Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Chintamani
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
চিন্তামণি
- - -
( উপন্যাসাকারে নাটক)
“মুচ্ছ না” প্রণেতা
শ্রীচণ্ডীদাস মুখখাপাধ্যায়
প্রণীত।
= = =
= = = = =
১৩৩০ সাল
মূল্য ১ এক টাকা
রণজিৎ কুমার মুখােপাধ্যায়,
৭৪২ নং রামকান্ত বােসের ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
নলিন চন্দ্র রায় দ্বারা মুদ্রিত
'ল আট ষ্টুডিও ও প্রিন্টিং লিমিটেড
. নিমতলা ঘাট ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
উ= সর্গ।
বড় দুর্দিনে এই নাটক লিখিতে বসিয়াছিলাম দুর্দিনেই
ইহার পরিসমাপ্তি হইল। দুর্দিন বলিতেছি এই জন্য
যাহাদের লইয়া এই নাটকের অবতারণা—হায় ! আজ
আর তাহারা কেহই ইহ জগতে নাই। একজন আমার
হৃদয়ের দেবী—আমার জীবন সঙ্গিনী প্রিয়তমা স্বৰ্গগতা
সরঙ্গিনী দেবী—অন্যটি আমার স্নেহােপমা কন্যা
রাধালতা দেবী--এই দুজনের পবিত্র স্মৃতি রক্ষার্থে
উভয়ের নাম সংযুক্ত করিয়া এই নাটক খানি ভক্তিভরে
রাধাকান্ত জীউর শ্রীচরণে উৎসর্গ করিলাম। পুস্তক
বিক্রয় লব্ধ অর্থ উক্ত দেব মন্দিরের সংস্কারার্থে প্রদত্ত
হইবে।
No text on this page.
ভূমিকা নানা বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া ঈশ্বর ইচ্ছায় এতদিন পরে জন সমাজে এই নাটকখানি প্রকাশিত হইল। ভক্ত রাগমার্গে কেমন করিয়া শ্রীভগবানকে ভালবাসে, ও সেই ভালবাসার চরমােৎকর্ষ যাহা-তাহ। দেখানই এই নাটকের মূল উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য কত দূর সফর হইয়াছে বলিতে পারি না—সে বিচারের ভার নাট্টামােদী সুধীবৃন্দের উপর রহিল। নাটকান্তৰ্গত আনুষঙ্গিক ঘটনাগুলির মধ্যে বিশেষতঃ বৰ্তমান হিন্দু সমাজে কন্যাদায়ে বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে যে করুণ ছবি দৃষ্ট হইতেছে—যাহা ইতিপূৰ্ব্বে বাংলার মনীষী নাটুকার পরম পূজনীয় শ্রদ্ধাস্পদ গিরিশবাবু বলিদানে দেখাইয়াছেন—বধূ নির্যাতনের সেই লােমহর্ষণ ছবি সমাজের সম্মুখে পুনরুদিত করিতে আমি তাহারি প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করিয়াছি। নাটকখানি সামাজিক ঘটনা লইয়া যদিও লিখিত হইয়াছে তথাপি হানে স্থানে ইহাতে উপন্যাসের কিঞ্চিৎ অভািস আসিয়া পড়িয়াছে সুতরাং ইহাকে উপন্যাসাকারে নাটক বলিয়া দেখিতে হইবে। পরিশেষে কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিতেছি যে বেঙ্গল আর্ট ষ্টুডিও ও প্রিন্টিং লিমিটেডের সুষােগ্য ম্যানেজিং এজেট ও সাহিত্যের অকৃত্রিম উৎসাহদাতা মাননীয় শ্ৰীযুক্ত বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ বর এফ,আর,জি,এস শিল্পকলা-বিভূষণ মহাশয় আমাকে উৎসাহিত না করিলে বোধ হয় তা ভবিষ্যতের গর্ভেই পাকিয়া যাইত। এজন্য তাহাকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি। শারীরিক অসুস্থতা হেতু নিয়ে প্রফ দেখিতে না পারায় স্থানে স্থানে মুদ্রাকর প্রমাদ ঘটিয়াছে। সহৃদয় পাঠকবর্গ ত্রুটি মার্জনা করিবেন। ৭৪২ রামকান্ত বােসের স্ত্রী বিনীত বাগবাজার। গ্রন্থকার। * } নিবেদন। পাঠকবর্গের প্রতি নিবেদন যে মৎকৃত এই নাটকন্তর্গত একটি চরিত্র “চিন্তামণি”---সাহার নামানুযায়ী পুস্তকখানি নামাঙ্কিত হইয়াছে তাহার বাল্যাবস্থায় পিতৃবিয়োগ হয়। পতি বিয়োগ ও অর্থাভাবে শােকাকুলা “বামুনম।” একমাত্র স্নেহের পুত্র চিন্তাকে লইয়া সাতিশয় বিপন্ন হইলেন। ভ্রাতৃজায়ার দুঃখ দূরীকরণার্থ জ্যেষ্ঠতাত ভ্রাতুস্পুত্র চিন্তাকে সস্নেহে স্বীয় ক্রোড়ে তুলিয়া লইলেন। ইহাতে বানমার ক্লেশ কথঞ্চিৎ প্রশমিত হইল বটে, কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয় হেতু ইহাও অধিক দিন স্থায়ী হইল না—চিন্তার হৃদয়ে স্বীয় স্মৃতিখানি চির জাগরূক রাখিয়া জোতাত অচিরে কালগ্রাসে পতিত হইলেন। দুঃখ সহিষ্ণু মাতা বামুন অনন্যোপায় হইয়া পুত্রসহ স্বয়ম্ভুর পরিবারভুক্ত হইলেন। তদবধি চিন্তা স্বয়ম্ভুকে জ্যেষ্ঠতাত জ্ঞানে অভিহিত করিত। স্বয়ম্ভু কিন্তু বামুন মাকে মাতৃবৎ ভক্তি করিতেন। ইতিমধ্যে পুস্তকোল্লিখিত ঘটনাটির সূত্রপাত হয় ।
নাট্টোলিখিত ব্যক্তিগণ ।
পুরুষগণ।
হরলাল চট্টোপাধ্যায়-অর্থলোভী মহাজন।
৭
শ্রীগোপাল
ঐ পুত্রদ্বয়।
লালগোপাল
স্বয়ম্ভুনাথ মুখােপাধ্যায়-লালগােপালের শ্বশুর।
সাহেব বাবু—স্বয়ম্ভুর সহােদর।
শ্রীকান্ত চক্রবর্ত্তী—হরলালের প্রতিবেশী ।
রাধারমণ সেন--জনৈক পুলিশ ইনস্পেক্টর।
কৃপান—ছত্মবেশী সাধু।
অধর-—হরলালের ভূত।
চিন্তামণি-মুনমার পুত্র।
উড়ে চাকর, দরওয়ান, পাহারাওয়ালাগণ, কাবুলীদ্বয়, উকালের পিয়ন,
ঝি, সা ইনস্পেক্টর, কয়েদীগণ, জেলের জমাদার, জেলার, জেলের
সুপারিনটেন্টে, রামচরণ, ডাক্তার, লালগােপালের ইয়ারগণ,
কন্যাত্রী বরযাত্রীগণ, নাপিত, খাতকদ্বয় ইত্যাদি ।
স্ত্রীগণ।
দামিনী—হরলালের স্ত্রী।
গ্রাম-~-লালগোপালের স্ত্রী।
প্রিয়ম্বদাসাহেব বাবুর স্ত্রী।
ললিতা—স্বয়ম্ভুর স্ত্রী।
নলিনী-হরলালের পল্লীস্থ ইতর বংণীয় বিধবা রমণী ।
বিলাসী ওরফে বেলা) হরলালের দূরস্থা আত্মীয়া ।
বামুনমা, পল্লীরমণীগণ ইত্যাদি।
শুদ্ধিপত্র। পৃ। পঙক্তি অশুদ্ধ শুদ্ধ। যাও ষাও বুড়ী। অষুধ দিয়েছে ঝড়ী ? ওষুধ দিয়েচে, দাও ২২ তোমরা তােমার। দুমাসের পাঁচ বছরের । ১৪ ৪৮ মা গঙ্গার মাগঙ্গার । থ সান্ত এইটু congisable সমস্ত । একটু। cognisable, ১১৬ ওপর ওপর, না— ১২৩ speak সুপারি ঐ speak of জেলার। y ঐ
চিন্তামণি।
$
প্রথম অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
( স্বয়ম্ভুর দরদালান।)
স্বয়ম্ভুগিন্নী শ্যামা কোথা ?
ললিতা-তা জাননা, শ্যামা তোমার বৃন্দাবনে গেছে।
স্বয়-সে কি ? বে’র যুগ্যি মেয়ে কার সঙ্গে বৃন্দাবন পাঠালে আমি কিছু
জানলুম না।
ললিতা-তুমি জান বৈকি, ভুলে গেছ। মেয়ের বে’র জন্যে হন্যে হয়ে
বেড়াচ্চ। বামুনমার ঠাকুর বাড়ীকে যে শ্যামা বৃন্দাবন বলে।
স্বয়-তাই ভালাে। গিন্নী হন্যে হয়ে বেড়াই সাধে। বাস্তুভিটে টুকু না
খােয়ালে, কন্যাদায় থেকে উদ্ধার হবারআর অন্য উপায় নাই।
কালো মেয়ে শুবে না গিন্নী সমাজ শুনবে না। সায়ের মত ছুরি
শাণিয়ে আছে, রক্ত খাবে—আকণ্ঠ পূরে রক্ত খাবে। নিষ্ঠুর
সমাজ, নিষ্ঠুর সমাজের রীতি নীতি, আর নিষ্ঠুর তুমি আর আমি।
মনে হয় সাত্ সাটা ব্যাটা মরে গেল, বংশ থাকে না বলে মা
অনেক ঠাকুর দেবতাকে মানত করেছিল। অনেক কষ্টের ধন
তবে ঐ একরত্তি মেয়ে। কত যত্নের, কত আদরের ধনকে, আজ
২
চিন্তামণি।
| প্রথম অঙ্ক
সমাজের পৈশাচিক পীড়নে গলগ্রহ মনে হচ্চে। এর চেয়ে আর
আমাদের দুরদৃষ্ট কি হবে। ধিক্ আমাদের বাৎসল্য স্নেহে, ধিক
আমাদের জীবনে। গিন্নী কত সাধই করেছিলুম, আট বছরের
মেয়েকে গৌরীদান কৰ্ব তারপর সে আশায় জলাঞ্জলি। তারপর
ন বছর, দশ বছর, এখন কন্যার কন্যাকাল উপস্থিত চোদ্দ পুরুষ
নরকস্থ হবে।
ললিতা--বালাই কেন নরক হবে? তুমি যদি বলত একবার গিন্নীর
দুটো হাতে পায়ে ধরে দেখি ।
স্বয়-মনেও ভেবনা তা। মাগী আবার বলেচে কি শােননি ত ?
বাড়ী তার ছেলের নামে লিখে দিতে হবে।
ললিতা-তা হাে, জামায়ের নামে বাড়ী লিখে দিলে পরে ও আমার
শ্যামাকেই বর্তাবে। শুনলুম ছেলেটি লেখাপড়া জানে, স্বভাব
চরিত্রও ভাল, বাপেরও দুপয়সা আছে। তুমি আর অমত করন।
ভাল ঘর, ভাল বর দেখে দোয়াই দরকার।
স্বয়ম্ভু—সে হাত তােমার আমার নয়, তুমি আমি নিমিত্ত মাত্র। দুনিয়ার
মালিক যেখানে তােমার মেয়ের অন্ন মাপিয়েছেন। ভবিতব্য
যেখানে নিয়ে যাবে সে কেউ লঙ্ঘন কত্তে পাৰ্বে না ।
বিধিমতে চেষ্টা কৰ্ব। পাড়াপড়সীর কাছে ঢের চেঞ্জ করেচি,
বন্ধুবান্ধবদের কাছে টের চেষ্টা করেছি।
ওদের কাছে বাড়ী বাঁধা
আছে শুনে, কেউ মার সাহস করে রাখতে চাইছে না। দেখি
ভাইকে একবার বলব, বস্ তা হলেই ধৰ্ম্মত খালাস, আপদের
ললিতা-- গা আবার ভায়ের নাম কচ্চ ? বাড়ী কি বাঁধা পড়ত, না
দেনা কত্তে হ’ত? মামলা মকদ্দমা বাধিয়ে, নাস্তানাবুদ করে
বাড়ী ভাগ করে নিয়েছে তােমার ভাই। তােমার মনে না থাকতে
প্রথম গর্ভাঙ্ক।।
চিন্তামণি।
পারে আমার কিন্তু হাড়ে হাড়ে বিঁধে আছে। যে তােমার
অপমান করেচে সে আমার পরম শত্রু। তার কাছে তােমায়
আমি কিছুতে যেতে দেব না।
স্বয়---ভায়ের কি দোষ বল, আমায় বাপের মত ভক্তি কত্ত। কোন
বিষয় পরামর্শ কত্তে হলে, আমা ভিন্ন আর কাকেও জানত না।
মা রেখে মরে গিয়েছিল, তুমি মায়ের মত হয়েছিলে। আর আমি
বাপের কর্তব্য পালন করে, লেখাপড়া শিখিয়ে, মানুষ করে বিয়ে
দিয়ে আনলুম। বড় আশা ছিল, তুমি বড় বউ হয়ে সংসারকে
মাথায় করে থাকবে। ঘােট বউ এসে তােমার কাছ থেকে
সংসারের নিয়ম কানুন শিখে তােমায় সাহায্য কৰ্বে। তােমার
আমার সময় অসময়ে ভাই ভাদ্দর বউ বুক দিয়ে পড়বে। ভাদ্দর
বৌ পরের মেয়ে, ঘর ভাংতে পারে, ধৰ্ম্ম না রাখতে পারে, কিন্তু
ভায়ের ওপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে। আহা! ছেলেমানুষ
হালকা বুদ্ধি, কিসে কি হয় বুঝতে পারে না।
ললিতা --না, ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। তুমি যা ভাব তা নয়,
ভাই তােমার অমানুষ।
স্বয়–সত্যিই যদি ভাই অমানুষ হয়, তােমার আমার হাত কি গিন্নী।
উপকারের প্রত্যাশায় ভাইকে মানুষ করিনি ; কর্তব্য বলেই
করেচি। কর্তব্য পালনই সংসারের ধৰ্ম্ম, আর জীবনের শেষ
পর্যন্ত তাই কৰ্ব্ব ।
ললিতা-তােমার বিশ্বাস নিয়ে তুমি থাক, আমায় আর কিছু জিজ্ঞাসা
করনা।
(নেপথ্য হইতে জনৈক উকীলের পিয়ন।)
স্বয়ম্ভু বাবু বাড়ী আছেন।
;
চিন্তামণি।
{ প্রথম অঙ্ক
(নেপথ্য হইতে উকীলের পিয়ন।)
আজ্ঞে বাইরে একবার আসুন বিশেষ আবশ্যক আছে।
স্বয়ম্ভ-.-দেখি কে আবার ডাকে।
[ স্বয়ম্ভুর প্রস্থান ।
ললিতা-ভগবান যদি দুঃখিনীর গর্ভে মেয়ে দিয়ে তুমি উপায় করে দাও
( চিন্তার সহিত খামার প্রবেশ।)
চিন্তা--জ্যাঠাই মা আমরা বৃন্দাবনে গিয়েছিলুম। বা শ্যামা কি
দেখলিবল ?
শ্যামা—কেন দাদা বৃন্দাবনের ঠাকুরকে দেখেচি
চিন্তা-আর কি দেখেচিস্ ?
শ্যামা—কেন দাদা ঠাকুরের পায়ের নূপুর দেখেচি।
চিন্তা—আর কি দেখেচিস্?
শ্যামা---আর দেখেচি ঠাকুরের হাসি। মরি মরি ঠাকুরবাড়ী যেন আলাে
হয়ে আছে। দেখ মা, ঠাকুর কেবল আমার দিকে এক দৃষ্টিতে
চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। দাদা বল্লে—“ঠাকুর আমায় বিয়ে
কৰ্বে”। হ্যা মা, ঠাকুর আমায় সত্যি সত্যি বিয়ে কৰ্বে না দাদা
মিছে কথা বল্লে। বাবা, ঠাকুরের যে চাউনি।
“চিন্তা-ঠাকুর তােকে দৃষ্টি দিয়েছে শ্যামা, সাবধানে থাকিস। দেখ জ্যাঠাই
মা, তােমরা বাপু ওকে আর শ্যামা বলে ডে’ক না।
ঠাকুরের বড় কষ্ট হয়, 'আমি একটা চমৎকার নাম রেখেচি। সে
কাকেও বলব না, ঠাকুর জানে আর আমি জানি।
শলিতা—তা এত বেলা কল্লে কেন ?
চিক'—কি কৰ্ব জ্যাঠাই মা, ঠাকুরের এতক্ষণ ভােগ সরেনি বলে আসতে
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি ।
দেরী হ’ল। ঠাকুর চান কল্লেন, খেলেন, দুমুলেন দেখে তবে
আসছি।
ললিতা—যাও রান্নাঘরে দুজনের ভাত ঢাকা আছে খাওগে।
চিন্তা-আয় শ্যামা ঠাকুরের পেসাদ পাই গে আয়।
[ চিন্তার কিয়দ্দ র অগ্রসর ও পুনরায় পশ্চাদবর্তন
জ্যাঠাই মা, জ্যাঠাই মা, মা কাশী থেকে এলে, মাকে বুঝিয়ে বলল,
তােমার দুটি পায়ে পড়ি, এবার থেকে আমি ঠাকুর পূজো কৰ্ব্ব ।
কেমন জ্যাঠাই মা, মা এলে বল্বে ত?
ললিতা—হ্যা হ্যা বলব, এখন খাওগে পিত্তি পড় চে।
[ চিন্তা ও শ্যামার প্রস্থান ।
(স্বয়ম্ভুর পুনঃপ্রবেশ।
‘য়-গিন্নী বড় মজার খবর, বড় মজার খবর। হরলাল চাটুয্যে
উকীলের চিঠি দিয়েছে, সাতদিনের মধ্যে টাকা দিতে না পালে
বাড়ী নিলেমে চড়বে।
ললিতা—হ্যা গা তবে কি হবে ?
স্বয়-দেনার জন্যে ভদ্রাসন বিক্রী হয়ে যাবে, মেয়ে আইবড় থাকবে।
তােমাকে আমাকে লােকে দেখবে, আর চূণ কালা নিয়ে আমাদের
মুখে দেবে। ভাবলে আর কি হবে বল, অদৃষ্টে যা আছে তাই
হবে।
[ স্বয়ম্ভুর প্রস্থান।
ললিত-দুপুর বেলা চুপি চুপি একবার গিন্নীর কাছে যাব। ঠাকুর তুমি
চাটুয্যে গিন্নীর সুমতি দাও।
( ললিতার প্রস্থান।
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
( প্রিয়ম্বদার কক্ষ।)
রূপানন্দ-গুরুকে সাক্ষাৎ পতি ভাবে ভজনা কত্তে হয়। শরীর, মন, 'ও
বাক্যের দ্বারা গুরুর সেবা কত্তে না পাল্লে বৃথা মন্ত্র গ্রহণ, বৃথা
জপতপ । সেই জন্যে বছিলুম দীক্ষা নেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ােনা ;
আগে ধ্যান ধারণা কওে শেখ, 'গুরুর ওপর অনুরাগ আনতে
শেখ। ভাবতে হবে না, সময় এলে আপনিই সমস্ত বুঝতে
পর্বে।
প্রিয়ম্বদা-আপনার চরণে দাসী প্ৰাণ মন সমস্ত অর্পণ করেছে। আপনি
কি আমার পত্র পড়ে তা বুঝতে পারেন নি। কাশী থেকে এসে
অবধি আপনার জন্যে মন কি রকম ব্যস্ত হয়েছিল। প্রতিদিন
আপনাকে পত্র লিখেচি, আপনি জবাব দিতেন না সারারাত
কেঁদেচি। সে কষ্টের এক বিন্দুও যদি অনুভব কত্তেন ; তা হলে
বারম্বার আমায় আর ও কথা জিজ্ঞেস কত্তেন না।
রূপানন্দ—সব বুঝি, সব জানি, কিন্তু এখন ও আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস
হয়নি।
গুরুকে সাক্ষাৎ পতিভাবে ভজনা করা, যত সহজ মনে
ক’চ্চ কাৰ্য্যে তত সহজ নয় বড় কঠিন। বিশেষতঃ তুমি স্ত্রীলােক
স্বভাবতঃ চঞ্চল। এ পথে দাড়ালে অনেক বাধা বিপ্ন, অনেক কষ্ট
সহ্য কত্তে হবে। তােক নিন্দার ভয়, সমাজ শাসনের ভয়, এক
কথায় সমস্ত ত্যাগ করে কেবল গুরুর ওপর ঐকান্তিক অনুরাগ ;
তীব্র একাগ্রতা। মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত গুরুকে ভজনা কতে হবে ।
বড় কঠিন বড় কঠিন।
খ্রিয়ম্বদা--জানি না কি কল্লে আপনার বিশ্বাস হবে। আমার ভাসুর
জা কতদিন আমায় কত কথা বলেচে সব হেসে উড়িয়ে দিয়েছি।
।
দ্বিতীয় গুর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
কিন্তু যেদিন আপনার নামে বৃথা অপবাদ কলঙ্ক-তুলে ; আমার
অচলা বিশ্বাস ভক্তিকে আপনার চরণ থেকে সরিয়ে দেবার জন্যে
যুক্তি করেছিল। সে দিন আমি কি করেছিলুম জানেন? স্বামীর
সামনে দাড়িয়ে জন্মের মত ভায়ে ভায়ে পৃথক করে দিয়েচি। সে
কার জন্যে আপনার মনে নাই ?
কৃপানন্দ—আর বল্তে হবেনা আমি তােমায় পরীক্ষা কচ্ছিলুম। তুমিই
দীক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত পাত্রী। আমি তােমায় মন্ত্র দেব, কিন্তু
মন্ত্র গ্রহণের পর একাধিক্রমে তিন বৎসর আমার আশ্রমে থাকতে
হবে। সেই অবসরে আমি তােমায় যােগ প্রক্রিয়ার গুঢ় রহস্য
সকল শিখিয়ে দেব। কিন্তু সাবধান এ কথা যেন তােমার
স্বামীর কানে না ওঠে। প্রকাশ হলে সমস্ত পণ্ড হবে, গুপ্ত ভাবে
সাধন কত্তে হবে। নির্জনে ভগবৎত্রস আস্বাদ কত্তে হবে।
( সাহেবী পরিচ্ছদে সাহেব বাবুর প্রবেশ।)
সাহেব বাবু--- গুড ইভনিং স্বামীজী, কবে এলেন ?
কৃপানন্দ—কলকাতায় আমি অাজ দিন কতক এসেছি। আমার এক
শিষ্যের বড়ই সাংঘাতিক পীড়া, তার চিকিৎসার জন্যে আমায়
আসতে হয়েছে।
সাহেববাবু—আপনি আবার চিকিৎসাও করেন নাকি ?
কৃপানন্দ—কত্তে হয় বৈকি ? জগতের উপকারের জন্যে আমাদের অনেক
রকম বিদ্যে শিখতে হয়।
afrezars-Oh ! I see you are well accomplished in various
learning of duty. | প্রিয়গদার প্রতি স্বামীজীকে জল
খাইয়ে ত ?
কৃপানন—তােমার স্ত্রীর সে সব বিষয়ে কোন দিকে ক্রটি নাই; অচলা
গুরুক্তি। যাও শরীরের ক্লান্তি দূর করতে। আগে আত্মরক্ষা
৭
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
পরে আত্মধৰ্ম্ম। আমি আজ আসি, আর একদিন এসে কথা
বাৰ্তা কইব
সাহেববাবু—এবার যেদিন আসবেন, অনুগ্রহ করে পত্র দিয়ে আগে
জানাবেন আমি বাড়ী থাকব।
| কক্ষান্তরে সাহেববাবুর গমন।
কৃপানন্দ—- প্রিয়ম্বদার প্রতি) তুমি আর এখানে দাঁড়িয়ে কেন ?
( প্রিয়ম্বদা স্বামীজীকে প্রণাম করিল।
কৃপানন্দ—এস কল্যাণ হাে আয়ুষ্মতী হও।
প্রিয়ম্বদা—আপনি একটু দাড়ান। আপনার জপ কব্বার জন্যে আমি
একখানা পশমের আসন বুনেছি নিয়ে যা।
| প্রিয়ম্বদার প্রস্থান।
কৃপানন্দ-- স্বগতঃ ) রূপৈশ্বর্যের গরবে উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলে
প্রিয়ম্বদা ; একদিন কত কেঁদেছিলুম যন্ত্রনা বােঝনি। অপমান
করে ফিরিয়ে দিয়েছিলে তবু ভুলতে পারিনি। এস এস প্রাণ মন
উন্মাদিনী রসময়ী মূর্তিতে আমায় তৃপ্ত কর। আমি তৃষিতের মত
তােমার রূপ সুধা পান করে সংজ্ঞাহীন হই, ডুবে যাই।
( আসন লইয়া প্রিয়ম্বদার প্রবেশ।)
বাঃ! বাঃ! অতি সুন্দর হয়েছে। আমি এই আসনে বসে নিত্য
জপ কৰ্ব। তােমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।
কৃপানন্দের প্রস্থান ।
( পায়ে চটি জুতা, সার্ট ও প্যান্ট পরিধানে কক্ষান্তর
হইতে সাহেববাবুর পুনঃপ্রবেশ।
প্রিয়ম্বদা—আবার উঠে এলে কেন ? একটু জিরােওগে না।
সাহেববাবু-তুমি আমার কাছে বস’বে চলল।
প্রিয়ম্বদা-না, না, আমি তােমার খাবার তৈরী করে আনিগে।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
সাহেববাবু-না, তুমি বসবে চলল। খাবার বামুন তৈরী কৰ্বে এখন।
প্রিয়ম্বদা-না, আজ আমার সাধ হয়েছে নিজের হাতে পাবার তৈরী করে
তােমায় খাওয়াব।
সাহেববার তার চেয়ে ব’লনা কেন, আমার কাছে বসতে তােমার ভাল
লাগে না।
প্রিয়ম্বদা-ওমা ! একি গায়ে পড়ে ঝগড়া ! আজ কিছু নেশা করে
নাকি ?
আজ যদি
সাহেববাবু—নেশা ! প্রিয়া যে নেশা তুমি আমায় ধরিয়েচ. তার চেয়ে
আর কোন মদে বেশী মাতাল কর্ধ্বে।
প্রিয়ম্বদা-এত নেশা কি ভালাে? না, না, এত ভালাে নয়।
আমি মরে যাই।
সাহেববাবু ও কথা বলনা, ও কথ বলনা আমার প্রাণ কেঁপে ওঠে ।
তোমায় ছেড়ে আমি এক দণ্ড বাঁচব না।
প্রিয়ম্বদা-( স্বগতঃ ) ভগবান কি হবে ! কেমন করে ফেলে যাব ।
সাহেববাবু-কি ভাবচ ? মনে কচ্চ আমি মিছে কথা কইচি। তুমি
আপনার মন দিয়ে কি আমার মন বুঝতে পার না? আমি যখন
আপিষে থাকি তােমার কাছে আসবার জন্যে ছটফট করি।
আমাকে পাবার জন্যে তােমার মন কি তেমন ব্যাকুল হয় না ?
প্রিয়ম্বদানা, হয় না।
সাহেববাবু-সে কথা আমি বিশ্বাস করি না। কেন করি না জান ?
আমার মন দিয়ে আমি তােমার মনের কথা বুঝতে পারি। কে
জানে কেন আজ তােমায় এত কথা বলছি। আমার মন আজ
ভারী উতলা হয়েছে।
প্রিয়ম্বদা--কেন? কেন ?
সাহেববাবু কেন জানি না,কিন্তু মনে হচ্ছে যেন তােমাকে আমি হারাব।
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
** । ।
প্রিয়ম্বদা সচকিত হইয়া ) একি কিছু জান্তে পেরেচে নাকি? ভগবান
আমায় বল দাও, আমি আর সইতে পাচ্ছি না। এই ভালবাসা
ছেড়ে আমি কোথায় যাব। কোন্ হরিকে খুঁজতে যাব। এই ত
আমার স্বর্গ, এই ত আমার সামনে দাড়িয়ে প্রত্যক্ষ দেবতা।
কিন্তু না, এ ভালবাসায় পৃথিবীর মাটি মিশিয়ে আছে সেটা
ধুয়ে
ফেলতে হবে।
সাহেববাবু-কথা কচ্চ’না কেন ?
প্রিয়ম্বদা-তুমি চল, আমি তােমার কাছে ব’সচি।
উভয়ের প্রস্থান ।
T
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
সাহেববাবুর শয়ন কক্ষ।
( সোফায় শায়িত সাহেববাবু, পার্শ্বে বসিয়া
প্রিয়ম্বদা বাস করিতেছে।)
সাহেববাবু-আজ তােমার একি বেশ। চুল বাধনি, চা কাপড় পরনি,
স্বামীজীকে দেখে বুঝি লজ্জা হয়েছিল।
প্রিয়ম্বদ-- না, না, তা নয়, বেলা গেল সময় পাইনি।
সাহেববা!---বলি স্বামীজীর কাছে কিছু বস্তু পেয়েচ নাকি ?
প্রিয়ম্বদা--স্বামীজীর মধ্যে বস্তু আছে কি না চেহারা দেখে বুঝতে পার
। আহা কি সুন্দর জ্যোতির্ময় মূর্ত্তি ! কি শান্ত সরল দৃষ্টি !
•১ -১ -
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
কাছে বসলে ঘর সংসার কিছুই মনে থাকে না। তােমার কি দু
দণ্ড ওঁর কাছে বসে দুটো ভগবানের কথা শুতেও ইচ্ছে করে না।
কেবল টাকা, টাকা করেই সময়টাকে বৃথা নষ্ট কচ্চ। টাকা পয়সা
কি পরকালে সঙ্গে যাবে।
সাহেববাবু—তা না যাক্ প্রিয়া, তুমি ত আমার সঙ্গে যাবে। বল যাবে
০
কি না ?
প্রিয়ম্বদানও রঙ্গরস রাখ।
সাহেববাবু—সত্যি বলতে কি, তােমার সঙ্গে রঙ্গ রস করে আমি যেন
হাতে স্বর্গ পাই। মাইরি কি মিষ্টি মুখখানি তােমার। কি মিষ্টি
কথাগুলি তােমার। অনেক তপস্যা কল্লে তােমার মত স্ত্রী রত্ন লাভ
হয়। ভাগ্যবান হওয়া চাই, ভাগ্যবান হওয়া চাই।
(নেপথ্য হইতে স্বয়ম্ভু।)
ভাই বাড়ীতে আছ, আমি তােমার দাদা বিশেষ দরকার আছে।
সাহেববাবু-আঃ জ্বালাতন কল্লে ? দাদা হয়েছেন বলে মাথা একেবারে
কিনে রেখেছেন। ডাকবার ছিরি দেখ দেখি ? না সাড়া দোবনা
ডেকে ডেকে আপনিই ফিরে যাবে এখন।
প্রিয়ম্বদা-না, না, ব্যাপারটা কি শােনই না। মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না,
কালাে বলে লােকে বেশী টাকা চাইছে। বোধ হয় সেই জন্যেই
তােমায় দরকার পড়েছে।
সাহেববাবু দেখা যাক্ কি রকম ভাব গতিক তুমি সরে যাও।
( সাহেববাবু কলিং বেল বাজাইয়া চাকরকে ডাকিল।)
(জনৈক উড়ে চাকরের প্রবেশ।)
ও বাড়ী থেকে বড়বাবু এসে বাইরে দাড়িয়ে আছে সঙ্গে করে
নিয়ে আয়।
[ চাকরের প্রস্থান।
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
( পার্শ্ব দৃশ্যের অন্তরাল হইতে মুখ বাড়াইয়া
প্রিয়ম্বদা কহিল।)
দেখ একটু শক্ত হয়ে।
সাহেববাবু সে তােমায় বলতে হবে না, তুমি সরে যাও।
[ অন্তরালে প্রিয়ম্বদার গমন ।
( স্বয়ম্ভর প্রবেশ।)
স্বয়ম্ভু—ভাই বড় বিপদে পড়ে তােমার কাছে এসেছি, ভিটে টুকু বুঝি আর
থাকে না। হরলাল চাটুয্যে উকীলের চিঠি দিয়েছে এই দেখ ।
( চিঠি লইয়া সাহেববাবু একবার বক্র দৃষ্টিতে দেখিল।)
সাহেববাবু-তা আমি কি কৰ্ব্ব বলুন।
স্বয়ম্ভু ভাই তুমি আমায় এই আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার না কল্পে আমার
জাত কুলমান সব বুঝি যায়। বাড়ী হরলাল চাটুবের কাছ থেকে
উতরে নিয়ে তােমার কাছে বাঁধা রাখছি আমায় হাজার তিন
টাকা দাও। দেনা শােধ কত্তে পারি ভাল, না হলে বাড়ী ছেড়ে
আমরা উঠে যাব। তুমি সুখে ভােগ দখল কর, আর তাতে যত
আনন্দ হবে, বাইরের একজন এসে বাপ পিতাম’র ভদ্রাসন জুড়ে
বস’লে বরং আমাদেরই নাম ডুববে। তুমি পরে আমায় দোষ
দিতে পার, সেইজন্য একবার জানাতে এলুম।
সাহেববাবু—আপনি ত বরাবরই জানেন, টাকা কড়ি আমার হাতে কিছু
রাখি না।
স্বয়ম্ভূ-তা জানি, কিন্তু তুমি মত কল্লে বোমা টাকা দিতে পথ পাবেন না ।
সাহেববাবু-আপনি তবে দাড়ান, আমি একবার বাড়ীতে জিজ্ঞেস করে
আসি ।
[ সাহেববাবু ভিতরে গমন করিল।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। স্বয়ম্ভু-(স্বগতঃ) ও আমার সেই ভাই, সে আমি না খেতে বল্লে থেত’না, শুতে না বল্লে শুত’না। আমার অনুমতি না হলে এক পা নড়ত । খেতে খেতে মিষ্টি লেগেচে আর পাইনি। ওকে ডেকে খাইয়েচি, বুক দিয়ে মানুষ করেচি। ( সাহেববাবুর পুনঃপ্রবেশ।) সাহেববাবু মান্ধাতার আমলে দেনা করে রেখেচেন ও ছেড়া ন্যাটা ত আর আপনার মিটল না। মাথার ওপর যার দেনা তার বুঝে সুজে চলতে হয়। বাড়ীতে ত পঙ্গপাল জুটিয়েছেন, দুবেলা খরচ ত কম নয়। স্বয়ম্ভু-ভাই যার বাড়ীতে পাঁচজনে পাত পাড়ে, জেনাে ভগবান তার ব্যবস্থা করেন, মানুষ উপলক্ষ। আমার কি সাধ্য যে সকলকে খাওয়াই। সাহেববাবু-ভগবান ত আর লােক পেলেন না দুনিয়ায় তাই আপনার ঘাড়ে কতকগুলাে বােঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। স্বয়ম্ভুবােঝা কাকে ব’চ ভাই বুঝতে পাচ্ছি না। যাদের নিয়ে আমার সংসার তারা ত কেউ বাইরের লােক নয়। বামুনমার কথা বচ, চিন্তার কথা বচ, তারা ত অনেকদিন আপনার হয়ে গেছে। সাহেববাবু—আপনার অবস্থায় সঙ্কুলান হয়, দুনিয়ার লােককে নিয়ে সংসার পাতান না কেন আমার কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। বাড়ী ভাগ কৰ্বার সময় বউদিদি যে গান্টা পেড়েছিল আমার wifeকে; অন্য স্ত্রীলােক হলে suicide হত। ভিটে টুকু নিলে ত আর রক্ষে থাকবে না। সুস্থদেহে ব্যাধির আবশ্যক নাই। স্বয়ম্ভু-শেল সম বাক্য বাণে আর কাজ নাই ভাই যথেষ্ট হয়েছে। তােমার নয় আমার অদৃষ্টের। এক মায়ের গর্ভে দুজনে জন্ম
১৪
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
গ্রহণ করে তুমি পূর্ব জন্মের পুণ্যফলে ভাগ্যলক্ষ্মীর দর্শন পেয়ে
অতুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েচ। আর আমি অর্থের জন্য মান
অপমান সমস্ত জলাঞ্জলি দিয়ে কাদায়ে কাঙালের মত লােকের
দ্বারস্থ হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্চি। ভগবান 'আমায় সহ্য কত্তে
দিয়েচেন সহ কৰ্ব। কিন্তু জেনাে বেশী বাড়াবাড়ি হলেই পতন
তার অনিবাৰ্য। দর্পহারী ভগবান নিজের দর্প চূর্ণ করেছেন।
টাকার গরম থাকবে না, থাকবে না।
সাহেববাবু—আপনি দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে শাপ দিন আমি চলুম।
[ প্রস্থান।
স্বয়ম্ভ-কি কলুম, কি কল্পম, মার পেটের ভাইকে শাপ দিলুম। ভগবান
আমায় এতদুর নামিয়েচ। কি কলুম প্রভু আমার এ অভিশাপ
যেন ব্যর্থ হয়। ভাই তোমার মঙ্গল হােক, মঙ্গল হােক, মঙ্গল
হােক্।
. স্বয়র প্রস্থান।
( হরলালের অন্দর মহলের এক পার্শ্ব।)
মিনী---তােমার যে অন্যায় কথা, যে সব মেয়ে চোকে দেখেছি, তাদের
কাছে তােমার মেয়ে আকাশ পাতাল তফাৎ। বউ আনব ঘর
আলো করে থাকবে, লােকে দুদণ্ড চেয়ে দেখবে। কালাে মেয়ে
এ ভিটেতে কখনও আসেনি, কেমন করে তা কৰ্ব্ব বল ?
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি ।
ললিতা-মেয়ের আমার রূপ নাই তা জানি দিদি, কিন্তু মেয়ের আমার
যে গুণ আছে, মা হয়ে বল্পে বড়াই করা হবে। বাছা অমর এক
চুপ করে বসে থাকতে জানে না। গেরস্থালী কাজ, রান্নার
কাজ, সেলয়ের কাজ, সমস্ত এলাটি করে। আমি ত সারাদিন
বসে দাড়িয়েই থাকি। কাজ কত্তে গেলে হাত থেকে কেড়ে নিয়ে
বলে—“মা যে কটা দিন পরের ঘরে না যাই তােমার সেবা শুশ্রুষা
করি”, কত বৃদ্ধি মায়ের আমার। সংসারে তােমায় কিছু দেখতে
হবে না দিদি, পায়ের ওপর পা দিয়ে হুকুম কৰ্বে সে তােমার
সংসারকে মাথায় করে রাখবে।
বিলাসী-হা গা মেয়ে তোমার কদ্দর অবধি পড়েছে?
ললিতা-পড়া শােনা মা তদ্দর ভাল হয়নি। তবে কাজ চালান গােচ
লিখতে পড়তে জানে। স্কুলে কখনও যায়নি মা,
দিন কতক
“মহাকালী পাঠশালায় গিয়েছিল। সেখান থেকে শিবপূজা,
গৌরীপূজা আরও অনেক ঠাকুর দেবতার স্তব ধ্যান এই সব
শিখেছে।
বিলাসী--তবে বাছা কি কত্তে এসেচ ? আজকালকার ছেলে তারা লেখা
পড়া চায়, বিবির মত সাজগােজ চায়, নাচ গান চায়। তােমার
যেমন সামর্থ্য তেমি ধর বর খোজগে।
দামিনী-এই ব’ত বিলেসী ব’ত। ঘরের কাজ শিখেচে তবে ত আমার
মাথা কিনেচে। ও সব শিখলে হবে কি বল ? আমার যে ছেলে
পাশ করা মেয়ে না হলে মানাবে কেন বাছা ? কেন মিছে
জ্বালাতন কত্তে এসেচ ? যেমন লােক তেম্নি পাঁচ পাঁচীর ঘরে মেয়ে
ওগে সুখে থাকবে।
ললিতা—দিদি কোনও দিকে কোনও উপায় নাই। ভিটে টুকু কৰ্ত্তার
কাছে বাঁধা, তােমার ত আর জান্তে কিছু বাকী নাই।
১৬
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
যেতে
দামিনী-কি কৰ্ব্ব বল, জোরের কাজ নয়’ ত ?
