Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Karmmabir Munshi Meherulla
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কল্পহীরনশহেল্প শখ হবিবর রহমান সাহিত্যরত্ন মূল্য সচিত্র শােভন সংস্করণ ১১ সাধারণ- সংণ •
মৌলবী মােহাম্মদ মােবারক আলী
মখদুমী লাইব্রেরী,
১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
এই পুস্তক বিক্রয়ের লভ্যাংশ
মরহুমের স্মৃতিরক্ষার
মেহেরুল্লা মেমােরিয়াল কমিটির
হস্তে প্রদত্ত হইবে।
Aanana ve
প্রিন্টার -
মােহাম্মদ খায়রুল আনাম খাঁ
মােহাম্মদী প্রেস
৯১, আপার সারকুলার রােড, কলিকাতা।
No text on this page.
কবীর মুন্শী মেহেরুল্লা-
.
.
গ্রন্থকার
নিলেন বাঙ্গালার অদ্বিতীয় বক্তা, অদ্বিতীয় সমাজসংস্কারক মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লার পরলােকগমনে সমস্ত বঙ্গদেশ ব্যাপিয়া শশাকের প্রবল ঝড় প্রবাহিত হইয়াছিল। সেই সময় হইতেই তাহার স্মৃতিরক্ষার ব্যবস্থার এবং তঁাহার একখানি উপযুক্ত জীবন-চরিত প্রণয়নের কথা যখন তখন অলােচিত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু গভীর আক্ষেপের বিষয়, জীবন্মত স্পার মুলমান-সমাজের দ্বারা এ-পর্যন্ত-এই সুদীর্ঘ ২৫ বৎসরের মধ্যেও ইহার কোনটিই সম্পন্ন হইতে পারে নাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুন্শী সাহেবের নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ। তাঁহার সহিত পরিচিত হইবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল। বিশেষতঃ আমরা একই জেলার অধিবাসী। সুতরাং তাঁহার প্রতি কর্তব্যপালনরূপ পবিত্র দায়িত্বের একটি বিরাট অংশ আমার উপরেও ন্যস্ত আছে, সন্দেহ নাই। আমার ক্ষুদ্র শক্তিতে আমি এই কর্তব্য পালনে বরাবরই চেষ্টা করিয়া আসিয়াছি; কিন্তু তাহা দ্বারা কোনই কাৰ্য্য হইতে পারে নাই। মুনশী- সাহেবের পরলােকগমনের সময় আমি স্কুলের ছাত্র ছিলাম। বিশেষতঃ তাঁহার সহিত অধিক ঘনিষ্ঠতা অর্জনের সৌভাগ্য আমার হয় নাই। তাঁহার পরলােকগমনের সঙ্গে সঙ্গে “মেহের বিলাপ” নামক একখানি শােকোচ্ছ্বাসপূর্ণ কবিতা-পুস্তক আমি লিখিয়াছিলাম। উহা ছাপিতে হয়ত ৩০/৪০০ টাকার অধিক লাগিত না। কিন্তু ঐ টাকার অভাবে পুস্তকখানি প্রকাশ করা সম্ভবপর হয় নাই। যশােহর জিলা-স্কুলে পড়িবার সময় আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলিয়া তাহার নামানুসারে “মেহেরুল্ ইলাম সভা” ;
} নামক একটি বক্তৃতা-সমিতি কিছুদিন পরিচালিত করিয়াছিলাম। তাহার পর অপেক্ষাকৃত পরিণতবয়সে ছাতিয়ানতলায় গিয়া তাহার জীবনী লিখিবার উপকরণ সংগ্রহে সচেষ্ট হই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশেষ কিছুই প্রাপ্ত হই নাই। যখন “যশাের-খুলনা সিদ্দিকিয়া সাহিত্য-সমিতি আমাদের পরিচালনাধীনে ছিল, তখন আমরা উক্ত সমিতির পক্ষ হইতে বিশেষ চেষ্টা করিয়া ১৯২০ সালের ৪ঠা জুলাই তারিখে ছাতিয়ানতলায় মুনশী সাহেবের স্মৃতি-সভা করিয়াছিলাম। উক্ত সভায় বহু উপযুক্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও স্থায়িভাবে কিছুই করিবার ব্যবস্থা করিতে পার। যায় নাই। * আমি যখনই সুযােগ পাইয়াছি, তখনই মুনশী সাহেবের স্মৃতি-রক্ষার ব্যবস্থা সম্বন্ধে আলােচনা ও চেষ্টা করিয়া আসিয়াছি। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, এ-পর্যন্ত আমার এই চেষ্টা সাফল্যের পথে কিছুমাত্র অগ্রসর হইতে পারে নাই। এইভাবে দুই যুগ চলিয়া গিয়াছে। পরলােকগত মুন্শী সাহেবের উজ্জ্বল-স্মৃতি অতীতের অন্তরালে বহুদূরে সরিয়া গিয়া কতকটা ঝাপসা হইয়া উঠিয়াছে। এতদিন আশা করিয়াছিলাম, সমাজের কোন না কোন যােগ্য ব্যক্তি তাহার উপযুক্ত জীবনী প্রণয়নে সচেষ্ট হইবেন। কিন্তু এপৰ্য্যন্ত তেমন কাহাকেও এই কাৰ্যে অগ্রসর হইতে দেখিলাম না। দুই এক ক্ষেত্রে এতৎসম্বন্ধে যাহা একটু আলােচনা হইতে দেখিয়াছি, তাহার * যশােহয়ের তদানীন্তন পুলিস সুপারিনটেনডেন্ট, মিঃ হােয়েলী সাহেব এই সভায় সভাপতিপলে বৰিত হন। স্থানীয় অস্থায়ী জিলা ম্যাজিষ্ট্রে মি: জে. কে. বিশ্বাস, শােহর টাউনের বহু উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী এবং হিন্দু-মুসলমান ভদ্রলােক এই সভায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। দূর-দূরান্তর হইতে প্রায় ৩৫ হাজার লােক ইহাতে যােগদান করিয়াছিল। আধুনিক প্রথায় শােকসভা অনুষ্ঠিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামী নীতি অনুসারে কোরআন শরিফ ও মৌলুদ শরিফ পাঠ এবং মুনশী সাহেবের কবর জিয়ারতের ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। উপস্থিত বিশিষ্ট ভদ্রলোকগণের আদর আপ্যায়ন এবং জলযােগের ব্যবস্থার একটা হয় নাই। ১৬ই জুলাই তারিখের “মােসলেম হিতৈষী পত্রিকায় এই সভার বিবরণ প্রকাশিত হয়।
No text on this page.
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা- মিঃ মােহাম্মদ মােহসীন মধ্যে স্তিরিকতার কোন চিহ্ন আছে এরূপ বুঝিতে পারি নাই। বরং একটা উপেক্ষা, স্বার্থপরতা এবং সঙ্কীর্ণতা অতি উৎকটভাবে সেখানে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। তাই একান্ত অক্ষমতা সত্ত্বেও সঙ্কোচের সহিত আমি এই মহৎ কাৰ্যে অগ্রসর হইয়াছি। কতদূর সফলকাম হইয়াছি, তাহা সুধীমণ্ডলীরই বিবেচ্য। মুর্শী সাহেবের উপযুক্ত পুত্র, আমার পরম স্নেহভাজন মিঃ মোহাম্মদ মােহসেন, বি. এ. বি. সি. এস. এবং তাহার ভক্ত-বন্ধু প্রসিদ্ধ ইসলাম প্রচারক মৌলবী শেখ মােহাম্মদ জমিরুদ্দীন বিদ্যাবিনােদ মহােদয়ের নিকট হইতে আমি নানা উপকরণ প্রাপ্ত হইয়াছি। তঁাহার লিখিত “মেহের চরিত বহু ক্ষেত্রেই আমার কাজে লাগিয়াছে। * এই সমস্ত কারণে তাহাদের উভয়ের নিকট আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ। বিখ্যাত সাহিত্যিক ও কবি মৌলবী শেখ ফজলল করিম সাহিত্য-বিশারদ মহােঙ্গয় অনুগ্রহপূর্বক এই পুস্তকের সুদীর্ঘ ভূমিকা লিখিয়া দিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত প্রসিদ্ধ “ইলামের ইতিহাস প্রণেতা বন্ধুবর অধ্যাপক কাজী আকরম হােসেন এম, এ, এবং আমার স্নেহভাজন সাহিত্যিক, ডাক্তার মােহাম্মদ আবুল কাসেম এই পুস্তক সম্বন্ধে বহু মূল্যবান্ পরামর্শ দান করিয়া আমাকে একান্ত বাধিত করিয়াছেন। তজ্জন্য তঁাহারা এবং অন্য যেমস্ত ভদ্র মহােদয়ের নিকট আমি উপকরণ সংগ্রহের সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি, তঁাহারা সকলেই আমার আন্তরিক ধন্যবাদের পাত্র। “গুলিস্ত।” নামক মাসিক পত্রিকায় মুনশী সাহেবের লােকান্তর গমনের অল্পদিন পরেই মুনশী শেখ মােহাম্মদ আমিরুদ্দীন বিদ্যাবিনোদ সাহেব “মেহের চরিত' নামে তাহার একখানি জীবন-চরিত প্রকাশ করেন। তাহা বড়ই সংক্ষিপ্ত। জীবনের খুব অল্প কথাই তাহাতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। মুনশী সাহেবের জীবনীর অনেকগুলি উপকরণ সংরক্ষণ উদ্দেশ্যেই উহু। মুদ্রিত হইয়াছিল। তাহার প্রায় অর্ধাংশ তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হার মৃত্যু সংক্রান্ত রিপাের্ট, শােকগাথা, শােকাচ্ছাস ইত্যাদিতে পূর্ণ।
00 এই পুস্তকের কতকাংশ প্রকাশিত হইয়াছিল। উক্ত পত্রিকার কর্তৃপক্ষের নিকট তজ্জন্ত আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। মুন্শী সাহেব সম্বন্ধে এই পুস্তকে লিখিত বিষয়গুলি ব্যতীত যিনি যাহা জানেন, তাহা অনুগ্রহপূর্বক আমাকে জানাইলে ধন্যবাদের সহিত ভবিষ্যতে এই পুস্তকের অন্তর্ভূক্ত করিয়া লওয়া যাইবে। জনাব মুন্শী সাহেব দেশের সমস্ত শ্রেণীর মুসলমান সমাজের সমান শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন । দেশের সর্ববিধ দলাদলির বহু উর্দ্ধে তিনি অবস্থিতি করিয়া সকলেরই কল্যাণার্থে আত্মনিয়ােগ করিয়াছিলেন। সুতরাং আমি আশা করি, সমস্ত দলের, সমস্ত শ্রেণীর মুসলমান তঁাহার স্মৃতিরক্ষার জন্য সমানভাবে মনােযোগী হইবেন। জনাব মুন্শী সাহেবের স্মৃতি অবলম্বন করিয়া যে চিন্তা ও ভাবধারা আমার মনে জাগিয়াছে, আমার দুর্বল লেখনীর সাহায্যে তাহাই ব্যক্ত করিতে চেষ্টা করিয়াছি। যেখানে প্রাণের বেদনা উচ্ছসিত হইয়া উঠে, হৃদয়-সাগর আলােড়িত করিয়া উত্তাল তরঙ্গ বহিয়া যায়, সেখানে কঠে যে অস্ফুট স্বর বাহির হয়, তাহা তীব্র সমালােচনার অধীন হউক ইহা কেহই পছন্দ করেন না। সেই হৃদয়-বেদনা হৃদয়বান ব্যক্তির নীরবেই অনুভব করিবার বিষয়, জ্ঞানীর গুরুগম্ভীর সমালােচনার বিষয় তাহাতে কিছুই নাই। সমগ্র বাঙ্গালা দেশ ব্যাপিয়া মুন্শী সাহেবের কীর্তি-সৌধ আজ লক্ষ লক্ষ মােসূলেম-হৃদয়ে গৌরবােমত তাজমহলের ন্যায় বিরাজ করিতেছে। বাঙ্গালী মুসলমান কবে ইহাকে প্রকৃত রূপ দিয়া বাস্তব জগতে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিবে। কলিকা, ১৪ই এপ্রিল, ১৯৩৪ শেখ হবিবর রহমান ১-১-১৩৪১ সূচীপত্র বিষয় পৃষ্ঠা ০ ০ ০ ৮০ ১৪ ১৮ ৪০০ ৪০০ be ৩৪ ৫০০ ৪ঃ at . ৬৪ ১। পূর্বাভাস ২। বাল্য-জীবন ৩। সাধনার পথে ৪। খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ ৫। পাদ্রী জন্ জমিরুদ্দীনের ইসলাম গ্রহণ ৬। পিরােজপুরে তর্ক সংগ্রাম ৭। বক্তা মােহামদ মেহেরুল্লা ৮। সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৯। বাঙ্গালা গজল ১০। নানা কথা ১১। মুন্শী সাহেবের প্রত্যুৎপন্ন মতিত্ব ১২। মহাযাত্রা ১৩। পরিশিষ্ট-আসল কোরান কোথায় ? ১৪। দেশ ও দশের অভিমত ১৫। শােকোচ্ছ্বাস ১৬। নীরব সমাধি . ০ ০ ০ ৮৪ ১১০ ১১৫ ১২৩ ১৪৩ ০৮ ০০০ ••• ১৪৮ • s, গ্রন্থকারের অন্যান্য পুস্তক ০০, ১০ ২২ ০ ০ ১|• be st y ১। আলমগীর (তৃতীয় সংস্করণ) ২। গুলিস্তার বঙ্গানুবাদ ৩। বুরি বঙ্গানুবাদ ৪। সাঈদীর কালাম (তৃতীয় সংস্করণ) ৫। পারিজাত (কবিতা পুস্তক, তৃতীয় সংস্করণ) ৬। আবেহায়াত (বাঙ্গালা গজল, তৃতীয় সংস্করণ) ৭। গুশান (কবিতা) / ৮। বাঁশরী (গীতি কবিতা) ৯। কোহিনূর কাব্য চেতনা (দ্বিতীয় সংস্করণ) ১১। পরীর কাহিনী (সচিত্র চতুর্থ সংস্করণ)••• ১২। "নিয়ামত (সমাজ সংস্কারমূলক বারটি গল্প ) ১৩। হাসির গল্প (সচিত্র চতুর্থ সংস্করণ) ১৪। সুন্দরবনে ভ্রমণ-কাহিনী ১৫। ভরত-সম্রাট বাবর। দ্বিতীয় সংস্করণ) • ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১৮ ০ ০ yি ১১ pp ৮০০ ৫০০ ৫০০ জেন পরী ০০ ০ yo ৫ । ܘ ܨ ১৭। গুলিস্তার গল্প (শিশু সংস্করণ) ১৮। আমার সাহিত্য জীবন ১৯। পদ্য ফাসী ব্যাকরণ বা ফাসী শিক্ষাসহায় ২০। ছেলেদের দীনীয়াত প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে বা নিম্ন ঠিকানায় প্রাপ্তব্য :- ম্যানেজার-মখদুমী লাইব্রেরী ১৫ নং কলেজ স্কোয়ার-কলিকাতা।
পুৰ্বাভাস চব্বিশ বৎসর পূর্বে মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের মৃত্যুর পর “শােস্তানে আমার একটি কবিতা বাহির হইয়াছিল। তাহার একস্থানে লিখিয়াছিলাম, “অদৃষ্টের উপহাসে কোহিনূর মণি খােয়াইনু মােরা ! কিন্তু আশা আছে প্রাণে আসিবে সেদিন, যেদিন তােমার স্মৃতি লক্ষ কোহিনূর হতে শ্রেষ্ঠ ভাবি’ মনে রক্ষিবে মােসলেমকুল বক্ষের মাঝারে।” এতদিন পরে আমার সেই আশা ফলবতী হইতে চলিয়াছে,-“কর্মীর মুন্শী মেহেরুল্লা বাহির হইতেছে ; ইহা কি আমার পক্ষে সামান্য আনন্দের কথা। অনুর্বর মরুপ্রান্তরে সহসা ফলজলশােভিত একটি সুরম্য উদ্যান চোখে পড়িলে পথিকের তৃষিত চিত্ত যেমন আপনা-আপনি সেইদিকে আকৃষ্ট হয়, অধঃপতিত বাঙালী মুসলিম-সমাজে মুন্শী মেহেরুল্লার অভ্যুদয়ও অনেকটা সেই প্রকারের। তাঁহার পূর্বে আর কোন বাঙালী মুসলমান বাগ্মীকে দেখিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না, শুনিয়াছি বলিয়াও স্মরণ করিতে পারিতেছি না। , একজন উচ্চশিক্ষিত হিন্দুস্থানী বাগ্মীকে দেখার সৌভাগ্য হইয়াছিল, তিনি মৌলভী হাসান আলী মরহুম । অমিরা তখন খুব ছােট, শিশু বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। কাকিনার ২ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা স্বর্গীয় রাজা মহিমারঞ্জন রায় চৌধুরী মহােদয়ের আমন্ত্রণে তিনি এখানে আসিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার বক্তৃতা শুনিলেও কিছু বুঝিতে পারি নাই; বুঝিবার যােগ্যতাও তখন আমাদের হয় নাই। বাঙলাদেশে মুসলমানদের তখন সবে দু’খানা সংবাদপত্র বাহির হইয়াছে। একখানা ইংরাজী—“Mohammedan observer, অপরখানা বাংলা—“সুধাকর।” মনে পড়ে, আমি যখন মদনমােহনের দ্বিতীয় ভাগ শেষ করিয়াছি, তখন বাবা আমাকে “সুধাকরের গ্রাহক করিয়া দিয়া- ছিলেন। বুঝি-কি-না বুঝি, ক্রমশঃ বুঝিতে পারিব এবং জাতীয় কার্যের কথঞ্চিৎ সহায়তা করা হইবে, ইহা ভাবিয়াই বােধ করি বাবা আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে ইংরাজি “অবজারভার এবং আমাকে “সুধাকর লইয়া দিয়াছিলেন। বাঙলার মুসলমান সমাজ তখনও বহুকালের জড়তায় অঘােরে ঘুমাইতেছিল। স্কুল কলেজে মুসলমানের ছেলের নাম বড় একটা শুনিতে পাওয়া যাইত না। আরবী এবং উর্দু, ফার্সির চর্চা স্থানে স্থানে কিছু ছিল বটে; কিন্তু ইংরাজি বাংলা—যাহা অর্থকরী বিদ্যা, তাহার ধারেও কেহ যাইতে চাহিত না। আমি একটী বৃদ্ধের কথা জানি। সে লেখা- পড়া বিশেষ কিছু জানি না। ছেলেকে স্কুলে দিবার কথা উঠিলেই সে বলিত,—“সৰ্ব্বনাশ, তাও কি কখনাে হয় ? উহার নাম ইস্কুল, ওখানে গেলে জাতিকুল সব যাইবে !” যদিও আধুনিক ধর্মহীন শিক্ষা অনেক স্থলে এই বৃদ্ধের আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করিয়াছে, তথাপি অর্থোপার্জনের দিক হইতে দেখিলে, বাঙলার মুসলমানের ঐ দুইটা “জাতিনাশা ভাষা শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা কত বেশী, এখন অনেকেই তাহা বুঝিতে পারিয়াছেন। ফলে স্বধৰ্ম্মনিষ্ঠ এবং ধৰ্মসম্বন্ধে উদাসীন—দুই শ্রেণীর লােকই আমরা সমাজে দেখিতে পাই।
পূর্বাভাস আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-বিরাগী মুসলিম সন্তানের যখন ঐ প্রকার যৎসামান্য আরবী-ফার্সি-উর্দুর গণ্ডীতে আবদ্ধ থাকিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছিল, বিরাট দুনিয়ার বিরাট কৰ্ম্মক্ষেত্রের সহিত তাহাদের পরিচয় হয় নাই বলিলেই হয়, মুন্শী মেহেরুল্লা সেই যুগে জন্মগ্রহণ করেন। সারা বাংলার মুসলমান তখন অধঃপতিত, দুর্দশাগ্রস্ত। সমাজে তাহাদের একতা নাই, উচ্চশিক্ষায় অনুরাগ নাই, ব্যবসায়ে তাহারা অনেকের পশ্চাতে। জমিদার এবং মহাজনে তাহাদের সম্বৎ- সরের পরিশ্রমের ফল লুটিয়া লইতেছে ; অর্থে, সম্মানে সকল দিকেই তাহার হৃতসৰ্বস্ব। “মুসলমান” বলিয়া পরিচয় দিলে লােকে তাহাকে অনেক ক্ষেত্রে অসভ্য, নােংরা জীব ছাড়া আর কিছু মনে করিত না। তাহাদের সংস্পর্শ দোষের এবং তাহাদের সহিত একাসনে উপবেশন করাও তখনকার দিনে অপমানজনক ছিল। (অপরদিকে ভিন্ন দেশীয় পার্জী সাহেবেরা খৃষ্টধর্ম প্রচারের জন্য দেশময় আপ্রাণ সাধনা করিতে ছিলেন। বাংলার অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মুসলমান যখন তাঁহাদের বাক্যবন্যায় ভাসিয়া “শ্যাম রাখি কি কুল রাখি অবস্থায় উপনীত, ঠিক সেই সময় ইলামের জলন্ত বৰ্ত্তিক হস্তে অপূৰ্ব্ব মনীষা, অদ্ভুত বাগ্মিতার অধিকারী মুন্শী মেহেরুল্লা আল্লার মেহেরের মতই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহার অলােকসামান্য প্রতিভা-রশ্মিতে সন্দেহের কুঙ্কুটিকাজাল সূর্যোদয়ে নীহার-কণার মত মুহুর্তে বিলীন হইল। পাত্রী সাহেবেরা স্তম্ভিত হইলেন, বাঙলার অসংখ্য মুসলমান পথহারা হইতে হইতে সহসা সত্যপথের সন্ধান পাইয়া বাঁচিল, মুসলমান সমাজে নব- জীবনের স্পন্দন জাগিল। দুই একজন কিশাের কবি জাতীয় সঙ্গীতে সুর সাধনা আরম্ভ করিলেন। বাঙলাদেশের অনেক স্থানে যখন মুন্শী মেহেরুল্লার খ্যাতি ছড়াইয়া ৪ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা পড়িয়াছিল, সেই সময় একদিন শুনিতে পাইলাম যে, আমাদের বাড়ী হইতে তিন ক্রোশ দূরে মহিষখচা নামক গ্রামে মুনশী সাহেব শুভাগমন করিতেছেন। তাহার বক্তৃতা শুনিবার ভাগ্য পূর্বে আমার আর কখনও হয় নাই; সুতরাং অপরিসীম আগ্রহ লইয়া নির্দিষ্ট দিনে আমি এবং আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা মুনশী ফজলুর রহমান সাহেব, ২১ জন বন্ধুবান্ধব সমভি- ব্যাহারে সভায় উপস্থিত হইলাম। লােকে লােকারণ্য। মহিপুরের স্বজাতিবৎসল জমিদার পরলােকগত খান বাহাদুর আবদুল মজিদ চৌধুরী সাহেব সভাপতির আসন অলঙ্কত করিলেন। মুন্শী সাহেবের বক্তৃতায় শ্রোতৃমণ্ডলী মুগ্ধ, চমৎকৃত হইল। আমিও সামান্য কিছু বলিলাম। এই সূত্রে সভার পরে মুন্শী সাহেবের সহিত আমার প্রথম আলাপ পরিচয় হইল। কথায় কথায় “পরিত্রাণ কাব্যের কথা উঠিল। মুশী সাহেব খুশী হইয়া বলিলেন,-আপনি পাণ্ডুলিপিখানি আমাকে পাঠাইয়া দিবেন, আমিনিজব্যয়ে উহা ছাপাইব।” তখনও আমার বইএর শেষের কয়েকটি সর্গ লেখা হয় নাই। যতখানি লেখা ছিল তাহাই তাহাকে পাঠাইয়া দিলাম। কয়েকদিন পরে কড়েয়ার “রিয়াজুইস্লাম প্রেস হইতে প্রুফ, পাইলাম এবং অল্প সময়ের মধ্যে পুস্তকের ছাপা শেষ হইল। মুসলমান সমাজে এই বইখানির যথােচিত আদর হয় নাই; কিন্তু হিন্দুসমাজে এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ হিন্দুসংবাদপত্র সমূহে ইহা বহু প্রশংসা লাভ করিয়াছিল। একথা বলিলে বােধ হয় অন্যায় হইবে না যে, মুসল- মানদের মধ্যে “পরিত্রাণ কাব্য পড়িবার মত লােক তখন খুব কমই ছিল; যাহারা ছিলেন, তাঁহাদের কাছেও উপেক্ষা ছাড়া আর কিছু বিশেষ লাভ হয় নাই। দু’একজন ব্যাঙ্গও করিয়াছিলেন। অবস্থা দেখিয়া মহাপ্রাণ মুন্শী সাহেব নব প্রকাশিত সাপ্তাহিক “সােন্তানের গ্রাহকদিগকে নামমাত্র মূল্যে পুস্তকখানি উপহার দিবার ব্যবস্থা করিলেন। ইহাতে আর পূর্বাভাস কিছু না হউক, অন্ততঃ বাঙলা দেশের অনেক স্থানে আমি কিঞ্চিৎ পরিচিত হইলাম এবং সাহিত্য-সেবায় আমার আগ্রহ বৃদ্ধি পাইল। সিরাজী সাহেবের “অনল-প্রবাহ, “পরিত্রাণ কাব্য প্রকাশের অব্য- বহিত পূৰ্বেই বাহির হইয়াছিল। তখন উহা একখানি ঘােট বই ছিল। মুনশী সাহেব উহা নিজব্যয়ে ছাপাইয়া দিয়াছিলেন বলিয়া শুনিয়াছি। মুন্শী সাহেবের সহিত আমার দ্বিতীয় বার দেখা হয় গঙ্গাচড়ার সভায়। খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ চৌধুরী সাহেব তাঁহার বাটী হইতে কিঞ্চিৎ দূরে গঙ্গাচড়ার মাঠে একটি মেলার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম বৎসর মেলায় একদিকে যেমন আমােদ-প্রমােদের ব্যবস্থা ছিল, অন্যদিকে তেমনি জ্ঞান বিস্তারের জন্য মুশী সাহেবের বক্তৃতা-সভারও আয়ােজন করা হইয়াছিল। তিস্তা নদীর দক্ষিণ পারে আমাদের বাড়ী হইতে চারি- ক্রোশ দূরে মেলাস্থলে এই সভা বসিয়াছিল। আমরা প্রাণের টানে সেখানে ছুটিয়া গিয়াছিলাম এবং মনে পড়ে, জনাব খান বাহাদুর সাহেবের অনুবােধে সে রাত্রে মুন্শী সাহেবের সহিত আমরাও তাহার আতিথ্য স্বীকার করিয়াছিলাম। এখানেও লােকে মুনশী সাহেবের বক্তৃতা শ্রবণে মােহিত হইয়াছিল। তৃতীয়বার দেখা হয় তঁাহার সহিত তুষভাণ্ডারের সভায়। স্কুলের সম্মুখস্থ খােলা মাঠে সহস্রাধিক লােকের সমাগম হইয়াছিল। মুন্শী সাহেবের সহিত মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন বিদ্যাবিনােদ এবং শাহ, আব্দুল্লা সাহেবান সভায় উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য বক্তারা যখন বক্তৃতা দিতেছিলেন তখন অনেক লােক তাহা মনােযােগ দিয়া না শুনিয়া গােলমাল করিতেছিল। মুশ, সাহেব এই অশান্তি নিবারণের জন্য উঠিয়া দাড়াইলেন এবং দশ মিনি- টের মধ্যে যাহা বলিলেন, তাহাতে মনে হইল, সভায় যেন আর একটাও ৬ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা জীবিত মানুষ নাই; চিত্রাপিতের মত সকলেই তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। গােলমাল থামিয়া গেল। শুধু এখানে নহে,সর্বত্রই তাহার বক্তৃতার এই অসাধারণত্ব লক্ষ্য করিয়াছি। তিনি মানুষকে সম্মোহিত করিতে পারিতেন। চেষ্টার ফলে এ ক্ষমতা তিনি লাভ করিয়াছিলেন, তাহা তখনও আমার মনে হয় নাই, এখনও হয় না। ইহা খােদা-দত্ত শক্তি। তা ছাড়া বক্তৃতা আরম্ভের পূর্বে তিনি দেখিয়া লইতেন যে, কোন্ শ্রেণীর শ্রোতার সংখ্যা কিরূপ? যে শ্রেণীর আধিক্য দেখিতেন তাহাদের উপযােগী কথাও পাড়িতেন। ফলে লােকের মন সহজে বিগলিত হইত; তিনিও যশঃলাভ করিতেন। জীবনে বিভিন্ন জাতীয় বহু বক্তার বক্তৃতা শুনিয়াছি। হাদের কথা শুনিয়া মনে হইয়াছে, তাহারা বেশ ভাবিয়া কথাগুলি বলিতেছেন। কিন্তু মুন্স্ট সাহেবের বক্তৃতার ধারা আমার কাছে অরূপ মনে হইত। ভাবিয়া চিন্তিয়া তাহাকে কথা বলিতে হইত না, কি এক ভাবে যেন তিনি বিভাের হইয়া পড়িতেন, অর কথাগুলি অনর্গল তাঁহার মুখ দিয়া বাহির হইতে থাকিত। তিনি কথা শুরু করিলে থামিতেন না,ঝর্ণার জলের মতই তাহার কথার ধারা শ্রোতৃবর্গের হৃদয় সরস করিয়া স্বচ্ছন্দ গতিতে চলিত ; অথচ তাহার মধ্যে একটি অসঙ্গত, অবান্তর বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক কথা থাকিত না। এজন্য তিনি হিন্দু-মুসলমান সকলেরই শ্রদ্ধাভাজন হইয়াছিলেন। নিজের সমাজের দুঃখকাহিনী বর্ণনার সময় তাঁহার বাণী অগ্নিময় তীরের মত সমঝদার শ্রোতার মর্মস্থলে গিয়া বি ধিত। এজন্য কত মানুষকে সক্ষেত্রে হা হা রবে ক্রন্দন করিতে দেখিয়াছি। বাস্তবিক তিনি আসিয়াছিলেন অনেক অকল্যাণের অবসান ঘটাইতে। কাজেই তাঁহার বাক্যেও এমন তেজ ছিল, যাহা মুসলমান সমাজের বহুকালের জড়তাকে ৭ ; • পূর্বাভাস ভাঙ্গিয়াছে, তাহাদের চেতনা ফিরাইয়াছে ; বাঙলার আত্মবিস্মৃত মুসলমান আত্মােপলব্ধি করিতে শিখিয়াছে, তাহাদের মধ্যে নব নব প্রতিভার উন্মেষ সম্ভব হইয়াছে ; এক কথায়-সমাজ জাগিয়াছে। নবযুগের জয় পতাকাধারী অনেক তরুণ সেবক আসিয়া সমাজসেবায় আত্মােৎসর্গ করিয়াছেন। দেখিয়া শুনিয়া আমার মনে হয়, মুন্শী সাহেবের মত বাগ্মী যদি সেই সময় আমাদের মধ্যে দেখা না দিতেন, তাহা হইলে বাংলার মুসলমানকে শিক্ষাক্ষেত্রে আজ যতটুকু অগ্রসর দেখিতেছি, ততটুকুও বােধ হয় দেখিতে পাইতাম না। তাঁহার প্রতিভার আলাে সূর্যরশ্মির মত সমাজের সকল স্তরে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। তাহাতে সমাজের অন্ধ অনেকটা দূর হইয়াছে, উচ্চশিক্ষার দিকে মুসলমানের নজর পড়িয়াছে। বলিতে কি, এই নিঃস্বার্থ লােকটা একা সমাজের যতখানি কাজ করিয়া গিয়াছেন, ততখানি কাজ করিবার মত কর্মবীরের আজিও অভাব আছে। মুন্শী সাহেবের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে মিশিবার সুযােগ ঘটে আমাদের পর্ণকুটীরে-কাকিনার সভা উপলক্ষে। এখানকার “ব্রাহ্মসমাজ এবং “ছাত্রসমাজের সম্মুখে “শম্ভুসাগর নামক প্রশস্ত সরােবর তীরে সভাধি- বেশনের বাসনায় আমাদের কর্মীরা বহু গুণসম্পন্ন কাকিনাধিপতি স্বর্গীয় রাজা মহিমারঞ্জন রায় চৌধুরী মহােদয়ের অনুমতি প্রার্থনা করেন। রাজা বাহাদুর স্বয়ং সুপণ্ডিত এবং সুবক্তা ছিলেন। কোন ধর্মের প্রতিই তঁাহার বিদ্বেষ ছিল না। বড় বড় সভা সমিতিতে বাগ্মিতা এবং বিদ্যাবত্তার পরিচয় দিয়া তিনি বিদ্বৎসমাজে এবং বাঙলার জমিদারগণের মধ্যে বরেণ্য হইয়াছিলেন। গুণীর কাছেই গুণীর সমাগম হইয়া থাকে ; তাহার কাছেও 'নানা দেশের বহু গুণীজ্ঞানী ব্যক্তি আসিতেন। মুসলমান সমাজের অধঃপতন লক্ষ্য করিয়া স্থানীয় লােকদের সন্তান সন্ততির শিক্ষার জন্য তিনি মৌলভী আব্দুল লতীফ নামক একজন প্রবীণ আলেমকে তাঁহার ৮ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা দরবারে রাখিয়াছিলেন। রাজ-এষ্টেট হইতে তাঁহার বেতন এবং মাদ্রাসার ব্যয় বহন করা হইত। মৃত্যুকাল পর্যন্ত মৌলভী সাহেব অতি সম্মানের সহিত এখানে ছিলেন। রাজা বাহাদুর ধর্মসম্বন্ধীয় নানা বিষয় তাঁহার সহিত আলােচনা করিতেন। যখন সভার অনুমতি প্রার্থনা করা হয়, তখন হয়ত তিনি মনে করিয়াছিলেন, চিরদিন যেমন দেখা যায়, এই মুনশী সাহেবও সেই শ্রেণীর একজন বক্তা হইবেন। তাই তিনি অনুমতি দিলেও বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। নির্দিষ্ট দিনে সভা হইল। প্রথমে মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন এবং শাহ, আবদুল্লা সাহেবান ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা করিলেন। তারপর উঠিলেন মুনশী সাহেব। সমগত সহস্রাধিক হিন্দু-মুসলমান এই ছিন্নবস্ত্রপরিহিত অতি সাধারণ মানুষটীর অদ্ভুত ক্ষমতা, অপূর্ব বাগ্মিতার পরিচয় পাইয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল। গুণগ্রাহী রাজা বাহাদুর উদ্বেলিত-চিত্তে উঠিয়া বলিলেন--“আজ আমার অনেকদিনের একটা ভুল ধারণা ঘুচিল। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এমন একজন বাগ্মী আছেন, ইহা আমি এই প্রথম দেখিলাম। মনে আছে, মুন্শী সাহেবের বক্তৃতার আলােচনা-প্রসঙ্গে সেদিন রাজা-বাহাদুরও দীর্ঘ অভিভাষণে মুসলমানদিগকে শিক্ষার জন্য উৎসাহিত করিয়াছিলেন। মুন্শী সাহেব অনেক সভায় নিজের কাহিনী অকপটে বর্ণনা করিতেন, এখানেও করিয়াছিলেন। অশিক্ষিত সমাজকে উদ্বুদ্ধ করাই বোধ হয় ইহার উদ্দেশ্য ছিল। তিনি একজন বড়দরের বাগ্মী, এ অভিমান কখনই প্রকাশ করিতেন না। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী হইলেও তাঁহার তিলমাত্র গৰ্ব দেখি নাই। যখন কাহারও সহিত বাক্যালাপ করিতেন তখন তাহাকে নিতান্তই “মাটির মানুষ মনে হইত; কিন্তু সভায় দাড়াইলে বুঝা যাইত, তিনি যে-সে লােক নহেন,-পুরুষসিংহ। তাঁহার বাক্যে একদিকে যেমন অমৃতপ্রবাহ বহিত, অপরদিকে তেমনি বিদ্যুণও • পূর্বাভাস হইত। শ্রোতার হৃদয় জয় করিবার অপরিসীম ক্ষমতা ছিল তাঁহার বাক্যে। সভার শেষে রাজা বাহাদুর, পরদিন প্রাতে বক্তাদের সহিত আলাপ করিবার ইচ্ছা জানাইলেন। যথাসময়ে রাজবাড়ী হইতে জুড়ি গাড়ী আসিয়া তাহাদিগকে লইয়া গেল। আমরাও তাহাদের কথা শুনিতে গেলাম। বহুক্ষণব্যাপী ধৰ্ম্মালাপে রাজা বাহাদুর নিরতিশয় আনন্দলাভ করিলেন। মুন্শী সাহেবের যুক্তিপূর্ণ কথা তাহার মনে গভীর রেখাপাত করিয়াছিল। মুন্শী মেহেরুল্লার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের একটি গল্প এস্থলে বােধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। কাকিনার সভায় ঘটনাচক্রে আমার নূতন বিলাতী জুতা জোড়া হারাইয়া যায়। আমি জনৈক বন্ধুর জুতা পায়ে দিয়া পথে আসিতে আসিতে মুর্শী সাহেবকে রহস্যচ্ছলে বলিলাম—“যা আপনার বক্তৃতায় আজ কিছু কাজ হয় নাই। চুবির সম্বন্ধে আপনার অত নীতি- কথা শুনিয়াও যখন চোরে আমার জুতা জোড়া লইয়া গেল, তখন কি করিয়া বুঝিব যে, আপনার কথায় কাজ হইয়াছে। মুন্শী সাহেব তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন,-“ভাই, ওটা আমার দোষ নয়,-আপনার কর্মের ফল! এইমাত্র আপনি বিলাসিতার বিরুদ্ধে কত কথা বলিয়া আসিলেন, আর আপনার নিজের পায়ে দামী বিলাতী জুতা। তাই চোর উহা চুরি করিয়া আপনাকে এই উপদেশ দিয়া গেল যে, আগে নিজে বিলাসিতা ছাড়, তারপর অন্যকে ছাড়িতে উপদেশ দিও।” এ কথার আর উত্তর কি? তদবধি বিলাতী জুতা ব্যবহার করিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না। আর একটা ঘটনার কথা মনে আছে। আমাদের বাড়ীতে সকাল বেলা মুন্শী সাহেব ছেড়া কাপড় সেলাই করিতে বসিয়াছেন; অনেক ভদ্রলােক কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন। তিনি কাজ করিতে করিতে সকলের সহিত আলাপ করিতেছেন। এমন সময় স্কুলের বৃদ্ধ হেড পণ্ডিত স্বর্গীয় গগনচন্দ্র ঘােষ মহাশয় বলিলেন,-“দেখুন, আপনাদের এই পর্দা- প্রথাটা বড় ভয়ঙ্কর রকমের। মুসলমানের দেখাদেখি হিন্দুর অন্তঃপুরেও এই কড়াকড়িটা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। এতটা কিন্তু ভাল নয়।” পণ্ডিত মহাশয় ছিলেন গোড়া ব্রাহ্ম। মুন্শী সাহেব তাহার কথা শুনিয়া হাসিয়া বলিলেন,-“আচ্ছা, পণ্ডিত মশাই, এই “অসূৰ্যম্পশ্যা শব্দটা হিন্দু না মুসলমানের? যদি মুসলমানের হইত, তাহা হইলে না হয় বলিতে পারিতেন যে, আমাদের দেখাদেখি হিন্দু সমাজে পর্দার কড়াকড়ি হইয়াছে। কিন্তু শব্দটা যে আপনাদেরই। পণ্ডিত মহাশয় এ কথার আর প্রতিবাদ করিতে পারিলেন না। শুধু বলিলেন-“আপনি ছেলেমানুষ। কিন্তু আপনার কাছে আজ বড় জব্দ হইলাম। এইরূপ সামান্য দুই-এক কথায় তিনি অনেকের কঠিন প্রশ্নের এত সহজ উত্তর দিতেন যে, শুনিয়া আমরা অবাক হইতাম। তাঁহার সাধারণ কথাবার্তাতেও অনুপ্রাসের ছড়াছড়ি থাকিত। শব্দগুলি এমন সুসঙ্গত- ভাবে তিনি প্রয়ােগ করিতেন, যেন তাঁহার মুখ হইতে মালাগাথা হইয়া বাহির হইতেছে। অধুনালুপ্ত “বিধবা-গঞ্জনায় তিনি এই শক্তির বহুল পরিচয় দিয়াছেন। লালমণিরহাট জংশনের উত্তরপূর্ব দিকে কুলাঘাট নামক স্থানে এক সময় একটি ধর্মসভার অধিবেশন হয়। আমরা সকলেই সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভা শেষ হইবার পূর্বে প্রবল ঝড় এবং মূষলধারে বৃষ্টি নামিল। শামিয়ানার রশি ছিড়িয়া গেল। এই ব্যাপারে সকলেরই মন ক্ষুব্ধ হইল। বাধ্য হইয়া পরদিন রাত্রে মুনশী সাহেবকে আবার বন্যা পূর্বাভাস ১১ দিতে হইল। এই স্থানে তিনি আমাকে “বিধবা-গঞ্জনার দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের কথা বলিয়াছিলেন। বিধবাদের দুঃখ সম্বন্ধে জাতিধৰ্ম্মনির্বিশেষে সকল কবির লেখা একত্র সংগ্রহ করিয়া একখানি বই বাহির করা তাহার উদ্দেশ্য ছিল এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি আমাকেও একটি কবিতা লিখিয়া দিতে বলেন। আমি তাহার কথামত “বিধবা-বিলাপ কবিতা লিখি। কিন্তু উহার অল্পদিন পরেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায়, সে বই আর বাহির হয় নাই। আমার লেখাটি পরে “ইলাম প্রচারকে ছাপা হইয়াছে। যতদূর স্মরণ হয়, তাহাতে তিনিই বােধ হয় বাংলা কবিতায় প্রথম গজলের সুর যােজনা করেন। এ বিষয়ে তাহাকে অগ্রদূত বলা যাইতে পারে। সভা-সমিতিতে যখন সুরে সুর মিলাইয়া তাহারা গাহিতেন- “কোথায় আরবভূমি, কোথা বঙ্গ, কোথা তুমি, পাব কি তােমারে আমি, মােহাম্মদ ইয়া রসুলােলা । ধৰ্ম্মরক্ষা, সত্যরক্ষা, করিতে ওম্মতে রক্ষা, পাসরিলে আত্মরক্ষা, মােহাম্মদ ইয়া রসুলােলা। সমস্ত জগত মাঝে তব ভা জোরে বাজে, বিধর্মীরা মরে লাজে, মােহাম্মদ ইয়া রসুলােল্লা । শােন রে মােসলেম জাতি, আললা রে জ্ঞানের বাতি, মুখে বল দিবারাতি মােহাম্মদ ইয়া রসুলাল্লা!”
১২ কর্মবীরমুশী মেহেরুল্লা তখন অশীতিপর বৃদ্ধ হইতে বালক পর্যন্ত সকলের মনেই একটা উদ্দীপনার স্রোত বহিয়া যাইত। কুলাঘাটের সভার পর মহিপুর যাইবার পথে তিনি আর একবার এই অধমের কুটীরে আসিয়াছিলেন। সম্ভবতঃ উহাই আমাদের শেষ দেখা। আমরা এক গাড়ীতে আসিতেছিলাম। বাড়ীর কাছাকাছি আসিলে সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন,-“কালে এই বাড়ীটা আমাদের তীর্থস্থান হইবে।” আমি চমকিয়া উঠিলাম-এ-ষে তাহার স্বপ্ন ! কিন্তু বাদা- বাদেরই বা কি আছে ? কাণা ছেলের “পদ্মলােচন নাম কতজনে রাখে ; একটা কণাও কি তাহাতে “পদ্মলােচন হয়? গুরুজনেরা অনেক সময় আশীৰ্বাদ করিয়া বলেন,-“রাজা হও।” কে তাহাতে সত্যিকার রাজাই হইয়া থাকে ? স্নেহ, ভালবাসার ক্ষেত্রে অসম্ভবই সম্ভব হইয়া উঠে। কষ্টিপাথরে ইহার বিচার চলে না। তাহার মৃত্যুর পর “সােতান অফিসে মেহেরুল্লা মেমমরিয়াল ফণ্ড, খােলা হইয়াছিল। তাহাতে আমিই বােধ হয় সর্বাগ্রে আমার লায়লী- মজনু ১০০ খণ্ড দান করি। আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা ২ টাকায় উহার একখণ্ড বই কিনিয়াছিলেন বলিয়া “সােলতান সম্পাদক মওলানা মােহাম্মদ মনিরুজ্জমান ইলামাবাদী সাহেব তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। কত টাকা সেই ফণ্ডে জমিয়াছিল, বলিতে পারি না। বােধ হয় বিশেষ কিছু জমে নাই এবং তাহাদ্বারা কোন কাজ হয় নাই। আধমরা জাতির কাছে ইহার অধিক আর কি আশা করা যাইতে পারে ? যাহা হউক, এতদিন পরে এখন যদি তাহাদের চেতনা ফিরিয়া থাকে, শিক্ষিত যুবকেরা তাহার স্মৃতিরক্ষার সুব্যবস্থা করেন, তাহা হইলেও আমাদের মুখের কালী অনেক পরিমাণে মুছিয়া যাইতে পারে। কাল চলিয়া যাইতেছে,যাইবে। কিন্তু গুণীর গুণগৌরব কালজয়ী
No text on this page.
