Bally Sadharan Granthagar
Prabandha Kusumabolee
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রবন্ধ-কুলুমাবলী।
ঈশানচন্দ্র দত্ত কর্তৃক
প্রণীত ও প্রকাশিত।
* বিজ্য মূৰ্পবদোষা
গুণ গৃহুন্তি সাধবঃ।
১)
কলিকাতা।
শ্ৰীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ২৪৯ সংখ্যক ভবনে
ষ্ট্যানহােপ যন্ত্রে মুদ্রিত।
সন ১২৭৮ সাল।
No text on this page.
প্রণয়ােপহার। প্রেমাস্পদপ্রবর শ্রীযুক্ত বাবু গিরিশচন্দ্র বসু, বিএ, হৃদয়-বান্ধবেষু। প্রিয়তম ! যাহার বিরহে বহুলােকাকীর্ণ জনপদও প্রাণী- শূন্য-মরু-মূর্তি ধারণ করে—যাহার মিলনে সমস্ত জগৎ আনন্দে প্লাবিত হয়, সেই বন্ধুর কর-কমলে এই প্রবন্ধ-কুসুমাবলী ” উপহার প্রদত্ত হইল। এই অকিঞ্চিৎকর পুস্তক খানি যে তােমার স্নেহের ভাজন হইবে, তদ্বিষয়ে আমার অনুমাত্র সঙ্কোচ নাই। নিতান্ত সৌন্দৰ্য-হীনতা সত্ত্বেও তুমি প্রথ- মাবধি ইহার প্রতি যে অকৃত্রিম আদর প্রকাশ এবং ইহার নিমিত্ত যে বিপুল কষ্ট স্বীকার করি- য়াছ, তাহা মনে হইলে হৃদয় প্রণয়ে উদ্বেল হইয়া উঠে। এই ক্ষুদ্র উপহার তােমার পবিত্র প্রণয়ের যথাযােগ্য উপহার বিবেচনা করিও না ; আমার যাহা ছিল তাহা তােমাকে দিয়া আমি সুখী হইলাম, এই মাত্র । অভেদাত্মা, ঈশানচন্দ্র দত্ত । তবে
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। কয়েকটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদ্য রচনা করিয়া পুস্তকা- কারে মুদ্রিত করিলাম। কাব্যরুচনা বিষয়ে এই আমার প্রথমােদ্যম; সুতরাং ইহা যে বিজ্ঞ- সমাজের মনােরঞ্জন করিবে তাহার কিছুমাত্র আশা করি না। যাহা হউক, উদার-স্বভাব পাঠক- বৃন্দ ইহার প্রতি একবার মাত্র সপ কটাক্ষপাত করিলেই সকল পরিশ্রম সার্থক বিবেচনা করিব। এতগ্রন্থের ৫ শুকপক্ষিচ্ছলে পরাধীনের বিলাপ” ও “তত্ত্বজ্ঞান ” প্রবন্ধদ্বয় কিয়ৎ বৎসর পূৰ্বে সােমপ্রকাশ ও এডুকেশন গেজেটে প্রকাশ শিত হইয়াছিল; এবারে তদুভয়ের কলেবর স্থানে স্থানে পরিবর্ধিত ও পরিবর্তিত হইল। পরিশেষে কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করিতেছি যে আমার পরম ভক্তিভাজন, অসামান্য-কবিত্বশক্তি- সম্পন্ন, হাইকোর্টের লব্ধ-প্রতিষ্ঠ উকিল শ্ৰীযুক্ত বাবু হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয় পরিশ্রম স্বীকারে এই সামান্য পুস্তকখানি আদ্যন্ত দেখিয়া দিয়াছেন; এবং আমার পরম মিত্র যুক্ত ধাতু ; ;
[ ]
গিরিশচন্দ্র বসু, বিএ, ইহার সংশোধন বিষয়ে
সবিশেষ আনুকুল্য করিয়াছেন ; আমি তদর্থ
তাঁহাদের সমীপে চির-অপরিশােধ্য ঋণে বদ্ধ
থাকিব।
নবগ্রাম।
১৭৯৩ শকাব্দাঃ ।
১লা শ্রাবণ।
ঈশানচন্দ্র দত্ত।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
নমাে ব্ৰহ্ম নিরধার, জগতের মূলধার,
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের ধাতা।
অনাদি অনন্ত-জ্ঞান , ঈশ সর্বশক্তিমান,
শিবরূপী জীব-শিব-দাতা।
শশী, সূৰ্য্য, নক্ষত্র, আকাশ, চরাচর,
বিন্দু মাত্র নহে তব জ্ঞানে অগােচর।
সৎ-স্বরূপ সনাতন, নিরাময় নিরঞ্জন,
সত্ত্ব রজমে। গুণাতীত।
দেশে কালে সীমা শূন্য, কিবা পাপ কিবা পুণ্য,
পূর্ণ-ব্রহ্ম নিয়মিত।
এ বিশে তােমার খেলা হয় সমুদয়,
নির্লেপ অভেদ্য রূপে তুমি সৰ্বময়
জ্ঞানে ধরিবারে নারে, বাক্য কি বর্ণিতে পারে,
মানবের মনে
বল ?
বেদে তুমি বেদ্য নও, কারণ-স্বরূপ হও,
নাহি তব
কে শিখাবে তব ধ্যান যাব কার কাছে?
এ জগতে হেন গুৰু কে কোথায় আছে ?
উপমার স্থল।
ক
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
ভ্রান্তি বশে জীবগণে, কল্পনা করিয়া মনে,
চাৰু মূর্তি করি বিনিতি।
ফুল জল উপহারে, পূজাদি অর্ণয়ে তারে,
মন্ত্র, যন্ত্র, তন্ত্র-নিয়ােজিত।
ইচ্ছামাত্রে সৃষ্টি তব ইচ্ছায় বিয়ােগ,
তুমি কি হে অভিলষ পার্থিব সম্ভোগ ?
অন্ধ হয়ে কেহ নরে, মনে অনুমান করে,
তুমি ঈশ নর-রূপ-ধারী।
লােকের নিস্তার হেতু, সংসার-সাগরে সেতু,
হর পাপ দিয়া নদ-বারি।
ঘাের কলুষিত হেরি মনুজ-হৃদয়,
তুমি কি হে অবতীর্ণ হইয়া সদয় ?
এই রূপে জীব যত, ভাবে অন্য ভাব কত,
অশক্ত হইয়া ব্ৰহ্মভাবে।
লােকালয় ত্যজি কেহ, কাননে মানিয়া গেহ,
নাশে দেহ যােগের প্রভাবে।
জল স্থল শূন্যে যদি তুমি সর্ব ঠাই,
ত্যজি নিকেতনে তবে বনে কেন যাই?
তর্কের লহরী ধরি, তােমা লাভ বাঞ্ছা করি,
সার হয় কেবল সংশয়।
ভর্কের কি আছে শক্তি, লভিতে অনন্ত-শক্তি,
ক্ষুদ্র মনঃ যাহার নিলয় ?
আত্মা ত্যজি যথা যাই সর্বজ নৈরাশ,
কেবল আত্মায় তব কিঞ্চিত আভাস।
-
প্রবন্ধ-কুমাবলী।
•
ধন্য সেই নয়ােত্তম, যার জ্ঞান অতিক্রম,
কোন ক্রমে করে না আত্মায়।
হয়ে আত্ম:যােগে যােগী, প্রেমের সম্ভোগ ভােগি,
সেই মাত্র জীবন কাটায়।
বজের ভীষণ নাদে হৃদয় অটল,
প্রেমিকের আঁখি সদা প্রেমে ছল ছল।
নিশির শিশিরে তঁার, বহে প্রেম-অশ্রুধার,
মুৰ্য সহ প্রেম দীপ্তিমান।
কুজিলে বিহঙ্গকুল, হৃদয়-সাগর-কুল,
উচ্ছলয় প্রেমের তুফান।
উষা সহ ভু-ময় প্রেমের শরীর,
অন্ধকার সহ গত অজ্ঞান-তিমির।
তােমারে উদ্দেশ্য করি, বাহেন জীবন-তরি,
জ্ঞান-দেবে বরি কর্ণধার।
পাপীর ভয়ের স্থান, নাহি যার পরিমাণ,
সে ভবসাগরে পান পায়।
উপনীত হন গিয়া সেই দিব্য লােকে,
সদা যথা প্রভাবিত প্রেমের আলােকে।
আমি নিজে কু-মতি, সহজে অজ্ঞান কাতি,
রতি-হীন ওহে বিশ-পতি!
পতিত-পাবন হায়! পতিত বিষম লায়,
গতি দেহ অগতির গতি।
মুরূপে উদি দেব মানসগগনে,
ফুটাও ভক্তির পয় জ্ঞানের জীবনে।
৪
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
ভুগত পরিবার,
মম
ভূত-ময় ঘর দ্বার,
ভূতের বেগার খেটে মরি ।
ভূত, বর্তমান, ভাবী, ভূতের ভাবনা ভাবি,
ভূত-সঙ্গে সদা কাল হরি।
এক ভূতে রক্ষা নাই এত ভূত-মেলা,
বিষম প্রঞ্চ পঞ্চভূতে করে খেলা!
সংসারে স্বপক্ষ যারা, বিপক্ষ হয়েছে তারা,
ক্ষীণ হেরি প্রকাশে বিক্রম।
নাই মম বল মূলে, পাই ভয় অরি-কুলে,
তাই ডাকি ওহে শত্রু-দম।
দুর্বলের বল
হর ভব-ভয়।
নিজ বল দিয়া কর শত্রু-বল ক্ষয়।
ভােগে ভােগিলাম কত, অধর্মের ভােগ যত,
অবিরত জর্জরিত প্রাণ ।
আর নাই সে বাসনা, এ দীনে কৰুণা-কণা,
কৰুণা-নিদান, কর
চাই জীবন দীর্ঘ, নাহি আকিঞ্চন
পার্থিব গৌরব সব ধন পরিজন।
জড়িত সংসার-জালে, গ্রাসিতে আসিলে কালে,
যেন তারে নাহি হয় ভয়।
বিষয়ের কলরবে, যেন নাহি পরাভবে,
ক্ষুদ্রতম আমার
যে পদ প্রসাদে মর অমরা পায়,
জীবনে মরণে যেন মজি সেই পায় !
দান!
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
কবিতা সুন্দরী।
.
কবিতা সুন্দরি, নমস্কার করি,
তােমার চরণ-তলে!
অদেহে জনম,
তাই অনুপম
রূপসী তােমায় বলে।
রাগ-অস্থি-ময়, তব তনু হয়,
ভাব:ত্বকে
আবরিত।
রসে
ঢল, বদন:কমল,
গুণ-হাস্য-প্রকটিত।
তােমার যে বেশ, বর্নিতে অশেষ,
শেষ বিশেষিতে নারে।
সেই জন জানে, কৃপা-সুধাদানে,
অমর করেছ যারে।
যত ছন্দোবৃন্দে, চরণারবিন্দে,
সাজে কি মােহন সাজে।
সব অলঙ্কার, বরাঙ্গে তােমার,
অলঙ্কার হয়ে রাজে।
রাজেন্দ্রাণী-গলে, কিবা ছার জ্বলে
মণি মুকুতার পাঁতি
ও দেহে যেমন, হয় সুশােভন,
মােহন রূপক-ভাতি!
পাই উপমা, যবে মালােপমা,
মাল-রূপে হৃদে ধর।
?