ললিতা-দিদি পাড়ার লােকে একঘরে কৰ্ব্বে শুনতে পাচ্চি।
পছন্দ নয় বল’চ ভাল কথা । আমাদের স্বামী স্ত্রীকে কন্যাদা
থেকে উদ্ধার করে ; ফের তুমি না হয় ছেলের বিয়ে দিয়ে। ঘট
করে রাজকন্যের মত মেয়ে ঘরে এনাে। বাড়ীর দাসী বাদীর মত
আমার মেয়েকে রেখে জান’ব মেয়ের অদেষ্ট। তােমার দুটি
পায়ে পড়ি দশের হেজ থেকে আমার স্বামীর মুখ রক্ষে কর।
দামিনী—কেন স্বামী তােমার লােকের কাছে ভিক্ষে কত্তে পারে না ।
দুমদো মেয়ে যাদের ঘরে তাদের পেটে অন্ন যায় কেমন করে
আমরা হলে সাত জন্ম অমন মেয়ে বিয়ােতুম না।
( নলিনীর প্রবেশ।)
নলিনী দামিনীর প্রতি) গিন্নী মা কর্তাবাবুর ঠাই করে দিয়ে এসেচি ।
[ নলিনীর প্রস্থান
দামিনী---বিলেসী যাবার সময় দেখা করে যাস্।ি
{ দামিনীর প্রস্থান
ললিতা-মেয়ে পেটে ধরে আমার কপালে এত লাঞ্ছনা গঞ্জনা ছিল।
ভগবান আমায় কেন আঁটকুড়াে কল্লে না।
বিলাসী-হা গা তুমি কেমন হাবা বােকা মেয়ে মানুষ ? ইসার কষ্টে
বুঝতে পার না? কেন পায়ে তেল দিচ্চ, সুখ ত হবে ভারী
ছেলে’ত রাত বেড়ায়, দেখ’চ না মাগীও বউ কাটকী।
ললিতা—তুমি আজ আমার মায়ের মত উপকার কলে, এ ঋণ আমি
জন্মেও শােধ কত্তে পাৰ্ব্ব না। চলুম মা, মাথার ওপর আগুন
অলচে দাড়াবার সময় নাই।
ললিতার প্রস্থান
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। চিন্তামণি। ১৭ D বিলাসী—(নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ) ও কে শ্রীগােপাল আসচে নয়। মরি মরি, সর্বাঙ্গে রূপ উথলে যেন চঁাদের গায়ে ঠিকরে পড়ছে। ইন্দ্রধনু দিয়ে চক্ষু গড়ে দিয়েছে বিধি, অবলা নারীর মন হরণ কৰ্বার জন্যে। ইচ্ছে করে দিনরাত চেয়ে দেখি, নিৰ্জ্জুনে দু দণ্ড কাছে বসে কথা কই। কি ভাবতে ভাবতে আসচে নয়, ভাবনা আর কি, পরিবারের শােক। বডড ভালবাসত তাই ঘা লেগেছে। ঘা জুড়িয়ে দেব, ফুলের মত হৃদয় নিংড়ে নিয়ে, ভালবাসার প্রলেপ দিয়ে ও ঘা জুড়িয়ে দেব। একটু আড়ালে যাই কি বলে শুনি। [ অন্তরালে বিলাসীর গমন। } ও ) ( শ্রীগােপালের প্রবেশ।) শ্রীগোপাল—(স্বগত) সেই সব মনে পড়চে, যেদিন বাড়ী শুদ্ধ লােক তার বিপক্ষে সংসারে আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। সেদিন তার দুই চক্ষু দিয়ে শ্রাবণের ধারা বয়ে গেছে। সেদিন যেন দেবীর প্রচ্ছন্ন মূর্তি সাক্ষাৎ জাগ্রত হয়ে, পাপতাপময় সংসারের পৈশাচিক পীড়নে জন্মের মত চলে গেল। ওই ওই সে আমার হেগ শুভ্ররত্নসিংহ- সনােপরি অধিষ্ঠিতা সাধনার মূর্তিমতী রাগময়ী প্রতিমা। হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ! প্রাণেশ্বরী! কোথায়! কোথায় তুমি ! স্বর্গের কোন পবিত্র জীবনের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছিলে। দাড়াও, দাড়াও, আমিও যাই। সংসারে বড় জ্বালা, সংসারে বড় জ্বালা। শ্রীগােপালের প্রস্থান । ( অন্তরাল হইতে বিলাসীর আগমন। বিলাসী-না, ঘোর কাটেনি, মরে গেছে তবু তার জন্যে এখন 'ও পাগল ; ভুলতে পারেনি। ভুলিয়ে দোব, যেমন করে পারি ভুলিয়ে দেব। নারীর মােহিনী মূর্তি নিয়ে তােমার সামনে দাড়াব ; দেখি কেমন
১৮
।
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
করে তুমি উপেক্ষা কর। শ্রীগােপাল ! শ্রীগােল! আমি বড়
কাঙালিনী। একবিন্দু প্রণয়ের আশায়, স্বামীর পদতলে পড়ে
কত কাকুতি মিনতি করে কেঁদেছিলুম ভিক্ষে চেয়েছিলুম।
নিষ্ঠুরের মত ফেলে রেখে চলে গেছে। অবলা নারীর হৃদয়ে কঠোর
দংশন করেছে। সে জালার মর্মান্তিক প্রতিশােধ নিবৃত্তি কৰ্বার
তুমিই আমার একমাত্র ভরসা, আশ্রয়, আশা।
| বিলাসীর প্রস্থান।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
( ইলালের বৈঠকখানা।
হরলাল- স্বয়ম্ভুর প্রতি) বাড়ী ত অরি উদ্ধার কত্তে পাব্বেন না ছা-
পােষা লােক, অবস্থা ত বুঝতে পাচ্চি। দু'বছর হ’ল সুদ বন্ধ
হয়েচে। সেও কোন্ না সুদের সুদে চার হাজার হবে।
হলে সুদে আসলে প্রায় পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। তা এ
বাজারে মেয়ের বিয়ে দিতে ও আপনার ঐ টাকাই পড়বে। মরু-
গে ছাই, ঘর থেকে আর আপনাকে কিছু দিতে হবে না। গয়না,
সে আমরা দিয়ে সাজিয়ে আত্ব। দান সামগ্রী, সে আপনার
ইচ্ছে হয় দেবেন, না হয় না দেবেন। ও সব আমি বড় পছন্দ
করি না। ঐ পাঁচ হাজারের মধ্যেই এক রকম করে সেরে
নেব। কি বল মাতুল ? অন্যায় কিছু বলেচি।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। শ্রীকান্ত-আরে রাধে গােবিন্দ ! মুখুয্যে মশাই, আপনিই দেখুন না কেন বুঝে ? গেরস্থ ঘরের মেয়ে, চলন সই হলেই হত। এ কে একেবারে ভদ্র সমাজের বার। কালো বলে, একেবারে কালো। হরলাল—তাতে কিছু এসে যায় না মাতুল। কালাে বলে কি আর বিয়ে হবে না। টাকায় কালো আলো হয়। শ্রীকান্ত—ঠিক কথা, দিন কাল পড়েছে কি? অামাদের বেলায় কড়ি দিয়ে লোকে মেয়ে পার ক’ত্ত। এখন দেখচি,বাস্তু ভিটেতেও কুলােয় না। স্বয়ম্ভূ-মশাই, সিন্ধুক বােঝাই টাকা থাকলে, ঝি জামাইকে দিতে কার সাধ হয়। মাইনে যৎসামান্য যা পাই, খাইনে আন্তে বায়ে কুলোয় না। মরি বিত্তি করে, কায় ক্লেশে দিন গুজরান কচ্চি। হরলাল-না মশাই, তা হলে আমার দ্বারা হবে না। আপনি যেখানে দু পয়সা সুবিধে পান, মেয়ের বিয়ে দিন, আমার কোন আপত্তি নাই। তবে টাকা আমি আর ফেলে রাখতে পাৰ্ব্ব না । শ্রীকান্ত-মুখুয্যে মশাই, তােমার কন্যা ভাগ্যবতী হবে। এ ঘরে মেয়ে পড়লে, কুটোটি পর্যন্ত নাড়তে হবে না। স্বয়ম্ভু—আজ্ঞে আমার ত সােল অনা ইচ্ছে নে বনেদী বংশ দেখে, সৎপাত্রে কন্যা সম্প্রদান করি। শ্রীকান্ত—পাত্র খুব সৎ, খুব সৎ। সাত চড়ে কথা ফোটে না, আহা ছেলে নয় ত রত্ন, রত্ন। জ্বলচে, দিনরাত জলচে। লেখাপড়ায় বল, চরিত্রে বল, সৰ্ব্বোপাধি ভূষিতং। অমত করন, অমত করনা শুভস্য শীঘ্রং। স্বয়ম্ভু— হরলালের প্রতি) মশাই, আপনি ভাগ্যবান, অতুল সম্পত্তির অধিকারী। আপনার সঙ্গে কুটুম্বিতা কত্তে যাওয়া আমার পক্ষে ধৃষ্টতা মাত্র। আপনাকে মিনতি করে ব’চি, বাড়ীর ওপর আমায় আর হাজার দুই টাকা দিন। আফিষে আমার provi--
চিন্তামণি।
{ প্রথম অক্ষু
dent fund এ টাকা আছে, তাই থেকে আপনার দেনা শােধ
কৰ্ব্ব কোন ভয় নাই।
হরলাল—ওটা কি আর কথার মত কথা হ’ল মুখুয্যে মশাই। শরীরের
ভদ্রাভদ্র আছে, কখন কি হয় বলা যায় না।
অত ঝাটে
খাওয়ায় কি দরকার। আমার ত আর মেয়ে নয়, দায় আপনার।
মধ্যে আমি আর বাড়ীর ওপর এক পয়সা দোবও না, আর টাকাও
ফেলে রাখতে পার্ব না ।
স্বয়ম্ভ—আপনাকে আর বেশী কি বলব, ভিটেটুকু গেলে, দুনিয়ায় মাথা
গুজে থাকবার এমন স্থান নেই, সে দুদিন নিশ্চিন্দি হয়ে বাস
করি।
হরলাল-সে জন্যে কোন ভাবনা নেই। বাড়ীতে আপনি স্বচ্ছন্দে বসবাস
করুন, সে ত আনন্দের কথা। আর আপনার ত কেউ নাই,
ঐ মেয়েরইত সব, তবে দুদিন আগে আর পরে।
শ্রীকান্ত-মুখুয্যে মশাই বাড়ী’ত আপনারই রইল ? ঝি, জামাইকে
দিচ্চেন, পরকে ত আর নয় ?
স্বয়-বেশ 'আমার কোন আপত্তি নেই।
হরলাল-তবে এই ষ্ট্যাম্প কাগজে সই করুন। একবার পড়ে দেখুন।
স্বয়ম্ভুও আর কি পড়ব।
( স্বয়ম্ভু সহি করিল।)
হরলাল--তা হলে আপনি জোগাড় যন্ত্র কত্তে আরম্ভ করুন। যত শিগগীর
হয় ততই ভালাে।
শ্রীকান্ত-ভাল বলে ভাল মুখুয্যে মশাই, কন্যাদান কচ্চ যখন, সে তুলনায়
বাস্তুভিটে কিছুই নয়।
হরলাল—কোন ভাবনা নাই মুখুয্যে মশাই, হরলাল চাটুযয্যর যে কথা সেই
-
পঞ্চম গর্ভা।]
চিন্তামণি।
স্বয়ম্ভ—( জনাস্তিকে) আর উপায় কি, একটা কথা ঠিক বলেছে, ওই
মেয়েরই’ত সব, তবে দুদিন আগে আর পরে।
{ স্বয়ম্ভুর প্রস্থান ।
হরলাল—মাতুল, হরলাল চাটুষ্যেকে এখনও চিন্তে পারেনি, অামার
কাছে দয়া ধর্ম নেই।
শ্রীকান্ত-নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, টাকা ধৰ্ম্মঃ, টাকা স্বর্গঃ, টাকা হি পরমন্তপঃ।
( দরওয়ানের প্রবেশ ও হরলালকে অভিবাদন।)
দরওয়ান—হুজুর, রেয়ৈতলােক বাহার মে খাড়া হ্যায়।
হরলাল—ভিতর মে বােলাও।
দর'ওয়ান—যাে হুকুম।
{ দরওয়ানের প্রস্থান ।
{ দুইজন খাতকের প্রবেশ।)
১ম খাতক—বাবু মশাই নমস্কার । আমার খুতখানা বদলে দিতে হবে ।
সুদ নাগাদ হাত পর্যন্ত সব চুকিয়ে দিলুম।
(১ম খাতকের টাকা প্রদান।)
হরলাল তােমার নামটা কি বলত বাপু, ?
১ম খাতক-আজ্ঞে বাসু ঘোষ।
(হরলাল জান্দা খাতা লইয়া দেখিতে লাগিল।}
হরলাল-তােমার কাছে ত বাপু এখনও সুদ পাওনা আছে। টাকা
দু আনা সুদ হলে, তিন বছরে কত হয় হিসেব করে দেখ দেখি ?
১ম খাতক--আজ্ঞে তখন টাকায় এক পাই হিসেবে কথা ছিল, এখন
আবার ওকি কথা বলছেন।
হরলাল-বাপু হে! আমি ত আর মিথ্যে করে বলচি না। এই দেখ
খাতায় কি লেখা আছে। তুমি নিজেই রাজী হয়ে সই করে
দিয়ে।
চিন্তামণি। [প্রথম অঙ্ক ১ম খাতক—আজ্ঞে তাইত দেখ চি। কি রকমটা হ’ল কিছু বুঝতে পাচ্ছি না । হরলাল--এখন ত আর বুঝতে পাঝে না বাপু? টাকা ধার কব্বার সময় কাহুনি, আর দেবার সময় হলেই কথার বাঁধুনি। তােমাদের ভাল কত্তে নাই। গরু বাছুর কেড়ে নিয়ে যাচ্ছিল মিউনিসিপ্যালের লােক, সেই হলেই বেশ হত। বাকী টাকা এনে খত বদলে নিয়ে মেয়াে। (২য় খাতকের প্রতি তোমার কি খবর হে ? বালা জোড়া বাঁধা রেখে, টাকা নিয়ে বেমালুম ত স’রে পড়লে ? বল্লে গিনি সােণা আছে, যাচাই করে শেষে মরা সােণায় দাড়াল। ঠকাবার কি আর জায়গা পাওনি বাপু? ২য় খাতক-আজ্ঞে বলেন কি? অবাক কল্লেন যে! গিনি সােণা কসে নিয়ে এখন ওকি বলছেন? হরলাল-তাড়াতাড়িতে তখন কি আর ঠাওর হয়ে ছিল? বল্লে টাকার জন্যে ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে পাচ্চ না। পাড়া প্রতিবাসী, বিশ্বাস করে বিপদের সময় দিলুম কি না? এখন বুঝি উল্টো চাপ ? ২য় খাতক-ভগবান জানেন, দৰ্ম্ম জানেন, মিথ্যে করে যদি বলি সর্বনাশ হরলাল শ্রীকান্তের প্রতি) দেখচ মাতুল ব্যাপার? এতে কি আর লােকের ভাল কত্তে ইচ্ছে হয় । শ্রীকান্ত-বিপদে আপদে অনেক ব্যাটা বেটীর মাথা রাখ’চ, চোকের ওপর তা দেখতে পাচ্চি। তবু লােক তুষ্ট নয়, কালস্য কুটিলা গতি। হরলাল---(২য় থাহকের প্রতি ) হাঁ করে দাড়িয়ে কেন বাপু ? টাকা এনে তােমার বালা নিয়ে যাও। অত ঝঞ্চাটে থাকতে ইচ্ছে করি না।
স্ব গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
২য় খাতক-হায়, হায়, ধনে প্রাণে মারা গেলুম। ভগবান তুমি দেখাে,
ধৰ্ম্ম তুমি দেখাে।
হরলাল- ২য় খাতকের প্রতি) বেশী কথা কয়েনা, সিদে পথ আছে
চলে যাও।
২য় খতক—হায়, হায়, সৰ্বসান্ত হলুম, স্বৰ্ব্বসান্ত হলুম।
| খাতকদ্বয়ের প্রস্থান।
হরলাল—মাতুল বাসায় গিয়ে পাক শাক কন্তে বেলা হবে অনেক। এই
খানেই আহারাদি করে মেয়ে।
শ্রীকান্ত-তােমার অন্নেই ত আছি, তােমার অন্নেই ত আছি।
[ অগ্রে হরলালের গমন, পচাৎ পশ্চাৎ শ্রীকান্তের প্রস্থান ।
আমার আর কি বল, এই ব্রহ্মাণ্ড উদর ভাণ্ডটা কোনও রকম
ভরলেই বস্ শ্রীকান্ত শৰ্ম্মা আর কিছু চায় না। তেনা নেনা
করে যে কটা দিন পরের ওপর দিয়ে যায়। চোরের রাত্তির বাসই
লাভ।
যষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
(দামিনীর কক্ষ।)
'দামিনী-পােড়া কপাল মিন্সে কল্লে কি গো বাড়ীর লােভে ছেলেটাকে
একটা পেত্নী ধরে দিলে ।
(হরলালের প্রবেশ।)
বলি হ্যাগা তােমার কি ভীমরতি হয়েছে ?
२४
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
হরলাল—ভীমরতি হয়েছে আমার না তাের ? ছেলের গুণাগুণ ত কেমন।
দামিনী-দেখ বয়েস দোষে দুদিন অমন বার নজর হয় চাদপান বউ
ঘরে আলে শুধরে যাবে। আর এই পেত্নীকে আনলে ছেলে
আর ঘর মুখখা হবে না।
হরলাল—আমায় ভারী বােকা ঠাউরে’চ নয় ? দাড়ানা, বাড়ীখানা আগে
ফাকতাল্লায় মেরে দিই। তারপর চাদপানা কি বচি চিনির
পানা এনে দেব।
দামিনীসতীনের ওপর মেয়ে দেবে কে ?
হরলাল—সে ভাবনায় তােমার দরকার নাই। হরলাল চাটুষের গদীয়ান
দেখে অনেক ব্যাটা বেটী পায়ে ধরে মেয়ে দেবার জন্যে হাঁ করে
দাড়িয়ে আছে।
দামিনী—এবার থেকে তবে লালগােপালকে হাতখরচা বলে কিছু দিয়াে।
নইলে রােজ রোজ টাকার জন্যে আমায় জ্বালাতন কৰ্বে সে ধাক্কা
আমি সামলাতে পার্ব না ।
হরলাল—না পার ছেলের মন যুগিয়ে থেকো। এক পয়সাও আমি
দোব না। খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেচি যে টাকা খরচ করে
জীবনে কখনও তা শােধ কত্তে পাৰ্বে ? লজ্জা করেনা বলতে?
মায়ে ব্যাটায় বুঝি যুক্তি করে দাওর মলবে আছ?
দামিনী—পােড় কপাল আর কি, ছেলে যত দিয়েচে ঢেলে তুমিও দিয়ে
তত, গায়ের গয়না তা পর্যন্ত খুলে নিয়ে সিন্ধুকজাত করে সার
করে কাচের চুড়ী।
হরলাল-অত যদি প্রাণের মধ্যে সখের ভুড়ভুড়ী, গিল্টি করা গয়না পরতে
পার’না এক বুড়ী।
দামিনী—পােড়া কপাল আমার গলায় দড়ি, মুখে আগুন আমার ঘর
সষ্ট গর্ভা।
চিন্তামণি।
হরলাল—তােমার বুী শােনার সময় নাই।
[ হরলালের প্রস্থান।
দামিনী—আমায় দিতে হলে বুক যেন চড়চড়িয়ে ফেটে যায়। মানুষের
চামড়া কি একেবারেই নাই। থাকবে কেমন করে? সুদের সুদ
খেয়ে কসাই হয়ে গেছে। লােকের চোকের জল পড়েছে, আর
হাসতে হাসতে সিন্ধুকে টাকা তুলেচে। যক্ষির ধন কারু ভােগে
লাগ্বে না।
( লালগােপালের প্রবেশ।)
লালগােপাল--মা ইদুর কলে ফেলেচি, হঁদুর কলে।
দামিনী—কেন রে কি হয়েছে ?
লালগােপাল—বাবার যা মনে যাচ্ছে তাই কচ্চে, আমার সঙ্গে চালাকী,
আমি ত ঐ বাপেরই ব্যাটা। আমায় উনি ভুজং দিয়ে
ভােলাবেন। তুমি ত জান মা সেবার মুখুয্যেদের মকদ্দমায় মিথ্যে
সাক্ষী দিলুম আপনি মেরে দিলেন সোণার লঙ্কা আর আমার
বেলায় লবডঙ্কা, মনে আছে মা, নীল মাধব বড়ুয্যর জায়গা দখল
কত্তে কেউ এগােয়না শেষে আমায় ঠেকিয়ে দিয়ে নিজে চুপটি করে
গ্যাট হয়ে বাড়ীতে বসে রইল। যায় এই শালার মাথা যাবে।
পুলিশ এসে আমায় ধড় পাকড় কল্লে একটি পয়সাও বার করেনি।
তুমি না থাকলে মা তােমার ছােট ছেলের পায়ে সেবার বেড়ী
পর’ত। বরাবর দেখে আচি মা ঠাজী। পাড়াপড়শীর সঙ্গে
ঠকাজী, বাড়ীর লােকের সঙ্গে ঠকবাজী, তােমার আমার সঙ্গে
ঠাজী। এবার তা হচ্ছে না, শুলুম বাবা এক haggard
মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করে বাড়ী লেখাপড়া করে
নিয়েছে। রাজী আছি মা, হয় বাড়ীর পাটা, না হয় হাজার খানি
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
****
চকচকে চাকী। তা আমি সব নােব’না, কাচের চুড়ী হাতে
দিয়ে বেড়াও, দুগাছা সােণার শাঁকা গড়িয়ে দেব। কি কাণ্ডটা
একবার বাধাই দেখ না।
দামিনী--তুই এবার কিছুতে ছাড়িনি, দেখি কি করে, বড় আস্পর্ধা
হয়েছে।
[ দামিনীর প্রস্থান।
.-লালগোপাল—এই এক একটা নকল চাবী লাগিয়ে বাক্স, আলমারী,
সিন্ধুক সমস্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেচি। বাবা ব্যাটার রেস্ত
কোথায় থাকে এখনও তা বার কত্তে পারিনি। নলিনী বেটীকে’ত
তক্কে তক্কে থাকতে বলেচি । ও সেটাকে দুচার অনা হাতে
দিলেই ঠিক থাকবে।
অধরার দ্বারা হবে না, ব্যাটা তালা ক্ষ্যাপা
সব গােল করে দেবে।
(অধরের প্রবেশ।)
অধর–ছােট দাদা বাবু তোমায় বাইরে এক বাবু শুকচে। বাবু ত বাবু,
দেখে অবাক, বাবু ত তেরে কেটে তা, চটেই আগুন। বলুম
ছােট দাদা বাবু অসচে না রেগেই খুন।
লালগােপাল -বেশী বকিস নি, বল্গে না অচে।
অধর--বক্তচে কে বাবু, খেটে খেটেই কাবু, তা আর বকি কখন।
সে দিন তোমার কাছে সে বাবু এল।
লালগােপাল—আরে ব্যাটা মিছে বচি কেন যা’ না।
অর-যাচ্চি ঘােট দাদা বাবু তবে সেই মা বলছেলাম।
লালগোপাল—আবার ব্যাটা বকে।
অর--যে আজ্ঞে ছােট দাদা বাবু।
[ অধরের প্রস্থান ।
সপ্তম গর্ভার।
চিন্তামণি।
২৭
লালগােপালটাকা চাই যেমন করে পারি টাকা চাই। বেলা ! বেলা!
তােমায় মর্তে ইন্দ্রের অপ্সরী করে রাখব। নন্দনকাননের
পারিজাত এনে তােমার গলায় দোব। তােমায় সুখী কৰ্বার
জন্যে যদি বাপের সঙ্গে লাঠি বাজী কত্তে হয়। মায়ের সঙ্গে
দাগাবাজী কত্তে হয়, ভায়ের সঙ্গে শয়তানী কত্তে হয়, রাজী আছি
টাকা চাই।
| লালগােপালের প্রস্থান।
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
(স্বয়ম্ভুর পূজার দালান।)
ভটচাজ-মুখুয্যে মশাই লগ্ন ত আগতপ্রায়, পাত্র এখনও উপস্থিত হল
। পাত্রের বাড়ীতে সংবাদ নেওয়া একবার নিতান্ত প্রয়ােজন।
স্বয়ম্ভুকি হ’ল বুঝতে পাচ্ছিনা ত, আঁ করি কি, হঁা লােক পাঠিয়েছি।
চিন্তাও সঙ্গে গেছে (জনৈক কন্যাত্রীর প্রতি) ভায়া তুমি
একবার যাবে ?
১ম কন্যাত্রী--তাইত আলাপ পরিচয় নাই, পরের বাড়ীতে যাওয়াটা
কেমন কেমন দেখায় না ?
স্বয়ম্ভূ-~-আচ্ছা তবে থাক্, তবে থাক্।
২য় কন্যাত্রী—পাত্রের শরীর গতিক ভাল আছে ত?
২৮
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
স্বয়ম্ভু আঁ-আঁ—আপনারা ও সব কি বল্চেন। অসুখ না, না, ও
কথা বলবেন না, ঝি এইমাত্র দেখে আসচে পাত্র বেড়িয়ে
বেড়াচ্ছে। তাই ত করি কি, ভগবান রক্ষে কর।
ভটচাজ-স্থির হন, স্থির হন, লগ্নের এখনও ঘণ্টাখানেক বিলম্ব আছে।
স্বয়ম্ভু ভটচাজ মশাই স্থির হতে পাচ্ছি না। সৰ্ব্ব শরীর কাঁপচে, মাথা
ঘুরছে।
তৃয় কন্যাত্রী—হবেই’ত সারাদিন উপবাস, তার ওপর দুঃসাহসিক
পরিশ্রম, তার ওপর নিদারুণ গ্রীষ্ম। হবেই'ত মাথায় একটু
জল দিন।
স্বয়ম্ভুনা, না, জল দেব না, মাথায় আগুন জ্বলচে, দু হাত যতক্ষণ এক
হয় জলেও আগুন জ্বলবে। উঃ! বুকের ভেতর যেন কেমন
কচ্চে এরা কেউ এখনও ফিরল না কেন ।
(স্বয়ম্ভুর জনৈক প্রতিবাসীর বেগে প্রবেশ।)
প্রতিবাসী-মুখুয্যে মশাই, দায়, মহাদায়, পাত্রকে আনা মহাদায়।
বাড়ীতে যাব কি, দেখি লােকে লােকারণ্য। বরযাত্রী সব রাস্তায়
দাড়িয়ে, পুরুত নাপিত রাস্তায় দাড়িয়ে। সকলকে জিজ্ঞেস কম
কি হয়েছে, কেউ কোন কথার জবাব দিলে না।
কল্লুম ভিড় ঠেলে যেতে পাল্লম না। চিন্তা শুনলে না জোর কত্তে
গেল, একজন তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে । ঝর ঝর
করে পা দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। তারপর ভিড়ের মধ্যে
কোথায় মিশিয়ে গেল আর দেখতে পেলুম না।
স্বয়ম্ভু-শ্যামা মা ! তাের অদেষ্টে কি আছে জানিনা। (পতনও মূৰ্ছা।
ভটচজ-ঝি, ঝি, জল নিয়ে আয়।
(জল লইয়া ঝিয়ের প্রবেশ।)
ঝি—বাবুর কি হ’ল ভটচাজ মশাই ?
টের চেষ্টা
!
সপ্তম গাঙ্ক।
চিন্তামণি।
ৰ
= + " sec
( ভটচাজ কর্তৃক স্বয়ম্ভুর মুখে জল ক্ষেপণ।)
ভটচাজ—যা, যা, গােলমাল করিস নি।
ঝি—এমন পােড়া মেয়েও হয়েছিল, বাবুর আমার একদিনের জন্যে সুখ
হল না।
( স্বয়ম্ভূ চেতনা পাইয়া উঠিল।)
স্বয়ম্ভু—(কন্যাত্রীদের প্রতি আপনারা সব মৌরসী সত্ত্ব গেড়ে এখানে
বসে আছেন কি জন্যে ? সুবিধে হবে না, সুবিধে হবে না, আমার
মেয়ে নাই। মরে গেছে অনেকদিন হ’ল মরে গেছে।
৪র্থ কন্যাত্রী--(তৃয় কন্যাত্রীর প্রতি) আচ্ছা জায়গায় সঙ্গে করে
এনেছিলে ? চল হে চল, খুব ভদ্রলােক জানা গেছে।
ভটচাজ করযােড়ে ) মশাই অপরাধ মার্জনা করুন, রাগ কৰ্বেন না।
দেখছেন না ওঁর মাথার ঠিক নেই, কন্যাদায়ে ব্রাহ্মণ উন্মাদগ্রস্ত।
( চিন্তার প্রবেশ।)
চিন্তা-ভয় নাই, ভয় নাই জ্যাঠা মশাই বর আসছে।
দুচাজ— নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ) কি গােলমাল শােনা যাচ্চে বটে।
হা বরই ত আসচে, উলু দাও, উলু দাও। মুখুয্যে মশাই আর
চিন্তার কারণ নাই পাত্র আগত।
স্বয়ম্ভু সহসা চিন্তার প্রতি চাহিল ) চিন্তা তাের পা দিয়ে রক্ত পড়চে
কেন রে ?
চিন্তা-কই জ্যাঠা মশাই ? না।
পয়—চেয়ে দেখ দেখি।
চিন্তা—ছুটে আসতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছি কিনা।
যাবে জ্যাঠা মশাই। যাই জেঠীমাকে খবর দিয়ে আসি।
[ চিন্তার প্রস্থান।
স্বয়ম্ভূ-শুভকাজ প্রথমেই রক্তপাত, পরিণাম বড় চমৎকার।
চিন্তামণি।
[প্রথম মঞ্চ
| sr
।
( দরওয়ান কর্তৃক লালগােপালকে সুরক্ষিত করিয়া হরলাল, বরযাত্রী,
শ্রীকান্ত, নাপিত ইত্যাদির প্রবেশ।):
হরলাল-রোজ রােজ মাথা গরম, বিয়ে কত্তে হলেই মাথা গরম। অষুধ
খেয়ে মাথা গরম সারে না। ছিষ্টি ছাড়া মাথা গরম নিয়ে আমায়
জ্বালিয়ে পুড়িয়ে থা কল্লে। দেখচেন না, অদ্ভুত, অদ্ভুত।
ভটচাজ-মশাই বাক্য ব্যয়ের সময় নাই লগ্নের আর অতি অল্পমাত্ৰ সময়
অাছে। পাত্রকে বরাসনে নিয়ে চলুন।
হরলাল-কৰ্ক কি মশাই আমার ত সম্পূর্ণ মত ছেলের যে হঠাৎ মাথা
বিগড়ে গেল। বলে,-মেয়ে কালাে আরও পাচশাে টাকা
খ্যাসারত ধরে দিতে হবে।
ভটচাজহরলালবাবু
হরলালবাবু টাকার কথা কি বলছেন ব্রাহ্মণের যথা সৰ্ব্বস্ব মায়
ভিটেটুকু পর্যন্ত লিখিয়ে নিয়ে স্বেচ্ছায় বিবাহ দিতে সম্মত হয়ে
এই নিদারুণ সঙ্কটাপন্ন সময়ে ও কি কথা বলছেন।
লালগােপাল—মশাই কালাে মেয়ের গন্ধ আমি একেবারেই সইতে পারি
। সাধ করে মাথা গরম হয়, গা ন্যাকার ন্যাকার করে,
ওয়াক্, ওয়া।
হরলাল-দেখুন ওর সাতপুরুষ কালাে, ব্যাটা বলে ওযাক, ওয়াক।
১ম ইয়ার-লালু দাও ছাড়িসনি ।
( চিন্তার পুনঃপ্রবেশ।)
লালগােপাল চিন্তার প্রতি ) কি হে ছােরা বড় যে আস্ফালন
করেছিলে টাকা কই ?
চিন্তা-ঠাকুর, ঠাকুর, জ্যাঠা মশাই জেঠীমাকে দয়া করে উদ্ধার কর।
জেঠী মা কাঁদচে, শ্যামা দুধের মেয়ে মুখখানি শুকিয়ে গেছে।
চোক ছলছল কক্ষে আমি যে আর দেখতে পাচ্ছি না।
#
সপ্তম গর্ভাঙ্ক। ]
চিন্তামণি।
লালগােপাল+বুঝেচি বাবা সব ফাকীবাজ মৎলব। বিয়ে কত্তে হয় তুমি
করগে আমি চলুম। (ইয়ারদের প্রতি) এই সব চল, চল।
[ প্রস্থানােত।
( রাধারমণের প্রবেশ।)
রাধারমণ—কোপা যাবে ? টাকা আমি দিচ্চি ব্রাহ্মণের জাত রক্ষে কর ।
ভটচাজ—সাধু, সাধু, কে আপনি উপযাচক হয়ে এই মহাবিপদের সময়
গরীব ব্রাহ্মণকে রক্ষে কত্তে এলেন? ধন্য ধন্য
রাধারমণ—মশাই আমাকে বারম্বার কেন বৃথা গৌরবে কলঙ্কিত কচ্চেন ?
ধন্যবাদ দিন এই বালককে। এই বালক যখন কাদতে কাঁদতে
আমার কাছে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল। স্থির থাকতে পাল্লম না সে
অবস্থা দেখে। বিশেষ আমার বাবার আদেশ মৃত্যুর সময় তিনি
বলে যান যদি কেউ বিপদে পড়ে দায়গ্রস্ত হয় তার সঞ্চিত অর্থ
যেন সেই সৎ উদ্দেশে ব্যয় হয়। এই বালক হতে সেই সুযােগ
পেয়ে আজ আমিও ধন্য হলুম। পাত্রপক্ষের কে অভিভাবক
ডাকুন টাকা দিচ্ছি।
লালগােপাল—দিন মশাই আমার হাতে দিন।
হরলাল—তুই ব্যাটা কে রে ?
ললিগােপাল--আমি বর।
হরলালগামি বরের বাবা, দিন মশাই আমার হাতে টাকা দিন।
লালগোপাল—তবে বে করগে তুমি আমি চলুম।
ভটচাজ—কি সর্বনাশ এ যে অকথ্য কথন!
রাধারমণ----মশাই আপনারা দুজনে আপােষে মিটমাট করে ব্রাহ্মণের
জাতকুলক্ষে করুন লগ্ন বয়ে যায়।
লালগােপাল----টাকাটা আমার হাতে দিলেই ত সব গােল চোকে।
চিন্তামণি।
[ প্রথম অঙ্ক
। ।।।।
।। ।।
রাধারমণ—আচ্ছা তাই দিচ্ছি কিন্তু তােমার বাবা যদি রােকে।
লালগােপাল-সে আমি সালা’ব।
হরলাল—সালাবি কিরে ব্যাটা ?
ভটচাজ ও অন্যান্য লােকগণ---মা মশাই মা, আর গােল তুলবেন না,
পাত্রের হাতেই টাকা দিন।
লালগােপাল-হা বাবা তাই দাও বাপের সুপুত্তর হয়ে বরাসনে গিয়ে
বসি।
( রাধারমণ লালগােপালকে টাকা দিল।)
ভটচাজনাও, নাও, চলাে, সুপুত্তুর কুপুর পরে বিচার হবে।
প্রতিবাসী—মুখুয্যে মশাই তা হলে বরযাত্রী খাইয়ে দিই।
কন্যাত্রীগণ—চল হে চল, লুচির গন্ধে প্রাণ আপ সে উঠছে।
হরলাল-দেখে নোেব, দেখে নাে’ব, দেখে নেব।
দ্বিতীয় অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। ( প্রিয়ম্বদার কক্ষ ) প্রিয়ম্বদা—ওঁকে না বলে কেমন করে যাব। আপনিই’ত বলেছেন- স্বামীর কাছে কোন বিষয় গােপন করা স্ত্রীর কর্তব্য নয়”। কৃপানন্দ—কর্তব্য নয় তা বলেচি বটে কিন্তু সে কোন্ বিষয় ? সাংসারিক বিষয় তুমি তােমার স্বামীর কাছে গােপন কত্তে না পার; কিন্তু তুমি জান স্বামীর কাছে ইষ্টমন্ত্র গােপন কত্তে হয়। যেখানে ইষ্ট সেখানে গুরুই শ্রেষ্ঠ। আমি তােমায় জেদ কচ্চিন তােমার মন যায় চল। প্রিয়ম্বদা—না, এতদিনে আমার ভুল ভেঙ্গেছে !. আপনার সঙ্গেই আমি যাব, দাসীকে যেন ফেলে যাবেন না। কৃপান—তুমি স্ত্রীলােক তায় যুবতী, সেই জন্যে তােমাকে আশ্রমে নিয়ে যেতে সময়ে সময়ে কেমন সঙ্কোচ হয়। প্রিয়ম্বদা-ছিঃ ছিঃ আপনি তুচ্ছ লােকাচারের মুখ তাকিয়ে আপনার হৃদয়কে সঙ্কুচিত কৰ্ব্বেন না। কৃপানন্দ-তােমার অলৌকিক রূপ লাবণ্যের নয়, হৃদয়ের অপরিসীম। প্রেমের মাধুরী দেখে আমি সত্য সত্যই বিস্মিত মুগ্ধ। আমার সঙ্গে যেতে হলে তােমায় আজই প্রস্তুত হতে হবে। আমি রাত্তির সাড়ে নটার গাড়ীতে রওনা হ’ব। অনেকদিন আশ্রম ছেড়ে চলে এসেচি আর দেরী কন্তে পাৰ্বনা। প্রিয়ম্বদা—আপনি কখন যাবেন কেমন করে জান্তে পর্ব ?
৩৪
চিন্তামণি।
৮ দ্বিতীয় অঙ্ক
কৃপানন্দ-সে ভাবনা তােমার নাই। তুমি তােমাদের খিড়কীর দরজার
কাছে দাড়িয়ে থেকো আমি ঠিক সময়ে আস’ব। (স্বগত)
একবার আপনার কোটে পেলে হয়। হৃদয় স্থির হও। তােমার
অনেক দিনের পিপাসা,
বুক ভ’রে অমৃত পান করাব।
প্রিয়ম্বদা-~-প্রভু কি ভাবছেন? আপনি কি এখনও আমায় বিশ্বাস কত্তে
পাচ্ছেন না ?
কৃপানন্দ—না, না, তা নয়, তুমি প্রস্তুত থেকো আমি তােমায় নিয়ে যাব।
" [ কৃপানন্দের প্রস্থান।
প্রিয়ম্বদাকাজ নাই আমার কাজ নাই গৃহ সংসারে। ওপরে অনন্ত
আকাশ তুমি সাক্ষী! নীচে মা বসুন্ধরা তুমি সাক্ষী ! মধ্যে সর্ব
নিয়ন্তা পাপ পুণ্য সুখ দুঃখের দণ্ডদাতা অন্তর্যামী তুমি সাক্ষী! যদি
শ্রীহরির ভজন করে এক মুহূর্তের জন্যেও স্বামীকে আমার ধর্ম
অর্থ কাম মােক্ষ চতুঃবর্গের অধিকারী কত্তে পারি জান’ব নারী জন্ম
সার্থক।
গুরু! প্রভু! তুমিই ভব সংসার পারের অকূলে কাণ্ডারী
পথ দেখিয়ে অভাগিনীকে নিয়ে চল।
[ প্রিয়ম্বদার প্রস্থান।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
( স্বয়ম্ভুর দরদালান।)
স্বয়ম্ভুকদ’চ, কাঁদ। খুব কদ, আজীবন কাদতে হবে। তবে জেনে
রেখ, কঁদলে বড় একটা সুবিধে হবে না। তােমার জামাই
বেয়ায়ের পাথরের প্রাণ।
ললিতা—আমার শ্যা মার অদেষ্টে শেষে এই ছিল। বাছার মুখের দিকে
চেয়ে তুমি একবার দেখলে না।
দ্বিতীয় গর্ভা। ]
চিন্তামণি।
স্বয়ম্ভু—খুব দেখেচি গিন্নী, চেয়ে চেয়ে বােজ দেখেচি। আপিষ থেকে শুধু
হাতে বাড়ী আসতুম, শ্যামা কাছে এসে দাঁড়াত, খাবার চাইত
দিতে পান্তুম না। মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখ তুম, আর চোক
দিয়ে টন্ টন্ করে জল পড়ত। দিনের পর দিন, এই ভাবে
কেটে যেত। তারপর হঠাৎ একদিন, সকাল বেলা বিছানা থেকে
উঠে শুনলুম, ঘটক গিন্নী বাড়ীতে এসেচে। সে দিন থেকে
আর শ্যামার মুখের দিকে চাইনি, তুমিও চেওনা। প্রাণটাকে
পাষাণ করে রাখ, আর এক একটা ঘটনা সেই পাষাণের ওপর
এক একটা জ্বলন্ত দাগ দিয়ে যা। নড়তে চড়বে, আর চোকের
সামনে দেখতে পাবে মেয়ের লাঞ্ছনা-বড় চমৎকার গিন্নী বড়
চমৎকার।
ললিতা—শুনলুম, জামায়ের নাকি মেয়ে পছন্দ হয় নি। ফুল শয্যার রাতে
ঘর থেকে শ্যামাকে আমার তাড়িয়ে দিয়েচে বেয়াই বেয়ান একটা
কথাও জামাইকে বলেনি।
স্বয়ম্ভু—সব সত্যি, আয় ও কি আছে বল ?
