Majhu Public Library, Howrah
Puran Rahassya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রাণরহস্য।
বিমান, মহাখুন, কাশি
ক্রৌপদীয় খায়, বিবিন টিবি
}
JU,
ঐতিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় প্রীত।
HOWTAR.
निमाड मनाचा काना
এবাণী শশীকরকাশিত।
RINTED BY NILXONY DHUR, AT TRB
HINDU PRESS,
61, Aheeritollah Street, Calcutta.
প্রকাশকের মন্তব্য।
কোন নূতন প্রকারের এই প্রচার মায়া ভাষাৰ পৰি
সাধন করা, আমাদিগের সিকার বাগান বান্ধৰ পুস্তকালয় ও
সাধারণ পাঠাগারের উদেয় বলিয়া আমরা বর্তমান পুস্তক
মুদ্রিত ও প্রচারিত করিতে উদ্যোগ হইলাম। . আধুনিক
শিক্ষায় শিক্ষিতগণ এখন অনেকে তাহাদিগের কল্পনা-
কৰ
নিৰাশাপযােগ প্রবন্ধ পাঠ করিতে আগ্রহ প্রদর্শন করিয়া
থাকেন। এ পুৰু তাহাদিগকে যেমন পরিতৃপ্ত করিতে
শামিৰে, সয়লায় বিলুপাঠকও তেমনই গ্রামের কল্পনা
প্রিয় ভাবুকতাতে আমােদ পাইবেন। ইতি ১লা জ্যৈ,
শন ১৩২ সাল।
বাণীনাথ নন্দ,
সিকদার বাগান ৰাৰ পুরকায়
মায়ণ পাঠাগার।
No text on this page.
PUBLIC LIBRIS MĀJU. HOWARE std.io ট নয় গুণাকরের কবিবর ভারত বিদ্যাসুন্দর। “মনে যা ভাৰ তা নয়।” হেঁয়ালী । কবিবর ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর যে একজন পণ্ডিত লােক ছিলেন, ইহা সকলেই স্বীকার কবেন। তিনি কেবল পণ্ডিত ছিলেন না, একজন পবিত্র লােক ছিলেন, একপ পরিচয়ও পাওয়া গিয়া থাকে। তাহার পবিত্রতার পরিচযক প্রসূ আমাদের এক্ষণে বর্ণনীয় নহে। তাহার যে কয়েকখানি জীবনবৃত্তান্ত আমরা পাঠ করিয়াছি, সে সকল গুলিই এক- বাক্যে ঘুৰ পবিত্ৰভাৰ স্বীকার করিয়াছে। এরূপ পৰিত্ৰ চেতা পণ্ডিতের লিখিত পুস্তক বিদ্যাসুন্দর” আধুনিক বিদ্যানুরাগী ও বিদ্বৎ-পদবাচ্য নব্য যুবকবিগের নিকট কেন অপাঠ্য বলিয়া ঘৃণিত হয়, তায় আমরা অনেক সময় বুঝিতে পারি না। বিদ্যাসুন্দর” সম্বন্ধে আমাদের যে সকল কথা মনে হয়, তাহা এই সকল শিক্ষিত যুবকবৃন্দের নিকট জানাইয়া একটা মীমাংসা করিয়া লইতে অনেকদিন অবধি ইচ্ছা হইয়াছে। কিন্তু গাছে এ সকল কথা তুলতে গেলে * এই এটা যদিও পৌরাণিক কথা বললে লি কি পৌষণিক কথার তাৎপর্য কিরূপে গল্প যাইহে, ক সুবিধায় আ জ দেখা হল।
পুরাণ-রহস্য।
কারও নিকট কোন প্রকারে অপরাধী হইয়া পড়ি, সেই
ভয়ে একটু কুষ্ঠিত হই। কিন্তু কবিবর জয়দেব সম্বন্ধে যে
সমালােচনা আজিকালি দেখিতেছি, তাহা দেখিয়া মনে হয়
সত্যের অন্বেষণ করিতে গিয়া কাহারও মনে পাছে বাণা
দিয়া ফেলি, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে ভয় করিবার আবশ্যক নাই।
জয়দেব সমালােচক মহােদয়গণ যেমন রাধাকৃষ্ণের প্রেমের
ত্মিকভাব ত্যাগ করিয়া তাহার উলঙ্গভাবের উপর সমা-
না করিয়াছেন, আমরা তদ্বিপরীতে কবির ভারতচন্দ্রকে
পবিত্ৰচেতা পণ্ডিত জানিয়া বিদ্যাসুন্দরের ভাবার গ্রহণ করি-
মাছি, এবংতাহাই এস্থলে বিবৃত করিতে উৎসুক হইয়াছি।
বিদ্যাসুন্দরের গল্পটা বােধ হয় সকলেই অবগত আছেন,
সুতরাং এস্থলে তাহাব আর পুনরাবৃত্তি আবশ্যকতা নাই।
যতদূর দেখিতে পাওয়া যায়, পুরাকালে ভক্ত কবিগণ
ভগবানের শীলা সামান্য স্ত্রীপুরুষের লীলার ন্যায় অনেকস্থলে
বর্ণন কবিয়াছেন। বিদ্যাসুরেও সেইরূপে ভগবানের লীলা
বর্ণিত হইযাছে। দেখিতে পাওয়া যায়, ভিন্ন-প্রকৃতি ভক্তের
ভাব লইযা পত্নী বা উপপত্নী, সখী বা সখা, মাতা বা পিত।
ইত্যাদি নানাপ্রকার রূপক বর্ণিত হয়। আর ভগবানের
ভাৰ লইয়া কখন “চিকণ কালা” কখন “দেৰ কখন “দেবী”
ইত্যাদির বর্ণনা হইয়া থাকে। শিক্ষা ভেদই ভরে এবং
ভগবৎ চিন্তাভেদের অন্যতর কারণ দেখিতে পাওয়া যায়।
সেই দেশ কাল পাত্রভেদে ভক্তের ভিন্ন ভিন্ন ভাব দেখিতে
ওয়া যায়। এমন কি যে সকল ভক্ত একেবারে ভাব,
1 অলকার ত্যাগ করেন, তাহারা কেবল প্রতি ও
Matter ও Motion এর লীলা লইয়া উন্মত্ত হয়েন;
ই ফল করেন। ভারতীয় মহায়াগণের মধ্যে
বিদ্যাসুন্দর।
৭
অনেকেই বসত; এইজন্য তাঁহারা প্রায় সকল বিষয়েই
অলঙ্কা দিয়া বর্ণন করিয়া গিয়াছেন।
যতদুর বুঝিতে পারা যায়, তাহাতে বিজাতীয় শিক্ষায়
শিক্ষিত এবং বিদ্যাদর্পে দর্পিত সরলমুবক-ভক্তের ভাব লইয়া
শ্ৰীমতী বিদ্যা গঠিত হইযাছেন। গ্রন্থকার যেন সেইজন্যই
হাকে বিদ্যানামে অভিহিত করিয়াছেন। শ্ৰীমতী বিদ্যা
বিদ্যাদর্পে দর্পিতা হইষা প্রতিজ্ঞা কবিলেন, “বিচারে জিনিবে
যেই, পতি হবে সেই, সেই সে তাহার।”—মী, কর্তা,
বা পুরুষভাবে আব তিনি যাহাকে-তাহাকে লইতে রাজি
নহেন। চিরপ্রচলিত নিয়মানুসারে পিত্রাদিব অনুজ্ঞাত স্বামী
তিনি চাহেন না। কাজেই পুত্তলিকাবৎ একজনকে তিনি
স্বামী বা ঈশ্বর বলিয়া গ্রহণ কবেন নই। তখন বিনা
সুতায় হারের অষ্টা, গুণসিন্ধু” রাজপুত্র, “কাঞ্চীপুরের
“সুন্দর পুরুষেব” টনক নড়িয়াছিল। তিনি মনােরথ অখে
আৰােহণ করিয়া ‘পাচখানি অস্ত্র গ্রহণপূর্বক উন্নতিশীল
সৰ্বাতির আবাসভূমি বর্ধমানে আসিয়া উপস্থিত হইয়া-
ছিলেন। কবি সুন্দর” পুরুষ একেবারে প্রকাশ্য কাজ
সভায় গমন পূর্বক ঐমতী বিদ্যাকে দর্শন দেন নাই।
ভপ্রধান ও যখন ডাকের চোটে ভগবানকে অস্থির
করিয়া তুলিয়াছিলেন, তখনও তিনি প্রথম সাক্ষাৎ করে
দর্শন দিতে পারেন নাই। তখন ওরুরূপ মস্থের বশ্যক
হইয়াছিল। এস্থলে বিদ্যার শিক্ষা ভেদে সেই কাৰে ভাৰ
মালিনীর হতে পতিত হইয়াছিল। মানিী হাত মুখ নাড়িয়া
নাগর-নাগরীর মন ভুলাইতে বেশ মজ; এচায়-বজি
প্রিয় ভক্তগণও হাত মুখ নাড়িয়া উত্তর সাধকগণের কাৰ্যৰ
এহণ করিয়া থাকেন।
পুরাণ-রহস্য।
মালিনী বিদ্যাবতী শ্ৰীমতী বিদ্যাকে প্রথমে সুন্দর
নির্মিত বিনা-সুতার হার দেখাইলেন। বিদ্যার হৃদয়ে
তাতেই প্রেমের অঙ্কুর হইল। তিনি সৃষ্ট পদার্থ দেখিয়া
স্রষ্টার জন্য ব্যাকুল হইলেন, এবং মালিনীকে বলিলেন,
“গড়িল যে জন, সে জন কেমন, বিশেষ কহনা ছলে।”
তিনি তাহাতে স্রষ্টার অদ্ভুত লিখিত নাম স্পষ্ট পাঠ করিয়া
একেবারে মুগ্ধ হইয়া পড়িলেন। পাঠক! বলুন দেখি, যদি
কোন শিক্ষিত ব্যক্তি নভােমণ্ডলে তারার মালা দেখিয়া,
তাহার স্রষ্টাকে দেখিবার জন্য ব্যাকুল হন, এবং নিকটস্থ
আচার্য্যকে তৎসম্বন্ধে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, তাহা হইলে
আপনারা তাহাকে প্রকৃত ঈশ্বর-কর্তা—অষ্টার প্রেমে প্রেমিক
বলেন কি না? এই অঙ্কুরিত প্রণয়ের সঙ্গে রক্ত মাংসের
সংশ্রণ নাই। সুন্দর যখন মাল্যরচনা করিতেছেন, তখন
“মলয় পবন গুণ যােগায়” ইত্যাদি ইত্যাদি পাঠ করি,
আমরা সুন্দবকে একটা বাজে কারিকর বা মলী বলিয়া
মনে করিতে পারি নাই।
এই পর্যন্ত পাঠ করিয়া অনেকে বলিতে পারেন, ওগুলা
বর্তমান লেখকের গাজুরির কথা, কতকটা মিল আছে বলিয়া
মিলাইয়া দিয়াছে। এবার শুনুন—ভারতচন্দ্র স্বয়ং কি বলি-
তেছেন। বিদ্যাসুন্দরের মিলনের ঠিক পূর্বেই তিনি ধুয়া
ধরিয়াছেন;
“কলিমল মখনং, হরিগুণ কখনং,
বিরচয় ভারত কবিবর ভুণ্ডে।”
একথাটা কিহয় ও কেহ বসাইয়া গিয়াছে। যদি
তবে আর একটু পাঠ করা যাক।
বিদ্যাৰ এখন অভিমুখ গতি হইয়াছে। সেই বিনা তার
তাহাই হয়,
বিদ্যাসুন্দর।
হারের অষ্টাকে দেখিবেন বলিয়া ব্যাকুল হইয়াছেন। কবির
কাজেই বিরহ বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু তাই বলিয়া
তখন পতিলাতে কাতরা বিদ্যা আপনাকে আপনি বিরহিনী
বলেন নাই; বরং তাঁহার বেশভূষা সমস্ত কাল’ বলিয়া
বােধ হইল। আর ভাবিল, “কেমনে জীবে পাপিনী” অর্থাৎ
অভিমুখ গতি হওয়ায় আপনাকে আপনি পাপিনী মনে
করিতেছেন। তৎপরে হঠাৎ সুন্দরকে বিদ্যার আপন
কমধ্যে দেখা উপলক্ষে কৰিবর পুনরায় ধুয়া ধরিলেন;-
“একি দেখি অপরূপ, দেখলাে সই,,
ভুবনমােহন রূপ।
কোন্ পথ দিয়া,
কেমন করিয়া,
আইল নাগর ভূপ।
এ এন যেমন,
দেখি এমন,
মদনমােহন কুপ।(রূপ?)
থাকে সব ঠাই, কেহ দেখে নাই,
বেহেতে কহে অনুপ।
ভারতের নিধি, মিলাইল বিধি,
কহিও চুপ চুপ।”
এখনও কি সন্দেহ রহিল—বিদ্যাসুরের এ ভাব কি বাড়ে
কথা ? তৰে পাঠক মহাশয়! আর একটু অগ্রসর হউন
কিন্তু এইবার যে স্থানটা সাধারণে অশ্লীল বলিয়া থাকেন
সেইস্থান আসিয়া পড়িল। বৈষ্ণয়ে বলেন, “রাগী
“মিলন’ এভৃতি বিষয় উচ্চ অঙ্গের গুঞ্জ ব্যতীত ফেসে
ব্যক্তি বুঝিতে পারে না; এবং যাহাতােহাকে বুঝান যা
খুঝাইতে চেষ্টা করা কর্তব্য নয়। এই ও সকল ব্যাপায়ের
কথা ঘটে, মাঠে, বারে পাওয়া গেল না। অধিকারী
০
১০
পুরাণ-রহস্য।
সকল সম্প্রদায়েরই আছে; তবে হিন্দুর অধিকারী-ভেদের
নিয়ম কিছু বিশেষ—হিন্দু সরলভাবে তা স্পষ্ট করিয়া
স্বীকার করেন। তাই বৈষ্ণবেরা উক্ত বিষয়ের কথা যেখানে
সেখানে বলেন না; এবং এইজন্যই বােধ হয় গ্রন্থকার
চুপি চুপি” বলিয়াছেন। ভাই, ‘বিরহাদি বিষয় ত্যাগ
করিয়া আরও অগ্রে চলিলাম।
তৎপরে সুন্দরের সন্ন্যাসীবেশে রাজদর্শন। তখন গ্রন্থকার
বলিতেছেন, সে রসিয়া-নাগর কত রূপই ধরেন।
“বড় রসিয়া নাগর হে।
গভীর গুণ সাগর হে।
কখন ব্রাহ্মণ ভাট ব্রহ্মচারী,
কখন বৈরাগী যােগ দণ্ডারী,
কখন গৃহস্থ কখন ভিখারী,
অবধূত টা-ধরহে।
কখন ঘেটেল, কখন কাড়ারী,
কখন খেটেল, কখন ভাড়ারী,
কখন লুটেরা, কখন পসারী,
কভু চোর কভু চর হে।” ইত্যাদি ইত্যাদি।
“এইরূপে ধুর্তজ করে ধুত্তপনা।
বহুরূপ চিনিতে না পারে কোন না ।
ভারত কহিছে ভাল চোরের চলনি।
রাঙ্গা রাজচক্রবর্তী চোর চুড়ামণি ॥
সর্বপ্রকার রূপ এক বিনিয়ন্ত ব্যতিরেকে আর কাহাতে
সম্ভৰে। এইস্থান পাঠ করিতে করিতে কবি চা-
দাসে শ্রীকৃষ্ণের স্বয়ং দৌত্য (জয় বাবুন সংস্করণ) মনে
পড়িয়া গেল। একক কখন বেদি, কখন বাণিতিনী,
বিদ্যাসুন্দর।
১১
কখন দোকানী ইত্যাদি নানা সাজে এরাধিকার সহিত
রুত করিতেছেন। বৈষ্ণবগণ সুন্দরের সহিত ঐকৃষ্ণের
তুলনা করিতেছি বলিয়া, কেহ যেন অপরাধ গ্রহণ করিবেন
না। আপনাদের মধ্যে কেহ শ্রীকৃষ্ণকে প্রভু, কেহ পুজ,
কেহ সখা, কেহ পতি, কেহ বা উপপতি ইত্যাদি রূপে
দেখিয়া থাকেন; অর্থাৎ শান্ত, দাস্ত, সখ্য, বাৎসল্য ও
মধুর এই পঞ্চরসের মধ্যে অধিকারী বিশেষে যে কোন রসে
‘ঢালি তনু মন সঁহার চরণে অৰ্পণ করিয়া থাকেন। কেহ
বা ‘ম’ নাম শুনিয়া মনে, কেহ বা কখন বা চিত্ৰদর্শনে
মনে, তেমনি কেহ যদি সৃষ্ট পদার্থ দেখিয়া স্রষ্টার অল্প
মজেন, তাহাতে ক্ষতি কি? সেইরূপ কোন ভক্ত যদি বলেন,
“কি স্বদেশে, কি বিদেশে, যথায় তথায় থাকি।
তোমার রচনা মধ্যে তােমাকে দেখিয়া ডাকি।”
তাহাতে কি তঁাহার সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রেমের পরিচয়
'হইল না?