কবীর মুন্শী মেহেরুল্লা-
ত
কবি শেখ ফজলল করিম সাহিত্য বিশারদ
পূর্বাভাস
হইয়া থাকিবেই; সে স্মৃতি চির অমলিন। মুনশী সাহেব সম্বন্ধেও এ কথা
বেশ খাটে। আমরা তাঁহাকে ভুলিতে বসিয়াছিলাম ; কিন্তু তাঁহার
গুণমুগ্ধ ভক্ত মৌলভী শেখ হবিবর রহমান সাহিত্যরত্ন সাহেব জগতের
সম্মুখে তাঁহার স্মৃতিকে উজ্জ্বল করিয়া ধরিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। এজন্য
তিনি আমাদের সকলেরই কৃতজ্ঞতাভাজন। যােগ্য ব্যক্তিই এ কাজের
ভার লইয়াছেন। তিনি অল্পকথায় মুন্শী সাহেবের কৰ্ম্মবহুল জীবনের
একটি পরিপূর্ণ চিত্র আঁকিতে চেষ্টা করিয়াছেন। তাহার বাসনা ফলবতী
হউক এবং বাংলার ঘরে ঘরে ধৰ্ম্মবীর, কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লার জীবন-কথা
সযত্নে লােকে পাঠ করুক, ইহাই আমি প্রার্থনা করি।
কারুনের সাথে ধনরাশি তার পাইয়াছে চিরলয়।
ন্যায়পরায়ণ নৌশেরোয়ার আজো গাহে লােকে জয় ।
সৎকর্মশীল মুন্শী সাহেবও অমর হইয়া থাকিবেন।
কাকিনা-(রংপুর)
রমজান, ১৩৫ হিজরি
শেখ ফজল করিম
কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা vie প্রথম পরিচ্ছেদ বাল্যজীবন এমন একদিন ছিল, যেদিন মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মরহুমের নামে সমগ্র বঙ্গ-ভূমিতে সাড়া পড়িয়া যাইত। তাঁহার বক্তৃতা শুনিবার জন্য দূরদূরান্তর হইতে সহস্র সহস্র লােক মধুলুব্ধ মক্ষিকার ন্যায় ছুটিয়া আসিত। জন সাধারণের উপর এমন একটা বিরাট প্রভাব তাঁহার পূৰ্ব্বে মােসূলেম-বঙ্গে বােধ হয় আর কেহই প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হন নাই। আজ মুসলমান সমাজে যে জাগরণের সূচনা হইয়াছে, মহুয়া মুন্শী সাহেবের প্রাণান্ত সাধনা ইহার মূলে কতখানি কাৰ্য্য করিয়াছিল, হতভাগ্য অকৃতজ্ঞ বঙ্গীয় মুসলমান আমরা তাহা এত অল্প সময়ের মধ্যেই ভুলিয়া যাইতে বসিয়াছি। অতি সামান্য অবস্থা হইতে অবিচলিত সাধনা ও অধ্যবসায় দ্বারা মানুষ যে কত বড় হইতে পারে, দেশ ও সমাজের উপর কত বিরাট প্রভাব বিস্তার করিয়া জাতির স্থায়ী কল্যাণ সাধন করিতে পারে, আকাশের ঐ সমুজ্জ্বল চন্দ্ৰসূর্বের ন্যায় মানবের হৃদয়-গগনে গৌরবময় স্থায়ী বাল্যজীবন আসন প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে, মহুম মুন্শী সাহেবের জীবন তাহার একটী সুন্দর নিদর্শন। তাঁহার পবিত্র স্মৃতিতে আজ শুধু তঁাহার নিভৃত পল্লী-নিবাস ছাতিয়ানতলা নহে, সমগ্র যশােহর জেলা, এমন কি, সমগ্র বঙ্গদেশ গৌরবান্বিত। বঙ্গীয় মােসলেম গগনের সেই দীপ্ত মিহির যদিও আজ কালের নির্মম গতিতে চিরঅস্তমিত, তথাপি পরােক্ষভাৰে তাহারই হিরণ কিরণে সমুদ্ভাসিত বহু জ্যোতিষ্ক আজিও বঙ্গ-গগন আলােকিত করিয়া আছে ! তাঁহার সেই অমৃতবর্ষী কমকণ্ঠ যদিও আজ চির- নীরব, তবুও সঙ্গীতের মূচ্ছনার মত আজিও তাহা বঙ্গ-মােসলেমের হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে কন্দরে প্রতিধ্বনিত হইতেছে। যশােহর টাউনের ৫৬ মাইল উত্তর-পশ্চিম কোণে ছাতিয়ানতলা নামক একটি সামান্য পল্লীগ্রামে মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মরহুমের পিতা মুন্শী মােহাম্মদ ওয়ারেছ উদ্দীন সাহেব বাস করিতেন। তিনি একজন ধর্মপরায়ণ ও একান্ত পরহেজগার * ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার পূৰ্বপুরুষগণই উক্ত গ্রামে প্রথম বসতি স্থাপন করেন। মুন্শী সাহেব মম ১২৬৮ সালের ১০ই পৌষ সােমবার দিবাগত রাত্রিতে যশােহর জেলার অন্তর্গত কালিগঞ্জ থানার অধীন প্রসিদ্ধ বারবাজারের নিকট বৰ্ত্তী ধােপ নামক গ্রামে তাঁহার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। দরিদ্রতা- নিবন্ধন এবং পিতার অকালমৃত্যুর জন্য মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মহুমের বােধাদয়ের ? উপরে স্কুলের শিক্ষা হয় নাই। বাল্যকাল হইতেই মুনশী সাহেবের জ্ঞানতৃষ্ণা অত্যন্ত বলবতী ছিল। এখনকার মত তখন যেখানে সেখানে স্কুল মাদ্রাসা ছিল না। * পরহেজগার-ধর্মভীরু। বােথােয় নিম প্রাথমিক শ্রেণীর একখানি প্রসিদ্ধ সাহিত্য পুস্তক। ইহা ঈশ্বরচন্দ্র , বিদ্যাসাগর মহালয় কর্তৃক বিরচিত।
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা মুসলমান সমাজে যাহাদের লেখা পড়া শিখিতে একান্তই আগ্রহ, তাহাদের অনেকে কোন মৌলভীর সঙ্গে থাকিয়া ‘বেলমী’ করিয়া আরবী ফারসী ভাষা শিখিতে চেষ্টা করিত। এই শ্রেণীর “তাবেলগণের প্রধান কর্ত্তব্য হইতেছে, মৌলভী সাহেবের বােচকা বহন করা, ওয়াজের সময় হার সুরে সুর মিশান, সভায় বসিয়া গালগল্প শােনা, দো- বেলা মুরগীর গােশতের শ্রাদ্ধ করা, আর কখনাে কখনাে আপারা বা কারিমা লইয়া বসিয়া শরীর দোলাইয়া সুর করিয়া অর্থ না বুঝিয়া দুই এক লাইনের পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা। এই শিক্ষার সহিত ভাষাজ্ঞানের কোন সংস্ৰবই ছিল না। এইভাবে ৫/৬ বৎসর কাটাইয়া দুই চারিটি বয়াত সুর করিয়া আওড়াইতে শিখিয়া লােকে মুন্শী মৌলভী সাজিয়া বাড়ী আসিত। শিক্ষার নামে মানব-জীবন লইয়া এই খেলা, এই আত্মপ্রবঞ্চনা এখনাে মুসলমান সমাজে অজস্র ভাবে চলিতেছে। এই শ্রেণীর মুন্শী মৌলভীগণই সাধারণত এপ্লামের নামে আজিও বিরাট বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের মুণ্ডু চর্বণ করিতেছেন। জনাব মুর্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মরহুমের যখন ঘটনা-প্রতিকুলতায় স্কুলের পড়া বন্দ হইয়া গেল, তখন তিনি জ্ঞান-তৃষ্ণার দুর্দম তাড়নায় ১৩১৪ বৎসর বয়সে গৃহত্যাগ করিয়া কয়ালখালি গ্রাম নিবাসী মৌলভী মােসহাব উদ্দীন সাহেবের নিকট তিন বৎসর, অতঃপর করটিয়া নিবাসী মােহাম্মদ ইসমাইল সাহেবের নিকট তিন বৎসর কাল আরবী ও ফায়সী শিক্ষায় ব্যয় করেন। এই সময় অন্য সাধারণ তালবেলমগণের ন্যায় মুন্শী সাহেব মহুম বৃথা সময় নষ্ট করেন নাই। (কোরান শরীফ এবং উর্দু, ফাসী ভাষায় তিনি যে বিশেষ ব্যুৎপত্তি • লাভ করিয়া ছিলেন, তাহা তাঁহার গ্রন্থাবলী ও জীবনের ঘটনা সমূহ হইতে নিঃসন্দেহে বুঝিতে পারা যায়। বিশ্ববরেণ্য কবি শেখ সাদীর বাল্যজীবন ১৭ পন্দ নামাও গুলিস্ত-বুস্তা, তার জীবনের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। তিনি বক্তৃতার মধ্যে প্রায় এই সমস্ত গ্রন্থ হইতে মধুর সুরে ফাসী বয়াত আবৃত্তি করিয়া মর্মস্পর্শী ভাষায় তাহার অর্থ সকলকে বুঝাইয়া দিতেন। উর্দু ভাষায় তাহার যথেষ্ট অধিকার ছিল। বিভিন্ন উর্দ, পুস্তক ও সাময়িক পত্রাদি নিয়মিতভাবে পাঠ করিয়া তিনি তাহা হইতে নানা উপাদান ও জাতীয়তার প্রেরণা লাভ করিতেন। এইরূপে(ইলামী জাতীয়তাপূর্ণ উর্দ-সাহিত্য তাহাকে নূতনভাবে, নূতন প্রাণে, নৃতন- শক্তিতে ধীরে ধীরে গড়িয়া তুলিতেছিল। পাঠ সমাপনান্তে তিনি খােজারহাট নামক স্থানে একটি দজ্জীর দোকানে সেলাইয়ের কাজ শিক্ষা করিতে আরম্ভ করেন। এই সময়েও তিনি মুন্শী তাজ মাহমুদ নামক জনৈক ভদ্রলােকের নিকট বিশেষ মনােযােগ সহকারে অবসর সময়ে উর্দু ও ফারসী সাহিত্য শিক্ষা করিতেন। অতঃপর মরহুম খড়কী গ্রাম নিবাসী জাহা বখশ মীর্জা নামক একজন বিখ্যাত “সাহেব বাড়ীর * দজ্জীর নিকট উন্নত শ্রেণীর দৰ্জীর কাজ শিক্ষা করিতে আরম্ভ করেন। সঙ্গে সঙ্গে এখন তিনি বাঙ্গলা সাহিত্য এবং ব্যাকরণ শিক্ষার প্রতি সমধিক মনােযােগী হন। কিছুদিন পরে মুন্শী সাহেব মরহুম “সাহেব বাড়ীতে নিযুক্ত হইয়া ৫/৬ বৎসর কাল এই কার্যে নিরত ছিলেন। এই সময়েও তিনি যথারীতি অধ্যয়ন পরিত্যাগ করেন নাই। এস্থলে সাহেব বলিতে ডিষ্ট্ৰীক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট, ডিষ্ট্রক্ট জজ বা স্থানীয় ইউরােপীয়ান খৃষ্টান মিশনারীদিগকে বুঝাইতেছে। কারণ অন্য কোন ইউরােপীয়ান ঐ সময় যশােহর টাউনে বাস করিতেন বলিয়া জানা যায় নাই।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সাধনার পথে মুনশী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মহুমের বাল্যজীবনে যশােহরে ও তাহার নিকটস্থ পল্লীগুলিতে খৃষ্টান পাদ্রীদের অত্যন্ত প্রভাব। তাহাদের প্ররােচনায় দলে দলে এ-দেশের অধিবাসিগণ খৃষ্টানধৰ্ম্ম আলিঙ্গন করিয়া নিজেদিগকে ধন্য মনে করিতেছিল। পাদ্রীদের নানা কুহেলিকাপূর্ণ কুটতর্কজালসমাচ্ছন্ন বক্তৃতা শুনিতে শুনিতে অল্পবয়স্ক মুনশী সাহেবের হৃদয়সমুদ্রে নানা চিন্তার তরঙ্গ বহিয়া যাইত। তবে কি ইলামধৰ্ম্ম মিথ্যা? এতদিন তবে কি মিথ্যা ধাঁধার মধ্যেই ঘুরিয়াছি ? তিনি ভাবিয়া ভাবিয়া অধীর হইয়া পড়িতেন ; কোন মীমাংসাতেই উপনীত হইতে পারিতেন না। এই সমস্ত তর্কের কোন উত্তর তিনি তথাকথিত আ’লমদিগের নিকট খুঁজিয়া পাইতেন না। দিন দিন হার মনে সন্দেহ বদ্ধমূল হইতে লাগিল। প্রবল ঝটিকা-সন্তাড়নে যখন সমগ্র বনভূমি আলােড়িত হইতে থাকে, তখন দৃঢ়মূল প্রাচীন তরুগুলি তাহা হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারিলেও অপরিপক্ক বৃক্ষরাজী সেই আঘাত সহ্য করিতে পারে না। খৃষ্টান ধৰ্ম্মের প্রবল সংঘাতে তরুণ-হৃদয় সত্যানুসন্ধিৎসু মুন্শী সাহেব বিচলিত হইয়া পড়িলেন। এই অবস্থায় তিনি যদি খৃষ্টানধৰ্ম্ম গ্রহণও করিতেন, তাহাও তেমন আশ্চর্যজনক হইত না। কিন্তু খােদাতাল। মুনশী সাহেবের প্রতি সদয় ছিলেন। তাই সাধনার পথে তাঁহার ইমান সুরক্ষিত হইল। এমনকি, যে খৃষ্টান ধর্মের নিকট তিনি আত্মসমর্পণ করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন, চিরজীবন তাহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করিয়া সহস্র সহস্র মুসলমানের ইমান রক্ষার কারণ হইয়াছেন। তাঁহার রদ্দে খৃষ্টান খৃষ্টধর্মের বিরুদ্ধে মেশিনগানের ন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছে। পাদ্রীদের যাবতীয় কূটতর্কের উত্তর ইহাতে এমন নিপুণতার সহিত প্রদত্ত হইয়াছে, অধুনা প্রচলিত খৃষ্টানধৰ্ম্ম যে মূলতঃ একটা প্রকাণ্ড অসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, এ কথা উক্ত পুস্তকে এমনভাবে প্রতিপন্ন করা হইয়াছে যে, তাহার তুলনা নাই। ধৰ্ম্মের কূট প্রশ্নের মীমাংসায় যখন মুন্শী সাহেবের মন নিতান্ত ব্যাকুল, এতদিনের অবলম্বন, কোটি কোটি মুসলমানের আশ্রয়কেন্দ্র নূরনবী- প্রচারিত মহা পবিত্র ইসলাম ধৰ্ম্ম যখন এ-দেশে খৃষ্টান পাদ্রীগণের নির্মম অস্ত্রাঘাতে ধুলিসাৎ হইবার উপক্রম, তখন সৌভাগ্যক্রমে তৎকালীন প্রসিদ্ধ বক্তা ও ইসলামপ্রচারক (হাফেজ নিয়ামতুল্লা মরহুমের “খৃষ্টান ধৰ্ম্মের ভ্রষ্টতা নামক একখানি যুক্তিতর্কপূর্ণ সুন্দর পুস্তক তাহার হস্তগত হইল। এতদ্ব্যতীত প্রথম জীবনে খৃষ্ট ধর্মপ্রচারক ও পরবর্ত্তী জীবনে ইসলামধৰ্ম্মপ্রচারক পাদ্রী ঈশানচন্দ্র মণ্ডল ওরুফে মুন্শী মোহাম্মদ এহছানুল্লা সাহেব কৃত “ইঞ্জিলে হজরত মােহাম্মদের খবর আছে নামক পুস্তকখানি তিনি প্রাপ্ত হন। এই দুইখানি পুস্তক তাঁহার জীবনের ধারা পরিবর্তনে “বিশেষ সহায়তা করিয়াছিল।) তিনি ধীরে ধীরে বুঝিতে লাগিলেন ইলামই জগতে খােদার মনোনীত একমাত্র ধর্ম। খৃষ্টান পাদ্রীগণের গােলক ধাধার রহস্য ক্রমশঃ তাঁহার নিকট পরিষ্কার হইয়া আসিল। তিনি যশােহরে “সাহেবদের বাটীতে কাজ করিবার সময় মধ্যে মধ্যে তাহাদের সঙ্গে দার্জিলিং যাইতেন। এই সূত্রে সেখানকার অনেক ভদ্রলোকের সহিত তাহার বিশেষ ঘনিষ্ট ছিল। একবার দার্জিলিঙ্গে ২০ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা অবস্থিতিকালে জনৈক ভদ্রলােকের পরামর্শ অনুসারে মুনশী সাহেব মরহুম মহীশূর হইতে প্রকাশিত—“মসুরে মােহাম্মদী নামক একখানি সাপ্তাহিক উর্দ পত্রিকার গ্রাহক হন এবং খৃষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে লিখিত কয়েকখানি উর্দ পুস্তক সংগ্রহ করেন। এই সমস্ত পুস্তক ও পত্রিকা পাঠে ক্রমশঃ তাহার হৃদয়-গগন হইতে ইস্লাম সম্বন্ধে সন্দেহের সমস্ত কুহেলিকা অরুণােদয়ে তিমির-পটলের মত বিদূরিত হইয়া গেল ; নূতন স্বর্গীয় আলােকে তাহার অন্তর-জগত আলােকিত হইয়া উঠিল। ইলামের নৃতন তেজে, নৃতন শক্তিতে দিন দিন পূর্ণ হইয়া মেহেরুল্লা * জনসমাজে দীপ্ত মিহিরের ন্যায়ই প্রতিভাত হইতে লাগিলেন। পরশমণির মঙ্গল-স্পর্শে লৌহ স্বর্ণে পরিণত হইল; (ইলমের দীপ্ত প্রভাবে সেই দৰ্জী মেহেরুল্লা বঙ্গবিখ্যাত বাগ্মীকুলতিলক, অদ্বিতীয় সমাজ-সংস্কারক মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লায় পরিণত হইলেন।) সংঘর্ষ মানবের শক্তি বৃদ্ধির প্রধান কারণ। খৃষ্টানধৰ্ম্মের সহিত প্রবল সংঘর্ষের প্রভাবেই মুন্শী মেহেরুল্লার সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত হইয়া উঠিয়াছিল। প্রকৃত সত্যে যখন হৃদয় উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, মুন্শী সাহেব তখন আর নিশ্চিন্তভাবে নিজ ব্যবসায়ে নিবিষ্ট থাকিতে পারিলেন না। পাত্রীগণ কেমনভাবে প্রকৃত স্বত্য চাপা দিয়া মিথ্যাকে সত্যের নামে চালাইতেছেন, ইস্লামের উপর দিনে ডাকাতি করিতেছেন, তাহা দেখিয়া মুশী সাহেব অধীর হইয়া উঠিলেন। প্রথমে পাদ্রীদের অনুকরণে তিনি হাটে হাটে , তাঁহাদের বক্তৃতার তীব্র প্রতিবাদ শুরু করিয়া দিলেন। হাটের একদিকে পাদ্রীদের বক্তৃতা, অন্যদিকে মুন্শী সাহেবের বক্তৃতা ! হাটের লোেক ভাঙ্গিয়া আসিয়া মুনশী সাহেবের বক্তৃতা শুনিতে লাগিল। সকলে বিস্ময়ে অবাক হইয়া গেল। তাহারা এতদিন দেখিয়া আসিতেছে মেহের শব্দের অর্থ অনুগ্রহ। মেহেরুল্লা-খােদার অনুগ্রহ।
সাধনার পথে পাদ্রীগণ নিঃস্বার্থ ভাবে (১) হাটে হাটে ধৰ্ম্মবক্তৃতা প্রদান করেন ; কেহ কখনাে তাহার প্রতিবাদ করেন না। মৌলভী মৌলানা সাহেবেরা এই সমস্ত বক্তৃতা ও আলােচনা সভয়ে সাবধানে এড়াইয়া চলিতেন। এতৎসম্বন্ধে কিছু বলিলে কাফেরী ও “গোমরাহীর ফৎওয়া দিয়া নাছারা- দিগকে দোজখে পাঠাইয়া দিতেন; কিন্তু সাহস করিয়া কেহ তঁাহাদের সম্মুখে কোন দিনই টু শব্দটী করিতেন না। আজ এ কি নৃতন দৃশ্য ! একজন তরুণ মোলেম প্রকাশ্যভাবে সম্পূর্ণ বিনা স্বার্থে এই সব বক্তৃতার সুযুক্তিপূর্ণ উত্তর দিতেছেন, বাদ প্রতিবাদ করিতেছেন, ইসলামের মহিমা আল্লা ও রসুলের মহান গৌরব ঘােষণা করিতেছেন। জনতা অবাক বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া রহিল-মুগ্ধ হইয়া গেল ! এমন ত তাহারা কখনাে দেখে নাই, শশানে নাই। দেশে দেশে পল্লীতে পল্লীতে এই অদ্ভুত গল্প ছড়াইয়া পড়িল। যে পাদ্রীদের বিরুদ্ধে এতদিন কেহই একটি কথা বলিতে সাহস করে নাই মোহাম্মদ মেহেরুল্লা নামক একজন তরুণ যুবক আজ তাহাদিগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আদান করিতেছেন। প্রকাশ্য বক্তৃতায় তাহাদের যুক্তিতর্কের অসারতা প্রতিপন্ন করিয়া ইলামের বিজয়-নিশান তুলিয়া ধরিয়াছেন। দেশের দূর দূরান্তরে সাড়া পড়িয়া গেল ; এই উন্নত পতাকার নিম্নে মুসলমানগণ দলে দলে সমবেত হইবার জন্য নূতন উন্মাদনায় মাতিয়া উঠিল। একবার এই অসাধারণ মানুষটিকে দেখিবার জন্য, তঁাহার মুখের কথা শুনিবার জন্য আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই ব্যাকুল হইয়া উঠিল। যশােহর-ঘুরুলিয়া নিবাসী মুন্শী মােহাম্মদ কাছেম সাহেব এবং যশােহর টাউনসংলগ্ন ঘােপ নিবাসী মুনশী গােলাম রব্বানী সাহেব এই সমস্ত তর্কযুদ্ধে (১) প্রকৃতপক্ষে এ-দেশে পাদ্রীগণ সাধারণত নিঃস্বার্থ ভাবে ধর্ম প্রচার করেন না। অনেকেই জানেন, তাহারা খৃষ্টান-মিশনফণ্ড হইতে যথেষ্ট টাকা পাইয়া থাকেন।
কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা ; মুন্শী মেহেরুল্লা সাহেবের সহযোগী থাকিতেন এবং অনেক সময় ইহারাও স্বতন্ত্রভাবে বক্তৃতায় বা তর্কযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতেন। যাহারা নিঃস্বার্থভাবে ইসলামের সেবায় আত্মােৎসর্গ করেন, সত্য প্রতিষ্ঠায় প্রাণপণ করেন, খােদা তাহাদিগকে বড় করিয়া থাকেন ; ইহা জগতের চিরন্তন সত্য। নিঃস্বার্থ ইসলাম সেবক মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা দেখিতে দেখিতে বিখ্যাত হইয়া পড়িলেন। এ দেশের সর্বত্রই মৌলুদ শরিফ পাঠের যথেষ্ট প্রচলন আছে। এই সমস্ত মিলাদ মহফেলে মহফেলে যাহা পঠিত হয়, তাহার প্রায় বার আনা মিথ্যা এবং কবির কল্পনা, এ কথা আজকাল প্রত্যেক অভিজ্ঞ ব্যক্তিই অবগত আছেন। ইহাতে হজরতের পবিত্র চরিত্র ও মহান জীবনাদর্শের বিষয় প্রায় আললাচিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই পাঠক বা শ্রোতা কেহই পঠিত বিষয়ের মর্ম বুঝেন না, অথচ সকলেই আশা করেন ইহার প্রভাবে তাঁহাদের জীবনের বহু বৎসরের পাপ ক্ষয় হইবে। বলিতে গেলে, এই ধরণের মিলাদ মহফেল এক শ্রেণীর মােল্লা মৌলভীদের জীবিকার্জনের একটি প্রধান উপায় । ইহা দ্বারা শ্রোতাগণের ধর্ম- জীবনের বা চরিত্রগঠনের বিশেষ কিছু উন্নতি হয় না। { মুন্শী সাহেব মরহুম সুযােগ পাইলেই এই সমস্ত মৌলুদ মহফিলে উপস্থিত হইতেন এবং সাময়িক ওয়াজ ও বক্তৃতা দ্বারা হজরতের মহান জীবনা- দর্শ পরিস্ফুট করতঃ জনসাধারণকে মুগ্ধ ও ধৰ্ম্মজীবনে উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিতেন। ক্রমে ক্রমে দূর দূরান্তর হইতে সভার জন্য তাঁহার নিমন্ত্রণ আসিতে লাগিল। তাঁহার অসাধারণ উদারতায়, বালকে চিত সরলতায় হৃদয়ের অসীম তেজ ও শক্তিতে যে কেহ তাহার সহিত মিশিয়াছে, সেই মুগ্ধ হইয়াছে ; চিরদিনের জন্য সে তাহাকে একান্ত আপন, একান্ত স্বজনরূপে মনে করিয়াছে। কিসে পতিত মুলসমান সমাজের উন্নতি হইবে, সাধনার পথে এই চিন্তা তাঁহার স্বপ্ন ও. জাগরণের একমাত্র সাধনা ছিল। কর্মী মেহেরুল্লা বক্তৃতার মধ্য দিয়া সমাজের প্রত্যেক স্তরে—কৰ্ম্মের প্রেরণা জাগাইয়া তুলিতে চেষ্টা করিতেন। (বাঙ্গলার মুসলমান সমাজ ধীরে ধীরে বুঝিতে লাগিল, সাধারণ মুন্শী মৌলভীদের ওয়াজের সহিত মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মরহুমের ওয়াজের পার্থক্য কোথায়? দীন ও দুনিয়ার সমবেত কল্যাণ সাধনের নামই ইলাম। দীন দুনিয়া হইতে পৃথক নহে। দীনদার হইতে হইলে, প্রকৃত ধাৰ্ম্মিক হইতে হইলে দুনিয়াদারীর মধ্য দিয়া, এই কৰ্ম্মকোলাহলময় সংসারের মধ্য দিয়াই হইতে হইবে। পরিবার প্রতিপালন, সংসারের সৰ্ববিধ উন্নতি সাধন, ইলামেরই অঙ্গ; তবে তাহার শর্ত এই যে, কৰ্ম্মসাধনার মধ্যে খােদাতালাকে ভুলিলে চলিবে না। হজরত রসুলের জীবনও পূর্ণরূপে এই শিক্ষাদান করে ও কোরানের শিক্ষা ঠিক ইহা) এতৎপ্রসঙ্গে হজরত মওলানা রুমী তাঁহার বিখ্যাত মনবীয়ে রুমীতে লিখিয়াছেন,-“চি দুনিয়া ? আজ খােদা গাফে শেদান্।” অর্থাৎ “গুনিয়া কি ? খােদাতালাকে ভুলিয়া যাইবার নামই দুনিয়া। ইন্নামের প্রকৃত শিক্ষা দীন ও দুনিয়ার যুগপৎ উন্নতি সাধন। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা তাঁহার অসাধারণ ওজস্বিনী ও প্রাণস্পর্শী ভাষায় সমাজকে এই শিক্ষাই দিতেছিলেন। তাঁহার বক্তৃতা, তাহার উপদেশ সম্পূর্ণরূপে ইম-নীতিসঙ্গত ছিল বলিয়াই মুসলমান সমাজ তাহা এমনভাবে গ্রহণ করিয়াছিল। তাহার উপদেশের সহিত তাহাকেও মরমের মর্মস্থলে ভালবাসিয়া, আদর করিয়া গ্রহণ করিয়াছিল। কর্মযোগের আদর্শ- সাধক মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ক্রমাগত নানাস্থানে বক্তৃতা দিতে দিতে অভিজ্ঞতা প্রভাবে হার শক্তি, জ্ঞান ও বিচক্ষণতা দিন দিন বৃদ্ধি ইতে লাগিল। খৃষ্টান পাদ্রীগণের সহিত ক্রমাগত তর্ক করিতে করিতে ২৪ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা তাঁহার তর্কশক্তি বাড়িয়া চলিল, সঙ্গেসঙ্গে ইসলাম ও খৃষ্টান ধৰ্ম্মশান্ত্রে তিনি অসাধারণ জ্ঞান সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। এই জ্ঞান-সাধনাই মুন্শী সাহেব মহুমের জীবনের সফলতার প্রধান ভিত্তি। ভিতরে জিনিস থাকিলে শুধু গলাবাজী করিয়া কেহ বড় হইতে পারে না। মুশ সাহেবের সাধনার অন্ত ছিল না; তাই খােদাতালার অনুগ্রহ ও আবেহায়াতের ন্যায় তাহার উপর এবং তাঁহার মধ্যবর্তিতায় নিখিল বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের উপর ঝরিয়া পড়িয়াছিল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ ইমের বিরুদ্ধে খৃষ্টান পাদ্রীদের প্রচারের ফলে কেমনভাবে সত্যানুসন্ধিৎসু মােহাম্মদ মেহেরুল্লার সুপ্ত প্রতিভা সাড়া দিয়া উঠিয়াছিল, কেমনভাবে তিনি ধীরে ধীরে সাধনার পথে অগ্রসর হইয়া নিজেকে যােগ্য করিয়া তুলিয়াছিলেন এবং পাদ্রীদের প্রবর্তিত তর্ক-সংগ্রামে ইসলামের পক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, পূর্ব অধ্যায়ে অতি সংক্ষেপে তাহার আভাস প্রদত্ত হইয়াছে। বলা বাহুল্য, এই সময়ের মধ্যে তিনি খৃষ্টান ধর্মশাস্ত্রেও অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন। বিচক্ষণ মোহাম্মদ মেহেরুল্লা দেখিলেন, শুধু মৌখিক বক্তৃতা বা তর্কের ফল স্থায়ী হইতে পারে না; বাক্য উচ্চারিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহা বাতাসে মিশিয়া যায়। লোকে কিছুদিন তাহা স্মরণ রাখিলেও তাহার স্থায়িত্ব বড়ই কম। বিশেষতঃ মৌখিক কথায় প্রভাব ব্যাপকভাবে দেশের উপর কাৰ্য্য করিতে পারে না। দেশকে, জাতিকে স্থায়ীভাবে, ব্যাপকভাবে প্রভাবান্বিত করিতে হইলে তাহা সাহিত্যের মধ্যবর্তিতাতেই করিতে হইবে। তাই কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা তাহার প্রচারকাৰ্য্যকে পূর্ণ সফলতা দিবার জন্য (খৃষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে পুস্তক, প্রণয়নে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। ইহার ফলে তিনি সমগ্র বাঙ্গালার জন- সাধারণের লক্ষীভূত হইয়া পড়িলেন। মুসলমান সমাজ তাহার নামে কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা v, we ! ভক্তিশ্রদ্ধায় মস্তক নত করিতে লাগিল। সমগ্র মুসলমান সমাজ নূতন উৎসাহে, নৃতন উন্মাদনায় যেন মাতিয়া উঠিল। পক্ষান্তরে খৃষ্টানগণ এই ব্যাপার দেখিয়া অবাক হইয়া গেলেন। বাঙ্গালাদেশে এমন যে একটা কিছু ঘটিতে পারে, তাহাদের সার্বভৌম প্রচারের বিরুদ্ধে এদেশে কেহ যে টু শব্দটি করিতে পারিবে, তাহারা ত এমন কল্পনা কখনই করেন নাই। আজ সেই অসম্ভব সম্ভব হইল, স্বপ্ন সত্যে পরিণত হইল। গ্রাম্য, তথাকথিত অশিক্ষিত মোহাম্মদ মেহেরুল্লা নামক একজন সামা যুবক সহস্র সহস্র অসাধারণ জ্ঞানী ও বিদ্বান পাদ্রীগণ-পরিচালিত খৃষ্টানধৰ্ম্ম প্রচারের বিরুদ্ধে বুক ফুলাইয়া সম্মুখ সমরে অগ্রসর হইতেছেন ! খৃষ্টান সমাজেও সাড়া পড়িয়া গেল। ইংরাজ বাঙ্গালী বহু পাদ্রী তাহার সহিত লেখনী ও তর্কসংগ্রামে অবতীর্ণ হইলেন। নানা স্থানে তর্কবাহাছ চলিতে লাগিল। বিবিধ পত্রিকা ও পুস্তকের মধ্যবর্তিতায় সর্বত্র তুমুল সংগ্রাম পরিচালিত হইতে লাগিল। এই সংগ্রামের ফলে একজন খৃষ্টধর্ম- প্রচারক বিখ্যাত পাদ্রী মহুম মুনশী সাহেবের হস্তে বন্দী হইয়া চিরজীবন স্বেচ্ছায় তাহার অনুগত্য স্বীকার করেন। শুধু তাহাই নহে, ইনি স্বয়ং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া সেই হইতে এখন পর্যন্ত দেশে দেশে ইলামের গৌরবােন্নত বিজয়-পতাকা বহন করিয়া বেড়াইতেছেন। প্রসিদ্ধ ইস্লাম প্রচারক মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন আহমদ বিদ্যাবিনােদ সাহেবের ইসলাম-গ্রহণ ইসলাম-গ্রহণ মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লার জীবনের একটি অতি প্রধান ঘটনা। বিদ্যাবিনােদ সাহেব তাহার প্রণীত “মেহের- চরিত” নামক পুস্তকে এই সমস্ত বিষয় নিজেই বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। চার্চ, অব, ইংল্যাণ্ডের ভূতপূৰ্ব্ব মিশনারী জন্ জমিরুদ্দীন সাহেব এলাহাবাদের অন্তর্গত সেন্ট পলস ডিভিনিটি কলেজে খৃষ্টানধৰ্ম্ম প্রচার বা মিশনারী বিদ্যা শিক্ষা করেন। উক্ত কলেজ হইতে অধ্যয়ন খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ ২৭ শেষ করিয়া II, G, R. ( Higher Grade of Reader) বা পাঠকরত্ন উপাধি প্রাপ্ত হন। খৃষ্টান পাদ্রীদের চিরাচরিত নিয়ম অনুসারে দেশে দেশে তিনি যিশুর জয়গান করিয়া বেড়াইতেন। পিতা-পুত্র ও পবিত্ৰাত্মা এই তিনজনই ঈশ্বর, একে তিন তিনে এক, যিশুকে বিশ্বাস করিলেই একেবারে বিনা হিসাবে স্বর্গে যাওয়া যাইবে, এইরূপ খৃষ্টানপাত্ৰীসুলভ মধুর বক্তৃতা দ্বারা তিনি নিরীহ জনগণকে খৃষ্টানধৰ্ম্মের “আলােকের দিকে আহ্বান করিতেন, আর সঙ্গে সঙ্গে ইস্লামের বিরুদ্ধে তীব্র গরল রাশি উদগীরণ করিতেন। এই সমস্ত ত্রিত্ববাদের হেঁয়ালী ললাকে যতটা বুঝুক আর না বুঝুক, বাহিরের আড়ম্বর দেখিয়া এবং যিশুকে বিশ্বাস করিলেই একেবারে বিনা হিসাবে বেহেশতে যাওয়া যাইবে এই প্রলােভনে ও নানা কারণে বহুলােকে খৃষ্টানধর্ম গ্রহণ করিত। (১৮৯২ খৃষ্টাব্দের “খৃষ্টীয় বান্ধব” নামক একখানি খৃষ্টানী মাসিক পত্রিকায় পত্রিী জন্ জমিরুদ্দীন সাহেব “আসল কোরান কোথায়? নামক একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। ঐ প্রবন্ধে তিনি বহু কূট-যুক্তি ও বাক্-জালের সাহায্যে প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন যে, মােহাম্মদ (দঃ) প্রচারিত কোরান শরিফ জগতে আর নাই ; সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত · হইয়া গিয়াছে। এত বড় একটা কথা পার্সী সাবে নিশ্চয়ই যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থিত না করিয়া প্রচার করিতে পারেন নাই। মুসলমান মাত্রেরই দৃঢ় বিশ্বাস, এ পর্যন্ত কোরান শরিফের কোন অক্ষরের, এমন কি, একটি জের-জবরেরও পরিবর্তন হয় নাই। কোরান শরিফে স্বয়ং খােদাতালা নিজেকে কোরানের সংরক্ষক বলিয়াছেন। আজ কিনা ঘিদ্যাগব্বী একজন পাদ্রীর আক্রমণে সেই কোরান শরিফ সম্পূর্ণ জাল বলিয়া ঘােষিত হইতেছে! আসল কোরান আর ইহজগতে নাই, ইহাই প্রমাণিত হইতে চলিয়াছে! কোরান সম্বন্ধে আলােচনামূলক পাদ্রী ২৮ কৰ্ম্মবীর মুশী মেহেরুল্লা • v y" সাহেবের এই প্রবন্ধে ইসলামের ইতিহাস এবং ধর্মগ্রন্থমূলক প্রমাণই ব্যবহৃত হইয়াছিল। যে কোরান শরিফ কোটি কোটি মুসলমানের জীবন-মরণের একমাত্র অবলম্বন, একজন খৃষ্টান পাদ্রী আজ তাহাকে ইলামী শাস্ত্র এবং ইতিহাসের সাহায্যে জাল প্রমাণিত করিতে চাহিতেছেন! তাহার এই চেষ্টা সফল হইলে, মুসলমানদের পক্ষ হইতে ইহার উপযুক্ত প্রতিবাদ না হইলে যে ইসলামের মূল ভিত্তিই সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হইয়া যায়! ইলামের উপর এইরূপ ভীষণ আক্রমণ বুঝি অরি কিছুই হইতে পারে না। হজরত ইসা আলায়হেসালামের প্রচারিত ইঞ্জিল কেতাব যে জগতে অপরিবর্তিত অবস্থায় নাই, নানাভাবে অসংখ্য খৃষ্টান মনীষী কর্তৃক প্রমাণিত হইয়া এ-কথা এখন একরূপ অবিসম্বাদিত সত্যরূপে গৃহীত হইয়াছে। * পাদ্রী সাহেব তাহাদের ধর্মগ্রন্থের ন্যায় মুসলমানের মহাগ্রন্থ খােদার কালাম কোরান শরিফকেও জাল বলিয়া প্রমাণ কবিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। বাঙ্গালায় ইস্লামের এই বিষম বিপদের দিনে সমাজের সহস্র সহস্র নায়েবেনবী, আলেম ও মৌলভীমওলানা কেহই সাড়া দিলেন না। এই শ্রেণীর শাস্ত্রীয় এবং জ্ঞানগর্ভ তর্ক-সমরে প্রবৃত্ত হইবার যােগ্যতা এদেশের সাধারণ আলেমের তখনাে ছিল না এবং এখনাে নাই। জ্ঞান থাকিলেও ভাষার অভাবে তাহা প্রকাশের সাধ্য ছিল না। বিশেষত খৃষ্টান পাদ্রীগণ রাজার ধর্মাবলম্বী, ইংরাজী এবং অন্য নানা ভাষায় তাঁহারা সুশিক্ষিত, বহু জ্ঞান-বিজ্ঞানে সুসজ্জিত। এরূপ অবস্থায় তাহাদের সম্মুখে দাড়াইবার সাহসই অনেকের হইত না। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লাই মুসলমান প্রচারকদের এই ভয় ভাঙ্গিয়া দিয়া সর্বপ্রথমে দেখাইয়াছেন যে মুসলমানগণ খৃষ্টান পাদ্রীদিগের সহিত তর্ক করিতে, এমন * মােস্তফা-চরিতের উপক্রমণিকার ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ দেখুন।
খৃষ্টান ধর্মের সহিতসংঘর্ষ কি, তাহাদিগকে পরাস্ত করিতে পারে। খৃষ্টান পাদ্রীগণ এবং অন্যান্য বহু খৃষ্টান লেখক কত অগাধ পাণ্ডিত্য লইয়া ইলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাইয়া থাকেন, জনাব মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সাহেবের মহাগ্রন্থ “মােস্তফা-চরিত” ও “কোরানের তফসির যিনি মনােযােগ সহকারে পড়িয়াছেন, তিনিই তাহা অবগত আছেন। শুধু আরবী ভাষাতেই যে তাহাদের অগাধ পাণ্ডিত্য তাহা নহে, ইলামী ধর্মশাস্ত্র কোরান, হাদিস, তফসির, এমে রেজাল ইত্যাদিতেও তঁাহাদের দখল অসাধারণ। এমন কি, সমগ্ৰ মোসলেম জগতে এ সম্বন্ধে তাহাদের সমকক্ষ আলেম খুব কমই আছেন। অনেকে শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইবেন, জার্মানীতে ইলামের বিশ্বকোষ বা Encyclopedia of Islam প্রকাশিত হইয়াছে, আরবে, বান্দাদে বা মিসরে নহে। এই অগাধ পাণ্ডিত্য এবং দুষ্ট প্রতিভা তাহারা ইসলাম-ধ্বংস কাৰ্যেই নিয়োজিত করিয়াছেন। কোরান শরিফের বহু আয়াতের কূট অর্থ করিয়া, মিথ্যা ও ‘মৌজু’ হাদিস এবং মিথ্যা তফসিরগুলি প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করিয়া তাহারা কনসাধারণের চক্ষে ধাঁধাঁ লাগাইয়া থাকেন। এই শ্রেণীর পাত্রীগণ ইস্লামকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার উদ্দেশ্যে বহুসংখ্যক কোরান শরিফের তরজমা ও তফসির প্রকাশিত করিয়াছেন। ইলাম-দর্শন, মিজানুল হক, তা'লিমে মােহাম্মদী, ইম-দর্পণ, তহকিক ইমান এবং এই শ্রেণীর প্রাণ জুড়ানাে বহু ইলামী নামের অবিরণে নানা কেতাব প্রচার করিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে ইহারা তীব্র হলাহল উদগীরণ করিয়া থাকেন। “মােসলেম ওয়ার্ল” (Muslim World) নামক এক- খানি সুপরিচালিত সাপ্তাহিক পত্রিকা এই উদ্দেশ্যেই প্রচারিত হইয়া থাকে। অসাধারণ বিদ্যাবায় এককালীন ফেরেশতা-নেতা ইবলিসের উত্তরাধি- কারী স্বরূপ এই সব তার্কিক পণ্ডিতগণ কোরান হাদিসের ভিতর বাজালের প্রভাবে এমন সকল সন্দেহ ঢুকাইয়া দেন, এমন কি, অনেক কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা সত্যকে এমনভাবে মিথ্যা প্রমাণিত করেন যে, তাহাতে সাধারণের ত দূরের কথা, অনেক মৌলভী মৌলানা বা বিচক্ষণ পণ্ডিত ব্যক্তিরও মাথা ঘুরিয়া যায়। * ঠিক ঐ সমস্ত লেখকের সমকক্ষ বিদ্বান ও জ্ঞানী না হইলে, যথেষ্ট তর্কশক্তি না থাকিলে তাহাদের লেখা খণ্ডন করা, তর্কের ভ্রান্তি ( falaey) প্রদর্শন করা সম্ভবপর নহে। কিন্তু সেরূপ লােক আমাদের এই বঙ্গদেশে কয়জন পাওয়া যায় ? তাই বহুলােকই ভ্রান্তিবশে পাদ্রীদের সমােহনমন্ত্রে আকৃষ্ট হইয়া খৃষ্টানধর্ম গ্রহণ করে বা ইস্লামের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়ে। আমার বিশ্বাস, বিরুদ্ধ রাজশক্তির বন্দুক, কামনি, বােমা বেয়ােনেট ইামের যে ক্ষতি করিতে পারে, এই শ্রেণীর সাহিত্য-কর্তৃক ক্ষতি তাহা অপেক্ষা সহস্র গুণ অধিক। বাহিরের আক্রমণ অপেক্ষা দেহের আভ্যন্তরীণ আক্রমণেই সহস্রগুণ অধিক লােক ধ্বংস প্রাপ্ত হইয়া থাকে। এই সকল ইস্লাম-বিদ্বেষী-সাহিত্য সংক্রামক রােগ বীজানুর ন্যায় মােসলেম-হৃদয়ে কুপ্রভাব বিস্তার করিতেছে; তাহার ফলেই আজ আমাদের জাতীয় জীবন বােগদুষ্ট, অসাড় ও জীবনীশক্তি- বিহীন। তাহার ফলেই আজ আমাদের মধ্যে অসংখ্য ঘরের ঢেকি কুমীর হইয়া আমাদিগকে গ্রাস করিতে আসিতেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জাতীয় সমস্যা জটিলতুর করিয়া তুলিতেছে। যাহা হউক, বলিতেছিলাম, খৃষ্টান পাদ্রী জন্ জমিরুদ্দীন জগতে * পাদ্রী সেল সাহেবের বা পাদ্রী জন্ রিড সাহেবের কোরান এবং মুওর মাগলিয়াস প্রভৃতির গ্রন্থাবলী পাঠে এই সত্য সম্যক উপলব্ধি হইবে। সেদিন কলিকাতায় মােহাম্মদ আলী পার্কের একটি সাধারণ সভায় ইংরাজ নও-মােসলেম-প্রচারক ডক্টর খালেদ শেড্রেক বলিয়াছিলেন,-“ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যত কেতাব লিখিত হইয়াছে, দুনিয়ার অন্য কোন ধর্মের বিরুদ্ধেই এত কেতাব লিখিত হয় নাই। এই শ্রেণীর কেতাবের ভিতর হইতেই কিন্তু সত্যানুসন্ধিৎসু খালেদ শেড্রেক ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ বুঝিতে পারিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। বলা বাহুল্য, খৃষ্টান লিখিত কেতাবগুলিই খালেদ শেলড্রেকের লক্ষ্য স্থল ছিল।
খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ আর অসিল কোরাণ নাই বলিয়া যখন মহাদন্তে ইস্লামের বিরুদ্ধে আস্ফালন ও আক্রমণ আরম্ভ করিলেন, তখন বঙ্গীয় মুসলমান ভীতি বিহাল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিল। তাহার এই ভয়াবহ প্রবন্ধের যে কি উত্তর হইতে পারে তাহা কেহই ভাবিয়া পাইল না। যেমন নিরীহ, নিরস্ত্র জনসাধারণ সহসা ভীষণ শার্দল-সন্দর্শনে সভয়ে আত্মরক্ষার জন্য নিজ গৃহকোণে ছুটিয়া যায়, কেহ তাহাকে বাধা দিতে সাহস পায়না, পাত্রী সাহেবের ভীষণ প্রবন্ধে বাঙ্গালী মুসলমানেরও সেই অবস্থা হইল। কেহ ইহার প্রতিবাদ করিতে পারিল না, অথচ ইহার আক্রমণ অসহ্য হওয়ায় সকলেই সভয়ে আত্মগােপন করিল। বাঙ্গালায় ইসলামের এই বিষম সঙ্কটময় মুহূর্তে মরহুম মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব মহাবীরের ন্যায় “যুদ্ধং দেহীরবে পাত্রী সাহেবের সম্মুখীন হইলেন। (“সুধাকর” নামক তৎকালে প্রচলিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকায় ২০শে ও ২৭শে চৈত্র এবং পরবর্তী বৎসরের ২রা বৈশাখ ও ২৭শে জ্যৈষ্ঠ (১৩০০ ) তারিখে “ইসায়ী বা খৃষ্টানী থােকাভঞ্জন নামক একটি সুদীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করিয়া অত্যন্ত নিপুণতার সহিত তিনি পাদ্রী সাহেব কর্তৃক উত্থাপিত ছয়টি প্রশ্নের যুক্তিতর্কপূর্ণ উত্তর প্রদান করিলেন। মুনশী সাহেবের প্রবন্ধের উত্তরে পাদ্রী সাহেব উক্ত সুধাকর পত্রিকাতেই একটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ইহার উত্তর স্বরূপ মুন্শী সাহেব সুধাকরে “আসল কোরান সর্বত্র নামক আর একটি সুদীর্ঘ সারগর্ভ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। পাদ্রী সাহেব এই প্রবন্ধের আর কোন উত্তর দিতে পারেন নাই।) তর্কযুদ্ধ আপাততঃ থামিয়া গেল। জন্ জমিরুদ্দীন সাহেব অতঃপর গম্ভীর- ভাবে নীরবতা অবলম্বন করিলেন। হয় ত তিনি তখন ভাবিতেছিলেন, তবে কি ইসলাম ধৰ্ম্মই সত্য? এতদিন কি তবে চারিদিকে মিথ্যার ডাই ৩২ কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা পিটাইয়া বেড়াইয়াছি ? তাহার ভিতরের মানুষটি আর মােহের অন্ধকারে সুপ্ত থাকিতে চাহিল না। সত্যের হিরণ-কিরণোঙাসিত এক শুভ প্রভাতে সে “লায়লাহা ইল্লাল্লা মােহামদো রসুলুল্লা” বলিয়া জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। চারিদিকে আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনি জাগিল, রসুলের প্রচারিত ইলামই জগতে একমাত্র সত্য ধৰ্ম্ম ! “লায়লাহা ইল্লাল্লা মােহাম্মদোর রসুলুল্লাই জগতে মানবের একমাত্র মুক্তিমন্ত্র। সেইদিন হইতে পাদ্রী জন্ জমিরুদ্দীন ইস্লাম প্রচারক মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন আহমদে পরিণত হইলেন।) সেইদিন হইতেই তিনি ইসলামের সমুন্নত বিজয়-পতাকা দেশে দেশে বহিয়া বেড়াইতেছেন। সহস্র সহস্র ব্যক্তি তাহার বক্তৃতায় হেদায়েত পাইয়াছে। সহস্র সহস্র ব্যক্তি হার কল্যাণে পাদ্রী সাহেবদের ত্রিত্ববাদের থােকাবাজী হইতে আত্মরক্ষা করিয়া দীন ও ইমান কায়েম রাখিতে সমর্থ হইয়াছে (১) শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব ইলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া একটি স্কুলে শিক্ষকতা করিতে আরম্ভ করেন। ইহার কিছুদিন পরে মুনশী রেয়াজদ্দীন আহমদ সাহেবের পরামর্শানুসারে শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব মহুমের সহযােগী রূপে ইস্লাম প্রচার-ব্ৰত গ্ৰহণ করিবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা তঁাহার এই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে খােদার অনুগ্রহে নিজের সহযােগী ও অনুচর রূপে পাইয়া অনতিবিলম্বে তাঁহাকে গ্রহণ করিলেন। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের তখন নিখিল-বঙ্গে অপ্রতিহত প্রভাব। পরাক্রান্ত সিংহের ন্যায় ইস্লাম-গৌরবের বিজয়হুঙ্কারে তিনি দিগন্ত প্রকম্পিত করিয়া তুলিতেছিলেন। সুতরাং তাহার সঙ্গে (১) জনাব মুনশী সাহেবের নিকটেই শুনিয়াছি এই পুস্তক প্রকাশের কিছুকাল পূর্ব • পর্যন্ত তাঁহার নিকট ১৩৪২ জন খৃষ্টান ইসলামধর্ম গ্রহণ করিয়াছে এবং তিনি খৃষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে সর্বসমেত ১০৮ খানি কু পুস্তক পুস্তিকা প্রকাশ করিয়াছেন।
কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা- মৌলবী শেখ জমিরুদ্দিন
No text on this page.
খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ ৩ত বেড়াই, তঁাহার সাহায্যে ও সহযােগিতায় মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব যে সহজেই সর্বত্র পরিচিত হইয়া দেশের ও সমাজের যথেষ্ট কল্যাণ সাধন করিবার সুযােগ পাইয়াছিলেন, একথা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব তাহার দীক্ষাগুরু মুন্শী সাহেব মহুমের সহযোগীরূপে বরাবর কাটাইয়াছেন; প্রায় প্রত্যেক সভাতেই উভয়ে একসঙ্গে যাইতেন। মুনশী মেহেরুল্লা সাহেব নানা ভাবে মুন্শী জমিরুদ্দীন সাহেবকে সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া দিয়াছেন। মুন্শী সাহেবের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একান্ত অকৃত্রিম সােদরপ্রতীম বন্ধুর ন্যায় শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব তাহার সঙ্গে ছিলেন। মৃত্যুকালেও তিনি তাহার প্রতি অন্তিম কর্তব্য পালনে ক্রট করেন নাই। মুর্শী-শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব তাহার কৃত “মেহের চরিতে” এই সমস্ত কথা একান্ত উদারভাবে উল্লেখ করিয়া অসাধারণ মহত্ত্বের পরিচয় দিয়াছেন। চিরজীবন তিনি তাহার এই শ্রদ্ধেয়-অভিম্নহৃদয় বন্ধুর প্রি-স্মৃতি বহন করিয়া আসিতেছেন। মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন বিদ্যাবিনোদ সাহেব দ্বারা অজি ইক্লামের যে সেবা ও সাহায্য হইতেছে, তাহার মূল কারণ আমাদের মুর্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা। ইল্লামের বিরুদ্ধে যে শক্তি, যে প্রতিভা নিয়ােজিত হইতেছিল, খােদার অনুগ্রহে আজ তাহা ইল্লামের সেবাতে নিয়োজিত রহিয়াছে। যাহারা তাহাকে গড়িয়া পিটিয়া বক্তা ও প্রচা, রক করিয়া তুলিয়াছিলেন, ইস্লামের মহিমায় ও মুন্শী সাহেবের চেষ্টায় আজ তিনি সেই খৃষ্টান মিশনারীদের বিপক্ষে ইস্লামের প্রধান সেনাপতির কাৰ্যে আত্মনিয়োগ করিয়াছেন। এই সময় মুন্শী সাহেবের সহিত নানা স্থানে খৃষ্টান পাদ্রীগণের সৰ্ম্মবিষয়ক সংঘর্ষ হইতেছিল। এই সমস্ত সংঘর্বে সর্বত্র সর্বত্রই খৃষ্টান পাদ্রীগণ পরাজিত হইতে থাকেন। ইহাতে খৃষ্টান-সমাজ ভীত ও ৩৪ কৰ্ম্মবীর মুশী মেহেরুল্লা বিচলিত হইয়া পড়িলেন ; পক্ষান্তরে মুসলমান সমাজের উৎসাহ ও উদ্দীপনা সর্বত্র আশ্চৰ্যভাবে জাগিয়া উঠিল। মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবের ইস্লাম গ্রহণের পূর্বে মুন্শী সাহেব বরিশাল জেলার অন্তর্গত পিরােজপুর নামক মহকুমার উপরে সর্বপ্রথম খৃষ্টান পাদ্রীগণের সহিত প্রকাশ্যভাবে তর্ক-সংগ্রামে প্রবৃত্ত হন। ঐ স্থানের পাদ্রীগণ এতই দুঃসাহসী হইয়া উঠিয়াছিলেন যে, তাহারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইলামকে আদান করিয়া বুক ঠুকিয়া দাড়াইলেন। খৃষ্টান পাদ্রীগণের এই চ্যালেঞ্জ, ইলামের পক্ষ হইতে গ্রহণ করিবার লােক সমগ্র বাঙ্গালায় খুঁজিয়া পাওয়া অসম্ভব হইয়া পড়িল। অবশেষে তৎকালীন“মিহির ও সুধাকর” পত্রিকার সম্পাদক মুনশী শেখ রেয়াজব্দীন আহমদ সাহেব পাত্রীদের সহিত মােকাবেলা করিবার জন্য মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মমকে অনুরােধ করিলেন।)ইস্লামের এই আহ্বানে মুন্শী সাহেব সাড়া না দিয়া পারিলেন না। সেই নিম্ন প্রাথমিক শ্রেণীর পাঠ্য বােপােদয় পৰ্য্যন্ত পড়া অর্ধশিক্ষিত যুবক যশােহর হইতে সুদূর বরিশাল জেলায় নানা ভাষায় সুপণ্ডিত, উচ্চশিক্ষিত, প্রচার- কাৰ্যে বহু অভিজ্ঞ খৃষ্টান পত্রিীগণের সহিত তর্ক-সংগ্রামের জন্য একাকী উপস্থিত হইলেন। বুকে কতখানি বল থাকিলে এইরূপ একটি অসম সংগ্রামে অগ্রসর হওয়া যায়, সহৃদয় পাঠক তাহা একবার চিন্তা করিয়া দেখিবেন। (১২৯৮ সালের ২১শে, ২২শে ও ২৩শে আশ্বিন তারিখে ক্রমাগত তিন দিন ধরিয়া তুমুল আড়ম্বরে তর্ক-সংগ্রাম চলিল। এই সংগ্রামে তিনি খৃষ্টান পাদ্রীদিগকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করিয়া ইসলামের গৌরব-পতাকা উড্ডীন করিলেন। এই ঘটনায় মুন্শী সাহেবের খ্যাতি দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছড়াইয়া পড়িল। “খৃষ্টান-মুসলমানে তর্ক যুদ্ধ” নামক পুস্তকে এই সভার বিস্তৃত বিবরণ বাহির হইয়াছিল।
খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ নানা সৎকাৰ্য-ব্যপদেশে পাদ্রীগণ যে ভিতরে ভিতরে খৃষ্টধৰ্ম্ম প্রচার করিয়া থাকেন তাহা অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই অবগত আছেন। কোথায় ও বিনামূল্যে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করিয়া, কোথায়ও দুঃস্থ ব্যক্তিগণকে নানা ভাবে সাহায্য ও সহানুভূতি করিয়া নানা মিষ্ট ও সদ্ব্যবহার দ্বারা তাঁহারা তাঁহাদের গুপ্ত উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিয়া থাকেন। ইষ্টার্ণ, বেঙ্গল রেলওয়ের প্রসিদ্ধ জংশন-ষ্টেশন রাণাঘাটে এইরূপ একটি সুন্দর দাতব্য চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল বহুদিন হইতে পাত্রীগণ দ্বারা পরিচালিত হইয়া আসিতেছে। হিন্দু-মুসলমান বহু দরিদ্র ব্যক্তি এই স্থানে বিনামূল্যে চিকিৎসিত হইয়া থাকেন। এই সকল উপকার- প্রাপ্ত, কৃতজ্ঞ, নিরীহ দরিদ্র গ্রামবাসীদিগের নিকট যিশুর দয়ার মহিমা প্রচার করিয়া নানা কৌশলে হিন্দু-মুসলমানকে খৃষ্টানধর্মে দীক্ষিত করা হইত। রাণাঘাটের মুসলমান সমাজ ইহাতে আতঙ্কিত হইয়া মুন্শী সাহেব মরহুম্ ও মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবকে স্থানীয় পাদ্রী দলপতি মরাে সাহেবের সহিত তর্ক-সমরে আহ্বান করেন। পাদ্রী সাহেবও তর্ক করিতে স্বীকৃত হইয়াছিলেন। সহস্র সহস্র হিন্দু- মুসলমান এই তর্ক-সমর দেখিতে সমবেত হইয়াছিল। পাত্রী সাহেরে ডিপেন্সারীতে স্থানাভাব নিবন্ধন নিকটস্থ একটি সুন্দর আম্রকাননে ১৩০৪ সালের ১৪ই মার্চ তারিখে সভার স্থান নির্দেশ করা হয়। পাদ্রী সাহেব মুসলমানদের ঐকান্তিক অগ্রহপূর্ণ আপ্রান সত্ত্বেও ঐ স্থানে যাইতে স্বীকৃত হন নাই। কোনরূপ শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা ছিল না; পুলিশ প্রহরী ঘটনাস্থলে যথেষ্ট উপস্থিত ছিল। তথাপি পাদ্রী সাহেব কেন তথায় উপস্থিত হন নাই, সে কারণ অনুমান করা কঠিন নহে। বহু সহস্র ব্যক্তি এই সভায় উপস্থিত হইয়াছিল। অতঃপর প্রশংসিত বক্তাদ্বয় সাত ঘণ্টা পর্যন্ত ঐ সভায় প্রাণস্পর্শী বক্তৃতা করিয়াছিলেন। এই বক্তৃতা প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা কবি বুলবুলে বাঙ্গালা শান্তিপুর নিবাসী মৌলভী মােজাম্মেল হক মরহুম সাহেব তৎকালীন সুধাকর পত্রিকায় লিখিয়াছিলেন ;- “বড়ই বিস্ময় ও ক্ষোভের বিষয়, যিনি মাঠ-ময়দান অতিক্রম করিয়া কষ্ট সহ্য করতঃ দূরবর্তী কৃষক-পল্লীতে যাইয়া খৃষ্টপ্রেম বিতরণ করিতে পারেন, তাহার এই স্থানে গৃহের সম্মুখে আসা হইল না।•••সভার চতুর্দিকে বহু পুলিশ প্রহরী এবং বহু হিন্দু ভদ্রলােকের সমাবেশ। পুরােভাগে কতিপয় পুলিশের উচ্চকৰ্মচারী আসীন। সভার পূর্ব প্রান্তে পশ্চিমাভিমুখী হইয়া বঙ্গবিখ্যাত ইসলাম-প্রচারক বাগ্মীপ্রবর মুর্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব ও তেজস্বী বক্তা মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন পাঠকরত্ন সাহেব উচ্চাসনে সমাসীন। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের পরিচয় অনেকেই জানেন ; এইজন্য মুশী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব সম্বন্ধে এই স্থানে কিছু বলা আবশ্যক। প্রথমে মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব হামদ্ ও না’য়াত অন্তে বক্তৃতা করেন। ইহার তেজপূর্ণ হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা অতীব প্রশংসনীয় । শ্রবণে বিবিধ ভাবে হৃদয় উচ্ছসিত হইয়া উঠে। ইনি অনর্গল তিন ঘণ্টা বক্তৃতা করার পর মুসলমান সমাজের প্রবীণ বক্তা মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেৰ গাত্রোখান করিলেন। ইহার যুক্তিপূর্ণ মধুর বক্তৃতায় শ্রোতৃবর্গ অতীব বিমােহিত হইয়াছিল। তাহারা কখনাে বিস্মিত, ভীত, চমকিত, কখনাে বা উল্লাসে স্ফীত হইয়া উঠিতেছিল।•••ইসলামের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন এবং বাধ্য হইয়া খৃষ্টীয় ধর্মের অসারতা প্রদর্শন ও তৎসহ মুসলমান সমাজের উন্নতি বিষয়ক বক্তৃতায় ৩৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়। পরে মােনাজাত করিয়া সভা ভঙ্গ হয়।” আমি যতদূর জানি, রাণাঘাটের উক্ত খৃষ্টান ডিপেনসারী ও হাসপাতাল এখনাে বিদ্যমান আছে।
কৰ্ম্মবীর মূশী মেহেরুল্লা-
*,
};
কবি মোজাম্মেল হক
No text on this page.
খৃষ্টান ধৰ্ম্মের সহিত সংঘর্ষ মুন্শী সাহেব মরহুমের সহিত পাত্রীগণের প্রকাশ্য সংঘর্ষের আর কোন লিখিত বিবরণ প্রাপ্ত হই নাই। নানা স্থানে তাহার হস্তে পাদ্রীগণের শােচনীয় পরাজয়-কাহিনী মধ্যে মধ্যে সংবাদপত্রে বিঘােষিত হইতেছিল। এতদ্ব্যতীত তাঁহার “রদে খৃষ্টান,” “খৃষ্টানধৰ্ম্মের অসারতা “খৃষ্টান-মুসলমানে তর্কযুদ্ধ’ নামক পুস্তকগুলির অকাট্য যুক্তিতর্কের সম্মুখে পাত্রীগণ আর মাথা উচু করিতে সাহস পান নাই। সর্বত্রই তাহারা তাহাকে এড়াইয়া চলিয়াছেন এবং নিরাপদ দূরত্বে (Safe distance) থাকিয়া নিরীহ গ্রামবাসিগণের মধ্যে ত্রিত্ববাদের মহিমা প্রচার করতঃ নিজেদের চাকুরী ও ঠাট বজায় রাখিতে চেষ্টা করিয়াছেন। যশােহরের অন্তর্গত ঝিনাইদহ নামক মহকুমায় পাদ্রীগণ একটি খৃষ্টান-মিশন সংস্থাপিত করেন। সেই স্থানের মুসলমানগণের আহ্বানে মুন্শী সাহেব ঝিনাইদহে উপস্থিত হইয়া সভা করিয়া পাত্রীদের উদ্দেশ্য পণ্ড, করিয়া দেন। ঐ সমরে যশােহরের পল্লী-অঞ্চলে খৃষ্টান-প্রচারকগণ এতই বাড়াবাড়ি করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন যে, বহু মহিলা প্রচারিকা পর্যন্ত সরল গ্রামবাসিগণের অন্তঃপুরে ঢুকিয়া কুসংস্কারান্ধ মুখ স্ত্রীলােকগণকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করিতে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু যেখানেই তাদের অত্যন্ত প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হইত মুন্শী সাহেব দেইস্থানেই উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে প্রতিহত করিতেন। এইরূপে পাদ্রীদের সহ চেষ্টা সত্বেও এই অসাধারণ শক্তিশালী বিজ্ঞ ও সতর্ক প্রহরীর কল্যাণে ইসলামের অঙ্গে তেমন কোনই আঘাত লাগিতে পারে নাই। কলিকাতার বিভিন্ন স্কোয়ারে বিশেষতঃ ওয়েলিংটন স্কোয়ারে নিয়মিতভাবে প্রচার করা তখনকার পাদ্রীদের একটা প্রথা ছিল। এই স্থানকে মুসলমানগণ চলিত কথায় গােলতালাব বলিয়া থাকেন। পাদ্রীদের এইরূপ কাৰ্য্যের বিষয় অবগত হইয়া মুন্শী সাহেব মরহুম মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবের সহিত ৩৮ কৰ্ম্মবার মুন্শী মেহেরুল্লা কিছুদিন কলিকাতায় মুন্শী শেখ রেয়জদ্দীন সাহেবের বাটীতে থাকিয়া উক্ত স্কোয়ারে পাদ্রীদের পাল্টায় বক্তৃতা করিতেন। এইরূপে পাদ্রীদের দুশ্চেষ্টা অনেকটা বিফল হইয়াছিল, তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। ১৩০৫ সালের শেষভাগে নােয়াখালীর পাদ্রী সাহেবের তথাকার মুসলমানগণের নিকট কতকগুলি প্রশ্ন করেন। সহস্র সহস্র আ’লে, মৌলভী মৌলানা অধ্যুষিত নােয়াখালীর মুসলমানগণ নিরুত্তর হইয়া প্রশ্নগুলি মুর্শী সাহেবের নিকট পাঠাইয়া দেন। মুন্শী সাহেব মুন্শী জমিরুদ্দীন সাহেবকে সঙ্গে লইয়া উহার উত্তর লিখিয়া প্রেরণ করেন। এই উত্তর পাইয়া পাদ্রীগণ উচ্চবাচ্য করেন নাই। নােয়াখালীর মুনশী আব্দুল জব্বার সাহেব পাদ্রীদের প্রশ্ন ও তৎসমুদয়ের উত্তর জওয়াবােন্নসার নামক ক্ষুদ্র পুস্তিকায় প্রকাশিত করেন। ঐ পুকখানি মুন্শী শেখ জমিদ্দীন সাহেবের নিকট এখনও পাওয়া যায়। অতঃপর মুসলমানগণ কর্তৃক সাদরে নিমন্ত্রিত হইয়া মুন্শী সাহেব মরুম মুনশী শেথ জমিরুদ্দীন সাহেবের সহিত নােয়াখালী অঞ্চলে প্রচারে গমন করেন। তথায় নানাস্থলে বহু বক্তৃতা-সভার অধিবেশন হইয়াছিল। এই স্থানে ইহারা কিছুদিন স্থানীয় ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট মৌলভী আব্দুল আজিজ সাহেবের বাসায় অবস্থিতি করিতেন। ১লা ফান রবিবারে ঈদের দিন ঈদের মাঠে যে বিরাট সভার অধিবেশন হইয়াছিল, তাহাতে স্থানীয় ডিষ্ট্ৰীক্ট জজ, মিষ্টার সৈয়দ নূরল হােদা B. A. L. L. B. Bar-at- Law সাহেব উপস্থিত ছিলেন। ৩রা ফাল্গুন তারিখে রাজকুমার-জুবিলী স্কুলে এবং ৫ই ফাল্গুন তারিখে নােয়াখালীর টাউন হলে স্থানীয় যাবতীয় সম্রান্ত হিন্দু-মুসলমানের সমবায়ে বিরাট সভার অধিবেন হইয়াছিল। প্রথমােক্ত সভায় খানবাহাদুর মৌলভী বজলুর রহিম বি, এল এবং পরবর্তী সভায় স্থানীয় ডিষ্ট্ৰীক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ কাগিল সাহেব
খৃষ্টান ধর্মের সহিত সংঘর্ষ
সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। এই শেষােক্ত সভায় মৌলানা হাফেজ
আহমদ মহুম সাহেবের স্মৃতি রক্ষোণােদ্দেশ্যে আহমদিয়া মাদ্রাসার ভিত্তি
স্থাপিত হয়। উহা পরে একটী উচ্চ শ্রেণীর ম দ্রাসায় পরিণত হইয়াছে।
অতঃপর মুন্শী সাহেবদ্বয় নােয়াখালী অঞ্চলে নানা স্থানে বহু সভা সমিতি
করিয়াছিলেন। জনাব মুন্শী সাহেবের নোয়াখালী প্রচার সম্বন্ধে তথাকার
কোন কবি আখলাকে আহমদিয়া নামক কেতাবে পুথির ছন্দে ৫৫
পৃষ্ঠায় যাহা লিখিয়াছিলেন, পাঠকগণের কৌতূহল নিবারণার্থে তাহার
কয়েক পংক্তি এখানে উদ্ধৃত হইল।
;
মুন্শী মেহেরুল্লা নাম যশাের মােকা,
জাহান ভরিয়া যার আছে খোশ নাম।
আবেদ জাহেদ * তিনি বড় গুণাধার,
হেদায়েতের হাদী জানাে দীনের হাতিয়ার।
মুলুকে মুল্লুকে ফেরে হেদায়েত, লাগিয়া ;
হিন্দু-খৃষ্টান কত লােক ওয়াজ শুনিয়া,
মুসলমান হইল সবে কলমা পড়িয়া,
অার তাদের দীন দিল যে ছাড়িয়া।
তার সাথে আর এক ছিল নেক্কার
মুর্শী শেখ জমিরুদ্দীন গুণের ভাণ্ডার।
সে দোনাে জাহেদ মর্দ ফজলে খােদার,
তের শত পাঁচ সাল ছিল বাঙ্গালার--
সেই সালের রজানের ঈদের সময়েতে
এসেছিল নােয়াখালি সহর বিচেতে।
আবেদ=এবাদতকারী, সাধক।
জাহেদ= ধর্মসংগ্রামকারী
৪০
কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা
পহেলা ওয়াজ কৈল জুবিলি ইস্কুলে,
শুনিল তামাম লােক আনন্দিত দেলে।
দোসরা ওয়াজ কৈল টাউন হলেতে;
সেদিনের বাত এবে শুন সকলেতে,
জজ, কালেক্টর আর যতেক হাকিম
মুন্শী মৌলভী আর যতেক আলিম
বড় বড় হিন্দু আর যতেক খৃষ্টান,
আসিয়া তামাম লােক ভরিল সেখান।
সে দোনাে জাহেদ মর্দ হুশিয়ার হইয়া
ওয়াজ করিল শুরু এলাহী ভাবিয়া।
এছাই ওয়াজ কৈল কি কব বয়ান,
হিন্দু মুসলমান শুনি কাঁদিয়া হয়রান।
এই সময়কার “মিহির ও সুধাকর পত্রিকায় মুনশী সাহেবদ্বয়ের
নােয়াখালীর প্রচার-সংবাদ বিস্তৃতরূপে প্রকাশিত হইয়াছিল।
অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই অবগত আছেন যে ইস্লামের প্রতি খৃষ্টান ধর্মের
জগৎব্যাপী আক্রমণ এখনাে পূর্ণবেগে প্রতিনিয়ত চলিতেছে। এদেশে
এই আক্রমণ প্রথম প্রথম অতি উগ্র ভাবেই আরম্ভ হইয়াছিল। সেভাবে
চলিতে থাকিলে তাহার ফলে অশিক্ষিত, দরিদ্র মুসলমান সমাজের অবস্থা
যে কিরূপ হইত, তাহা ভাবিতেও ভয় হয় এদেশে মুনশী মােহাম্মদ
মেহেরুল্লা সাহেবই এই আক্রমণের বেগ পূর্ণরূপে প্রতিহত করিয়া-
ছিলেন। জাতির সেই বীর-সেনাপতির নেতৃত্বে অনেকেই বুকে বল
পাইয়াছিলেন, যুদ্ধের উপকরণ পাইয়াছিলেন। সেই যুদ্ধ মন্থরগতিতে,
অথচ অধিকতর ব্যাপকভাবে এখনাে চলিতেছে—শুধু বক্তৃতায় নহে,
প্রধানতঃ সাহিত্যের মধ্য দিয়া। পাদ্রীগণ আগের মত এখনাে হাটে-
খষ্টান ধৰ্ম্মের সহিত সংঘর্ষ ৪১ ঘাটে যেখানে সেখানে ইলামের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করিলেও তাহার মোকাবেলায় মুসলমানদের পক্ষ হইতে বক্তৃতার কথা বড় একটা শুনিতে পাওয়া যায় না। বক্তৃতা ব্যতীত নানা সাময়িক পত্রিকায় এবং পুস্তক- পুস্তিকায় খৃষ্টান পাদ্রীগণ ইসলামের কুৎসা এবং খৃষ্টান ধর্মের জয় ঘােষণা করিতেছেন। কোরান শরিফের তফসির প্রকাশ করিয়া নানা অয়াতের কুট ব্যাখ্যা দ্বারা মুসলমান সমাজকে ধােকা দিতেছেন। কোটী কোটী টাকা খৃষ্টানধৰ্ম্মের প্রচারের জন্য ব্যয় করিতেছেন। নবদীক্ষিত খৃষ্টান- গণের সম্মুখে সহস্র প্রলােভন উন্মুক্ত রাখিয়াছেন। এই সমস্ত আক্রমণ প্রতিরােধ করিবার জন্য আমাদের সমাজে লােকের একান্ত অভাব। পাদ্রীদের পুস্তক ও লিখন সমূহের উত্তরের জঙ্গ আমাদের মধ্যেও যথেষ্ট সংখ্যক পুস্তক ও সামরিক পত্রিকার প্রয়ােজন। কিন্তু তাহা কোথায়? কে তাহা করিবে ? সকলেই স্বকীয় স্বার্থে আবদ্ধ এবং তাহা স্বাভাবিকও বটে। এই সমস্ত বিরাট কাৰ্য ব্যক্তিগতভাবে কর কাহারাে পক্ষে সম্ভবপর নহে। আঞ্জামানে ওলামায়ে বাঙ্গালা বাচিয়া থাকিলে তাহার নিকট এই কার্যের দাবী করা যাইত এবং উহ এই কাৰ্য্যে আত্মনিয়ােগও করিয়াছিল। একান্ত দুঃখের বিষয়, উক্ত অঞ্জামানের তত্ত্বাবধানে বহুদিন পর্যন্ত ইসলাম-মিশন সুপরিচালিত হয়। আজ এই অতি প্রয়ােজনের দিনে উহা সময়-সাগরে বিলীন হইয়া গিয়াছে ! আঞ্জামানে ওয়ায়েজিন মুমূর্ষ অবস্থায় বাঁচিয়া আছে সত্য, কিন্তু ইসলাম-মিশন পরিচালনার দায়িত্ব লইতে তাহার ইচ্ছা বা ক্ষমতা নাই। যে সমস্ত আলেম, পীর বা খলিফা সাহেবান দেশে দেশে ইল্লাম প্রচার করিতেছেন, সত্য কথা বলিতে গেলে, তাঁহাদের অধিকাংশই ইল্লাম প্রচারের নামে নিজেদের অর্থোপার্জনের ব্যবসায় চালাইতেছেন। সবদ্ধভাবে সুশৃঙ্খলার সহিত একটি মিশন পরিচালনার অবশ্যকত।
৪২ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা • তাহারা বুঝেন না। গভীর আক্ষেপের বিষয়, ইহাদের মধ্যে যাহারা খুব নামজাদা তাহাদের অনেকে এইরূপ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধ করিয়া আসিতেছেন; কারণ, হয়ত তাঁহাদের ধারণা, ইহাতে তাহাদের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও ব্যবসায়ের (৫) ক্ষতি হইবার আশঙ্কা আছে। * বর্তমান যুগে কালি কলমের এবং প্রচারের যুদ্ধই হইতেছে প্রকৃত জেহাদ। এই জেহাদে পশ্চাৎপদ হইলে এদেশে ইস্পাম রক্ষা পাইবে । বিধর্মীর সাহিত্যের বিষাক্ত প্রভাবে ইলাম ও মুসলমান জাতির (খােদা না করুন) এদেশে অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়িবে। কিন্তু উল্লেখযােগ্য কোন ব্যক্তিই এদিকে তেমন মনােযােগ দিতেছেন বা দিতে পারিতেছেন না। আমি যতদূর জানি, জনাব মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবই বর্তমানে খৃষ্টান পাদ্রীগণের প্রচারিত ইলাবে বিরুদ্ধে লিখিত পুস্তকগুলির প্রতিবাদ করিতে চেষ্টা করিতে এ সম্বন্ধে তিনি যােগ্য লোক, সন্দেহ নাই। সমাজের সকলেরই এজন্য তাঁহাকে উৎসাহ দেওয়া ও সাহায্য করা উচিত। অন্য যােগ্য- ব্যক্তি যাহারা আছেন, তঁাহাদেরও এই শ্রেণীর জাতীয় জেহাদে অবিলম্বে ঝাপাইয়া পড়া একান্ত কর্তব্য। সর্বাপেক্ষা কর্তব্য হইতেছে, আবার ইলাম মিশন কায়েম করিয়া ইস্লামের স্বপক্ষে সংগ্রাম পরিচালনা ছেন। প্রত্যেক বৎসর ২১শে, ২২শে ও ২৩শে ফান তারিখে ফুরফুরা জনাব হজরত হাজী মৌলানা শাহ সুফী মােহাম্মদ আবুবকর সিদ্দীকী পীর সাহেবের বাটীতে বাঙ্গালার প্রায় সমস্ত জিলার সহস্র সহস্র ধর্মপরায়ণ মুসলমানের সমবায়ে বিরাট আড়ম্বরের সহিত ইসালে সওয়াব মহ,ফেলের অধিবেশন হয়। জনাব পীর সাহেবের নেতৃত্বে উক্ত অধিবেশনে সমবেত আলেম, বক্তা ও খলিফামণ্ডলী চেষ্টা করিলে অতি সহজেই এইরূপ একটি মিশন প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত করিতে পারেন। কিন্তু এই দীন লেখক এবং অন্য অনেকে এজন্য বিশেষ চেষ্টা করা সত্ত্বেও এবং সংবাদপত্রে বৎসর বৎসর আন্দোলন সত্ত্বেও এ পর্যন্ত এইরূপ মিশন প্রতিষ্ঠার কোন চেষ্টাই হয় নাই। এই জাতীয় কর্তব্যের বা ফরূজে কেফায়ার দিকে বিনীত ভাবে সমাজের শক্তিশালী আলেম ও নেতৃবর্গের আশুমনােযােগ আকৰ্ষণ করিতেছি।
খৃষ্টান ধম্মের সাহত সংঘর্ষ ৪৩ করা। ইসলামের পবিত্র অঙ্গে বিধর্মীর নির্মম আক্রমণ। মুসলমান তাহা প্রতিহত করিতে সম্পূর্ণ উদাসীন। আমাদের এই শােচনীয় কর্তব্যক্ৰটীর কি জবাবদিহি হাসরের দিনে খােদার দরগায় করিবার আছে, তাহা সকলেরই ভাবিয়া দেখা কর্তব্য। অকূল-সমুদ্রে নৌকা ডুবিলে নৌকার আরোহীও ডুবিয়া যায়। এদেশে ইলাম না পাকিলে মুসলমানেরও অস্তিত্ব থাকিবে না। ভবিষ্যতের এই নির্মম- চিত্র কল্পনাচক্ষে দেখিলে আতঙ্কে অভিভূত হইতে হয়। বিপক্ষ প্রকাশ্য- ভাবে সমর ঘােষণা করিয়া ইলমের বিলােপ সাধনে অগ্রসর, আর ইসলামের সেবক মুসলমান নীরব নিস্তব্ধ ! মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব ইস্লামের স্বপক্ষে দাঁড়াইয়া খৃষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধে যে নিরস্ত্র জেহাদ পরিচালনা করিয়াছিলেন, তাঁহার লােকান্তরের পর সেই জেহাদের নেতৃত্ব করিবার লােক আমরা খুঁজিয়া পাইতেছি না। ইল্লামের চির পবিত্র গৌরবময় উন্নত পতাকা আজ ধূলি-বিলুষ্ঠিত! কে অছি সত্যিকার মুসলমান, এই অর্ধচন্দ্রলাঞ্ছিত বিজয়-কেতন আজ আবার উর্জে তুলিয়া ধর। পর- পদদলিত, দারিদ্র-নিষ্পেষিত, শত অভাবজর্জরিত মুসলিমের ভাঙ্গাবুকে আবার নূতন সাহস, নূতন তেজ, নূতন উন্মাদনা ফিরিয়া আসুক। নূতন নূরে তাহার সমস্ত মােহান্ধকার অপসারিত হউক। আবার সে বিশ্বের বুকে বিজয় যাত্রায় বাহির হউক ! আবার তাহার জ্ঞান-দীপ্তিতে, শক্তি সামর্থ্যে জগতের চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়া যাউক।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা নানা গুণে, নানা দিক দিয়া মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা বৃহুম স্মরণীয় হইয়া গিয়াছেন। ইসলাম ও খৃষ্টান-শাস্ত্রে হার অসাধারণ গভীর জ্ঞান ছিল। তাঁহার সমকক্ষ তার্কিক তখন এদেশে মিলিত না! প্রত্যুৎপন্ন- মতিত্বে তাঁহার তুলনা দেখা যায় নাই। তিনি একজন অদ্বিতীয় সমাজ-সংস্কারক বলিয়া মুসলমান সমাজে অভিনন্দিত। তঁাহার ব্যক্তিত্ব অতুলনীয় ছিল। এইরূপ নানাবিধ গুণের জন্য সর্বত্র বিপুলভাবে সমাদৃত হইলেও{বক্তা রূপে তিনিসর্বাপেক্ষা অধিক বিখ্যাত হইয়াছেন। বলিতে গেলে, এদেশে মুসলমান সমাজে সভাসমিতি এবং বক্তৃতার প্রথা তিনিই প্রবর্তিত করিয়াছেন তঁাহার সমকক্ষ বক্তা মােসলেম-বঙ্গে এ- পর্যন্ত কেহই আবির্ভূত হন নাই। তাহার সমকালে বা তাহার পরে যাহারা মুসলমান সমাজে বক্তারূপে খ্যাতি অর্জন করিয়াছেন, তাহারা প্রায় সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে তাঁহাদ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া- ছেন। (তাহার বক্তৃতা যেমন মর্মস্পর্শী, চিত্তেম্মািদক, তেমনি সারগর্ভ ছিল। যে একদিন শুনিয়াছে সে তাহা জীবনে কখনই বিস্মৃত হইতে পারে নাই। মুনশী সাহেবের হস্তে বাঙ্গালার বহু বিধৰ্ম্মী ইস্পাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিও বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৪৫ * * 4 ৭ ৩% । এrs, ছিলেন। দুঃখের বিষয়, তাঁহাদের বিবরণ সংগ্রহ করিবার সুবিধা আমার হয় নাই। তাহার বক্তৃতা শুনিয়া বহু লােক পাপকাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া ধর্মপথের পথিক হইয়াছে। প্রকৃত হাদীর যে সমস্ত গুণ থাকা প্রয়ােজন তঁাহার মধ্যে তৎসমুদয় পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। তিনি প্রাণের ভিতর হইতে কথা বলিতেন, তাই বিদ্যুৎ-শক্তির ন্যায় তাহা অন্যের প্রাণ স্পর্শ করিত। তাহার বক্তৃতায় যেন চারিদিকে জীবন-ধারা ছড়াইয়া পড়ি। যে তাহা শুনিত সেই নৃতন শক্তিতে, নৃতন সাধনায়, নূতন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হইয়া উঠিত। মুন্শী সাহেবের দুইটি সভায় যােগদানের সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল। আমি তখন পায়গ্রাম কসবায় থাকিয়া স্থানীয় মাইনর স্কুলে পড়িতাম। একদিন সংবাদ পাওয়া গেল, খুলনার নিকটবর্তী দৌলতপুর নামক প্রসিদ্ধ স্থানে মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের একটি সভা হইবে। চারিদিকে নূতন উদ্দীপনা, নূতন উৎসাহের স্রোত বহিয়া চলিল। আমরা ছাত্র ও মুরব্বী দল মিলিয়া ৭৮ জন সভা দেখিতে চলিলাম। স্কুলের সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণে সভার অধিবেশন হইল। সে একটা বন্ধের দিন। খুলনা টাউন হইতে হিন্দু-মুসলমান নিৰ্বিশেষে দলে দলে শিক্ষিত ভদ্রলােক আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মুন্শী মেহেরুল্লার নাম শুনে নাই তখনকার দিনে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত হিন্দু-মুসলমান এমন লোক বড় একটা ছিল না। খুব কম শিক্ষিত লােকই উক্ত সভায় যােগদান করেন নাই। সিন্দ সাহিত্যিক খানবাহাদুর মৌলভী কাজী এমদাদুল হক বি. এ. বি টি মহুম সাহেব ঐ সভায় যােগদান করিয়া একটি প্রবন্ধ পাঠ করিয়াছিলেন। দৌলতপুর খুলনা টাউনের * উক্ত প্রবন্ধের নাম ঠিক স্মরণ নাই। অধুনালুপ্ত প্রসিদ্ধ নবনূর নামক মাসিক পত্রিকায় উহা প্রকাশিত হইয়াছিল।
৪৬ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা অন্য কাহাকেও চিনিবার সুবিধা আমার হয় নাই। ঐ সভায় ৪৫ ঘণ্টা কাল পর্যন্ত জনাব মুন্শী সাহেব মম যে বক্তৃতা দিয়াছিলেন, তাহাতে শ্রোতৃমণ্ডলী মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় হইয়া বক্তার অজস্র প্রশংসা করিয়া- ছিলেন। বলিতে কি, সেই বক্তৃতার মধ্যে যে মাদকতা ছিল, কয়দিন পর্যন্ত আমি তাহার মােহ কাটাইয়া উঠিতে পারি নাই। সেই বক্তৃতা-ঝঙ্কার যেন শয়নে স্বপনে অামার মনের মধ্যে তন্ময়তা ঢালিয়া দিত। এই সভার কয়েকদিন পরে ফুলতলা থানার অন্তর্গত ছাতিয়ানী নামক গ্রামে মুন্শী সাহেবের একটি সভায় আমার উপস্থিত হইবার সৌভাগ্য হয়। তাহার এই সভায় বক্তৃতাও দৌলতপুর সভার বক্তৃতার ন্যায় সজনমনােহর হইয়াছিল। মরহুম মুন্শী সাহেবের এই দুইটি বক্তৃতার প্রত্যেকটিরই একএকটি বিশেষত্ব ছিল। শেষের বক্তৃতায় প্রথম বক্তৃতার পুনরুক্তি মােটেই হয় নাই। মুন্শী সাহেবের বক্তৃতায় যে একটি অসাধারণ বিশেষত্ব ছিল, প্রাণ-মাতানাে তন্ময়তা ছিল তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। সেই অনন্ত দুর্লভ অঙ্গভঙ্গির তুলনা হয় না; তাহাতেই সকলে মুগ্ধ হইয়া যাইত। (বক্তৃতায় মধ্যে মধ্যে তিনি মধুর চাটনীর ন্যায় অতি মধুর সুরে ফাসী বয়াত আবৃত্তি করিয়া তাহার অর্থ সকলকে বুঝাইয়া দিতেন। সেই সুর-লহরীতে যেন চারিদিকে অমিয়ধারা ঝরিয়া পড়িত। তাহার বক্তৃতার ভাষাও বন্ধস্থলে অনুপ্রাস-অলঙ্কারপূর্ণ ছিল। মুহূর্তে মুহূর্তে তিনি তাহার শ্রোতৃমণ্ডলীকে হাসাইতেন, কঁাদাইতেন। সভাস্থ সহস্র সহস্র ব্যক্তির মন লইয়া তিনি যেন ছিনিমিনি খেলিতেন। তাহার বক্তৃতার সময় লােকে নিখিল স’সার ভুলিয়া যাইত ! সমস্ত ভুলিয়া গিয়া তন্ময় হইয়া যেন তঁাহার বক্তৃতার মধ্যে একেবারে ডুবিয়া থাকিত। সুদক্ষ যাদুকরের ন্যায় তিনি যেন সকলের হৃদয় একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া t বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৪৭ রাখিতেন। প্রায়ই দেখা যায়, জনসাধারণ সভাসমিতিতে গিয়া ভাল ওয়াজ নছিহত, লেকচার বক্তৃতা শুনিয়া মুগ্ধ হয় এবং সভা হইতে আসিবার কালে বক্তাগণের বক্তৃতার সমালোচনা করিয়াই নিজেদের কর্তব্য শেষ করে। এই সমস্ত বক্তৃতার কোন স্থায়ী প্রভাব তাহাদের মনের ভিতর কাৰ্যকরী হয় না। কিন্তু মরহুম মুন্শী সাহেবের বক্তৃতা লােকের মনের ভিতর প্রবেশ করিয়া “ভিতরের মানুষটিকে একেবারে স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত করিয়া দিত। তাই দেখা গিয়াছে, তঁাহার বক্তৃতায় সহস্র সহস্র ব্যক্তি হেদায়েত * হইয়াছে ! পাপকাৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া পুণ্যের পথে অগ্রসর হইয়াছে। অনেকে তওবা করিয়া নামাজ রােজা আরম্ভ করিয়াছে, অনেকে সুদ ও নানাবিধ নেশা ছাড়িয়াছে ; বহু উচ্ছঙ্খল নরপিশাচ নেড়ার ফকির তাহার নিকট তওবা করিয়া শুদ্ধাচারী খাটা মুসলমান হইয়াছে। তাহার বক্তৃতা শুনিয়া অনেকে বিধবার পুনর্বিবাহ দিতে একটুও দ্বিধাবােধ করেন নাই। ফঁকি। কৌলিণ্য-মৰ্যাদার অসার মোহ একমুহূর্তে ঝাড়িয়া ফেলিয়াছেন। মুন্শী সাহেব মহুমের বক্তৃতায় বহু লােক আলস্য ও জড়তার বন্ধন কাটাইয়া উঠিয়া শিল্প, কৃষি ইত্যাদি নানা কার্সে আত্মনিয়ােগ করিয়াছে। যাহারা তঁাহার বক্তৃতা শুনিয়াছে, চিরঞ্জীবনের জন্য তাহারা আর তাহা ভুলিতে পারে নাই। তাই অজিও এই সুদীর্ঘ দুই যুগ পরে সমগ্র বাঙ্গালার লক্ষ লক্ষ ব্যক্তি মুশী সাহেবের নামে নূতন প্রেরণা লাভ করিয়া থাকে। একান্ত আপনার জনের মত, প্রিয়তম পরিজনের মত হার পবিত্র স্মৃতি হৃদয়ের নিভৃত নিকেতনে পরম যত্নে রক্ষা করিয়া মুনশী মােহাম্মদ মেহেরুল্লার নাম তখন সমগ্র বাঙ্গালায় এমন একটি ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী সুপথ প্রাপ্ত।
৪৮ কর্মবীর মুণী মেহেরুল্লা মােহে। সৃষ্টি করিয়াছিল যে, এপর্যন্ত এদেশে তাহার তুলনা দেখ যায় নাই। যশােহরের মুন্শী সাহেবের নামে নিখিল-বঙ্গ-মােসলেমের প্রতি স্তরে যেন সাড়া পড়িয়া যাইত। জ্ঞানী ইতর-ভদ্র নির্বিশেষে সকলেই তাহার নামে মস্তক অবনত করিত। মুন্শী সাহেবের নামই তাঁহার বক্তৃতাকে সমধিক মােহময় করিয়া তুলিত। যাহারা বুঝিত তাহারাও মুগ্ধ হইত, যাহারা না বুঝিত তাহারাও মুগ্ধ হইত। এইরূপ একটি গল্প প্রচলিত আছে যে, উত্তরবঙ্গের জনৈক বৃদ্ধ একদিন এক সভায় বসিয়া ওয়াজ শুনিতে শুনিতে বিরক্ত হইয়া বলিল, “এ লােকটা কী ছাই কইছে ? যশােরের মুর্শী ছায়েব কই? তঁার ওয়াজই ত শুনতে এলাম। পার্শ্বের লােকের নিকট যখন সে জানিয়ে পারিল, যিনি বক্তৃতা করিতেছেন, তিনিই যশােরের মুনশী মেহেরুল্লা, তখন সে গভীর মনােযােগের সহিত তাঁহার বক্তৃতা শুনিতে লাগিল এবং উচ্ছসিতকণ্ঠে তাহার প্রশংসাকীৰ্ত্তন করিতে লাগিল। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি না থাকিলে কিছুই শেখা যায় না। শেখা যায় না। এমন কি, ভক্তি না থাকিলে ভাল ঔষধেও রােগীর আশানুরূপ উপকার হয় না। পক্ষান্তরে একথা সর্বজনবিদিত যে, শুধু ভক্তিতেই অনেক বড় বড় ব্যাধি আরােগ্য হইয়া থাকে। ভক্তিতে মুক্তি, এ কথা বড়ই সত্য। মুন্শী সাহেব সমস্ত জাতির কতখানি ভক্তি-শ্রদ্ধা লাভ করিয়াছিলেন, তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। লােকে তঁাহাকে এত খানি ভক্তি করিত বলিয়াই তাহার কথায় এত কাজ হইত। দেশের আপামর সাধারণ সকলের নিকট হইতে এইরূপ ভক্তি-শ্রদ্ধা আকর্ষণ করা সহজ কথা নহে। কতখানি ব্যক্তিত্ব থাকিলে, হৃদয়ের কতখানি মহত্ত্ব থাকিলে এইভাবে একটা দেশের ছোট বড়, পণ্ডিত মুখ সকলের হৃদয় জয় করা যায়, তাহা চিন্তা করিলেও বিস্ময়ে অভিভূত হইতে হয়।
বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৪৯ আজকাল আমরা দেখিতেছি ওয়ায়েজ এবং বক্তাগণ সাধারণত ওয়াজ-বক্তৃতাকে একটি ব্যবসায়রূপে গণ্য করেন। তাহারা প্রথমে বিবেচনা করিয়া দেখেন কোন্ অঞ্চলের লােকের অবস্থা এবার স্বচ্ছল ; তারপর সেই দিকেই তাঁহারা হেদায়েতের অর্থাৎ অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে বাহির হন। অনেকেরই বাঁধা রেট আছে, তাহার কমে কোথাও যান –আর সে রেটও নিতান্ত কম নহে; অনেকের বারবরদারীও যথেষ্ট। তারপর এই দেনাপাওনা লইয়া অনেক সময় নানা কেলেঙ্কারী কাণ্ড ঘটে। সওয়াবের কাজ করিলে পরকালে বেহেশতে বড় বড় বালাখানা পাওয়া যাইবে, এ কথা কেতাবে লেখা আছে। এই সব ওয়ায়েজও বক্তাগণ কিন্তু ইহকালেই তাহার নমুনা দেখাইয়া সওয়াবের বকতে বাটীতে বড় বড় বালাখানা তুলিতেছেন-অগাধ সম্পত্তি সঞ্চয় করিতেছেন। এরূপ দৃষ্টান্ত আজকাল যথেষ্ট পাওয়া যায়। জাতির জাতির বিপদের দিনে ইহাদিগকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। * সমাজের প্রয়ােজনে ইহাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয়িত হয় না, সমাজ কিরূপে সঙ্ঘবদ্ধ হইয়া শিক্ষা ও সৰ্ব্ববিধ উন্নতির পথে অগ্রসর হইবে, বর্তমান প্রতিযােগিতা-সংগ্রামে টিকিয়া থাকিয়া জগতে প্রতিষ্ঠা অর্জন করিতে পারিবে, সে সমস্ত চিন্তার কোন বালাই ইহাদের নাই। কতকগুলি বাঁধা বুলি শুনাইয়া নজরানা ও বারবরদারী আদায় করিতে পারিলেই ইহাদের কর্তব্য * প্রসিদ্ধ কুলকাটিতে মসজিদের সম্মান রক্ষার জন্য ২• কুড়িজন মুসলমান অম্লানবদনে বীরের ন্যায় জীবন দান করিয়াছিলেন। তাহাদের এই কাৰ্য্য সঙ্গত কি অসঙ্গত হইয়াছিল, সে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু হারা যে কোন সংকীর্ণ স্বার্থপ্রণােদিত হইয়া এই কাজ করেন নাই বরং ইসলামের সম্মান রক্ষার জন্যই স্বেচ্ছায় আত্মবলি দিয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। তৎকালীন মুসলমান সংবাদপত্রসমুহ তাহাদের কাৰ্য্য সমর্থন করিয়াছেন। এই ব্যাপারে বাঙ্গালার কোন বিশিষ্ট আলেম পীর বা খলিফা কিছুমাত্র বিচলিত হন নাই; সেই উৎসর্গীকৃত প্রাণ শহির বলিয়া কখিত নিহত ব্যক্তিগণের প্রতি কেহই কার্যত কোন সহানুভূতি দেখান নাই।
কৰ্ম্মবীর মুশী মেহেরুল্লা শেষ হইল। মুনশী সাহেব মরহুম এই শ্রেণীর বক্তা ছিলেন না। স্বতঃপ্রণােদিত হইয়া স্বেচ্ছায় যে যাহা দিত, তিনি তাহাই খুশী হইয়া লইতেন। এ সম্বন্ধে কোন বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। একজন ভদ্রলােক আমাকে বলিয়াছেন, তিনি মুর্শী সাহেব মরহুমের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাঁহাকে কোন সভায় আহ্বান করিতে হইলে অন্ততঃ কত টাকা নজরানা লাগিতে পারে। ইহাতে মুন্শী সাহেব বিরক্ত হইয়া বলেন, এরূপ কোন বন্দোবস্তই তিনি করেন না। স্বেচ্ছায়, সহজে, সন্তোষের সহিত কেহ কিছু দিলে তিনি:তাহা লয়েন। কিন্তু দিলে কিছুমাত্র অসন্তুষ্ট হন না। * টাকার উদ্দেশ্যে তিনি কোথাও বক্তৃতা করেন নাই। কেহ কিছু না দিতে পারিলে যে তাহাদের সভায় যােগদান করিতেন না বা বিরক্ত হইতেন এরূপ • কেহ বলিতে পারে না। বলা বাহুল্য এরূপ আদর্শ অন্যত্র একান্তই বিরল। * বাঙ্গালার মুসলমান সমাজ এমন অবিবেচক নহে যে, একজন শিক্ষিত উপযুক্ত ভদ্র ব্যক্তিকে কোন সভায়.আহ্বান করিয়া সাধ্যপক্ষে তাঁহাকে রিক্ত হন্তে বিদায় করিবে। অনেকে বলেন—আলেম, হাদী ও বক্তাগণের কোনরূপ নজরানা লওয়াই জায়েজ বা ধৰ্ম্মসঙ্গত নহে। কিন্তু তাহাদের এই উক্তির কোন শাস্ত্রীয় প্রমাণ নাই। আলেম বা হাদীগণ অর্থোপার্জন লক্ষ্য করিয়া হেদায়েত বা ধৰ্ম্মকাৰ্য করিলে তাহা নিশ্চয়ই অবৈধ হইবে। কিন্তু যদি সেরূপ লক্ষ্য তাহাদের না থাকে, তবে কেহ কিছু স্বেচ্ছায় দান করিলে তাহা গ্রহণ করা নিশ্চয়ই বৈধ হইবে। একথা সহজ বিবেকেও অনুমােদন করে। যিনি জনসাধারণকে হেদায়ত করিতে গিয়, বিশেষতঃ এজন্য আহুত হইয়া নিজের সাংসারিক কাৰ্য্য করিতে সুযোগ পাইলেন না তাহার এবং তাহার পরিবার প্রতিপালনের ব্যবস্থা করা সমাজের পক্ষে অবশ্যই কর্তব্য। এ সম্বন্ধে শরিয়তের ব্যবস্থার নীতি এইরূপ—কেহ কোন মসজিদে নিয়মিতভাবে নামাজ পড়িতে বা আজান দিতে নিযুক্ত হইলে, এই কার্যের জন্য তিনি কোনই মজুরি পাইবেন না। কিন্তু যেহেতু এই ব্যাপারে তাঁহাকে সময়মত উক্ত মসজিদে উপস্থিত থাকিতে বাধ্য হইতে হইবে, এই জন্য তিনি নিশ্চয়ই টাকা লইতে পারিবেন। এইরূপ ব্যবস্থা সর্বত্রই প্রযুজ্য।
বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মুন্শী সাহেবের নজরানা সম্বন্ধে কোন নিয়ম না থাকিলেও একথা সহজেই অনুমান করা যায় যে, তঁাহার ন্যায় বিপুল প্রতিভাশালী বঙ্গ- বিখ্যাত বক্তার উপযুক্ত আদর ও কদর বাঙ্গালী মুসলমান করিতে কখনই কুষ্ঠিত হয় নাই। তিনি যদি ইচ্ছা করিতেন, তাহা হইলে অগাধ সম্পত্তি, বিপুল ধনদৌলত সঞ্চয় করিয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু তিনি তাহা করেন নাই। তাহার উপার্জিত অর্থের অধিকাংশই সৎ- কার্যে ব্যয়িত হইত। তঁাহার প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত মাদ্রাসায়ে ক্রামতিয়ার জন্য তিনি নিয়মিতভাবে এই অর্থ ব্যয় করিতেন। হার লক্ষ্য ছিল, ছাত্রগণ জাতীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া যেন শিক্ষাপথে অগ্রসর হয়। তাঁহার বাটিতে বহু ছাত্রের জায়গীর ছিল। তাহা ছাড়া তাঁহার মত দেশবিখ্যাত ব্যক্তির যশােহর টাউনের নিকটস্থ ডিষ্ট্ৰীক্ট বাের্ডের রাস্তার পার্শ্বের বাটীতে অতিথি ও মেহমানের কখনই অভাব হইত না। প্রায় সময়ে ৪৫ জন বা তদধিক লােকও একসঙ্গে দল- আঁধিয়া তাঁহার আতিথ্য গ্রহণ করিত। হার বাটীতে কখনই কোন অতিথির অযত্ন হইত না। এই সমস্ত কারণে তঁাহার তৃণাচ্ছাদিত চালা- গৃহ সমুন্নত অট্টালিকায় পরিণত হয় নাই, কিন্তু সেই খড়ের চালের ভিতর হইতেই যেন বেহেশতের হীরক-রত্ন-খচিত রম্য অট্টালিকার গৌরব-মহিমা ফুটিয়া উঠিত। তিনি দরিদ্র অবস্থায় থাকিলেও তাহার উত্তরাধিকারিগণকে একেবারে নিঃস্ব রাখিয়া যান নাই। প্রকৃত মুসলমানের মত সকল দিক সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া চলা তাঁহার জীবনের খুব বড় একটা বিশেষত্ব ছিল। মুন্শী সাহেব মরহুমের ব্যক্তিত্ব কেমন অসাধারণ ছিল, কেশবপুরে একটি সভায় তাহা নিঃসন্দেহরূপে প্রতিপন্ন হয়। ১৩০৬ সালের ১৫ই অগ্রহায়ণ তারিখ। হানাফী ও মােহাম্মদী, মুসলমান ধর্মাবলম্বী এই দুই কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহস্র সহস্র ব্যক্তি একান্ত কৌতুকাবহ তর্ক-সমর দেখিবার জন্য সমবেত হইয়াছে। উভয় দলের বড় বড় মৌলভী-মৌলানা সাহেবান রাশি রাশি কেতাব ও দলিল-দস্তাবেজ সহ সভা গুঞ্জার করিয়া বসিয়া আছেন।* শুনা যায় এই শ্ৰেণীয় বাহাস বা তর্ক-সমরে কোন্ দল কত মণ বা কত গাড়ি কেতাব হাজির কারিতে পরিয়াছেন, তাহা হিসাব করিয়া আলেমদের বিদ্যার একটা আন্দাজ করা হয়। সুতরাং এই প্রসিদ্ধ বাহাসে কোন পক্ষেরই কেতাবের পরিমাণ কম ছিল না, একথা সহজেই অনুমান করা যায়। দুই দল সভার দুই দিকে উপবিষ্ট। যেন সেকালের কোন এক প্রসিদ্ধ মােগল-পাঠান যুদ্ধ কিঞ্চিৎ রূপান্তরিত এবং অপেক্ষাকৃত অহিংস মূর্তিতে এই তর্ক-মহাসমর-ক্ষেত্রে অতীতের অন্ধকার কক্ষ হইতে পুনরায় সমাগত। এই ভাবের তর্ক-সমরের পরিণাম যে অনেক সময়েই মুখোমুখি হইতে হাতাহাতি, লাঠালাঠিতে পর্যবসিত হয়, শেষকালে মাথা ভাঙ্গা- ভাঙ্গি করিয়া, এমন কি, ইংরাজের আদালতে পৰ্যন্ত শ্রাদ্ধ গড়াইয়া থাকে, তাহা অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রই অবগত আছেন। এই শ্রেণীর বাহাসের সভাগুখি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজের মূখতা ও অতি- গোড়ামীর একান্ত শশাচনীয় অভিব্যক্তি। উভয় সম্প্রদায়ের প্রকৃত জ্ঞানী আলেমগণ ইহা কখনই পসন্দ করেন না। যাহা হউক, উক্ত তর্কসভা রূপ সমর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের আলেমরূপ বীর সেনাপতি- গণ যখন স্ব স্ব দলিল-প্রমাণের অস্ত্রশস্ত্রগুলি শানাইতেছিলেন, যখন আসন্ন ঝটিকাবর্তের পূর্বমুহূর্তের স্তব্ধ প্রকৃতির মা সমগ্র সভাক্ষেত্র * মওলানা মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদী, মৌলভী মােহাম্মদ সানাউল্লা ও কোরান শরীফের অনুবাদক মৌলভী আব্বাস আলী মরহুম ইত্যাদি বিশিষ্ট আলেমগণ এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা নীরব উন্মাদনায় ভরপুর, ঠিক সেই সময় জনাব মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব স্বীয় অসাধারণ ব্যক্তিত্ব লইয়া আসরে অবতীর্ণ হইলেন। তাহার নামে উভয় দলের সহস্র সহস্র ব্যক্তি হার বক্তৃতা শুনিবার জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিল। তিনি অসাধারণ বিচক্ষণতা সহকারে স্বকীয় বিশিষ্ট মধুর ওজস্বিনী ভাষায় এইরূপ তর্ক-বাহাসের অপকারিতা ও অনাবশ্যকতার বিষয় এমনভাবে সকলকে বুঝাইয়া দিলেন যে, মুহূর্ত- মধ্যে সেই পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ-বিষ কলুষিত সভাক্ষেত্র শান্তি ও প্রেম-পবিত্রতার অমিয় প্রবাহে ভাসিয়া গেল। হানাফী ও মােহাম্মদী সকলেই এক নবীর ওম্মত ও এক কোরানের অনুকরণকারী মুসলমান, একথা হৃদয়ঙ্গম করিতে আর কাহারাে বিলম্ব হইল না। মুসলমান সকলেই পরস্পরের ভাই, কোরাণ শরীফের এই অমর উক্তির সম্মান সকলেই রক্ষা করিলেন। উভয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধ-ভাবাপন্ন সমস্ত আলেমই . অবনত মস্তকে মুন্শী সাহেবের মীমাংসা মানিয়া লইয়া একই মহান ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হইলেন। * কৃতথানি ব্যক্তিত্ব এবং শাস্ত্র জ্ঞান থাকিলে এইরূপ বিরুদ্ধ মানসিকতা নিশেৰু বিদ্বেষ-বিষ্ণগ্ধ সহস্র সহস্র ব্যক্তির হৃদয় জয় করা যায়, শাস্ত্রজ্ঞান-গর্বিত পরস্পর বিরুদ্ধ-ভাবাপন্ন দুই দল দুর্ধষ ধৰ্মান্ধ আলেম সম্প্রদায়কে নিজের আয়ত্তের মধ্যে আনিয়া ভ্রাতৃত্বের মধুর বন্ধনে আবদ্ধ করা যায়, তাহা সহজেই অনুমেয়। জনাব মুন্শী সাহেবের ওয়াজ-নসিহত কোরান, হাদিস এবং বিশেষ করিয়া গুলিস্তা, বুস্তা, পশনামা ইত্যাদি শেখ সাদীর গ্রন্থসমূহের উপ- * আলেম-ইসলাম ধৰ্ম্মশান্ত্রে অভিজ্ঞ। সাতক্ষিরার এই প্রসিদ্ধ সভার বিবরণ আমি যেরূপ শুনিয়াছি, মেহের চরিতের বর্ণনায় সহিত তাহার সর্বতােভাবে মিল হয় না। মুলঘটনা কিন্তু একই। মুনশী সাহেবের যুক্তিপূর্ণ মীমাংসা উভয় দল অবনত মস্তকে মানিয়া লইয়াছিলেন।
৫৪ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা দেশাবলীতে পূর্ণ থাকিত। মধ্যে মধ্যে মধুরসুরে শেখ সাদীর বয়াত আবৃত্তি করিয়া তিনি শ্রোতৃবর্গের প্রাণমন বিমােহিত করিতেন। তাহা পূৰ্বেই উল্লেখ করিয়াছি। সেই মধুর সুরে যেন সকলের মন বিগলিত হইয়া যাইত, আকাশ-বাতাস স্তব্ধ হইয়া থাকিত, গভীর ভাবের আবেগে ভাবুক-জন-মন মুগ্ধ ও তন্ময় হইয়া পড়িত। তাহার বক্তৃতার আর একটি বিশেষত্ব ছিল, উপদেশমূলক বহু সুন্দর সুন্দর গল্পের অবতারণা করা। গল্পগুলি বলিবার এমনই ভঙ্গি ছিল যে, শ্রোতৃগণ অবাক-বিস্ময়ে তাহা শ্রবণ করিত; তাহার ভিতরে নিহিত গভীর উপদেশ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিয়া মুগ্ধ হইয়া যাইত। তিনি যতক্ষপ বক্তৃতা করিতেন, ততক্ষণ শ্রোতৃবর্গ যেন বৰ্ত্তমান জগত এবং নিজের সমস্ত অস্তিত্ব ভুলিয়া গিয়া এক নূতন মােহের মধ্যে, এক অপার্থিব স্বপ্ন- রাজ্যের মধ্যে ডুবিয়া থাকিত। মুক্ত বারিধির অবারিত তরঙ্গভঙ্গের ন্যায় হাসিকান্নার সহস্র তরঙ্গ রাশি মুহূর্তে মুহূর্তে শ্রোতৃবর্গকে অভিভূত করিয়া রাখিত। যেমন বৈশাখের জলদ-জালাবৃত অমানিশিথিনীর নিবিড় তিমির-পটলের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুতের বিমল বিভা ঝলকিয়া উঠে, হার অনদুর্লভ অঙ্গভঙ্গিসমন্বিত বক্তৃতাকালেও শ্রোতৃবর্গের হৃদয়-গগনে সেইরূপ যুগপৎ বিষাদ-করুণ ও হাস্যরসের বিমল বিভাস চমক খেলাইতে থাকিত। মুন্শী সাহেব মহুম এস্লামের একনিষ্ঠ সাধক হইলেও কখনই বিধৰ্মী-বিদ্বেষী ছিলেন না। তাঁহার অধিকাংশ সভাতেই বহু শিক্ষিত হিন্দুর সমাগম হইত। তাঁহারাও মুক্তকণ্ঠে তাহার বক্তৃতার প্রশংসা কীর্তন করিতেন। সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা থাকিলে তিনি কিছুতেই শিক্ষিত বিধর্মীর হৃদয় জয় করিতে পারিতেন না। (১৩০৮ সালের ২৮শে মাঘ তারিখে রংপুর টাউনে একটি বিরাট সভার অধিবেশন হইয়াছিল ।
বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ঐ সভায় হিন্দু-মুসলমান সহস্র সহস্র ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। (মুনী সাহেব মরহুম ঐ সভায় গােহত্যা সম্বন্ধে একটি সুন্দর বক্তৃতা করেন। উক্ত বক্তৃতা শ্রবণে উপস্থিত হিন্দুগণ পৰ্যন্ত মুগ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার বক্তৃতা অন্তে স্থানীয় পণ্ডিত মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত যাদবেশ্বর তর্করত্ন মহাশয় বক্তার গলায় গলায় মিলিয়া তঁাহার শত শত প্রশংসা করিয়াছিলেন। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা লাভ করা কম সৌভাগ্য ও কৃতিত্বের কথা নহে। তিনি এই সভায় গােরক্ষা ও গােজাতির উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুদিগকে যে কি প্রকারে তাহার পথ প্রদর্শন করিতে হইবে, সে বিষয়ে সুন্দরভাবে বক্তৃতা করিয়া তথাকার সমগ্র হিন্দু-সমাজকে মুগ্ধ করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়ে ক্রামতিয়ায় বহু হিন্দু-ছাত্র বিনা মাহিনায় পড়িত। ব্যক্তিগত ভাবেও তিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বহু ছাত্রের সাহায্য করিতেন। মুন্শী সাহেব মরহুম বক্তৃতার মধ্যে নীতি ও উপদেশপূর্ণ বহু সুন্দর সুন্দর চিত্তাকর্ষক গল্প বলিতেন, একথা পূৰ্বেই উল্লেখ করিয়াছি। এই সমস্ত গল্পের কয়েকটির উল্লেখ এ স্থলে আশা করি অপ্রাসঙ্গিক হইবে । মুন্শী সাহেব মরহুমের দৌলতপুরের যে সভায় আমার যােগদানের সৌভাগ্য হইয়াছিল, তাহাতে তাহার বক্তৃতার ভূমিকাতেই তিনি যে গল্পটি বলিয়াছিলেন, কত যুগ পরেও যেন আমার মনের ভিতর তাহা তেমনই মধুরভাবে ঝঙ্কত হইতেছে। তিনি তাঁহার অনন্যদুর্লভ বিশেষত্বের সহিত বলিলেন,-এক স্থানে একটি পাখী গাছের উপর বসিয়া আপন মনে গান করিতেছিল। বক্ নামক দেশবাসী একজন 'পথিক সেই পথ দিয়া যাইতে যাইতে পাখীর স্বর শুনিয়া স্তব্ধ হইয়া দাড়াইল। সৰ্ব্বদাই সে তাহার স্বদেশের কথা ভাবিত, স্বদেশের স্মৃতি তাহার মর্মে জড়াইয়া ছিল ; সুতরাং পাখীর স্বর শুনিয়া তাহার মনে কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা হইল, পাখীটি যেন বলিতেছে, “আজব, শহরে বদর! অর্থাৎ বদরক শহরটি কি সুন্দর, কি আশ্চৰ্য্য। পথিক তন্ময়ভাবে এই সমস্ত কথা ভাবিতেছে, এমন সময় সেইস্থানে একজন ফেরিআওলা আসিয়া উপস্থিত হইল। সে পেয়াজ রসুন ও আদরক ফেরি করিয়া বেড়াইত। ফেরিওলা পথিককে বলিল,-ভাই এখান দাড়াইয়া কি দেখিতেছ? পথিক বলিল,-দেখ কি বিচিত্র ব্যাপার, পাখীটি ঠিক যেন বলিতেছে, আজব শহরে বদরক ! ফেরিআওলা পথিকের কথার প্রতিবাদ করিয়া বলিল,-না হে, তা নয় ; পাখীটি বলিতেছে, পেয়াজ লহ ছন আক্! সে পেয়াজ রসুন ও আদরকের কারবার করে, সুতরাং সে পাখীর স্বরে “পেয়াজ লহছন আদরকই শুনিতে পাইল। পাখীটি কি বলিতেছে, তাহা লইয়া ক্ৰমে পথিক ও ফেরিওলার মধ্যে বিষম তর্ক বাধিয়া গেল। কেহই নিজের জেদ ছাড়ে না। শেষে এমন কি মারামারির যােগাড়! এমন সময় সেই স্থানে একজন দরবেশ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। উভয়ে আগ্রহের সহিত দরবেশকে মধ্যস্থ মানিল, তিনি মীমাংসা করিয়া দিবেন, পাখীটি কি বলিতেছে। যিনি প্রকৃত দরবেশ, খােদার পথের পথিক, তিনি সমস্ত ব্ৰহ্মাণ্ডকেই খােদময় দেখিয়া থাকেন, বিশ্বের সমস্ত পদার্থই নীরবে সেই বিভূনাম জপ করিতেছে, তাহা দিব্যকর্ণে সুস্পষ্ট অনুভব করিয়া থাকেন। এই প্রসঙ্গে মহাকবি শেখ সাদী বলিয়াছেন, বজেক্শ, হরচে বিনি দৰ খনােশন্ত, অলে দানাদ দরি মানী কে গােশস্ত, বুবুল বৰু গুলিস্ত। তসবিহ, খান, কে হ, খারে বতবিহশ, জবানন্ত।
বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা
অর্থাৎ যাহা কিছু দেখ সবাই স্পষ্টভাবে সেই খােদার জেকের করে।
যাহার ( আধ্যাত্মিক) কর্ণ আছে, কেবল সেই এই গুপ্ত রহস্য
গুপ্ত রহস্য বুঝিতে
পারে। শুধু বুলবুলই যে ফুলের গান গাহিয়া থাকে তাহা নহে; প্রত্যেক
কাটাও তাহার গানে সর্বদা নিরত।
দরবেশ উত্তর দিলেন, তােমাদের কাহারাে কথা সত্য নহে! পাখীটি
বলিতেছে,-“অজিব খোদাকা কেতি, অর্থাৎ খােদার মহিমা অতি
আশ্চৰ্যজনক।
এই গল্পে বুঝা যাইতেছে, যে যে প্রকৃতির লােক, কোন বিষয়ের সে
সেইরূপই ব্যাখ্যা করিয়া থাকে। পাখী যাহা গাহে, তাহার প্রকৃত অর্থ
হয়ত কিছুই থাকে না। যে-লােক যে-প্রকৃতির এই গল্পে সে পাখীর
ধ্বনির মধ্যে তদনুরূপ কথাই শুনিতে পাইয়াছে। ভদ্র মহােদয়গণ,
আপনাদের মত সজ্জন পরিপূর্ণ এই সভায় আমার নূতন কথা শুনাইবার
যােগ্যতা নাই। তবে এইটুকু মাত্র আমার ভরসা যে, আমি সেই পাখীর
ন্যায় যাহা কিছু বলিব, হয়ত অনেকস্থলে তাহা অর্থহীন হইতেও পারে।
তথাপি আপনারা নিজ নিজ গুণে তাহার মধ্য হইতে ভাল অর্থই গ্রহণ
করিবেন। * মুন্শী সাহেবের বক্তৃতার এই ভূমিকায় কেহ গল্প শুনিয়া,
* মহাকবি শেখ সাদী এতৎপ্রসঙ্গে বলিয়াছেন,
না গােয়দ আজ, ছরে বাজিচা হরুফে
কাজ। পদে না গীর সাহেবে হােশ!