ললিতা—তুমি যাও, বেয়াই বেয়ানের হাতে পায়ে ধরে বাছাকে আমার
নিয়ে এসাে। বছর খানেক না হয় এই খানেই এখন রইল, বয়েস
হলে তারপর যাবে এখন।
স্বয়ম্ভূ-ও সব ভাবতে হয়, তুমি'ভাব’গে আমার সময় নেই। সামনে রথ,
তত্ব কত্তে হবে হুস আছে কি ?
ললিতা —নমাে, নমাে করে সেরে দাও গে।
স্বয়—মােটামুটি রকম কত্তে গেলেও, এ বাজারে পঞ্চাশ টাকার কম নয়
জেনাে। ঘরে ত দেখতে পাচ্ছ, বাস্ক সিন্ধুক একেবারে টাকা
বােঝাই রাত পােহালে হাঁড়ি চড়ে না।
ললিতা-কি কৰ্ব্বে তবে?
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
৭.
১৯৭৭%A«
স্কয়—যা বরাবর করে আসছি। লােকের ধার নিয়ে শুধতে পারি না,
বাজারে জোচ্চোর, ছ্যাচড়া, ঠজ নাম নিয়েছি। ভগবান
জানেন, বাপ পিতাম, যারা স্বর্গে গেছেন তারা জানেন, আমি
বংশের কুলাঙ্গার হতভাগা।
(নেপথ্য হইতে ১ম পাওনাদার।)
মুখুয্যে মশাই আছেন।
স্কয়—তুমি ভেতরে যাও, কে আসচে দেখি ।
[ অন্তরালে ললিতার গমন।
(১ম পাওনাদারের প্রবেশ।)
১ম পাওনাদার--বেশ ত মশাই আপনার আক্কেল ? আনুন, আনুন,
টাকা নিয়ে আসুন। রাস্তায় ত দেখা পাবার যাে টি নাই ?
( নেপথ্য, হইতে ২য় পাওনাদার।)
মশাই গাে বাড়ী আছেন।
স্বয়ম্ভুকে ডাকে ভেতরে আসুন।
(২য় পাওনাদারের প্রবেশ।)
২যু পাওনাদারমশাই ছ মাস হতে গেল, বিয়ের পর সমস্ত টাকা শােধ
কৰ্বেন তখন ত দিব্যি মিষ্টি কথায় বলেছিলেন, কই মশাই, কথার
ঠিক কই ? ভদ্রলােক বটে! সােজা কথায় দেন ভাল, না হলে
নালিশ কত্তে বাধ্য হব।
স্বয়ম্ভু—নালিশ কত্তে হবে না মশাই। ফাকী দেব না কাকেও, তবে
নেহাৎ নানে পড়েছি, তাই দিন কতক দেরী হচ্চে।
২য় পাওনাদার—ব্যবসাদারের টাকা মিছেমিছি পড়ে রয়েছে, আপনি
বলেন কোন হিসেবে ? সুদে খালে টাকাটা এতদিনে কত দাড়াত
ভাবুন দেখি ?
১ম পাওনাদার—ঠিক, ঠিক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিমণি।
৩৭
স্বয়ম্ভু—আপনার আর গলাবাজী করে কেলেঙ্কারী কৰ্ব্বেন না। যেমন
করে পারি কাল আমি আপনাদের টাকা পৌঁছে দিয়ে আসব।
কষ্ট করে আর আসবার দরকার নাই
২য় পাওনাদার-ও কথা ত’ কদ্দিন থেকে বলে আসছেন ?
স্বয়ম্ভু কি কৰ্ব্ব বলুন? অদৃষ্ট চক্রে মানুষ জীবনের অমূল্য গৌরব—মান,
সম, সর্বস্ব হারিয়ে জগতের কাছে অপদস্থ, লাঞ্ছিত, ঘৃণার পাত্র।
দোষ আপনার নয়—আমার কৰ্ম্মফল।
১ম পাওনাদার-ভদ্রলােক বলছেন, দেখা যাক্ কদরের জল করে
দাড়ায়। চলুন, চলুন।
| উভয়ের প্রস্থান।
স্বয়ম্ভু--হায় রে অর্থ ! মানুষের সঙ্গে তােমার চিরদিন কি কেবল স্বার্থের
আদান প্রদান। ছিঃ ছিঃ, তুমি অনর্থের মূল। ব্যবহার গুণে
আবার তুমিই পরমার্থ এ সংসারে। তাই ত কাবুলীটাকে বাড়ীর
নম্বর পর্যন্ত দিয়ে এলুম, এল’না কেন বুঝতে পাচ্ছি না।
(নেপথ্য হইতে জনৈক কাবুলী।)
বাবু সা হায় ?
ওই এসেচে বটে, সাহেব ভিতরে এস।
( কাবুলীর প্রবেশ।)
কাবুলী-বাবু সা সেলাম, আচ্ছি হায় ।
স্বয়ম্ভু-হঁ্যা সাহেব ভাল আছি, টাকা এনেচ ত ?
কাবুলী-আলবৎ।
স্বয়ম্ভূ-পঞ্চাশ টাকা নাে’ব বলেছিলুম, তাতে হবে না আরও যান্তি
দরকার।
কাবুলী-কুছ ডর নেহি হামলােকা, একশাে, দোশে, হাজার রূপে
লে লেও। কেনে মাংতে আপ ?
চিন্তামণি ।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
স্বয়ম্ভু—এক শো টাকা চাই সাহেব।
কাবুলীলে লেও, উসূমে কেয়া হা হায় ? লিখাে হামারা খাতামে সহি
ভাররা। আপকো বাবু সাক্ হাহ্ বড়া পিয়ার কা আঁখ সে দোস্ত
কিয়া । রূপেয়া কো ম্যয় চার আনে সুদ লেতে। বাবু সা
আপকো আধা ক দিয়া।
স্বয়—টাকায় দু আনা সুদ ? তবে পাৰ্ব্ব না সাহেব সেলাম।
কাবুলীকেও ঝুটমুটু বােলায়া? জরুর লে নে হােগা ? সব কই লেতে,
তুম্ কাহে নেই লে গা ?
স্বয়সাহেব একটু কমিয়ে সমিয়ে নাও, গরীব লােক বুঝতে পাচ্চ ত ?
কাবুলীকেও অ্যায় সে কোঠিমে রয়তা হয়। তুম্ সে যে লােক্
আউরৎ হায় উ লােক্ ভি লেতে তুম্ কাহে নেই লে গা ? জরুর
লেনে হােগ ?
(চক্ষু রাঙ্গাইয়া সজোরে লাঠীর শব্দ।)
স্বয়ম্ভু-গণ্ডগােল বাধালে দেখছি, খাতা দাও সাহেব।
কাবুলী—ওহি বাৎ বােলো, সিধা বাত, কো, হাম্ লােক কুছ বখেড়া নেহি
কর্তা হায় বাবু সা। লেও বুড়ে আঙুল কো টিপ, ছাপ দেও।
[ স্বয়ম্ভুর তথা করণ।
রূপেয়া লে লেও। (নােট প্রদান ) আউর লেনে মৎলব হায়,
হাম্ সে লেও বাবু, সাব, সেলাম ।
* [ কাবুলীর প্রস্থান।
স্বয়ম্ভুপাপের ভােগ এইবার পূর্ণ হবে বলে কি ভগবান, শেষে এই
অসভ্য, দুরন্ত পাঠানের হাতে অভাগাকে ফেলে দিলে। দাও
তােমার ইচ্ছা রােধ করে কার সাধ্য।
( ললিতার প্রবেশ।)
ললিতা-হা গা ও কাবলেটা এসেছিল কেন? আমার বুকটা ত সেই
অবধি দুর দুর করে কাঁপচে।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
৩৯
---
স্বয়ম্ভু—কেন বুঝুতে পার নি ?
ললিতা—টাকা ধার করে নাকি ? সর্বনাশ কল্লে, সর্বনাশ কঙ্গে, ওরা
যে বড় বজ্জাত গাে ! বল্লে কথা বােঝে না। দুদিন সুদ দিতে
দেরী হলে, হাতে পায়ে ধরে কাঁদলেও শশানে না। ওদের যে
দয়া মায়া একেবারে নাই গাে ! ও বাড়ীর বিল্লীর ভাতার, লাঠি
খেয়ে অপঘাতেই বেচারী মরে গেল। কি কল্লে গাে তুমি ! মেয়ের
বিয়ে দিয়ে কি সত্যি সত্যিই পাগল হলে ? ভগবান আমায় নিষ্কৃতি
দাও। সংসার ধৰ্ম্মে আর কাজ নাই প্রভু চরণে স্থান দাও।
(নেপথ্য হইতে ডাক হরকরা )
চিটি আছে বাবু।
স্বয়ম্ভুদাড়াও।
[ চিটি অনিতে স্বয়ম্ভুর গমন।
(নেপথ্য হইতে ডাক হরকরা।)
স্বয়ম্ভুনাথ মুখােপাধ্যায় আপনার নাম?
স্বয়-হা
(চোকে কাপড় দিয়া কাদিতে কাদিতে অন্য দিক
হইতে চিন্তার প্রবেশ।)
ললিতা—চিন্তা কচি কেন বাবা ?
চিন্তা-ঠাকুর যে কাদছে জ্যাঠাই মা? তােমরা শ্যামাকে জোর করে
বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলে। শ্যামা খেলা কত্ত, হাসত, ঠাকুর
কত সুখে ছিল। তােমরা যে ঠাকুরের দিকে চেয়ে দেখ না ?
নিজের মেয়ে বলেই ব্যস্ত হও। তােমরা মেয়ের কিন্তু বাপু যােল
আনা টান ঠাকুরের ওপর। যাবার সময় ঠাকুর ঘরের দরজায়
প্রণাম করে কাঁদতে কাদতে কি বলে গেছে তা জান ? না বলব
, সে কথা তােমরা কেউ বুঝতে পাৰ্বে না ।
চিন্তামণি। [ দ্বিতীয় অঙ্ক A A-এ । M ( চিটি পড়িতে পড়িতে স্বয়ম্ভর প্রবেশ।), স্বয়ম্ভুবামুন মা চিটি লিখেচেন, কাশী থেকে কাল রওনা হয়েছেন আজ আসবেন। হাওড়া স্টেশনে আমায় এখনি যেতে হবে। তুমি মায়ের খাবার ব্যবস্থা কর। চিন্তা-জ্যাঠা মশাই আমিও তােমার সঙ্গে মাকে আনতে যাব। ললিতা – একলাটি যাবে কেন ? চিন্তাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও। স্বয়—চিন্তা, বাবা, একটু জল খেয়ে নাও। রাঁধতে’ ত অনেক বেলা হবে পিত্তি পড়বে। ‘চিন্তা--না, জ্যাঠা মশাই, এখন আমি জল খাব না। কতদিন পরে মা আমার আলাে করে ঘরে আসছেন। মায়ের পাদপদ্ম দুখানি আগে দেখি তার পর জল খাব। কতদিন মাকে দেখিনি বল দেখি ? জ্যাঠা মশাই, তােমারও কি মায়ের জন্যে ঠিক আমার মত মন কেমন করে ? 'স্বয়ম্ভু-পাগল, মা যে আমার সর্বদুঃখ বিনাশিনী নিখিল আনন্দময়ী মূৰ্ত্তিতে, যে দিন দশমহাবিদ্যারূপ পরিত্যাগ করে, সন্তানের ওপর অযাচিত করুণা কার জন্যে কৈলাস থেকে দিব্য ছটায় মর্ত্যে নেমে এসেচেন ; এসেছেন ; সেই দিন থেকেই ত জগৎ মায়ের চরণে বাঁধা। [ স্বয়ম্ভুর প্রস্থান। চিন্তা-জ্যাঠা মশাই, তুমিই ঠিক ঠিক মাকে চিনেচ। মা দয়া কল্লে তবে ঠাকুর কে দেখতে পাই, ঠাকুরের কাছে শ্যামাকে দেখতে পাই। ললিতা—চিন্তা তুই পাগলের মত কি বলিস আমি কিছু বুঝতে পারি না। চিন্তা—আমিও পারি না জ্যাঠাই মা। এক এক সময় দেখি, সৃষ্টি সংসার কেউ কোথাও নাই। কেবল ঠাকুর আর শ্যামা, শ্যামা আর ঠাকুর। তােমরা ত আমার কথা কেউ শুনলে না জ্যাঠাই
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
মা ? ঠাকুরের সেবা দাসীকে সরিয়ে দিলে ঠাকুরের কত কষ্ট হচ্ছে
একবার ভাব দেখি ? ঠাকুর কঁদছে, আমিও কাঁদচি।
ললিতা—কাদিস নি বাবা, তাের কাছে থেকেই শ্যামা আমার ঠাকুর
অন্তপ্রাণ ; ঘুরত ফিরত, আর দৌড়ে দৌড়ে বাছা আমার
ঠাকুর বাড়ী ছুটে যেত। হাত নেই কি কৰ্ব্ব বল্ ? শ্যামা পরের
জন্যে হয়েছে। তুই আমার ঘরের ধন, ঘরের মাণিক, তুই অমন
কল্লে বেঁচেও আমাদের সুখ নেই। চ, নতুন কাপড় বার করে
দিই গে, পরে মাকে আস্তে যাবি।
[ ললিতা ও চিন্তার প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
( দামিনীর কক্ষ সংলগ্ন ছাদের এক পার্শ্ব।)
নলিনী--গিন্নী মা, আমি আর তােমাদের বাড়ী থাকতে পাৰ্বনা বাপু?
আমার টাকা কড়ি, কৰ্ত্তা মশায়ের কাছে যা কিছু আছে সমস্ত
ফিরিয়ে দিতে বল। আমরা গরীব লােক, আমাদের প্রাণে সবই
সহ “য়। ভগবান আমার কপালে এত লিখেছিলে।
দামিনী-বুঝেছি, বউ মা বুঝি কিছু বলেচে ?
নলিনীবাবা, তােমার বউ উকীলের কান কাটতে পারে ? মুখের সামনে
দাড়ায় কার সাধ্যি ? দোষের মধ্যে কর্তা বাবুর ভাতে ঢাকা
দিতে বলেছিলুম। ও মা ! বলতে গেলুম ভাল কথা হ’ল কি না
উল্টোছিরি ? তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে, যা মুখে এল তাই বলে
সে কথা শুলে কানে আঙ্গুল দিতে হয়। আমি বিধবা আমায়
বলে কি না( ভান পূর্বক বােদন।)
82
চিন্তামণি ।
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
।
দামিনীকঁদিস নি, যা কিছু বলতে হয়, কর্তাকে বলিস আমি ওসক
কিছু জানি না।
( নলিনীর প্রস্থান ও পুর্নঃ প্রবেশ।)
নলিনী-গিন্নীমা, গিন্নীমা, ছােট দাদা বাবু বুঝি বৈঠকখানায় গান বাজনা
কচ্ছিল। কত্তা দেখে ভয়ানক চ’টে গেছেন। বকূতে বকূতে যে
রকম করে ওপরে উঠে আসছেন, দেখে ফিরে এলুম। ওই যে,
এই দিকেই আসছেন।
(হরলালের প্রবেশ।)
হরলাল-নলিনীর প্রতি) তুই এখানে কি কত্তে দাড়িয়ে আছিস ?
দুবেলা খেতে দোব এই মাগ্যির বাজারে, গােয়াল ঘরটা কাল
থেকে অপরিষ্কার হয়ে রয়েছে সে হুস নাই ?
[ নলিনীর প্রস্থান।
দামিনীওত বেশ কাজ কৰ্ম্ম কচ্ছিল। তােমার বউই ওর সঙ্গে দিনরাত
খুটিনাটি করে। গুরুতর কি একটা কথা বলেছে, থাকবে না বলে,
সেই জন্যে টাকা চাইছিল।
হরলাল—কিসের টাকা? ওর স্বামী মজুরগিরী করে খেত, টাকা কোথা
পাবে ? এবার যে দিন ফের বলবে, যেন আমার সামনে বলে।
এ দিকে কি খবর শুনে ?
দামিনী-কি ?
হরলাল—তােমার গুণধর ছােট ছেলের কীৰ্ত্তি কাহিনী। বাবু ইয়ার
বশিস্ নিয়ে ফুর্তি কচ্ছিলেন বৈঠকখানার ঘরে। আমি ঘরে যাব
কি,দেখি হরদম চলচে। চলুচে কি বুঝে ?
দামিনী--তােমাকে ত তখন বারণ করেছিলুম, অল্প বয়সে, ছেলেটার
স্কুল ছাড়িয়ে চাকরীতে দিলে, তখন সে কথা মােটে কাণেই
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। ৪৩ তুল্লে না। এখন যা হােক, দু পয়সা হাতে পড়চে, বদখেয়ালীও ক্রমশঃ বাড়ছে। হরলাল-দামিনী শােনন, শােননা, আর ও শােনাে--শ্রীকান্ত মামার মুখে শুনলুম, তােমার ছােট ছেলে দিব্যি বেশ্যার গােলাম হয়েছে। দামিনী—যা বলেছিলুম তা কাজে কথায় হ’ল ত ? বউ এনেচ কালাে, ছেলে শােধরাবে কি বলাে। আমার যেমন পােড় অদেষ্ট। হরলাল—তা বল্লে হবেনা দামিনী, যে স্ত্রীলােকের অন্ধ ভালবাসা, স্বেচ্ছা- চারী ছেলেকে আদর দিয়ে আমায় পথের কাঙাল কৰ্বার জন্যে সৰ্ব্বনাণী মূৰ্ত্তিতে দাড়িয়ে আছে ; তাদের এ বাড়ীতে থাকা কত দুর যুক্তি সঙ্গত বিবেচ্য। দামিনী--তােমার ত ঐ কেমন ধারণা কৰ্ব কি বল ? পেটে ধরেছি ফেলতে ত পারি না। হরলাল—না পার, তােমার ছেলেদের নিয়ে থেকো আমার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নাই। জান না, কত অনাথা বিধবা রমণীর চোকের জলে, কত দীন দরিদ্র ব্রাহ্মণের তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে, কত নৃশংস কার্য্যের অনুষ্ঠানে, আমার এই অতুল বিষয় সম্পত্তি উপার্জিত। এক কপর্দকের বিনিময়ে যে ক্ষুৎপিপাসুর মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে পারে, তার কাছে স্ত্রী পুত্রের অযথা প্রশ্রয় দণ্ডনীয়। দামিনী--তাই কি কত্তে হবে স্পষ্ট ভেঙ্গে বল্লেই ত হয়। তােমার পেটের কথা জান’ব কেমন করে ? হরলাল-ত্যজ্য পুত্রের প্রতি যে বিধান লিপিবদ্ধ, তাই তােমার লালগােপালের উপযুক্ত পুরস্কার। আজ থেকে তােমার ছােট ছেলের এ বাড়ীতে আসা বন্ধ। দামিনী-—বেশ যা ভাল বােঝ কর। ছেলে যদি শুধরে যায়, তাতে কি আমার অসাধ।
B3
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয় অৰু
---
হরলাল-হাড়ে হাড়ে যদি বুঝে থাক ভাল। ঘঁন, বৌমাকে একবার
আমার কাছে ডেকে দাও গে’ত।
[ দামিনীর প্রস্থান।
(শ্যামার প্রবেশ।
হরলাল-বৌমা, গায়ের গয়নাগুলাে বাছা সব খুলে দাও। লক্ষণযুক্ত
হতে, জানতুম সংসারে এসে শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, ভগবতীর মত রূপ
হ’ত, গয়না পরতে। পেত্নীর গায়ে গয়না মানায় না।
( অন্তরালে শ্যামার গমন ও গয়না লইয়া হরলালের সম্মুখে স্থাপন।
ও আমার সামনে থেকে।
[ শ্যামার প্রস্থান।
(দামিনীর পুর্নঃ প্রবেশ।)
হরলাল— দামিনীর প্রতি) দরওয়ানকে বারণ করে দিয়েছি তােমার
ছােট ছেলেকে এ বাড়ীতে আর আসতে দেবে না। অধরা
আর নলিনীকে ডেকে বলে দাও গে—যেন তার কোন ফাই
ফরমাস না শােনে।
[ হরলালের প্রস্থান।
লামিনী--আমার দায় পড়েছে বার ? ছেলেকে বাড়ীতে আসতে দেবেন
, আস্পর্ধার কথাটা দেখ দেখি ? আমি যত দিন বেঁচে আছি
কার সাধ্যি না আসতে দেয় ? বাড়ীতে কাকে রেখে যে তুষ্ট
তা’ত জানি না। ভিন্ন বিধাতায় গড়েছিল ? গয়নাগুলাে দিয়ে
বয়ে’র গা থেকে দিব্যি আবার খুলে নিলে গা ? প্রাণটা একবার
কতরালে না ? দেখি’গে আড়ীপেতে গয়না কোথায় লুকিয়ে রাখে।
[ দামিনীর প্রস্থান।
( নলিনীর প্রবেশ।)
নলিনী--ব্যাটার বয়ে’র গয়না খুলে নিয়ে মিন্সে সিড়ির ঘরের ভেতর
৪৫
- ৭
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।]
চিমশি।
গেল মাগী তাই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল। আমি আসছিলুম
দেখে মাগী সরে গেল। মনে কল্পে নলিনী কিছু জাৱেম্পারেনি।
নলিনীর চোক যে চকীপাকের মত চান্দিকে ঘুচ্চে তা’ত জানে
না। ছােট দাদাবাবুকে গিয়ে বল’ব এখন, তারপর বয়ে’র
বাপের বাড়ী যাব। মাগী মিন্সের সব কথা খুলে বলব। মিন্সেকে
পথের ভিখিরী কৰ্ব্ব, আগুন লাগাব সংসারে। পুড়িয়ে ছাই
করে দেব। নলিনী! ভুলিস নি, ভুলিস নি।
{ নলিনীর প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
( ঠাকুর বাড়ীর সংলগ্ন প্রাঙ্গন।)
চিন্তা—মা, মা, আমি তােমায় চাদ্দিকে খুজে বেড়াচ্চি।
[ চিন্তা বামুনমাকে প্রণাম করিল।
বামুন মাতােমার ঠাকুর পূজো হয়েছে ?
চিন্তা—পূজো কৰ্ক কি মা? দেখি ঠাকুরের পাশে শ্যামা দাঁড়িয়ে
খামার পাশে ঠাকুর দাড়িয়ে। বিশ্বাস না হয়, দেখবে চল,
ঠাকুরকে যা ফল মূল নৈবিদ্যি করে সাজিয়ে দিয়েছিলে ; ঠাকুর
সব শ্যামার মুখে তুলে দিচ্ছে। শ্যামা ও কম নয় মা, নিজের
উচ্ছিষ্ট ঠাকুরকে খাওয়াচ্চে, আর ঠাকুর অম্লান বদনে তাই
খাচ্চে, আর মুচকে মুচ কে হাসচে। সে বড় চমৎকার ! বড়
সুন্দর ! দেখলে চোক জুড়িয়ে যায় মা।
চিন্তামণি। [ দ্বিতীয় অঙ্ক বামুন মা—চিন্তা, আবার সেই কথা। যে ভুলের জন্যে তোমায় কতদিন সাবধান করে দিয়েচি, ঠাকুরের সেই • অমৰ্য্যাদা তােমার গভধারিণী জননীর সামনে উচ্চারণ কত্তে তিলমাত্র সঙ্কোচ বােধ হল’না ? ছিঃ ছিঃ তােমার মাতৃভক্তির পরিচয় যে শুধু আমার মনস্তুষ্টির জন্যে ভান মাত্র এতদিনে আজ বুঝতে পাল্লম। চিন্তা-তােমার ছেলে হয়ে মা, মিথ্যে কথা বলতে পার্ব না। ঠাকুর যে শ্যামাকে বিয়ে করেছে। তুমি যে তখন বড় বলেছিলে, শ্যামার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে। কই পাল্টে দিতে ? আমি কিন্তু দুজনকেই বিয়ে করেচি। ঠাকুরকে বিয়ে করে মাথায়, আর শ্যামাকে হৃদয়ে রেখে বুঝতে পারি না, কে ঠাকুর, কে শ্যামা, ওই কেমন ভুল হয়ে যায়। বামুন মা -বুঝতে পার না?—যিনি পুরুষানুক্রমে তােমাদের কুলদেবতা হয়ে নিত্য ঘরে জাগ্রত বিরাজ কচ্চেন। জান না, তিনি সামান্য ঠাকুর নয় ? দুমাসের ছেলে রেখে তিনি মারা যান। তােমায় নিয়ে অকুল সমুদ্রে পড়লুম। কেমন করে মানুষ কর্ব কোন ও দিকে কোন উপায় ছিল না। দিনরাত কঁাদতুম, আর ঠাকুরকে জানাতুম। তারপর একদিন কি জানি, ঠাকুর কোথেকে শ্যামার বাপকে জুটিয়ে দিলেন। শ্যামার বাপ এসে আমাদের দুজনকে আপনার মত করে নিলে। শুধু তাই নয়, ঘরের গিন্নীর মত রেখে আজও সেই সম্ভমে, মায়ের মত আমায় মা করে। আর তুমি পেটের সন্তান, মায়ের কথা শােনা চুলােয় যাক্, প্রতিপদে যাতে আমার মনকষ্ট হয় তাই তােমার একান্ত ইচ্ছে। চিন্তা-আমার কি দোষ মা ? ঠাকুর যেমন দেখাচ্চেন তেমি দেখচি । তবে শােন। ,
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
৪৭
s,
(গান।)
দোষ কিগাে মা, বল গাে আমার, আমি শুধুই ভেবে আকুল।
জানিনাক সত্যি মিছে, জানিনাক ঠিক কি ভুল,
জানিনাক পথের স্কুলে,
আঁধার ঘরে প্রদীপ জ্বলে,
কে যেন গাে বলে গেল, শােনূরে ওরে ও বাতুল।
[ চিন্তার প্রস্থান।
বামুন মা—অবােধ, মূর্খ বালক, তােমায় উচিত মত দণ্ড দোব কাল
থেকে। দেখি বুড়াে কর্তাকে বলে ব্যবস্থা কত্তে পারি কি না ?
দূর হও বংশের কলঙ্ক।
[ বামুনমার প্রস্থান।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
(শ্যামার কক্ষ সংলগ্ন বারাণ্ডার সম্মুখ।)
নলিনী--বউদিদি যা ভেবেচি তাই ? শুলেনা ত কথা, বল্লুম যে
তােমার শাশুড়ী ঘুমুলে পর ঘােট দাদাবাবুকে চিঠি দিয়ে
আসব। তােমার ত বাছা দেরী সইল না? ভাবলে বুঝি নলিনী
মিথ্যে করে ওজর কচ্চে? পড় ত পড়, তােমার শাশুড়ীর
সামনে। আমি যাচ্ছিলুম খিড়কী দিয়ে পাছে কেউ দেখতে
পায়। ওমা! পেছুন থেকে মলিনী বলে কে হাঁক দিচ্ছে,
ফিরে দেখি তােমার শাশুড়ী। বলে কি জান शा-गारिक
দুপুর বেলা হন্ হন্ করে যাচ্ছিস কোথা ? দূতীগিরী শিখলি
কবে থেকে”? আমি ত অবাক হয়ে থমকে দাড়ায়। আর
৪৮
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয় আৰু
* *
তােমার শাশুড়ী সেই তক্কে চিঠিখানা হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে
পড়লে। তারপর কুটোকুটি করে ছিড়ে ফেলে দিলে। আমার
হাড়ির হাল করে তবে ছেড়েছে। আমি যে জানি বউদিদি,
আজ ছ সাত মাস ঘর কচ্চি। আমার কি জান্তে আর কিছু
বাকী আছে ?
শ্যামা দেখ নলিনী মুখ সামলে কথা ক’স ? শাশুড়ী গুরুজন, জানিস
তাঁর নিলে তার পুত্রবধুর কাণে বজ্রের মত বাজে। ধিক্ তােরে।
যার অন্ন খা, তারই গ্লানি করে বেড়াস ? তাের নরকেও
স্থান হবে না।
নলিনী-বটে, এতটা, তা জান্তুম না বউদিদি, তােমার পেটে এক
মুখে আর।
শ্যামা—ছাই চাপা আগুনে হাওয়া লাগিয়ে তার বিক্রম দেখবার জন্যেই
নাচিয়েছিলুম তােকে বুঝতে পারিনি তা? তুই শয়তানী দুর হ।
নলিনী-( স্বগত) উহুঃ! এত অপমান, এত তেজ, ছাই পড়বে
*
[ নলিনীর প্রস্থান।
('দামিনীর প্রবেশ।).
দামিনীহা গা বউমা তােমার ত বাছা আক্কেলটা বেশ ? আমি
মরচি একলাটি রান্নাঘরে নাকানি চোবানি খেয়ে। আর তুমি
৩ দিব্যি গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়াচ্ছ ? শাশুড়ীর বুঝি খুক
গতর দেখেচ? পরের বেটীদের কি আর শশুড় শাশুড়ীর ওপর
দরদ থাকে। হত যদি নিজের মা, তা হলে কি বাছা নিশ্চিন্দি
হয়ে থাক্তে পাত্তে ?
শ্যামা-সত্যি বল’চি মা জগদীশ্বর জানেন, তুমি কখন রান্নাঘরে গেছ
তা জানিনা। মােজ যেমন সময় উনুনে আগুন দেয়া হয় ঠিক সেই
}
ঙ্ক।
fलि
৪৯
সমু তােমায় ডেকে নিয়ে যাব জানি। যদি কোন দোষ হয়ে
থাকে মা, আমায় ক্ষমা কব তােমার দুটি পায়ে ধব’চি।
আমি বালিকা, সংসারে কোন নিয়ম বন্ধন জানি না।
হলে শিখিয়ে দিও মা, প্রাণপণে মনে বাখব।
মিন -এমাহ কত ভাল মানুষটি সেজে! পেটে পেটে বদমায়েসী,
সে তােমার শ্বশুরের ভাল খাওয়া হয় নি, কই একবার কি
জিজ্ঞেস করেছিলে ? জানি গাে জানি, সেবা’র দুদিন বাপের
বাড়ী গিযেছিলুম, তােমাব শ্বশুব, সমষে পান, সমষে জলটুকু
অবধি পায়নি।
শানা - বাবার যে খাওয়া হয়নি, কই, তুমি’ত মা সে কথা আমায় বলনি ?
দামিনী-বল'ব আব কি? চোক ছিল না, দেখতে পাওনি পাতে কত
ভাত পড়েছিল ?
শ্যামা নলিনী এটো পেড়ে যখন থালা নিয়ে আসে পাতে কিছুই ছিল না।
দামিনী-আচ্ছা নলিনী আসুক জিজ্ঞেস কচ্চি। নলিনী আছিল ও
নলিনী।
( নলিনীব প্রবেশ।)
নলিনী--কি বল’চ গিন্নী মা ?
দামিনী-হ্যারে নলিনী, ওবেলা কাব পাতেব ভাতগুলো বৌমাকে
দেখাতে বলেছিলুম, না দেখিয়ে ফেলে দিয়েচিস্ কেন ?
নলিনী—কেন দ্যাখাব না গিন্নী মা ?
=ামানা, মা দেখাযনি, ও মিথ্যে করে বল্চে। ও ওই কম মিথ্যে
বলে। তােমার কথা আমায়, আমার কথা তােমায়, এই রকম
মিথ্যে বলা ওর স্বভাব।
নলিনী—গিন্নীমা, বউদিদি বড় লােকের মেযে সব বলতে পারে। আমরা
গরীব লােক ভাতের কাঙাল। ফেলে দেব কি বল’চ ? কর্তার
}
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয়, অঙ্ক
পাতের ভাতগুলাে গুচিয়ে নিয়ে খাব মনে কলুম, ওমা! খাব কি?
ব্যঞ্জন একেবারে নুনে পােড়া, আর ভাতগুলাে আধ সেদ্ধ
কাচা। গরীব লােক আমরাই খেতে পান্নুম না তা, কৰ্ত্তাবাবু
খাবেন কি, শেষে গরু ছাগলকে ধরে দিলুম। এই মাগির
বাজারে অত ভাত তরকারী নষ্ট অপচয়, বুকটা করকরিয়ে গেল
গিন্নীমা। আর বউদিদি তােমাকেও বাছা একটা কথা বলি, রাগ
কর’ন, শ্বশুড় বাড়ী বলেও একটু টানতে হয়।
দামিনী-টান কত তা’ত দেখতেই পাচ্ছি। ভিটেয় পা দিয়ে অবধি
আমার সৃষ্টি সংসার ভেঙ্গে তছনচ কল্লে। সে দিন বাসনওলীর
কাছ থেকে অমন পাথরের বাটীটা কিলুম দুদিন সরিনি ; এমি
লক্ষ্মীমন্ত, হাত থেকে টু করে ফেলে দিয়ে আমার পাঁচ ছ টাকা
লােকসান করালে। হাড়ে কালি দিলে, 'আমার হাড়ে কালি
দিলে।
নলিনী-গিন্নীমা, তুমি বাপু এ বেলা কৰ্ত্তার রান্না নিয়ে থেকো আর
গেরস্তর দিকে বৌদিদিকে দিও। কৰ্ত্তাবাবু সকালে একটা হাতে
ভাতে করেন নি ?
দামিনী--এ বেলা আর কার খাওয়া নাই লাে নলিনী, বয়ের হাড়
জুড়িয়েছে।
নলিনী—কেন গিন্নীমা, কৰ্ত্তাবাবু কোথাও দূরে গেছেন নাকি ?
দামিনী-কি জানি, বেরুবার সময়’ত বল্লেন উকীলের আপিসে কাজ সেরে
কোথায় নেমন্তন্ন আছে সেইখান হয়ে তবে বাড়ী আসবেন।
আসতে রাত হবে বলে গেছেন।
নলিনী-গিন্নীমা, তবে এই ফুরসুদে আমি একবার দেশের লােকের সঙ্গে
দেখা করে আসি। তুমি ততক্ষণ বৌদিদিকে নিয়ে রান্নাঘরে
যাও। আমি ব'লা টাটনা বেঁটে ঠিক করে রেখে এসেছি।
পঞ্চম গর্জাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
}
দামিনী-চট করে আসি।
নলিনী—এই গােন তিনেক কথা জিজ্ঞেস করেই আসব। দেশে থেকে
আসবার সময় আমাদের ক্যাবৃলার মায়ের ছেলেটাকে পেঁচোয়
পেয়েছিল দেখে এসেছিলুম এই তার কথা। আর আমাদের
বাড়ীর পাশে মােড়লদের উইনে, কচি কচি নটে শাগগুলাে কেমন
আছে এই দুটো কথা। আর কুমােরদের বউ যমজ ছেলে বিইয়ে-
ছিল, মায়ে ছায়ে কেমন আছে এই তিনটে কথা জিজ্ঞেসা করেই
চলে আসব।
[ নলিনীর প্রস্থান।
দামিনী—আমার সঙ্গে মিথ্যে ফেরাবী ? ভাল ঘরের মেয়ে হলে দোসরা
কথাটি কইতে না ? এনেচি হাড়ী দুলেনীর ঘরের মেয়ে।
সের চালের ভাত খাবেন দুবেলা, আর লােক ধরে ধরে কেচ্ছু
গাইবেন আমার। মা বুঝি বিইয়েছিল আমার হাড় মাস খাবার
জন্যে ? মরণ আর কি, নূন ছিল না ? গেরস্তর কাজ পড়ে রয়েছে
তবু কেমন দিব্যি পুতুলষ্টির মত দাড়িয়ে আছে দেখ :
থাক বাছা
থাক, আমারই’ত গরজ, যাই রান্নাবান্নার জোগাড় করে নিইগে।
[ অগ্রে দামিনী পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্যামার প্রস্থান।
৫২
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয় অৰু
ঘষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
( শ্রীগােপালের কক্ষ।)
গােপাল—স্ত্রীর অঙ্কিত প্রতিমূর্তির প্রতি দৃষ্টি করিয়া) সবাই তােমাকে
জন্মের মত মন থেকে মুছে ফেলেচে আমি ও ফেলব। না-
যে ভােলে ভুলুক, আমি তােমাকে ভুলতে পাৰ্বনা। যতদিন
বেঁচে থাকব, তােমায় বুকে নিয়ে সংসারে শ্মশানে ঘুরে বেড়াব।
ভুলতে পাৰ্বনা, ভুলতে পাৰ্বনা। আহা! আমার সােণার কমল
ভেসে গেল রে!
( বিলাসীর প্রবেশ।)
বিলাসী-শ্রীগােপাল ! শ্রীগােপাল ! কার পানে চেয়ে আকাশ পাতাল
ভাব’চ? ছবি কি কথা কয় ? তুমি পুরুষ মানুষ, কেন মিছে
হাওয়ার পেছনে অন্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? হাজার ডালে যে সাড়া
দেবেনা, চোকের জল ফেলে যে আর ফিরে আসবে না ; যা
হবার নয় হবেনা, ছিঃ ছিঃ তার জন্যে এত লালায়িত কেন?
গােপাল-কে আপনি?
বিলাসী-চিন্তে পাচ্ছনা, সত্যি সত্যি পাগল হলে নাকি। আমি বিলাসী।
শ্রীগোপাল—আমার হাতে আজ রেহাই পেলেন। অন্য কেউ হলে মুখটা
ঘাড়ের দিকে বেঁকিয়ে দিতুম। যান, যান, আপনার কাজে যান।
বিলাসীতা না হয় যাচ্ছি, কিন্তু তেমন তেমন সুন্দরী চোকের ওপর
পড়লে কেমন না মাথা ঘুরে যায়, মৰ্ব্বনা দেখব। এই ধরনা
কেন, আমিই যদি একটু ঠক ঠক করে তােমার সনে গিয়ে
দাড়াই ; দেখি কি রকম পুরুষ মানুষ তুমি ?
গোপাল—নারী! দেবীজ্ঞানে আপনাকে মাথায় করে রাখি। সংযত
হয়ে কথা কইবেন ব’চি।
;
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
-
বিলাসী-সংযত? কার কাছে সংযত হব ? যার মুখের পানে চেয়ে
পৃথিবীর ওপর এখনও দাঁড়িয়ে আছি। চোক যে রূপ ধ্যান করে
আনন্দে নেচে ওঠে। প্রাণ মন দেহ অবশ হয়ে যার পায়ে
দিনরাত লুটিয়ে পড়ে তার কাছে লজ্জা? হাসির কথা।
গোপাল—অসংযতা নারী! দূর হয়ে যাও সামনে কােকে।
—আমিই এ বাড়ী ছেড়ে চলে যাচ্চি। ওহহ ! সংসারে বড়
জালা, বড় জ্বালা !
{ বেগে শ্রীগােপালের প্রস্থান।
বিলাসী--(স্বগত) একবার মুখ তুলে চাইলে না, আমায় দেখলে না।
আচ্ছা দেখ’ব কতদিন এ হেনস্থা থাকে। শ্ৰীগােপাল।
শ্রীগােপাল !
চুর্ণ কর্ব তােমার অহঙ্কার। মুহূর্তের কটাক্ষে টেনে নিয়ে আসব
স্বর্গের সিংহাসন থেকে হৃদয়ে এনে আলা জুড়ব। দেখি কেমন
করে তুমি চোকের আড়াল হও ?
