Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kahinee
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কাহিনী
শ্রীগুরুদাস আদক
ভাদ্র, ১৩১৯
ফুণ মানা।
প্রকাশক
শ্রীপাচুদাস আদক
৩, চাউলপটী লেন,—ভবানিপুর, কলিকাতা
লক্ষীবিলাস প্রেস
১২, নারিকেলবাগান লেন, কলিকাতা।
বি, বি, চক্রবর্তীর দ্বারা মুদ্রিত।
যুক্ত সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়, বি, এল করকমলেষু-
No text on this page.
নিবেদন
‘কাহিনী’ প্রকাশিত হইল। ইহাতে কতিপয়
পুণ্যশীলা আদর্শ ভারত-মহিলার কাহিনী বর্ণিত
হইয়াছে। ইহার অনেকগুলি গল্প স্বর্গীয় শ্ৰীযুক্ত
মন্মথনাথ দত্ত, এম, এ, লিখিত, ‘The lleroines
of Ind' নামক পুস্তকের ভা লইয়া রচিত।
‘কাহিনী’র শােভাবর্ধনের জন্য কয়েকটি চিত্র
প্রদত্ত হইল। শ্রদ্ধেয় বন্ধুবর শ্ৰীযুক্ত ভবানীচরণ
লাহা তাহার অঙ্কিত দুইখানি চিত্র কাহিনী’তে
প্রকাশ করিবার অনুমতি দিয়া আমায় চিরবাধিত
করিয়াছেন। এই চিত্র দুইখানি পূৰ্ব্বে কোথাও
প্রকাশিত হয় নাই। আমি এই অবসরে তাহাকে
আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি।
পরিশেষে স্বীকার করিতেছি, আমার প্রিয়
সুহৃৎ শ্ৰীযুক্ত ফণীন্দ্র নাথ পাল বি, এ, এই পুস্তক
প্রকাশে আমায় অনেক প্রকারে সহায়তা করিয়া-
ছেন; তঁাহার উৎসাহ ব্যতীত এ পুস্তকখানি কখন
প্রকাশিত হইত কি না জানি না। ইতি
ভবানীপুর
ভাদ্র, সন ১৩১৯।
শ্রীগুরুদাস আদক
No text on this page.
সূচী
১
মীরাবাঈ
কৰ্ম্মদেবী
তারাদেবী
•••
•••
৩৪
৪২
গণাের রাজমহিষী।
দুর্গাবতী
যােধপুর রাণী
৫৯
রাণী ভবানী
অসামান্য
•••
০ ০ ০
অহল্যা বাঈ
কৃষ্ণকুমারী
No text on this page.
No text on this page.
কাহিনী
মীরা বাঈ
কিভবানীচরণ লাহা।
শ
কাহিনী। মীরাবাঈ। ভারতবর্ষেরর উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রায় সর্বত্রই রাখালবালকগণের ক্রীড়াকুঞ্জে, যুবকদিগের সান্ধ্য মজলিসে এবং ধনীর বিলাসকক্ষে যে রাগিনী অনু- রণিত হইয়া উঠে, তাহার সুরে একটি পরিচিত নামের ঝঙ্কার প্রায়ই শুনা যায়। এই নাম ইতিহাস- প্রসিদ্ধ। মহিষী মীরাবাইয়ের । রাজপুতানার নিরত একটি ক্ষুদ্র মনােরম গ্রাম। গ্রামটির চারিপার্শ্বে ছছাট ছােট পাহাড়। সেই পাহাড়ের গাত্র ভেদ করিয়া সঙ্কীর্ণ নদীগুলি আঁকিয়া বাঁকিয়া গ্রামটির ভিতর দিয়া বহিয়া চলিয়াছে, দেখিলেই মনে হয় যেন প্রকৃতি- রাণী তাহার সমুদয় সৌন্দৰ্য একত্র করিয়া এই অন্তর্গত
কাহিনী।
ক্ষুদ্র স্থানটীকে বেষ্টন করিয়া আছেন। এই স্থানেই
আমাদের স্বনামধন্যা সতীলক্ষ্মী মীরাবাঈ জন্মগ্রহণ
করেন। প্রকৃতির দুলালী মীরাবাইয়ের তুল্য
রূপবতী নারী তৎকালে রাজপুতানায় আর দ্বিতীয়
ছিল না, তাই তিনি অনেকের কিট জ্যোতির্ময়ী’
নামেও পরিচিত।
অতি বাল্যকাল হইতেই রমণীসুলভ যাবতীয়
গুণ—দয়া, শ্রদ্ধা, ভক্তি প্রভৃতি তাহার সেই ক্ষুদ্র
হৃদয়টি পূর্ণ করিয়া রাখিয়াছিল। দেবতার প্রতি
তাহার অসীম ভক্তি ও ঐকান্তিক বিশ্বাস। এত
ব্যতীত সঙ্গীত ও ছড়া রচনায় তাহার অসাধারণ
শক্তি দেখিয়া বালক বৃদ্ধ সকলেই আশ্চর্যান্বিত হইয়া
ভাবিত, এত অল্প বয়সে ইনি এ সকল বিষয়
কিরূপে আয়ত্ত করিতে পারিলেন! ভাগবত হইতে
শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা
শ্রবণ
করিয়া স্বয়ং তাহার ছড়া
রচনা করিয়া যখন সুললিত স্বরে তিনি তাহা গাহি-
তেন, তখন কত বৃদ্ধেরও চক্ষু দিয়া প্রেমা বহিয়া
যাইত। ভগবানে এমন আত্ম-নির্ভর জগতে প্রকৃতই
দুলভ। কৃষ্ণলীলা গাহিতে গাহিতে মীরা কতদিন
বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িয়াছেন, আবার জ্ঞানলাভে
२
মীরাবাঈ
কখন কখন সেই গােকুলবিহারী নবঘনশ্যামকে মনে
করিয়া কঁদিয়া কত আকুলও হইয়াছেন।
ক্রমে বাল্য কাটিয়া যৌবন আসিল। চিতােরের
মহারাণা কুম্ভসিংহের সহিত তাঁহার শুভ পরিণয়
হইয়া গেল। মহারাণাও বাল্যে কবিতাপ্রিয় ছিলেন।
নববিবাহিতা বধূর সহিত কিছুকাল বেশ একরূপ
সুখে কাটিল, কিন্তু দিন চিরকাল সমান যায় না।
মীরা প্রায় সর্বদাই সখিগণ সহ কৃষ্ণলীলায়
বিভােরা। কখন বা কোন সখীকে শ্রীকৃষ্ণ সাজা-
ইয়া স্বয়ং রাধিকা হইয়া তাহার বামে দাড়াইতেন,
আবার কখন নিজেই শ্ৰকৃষ্ণ সাজিয়া শ্ৰীমতীর
মানভঞ্জনের পালা গাহিতেন। মহারাণা প্রথম
ইহাতে বেশ আনন্দ পাইলেও ক্রমে এসব আর ভাল
লাগিত না। তিনি যাহা চান, মীরার নিকট
হইতে যেন তাহা পান নাইহাই তাহার আক্ষেপ।
তরুণ বয়সে তাহার যাহা আকাঙ্ক্ষা, মীরার পক্ষে
তাহা মুক্তির পথে দারুণ বাধা।
.
দিল্লীর রত্ন-সিংহাসনে বসিয়া মােগল সম্রাট আকবর মীরা দেবীর সঙ্গীত-শক্তির প্রশংসা শুনি- লেন। তিনি চিরদিনই গুণগ্রাহী। তাহার নিকট হিন্দু মুসলমানে ভেদজ্ঞান ছিল না। এই সহৃদয়তা • গুণেই তিনি একদিন বিস্তৃত মােগল সাম্রাজ্যের আধিপত্য লাভ করিতে পারিয়াছিলেন । মীরাদেবীর সঙ্গীতের সাতিশয় প্রশংসা শুনিয়া তাহা শুনিষার জন্য আকবরের একান্ত আগ্রহ হইল। রাণা প্রতাপের মৃত্যুর পর চিতাের মােগল সাম্রাজ্যের অধীন না হইলেও উভয় রাজ্যের সহিত তখন কোন শত্রুতা ছিল না। আকবর একবার মনে করিলেন, মহারাণা কুম্ভ সিংহের নিকট প্রস্তাব করিয়া দেখিবেন, কিন্তু পরক্ষণেই আবার পদ্মিনীর কথা স্মরণ হওয়ায় সে সঙ্কল্প তিনি ত্যাগ করিলেন। তিনি জানিতেন, হিন্দর পর্দা উদঘাটিত হইবার নহে । নারীর সম্মান রক্ষার জন্য হিন্দু অকাতরে প্রাণ বিসৰ্জন করিতে পারে। এইরূপ নানা চিন্তা করিয়া পরিশেষে তিনি তার বিখ্যাত গায়ক-প্রবর তান- ৪
মীরাবাঈ।
সেনের সহিত পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন, তাহারা
উভয়ে একদিন ছদ্মবেশে চিতাের মন্দিরে গিয়া মীরা
দেবীর সঙ্গীত শুনিয়া আসিবেন।
তাহাই হইল। তাহারা উভয়ে ছদ্মবেশে মীরা
দেবীর প্রাণ মাতান সঙ্গীত শ্রবণ করিলেন। আকবর
তাহার সঙ্গীতে এতাদৃশ মােহিত হইয়া পড়িলেন
যে, আপন অবস্থা ভুলিয়া তিনি মীরাদেবীর পদপ্রান্তে
পড়িয়া তাহার সঙ্গীত শিক্ষার সার্থকতার বারবার
প্রশংসা করিতে লাগিলেন। আসিবার সময় বস্ত্র মধ্য
হইতে একছড়া বহুমূল্য মুক্তার মালা বাহির করিয়া
মীরার হস্তে তাহা প্রদান করিয়া তিনি বলিলেন,
দেবী, এই বহুমূল্য মালা ছড়াটি আপনি দেবপ্রতিমার
গলদেশে পরাইয়া দিন—দেখিয়া আমি চরিতার্থ হই।
মীরা সেই মালা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিতা হইলেন।
জিজ্ঞাসা করিলেন, “রাজপুত! তুমি এ বহুমূল্য
মালা কোথায় পাইলে ?
আকবর প্রত্যুত্তরে বলিলেন, ‘দেবী! যমুনায়
স্নান করিবার কালে আমি এই মালা কুড়াইয়া
পাই। এ বহুমূল্য মালা আমাদের উপযােগী নহে,
তাই দেবতার চরণে ইহা অৰ্পণ করিলাম।
কাহিনী। মীরা তাঁহার দেবভক্তিতে সন্তুষ্ট হইয়া মালা ছড়াটি দেবতার চরণে উৎসর্গিত করিলেন। আকবরও স্বরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এই মাল্য-গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই মীরাদেবীর ভাগ্যাকাশে এক প্রবল বাতার সূচনা হইল। মহারাণা লােক-পরম্পরায় এই মালা-প্রাপ্তির সংবাদ পাইলেন। তিনি মালা দেখিতে চাহিলেন। মালা আনীত হইল। তিনি সে বহুমূল্য মুক্তার মালা দেখি- যাই বিস্মিত হইয়া গেলেন। জহুরিরা আসিয়া তাহার দর কষিল, দশলক্ষ মুদ্রা ! বহুমূল্য মালা দিয়া গেল। চতুর্দিকে লােক ছুটিল সংবাদ আনিতে। সংবাদ আসিল-মােগল সম্রাট আকবর ছদ্মবেশে দেবীর গান শুনিতে আসিয়া- ছিলেন। রাণা শুনিয়াই ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া উঠিলেন —জ্ঞানশূন্যের ন্যায় উত্তর দিলেন, কে আছ- এই দণ্ডেই মীরার জীবন নাশ করিয়া আমার বংশের কালিমা দূর কর।
আদেশ প্রচারিত হইল; কিন্তু কেহই সে বীভৎস কার্যে অগ্রসর হইল না। রাণা অন্য উপায় না দেখিয়া মীরাকে আত্মহত্যা করিবার জন্য একখণ্ড পত্রে আদেশ লিখিয়া নিজ নাম স্বাক্ষর করিয়া তাহা পাঠা- ইয়া দিলেন। মীরাদেবী সেদিন যখন দৈনিক পূজা সমাপনান্তে মন্দির হইতে ফিরিয়া আসিতেছিলেন, ঠিক সেই সময়ে সেই আদেশ-পত্রখানি তাহার হস্তে অর্পণ করা হইল। তিনি একবার মাত্র পাঠ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, একটিবারও কি তাহার চরণ দর্শন মিলিবে না? পত্রবাহক মস্তক নত করিয়া অস্পষ্ট স্বরে বলিল, “মহারাজের, বােধ হয়, সে আদেশ নাই। মীরা তখন আর কিছুমাত্র দ্বিধা করিয়াই পত্রবাহককে বলিলেন, ‘মহারাণাকে বলিও, রাণী তাহার আদেশ শিরােধার্য্য করিয়াছে।” ইহা বলিয়া রাণী অন্তঃপুরে প্রত্যাবর্তন করিলেন। রজনীর গভীর অন্ধকারে মীরাদেবী বিলাস- পরিচ্ছদ ত্যাগ করিয়া ভিখারিণীর বেশে রাজগৃহ ৭
কাহিনী।
পরিত্যাগ করিলেন। কেহই জানিল না, মীরাদেবী
আজ সকলকে অকূল শােক-সাগরে ভাসাইয়া কোথায়
চলিয়াছেন। সেই অন্ধকারে পথ অতিক্রম করিয়া
নীরা শেষে এক নদীর ধারে আসিয়া দাড়াইলেন,-
কয়েক মুহূর্তমাত্ৰ ,তাহার জীবন মরণের আরাধ্য
দেবতার নাম স্মরণ করিয়া প্রফুল্ল চিত্তে নদীর জলে
ঝাপ দিলেন।
ভগবানের অসীম দয়া। কোথা হইতে কি হইল,
মীরা কিছুই বুঝিতে পারিলেন না! কেবলমাত্র তাহার
মনে হইল, কে যেন অলক্ষ্যে থাকিয়া তাহার হস্ত
ধরিয়া তাহাকে মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা করিলেন!
শুনিতে পাইলেন, কে যেন তাহার কানে কানে
বলিলেন, ‘মীরা। তােমার স্বামীর আদেশ রক্ষা
করা হইয়াছে। কিন্তু এ পৃথিবীতে তােমার যে আরও
অনেক কাজ আছে। আমার মহিমা প্রচার করি-
বার জন্যই যে তােমার জন্ম। যাও, তােমার কাৰ্য্য
কর গিয়া ।
প্রভাতের স্নিগ্ধ
স্নিগ্ধ বাতাস
বাতাস চতুর্দিকে বহিয়া
ছুটিয়াছে। মীরাদেবী চাহিয়া দেখিলেন, তিনি
মীরাবাঈ।
নদীর ধারে বালুচরের উপর পড়িয়া রহিয়াছেন।
সূর্যের রশ্মিতে চারিধারে বৃক্ষের শিরগুলি অনেক
খানি রক্তিমাভ হইয়া উঠিয়াছে। যতদূর দৃষ্টি
যায়, তাহার মধ্যে কোন মনুষ্য-মূৰ্ত্তি তাহার চক্ষে
পড়িল না। তখন ধীরে ধীরে গাত্রোখান করিয়া
নদীর তীর দিয়া গান গাহিতে গাহিতে তিনি
পথ বাহিয়া চলিলেন। সেই অজানা পথে চলিতে
তাহার কিছুমাত্র, কষ্ট হইল না। ভগবানে আত্ম
সমর্পণ করা অবাধ তাহার ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছুই ছিল না।
কিছুদূর যাইবার পর কতকগুলি রাখাল বালকের
সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। তিনি তাহাদিগকে
মিষ্ট কথায় জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘বাছা, আমি বৃন্দা-
বনের পথিক-~-বৃন্দাবনের পথ কোথায় আমায়
বলিয়া দিতে পার ? বালকেরা তাঁহার মিষ্ট কথায়
তৃপ্ত হইয়া বলিল, “মা, তুমি পথশ্রমে অত্যন্ত ক্লিষ্ট
হইয়াছ, দেখিতেছি। আমাদের নিকট কিছু দুধ
আছে। এইটুকু পান করিয়া শ্রান্তি দূর কর। আমরা
তােমাকে বৃন্দাবনের পথে রাখিয়া আসিতেছি।
মীরাদেবী বালকদিগের কথা এড়াইতে পারিলেন না।
বালকদিগের সহিত প্রাণ ভরিয়া হরিগুণগান
কাহিনী। করিতে করিতে মীরাদেবী বৃন্দাবনের পথে চলিলেন। পথের লােক তাঁহার গান শ্রবণে মুগ্ধ হইয়া গেল। তাঁহার কিন্তু সে দিকে লক্ষ্য ছিল না--ভগবানে প্রাণ সমৰ্পণ করিয়া আপন মনেই বিভাের-চিত্তে চলিয়াছেন—পশ্চাতে তাহার অসংখ্য মুগ্ধ ভক্ত। যখন তিনি বৃন্দাবনে পৌছিলেন, তখন আর তাহার আনন্দ ধরে না। অল্পদিনের মধ্যে তাহার নাম বৃন্দাবনে ব্যাপ্ত হইয়া উঠিল। হার কণ্ঠনিঃসৃত সুমিষ্ট কৃষ্ণলীলা শ্রবণের জন্য অসংখ্য ভক্ত দলে দলে তাহাকে ঘেরিয়া দাড়াইত। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। মীরা এখন মেবারের মহারাণী নহেন—ভিখারিণী-প্রেম- ভক্তির আদর্শ মূর্তি। পূর্বে যাঁহারা তাহার সঙ্গীত শ্রবণে অতৃপ্ত ছিলেন, তাঁহারা এক্ষণে প্রাণ ভরিয়া তঁাহার গান শুনিয়া কায় মন পরিতৃপ্ত করিতে লাগিলেন। বৃন্দাবনে তৎকালে রূপ গােস্বামীর ন্যায় ভগবৎ ভক্ত আর দ্বিতীয় ছিল না। অনেকে তাঁহাকে ভগবানেরই অংশ বলিয়া মনে করিতেন। তিনি কথনও স্ত্রীলােকের মুখ দর্শন করিতেন না; কিন্তু
মীরাবাঈ।
মীরাদেবীর ঐকান্তিক ভক্তি ও ভগবানে অচল নিষ্ঠা
দেখিয়া তাহাকে কন্যার ন্যায় সস্নেহে কাছে রাখিয়া
ধর্মশিক্ষা দিতে লাগিলেন এবং তাহার মধুর কণ্ঠের
হরিনাম সংকীর্তন শুনিতে শুনিতে বিভাের হইয়া
পড়িতেন।
৪
মীরাদেবীর সঙ্গীতের প্রশংসা ভারতের প্রতি
দেশে ধ্বনিত হইতে লাগিল। চিতকারের মহারাণা
কুম্ভ সিংহও তাহা শুনিলেন। আজ তিনি ভাবিয়া
দেখিলেন, মীরা সত্যই কি তাহার বংশে কালিমা
লেপন করিয়াছেন,না, বংশের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছেন।
আজ মীরাদেবীর নাম লক্ষ কণ্ঠে উচ্চারিত, কিন্তু
কই তার কথা ত কেহ বলে না। বিশেষতঃ
সমগ্ৰ মেবারবাসী যখন তাহাকে চাহে, তখন তিনি
আর তাহাতে প্রতিবন্ধক হইবেন না; স্থির করি-
ললন, মেবারলক্ষ্মীকে আবার মেবারে আনিবেন।
একদিন ছদ্মবেশে মহারাণা বৃন্দাবনে আসিয়া
কাহিনী। দেখা দিলেন। তিনি দেখিলেন, মীর মন্দিরে বসিয়া হরিনাম গান করিতেছেন-সে কি মধুর নাম, যেন স্বর্গ হইতে সুধা ক্ষরিতেছে। মহারাণ। তাঁহার নিকট- বর্তী হইয়া বলিলেন, ‘দেবি! আমায় ভিক্ষা দাও। মীরা বিনীত স্বর বলিলেন, 'আমি ভিখারিণী ধনীর দুয়াবে যান, সেখানে ঈপ্সিত ভিক্ষা মিলিবে। তখন মহারাণা ছদ্মবেশ দূর করিয়া মারার হন্ত ধরিয়া বলিলেন, ‘মীরা, আমায় ক্ষমা কর—আজ তুমি যদি ভিখারিণী, তবে রাজরাণী কে ? মীরা সম্মুখে জীবন-দেবতা স্বামীকে দেখিয়া তাহার পদপ্রান্তে লুটাইয়া পড়িলেন। তাঁহার মুখ হইতে আপনা আপনিই যেন উচ্চারিত হইল, ‘স্বামিন, প্রভু, এতদিনে এ অধীনীকে স্মরণ করিয়া- মীরাদেবী গােস্বামীর পদধূলি লইয়া চিতােরে প্রত্যাবর্তন করিলেন। চিতাের নগরী আবার আনন্দ-স্রোতে ভাসিল। এখন হইতে তিনি বৎসরের অর্ধভাগ চিতােরে এবং অপর অর্থ ভাগ বৃন্দাবনে যাপন করিতেন।
কৰ্ম্মদেবী। কৰ্ম্মদেবী কোন স্বনামখ্যাত রাণা, মহারাণী অথবা কোন রাজচক্রবর্তী সম্রাটের কন্যা না হইলেও রূপে ও গুণে রাজকন্যারই সমতুল ছিলেন। তাঁহার পিতা অরন্তি নিবাসী সামান্য মাহিলদিগের প্রধান দলপতি। কৰ্ম্মদেবীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ হইয়া ম!- ধিপতি তাহাকে বিবাহ করিবার জন্য প্রস্তাব করিয়া পাঠান। মাহিলপুতিও তাঁহার এই অনুগ্রহে আপ- নাকে বিশেষ সম্মানিত জ্ঞান করিয়া শুভ পরিণয়ের দিনস্থির করিলেন। কিন্তু মানুষ গড়ে, বিধাতা ভাঙ্গেন। এ ক্ষত্রে তাহাই হইল। পূৰ্ব্ব হইতেই বিবাহের সরঞ্জাম চলিতেছিল। এমন সময় হঠাৎ এক বিদেশীর আগমনে সব গােলমাল হইয়া গেল। এই বিদেশী এক অরণ্য প্রদেশের অধিপতি-নাম সাধু। যুদ্ধ- কৌশলাদির দ্বারা নিজ বীরত্ব প্রদর্শনই তাঁহার একমাত্র কার্য্য। ভারতের এমন কোন রাজ্য ১৩
কাহিনী।
ছিল না, যেখানে তিনি একবারমাত্রও তঁাহার অসীম
বীরত্ব না দেখাইয়াছেন। সমগ্র দেশ ভঁহার ভয়ে
কম্পিত। মাহিলপতি পূর্বে তাহার অত্যদ্ভুত
ক্ষমতা ও বিক্রমের কথা শুনিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাকে
কখন চক্ষে দেখেন নাই। একদিন তিনি শুনিলেন,
সাধু অন্তি-প্ৰদেশ অতিক্রম করিয়া স্বরাজ্যে
প্রত্যাবর্তন করিতেছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ অতি
সম্মানের সহিত তাহাকে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন
এবং আতিথ্যগ্রহণের জন্য বিশেষ অনুরােধ করি-
লেন। সাধু তাহার সদাশয়তায় আপ্যায়িত হইয়া
অরন্তিতে এক সপ্তাহকাল অবস্থান করিলেন।
কৰ্ম্মদেবী বীর যুবককে দেখিলেন। পূর্বে তাহার
অতুল বীরত্বের কথাও শুনিয়াছিলেন। যুবকের
বীরােচিত সুঠাম মুর্তি বালিকার কোমল হৃদয়ে
রেখা পাত করিল। সেই ভালবাসা পরিণামে বিষময়
ফল উৎপাদন করিল।
কৰ্ম্মদেবী তাহার সখিদিগের নিকট হৃদয়ের ভাব
প্রকাশ করিলেন। ক্রমে সেই কথা তাঁহার মাতার
কর্ণগােচর হইল। তিনিও আবার স্বামীর নিকট
তাহা উত্থাপন করিলেন। মাহিলপতি শুনিয়া স্তম্ভিত
১.
