বাজতে লাগলাে মৃদু আওয়াজে। মেয়েটির
ভয়-ডর কিচ্ছু নেই। পা যেন সব সময়ে, যে কোন অবস্থায়, চুম্বকের
মত তারে আটকে আছে। পড়েও পড়ে যায় না। মাঝে মাঝে ফি
ফিক্‌ করে আবার হাসছিল। পরে উঠলাে সেই তাবুর ছাদের ঝোল
দোলনাতে।
বেবী বিড় বিড় করে বলছে,আমি ত ভয় পাই না, আমি ত
ভয় পাই না।
টেনী বুঝতে পারলো বেবী ভয় পাচ্ছে। বেবীর হাত নিজের
হাতের মুঠায় চাপ দিয়েরে রইলাে। খেলার শেষে যখন মেয়েটি
ঝাঁপ দিয়ে নীচের জালে এসে পড়লাে, বেবী তখন চোখ বুজে নিঃশ্বাস
বন্ধ করে বসে।
টেনী বললো, কি সুন্দর, না ?
লর কুশ জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় ।
বেবী বলে,-এর নাম কি বল্লে গা দিদি।
সত্যি ত’ বেহুশ হয়ে দেখতে দেখতে নাম জানার কথা মনে
পড়েনি। প্রােগ্রাম দেখে টেনী বলে,-এলিজা-নামটি ভাল নয়,
করে কিন্তু বেশ। বেবী মন্তব্য করে ।
-তােমার নিজের নাম কি, বড় ভাল বুঝি ?
৮

ছেলেধরা সার্কাস পয়েসু-নসি-মসি। লব খুনসুটি করে বলে । -দেখলে দিদি, আবার ঐ বলছে এখানে সকলের সামন্তে! ঈদ কঁাদ আবদারের সুরে বেৰী আবেদন জানায়। বেশীর ভাল নাম পূর্ণিমা। বেচারী যখন একটু আধটু বানান করে পড়তে শিখেছে, একদিন বাবা পূর্ণিমা বানান করতে বলেন। অম্লানবদনে বেবী বলে যায় পয়সু-নয়সি-ময়সি। আর যায় কোথা । এরপর থেকে ভাই বােনেরা সুযােগ পেলেই ক্ষেপায় পয়েশু-নসি-মসি! আরাে অন্য সব খেলা চলতে থাকে। মাঝে মাঝে এসে হাসিয়ে যায় ক্লাউন দু'টি, আম্বাে ও জাম্বাে। আহাহা, সাজসজ্জার কি ছিরি- ছাদ ! ভূতের মতন সেজেছে ! সাততালি দেওয়া রামধনু রংএর ঝমলে পােষাক, দু’পায়ে দু'রকম জুতাে, মাথায় চোঙ্গ হনুমান টুপী ! জামাের নাক পাঁচ ইঞ্চি লম্বা লাল টকটকে, যেন বােলতা কামড়েছে। আম্বাের নাক বেগুনে থ্যাবড়া, জাপানীদের হার মানায়। ফিরছে আওয়াজ করে, চটাপ থাপ্পড় এ মারে ওকে, ও মারে একে! এ দুটি সঘটে আছেন অঘটন ঘটাতে, আর যতরাজ্যের কুপাট করতে। চ্যাং একমনে নাকের উপর বল-ব্যালান্স করছে, পিছন থেকে গিয়ে কিনা কানে বিড়াল-ডাক ডাকলাে, বিকট মাও করে । চ্যাং চমকেই সামলে নিল। এলিজা নড়বড়ে হালকা তারের উপর মাত্র ডানপায়ের বুড়াে আঙ্গুলে ভর করে ছাতা দোলাচ্ছে, আম্বাে জাম্বাে তারের খুঁটি ধরে নেড়ে দিল। ছেলেমানুষী ত’ নয়, যদি পড়ে যেত? একবার কিন্তু ভারী জব্দ হয়ে গেল। বেশ হয়েছে, এই ত’

ছেলেধরা সার্কাস
উচিত সাজা। তামাসা করতে গিছলাে টিপুর সঙ্গে, শিক্ষা পেয়ে
গেল। গরিলার সঙ্গে চালাকি, সােজা ব্যাপার নয় !
সুজিকুমার ও টিপু বারের খেলা দেখাচ্ছে। টিপুর সামনে গিয়ে
ধোকা দিতে লাগলাে,এই পড়ে যা, পড়ে যা—এমনি করে। বিরক্ত
হয়ে টিপু হঠাৎ এক ছোঁ মেরে দু’জনার চোঙ্গ-টুপিশুদ্ধ মাথার চুল
ধরে হিড়হিড় টান। আম্বো জাম্বাে ঝুলতে লাগলাে শূন্যে, আর
পরিত্রাণে চীৎকার,—মরে গেলাম ছেড়ে দে রে বাবা! সমস্ত লােকে
হেসেছে হাে হাে হাউমাউ করে, পেটে ব্যথা ধরে গেল।
হয়েছে। যেমন কর্ম তেমনি ফল!
ইন্টারভ্যালের সময় আম্বো জাম্বোর কাও কারখানা আলােচনা
করে টেনী বেবীরা হেসে খুন।
হেসে খুন। চেয়ার থেকে নীচে গড়িয়ে পড়ে,
এমন বেদম হাসি ! সেই হামাগুড়ি-দেওয়া গোঁফ, কালাে লােকটি
এসে বললাে, কি খােকাখুকীরা কেমন লাগছে ?
কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে সকলে জানালাে, চমৎকার, খুব ভাল !
জীবনে এমন দেখেনি কখনাে।
বাঘ সিংহের খেলা কখন হবে ?
—ও শেষের দিকে, বেশ মজা।
লবের এখন খুব সাহস ; জিজ্ঞাসা করে,আপনি কি করবেন ?
-দেখবে সময় মত। তােমরা পার এসব করতে ?
“নিশ্চয়ই। খুব পারবাে। আমরা ত’ স্কুলে জিমন্যাস্টিক শিখি
কালীবাবুর কাছে। শেখালে নিশ্চয় পারবাে।-লব কুশ মিলে মিশে
বলে।
৪ ০

ছেলেধব সার্কাস
টেনার দিকে ফিরে লােকটি বলে,—আর তুমি ?
টেনী উত্তর দেয় না, চোখ নীচু করে মিটি মিটি হাসে।
জিজ্ঞাসা না করতেই বেবী হঠাৎ বলে উঠে,আমি ভয় পাই না
কিছুতেই।—সকলে হাে হাে করে হেসে উঠলো।
শেষের খেলা দু'টি সত্যি চমৎকার। রােমাঞ্চকর যাকে বলে,
ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে।
মাঝখানে একটি পরিখা তৈরী করে আগুন জ্বালানো হল।
দু'দিকে খুব সরু লম্বা লম্বা তক্তা পাতা উচুতে। মােটরসাইকেলে
তীরের গতিতে এসে লাফিয়ে পার হয়ে গেল সেই মােটা লােকটি,
একবার, বার বার তিনবার। প্রােগ্রামে নাম দেখলাে লেখা
আছে চন্দ্ররাও। ও এই চন্দ্ররাও সার্কাসের মালিক ? ঠিক লাফাবার
সময় চোখের সামনে উত্তেজনায় ও আতঙ্কে একটা ঝাপসা মতন কি
হয়ে যায় ! শেষ হলে দেখা যায় বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটছে, কপালে
ফুটে উঠেছে ঘামের বিন্দু। প্রথমবারে বেবী চীৎকার করে উঠেছিল,
টেনী তাড়াতাড়ি মুখে হাত চাপা দিয়ে থামায়।
দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন ভদ্রলােক এসে একটি মেডেল
পরিয়ে দিয়ে গেলেন। আগুনের উপর দিয়ে এত লম্বা বাপ এর মত
কেউ পৃথিবীতে লাফাতে পারে না। সেইজ এর এত খাতির ও
নাম-ডাক। নিজের জীবন বিপন্ন করে রােজ এই খেলা দেখাতে হয়
অন্য মানুষদের আনন্দ দেবার জন্য। যদি একদিন লাফাতে গিয়ে
পড়ে যায় !

ছেলেধরা সার্কাস যেন সবচেয়ে শেষ খেলা বাঘ ও সিংহ নিয়ে । চারিদিকে ঘেরা লােহার খাঁচা তৈরী হয়ে গেল, ঠিক মাঝখানে পাঁচমিনিটে। ম্যাজিক : বেবীর ঘুম পাচ্ছিল, মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম তাড়িয়ে সােজা হয়ে বসলাে। প্রথমে এল এয়া-বড় এক কালাে হলদে ডোরাকাটা বাঘ-রয়েল বেঙ্গল-চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে প্রচণ্ড এক হুঙ্কার ! পরে আরেকটি, একটু ছােট আকারের । বােধহয় এর জুড়ি। এবারে একটি কেশর-ফোলানাে সিংহ, মাথাটা এত বড় যে একজন মানুষ দু’হাতে জড়িয়ে ধরতে পারে না। সিংহ এসে এক কোণে ওৎ পেতে ঘড় ঘড় আওয়াজ করতে লাগলাে। ভাবটি এই যে, বেশী গােলমাল করেছ ত’ বাস, একটি থাবায় লােপ পাইয়ে দেব। একজন মেয়ে আঁটসাট কালাে গরম পােষাক পরে, একটি চাবুক ও একটি লম্বা চকচকে পিতলের লাঠির মতন নিয়ে সিংহের সঙ্গে সঙ্গে এসে ঢুকলাে। বাঘ সিংহের হাঁক-ডাক পিতলের লাঠি চোখের সামনে আনতে থেমে যাচ্ছিল। লব বললাে,-ঐ হচ্ছে ইলেটিক চাবুক, গায়ে ছোঁয়ালেই জ্বলে যাবে। দেখছো না কেমন ভয় পাচ্ছে ? বেবী বলে,-যদি বাঘ-সিংহরা বেরিয়ে পড়ে কোন রকমে,—সেই যে রাস্তার ছেলেটি বলছিল, তাহ'লে ? সকলেরই একটু একটু ভয় হচ্ছিল বৈ কি! তবু বেবীকে সান্তনা দিয়ে টেনী বললাে,-না না লােহার খাঁচার ভিতর দিয়ে আসবে কি করে ? আবার ইলেটিক চাবুক আছে হাতে। কুশ বলে,—বইতে পড়নি একজন আবার পিস্তল নিয়ে বাইনে ৪২ ছেলেধর। সার্কাস তৈরী হয়ে থাকে, সে রকম কিছু গােলমাল হলেই দুম করে গুলি করে মেরে ফেলে। প্রােগ্রাম দেখে টেনী বললাে,-যে খেলা দেখাচ্ছে ঐ মেয়েটির নাম রমাবাই। সাহস আছে বলতে হবে। সবশেষে খাচায় ঢুকলে প্রকাণ্ড এক রামছাগল, পাকানাে শিং, লম্বা সাদা দাড়ি। বাঘ, সিংহ, ছাগল, এক সঙ্গে বসে টেবিলের উপর পা তুলে খেলে। এ ওর পিঠে ভর দিয়ে দাড়ালাে। ছাগলের পিঠে একটি আগুনের রিং রাখা হল, তার ভিতর দিয়ে দু’টি বাঘ ও সিংহ বার বার লাফিয়ে পার হয়ে গেল। আগুনের ভিতর দিয়ে লাফাবার সময় বড় বাঘটি ভীষণ গােলমাল সুরু করলাে। কিছুতেই রাজি হয় না লাফাতে । দু’বার চাবুক মারতে হ’ল, তবুও না। মেয়েটি চাবুক আবার যেই তুলেছে, ঘ করে এক লাফে প্রায় ঘাড়ের উপর এসে পড়েছিল আর কি ! দর্শকদের মধ্যে কত লােক ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলাে। একটি ছােট ছেলের কান্না শােনা গেল। আর কি, শেষ হয়ে যায় বুঝি ! টেনীরা থরথর কেঁপে ভাবছিল এইবার পিস্তলের আওয়াজ হবে। রমাবাই খুব সাহসী ও তৎপর বলতে হবে। এক নিমেষে পিছিয়ে গিয়ে বাঁ হাতের পিতলের লাঠি বাঘের নাকের উপর ধরলো। মনে হ'ল একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গের মত জ্বলে উঠলাে। বাঘটা ভীষণ চীৎকার করে এক লাফে অন্যদিকে গিয়ে রাগে গরগর করতে লাগলাে। সবশেষ খেলাটি আরাে দারুণ। সিংহ বসলাে মাঝখানে একটি ১৩ ছেলেধবা সার্কাস চৌকীতে, দু'পাশে দু’টি মাণিকজোড় বাঘ। রমাবাই বাঁ হাতে পিতলের লাঠি ও চাবুক একসঙ্গে নিয়ে ডান হাতটি বাঘের মুখে পুরে দিল, দুজনকারই! মনে হ’ল সিংহমশাই মিটিমিটি হাসছে দাত বার করে, মজাটি দেখাবো, এস আমার কাছে । পরে সিংহ হাঁ করলাে, রমাবাই নিজের মুণ্ডটি সিংহের মুখের ভিতর দিয়ে চুপ করে দাড়িয়ে রইলো। ব্যাও বাজছে না। চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অনেকে উত্তেজনায় দাড়িয়ে উঠলাে। টেনীরাও পরস্পরকে জাপটে দাঁড়িয়ে রইলাে। কি যেন কি একটা অঘটন এখুনি ঘটে যাবে সুনিশ্চিত। রমাবাই ধীরে ধীরে নিজের মাথা বার করে আনলাে। ব্যাণ্ড খুব জোরে, বিপুল উৎসাহে বেজে উঠলাে। আজকের মত সার্কাস শেষ।

খাঁচার পাখী একটি আলাদা তাবুতে চারজনকে শুতে দেওয়া হয়েছিল। সকালে ঘুম ভাঙ্গলাে বেশ বেলা করে। লব বললে,—চল দিদি, বাঘ- সিংহদের একবার দেখে আসা যাক, কি করছে। টেনী উত্তর দিল,—চল, কিন্তু আজ আমাদের বাড়ি ফিরবার ব্যবস্থা করতে হবে। লােকটি খুব ভাল, না? আমাদের ঠিক বাড়ি পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দেবে। কথা শেষ হতে সকলে যাবার উপক্রম করছে, এমন সময় একজন চাকর এসে বললাে, তােমাদের ডাকছেন কৰ্ত্তাবাবু। চাকরের সঙ্গে সকলে বেরিয়ে এল। কালকের সেই ছােট তাবুতে চলরাও বসে কি কাগজপত্র দেখছিল, চোখে চশমা দিয়ে, গম্ভীর ভাবে। বললাে,-এস এস, তােমাদের সঙ্গে কথা আছে। সকলে চারপাশের চেয়ারে বসলাে।লােকটি বেশ মিষ্টি ভাবে বললাে,-সার্কাস কেমন, খুব ভাল, না? তােমরাও সার্কাসে যােগ দাও না, বেশ মজা লাগবে। খাওয়া-থাকার সব ব্যবস্থা করে দেবে। ভাল করে। আর কত আর কত দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াবে। যাবাে কলকাতা, ভারী বড় সহর, দেখবার কত জিনিষ । কুশ জবাব দেয়,—আমাদের বাড়ি ফিরবার ব্যবস্থা করে দিন। সার্কাস আমাদের ভাল লাগে খুব ; কিন্তু মা বাবা এতক্ষণে বড় এর পরই ৪৫

ছেলেধরা সার্কাস
ভাবছেন, বলে আসিনি কিনা! বাড়ি ফিরে যদি ওঁরা মত করেন
তবে সার্কাসে এসে যােগ দিতে পারি।
লয় বললাে কুশকে,-সার্কাস করবে ত’ স্কুল ? পড়াশুনা করতে
হবে না বুঝি ? মুখ হয়ে থাকবে ? খাবে কি ?
সার্কাস করেও ত' কত লােক রােজগার করে। এই ত' এরও
করছেন—কুশ পালটা জবাব দেয়।
বেবী ব্যস্ত হয়ে মিনতি করে বলে,-না না, বাড়ি চল ভাই। মার
জন্য মন কেমন করতে সুরু করেছে ভয়ানক।
লােকটি চুপ করে এদের কথা শুনে বললাে, দেখাে সােজা কথার
মানুষ আমি, স্পষ্ট বলে দিচ্ছি। , আমার নাম জান ত'—চন্দ্ররাও!
এই নাম শুনলে মানুষ দূরের কথা এই সার্কাসের বাঘ-সিংহরাও
থরথর করে কাঁপে। যাওয়া তোমাদের হবে না। তােমাদের নিয়ে
আমি সার্কাসে নতুন নতুন খেলা দেখাতে চাই। বয়স কম ও চালাক
আছ তােমরা, শিখবে চট করে। যদি ভালমানুষের মত কথা শােন
আদর যত্ন পাবে, ভাল খেতে পরতে পাবে, আর তা না হলে হাত
উঁচু করে ভঙ্গি করে শেষ করলাে-চাবুক সপাস। এরকম অনেককে
সায়েস্তা করে ছেড়েছি।
সকলে ভয়ে আঁৎকে উঠলাে। মুখ চোখ ফ্যাকাশে হয়ে
গেল।
টেনীর গলা শুকিয়ে গিছলাে। জোর করে এক ঢােক গিলে
বললাে,-আমরা ছােট ছেলেমেয়ে। এরকম ভয় দেখানো, জোর করা
আপনার উচিত নয় ।
উচিত নয়। আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিন।
এখনি চলে
৪ ৬