[ বিলাসীর প্রস্থান।
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
( হরলালের গুপ্ত কক্ষ।)
নলিনী—এস ছােট দাদা নির্ভয়ে এস, বাবু বাড়ী নাই—রাত হবে
আসতে। গিন্নীমা রান্নাঘরে ধচে, এই বেলা পার যদি দেখ।
এই সিড়ির ঘরে আছে।
লালগােপাল—দুর বেটী, আমি আতি পাতি করে এ ঘরের চাব্দিকে
দেখেচি কোথাও পাইনি।
চিন্তামণি। [ দ্বিজয় অরু ••••• ++ AMA ১A WWW ? নলিনী-মাইরি বলচি, ছােট দাদা এই ঘরেই আছে। আমার মাথা খাও, তুমি আর একবার দেখই না ছাই ? চাবী আছে লালগােপাল-দেখ, বেটী আমায় যদি মিছিমিছি নাকাল কবি ত টের পাবি? জানিস্ ত ছােটদাদাকে। নলিনী--অর যদি পাও ছােট দাদা, বল আমায় দেবে আধা ? লালগােপাল—দেখি বেটী জল কি কাদা ? তুই এই বাইরে দাড়া। ( লালগােপাল চাবী খুলিয়া ভিতরে গেল।) কই রে বেটী কই ? আমার সঙ্গে ফেরাবী ? পয়জার দিয়ে বিদেয় ক ? নলিনী—সব ভাল করে খুলে দেখে ? লালগােপাল-আজ দেখব কিরে বেটী ? অনেকদিন থেকে দেখে আসছি। নলিনী—আচ্ছা আমি একবার দেখে আসি, তুমি বাইরে দাড়াও। দেখাে ছােট দাদা তােমার জন্যে শেষটা হাতে দড়ী না পড়ে। [ নলিনী ভিতরে গমন করিল। লালগােপাল—নিশ্চিন্দি হয়ে যা বেটী। (স্বগত) বাবা ব্যাটা যেমন নাছােড়বান্দা, ছেলে ব্যাটাও যে তেমি ধনুর্দ্ধর তা’ত জানে । নলিনীছােটদাদা। ছােটদাদা! শীগগির এসাে বেরিয়েছে, বেরিয়েছে। লালগোপাল-বলিস কি রে বেটী ? নলিনী—আহা দেরী করনা, চট এসাে। লালগােপাল—চ বেটী। ( লালগােপাল ও নলিনী গুপ্তকক্ষে প্রবেশ করিল।) নলিনী—এই আলমারীটার তলাকার কাঠখানা সরাতে পার ? লালগােপাল—কেন রে বেটী ? নলিনী-আমার সন্দেহ হচ্ছে। সরাও না বলচি, নাও আমিও ধরচি। লালগোপাল-বাঃ এ যে শ্রীংএর মত চলে গেল।
সপ্তম গর্জাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
নলিনী—এই দেখ ছোটদাদা, সিড়ির নীচে সিড়ি, তার নীচে ঘর। এই
সিড়ির চাবী কোন রকমে যদি খুলতে পার দেখ? এখন তুমি
নিতে পাল্লেই হ’ল, আমার কাজ আমি করেচি।
লালগােপাল-জয় মা কালী ! লাগিয়ে দে মা একটা চাবী। দোহাই
মা তাের, জোড়া পাঁটা দোব। ওরে বেটী! সিড়ির দরজার
সঙ্গে যে একটা লম্বা শেকল ঝুলচেরে-কাটা পড়ব না ত শেষটা?
নলিনী—তুমি পাব্বেনা ছােটদাদা, তােমার নাই বুকের পাটা ।
লালগােপাল-খুল গিয়া-খুল গিয়া—জ মা কালী !
( লালগােপাল সিড়ি খুলিয়া নীচে নামিল ও সিন্ধুকের ভিতর
হইতে গয়না, টাকা ইত্যাদি রুমালে বাঁধিয়া
উপরে আসিল।)
নে আলমারীটা ধর দেখি ? যেমন ছিল,ঠিক তেমি ক'রে কাঠখানা
তলায় দে। লম্বা শেকলটার সঙ্গে নীচের লােহার সিন্ধুকের
ডালার সঙ্গে বাঁধা। সিড়ির দরজা যেমন খােলা ওদিকে নীচেয়
গিয়ে দেখি সিন্ধুকের ডালাও ঠিক খােলা। বাবা ব্যাটার কায়দাকে
বলিহারী। ভাগ্যিস দেশলাইটা সঙ্গে ছিল। অন্ধকারে তা না
হ'লে হাতড়ে পেতুম না। চল বেটী তাের বশিস্ দিইগে ?
তুই আগে চলে যা, আমি পেছু পেছু যাচ্চি।
{ অর্থে নলিনীর গমন, পশ্চাৎ পশ্চাৎ লালগােপালের প্রস্থান।
(দামিনীর প্রবেশ।)
দামিনী---নলিনীটা মাঝের ঘরের দিক থেকে বেরিয়ে গেল, তার পেছুনে
লালগােপালটা গেল দেখলুম। লালগােপালের হাতে রুমালে
বাধা কি যেন বােধ হল। ডাকলুম সাড়া দিলে না। না—এ বড়
ভাল লক্ষণ নয়, মিন্সের যদি কিছু থােয়া গিয়ে থাকে, মিন্সে
আমাকেই সন্দেহ কৰ্বে। আমি নলিনী বেটীর ওপর দোষ দেব।
মিন্সে বিশ্বাস কল্লে হয়, কি জানি বরাতে কি আছে। '
[ দামিনীর প্রস্থান।
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয় অৰু
অষ্টম গর্ভাঙ্ক।
(বেলার সুসজ্জিত কক্ষ।)
রাধারমণ-ছোঁড়াটার তাের ওপর বড় ঝোঁক পড়েছে। স্থাখ, আমি
লেখাপড়া সব ঠিক করে রেখেচি। এই নে সই করে নিবি, তা
হলেই কাজ ফস।। তােকে যা মৎলব বাতলে দিয়েছি মনে
আছে ত? এই সময় থােক থাক্ কিছু বাগিয়ে নে ?
বেলা—আমায় বল্লে কি জানিস? ওর শ্বশুড় শাশুড়ী এখন সেই বাড়ীতে
বাস কচ্চে। তাদের বার করে দিয়ে আমায় সেইখানে নিয়ে যাবে।
রাধারমণও সব ফালতো কথায় ভিজিসনি। তােকে যতক্ষণ পর্যন্ত
লিখে না দ্যায় ততক্ষণ বিশ্বাস করিসনি। জোচ্চোরের ছেলে জুরী
বুদ্ধি খুব জানে। খুব বুজে সুজে কাজ কত্তে হবে জানলি? সই
হলে আমায় দ্যাখা আমি নীচেয় থাকব।
( নেপথ্য হইতে লালগােপাল।।
বেলা ! বেলা !
রাধারমণ—ওই বুঝি এসেচে।
বেলা—তুই এই দরজা দিয়ে চলে যা। ঘুমুলে পর, তােকে ওপরে ডেকে
নিয়ে আসব এখন।
[ রাধারমণের প্রস্থান।
কে ডাকছে গা? ভেতরে এসাে।
( লালগােপালের প্রবেশ।)
ও মা! তুমি ডাকছিলে ?
লালগােপাল-বেলা ! বেলা ! বাবা ব্যাটার চোকে ধূলাে দিয়ে সিন্ধু
থেকে বার করে এনেচি এই গয়না—তােমার সর্বাঙ্গ সােণায়
মুড়িয়ে দেব। আর এই নাও নােটের তাড়া।
[ বেলাকে প্রদান।
অষ্টম গর্ভা।]
চিন্তামণি।
বেলা—তবে দেখচি, তুমি আমায় সত্যি সত্যি ভালবাস?
লালগােপাল-বেলা! যে দিন সর্বপ্রথম আমাদের বাড়ীতে তােমায় দেখি
সেই দিন থেকে কি জানি কোন মন্ত্রমুগ্ধ ইঙ্গিতে তােমার পেছু
পেছু চলেছি।
বেলা—এ সব গয়না কার ? তােমার বয়ের বুঝি ?
লালগােপাল-বারই হাে, এখন তােমার। নাও, পরে একবার সামনে
দাঁড়াও।
{ বেলা সমস্ত গয়না পরিল)
বেলা—এই দেখ, দিনরাত দেখবে এখন। আমায় সে বাড়ীতে আগে
নিয়ে চলল বুঝবে তখন, কেমন আমি রংদার মেয়েমানুষ।
লালগােপাল—তােমার উকীলকে বলে শীগগির কাজ মিটিয়ে নাও।
বেলা--সে সব আমি ঠিক করে রেখেচি। তােমার সই হলেই হয় ।
লালগােপাল-কই দোয়াত কলম নিয়ে এস, সই করে দিচ্চি।
বেলা—এই ত এলে জিবােও না একটু।
লালগােপাল-রামচরণকে ডাক, ততক্ষণ মাল নিয়ে আসুক।
বেলা-আন্তে হবেনা ঘরেই আছে। সােড়া আন্তে দাও। রামচরণ,
রামচরণ আছিস।
(নেপথ্য হইতে রামচরণ।)
যাই মাজী।
( রামচরণের প্রবেশ ও লালগােপালকে অভিবাদন।)
লালগােপাল-রামচরণ চট করে এক বােতল সােজ নিয়ে আয়।
রামচরণ—যে আজ্ঞে।
[ রামচরণের প্রস্থান ।
বেলা--াড়াও নিয়ে আসছি।
বেলার প্রস্থান ও মদের বােতল লইয়া প্রবেশ ।
চিন্তামণি।
[ দ্বিতীয় অল্প
( সােঙ লইয়া রামচরণের প্রবেশ।) ।
লালগােপাল-রামচরণ এই নে তাের বশি।
[ রামচরণকে টাকা প্রদান।
রামচরণ-~-আপনি যা দেন বাবু, আর কোন শালার কি এমন ছাতি
আছে।
| রামচরণের প্রস্থান।
লালগােপাল—এই নাও তুমি আগে পেসাদ কর।
বেলা—-ও কি! তােমার মনে থাকে না? আজ যে সােমবার? বাবা
তারকনাথের বার করেছি, তােমাকে না বলেচি নিয়ম ভঙ্গ হবে।
লালগােপাল--তুমি না খেলে মাইরি কোন শালা খাবে। ও নিয়ম, টিয়ম,
damn care ছেড়ে দাও সব ।
বেলা—তােমায় বলে বােঝ না, কেমন ধারা মানুষ ? আমার ভাল মন্দের
দিকে তােমার দৃষ্টি নাই ত?
লালগোপাল--তবে থাক, আমার দোষ নাই কিন্তু।
বেলা-খাওনা, ন্যাকাপনা কর কেন ?
| লালগােপালের মদ্যপান ।
(স্বগত)—যে জিনিষ মিশিয়ে দিয়েছি, চট করে বেহুস হবে।
( লালগােপাল কাত হইয়া বালিশের উপর মাথা রাখিল।
বেলা—এক চুমুক খেয়েই যে কাত হয়ে পড়লে; আর কোথাও গিয়েছিলে
বুঝি ?
লালগোপাল—মাইরি নয়, কোন শালা বলে নয় ? বেলা কোথায় তুমি !
আমি চোকে কিছু দেখতে পাচ্ছি না বডড নেশা হয়েছে।
বেলা--এই ত, আমি তােমার কাছেই আছি। দাঁড়াও লেখা পড়াটা
নিয়ে আসি।
আম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি
(বেলা কক্ষান্তরে গমন করিল ও লেখা পড়ার কাগজ
হাতে করিয়া প্রবেশ করিল।
লালগােপাল—জদী লে আও।
(বেলা দোয়াত কলম লইয়া আসিল।)
বেলা—এই নাও সই কর। (লালগোপাল সই করিল।
লালগােপাল—বেলা ! মর্তের উৰ্বশী তুমি আমার গয়া গঙ্গা বারাণসী
বেলা-শােবে চল।
লালগােপাল—আমি উঠতে পাচ্ছি না হাত ধরে আমায় নিয়ে চল।
( বেলা লালগােপালকে কক্ষান্তরে লইয়া গিয়া শেকল দিয়া
বাইরে আসিল ; ও রাধারমণকে ডাকিয়া আনিল।)
( রাধারমণের সহিত বেলার প্রবেশ।)
বেলা—এই দ্যাখ ঠিক হয়েছে ত?
রাধারমণ—দেখতে হবে না কাজ হাসিল।
বেলা--গয়না দেখেছিস গায়ে ?
রাধারমণ—তাই ত রে! দিল দরিয়া যে ! হ’ল কি রে ?
বেলা—আবার নােটের তাড়া দেখেছিস ?
রাধারমণ—কই,কই, দেখি ? এই রে! সব জাল নােট দিয়েছে। খবরদার,
খবরদার, বাজারে বার করিস নি ? জোচ্চোরের ছেলে সাধে কি
বলেছিলুম ?
বেলা বলিস কি ?
রাধারমণ—আর বলব কি? মেয়ে মানুষ দেখে, খুব ভুলিয়েছে তােকে ?
ফিরিয়ে দিস, ফিরিয়ে দি।
বেলা—তুই কোন রকমে চালাতে পাৰ্বি না ?
রাধারমণ-আমায় জেলে যেতে বলিস নাকি ?
বেলা-নােট গুলাে সব জল নাকি?
চিন্তামণি । [ দ্বিতীয় অঙ্ক - ৭ । । । । । শ. s রাধারমণ—আগা গােড়া জাল। পুড়িয়ে ফেলি, না হয় ফিরিয়ে দি। ঘরে রাখলে মহাবিপদে পড়বি বলে রাখলুম। পুলিশ টের পেলে দুজনকেই ধরপাকড় কৰ্বে । বেলা—ফিরিয়ে দিতে গেলে চটে যাবে। নে তুই যা হয় করিস। আমার’ত তাের কথা শুনেই পেটের পীলে চম্কে গেছে। রাধারমণ—আমি নিয়ে কি কৰ্ব্ব বল ? দে পুড়িয়ে ফেলব। (বেলা নােটের তাড়া রাধারমণকে দিল) দেখ, তােকে শিখিয়ে দিই, গয়না খবরদার ঘরে রাখি নি। ওর বাবা ভয়ঙ্কর লােক, তাের বাড়ী এসে খানাতল্লাসী কত্তে পারে আমার তাই ভয় হচ্ছে। বেলা—তবে কি কৰ্ব্ব বল দেখি? রাধারমণ-আমার মতে ও গুলাে গলিয়ে ফেলাই ভাল, ধরা ছোঁয়া পাবেনা কেউ। বেলা—সেই ভাল-গালাব কোথায় ? রাধারমণ—বিশ্বাস হয় ত, আমার কাছে দিতে পারিস। আমার বাড়ীতে এক স্যাক্রা ভাড়াটে আছে, তাকে দিয়ে কাজ ঠিক করে নােব কেউ জান্তে পাব্বে না। বাজারে বার কল্লেই গােল হবে। বেলা—নে, নে, তবে তুই-ই নিয়ে যা। বেলা তােকে অনেক পরখ করে বাজিয়ে নিয়েছে। দেখছিস কি? এইবার তােকে নিয়ে একদিকে চলে যাব আর ওকে ছাের কগ্নী পরিয়ে বিদেয় করে দেব। রাধারমণ—কোন দিন বা আমায় বিদেয় করে দিবি? তােদের জাতকে সহজে বিশ্বাস হয় না ? বেলা-মনেও ভাবিস নি তা, আমরা ইচ্ছে করে যাকে ধরা দিই, ঠিক ঠিক থাকে আমাদের প্রাণে লাগে তার কাছে আমরা দাসী। রাধারমণ—যা, যা, ন্যাকাম করিস নি।
অষ্টম গর্ভা।
চিন্তামণি।
বেলা--মাইরি কোন্ বেটা মিথ্যে বলে ?
রাধারমণ-কাগজটা এখন আমার কাছেই রইল। কোথাও ভুলচু
হল কি না আর একবার ভাল করে দেখব। লামি এখন
আসি।
বেলা—গয়নাগুলাে নিয়ে যা ।
রাধারমণ—দে তবে। হ্যা আর একটা কথা বলে দিই—ওর বাবা
চাই কি গােয়েন্দাও লাগাতে পারে, তােকে যদি কেউ কথা
দিয়ে কথা বার কার চেষ্টা করে আমল দিনি মােটেই। খুব
সাবধানে কথা কইবি ?
বেলা—সে আর বলতে ? গয়নাগুলো গালিমে কাল ঠিক আনিস? ভুলিস
নি যেন ?
রাধারমণ-সৰ ভুলতে পারি, তাের কথা রাত্তির দিন ইষ্টি মন্তর।
[ উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
(দরদালানস্থ খামার কক্ষ।)
খামা-না-বড় বাড়িয়েছে, শাশুড়ীকে বলব আজ। বােতল লুকিয়ে
রেখে গেছে আমার ঘরে। আমিও দাড়াও না ফেলে দিচ্ছি।
( বােতল আনিয়া বােতলস্থ মদ ফেলিয়া দিল।)
উঃ! কি বিটকেল গন্ধ। পয়সা দিয়ে লােকে কেমন করে এ
বিষ খায় গাে ?
( অধরের প্রবেশ।)
অধর-বউদিদি, তােমার বাপের বাড়ী থেকে—বাবা ঠাকুর গাে! নেচে
নেচে গান গায় সেই বাবা ঠাকুর গাে ! তােমার সঙ্গে দেখা কত্তে
আসছিল। কর্তাবাবু দেখতে পেয়ে এক ধমক, ভয়ে এগুতে
পাল্লে না, চোক ছলছল কত্তে লাগল বাড়ী থেকে বেরিয়ে
গেল। বাবা ঠাকুর তােমার কে হয় বউদিদি ?
শ্যামা—আমার দাদা যে রে ! তুই জানিস না ? আমায় ছােট বােন
বতে অজ্ঞান, এক দণ্ড দেখতে না পেলে চাদ্দিকে ছুটোছুটি
করে বেড়ায়। তুই একবার খিড়কী দিয়ে দাদাকে ডেকে আন্তে
পারিস? আমার গােটা কত কথা ছিল বতুম।
অধর-বেশ কথাটি বল্লে আর কি? আমার গর্দানা যাক। কি বলতে
হবে লিখে দাওনা? আমি চিঠি দিয়ে আসব, কেউ জান্তে
পার্কে না।
আমা–পাব ?
প্রথম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
W
অধর-খুব, খুব, ছেলেবেলায় গুরুমশায়ের টিকি চুরি করে রাখতুম।
শ্যামা—তবে দাড়া লিখে দিই।
(শ্যামার পত্র লিখন ও অধরকে প্রদান।)
এই নে চিটি, আর এই টাকাটি দিস্ দাদাকে। দেখিস কেউ
যেন না ছাখে।
অধর-ভেবনা বউদিদি, কাগে, ব’গে কেউ টের পাবে না।
{ অধর পত্র লইয়া কিয় র অগ্রসর হইয়া চলিয়া গেল।
এবং পুনরায় পশ্চাৎ ফিরিল।)
শ্যামা–আসবার সময় হাত খরচা দিয়েছিল মা, পুতি পুতি করে রেখেছিলুম,
আজ পূর্ণিমা সংক্রান্তি ঠাকুরের সেবায় লাগবে এখন। (অধরকে
ফিরিতে দেখিয়া) ফিরে এলি যে?
অধরা বউদিদি, চিটির এক পিঠে না দুপিঠে জবাব নিয়ে আসব ?
শ্যামা-না—তােকে নিয়ে আমার বড় আলা হ’ল। সােজা কথা একটা
বুঝতে পারিস নে ? যত মনে করি হাসব’না, তুই ও ছাড়বিনে।
অধর-বউদিদি, তােমার মুখে হাসি দেখলে আমার বুকটা যেন সাত
হাত হয়। তুমি মন গুমরে থাক, আমার চোকে সৃষ্টি সংসার
ফাকা ফাঁকা ঠেকে। দেবতার মত বড় দাদা বাবুকেও সময়ে
সময়ে ভাল লাগে না।
[ অধরের প্রস্থান।
( অন্য দিক দিয়া লালগোপালের প্রবেশ।
লালগােপাল—আপদ, আপদ, কোত্থেকে এক বালাই এসে জুটেছে।
ঘরে এসেও এক দণ্ড সােয়ান্তি নেই। বিশ্রী, বিশ্র চেহারা, সরে
যাও—সরে যাও।
শ্যামা~~-আমার রূপ নাই বলে তােমার সদা সর্বক্ষণ অশান্তি। তোমার
দুটি পায়ে ধরি, তুমি ফের বিয়ে করে সুখে ঘরকন্না কর । তােমার
চিন্তামণি। [ তৃতীয় অঙ্ক সুখ হলেই আমার ইহকাল পরকালের চরম সুখ হবে। আর একটি কথা রাখ, দুঃখিনীর ওপর দয়া করে একটি কথা রাখ। ভিখারিণীর ভিক্ষে চাইবার অধিকার আছে বলেই বলচি, রাগ করনা, বেশ্যা ছেড়ে দাও। লালগােপাল—সাবধানে কথা কয়াে ? যে অপ্সরা-বিনিন্দিতা ভুবনমােহিনী প্রতিমূর্তি প্রতি পলে পলে আমার চোকের সামনে খেলা কচ্চে । তাকে ত্যাগ কত্তে যে পরামর্শ দেয় সে আমার পরম শত্রু। যাও- সরে যাও। শ্যামা—চাদ্দিন বাদে আজ তুমি বাড়ীতে এসেচ শুনে দেখতে এলুম। লালগােপাল-দেখতে না মজা কত্তে এলে ? শ্যামা-ছিঃ ছিঃ অমন কথা মুখে এনো না। মজা শত্রু করুক। তুমি বােজ বাড়ী এসো, আমি তােমার ঘল্পে আসব না, রান্না ঘরে পড়ে থাকব। লালগােপাল--এখনও আসছি, আজ থেকে একদম আস’ব না। শ্যামা-না-না—তুমি বাড়ী আস’না মা কাঁদেন, বাবা রাগ করেন, বড় ঠাকুর কত কি বলেন তাতে আমার প্রাণে বড় কষ্ট হয়। তুমি বাইরে থাক, তােমার কাছে আমার মন দিনরাত পড়ে থাকে। তুমি জান না, কিন্তু আমি জানি তুমি যেখানেই থাক, যার কাছেই থাকনা কেন তবু তুমি আমার। তােমার ওপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার। সে সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন কত্তে তােমার সাধ্য নাই, বেশ্যার ক্ষমতা নাই, ভগবানের শক্তি নাই। লালগােপাল-তােমার সঙ্গে আমার কিসের সম্বন্ধ এখনও তা বুঝতে পারনি? টাকার লােভে বাবা তােমার সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছিল। স্বামী স্ত্রীর সম্বন্ধের জন্যে নয় ? তা যদি মনে করে থাক, মস্ত ভুল করে জীবনে।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। শামা—কিসের ভুল? তুমি আমাকে বাড়ীর দাসী বাদীর মত রাখবে রাখ। লাঞ্ছনা গঞ্জনা দেবে দাও। আমাকে ত্যাগ করে তুমি যদি সুখী ইও, আমার কোন দুঃখু কোন কষ্ট নাই। দিনান্তে তুমি আমায় একবার দেখা দিয়ে। অভাগিনী আর কিছু তােমার কাছে প্রত্যাশা করে না। লালগােপাল—যারা তােমার সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ন যথাযথ উপযুক্ত মনে করে এ বাড়ীতে আশ্রয় দিয়েচে যাও তাদের কাছে যাও, আমার সঙ্গে তােমার কোন সম্বন্ধ নাই। মা-অমন মর্মভেদী কথা তুমি আমার সামনে আর বলনা। তােমায় ভুল’ব মনে হলে আমি সংসার শূন্য দেখি। জীবন যন্ত্রণা মনে হয়। চির জীবনের ধ্যান! হৃদয় সর্বস্ব তুমি! বাপের বাড়ী থেকে আসবার সময় মা বলে দিয়েছিল “তুমি আমার ইহকাল পরকাল”। ছেলে বেলায় পাঠশালায় যেতুম মতাজী বলতেন- “তুমি আমার সাক্ষাৎ ধৰ্ম”। “চিন্তাদাদা” বলেছে—“তুমি আমার গুরু, ভগবান, ঠাকুর”। লালগােপাল—আমি তােমার মুগুর। তুমি আমার চিরজীবনের কণ্টক। তােমর জন্যে আমি মাতাল, তােমার জন্যে আমি বেশ্যাস। যাও, যাও, মাতালের কাছ থেকে সরে যাও। রূপের নেশা, বেলা ! বেলা ! (কক্ষান্তরে লালগােপালের প্রবেশ ও তন্মুহূক্তে আগমন। আমার বােতল কে নিয়েছে ? খামা--কিসের বােতল ? লালগোপাল--মদের বােতল। শ্যামা- -আমি নিয়েছি। লালগােপাল—কোথায় রেখেচ শীগ্গির দাও ?
চিন্তামণি।
{ তৃতীয় অঙ্ক
=
শ্যে। ---সে আমি ফেলে দিয়েছি।
গালাগাপাল—ভাল চাও’ত এখনও বার করে দাও ? না হলে—এই
চিউনী অচে গায়ে ‘াকা দোৰ পুড়িয়ে মাৰ্ব্ব।
শ্যাম---লুকিয়ে রেখে মিথ্যে কথা বলা আমার স্বভাব নয় ? আমি ফের
বল’চি সত্যি সত্যি ফেলে দিয়েছি। তুমি বােজ আনবে আমি
রোজ ফেলে দোব। তুমি না হয় মাৰ্বে ? মার খাব তবু নরকের
পথে তােমায় এগিয়ে দিতে পাৰ্ব না। বেশ্যার মত তােমায়
ভালবাসতে পাৰ্বনা, আমায় ক্ষমা কর।
লালপোল-দেখ তবে মজা।
(খামার দু হাত সজোরে ধরিয়া জল চিউনী লইয়া
শ্যামার গায়ে ছ্যাকা দিল।)
গান:——ওগাে তােমার দুটি পায়ে পড়ি, জলচে ফোস্কা পড়ল, ছেড়ে দাও,
ছেড়ে দাও।
লালােপাল-চঁচাবি ত তেল শুদ্ধ ঢেলে দোব গায়ে।
শ্যামা-দাও গাে তাই দাও--- আর সহ্য কত্তে পাচ্ছিনা।
লালগােপাল—দূর হ হতচ্ছাড়ী !
; লাথি মারিয়া চলিয়া গেল।
শ্যামা—(স্বগত) দনিনা । এখনও হয় নি, আরও কি সাজা আছে
অভাগিনী শ্যামাকে দাও! মন কাঁদিসনি, ওঁর অকল্যাণ করিসনি।
(দামিনীর প্রবেশ।)
দামিনী--মারেনি পরেনি কেউ, চাচাবার ভূঙ্গিমেটে একবার দেখ ?
মৃৎলব আশ পাশের লােককে জানান যে আমরা পরে ধরে
মারি। হাড়ে হাড়ে ভেল্কী খেলে।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। (বেগে হরলালের প্রবেশ ও শ্যামার প্রস্থান।) হরলাল—(দামিনীর প্রতি আমার শােবার ঘর কে খুলেছিল? লাল- গােপাল খুলেছিল বুঝি ? কে ওকে বাড়ীতে আসতে বলেছে? ছেলে অন্দর মহল থেকে মাতালের মত টতে টতে বেরিয়ে গেল আর তুমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে তাই দেখছিলে? মুখটা পুড়ে গেল না? নিশ্চয় তােমার আস্কারাতেই তার বুকের পাটা এতটা বেড়ে গেছে ? আজ সব এক গড় কৰ্ব্ব । শীগগির বল বলচি, কে ঘর খুলেচে ? দামিনী--কেন গা? কি হয়েছে? টাকা কড়ি চুরি গেছে নাকি ? নলিনীকে কাল তােমার ঘরের দিকে যেতে দেখেছিলুম বটে- ওকে 'অমরি সন্দেহ হয়। হরলাল-নলিনীর চোদ্দপুরুষের ঘাড়ে এত রক্ত নেই যে আমার ঘর খুলতে সাহস করে ? এ কাজ তােমার আর তােমার ছােট ছেলের ? আর আমি কাকেও সন্দেহ করি না। দামিনী--তৰ তুলসী অনিনা ছুয়ে বচি। হরলাল জে •রের পরিবার তুমি? তােমার আবার তাবা তুলসী ছুয়ে িিপ। ক বিশ্বাস কৰ্বে ? আমি ত ক না। দামিনী– ১ • 'f a .. ? আমার কথায় বিশ্বাস না হয়, বাড়ীর আৰু অ: 4}, 'অ৮ সকলকে জিজ্ঞেসা কর। হরলাল-•( উচ্চৈঃস্বরে) অধরা! 'অধরা ! ( নেপথ্য হইতে অধর।) ( অধরের প্রবেশ।) হরলাল-* : নব কে খুলেছিল রে ? তাের মা ঠাকরুণ দেখেচে-তুই
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অঙ্ক
= ১r ।
আর নলিনী এ কাজ করেচি? এখনও স্বীকার কর, না হলে
হাতকড়ি পরবে।
অধর-বাবু আমি এর বাষ্প বিন্দুও জানি না। আপনি বেরিয়ে গেলে
মা ঠাকরুণ আমায় বাজারে পাঠিয়েছিল। চাকরী কত্তে এসে
বাবু মনিবের টাকা চুরি, এমন কাজ আমার বংশে কেউ কখনও
করেনি। কথা ভাল নয়। আপনি গুণিয়ে দেখুন, না হয় বলুন
আমি মা “শেতলা” ঠাকুরের বামুনকে ডেকে আনচি, তিনি
ঠিক বলে দেবেন।
করলাল—'আচ্ছা দরওয়ানকে ডেকে দিগে ?
[ অধরের প্রস্থান।
( দরওয়ানের প্রবেশ ও হরলালকে অভিবাদন।)
ছােটা বাবুকো তােম্ কোঠিমে আনে দিয়া ?
দরওয়ান—হাম্ ত ছােটে বাবুকো বহুত রােখা হয়। বাকী ছােটে বাবু,
ঘড় বড় কিয়া। হামকো লাঠি লেকে মারূনে আয়া। হাম ত
নােকর হায় ক্যায় সে যােখে ?
হরলাল ছােটে বাবু তােমূকে তলব দেতে হু? নেহি বড়ি নিমক্কা
নােকর আয় তুম ? জাহান্নম্ মে যানে হোগা, হুসিয়ার রহহ ?
ঝি কো-ভেজ দেও।
[ দরওয়ানের প্রস্থান।
দামিনী-দেখলে ত? দরওয়ানকেই মাত্তে আসে আমি বারণ কল্লেই
কি শুনবে?
হরলাল-সােজায় কি শুনবে, প্যায়দায় শােনাবে ?
( নলিনীর প্রবেশ।)
হরলাল-নলিনী তুই জানিস কে ঘর খুলেছিল? যে ঘরে আমি শুই।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
.
নলিনী---ঘর খুলত কাকেও দেখিনি? গিন্নী মা আর ছোেটদাদা বাবু
ওই দিকে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল দেখেচি।
দামিনী--কখন রে নলিনী ?
নলিনী—গিন্নীমা তােমার মনে নাই ? সেই যে গাে আমি ওপরে উঠে
আসছিলুম।
দামিনী-দ্যাখ নলিনী মিথ্যে বলিনি? ধৰ্ম্ম আছে। তুই ত ওই দিক
থেকে বেরিয়ে এলি দেখলুম ?
নলিনী--সে কি গিন্নীমা? তুমি ত সব কত্তে পার ? গরীবদের ধৰ্ম্ম ভয়
আছে জেনাে। বড়লােকদের মত অমন মিথ্যে জানেনা।
হরলাল--যা চলে যা।
[ নলিনীর প্রস্থান।
দামিনী আর কাকে জিজ্ঞেসা কম্ভে বল ?
দামিনী—তুমি যা-ই মনে কর, আমি কিন্তু দেখে শুনে অবাক যাচ্চি।
এই ত মােটে রাত নটা বেজেছে। তুমি পুলিশে খবর দাও, মাথা
খাও এখনি খবর দাও।
হরলাল-দামিনী, এ কাজ যদি তােমার ছােট ছেলের প্রমাণ হয় ;
জেনাে, মা ব্যাটা দুজনকেই জেলে পূৰ্ব্বো।
| হরলালের প্রস্থান।
দামিনী- স্বগত) নলিনী বেটী ত দেখচি কম নয়? মিন্সের কাছে
আমায় অবিশ্বাসী করে দিলে। দাড়াও হাতে নাতে একবার
পেলে হয় ? চোদ্দ পুরুষের নাম ভুলিয়ে দেব।
[ দামিনীর প্রস্থান।
০
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অল্প
– ১ • * *
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
(শ্রীকান্তের আটচালা।)
শ্রীকান্ত আচ্ছা তাে ব্যাটা কি আমার আস্তানা ছাড়বিনি ? ফুরসুদ
পেলেই কি এইখানে এসে আড্ডা গাড়বি ? বলি তােত ব্যাটাকে
মেয়ে দেবে কে বল দেখি? ব্যাটার চাল নেই, চুলাে নেই, জন্ম
নেই ভাল, কৰ্ম্ম নেই ভাল, আম্বাটুকু আছে ষােল আনা ? বিয়ে
কৰ্বি ত কর্গে যা ? আমার কাছে ঘ্যান ঘ্যান কত্তে আসিস কেন ?
তাের বাবুকে বগে চমৎকার ক’নে খুঁজে আবে।
অধর-আজ্ঞে দাদা ঠাকুর, বাবু মশাইকে’ ত বলে বলে হার মেনেচি।
বাবু বলে কিনা-“আগে টাকা রােজগার কর, দুপয়সা হােক,
তারপর বিয়ে কৰ্বি।” আচ্ছা দাদা ঠাকুর, এটা কি একটা
কথার মত কথা হ’ল ? কবে দুপয়সা হবে বলে বয়েসটা’ত বােঝে
। ডঙ্কা ছোড়া ত বটে ? বল কি দাদা ঠাকুর? প্রাণের
মাঝে থেকে থেকে কে যেন উকি ঝুকি মারে। ঠিক যেন
ঘোটার ভেতর প্যাটা নাচে। দাদা ঠাকুর ঘােষ্টার ভেতর
খ্যামটা নাচে প্রাণটা কেমন করে ?
(গান।)
ঘোষ্টার ভেতর খ্যাষ্টা নাচে প্রাণটা কেমন করে,
( দাদা ঠাকুর গো প্রাণটা কেমন করে )
যখন ফুটফুটে বেশ ওঠে চাদ দাওয়ায় এসে পড়ে।
বাতাস বয় অন্ধ ছুটে,
ফুলের বুকে গন্ধ লুটে,
কোকিল ডাকে ঘুমিয়ে উঠে মন মজীন স্বরে।
তখন কে যেন যায় উকি মেরে, প্রাণের মাঝে নয়না ঠেরে ;
আমি হাই তুলে দেখি গা ঝেড়ে, যায় চলে সে
সােহাগ ভরে।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণ। ৭১ } শ্রীকান্ত—তাে ব্যাটার যে দেখ চি, বড় রস উথলে পড় চে? অধর-হাঃ হাঃ হাঃ! আজ্ঞে ধরেচেন ত ঠিক? না, দাদা ঠাকুরে কিছু বস্তু আছে। আঁতের কথা টেনে, ব্যথার ব্যথী না হলে কি কেউ লতে পারে ? সত্যি বলতে কি দাদাঠাকুর ? রাত্তিরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি—স্বর্গে থেকে যেন সব অপ্সরীরা নেমে এসে, আমার চাদ্দিকে ঘুরে ঘুরে নাচে গান গায়। কি চমৎকার সব চেহারা, মাজা ঘষা চাকন চেকন মুখ, রং দুধে আলতায় টুক টুক। আর বাকি একেবারে মধুমাখা, কেবল দাও হাপসে হাপসে চুমুক। দাদা ঠাকুর দিল্লীকা লাড্ড, দিল্লীকা লাড়ু শ্রীকান্ত—তাের মুণ্ড নিয়ে হাডু ডু ডু? ব্যাটা উচ্ছন্ন গেছে। এই অল্প বয়েসে যখন নারী প্রেম মস্তিষ্কে প্রবেশ করেচে পরকাল একেবারে ঝরঝরে। পাঁচটা পাঁচ রকমের দেখে শুনে দুরন্ত যৌবনে অদ্ভুত উন্ম দিগ্রস্ত হয়েছে। অধর-“আজ্ঞে দাদা ঠাকুর মনে কল্লে উন্মাদগ্রস্তকে দোরস্ত কৰে পারেন। সে গুণ দাদা ঠাকুরে জল জল কচ্চে। শ্রীকান্ত--কি রকম, কি রকম ? "অধর--অজ্ঞে যে রকম যে রকম হয়েছে। এই আপনি কল্লেন সম্বন্ধ ছােট দাদাবাবুর সঙ্গে দেখে শুনে। ছােট দাদাবাবু ফুল কেসীয়ানী বাবু। তেনার কি আর কালাে মেয়ে নজরে ধরে ? আহা! বউদিদির কথা ভাবতে গেলে প্রাণটা কত রে ওঠে, কলজেটা কেটে যায়। দাদাঠাকুর অঘটন ঘটালে ? শ্রীকান্ত—মেয়ে ত দেখেছিলুম ভাল ? যেমন ছেলে তেমি বউ হত। তাের বাবুর যে পছন্দ হলনা বল্লে-“মেয়ে কালাে না হলে কে টাকা পাওয়া যাবে না। আমার কি দোষ রে ব্যাটা? নচ্ছার, কুলাঙ্গার, অপগণ্ড, বেল্লিক।
१२
চিন্তামণি।
| তৃতীয় অঙ্ক
অধর-আহা দাদাঠাকুর চটেন কেন? আপােষে দুকথা হয়ে গেল, হঠ
করে মাথা গরম করেন কেন? এখনও বুঝি দাদাঠাকুরের চান
আহার হয় নি
ঐকান্ত—আহার তাের পিণ্ডি হবে।
অধর—দাদাঠাকুরের বুঝি গয়ায় স্থিতি ?
শ্রীকান্ত-দেখ লে, দেখলে, জল জ্যান্ত সামনে দাড়িয়ে, ব্যাটার আক্কেলটা
একবার দেখলে ? দূর হ, দূর ই।
অধর--রাগ ক’চ্চ দাদাঠাকুর, তবে চল্পম। দেখাে ফের যেন খােসামােদ
করে ডেক’না।
শ্রীকান্ত-ঘােমােদ কিরে ব্যাটা? আমি হচ্চি যজন যাজন বিশিষ্ট
ব্রাহ্মণ সন্তান। আর তুই ব্যাটা হচ্চি শূদ্রাধম, নরাধম,
পাপিষ্ঠ। আমি যে তাের সঙ্গে বাক্যালাপ করি সে তাের
চোদ্দপুরুষের ভাগ্যি।
অধর—একশাে বার, একশাে বার। আমার বাপ ঠাকুদ্দ। ব্রাহ্মণের
পাদোদক না নিয়ে জল গ্রহণ ক’ত্ত না। আমি ত আর তাদের
ছাড়া নই। দিন একটু পদধূলি দিন । তবে এখন অসি দাদা
ঠাকুর।
( প্রণামান্তর অধরের প্রস্থান।
ঐকান্ত--যা ব্যাটা একদম চোকের ফারাকে যা। ব্যাটার ভক্তিকে
বলিহারী।
এত বকি, মারি, সব হেসে উড়িয়ে দেয়। কি জানি,
কি যাদুমন্ত্রে আমায় ভুলিয়েচে। না ডেকেও থাকতে পারিনা।
( নেপথ্যের দিকে চাহিয়া।)
কাঠ ঠো মাগী চিন্তের মা’টা এদিকে আসচে নয়? না,
মালাগাছটা বার কত্তে হ’ল। (শ্রীকান্ত মালা লইয়া ঘুরাইতে
লাগিল।) কি জানি নিষ্ঠাচার না দেখলে কলাটা, মুলােটা,
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি
যা দুচার আনা পাই হয় ত তাও বন্ধ করে দেবে। কাজ নাই
যস্মিন্ দেশে যদাচার।
(বামুনমার প্রবেশ ও শ্রীকান্তকে প্রণাম।)
এস মা, কল্যাণ ক্।ে বাড়ীর সমস্ত মঙ্গল ত ? চিন্তা বেশ
ভাল আছে ত ?
বামুনমা-চিন্তা ভাল আছে বটে—কিন্তু তার স্বভাব চরিত্র দিন দিন যে
রকম দেখচি । উপযুক্ত শাসন ভিন্ন সে কুঅভ্যাসকে শােধরান’র
আর অন্য উপায় নাই।
শ্রীকান্ত—কেন মা, চিন্তাকে ত কখনও কুসংসর্গে বেড়াতে দেখিনি ?