৬
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
হই ভ্রান্তি-মান, যদি ভ্রান্তি-মান
অলঙ্কার অঙ্গে পর।
সকলি বিচিত্র, ও দেহে সুচিত্র,
করে চিত্র-অলঙ্কারে।
শোভার নিলয়, অনু-প্রাসচয়,
মুম্বজা করে তােমারে।
যবে মৃদুস্বরে,
ও অধরে সরে,
কৰুণা-পূরিত বাণী।
কি আছে জগতে, তার তুল্য হতে?
কাদাও সকল প্রাণী।
যবে ঘাের রবে, প্রকৃত গৌরবে,
উৎসাহিত কর নরে।
ভীৰুৱে হৃদয়, উঠে সে সময়,
বীণা-তার যথা করে।
যখন গম্ভীরে, গাও ধীরে ধীরে,
বিভুর মহিমা গান।
পুণ্যবান সবে, ভাসে প্রেমার্ণবে,
চমকে পাপীর প্রাণ।
তােমারে সকলে, কবি-সুতা বলে,
কিন্তু আমি বলি আর ।
বিধির নন্দিনী, ত্রিদিব বাসিনী,
তপস্যার ফল সার ।
করি কষ্ট-ভােগ, ধরি চিন্তা-যােগ,
কবি উদাসীনভাবে।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
.
ত্যজিয়া সংসার, মজি অনিবার,
তোমার চরণ ভাবে ।
অগ্রে মৃদুহাসি, দেখা দেন আসি,
তব শক্তি সে কল্পনা।
দেন দিব্য আঁখি, আর থাকে নাকি,
মনের বৃথা জল্পনা
বীত পাপচয়, সুকৃতি উদয়,
উপনীত হও শেষে।
বরদান • ছলে, হৃদয়-কমলে,
অভয়া বরদা-বেশে।
বহু পুণ্যফলে, ও তপস্যা ফলে,
তাই মা ভাবিয়া ক্ষীণ।
নাই ভক্তি-যােগ, পাই কষ্ট-ভােগ,
সহজে সাধন-হীন।
ভরসা কেবল, মানস অবল,
দীনতা প্রবল আছে।
তুমি, দয়াশীলে, বিমুখী হইলে,
কলঙ্ক ঘটিবে পাছে!
প্রবন্ধ:কুসুমাবলী।
কাল।
(১)
অনন্তু শকতি তব অপার মহিমা,
সংসারে তোমার দেব কাল ” অভিধান!
ক্ষুদ্রতম নর কিবা দিবে তব সীমা?
ভাবিলে পরান্ত হয় অমরের জ্ঞান।
(২)
তােমাতে করিয়া জীব জুনম-গ্রহণ,
দণ্ড, পল, বর্ষাদিতে বিভাগি তােমারে,
সুখে দুঃখে তােমাতেই করি বিচরণ,
তােমাতেই লীন হয় ত্যজিয়া সংসারে।
( ৩ )
উন্নত-নিগিরি, অতল সাগর,
অন্ধখনি-মণি যথা জ্বলে অবিরত
সূর্যের আতপ-শূন্য কুঞ্জ মনােহর,
সর্বস্থলে তব হস্ত হয় অব্যাহত।
(৪)
রাশিচক্র,যেই পথে ভাস্করের গতি-
বােধাতীত শূন্যে যথা ভ্রমে গ্রহগণ,
কিবা প্রদক্ষিণ যথা করে রাকা-পতি,
সর্বত্র তোমার, দেব, সমান শাসন!
প্রবন্ধ-কুসুমালী। ৯ তুমিই–কুসুমাবলী (বিপিনের শােভা) ফুটাও-বসন্ত-রূপে প্রবেশি কাননে,- প্রেমীর প্রধান মধুকর-মনােলােভা, সৌন্দৰ্য্য মাধুৰ্য যার ধরে না নয়নৈ ;- বহিতে সৌরভ তার কানন ব্যাপিয়া, আনিয়া নিযুক্ত কর সুমন্দ বাতাসে; তুমিই বিনাশ তারে নিদাঘ হইয়া, কোথা রূপ, পরিমল তােমার হুতাশে ! (৭) আশার তরিতে তুলি দিয়া প্রলােভন, তুমিই বান্ধহ জীবে মমতা-শৃঙ্খলে, স্বপ্ন-বৎ কিছু মুখ করি বিতরণ, ডুবাও শােকের, হায়, তলশূন্য জলে ! (৮) কিবা রাজা,- চক্রবর্তী যাহার আখ্যান, দোর্দণ্ড প্রতাপে যার কাপে বসুন্ধরা, বীরত্বে দ্বিতীয় নাই লভিতে সম্মান, ধরাখান যার চক্ষে ক্ষুদ্র যথা শরা ;- (৯) কিবা দীন হীন,অন্ধ যুগলনয়ন, ললিত গাত্রের মাংস পলিত চিকুর, প্রতিবেশী-দ্বারে বসি করে উচ্চারণ, দীনে দয়া কর পিতঃ হৈও নিষ্ঠুর র”;- – খ
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
(১০)
কিবা বিদ্যাবত্ত,কবি-কুল-শিরােমণি,
বিদ্যাবলে সমগ্র ভুবন করতল,
অসমা অক্ষয় কীর্তি ব্যাপিল অবনী,
বাণী-বর-পুত্র ঘােষে মানব সকল ;-
(১১)
কিবা মূঢ়, হ্রস্ব-দীর্ঘ জ্ঞান মাত্র নাই,
দেখিলে লােকের হয় ঘৃণার সঞ্চার ;
তােমার নিকটে কারাে থাকেনা বড়াই,
সমভাবে নমে রাজচরণে তােমার!
(১২)
তুমি না বরিয়াছিলে “আলেজণ্ডারে
ভুবন-বিজয়-কর “গ্রীস ” সিংহাসনে,
অক্ষয় বীরত্ব
বীরত্ব যেই লভিল সংসারে,
যার নামে শত্ৰু-দল হত-বল রণে ?
(১৩)
দুর্জয়
যার বিক্রম অটল,
করেছিল “রােমে যেই একৈব প্রধান,
কোথা আজি সেই সব বীর মহাবল ?
কালির অক্ষরে মাত্র রয়েছে নিশান!
(১৪ )
আনিলে হে রঙ্গ ভুমে “ বােনাপাটা বীরে,
দেখাইল কত মত করি অভিনয়
বলেছিল সেই বীর জলদ-গম্ভীরে,
৬৫ ‘অসম্ভব’ শব্দ ফরাসীর শব্দ নয় !
সীজর ”
প্রবন্ধ-কুসুমবলী।
(১৫)
তারি ভ্রাতৃ-পুত্র বীর অদ্ভুত ধীমান্,
সাক্ষ্য দেয় কীর্তি যার নানা জনপদে,
সর্ব-লােক-শ্রেষ্ঠ বলি যাহার সম্মান,
তার শিরঃ কেন আজি “শীয়ার” পদে?
(১৬)
কোথায় ভরত রাজা দুষ্মন্ততনয় ?
ভারকাখ্যা যার হতে খ্যাত চরাচরে,
বিদ্যা বুদ্ধি কবিতার অতুল নিলয়,
রেখেছিল নাম কি হে বিদেশীর তরে ?
(১৭)
ধৰ্ম্ম-পুত্র যুধিষ্ঠির ধৰ্ম মূর্তিমান,
পঞ্চ ভাই অদ্বিতীয় এক এক
সর্বথা ধৰ্ম্মের যারা রাখিল, সম্মান,
তারাও হলাে না তব স্নেহের ভাজন ?
(১৮)
ওই যে “ ইংলণ্ড ভাসে জলের উপরে,
পৃথিবীর মধ্যে
মধ্যে এবে উন্নত প্রদেশ,
ভারতের আধিপত্য ন্যস্ত যার করে,
গম্ভীর ভাবেতে অন্যে দেয় উপদেশ;
(১৯)
ভব অনুগ্রহে, কাল, তার পুত্রগণ !
অন্য লােকেদের প্রতি গৌরবে না চান,
জানি হে জানি হে কাল পূৰ্ব বিবরণ !
ওরা না একদা ছিল অসভ্য-প্রধান?
জন,
প্রবন্ধ-কুসুমবিলী।
(২০)
ভারতীর বর-পুত্র কবীন্দ্র-প্রধান,
কাব্য-সুধা পানে যার জগত্ মােহিত,
নিদয়শরীর কাল, পাষাণ সমান।
তীক্ষ্ণ দন্তে তারে তুমি কয়েছ চর্বিত।
(২১)
কবি-পিতা বাল্মীকি, শ্রীহ, ভবভূতি,
প্লেটো, মীন, পােপ, নিউটন্ আদি,
তােমার জঠরানলে দিয়াছ আহুতি,
বড় সুখে তুমি, কাল, বড় প্রতিবাদী।
(২২)
বুঝেছি বুঝেছি, কাল, করি নমস্কার!
তব রঙ্গ-ভূমি দেব! এ সংসার হয়,
জীব-কুল আসে যার যবে হয় বার,
চলে যায় সাঙ্গ করি নিজ অভিনয় !
স্বভাব।
ইচ্ছামাত্ৰে ইচ্ছাময় অনাদি ঈশ্বর
সৃজিলেন বিশ্বে করি সর্বাঙ্গসুন্দর ;
উপরে জ্যোতিষ্কপূর্ণ মুনীল গগন,
নিমে ভূমি, জল, গিরি, বন, উপবন
যে দিকে যখন চাও মনােজ্ঞ সকল,
ভাবে মুগ্ধ ভাবুকের নয়ন যুগল।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী। তুঙ্গ-শৃঙ্গ গিরি, দেহ নীহারে আবৃত, সুন্দর কদর কত, সদা সুশােভিত, সমুন্নত, কুসুমিত, বিটপী-মালায় ; ঝঝরে নিঝর-বারি, পরাভব পায় রজতের কান্তি যাহে—যার দরশনে ঝরে প্রেম-উৎস-নীর সাধকের মনে। কোথা সমতল কোথা বন্ধুর প্রদেশ। রঞ্জিত উপল-দেহ; নিবারে দিনেশ- প্রখর-কিরণমালা নিবিড় পল্লব বৃক্ষের উপর হতে,-হয় অনুভব, বিরাম লভেন আসি অমর সকলে, ধরেছে পাদপকুল ছত্ৰ পত্ৰ-ছলে ! তড়িত্-লােচনা মৃগী, মৃগী, লােচন-ভঙ্গিমা করি তােযে মৃগবরে, প্রেমের গরিমা বাড়াইছে, আশে পাশে শাবক সকল লক্ষে লক্ষে বেড়াইছে হইয়া চঞ্চল । অদ্ভুত প্রপাতে কোথা নিঝর-সলিল, ভীষণ নির্ঘোষে করে সুদূর ফেনিল ; তারকার জল-বিন্দু ছুটে অবিরাম, উগরে পৃথিবী যেন মুকুতার দাম ! মঞ্জু কুঞ্জবন কত শােভার নিদান ! লতায় রচিত মৃদু-বহমান গন্ধ-বহ, বৃক্ষকুল নবীন পল্লবে- আধ আধ মিষ্ট বাক্যে যেমন শৈশবে গৃহ ।
১৪
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
মধু পানে
কাঁপে ওষ্ঠ,-দোলাইছে; শ্যামল শাল
শােভিত করেছে চাৰু কাননের ভল
কিবা ছার রাজ-শয্যা তাহার তুলনন?