ছেলেধরা সার্কাস যেতে দিন দয়া করে, নিজের বাড়ি ফিরে যাবো। দিলে বাবা খবর পেয়ে আপনাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন। বাহাদুর মেয়ে বটে টেনী ! সাবাস সাহস ! কিন্তু চরাও ? চন্দ্ররাও-এর সে কি হাসি ! পৈশাচিক হাসি ! সারা সহর যেন কেঁপে উঠলাে ভূমিকম্পে । চোখ থেকে চশমা খুলে, ঘােড়ার খুরের মত গোফ আঙ্গুল দিয়ে টানতে টানতে বলে,-ভয় দেখাচ্ছি আমায় ? সাবাস মেয়ে ! সাহস আছে তােমার। তােমায় নিয়ে তােমায় নিয়ে সার্কাস জমবে বটে ! জহুরী আমি—ঠিক জহর চিনে নিয়েছি। সার্কাসের তাবু থেকে কাক পক্ষীও তােমাদের সন্ধান পাবে না, নিয়ে যেতেও পারবে । তােমাদের লম্ফঝম্ফ ইলেকটিক চাবুক ছোঁয়ালে বা সিংহের খাচায় পূরে দিলেই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। রাগে টেনীর চোখদুটো জ্বলে উঠলো। উঠে দাঁড়িয়ে বললো, যাচ্ছি আমরা, দেখি কি করতে পারেন। চল্ লব কুশ বেবী, এক্ষুণি চলে যাবে। মন্ত্র-চালিতের মত সকলে টেনীর কড়া হুকুমে উঠে দাড়ালাে ও লাইন বেঁধে তাবু থেকে বেরিয়ে গেল। চন্দ্ররাও বসে তখন মিটি মিটি হাসছে। প্রতিদিন সকালে সার্কাসের বড় তাবুতে কসরৎ শেখানাে হয়। এখানেই চলে সন্ধ্যাবেলা খেলা দেখানাে। যারা সন্ধ্যায় সার্কাস দেখে, ভাবে কি মজা সার্কাস করা, জীবনটাই এদের শুধু হাসি আর খেলা। তারা যদি সকাল এসে দেখে, দৈখবে কত কষ্ট করে প্রতি জিনিষটি শিখতে হয়। মজা উড়ে যায় ! কষ্টের শেষ থাকে না। পরিশ্রম করতে হয়, চেষ্টা করতে হয় বারবার ; না পারলে বকুনি, ধমকানি, গালাগালি, ৪৭ ছেলেধরা সার্কাস মার পর্যন্ত খেতে হয়—যেমন জন্তু-জানােয়ার তেমনি মানুষকেও। চন্দ্ররাও ভারী জেদী, কড়া মানুষ, নিজে সব দেখাশুনা করে। তাবু থেকে বেরিয়ে টেনীরা চটপট বাইরে যাবার জন্য চলতে লাগলাে। কোন রকমে এই বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাক, পরে ভেবে ঠিক করা যাবে বাড়ি ফিরবার উপায়। বেশীদূর যায়নি, দেখলােকালকের সেই টিপু গরিলা তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, মাতালের মত টলতে টলতে দাত বার করে। বেবী টেনীকে জড়িয়ে ধরলাে। টেনী বেবীকে টানতে টানতে ও লৰ কুশকে ঠেলতে ঠেলতে পাশ কাটিয়ে অন্য দিক দিয়ে যাবার চেষ্টা করলাে, কিন্তু সক্ষম হ'ল না। টিপু বড় বড় লােমওয়ালা এবড়াে খেবড়াে হাত দু’টি প্রসারিত করে সারা পথ আগলে দাঁড়ালাে ও মাত্র ভয়ের ইঙ্গিতে ঠেলে নিয়ে ঢােকালে সেই বড় তাবুর ভিতর। বড় তাবুতে তখন কসরৎ চলেছে পুরাদমে। চ্যাং উল্টে পাল্টে নানা ভঙ্গি করে বসছে শুচ্ছে, সুজিৎ- কুমার প্যারালাল বারে দুলছে, এলিজা তারের উপর তাড়াতাড়ি চলবার চেষ্টা করছে, আর রামাই একটা চেয়ারে গুম হয়ে বসে আছে। কালকের পাগল দুটো আম্বাে জাম্বাে এখন বেশ ভালমানুষ সেজে সকলের তদারক করছে, সাহায্য করছে। এরা ঢুকতেই জাম্বাে এগিয়ে এসে বললো,-তােমাদের কার কি খেলা কর্তা ঠিক করে দিয়েছেন ? শিখতে হবে আৎ থেকেই। ঐ ছােট্ট মেয়েটি কি নাম ওর—বেবী ? বেশ ও শিখবে চ্যাংএর কাছে হাড়-গােড় ভাঙ্গা খেলা। যাও ৯কার যেমন ডিগবাজী খায় করগে । ৪৮ ছেলেধরা সার্কাস আর তােমরা দুজন একরকম দেখতে; যাও এলিজার কাছে দু’পাচবার চিৎপটাং হওগে। তােমার নাম কি গা লক্ষী মেয়ে, টেনী ?—ভাল, তুমি শিখবে ঘােড় হাতী-চড়া কসরৎ। বুদ্ধি আছে শিখে নেবে ঠিক। ‘ড়াও একটু, রজনীকান্ত এখনো আসেনি। আর দু'একটি নূতন খেলা তােমরা চারজন ও টিপু করবে হুকুম দিয়েছেন কা; কিন্তু সে আজ হবে না, সাজসরঞ্জাম কিনে আনতে হবে। কাল থেকে দেখা যাবে। পাথরের মানুষের মত চুপ করে চারজনে সব শুনলাে। মনে পড়লাে মা বাবার মুখ, মনে পড়লাে সেখপুরা পাহাড়ের স্বাধীনতা। টেনী কি একটা বলতে যাচ্ছিল ; চোখে পড়লাে টিপু দু'হাত বুকে রেখে দাঁত খিচিয়ে হাসছে। টেনী বললাে না কিছু, বলে কি হবে ? এর পর থেকে চলে কসরৎ শেখার পালা। প্রথম প্রথম করতে বেশ লাগে, মজা হয় আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু একই জিনিষ নিজেদের মধ্যে বার বার করা কষ্টকর, বিশেষ করে তার সঙ্গে যদি মিশানাে থাকে ভয়, ধমকানি ও বাড়ি ফিরে যেতে না পাওয়ার দুঃখ। বাড়ির কথা মনে হ'লে বুক ভেঙ্গে যায়। মনে হয়—কত দিন, কত যুগ যেন বাড়ি- ছাড়া ! মার মিষ্টি ডাক আর বাবার মজার গল্প কত দিন শােনা হয়নি! পালিয়ে যেতে ইচ্ছা হয়, কত কল্পনা মনে ভেসে আসে। একটা এবােপ্লেন যদি টুপ করে এসে সামনে নামে ত’: চট্টপট উঠে পড়া আর হাওয়ায় উড়ে যাওয়া, সেখপুরায় বাড়ির সামনে কোলাহল করে নামা। রাত্রিবেলা যদি কোন রকমে সরে পড়ে স্টেশনে পৌছান যায়, একটা না একটা ট্রেন মিলবেই; কিন্তু পালাবার উপায় কোথা ? ৪৯ ছেলেধরা সার্কাস ; ওকে এসব অষ্টপ্রহর কত জোড়া চোখ একসঙ্গে নজর রেখেছে ! একটু নিশ্চিন্ত ভারে নড়াচড়া করবার উপায় নেই। টিপু যেন মানুষের চেয়েও বেশী সচেতন, মারধাের করে না, আঁচড়ে কামড়েও দেয়নি কোনদিন ; তবু মনে হয়, কিছু বেয়াদপি করলেই ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে দেবে। টিপু সব বুঝতে পারে, বুঝতেও পারে স্পষ্ট ভাবে। শেখালাে কে-ঐ চন্দ্ররাও? কি দুর্দান্ত নিষ্ঠুর মানুষ ! নিয়মমত রুটিন অনুযায়ী কসরৎ শিখতে হয়। সৈনিকের মত মাপা জোকা খাওয়া বসা, কলের মত হিসাব করে মানুষদের সাথে কাজ ব্যবহার। ভুল চুক হবার বেশী-কম হবার জো নেই। সন্ধ্যায় সার্কাস আরম্ভ হ'লে আলাদা জায়গায় বসে দেখতে হয়। দু'দিন বাদে নিজেরা ভাল করে শিখে এমনি এত লােকের সামনে খেলা দেখাতে হবে। ভাবলে আনন্দ হয় আবার ভয়ও হয় একটু একটু। যদি খেলা দেখাতে ভুল হয়, দুম্ করে পড়ে যায়, তাহলে? চ্যাং মানুষটি বড় ঠাণ্ডা। বেবীকে কত কষ্ট করে মিষ্টি কথা বলে শেখায়। বেবী যখন সত্যি ৯-কারের মতন বুকের উপর ভর দিয়ে পা’দুটি সমান বেঁকিয়ে উচু করে থাকে, ভারী সুন্দর দেখায়। তবে কষ্ট হয় খুব, মুখে চোখে রক্ত নেমে আসে। আবার বেবীকে কাঁধে করে সেই ছুরি শূন্যে ছোঁড়া ও লুফে নেওয়া প্র্যাকটিস করছে আজকাল। একবার যদি ছুরির ফলা বেবীর শরীরে দিধে যায় ? লব-কুশের ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন নয়। এলিজা খুব খিটখিটে, ধৈৰ্য্য নেই একেবারে। একটু ভুল হলে যা তা বলে, দূর দূর করে;

ছেলেধরা সার্কাস রাওকে বলে দেবার ভয় দেখায়। লব-কুশ করছে কিন্তু খুব উঁচুদরের খেলা। যেন কলের তৈরী একজোড়া একই রকম দেখতে মানুষ ! হাবভাব, ভঙ্গি সমস্ত মিলে চমৎকার দেখবার মত জিনিষ। রজনীকান্ত কথা বলে কম। বেশীর ভাগ চোখের ইশারায় সারে। যখন রাগে, ওর চোখের দিকে না তাকালেই ভাল হয়। সারা দেহে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, সেই ঘৃণার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি। একদিন টেনী উপরি উপরি তিনবার পড়ে গেল ঘােড়া থেকে। রজনীকান্ত টেনীর দিকে একবার তাকিয়ে হাতের চাবুক মাটিতে আছড়ে ফেলে তাবু থেকে চলে গেল। টেনীর সে কি কান্না ! এতবড় অপরাধ ও এমন ভীষণ শাস্তি যেন জীবনে আর ঘটেনি কখনাে ! এর চেয়ে চাবুক দিয়ে মারলে টেনীর লাগতাে কম। টেনীকে কিন্তু ভারী সুন্দর দেখায় ওর নতুন পােষাকে। চিনতে পারা যায় না যে, এ সেই শেখপুরার ছােট মেয়ে টেনী। গলায়, কাঁধে, কোমরে-সিল্কের ঝালর দেওয়া সবুজ আঁটা পােষাকে ওকে স্বর্গের পরীর মত সত্যিই দেখায়। এর পাশে এলিজা সৌন্দর্যে ম্লান হয়ে যায়। এই জন্য বােধহয় এলিজার হিংসা আজকাল এত বেড়েছে, খিটখিটেমির শেষ নেই, লব-কুশের উপর শাস্তির পরিমাণও বেড়েছে। সবচেয়ে অসহ্য কিন্তু রমাবাই। নামটি বেশ সুন্দর কিন্তু মানুষটি বড় খারাপ, ম অত্যন্ত সংকীর্ণ। ওর কাছে শিখতে হয় না কিছু, তবু ওর ফাইফরমাশ খাটতে হবে দিনরাত। সে যে কতরকমের, তার ইয়ত্তা নেই। এতটুকু মিষ্টি কথা বলে না, শুধু চাকরের মত হুকুম ছেলেধরা সার্কাস । করে। একদিন টেনী ওর চুল আঁচড়ে দিতে দিতে লাগিয়ে দিয়েছিল। ইচ্ছা করে নয়, এমনি লেগে গেছে। রমাবাই রেগে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চল্ল সিংহের খাঁচায় পূরে দিতে। ? শুনবে না কোন ওজর-আপত্তি অনুনয়-বিনয় । শেষে লব কুশবেবী হাউমাউ করে কেঁদে, পায়ে ধরে মাফ চেয়ে টেনীকে বাঁচায়। একবার টেনী চন্দ্ররাওকে বলে দিল, কিন্তু ফল হ’ল উলটো। চন্দ্ররাও নিজেই রমাবাইকে ভীষণ ভয় করে, কোন কথার প্রতিবাদ করে তর্ক করতে সাহস করে না। রমাবাই যা খুশী, যত খুশী, করতে পারে। ওদিকে থাকেন সবচেয়ে বাবুয়ানীতে, আরামে। আম্বাে-জাম্বাে অন্যের সামনে গম্ভীর চুপচাপ থাকে, কিন্তু আড়ালে টেনীদের সঙ্গে খুব ভাব করে ফেললাে। ওরা দুজনে সত্যি বড় ভাল মানুষ। ক্লাউন সেজে পাগলামি করলে কি হয়, আসলে খুব পাকা খেলােয়াড়, ঐরকম ভান করে। আড়ালে চন্দ্ররাওকে বলে যমদূত, রমাবাইকে শূর্পণখা, এলিজাকে ছি চুদুনী, আর রজনীকান্তকে ক্যাবলাকান্ত ! আম্বাে-জাম্বাে লুকিয়ে টেনীদের খাবার-দাবার দেয়, চকলেট কিনে দেয়, মন খারাপ হলে মিষ্ট কথায় সান্ত্বনা দেয়। পেলেই কত কত গল্প করে ওদের সঙ্গে। নিজেদের জীবনেরও অনেক কথা বলেছে। ছােট বেলায় একই গ্রামে পাশাপাশি থাকতত দুজনে, খুব ভাব ছিল। চন্দ্ররাও তখন খুব ছােট একটি দল নিয়ে সার্কাস দেখিয়ে বেড়াতে ; ওদের গ্রামে সে আসে দু'চারটি মানুষ ও জন্তু- সময় ছেলেধরা সার্কাস জানােয়ার নিয়ে ; এক এক পয়সা টিকিট। আম্বাে-জাম্বাে তিন-চার দিন দেখতে গেছলাে। সার্কাসের দল খেলার শেষে গ্রাম...ছেড়ে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আম্বাে-জাম্বােকে আর খুজে পাওয়া গেল না। চন্দ্রাও ভুলিয়ে ভালিয়ে ছেলে দু’টিকে সঙ্গে নিয়েছিল। সার্কাসে চাকর, ঘােড়ার সহিস, এরকম অনেক কাজ ওড়ের করতে হয়েছে। পরে নিজেদের বুদ্ধির বলে ক্লাউনের কাজ পেয়েছে। এখনও ওদের অন্য সবাইকে কসরৎ করবার সময় সাহায্য করতে হয়, টাকা-কড়ির হিসাব-নিকাশ রাখতে হয়। আম্বাে দুঃখের হাসি হেসে নিজেদের কাহিনী শেষ করে বলে, আমাদের আসল নাম আম্বােও নয় জাম্বােও নয়, পরে ঐ নাম দেওয়া হয়েছে। এখন আসল নাম বললে মানবে কে ? চিনতে পারবে না। তারা শুধু সার্কাসের ক্লাউন বৈ ত’ না। টেনী একদিন ওদের বলে,—আমাদের পালাবার ব্যবস্থা করে দাও। --ওরে বাবা ! গর্দান যাবে আমাদের। যমদূত ও শূর্পণখা আস্ত রাখবে না, টুকরাে টুকরো করে বাঘ সিংহদের খাইয়ে দেবে। তবে সুবিধা যদি হয়, নিশ্চয়ই।