আগা সদ বাবে হেমত, পেশে নাদা
বে খানি আদাশ, বাজিচা দরূ গোশ,!
কেহ কভু কোন কথা খেলা-ছলে কয় না,
যাহা হতে জানিগণ উপদেশ লম না।
পড়িয়া শুনাও শত দর্শনের পরিচ্ছেদ,
অবোধের কাছে অর কোন দাম হয় না।
( গুলিস্তর বঙ্গানুবাদ)
৫৮ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা কেহ তাহার ভিতরকার গভীর অর্থ এবং গভীর ইঙ্গিত উপলব্ধি করিয়া, সর্বোপরি তাহার বিনয়ের পরিচয় পাইয়া সকলেই বিমুগ্ধ হইয়াছিলেন। শিক্ষার আবশ্যকতা প্রসঙ্গে একদিন তিনি এক সভায় এইরূপ গল্প বলিয়াছিলেন,-একদিন রাত্রে কোন রাজবাড়ীতে খুব আড়ম্বরের সহিত গান হইতেছিল। রাত্রি শেষ হইয়া আসিল, কিন্তু গায়কেরা যেরূপ পুরস্কার প্রাপ্তির আশা করিয়াছিল, তাহার কিছুই পাইল না। ইহাতে গায়কদের একজন তাহার গানের সাহায্যে এই নিরাশার অবস্থা তাহার সহযােগী গায়কগণকে জানাইয়া দিল। তাহাদের মধ্যে একজন তাহাকে আরাে কিছুকাল ধৈৰ্য্য ধরিয়া গান করিতে উপদেশ দিল এবং “সবুরে মেওয়া ফলে ইহাও কৌশলে গানের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টায় জানাইয়া দিল। বলা বাহুল্য, সাধারণ সঙ্গীতের মধ্যেই তাহাদের এই যে ব্যক্তিগত কথার আদান-প্রদান, সভায় অন্য কেহই তাহা বুঝিতে পারিল না। সেই সভায় রাজার সুশিক্ষিতা, পূর্ণযৌবনা কুমারী কন্যা উপস্থিত ছিলেন। এতদিন পর্যন্ত তাহার বিবাহের কোন বন্দোবস্ত না হওয়ায় তিনি মনদুঃখে নিজ ইচ্ছামত পতি গ্রহণ করিয়া গৃহত্যাগের সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। রজনী প্রভাত হইলেই তিনি এই সংকল্প মত কাজ করিবেন, এইরূপ সিদ্ধান্ত হইয়াছিল। গায়কদের সঙ্গীতের এই অতুলনীয় উপদেশ রাজকুমারী নিজের জীবনের উপরেও প্রযুজ্য বলিয়া বুঝিতে পারিলেন। সহসা তাহার মনের ভাব পরিবর্তিত হইয়া গেল। তিনি বিলেন, সত্যই ত, আরাে কিছুকাল ধৈৰ্য্য অবলম্বন করা উচিত। “সবুরে মেওয়া ফলে। সহসা অবিবেচকের মত তিনি কি কাজ করিতে যাইতেছিলেন! গায়কের উপদেশ তাহার মনােভাবের পরিবর্তন ঘটাইতে সমর্থ হইয়াছে, তিনি। পতনের হাত হইতে রক্ষা পাইয়াছেন, এই জন্য পুরস্কারস্বরূপ তিনি তাহাকে একছড়া সােণার হার দান করিলেন।
বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ঐ সভায় রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্রও উপস্থিত ছিলেন। বৃদ্ধ রাজা এ পর্যন্ত তাহাকে রাজক্ষমতা প্রদান না করায় তিনি মনে মনে বিষম বিরক্তি ও অভিমান পােষণ করিতেন। এমন কি, তিনি রাজাকে হত্যা করিয়া স্বয়ং রাজা হইবার সংকল্পও করিয়াছিলেন। কিন্তু গায়কের উপদেশ শুনিয়া তিনি ভাবিলেন, লােকটি ত অতি সত্য কথাই বলিয়াছে। রাজা আর কতদিনই বা বাঁচিবেন? আর কতদিন আমাকে সিংহাসন হইতে বঞ্চিত রাখিতে পারিবেন ? অহেতু তাহাকে হত্যা করিয়া কেন মহাপাপে ও দুরপনেয় কলঙ্ক-পতে নিমজ্জিত হই ? “সবুরে মেওয়া ফলে। ইহা অতি সত্য কথা ! গায়কের উপদেশে তাঁহার পাপ-সংকল্প পরিবর্তিত হইল। তিনি খুশী হইয়া গায়ককে সহস্র মুদ্রা পারিতােষিক প্রদান করিলেন। ঐ সভায় কোতােয়ালের মুখপুত্রও উপস্থিত ছিল ! তাহার সাহিত্য- জ্ঞান ছিল না বলিয়া সঙ্গীতের প্রৰ্ম্ম সে প্রায়ই কিছু বুঝিতে পারে নাই। যখন সে দেখিল, রাজপুত্র ও রাজকন্যা একটি গান শুনিয়া খুশী হইয়া গায়ককে অজস্র পুরস্কার প্রদান করিলেন, অথচ সে সেই গানটির মর্ম কিছুমাত্র বুঝিতে পারিল না, তখন সে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া অদূরে উপবিষ্ট তাহার বৃদ্ধ পিতার গণ্ডে প্রচণ্ড চপেটাঘাত করিতে লাগিল। কোতােয়াল ইহাতে কিছুমাত্র ক্রুদ্ধ না হইয়া পুত্রকে কোলে করিয়া নাচিতে লাগিল। সভায় বিষম হুলস্থুল পড়িয়া গেল। সভাস্থ সকলে মহা বিরক্ত হইয়া কোতােয়াল পুত্রকে তিরস্কার করিয়া বলিল,- ওহে, তুমি তোমার বৃদ্ধ পিতাকে অহেতু এভাবে সভার মধ্যে কেন প্রহার ও অপমান করিতেছ? মূখ কোতোয়াল পুত্র একথায় দাত খি চাইয়া তীব্র ভাষায় উত্তর দিল,-বুঝিতেছ না? যে গান শুনিয়া রাজকন্যা ও রাজপুত্র গায়ককে এত অজস্র পুরস্কার দান করিলেন, আমি এমন মূখ যে, তাহার ৬০ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা ; কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। যে পিতা আমাকে লেখাপড়া না শিখাইয়া আকাট মূর্খ বানাইয়াছে, সভার মধ্যে তাহার এইরূপ শাস্তি হওয়া উচিত। কোতােয়ালপুত্রের এই অদ্ভুত উত্তর শুনিয়া সকলে হাসিতে লাগিল এবং বলিল, হাঁ যুক্তিটা নিতান্ত মন্দ নয়। যে নির্বোধ নিজ পুত্রকে লেখাপড়া ও আদব-কায়দা না শিখায়, তাহার এইরূপ শাস্তি হওয়াই উচিত। অতঃপর সকলে বৃদ্ধ কোতােয়ালকে বলিল, ওহে, তােমার একি কাণ্ড? তােমার পুত্র তােমাকে সভার মধ্যে মারিতেছে, অপমান করিতেছে, অথচ তুমি তাহাকে আদর করিয়া কোলে লইয়া নাচিতেছ ! তুমি কি একেবারে পাগল হইয়াছ? কোতােয়াল বলিল ; আপনারা তাহা বুঝিতে পারিতেছেন না? পুত্রকে লেখাপড়া, আদব-কায়দা শিখাই নাই; তাহারই উপযুক্ত পুরস্কার এই সভার মধ্যে চপেটাঘাত! কথায় বলে, মূর্থ পুত্র যমের সমান! সে যে আমাকে একেবারে খুন না করিয়া শুধু চপেটাঘাত করিয়াই ছাড়িয়া দিয়াছে, ইহাতেই আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করিতেছি এবং এই আনন্দেই তাহাকে এত আদর করিয়াছি! পুত্র মূৰ্থ হইলে পিতা যে কিরূপ বিড়ম্বনা ভােগ করিতে বাধ্য হন, এই গল্পটিতে তাহা কেমন সুন্দরভাবে দেখান হইয়াছে। এই গল্পটি শুনিয়া কোন্ পিতা পুত্রকে লেখাপড়া ও আদব-কায়দা শিখাইতে ইচ্ছুক না হইয়া পারে? যাহারা দেশের লােককে মূখ রাখিয়া নিজেরা নিরাপদে নানা বৈধ ও অবৈধ সুবিধা লাভ করিতে চাহেন এবং তজ্জন্য কাউন্সিলে বা অন্যত্র বিশেষ চেষ্টা করিয়া থাকেন, এই গল্প হইতে তাহাদের চৈতন্য হওয়া উচিত। যাহাদের নিকট হইতে তাহারা মানববাচিত সদ্ব্যবহার এবং শ্ৰদ্ধাপ্রীতি লাভ করিতে পারিতেন, অশিক্ষা-নিবন্ধন তাহাদের হন্তে লাঞ্ছনা লাভ করিলে তজ্জন্ত অভিযােগ না করিয়া, অসন্তুষ্ট না হইয়া বরং তাহা নীরবেই হজম বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা করা এবং আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করাই বুদ্ধিমানের কাৰ্য্য । ইহা কে তাহাদের এবম্বিধ দুষ্কর্মেরই উপযুক্ত পুরস্কার! নেতার আবশ্যকতা সম্বন্ধে তিনি একটি গল্পে বলিয়াছিলেন যে, এক মাঠে অনেকগুলি ভূত বাস করিত। ভূতেরা একদিন ঠিক করিল, স্থানীয় মােল্লাজীকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়া তাহাদের বাটীতে মৌলুদ শরিফ পড়াইতে হইবে। ভূতেদের মধ্যে ত আর মােল্লা নাই, তাই মানুষের গ্রামে গিয়া ভূতেরা এক মােল্লাজীকে তাহাদের বাটীতে মৌলুদ শরিফ পড়িবার জন্য নিমন্ত্রণ করিল। মােল্লাজী ত ভূতেদের নিমন্ত্রণ পাইয়া ভয়ে থর থর করিয়া কাপিতে লাগিলেন। তঁাহার ঘাড়ে কয়টি মাথা যে, রাত্রে ভূতেদের বাটী নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইবেন! অথচ নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে স্বীকৃত না হইলে হয়ত তখনই তাঁহার কঁচা মাথাটি গর্দান হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইবে। তাই অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া মােল্লাজী . বলিলেন,-বেশ ভাল কথা ! কিন্তু বাপু, আমার একটা শর্ত আছে। তােমাদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, যিনি তােমাদের সকলের মােড়ল তাঁহার নিমন্ত্রণ ব্যতীত আমি যাইতে পারি না। প্রথমে তােমরা সভা করিয়া সকলের মোড়ল ভূত ঠিক করিয়া তাহাকে আমার নিকট পাঠাইলেই আমি যাইব। প্রকাণ্ড মাঠের ঠিক মাঝখানে ভূতদের সভা বসিল ! আমড়া গাছের ধামড়া ভূত, হাজরা গাছের নাজরা ভূত, বাবরা গাছের ডাবরা ভূত, আরাে কত কত বিখ্যাত ভূত আসিয়া সেই সভায় উপস্থিত হইল। এক একজনের এক এক রকম বিটকেল মূর্তি! কে সকলের বড় নেতা, সে কথা উঠিবা মাত্রই প্রত্যেকেই নিজকে সকলের শ্রেষ্ঠ বলিয়া প্রমাণ করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিল! কাহার কয় পুরুষ মাতব্বর ছিল, কে ব্রাহ্মণ ভূত, নমঃশূদ্র ভূত, আর কে কায়েত ৬২ কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা ভূত, কে কুলিন ভুত, কে মামদো ভূত, কে আসল ভূত, কে নকল ভূত এই সব কঠিন কঠিন সামাজিক তথ্য লইয়া তর্ক তুমুল হইয়া উঠিল। ক্রমে মুখােমুখি হইতে হাতাহাতি, লাঠালাঠি, কিলেকিলি ও চুলােচুলি আরম্ভ হইল। পরিশেষে তাহারা বড় বড় গাছ উপড়াইয়া এমন এক ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ করিয়া দিল যে, ভূতের বংশ সমূলে ধ্বংস হইয়া গেল। পরদিন সে মাঠে আর একটী ভূতও জীবিত থাকিল না। যাহারা প্রত্যেকেই নেতা হইতে চায়, যাহারা সমগ্র সমাজ ও জাতির মধ্যে একজন নেল ( এমাম) ঠিক করিয়া তাহার অনুগত হইয়া চলিতে না পারে, তাহারা জগতের বক্ষ হইতে সমূলে ধ্বংস হইয়া থাকে, এই নির্মম সত্য কেমন সুন্দর কৌশলে এই গল্পে প্রদর্শন করা হইয়াছে। মুন্শী সাহেব মহুমের আর একটি গল্প এইরূপ ;-একজন ব্রাহ্মণ, একজন নমঃশূদ্র এবং একজন মুসলমান এক মুসলমান কৃষকের ইক্ষুক্ষেত্রে গিয়া ইক্ষু চুরি করিয়া খাইতেছিল। হঠাৎ কৃষক ইহাদিগকে দেখিতে পাইয়া ভাবিল, সে একাকী ইহাদের সহিত পারিয়া উঠিবে না। অতএব ইহারা যাহাতে একতাবদ্ধ হইতে না পারে, তজ্জন্য এক কৌশল অবলম্বন করিল। সে বলিতে লাগিল,“ব্রাহ্মণ হিন্দুজাতির দেবতা স্বরূপ ; তিনি আমার ভুইয়ের একখানা ইক্ষু খাইয়াছেন, সে ত আমার সৌভাগ্য। মুসলমান আমার জাতভাই। তিনি যদি আমার সামান্য ইক্ষু খাইয়া থাকেন, তাহাতেই বা আমার এমন কি ক্ষতি হইয়াছে ? কিন্তু বেটা নমঃশূদ্র, ছােট লােক, তুই কেন আমার ইক্ষু খাইলি ? এই বলিয়া সে নমঃশূদ্রকে প্রহার করিতে করিতে জীবন্ত করিয়া ফেলিল। এতক্ষণ ব্রাহ্মণ ও মূসলমানটি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাস দেখিতেছিল। এখন ভুইআওলা ব্রাহ্মণকে বলিল,-বেটা চোর ছুচো, তুই হিন্দুর বামন, তাতে বক্তা মােহাম্মদ মেহেরুল্লা আমার কি ? ইনি আমার স্বজাতি, ইহাকে নয় ক্ষমা করিতে পারি। তােকে উচিত শিক্ষা না দিয়া ছাড়িব না ! এই বলিয়া সে ব্রাহ্মণকে ভীষণভাবে প্রহার করিতে লাগিল। এতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানটি আনন্দে ও গৌরবে হাসিতেছিল। এখন কৃষক ব্রাহ্মণকে আচ্ছা করিয়া উত্তম- মধ্যম দিয়া সহসা মুসলমানটির গলা ধরিয়া বলিল,-বেটা বেইমান, চোর বদমাইশ ! তুই মুসলমান হইয়া চুরি করিস! এই বলিয়া তাহাকে পিটাইতে পিটাইতে একেবারে আধমরা করিয়া ফেলিল। ভেদনীতির প্রভাব এই গল্পে কেমন সুন্দরভাবে প্রদর্শিত হইয়াছে। তিনটি চোর পূৰ্ব হইতেই একতাবদ্ধ থাকিলে কৃষক তাহাদের কিছুই করিতে পারিত । আমাদের দেশে বর্তমানে এইরূপ শিক্ষার যে কত প্রয়ােজন, অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ এই গল্পের ইঙ্গিতে তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবেন। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের বক্তৃতার অন্তর্ভূক্ত এইরূপ বহু , নীতি-উপদেশপূর্ণ গল্প এখনাে দেশে দেশে প্রচলিত আছে। বহু বক্তা ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক কথিত হইয়া সেগুলি আজিও সহস্র সহস্র ব্যক্তিকে সুপথে পরিচালনার সহায়তা করিতেছে। * এই গল্পটি মুনশী সাহেব মরহুমের কখিত বলিয়াই আমার দৃঢ় ধারণা আছে। তবে এ সম্বন্ধে আমি একেবারে নিঃসন্দেহ নহি।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা বক্তৃতার প্রভাব ক্ষণস্থায়ী এবং অল্পস্থানব্যাপী। দেশে ব্যাপকভাবে, স্থায়ীরূপে কোন কাজ করিতে হইলে বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের মধ্যবর্তিতায় প্রচার আবশ্যক, বিচক্ষণ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা একথা হার প্রথম জীবন হইতেই বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলেন। খৃষ্টান পাদ্রীদের সহিত ধর্মবিষয়ক তর্ক-বিতর্ক ও সংঘর্ষের ফলে কিভাবে তাহার সুপ্ত প্রতিভা সাড়া দিয়া উঠিয়াছিল, কি ভাবে তিনি ধীরে ধীরে খৃষ্টান ও ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করিয়াছিলেন, সে কথা পূর্বে যথাস্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহার এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ব্যাপকভাবে স্থায়ীরূপে প্রচার করার জন্য তিনি পুস্তক প্রণয়নে মনোেযােগী হন। ১২৯৩ খৃষ্টাব্দে সর্বপ্রথম তাহার লিখিত “খৃষ্টান ধর্মের অসারতা নামক একখানি পুস্তক বাহির হয়। ইহার কিছুদিন পরে ভূতপূর্ব “ইসলাম প্রচারক” এবং “মিহির ও সুধাকর” সম্পাদক মুন্শী রেয়াজুদ্দীন আহমদ সাহেবের সহিত তাঁহার চিঠিপত্রে আলাপ হইয়াছিল। অতঃপর যশােহরে ইলাম ধর্ম প্রচারােদ্দেশ্যে তিনি একটি আঞ্জমনের প্রতিষ্ঠা করেন। এই আঞ্জমনের একটি বিশেষ অধিবেশন উপলক্ষে কলিকাতাস্থ মৌলভী মেয়ারাজুদ্দীন আহমদ মরহুম * মুন্শী মােহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ, এবং * মৌলভী মেরাজুদ্দীন আহমদ সাহেব একজন প্রকৃত সমাজহিতৈষী, উৎসাহী পুরুষ ছিলেন। মােসলেম-জাতীয়তা উন্মেষের সেই প্রাথমিক যুগে তিনি সমাজের অনেক কার করিয়াছিলেন। 4 সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ; বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সম্পাদক মুন্শী শেখ আবদুর রহিম সাহেবের সহিত তঁাহার প্রথম মিলন হয়। সে কি শুভদিন ! অতঃপর চিরজীবন ইহারা ফৰ্ম্মজীবনে এবং সমাজ সেবায় পরস্পরের সঙ্গী ছিলেন। ইহাদের প্রাণপণ চেষ্টাতেই বলিতে গেলে আজ মুসলমান বঙ্গসাহিত্য বর্তমান অবস্থায় উন্নীত হইয়াছে; সমাজে কথঞ্চিৎ জীবন ও চেতনার সঞ্চার হইয়াছে। মুন্শী সাহেব মহুম যখন প্রথম-যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন মুসলমান সমাজ সুপ্তির গভীর মোহে অভিভূত। জাতীয় চেতনা বলিয়া কোন জিনিস তখন তাহার ছিল না। হিন্দুসমাজ তখন পূর্ণ উদ্যমে শিক্ষা ও সৰ্ব- বিধ উন্নতির পথে শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হইতেছে। খৃষ্টান পাত্রীগণ কিভাবে সমগ্র দেশবাসীকে খৃষ্টান করিবেন, সেই চিন্তায় বিভাের। আর মুসলমান সময়ের স্রোতে গা ঢালিয়া দিয়া অলক্ষ্যে ধ্বংসের নিম্নতম আবর্তে ডুবিয়া যাইতেছিল। কোন সংবাদপত্র তখন পর্যন্তও বঙ্গীয় মুলমান সমাজে প্রচলিত হয় নাই। * যে সংবাদপত্র জাতীয় জীবনের একমাত্র অবলম্বন, তাহার কোন প্রয়োজনও তখন কেহ বড় একটা অনুভব করিত না। (মুন্শী সাহেব মরুম দেখিলেন, বাঙ্গালার মুসলমানকে সংহত ও একতাবদ্ধ করিয়া উন্নতির পথে চালাইতে হইলে বর্তমান জগতের ভীষণ, সংঘর্ষের ভিতরে তাহাকে বাঁচাইয়া রাখিতে হইলে প্রথমেই সংবাদপত্রের আবশ্যক প্রবীণ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুন্শী শেখ আবদুর রহিম সাহেব (মরহুম) সুলেখক মুন্শী শেখ রেয়াজুদ্দীন আহমদ ইত্যাদির সহযােগিতায় মুনশী সাহেব অধুনালুপ্ত “মিহির ও সুধাকরের উন্নতি ও প্রচারের জন্য আত্মনিয়ােগ করিলেন। শেখ আবদুর রহিম সাহেব বহুকাল পর্যন্ত উক্ত পত্রিকার সম্পাদক এবং মুন্শী রেয়াজুদ্দীন আহমদ সাহেব প্রকাশক ছিলেন। (সংবাদপত্রের প্রাণ ও সার্থকতা ইহার গ্রাহক-সংখ্যার উপরেই , মেহের চরিত।
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা নির্ভর করে। মুর্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব দেশ-বিদেশে ঘুরিয়া, সভা-সমিতিতে বিশেষ চেষ্টা করিয়া “মিহির ও সুধাকরের গ্রাহক সংগ্রহ করিতেন।)এইরূপে বাঙ্গালার মুসলমান সমাজে “মিহির ও সুধাকর” বিশেষ প্রতিপত্তি অর্জনে সক্ষম হইয়াছিল। “মিহির ও সুধাকরের প্রতিনিয়ত ভেরী-নিনাদেই সেই যুগে মুসলমান সমাজের মােহনিদ্রা অনেকটা অপসারিত হইয়াছিল। সপ্তাহের পর সপ্তাহ মর্মস্পর্শী ভাষায় “মিহির ও সুধাকর বাঙ্গালী মুসলমানের কর্ণে জাগরণের সঞ্জীবনী-গীতি বর্ষণ করিত, দেশের প্রান্তে প্রান্তে, পল্লীতে পল্লীতে প্রাণের পরশ বুলাইয়া দিত। আজ মুসলমান সমাজে যে একটু চেতনার সাড়া দেখিতেছি, শক্তিশালী সংবাদপত্র সমূহকে যেভাবে জাতীয় যুদ্ধে আগুয়ান দেখিতেছি, “মিহির ও সুধাকরের প্রাণশক্তি তাহার মূলে যথেষ্ট কাৰ্য্য করিয়াছে। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের আপ্রাণ চেষ্টা না থাকিলে এই পত্রিকাখানি কখনই সমাজে তেমন সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পারিত না। * “মিহির ও সুধাকর ব্যতীত মুন্শী রেয়াজুদ্দীন আহমদ সাহেব কর্তৃক সম্পাদিত“ইসলাম প্রচারক নামক মাসিক পত্রিকার তিনি একজন পৃষ্ঠপোেষকু ও নিয়মিত লেখক ছিলেন।এই পত্রের গ্রাহক সংগ্রহের জন্যও তিনি কম চেষ্টা করেন নাই। এই সমস্ত পত্রিকা এবং তৎকালে প্রকাশিত অধিকাংশ মুসলমান লেখকের পুস্তকাদি মুন্শী শেখ রেয়াজুদ্দীন আহমদ সাহেবের কড়েয়াস্থিত “রেয়াজুল ইসলাম প্রেস হইতে প্রকাশিত হইত। বর্তমান বঙ্গীয় মােস্লেম-সাহিত্য ও জাতীয়তা গঠনের মূলে এই কয়েকজন মনীষী ব্যতীত মরহুম কবি মােজাম্নেল হক কাব্যকণ্ঠ, অসাধারণ বক্তা সুকবি সৈয়দ আবুল মােহাম্মদ ইসমাইল হােসেন সিরাজী, সুকবি * আমার স্মরণ হ উক্ত পত্রিকার কোন কোন রিপাের্টে আমি দেখিয়াছি, তিনি এক এক সময় ৬•|• জন পৰ্য্য হিসংগ্রহ করিয়া দিয়াছেন।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা শেখ ফজলুল করিম সাহিত্যবিশারদ নীতিভূষণ, সুলেখক মৌলভী রেয়াজুদ্দীন আহমদ ইত্যাদির নামও বিশেষরূপে উল্লেখযােগ্য। যে যুগের কথা লিখিত হইতেছে, ইহারা সকলেই তখন সংবাদ ও সাময়িক পত্রের নিয়মিত লেখক ছিলেন। আজ বঙ্গীয় মােলেম-সাহিত্যের যে বিরাট সৌধ ধীরে ধীরে মস্তক উত্তোলন করিয়া দাড়াইতেছে, ইহাদের সাহিত্য-সাধনা একদিন তাহার ভিত্তিমূল প্রােথিত করিয়াছিল। বর্তমান যুগে মোসলেম সাহিত্যিক ও কবিগণের তাহাদের প্রতি কর্তব্য ভুলিয়া যাওয়া কখনই উচিত নহে। সংবাদ ও সাময়িক পত্রের গায় জাতীয় সাহিত্য-পুস্তকও জাতিকে বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য, উন্নতির পথে পরিচালিত করিবার জন্য একান্ত প্রয়ােজনীয়। সাহিত্যের প্রভাব ব্যাপক ও স্থায়ীভাবে সমাজের উপর কাৰ্য্য করে। সাহিত্য-শক্তিই জাতির সর্বপ্রধান শক্তি তাই ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ চিন্তাশীল লেখক মহামতি থমাস্ কার্লাইল যদি প্রয়ােজন হয়, তবে ভারত সাম্রাজ্য হারাইতেও রাজী হইয়াছেন, কিন্তু শেক্সপিয়ারকে হারাইতে সম্মত হন নাই। * মনীষী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা এই তথ্য বুঝিতেন। তাই জাতীয়-সাহিত্য সৃষ্টির জন্য তিনি চিরজীবন চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। (তাহার বিখ্যাত স্বদে খৃষ্টান’ নামক পুস্তকখানি পাদ্রীগণের আক্রমণের পাণ্টাম্বরূপ খৃষ্টান ধৰ্ম্মের বিরুদ্ধে লিখিত হইয়াছিল। উক্ত পুস্তকখানি এমন অসাধারণ নিপুণতা ও শাস্ত্র জ্ঞানের সহিত বিবিধ যুক্তিতর্কপূর্ণ ভাষায় লিখিত যে, তাহা একবার পড়িলেই উক্ত ধর্মের অসারতা সম্বন্ধে মনে একটা দৃঢ় ধারণা বদ্ধমূল হইয়া যায়। তখন যেভাবে শনৈঃ শনৈঃ এতদ্দেশীয় হিন্দু-মুসলমান খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করিতেছিল, তাহাতে মুন্শী সাহেব মরহুমের মত Lecture on Keroes and Heroworship.
৬৮ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা একজন অসাধারণ শক্তিশালী ব্যক্তি সম্মুখ সংগ্রামে অগ্রসর না হইলে ইহার পরিণাম যে—কি হইতে পারিত, তাহা ভাবিতেও শরীর শিহরিয়া উঠে! যশােহরের নিকটে বহু গ্রাম প্রায় সম্পূর্ণরূপে খৃষ্টান হইয়া গিয়াছিল। * উক্ত টাউনের পার্শ্বেই জনৈক মুসলমান খৃষ্টান হইয়া শেষে পাদ্রী সাহেবে পরিণত হইয়াছিলেন। সাধারণে তাহাকে “ধােনা পাত্রী বলিত। নিশ্চয়ই তাহার খৃষ্টানপাদ্রীসুলভ কোন আড়ম্বরপূর্ণ নাম ছিল; কিন্তু আমি তাহা জানিতে পারি নাই। তাঁহার বক্তৃতা আমি শুনিয়াছি। কি ভীষণ শক্তিতে এই সব নব-দীক্ষিত খৃষ্টান প্রচারকগণ ইমের অঙ্গে আঘাত করিতেছিলেন, তাহা প্রত্যক্ষ না করিলে অনুমান করা যায় না। মুন্শী সাহেব মরূহুমের বক্তৃতা এবং তর্ক-সংগ্রাম ইলামের এই নিদারুণ বিপদের দিনে যতখানি কার্যকরী হইয়াছিল, তাহার লিখিত “রদে খৃষ্টান” এবং “খৃষ্টানধৰ্ম্মের অসারতা” নামক পুস্তক দুখানি তাহা অপেক্ষা কম হয় নাই। পুস্তক নীরব প্রচারক। খৃষ্টান- ধর্মের বিরুদ্ধে এই পুস্তক দুখানি যেন সমগ্র বাঙ্গালাদেশ ব্যাপিয়া যুদ্ধ চালাইতেছিল। রব্দে খ্ৰীষ্টিয়ান পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ড “দলিলুল ইলাম বাহির হইবার পূর্বেই জনাব মুন্শী সাহেবের পরপারের ডাক আসে। । দুঃখের বিষয় এমন একখানি মূল্যবান পুস্তক আর বাহির * পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রবল স্রোতে যখন এদেশের হিন্দুসমাজ ভাসিয়া যাইতেছিল, দলে দলে সুশিক্ষিত হিন্দুসন্তানগণ খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করিতেছিল, তখন রাজা রামমােহন রায় ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠিত করিয়া ইহার গতিরােধ করেন। এই তরঙ্গ মুসলমান সমাজকে স্পর্শ করে নাই। রামমােহন রায়ের অনেক কাল পরে সাধারণ মুসলমান সমাজে খৃষ্টান ধর্ম প্রবেশ করিতে আরম্ভ করে। মরহুম মুনশী সাহেবই খৃষ্টান ধর্মের এই আক্রমণ প্রতিহত করেন। এই দিক দিয়া তিনি রাজা রামমােহন রায়ের সহিত তুলনীয়। । রদ্দে খৃষ্টিয়ান পুস্তকের সম্পূর্ণ নাম রদ্দে খৃষ্টিয়ান ও দলিলুল ইসলাম। ইহার প্রথম অংশ রদ্দে খৃষ্টিয়ান প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় অংশ বাহির হইবার পূর্বেই মরহুম রলোক গমন করেন।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা হইতে পারে নাই। সন্ধান লইয়া জানিয়াছি, রিয়াজুল ইসলাম প্রেস হইতে উক্ত পুস্তকের পাণ্ডুলিপিখানি নাকি কি ভাবে হারাইয়া গিয়াছিল। প্রেস-কর্তৃপক্ষের দক্ষতার গুণে এইরূপভাবে পাণ্ডুলিপি হারাইয়া যাওয়ার কথা অনেক সময়েই শুনা গিয়া থাকে। এই শ্রেণীর একখানি উপযুক্ত পুস্তক এই দীর্ঘ পঁচিশ বৎসরের মধ্যেও প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া আমি জানি না। মুসলমান সমাজের উপযুক্ত ব্যক্তি গণের আশু দৃষ্টি এদিকে বিনীতভাবে আকর্ষণ করিতেছি। মুর্শী সাহেব মরুভমের মেহেরুল ইসলাম নামক পুস্তকথানিও সমাজের একান্ত উপযােগী এবং অমূল্য উপদেশে পূর্ণ। মুসলমান সমাজের আভ্যন্তরীণ সংস্কারের উদ্দেশ্যে বাঙ্গালা পুঁথির ধরণে ইহা কবিতায় লিখিত। ইহার ভাষা বিশুদ্ধ, মধুর এবং সম্পূর্ণ ইস্নামীভাবপূর্ণ। সাধারণ- ধরণের বহু ধর্মোপদেশ উহাতে প্রদত্ত হইয়াছে এই পুম্বকের প্রারম্ভে হজরত রসুলে করিমের যে নায়া’ত বা স্তোত্র লিখিত হইয়াছে, আজিও বহু ওয়ায়েজ ও বক্তা সভাসমিতিতে তাহা দরূদ শরিফের ন্যায় আবৃত্তি করিয়া থাকেন। আজিও বাঙ্গালার বহু শান্তশীতল পল্লী-প্রান্তরে, মৰ্ম্মর- মুখর সুদূর-পিয়াসী তটিনীতটে, কৰ্ম্মক্লান্ত শ্রমিককূলের ভক্তিগদ্গদ কণ্ঠ-বিনিঃসৃত মহুমের সেই অমর গজল-গীতি সন্ধ্যা নিভৃত অন্ধকারে নন্দনের মন্দার-গন্ধ-মধুর-সঙ্গীত-লহরীর ন্যায় দূর গগনে প্রতিধ্বনিত হইয়া থাকে। উক্ত গজলের কয়েক পংক্তি এস্থলে উদ্ধৃত করিবার লােভ সংবরণ করিতে পারিলাম না। গাও রে মােসলেমগণ, নবী-গুণ গাও রে, পরাণ ভরিয়া সবে ছল্লে আলা গাও রে। আপনা কালামে, নবীর সালামে, তাকিদ করেন বারী কালেবেতে জান, কহিতে জবান, যে তক থাকে গাে জারি।
৭০
কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা
যে বেশে যে ভেসে, যে দেশেতে যাও রে,
গাও গাও গাও সবে ছল্লে আলা গাও রে।
হজরত আদম, গোনাতে যে দম বেদম কাদিয়াছিল,
পাইল রেহাই মােত্তফা দোহাই যেই দমে দিয়াছিল।
তাই বলি’ পাপি, যদি পাপ ক্ষমা চাও রে
ত্বরা করি’ প্রাণ ভরি’ ছল্লে আলা গাও রে।
নূহ পয়গম্বর, হুকুমে আল্লার, জাহাজ বানান যবে,
উপরে তাহার, নাম মােস্তফার লিখিলে ভাসিল তবে।
ভব পার যেতে যার বাসনা সে আও রে,
হৃদয়-জাহাজে লিখে নবী-নাম গাও রে।
খলীলের পেশানীতে, নবীর নেশানীতে আলােকিত ছিল হায় !
আহা সেই নূর বলে, নদের মহানলে, খলিলুল্লা মুক্তি পায় !
ওহে ভাই, জাহান্নামে যেতে যে না চাও রে
আজীবন মনপ্রাণে নবীগুণ গাও রে।
ফেরেশ সই হয়ে, যাহার বােরাক লয়ে,
আসিল এ দুনিয়ায়,
তিনি যে কেমন জন, ভাবহে ভাবুকগণ,
তাহার মেছাল দিব কায় ।
বােরাকে ছেরাত-পার যাইতে যে চাও রে
বদন ভরিয়া সেই ছল্লে আলা গাও রে।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা
৭১
নিমেষে আরশে যায়, বারী’লা দরগায়, ওমত নিস্তার তরে,
বান্দার নাজাত পথ, নিত্যনিধি শরিয়ত, থতম তাহার পরে ।
নিমেষে চুলের পুল যদি পার হও রে,
নবীজীর শরিয়ত শিরে তুলে লও রে।
আমরা মােসলেম দলে, আহা কি কপাল ফলে, পাইয়াছি সে মাতিনে,
মুসা ও দাউদ-ইসা (আঃ) যে পাক চরণ আশা, রেখেছে নিদান দিনে।
এস মােরা সে-চরণ শিরে
তুলে
দুখে সুখে মনে মুখে ছল্লে আলা কই রে ।
লই রে,
যে সময় ভবঘাের, হইল গােয় পাের, এমন সময় বারী
মােস্তফা সুরুজে তবে, উদয় করেন ভবে, করিতে আলােক জারি।
উদিলে ইস্লাম-রবি কাফেরী বিলয় রে
বল সবে উচ্চরবে ছল্লে আলা জয় রে।
যত পীর অলীগণ, সেবি’ সে চরণ-ধন, সাধনে পেয়েছে ফল,
সে পাক চরণ যারা, ছাড়িল নাদান তারা, তাহাই সম্বল।
চেয়ে পেয়েছ তারে আর কারে চাও রে ?