কৰ্ম্মদেবী।
.
হইলেন, কি করিবেন, কিছুই স্থির করিতে পারিলেন
, কেমন করিয়াই পূৰ্ব সম্বন্ধ ছিন্ন করিবেন ?
না করিলে নিশ্চয়ই মাধিতি অপমান বােধ করিয়া
সসৈন্যে অরক্তি-প্রদেশ আক্রমণ করিবেন-ফলে
অনর্থক রক্তপাত, সে কি ভীষ দৃশ্য ! না, তাহা
কখনই হইবে না। সামান্য বালিকার কথায়
দেশের শান্তি নষ্ট—না, কখনই হইতে পারে না।
স্নেহের জয় সর্বত্রই। কৰ্ম্মদেবী তাঁহার এক
মাত্র কন্যা। তিনি তাহার মনে ব্যথা দিতে পারি-
লেন না। অগত্যা সাধুর সহিতই তাঁহার পরিণয়
স্থির হইল। যথা সময়ে মাহিলপতি সাধুর পিতৃ-
সকাশে বিবাহের প্রস্তাব করিয়া পাঠাইলেন। বলা
বাহুল্য, তাহার প্রার্থনা গৃহীত হইল। নির্দিষ্ট দিনে
খুব ধূমধামের সহিত তাহাদের বিবাহ হইয়া গেল।
বিবাহের পর দিবস বরবধূ নিজ আলয়ে চলিলেন।
মাধিপতি দত্ত বাক্য ভঙ্গে মাহিলপতির প্রতি
সাতিশয় অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। তিনি বিবাহ ভঙ্গ
করিতে পারিলেন না, কিন্তু কোনরূপে প্রতিশােধ
লইবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন।
হইতে চারি সহস্র সৈন্য সংগ্রহ করিয়া বরবধূ যে
তিনি পূর্ব
কাহিনী।
পথ দিয়া গমন করিবেন, সেই পথে গােপনে প্রতীক্ষা
করিতে লাগিলেন।
কতক পথ বরবধূ নির্বিঘ্নে চলিলেন। আনন্দে
তাঁহাদের হৃদয় পূর্ণ। কোন বিপদের কথাই তাহা-
দের মনে স্থান পায় নাই। কিন্তু আব অগ্রসর হইতে
পারিলেন না। দেখিলেন, সম্মুখে অসংখ্য সৈন্য
তাঁহাদের পথ অবরােধ করিয়া আছে। অগ্রসর
হইলে, যুদ্ধ সুনিশ্চিত।
সাধু তৎক্ষণাৎ সকলকে যুদ্ধ সজ্জায় সজ্জিত
হইতে বলিলেন
মাধিপতির
সৈন্য সংখ্যা
সমধিক। তিনি বিপক্ষীয়গণকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান
করিলেন। তাঁহার অভিপ্রায়—এই কৌশলে অতি
সহজেই শত্রুসৈন্য পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িবে।
সাধু এবং মাধিপতি—উভয়েই আত্মপক্ষীয়
সৈন্যের যুদ্ধ-কৌশল দেখিতেছিলেন। অবশেষে
সাধু স্বয়ং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইলেন। মাধিপতি
তাহাই চাহিতেছিলেন। সাধু প্রাণাধিক কৰ্ম্মের
নিকট বিদায় লইতে আসিলেন। কৰ্ম্মদেবী তাহার
হস্ত ধরিয়া বলিলেন, ‘প্রিয়তম । আজ আমিও
তােমার যুদ্ধ কৌশল দেখিব। আর যুদ্ধক্ষেত্রই
কৰ্ম্মদেবী। যদি তােনার উপযুক্ত শয্যা হয়, তাহা হইলে এ হতভাগিনীও তােমার সঙ্গিনী হইবে। বারবার যুদ্ধের আহ্বান আসিল, কিন্তু কৰ্ম্ম তাঁহাকে অতি সত্বর বিদায় দিতে পারিলেন না। মিলনের এই প্রথম মুহূর্ত! বাসরের মধুর রাগিণী এখনও যে কাণে বাজিতেছে—ইহারই মধ্যে মৃত্যুর কঠোর আহ্বান! কে যেন তাহার মনের মধ্যে বলিয়া দিল, ইহ জগতে বুঝি এই শেষ দেখা! সাধু আর অপেক্ষা করিতে পারিলেন না। সত্বর যুদ্ধস্থলে উপস্থিত হইলেন। উভয় বীরই দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। উভয়েই উভয়কে অগ্রে আঘাত করিবার জন্য সুযােগ খুঁজিতে লাগিলেন। সাধুই সৰ্ব্বাগ্নে মাধিপতির গলদেশে আঘাত করিলেন। তিনিও নিমেষের মধ্যে তাহা প্রত্যর্পণ করিলেন। কৰ্ম্মদেবী দেখিলেন, মাধি- পতির অসি তঁাহার স্বামীর মস্তক লক্ষ্য করিয়া উঠি- য়াছে। উভয়েই চকিতে ভূমিশয্যা গ্রহণ করিলেন। মাধিপতি মূচ্ছিত হইলেন মাত্র, কিন্তু সাধুর জীবন- দীপ একেবারেই নিৰ্বাপিত হইল। এই বিপদে সকলের চক্ষে জলধারা বহিল, কিন্তু
কাহিনী।
'
কৰ্ম্মদেবীর চক্ষে জল নাই। তিনি স্বয়ং তাহার
স্বামী-পরিত্যক্ত সৈন্যের পরিচালন-ভার গ্রহণ
করিলেন। তার পর ধীরে ধীরে স্বামীর পার্শ্বে আসিয়া
তাঁহার অসি গ্রহণ করিলেন এবং সেই অসির দ্বারা
আপন বামহন্ত ছেদন পূৰ্ব্বক এক বিশ্বস্ত সৈন্তা-
ধ্যক্ষের হস্তে তাহা অৰ্পণ করিয়া বলিলেন, এই হস্ত
আমার শ্বশুর ঠাকুরকে প্রদান করিয়া বলিও
ইনিই আপনার পুত্রবধূ। তৎপরে তিনি তাঁহার
সঙ্গিগণকে অপর হস্ত ছেদন করিয়া পিতৃসকাশে
তাহা লইয়া যাইতে আদেশ দিলেন। আরও কহিলেন,
‘তাহাকে বলিও, তাহার কন্যা বীর মাহিলরমণীর
মতই সগৌরবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিয়াছে। কিন্তু
কেহই তঁাহার সে আদেশ পালন করিতে অগ্রসর
হইল না। তখন তিনি সিংহিনীর ন্যায় বিক্রমে হুঙ্কার
দিয়া উঠিলেন, “কি ? তােমরা তােমাদের অধ্যক্ষের
আদেশ অমান্য করিবে, এত সাহস?' তখন এক
ব্যক্তি অগ্রসর হইয়া বলিল, “জননী, আমরা আপনার
আদেশ অমান্য করিতে পারি না, কিন্তু আমরা যে
আপনাকে অত্যন্ত ভালবাসি। কেমন করিয়া এই
নৃশংসের কাৰ্য্য করিব? আর একান্ত যদি আপনার
১৮ ৫
কৰ্ম্মদেবী।
maman
অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে এ দাসই আপনার
এ আদেশ পালন করিবে। কৰ্ম্মদেবী নিশ্চল ভাবে
দাড়াইয়া রহিলেন—আর তাহার হস্ত ঠিক পূৰ্বেরই
মত স্কন্ধ হইতে বিচ্যুত হইল।
তাহার পর যুগ্ধ স্থলেই চিতা সজ্জিত হইল।
সেই চিতায় কৰ্ম্মদেবী চিরদিনের জন্য স্বামীর অনু-
গামিনী হইলেন।
।
তারাদেবী। থ রাজপুতানার এক ক্ষুদ্র জনপদ। সিংহ ইহার শাসনকর্তা। রতন সিংহ সুপুরুষ ও সাহসী বীর, কিন্তু উপযুক্ত সৈন্যবল না থাকায় তাঁহাকে অনেক সময় বিপর্যস্ত হইতে হইয়াছে। মুসলমান সৈন্যগণ বার বার তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করিত, দুর্গ অবরােধ করিত, নগর লুণ্ঠন করিত। তিনি বহু চেষ্টা করিয়াও ইহার কোন প্রতিকার করিতে পারিতেন না। অবশেষে নিরুপায় হইয়া তিনি স্থানীয় রাজন্যবর্গ ও মেবারের মহারাণা সংগ্রাম সিংহের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। মুসলমানের উৎ- পীড়নে রাজপুতানার তখন সে গৌরব নাই। রাজ- পুতানা তখন হীনবীৰ্য্য, হতবল। অন্যের কথা কি, স্বয়ং মহারাণাও মুসলমানের অত্যাচারে সশঙ্কিত। সকলেই নিজ নিজ রাজ্য-রক্ষায় ব্যস্ত ; কেই-বা রতন সিংহের সাহায্যের জন্য ছুটিয়া আসিবে? কেহই
তারাদেবী
আসিল না। নিঃসহায় রতনসিংহ এবার শেষ বারের
জন্য অদম্য উৎসাহে মুসলমানদিগের বিরুদ্ধে যাত্রা
করিলেন, কিন্তু তাহার মুষ্টিমেয় সৈন্ত দিল্লী-অধিপতির
অসংখ্য সৈন্য-সাগরে জলবৃদ্ধদের ন্যায় মিলাইয়া
গণ।
রতন সিংহ আজ রাজ্যচ্যুত। তাহার বড় সাধের
খড়া,-মুসলমানের অধিকারে। তিনি সুদূর বিরে
আসিয়া আশ্রয় লাভ করিলেন। কে জানে, এই
সুদূর বিনরে তিনি তাহার সাধের থড় ও তাহার
অধিবাসিগণের মঙ্গল কামনায় কোন দৈবশক্তির
সাধনা করিতেছিলেন কি না! তিনি তাহাদিগকে
একদিনের জন্যও, এমন কি এক মুহূর্তের জন্যও
তাহার হৃদয় হইতে অপসারিত করিতে পারেন নাই।
কিন্তু সৈন্যহীন, উপায়হীন, অর্থহীন, স্বরাজ্য-চ্যুত
এই ক্ষুদ্রাদপিক্ষুদ্র রতন সিং সেই অগণিত মুসলমান
সৈন্যের বিরুদ্ধে কি করিতে পারেন?
মানুষ আশার দাস। আশা মানুষকে বাঁচাইয়া
রাখে। রতন সিংহ আশা পরিত্যাগ করেন নাই।
তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, একদিন না একদিন এমন
দিন আসিবে, যখন তাঁহার সাধের থ আবার
.
কাহিনী। তার হস্তে ফিরিয়া আসিবে—থডার অধিবাসিগণ আবার তাহাকে আহ্বান করিবে! তাহার স্নেহের কন্যা তারাই এখন একমাত্র আশার স্থল! রতন সিংহের পুত্র ছিল না। তারাকেই তিনি পুত্র- নিৰ্বিশেষে দেখিতেন এবং সেইরূণ ভাবেই তাহাকে শিক্ষা দিতেন। অতি বাল্যকাল হইতেই তারা অশ্বারােহণ, অস্ত্রচালনা প্রভৃতি রণ-কৌশল অতি সুন্দররূপেই আয়ত্ত করিয়াছিলেন। যখন রতন সিংহ যুদ্ধে যাইতেন, তারা তাঁহার অনুগমন করিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা অবিচলিত ভাবে যুদ্ধ করিতেন। ভয় কাহাকে বলে, তারা ভাহা জানিতেন না। তারার এই সাহসিকতা দেখিয়া তাহার সমবর্ষীয়ার। বলিত, কালে তারা বীরবালা নামে পরিচিত হই- বেন। সৌন্দর্য্যেও তারা রাজপুতানায় অতুলনীয়। স্ত্রীজনােচিত সকল সদ্গুণ বর্তমান থাকিলেও সময় সময় তারা বীরত্বে সিংহীসদৃশ—সাহস ও নৈপুণ্যে রাজপুতবীরগণের সমতুল্যা বলিয়া তাহাকে বােধ * হইত। রতন সিংহ অনেক সময়ে মনে ভাবিতেন, যদি তাহার মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বরাজ্য উদ্ধার করিতে না
তারাদেবী।
পারেন তাহা হইলে তারাকে তিনি যে শিক্ষা দিয়া
যাইতেছেন, সেই শিক্ষা-প্রভাবেই তারা একদিন না
একদিন তাহার পিতৃরাজ্য উদ্ধার করিতে পারিবেন।
সেই জন্যই তিনি স্থির করিলেন, যে ব্যক্তি স্ববাহুবলে
তাহার রাজ্য প্রবল প্রতাপশালী দিল্লী-সম্রাটের হস্ত
হইতে পুনরুদ্ধার করিতে পারিবেন, তিনিই তাহার
একমাত্র কন্যা তারাদেবীর পাণিগ্রহণ করিবেন।
তারাদেবীর অতুলনীয় সৌন্দর্য্য ও সদগুণের ভূয়সী
প্রশংসা রাজপুতানাময় ব্যাপ্ত ছিল। অনেক রাজপুত্র
তারাকে বিবাহ করিবার জন্য প্রার্থী হইয়া আসি-
লেন। কিন্তু রতন সিংহের কঠোর প্রতিজ্ঞা শুনিয়া
সকলেই ব্যর্থমনােরথে গৃহে ফিরিলেন ।
এইরূপে অনেক রাজপুত্র আসিলেন, যাইলেন।
অবশেষে মেবারের মহারাণার দ্বিতীয় পুত্র জয়ম
তারাদেবীকে বিবাহ করিবার জন্য প্রার্থী হইয়া
আসিলেন।
রতন সিংহ মহারাণার অধীনস্থ
ক্ষুদ্র রাজা। মহারাণার পুত্রের সহিত তাঁহার
কন্যার বিবাহ, বড় আনন্দের কথা। কিন্তু এ
সময়ও তাহার
মন অকৃত্রিম স্বদেশানুরাগে
উদ্দীপিত হইয়া উঠিল। তিনি দৃঢ়তার সহিত
কাহিনী।
বলিলন,“যিনি আমার ক্ষুদ্ররাজ্য থডাকে মুসলমানের
দুর্জয় হস্ত হইতে রক্ষা করিতে পারিবেন, তিনিই
আমার কন্যার পাণি গ্রহণ করিবেন, অপরে নহে।”
জয়মল্ল ভীরু, কাপুরুষ-প্রকৃতি। রতন সিংহের
এ বীরােক্তি তঁাহার ভাল লাগিল না। তাই তিনি
অতিশয় ঘৃণিত কঠোর ভাবে তাহার প্রতিজ্ঞার প্রতি
অবজ্ঞা প্রকাশ করিলেন। রতন সিংহ কুমারের
নীচতা সহ্য করিতে পারিলেন না। নিমেষে তাহার
কটিবন্ধ হইতে অসি ঝলসিয়া উঠিল। পরক্ষণেই
কুমারের রক্তাক্ত কলেবর ধূলায় লুণ্ঠিত হইয়া
পড়িল। +
{
%
গ
মহারাণা দরবারে বসিয়া পুত্রের নিধন-বার্তা
শুনিলেন। ক্ষণেকের জন্য তাঁহার মুখমণ্ডলে মলি-
নতার ছায়া পড়িল, কিন্তু পরক্ষণেই গম্ভীরভাবে
তিনি বলিলেন, “পাপের উপযুক্ত শাস্তি হইয়াছে।
+ কাহারও মতে, জয়মল্ল বিনানুমতিতে তারাদেবীর
কমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। রতন সিংহ তাহা জানিতে
পারিয়া ক্রোধে জ্ঞানশূন্য হইয়া এই শাস্তি প্রদান করিয়াছিলেন।
२
তারাদেবী
সর্বান্তঃকরণে আমি আমার পুত্রহন্তাকে ক্ষমা
করিলাম।”
মহারাণার মহত্বে সকলে অভিভূত হইল
পৃথ্বীরায় মহারাণার অন্যতম পুত্র। কোন
কারণে তিনি পিতৃরাজ্য
পিতৃরাজ্য হইতে নির্বাসিত
হইয়াছিলেন। আজ মহারাণা সস্নেহে আবার
তাহাকে আহ্বান করিলেন। পৃথ্বীরায়ের সরল
অন্তঃকরণ, সস্নেহ আচরণ চিতােরবাসীর হৃদয়ের
অন্তঃস্তলে যে সহানুভূতি জাগাইয়া রাখিয়াছিল,
কয়েক বৎসরের অদর্শনে তাহা মুছিয়া যায় নাই।
তাই আজ তঁাহার অভ্যর্থনার জন্য চিতােরবাসী
উন্মত্ত হইয়া উঠিল। ফুলের আভরণ, ফুলের তােরণ,
ফুলের মালায় আজ যেন চিতাের নগরী হাসি-
তেছে। প্রকৃতি-দেবী নব আভরণে সজ্জিতা
হইয়া প্রিয় সহচরী দিবধূর সহিত যুবরাজের
প্রতীক্ষায় রহিয়াছেন, চিতাের জননী পাঞ্চজন্যের
মধুর
নিনাদে সন্তানের মঙ্গল ঘােষণা করিতেছেন।
२९
কাহিনী।
হুদিনের পর পৃথীরায় আবার চিতােরে ফিরিয়া
আসিলেন। চিতােরবাসী বহুদিনের পর তাহাকে
ফিরিয়া পাইয়া আনন্দিত হইল। তাঁহার ন্যায়
যােদ্ধা তৎকালে রাজপুতানায় আর কেহ ছিল না।
সমগ্র রাজপুতানায় যদি কেহ তারাদেবীর উপযুক্ত
পাত্র থাকেন, তবে তিনি পৃথীরায়। তারাদেবী
পৃথ্বীরায়কে প্রাণের সহিত ভাল বাসিয়াছিলেন।
পৃথ্বীরায়ও তারাদেবীকে অন্তরের সহিত ভাল বাসি-
তেন। কিন্তু হায়! তাহাদিগের সুখের পথে এক
ভীষণ বাধা—সে বাধা, রতন সিংহের দুর্জয় প্রতিজ্ঞ।
পৃথীরায় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, যদি যুদ্ধে
জয়লাভ করিয়া প্রাণের তারাকে আমার করিতে
পারি, তবেই আবার চিতাের রাজ্যে ফিরিয়া আসিব,
নচেৎ এ জীবনের সমাপ্তি, সেই যুদ্ধক্ষেত্রে। দুইশত
উৎকৃষ্ট অশ্বারােহী সৈন্য সংগ্রহ করিয়া তিনি থড়া
অভিমুখে যাত্রা করিলেন । তারাদেবীও তাহার
সঙ্গিনী হইলেন।
ক্রমাগত অশ্বচালনার পর তাঁহারা এক গভীর
অরণ্যমধ্যে আসিয়া পৌছিলেন। সেই অরণ্যের
পরই থ।
মধ্যে কেবল অর্ধক্রোশ মাত্র ব্যবধান।
No text on this page.