বিদ্যাসুন্দর লীলার আসরে এইবার আর দুইখানি চিত্র
দেখা দিল রাজা ও রাণী। সমগ্র পুস্তকখানি পৰ্যালােচনা
করিলে দেখা যায়, ইহার পাঁচখানি চিত্ৰই এধানবিদ্যা,
সুন্দর, মালিনী, রাণী ও রাজা। তন্মধ্যে প্রথম তিনখানি
চরিত্র যে ভাব লইয়া গঠিত, তাহ৷ উল্লেখ করিয়াছি। যথা-
বিদ্যা বিজাতীয় ভাবে শিক্ষিত যুবকের, সুন্দর অষ্টার, এবং
মালিনী প্রচারকে, ভাব লইয়া গঠিত। এইবার আণ, তৎপৰে
রা। আমরা যতদুর বুঝিয়াছি, তাহাতে গ্রন্থকার সমাজের
ছায়া লইয়া রাণ, এবং সমাজপতির (সমা যাহাদিগের
দ্বারা চালিত হয়, তাহাদিশেছায়া লইয়া জানান, চরিত্র
গঠিত রিয়াছে,
পুরাণ-রহস্য।
“বিচারে বিনিবে যেই, পতি হবে সেই
সেই সে তাহার।”
এ প্রতিজ্ঞা শুনিয়া সমাজরূপিণী রাণী কি ভাবিতেছেন,
তাহা গ্রন্থকারের ভাষায় বলা যাউক
“আমি জানি ধন্যা, বিদ্যা মাের কন্যা,
ধন্য ধন্য সর্বঠাই।”
প্রথমে শিক্ষিত যুবকের দল দেখিয়া, সমাজেরও মনে
উক্ত ভাবের উদয় হয়। কিন্তু বিজাতীয় ভাবে শিক্ষিত
যুবকের উদর স্ফীত হইয়াছে, দেখিয়া সমাজ এইবারে মাথায়
হাত দিয়া পড়িলেন। ঘাের তিরস্কার আরম্ভ করিলেন ।
তখন স্রষ্টার প্রেমে উন্মত্তা শ্রীমতী বিদ্যা বলিলেন ;-
সবে এক জানি, শুন ঠাকুরাণি,
প্রত্যহ দেখি স্বপন।
দেব কি কিন্নর,
বলে করে আলিঙ্গন।
চোর বলি তারে, চাহি ধরিবারে,
তপাশি
ঘুমের ঘােরে।
নিদ্রাভঙ্গে চাই, দেখিতে না পাই,
নিত্য এই লা মােরে ॥”
সুন্দরের এরূপ পরিচয়ে সমাজরূপী রাণীর অসন্তোষ
কমিল না, কাজেই তিনি পতির নিকটে গেলেন। রাজাই
প্রকৃতপক্ষে সমাজপতি; কাজেই রাণী তাহার উপরে রাগ
অভিমান জানাইলেন। রাজা বা সমাজপতি “পলিটিক্স”
(রাজনীতি) ইয়া ব্যস্ত। তাঁহার অন্য কিছু দেখিবার বড়
সময়ের অপ্রতুল। তবে ফে আলিয়া জানাইলে ক্ষমতা
পারে সে এ চা করিয়া থাকেন।
একই সুন্দর,
বিদ্যাসুন্দর। ১৩ এ স্থলে একটা কথা বলিয়া রাখি,-সুনব কে, বা তাহাকে কিরূপ ভাবিতে হইবে, তাহা দেখাইবার জন্য গ্রন্থকার গ্রন্থের নানাস্থলে যেরূপ ধু দিছেন, অশ্লব পরিচয়ের জন্য সেরূপ দেন নাই। এইজন্য আমাদেৰ বাক্য প্রতিপাদক গ্রন্থকাৰেব স্পষ্ট বচন উদ্ধৃত করা কঠিন। তবে গ্রন্থের প্রথম হইতে সাবধানে পাঠ কবি। গেলে, আব কোন কথা স্পষ্ট কবিয়া বলিবাব আবশ্যক থাকে না আভাসে বেশ বুঝিতে পারা যায়। শ্ৰীমতী বিদ্যা অসুন্দরকে যেরূপ পাইয়াছিলেন, শ্ৰীমতী মালিনী তেমন পান নাই। তবে তিনি প্রথমে শ্রীসুন্দরেব রূপ দেখিয়া মুগ্ধ হইছিলেন, এবং তাহার উপর একটা টানও জন্মিছিল। ঐসুন্দবের তিস্তবের ও বাহিবের সৌন্দর্য্য শ্ৰীমতী বিদ্যাই বুঝিযাছিলেন। আৰ সকলে ৰাহিক সৌন্দর্য দেখিয়া ভুলিযাছিল। এ জগতে আব একদল লোক আছে, তাহা সমাজ- পতির আদেশমত মহা ধূমধাম কবিয়া “চোৰ চুড়ামণি” ভগবানকে ধরিতে চায়। আমাকে সমালোচ্য বিদ্যালয়ে সমাজপতি বাজার অধীনস্থ “ধূমকেতু” তাহাবই প্রতিরূপ। তাহারা ব্রজনারীর ন্যায় নবীবেশে চোর চুড়ামণিকে ধরিযা- ছিল। চোর ধরায় গ্রন্থকাৰ ধুয়া ধরিয়াছেন “আজি ধরা গেল চোব চুড়ামণি। মােৰা জেগে আছি সকল রমণী। ভান গেল যত দূর, চাতুরী হইল চুৰ, এড়াইতে নারিবে এমনি। প্রকাশিয়া ভারি ভূরি, অনেক কমে চুরি, আদি ধরি লিখব তেমনি।
১৪
পুরাণ-রহস্য।
হৃদি কারাগারে জােরে, বান্ধিয়া মনের ডােরে,
গছাই পরাণে এখনি।
সকলেরে ফাকি দেই, ধরিতে না পারে কেহ,
ভারত না ছাড়িবে অমনি।
কোটালাপি কর্মচারীগণ অল্পবিদ্যা-সম্পন্ন; তাহারা
তাহকে সাকার ধরিতে চায়। তাহারা তাহাকে সাকার
ডাবিয়াছিল—সাকার দেখিয়াছিল। সর্বত্রই শুনিতে পাই,
তাহাকে যে যেভাবে ভাবে, সে সেইভাবে দেখিতে পায়।
এ স্থলে তাহারা তাহাকে সাকার ভাবে, কাজেই সাকার
দেখে। নিরাকারবাদী স্রষ্টা পূজক শিক্ষিত যুবক তাহাকে
“স্বপনে দেখেন। কিন্তু বাস্তবিক তাহাও সাকার—তাই
তাহাদের গানে শুনিতে পাই—“স্থান দিও চরণতলে” ইত্যাদি।
ক্রমে যখন সমাজপতি সুন্দরকে দেখিলেন,—তাহার কপে
মন বিচলিত হইল—পরিচয়ে আপনার বলিয়া বুঝিলেন,
তখন সকল গােল মিটিয়া গেল। সুন্দর জামাই হইলেন,
আপনার বলিয়া গৃহীত হইলেন। পরিচয়ের পূর্বে একদিন
রাজা সুন্দরকে মশানে বইয়া গিয়া কাটিতে চাহিয়াছিলেন;
কিন্তু সে জন্য সুন্দর বা তাঁহার ভক্ত বিদ্যা (সমাজপতি)
রানার উপর বিদ্বেষভাৰ প্রকাশ করেন নাই। প্রকৃত ভক্তের
হৃদয়ে বিদ্বেষভাব থাকে না। তাই বলি, যে সকল শিক্ষিত
যুবক ভগবানের প্রেমে মুগ্ধ হইয়াছেন, এরূপ ভাব দেখান
অথচ সমাজপতির নির্যাতন ভাবিয়া তাহার প্রতিশােধ লইতে
উদ্যত হন, তাহারা এক ভক্ত নহেন।
অনেকে বলিতে পারেন, বর্তমান লেখক সমাজের
বর্তমান অবস্থা দেখিয়া বিদ্যালয়ের এরূপৰ প্ৰকাশ
করিয়াছেন। কিন্তু যে সময়ে এই গ্রন্থ লিখিত হইয়াছিল,
;
বিদ্যাসুন্দর। তৃখন যে কতক পরিমাণে সমাজের এইরূপই অবস্থা ছিল না, একথা মনে হয় না। সকল দেশে সকল সময়েই শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত ঈশ্বর-প্রেমিক, সংসারে মত্ত, প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের বিভিন্ন অধিকারের লােক থাকে। নিতান্ত বৰ্বরদিগের মধ্যেও সামাজিক নিষম বিধিবদ্ধ আছ। কোন দেশে পূৰ্ব্বকালে হয়ত কোন কোন বিষয় এখনকার মত এতটা ছিল না, হয়ত কোন কোন বিষয় আবার এখনকার অপেক্ষা বেশী ছিল ; এইরূপ মাত্র। ভেদমাত্র। এসব জিনিস চিরকালই একধরণের। এই জন্যই ৬ শঙ্করা- চার্যের “মােহমুদগর” যখন প্রস্তুত হয়, তখনও যেমন লােকের অবস্থার উপযুক্ত, এখনও সেইরূপ উপযুক্ত। কোন শাস্ত্র গ্রন্থই এই জন্য পুরাতন বা বালি হয় না। আরও এক- দিক হইতে দেখ,কবি, ভাবুক, রসিক বা প্রেমিক, এই জড় জগতের অধিবাসী হইলেও, তিনি ঐ জগতের অন্যান্ত জীবের ন্যায় সম্পূর্ণরূপে জড় ভাবাপন্ন নহেন। অন্যান্য জীব যতই কেন উন্নত হউক না-তাহার ক্ষমতা দেশ কাল পাত্র দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকিবে; কিন্তু প্রকৃত কবির দৃষ্টি শক্তি তদ্রুপ সীমাবদ্ধ নহে। তাহার হৃদয়তন্ত্রী বাজিয়া উঠিলে ও ভবিষ্যৎ, বর্তমানের ন্যায় তাহার নয়নপথের গােচর হয়। সেক্সপীয়র, মিল্টন, বাল্মীকি, বেদব্যাস প্রতি কৰিগণের গ্রন্থের প্রকৃত পাঠকের কবির এই মহাশক্তি অস্বীকার করিতে পারেন না, এইজন্যই বোধ হয় কথা আছে - “রাম না হইতে বাটিহাগার বৎসর। অনাগত পুরাণ রচিল মুনির।” প্রবন্ধ দীর্ঘ হইল দেখিয়া, ক্রমেই আরও সংক্ষিপ্তভাবে কয়েকটা কথা বলা হইতেছে। মুরের কালীগ, রাম- ;
পুরাণ-রহস্য। চন্দ্রের ভগবতী স্মরণের সঙ্গে অথবা খৃষ্টের পিতৃন্মরণের সঙ্গে মিলাইয়া লইলেই চলিবে। তৎপরে সুন্দরের স্পর্শে রাজা বীৱসিংহের জ্ঞানােদয় হইল। তিনি শ্মশানক্ষেত্রে অনন্ত- রূপিনী কালীর দর্শনলাভ করিলেন। মহাশক্তির মহিমা প্রকাশ হইল, আর পরম পুরুষ সুন্দর প্রকটমুর্তিতে “বর্ধমানে” তিষ্ঠিতে সম্মত নহেন। কাজেই শ্ৰীমতী বিদ্যাকেও মঙ্গে লইয়া কাঞ্চীপুর” গমন করিলেন। দীর্ঘতর ভয়ে প্রায় সকল কথাই সংক্ষেপে বলা হইয়াছে। আশা করি, সুবােধ বিদ্যাসুন্দবিদ্বেষী পাঠক মহােদয়গণ বিষয় বিচার করিয়া একটা সুমীমাংসা করিয়া লইতে পারিবেন।
মহাভারতীয় কথার সুচনা।
কাৰ্যঋষিগণ যে কিরূপ স্কানসম্পন্ন ছিলেন, তাহা এদিক
বইতে দেখিলে, কিছু বুঝিতে পারা যায় না। তবে সফল
দিক পৰ্যালােচনা করিয়া দেখিলে বােধ হয় যে, তাহারা
নিরন্তর ব্রহ্মচিন্তায় থাকিয়া যেন কতকটা ৰহ্ম পাইয়াছিলেন।
তাহারা অসীম জ্ঞান ও ভক্তিযােগে যে করে উৎপাদন
করিয়াছিলেন,-সুমেরু-সম ধর্মের যে উচ্চশিখরে উপনীত
হইয়াছিলেন, তাহা তাহাদের ন্যায় ভানসম্পন্ন না হলে,
পামরা কিরূপে বুঝিতে পারিব ? তবে ক্রমাগত তাহাদের
পা ধরিয়া চলিলে যে তাহাদের নাগির উত্তাপে
আমরা কতৃকটা উত্তাপিত হইতে পারি, তাহা সামান্য গড়ে
উত্তাপের নিয়ম দেখিলেও অমিত হইতে পারে।
যেমন এক দেহে নানা রােগ •থাকিলেও সুবিত্ত বৈদ্য
ৰা, পিও, কফের প্রভাব বুঝিয়া রােগের মূল নির্ণর, এবং
তদনুসারে ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করিতে পারেন, তজ্জল
সমার মধ্যে নানা-একতির লােক থাকিলেও আৰ্যখৰিগণ
(নি। এক্ষ হইতে প্রকৃতি ও প্রকৃতি হইতে সত) সক
ব, তমঃ, তিনটা গুণের প্রভাব বুঝিয়া চরিত্রে দেব ।
নির্ণয় অনুসারে বা পান করিতে পারিবেন।
* "निसिंग नाचनालविणारे
देशल निम्माधिरिति॥
.
১৮ পুরাণ-রহস্য। গুণত্রয়ের প্রভাব বুঝিয়া আর্যঋষিগণ পুরাণাদিতে যে সকল চরিত্র রচনা করিয়া গিয়াছেন, যতদিন গুণত্রয়ের লীলা থাকিবে, ততদিন তাহাদের প্রদর্শিত সেই সকল চরিত্র সজীব থাকিবে। এই কারণেই তাহাদের অনেক কথা ভবিষ্যদ্বাণীর ন্যায় বােধ হইয়া থাকে। যাহারা আর্যঋষিগণের প্রদর্শিত নিগুণ তত্ত্বের সহিত প্রকৃতুিস্থ গুণত্রয়ের লীলার বিষয় জ্ঞাত নহেন, তাহারা “রম না হইতে রামায়ণ” লেখার মত কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত বলিয়া মনে করেন। যাহা হউক, নির্বিকার আত্মা ও গুণত্রয়ের সবিকারী লীলা বুঝিধার জন্য মহাভারতের মূল কথা আরম্ভ করিবার পূৰ্বে অপেক্ষাকৃত সহজ-বােধ্য “বশিষ্ঠ-তীর্থের” বিষয় প্রথমে আরম্ভ করা গেল। বায়ুঃ পিত্তং কফস্টোক্তঃ শারীরো দোষ সংগ্রহঃ । মানস পুনরুদ্দিষ্টো রজশ্চ তম এব চ। প্রশাম তৌষধৈঃ পুব্বো দৈব যুক্তি ব্যাপায়ৈঃ । মানসে জ্ঞান বিজ্ঞান ধৈৰ্য্য স্মৃতি সমাধিভিঃ ॥” চরক (সুত্রস্থান) ১ম অঃ ২৯/৩,৩১। অর্থাৎ পরমাত্মা নির্বিকার। ইনি মন, ভূতগণ ও ইন্দ্রিয় সমুহের সহিত বৰ্তমান থাকিয়া চৈতন্য-সম্বন্ধে কারণস্বরূপ হন। ইনি নিত্য, ইনি দ্রষ্টা, ইনি সমুদায় ক্রিয়ার সাক্ষী- স্বরূপ। ২৯। বায়ু, পিত্ত ও কফকে শারীরিক দোষ কহে। মনের দোষ রজঃ ও তমঃ। যাহা বিকৃত হইলে রােগ হয়, তাহাকে দোষ কহে। ৩৪ | শারীরিক দোষ দৈব ও যুক্তির আশ্রয়দ্বারা শান্ত হয়, আর মনের দোষ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, ধৈৰ্য্য, স্মৃতি ও সমাধিদ্বারা শান্ত হয়। ( দৈব শব্দের অর্থ- বস্ত্যয়নাদি। যুক্তি শব্দের অর্থ—ঔষধযোগ }। ৩১। (চরক, কবিরাজ শ্রীযুক্ত যশােদাবাবুর অনুবাদ)।
বশিষ্ঠ-তীর্থ।
মহাভারতের শল্য-পৰ্ব্বে ( কাশীরাম দাসের লিখিত
মহাভারতের গদাপৰ্বে ) এই তীর্থটার উল্লেখ আছে। এই
তীর্থের অপর নাম সরস্বতী তীর্থ। ভগবান্ বলদেব এই
তীর্থসম্বন্ধে বলিয়াছেন যে,-“সরস্বতী তীর্থে বাস করিতে
যাদৃশ রতি হইয়া থাকে, তাদৃশী রতি আর কোথায় ?