দৃষ্টিমাত্র দর্শকের ভুলায় নয়নে
নয়ন • রঞ্জন ফুলাবলী ; গুণ
রবেতে দ্বিরেফ গায় প্রকৃতির গুণ ;
মানব-দুর্লভ
অফুলে,
মনের আনন্দে ভ্রমে এফুলে ও ফুলে।
শাখারূপ বাহুতে সংযুক্ত তৰুগণ,
প্রেম ভরে পরস্পরে দেয় আলিঙ্গন।
শাখী পরে পাখী করে মধুর কাকলী,
জুড়ায় তাপিত প্রাণ, মুগ্ধা বনস্থলী
সে স্বরে; কি ছার বীণে ! তােমার সনে
কর বিগলিত-চিত্ত সামাজিকগণে ?
ফল-ভরে নমিত পাদপ-বর-শির,
বিনয়-বিনম্র যথা মহতু স্থবির।
হিংসানলে দগ্ধ হেরি মনুজ-সমাজে,
পশেছেন শাস্তি দেবী উপবন মাঝে
সুখ সহ! আরক্ত বসন অঙ্গে পরা
তপন - জ্ঞাপনী ঊষা সুস্মিত - অধরা
ধীরে ধীরে দিলে দেখা পূর্ব অনম্বরে,
নিদ্রাত্যজি দ্বিজকুল, মনােহর ঘরে
(স্তাবক রাজ্ঞীর যথা সুরচিত দ্বারে )
প্রকৃতির স্তব গায়, যেন অশ্রুধারে,
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী ।
অদ্রে মহী বনলী সে বন্দন গানে।
উছলে অৰুণছটা অমল বিতানে।
সােণর নিকুঞ্জ যেন নব রবি-করে,
মন্দানিলে কাঁপি কপি ঝক, মক করে।
ভক্ষ্য অন্বেষণে সব ত্যজিয়া কুলায়
ধায় দ্বিজ-কুল যবে, নয়ন ভুলায়
আন্দোলিয়া পক্ষ-পুট রবির কিরণে,
দুলে যেন চন্দ্রাতপ বিবিধ বরণে।
ঝাকে ঝাকে মধুমক্ষি ত্যজে মধু-ক্রমে,
• ভো ভো রবে বিমােহিয়া মাতে পরিশ্রমে।
ছােট ছােট পাখী সব শাখীবর-তলে,
বালকের মত ক্রীড়া করে কুতুহলে।
ভানুর কিরণমালা
তপ্ততর
ক্রমে, যত মনােরম পক্ষী জল-চর
সত্তরণ দেয় সুখে দর্পণ - প্রতিম
সরসীর স্বচ্ছ নীরে ; আনন্দ অসীম
মধু-করে (যথা যবে করে দরশন,
কপতৰু নৃপজায়া করে বিতরণ
অমুল রতন-বৃন্দ,-ভিক্ষুকের কুল,
ভুলি বর্তমান দুঃখে আহলাদে আকুল)
হেরি ভানু-প্রণয়িনী (কুসুম-ঈশ্বরী)
বিতরেন মধু-সুধা; আদে, আ মরি ।
ধরে না সরলা হাসি অমল দনে,
আমােদে বিলা বুঝি কান্তের মিলনে !
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
আরাে নানা জল-ফুল ফুটে চারি পাশে,
রাণীর আনন্দে যেন সখীকুল হাসে;
অথবা তারকা মালা মনােক্ত অম্বরে,
যবে সে পূর্ণিমা নিজ পূর্ণ রূপ ধরে ।
বাড়ে স্বভাবের শােভা, যবে দূর হতে
মৃদুল গমনে-হেরি পশ্চিম পৰ্বতে
দিননাথে—দেখা দেম সন্ধ্যাদেবী—পর।
সীমন্তে সিন্দুর-বিন্দু চাৰু, নীলাম্বরী,
সঙ্গে লয়ে সহচর সুমন্দ বাতাসে;
দিগঙ্গনা নমে পদে পশ্চিম আকাশে।
দিবাকর করজালে হয়ে দন্ধকায়
জীবকুল, সহজেই শীতলতা চায়
ব্যগ্রমনে, অমনি সে আশা সফলিত,
থাকে আনন্দে ওর, সবে আলাদিত।
কলরবে দিগন্ত পূরিয়া পক্ষিগণ,
আপন আবাস শুরু করে অন্বেষণ।
বিষয়ের কোলাহল স্তিমিত, বিহারে
ব্যস্তমনা জীবগণ ; নিঃশব্দ সঞ্চারে
সমাগত অন্ধকার, হীরক উজ্জ্বল
সমুদিত সুশােভিত নক্ষত্র সকল,
কৃষ্ণ চন্দ্রাতপ যথা খচিত রতনে।
সমুদিত ইন্দু, সুধা-বিন্দু প্রতিক্ষণে
ক্ষরিছে, বিগত-তৃষ্ণ হয়ে চক্রবাক
ডাকিছে, মিশিয়ে তাহে অারাে কত ডাক।
প্রবন্ধ-কুসুমালী।
১৭
পিউ পিউ পিউ রবে পাপেয়া সকল,
পূরিল পূরিল নীল অম্বরের তল !
কলকণ্ঠ-কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠিত করে
প্রাণ, গায় কত ক্ষুদ্র বিহঙ্গী নিকরে ।
‘
ঝিঝি স্বরে শব্দ করে ‘ঝি ঝি পােকা নাম,
কি অদ্ভুত রব তার জিনে সপ্তগ্রাম।
কে শিখায়ে দিল তান বন-বিহঙ্গীরে?
কে দিল এমন তেজ কীটের শরীরে ?
কে রচিল উপবনে গৃহ মনােরম ?
নব দূৰ্বাদলে দিল রূপ অনুপম ?
বালুকা-কণায় যার মহিমা অপার,
এরা সব তারি সত্তা করিছে প্রচার !
সরসীয় বাড়ে শোভা হলে সমুদিত
শশাঙ্ক, কলার কুমুদিনী প্রফুল্লিত
হইয়া কৌতুক করে কৌমুদীর সহ ।
কাপায় বিমল নীর ধীরে মন্দহ
সমীরণ, তার সহ হরিয়া নয়ন,
দুলিছে সুনীল নভঃ, তার অগণন,
ভুবন-শােভন শশী, (সুধার আধার )
ভাবিনীর হৃদে যথা ভাবের সঞ্চার।
নিশি দিনে জগতের যেই দিকে চাই,
প্রেমেতে মােহিত হই সংসারে না চাই
গভীর জলধি অতি ভীষণ প্ৰতাপ :
গর্জে, যবে নভম্ব আসি বীর-দাপে
গ
১৮
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
দেয় দেখা, উপাড়িয়া দীর্ঘ অবরে—
( পন্থের আশ্রয়-স্থান, যারে প্রেমাদরে
বরণ করিয়াছিল ব্রততী সুন্দরী,
সতীর প্রেমের ভাব চমৎকার মরি।
মৃতপতি তবু তারে ত্যাগ না করিবে,
গল দেশে বেড়ি নিজ জীবন ত্যজিবে!)
ধূলায় আচ্ছন্নতর করি ভানুমা,
নিরন্তর মহাবলে করি ‘স্বা’ ‘আ’;-
জভঙ্গে উত্ততম তরঙ্গ প্রহারে,
সন্ত্রাসিত বিচলিত করে বনুধারে ;
ৰুদ্র যথা রৌদ্ররসে মাতিয়া, উদ্ধত
করিতে প্রলয়, হতবুদ্ধি জীব যত।
রাশি রাশি উঠে ফেণা তরঙ্গের মুখে,
বেলায় উল্লঞ্জি পড়ে ধরণীর বুকে।
আরে রে মান্তিক চক্ষুঃ! কর দরশন
লঘু দেহে কত বল ! তবুও কি নন
প্রত্যক্ষ ও চক্ষে সেই কারণ-স্বরূপ :
জানি ও বিশ্বাস কিরূপ অপরূপ।
পুনঃ কিবা নব ভাব ধরিয়াছ তুমি
জলধি ! গর্জনে আর কাঁপেনাক ভূমি ;
ভীষণ তরঙ্গ ভিরােহিত, শান্ত ভাবে
বহিছ; মানবকুল বিজ্ঞান প্রভাবে
তােমার হৃদয় বাহি গিয়া নানা দেশ,
সাধিতেছে সংসারের সমৃদ্ধি অশেষ।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
গিরি-সুতা নদী তব প্রেম আকিঞ্চনে,
অবহেলি অবরােধে, দুর্গম কাননে
তুচ্ছ করি, অতিক্রমি নানা জনপদে,
আনন্দে অধীরা হয়ে পড়ে তব পদে।
সুচিত্র, সিকতাময় সুন্দর পুলিন
তােমার, কোথা সে চিত্রকর সুপ্রবীণ ?-
দয়া করি জলনিধি দাও উপদেশ,
অধীর আমার মন যাইতে সে দেশ।
জগতের চক্ষুঃ তুমি ওহে দিনকর ।
কোথাও কিছুই নাই তব অগােচর ;
প্রদীপ্ত তােমার তেজে হন নিশাপতি,
আমি ভাবি অনিৰ্দেশ্য তােমার শকতি,
দীন ভাবে উপদেশ মাগি, দেব, আমি!
কোন্ রূপে কোথা সেই অখিলের স্বামী,
যার তেজে তেজোময় তব অভিধান,
কোথা সেই আদি-জ্যোতিঃ কৰুণা-নিদান ?
করুণা ।
দিবসের শ্রমে, নিশা সমাগমে,
সমীরে শীতল কায় ।
ব্যাহহন্দ্রিয় যত, স্বকাৰ্য-বিরত,
অচেতন সুনিদ্রায়।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী ।
স্বপন আবেশে; সুরম্য প্রদেশে,
হইলাম উপনীত।
যথা সব নরে, আনন্দে বিহরে,
দ্বেষভাব তিরােহিত।
সহােদর-ভাবে, পরস্পরে ভাবে,
সুখের অভাব নাই।
যথায় স্বভাব, ধরি নানা ভাব,
আলো করে সব ঠাঁই।
বিরামের তরে, দিব্য সরোবরে,
সম্মুখে দর্শন করি ।
গিয়া ধীরে ধীরে, তার রম্য তীরে,
বসিনু পাষাণ ‘পরি।
মৃদুল গমনে,
মলয়
পবনে,
সুষম কুসুমাবলী
হতে পরিমল, হরে অবিরল,
বিহরে কতই অলী।
যত জলচরে, মনােহর চরে,
চরে সহচরী সনে।
ভাসি কুতুহলে, আসি মীন দলে,
শৈবালদলে অশনে।
মন্দ মন্দ হাসি, উপনীতা আসি,
যামিনী কামিনী ধনী।
নায়কের পাশে, যাইতে উল্লাসে,
বিলাসে যথা রমণী।
প্রবন্ধ-কুসুমবিলী।
অকস্মাৎ একি! অদূরেতে দেখি,
পূর্বের আকাশ-তলে।
লােহিত বরণ, ভানুর কিরণ,
যেমন উদয়াচলে।
ভাবিলাম মনে,-নিশা আগমনে,
ভাস্কর কেনই হবে ?
