Mohiary Public Library,andul, Howrah

Rammohan Granthabali Vol. 6

2009/08/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রামমােহন-গ্রন্থাবলী-
চারি প্রশ্ন
[ ৬ এপ্রিল ১৮২২ তারিখের ‘সমাচার দর্পণে’ প্রকাশিত ]

শ্রীরামপুর হইতে প্রকাশিত, জন্ ক্লার্ক মার্শম্যান্ সম্পাদিত ‘সমাচার দর্পণ পত্রের ২৫ চৈত্র ১২২৮ (৬ এপ্রিল ১৮২২) তারিখের সংখ্যায় “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী” প্রেরিত চারি প্রশ্ন সম্বলিত এই পত্রখানি প্রকাশিত হয়। পত্রের শেষে ‘সমাচার দর্পণ’-সম্পাদক এইরূপ মন্তব্য করিয়াছিলেন :- “এই পত্র অনেক বিশিষ্ট লােকের অনুরােধে দর্পণে অৰ্পণ করিলাম কিন্তু আমরা পরস্পর বিরােধের সহকারী নহি এবং যদ্যপি কেহ ইহার উপযুক্ত শাস্ত্রীয় উত্তর পাঠান তাহাও আমরা দর্পণে স্থান দিব।”

প্রেরিত পত্র ।শ্ৰীযুত সমাচার দর্পণ প্রকাশক মহাশয়েষু এই পশ্চাদ্বী কএক পংক্তি ধর্মপ্রশ্ন দর্পণে অৰ্পণ করিয়া মনের মালিন্য দূর করিয়া উপকৃত করিবেন। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী সকলজনহিতৈষী ব্যক্তি প্রেরিত প্রশ্নপত্ৰমিদ। সংপ্রতি যুগধর্মপ্রযুক্ত নানা প্রকার দুরাচার কুব্যবহার দেখিয়া ধৰ্ম্মহানি পাপবৃদ্ধি জানিয়া অত্যন্ত ভীত হইয়া প্রশ্ন চতুষ্টয় করিতেছি ইহাতে কোন ব্যক্তির নিন্দা কিম্বা দ্বেষ উদ্দেশ্য নহে কেবল বিশিষ্ট লােকের পাপকর্ম নিবারণ এবং তৎসংসর্গজ দোষ নিরাকরণ তাৎপর্য অতএব ইহা প্রকাশ করণে লােকহিত ব্যতিরেকে দোষলেশও নাই। প্রথম প্রশ্নঃ। ইদানীন্তন ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী পণ্ডিতাভিমানী ব্যক্তিবিশেষেরা এবং তদনুরূপ অভিমানী তৎসংসর্গী গড্ডরিকাবলিকাবৎ গতানুগতিক অনেক ধনিলােকেরা কি নিগূঢ় শাস্ত্রাবলােকন করিয়া স্বজাতীয় ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বিজাতীয় ধর্ম কর্মে প্রবৃত্ত হইতেছেন এতাদৃশ সাধু সদাশয় বিশিষ্ট সন্তান সকলের সহিত সংসর্গ যােগবাশিষ্ঠ বচনানুসারে ভদ্রলােকের অবশ্য অকৰ্তব্য কি না। যথা সংসারবিষয়াসক্ত ব্ৰহ্মজ্ঞাে- স্মীতিবাদিনং। কৰ্ম্মব্রহ্মোভয়ভ্রষ্টং তং ত্যজেদন্ত্যজং যথা দ্বিতীয় প্রশ্নঃ। যাহারা বেদ স্মৃতি পুরাণাক্তস্বস্বজাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহারবিরুদ্ধ কৰ্ম্ম করেন অথচ ভ্রমাত্মক বুদ্ধিতে আপনাকে আপনিই ব্রহ্মজ্ঞানী করিয়া মানেন তাহাদিগের তবে অনাদর পুর:সর যজ্ঞসূত্র বহন কেবল বৃদ্ধব্যাঘ্র মার্জার তপস্বীর ন্যায় বিশ্বাসকারণ অতএব এতাদৃশাচারবস্ত ব্যক্তিরদিগের স্কান্দ ও মহাভারতবচনানুসারে কি বক্তব্য। যথা। সদাচাররা হি সৰ্বাহো নাচারাদ্বিচ্যুতঃ পুনঃ তস্মাদ্বিপ্ৰেণ সততং ভাব্যমাচারশীলিনা। দুরাচাররতাে লােকে গহণীয়ঃ পুমান্ ভবেৎ। তথাচ। সত্যং দানং ক্ষমা শীলমানৃশংস্যং তপাে ঘৃণা। দৃশ্যন্তে যুত্র নগেন্দ্র স ব্রাহ্মণ ইতি স্মৃতঃ। যত্ৰৈতন্ন ভবেৎ সর্প তং নির্দিশে। তৃতীয় প্রশ্ন। ব্রাহ্মণসজ্জনের অবৈধ হিংসাকরণ কোন ধর্ম বিশেষতঃ সৰ্ব্বভূতহিতে রত অহিংসক পরম কারুণিক আত্মতত্ত্বজ্ঞানীরদিগের আত্মােদর ভরণার্থে পরমহর্ষে প্রত্যহ ছাগলাদিচ্ছেন করণ কি আশ্চর্য এতাদৃশ সাধু সদাচার মহাশয় সকলের স্কন্দপুরাণবচনা- সারে ঐহিক পারত্রিক কি প্রকার হয়। যথা। যে জন্তুনাত্মপুষ্ট্যর্থং হিনস্তি জ্ঞানদুর্বল। দুরাচারস্য তত্যেহ নামুত্রাপি সুখং কচিৎ। চতুর্থ প্রশ্ন। অনেক বিশিষ্ট সন্তান যৌবন ধন প্রভুত্ব অবিবেকতা প্রযুক্ত কুসংসর্গগ্রস্ত হইয়া লােকলজ্জা ধর্মভয় পরিত্যাগ করিয়া বৃথা কেশচ্ছেন সুরা পান যবন্যাদি গমনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন ইহার শাসন ব্যতিরেকে এই সকল দুষ্কর্মের উত্তরােত্তর বৃদ্ধি হইতেছে তত্তৎকৰ্ম্মানুষ্ঠাত্ মহাশয়েরদিগের কালিকাপুরাণ মৎস্যপুরাণ মনুবচনানুসারে কি বক্তব্য। যথা গঙ্গায়াং ভাৰুক্ষেত্রে পিত্রোশ্চ মরণং বিনা। বৃথা ছিনত্তি যঃ কেশান্ তমাহুব্রহ্ম- ঘাতক। তথাচ। যাে ব্রাহ্মণােহপ্রভৃতীহ কশ্চিৎ মােহাৎ সুরাং পাতি মন্দবুদ্ধি।

৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী তপােপ ব্রহ্মহা চৈব স স্যাদম্মিন লােকে গহিত স্যাৎ পরে চ। অপিচ যস্য কায়গতং এক মনােপ্লাষ্যতে সকৃৎ। তস্য ব্যপৈতি ব্রাহ্মণ্যং শূদ্ৰত্বঞ্চ স গচ্ছতি ॥ তথাচ। চাণ্ডালাস্ত্যপ্রিয়াে গত্বা ভুক্ত। চ প্রতিগৃহ চ। পতত্যজ্ঞানতাে বিপ্রাে জ্ঞানাৎ সাম্যন্তু গচ্ছতি। অত্যা মেচ্ছবনাদয়ঃ। ইতি কুল্প কভট্ট - সমাচার দর্পণ', ৬ এপ্রিল ১৮২২। ২৫ চৈত্র ১২২৮।

চারি প্রশ্নের উত্তর [ ১৮২২ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে প্রথম প্রকাশিত ) || ভূমিকা | চৈত্র মাসের সম্বাদ লিপিতে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী চারি প্রশ্ন করিয়াছিলেন যদ্যপি বিশেষ বিবেচনা করিলে তাহার উত্তরের প্রয়ােজন থাকে না তথাপি সাধারণ নিয়মানুসারে ঐ চারি প্রশ্নের উত্তর আপন বুদ্ধিসাধ্যে লিখিলাম এখন ইহার প্রত্যুত্তরের প্রত্যাশায় এবং আমার প্রশ্ন সকলের উত্তরের প্রতীক্ষায় রহিলাম যেহেতু ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী আপনাকে সৰ্বজনহিতৈষী নামে প্রসিদ্ধ করিয়াছেন। তাহার ঐ চারি প্রশ্নকে এবং তাহার এই উত্তরকে ঈশ্বরের ইচ্ছায় ভাষান্তরেও ত্বরায় প্রকাশ করা যাইবেক ইতি। ৷ সমগনুষ্ঠানাক্ষম তজ্জন্যমনস্তাপবিশিষ্ট।

। পরমাত্মনে নমঃ। কোন এক ব্যক্তি আপনাকে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী এবং সৰ্বজনহিতৈষী জানিয়া চারি প্রশ্ন করিয়াছেন। তাহার প্রথম প্রশ্ন এই যে “ইদানীন্তন ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী পণ্ডিতাভিমানী ব্যক্তিবিশেষেরা এবং তদনুরূপ অভিমানী তৎসংসর্গী গড়ডরিকা- বলিকাবৎ গতানুগতিক অনেক ধনিলােকেরা কি নিগূঢ় শাস্ত্রাবলােকন করিয়া স্বস্বজাতীয় ধৰ্ম্ম কর্ম পরিত্যাগপূর্বক বিজাতীয় ধর্ম কর্মে প্রবৃত্ত হইতেছেন এতাদৃশ সাধু সদাশয় বিশিষ্ট সন্তান সকলের সহিত সংসর্গ যােগবাশিষ্ঠবচনানুসারে ভদ্রলােকের অবশ্য অকৰ্ত্তব্য। কি না। যথা সংসারবিষয়াসক্তং ব্রহ্মজ্ঞােম্মীতি- বাদিনং। কর্মব্রহ্মোভয়ভ্রষ্টং ত্যজেদন্ত্যজং যথা” । উত্তর।-কি ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী কি অভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী কি তাহার সংসর্গী কি তাহার অসংসর্গী যে কোন ব্যক্তি স্বস্বজাতীয় ধৰ্ম্ম কর্ম পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বিজাতীয় ধৰ্ম্ম কর্মে প্রবৃত্ত হয়েন তাহাদের সহিত সংসর্গ ভদ্রলােকের অর্থাৎ স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠায়ী ব্যক্তিদের যােগবাশিষ্ঠ- বচনানুসারে এবং অন্য২ শাস্ত্রানুসারে সর্বথা অকর্তব্য। কিন্তু এক ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী ও এক ভাক্তকৰ্মী উভয়েই স্বস্বধৰ্ম্মের লক্ষাংশের [২] একাংশও অনুষ্ঠান না করিয়া পরধর্মানুষ্ঠানেই বহুকাল ক্ষেপ করে আর যদি তাহার মধ্যে ওই ভাক্তকৰ্মী সেই ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানীকে আপন অপেক্ষাকৃত নিন্দিত জানিয়া তাহার সংসর্গে পাপ জ্ঞান করে তবে সে ভাক্ত কৰ্মীর নিন্দা কেবল হাস্যাস্পদের নিমিত্তে এবং পাপের নিমিত্তে হয় কি না। যেহেতু তত্ত্বজ্ঞান ও কৰ্ম্মানুষ্ঠান এই দুইকে যদি সমানরূপে স্বীকার করা যায় আর ঐ দুইয়ের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত দুই ব্যক্তি স্বস্বধর্ম পালন না করে তবে দুই ব্যক্তিকেই তুল্যরূপে স্বধর্মচ্যুত পাপী কহা যাইবেক। তাহাতে যদি ঐ দুইয়ের এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে স্বধৰ্ম্মচ্যুত কহিয়া নিন্দা ও তাহার গ্লানি করে তবে সে এইরূপ হয় যেমন এক অন্ধ অন্য অন্ধকে অন্ধ কহিয়া এবং এক খঞ্জ অন্য খঞ্জকে খঞ্জ কহিয়া নিন্দা ও ব্যঙ্গ করিতে প্রবৃত্ত হয়। পক্ষপাতরহিত ব্যক্তি সকলে ঐ ব্যঙ্গকৰ্ত্তা অন্ধকে ও খঞ্জকে লজ্জাহীন এবং স্বদোষ দর্শনে অপারক জ্ঞান করিবেন কি না। যােগবাশিষ্ঠে ভাক্ত জ্ঞানীর বিষয়ে যাহা লিখিয়াছেন তাহা যথার্থ বটে যে ব্যক্তি সংসারসুখে আসক্ত হইয়া আমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী ইহা কহে সে কৰ্ম্ম ব্ৰহ্ম উভয়ভ্রষ্ট অতএব ত্যজ্য হয়। সেইরূপ ভাক্ত কৰ্মীর প্রতিও বচন দেখিতেছি। মনুঃ “শূদ্ৰাং শূদ্রসম্পর্কঃ শূদ্রেণ চ সহাসনং। শূদ্রাদ্বিদ্যাগমঃ কশ্চিজ্জ্বলন্তমপি পায়েৎ” । অর্থাৎ শূদ্রের অন্ন গ্রহণ শূদ্রের সহিত সম্পর্ক রামমােহন-গ্রন্থাবলী শূদ্ৰাসনে বসা এবং শূদ্র হইতে কোন বিদ্যা শিক্ষা করা ইহাতে জ্বলন্ত ব্রাহ্মণও পতিত হয়েন। “উ[৩]দিতে জগতীনাথে যঃ কুৰ্যান্তধাবনং। স পাপিষ্ঠঃ কথং জ্বতে পূজয়ামি জনার্দনং”। অর্থাৎ সূর্যোদয়ের পর যে ব্যক্তি দন্তধাবন করে সে পাপিষ্ঠ কি প্রকারে কহে যে আমি বিষ্ণু পূজা করি! অত্রিঃ। “আসনে পাদমারােপ্য যাে ভুঙক্তে ব্রাহ্মণঃ কচিৎ। মুখেন চামাতি মুখেন চামশ্নাতি তুল্যং গােমাংস- ভক্ষণৈঃ” । অর্থাৎ আসনের উপরে পা রাখিয়া যে ব্রাহ্মণ ভােজন করে এবং হস্ত বিনা গবাদির ন্যায় কেবল মুখের দ্বারা ভােজন করে সে ভােজন গােমাংসাহার তুল্য হয়। “উদ্ধত্য বামহস্তেন যত্তোয়ং পিবতি দ্বিজঃ। সুরাপানেন তুল্যং স্যানুরাহ প্রজাপতিঃ”। অর্থাৎ বামহন্তকরণক পাত্ৰ উঠাইয়া জল পান করিলে সুরাপানতুল্য হয় ইহা মনু কহিয়াছেন। অতএব জ্ঞান সাধনে কোন অংশে ত্রুটি হইলে সে সাধক ত্যজ্য হয় এমৎ যে জ্ঞান করে অথচ কৰ্ম্মানুষ্ঠানে সহস্ৰ২ অংশে স্বধর্মচ্যুত হইয়াও আপনাকে পবিত্র ও অন্যকে ত্যজ্য জানে সে স্বধর্মচ্যুত ও স্বদোষ দর্শনে অন্ধকে কি কহিতে পারা যায়। যে ব্যক্তি স্বয়ং এবং পিতা ও পিতামহ তিন পুরুষ ক্রমশঃ স্নেচ্ছের দাসত্ব করে সে যদি দ্বিতীয় ব্যক্তি যে নিজে স্নেচ্ছের চাকরি করিয়াছে তাহাকে স্বধর্মচ্যুত ও ত্যজ্য কহে তবে তাহাকে কি কহি। যদি এক ব্যক্তি যবনের কৃত মিসি প্রায় নিত্য দন্তে ঘর্ষণ করে ও যবনের চোয়ান গােলাব ও আতর এসকল জলীয় দ্রব্য সর্বদা আহারাদিকালে ও অন্য সময়ে শরীরে মৃক্ষণ করে কিন্তু অন্যকে কহে যে তুমি যবন স্পর্শ করিয়া থাক [৪] অতএব তুমি স্বধর্মচ্যুত ত্যজ্য হও এরূপ বক্তাকে কি কহা যায়। ও এক ব্যক্তি নিজে যবন ও স্নেচ্ছের নিকটে যাবনিক বিদ্যার অভ্যাস করে ও মনু মহাভারতাদির বচনকে সমাচারচন্দ্রিকা ও সমাচারদর্পণ যাহা সে ব্যক্তির জ্ঞাতসারে অনেক স্নেচ্ছে লইয়া থাকে তাহাতে ছাপা করায় কিন্তু অন্যকে কহে যে তুমি যবনশাস্ত্র পড়িয়াছ ও শাস্ত্রের অর্থকে ছাপা করাইয়াছ সুতরাং স্বধর্মচ্যুত ত্যজ্য হও তবে তাহাকে কি শব্দ কহিতে পারি। যদি এক ব্যক্তি শূদ্র স্বস্থানে ব্রাহ্মণকে দেখিয়া গাত্রোখান করে ও স্বতন্ত্র আসন প্রদান না করিয়া আপনার আসনে বসাইয়া সেই ব্রাহ্মণের পাতিত্য জন্মায় কিন্তু সে অন্য শূদ্রকে কহে যে তুমি ব্রাহ্মণকে মান না তবে তাহাকেই বা কি কহি। আর যদি এক ব্যক্তি বহুকাল মেচ্ছ সেবা ও ম্লেচ্ছকে শাস্ত্র অধ্যাপনা করিয়া এবং ন্যায়দর্শনের অর্থ ভাষাতে রচনাপূর্বক ম্লেচ্ছকে তাহা বিক্রয় করিতে পারে সে আস্ফালন করিয়া অন্যকে কহে যে তুমি স্নেচ্ছের সংসর্গ কর ও দর্শনের অর্থ ভাষায় বিবরণ করিয়া মেচ্ছকে দেও অতএব তুমি স্বধর্মচ্যুত চারি প্রশ্নের উত্তর বচন হও তবে সে ব্যক্তিকে কি কহা উচিত হয়। বিশেষতত দুই স্বধর্মচ্যুতের মধ্যে একজন আপনার ত্রুটি স্বীকার ও আপনাকে সাপরাধ অঙ্গীকার করে ও দ্বিতীয় ব্যক্তি আপনাকে পবিত্র জানিয়া অন্যকে প্রাগভ্যপূৰ্ব্বক স্বধর্মরাহিত্য দোষ দেখাইয়া ত্যজ্য কহে তবে ঐ দ্বিতীয় ব্যক্তির প্রতি কি শব্দ প্রয়ােগ কর্তব্য হয়। যদি ধৰ্ম্ম[৫]সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী কহেন যে পূর্বোক্ত বচন সকল অর্থাৎ শূদ্ৰান্ন গ্রহণ ইত্যাদি দোষে জ্বলন্ত ব্রাহ্মণও পতিত হয়। ও সুৰ্যোদয়ানন্তর মুখ প্রক্ষালন করিলে সে পাপিষ্ঠের পূজাধিকার থাকে না। আর আসনে পা রাখিয়া ভােজন করিলে গােমাংস ভােজন হয় আর বাম হস্তে পাত্ৰ উঠাইয়া জল পান করিলে সুরাপান