কাহিনী পৃথারায়, তারাদেবী ও শঙ্কর
'তারাদেবী।
সেই গভীর অরণ্যেই পৃথীরায় সেদিনকার মত
শিবির সন্নিবেশ করিলেন। পৃথীরায় ভাবিলেন, কাল
মুসলমানদিগের মহরম। সেই দিনই তাহাদিগকে
হঠাৎ আক্রমণ করিয়া চকিত, ত্রস্ত করিয়া তুলিবেন।
কিন্তু সে বড় ভয়ঙ্কর দিন। সে দিন প্রত্যেক
মুসলমান উত্তেজনায় উন্মত্তপ্রায়, ধৰ্ম্মপ্রণােদিত
হৃদয়ােচ্ছ,সে প্রজ্বলিত। প্রত্যেকেই যেন কালান্তক
যমরূপে অবতীর্ণ।
কিন্তু পৃথীরায় এই দিনই
তাহাদিগকে আক্রমণ করিবেন, স্থির করিলেন।
আজ মহরম -মুসলমানের পৰ্ব দিন। আজ
থডায় বড় ধুম লাগিয়া গিয়াছে। সন্ধ্যার প্রারম্ভেই
তিনজন অশ্বারােহী দুর্গাভিমুখে চলিয়াছেন। ইহারা—
পৃথীরায়, তারাদেবী ও শঙ্কর। শঙ্কর পৃথীয়ের
বাল্যবন্ধু। শৈশব হইতে পরস্পর পরস্পরকে আপন
সহােদরের ন্যায় দেখিয়া আসিতেছেন।
জনে অতি সন্তর্পণে দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
পূর্ব হইতেই সৈন্যগণকে সতর্কভাবে দুর্গাভিমুখে
অগ্রসর হইতে আদেশ দেওয়া হইয়াছিল। এখন
তাহারাও ক্রমে ক্রমে দুর্গের পাদদেশে আসিয়া
দাড়াইল। কাহারও মুখে একটা কথা নাই।
।
কাহিনী। সকলেই নির্বাক, নিম্পন্দ,-যেন পাষাণের এক একটি প্রতিমূর্তি অনেক দিন হইতে এমনই ভাবে দাড়াইয়া আছে। এই সময় দুর্গের অভ্যন্তরের অবস্থা বড় ভয়ঙ্কর। পৃথীরায়, তারাদেবী ও শঙ্কর এখন উপযুক্ত সময় বিবেচনা করিয়া তাহাদের কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন। মুহূর্তে রাশি রাশি দেহ ভূলুষ্ঠিত হইল। চতুর্দিকে রক্তের স্রোত বহিয়া গেল। আর্ত- নাদের করুণ স্বরে দিক পূরিত হইয়া উঠিল। অসতর্ক মুসলমান উপায় নাই দেখিয়া যে যেদিকে পারিল, সেইদিকে ছুটিল। তখনই দামামা বাজিয়া উঠিল। দুর্গের দ্বার অবরুদ্ধ হইল। পৃথীরায় এইরূপই আশা করিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন, যদি তিনি সসৈন্যে দুর্গ আক্রমণ করেন, তাহা হইলে কখনই এত সত্বর কাৰ্যোদ্ধার হইবে না। মুসলমানগণ অশ্বের হেযা শুনিলেই দুর্গ-দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিবে—তারপর দলে দলে তাঁহার মুষ্টিমেয় সৈন্যের উপর আসিয়া পড়িবে। এই জন্যই তিনি সৈন্যগণকে পশ্চাতে রাখিয়া আসিয়া- ছিলেন। যখন তাহারা মুসলমানদিগকে আক্রমণ করিলেন, তখন তাঁহাদিগের উপরই সকলের চক্ষু ২৮
তারাদেবী।
পড়িল,-বাহিরের কোন বিষয়ে দৃষ্টি রহিল না।
এই সময় পৃথীরায় দুর্গের দ্বার খুলিয়া দিলেন।
রাজপুত সৈন্যগণ দলে দলে দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিল।
মুসলমানগণ আত্মরক্ষার জন্য একবারমাত্র চেষ্টা
করিল, কিন্তু সে বৃথা। মুষ্টিমেয় রাজপুতের কাছে
আজ অসংখ্য মুসলমান সৈন্যের বিজয়-গৰ্ব খর্ব
হইল। তারাদেবী পৃথ্বীরায়ের, পার্শ্বে থাকিয়া যুদ্ধ
করিতে লাগিলেন। আজ যেন তারা আর সে
তারা নহে। যেন কোন দৈবশক্তি তারার কোমল
হৃদয়কে নাচাইয়া তুলিয়াছে। তারা আজ রণচণ্ডী
সাজিয়া দুই হস্তে শত্রু-নিধনে ব্যস্ত। সন্ধ্যার মধ্যেই
যুদ্ধ শেষ হইল।
রাজপুতের আজ আর
উল্লাসের সীমা নাই। মুসলমানের রাশি রাশি মৃত
দেহ যুদ্ধের পরিণাম জানাইল। থড
থডা আবার
স্বাধীন হইল।
তাহার পর অতি অল্পদিনের মধ্যেই তারার
সহিত পৃথ্বীরায়ের বিবাহ হইয়া গেল। রতন সিংহ
আবার স্বরাজ্যে ফিরিয়া আসিলেন, কিন্তু অল্পদিন
পরেই পৃথীরায়কে রাজ্যভার দিয়া বিনরে চলিয়া
গেলেন। এইরূপে অতি সুখে দুই বৎসর কাটিয়া
.
কাহিনী।
।
গেল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সুখ বুঝি নিয়তি মানবের
ভাগ্যে লিখে নাই ; তাই এই সুখের উন্মেষ
হইতে না হইতেই পৃথ্বীরায়ের জীবন-নাট্যে যবনিকা
পড়িল।
পৃথ্বীরায় যখন দ্বাবিংশতি বৎসর মাত্র অতিক্রম
করিয়াছেন এবং তারা প্রথম যৌবনে অনুপম
সৌন্দৰ্য্য ও মাধুর্যের ললিত রাগে বিকশিত হইয়া
উঠিয়াছেন,এমন সুখের দিনে সহসা প্রলয়ের মেঘ
উঠিল।
পৃথ্বীরায়ের এক ভগিনী ছিলেন, তাহার
নাম কৃষ্ণা। কোন সম্ভ্রান্ত বংশীয় যুবকের সহিত
তাঁহার বিবাহ হইয়াছিল। 'এই যুবকের নৈতিক
চরিত্র তেমন ভাল ছিল না। কৃষ্ণা এই চরিত্রহীন
যুবকের সহবাসে একদিনের জন্যও সুখী হইতে
পারেন নাই। অত্যাচার দিনে দিনে ক্রমে অসহ হইয়া
উঠিল। অবশেষে নিরুপায় চিত্তে কৃষ্ণা পৃথ্বীরায়ের
শরণ লইলেন, অতি গােপনে একখানি পত্র
তারাদেবী।
ALAM
লিখিয়া পৃথ্বীরায়ের নিকট পাঠাইয়া দিলেন।
পৃথীরায় যে দিন এই পত্র পাইলেন, সেইদিনই
কৃষ্ণাকে রক্ষা করিবার জন্য যাত্রা করিলেন। উদ্ধত
যুবককে অনেক ভৎসনা করিলেন। এমন কি
স্বপত্নীর ব্যবহৃত পাদুকা মস্তকে, করাইয়া তাহার
পূৰ্ব্ব ব্যবহারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাইলেন ;
কিন্তু এই অপমান যুবকের হৃদয়ে আঘাত করিল।
প্রতিহিংসার প্রবল বহি তাহার হৃদয়ে জ্বলিয়া
উঠিল। ইহার প্রতিশােধ লইবার জন্য মনে মনে
সে এক ষড়যন্ত্র করিল। মনের ভাব মনে
চাপিয়া সে পৃথ্বীরায়কে উপযুক্ত সম্মান দেখাইতে
ত্রুটি করিল না। সে দিন এক মহাভােজের
আয়ােজন হইল। সরল প্রকৃতি পৃথ্বীরায় জানিতেন
যে, এই আয়ােজনের সঙ্গে সঙ্গেই তাহার জীবনের
বিরুদ্ধে এক মহা ষড়যন্ত্র চলিয়াছে।
ভােজের সময় সরবতের সহিত বিষ মিশ্রিত
করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। সেই সরবত পৃথীরায়
পান করিলেন। অল্পক্ষণ পরেই বিষের ক্রিয়া
আরম্ভ হইল। তাঁহার মুখের জ্যোতি ক্রমশঃ
নিভিয়া আসিল। অচেতন অবস্থায় তিনি ভুলে
কাহিনী।
পড়িয়া গেলেন। তৎক্ষণাৎ চতুর্দিকে সংবাদ
ছুটিল। তারাদেবী সংবাদ পাইয়া মুহূর্তে আসিয়া
পৌছিলেন। বৃদ্ধ পিতা আর স্থির থাকিতে
পারিলেন না,-মুমু পুত্রকে দেখিবার জন্য ব্যস্ত
হইয়া উঠিলেন। কিন্তু হায় !
সকল চেষ্টা ব্যর্থ
হইল,—পৃথীকে আর রক্ষা গেল না।
চিতকারের অধিবাসিগণকে কাদাইয়া, তারার হদয়
ভাঙ্গিয়া পৃথ্বীর জীবন-দীপ চিরনিৰ্বাণ লাভ করিল।
তখন সতীদাহ প্রথা বর্তমান ছিল। তারাদেবী
ইহকালে পৃথীরায়ের সঙ্গিনী ছিলেন,-পরকালেও
সঙ্গিনী হইতে চলিলেন। মহারাণা, রতন সিংহ
প্রভৃতি আত্মীয়-স্বজন,
এমন কি সমুদয় চিতােরবাসী
তাঁহাকে এই সঙ্কল হইতে নিরস্ত করিবার জন্য
কত চেষ্টা করিল, কত অনুরােধ করিল, কিন্তু
তারাদেবী আপন কর্তব্য হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত
হইলেন না।
চিতা সজ্জিত হইল। ধীরে ধীরে পৃথী-
রায়ের মৃতদেহ তাহার উপর স্থাপন করা হইল।
তারার চিত্তে আর কোন বেদনা নাই। ইতিপূর্বে
তাহার হৃদয়ে শােকের যে প্রবল তুফান উঠিয়াছিল,
৩২
তারাদেবী।
সহসা তাহা প্রশমিত হইয়া আনন্দের স্রোত
ছুটিল। ব্রাহ্মণগণ পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করিতে
লাগিলেন। তারা ধীরে ধীরে আসিয়া চিতার পার্শ্বে
দাড়াইলেন। জন্মের শােধ স্বামীর পদধূলি মস্তকে
লইলেন। তাহার পর পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণের সহিত
চিতা প্রদক্ষিণ করিয়া স্বামীর সহগামিনী হইলেন।
চিতা সহস্র শিখায় জ্বলিয়া উঠিল। দামামা, মৃদঙ্গ,
করতাল প্রভৃতি বাদ্যে দিক নিনাদিত হইল। কিন্তু
তারাদেবীর কোমল দেহ নিশ্চল, নিস্পন্দ-চিতা
প্রজ্জ্বলিত হইবার বহু পূর্বেই যেন তাহার জীবন
অনন্তে মিশিয়া গিয়াছে।
নিমেষে সব শেষ হইল। পৃথ্বী ও তারার
কমনীয় কান্তি ভস্মে পরিণত হইল। দেশের
লােক সে ভস্ম মাথায় ধরিয়া বীরত্ব ও প্রেমের দিব্য
স্মৃতি লইয়া গৃহে ফিরিল।
৩৩
=
ধাত্রী পান্না।
মেবারের মহারাণা সংগ্ৰামসিংহ এক সময় সমগ্র
রাজপুতানার মধ্যে অদ্বিতীয় বীর বলিয়া খ্যাত
ছিলেন। নিয়তি-চক্রে হীনবংশীয় এক যুবকের কৃত্রিম
সৌহার্দ্যে তিনি এতদূর মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলেন যে
সামান্য, দাস হইতে ক্রমশঃ উচ্চপদস্থ রাজমন্ত্রীর পদেও
তাহাকে বরণ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই।
যুবকের নাম বনবীর। রাজমন্ত্রীর পদে প্রতিষ্ঠিত
হইলেও বনৰীরের জন্মসিদ্ধ হীন-প্রকৃতি একবারে
নষ্ট হয় নাই—উপযুক্ত অবসরের প্রতীক্ষা করিতেছিল,
মাত্র। খৃষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর শেষভাগে মহারাণার
মৃত্যু হয়।
মৃত্যুকালে তিনি এই সৰ্পধৰ্ম্মী খলের
হস্তে তাহার একমাত্র শিশু পুত্র উদয়সিংহের অভি-
ভাবকত্ব অর্পণ করিয়া যাইলেন। উদয়সিংহের বয়স
তখন ছয় বৎসর মাত্র।
পান্না মেবারের রাজাপুরের পুরাতন ধাত্রী।
শুধু পান্না কেন? তাহার তিন পুরুষ ধরিয়া
৩৪
ধাত্রী পান্না।
AR
মহারাণার অন্নেই প্রতিপালিত। এই জন্যই-দাসী
ও প্রভু—এই উভয় বংশের মধ্যে বেশ একটি
ঐকান্তিক হৃদ্যতা ও সহানুভূতি আপনা হইতেই
জন্মিয়াছিল- পিতৃমাতৃহীন বালক উদয়সিংহ এই
ধাত্রী পান্নার হস্তেই প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন।
আপন পুত্ত অপেক্ষাও পান্না তাহাকে অধিক স্নেহ
করিত। এই রাজকুমারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সে
আপন স্নেহের পুত্রকেও বলি দিতে কুষ্ঠিত হয় নাই।
খলের স্বভাব এমনই যে, সুযােগ পাইলেই তাহা
বিষ উদগীরণ করে। বনবীর এইবার নিজমূর্তি ধারণ
করিল। অতি হীন দাসী-পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করিয়া
রাজ-অনুগ্রহে এক্ষণে একরূপ সমগ্র মেবার রাজ্যের
অধিপতি হইয়াও তাহার আশার নিবৃত্তি হইল না ;
সিংহাসন-লাভের জন্য ঔৎসুক্য জন্মিল। কিন্তু সে
পথে এক ভীষণ বাধা-কুমার উদয় সিংহ।
কুমার উদয় সিংহ জীবিত থাকিতে তাহার
অভিলাষ পূর্ণ হইবার কােন সম্ভাবনা নাই।
দুরাকাঙ্ক্ষা মানুষকে জ্ঞানশূন্য করে। বনবীর
অবশেষে কুমারকে হত্যা করিবার সঙ্কল্প করিল।
কিন্তু কাহাকে এ বিষম কার্যের ভার অর্পণ করিবে ?
কাহিনী।
৫
কাহারও সহিত তাহার সভাৰ নাই এবং সহসা
কাহাকে বিশ্বাসও করা যায় না। বিশেষতঃ
এ কথা একবার প্রকাশ পাইলে তাহার জীবন
সংশয়! সমগ্র রাজপুত বীরের অসি এককালে তাহার
বিরুদ্ধে ঝলসিয়া উঠিবে। অগত্যা বনবীর স্থির করিল,
নিজহস্তে সে এ বিশ্বাসঘাতকতার কার্য সম্পন্ন
করিবে; পরে সভাসদবর্গকে একবার সন্তুষ্ট করিতে
পারিলে সিংহাসন-লাভের পক্ষে আর কোন অন্তরায়
থাকিরে না।
বনবীরের এ পাপ সঙ্কল্প সাধারণে অপ্রকাশ
থাকিলেও একজন তাহা জানিতে পারিয়াছিল—সে
চন্দ্রধর। পান্নার ন্যায় তাহারও পিতৃ-পিতামহগণ
রাজপরিবারে পুরুষানুক্রমে দাসত্ব করিয়াছে। আজ ।
তাহার কৃতজ্ঞতা-স্বরূপ সে আপন জীবন-বিনিময়েও
রাজকুমারের প্রাণরক্ষায় বদ্ধপরিকর হইল।
রজনীর অন্ধকার ক্রমশঃ গাঢ় হইয়া নামিতেছিল।
পান্না রাজকুমার এবং নিজ পুত্রকে শয়ন করাইয়া স্বয়ং
পার্শ্বে বসিয়া বাতাস করিতেছিল। মাঝে মাঝে
একবার তাহার তন্দ্রাও আসিতেছিল।
চারিদিক নিস্তব্ধ-পাতাটি
নিস্তব্ধ-পাতাটি নড়িলে শুনা যায়।
ধাত্রী পান্না।
এমন সময় কাহার পদশব্দ শুনা গেল। পান্না
ত্বরিতে দ্বার খুলিয়া দেখিল-রাজবাটীর বৃদ্ধ ভৃত্য
ব্যস্তভাবে তাহারই নিকট আসিতেছে। পান্না জিজ্ঞাসা
করিল, “চন্দ্রধর, সংবাদ কি ?
“সংবাদ বড় মুদ। রাজকুমারের জীবন-সংশয়।
বিশ্বাসঘাতক বনবীর, বােধ হয়, সত্বরই কুমারের
জীবন-নাশের জন্য এখানে আসিবে। আমি এই
সংবাদ পাইয়াই তােমার নিকট আসিতেছি। এখন
উপায় কি?”