ওই কলরব, হই হই ? সব,
আগুন বুঝি বা ভবে।।
উদ্বিগ্ন অন্তুরে, দ্রুত পদ ভরে,
চলিলাম তথা হতে।
অনল নিশ্চিত, হইল প্রতীত,
যাইতে অর্ধপথে।
দপদপ করি, সর্বনাশ-করী,
অনলের শিখা জ্বলে।
নহে নিবারিত, হইছে বর্জিত,
আগুন দ্বিগুণ বলে ।
‘ধূ ধূ' শব্দময়, শুধু তাই নয়,
বম্ব’ ফাটে বশ ।
উক। ভীম ঝপে, ধায় লক্ষে লক্ষে,
সে সাে সে করে বাতাস।
হইছে বিক্ষিপ্ত, স্ফুলিঙ্গ প্রদীপ্ত,
‘হুড় মুড়ে পড়ে ঘর।
মহা কোলাহল, বিশ্রুত কেবল,
* * জল’ নিরন্তর।
৫
৫
৩
প্রবন্ধ-কুমাবলী।
দৌড়ি উলে, জনতার পাশে
ভেদি মাঝে প্রবেশি। •
লােকের কাভার, মধ্যদেখে তার,
আহা! আহা! কি দখিনু !
এক মনস্বিনী, মানস মােহিনী,
রমণীকুলের মণি।
শ্লথ কেশ-শ, আললালিত বাস,
ঘন শ্বাস ফেলে ধনী।
অপরূপ রূপ, নাহিক স্বরূপ,
সুধাংশু লাবণ্যময়ী।
স্বর্গীয় সৌরভে, বামার গোয়কে,
করেছে ভুবনজয়ী।
গােলাবের দল, জিনিয়া কোমল,
অমল সে অনুধানি।
বক্তা-অভ, সরল স্বভাব,
সরল যুগল পণি।
হেরিলে চল, কার না শরণ,
লইতে খনন হয় ?
সেছেন ইমি, ত্রিদি-সিনী,
বুঝি ৰা দিতে অভয়।
দুনয়নে জল করে অবিল,
অবিক ব্য।
নিকি পিরে অনী গল্প,
সয়ে শাখা
৭
প্রবন্ধ-কুমাবলী।
* আহা মরে যাই, পুড়ে হলাে ছাই,
অভাগার যাহা ছিল।
করি প্রাণ-পণ, অর্জিল যে ধন,
অনল আহুতি নিল ।
আহা বাছা সবে ! হাহাকার রবে,
পতিত ধরণী-তলে।
শােকে অচেতন, করিয়া যতন,
নিবাইবে কে অনলে ?
এত, পরিবার, পাবে না আহার,
তৰুমুলে পড়ে রবে !
নুতন সংসার, পুনঃ কি আবার,
অভাগার ভাগ্যে হবে ? ”
বামার বন,
করে এবণ,
সে জন মাতিয়া উঠে।
করিতে নির্বাণ, অগ্নি দীপ্তিমান্,
ত্যজি প্রাণ-ভয় ছুটে।
হেরি সবিস্ময়, আমার হৃদয়,
রােঞ্চ শরীরময় ।
জানিতে অন্তর, হলাে ব্যর্থতর,
সে নারীর পরিচয়।
সহসা সুন্দর, দিব্য বিদ্যার,
লট ভেদিয়া মম,
বলিলেন মীরে,-“এই রমণীকে,
চিত্র নাকি প্রিয়তা
প্রবন্ধ-কুমাবলী।
অন্তরীক্ষে রন, আবিভূতা হন,
আসি এই মৰ্ত্ত-ধামে ;
যবে কারাে হয়, দুঃখের উদয়,
বিদিত কৰুণা” নামে।
হেরি অকস্মাৎ, হয় ভস্মসাৎ,
গৃহীর সম্বল মূলে ।
পারি থাকিতে, এলেন রাখিতে,
প্রবর্তিয়া নরকুলে।
ধন্য সেই জন, যেজন জীবন,
বামার চরণ-তলে,
সঁপে বিনামূলে, স্বার্থে যায় ভুলে,
দমে সে কালেরে বলে ।
কপিল শরীর, পুৰুষ স্থবির,
হইলেন অন্তুহিত।
মেলিনু নয়ন, ভাঙ্গিল স্বপন,
হইলাম জাগরিত!
কবি-কুল-রত্ন মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কে আবজায় বেণু মনােহর স্বনে
ভারত-বিপিনে ?কোন্ পুণ্যবান স্বীয়
পােৰলে জাগাইল ভারতীয়ে,-আহা!
নিদ্রিতা ছিলেন যিনি বহু দিন হতে ?
প্রবন্ধ-কুসুমবিলী। কোন্ মালাকর, মরি! স্বভাব-কাননে তুলিছে ভাবের ফুল, কল্পনা-সূতায় গাঁথি মালা—গন্ধে যার কাড়ি লয় প্রাণ- দোলাইছে হাসি হাসি বঙ্গের গলায় ? হায় রে বঙ্গের দশা! বারেক চিত্তনে পাষাণ-হৃদয় জ্বরে ;-পরের চরণ- দলিত, সস্তৃপ্ত অতি পর-অনুগ্রহে ভাহার সন্তানবৃন্দ,—বল-শূন্য-দেহ, ডুবেছে পৌষ ভীতি-সাগরের জলে। কোন্ বীরবর আজি, সে ভীর দল হইতে, সমর-শিঙ্গা ধরি ঘােরনাদে, চমকি বিপক্ষ-হিয়া, মেঘনাদ-রূপে করিল গম্ভীর শব্দ, অবজ্ঞি মৃণায় চোরের স্বভাব-ধারী সুমিত্রা-নন্দনে ? কোন বাজী-কর ওই, কাব্য-ইন্দ্রজাল বিস্তারিয়া বিদ্যা-বলে, করে প্রদর্শন ( ভীষণ জলধি অতিক্রমি) বহুতর জন-পদশােভা ভ্রাতৃ-মানস-নয়নে,- আবদ্ধ যাদের পদ গৃহের সীমায় ? কে আজি পবন-রূপে আনে উড়াইয়া দিব্য-সরােবর-জাত সরােজ সুন্দর হতে পরিমলে, যার মাধুৰ্য বিমল আনন্দ-বিমুগ্ধ করে বঙ্গবাসীগণে । ফিরে কি উদিল কাল-সন্তাচল হতে প্রবন্ধ-কুনুমাবলী। কুল’ করি বাণী-বর-পুজ কালিদাস কবিকুল রবি ?—আহা মরি। যার অতুলিত তেজে, প্রফুল্লিতা কবিতা-পদ্মিনী মনােমা প্রকৃতি-সরসী-নীরে, ঢল ঢল ঢল রসে দেহ,নাশে ক্ষুধা সুধার স্বরূপ মধুদানে লােলুপ ভাবুক-দ্বিরেফের ? ধন্য হে কবীশ ভৰ জনম ভারতে। কল্পনা কামদা সখী, ত্রিদিবের দ্বার খােলেন তােমার নেত্রে ; ‘কুল বহেন মানসে তব স্বর্গ-মন্দাকিনী, পবিত্রি ও দেহ; তব ভ্রমণ কৌতুকে দৈব-রণ-রঙ্গ-ভূমে--যাহার স্মরণে তৰ-পত্ৰ-তুল্য কাঁপে বসুধার হিয়া শঙ্কায় ; নশ্বর দেহে তুমি স্বর্গ-ভােগী। সােৎকণ্ঠ সদাই বঙ্গ ভব কাব্য-রস- তৃষ্ণায়, চাতক যথা জলদ-সকাশে। নবীন ভাবেতে পূৰি তােমার মানস, সরস্বতী বরেছেন-নবীনা ভাষার নবীন কবির শ্রেষ্ঠ সিংহাসন’পরে- তোমারে ; আবদ্ধ বঙ্গ রবে তব ঋণে। মধুর সদন ‘মধুসূদন মুনামে করিবে অক্ষয় মধু ভারত-হৃদয়ে। বাজাও বাজাও বীণা ধর আর বার, নীরস বঙ্গের হৃদে বর্ষ সুধাসার ! ;
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
শুকপক্ষীচ্ছলে পরাধীনের বিলাপ।
হে চাৰু স্বর্ণ-পিঞ্জর-বাসী শুকপাখী।
নত-শিরে কি ভাবনা করিছ একাকী ?
পূর্বের সে ভাব-শূন্য, মলিন-বদন,
নিষ্প্রভ প্রভাত কালে শশাঙ্ক যেমন!
সে দিন-যে দিন তুমি ছিলে বন-চর
বিহঙ্গ,কতই রঙ্গ নয়ন গােচর
করেছি তােমার ; ছিলে প্রেমিক প্রধান
সে কাননে, হতে যবে নিশা অবসান,
কলরব করি মিশি সহচর দলে,
নাচিয়া নাচিয়া উড়ে যেতে নভন্তুলে।
বিশ্বের অনন্ত সীমা, যেখানে যখন
ভ্রমিতে হে আমােদেতে হতাে তব মান
বিশুদ্ধ নিঝর-নীর পানীয় ভােমার
ছিল তদা, সদা সুখে করিতে আহার
তর সুপক্ক ফল। দিনমণি করে
দগ্ধ-দেহ পান্থ, যবে বিরামের তরে,
আসিত বৃক্ষের মূলে, শাখায় বসিয়া,
সুস্বরে বিগত-রুম করি তার হিয়া,
গাইতে; তা সহমিশি নয়নের নীর
বহিত, প্রেমেতে মন হইত অধীর।
নিশা-মুখে, মুখে মুখে কল’ বান্ধব
একত্রে, করিতে কত সুখ অনুভব !
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
নিবিড় পক্স ভেদি চন্দ্রিকা সুন্দরী
পশিতেন তব গৃহে—রূপে আলে করি।
পূর্কের সে সুখ কি হে হৃদয়ে তােমার
করিতেছে—উদিত হইয়াতিরকার ?
করিছ কি আশা-সেই নিলয়-কাননে,
বসিতে হে পুনরায় সুখ-সিংহাসনে ?
পড়েছে কি মনে দারা, সুত, পরিবার ?
তাই দুটী নয়নেতে বহে নীর-থায় ?
সােণার পিঞ্জরে বাস, সােণার বাণীতে
রয়েছে পানীয় তব, খাদ্য চারি ভিতে ;
কিন্তু তাহে সুখ কিছু আছে কি ভােমার ?
কিছু নাই, কিছু নাই, বুঝিয়াছি সার।
রােধিয়াছে তব পদ দাসত্ব-শৃঙ্খল
সুকঠিন; স্বর্ণকান্তি, জ্বলন্ত অনল
তােমার নয়নে; দগ্ধ শশাকের হুতাশে;
সুখ-ভােগ কবে কার হয় কারাবাসে?
সত্য হে এ হেন দশা যদ্যপি মাের,
ভবেত নিশ্চয় তুমি বান্ধব আমার!
আমার দুঃখের কথা তােমায় বলিব,
বিহ। বিরলে দুই সখায় কাঁদিব।
আমার, তােমার মত আবদ্ধ চরণ
অধীনতা-নিগড়েছে; ক্রীতদাস মন
সাধিতে পরের বা; পর গৃহ সার,
কোথা দারা সুত বন্ধু, কোথা ৰা সংসার!