বামুনমা--গুরুতর অপরাধ করেচে চিন্তা। তার মুখ দেখতে আর আমার
ইচ্ছে নাই।
শ্রীকান্ত--কেন মা, চিন্তা কি তােমায় কোন কটুবাক্য বলেচে ?
বামুনম-আমায় বল্লে ক্ষতি ছিল না। আমাদের কুলদেবতা রাধাকান্ত
জাউর অমৰ্যাদা করেছে।
শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী ঈশ্বরের সাক্ষাৎ
মূর্তিকে কৌতুক ব্যঙ্গ।
শ্রীকান্ত—আঁ বল কি ? এত বড় আস্পদ্ধ! ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র বালকের
এত অহঙ্কার ? না বিধিমত শাসনই এ ক্ষেত্রে নিতান্ত প্রয়ােজন।
বামুনমা—আপনাকে আজ থেকে আবার ঠাকুরের পূজো কত্তে হবে।
চিন্তা যদি পূজোর সময় কোনরূপ অন্যায় উপদ্রব করে আমাকে
গােপনে জানাবেন।
শ্রীকান্ত—যাও মা, পূজার আয়ােজনাদি করে রাখগে, আমি গঙ্গাস্নান
করে এখনই যাচ্চি।
[ প্রণামান্তর বামুনমার প্রস্থান।
গঙ্গাস্নানটা বাসাতেই এক রকম করে সেরে নােওয়া যাবে।
আবার এতটা পথ হাঁটে কে ? দক্ষিণা ত মাস গেলে অষ্টগণ্ডা।
২৪ চিন্তামণি। [ তৃতীয় অঙ্ক এ দিকে বেলাও সম্ভব নটা বাজে। না, একটুজলযােগ করে যাওয়া যাবে। মাগী যে রকম খুঁত খুতে, চট করে যে পূজো সেরে উঠ’ব তার মােটি নেই। | শ্রীকান্তের প্রস্থান। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। { বন-পথ।) প্রিয়ম্বদা-এ অামায় কোথায় নিয়ে এলেন? এই জনশূন্য নিবিড় অন্ধকারে ঢাকা বনের মধ্যে আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ? রূপানন্দ--আর বেশী দূর নাই। ওই অদূরে আমার আশ্রম দেখা যাচ্চে। ওই দেখ ! শূন্য পড়ে আছে। নিরাশ, বিক্ষুব্ধ হৃদয়ে, বিরহ সন্তাপিত জীবনের ব্যাকুলতা নিয়ে—ওই অনন্ত আকাশের মত শূন্য হৃদয়ে তােমার দিকে সর্তৃষ্ণ নয়নে চেয়ে আছে । বাঞ্ছিত বনদেবীর আগমন সংবাদ জানিয়ে দেবার জন্যে, নব মুকুলিত পল্লবে পল্লবে ওই শােন—মধুকরের গুঞ্জনধ্বনি বীণা- যন্ত্রের আলাপ রাগিণীতে তোমার আবাহন কচ্চে। চল চল। মানস-রঞ্জিণী ? কন্দর্পললামভূত—নয়ন অপাঙ্গে মদনসোহাগিনী ! এই শ্বাপদ সঙ্কুল মহারণ্যের গভীর নীরবতার মধ্যে—রতি সুখ সাধনে অাত্মতৃপ্তি কৰ্বে চল ? প্রিয়ম্বদা-আপনি আমায় আজ ওসব কথা কি বল্চেন ; আমি কিছু বুঝতে পাচ্চিনা ত? আমায় হরি কথা শােনান। সেই নিখিল- ভয়হারী ভক্তবৎসল ভগবানের নাম কীর্তন করুন। শুনতে শুতে আমার হৃদয় রােমাঞ্চিত হয়ে উঠুক আর আমি সাক্ষাৎ তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। শ্রীহরির মূর্তি--আপনাতে দর্শন করে নারী জন্ম সফল করি। আমায় সেই উপদেশ দিন। রূপানন্দ—প্রিয়ম্বদা ! যে সাধনার প্রলােভনে তােমায় নিত্য হৃদয়ে আকর্ষণ করেছি সে সাধনা-গুরুশিষ্যের নয়, ভক্ত ভগবানের নয়, সে সাধনা-পুরুষ প্রকৃতির। সেই আদ্যশক্তি মহাশক্তি স্বরূপিণী--মহা প্রকৃতির, আর সেই অনাদির আদি পুরুষ সেই মহাপুরুষ-মহাকালের, একত্র মিলনের প্রতিদান স্বরূপ যে ভালবাসা সৃষ্টির প্রথম এবং সৃষ্টির শেষ ; সেই পতি পত্নীর মধুর 'অবিচ্ছিন্ন সম্ভোগ সাধন ভিন্ন সে সাপনার আর অন্য কোন উদ্দেশ্য নয় বুঝতে পাল্লে ? প্রিয়ম্বদা—গুরুদেব! অনাথিনী রমণীকে নির্জনে একাকিনী পেয়ে- পরীক্ষা করে দেখ চেন পাৰ্ব কিনা? এই দেখুন, আমার হৃদয়ে, মস্তকে, সর্বাঙ্গে শ্রীহরির মূর্তি আঁকা। আপনাতে যদি আমার মতিগতি অচল থাকে, কার সাধ্য আমায় ইষ্টদেবের চরণ থেকে বঞ্চিত করে ? বলুন, বলুন, সেই অনাথের নাথ শ্রীনাথের কথা আমায় বলুন? ছলনা কৰ্ব্বেন না। কৃপান--প্রিয়ম্বদা ! ছলনার কাৰ্য শেষ হয়েছে। এইবার মনস্কামনা পূর্ণ হবার দিন সমাগত। খঞ্জন অঞ্জন বিগলিত! মন্মথ মনমােহিনী তােমার ওই নবনীত, সুকুমার বক্ষ মাঝে প্রণয়-রাগ-রক্ত চন্দনে চৰ্চিত করে একান্তে বনফুল হারে সাজাইগে চল ? প্রিয়ম্বদা-গুরুদেব । আপনাকে দেখে আজ আমার ভয় হচ্ছে কেন তা বুঝতে পাচ্ছিনা। বুকের ভেতর দুর দুর করে কেঁপে উঠছে। আপনার পানে চাইতে পাচ্ছিনা কেন ? না--আপনার দোষ নাই। পাপমন আমার অবিশ্বাস এনে বারম্বার ছলনা কচ্চে। ক্ষমা করুন দাসীর অপরাধ।
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অঙ্ক
কৃপানন্দপ্রিয়ম্বদা তােমায় বারম্বার বলচি ছলনার কাৰ্য শেষ হয়েছে।
এইবার মনস্কামনা পূর্ণ হবার দিন সমাগত। চল, চল, আর
বেশীক্ষণ এখানে থাকা উচিত নয়, এখনি বন্য পশুর বঙ্গক্ষেত্রে
এই স্থান পরিণত হবে।
( অগ্রে কৃপানন্দ পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রিয়ম্বদার গমন।)
প্রিয়ম্বদা-গুরুদেব! দয়াময় ! একি মহাসঙ্কটে অভাগিনীকে ফেলে
দিয়ে—একি! কঠোর পরীক্ষা প্রভু ! রক্ষে করুন, অসহায় অবলা
নারীকে রক্ষে করুন।
[ প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
( ঠাকুর বাড়ী।)
সম্মুখে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি।
( চিন্তা, ফুল ও চন্দন দিয়া ঠাকুরের পূজা করিতেছে।
চিন্তা-পূজা অন্তে ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া ) ঠাকুর, ঠাকুর, আজ আর
আমায় ফাকী দিতে পাৰ্বেনা। তােমার ওই রাঙ্গা মুখে--ক্ষীর,
সর, তুলে দিই তুমি খাও, আমি দেখি। মা তােমার জন্যে
বড় যত্ন করে শেতল সাজিয়েছেন। আগে মায়ের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ
কর। এই নাও ক্ষীরের নাড়টি আগে খাও। ( ঠাকুরের মুখে
ক্ষীরের নাড়ু, দিল।) মা, মা, ঠাকুর তােমার ভক্তি ভােরে বাঁধা
দেখবে এস। আমি আর কোথায় কি পাব ঠাকুর? জেঠীমা
পয়সা দিয়েছিল খাবার খেতে, তােমার জন্যে ভাল সন্দেশ কিনে
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
৭৭
আঁচলে বেঁধে রেখেচি। এই নাও সন্দেশটি খাও। তুমি খেলে
আনন্দে আমার ক্ষিধে তেষ্টা কোথায় চলে যায় তা জান্তেও
পারিনা। এই নাও জল খাও। (জলের গেলাস লইয়া ঠাকুরের
মুখে ধরিল।) এইবার একটু বাতাস করি, তুমি শশাওগে আমি
এখন যাই। বেশীক্ষণ থাকলে লােক জানাজানি হবে। তা হলে,
আমি আর তােমায় দেখতে পাবনা।
( চিন্তা ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া, ঠাকুর দালান হইতে
নামিয়া, রাস্তার অপর পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইল।)
( অধরের প্রবেশ। )
অধর—প্ৰাৰ্তপ্রণাম বাবা ঠাকুর। মনমরা হয়ে ভাবছেন কি?
চিন্তা—অধর, অধর, যার ভাবনা আমায় দিনরাত অস্থির করে তােলে ।
সে আমার কেমন আছে বল ? আমার শ্যামা কেমন আছে বল ?
ভাল আছে ত?
অধর-ভাল আর বলি কেমন করে বাবা ঠাকুর ? দিনরাত ফিক্ বেদনা,
চলতে ফিতে, খাবার সময় পর্যন্ত নিস্তার নেই। অসহ্য বেদনা।
চিন্তা—অধর তুই কি রচিস্ আমি কিছু বুঝতে পাচ্ছিনা।
ধর—পাৰ্ব্বেনা বাবা ঠাকুর, আজ পাবেন। পার্কে কাল, হাসবে
কাদবে পাড়বে গাল।
চিন্তা—অধর তুই সত্যি করে বল।
অধর-সত্যি বলে বিশ্বাস কই ঠাকুর ?
চিন্তা—না, না, বিশ্বাস কৰ্ব্ব, তুই বল।
অধর–ছােট দাদা বাবুকে ত জানেন, তিনি ঠিকানায় থাকেন, ঠিকানায়
খান। বাড়ীর সঙ্গে তার কোন সম্পর্কই নেই। বাড়ীতে কর্তা-
বাবু, গিন্নীমা, আর বড় দাদাবাবু। বড়দাদার কথা ছেড়েই দিন
—তিনি এক রকম বিবাগী বল্লেই হয়। কাবাবু আর গিন্নীমা,
৭৮ চিন্তামণি। [ তৃতীয় অঙ্ক বউদিদিকে আমার অষ্টপ্রহর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মার্চে। এর চেয়ে ফি বেদনা আর কি হবে বাবা ঠাকুর ? চিন্তা—অধর তুই ভাবিসনি, ঠাকুরের কৃপায় সব ঠিক হয়ে যাবে । অধর—বাবা ঠাকুর, বাবা ঠাকুর, তাই বলে তাই বলে। তােমার মুখে ফুল চন্নন পড়ুক। বৌদিদি আমার হেসে খেলে বেড়াক, আমি প্রাণপণে সংসারে খাটি আর হাসতে হাসতে বৌদিদির ফাই ফরমাস শুনি। আমার মাগাে বাবা ঠাকুর আমার মা। ছেলে বেলায় এক মা পেয়েছিলুম তখন মাকে চিন্তুম না, সে মা খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করে হাসতে হাসতে একদিন অন্ধকারে কোথায় মিলিয়ে গেল আর দেখতে পেলুম না। আবার আর একজন মা হল। এ মাও পাছে ফাকী দিয়ে চলে যায়, তাই ভয় করে বাবা ঠাকুর বড় ভয় করে। চিন্তা-অধর, অধর, দে, দে তাের পায়ের ধূলো আমায় একটু দে। আমায় একবার স্পর্শ কর। অধর—এই ত বাবা ঠাকুর, পাগলামী জুড়লে। এই দুঃখে ত তােমার কাছে আসিনা। আমার কি বল, বউদিদি চিটি দিয়েছিল, না হয় ফিরিয়ে নিয়ে যাব। চিন্তা–অধর, শ্যামার চিটি কই দে? অধর—চিটি কোথায় পাব ? পাগলামী, পাগলামী। চিন্তা-~-অধর, তুই আমার মনের অবস্থা বুঝতে পাচ্ছিস না ; তাই বলছিস পাগলামী। শােন তবে। ( গান।) পারিস যদি আয়, তবে আয়রে ছুটে প্রাণের টানে ঠাকুর জানে তার উপায়। কর’রে নাম জপের মালা, ঘুচবে রে তাের ভবের জ্বালা, করিসনিক অবহেলা, সময় বয়ে যায় । ;
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
৭৯
গেছে রে কাল কতই কেটে, মিছে কাজে কেবল খেটে
পড়না হরির পায়ে লুটে, থাকবি ফুটে রাঙ্গা পায়।
অধর—বাবা ঠাকুর, বাবা ঠাকুর, হেসে খেলে বেড়িয়েচি চিরদিন ; আজ
আমাকেও কাঁদালে। দাও বাবা ঠাকুর, তােমার পা দুটো
আমার মাথায় একবার ঠেকিয়ে দাও। আমি পতিত পাবন
বলে তােমায় একবার ডেকে নিই। না, আর তােমায় যন্ত্রণা
দোবনা। এই নাও বৌদিদির চিটি, আর এই টাকাটি দিয়েছে।
চিটিতে সব লেখা আছে।
( চিন্তাকে পত্র ও টাকা দিল।
চিন্তা—অধর তুই বড় ভাগ্যবান, ঠাকুর যুগল মূর্তিতে তাের হৃদয়ে নিত্য
বিরাজ কচ্চেন।
( পত্ৰ খুলিয়া চিন্তা আপন মনে পড়িল।)
সাধে কি বলি ঠাকুর দাসী ? ঠাকুর নিয়ে খেলা হাসি। সাধ
গিয়েচে ঠাকুরকে নতুন গুড়ের সন্দেশ আর নতুন কমলালেবু
খাওয়াতে। ভালবাসার খেলাই এই। যাই কিনে এনে ঠাকুরকে
আ
[ চিন্তার প্রস্থান।
অধর--বাবা ঠাকুর আমার সাক্ষাৎ বাবা ঠাকুর। আহা! দেখলে
প্রাণটা একদম ঠাণ্ডা। এমন বাবা ঠাকুরকে কি ছাড়তে
আছে। যাই পেছু নিইগে।
[ অধরের প্রস্থান।
( শ্রীকান্তের প্রবেশ ও মন্দিরের নিকট গমন।)
শ্রীকান্ত-দরজায় ফুল চন্দন কে ছড়িয়ে গেল ? নিশ্চয় চিন্তার কাজ।
মাগীকে ডেকে একবার দেখাই। ওগাে মা আছো? এখন আর
সাড়া শব্দটি নেই! না থাগে আমার কাজ সেরে চলে যাই।
দিই।
চিন্তামণি। [ তৃতীয় অঞ্চ ( শ্রীকান্ত ঠাকুর ঘরে গমন করিল এবং ঠাকুরের সম্মুখে বসিল।) আসা গেছে যখন একবার কোশাকশিটে নাড়া যাক্। (শ্রীকান্ত কোশাকুশি নাড়িয়া ওঁ বিষ্ণুঃ তিনবার উচ্চারণ করিয়া সন্ধ্যায় বসিল।) (অধরের প্রবেশ।) অধর—দেখতে দেখতে একেবারে চোকের অদৃশ্য হয়ে গেল গা ! কোন পথে যে গেল বাবা ঠাকুর মােটে ঠাওর কত্তেই পান্নুম না। ধরা দিলে ধৰ্ব্বে কে ? (সহসা ঠাকুর ঘরের দিকে চাহিয়া ) ঠাকুর ঘরে দাদা ঠাকুরের মত কে দেখ চি নয় ? ( একটু অগ্রসর হইল।) দাদা ঠাকুরই’ত বটে ? একটু আড়ালে যেতে হ’লকি করে দেখি। ( অধর এক পাশে গিয়া লুকাইল।) শ্রীকান্ত (স্বগত) মাগী আজ জলযােগের ব্যবস্থাটা করেচে ভাল। বেলা থাকতে থাকতে আমিও কালাচঁাদ চড়িয়ে দিয়েচি। মােতাতটা জমবে ভাল। মিষ্টান্নটা এইবার নিবেদন করে দেয়া যাক। নিবেদন আর কি ছাই কৰ্ব ? ঠাকুর ত সৃষ্টি সংসার খেয়ে বসে আছে। কি বলব পােড় পেট হচে বালাই, না হলে শ্রীকান্ত শৰ্মা এতদিন ঠাকুরের দফারফা করে ব্যোম্ কেদারনাথ হয়ে বসে থাকত। না, রসনায় ক্রমশঃ রস সঞ্চার যেরূপ বৃদ্ধি হচ্চে দু একটা মিষ্টান্ন উদরস্থ ব্যতিরেকে নিশ্চল হয়ে লােভ সংবরণ করা দুরূহ ব্যাপার। কেউ কোথাও না-ই ত? ( আশে পাশে এক- বার দেখিয়া শ্রীকান্তের মিষ্টান্ন ভক্ষণ।) ( অধর আড়াল হইতে আসিয়া শ্রীকান্তের সম্মুখে দাড়াইল।) ।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
=L
অধর—দাদা ঠাকুর, দাদা ঠাকুর, বেশ পূজো হচ্চে। এর নাম ঠাকুর
পূজো-না পেট পূজো দাদা ঠাকুর ?
শ্রীকান্ত—( সন্দেশ গলাধঃকরণ করিতে করিতে ) আরে মলাে এ গুয়াে
ব্যাটার সন্তান কোথায় ছিল রে ? আচ্ছা তুই ব্যাটা কি বাঘের
পেছু ফেউ লেগেছিস ?
( শ্রীকান্ত ঠাকুর ঘর হইতে বাহিরে আসিল।)
যেখানে যাব গুয়াে ব্যাটার সন্তান কি ঠিক সেই খানে গিয়ে
হাজির? মড়া পােড়াতে গেছি, সেখানেও নিস্তার নেই। যমের
বাড়ী গেলে কি কৰ্বি রে গুয়াে ব্যাটার সন্তান ?
অধর—আজ্ঞে দাদা ঠাকুর, সে মৎলব ত অনেক দিন থেকে ভেজে রেখেচি
যে দিন আমি মৰ্ব দাদা ঠাকুর, সেদিন তুমি ও বুঝলে কিনা ?
শনি মঙ্গলের মড়া গােদোসর না নিয়ে যায় না।
(শ্রীকান্ত অধরের চুলের মুটি ধরিল ও অন্য
হাতে গলা টিপিয়া ধরিল।)
দাদা ঠাকুর ছাড়ুন, ছাড়ুন।
অঙ্গ হানি কৰ্ব্বেন না । এখন ও
আইবড়।
শ্রীকান্ত—ব্যাটারি কি মার খেয়ে ও লজ্জা আছে। বেল্লিক, বেল্লিক।
ছােট লােক জাতটাই আলাদা।
অধর—-আজ্ঞে যারা ঠাকুরকে ফল মূল নিবেদন কব্বার আগেই ;
নৈবিদ্যির কলাটা সন্দেশটার প্রতি দৃষ্টি দেন, এই তাদের চেয়ে
ছােট লােক জাতটা বড় কিছু বেশী ছােট নয়।
শ্রীকান্ত ক্রোধভরে ) ব্যাটা মুখ সামলে কথা ক’স ?
অধর—দাদা ঠাকুর দিব্যি চলছিল টপাটপ্।
শ্রীকান্ত---তাের বাবার কি রে ?
৮২
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অঙ্ক
অধর--আজ্ঞে আমি ও ডােল সহরতের ব্যবস্থা করে রেখেছি। চলুম
দাদা ঠাকুর।
[ প্রস্থানােত।
শ্রীকান্ত—ওরে শােন্, গুয়াে ব্যাটার সন্তান না মলে নিশ্চিন্দি নাই।
ওরে তাের বিয়ের সম্বন্ধ করেছি।
অধর-না, ফিরতে হ’ল। কি বল দাদা ঠাকুর, দাড়াবার সময় নেই ?
শ্রীকান্ত। বলছিলুম কি ? তাের একটা চমৎকার ইহুদি প্যাটার্ণের
মেয়ে ঠিক করেচি। হ্যা তাের কার সন্তান বল দেখি ?
অধর-আজ্ঞে, আমরা বাবার সন্তান।
শ্রীকান্ত—ওরে ব্যাটা সে সন্তান নয়। তােদের বংশের আদি পুরুষের
নাম কি ?
অধর---আজ্ঞে তখন’ত আমি জন্মাই নি দাদা ঠাকুর। কেমন করে
জান’ব বলুন ?
শ্রীকান্ত—আচ্ছা তােদের মেল কি ?
অধর-দার্জিলিং মেল ।
শ্রীকান্ত-মুখস্য লাট্টেীষধি। ছােট লােকে নাই দিলে মাথায় ওঠে
এখন বুঝতে পাচ্ছি।
অধর—দাদা ঠাকুর ও কথা বলবে না বল’চি। ব্রাহ্মণ আমাদের মাথার
মণি। দিন একটু পদঃরজ দিন। এই আমাদের পথের সম্বল।
[ শ্রীকান্তকে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল।
( বামুনমার প্রবেশ ও ঠাকুরকে আগে প্রণাম করিয়া
পরে শ্রীকান্তকে প্রণাম করিল।)
একান্ত--এই যে মা এয়ে, তােমার কাছেই যাচ্ছিলুম। আমার দ্বারা
বাছা ঠাকুর পূজো আর হবে না। তুমি অন্য লােক ঠিক কর।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
২৫ -
যে রকম তােমার ছেলের দৌরাত্ম্য আমার বাবার সাধ্য নাই
যে শাসন করে। অবিহিত রূপে শাস্ত্র বাক্য লঙ্ঘন, ঠাকুর ঘরের
তৈজস পত্ৰ চারি দিকে ছড়ান, তুমি জানাতে বলেছিলে এখন যা
ব্যবস্থা হয় কর।
বামুন মা—এখন ও আমার আজ্ঞার প্রতীক্ষায় আছেন? রাখুন চাবী
দিয়ে অন্ধকার ঘরের মধ্যে অবাধ্য বালককে অবরােধ করে রাখুন।
অনাহারে, উপবাসে, কয়েদীর মত প্রহারে অঙ্গ ক্ষত বিক্ষত করে,
কঠোর শাসনকেও যদি উপেক্ষা করে আমাকে জানাবেন,
দূর করে দোব জন্মের মত চোখের আড়ালে।
[ বামুনমার প্রস্থান।
শ্রীকান্ত— মাগী তেজীয়ান বটে। অমন না হলে কি ছেলে শাসন হয় ?
ছোঁড়াটা ভারী বাড় বেড়েছে। এইবার উত্তম মধ্যম ওষুধ দিতে
[ শ্রীকান্তের প্রস্থান।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
( স্বয়ম্ভুর ভিতর বাড়ীর উঠান।)
নলিনী --বল’ব কি মা, তোমার মেয়েকে ধরে ধরে মারে। অমন যে
শিরতিমের মত রূপ ছিল ; একেবারে কালী মেরে গেছে।
তােমার বেয়াই বেয়ান মেয়ের গা থেকে সমস্ত গয়না কেড়ে
নিয়েছে। তােমরা ভদ্র লােক হয়ে সহ কর, আমাদের ছােট।
লোকের ঘরের হলে এতদিন থানায় খবর দিয়ে ; পুলিশের লােক
সঙ্গে নিয়ে গিয়ে মেয়েকে জোর করে নিয়ে আসত।
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অষ্ণ
শ্বশুর বাড়ীতে ঘর করার চেয়ে সােয়ামী ত্যাগ করে বাপের
ভাতে থাকলে কিসের নিলে গা ? মেয়ে বেঁচে থাকলে তবে ত
জামাই ?
ললিতাহঁা গা, জামাই আমার মেয়েকে কিছু বলে নাকি ?
নলিনী--তুমি ঠাণ কেমন ধারা অবুঝ ? জামাই যদি মানুষ হত
তা হলে কি ভাবনা ছিল। একদিন তােমার জামাই নেশা করে
তােমার মেয়েকে মেরেছিল। আমি কি ছাই জাম, তােমার
মেয়ে পিঠ ঢেকে ঢেকে বেড়াত। একদিন চা'ন কচ্ছিল হঠাৎ
দেখতে পেলুম ফোস্কার মত দাগ গােটা পিঠময় স্পষ্ট হয়ে রয়েছে।
ললিতা—আঁ! আঁ! তবে কি আমার শ্যামার আপনার বতে সেখানে
আর কেউ নাই। শ্যামারে ! বাছারে ! তাের ননীর অঙ্গে না জানি
কত ব্যথা যন্ত্রণা হয়েছে মা। বড় সাধ করে বলেছিলুম তােক
ভাল ঘরে ভাল বরে দোব। আহা ! মা কমলাকে 'অসুরের
হাতে লাঞ্ছনার জন্যে সঁপে দিয়েচি। মাতালের হাতে সঁপে দিয়েছি
মা। হতভাগীর গর্ভে এসে তাের কপালে এত কষ্ট ছিল।
নলিনীকেঁদনা মা, কেঁদনা । কৰ্ত্তা বাড়ী এলে ঠাণ্ডা হয়ে বুঝিয়ে
সব বলে। তিনি পুরুষ মানুষ যা হয় এর একটা বিহিত কৰ্বেন।
আমি তবে এখন আসি মা।
| নলিনীর প্রস্থান।
(বামুনমার প্রবেশ।)
বামুনমা—বৌমা, কাদচ কেন মা?
ললিতা—শ্যামার শ্বশুর বাড়ী থেকে লোক এসেছিল।
বামুনম-কেন গ্লামার কথা কিছু বলে নাকি ?
ললিতা—বাছাকে আমার বাড়ীর সকলে ধরে ধরে মারে, জামাই নাকি
মেরেছিল। আমি আর ত্যামার যন্ত্রণার কথা কানে শুনতে
।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
* *
পারি। আমার হাড় ক’খানা এখন মা গঙ্গার গর্ভে গেলেই
বাঁচি।
বামুনমা—ছিঃ মা, অমন অলক্ষুণে কথা কি মুখে আনতে আছে ?
তুমি মা ঘরের লক্ষ্মী, সংসারের শােভা। কেঁদনা মা, ছেলে বাড়ীতে
আসুক, যাতে শামাকে এ বাড়ীতে আন্তে পারি তার ব্যবস্থা
কচ্চি।
ললিতা—তুমি বল্লে তােমার কথা ঠেলতে পাৰ্ব্বেন না। আমি বলতে
গেলে কেবল রাগ করেন।
বামুন-সে জন্যে মা ভেবনা, আমি তার উপায় কৰ্ব্ব। মনে করে-
ছিলুম কাশী যাব, তা আর বােধ হয় হয়ে উঠল’ না। সামনে
জলসংক্রান্তি বাবা বিশ্বেশ্বরের মাথায় জল দোব মানত করেছিলুম
কিন্তু কি ক ছুঁড়ীটার একটা ব্যবস্থা না করেও ত যেতে
পাচ্ছিনা। আহা! বিয়ে হয়ে পৰ্য্যন্ত ছুড়ীটার একদিনের জন্যে
সুখ হলনা।
( চিন্তার প্রবেশ )
চিন্তা-জ্যাঠাই মা, জ্যাঠাই মা, এই যে মা’ও আছ। শ্যামা চিঠি
দিয়েচে, কি লিখেচে শুনবে ? শােন।
চিন্তার পত্র পাঠ।
“আমার ভাবনা যিনি ভাববার তিনি ভাবছেন। তােমরা ভেবে
কিছু কত্তে পাব্বে না।” দেখলে’ত জ্যাঠাই মা ? ঠাকুর বলে কত
টান। শ্যামা যে ঠাকুরকে বিয়ে করেচে, চিঠির ইসারাতে বুঝতে
পাচনা জ্যাঠাই মা ? ঠাকুর যে তােমার জামাই গাে ! তােমার
মেয়ের আবার ভাবনা কিসের?
বামুনাে-চিন্তা আমার সামনে তােমার অমন ভাবে কথা কওয়া
উচিত
নয় তা জান ? চিঠি তুমি কোথায় পেয়েছ ? কে দিয়েছে ?
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অঙ্ক
চিন্তা-মা, কাল সন্ধ্যার সময় আমি যখন ঠাকুর বাড়ীতে গিয়েছিলুম
শ্যামার শ্বশুর বাড়ীর চাকর এসে চিঠি দিয়ে গেছে।
বামুনমা-ঠাকুর বাড়ীতে কি কত্তে তুমি গিয়েছিলে ?
‘চিন্তা–পূর্ণিমা সংক্রান্তির দিন ঠাকুরকে দর্শন কত্তে গিয়েছিলুম।
জীবন সার্থক হয়েছে মা, এমন দর্শন আর জীবনে কখনও হয় নি।
ঠাকুর আর শ্যামা, শ্যামা আর ঠাকুর। কি সুন্দর ! কি সুন্দর ।
বামুন—দূর হও আমার সামনে থেকে বংশের কুলাঙ্গার। আজ
থেকে আমি তােমার বিমাতা, তুমি আমার পরম শত্রু।
ঠাকুরের সঙ্গে শ্যামার তুলনা কত্তে তােমার বাবােধ হলনা?
জিব খসে পড়ল না, তােমার মৃত্যু হলনা কেন ?
চিন্তা—আমার কি দোষ মা, ঠাকুর যেমন দেখাচ্চেন তেম্নি দেখচি।
[ চিন্তার প্রস্থান।
ললিতা—মা, অমন করে তুমি আর বাছাকে কঠিন কঠিন গল দিওনা।
যাটসষ্টার দাস বংশের দুলাল, বাড়ীতে একটা ছেলে নাই; শিব
রাত্তিরের সলতে। তামাকে পর করে দিয়েছি তবু চিন্তার মুখ
দেখে ভুলে আছি।
বামুনমা-সাক্ষাৎ জাগ্রত শ্রীবিগ্রহের যে জপমান করে, তার মত নরাধম
পশুর জননী হওয়াও মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত।
জাননা? যে মা ছেলের চরিত্রের দিকে লক্ষ্য না রেখে কেবল বংশ
রক্ষের কারণ মনে করে সন্তুষ্ট হয় সে মা পুত্রঘাতিনী।
( নেপথ্য হইতে কাবুলীয় চীৎকার করিয়া
স্বয়কে ডাকিল।)
কাবুলীয়বাবু সা হয় ?
বামুন-বৌমা, সদরে কে ডাকচে নয়? বােধ হয় ছেলে এসেছে,
দরজা খুলে দিয়ে এসো।
বৌমা তুমি
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
৮৭
ক + ১
বৌমা,
ললিতা—তার আওয়াজ’ত মা এ রকম নয় ?
(নেপথ্য হইতে কাবুলীদ্বয় পুনরায়
চীৎকার করিল।)
কাবুলীদ্বয়বাবু সা হয় ?
বামুনকে ডাকে গা ? (নেপথ্যের দিকে চাহিয়া )।
বৌমা, ভেতরে গিয়ে শীগগির খিল দিই গে চলল। দুটো কাবুলে
বাড়ীতে এসেচে।
(বামুন ও ললিতা ভিতরে গিয়া কক্ষ মধ্যে
অর্গল বদ্ধ করিল।)
( চিন্তার সহিত কাবুলীদ্বয়ের প্রবেশ।)
কাবুলীদ্বয়কঁহা গিয়া জদী বােললা ? বাবু কাঁহা হায় জী বােলা।
চিন্তা-বাবু বাড়ী নাই সাহেব।
কাবুলীদ্বয়—জরুর হায় ? ইস্ কোঠিমে ছিপায়কে ঝুটে বাৎ বােলতে ?
রূপেয়া লে আও?
চিন্তা--সাহেব, বাবু এলে বব।
কাবুলীদ্বয়-কুছ বাৎ নেহি, রূপেয়া দে’কে বাৎ কহাে। বাবু, সাব
জরুর কোঠিমে হায় ? কোঠিকা অলর মে যায়েগা ? ইধার
আও।
চিন্তা—অন্দরে জেনানা আমি আছে সাহেব।
কাবুলীদ্বয়-কুছ বাৎ নেহি ? অন্দর মে যায়েগা ?
(লাঠির দ্বারা সজোরে অন্দর মহলস্থ
দরজায় আঘাত।)
চিন্তা—সাহেব ভাল চাও ত বাইরে এসে দাঁড়াও। বাবুকে ভেকে
আচি।
[ চিন্তার প্রস্থান।
৮৮
চিন্তামণি।
[ তৃতীয় অঙ্ক
কাবুলীদ্বয়—ওহি বাৎ বােলল ।
(বেগে স্বয়ম্ভুর প্রবেশ)
স্বয়ম্ভু কি হয়েছে? বাড়ীতে হল্লা কিসের?
(কক্ষের ভিতর হইতে জানালা খুলিয়া বামুন মা বলিল।)
বামুনমা~-এয়েছিস্ বাবা এয়েছিস্? দেখ, দেখ, কি কাণ্ডটা কচ্চে
একবার দেখ।
স্বয়ম্ভু—(কাবুলীদ্বয়ের প্রতি) কি সাহেব, জোর জুলুম করে অন্দর মহলে
পুলিশ পুলিশ, পাহারওলা পাহারওল।
কাবুলীদ্বয়—রূপে আবি লে আও? নেহি ছছাড়ে গা।
(কাবুলীদ্বয় স্বয়ম্ভুর হাত বাধিল।)
( বামুনমা ভিতর হইতে বাহিরে আসিল।)
বামুনমা—ওগাে তােমাদের পায়ে পড়ি আমায় বাঁধ, আমার ছেলেকে
ছেড়ে দাও।
( পাহারওলা ও ইনস্পেক্টরকে সঙ্গে করিয়া
চিন্তার প্রবেশ।)
চিন্তা--এই দেখ ইনস্পেক্টর দাদা।
রাধারমণ-জমাদারের প্রতি) ফজলু খাঁ, বঁধাে। হাতকড়ি লাগাও।
(পাহারওলা দুইজন কাবুলীদ্বয়কে কোমরে দড়ি ও
হাতকড়ি দিয়া লইয়া গেল।)
চিন্তা-জ্যাঠা মশায়ের যেমন কাজ, ওদের কাছে আবার মানুষ টাকা
ধার করে।
রাধারমণ—চিন্তা, তােমার জ্যাঠা মশায়ের দোষ নাই। অর্থের অনাটন,
দারিদ্র্যের কঠোর পীড়ন, সমাজের লাঞ্ছনা, যখন অসহ মৃত্যু যন্ত্রণার
মত বােধ হয় মানুষ তখনি দুঃসাহসিক কাজে প্রবৃত্ত হয়।
স্বয়ম্ভু বাবু আর কখন ও এমন কাজ কৰ্বেন না। ভাবুন দেখি?
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। আজ কি মহা অনর্থ ঘট’ত যদি সদাশয় ইংরাজ গভর্ণমেন্ট দুষ্টের দমনের জন্য ; জন সাধারণের শান্তি রক্ষের জন্য, থানায় থানায় পুলিশ পাহারওলা সদা সর্বদা মােতায়েম না রাখতেন ; তা হলে দেখতে পেতেন দেশে কি মহা অশান্তি হত। স্বয়ম্ভূ-ইনস্পেক্টর বাবু, এতদিনে আমার ভুল ধারণা গেল। পুলিশের লােক এত উদার, সরল, কর্তব্যপরায়ণ হয় তা স্বচক্ষে আজ দেখলুম। রাধারমণ-স্বয়ম্ভু বাবু বেশী বাক্য ব্যয়ের দরকার নাই। দরকার নাই। টাকাটা আদালতে জমা দেবেন। [ ইনস্পেক্টরের প্রস্থান ও অন্য দিক দিয়া চিন্তা ও স্বয়ম্ভুর প্রস্থান। বামুনমা—উঃ ! আর যে দেখতে পারা যায় না। ভগবান! সয় বলে কি এতই সয় মানুষের প্রাণে ? না হয় কষ্টই দিয়েচকেন কষ্টের ভাত সুখে খেতে দিচ্চনা? স্বয়ম্ভুর মুখখানা দেখচি আর প্রাণটা যেন ফেটে যাচ্ছে। দুঃখের জ্বালায় স্বয়ম্ভু আমার পাগলের মত ছুটে ছুটে বেড়াচ্চে, চোখের সামনে আর যে দেখতে পারি না। আমি মা হয়ে কোন প্রাণে এখনও দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছি ? দেখবার আগে কেন আমার মরণ হল’না ? যাদের অন্নে এতদিন কাটালুম কই তাদের’ত কিছুই কত্তে পালুম না। না—না, আমি কাশী চলে যাই। সেখানে গিয়ে বাবার কাছে হতত্য দোব, গতর খাটাব, না হয় বাড়ী বাড়ী ভিক্ষে কর্ব। এতে যদি প্রাণ যায় যাক, যদি অঞ্চলের নিধি নয়নের মণি চিন্তার মায়া ত্যাগ কত্তে হয় তাও কৰ্ব। ভগবান ! দাও আমায় তেয়ি বল দাও। [ প্রস্থান।
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম গাঙ্ক।
(হরলালের বৈঠকখানা।)
হরলাল-হায়! হায়! সর্বস্ব নিয়ে গেছে হারামজাদা ব্যাটা। আমার
প্রাণের আধখানা কেটে দিয়ে গেছে। জেলে দেব, ঘানি গাছে
ঘােরাব তবে এ রাগ যাবে। আর ছাই জেলে দিয়েই কি আদায়
হবে। টাকা কড়ি ত হবেই না। একখানা ও নম্বরী নােট ছিল
। গয়না তাও কি আর ফিরে পাব ? সেই বেশ্যা মাগীটাকে
দিয়েছে নিশ্চয়, সে বেটী ঘাগী মেয়ে মানুষ এতদিন গালিয়ে ঠিক
ঠাক করে নিয়েচে এর আর ভুল নাই। কিছুই আদায় হবে না
দেখচি। না, না, তা হলে মরে যাব, সৰ্বস্ব গেলে প্রাণ বেরিয়ে
যাবে ? টাকা কড়ি না পাই, গয়না চাই, গয়নার মায়া ভুলতে
পাৰ্ব্ব না, অনেক টাকার গয়না। ব্যাটার ছেলের কাছ থেকে
আদায় কত্তে না পারি, ব্যাটার ছেলের শ্বশুরের ঘাড় ভেঙ্গে
শেষটা গয়না আদায় কৰ্ব্ব সেই মৎলব ফেঁদে রেখেছি। পুলিশে
গুয়ারী ও আগে থাকতে তাই করে রেখেচি। ঝি চাকরকে
শিখিয়ে রেখে দিই, পুলিশ যদি জিজ্ঞাসা করে হয়ত কি বলতে কি
বলবে। আট ঘাট বেঁধে কাজ কত্তে হবে? অধরা আছিস?
(অধরের প্রবেশ।)
আচ্ছা অধরা, এই যে এত বড় চুরিটা হয়ে গেল, তাের কাকে
সন্দেহ হয় ঠিক করে বল।
'ধর-আজ্ঞে কেমন করে বলি ? যখন চোখে দেখিনি কার নাম কৰ
বাবু ?
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
হরলাল-তাের ছােট দাদা বাবুর শ্বশুর আর তাের ছােট দাদা বাবু,
নিয়েছে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অধর—আজ্ঞে হবে তা।
হরলাল হবে কি ? নিশ্চয়ই তাই হয়েছে।
অধর-আজ্ঞে আপনি যখন বলচেন তখন হতেও পারে।
হরলাল-ববি দেখেচিস?
অধরা বাবু মিথ্যে করে বলব ? ওটি আমার দ্বারা হবে না মশাই।
অনেক দিন আপনার অন্ন খেয়েচি আর না রাখেন কি কৰ্ব ।
হরলাল-- হারামজাদা ব্যাটা! তাের দ্বারা আমার কোন্ কাজটা হয় ?
দূর হয়ে যা, নলিনীকে ডেকে দিগে।
অধর--তা ডেকে দিচ্চি, সব কাজ পাৰ্ব কিন্তু ও কাজটি আমার দ্বারা
হবেনা।
[ অধরের প্রস্থান।
( নলিনীর প্রবেশ।)
হরলাল-নলিনী চুরির হদিস্ এখনও বার কত্তে পাল্লিনি? কি কত্তে
বাড়ীতে আছিস ?