দশ অদ্য বিশেষ রজন সব ঠিকঠাক আসছে শনিবার থেকে টেনীরা খেলা দেখাবে। কাগজে ছাপানাে হয়ে গেল, হ্যাণ্ডবিল বিলি করা হ’ল। টেনী বেবীদের আসল নাম গােপন রেখে এক একটি নতুন নাম দেওয়া হল, এবং ঠিক হ’ল ‘মেকাপে’ এদের মুখ চোখ বদলে নামানাে হবে,কেউ চিনতে না পারে।—চন্দ্ররাও ভারী ধড়িবাজ, বড় হুসিয়ার মানুষ ! সবদিক আটঘাট বেঁধে কাজ করা অভ্যাস। দু’দিন আগে থেকে খুব জোরসে কসরৎ চললাে। কোন রকম ভুলচুক, কোন রকম বেসামাল না হয়ে পড়ে। সার্কাস দেখানাে সহজ নয়, তামাসাও নয়। লােকে পয়সা দিয়ে দেখতে আসে। পয়সার মূল্য অনুযায়ী আমােদ না পেলে আর কখনও আসবে না, আসবে কেন ? উত্তেজনায় এবং খেলা দেখাবার আনন্দে টেনীরা প্রায় বাড়ির কথা ভুলে গেল শেষের দিকে। শুধু একটি চিন্তা দিনরাত যে ভাল করে দেখাতেই হবে। আম্বাে-জাচ্ছে আগাগােড়া সাহায্য ও উৎসাহ দিতে লাগলাে। অনেক সময় এদের খেলা দেখে অন্যদের স্বীকার করতে হয়েছে যে, যদি ঠিক এইরকম দর্শকদের সামনে দেখাতে পারে কোন লজ্জা বা ভয় না পেয়ে, তাহলে সত্যি দেখবার মতই জিনিষ ৫৪ ছেলেধরা সার্কাস হবে ; পরে দেশময় সুখ্যাতি ও নাম ছড়িয়ে যাবে এবং যখন কলকাতায় সার্কাস গিয়ে পৌছাবে, তখন সারা সহরের মানুষ এসে ভেঙ্গে পড়বে। চন্দ্ররাও এসব দেখেশুনে আজকাল ব্যবহার অনেক ভাল করছে। কিন্তু এলিজার হিংসা যেন বেড়েই যাচ্ছে। এই সেদিন লবকে চটাস করে এক চড় বসিয়ে দিল বিনা কারণে। লবও ছাড়বার ছেলে নয় । আঁচড়ে কামড়ে ঠেলেঠুলে ব্যতিব্যস্ত করে মেরেছিল, শেষে অন্যেরা এসে থামায়। আর রমাবাই ? ওর কথা না বলাই ভাল। পৃথিবীর কোন মানুষকে ও ভালবাসে না, লােককে ফরমাস করা, জ্বালাতন করা একমাত্র কাজ। ওর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার উপায় কিছু নেই। শনিবার সন্ধ্যায় সার্কাস আরম্ভ হ'ল। আজকে বিশেষ রজনী, তাই বেশী ভিড়। অনেক লােক এসেছে আত্মীয়-স্বজন ছেলেমেয়ে নিয়ে, নতুন নতুন খেলা দেখবার আশায়। চারিদিকে গরম জামা- কাপড় শাল-দোশালার ছড়াছড়ি। চীনাবাদাম, চকলেট ও কমলালেবুর দাম চড়ে চারগুণ! ব্যাণ্ড এতক্ষণ বাইরে মঞ্চের উপর বাজছিল ; প্রথম ঘণ্টা পড়তেই, ভিতরে এসে নিজেদের জায়গায় বসে প্রবল উৎসাহে বাজাতে লাগলাে। চন্দ্ররাও সবচেয়ে দামী জামাকাপড় পরে সবগুলি মেডেল বুকে ঝুলিয়ে তদারক করছে ব্যস্তভাবে। সকলকে বার বার মনে করিয়ে দিল খেলা যেন সর্বাঙ্গসুন্দর হয়, অনেক লোেক এসেছে। উত্তেজনায় প্রসিদ্ধ গোঁফজোড়াটি নাচতে লেগেছে। টেনীদের সকলের পিঠ ছেলেধরা সার্কাস •• চাপড়ে বলল,“ভয় নেই কিছু, সব ঠিক হয়ে যাবে । যেমন শিখানাে হয়েছে, করলেই হবে। ভুল হলে কিন্তু নাকের াছে আঙ্গুল নেড়ে দেখালাে। মানে—ইলেকট্রিক চাবুক সপাসপ,। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধবধবে সাদা পােষাক পরে বেবী নামলাে- চ্যাং সঙ্গে। এদের দেখেই হাততালি পড়লো খুব, বিশেষ করে যখন ছােট্ট বেবী ছােট্ট মাথাটি নীচু করে অভিবাদন জানালাে। চমৎকার করলাে বেবী ! . ওর শরীরে যেন হাড় একখানিও নেই! আশ্চৰ্য্য যে এমন বাকাচুরা মানুষ আবার হতে পারে ? গম্ভীর মুখ করে বেবী একের পর এক সমস্ত সুন্দর ভাবে করে গেল,ভীষণ ছুরি লােফা পৰ্যন্ত। মাঝে মাঝে ড্যাবড্যাব করে লােকেদের দিকে দেখছিল, -কিন্তু ভয় পায়নি কিছুই। নৌকার মত বেঁকে বেবী শক্ত হয়ে রইলাে। চ্যাং একটা লাঠি বেবীর পেটে লাগিয়ে, উচু করে বনবন, ঘুরিয়ে দিল। বেবীর পােষাকের তলায় একটি মােটা শক্ত চামড়ার বেল্ট লাগানাে ছিল, দর্শকরা কেউ দেখতে পেল না। এই ছিল বেবীর শেষ খেলা। চ্যাং শূন্যে ছুঁড়ে যেই লুফে কোলে করে নিল, সে কি হাততালি ! থামতে চায় না অনেকক্ষণ ! লবের হলদে গেঞ্জির আঁটা পােষাক ও লাল জাঙ্গিয়া। কুশের ঠিক উলটো, লাল পােষাক ও হলদে জাঙ্গিয়া। এলিজা আগের মতনই বাদামী পােষাক ও ব্লু জাঙ্গিয়া পরে, একসঙ্গে এসে দাড়ালাে। লব- কুশকে দেখাচ্ছিল যেন একটি সুন্দর ছেলের আরেকটি প্রতিবিম্ব,

No text on this page.

আগে কে স্বপ্নেও ভাবতে পারতাে টেনী এমন কায়দা করে ঘােড়ায়
চড়তে পারে।
—৫৮ পৃষ্ঠা

ছেলেধবা সার্কাস
আশীতে নিজের মুখ যেমন দেখায়। শুধু পােষাকের তফাতে ধরা
যায় দু’জন মানুষ।
যন্ত্র চালিতের মত তিনজনে তারের উপর খেলা দেখাল।
জাপানী ছাতা এর হাত থেকে ওর হাতে নাচতে লাগলাে, একজনকে
টপকে আরেকজন এপাশ ওপাশে লাফিয়ে পড়লাে, যেন ওরা
শক্ত চওড়া মাটির উপর কসরৎ করছে—সক দোলা তারের
উপর নয় ।
লবের একবার পা পিছলে গেল সড়াৎ করে, আরেকটু হলেই
পড়ে যেত একেবারে সকলের সামিন চিৎপটাং। অন্যদিকে ঝুঁকে
ব্যালান্স করে সে যাত্রা অনেক কষ্টে রক্ষা পেল।
অনেক কষ্টে রক্ষা পেল। আরেকটু হলেই
হয়েছিল আর কি। এলিজার টিটকায় এবং চন্দ্ররাওএর চাবুক ভােগ
করতে হত।
তারের খেলার পর তিনজনে গিয়ে উঠলো সেই উচু বােলানাে
দোলাতে। ওদের এতটুকু-টুকু দেখাচ্ছিল।
ভয় হয় না ? যদি
পড়ে যায় ? কিন্তু সার্থক শিক্ষা পেয়েছে বলতে হবে। এতটুকু
ভুলচুক করলাে না—পরের পর করে গেল নিয়মমাফিক। দোলনার
দড়িতে পা আটকে দু’কোণে লব ও কুশ মাথা নীচু করে ঝুলে রইলাে,
দুজনার হাতে হাত ধরে ঝুলতে থাকলাে এলিজা। এলিজা অত
বড় দেহটাকে ওরা যে কি কায়দায় দোলাতে খেলাতে লাগলাে, সে
না দেখলে বর্ণনা করা যায় না। মনে হয়, আর পারে না—এবার বুঝি
সবশুদ্ধ ছিড়ে নীচে-পাতা জালের উপর ঝপাঝপ, এসে পড়বে; কিন্তু
তা নয়, এক একজন করে ডিগবাজী দিয়ে জলে ‘ডাইভ’ খাওয়ার মত
•

ছেলেধরা সার্কাস জালে এসে নামলে। চটাপট শব্দ বহুক্ষণ ধরে জানাতে লাগলাে যে, ললাকেদে ভাল লেগেছে খুবই । ইন্টারভ্যালের ঠিক আগে টেনীর খেলা। চারিপাশে কেঁচাননা ঝালর দেওয়া পােষাকে মনে হচ্ছিল টেনী যেন সত্যিকারের মানুষ মেয়ে নয়, কোন ছবিতে-আঁকা মূৰ্ত্তি, এমনি সুন্দর! আগে কে স্বপ্নেও ভাবতে পারতাে টেনী এমন কায়দা করে ঘােড়ায় চড়তে পারে! শুধু চড়া নয়,ঘােড়া ছুটছে, পিঠের উপর সােজা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, একপায়ে ভর দিয়ে বাজনা বাজাতে হবে ব্যাণ্ডের তালে তালে, এক ঘােড়া থেকে আরেক ছুটন্ত ঘােড়ায় লাফিয়ে পড়তে হবে ! পরে কাঠের পুতুলের মত শক্ত হয়ে রইলাে, হাতী শুড়ে করে ধরে ছুটতে থাকলো! মনে হয়—এই পড়ে গেল ! পড়ে গেলে হাতীর পায়ের তলায় ওঁড়াে হয়ে যেত। রজনীকান্তের মুখের দিকে চেয়ে মনে হয় গর্বে ঘাড়টি ফুলিয়ে খুশী মনে খেলাচ্ছে ! চোখের দৃষ্টি তত তীব্র নয়, বেশ কোমল। লােকেদের সবচেয়ে ভাল লাগে টেনীর মুখের মিষ্টি হাসিটি,—সব সময়ে হাসছে। খেলার শেষে রজনীকান্ত টেনীর হাত ধরে সামনে নিয়ে গিয়ে একসঙ্গে লে করে অভিবাদন জানালাে। রজনীকান্তের সঙ্গে অনেকেই খেলা দেখিয়েছে কিন্তু এতদিনে এত বড় সৌভাগ্য কারুর হয় নি। এর চেয়ে বড় প্রশংসা, টেনী আর কি আশা করতে পারে ? শেষের দিকে আরেকটি নতুন খেলা সকলে দেখালাে। ঘন্টা পড়তে সবুজ পর্দা সরিয়ে সব প্রথমে এল টেনী, খুব উঁচু একটি ছেলেধরা সার্কাস একচাকার সাইকেলে। দু’হাত দু’পাশে ব্যালান্স করতে করতে পাখীর মত উড়ে এল। পিছনে এল লব কুশ বেবী। সারি সারি। ও আবার কে সবচেয়ে শেষে ? আরে টিপু ! টিপু একচাকার, সাইকেল চালাচ্ছে অন্যদের মত! তাজ্জব কাণ্ড! এতটা কিন্তু আশা করা যায় না । আর এই দলের সঙ্গে এসে হাজির নানা রকম অঙ্গভঙ্গি ও আওয়াজ করতে করতে,কারা ? সব সময়ে অঘটন ঘটাবার বাহাদুর দুটি, -আম্বাে জাম্বাে। না, এতটা সত্যি আগে ভাবা যায়নি। সার্কাসটি উচুদরের স্বীকার করতে হয়। উঁচু উচু, সেই অনেক উঁচু, তিনশৃনুষ সমান একচাকার সাইকেলে চারটি ছেলেমেয়ে ও একটি গরিলা নানা ভাবে এঁকে বেঁকে, ছুটে দাঁড়িয়ে, লাফিয়ে, কায়দা দেখাতে লাগলাে, যেন ওরা এক সূতায় গাঁথা ! আর হাসাচ্ছে, বেদম হাসি হাসাচ্ছে, দু' ঠ্যাংএ মাটির উপর অনুকরণ করে আমাদের আম্বাে-জাম্বাে । একচাকার সাইকেল চড়া সােজা কাজ নয়, বিশেষ করে অত উঁচু যখন। এক-একবার এক- একজন টাল খেয়ে যাচ্ছে আর বাঁচিয়ে দিচ্ছে ক্লাউন দু’জন। দেখে কিন্তু মনে হয়—ওরা নিজেরাই খালি খালি পড়ে যাওয়ার ভান করছে, কায়দা এমনি চমৎকার । চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে ইচ্ছে করে কাছে এসে লর চুপিচুপি বললাে,-দিদি, তােমার পা দিয়ে রক্ত- শেষ করতে পারলাে না, নিয়ম অনুযায়ী দূরে সরে যেতে বাধ্য টেনীর হুস্ ছিল না শরীরের উপর। দেখে সত্যি তাই, পা ছেলেধরা সার্কাস দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। নিশ্চয় সাইকেলের প্যাডেলে কখন কেটে গেছে ! এখন কি করা যায় ? খেলা বন্ধ রেখে নেমে পড়া অসম্ভব, সব মাটি হয়ে যাবে। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল। পা তুলে এক পায়ে চালাতে চালাতে হাতের রুমাল টপ, করে বেঁধে দিল, দু’বার টাল খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিল নিজেকে। লােকেরা ভাবলাে এক নতুন রকম খেলা বুঝি, হাত তালি দিয়ে উঠলাে খুব জোরে। জাম্বাে দেখেছিল ব্যাপার কি! সেজন্য টনীর কাছে কাছে ঘুরে তামাসা করতে লাগলাে, যদি পড়ে যায় ধরে ফেলবে বলে। টেনীর পা জ্বালা করছিল কিন্তু উপায় কি ? টেমী আবার মন দিয়ে খেলা দেখাতে লাগলাে। খেলা শেষ হলে লােকের।' চেঁচিয়ে উঠলো,—আরাে আরাে ! সুতরাং আবার খানিকক্ষণ দেখিয়ে শেষ করতে হ’ল । অন্যদিনের মত সেদিনও বাঘ সিংহের খেলা দেখিয়ে সার্কাস শেষ হ’ল। লােকেরা বলতে বলতে বাড়ি ফিরে গেল যে, আবার দেখতে হবে; এ জিনিষ একবার দেখলে আশ মেটে না। সত্যি সার্কাসটি বড় চমৎকার ! ;

এগারাে,
গােয়েন্দা রজনীকান্ত,
;
দিনের পর দিন সার্কাস চলে। দিন দিন বেড়ে যাম লােকের
ভিড়। তিল ধরবার জায়গা থাকে না। আগে থেকে সমস্ত সিট
রিজার্ভ হয়ে যায়, কত লােক রােজ ফিরে যায় দেখতে না পেয়ে।
টেনীদের খাতির বেড়ে গেছে । ওদের জন্যই যে টাকা বেশী
রােজগার হচ্ছে, সে কথা চেপে রাখবার উপায় নেই ; সকলে জানে।
খাতির বাড়লে কি হয়,
‘একটি
কথা কিন্তু
উচ্চারণ করা নিষেধ। টু
শব্দ করলে ধমকানাে আর ভয় দেখানাে আরম্ভ হয়ে যাবে। সে
কথাটি কেউ মুখে আনতে পারে না,-াড়ি ফিরবার কথা।
টেনীদের মােটের উপর ভালই লাগছে। কার না লাগে ? নাম
করা কি যে সে ব্যাপার। এই যে হাজার হাজার লােক কাতারে
কাতারে দেখতে আসছে, সুখ্যাতি করছে, তবু ফাটিয়ে হাততালি
দিচ্ছে,এ কি সহজ কথা? কিন্তু তবুও মানুষ ত’, বাড়ির জন্যে কার
মন কেমন করে! কতদিন বাড়ি ছেড়ে থাকা যায়, তা সে যত
সুখ যত আনন্দই হােক না কেন। মা বাবার কথা দিনের মধ্যে
কতবার করে মনে পড়ে যায় ! হায় শেখপুরা, কত স্বাধীনভাবে
জীবন কাটতাে সেখানে !
এ যেন খাঁচার পাখী ! সময় মত খাবার আসছে খাও, নিয়ম মত
শিষ দাও টুই-টুই-টুই, আর হুকুম মত ল্যাজ তুলে তলে তুড়ুক তুড়ক