প্রবন্ধাবলী। = প্রস্ফুটিত সেবিতে পরের পদ যুক্ত দুই কর। দিবস, যামিনী, ঋতু, অয়ন, বৎসর চলিছে নিঃশব্দে, হরি জীবের জীবন- ভাণ্ডার হইতে আয়,-ভস্কর যেমন নিদ্রিত গৃহীর ধন হরে ;- করিয়া বাসন্তু কলি ; শূন্যে সমুখিত করিয়া নৈদাঘ বারি; জলদের মুখে ভাসাইয়া বসুন্ধরা; প্ৰদানি কৌতুকে কবির মানসে ; প্রেম আনন্দ বিমল, নরক যন্ত্রণা ঘাের, সবল দুর্বল সাধু পাপাত্মার হৃদে ; নিক্ষেপ করিয়া আমার নয়নে ধূলি। পড়ে গড়াইয়া বাসনা-লহরী—ঠেকি দাসত্ব-বেলায় হৃদয়-সাগরে ; ভাগ্য বঞ্চিত আমায় করেছে সকল সুখে; নাহি অবসান দুঃখের ; করেছি কত পাপ অপ্রমাণ পরের ইচ্ছায়, প্রতিবিম্ব ভয়ঙ্কর তা সবার মানস-মুকুরে নিরন্তর হেরিতাম যদিও! ডুবি ভব-ঘােরে, ধিক্ রে অধীন-জন্ম শত ধিক্ তােরে! হয়ত মাইতে হবে দেহ অবসানে, চির-অন্ধকার দেশে বিধির বিধানে । অভাগার যা হবার হয়ে গেল তাই। দীননাথ! তব পদে এই ভিক্ষা চাই, * এই স্থলে কৌতুক কর্মকারক।
৩০
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী
যদ্যপি আবার ভবে হয় জনমিতে,
দাসত্ব-শৃঙ্খল যেন না হয় পরিতে!
মেষ।
অন্তরীক্ষবাসী, মানস-মােহন,
নবীন নীরদবর হে!
তােমার রূপের, নাহিক তুলনা,
অমল শ্যামল-ভর হে।
গিরীন্দ্র-নন্দিনী, জননী ভোেমার,
পিতা তব দিনকর হে।
বালকের মত, সাজান তােমারে,
দিয়া আপনার কর হে।
কাল বলি তােমা, অবহেলে লােকে,
আমি বলি মনােহর হে।
কুরূপ কি হয়, যাহার জননী
জনক অতি সুন্দর হে ?
মানসে যেরূপ, সম্মােহিনী আশা,
বরে দিয়া স্বীয় কর হে।
সেরূপ চপলা, (রূপের উপমা )
বরে তােমা, জলধর হে!
বাহন তােমার, সদা সদা-গতি,
হেলায় সাগর ভর হে।
প্রবন্ধ-কুসুমালী।
৩১
প্রেমিকের সার, স্বাধীনতা ভরে,
ভ্রম দেশ দেশান্তর হে।
বিশুদ্ধ সুখের, তুমিই নিদান,
এ জগতে কাম-চর হে।
মস্তক পাতিয়া,
তােমায় পার
ধারা ধরে ধরা-ধর হে।
ভাবে ভুলাইয়া, ভাবুকের মন,
জ্ঞানের নয়নে চর হে।
কখনাে ভােমায়, করি দরশন,
শুভ্র রূপে মন হর হে।
ক্ষণেক আবার, দেখিতে দেখিতে,
লােহিত বরণ ধর হে।
হরিত ধূসর, আরাে কত রূপ,
ধর তুমি রূপ-ধর হে।
কখনাে তােমার, দেহ লঘুতর,
দৃষ্টি-পথ হতে সর হে।
কভু বীর বেশে, কাঁপাও সকলে,
গর্জিয়া গভীরতর হে।
যবে দিন-কর,
ভীষণ প্রতাপে,
দন্ধ করে চরাচর হে।
উম্মুখ চাতক, তােমায় আরাধে,
তৃষ্ণায় হয়ে কাতর হে।
হায় রে শুকায় ! সে কাল অনলে,
বসুধার হৃদি-সর হে।
একুসুমাবলী।
ফুটিকের প্রায়, ফাটে অবিরাম,
মৃত্তিকা কোমলতর হে।
যায় বাহিরে, জীবকুল যত,
কাঁপে থর থর থর হে।
জগতের দুঃখে,
তােমার নয়নে,
ধারা বহে দর দর হে।
ভৰ সজল, সুধার স্বরূপ,
সঞ্জীবনীশক্তিধর হে।
চে বসুন্ধরা,
-বিগত জীবনা-
চাতকের তৃষাহর হে।
স্বভাব তােমার,
লবণাম্বু পান কর হে।
আহা মরে যাই, জগতের হিতে,
অমৃত রূপে উগর হে
তােমার উদয়ে, বিস্তারি কলাপ,
নাচ কলাপ-ধর হে।
যাহার সহিতে, কবির কল্পনা,
খেলা করে নিরন্তর হে।
উদার সাধু,
স্বর্গ ও নরক।
বুঝাতে কর্মের ফল, শাস্ত্র প্রদর্শন জ্বল,
অল্প-বুদ্ধি মানৰ নিকৰে ।
এবাণী।
সুধ ও দুঃখের ধাম, স্বর্গ ও নরক নাম,
অবস্থান হেতু দেহান্তরে।
যে জন লভিয়া জন্ম, আচরেন এ কর্ম,
রতি মতি গতি ঈশ-পদে।
সর্ব জীবে সমভাব ; ভাবিতে আধৰ্ম আৰ,
মনে গণে বিষম বিপদে।
পর-দুঃখ দরশনে, আপনার মানি মনে,
প্রাণপণে করেন উদ্ধার ।
অজ্ঞজনে জ্ঞান দান, ভূর্তে জল বিধান,
ক্ষুধাতুরে যােগান আহার।
বিলাসের নাহি ঠাই, বসনে ব্যসন নাই,
অশনে সন্তুষ্ট যা ঘটে।
বিনীত সুশীল অতি, অহঙ্কত নহে মতি,
সরলতা নয়নে প্রকটে।
নীরবে নীহার যথা, দান করে সজীবতা,
হয় তাঁর উপমার স্থল।
শত্রুতা সাধিলে কেহ,তারে প্রতি তুল্য স্নেহ,
দেহ তাঁর পরাখে কেবল।
সে জন ত্যজিলে প্রাণ, স্বর্গে তার বহু মান,
অবস্থান দেবগণ
মাবে।
রত্ন-নিকেতনে তার, অধ্যাত্ম শরীরসার,
স্বর্ণময় পালঙ্কে বিরাজে।
ললিতাজী বিদ্যাধরী, বিশদ চামর ধরি,
কিঙ্করীর কার্যে নিয়ােজি।
প্রবন্ধাবলী
সুগন্ধ মন্দার মালা, গাখি সাজায়া ডালা,
দেব-বালা চৌদিকে বেষ্টিতা',
সুশীতল গ-বয়ে অর গন্ধ বয়ে
হৈমপাত্ৰে আহার বিধাৰ।
মনােহর ক্রীড়াস্থান, সব সুখ বিদ্যমান,
অভাবের নাম অবসান।
যেই মুঢ় ধরাতলে, নিজ কুট বুদ্ধিবলে,
হলে মুগ্ধ করি অন্য জমে।
পূর্ণকরে আমােদর, পরহিংসা-সুতৎপর।
কারাে মুখ না সহে নয়নে
কিসে হব ধনৰাম, সর্বোচ্চ হইবে মান,
সর্ব খর্ব হবে পদতলে।
প্রতিযােগী না রহিবে, সদা তুষ্টি যােগাইবে,
অহরহ সেবিবে সকলে ।
বিলাস যখন যাহা, হইবে অন্তরে, তাহ
আত্তা মাত্র যােগাবে সেবকে।
বনা আছে যত, রস রঙ্গে মানামত,
শীতলিবে কামের পাবকে
ধার্মিকের সদা যে, তাহাদের ফুল শেষ
বিশেষ ভাবনা কিসে হবে।
* পাকাল কারে বলে ? দেহের পতন হলে,
জ্বলে শেষে ছাই মাত্র গবে।
দুশ মজা ত্যাগ ক, ঘোড়ার ডিমে তরে,
পালােচাল কেন মেয়ে রি?
একাকলী।
এসেছি মজার হাটে, মজা মারি মাঠে ঘাটে,
কোথা ধর্ম, কে সে হরি নি।
অমুক না খেতে পায়, আমার কি বয়ে যায়,
ও মরে মরু কিবা ক্ষতি ?”
ক্রোধে কু রক্তাকার, মুর্তিমানু, অহঙ্কার,
দম্ভভরে কম্পে বর্তী ॥
এরূপ যে বােধ-হীন, তার অন্তে সুকঠিন
নয়কাখ্য যন্ত্রণার
স্থান।
মমের শাসন বলে, পুরীষ হ্রদের তলে,
কৃমি সহ তার অবস্থান।
দগ্ধ করি অগ্নিকুণ্ডে, প্রহায় মুখে তুতে,
লৌহপিণ্ড শন-কিঙ্করে।
জলবিন্দু নাহি দান, পিপাসায় প্রাণ,
তৃণ যথা দিন-করকল্পে।
হায় নিহণ বিধি! তপ্ত তৈলে মন বিষি,
ব্যাধি করে বিক্ৰেম প্রকাশ।
আরো কত মত হয়, দারুণ যন্ত্রণা-চ,
তবু নয় পাপের বিনাশ।
দুই স্থান বিপরীত, উর্কে স্বর্গ সংস্থিত,
অষােভাগে রচিত নিরয়।
স্বীয় স্বীয় কৰ্ম্মফলে, যায় লােক দুই স্কুলে,
যথা কৰ্ম্ম তথা ভােগ হয়।
অধিক লাভের আশে, অল্প ত্যজি অনায়াসে,
করে লােকে উপার্জন।
এৰকুমাবলী।
অন্তিমে বিপদ ঘাের, শমন কবে জোর,
ভয়ে পাপে না চলে চরণ।
এই রূপে ক্ষুদ্র নরে, লােভে ভয়ে গাৰ্য্য করে,
তত্ত্বরে বিভিন্ন প্রকার ?
আপন কর্তব্য ক, ভাবি আচরন ধর্ম,
মর্শ ভেদি করেন বিচার।
এখানে ভজিবে যানে, চরমে লতিব তারে,
তবে কেন এতই বিবাদ। (*)
তা নয় তা নয় নয়, নিষ্কামে ত্যজিতে হয়,
লাভ সার চিত্তেরপ্রসাদ।
স্বর্গ ও নরক যা, আত্মাতেই আছে তাহ,
কর্মের সঙ্গেতে ফল ফলে।
বিমল আনন্দ ভােগ, দুর্বার মালিন্য-যােগ,
স্বর্গ ও নরক লােকে বলে।
-
বিশুদ্ধ শোভা।
কে তুমি, রমণি, এই মর্ত্যলােকে,
ব্যাপিয়া রয়েছ সকল ঠাই,
সঙ্গে আনিয়া স্বর্গীয় আলােকে,
মুগ্ধকর আঁরি যে দিকে চাই?
(*) ধর্মোপনে গলামের সহিত বিবাদ।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
২
কে তুমি গাে প্রজাপতির শরীরে,
হরিত লােহিত নানা ধরণে
মিশিষ্ম রয়েছ, আকর্ষিহ ধীরে
ভাবুকের ভাবগাথক মনে?
বনের কুনুম (কে তারে আদরে।)
পালিত কেবল নীহার স্নেহে,
হেলিছে দুলিছে পবনের ভয়ে,
কে তুমি, জড়িত তাহার দেহে ?
কে তুমি গো চাৰু তৰুর-কোলে,
যথায় বিরাজে ব্রততী সতী,
ভ্রমর-ঝঙ্কার সহ সুখে দোলে,
বাড়াই বসি গৌরব অতি?