নলিনী—কেন পাৰ্ব্ব না কৰ্ত্তা বাবু? গিন্নীমা ছােট দাদা বাবুকে দেখিয়ে
দিয়েছে যেখানে টাকা কড়ি থাকত আর ঘােট দাদা বাবু নিয়ে
দিব্যি সরে গেছে।
হরলাল-মিথ্যে কথা? আমার টাকা কড়ি কোথায় থাকে তাের গিন্নীমা
সাত জন্ম চেষ্টা কল্লেও খুঁজে বার কত্তে পাব্বে না। এ তাের ছােট
দাদার কাজ। শুধু তাের ছােট দাদা নয়, ছােট দাদার শ্বশুরেরও
এতে যােগ আছে আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি।
নলিনীছােট দাদার শ্বশুর ? না, না, তা হতেই পারে না। ছােটদাদার
শ্বশুর যে মাটীর মানুষ, বিশ্বাস হয় না বাবু।
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
হরলাল—আমার মােল আনা বিশ্বাস। বিশেষ তােক্স ছােট দাদার
শ্বশুরের অবস্থা ভাল নয়। অভাবে স্বভাব নষ্ট, টাকার খাতি
হলে মানুষ সব কত্তে পারে।
নলিনী—ঠিক বলেচে বাবু? তাই ছোট দাদার শ্বশুর রাস্তায় দেখা হলে
আর কোন কথাটি কয় না। বাবা ! কি অবিশ্বাসের কাল
পড়েছে।
হরলাল—যা দরওয়ানকে ডেকে দিগে।
[ নলিনীর প্রস্থান।
( দরওয়ানের প্রবেশ।)
হরলাল-তাম অ্যারিসে পুতুলকামাপি দেউড়ীমে খাড়া র্যয় তা হয়, মেরা
মল রূপেয়া লেকর কোন্ দুষমণ ভাগ্ গিয়া হয় পাকড়ানে
নেহি সেকা? হাকা হাতমে পাক’ড় গিয়া । ছােটে বাৰুকা
শ্বশুর লিয়া হ্যায় আউর ছােটে বাবু লিয়া হায়।
দরওয়ান--বাবু অ্যায় সে কাম্ হাহ্ ক্যায় সে বুঝে।
হরলাল—আউর ঘােড়ে কা মাপী নিদ যাও মৎ হুসিয়ার ব্যয় না ?
দরওয়ান-যাে হুকুম।
| দরওয়ানের প্রস্থান।
হরলাল—এইবার মাতুলকে শিখিয়ে নিলেই সাক্ষীর জোর প্রমাণ রইল।
(অধরের প্রবেশ।)
দারােগা বাবু আচেন।
হরলাল-সঙ্গে করে নিয়ে আয়।
( অধরের প্রস্থান ও রাধারমণকে সঙ্গে লইয়া প্রবেশ।)
হরলাল—আসুন ইস্পেক্টর বাবু, অধরা তামাক দে।
রাধারমণ—তামাক আমি খাইনা মশাই। আপনার ছেলেকে গ্রেপ্তার
কৰ্বার জন্যে আমার Assistant ( আসিষ্টান্ট ) এবং জমাদারকে
প্রথম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
সেই মাগীর বাড়ীতেই পাঠিয়েছি। কোন ঘর থেকে আপনার
চুরি গেছে আমি সেই ঘর একবার দেখতে চাই।
হরলাল—আসুন আমার সঙ্গে।
( হরলাল ও রাধারমণের ভিতরে গমন ও অন্য দিক
হইতে নলিনীর প্রবেশ।)
নলিনী—নিরীহ গোবেচারী ছেলের শ্বশুরকে ফাসিয়ে নিজের পেট ভর্ধার
মৎলব করেচ মিন্সে? নলিনী বেঁচে থাকতে তা কিছুতেই হবে না।
এইবার তােমার মরণ বাড় জেনাে ? নলিনীর কামড়ে জ্বলে পুড়ে
ছটফট কত্তে হবে। কেউটে সাপের মত বিষ ছড়িয়ে দিয়ে এক
দণ্ডে সবংশে নির্বংশ কৰ্ব্ব, মেরে ফেল’ব, পুড়িয়ে ফেল’ব, তারপর
যে টুকু বাকী থাকবে রাক্ষুসীর মত এক নিশ্বসে কড়মড়িয়ে
চিবিয়ে খাব তবে প্রাণের জালা জুড়বে। যাই ছোটদাদার
গুড় শ্বশুরের কাছে গিয়ে বলব, শােনে ভাল না হলে শেষে নলিনী
তোমার কাল সাপিনী ; তােমায় মরণ কামড় কামড়াবে মরণ
কামড় কামড়াবে। নলিনী! ভুলিস নি, ভুলিস নি ।
[ নলিনীর প্রস্থান।
( হরলাল ও রাধারমণের পুনরায় প্রবেশ।)
রাধারমণ-যতটা বুঝলুম এ কাজ আপনার ছেলের দ্বারাই হয়েছে।
হরলাল—আজ্ঞে আমার ছেলের দ্বারাই হয়েছে তা জানি কিন্তু আমার
ছেলে তার শ্বশুরের কুপরামর্শে এ কাজ করেচে। গয়না ছেলের
শ্বশুরের কাছেই আছে। আপনি তার বাড়ী Search করুন
খুব বিশ্বাস গয়না সেখানেই পাওয়া যাবে।
ইনস্পেক্টর পাওয়া যাবে বল্লেই হয় না মশাই। বামাল যদি না পাওয়া
বায় জানবেন হিতে বিপরীত হবে।
৯৪
চিন্তামণি।
( চতুর্থ অঙ্ক
হরলাল—আমি কি সহজে ছাড়ব ইনস্পেক্টর বাবু? অনেক টাকার
গয়না। আদায় হলে আপনার কাছে বিশেষ অনুগৃহীত হ’ব।
সে কথা এখন আর বলব না।
ইনস্পেক্টর—আমাদের কাছে অনুগ্রহ নাই মশাই, নিগ্রহ আছে। দুষ্টের
দমন, শিষ্টের পালন, এই মহাগুরুতর কাজের দায়ীত্ব পুলিশের।
আমরা কার খুসী অখুসীর তােয়াক্কা রাখি না। ঠিক কাজ করে
যাব, ঠিক মাইনে নাে’ব। চলুম মশাই।
{ ইস্পেক্টরের প্রস্থান ।
হরলাল—লােকটা যেন কেমন কেমন ঠেছে। আগের আগের
ইনস্পেক্টর গুলাে বেশ মােলায়েম গােচ ছিল। এ লােকটা দেখছি
বড় রােকা, প্রথমটা ওর। ও রকম দেখায়। যে কোন গতিকে
হােক ইস্পেক্টর টাকে হাতে রাখতে হবে। হরলাল চাটুয্যের
পয়সা দেখলে সুড় সুড় করে লেজ গুটিয়ে কাছে আসতে পথ পাবে
। দেখি কি হয়।
(শ্রীকান্তের প্রবেশ।
হরলাল—এই যে মাতুল এসেচ, তােমার জন্যেই ভাবছিলুম। সব শুনেচ ত?
শ্রীকান্ত-~-"আমি তাে শুনেই বলেছি এ তােমার লালগােপালের কাজ।
হরলাল—সে আমি জানি। পুলিশ তাকে ধৰ্ব্বার জন্যে ঘুরে বেড়াচ্চে
তা নয় হ’লকিন্তু গয়না যদি ব্যাটার ছেলে নষ্ট করে থাকে
আদায় হবে কিসে ?
শ্রীকান্ত-ধর পাকড়ে আদায় হবে।
হরলাল তা হবে না মাতুল। গয়না আদায় হবে না। আমি একটা
মৎলব ভেঁজে রেখেচি, যুক্তি কৰ্ব্ব বলে সেই জন্যে তােমায়
ডেকেচি।
শ্রীকান্ত—কি মৎলবটা শুনি?
প্রথম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি ।
হরলাল—Caseটা আরও ভারী করে সাজিয়েছি মাতুল। পুলিশে
এই বলে ডায়রী করেছি যে আমার ছােট ছেলে তার শ্বশুরের
কুপরামর্শে আমার সিন্দুক থেকে টাকা গয়না সমস্ত চুরি করে
শ্বশুরের হাতে সমস্ত সঁপে দিয়েছে। তা হলে হবে কি জানলে ?
পুলিশ গিয়ে মিন্সের বাড়ী খানা তল্লাসী কৰ্ব্বে, কেলেঙ্কারী বাধাবে,
মিলে সত্যি কিছু আর চুপ করে থাকতে পাৰ্বে না। মান ইজ্জতের
ভয়ে কাজে কাজেই তখন অপােষে মিটমাট কত্তে চাইবে। সঙ্গে
সঙ্গে আমার ও ক্ষতি পূরণ কত্তে হবে না হলে ছাড়বনা। কেমন
Caseটা সাজান মন্দ হয়েছে ?
শ্রীকান্ত—কি জানলে, সাজান অসাজান সব সাক্ষীর মুখে।
হরলাল--সে সব আমি ঠিক না করেছি কি? হরলাল চাটুযয্যর টাকার
জোরে সাক্ষীর অভাব হবে না মাতুল ? বিশেষ তােমার মত লােক
আমার হাতে থাকলে সৃষ্টির সােজা দিকটা উল্টো করে দিতে
পারি।
শ্রীকান্ত—আমায় আর কেন জড়াও? বুড়াে মামার হাতে শেষটা দড়ী
দেবে।
হরলাল—মাতুল তােমায় ছেড়ে দিলে আমি পথে বস’ব মারা যাব।
শ্রীকান্ত-ধােপে টিকলে হয় ?
হরলাল—এই কাজটা করে এতটা সম্পত্তি করেচি, খুনী আসামীকে
বাঁচিয়ে দিতে পারি কি বল’চ মাতুল ?
শ্রীকান্ত—তা বটে, তবে সকল ক্ষেত্রে কি সমান ঘটে।
(অধরের প্রবেশ।)
অধর-বাবু, মাঠাকরুণ বলেদিলেন-তেনার খুড়ীমা টাকা দিতে এসেচেন,
কি হিসেব কনে আপনাকে ভেতরে ডাকচেন।
[ অধরের প্রস্থান ।
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
হরলাল-তুমি ব’স মাতুল, আমি আসছি।
শ্রীকান্ত—না, আর বস’ব না। সন্ধ্যে ও হয়ে এল, আমি এখন আসি।
হরলাল-তবে ঐ কথাই রইল। আর আর যা কত্তে হবে সে আমি
পরে বল্ব এখন।
[ হলালের প্রস্থান।
শ্রীকান্ত—ভগবানকে ডাকলে হবে কি? ভগবানের কি কান আছে না
চোক আছে তা না হলে হরলাল চাটুয্যের মত লােকের তেতলা
চৌতলা বাড়ী হয় আর যে দিন রাত্তির হা ভগবান হা ভগবান
কচ্চে তার এক মুটো তাও জোটে না। ভগবানের সব লীলা খেলা
গরীবের ওপর গুতাে ঠেলা ।
[ শ্রীকান্তের প্রস্থান।
দ্বিতীয় গর্ভা।
( দরদালানস্থ শ্যামার কক্ষ।)
- শ্যামা-দিনরাত গতর দিয়ে সংসারে খাটচি একদণ্ড বিশ্রাম নাই তবু,
একবার ডেকে কেউ দুটো মিষ্টি কথা বলে না। জানি না কি
দোষ করেছি জিজ্ঞাসা কল্লে কেউ কথা কয় না। শাশুড়ীর কাছে
যাই পােড়াকপালী বলে তাড়িয়ে দেন। শ্বশুরের কাছে যাই মুখ
ফিরিয়ে চলে যান। প্রাণের জালা জুড়বার জন্যে স্বামীর কাছে
গিয়ে দাড়াই, তিনিও আমায় লাথি ঝটা মেরে ঘর থেকে দূর
করে দেন। আমি বড় হতভাগী ।
( অধরের প্রবেশ।)
অধর—বৌদিদি, তােমার বাবা আসচে গাে দেখা কত্তে।
[ অধরের প্রস্থান।
দ্বিতীয় গর্ভাৰু।]
চিন্তামণি।
শ্যামা—না, চোকের জল মুছে ফেলি বাবা হয়ত বুঝতে পাৰ্বে।
(স্বৰ্গর প্রবেশ)।
ভয়-ভাল আছ মা?
শ্যামা স্বয়কে প্রণামান্তর) হঁ্যা, আপনি ভাল আছেন বাবা। মা,
বাড়ীর সকলে ভাল আছে ত? চিন্তা দাদা ভাল আছে ?
স্বয়ম্ভা উপস্থিত মঙ্গল বটে, তবে তোমার গর্ভধারিণী তােমাকে
দেখবার জন্যে বড়ই উতলা হয়ে কান্নাকাটি কচ্চে। অনেক দিন
হল এসেচ, তােমার শ্বশুরকে বলে দিন কতকের জন্য নিয়ে যাব মনে
কচ্চি। (সহসা শ্যামার হাতের দিকে চাহিয়া) দেখি দেখি
হাত দেখি? এই যে কাচের চুড়ী সার হয়েছে ? কেশ, বেশ,
গয়না সব কেড়ে নিয়েচে ত ? তােমার শ্বশুর কোথায় ?
শ্যামা—বেরিয়ে গেছেন বােধ হয় । শ্বশুর বলেছেন—“বাপের বাড়ী
আমায় আর পাঠাবেন না। আপনি ফিরে যান, মিছেমিছি
কেন অপমান হবেন।
স্বয়ম্ভু—কেন মেয়ে’ ত বিক্রী করে খাইনি ? সর্বস্ব খুইয়ে একটা বয়াটের
হাতে সঁপে দিয়েছি।
গামা-বাবা ও কথা বলবেন না, কার দোষ নয় আমার অদৃষ্ট মন্দ।
তথন কষ্ট হােক জ্বালা যন্ত্রণা হােক্ সমস্ত সহ্ন করে একান্ত
মনে পতি পরম গুরু স্মরণ করে তার ধ্যানস্থ হয়ে জেগে থাকবার
জন্যেই ত সতীর সতীত্ব, নারীর গৌরব।
স্বয়—তােমার উচিত কথাই তুমি বলবে মা তা জানি, কিন্তু আমরা
বেঁচে থাকতে নিত্য চোখের সামনে তােমার লাঞ্ছনা দেখতে
পাৰ্ব্ব না। যতদিন আমরা বেঁচে থাকি তুমি আমাদের কাছে
শিয়ে থাকবে চল। আমরা মরে গেলে তােমার যেখানে ইচ্ছে
থেকে দেখতে আসব না।
৭
৯৮
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
শ্যামা-আপনিই ত বলেচেন বাবা “স্বামীর ঘরই ঘর, সেই তীর্থ, সেই
স্বর্গ”। বাবা, মাকে বুঝিয়ে বলবেন যখন তিনি আমার জন্যে বড়
অস্থির হবেন তখন সতী দময়ন্তীর কথা মনে কত্তে বলবেন,
জনম দুখিনী সীতার কথা ভাবতে ববেন, আর একবার মা
সাবিত্রীর কথা মনে করে আশীৰ্বাদ কত্তে বলবেন,—বেন স্বামীর
পায়ে মতি গতি অচলা থাকে। তা হলেই আমার ইহজীবনের
সকল সাধ পূর্ণ হবে।
স্বর—তা হলে তােমার যাবার ইচ্ছে নাই বুঝতে পাচ্চি। বেশ, আমি
তােমার গর্ভধারিণীকে সমস্ত কথা খুলে বলব। এখন তবে অাসি।
( শ্যামা প্রণাম করিল।)
এস মা কল্যাণ হােক।
{ হরলালের প্রবেশ ও অন্তরালে শ্যামার গমন।
হরলাল ( স্বয়ম্ভুর প্রতি ) মেয়ের সঙ্গে দেখা করে বেমালুম ত গা ঢাকা
দিয়ে চলে যাচ্চেন। পকেটটা একবার দেখি ?
স্বয়ম্ভ—কেন আমি কি চোর ?
হরলাল নিশ্চয়ই। আমার সমস্ত গয়না হাত করে এখন বুঝি সাধু
সাজছেন ?
স্বয়ম্ভু সবিস্ময়ে ) গয়নাকে নিয়েছে ? আমি ! হরলাল বাবু যথেষ্ট
হয়েছে, আর আপনাকে বেয়াই বলতে ইচ্ছে নাই। গয়না যদি
আমার ঘর থেকে বার কত্তে না পারেন—জানবেন আমি সহজে
ছাড়ব না।
হরলাল—বেরিয়ে যান আমার বাড়ী থেকে।
স্বয়--তােমার বাড়ীতে থুথু ফেলতে ও আসি না।
হরলাল-বেয়ােও এখনি? কে আছিস রে ? গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দে।
দ্বিয় গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
স্বয়ম্ভ-মা, মা, তােমার কপালে যা হবার হােক, ভেবে কি কৰ্ব।
ভগবান দেখাে।
[ স্বয়ম্ভুর প্রস্থান।
হরলাল-বৌমা আছ, এ দিকে এস ত একবার।
(তামার প্রবেশ।)
হরলাল—তােমার বাবা আমার বাড়ীতে এসে আমায় অপমান করে গেল।
দাড়াও এর শােধ তুচি। এস’ ত বাছা এই ঘরে এখন চাৰী..
দেওয়া থাক। বাপের কাছ থেকে গহনা আদায় কত্তে পার
ভাল না হলে গােয়ালঘরে পুরে রাখ’ব মনে থাকে যেন। এবার
উত্তম মধ্যম ওষুধ দিচ্চি।
শ্যামা–বাবা! আমাকে চাবী দিয়ে রাখুন, না খেতে দিয়ে শুকিয়ে
রাখুন, তাতে দুঃখ নাই। আমার বাবাকে কিছু বলবেন না
আপনার পায়ে পড়ি। আমার বাবার দোষ নেই, আমি তাদের
পােড়া কপালী মেয়ে আমার জন্যেই তাদের অশেষ দুর্গতি হচ্ছে।
বাবা গাে ! কেন আমি তােমাদের কাছে এসে জন্মেছিলুম।
হরলাল—তােমারও দেখচি দুৰ্ম্মতি হয়েছ।
f শ্যামাকে ঘরে চাবী দিয়া হরলালের প্রস্থান।
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অৰু
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
(বেলার কক্ষ)
বেলা—(স্বগত) তিল তিল করে ভালবাসা একে রেখেচে-
গােপালের মূৰ্ত্তি হৃদয়ের শিরায় শিরায়। এ হৃদয়ে আর কার
অধিকার আছে ? রাধারমণের ? সে ত একটা বিশ্বাসী
কর্মচারী ভিন্ন আর কিছু নয় ? নারীর ছলনাময়ী ভালবাসার
প্রলােভনে মুগ্ধ করে রেখেচি তাকে স্বর্গের ইন্দ্রধনুর ছটায় ।
আর লালগোপাল সে’ত বেলার নয়ন কটাক্ষের খেলার পুতুল মাত্র।
রাধারমণ ! রাধারমণ! লালগােপাল! লালগােপাল ! ত জড়িত
নয়নের স্বপ্নময়ী ঘুম ঘােরে অযুত নক্ষত্র খচিত গগণের চাদকে
নিংড়ে আর সুধার জন্যে বুক পেতে রেখেচ ? মূখ ! জান না ?
নারীর ব্যভিচারিণী মূৰ্ত্তির কলঙ্কিতা রূপচ্ছবির অলীক সৌন্দর্য্যে অন্ধ
লম্পটের চরণতলে বেলার হৃদয় সঞ্চিত রত্নরাজী লুটিয়ে দেবার জন্যে
সৃষ্টি হয় নি? শ্ৰীগােপাল! এগােপাল ! তুমিই বেলার হৃদয়
রাজ্যের একমাত্র আরাধ্য দেবতা। জানি না, কোন জগতের
অন্তরালে—উষার ফুল্ল কুসুম রঞ্জিত ভুবন সুন্দর মূর্তিতে বেলার
হৃদয় স্পর্শ করে।
( ইতস্ততঃ পদচারণ করিতে লাগিল।)
( রাধারমণের প্রবেশ।)
রাধারমণ-বেলা! বেলা ! লালগোপালকে পুলিশে ধরতে আসছে।
খবরদার তাকে জায়গা দিনি, মহাবিপদে পড়বি। আমি
চল্পম।
ৰেলা-সে আর তােক শিখিয়ে দিতে হবে না। শােন্ ৰা বলি ?
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। রাধারমণ-এখন সময় নেই চলুন। [ রাধারমণের প্রস্থান। (মালকেঁাচা বাঁধিয়া ছুটিতে ছুটিতে লালগােপালের প্রবেশ। লালগােপাল-বেলা ! বেলা ! শীগগির আমায় ছাদের চাবি দে? আমি পীল টপকে ফুলীদের বাড়ী গিয়ে লুকোই। বাবা ব্যাটা মহা হুলস্থূল বাধিয়েচে। আমায় চোর বলে ফৌজদারীতে ফেলেছে। বেলা-তুই ত বেশ মজার মানুষ দেখচি ? চোরকে জায়গা দিয়ে শেষে আমি ও ফ্যাসাদে পড়ি আর কি ? লালগােপাল তুই বাড়ী থেকে বেরিয়ে যা। লালগােপালভাের পায়ে পড়ি, এ যাত্রা আমায় কোন গতিকে বেলা—বেশী গােলমাল করিস নি সরে পড়। রামচরণকে ডাক’ব, গলা টিপে বার করে দেবে। ( লালগােপাল সজোরে বেলার হাত ধরিল। লালগােপাল—মুখ সামলে কথা কস? শয়তানী ! তাের জন্যে বাপের যথা সৰ্বস্ব উড়িয়ে দিয়ে পথের ভিখিরী হয়েচি। স্নেহময়ী জননীর স্নেহে পদাঘাত করেচি। লক্ষ্মীর মত স্ত্রীকে অযথা নিৰ্যাতন করে দিনরাত কাদিয়েচি। সর্বনাশী ! যে দিন তােকে এ সংসারে দেখবার কেউ ছিল না, কে আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়েছিল? বিশ্বাস- ঘাতিনী! সব ভুলে গেলি? বেলা—হাত ছেড়ে দে বলচি ? লালগােপাল—তােকে খুন কৰ্ব্ব। বেলা-রামচরণ ! রামচরণ! শীগগির আয়। মেরে ফেল্পে, মেরে ফেল্লে। (বেগে রামচরণের প্রবেশ, ও লালগােপালের দু হাত ধরিয়া ধাক্কা দিয়া ঘরের দরজার কাছে লইয়া গেল।
চিস্তামপি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
রামচরণ-কোন শার্লারে ! এ যে বড় বাবু দেখচি? কি কৰ্ব্ব, বিকির
অন্ন খাই।
লালগোপাল—রামচরণ, ছেড়ে দে বচি ? এই জুতাে শুদ্ধ লাথি ওর
মুখে এক ঘা দিয়ে আসি।
}
( সাব ইনস্পেক্টর ও পাহারওলার প্রবেশ।)
সাব ইন-~-এই যে লালগোপাল বাবু। সামনেই হাজির।
( সাব ইনস্পেক্টর পাহারওলাকে ইঙ্গিত করিল, পাহারও
লালগােপালের হাতে হাতকড়ি ও কোমরে
দড়ি দিয়া বাধিল।)
লালগোপাল--ছেড়ে দাও আমায়, ছেড়ে দাও বচি।
বেলা-ইনস্পেক্টর বাবু, ও লােকটা অামায় খুন কত্তে এসেছিল।
সাব ইন্নালিশ করগে, আদালত খােলা। লালগােপাল বাবু, এইবারে
ফুৰ্টির চতুরং হবে চলুন।
{ লালগােপালকে লইয়া পুলিশের প্রস্থান।
( রাধারমণের প্রবেশ ।)
রাধারমণ---লালগােপালকে সত্যি সত্যিই ধরিয়ে দিলি? পুলিশ কোমরে
দী বেঁধে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমার ত চোক
দিয়ে জল পড়ল, আর তুই এত দিন ধরে ওর নেমক খৈলি,
তাের প্রাণ একটু ও কঁাদল’ না। কদবে কেন ? নেমক
হারামের জাত।
বেলা—দেশ, রাতদিন নেমক হারাম, নেমক হারাম করিস নি। ভাল
লাগে না এক শাে বার। ঐ এক বুলি হয়েছে ? আমার গয়নার
কি কল্লি বল ? অার সে দলিলটা ফিরিয়ে দিলি না ? আজ যা
* একটা হেস্তনেস্ত তােকে কত্তেই হবে। আজ দোব কাল
,
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
১০৩
দোব বলে কদিন হয়ে গেল কল দেখি ? গয়না আজ হাজির কত্তেই
হবে আমি আর শুনব’ ।
রাধারমণ-না শুনিস বয়ে গেল। কে তাের গয়না নিয়েছে ? সাক্ষী
সুবোদ আছে ? লেখাপড়া আছে ? যা কত্তে পারিস করগে যা।
বেলা-ইয়ারকি করিসনি আমার ভাল লাগে না।
রাধারমণ-বেশ্যার সঙ্গে ইয়ারকি কত্তে রাধারমণের
জানিস ?
বেলা—ইস্! তাের আজ যে ভারী লম্বা লম্বা কথা দেখছি ?
রাধারমণকেন,তাের খেয়ে নাকি ?
বেলা--তুই কি মনে করেছিস গয়না না দিয়ে পার পাবি ? এইখানে
মাথা রেখে যেতে হবে।
রাধারমণ—খবরদার বল্চি ? চিনিসনি আমায় ? এই দেখ । { ইনস্পেক্টর
বেশে দণ্ডায়মান) এখনই তােকে গ্রেপ্তার করে থানায়
চালান দেব। মদের সঙ্গে বিষ দিয়ে অজ্ঞান করে লালগােপালের
পকেট থেকে নােটের তাড়া চুরি করেচিস? আমি সাক্ষী।
কী দিয়ে, লালগােপালের কাছ থেকে গয়না নিয়েচিস ?
আমি সাক্ষী। লালগােপালের বাড়ী জচ্চরী করে লিখিয়ে
নিয়েচিস? আমি সাক্ষী আছি। সতী লক্ষ্মীর আশ্রয় কেড়ে
নিয়ে মনে করেচি লালগােপালের বাড়ী বসে সা, ঋ, গা, মা
সাধবি ? সে পথ সাফ করে রেখেচি। আজ থেকে তােক দোরে
দোরে ভিক্ষে করে বেড়াতে হবে। কি বলব, মেয়ে মানুষ বলে
এ যাত্রায় জেলে দিলুম না ক্ষমা কলুম। ওস্তাদের কা शमी
কতে এসেছিলি? দূর হ বেশ্যা কোথাকার! মুখ দেখলে
জোটে না, আয়ু লক্ষ্ম হয়।
[ রাধারমণের প্রস্থান।
কাছে,
*,
১০$
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
বেলা—আঁতে আঁতে ঘা মেরে চলে গেল। ভুল করেছিলুম,—বিশ্বাস করে
পথে বসলুম—রাস্তার ভিখিরী মাগীর ও অধম হদুম আজ। না, না,
সব গেছে যা এখন ও আশা আছে। গােপালের আশায়
এখন ও প্রাণকে মাতিয়ে রেখেছি। দেখ’ব, আর একবার শেষ
দেখ’ব। পায়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে আর একবার দেখব
তােমায়। শ্রীগােপাল! শ্রীগােপাল।
!
[ রেগে বেলার প্রস্থান।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
সাহেববাবুর বৈঠকখানা।
(সাহেবাবু চিন্তামগ্ন )
সাহেব বাবু-( স্বগত) থানায় থানায় খবর দিলুম-পাড়ায় পাড়ায় খোঁজ
কলুম, কোথাও তার সন্ধান পেলুম না। তবে কি স্বামীজী তাকে
কোথাও ভুলিয়ে নিয়ে গেছে? না না তা অসম্ভব, স্বামীজী যে
দেবতার মতন। তবে সে কি আপনিই চলে গেছে না কেউ
তাকে আটক করে রেখেছে ? মিথ্যে কথা আটক কৰ্বে কে ?
তবে কি অভিমান করে কোথাও লুকিয়ে আছে ? না না আমি ত
তাকে কখনও একটা উঁচু কথা বলিনি। তবে গেল কোথায় ?
ওহহ! বুঝেছি বুঝেছি। মৎলব আছে। দাগাবাজী বেইমানী
করে চলে গেছে। নিশ্চয় নিশ্চয়ই তাই। হায় ! কালসাপিনীকে
আদর করে বুকে তুলেছিলুম ছােবল দিয়ে চলে গেছে। বেশ
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
করেচে ঠিক করেছে। আমার যেমন কাজ তেমি ফল। তাঁর
কথায় মার পেটের ভাইকে পর করেচি, কত অকথা কুকথা
বলেছি।
বড় কাজের সঙ্গে ঝগড়া করেচি। শেষে আলাদা
হয়ে তার উপযুক্ত পুরস্কার পেয়েছি।
দাদা! দাদা! দেখে
যাও, তােমার শাপ ফলেচে। ওহহ! কি যন্ত্রণা। ভালবাসার
কি এই পরিণাম ? পৃথিবীতে ভালবাসা কোথা ? এখানে ভাই
ভায়ের রক্ত খাবার জন্যে ছুরি উঁচিয়ে আছে। মা ছেলের মুণ্ডু
চিবিয়ে খাবে বলে বিষ নিয়ে দাড়িয়ে আছে। স্ত্রী স্বামীর গলায়
চোপ দিয়ে পরপুরুষে আসক্ত হচ্চে, ব্যভিচার কচ্চে। সংসারে
কেবল হিংসা কেবল—শঠতা কেবল দাগাবাজী। আর এ
সংসারের মায়ায় পড়বনা। আর ভুলব না। যাব একবার দাদার
কাছে যাব, পায়ে ধরে ক্ষমা চাইব। তারপর—তারপর যেখানে
দুচক্ষু যায় চলে যাব।
( নলিনীর প্রবেশ )
নলিনী বাড়ীর দিকে তাকাইয়া) এই বােধ হয় বৌদিদির কাকার
বাড়ী, ঐ যে কে একজন সাহেবের মত ঘরে বুসে রয়েছে নয় ?
শুনেচি বউ দিদির কাকা নাকি সাহেব সেজে থাকে। সম্ভব ঐ
লােকটাই হবে। যাই যে মলব করে এসেছি সেই সাহসে ভর
করে এগিয়ে যাই।
(নলিনী সাহেব বাবুর সম্মুখে গিয়া দাড়াইল।)
সাহেব বাবুকে তুমি?
নলিনী—জিজ্ঞেস কর’না, পরিচয় পাবে না। তুমিই কি স্বয়ম্ভু মুখুয্যের
ভাই? তােমার শরীরে কি রক্ত মাংস নেই ? তুমি কি মানুষ হয়ে
জন্মাও নি? তােমার কি হিতাহিত জ্ঞান নেই ? মাটীর মানুষ
বল কি
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
তমার ভাই ভাজ, না খেয়ে না পরে তােমার মানুষ করেছে।
তােমার অদিনে দুঃসময়ে নিজের প্রাণ দিয়ে তােমায় বাঁচিয়ে
রেখেচে আর তুমি সেই দেবতার মত ভাইকে ছেড়ে স্ত্রীর কথায়
ভেন্ন হয়ে আজ ভায়ের কথা ভুলে গেছ ? ভেবেচ কি পৃথিবীতে এম
দিনই যাবে? ধর্মে কি এত সইবে? এর ফল কি তােমায়
ভুগতে হবে না মনে করে ?
সাহেব বাবু—না, না, শাপ দিয়ো না, আর শাপ দিয়াে না।
হয়েচে বল ?
নলিনী--তােমার ভাইঝির বিয়ে দিয়ে তােমার ভাই পথের ভিখিরী
চে। থাকবার আশ্রয় ভিটেটুকু গেছে, দেনার জালায় অস্থির
হয়ে বেড়াচ্চে। এক পয়সা দিয়ে তুমি সাহায্য করনি, খোঁজ নাওনি,
চেয়েও একবার দেখনি? তােমার ভাইঝির শ্বশুর তােমার ভায়ের
হাড়মাস ক্ষ্যাপা কুকুরের মত ছিড়ে ছিড়ে খাচ্চে কঙ্কাল সার
করেচে আর তুমি ভাই হয়ে এখনও দাড়িয়ে আছ ?
সাবে বাবু—আর তিরস্কার করুন। অমর আক্কেল হয়েছে। বল কি
কওে হবে বল ?
নলিনী—আমার সর্ব শরীর আগুনের মত তেতে উঠচে সে কথা বলতে
মিছে মিছি চুরির অপবাদ দিয়ে তােমার ভাইকে জেলে দেবার
জন্যে ষড়যন্ত্র করেছে তােমার ভাইঝির শ্বশুর।
কুটুম্বু আজ
ক্রর মত বল প'রে তােমার ভাইকে লাঞ্ছনা যন্ত্রণায় পিষে
মেরে ফেলুচে তাই শুনে এখনও তোমার চোখে এক ফোটা
জল নাই ? 'আবার বলচি তুমি কি মানুষ হয়ে জন্মাও নি? পার
যদি এলাে—আমার সঙ্গে এসে তেহয় সাহায্য কৰ্ব। শত্রুর
গলায় পা দিয়ে তার জিব টেনে বার কত্তে পার যদি আজ
জান’ব তােমরা এক মায়ের পেটের ভাই এক মায়ের ছেলে।
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। ১০৭ দেরী কৰ্ব্ব না আর পুলিশ বােধ হয় এতক্ষণ এসে বাড়ী ঘেরাও করেছে আমি চলুম। সাহেববাবু—কি বল্লে পুলিশ—পুলিশ বাড়ীতে এসেচে ? চল, চল শীগগীর চল। প্রাণ দিয়ে রক্ষে কৰ্ব দাদাকে। দাদা! দাদা! [ অগ্রে নলিনীর গমন পশ্চাৎ পশ্চাৎ সাহেববাবুর প্রস্থান পঞ্চম গর্ভাঙ্ক। ( ঠাকুর বাড়ীর সম্মুখস্থ পথ। শ্রীকান্ত-স্বগত) সরিয়ে দিয়েছি ঠাকুরকে। দেখি আজ মুখপােড় কি করে। নিরাকার ব্রহ্মের 'আবার রূপ কি ? অর্বাচীন, অৰ্বাচীন। , ঠাকুর ঘর এমন করে খুলে রাখা হবে না। মাগী দূষতে পারে আমায়, তার চেয়ে পূজো কৰ্বার সময় খুলে দেখালেই হবে। মুখ পােড়ার ঘাড়েই দোষ চাপান যাবে। মাগীও নিশ্চয় তাই বিশ্বাস কৰ্বে। বালক হয়ে শাস্ত্রের কূট তর্কে আমায় পরাস্ত কত্তে আসে ? আসুক না আজ ? মাথাটা কড়মড়িয়ে চিবিয়ে খাব। আড়ালে গিয়ে লুকোই, দেখি এসে কি করে। [ অন্তরালে শ্রীকান্তের গমন। { মেয়েদের মত কাপড় পরিয়া মালা হাতে চিন্তার প্রবেশ।) চিন্তা –-কি জানি, ঠাকুর যেন কেমন করে দেয় বাপু? থেকে থেকে স’খ হ’ল কিনা মালা পৰ্ব্বার। হুকুম হলে ত আর রক্ষে নাই ? ছােট,
১০৮
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ ক্ষয়
ছােট, এ বাগান সে বাগাৰ, খুঁজে খুঁজে, ফুল তুলে কত আশা
করে আসচি মালা গাছটি গলায় পরিয়ে দিয়ে একবার চোকে
দেখ’ব। রঙ্গ দেখ দেখি ঠাকুরের ? মানুষকে নাকাল করার
মর। অমনি তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করা হয়েছে। ঠাকুর।
ঠাকুর ! ও ফন্দী তােমার খাটবে না। তােমায় নজর বন্দী
করেচি। নাও, দরজা খােল বল’চি। ও মা ! চাবী দোয়া যে?
এ সেই বুড়ােদা’র কাজ। আচ্ছা আমিও চাবী ভাব।
(শ্রীকান্তের প্রবেশ।)
শ্রীকান্ত-তবে রে পাজী চাবী ভাংবে ? আজ তােকে চাবী দোব।
আমলে আবার মেয়েদের মত কাপড় পরে হাতে মালা নােওয়া
হয়েচে ? টং দেখলে আপাদ মস্তক জ্বলে যায়। ধৰ্ম্ম কি রং তামাসা
খেলারে হতভাগা ?
চিন্তা-বুড়ােদা, ছেলে বেলায় পুতির মালা ঠাকুরের গলায় পরাতুম।
চড়ুইভাতী রেধে ঠাকুরকে খাওয়াতুম। রাত্তিরে ঠাকুরকে কাছে
নিয়ে শুতুম। তখন বুঝতু না এখন বয়েস হয়েছে কি না?
বুড়ােদা বড় রসের খেলা, বড় রসের খেলা
শ্রীকান্ত—এ টেকি কচকচির ঠেলায় যে অস্থির হলুম ? বলে কি গাে?
আমি হলুম মহামহােপাধ্যায় বিদ্যাভূষণ। ন্যায়, দর্শন, বেদবেদান্ত
অধ্যয়ন কম কোথাও রসের ধর্ম দেখতে পেলুম না। যেখানেই
ধর্মের কথা, সেই খানেই সংযম, যম, নিয়ম প্রাণায়াম ইত্যাদি
সাধনের অষ্টাঙ্গ প্রয়ােজন, বুঝলি রে মুখপােড় ?
চিন্তা—আমার ঠাকুর ও সব চায় না। আমার ঠাকুর চায় ভালবাসা,
আমার ঠাকুর চায় রস।
শ্রীকান্ত-ফের বলুচিস রস ? বল স্বাধ্যায়, প্রত্যাহার, তিতিক্ষা
যােগ।
পশ গরু]
চিন্তামণি।
চিন্তা চোক কপালে তুলে নিশ্বেস বন্ধ করে বনে গিয়ে আমার
ঠাকুরকে ডাকতে হয় না। আমার ঠাকুর মনে বনে কোণে
সর্বস্থানে বিনিমূলে আপনা হতে বিকিয়েছে। বুড়াে'লা বড়
গায়ে পড়া ঠাকুর।
শ্রীকান্ত—ঠাকুর কোথারে মড়? কাট খড়ে জড়ান মাটিতে পা রং
করা মানুষের হাতে গড়া নিরাকার, নিরাকার।
চিন্তা—তা হলে ঠানদিদি ও নিরাকার কি বল ?
শ্রীকান্তদুগ্ধপােষ্য শিশু, আমায় বিপ ? হরগােবিন্দের অকাল কুণ্ড
তুই আমায় শিক্ষা দিতে আসিস? হিন্দুধৰ্ম্মের সার বদ কি বলচে
জানি? অহং ব্ৰহ্মাশ্মি আমিই ব্ৰহ্ম। আমার শক্তিতে আমি
দেবত্ব, ইন্দ্ৰত্ব, ঈশ্বরত্ব, পৰ্যন্ত পেতে পারি।
চিন্তাবুড়ােদা, এক গাছ চুল সােজা কৰ্বার ক্ষমতা নাই ? তা জানা
গেছে ঠানদিদির অসুখের সময়। তাই আমার ঠাকুরের চন্নামে
নিয়ে গিয়ে মােজ খাওয়াতে ? কেন নিজে ভাল কত্তে পারনি ?