সে পাক চরণে সবে হৃদে জাগা দাও রে ।
ইহুদী নাছারা দল, হিন্দু শিখ এ সকল, ত্যজিয়া আসল রব
দেবদেবী গাছপালা, ঘাট মাঠ কাষ্ঠ শিলা, তাহারা পূজিছে সব।
সত্য রবে মােরা পেয়েছি যে অছিলায় রে
এস কোট কণ্ঠে ভেজি ছালাম তাঁহায় রে।
৭২ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা নবীজীর ছানা (১) যত, লক্ষ মুখে অবিরত, কহিলেও হইবে না, যাহার জবানে ভাই, নবীর দরূদ নাই, সে নাজাত (২) পাইবে না। অতএব সবে আখেরের গম খাও রে, নবী-নামে ছল্লে আলা দমে দমে গাও রে ! নবীজী সহায় যার, ভয় কি নরকে তার ? সে জন পেয়ারা খােদা। নবীর খেলাফ, যারা, খােদার দুশমন তারা, নরকে থাকিবে সদা। নবীজীর প্রেম-ভােরে সবে শির দাও রে, হৃদয় ভরিয়া সবে ছল্লে আলা গও রে! এ অধীন জোড় করে, চরণে বিনয় করে,-হে মম দয়াল নবী, গােনা মাের বড় দেখে, ফেলনা চরণ থেকে, আর না লুকাও ছবি! রে পাপি, ও মূঢ় মন, মােক্ষ যদি চাও রে, নবী, পদ লক্ষ্য করি’ ছল্লে আলা গাও রে। “মেহেরুল এম কেতাবের কল্পিত বড় মিঞার নকল পড়িয়া সহস্র সহস্র মুসলমান ধর্মপরায়ণ হইয়াছে। কেমন করুণ ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তিনি এই কবিতাটিতে সাংসারিক ধনসম্পদ ও জীবনের অসারতা বর্ণনা করিয়াছেন। পড়িলেই বৈরাগ্যে হৃদয় ভরিয়া উঠে, পাপ হইতে সভয়ে মন সরিয়াস খােদার দিকে হৃদয় ঝুকিয়া পড়ে। আত্মােপদেশ নামক কবিতায় কেমন মর্মস্পর্শী ভাষায় কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা আত্মােপদেশচ্ছলে মানবকে তত্ত্বোপদেশ দিয়াছেন ! সংসারের অন্তর্নিহিত নির্মম চিত্র উদঘাটিত করিয়া সৃষ্টির অনন্ত রহস্যের দিকে ইঙ্গিত করিয়াছেন, সেই অনন্তের আশ্রয় খােদাতালাতে আত্মসমর্পণ করিতে, মানবের আদিনিকেতন “পরাৎপরপরমােন্নত স্থানে (৩) অধিরােহণ করিতে উদ্বুদ্ধ (১) ছানা ও গুণগ্রাম। (২) নাজাত= মুক্তি। (৩) এই শব্দটি প্রসিদ্ধ কিমিয়ায় সায়াদাৎ বা সৌভাগ্য স্পর্শমণি হইতে গৃহীত।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্ল। করিয়াছেন। পাঠকের কৌতূহল নিবারণের জন্য উক্ত কবিতা হইতে কয়েকটি পংক্তি এস্থলে উদ্ধৃত করা হইল। ভাব মন দমে দম, রাহা দূর বেলা কম ভুখ বেশী অতি কম খানা ! ছামনে দেখিতে পাই পানি তাের তরে নাই কিন্তু রে পিয়াসা বােল আনা ! দেখিয়া পরের বাড়ী জামা জোড়া ঘােড় গাড়ি ঘড়ি ঘড়ি কত সাধ মনে, ভুলেছ কালের তালি, ভুলেছ বাঁশের চালি, ভুলিয়াছ কবর সামনে। মানবদেহের পরিণাম কেমন শােচনীয়, সংসারের ধন-জন ও বংশমর্যাদা কেমনভাবে গােরস্থানে সব বিলীন হইয়া যায়, কেমনভাবে” এই দুনিয়ার পণ্ডিত-মূখ, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, মহন ও ক্ষুদ্র সকলে একাকার হইয়া নিঝুম নীরবে সেই অকুলের কোলে অনন্ত নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, প্রাণস্পর্শী ভাষায় তাহা বর্ণনা করার পর কবি লিখিতেছেন- “রে মন, দেখিবি কত দুনিয়ার ঠাট যত, নিদ্রা কালে স্বপনের ন্যায়। ঘুম যে ভাঙ্গিলে তার দেখা না পাইবি আর, শুধু সার হবে হায় হায়। গেল এ চৌত্রিশ সাল ; এখনাে ছেলেমাে হাল গেলনা, ঘুমেই শুয়ে বলি। জাগিয়া দেখ রে এসে, পড়িয়াছ কোন দেশে, এ কোন শহর কোন গলি ! মনে হইতেছে ববির ৩৪ বৎসর বয়সে এই কবিতাটি লিখিত।
-- * *
৭৪
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা
চৌত্রিশ বর্ষের আগে, ছিলি তুই কোন্ বাগে,
কোন্ দেশে কোন শহরেতে।
সে কুঞ্জ কানন আহা ভুলিয়া গিয়াছ তাহা
ফেলে এলি কার কহরেতে!
মানবের আদিম নিবাস সেই আধ্যাত্মিক জগতের জন্য দীর্ঘনিশ্বাস
ত্যাগ করিতে করিতে কবি এই সংসারের নানা বিপদের কথা উল্লেখ করিয়া
বলিতেছেন,
ভবের বাজার এই, হেন দেশ আর নেই ;
পায় পায় ফেরে ঠগি দল !
পাইলে বিদেশী নরে
ভুলায়ে বেরাহ করে
লুটে তারে করে নিঃসম্বল।
হয়ে তুই দিশাহারা
জীবন কাটালি সারা
বেলা কিন্তু বেশী নাই আর ;
ডুবিলে হায়াত-বেলা যাবে তাের ধুলি খেলা
ভাঙ্গিবে এ ভবের বাজার ।
অতঃপর কবি মানবের একমাত্র মুক্তিপথ-প্রদর্শক মহানবী রসুলে-
মকবুলের দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিতেছেন,
শুন শুন কান খুলে,
তাকাও নয়ন তুলে
কে তােরে ডাকেরে বার বার,
ওমতি ওমতি রবে, কাদিছে পড়িয়া ভবে
মদিনার থাকে অনিবার!
কহর=কঠোরত, প্রতিকুলতা।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা
স্বর্গ মর্ত্য যার তরে
রহমান সৃজন করে,
চন্দ্র সূৰ্য্য যার বিন্দু ঘাম,
নূরী নারী খাকীতন, (১) আকাশের তারাগণ
প্রণমে শুনিয়া যার নাম।
সেই নবী ছরােয়ারে পাঠালেন পরােয়ারে
বেরাহী জনায় রাহে নিতে (২)
তাই সে আউয়াল নূরী (৩) বাজায়ে ধৰ্ম্মের তুরী
ডাকে তােরে, চল রে ত্বরিতে ।
তুরীর আওয়াজ শুনে,
খােজ তারে একমনে,
এ হাটেই দেখা পাবি তঁার ;
খাটি মাল কেনাইবে, দেশী পথ চেনাইবে,
পুজি না হারাবে তবে অর!
যে-দেশ ফেলিয়া এসে ফিরিছ অনাথ বেশে,
সে-দেশে পৌছাবে তুঝে নিয়া,
যাবে রে সকল দুখ, পাবি রে অন্য সব
ত্বরা সে দামন ধর গিয়া। (৪)
(১) নূরী=জ্যোতি হইতে উৎপন্ন ফেরেশতা। নারী=অগ্নি হইতে উৎপন্ন জেন।
থাকীতন=মৃত্তিকা নিৰ্মিত দেহবিশিষ্ট মানব।
(২) ছরােয়ার=নেতা। পরােয়ান=প্রতিপালক, খােদাতালা। বেরাহী=পথভ্রষ্ট।
রাহ= রাস্তা।
(৩) আউয়াল নূরী= প্রথম জ্যোতির্ময় ; হজরত মােহাম্মদ। খােদ যাহার আত্মা
সর্বপ্রথমে অসাধারণ জ্যোতির্ময়রূপে সৃষ্টি করিয়াছিলেন।
(৪) দামন= বস্ত্ৰাঞ্চল।
৭৬ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা তবে সে মেহেরবান, করিবে মেহের দান অফুরন আল্লার মেহের (১) লায়েলাহা ইল্লাল্লা, মােহাম্মদোর রসুলুল্লা পড় মন নােয়াইয়া ছের! (২) মেহেরুল এলাম পুস্তকখানির একটি অসাধারণ বিশেষত্ব এই যে, ইহার ভাষা অত্যন্ত সরল সৰ্বসাধারণের বুঝিবার উপযােগী ; অথচ রচনা লালিত্য ও মাধুৰ্যপূর্ণ। ইহা পুঁথি ধরণে লিখিত হইলেও ভাষা বা ছন্দগত বিশেষ কোন দোষত্রুটী চোখে পড়ে না। সুতরাং সমস্ত স্তরের লােকই প্রাণ ভরিয়া এই পুস্তকখানি পড়িতে পারে। ভাষা ও ভাবের মধ্যে ইলামী জাতীয়তা সম্পূর্ণ পরিস্ফুট। পুস্তক- খানি মুসলমান সমাজের সাধারণ স্তরে আদর্শ বলিয়া গণ্য হইবার উপযুক্ত। যেযুগে ইহা লিখিত সেই সময় মােসলেম বঙ্গসাহিত্যের এবং তাহার সাধারণ পাঠকবর্গের যে অবস্থা ছিল, তাহা বিবেচনা করিয়া এই পুস্তকখানির ও মবুহুমের অন্যান্য পুস্তকের সমালােচনার মাপকাঠি ঠিক করা কর্তব্য। (মুন্শী সাহেব মহুম জগদ্বিখ্যাত পারস্য কবি শেখ সাদী আলায়হে রহমতের প্রসিদ্ধ পন্দনামার একটী পদ্য অনুবাদ বাহির করেন।) (৩) এই ' পুস্তকখানিও সমাজে যথেষ্টরূপে প্রচারিত হইয়াছে। এই শ্রেণীর পুস্তকের প্রয়ােজন আমাদের সমাজে যে কত অধিক, আশা করি অভিজ্ঞগণ তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবেন। (১) মেহের=অনুগ্রহ। (২) “লায়লাহা ইল্লাল্লা মােহাম্মদোর রসুলুল্লা” ইহাই ইসলামের মূলমন্ত্র। ইহার অর্থ আল্লা ব্যতীত অন্য কোন উপায় নাই। মােহাম্মদ (দঃ) তাঁহার প্রেরিত। (৩) এই অনুবাদ-পুস্তকে মূল ফারসী বয়াত এবং বাঙ্গালা অক্ষরে লিখিত তাহার উচ্চারণও দেওয়া আছে।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৭৭ (মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মহুমের পুস্তকাবলীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক প্রসিদ্ধি অর্জন করিয়াছিল “বিধবা গঞ্জনা” এবং “হিন্দুধর্ম রহস্য। উক্ত উভয় পুস্তক গ্রন্থকারের মৃত্যুর পরই গভর্ণমেন্ট কর্তৃক বাজেয়াফত, হয়।) বিধবা-জীবনের করুণ চিত্র একান্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় সুললিত গদ্য এবং মধ্যে মধ্যে সুবিধামত স্থানে পদ্য ছন্দে বিধবা গঞ্জনায় অঙ্কিত করা হইয়াছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিধবাবিবাহ যে হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দোষণীয় নহে, বরং সম্পূর্ণ অনুমােদিত রাজা রামমােহন রায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ইত্যাদির প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করিয়া তাহা দেখান হইয়াছে। পুস্তক- খানির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযােগ আরােপিত হয়। “দেবলীল বা হিন্দুধৰ্ম্ম রহস্য” নামক পুস্তকখানিতে পৌরাণিক দেবদেবীগণের অনেক লীলাখেলার কথা লিখিত হইয়াছিল। হইয়াছিল। অবশ্য লিখনগুলির সমস্তই পুরাণাদি হিন্দুধর্মশাস্ত্র হইতে অবিকল উদ্ধৃত। তাহা সত্ত্বেও পুস্তকখানির কোন কোন অংশ খুব সম্ভব অশ্লীল এবং ধর্মবিদ্বেষমূলক বলিয়া প্রমাণিত হয়। (১) এইরূপে মুন্শী সাহেব মহুমের পরলােক গমনের সঙ্গে সঙ্গেই পুস্তক দুইখানি কতিপয় হিন্দুর চেষ্টায় গভর্ণমেন্ট কর্তৃক বাজেয়াফত এবং এতৎসম্পর্কে পুস্তক দু’খানির প্রকাশক ও মুদ্রাকরের জরিমানা হইয়া- ছিল। মুন্শী সাহেবের জীবিতাবস্থায় এই পুস্তকখানির অঙ্কন (১) হিন্দুগণ কর্তৃক লিখিত প্রায় সমস্ত বাঙ্গালা পুস্তকেই মুসলমান ধর্ম ও জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষের তীব্র হলাহল উদগীতি দেখিতে পাওয়া যায়। নিজের শরীরে আঘাত লাগিলে অপরের শরীরের আঘাতেও যে সে বেদনা পায়, ইহা কেহ বুঝিতে পারে না। তাই হিন্দুশাস্ত্রের বচনাবলী উদ্ধত করিয়া তিনি তাহাদিগকে এই মহাসত্য শিক্ষা দিতে চাহিয়াছিলেন। তাহার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উক্ত পুস্তকখানি বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু মুসলমান জাতির বিরুদ্ধে লিখিত হিন্দুগণের পুস্তকগুলি এখনো পর্যন্ত সমানভাবে চলিতেছে! তৎসমুদয় প্রতিরােধের তেমন চেষ্টাই দেখিতে পাওয়া যায় না। পতিত জীবত জাতির ইহা একটি জলন্ত পরিচয়। * আপত্তিজনক অংশগুলি বাদ দিয়া বা পরিবর্তিত করিয়া এই উভয় পুস্তক বিশেষতঃ ৭৮ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা ৮১০ সংস্করণ বাহির হইয়াছিল; কিন্তু এই দীর্ঘকালের মধ্যেও কেহই উল্লিখিত পুস্তক দুখানির বিরুদ্ধে কোন কথা উত্থাপন করিতে সাহস করেন নাই। মরহুমের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত চক্ষুলজ্জা ত্যাগ করিয়া তাহার এতিম বালক-পুত্রগণের ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে এই মােকদমা পরিচালিত করা হইয়াছিল ? মুর্শী সাহেবের ব্যক্তিত্ব কত অসাধারণ ছিল, পরে নিষিদ্ধ বলিয়া প্রমাণিত এই দুইখানি পুস্তক হার জীবিতকালে অনুমান ৮১ বৎসরের মধ্যেও অভিযুক্ত না হওয়ায় তাহা বেশ বুঝিতে পারা যাইতেছে। পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব কেহই এড়াইতে পারে না। এ দেশের হিন্দুসমাজের পাশে পাশে বাস করিয়া তাহাদের বহু দোষ আমাদের সমাজে প্রবিষ্ট হইয়াছে। পক্ষান্তরে ইসলামের বহু মূলনীতি অধুনা হিন্দুগণ গ্রহণ করিয়া উন্নতির পথে আরােহণ করিতে চেষ্টা করিতেছেন। একটু বিবেচনা করিয়া দেখিলেই একথা বেশ বুঝা যাইবে যে, হিন্দুজাতি উন্নত হইতেছে অনেক ক্ষেত্রেই তাহাদের ধর্মের বিধান ত্যাগ করতঃ ইস্লামী বিধান গ্রহণ করিয়া, আর মুসলমান ধ্বংস হইতেছে তাহাদের ধর্ম ইসলামকে বিসর্জন দিয়া। বিদ্যাশিক্ষা, স্পর্শদোষ ও মাদকতাবর্জন, সাম্যবাদ, তালাকপ্রথা, পর্দাপ্রথা, দায়ভাগে স্ত্রীজাতির অধিকার, ইত্যাদি হিন্দুগণ ইসলামের নিকট হইতে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে লইয়াছেন বা লইতে চেষ্টা করিতেছেন। বিধবাবিবাহ হজরত রসুলে করিমের একটি বড় ছােত; অনেক ক্ষেত্রে ইহা ওয়াজেব বা একান্ত কর্তব্য। হিন্দুগণ তাহাদের সমাজে আজকাল এই বিধবাবিবাহ প্রচলনের চেষ্টা বিধবা গঞ্জনা শীঘ্রই পুনরায় প্রকাশ করা আবশ্যক। আশা করি, সমাজের উপযুক্ত ব্যক্তি গণ অবিলম্বে এদিকে মনােযােগী হইবেন। মুনশী সাহেব মরহুমের দুইখানি অমুল্য পুস্তক এভাবে নষ্ট হইতে দেওয়া বাঙ্গালার মুসলমান সমাজের কিছুতেই কর্তব্য নহে।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৭৯ মুন্শী করিতেছেন। পক্ষান্তরে, মুসলমানগণ হিন্দুদের অনুকরণে বহুক্ষেত্রে অসার কৌলিন্যের অহঙ্কারে বিধবাবিবাহ বৰ্জন করিয়াছেন। সাহেবের বিশেষ চেষ্টায় এবং “বিধবা গঞ্জনা” পুস্তকের প্রভাবে মুসলমান সমাজে বহু স্থানে বিধবাবিবাহের প্রচলন হইয়াছে। হিন্দুসমাজেও বিধবাবিবাহের চেষ্টা হইয়াছিল, কোন কোন স্থানে এই চেষ্টা ফলবতীও হইয়াছিল। ধীরভাবে গ্রন্থাদি লিখিবার মুন্শী সাহেব মরহুমের মােটেই অবসর ছিল না। নিখিল-বঙ্গের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাহাকে সভাসমিতি উপলক্ষ্যে ক্রমাগত ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে হইত। যখন তিনি বাটীতে থাকিতেন, তখনাে ক্রমাগত জনসমাগমের বিরাম ছিল না। জীবনের নিতান্ত অল্প অবসরের মধ্যেও তিনি যে কয়খানি পুস্তক প্রণয়ন করিয়াছিলেন, তৎসমুদয় সমাজদেহে নূতন জীবনের সাড়া জাগাইয়া দিয়াছিল। প্রচারের জন্য যথােপযুক্ত চেষ্টা না থাকা সত্ত্বেও এখনাে তাঁহার অবশিষ্ট পুস্তকগুলি সমাজে বেশ চলিতেছে এবং তদ্বারা সহস্র সহস্র ব্যক্তি সুপথপ্রাপ্ত হইতেছে। কি গদ্য, কি পদ্য তাঁহার সমস্ত লেখার মধ্যেই ভাষার নূতন একটা মাধুৰ্য, নূতন এটা ঝঙ্কার ছিল। হারু বক্তৃতার ভাষাতেও এই বিশেষত্ব লক্ষিত হইত। অনুপ্রাসের ললিতলহরী-লীলা তাঁহার রচনা বা বক্তৃতার মধ্যে সর্বত্রই পাঠক ও শ্রোতৃবর্গকে মুগ্ধ করিত। তাঁহার পুস্তক পাঠ বা বক্তৃতা প্রবণকালে হাসি ও অশ্রুর মধ্যে সকলে যেন ডুবিয়া থাকিত। নানা ভাব বিদ্যুৎ-প্রবাহের ন্যায় তাহাদের হৃদয়ের মধ্যে খেলিয়া বেড়াইত। জনাব মুন্শী সাহেব যে শুধু নিজে সাহিত্যিক, কবি ও সুলেখক ছিলেন, তাহা নহে, তিনি যখনই কোন অঙ্কুরােন্মুখ সাহিত্যিক প্রতিভার পরিচয় পাইয়াছেন, তখনই উপযুক্ত সাহায্য ও উৎসাহদ্বারা তাহাকে কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা জাগাইয়া তুলিতেন, ভবিষ্যতে যাহাতে অহা সাফল্যের গৌরবে ধন্য হইতে পারে, তজ্জন্য চেষ্টার কোন ক্রী করেন নাই। প্রসিদ্ধ কবি ও সুলেখক মৌলভী শেখ ফজলুল করিম সাহিত্য-বিশারদ, নীতি- ভূষণ সাহেবের প্রথম গ্রন্থ “পরিত্রাণ কাব্য জনাব মুন্শী সাহেব নিজব্যয়ে প্রকাশ করেন, মহুম মুন্শী সাহেব সাহিত্য-বিশারদ সাহেবকে কি ভাবে উৎসাহিত করিয়াছিলেন এই পুস্তকের ভূমিকায় পাঠক তাহা দেখিতে পাইয়াছেন। তাঁহার পরলােক গমনের পর সাহিত্য-বিশারদ সাহেবের এই উপলক্ষ্যে লিখিত যে সুদীর্ঘ সুন্দর কবিতাটি সােলতানে বাহির হইয়াছিল তাহার এক স্থানে আছে, তােমারি বিপুল স্নেহ অকুল আহ্বানে হতভাগ্য এই কবি লভি নববল অবতীর্ণ হয়েছিল সাহিত্য-সংসারে ! আজি তুমি দেখিছ না হয় তার বুকে কি ভীষণ চিতানল জ্বলে ধিকি ধিকি ? প্রসিদ্ধ বক্তা ও কবি অসাধারণ তেজস্বী লেখক সৈয়দ ইসমাইল হােসেন সিরাজী মরহুম সাহেবের বাল্যজীবনে লিখিত “অনল প্রবাহ নামক অগ্নিবর্ষী জাতীয় কবিতা-গ্রন্থখানিও মুনশী সাহেব কর্তৃক প্রকাশিত। বাঙ্গালার সর্বজন-পরিচিত এই দুইজন প্রতিভাবান বিখ্যাত লেখককে জনাব মুন্শী সাহেবই সর্বপ্রথমে সাধারণ পাঠক-সমাজে পরিচিত করিয়াছিলেন। “পরিত্রাণ কাব্য সম্বন্ধে জনাব মুন্শী সাহেব মরহুম এক সময় আমাকে লিখিয়াছিলেন—“এই পুস্তকখানির ২১ কপিও মাসে বিক্রয় হয় না। কিন্তু এমন দিন আসিবে, যেদিন এই জাতীয় কাব্যখানির নিশ্চয়ই আদর হইবে। জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতির স্বপ্নে বিভাের জনাব মুন্শী সাহেব সমাজে সৎ-সাহিত্যের সৃষ্টির জন্য কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা- কবি সৈয়দ ইসমাইল হােসেন সিরাজী
No text on this page.
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা কত চেষ্টাই না করিয়াছিলেন, কত অর্থই না ব্যয় করিয়াছিলেন। মুন্শী সাহেব পুস্তক-ব্যবসায়ী বা পুস্তক-প্রকাশক ছিলেন না; কেবলমাত্র দরিদ্র প্রতিভাবান লেখকগণকে সাহায্য ও উৎসাহ দানের জন্যই তঁাহার এই প্রচেষ্টা। গ্রন্থলেখক ও প্রকাশকগণ মাত্রেই অবগত আছেন পে, কবিতাগ্রন্থ সাধারণতঃ কত কম বিক্রয় হয়। ছাপিবার এবং বিজ্ঞাপন খরচ উঠাইবারও কেহ ইহাতে আশা করেন না। তখনকার যুগে এই অশাি আরো সুদূরপরাহত ছিল। তা সত্ত্বেও মুন্শী সাহেব মরহুম সাহিত্যিক ও কবিগণকে উৎসাহ দানের জন্য অর্থ ব্যয়ের টা করেন নাই। সাহিত্যিক হিসাবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাহার নিকট যে সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি, আশা করি এক্ষেত্রে তাহার উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হইবে । আমি তখন খুলনা জিলার অন্তর্গত প্রসিদ্ধ পায়গ্রাম-কসবা গ্রামে থাকিয়া স্থানীয় মাইনর স্কুলে ২য় শ্রেণীতে পড়িতাম। বহুদিন হইতে আয়োজন করিয়া উক্ত গ্রামে একটি সভার বন্দোবস্ত করা হয়। সেই সভায় জনাব মুন্শী সাহেবকে এবং মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবকে দাওয়াত করা হইয়াছিল। ১৩০৬ সালের এই জ্যৈষ্ঠ তারিখে সভার দিন ঠিক হয়। ঐ তারিখেই আমার সহিত মুনশী সাহেবদ্বয়ের প্রথম পরিচয় হইয়াছিল। অতিবৃষ্টি নিবন্ধন ঐদিন সভার অধিবেশন হইতে পারে নাই। সমবেত জনগণকে সম্বােধন করিয়া মুশ সাহেব সামান্য কয়েকটি কথা বলিয়াছিলেন মাত্র। আপাততঃ উহাতেই আমাদিগকে সন্তুষ্ট হইতে হইয়াছিল। ১৯শে জ্যৈষ্ঠ তারিখে সুন্দরভাবে উক্ত সভার কার্য সম্পন্ন হয়। গ্রীষ্মেপলক্ষে আমাদের স্কুল বন্ধ থাকায় আমার এই সভায় যােগদানের সৌভাগ্য হয় নাই। আমি তখন শােহর জিলার অন্তর্গত ঘােষগাতি গ্রামে আমার নিজ বাটীতে ৮২ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা গিয়াছিলাম। উক্ত সভা উপলক্ষে আমি দু’টা কবিতা লিখিয়াছিলাম ; তিনি তাহা শ্রবণে আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দান করেন, এবং একান্ত অযােগ্যতা সত্ত্বেও নিজ মেহগুণে আমাকে “শিশু-কবি বলিয়া অভিহিত করিয়াছিলেন। ইহার কয়েক বৎসর পরে আমি “শের সংহার কাব্য নামক একখানি পুস্তক অমিত্রাক্ষর ছন্দে লিখিয়াছিলাম। এখন আমি বেশ বুঝি, ঐ পুস্তকখানি সংশােধন করিয়াও প্রকাশের উপযুক্ত ছিল না। তথাপি তিনি উহার কতকটা বিখ্যাত কবি মৌলভী শেখ ফজলুল করিম সাহিত্য-বিশারদের দ্বারা সংশােধনের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। উক্ত পুস্তকের সামান্য কতকাংশ মুন্শী সাহেবের চেষ্টায় “ ইম” নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। তিনি ১৩১২ সালে ২রা শ্রাবণ তারিখে তাঁহার ২৭৭নং পত্রে আমাকে লিখিয়াছিলেন,-- “আমার অর্থের অভাব না হইলে আপনার সম্পূর্ণ কাব্যখানি নিজব্যয়ে প্রকাশ করিতাম। খােদালা আমাকে জীবনে সুস্থ রাখিলে যে গতিকেই হউক পত্রিকায় এবং গ্রন্থাকারে আপনার লিখিত পুকগুলি প্রকাশ করিতে যথাশক্তি চেষ্টা করিব। মহাপ্রলয় কাব্যও শেষ করিবার চেষ্টা করুন।” আমার সুদীর্ঘ সাহিত্য-জীবনে এমন আশার বাণী আর কখনো শুনি নাই। সাহিত্যক্ষেত্রে উৎসাহ ও সহায়তা-প্রাপ্তি খুব কম মুসলমান লেখকের ভাগ্যেই জুটিয়া থাকে। জনাব মুন্শী সাহেব ব্যতীত আজ আর এমন একজন লােকের কথাও স্মরণ করিতে পারি না, আমার প্রাথমিক জীবনে সাহিত্য সম্বন্ধে ঘঁহার নিকট উল্লেখযােগ্য . ভারতে মুসলমান জাতির পতন উপলক্ষ করিয়া মহাপ্রলয় নামক একখানি পুস্তক লিখিবার ঐকান্তিক আগ্রহ এই সময় আমার হইয়াছিল। এই পুস্তকের প্রায় দুই স লিখিবার পর আর লেখা হয় নাই।
সাহিত্যিক ও কবি মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ৮৩ কোন সাহায্য বা উৎসাহ প্রাপ্ত হইয়াছি। আমার ও সমাজের একান্ত দুর্ভাগ্যক্রমে উপরোক্ত পত্র লিখিবার অত্যল্পকাল পরেই জনাব মুনশী সাহেব পরলােকগমন করেন। একটু বিবেচনা করিয়া দেখিলে এ-কথা সহজেই বুঝিতে পার। যাইবে যে,(বঙ্গীয় মুসলিম-সাহিত্যের সেই প্রাথমিক যুগে মুনশী সাহেব মরহুম সমাজকে যাহা দিয়া গিয়াছেন তাহার তুলনা নাই ১ প্রকাশিত পুস্তকগুলি ব্যতীত সাময়িক ও সংবাদ পত্রাদিতে অনেক সময় তাঁহার প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হইত। এতদ্ব্যতীত যাহাতে সমাজে উপযুক্ত সাহিত্যিক ও কবির উদ্ভব হয়, সেজন্য তাঁহার যত্ন-চেষ্টার অবধি ছিল না। এ-পর্যন্ত এমন আর কাহাকেও জানিনা, যিনি সমাজের অঙ্কুরােন্মুখ প্রতিভাকে ফুটাইয়া তুলিতে, তরুণ লেখক ও কবিগণকে সর্ববিধ সাহায্য করিয়া, উৎসাহ দিয়া গড়িয়া তুলিতে চেষ্টা করিয়াছেন। আমি জানি, আজ আমাদের সমাজের প্রতিস্তরে অসংখ্য তরুণ সাহিত্যিক ও কবি ক্ষুব্ধ অভিমানে অবস্থিতি করিতেছেন। তাহাদের সন্ধান লইবার, তাঁহাদিগকে দুইটি আশার বাণী শুনাইবার, কিঞ্চিৎ সহায়তা করিয়া, উৎসাহ দিয়া গড়িয়া পিটিয়া মানুষ করিয়া তুলিবার লোক কেহই নাই। হায়, মুন্শী মেহেরুল্লা আজ বাঁচিয়া থাকিলে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যের এতদিনে বুঝি বা যুগান্তর দেখিতে পাইতাম।
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ নানা কথা কর্মবীর মুন্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা সমাজের ও দেশের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ-সাধনের জন্য চিরজীবন প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। জাতির জন্য যেখানে যেটুকু যাহা করা আবশ্যক, তিনি তাহা করিতে কখনই কুণ্ঠিত হন নাই।(তিনি কাজ করিতেন সমস্ত প্রাণ দিয়া, অন্তর দিয়া, প্রকৃত মুসলমানের মৃত একমাত্র খােদার ওয়াস্তে) তাই তঁাহার চেষ্টা এমন অসাধারণ সাফল্যমণ্ডিত হইয়াছিল। অসার যশ-প্রলােভন কখনই তাঁহাকে প্রলুব্ধ করিতে পারে নাই। তিনি যখন যে সভায় বক্তৃতা করিতেন বা যে শ্রেণীর লােকের সহিত মিশিতেন তখন উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মান- সিকতার দিকে লক্ষ্য রাখিয়া, কোন্ শ্রেণীর কথা তাহাদের জন্য প্রয়ােজন, তাহা ভালরূপে বিবেচনা করিয়া বক্তৃতা করিতেন বা উপদেশ দিতেন। তাই সঁহার উপদেশ সর্বদাই এমন কাৰ্য্যকরী হইত। তাহার মধ্যে অহমিকার লেশমাত্র ছিল না, তিনি সকলেরই সম্মান রাখিয়া চলিতেন, গুণিগণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতেন। তাই সকলেই তাঁহাকে একান্ত আপনজনের ন্যায় ভালবাসিত ও শ্রদ্ধা করিত। তঁাহার কথা সমস্ত অন্তর দিয়া শুনিয়া তদনুযায়ী কাজ করিতে চেষ্টা করিত। ( জনাব মুনী সাহেবকে যে দেশের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই ভাল- বাসিত আন্তরিক শ্রদ্ধা করিত, তাহা তাঁহার জীবনের নানা ঘটনা হইতে নানা কথা ৮৫ পরিস্কার বুঝিতে পারা যায়। কোনরূপ সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা তাঁহার ভিতর ছিল না। তাই সকল সম্প্রদায়ের সর্বশ্রেণীর লােকই হার সভায় সমবেত হইত, তাহার বক্তৃতা শুনিয়া মুগ্ধ হইত এ-কথা পূর্বেই লিখিত হইয়াছে। যে যুগে তিনি আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তখন মুসলমান সমাজ অসাড় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় হীনতার ক্লেপৰুে নিমজ্জিত ছিল; এই কারণে এবং নিজে উক্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া তিনি বিশেষ করিয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের উদ্ধারের জন্য, কল্যাণ-সাধনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া- ছিলেন। যেমন কোন ব্যক্তির এক পা অচল অবশ হইলে তাহার পক্ষে অগ্রগমন সম্ভবপর হয় না, ঠিক সেইরূপ বাঙ্গালার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান জাতি প্রগতির পথে অগ্রসর হইতে না পারিলে মানববাচিত গুণগ্রামে বিভূষিত হইতে না পারিলে স্বদেশের প্রকৃত কল্যাণ কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। গরুর গাড়ীর একখানি চাকা ভাঙ্গিয়া অচল হইয়া পড়িলে সমস্ত গাড়ীখানিরই অগ্রগতি বন্ধ হইয়া যায়। যে অঙ্গ ব্যাধিগ্রস্ত তাহারই চিকিৎসার আবশ্যক। এই সমস্ত কারণেই মুশী সাহেব স্বদেশের এবং বিশেষ করিয়া মুসলমান সমাজের কল্যাণ-সাধনে প্রাণমন উৎসর্গিত করিয়াছিলেন। সমাজে ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রচলনের জন্য, অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রণালীতে কৃষিকাৰ্য্য বিস্তারের জন্য তাহার চেষ্টার অবধি ছিল না মুসলমান মিঠাই খাইতে জানে, কিন্তু তৈয়ার করিতে জানে না! পান খাইয়া অজস্র পয়সা নষ্ট করিতে জানে, কিন্তু পানের বরজ তৈয়ার করা অপমানজনক মনে করে। (মুনশী সাহেব মুসলমানগণকে মিঠাইয়ের দোকান করিতে, পানের বরজ তৈয়ার করিতে সর্ব স্থানেই বিশেষ উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন। তাঁহার চেষ্টা বহু স্থানেই ফলবতী হইয়াছিল। যশােহর বাজারের দড়াটানা পুলের নিকটস্থ প্রসিদ্ধ দ্বিতল মিঠাইয়ের দোকান তাহারই উৎসাহে •• ৮৬ কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা প্রতিষ্ঠিত। বিহু স্থানে নানা শিল্পকার্যে তিনি উৎসাহ দিয়াছেন। কথায় অর্থকরী বিবিধ কাৰ্য্য অলস কৰ্ম্মবিমুখ মুসলমান সমাজে প্রচলনের জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার বক্তৃতায় মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক দুর্দশার করুণ চিত্র এমন মর্মস্পর্শী ভাষায় আঁকিয়া দেখাইতেন যে, শ্রোতৃমণ্ডলী নিজেদের শােচনীয় অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করিয়া মুহুর্ত মধ্যে কৰ্ম্ম প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হইয়া উঠিত; সাহস করিয়া, বুকে বল বাঁধিয়া নূতন নূতন কর্মপথে ঝাঁপাইয়া পড়িত। এইরূপে ব্যাপকভাবে সমস্ত সমাজে একটা কৰ্ম্মের সাড়া জাগিয়া উঠিয়াছিল। জনাব মুন্শী সাহেব যেস্থানেই গিয়াছেন, সেইস্থানেই লােকদিগকে কল্যাণ-ব্রতে উৎসাহিত করিয়াছেন। যাহাদ্বারা দেশের ও সমাজের যেটুকু কাজ হওয়া সম্ভব, যাহাতে সে তাহা করিবার উপযােগী হইয়া উঠিতে পারে, মুন্শী সাহেবের তজ্জন্য চেষ্টার অন্ত ছিল না। পরলােক- গত জনাব সিরাজী সাহেবের অসাধারণ বাগ্মীতার বিষয় অনেকেই অবগত আছেন। বক্তৃতার এই প্রেরণা তিনি মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সিরাজগঞ্জের অধিবাসী মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা নামক একজন ভদ্রলোকও ইসলাম প্রচার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রসিদ্ধি অর্জন করিয়াছিলেন। সাধারণ লােকে তাঁহাকে ছানী * মুনশী মেহেরুল্লা বলিত। তিনি এবং প্রসিদ্ধ বক্তা মুন্শী মােহাম্মদ এবরাহিম সাহেব বক্তৃত সম্বন্ধে মুন্শী সাহেবের শিষ্যস্থানীয়। আজ যে দেশে মুসলমান সমাজে বহু উপযুক্ত বক্তার আবির্ভাব দেখিতেছি, মুনশী সাহেব তাহাদের অনেকেরই বক্তৃতা শিক্ষার প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ কারণ ছিলেন। এমন একদিন ছিল, যেদিন এদেশের মুসলমান সমাজে লেক্চার বা বক্তৃতার প্রচলন ছিল না, সভাসমিতির কথা * ছাশী-দ্বিতীয়।
না কথা ৮৭ লােকে বুঝিত না। মুন্শী সাহেবই ইহার সূত্রপাত করিয়া এ-দেশে মুসলমান সমাজে নৃতন জাগরণের সূচনা করেন। তাহার আবির্ভাবের পূৰ্ব্বে পুরাতন ধরণের প্রাণহীন ওয়াজের প্রচলন ছিল বটে, কিন্তু তদ্বারা সমাজে চেতনার কোনই লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় নাই। সেই উর্দু লা-মিশ্রিত নানা উদ্ভট গল্প সম্বলিত ওয়াজ সাময়িকভাবে শ্রোতাদের মনে ধৰ্মভাব জাগাইয়া দিলেও তারা স্থায়ী কোন উপকার হইত না। বিশেষতঃ সাংসারিক উন্নতি-বিষয়ক কোন ওয়াজ তখন একেবারেই প্রচলিত ছিল না। অনেকে এখনাে এই শ্রেণীর ওয়াজ নছিহত অবৈধ মনে করেন। তাহাদের মতে প্রকৃত মুসলমান যে, সে হীনতাপূর্ণ দরিদ্র-জীবন যাপন করিবে। কারণ, পরকালে যে তাহার জঙ্ক বেহেশতের হীরক-রত্ন-খচিত, হুর-গেলেমানবিশােভিত, স্বর্ণ-বিনিৰ্ম্মিত উন্নত বালাখানা রিজার্ভ করা রহিয়াছে। তাহারা বুঝিতে পারেন নাই, দীন ও দুনিয়ার সর্বাঙ্গীন সম্পদ, গৌরব ও মহিমা অর্জন করাই প্রকৃত ইস্লামের লক্ষ্য। ইস্লামের প্রত্যেক কাৰ্যে এই দীন ও দুনিয়ার সর্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনা করা হইয়া থাকে। টাকা না থাকিলে ইস্লামের নির্দিষ্ট একান্ত কর্তব্য কাৰ্যগুলিও সংসাধিত হইতে পারে না। মুসলমানের মােনাজাতে প্রথমে দুনিয়ার পরে অখেরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করা হয়। * এই শ্রেণীর আলেম ও ওয়ায়েজ এখনাে অনেকে আছেন। অনেক মুসলমান এখনাে সংসারােমতি ধর্মের হানিজনক মনে করেন। রব্বানা আতেনা ফি নিয়া হাসনাতাও ওয়াফিল আখেরাতে হাসনাতাও অকেনা আজাবান্নায়! হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদিগকে পৃথিবীর ও পরলোকের কল্যাণ দান কর এবং অগ্নির শাস্তি হইতে রক্ষা কর ।
r কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা (দেশের ও সমাজের কল্যাণের জন্য শিক্ষাই যে সর্বাপেক্ষা প্রয়ােজনীয় মনীষী মুনশী সাহেব তাহা ভালরূপেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তিনি এই জ দেশে দেশে শিক্ষা বিস্তারকল্পে জনসাধারণকে উদ্দীপনামন্ত্রী ভাষাতে উপদেশ দিতেন। তাঁহার চেষ্টায় নানাস্থানে বহু স্কুল মাদ্রাসা সংস্থাপিত হইয়া দেশে, বিশেষ করিয়া মুসলমান সমাজে জ্ঞান প্রচারের সুবিধা হইয়াছে। মুন্শী সাহেব শুধু উপদেশ দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই প্রকৃত কর্মীর মত তিনি নিজ পরিচালনাধীনে হার বাটীর পার্শ্বে মনােহরপুর নামক স্থানে মাদ্রাসায়ে কারামতিয়া নামক একটা মাদ্রাসা স্থাপন করেন। উক্ত মাদ্রাসার জন্য তিনি অজস্ব অর্থ ব্যয় করিতেন, বই ছাত্রকে নিজ বাটীতে জায়গীর দিতেন। মরহুম মুন্শী সাহেব নিজে ইংরাজী ভবা ভালরূপ জানিতেন না; তথাপি ইংরাজী শিক্ষা বিস্তারের জঙ্গ তিনি চেষ্টার ত্রুটা করেন নাই। এই মাদ্রাসার সহিত তিনি পরে মধ্য ইংরাজী স্কুলও সংযােগ করিয়া দিয়াছিলেন। এই স্কুল ও মাদ্রাসার ছাত্রগণ যাহাতে বক্তৃতা ও তর্কশক্তি আয়ত্ত করিতে পারে তিনি জাহর ব্যবস্থা করেন। তাহারা যাহাতে ভবিষ্যৎ জীবনে কাজের লােক হইতে পারে তজ্জন্য তাঁহার চেষ্টার অন্ত ছিল না অনেকেই অবগত আছেন, মৌলানা কারামত আলী সাহেব বাঙ্গালা দেশের প্রায় সর্বত্র শেরেক বেদাত ও বহু কুসংস্কারান্ধকার বিদূরিত করিয়া ইস্লামের উজ্জ্বল মশাল প্রজ্জ্বলিত করিয়াছিলেন মরহুম হারই স্মৃতি রক্ষার জন্য তাঁহার মাদ্রাসার নাম মাদ্রাসায়ে কারামতিয়া রাখেন। ইহাও তাহার বিশেষ মহত্বের পরিচয়, তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। যিনি নিজে মহৎ তিনি সর্বপ্রযত্নে মহতের আদর করেন, তাহার স্মৃতি রক্ষার চেষ্টা করেন। যদি কখনাে খুশী সাহেবের বিস্তৃত জীবনী লিখিত হয়, তবে } নানা কথা T তাহারা সমাজের ও দেশের কত কাজ হইয়াছে তাহা সাধারণে বুঝিতে পারিবে। ফাকি দিয়া শুধু বাচাতুর্যের প্রভাবে কেহই ব্যাপকভাবে এক বিরাট দেশের জনসাধারণের প্রাণের মধ্যে আসন অধিকার করিতে পারে না। দেশের কাজে, সমাজের কাজে যে নিজকে নিঃশেষে বিলাইয়া দিতে সমর্থ কেবল সেই-ই দেশের জনসাধারণের প্রাণের প্রাণ হইয়া বিরাজ করিবার, অমরতা লাভে ধন্য হইবার সৌভাগ্য অর্জন করিতে পারে। প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে জনাব মুনশী সাহেব দেশের, বিশেষ করিয়া মুসলমান সমাজের যে কত উপকার করিয়াছেন, আমাদের দুর্ভাগ্য জীবন্মত সমাজ, দুঃখের বিষয় তাহা জানে না, এ পর্যন্ত জানিবার তেমন চেষ্টাও করে নাই। বাঙ্গালার মুসলমান সমাজ অধুনা সর্ববিষয়ে অধঃপতিত। গুণীর সমাদর নাই, সৎকর্মে উৎসাহ নাই, পরলােকগত মহাজনগণের পবিত্র স্মৃতির প্রতি সম্মান নাই। তাই আমাদের সম্মুখে কোন আদর্শ মূর্তিমান হইয়া ফুটিয়া উঠে না। তাই আমরা কোনরূপেই মাথা তুলিয়া দাড়াইতে পারিতেছি না, আমাদের জাতীয়তার মেরুদণ্ড তাই কোনরূপেই গড়িয়া উঠিতে পারিতেছে না। এই জন্যই আমাদের কমিগণ, সাহিত্যিক ও কবিগণ নীরবে কাল-সাগরে বিলীন হইয়া যাইতেছেন। তাহাদের পবিত্র স্মৃতির একটি ক্ষীণ চিহ্নও সময়-সাগরের বেলাভূমিতে অঙ্কিত হইতে পারিতেছে না। যে আদর্শ সম্মুখে রাখিয়া আমরা বড় হইতে পারিব আমাদের মধ্যে সে আদর্শের একান্তই অভাব। এই জন্যই আমাদের সমাজে তেমন গুণীজন আবির্ভূত হইতেছেন না। যাহার একদিন অসাধারণ প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়া দেশের গৌরব বন্ধন করিতে পারিতেন তাহারাও সাধারণের উৎসাহ ও সমাদরের অভাবে স্ফূৰ্ত্তিহীন, অবসন্ন ও জীবন্মত হইয়া পড়িতেছেন। জাতীয় জীবনের ইহা e কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা অপেক্ষা শোচনীয় ব্যাধি বােধ হয় আর কিছুই হইতে পারে না। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের সহিত এই স্থানে আমাদের পার্থক্য যে কত অধিক, অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ তাহা চিন্তা করিয়া আমাদের অবস্থা সম্বন্ধে নিরাশায় অবসন্ন হইয়া পড়িবেন, সন্দেহ নাই। তাঁহাদের মধ্যে প্রতিভার আদর আছে, তাই হিন্দু সমাজে প্রতিভাবান ব্যক্তির অভাব হইতেছে । অজি তাহাদের কীর্তিচ্ছটায় সমগ্র জগতের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি ভারতের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছে। মুন্শী সাহেব মহুমের আকৃতি অতি সাধারণ ধরণের ছিল। অপরিচিত ব্যক্তি তাহাকে দেখিয়া তিনি যে একজন অনন্যদুল্লভ প্রতিভাশালী দেশ বিখ্যাত ব্যক্তি, তাহা কিছুতেই অনুমান করিতে পারিত না। জনসাধারণের সহিত তিনি অতি সরলভাবে, একান্ত সাধারণ ব্যক্তির ন্যায়ই মিশিতেন। তাহার উপর তাহার পােষাক- পরিচ্ছদও সর্বপ্রকার আড়ম্বরবজ্জিত ছিল। বলা বাহুল্য, এই সাধারণ পােষাকের ভিতর তিনি ইমী জাতীয়তা সৰ্ব্বদাই রক্ষা করিয়া চলিতেন। তিনি বক্তারূপে বিখ্যাত হইবার পূর্বে একদিন কোন এক দূরবর্তী গ্রামে বড় একটি জিয়াফত (ভােজ) উপলক্ষে গমন করিয়াছিলেন। সেখানে কেহই তাহাকে চিনিত না। বিদেশাগত বহু জনসমাগমে সেই পাড়াটি তখন সরগরম। নানা বাড়ীর দহলিজে নানা লােক বসিয়া জটলা করিতেছে। মুন্শী সাহেব এই ভিড়ের ভিতর তেমন সুবিধামত আসর জমকাইয়া লইতে পারিতেছিলেন না। শেষে তাহার কয়েকজন সঙ্গীর সহিত এক বাড়ীর দহলিজে বসিয়া বিশেষ সুরের সহিত একখানি পুঁথি-কেতাব পড়িতে আরম্ভ করিয়া দিলেন। শুনা যায়, কাননচারী কুরকুল দলে দলে উদ্ধশ্বাসে বাঁশীর সুর-লহরীর তালে তালে বংশীবাদকের নিকট আসিয়া থাকে ; ঠিক সেইরূপই অবিলম্বে বহুলােক আসিয়া মুন্শী নানা কথা - সাহেবকে ঘিরিয়া তাহার সুকণ্ঠ-নিঃসৃত “কেতাব পড়া শুনিতে লাগিল। আসর পুরাদমে জমকিয়া উঠিল। মুন্শী সাহেবের অসাধারণ বাকচাতুর্য্য ও আলাপ আপ্যায়নে সকলেই মুগ্ধ হইল। তখন তাহার সমাদর দেখে কে! সমাজের অতি সাধারণ স্তরের সহিত তিনি কেমনভাবে মিশিয়া যাইতে পারিতেন, এই ঘটনায় তাহা বেশ বুঝা যায়। যে ব্যক্তিরই মুর্শী সাহেবের সহিত মিশিবার সৌভাগ্য হইয়াছে, সেই তাহার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়াছে। বালক বা প্রবীণ, জ্ঞানী বা নিৰ্বে'ধ, পণ্ডিত বা মূখ সকলেই তাঁহাকে একান্ত অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করিত। আমি জীবনে মাত্র একদিন তাহার সহিত তাহার বাটীতে প্রাইভেট ভাবে মিশিবার সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিলাম। তখন আমি বালক, এবং হাই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর (আজ কালকার Class VIII } ছাত্র মাত্র। আমার একখানি কবিতা পুস্তক প্রকাশ সম্বন্ধে তাহার পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ করিবার জন্য আমার জনৈক বন্ধুর সহিত একদিন সন্ধ্যার পর ছাতিয়ানতলায় তাঁহার দৌলতখানায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। তিনি বাটী নাই শুনিয়া মন বড়ই বিমর্ষ হইয়া পড়িল। আমাদের আদর যত্নের কোনরূপ ক্ৰটী হইল না। সৌভাগ্যক্রমে শেষ রাত্রিতে মুনশী সাহেব বিদেশ হইতে বাটী ফিরিয়া আসিলেন। তখন তিনি শ্রান্ত , সমস্ত রাত্রি জাগরণে অতিশয় অবসন্ন। তথাপি সারা সকাল বেলাটা তিনি আমাদের সহিত অবিশ্রান্ত ভাবে ও পূরাদমে গল্প চালাইলেন। সেও যেন একটি সারগর্ভ বক্তৃতা ! প্রত্যেক কথাই উপদেশ ও উদ্দীপনাপূর্ণ। আমার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তির এতখানি গুরুত্ব ঐ সময়ের পূর্বে আর কেহই দেন নাই। তাঁহার এই অমায়িক ব্যবহারে আমি একেবারে বিস্মিত, মুগ্ধ এবং কৃতার্থ হইয়া গেলাম। যাহার নামে সমগ্র বাঙ্গালায় দোহাই ফিরে, আজ আমি সেই মহাত্মার সহিত ঘনিষ্ট-অন্তরঙ্গভাবে মিশিবার সুযােগ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্ল, পাইলাম। ইহা অপেক্ষা সৌভাগ্য আমার আর কি হইতে পারে। আমি যে উদ্দেশ্যে গিয়াছিলাম তৎসম্বন্ধে তিনি আমাকে এমনভাবে উৎসাহিত করিয়াছিলেন যে, তাহার তুলনা নাই। ছাত্রজীবনের কবিতা-লেখক আজকালকার দিনে উপহাস ও উপেক্ষা ব্যতীত আর কিছুই লাভ করিবার আশা করিতে পারেন না। কিন্তু মুনশী সাহেব তাহার বদলে কথায় এবং কাৰ্য্যে আমার সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করিয়াছিলেন, তাহা চিরদিন স্মরণ রাখিবার উপযুক্ত। তিনি আমাকে কবিতা লিখিতে উৎসাহ দিলেও সাধারণ পাঠের দিকে যথেষ্ট মনোেযােগ দিবার জন্যও উপদেশ দিয়াছিলেন। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা বরাবর মুন্শী সাহেবই রহিয়া গিয়াছেন। কখন “মৌলভী বা “মৌলানা হন নাই। বর্তমান যুগে আমরা মহা- গৌরবব্যঞ্জক মুনশী সাহেব উপাধি আর বড় একটা দেখিতে পাই না। কাহাকেও মুনশী সাহেব বলিলে তিনি নিজেকে অসম্মানিত মনে করেন। যা’ দুই একটি বয়াত পড়িতে শিখিয়া ইজার চাপকান্ এবং পাগড়ী পরিতে পারিলেই দস্তুরমত মৌলভী! তাহা ছাড়া ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিমত্তই মৌলভী! ইহাদের মধ্যে যাহারা সরকারী চাকুরী করেন, আরবীর আলেফ বে পড়া না থাকিলেও তাঁহারা গভর্ণমেন্ট হইতে মৌলভীর ট্রেড মার্ক পাইয়া থাকেন। * আমরা এমনও দেখিতেছি, যিনি এক সময় মুনশী সাহেব বলিয়াই সৰ্ব্বত্র পরিচিত ছিলেন, সহসা তিনি মৌলভী হইয়া বসিলেন। আবার কিছুদিন পরে দেখিতে দেখিতে যেন * কোন হিন্দু ভদ্রলোকের নামের পূর্বে বাবু লিখিবার নিয়ম আছে। মুসলমান ভদ্রলােকের নামের সহিত এই বাবু শব্দের পরিবর্তে মৌলভী লিখিবার নিয়ম প্রবর্তিত হইয়াছে। এইরূপ ক্ষেত্রে মৌলভী শব্দের ব্যবহার দ্বারা ইসলামী শাস্তজ্ঞান সূচিত হয় না। বর সাধারণ সমমাত্মক শব্দরূপেই ইহা ব্যবহৃত হইয়া থাকে।