সরস্বতী-তীরে বাস করিলে, যাদৃশী গুণােৎপত্তি, তাহা আর
কুত্রাপি নাই-ইত্যাদি।” বর্তমান-কালধৰ্ম্মে তীর্থসমুহের
মহিমা প্রায় অতিশয়ােক্তি-অলঙ্কা-দোষে দূষিত বলিয়া জ্ঞান
থাকিলেও, এই তীর্থ টী কোথায়, তাহা জানিবার জন্য
ইচ্ছা হইল। যদি অবস্থায় কুলান হয়, তবে এমন সুন্দর
তীর্থটা দর্শনের অভিলাষও মনােমধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে উদিত
হইল। যতদূর পারি, তীর্থটা কোথায়, জানিবার জন্য, আত্মীয়-
বন্ধু পাঁচজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম। কেহই বলিতে পারিলেন
না অবশেষে স্থির করিলাম যে, যদি তীর্থ টীর বিষয় মত
দূর পারি, লিখিয়া সাধারণের সমক্ষে উপস্থাপিত করি, তাহা
হইলে যদি কোন সহৃদয় পাঠক ইহার তথ্য জ্ঞাত থাকেন,
তবে কৃপা করিয়া আমার মানস পূরণ করিতে পারেন।
এই বশিষ্ঠ-তীর্থটীর ইতিহাস মহাভারতে সপেত
এইরূপ বর্ণিত আছে ;-পুরাকালে মহর্ষি বিশ্বামিত্র ও
বশিষ্ঠের তপস্যা-বিষয়ে স্পর্ধা-জনিত বৈরভাব ঘটিয়াছিল।
কথিত আছে, পূর্বে বিশ্বামিত্র রাজা ছিলেন। তিনি
মৃগয়াৰ্থ ৰন মধ্যে পরিভ্রমণ করিতে করিতে, বশিষ্ঠের আশ্রমে
२० পুরাণ-রহস্য। কন। উপস্থিত হইয়াছিলেন। তথায় কামধেনুর গুণে বশিষ্ঠের স্থানে যথোচিত আতিথ্য পাইয়া, কামধেনুটী গ্রহণের চেষ্টা কিন্তু তাহাতে অক্ষম হইয়া এবং ঋষিবরের তপ-প্রভাৰ বুঝিয়া, রাজ্যত্যাগ করিয়া, বিশ্বামিত্র তপস্যাবৃত্তি গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষত্রিয় (ব্রাহ্মণেতর) বংশােব বিশ্বামিত্র তপক্ষাবলে ব্রাহ্মণ-বংশোদ্ভব বশিষ্ঠের তুল্য হইতে পারেন নাই বলিয়া, তাহার মনে বশিষ্ঠের প্রতি বিদ্বেষ-ভাব ছিল। সেই ধর্মনিরত বিশ্বামিত্রের মনে ইহাই বিবেচনা হইল সে-“সরস্বতী বেগবলে তপােধন ৰশিষ্ঠকে অবিলম্বে আমার নিকট আনিয়া দিলে, আমি সেই জাপক-শ্রেষ্ঠ বিজবরকে অনায়াসে নিহত কৰিব, সন্দেহ নাই।” মহামুনি ভগবান্ বিশ্বামিত্র এইরূপ নিশ্চয় করিয়া, সরিরা সরস্বতীকে স্মরণ করিলেন। ভগবতী সতী বিশ্বামিত্রকে বড় কোপন-বৰ ৰলিয়া জানিতেন। সুতরাং বিবর্ণা ও কম্পমানা হইয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে তাহার নিকটে উপস্থিত হইলে, মুনি বলিলেন- “তুমি শীঘ্র বশিষ্ঠকে আমার নিকট আনয়ন কর, আমি অদ্যই তাহাকে নিহত করিব।* সরস্বতী এই কথা শুনিয়া অতিশয় ব্যণিত হইলেন, এবং আদিষ্ট কৰ্ম্মকে পাপাত্মক, ও ভূমণ্ডল-মধ্যে বশিষ্ঠের প্রভাব অপরিমিত পানিয়া, অগত্যা বশিষ্ঠের নিকট গমনপূর্বক বিশ্বামিত্রের কথা জানাইলেন। ধাঝা মানব-শ্রেষ্ঠ বশিষ্ঠ, তাহাকে শাপভয়ে কুশা, বিবর্ণা, ভীত ও চিন্তাকুলা দেখিয়া কহিলেন,-“হে সরিরে! তুমি শীষগামিনী হইয়া আমাকে বহন করিয়া আত্মরক্ষা কর।” মহর্ষি বশিষ্ট এই কথা বলিলে, সরস্বতী, বেগয়ে তাঁকে বিখামিত্রের অাশ্রমে লইয়া গেলেন, এবং তখন বিশ্বামিত্র ৰশিকে নিধন করিবার গল্প অন্বেষণ করিতে লাগিলেন।
বশিই-তীর্থ।
দেবী সরস্বতী, বিশ্বামিত্রকে ক্রোধ-পরতন্ত্র-দর্শনে, ব্রাহ্মণ-বধ,
আশঙ্কা-বশতঃ তাহাকে বঞ্চনা করিয়া, বশিষ্ঠকে পূর্বদিকে
লইয়া গেলেন।
অনন্তর ক্রুদ্ধ বিশ্বামিত্র ঋষি-সত্তম বশিষ্ঠকে
অপবাহিত বিলােকনে অমর্ষণ হইয়া বলিলেন,-“হে নিম্নগে।
যেহেতু তুমি আমাকে বঞ্চনা করিয়া গমন করিলে, সেই
কারণে তুমি
রাক্ষস-কুল-ঈস্পিত শােণিত বহন কর।”
বিশ্বামিত্র মুনির এইরূপ অভিসম্পাতে সরস্বতী কিছুকালের
জন্য শোণিত-মিশ্রিত তােয়রাশি ধারণ করিয়া ছিলেন। তদনন্তর,
ঋষিগণ, দেবতা সকল, গন্ধৰ্ব্বকুল ও অষ্পর সমুদয়, সরস্বতীর
তাদৃশ দশ দর্শনে নিতান্ত দুঃখিত হইলে, সরিদ্বর সরস্বতী
পুনরায় নিজ-পথে আগমন করিলেন। যে স্থলে এই ঘটনা
হইয়াছিল, তাহাই বশিষ্ঠ বা সরস্বতী-তীর্থ বলিয়া খ্যাত।
সে তীর্থ এখন কোথায় ? পুণ্যভূমি ভারতবর্যে দুইটা
সরস্বতী নদী আছে। একটী প্রয়াগধামে আসিয়া গঙ্গা-
যমুনার সহিত মিলিত হইয়া যুক্ত-বেণী’ তীর্থ হইয়াছে ; আর
অপরটা কলিকাতার অদূরবর্তী ত্রিবেণীতে মিলিত ভাগীরণী-
যমুনা হইতে বিযুক্ত হইয়া মুক্তবেণী’ হইয়াছে। শেষােক্ত
ত্রিবেঞ্চ যেন আধুনিক ও সৰ্ব্ববাদি-সম্মত নহে বলিয়া মনে
হয়। যাহা হউক, মহাভারতে বশিষ্ঠ-তীর্থের সরস্বতী
কোথায়—বা ঐ দুইটীর মধ্যে কোষ্টী ? পাঠক! বলিয়া
দিতে পারেন কি ? এখন, এ দুইটীর মধ্যে কোটা সম্ভব
বা অসম্ভব দেখা যাউক।
ভারতের সরস্বতী দুইটাই নিতান্ত ক্ষীণা বা লুপ্তা।
দুইটারই প্রকৃতি প্রায় এক প্রকার। ভগবান্ বশিষ্ঠ এই
পুণ্যতোয়ার শুকালে বলিয়াছেন,-“দেবি! তুমি পিতামহের
‘মানস-সবােবর’ হইতে নিঃসৃত হইয়াছ বলিয়া, তোমার নাম
;
পুরাণ-রহস্য।
;
সরস্বতী।” এ কথাটা কি ? বশিষ্ঠদেব ভক্তির আবেগে
বলিয়া ফেলিয়াছেন—না, প্রকৃতই ব্রহ্মার মানসসরােবর
নামক কোন সরােবর হইতে এই নদীর উৎপত্তি হইয়াছে।
ঐ দুইটীর কোনটাই মূল পাওয়া যায় না-পূর্বেই বলিয়াছি,
উহারা লুপ্তপ্রায় হইয়াছে। তবে স্তবটা আর একটু পড়িয়া
দেখা যাউক,-“আমরা তােমা হইতেই অধ্যয়ন করিয়া থাকি।
এ কথাটার অর্থ কি ? তবে কি এ সরস্বতী আমাদের
উপাস্য দেবতা—বিদ্যা? জড়বাদী কি বলেন, জানি না;
যাহারা শশিমুখী কন্যার বর্ণনা শুনিয়া গােলকার মুখবিশিষ্ট
একটা জীব দেখিতে চাহেন, তাহাদের কথা জানি না।
তবে স্তবটী পাঠ করিয়া মনে হইতেছে, ইনি আমাদের সেই
উপাস্য দেবীই বটেন। যদি তাই হয়, তবে নিতে
সংশেরই বা অর্থ কি ?
“পূর্বকূলে বশিষ্ঠের আশ্রম সুন্দর।
তথা রহি তপস্যা করেন মুনিবর।
বশিষ্ঠের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সতত করিতে।
বিশ্বামিত্র রহিলেন পশ্চিম-কূলেতে।”
(কাশীরাম দাসের মহাভারত)
যদি উক্ত সরস্বতী নদী মূর্তিময়ী বাকদেবী হয়েন, তবে
পুৰ্ব্ব-কুল পশ্চিম কুলের অর্থ—প্রাচ্যশিক্ষা ও পাশ্চাত্য-শিক্ষা
বুঝিতে হইবে কি? মহাভারত বহুদিনের জিনিষ—তখনও
এই হতভাগ্য ভারতভূমে পাশ্চাত্য-শিক্ষা” ছিল, তাহা ও
বােধ হয় না। তবে একমাত্র কামধেনু-সম্বল বশিষ্ঠের চরিজ,
ও তাহাতে লােভ-পরবশ বিশ্বামিত্রের চরিত্র, পৰ্যালােচনা
করিলে দেখা যায় যে, বশিষ্ঠ, ৰমচারী, তপঃপৰায়ণ, ধৰ্ম্মনিষ্ঠ,
কথায় সত্বগুণবিশিষ্ট কোন ব্যক্তি বা জাতি, এ
বশিষ্ঠ-তীর্থ। বিশ্বামিত্র, তপঃপরায়ণ, তেঙ্গোবন্ত, রজোগুণবিশিষ্ট কোন ব্যক্তি বা রাসিক জাতি। বিশ্বামিত্র ছলে বলে বশিষ্ঠের সেই ধৰ্ম্মরূপ সফলপ্রদ কামধেনুটা লইবার চেষ্টা করিয়া- ছিলেন। কোন সময়ে কোন মহাত্মা বলিষ্ঠকে হিন্দুর সহিত, এবং কামধেনুকে উহার সর্বফলপ্রদ ধৰ্ম্মের সহিত তুলনা করিনাছিলেন; এবং রাজা বিশ্বামিত্র সনাতন ধর্মস্বরূপ কামধেনুকে লইবার চেষ্টা করায়, সেই ধেনুরই অঙ্গ হইতে ব্রাহ্ম প্রভৃতি সম্প্রদায় বাহির হইয়া হিন্দুধর্মকে রক্ষা করি- মাছে, এইরূপ বর্ণনা করিয়াছিলেন। উক্ত মহাত্মার কথার যেরূপ মিল দেখা যাইতেছে, তাহা যদি ঠিক মনে করা যায়, তাহা হইলে বশিষ্ঠ-তীর্থের কাণ্ড ত বৰ্তমান সময়ের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য-শিক্ষার দ্বন্দ্ব বলিয়াই মনে হয়। তাহাই কি ? না, তাহাও ত হইতে পারে না; এখনকার ঘটনা দেখিয়া, তখনকার লিখিত ঘটনার কথা বলিলে চলিবে কেন? যদি বল, কবিদিগের ভবিষ্যদৃষ্টি অন্যান্য লােকের ন্যায় দেশ- কাল-পাত্র রূপ আবরণ দ্বারা সীমাবদ্ধ নহে, তাই বাল্মিকী মুনি শ্রীরামের জন্মের বহুকাল পূৰ্ব্বে রামায়ণ গাহিয়াছিলেন। যদি এক্ষেত্রে তাহাই হইয়া থাকে? দশে পাঁচে না বলিলে আমি বলিতে পারি না, অন্ততঃ বলা উচিত নহে। তা- লালী মহাত্মাগণই বলিবার যােগ্যপত্র। আর যদি সরস্বতী নদীর বিভিন্ন তীর, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য ব্যক্তিগণের বিদ্যা ও জ্ঞানের বৈষম্য নির্দেশক-স্বরূপ, এবং বশিষ্ঠ-তীর্থ উক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিগণের যুদ্ধের রঙ্গভূমি না হইল, তবে কি ?.তৰে কি উহা ঠাকুরাণী দিদির উপকথা। তাই কি উহাতে নদী নুষী হইয়াছে, এবং ব্রাহ্মণের বড়াই করিয়াছে। চিরদিনই এদেশে পতিত ৰাহ্মণ আছে; তথাপি এখন পতিত বা
२४
পুরাণ-রহস্য।
অনাচারী বিদ্যাহীন ব্রাহ্মণের সংখ্যা অত্যন্ত অধিক হওয়ায়,
ব্রাহ্মণ বলিলে সকলের মনে আর পূর্বের ন্যায় সত্ত্বগুণাত্মক
জীক মনে হয় না। এখন কাহার কাহার মনে হয়, রাধুনি
বামুন, সূত্ৰধারী (নামে, যজ্ঞসূত্রধারী) মানবকখন কখন
কাহার কাহার ব্যবহার দেখিয়া নরপিশাচ বলিয়াও মনে হয়।
কিন্তু কি করা যায় ? যদি গুণীর অপ্রতুল হয়, তবে গুণ
স্মরণ করিলেই স্বতঃই গুণী মনে হয়। আশা করি, পাঠক
গণ! সত্ত্বরজস্তম গুণত্রয়ের মোটামুটি ভাবটা জ্ঞাত আছেন।
সুতরাং “সত্ত্বগুণবিশিষ্ট ব্যক্তির কথা বলিলে, সহজেই সেই
গুণবিশিষ্ট ব্যক্তি—অর্থাৎ বদন-মণ্ডল অপূৰ্ব্ব সন্তোষ-প্রভা-
নয়নদ্বয়ে সরল অক্ষীণ সুশীতল কান্তি উদ্ভাসিত,
কর্কশত-হীন, ভয় ও সম্মানের পাত্র ইত্যাদি গুণবিশিষ্ট
কোন ব্যক্তি—নয়ন-পথে আবির্ভূত হইয়া থাকেন। তাই
বলিতেছিলাম, যদি জগতে নিষ্কলঙ্ক শশী দেখিবার এত
সাধ থাকে, যদি বিনাখাদে গঠিত অলঙ্কারের এই প্রিয়
হও, তবে গুণের উল্লেখ করিয়া গুণীর নাম নির্দেশ কর।
বশিষ্ঠকে ব্রাহ্মণ বলিতে যদি সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি হেতু
আপত্তি থাকে, তবে তাহাকে সত্ত্ব গুণাত্মক ব্যক্তি বা-জাতি
বলিতে
বােধূ হয়, কাহারও আপত্তি হইবে না। যদি
ব্রাহ্মণের (ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র বা ম্লেচ্ছাদি অপর কোন)
নাম লইতে কাহারও আপত্তি থাকে, তবে রজোগুণবিশিষ্ট
(অর্থাৎ দম্ভ, মাংসৰ্য, হিংসা, নিষ্ঠুরতা, যশঙ্কামনা, প্রভুত্ব
প্রিয়তা প্রভৃতি গুণবিশিষ্ট) ব্যক্তি বা জাতিই বিশ্বামিত্রের
মুর্তি বলিতে বােধ হয়, কাহারও আপত্তি হইবে না।
এই প্রকার গুণসম্পন্ন দুই ব্যক্তি বা জাতি, ভগবতী
বিদ্যাদেবীর বিভিন্ন মুর্তি-ব্যঞ্জক দুই তীরে বসিয়া আছেন।
বশিষ্ট-তীর্থ। = ও রজোগুণবিশিষ্ট ব্যক্তি চিরদিনই বিদ্যমান আছে বলিয়া মনে করা যায়। তাই পুরাকালের-মহাভারতের সময়ের, ঐ দুই গুণবিশিষ্ট ব্যক্তির দ্বন্দ্ব, এখনও বর্তমান বলিয়া অনুৰ কয়া যাইতে পারে। উভয়েই তপন্থী, উভয়েই বিদ্যার অনুশীলন করিয়া থাকেন। সেইজন্য পুরা: কালেও একদিন পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যবাসী দুইজনে বা দুই দলে দ্বন্দ হইয়া, তাহার ফলে, একের হস্ত হইতে বেদ- পুরাণাদি বাহির হইয়াছিল, আর অপরের হস্ত হইতে নানা- প্রকার অস্ত্রশস্ত্রাদি বাহির হইয়াছিল। এখনও তাই হইতেছে ; অর্থাৎ এখন, সদ্বিরা বিশ্বামিত্রের শাপ প্রাপ্ত হওয়ায়, পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সাহায্যে লােকহত্যা, লােকের কর্মলােপ সুতরাং আহার লােপ, অপরের কঁকি দিয়া লইবার নানা- প্রকার উপায় উদ্ভাবিত, হইতেছে। যে আকাঙ্ক্ষায় এইরূপ করিতেছে, তাহাকেই রজণ-সভূত লােহিতবর্ণ বলা যায়। পক্ষান্তরে কোথাও কোথাও ইহারই প্রভাবে গুপ্তহত্যার সংবাদও পাওয়া যায়। তাই বলি, যে বিদ্যাবলে এইরূপ ঘটিতেছে, তাহাই লােহিতবর্ণা সরস্বতী। তাই শুনিতেছি, বিশ্বামিত্র বলিতেছেন :— বশিষ্ঠ আছয়ে যােগে বসিয়া আসনে। অন্তর্বাহ জ্ঞান তার মাহিক কথনে। জলে একাকার করি ভাবাও মুনিরে। অবিলম্বে বশিষ্ঠেৰে আনহ এ পারে।” ( কাশীরাম দাসের মহাভারত।) তাই দেখিতেছি, আজ শাদি আলােচনা ছাড়িয়া, কিসে পরপহরণ করিব, ইহা চিন্তাই পৃথিবীতে প্রবল হইয়াছে। তাই বশিষ্ঠের “অৰ্বাৰ আনহীনতার সুযােগ পুরাণ-রহস্য। বুঝিয়, কল কারখানা, বাষ্পীয় যন্ত্র, বৈদ্যুতিক কাণ্ডে. দেবী সরস্বতীর যে মূর্তি দেখা দিয়াছে, তাহারই প্রভাবে বশিষ্ঠের সর্বনাশ করিতে বিশ্বামিত্র কৃতসঙ্কল্প হইয়াছেন। কিন্তু কিছু পরে তাহাতে অক্ষম দেখিয়া, শাপ-প্রদান করিয়াছেন। অর্থাৎ পাশ্চাত্য সভ্যতা যেন প্রথমে বশিষ্ঠকে ধ্যানস্থ দেখিয়া বাকশক্তিহীন জন্তু বিশেষ মনে করিয়া, ঔাহার ধৰ্ম্মসদৃশ প্রাণনাশের চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি তেমনি ধ্যানস্থ থাকিলেন দেখিয়া, তাঁহাকে শাপম্বরূপ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ শিক্ষা দিয়া তাহার হৃদয়ে রজগুণ ব্যঞ্জক লােহিতবর্ণের সরস্বতীর আবাস করিয়া দিলেন। যাহা হউক, এক্ষণে শাস্ত্রাদি পুনঃ প্রকাশে বা আলােচনায়, গতাসু মুনিকে লইয়া দেবী সরস্বতী পলায়ন করিতেছেন, দেখিতেছি। এক্ষণে শাপগ্রস্ত সরিরা রক্তাক্তকলেবরা রাক্ষসের পেয় হইয়াছেন দেখিয়া, কোমৎ, এমার্সন, গেটে প্রভৃতি মুনিগণ আবার ব্যাকুল হইতেছেন। কিসে দেবী আবার নির্মল। হয়েন, সেই চিন্তায় যেন জীবন অতিবাহিত করিয়া যাইতে- ছেন। এইরূপ পুনঃপুনঃ সত্ত্বগুণসম্পন্ন মুনিগণের আগমন হইলে, আবার সরির নির্মলা হইবেন, এরূপ #শা করা যায়। পাঠক! এখন বলুন, কালের অঙ্গের যে অঙ্গের যে স্থলে সরস্বতী ঐরূপ নিৰ্মলা হইবেন, সেই স্থল বশিষ্ঠ-তীর্থ কি না? যদি তাহা না হয়, তবে হে জড়বাদি ! হে সঠিকবাদি (Positivist)! হে ভক্তবৃন্দ। আপনারা কৃপা করিয়া আমায় সেই মহাতীর্থ দেখাইয়া দিউন। আমি উক্ত সরিধারার বিন্দুমাত্র নিৰ্ম্মল সলিল গ্রহণ করিয়া উদ্ধার হই।,
AJU, HOWRAHY
MU TUBLIC LIBRAFE
std. 1902,
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ।
"There is a circle throughout nature."--Emerson.