ঠাকুর আমার, আহা! এইটু আদরেই গলে যায়।
শ্রীকান্ত-সে তাের ঠাকুরের শক্তি নয় রে হতভাগা ? বিশ্বাস, বিশ্বাসের
জোরে ভাল হয়েছে। দেখ’ব তাের ঠাকুর কে ? সরিয়ে দিয়েছি
ঘর থেকে। এই নে চাবী খুলে দেখ।
চিন্তা—বুড়ােদা চাবী দিয়েচ কাকে ? আমার ঠাকুর ঘরে, বাইরে ভুবন
জোড়া মনচোরা। যেখানকার ঠাকুর ঠিক সেই খানেই আছে।
শ্রীকান্ত—তাের শ্রাদ্ধ কত্তে এই দেখ-ঠাকুর নেই।
( ঠাকুর ঘরের দরজা খুলিয়া শ্রীকান্ত ঠাকুরের পানে
বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল।)
চিন্তা --আহা! প্রাণ ভােলানরূপ, মরি! মরি! ঠাকুর খুব নাকালটা
কল্লে য হােক? সেই অবধি হা পিত্তেশ করে দাড়িয়ে আছি
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
মালা গাছটি নিয়ে। এস, পরিয়ে দিই গলায়। আহা! কি
সুন্দর! কি সুন্দর ! চোক, চেয়ে দেখ, রূপের লহর বয়ে যায়।
বুড়ােদা, তুমিও চেয়ে দেখ। প্রাণের টানে ঠাকুর আমার বাঁধা।
সে টান যখন বুঝবে ছাড়তে চাইবে না ঠাকুরকে, এক দণ্ড চেকের
আড়াল কত্তে পাব্বে না ।
শ্রীকান্ত-নাতি নাতি, যথার্থই তুই আমার স্বর্গের বাতী! আজ আমায়
জাগ্রত দেখালি
দেখালি ঠাকুরকে। ঠাকুর কেমন করে তােমায় -
ভালবাসতে হয় জানিনা-বলে দাও ।
চিন্তা-বুড়ােদা, ওকি মজে গেলে যে দেখছি ? একেই বলে প্রাণের টন।
ওই শোন, প্রাণের টানে পাড়ার যত সব মেয়েরা গাইতে গাইতে
এই দিকে আসছে।
( পল্লী রমণীগণের গাইতে গাইতে প্রবেশ।)
(গান)
১ম রমণী—আমি এনেচি আচার করে তেঁতুল দিয়ে মেখে,
আমি এনেছি ক্ষীরের পুলী থরে থরে রেখে।
আমি এনেচি কড়াই মুড়ী,
ย์ আমি এনেচি শাকের ঝুড়ী।
৫ম আমি এনেচি কুমড়ো লাউ, আমাদের বাগান থেকে।
আমি এনেচি তুলসী ফুল,
৭ম আমি করেচি মস্ত ভুল, লাজ শরমের মাথা খেয়ে গিয়েছি ঠেকে।
প্রথম রমণী—আমার যেন কেমন এক স্বভাব হয়েছে কে জানে? এই
তেঁতুলের আচার না হলে কি ভাত কিছুতে মিষ্টি লাগবেনা ?
ঠাকুরের জন্যে তাই এনেছি।
দ্বিতীয় রমণী—আমাদের গরু আজ নতুন দুধ দিয়েছে। সেই দুধ টুকু
মেরে ক্ষীরের পুলি করে এনেচি। ঠাকুরের রাজা মুখে দাও দেখি ?
৩য়
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
১১১
- - *
তৃতীয় রমণ—আমরা গরীব, কড়াই মৃড়ী আমাদের মুখে বড় ভাল লাগে
তাই ঠাকুরের জন্যে এনেচি ।
চতুর্থ রমণী—আমাদের কর্তা পাল শাক বুনেছিল, আমি তাই থেকে
চারটি চুরি করে ঠাকুরের জন্যে রেখেচি।
পঞ্চম রমণী—“আমার কুমড়াে লাউ বাগানের।
ষষ্ঠ রমণী---আমি কাল রাত্তিরে স্বপ্ন দেখেছিলুম, যেন ঠাকুরের পায়ে
তুলসী আর ফুল দিচ্চি। ভােরে উঠেই দেখি তুলসী মঞ্জরীতে যেন
চন্দনের ছিটে আর ফুল গুলি ফুটে। তাড়াতাড়ি গঙ্গায় ডুব
দিয়ে কাপড় ছেড়ে আসচি ছুটে।
সপ্তম রমণী—আমি একদিন লাজ সরমের মাথা খেয়ে ঠাকুর ঘরে খিল
দিয়ে মনের সাধে দেখেছিলুম ঠাকুরকে। কেউ ছিলনা, সেই
অবধি ম'রে আছি। ঠাকুরকে কি দোব না দোব ঠিক কত্তে
পেরে বুকে নিয়ে নিয়ে ঘুরচি।
শ্রীকান্ত—নাতি আমায় কি কত্তে হবে শিখিয়ে দে ভাই ?
চিন্তা--বুড়াে দা দেখলে ত কেমন রসের খেলা? হাসতে খেতে নাচতে
গাইতে প্রাণের টানে যে আমার ঠাকুরকে ভালবাসে। জীবনের
দৈনন্দিন ঘটনার মধ্যে যে আমার ঠাকুরের সেবা কত্তে পারে।
সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজাগ রেখে যে জাগা ঘরে ঠাকুরকে চুরি কত্তে
পারে সেই বটে দাগাবাজ চোর। না হলে ভাবের ঘরে চুরি
দুনিয়া কচ্চে বুড়াে দা দুনিয়া কচ্চে। তােমাদের সকলের মনাে-
বা। ঠাকুর পূর্ণ করেছেন। চল ভেতর বাড়ীতে সব, আজ ভাল
করে ঠাকুরের ভােগ সাজাই গে। কুড়াে দা, তুমি আমাদের
বড়াই সখী আগে আগে চল।
| ঠাকুরকে প্রণামান্তর সকলের প্রস্থান।
f
চিন্তামণি।
( চতুর্থ অৰু
eart 1
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
( স্বয়ম্ভুর বহিবাটীর এক পার্শ্ব।)
ললিতাবামুনমা কালী থেকে যে ক'টা টাকা পাঠিয়েছিলেন তাই থেকে
এ ক’দিন চললাে। আজ কি হবে তা জানিনা। কি দিয়ে
ঠাকুরের ভােগ দোষ, চিন্তাকে কি খেতে দোব, কত দিন পরে
মেয়েটা আসচে তার মুখেই বা কি দোব।
( চিন্তার প্রবেশ)
চিন্তা-ঠাকুরের পেসাদ দেবে আর কি দেবে জ্যাঠাই মা। সেই পেসা
শ্যামা পাবে, আমি পাব, সবাই পাবে।
ললিতা-বাবা ঠাকুরের ভােগের কোন উপায় কর। ঘরেতে কিছুই
নাই। বাস্কতে একটা পয়সা পৰ্যন্ত নাই।
চিন্তা—তার জন্যে ভাবনা কি জ্যাঠাই মা ? ঘরে গুড় আছে ত? গঙ্গা জল
ত আছে ? তাই দিয়ে ঠাকুরের ভােগ দেবে। ঠাকুর আমার
বিদুরের ক্ষুদ খেয়েছেন। তবে কি জানলে একটু ভালবেসে প্রাণের
সহিত যত্ন করে দিলে যাকে দোয়া হয় ঠিক তারই কাছে গিয়ে পড়ে
আর যে দ্যায় সেও মহা আনন্দে মেতে ওঠে। তারপর অানন্দ
যখন উথলে ওঠে বল’ব কি জ্যাঠাই মা তখন বড় সুন্দর ! বড়
ললিতা-বাবা চিন্তা, শ্যামসুন্দরের সেবা করে আমাদের কোন দিন
অভাব দুঃখু ছিল না। বােধ হয় সেবার কোন ত্রুটি হয়েছে।
তাই ঠাকুর পরীক্ষা করে দেখছেন।
চিন্তা-জ্যাঠাই মা ঠাকুর আমার মন পরীক্ষা করেন তা তুমি গুড়
ছােলাই দাও আর ক্ষীর রাবড়ীই দাও তাতে কিছু এসে যায় না।
জ্যাঠাই মা ঘরে কিছুই যদি না থাকে আমরা উপােস কৰ্ব,
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
১১৩
ঠাকুরের কাছে ধন্না দিয়ে পড়’ব ঠাকুর অন্তর্যামী সব বুঝতে
পাৰ্বেন।
ললিতা-বাবা বুক ফেটে যাচ্ছে, যাকে সাত ব্যঞ্জন দিয়ে ভোগ দিয়েছি
তাকে উপপাসী রাখ’ব কেমন করে ?
চিন্তা-ভয় নাই জ্যাঠাই মা? পাড়ার মেয়েরা সাধ করে ঠাকুরকে আমার
যে যা দিয়েছে তাই দিয়ে আজ ঠাকুরের ভােগ দোব। যাই
যােগাড় করে নিইগে তুমি ভােগ আরতির সময় গিয়ে দেখাে।
( চিন্তা যাইতে যাইতে বলিল।)
মানুষ ভাবে আমি কচ্চি, যার কাজ তিনিই করে নেন।
| চিন্তার প্রস্থান।
ললিতা--আহা! চিন্তাকে দেখলে মনে হয় ধ্রুব কি প্রলাদ এসে
বামুনমার গর্ভে জন্মেছে। কেমন মায়ের ছেলে। বামুনুমা সাক্ষাৎ
দেবী। তাইত বেলা হ’ল কত ইনি এখনও আসছেন না কেন?
বােধ হয় শ্যামাকে পাঠাবে তাই দেরী হচ্চে।
( স্বয়ম্ভুর প্রবেশ ।)
ললিতা—শ্যামা কোথায় ?
স্বয়-যমের বাড়ী।
ললিতা-ষাট, ষাট, অমন অলক্ষুণে কথা বল’না বলচি ? পাচটা নয়
সাতটা নয় বংশে একটা মাত্র মেয়ে, গাল দিতে মুখে একটু
বাধল’ না। আজকাল তােমার এত তিরিখ্যি মেজাজ কেন ?
স্বয়ম্ভূ-কেন জান না ? খুব জান। বড় সাধ হয়েছিল বড়লােক বেয়াই
বেয়ান নিয়ে আমােদ আহলাদ কত্তে। এবার খুব আমােদ
আলাদ করে। জেলটা বাকী আছে, সেইটে হলেই চুড়ান্ত হয়।
আমি জেলে গিয়ে কয়েদীদের সঙ্গে সাধ আহলাদ মেটাব আর
১১৪
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
তুমি ঘরে বসে পাড়া পড়সীর কাছে মেয়ের সুখ ছড়িয়ে সাধ
আহলাদ কৰ্বে। বড় চমৎকার হবে।
লতা-হা গা কি হয়েছে, খুলে বলনা ছাই ? আমার যে পেটের ভেতর
হাত পা সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
স্বা—মেয়ের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় তােমার
বেয়ায়ের সঙ্গে দেখা। খুব শুভক্ষণে দেখা হয়েছিল বটে, শেষটা
চোর অপবাদ। তােমার বেয়াই স্পষ্টাক্ষরে আমার মুখের সামনে
বল্লে—“যে শ্যামার গয়না আমরা নাকি সব চুরি করেচি” ।
লালত--এত অধৰ্ম্ম। সইবেনা, সইবেনা। হা গা শ্যামার গায়ে তবে কি
গয়না নেই ?
স্বয়---সেজন্যে ভাবতে হবে না, ঠিক বন্দোবস্ত কাচের চুড়ী সার হয়েছে।
লালতা-ভগবান! তুমি বিচার করাে।
সুম- ভগবান ঠিক বিচার কচ্চেন, গিন্নী, কৰ্ম্মফল কেউ লঘন কত্তে
পৰ্ব্বেনা।
ললিতহা গা, শ্যামার আমার শরীর গতিক কেমন আছে ?
সুস্থ-শ্যামা কেমন আছে জিজ্ঞেস কষ্ট ? খুব ভাল।
জ্বলে পুড়ে,
স্বলে পুড়ে, পােড়া কাঠ—ছাই হতে বাকী কেবল।
ললিতা--শ্যামারে বাছারে ! ( ক্রন্দন )
গয়ন্থ—প্যান প্যানানি পরে করো । এখন ছাই পাশ কি রেধে দুটো
দেবে চুল ? পেট বুঝবে না, পেট বুঝবে না।
ললিতা-~-চাল বাড়ন্ত, আজ উনুন জলেনি।
স্বয়ম্ভ----অামার মুখটা জেলে উনুনে আগুন ধরিয়ে দাও। সব জ্বালা, সব
আপদের শান্তি হােক্। (ললিতার মুখের দিকে চাহিল ) একি!
তােমার চোক দিয়ে যে টটস্ করে জল পড়চে। মরিনি এখনও
ভাবনা কি তােমার।
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।}
চিন্তামণি।
ললিতা—মনকে প্রবােধ দিয়ে অনেক সান্ত্বনা করে রেখেছিলুম আজ আর
পান্নুম না। আমার মরণ হলনা কেন তাই কাদচি।
স্বয়ম্ভূ-মরণের জন্যে কাদচ, বিষ খেলেও কিন্তু মৰ্ব্বে না ঠিক জেনে।
ললিতা—( নেপথ্যের দিকে চাহিয়া ) দেখ, দেখ, ওরা সব কারা বাড়ীর
ভেতর আসচে পাহারওয়ালা সঙ্গে করে।
স্বয়ম্ভু-আমি দেখছি তুমি ভেতরে যাও। (স্বগত
( স্বগত) স্বয়ম্ভু মুখুয্যে ছাই
খাও, ছাই খাও।
( জমাদার ও ইনস্পেক্টরের সহিত হরলালের প্রবেশ।)
হরলাল-( স্বয়কে দেখাইল।) এঁরই কাছে গয়না আছে, আপনি
search করুন ইনস্পেক্টর বাবু।
স্বয়—ভলােকের বার ইর এসে আপনার পুণিসর লােক হয়ে
এ রকম জুলুম কচ্চেন। ইস্পেক্টর বাবু বাইরে চলুন।
ইস্পক্টর-By no means. A charge of congisable offence
has been entered against you and the police has
every right to search your house. 2391709 atd. Tilbar
আপনার বাড়ীতে চোরাই মাল আছে আমি search কৰ্ব।
আপনি মেয়েদের সরে যেতে বলুন।
স্বয়ম্ভুইস্পেক্টর বাবু আপনি কি বল্চেন আমি কিছু বুঝতে পাচ্ছিনা।
ইনস্পেক্টর বুঝতে পাৰ্বেন বৈ কি ? দেখুন আমরা আইন অনুযায়ী
কাজ কত্তে বাধ্য। ( হরলালের প্রতি ) কেমন হরলাল বাবু
আপনার মাল পাওয়া যাবে ত? দেখবেন যেন শেষে ফ্যাসাদে
না পড়েন।
হরলালদেরী কৰ্ব্বেন না ইনস্পেক্টর বাবু, মাল পাচার হয়ে যেতে পারে।
ইনস্পেক্টর—জমাদার, ঘরকা মাল সব বাহারমে লে আও। ( স্বয়ম্ভুর
চিন্তামণি।
[ চতুর্থ অঙ্ক
গৃহের আসবাব পত্র বাহিরে আনিল।) (স্বয়ম্ভর প্রতি) খুলুন
মশাই, চাবী খুলে বা পেট্রা দেখান।
স্বয়ম্ভু আঁ-আঁ—তবে সত্যি সত্যিই কি আমি চোর।
ভগবান !
ভগবান! বেয়াই মশাই! না-না-হরলাল বাবু দগ্ধে দগ্ধে
আমায় মার’চ কেন, তার চেয়ে গলাটিপে একেবারে মেরে ফেল
মেরে ফেল। ও !
ইনস্পেক্টর(স্বয়ম্ভুর প্রতি) মশাই চাবী খুলুন বলচি না হলে ভেঙ্গে
দেখ’ব। (স্বয়ম্ভু চাবী খুলিয়া প্রত্যেক বাস্ক পেট্রা দেখাইল)
(হরলালের প্রতি) হরলাল বাবু, এই ত মশাই search করে
দেখা গেল। বামাল কই মশাই ?
হরলাল ইস্পেক্টর বাবু নাল পাচার হয়ে গেছে। আমার সন্দেহ হচ্চে।
আসামীকে হাজতে রাখা হােতূ যতদিন পর্যন্ত না তদন্তের শেষ
মীমাংসা হয়।
( রুদ্ধশ্বাসে ললিতার প্রবেশ।)
ললিতাবেয়াই। বেয়াই ! ধৰ্ম্ম মাথার ওপর এখনও দিনরাত হচ্চে, চন্দ্র
সূয্যি উঠ। এখনও মা বসুন্ধরা পাপীর দণ্ড নিয়ে দাড়িয়ে
আছে। নিজের বুকে হাত দিয়ে একবার ভাব দেখি নির্দোষীকে
চোর বলতে বুকের ভেতর একবার কেঁপে উঠল না? তােমায়
আর কি ব’ব-তােমার প্রাণে কি দয়া মায়া একটুও নাই ?
আমার স্বামীকে ছেড়ে দাও, দেখতে পাচ্চনা মুখের দিকে চেয়ে
এতখানি বেলা হ’ল এক বিন্দু জল স্পর্শ করে নি এখনও
তুমি পাষাণের মত দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখুচ? আমি যে আর
দেখতে পাচ্ছিনা চোকে। (রােদন )
হরলাল—দেখতে পাচ্ছিনা আর দেখতে খুবই পাচ্চি। মুখখানা শুকিয়ে
আসি হয়ে গেছে । চুরি করলে ঐ রকমই হয়।
ষষ্ঠ গর্ভা।]
চিন্তামণি ।
১১৭
ইনস্পেক্টর( ললিতার প্রতি) মা! আপনি ভেতরে যান। এই ঘটনার
সম্পূর্ণ তদারক না হওয়া পর্যন্ত আপনার স্বামীর বিপদের কোন
সম্ভাবনা নাই।
[ অন্তরালে ললিতার গমন।
( নলিনীর সহিত সাহেব বাবুর প্রবেশ।)
সাহেব বাবু-Mr. Inspector, please arrest the man who
brings in a false charge against an innocent person
maliciously. The evidence of this woman will
enlighten you on the point. ইনস্পেক্টর বাবু এই
স্ত্রীলােকের মুখে চুরির আদ্যোপান্ত শুনলেই বুঝতে পাৰ্বেন সব।
নলিনী-ইস্পেক্টর বাবু, আমার মুখে চুরির কথা শুনুন ওর ছােট ছেলে
সিন্ধুক থেকে গয়না চুরি করেছে আমি দেখেচি। ছেলের কাছে
থেকে আদায় কত্তে না পেরে ; ছেলের শ্বশুরের রক্ত খাবে বলে
এই ষড়যন্ত্র করেছে। অনেক লােককে ও ঠকিয়েছে সর্বনাশ করেছে।
ইনস্পেক্টর বাবু, ওরই কাছে আমার স্বামী টাকা গচ্ছিত রেখেছিল।
স্বামীর যখন আমার ভারী অসুখ ডাক্তার দেখাতে পাই না,
ওষুধ কেনবার পয়সা ছিল না, তখন ও পিশাচ চণ্ডাল টাকা
কবুল
করেনি। চিকিৎসা অভাবে স্বামী আমার মারা গেল।
কষ্ট রাখবার কি আর জায়গা আছে ইনস্পেক্টর বাবু ? ওকে মেরে
ফেল্লেও সে রাগ যায় না। যে জন্যে ওর সংসারে দাসী বৃত্তি কত্তে
এসেছিলুম, সে কাজ আমার হয়ে গেছে। ইস্পেক্টর বাবু ওকে
হাতকড়ি দিয়ে রাস্তায় নিয়ে চলুন, একবার দেখি।
( শ্রীকান্তের প্রবেশ।)
শ্রীকান্ত—দাও, হরলাল চাটুয্যের হাতে হাতকড়ি দাও, আমি সাক্ষী
আহা! নিরীহ ব্রাহ্মণের সর্বস্বান্ত করে এখন ও
আছি।
১১৮ চিন্তামণি। [ চতুর্থ অঙ্ক নরপিশাচের পেট ভরেনি। ওর ছায়া স্পর্শ কল্লে নরহত্যা, ব্ৰত্মহত্যা, স্ত্রীহত্যার পাতক হতে হয়। ইনস্পেক্টর বাবু, পাহার- ওলাকে হুকুম দিন, রূল গাছটা একবার আমার হাতে দিক, ওর পিঠে ঘা কতক বসিয়ে দিই। হরলাল চাটুষ্যে, মামার হাতে দড়ী দেবার মৎলব করেছিলে ? আজ শ্রীকান্ত শৰ্ম্মা তােমায় বেড়ী পরিয়ে তবে নিরস্ত হবে। আজ আমি আর অধাৰ্মিক পাষণ্ড হরলাল চাটুয্যের অন্ন প্রত্যাশী খােসামুদে শ্রীকান্ত নয়। আজ ধৰ্ম্মের শ্রীকান্ত, ঠাকুরের শ্রীকান্ত, ঠাকুরের সামনে প্রতিজ্ঞা করেছে তােমাকে জেলে না দিয়ে জল গ্রহণ কৰ্বে না। ইস্পেক্টর-হরলাল বাবু আপনার সাক্ষী কোথা মশাই? ব্যাপার যে রকম দেখ িআপনার againstএ সবই দাড়াচ্ছে। হরলাল-ইস্পেক্টর বার ওরা আমার শত্রু পক্ষের লােক বিশ্বাস কৰ্ব্বেন না। শ্রীকান্ত --পবরদার, মুখ সামলে? ইম্পেক্টর-হরলাল বাবু, আপনিই না ছেলের বিয়ে দিতে এসে গণপণের টাকার জন্যে এই ব্রাকাণের জাত খাবার চেষ্টা করেছিলেন ? আমায় দুষখোর মনে করে আপনিই না আমার অনুগ্রহ চেয়েছিলেন ? মনে আছে কি হরলাল বাবু? একদিন বলেছিলুম দুষ্টের দমনের জন্যেই পুলিশ। তােমার মত শয়তানকে সায়েস্তা কব্বার জন্যে রাশরমণ অনেক দিন থেকে লেগে আছে। ধিক্ তােমায় ! বিক তােমার পয়সাকে, শতধিক্ তােমার জন্মকে। কুলের কুললক্ষ্মী পুলিসের সামনে এসে দাঁড়াল দেখে মজা কচ্চিলে নয়? মজার কি সাজা সেটা বুঝি মনে নাই ? আপনাকে আমি সহজে ছাড়বনা মশাই। আসুন আমার সঙ্গে থানায় আসুন। আজই আমি ডেপুটি কমিশনারের কাছে আমার রিপাের্ট put up
যষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
কৰ্ব্ব।
( শ্রীকান্তের প্রতি) আপনিও আসুন, আপনাকে
অামার বিশেষ দরকার। ( নলিনীর প্রতি) তুমিও এস বাছা
সত্যি কথা বল্বে কোন ভয় নাই।
স্বয়ম্ভু—আর কেন ইনস্পেক্টর বাবু ভদ্রলােককে রেহাই দিন, আর থানায়
যাবার আবশ্যক কি। আমি আর থানা পুলিশ কত্তে ইচ্ছে
করি না।
যা হবার তা হয়ে গেছে। এস বেয়াই কিছু মনে
কর’না—চল ঘুরে চল।
ইনস্পেক্টর—স্বয়ম্ভু বাবু কৰ্ত্তব্যে দয়া দেখালে চলবে না। আপনি ছাড়লে
আমরা ছাড়ব না। পুলিশকে যখন অনর্থক harass করা হয়েছে
দুষ্টের দমন করা চাই।
একান্ত ও নলিনী( সমস্বরে ) নিশ্চয়ই
সাহেববাবু—আমি কালই মকদ্দমা রুজু কৰ্ব্ব।
শ্রীকান্ত ও নলিনী— সমস্বরে ) 'আমরা সাক্ষী দোব।
ইনস্পেক্টর-আপনারা সব জমাদারের সঙ্গে সঙ্গে আসুন।
[ শ্রীকান্ত, নলিনী, হরলাল, জমাদার ও ইস্পেক্টরের প্রস্থান ।
সাহেববাবু-দাদা মকদ্দমার জন্য তিলমাত্র ভেবনা।
সে ভার আমার
ওপর।
( অন্তরাল হইতে ললিতার আগমন।)
স্বয়ম্ভু ভাই মামলা মকদ্দমায় আর কাজ নাই। আমার ওপর দিয়ে
গেছে যাক। কুটুম্বের অপমানে সে’ত আমাদেরই অপমান হবে।
ললিতা-ঠাকুর পাে এ বিপদের সময় তােমায় দেখে তবু ভরসা হল।
সাহেববাবুও সব লোককে সিধে না কল্লে আবার আপনাকে ফাসাদে
ফেলতে পারে।
চিন্তামণি। [ চতুর্থ অঙ্ক ললিতা-ঠাকুর পাে তুমি ওঁর কথা শুনােনা। উনি যাতে এ বিপদ থেকে খালাস পান তােমার দুটি হাতে ধরে বচি ভাই তুমি তাই সাহেববাবু-বৌদিদি তুমি নিশ্চিন্দি থেকে কোন ভয় নাই। দাদা একটা কথা বল’ব মনে করে এসেছিলুম যদি ভরসা দেন ত বলি। স্বয়ম্ভু-ভাই তুমি আমার সেই পিতৃমাতৃহীন আমার ছােট ভাই শিবনাথ। মা তােমার ভার আমায় যে দিন থেকে দিয়ে গিয়েছিল সেইদিন থেকে তােমার কোন্ কথাটা মন প্রাণ দিয়ে না শুনেচি ভাই ? বল তােমার যা মনের কথা বল। সাহেববাবু—দাদা সত্যি করে বচি, মনের কথা বলছি। তােমার সামনে দাড়িয়ে বচি আমার স্থাবর অস্থাবর যা কিছু সম্পত্তি আছে সব শ্যামার নামে লেখাপড়া করে দিয়ে চলে যাব। কোথায় যাব জিজ্ঞেস করন। সংসার ধৰ্ম্মে আর আমার ইচ্ছে নাই। বৌদিদি ! দাদা! যা কিছু অন্যায় করেছি সব ভুলে যাও। আমায় ক্ষমা কর। [ সাহেববাবু স্বয়ম্ভুর পদতলে হাঁটু গাড়িয়া বসিল। স্বয়ম্ভ-ভাই, ভাই, আমার প্রাণের ভাই আর অমন কথা শােনা নে আমায়। আয় ভাই একবার তােক বুকে নিয়ে প্রাণটা জুড়ােই। [ সাহেববাবুকে হাত ধরিয়া তুলিয়া উভয়ের আলিঙ্গন।
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
প্রান্তরস্থ বৃক্ষতলে গােপাল আসীন।
শ্রীগােপাল—এই গাছতলায় পড়ে থাক’ব, ভিক্ষে মেগে খাব আর তার
নাম হৃদয়ে নিত্য স্মরণ করে দেবীর জাগ্রত মুর্তি প্রতিষ্ঠা কৰ্ব এই
হৃদয় মন্দিরে সমাধিস্থ হ’ব তার ধ্যানে। (নেপথ্যের দিকে
সহসা চাহিল।) ও কে স্ত্রীলােক একজন গান গাইতে গাইতে
এ দিকে আসছে।
( ভিখারিণী বেশে গাহিতে গাহিতে বিলাসীর প্রবেশ।
( গান)
বঁধূ কি আর বলিব আমি,
জনমে জনমে
জীবনে মরণে
প্রাণনাথ হৈয়াে
তুমি।
তােমার চরণে আমার পরাণে,
লাগিল প্রেমের ফাঁসি
সব সমপিয়া
এক মন হৈয়া
নিশ্চয় হইলাম
তুমি রসরাজ, বলিতে কি লাজ
তুমি বন্ধু তুমি
স্বামী
ভিখারিণী কহে, জনমে জনমে,
কয়ে আছি
অনুগামী।
দাসী।
১২২
চিন্তামণি।
{ পঞ্চম অঙ্ক
বিলাসী-গান শুনলেন ত, দিন ভিখারিণীকে ভিক্ষে দিন।
শ্রীগােপাল—আঁ-আঁ-ভিক্ষে। আমি নিঃসম্বল পথিক
কোথায় পাব।
বিলাসী-পথিকের গায়ে ত দিব্যি সভ্য ভব্য জামা জোড়া দেখচি।
আপনি কোন পথের পথিক ?
শ্ৰীগােপাল—আমি নিজেই তা বুঝতে পারি না।
বিলাসী-আপনি না পারুন, আমি কিন্তু আপনার হাবভাব দেখে বুঝে
নিয়েছি।
শ্ৰীগােপাল-না-না বুঝতে পারনি, কেউ পারেন। যার জ্বালা সেই জানে।
বিলাসী-জালা সকলেরই আছে। আপনার যেমন বুকের পাঁজরার
ভেতর কাঠের আংরা ধিকি ধিকি জচে ঠিক আপনারই মত
'আমার প্রাণেও সেই এক জ্বলা, এক ব্যথা।
শ্রীগােপাল--কেন, কেন আপনার কি হয়েছে?
বিলাসী-সে অনেক কথা।
শ্রীগোপাল—বলুন, বলুন।
বিলাসী--শুনবে? বাপের এক মেয়ে বড় আদরের ছিলুম। অল্প বয়েসে
বাপ বিয়ে দ্যায় কিন্তু মনের সুখ একদিনের জন্যেও পাইনি।
স্বামী আমায় নিয়ে কখনও ঘর করেনি। কেন করেনি,
তা বুঝতে পাত্তম না। দেখতুম ঘরে পিল দিয়ে দিনরাত কি
জপতপ কত্তেন ধত্তে পান্তুম না। তার পর একদিন সতি
সত্যিই শুনলুম—লােকে বলতে লাগল সন্ন্যাসী হয়ে কাশীতে।
কোথায় নাকি অাশ্রম করেছেন। অনেক চেষ্টা কলুম খুজে বার
কত্তে পালুম না। কেউ বলে মারা গেছেন। ঘরে আর কার
জন্যে থাক’ব। এখন তাই ভেক নিয়েচি। ভিক্ষে করি আর
গান গাই। আপনার কি হয়েছে বলুন?
?
প্রথম গর্ভাঙ্ক।] চিন্তামণি। শীগােপাল—আমার কি হয়েচে অবস্থা অবস্থা দেখে বুঝতে পাচ্চ না আবার জিজ্ঞাসা কচ্চ ? বলতে পাৰ্ব্ব না, বলতে পাৰ্ব না সে কথা। চোখের পলক পড়তে না পড়তে সব ফুরিয়ে গেল ফুরিয়ে গেল, ফুরিয়ে গেল। | বেগে শ্রীগােপালের প্রস্থান। বিলাসী স্বগত) আর আশা নাই তবে আর কার জন্যে বেঁচে থাকব, কি নিয়ে মনকে সান্ত্বনা দোব। টাকা গেছে, গয়না গেছে, নারীর অমূল্য ধন সতীত্ব গেছে। কি নিয়ে মনকে প্রবোেধ দোব। কার কাছে গিয়ে জুড়ব? কেউ ত নাই আমার। নানা—আছে, বড় যত্নে বুকের মধ্যে লুকুননা আছে। ছুরি এস! তােমায় বুকে করে রেখেচি, এস, আজ তােমাকেই প্রাণ দিই। না---কার জন্যে মৰ্ব্ব ? আমি যে কাঙালিনীর মত পায়ে ধরে কেঁদেছিলুম, কই কেউ কি আমার ব্যথার ব্যথী হয়ে আশ্বাস দিয়ে আমায় বাচিয়েছিল ? আমি নে সারারাত জেগে বসে থাকতুম ভাের হয়ে যেত, চোকের জল মুছতে মুছতে ঘুমিয়ে পড়তুম ; কই কেউ কি একবার আমার মুখ তাকিয়েছিল ? তবে কার জন্যে মৰ্ব ? না--মৰ্ব্ব না ? সে আমায় চির- জন্মের মত মেরে রেখে গেছে তাকে খুঁজ’ব। অলিতে গলিতে, বাড়ীতে বাড়ীতে, পাহাড়ে বনে, তাকে খুজ’ব, তাকে খুজ’ব । [ বেগে বিলাসীর প্রস্থান।
১২৪
চিন্তামণি।
[ পঞ্চম অঙ্ক
দ্বিতীয় গর্ভা
( জেল।).
( কয়েদীগণের গান।)
হােলাে জান্ হায়রাণ,
পায়ে বেড়ী, হাতকড়ি, হাড়ে হাড়ে হেঁচকা টান ।
ক্ষিদের সময় জ্বলে নাড়ী,
মারে কেবল বেতের বাড়ি,
ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ি, শুনেও তবু দেয় না কান।
চোক থাকে ত দেখ না তােরা,
বুঝবি তবে আগা গােড়া,
লেখা আছে যেমন যার, জানিস তার ঠিক বিধান।
জমাদার--( লালগােপালের প্রতি) এই শালা কাঁদছিস কেন? পাথর
ভাং।
লালগােপাল—আর পাচ্ছিনা জমাদার সাহেব। ছাতি ফেটে যাচ্চে,
একটু জল দিতে পার।
জমাদার--শালা, তাের বাবার নােকর আছি।
লালগােপালগাল দিচ্চ কেন ?
জমাদার—শালা পাথর ভাং বলচি। সাক্ আয়েগা , চাবুক সে জান্
নিকাল জায়েগা। দু ঘণ্টার মধ্যে বিলকুল সাফ কত্তে হবে,
ইয়াদ থাকে। (২য় কয়েদীর প্রতি) এই, তুই শালা বড় চালাক
আছিস। দাড়িয়ে দাড়িয়ে কি দেখছিস্? গাড়ী টেনে লিয়ে আয় ।
এঠো ইটা গিরে কি ভাঙ্গে মিঠা কড়েয়া হােগা। ( অন্য
কয়েদীর প্রতি।) এই তােম লােক কান্ মে হুসিয়ার রহহ।
সা আভি আয়ে গা।
[ জমাদারের অন্যদিকে গমন।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।]
চিন্তামণি।
২য় কয়েদীশালা বেশ মজায় আছে।
তৃয় কয়েদী—প্রথম প্রথম ওকে ও খুব খাটতে হয়েছিল তারপর কিছু
দিন গেলে, সাহেব ওর কাজে খুশী হয়ে জমাদার করে দিয়েছে।
ওকে হাতে রাখি ভারী কাজ কমিয়ে দেবে।
৪র্থ কয়েদী— তৃয় কয়েদীর প্রতি) দেখ ভাই, এই লােকটা চার পাচ
মাস এয়েচে, কারাে সাৎ বানা-ফুৰ্ত্তি—না না—হরবখত কাদবে
আর কামভি পাব্বে না, মারভি খাবে। (লালগােপালের প্রতি)
এই, তুই বড় বােকা আছিস? মনকে ফুৰ্ত্তি মে রাখ। দেখবি
কাম্ আপসে হােবে। উর কি আছে ? চুরি কচিস, খালাস
হােবে। হামি পাঁচ পাঁচবার ফাটক আসছে, ফাটক ত ঘর বাড়ী
আছে।
(জমাদারের প্রত্যাগমন।)
জমাদার—এই হুসিয়ার রহহ, সাক্ আতা হ্যায়।
(জেলার সাহেবের প্রবেশ, জমাদার ও কয়েদীগণ
জেলার সাহেবকে সেলাম করিল।)
০
জেলার সাহেব— জমাদারের প্রতি) কাম ঠিক সে চলতা হ্যায় ।
সুপারিন্ সা আভি আয়েগা। যি লােককা মিয়াদ হাে গিয়া
ছুটি মিলেগা।
জমাদারহুজুর একুঠো বদমাস সিধা নেহি হােতে। ওহি দেখে সাবৃ
( লালগােপালকে দেখাইল।) বৈঠা, বৈঠা, হড়ঘড়ি রােতে হ্যায়
কান্ নেহি মাংতে ।
(জেলার সাহেব চাবুকের বাড়ি লালগােপালের
পিঠে সজোরে মারিল।)
লালগােপাল–ওরে বাপরে! মা’রে! গেলুম রে!
চিন্তামণি।
| পঞ্চম অঙ্ক
জেলার সাহেব—You damnel rogue. জরুকা কোঠি না আছে,
শালা কান্ করাে।
লালগােপাল--সাহেব, সাহেব, 'আমার বাড়ীর কথা মনে পড়ছে। আমার
সাধ্বী সতী স্ত্রীর কথা কেবল জেগে উঠছে। তুমি যেমন আমায়
চাবুক দিয়ে মারলে তার চেয়ে জোরে আমি আমার স্ত্রীকে
মেরেচি। মারো মারো সাহেব, আমায় খুব মারাে, খুব মারাে।
জেলার সাহেব---শালা, পাগল কা ঢং দেখা ? মজা দেখাে।
( পুনরায় প্রহার।
লালগােপাল---ওরে বাপরে! মারে! গেলুম রে !
( ফাইল দেখিতে দেখিতে জেলের সুপারিনটেণ্ডের প্রবেশ ও
তৎসঙ্গে রাধারমণের প্রবেশ।)
915-1 see, Babu, you speak the prisoner Lalgopal
Chattrejee sentenced on a charge of theft. I am
indeed sorry to learn the bistory of the unfortunate
chap, but. I am sure you will see that he repents
of his misdoings and endeavours to prove himself
a man,
Sir,
রাধারমণ-Yes,
that has been my intention
throughout. I feel the forge of prison has brought
him to his senses and I will not have much to do.
He has, Sir, served out his period of punishment
and will be released this morning I believe.
gaisa. Yes, Babu, so it is. (জেলারের প্রতি) Mr.
Fenniston, will you please call out the prisoners
as per the list in the File ?
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি ।
১২৭
জেলার---Yes Sit.
সুপারিন-( জমাদারের প্রতি ) রহমউল্লা আকবর ছুটি মিলা।
( জমাদার কয়েদীদের নাম ধরিয়া তিনবার জোরে ডাকিল।)
জমাদার— ১ম কয়েদীর প্রতি) ছুটি হাে গিয়া ঘর যাও।
[ ১ম কয়েদী সুপারিন সাহেবকে সেলাম করিয়া চলিয়া গেল।
সুপারিন-নাসিরুদ্দীন মহম্মদ।
জমাদার-- ২য় কয়েদীর প্রতি) ছুটি মিল ঘর যাও।
[ ২য় কয়েদীর প্রস্থান ।
সুপারিন—লালগােপাল চাটার্জী।
জমাদার— লালগোপালের প্রতি) খালাস হো গিয়া ।
সুপারিন— রাধারমণের প্রতি) Babu Is this your chap ?
রাধারমণ—Y*s sil.
Much obligerl.
| লালগোপালকে সঙ্গে ইয়া রাধারমণের প্রস্থান।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
পথ।
রাধারমণ—ফুৰ্ত্তির দৌড়টা কি রকম হ’ল লালগােপাল বাবু ? বল,
একবার শুনি।
লালাগােপাল—পিঠে এই দাগ দেখ, খুব মার খেয়েছি। কখন আমি
বাড়ী গিয়ে আমার স্ত্রীকে দেখ’ব। তার জন্যে আমার মন বড়
অস্থির হয়েছে।
রাধারমণ—কেন, বেলার জন্যে হয় নি ?