৫
সন্তাপ-নাশিনী নিশি-আগমনে,
সরসীর প্রেম-চঞ্চল বুকে,
শ্যামল গগন, ভাদল সনে,
কে তুমি নাচিয়া বেড়াও মুখে ?
কে তুমি সাধুর বদন-কমলে,
প্রিয়সখী অমলতার পাশে,
দাও দরশন দর্শকের দলে,
কমলা যেরূপ কমলবাসে?
مان
প্রবন্ধ-কুনুমাবলী।
৭
কে তুমি অস্থির হরিণ-নয়নে,
ভ্রমণ করিছ চঞ্চল হয়ে,
বর্ষা-সমাগমে যেমন গগনে,
চঞ্চলা বীন ঘন-হৃদয়ে ?
৮
চিনেছি তােমায় দেবের নন্দিনী,
থাক প্রকৃতির পবিত্র রূপে,
আনন্দ বিতর আনন্দ দায়িনী,
প্রবেশি জ্ঞানের নয়ন-কূপে!
৯
যুাও ভবের বন্ধনের দাম,
তােমাহতে মর অমর হয়,
লয়ে যাও তথা যথা অবিরাম
অক্ষয় প্রেমের লহরী বয়।
তত্ত্বজ্ঞান।
কে রচিল এই বিশ্ব ? কাহার কৌশল
অহরহ প্রকাশিছে পদার্থ সকল ?
কোথায় লভিব তারে? কি রূপ প্রকার
জানি,কি হয় অতি প্রিয়তম তার ।
এরূপ সহসা মনে ভাবিতে ভাবিতে,
ত্যজিম লােকালয়, পাই দেখিতে
প্রবন্ধ-কুমাবলী । • সম্মুখে পাদপ বরে, জিজ্ঞাসিনু তায়- দয়া করি তৰুবর বল হে আমায়, কোথায় সে জন ?—যার নিয়মের বলে, ঋতু ছয় তােমারে সাজায় ফুল ফলে ; হরিত-অম্বল—স্বয়ম্বরা রূপে তােমারে আশ্রয় করে, মহাবল ভূপে বরাঙ্গনা বরে যথা; গুণ গুণ করি, তব গুণ গায় অলী দিবস সৰ্বরী ; যবে ভানু সহ কবাণু-পূর্ণ করে, শীতলতা হরি দগ্ধ করে চরাচরে, নিদাঘ-বিদগ্ধ পান্থ নিদ্রা-অভিলাষী, নিবারে তপন-তাপ তব তলে আসি । আপনি সহিয়া সেই বিষম অনলে, শীতল ব্যজন কর অতিথীর দলে। কাহার দয়ায় তুমি আরামের স্থান জগতের, কোথা সেই দয়ার নিদান ? * ওগে। নদি, রূপবতি নগেন্দ্র নন্দিনি। ভাবুকের জ্ঞান-চক্ষে প্রীতি-প্রদায়িনী, তৰ তনু-অণু পুঞ্জ উঠিয়া অম্বরে, শান্তিরস-রূপে শান্ত করে চরাচর ; উর্বর বনু তাহে, কমনীয় বেশ ধরেন হরষে ; সতি! দেহ উপদেশ- কার প্রেমে কলকল শব্দ তব মুখে ? কার প্রেমে আনন্দ-লহরী তব বুকে ?
৪০
প্রবন্ধ-কুনুমাবলী।
কার প্রেমে উছলে তােমার প্রেম-কুপ?
কোথা বিরাজিত সেই প্রেমের স্বরূপ?
“ওহে দূরাগত বায়ু জগতের প্রাণ!
সর্বত্র তােমার গতি;—যথা দীপ্তিমান
তমােময় খনি-গর্ভে মণি অগণন ;
কিম্বা তৰুসঙ্কুল বিপুল-কায় বন
দিনকর-করােধী, ভথায় তােমার
গমন অবাধে ; অতি ভীষণ-আকার
নীল-জলনিধি,—যাহা মানব-নয়নে
অকূল, শ্রবণ রোধে যাহার গর্জনে,
হাস্যমুখে তার দেহ করি অতিক্রম,
দিগদিগন্তর নানা জনপদ ভ্রম
তুমি; নিত্য-গামী পান্থ এ ভব সংসারে।
প্রবেশ তােমার অতি নীরব সঞ্চারে
নরদেহ-অভ্যন্তরে কৈশিকা শিরায়,
সূক্ষতম রক্ত-বিন্দু ভাসিছে যথায় ;
অথবা কীটাণু-দেহ দৃষ্টির অতীত,
(স্মরণে মানস ঘাের বিস্ময়ে প্লাবিত !)
তাহারো-শিরার গর্ভে রক্তবিন্দুসহ,
আমােদে তোমার খেলা হয় অহরহ!
বিচিত্র তােমার কাৰ্য্য;-কুসুম-কাননে
নব-বিকশিত চাৰু প্ৰমুনের সনে
রঙ্গ তব ; ভৃঙ্গ যবে মধু-পানি অাশে
অাসে, তুমি নিবারণ কর মৃদুহাসে।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
৪১
আপনি নাচ হে আর জগতে নাচাও,
বালকের মত সুখে খেলিয়া বেড়াও !
ক্ষণেকে তােমার তেজ জগতে দুঃসহ,
আর তুমি নই যেন পূর্ব-গন্ধ-বই ।
প্রচণ্ড প্রতাপে ধরা কাঁপে অবিরাম,
ছিড়ে ফেল কুসুমের প্রণয়ের দাম
হুহুঙ্কারে! অচল চঞ্চল তব বলে ;
সমুদ্যত নিক্ষেপ করিতে রসাতলে
ধরিত্রীরে; মনে তদা হয় অনুমিত,
সৃষ্টি-বিনাশিনী শক্তি তােমাতে নিহিত।
অপার মহিমা তব, আমি হীন-বল
অভাজন, মনে মম বিশ্বাস অটল,-
অবশ্য কোথাও তুমি দেখিয়াছ তারে,
উন্মত্ত আমার চিত্ত বিলােকিতে যাবে,
যার তেজে তব তেজ জগতে প্রচার।
কোথা সে কৰুণা-সিন্ধু বিশ্বের আধার ?
এই উপদেশ, দেব, মাগি ও চরণে।
দয়া করি চরিতার্থ কর অকিঞ্চনে।”
এই রূপে নানা স্থানে ভ্রমণ করিতে,
* প্রজ্ঞা ” উদি মনে মম লাগিল কহিতে-
আরেরে অজ্ঞান, একি ভ্রান্তি ঘােরতর ।
পাইবে তাঁর দেখা ভ্রমি চরাচর
এরূপ উন্মত্ত হয়ে, কর অন্বেষণ
আপন আত্মায় সেই পরমাত্মা ধন
চ
৪২
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
সত্যেরে সহায় করি, নতুবা বৃথায়
অন্ধ হয়ে মিলে না পাইবে তাহায় !”
আশা।
১
—
কে দীন হীনের কাণে বলে মৃদুভাষে,
সাংসারিক দুঃখ যার নিত্য-সহচর ? -
* অচিরে যুচাব তব ক্লেশ অনায়াসে,
বলাব লােকের মুখে ধরণী-ঈশ্বর।”
২
শয্যায় লুণ্ঠিত রােগী, ব্যাধির কবলে
কবলিত, আছে প্রাণ কতক্ষণ তরে ;
কে তার শিয়রে বসি সকৰুণে বলে,-
দূরে যাবে ব্যাধি, প্রিয়, ভয় কি অন্তরে ?”
মগ্ন তরি, ভাসমান অকূল পাথারে,
অভাগা উপায়-হীন হাবু ডুবু খায়,
কে সেই সাগরে দেয় ভরসা তাহারে ?
* ভেব না হে কূলে লয়ে যাইব তােমায় !”
৪
উত্থিত শত্রুর অসি প্রহার উদ্যমে,
কর পদ শৃঙ্খলিত, কে তারে আশ্বাসে?
« দেখাইব দৈবীশক্তি শত্রু নরাধমে,
ভুবনে কাহার সাধ্য তােমারে বিনাশে ?”
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
৪৩
ভগ্নোম বসি দেশহিতৈষী প্রবর,
ভাপে শুদ্ধ করে দেহ ক্ষোভের অনল,
কেতার শ্রবণে ঢালে মধুমাখা স্বর?
* আর বার যত্ন কর হইবে সফল।”
কাহার অটল বাক্যে জনক জননী,
সদ্যজাত শিশুরে,—যাহার সুকোমল
অস্থিময় কলেবর যেমন নবনী,
হেরিতে বিশ্বের তেজ নয়ন দুৰ্বল,
---
৭
—স্টুরেনা অধরে বাণী, (নাজানি কাহার
প্রেমে হাসে !) সবে মাত্র সম্বল রােদন,-
( মানসেতে খুলি ভবিষ্যতের দুয়ার )
হেরে সংসারেতে সৰ্ব্ব সুখের সাধন?
কার প্রলােভনে কবি নিশীথ সময়-
নিস্তব্ধ বসুধা যবে, কুসুম নিকরে
দোলায় মাৰুত ধীরে, পতঙ্গ নিচয়
ধরে তান, ক্ষুদ্র তারা মিলায় অম্বরে
-
ত্যজিয়া নিদ্রার কোল, করে বিচরণ—
তুলিয়া সৌন্দৰ্য-ফুল, স্বভাব-কাননে,
ভাবসূত্রে বহুযত্নে করিয়া গ্রন্থন,
অঞ্জলি প্রদান করে বাণীর চরণে ?
৪৪ প্রবন্ধ-কুসুমাবলী। ১০ অক্ষয়-যৌবনা আশা! মনুজ-হৃদয়ে। বিহরি, ভুলও বর্তমান দুঃখ যত ; ভবিষ্যতে গতি তব, হায় দাস হয়ে তােমার, সংসারে জীব ভ্রমে অবিরত। ১১ তুমি না থাকিলে আশা ! বিপদের জলে ডুবিত মানব-কুল ; কাহারে আশ্রয় করিত উদ্যম ? কি করিত বুদ্ধিবলে ? ক্ষণমাত্রে এ সংসার পাইত বিলয়! যৌবন-কানন। প্রজ্বলিত বিষয়-অনল- উত্তাপেতে হৃদয় বিকল, ছটফট করে প্রাণ, সুস্থিরতা-অবসান, দর বহে এম-জল। मत्र দুঃখময়ী দিক সমুদয়, গৃহ যেন বিষের নিলয়, অস্তমিত সুখ-শশী। এরূপে একদা বসি, ভাবিতেছি আসন্ন প্রলয়।
প্রবন্ধ-কুমাবলী।
৪৫
সহসা সন্তাপ-বিনাশিনী,
কল্পনা আনন্দ-বিধায়িনী,
হৃদয়-কমলে উদি ( শুনিনু নয়ন মুদি)
বলিলেন মানস-মােহিনী।
কি ভাবিছ বসিয়া বিরলে,
দগ্ধ হয়ে বিষাদ-অনলে ?