নানা কথা ডারউইনের বিবর্তনবাদের নিয়ম ( Evolution Theory) অনুসারে তিনি মৌলানা সাহেব হইয়া বসেন। “স্বদেশ মৌলানাদের কথা বাদ দিলেও কেহ কেহ যে নিজেকে নিজেই এইরূপ “প্রমােশন দিয়া থাকেন, তাহা হয়ত অনেকে লক্ষ্য করিয়াছেন। এলেম কালাম বৃদ্ধির অনুপাতে যদি এইরূপ উপাধি- গৌরব বৃদ্ধি পাইত, তাহা হইলে ত সেটা যথেষ্ট আনন্দের কথাই হইত। কিন্তু সেদিকের উন্নতি তেমন কিছু না হওয়া সত্ত্বেও উপাধির এই যে আড়ম্বর বৃদ্ধি, জনাব মুনশী সাহেব মরুহুমের ভিতর তেমন কিছুই ছিল না। তাই তিনি চিরদিনই মুন্শী সাহেব ! চিরপরিচিত, চিরআদৃত, চিরঅভিনন্দিত মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব যখন পূর্ণ গৌরবে পূর্ণকল শশধরের ফায় সমাজগগনে প্রতিষ্ঠিত, তখন জনাব মৌলানা মােহাম্মদ আকরম খা সাহেব অল্পবয়স্ক যুবক মাত্র। মৌলানা সাহেব ভলান্টিয়ায় বেশে নানা স্থানে ভ্রমণ করিতেছিলেন। এমন সময় একদিন রাজশাহীতে কি একটা কনফারেন্সে যাইবার সময় ষ্টিমারে মুন্শী সাহেবের সঙ্গে তাহার সাক্ষাৎ হয়। জনাব মৌলানা সাহেব বলিয়াছেন,সেই সাক্ষাতের অল্প সময়ের মধ্যেই জনাব মুন্শী সাহেব যেভাবে তাহাকে জাতীয় প্রেরণা দান করিয়াছিলেন, তাহা চিরদিন তঁাহার স্মরণ থাকিবে। মুনশী সাহেব তাহার সর্বাঙ্গীন কল্যাণের জন্তু দোয়া করিয়াছিলেন। * তিনি তাঁহার নামের পূর্বে “মুনশী” উপাধিও পছন্দ করিতেন না। এক সময়ে তিনি একটী মােহরের দোকানে স্বীয় নামের একটী মােহর প্রস্তুত কমিতে দিয়াছিলেন। মােহ প্রস্তুতকারকগণ তাহার নামের পরিচয় পাইয়া নামের পুর্বে “মুনী” শব্দটী যোগ করিয়া দেন। কিন্তু মুনশী সাহেব ঐ মােহর ব্যবহার কালে নিজেই শব্দটা উঠাইয়া দিয়াছিলেন ৯৪ কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরু উক্ত মৌলানা সাহেব প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতিরূপে যশােহরের অন্তর্গত নড়াইলে যে অভিভাষণ পাঠ করিয়াছিলেন তাহার এক স্থানে তিনি বলিয়াছিলেন,-“কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভে স্ব সমাজের দৈন্য দুর্দশার যে তীব্র অনুভূতি আমার মন ও মস্তিষ্ককে বিচলিত করিয়া তুলিয়াছিল, আপনাদের এই যশােহরেরই একজন ক্ষণজন্মা মুসলমান কৰ্ম্মবীরের ( মুন্শী মেহেরুল্লার) সাধনার আদর্শ তাহার মূলে অনেকটা প্রেরণ যােগাইয়া দিয়াছিল।” ইলামের সহিত খৃষ্টানধৰ্ম্মের ইতিহাস- বিত সংঘর্ষ ইস্লামের জন্মদিন হইতেই বরাবর চলিয়া আসিতেছে। পূর্বযুগে জেহাদ ও ক্রুসেড নামে তরবারী দ্বারা যে সংগ্রাম পরিচালিত হইত এখন তাহ প্রধানত লেখনীর সাহায্যে হইয়া থাকে ইহাই যা প্রভেদ। এই উভয় ধৰ্ম্মের সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ট। উভয় ধৰ্ম্মই খােদায়ী কেতাবে এবং পয়গম্বরে বিশ্বাস করে। ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদের ন্যায় ইহাদের সংঘর্ষ চিরদিনই অত্যন্ত ভীষণ। বাঙ্গালা দেশে মুন্শী সাহেব এই সংগ্রামে ইসলামের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। সে সমস্ত বিবরণ পূর্বেই লিখিত হইয়াছে। হিন্দুধর্মের সহিত তাহার তেমন কোন সংঘর্ষ হয় নাই। হিন্দুধর্ম চিরদিনই অন্তর্মুখী, বাহিরে প্রাধান্য বিস্তারের জন্য ইতােপূর্বে ইহা কোন চেষ্টা করে নাই। নিজের অতি পুরাতন ক্ষুদ্র কুটীরে নিজের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখিয়া, জগতের সংস্রব সাবধানে এড়াইয়া সাত্ত্বিক ঋষির ন্যায় ইহা দিন কাটাইতে চাহে। * সুতরাং ইসলামের সহিত ইহার তেমন কোন সংঘর্ষ কোনদিনই হয় নাই। মুন্শী সাহেব * কিছুদিন হইতে আৰ্য নামধেয় একশ্রেণীর হিন্দু অপর ধর্মাবলম্বীকে হিন্দুধর্মে গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। কিন্তু নিষ্ঠাবান সনাতনী হিন্দুগণ এই আৰ্যগণকেই হিন্দু বলিয়া ধীকার করেন না। জাৰ্য্য ও সনাতনী হিন্দুদের মধ্যে বহু সংঘর্ষ হইয়া গিয়াছে।
নানা কথা মছমের সহিতও হয় নাই। হিন্দু লেখকগণের মােসলেম-বিদ্বেষ-বিষপূর্ণ গ্রন্থাবলীর পান্টাম্বরূপ দেব লীলা” লিখিবার জন্য তিনি অনেক হিন্দুর অপ্রীতিভাজন হইয়াছিলেন, সন্দেহ নাই। কিন্তু শাস্ত্রোদ্ধৃত বিষয় বলিয়া কেহই এই গ্রন্থের প্রতিবাদ করিতে পারেন নাই। পক্ষান্তরে আমি যতদূর জানি, শিক্ষিত ও সুরুচিসম্পন্ন হিন্দুসমাজ এই সমস্ত পৌরাণিক দেব-দেবীর ও তাঁহাদের লীলা-খেলার প্রতি কখনই তেমন ভক্তি শ্রদ্ধা পােষণ করেন না। তাহারা একেশ্বরে বিশ্বাসী। দেব- দেবী সমূহকে ব্রাহ্মণদের কল্পিত বলিয়াই তাহারা জানেন এবং সেকথা প্রকাশ্যভাবে প্রচার করিতেও তাঁহারা কুষ্ঠিত নহেন। * এই সমস্ত কারণে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুগণ বরাবর মুনশী সাহেবকে শ্রদ্ধা করিতেন । এমন কি, হিন্দুধৰ্ম্মের অদ্বিতীয় সংস্কারক মহাপণ্ডিত শঙ্করাচার্যের সহিত তাঁহার তুলনা করিতেও কুণ্ঠিত হইতেন না। পক্ষান্তরে, খৃষ্টানগণও তাহার অসাধারণ প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন। তাহাদের অনেকে তাঁহাকে মুসলমান সমাজের মার্টিন লুথার নামে অভিহিত করিতেন। তঁাহার মৃত্যুর পর হিন্দু ও খৃষ্টান সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি শােক প্রকাশ ও তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করিয়া পত্রাদি লিখিয়াছিলেন। দুঃখীর দুঃখে সর্বদাই সহানুভূতিতে মুন্শী সাহেবের হৃদয় বিগলিত * আৰ্য সমাজ কর্তৃক প্রকাশিত “দেবদেবী ও প্রতিমা পূজা” গ্রন্থ দ্রষ্টব্য। ব্রাহ্ম ও আৰ্য সমাজের ব্যক্তিগণ লােক গণনার হিসাবে আপনাদিগকে হিন্দু বলিয়া পরিচিত করিয়া থাকেন। কিন্তু এই দুই সম্প্রদায়ের কোনটিই দেব-দেবী ও এতিমা পূজা সমর্থন করেন না। বহু উচ্চশিক্ষিত উদার হিন্দুও বহু দেববাদ বা প্রতিমা পূজার সমর্থক নহেন। বেদ হিন্দুপণের সর্ব প্রধান ধর্মগ্রন্থ বলিয়া অভিহিত, ইহাতে শিব, দুর্গা ইত্যাদি দেবতাগণের নাম পর্যন্তও উল্লিখিত নাই। উপনিষদ হিন্দুগণের অশেষ একাভাজন ধর্মগ্রন্থ, ইহা নিরাকার একেখয়- বাদের পূর্ণ সমর্থন করে।
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা হইত। যশােহর বাজারে একজন অন্ধ তামাক বিক্রয় করিত। বাটী হইতে সে মাখা তামাকের তাল পাকাইয়া লইয়া আসিত। ইহার এক একটি এক এক পয়সায় বিক্রয় করিত। সে অন্ধ, তাহা সত্ত্বেও অহের সুবিধার জন্য তাহার ক্ষুদ্র দোকানে একটি কেরােসিনের প্রদীপ জ্বালাইয়া রাখিত। একদিন এক দুবৃত্ত ঐপ্রদীপটি চুরি করিয়া লইয়া পলায়ন করে। অন্ধটি কিছু পরে তাহা বুঝিতে পারিয়া মনের দুঃখে উচ্চৈঃস্বরে নােদন করিতে থাকে। ঘটনাক্রমে তখন মুন্শী সাহেব সেই স্থানের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন; অন্ধের ক্রন্দনের কারণ অবগত হইয়া তিনি তৎক্ষণাৎ একটি প্রদীপ ও কিছু কেরােসিন তৈল কিনিয়া ও নিজের কাপড় ছিড়িয়া তদ্বারা সলিতা প্রস্তুত করতঃ অন্ধকে দান করিলেন। অন্ধও তাহাকে প্রাণ খুলিয়া আশীৰ্বাদ করিতে লাগিল। একদিন তাহার নিজ গ্রামে একটি বালক ঘটনাক্রমে কূপের ভিতর পড়িয়া গিয়াছিল। মুন্শী সাহেব নিজ-জীবন তুচ্ছ করিয়া তাহাকে উদ্ধার করিবার জন্য তৎক্ষণাৎ উক্ত কূপের ভিতর ঝম্প প্রদান করিলেন। তিনি অতি কষ্টে বালকটিকে উদ্ধার করিয়াছিলেন, কিন্তু অপরের সাহায্যে তিনি আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হন। সমাজোন্নতিকর সমস্ত কাৰ্য্যে তিনি সর্বদা আগুয়ান থাকিতেন। ১৩১০ সালে রাজশাহীতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির প্রথম অধিবেশন হয়। জাতীয় উন্নতির জন্য শিক্ষাই যে সর্বপ্রথম আবশ্যক, তাহ মহুম খুব ভালরূপেই জানিতেন। তাই তিনি প্রায় প্রত্যেক সভাতেই শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা সম্বন্ধে উপদেশ দিয়া জনসাধারণকে শিক্ষাপথে উদ্বুদ্ধ করিতেন। এই কৰ্ম্মযােগী শুধু বাক্য দ্বারা নহে, নিজে বাঙ্গালার সর্বত্র বহু স্কুল মাদ্রাসা স্থাপনের ব্যবস্থা করিয়াছেন। মাদ্রাসায়ে। কারামতিয়া নিজ দায়িত্বে বিশেষ প্রতিষ্ঠার সহিত পরিচালিত করিয়াছেন নানা কথা এ-কথা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মিলনের সফলতার জন্য মুন্শী সাহেব চেষ্টার কিছুমাত্র ত্রুটী করেন নাই। তাহার সুললিত ওজস্বিনী বক্তৃতা দ্বারাও তিনি এই সন্মিলনীকে সঞ্জীবিত করিয়া তুলিয়াছিলেন। ১৩১২ সালের ৯ই ও ১০ই বৈশাখ তারিখে ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত পশ্চিমগাঁয়ের জমীদার প্রসিদ্ধ খান- বাহাদুর প্রিন্স, আলি নওয়াব চৌধুরী সাহেবের বাটীতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির দ্বিতীয় অধিবেশন হয়। কনফারেন্সের শেষ দিনে মুন্শী সাহেব ধৰ্ম্ম ও শিক্ষা সম্বন্ধে হৃদয়গ্রাহী সারগর্ভ বক্তৃতা দিয়া সকলকে মুগ্ধ করিয়াছিলেন। এই কনফারেন্সের সফলতার মূলে তাঁহার কর্মশক্তি বিশেষভাবে কাৰ্য্য করিয়াছিল। পরদিন মৌলভী মােহাম্মদ মনিরজ্জমান ইস্লামাবাদী সাহেবের সহিত তাহার নানা বিষয়ে তর্ক ও আললাচনা হয়। মৌলভী সাহেব মুন্শী সাহেবের জ্ঞানের গভীরতা ও তর্কশক্তি দেখিয়া অবাক হইয়াছিলেন। এই সভার পর মুন্শী সাহেব ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত রুপসার প্রসিদ্ধ জমীদার মৌলভী আহমদ গাজী চৌধুরী সাহেবের বাটীতে এবং ঐ অঞ্চলের অন্য নানা স্থানে বক্তৃতা করেন। (সমাজদেহের যেখানে যেখানে যে যে রােগ দেখা যাইত তাহার চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসক স্বরূপ মুন্শী সাহেব ছুটিয়া যাইতেন। রাজশাহী জেলার অন্তর্গত নাটোর অঞ্চলের বহু মুসলমান হীন অবস্থাপন্ন এবং একেবারে আত্মসম্মান-জ্ঞান-জ্জিত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার নিঃসঙ্কোচে হিন্দুদের বাড়ীতে অন্নাদি আহার করিত। তাদের স্ত্রীলােকেরা পর্যন্ত বেপর্দা অবস্থায় হিন্দুদের বাড়ীতে গিয়া শ্রমসাধ্য কাজ করিতে কুণ্ঠিত হইত না। সাধারণ হিন্দুগণ মুসলমান কোন দ্রব্য স্পর্শ করিলে সৃষ্ট দ্রব্য অপবিত্র বলিয়া মনে করেন। এমন কি, কোন গৃহের ১৮ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা ভিতরে মুসলমান প্রবেশ করিলেও খাদ্যদ্রব্য ফেলিয়া দিয়া থাকেন । অথচ দেখিতে পাওয়া যায়, কুকুর কোন গৃহে প্রবেশ করিলে বা কোন খাদ্যদ্রব্য স্পর্শ করিলে তাহার পবিত্রতার কোনই হানি হয় না। তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানের প্রতি এইরূপ ঘুণাপূর্ণ ব্যবহার সমধিক প্রবল। প্রায়ই দেখা যায়, মুসলমানের পানের দোকান হইতে উচ্চ-নিম্ন কোন শ্রেণীর হিন্দুই পান ক্রয় করে না। যাহা হউক, যে জাতি সাধারণ ভাবে উচ্চ-নীচ নিৰ্বিশেষে মুসলমান সমাজকে এমন অবজ্ঞা করে, তাহাদের বাটীতে অল্প আহার করা, তাহাদের বাটীতে মুসলমান স্ত্রীলােকগণের কাজ করা কোন ক্রমেই সঙ্গত বলিয়া মনে করা যাইতে পারে না। এইরূপ কাৰ্য্য সমগ্র জাতির পক্ষে অপমানজনক, হীনতার পরিচায়ক। অবশ্য ইলাম কোন মানবকেই ঘৃণা করে না। যে কোন ধর্মাবলম্বীর সৃষ্ট বা প্রস্তুত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং শরিয়তসম্মত খাদ্য খাইতে মুসলমানের বাধা নাই। তথাপি জাতীয় গৌরব অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য যাহারা মুসলমানগণের প্রতি এইরূপ হীনতাপূর্ণ ব্যবহার করেন, তাহাদের সহিত আত্মসম্মান বজায় রাখিয়া মুসলমানের চলা উচিত। যাহারা আত্মসম্মান রাখিতে জানে জগতে কেহই তাহাদের সম্মান করে না, দিন দিন হীন হইতে হইতে তাহারা ধরণীবক্ষ হইতে বিলীন হইয়া যায়। মুন্শী সাহেব নাটোর অঞ্চলের মুসলমানগণের হীন মনােবৃত্তির পরিচয় পাইয়া তাহাদিগকে জাতীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করিতে আত্মনিয়ােগ করিলেন। যে মােসলেম- মহিলার গায়ের মহম * পুরুষের সম্মুখে যথোচিত সাবধানতা অবলম্বন ব্যতীত উপস্থিত হওয়াই আপত্তিজনক, বিধর্মীর বাটীতে গিয়া কাজ করা শাস্ত্রানুসারে যাহাদের সহিত বিবাহ হইতে পারে ।
নানা কথা তাহাদের এবং সমগ্র জাতির পক্ষে কতবড় অপমানজনক তাহা তিনি ভালরূপে বুঝাইয়া দিলেন। ইহার ফলে অল্পদিনের মধ্যে নাটোর অঞ্চলের মুসলমান সমাজের এই হীন মনােবৃত্তি তিরােহিত হইয়া গিয়াছিল। সকল দেশেই দেখা যায়, একদল লােক সমাজ ও সংসারের বাহিরে উদাসীনভাবে সন্ন্যাস-জীবন যাপন করিয়া থাকেন। ইহাদের মধ্যে অনেকে যে বাস্তবিকই সংসারবিরাগী, তপস্বী, সাধক, খােদা-প্রেমিক তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। এই জন্য জনসাধারণ তাঁহাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাভক্তি প্রদর্শন করিয়া থাকে। তঁাহারা আপন প্রয়ােজনের জন্য কিছুই উপার্জন করেন না। জনসাধারণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া হাদিগকে নানারূপ উপহার ও নজর দিয়া থাকে। যাহারা বাস্তবিক আদর্শ চরিত্র, কঠোর সাধনার ব্রত যাহারা গ্রহণ করিয়াছেন—আহার নিদ্রা ও শারীরিক অন্যান্য প্রয়ােজনের দিকে যাহাদের লক্ষ্য নাই, তাহাদিগকে শ্রদ্ধা করা, তাঁহাদের ভরণপােষণের ব্যবস্থা করা সমাজের অন্যতম কর্তব্য তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু বর্তমানে যােগী সন্ন্যাসী ও দরবেশ ফকিরের নামে অসংখ্য ভণ্ড, প্রতারক ও জুয়াচোরের আবির্ভাব হইয়াছে। বাহিরে বৈরাগ্যবস্ত্র পরিধান করিলেও এবং সংসারের সহিত নির্লিপ্তভাব দেখাইলেও ইহারা প্রকৃতপক্ষে ভয়ঙ্কর ভণ্ড। ইহাদের দরবেশী বা সন্ন্যাসব্রত অনেক ব্যবসায়ের নামান্তর মাত্র। প্রায়ই তাহার চরিত্ৰভ্ৰষ্ট। ফকির সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে বহু দস্যু ও খুনী আসামী পর্যন্ত অনেক সময় আত্মগােপন করিয়া থাকে। যে মানব, মানবীয় সর্ববিধ কর্তব্য সাধনেই হার নিরত থাকা উচিত। যাহারা আদর্শ সাধু, আদর্শ দরবেশ, তঁাহারা সংসারে জড়িত থাকিয়াও সেই নিখিল নাথের চরণে মতি স্থির রাখিতে পারেন। তাহার ধ্যান সাধনায় আপনাকে বিলাইয়া দিতে পারেন। কপট ও ১০০ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা এইভাবে সংসার বজায় রাখিয়া নিভৃতে খােদা-প্রেমে নিজেকে বিলাইয়া দেওয়াই ইসলামের বিধান। হজরত মােহাম্মদ (দঃ) পারিবারিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সৰ্ববিধ কর্তব্যে সর্বদা জড়িত থাকিয়াও সেই বিশ্বনাথের চরণে সৰ্ব্বদা উৎসর্গিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি বলিয়াছেন, ইমে জেহাদ ব্যতীত কোনই সন্ন্যাস নাই।* এ-দেশের অনেক তথাকথিত মুসলমান এই তথ্য না বুঝিয়া হিন্দু-সন্ন্যাসীদের আদর্শে ফকির দরবেশ সাজিয়া দেশে নানা অনাচারের সৃষ্টি করিয়া থাকে। ইহারা নামাজ রােজা ইত্যাদি শরিয়তের অবশ্য প্রতিপাল্য কাৰ্যসমূহ কিছুই করে না। নানা প্রকার চাতুরীর সহিত ইহারা লােকদিগকে মুগ্ধ করে। ইহাদের অনেকে এমনই অধঃপতিত যে কাপালিক, অঘােরপন্থী ইত্যাদি হিন্দু সন্ন্যাসীদেব অনুকরণে মলমূত্র পর্যন্ত আহার করিতে ঘৃণা বােধ করে না। এ-দেশে এই শ্রেণীর ফকিরকে সাধারণতঃ নেড়ার ফকির বলে। ইহারা ইবলিসের প্রতিনিধিরূপে সহস্র সহস্র ব্যক্তিকে বিপথে চালাইয়া থাকে। এই শ্ৰেণীয় শত শত নেড়ার ফকির মুৰ্শী সাহেবের নিকট তওবা করিয়া খাটি চরিত্রবান মুসলমান হইয়াছিল। মুনশী সাহেবের বাটীর নিকটেই এড়ােলের বিলের দক্ষিণপার্শ্বে একটী স্থান জঙ্গলাবৃত ছিল। একদিন হঠাৎ সেখানে একজন ফকিরের আবির্ভাব হইল। দেখিতে দেখিতে তাহার অনেক ভক্ত ও চেলা জুটিয়া গেল। ফকির জঙ্গলের পাশ্বে বাস করিত বলিয়া তাহার নাম হইল জঙ্গলপীর। সপ্তাহে দুই দিন জঙ্গলপীরের আস্তানায় মেলা বসিত। হাজার হাজার লােক নানা হাজত লইয়া এই পীরের আস্তানায় হাজির হইত। দেখিতে দেখিতে জঙ্গলপীরের নামে গ্রাম্য ধুয়া বাধা হইয়া গেল, * লা রাহবানিয়েত, যি ইসলাম ইল্লা জেহাদ। (হাদিছ শরিফ) নানা কথা ১০১ ৬ । + LA অত্র : জঙ্গলপীর, মঙ্গল কর, আইছি তােমার থানে বাবা, আইছি তােমার থানে। সহস্র সহস্র হিন্দু মুসলমান স্ত্রীলোেক বেপর্দা অবস্থায় এই আস্তানায় হাজিরা দিতে লাগিল। জনাব মুন্শী সাহেব তাহার বাটীর নিকটেই এই ব্যাপার দেখিয়া মরমে মরিয়া গেলেন। যে মুন্শী সাহেব সমগ্র বাঙ্গালা ও আসাম প্রদেশে হেদায়েত করিয়া বেড়ান, তঁহার বাটীর পার্শ্বেই শরিয়তবিরুদ্ধ এই ভীষণ অনাচার! তিনি অনেক লোককে অনেকরূপ বুঝাইলেন। কোনই ফল হইল না। অবশেষে এতৎসম্বন্ধে একখানি ক্ষুদ্র কেতাব সুললিত সহজ ছন্দে লিখিয়া স্থানীয় বিশেষতঃ ঐ আস্তানায় সমবেত জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করিতে লাগিলেন। হার এইরূপ ক্রমাগত চেষ্টায় কিছুকাল পরে ঐ পীরের আস্তানা উঠিয়া গেল। (১) পরহিতৈষণা, অপরকে গড়িয়া পিটিয়া মানুষ করিতে চেষ্টা করা মুন্শী সাহেবের চরিত্রের একটি প্রধান বিশেষত্ব ছিল, এ-কথা পূৰ্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব দেশবিখ্যাত ইমপ্রচারক হইতে পারিয়াছিলেন, মুনশী সাহেবেরই কল্যাণে। মেহের চরিতেই প্রকাশ,তিনি শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবকে সমাজে সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন। তিনি বাঙ্গালার সর্বত্র তাঁহার দাওয়াত দেওয়াইতেন, ছায়ার ন্যায় সর্বদা তাহাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখিতেন, সংবাদপত্রে তাহার উচ্চ প্রশংসা প্রকাশ করিয়া বাঙ্গালী মুসলমানকে তিনি “অন্ততঃ একদিন তঁহার মুখের সুধাময় (১) ছাতিয়ানতলার নিকটবর্তী বেনিয়ালি গ্রাম নিবাসী মুনস্ট আবদুল বারী সাহেবের নিকট এই বিবরণী এবং আরো দুই একটি বিবরণ প্রাপ্ত হইয়াছি। এজন্য তিনি আমার ধন্যবাদভাজন।
১০২ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্ল। উপদেশ শ্রবণ করিয়া জীবন সার্থক করিতে অনুরােধ করিয়াছিলেন। বাঙ্গালার শত শত বক্তা তঁাহার বক্তৃতা-শক্তিতে সঞ্জীবিত হইয়া সমাজসেবায় আত্মনিয়ােগ করিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহাদের অনেকে এখনাে দেশে দেশে ইলাম প্রচারে নিয়ােজিত আছেন। সাহিত্যিক ও কবিগণ তঁহার নিকট কিভাবে উৎসাহ ও সহায়তা পাইয়াছেন, তাহা পূৰ্বেই লিখিত হইয়াছে! কোনরূপ সঙ্কীর্ণতা তাহার মধ্যে দেখা যাইত না। আজকালকার মােসলেম-সাহিত্যের অনেক কর্ণধার যেমন স্ব স্ব অনুগত ও স্তাবক লেখকগণকেই সৰ্ব্বতােভাবে উৎসাহ দিয়া থাকেন, অপরের দিকে মনােযােগ দেওয়া তেমন আবশ্যক মনে করেন না, সমাজে সামান্য প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়া অপরকে মানুষ বলিয়া গ্রাহ্য করিতে চাহেন , তাহার মধ্যে তেমন কোন সঙ্কীর্ণতা, হীন মানসিকতা কখনই দৃষ্ট হইত না। তাই সকল দলের সকলেই তাহাকে সমানভাবে ভালবাসিতেন। বাহার মধ্যে যেটুকু প্রতিভার অঙ্কুর তিনি দেখিতেন তাহাই সঞ্জীবিত করিয়া সমাজের কাজে লাগাইতে তিনি চেষ্টার ত্রুটী করেন নাই। ফলতঃ কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লার নিকট সমাজের কল্যাণজনক কোন পন্থাই উপেক্ষিত হইত না। সকল দিকেই তাহার কর্মতৎপরতা সমানভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। গুণের অধিকারী হইয়াও জনাব মুন্শী সাহেব বিনয়ের অবতার ছিলেন। বালকোচিত সরলতা লইয়াই তিনি সকলের সহিত আলাপ করিতেন। আমি যখন সামান্য একটা স্কুলের ছাত্র ছিলাম, তখন তিনি কেমন অমায়িকভাবে কত দীর্ঘকাল আমার সহিত কথা বার্তায় অতিবাহিত করিয়াছিলেন, তাহা পূৰ্বে লিখিত হইয়াছে। তিনি বাঙ্গালা ভাল জানেন না, তবুও কয়েকখানি পুস্তক লিখিয়াছেন, মুন্শী জমিরুদ্দীনের নিকট লিখিত একখানি পত্রে এইরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন।
নানা কথা যাহার ভাষার অতুলনীয় লালিত্যে ও মাধুর্যে তখন সমগ্র মােসলেম-বঙ্গ মুগ্ধ, ক্রমাগত সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশিত হইয়া যাহার পুস্তকগুলির অসাধারণত্ব ঘােষণা করিয়াছে, তাহার এই উক্তি অসামান্য বিনয়ের পরিচয় সন্দেহ নাই। তাহার পােষাক পরিচ্ছদ ও চালচলনের ভিতর হইতে সর্বদাই অসাধারণ বিনয়-মাধুরী ফুটিয়া বাহির হইত। তিনি বক্তৃতার মধ্যে ও কথাবার্তায় প্রয়ােজনমত হাস্য-কৌতুকের অবতারণা করিতেন। তাহার বক্তৃতা চাটনী সংযুক্ত পলায়ের ন্যায় বড়ই মধুর অনুভূত হইত। চোখের জলের পাশেপাশে হাসির উচ্ছাস—যেন জলদজালাবৃত অমা- নমিনীর নিবিড় তিমির পটলের পাশে দামিনীর উজ্জ্বল ঝলক। শহর কথার কষাঘাত মিছরির ছুরির ন্যায় যাহার অন্তরে গিয়া বিদ্ধ করিত সেও তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট হইত না। হাসিমুখেই তাঁহার আঘাত বরণ করিয়া ইহাতে ইত। বিশাল বঙ্গের প্রত্যেক অঞ্চলে, প্রত্যেক জেলাতেই মুনশী সাহেবের মান আদর, সমান প্রভাব ছিল। নিখিল-বঙ্গ-মােসলেম তাহার নামে মস্তক অবনত করিত। এরূপ সার্বভৌম লােকপ্রিয়তা এ-দেশে অার কোথাও দেখা যায় নাই। সাধারণত দেখা যায়, যে বক্তৃতা পণ্ডিত ও জ্ঞানী সমাজের উপযােগী, সাধারণ জনগণ তাহা বুঝিতে পারে না, পছন্দ করে না। পক্ষান্তরে যে বক্তৃতা জনসাধারণ শুনিয়া মুগ্ধ হয়, বিছান ও সমাজের উচ্চ স্তরের সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণ তাহাতে আকৃষ্ট হইতে পারেন না ; কারণ তাহার মধ্যে তঁাহাদের মানসিক খােরাক খুব কমই থাকে। বিশেষ আশ্চর্যের বিষর এই যে, জনাব মুন্শী সাহেবের বক্তৃতা, ইতর ভদ্র, পণ্ডিত মূর্থ নির্বিশেষে সকলেই সমানভাবে আগ্রহের সহিত শুনিত, সকলেই তাহা হইতে সমান ভাবে উপকার লাভ করিত। তাই আমরা দেখিয়াছি তাহার নামে একদিকে যেমন পঙ্গপালের ন্যায় গ্রাম্য জনসাধারণ ছুটিয় ১০৪ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্ল ~~~~~ আসিত, ঠিক সেইরূপ বিশিষ্ট হিন্দু মুসলমান পণ্ডিত ও সুশিক্ষিত ভদ্র- মগুলীও তঁাহার সভায় পূর্ণ আগ্রহের সহিত সমবেত হইতেন। রংপুর টাউনের একটি সাধারণ সভায় বহু সুশিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলােক তাঁহার গো-হত্যা সম্বন্ধে বক্তৃতা শুনিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। স্থানীয় পণ্ডিত মহা- মহোপাধ্যায় যাদবেশ্বর তর্কালঙ্কার মহাশয় তাহার গলায় গলায় মিলিয়া শত শত প্রশংসা করিয়াছিলেন।** গাে-হত্যা সম্বন্ধে বক্তৃতা করিয়া সুশিক্ষিত হিন্দু সমাজের এইরূপ প্রশংসা অর্জন করা একজন মুসলমান বক্তার পক্ষে কতবড় কৃতিত্বের পরিচায়ক, অভিজ্ঞ পাঠক তাহা একবার বিবেচনা করিয়া দেখিবেন। ১৩০৮ সালের ২২শে মাঘ গরিখে বগুড়ার টসন হলে সভা হইবার কথা ছিল। কিন্তু মুন্শী মেহেরুল্লার সভার শ্রোতৃবর্গের স্থান সাধারণ হলে হইতে পারে না। অগত্যা উক্ত হলের সম্মুখস্থ বিরাট ময়দানে সভার অধিবেশন হইয়াছিল। বগুড়ার নওয়াব সৈয়দ আবদুস্ সােবহান বাহাদুর, স্থানীয় ডেপুটি, মুন্সেফ, উকিল এবং অন্য যাবতীয় ভদ্রলোক ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেই মাঘ মাসের দারুণ শীতের দিনে এই খােলা মাঠে রাত্রি ১০ দশটা পর্যন্ত জনাব মুনশী সাহেব ওয়াজ করিয়াছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, উল্লিখিত ভদ্রলােকগণ শীতের সমস্ত কষ্ট ও অসুবিধা অগ্রাহ্য করিয়া সভা সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তন্ময়ভাবে অবস্থিতি করিয়াছিলেন। তঁাহার বক্তৃতা শুনিয়া লােকে তৃপ্ত হইত না। ১৩০৮ সালের ৩রা, ৪ঠা, ও ৫ই, আষাঢ় তারিখে পর পর তিনদিন পাবনা টাউন হলে তিনি বক্তৃতা করেন। এই সভায় সুপ্রসিদ্ধ কবি ও বক্তা শিরাজী সাহেব ও মুন্শী মােহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেব এবং অন্য বহু বিশিষ্ট ভদ্রলােক উপস্থিত ছিলেন। কুচবিহারের টাউন মেহের চরিত ৬৩ পৃষ্ঠা নানা কথা --- yvvv New হলে একবার মুনশী সাহেব অসাধারণ বক্তৃতা প্রদান করেন। তাহাতে তাঁহার খ্যাতি শুধু বাঙ্গালায় নহে, বাঙ্গালার বাহিরেও বহু দূর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। কুচবিহারের মহারাজের দেওয়ান বাহাদুর ঐ সভার সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। ঐ অঞ্চলের বহু রাজকর্মচারী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি উক্ত সভায় উপস্থিত থাকিয়া মুর্শী। সাহেবের বক্তৃতার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। আসাম প্রদেশেও তাঁহার অবারিত গতি ছিল। জীবনে তিনি কত সভাসমিতি করিয়াছেন তাহার ইয়ত্তা নাই। নিখিল-বঙ্গের এমন স্থান ছিল না, যে স্থান তাহার মধুর বক্তৃতা-ঝঙ্কারে মুখরিত হয় নাই। এক কথায় বলা যায় যে, বক্তৃতার এরূপ সাৰ্বভৌম সম্রাট বাঙ্গালা দেশে আর কখনাে দেখা যায় নাই। জনাব মুন্শী সাহেব বাল্যজীবনে ক্রীড়াকৌতুকের খুবই অনুরক্ত ছিলেন। তাহার শারীরিক শক্তিও অসাধারণ ছিল। মানবজীবনের নানাদিকের অভিজ্ঞতা তিনি লাভ করিয়াছিলেন। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পূর্বে তিনি কিছুদিন যশােহর ডিষ্ট্রিক্টবাের্ডে একটি চাকুরীতে নিযুক্ত হন। স্বাধীনচেতা মুনশী সাহেবের এই পরাধীন জীবন ভাল লাগিল না। তাই দরিদ্র মেহেরুল্লা চাকুরী-জীবনের এই নিশ্চিন্ত উপার্জনের ও শান্তির আশা ত্যাগ করতঃ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝাপাইয়া পড়িয়! দর্জির কাজে আত্মনিয়ােগ করিলেন। ইহাও হার কম মনােবলের পরিচয় নহে। প্রতিভার আদর সর্বত্র। সাধনাই প্রতিভাকে ফলপ্রসূ করিয়া থাকে। তাই আমরা দেখিয়াছি, এই সাধারণ দর্জি মেহেরুল্লা কেমন করিয়া অত্যল্প সময়ের মধ্যে উচ্চ দজ্জি বিজ্ঞান আয়ত্ত করিয়: যশােহরের শ্রেষ্ঠতম ইংরাজ রাজকর্মচারিগণের উন্নত শ্রেণীর পােষাক পরিচ্ছদ প্রস্তুত-কার্যে নিযুক্ত হইয়াছিলেন এবং ক্রমে ক্রমে তাহাও ছাড়ি কৰ্ম্মবীর মুশী মেহেরুল্লা। দিয়া বাঙ্গালার মুসলমান সমাজের সর্বজনপ্রিয় সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুসিংহরূপে অসাধারণ প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়াছিলেন। বাঙ্গালা দেশের পল্লীগ্রামের সর্বত্র যাত্রা, কবি, ভাসান, ধুয়া ইত্যাদি নানা প্রকারের গান হইয়া থাকে। গানের নামে দূর দুরান্তর হইতে লােক ভাঙ্গিয়া আসে ! এই সমস্ত গানের মধ্যে অনেক অশ্লীল ও কুৎসিৎ বিষয়ের আলোচনা হইয়া থাকে। তজ্জন্য এবং অন্য নানা কারণে ইহা দ্বারা সাধারণ সরল প্রকৃতির গ্রামবাসিগণের নৈতিক অবনতিই ঘটিয়া থাকে। গানের একটি ভাল দিক আছে, সন্দেহ নাই। এই সমস্ত গ্রাম্যগান ভালভাবে ভাল উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হইলে তদ্বারা অনেক কল্যাণ হইতে পারে বলিয়া আমি মনে করি। কারণ, গ্রামের নীরস একঘেয়ে জীবনে মধ্যে মধ্যে নির্দোষ আমােদ-প্রমােদের ব্যবস্থা হওয়া আবশ্যক। তবে যাহাতে তৎসহ নৈতিক অবনতির কোন কারণ না হয়, এবং শ্রোতাগণ আনন্দের সহিত উপকারও লাভ করিতে পারে সেইরূপ ব্যবস্থা হওয়া প্রয়ােজন। যাহা হউক, বর্তমানে যে ভাবের গান দেশে প্রচলিত আছে, তাহা যে সমূহ অকল্যাণজনক, তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই। মুশী সাহেব তাহার প্রাথমিক জীবনে এই সমস্ত গান অনেক সময় শুনিয়া- ছেন ; শুনিয়া নিরতিশয় ব্যথিত হইয়াছেন। তাহার পুস্তকে ও বক্তৃতায় ইহার বিরুদ্ধে তীব্র মন্তব্য প্রকাশিত হইয়াছে। কখনাে কখনাে এমনও ঘটিয়াছে যে, তিনি গানের মজলিসে উপস্থিত হইয়া হঠাৎ সুযোগ মত গানের বিরুদ্ধেই বক্তৃতা আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন। জনসাধারণ গান ফেলিয়া মুগ্ধ চিত্তে তঁাহার বক্তৃতা শুনিয়াছে, অনেকে তওবা করিয়াছে। ইহাতে গানের দলের লােকেরা বা গানের বন্দোবস্তকারিগণ কেহই অসন্তুষ্ট হন নাই ; বরং সমধিক আনন্দ লাভ করিয়াছেন। মরহুম মুনশী সাহেব বাঙ্গালার মুসলমান সমাজে শিক্ষা বিস্তার ও ;
নানা কথা ১৭ e ধর্মপ্রচারের জন্য সমধিক চেষ্টা করিতেন। তাহারা যাহাতে খাটা মুসলমানের ন্যায় জ্ঞানে, চরিত্রে ও অর্থ-সম্পদে সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পারে, ইহাই তাহার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। রাজনৈতিক উন্নতি সৰ্বতােভাবে শিক্ষার উপর নির্ভর করে। অশিক্ষিত জাতির বা ব্যক্তির পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রমত্ত হওয়া বিড়ম্বনার নামান্তর মাত্র। মুশ সাহেব এ-কথা ভালরূপে বুঝিতেন। তাই সমাজের শক্তি যাহাতে বিপথে পরিচালিত হইতে না পারে, এই উদ্দেশ্যে তখনকার তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলনে তিনি যােগদান করেন নাই। এই স্বদেশী আন্দো- লনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক-অর্থাৎ বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদ রহিতকরণ। তাই আমরা দেখিয়াছি, বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদ রহিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন থামিয়া গিয়াছিল। তখনকার “স্বদেশী” স্বদেশীর জন্য নহে, বরং রাজনৈতিক অস্ত্রস্বরূপ ব্যবহৃত হইত। মুসলমান সমাজের পক্ষে এই আন্দোলনে যােগ দিবার প্রতিকূলে আরাে অনেক যুক্তি ছিল। অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ অবগত আছেন, এই আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গেই বৃটিশ-বিদ্বেষ এবং তৎসহ বােমা পিস্তল দ্বারা গুপ্তহত্যা বা ত্রাসবাদের আবির্ভাব হয়। এই আন্দোলনের ভিতরে যে গভীর ষড়যন্ত্র নিহিত ছিল, এবং হিন্দু- রাজপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যে ইহার পিছনে জাগ্রত ছিল, তাহা মনে করিবার কারণ আছে বলিয়া অনেকেরই ধারণা। সেদিনও মিঃ বি, সি, চ্যাটার্জী বলিয়াছেন,-স্বদেশী আন্দোলনের মূলমন্ত্র বন্দে মাতরম যে আনন্দ মঠ হইতে গৃহীত সেই আনন্দ মঠের রাজনৈতিক বিরুদ্ধ-ইঙ্গিত ইংরাজের সম্বন্ধে নহে, বরং মুসলমানের বিরুদ্ধেই পরিকল্পিত। প্রকৃত স্বদেশভক্ত মুসলমান কখনই এইরূপ আন্দোলনে যােগ দিতে পারে না, মুন্শী সাহেবও পারেন নাই। মুন্শী সাহেব প্রকৃত স্বদেশীর বিরুদ্ধে ছিলেন না, কোন মুসলমানেরই তাহা হওয়া উচিত নহে। স্বদেশপ্রেম Sobre কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা। ইমানের অংশ, * এ-কথা হজরতেরই বাণী। কিন্তু দেশপ্রেমের নামে অন্য জাতির বা দেশের প্রতি অযথা বিদ্বেষও সঙ্গত নহে। আরাে কথা এই যে, তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলনের ভিতর আন্তরিকতা ছিল না, এখনাে নাই। তাই আমরা দেখিতে পাই, বড় বড় বাবুদের ও দেশনায়কদের বিলাসের উপকরণস্বরূপ যাবতীয় সামগ্রীই প্রায় বিদেশী,তাই আমরা বরাবরই দেখিতেছি, স্বদেশী প্রচারক প্রধান প্রধান সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় বিদেশী দ্রব্যের—এমন কি, বিদেশী সিগারেট ও মদ্যের বিজ্ঞাপন নিয়মিতভাবে প্রচারিত হইয়া আসিতেছে। শুনা যায়, বহু স্বদেশী নেতার সভাসমিতির জন্য এক প্রস্ত খন্দরের পােষাক থাকে। বাটীতে বা অন্যক্ষেত্রে হরদম বিলাতী বস্তু চলে। মুন্শী সাহেব বাহিরে ও ভিতরে সম্পূর্ণ একরূপ ছিলেন। তাই তিনি অন্তরে অন্তরে স্বদেশীর পূর্ণ ভক্ত হইলেও, এবং নিজ পােষাক পরিচ্ছদে তাঁহার পরিচয় দিলেও তিনি তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলনে যােগদান করেন নাই এজন্য তাহাকে নাকি উৎকট লােভনও দেখান হইয়াছিল, কিন্তু তিনি তাহাতে বিচলিত হন নাই। হিন্দু নেতাগণের আহ্বানের উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন,-“একখানি ভগ্ন ও একখানি সবল পদ লইয়া পথ চলা যেমন দুস্কর, সেইরূপ শিক্ষায় দীক্ষায় যতদিন মুসলমান হিন্দুর সমকক্ষ হইতে না পারিবে, ততদিন রাজনীতি ক্ষেত্রে হিন্দুর অনুকরণ করিতে যাওয়া মুসলমানের পক্ষে বিড়ম্বনা মাত্র। মুনশী সাহেবের দানের হস্ত সর্বদাই প্রসারিত থাকিত। জাতিধৰ্ম্ম- নির্বিশেষে দুস্থ ব্যক্তির মর্ম-বেদনায় তাহার কোমল হৃদয় বিগলিত হইত। সমাজের কাৰ্য্যে এবং আর্তের সেবায় অজস্ব অর্থ ব্যয় الوطن من الإيمان حب الوطن নানা কথা করিতেন বলিয়া যথেষ্ট আয় সত্ত্বেও তিনি বিশেষ কিছুই সঞ্চয় করিতে পারেন নাই। প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি অর্থের পূর্ণ সদ্ব্যবহারই করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার বাটীস্থ পুস্তকাগার নানাবিধ গ্রন্থাবলীতে সৰ্ব্বদা সুসজ্জিত থাকিত। ইহাতেও তাহার কম অর্থ ব্যয় হইত না। সমাজের জাগরণের ও উন্নতির জন্য বাঙ্গালা ভাষায় অভিজ্ঞ জ্ঞানােত পবিত্র চরিত্র বক্তার প্রয়ােজন যে কত অধিক, তাহা তিনি খুব ভালরূপেই বুঝিতেন। স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী তথাকথিত মৌলভী মৌলানাগণের দ্বারা যে কোনই কাজ হইতেছে না, হইতে পারে না, এ-কথা নিঃসন্দেহরূপে জানিতেন বলিয়াই তিনি মুর্শী জমিরুদ্দীন সাহেবকে ইমপ্রচার-ক্ষেত্রে আহ্বান করিয়া ১৮-১১৩০৪ তারিখে লিখিয়াছিলেন,-“আজকাল বঙ্গ- দেশে বাঙ্গালা ভাষাভিজ্ঞ ইলাম প্রচারকের এতই আবশ্যক হইয়াছে যে, আপাততঃ ২৩২৫ জন ভাল প্রচারক হইলেও সে অভাব পূরণ হয় না।” বাঙ্গালা ভাষা-জ্ঞানের অভাবে আমাদের আলেম সমাজ তাঁহাদের প্রধানতম কৰ্তব্য হেদায়েত কার্যে যে কতদূর অক্ষম হইয়া পড়িয়াছেন, তাহা অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রই অবগত আছেন। মুন্শী সাহেব বাঁচিয়া থাকিলে আজ হয় ত তাহার অন্তনিহিত এই পরিকল্পনা সফল হইত!-উপযুক্ত ইলাম মিশনের তত্ত্বাবধানে বহু সংখ্যক সুশিক্ষিত বক্তা নিযুক্ত করিয়া বাঙ্গালার মুসলমান সমাজকে তিনি সংহত ও সজঘবদ্ধ করিয়া উন্নতির পথে, কল্যাণের পথে পরিচালিত করিতে পারিতেন। লক্ষ লক্ষ সাধারণ সিপাহি বিজ্ঞ সেনাপতির অভাবে যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে কিছুই করিতে পারে , অল্পসংখ্যক নিয়মানুগত, সুদক্ষ নেতা কর্তৃক পরিচালিত বিরুদ্ধ- সৈনিকের আক্রমণে তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হয়, আজ মুসলমান সমাজের ঠিক সেই অবস্থাই হইয়াছে। খােদা, কবে তুমি তােমার একমাত্র মনােনীত ইলাম ধর্মাবলম্বী বাঙ্গালী মুসলমানের দুর্দশার ১১০ কৰ্ম্মবীর মুশী মেহেরুল্লা অবসান করিবে। উপযুক্ত নেতার অধীনে পরিচালিত করিয়া তাহাদের অতীত কলঙ্ক মুছাইয়া দিবে—দুনিয়ার বুকে আবার তাহাদিগকে মানুষ করিয়া তুলিবে ! এদেশের তথাকথিত আলেমগণের গুণগরিমার বিষয় সম্পূর্ণরূপে অবগত থাকা সত্ত্বেও জনাব মুন্শী সাহেব কখনই তাঁহাদের অসম্মান করেন নাই; বরং অনেক সময়েই বক্তৃতার প্রারম্ভে তিনি আলেমগণের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতেন, এবং তাহাদিগকে “মাথার উপর রাখিয়াই যে তিনি সামান্য দু'চারিটি কথা বলিতেছেন, অসাধারণ বিনয় সহকারে তাহা প্রকাশ করিয়া সকলের মন মুগ্ধ করিতেন। একবার বহু- জনপূর্ণ এক সভায় তাহাকে সভাপতি হইতে হইয়াছিল। সভাপতির আসন গ্রহণ করিয়াই তিনি বক্তৃতার প্রারম্ভে বলিলেন,-“ভদ্র মহােদয়গণ, আপনারা দেখিয়াছেন, ঘোড়গাড়ীর চালক গাড়ির উচ্চ ছাদের উপরে বসিয়া থাকে । কিন্তু তাহাতে তাহার সম্মান অধিক, এ-কথা কিছুতেই বুঝা যায় না। অদ্যকার সভায় সেইরূপ কার্যের সুবিধার জন্য আমাকে এই উচ্চ আসন গ্রহণ করিতে হইয়াছে ; ইহাতে আমার কিছুমাত্র শ্রেষ্ঠতা ও গৌরব সূচিত হইতেছে না; আশা করি, তাহা সকলেই বুঝিতে পারিতেছেন। কি সুন্দর উপমা সহকারে কি সুন্দর সময়ােপযােগী বিনয় প্রকাশ ! মহুম মুন্শী সাহেবের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব অসাধারণ ছিল। অনেক প্রকার বাজে তর্ক তাহার সম্মুখে উপস্থিত করিত। প্রশ্নের অনুরূপ উপস্থিত-উত্তর দানে তিনি তাহাদিগকে নিরুত্তর করিতে পারিতেন। এই ভাবের বহু গল্প তাহার নামে প্রচলিত আছে। এক সময় জনৈক পাদ্রী নাকি তাহাকে বলিয়াছিলেন,-খৃষ্টানদের পয়গম্বর ইস নবী (আঃ) চতুর্থ আছমানে অবস্থিতি করিতেছেন; কিন্তু মুসলমানদের • অনেকে ; নানা কথা agremme পয়গম্বর সাধারণ লােকের ন্যায় পৃথিবীর মাটিতেই সমাহিত আছেন। এরূপ ক্ষেত্রে কোন্ নবী বড় হইলেন? মুন্শী সাহেব তৎক্ষণাৎ অনুরূপ উত্তরে বলিলেন,—আপনাদের পয়গম্বর আপনাদিগকে পৃথিবীতে রাখিয়াই আকাশে চলিয়া গিয়াছেন। কিন্তু আমাদের পয়গম্বর আমাদের সকলকে সঙ্গে না লইয়া স্বর্গে যাইবেন না। সেই জন্য আমাদের সকলের প্রতীক্ষায় পৃথিবীতেই অবস্থিতি করিতেছেন কেয়ামতের দিন সমস্ত ধার্মিক মুসলমানকে সঙ্গে লইয়া স্বর্গে যাইবেন। পাদ্রী সাহেব এই উত্তরের আর কোন প্রতিবাদ করিতে পারেন নাই। একবার এক হিন্দু ভদ্রলােক মুর্শী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, গােমাংস ভক্ষণটা কি ভাল? মুন্শী সাহেব তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন,“কেন নয়? গােবর ভক্ষণে যদি হিন্দুর মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত হইতে পারে, তবে যাহারা গােমাংস ভক্ষণ করে, কেন তাহাদের সমগ্র জীবনের পাপ ক্ষয় হইবে না? গােবর অপেক্ষা কি গােমাংস অধিক সারবান নহে? এইরূপ বহু প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের গল্প মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মহুমের নামে দেশে দেশে প্রচলিত আছে। মুন্শী সাহেব অগাধ অর্থ উপার্জন করিয়াছিলেন । কিন্তু কৃপণের স্থায় তিনি সঞ্চয়ী ছিলেন না; সৎকার্যে ব্যয়ের দ্বারা তিনি অর্থের সদ্ব্যবহার করিয়া গিয়াছেন। মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব মেহের চরিত পুস্তকে লিখিয়াছেন,—“অপব্যয় কাহাকে বলে তিনি মহা জানিতেন না। সামান্য পােষাক পরিধান করিতে তিনি বড়ই ভালবাসিতেন এবং সামান্য আহার করিতেন। আড়ম্বরপূর্ণ খাওয়া দাওয়া তিনি আদৌ পছন্দ করিতেন না। তিনি সহচর ও অনুচরদিগকে সর্বদা সন্তুষ্ট রাখিতে চেষ্টা করিতেন কাহারও মনে কষ্ট দিতেন না। তিনি সদা প্রফুল্ল ও কৌতুকপ্রিয় লােক ছিলেন। দুঃখীর আর্তনাদ তিনি কখনও সহ করিতে • ;