“আমি যাহা ভয় করিয়াছিলাম, দেখিতেছি,
তাহাই হইতে চলিল। কিন্তু যে কোন উপায়ে হউক,
স্বর্গীয় মহারাণার একমাত্র বংশধরকে রক্ষা করিতে
হইবেই।” পান্না কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া পুনরায়
বলিল, “দেখ, চন্দ্রধর, রাজকুমারকে এই মুহূর্তেই
স্থানান্তরিত করা ব্যতীত অন্য উপায় দেখিতেছি না।
তুমি ইহার জীবন রক্ষা কর।”
“এ যুক্তি মন্দ নয়, কিন্তু আজ বড় ভয়ঙ্কর দিন।
চতুর্দিকেই অতি সতর্ক কঠিন পাহারা। উপযুক্ত
কারণ ব্যতীত কোন প্রাণীর রাজবাটী হইতে বাহির
হইবার উপায় নাই।”
কাহিনী। “আমি এক উপায় স্থির করিয়াছি। তুমি ঐ ঝুড়িটিতে কুমারকে রাখিয়া উপরে কিছু জঞ্জাল চাপাইয়া লইয়া যাও, তাহা হইলে আর কেহই তােমায় সন্দেহ করিবে না।” ইহা বলিয়া পান্না তাহার পরিচিত এক, জৈন সদাগরের গৃহে কুমারকে লইয়া আশ্রয় গ্রহণ করিতে তাহাকে উপদেশ দিল। “স্বীকার করিলাম, কিন্তু যখন কুমারের সন্ধান না পাইয়া চারিদিকে লােক ছুটিবে, সে সময়ের উপায়?” “সে উপায়ও আমি ভাবিয়া রাখিয়াছি। বনবীর জানিবেন না যে রাজকুমারকে স্থানান্তরিত করা হইয়াছে। আমি ইতিমধ্যে আমার পুত্রকে কুমারের অলঙ্কার ও পরিচ্ছদে ভূষিত করিয়া রাজ শয্যায় শয়ন করাইয়া রাখিব। ভবিতব্য কে খাইতে পারে? আমার বড় স্নেহের পুত্র, যদি ইহার জীবনের বিনিময়েও মেবার রাজবংশের ভবিষ্যৎ গৌরব রাজ- কুমারকে রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলেও আমার জীবনকে ধন্য জ্ঞান করিব।” চন্দ্ৰধর স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার মুখ হইতে একটি কথাও বাহির হইল না। ৩৮ ধাত্রী পান্না। দিল। পান্না ধীরে ধীরে উঠিয়া সেই ঝুড়ি লইয়া আসিল। ধীরে ধীরে রাজকুমারকে তাহাতে রক্ষা করিয়া কতকগুলি আবর্জনায় ঝুড়িটি পূর্ণ করিয়া চন্দ্ৰধর নির্বাকভাবে পান্নার কাৰ্যকলাপ দেখিতেছিল। পান্না বলিল “চন্দ্রধর, আর বিলম্ব করিও না। সত্বর রাজকুমারকে লইয়া চলিয়া যাও।” “কিন্তু, পান্না, তুমি এ কি করিতেছ-জননী হইয়া ঘাতক হস্তে নিজ পুত্রের জীবন উৎসর্গ ?” “আমি আমার শ্রেষ্ঠ কৰ্তব্য পালন করিতেছি। তুমি আর বিলম্ব করিও না।” চন্দ্রধর চলিয়া গেল। পান্না আপন পুত্রকে রাজ- শয্যায় শয়ন করাইয়া ঘাতকের অপেক্ষায় বসিয়া রহিল। রাত্রি দ্বিপ্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে। চারিদিক নিস্তব্ধ। সহসা আবার সেই পদশব্দ। পান্না ভয় বিহ্বল চিত্তে চাহিয়া দেখিল, দ্বারে বনবীর দণ্ডায়- মান। পান্না উঠিয়া দাঁড়াইল। “পান্না, রাজকুমার কেমন আছেন? শারীরিক ভাল ত?” এই বলিয়া বিশ্বাসঘাতক বনবীর কুমারের শয্যাভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিল।
কাহিনী।
;
পান্নার হৃদয় তখন কঁপিয়া উঠিল। বনবীর
কয়েক মুহূৰ্ত্ত কুমারের শয্যা-পার্শ্বে দাড়াইয়া রহিল
তাহার পর সহসা বস্ত্রমধ্য হইতে লুক্কায়িত এক
তীক্ষ ছুরিক বাহির করিয়া শিশুর কোমল অঙ্গে
বসাইয়া দিল। তৎক্ষণাৎ একটি করণ চীৎকার
প্রতিধ্বনিত হইয়া সমগ্র রাজপ্রাসাদ সচকিত করিয়া
তুলিল। বনবীর আত্মরক্ষার জন্য ত্বরিত পদে
তথা হইতে প্রস্থান করিল।
অল্পকাল মধ্যেই চারিদিক হইতে অনেকে পান্নার
গৃহাভিমুখে ছুটিয়া আসিল। আসিয়া যাহা দেখিল,
তাহাতে তাহাদের হৃদয়ের রক্ত-ভয়ে ও বিস্ময়ে
যেন হিম হইয়া আসিল। তাহারা দেখিল, শিশুর
তরল রক্তে গৃহ প্লাবিত–পান্না মুচ্ছিতা। বহু কষ্টে
পান্নার জ্ঞান হইলে, সকলে তাহাকে, জিজ্ঞাসা করিল
“কে রাজকুমারকে হত্যা করিল ?” পান্না তৎকালে
প্রকৃত ঘটনা গােপন করিয়া সংক্ষেপে বলিল, “এক
ভীষণ-আকার দ্য সহসা গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়াই
রাজকুমারকে হত্যা করিতে উদ্যত হইল। আমি
ভয়ে চীৎকার করিয়া মূচ্ছিত হইয়া পড়িলাম। তাহার
পর কি হইল, কিছুই জানি না।”
৪০
ধাত্রী পান্না।
সকলে ভাবিল, রাজকুমারই হত হইয়াছেন।
পান্না তৎপরে রাজবাটী পরিত্যাগ করিয়া উদয়
সিংহের পরিচর্যার নিমিত্ত পূর্বকথিত নির্দিষ্ট স্থানে
আসিয়া মিলিত হইল।
তাহার পর, উদয়সিংহ বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া যখন
মেবার সিংহাসন অধিকার করিলেন, বনবীর তাহার
বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত প্রতিফল পাইল। আর
পান্না রাজমাতার ন্যায় আজীবন রাজগৃহে পূজা ও
সম্মান লাভে বঞ্চিতা হন নাই-মৃত্যুর পরও,সে
আজ কত শত যুগ চলিয়া গিয়াছে-ভক্তি ও শ্রদ্ধার
সগৌরব স্মৃতিতে মণ্ডিত হইয়া পান্নার নাম এ
কালের নরনারীর চিত্তেও অমর অক্ষরে প্রতিফলিত
রহিয়াছে। তাহার পুণ্য কাহিনীর অমল দীপ্তিতে
সারা গগন আজ উজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে—সে স্মৃতি
কখনও মুছিবে না, সে দীপ্তি কখনও নিভিবে না।
গশাের রাজমহিষী। মধ্যভারতে গণণার একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যখন ছােট বড় হিন্দুরাজ্যগুলি একে একে মােগল সাম্রাজ্যের অন্তভূত হইয়া হিন্দুর বাহুবল কলঙ্কিত করিতেছিল, সেই সময়ে গণাের ক্ষুদ্র হইলেও আপন স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রাণ- পণ চেষ্টায় ত্রুটি করে নাই। মােগল কর্তৃক পরাভূত পাঠানেরাও তৎকালে রাজ্যান্তরে বিতাড়িত হইয়া ফিরিতেছিল, তাহা- রাও এক্ষণে সুযােগ বুঝিয়া এই সকল হিন্দুরাজ্যের উপর অশেষ প্রকার উৎপীড়ন আরম্ভ কোথাও বা লুণ্ঠনে, কোথাও বা নিরীহের প্রতি অযথা অত্যাচারে তাহারা আপন:- দিগের বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখাইতেছিল। সকল পাঠান—সুবাদার বা উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন, তাঁহারাও অনন্যোপায় হইয়া এই সুযােগে . করিল। 82
গণণার রাজমহিষী।
দুই একটি নিরীহ হিন্দু জাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া
আপনাদিগকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পশ্চাৎপদ হইলেন
।
এইরূপে বিতাড়িত এক পাঠান সেনাপতির দৃষ্টি
গণাের রাজের উপর পড়িল। তিনি সদলবলে
গণাের রাজ্য আক্রমণ করিলেন। গলাের-রাজ
তাহার নির্বাচিত কয়েক সহস্র সৈন্য লইয়া পাঠানের
বিরুদ্ধে যাত্রা করিলেন। হিন্দু মুসলমানে ঘাের
সংগ্রাম বাধিল-কয়েক দিবস-ব্যাপ ভীষণ যুদ্ধের
পর বিজয় লক্ষ্মী অবশেষে মুসলমান সেনাপতিরই
অঙ্কশায়িনী হইলেন। গণােররাজ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ
দিলেন।
এই সংবাদ যখন গণের রাজমহিষীর নিকট
পৌছিল, তখন তিনি এই আসন্ন বিপদে কিছুমাত্র
বিচলিত না হইয়া অকাতরে স্বামী-শােক সম্বরণ
করিলেন এবং স্বয়ং কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া
রাজ্যের চতুম্পার্শ্ব হইতে সৈন্য সংগ্রহে প্রবৃত্ত হইলেন।
তাহার প্রাণােদ্দীপক বক্তৃতায় অনেক হিন্দু তাহার
পক্ষে আসিয়া যােগদান করিল।
সেই সকল সৈন্য সমভিব্যাহারে তিনি স্বয়ং
কাহিনী। পাঠান সেনাপতির সম্মুখীন হইলেন। আবার যুদ্ধ আরম্ভ হইল। অক্লান্ত পরিশ্রমে হিন্দু সৈন্য মুসলমান- দিগের সহিত সমভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিল। সেই যুদ্ধে অসংখ্য পাঠান হত ও আহত হইয়া হিন্দুর বিজয় বার্তা ঘােষণা করিল। এইরূপে পর পর পাঁচটি দুর্গ শক্রর হস্ত হইতে রক্ষা করিয়া তিনি অবশিষ্ট সৈন্য সমেত নর্মদার তীরবর্তী তাহাদিগের প্রধান দুর্গে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কিন্তু ভাগ্য তাহাদিগের প্রতিকূলে। সবেমাত্র তিনি নর্মদা অতিক্রম করিয়া দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিতেছেন—বহু সৈন্য তখনও নর্মদা বক্ষে, —এমন সময় উন্মত্ত পাঠানেরা সুযােগ বুঝিয়া সহসা দুর্গ আক্রমণ করিল। রাণী নিরুপায় হইয়া তৎক্ষণাৎ দুর্গ-দ্বার রুদ্ধ করিতে আদেশ দিলেন। পাঠানেরা প্রথমেই দুর্গের বহির্ভাগে পরিত্যক্ত সৈন্যের উপর নিতান্ত নৃশংস অত্যাচার করিল। অল্পকালের মধ্যেই হিন্দুর তপ্ত-রক্তে নর্মদা-বক্ষ রঞ্জিত হইয়া উঠিল। দুর্গের দ্বার রুদ্ধ দেখিয়া শত সহস্র পাঠান প্রাচীরগাত্রে মই লাগাইয়া দুর্গমধ্যে লাফাইয়া পড়িতে ৪৪ গণের রাজমহিষী। লাগিল। রাণীর সহিত কয়েক সহস্ৰমাত্র রক্ষী দুর্গে প্রবেশ করিবার সুযােগ পাইয়াছিল। তাহারা রাণীর পশ্চাতে থাকিয়া একবার শেষ রক্ষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করিতে সঙ্কল্প করিল। কিন্তু হায়, সব বৃথা! সে অসংখ্য পাঠান সৈন্যের নিকট মুষ্টিমেয় হিন্দু সৈন্য কি করিবে? রাণীর সৈন্যসংখ্যা ক্রমশঃ ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া আসিল। জয়ের আশা একবারে অসম্ভব বলিয়া বােধ হইল। তথাপি হিন্দুদিগের যুদ্ধের অবসান নাই। রাণী অগত্যা নিরুপায় হইয়া পাঠানের বশ্যতা স্বীকার করিলেন। পাঠান-সেনাপতি রাণীর অতুলনীয় সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হইয়াছিলেন। তাহার আদেশ ছিল, গণাের- রাজমহিষীকে জীবিত অবস্থায় বন্দী করিতে। এখন তাঁহাকে স্বয়ং বশ্যতা স্বীকার করিতে দেখিয়া তিনি অতিশয় আনন্দিত হইলেন; একজন বিশ্বস্ত পাঠান দূত দ্বারা রাণীর নিকট সংবাদ পাঠাইলেন ‘আমি আপনার বীরত্ব দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। ৪৫
কাহিনী।
বীরত্ব গণণার-রাজমহিষীরই উপযুক্ত হইয়াছে।
আপনি পূর্বের ন্যায় এখনও সেইরূপ নবাব-মহিষী-
রূপে সমগ্র গণাের-রাজ্য এবং এ গােলামের উপর
প্রভুত্ব করিয়া দাসকে কৃতার্থ করুন, ইহাই আমার
প্রার্থনা।
পত্র পাঠ করিয়া রাণী মনে মনে চিন্তা করিতে
লাগিলেন, আমি হিন্দু রমণী, মৃত্যুকে ভয়
করি না। কিন্তু যতদিন এই দুৰ্বত্ত পাঠান তাহার
পাপ অভিলাষের উপযুক্ত শাস্তি না পাইতেছে,
ততদিন মৃত্যুতেও আমার শান্তি নাই। এখন
তাহার নীচ প্রস্তাবে অসম্মতি জানাইলে কামােন্মত্ত
পাঠান আমার উপর বল প্রয়ােগে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত
হইবে না। কৌশলে কার্যোদ্ধার ব্যতীত অন্য
উপায় দেখিতেছি না। ভাবিয়া সেই পাঠান দূতের
মুখেই তিনি উত্তর দিলেন, তােমার প্রভুকে বলিও
আমি তাহার সৌজন্যে সাতিশয় প্রীত হইলাম।
তিনি আমাকে দয়া করিয়া পত্নীত্বে বরণ করিলে,
তাহা বিশেষ শ্লাঘ্য মনে করিব। কিন্তু আমার একটি
অনুরােধ আছে। আমাদের বংশের চির-প্রচলিত
নিয়মানুসারে বিবাহদি উৎসবে একটি উচ্চ মঞ্চ
৪
গণাের রাজমহিষী। নির্মাণ করাইতে হয়। এই মঞ্চ-নির্মাণে যে সময়ের প্রয়ােজন, তৎকাল অবধি তিনি যেন আমায় সময় দান করেন। বলা বাহুল্য, রাণীর প্রার্থনা তথনই মঞ্জুর হইল। ইতিমধ্যেই রাণী একটি বহুমূল্য রাজপরিচ্ছদ পাঠান- সেনাপতিকে উপহার পাঠাইলেন। সেনাপতি হিন্দু রমণীর ভালবাসার প্রথম নিদর্শন পাইয়া আনন্দে আত্মহারা হইয়া পড়িলেন। কত সুখের কল্পনাই তাহার মনে জাগিতে লাগিল। যথা সময়ে প্রাসাদের এক বিস্তৃত প্রাঙ্গণে মঞ্চ নিৰ্ম্মিত হইল। শুপীকৃত বারুদের রাশি—তাহার উপর কিংখাপের শয্যা রচিত। রাণী একটি মখমলের আসনে উপবিষ্টা এবং তাহার চতুষ্পর্শ্বে সহচরিগণ সুন্দর বেশে সজ্জিত হইয়া তাহাকে ঘিরিয়া আছে। তাহাদের প্রত্যেকের হস্তে এক একটি মশাল। পাঠান-রাজ পূৰ্বেই সংবাদ পাইয়াছিলেন। আজ আর তাহার আনন্দের সীমা নাই। তাহার সহিত সমুদয় পাঠান সৈন্যও আনন্দে উন্মত্ত। নৃত্যে, গীতে, আনন্দে, শােভায় সমুদয় গলাের-রাজ্য এক অপূর্ব শ্রী ধারণ করিয়াছে। সন্ধ্যা-সমাগমেই ৪৭ কাহিনী। সেনাপতি ভাবী পত্নীর প্রথম দান সেই অপরূপ পরিচ্ছদটি পরিধান করিয়া গণণার প্রাসাদে পত্নী সম্ভাষণে চলিলেন—পশ্চাতে তাহার অসংখ্য অনুচর। সেনাপতি প্রাসাদের সম্মুখীন হইলে, রাণী স্বয়ং আসিয়া উহাকে অভ্যর্থনা করিয়া মঞ্চের নিকট লইয়া যাইলেন। তথায় তাঁহাকে উপবেশন করাইয়া পরস্পর বাক্যালাপে কাল হরণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইলে পাঠান- সেনাপতি হঠাৎ মূচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। ক্রমে মৃত্যু-চিহ্ন তাহার মুখমণ্ডলে স্পষ্টই ফুটিয়া উঠিল। বিকারের ঘােরে তিনি সেই মূল্যবান পােষাকটি খণ্ড খণ্ড করিতে লাগিলেন। রাণী তখন হৃষ্ট চিত্তে তাহাকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন, ‘পাঠানরাজ । তুমি হিন্দু রমণীর সতীত্বের উপর হস্তক্ষেপ করিতে গিয়াছিলে, তাই তােমার এই শাস্তি। তােমার ন্যায় পিশাচের হস্ত হইতে উদ্ধার-লাভ জন্য বিষাক্ত পােষাক তােমায় উপহার পাঠান হইয়াছিল, আজ আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইল। এই কথা বলিয়া রাণী চকিতের মধ্যে প্রাসাদের গবাক্ষ দিয়া নর্মদার স্ফীত বক্ষে ঝাপাইয়া পড়িলেন। ৪৮ গণাের রাজমহিষী। পাঠান সেনাপতির মৃত্যু-কাহিনী চারিদিকে প্রচারিত হইবার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্দপ্ত পাঠান সৈন্যেরা প্রতিহিংসা-পরবশ হইয়া রাণীর উদ্দেশে ধাবিত হইল। কিন্তু কোথায় রাণী! সম্মুখে রাণীর সহ- চরিবৃন্দকে দেখিতে পাইয়া সৈন্যগণ তাহাদিগকেই আক্রমণ করিল। পূৰ্বেই বলিয়াছি, সেই মঞ্চ বারুদ- পূর্ণ ছিল। এক্ষণে তাহারা হাসিতে হাসিতে সেই বারুদে মশালের আগুণ ধরাইয়া দিল। মুহূর্তে ভীষণ শব্দে রাজপ্রাসাদ প্রকম্পিত হইয়া উঠিল। তাহার পর সকলই নীরব। পরদিন বহু কষ্টে পাঠান সেনাপতির অর্ধদগ্ধ মৃতদেহ রাজপ্রাসাদ হইতে উদ্ধার কয়িয়া ভূপালের নিকটবর্তী একটি স্থানে তাহা সমাহিত করা হয়। অদ্যাবধি সে সমাধিমন্দির সেখানে বর্তমান রহিয়াছে। -
রাণী দুর্গাবতী।
গড়মণ্ডল একটি ক্ষুদ্র রাজ্য, মধ্য ভারতে অবস্থিত।
সম্রাট আকবরের প্রবল প্রতাপে ভারতের অনেক
ভূপতি মােগলের বশ্যতা স্বীকার করিলেও গড়মণ্ডল
তখনও পর্যন্ত স্বাধীনভাবে আপন শাসন বিস্তার
করিতেছিল। সর্বাপেক্ষা বিস্ময়ের বিষয় ছিল,
সেই ক্ষুদ্র রাজ্যের অধিপতি, একজন রমণী।
দুর্গাবতী গড়মণ্ডলের রাণী। তিনি কনৌজরাজ
চন্দনসিংহের কন্যা। দুর্গাবতী অসামান্থা রূপসী
তাঁহার পিতার ইচ্ছা ছিল, কোন
সম্রান্তবংশীয় রাজপুত নৃপতির সহিত তাহার বিবাহ
দিবেন। কিন্তু দুর্গাবতী আর একজনকে ভাল
বাসিয়াছিলেন—তিনি এই গড়মণ্ডলের অধিপতি
দলপত সা। দুর্গাবতী তাঁহাকে পিতার নিকট
বিবাহের প্রস্তাব করিতে লিখিলেন। চন্দনসিং
এ বিবাহে সম্মত হইলেন না। মণ্ডল-অধিপতি
ছিলেন।
রাণী দুর্গাবতী। ইহাতে অপমান বােধ করিয়া কনৌজ আক্রমণ এবং চন্দনসিংকে পরাস্ত করিয়া দুর্গাবতীকে লইয়া প্রস্থান করিলেন। কয়েক বৎসর সুখেই সুখেই অতিবাহিত হইল। দুর্গাবতীর এক পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হইল। পুত্রের জন্মােৎসবে গড়মণ্ডলের ঘরে ঘরে আনন্দের উৎস ছুটিল। পুত্রের নাম রাখা হইল—বীর নারায়ণ। সুখ দুঃখের আবর্তন চক্রনেমিরই মত-চিরদিন কাহারও অদৃষ্টে সুখভােগ ঘটে না। সকলকে শােকসাগরে ভাসাইয়া দলপত সা একদিন অকালে প্রাণ বিসর্জন করিলেন। সেই গভীর শােক এবং দুঃখের মধ্যেই শিশু পুত্রের অভিভাবকরূপে রাণী দুর্গাবতীকে রাজ্যভার গ্রহণ করিতে হইল। অবসরের মুহূর্তগুলি দারুণ শােকে তাঁহাকে অভিভূত করিয়া তুলিলেও কর্তব্য- সাধনকালে তাহার উৎসাহের সীমা থাকিত না। সে সময় তিনি সকল শােক বিস্মৃত হইতেন। রমণী হই- লেও রাজকাৰ্য-পরিচালনায় তাহার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। গড়ুমণ্ডলের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাহার প্রাণপণ পরিশ্রম ও যত্নের কাহিনীতে ইতিহাসের