(পূর্বাভাষ।)
কাৰ্য্যগতিতে ভারতবর্ষের প্রায় বিভিন্ন প্রদেশ কয়টাই
বেড়াইয়া আসিতে হইয়াছে। মাঙ্গ প্রদেশে মাদ্ৰাজী বা
দাক্ষিণাত্য বাণীকে সাধারণতঃ নগ্নপদ, (একখানি পরিধেয়
বস্ত্র ও একখানি উত্তরীয় যুগল বধারী, দীনবেশ দেখি।
আসিয়াছি। উহাদিগকে দেখিলেই যেন সাধকের জাতি
বলিয়া সহজেই প্রতীয়মান হয় । উহাদিগকে প্রধানত
তামিল
এবং
ত্রৈলঙ্গভাষী দেখিতে পাওয়া যায়।
মান্দ্রাজ প্রদেশ হইতে বােম্বাই, রাজপুতানা এবং qata
প্রদেশের শস্ত্র ও শাস্ত্র আলোচনাকারী ভারতের পশ্চিম
প্রান্তবাসী, তৎপরে আর্যাবর্তের মধ্যভাগের সতে, দাম্ভিক,
সলচিত্ত উত্তর পশ্চিমাঞ্চলবাসী এবং আমাদের বাঙ্গালা,
প্রদেশের ধর্মভীরু, হীনতেজ, নিরীহ বঙ্গবাসী পৰ্য্যন্ত দেখি,
লাম। কাৰ্যগতিতে এই সকল প্রদেশবাসীর সঙ্গে মিশিতে
হইয়াছে। সঁহাদিগের সহিত মিশিতে হইয়াছে, তাহাদিগের
ব্যক্তিগত হৃদয়-চিত্র (বা চরিত্র, Character) বেশ পরিষ্কার
মনে না থাকিলেও তাঁহাদিগের জাতিগত হৃদয়চিত্ৰ আমাৰু
মন হইতে এখনও বিলুপ্ত হয় নাই। যখন . মাম্রাজ,
• ত্রিচিনাপলি বা গােলাপুর নিবাসীকে মনে পড়ে, তখন যেন
পুরাহ।
তাঁহাদের জাতিগত সতেজতা, বিনয় এভৃতি গণের,
মূর্তি আপনা হইতেই মনে গাইলে। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের
কয়েকটা ভদ্রলােকের সঙ্গে আলাপ হইয়াছিল, প্রথমে
তাঁহাদিগকে দেখিয়া তাহারা ইংরাজী জানেন, ৰা ইংরাজী
কোনকালে পড়িয়াছেন, তাহা কিছুমাত্র বােধ হয় নাই।
তাহাদের স্বপ্রদেশীয় বেশভূষা, স্বাভাবিক নম্রতা ও ফী
ভাব, বিলাতী বিকৃতভাবে পরিণত হয় নাই। মহারাষ্ট্রীয়,
উত্তর পশ্চিমাঞ্চলবাসী এবং বিশেষ করিয়া এই হতভাগ্য
বাঙ্গালীর প্রতি তাহাদের যেন অভূতপূর্ব ভক্তি।
ভক্তি। এস্থলে
বলিয়া রাখি, মাদ্রাজে জাতীয় সমিতির অধিবেশনের পূর্বে
এবং পরে, দুই সময়েই এই তাৰ দেখিয়াছি। আমরা
বাঙ্গালী বলিয়া যেন ভাহারে নিতান্ত আপনার লােক,
আমাদের সঙ্গে কথা কহিয়া যেন তাহা পরম আপ্যায়িত
বােধ করেন। মােটামুটা মিল ও তৈলঙ্গতাষী জনপদের
এইভাৰ হৃদয়ে গ্রহণ করিয়া আসিয়াছি। তৎপর্কে মহারাষ্ট্রীয়,
রাজপুত ও পঞ্চাৰীদিগের প্রিয়দর্শন মূর্তি ও সুমধুর ভাষা
নয়নপপে ও শ্রবণবিবৰে যেন সদাই আসিতেছে।
ক্রমে উদ্ধতভাব, সরলহৃদয়, হিন্দুস্থানী ও উত্তর পশ্চিা
এদেশবাসী সােদর প্রতিমগণের বিশালতাৰ হৃদয়ে প্রতিফলিত
হইতেছে।
অবশেষে ধীয়, নিরীহ, শান্তপ্রিয় দেশগণের কথাও
মনে উদিত হইতেছে।
ই সকল প্রদেশীয় কয়েকজনের সহিত গতিতে
শত্রু মিত্ৰতা উতই ঘটিয়াছে, এবং তারই ফলে উক্ত
চরিত্রটি আমার হৃদয়ে প্রতিফলিত হইয়াছে। বাহ
হক, ঔ কয় এদেশে ভারতকে এখন পাট গুগে
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। ২৯ • বিক্ত মনে করিলে পাঁচখানি চিত্র তাই নয়নপথের গােচর এবং মনে হয়, এরূপ বিভিন্ন ভাবাপন্ন এক দেশ- ৰাসী কি কখন এক হইতে পারে ? (পরিচয়।) কিছুদিন পরে প্রবাস হইতে আসিয়াছি, এমন मघद्र একদিন সন্ধার পর মহাভারত গড়িতে বসিলাম। মহাভারত খুশিমাত্ৰ সভাপর্ব–“পাশাখেলা” বাহির হইল। সেইস্থানটা পাঠ করিতে আরম্ভ করিয়া, ক্রমে দ্রৌপদীব নিৰ্যাতন ও পাণ্ডবের বনবাস পর্যন্ত পড়িলাম। পাঠ সাঙ্গ ইলে, কিছু পরে নিদ্রা গেলাম। নিদ্রাবস্থায় স্বপ্ন অনেক কথা মনে হইয়াছিল। সকল কথা যদিও এখন মনে নাই; তবে কথাগুলি যেন কেমন কেমন বোধ হইল, সেইজন্য লিখিয়া রাখিতে প্রবৃত্তি হইল। পণ্ডিতেরা উহার বিশিষ্ট টাকা করিয়া দেখিলে, কথাগুলি তাহাদের সাত বােধ হয় কি না, জানি না। তবে পুরাকালে আর ঋষিগণ সরজতম গুণত্রয়ের ন্যূনধিক ধরিয়া যে সকল চরিত্র ৰচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহা দেশকাল-পাত্র নির্বিশেষে ব্যাগ চরিত্র বলিয়াই মনে হয়, এবং তদনুসারে যে সকল কথা মনে হইয়াছিল, তাহা মােটামুটি অযথা বােধ হইতেছে । এই আশা করি, কোন সহৃদয় পণ্ডিত পাঠক ইহার কায়সঙ্গত ব্যাখ্যা করিয়া দিবেন। মনে হইল,-হষি ব্যাসদেব ভারতের উক্ত প্রধান প প্রশেবাগীর চরিত্ত লইয়া হাত পাখালি পারি গড়িয়াছেন। যথা- (১) চাযােংক ৰাণীৰ পাৰ খরিয়া বুথি। বাণী , বি-বাণীই হৰে হৈ
পুরাণ-রহস্য।
লী-বাঙ্গালীরই হৃদয়ক্ষেত্রে “গৌড়েনােৎপাদিত বিদ্যা
অল্পের বিকাশ-বাঙ্গালীই মহামায়ার প্রধান সেবক ইত্যাদি
ধর্ম-সম্বন্ধীয় কাণ্ড এবং যুধিষ্ঠিরের ধর্মভাৰ তুলনা করিলে,
যেন অনেক মিল পাই। যুদ্ধকার্যে বাঙ্গালীর এবং যুধিষ্ঠিরের
রাহিক বিকাশ একই প্রকার বলিলে, বােধ হয় অন্যায় হয়
না। অবশেষে মহাত্মা (!) মেকলে কর্তৃক বাঙ্গালীর মিথ্যা-
বাদী বদনাম টুকু পর্যন্ত যুধিষ্ঠিরের সহিত মিল পাইতেছি।
এতদ্ব্যতীত অৰ্জনাদি চরিত্র বুঝিবার প্রসঙ্গে যুধিষ্ঠিরকে আরও
বুঝিবার চেষ্টা করা যাইবে।
(২) ভীমের ভীমত্বের সঙ্গে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলবাসীর
চরিত্রগত মিল সহজেই অনুমিত হয়। উভয়েই সরলচিত্ত,
উদ্ধত এবং মহা পরাক্রমশালী। যুধিষ্ঠিরের ন্যায় নেতা
পাইলে ভীম যেমন রণক্ষেত্রে অজেয় বলিয়া বােধ হয়,
উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বাসীদিগের পরাক্রমশালিতা তদপেক্ষা
কোন অংশে নন বলিয়া ৰােধ হয় না। পাশাখেলার
কাপট্য না বুঝিয়া তদুপলক্ষে সরলচিত্তে রাজ্যনাশের এবং
তাহার পর আপনাদিগের দুরবস্থা ভাৰিয়া ভীমই কেবল
( কখন স্বয়ং কখন বা দ্রৌপদীর সঙ্গে যােগ দিয়া) যুধিষ্ঠিরকে
মধ্যে মধ্যে বাক্য-যন্ত্রণা দিয়াছেন। আর এইরূপ ক্ষেত্রেই হিন্দু-
স্থানীর সহিত বাঙ্গালীর মনােমালিন্ত মধ্যে মধ্যে ঘটিয়া থাকে।
(৩) পঞ্চাব হইতে মহারাষ্ট্রীয় দেশ পর্যন্ত ভারতের
পশ্চিম ভূভাগে কি ধর্মভাব, কি বীরত্ব, উভয়বিধ দৃষ্টান্ত
বহুল পরিমাণে পাওয়া যায়। শিং, রাজপুত এবং মহা
রাষ্ট্রীয়দিগের ইতিহাসই তাহার আল্যমান প্রমাণ। নানক,
কবীর, গুরুগােৰিল, মহারাণা প্রতাপসিংহ, শিবলী, ৰাজীরা
পেশােয়া এবং মশাজী, এই খণ্ডে বৈষতিকর ও কাৰ
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। মতার দৃষ্টান্ত নিয়াছেন। তাই বলি, ইহাদের ভাৰ ইমা অর্জুন সৃষ্ট হইয়াছেন। পাণ্ডবগণের মধ্যে কার্ধক্ষেত্রে অর্জুনের যে গন, তাহাতে তাহার প্রসঙ্গ আর একটু পরিষ্কার করিয়া দুই একটা উদাহৰণ দেখিয়া বুঝিতে চেষ্টা করিলে বােধ হয়, সক চরিত্রগুলি বুঝিবার পক্ষে একটু সুবিধা হইতে পাবে। বাঙ্গালী একবারে “বিশ্বপ্রেম” লইযা ব্যস্ত, কিন্তু পঞ্চাৰী ধর্ম-সংস্কাব স্বদেশের প্রেমে উন্মত্ত। ভ্রাতাগণ যতই কষ্ট পাউক, যুধিষ্ঠিব সত্যের জন্য ব্যাকুল; আর অর্জুন ভাই- দিগের জন্য ব্যাকুল। অৰ্জ্জুন অস্ত্র শিক্ষা করিবার জন্য স্বর্গে যাইতেছেন। হিমাদ্রি পর্বতের পৰ বহুদুঃখে গন্ধমাদন পর্বতে উঠিলেন। তথায় উঠিয়া শূন্য বাণীতে শুনিলেন :- “অগ্রে পথ নাহি আছে মনুষ্য যাইতে। শুনি পার্থ মহাবীর রহিল তাহাতে। হেনকালে দেখিলেন জটিল তপস্বী। অনেরে বলিলেন নিকটেতে আসি। কে তুমি কবচ ও ধনু অস্ত্র ধরি। কি হেতু জাইলে তুমি পৰ্বত উপবি । অস্ত্রধারী হৈয়া তুমি এলে কি কাবণ। এ পর্বতে নিবসে নিস্বামী যত জন। এর কেলহ ফেলহ শর তুণ। দিব্যগতি পেলে অন্ত্রে কি প্রয়ােজন । বড় তেলােব তুমি আইলা সে কারণ। শুনিয়া নিঃশব্দ হৈয়া রহেন অনুন। উত্তর না পাইয়া বলয়ে টাখন। র মাগ ধনঞ্জয় আমি পুরন্দর।
৩২ রাহ। করঘােড়ে অর্জুন মাগেন বসান। কৃপা যদি কর তবে দেহ ধনুর্বাণ। ইন্দ্র বলে হেথা আমি কি কাজ অন্যেতে। দেবত্ব লইয়া ভোগ কহ স্বর্গেতে। পার্থ বলিলেন যদি ইন্দ্রপদ পাই। তথাপি ত্যজিতে আমি নারি চারি ভাই। দুর্গম অরণ্যে রাখি আইনু ভ্রাতৃগণে। অস্ত্র বাঞ্ছা করি আমি শত্রুর নিধনে।” (কাশীরাম দাসের মহাভারত, বনপর্ব।) এইত অর্জুনের কথা। আর শিখ-গুরু গােবিন্দলীয় একটা স্তব এই সঙ্গে পাঠ করিয়া দেখা যাউক। শক্তি বরূপ ৩ নয়নাদেবীকে উদ্দেশ করিয়া এইরূপ স্তব পঠিত হয়। “নমঃ উগ্ৰদন্তী অনন্তী সবইয়া। নমাে যােগেশ্বরী যােগ মায়িয়া। ১। নমাে কেহরী (১) বাহনী শহত্তি। নমাে সারদা ব্ৰহ্মবিদ্যা পটুন্তি ॥ ২ নমাে ঋদ্ধিদা সিদ্ধিদা বুদ্ধিদায়নী। নমাে কাকে কালকে কাছেনী ॥ ৩॥ নমাে কাল আজাল হা হের তেরাে নমাে তিহলােক কিননা আহেরাে। ৪। নমাে জ্যোতি আলা তােমে বেদ গায়ে । রানুর রিখি (২) সুর নহি ভেদ পায়ে। ৫। তুহি জয় করত্তি অনুর গহি পচ্ছারে । তুহি ৰােগ যুগতনি তুহি খড় খায়ে ॥৬॥ তুহি যােগিনী খপ্লণ অদেখং। ‘রক্তবীজকো প্রাণকে পাকড়, সােখ। ৭। তুহি জল খলে পর্বতে গিরি নিবাসী। তুমি সঙঘটনমাে নিরলস্ প্রকাশি (১)কেশমী। ২) ঋষি।
দৌপদীর বস্ত্রহরণ।
৮। তুহি দুষ্ট চাহনি তুহি সৰ্বপালী। তুহি বৃছ (৩)
পােপা (৪) তুহি আপমালী ॥ ৯। তুহি বিতরণী তুহি
জগ্ প্রকাশি। তুহি আলথ বরণী তুহিত্ আকাশী । ১
নমে জলপা দেবি দুর্গে ভবানী। তিহুলােক নব খণ্ডমৈ
তুম প্ৰধানী ১১। অটলছত্র ধরণী তুহি আদি দেবং।
সকল মুনিজনা ভােহি নিশদিন সরেবং ১২। তুহি কাল
আকাল কি জ্যোতি ছাজৈ। সাজয় সদাজয় সদায়
বিরাজে ॥ ১৩ | এহি দাস মালৈ কৃপাসিন্ধ কিলৈ ।
স্বয়ং ব্রহ্মকি ভক্তি সর্বত্র দিজৈঃ ॥১৪। তুহি জাগতি
জ্যোতি জ্বালা স্বরূপং তুহি সকল জগমে মন্তি অনুপং ১৫।
মহামুঢ় হও দাসন্তেহাবা। পাকড় বাহু (৫) ভবন
বেগপাব ৷ ১৬ ৷৷ ফতেহি ডঙ্ক বাজৈ কৃপা ইয়ং
করিজে । এহী বাবতা দাস কি নিৎ শুনিজে।। ১৭।
করই হক আপনা সফল দুষ্ট বাযু ॥ তুব হিলকা সকল
ঝগরা মিটাযু। ১৮ ॥ আগম সুবীরে উঠে সিংহ যােবা।।
পাক, তুক ননকে। করে বৈ নিরােধা। ১৯॥ সকল
জগৎম খালিসা পন্থরাজের জগেধৰ্ম্মাহিন্দু তুরদুন্দভাজে
# ২০ জপো জাপ একা হবে হরি অকাল হষ
সবহুনী তব নিচ্ছকমে নেহালং ২১। শুনো তুম ভবানী
হাম কি পুরে কবাে দাস পর মেহব আম্
অপারে। ২২ *
[ এস্থলে বলিয়া রাখি, এখানে হিন্দু মুসলমান লইয়া
কথা হইতেছে না। মুসলমানেরাও এখন হিন্দুদিগের ন্যায়
ভারতবাসী; সত্যপীর এখন সত্যনারায়ণ হইয়াছেন। সুতরাং
;
(৩) বৃক্ষ। (৪) পুপ। (৫) বাহু।
৩ পুরাণ-রহস্য। এখানে হিন্দু মুসলমানের তর্ক উঠান আমাদের উদ্দেশ্য নহে। এলে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলবাসীর স্বদেশানুরাগ দেখাইবার অই উক্ত স্তব উদ্ধৃত হইয়াছে। ] এরূপ আরও অনেক গুলি স্তব শিখদিগের নিত্য পাঠ্য। ইহা নিতান্ত কবির কাব্য বলিয়া পঠিত হয় না। ইহা দেবতার উদ্দেশে , ভক্তিভাবে পাঠ করিবার জন্য নির্দিষ্ট হইয়াছে। কথিত আছে যে, গুরুগােবিন্দজী এইরূপ কয়েকটা স্তব পাঠ করিয়া নয়নাদেবীকে প্রসন্ন করিয়াছিলেন। ধর্মভাবের সঙ্গে সন্মিলিত এরূপ স্তবাদি ভারতের ঐ অঞ্চলেই শুনিতে পাওয়া যায়। অন্যান্য অঞ্চলে স্বয়ং ব্রহ্ম কি ভক্তি সর্বত্র দিজৈ” এরূপ কথা বিস্তর শুনিয়াছি ; “মহা মুঢ় হও দান্তেহারা, পাকড় বা ভবজল করে বেগ পারা” এরূপ কথাও অনেক শুনিয়াছি। নিজের জন্য অথবা একবারে বিশ্বের জন্য ভাবিতে বা কাঁদিতে অনেক শুনিয়াছি। কিন্তু, “গর্ভে জন্ম নিয়েছ যার, জননী সে তােমার, কৈ বন্ধন মুক্ত কলে তার, এবে যশােদার বন্ধন স্বীকার করেছ।” একথা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকেই স্মরণ করাইয়া দিতে হইয়া- ছিল, তবে আর অন্য পরে কা কথা। মায়ের বন্ধনমুক্ত করিবার জন্য ভগবানকেও তব স্তুতি করিয়া জানাইতে হয়। অর্জুনের ন্যায়, মহাপুরুষগণ স্বর্গসুখ পাইয়াও ভাই- দিগের দুঃখ ভুলেন না,-ইহাই অর্জুনের অর্জুনত্ব। অন্যান্য পাগণের হৃদয়ে ভাইদিগের জন্য টান ছিলনা, একথা বলি না। তবে অর্জুনের যথাসর্বস্ব জপ, জপ সকলই ভাইদিগের অন্ত, নিজের সুখের জন্য নয়। তাইদিগের