হয়। এ সকল নিন্দার্থবাদ মাত্র ইহার তাৎপর্য এই যে শূদ্ৰান্ন গ্ৰহণাদি করিবেক না। তবে ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী যােগবাশিষ্ঠের এই যে সংসার বিষয়ে আসক্ত হইয়া আপনাকে ব্ৰহ্মজ্ঞানী কহে সে অন্ত্যজের ন্যায় ত্যজ্য হয়। তাহাকে নিন্দার্থবাদ না কহিয়া কি প্রকারে যথার্থবাদ কহিতে পারেন। সংসারের বিষয়ে আসক্ত হওয়া এবং আপনাকে ব্রহ্মজ্ঞানী অঙ্গীকার করা আননিষ্ঠের জন্যে নিষিদ্ধ হয় ইহা কেন না ওই বচনের তাৎপৰ্য হয়। এ কথা যদি কহেন যে পূৰ্ব২ বচনকে নিন্দার্থবাদ না কহিলে তঁাহার নিজের নিস্তার হয় না আর যােগবাশিষ্ঠের বচনকে যথার্থবাদ না মানিলে জ্ঞানীদের প্রতি নিন্দা করিবার উপায় দেখেন না তবে তিনি ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষী সুতরাং আমরা কি কহিতে পারি। বস্তুতঃ যােগবাশিষ্ঠের যে শ্লোক ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষী লিখিয়াছেন তাহার অর্থ বিশেষরূপে সেই যােগবাশিষ্ঠের শ্লোকান্তরের দ্বারা অবগত হওয়া উচিত তথাচ যােগবাশিষ্ঠে “বহিৰ্বাপারসংরম্ভো হৃদি সংকল্পবর্জিতঃ। কৰ্ত্তা বহিরকান্তরেবং বিহর রাঘব”। অর্থাৎ [৬] বাহেতে ব্যাপারবিশিষ্ট মনেতে সংকল্প ত্যাগ আর বাহিরেতে আপনাকে কর্তা দেখাইয়া ও মনেতে অকর্তা জানিয়া হে রামচন্দ্র লােকযাত্রা নির্বাহ কর। অতএব জ্ঞানাবলম্বী অথচ বিষয়ব্যাপারযুক্ত ব্যক্তিকে দেখিয়া দুই অনুভব হইতে পারে এক এই যে মনেতে আসক্ত হইয়া ব্যাপার করিতেছে দ্বিতীয় এই যে আসক্তি ত্যাগপূৰ্ব্বক ব্যাপার করিতেছে যেহেতু মনের যথার্থ ভাব পরমেশ্বরই জানেন তাহাতে দুর্জন ও খল ব্যক্তিরা বিরুদ্ধ পক্ষকেই গ্রহণ করিয়া থাকেন অর্থাৎ কহিবেন যে আসক্তিপূৰ্ব্বকই বিষয় করিতেছে আর সজ্জন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উত্তম পক্ষকেই গ্রহণ করেন অর্থাৎ কহিবেন যে এ ব্যক্তি জ্ঞান সাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছে তবে বুঝি যে আসক্তি ত্যাগপূর্বকই বিষয় করিতেছে যেমন জনকাদির রাজ্য শাসন ও শত্রু দমন ইত্যাদি বিষয়ব্যাপার দেখিয়া দুৰ্জ্জনেরা তাঁহাদিগকে বিষয়াসক্ত ১০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী জানিয়া নিন্দা করিত এবং ভগবান কৃষ্ণ হইতে অর্জুন জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া যুদ্ধ এবং রাজ্য করিলে পর দুৰ্জ্জনেরা তাহাকে রাজ্যাসক্ত জানিয়া নিন্দিতরূপে বর্ণন করিত ইহা পূৰ্ব্বেও দৃষ্ট আছে। এ উদাহরণ দিবার ইহা তাৎপৰ্য নহে যে জনকাদির ও অর্জুনাদির তুল্য এ কালের জ্ঞানসাধকেরা হয়েন অথবা ইদানীন্তন জ্ঞানসাধকের বিপক্ষেরা তাঁহাদের মহাবলপরাক্রম বিপক্ষের তুল্য হয়েন তবে এ উদাহরণের তাৎপৰ্য এই যে সৰ্ব্বকালেই দুৰ্জ্জন ও সজ্জন আছেন আর [৭] দুর্জনের সর্বকালেই স্বভাব এই যে কোন ব্যক্তির প্রতি দোষ ও গুণ এই দুইয়েরি আরােপ করিবার সম্ভাবনা থাকিলে সেখানে কেবল দোষেরি আরােপ করে আর সজ্জনের স্বভাব তাহার বিপরীত হয় অর্থাৎ দোষ গুণ দুইয়ের সম্ভাবনা সত্ত্বে গুণেরি আরােপ করিয়া থাকেন। ঐ ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর লিখিত যােগবাশিষ্ঠবচনে প্রাপ্ত হইতেছে যে যে ব্যক্তি বিষয়সুখে আসক্ত হয় আর কহে যে আমি ব্ৰহ্মকে জানি সুতরাং সে ত্যজ্য কিন্তু ইহা বিবেচনা কৰ্তব্য যে ব্ৰহ্মনিষ্ঠ কদাপি এমত কহেন না যে ব্ৰহ্মকে আমি জানি অতএব যে এমত কহে সে অবশ্যই কৰ্ম্ম ব্ৰহ্ম উভয়ভ্রষ্ট এবং ভাক্ত কৰ্মীর ন্যায় অধম হয়। কেনতিঃ। “অবিজ্ঞাতং বিজানতাং বিজ্ঞাতমবিজানতাং”। অর্থাৎ যাঁহারা ব্রহ্মের অগােচর স্বরূপ নিশ্চয় করিয়াছেন তাহারা অবশ্যই কহেন. যে ব্ৰহ্ম- স্বরূপ জ্ঞেয় আমাদের নহে আর যাঁহারা ব্ৰহ্মকে না জানেন তাহারা কহেন যে ব্রহ্ম আমাদের জ্ঞেয় হয়েন। তবে দুর্জন ও খলে অপবাদ দেয় যে তুমি আপনাকে ব্ৰহ্মজ্ঞানী কহিয়া অভিমান কর এ পৃথক্ কথা। কোন এক বৈষ্ণব যে আপন বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের লক্ষাংশের একাংশ অনুষ্ঠান করে না ও বিপরীত ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করিয়া থাকে সে যদি কোন শাক্তের স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানে ত্রুটি দেখিয়া তাহাকে ভাক্তশাক্ত কহে ও ব্যঙ্গ করে এবং কোন ব্ৰহ্মনিষ্ঠের স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানে ত্রুটি দেখিয়া তাহাকে ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী ও নিন্দিত কহে কিন্তু আপনাকে ভাক্ত বৈষ্ণব না মানিয়া ধৰ্ম্মসংস্থাপনা-[৮] কাক্ষী এবং সর্বজনহিতৈষী বলিয়া অভিমান করে তাহাকে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা নিন্দকের মধ্যে অতিশয় নিন্দিত করিয়া জানিবেন কি না। জ্ঞান ও কর্ম এই দুইকে সমান- রূপে স্বীকার করিয়া এই পূর্বের পঙক্তি সকল লেখা গেল বস্তুতঃ কর্ম ও জ্ঞান এ দুইয়ের অত্যন্ত প্রভেদ যেহেতু কর্মের সম্যক্ অনুষ্ঠায়ী হইলেও জ্ঞাননিষ্ঠের মধ্যে অপ্রতিষ্ঠিত যে ব্যক্তি তাহার তুল্যও সে হয় না। তথা মুণ্ডকশ্রুতিঃ। “প্লব হেতে অদৃঢ়া যজ্ঞরূপা অষ্টাদশােক্তমবরং যে কৰ্ম্ম। এতচ্ছেয়াে যেহভিনন্দন্তি মূঢ়াঃ জামৃত্যুং তে পুনরেবাপিযন্তি”। অষ্টাদশাঙ্গ যে যজ্ঞরূপ কৰ্ম্ম তাহা সকল বিনাশী হয় ঐ বিনাশী কৰ্ম্মকে যে সকল ব্যক্তি শ্ৰেয় করিয়া জানে তাহারা পুনঃ২ জন্মজরা চারি প্রশ্নের উত্তর ১১ মৃত্যুকে প্রাপ্ত হয়। “অবিদ্যায়াং বহুধা বর্তমান বয়ং কৃতার্থ ইত্যভিমন্যন্তি বালা। যৎ কৰ্ম্মিণাে ন প্রবেদয়ন্তি রাগাৎ তেনাতুরাঃ ক্ষীণলােকাবন্তে”। অর্থাৎ যে সকল ব্যক্তি অজ্ঞানরূপ কৰ্ম্মকাণ্ডের অনুষ্ঠানে বহু প্রকারে নিযুক্ত থাকিয়া অভিমান করে যে আমরা কৃতকার্য হই সে অজ্ঞান লােকেরা কৰ্ম্মফলের বাসনাতে অন্ধ হইয়া তত্ত্বজ্ঞান জানিতে পারে না অতএব সেই সকল ব্যক্তি কর্মফল ক্ষয় হইলে দুঃখে মগ্ন হইয়া স্বর্গ হইতে চ্যুত হয়। আর অপ্রতিষ্ঠিত জ্ঞানীর বিষয়ে ভগবদগীতা কহেন। “অৰ্জ্জুন উবাচ। অতিঃ শ্ৰদ্ধয়ােপেতে যােগাচ্চলিতমানসঃ। অপ্রাপ্য যােগসং- সিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি। কচ্চিস্লোভয়বিভ্রষ্টচ্ছিন্নামিব নশুতি। অপ্রতিষ্ঠো [9] মহাবাহাে বিমূঢ়ে। ব্ৰহ্মণঃ পথি”। অর্জুন কহিতেছেন যে ব্যক্তি প্রথমতঃ শ্রদ্ধান্বিত হইয়া জ্ঞানাভ্যাসে প্রবৃত্ত হয় পশ্চাৎ যত্ন না করে এবং জ্ঞানাভ্যাস হইতে বিরত হইয়া বিষয়াসক্ত হয় সে ব্যক্তি জ্ঞানফল যে মুক্তি তাহা না পাইয়া কি গতি প্রাপ্ত হইবেক। সে ব্যক্তি কর্মত্যাগপ্রযুক্ত দেবস্থান পাইলেক না এবং জ্ঞানের অসিদ্ধতা- প্রযুক্ত মুক্তিকে না পাইয়া নিরাশ্রয় ও ব্রহ্মপ্রাপ্তিতে বিমূঢ় হইয়া ছিন্ন মেঘের ন্যায় নষ্ট হইবেক কি না। ভগবান্ কৃষ্ণ এই প্রশ্নের উত্তর দিতেছেন। “ভগবানুবাচ । পার্থ নৈবেহ নামুত্র বিনাশস্তস্য বিদ্যতে। নহি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত গচ্ছতি ॥ প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লােকালুষিত্বা শাশ্বতীঃ সমা। শুচীনাং শ্ৰীমতাং গেহে যােগভ্রষ্টোহভিজায়তে” ॥ তথা। “তত্র তং বুদ্ধিসংযােগং লভতে পৌৰ্ব্বদেহিকং । যততে চ ততাে ভূয়ঃ সংসিদ্ধৌ কুরুনন্দন”। হে অর্জুন সেই ব্যক্তির ইহলােকে পাতিত্য ও পরলােকে নরক হয় না যেহেতু শুভকারী ব্যক্তির দুর্গতি কদাপি হয় না সেই জ্ঞানভ্রষ্ট ব্যক্তি কর্মীদের প্রাপ্য যে স্বর্গলােক সকল তাহাতে বহুকাল পর্যন্ত বাস করিয়া শুচি ধনবান্ ব্যক্তিদের গৃহে জন্ম লয় পরে ঐ জন্মেই পূৰ্ব্বদেহাভ্যস্ত জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া তাহার দ্বারা মুক্তির প্রতি অধিক যত্ন করে। মনুঃ “সর্বেষামপি চৈতেষামাত্মজ্ঞানং পরং স্মৃতং। তদ্ধ্যগ্ৰং সৰ্ববিদ্যানাং প্রাপ্যতে মৃতং ততঃ”। এই সকল ধর্মের মধ্যে আত্মজ্ঞানকে পরম ধৰ্ম্ম কহা যায় যেহেতু সকল [১] ধর্মের শ্রেষ্ঠ যে আত্মজ্ঞান তাহা হইতে মুক্তি হয়। অন্যের সংসৰ্গাধীন জ্ঞানাবলম্বনের নিমিত্তে যত্ন করিলে তাহাকে গডরিকাবলিকার ন্যায় লিখিয়াছেন অতএব ইহার প্রয়ােগ- স্থান বিবেচনা করা কর্তব্য যেমন অগ্রগামী মেষ দেখিয়া পশ্চাতের মেষ ভদ্রাভদ্র বিচার না করিয়া তাহার অনুগামী হয় সেইরূপ যুক্তি ও শাস্ত্র বিবেচনা না করিয়া পূর্ব২ ব্যক্তির ধর্ম ও ব্যবহার অনুষ্ঠান যদি কোন ব্যক্তি করে তবে তাহার প্রতি ঐ গড়ডরিকাপ্রবাহ শব্দের প্রয়ােগ পণ্ডিতেরা করিয়া থাকেন কিন্তু এ স্থলে দুই = ১২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী প্রকার ব্যক্তি সকল দেখিতেছি এক এই যে বেদ ও বেদশিরােভাগ উপনিষদ তাহার সম্মত ও মনু প্রভৃতি তাবৎ স্মৃতিসম্মত এবং মহাভারত পুরাণ তন্ত্র সকল শাস্ত্র- সম্মত আত্মােপাসনা হয় ইহা জানিয়া আর ইন্দ্রিয়ব্যাপ্য যে বস্তু এবং বিভাগযােগ্য যে২ বস্তু সে সকল নশ্বর অতএব তাহা হইতে ভিন্ন পরমেশ্বর হয়েন ইহা যুক্তিসিদ্ধ জানিয়া অন্য২ নশ্বর মনঃকল্পিত উপাসনা হইতে বিরত হইয়া সেই অনির্বচনীয় পরমেশ্বরের সত্তাকে তঁাহার কার্য্যের দ্বারা স্থির করিয়া তাহাকে শ্রদ্ধা করে তাহার প্রতি গড়ডরিকাবলিকা শব্দের প্রয়ােগ করা উচিত হয় কি যে ব্যক্তি এমত কোনাে কল্পিত উপাসনা যাহা বেদ ও মাদি স্মৃতি এবং মহাভারত ইত্যাদি সর্বসম্মত প্রসিদ্ধ গ্রন্থে কোন মতে প্রাপ্ত হয় না কেবল অন্য কেহ করিতেছে এই প্রমাণে তাহা পরিগ্রহ[১১]করে এবং যুক্তি হইতে এককালে চক্ষু মুদ্রিত করিয়া দুর্জয় মানভঙ্গ যাত্রা ও সুসম্বাদ এবং বড়াই বুড়ীর উপাখ্যান যাহা কেবল চিত্তমালিন্যের ও মন্দ সংস্কারের কারণ হয় তাহাকে পরমার্থসাধন করিয়া জানে ও আপন ইষ্ট দেবতার সঙকে সম্মুখে নৃত্য করায় কেবল অন্যকে এ সকল ক্রিয়া করিতে দেখিয়া সেই প্রমাণে অনুষ্ঠান করে এমত ব্যক্তির প্রতি গড়ডরিকাবলিকা শব্দের প্রয়ােগ উচিত হয় এ দুয়ের বিবেচনা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা করিবেন। আর ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী প্রথম প্রশ্নে লিখেন যে ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানীরা এবং তাহার সংসর্গীরা কি নিগূঢ় শাস্ত্রাবলােকন করিয়াছেন। উত্তর প্রণব গায়ত্রী উপনিষৎ মঘাদি স্মৃতি এই সকল শাস্ত্র নিগূঢ় হউক কি অনিগূঢ় হউক ইহারি প্রমাণে তাহারা জ্ঞানাবলম্বনে প্রবৃত্ত হয়েন কিন্তু বেদবিধির অগােচর গৌরাঙ্গ ও দুটি ভাই ও তিন প্রভু এই সকলের সাধকেরা কোন্ শাস্ত্র প্রমাণে অনুষ্ঠান করেন জানিতে বাসনা করি। ইতি। ধৰ্মসংস্থাপনাকাক্ষীর দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে “যাহারা বেদ স্মৃতি পুরাণাক্ত স্বস্বজাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহারবিরুদ্ধ কৰ্ম্ম করেন অথচ ভ্রমাত্মক বুদ্ধিতে আপনাকে আপনিই ব্রহ্মজ্ঞানী করিয়া মানেন তাহাদিগের তবে অনাদর পুর:[১২]সর যজ্ঞসূত্র বহন কেবল বৃদ্ধ ব্যাভ্র মার্জার তপস্বীর ন্যায় বিশ্বাসকারণ অতএব এতাদৃশাচাবন্ত ব্যক্তিদিগের স্কাল ও মহাভারতবচনানুসারে কি বক্তব্য। “যথা। সদাচারাে হি সর্বাহে নাচারাদ্বিযুতঃ পুনঃ। তস্মাদ্বিপ্ৰেণ সততং ভাব্যমাচারশীলিনা। দুরাচার- রতাে লােকে গহণীয়ঃ পুমান্ ভবেৎ। তথাচ। সত্যং দানং ক্ষমা শীলমানৃশংস্যং তপাে ঘৃণা। দৃশ্যন্তে যত্ৰ নাগেন্দ্র স ব্রাহ্মণ ইতি স্মৃতঃ। যত্রতন্ন ভবেৎ সর্প তং শূদ্র ইতি নিৰ্দিশেৎ”। উত্তর। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী সদাচার সদ্ব্যবহারহীন চারি প্রশ্নের উত্তর অভিমানীর যজ্ঞােপবীত ধারণ নিরর্থক হয় লিখিয়াছেন এ স্থলে সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দের দ্বারা তাহার কি তাৎপর্য তাহা স্পষ্ট বােধ হয় না। প্রথমত যদি ইহা তাৎপৰ্য হয় যে তাবৎ উপাসকের ও অধিকারীর যে আচার ও ব্যবহার তাহাই সদাচার ও সদ্ব্যবহার হয় এবং তাহা না করিলে যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয় তবে ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীকে জিজ্ঞাসা করি যে তিনি তাবৎ উপাসকের ও অধিকারীর আচার ও ব্যবহার করিয়া থাকেন কি না অর্থাৎ বৈষ্ণবের আচার যে মৎস্য মাংস ত্যাগ এবং অধীনতা ও পরনিন্দারাহিত্য ইত্যাদি ধৰ্ম্ম তাহার অনুষ্ঠান করেন কি না এবং তত্তৎকালে কৌলের ধর্ম যে নিবেদিত মৎস্য মাংসাদি ভােজন ও মৎস্য মাংস যে আহার না করে তাহার প্রতি পশু শব্দ প্রয়োেগ ইহাও করিয়া থাকেন কি না। আর ব্রহ্মনিষ্ঠের ধর্ম যাহা মনু কহিয়াছেন যে। “জ্ঞানেনৈবাপরে বি যজন্ত্যে[১৩]তৈম খৈঃ সদা। জ্ঞানমূলাং ক্রিয়ামেং পশ্যন্তে জ্ঞানচক্ষুষ। তথা। যথােক্তাদ্যপি কৰ্ম্মাণি পরিহায় দ্বিজোত্তমঃ । আত্মজ্ঞানে শমে চ স্যাৎ বেদাভ্যাসে চ যত্নবান”। অর্থাৎ কোন২ ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থের গৃহস্থের প্রতি যে যজ্ঞ শাস্ত্রে বিহিত আছে তাহা সকল কেবল ব্ৰহ্মজ্ঞান দ্বারা নিষ্পন্ন করেন তাহারা জ্ঞানচক্ষু দ্বারা জানিতেছেন যে পঞ্চ যজ্ঞাদি সকল ব্ৰহ্মাত্মক হয়েন অর্থাৎ ব্রহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থদের ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা সমুদায় সিদ্ধ হয়। পূর্বোক্ত কৰ্ম্মসকলকে পরিত্যাগ করিয়াও ব্রাহ্মণ আত্মজ্ঞানে ইন্দ্রিয়নিগ্রহে প্রণব উপনিষদাদি বেদের অভ্যাসে যত্ন করিবেন। এই সকলেরও অনুষ্ঠান ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী করিয়া থাকেন কি না। এই তিন পৃথক্‌২ ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের আচার যাহা পরস্পর বিরুদ্ধ হয় করিয়া থাকেন কহিতে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষী বুঝি সমর্থ হইবেন না যেহেতু ধৰ্ম্মবুদ্ধিতে মৎস্য মাংস ত্যাগ ও মৎস্য মাংস গ্রহণ এবং গ্রহণা গ্রহণে সমান ভাব এই তিন ধৰ্ম্ম কোন মতে এককালে এক ব্যক্তি হইতে হইবার সম্ভাবনা নাই অতএব যদি সকল উপাসকের আচার ও ব্যবহার ইহাই সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দের দ্বারা ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাভক্ষীর তাৎপৰ্য্য হইল তবে তঁাহার ব্যবস্থা- মুসারে সদাচার সদ্ব্যবহারের অনুষ্ঠানে অক্ষমতাহেতুক যজ্ঞােপবীত ধারণ তাহারি আদৌ বৃথা হয়। দ্বিতীয়ত। যদি আপন২ উপাসনাবিহিত যে সমুদায় [১৪] আচার তাহাই সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দে ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর অভিপ্রেত হয় তবে তাহাকেই মধ্যস্থ মানি যে তিনি আপন উপাসনার সমুদায় আচার করিয়া থাকেন কি না যদি শাস্ত্রবিহিত সমুদায় আচার করিয়া থাকেন তবে যথার্থরূপে তিনি অন্য ব্যক্তি যে আপন উপাসনার সমুদায় ধর্ম না করিতে পারে তাহাকে ত্যজ্য কহিতে পারেন এবং এমত ১৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী তাহার যজ্ঞােপবীত বৃথা ইহাও আজ্ঞা করিতে পারেন আর যদি তিনি আপন উপাসনাবিহিত ধৰ্ম্মের সহস্রাংশের একাংশও না করেন তবে তাহার এই যে ব্যবস্থা যে স্বধৰ্ম্মের সমুদায় অনুষ্ঠান না করিলে যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয় ইহার অনুসারে অগ্রে আপন যজ্ঞােপবীত ত্যাগ করিয়া যদি অন্যকে কহেন যে তুমি স্বধৰ্ম্মের সমুদায় অনুষ্ঠান করিতে পার না অতএব কেন বৃথা যজ্ঞােপবীত ধারণ করহ তবে এ কথা শােভা পায়। তৃতীয়ত সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দের দ্বারা আপন২ উপাসনাবিহিত ধৰ্ম্মের যথাশক্তি অনুষ্ঠান করা ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর যদি অভিপ্রেত হয় ও যে২ অংশের অনুষ্ঠানে ত্রুটি হয় তন্নিমিত্ত মনস্তাপ এবং স্বধৰ্ম্মবিহিত প্রায়শ্চিত্ত যে করে তাহার যজ্ঞসূত্র ধারণ বৃথা হয় না তবে এ ব্যবস্থানুসারে কি ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর কি অন্য ব্যক্তির যজ্ঞােপবীত রক্ষা পাইল। চতুর্থ যদি ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী কহেন যে মহাজন সকল যাহা করিয়া আসিতেছেন তাহার নাম সদাচার ও সদ্ব্যবহার হয় ইহাতে [১৫] প্রথমত জিজ্ঞাসা করি যে মহাজন শব্দে কাহাকে স্থির করা যায় যেহেতু দেখিতে পাই যে গৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দ এবং কবিরাজ গোঁসাই ও রূপদাস সনাতন- দাস জীবদাস প্রভৃতিকে গৌরাঙ্গীয় সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবেরা মহাজন কহিয়া তাহাদিগের গ্রন্থানুসারে পরম্পরায় আচার করিতে উদযুক্ত হয়েন এবং শাক্ত সম্প্রদায়ের কৌলেরা বিরূপাক্ষ ও নির্বাণাচাৰ্য্য এবং আগমবাগীশ প্রভৃতিকে মহাজন কহিয়া তাহাদিগের ব্যবহার ও তাহাদের গ্রন্থানুসারে আচার করিতে প্রবৃত্ত আছেন সেই- রূপ রামানুজ সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবেরা রামানুজ ও তৎশিষ্য প্রশিষ্যকে মহাজন কহিয়া তাহাদিগের ব্যবহার ও আচারকে সদাচার সদ্ব্যবহার জানিয়া তাহার অনুষ্ঠান করিতে এ পর্যন্ত যত্ন করিতেছেন যে শিবলিঙ্গ দর্শনকে পাপ কহিয়া শিবমন্দিরে প্রবেশ করেন না এবং নানকপন্থী ও দাদূপপন্থী প্রভৃতিরা পৃথকৃৎ ব্যক্তিকে মহাজন জানিয়া তাহাদের ব্যবহার ও আচারানুসারে ব্যবহার ও আচার করিতে যত্ন করেন এবং শাস্ত্রেও অধিকারিবিশেষে বিশেষ অনুষ্ঠান লিখিয়াছেন। অধিকারিবিশেষেণ শাস্ত্রাণাক্তান্য- শেষতঃ । কিন্তু একের মহাজনকে অন্যে মহাজন কি কহিবেক বরঞ্চ খাতকও কহে না এবং ঐ সকল মহাজনের অনুগামীরা পরস্পরকে নিন্দিত ও অশুচি কহিয়া থাকেন। অতএব ধর্মসংস্থাপনাকাক্ষীর এরূপ তাৎপৰ্য হইলে সদাচার সদ্ব্যবহারের [১৬] নিয়মই রহে না সুতরাং একের মতে অন্য সদাচার সদ্ব্যবহারহীন ও বৃথা যজ্ঞাে- পবীতধারী হয়েন। পঞ্চম যদি ধৰ্মসংস্থাপনাকাতক্ষীর ইহা তাৎপৰ্য্য হয় যে আপন পিতৃপিতামহাদি যে আচার করিয়াছেন সে সদাচার হয় তথাপিও সদাচারের নিয়ম রহিল না পিতা পিতামহ অযােগ্য কৰ্ম্ম করিলে সে ব্যক্তি অযােগ্য কৰ্ম্ম করিয়াও চারি প্রশ্নের উত্তর আপনাকে সদাচারী কহিতে পারিবেক এবং ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর মতে পিতৃপিতামহের মতানুসারে সেই অযােগ্য কর্মকর্তার যজ্ঞােপবীত রক্ষা পায়। বস্তুত আপন২ উপাসনানুসারে শাস্ত্রে যাহাকে সদাচার কহিয়াছেন তাহা শাস্ত্রের অবহেলাপূর্বক পরিত্যাগ যে করে অথবা বাধকপ্রযুক্ত তাহার সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানে ত্রুটি হইলে মনস্তাপ ও তত্তশাস্ত্রবিহিত প্রায়শ্চিত্ত যে না করে তাহার যজ্ঞােপবীত ব্যর্থ হয় এবং যে আপনি স্বধর্মহীন হইয়া অন্য স্বধর্মহীনকে বৃথা যজ্ঞােপবীতধারী বলে এমতরূপ নিন্দকের এবং স্বদোষ দর্শনে অন্ধের যজ্ঞসূত্র ধারণ বৃথাও হইতে পারে। ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী বৃদ্ধ ব্যাঘ্র বিড়াল তপস্বীর যে দৃষ্টান্ত লিখিয়াছেন তাহা কাহার প্রতি শােভা পায় ইহা বিজ্ঞ ব্যক্তি সকলে বিবেচনা করুন। নাসিকাতে সবিন্দু তিলক যাহার সেবাতে প্রায় অর্ধ দণ্ড ব্যয় হয় ও ভূরি কাল হস্তে মালা যাহাতে যবনাদির স্পর্শাস্পর্শ বিচার নাই এবং লােকের সহিত সাক্ষাৎ হইলে অত্যন্ত বিনয় পরােক্ষে আপন জ্ঞাতিবর্গ [১৭] পৰ্যন্তেরও নিন্দা এবং সৰ্ব্বদা এই ভাব দেখান যেন এইক্ষণে পূজা সাঙ্গ করিয়া উত্থান করিলাম ও বাহেতে কেবল দয়া ও অহিংসা এই সকল শব্দ সৰ্ব্বদা মুখে নির্গত হয় কিন্তু গৃহমধ্যে মৎস্যমুণ্ড বিনা আহার হয় না। আর এক ব্যক্তি মহানিৰ্বাণের এই বচনে নির্ভর করেন। “যেনােপায়েন দেবেশি লােকঃ শ্রেয়ঃ সমশ্নতে। তদেব কাৰ্যং ব্রহ্মজ্ঞৈরেষ ধৰ্ম্মঃ সনাতন”। অর্থাৎ যে উপায় দ্বারা লােকের শ্রেয়ঃপ্রাপ্তি হয় তাহাই কেবল ব্ৰহ্মনিষ্ঠের কর্তব্য এই ধৰ্ম সনাতন হয়। এবং তদনুসারে বাহে কোন প্রতারকতা কি বেশে কি আলাপে কি ব্যবহারে যাহাতে হঠাৎ লােকে ধাম্মিক ও সাক্ষাৎ ব্ৰহ্মণ্যদেব জ্ঞান করিয়া থাকে তাহা না করিয়া অন্যের বিরুদ্ধ চেষ্টা না করে এবং তন্ত্রাদিবিহিত মৎস্য মাংসাদি ভােজন যাহা দেখিলে অনেকের অশ্রদ্ধা হয় তাহাও স্পষ্টরূপে করিয়া থাকে এই দুইয়ের মধ্যে কে বিড়ালতপস্বী হয় ইহা কিঞ্চিৎ প্রণিধান করিলেই সুবােধ লােকেরা জানিবেন। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর তৃতীয় প্রশ্ন। ব্রাহ্মণ সজ্জনের অবৈধ হিংসাকরণ কোন ধৰ্ম্ম বিশেষতঃ সৰ্ব্বভূতহিতে রত অহিংসক পরম কারুণিক আত্মতত্ত্বজ্ঞানীদিগের আত্মদর ভরণার্থে পরমহর্ষে প্রত্যহ ছাগলাদি ছেদনকরণ কি [১৮] আশ্চৰ্য্য এতাদৃশ সাধু সদাচার মহাশয় সকলের স্কন্দপুরাণবচনানুসারে ঐহিক পারত্রিক কি প্রকার হয়। “যথা। যাে জন্তনাত্মতুষ্ট্যর্থং হিনস্তি জ্ঞানদুৰ্বলঃ। দুরাচারস্য তস্যেহ নামুত্রাপি সুখং কচিৎ” ॥৩৷৷ উত্তর ধর্মাধর্ম খাদ্যাখাদ্য শাস্ত্রবিহিত হইয়াছে দেখ পূজার্থে কুন্দশেফালিকা জবা মহাদেবকে দান করিলে শাস্ত্রনিষিদ্ধপ্রযুক্ত পাতক রামমােহন-গ্রন্থাবলী = হয় আর দেবতাকে রুধির প্রদানেতেও পুণ্য হয় যেহেতু শাস্ত্রে বিধি আছে সেই শাস্ত্রে কহিতেছেন। “দেবান্ পিতৃন সমভ্যশ্চ খাদন্ মাংসং ন দোষভা”। মনুঃ “নাত্তা দুষ্যত্যদন্নাদ্যা প্রাণিনােহন্যহস্যপি। ধাত্রৈব সৃষ্ট। হাদ্যাশ্চ প্রাণিনােহাত্তার এব চ”। “অনিবেদ্য ন ভুঞ্জীত মৎস্যমাংসাদিকঞ্চন”। অর্থাৎ দেবতা পিতৃলােককে নিবেদন করিয়া মাংস ভােজন করিলে দোষভাগী হয় না। ও ভক্ষ্য প্রাণিসকলকে প্রতি দিন ভােজন করিয়া তাহার ভােক্তা দোষ প্রাপ্ত হয় না যেহেতু বিধাতাই এককে ভক্ষক অপরকে ভক্ষ্য করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। এবং মৎস্য মাংসাদি কোন দ্রব্য নিবেদন না করিয়া ভােজন করিবেক না। অতএব বিহিত মাংসাদি ভােজনে ছাগলাদির হনন ব্যতিরেকে মাংসের সম্ভাবনা হইতে পারে না যেহেতু অপ্রেক্ষিত মৃত পশু খাদ্য নহে কিন্তু ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী কিরূপে জানিয়াছেন যে অনিবেদিত ভােজন ও পরম হর্ষে ছেদন কেহ করিয়া থাকেন তাহার বিশেষ লিখেন নাই তিনি কি ছাগহননকালে বিদ্যমান [১৯] থাকিয়া নৃত্য কিম্বা উৎসাহ করিতে দেখিয়াছেন কি ভােজনকালে বসিয়া স্ব স্ব উপাসনার অনুসারে অনিবেদিত ভােজন করিতে দৃষ্টি করিয়াছেন। দোষােল্লেখ করিবার জন্য ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী সত্যকে এককালেই জলাঞ্জলি দিয়াছেন ইহাতে আশ্চৰ্য্য কি যাঁহারা পরমেশ্বরকে জন্ম মরণ চৌৰ্য্য পরদারাভিমর্ষণ ইত্যাদি দোষকে যথার্থ জানিয়া অপবাদ দিতে পারেন তাহারা যে কেবল অনিবেদিত ভােজনের অপবাদ মনুষ্যকে দিয়া ক্ষান্ত থাকেন ইহাও আহলাদের বিষয়। মহানিৰ্বাণ “বেদোক্তেন বিধানেন আগমােক্তেন বা কলো। আত্ম- তৃপ্তঃ সুরেশানি লােকযাত্রাং বিনিৰ্বহেৎ”। জ্ঞানে যাহার নির্ভর তিনি সর্বযুগে বেদোক্ত বিধানে আর কলিযুগে বেদোক্ত কিম্বা আগমােক্ত বিধানে লােকাচার নিৰ্বাহ করিবেন অতএব আগমবিহিত মাংস ভােজন স্ব স্ব ধর্মানুসারে নিবেদন- পূৰ্ব্বক করিলে অধৰ্ম্মের কারণ হয় ও গৌরাঙ্গীয় বৈষ্ণবেরা স্বহস্তে মৎস্য বধ করিয়া বিষ্ণুকে নিবেদন না করিয়া খাইলেও ধৰ্ম হয় ইহা যদি ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর মত হয় তবে তিনি অপূৰ্ব্ব ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী হইবেন। মৎসরত। কি দারুণ দুঃখের কারণ হয়। লােকে কেন খায় কেন সুখে কাল যাপন করে ইহাই মৎসরের মনে সর্বদা উদয় হইয়া তাহাকে ক্লেশ দেয়। মাংস ভােজন শাস্ত্রে অবিহিত ইহা যদি কহিতে পারে অন্ততও লােকের নিন্দা করিবার উদ্দেশে কহিবেক যে নিবেদন করিয়া [২০] খায় না কিম্বা আচমনে অধিক জল কি অল্প জল লইয়াছিল কিন্তু মৎসরের তুষ্টির নিমিত্তে কে আপন শাস্ত্রবিহিত আহার ও প্রারব্ধনির্মিত ভােগ পরিত্যাগ করে ইহাতে মৎসরের অদৃষ্টে যে দুঃখ তাহা কে নিবারণ করিতে পারিবেক ইতি ॥