আইস আমার সনে, যাই যৌবন-কাননে,
অদ্ভুত-দর্শন মর্ত-তলে।”
কল্পনার প্রসাদে সত্বরে,
মনােবক্সে গিয়া মুখভরে,
সবিস্ময়ে দৃষ্টি করি, অপূৰ্ব্ব ব্যাপার, মরি,
যৌবনের কানন ভিতরে ।
হেরিলাম মত্ততা' করিণী,
ভ্রমিতেছে যেন উন্মাদিনী,
হেলে শুণ্ড দোলাইয়া, তীব্ৰমদ ছড়াইয়া,
ঘাের রবে কাঁপায় মেদিনী।
বিকসিত দশন ভীষণ,
হুহুঙ্কারে আন্দোলিয়া বন,
অতি ভয়ঙ্কর রূপ, দুষ্ট-মতি ‘দম্ভ রূপ
শার্দুল করিছে বিচরণ।
৪৬
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
সে বনের দিক অন্যতরে,
নিশাচর ‘লােভ' নাম ধরে,
বৃদ্ধি করে কলেবর, আপদ-লম্বিতােদর,
বুঝি ধরা গ্রাসিবার তরে!
তার পাশে ‘আশা’ নিশাচরী,
রয়েছে আলােক হস্তে ধরি,
ভাবী অন্ধকার পথে, লয়ে যেতে মনােরথে,
মায়া-জাল বিস্তার করি।
মােহ’ নামে রাক্ষস প্রধান,
অসিত বসন পরিধান,
আবরি পিন্ধন বাসে, ক্ষণে ক্ষণে প্রভা নাশে,
অন্ধকার করিছে সেস্থান।
t
কাম, 'কাল বিষ-ধর, বিষ
বর্ষণ করিছে অহর্নিশ ।
শৃঙ্গযুগ তুঙ্গ অতি, বিদারিয়া বসুমতী,
বিহরিছে : মাংসৰ্য ' মহিষ।
মায়াবিনী বিষম কুৎসিতা,
দিব্য অবগুণ্ঠন-আবৃতা,
ভ্রমে কপটতা' নারী, বাহ্য শােভা বলিহরি,
মাল্য-আভরণ-বিভূষিতা।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
৪৭
সেই কাননের একস্থলে,
ঘাের ক্রোধ ' দাবানল জ্বলে,
হিংসা’ রূপ শিখা উঠে, ভীমতর বেগে ছুটে;
ভস্ম-ময় করিতে সকলে।
আরো কত কাণ্ড ভয়ঙ্কর,
করিলাম নয়ন-গোচর,
ভয়ে অঙ্গ শিহরিল, আস্যে হাস্য শুকাইল,
কাপিল শরীর থর থর !
পুনৰ্বার করি নিরীক্ষণ,
ঊর্ধ-কর্ণ সতৃষ্ণ-নয়ন,
সৈই বনে অনুক্ষণ, করিতেছে বিচরণ,
কৌতূহল ' অপর মােহন।
তার পাশে নাচে অবিরাম,
অলরা বাসনা তার নাম,
চরণ-ভঙ্গিতে দুঃখ, বিনাশি, বিতরে সুখ,
মৃদু মৃদু হাসে অভিরাম।
কি দিবস কিবা বিভাবরী,
সে কাননে প্রবাহিত, মরি।
বিহরিয়া যদা তদা, উদ্যম’ সমীর সদা,
উতেলিয়া বিবিধ লহরী।
৪৮
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
সমুন্নতস্কন্ধ দৃঢ়তর,
পৌৰু ? পাদপ-কুলেশ্বর,
‘প্রণয়’ প্রভৃতি কত, আরাে চাৰু তৰুত,
দর্শক-নিকর-মনােহর।
.
৫
দিব্য মুললিত-রূপ-ধরী,
দয়া , ক্ষমা , মমতা ? বল্লরী,
লাবণ্যে নয়ন হরে, অনুপম শােভা ধরে,
বৈজয়ন্তে যেমন অমরী ।
মধ্য দেশে এক সরোবর,
ও শান্তি ' রূপ জল স্বচ্ছতর,
ঢল ঢল ঢল করে, ক্রীড়া ছলে মন হরে,
* প্রেমের তরঙ্গ নিরন্তর।
সেই নীরে কিবা সুহাসিনী,
শােভা পায় ‘ভক্তি’ সরোজিনী ।
নহে পূর্ণ-বিকসিত, কিম্বা নহে মুকুলিত,
‘আনন্দ’ মধুর প্রসবিনী,
তেজোময় তপনের তরে,
ঊর্ধ-মুখী হইয়া বিহরে ;
সুখে তার যায় কাল, যেই জন সৰ্বকাল,
সেই পদ্ম হৃদয়েতে ধরে।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
৪৯
এইরূপ আরো কত রূপ,
হেরিলাম যত অপরূপ,
যৌবন-কানন মাঝে, সাজে মনােরম সাজে,
চক্ষে যার না হেরি স্বরূপ।
আর এক চমৎকার তথা,
বসন্তের উপবন যথা,
সব দেহ বলময়, কেহ কিছু উন নয়,
নবীনতা নেহারি সর্বথা।।
বিশাল-উরস্ক যুবাগণ,
প্রবেশিয়া যৌবন-কানন,
কভু কাদে কভু হাসে,
কভু হাসে, পরস্পরে উপহাসে,
কভু নেত্রে প্রজ্বালে দইন।
আমার मन
একজন,
সে বিপিনে করিছে ভ্রমণ,
মিশি সেই যুবদলে, যােগ দিয়া কোলাহলে ;
হেরিয়া বিস্মিত হলাে মন।
কহিলেন ত্রিদিব-ললনা,
দয়াবতী, কামদা কল্পনা,
ওই যে মায়াবীগণে, নিত্য চরে এ কাননে,
উহাদের প্রতাপ জান না।
ছ
৫০
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
মুহূর্তেকে এক এক জন,
বিনাশিতে পারে এ ভুবন,
হায়! যত ক্ষুদ্র নারে, ওদের হৃদয়ে বরে,
অবহেৰি জ্ঞানের শাসন।
তুমি এক জন যুবদলে,
ভুলিওনা মায়াবীর ছলে,
এই যে সম্মুখে দেখ, সৌম্য-মূর্তি দেব এক,
৫ জান’ নামে খ্যাত ধরাতলে ।
থাকিবে ইহার বশম্বদ,
দূরে যাবে সকল আপদ,
জ্ঞানের প্রসাদ-বলে, অবগাহি শান্তি-জলে,
শীতল হইবে, প্রেমাস্পদ!
“ ভক্তি-পদ্মে মধু-পান করি,
ক্ষুদ্ৰনর-জীবনে আমরি ।
অমরতা লাভ হবে, অতুল
অন্তে যাবে অমর নগরী।
গৌরবে রবে,
পৌষাদি তৰুলতা দলে,
স্থাপিয়া মানস-ক্ষেত্র-তলে,
যতনিবে অবিরত, তারা তােমা নানামত
ভুজাইবে সুখ, ফুল ফলে। ”
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
কল্পনা, কথার সমাপনে,
সৌরভে পূরিয়া হৃদি-বনে,
নেত্র মােহ রূপালােকে, চলিলেন দিব্যলােকে।
পুষ্পসার বর্ষে দেবগণে।
সেই সব ভাব নিরখিয়া,
অন্তরেতে গেলাম গলিয়া,
ভবে রব যতকাল,
এ বিচিত্র চিত্র-জাল,
হৃদি-পটে রাখিব আঁকিয়া!
পাপীর মন।
ওই যে গগনে শােভে মনােহর,
অগণন ক্ষুদ্র জ্যোতিফ-দল,
অলঙ্ঘ্য নিয়মে ভ্রমে দিন-কর,
শশধর, অন্ত-উদয়াচল।
* কানন-কুসুম (রূপের নিদান )
বিবিধ বরণে রয়েছে ফুটে,
জগত্-বিহারী জগতের প্রাণ,
হরি পরিমলে চৌদিকে ছুটে।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
* তৰুর তৰুণশাখায় বসিয়া,
মাতিয়া আমােদে বিহগ সবে,
পাতার ‘মর্মর সহ মিশাইয়া,
অবিরত গায় কতই রবে।
৫ বরষা-মিলনে, জলদ-মালায়,
অসিত বরণে সােণার লেখা,
উজলিয়া দিক্ রূপের প্রভায়,
সৌদামিনী ধনী দেয়গাে দেখা।
৫৫ সরসীর নীরে,—দিনেশ-দুহিতা,
জনমিয়া কাদম্বিনীর কোলে,
অতুলিত নানা-বরণ-রঞ্জিতা,-
মৃদুল পবন-হিল্লোলে দোলে।
“ গিরি-সুতা অভিসারিকা সুন্দরী,
নমিতে জলধি-পতির পায়,
দোলাইয়া হৃদে প্রেমের লহরী,
চপলা-চঞ্চল চরনে ধায়।
৫৫ নিশীথে, সুনীল, নীরব অম্বরে,
ঝিম্ ঝিম্ করে তারকাবলী,
ঝিল্লি-রব পশে শ্রবণ-বিবরে,
আধ আধ হাসে কুসুম-কলি।
• ইন্দ্রধনু।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
৫ লােকে বলে এই নিসর্গ-নিকর,
, বিশ্ব-জনকের প্রেমের মূল,
মুপবিত্র স্থির সুখের আকর,
যে সুখের নাই দ্বিতীয়
তুল ।
৫৫ কিন্তু এই সব আমার নয়নে,
তেমন মাধুরী প্রকাশে কই?
বিতরেনা সুখ-লেশ মম মনে,
আমি কি সংসারে মানুষ নই ?
তাহাদের মত আছে সমুদয়,
হত্ত, পদ, শির, মুখ, শ্রবণ,
কেন অন্য রূপ আমার হৃদয় ?”
ভাবিছে বিরলে পাপীর মন।
সহসা সৌরভে পূরিল সমীর,
উজলিল দিক্ বিজলী হাসি,
জ্ঞানদেব তদা ধরিয়া শরীর,
উত্তরেন তার সম্মুখে আসি ;-
* প্রকৃতির চাৰু মােহিনী মুরতি,
বিতরে বিশুদ্ধ সুখের সার,
নিত্য ভােগ করে সাধু মহামতি,
মরমে নিবসে ধরম যার ;
৫৪
প্রবন্ধ-কুমাবলী।
কলুষ-আবিল মলিন নয়নে,
খেলে না সে চাৰু রূপের ছটা,
পঙ্কে কি কখন, যামিনী-মিলনে,
বিলসে শরীর কিরণ ঘটা ?”
চমকি কলুষী উঠিল শিহরি,
হেরিতে সে রূপ ব্যাকুলে চায়,
অমনি অম্বরে দেহ পরিহরি,
স্বর্গীয় শরীর মিলায়ে যায়!
চন্দ্র।
ওহে শান্তু শশধর! রূপ তব মনােহর,
অনুক্ষণ আমার হে জাগিতেছ হৃদয়ে !
সঙ্গে প্রিয়তমা জায়া,-দেহের যেরূপ ছায়া-
বিরাজ তােমার নীল-মণি-ময় নিলয়ে।
তব সুতা দয়াবতী, ৰুচিরা চন্দ্রিকা সতী,
আবৃত করিয়া দেহ সুবিশদ বসনে।
আইসেন ধরাতলে, শীতলিতে জীবদলে,
আধ আধ আধ হাসি ধরে নাক বদনে।
চৌদিকে বর্ষেন সুধা, চকোর নিবারে ক্ষুধা,
আনন্দে মােহিত হয়ে তবগুণ গায় হে।
কুমুদ আমােদ ভরে, হাসি হাসি সরােবরে,
একদৃষ্টে অবিরত তব মুখ চায় হে।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
*
বায়ুতে ঈষদ হেলা, গ্রীবাভঙ্গী করি হেলা,
খেলা করে কৌমুদীর কুর ধরি প্রণয়ে।
বাড়াও লতার শােভা, ভাবুকের মনােলােভা,
ধরে ধনী রজতের কান্তি তব উদয়ে।
তােমারে হৃদয়ে ধরি, পূর্নিমার বিভাবরী,
সুন্দরী হইয়া আর আদরে না ভূষণে।
অমা নাকি নিজে কাল, পরে অলঙ্কার-জাল,
কাল মেয়ে চিরকাল যত্ন করে রতনে।
হেরি তােমা, সুধা-নিধি ! উথলয় জল-নিধি,
ক্ষেপার মতন হয়ে আলিঙ্গিতে তােমারে ।
হায় রে অপভ্য-স্নেহ, সংসারে সবার দেহ,
ফুলায় দ্বিগুণ সুধাময় প্রেম সঞ্চারে !