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ।
প্রতি যুধিষ্ঠিরের যে টান ছিল, তাহা ধর্মভাবে পনের আনা
তিন পাই ঢাকা। বাঙ্গালা এদেশের তল্লাদিতেও সেই
ভাব দেখা যায়।
(৪) ও (৫) তামিল ও ত্রৈলঙ্গভাষীদিগকে (মান্দ্রাজ
ব) মরাজ তনয়ার পুত্রদ্বয় অর্থাৎ নকুল ও
ভাবিলে বােধ হয়, অসঙ্গত হয় না। ইহারা বীরত্বে নিতা
নূন নহেন। পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি যে, আর্যাবর্ত বাসী-
দিগের প্রতি ইহঁদের জ্যেষ্ঠ-বুদ্ধি বিলক্ষণ। আর্যাবর্ত
বাসী যখন যাঁহার অধীনে থাকেন, ইহাদের পরিচয় অবধি,
ইহাদিগকেও তাহারই অধীনে দেখা যাইতেছে। ইহারা
প্রধানতঃ অনাৰ্যভাষী হইলেও সমস্ত ভারতবর্ষকে এক্ষণে
আর্যাবর্ত মনে করিয়া, আপনাদিগকে আৰ্য বলিয়া পরিচয়
দিয়া থাকেন। এখন পর্যন্ত শাস্ত্রচর্চা দ্বারা এবং শঙ্করাচার্যের
ন্যায় ব্যক্তিকে জন্ম দিয়া দাক্ষিণাত্য ভূমিও প্রকৃতই আৰ্যাৰ
হইয়াছে। মাদ্রাজ অঞ্চলেই বর্তমান কালে জাতীয় মহা সখি
লনের সময়ােচিত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। সহদেবই পাণ্ডবদিগের
মধ্যে পুণি পাজি সবিশেষ নাড়াচাড়া করিতেন, এবং শাস্ত্রীয়
ব্যবস্থাদির সময়ােচিত কারণ-সম্বন্ধে সন্দেহভঞ্জন করিতেন।
এই সকল মিল দেখিয়া ইহাদিগকে নকুল ও সহদেবের স্থান
দেওয়া হইয়াছে।
এইরূপে পঞ্চ পাণ্ডবের ইতিহাস ভারতবাসীর ইতিহাস
অথবা এই পাঁচটা জাতি কোনকালে পাঁচ ভাই হিল,
এক্ষণে এক একজনের বংশে এক এক এদেশবাসী লােক
হইয়াছে, এরূপ ভাবা যাইতে পারে। কিন্তু যদি এক এক
দেশবাসীই এক একজন পাণ্ডৰ বলিয়া অভিহিত হইয়া
এরূপ মনে করা যায় ; তাহা হইলে তাঁহাদের
পুরাণ-গ্রহ।
জন্ম ব্যাপারটা আর অদ্ভুত মনে হয় না। এক এক প্রদেশ
কিরূপে ঐ সকল গুণসম্পন্ন লােক দ্বারা অধিষ্ঠিত হইয়া-
ছিল, তাহারই ইতিহাস মাত্র বলিয়া মনে হয়।
ভােজরাজ তনয়া কুন্তী বা পৃথাই যে আৰ্যাব, এবং ক্রমে
প্রসারিত হইয়া ভারতবর্ষ হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহা সহজেই
অনুমিত হয়।
দ্রৌপদী-সম্বন্ধে এইরূপ ভাব মনে হইয়াছিল, যে, অযযানি-
সম্ভবা পাঞ্চালরাজ-নন্দিনী পাঞ্চালী পঞ্চ দেবােপাসক হিন্দু
বা পাণ্ডবপত্নী অথবা ভারত সমাজের হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী
দেবী বা ভারতের রাজলক্ষ্মী ব্যতীত আর কে হইতে
পারেন ? ইহার অপর একটি নাম কৃষ্ণা—ইহার ব্যাপার
দুঞ্জের বলিয়াই বােধ হয়, ইহাকে কৃষ্ণবর্ণা করা হইয়াছে।
ইনি পাণ্ডবগণের মনােমধ্যে অবস্থিতি করেন। জড়মুক্তি
ইর নাই বলিয়াই, ইনি অযযানিসম্ভবা-মাটীর সঙ্গে
ইহার সাক্ষাৎ সংস্রব নাই। ইহার পিতা পাঞ্চালরাজ।
বৈয়াকরণিকেরা বলিতে পারেন, পঞ্চ শব্দের সঙ্গে পাঞ্চালির
সম্বন্ধ কি ? ইহার জন্মস্থান পাঞ্চাল, এবং ইহার স্বামীও
পঞ্চন। এই পঞ্চজন কি, তাহা কবি, বৈয়াকরণিক
অথবা বিজ্ঞানবিদ যদি স্থির করিয়া দেন, তাহা হইলে বােধ
হয়, প্রকৃত পণ্ডব ইতিহাস বুঝিতে পারা যায়। নিদ্রিা-
বস্থান, বা স্বপ্নবৎ চিন্তার, কথা তর্কে টিকে না।
শুনিয়াছি, কোন মহাত্মা না কি পঞ্চ পাণ্ডবকে পঞ্চভূত
ও দ্রৌপদীদেবীকে বুদ্ধির সহিত মিলাইয়া আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
করিয়াছেন। আমাদের ভাগ্যদোষে উক্ত মহাত্মা এখন আর
ইহ জগতে নাই, এবং তিনি কিরুপ এরণে ঐ আধ্যাত্মিক
ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন, তাহাও আর এখন দেখিতে পাইবার
জৌপদীর বস্ত্রহরণ। ও) উপায় নাই। যাহা হউক, এক্ষণে ভারতে উক্ত পাব প্রকৃতি জাতিগণকে দেখিয়া বােধ হইতেছে, পুরাকালে ঐরুপ জাতি বা ব্যক্তি ছিল, অথবা কবি-কল্পনায় রূপ প্রকৃতি বিশিষ্ট, পঞ্চভ্রাতাব সৃষ্টি হইয়াছিল। এতই যদি কল্পনাৰ উপজীব্য হয়, তবে কবি হয়, সরকতম গুণ- এগের নানাধিক সমাৰেণ কবি, অথবা প্রত্যক্ষ ঐরূপ প্রকৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তি বা জাতি দেখিয়া পঞ্চ পাণ্ডৰেৰ চরিত্র গড়িয়াছেন। পূর্বেই বলিয়াছি, যদি উহা ব্যক্তিগত ধৰা যায়—তাহা হইলে উহাদেব জন্মকথা কেমন কেমন ঠেকে—অর্থাৎ আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝিতে পারি না। কিন্তু জাতিগত ধৰিলে, জননী জন্মভূমি কুন্তীদেবীর সন্তান বলিলে যেন কতক বুঝিতে পারা যায়। আর উক্ত মূহ- পুরুষের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার কথা শুনিয়া বোধ হয়, ব্যাসদেব ইহা কেবলমাত্র সােজাসুজী পাচটা ভাইয়ের গল্প লেখেন নাই , হয় ত উহার কতক ঐতিহাসিক, কতক কৰি কল্পনা। কিন্তু কতদূর ঠিক, কতদুৰ কৰিকল্পনা, তাহা বলা যায় না। তৰে চবিত্র গুলি যেরূপ ভাবে দাঁড়াইয়া আছে, তাহ এখনও দেখা যাইতেছে, এবং উহাদের সহিত প্রকৃতি গত মিল এবং কোথাও কোথাও জাতির নামে শব্দ সাদৃশ্য দেখা যাইতেছে। ইহাতেই বেশ প্রতীয়মান হইতেছে যে, বর্তমান ভারতবাসী না হউক, এইরূপ প্রকৃতি-বিশিষ্ট কোন জাতি বােধ হয় কোন সময় ছিল, এবং তাহাদিগকে উপলক্ষ ফরিষা ব্যাসদেৰ মহারতের ব্যাপার লিপিবদ্ধ কবি গিয়াছেন। যদি তাই হয়, তবে কুরুর ন্যায় এক জাতি ছিল, যাহাদের কর্তা অশান্তানুসারে রাহা না হইলেও কার্যত
পুরাণ-মহ।
রাজা ছিলেন। (অন্ধ অনেক প্রকারের হয়। যাহার চ
নাই, সে অন্ধ ; যে দেখিয়াও বুঝিতে পারে না, সেও অন্ধ ;
আর যে দূরে থাকিযা দেখিতে পায় না, সেও এক একাৰ
।) নিগণের প্রতি তিনি এতই মায়াবৃদ্ধ যে, ধৰ্ম্মত
বাৎসল্য ভাবাপন্নদিগের প্রতি বে-পরবশ ছিলেন। অন্ধরাজ
মুখে বা মনে যদিও অধিকাংশ সময়েই ন্যায়পথে এবং চীয়,
দ্রোণ, বিহুরাদির ন্যায় মহামতিগণের পরামর্শানুসাবে চলিতে
চাহিতেন; কিন্তু কাৰ্যতঃ ধাবাগণের শকুনি ও কর্ণাদির
সহিত পরামর্শ করিয়া যাহা বলিতেন, তাহাই দাড়াইত।
এমন কি, দ্রৌপদীর বস্ত্রহবণে ভীষণদৃশ্য দেখিয়া দ্রৌপদীকে
অভয় দান করিলেও আবার দ্যুত ক্রীড়া চলিযাছিল।
এখন বলা যাইতে পারে, কুরু-পাণ্ডবগণের ইতিহাস
যদি উক্ত প্রকার কোন জাতির ইতিহাস হয়, তাহা হইলে
একপকে উহার অনেক আপাত-অসঙ্গত কথা সঙ্গত বলিয়া
বােধ হয়; এবং অপর পক্ষে উহা হইতে আমাদের শিক্ষণীয়
অনেক কথাও পাওয়া যায়। তাই বলি, পণ্ডিতমণ্ডলী
যেমন মহাভারতের নানা ব্যাখ্যা দেখিয়া থাকেন, সেইকপ
ইহার এই ভাবটা দেখিলে, আবও অনেক তথ্য বাহির
হইতে পারে।
(প্রমাণ)
মুল মহাভারতের প্রধান প্রধান ঘটনাগুলি মহাত্মা
কাশীৰাম দাসের মহাভাবতে বেশ অল্প কথায় বর্ণিত
হইয়াছে। এই জন্য এস্থলে কাশীদাসী মহাভারত হইতে
কয়েকস্থল উদ্ধত কবিয়া সংক্ষেপে আমাদের কথা সঙ্গত,
কি না, তাহা প্ৰঙ্গিপন্ন করিতে চেষ্টা করি। দ্রৌপদী
নির্যাতনের সময় উভয়দলের একটা বিশেষ সংবর্ষের সময়।
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ।
এইরূপ সময়েই প্রায় চরিত্র প্রস্ফুট হয়, এবং ঐরূপ হল
পাঠ কবিয়াই আমার হৃদয়ে কুরু-পাণ্ডবের চিত্র এরূপ
ভাবে উদিত হইয়াছে।
পাশাখেলা . হইয়া গিযাছে। পাণ্ডবগণ কপট পাশা
পরাজিত হইয়া ধার্তরাষ্ট্রগণের কর-কবলিত হইয়াছেন।
পাণ্ডবগণের রাজলক্ষ্মী স্বরূপিণী দ্রৌপদী •একমাত্র ধরে।
আচ্ছাদিত হইয়া, দুঃশাসন কর্তৃক কেশাকর্ষিত অবস্থায়
সামধ্যে আনীতা হইয়াছেন। তখন যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে
পণ করিয়াছিলেন কি না ? তাহার উপর কুরুর সত্ব
সাব্যস্থ হইছে কি না ? এইরূপ প্রশ্ন উঠিয়াছিল। এমন
সময় কুরু-কুলোদ্ভব সহৃদয় বিকর্ণ বলিতেছেন।
“ভামধ্যে আছে বড় বড় রাজগণে।
দ্রৌপদীর
প্রত্যুত্তব নাহি দেহ কেনে।
পুনঃপুনঃ দ্রৌপদী যে কহিছে সভায়।
সভাসদ লােৰ হেন বুঝিতে যুয়ায়।
সভায় থাকিয়া যদি বিচার না করে।
সহস্র বৎসর থাকে নরক ভিতরে।
এ যে ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র বিদুর সুমতি।
কুরুকুলে হর্তা কর্তা এই তিন কৃতী।।
এ তিন জনের নারি করিতে হেলন।
তােমরা উত্তর নাহি দেহ কি কারণ।
পুনঃ পুনঃ দ্রৌপদী কহিল বারবার।
বা যেই চিন্তে আছে ফরহ বিচার।
এই স্কুলে বলি-রং কুকুােেয়ব ইয়াও বিকর্ণ সেপ
ৰতা করিতেছেন, ইহা আমাদের দেশে শিক্ষিত সদায়ে
পুরাণ-মহল। নিকট এখন নুতন বলিয়া বােধ হইবে না। তবে রাজ- কার্য চালনা-সম্বন্ধে তিনি যে ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র এবং বিদুর এই তিনটা শক্তির উল্লেখ করিয়াছেন, ইহাও স্থায়ী শক্তি কি দেখা যাউক। (১) ভীষ্ম-বাৰ্তরাষ্ট্র এবং পাণ্ডবগণের বর্তমানের পূর্বেও ছিলেন। ভীন্ন সমী। ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যু। ভীম অন্তিমে শয্যাশায়ী। ভীষ্ম যাহার পক্ষে, তিনি লক্ষ্মী লাভ করিবেন, ইহা কুরু পাণ্ডব উভয়েই স্বীকার করেন। ভীষ্মই কুরু কুলকে পােষণ করিয়াছেন। দুষ্পরণীয় কামজয়ী যােগী অর্জুনের শরেই ভীষ্ম ভূতলশায়ী—ইত্যাদি। ভীষ্মের এই রূপ নানাগুণ ৰা কাৰ্য-কারণদশী ভাবগুলির সহিত ব্যবসা ( Gommerce) শক্তির মিল পাওয়া যায়। এই সঙ্গে যতগুলি কথা মনে হইয়াছিল, সে গুলি বলিতে হইলে ভীষ্মপর্বের জন্য একটা স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিথিতে হয়। এস্থলে আমাদের দেশের মাড়য়ারী প্রভৃতি ব্যৰসাদার জাতির সংযমী ধরণ, অন্নদাতার প্রাধান্য স্বীকার, ইত্যাদি গুণ মনে হইয়াছিল। (২) ধৃতরাষ্ট্র-অন্ধ। বপণের প্রতি মায়াবদ্ধ। রাজ- পদে প্রতিষ্ঠিত। ইহার পতিতা পল্লী স্বামীর সহিত সম- ব্যথিত হইবার জন্য নিজ অদ্বিয় বিবাহের পর হইতে চিনি বাত রাখিয়া অন্ধের ন্যায় ছিলেন। এই রাণী গান্ধারীর কথাতেই পাশাখেল একবার নিবৃত্তি পায়, এবং পাণ্ডবগণকে অভয় দান করা হয়। এইরূপ সকল কারণে দৃষ্ট বুলায় তাকে রাণী গান্ধারীর অধীনস্থ রাঙ্গ শকি মুৰি দেখা গিয়াছিল। (৩) ৰিদুরসীন ভাবাপন্তু, ভগ। দীনভাৰ এবং গতি হইতেই তিনি পাৰে ৰখাৰ ব্যথী। রাসায়
জৌপদীর বস্ত্রহরণ।
এনাশক্তি যি বিভাজিত। একদল ব্যবসায়াদি শক্তিবলে
সানিত, অপর এল দরিত নিবন্ধন হেয়। কিন্তু অপৰ
* হয় ইলে, দরিদ্রের সহায়। এই মূর্তিই শেষ পর্যন্ত
রাষ্ট্রের অনুগামী। এইরূপ সকল কারণে, ভীষ্ম সম্মানিত
বাকুলােত প্রাপুঞ্জের শক্তি এবং বিহুর পরিদ্র এলা-
শকি মুর্তিরূপে দেখা দিয়াছিলেন।
যাহা হউক, এক্ষণে বিকর্ণের কথা আরও শুনা যাক।
“এইমত পুনঃ পুনঃ বিকর্ণ কহিল।
একজন সভায় উত্তর না করিল।
কাহার মুখেতে নাহি পাইয়া উত্তর।
ক্রোধভরে বিকর্ণ কালে করে কর।
তােমরা যে কে কিছু না দিলে উত্তর।
আমি কিছু কহি শুন সর্ব নরবর ।
যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীরে নাহি করে পণ।
কপটেতে কহিলেক মুল নন
অর্থে নরপতি আপনাকে হারিয়াছে।
কার উপরে কিবা প্ৰতু পণ আছে।
সে কারণে ক্রৌপদী পাশায় নহে জিত ।
তােমরা কি ৰা, ৰলে । এইচি ।
ৰি ৰচন নি যত সন।
সাধু সাধু বলি সবে বলৰে ৰচন।”
পাঠকগণ! ভাবিয়া দেখুন দেখি, উক্ত পাতিয়
জীবনে এ টিয়াছে কি না। যদি ভাল বুঝিতে
১২
পুরা-রহস্য।
পারিয়া থাকেন-যদি সে সকল কথা মনে না পড়িয়া
থাকে, তবে দুর্যোধনের একজন প্রধান মন্ত্রী কর্ণ কি
বলিতেছেন—শুনুন। কর্ণ কুন্তীপুত্র, কিন্তু আপনা ভুলিয়া
একেবারে কুরু-ভাবাপন্ন হইয়াছেন। এ হেন কর্ণ কি
বলিতেছেন—শুনুন ;-
“বিকর্ণ বচন শুনি কর্ণে ক্রোধ হৈল।
দুর্যোধন চাহি তবে কহিতে লাগিল।
অনেক বিচাব বুদ্ধি দেখি যে ইহাব।
অগ্নি কাষ্ঠে জন্মিয়া সংহাব কবে তার।
সেইমত অগ্নিরূপে এই তব কুলে।
হেন অপরূপ কহিলেক সভাস্থলে।”
পাঠক মনে ভাবিয়া দেখুন,-ভাবত সন্তানের প্রতি মিষ্ট
বাক্য কহিলা কে কেমন মুখতাড়া খাইযাছেন। তাহা
দেখিলেই সেই স্বপ্নময়ী মুক্তি দেখিতে পাইবেন। যাহা