১২৮ চিন্তামণি। | পঞ্চম অঙ্ক লালগােপাল—সে অসতী, তার নাম করনা। পিশাচী আমায় যাদু করে রেখেছিল। রাধারমণ—চমক ভেঙ্গেচে কি লালগােপাল বাবু ? লালগােপাল—ও কথা জিজ্ঞেস করনা আর। শীগগির আমায় বাড়ীতে নিয়ে চল। রাধারমণ—লালগােপাল চিন্তে পার আমি কে? আমি তােমার ছেলে বেলার বন্ধু বরাবর এক সঙ্গে দু জনে পড়েছি। তুমি কাঃ আর্ট অবধি পড়ে কলেজ ছেড়ে দিলে আর আমি বি,এ পাশ করে পুলিশের ইস্পেক্টর হলুম। তারপর তােমার সঙ্গে আমার আর দেখা হতনা। ক্রমে তুমি আমায় ভুলে গেলে আমি কিন্তু তােমায় ভুলতে পাল্লুম না। যখন জানলুম তুমি কুসঙ্গে ভিড়ে তােমার স্ত্রীকে ত্যাগ করে বেশ্যার প্রেমে উন্মত্ত হয়ে তখন তােমাকে ফিরিয়ে আনবার জন্যে পিশাচীর রঙ্গক্ষেত্রে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করেচি। মনে পড়ে লালগােপাল ? যে দিন পুলিশে তােমায় তাড়া করে, তুমি বেলার কাছে আশ্রয় চেয়েছিলে ? বেলা তােমার বিপদের সময় আশ্রয় দেওয়া অন্য কথা, ঘর থেকে দূর করে দিয়েছিল। সে কর ইঙ্গিতে জান ? এই রাধারমণের? রাধারমণ মনে কলে সে যাত্রা তােমাকে রক্ষে কত্তে পারত, কিন্তু তােমার মত নরম পাষণ্ডের জেলই উপযুক্ত স্থান। বারণ করেছিলুম বেলাকে। বুঝে দেখ লালগােপাল, মে বেলাকে তুমি প্রাণ দিয়ে ভালবাসতে সেই বেলা আমার কথায় উঠত বসত। সে জানত আমি তার বিপদে আপদে সুখে দুখে একমাত্র সঙ্গী। অগাধ বিশ্বাসে তাই-টাকা গয়না, সমস্ত গচ্ছিত রেখেছিল আমার কাছে। বুঝতে পারেনি শয়তানী। ভুলিয়ে রেখেছিলুম- ধৰ্ম্মের কাছে ভালবাসার ভান করে অধৰ্ম্মের পূরাে মাত্রায় বিশ্বাস
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
ঘাতকের ছুরি গলায় মেরে চলে এসেছি। লালগােপাল, এই নাও
---তােমার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি। এই তােমার বাড়ীর দলিল,
চল, তােমার স্ত্রীর নামে এই কাগজ তার হাতে দিয়ে তবে নিশ্চিন্দি
হ’ব। এই দেখ তােমার স্ত্রীর গয়না, আর এই নােটের তাড়া।
সাবধান লালগােপাল। পিঠের দাগের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখাে-
তা হলেই সতীকে কাদান’র প্রায়শ্চিত্ত হবে।
লালগোপাল রাধারমণ ! রাধারমণ ! তোমার বন্ধুত্বের প্রতিদান কি
দিয়ে কত্তে হয় তা জানি না ভাই ; আমায় ক্ষমা কর। কাঞ্চন
ফেলে কাচে ভুলেছিনু, রত্ন চিনতুম না। তুমি চোৰু দুটো
ড়ে দেখিয়ে দিয়ে।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
(গােয়ালঘর-শ্যামা 'অবরুদ্ধ )
শ্যামা-চারটি করে ভাত খেতে দেয়, তাও আজ দুদিন হ’ল বন্ধ করেছে।
আর কেউ একবারও এদিকে উঁকি মারে না। কারুর সাড়া
শব্দটি নেই। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্চে কেউ একটু জল দিলে
না। গােয়ালঘরে পূরেচে আমায় মেরে ফেলবার জন্যে। মেরে
ফেলুক তাতে দুঃখ নাই ; কিন্তু মব্বার আগে তার সঙ্গে একবার
দেখা কৰ্বার বড় সাধ । ওগাে ! কোথায় আছ তুমি এসময়ে
একবার এস ; আর যে তােমায় না দেখে থাকতে পাচ্ছি না।
আমি তােমার আদর চাইনা, সােহাগ চাইনা, তুমি আম
তেম্নি করে বকতে বক্তে মারুতে মাতে আমার সামনে এলে
চিন্তামণি।
( পঞ্চম আর
দাড়াও আমি তােমায় প্রাণভরে দেখে নিই। আহা! জেলেতে
না জানি তােমার কত কষ্ট হচ্ছে কত যন্ত্রণা হচ্চে।
( হঠাঙ্গায় খাবার ও ভাড়ে জল লইয়া অধরের
চুপি চুপি প্রবেশ।)
কে আসচে নয় ? কার যেন পায়ের শব্দ পাচ্ছি। কে আছ গা?
একটু জল দাও। বড় তেষ্টা, বড় তেষ্টা।
অধর-বউদিদি ! চুপ কর চেঁচিয়ােনা। কেউ দেখতে পেলে কি জান্তে
পাল্লে এখুনি কৰ্ত্তা বার আমার গর্দান নেবে। গেলাস বাটি
কোথাও কিছু পেলুম না, এই ভাঁড়ে করে জল এনেচি আর এই
ঠোঙ্গায় কিছু মিষ্টি আছে। চট করে নিয়ে নাও। বাবা ঠাকুরকে
খবর দিয়ে এলুম, তিনি শুনে যেন কেমন হয়ে গেল—বল্লে “তুই
যা আমি আসছি”। বৌদিদি ! আর দেরী করনা, নিয়ে নাও।
শ্যামা--অধর, চিন্তা দাদার কাছে কেন তুই এ সব বলতে গেলি?
—না, তুই ফের গিয়ে বলে আয় আমি বেশ সুখে আছি আমার
কোন কষ্ট নেই।
অধরনা বৌদিদি ! তা আমি কিছুতে বলতে পান। তােমার পায়ে
পড়ি দেরী করনা, ঠোঙ্গাটা নাও, না হলে আমি মাথা খুড়ব,
কিছুতেই এখান থেকে নড়ব না। আমার বুকের ভেতরটা কি
রকম কচ্চে তা তুমি বুঝতে পাচ্ছি না।
আমা—তাের চেয়ে আমার প্রাণে কি যন্ত্রণা হচ্চে, অধর তুই কি বুঝবি
বল? তাের ছােট দাদাবাবু কবে বাড়ী আসবে, একবার তার সঙ্গে
আমার দেখা করিয়ে দে। তাের কাছে আর আমার কিছু
বলবার নেই।
অধয়—বৌদিদি! ছােট দাদাবাবু, কাল খালাস পেয়েছে শুনলুম।
ভয় নাই ভেবনা আমি সেই তকেই ঘুরচি। একবার দেখা
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
পেলে হিড়হিড় করে তােমার কাছে টেনে নিয়ে আসব। দেরী
হয়ে যাচ্চে কেউ এসে পড়বে, শীগগির নাও।
শ্যামা—কি বল্লি ? খালাস পেয়েছেন? সত্যি না মিথ্যে বলুচিস?
অধর মিথ্যে কথা বলা অধরের কুষ্ঠিতে লেখেনি।
শ্যামা-তুই সুখে থাক। ভগবান তোর মন প্রাণকে যে জিনিষ দিয়ে
গড়ে দিয়েছেন তাই নিয়ে তুই সুখে থাক্। তোকে বেশী কি
বলব, আর আমার ক্ষিদে তেষ্টা নাহ। যা তুই ও সব ফিরিয়ে
নিয়ে যা।
অধর—কি বল্লে বউদিদি ফিরিয়ে নিয়ে যাব ! তিন দিন থেকে উপােস
করে আছি, তুমি ঘরের লক্ষ্মী তােমার চোক দিয়ে জল পড়বে--
আর এই ভিটেয় বসে অধর তাই দেখবে ? প্রাণ থাকতে তা
পাব্বে না । সতীলক্ষ্মী ! এই রহ’ল ভাড়ে জল আর এই রইল
মিষ্টি। ইচ্ছে হয় নিয়ােনা হয় যা ইচ্ছে কোরে। এ ভিটে
ছেড়ে 'অধর জন্মের মত চললাে।
মা-নাছােড়বান্দা তুই, কিছুতে শুনিনি তা জানি। তবে দে এই
জালার ওপর দিয়ে দে।
[ অধর জল ও মিষ্টি জাল্লা দিয়া দিল, এবং
শ্যামা হাতে করিয়া লইল।
ধর—বৌদিদি ! বৌদিদি ! আজ আমার জন্ম সার্থক, জীবন ধন্য, আমি
মহাভাগ্যবান। তােমারই মতন একজন আমার মা ছিল তাকে
কোনও দিন হাতে করে কিছু দিতে পাইনি। আজ আমার সকল
সাধ মিটল।
১৩২
চিন্তামণি।
[ পঞ্চৰ ৰু
• • • • •
পঞ্চম গাঙ্ক।
( হরলালের কক্ষ)
-হরলাল--ব্যাটারা আমার নামে ওয়ারেন্ট বার করেছে। মনে করেছে
আমি একেবারে কচিখােক।। ওরে ব্যাটারা গােমুখর দল!
আমি আবাট না বেঁপে কি আর এ কাজে নেমেচি ? বাড়ী
থেকে বেরুব না—চার্দিক বন্ধ করে চাবী দিয়েচি। ধর ব্যাটারা
আমায় কি করে ধরি? হায়! হায়! আমায় বড্ড ঠকাষ্টা
ঠকিয়েছে। সাক্ষী দোব বলে শেষটা ব্যাটা বেটীরা সব উল্টো
গাইলে। আচ্ছা আমিও হরলাল চাটুৰ্যে—বুঝে নােব। না না
বােঝাবুঝি এখন কাজ নাই, আগে এ দায় থেকে এ যাত্রা বেঁচে
উঠি ; তারপর দেখব কার ঘাড়ে কত রক্ত। কৰ্বে আর কি ?
জরিমানা না হয় জেল এই ত? কিন্তু জরিমানা হলে টাকা দোৰ
কোত্থেকে? ঘরের টাকা ! বাপরে! কলজের রক্ত! কিছুতে
দিতে পাঝ না। -না-জেলে যাব। হা হা হা ব্যাটার
আমায় জেলে দেবে ? ( পিস্তল লইয়া ) তার আগে সব ব্যাটাদের
গুলি কৰ্ব। কিন্তু সব মাটি হয়ে গেল-~-অনেকগুলাে গয়না! এক
এক খানা গয়নার কথা মনে হচ্চে, আর এক এক খানা হাড়
আমার পাজরা থেকে খসে যাচ্চে। ওহহ! গুয়াের ব্যাটা আমার
সর্বনাশ কল্লে। এমন কুলাঙ্গার ছেলেও জন্মেছিল ! কি করি
কিছুই ভেবে উঠতে পাচ্চি না। আচ্ছা এক কাজ কল্পে হয় না ?
এই সুযােগে দম দিয়ে যদি মাগীর টাকাটা বার কত্তে পারি দেখি
-না স্থায় তারও উপায় ঠিক করে রেখেছি।
ডেকে পাঠিয়েচি
দেখি কি হয়।
(দামিনীর প্রবেশ।)
দামিনী-কি গো কি বল’চ।
পঞ্চম গর্ভা।
চিন্তামণি।
১৩.
.
!
হরলাল—তা হলে কি হবে।
দামিনী--কিসের কি হবে ?
হরলাল-ন্যাকা সাজ’চ যে দেখচি? না হাতী সঁকে পড়েছে দেখে পায়ে
খাতলা বুঝি ?
দামিনী—তা আমি কি কৰ্ব্ব বল, আমায় ত আর দুচার খানা গয়না দাও
নি যে এ সময় দিয়ে তােমায় সাহায্য কৰ্ব ।
হরলাল—তুমি মনে কল্লে এ দায় থেকে আমায় উদ্ধার কত্তে পার।
তোমার বাপ তােমার নামে যে কোম্পানীর কাগজ দিয়েছে সেই
খানা আমায় এখন দাও,আমি বাধা দিয়ে টাকা নিই পরে তােমায়
উদ্ধার করে দেব।
দামিনী--সে কাগজ ত বাবা নিজের কাছেই রেখেচেন।
হরলাল—বেশ তােমার বাপকে বলে পাঠাও যে-
দামিনীতিনি এখন হাওয়া খেতে মধুপুরে গেছেন। তার শরীর অসুস্থ
এ সময় আমি তাকে বিরক্ত কত্তে পাৰ্ব্ব না ; আর লােকেই
বা আমায় বলবে কি!
হরলাল-~-তা হলে তােমার ইচ্ছেটা আমি জেলে যাই, বেশ তাই হকে
কিন্তু জেলে যাবার আগে তােমাকে আর তােমার বউকে এই দুটো
ডাইনীকে যমের বাড়ী পাঠিয়ে তবে যাব। দাড়াও ঠিক হয়ে।
দাড়াও।
(দক্ষিণ হস্তে পিস্তল লইয়া বাম হস্তে দামিনীর গলা টিপিল।)
কামিনীমের’না মের’না পায়ে পড়ি
হরলাল—এই নে জন্মের শােধ।
[ গুলি নিক্ষেপ ও দামিনীর মৃত্যু।
( পুলিশ সই নলিনীর প্রবেশ।
নলিনী-ঐ-ঐ-ইনস্পেক্টর বাবু।
চিন্তামণি।
[ পঞ্চম আৰু
হরলাল-বটে শয়তানী ।
| নলিনীকে গুলি করিয়া পলায়ন, নলিনীর পতন ও মৃত্যু।
ইনস্পেক্টর-খুন হুয়া-খুন হুয়াশলাকে পাকড়া।
[ পশ্চাৎ পশ্চাৎ পুলিশের গমন।
পট পরিবর্তন
( গােয়াল ঘর-গুলি ছুড়িতে ছুড়িতে হরলালের প্রবেশ। )
হরলাল—এখনও একটা
{ গােয়ালঘরে গুলি নিক্ষেপ, পুলিশ কর্তৃক হরলাল ধৃত। হরলালকে
লইয়া পুলিশের প্রস্থান ও গােয়ালঘর হইতে অগ্নি স্ফুরণ।
(বেগে অধরের প্রবেশ।)
অধর--এত ধোয়া কোথা থেকে আসছে। একি! সর্বনাশ হ’ল, সর্বনাশ
হ’ল ! গােয়ালঘরে আগুন। বৌদিদি ? বৌদিদি ! সাড়া পাচ্ছিনা
কেন? দীনবন্ধু! ভগবান! কি করি? কাকে ডাকি। হায়!
হায় ! কি হল, কি হ’ল। (দরজা ভাঙ্গিতে উদ্যত।)
(বেগে চিন্তার প্রবেশ। )
চিন্তা-অধর! সরে যা সামনে থেকে সরে যা। ঠাকুর : ঠাকুর।
[ দরজা ভাঙ্গিয়া জলন্ত অগ্নির মধ্যে চিন্তার প্রবেশ ও
শ্যামাকে স্কন্ধে লইয়া দগ্ধ দেহে আগমন।
অপর, ভয় নাই এখনও প্রাণ আছে শীগগির আয়।
[ শ্যামাকে লইয়া বেগে চিন্তার প্রস্থান,
পশ্চাৎ পচাৎ অধরা গন।
অধর- ঠাকুর কি কল্পে গাে! কি সর্বনাশ হ’ল গাে ।
যই গর্ভাঙ্ক। চিন্তামণি। যষ্ঠ গর্ভা। ( কাশীর নির্জন প্রান্তস্থিত ভগ্ন কালী মন্দির সম্মুখে কালী প্রতিমা।) কৃপান-মরি । মরি। আমার বিলাসকল্প মঞ্জরীর ফুটন্ত গােলাপ, তােমার সুঠাম অঙ্গের সমস্ত মাধুরী—যােগীর যােগ ভঙ্গিমায় ধ্যানস্থ আঁখিকেও চঞ্চল করে। প্রিয়ম্বদা—গুরুদেব রক্ষে করুন। কৃপান-প্রিয়ম্বদা ! অনেক দিনের আশা, হৃদয়ের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা আজ পূর্ণ হবে। প্রস্তুত হও। প্রিয়ম্বদা-~~আমায় কি মা কালীর কাছে বলি দিতে এনেছেন ? ৰূপানন্দ-~-কালীর কাছে নয় বটে—তবে পাপের চরণে তােমায় উৎসর্গ কৰ্ব। তার আগে এই নাও-পাপের সহচরী অমৃতরস সােম- সুধা পান কর। ( সম্মুখে মদের বোতল রাখিল এবং পান করিল।) প্রিয়ম্বদা |--গুরুদেব। কে যেন এই বনের চাদ্দিকে ঘিরে আমায় ভয় দেখাচ্চে । অবলা নারীকে আপনার আশ্রয়ে রক্ষে করুন। কৃপান—জান কোথায় তুমি এসেচ ? প্রিয়ম্বদা--গুরুদেবের আশ্রমে। কপানন্দ---কি কত্তে এসেচ ? প্রিয়ম্বদা-গুরু অন্তর্যামী তিনিই জানেন। কৃপানন্দ-তুমিও জান বৈকি? ঘর সংসার স্বামী সমস্ত ছেড়ে পরপুরুষকে আশ্রয় করে। জাননা বল্লে কে শুনবে ? প্রিয়ম্বদাকে! কে আপনি শীগগির বলুন। আতঙ্কে আমার সর্বশরীর কাপচে।
চিন্তামণি। [ পঞ্চম আৰু কৃপান-সােম সুধার প্রতি ক্রিয়ার আর অল্প মাত্র দেরী আছে। অস্থির হােয়ােনা। প্রিয়ম্বদা--মা, বিপদভয়বিনাশিনী কালী, একি কল্লি মা ! আমার ইষ্টদেবকে চিনিয়ে দে মা। কৃপানন—প্রিয়ম্বদা ! প্রিয়ম্বদা । রমেন্দ্র তােমার ইষ্টদেব। { কৃপানন্দ আলখাল্লা ও কৃত্রি দাড়ি গোঁফ খুলিয়া রমেন্দের বেশে দাড়াইল) বড় সাধ গিয়েছিল তােমায় বিয়ে কত্তে, তােমার বাপ কিন্তু রাজী হয় নি। তােমারই জন্যে রাজী হয় নি। আমি প্রাণ দিয়ে তোমায় ভালবাসতুম, তুমি ফিরেও চাইতে না। আজ তার প্রতিশােধের দিন। প্রিয়ম্বদা রমেন্দ্র । রমেন্দ্র বিশ্বাসঘাতক, প্রবঞ্চক, সাবধান বলচি । কৃপান-জান, এখন তুমি আমার হাতের মুটোয়? এখানে তােমায় রক্ষে কৰ্বার আর দ্বিতীয় কেউ নাই ? প্রিয়ম্বদা-তাের মত শত রমেন্দ্র এলেও সতীর অঙ্গ স্পর্শ কত্তে পাব্বে না ? কৃপানন্দ—প্রিয়ম্বদা, তোমার জন্যে স্ত্রীকে ত্যাগ করে চলে এসেছি। সমস্ত দিন অনাহারে রােদে বসে মন্ত্র জপ করেছি। তােমার জন্যে শ্মশানে গিয়ে অন্ধকারে মড়ার ওপর রাত কাটিয়েছি। আর ও কি বলব? তুমি আমায় পাগল করে, আমায় শান্ত কর ? প্রিয়া—এখনও সাবধান বল’চি। কৃপানন্দ—তুমি কি পাষাণী ? না-না-হৃদয়সোহাগিনী—এস, হৃদয়ে ( প্রিয়ম্বদাকে ধরিতে অগ্রসর।) শিয়া-চুনি, সতীর অঙ্গ সনি, পুড়ে যাবি। কে আছ কোথায় রকে কর, রক্ষে কর। (নেপথ্য হইতে) ভয় নাই, ভয় নাই। ।
যই গর্ভা।
চিন্তামণি।
১৩৭
কৃপানন্দ—একি! ভয় হচ্ছে কেন? সুরা সুরেশ্বরী, আর একবার তােমায়
পান করি। সাহস দে মা। প্রিয়ম্বদা হৃদয়েশ্বরী ! (পুনরায়
প্রিয়ম্বদাকে ধরিতে অগ্রসর, ও প্রিয়ম্বদা পশ্চাৎ হঠিতে হঠিতে
মন্দিরে গিয়া দাড়াইল।)
প্রিয়ম্বদা—মাগো! অসুর দলনী শক্তি দে মা। আয় পিশাচ আয়, আর
একটা মুণ্ডু মা'র হাতে ঝুলিয়ে দিই। ( মা কালীর হস্তস্থিত খাঁড়া
লইয়া প্রিয়ম্বদা ভৈরবী মৃত্তিতে দাড়াইল।।
( পরিব্রাজক বেশে সাহেববাবুর প্রবেশ।)
পরিব্রাজক—এই নির্জন স্থানে কে করুণ চীৎকার কল্লে। স্ত্রীলােকের
কণ্ঠস্বর বলে বোধ হ’ল । শব্দটা যেন এই দিক থেকেই হল।
( মন্দিরের নিকট গিয়া ) একি! একি! প্রিয়ম্বদা ! প্রিয়ম্বদা ।
( মূর্হিত হইয়া প্রিয়ম্বদা পড়িয়া গেল।
পরিব্রাজক প্রিয়ম্বদার মস্তক ক্রোড়ে লইয়া ) ওঠ ওঠ প্রিয়ম্বদা চেয়ে
দেখ আমি এসেচি আর ভয় নাই।
( কৃপান খাঁড়া লইয়া পরিব্রাজককে কাটিতে উদ্যত,
ইত্যবসরে একহস্তে কমণ্ডলু ও অপর হস্তে ত্রিশূল
লইয়া সন্ন্যাসিনী বেশে বেগে বিলাসীর প্রবেশ1)
বিলাসী—সাবধান পিশাচ। আর এক পা এগুলে এই ত্রিশূল দিয়ে বিধে
ফেলব।
(কৃপান স্তম্ভিতভাবে দাড়াইয়া রহিল, ইতিমধ্যে পরি-
ব্রাজক এক লক্ষে উঠিয়া কাপড় দ্বারা তাহার
হস্ত পদ বাধিয়া ফেলিল।)
পরিব্রাজক-মা! তুমি কে মা ?
বিলাসী-বাবা? এখন পরিচয়ের সময় নয়। স্ত্রীলােকটির মূৰ্চ্চা হয়েছে
চিন্তামণি।
[ পঞ্চম এ
আগে তাকে রক্ষা কত্তে হবে। ( বিলাসী কমণ্ডলু হইতে জল
লইয়া প্রিয়ম্বদার মুখে ছিটাইল।)
প্রিয়ম্বদা চেতন পাইয়া) কোথায় আমি! পিশাচ! এখনও বলছি
সরে যা—সতীর অঙ্গ চুনি।
পরিব্রাজক—প্রিয়ম্বদা ! চিনতে পাচ্ছনা ? আমি যে তােমার কাছেই
প্রয়েছি।
---
প্রিয়ম্বদা--(উঠিয়া বসিল।) কে আপনি ? একি একি! স্বামী! ইষ্টদেব ।
গুরু। দাসীর অপরাধ মার্জনা করুন। ( পদধারণ।)
পরিব্রাজক-~-অপরাধ তােমার নয় প্রিয়ম্বদা-অপরাধ আমার ।
এই অজ্ঞাত কুলশীল অণ্ডকে গৃহে স্থান দিয়েছিলুম। ঐ দেখ
পিশাচকে হাত পা বেঁধে ফেলে রেখেছি। শিয়াল কুকুরে ওকে
জীৱন্তে ছিড়ে খাবে। (কৃপানন্দের প্রতি) দেখ, পিশাচ ! তাের
উপ কাজের এই উপযুক্ত ফল। প্রিয়ম্বদা। এই মা-ই
আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন।
প্রিয়ম্বদা-মা ! তুমি কে মা? মাগাে ! তুমি কি ঐ অসুরদলনী অভয়া-
মূর্মিত হয়ে দেখা দিয়ে?
বিলাসী-না, মা—আমি এক পিশাচের স্ত্রী পিশাচী। মা ! (মন্দিরস্থ
প্রতিমার দিকে অঙ্গু নির্দেশ করিয়া ) 'ওই সতীকুলরাণী তােমায়
রক্ষা করেছেন।
পরিব্রাজক-ধন্য তুমি প্রিয়ম্বদা ! ধন্য হিন্দুরমণী ! সতীর আদর্শ মহিমা
আজ স্বচক্ষে দেখলুম--তাই তােমার মুষ্টি হিন্দুর ঘরে ঘরে
আধ্যাতিক দেবীরূপে বিরাজ কচ্চে। আর আমিও ধন্থ ষে
তােমার মত স্ত্রীরত্ব লাভ করেচি। চল, আমরা মা মহাকালীকে
প্রণাম করে এই স্থান ত্যাগ করি, কিন্তু সংসারে আর ফিরব না।
জীবনের শেষ ক'টা দিন ভগবানের নাম করিগে চল।
এই গর্ভা।]
চিন্তামণি।
A - ৭ - ২ ।
৫ । । ।
প্রিয়ম্বদা-মহা ভুল করেছিলুম তার যথেষ্ট শাস্তিও পেয়েছি। আর কখনও
এমন ভুল কৰ্ব্ব না—স্বামী ছাড়া আর এক পাও নড়’ব না।
পরিব্রাজক—চল আমরা হরিদ্বার খাই।
প্রিয়ম্বদা—মা, আপনিও আমাদের সঙ্গে আনুন।
বিলাসী-না, মা! আমি ত যেতে পাৰ্বনা মা—মান করে বেরিয়েছি।
মা ! তুমি তােমার স্বামীর সঙ্গে যাও—আমিও আমার স্বামীর
কাছে যাই।
প্রিয়ম্বদা—তবে অসি মা।
{ মা কালীকে প্রণামান্তর উভয়ের প্রস্থান।
বিলাসী কালীমূর্তির প্রতি দৃষ্টি করিয়া পাষাণী ! আর আমি তাের
কাছে কিছু চাই না। তুই যেমন তাের স্বামীকে পায়ে করে
চেপে মেরে নিজের মাথা কেটে নিজের রক্ত থাসি--দে সর্বনাশ
আমাকে সেই ভৈরবী নেশায় মাতিয়ে দে।
(গান।)
রক্তপাগী সৰ্ব্বনাশী রক্ত খেতে চায়--
সে কথা কে বুঝবে ব ওই আস্তা পরা রাঙ্গা পায়।
জানিনা গাে কবে ভুলে,
দাড়িয়েছিল এলো চুলে ;
স্বামীর বুকে লপি তুলে একলা নাচে একলা গায়।
কেউ বলে গাে শ্মশান কালী,
আমি জানি পােড়া কপালী,
নিজের মুখে কালি দিলি, মুখ দেখে যে সে পালায়।
বিলাসী---সবাই পেলে, আমি কেবল পেলুম না। দিলেনা তাই পেলুম
। দোষ কার? আমার না তার? আমার কি দােষ ? আমি
১৪
চিন্তামণি।
[ পঞ্চম আৰু
!
ত কেঁদে তার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলুম; সে আমার জ্বালা বুঝলে
কই? দোষ কার—অামার—না তার?
কৃপান-কে-কে বিলাসী? বিলাসী! বিলাসী ! একবার আমায় খুলে
দে তাের পায়ে পড়ি।
বিলাসী-না, না, তা হবেনা, তা হবে না—মানত করে বেরিয়েছি।
আমার এক জ্বালা ছিল, তােমা হতে আমার শতেক জ্বালা হল।
সেই জালা জুড়বার জন্যে পাষাণীর কাছে এসেচি। দেখে নাও,
শেষ সময় বিলাসীকে জন্মের মত একবারদেখে নাও-দেখে নাও
নারীর সর্বনাশী মূর্তির বিকট ছায়ায় প্রতিহিংসাময়ী কুটির শেষ
ভঙ্গী। (বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে ছুরিক বাহির করিয়া) দেখে নাও
ভীমা ভৈরবী, ধূমাবতী, বগলা, ছিন্নমস্তার রক্তে এই ছুরি ডুবিয়ে
এনেচি। পাষাণী । দেখ চেয়ে দেখ।
(কৃপানন্দকে ছুরিকাঘাত )
কৃপানন্দ–উঃ ! বিলাসী-
(মৃত্যু।).
বিলাসী-চুরি! এইবার আয় তােকে বুকে করে ঘুমােই। (নিজ বক্ষে
ছুরিকাঘাত ও মৃত্যু।)
মন গর্ভা। ] চিন্তামণি। ১১ 5. L । । । সপ্তম গর্ভাঙ্ক। দ্বীপান্তর। হরলাল--- ঝােপের অন্তরাল হইতে ত্রস্তপদে বহির্গত হইয়া) আমাকে এ কোথায় নিয়ে এল ? কেবল গাছ-কেবল গাছ, শা--সা করচে। গাছের ওপর ওসব কারা ! ভূত-পেত্নী আমাকে মারবে? না-- ,আমাকে মেরনা—আমি কিছু করবনা-কিছু করুক না (পুনরায় ঝােপের অন্তরালে যাইয়া উকি মারিতে লাগিল ও (বহির্গত হইয়া নিম্নস্বরে) চুপ করে থাকব—একদম কথা কইব না-কেউ যদি শুনতে পায়। (উচ্চস্বরে) অধর। অধর! দে-সব ধিল লাগিয়ে দে। না-না, আমি কি বলচি—এখানে অধর কোথা? কেউ নাই—কেউ নাই-ওকে-ওখানে অমন করে দাড়িয়ে ? চিনেছি--চিনেছি। দামিনী। দামিনী। বড় জ্বালা-বড় জ্বালা, দেখ—দেখ—মেরে মেরে সর্বশরীরে আমার বা করে দিয়েচে–পােক পড়ছে। ওকি ? তুমি অমন করে চেয়ে আছ কেন ? দামিনী তোমার পায়ে পড়ি—আমায় ক্ষমা কর। আবার কে?-নলিনী! পুলিশ নিয়ে আসচিস? ধরিয়ে দিবি ? -না, দিসনি—দিসনি—এইনে তাের টাকা নে—আমার যা কিছু আছে সব দিচ্চি। তবু তাের দয়া হলনা? নলিনী। আর আমি কিছু করব না—কিছু করব না—আমায় ছেড়ে দে। (নােদন) ওহোহাে ! এমন সময় কেউ আমায় দেখছে না--কেউ আমার কাছে আসচে না। কি করি—কোথা যাই ? বৌমা—বৌমা ! তুমি ত মা সতীলক্ষ্মী—তুমি এস--আমাকে রক্ষে কর। আমার একটু জায়গা দাও সেখানে লুকিয়ে থাকি-সেখানে বসে একটু কাদি। কই—তুমিও এলে না? তােমারও দয়া হ’ল না? ঐ -
চিন্তামণি।
[ পঞ্চম অ
ঐ, আবার দামিনী ধরূতে অসটে—ঐ আবার নলিনী আসছে—
ও কাকে সঙ্গে করে আনছে—হাতে লােহার মুগুর—চোক দুটো
লাল—কটমট করে চাইছে—আমায় মারবে বলে ছুটে আসছে।
কে তােমরা মের না—আমায় রক্ষে কর—এই নাও আমার সব
টাকা দিচ্ছি--এই নাও আমার সিন্দুকের চাবী আমায় মের,
--তােমার পায়ে পড়ি। তবু শুনলে না—শুনলে না—কোথা
পালা? (পুনৰ্ব্বার ঝোপের অন্তরালে গমন ও বহির্গত হইয়া )
হাঃহাঃহাঃ! আমার টাকা নেবে? কিছুতেই দোবনা—এই
আমার মুটোর ভেতর চাবী রেখে দিয়েসি-নে-দেখি কি করে
নিবি ?
। পুনরায় ঝােপের অন্তরালে গমন।
অষ্টম গর্ভা।
( চিন্তা মৃত্যু শয্যায়।)
ললিতা মাথার কাছে বসিয়া কাদিতেছে, শ্যামা মাথায়
বাতাস করিতেছে, স্বয়ম্ভু পাশে দাঁড়াইয়া ও অধর
পায়ের দিকে অদূরে দাড়াইয়া আছে।
চিন্তা-জ্যাঠা মশাই মা কখন কাশী থেকে আসবে?
স্বয়-টেলিগ্রাম করেছি বাবা আজকেই আসবেন।
অষ্টম গর্ভা।]
চিন্তামণি।
চিন্তা--মা আমায় ঠাকুরকে দেখিয়েছিল--ঠাকুর আবার শ্যামাকে দেখিয়ে-
ছিল। ঠাকুর আর শ্যামা রাধা আর শ্যাম! তেমি ভক্তি-
তেম্নি প্রেম!
স্বয়ম্ভুবাবা ! বেশী কথা কমােনা।
ললিতা-কি কল্লিরে বাবা ! মায়ের কাছে আমি মুখ দেখাব কেমন করে।
ঠাকুর ! তোমার মনে কি শেষে এই ছিল।
চিন্তা-কে-জ্যাঠাইমা! ঠাকুরের কি দোষ-দয়াল ঠাকুর যে আমার
শ্যামাকে রক্ষে করেচে দেখে যাচ্ছি তাতেই আমার সুখ। শ্যামা
কই ?
ললিহা---এই যে বাবা মাথায় বাতাস কচ্চে তোমার।
চিন্তা--শ্যামকে সামনে আসতে বল—একবার দেখি ।
(শ্যামা চোখ মুছিতে মুছতে চিন্তার সম্মুখে দাড়াইল।)
খামা—এই যে দাদা আমি।
চিন্তা--ওকি কাদচ? আবার দেখা হবে ? ঠাকুরের খেলা কেউ থাকবে
–থাকবে কেবল ঠাকুর আর ভালবাসা।
( লালগােপালের প্রবেশ।)
লালগোপাল-ডাক্তার বাবু 'আসছেন।
[ ললিতা ও গ্রামার অন্তরালে গমন।
( ডাক্তারের প্রবেশ ও চিন্তাকে পরীক্ষা।)
স্বয়ম্ভু—কেমন দেখলেন ডাক্তার বাবু ?
ডাক্তার-pulse খুব slow beat কচ্চে। ডিলিরিয়মের লক্ষণ দেখা
যাচ্ছে। কি খেতে দেয়া হয়েছে ?
স্বয়-বেদানার রস আর দুধ। কিছুই খেতে চাচ্ছে না।
১৪৪
চিন্তামণি।
{ পঞ্চম অঙ্ক
A
ডাক্তার—তা বল্লে হবে না । অল্প অল্প করে কিছু খাওয়ান চাই।
( দাড়াইয়া) একজন আমার সঙ্গে আসুন—আমি একটা ওষুধ
দিচ্চি, এনেই সেটা খাইয়ে দেবেন।
লালগােপাল—চলুন, আমি যাচি চলুন।
[ ডাক্তার বাবুর প্রস্থান।
স্বয়ম্ভুবাবাজী! ডাক্তার বাবুর ফিটা আর ওষুধের দামটাও অমনি
লালগােপাল-সেজন্যে আপনি ব্যস্ত হবেন না। আপনি কিছু খাওয়াতে
চেষ্টা করুন।
{ লালগোপালের প্রস্থান।
( ললিতা ও শ্যামার প্রবেশ1)
ললিতা-হা গ ! ডাক্তার কি বলে ?
স্বয়ম্ভুবলে আমার মাথা আর মুণ্ডু।
চিন্তা-ফ্ল্যাঠাই মা! ঐ দেখ ঠাকুর আজ কেমন সেজেচে। পায়ের ওপর
পাতার ওপর হাতে বশী-তার ওপর গলায় মালা--তার ওপর
মােহন চূড়া—আর সকলের ওপর ওই মুচকে মুচকে হাসি।
আহা! আহা !
ললিতা—শল্পী বাবা একটু চুপ কর। আমি একটু দুধ গরম করে আনি—
চিন্তা-না জ্যাঠাই মা। ভােমারা সব আমার কাছে বস। কই জামাই
বাবুকে ত দেখতে পাচ্ছিনা ? উঃ গলাটা যেন শুকিয়ে আসছে।
একটু গঙ্গা জল দাও জ্যাঠাই মা।
( ললিতা গেলাসে দু আনিয়া)
ললিত-হাঁ করত বাবা।
চিন্তা-না হাতে দাও—আমি আপনি খাব।
ললিতা—তুমি পারবে না বাবা শরীর দুর্বল, আমি খাইয়ে দিই।
অষ্টম গর্ভাঙ্ক।
চিন্তামণি।
১০৫
চিন্তা—তবে আমি জ্যাঠাইমা বলে আর ডাকব না।
ললিতা—ছিঃ বাবা ও কথা বলতে নাই। এক রত্তি বেলা থেকে যে ঐ
বলেই ডেকে আসছিস বাবা, আমার যে বড় মিষ্টি লাগে আর ত
কিছু বল্লি না। আমার মাথা খাও এই দুধ টুকু খাও বাবা।
[ চিন্তা রাগে ফেলিয়া দিল।
স্বয়হ’ল ত।
চিন্তা-~-জ্যাঠা মশাই তােমরা আমায় পুড়িয়ে মার’চ। আমি সুস্থ হয়ে
ঠাকুরকে দেখচি-তােমরা আমায় অসুস্থ কচ্চ? কেউ তােমর
কাল দেবে না জানি, মা ! বােন তুমি দাও।
(গঙ্গা জল আনিতে শ্যামার গমন।)
জ্যাঠা মশাই! মা বােধ হয় টেলিগ্রাম পায়নি তা হলে ছুটে
আসত। মা এলে বললাে--তার হতভাগা ছেলে জন্মাবধি বড়
কষ্ট দিয়েছিল, তাই মরবার সময় মাকে দেখতে পেলে না। মা
কাঁদলে সান্ত্বনা করে বলাে-তােমার ছেলে মরেনি তােমার কাছেই
আছে—এই ঠাকুর ঘরে যিনি আছেন তাকে দেখিয়ে দিয়ে।
(পট্টবস্ত্র পড়িয়া গঙ্গাজল, চন্দন, গঙ্গা মৃত্তিকা ও তুলসী হস্তে
শামার পুনঃপ্রবেশ।)
শ্যামা-- করত দাদা। ( চিন্তার মুখে গঙ্গাজল ও তুলসী দিল।)
চিন্তা--আঃ প্রাণটা জুড়ল। গঙ্গাজল তুলসী-ঠাকুরের চরণের গন্ধ
চন্দনে লেগেছে–গঙ্গাজল তুলসীতে লেগেছে। খামা! দাও
আমায় চন পরিয়ে দাও।
খামা-দিচ্চি দাদা! ( কপালে চন্দন ও তুলসী সাজাইয়া দিল।)
চিন্তা-জ্যাঠাই মা ! দেখলে ত? যার কাজ তারে সাজে। জামাই বাবু,
যে শুধরেচে শুনলুম-শ্যামার যে সুখ হ’ল দেখে যাচ্ছি- এতে
আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে তা আর কি বলব। আর একটু গঙ্গা
অল-গঙ্গাজল প্রদান।) আঃ! জামাইবাবু এখনও এল’না কেন?
চিন্তামণি। [ পঞ্চম অঞ্চ ( ওষুধ হস্তে লালগােপালের প্রবেশ।) লালগােপাল—এই যে—আমি এসেছি। এই ওষুধটা ডাক্তার বাবু খেতে বলেচেন সমস্ত কষ্ট এখনি উপশম হবে। চিস্তানা—আমি ওষুব ফসুদ আর খাব না আমার কোনও কষ্ট নাই। জামাইবাবু আমার কাছে এস । শ্যামা ! তুমিও আমার কাছে, এস। ( উভয়ের হস্ত একত্র ধরিয়া । জামাই বাবু ! আমার শেষ অনুরােধ আব মেন শ্যামার কোন কষ্ট—আর একটু গঙ্গা জল। ( শ্যামা গঙ্গাজল দিল। অধর-বাবা ঠাকুর ! বাবা ঠাকুর। অধম অধরকে একবার চেয়ে দেখ । দাও—হতভাগা অধরকে একটু পায়ের ধূলাে দাও। চিন্তা-কে 'অধর? অধর তাের ভাবনা নেই—ঠাকুর তােকে পেয়ে রয়ে। জ্যাঠাই মা! এইবার তােমরা সকলে আমার দুপাশে সার হয়ে দাড়াও--আর মাঝ খানে ওই—এই যে আমার ঠাকুর ত্রিভঙ্গ হয়ে স্বাণী নিয়ে দাড়িয়ে ঠাকুর। 'আজ বুঝি তােমায় আর ভাতে হয়নি আপনিই এসেচ দেখ চি। যদি এসেচ- এসএস হরি আরও সরে এস। মরি মরি বৃন্দাবন। বৃন্দাবন ! রাধাশ্যাম । রাধাশ্যাম ! (দেহ ত্যাগ। আমা—দাদা গাে । ( মূৰ্জিত হইয়া পডিয়া গেল। অধর-বাবা ঠাকুর কি কল্লে গো ! (চোকে হাত দিয়া রােন। স্বয়---পালিয়ে গেলিরে বাবা । ললিত-চিন্তারে--বাবারে—কি পােড়াকপাল পুড়ল রে ! (পতন ) ( আল গাল বেশে বামনমার প্রবেশ ।। বামুন--কই ! কই! আমার অন্ধের নয়ন নিধি, কই—কই আমার চিন্তা ! বাবারে কোথা গেলিরে । [ চিন্তার বক্ষোপরি পতন ও মুচ্ছা। বনিকা পতন।
No text on this page.
মূৰ্চ্চনা” সম্বন্ধে অভি
টারী মহারাজাধিরাজ বাহাদুর বর্ধমান ... ?
Babu Chandy Das Mukherjee
12, Gour. Laha's St:
Ninntolla, C..'.....
'autilita] a
1. desired by the Hon'ble the v.
1. Ir of Burdwan to convey his thatik
play of "Moorchana" which you how to
sented!
;
শিমবাজার বা লাইব্রেরী হইতে শ্ৰীযুক্ত
===
শ্ৰীসক্ত চণ্ডীদাস মুখে', 'ধাঃ
"
৬।
-
: ১.দন,
জা বাহাদুরের নিকট প্রেরিত আপনার ৩৭৫' “স্ক্রন কি
করিয়াছেন ও তাহার মাজে মই . . করি,
: ১৭ই জুন, ১৯১৮ ।
ওয়ান নর্মপুর ব;জ পিপি,ছেন ;--
শ্ৰীযুক্ত রাজা বাহাদুরকে যে পুস্তকখানি;
{ঠ করিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছেন।
ঝুলে
:: অমৃতবাজার, জন্মভূমি এবং অর্থা
নাৰ বশতঃ দ শ অসৰ হই ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.