কাহিনী।
পৃষ্ঠা আজ সমুজ্জল, এবং এই দেশের জন্যই অকাতরে
আপনার শরীর প্রাণ উৎসর্গ করিতে তিনি কাতর
হন নাই।
বাদশাহ আকবরের অধীনস্থ মধ্য ভারতের
শাসনকর্তৃগণ বার বার গড়মণ্ডল অধিকারের জন্য
সম্রাটের অনুমতি প্রার্থনা করিতে লাগিলেন।
আকবর গুণের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি এই
ক্ষুদ্র রাজ্যের রাণীর বীরত্বের কাহিনী শুনিয়াছিলেন।
এই ক্ষুদ্র রাজ্যের তিনি মাতৃস্বরূপিনী। দেশের
হিতের জন্য অকাতরে তিনি কত অর্থ ব্যয়
করিয়াছেন—পুষ্করিণী খনন, দাতব্য চিকিৎসালয়
প্রতিষ্ঠা, দেবমন্দির স্থাপন প্রভৃতি অসংখ্য কীর্তি
এখনও পর্যন্ত হার মহিমা প্রচার করিতেছে।
গড়মণ্ডল ক্ষুদ্র রাজ্য হইলেও, সুশাসনে প্রজার সুখের
সীমা ছিল না—দেশ ধনধান্যে পরিপূর্ণ থাকায় কলা-
শিল্পেরও সমধিক উন্নতি হইয়াছিল।
আকবর বার বার প্রতিনিধিবর্গের প্রস্তাব
প্রত্যাখ্যান করিলেও মধ্য ভারতের অন্যতম
শাসনকর্তা আশফ খাঁর যুক্তি অগ্রাহ করিতে
পারিলেন না। আশফ খাঁর অধীনে একদল সৈন্য
৫২
রাণী দুর্গাবতী।
গড়মণ্ডল অভিমুখে প্রেরিত হইল। দুর্গাবতী কখনই
প্রবল প্রতাপান্বিত মােগল সম্রাটের সমকক্ষ হইতে
পারেন না। বাদশাহ ইচ্ছা করিলে বহুদিন পূৰ্ব্বেই
তাঁহার ক্ষুদ্র রাজ্য অধিকার করিতে পারিতেন।
দুর্গাবতীর পক্ষে দেশরক্ষার আশা দুরাশা মাত্র
তথাপি তিনি একবারে নিরাশ হইলেন না-হয়
রাজ্যরক্ষা, না হয় জীবন বিসর্জন-ইহাই তাহার
সঙ্কল্প হইল।
সমগ্র গড়মণ্ডল হইতে অষ্ট সহস্র অশ্বারােহী এবং
দ্বিসহ হস্তি সংগৃহীত হইল। গড়মণ্ডলের সকল
বীর বীরনারীর অধিনায়কতায় দেশের স্বাধীনতা
রক্ষার জন্য অগ্রসর হইল। রণরঙ্গিণী রমণীর
উৎসাহ দেখিয়া বীরহৃদয়ের উৎসাহ সহস্র গুণ বর্ধিত
হইল—দুর্বলের প্রাণেও শক্তি সঞ্চারিত হইল।
আশফ । নিমেষের জন্যও ভাবেন নাই যে
সামান্য গড়মণ্ডল হইতে এত সৈন্য সংগৃহীত হইতে
কাহিনী।
পারে।
আবার সে সৈন্যগণের হৃদয় অটল,
ভীতিকম্পিত নহে। তিনি ভাবিয়াছিলেন, গড়-
মণ্ডলের ন্যায় সামান্য রাজ্য অধিকার করিতে গুরু
আয়ােজনের প্রয়ােজন হইবে না। তাই তিনি
পঞ্চ সহস্র মাত্র অশ্বারােহী লইক গড় আক্রমণে
আসিয়াছিলেন। এখন তিনি আপনার ভ্রম বুঝিতে
পারিলেন। যাহাকে তিনি সামান্যা রমণী ভাবিয়া
ছিলেন তিনি অসামান্য বীরবালা। সেনাপতি
দেখিলেন, এই অল্পসংখ্যক সৈন্য লইয়া যুদ্ধ করা
শুধু বল ক্ষয় করা মাত্র, তথাপি তিনি ফিরিতে
পারিলেন না,অন্তত মােগল সম্রাটের সম্মান
রক্ষার জন্যও যুদ্ধ করিতে হইবে।
উভয় পক্ষে তুমুল সংগ্রাম চলিল। সেই যুদ্ধে
রাজসৈন্য শােচনীয় ভাবে পরাস্ত ও নিহত হইল।
আশফ খাঁ অতি কষ্টে প্রাণ লইয়া দিল্লীতে প্রত্যাবর্তন
করিলেন। গড়মণ্ডলে আনন্দের জয়ধ্বনি উঠিল।
কিন্তু দুর্গাবতীর মনে এক তিলও আনন্দ দেখা দিল
, কারণ তিনি জানিতেন, মােগল সম্রাট যখন গড়
অধিকারে সঙ্কল্প করিয়াছেন, তখন সহজে নিরন্ত
হইবেন না। এবার গভীর আক্রোশে সম্রাটের
রাণী দুর্গাবতী।
বিপুল বাহিনী গড়মগুলের গিরিব ছাইয়া ফেলিবে।
দুর্গাবতী যাহা ভাবিয়াছিলেন, তাহাই ঘটিল।
দুই বৎসর অতীত হইতে না হইতে আশফ খাঁ
পুনরায় গড় আক্রমণ করিলেন। এবার তাহার
সৈন্যদল অংখ্য ! মােগলের জয়পতাকা উড়াইবার
জন্য আয়ােজন এবার চূড়ান্ত হইয়াছিল।
দুর্গাবতী জীবন পণ করিয়া রাজ্যের স্বাধীনতা
রক্ষায় ব্রতী হইলেন। দেহে প্রাণ থাকিতে
কাহাকেও তিনি তাহার সাধের গড় অধিকার
করিতে দিবেন না, ইহাই তাহার সঙ্কল্প হইল।
পূর্বের ন্যায় তিনি এবারও বহু সৈন্য সংগ্রহ করিয়া
শক্রর সম্মুখীন হইলেন। এবারও বিজয় লক্ষ্মী
তাহার প্রতি সুপ্রসন্না হইলেন। আশফ খাঁ পরাস্ত
হইয়া শৃগালের মত পলায়ন করিলেন।
আশফ খা দেখিলেন, সম্মুখ যুদ্ধে জয়লাভ
করিবার কোন আশা নাই। কৌশলে কার্যোদ্ধার
করিতে হইবে স্থির করিয়া তিনি কয়েকটি গুপ্তচর
নিযুক্ত করিলেন। উৎকোচ-দানে মণ্ডল সৈন্যগণকে
পক্ষভুক্ত করিবার সকল চেষ্টাই তাহাদিগের ব্যর্থ
হইল। তাহাতে সুবিধা হইল না। তখন তাহারা
কাহিনী।
গৃহবিবাদের বীজবপনে রত হইল। আশার গাছে
ফল ধরিতে বিলম্ব হইল না। পরস্পরের মধ্যে
মনােমালিঙ্গ সঞ্চারিত হইল। সুযােগ বুঝিয়া
মুসলমান সেনাপতি তখন তৃতীয় বার আসিয়া গড়
আক্রমণ করিলেন। দুর্গাবতী সেলিন, এবার
আর রক্ষা নাই। যখন আত্ম-কলহ গৃহ-বিচ্ছেদ
আসিয়া দেশবাসীর হৃদয় অধিকার করিয়াছে, তখন
দেশের জন্য আর কাহারও প্রাণ দিবে না।
দুর্গাবতী একবারে ভগ্নোৎসাহ হইয়া পড়িলেন,
তথাপি তিনি মুসলমানের বশ্যতা স্বীকার করিতে
পারিবেন না। তাহা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়। তিনি
তাহার চতুর্দশবর্ষীয় পুত্রকে সঙ্গে লইয়া, যে কয়েক
সহস্র সৈন্য সাগ্রহে আসিল, তাহাদিগকে লইয়াই,
যুদ্ধক্ষেত্রে নামিলেন।
সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলিল। দুর্গা-
বতী দেখিলেন, তাহার স্নেহের পুত্র বীরনারায়ণ
আহত হইয়া অশ্বপৃষ্ঠ হইতে ভূতলে পড়িলেন।
তখনই তাঁহাকে স্থানান্তরিত করা হইল। কয়েক
মুহূর্ত পরে সংবাদ আসিল, মুমু পুত্র মৃত্যুর পূর্বে
একবার তাঁহাকে দেখিতে চাহে। রাণী বলিলেন,
রাণী দুর্গাবতী। এখন আমার যাইবার সময় নাই। আমার অদর্শনে সৈন্যগণ ছত্রভঙ্গ নিরুৎসাহ হইয়া পড়িবে। যদি আমার পুত্রের মৃত্যুই হয়, তাহা হইলে পরজগতে আবার আমরা শীঘ্রই মিলিত হইব। মাতার হৃদয় একটুও কপিল না ;যুদ্ধ চলিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ অতীত হইলে বিপক্ষ দল হইতে একটি তীর সবেগে আসিয়া রাণীর চক্ষুতে আঘাত করিল। রাণী স্বহস্তে তাহা চক্ষু হইতে তুলিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না। তথাপি যুদ্ধে ক্ষান্তি দিলেন না। তারপর ক্রমে তাহার সমুদয় সৈন্যই হত ও আহত হইয়া পড়িল। কেবল কয়েক শত মাত্র তাঁহার শরীর রক্ষার জন্য তখনও পর্যন্ত প্রাণপণে যুদ্ধ করিতেছিল। রাণী দেখিলেন, আর রক্ষা নাই, বন্দী হইতে বিলম্ব নাই। বনের সিংহিনী বন্দিনী হইবে? না, কখনও ! তবে উপায়? মুহূর্তের জন্য তিনি একবার যুদ্ধক্ষেত্রের পরিণাম কল্পনানেত্রে প্রত্যক্ষ করিলেন- তাঁহার সাধের গড়ের কি দশা হইবে ভাবিয়া কাতর হইলেন। কিন্তু আর ভাবিবারও সময় নাই। ঐ মুসলমানের বিজয়-উল্লাস! ঐ তাহাদিগের রণােন্মাদ =
কাহিনী।
হুঙ্কার! আর নহে ! আর আশা নাই। স্বহস্তে
রাণী আত্মপ্রাণ বিসর্জন দিলেন।
তাহার এক বিশ্বস্ত সৈনিক সে পবিত্র মৃতদেহ
রণস্থল হইতে লইয়া আসিয়া তাহার যথারীতি সৎকার
করিয়া শত্রুর রুদ্র হস্তের স্পর্শ-কাল্লি হইতে রক্ষা
করিল।
যােধপুর রাণী।
সাজাহানের রাজত্বকালে . যােধপুর-অধিপতি
যশােবন্ত সিং প্রবল প্রতাপান্বিত মােগল সম্রাটের
দক্ষিণ হস্ত স্বরূপ ছিলেন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
ঔরঙ্গজেব যখন বিদ্রোহের নিশান তুলিয়া দিল্লী
অভিমুখে অগ্রসর হইতেছিলেন, সেই সময় রাজা
যশােবন্ত সিংহ কয়েক সহস্র সৈন্য সমভিব্যহারে
ঔরঙ্গজেবের পথ রােধ করিতে অগ্রসর হন।
নর্মদার সন্নিকটে এক যুদ্ধ হয়—সেই যুদ্ধে সূর্যাস্তের
সঙ্গে সঙ্গেই দশ সহস্র মােগল সৈন্য প্রাণ বিসর্জন
করিল। যশােবন্ত সিংহ পরাস্ত হইয়া স্বরাজ্যে প্রত্যা-
বৰ্তন করিলেন, কিন্তু তাহার মনের মধ্যে এক গুরু-
চিন্তা বার বার উদয় হইয়া তাহাকে অতিশর পীড়িত
করিতে লাগিল। কেমন করিয়া তিনি রাণীর
নিকট মুখ দেখাইবেন? হয় ত তিনি এতক্ষণে তাহার
পরাভব-সংবাদ পাইয়াছেন। এইরূপ নানা চিন্তা
করিতে করিতে রাজা রাজধানী-অভিমুখে অগ্রসর
হইতে লাগিলেন।
কাহিনী। রাণী শুনিলেন, তাঁহার স্বামী যুদ্ধে পরাভূত হইয়া স্বরাজ্যে প্রত্যাবর্তন কবিতেছেন। তিনি তাহাকে অভ্যর্থনা করা দূরে থাকুক বরং আদেশ দিলেন, দুর্গদ্বার রুদ্ধ করিতে, যেন জনপ্রাণীও দুর্গ- মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারে। ‘আমার স্বামী ভীরু, কাপুরুষ ?-যােধপুরের অধিপতি, মেবারের মহারাণার জামাতা আজ এত- দূর হীন? কখনই না। আমার স্বামী নিশ্চয়ই যুদ্ধে প্রাণ দিয়াছেন। এ ব্যক্তি হয় কোন ছদ্মবেশী পাপিষ্ঠ, না হয় তাহার প্রেতমূর্তি। ইহার সহিত আমার সম্বন্ধ কিসের ? এই বলিয়া রাণী মনের খেয়ালে কল্পিত মৃত স্বামীর সহগামিনী হইবার জন্য চিতা সজ্জিত করিতে আদেশ করিলেন। আট দশ দিবস অতীত হইলে রাণীর মনােভাব অনেকটা প্রশমিত হইল। তিনি রাজাকে দেখি- বার জন্য উৎসুক হইয়া উঠিলেন তখন দ্বার উন্মুক্ত হইল। রাজা দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিলেন। রাণী স্বয়ং তাহার আহত স্থান ধৌত করিয়া দিলেন। ঔরঙ্গজেব দিল্লীর রাজতক্তে উপবেশন করিয়াই যশােবন্তকে দমন করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইলেন, যােধপুর রাণী কারণ সমগ্র রাজস্থানের মধ্যে একমাত্র যশােবন্তকেই তিনি ভয় করিতেন। কাবুলের শাসনকর্তা অনেক দিন হইতেই বিদ্রোহের নিশান তুলিয়াছিলেন। ঔরঙ্গজেব রাজা যশােবন্ত সিংহকে তাহার বিরুদ্ধে প্রেরণ করিলেন। অভিপ্রায়, শত্রুদমন—হয় আফ- গানদিগকে বশীভূত করুন, না হয় অসভ্য বর্বর আফগানের হস্তে রাজার মৃত্যু হউক। রাজা যশােবন্ত সম্মানের সহিত সে পদ গ্রহণ করিলেন। সম্মানের হইলেও সে পদে বিপদের সম্ভাবনাই সমধিক। রাণীও তাঁহার সহগামিনী হইবার জন্য অভিলাষিণী হইলেন। তাহারা উভয়ে পুত্র পৃথী সিংহের উপর রাজ্য ভার দিয়া এক বিপুল সৈন্যবাহিনী সহ আফগানদিগের বিরুদ্ধে যাত্রা করিলেন। রাণী রমণী হইলেও বীরজায়া। তিনি সামান্য সৈনিকের ন্যায়ই স্বামীর পার্শ্বে গমন করিতে লাগিলেন। সৈনিক-জীবনের সকল কষ্ট সহ করিতে অনভ্যস্ত হইলেও স্বামীর পার্শ্বে থাকায় তাঁহার কিছুমাত্র কষ্ট হইল না। এইরূপে অনেক দিন ধরিয়া বহু কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়া কত
কাহিনী।
পাহাড় পর্বত মাঠ অতিক্রম করিয়া তাহারা কাবুলে
আসিয়া পৌছিলেন। যশােবন্ত সিংহ দেখিলেন,
সমুদয় রাজ্য দুর্গে ছাইয়া গিয়াছে।
রাজপুত
বীরগণের কষ্টের আর সীমা নাই। একে চারি-
দিকেই বরফ-অবিশ্রাম তুষারপাত, তাহার উপর
আবার সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান—অসভ্য বর্বরগণ
তাহার অধিবাসী। এত কষ্টেও যােধপুর-রাণী
স্বামীর পশ্চাতে ছায়ার ন্যায় ঘুরিতে লাগিলেন
এবং সময়ে সময়ে তঁাহার পার্শ্বে থাকিয়া অসীম
সাহসে শক্রদিগের সম্মুখীন হইতেও পশ্চাৎপদ হইলেন
। তাহার অসীম বীরত্ব দেখিয়া রাজপুত বীরগণ
পর্যন্ত স্তম্ভিত হইয়া গেল।
কিন্তু, হায়! যশােবন্তের জীবন-নাট্য এইখানেই
শেষ হইল। তাহার পুত্র পৃথীসিংহ বিশেষ সম্মানের
সহিত দিল্লী সম্রাট কর্তৃক আহূত হইলেন, কিন্তু
তিনিও অল্পদিনের মধ্যে মানব-লীলা সম্বরণ করি-
লেন। ঔরঙ্গজেব গােপনে বিষ-প্রয়ােগে তাহাকে
হত্যা করিলেন। শয়তান ঔরঙ্গজেব জানিতেন,
যশােবন্ত কখনই অসভ্য আফগানদিগের হস্ত হইতে
রক্ষা পাইবেন না, এখন তাঁহার পুত্র যদি পিতৃশােকে
যােধপুর রাণী।
অন্ধ হইয়া তাহার বিরুদ্ধাচরণ করেন, তাই তাহাকেও
ধরাপৃষ্ঠ হইতে সরাইয়া দিলেন।
যশােন্তের মৃত্যুর পর পাৰ্বত্যময় আফগান
রাজ্যে রাণীর অবস্থা অতি ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল।
তিনি হিন্দু রমণী, স্বচ্ছন্দে স্বামীর চিতায় প্রাণ
দিতে পারিতেন, কিন্তু বিধি বাদী। তাহা'ও
তাঁহার ভাগ্যে ঘটিল না। রাণী তৎকালে অন্তঃসত্ত্বা
ছিলেন। তিনি রাজপুত-সৈন্যের অধিনেত্রী হইয়া
স্বরাজ্য অভিমুখে প্রত্যাবর্তন করিবার বন্দোবস্ত
করিতে লাগিলেন। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই
কাবুল নগরীতে তাঁহার এক পুত্র ভূমিষ্ঠ হইল।
কাজেই আরও মাসাধিক কাল সেখানে অতিবাহিত
করিয়া সকলে ভারতবর্ষে ফিরিলেন।
যথাসময়ে তাহারা দিল্লীতে আসিয়া উপস্থিত
হইলেন। রাণী এবং তাহার অনুচরর্গের ইচ্ছা,
একবারে যােধপুরে আসেন, কিন্তু ঔরঙ্গজেব তাহাদের
পথ অবরােধ করিলেন। তিনি শিশু পুত্রকে চাহেন।
রাণী দৃঢ়তার সহিত রাজ-আজ্ঞা প্রত্যাখ্যান
করিলেন। সমস্ত রাজপুত সৈন্য শিশু পুত্রের জীবন
রক্ষার জন্য সজ্জিত হইয়া দাড়াইল।
কাহিনী।
একটি মিষ্টান্নের ঝুড়িতে শিশু পুত্রকে শয়ন
করাইয়া কোন এক বিশ্বস্ত মুসলমান ভৃত্যের দ্বারা
এক নিরাপদ স্থানে পাঠাইয়া দেওয়া হইল।
প্রভুভক্ত ভৃত্য তাহাদের আগমন পর্যন্ত কুমারকে
লইয়া তথায় অপেক্ষা করিবে।
ভৃত্য কুমারকে লইয়া চলিয়া যাইবার পর
রাজপুতগণ বুদ্ধশয্যায় সজ্জিত হইয়া প্রাসাদ হইতে
বহির্গত হইল—রাণী তাহাদের অধিনেত্রী। তিনিও
যোদ্ধ বেশে। পথে সম্রাটের সৈন্যের সহিত ভীষণ
সংগ্রাম চলিতে লাগিল। বহু রাজপুত যুদ্ধ করিতে
করিতে বীরের ন্যায় প্রাণ
তথাপি
তাহারা বিরামহীন গতিতে অগ্রসর হইতে লাগিল।
রাণী ক্ষত-বিক্ষত শরীরে নির্দিষ্ট স্থানে আসিয়া
পুত্রের সহিত মিলিত হইলেন।
বহুক্ষণের পর
হৃদয়ের ধনকে বুকে ধরিয়া অনেকটা শান্তি লাভ
করিলেন।
রাণী তখন শিশু পুত্রকে কোলে লইয়া তাহার
ভ্রাতা মেবারের মহারাণার নিকট গমন করিয়া
সবিস্তারে তাহার দুঃখ-কাহিনী নিবেদন করিলেন।
তাহার ইতিহাস শুনিয়া অনেক রাজপুতেরই চক্ষু
দিল।
৬৪
যােধপুর রাণী।
ফুটিল। মহারাণা তাঁহার পুত্রের রক্ষণভার গ্রহণ
করিলেন।
তারপর রাণী যােধপুরে প্রত্যাবর্তন করিয়া
আজীবন মােগল রাজ্যের ধ্বংসের জন্য ঈশ্বরের
নিকট ঐকান্তিক প্রার্থনা করিতে লাগিলেন।
তঁাহার আশাও পূর্ণ হইয়াছিল। জীবিত অবস্থাতেই
তিনি মােগল রাজ্যের চরম পরিণতি দেখিয়া
শান্তিলাভ করিয়াছিলেন।
রাণী ভবানী
১
বাংলায় মুসলমান রাজত্বের প্রাক্কালে দেশের
আভ্যন্তরীন শাসনভার হিন্দু রাজদিগের উপরই
অনেকটা নির্ভর করিত। তাঁহারা যথেষ্ট ক্ষমতা
সম্পন্নও ছিলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে
মুর্শিদাবাদে রাজকর পাঠাইতে পারিলেই ভাবনা ছিল
, কিন্তু রাজকর পাঠাইতে অসমর্থ হইলেই নবাব
ফৌজ পাঠাইয়া তাঁহাদিগের ধনাগার লুণ্ঠন করিতেন
এবং প্রয়ােজনমত শিক্ষাও দিতেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে মুসলমান শক্তি ক্রমশঃ
হাস হইতে ছিল। দিল্লীশ্বর নামে মাত্র সম্রাট।
কাজেই বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তৃগণ সুযােগ
পাইয়া স্বাধীনতা গ্রহণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু
তাহাদেরও আধিপত্য অধিক কাল স্থায়ী হইতে
রাণী ভবানী। পারিল না ;-করদাতৃ দেশীয় রাজাগণ স্থানে স্থানে বিদ্ৰোহানল জ্বালিতে লাগিলেন। বাংলার শেষ নবাব আলিবর্দী খাঁ। আলিবর্দীর মৃত্যুর পর তাঁহার পৌত্র সিরাজদ্দৌলা নবাবের পদ গ্রহণ করেন। আলিবর্দী বহু কষ্টে দেশীয় রাজদিগকে তঁাহার বশ্যতা স্বীকার করাইয়াছিলেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিংহাসনের ভার এই হিন্দু রাজগণের উপরই ন্যস্ত ছিল। ইহাদিগের মধ্যে চারিজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য,কৃষ্ণ- নগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, ঢাকার রাজা রাজবল্লভ, পাটনার রাজা রামদুল্লভ, নাটোরের রাণী ভবানী। ইহারা সকলেই বিশেষ ক্ষমতাপন্ন এবং মুর্শিদাবাদের সিংহাসনের স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন। এতদ্ব্যতীত আরও দুইজনের নাম বাংলায় বিশেষ বিদিত-জগৎ শেঠ এবং নবাবের সেনাপতি মীর্জাফর। নাটোর রাজ্য নিতান্ত ক্ষুদ্র নহে। সমগ্র প্রদেশের বাৎসরিক আয় প্রায় দেড় কোটি মুদ্রা। বাংলার নবাবকেও প্রায় ৫২ লক্ষ মুদ্রা রাজকর দিতে হইত। এতদ্ব্যতীত সৈন্য রক্ষা প্রভৃতি অন্যান্য ব্যয়ও ছিল। রাণীর অধীনে প্রায় ৫০ সহস্র