হউক, কণের কথা আরও শুনুন -
“সবে বলে কৃষ্ণা জিতা হইযাছে পণে।
বুঝিযা উত্তর নাহি করে কোন জনে।”
এ কথাটাব অর্থ পাঠক মনে পড়ে কি
সে যাহা হউক, ইহার পর কর্ণ আর ও কি বলিতেছেন,
দেখা যাউক
*আব যে বলিলা কৃষ্ণা এক বস্তু কায়।
সভামধ্যে ইহারে আনিতে না যুয়ার।
কি তার গর্বিত গুরু কিবা ভয় লাল।
বেশ্যাজনে কেন লজ্জা আসিতে সমাজ।
যতেক সংসারে এই বিধাতা সৃজিল।
ভাৰ্য্যার একই স্বামী নিৰ্মাণ করিল।
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। ৪৩ দুই স্বামী হইলে বলি সে দ্বিচারিণ। পথ স্বামী হৈলে পরে বেশ্যা মধ্যে গণি।” হিন্দুগাতি মুলে অদ্বৈতবাদী; কিন্তু সাধনার জন্য দ্বৈত বাদী এবং পঞ্চোপাসক। হিনুর শর্ষস্থানীয় ব্রাহ্মণগণ গণেশাদি পঞ্চদেবতার পূজা না করিয়া,এখনও পর্যন্ত জল গ্রহণ করেন না। এতদ্ব্যতীত বিজাতীয়ু ভাবাপন্ন হিন্দু বিজাতীষ দেব পূজা ও ব্যবস্থা করিয়া থাকেন, একথাও মহাভারতের স্থানান্তরে উল্লেখ করা হইযাছে। যাহা হউক, হিন্দুর অদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ, পঞ্চ-দেবােসনা, তেত্রিশ কোটা দেহ, এ সকল ব্যাপার অন্তর্মাবলম্বী বুঝি, পারেন না। বােধ করি, বােধ করি, হিন্দু ব্যতীত অপর আতীষেবা উক্ত ভাবটা সম্বন্ধে কিরূপ বলেন, তাহাই দেখাইবার জন্য ব্যাসদেব এরূপ কথা উল্লেখ করিয়াছেন। পাণ্ডবগণ যে কৃষ্ণের একান্ত অনুরাগী ছিলেন, অর্জুন যাহাব বিশ্বরূপ দেখিয়াছিলেন, কুরুগণ তাহার মর্ম গ্রহণ করিতে সক্ষম হয়েন নাই। তবে ভীষ্মাণি মহাত্মাগণ কিছু কিছু বুঝিলেও, কাৰ্যতঃ তাহার কিছুই দেখাইতে পারেন নাই; এবং সেই অত্যাচারে ও ভীম্মাদি নিস্তব্ধ। বিকৃত মস্তিক হিন্দু। তাই কর্ণ বলিলেন- সভা আনিতে বেশ্যা লাল তার কিন্তু। এইমত বিচার আমার মনে আইলে।” দ্রৌপদী পাণ্ডবে ৰা হিন্দু হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়সী বলিয়া বর্ণিত। তিনি যে সময়ে একমাত্ৰ ধৰ্মৰৱে আচ্ছাদিতা, সেই সময় কুরুপভায় বানী। এক্ষণে সেই অস্ত্র ধরিয়া চান পড়িয়াছে। যুধিষ্ঠির প্রতিজ্ঞা ব, ভীষ মােৰ কষায়িত-লােচন হইবে যুধিষ্ঠিরের আজাবী, কর্ণ কুহৰে ৪৪ পুরাণ-রহস্য। a অপর তিনজন পাওবও তাহাদের অনুগত, কিন্তু তাই বলিয়া কি তাহাদের হৃদয় আলােড়িত হয় নাই? অবশ্যই হইয়া- ছিল, এবং তাহারা জ্ঞানবলে সেই আলােড়নের বেগ ধরিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু নিসর্গ এ ভীষণ অত্যাচার সহ করিতে পারিলেন না; সভার বাহিরে গৃহ দাহাদি কাণ্ড ঘটাইতে লাগিলেন। এক্ষণে সেকথা বুঝিবার পূর্বে দেখা যাউক,কুরু- গণের দাবী কি ? তাহাৱা দ্রৌপদী বা পাণ্ডবগণের নিকট কি চাহিতেছেন ? এই জন্য পাঠক! এক্ষণে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পুগণের কথা শুনুন। দুর্যোধন বৈভবটাই বুঝেন- দুৰ্য্যোধন বলে এই শিশু অল্পমতি। কি জানে বিচাৰত ধৰ্ম্ম গতি। তবে আজ্ঞা করি নৃপতি দুঃশাসনে। পাণ্ডবগণের মান বস্তু আভরণে ॥ দৌপদীর বস্ত্র আর যত অলঙ্কার। ঋটিতে আনিয়া দেহ অগ্রেতে আমার ॥” হে পণ্ডিতমণ্ডলী! “দুঃশাসন” কে, তাহা আমি আপনা- দের মতে নিলাম কি না, তাহা জানি না। তবে “কুশাসন” বা অস্থায় শাসন” এই ভাবই আমার মনে আসিয়াছিল। যদি ইহাতে দোষ হয়, তবে স্বপ্নদৃষ্ট ভাব বলিয়া ক্ষমা করিবেন। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র-পুত্র দুৰ্য্যোধন অপশাসন দ্বারা ভারতের পঞ্চ প্রদেশবাসীর বস্ত্রালার চাহিলেন। “এই শুনি ততক্ষণে পঞ্চ মহােদর। বস্ত্র অলঙ্কার ফেলি দিলে সন। এস্থলে যেন ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রগণ বলিয়া উঠিলেন, “য় হা। কি বােক, কি বােকা!” কিন্তু কাশীরাম সে কথা কিছু বলেন নাই। এখন:- দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। ৪৫ “এক বস্ত্র পরিধান দ্রৌপদী সুন্দরী। দুঃশাসন টানিতেছে পিন্ধনেতে ধরি ।। ছাড় ছাড় বলিয়া সঘনে ডাক ছাড়ে। সভামধ্যে ধরিয়া অঙ্গের বস্ত্র কাড়ে।” দেবীর চীৎকার রাজ্যাধিকারী অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের কর্ণকুহৰে প্রৱেশ করিল না। দুৰ্য্যোধনের যাহা ইচ্ছা, তাহাই কৰিছে লাগিল। কিন্তু দেবীর এখন উপায় :- সঙ্কটে পড়িয়া দেবী না দেখি উপায়। আকুল হইয়া কৃষ্ণা ডাকে দেবরায়।” তাই যেন চারিদিকে এখনও “হরি” ধ্বনি শুনিতেছি। ইচ্ছা হয়, দ্রৌপদী কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণকে স্তুতি কাশীরাম যেরূপ লিখিছেন, তাহা এস্থলে উক্ত করি ; কিন্তু প্রস্তাবে দীর্ঘ তা ভয়ে তাহা করিতে পারিলাম না। পরে, দ্রৌপদী আকুলা জানি, অস্থির সে চক্রপাণি, যার নাম বিপদ ভঞ্জন। ধৰ্ম্মরূপে জগৎপতি, রাখিতে এলেন সতী, সত্য ধৰ্ম্ম করিতে পালন । আকাশ মার্গেতে রয়ে, বিবিধ বসন লয়ে, দ্রৌপদীরে সঘনে যােগায়। যত দুঃশাসন কাড়ে, ভকে বসন বাদু, আচ্ছাদন কৰি সৰ্ব্ব গায় । লােহিত পিঙ্গল সিত, নীল খেত বিরচিত, নানাচিত্র বিচিত্র বসনে। বিবিধ বর্ণের শাড়ী, দুঃশাসন ফেলে কাড়ি, পুঞ্জ পুঞ্চ হৈল স্থানে স্থানে।”
5 পুরাণ-রহস্য। • পাঠকগণ ! এই সময় একবার দেখুন দেখি, সে বস্ত্রগুলি কেমন ? ঐ দেখুন, ধৰ্ম্মরূপ বস্ত্র ধরিয়া টান পড়িয়াছে উক্ত রাশি রাশি শাস্ত্র প্রকাশ, শাস্ত্রীয় আন্দোলন, ভগবৎ- চিত্ত হইয়া আত্মসংযম পূর্বক আত্মরক্ষার উপায় উদ্ভাবন, এইরূপ সকল বােধ হয় সেই নানাবর্ণের শাড়ীর মত হইয়া- ছিল। আত্মসংযমটা ঠিক যেন পাক দিয়া নিজ বয়ে নিজকে রক্ষা করা বলিয়া বােধ হইতেছিল। যখন দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ চেষ্টায় ভীষণকাও হইতেছে, তখন রাজ্যমধ্যে মহাবিপত্তি পড়িয়া গেল। কাজেই অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মিষ্টবাক্যের আবশ্যকতা হইল। তখন উক্ত পঞ্চ-পাণ্ডবকে কতকটা মুক্তি দিয়া আবার তাহাদিগকে দুৰ্য্যোধনদিগের হন্তে অর্পণ করা হইল। তখন বনবাসের ব্যবস্থা হইল। এরূপ দেখিলে, আর কি হিন্দুশাস্ত্র মিথ্যা বলিয়া মনে হয়? যে হিন্দুর এমন শাস্ত্র, তাহার বনবাস কালে তাহার বল কত, তাহা অন্তে কি বুঝিবে ? ঘােষ যাত্রায় যখন যাওয়া হইবে, তখন গন্ধর্বের হস্ত হইতে রক্ষা পাইবার জন্য উক্ত পাণ্ডবের আবশ্যকতা বুঝা যাইবে। পাণ্ডব উদ্যােগী হইয়া কুরুর সহিত অযথা ব্যবহার করে নাই। প্রতিজ্ঞা পালন করিয়া আত্মসংযম পূৰ্ব্বক তাপসবেশে বনে বনে কাটাইয়া কিছুদিন অস্তিত্নে-হীনের ন্যায় অজ্ঞাতবাসে থাকিয়া যথাসময়ে গােগৃহের হাঙ্গামায় আত্মপ্রকাশ এবং পরে আপনাদিগের দাবী করিয়াছিলেন। এই সকল কথা মনে হইতে হইতে ধীরে ধীরে কাক কোকিলের রবের সঙ্গে সেদিন নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছিল। আরও কত কথা মনে হইয়াছিল,—সে কথায় আর কাজ নাই।
বিরাট-ভবন। আর একদিন বন্ধুবর্গের সহিত মহাভারত পাঠ করিয়া মনে হইল :—পাণ্ডবগণ দুর্যোধনের রাজত্বকালে কাম্যন, দ্বৈতবন প্রভৃতি অতিক্রম করিয়া এবং শমীবৃক্ষে অস্ত্র রক্ষা করিয়া যে বিরাট-ভবনে প্রবেশ করিলেন, তাহা কোথায় ? অর্থাৎ যে বিরাট-ভবনে সমগ্র ভারতবাসীর চরিত্র লুক্কায়িত থাকিতে পারে, তাহা কোথায় ? এমন বিরাট-ভবন কি হইতে পারে ? যদি না হয়, তবে হয় বলিতে হইবে যে, পূৰ্ব্ব প্রবন্ধে যে পাণ্ডব চরিত্রই সমগ্র ভারতবাসীর চরিত্র বলিয়া মনে করা হইয়াছে, সে সংস্কার অমূলক, অৎবা সেই পাণ্ডব চরিত্রকে আচ্ছাদিত করিয়া রাখিতে পারে, এরূপ বিরাট-ভবন অবশ্যই ছিল। আমার এইরূপ মনে হয় যে, ইহাই দুর্যোধনের রাজত্বকালে পাণ্ডবের জাতীয় সাধনার অবস্থা।-স্তরে স্তরে সাজান আচণ্ডাল- ব্রাহ্মণ-সেবিত জাতিভেদ প্রথার ভিতরে বসিয়া যে সাধনার অবস্থা, তাহাই সেই বিরাট-ভবনে বাস। এরূপ অবস্থাকে যে কেন বিরাট-ভবন বােদ হইয়াছিল, তাহাই এই প্রবন্ধে আলোচ্য। পূৰ্ব্ব প্রবন্ধে পাগুবচৰিত্ৰ গুণ বা প্রকৃতি অনুসারে ধরা হইয়াছে, এবং সেই সঙ্গে নামের সৌসাদৃশ্য • বা ব্যুৎপত্তির অর্থ (যদি সহজে পাওয়া গিয়া থাকে। তবে তাহাও গ্রহণ করা হইয়াছে। গুণ বা প্রকৃতি স্থায়ী পদার্থ।
৪৮ পুরাণ-রহস্য। সুতরাং সেই গুণ বা প্রকৃতি অনুসারে যাহার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে, তাহাকে সহজে অমুলক ভাবিতে' পারা যায় না। পূর্ব প্রবন্ধে দেখা গিয়াছে, “(১) বাঙ্গালীর . ভাব চরমােৎকর্ষ প্রাপ্ত ধরিয়া যুধিষ্ঠির। ** * * (২) ভীমের ভীমত্বের সঙ্গে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলবাসীর মিল সহজেই অনুমিত হয়। * * * (৩) পঞ্চাব হইতে মহারাষ্ট্রীয় দেশ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমস্থ যে ভূভাগে আর্যাবর্তের অপরাপর, স্থানের ন্যায় আর্যভাষা প্রচলিত, তথায় কি ধৰ্ম্মভাব, কি বীরত্ব, উভয়বিধ দৃষ্টান্ত বহুল পরিমাণে পাওয়া যায়। শিখ, রাজপুত এবং মহারাষ্ট্রীয়দিগের ইতিহাসই তাহার জাজল্যমান, প্রমাণ। তাই বলি, ইহাদের ভাব লইয়া অৰ্জ্জুন সৃষ্ট হইয়াছেন। * * * এবঃ (৪) ও (৫) তামিল ও ত্রৈলঙ্গ ভাষীদিগকে (গাজ বা মদ্ররাজ তনয়ার পুত্রদ্বয় নকুল ও সহদেব ভাবিলে বােধ হয়, অসঙ্গত হয় না” ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বাঙ্গালীর সহিত যুধিষ্ঠিরের চরিত্রের সৌসাদৃশ্য আছে বলিয়া যেন এরূপ মনে না করা হয় যে, সমগ্র বাঙ্গালীজাতির ভিতর ভীমাদি অপর পাণ্ডব চতুষ্টয়ের, অথবা উত্তর পশ্চিমাঞ্চলবাসীর ভিতর ভীম ব্যতীত যুধিষ্ঠিরাদি পাণ্ডব চতুষ্টয়ের, অথবা পঞ্জাবাদি বাসীদিগের ভিতরে অর্জুন ব্যতীত অপর পাণ্ডব চতুষ্টয়ের, অথবা দাক্ষিণাত্য বাসীদিগের ভিতরে নকুল ও সহদেব ব্যতীত অপর পাণ্ডবয়ের, চরিত্র ‘নাই-একথা কখনই বলা যায় না। বরং গুণত্রয়ের এক সমাবেশেই প্রকৃতি, এবং প্রকৃতি হইতেই পরিদৃশ্যমান জগৎ সৃষ্ট হইয়াছে। সুতরাং প্রত্যেক জাতির মধ্যেই-প্রত্যেক জাতি কেন, প্রত্যেক মানবেই গুণত্রয় বৰ্তমাৰ আছে বিরাট-ভবন। এবং তাহারই নূনাধিক্যে বিভিন্ন চরিত্রের উপলব্ধি হয়। এত্যেক জীৰ বা প্রত্যেক জাতিতে গুণত্রয় আছে বলিয়াই, পাণ্ডব ও বার্তরাষ্ট্রেও কতক মিল পাওয়া যায়। তবে কাহাতে কোন্ গুণ অগ্নিক, কাহাতে কোন্ গুণের প্রাধান্ত স্বীকৃত হইয়াছে, তাহা দেখিয়াই বিশেষত্ব টুকু ধরা যায়। উদাহরণ দিয়া দেখিতে হইলে, ভীমে ও দুর্যোধনে, অনেক সৌসাদৃশ্য পাওয়া যায়। উভয়েরই ক্রোধ, হিংসাদি রজোগুণের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু ভীম সত্ত্বগুণ-প্রধান যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞা বৰ্ত্তী, এবং দুৰ্য্যোধন তমণাত্মক ধৃতরাষ্ট্রের অধীন—এই এতেদের জন্যই উহাদের বিভিন্নতা বুঝা যায়। মহাভারত- কারও বোধ হয়, এইটা স্পষ্ট করিয়া দেখাইবার জন্য শান্তিপর্বে চার্বাক রাক্ষস বধের পর পাণ্ডবদিগের নিম্নলিখিত প্রকার স্থান নির্ণয় করিয়াছেন :- “দুৰ্য্যোধন যেই গৃহে করিত বসতি। ভীমসেনে সেই গৃহ দিলেন ভূপতি। যেই গৃহে বসতি করিত দুঃশাসন। অর্জুনেরে সেই গৃহ দিলেন রাজ। দুষণ যেই গৃহে করিত নিবাস। নকুলেরে সেই গৃহ দিলা মহেশ্বাস । দুখের গৃহখানি সহদেবে দিল। চারি ভাই মহাহর্ষে প্রবেশ করিনা ।” (মহাভারত-রাজা বাবুর অনুবাদ। এইট পাঠ করিয়া বােধ হয় যে, যেরূপ প্রকৃতি-বিশিষ্ট, সে সেইরূপ গৃহ পাইল। তবে এক্ষণে এই সকল গৃহ নিতসেবী, সণাত্মক, ধৰ্মনাভূক্ত, ইহাই পাণ্ডবের বিশিষ্টতা। আর একটা কথা বলিলে, আরও পরিষ্কার দেখা
পুরাণ-রহস্য।
বা অনুসারে ধরিতে গেলে, সণাত্মক ব্রাহ্মণ্য
ভাৰ যুধিষ্ঠিরে
অধিক।
কর্ণপর্বে কর্ণের উক্তিতে সেই
কণ স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে।