r " চারি প্রশ্নের উত্তর ১৭ চতুর্থ প্রশ্ন। অনেক বিশিষ্টসন্তান যৌবন ধন প্রভুত্ব অবিবেকতাপ্রযুক্ত কুসংসর্গগ্রস্ত হইয়া লােকলজ্জা ধর্মভয় পরিত্যাগ করিয়া বৃথা কেশচ্ছেদন সুরাপান যবস্যাদি গমনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন ইহার শাসন ব্যতিরেকে এই সকল দুষ্কর্মেয় উত্তরােত্তর বৃদ্ধি হইতেছে তত্তৎকৰ্ম্মানুষ্ঠাতৃ মহাশয়দিগের কালিকাপুরাণ মৎস্যপুরাণ মনুবচনানুসারে কি বক্তব্য! “যথা গঙ্গায়াং ভাস্করক্ষেত্রে পিত্রোশ্চ মরণং বিনা। বৃথা ছিনত্তি যঃ কেশান্ তমাহুব্রহ্মঘাতকং। তথাচ। যাে ব্রাহ্মণােহদ্যপ্রভৃতীহ কশ্চিৎ মােহাৎ সুরাং পাস্ততি মন্দবুদ্ধিঃ। তপােপহ ব্ৰহ্মহা চৈব স স্তাদস্মিন্ লােকে গহিতঃ স্যাৎ পরে চ। অপিচ যস্য কায়গতং ব্ৰহ্ম মদ্যনাপ্লাব্যতে সকৃৎ। তস্য ব্যপৈতি ব্রাহ্মণ্যং শূদ্ৰবঞ্চ স গচ্ছতি ॥ তথাচ। চাণ্ডালান্ত্যস্ত্রিয়াে গত্বা ভুক্ত। চ প্রতিগৃহ চ। পতত্যজ্ঞানতত বিপ্রাে জ্ঞানাৎ সাম্যন্তু গচ্ছতি । অন্ত্যা স্লেচ্ছযবাদয় ইতি কুল্লুকভট্টঃ” [২১]। উত্তর। যৌবন ধন প্রভুত্ব অবিবেকতাপ্রযুক্ত লজ্জা ও ধর্মভয় পরিত্যাগ করিয়া যাহারা বৃথা কেশচ্ছেদন সুরাপান যবন্যাদি গমন করেন তাহারা বিরুদ্ধকারী অতএব শাসনাহ অবশ হয়েন সেইরূপ যাহাদের পিতা বিদ্যমান আছেন এ নিমিত্ত ধন ও প্রভুত নাই কেবল যৌবন ও অবিবেকতা প্রযুক্ত ধর্মকে তুচ্ছ করিয়া বৃথা কেশচ্ছেদ সুরাপান ও যবাদি গমন করেন তাহারাও শাসনযােগ্য হয়েন অথবা কেশে অন্ত্যজরচিত কলপের ছােপ প্রায় প্রত্যহ দেন ও সম্বিদা যাহা সুরাতুল্য হয় তাহার পান এবং স্বভৃত্য যবনস্ত্রী ও চণ্ডালিনী বেশ্যা ভােগ করেন সেই ব্যক্তিও বিরুদ্ধকারী ও শাসনাহ হয়েন। হেতু পিতা অবিদ্যমানে ধন ও প্রভুত্ব এ দুই অধিক সহকারী হইলে তাহাদের কি পৰ্যন্ত অসৎ প্রবৃত্তির সম্ভাবনা না হইবেক ? ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীকে জানা উচিত যে প্রয়াগ ও পিতৃবিয়ােগ ব্যতিরিক্ত বৃথা কেশচ্ছেদ করিবে না ইহা নিষেধ আছে অতএব বৃথা শব্দের দ্বারা নৈমিত্তিক কেশচ্ছেদের নিষেধ ইহাতে বুঝায় না। বিশেষত বৃথা কেশচ্ছেদ অত্রিকচ্ছ পরিধান ও হাঁচি হইলে জীব ইহা না বলা এবং ভূমিতে পতিত হইলে উঠ এ শব্দ প্রয়ােগ না করা যাহাতে ব্ৰহ্মহত্যা পাপ হয় এরূপ ক্ষুদ্র দোষে মহাপাতকতি যে সকল বিষয়ে আছে তাহার ক্ষয়ের নিমিত্তে ওইরূপ অল্পয়াসসাধ্য অন্ন হিরণ্যাদি দানরূপ উপায়ও (২২) আছে। “ব্রহ্মহত্যাকৃতং পাপময়দানাৎ প্রনশুতি। সম্বৰ্তঃ। হিরণ্যদানং গােদানং ভূমিদানং তথৈব চ। নাশয়ন্ত্যা পাপানি মহাপাতকাপি ॥ কুলার্ণবে ক্ষণং ব্ৰহ্মাহমশ্মীতি যৎ কুৰ্যাদাত্মচিন্তনং। তৎ সর্বপাতকং নষ্যেৎ তমঃ সূর্যোদয়ে যথা” । অর্থাৎ অল্প দান করিলে ব্ৰহ্মহত্যাপাপ নষ্ট হয়। স্বর্ণদান গােদান ভূমিদান ১৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী = ইহাতে মহাপাতকও নষ্ট হয়। ব্ৰহ্ম ও জীব এই দুইয়ের অভেদ চিন্তা ক্ষণমাত্র করিলেও যেমন সূর্যোদয়ে অন্ধকার যায় তােপ সকল পাতক নষ্ট হয়। অতএব সাধারণ দোষের সাধারণ প্রায়শ্চিত্ত পূৰ্ব্বং শাস্ত্রকারেরাই লিখিয়াছেন। ধর্ম- সংস্থাপনাকাঙক্ষী বচন লিখিয়াছেন যে ব্রাহ্মণ সুরাপান করিলে ব্ৰহ্মহত্যাপাপগ্রস্ত এবং ব্রাহ্মণ্যহীন হয়েন এবং অন্য স্মৃতিবচনেও কলিতে ব্রাহ্মণের মদ্যপান নিষিদ্ধ দেখিতেছি এ সকল সামান্য বচন যেহেতু ইহাতে বিশেষ বিধি দেখিতে পাই শ্রুতিঃ “সৌভ্রামণ্যাং সুরাং গৃহীয়াৎ”। সৌভ্রামণী যজ্ঞে সুরাপান করিবেক। ভগবান্ মনুঃ “ন মাংসভক্ষণে দোষাে ন মদ্যে নচ মৈথুনে”। অর্থাৎ প্রবৃত্তি হইলে যে প্রকার মদ্যপানে ও মাংস ভােজনে এবং স্ত্রীসংসর্গে বিধি আছে তাহা করিলে দোষ নাই। কুলার্ণব ও মহানিৰ্বাণতন্ত্র। “কলৌ যুগে মহেশনি ব্রাহ্মণানাং বিশেষতঃ। পশুর্ন স্যাৎ পশুর্ন স্যাৎ পশুর্ন স্যাৎ মমাজ্ঞয়া । অতএব দ্বিজাতীনাং মদ্যপানং বিধীয়তে। দ্বেষ্টারঃ কুলধৰ্ম্মাণাং বারুণীনিকাশ্চ যে। জ্ঞেয়া মহাকিষিকারিণঃ” । [২৩] কলিকালে বিশেষত ব্রাহ্মণেরা কদাপি পশু হইবেক এই হেতু ব্রাহ্মণ প্রভৃতির মদ্যপান বিহিত হয়। যে সকল ব্যক্তি কুলধৰ্ম্মের দ্বেষ এবং মদিরার নিন্দা করে সে সকল মহাপাতকী চণ্ডাল হইতেও অধম হয়। পূর্বোক্ত স্মৃতিবচনে সামান্যত সুরাপানে নিষেধ বুঝাইতেছে আর পশ্চাতের লিখিত তিস্মৃতিতন্ত্রবচনে বিশেষ অধিকারে সুরাপানে বিধি প্রাপ্ত হইতেছে অতএব দুই শাস্ত্রের পরস্পর বিরােধ হইল তাহাতে ভগবান্ মহেশ্বর আপনি সিদ্ধান্ত করিয়াছেন। “অসংস্কৃতঞ্চ মদ্যাদি মহাপাপকরং ভবেৎ”। অর্থাৎ সংস্কারহীন যে মদ্যাদি তাহার পান ভােজনে মহাপাতক জন্মে। অতএব সংস্কৃত মগ্ন ভিন্ন যে মদ্য তাহার পানে ঐ স্মৃতিবচনানুসারে অবশ্যই মহাপাতক হয় আর সংস্কৃত মদিরা পানে পাপ কি হইবেক, বরঞ্চ তাহার নিন্দকের মহাপাতক জন্মে পূর্বোক্ত বচন ইহার প্রমাণ হয় । এইরূপ বিরােধ যখন বেদে উপস্থিত হয় অর্থাৎ এক বেদে কহিয়াছেন যে কোন প্রাণীর হিংসা করিবে না আর অন্য বেদে কহেন যে বায়ু দেবতার নিমিত্তে শ্বেত ছাগল বধ করিবেক এমত স্থলে মীমাংসকেরা এই সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে যে হিংসাতে বিধি আছে তদ্ভিন্ন হিংসা করিবে না যেহেতু এক শাস্ত্রের কিম্বা এক শ্রুতির অমান্য করিলে কোন শাস্ত্র এবং কোন ক্ষতি সপ্রমাণ হইতে পারেন না। মদ্যপান বিষয়ে পরিসংখ্যাবিধি অর্থাৎ অধিক বারণও দেখিতেছি। “যথা। [২৪] অলিপিনং কুলস্ত্ৰীণাংগন্ধস্বীকারলক্ষণং। সাধকানাং গৃহস্থানাং পঞ্চপাত্র প্রকীর্তিতং। পানপাত্রং প্রকুব্বীত ন পঞ্চততালকাধিকং। মন্ত্ৰাৰ্থস্ফুরণার্থায় চারি প্রশ্নের উত্তর অতএব ব্রহ্মজ্ঞানস্থিরায় চ। অলিপিনং প্রকৰ্তব্যং লােলুপাে নম্বক জেৎ ৪ পানে ভ্ৰান্তিৰ্ভবেৎ যস্য সিদ্ধিস্য ন জায়তে। গােপনং কুলধৰ্ম্মস্ত পশাের্বেশবিধারণ ॥ পয়ভােজনং দেবি বিজ্ঞেয়ং প্রাণসঙ্কটে।” কুলার্ণব ও মহানিৰ্বাণ। কুলবধূর মদ্যপান স্থানে আঘাণ মাত্র বিহিত হয়। আর গৃহস্থ সাধকেরা পঞ্চ পাত্রের অধিক গ্রহণ করিবেক না। পাঁচ তােলার অধিক পানপাত্র করিবে না। মন্ত্রার্থের স্ফুর্তি হইবার উদ্দেশে এবং ব্রহ্মজ্ঞানের স্থিরতার উদ্দেশে মদ্য পান করিবেক লােলুপ হইয়া করিলে নরকে যায়। যাহাতে চিত্তের ভ্রম হয় এমত পান করিলে সিদ্ধি হয় না। কুলধৰ্ম্মের গােপন ও পশুর বেশ ধারণ এবং পশুর অন্ন ভােজন প্রাণসঙ্কটে জানিবে । আপন২ উপাসনানুসারে পরিমিত মদ্য পান করিলে হিন্দুর শাস্ত্র যাঁহারা মানেন তাহারা শাসন করিতে প্ৰবৰ্ত্ত হইবেন না। যদিস্যাৎ ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষী স্বীয় মৎসরতার জ্বালাতে যবনশাস্ত্রের কিম্বা চৈতন্যমঙ্গলাদি পয়ারের অবলম্বন করেন যাহাতে কোনাে মতে মদিরা পানের বিধি নাই তবে শাসনের ক্ষমতা হইলে বৈধ মদ্য পানে দোষ কহিয়া শাসন করিতে পারগ হইবেন। কিন্তু যাঁহাদের উপাসনাতে মদ্য ও মাদক দ্রব্য বিন্দুমাত্রও সর্বথা নিষিদ্ধ হয় তাহারা যদি [২৫] লােকলজ্জা ও ধর্মভয় ত্যাগ করিয়া মদ্য কিম্বা সম্বিদা কি অন্য মাদক দ্রব্য গ্রহণ করেন তবে ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্গীর লিখিত বচনের বিষয় তাহারা হইয়া পাতকগ্রস্ত এবং ব্রাহ্মণ্যহীন হইবেন। যবনী কি অন্য জাতি পরদার মাত্র গমনে সৰ্ব্বথা পাতক এবং সে ব্যক্তি দ্য ও চণ্ডাল হইতেও অধম কিন্তু তন্ত্রোক্ত শৈব বিবাহের দ্বারা বিবাহিতা যে স্ত্রী সে বৈদিক বিবাহের স্ত্রীর ন্যায় অবশ্য গম্যা হয়। বৈদিক বিবাহের স্ত্রী জন্ম হইবা মাত্রেই পত্নী হইয়া সঙ্গে স্থিতি করে এমত, নহে বরঞ্চ দেখিতেছি যাহার সহিত কোন সম্বন্ধ কল্য ছিল না সেই স্ত্রী যদি ব্রহ্মার কথিত মন্ত্রবলে শরীরের অর্ধাঙ্গভাগিনী অদ্য তবে মহাদেবের প্ৰােক্ত মন্ত্রের দ্বারা গৃহীতা যে স্ত্রী সে পত্নীরূপে গ্রাহ কেন না হয়? শিবােক্ত শাস্ত্রের অমান্য যাঁহারা করেন সকল শাস্ত্রকে এককালে উচ্ছন্ন তাহারা করিতে পারগ হয়েন এবং তন্ত্রোক্ত মন্ত্র গ্রহণ ও অনুষ্ঠান তাহাদের বৃথা হইয়া পরমার্থ তাহাদের সর্বথা বিফল হয়। খাদ্যাখাদ্য ও গম্যাগম্য শাস্ত্ৰপ্ৰমাণে হয় গােশরীরের সাক্ষাৎ রস যে দুগ্ধ সে শাস্ত্রবিহিত হইয়াছে অতএব খাদ্য হইল আর গৃঞ্জনাদি যাহা পৃথিবী হইতে জন্মে অথচ স্মৃতিতে নিষেধপ্রযুক্ত স্মার্ত মতাবলম্বীদের তাহা ভােজনে পাপ হয় সেইরূপ স্মৃতির বচনে সত্য ত্রেতা বাপরে ব্রাহ্মণ চতুৰ্বর্ণের কন্যা বিবাহ করিয়াও সন্তান জন্মাইয়াও রামমােহন-গ্রন্থাবলী পাতকী হইতেন না সেইরূপ সা[২৬]ক্ষাৎ মহেশ্বরক্তে আগমপ্রমাণে সর্বজাতি শক্তি শৈবােহাহে গ্ৰহণ করিলে পাতক হয় না এ সকল বিষয়ে শাস্ত্রই কেবল প্রমাণ। “যথা বয়ােজাতিবিচারােইত্ৰ শৈবােৰাহে ন বিদ্যতে। অসপিণ্ডাং ভর্তৃহীনামুহেচ্ছ শাসনাৎ”। মহানিৰ্বাণ। শৈব বিবাহে বয়স ও জাতি ইহার বিচার নাই কেবল সপিণ্ডা না হয় এবং সভর্তৃকা না হয় তাহাকে শিবের আজ্ঞাবলে শক্তিরূপে গ্রহণ করিবেক। কিন্তু যাঁহারা স্মাৰ্তমতাবলম্বী ও যাহাদের উপাসনামতে শৈব শক্তি গ্রহণ হইতে পারে না অথচ যবনী কিম্বা অন্য অন্ত্যজ স্ত্রীকে গমন করেন তাঁহারাই পূর্বোক্ত স্মৃতিবচনের বিষয় হয়েন অর্থাৎ সেই জাতি প্রাপ্ত অবশ্যই হয়েন। ইতি বৈশাখ ৩০ শক ১৭৪৪।

পাষণ্ডপীড়ন ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম প্রকাশিত ] ‘চারি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশিত হইলে “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী” এই উত্তরে সন্তুষ্ট না হইয়া প্রত্যুত্তর-বরূপ ১ ফেব্রুয়ারি ১৮২৩ ( ২৩ মাঘ ১২২৯) তারিখে পাষণ্ডপীড়ন' প্রকাশ করেন। ইহাতে “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্খীর চারি প্রশ্ন, “ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর, এবং “ধৰ্ম্ম- সংস্থাপনাকাজী”র প্রত্যুত্তর একত্র মুদ্রিত হইয়াছে ! ‘চারি প্রশ্ন এবং ‘চারি প্রশ্নের উত্তর ইতিপূর্বে মুদ্রিত হওয়ায় আমরা এখানে কেবল ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর প্রত্যুত্তরটি পুনর্মুদ্রিত করিলাম। এই তর্কবিতর্কে কোন পক্ষই স্বনামে যােগদান করেন নাই। পাষণ্ডপীড়ন প্রসঙ্গে রামমােহনের জীবনীকার নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় লিখিয়াছেন :- উহাতে...‘পাষণ্ড’, ‘নগরবাসী ভাক্তত্বজ্ঞানী ইত্যাদি মধুর বাচ্যে তাঁহাকে [ বামমােহনকে সম্বােধন করা হইয়াছিল। নগরান্তসী’র দুই অর্থ ; নগরের অন্তে যিনি ৰাস করেন; অর্থাৎ রামমােহন রায় মাণিকতলায় বাস করিতেন। উহার আর এক অর্থ, চল।-৩য় সং, পৃ. ১৪৩। ‘পাষণ্ডপীড়ন’ উমানন্দন (বা নন্দলাল ) ঠাকুরের নির্দেশে কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন কর্তৃক লিখিত হয়। উমানন্দন ঠাকুর পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর-গােষ্ঠীর হরিমােহন ঠাকুরের পুত্র। পুস্তকে গ্রন্থকার-রূপে কাশীনাথের নাম না থাকিলেও, রামমােহনের চারি প্রশ্নের উত্তর পুস্তকে তাহার ইঙ্গিত আছে। কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন এই সময়ে উইলিয়ম কেরীর অধীনে কলিকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এক জন সহকারী পণ্ডিত ছিলেন এবং বিলাত হইতে আগত সিভিলিয়ানদিগকে বাংলা শিখাইতেন। তিনি ১৮২১ খ্রীষ্টাব্দে ‘ন্যায়দর্শন’ প্রকাশ করেন ; তাহার অনুরােধে কলেজ-কাউন্সিল ইহার দশ খণ্ড ৫০, মুল্যে কলেজ-লাইব্রেরির জন্য গ্রহণ করেন। নিমােত অংশে রামমােহন এই সকল কথারই ইঙ্গিত করিয়াছেন :- আর যদি এক ব্যক্তি বহুকাল ম্লেচ্ছসেবা ও মেচ্ছকে শাস্ত্র অধ্যাপনা করিয়া এবং জায়নের অর্থ যাতে বচনাপূর্বক অচ্ছকে তাহা বিক্রয় করিতে পারে সে আস্ফালন করিয়া অন্যকে কহে ৰে তুমি মেচ্ছের সংসর্গ কর ও শনের অর্থ ভাষায় বিবরণ করিয়া মেকে দেও অতএব তুমি স্বর্গচ্যুত হও তৰে সে ব্যক্তিকে কি কহা উচিত হয়। কানাথ তর্কপঞ্চাননের জীবনী ১৪ সংখ্যক সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা’য় দ্রষ্টব্য।

ঐশ্রীদুর্গা ॥
জয়তি ॥
( পাষণ্ডপীড়ন নামক প্রত্যুত্তর)
A
REPLY, ENTITLED
"A TORMENT TO THE IRRELIGIOUS"
কোন ধর্মসংস্থাপনাকাক্ষি কর্তৃক কোন পণ্ডি-
তের সহায়তায় দেশীয় লােক হিতার্থ
প্রস্তুত ও প্রকাশিত হইল
PREPARED AND PUBLISHED WITH THE
ASSISTANCE OF A PUNDIT,
By a Person, wishing to defend and disseminate
Religious principles.
FOR THE BENEFIT OF HIS COUNTRYMEN.
সমাচার চন্দ্রিকা মুদ্রান্ত্রে মুদ্রাঙ্কিত হইল।
[Printed at] the Sumachara Chandrica Press.
CALCUTTA,
1828.