ছেলেধরা সার্কাস নাচ! এদের জীবন কি ঠিক সেই রকম নয় ? তফাৎ কোথায় ? কিচ্ছু নেই। প্রায়ই চারজনে আলােচনা করে কি করা যায়, কি ভাবে বাড়ি ফিরে যাওয়া যায় ! আম্বাে-জাম্বাে বসে চুপ করে শশানে এর কথা, দুঃখে সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু উপায় বাৎলাতে পারে না এই বদ্ধ খাঁচার পাখীদের উড়ে যাবার বিষয়। এর কোন উপায় নেই ; সুতরাং দুঃখ কর আর চুপ করে বসে থাক, খাও দাও মন দিয়ে কাজ করে যাও-বাস্ ! আর কি চাও? কাগজে হাবিলে ছাপা বেলে,—শেষ সপ্তাহ, শেষ সপ্তাহ ! সাতদিন বাদে সার্কাস এখান থেকে চলে যাবে কলকাতায়, বাংলার রাজধানী কলকাতা সহরে। বড়দিন আসছে যে! বড়দিনে কলকাতার চেয়ে সেরা আমােদ-প্রমােদ দেখাবার, টাকাপয়সা লােটবার জায়গা আর আছে নাকি পৃথিবীতে? টেনীদের ভাবনা বেড়ে গেল। আরও দূরে চলে যাচ্ছে শেখপুরা থেকে, আরাে দূরে। ফিরবার হবে কি ? অবশ্য মামারা থাকেন কলকাতায় কিন্তু ঠিকানা ত’ মনে নেই ! কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট এইটুকু মনে আছে। এতে খবর পাওয়া যাবে কি করে? এক যদি মামাবাবু দেখতে আসেন সার্কাস ; কিন্তু চিনবেন কি করে ? ‘মেকাপে’ ত মুখ বদলে খেলা দেখাতে হয়। আর সারি সারি ললাকের ভিড়ের মধ্যে থেকে মামাবাবুকে চিনে ডেকে নেওয়া শিবের অসাধ্য কাজ। কি হবে ? আদাে-জাম্বাে চুপ করে শুনে যায়, বলে না কিচ্ছু ; মিছে সান্ত্বনা কতদিন দেওয়া যায় ? চুপ করে থাকাই ভাল। ৬২ ছেলেধরা সার্কাস কলকাতা যাবার দু'দিন আগে। নিশুতি অমাবস্যার রাত। সার্কাসের তাঁবুগুলি প্রকাণ্ড কালাে পাহাড়ের মত নিশ্চল নিশ্চিন্তভাবে মাটির উপর পড়ে আছে। মানুষেরা গভীর নিদ্রায় মগ্ন। জানােয়ারেরাও ঘুমে অচেতন। ঘুমন্ত আওয়াজে মাঝে মাঝে হাট মুখর হয়ে আবার চুপ করে যাচ্ছে। কোথায় ঘােড়। পাকলে ঠক ঠক করে, কখনাে বা ফোঁস কন্তু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন সিংহমশাই, বাঘের গলা ঘড়ঘড়ানি সময় সময় শােনা যায়—আবার সমস্ত চুপ, একেবারে নিস্তব্ধ। সুজিতের তাবুতে সুজিৎকুমার ও টিপু দুজনে পাশাপাশি ঘুমায় দুখানি খাটে। একটি ছায়ামূর্তি সাবধানে ধীরে ধীরে এসে খুব সাবধানে উকি মেরে ভিতরে দেখে নিয়ে সরে গেল। ছায়ামুর্তি সন্তর্পণে টেনীদের তাঁবুর সামনে এসে দাড়ালাে, তাবুর সঙ্গে গা মিশিয়ে চারিদিকে ভাল করে দেখলাে, কান পেতে অনেকক্ষণ কি যেন শুনলাে ! চারিদিকে অন্ধকার—গাঢ় অন্ধকার। কালাে সাদা মেঘের টুকরাে সারা আকাশ ঢেকে দিয়েছে, একটি তারাও দেখা যায় না। ছায়ামূর্তি সাবধানে টেনীদের তাবুর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পরে ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। পিছনে পিছনে. চারটি ছােট ছোট ছায়ামূর্তি, সব শেষে আরেকটি বড় লাইন বেঁধে চারিদিকে সতর্ক ভাবে দেখতে দেখতে বেরিয়ে এল। সুজিৎকুমারের তাঁবুর মনে যেন হাওয়ায় পা ফেলে বেশী সাবধানে বেরিয়ে গেল, একটুও শব্দ হল না।

ছেলেধরা সার্কাস
মাঠের শেষটায় এসে প্রথম ছায়ামুর্তি ঝুকে তার পিছনের ছায়া-
মূর্তিকে চুপি চুপি কানে কানে বললাে,-টেনী, সােজা চলে যাও।
ঐ রাস্তা, স্টেশনে আধঘণ্টা বাদে ট্রেন ছাড়বে।
ধূটনীও ঠিক তেমনিভাবে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসুফি
করে বললাে, আম্বা তােমাদের দুজনের জীবনে ভুলবাে না।
বাড়ি ফিরে তােমাদের কথা মর্মে থাকবে চিরকাল।
আমাদের পরম বন্ধু।
চারটি ছােট ছায়ামুর্তি মাঠ পেরিয়ে চলে গেল। বড় দুটি যতক্ষণ
দেখা যায় চুপ করে দাড়িয়ে রইলাে। মনে হ'ল যেন হাত দিয়ে
চোখ মুছলাে। অন্ধকারে ভাল করে দেখা গেল না।
পথ একেবারে নির্জন। কোন মানুষ চলাচল করছে না। একটি
গাড়ির টুপ টুপ শব্দ দূরে শােনা যায়, কারা স্টেশনে যাচ্ছে ।
কিছুদূর এসে লব বলে,“দেখ দিদি, কে যেন আসছে ।
হ্যা সত্যিই ত', উলটো দিক থেকে একটি মানুষ আসছে পা পর্যন্ত
লম্বা ওভারকোট পরা, মাথায় পট্টি বাঁধা, হাতের লাঠি ঠকঠক করতে
করতে। রাস্তার আলােতে মাত্র এই দেখা গেল, চোখ-মুখ দেখা যায় না।
টেনী বলে,-কাজ নেই বাপু সামনাসামনি হয়ে। যদিও
চেনা লােক কেউ নয়, তবু সাবধান হওয়া ভালাে। এস, আমরা এই
নিমগাছটির আড়ালে যাই, চলে গেলে আবার যাব।
সকলে গিয়ে নিমগাছের গুড়ির পিছনে লুকিয়ে বসে পড়লাে।
লােকটি সোজা যেতে যেতে নিমগাছের কাছে এসে হঠাৎ এক
লাফ মেরে এদের সামনে এসে হাজির। ভয়ে সকলে এমন বিহ্বল
৬৪

ভয়ে সকলে এমন বিহ্বল হয়ে পড়লাে যেন অজ্ঞান হয়ে গেছে ! —১৫পৃষ্ঠা

No text on this page.

ছেলেধরা সার্কাস হয়ে পড়লে যেন অজ্ঞান হয়ে গেছে! কথা বলা দূরের কথা, সারা দেহে পক্ষাঘাত লেগে গেল। কি কোথায় যাওয়া হচ্ছিল চুপিচুপি ?-রজনীকান্তের মুখ দিয়ে ভক্ ভক্ করে মদের গন্ধ বেরুচ্ছে। সুর করে রজনীকান্ত আবার বলে,—তাই বলি গুটি গুটি যাচ্ছে কারা, মদ খেলেও মাতাল আমি সহজে হই না বাপধন, বুঝলে ? মাইল দূরে দেখতে পাই। কার হুকুম—রাত্রে কেউ তাঁবু ছেড়ে বেরুতে পাবে না কোনদিন। সে কি আর হয় রে বাপু? রজনীচন্দর মাঝে মাঝে একটু আধটু নেশা না করবো কি করে? তাই গা ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে পড়ি পাশবালিশটিকে লেপ মুড়ি দিয়ে নিজের জায়গায় শুইয়ে। সবাই ভাবে রজলীচন্দর ঘুমুচ্ছে—হা হা হা ! আজ আবার তিনটে চৌকিদার ছুটি নিয়েছে—ভারী সুযােগ ! ভাবলাম, একটু নেশা করে আসি। যাক আমিও ধরা পড়লাম,তোমরাও ধরা পড়ে গেলে। চল বাপু, ঘরে চল বাপু, ঘরে ফিরমেদের ধরে নিয়ে গেলে কৰ্ত্তা হয়তাে আমার কসুর মাপ করবে, চাই কি—দু-পাঁচটাকা মাইনে বাড়িয়ে দেবে ! টপু.ব্যাটা যে বড় আজ ঘুমুচ্ছে, হ’ল কি তার? একটু আওয়াজ পেলেই ত’ দোৎ ঘোঁৎ করে চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়। এত গম্ভীর রজনীকান্ত, অথচ মদ খেয়ে এ কি বকুনি! বেবীর হাত খপ করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললাে। মাতালের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, কাকুতি-মিনতিতেও ফল হ’ল না। এদিকে বেবীকে একলা ফেলে রেখে ছুটে পালানাে যায় না। অগত্যা ফিরে যেতে হ’ল রজনীকান্তের সঙ্গে।

ছেলেধরা সার্কাস সকালে উঠে রজনীকান্ত সব কথা চন্দ্ররাওকে বলে দিল, বললাে শুধু নিজের মদ খাওয়ার কথা। সেখানে রমাবাই বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল, হাত পা ছুড়ে চীৎকার করে বলে উঠলাে,-দাও ওদের সিংহের খাঁচায় পূরে দাও, এক্ষুণি দাও বলছি, বেয়াদব নিমকহারামের দল! এত যত্ন করে খাওয়ানাে পরানােভস্মে ঘি ঢালা হয়েছে ! এই তার পরিণাম । চন্দ্ররাও ভাবছিল, কিন্তু ভাববার সময় মিললাে না। রমাবাই-এর চীৎকারে হুকুম দিল ওদের ধরে নিয়ে আসতে সিংহের খাঁচার কাছে। দু’মিনিট বাদে সার্কাসের যত মানুষ সিংহের খাঁচার সামনে এসে হাজির। টেনীরা চুপ করে শুনলাে চন্দ্ররাও-এর বকুনি ও বুমাবাই- এর চীৎকার। বললাে না একটি কথাও,রজনীকান্তের মদ খাওয়ার কথাও না। আদা-জাম্বাে শুনােমুখে নিস্তব্ধ পাথরের মত দাড়িয়ে রইলাে। আধ্যে কি একটা বলতে যাচ্ছিল, জাম্বাে কাঁধে হাত দিয়ে টেনে বাধা দিল। চন্দ্ররাও হুকুম দিল খাঁচার দরজা খুলে ওদের ভিতরে পূরে দিতে। সিংহমশাই প্রথমে এত লােকজন ও চীৎকারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিছলো। এত সকালে ব্যাপারখানা কি! নিতান্ত বিরক্তভাবে গগর করে প্রতিবাদ জানাতে লাগলাে। খাঁচার তালা খােলা হ’ল। রমাবাই পৈশাচিক চীৎকারে জানালাে আগে ঐ বড়টাকে খাঁচার মধ্যে ফেলে দিতে, বড়টাই দলের সর্দার, পাজীর পা ঝাড়া । টেনী চুপ করে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল ; হাত ধরে টানতে

ছেলেধরা সার্কাস
বড় বড় জলের ফোঁটা চোখ থেকে ঝরে পড়ে গেল। লব কুশ বেবী
আর ঠিক থাকতে পারলাে না। হাউমাউ করে কেঁদে চন্দ্ররাও-এর
পায়ের উপর গিয়ে পড়লাে।
—ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও দিদিকে, এবারের মত মাফ কর,-
একাজ আমরা আর কখনাে করবাে না।
চন্দ্ররাও কোন কথা বলে না, মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয় ।
বেবী ছিটকে গিয়ে রমাবাই-এর পা জড়িয়ে ধরলাে, পায়ে মাথা
খুড়তে লাগলাে—সে কি কান্না! পাষাণ গলে যায়, কিন্তু নিষ্ঠুর
মানুষ অবিচল।
টেলীকে খাঁচার দরজা পর্যন্ত নিয়ে গেছে, এবার দরজা খুলে
ভিতরে ঠেলে দিলেই হ’ল—একটি খাবাতে সিংহ শেষ করে দেবে।
চন্দ্ররাও আর চুপ করে থাকতে পারলাে না। লাফিয়ে উঠে
চেঁচিয়ে বললো,--যাও ওদের সরিয়ে নিয়ে যাও চোখের সামনে থেকে
এক্ষুণি।
রমাৱাই বলে,—না কখখােনন না, দাও ভিতরে ঠেলে। না
দিলে আমি এখুনি সার্কাস ছেড়ে চলে যাবে।
—যেতে হয় যাবে। ওদের সরিয়ে নিয়ে যাও।—একথা বলে
চন্দ্ররাও তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে গেল।
রমাবাই মুখ গোঁজ করে বসে রইলাে, রাগে সর্বশরীর থরথর
করে কঁপছিল ।

বারাে আজব সহর কলিকাতা সার্কাসের দলের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া, সে এক ভয়ানক ব্যাপার। একটি সহরের সমস্ত মানুষ, জীবজন্তু সহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এমনি বােধ হয়। সারাদিন তােড়জোড়, ব্যবস্থা- বন্দোবস্ত করতে কেটে গেল। সন্ধ্যা থেকে মধুপুরের সমস্ত বাসিন্দা ভেঙ্গে এসে পড়লাে ষ্টেশনে, সার্কাস-দলকে বিদায় দিতে। প্রায় একটা পুরাে ট্রেন লাগলাে—মানুষ, জন্তু-জানােয়ার, তবু ও আসবাবপত্র নিয়ে। প্ল্যাটফরমে লােকেরা একবার এখানে একবার ওখানে দাড়িয়ে হাঁ করে দেখে ও আলােচনা করে। টিপুকে টেনীদের কামরায় রাখা হ’ল। সাধারণ জন্তু ও নয়, বুদ্ধিশুদ্ধি প্রচুর আছে, হঠাৎ কিছু অন্যায় করে ফেলবে না। এ ছাড়া গার্ড হিসাবে টিপুর প্রয়ােজন আছে বৈ কি! কোথায় কোন ফাঁকে যদি আবার পালায় ছেলেমেয়েগুলাে! সাবধানের মার নেই। কলকাতায় আগে থেকে লােক পাঠানাে হয়েছে সমস্ত ব্যবস্থা করবার জন্য। বৌবাজারের মােড়ে যে ভােলা জায়গা আছে, সেখানে তবু পড়বে। যেদিন পৌছানাে, তার পরদিনই প্রথম শাে। আগে থেকে ছবিওয়ালা প্ল্যাকার্ড ও হাবিলে ছেয়ে ফেলা হয়েছে কলকাতা সহর। লােকেদের মুখে মুখে ফিরছে টেনী বেবীদের নাম, টিপুর কীৰ্ত্তি ও আম্বাে-জামাের পাগলামির কথা।

ছেলেধরা সার্কাস ট্রেন ছাড়তে প্ল্যাটফরম শুদ্ধ নােক রুমাল নেড়ে চেঁচিয়ে বিদায় জানালাে। টেনীদের কামরায় টিপু বেঞ্চে বসে বসে লােকেরা যে সব ফুলের মালা দিয়েছিল, নিজের গলায় একবার পরছে আর খুলছে, মাঝে মাঝে দাঁত খিচিয়ে হাসছে; ট্রেন যে ছাড়ছে, সে বিষয়ে ওর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। টেনী জানলা দিয়ে বুকে দেখলে মধুপুর স্টেশন ক্রমশঃ ছােট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রথম আসার দিনটি বার বার মনে পড়লাে, আরাে মনে হ’ল শেখপুরা থেকে আসবার দিন রাত্রে মালগাড়িতে বসে কিউলে মেলা দেখবার জন্য যে অভিনব যাত্রা। কোথd কিউল আর কোথায় মধুপুর ! ভাগ্যদেবী উপস্থিত আরাে পূবদিকে ছুটে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কলিকাতা সহর—কেমন জায়গা, কে জানে ? খুব ভােরে হাওড়া স্টেশনে এসে ট্রেন থামলাে। লোেক নামা, প্রকাণ্ড ভারী ভারী জিনিষ নামানো, পশুদের হুসিয়ারে স্থানান্তরিত করা,-সৈ এক বিষম ঝাট ও হাঙ্গামার কাজ। সমস্ত প্ল্যাটফরম কোলাহলে সরগরম হয়ে উঠলাে। এত ভিড় ও এত গােলমাল যে চেঁচিয়ে কথা বললেও সব সময়ে শােনা যাচ্ছে না। এ-ত’ ঘােট স্টেশন নয়—হাওড়া স্টেশন। কত ট্রেন আসছে যাচ্ছে, তেমনি অগুণতি লােক,—মাথার ঠিক থাকে না। চন্দ্ররাও দাড়িয়ে তদারক করছিল, হিসাব-পত্র করছিল। চাকরেরা হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ছুটোছুটি করে। একজন চাকর দৌড়ে এসে খবর দিল,-কৰ্ত্তা, ছেলেমেয়েরা নেই, পালিয়েছে।