কাহিনী।
অশ্বারােহী ও পদাতিক সৈন্য থাকিত। রাণী
ভবানীর স্বামীর নাম রাজা রামকান্ত। অতি অল্প
বয়স হইতেই তিনি ঘােরতর বিলাস-প্রিয় হইয়া
উঠিয়াছিলেন। তাঁহার পিতার প্রাচীন দেওয়ান
দয়ারাম অনেক চেষ্টা করিয়া তাহাকে সৎপথে
আনিতে পারিলেন না। রাণী ভবানী তখন
অল্পবয়স্কা হইলেও বিশেষ বুদ্ধিমতী ছিলেন, নানা
অনুনয় বিনয়, কিছুতেই তাঁহাকে নিরস্ত করিতে
পারিলেন না। রামকান্ত দেখিলেন, বৃদ্ধ দয়ারামই
তাহার পথের কণ্টক। তিনি কোন এক সামান্য
কারণে তাহাকে রাজকার্য হইতে অপসারিত
করিলেন। তখন আর তাহার কোন বাধা রহিল
অকাতরে জলের ন্যায় অর্থ ব্যয় করিতে
লাগিলেন। অভিভাবকহীন যুবক সঙ্গদোষে যেরূপ
হয় তাহাই হইলেন—দিন দিন অবনতির চরমে
নামিতে লাগিলেন। রাজকাৰ্য্য কিছুই পৰ্যালােচনা
করিতেন না। সৈনিকগণ নিয়মিত তাহাদের বেতন
পাইত না। ক্রমে ক্রমে রাজকরও বাকী পড়িতে
লাগিল।
একদিন
নবাবের
সৈন্ত আসিয়া
রাজপ্রাসাদ ঘিরিয়া দাঁড়াইল। তাহারা রাজাকে
রাণী ভবানী।
অকর্মণ্য ভাবিয়া অপর এক ব্যক্তিকে গদীতে
বসাইল। রামকান্ত রাজ্যচ্যুত হইয়া রাণী ভবানীর
সহিত জগৎ শেঠের গৃহে আশ্রয় লইলেন।
বিলাসিতা তাঁহাকে একবারে অকর্মণ্য করিয়া
তুলিয়াছিল। জীবনে কখনও তিনি দুঃখভােগ করেন
নাই, এখন দুঃখের মুখ দেখিয়া অভিভূত হইয়া পড়ি-
লেন। রাণী তাঁহাকে আশ্বাস দিলেন। এখন হইতে
তিনি রাণীর পরামর্শ না লইয়া কোন কাৰ্য্যই করি-
তেন না। ভবানী পুনরায় বৃদ্ধ দয়ারামকে আহ্বান
করিয়া পাঠাইলেন। তিনি তাহার বহুমূল্য অলঙ্কার
সকল নবাবের রাজকর্মচারীদিগকে উৎকোচ প্রদান
করিয়া কোন উপায়ে পুনরায় তাঁর স্বামীকে
নাটোরের রাজগদীতে বসাইলেন। আবার আনন্দ
ফিরিয়া আসিল।
এ সুর্থ ভবানীর অদৃষ্টে অধিক কাল স্থায়ী হইল
। তাহাকে নিঃসহায় অবস্থায় ফেলিয়া তাঁহার
স্বামী পরলােক গমন করিলেন। তাঁহার দুই পুত্রের
শিশু অবস্থাতেই মৃত্যু ঘটিয়াছিল—এক কন্যা ছিল,
তাহার নাম তারা। অদৃষ্ট দোষে তারাও বালবিধবা।
রাণী ভবানীর যখন স্বামী-বিয়ােগ হয়, তখন তাঁহার
কাহিনী।
বয়ঃক্রম সবে দ্বাত্রিংশ বর্ষ মাত্র। এই অল্প বয়সেই
তাঁহার হন্তে নাটোরের বিস্তৃত রাজ্যভার পতিত
হইল। কিন্তু তিনি এ কার্যে অনুপযুক্তা ছিলেন
। রাজকাৰ্য-পরিচালনে তিনি অদ্বিতীয়া ছিলেন
বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এতদ্ব্যতীত তিনি অনেক
সময়েই স্বয়ং সৈন্য পরিচালনা করিতেন।
রাণী রাজ্যভার গ্রহণ করিয়াই দেখিলেন, সৈন্য
সংখ্যা বর্ধিত করা ব্যতীত যথেচ্ছাচারী নবাবের হন্ত
হইতে তাঁহার রাজ্য রক্ষা করা অসম্ভব হইয়া উঠিবে।
নবাব সিরাজদ্দৌলার প্রকৃতিতে তখন উচ্ছলতা
ছিল। ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য তিনি অকাতরে অর্থ
ব্যয় করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। কিন্তু এত অর্থ
কেবল রাজকর হইতে সঙ্কুলান হইয়া উঠিত না,
কাজেই অসদুপায়েও তাঁহাকে অর্থ সংগ্রহ করিতে
এ কারণে অত্যাচারের মাত্রাও অনেক
বাড়িয়া গেল।
রাণী ভবানী অতিশয় বুদ্ধিমতী ছিলেন। তিনি
হইত।
রাণী ভবানী।
দেখিলেন, বাংলার রাজনৈতিক আকাশে শীঘ্রই এক
তুমুল ঝড় উঠিবে। সেই ঝড়ে মুসলমান শক্তি
চিরদিনের জন্য লােপ পাইয়া আবার বাংলায় হিন্দু
রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হইতে পারে। হিন্দু রাজগণ
যদি এই সময়ে হিংসা-দ্বেষ ভুলিয়া একত্র মিলিত হন,
তাহা হইলে বাংলা হিন্দুদেরই হইবার সম্ভাবনা।
রাণী পূর্ব হইতেই নিজেকে আসন্ন বিপদের নিমিত্ত
প্রস্তুত রাখিবার জন্য সৈন্য সংস্কারে প্রবৃত্ত হইলেন।
ঠিক এই সময়ে এক অভিনব ঘটনা সংঘটিত হইল।
রাণী ভবানীর বিধবা কন্যা তারা বাংলায়
অতুলনীয়া সুন্দরী বলিয়া খ্যাত। নবাবের কতিপয়
অসৎ সহচর সিরাজের নিকট সবিস্তারে তাহার
রূপের প্রশংসা করিল। নবাব তাহাদের প্রশংসায়
মুগ্ধ হইয়া যে কোন প্রকারে হউক, তারাদেবীকে
আনিতে আদেশ করিলেন—যদি বল-প্রমােগে প্রয়াে-
জন হয়, তথাপিও। তাহাদের অভিপ্রায়ই ছিল,
নবাবের সহায়তায় রাণীর ধনাগার লুণ্ঠন করা। এখন
তাহাদের মনস্কামনা পূর্ণ হইবারও দিব্য সুযােগ
উপস্থিত হইল।
নবাবের অভিপ্রায়
জ্ঞাপনার্থ এক ব্যক্তিকে
কাহিনী।
নাটোরে প্রেরণ করা হইল। বলা বাহুল্য, সে ব্যক্তি
কেবল প্রাণ লইয়া ফিরিয়া আসিতে সক্ষম হইয়াছিল।
কোন্ হিন্দু প্রাণ থাকিতে এ প্রস্তাবে স্বীকৃত হইতে
পারে ? পর দিবস নবাবের সৈন্য নাটোর আক্রমণ
করিল। রাণী ভবানী পূর্ব হইতেই প্রস্তুত ছিলেন।
তিনি স্বয়ং সৈন্যের পরিচালনা ভার গ্রহণ করিয়া
যুদ্ধ করিলেন। মুসলমান সৈন্য ছত্রভঙ্গ হইয়া
চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। রাণী তাহাদিগকে
পরাজিত ও রাজ্য হইতে বহিষ্কৃত করিয়া প্রাসাদে
প্রত্যাবর্তন করিলেন।
সিরাজদ্দৌলার অত্যাচারে
দেশ উৎপীড়িত
হইয়া উঠিল। ছােট বড় সকলেই তাহার ভয়ে
সশঙ্কিত। একদিন জগৎ শেঠের গৃহে এক মন্ত্রণা
সভা বসিল। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রাজা রাজবল্লভ,
রাজা রায় দুর্লভ প্রভৃতি এই সভার অধিনে।
রাণী ভবানীও নিমন্ত্রিত হইয়া সভায় আসিয়াছিলেন।
জগৎ শেঠ প্রস্তাব করিলেন, মীর্জাফরকে সিংহাসন
৭২
রাণী ভবানী।
প্রদান করা হউক। তিনি আমাদের অভিমতানুযায়ী
রাজ্যশাসন করিতে স্বীকৃত আছেন। বিশেষতঃ
তিনি নবাবের সৈন্যাধ্যক্ষ। সমগ্র মুসলমান সৈন্য
তাহার অধীনে। তঁহাকে সিংহাসন প্রদান করিলে
অনর্থক রক্তপাতেরও সম্ভাবনা নাই, অথচ আমাদের
কার্যোদ্ধারও হইবে। রাণী ভবানী তাহার
প্রস্তাবের প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, 'কোন হিন্দু
নরপতিকে সিংহাসনে বসান কি সম্ভবপর নয় ?
আমার বােধ হয় ইহাই উপযুক্ত সময়।
কৃষ্ণচন্দ্র বলিলেন, ‘কার না সে ইচ্ছা ? কিন্তু এ
যাবৎকাল বিদেশীর অধীনে থাকিয়া আমরা নিতান্ত
অক্ষম হইয়া পড়িয়াছি। এমন উপযুক্ত সৈন্য নাই
যে বিদেশীর আক্রমণ হইতে দেশকে রক্ষা করিতে
পারা যায়। এতদ্ব্যতীত আমাদের মধ্যে একতার
বড়ই অভাব, আছে কেবল দ্বেষ আর হিংসা।
কোন হিন্দু রাজাকে সিংহাসন প্রদান করিলেই
আমাদের পরস্পরের মধ্যে গৃহবিচ্ছেদ উপস্থিত হইবে
এবং সেই সুযােগে মহারাষ্ট্রগণ আসিয়া সিংহাসন
গ্রহণ করিতে পারে। মুসলমান বিদেশী হইলেও
অনেক দিন তাহাদের সহিত বাস করিতেছি। এখন
৭৩
কাহিনী।
মহারাষ্ট্রগণ সম্পূণ আমাদের নিকট অপরিচিত।
এ ক্ষেত্রে মুসলমানেরই সহায়তা গ্রহণ আমার মতে
যুক্তিসঙ্গত।
‘স্বীকার করিলাম, আপনি যাহা বলিতেছেন,
তাহ সত্য। কিন্তু মনে করুন, মীর্জাফরও যদি
সিংহাসন পাইয়া সিরাজের ন্যায় আচরণ করেন,
তথন আমাদের উপায় ?
রাজা রাজবল্লভ বলিলেন, আমরা তার উপায়
স্থির করিয়াছি। মীর্জাফরকে
মীর্জাফরকে শাসনে রাখিবার
জন্যই আমরা ইংরাজের সহায়তা গ্রহণ করিতেছি।
তাহারা অতি ক্ষমতাশালী কিন্তু ব্যবসায়ীর জাতি,
সিংহাসনের প্রতি তাহাদের কোন লক্ষ্য নাই।
ব্যবসায় ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাইলেই তাহারা সর্বদাই
আমাদের সহায়তা করিতে কুণ্ঠিত হইবে না।
তাহাদের সাহায্যেই আমরা মীর্জাফরকে বশীভূত
রাখিতে সমর্থ হইব।
‘বিশেষতঃ সিরাজ কলিকাতায় ইংরাজদের দুর্গ
বংস করিয়া একরূপ তাহাদের বিরাগভাজন হইয়াই
আছেন। তাহারা সুযােগ পাইলেই সিরাজকে
শাস্তি দিতে পশ্চাৎপদ হইবে না। আবার যদি
৭৪
রাণী ভবানী।
মীর্জাফরও তাহাদের সহিত সভাব রাখিয়া কাজ
করেন, তাহা হইলে তাহাকেও ইংরাজদের
অপ্রীতিভাজন হইতে হইবে। এই বলিয়া মহামতি
জগৎ শেঠ রাজার উক্তির সমর্থন করিলেন।
রাজা রায়দুর্লভ বলিলেন, ‘আমিও শুনিয়াছি,
সেদিন ইংরাজরা দাক্ষিণাত্যের নবাবকে অকাতরে
পরাস্ত করিয়াছিল।
‘মহারাজগণ! আমি সামান্য রমণী মাত্র।
এরূপ গুরুতর রাজনৈতিক বিষয়ে আপনাদিগকে
কোন উপদেশ দেওয়া আমার পক্ষে ধৃষ্টতার কাৰ্য্য,
তবে অন্তত আমার ভ্রম সংশােধনের নিমিত্ত দুই
একটি কথা বলা প্রয়ােজন বিবেচনা করিতেছি।
অনুমান করুন, যদি ইংরাজই মহারাষ্ট্রবিগের ন্যায়
নিষ্ঠুর এবং রাজ্যাভিলাষী হয়, মনে করুন যদি
রাজ্যের আস্বাদ গ্রহণ করিয়া ব্যবসায়ের পরিবর্তে
শাসনকৰ্ত্তর পদ বরণীয় মনে করে, তখন তাহা-
দিগকে কিরূপে দমন করিবেন ? মহারাষ্ট্রগণ বরং
আমাদের স্বদেশবাসী কিন্তু ইংরাজ বিদেশী। আমি
মীর্জাফর কি মহারাষ্ট্র কি ইংরাজ কোন পক্ষই
সমর্থন করিতে চাহি না। স্বর্গীয় নবাব আলিবর্দীর
কাহিনী।
নিকট আমরা অনেক প্রকারে ঋণী। আমার ইচ্ছা,
সিরাজ অত্যাচারী,-সিরাজের পরিবর্তে তাহার
অন্য কোন বংশধরকে সিংহাসন প্রদান করুন।
এইরূপে বহুক্ষণ বাদানুবাদের পর রাণী ভবানী
মীর্জাফরের পক্ষেই মত দিলেন, কিন্তু বলিলেন,
‘মহারাজগণ!
আমি আপনাদের প্রস্তাবেই মত
প্রদান করিলাম, কিন্তু আমার মন যেন বলিতেছে
আমাদের এ ষড়যন্ত্র দেশের পক্ষে কখনও মঙ্গলপ্রদ
হইবে না। সেদিন সভা ভঙ্গ হইল।
যথাসময়ে পলাশীর বিস্তৃত প্রান্তরে এক
যুদ্ধাভিনয় হইল। মীর্জাফর ধীরে ধীরে ইংরাজদের
সহিত যােগ দিলেন। সিরাজ রাজধানী পরিত্যাগ
করিয়া পলায়ন করিলেন। মীর্জাফর নবাব পদে
অভিষিক্ত হইলেন।
৪
ইতিহাস পাঠক মাত্রেই জানেন, পলাশীর যুদ্ধের
পর অনেকদিন ধরিয়া বাংলায় ঘােরতর অরাজকতার
রাণী ভবানী। স্রোত বহিয়াছিল। ইংৰাজের অর্থের নিমিত্ত মীর্জাফরকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া মীরকাশিমকে বসাইলেন, আবার কিছুদিন পরে মীরকাশিমকে সরাইয়া মীর্জাফরকে পুনঃস্থাপিত করিলেন। কিছুকাল ধরিয়া এইরূপই চলিতে লাগিল। কথা সবিস্তারে বলিবার প্রয়ােজন নাই। রাণী ভবানীর জীবনের শেষকাল বেশ সুখে ও শান্তিতে কাটিয়াছিল। তাহার পুত্র ছিল না, এজন্য তিনি পােষ্যপুত্র গ্রহণ করেন। তাঁহার হস্তে রাজ্যের সমুদয় ভার অর্পণ করিয়া তিনি ধৰ্ম্মকর্মে মনঃসংযােগ করিলেন। মুর্শিদাবাদের অতি সন্নিকটেই গঙ্গার উপর এক অট্টালিকা নির্মাণ করাইয়া তাহাতেই তিনি তাহার জীবনের শেষভাগ অতিবাহিত করেন। দরিদ্রের দুঃখ দূর করিতে, দেবভাষা সংস্কৃত শিক্ষার প্রসার বৃদ্ধি করিতে, ধৰ্ম্মমন্দির গঠন, পুষ্করিণী খনন প্রভৃতি করাইতে সহস্র মুদ্রা তিনি ব্যয় করিয়া গিয়াছেন। কাশীধামে তাহার প্রতিষ্ঠিত অনেক দেব- মন্দির, অতিথিশালা প্রভৃতি এখনও বর্তমান আছে।
কাহিনী।
কথিত আছে, তিনি বাৎসরিক প্রায় পঞ্চবিংশতি
সহ মুদ্রা কেবল অতিথি-সেবায় ব্যয় করিতেন।
১৮৩ খৃষ্টাব্দে উন-আশি বৎসর বয়ঃক্রম কালে
তাহার দেহত্যাগ হয়।
তাহার গৃহীত পুত্র রাজা রামচন্দ্র ধর্মাচরণেই
অধিক মনোেযােগ দিয়াছিলেন। প্রায় সমুদয় সম্পত্তিই
তিনি দরিদ্রের দুঃখ-বিমােচনের জন্য অকাতরে দান
করিয়া গিয়াছেন এবং অবশিষ্ট সুশাসনের অভাবে
বিক্রয় হইয়া যায়। এখন অতি সামান্য অংশই
তাঁহার বংশধরগণ উপভােগ করিতেছেন। সদাশয়
ইংরাজরাজ এখনও পর্যন্ত রাণী ভবানীর সম্মানার্থ
উক্ত পরিবারবর্গকে মহারাজ বাহাদুর উপাধিতে
ভূষিত করিয়া থাকেন।
অসামান্য।
সপ্তদশ শতাব্দীর প্রায় মধ্যভাগে—আলিবর্দীর
জীবনের শেষ অবস্থায় বাঙ্গালায় ভীষণ অত্যাচারের
আরম্ভ হয়।
নবাবের দৌহিত্র সিরাজ নবাবের
অত্যধিক স্নেহে অন্ধ হইয়া সেই অনলে ক্রমান্বয়ে
ঘৃতাহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। নবাব নাজিম
আলিবর্দীর মৃত্যুর পর সিরাজই বাঙ্গালার রাজতক্তে
উপবেশন করেন।
কতিপয় অসচ্চরিত্র যুবকের
সাহচর্য মিলিল। এতদিন যে সকল কাৰ্য গােপনে
অনুষ্ঠিত হইত, এক্ষণে তাহা প্রকাশ্যে চলিতে
লাগিল। গৃহস্থের রূপবতী স্ত্রী কন্যার সতীত্ব রক্ষা
একবারে অসম্ভব হইয়া উঠিল রাজ্যের স্ত
স্বরূপ সম্ভ্রান্ত কৰ্ম্মচারিগণের পুরমহিলাগণ অবধি
নিস্তার পাইতেন না। সকলেই সশঙ্ক,—সকলেই
ম্রিয়মান।
এই সময়ে জগৎশেঠগণই মুর্শিদাবাদের মধ্যে
৭৯
কাহিনী।
সৰ্ব্বাপেক্ষা ধনী ও বণিকৃশ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিচিত।
ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই ইহাদিগের বিস্তৃত ধনা-
গারের এক একটি শাখা ছিল। দেশের রাজা,
মহারাজা, ধনী মহাজনগণ পৰ্য্যন্তও অভাবের সময়
ইহাদের নিকট হইতে অর্থ গ্রহণ করিতে কুষ্ঠিত
হইতেন না। এই শেঠ বণিকগণের মধ্যে মহাতব
চঁদই বিশেষ গণ্যমাণ্য বলিয়া খ্যাত ছিলেন।
তাঁহার এক সর্বাঙ্গ সুন্দরী কন্যা ছিলনাম
‘অসামান্যা। সিরাজ রাজ-তক্তে বসিয়া তাহার
রূপের প্রশংসা শুনিলেন, কিন্তু মহাতব শেঠের ন্যায়
প্রতিপত্তি-সম্পন্ন বণিকের কন্যাকে প্রকাশ্যভাবে
অপহরণ করা নিতান্ত সহজসাধ্য নয় ভাবিয়া তিনি
মনে এক কৌশল স্থির করিলেন।
একদিন রজনীর গাঢ় অন্ধকারে সিরাজ এক
অপরূপ সুন্দরীর বেশ ধরিয়া জগৎশেঠের অন্তঃপুরে
প্রবেশ করিলেন। অসামান্যা যে গৃহে শয়ন করি-
তেন, সেই গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তিনি যাহা
দেখিলেন, তাহা এ জীবনে ভুলিবার নহে। তিনি
দেখিলেন, তাহারই বাঞ্ছিতা যেন স্বর্গের সমুদয়
সৌন্দৰ্য্য-সমুদয় রূপ—সমুদয় শােভা স্বদেহে প্রতি-
অসামান্য।
ফলিত করিয়া তাহারই সম্মুখে এক অপূৰ্ব্ব ভাস্বর
প্রতিমা দণ্ডায়মানা। সিরাজ বুঝিতে পারিলেন
, তিনি স্বর্গে না মর্ত্তেজাগ্রত না স্বপ্নবিষ্ট।
সিরাজ যখন তন্ময় হইয়া স্বর্গের স্বপ্ন দেখিতে
ছিলেন, সে সময় অসামান্যা’ এক অপরিচিতকে
সম্মুখে দেখিয়া ভয়ে স্বামীর নিকট পলায়ন করেন।
তাঁহার স্বামী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া সমুদয়
ব্যাপার বুঝিতে পারিলেন এবং ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া
সিরাজের এই স্পর্ধা ও দুঃসাহসের উপযুক্ত পুরস্কার
প্রদান করিলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পর একদিন প্রকাশ্য
রাজপথে তাঁহার স্বামীর মস্তক দ্বিখণ্ডিত হইল।
রৌপ্যপাত্রে করিয়া সেই মুণ্ড জগৎ শেঠের কন্যার
নিকট উপহার আসিল ।। এ ব্যাপারে শেঠ গৃহে
* পাদুকা প্রহার।
+ অসামার স্বামীর প্রতি সিরাজের এই অত্যাচারের
বর্ণন মন্মথ বাবুর The Heroines of Ind' হইতে গৃহীত।
আধুনিক ঐতিহাসিকগণের মতে সিরাজ-চরিত্র অরূপ। এ
সম্বন্ধে বিশদরূপে জানিতে হইলে শ্রীযুক্ত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়
প্রণীত ‘সিরাজদ্দৌলা' নামক পুস্তক পাঠ করুন।
কা
কাহিনী।
শশাকের ঝড় বহিয়া গেল। বণিক-কন্যা সেই
শশাকের দারুণ তীব্রতা সহ করিতে না পারিয়া
উন্মাদিনী হইলেন।
এইরূপে কিছুকাল অতীত হইলে সিরাজের
ব্যবহারে দেশবাসী একবারে উত্যক্ত হইয়া উঠিল।
অত্যাচারির হস্ত হইতে উদ্ধার লাভের নিমিত্ত নানারূপ
কল্পনা চলিতে লাগিল। পরিশেষে একদিন স্থির
হইল, ইংরাজের সাহায্যে সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত
করাইয়া তাহার স্থানে মির্জাফরকে নবাব পদে
অভিষিক্ত করা হইবে। ইংরাজ প্রচুর অর্থের বিনি-
ময়ে সহায়তা করিতেও প্রস্তুত আছে।
তাহাই হইল। সিরাজ পলাশীর যুদ্ধে পরাস্ত
হইয়া পলায়ন করিলেন; কিন্তু পথিমধ্যে ধৃত হইয়া
মির্জাফরের পুত্র মিরণের আদেশে মহম্মদি বেগ
নামক এক প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি কর্তৃক নিহত
হন।
৮২
কাহিনী
অসামান্যা
K. V. Seyne & Bros.
No text on this page.