কলিকাতা সন ১২২৯
২০ মাঘ।

| প্রয়ােজন।
অব্যক্তভাক্ততত্ত্বব্যতীনাং ব্যক্তকামণাৎ। প্রকাশিতশ্চতুঃপ্রশ্নঃ পূৰ্ব্বমুত্তরদর্শন।
তদুত্তরস্বরূপেণ পাশেন পাশবেন চ। বুদ্ধাবরুদ্ধা পাষণ্ডা পান্ ভণ্ডা ক্ষণেন চ। দুষ্টান
নিগ্রহথায় শিষ্টানাং ত্রাণহতবে। ধর্মসংস্থাপনার্থায় স্বর্গারােহণসেবে। তিস্মৃতি-
পুরাণানি তন্ত্ৰাণি বিবিধানি চ। শ্রুতিমৃত্যবিরুদ্ধানি প্রকৃতানি শুভানিচ। এবম্বিধানি
চাস্তানি শাস্ত্রাণি চ তথাপরান। সাধুনাং ব্যবহারাংশু, সদাচারাংশ্চ শাশ্বতা। বিলােক্যা-
শক্যশক্যাৰ্থমালােক্য শুদ্ধয়া পিয়া। বিমৃশ্য তমাষ্য যত্নাৎ রত্নং সুচিন্তয়া। কর্মব্রহ্মো-
ভয়াসক্তা যুক্তিযুক্তা বিনির্মিতা। মুক্তামুক্তামৃতসিক্তা ধৰ্ম্মাণাং সংহিতা হিতা। শােধ্য
যােধ্যা কৃপাবম্ভিবিত্তিঃ সা হি মাম্প্রতি। নলিনী মলিনী তত্র যত্র নাে ভাতি ভাপতিঃ ॥৮*
(নমে ধৰ্মায় মহতে )
( পাষণ্ডপীড়ন নামক প্রত্যুত্তর)
জয়তি জয়তি ধর্মঃ পাতু বিশ্ব শৰ্ম,
হসতু নট নিত্যং ধাম্মিক সচ্চ কৰ্ম্ম।
ভতু ভজতু লজ্জাশীঃ পাষণ্ডধৰ্ম্ম-,
তপতু দহতু পূর্নং পূর্ণপাষণ্ডমর্শ।
শ্লোকের ভাষা।
জয় জয় জয় ধৰ্ম্ম, বিতর বিশ্বের শৰ্ম্ম, ধার্মি-
কে কয় লজ্জা ছেদ। বিপক্ষ পক্ষের গর্ব,
অবিলম্বে কম খ, পাষণ্ডের কর মর্মভে।

( পরমাত্মনে নম: ) । ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর ভূমিকা। চৈত্র মাসের সম্বাদলিপিতে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী•••মনস্তাপবিশিষ্ট। [ ২ ] ৷ ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর ভূমিকা। অবিরত মনস্তাপ তাপিত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী পতিভমানী ব্যক্তিবিশেষদিগের এবং প্রতারক- প্রতারণাস্বরূপ মহাধুমান্ধ করে জন্মান্ধের ন্যায় অন্ধ তৎসংসর্গী জীববিশেষদিগের জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম দিবসে প্রেরিত, চিরচিন্তিত, স্বকপােলকল্পিত নানাবাগাড়ম্বরিত, মদিবচনতা- পৰ্যাৰ্থবহিস্কৃত, স্বানুচরজীবসমাজসন্তোষাৰ্থ রচিত, অন্তঃসাররহিত, অল্পবুদ্ধিজনগণের আপাততঃ শ্রবণমধুর নয়নধূলিপ্রক্ষেপসদৃশ, উত্তরাভাস প্রাপ্ত হইবামাত্র হৃষ্টচিত্ত কৃতকৃত্য হইলাম । উত্তরাভাসের বচন রচনার বিবেচনা তৎপ্রত্যুত্তর প্রদান দ্বারা তদ্ব্যক্তির যন্ত্রণা, মর্মান্তিক বেদনা, পশ্চাৎ ধৰ্ম্মের প্রভাবে বিধিববাধিত রূপেই হইবেক। এবং সুরসিক সুচতুর জনসন্নিধানে সুব্যক্ত বচনরচনাপেক্ষা সব্যঙ্গবচনরচনায় মাধুর্যের প্রাচুর্য্য বিনা অপ্ৰাচুৰ্য্য কদাচ হইবেক না। [৩] ইদানীন্তন সুবুদ্ধি সুপণ্ডিত সদ্বিবেচক গতানুগতিক অনেক সজ্জন সৎসন্তানদিগের দেহান্তরকৃত বহুবিধ কর্মবিশেষার্জিত গুরুতরদৃষ্টবিশেষবলতঃ তাহারা ইহ জন্মে জন্মাবধি কর্মক্লেশলেশাভাবেও অপ্রাকৃত অপ্রতারক পরমকারুণিক দৈবাৎসমাগত সদ্গুরুসন্নিধানে অনির্বচনীয় অচিন্তনীয় সদুপদেশ প্রাপ্ত হই বামাত্ৰ অপূৰ্বদিব্যজ্ঞান প্রভাবে কেহ চতুষ্পদ, কেহ ত্রিপাদ, কেহ দ্বিপা, কেহ একপাদ, কেহ ব্যক্ত, কেহ অব্যক্ত, কেহ বা ব্যক্তাব্যক্ত, অকস্মাৎ এইরূপ অদৃষ্ট অশ্রুত অদ্ভুত আস্তিক হইয়া স্বস্ব জাতীয় বর্ণাশ্রমবিহিত, পূৰ্বপুরুষকৃত ধর্ম কর্ম আচার ও ব্যবহার জলাঞ্জলিপূৰ্ব্বক বিসর্জন করিয়া অত্যানন্দে অহােরাত্ৰ অপূৰ্ব বেদ স্মৃতি পুরাণবিহিত সৎকর্ম সদাচার সদ্ব্যবহার সদনুষ্ঠান সৎসঙ্গ সদালাপে সদা আসক্ত ও অনুরক্ত হইতেছেন, তঁাহারদিগের এতাদৃশ সদাচার সৎকৰ্ম্মাদিকরণ নিষ্প্রয়ােজন নহে, এই এক [৪] অতি প্রয়ােজন দেখিতেছি যে, যাবজ্জীবন পুত্রপৌত্রাদিক্রমে অত্যল্প ধনব্যয়ে অনায়াসে পরম সুখে দিব্য যানারােহণ, দিব্য বসন ভূষণ পরিধান, বারাঙ্গনাসেবন, ধােদর পূরণ সুসম্পন্ন হইবেক, সে যাহা হউক, এ অতি আশ্চৰ্য, যে তাহার কাম ক্রোধ লােভ মােহ মদ মাৎসৰ্য্য শােক সন্তাপ পরনিন্দা পরহিংসা পরদ্বেষাদিগুণপরায়ণ, অথচ পরােপদেশে নিপুণ, বিশেষত দেশবিদেশের জাতিবিশেষের ক্ষণিক মনােরঞ্জনার্থ অনর্থ অম্লান বদনে স্বজাতীয় ধর্ম নিন্দা করণ ততােধিক সাধু লক্ষণ, হায়২ কিবা পাপ কালমাহাত্ম, কিবা কলিপ্রেরিত সদগুরুর সদুপদেশ, কিবা গতানুগতিক সচ্ছিষদিগের সদ্বোধ, কিবা সৎসঙ্গের গুণ, কলিকালের উদয় মাত্রেই পাষণ্ড দণ্ড কাক সন্তোষাৰ্থ পাপমহামহীরুহ প্রায় শাখাপম্নবিত, মুকুলিত, পুষ্পিত, ফলিত হইতেছে, তাহাতে পুরাতন সনাতন ধর্মকর্ম লুপ্তপ্রায় এবং [৫] বেদস্বতিসদাচারবিরুদ্ধ ২৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী বিবিধ অভিনব অপূৰ্ব্ব ধর্ম কর্মের প্রাবল্য বাহুল্যের উপক্রম তদ্রুপ দৃষ্ট হইতেছে, যদ্রুপ পূৰ্বকালীন বহুবিধ নাস্তিকের নাস্তিকতারম্ভে এবং মহাপুণ্যশীল বেণ রাজার রাজ্যশাসন প্রথমে পূৰ্বে পুরাণাদিতে শ্রুত আছে। পরন্তু ধৰ্ম্মবিপ্লবকারক, প্রতারক, গড্ডলিকাবলিকাপাল, নগরান্তবাসী, মাংসাশী, বকাণ্ডপ্রত্যাশাবৎ পণ্ডপ্রত্যাশী, সুরাচার্যের কিবা আশ্চর্য পাণ্ডিত্যপ্ৰাচুৰ্য্য এবং তন্মতাবলম্বী তৎসংসর্গী অপূর্বধর্মশাস্ত্র প্রকাশক গােপাল আচার্য্যেরাও সুরাচাৰ্যসংসর্গে সুরাচাৰ্যকল্প, এ অত্যাশ্চর্য নহে, অঙ্গারের আসজে গৌরাঙ্গও শ্যামাঙ্গ হন । সৰ্বজনহিতৈষী ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের সর্বজনগােচর সমাচারপত্রের দ্বারা প্রশ্নচতুষ্ট প্রকাশ করণের তাৎপৰ্য এই যে, [ ৬ ] সৰ্ব্বজনের সর্ব অনর্থের মূলীভূত ব্যক্তিবিশেষদিগকে বিশেষ বিজ্ঞাত হইয়া তৎসংসর্গ পরিত্যাগ করণ ও বিশিষ্ট সন্তানসকলের কুকৰ্ম্মনিবারণ, নগরান্তবাসীর প্রেরিত উত্তরাভাস দর্শন মাত্রেই তাহারদিগের তাৎপৰ্য্য বিষয় সিদ্ধ হইয়াছে, যদি নগরান্তবাসী, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী না হইতেন, তবে তাবল্লোকের মধ্যে কেবল তেঁহ প্রশ্নচতুষ্টয় দর্শনে ক্রোধাকুল হইয়া এতাদৃশ দোকাশ উত্তরাভাস প্রকাশ করিতেন না এবং উত্তরদান বিষয়ে নিজভূমিকালিখিত তদীয় সাধারণ নিয়মানুসারেই তেঁহ, আপনার ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানিত্ব আপনিই স্বমুখে স্বহস্তে সুস্পষ্ট সুব্যক্ত করিয়াছেন, যদি কহেন যে, আমার এই সাধারণ নিয়ম, পরমতখণ্ডনপূর্বক স্বমতসংস্থাপনার্থ নহে, কিন্তু প্রশ্নকর্তার সন্দেহভঞ্জনার্থ, সে কেবল প্রতারণা, তাহা সুবােধলােকদিগের অববাধের বিষয় কি, যেহেতু তৎপ্রেরিত উত্তর, কেবল পরনিন্দা পরদ্বেষ [৭] আত্মপ্রশংসা বিজিগীষা ক্রোধ অহঙ্কারাদি দোষে পরিপূরিত ও দুরাত্মার চিহ্নেতে চিহ্নিত। দুরাত্মার লক্ষণ এই। মনস্তন্যচস্যন্যৎ কৰ্ম্মণ্যন্যদুরাত্মনামিত্যাদি। অর্থাৎ দুরাত্মার মনে এক প্রকার বাক্যে অন্য প্রকার কর্মে তদ্বিপরীত। কিন্তু সম্প্রতি কর্মের যাহা হউক, ধর্মের প্রভাবে বাক্যমনের ব্যবহারের ঐক্য অবশ্যই হইবেক, কুন্দযন্ত্রের মুখে কাষ্ঠের বক্রভাব কি নিরাকরণ হয় না। সে যাহা হউক অহহ ধর্মস্য মাহাত্মং কিমাশ্চৰ্য্যমতঃপরং। দেখ, ধর্মের নাম শ্রবণমাত্রেই এতাদৃশ দুর্দান্ত দুৰ্জ্জীবেরাে সম্প্রতি পিতৃমাতৃশ্রাদ্ধাদিরূপ কর্মকাণ্ডে প্রবৃত্তি হইয়াছে, যে দুৰ্জ্জীব পূৰ্বে অনেক অবােধ জীবকে অসদুপদেশদ্বার মুক্তিকারণ গঙ্গাদিতে অভক্তি ও অশ্রদ্ধা জন্মাইয়া অট্টালিকোপরি দিব্যাসনে অপূৰ্বতত্ত্বজ্ঞানে প্রাণ বিয়ােগপূর্বক অপূর্ব সুখসন্তোগস্থানে প্রস্থান করাইয়াছেন, তবে যে, প্রচ্ছন্নভাবে কাপট্যরূপে তত্তৎকালে স্থানান্তরে [৮] প্রস্থান করিয়া তত্তৎকৰ্মকরণ, সে কেবল স্বানুচর অবােধ জীবদিগের অনর্থের নিমিত্ত এবং আপনার পূর্বভাব ও কাপট্যের অপ্রকাশযুক্ত, তাহা কি, সে অবােধ জীবদিগের মধ্যে এক জীবেরাে বােধগম্য হইবে না। ০=== এ কি আশ্চর্য, দুষ্টান্তঃকরণ দুর্জনদিগের শিষ্টাচরণ প্রিয়বচন খেদোক্তি ও নড্রোক্তি কেবল কাৰ্য্যসাধনাৰ্থ ও বিশ্বাসজননার্থ মৌখিকমাত্র, আন্তরিক নহে, ইতত ভ্রষ্টততা নষ্ট মহাশয়েরাই তাহার সাক্ষী, যেহেতু, তাঁহারা প্রথমতঃ নিজ অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতাতে আপনারদিগের পাষণ্ডপীড়ন সমগনুষ্ঠানাক্ষম তজ্জন্য মনস্তাপবিশিষ্ট এই নাম প্রকাশ করিয়া, * শনৈঃ শনৈঃ ক্ষিপেৎ পাদ প্রাণিনাং বধশঙ্কয়া। পশ্য লক্ষ্মণ পম্পায়াং বক: পরমধাৰ্মিক এই শ্লোকের প্রতিপাদ্য পরমধাৰ্মিক বকের ন্যায় বিশ্বাস জন্মাইয়া পশ্চাৎ অভােজ ভােজন অপেয় পান অগম্যা গমন ইত্যাদির প্রমাণান্বেষণে প্রাণপণে যত্ন করিয়াছেন ও অদ্যাপি [৯] করিতেছেন। ধৰ্ম্মসংস্থা- পনাকাঙ্ক্ষীদিগের প্রশ্নচতুষ্টয়ের উত্তর ত্বরায় ভাষান্তরে প্রকাশ করণ, নগরান্তবাসীর অত্যাবশ্যক বটে, যেহেতু, তাহাতে সতের নিন্দা, অসতের প্রশংসা, অভক্ষ্য ভক্ষণ, অপেয় পান ও অগম্যা গমন ইত্যাদির যথাশ্রুত যথাদৃষ্ট বিরুদ্ধ শাস্ত্রানুসারে প্রকাশের দ্বারা দেশাধিপতিদিগের মনােরঞ্জনস্বরূপ তাহার ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানের ফল সম্পূর্ণ হইবেক, যদ্যপি উত্তরাভাসের প্রত্যুত্তর প্রদানে প্রয়ােজনাভাব তথাপি সৰ্বজনহিতৈষী ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের অপূৰ্ব আস্তিকমত- খণ্ডনে পূৰ্বাবধি বিশেষ নিয়ম সন্দর্শনে প্রত্যুত্তর প্রদান অবশ্যই কর্তব্য হয়, অতএব শ্রুতি স্মৃতি পুরাণাদির যথার্থ তাৎপৰ্য্যার্থের অনুসারে এবং শাস্ত্ৰসিদ্ধ লােকপ্রসিদ্ধ যুক্তিদৃষ্টান্তদৃষ্টিতে প্রত্যুত্তর লিখিতে প্রবৃত্ত হইলাম, অপক্ষপাতী ধাৰ্মিক সদ্বিবেচক মধ্যস্থ মহাশয়দিগের স্থানে অসদ্বিচার [১০] ও পক্ষপাতের বিষয় কি, তন্মতাবলম্বী পক্ষপাতী ব্যক্তাব্যক্ত গূঢ়াভিমানী মহাশয় সকলকে বিনয়পূৰ্ব্বক নিবেদন যে, বিনা পক্ষপাতে ধৈৰ্য্যাবলম্বনে সঘােধ সদ্বিবেচনা সন্মনােযােগপূর্বক উত্তর প্রত্যুত্তরের সদসদ্বিবেচনা করিবেন, কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের নামশ্রবণ মাত্রেই ভাবে গদগদ হইবেন না, ইত্যলমতিবিস্তরেণ । শ্ৰীমদ্ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষিসৰ্বজনহিতৈষিণঃ শ্ৰশ্ৰীকৃষ্ণ। শরণং। ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের প্রকাশিত প্রশ্নচতুষ্টয় দৃষ্টি করিয়া মৰ্ম্মপীড়া প্রাপ্ত হইয়া পণ্ডিতাভিমানী ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী, স্বানুচরজীবগণমনােরঞ্জনার্থ স্বীয় বিদ্যাপ্রভাবে প্রথমতঃ অগত্যা আত্মদোষ স্বীকার করিয়া পশ্চাৎ দোষাকর উত্তর দ্বারা নির্দোষে দোষপ্রক্ষেপপূৰ্ব্বক তদ্দোষ নিরাকরণার্থ অপূৰ্ব বুদ্ধি সৃষ্টি করিতেছেন, যেমন এক ব্যক্তি, প্রথমতঃ মহাপদে নিমগ্ন হইয়া পশ্চাৎ স্বশরীরে লিপ্ত পঙ্কের কণিকা, করদ্বয়ের দ্বারা স্থানে প্রক্ষেপ করিয়া অত্যল্প সমল সলিলকরণক প্রক্ষালন করিতে যত্ন করে । [ ২ ] ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রথম প্রশ্ন। ইদানীন্তন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী পণ্ডিতাভিমানী ব্যক্তিবিশেষেরা,•••ত্যজেদন্ত্যজং যথা || ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—কি ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী কি অভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী.অপারক জ্ঞান করিবেন কি না।

২৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী [ •••৪ ] ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর। স্বদোষ স্বীকারে সুতরাং সজ্জনেরা অক্রোধ ও অনুত্তর হয়েন। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী শকে স্বধৰ্ম্মের লক্ষাংশের একাংশেয়াে অনুষ্ঠান করে না কিন্তু বাহে লােক প্রতারণার্থ জ্ঞানীর ন্যায় ব্যবহার করে, অর্থাৎ ভণ্ডতত্ত্বজ্ঞানী, যেমন ভণ্ডতপস্বী, ভাক্তকৰ্ম্মী শব্দেয়াে সেইরূপ অর্থ। কি আশ্চৰ্য, পণ্ডিতাভিমানী স্বয়ং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী, অথচ ভাক্ত শব্দের অর্থ জানেন না, যেহেতু, ইদানীন্তন কৰ্ম্মীদিগের সন্ধ্যা বন্দনাদি, নিত্যপূজা হােমাদি, পিতৃমাতৃকৃত্য, যাত্রা মহােৎসব, জপ, যজ্ঞ, দান, ধ্যান, অতিথিসেবা প্রভৃতি, তিস্মৃতিবিহিত নিত্যনৈমিত্তিক, কাম্য কর্ম, সৰ্ব্বদা দর্শন ও শ্রবণ করিতেছেন, তথাপি [ ৫ ] স্বয়ং প্রকৃত লক্ষণাক্রান্ত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী হইয়া সম্পূর্ণ কিম্বা অসম্পূর্ণ কৰ্ম্মিসকলকে কোন্ শাস্ত্ৰদৃষ্টিতে নিরপরাধে ভাক্তকৰ্ম্মী কহিয়া নিন্দা করেন, উত্তমের নিন্দায় কেবল নিন্দাকৰ্ত্তা পাপী হয়েন, এমৎ নহে, যাহারা শ্রোতা তাহারাও তদ্রুপ, অতএব অপক্ষপাতী ভদ্রলােকেরা, তাহাকেই অন্ধ, বধির, পরনিন্দক, ও পরদ্বেষী কহিবেন কি না। কিম্বা তেঁহ, ভাক্ত শব্দের অর্থ অবগত আছেন, কিন্তু বুঝি, অন্য ভদ্রলােক সকলকেও আপনার সমান দোষী করিবার বাঞ্ছায় অপবাদ দিতেছেন, দুষ্টের স্বভাব এইরূপই বটে, কিন্তু যুগসহস্রেও সে অপবাদ যথার্থবাদ হইবে না, কোন চোর, তিরস্কৃত ও তাড়িত হইলে ভদ্রলােকের অপবাদ না জন্মায়, তাহাতে কি তাহার চৌর্যদোষ খণ্ডন ও ভদ্রলােকের চৌৰ্য্যাবধারণ হয়, যে চোর, সে চোরই, যে সাধু, সে সাধুই, তাহার অন্যথা কদাচ হয় না। যদি বল, ন্যায়াজ্জিত ধনেই যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম সিদ্ধ হয়, অন্যায়াজ্জিত ধনে কৰ্ম্ম সিদ্ধ [ ৬ ] হয় না অতএব অন্যায়াজ্জিত ধনদ্বারা কর্মকরণযুক্ত ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা, কৰ্ম্ম করিলেও ভাক্তকৰ্ম্মী হয়েন, সেও অশাস্ত্র, যেহেতু, মীমাংসাদর্শনে লিসূত্রে তৃতীয় বর্ণকে গুরু, এতদ্বিষয়ের পূর্বপক্ষ করিয়া পশ্চাৎ অন্যায়াজ্জিত ধনেও কৰ্ম্ম সিদ্ধ হয়, এই সিদ্ধান্ত করিয়াছেন। যথা নিয়মাতিক্রম পুরুষস্য ন ক্রতােরিতি। অস্য চার্থ এবং বিবৃত গুরুণা। যদা দ্রব্যার্জননিয়মানাং ক্ৰত্বৰ্থত্ব তদা নিয়মাজ্জিতেনৈব দ্রব্যেণ তুসিদ্ধিনিয়মাতিক্ৰমাজ্জিতেন দ্রব্যেণ ন তুসিদ্ধিরিতি, ন পুরুষস্ত নিয়মাতিক্ৰমদোষঃ পূৰ্বপক্ষে সিদ্ধান্তে তু অৰ্জননিয়মস্য পুরুষার্থত্বাৎ তদতিক্রমেণজ্জি- তেনাপি দ্রব্যেণ ক্রসিদ্ধির্ভবতি পুরুষস্বৈ নিয়মাতিক্রমদোষ ইতি। অর্থাৎ ধনার্জনের শাস্ত্রীয় যে নিয়ম, সে যজ্ঞার্থ, কি পুরুষার্থ, যদি ধনার্জনের শাস্ত্রীয় নিয়মসকল যজ্ঞার্থ হয়, তবে নিয়মাজ্জিত [৭] ধনেই যসিদ্ধি হইতে পারে নিয়মাতিক্ৰমাজ্জিত ধনে যজ্ঞসিদ্ধি হয় অতএব পুরুষের নিয়মাতিক্রমনিমিত্ত দোষাভাব এই পূৰ্ব্বপক্ষের অনন্তর সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, ধনার্জনের শাস্ত্রীয় নিয়মসকল পুরুষার্থ হয়, অতএব নিয়মাতিক্ৰমাজ্জিত ধনেও যজ্ঞসিদ্ধি হয়, কিন্তু পুরুষের নিয়মাতিক্রমনিমিত্ত দোষভাগিতামাত্র, ফলতঃ নিয়মাতিক্ৰমাজ্জিত ধনে পুরুষের স্বত্ব জন্মে না এবং তৎপুত্রাদিয়াে তদ্ধন দায়পদার্থ হয় না এমত নহে, অতএব অর্জকের নিয়মাতিক্রমনিমিত্ত দোষের প্রায়শ্চিত্ত কহিয়াছেন মনু। যথা। যদগহিতেনাৰ্জয়ন্তি কণা ব্রাহ্মণা ধনং। স্যোৎসর্গেণ শুধ্যন্তি জপেন তপসৈব চ। অর্থাৎ গহিত কর্মে ফলত অসৎপ্রতিগ্ৰহ কৃষিবাণিজ্যাদির দ্বারা ব্রাহ্মণ, যে ধন অর্জন করেন, সেই ধনের উৎসর্গে এবং পাষণ্ডপীড়ন ২৯ । জপে ও তপস্যায় তেঁহ শুদ্ধ হয়েন। এবং ব্রাহ্মণভিন্ন জাতিয়াে গহিত কৰ্ম্মের দ্বারা ধনার্জনে এইরূপ প্রায়শ্চিত্ত [৮] হইবেক, যেহেতু, একত্র নির্দিষ্ট শাস্বার্থোহ ত্রাপি তথা বাধকাভাবাৎ। অর্থাৎ এক স্থানে নির্দিষ্ট যে শাস্বার্থ, তাহা অন্য স্থানেও গ্রাহ হয়, যদি বাধক না থাকে, এই ন্যায় আছে। চৌৰ্য্যধনে এবং চোরনিকটে প্রাপ্ত ধনে স্বত্ব জন্মে না, যেহেতু লােকব্যবহার- বিরুদ্ধ এবং শাস্ত্রবিরুদ্ধ। অতএব চোর হইতে যাজনাদিদ্বারাও ন গ্রহণ করেন যে ব্রাহ্মণ, তাহারাে দণ্ড বিধান করিয়া চোরের চৌৰ্য্যধনে এবং ব্রাহ্মণের যাজনাদিপ্রাপ্ত চোরধনে স্বভাব সিদ্ধ করিয়াছেন মনু। যথা। যােহদত্তাদায়িনাে হস্তাল্লিতে ব্রাহ্মণে। ধনং। যাজধ্যাপ- নেনাপি যথা স্তেনস্তথৈব সঃ অর্থাৎ যে ব্রাহ্মণ, চোর হইতে যাজন ও অধ্যাপনার দ্বারাও ধন গ্রহণ করেন, তেঁহ চোরের ন্যায় দণ্ডভাগী হয়েন। পরন্তু, যে ব্যক্তি স্বয়ং নিরন্তর পরধর্মানুষ্ঠানমাত্রে নিরত, অথচ স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানের সাবকাশ- সময়ে স্মৃতিশাস্ত্র প্রমাণানুসারে সাময়ি-[ ১ ]ক ধৰ্ম্ম ও রাজকৃত ধর্মের অনুষ্ঠানকর্তাকে নিরন্তর পরধর্মানুষ্ঠাতা কহিয়া নিন্দা করেন, সে স্বধর্মচ্যুত সজ্জননিন্দক পাপিষ্ঠের কি গতি হইবেক। যথা। স্মৃতিঃ। নিজধৰ্ম্মাবিরােধেন যস্তু সাময়িকো ভবেৎ। সােহপি যত্নেন সংরক্ষ্যো ধৰ্মো রাজকৃতশ্চ যঃ। অর্থাৎ স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠায়ী সজ্জনেরা, স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানের সাবকাশসময়ে অন্য যে সাময়িক ধৰ্ম্ম ও রাজকৃত ধৰ্ম্ম তাহাও অতিযত্নপূৰ্ব্বক প্রতিপালন করিবেন। অথবা, তুষ্যতু দুৰ্জ্জনঃ অর্থাৎ দুর্জন সন্তুষ্ট হউক, যদি পূর্বোক্ত ভাক্তলক্ষণাক্রান্ত এক ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী ও এক ভাক্তকৰ্ম্মী উভয়েই স্বস্ব ধৰ্ম্মাদির অনুষ্ঠানাদিতে তুল্যরূপ অন্ধ, খঞ্জ, বধির ও বামন হয়, কিন্তু তাহার মধ্যে ঐ ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী দ্রব্যগুণবশতঃ কিম্বা চিত্তবিকারবলতঃ কহেন যে, আমি পদ্মচক্ষুদ্বারা চন্দ্রসূৰ্য্য দর্শন করিতেছি কিম্বা সমুদ্রলঙ্ঘনে প্রবৃত্ত হয়েন, কিম্বা দৈববাণী শ্রবণ করিয়া অন্য ব্যক্তিকে উপদেশ করেন, অথবা অত্যুচ্চ বৃক্ষশিখরস্থ ফল গ্রহণ করিতে অ-[ ১০ ]ঙ্গুলি মাত্রের দ্বারা ভূমি স্পর্শপূৰ্ব্বক উৰ্দ্ধবাহু হয়েন, তবে ঐ অকিঞ্চন ভাক্তকৰ্ম্মী ঐ অন্ধ, খঞ্জ, বধির ও বামন, ভাক্ত- তত্ত্বজ্ঞানীকে উপহাস ও ব্যঙ্গ করিতে পারেন কি না, এবং অপক্ষপাতী মহাশয়েরাও ঐ নির্লজ্জ প্রতারক দুরাশয়কে কি শব্দ উচ্চারণ না করিতে পারেন। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—যােগবাশিষ্ঠে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর বিষয়ে...কি কহিতে পারা যায়। [ ১১ ] ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর-পণ্ডিতাভিমানীর লিখিত বচনসকল, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানিত্বপ্রকা-[১২]শক যােগবাশিষ্ঠবচনের ন্যায় ভাক্তকৰ্মিত্ববােধক প্রমাণ নহে, কেবল অসম্বন্ধ প্রলাপদ্বারা বাগাড়ম্বরমাত্র, মনুবচনে শূদ্ৰান্ন শষে শূদ্রের আমান্ন, যেহেতু, পান্ন গ্রহণ অসম্ভব, আমান্ন গ্রহণে অসৎপ্রতিগ্ৰহ মাত্র। অসৎপ্রতিগ্রহের ও সুরাপানাদির মহদ্বৈষম্য- প্রযুক্ত সুরাপান জবনীগমনাদিনিমিত্ত পাতিত্য ও শূদ্ৰান্নগ্রহণনিমিত্ত পাতিত্য উভয়ের বিস্তর বৈলক্ষণ্য, যেমন, অশ্বমেধাদি যাগের পুস্তকাধ্যয়নজ, ফল ও অশ্বমেধাদি যাগকরণজন্য ফল উভয়ের বৈলক্ষণ্য এবং প্রতিমাসলভ্য আত্মজন্মনক্ষত্রে ও পুষ্যা নক্ষত্রে গঙ্গাস্নানে ত্রিকোটি কুলােস্কার এবং অতি দুষ্প্রাপ্য মহামহাবাণীতে গঙ্গাস্নানে ত্রিকোটি কুলােদ্ধার এ স্থানে রামমােহন-গ্রন্থাবলী উদ্ধারের মহলৈক্ষণ্য এবং যেমন, মশকাদি বধের ও গবাদি বধের পাপের অত্যন্ত তারতম্য। শূদ্রসম্পর্ক শব্দে, যাজকত্ব যজমানাদিরূপ সম্বন্ধ, ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীদিগের মধ্যে কে [ ১৩] শূদ্রযাজক এবং শূদ্রের সহিত ব্রাহ্মণের একাসনে উপবেশনে পাপ শ্রবণে ব্রাহ্মণের বহুত্ব আপনার একত্বপ্রযুক্ত বিশিষ্ট শূদ্রেরা, আপনিই পৃথক্‌ আসনে উপবিষ্ট হয়ে! অধিকন্তু শূদ্রযাজনাদি করণে যে সকল দোষশ্রুতি আছে, সে তাবৎ অসৎ শূদ্র অন্ত্যজাদিপর, যেহেতু চারি বর্ণ, চারি যুগেই প্রসিদ্ধ আছেন, তাহাদিগের ক্রিয়াকৰ্ম্ম, ষট্‌কর্মশালী ব্রাহ্মণসকল চিরকাল করিয়া আসিতেছেন, এবং বব সৎশূদ্রযাজী ও অশুদ্রযাজী বিদিগের পরস্পর তুল্যরূপে মান্যমানতা কুটুম্বতা ও আহার ব্যবহার সর্বদেশেই হইতেছে, কিন্তু অন্ত্যজষাজী ব্রাহ্মণের সহিত এতাদৃশ ব্যবহার বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ দূরে থাকুন, সৎশূদ্রেরাও করেন না, অতএব তাহারা কেবল অন্ত্যজবর্ণ যাজনদ্বারা পতিত ও অব্যবহাৰ্য্য হইয়া সর্বত্র আছেন, ইহা সৰ্ববাদিসম্মত। এবং ব্রাহ্মণের শূদ্রমাত্রের সহিত একাসনে উপবেশন পাতিত্যজনক নহে, যেহে[ ১৪ ]তুক, অন্ত্যজ জাতি বৈষ্ণব হইলে সেও বিশ্বপবিত্রকারক হয় এবং তীর্থগণ, আত্মপাপক্ষয়াৰ্থ তাহার- দিগের সঙ্গ বাঞ্ছা করেন। যথা পাদ্মে। যথা পাদ্মে। অন্ত্যজাঃ শপচান্তাশ্চ জবদ্যাস্তথৈবচ। যদি তে বিষ্ণুভক্তাশ্চ বিশ্বং পবিত্রয়ন্তি বৈ । অর্থাৎ জবনাদিশ্বপচপর্যন্ত অন্ত্যজ জাতিসকল বিষ্ণুভক্ত হইলে তাহারাও বিশ্বপবিত্রকারক হয়। ব্রহ্মবৈবর্তে। সদা বাঞ্ছস্তি তীর্থানি বৈষ্ণবস্পর্শ- দর্শনে। পাপিদানি পাপানি তেষাং নশ্যন্তি সঙ্গতঃ । অর্থাৎ তীর্থগণের বৈষ্ণবের স্পর্শন ও দর্শন সৰ্ব্বদা বাঞ্ছা করেন, যেহেতু, বৈষ্ণবের স্পর্শমাত্রেই তীর্থগণের পাপিকতৃক দত্ত যে সকল পাপ, তাহা নষ্ট হয়। কোন্ ব্রাহ্মণ শূদ্র হইতে বিদ্যাভ্যাস করেন, কেবল অনুপনীতকালে শূদ্ৰশিক্ষকস্থানে বর্ণমালাদি শিক্ষা দেখিতেছি ও দেখিতেছেন, কিন্তু এতদ্বিষয়ে মনু বিশেষ কহিয়াছেন। যথা। -[ ১৫ ]দ্দন শুভাং বিদ্যামাদদীতাবরাদপি। অন্ত্যাদপি পরং ধৰ্মং স্ত্রীর দুলাদপি । অর্থাৎ শ্রদ্ধান্বিত হইয়া শূদ্র হইতেও উত্তম বিদ্যা এবং অন্ত্যজ হইতেও পরম ধর্ম এবং কুৎসিত কুল হইতেও স্ত্রীরত্ব গ্রহণ করিবেক। উদিতে জগতীনাথে ইত্যাদি বচনের এ তাৎপৰ্য্য নহে যে, সূর্যোদয়ানন্তর দন্তধাবনকর্তা বিষ্ণুপূজাদিরূপ কর্মে অনধিকারী হয়, যেহেতু দন্তধাবন, স্নান ও আচমন, তাবৎ কর্মের কতৃসংস্কাররূপ অঙ্গ, তাহার যথােক্ত কাল ও মন্ত্রাদির বৈগুণ্যে অনধিকারিকৃত কর্মের ন্যায় যথােকালমন্ত্রাদিহিত দন্তধাবনাদিকর্তার কৃত দৈব ও পৈত্ৰ কৰ্ম্ম অসিদ্ধ হয় না এবং প্রতিদিনকর্তব্য সন্ধ্যাবন্দনাদি বিষ্ণুপূজাদি কর্ম যথাকবঞ্চিপে কৃত হইলেও সিদ্ধ হয়। বস্তুত উদিতে জগতীনাথে ইত্যাদি বচনের তাৎপৰ্যাৰ্থ এই যে, অশাস্ত্রীয় দন্তধাবাদিকর্তা অসম্পূর্ণ অধিকারী, এ কারণ অসম্পূর্ণ ফল[ ১৬ ] প্রাপ্ত হয়। অতএব তীর্থস্নানাদিতে সংযতহস্তপাদাদি ব্যক্তির সম্পূর্ণ ফল, অসংযতহস্তপাদাদি ব্যক্তির অসম্পূর্ণ ফল শাস্ত্রে কথিত হয়। যথা। স্কালে। যস্য হন্তৌ চ পদৌ চ মনশ্চৈব সুসংষতং। বিদ্যা তপশ্চ কীৰ্তিশ্চ সতীর্থফলমশ্ন তে । অর্থাৎ পাষণ্ডপীড়ন ৩১ যে ব্যক্তির হস্ত, পাদ ও মনঃ সংযত, ফলতঃ অসৎপ্রতিগ্রহাদি, অগম্য দেশগমনাদি ও পরস্ত্রী- লােভাদি হইতে নিবৃত্ত হয় এবং যেহ বিদ্বান্ তপস্বী ও যশস্বী, তেঁহ তীর্থের সম্পূর্ণ ভলভাগী হয়েন, অন্য অসম্পূর্ণফলভাগী হয়, এবং কর্মের আরম্ভে কৰ্ত্তার শুদ্ধ্যর্থ মন্ত্র ও তৎপাঠের ব্যবহারে দৃষ্ট হইতেছে। যথা। অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সৰ্বাবস্থাঙ্গতােপি বা। যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ । অর্থাৎ কি পবিত্র, কি অপবিত্র, কি সর্বাবস্থাপ্রাপ্ত, যে পুণ্ডরীকাক্ষ বিষ্ণুর স্মরণ করে, সে অন্তঃশুদ্ধ ও বহিঃশুদ্ধ হয় এবং কৰ্ম্মান্তেও পূৰ্বাবধি ব্ৰহ্মাদিয়াে কৰ্মবৈগুণ্যসমাধানাথ ম-[ ১৭ ]ন্ত্রপাঠের ব্যবহার লােকপরম্পরা ত আছে ও অদ্যাপি লােকে দৃষ্ট হইতেছে। যথা। যদসাঙ্গং কৃতং কৰ্ম্ম জান বাহপ্রজানতা। সাঙ্গং ভবতু তৎ সৰ্বং শহরের্নামানুকীৰ্ত্তনাৎ | অজ্ঞানাৎ যদি বা মােহাৎ প্রচ্যবেধ্বরেষু যৎ। স্মরণাদেব তদ্বিষ্ণোঃ সম্পূর্ণং স্যাদিতি শ্রুতিঃ । অর্থাৎ অজ্ঞানতঃ কিম্বা জ্ঞানতঃ যেৰ কৰ্ম্ম অঙ্গরহিত কৃত হইয়াছে, সে সকল কর্ম, শ্রীহরির নামানুকীৰ্ত্তনে অঙ্গসহিত হউক। এবং এই যজ্ঞে যে কৰ্ম্ম অজ্ঞানপ্রযুক্ত কিম্বা মােহপ্রযুক্ত অসম্পূর্ণ হইয়াছে, সেই সকল কর্ম, সেই বিষ্ণুর স্মরণ মাত্রেই সম্পূর্ণ হয়, শ্রুতিও এই প্রকার। প্রায়শ্চিত্তবিশেষ ব্যতিরেকে কেবল মুখের দ্বারা কে ভােজন করে, এবং কোন্ বিশিষ্ট লােক আসনারূঢ়পাদপূৰ্ব্বক ভােজন এবং দক্ষিণহস্ত স্পর্শ বিনা বাম হস্তে জলপাত্র গ্রহণ করিয়া জল পান করেন, পরন্তু ভােজনাসনােপরি চরণক্ষণপূৰ্ব্বক ভােজন ও বামহস্তকরণক জলাধার ধা-[ ১৮ ]রণপূর্বক জলপান, ধনী ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের প্রায় হয় না, কারণ, তাহারা দিব্য কাষ্ঠানে উপবেশন ও ভূমিতলে চরণ বিন্যাসপূৰ্ব্বক দিব্যকাষ্ঠাধারােপরি দিব্যপাত্র- বিশেষ অন্ন ভােজন এবং দক্ষিণহস্তদ্বারা ধারণপূর্বক দিব্য পানপাত্রকরণক দিব্য জল পান প্রায় করেন, কিন্তু নির্ধন ও অল্পধন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের ধনব্যয়ে অসামর্থ্যপ্রযুক্ত সুতরাং অগত্যা প্রায়ঃ মাংসবিশেষের ও পেয়বিশেষের অনুকল্প স্বীকার করিতে হয়। সে যাহা হউক, অত্রিবচনে তাদৃশ অন্নের গােমাংসতুল্যত্ব ও তাদৃশ জলের সুরাতুল্যত্ব কীৰ্ত্তন, যেমন তর্পণস্থলে সুবৰ্ণ রজতের তিলপ্রতিনিধিত্ব কথনদ্বারা তিলতুল্যত্ব কীৰ্ত্তন। যথা। তিলনামপ্যভাবে তু সুবৰ্ণরজতান্বিতং। অর্থাৎ তিলের অভাবে সুবর্ণজতযুক্তজলকরণক তৰ্পণ করিবেক। বস্তুতঃ ইত্যাদি দোষে শাস্ত্রে প্রায়শ্চিত্তবিশেষের প্রায় বিশেষরূপে অকথনপ্রযুক্ত [ ১৯] ইত্যাদি দোষ, অতি ক্ষুদ্র কিম্বা অতি মহান হউক, কিন্তু যদি ডাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগের সন্ধ্যা গায়ত্রী ও গায়ত্রীর স্তব কবচাদির সংস্কার লােপ না হইত, তবে কৰ্মীদিগের প্রতি ইত্যাদি দোষের উল্লেখ করিতেন না অতএব জ্ঞানসাধনের একাংশেরাে অনুষ্ঠান, কি প্রমানে, কি ভ্রমে, কি স্বপ্নে জন্মাবধি কস্মিন্ কালেও করেন না, অথচ কৰ্ম্মানুষ্ঠানের অতি ক্ষুদ্র দোষে তিলপ্রমাণকে তালপ্রমাণ করিয়া নিরপরাধে অপূৰ্ব জ্ঞানীর ধৰ্ম্ম রক্ষার্থে কর্মিসকলকে স্বধর্মচ্যুত ও পতিত বলিয়া নিন্দা করেন, এতাদৃশ পরদোষান্বেষক স্বধর্মচ্যুত পতিত দুরাশয়দিগের প্রতি অপক্ষপাতী মহাশয়েরা, মুখে স্পষ্ট কোন উক্তি না করুন, কিন্তু মনে মনেও কি করিবেন না !