ছেলেধরা সার্কাস
চন্দ্ররাও ক্ষেপে চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করে,—টিপু ?
—টিপুও নেই।
চন্দ্ররাও কিছু বলতে পারলাে না, চোখ দুটো আগুনের গােলার
মত জ্বলতে লাগলাে।
সহর কলকাতা। লাইনবন্দী বাড়ির পর বাড়ি।
রাস্তাঘাট একইভাবে ফুটপাথ দিয়ে বাঁধা, ট্রামের লাইনে গাঁথা, মাথার
উপর তারের জাল বােনা। এতটুকু ফাক নেই ! সহরকে আষ্টে-
পৃষ্ঠে ঘিরেছে, বেঁধেছে, ছােট করে দিয়েছে। বেড়াবার, একটু নিঃশ্বাস
নেবার ফাঁকা জায়গা পার্কগুলিও নিস্তার পায়নি। লােহারেলিং
দিয়ে ঘিরে ঘিরে খাঁচার মত বন্ধ করা হয়েছে। একটু আনমনা
ভাবে রাস্তায় চলে কার সাধ্যি! ট্রাম, বাস, গাড়িঘােড়ার সবসময়ে
সতর্ক সাবধানের চীৎকার,সরে যাও, সরে যাও চটপট, নইলে
আমাদের পায়ের তলায় পিষে মাড়িয়ে চলে যাব, প্রাণটুকু আর থাকবে
দেহে।
ফুটপাথে নিশ্চিন্ত হয়ে চলবে তার উপায়ও নেই।
পিপড়ের
সারির মত মানুষ, মানুষ, কত মানুষ—যাওয়া-আসা কচ্ছে ব্যস্তভাবে।
একটু অন্য দিকে চেয়েছ ত’ গোঁজা মেরে ধাক্কা মেরে চলে যাবে ।
যাবার সময় বলে যাবে,—দেখতে পাও না চোখে, কাণ নাকি ?
—পিপড়ের সারির মত হলে কি হয়, পিপড়েদের চেয়ে অনেক বেশী
অভদ্র। পিপড়েরা যখন চলাফেরা করে, ধাক্কা মারতে দেখেছ ?
‘কাণা নাকি বলতে শুনেছ ?
৭০

ছেলেধরা সার্কাস এই যে এত মানুষ দৌড়ে ছুটোছুটি করছে, এদের মুখ দেখে মনে হয় শুধু এই ব্যস্তভাবে দৌড়ে যাওয়া-আসাই এদের কাজ। কোথায় যাচ্ছে, কি জন্য যাচ্ছে, এরা জানে না কিচ্ছু; পৃথিবীর কোন জিনিষে এদের কৌতূহল নেই। কিন্তু ভুল ভেঙ্গে যাবে এক মিনিটে। তুমি হঠাৎ পথে দাড়িয়ে গিয়ে চুপ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। দলে দলে লােক ভিড় করে আসবে তােমার চারপাশে, তােমার মতনই আকাশে মুখ তুলে ভীষণ গম্ভীর হয়ে খুঁজে খুঁজে বেড়াবে কোথায় আছে দ্রষ্টব্য জিনিষ ! না দেখতে পেলে লজ্জার মাথা খেয়ে কৌতুহলের তাড়ায় বেমালুম প্রশ্ন করে তােমায় ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে,—কি দেখছো ভাই, বল না সত্যি বল না—ওদের অত ব্যস্তভাবে যাওয়া আসা ভুলে গেছে, এখন আকাশে একটা কিছু দেখতে পাওয়ার উপর নির্ভর করছে সমস্ত জীবন । এমনি সহর কলকাতা। কোথায় কি হচ্ছে, কেউ খবর রাখে না ; খবর পাবার চেষ্টাও করে না। কিন্তু যেখানেই একটা কিছু হােক—তা সে যত সামান্য যত তুচ্ছই হােক—দর্শকের অভাব হবে না, সারাদিন ধরে এবং রাতের অনেকটা অংশ পর্যন্ত। বৌবাজারের মােড়ে সেই খালি জায়গার সামনে দেখা গেল, সারাদিন একদল মানুষ দাড়িয়ে। একই লােক যে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে তা নয় ; কেউ যাচ্ছে কেউ আসছে, কিন্তু দলটি মােটের উপর ঠিক মােতায়েন আছে। মাঝখানে প্রকাণ্ড বড় তাবু পড়লো। পিছনে ঘিরে ঘিরে ছােট ছােট তাঁবু লাগানাে হ’ল। জন্তুদের বড় বড় গাড়ি, খাঁচা পাশাপা ; ৭১ ছেলেধরা সার্কাস সাজিয়ে রাখা হ’ল চিড়িয়াখানার মত। একধারে সারি সারি হাতী, উট, ঘােড়, সব বাঁধা হ'ল। সকলে বড় ব্যস্ত। কাল সন্ধ্যায় প্রথম খেলা দেখাতে হবে। চন্দ্ররাও মুখ কালাে করে দেখাশুনা তদ্বির করে বেড়াচ্ছে। ওর উৎসাহ ও আনন্দ যেন অনেকটা উপে গেছে। কোন রকমে শরীরকে টেনে টেনে কাজ চালাচ্ছে। চার চারটা ছেলেমেয়ে স্টেশন থেকে উধাও হয়ে সরে পড়লাে, সঙ্গে গেল অমন সাধের শেখানাে পড়ানাে গরিলা ! এদিকে রমাবাই দারুণ জ্বরে শয্যাশায়ী। সেই তর্কাতর্কির পর থেকে রমাবাই খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করেছিল। ট্রেন থেকে জ্বর হয়ে গেল। বােধহয় রাগের আগুন ফুটে বেরুতে না পেরে সারাদেহ জ্বরে পুড়িয়ে মারছে। এদের সব খেলা দেখাবে কে ? নতুন আনা অন্য লােকদের দিয়ে সার্কাসের কসরৎ দেখানাে যায় না। অনেক কষ্ট, অনেক সাধনা করে শিখতে হয়। দু’ঘন্টা দেখে হাততালি দিয়ে যারা ঘরে ফিরে গেল, তারা ভেবেও দেখে না কত পরিশ্রম করে এরা শিখেছে, কত কষ্ট করে এরা দেখাচ্ছে । এখন উপায় কি ? খবরের কাগজে, প্ল্যাকার্ডে, হাবিলে, সাতদিন আগে লােকেরা জানে কি কি হবে ! আসছে কাল সন্ধ্যায় প্রথম ‘শাে’। মানুষ সব ক্ষেপে যাবে দেখতে না পেলে ! ভেঙ্গে- চূরে লণ্ডভণ্ড করে দেবে ! তাঁবুতে আগুন জ্বালিয়ে দেবে ! হিংস্র পশুদের ছেড়ে দেবে খাচা খুলে । সহরের মানুষ ক্ষেপে গেলে বড় ভয়ানক, তাদের সামলানাে দায়। १२

ছেলেধরা সার্কাস
তখন ?—চন্দ্ররাও-এর এতদিনের খ্যাতি, এত কষ্টের সুনাম 'ধূলায়
পড়ে গড়াগড়ি যাবে।
সত্যি চন্দ্ররাও-এর বড় দুর্দিন। সার্কাস এবার বুঝি উঠে যায় !
এদিকে আয়ােজন চলেছে কোন নিয়তির নিষ্ঠুর ইঙ্গিতে। লােক
পাঠানাে হয়েছে—চারিদিকে খোজ, ভাল করে খোঁজ সেই চারটি
ছেলেমেয়েকে, সেই সাধের গরিলাকে।
কিন্তু খোঁজা কি সাধারণ ব্যাপার ? সহরের ভিড়ে নিজেরাই
দিনে দশবার হারিয়ে যেতে হয়, এর মধ্যে অন্যকে খুঁজে বার করা
সহজ কাজ নয়। পুলিসে খবর ? অসম্ভব। পুলিসে খবর দিলে
নিজের জালে নিজেকে পড়তে হবে । চন্দ্ররাওকে সার্কাস ছেড়ে
জেলের মধ্যে পচে মরতে হবে। ছােট ছেলেমেয়েদের আটকে
রেখেছে কেন ?—এতদিন ?
আম্বাে-জাম্বাে—মুখ দেখে মনে হয় ওরা খুশী। যাক এবার
বাচ্চারা মুক্তি পেল, আগের বারে বড় ধরা পড়েছিল।
দিন গড়িয়ে রাত্রি এল। চন্দ্ররাও-এর দুঃখের রাত্রি কেটে পরের
দিন এসে উপস্থিত ।
খোঁজ পাওয়া গেল কিছু ?-না, একেবারে কিছু না! লােকের
পর লােক ফিরে এসে জানায়, দেখতে পেলাম না।. কতলােককে
জিজ্ঞাসা করা হ’ল, কেউ কিছু বলতে পারলাে না।
কোথায় গেল তারা? কোথায় গেল টিপু? রাস্তায় গাড়ি-চাপা
পড়ে গেল না ত’ ?
রমাবাই-এর জ্বর ছেড়েছে কিন্তু এত দুর্বল যে আজকের সন্ধ্যায়

ছেলেধরা সার্কাস বাঘ সিংহ নিয়ে খেলানাে অসম্ভব। নিজের শরীরের উপর জোর নেই, হিংস্র পশুদের উপর জোর খাটাবে কি করে? আজ অসম্ভব, কাল দেখা যাবে। দিন গড়িয়ে গেল। ঢং ঢং করে ঘড়িতে পাঁচটা বাজলাে। বিকাল পাঁচটা। চন্দ্ররাও নিজের তাঁবুতে ক্যাম্প-চেয়ারে বসে। হাতঘড়ি চোখের সামনে এনে দেখলাে, হ্যা পাঁচটাই বটে, আর এক ঘণ্টা বাদে ‘শাে’ দেখাতে হবে। সমস্ত টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। দু’চারজন করে লােকজন আসতে শুরু করেছে। ঐ গেটের সামনে মঞ্চের উপর ব্যাও বাজতে আরম্ভ হল। এবার দলে দলে লােকেরা আসবে সার্কাস দেখতে, আত্মীয়- পরিবার ছেলেপুলে নিয়ে হাসতে হাসতে গল্প-গুজব করতে করতে। আগে থেকে সব পড়েশুনে আসবে—কি কি হবে, কে কে আছে ! ক’টা জন্তু-জানােয়ার, তাও তাদের মুখস্থ। এদিকে পুরাদমে আয়ােজন চলেছে সবুজ পর্দার পিছনে। কার পর কি সাজানাে হবে, কোন্ কোন্ ঘােড়া প্রথমে যাবে, খেলার কতক্ষণ আগে বাঘ সিংহকে আফিং দেওয়া হবে,-রােজকার মত ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত হচ্ছে। রজনীকান্ত আজ চন্দ্ররাও-এর বদলে দেখাশুনা করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারা কই? সেই চারটি প্রসিদ্ধ খেলােয়াড় ছেলেমেয়ে, সেই সাধের শেখানাে গরিলা ? তাদের খেলার সময় হ'লে, কে গিয়ে নামবে, কে দেখাবে খেলা ?—দর্শকরা বলবে কি? বাঘ সিংহের খেলাই বা দেখায় কে ? ৭৪

। ।।RR *#
ছেলেধরা সার্কাস
চন্দ্ররাও আর ভাবতে পারে না। মাখা খারাপ হয়ে যাবে, পাগল
হয়ে যাবে এবার ! এ যন্ত্রণাদায়ক ভাবনা থেকে উদ্ধার নেই।
দু’হাতে মুখ ঢেকে চন্দ্ররাও গােঙ্গাতে লাগলাে, ভগবান্‌কে ডাকতে
লাগলাে,-ভগবান্ এর থেকে, এত কষ্ট থেকে আমাকে পরিত্রাণ
দাও!
S ' 0:18,
•

তেরো চারটি ছেলেমেয়ে ও গরিল। টেনীরা ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফরমে দাড়ালাে। চারিদিকে ভিড়ে ভিড়। টেনীর মনে পড়লাে, বাবা বলতেন,-বড় হলে যখন কলকাতায় মামার বাড়িতে নিয়ে যাবে, দেখবে কত মানুষ একসঙ্গে পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করছে ! যেখানেই যাও শুধু মানুষের ভিড়। বাবা ঠিকই বলতেন বটে ! টিপুও সঙ্গে সঙ্গে নেমে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বেচারী একেবারে হকচকিয়ে গেছে । এত মানুষ, এত গােলমাল, কখনাে জীবনে দেখেনি। টিপু এই প্রথম কলকাতায় এল। ভ্যাবাচাকা খেয়ে, ভয় পেয়ে টেনীদের গা ঘেঁসে দাঁড়ায়, হাজার হােক এরা অনেক চেনা। একসঙ্গে থেকেছে, একসঙ্গে খেলা দেখিয়েছে । ঐ ব্যস্তভাবে চেঁচামেচি করে যারা দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে ওদের চেয়ে টিপুর কাছে টেনীরা অনেক আপনার। টেনী আপন মনে বলে উঠে,কই কেউ আসছে না কেন? সকলে বােধ হয় মাল ও জন্তু-জানােয়ার নিয়ে ব্যস্ত আছে। ললাকের ভিড়ের ফাঁক দিয়ে একবার দেখা গেল চন্দ্ররাওকে, একবার রজনীকান্তকে, পিছনে মালগাড়ির সারির কাছে অনেক লােকের মধ্যে ব্যস্ত। লব হঠাৎ ব্যস্তভাবে বলে উঠে,—দিদি, চল এই বেলা পালাই, ওরা এসে পড়ার আগে—এই মস্ত সুযােগ। ৭৬ ছেলেধরা সার্কাস e . কোথায় যাবে, মামার বাড়ি ? কিন্তু ঠিকানা ? —সে ঠিক হবে। মামাবাবুর নাম কর্ণওয়ালিস ঠুটে গিয়ে বললে লােকে নিশ্চয় বাড়ি দেখিয়ে দেবে। কথাটি মনে লাগে টেনীর। কুশ ও বেবী উৎসাহে রাজী হয়ে যায়। আর সার্কাস ভাল লাগে না এমন বন্দী অবস্থায়, বাড়ি না ফিরার মনঃকষ্ট নিয়ে। চন্দ্ররাও যে মানুষ, কোনদিনই ছাড়বে না। শেষে আম্বাে-জাম্বাের মত সারা জীবন শুধু সার্কাসে কাটাতে হবে। টেনী বললাে,-চল! যা বলা তাই করা সেই মুহূর্তে ! সময় নষ্ট করা যায় না, পিছু ফিরে তাকালেই হয়তাে আবার গ্রেপ্তার । টেনী বেবীর হাত নিজের হাতে শক্ত করে ধরে পা বাড়ালাে। লব-কুশ জোরে জোরে পা চালিয়ে সঙ্গে রইলো। উত্তেজনায় দম আটকে যাবার মত। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে পাশ কাটিয়ে সােজা গেটে গিয়ে পৌছালাে। টিকিট চেকার দাঁড়িয়েছিল ; জানতে সার্কাস-পার্টি আসছে। এদের দেখে বুঝলাে এরা সার্কাসের দলের, টিকিট নিয়মমত পরে ম্যানেজার এসে দেবে। কিছু না বলে দরজা ছেড়ে দিল। আরেকটি কারণে চেকার বুঝেছিল নিশ্চয়ই এর সার্কাসের লােক, সেটি টেনীরা পরে আবিষ্কার করলো। গেট পেরিয়ে রাস্তায় এসে সকলে চমকে সভয়ে দেখলো, পাশে দাড়িয়ে টিপু !—টিপু ধরে নিয়ে যেতে এল নাকি ? সার্কাসের ঐ গােয়েন্দা পুলিশ !-না, তা নয়। টিপু বেচারী বড় ঘাবড়েছে নিজে সহরের এই গােলমাল, কাণ্ডকারখানা দেখে। টেনীদের পালাতে ; -

হবে। সকাল
দেখে ভাবলাে সঙ্গ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, কোথায় থাকবে এই
একলা অজানা অচেনাদের মধ্যে ?
রাস্তায় এসে মােটারের অবিশ্রান্ত হর্ণ ও ট্রামের ঘড়ঘড় শুনে
টিপু আরাে ঘাবড়ে এদের গায়ের উপর এসে দাড়ালাে। গােয়েন্দা
পুলিশের দাঁত খিচানাে হাসি আর নেই, চোখে মুখে আশ্রয়প্রার্থীর
করুণা ভিক্ষা ফুটে উঠলো।
কুশ বলে,—নিয়ে চল দিদি—যখন এসে পড়েছে। ফিরিয়ে
দিতে গেলে আমরাও ধরা পড়ে যাবে।
টেনী ভাবলে একটু, সঙ্গে নেবে কিনা। কিন্তু ভাবনা-চিন্তার
সময় কোথা ? যখন পালিয়েছে তখন ধরা এবারে কিছুতেই পড়া
হবে না। বললাে,-টিপু, এস।
এক হাতে বেবীর, অন্য হাতে টিপুর হাত ধরে টেনী এগুতে
থাকলাে। লব-কুশ সঙ্গে সঙ্গে চললাে।
টেনী অনেকবার শুনেছে যে হাওড়া স্টেশন থেকে গঙ্গার পুল
পেরিয়ে কলকাতা যেতে হয়। দেখতে পেল প্রকাণ্ড পুল রাস্তা
থেকে। ভাবলাে, ওদিকে যাওয়া হবে না আজকে ; চন্দ্ররাও ধরে
ফেলবে।
যখন বেরিয়েছে, এবারে সত্যি পালাতে হবে। উল্টো
দিকের পথ ধরলাে।
লব-কুশ খুব খুশী। এই লুকোচুরি খেলায় মজা আছে। ওদের
সবাইকার ভয়-ভাবনা খুব কমে গেছে, শেখপুরা থেকে চলে আসার
পর থেকে। ভয় না করলেই ভয় থাকে না। যা হবার তা হবেই,
ভেবে কি লাভ? বেবী পৰ্য্যন্ত আজকাল ভয় পায় কম। আমি ত’
৭৮