১১২ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা • • পারিতেন না। কেহ কখনও তাহার নিকটে কোন বিষয়ে প্রার্থী হইয়া বিফলমনােরথ হয় নাই। তিনি যখন যেখানে যাইতেন, ছােট হইতে চেষ্টা করিতেন। নামাজে এমাম হইবার জন্য অদৌ পা বাড়াইতেন না। বিলাসিতাকে তিনি বড়ই ঘৃণা করিতেন। তিনি সর্বদা লােকের নিকট কোন না কোন বিষয় শিক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেন। অহঙ্কার, ক্রোধ ও হিংসা ইত্যাদি কোন ঘৃণিত রিপুরই তিনি বশীভূত ছিলেন না। বৃদ্ধা জননীকে তিনি বড়ই ভক্তি করিতেন তাঁহার অবাধ্য হইয়া কখনই কোন কার্য করিতেন না। তাঁহার গুণের কথা আর কি লিখিব। তাহার বক্তৃতা শুনিয়া সহস্র সহস্র লােক শেরেক বেদাত পরিত্যাগ করিয়া দীনদার হইয়াছেন; সহস্র সহস্ৰ বেনামাজী নামাজী হইয়াছেন। শত স্থানে তাহার বক্তৃতায় মাদ্রাসা, মক্তব ও স্কুল স্থাপিত হইয়াছে। কত সুদখোর মহাজন তাহার উপদেশে সুদ পরিত্যাগ করিয়াছেন। অনেক বেপর্দা স্ত্রীলােক তঁাহার বহুমূল্য উপদেশ শুনিয়া পর্দানশিন্ হইয়াছেন। তাহার বক্তৃতায় উৎসাহিত হইয়া বহুলােক ব্যবসায় বাণিজ্যে মন দিয়াছেন। কত সময়ে কত শত হিন্দু ও খ্ৰীষ্টান তাঁহার নিকটে তৌবা পড়িয়া দীন এক্লাম কবুল করিয়াছেন। ইহা ব্যতীত তিনি কত শত সামাজিক কাৰ্য্য করিয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। তিনি এমন ভাবে তর্ক করিতেন যে, কাহার সাধ্য তাঁহার নিকট জয়ী হইয়া যায়। জানি না কত দিনে তাহার অভাব পূর্ণ হইবে। মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা ভিতরে বাহিরে খাটি মুসলমান ছিলেন। শরিয়তের বিধি ব্যবস্থার উপর তাহার শ্রদ্ধা ছিল অবিচল। নামাজ রােজা ইত্যাদি অবশ্য প্রতিপাল্য বিধান সমূহ তিনি নিয়মিত ভাবে পালন করিতেন তাসাওফ বা খােদাপ্রাপ্তি-জ্ঞানের গৌরবময় পথ অবলম্বন করিবার তেঁাহার একটা আন্তরিক আগ্রহ ছিল। বিখ্যাত ফুরফুরার পীর সাহেবের নানা কথা ১১৩ নিকট মুরিদ হইয়া এই বিদ্যা শিক্ষা করার সঙ্কল্প তিনি অন্তরে পােষণ করিতেন। কিন্তু তাঁহার সে আশা পূর্ণ হয় নাই। মৃত্যুর পূর্বে বিখ্যাত এরশাদে খালেকিয়া বা খােদা-প্রাপ্তিতত্ত্ব-প্রণেতা খড়কী নিবাসী পীর জনাব মৌলভী আবদুল করিম সাহেবের নিকট তিনি তওবা করিয়াছিলেন। সকল দিক দিয়া ইস্লামের পূর্ণ আদর্শ যেন তাহার মধ্যে মূর্ত হইয়া বিরাজ করিত। বাক্যে ও কার্যে তঁাহার সম্পূর্ণ মিল ছিল। তিনি যাহা বলিতেন নিজে তাহা করিতেন। সমাজের প্রতি তাঁহার দরদ ছিল অসাধারণ, সমস্ত প্রাণ দিয়া তিনি সমাজকে ভালবাসিতেন, সৰ্ব্বদা সমাজের কল্যাণ চিন্তা করিতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁহার প্রিয়তম সমাজকে ভুলিতে পারেন নাই। যখন তিনি জলপাইগুড়িতে অন্তিম পীড়ায় আক্রান্ত হন, সেই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করিয়া জনাব দেওয়ান নাসিরুদ্দীন আহমদ সাহেব লিখিয়াছেন-“এই পীড়িত অবস্থাতেও তিনি আমার সহিত সমাজের বর্তমান অবস্থার বিষয় আলােচনা করিয়া ভগ্ন-হৃদয়ে যে প্রকার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়াছিলেন তাহা আজিও স্মৃতিপটে অতি আছে। তিনি দীন দরিদ্র হতভাগ্য মুসলমান সমাজকে এত ভালবাসিতেন, তাই মুসলান সমাজও হৃদয়ের প্রতি রক্তকণা দিয়া তাঁহাকে ভালবাসিতে পারিয়াছিল। কৰ্ম্মবীর মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা তাহার জীবনের প্রতি মুহুৰ্ত্ত সমাজের কল্যাণজনক কার্যে নিযুক্ত রাখিয়াছিলেন। সমাজ- সেবায় তিলে তিলে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়াছিলেন। যখন তাহার নিকট শমনের ডাক আসিয়া পৌছিয়াছে সেই সময়েও তিনি শারীরিক ব্যাধি অগ্রঙ্ক করিয়া ভগ্নস্বাস্থ্য অবস্থায় দারাজগঞ্জে পূর্ণ তেজে বক্তৃতা করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। জরে সংজ্ঞশূন্য অবস্থায় প্রলাপ বকিতেছেন, তথাপি তিনি তাহার কর্তব্য ভুলিতে পারেন নাই। রংপুর মাদ্রাসার ছাত্রগণ তাঁহার প্রতীক্ষা করিতেছে, তিনি তথয় যাইতে না পারিলে ৮ ১১৪ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা তাহারা কত দুঃখিত হইবে, এই চিন্তায় তিনি তখনও অধীর! বাটা প্রত্যাগমন পথেতাহার সঙ্গীদেওয়ান নাসিরুদ্দীন আহমদ সাহেবকে“ছাত্রগণ নিরাশ হইবে এই জন্য সানয়নে রংপুরে পাঠাইয়া দেন। হায় মােহাম্মদ মেহেরুল্লা! কৰ্তব্যপরায়ণতার কি জ্বলন্ত আদর্শই না তুমি শেষ পর্যন্ত দেখাইয়া গিয়াছ ! অলস কর্মবিমুখ দায়িত্বজ্ঞানবর্জিত বঙ্গীয় মুসলমান কৰে তােমার উন্নত আদর্শ অনুসরণ করিতে পারিবে ।
সপ্তম পরিচ্ছেদ মহাযাত্রা জগতে কেহই চিরদিন থাকে না। শীঘ্রই হউক আর বিলম্বেই ইক, সংসারের সমস্ত বন্ধন, সমস্ত মায়া মমতা কাটাইয়া একদিন সেই অনন্ত পথে যাত্রা করিতে হয়। ইহাতে জগতে কাহার কত ক্ষতি হইল, কাহার হৃদয় কি কঠোর আঘাতে চূর্ণ হইল, নির্মম কাল সেদিকে ফিরিয়াও তাকায় না। বিধাতার ইঙ্গিতে সে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ভাঙ্গা-গড়ার এক তাণ্ডব ক্রীড়া করিতে করিতে যেন কোন অলক্ষ্যে অনন্ত পথে ছুটিতেছে। সে কাহারো দিকে বিন্দুমাত্রও হৃক্ষেপ করে না, একই তালে একই ভাবে সে ছুটিয়া চলিয়াছে। নবী রসুল পীর অলী কেহই তাহার হাতে নিস্তার পান না। ভাল মন্দ, সৎ অসৎ, সে সমস্তই একভাবে গ্রাস করিয়া যায়। সময়ের নির্মম গতিতে মােসলেম-বঙ্গের দীপ্ত মিহির মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লারও সংসার হইতে মহাপ্রস্থানের সময় আসিয়া উপস্থিত হইল। (মুন্শী সাহেবকে অনেক সময়ই সভাসমিতিতে এবং সমাজের অন্যান্য কাৰ্যে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করিতে হইত। আহার নিদ্রা ইত্যাদি কিছুরই কোন নিয়ম ছিল না। এই সমস্ত কারণে অল্প বয়সেই তাহার স্বাস্থ্য ভঙ্গ হইতেছিল; জীবনীশক্তি ক্ষয় হইয়া আসিতেছিল। কয়েকবার কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা ,.. তিনি ভীষণ রােগে আক্রান্ত হইয়া খােদার করুণায় রক্ষা পান। অবশেষে ১৩১৪ সালের প্রারম্ভে তাঁহার নিকট অনন্তের আহ্বান আসিল। ঐ বৎসর বৈশাখ মাসে উত্তরবঙ্গের মণ্ডল ঘাট নামক স্থানে ২৪শে ও ২৫শে তারিখে তিনি পর পর দুইটি সভা করিয়া সামান্য অসুস্থতা অনুভব করেন। এই অবস্থাতেই অবস্থাতেই ২৭শে বৈশাখ তারিখে দারাজগঞ্জ নামক স্থানে মহুম একদিনেই তিনবার সভা করেন। এই অত্যাচার তঁাহার শরীরে সহ হইল না। সহস্র সহস্র শ্রোতাপূর্ণ সভায় সুদীর্ঘ বক্তৃতা করা কম পরিশ্রমের কাজ নহে। সভার অত্যাচার ব্যতীত এই স্থানে আহারাদির বড়ই অনিয়ম হইয়াছিল। ইহার ফলে ২৮শে বৈশাখ বেলা ১০ দশটার সময় দরাজগঞ্জে তাহার ভয়ানক জ্বর হইল। অবিলম্বে কয়েকজন সঙ্গীর সহিত তিনি বাটীতে প্রত্যাগত হইলেন। এই জ্বর কমে ভীষণ নিউমোনিয়ারূপে আত্মপ্রকাশ করিল। এই পীডর সংবাদ পাইয়া মুন্শী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব ২১শে জ্যৈষ্ঠ তারিখে ছাতিয়ানতলায় গমন করেন। মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব লিখিতেছেন, “শয়নাগারে প্রবেশ করিলেই মুন্শী সাহেব অতি ক্ষীণস্বরে আমাকে আচ্ছালামাে আলায়কোম বলিলেন। পরে আর কোন কথা বলিতে পারিলেন না। ডাক্তার কথা বলিতে নিষেধ করিয়াছেন শুনিয়া আমিও আর কোন কথা বলিলাম না। মুখের দিকে চাহিয়া কেবল অশ্রু বিসৰ্জন করিতে লাগিলাম। সে কি হৃদয় বিদারক দৃশ্য ! তিনি অামার শরীরে হাত দিলেন, এবং কি কি বলিলেন ভালভাবে বুঝা গেল না। সেইদিন রাত্রিতেই আমি কলিকাতায় ভাল ডাক্তার অনিরার জন্য রওয়ানা হই। কিন্তু ডাক্তার কি করিবে ? রােগের ঔষধ আছে বটে, কিন্তু মৃত্যুর ত ঔষধ নাই ? তিনি ২৪শে জ্যৈষ্ঠ শুক্রবারে বেলা ১টার সময় ( ঠিক জুমার নামাজের সময় ) ৪৫ বৎসর মহাযাত্রা ১১৭ ~ বয়সে স্বীয় পরিবার ও বন্ধুবান্ধবগণকে শোক সাগরে ভাসাইয়া পরলােক- গমন করেন। “ইন্নালিল্লাহে অইন্না এলায়হে রাজেউন”-* ভীষণ ঘূর্ণাবর্ত যখন দেশের উপর দিয়া বহিয়া যায়, তখন যেমন সমগ্র বৃক্ষলতা প্রতিনিয়ত হতাশভাবে আছাড়িয়া আছাড়িয়া কঁদিতে থাকে, প্রাণিকুল আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় অস্থির হইয়া স্তব্ধভাবে অবস্থিতি করে, মুনশী সাহেব মহুমের অকাল মৃত্যুতে সেইরূপ একটি প্রবল শােকোচ্ছাস সমগ্র দেশের উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছিল ! প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয় কঁদিয়া কঁদিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিয়াছিল। ব্যক্তিগত সৰ্ব্বনাশের ন্যায় সকলে এই বিয়ােগ-বেদনাকে মরমের মর্মস্থানে অতি তীব্রভাবে অনুভব করিয়া অধীর হইয়া পড়িয়াছিল। সকলের হৃদয় যেন অসাড় স্তব্ধ হইয়া গয়াছিল, যেন এদেশের মােসলেম-সমাজের ভিত্তিমূল পর্যন্ত প্রকম্পিত হইয়া উঠিয়াছিল ! বিশাল বঙ্গের আকাশ বাতাস তেমনতরাে করুণ ক্রন্দনে আর বুঝি কখনাে মুখরিত হয় নাই। বিশ্ব প্রকৃতির বুকের ভিতরে তেমন একটা উদাস রাগিনী আর বুঝি কখনই বাজিয়া উঠে নাই ! বঙ্গ-মােসলেম সেদিন ভাবিয়াছিল, আজ তাহারা অসহায় হইল, অভিভাবকহীন হইল। নিবিড়জলদাবৃত অমানিশিথিনীর দিকভ্রান্ত পথিক তাহারা, তাহাদের যে মশালধারী অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক, মহামহিমান্বিত পেশােয় সকলকে পরিচালিত করিতেছিলেন, অজি সহসা তাঁহার অন্তর্ধানে তাহারা অন্ধকারে দিশাহারা হইয়া থাকিয়া দাড়াইল । আততায়ী-পরিবৃত ভীষণ সমরক্ষেত্রে তাহাদের এমাম, তাহাদের পরিচালক, তাহাদের প্রাণের * নিশ্চয় সকলই খােদাতালার জন্য এবং তাহার দিকেই সকলের প্রত্যাবর্তন। (কোরান শরিফ * পেশােয়= নেতা, পরিচালক।
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা প্রাণ বীর-সেনাপতির পতন হইল । ক্ষোভে নিরাশায় তাহারা যেন অসাড় হইয়া বসিয়া পড়িল! ভাঙ্গাবুক চাপিয়া ধরিয়া উৰ্দ্ধ দিকে চাহিয়া তাহারা বলিল,-খােদা তােমার ইচ্ছার উপরেই আমরা আত্মসমর্পণ করিতেছি! ইন্না লিল্লাহে অইন্না এলায়হে রাজেউন তৎকালে মুসলমান সমাজে প্রচলিত “মিহির ও সুধাকর, “সােলতান, “মােসলেম সুহৃদ”, “ইলাম “ইলাম প্রচারক ইত্যাদি সমস্ত সংবাদ ও সাময়িকপত্র কয়েকমাস পর্যন্ত মুন্শী সাহেব মহুমের প্রসঙ্গে ও শােক গাঁথায় পূর্ণ থাকিত। বাঙ্গালার এমন কোন মুসলমান লেখক ও কবি ছিলেন না, যিনি মুশী সাহেবের স্মৃতির উদ্দেশে আন্তরিক গভীর শােকোচ্ছাসপূর্ণ প্রবন্ধ বা কবিতা লিখেন নাই, সমগ্র জাতির এই অশ্রু-প্রবাহের সহিত নিজের তপ্ত অশ্রুধারা মিশান নাই। বাঙ্গালায় এমন কোন পল্লী ছিল না, যাহা মুন্শী সাহেবের মৃত্যুতে শােকোচ্ছাসে আকুল হইয়া উঠে নাই। মােসলেমবঙ্গের সেই দারুণ দুর্দিনে সমগ্র দেশ ব্যাপিয়া যে শশাকের তুমুল ঝড় বহিয়া গিয়াছিল এমন কোন মােসলেম হৃদয় ছিল না, যে তাহার সহিত নিজের তপ্ত-হৃদয়ের হতাশার দীর্ঘনিশ্বাস মিশায় নাই। নাই। তিনি গিয়াছেন, কিন্তু সেই বিরাট শূন্যের আজিও পূরণ হয় নাই,–এই সুদীর্ঘ ২৫ বৎসরের মধ্যেও আর পূরণ হয় নাই! আর কাহাকেও সমগ্র মুসলান সমাজ তেমন একান্ত আন্তরিকভাবে, আপনার জনের ন্যায়, অবিম্বাদিত নেতারূপে গ্রহণ করিতে পারে নাই। বর্তমানের ন্যায় তখনও মুসলমান সমাজে অনেক দলাদলি ছিল, কিন্তু মুন্শী সাহেব কোন দলেরই অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না। সমগ্র দলাদলির বহু উর্ধে তিনি অবস্থিত ছিলেন। সকল দলের সকল শ্রেণীর লােকই তাঁহাকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করিত, মান্য করিত, ভালবাসিত, অন্তরের অন্তস্থলে একান্ত আপন
কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা-
রুশ
আবু এহসান
No text on this page.
মহাযাত্রা ১১৯ জনের ন্যায় গ্রহণ করিত। তাহার কোন শত্রু ছিল না। প্রায়ই দেখা যায়, সমাজের কর্মী ও বড়লােকেরা নিন্দুকগণের প্রধান লক্ষীভূত হইয়া থাকেন। কিন্তু মুনশী সাহেবের কেহ নিন্দা করিয়াছে এরূপ কথা কখনই শুনা যায় নাই। বিধাতার অমূল্য দান সৌরকরের মত খােদার মেহের মেহেরুল্লা সকলকেই সমান দৃষ্টিতে দেখিতেন, সমান- ভাবে অনুগ্রহ বিতরণ করিতেন। তাই তাহার পরলােকগমনের এই সুদীর্ঘ দুই যুগ কাল পরেও আমরা দেখিতেছি, তাহার শশাকের আঘাতের সেই মর্মান্তিক বেদনা নিখিল-মােসলেমবঙ্গের হৃদয় হইতে একটুও অপসারিত হয় নাই। এখনাে লক্ষ লক্ষ ব্যক্তি তাহাকে স্মরণ করিয়া নীরবে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া থাকে। যশােহরের মুন্শী মেহেরুল্লার গ্রামের প্রবীণগণ নূতন প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হইয়া থাকেন। মুন্শী সাহেব বৃদ্ধা মাতা, দুই স্ত্রী, তিনটি পুত্র ও তিনটি কন্যা রাখিয়া পরলােকগমন করেন। একমাত্র উপযুক্ত পুত্রের তিরােধানে তাঁহার বৃদ্ধা মাতা শশাকে উন্মাদিনী প্রায় হইয়া চারিবৎসর কাল জীবিত। ছিলেন। এই পুস্তক প্রকাশের সময় তাহার দুই পুত্র এক কন্যা ও দুই স্বী জীবিত আছেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র মােহাম্মদ মন্সুর আহমদ অল্পবয়সে কয়েকটি নবালক পুত্রকন্যা রাখিয়া ১৩২৮ সালের ৪ঠা ভাদ্র তারিখে শনিবারে পরলােকগমন করেন। মুন্শী সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র মৌলভী মােহাম্মদ মােহসেন ১৯২০ সালে ডিষ্টিংশনে বি, এ, পাস করেন। পরে ১৯২২ সালে ডিসেম্বর মাসে সর্বপ্রথমে গৃহীত বি, সি, এস, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া পরবৎসর মে মাসে সাবডেপুটি কলেক্টর পদ প্রাপ্ত হন। অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, তিনি উক্ত পদে কাৰ্য্য করিয়া ইতিমধ্যেই সৰ্বসাধারণের ও গভর্ণমেন্টের বিশেষ প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হইয়াছেন।
কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা তাহা ছাড়া দেশের কল্যাণকর বিবিধ কার্যে তিনি সর্বদা আত্মনিয়ােগ ও অর্থব্যয় করিয়া থাকেন। আমরা আশা করি তিনি ক্রমশঃ উন্নতির উচ্চ সোপানে আরােহণ করিয়া দেশের ও দশের যথেষ্ট কল্যাণ-সাধন করিতে সমর্থ হইবেন। তাহাদ্বারা তাঁহার মহামান্য পিতার গৌরব রক্ষিত হইবে। মােহাম্মদ মােহসেন সাহেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র মােহাম্মদ আবু এই সান চারিবৎসর বয়সে রাজশাহী জেলার অন্তর্গত গােদাগাড়ীতে ১৩৩৬ সালের ২৫শে শ্রাবণ তারিখে শনিবারে লােকান্তরিত হয়। এই অল্পবয়স্ক শিশুটির ভিতর এক অসাধারণ শক্তি লক্ষিত হইয়াছিল। মুন্শী সাহেবের অনেক গুলি গুণের সমাবেশ অতি আশ্চৰ্যভাবে এই সুন্দর শিশুর জীবনে প্রকটিত হইয়াছিল। এই কুসুম-কোরকসম সুন্দর শিশুটি বাঁচিয়া থাকিলে কালে সে যে একজন অসাধারণ শক্তিশালী যশস্বী ব্যক্তি হইতে পারি তাহতে সন্দেহ নাই। তাহার কথা মনে হইলে কবির সেই বিখ্যাত গানটি স্মৃতি- পথাৰুঢ় হইয়া সমস্ত মনাে প্রাণ উন্মত্ত করিয়া তুলে ফুটিতে পরিত গাে ফুটিল না সে মরমে মরে গেল মুকুল ঝরে গেল প্রাণভরা আশা র’ল শুধু পিয়াসে ! রাজশাহী জেলার গােদাগাড়ীর সন্নিকটে গড়ের মাঠ নামক স্থানে সাবডেপুটী সাহেব তাঁহার প্রিয় পুত্রের কবরটি সাড়ে ছয় শতাধিক টাকা খরচ করিয়া পাকা করিয়া দিয়াছেন। ইহা তাহার পুত্রের নামানুসারে “আবু মঞ্জিল নামে আখ্যাত হইয়াছে। আবু মঞ্জিলের সন্নিধানে একটি সুন্দর ঈদগাহও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এই সুদৃশ্য সমাধির ছবি এতৎসহ প্রকাশ করা গেল। বর্তমানে সাবডেপুটি সাহেবেব অল্পবয়স্ক একটি
কম্ম বীর মুনশী মেহেরুল্লা-
- -
আবু মিয়া-সমাধি
No text on this page.
মহাযাত্রা ১২১ N, পুত্র ও দুইটী কন্যা আছে। মুনশী সাহেবের কনিষ্ঠ পুত্ৰ শ্ৰমান মুখলেছুর রহমান ম্যাট্রিকুশেন পাশ করিয়া বর্তমানে বাটীতে অবস্থান করিতেছে। জগতে কিছুই স্থায়ী নহে। সমুদ্রের জলবিম্বের মত মানব কাল-সাগরে দু’দিনের জন্য ভাসিয়া উঠিয়া আবার কোথায় মিশিয়া যাইতেছে তাহার সমস্ত কৃতিত্ব, সমস্ত মহিমা গরিমা, ধীরে ধীরে অতীতের গর্ভে বিলীন হইয়া যাইতেছে। কিন্তু এই দু’দিন যাহারা মানবসেবায় আত্মােৎসর্গ করিয়াছেন, বিশ্বের কল্যাণে মনটপ্রাণ বিনিয়ােগ করিয়াছেন, মানব তাহাদিগকে সহজে ভুলিতে পারে না। যুগ যুগ কাল ব্যাপিয়া জন- সাধারণের হৃদয়ের নিভৃত নিকেতনে পরতে পরতে তাঁহাদের কীর্তির ছাপ থাকিয়া যায়। মানবমন সশ্রেদ্ধ কৃতজ্ঞতা ভরে আপনা আপনি তাদের স্মৃতির উদ্দেশে মাথা নত করিয়া থাকে ! মুন্শী সাহেবের পবিত্র গৌরবেন্নত স্মৃতির প্রতি বাঙ্গালী মুসলমানের শ্রদ্ধা নিবেদন বরাবর সমানভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সঙ্ঘবদ্ধভাবে সভ্য- সমাজোমােদিত প্রথায় তঁাহার স্মৃতি রক্ষার জন্য কোন স্থায়ী কাৰ্য্যই পৰ্যন্ত করা হয় নাই। ইহা বাঙ্গালী মুসলমানের অতীব লজ্জার কথা। সমাজের চিন্তানায়ক এবং কম্মিগণের কর্ণকুহরে এ-যাবত জাতীয় কর্তব্যের এই বিরাট আহ্বান প্রবিষ্ট হয় নাই অথবা প্রবিষ্ট হইয়া থাকিলেও কার্যক্ষেতে কেহই এ-যাবৎ অগ্রসর হন নাই। ইহা আমাদের যৎপরােনন্তি কলঙ্কের কথা! বাঙ্গালী মুসলমান, অচিরে এই জাতীয় কর্তব্যের প্রতি অবহিত হও। মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা বহুদিন হইল ইহজগত হইতে চলিয়া গিয়াছেন; কিন্তু আজিও যেন সমগ্র বঙ্গের গগনে পবনে তাহার সেই কমকণ্ঠ মধুর সুরে প্রতিধ্বনিত হইতেছে ! জাতির জীবনে তিনি যে ১২২ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা সাড়া জাগাইয়া দিয়াছেন, মৃতসঞ্জীবনী ঢালিয়া দিয়াছেন, এখনো ভিতয়ে ভিতরে প্রতিনিয়ত তাহার কাজ চলিতেছে। খােদাতলার একান্ত অনুগ্রহ, তাই এমন একজন মহাপুরুষকে আমরা কিছুদিনের জন্য নেতারূপে পাইয়াছিলাম। দুর্ভাগ্য আমাদের, তাহার উপযুক্ত কদর, তাঁহার স্মৃতির উপযুক্ত সম্মান এতদিনেও আমরা করিতে পারি নাই। খােদা দয়াময়, গফুর, রহিম, মহুমের পারলৌকিক জীবন শান্তিময় ও গৌরবােন্নত কর। আমিন।
পরিশিষ্ট (১) “আসল কোরান কোথায় ?” রেভারেণ্ড জ জমিরুদ্দীন সাহেবের সহিত মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মহুমের আসল কোরান পৃথিবীতে বর্তমানে আছে কিনা তাহা লইয়া যে, সুদীর্ঘ তর্কযুদ্ধ হইয়াছিল, যে তর্কযুদ্ধের ফলে উক্ত পাত্রী সাহেব ইসলাম ধৰ্ম্ম গ্রহণ করেন, সেই তর্কের বাদ প্রতিবাদগুলি সাধারণের পক্ষে শিক্ষা- জনক ও আনলপ্রদ হইবে মনে করিয়া এ-স্থানে উদ্ধৃত হইল। ১৮৯২ খৃষ্টাব্দের জুন মাসের “খ্রষ্টীয় বান্ধব” নামক মাসিক পত্রিকায় “অসল কোরান কোথায় শীর্ষক নিম্নলিখিত প্রবন্ধটি বাহির হয় - “আমরা যখন মুসলমানদের নিকট সুসমাচার প্রচার করি, তখন অনেক মুসলমানেই কহিয়া থাকেন যে, আপনাদের ধর্মশাস্ত্র পরিবর্তিত হইয়াছে। কিন্তু আমাদের কোরান কখনই পরিবর্তিত হয় নাই। খােদাতালা মােহাম্মদ (দঃ) এর উপর যাহা নাজেল করিয়াছিলেন অধ্যাপি অবিকল তাহাই রহিয়াছে। আমাদের ধর্মশাস্ত্র যে কখন পরিবর্তিত হয় নাই, একথা মুসলমানদিগকে অনেক পুস্তকে লিখিয়াছি। ••••••••• যিনি মুসলমান শাস্ত্রে অজ্ঞ, তিনিই বলেন যে, কোরান কখনই পরিবর্তিত হয় নাই। আমরা মুসলমানদিগের হাদিছ এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ হইতে প্রমাণ ১২৪ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্ল। দিতেছি যে, আসল কোরান বিকৃত ও পরিবর্তিত হইয়াছে। মুসলমানদিগের হস্তে এখন অসিল কোরান নাই। (১) কোরান মােহাম্মদ (দঃ) এর সময় একত্র একত্র সংগৃহীত হয় নাই। দেখ—“তির্ষিক্তি”—সুন্নী মুসলমানদিগের হাদিছ। (২) মােহাম্মদ (দঃ) এর মৃত্যুর পর খলিফা আবুবকর (রজিঃ) জয়েদ দ্বারা কোরান শরিফের সুরাগুলি একত্র শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছিলেন। দেখ—“বােখারী গ্রন্থে। (৩) ওসমান (রাজিঃ ) দুইবার কোরান দগ্ধ করেন। দেখ- “মেশকাতউল মশাবী। (৪) শিয়া সম্প্রদায় কহিতেছেন যে, কোরানে আলীর ( রাজি। এবং তঁহার বংশের মাহাত্ম্যর বিষয় অনেক কথা লেখা ছিল। কিন্তু কাফের ওসমান (রাজিঃ) তাহা কোরান শরিফ হইতে উদ্ধৃত করিয়া দগ্ধ করিয়া ফেলিয়া দিলেন। দেখ—“নহল আলবালাগত এবং শিয়াদিগের হাদিছ। কলিকাতা, দিল্লী, এলাহাবাদ প্রভৃতি ভারতের নানা নগরে শিয়াগণ বাস করিতেছেন, তঁাহাদিগকে একবার জিজ্ঞাসা কর। (৫) এমাম জাফর কহিতেছেন যে,সুরা আহজাবে কোরেশের স্ত্রী ও পুরুষের ভ্রষ্টতার বিষয় বর্ণিত ছিল; ঐসুরাটি সুরা বকর হইতে বড় । দেখ—“আইনুল হক” গ্রন্থের দুই শত আট ওরকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠা। আনিস এবনে মালিক কহিতেছেন, যখন আৰ্ম্মিনিয়ায় সুরীয় দেশের লােকদিগের সহিত আজার মিজান ইরাফ লােকদিগের যুদ্ধ হইতেছিল, তখন হাফিজ এবনে ইমাম ওমানের (রাজিঃ) নিকট আসিয়া কোরান পাঠকের পাঠে অমিল হইবে এইরূপ ভয় করিয়া কহিল,“হে বিশ্বাসী লােকের পথ- প্রদর্শক, শিষদিগের তথ্য লউন। পাছে তাহারা ইহুদী ও নাছারাদিগের ব্যয় শাস্ত্রে গােলযােগ উৎপন্ন করে। তাহাতে ওসমান (রাজিঃ } আসল কোরান কোথায় হাফিজার (মােহাম্মদ (দঃ) এর স্ত্রী) নিকট লােক প্রেরণ করিয়া কহিলেন যে, তুমি কোরানের হস্তলিপিখানি আমার নিকট পাঠাইয়া দাও । আমরা নকল করিয়া ইহা তােমার নিকট পুনরায় পাঠাইয়া দিব। তখন ওসমান (রাজিঃ) জৈষদ এবনে শাবিৎ, অাবদুল্লা এবনে জবির এবং হারিৎ এবনে ইমম এই তিনজনকে আদেশ দিলেন যে, তােমরা উহা নকল কর । তাহারা উহা নকল করিলেন। আর ওমান (রাজিঃ) উক্ত তিনজনকে কহিলেন,“যখন তােমাদের এবং জয়েদের কোরানের সঙ্গে পরম্পর অনিল ১ইবে, তখন তাহা কোরেশের ভাষায় লিখিও। কারণ কোরান এই ভাষার নাজেল হইয়াছে। তাহারা ঠিক সেইরূপ করিলেন। খতিটী নকল হইয়া গেলে, ওমান (রাজিঃ ) পুনরায় তা জয়েদের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। আর যাহা লেখা হইল, তাহার এক একখানি প্রতিলিপি নানা প্রদেশে পাঠাইয়া দেওয়া হইল এবং পূৰ্ব্বকার যত খাতা ছিল, তাহা দগ্ধ কবিবার আদেশ দিলেন। দেখ,-বােখারী--সুন্নিদিগের হাদিছ গ্ৰন্থ। * ( ৬ ) সকল মােসলমানই জানেন যে, মােহাম্মদ (দঃ) স্বয়ং নিরক্ষর অর্থাৎ বিদ্যাহীন লােক ছিলেন। উক্ত আছে যে, যখন কোরানের আয়েত সকল মােহাম্মদ (দঃ) এর উপর নাজেল হইত, তখন হাফেজেরা তাহা মুখস্থ করিয়া রাখিত। আবার কখন কখন চৰ্ম্মে, খোরমা- পত্র প্রভৃতি বস্তুতে লিখিয়া একটা বাক্সেতে ফেলিয়া রাখা হইত। লিখিত হইত, তাহা মুখস্থ হইত না, আবার যাহা মুখস্থ হইত তাহা লিখিত হই না। এই প্রকৰে ২৩ বৎসর মধ্যে কোরান নাজেল শেষ হয়। সকলেই জানেন, মুখস্থ করা অনেক সময় বেঠিক হইয়া থাকে। হাফেজের ভুল করিলে মােহাম্মদ (দঃ) এর ধরিবার সাধ্য ছিল না। ইহাতে * এই অনুবাদটী ঠিক হয় নাই। পাদ্রী জি, সি, ফাণ্ডার ডি, ডি সাহেব কৃত মিজানুল-
কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা
দেখা যাইতেছে যে, নিশ্চয় আসল কোরান এখন নাই। এখনকার
মুসলমানদিগের হস্তে যাহা আছে, তাহা নকল এবং সংশােধিত কোরান ।
আমরা এ-সম্বন্ধে আরও অনেক প্রমাণ দিতে পারি, কিন্তু অধিক লেখা
বাহুল্যমাত্ৰ এবং “খ্রষ্টীয় বান্ধব সম্পাদক মহাশয়ের অনুরোধ এই,
“প্রবন্ধটী যেন অতিশয় দীর্ঘ না হয়।” অতএব আমরা এখন
মুসলমানদিগের নিকট উক্ত ছয়টা প্রমাণ প্রদর্শন করিয়া নিঃসন্দেহে
জিজ্ঞাসা করিতে পারি, আপনাদিগের আসল কোরান শরিফ কোথায় ?
মাছায়ে ইলমে ইলাহী
এলাহাবাদ
শ্রীজ জমিরুদ্দীন শেখ
৪-৪৯২
আসল কোরান কোথায়? প্রবন্ধের প্রুফ দেখিবার দোষে কয়েকটা
ভুল থাকে। পরে ১৮৯২ সালের জুলাই মাসের খ্ৰীষ্টীয় বান্ধবে উহার
সংশােধন হয়। সেই পত্ৰখানি এই
আসল কোরান কোথায় ?
ভ্রম সংশােধন
“তালিম মহম্মদ স্থানে “তালিম মহম্মদী”, “তীৰ্ম্মিক্তি স্থানে “তীমিজি,
“মিশকাউল মাবি স্থানে-“মিশকাতউল মশাবী”, “নহল আলবলায়েত
স্থানে “নহল আলবলাগত হইবে।
অনুগ্রহ পূর্বক সংশােধন করিবেন, নতুবা অনেক গােলযােগ হইবার
সম্ভাবনা।
জে, জে, শেখ
এলাহাবাদ।
শেখ জমিরুদ্দীন সাহেবের প্রবন্ধ পাঠ করিয়া মুনশী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা
সাহেব যে প্রতিবাদ করিয়াছিলেন তাহা এই :-
আসল কোরাণ কোথায় ১২৭ ইসাই বা খ্রষ্টানী থােকা ভঞ্জন ( সুধাকর সম্পাদকের প্রতি। পরম শ্রদ্ধাস্পদ ও মহামান্য সম্পাদক সাহেব। নিমােক্ত বিষয়টা আপনার সুবিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশ করতঃ বিজাতীয় আক্রমণের প্রতীকার ও ইসলাম সমাজের ব্যথিত-হৃদয় আনন্দিত করিবেন। বিষয়টা এই :- বিগত ১৮৯২ সালের জুন মাসের “খ্রষ্টীয় বান্ধব পত্রিকার ১৩০ পৃষ্ঠায় ‘আসল কোরান কোথায়” শীর্ষক থােকাপূর্ণ একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ মুদ্রিত হইয়াছে। উহার লেখক জন্ জমিরুদ্দীন শেখ মহাশয় পাদ্রী ফাণ্ডার কৃত মিজানউল-হক ও (উর্দু) পাত্রী আমামুদ্দীন প্রণীত ‘তালিমে মােহাম্মদী (উর্দু) এবং পাদ্রী য্যকিব কান্তিনাথ বিশ্বাস কৃত ‘এসলাম দর্শন’ (বাঙ্গালা) ইত্যাদি গ্রন্থসমুহের আশ্রয় লইয়া সংশয়শূন্য মহাকোরানের প্রতি অযথা আক্রমণ ও ব্যঙ্গোক্তি করিয়া বোধকরি ইসাই সমাজের ‘ট্যাংরা বাবুদের নিকট অগণ্য ধন্যবাদও পাইয়াছেন। তিনি উক্ত গ্রন্থদ্বয় পাঠে ঈদৃশ চেতনাশূন্য হইয়া পড়িয়াছেন যে, ইসাই শাস্ত্রের সত্যতা ও ইসলাম শাস্ত্রের অসত্যতা প্রমাণ দর্শাইবার জন্যই সমুদয় মুসলমান ভাইকেই ঐ পুস্তক পাঠ করিতে অনুরােধ করিয়াছেন। আমরা বলি ভায়া ! ইহার অকেদিন পূৰ্বে মুসলমানগণ উহা পাঠ করিয়াছেন। যেদিন খৃষ্টানদিগের তর্কবাগীশ মুরব্বী ফাণ্ডার সাহেব ‘মিজান-উল-হক জনসমাজে প্রকাশ করিলেন, তাহার পরদিনই ত মুসলমান ধৰ্ম্মবীর স্বর্গীয় মওলানা রহমতুল্লা ১২৮ কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা মরহুম উহার দান্দানশেকে প্রতিবাদ (বন্দে মিজানউল মিজান) এজাযে ইছুবি (১) নামক গ্রন্থদ্বয়) প্রচার করিয়াছিলেন। উক্ত প্রতিবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হইলেও ফাণ্ডার সাহেব অনেকদিন জীবিত ছিলেন, কিন্তু উহার বিরুদ্ধে টু শব্দটী করিতেও পাদ্রী সাহেবের শক্তি অপারগ ছিল। পাদ্রী আমাদুদ্দীন ও তৎপ্রণীত তালিমে মােহাম্মদী জন সাহেবের দ্বিতীয় আশ্রয়। কিন্তু কানপুর নিবাসী মৌলভী মোহাম্মদ আলি সাহেব কর্তৃক তাহার পুস্তকের যে কঠোর প্রতিবাদ হইয়াছে, শেখজীর নজরে তাহা কি (মিরাতুল একিন নামক গ্রন্থখানি) আজিও পড়ে নাই? যদিও বঙ্গীয় মুসলমানদিগের কাপুরুষতা ও নির্জীবতা হে? পাদ্রী ব্যকিব কান্তিনাথ বিশ্বাস কৃত ইসলাম দর্শনের প্রতিবাদ বঙ্গ ভাষায় আজিও সম্পাদিত হয় নাই, তথাপি উর্দ ও পাসি ভাষাতে উহায় শত শত প্রতিবাদ পুস্তক বর্তমান এবং যেদিন তাহা বঙ্গভাষায় সম্পন্ন হইবে, খােদা চাহেত সেদিন অতি নিকটবর্তী। দ্বিতীয়তঃ ইলাম দর্শনে এমন কোন বিষয় নাই, যাহা পাদ্রী ফাণ্ডার সাহেব রচিত গ্রন্থ সমূহে মুত্রিত করেন নাই এবং পত্রিী ফাণ্ডারের এমন কোন প্রশ্নই নাই, ধর্মবীর মওলানা রহমতউল্লা সাহেব যাহার যুক্তি ও শাস্ত্র সঙ্গত ৪০ টা করিয়া উত্তর না লিখিয়াছেন। খ্রষ্টভক্ত শেখ মহাশয় জগতের যাবতীয় কোরান বিশ্বাসী মুসলমানকে অজ্ঞ বা মুখ বলিতে কসুর করেন নাই। তিনি লিখিয়াছেন “যিনি মুসলমান শাস্ত্রে অজ্ঞ তিনিই বলেন যে কোন কখনও পরিবর্তিত হয় নাই। আহা! খ্রীষ্টভক্তের কি অদ্ভুত শিক্ষা ! নৈলে কি মহাশয়ের এত অভিজ্ঞতা ? হায় ! যে মহাকোরানের বিমলালােকে আজ ভূমণ্ডল আলােকময়, খ্রীষ্ট শিষ্যের চক্ষে তাহা অন্ধকার সে দোষ কার ? ঐ যে চর্ম চটিকা দিবসে দেখিতে - আসল কোরান কোথায় ? ১২৯ “AA%af - An এ পায় না, সে জন্য সূধ্যের কোন অপরাধ নাই। ইসাই ভাষার ওপ্রকার বাক-চাতুর্যে আমাদেৱ মনক্ষুন্ন হইবার ত কোনই কারণ নাই; কেননা তাহাদের ধর্মশাস্ত্র বাইবেলে যখন সেই জগতকারণ করুণাময় বিশ্বপতি খােদাতালার প্রতি প্রলাপ, অজ্ঞ, দুৰ্বল, নাদান এবং কমজোরি শব্দসমূহ ব্যবহৃত হইয়াছে (বাইবেল ১ম কর পুস্তক অধ্যায় দেখ) তখন উক্ত শাস্ত্রধারিগণ সেই খােদা-প্রেমিক মুসলমানকে অজ্ঞ বলিবেন না কেন ? যাক সে কথা ; এখন ইসাই ভায়া ফাণ্ডারী ফণ্ড, হইতে যে ৬টা থােকা নকল করিয়া আবার সদর্পে উহার উত্তরপ্রার্থী হইয়াছেন পাঠক, কিঞ্চিৎ ধীরচিত্তে তাহার বাদ-প্রতিবাদ বিচার করুন। প্রথম তিনটা প্রমাণ দ্বারা খৃষ্টান বন্ধুর কোন্ বাসনা পূর্ণ হইল, তাহা ত বুঝিলাম না। আমরাও স্বীকার করি, হজরতের বর্তমানে মহা কোরানের লিখিত অংশগুলি একত্র সংগৃহীত হয় নাই ; সমুদয় কোরান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে লেখা ছিল। কিন্তু মহা কোরানের কোন একটী অক্ষরও পরিবর্তিত হইতে না পারে, এই উদ্দেশ্যে হজরত স্বয়ং সহস্রাধিক হাফেজ (কোরান কন্থকারী) প্ৰস্তুত করিয়া স্বর্গধামে গমন করেন। শেখজী দ্বিতীয় থােকাতে বােখারী হাদিছ শরিফের নাম করিয়া, উহার অর্থ প্রকাশের বেলায় ঘােমটার তলে মুখ লুকাইয়াছেন, নতুবা বিজ্ঞ পাঠকবর্গ শেখজীর নিজের লেখাতেই মহা কোরানের আসলত্বের প্রমাণ পাইতেন। পাঠকের কৌতূহল নিবারণার্থে জন্ সাহেবের মানিত হাদিছটীর মর্ম প্রকাশ করিতেছি,-খলিফা আবুবকরের (রাজিঃ) শাসনকালে যখন এমামার জৈহাদে (ধর্ম সংগ্রামে) বহুতর কোরানের হাফেজ ধৰ্ম্মার্থে পঞ্চত্ব কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা পাইতেছিলেন, সেই সময় মহাপুরুষ হজরত আবুবকর (রাজিঃ) ও হজরত ওমর (রাজিঃ) একত্রে এই পরামর্শ স্থির করিলেন যে, যদি অন্যান্য যুদ্ধে এই প্রকার হাফেজ শহিদ হন ও দেশ হাফেজশূন্য হয়, তবে ভবিষ্যতে সম্ভবতঃ কোরানের কোন অংশ গােলমাল হইলেও হইতে পারে; অতএব যাহাতে ঈদৃশ আশঙ্কা কোন সময়েই না থাকে, এখনই তাহার ব্যবস্থা করা দরকার। (এই পরামর্শানুযায়ী) তাহারা যুদ্ধস্থল হইতে সুলেখক জায়েদকে আহ্বান করতঃ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে খােরমাপত্র ইত্যাদিতে লিখিত সুরাগুলি উদ্ধৃত ও হাফেজদিগের দ্বারা উহা শৃঙ্খলাবদ্ধ করাইলেন। (১) (বােখারী গ্রন্থ) প্রিয় পাঠক! খৃষ্টান সাহেবের মানিত হাদিছটীই অসিলত্বের পাকা প্রমাণ কিনা তাহা বিচার করুন। মহা কোরানকে অক্ষুন্ন রাখিতে মুসলমান খলিফাগণ কতদূর তৎপর ছিলেন, উক্ত হাদিছটী তাহার জ্বলন্ত নিদর্শন। তৃতীয় ধােকায় ইসাই সাহেব ওসমানের (রাজিঃ)“কোরান দগ্ধ কোরান দগ্ধ করিয়া হঠাৎ “মিশকাতুল মাবি এই একটা উৎকট উভঙ্গি ও স্বীয় গৃহগঠিত নামের আবিষ্কার করিয়া ভয়ানক বীরত্ব প্রকাশ করিয়াছেন। কেননা আজিও ইস্লাম-জগতে উক্ত নামে কোন গ্রন্থ নাই, তবে “মিশকাতুল মসাবি” নামক হাদিছ শরিফ আছে। স্বয়ং সর্বশক্তিমান খােদাতালা যখন স্বীয় উক্তিতে বলিয়াছেন যে, আমিই কোরানের সংরক্ষক ( সুরা হেজর-৯ আয়াত), তখন কোন্ মানুষের শক্তি যে, সেই (১) এই লিখিত কোরান শরিফথানি হজরত আবুবকরের (রাজিঃ) মৃত্যু অ হজরত ওমরের (রাজিঃ) নিকট এবং হজরত ওমরের (রাজিঃ) মৃত্যুর পর তাহার কন্যা হাফিজার ( রাজিঃ) নিকট থাকে, এই হস্তলিখিত কোরানখানি আজিও বর্তমান আছে। * মুদ্রাকরের টীতে নামটি ছাপিতে ভূল হইয়াছিল এ-কথা পাত্রী সাহেব পুর্বেই একা করিয়াছিলেন।
আসল কোরান কোথায় ?