যুধিষ্ঠিরে কহে কর্ণ ওহে মহারাজ।
বুঝিয়াছি যুদ্ধ করা নহে তব কাজ।
বেদ পাঠ যাগ যজ্ঞ কাৰ্য্য যে তােমার।
যুদ্ধ না করি ও রাজা সহিত আমার ।
এত কহি যুধিষ্ঠিরে করি পরিহার ।
আরঙিলা শক্তগণে করিতে সংহার।”
(মহাভারত-রাজকৃষ্ণ বাবুর অনুবাদ।)
এইরূপে স্বর্গারোহণ বা মহাপ্রস্থান পর্ব পর্যন্ত পাঠ
বিলে দেখা যায় যে, মহাভারতকার একপ্রকার স্পষ্টতই
বলিয়া দিয়াছেন যে, ভীমার্জন রজগু, এবং নকুল সহদেব
তমণাত্মক পুরুষ; তবে, ইহারা সকলেই সগুণাত্মক
যুধিষ্ঠিরের অধীন। একটা দেহের গঠন করিতে যেমন হত্ত
পদাদি হইতে মস্তক পর্যন্ত সকলই আবশ্যক, জীবগঠনেও
গুণত্রয়ের আবশ্যক। পাণ্ডব গঠন করিতে সেইটা স্পষ্টরূপে
দেখান হইয়াছে। কৃষ্ণ। ইহাদিগের বন্ধনীশক্তি এবং ভগবান
শ্রীকৃষ্ণই আত্ম।
যে যেরূপ প্রকৃতিবিশিষ্ট অর্থাৎ বাহার যে গুণ প্রধান,
সে অনুরূপ কার্য করিয়া থাকে, অর্থাৎ যে সগুণাক,
সে সার্বিকভাবে, যে রজগুণাত্মক, সে রানিকভাবে এবং
'যে তমগুণাত্মক, সে তামসিকভাবে কাৰ্য্য করিয়া থাকে,
এৰ, সেই অনুসারে করিলেই তাহার কাৰ্য্য সহ-সাধ্য
হয়। কিন্তু দেখিতে পাওয়া যায়, রাগই কার্যকরী
শক্তি। উহা প্রায়ই গ, অথবা হুমগুণের অধীন হইয়া কাণ
বিরাট-ভবন।
কৰে। সত্বও আধ্যাত্মিক (Spiritual) বৈভবের এ এবং
তনগুণ ভেহিক (Material)বৈভবের অন্য লালায়িত। রজগুণ
যখন যাহার অধীনে থাকে, তখন তাহার সাহায্য করে।
এবং ইহাই প্রভাবে তৃতীয়গুণ নিষ্পত থাকে । অর্থাৎ
জগুণ সত্বগুণের অধীনে থাকিলে, তমগুণ নিষ্প্রভ আর
রজগুণ তমগুণের অধীনে থাকিলে সগুণ নিষ্প্রভ হইয়া
থাকে। পৰ্যালােচনা করিলে দেখা যায়, সগুণাত্মক
যুধিষ্ঠির যেমন পাণ্ডবদলের কর্তা, তম গুণাত্মক ধৃতরাষ্ট্র
সেইরূপ কুরুপক্ষের কর্তা, অর্থাৎ সাধারণতঃ যে দুৰ্য্যোধনকে
কুরুপক্ষের কর্তা বলিয়া বােধ আছে, তাহা নহে। মহা-
ভারতে সেকথা উক্ত হইয়াছে। নিম্নলিখিত
পংক্তি শ্রদ্ধের সময় শ্রবণীয় :-
“দুর্যোধনাে মমষে মহাম স্কন্ধঃ
কর্ণঃ শকুনি ও শাখ।
দুঃশাসন পুষ্পফলে সমৃদ্ধে মূল রাজা
ধৃতরাষ্ট্রে মনীষী।”
“যুধিষ্ঠিবাে ধর্মময়ে মহাম স্কন্ধোহৰ্জ্জুনাে
ভীমসেনােঙ্গ শাখা
মাদ্রীতে পুপফলে সমুদ্ধে মূলং কৃষ্ণো
ব্রহ্মা ব্রাহ্মণা।”
অর্থাৎ দুৰ্য্যোধন মন্তষয় বা পাপকারণ ক্রোধময় বৃক্ষ
পরূপ, কর্ণ ও শকুনি উহার শাখা, দুঃশাসন উহার পুষ্প
ফল স্বরূপ, এবং রাজা ধৃতরা ঐ বৃক্ষের মূল।
যুধিষ্ঠির ধময় বৃক্ষস্বরূপ, অর্জুন উহার স্কন্ধ, ভীমসেন উহার
শাখাস্বরূপ, নকুল সহদেব উহায় সমৃদ্ধ পুপফল, এবং পর
ব্ৰহ্ম কষ্ণ ও তদীয তজ্ঞ ব্রাশ বৰ্গই ঐ বৃক্ষেব মূল।
পুরাণ-রহ।
*
তবেই পাণ্ডবলের কর্তাও যুধিষ্ঠিরকে না বলিয়া পর
ব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণকে বলিলেই ঠিক হয়। তাহা হইলেই অন্যান্য
শান্ত্রেও যে সয়তান এবং ভগবানের বিবাদের কথা উ
হইয়াছে, তাহাই আসিয়া দাঁড়ায়। তবে ভগবান্ নিও
ৰলিয়া উক্ত, এইজন্য সত্ত্বগুণ-প্রধান যুধিষ্ঠিরকে বা ভগবানের
ভজ্ঞ ব্ৰহ্মণগণকে পাণ্ডবদলের কর্তা বলা হইয়াছে।
পক্ষে তমগুণের প্রাধান্য বলিয়া ভীষ্ম দ্ৰোণ প্রভৃতি সত্বগুণ
প্রধান মহাত্মাগণ পিতামহ, গুরু প্রভৃতি পদ পাইয়া
নিত। তাঁহারা কেবলমাত্র অ-ভােক্তার ন্যায় অবস্থিত।
তবে দুৰ্যোধনেরা তাঁহাদের যে মান্যটুকু করিত, তাহা
নিজেদের হৃদয়ের দৌর্বল্য বশতঃ—ভয়ে, ভক্তিতে বা কর্তব্য,
বােধ নহে। কিন্তু ভীমৰ্জ্জুনাদির যে যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞা
বর্তিতা, উহা ভয়' বশতঃ নহে-কর্তব্যবােধে। যুধিষ্ঠির যখন
রাজা, তখনও ভীমার্জুনাদি তাঁহার আজ্ঞানুৰী; যখন
কাম্যবনে পুরােহিতাদি অপর লোক সঙ্গে, তখনও উহারা
আনুবর্তী; আবার যখন চোরের ন্যায় গােপনবেশে অবস্থান,
তখনও যুধিষ্ঠিরের কর্তৃত্ব চলিতেছে । বিরাটভবনে এই
শেষ অবস্থাটা দেখান হইয়াছে। আবার অপরপক্ষে—যিনি
রাজাসনে আসীন, তাহার কর্তৃত্ব অধিক, কি, তাহার পুত্রের
কর্তৃক অধিক, ইহা বুঝিয়া উঠা কঠিন। ধৃতরাষ্ট্র কতবার
বলিতেছেন, ভীম ভােণ, যাহা বলেন, তাহাই হউক ;
হউক; কিন্তু
কাৰ্যতঃ দুর্যোধনের কথাই বর্তায় থাকে। যথায় মন
প্রধান, হুথার রণের কর্তৃত্ব প্রহিত। তথায় কর্তার
ক খাটে না, ৰা তথা সাম্যবাদ সংস্থাপিত। অপর পক্ষে
ৰায় সৰ প্ৰধান, তথায় সর্বসময়েই কর্তা, কর্ক
বজায় থাকে; কিন্তু কোন ৰলে ৰা শক্তিতে যে সেক
বিরাট-ভবন। ৫৩ বজায় থাকে, তাহা যুক্তিদ্বারা তমগুণাত্মকের অধীন রজগুণ- প্রিয় বুদ্ধিতে বুঝিয়া উঠা কঠিন। যখন যুধিষ্ঠির রাজাসনে ছিলেন, তখন সকলে তাঁহার আজ্ঞাধীন ছিল, ইহা ত বেশ বুঝা যায়। কিন্তু যখন তিনি পথের কাঙ্গাল, তখন তাহাকে মান্য করাই সাধারণত বিচিত্র কথা। অম্মদেশের জাতিভেদ প্রথায় এইটা দেখিতে পাওয়া যায়। তাই বলি, বিরাটভবন সেই জাতিভেদ প্রখ, এবং তথায় লুকাইলে তম গুণের লুকাইলে তম গুণের অধীন রজগুণ বিশিষ্ট ব্যক্তি আর প্রকৃত ব্যাপার দেখিতে পারেন না। এখন দেখা যাউক, বিরাট-ভবনে কোন্ পাণ্ডব কিরূপে লুকায়িত ছিলেন। যুধিষ্ঠির রাজার সভাসদ, ভীম ভীম মজ কাৰ্য্যে এবং রন্ধন শালায় নিযুক্ত, অৰ্জ্জুন নপুংসকবেশে রাজকন্যাগণের শিক্ষয়িত্রী, নকুল অশ্বপাল, সহদেব গােপাল বা পশুপাল এবং দ্রৌপদী সৈন্ধুি হইয়াছিলেন। পাণ্ডবের এরূপভাবে থাকার উদ্দেশ্য কি ? নির্দিষ্ট নিয়ম- পাশ হইতে মুক্ত হওয়াই তঁাহাদের উদ্দেশ্য। ইহ সংসারে সকলেরই সেই দশা। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু গুণত্রয়ের মৰ্ম্ম ও কর্মের প্রভাব বুঝিয়াছিলেন বলিয়াই, এবং নিন তত্বই জীবের চরম জানিয়াই সত্বগুণ-প্রধান জাতিভেদ ব্যবস্থা দ্বারাই ধৰ্মক্ষেত্র ভারতক্ষেত্রকে সাজাইয়াছিলেন। জন ও ভক্তি উভয়ের মাহাত্ম্য না বুঝিলে সত্বগুণের মাহাত্ম্য বুঝিতে পারা যায় না। আপাত-মধুর তমগুণের দাতা বাহিক সাম্যবাদ এই অকৃত্রিম জাতিভেদের মর্য গ্রহণে সক্ষম নহে। বাহির হইতে ইহা অদ্ভুত বা অসম্ভব বলিয়া মনে হয়। এইরূপে জাতিতে প্রথা পৰ্যালােচনা করিলে সহজেই মনে হয়, পাণ্ডব চরিত্র বা হিন্দুর চরিত্র
৫০
পুরাণ-রহস্য।
জাতিভেদ প্রথারূপ বিরাট-ভবনে লুক্কায়িত ছিল, এবং
পাণ্ডবপক্ষীয় যাহারা জাতিভেদ প্রথাকে অবজ্ঞা করিয়া
সকলের সম অধিকার” বােধ করিয়াছিল,
বােধ করিয়াছিল, প্রকৃতপক্ষে
তাহারাই ধাৰ্তরাষ্ট্রগণের বিজিত প্রজা বা কুরুপক্ষীয়গণের
মধ্যে গণ্য হইয়াছিল। কুরুক্ষেত্রেও দেখা গিয়াছে, ইহাদের
সংখ্যাই অধিক ছিল
আর একটা কথা—তমগুণের রাজ্যে পার্থিব বৈভব অনুসারে
অধিকার নির্ণয় হয়, আর সত্ত্বগুণের রাজ্যে অধ্যাত্ম ৰণ
অনুসারে অধিকার নির্ণয় হয়। এই অধ্যাত্ম বলটা কি,
তাহা তমগুণের অধীনে বুঝা যায় না। তাই মােট কথায়
তমগুণের রাজ্যে ধনবা দেখিয়া এবং সত্ত্বগুণের রাজ্যে
সৎবৃত্তি দেখিয়া ভদ্রাভদ্র বিচার হয়। কিন্তু সৎপ্রবৃত্তি
দৃঢ়রূপ বুঝিবার ক্ষমতা তমগুণের নাই, এই জন্যই দুৰ্য্যোধন
ধন, জন, মান বৃদ্ধির দিকেই প্রশ্রয় দিতেন। সত্য, দান,
তপ এ সকলের মাহাত্ম্য দুর্যোধনের রাজ্যে বর্ণিত হয়
নাই, উহা যুধিষ্ঠিরের রাজ্যেই শুনা যায় ।
এইরূপে গুণকৰ্ম্মের লক্ষণ দেখিয়া এবং পঞ্চ পাণ্ডবের
আন্তরিক একতা দেখিয়া মনে হয় যে, যদি আত্মার একত্ব
এবং গুণের বৈষম্য স্বীকার করিয়া এবং অহঙ্কার ভাৰ
ত্যাগ করিয়া চলা যায়, তাহা হইলে নিজ অধিকার অনুসারে
পাণ্ডবের ন্যায় কেহ রাজসভায়, কেহ রন্ধনশালায়, কেহ
নৃত্যশালায়, কেহ গােশালায়, কেহ বা অশ্বশালায় থাকিয়া,
এবং কেহ লক্ষ্মীস্বরূপ হইয়াও সৈৰিীবেশে কর্মক্ষয় করিতে
কুষ্ঠিত হয়েন না। পাণ্ডবগণ মােহাদি রিপুগণে অভিভূত
ছিলেন না বলিয়া, কর্তব্যবােধে জ্যেষ্ঠের জ্যেষ্ঠত্ব স্বীকার,
জ্যেষ্ঠের জগতে দুঃসহ ক্লেশ স্বীকার, এবং নিজ নিজ
বিরাট-ভবন। অধিকার নির্ণয়ে সক্ষম হইয়াছিলেন। এই পর্যন্ত বলিলে বিরাট-ভবন একপ্রকার বুঝিতে পারা গেল বটে ৰদিন হইতে এই জাতিভেদ প্রথা অদ্দেশ হইতে উঠাই- বার চেষ্টায় ইহা এমন বিকৃত অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছে যে, এখন ইহার মাহাত্ম্য বুঝিয়া উঠা কঠিন, এবং সেইজন্য জারও দুই চারি কথা বলা আবশ্যক বােধ হইতেছে। (১) যদি জাতিভেদ স্বাভাবিক গুণের উপর নির্ভর করিয়া হইয়াছে, তবে উঠাইবার চেষ্টা কেন ? (২) এই বিরাট-ভবন যদি জাতিভেদ প্রথা হইল, তবে কীচক-বধাদি প্রকাণ্ড ঘটনাগুলি কি ? প্রথম প্রশ্ন সম্বন্ধে সক্ষেপতঃ বলিতে গেলে, রজ গুণের দ্বারা চালিত হইয়া স্বভাবকে বিকৃত করা জীবের একটা লক্ষণ এবং নীচ বা ঘােট যদি শুনিতে পম যে, সে বড়র সমান, তবে আনন্দে আটখানা হয়, এবং যাহার মুখে ওকথা শুনে, তাহাকেও বড় বলে, এবং নিজেও অহঙ্কার কর্তৃক চালিত হইয়া উহাকেই প্রকৃত তথ্য মনে করে। তবে সাধু ব্যক্তিরা যখন আত্মার একত্ব বুঝেন, যখন জড় গুণকে উপেক্ষা করিতে পারেন, যখন অগ্নির উত্তাপ এবং বরফের শৈত্য সমান বােধ করেন, তখন আত্মার একত্ব উপলব্ধি করিয়া সব সমান বলেন, কিন্তু তাঁহারা সেকথা জনসাধারণের অন্য প্রচার করিয়া বেড়ান না। দ্বিতীয় প্রশ্ন পৰ্যালােচনা করিতে গিয়া দেখা যায়, পাঙবের অজ্ঞাত-ৰাস কালে বিরাটভবনে প্রধানতঃ চারিঙ্গী ঘটনা ঘটিয়াছিল ;- ১) ভীমের মল্লযুদ্ধ (২) কীচক-বধ (৩) গােধন হরণ (৪) পাণ্ডব প্রকাশ ও অভিমন্যুর বিবাহ। এই চারিটা ঘটনার বিষয় যদি সকলদি ধরিয়া বলা যায়, পুরাণ-রহস্য। তাহা হইলে এ প্রবন্ধ বড় দীর্ঘ হইয়া পড়ে। আর পাঠকেরাও একটু চর্বণ করিয়া এ রস আস্বাদ করেন, ইহাও এনীয়। তবে এলে সামাজিক ও জাতিভেদ প্রথা উপলক্ষে কথঞ্চিৎ উল্লেখ করা যাইতেছে, • অন্যান্য বিষয় আবশ্যক-মত পরে ধরা যাইতে পারে। (১) ভীমের মল্লযুদ্ধ—এতৎসম্বন্ধে অধিক • কিছু বলিবার আবশ্যকতা নাই। এই পর্বাধ্যায়ে মহাভারতকার। দেখাইয়াছেন যে, পাণ্ডবগণ (ওরফে ভারতবাসী) অজ্ঞাত- বাসকালে, বিরাট-ভবনে নিজ নিজ স্থান অনুসারে নিজ নিজ কর্তব্য কিরূপ পালন করিতেছেন। (২) কীচক-বধ -জাতিভেদ-প্রথা-বিদ্বেষীরা বলেন, জাতিভেদ অহঙ্কার-বৃদ্ধিকর। অবশ্য উচ্চ জাতির বিরুদ্ধেই সে কথা বলা হয়। অহঙ্কার মােহের জন্মদাতা। মােহ অজ্ঞানতা-বর্ধক। প্রকৃতপক্ষেই যে স্থলে সত্বগুণাত্মকের শ্রেষ্ঠত্ব নাই, তথায় জাতিভেদ কেবল অহঙ্কার-বৃদ্ধিকর কেন, অনেক কার দোষাবহ সন্দেহ নাই। কিন্তু জাতি- ভেদ যখন গুণকর্মের বিভাগ অনুসারে হইয়া থাকে, তখন যেখানে গুণক শাকিবে, সেইখানেই জাতিভেদ থাকিবে। এবং সেই জন্যই মাতিভেদ সর্বত্রই বিদ্যমান। তবে যথায় আধ্যাত্মিক বলের প্রাধান্ত নাই, তথা অঙ্গের বল বা ধন- বল প্রাধান্য পাইয়া সমাজের শীর্ষস্থান গ্রহণ করে। সেই রূপে মৎঙ্গরাজ্যে কীচক ধীরে ধীরে সর্বেসর্বা হইয়াছিল। কীচকের পরিচয়ে দেখা যায় যে, সে মুশৰ্মাকে পরাজয় করিয়াছিল, এবং বিটাজ্যের প্রকৃত রাজা না হইয়াও রাজার অপেক্ষা অধিক ক্ষমতা পাইয়াছিল— তায় ধর্ম অপেক্ষা কীচককে অধিক ভয় করিতেন। এ হেন কীচক বিরাট-ভবন। সাধনা রাজ্যে মূর্তিমান কামাদি রিপুষরূপ। জানি না, এই কীচকের মাৎসর্য্য দেখিয়া বিরাট-ভবনের অপর নাম মৎস্য রাঙ্গ হইয়াছে, কি না? যাহা হউক, যখন সেই কীচক রাজলক্ষ্মী স্বরূপিণী, সত্বরজ্যুমগুণের বন্ধনী স্বরূপিণী, প্রেম- ভক্তি স্বরূপিণী দ্রৌপদীকে আক্রমণ করিল, তখন প্রণয় কঁপি উঠিল। সত্বগুণের ইঙ্গিতে রজোগুণ তাহাকে ধ্বংশ করিল। ধ্বংশ করিবার ধরণটা দেখিলে, রিপু সংযত করিয়া ধ্বংশ করাই যে শাস্ত্রের বিধি, তাহা মনে পড়ে। ভীম কীচকের হস্তপদাদি সংযত করিয়া দিয়া তাহাকে বধ করিয়াছিলেন। বিরাট-ভবনে পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস কালে কীচক-বধ ব্যাপারল সামাজিকভাবে দেখা যাউক। জাতি- ভােদ প্রথার মধ্যে স্বার্থপর, কামুক লােভী ইত্যাদি রিপু পরত লােকের ভাব লইয়া কীচক গঠিত। এরূপ লােকও কখন কখন সমাজ মধ্যে প্রশ্রয় পায়। এবং ঐরূপ লােক প্রশ্রয় পাইলে সে কখন বৃথা ভক্তিগর্বে, কখন বৃথা জ্ঞান গর্বে, কখন ধনগর্বে ইত্যাদি রূপে মাৎসর্য পরতন্ত্র হইয়া এরূপ ব্যবহারিক কার্যকলাপে চলিয়া থাকেন যে, हार লােকের সন্দেহ হয়, যেন সেই লােক দ্বারা সমাজ ও ধর্ম রক্ষিত হইতেছে। গর্বে ধৰ্মৰক্ষিত হয় না। যতদিন সেই লােককে ভক্তি, জ্ঞান বা ধনের আশ্রয় বলিয় সাধারণের তাহার প্রতি বিশ্বাস থাকে, ততদিন ভক্তি, জ্ঞান বা ধনের কাদা নিসাধারণ তাহার সেবা করে। স্বার্থ বুঝিয়া চলিলে, ধন ওরূপ অবস্থায় টিকতে পারে; কিন্তু সাবিক ভক্তি বা স্নান ওরূপ স্থলে, কেন না। এইজন্যই ওরূপ লােকের কর্তৃত্বাধীনে ধর্মের খ্যাত্মিক ভাব লােশ পাইয়া লৌকিকভাবে পরিণত হয়। ধনের আদান প্রদান যেমন পুরাণ-রহস্য। সহজ, জ্ঞান-ভক্তির আদান প্রদান, তেমন সহ সাধ বা 'বােধ্য নয়। এইজন্যই পূর্বে বলা হইয়াছে, অন্ধত্ব-ব্যঞ্জক গুমগুণাত্মকেরা ধন, বল, ধনাধিকার যেমন বুঝেন, জ্ঞান- ভক্তির বল তেমন বুঝেন না। যখন.