ছেলেধরা সার্কাস
ভয় পাই না'—বলা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। এই যে এদের সঙ্গে
একটি পয়সাও নেই, সেজন্য কোন দুর্ভাবনাও নেই।
নেই। পালাতে হবে
চল পালাই, পরের কথা পরে ভাবা যাবে।
বিপরীত দিকে চলতে চলতে দেখে পথ ক্রমশঃ উপরে উঠে যাচ্ছে।
আরে, এও যে আরেকটি ব্রিজ! উপরে উঠে পাঁচিল দিয়ে বুকে
দেখে, নদী নেই—শুধু রেলের লাইনের জাল বােনা।
কুশ বলে,-এ ত’ ভারী মজা ! নীচে নদী নেই অথচ পুল
রয়েছে ! কি বােকা, মিছামিছি কত বড় পুল বানিয়েছে, কত খরচ
করে।
---না গো মশাই! অত লাইন দেখছে না, কত ট্রেন আসা-
যাওয়া কচ্ছে! রাস্তা ঐখান দিয়ে হলে সব সময়েই রাস্তা বন্ধ
রাখতে হত, তখন লােকজন গাড়ি-ঘােড়া যেত কি করে শুনি ?
বব বলে।
টেনী বললাে,—ঠিক তাই, লবের বুদ্ধি আছে মানতে হবে ।
—আর সার্কাস দেখবার বুদ্ধিটি ? কে দিল?
দিদি, তুমি বড়
একচোখাে, খালি লবের গুণ দেখতে পাও—কুশ রেগে উত্তর দেয়।
পথ চলতে চলতে কতদূর এসে পড়েছে । লােকেরা হাঁ করে
তাকিয়ে দেখে।
এ কি রে বাবা, চারটি ছেলেমেয়ে ও একটি প্রকাণ্ড
গরিলা ! পুষেছে বােধ হয়। একি অদ্ভুত পােষার সখ !
কেউ কেউ সঙ্গ নেয় বিশেষ করে ছােট ছেলেমেয়েরা।
টিপু মাঝে মাঝে ফিরে দাঁড়ায়, দাঁত খিচিয়ে হাসে, সব ভয়ে
‘বাবারে মারে’ করে লম্বা দৌড় দেয় ।

ছেলেধরা সার্কাস টিপুর ফুর্কি খুব, মুক্তির আনন্দ ভােগ করছে। বাঁধা-নিষেধ নেই, এদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে চলতে পাচ্ছে, চারিদিকে কত কি দেখতে পাচ্ছে! সার্কাসে একটু চোখের আড়াল হলেই,—টিপু এদিকে আয়, ঐখানে বােস,অষ্টপ্রহর লেগে আছে। ভিড় কম দেখে টিপুর সাহস হয়েছে, টেনীর হাত ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। একটি মাঠের মধ্যে গাছের তলায় বসে খানিকটা জিরিয়ে নেওয়া হ’ল। প্ল্যান ঠিক হ’ল। আজকের দিনটি কোন- রকমে লুকিয়ে থাকতে হবে, কাল সকালে খোঁজ করে কর্ণওয়ালিস স্ত্রীটে মামার বাড়ি গিয়ে উঠা যাবে। চন্দ্ররাও যা খোঁজাখুজি করবার আজকে করে হাল ছেড়ে দেবে। —আরও একটি কথা-কারুকে বলা হবে না, শেখপুরা থেকে এসেছি, ও কিভাবে পালিয়েছি। তাহলে আবার অন্য কেউ চন্দ্ররাওএর মত ধরে নিয়ে আটকে রাখবে। বেবী বললাে,--খিদে পেয়েছে দিদি। টিপু এতক্ষণ দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি করে গাছের পাখী তাড়াচ্ছিল। পরিশ্রান্ত হয়ে ধপ করে কাছে এসে বসে পেটে হাত দিয়ে দেখালাে-বেজায় খিদে। ও ঠিক বুঝে নিয়েছে টেনীকে জানাতে হবে, জানালেই পাওয়া যাবে। কিন্তু খাবার পাওয়া যায় কোথা ? পয়সা একটিও নেই কাছে। কারুর বাড়ি গিয়ে চাওয়া যাবে ? যদি না দেয় ? দেখা যাক ত’ চেষ্টা করে ! তেষ্টাতেও গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, সূৰ্য্যদেব যে ঠিক মাথার উপরে।

ছেলেধরা সার্কাস
আবার অভিযান শুরু হয়। এবার খাবারের সন্ধানে। একটি
ঘােট দোতলা বাড়ি, বাইরের বােয়াকে বসে একজন লােক ছােট
মেয়ে কোলে নিয়ে। এদের আসতে দেখে চেঁচিয়ে বলে উঠে,-যাও
যাও আমরা বাঁদর নাচ দেখতে চাই না, যত সব বুজরুকি !
টেনী কাছে এসে বলে—বড় খিদে পেয়েছে, যদি খেতে দেন
কিছু।
—খেতে? এটা কি ধৰ্ম্মশালা পেয়েছ ? যাও, যারা নাচ দেখবে,
তার খেতে দেবে ; যাও, যাও।
টিপু হাবভাবে বুঝলাে খাবার দিতে রাজী হচ্ছে না। ভাবলে
তারও একটু মিনতি করে আবেদন জানানাে দরকার। কিন্তু
গরিলার কথা যে মানুষ বােঝে না, সে জ্ঞান এখনো হয়নি।
টিপু কাছে গিয়ে খপ করে লােকটির হাত ধরে অন্য হাত নিজের
পেটে রেখে গরিলার ভাষায় কতকগুলি শব্দ করে কি বলতে গেল।
—আরে বাপরে মেরে ফেললে রে—এরা সব ডাকাত, লুটেরা,
বলে হাউ-মাউ করে চেঁচিয়ে ভদ্রলােক হেঁচকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে
নিল। ঘােট মেয়েটিকে তুলে নিয়ে চেঁ উঁ দৌড় ভিতরে, দড়াম্ করে
দরজা বন্ধ করে দিল।
সকলে হিহি হহহহ করে হেসে গড়িয়ে যেতে লাগলো।
দারুণ মজার দৃশ্য দেখে খিদে তেষ্টা ভুলে গেছে! কি রকম মুখ
করলােলােকটি।
টেনী বলে,—চল পালাই। চেঁচিয়ে লােকজন জড় করবে; শেষে
খাবার পাওয়া দূরের কথা, মুস্কিলে পড়তে হবে ।
এরকম
;
৮১

ছেলেধরা সার্কাস
আবার চলতে থাকলাে। একটি মাত্র চিন্তা খাবার কি করে
পাওয়া যায় !
খানিকটা এসে দেখা গেল দূরে সাইনবাের্ডে লেখা,-“বিপিন
পবিত্র ভােজনালয়”।
টেনী বললাে,-তােমরা একটু দাঁড়াও এপাশে, আমি একলা গিয়ে
কথা বলি যদি কিছু খেতে দেয়। টিপুকে দেখে ভয় পেতে পারে।
এরা একপাশে দাড়িয়ে রইলাে। টেনী এগিয়ে হােটেলের
সামনে গিয়ে দেখলাে, চেয়ারে একটি লােক বসে আছে।
বললাে--আমাদের কিছু খেতে দেবেন ?
বড় খিদে পেয়েছে।
—নিশ্চয়ই দেবাে।
বলে কি? এক কথায় রাজী।
-আমাদের পয়সা নেই কিন্তু, শুধু শুধু খেতে দিতে হবে।
-শুধু কেন তােমার বাঁদর নাচ দেখাও, খাওয়াবাে। আমি
বাঁদর-নাচ দেখতে বড় ভালবাসি।
—আমি ত’ জানি না।
-দেখ বাপু মিছে কথা বল না এই
দিনের বেলায়। আমি
সহুরে-লােক, অত সহজে চোখে ধূলাে দিতে পারবে না। তােমাদের
আসতে দেখেছি। চারজন ছেলেমেয়ে ও একটি প্রকাণ্ড কালাে
বাঁদর। ওদের ওদিকে রেখে তুমি একলা এলে।
বাঁদর নয় গরিলা।
—তাহলে ত’ আরাে মজা। গরিলার নাচ কখনাে দেখিনি।
ভাল করে দেখাও; পেট ভরে খেতে দেবাে সকলকে।

ছেলেধরা সার্কাস ; টেনী একটু চুপ করে ভাবলাে। চোখ পড়লাে একটা লম্বা সাইনবাের্ডে লেখা—ভাত—দু’পয়সা ডাল-এক পয়সা মাছের ঝােল—এক পয়সা—ইত্যাদি। জিভে জল এসে গেল। এতক্ষণ পেটে কিছু পড়েনি; সেই সকাল থেকে ট্রেনের পর খালি হাঁটা আর হাঁটা। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। একটু খেলা দেখালে ক্ষতি কি ? টেনী ঘাড় নেড়ে জানালাে, আচ্ছা। হাত দিয়ে ইশারা করে ওদের কাছে ডাকলাে। খবর পেয়ে হােটলের সব লােক এসে হাজির। রাস্তার লােক- জনও ঘিরে গােল হয়ে দাড়ালাে। ভারী মজা! গরিলার খেলা ত’ চাড়িখানি কথা নয়,—গরিলা ক’জন দেখেছে শুনি! টেনী গম্ভীর ভাবে সার্কাসের যে সব খেলা দেখানাে সম্ভব, দেখাতে লাগলাে। লব কুশ বেবী সাহায্য করতে লাগলাে। টিপু প্রথমে আপত্তি জানায়। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে, এখন খেলা দেখানাে চলবে না। টেনী পিঠে হাত বুলিয়ে, নানা ভঙ্গি করে বুঝিয়ে দেয় যে, খেলা না দেখালে অন্ন জুটবে না, আর দেখালে পেট ভরে এত খাওয়া যাবে যে পেট জালার মত ফুলে উঠবে। শেষে গরিলা টিপু ভাল- মানুষটির মত টেনীর হুকুম ও ইশারাতে খেলা দেখাতে লাগলাে। কত মজার খেলা ! লােকেরা হেসে খুন! -বাহাদুর মেয়ে বটে, এতটুকু বয়সে একটা বুনাে গরিলাকে শুধু ছেলেধরা সার্কাস যে পােষ মানিয়েছে তা নয়, কত রকম আশ্চৰ্য্য আশ্চর্য্য খেলা শিখিয়েছে। বড় হলে নিশ্চয় কেওকেটা হয়ে যাবে! হাজার হােক বাঙ্গালীর মেয়ে কিনা, মাথায় বুদ্ধি আছে।—দর্শকরা এমনি আরাে কত মন্তব্য করে ! টিপু দু’হাতে ভর দিয়ে চললাে। এক পায়ে খুঁড়িয়ে চললাে। বেবীকে দু’হাতে ছুঁড়ে লুফে নিল। লব-কুশকে কাঁধে করে বন বন ঘুরলল। মাতাল হয়ে টলতে টতে ধপাস্ করে পড়ে ধূলােয় গড়াগড়ি দিল। এক দোই তেন সার পাইচ-গুণে গেল। আরাে কত কি! খেলার নেশায় একটির পর একটি চলতে থাকলাে। খেলােয়াড় ও দর্শক কারুরই হুশ নেই, কত সময় কেটে গেছে । পরে খেলা শেষ হতে হােটেলের মালিক প্রচুর খাওয়ালে যত্ন করে। বিদায় দেবার সময় বার বার বললাে,—এমন খেলা জীবনে দেখিনি। যদি এপথে আবার আস, নিশ্চয় এস আমার হােটেলে। পেট ভরে যত ইচ্ছা খেও। বেলা শেষ হয়ে সন্ধ্যার কাছে এগিয়ে এসেছে। আকাশ রামধনু রংএর। পাতলা মেঘে ঢাকা সূৰ্য্য ফুলঝুরির মত চারিদিকে কিরণ- রেখা ছড়িয়েছে। পাখীরা গাছের মাথায় মাথায় ঘুরে ঘুরে ডাকছে। লােকেরা কাজের শেষে বাড়ি ফিরছে। সােজা রাস্তায় চলতে চলতে এক প্রকাণ্ড বাগানের সামনে এসে টেনীরা পৌছালাে। উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘বােটানিক্যাল গার্ডেন। ৮3

ছেলেধরা সার্কাস
এখানে কলকাতার লােকেরা বেড়াতে, পিকনিক করতে আসে ছুটির
দিন--শুনেছে বটে !
ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকলাে। একজন মালী বসে গাছের গােড়া
কোপাচ্ছিল, ফিরে তাকালাে। টিপুকে সঙ্গে দেখে বললো,-তােমর
এত দেরী করে এসেছ কেন ? সন্ধ্যা হলেই চলে যেতে হবে।
এখানের এই নিয়ম।
কুশ এগিয়ে গিয়ে বলে,—নিয়ম কেন এরকম ?
নিয়ম মানে নিয়ম, তার বেশী জানি না। আবার ঐ জংলী
জন্তুটাকে সঙ্গে এনেছ কেন ? গাছপালা ভেঙ্গে ছিড়ে একাকার
করে দেবে। যাও, বরং কাল সকালে এস ; আর ওকে সঙ্গে
এনাে না।
কুশ রেগে উত্তর দেয়,ও জন্তু হ'লেও জন্তু নয়, অনেক মানুষের
চেয়ে বেশী বুদ্ধি আছে। আমরা বারণ করলে তােমার গাছপালায় হাত
দেবে না।
টেনী ভাবছিল আজ রাতে কোথায় থাকা যায় ! বললাে,-এখানে
রাতে থাকা যায় না ?
মালী যেন হঠাৎ ক্ষেপে গেল ;-ও রাত কাটাতে এসেছ সরকারী
বাগানে ? নিয়ম জান না—চালাকি ? যাও, যাও এখনি বেরিয়ে
যাও; সিপাই ডাকবাে না হ'লে।
ভয় দেখানােতে নড়ে না দেখে মালী হাতের কুরপী উচু করে
তেড়ে এল। মনে হ’ল এবার দেরী করলে নিশ্চয় মারবে।
টিপু পিছনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে বুঝবার চেষ্টা করছিল ব্যাপার
৮৫

ছেলেধরা সার্কাস কি!' মালীকে দৌড়ে আসতে দেখে এক লাফে কাছে গিয়ে গিট- বাঁধা টিকি ধরে—হেঁইও টান। মালী ‘বাপরে’ বলে চিৎপটাং। “টিপু, টিপু।”—চেঁচিয়ে উঠলাে সকলে। তবু শােনে না কথা। টান সমানেই চলেছে, এবার মাথার খুলি, বুঝি খুলে আসে। টেনী লব কুশ টানাটানি করে কোন রকমে ছাড়ালাে, টেনী ত’ চটাস্ করে পিঠে এক চাপড়ও মেরে দিল। তবু লজ্জা আছে ওর ? দাঁত খিচিয়ে সমানে হাসছে। আর হাসছে আর হাসছে বেবী মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে আর মাঝে মাঝে অনুকরণ করে--“বাপরে! টিপু ও বেবীর হাত ধরে টানতে টানতে সকলে দৌড়তে লাগলাে বাগানের ভিতর-মালী তখন মাথায় হাত বুলাচ্ছে। খানিকটা গিয়ে চোখে পড়ে—গঙ্গা তরতর করে বয়ে যাচ্ছে। কি সুন্দর গঙ্গা ! কিন্তু সৌন্দর্য্য দেখবার ও উপভোগ করবার সময় নেই, হয়তাে মালী লােকজন সিপাই নিয়ে পিছু নিয়েছে। আরাে দৌড়ে যেতে হয়। সামনে পড়ে একটি বড় ঘরের মত,—আগাগােড়া গাছপালা দিয়ে তৈরি। ভিতরে উকি মেরে দেখে নানারকমের গাছ টবে টবে থাক থাক যত্ন করে সাজানাে। সে যে কত, গুণে ঠাহর করা যায় না। মাঝখানে একটি ছােট ফোয়ারা দিয়ে জল ঝরছে । এই বেশ জায়গা। লুকিয়ে থাকা যাবে আর শীতের রাতটি মন্দ কাটবে না। তাড়াতাড়ি সকলে ঢুকে পড়লাে, আর একটি লুকানাে জায়গা বেছে ৮৬

ছেলেধরা সার্কাস
নিয়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে দেখতে লাগলাে আলী আসছে কিনা।
মালী আর এল না। বােধহয় সাহস হ’ল না। টিকির অর্ধেকটি ত”
গেছে, এবারে যদি হাত পা একটা ছিড়ে যায়।
ক্রমশঃ রাত্রির অন্ধকার চারিপাশে ছেয়ে গেল। গাছপালা আর
দেখতে পাওয়া যায় না। জোনাকীরা পিটির
পিটির আলাে জ্বেলে
ঘুরে বেড়াতে লাগলাে শূন্যে ।
টিপু পেটে হাত দিয়ে দেখালাে খিদে পেয়েছে আবার। খিদে ত’
পাবেই, সকলেরই পেয়েছে। শেখপুরায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় খিদে পেত,
মধুপুরে নিয়মৰাধা সার্কাসের আইনেও চারবার খেতে পাওয়া যেত,
আর আজকে মােটে একবার জুটেছে।
টেনী দু’হাতের বুড়াে আঙ্গুল নেড়ে জানালাে কিছু নেই
খাবার, বাইরে হাত দেখিয়ে বললাে-এত রাত—অন্ধকার গিয়ে
আনবে কে ?
লব বলে,—চল না দিদি, গিয়ে দেখি মেলে কিনা!
লব-কুশের আজকাল ভারি সাহস। লব-কুশ কি, বেবীও তৈরী
বাইরে যেতে, একবার বললাে না—ভয় পাই না আমি। কত বদলে
গেছে সব।
টিপু উঠে দাঁড়ালাে। ইশারা করে বললােতােমরা থাকো,
আমি আসছি।
লব-কুশ সঙ্গে যেতে চায়। হাত দিয়ে ঠেলে বারণ করে
অন্ধকারে চোরের মত বেরিয়ে গেল। বনের পশু বনে গেল একলা,
—ফিরবে ত’?