১৩১
কোরানকে দগ্ধ করিতে পারে? হজরত ওসমান (রাজিঃ) কি দগ্ধ
করিয়াছেন তাহাও পাঠক শুনুন।
যে কোন কাগজ বা বৃক্ষপত্র হউক, যাহাতেই কোরানের আয়াত
منهم
273 -
هه مه 1 عد د
datancerzon!
agar- - و Al aore
مدة 2 ع: -دو خواه هع
مين قام فيه هق هق
و معنا در مجله عصير ليمو
میلیییههههههعععهعه
يا واخيه=غ وامج
eeفع لهم بها، 62tz
মুনশী সাহেবের ইস্তাক্ষর
و مع
مد
(22
ure
বা খােদাতালার নামাঙ্কিত থাকে, উহাকে যথােচিত সম্মান করা শাস্ত্রের
দৃঢ় আদেশ; তাই যখন হজরত ওসমান (রাজিঃ) দেখিলেন যে,
কোরানের বহুতর আয়াত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খােমাপত্রাদিতে লিখিত আছে,
১৩২ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা এবং সমুদয় কোনও এক্ষণে শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া গিয়াছে, তখন তিনি ভাবিলেন যে, ঐ ক্ষুদ্র পত্রগুলির আর কোন আবশ্যকতা নাই, এবং পত্রগুলি সাবধানে রাখাও দুরূহ। কোনক্রমে যদি এগুলি কোন কদৰ্য্য স্থানে পড়িয়া বিনষ্ট হয়, তাহাও শাস্ত্রবিরুদ্ধ ; সুতরাং পত্রগুলি দগ্ধ করিয়া ফেলিলে, আর সে আশঙ্কা থাকিবে না। এই উদ্দেশ্যে তিনি সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পত্রগুলি দগ্ধ করিবার আদেশ দেন। (মিশকাতুল মসাবি); এখন কোরান দগ্ধ, না খ্রীষ্টভক্তের দুকাল দগ্ধ হইল, তাহা নিরপেক্ষ পাঠক- বর্গের বিচারাধীন। শেখজীর চতুর্থ থােকার উত্তর (১) খ্ৰীষ্টভক্তকে আমরা ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারিলাম না ; কেননা, ঝটাপট একটা ‘ইটাতল হাদিছের’ নামাবিষ্কার করাও ভারি অভিজ্ঞতার লক্ষণ। শিয়াদিগের মধ্যে উক্ত নামের কোন গ্রন্থই নাই; জন্ সাহেব যখন সেই নামটীর আবিষ্কারক, তখন তিনি অশেষ ধন্যবাদের পাত্র। (২) শিয়াদিগের কোন প্রামাণিক পুস্তকেই হজরত ওমানের(রাজিঃ) প্রতি “কাফের” শব্দ ব্যবহৃত হয় নাই, এবং আজিও কোন শিক্ষিত শিয়ার মুখ হইতে ঈদৃশ কুৎসিত বাক্য নির্গত হয় নাই। তবে যদি ভায়া কোনদিন কোন ষণ্ডা-গুণ্ডা শিয়ার মুথে এরূপ শুনিয়া থাকেন, তবে প্রােটেষ্ট্যান্ট-গুরু পাদ্রী লুথারের প্রতি রােমান মণ্ডলীর সুধামাখা বােলগুলি স্মরণ করিতে অনুরােধ করি। কলিকাতা ও অন্যান্য স্থানের রােমান খ্ৰীষ্টানদিগের নিকট তিনি জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা একবাক্যে বলিবেন যে, পাদ্রী লুথার ও প্রােটেষ্ট্যান্ট খ্ৰীষ্টানগণ বাইবেলের অনেক অংশ বাদ দিয়াছেন। (৩) হজরত ওসমান (রাজিঃ) সম্বন্ধে শিয়াদিগের কোন প্রামাণিক আসল কোরান কেথায় ? গ্রন্থেই “কাফের” শব্দ ব্যবহৃত হয় নাই; বরং তঁাহার প্রতি শিয়াদিগের শিরোধার্য্য ও সৰ্ব্বপ্রধান “হেঞ্জাল বালাগ,তাহ নামক গ্রন্থে কি লিখিত আছে তাহা দেখ—“খােদাতালার অনুগ্রহবর্তৃক হজরত ওমান (রাজিঃ) ও হজরত ওমরের (রাজিঃ) প্রতি, কেননা নিশ্চয় তঁাহারা বক্রপথের পথিকদিগকে সােজা ও সরল পথের পান্থ করিয়াছেন এবং কুসংস্কার সমূহকে সমূলে উচ্ছেদ করতঃ, সুসংস্কার ও দীনে-মােহাম্মদী বা সুন্নতকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।” কাশফল গামতাহ' নামক গ্রন্থখানিতেও মহা- পুরুষ ওসমান (রাজিঃ) সম্বন্ধে ঐ প্রকার বর্ণিত আছে। শিয়াদিগের শিরােধার্য গ্রন্থসমূহে যখন মহাত্মা ওসমানের (রাজিঃ) প্রতি ঈদশ মাহাত্ম্যপূর্ণ বচনাবলী বর্তমান, তখন সেই শিয়াদিগের স্কন্ধে ভর করিয়া যদি কেহ হজরত ওসমান (রাজিঃ)কে দোষী করিতে চান, সেটা তাঁহার বাতুলতা বা সারশূন্য থােকা বই আর কি ? জন্ সাহেবের ৫ম থােকা “এমাম জাফর কহিতেছেন যে, সুরা আহযাবে কোরেশের পুরুষ ও স্ত্রীদিগের ভ্রষ্টতার বিষয় বর্ণিত ছিল। এ-সুরাটী সুরা বকর হইতে বড়।” দেখ‘আয়ন-উল-হক’ গ্রন্থের ২০৮ ওরক। (১) ‘আয়ন-উল-হক’ নামক গ্রন্থে ঈদৃশ কোন কথা লেখা নাই। জনৈক বিকৃতমনা শিয়া ‘অয়নুল হায়াত’ নামক একখানি খামখেয়ালী পুস্তকে ঐরূপ ভিত্তি ও প্রমাণশূন্য কয়েকটা প্রলাপােক্তি করিয়াছিল কিন্তু উক্ত পুস্তক প্রকাশ হওয়া মাত্রই যে স্বয়ং শিয়া পণ্ডিতগণই উহার কঠোর প্রতিবাদ ও সেই ভণ্ড শিয়াটীকে সম্পূর্ণ প্রতারক নির্দেশ করিয়াছিলেন, শেখ মহাশয় কি তাহা কখনই শুনেন নাই ? সত্য ;
কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা (২) কোরান সম্বন্ধে যে-কোন বিষয়ই হউক না কেন, প্রামাণিক হাদিছবিরুদ্ধ হইলেই তাহা অগ্রাহ; সুতরাং আয়নুল হায়াত-প্রণেতা যখন হাদিছ হইতে কোনই প্রমাণ দিতে পারেন নাই, তখন তাহার কথা বাতুলতা মাত্র। (৩) আবু জাফর সাহেব কখনই ঐ কথা বলেন নাই, উহা সম্পূর্ণ সেই ভণ্ড শিয়াটীর প্রতারণা। আবু জাফর সাহেবের স্বরচিত গ্রন্থই এ-বিষয়ের জ্বলন্ত প্রমাণ প্রদর্শন করিতেছে। “এক্কাদাৎ নামক যে গ্রন্থখানি আজিও শিয়া সম্প্রদায়ের শিরােধার্য্য, সেই গ্রন্থে তিনি স্বয়ং বলিয়াছেন যে, “কোরানের প্রতি আমার বিশ্বাস এইরূপ- আল্লাহতালা স্বীয় প্রেরিত হজরত মােহাম্মদের (দঃ) প্রতি যে কোরান অবতীর্ণ (নাজেল ) করিয়াছেন, তাহা দুইটা উৎকৃষ্ট প্রণালীতে ( লিখিত ও কণ্ঠস্থ ) বর্তমান লােকদিগের নিকট পাওয়া যায়। ইহা অপেক্ষা কম বা বেশী নয়। কিন্তু অন্যের নিকট সুরা আলাস্শরা ও অদ্দোহা পৃথক পৃথক দুইটি সুরা। উহা আমার বিবেচনায় (উভয় মিলিয়া) একটা সুরা। এতদ্ভিন্ন যে কেহ আমার সম্বন্ধে বলে যে আমি বলি, কোরানে ইহা অপেক্ষা বেশী ছিল’ সে প্রকাশ্য প্রতারক।” আবু জাফর প্রণীত এক্কাবাৎ গ্রন্থ। প্রিয় পাঠক, যে আবু জাফর সাহেব বর্তমান কোরানের একটি অক্ষর বা আকার একারেরও কমিবেশী স্বীকার করেন নাই, সেই মহাপুরুষের মাথায় এতবড় দোষ চাপাইয়া যাহারা সুপথগামীকে বিপথগামী করিতে নিয়ত চেষ্টিত, তাহারা কোন্ নামে অভিহিত হইবার যােগ্য, তাহার মীমাংসা আপনারাই করুন। ধােকাবাজ খ্রীষ্টানগণ কোরানের বিরুদ্ধে বক্তৃতাকালে সৰ্ব্বদাই শিয়াদিগের মাথায় ভর দিয়া নানা প্রকার ব্যঙ্গোক্তি করিয়া থাকে। এজন্য সৈয়দ মতিজা নামক একজন প্রবীণ আসল কোরান কোথায় ? শিয়া পণ্ডিতের মত নিম্নে উদ্ধৃত হইল। শিয়াদিগের শিয়ােধাৰ্য্য “জামেউল্- বয়ান নামক গ্রন্থে উক্ত মহাত্মা লিখিয়াছেন,—“নিশ্চয়ই কোরানের এ একটি অত্যাশ্চর্য বিষয় ; নিশ্চয়ই আরবীয় ওলামাগণ (পণ্ডিতমণ্ডলী) স্বীয় শাস্ত্র মহা কোরানকে পৃথিবীতে অক্ষুন্ন রাখিতে সৰ্বোন্নত স্থানের অধিকারী। যেহেতু কোরান প্রেরিতত্বের (নবুয়তের) একটি পূর্ণ মােজেজা (নিদর্শন), সুতরাং কোরান শরিফই ব্যবস্থা, বিজ্ঞান, ঐহিক এবং পারমার্থিক বিষয়ক শিক্ষার মূল। মােস্লেম ওলামাগণ কোরানকে ঈদৃশ অক্ষুন্ন রাখিতে সক্ষম হইয়াছেন যে, উহার একটি জের জবরেরও ( আকার একার) পরিবর্তন হয় নাই। প্রিয় ইসাই, দেখুন, আপনাদের মানিত সাক্ষী শিয়া পণ্ডিতের মুখেই কোরানের অকৃত্রিমতার কি সুন্দর প্রমাণ হইল। এক্ষণেও কি আপনাদের সেই অসার স্বপ্ন ভঙ্গ হইবে না ? পঞ্চম প্রশ্নে জন্ সাহেব যে হাদিছটির অবতারণা করিয়াছেন, তাহাই কোরানের অপরিবর্তনীয়তার অকাট্য প্রমাণ। কিন্তু জন্ সাহেব হাদিছটির অনুবাদে ঠিক তাহাদের বাইবেলের ন্যায় “মন পােলাও পাকাইয়া ফেলিয়াছেন। আমরা গদিছটির যথার্থ অনুবাদ এখানে প্রকাশ করিতেছি মালেকের পুত্র আনেছ রওয়ায়েত করিতেছেন- যখন ইমানের পুত্র হোজাফা আর্মেনিয়ায় সুরিয়াবাসীদের এবং আজর- বিজানে ইরাফী সম্প্রদায়ের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত ছিলেন, তখন তিনি (ইমানের পুত্র হােজায়ফা) কোরানপাঠকের পাঠোচ্চারণে অমিল হইবে এই আশঙ্কায় (১) হজরত ওমানের (রাজি) নিকট আসিয়া ১। এই ঘটনার পূর্কে যে কোরান শরিফের কোন অংশই গােলমাল হয় নাই, “হইবে আশঙ্কা শব্দ দ্বারা তাহা পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে। উক্ত যুদ্ধে বহুতর হাফেজকে শহিদ হইতে দেখিয়া হােজায়ফার মনে ঈদৃশ আশঙ্কা উপস্থিত হইয়াছিল।
১৩৬ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্ল। কহিলেন,“হে আমিরুল মুমেনিন, ইহুদী ও ইসায়ীদিগের বাইবেলের ন্যায় মুসলমান শাস্ত্রে (কোরানে) গােলযােগ উৎপন্ন হইবার পূর্বে (১) মােসলেম শিষগণের তত্ত্ব লউন। তখন হজরত ওমান হাফিজার (রাজিঃ) নিকট লােক পাঠাইয়া কহিলেন, আপনি (কোরানের) হস্তলিপি আমাদের নিকট পাঠাইয়া দিবেন। আমরা উহা উদ্ধৃত করিয়া পুনরায় আপনার নিকট পাঠাইয়া দিব। (২) হজরত হাফিজা (রাজিঃ)। তৎক্ষণাৎ হস্তলিপিটি পাঠাইয়া দিলেন। তখন হজরত ওসমান (রাজিঃ সাবেতের পুত্র জয়েদ, জাবিরের পুত্র আবদুল্লা, আল আসের পুত্র সয়িদ এবং হাম্মামের পৌত্র ও হারেসের পুত্র আবদুল্লা এই চারিজনকে (৩) তাহা নকল করিতে আদেশ দিলেন। কিন্তু আদেশকালে বলিলেন,- যখন তােমাদের সহিত (অন্য স্থানের ও বংশের) জয়েদের (৪) কোরানের শব্দোচ্চারণের অনৈক্য হয়, তখন তাহা কোরেশের ভাষার ১। উক্ত পদটির দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে, এই সময়ের পূর্বেই বাইবেলে গােযােগ উৎপন্ন হইয়াছিল ; তদ্দর্শনে মুসলমানগণ ভীত হইয়া ঈদৃশ দোষ স্পর্শ করিবার পূর্বেই মহা কোরানকে অক্ষুন্ন রাখিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন। ২। এই হস্তলিপিটী এখনাে কাবাতে বর্তমান আছে। দাফেওল বিসাত গ্রন্থ দেখ। ৩। পাদ্রী সাহেব এই চারিটি নাম লিখিতেও খিচুড়ি পাকাইয়াছেন; বরং চারি স্থলে তিন জন বলিয়াই পালাসায় করিয়াছেন। ৪। জায়দ ভিন্ন আর তিন জনেই কোরেশ বংশােদ্ভব ছিলেন। এক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার উচ্চারণে পার্থক্য হইয়া থাকে। জায় উপযুক্ত শিক্ষিত এবং কোরেশ ভাষায় সুপণ্ডিত হইলেও কথার উচ্চারণে কিছু কিছু পার্থক্য ছিল ; তাহা স্বাভাবিক। লিখিত ভাষাতেও এইরূপ ভুল দেখা যায়। মহাপুরুষ ওসমান ইহা বিবেচনা করিয়া যাহাতে কোরানে ঈদৃশ বিকৃতভাবে উচ্চারিত কোন শব্দের সমাবেশ হইতে না পারে এই উদ্দেশ্যে কোরেশ বংশীয় উক্ত তিন ব্যক্তিকে পূর্বেই সতর্ক করিয়া দিয়া বলিলেন যে,যদি তােমাদের তিন জনের সহিত জায়েদের শব্দোচ্চারণে কোন অনৈক্য হয় তবে তাহা কোরেশের ভাষায় লিখিও। কারণ, কোরান কোরেশ ভাষায় নাজেল হইয়াছে। এস্থলে মাত্র উচ্চারণের অমিলের কথা বলা হইয়াছে ; কোন শব্দ বা অধ্যায় বিষয়ক অমিলের কথা নহে।
আসল কোরান কোথায় ? ১৩৭ উচ্চারণানুযায়ী লিখিও। কারণ কোরান শরিফ কোরেশের ভাষায় নাজেল হইয়াছে। পরে তাহাদের লেখা শেষ হইলে হজরত ওসমান ( রাজিঃ) হস্তলিপিটি হাফিজার ( রাজিঃ) নিকট পাঠাইয়া দিলেন। আর ঐরূপ এক এক খণ্ড কোরান লেখাইয়া প্রত্যেক দেশে প্রেরণ করিলেন। আর যে সমস্ত সহিফা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পত্রাদিতে বিচ্ছিন্নভাবে লেখা ছিল, তাহা দগ্ধ করিবার আদেশ দিলেন। (দেখ মিশকাত, ও বােখারী।) প্রিয় পাঠক! উক্ত হাদিছটির মূলতত্ত্ব—বাহা পাদ টীকায় লিখিত হইল, কিঞ্চিৎ স্থিরভাবে গভীর চিত্তে পাঠ করুন ; দেখিবেন, মুল কোরানের ইহাই আসলত্বের প্রমাণ। ৬৪ থােকার উত্তর হজরত মােহাম্মদ (দঃ) সাধারণ বিদ্যায় নিরক্ষর ছিলেন একথা সত্য ; ইহা তাহার প্রেরিতত্বের বা নবুয়তের একটি জলন্ত প্রমাণ। আমরা স্বীকার করি, তিনি কোন মানুষের নিকট কোন দিন কোন বিদ্যা শিক্ষা করেন নাই। কিন্তু সেই নিরক্ষর মহাপুরুষের পবিত্র রসনা- নিঃসৃত অনন্ত জ্ঞান ও যুক্তিযুক্ত এবং ব্যাকরণবিশুদ্ধ অলঙ্কারপূর্ণ বচনাবলীর নিকট যখন সমুদয় জগতের ভাষাবিদ বিদ্যাবাগীশ পণ্ডিত- মণ্ডলীকে অবনত মস্তক দেখি, তখন তিনি যে নিশ্চয়ই সেই সর্বোপরিস্থ মহামহিমের প্রদত্ত বচন প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্থির নিশ্চয়।••••••হজরত খােদাতালা প্রদত্ত আয়াতসমূহ বিশুদ্ধরূপে উচ্চারণ ও কণ্ঠস্থ করিয়া জগৎ- বাসীকে শিক্ষাদানে পূর্ণ শক্তিমান হইয়াছিলেন। কোরানের আয়াতসমূহ নাজেল হওয়া মাত্র তিনি স্বয়ং তৎসমুদয় কণ্ঠস্থ করিয়া তৎক্ষণাৎ সহস্রাধিক সাহাবীগণকে তাহা মুখস্থ করাইতে প্রবৃত্ত হইতেন। আয়াতসমূহ কাহারাে কাহারাে তৎক্ষণাৎ মুখস্থ হইয়া যাইত ; আর যাহাদের মুখস্থ কর্মবীর মুনী মেহেরুল্লা mm করিতে বিলম্ব হইত, তাহারা তখন খােৰ্ম্মাপত্রাদিতে লিখিয়া লইতেন। • হাফেজগণ সমস্ত কোরানই মুখস্থ করিয়া রাখিতেন। “যাহা লিখিত হইত তাহা মুখস্থ হইত না, আর যাহা মুখস্থ হইত তাহা লিখিত হইত না, ইহা মিথ্যা কথা। দুই চারিজন হাফেজের মুখস্থ বিষয় বেঠিক হওয়া সম্ভব, কিন্তু যে বিষয়টি সহস্র সহস্র লােকে তখনি মুখস্থ করিত, তাহা সকলেরই বেঠিক হওয়া সম্ভবপর নহে। কোন হাফেজের কোরান পাঠে ভুল হইলে হজরত নিজেই তাহা সংশােধন করিয়া দিতেন কারণ তিনি নিজেই হাফেজ ছিলেন। জন সাহেবকে আমরা অনুরােধ করি, তিনি যেন এলাহাবাদী কোন হাফেজের নিকট গিয়া কোরানের যে কোন স্থানের একটি পদ কেন, একটি আকার বা একার মাত্র ভুল করিয়া পরীক্ষা লন যে, হাফেজদিগের ভুল ধরিবার সাধ্য আছে কি না। * আশা করি, এখন বেশ বুঝা যাইতেছে যে, কোরানের আসলত্বে কোন প্রকারেই কোন গােলমাল হয় নাই। আজ আমরা তর্করূপ রণপ্রান্তরে দণ্ডায়মান হইয়া সগর্বে উচ্চৈঃস্বরে বলিতে পারি যে, যদি ঘটনাক্রমে এই সময়ে জগতের সমস্ত লিখিত কাগজপত্র, প্রস্তর ইত্যাদি বিলুপ্ত হইয়া যায়, তবে রমজানের সময় কলিকাতার এবং এদেশের অন্যান্য প্রধান প্রধান নগরে ও গ্রামে রাত্রিতে মসজিদে খতম তারাবী পড়িবার নিয়ম আছে। এই নামাজে হাফেজগণ কতিপয় দিবসে নামাজের সহিত উচ্চৈঃস্বরে সমগ্র কোরান শরিফ আবৃত্তি করিয়া থাকেন। ইহা বিশেষ ছওয়াবের কাজ বলিয়া মনে করা হয়। হাফেজের কোন আয়াতে ভুল করিলে উপস্থিত অন্য কোন হাফেজ বা সমবেত লােকদে কেহ না কেহ সে ভুল ধরিতে পারেন। কোরানের নানা স্থানের নানা আয়াত সাধারণেরও মুখস্থ আছে। এইরূপ অগ্নিপরীক্ষায় হাফেজগণ সর্বদা অত্যন্ত। কলিকাতার শত শত মসজিদে খতম তারাবী পঠিত আসল কোরান কোথায় ? ~~~ পৃথিবীস্থ অন্য কোন জাতির ধর্মগ্রন্থ অঙ্গহীন অবস্থায় ব্যতীত পাওয়া যাইবে না। কেবল কোরান শাস্ত্রই সৰ্বাঙ্গপূর্ণ অটলভাবে বিদ্যমান থাকিবে। তার আসলত্বের বিন্দুবিসর্গও ক্ষতি হইবে না। খ্ৰীষ্টীয়ান বন্ধুগণ, ধৰ্ম্মতঃ বল দেখি, তােমরা বাইবেলের বলে এরূপ সাহস বাধিতে পার কি ? প্রতিবাদের উত্তর জন্ জমিরুদ্দীন সাহেব-উক্ত প্রতিবাদের উত্তরে সুধাকরে একটা ক্ষুদ্র প্রবন্ধ প্রকাশিত করেন। উক্ত প্রবন্ধের প্রয়ােজনীয় অংশ নিম্নে লিখিত হইতেছে :- “সুদীর্ঘ প্রবন্ধটি পাঠ করিয়া অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইয়াছি। প্রবন্ধ- লেখক আমার লিখিত প্রবন্ধটির ঠিক মৰ্ম্ম অবগত না হইয়া ও আমার লিখিত ছয়টি প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর না দিয়া আমার প্রতি অনর্থক কটুক্তি প্রয়ােগ করিয়াছেন। কিন্তু তিনি সেটি ভাল কাজ করেন নাই। “পরিশেষে লিখিতব্য এই যে, কোরান শরিফ যদি পরিবর্তিত না হইত, তবে শিয়া ও সুন্নীদিগের কোরান শরিফে পরস্পর মিল থাকিত। সুন্নী ও শিয়া উভয় সম্প্রদায়ের কোরান শরিফের পরস্পর মিল নাই। শিয়াদিগের কোরানে যে সুরা আছে সুন্নীদিগের কোরানে সেই সুর নাই। যদি কোন মহাশয় উক্ত সুরা দেখিতে চান, তাহা হইলে পাঞ্জাবস্থ অমৃতসরের পাদ্রী শ্ৰীযুক্ত রেভারেণ্ড মৌলভী এমাদ উদ্দীন লাহিজ ডি, ডি, সাহেবের কৃত “তহকিক ইমান নামক কেতাবের ৯ম পৃষ্ঠা হইতে ১১শ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঠ করিয়া দেখুন। উক্ত কেতাব ১৪০ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা এলাহাবাদ ও লাহাের ট্রাক্ট সােসাইটিতে পাওয়া যায়। শিয়া সম্প্রদায় মুক্তকণ্ঠে সাক্ষ্য দিতেছে যে, সুন্নীদিগের কোরান তহরিফ ( পরিবর্তিত) হইয়াছে। ভাই মােহাম্মদী, আপনি অনুসন্ধান করিয়া দেখুন, যাহা সম্পূর্ণ সত্য তাহা গ্রহণ করুন। তাহাতে আপনার মঙ্গল হইবে।” শ্রীজ জমিরুদ্দীন এলাহাবাদ উক্ত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হইবার পর মুশী মেহেরুল্লা সাহেব নিম্নলিখিত প্রবন্ধটি প্রকাশিত করেন। সর্বত্রই আসল কোৱান “খ্রীষ্টিয় বান্ধব পত্রিকায় “আসল কোরান কোথায় ?” শীর্ষক প্রবন্ধে মুসলমানদিগের নিকটে কোরানের বিরুদ্ধে যে ছয়টি প্রশ্ন করা হইয়াছিল, “সুধাকরে তাহার সমস্তগুলিরই ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু প্রতিবাদী সাহেব লিখিয়াছেন,-“সুধাকরে ইসায়ী বা খৃষ্টানী থােক। নামক সুদীর্ঘ প্রবন্ধটি পাঠ করিয়া অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইলাম। প্রবন্ধ- লেখক আমার লিখিত প্রবন্ধের ঠিক মৰ্ম্ম অবগত না হইয়া আমার প্রতি অনর্থক কটুক্তি প্রয়ােগ করিয়াছেন।” জন্ সাহেবের ছয়টি প্রশ্নই অবিকল উদ্ধৃত করিয়া পদে পদে প্রতিবাদ এবং তাঁহার মানিত হাদিছসমূহের দ্বারাই বর্তমান কোরানের আসলত্ব বা নিভুলতার প্রমাণ প্রদর্শন করা হইয়াছে। উত্তর লেখক তাহার কোন্ কথার ঠিক মৰ্ম্ম বুঝিতে পারেন নাই, সে কথার আলােচনা না করিয়া আমার প্রবন্ধের মর্ম অবগত হন নাই, প্রকৃত উত্তর দেন নাই।” এবম্বিধ ভুয়া মন্তব্য ঝাড়া বা লক্ষ্যশূন্য উড়ো ফায়ার করা কি তাহার পক্ষে ভদ্রতাবিরুদ্ধ কাজ হয় নাই? প্রশ্নকারী হাদিছগুলির উচ্চারণ-দোষ আসল কোরান কোথায় ? ১৪ হয় কম্পােজিটারের মাথায় দিয়াই পার পাইলেন। কিন্তু আনে বেন্ মালেক বর্ণিত হাদিছটির অনুবাদেও তিনি যে স্বরুচি মােতাবেক খিচুড়ি পাকাইয়া ফেলিয়াছেন, সেটি কি তাঁহার হৃদ্যন্ত্রের জ্ঞান-কম্পাে- জিটারের দোষ নয় ? শেখজী বােধহয় আমার ৪র্থ ও ৫ম প্রশ্নের উত্তর কয়টি পাঠ করেন নাই; তাহা না হইলে তিনি বারংবার সেই শিয়া কাহিনীই গাহিবেন কেন? তঁাহার মানিত শিয়াদিগের প্রমাণিত ও শিরােধার্য্য গ্রন্থসমূহের দ্বারাই ত প্রমাণিত হইয়াছে যে, বর্তমান কোরানই আসল কোরান। প্রশ্নকারী শেখ মহাশয় ৪র্থ ও ৫ম প্রশ্নে শিয়াদিগের মাথায় হাত রাখিয়া বলিয়াছিলেন যে, যে সুরাটী হজরত ওসমান (রাজিঃ) কোরান হইতে তুলিয়া দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছিলেন তাহা সুরা বকর হইতে বড়। পাঠক! স্মরণ রাখিবেন যে, সুরা বকরী অন্যূন ৮০/৯০ পৃষ্ঠায় পূর্ণ। কিন্তু প্রতিবাদী ২৩শে বৈশাখের সুধাকরে লিখিয়াছেন যে, “যদি কেহ শিয়াদিগের কোরানােক্ত সুরাটি দেখিতে চান, তবে পাদ্রী আমাদুদ্দীন কৃত “তহকিকল ইমান পুস্তকের ৯ হইতে ১১ পৃষ্টা দেখুন। আমরা বলি, সুরা বকর হইতে বড় সুরাটি অগত্যা শতাধিক পৃষ্ঠা হওয়া চাই। সেই সুরাটি পাদ্রীজী নাকি ৯ হইতে ১১ অর্থাৎ ২৩ পৃষ্ঠায় সমাবেশ করিয়াছেন, এ-কথার বুনিয়াদে কি পরিমাণ সত্যের সম্পর্ক আছে, তাহা আবার বুঝাইতে হইবে? থােক। ইহারই নাম । দ্বিতীয়তঃ,—প্রশ্নকারী শেখজী পূৰ্বেই ৪র্থ ও ৫ম প্রশ্নে স্বয়ং সাক্ষ্য দিয়াছেন যে, হজরত ওসমান (রাজিঃ) তাহা দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছিলেন। দগ্ধীভূত সুরাটি পাদ্ৰীজী কোথায় পাইলেন ? তৃতীয়তঃ-এই, বিশাল বঙ্গদেশের নানাস্থানে অসংখ্য শিয়া ও শিয়াদিগের পাঠ্য কোরান বর্তমান থাকিতে সেই পাঞ্জাবস্থ জনৈক বিকৃতমনা ব্যক্তির কৃত পুস্তক যাহা সহজে ১৪২ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা পাঠকের দৃষ্টিগােচর হওয়া সম্ভবপর নহে, তাহার বরাত দিয়া শেখ মহাশয় ভাল করিয়াছেন কি? আমরা কিন্তু শিয়া সুন্নিদিগের সহস্র সহ পাঠ্য কোরান একত্র করিয়া তাহার অভিন্নতা দর্শাইতে পারি। কিন্তু একই সহরে যদি রােমান ও প্রটেষ্ট্যান্ট উভয় সম্প্রদায়ের খ্ৰীষ্টান থাকে, তবে তাহাদের দুই দলের বাইবেল লইয়া মিলাইয়া দেখিবেন যে, উভয় বাইবেলে সম্পূর্ণ অমিল হইবে। যিনি ল্যাটিন ভাষা না জানেন, তিনি যেন রােমান পাদ্রীকে এ-কথা জিজ্ঞাসা করেন ; দেখিবেন, তিনি বলিবেন যে, “আমাদের রােমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বাইবেল আজিও বঙ্গভাষায় অনুবাদিত হয় নাই।” ইসাই বন্ধুকে আমরা অনুরােধ করি, তিনি পৃথিবীর সমস্ত দেশের কোরান একত্র করিয়া পরস্পর ঐক্য করিয়া দেখুন ; তাহা হইলে বুঝিতে পারিবেন, তাহাদের মধ্যে বিন্দুমাত্রও পার্থক্য নহে। তাই বলি, সর্বত্রই আসল কোরান। ; মােহাম্মদ মেহেরুল্লা যশােহর শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব এই প্রবন্ধের আর কোনই উত্তর দিতে পারেন নাই। এই ঘটনার অল্পদিন পরেই তিনি ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন । T0 == (২) দেশ ও দশের অভিমত মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা মহুমের মৃত্যুর পর তৎকালীন সংবাদপত্র সমূহে তাঁহার সম্বন্ধে যে সমস্ত মন্তব্য ও কবিতা প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহার কয়েকটির কিছু কিছু অংশ এস্থলে উদ্ধৃত করা হইল। এই সমুদয় পাঠে তাহার ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্ব সম্বন্ধে কথঞ্চিৎ ধারণা হইবে। বলা বাহুল্য, স্থানাভাব নিবন্ধন তঁাহার সম্বন্ধে অধিকাংশ লিখনই প্রকাশ করা সম্ভবপর হইল না। মিহির ও সুধাকর আজকাল বঙ্গীয় মােসূলেম-রাজনৈতিকজগত ও ধর্মজগত ঘাের তমসাচ্ছন্ন। এই দুঃসময়ে যিনি উভয় বঙ্গের নানা অস্বাস্থ্যকর স্থানে গমনপূর্বক তত্ৰত্য অশিক্ষিত নিরীহ মুসলমানদিগকে সদুপদেপ প্রদান করিয়া শিক্ষা ও ব্যবসায় বাণিজ্যে মনােযােগী হইবার জন্য উৎসাহ দিতেছিলেন, যিনি আজ আঠার বৎসর কাল ধৰ্ম্ম ও সমাজের জন্য স্বীয় জীবন উৎসর্গ করিয়া বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজে এক নব জীবনের সঞ্চার করিয়াছেন, বঙ্গের সেই অদ্বিতীয় বাগ্মী ইস্লামধৰ্ম্ম-প্রচারক মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব আর ইহজগতে নাই ! মুসলমান সমাজকে কাদাইয়া তিনি গত ২৪শে জ্যৈষ্ঠ মােতাবেক ৭ই জুন, (২৪শে রবিয়ানী) শুক্রবার বেলা একটার সময় (ঠিক জুম্মার নামাজের সময়) পবিত্র কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন (ইন্না লিল্লাহে.) তাঁহার মৃত্যুর অর্ধ ১৪৪ কর্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা ঘণ্টা পূৰ্ব্ব হইতে সমস্ত আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছিল, মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাইতেছিল, এবং প্রবল বেগে বায়ু বহিতেছিল। ঐদিন দিনরাত্রির ভিতর রৌদ্র বা বৃষ্টি হয় নাই। এই সকল ঘটনাপরম্পরা ও মৃত্যুর পবিত্র সময় ইত্যাদি দ্বারা বুঝিতে পারা যায় যে, তিনি একজন কিরূপ ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। বাস্তবিক মুনশী সাহেব একজন আদর্শ মুসলমান ছিলেন, তাহাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই। তিনি পরম ধাৰ্মিক, দয়ালু, অমায়িক, জনহিতৈষী ও স্বজাতিবৎসল মহাত্মা ছিলেন। তাঁহার প্রতাপে খ্রীষ্টিয়ান পাদ্রীগণ কম্পিত হইতেন। ধর্মদ্রোহী নেড়ার ফকিরগণ তাহার নিকট মস্তক অবনত করিত। শত শত নেড়ার ফকির ও অসংখ্য হিন্দু তাঁহার নিকট তওবা করিয়া পবিত্র ইস্লাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছে। অনেক খ্ৰীষ্টিয়ানকে তিনি সদুপদেশ দ্বারা ইল্লাম ধর্মে আনয়ন করিয়া- ছেন। সহস্র সহস্র বেনামাজীকে তিনি নামাজে খাড়া করিয়াছেন। তঁাহার জ্বলন্ত উপদেশে শত সহস্র লােক পাপকাৰ্য্য ছাড়িয়া, ধৰ্ম্মপথের পান্থ হইয়াছে। বহুলােক তাহার সাহায্যে ঋণদায় হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছে। তাহার চেষ্টায় বহু মাদ্রাসা, স্কুল, মক্তব ও পাঠশালা স্থাপিত হইয়াছে। তাহার ধর্মোপদেশে বহুসংখ্যক মজেদ নিৰ্মিত হইয়াছে। তাহার ওজস্বিনী বক্তৃতার প্রভাবে নির্জীব মুসলমান- দিগের মধ্যে এক জীবন্ত ধৰ্ম্মভাব প্রবেশ লাভ করিয়াছিল। শত সহস্র মুসলমান অলসতা ছাড়িয়া শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মনােযােগ প্রদান করিয়াছে। বহুসংখ্যক সবল ও কর্মঠ ভিক্ষুক ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়িয়া শ্রমজীবী ও ব্যবসায়ীর দল পুষ্ট করিয়াছিল। তাঁহার অসাধারণ চেষ্টায় মুসলমানদিগের মধ্যে বিধবাবিবাহের প্রচলন হইয়াছিল। এরূপ অসীম ক্ষমতাশালী বক্তা হিন্দু সমাজেও দৃষ্ট হয় না। মুসলমান সমাজের দুর্গতির জ্বলন্ত চিত্র তিনি এমনই সজীবভাবে অঙ্কিত করিয়া দেখাইতেন যে * দেশ ও দশের অভিমত ১৪৫ তদ্বারা শ্রোতৃমণ্ডলী আপনাদের মারাত্মক রােগের বিষয়, অভাবের বিষয়, সুন্দররূপে উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইত। তাহার বক্তৃতায় একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষিত লােকেরা মুগ্ধ হইতেন, সেইরূপ অন্যদিকে অশিক্ষিত জনসাধা- রণও উহা উত্তমরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া আত্ম-সংশোধনে প্রবৃত্ত হইত। তিনি পরাক্রান্ত সিংহের ন্যায় বঙ্গের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বক্তৃতা করিয়া বেড়াইতেন। হিংসা, দ্বেষ, ক্রোধ ইত্যাদি কোন স্মৃণিত রিপুরই তিনি বশীভূত ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত মিষ্টভাষী ছিলেন ; বক্তৃতপ্রসঙ্গে লোকের উপর কষাঘাত করিলেও লােকে তাহাতে বিরক্ত হইয়া একাগ্রচিত্তে তদীয় বক্তৃতা-সুধা পান করিত। দরিদ্রের দুর্দশা দেখিয়া তাহার কোমল হৃদয় বিগলিত হইত। পবিত্র ইলাম ধর্মের আয়ত্তে থাকিয়া তিনি গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতেন। তাহার উদারতা দর্শনে হিন্দু-মুসলমান খ্ৰীষ্টিয়ান প্রভৃতি সকল শ্রেণীর লােকেই মুক্তকণ্ঠে তাঁহার প্রশংসা-কীৰ্ত্তন করিতেন। তিনি মুসলমানদিগের জন্য বঙ্গদেশে সুধাধার ঢালিতেছিলেন। কিন্তু হায় সকলই ফুরাইল! ভাই বঙ্গীয় মুসলমান ! আজ তােমরা প্রকৃত বন্ধু হারাইলে! আর কাহার সুমধুর বক্তৃত সুধাপান করিয়া তােমরা পরিতৃপ্ত হইবে? আর কে তােমাদিগকে ওজস্বিনী ভাষায় পবিত্র ধর্মকথা শুনাইবে? বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজ একপ্রকার বাশূন্য হইল। সােলতান বলিতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়, সৰ্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠে! লেখনী আর অগ্রসর হয় না, স্মরিতে প্রাণ শতধা ফাটিয়া যায় ! হতভাগ্য সমাজের দূরদৃষ্টের কথা হৃদয়ে জাগ্রত হইলে প্রাণে প্রবল শোকস্রোত প্রবাহিত হয়। একি ভয়াবহ হৃদয়বিদারক দুঃসংবাদ শুনিলাম ! পতিত সমাজের ১৪৬ কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা উদ্ধারের আশা বুঝি ফুরাইল! সুষুপ্ত বঙ্গীয় মুসলমাম সমাজ বুঝি জাগিতে জাগিতে আর জাগিতে পারিল না। তাহাৱা বােধহয় উন্নতি-সােপানে উঠিতে উঠিতে আর উঠিতে পারিল না। আমাদের মহাপাপ নিবন্ধনই খােদাতলার অভিপ্রায় অনুসারে বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজ হইতে বাগ্মীকুলশিরােমণি স্বজাতিবৎসল, সমাজহিতৈষী ধৰ্মগতপ্রাণ, সমাজদেহের আত্মাসদৃশ যশােহর ছাতিয়ানতলা নিবাসী ইল্লাম প্রচারক মুনশী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব নিরাশ্রয় বঙ্গীয় পতিত মুসলমান সমাজকে অকূল শােকসাগরে ভাসাইয়া বিগত ৭ই জুন শুক্রবার বেলা ১টার সময় অনন্তধামে যাত্রা করিয়াছেন। বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজ আজ চারিদিক অন্ধকার দেখিতেছে! মােস্লেম সুহৃদ যিনি সমাজের জন্য, ধর্মের জন্য দিন রাত্রি চিন্তা করিয়াছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া পরিশ্রম করিয়াছেন, যাঁহার অনাময়ী বক্তৃতা শ্রবণ করিয়া বঙ্গের শিক্ষিত অশিক্ষিত হিন্দু মুসলমান স্তম্ভিত হইয়াছেন, যাহার উৎসাহপূর্ণ বক্তৃতাচ্ছটায় মনপ্রাণ আনন্দে নাচিয়া উঠিয়াছে, শিরায় শিরায়, ধমনীতে ধমনীতে উৎসাহ-স্রোত প্রবাহিত হইয়াছে, পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গের বক্তৃতারাজ্যের প্রধান সম্রাট শােহর ছাতিয়ানতলা নিবাসী সেই মুন্শী মােহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেব আর ইহজগতে নাই।••••••বঙ্গীয় মুসলমানদের ধর্ম ও রাজনীতিগগন আজ ঘাের অন্ধকারে পূর্ণ। মুসলমান-সমাজের এই ঘাের দুর্দিনে, তাহাদের উন্নতি-অবনতির এই সন্ধিস্থলে মুন্শী মেহেরুল্লার উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা অজ্ঞান তিমিরাচ্ছন্ন উভয় বঙ্গের মুসলমান সমাজে জ্ঞানালােক বিকীর্ণ করিতেছিল, এই সময় দুরন্ত কাল তাঁহাকে অকালে গ্রাস করিয়া প্রত্যেক মুসলমান-হৃদয়ে যে বজ্রপাত দেশ ও দশের অভিমত ১৪৭ *** AAAA করিল, ইহার আর শান্তি হইবে না। বঙ্গীয় মুসলমান-সমাজ যে মূল্যবান রত্ন হারাইল, আর তাহা ফিরিয়া পাইবে না। অন্য আমরা সাশ্রনয়নে তঁাহার পরলোকগত আত্মার মঙ্গল কামনা করিতে করিতে বিদায় হইবার সময় বঙ্গের ছোট বড় শিক্ষিত অশিক্ষিত প্রত্যেক মুসলমান ভ্রাতার নিকট করজোড়ে বিনীতভাবে প্রার্থনা করিতেছি যে, মুনশী সাহেবের সদগতির জন্য সকলেই যেন খােদাতালার নিকট প্রার্থনা করেন , সাধ্যমত দোয়া দরূদ পড়িয়া কোরান মজিদ তেলাওয়াত করিয়া উক্ত স্বর্গীয় অহাম্মার নামের উপর বখশেশ করেন। ইল্লাম প্রচারক বঙ্গের সর্বপ্রধান বাগী ও সমাজসেবক, মুসলমানদিগের উন্নতির “থপ্রদর্শক ও সমাজ-সংস্কারক, মুসলমান কবি, গ্রন্থকার ও ধর্মপ্রচারক, সৰ্বজনপ্রিয় মুর্শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের অকাল মৃত্যুতে বঙ্গীয় যুসলমানের যে চূড়ান্ত ক্ষতি হইয়াছে, সে ক্ষতি পূরণ হইবার আর আশা নাই। আমাদের প্রাণের ভাই অকালে চলিয়া গিয়াছেন। আমাদের হৃদয় চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়াছে, বাহুভগ্ন হইয়াছে। বঙ্গীয় মুসলমানগণ আর কাহার বক্তৃতা-সুধা পান করিয়া পরিতৃপ্ত হইবে। কাহার উদ্দীপনাময়ী বক্তৃতা শ্রবণে আত্মা চরিতার্থ করিবে? কাহার অমূল্য উপদেশমালা শ্রবণে সমাজ সেবায় গা ঢালিয়া দিবে। আমরা যে মহার্ঘ রত্ন হারাইয়াছি তাহ আর ফিরিয়া পাইবার অাশা নাই। মুন্শী সাহেবের অভাবে বঙ্গীয় মোস্লেম-আকাশ যেন গভীর ঘনঘটায় আচ্ছন্ন। বঙ্গের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পৰ্য্যন্ত সর্বত্র হাহাকার পড়িয়া গিয়াছে।
শােকোচ্ছাস
একি অকস্মাৎ হ’ল বজ্রপাত । কি আর লিখিবে কবি?
বঙ্গের ভাস্কর প্রতিভা-আকর অকালে লুকাল ছবি।
কি আর লিখিব, কি আর বলিব, আঁধার যে হেরি ধরা!
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল খসিয়া কক্ষচ্যুত গ্রহ তারা।
কঁপিল ভূধর কানন সাগর প্রলয়ের প্রভঞ্জনে,
বহিল তুফান ধ্বংসের বিষাণ বাজিল ভীষণ স্বনে!
ছিন্ন হ’ল বীণ কল্পনা বিলীন উড়িল কবিত্ব পাখী,
মহা শােকানলে সব গেল জ্বলে শুধু জলে ভাসে আঁখি
কি লিখিব আর, শুধু হাহাকার শুধু পরিতাপ ঘাের,
আনন্ত ক্রন্দন অনন্ত বেদন বহিল জীবনে মাের।
মধ্যাহ্ন তপন ছাড়িয়া গগন হায়রে খসিয়া পল।
সুধা-মন্দাকিনী জীবন-দায়িনী অকালে বিশুষ্ক হ’ল ।
বাজিতে বাজিতে মােহিতে মােহিতে অকালে থামিল বীণ,
প্রভাত হইতে দেখিতে দেখিতে আঁধারে মিশিল দিন ।
মলয় পবন সুখ-পরশন থামিল বসন্ত ভােরে ;
গােলাপ কুসুম চারু অনুপম প্রভাতে পড়িল ঝরে।
ভবের সৌন্দর্য সৃষ্টির ঐশ্বৰ্য শারদের পূর্ণশশী
উদিতে উদিতে হাসিতে হাসিতে রাহুতে ফেলিল গ্রাসি ও
জাগিতে জাগিতে উঠিতে উঠিতে নাহি হল জাগরণ ;
এ বঙ্গ-সমাজ সিন্ধুনীরে আজ হইলরে নিমগন।
১৪৯
শােকোচ্ছাস
এ পতিত জাতি আধারেই রাতি পােহাবে চিরটি কাল,
হবে না উদ্ধার বুঝিলাম সাঁর কাটিবে না মােহজাল!
যেই মহাজন করিয়া যতন অপূৰ্ব্ব বাগ্মিত বলে
নিজিত মােসলেমে ঘুরি’ গ্রামে গ্রামে জাগাইলা দলে দলে,
যার সাধনায় প্রতিভা-প্রভায়
নূতন
জীবন-উষা
উদিল গগনে মধুর লগনে পরিয়া কুসুম-ভূষা।
আজি সে তপন হইল মগন অনন্ত কালের তরে!
প্রলয়-আঁধার তাই একেবারে আবরিছে চরাচরে।
বক্তৃতা-তরঙ্গে এ বিশাল বঙ্গে ছুটিল জীবন ধারা,
মোসলেমবিদ্বেষী যত অবিশ্বাসী বিস্ময়ে স্তম্ভিত তারা।
হায়! হায়! হায়! হৃদি ফেটে যায় অকালে সে মহাজন
কাদায়ে সবারে গেল একেবারে আঁধারিয়া এ ভুবন।
কেহ না ভাবিল কেহ না বুঝিল কেমনে ডুবিল বেলা!
ভাবিনি এমন হইবে ঘটন সবাই করি হেলা !
শেষ হ’ল খেলা ডুবে গেল বেলা আঁধার আইল ছুটি
বুঝিবি এখন বঙ্গবাসিগণ কি রতন গেল উঠি।
গেল যে রতন হায় কি কখন মিলিবে সমাজে আর ?
মধ্যাহ্ন তপন হইল মগন, বিশ্বময় অন্ধকার।
--শিরাজী
নীরব সমাধি
১ )
এই কি সে পুণ্যময় মােসলেমের তীর্থস্থান
যার নামে উঠে নাচি সবার মানস প্রাণ?
ছাতিয়ানতলা গ্রাম যশোহর জেলা মাঝে
এই কি সম্মুখে আজি শােভিছে অপূর্ব সাজে ?
মােসলেম-সমাজ-জ্যোতি-কোহিনূর মহামণি
জনমিল এখানে কি ? এই কি সে পুণ্য খনি ?
নীরবে নিশীথে আজি নেহারি এ পুণ্য স্থান,
কত কত নব ভাবে চমকিছে মন প্রাণ।
রজনী ত্রিযাম প্রায় ঘাের স্তব্ধ ভূমণ্ডল,
শান্তির সলিলে ধরা হইয়াছে সুশীতল।
আকাশে জাগিছে তারা, হাসিছে নীরবে শশী,
প্রকৃতির গভীরতা পরাণে যেতেছে বসি।
সহসা সহসা একি ! এই কি সে গোরস্থান ।
এই কি সে—য় মরি ভাবিতেও কাদে প্রাণ।
এখানে কি মেহেরুল্লা শায়িত আছেন হায় !
সমাজসংসার ভুলি ভুলে গিয়া সমুদায় !
( ৩ )
ধীরে ধীরে শির ধারে দাড়াইয়া মােরা সবে
উদ্দেশে “সালাম তার করিলাম উচ্চ রবে।
পাই প্রত্যুত্তর, না পাই সম্ভাষণ।
কাদিল প্রকৃতি যেন হইয়া উদাস মন!
সমীরণ গেল বহি হায় হায় হায় রবে।
সুদূরে নক্ষত্রকূল কঁপিল উচ্ছাসে সবে।
বিষাদে মেঘের আড়ে দাড়াইল শশধর,
হইল আধারময় এ বিশাল চরাচর।
প্রবল তরঙ্গমালা উঠিল হৃদয়-সরে
নীরবে কাদিল প্রাণ হৃদয়ের অভ্যন্তরে।
কৰ্ম্মবীর মুন্শী মেহেরুল্লা মেহেরুল্লা-সমাধি
No text on this page.
নীরব সমাধি
১৫১
(৪)
জানি না শুনিলা কিংবা না শুনিলা সেই স্বর,
জানি নাক সালামের দিল কিনা প্রত্যুত্তর।
জানি না চিনিলা কিংবা না চিনিলা অভাগায়,
জানি না কি কয়েছিল তিনি আম। সবাকায়।
জানি নাক আমাদের মর্মান্তিক সে বেদনা
বুঝিয়াছিলেন কিংবা বুঝিলেন কিছুই না।
নীরবে কাদিল প্রাণ, বহিল নয়নে ধারা,
উদাসে বিষাদে খেদে হইলাম আত্মহারা।
(৫)
হে মেহের বাঙ্গালার মােলেম-গৌরবরবি,
কেমনে ঘুমায়ে আছ এখানে ভুলিয়া সবি ?
তােমার অভাবে আজি চারিদিক অন্ধকার,
মােসলেমের ভাঙ্গা প্রাণে উঠিতেছে হাহাকার।
তােমারে হারায়ে কারে লয়ে বঙ্গ-মুসলমান
উন্নতির উচ্চ লক্ষ্যে হইবেক আগুয়ান?
চারিদিকে তব শােকে শত আঁখি ঝরিতেছে,
শত বজ কালানল অবিরল জ্বলিতেছে ।
সমগ্র বাঙ্গালা জুড়ি’ বিষাদের দীর্ঘশ্বাস
বহিতেছে নিরবধি, না আছে আনন্দ-হাসি।
তাই বলি আঁখি মেলি বারেক উঠহ বসি ;
দূরে যাক শােক দুঃখ বিষাদ বেদনা রাশি।
হায় রে নিদয় কাল। আর তাহা হইবে না।
মেয়ে-মিহির নভে পুনঃ আর উদিবে না !
গিয়াছে সে মহামণি গেছে চিরকাল তরে,
আসিবে না আসিবে না ডাকিলে জনম ভরে
অমিয়বধিনী ভঁর তেজোময়ী সে রসনা
গভীর নীরব আজি, নাই বিন্দু শব্দ-কণা।
১৫২ কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা বক্তাকূল অলঙ্কার সর্বজয়ী মহামতি, শায়িত সমুখে ঐ অনন্ত নিদ্রায় মাতি। হায় রে সময়, তাের এ কি নীতি ভয়ঙ্কর। মধ্যাহ্নে করাল রাহু অবিরিল বিভাকর। ইচ্ছা হয় এ সংসার ভুলি’ গিয়ে সমুদয় এই গােরস্থানে বসি’ করি এ জীবন ক্ষয়। ইচ্ছা হয় ঐ ধূলি আদরে হৃদয়ে মাখি! ইচ্ছা হয় ঐ গােরে তার সহ মিশে থাকি। মেহের! মেহের ! তুমি চলিয়া গিয়াছ হায়, দেখিতে তােমায় আমি পাব নাকি পুনরায় ? ( ৮ ) আশা আছে হাশরের সেই ভয়ঙ্কর দিনে দেখা তুমি দয়া করি’ বারেক দিবে এ দীনে। আশা আছে অনন্তের অনন্ত সাম্রাজ্যে পশি’ শুনিব কাহিনী তব পুনঃ সুধা-সরে ভাসি। যদিও নীরব তুমি তবুও এ আশা মনে নীরবে করিছ “দোয়া তব এই দাসগণে। ভুলিও না মহাত্মন, বাঙ্গালার মুসলমানে, কর দোয়া তাহা সবে দয়াময় সন্নিধানে। কর দোয়া যাক দূরে মম মন-অন্ধকার, পুরুক কামনা, আশা পূর্ণ করে পরােয়ার। সহস্র সালাম তব ও চরণ-শতদলে জানায় অভাগা আর বঙ্গীয় মােসলেম দলে। —শেখ হবিবর রহমান - s সমাপ্ত } are
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.