কীচকের ন্যায় লােকের অধীনে সমাজ পাপ প্রাপ্ত হয়, তখন সৰলচিত্ত লােক সমাজ সংস্কারের চেষ্টা করিয়া থাকেন। “সুশৰ্মা * সেইজন্য বােধ হয়, বিরাট-ভবনের সংস্কার সাধনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু সংস্কার কার্য কঠিন ব্যাপার। দেশ কাল পাত্রের সংযোগ চাই। শুদ্ধ ইচ্ছা মাত্রেই যে সে লােকের দ্বারা রাতারাতি সংস্কার হয় না। কাযেই সহজেই কীচকের, দ্বারা নিবারিত হইলেন। পরে যেরূপেই হউক, কীচক নিধন হইয়াছে, এই সংবাদ পাইয়া সুশৰ্ম্মা কুরুরাজের সাহায্যে বিরাট-ভবনে প্রবেশ করিয়া গােন হরণের চেষ্টা করেন। গােধনই বিরাট-ভবনের প্রধান সম্পত্তি। সাধক-সংসারীর গােধন অপেক্ষা উৎকৃষ্ট সম্পত্তি, আর কি হইতে পারে ? এহেন ধন যখন দুর্যোধন আক্রমণ করিল, তখন ধৰ্ম্ম- স্বরূপ গোধন রক্ষা করিতে যেরূপ কাৰ্য করা উচিত, সাধক ভারতবাসী তাহাই করিয়াছিলেন। নাম প্রকাশ বা যশ প্রার্থনা ত সাধকের পক্ষে কোন সময়েই উচিত নয়, সেজন্যই এ অবস্থাকে অজ্ঞাত অবস্থা বলা হইয়াছে। কৰ্তব্যবােধে কাৰ্য্য করেন,-সুখের বা যশের প্রার্থী নহেন। (৩) গােধন হরণ-কীচকৰধ হইয়াছে, এই সংবাদ গাইয়া ধৃতরাষ্ট্র রাজার সাহায্যে সুর্মা গােধনহরণে উদ্যত হইয়া বিরাটরাজ্য আক্রমণ করিয়া মৎশুরামকে * 80-called reformer,
বিরাট-ভবন।
০
করেন। যুধিষ্ঠিরের অনুমতিক্রমে ভীম অজ্ঞাত ভাবে মৎস্য
রাজ এবং সুশৰ্ম্মার শীর্ষদেশ (জ্ঞান বুদ্ধির স্থান) সজোরে
ধরিয়া ধর্মের পদানত করাইয়া দেন। প্রচ্ছন্ন ভাবে স্থিত
ধর্মরা তখন শর্মাকে ছাড়িয়া দেন। সুশৰ্মা সবলচিত্ত
ইলেও, কুরুভাবাপন্ন হইয়া ধৰ্ম্মরাজকে চিনিতে পাবেন নাই।
আবাৰ অৰ্জ্জুন “শমী” * বৃক্ষ হইতে অস্ত্র লইয়া অন্ধ
ধৃতরাষ্ট্র পক্ষীয়গণকে মুগ্ধ কবি গােবন রক্ষা কবিয়া
ছিলেন। গােধন বা না হইলে, সারিক ভাব নষ্ট হয়,
আচার ভ্রষ্ট হইতে হয়। সই গুণ-প্রধান লােক জানেন যে,
আচারই ধম্মেব মুল। পা খুব যে এহেন গোধন বক্ষায
তৎপর হইবেন, ইহা অব বিচিত্র কি? এস্থলে আর একটা
কথা বলি,-অন থােধন-রক্ষা বুকসৈন্তের নিকটবর্তী
হইলে কুকপক্ষীয় সার্বিক গুণ প্রধান ভীষ্ম দ্রোণই তাহাকে
প্রথমে চিনিয়াছিলেন। প্রকাশ বা জ্ঞান বা
প্রকাশ বা জ্ঞান বা অদৃষ্টিই
সাকিগুণে লক্ষণ।
(৪) পাণ্ডবপ্রকাশ ও অভিমন্যুর বিবাহ
কুৰুপক্ষীয় ভীষ্ম দেণি অর্জুনকে চিনিতে
যথাসময়ে পাণ্ডব ইচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া প্রকাশিত হইলেন,
এবং বিরাটের সিংহাসনেই বসিলেন। সাধনার অবস্থাতেও
এইরূপ তবে স্তবে সাজান-জন্মে-জন্মে-ক্রমােন্নতিয়-পথ-বিমুক্ত
বাতিভেদ প্রথার অধীনে দীনভাবে শাকিয়া পাণ্ডব যথা-
প্রকাশিত হইলেন। কোন মহাত্মা লিখিছেন,
“হিন্দুর জীবন বিরাটজীবন, উহা এক জন্মে শেষ হয় না।
যিনি এই কথাটার উপলব্ধি করিয়াছেন, তাহার পক্ষে গুণ
* শমমাদি।
পুরাণ-রহস্য।
জন্যই,
কৰ্ম্মানুসারে সাজান আতিভেদ প্রথা আর বিষম বােধ
হইবে না।
কেহ কেহ বলিতে পারেন, যদি অজ্ঞাতবাসের
জাতিভেদ প্রথার অবশ্যক হয়, তবে পাণ্ডব প্রকাশের
পর উহা থাকিল কেন ? প্রকৃতপক্ষে পাণ্ডব প্রকাশ হইলে
মৎস্তরাজ্য আর পূর্বের ন্যায় সতেজ রহিল না, কিন্তু
বিবাহাদি কাৰ্যে জাতিভেদ প্রথার আবশ্যকতা ও উপকারিতা
বুঝিয়া বৈবাহিক সম্বন্ধে পাণ্ডবগণ মৎস্বরাজ্য
করিয়াছিলেন।
যে দেশে জাতিভেদ প্রথা স্বীকৃত হয় না, সে দেশে
জনসাধারণের মধ্যে বৈবাহিক কার্যে বিশেষ বিচার দেখা
যায় না বটে; কিন্তু যাঁহাদের মধ্যে ভদ্রতা, বিদ্যামা, বুদ্ধি-
মত্তা, ধনমত্তা ইত্যাদি আছে, তাহারা উচ্চ বংশাদির
মর্যাদা স্বীকার করেন। হিন্দুদিগের মধ্যে এই মর্যাদা
সামান্য লােকেও বুঝিয়া থাকেন। জাতিভেদ প্রথা কেবল
পদস্থ ধনীগণের ভােগবিলাসের জন্য হিন্দুদিগের মধ্যে প্রচলিত
হয় নাই, উহা সকলকে যথাযােগ্য স্থান দিয়া জন্মে জন্মে
কমােন্নতির পথ মুক্ত করিয়া রাখিয়াছে। উহার শীর্ষস্থানীয়-
গ ভােগ বিলাসকে
(কীচক-বধ পূৰ্ব্বক)
বৈরাগ্য আয় করিয়া কর্তৃব্যববাধে সংসারযাত্রা নির্বাহ
করিতেন।
সংক্ষেপে বিরাট-ভবনের কথা বলা হইল।
অভিমনু প্রভৃতির কথা তুলিলে, অন্য কথা আসিয়া প্রবন্ধ
দীর্ঘ হইবে, সেই ভয়ে আপাতত বন্ধ করা গেল।
তুচ্ছ করিয়া
পরিশিষ্ট।
চৈতন্যলীলা—নিত্যলীলা।
বরং ঐরূপ
যে কয়টা প্রবন্ধ দিয়া পুরাণ-রহস্য প্রথম ভাগ শেষ
হইল, ইহা পাঠ করিয়া কোন বন্ধু বলিয়াছিলেন, যদি
যুধিষ্ঠিরকে বাঙ্গালী জাতি বা সাত্ত্বিক গুণবিশিষ্ট জাতি মনে
করা যায়, তবে কি যুধিষ্ঠির ছিলেন না? যুধিষ্ঠির, প্রভৃতি
ছিলেন না,
জনসাধারণের এরূপ বিশ্বাস ত ভাঙ্গিতে
যাওয়া ভাল নয়। বন্ধুবরের এই কথাটা শুনিয়া বলে
হইল, বােধ হয়, লেখার কোন ত্রুটী হইয়াছে। যুধিষ্ঠির
প্রভৃতি ছিলেন না, এমন কথা ত বলি নাই।
গুণবিশিষ্ট এক একজন ছিলেন, এবং তাঁহাদের ভাব লইয়া
এক একটা জাতি হইয়াছে—ইহাই বলিয়াছি। পাছে এরূপ
বিষমবােধ অন্য কোন পাঠকের হয়, এইজন্য এই কথাটা
আরও পরিষ্কার করিয়া বুঝিবার নিমিত্ত ঐতিহাসিক কালের
বা ইদানীন্তনকালের একটা কাণ্ড বা লীলা উপলক্ষ করিয়া
দুই একটা কথা বলি।
ভগবান্
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য সম্বন্ধীয় কথা যাহারা জ্ঞাত
আছেন, তারা জানেন যে, উহার আবির্ভাবের অল্পদিন
পূৰ্বে স্বার্থপর, বিষয়ী, বৃথা আমােদ-প্রিয় লােকের দল
বৃদ্ধি হইলে লােকহিতৈষী ভগবদ্ভক্ত শান্তিপুর নিবাসী অদ্বৈত
প্রভু জীবের দশা মলিন দেখিয়া বড় ব্যাকুল হয়েন, এবং
জীবের মঙ্গলার্থ স্বয়ং ভগবান্ আসিয়া যাহাতে লােক
১২
পুরাণ-রহস্য।
উদ্ধার কবেন, সেজন্য প্রার্থনা করেন। সেই প্রার্থনাৰ ফলে,
সেই ৩ গঙ্গাজল তুলসী দিয়া আবাহনেব ফলে,
নবদ্বীপে
ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য আবিষ্কৃত হয়েন। এবং লোককে
জ্ঞান বৈবাগ্য শিক্ষাদিবার জন্য বলেন -
“তৃণাদপি সুনীচেন তববাবিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয় সদা হরি।”
উক্তরূপ বৈগ্য অবলম্বন কবিলে যে প্রেমভক্তি লাভ
হয়, এই মহাজ্ঞান শিক্ষা দিয়া জগৎ মাতাইযাছিলেন।
তিনি (ব্ৰহ্ম) জ্ঞান, (আন্তরিক) প্রেম এবং (সবৈবাগ্য ।
কৰ্ম্ম যে একাধারে আবশ্যক, তাহা তঁাহাব যডভুক্ত মুর্তিতে
শ্রীঅদ্বৈত, শ্ৰসাৰ্বভৌম প্রভৃতি কযেকজন জ্ঞানী ভক্তকে
দেখাইযাছিলেন। এ অধিদৈব মূর্তি জনসাধারণ দেখিতে
পাষ নাই। যাহা হউক, এসকল ঘটনা ঐতিহাসিক সময়ে
ঘটিয়াছে। যাহারা শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের লীলা দেখিয়াছেন,
তাঁহাদেব লিখিত কড়চা, সে সময়েব ঘটকদিগেব পুণি,
* অমানিত্ব মাঙ্কি মহিংসা শাস্তির্জব।
আচাষােপাসনং শৌচং বৈমাত্মবিনিগ্রহ ।।
ইন্দ্রিয়াৰ্থে বৈরাগ্যমনহাব এব চ।
জম্মমৃত্যুব্যাধিদুঃখদোষাসুদর্শনম্ ।
অসক্তি রনভিঃ পুত্রদাবাদি।
নিত্য সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তি।
ময়িচনবোগেন শক্তিব্যভিচারিণ।
বিঘিদেশসেবিমরতির্জনসংসদি।
অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যং তত্ত্বজ্ঞানার্থ দর্শন।
এতক্ষনমিতি লােকমান যতােইন্যথা।
গত ১৩শ অঃ ৭১১।
পরিশিষ্ট। প্রভূতি এখনও বর্তমান, এবং সহ লীলাকারী এভুগণের বংশধরগণ এখনও বৰ্তমান বৈষ্ণব সমাজের উজ্জ্বল মণিস্বরূপ শোভা পাইতেছেন। শ্রীচৈতন্যলীলার এ সকল জাজ্বল্যমান প্রমাণ থাকিলেও, যাহারা ভগবানকে ধ্যানগম্য ভাবময় মূর্তিতে দেখিতে ভাল বাসেন, তাহারা হয়ত বলিবেন, ইহ- জগতে হিন্দু অদ্বৈতবাদী এবং শান্তিপ্রিয় । অতএব জীবের দশা মলিন দেখিয়া অর্থাৎ ভােগ-বিলাসে উন্মত্ত মানব মণ্ডলীকে দেখিয়া হিন্দু (অর্থাৎ শান্তিপুর নিবাসী অদ্বৈত) ভগবাকে ব্যাকুলভাৰে ডাকায়, নবদ্বীপে অর্থাৎ মূতন জ্যোতিতে “বিশ্বরূপ” অনুজ শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের কথা বর্ণিত হইয়াছে—ইত্যাদি ইত্যাদি। এরূপ ভাবিলে, সঠিকবাদী (Positivist) বা আধিভৌতিক ( Matermi ) ভাবের প্রিয় জনগণের মতে দোষ হইতে পারে। কিন্তু শুনিয়াছি, যে, আধিদৈবিক ভাৰদশী কবিগণের মতে অথবা অধ্যাত্মদশী মহাপুরুষগণের মতে ইহাতে দোষ পড়ে না। তাহারা নিত্যলীলা অর্থাৎ গুণত্রয়ের ও পরমাত্মার লীলা যে নিত্য,উহা ঘটনা বিশেষ বা ব্যক্তিবিশেষে আবদ্ধ নহে, এই কথা বলিয়া থাকেন। কিন্তু গুণকৰ্ম্মানুসারে চিত্ত-ভেদ হইয়া থাকে, এইজন্য একই ঘটনা বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখিয়া থাকেন। তাই বলি, ভগবদ্ভাবগতচিত্ত নিত্য দর্শনা- কাক্ষীগণ “বিশ্বরূপ” বা “বিশ্বরূপানু ষড়ভুজ’ দর্শন করিতে চাহেন, একথা কি আর বলিয়া দিতে হইবে। খামার একজন মাননীয় বন্ধু বলেন, মােটা কথা, তােমার পুত্র তােমায় পিয় দেখেন, তােমার পর্দী তােমাতে পতি দেখেন, তােমার বন্ধু তােমার বন্ধু দেখেন, তােমার ভাই তােমায় ভাই দেখেন, তােমার চাকর তােমায় মনিব দেখে, ইত্যাদি PUBLIC LIBRARY ৬৪ পুরাণ-রহস্য। যখন তোমার ন্যায় সামান্য একই পদার্থতে এরূপ দেখা যায়, তখন সেই অচিন্ত্য সৰ্বেশ্বরকে যে অনন্তরূপে দেখা যায়, ইহা আর বিচিত্র কি? কৰি রামেশ্বর বলেন ;- “জগতে ভকত ধন্য, যাহাব সাধন জন্য, একমুর্তি অনন্ত কপিণী।” সিনি যে মূৰ্ত্তি হৃদয়ঙ্গম করিতে সক্ষম হইয়াছেন, তিনি সেই মুক্তি দেখেন। তিনি শান্তদশীর নিকট সৌম্য, দাস্য ভাবদশীর নিকট প্রভু, সখা, ভাবদর্শীর নিকট সখা, বাৎসল্য ভাবদলীর নিকট পুল, মধুব ভাবদশীর নিকট রসবাজ। তবে সাত্ত্বিক গুণের ভাধীন স্বদেশ সেবীর স্বসমাজ সেবী নিকট তিনি পরপীড়া-বিহীন স্বজাতিবাৎসল্য মূর্তিতে দেখা দিবেন না কেন ? অনেকের বোধ আছে, *ব জাতি পড়ন না ববিলে, স্বজাতি-বাৎসল্যের মূর্তি দেখা যায় না। একথা অন্ধত্বব্যঞ্জক তম গুণের কথা। নিজের ছেলেটীকে ভাল বাসিলে, পরের ছেলেটীর দ্বেষ করিতে হইবে, নিজ ধর্মের অনুবর্তী হইলে, পরধর্মের দ্বেষ করিতে হইবে, একথা সাত্ত্বিক গুণ- লােকের নিকট কখনও শুনি নাই। তাই বলি, অধীন স্বদেশসেবীর নিকট তিনি পরাণি দেষবিহীন স্বজাতিৰাৎসল্য মুর্তিতে কেন দেখা দিবেন না : ভগবান স্বয়ং বলিতেছেন- “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাং তথৈব জামাই।” এৰাৰ এই পৰ্য্যন্ত। সমাপ্ত। সাত্ত্বিক গুণে ট 1902.
No text on this page.
No text on this page.