ছেলেধরা সার্কাস খানিক বাদে সকলে চমকে উঠলাে একটা কালাে ছায়া একেবারে পাশে এসে দাঁড়াতে দেখে । ও ভয় নেই, টিপু ফিরে এসেছে। ধপ্ করে একটা কি পায়ের কাছে ফেলে দিল। টেনী হাত বুলিয়ে অন্ধকারে অনুভব করে দেখে, কলার কঁদি-অনেকগুলি কলা আছে—বেশ বড় বড়। গরিলা কিনা, গন্ধ শুকে শুকে ঠিক কলার কাদি গাছ থেকে পেড়ে এনেছে। যাই হােক—যা পাওয়া গেছে, তাই ভাল। পেট ভরা নিয়ে কথা। সকলে দু’তিনটা করে পেটের জ্বালায় খেল। ফোয়ারা থেকে আঁজলা ভরে জল খেয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। বাকী কলা এক পাশে সরিয়ে রেখে টেনী যতদূর সম্ভব বুঝিয়ে টিপুকে বললল—এগুলি খেয়ে ফেল না, কাল সকালে খেয়ে বেরুনাে সকলে শুয়ে পড়লাে। শুয়ে শুয়ে বেবী বলে,“দেখ দিদি, টিপুকে সেখপুরায় নিয়ে গিয়ে আমরা একটা নূতন সার্কাস খুলবে। আজ যা খেলা দেখিয়েছে, ওর সঙ্গে আমরা যদি দু'একটা করে দেখাই ত’ বেশ দেখানাে যাবে। লব-কুশ প্রবল উৎসাহে আরাে খুঁটিনাটি আলােচনা করতে লাগলাে। ঘড় ঘড় মেঘ ডাকার মত শব্দে জানা গেল, টিপু ঘুমিয়ে পড়েছে। এরাও এক এক করে ঘুমিয়ে পড়লাে। সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গলাে অনেক বেলা হয়ে গেছে। যােদ্দর খাঁ খাঁ করছে। গাছপালার তৈরী ঘরের ভিতর শুয়ে বুঝতে পারা ৮৮

ছেলেধরা সার্কাস
}
যায়নি এত বেলা হয়ে গেছে। উঠে পড়ে তৈরী হয়ে নেওয়া গেল,
মামার বাড়ি তাড়াতাড়ি পৌছানাে দরকার। খুঁজতে ত’ খানিকটা
দেরী হবেই।
টিপু গাছের টবে ঠেসান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসেছিল। টেনী
বলে,—চল টিপু, বেরিয়ে পড়া যাক। কতটা হাঁটতে হবে কে জানে?
কলাগুলি খেয়ে বেরুনাে যাবে। কিন্তু কোথায় কলা ?
একটি খােসা পর্যন্ত চোখে পড়ে না। টিপুর দিকে চাইতে, দাঁত
খিচিয়ে চোখ নীচু করে হাসে–লজ্জার হাসি।
-ও বুঝেছি, ভাের না হতেই ‘পেটায় নমঃ' করে দিয়েছে !
রাগ করবে কি, সকলে হেসে অস্থির, টিপু শয়তানের কাণ্ড দেখে ।
-চল দেখা যাক পথে কি মেলে ! মামার বাড়ি পৌছে গেলে
পেটভরা খাওয়া আছেই।
সকলে বেরিয়ে পড়লাে। গেটের কাছে আসতেই কালকের সেই
মালীর সঙ্গে দেখা, গাছে জল দিচ্ছে। মালী এদের দেখেই জলের
ঝারি ফেলে দৌড়! বেচারী কালকের কথা ভুলতে পারেনি। ভালই
হ’ল, কোন হাঙ্গামা বাঁধলাে না।
পথ চলতে চলতে বেবী বললো,—দিদি, চল কালকের হােটেলে
যাওয়া যাক। একটু খেলা দেখিয়ে কিছু খেয়ে মামার বাড়ি খোঁজা
যাবে।
কথাটি মন্দ নয়। কিন্তু অনেক ঘুরেও কালকের হােটেল পাওয়া
গেল না। এত রাস্তা কি মনে থাকে ? অদৃষ্টে আজ খাওয়া নেই
সকালে।

ছেলেধরা সার্কাস
কিছু দূর যেতে পিছন থেকে একটি লরী ঝড় ঝড় শব্দে তেড়ে
এল। এরা রাস্তার এক পাশে সরে দাঁড়ালাে। লরী একেবারে
পাশে এসে দাড়ালাে।
যে চালাচ্ছিল সে ঝুকে বললাে,-কোথায় যাবে তােমরা ? আমার
রাস্তায় যাও ত’ পৌছে দিতে পারি ।
-কর্ণওয়ালিস ষ্ট্ৰীটে যাব।
—এখান থেকে অনেক দূর যে হেঁটে যেতে সারাদিন লেগে যাবে।
আমি টালায় যাচ্ছি শ্যামবাজারের মােড়ে নামিয়ে দিতে পারি।
শ্যামবাজারের মােড় আবার কোথায় ?
সেখান থেকে কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট আরম্ভ।
সেই ভাল সুবিধা হ’ল, হাঁটতে হবে না। গরীতে চটের বস্তা
বােঝাই ছিল। তার উপরে সকলে গিয়ে বসলো। লরীর লােকটি
যেতে যেতে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলাে ঘাড় ফিরিয়ে। হ্যা না
করে অতি কষ্টে রেহাই পাওয়া গেল।
, আর সত্যি কথা বলা হবে না, মামার বাড়ি না পৌছানাে
পৰ্যন্ত হুসিয়ার হতে হবে । চন্দ্ররাওএর মত আরেকজনের খপ্পরে
পড়লে আর রক্ষা নেই।
শ্যামবাজারের মােড়ে নামিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে শরীওয়ালা
চলে গেল।
কলকাতা সহরের মানুষরা সবিস্ময়ে দেখে প্রকাশ্য রাজপথে
দিনের বেলায় চারটি ছেলেমেয়ে ও একটি গরিলা ! একি অসম্ভব
৯০

ছেলেধরা সার্কাস
কতলােক গায়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করে—কি কর, কোথায় যাবে।
-একটি দল সঙ্গে সঙ্গে পিছনে চলে।
কত লােককে জিজ্ঞাসা করা হ’ল-রজনীবাবুর বাড়ি জানেন?
কর্ণওয়ালিস দ্বীটে থাকেন?
সকলেই পালটে জিজ্ঞাসা করে,—কত নম্বর ? নম্বর জানা
নেই ? তাহলে সারা বছর খুঁজে বেড়ালেও পাবে না।
এ কি
পাড়াগাঁ যে নাম বললেই লােকে বলে দেবে ঐ বাড়ি?
সত্যি কথা। খেয়াল হয়নি এমনি মুস্কিলে পড়তে হবে।
সারিবন্দী বাড়ির পর বাড়ি, কত বড় বড় বাড়ি, এর মধ্যে কোথায়
মামাবাবু লুকিয়ে আছেন বলা মুস্কিলের ব্যাপার। তা হলেও যখন
বেরুনাে গেছে, চেষ্টা করতে হবে। নিশ্চয় খুঁজে পাওয়া যাবে।
হয়তাে হঠাৎ মামাবাবুর সঙ্গে সামনাসামনি হয়ে যাবে।
পথ চলতে চলতে দু'ধারে জিজ্ঞাসা করতে করতে চললাে। পিছনে
লােকেরা মন্তব্য করতে করতে চলে—এরা খেলা দেখাবে নিশ্চয়ই
কোথাও না কোথাও ; বাড়ি খুঁজছে ঐ জন্য। চল যাওয়া যাক সঙ্গে,
গরিলার নাচ দেখবার জিনিষ ।
কতবার টেনীকে বলে,—দেখাও না খেলা।
কিন্তু সেদিকে টেনীর হুশ নেই। আজ মামার বাড়ি খুঁজে বার
করতে হবে আগে। তা না হলে কি করবে তারা? কোথায় যাবে?
খাবে কি? এ-ত শেখপুরা নয়, এ আজব সহর কলকাতা !
এত লােক সঙ্গে সঙ্গে চলেছে, একবার জিজ্ঞাসা করলাে না, তােমরা
এই যে

ছেলেধরা সার্কাস খেয়েছ ? : মামার বাড়ি কথা জিজ্ঞাসা করলে আমােলই দেয় না। এরা শুধু মজ। দেখতে চায়। এপাশে ওপাশে কত বাড়ি খোঁজ করলাে, কত লােককে জিজ্ঞাসা করলাে ! রাস্তা পার হয়ে হয়ে গায়ে ব্যথা হয়ে গেল। সূর্যদেব মাথার উপর উঠলেন, তবুও সন্ধান মিললাে না। রােদুরের তাপে মাথা ঝঝম্ করছে, পেট মােচড় দিচ্ছে খিদের জ্বালায় ; সকাল থেকে একটি দানা বেঁটে পড়েনি। বেবীর মুখ শুকিয়ে আমসী, গায়ে হাত দিলে মনে হয় জ্বর হয়েছে । সামনে একটি বাগান দেখা গেল রেলিং দিয়ে ঘেরা, মাঝখানে সুন্দর পুকুর। বাগানে বাগানে ঢুকে একটি বড় গাছের ছায়ায় ঝুপ ঝুপ, সব বসে পড়লাে। পিছনে যারা আসছিল ; সেই সব লােকেরা ভাবলো এইবার খেলা আরম্ভ হবে। তারাও ঘিরে গােল হয়ে বসে পড়লাে ঘাসের উপর। রাগে, দুঃখে, কষ্টে, চোখে জল এসে যায়। আমরা মরে যাচ্ছি আর ললাকেরা মজা দেখছে ! একবার মনে হয় টিপুকে লেলিয়ে দেওয়া যাক। আঁচড়ে, কামড়ে, তাড়িয়ে লােকগুলিকে উচিত শাস্তি দেবে। আহা, টিপু বেচারী জিভ বার করে কুকুরের মত হাঁফাচ্ছে ! ও যে পশু, খেতে না পেলে ওর আরাে বেশী কষ্ট হয়। লােকেরা বসে বসে বিরক্ত হয়। নানা কথা বলতে লাগে, টিটুকারী দেয়, কেউ বা গালাগালিও দিয়ে ফেলে। টেনীরা উত্তর দেয় না কিছু। শেষে এক এক করে সব উঠে চলে গেল। পাশের গাছের তলায় আরেকজন লােক বসে জিরুচ্ছিল, পাশে একটি টুকরীতে

ছেলেধরা সার্কাস
কাপড় ঢাকা কি ছিল ! উঠে যাবার সময় টুকরী থেকে একটি বড়
পাউরুটি বার করে টিপুর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সেও চলে গেল।
টেনীরা ভাবলাে টিপু তিন কামড়ে শেষ করবে। করলাে না তা।
রুটিটা নেড়ে চেড়ে দেখে, জিভ দিয়ে ঠোঁট মুছে টেনীর কোলের উপর
ছুঁড়ে ফেলে দিল।
এমন ভাল লাগলে টিপুর এই কাজটি যে লিখে বােঝানাে যায়
! নিষ্ঠুর মানুষগুলাের তুলনায় কত দয়ালু এই গরিলা টিপু !
টেনী ছিড়ে ছিড়ে ভাগ করলে, বড় ভাগটি দিল টিপুকে। শুধু
পাউরুটি, তাই সই ; পেটের জ্বালায় বাচবিচার চলে না। খেয়ে, জল
খেয়ে, পাশাপাশি শুয়ে সব ঘুমিয়ে পড়লাে। সারাদিনের ক্লান্তি
আর জেগে থাকতে দিল না।
;
ঘুম ভাঙ্গতে বিকাল হয়ে গেল ।
টেনী বলে,-চল। আবার রাত্রি হলে খুজে আর পাওয়া যাবে
, তখন রাত কাটানাে বিষম সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
বেবী বললাে,আর চলতে পারছি না দিদি, পা বড় ব্যথা করছে,
খিদে পেয়েছে বেজায় ।
লব-কুশেরও কষ্ট হচ্ছিল
কিন্তু বললাে না কিছু! বলে কি হবে
উপায় যখন নেই কিছু ?
টেনী ভাবলাে বেবীকে কোলে নিয়ে চলবে কিন্তু শক্তিতে কুলায়
। সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। টিপু চুপ করে
দেখছিল এদের কাজ ; টপ, করে বেবীকে তুলে নিজের কাঁধে বসিয়ে

ছেলেধরা সার্কাস নিল । বেবী ভয় পেয়ে গিছলাে; শেষে দেখে মন্দ নয়, কাঁধে চড়ে যাওয়ায় আরাম আছে। টেনী চলে আগে আগে, লব-কুশ, তারপর, পিছনে টিপু-কাঁধে বেবী ! সকালের যে সব লােক পিছু পিছু এসে ক্ষুন্ন মনে ফিরে গেছে, তারা কোথা থেকে দলবল নিয়ে এসে জুটলাে। ভাবলে এই খেলা শুরু হয়েছে। হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিতে লাগলাে, কেউ বা দুষ্টামি করে পিছন থেকে ধাক্কা দিল টিপুকে, দু’ এক টুকরা ইট- পাটকেল এসেও পড়লাে। টেনীরা পা চালিয়ে হন্ হন করে চলতে লাগলাে। টিপু এক- একবার রেগে গিয়ে দাঁত খিচিয়ে ‘যুদ্ধং দেহি' ভাবে দাঁড়ায়, লােকেরা হাউমাউ করে এ ওর ঘাড়ে পড়ে ছুটে পালায়। আবার যে কে সেই। কত লােককে জিজ্ঞাসা করলাে—রজনীবাবুর বাড়ি জানেন কর্ণওয়ালিস ষ্ট্ৰীটে ? কেউ পারে না বলতে। সবারই এক কথা-বাড়ির নম্বর না হলে বলা যাবে না। এ যে কলকাতা সহর ! একটি চৌমাথায় এসে জিজ্ঞাসা করতে একজন লােক বললাে,- কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট শেষ হয়েছে এখানে। ঐ দিকে খোজ কর। আরে ঐদিক দিয়ে আগাগােড়া রাস্তাই ত’ জিজ্ঞাসা করতে করতে এসেছে, বলতে পারলাে না কেউ। আবার ফিরে একই পথে ঘুরে বেড়াবে ! খোঁজ মিলবে কি ? পিছনের লােকের দল ক্রমশঃই বেড়ে চলেছে। বিকালের দিকে কত লােক বেড়াতে বেরিয়েছে ! ভাবলল,-মজা মন্দ নয়, কলকাতা সহরে ১৪ ছেলেধরা সার্কাস হচ্ছে। ছােট মেয়ে কঁাধে গরিলাকে চলতে দেখা যায় না,একটু মজা করাই যাক। তাদের চীৎকার, হাততালি, দুষ্টামি—মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। টেনী চুপ করে চৌমাথায় দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাে কি করা যায়- কোথায় যাবে? বেবী টিপুর কাঁধের উপর থেকে বললাে,-ঐ দেখ দিদি আমাদের সার্কাসের, প্ল্যাকার্ড, আমাদের ছবিসুদ্ধ দেওয়ালে মারা। টেনী দেখলাে—সত্যি তাই। লব, কুশ, টিপুও দেখতে লাগলাে। একজন মস্ত গোঁফওয়ালা, লাল-পাগড়ি পুলিশ ভিড় ঠেলে এসে বলে,“এখানে দাঁড়িয়ে ভিড় করা নিয়ম না। লােকজনের অসুবিধা খেলা দেখাতে হয় গড়ের মাঠে যাও, নয়তাে ধরে থানায় নিয়ে যাবাে। এ’ ত’ বড় মুস্কিল! আজব সহর কলকাতায় আর কিছু না থাক, নিয়ম আছে অজস্র। বাগানে রাত কাটানাে নিয়ম নেই, রাস্তায় দাড়িয়ে একটু ভাববারও নিয়ম নেই—ভাবলেই থানায় ধরে নিয়ে যাবে! ' টেনী ঠিক করলাে সার্কাসেই আবার ফিরে যাবে। উপায় কি ? এত কষ্টের চেয়ে সেই ভাল। লব, কুশ, বেবীকে বলতে ওরাও রাজী তক্ষুণি। টিপু ? টিপুর এখন খেতে হবে পেট ভরে, তা সে যেখানেই হােক রাজী। একজন ভাল লােককে প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে টেনী জিজ্ঞাসা করলাে, ঐ সার্কাস কোন্ দিকে। লােকটি বললাে,খুব কাছেই, আমি ঐদিকে যাচ্ছি, সঙ্গে এস।