অসামান্য। সিরাজের মৃত- ‘অসামান্যা’ এতাবৎকাল উন্মাদিনীর ন্যায়ই অব- স্থান করিতেছিলেন। বহু চিকিৎসাতেও তাঁহার কোন উপকার দর্শিল না। না। সিরাজের হত্যা সংবাদে অনেকে স্থির করিলেন,-সতী স্বামী শােকে বিলা। প্রতিহিংসার দাবানল তাহার হৃদয়কে পলে পলে ভস্মীভূত করিতেছে। দেহ যেখানে সমাহিত হইয়াছিল, সেই স্থানে একবার লইয়া যাইলে, বােধ হয়, অনেকটা মনের জ্বালা নিবারণ হইতে পারে—এমন কি উন্মত্ততাও আরােগ্য হওয়া সম্ভবপর। সঙ্কল্প-অনুযায়ী কাৰ্য্য উন্মাদিনীকে সিরাজের কবর দেখাইতে আনা হইল। অসামান্য কি জানি কেন বহুক্ষণ ধরিয়া শ্বেতমৰ্ম্মর রচিত স্তম্ভের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন। বােধ হয়, অনেক দিনের পুরান কথা আবার নূতন করিয়া মনে জাগিয়া উঠিল— অথবা মানবের জীবন-নাট্যের অভিনয় কোনখানে কি ভাবে সমাপ্ত হয়, তাহাই চিন্তা করিতেছিলেন। হইল। স্বামীর মৃত্যুর পর সুদীর্ঘ দুইটি বৎসর অতীত হইয়া গিয়াছে। ‘অসামান্য এতদিনে অনেকটা ৮৩
কাহিনী।
প্রকৃতিস্থ হইয়াছেন। আজ কয়দিন হইতেই তিনি
সিরাজের সমাধির নিকটে এক প্রাসাদে বাস করি-
তেছেন। অনেক সময়েই ‘অসামান্যা’ সমাধির দিকে
চাহিয়া কি ভাবেন—কখন বা মনকে জিজ্ঞাসা
করেন “কে এহতভাগ্য, বসন্তের প্রারম্ভেই শােভায়
সৌন্দর্য ফুটিয়া না উঠিতেই ঝরিয়া পড়িয়াছে। এই
কি নবাব সিরাজদ্দৌলা ! কে যেন পরােক্ষে থাকিয়া
উত্তর দেয়, “হাঁ, এই তােমার স্বামীহন্তা, অত্যাচারী
নবাব সিরাজদৌল্লা। আবার কখন তিনি ভাবি-
তেন, ‘পাপীর শাস্তি ভগবান দিয়াছেন। কিন্তু
আমার হৃদয়ের জ্বালা নিভিতেছে না ত! সিরাজ
তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাইতেছ—ঘুমাও, কিন্তু তােমার
আত্মা উৰ্দ্ধ হইতে দেখুক—আসামান্য প্রতিহিংসা
গ্রহণ করে বটে, কিন্তু সে প্রতিহিংসার পরিতৃপ্তিতে
কি নির্মল আনন্দ, কি পূর্ণ শান্তি! তাহাতে জীবন
কেমন জুড়াইয়া যায়।
একদিন মধ্য রাত্রে অসামান্যা’ গৃহ ত্যাগ করিয়া
কোথায় চলিয়া গেল,কেহ জানিল না।
৮
অসামান্য।
চলিলেন ;
সেই গভীর রজনীতে ‘অসামান্যা ক্রমাগত পথ
নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য স্থান নাই—শুধুই
চলিয়াছেন। ক্রমে ভগবান গােলার নিকটবর্তী হইয়া
তিনি শুনিলেন, সিরাজের প্রিয়তমা বেগম লুন্নিসা
যখন সিরাজের সহযাত্রী হইয়া পলাইয়া বেড়াইতে
ছিলেন, সেই সময় এই স্থানে তাহার এক সুন্দরী
কন্যা জন্মগ্রহণ করে। ঠিক তৎকালেই সিরাজ
মির্জাফরের অনুচরগণ কর্তৃক ধৃত হন। সে আজ
প্রায় মাসাধিক কাল। এযাবৎ লুৎফ, একটি স্ত্রীলাে-
কের গৃহে আশ্রয় লইয়া
লইয়া বাস করিতেছিলেন।
অসামান্য। তাঁহার সন্ধান করিতে লাগিলেন। লুৎফ,
এ সংবাদ পাইয়া সে স্থান ত্যাগ করিলেন—ইচ্ছ।
হইল, একবার দিল্লীতে সম্রাটের নিকট যাইয়া
আশ্রয় ভিক্ষা করেন। দুই মাসের শিশুটিকে বক্ষে
ধরিয়া লুক প্রাণ ভয়ে ছুটিলেন। অসামান্যা’
তাহার অনুসরণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে
প্রায় তিন বৎসর কাটিয়া গেল, কেহই কাহাকে
দেখিতে পাইলেন না।
৮৫
৪
সে এক বড় ভয়ঙ্কর দিন। প্রভাতের প্রারম্ভ
হইতেই ভীষণ ঝড় নামিয়াছে। বেলা যত বাড়িতে
লাগিল, ঝড়ও তত উগ্র-মুর্তি ধারণ করিতে লাগিল।
প্রকৃতি আজ যেন বিশ্বের সহিত বাদ সাধিবার জন্য
রণচণ্ডী বেশে সাজিয়া
উঠিয়াছে। এই ভীষণ
দুৰ্যোগে এক অসহায় যুবতী কি একটা দ্রব্য বক্ষে
চাপিয়া পাগলিনীর ন্যায় নদীর পথে ছুটিয়াছে, আর
তাহার পশ্চাতে আর এক রমণী তাহাকেই ডাকিতে
ডাকিতে উৰ্দ্ধশ্বাসে চলিয়াছে। বাল ভয়বিহ্বলা,
বাহ্যজ্ঞান-রহিতা-রমণীর সে চীৎকার তাহার কর্ণে
পৌছিল না। বালা নদীর তীরে আসিয়া দেখিল,
কতকগুলি মাঝি ঝড়ের ভয়ে নৌকা বাঁধিয়া তীরে
বসিয়া আছে। যুবতী পার করিয়া দিবার জন্য
তাহাদিগকে বহু অনুনয় অনুরােধ করিতে লাগিল
কিন্তু কেহই সে দুর্যোগে নৌকা খুলিতে সাহস
করিল না,-পরে একজন তাহার হস্তের এক বহু
মূল্য অঙ্গুরীয়ের প্রলােভনে অবশেষে স্বীকৃত হইয়া
নৌকা খুলিল।
অসামান্য।
অনুসারিণী রমণী নদীতীরে উপস্থিত হইয়া
দেখিল, একখানি নৌকা গঙ্গার উত্তাল বারিরাশির
সহিত সংগ্রাম করিতে করিতে অপর পারে চলিয়াছে
-তরঙ্গাঘাতে নৌকা একবার উঠিতেছে, আবার
নামিতেছে—প্রতিক্ষণেই মনে হয়, এইবার বুঝি
ডুবিল! শেষে সত্যই তাহা ঘটিল। একটা চঞ্চল
বাতাসে নৌকা হঠাৎ উলটিয়া গেল, আর উঠিল না—
শুধু এক করুণ চীৎকার সেই ভীষণ দুর্যোগের বক্ষ
ফিরিয়া বিদ্যুতের মত ফুটিয়া উঠিল! তাহার পর
আবার ঝড়ের সেই মর্মভেদী হুহুঙ্কার—বায়ুর গর্জন,
নদীর জলকল্লোলের উপর প্রকৃতির উদ্দাম নৃত্য
চলিতে লাগিল।
‘অসামান্যা’ তীরে দাঁড়াইয়া ছিলেন। যখন
দেখিলেন, নৌকা আরােহীসহ নদীগর্ভে ডুবিল,
তখন আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। চকিতে
তিনি জলে ঝাপাইয়া পড়িলেন। তরঙ্গের সহিত
বহু যুদ্ধ করিয়া পরিশেষে যে স্থানে নৌকা জলমগ্ন
হইয়াছিল, সেই স্থানে আসিয়া দেখিলেন, অদূরে
লুৎফের অচেতন দেহ নদী-বক্ষে ভাসিয়া চলিয়াছে।
‘অসামান্যা’ বহু কষ্টে ভাসিতে ভাসিতে ডুবিতে
৮৭
কাহিনী।
ডুবিতে লুফকে তীরে আনিলেন। হতভাগিনীর
শেষ নিশ্বাস অনেকক্ষণ বহিয়া গিয়াছে, তথাপি
সেই শিশুটিকে বেশ করিয়া আকড়াইয়া রহিয়াছে,
পাছে অসাবধানতাবশতঃ তাহার বক্ষ হইতে খসিয়া
পড়ে-নদী ছিনাইয়া লয়।
জননীর জীবন-দীপ নিৰ্বাপিত হইলেও, শিশুর
প্রাণ তখনও পর্যন্ত দেহচ্যুত হয় নাই। অসামান্য
বহু যত্নে শিশুর জীবন রক্ষা করিলেন এবং যতদিন
বাঁচিয়াছিলেন, ততকাল শিশুর লালনপালন করিয়া
নারীসমাজে এক সুমহান আদর্শ রাখিয়া গিয়াছেন।
পূর্ববঙ্গের অনেক গৃহে এখনও তাহার নাম
চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে।
অহল্যা বাঈ। মহারাষ্ট্র প্রদেশের মধ্যে ইন্দোর একটি প্রতিষ্ঠা- পন্ন রাজ্য। হােলকার বংশীয়গণ ইহার শাসনকর্তা। ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে ইন্দোরাধিপতি মহর রাও পর- লােকগত হন এবং তাঁহার পৌত্র মালিরাও সিংহাসনে অধিরােহন মালিরাওয়ের বিধবা মাতা অহল্যা দেবী স্বামীর মৃত্যুর পর হইতে ধৰ্ম্ম-কর্মেই বিশেষ মনোেযােগ দিয়াছিলেন। নবীন ভূপাল অতি অল্প দিন মাত্র রাজত্ব করিয়াই অকালে ইহলীলা সম্বরণ করেন ! তাহার কোন সন্তান- সন্ততি ছিল না, কাজেই রাজমাতা অহল্যা দেবীকেই স্বামী ও পুত্রশােকের মধ্যেই রাজ্যভার গ্রহণ করিতে হইল। অহল্যা দেবী আজীবন অসাধারণ সাহসী ও বুদ্ধিমতী বলিয়া খ্যাত ছিলেন। কেবল বুদ্ধি বলেই তিনি এত বড় ইন্দোর রাজ্য নিজ আয়ত্তাধীনে রাখিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। আজ প্রায় শত বৎসরের অধিক অতীত হইয়া গিয়াছে, তথাপি তাহার
কাহিনী।
নাম এখনও পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের প্রতি গৃহে
চিরস্মরণীয় হইয়া আছে। তাঁহার মৃত্যুর পর কত
রাজা ইন্দোরের সিংহাসন সুশশাভিত করিয়াছেন
কিন্তু কেহই তাহার ন্যায় প্রাণ খুলিয়া প্রজার
মনস্তুষ্টি সাধন করিতে পারেন নাই। তিনি সকলের
মাতৃস্থান অধিকার করিয়া মাতৃস্নেহে ইন্দোরবাসি-
গণের হৃদয় জয় করিয়াছিলেন। একপুত্র হারাইয়া
অসংখ্য পুত্রের জননী হইয়াছিলেন।
দুর্বলের উপর সবলের বল প্রয়ােগ প্রায় সর্বত্রই
দেখিতে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রেই বা সে নিয়মের
ব্যতিক্রম হইবে কেন ? রমণীকে সিংহসানে
দেখিয়া ম-প্রকৃতির লােক সকল নানা উপায়ে
আপন আপন অভীষ্ট সিদ্ধির সুযােগ অনুসন্ধান
করিতে লাগিল। কিন্তু অহল্যা দেবী বিলাসপ্রিয়া
রমণী ছিলেন না। তাঁহার ন্যায় শক্তিশালিনী
শাসনকর্তী বােধ হয় পূর্বে কখনও ইন্দোর সিংহাসনে
উপবেশন করেন নাই। তিনি স্বয়ং সকল রাজকীয়
কাৰ্য্য তত্ত্বাবধান করিতেন—রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি সাধনে
সর্বদা সচেষ্ট থাকিতেন—প্রজার প্রতি কোন
দুর্ব্যবহার হার সহ হইত না-প্রজার সন্তোষ
অহল্যা বাঈ। বিধানই তাহার প্রধান লক্ষ্য ছিল। দুজ্জনগণ স্ব স্ব অভিলাষ পূরণে ব্যর্থ-মনােরথ হইয়া দ্বিতীয় উপায় চিন্তা করিতে লাগিল। গঙ্গাধর যশােবন্ত ইন্দোর-রাজের কুলপুরােহিত। তিনি অনেক সময়েই রাজ-কাৰ্য্যের উপর অযথা হস্তক্ষেপ করিতেন। অহল্যা দেবী একদিন তাহাকে আহ্বান করিয়া অতি বিনীত ভাবে বলিলেন, “আপনি কুলপুরােহিত। আপনি আমাকে ধৰ্ম্মাদি সম্বন্ধে যাহা কিছু বলিবেন, মস্তক অবনত করিয়া তাহা গ্রহণ করিতে আমি প্রস্তুত আছি; কিন্তু, রাজকাৰ্য্য বিষয়ে আমাকে কোন অনুরােধ করিবেন না। রমণী হইলেও রাজকাৰ্য আপনা হইতে আমি বােধ হয় ভালই বুঝি। রাজ্যের মঙ্গলামঙ্গল বিশেষ রূপে পর্যালােচনা না করিয়া আমি কোন কার্যের অনুষ্ঠান করি না। প্রজারঞ্জনই আমার চরম লক্ষ্য।” রাণীর কথায় পুরােহিত-প্রবর জ্বলিয়া উঠিলেন। প্রতিহিংসা-গ্রহণের সুযােগ অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। মধুরাও ইন্দোর রাজ্যেরই পূর্ধ্বতন এক শাসন- কর্তা ছিলেন, রাঘব দাদা তাহার দূর সম্পর্কীয় কাহিনী। পিতৃব্য। ইন্দোর-রাজ্যে তাহার যথেষ্ট সম্মান ও প্রতিপত্তি ছিল। অনেকে তাহাকে ভয় ও ভক্তি করিত। গঙ্গাধর তাহাকে স্বদলভুক্ত করিয়া অহল্যা দেবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন। একদিন প্রকাশ্য ভাবে অহল্যা দেবীকে একখানি পত্ৰ দিল— তাহাতে লেখা ছিল :- “ইংরাজ ও রাজপুত—এই উভয় শত্রু বর্তমানে ইন্দোর-সিংহাসনে রমণীর উপবেশন শােভা পায় । এ ক্ষেত্রে পােষ্যপুত্র গ্রহণ এবং প্রতিনিধি নিয়ােগই সৰ্ব্বততভাবে বিধেয়। যদি এতদনুসারে কাৰ্য্য না হয়, তাহা হইলে সত্বরই দেশে ঘােতর অশান্তির উদয় হইবে। অতঃপর সাবধান হইবেন। ইতি-- রাঘব দাদা। রাণী অহল্যা দেবী পূর্ব হইতেই প্রস্তুত ছিলেন। 'চতুর্দিকে গুপ্তচর প্রেরণ করিয়া এই সকল ষড়যন্ত্র- কারিদিগের কাৰ্য-কলাপাদির অনুসন্ধান লইতে অহল্যা বাঈ। ছিলেন। রাজসৈন্যদিগকে সর্বদা বিপদের জন্য প্রস্তুত রাখিয়াছিলেন—যেন এতটুকু সুযােগ পাইয়া শত্রুগণ রাজ্যের মধ্যে অকারণ কোন গােলযােগ বাধাইয়া বসে। এইরূপে সকল দিক সুশৃঙ্খল করিয়া তিনি রাঘব দাদার পত্রের উত্তর পাঠাইলেন “তােমরা মনে করিয়াছ আমি তােমাদের ভয়ে ভীত হইয়া দেশে উচ্ছ ঙ্খলতার প্রশ্রয় দিব? জেন, আমি মহারাষ্ট্র রমণী । আমার ক্রোধ উদ্দপ্ত করিয়া নিজেদেরই অনিষ্টের সম্ভাবনা করিয়া তুলিতেছ মাত্র। রাজ কার্যের অনুরােধে আমি তােমাদের বন্দী করিবার আদেশ দিলাম।” এই পত্র প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহারা সদল বলে বন্দী হইয়া রাজ- কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইলেন। গঙ্গাধর যশােবন্ত রাজসভায় ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া মুক্তি লাভ করিলেন। অন্যান্য বন্দীগণও একে একে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হইয়া বন্ধনমুক্ত হইল। রাঘবদাদাও মুক্ত হইলেন কিন্তু ইন্দোর রাজ্যে আর তাহার স্থান হইল না। এ লাঞ্ছনা তিনি ভুলিতে পারিলেন না,-প্রতিহিংসার প্রবল বহ্নি তাঁহার হৃদয়ে জ্বলিয়া উঠিল। তিনি গােপনে রাজপুতদিগের ৯৩, কাহিনী। সহিত যােগ দিয়া ইন্দোর-রাজ্য আক্রমণ করিবেন বলিয়া স্থির করিলেন। অহল্যা দেবী পূৰ্ব্ব হইতেই সন্দেহ করিয়া- ছিলেন। তিনিও রাজপুতদিগের সহিত সমকক্ষ হইবার জন্য বিশেষ আয়ােজন করিতে লাগিলেন। তুকাজী হােলকার নামক এক ব্যক্তিকে সৈন্যাধক্ষ্য করিয়া তাহার অধীনে সৈন্য শিক্ষার ভার দিলেন। তুকাজী হােলকার একজন উপযুক্ত ব্যক্তি—অতি সামান্য বংশে জন্মগ্রহণ করিলেও সৈন্য বিভাগে তিনি আশ্চৰ্য্য কৰ্ম্মপটুতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় প্রদান করেন। রাণী তাঁহার বুদ্ধি-চাতুর্যে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে সৈন্যাধক্ষ্যের পদে উন্নীত করিয়াছিলেন। রাজপুতগণ আশায় প্রলুব্ধ হইয়া ইন্দোর রাজ্য আক্রমণ করিলেন—সীমানা অতিক্রম করিয়াই একটি ক্ষুদ্র দুর্গ অধিকার করিয়া ফেলিলেন। এই সংবাদ প্রাপ্তি মাত্ৰ অহল্যা দেবী তুকাজীর অধীনে পঞ্চ সহস্র সৈন্য দিয়া দুর্গ পুনরধিকারের জন্য পাঠা- ইয়া দিলেন। তুকাজী দুর্গ পুনরধিকার করিয়া রাজ- পুতদিগকে রাজ্য হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন। ইহার পর হইতে অহল্যা দেবীর জীবিতকালের মধ্যে
অহল্যা বাঈ।
আর তাহারা দ্বিতীয়বার ভঁহার রাজ্য আক্রমণ
করেন নাই।
অহল্যা দেবী যে কেবল বীর-হৃদয় ছিলেন, তাহা
নহে,—স্বহস্তে সৈন্য-চালনায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অসীম
সাহসিকতা প্রদর্শনে রমণীকুলে অদ্বিতীয়া ছিলেন।
পূর্বেই বলিয়াছি প্রজারঞ্জনই তাহার প্রধান লক্ষ্য
ছিল। ইন্দোরবাসিগণের জীবন, ধন, ঐশ্বৰ্য যাহাতে
নিরাপদে রক্ষা পায়, এ বিষয়ে তিনি সুদৃঢ় লক্ষ্য
করিয়াছিলেন। তাঁহার সময় ইন্দোর-রাজ্য পরিপূর্ণ
শান্তি উপভােগ করিয়াছিল।
তিনি যখন স্বহস্তে
রাজ্য গ্রহণ করেন, সে সময় দ্য তস্কর ও ঠগীদিগের
অত্যাচারে দেশবাসিগণের আতঙ্কের সীমা ছিল না—
তিনি রাজ্যে শান্তি-স্থাপনের জন্য এক কৌশল
অবলম্বন করিলেন। অহল্যা দেবীর এক অপরূপ
সুন্দরী কন্যাছিল—নাম মুক্তা। তিনি একদিন প্রকাশ্য
রাজসভায় তাহার অভিলাষ ব্যক্ত করিয়া বলিলেন,