বিধির মানস-সুতা, প্রকৃতি সুরূপ-যুত,
সুচাৰু সীমন্তে তােমা পরেছেন আদরি।
কবির হৃদয়ে সরে,
রাজহংস রূপধরে,
খেল হে কতই রঙ্গে শােভা-নিধি বিতরি!
শিশু সব খেলা ছলে, ডাকে ‘আয় চাঁদ বলে,
কার নাহি মন হর মনােহর বরণে?
ভবে কেবা তব সম, সকলের প্রিয়তম ?
উপদেশদাতা তুমি ভাবুকের নয়নে।
* হেলা-জলজ ফুল বিশেষ।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
অগ্নিময় রবি-করে, বিতর আপন করে,
সুধা-সিক্ত করি, তারে এই মর ভুবনে।
অক্ষয় যশের ধাম, এ জগতে ‘সাধু’ নাম,
লভে নর শশধর তব অনুকরণে !
ধন নহে জ্ঞানই সুখের মূল।
কে বলে সঞ্চয়ি ধন সুখী হয় নর?
সে কেবল মূঢ় অর্থ-পিশাচের ভাণ,
অথে ঘটে অহরহ অনর্থ বিস্তর,
একমাত্র জ্ঞান হয় সুখের নিদান।
সত্য বটে রম্য হৰ্মে ধন প্রয়ােজন,
ভামিনীর বিলাসেতে অর্থ-যােগ চাই,
বিভবের রূপান্তর বিবিধ রতন,
সুখের সম্পর্ক কিন্তু কিছু তাহে নাই।
প্রথমতঃ কত ক্লেশ অর্থ উপার্জনে,
পরিশ্রমে পদে পড়ে মন্তকের ঘাম,
অবশ্য ধৰ্মেরে হয় ঠেলিতে চরণে,
তবে কথঞ্চিৎ সিদ্ধ হয় মনস্কাম।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
মলিন-বসনা, জীব-শাণিত-শােষিণী,
চিন্তা-নিশাচরী,প্রবেশিয়া ধীরে ধীরে,
ধনের রক্ষিকারূপে-—দিবস যামিনী,
নৃত্য করে ধনীদের মানস মন্দিরে।
লােভের জঠরানল জ্বলে অনিবার,
ক্রমশঃ প্রবলতর, দূরে যায় জ্ঞান,
জগত্ আহুতি পেলে তৃপ্তি নাহি তার,
অচিরে মানবে করে পশুর সমান।
ছিন্ন করে পিতৃ-মাতৃ-স্নেহের শৃঙ্খলে,
দূরে যায় প্রণয়ীর প্রণয়ের হার,
নির্দোষী জনেরো দেহ দলে পদতলে,
ধনের সম্পর্ক হলে রক্ষা নাই আর।
শাস্তির অভাবে নিদ্রা নেত্র পরিহরে,
তাই বুঝি দেখে তারা জাগ্রতে স্বপন।
ইন্দ্রিয়ের পথে ভয় সতত বিহরে,
শত্রুময় এ জগত ভাবে অনুক্ষণ।
ভােজনেতে নিয়মিত সুবর্ণ ভাজন,
নানা উপাদেয় খাদ্য-জাত-প্রপূরিত,
সুবাসিত সুকোমল শয্যায় শয়ন,
কিন্তু তার চক্ষে যেন বিষ-বিমিশ্রিত !
জ
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
হায় রে ! দারুণ রােগ ধনীর হৃদয়ে,
সমুদ্র করিছে পান, তবু পিপাসার
নাহিক নিবৃত্তি, ক্ৰমে যায় বৃদ্ধি হয়ে ;
সে কি সুখী, এত দুঃখ অন্তরে যাহার ?
সম্পদের অপগমে দুঃখ অনিবার,
অন্তরাত্মা জর জর ক্ষোভের প্রভবে,
যার উপার্জনে ক্লেশ ঘটেছে অপার,
তাহার বিয়ােগে দুঃখ কেনই না হবে ?
এইরূপে ধনেশের মানস-আবাস,
সুখ-বিনিময়ে হয় পিশাচীর স্থান,
ক্ষুব্ধতা, ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা, সন্ত্রাস,
বিহরিয়া করে দেব-মন্দিরে শ্মশান!
দীনেরো অন্তরে উঠে দয়ার তরঙ্গ,
ধনার্থীর দুঃখাবলী করিলে শ্রবণ ;
তাই বলি দাও মন ও স্বপনে ভঙ্গ।
অন্য কোথাও কর সুখ অন্বেষণ।
যাহার ইচ্ছায় ভবে আসিয়াছি আমি,
যাইব আবার চলে ইচ্ছা-বশে যার,
সে ইচ্ছাময়ের হলে ইচ্ছা-অনুগামী,
থাকে কি সংসারে সুখ-অভাব আমার ?
প্রবন্ধ-কুসুমালী।
জানিতে তঁাহার ইচ্ছা জ্ঞান-যােগ চাই,
সূৰ্থনহে সে জ্ঞানের প্রাপ্তির সাধন,
জন্মে না খনিতে তাহা, সাগরে না পাই,
কেবল আত্মায় তার লভি দরশন।
জ্ঞান যত লব্ধ হয় তত ক্ষয় দুরে
সংসার-বাসনা, মন হয় পরিস্কৃত,
সুখ-স্বর্গ-ভােগ হয় বসি মর্ত্য-সুরে,
বিভুর প্রসাদে যাহা নিত্য-সুবাসিত।
তখন নিঝর-বারি মুখে করি পান,
বন-জাত ফলে সুখে আদি অমৃত,
সুখে শুনি বিহঙ্গের সুখময় তান,
সমস্ত জগত্ যেন সুখে আপ্লাবিত।
ঘুচে যায় ‘আমার’ ‘আমার’ অভিমান,
ইন্দ্রিয়-নিকর হয় সহজে শাসিত,
• আমার সম্বন্ধ যত পায় অবসান,
‘আমি’ লীন হয় মূল আমিতে’ নিশ্চিত
জ্ঞানের নিঝরে মন রাখরে যতনে।
করেন। তাহার মুখে মালিন্য নিহিত,
অক্ষয় ধারায় তব ভাবের ভবনে,
নিত্য শান্তি-সুখ-বারি হইবে নিঃসৃত।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী
মনের প্রতি উপদেশ ।
ওরে মূঢ় মন! শুন শুন শুন,
তােমারে বিনয় করি রে ।
পাপের পরশে, যেওনা যেওনা,
সদা ভাব সেই হরিরে ।
এভব
সংসার, রণ-রঙ্গ-ভূমি,
ভাবিও দিবা সৰ্বরী রে ।
ওই মহাকাল, তােমারে বাঁধিতে,
রয়েছে সন্ধান করি রে ।
উহারে হেরিয়া, কেপনা কেপনা,
থর থর থর থরি রে ।
হও সাবধান, সংগ্রাম করিতে,
বীরবর-বেশ ধরি রে ।
যাহারা তোমার, দেহ-গেহ-দ্বারে,
রয়েছে হয়ে প্রহরী রে।
তাহাদের প্রতি, রেখরে নয়ন,
কি দিবস বিভাবরী রে।
প্রবন্ধ-কুসুমাবলী।
বিশ্বাসঘাতক, দুরাচার সবে,
তােমার বিশ্বাস হরি রে।
ছলেতে মােহিয়া, গােপনে গােপনে,
প্রদান করিবে অরিরে ।
এই বেলা রাখ, মুখ্য-সেনাপতি-
পদে জ্ঞানদেবে বরি রে ।
তা হলে হেলায়, সংসার-সমরে,
থাকিবে নির্ভয় শরীরে।
নিত্য কিছু নয়, অনিত্য সকল,
সহচর সহচরী
রে ।
দিন কত তরে, তাহাদের সনে,
ভবের কাননে চরি রে।
অপেক্ষা তােমার, করিবেনা কেহ,
সময় হইলে মরি রে !
তবে কেন মিছে, বাড়াও জঞ্জাল,
আমার আমার করি রে ?
সুন্দর ভূষণ, কাকের পুরীষ,
দিওনা দিওনা শরীরে।
এই কর যাহে, আলােয় আলােয়,
মায়া-জাল হতে সরি রে।
প্রবন্ধ-কুকুমাবলী।
দেহের যতন, করেনা করােনা,
সুচাৰু বসন পরি রে।
ভূতময় দেহ, ভূতের বেগার,
খেটে কেন কাল হরি রে ?
অবশ্য একদা, হইবে
হইবে যাইতে,
এ শরীর পরিহরি রে।
কধুকে যেমন, ত্যজয় ককী,
কানন-মৃত্তিকা’পরি রে।
পরের অহিতে, কখনো যেওনা,
দ্বেষের জ্বরেতে জ্বরি রে।
দম্ভের অনলে, ধৰ্ম্মের আহুতি,
দিওনা নিষেধ করি রে।
নয়নে হেরােনা, পরের রমণী,
হইলেও বিদ্যাধরী রে ।
রূপ নহে তার, শরীর দহিবে,
ঘাের কাল বিষধরী রে।
ওই যে মিছে, সংসার-কাননে,
অহঙ্কার মত্ত করী রে।
জ্ঞানের শৃঙ্খলে, সুদৃঢ় বন্ধনে,
বাঁধহ যতনে ধরি রে।
প্রলােভন-জাল, পাতিয়া দুরাশা আছে, কাল নিশাচরী রে। ওই মায়া ফাঁদে, বাড়া’ও না পদ, ভ্রমেতে কভু বিচরি রে । সাধু-সহবাস, (মহৌষধ ভবে, ) করহ সদা আদরি রে। ভাবিওনা' সুখ, কভু কটুভাষে পরের হৃদি বিদরি রে । পার্থিব সুখের, বিয়ােগ হইলে, উঠনা যেন শিহরি রে। কি ক্ষতি তােমার, যার ধন সেই লয় যদি পুনঃ হরি রে ? কুসুমের মত, ভবের উদ্যানে, সৌরভ-ধনে বিতরি রে । চল চল ভরি, বিপদ-সাল বাহিয়া বিবেক-তরি রে। দুঃখের আগার, এই কারাবাস- হতে সুখে অপশরি রে। করিব দর্শন, প্রেমের স্বরূপে, তোমার নয়ন ভরি রে।
তুমি যদি হও, আমার সহায়,
তবে আর কারে ডরি রে ?
বিপক্ষ-নয়নে, নিক্ষেপিয়া ধূলি,
অবহেলে ভব তরি রে ?
তাই বলি মন ! শুন শুন শুন,
তােমারে বিনয় করিরে।
পাপের পরশে, যেওনা যেওনা,
সদা ভাব সেই হরিরে।
সম্পূর্ণ
Printed by I. C. Bose d: Co., Stanhope Press, 249, Bow-Bazar
Roud, Calcutta.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.