রামমােহন-গ্রন্থাবলী ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর। যে ব্যক্তি স্বয়ং এবং পিতা ও পিতামহ..কি শব্দ প্রয়ােগ কর্তব্য হয়। [ ২২ ] ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।—ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর জ্ঞানিত্ব সংস্থাপন এবং দুরাচারের সদাচারত্ব প্রমাণ, এই সকল উন্মত্তপ্রলাপ দ্বারা হয় না। তিন পুরুষের অপেক্ষা কি, যে স্বয়ং স্নেচ্ছের দাসত্ব করে, তাহাকেও স্বধৰ্ম্মচ্যুত কি জাত্যন্তরে কহিলে কহা যায়, যদি পণ্ডিতাভিমানীর মধ্যদিবচন, শুকপক্ষীর ন্যায় শুত কিম্বা পঠিত না হইত এবং দাস শব্দের অর্থ কর্ণকুহরে প্রবেশ করিত, তবে ইদানীন্তন দেশাধিপতিদিগের রাজকীয় ব্যাপারে নিযুক্ত ব্যক্তিসকলকে স্নেচ্ছের দাস বলিয়া নিন্দা করিতেন না। মিতাক্ষরাতে নারদ, দাসের বিবরণ করিয়াছেন। যথা। শুশ্রুষকঃ পঞ্চবিধ শাস্ত্রে দৃষ্টো মনীষিভিঃ। চতুব্বিধঃ কর্মকরস্তেষাং দাসাস্ক্রিপঞ্চকাঃ। শিষ্যান্তেবাসিভৃতকাশ্চতুর্থধিকৰ্ম্মকৃৎ। এতে কর্মকর জ্ঞেয়া দাসস্তু গৃহজাদয় । কৰ্ম্মাপি দ্বিবিধং জ্ঞেয়মশুভং শুভমেবচ। অশুভং দাস[ ২৩ ]কম্মোক্ত শুভং কর্মকৃতাং স্মৃতং। গৃহদ্বারাশুচিস্থানরথ্যাবরশােধনং। গুহাঙ্গস্পর্শনােচ্ছিষ্টবিন্মত্ৰ গ্ৰহণাে- ঝনং। অশুভং কৰ্ম্ম বিজ্ঞেয়ং শুভমন্যদতঃ পরং। গৃহজাতস্তথা ক্রীতে লন্ধো দায়াদুপাগত। অনাকালভৃতস্তদ্বদাহিতঃ স্বামিনা চ যঃ। মােক্ষিতত মহতশ্চর্ণাদ যুদ্ধ প্রাপ্ত পণে জিতঃ। তােহমিত্যুপগতঃ প্রব্রজ্যাবসিতঃ কৃতঃ | ভক্তদাস বিজ্ঞেয়স্তথৈব বড়বাহৃতঃ। বিক্রেতা চাত্মনঃ শাস্ত্রে দাসঃ পঞ্চদশ স্মৃতাঃ । অর্থাৎ শাস্ত্রে শুশ্রুষক পঞ্চপ্রকার দৃষ্ট হয়, শিষ্য, অন্তেবাসী, ভৃতক, অধিকর্মকৃৎ ও দাস, তাহার মধ্যে প্রথম চারিপ্রকার, কর্মকর, অন্তিম যে দাস, তাহারা গৃহজাত প্রভৃতি পঞ্চদশপ্রকার হয়। শিষ্য শব্দে বেদবিদ্যার্থী, অন্তেবাসী শব্দে শিল্পশিক্ষার্থী, যে বেতনাৰ্থে কৰ্ম্ম করে তাহার নাম ভৃতক, অধিকৰ্ম্মকৃৎ শব্দে কর্মকরদিগের অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ ভূতকেরা যাহার আজ্ঞানুসারে কৰ্ম্ম করে। কৰ্ম্মও দুই [ ২৪ ] প্রকার, শুভ ও অশুভ, কর্মকরদিগের শুভ কৰ্ম্ম, দাসদিগের অশুভ কৰ্ম্ম। গৃহদ্বার, অশুচিস্থান, অর্থাৎ উচ্ছিষ্ট প্রক্ষেপ, মূত্রত্যাগাদিস্থান, রথ্যা অর্থাৎ অপকৃষ্ট স্থানবিশেষ, অবর অর্থাৎ গৃহের মাজ্জিত ধূলি প্রভৃতির সঞ্চয়স্থান, এই সকল স্থানের শােধন এবং গুহ অঙ্গের স্পৰ্শন উচ্ছিষ্ট মার্জন বিষ্ঠা মুত্রের গ্রহণ ও ত্যাগ ইত্যাদি অশুভ কৰ্ম্ম, এতদ্ভিন্ন শুভ কৰ্ম্ম। গৃহজাত, ক্রীত, লব্ধ, পৈতৃক, অনাকালভৃত, আহিত অর্থাৎ ধন গ্ৰহণার্থ উত্তমর্ণের নিকট স্বামী যাহাকে বন্ধক দিয়াছেন। মােক্ষিত অর্থাৎ ঋণ মােচনাৰ্থ যে স্বয়ং উত্তমর্ণের দাসত্ব স্বীকার করিয়াছে, যুদ্ধপ্রাপ্ত, পণে জিত, স্বয়ংস্বীকৃতদাস্য, ভক্তদাস, বড়বাহৃত অর্থাৎ দাসীলােভে স্বয়ংস্বীকৃতদাস্য, আত্মবিক্রেতা, এই পঞ্চদশপ্রকার দাস। পঞ্চদশপ্রকার দাস। অতএব এই সকল দেদীপ্যমান শাস্ত্র সত্ত্বেও ইদানীন্তন রাজকীয় ব্যাপারে নিযুক্ত লােকসকলকে ভৃতক কিম্বা অধিকর্মক[ ২৫ ] না কহিয়া স্নেচ্ছের দাস শব্দ প্রয়ােগকর্তাকে অপূৰ্ব পণ্ডিত কহা যায় কি না। নগন্তবাসীই মেচ্ছের প্রকৃত দাস হইবেন, যেহেতু, তেঁহ নিজ অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতাতে, সে যদি, যে নিজে মেচ্ছের চাকরি করিয়াছে তাহাকে স্বধর্মচ্যুত ও ত্যজ্য কহে এই বাক্যের দ্বারা আপনিই আপনার মেচ্ছদাসত্ব ব্যক্ত করিয়াছেন, অতএব নগরান্তবাসী, নিজে জ্ঞানী, অকিঞ্চন কর্মী লােকেরা পাষণ্ডপীড়ন তাঁহাকে কি কহিতে পারেন, কিন্তু শাস্ত্রেও তাহার ম্লেচ্ছদাসত্ব সম্ভব হয়, তাহার বারণ কিরূপে করা যায়। যথা নারদ। বর্ণানাং প্রাতিলােম্যেন দাসত্বং ন বিধীয়তে। স্বধর্মত্যাগি- নােহন্যত্র দারবদ্দাস মতা। অর্থাৎ অধম উত্তমের দাস হইতে পারে উত্তম অধমের দাস হইতে পারেন না, যেমন, ব্রাহ্মণ শূদ্রাদির কন্যা বিবাহ করিতে পারেন, শুদ্র ব্রাহ্মণাদির কন্যা বিবাহ করিতে পারে না, কিন্তু স্বধর্মত্যাগী লােক আপনা হইতে অধমেয়ােদাস হইতে পারে এ[ ২৬ ]ই বচনে নারদ, সামান্যতঃ স্বধর্মত্যাগী মাত্রের প্রতি স্বাপেক্ষা অধমমাত্রের দাসত্ব বিধান করিয়াছেন, কিন্তু স্বধৰ্ম্মত্যাগীর অপরাধিত্বপ্রযুক্ত দণ্ডাধিকারী রাজার দাসত্বই যুক্তিসিদ্ধ । অতএব স্বধর্মচ্যুত যুতির প্রতি যাজ্ঞবল্ক্য কহিয়াছেন। যথা। প্রব্রজ্যাবসিত রাজ্ঞাে দাস আমরণান্তিক। অর্থাৎ সন্ন্যাসধৰ্ম্মচ্যুত যতিকে রাজা আপনার দাস করিবেন, যাবৎ তাহার মৃত্যু না হয়। অতএব কলির স্বধর্মচ্যুত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের কলির ম্লেচ্ছরাজের দাসত্বই উচিত হয় । জবনের কৃত মিশী কি, গােলাব আতরই বা কি, বােগশান্তির নিমিত্ত অভক্ষ্যও ভক্ষ্য হয়, অপেয়ও পেয় এবং অস্পৃশ্য ও শৃশ্য হয়, যেহেতু, শাস্ত্রে তাহার বিধি দৃষ্ট হইতেছে। যথা সুমঃ। লশুনপলাতুগৃঞ্জনকুম্ভীশ্রাদ্ধানুসূতিকান্নাভােজান্নমধুমাংসমূত্ররেতােহমেধাভক্ষ্য ভক্ষণে গায়ত্ৰষ্টসহস্রেণ মুদ্ধি, সম্পাতা[ ২৭ ]নবনয়ে উপবাস এতানি ব্যাধিত ভিষক্রিয়ায়াম- প্রতিষিদ্ধানি ভবন্তি যানি চান্যান্যেংবিধানি তেন্থপদোষ ইতি। রশুন, পলা অর্থাৎ পেয়াজ, গৃঞ্জন অর্থাৎ গাজর, কুম্ভী কথাৎ পানা, প্রেতশ্ৰাদ্ধা, সূতিকান্ন, অভােজ্যান্ন, মধু, মাংস, মূত্র, রেতঃ, অমেধ্য অর্থাৎ অশুদ্ধ, অভক্ষ্য, এই সকল দ্রব্যের ভক্ষণে অষ্টাধিকসহ গায়ত্ৰীকরণক মস্তকে জলবিন্দু প্রক্ষেপ ও উপবাস করিবেক, কিন্তু ব্যাধিত ব্যক্তির ভিষক- ক্রিয়াতে এই সকল দ্রব্য অনিষিদ্ধ হয় এবং এই প্রকার অন্য যে দ্রব্য তাহাতেও দোষাভাব, যাহারা জবনী নর্তকীর নৃত্যদর্শনসময়ে গােলাব আতর ব্যবহার করেন, তাহারা কাৰ্যানুরােধে সময়ক্রমে জবন স্পর্শ করিলে যেরূপ শুদ্ধ্যর্থ হস্তপাদাদি প্রক্ষালন বস্ত্ৰত্যাগ ও বিষ্ণুস্মরণাদির ব্যবহার আছে তাহাতেও সেইরূপ করিয়া থাকেন। যদি কোন সত্যবাদী দিব্যচক্ষুঃ মনুষ, ভােজনকালেও কোন ব্যক্তিকে গে[ ২৮ ]লাব আতর ব্যবহার করিতে দেখিয়া থাকেন তবে তাহাকে রােগী বিনা তাহার কি বােধ হয়। দন্তরােগ শান্তির নিমিত্ত বৈদ্যকশাস্ত্রেও মিশী লিখিয়াছেন, যাহার নাম মঞ্জন লােক প্রসিদ্ধ এবং ব্রাহ্মণাদিকৃত গােব আতর, বারাণত্যাদি হইতে এতদ্দেশেও আসিয়া থাকে তাহাও কি তেঁহ না দেখিয়াছেন ও না শুনিয়াছেন, কিন্তু পরের গ্লানির নিমিত্ত তমত ন্যায় এইরূপেই কি পরের গ্লানি করিতে হয়, রােগাদি ব্যতিরেকে যে কেহ ঐ সকল, নিষিদ্ধ দ্রব্য ব্যবহার করেন, তেঁহভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী হইতেও নরাধম অতএব ভদ্রলােকের অস্পৃশ্য ও অসম্ভাষ হয়েন, নগরান্তবাসী মহাশয়কে জবন স্পর্শ করিয়া থাক বলিয়া কোন্ ভদ্রলােকে নিন্দা করিয়া থাকেন, যদি কেহ করেন, সে ও অনুচিত, যেহেতু অত্যল্পপাপৈবিপদ শুচীনা পাপাত্মনাং পাপশতেন কিম্ব। অর্থাৎ শুচি: ব্যক্তির অত্যঙ্গ পাশেই বিপদ হয়। পাপাত্মার [২৯] শত২ পাপেও সমুদ্রের জলের ন্যায় হ্রাসবৃদ্ধি ৩৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী হয় না, কি জানি, কে দেখিয়াছে, পরমেশ্বরই জানেন, কিন্তু অনেকেই জবনাভােক্তা বলিয়া মহাপুরুষকে নিন্দা করিয়া থাকেন, লােকপরম্পরা শুনিতে পাই, ন হমূলা জনশ্রুতিঃ, বহু জনের বাক্য প্রায় অমূল হয় না, সুবােধ লােকেরাই বিবেচনা করিবেন। যে ব্যক্তি বাল্য অবধি অহােরাত্র জবনমারে সহিত আলাপ পরিচয় একাসনে সহবাস ও অন্য ব্যবহার করিতেছেন, তেঁহ সুতরাং আত্মবন্মন্যতে জগৎ ইহার ন্যায় অন্য ব্যক্তিকেও জবনজ্ঞান করিতে পারেন, সে যাহা হউক, তাহার এইরূপ জবনজ্ঞানে পরমাপ্যায়িত হইলাম, বুঝিলাম যে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী পণ্ডিতাভিমানীর বহু কালে বহু পরিশ্রমে এক্ষণে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানের ফল সম্পূর্ণ হইবার উপক্রম হইতেছে, ভাল ভাল, ঈশ্বর মঙ্গল করুন, ক্রমে সর্বত্রই জবনজ্ঞান হইবেক, যেমন যথার্থ তত্ব[৩০]জ্ঞানের ফল, ব্রহ্মমাত্ৰে তৰ্গতমানসপ্রযুক্ত ব্ৰহ্মজ্ঞানী ব্রহ্মাণ্ডই ব্ৰহ্মময় দর্শন করেন, এবং আপনিও ব্ৰহ্মস্বরূপত্ব প্রাপ্ত হয়েন, তেমন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানের ফল, জবনমাত্রে তগতচিত্ততাযুক্ত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী, ব্রহ্মাণ্ডই জবনময় দর্শন করেন এবং আপনিও জবন জাতি প্রাপ্ত হয়েন, যে নিতান্ত তৰ্গতচিত্ত হয়, সে স্বপ্নেও তাহাকেই দর্শন করে এবং এক ক্ষুদ্র কীটবিশেষ, অন্য এক ক্ষুদ্র কীটবিশেষে তদগতচিত্ত হইয়া তৎকীটজাতি প্রাপ্ত হয়, ইহা শ্রীমদ্ভাগবতে ও লােকেও দৃষ্ট হইতেছে, অতএব মৃত্যুকালে ভগবদগীতাও কহিতেছেন। যথা। অন্তকালে চ মামেব স্মরন্ মুক্ত কলেবরং। যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ । যং যং বাপি স্মরন্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরং। তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিত। তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ। ময্যর্পিতমনােবুদ্ধি- মামেবৈষ[৩১]স্যসংশয়। অর্থাৎ হে অর্জুন, অন্তকালে যে জীব কেবল আমাকে স্মরণ করতঃ দেহত্যাগ করে, সে মদ্ভাব প্রাপ্ত হয়, ইহা নিশ্চয়। যেই ভাব স্মরণ করতঃ জীব অন্তকালে শরীর ত্যাগ করে সর্বদা সেই ভাবে ভাবিত হইয়া সেই ভাব প্রাপ্ত হয়। অতএব তুমি সকল কালে আমাকে স্মরণ কর ও যুদ্ধও কর, যে আমাতে মন ও বুদ্ধি সমর্পণ করে, সে নিশ্চয় আমাকেই পায়। যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানীর যে ব্রহ্মরূপত্বপ্রাপ্তি ও ব্রহ্মাণ্ডকে ব্ৰহ্মময় দর্শন, তাহার কতিপ্রমাণ নগরান্তবাসীর পুণ্যপ্রতাপে সম্প্রতি স্নেচ্ছেরাও বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্যরূপে জাত আছেন, পণ্ডিতাভিমানীর ন্যায় ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের এরূপ বাঞ্ছা নাই যে, আমি অনেক শ্রুতি জানি এই প্রকারে সর্বসাধারণ লােকের নিকটে আপনার নাম প্রকাশ কিরূপে হইবেক, সামান্য জাতির নিকটে অগত্যা মদিবচন প্রকাশ করণেই ধর্ম- সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা যে প্রকার কুষ্ঠি[৩২]ত ও দুঃখিত আছেন, তাহা কি কহিতে পারেন। বিষয় ব্যাপারে নিমিত্ত জাবনিকাদি বিদ্যাভ্যাস, তত্তজাতি ব্যতিরেকে তাহা কিরূপে হইতে পারে। ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের সর্বজনগােচর সমাচার পত্রে মাদিবচনসহিত প্রশ্নচতুষ্টয় প্রকাশ করণপণ্ডিতাভিমানীর বেদান্ত প্রকাশের ন্যায় মেচ্ছদিগের বােধাৰ্থ নহে, কি সকলের অনর্থের মূলীভূত ব্যক্তিবিশেষকে জ্ঞাত হইয়া সকলের তৎসংসর্গ পরিত্যাগার্থ ও জগতের মঙ্গলার্থ তাহা কমে হইতেছে ওহইবেক, তবে যে, স্নেচ্ছের বােধে উদ্দেশ্যতার অভাবেও পাপের আশঙ্কা, সে অবােধ মাত্র, মহাপুণ্যজনক কর্মেও কি অল্প দোষ ক্ষতিকর হয়। এবং জাবনিক বিদ্যা অভ্যাস পাষণ্ডপীড়ন করিয়াছ বলিয়া নগরান্তবাসী মহাশয়কে কে নিন্দা করে, ইত্যাদি বিষয় লিখনে লিপি- পরিষ্কারক ভট্টাচাৰ্য মহাশয়দিগের হস্তবেদনামাত্র এ কি ব্য[ ৩৩ ]গুণবশতঃ, কি চিত্তবিকারনিমিত্ত, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি । দৈবাৎ সমাগত, কদাচিদাগত ও সদাগত অতিমান্য, মান্য ও সামান্য, কোন্ যুগে না ছিলেন ও না আছেন, কোন্ যুগেই বা যে লােক যজ্রপ, তাহার তদ্রুপ সম্মান না হইয়াছে ও হইতেছে, দৈবাৎ সমাগত, অতিমান্য নারদাদির কোন্ স্থানে গাত্রোখানপূর্বক অভ্যর্থনা পৃথক আসন প্রদান পাদ্য অৰ্য্য আচমনীয়করণক পূজা না হইয়াছে, কদাচিদাগত মান্য রাজ- পুরােহিত বশিষ্ঠ ধৌম্য প্রভৃতির দশরথ যুধিষ্ঠির প্রভৃতির নিকটে কি বিশিষ্ট সমাদর না হইয়াছে, এবং সদাগত সামান্য ব্যক্তিরাে সর্বকালেই কি উত্তমের কি অধমের নিকটে যথােচিত সামান্যাদয়ের কি কুত্রাপি অভাব আছে। যাে যত্ৰ সততং যাতি ভুক্তে চাপি নিরন্তরং। স তত্র লঘুতাং যাতি যদি শক্রসমাে ভবেৎ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি যে স্থানে সতত গমনাগমন করেন, সে ব্যক্তির সে স্থানে [৩৪] লঘু সমাদর অবশ্যই হয়, যদ্যপি তেঁহ ইন্দ্রতুল্যও হয়েন, কিন্তু তাহাতে না তাহার উত্তমতার অল্পতা, না সম্বৰ্ধক ব্যক্তির দোষভাগিতা হয়, দৈবাৎ আবাহিত ইন্দ্রাদি দেবতাররা যােড়শােপচারে পূজা হয়, প্রতিনিয়ত শালগ্রামশিলায়ে গন্ধপুষ্পমাত্রেই পূজা হয়, দেখ, সাক্ষাৎ ব্ৰহ্মণ্যদেব শ্ৰীশ্ৰীকৃষ্ণ, যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞে ব্রাহ্মণদিগের পাদপ্রক্ষালনােদক দানার্থ নিযুক্ত ছিলেন, তাহাতে কি তাহার অনুত্তমতা ও অমান্যতা হইয়াছে, কি যুধিষ্ঠির নিন্দিত ও পাপী হইয়াছেন, এই সকল দৃষ্টিতে কাৰ্যবশতঃ কিম্বা সম্প্রীতিবশতঃ নিয়ত গমনাগমনকারী অতি বিশিষ্ট ব্রাহ্মণেরাে সতত সমাগমনপ্রযুক্ত সমাদরের তারতম্যে শূদ্র ও ব্রাহ্মণের কিরূপে জঘন্যতা ও দোষভাগিতা সম্ভব হয়, শূদ্রস্থানে ব্রাহ্মণের আগমনে শূদ্রকতৃক গাত্রোখানপূর্বক স্বতন্ত্ৰাসন প্রদান বিনা একাসনে সহপবেশনে ব্রাহ্মণের পাতিত্যবিধায়ক যে বচন, তাহার এই [৩৫] তাৎপৰ্য যুক্তিসিদ্ধ হয় কি না যে, স্বস্থানে দৈবাৎ সমাগত বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ দর্শনে এইরূপ বিশেষ সম্বর্ধনার অকরণে শূদ্র, পাতিত্য জন্মান ও ব্রাহ্মণ পতিত হয়েন। পরন্তু, জাতিব্রাহ্মণ কর্মশূদ্রের দোষক্ষালন শূদ্র নিন্দা দ্বারা হয় না এবং এমৎ . কোন্ শূদ্র আছে যে, সৰ্বারাধ্য ভূদেব ব্রাহ্মণ পণ্ডিতাদিকে দেখিয়া অভ্যুত্থান ও ভিন্নাসন প্রদান না করে এবং যুগধর্মপ্রযুক্ত বিষয় ব্যাপারে নিযুক্ত অহরহ অবিরত সমাগত দ্বিজের