কাহিনী। “যিনি আমার রাজ্যে শান্তি স্থাপন করিয়া ভীত অধিবাসিগণকে দস্যু তস্করের হস্ত হইতে রক্ষা করিতে পারিবেন, তাঁহাকে পুরস্কার স্বরূপ আমি আমার একমাত্র কন্যাকে সাদরে সমৰ্পণ করিব। যতদিন না দেশে শান্তি স্থাপিত হয়, ততদিন আমার কন্যা অবিবাহিত থাকিবে।” যশােবন্ত রাও নামক এক সম্ভ্রান্ত যুবক অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশ হইতে অশান্তি দূর করিয়া রাণীর মেহভাজন হন; এবং তিনিও প্রতিজ্ঞানুযায়ী তাঁহার সহিত নিজ কন্যার বিবাহ দিয়া আপন প্রতিজ্ঞা পালন করেন। অহল্যা দেবী সুবিচারক ছিলেন। দুই একটি ঘটনার উল্লেখ করিলেই তাহার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাইবে। একদা শিরকামদাস নামক এক ধনী ব্যবসায়ী প্রচুর সম্পত্তি রাখিয়া কালগ্রাসে পতিত হন। কোন সন্তান-সন্ততি না থাকায় তাহার বিধবা পত্নী পােষ্যপুত্র গ্রহণের অভিলাষ জানাইয়া রাজ- সরকারে আবেদন করেন। রাণীর কোন এক প্রধান কর্মচারী তাঁহার আবেদন অগ্রাহ করিয়া অহল্যা বাঈ। তাঁহার সমুদয় সম্পত্তি রাজসরকারে বাজেয়াপ্ত করিয়া লন। রাণী এই সংবাদ পাইয়া তৎক্ষণাৎ সেই কৰ্ম্ম- চারীকে আহ্বান করিয়া বিধবার সম্পত্তি প্রত্যর্পণ করাইলেন এবং বিধবাকেও পােষ্যপুত্র গ্রহণে আদেশ দিলেন। আর একবার এইরূপ দুইটা ধনী বণিক অপুত্রক অবস্থায় পরলােক গমন করেন। তাঁহাদের বিধবা পত্নীদ্বয় রাণীর নিকট আসিয়া আবদন করেন যে তাঁহারা তীর্থ যাত্রা করিবেন-ধন, ঐশ্বৰ্য্য আর তাহাদের কোন প্রয়ােজন নাই। সেই সম্পত্তি তিনি গ্রহণ করুন। অহল্যা দেবী তাহাদের সরল ব্যবহারে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া অতি মিষ্ট কথায় বলি- লেন, “ভগ্নী আমায় ভগবান যাহা প্রদান করিয়াছেন তাহাই আমার পক্ষে প্রচুর—ইহা অপেক্ষা অধিক অর্থে আমার প্রয়ােজন নাই। তােমরা এই অর্থ পরােপকারে ব্যয় করিয়া যাও। ভগবান তােমাদের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করিবেন।” রাণীর উপদেশানুযায়ী তাঁহারা জলহীন স্থানে পুষ্করিণী ও দরিদ্রদিগের জন্য ভাণ্ডার স্থাপন করাইয়া অর্থের সদ্ব্যবহার করিতে কালবিলম্ব করিলেন না।
কাহিনী।
অহল্যা দেবী অতি সরল ভাবেই জীবনযাত্রা
নিৰ্বাহ করিতেন। বিলাসিতার নাম মাত্রও তাহার
ছিল না। রাণী হইলেও তাঁহার পরিধেয় সাধারণ
বিধবা রমণীর ন্যায়ই ছিল—তাহাতে ঐশ্বর্যের চিহ্ন
মাত্র পরিলক্ষিত হইত না। সৎকার্যে তিনি অজস্র
অর্থ ব্যয় করিতেন। পুষ্করিণী খনন, অতিথিশালা
স্থাপন, মন্দির-প্রতিষ্ঠা প্রভৃতিতে তাঁহার সকাৰ্য্যের
অসংখ্য নিদর্শন আজ পর্যন্ত বর্তমান রহিয়াছে।
গয়ার বিখ্যাত বিষ্ণুপদ মন্দির অহল্যা দেবী কর্তৃক
প্রতিষ্ঠিত। স্থাপত্য নৈপুণ্যে এ মন্দিরটিও গয়ার
অন্যান্য মন্দির অপেক্ষা কোন অংশে নিকৃষ্ট নহে।
প্রায় ত্রিশ বৎসর সুখে ও শান্তিতে রাজত্ব
করিয়া অহল্যা দেবী ১৭৯৫ খৃষ্টাব্দে পরলােক গমন
করেন। তাঁহার মৃত্যুতে ইন্দোরবাসী যে রত্ন হারা-
ইল তাহা আর কখন পূরণ হইবে কি না জানি না
তবে তাহার যশঃ সৌরভ আবহমানকাল প্রবাহিত
থাকিয়া ভারত রমণীর সম্মুখে এক উজ্জ্বল আদর্শ
ধরিয়া রাখিবে।
কৃষ্ণকুমারী। কৃষ্ণকুমারী উদয়পুরের মহারাণার কন্য। অতুল- নীয়া রূপসী বলিয়া ইহার খ্যাতি অল্পদিনের মধ্যেই রাজপুতনাময় বিস্তৃত হইয়া পড়ে। বহু দূর দেশ হইতেও রাজকুমারগণ ইহার পাণিগ্রহণে উৎসুক হইয়া ইহার পিতার নিকট বিবাহের প্রস্তাব করিয়া পাঠান। কিন্তু মহারাণা জয়পুরাধিপতি রাজা জগৎ- সিংহের সহিত কৃষ্ণকুমারীর পরিণয় স্থির করিলেন। জয়পুর অধিপতি এই সংবাদে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া মহারাণার নিকট তিন সহস্র সৈন্য - সমভিব্যহারে নানাবিধ উপঢৌকন প্রেরণ করিলেন। এই বৃত্তান্ত যেমন প্রচার হইয়া পড়িল, অমনি সমগ্র রাজপুতনাময় সমরভেরী বাজিয়া উঠিল চতুর্দিকে রক্তের নদী প্রবাহিত হইতে লাগিল, এবং দ্বেষ ও কলহে সমস্ত দেশ উৎসন্ন হইতে বসিল। কৃষ্ণকুমারীর অনুপম রূপরাশি ও লাবণ্যই এই যুদ্ধের মূল কারণ। “মাড়ােমার-পতি রাজা মণিসিংহও কাহিনী। New ইহার পাণিগ্রহণে অভিলাষী ছিলেন। তিনি মহা- রাণাকে বলিয়া পাঠাইলেন, “আমার পূর্বে যিনি রাজত্ব করিতেন, তাহার সহিত আপনার কন্যার বিবাহ স্থির হইয়াছিল, কিন্তু তাহার অবর্তমানে এখন আমিই উত্তরাধিকারী; অতএব আমার সহিত আপনার কন্যার বিবাহ দিন।” তিনি আরও বলিয়া পাঠাইলেন, “যদি আপনি আমার প্রস্তাবে সম্মত না হন, তাহা হইলে জানিবেন, সত্বরই উদয়পুরে ঘাের অশান্তির ঝড় বহিবে।” মেবারের মহারাণা যদিও তৎকালে রাজপুতগণ মধ্যে মুখ্য বলিয়া পরিগণিত হইতেন, তথাপি তঁাহার শক্তি এমন কিছু প্রবল ছিল না। ঘােট ঘােট রাজাগণ, যাহারা ইহার অধীন ছিলেন, সর্বদাই নিজ নিজ সৈন্য লইয়া ইহার সাহায্য করিবার জন্য প্রস্তুত থাকিতেন। যে সময় কৃষ্ণকুমারীর জন্য সমগ্র রাজপুতান ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া উঠিল, সেই সময় মহারাষ্ট্রপ্রধান ‘সিন্ধিয়া-অধিপতি বার বার রাজ- স্থান আক্রমণ করিয়া রাণা, মহারাণা ও সর্দারগণের নিকট হইতে বলপূর্বক ‘চৌথ’ গ্রহণ করিতেছিলেন। মেবারের মহারাণাকেও চৌথ প্রদান করিতে হইত।
কৃষ্ণকুমারী। যে রাজপুতজাতি ম্লেচ্ছ কর্তৃক অনন্ত দুঃখ ও ক্লেশ পাইয়াও কখন নতশির হয় নাই, সেই রাজপুতজাতি তখন দৈব দুর্বিপাকে পড়িয়া মহারাষ্ট্রগণ কর্তৃক মেষপালের ন্যায়ই লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত । নবাব আমীর খাঁ মুসলমান হইলেও উন্নত চরিত্র রাজপুতদিগের মধ্যে মহাশূরবীর বলিয়া খ্যাত ছিলেন কিন্তু ছলনা এবং প্রবঞ্চনায় তাহার তুল্য দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিল না। যখন তিনি দেখিলেন যে রাজপুত শক্তি গৃহ বিচ্ছেদে ক্রমশঃ দুর্বল হইয়া পড়িতেছে, তখন তিনি মাঝে মাঝে কোন কোন সর্দারকে সহায়তা করিতে লাগিলেন। ইহার তাৎপৰ্য এই যে আমীর খাঁ সমস্ত রাজপুত সর্দারদের সর্বনাশ করিতে কতনিশ্চয় হইয়া আসিয়াছিলেন। মায়ােরের মহারাণা মণিসিংহকে মহারাজা ‘সিন্ধিয়া সহায়তা করিতে স্বীকৃত হইলেন, আমীর খও মহারাণা ‘উদয়পুরকে সাহায্য করিবার জন্য কৃতনিশ্চয় হই- লেন, এবং অন্যান্য রাজপুত সর্দারগণ জয়পুরাধিপতি রাজা জগৎসিংহের জন্য জীবন পণ করিল। মহারাজা ‘সিন্ধিয়া অষ্ট সহ সেনা লইয়া উদয়পুর নগর-প্রান্তে আসিয়া উপস্থিত হইলেন;
কাহিনী। এবং মহারাণাকে বলিয়া পাঠাইলেন, যেন জয়পুর রাজের প্রার্থনা অস্বীকার করা হয়, এবং কৃষ্ণ- কুমারীর বিবাহ মাড়ােয়ার-পতি মণিসিংহের সহিত সম্পন্ন করা হয়। মহারাণা ‘উদয়পুর এই বার্তা শ্রবণে সাতিশয় চিন্তিত হইলেন তখন মহারাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ নিতান্ত সহজ ব্যাপার ছিল । কাজেই তিনি জয়পুরের মহারাজার সহিত বিবাহ-সম্বন্ধ ভঙ্গ করিয়া, সিন্ধিয়ার কথাই স্বীকার করিয়া লইলেন। রাজা জগৎসিংহ এই সংবাদ শুনিবামাত্র ক্রোধে গর্জিয়া উঠিলেন, এবং মহারাণা-উদয়পুরের দত্তবাক্য ভঙ্গের প্রতিশােধ লইবার জন্য এত সৈন্য সংগ্রহ করিলেন যে সমগ্র রাজপুতানায় পূর্বে তেমন কখনও একত্রিত হয় নাই। মাড়ােয়ার’-অধিপতিও রাজা ‘সিন্ধিয়ার’ সহিত আসিয়া সম্মিলিত হইলেন। লক্ষ লক্ষ যােদ্ধা রণক্ষেত্রে চিরতরে শায়িত হইলেন, কিন্তু কেহই পরাজয় স্বীকার করিলেন না। ইত্যবসরে আমীর খাঁ মহারাণা “উদয়পুরকে” পরামর্শ দিলেন যে, আপনি যুদ্ধের মূল কারণ, কৃষ্ণকুমারীকে পৃথিবী হইতে অপসারিত করুন। ইহা শুনিয়া প্রথমে মহা-
কৃষ্ণকুমারী।
।
রাণ কোপান্বিত হইলেন। তিনি কহিলেন, “এরূপ
নিন্দনীয় কাৰ্য্য আমার দ্বারা কখনই হইতে পারে না,
কিন্তু আমীর খাঁ, তাহাকে বিবিধ প্রকার কুপরামর্শ
দিতে লাগিলেন। অবশেষে তিনি এই ঘৃণিত কাৰ্য্য
করিতে সম্মত হইলেন, এবং কৃষ্ণকুমারীকে নিধন
করিবার আজ্ঞা দিলেন। কিন্তু তাঁহার আজ্ঞা কে
পালন করিবে?
প্রথমে মহারাণা নিজ শ্যালক রাজা দৌলত
সিংহকে এই কার্যে নিযুক্ত করিতে মনস্থ করিলেন।
রাজা দৌলত সিংহ তাঁহার আদেশ শুনিয়া আশ্চৰ্য্যা-
ন্বিত হইয়া বলিলেন, “মহারাজ, আপনি এ কি বলিতে-
ছেন? পিতা হইয়া সন্তান হত্যা ? আমি মহারাণার
এ আজ্ঞা কখনও পালন করিতে পারিব না।” অনন্তর
মহারাণা কৃষ্ণকুমারীর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা জীবনদাসকে
কহিলেন, “বৎস, তুমি কৃষ্ণকুমারীর জীবন-সংহার
কর।” রাজা জীবনদাস নম্রভাবে উত্তর দিলেন,
“পিতা, এ অধীনকে অমন কঠিন আদেশ করিবেন না,
আমি আমার প্রিয় ভগিনীকে নিজ হস্তে দ্বিখণ্ডিত
করিব ?” রাজা কহিলেন, “বৎস! আমি কি করি?
কৃষ্ণকুমারীর মৃত্যু যে সমস্ত দেশবাসীর বাঞ্ছনীয়।”
কাহিনী। জীবনদাস তখন একখানি খগ গ্রহণ করিয়া কৃষ্ণকুমারীর নিকট গমন করিলেন। তাহাকে দেখিবামাত্র কৃষ্ণকুমারী তাঁহার নিকট ছুটিয়া আসি- লেন এবং বাল্যকালে যেরূপ মৃদু মধুর ভাবে আলাপ করিতেন, তেমনই মিষ্টস্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভাই! তুমি পিতার নিকট হইতে কি আজ্ঞা লইয়া আসিয়াছ?” জীবনদাস উত্তর করিলেন, “ভগিনী আমি তােমার জীবননাশ করিতে আসিয়াছি।” ইহা শুনিয়া কৃষ্ণকুমারী অস্ফুট হাস্য করিতে লাগিলেন। জীবনদাস, পূর্বের ন্যায়ই গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “ভগিনী! আমি উপহাস করিতেছি না, মহারাণার ইহাই আজ্ঞা। তুমি দেশের হিত- কামনায় নিজ প্রাণ উৎসর্গ কর। তােমার মৃত্যুর উপরই দেশের শান্তি নির্ভর করিতেছে।” কৃষ্ণ- কুমারী এবার সহসা গম্ভীর ভাব ধারণ করিলেন। একবার নিজ সখিদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন, এবং পরক্ষণে ভ্রাতাকে সমােধন করিয়া বলিলেন, “ভাই! ইহা আশ্চর্যের কথা নহে। পূর্বেও কত শত ভাগ্যবতী রমণী দেশের হিত কামনায় নিজ নিজ প্রাণ দিতে কুণ্ঠিত হন নাই, আমারও সেই পবিত্র
কৃষ্ণকুমারী।
!
রমণী কূলে জন্ম। আমিও প্রাণত্যাগ করিতে প্রস্তুত
আছি। পূজনীয় পিতার আজ্ঞা উপেক্ষিত হইতে পারে
না ; তাহার আজ্ঞানুসারে আমি আপনার জীবন দান
করিতে কুণ্ঠিত নহি। আমার তুচ্ছ প্রাণ-বিসর্জনে
যদি শত শত যােদ্ধার প্রাণ রক্ষা পায়, দেশে সুখ
শান্তি ফিরিয়া আসে, তবে তাহা অপেক্ষা সুখের
বিষয় আর কি হইতে পারে ?”
ইহা শুনিয়া জীবনদাস নির্বাক হইলেন, এবং
কিয়ৎক্ষণ পরে রুদ্ধ উচ্ছাসে বলিলেন, “ভগিনী ! কি
করি, পিতার আজ্ঞা।” কৃষ্ণকুমারী পূর্বের ন্যায়ই
অটল ভাবে বলিলেন, “ভাই, বৃথা সময় নষ্ট করিয়া
ফল কি ? আপন কর্তব্য কাৰ্য্য সমাধা কর।
রাজাদেশ পালন কর।”
কৃষ্ণকুমারীর এই মিষ্ট এবং হৃদয়-ভেদী বচন
শুনিয়া তাঁহার সখীরা অশ্রু সম্বরণ করিতে
পারিল না। কৃষ্ণকুমারী বলিলেন, “প্রিয় ভগিনী-
গণ, তােমরা নিরর্থক কেন অশ্রু বিসর্জন করিতেছ?
বরং আজ আনন্দ প্রকাশ কর। আজ আমার
জন্য দেখ, রাজপুতের ঘরে ঘরে হাহাকার। আমার
জীবন-দানে সে দাবানল নির্বাপিত হইবে। তােমরা
কাহিনী।
আনন্দের সহিত আমায় বিদায় দাও। আমিও সুখে
মৃত্যুকে বরণ করি।”
জীবনদাস এতক্ষণ অবনত মস্তকে দণ্ডায়মান
ছিলেন, আর থাকিতে পারিলেন না। তাহার হস্ত
হইতে খঙ্গা খসিয়া পড়িল। তিনি সে স্থান হইতে
পলায়ন করিলেন এবং সকলের অলক্ষ্যে রাজভবন
পরিত্যাগ করিলেন। অবশেষে মহারাণা অন্যান্য
সর্দারগণকে এই কাৰ্যে নিযুক্ত করিলেন, কিন্তু
কেহই সে কঠিন আদেশ পালন করিতে পারিল না।
যখন রাজপুরে মহারাণার এই কঠোর আদেশ প্রচা-
রিত হইয়া পড়িল, তখন পুরী হইতে গগনভেদী
বিলাপ ও ক্রন্দনের রােল উথিত হইল। কিন্তু
রাজকুমারীর মনে অথবা শরীরে কোনরূপ ভরের
কিন্তু শােক ও দুঃখের চিহ্ন দেখা গেল না। তিনি
সেই প্রকারেই প্রাণত্যাগ করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া
নিশ্চল প্রাচীরবৎ অটল অকম্পিত রহিলেন।
মহারাণা নিরাশ হইলেন। ইতিমধ্যে আমীর
খাঁ সংবাদ পাইলেন, বহু রাজপুত সর্দার নিজ
নিজ সৈন্য লইয়া কৃষ্ণকুমারীর রক্ষার জন্য আসি-
তেছে। তখন সে দুৰ্ম্মতি মহারাণার নিকট যাইয়া
কৃষ্ণকুমারী। কহিল, “আপনি শীঘ্ৰ কৃষ্ণকুমারীকে বধ করুন, নচেৎ মহা অনর্থ ঘটিবে।” কিন্তু কেহই আর অগ্রসর হইল না। তখন তিনি আজ্ঞা দিলেন, “যে কোন প্রকারে হউক, বিষদানে কৃষ্ণকুমারীকে হত্যা কর।” অগত্যা একজন দাসী বিষ-পাত্র হস্তে রাজকুমারীর নিকট আসিয়া কহিল, “রাজকুমারী, আপনার পিতা এই বিষপাত্র আপনাকে পান করাইবার জন্য পাঠাইয়াছেন।” ইহা শুনিবামাত্র রাজমন্দিরে হাহা- কারধ্বনি উত্থিত হইল। সর্বত্রশােক ও দুঃখের চিহ্ন, ক্রন্দনের নােল। রাজকুমারীর মাতা শােকে অভিভূত হইলেন। কিন্তু শান্ত স্বভাব, ধীর গম্ভীর কৃষ্ণকুমারীর নেত্র হইতে এক বিন্দুও অশ্রু নিপতিত হইল না। তিনি তখনই বিষ-পাত্ৰ দাসীর হস্ত হইতে লইয়া সখি- দিগকে সবােধন করিয়া কহিলেন, “প্রিয় ভগিনীগণ, এই আমাদের শেষ দেখা। ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি, যেন জন্মে জন্মে তমাদেরই মত সখী পাই। পরে নিজ মাতৃদেবীর পদধুলি লইয়া কহিলেন, “মা! তুমি যদি শােকে ও দুঃখে কাতর হইয়া পড়, তাহা হইলে আমি ত নিশ্চিন্ত মনে মরিতে পারিব না। মা! চিরকাল পৃথিবীতে কেহই থাকিবে না, সকল-
৫
কাহিনী।
কেই মরিতে হইবে ; তবে কেহ বাল্যকালে, কেহ
যুবাবস্থায় এবং কেহ ৰা বৃদ্ধ হইয়া মরে। যদি
এই নশ্বর শরীর পরের জন্য ত্যাগ করিতে
পারি, তাহা হইলে ইহা অপেক্ষা আনন্দের বিষয় আর
কি আছে ? আমার জন্য সহস্র সহস্র রাজপুত-গৃহ
শান্তিহীন হইতেছে, কত শত অবলা ও বালক-বালিকা
অনাথ হইতেছে, অতএব আমার মৃত্যু হইলে দেশের
কতদূর মঙ্গল হয়, একবার ভাবিয়া দেখুন। আপনি
বুদ্ধিমতী, আমি আপনাকে আর কি উপদেশ দিব?
আশীৰ্বাদ করুন, যেন আমি পরলােকে নিশ্চিন্ত
চিত্তে ও হৃষ্ট-মনে অবস্থান করিতে পারি।
তৎপরে তিনি ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিলেন,
‘হে সচ্চিদানন্দ পরমাত্ম, আপনি সকল জীবের
আধার এবং পালক। আপনি পিতার ধন ধান্ত ও যশ
বৃদ্ধি করুন, তাহাকে দীর্ঘজীবী করুন। ইহা বলিয়া
তিনি বিষপূর্ণ পাত্র ওষ্ঠের সহিত সংলগ্ন করিয়া
নিশ্চিন্ত মনে:পান করিয়া তাহা নিঃশেষ করিলেন।
বিষ পান করিবার পর তিনি আপনার ভ্রাতৃ
বন্ধুদিগের সহিত...সহজভাবে বাক্যালাপ করিতে
লাগিলেন। কিন্তু বিষ উদর-মধ্যে থাকিতে পারিল
১০৮
কৃষ্ণকুমারী। , বমন হইয়া গেল। গেল। তখন দ্বিতীয় বিষপাত্র প্রস্তুত হইয়া আসিল, কিন্তু উহাও সেই প্রকারে বাহির হইয়া গেল। তাহার পর আর একটি বিষপাত্র দেওয়া হইল। কৃষ্ণকুমারী চক্ষু মুদিত করিয়া তাহা পান করিয়া ফেলিলেন। এইবার বিষের ক্রিয়া আরম্ভ হইল। কৃষ্ণকুমারী চিরদিনের জন্য চক্ষু মুদিলেন--সে চক্ষু আর খুলিল না। কৃষ্ণ- কুমারীর মৃত্যু-সংবাদ প্রচারিত হইলে, সকলেই রাজকুমারীর অসীম সাহসিক ৰ্য্যের প্রশংসা ও তাহার অকাল মৃত্যুতে সহানুভূতি প্রদর্শন করিতে লাগিলেন এবং মহারাণার নির্দয়তা ও আমীর খার কুপরামর্শের কথা স্মরণ করিয়া তাহাদিগকে ধিক্কার দিতে লাগিলেন।
গ্রন্থকার প্রণীত নূতন পুস্তক
ইতিকথা
বহু সংখ্যক চিত্র সমেত শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে
প্রকাশক।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.