ছেলেধরা সার্কাস
পিছনের দল মন্তব্য করে,—সে ত’ জানতামই গােড়া থেকে
সার্কাসের খেলা দেখাবে ; মিছামিছি আমাদের ঘােরালে।
চল চল,
সার্কাসেই যাই।
টেনীরা লােকটির সঙ্গে চললাে। রাস্তার ধারে একটি গির্জার
ঘড়িতে ঢং ঢং করে বাজলাে পাঁচবার।

চৌদ্দ
বাঘ-সিংহের মুখে
ঠিক ছ'টার সময় সার্কাস আরম্ভ হ'ল। প্রথম শাে। সমস্ত
টিকিট বিক্রয় হয়ে গেছে, কত লােক না পেয়ে ফিরে গেছে। চারিদিকে
তাকালে শুধু মানুষের কালাে মাথা থকের পর থাক্ সাজানাে।
কত সেজে গুজে তৈরী হয়ে সকলে আনন্দ করতে এসেছে।
সাকাস কলকাতায় বছরে একবার করে আসে, না দেখলে আর
হ’ল কি ?
টেনীদের পিছনে পিছনে যারা এসেছিল, তারাও মিশে গেছে
মানুষের সারির মধ্যে, এখন খুঁজে বার করা সম্ভব নয়। তারা
দেখলাে সেই চারটি ছেলেমেয়েকে অন্য রকম দেখাচ্ছে সার্কাস করবার
সময়। মেকাপ করে চেহারা বদলেছে, আর কি!
নিয়মমাফিক্‌ পরের পর খেলা চললল। কলকাতার লােকেরা
দেখলে ছােট্ট মেয়ে বেবীর অদ্ভুত খেলা, চ্যাংএর সঙ্গে।
সেই যমজ ছেলে দুটি তারের উপর, ঝােলা দোলনার উপর কত
কায়দাই না করলাে-এলিজার সঙ্গে সঙ্গে। ছেলে দুটির হাব-ভাব,
আদব-কায়দা—যেন এক ছাঁচে গড়া! কি অপূর্ব শিক্ষা!
এ আবার কি! সেই গরিলা সাইকেল চালাচ্ছে ওদের সঙ্গে
একচাকার সাইকেল ! এ গরিলা নয় কিছুতেই, মানুষ অমন
সেজেছে। গরিলা সাইকেল চালাতে পারে অমন সুন্দর ভাবে ? ঐ
ลง

ছেলেধরা সার্কাস ভাইবােন ছেলেমেয়েরা যেন একটি সূততায় গাঁথা। সূতােয় গাঁথা। কোন ভুলচুক হয় না। এ সার্কাস নয়, এ ম্যাজিক—এ রকম হয় কি করে ? আর এই আদা-জাম্বো, পেটে খিল ধরিয়ে দেয়। বদমায়েশের রাজা! এত ফন্দিও মাথার ভিতর আছে ! হাে হাে হ, হি হি হি, হা হা হাওরে বাবা আর পারিনে। বড় মেয়েটি আবার ঘােড়ায় চড়ে, হাতীতেও চড়তে পারে। আরে পড়তে পড়তেও পড়লে না ; ওটা-কায়দা। ঐ রকম ঐ লােকটাই ওকে শিখিয়েছে। কি নাম ঐ পাচার মত গম্ভীর মুখ—রজনীকান্ত। বাহাদুর মেয়ে বাবা, সাবাস খেলা দৌড়ালাে ঘােড়র উপর ‘ভলট’ খেলাে ! হাততালি—আরাে জোরে হাততালি দাও। অনেকদিন এমন সার্কাস দেখা যায় নি-স্বীকার করতে লজ্জা নেই। বাঘ-সিংহের খেলার আগে চন্দ্ররাও সামনে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালাে। খুব চেঁচিয়ে বললাে, দেখুন, আপনাদের কাছে আমার একটি নিবেদন আছে। প্রােগ্রামে দেখেছেন রমাবাই আশ্চৰ্য্য রােমাঞ্চকর খেলা আজ দেখাবে বাঘ সিংহদের নিয়ে ; কিন্তু রমাবাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শেষ করবার আগেই দর্শকরা ভীষণ চীৎকার করে বলে উঠে নানা গলায়,-ওসব চালাকি শুনবে না-খেলা আমাদের দেখাতেই হবে— ওস্তাদী পেয়েছ ? পয়সা ফেরৎ দাও-বাঘ সিংহর খেলা আমরা দেখবই-নড়ছি না বাবা! সার্কাসে আগুন ধরিয়ে দেবাে, আমরা কলকাতার ছেলে—ইত্যাদি, ইত্যাদি। চন্দ্ররাও দু’হাত জোড় করে আকারে ইঙ্গিতে লােকেদের চুপ ৯৮

ছেলেধরা সার্কাস
করতে বললাে। চীৎকার যেই
একটু থেমেছে,
খুব চেঁচিয়ে চন্দ্ররাও
বলে উঠে,বাঘ-সিংহের খেলা দেখানাে হবে।
দর্শকরা বেশ ‘বেশ করে-চেঁচিয়ে হাততালি দিয়ে শান্ত হল।
• চন্দ্ররাও বললে,—আমাকে কথা শেষ করতে দিন। রমাবাই
অসুস্থ, সেজন্য তিনি খেলাটি দেখাতে পারবেন না। তার বদলে
আরেকটি মেয়ে খেলা দেখাবে। বয়সে এ অনেক ঘােট, কিন্তু সাহসে
কিছু কম নয়। আমার অবস্থা দেখে, দয়া করে নিজের ইচ্ছায় এই
বিপজ্জনক খেলা দেখাতে রাজী হয়েছে।
চন্দ্ররাও কথা শেষ করে আবার অভিবাদন করলাে, পরে হাতের
ইঙ্গিতে খেলা শুরু করতে হুকুম দিল।
• বাঘ সিংহের সঙ্গে খাঁচায় এসে ঢুকলাে টেনী!—আগাগােড়া
সােনালী পােষাক, লম্বা বেণীর শেষে বাঁধা সােনালী ফুল। এক হাতে
চাবুক অন্য হাতে পিতলের লাঠি। টুকে মাথা নীচু করে ‘বাে’ করে
চামড়ার চাবুকে পটাস্ করে এক আওয়াজ করে সােজা হয়ে দাঁড়ালাে।
আলােতে টেনীর পােষাক ঝম করে উঠে।
এই দেখেই যেন সব পয়সা উঠে গেল লােকদের! চটাপট
হাততালি আর সােল্লাসে চীৎকার! কানে তালা লাগিয়ে দেয়, অন্য
কিছু শােনা যায় না।
সবশেষে চন্দ্ররাও এসে খাঁচার ভিতর এক কোণে দাড়ালাে, আজ
নিজেই পিস্তল নিয়ে। ছােট মেয়ে প্রথম দেখাচ্ছে কোন শিক্ষা না
যদি কোন বিপদ ঘটে, দায়িত্ব আছে। বাঘ-সিংহ আজ একটু
বেশী গরম। সিংহের মেজাজ যেন বেশী খারাপ ; ছটফট করছে,
নিয়েই ;

ছেলেধরা সার্কাস একটুতে রেগে যাচ্ছে। নতুন জায়গায় খেলা দেখাবার সময় প্রত্যেক বারই এমন হয় । টেনী চাবুকের আওয়াজ ও মুখে শব্দ করে’ করিয়ে যেতে লাগলো নিয়মমত খেলা। বাঘ-সিংহ কথা না শুনলে, দাঁত খিচিয়ে তেড়ে এলে, পিতলের লাঠি দিয়ে ভয় দেখাতে লাগলাে, আবার রমাবাঈ-এর মত মিষ্টি কথায় আদরও করলো। টেনীর ভয় করছিল না একথা বলা যায় না, কিন্তু সাহস ওর খুব। যখন ভার নিয়েছে, তখন শেষ করতেই হবে সুন্দর ভাবে এই ওর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাঘ সিংহ ছাগল এক সঙ্গে টেবিলে পা তুলে খেলে, এ ওর পিঠে ভর দিয়ে দাড়ালাে। ছাগলের পিঠে আগুনের রিং রেখে, তার ভিতর দিয়ে বাঘ দু’টি লাফিয়ে বারবার পার হয়ে গেল। এবারে শেষ খেলা,বাঘের মুখে হাত ঢােকানন, সিংহের হ-এর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া। ব্যাও বাজতে বাজতে থেমে গেল। চন্দ্ররাও নড়ে চড়ে সতর্ক হয়ে দাঁড়ালাে। টেনী বাঁ হাতে পিতলের লাঠি ও চাবুক নিয়ে এক এক করে ডানহাতটি বাঘেদের মুখে পূরে দিল ; বাঘেরা ঘড় ঘড় আওয়াজ করতে করতে হাঁ করে রইলাে নিতান্ত অনিচ্ছুক ভাবে। সিংহ কিছুতেই হাঁ করবে না। কত সাধ্যি-সাধনা, তবুও নয় কিছুতে। পিতলের লাঠি মুখের কাছে নিয়ে যেতে এক লাফে চৌকি থেকে নেমে পড়ে ভীষণ আওয়াজ করতে লাগলাে। মারতে হয়, দু- তিন ঘা চাবুক, তবে চুপ করে। আবার সাধ্যি-সাধনা খােসামােদ, তবে চৌকিতে উঠে। • ১০০ ছেলেধরা সার্কাস পিতলের লাঠি দেখিয়ে ভয় পাইয়ে হা করানাে হ’ল। টেনীর সমস্ত দেহ যেন একবার থরথর করে কেঁপে উঠলাে। সাহসে ভর করে এগিয়ে গেল, চোখদুটো সিংহের চোখে স্থির দৃষ্টিতে চন্দ্ররাও একবার ভাবলল, এ খেলা বন্ধ করে দি; কাজ নেই একটি ছােট মেয়ের জীবন বিপন্ন করে। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ভয়ে চুপ করে রইলাে; ওরা শুনবে না কিছুতেই। পয়সা যখন দিয়েছে, টিকিট কিনেছে, সবটুকু দেখে তবে ছাড়বে। তা না হলে সার্কাস পুড়িয়ে দেবে বলেছে। ধীরে ধীরে টেনী নিজের মাথা সিংহের মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। সোনালী ফুল লাগানাে বেণীটি বাইরে ঝুলতে লাগলাে। ব্যাণ্ড থেমে চুপ করে আছে। সমস্ত মানুষ নিস্তব্ধ জড়ের মত বসে দেখছে। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই! দর্শকদের মনে হল যেন সিংহের হাঁ আস্তে আস্তে ছােট হয়ে আসছে, মুখ বুজে আসছে—আর এক সেকেণ্ড বাদে ঐ বড় বড় চকচকে ধারালাে দাঁত মেয়েটির গলা চেপে ধরবে। মনে হ’ল•••• সমস্ত আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে কে একজন চেঁচিয়ে উঠলাে,- দিদি, দিদি, দিদি ! এ বেবীর গলা ! সঙ্গে সঙ্গে দড়াম দড়াম্ করে পিস্তলের আওয়াজ—একবার-দু’বার ! সিংহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লাে। বাধদুটো ভয়ে লাফিয়ে কোণে গিয়ে দাড়ালাে। ১০১

ছেলেধরা সার্কাস
টেনী পাথরের মত দাঁড়িয়ে খাঁচার মাঝখানে,—ঠিক সময়ে নিজের
মাথাটি বার করে এনেছে।
ওখানে কি হল? দর্শকদের এক দিকে—‘জল জল’ করে অনেক
লােক চেঁচাচ্ছে ! বলছে,—সরে লান, সরে যান, হাওয়া ছেড়ে দিন,
মূচ্ছা গেছে—জল জল ।
ঐ দিক থেকে একজন বলিষ্ঠ লােক সকলকে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে
এল, চীৎকার করে ডাকতে লাগলাে, -টেনী, টেনী, বেবী, লব,
কুশ !এদিকে এস, এদিকে আমি, তােমাদের মামাবাবু !
DIP SHIKH LIBRARY
KASTUSANGRAH,
HÜM RAH.

শেষ হ’ল টেনী বেবীদের বাড়ি পালানাের কাহিনী, কিউলের মেলা দেখতে বৈসিয়ে এ্যাডভেঞ্চারের ইতিহাস। বাড়ি ফিরে এসেছে শেখপুরায়। সঙ্গে এসেছে একটি নতুন মানুষ ! না না মানুষ নয়, গরিলা। মানুষের মতনই বুদ্ধি বটে। বাবা-মা খোঁজাখুঁজি করতে করতে কলকাতায় গিয়ে উঠেছিলেন মামার বাড়িতে। সেই কর্ণওয়ালিস ষ্ট্ৰীটে। এ বাড়ির সামনে দিয়ে টেনীরা অভুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়িয়েছে, জিজ্ঞাসা করে ফিরেছে, তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে। অথচ তিনতলার উপর মা বাবা বসে ভাবছিলেন ওদের কথা, মামাবাবুর সঙ্গে আলােচনা করছিলেন কেথায় সন্ধান করা যায়। এ শুধু আজব সহর কলকাতাতেই मलते কেঁদে কেঁদে মার শরীর মন দুই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মামাবাবু জোর করে সেদিন সানি দেখতে নিয়ে যান, মন ভাল হবে ভেবে । সার্কাসেও মা সারাক্ষণ দেছেন চুপ করে বসে। চারিটি ছেলেমেয়ের চলাফেরা, আকার-ইতি,সমস্ত তার নিজের ছেলেমেয়ের মত কিন্তু দেখতে এরা অন্য রকম! কি অদ্ভুত, অবিকল সাদৃশ্য ! খালি মনে পড়েছে টেনী-লব-কুশ-ববীর কথা, আর কেঁদেছেন। বেবী এককোণে বসে বশের সঙ্গে দিদির বাঘ-সিংহের খেলা দেখছিল, কিন্তু শেষে আর সহ্য করতে পারলাে না। সিংহের মুখে #৩

ছেলেধরা সার্কাস
মাথা ঢোকানাে আর সিংহের মুখ বন্ধ হয়ে আসছে,কেঁদে চীৎকার
করে উঠলাে,-দিদি-দিদি-দিদি।
বেবীর ডাকই চিনিয়ে দিল, এরা কারা!
মার মূচ্ছ। ভাঙ্গলে, অপূর্ব মিলন। হারানাে কোলের ছেলে-
মেয়েদের কোলে ফিরে পাওয়া গেল । চন্দ্ররাও ভয়ে এতটুকু?
ঘােড়ার খুর গোঁফ আরাে ঝুলে যায়।
টেনীর মামা রজনীবাবু পুলিশ ডাকতে ছােটেন। শেষে বুদ্ধিমান
লব-কুশ চন্দ্ররাওকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে দেয় এই সৰ্তে যে,
টিপুকে দিয়ে দিতে হবে।
প্রথমে রাজী হয় না কিছুতেই। শেষে রাজী হতে বাধ্য হয়।
করে কি, বুড়ো বয়সে জেলে গিয়ে পচবে ? রজনীকান্ত গা’ ঢাকা
দেয় তখনকার মত। কাজ কি ? কি ফ্যাসাদে ফেলে দেবে,
গােয়েন্দাগিরির শাস্তি দেবে হয়তাে! আম্বাে-জাম্বাে এত খুশী যে
পটাপ এ ওকে চড় মেরে মিছামিছি পড়ে যেতে লাগলাে। মজা না ?
টেনীর শেখপুরায় ফিরে এসেছে। কৰা দিয়েছে আর অমন
করে পালাবে না-যা ইচ্ছা হবে "লবে।
শেখপুরায় আজকাল মাঝে মাঝে একটি ছােট সার্কাসের খেলা
দেখানাে হয়, বিনা টিকিটে। এই সার্কাসের দলে ছ’জন খেলােয়াড়,
ছ’জন মানুষ। টেনী। -লব-কুশবেবী—টিপু-বিশুয়া।
ও টিপু মানুষ নয় বুঝি—গরিক? তা হলে তাই। কিন্তু ওর
মানুষের মতনই বুদ্ধি।
।
চ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Cheledhara Circus

Author
Not Available
Title
Cheledhara Circus
File name
Cheledhara Circus
Text
OCR done
Citation
1941
Published
2010/04/29
Publisher
Deb Sahitya-kutir, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Dipsikha Library, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Cheledhara Circus
DLI number
514524
Barcode
4990010016749.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
lpGzJKYeEBo
Download PDF

Cheledhara Circus