প্রতি পৌনঃপুন্য গাত্রোখানাসম্ভবেও তাহার প্রয়ােজনাধীন স্বতন্ত্রাসনে উপবেশন করেন এবং তাবৎ ধনী মানী বিশিষ্ট শূদ্রগৃহে প্রতিনিয়ত ও কর্মোপলক্ষ্যে ব্রাহ্মণ শূদ্রের পৃথক পৃথক্‌ আসন হইয়া থাকে, তাহা ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর জ্ঞানের বিষয় কি, যেহেতুক, স্বয়ং দুচার ও স্বদেশে বিদেশে অব্যবহার্য এ প্রযুক্ত ভদ্রলােকের বাটীতে ও সভাতে তাহার গমনের প্রসক্তি কি, এবং পণ্ডিতাভিমানীর পূর্বোক্ত মনু পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্ম[৩৬]বৈবর্ত পুরাণের বচন জানিবারি বা সম্ভাবনা কি, সুতরাং দ্রব্যগুণবশতঃ যাহা চিত্তমধ্যে উদয় হয়, তাহাই অনর্গল জলন করেন। স্ববিদ্যাজ্জিত ধনধারা অবশ্য পােয় কুটুম্ব ভরণ ও ধনসাধ্য স্বধর্মানুষ্ঠানের উদ্দেশে বিদ্যাভ্যাসকালে তৎপ্রতিবন্ধক অবশ্য পােষ্য পরিবার পােষণ নিমিত্ত দুশ্চিন্তানিয়াকরণার্থ রামমােহন-গ্রন্থাবলী মনুবচনপ্রমাণে অগত্যা কিয়ৎকাল অল্পায়াসসাধ্য দেশভাষাধ্যাপনে কি পাপ হয়। যথা—মনু। বৃদ্ধৌ চ মাতাপিতরে সাধ্বী ভাৰ্য্যা সুতঃ শিশু। অপকাৰ্য্যশতং কৃত্বা ভর্তব্যা মনুরব্রবীৎ | অর্থাৎ বৃদ্ধ মাতা ও বৃদ্ধ পিতা সাধ্বী ভাৰ্যা এবং শিশুসন্তান এই সকলকে শত সহস্র অসৎকৰ্ম্ম স্বীকার করিয়াও ভরণ করিবেক, ইহা মনু কহিয়াছেন। অতএব মাতৃপােষণ পারদাৰ্যেও দোষাভাব, জীমূতবাহনাদির গ্রন্থে উক্ত আছে, তাহা যদ্যপি দৃষ্ট না হয়, তথাপি শ্রুত হইতে পারিবেক * ভাষাপরিচ্ছেদে দ্রব্যাদি [৩৭] পদার্থের নিরূপণ, তাহার ভাষা বিক্রয়ে ন্যায়দর্শনের ভাষা বিক্রয় কিরূপে হইতে পারে, তাহাতেই বা কি পাপ * যদ্যপি পণ্ডিতাভিমানীর মতে ভাষাপরিচ্ছেদও ন্যায়দর্শন হয়, তবে তাহার ভাষা প্রকাশের ও সৰ্বসাধারণ লােকের নিকটে তাহার বিক্রয়ের এই অভিপ্রায় কেন বােধ না করেন যে, আশু মনােরঞ্জক, প্রতারক, নাস্তিকপথগমনে উদ্যত অজ্ঞাননিবিড়তিমিরাবৃতনয়ন জনগণের নাস্তিকপথপ্রস্থান নিরাকরণার্থ ও মুদ্রাকরণের ব্যয়ার্থ তাহার ভাষাচন ও বিক্রয়করণ, যেহেতু, গােতম মুনি, দুঃখপঙ্কনিমগ্ন জগদুদ্ধরণ ও নাস্তিকমত খণ্ডন নিমিত্ত ন্যায়দর্শনের প্রকাশ করিয়াছেন, ম্লেচ্ছসংসর্গের উত্তর ২৮ পৃষ্ঠে ১৩ পঙক্তিতে পূৰ্বেই করিয়াছি, কিন্তু ম্লেচ্ছনিকটে ভাষাচিত বেদান্তদর্শনের প্রদানে অনেকে স্বধর্মচ্যুত কহিয়া তাহাকে নিন্দা করিয়া থাকেন সে তাহাদিগের অনুচিত, যেহেতু প্রয়াগে মূত্রিতং যেন তস্য গঙ্গা বরাটিকা [৩৮] অর্থাৎ গঙ্গা যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গম হয় যে প্রয়াগে তাহাতে দণ্ডায়মান হইয়া মূত্রত্যাগ করিয়াছেন যে পুণ্যবান্, তঁাহার কেবল গঙ্গায় মূত্রত্যাগ কি আশ্চর্য্য। অর্থসহিত বেদমাতা গায়ত্ৰীই স্লেচ্ছহস্তে সমৰ্পণ করিয়াছেন যে সজ্জন সৎসন্তান তাহার ভাষারচিত বেদান্তদর্শন ম্লেচ্ছনিকটে সমর্পণ কোন্ বিচিত্র। অতএব দোষাকর শশধরের, মাসবিশেষের তিথিবিশেষে তদ্দর্শক নির্দোষে স্বদোষ সমর্পণের ন্যায়, স্বয়ং প্রকৃত খ্যাত স্বধৰ্ম্মচ্যুত ব্যক্তি, তদোষপ্রকাশক অধৰ্ম্মচ্যুত ব্যক্তিসকলে স্বীয় স্বধৰ্ম্মচ্যুত দোষ সমর্পণ করিলে যদ্যপি তাহাকে স্বধর্মচ্যুত কহিলে কলঙ্কীকে কলঙ্কী কথনের ন্যায় স্বরূপকথন দোষ না হয় তথাপি তাহার স্বধৰ্ম্মক্তত্ব দোষের সাধনে সিদ্ধসাধনদোষ অবশ্যই হইবে । [৩৯] ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—যদি ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী কহেন যে পূর্বোক্ত বচন- সকল •••কি কহিতে পারি। •••৪০ ] ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-পণ্ডিতাভিমানী ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী, ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের নিন্দাকরণার্থ, শূদ্ৰাং শূদ্রসম্পর্ক ইত্যাদি পূর্বোক্ত বচনসকলকে যে নিন্দার্থবাদ কহিয়াছেন, সে যথার্থ, কিন্তু যেমন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী আপনার যথার্থবাদকে নিন্দার্থবাদ জ্ঞান করিয়া আপনাকে আপনিই অনিন্দিত জ্ঞান করিয়াছেন, তেমন ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা অত্যল্প নিন্দাবাদেও অত্যন্ত পাপবােধে আপনাকে অনিন্দিত জ্ঞান করেন না, যেহেতু, গােমূত্র- মাত্রেণ পয়াে বিনষ্টং তণে গােমূত্রগতেন কিম্বা। অর্থাৎ গােমূত্ৰকণিকামাত্র স্পর্শেই দুরু দুষ্ট হয়, কিন্তু গােমূত্র বর্ষণেও তক্রের পূর্বেও যে ভাব পরেও [৪১] সেই ভাব, অতএব তাহারা ২৯ পৃষ্ঠে ২ পঙক্তিতে পূর্বেই আত্মনিন্দাদোষের পরিহরণ করিয়াছেন, পরের নিন্দাবাদে আপনার যথার্থবাদ কি অযথার্থবাদ হয় বরঞ্চ সেই যথার্থবাদ অপূৰ্ব না হইয়া অতিপূৰ্বই হয়। সে যাহা পাষণ্ডপীড়ন ৩৭ হউক, পণ্ডিতাভিমানীর এ বিবেচনা করা কর্তব্য যে, কোন্ বচন নিন্দার্থবাদ ও কোন্ বচন বা যথার্থবাদ হইতে পারে, যে যে বচনে পাপবিশেষ ও প্রায়শ্চিত্তবিশেষ এবং নরকবিশেষ উক্ত নাই, কেবল কর্তার ভয় প্রদর্শনমাত্র, সেই সেই বচন নিন্দার্থবাদ হয়। যথা। অজ্ঞা ধৰ্ম্মশাস্ত্রাণি প্রায়শ্চিত্তং বদন্তি যে। প্রায়শ্চিত্তী ভবে পূতস্তং পাপং তেষু গচ্ছতি ॥ অর্থাৎ ধর্মশাস্ত্রানভিজ্ঞ লােক প্রায়শ্চিত্তোপদেশক হইলে পাপী কদাচিৎ পাপমুক্ত হইবেক, কিন্তু তেঁহ তৎপাপভাগী হইবেন। ব্ৰহ্মঘ্নে চ সুরাপে চ স্তেয়ে চ গুরুতল্পগে। নিষ্কৃতিৰ্ব্বিহিতা সঙি কৃতম্নে নাস্তি নিষ্কৃতিঃ । অর্থাৎ ব্রহ্মম্ন সুবর্ণচোর ও গুরুপত্নাদিগামী, ই[ ৪২ ]হারদিগেরও নিষ্কৃতি মন্থাদি কহিয়াছেন, কিন্তু কৃতরে নিষ্কৃতি নাই। বহুশত্রু: পটোলে স্যানহানিস্তু মূলকে। অর্থাৎ তৃতীয়াতে পটোল ভক্ষণে বহু শত্রু হয় এবং চতুর্থীতে মূলক ভক্ষণে ধনহানি হয় ইত্যাদি। এবং কুশুম্ভং নালিকাশাকং বৃন্তাকং পূতিকাং তথা। ভক্ষয় পতিত স্যাপি বেদাস্তগাে দ্বিজঃ । অর্থাৎ কুশুম্ভশাক নালিকাশাক ক্ষুদ্ৰবাৰ্তাকী ও পৃতিকা এই সকল দ্রব্য ভক্ষণে পতিত হয়, যদ্যপি তেঁহ বেদের পারদর্শী ব্রাহ্মণও হয়েন। এবং যে২ বচন, কর্তার নরক প্রায়শ্চিত্তবিশেষ ও ত্যাগাদির প্রতিপাদক, সেই সেই বচন যথার্থবাদ হয়। যথা। স্ত্রীতৈলমাংসসম্ভোগী পৰ্বম্বেতেষু বৈ পুমা। বিম্মুত্রতভাজনং নাম প্রতি নরক মৃতঃ। অর্থাৎ এই পঞ্চ পর্বে স্ত্রীসঙ্গী তৈলাভ্যঙ্গী মাংসভােজী পুরুষ, বিষ্ঠামূত্রভােজন নামক নরকে গমন করে। আচাৰ্যপত্নীং স্বসুতাং গচ্ছংস্তু গুরুতল্পগঃ। ছি লিঙ্গং বধস্ত সকামায়া স্ক্রিয়াস্তথা ॥ অ[ ৪৩ ]র্থাৎ আচাৰ্যপত্নীগমন কিম্বা কন্যাগমন করে যে, তাহার নাম গুরুতল্পগ, তাহার লিঙ্গচ্ছেদপূৰ্ব্বক বধ করিবেন, কামা স্ত্রীরও সেইরূপ দণ্ড। হীনবর্ণোপভােগ্যা যা ত্যজ বধ্যাপি বা ভবেৎ। অর্থাৎ নীচজাতির ভুক্তা যে স্ত্রী সে পতির ত্যজ্যা কিম্বা বধ্যা হয়। এবং মহাপাতকী প্রভৃতি অধিকার করিয়া কহিয়াছেন। তজেদ্দেশ কৃতযুগে ত্রেতায়াং গ্রামমুৎসুজেৎ। দ্বাপরে কুলমেকন্তু কৰ্ত্তার কলো যুগে । অর্থাৎ সত্যযুগে মহাপাতকী প্রভৃতির দেশ পরিত্যাগ করিবেক, ত্রেতাযুগে সে গ্রাম, দ্বাপর যুগে পাপী ব্যক্তির কুল এবং কলিযুগে পাপকর্তাকে ত্যাগ করিবেক, যেহেতু পাপীর সংসর্গে তত্তল পাপ হয়, পণ্ডিতাভি- মানী মহাশয় এই সকল বচনকে নিন্দার্থবাদ কহিবেন, কি যথার্থবাদ কহিবেন, অবশ্যই যথার্থবাদ কহিবেন, অন্যথা গুরুতল্পগ প্রভৃতির বধাদি এবং কলিযুগে পাপকৰ্ত্তার পরিত্যাগ হইতে পারে না এবং পাপীর সংসর্গে [ ৪৪ ]য়শ্চিত্তবিধিরে বৈয় হয়। এবং পূর্বোক্ত অজ্ঞাত্ব ধর্মশাস্ত্রণি ইত্যাদি বচনসকলকেও অবশ্যই নিন্দার্থবাদ কহিবেন, অন্যথা ধর্মশাস্ত্রানভিজ্ঞ ব্যক্তি প্রায়শ্চিত্তের উপদেশ করিলে পাপী ব্যক্তির তৎপাপের প্রায়শ্চিত্ত উপদেশক ব্যক্তিকেও করিতে হয়, ইহা কোন শাস্ত্রে কোন নিবন্ধকৰ্ত্তা লিখেন নাই, অতএব ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী- দিগের নিন্দার্থ ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর প্রকাশিত, শূদ্ৰাং শূদ্রসম্পর্ক ইত্যাদি বচনসকলকে তেঁহ নিন্দার্থবাদ কহিয়াছেন ও এক্ষণেও কহিবেন, কিন্তু ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের প্রতি ধৰ্মসংস্থাপনা- কাজীদিগের লিখিত যে, সংসারবিষয়াসক্তং ইত্যাদি তং ত্যজেদন্ত্যজং যথা ইত্যন্ত যােগবাশিষ্ঠবচন, তাহাকে তেঁহ এক্ষণে যথার্থবাদ কহিবেন কি না কি জানি, তেঁই নিজে রামমােহন-গ্রন্থাবলী পণ্ডিতাভিমানী, যদ্যপি আনুচর জীবগণের নিকটে অভিমানভঙ্গভয়ে না কহেন ও সে জীবেয়াও কিঞ্চিঘােধ করিতে না [ ৪৫ ] পারেন, তথাপি অপক্ষপাতী মধ্যস্থ মহাশয়েরাও কি বােধ করিবেন না এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী কহেন যে, ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর লিখিত যােগবাশিষ্ঠবচনের এই তাৎপৰ্য যে, সংসার বিষয়ে আসক্ত হওয়া ও আপনাকে জ্ঞানী স্বীকার করা জ্ঞানীর জন্যে নিষিদ্ধ এতাবত্র অর্থাৎ অন্ত্যজসংসর্গের ন্যায় ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর সংসর্গ ভদ্রলােকের অকৰ্তব্য, সে বচনের এ তাৎপৰ্য্য নহে, এ অপূৰ্ব পাণ্ডিত্য প্রকাশ, কারণ, তাহার মতে বুঝি গুরুতল্পগ- দিগের বিষয়ে যে পূর্বোক্ত বচন, তাহারও এইরূপ তাৎপৰ্য যে গুরুতগ প্রভৃতির বধাদি হইবে না, কেবল আচাৰ্যপত্নীগমনাদিই নিষিদ্ধ, কি আশ্চৰ্য, আত্মদাষক্ষালনাৰ্থ কি শাস্ত্রের যথার্থাপলাপও করিতে হয়, পণ্ডিতাভিমানীর কি ধৰ্ম্মই এই, এক্ষণে মধ্যস্থ মহাশয়েরা এরূপ জ্ঞান করিবেন কি না যে, ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর নিকটেই ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর নিস্তার পাওয়া ভার ইহাতে ধৰ্ম্মের নি[ ৪৬ ]কটে কিরূপে নিস্তার পাইবেন এবং ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা, তঁাহার- দিগের নিন্দা করিবার এক্ষণে কোন উপায় দেখিতে পান কি না? এবং অপূৰ্ব্বজ্ঞানিসকলকে কোন শব্দ কহিতে পারেন কি না? ইহাতে নিরুত্তর হইবেন না, স্বরূপ কথনে যদ্যপি নিরুত্তর হইতে হয়, তথাপি পরের আরােপিত দোষােৎকীর্তনে বিশিষ্ট মহাশয়দিগের অবশ্যই অত্যন্ত উৎসাহবৃদ্ধি হইবেক। তাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—বস্তুত যােগবাশিষ্ঠের যে শ্লোকগুণেরি আরােপ করিয়া থাকেন। [.. ৪৮] ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর-ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর লিখিত যে সংসার- বিষয়াসক্ত ইত্যাদি যােগবাশিষ্ঠবচন, তাহার প্রকৃত অর্থই এই যে, সাংসারিক সুখে আসক্ত, অথচ আপ[৪৯]নাকে ব্রহ্মজ্ঞানী কহে, অর্থাৎ যে লােক, সুগন্ধি সুকুসুমরচিত মাল্য চন্দন দিব্য বসন ভূষণ ধারণ স্বাভিলষিত ভােজন দিব্যাঙ্গনা সম্ভোগজন্য সুখে সতত অত্যন্ত অনুরক্তচিনিমিত্ত সৰ্ব্বদাই ব্ৰহ্মজ্ঞানের অনুষ্ঠানে অসক্ত ও বিরক্ত হয়, যেমন নবযুবকের রতিরসাস্বাদনে নবযুবতি বৃদ্ধ পতির প্রতি বিরক্তা, ফলতঃ যেমন নবষুবকে আসক্ত নবযুবতির বৃদ্ধ পতির প্রতি মৌখিক প্রীতি, তেমন সাংসারিক সুখে আসক্ত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর ব্রহ্মজ্ঞানের প্রতি মৌখিক প্রীতি মাত্র। এবং কর্মকাণ্ডের অকরণার্থ আমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী আমার কর্মকাণ্ডে প্রয়ােজন কি এই কথা কহিয়া লােকসকলকে প্রতারণা করে এতাদৃশ পাপিষ্ঠ নরাধমের কর্ম ও ব্রহ্ম হইতে ভ্রষ্ট ও অন্ত্যজের ন্যায় ত্যজ্য অর্থাৎ উভয়বজ্জিত না স্বর্গ, না ব্ৰহ্ম পায়, ক্লীবের ন্যায় পণ্ড হয়, না পুংধৰ্ম্ম না স্ত্রীধৰ্ম, অতএব সুতরাং মেচ্ছাদির সংসর্গের ন্যায় তাহাদিগের সংস[৫০]গও বিশিষ্ট লােকের অকৰ্তব্য, যেহেতু, সাংসারিকসুখাসক্তং ব্রহ্মজ্ঞাশ্মীতি বাদিন। কর্মব্রহ্মোভয়ভ্রষ্টং তং ত্যজেদন্ত্যজং যথা। কুলার্ণবে এই প্রকার পাঠ দেখিতেছি। এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ও পূর্বে আপনার অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতার ২ পৃষ্ঠের ১৬ পর্ভূক্তিতে যােগবাশিষ্ঠবচনের তাৎপৰ্য্যার্থ লিখিয়াছেন, যে ব্যক্তি সংসারমুখে আসক্ত হইয়া ইত্যাদি। অতএব পূৰ্বলিখনের বিস্মরণে যােগবাশিষ্ঠবচনের পুনর্বার স্বমত রক্ষাৰ্থ অন্যার্থ কল্পনা করিয়া যােগবাশিষ্ঠের বচনার পাষণ্ডপীড়ন ৩৯ কথনে ও নিরর্থ নানাবাক্যোচ্চারণে উন্মত্তপ্রলাপ এবং তাহার বস্তুত অবস্তুতঃ হয় কি না? যদ্যপি প্রলাপের উত্তর প্রদানে উত্তরকর্তার বাক্যও তদ্রুপ হয়, তথাপি প্রথমাবধিই অগত্যা তদ্দোষ স্বীকারে প্রলাপেয়ে শান্তি করা কর্তব্য হয়। সে যাহা হউক, যেমন যােগবাশিষ্ঠের বহ্যিাপারসংরম্ভ ইত্যাদি শ্লোকের উত্থাপন করিয়া জনকাৰ্জ্জুনের দৃষ্টান্ত [৫১] দ্বারা আসক্তি ত্যাগপূর্বক আপনারদিগের বৈষয়িক ব্যাপার করণ সুসিদ্ধ করিতেছেন, তেমন তন্ত্রোক্ত বচনান্তরের দ্বারা ঐ জনকাৰ্জ্জুনের লৌকিকাচার দৃষ্টিতে কলির জ্ঞানী মহাশয়দিগের লৌকিকাচার কর্তব্য, কি সন্ধ্যাবন্দনাদি পরিত্যাগ ও সাবানের দ্বারা মুখ প্রক্ষালন ক্ষুরিকর্ম, ইত্যাদি লােকবিরুদ্ধ কৰ্ম্মই কৰ্ত্তব্য হয়। যথা। শিবতুলল্যাহপি যাে যােগী গৃহস্থ যদা ভবেৎ। তথাপি লৌকিকাচারং মনসাপি ন লঙ্ঘয়ে। অর্থাৎ গৃহস্থ যােগী যদ্যপি শিবতুল্যও হয়েন তথাপি লৌকিকাচারের লঘন মনেতেও করিবেন না। যদি কহেন যে, কৰ্মীদিগের বীত কৰ্ম্ম না করিলে কলির জ্ঞানী হওয়া হয় না, তবে যেমন জবনেরা ব্রাহ্মণাদি জাতির বিপরীত তাব কৰ্ম্ম করে, তেমন মুক্তকচ্ছ হওয়া, দণ্ডায়মান হইয়া মূত্রত্যাগ করা ও মলমূত্রত্যাগানন্তর জলশৌচ না করা, ইত্যাদি কর্মীদিগের বিপরীত কৰ্ম্ম করিয়া কলির সম্পূর্ণ জ্ঞানী হওয়া [ ৫২ ] তাহারদিগের উচিত হয় কি না? ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরা এ সকল কৰ্ম্ম বুঝি না করিয়া থাকেন, কি তাহাতেও বা পরমেশ্বরকে সাক্ষী করেন? মনের যথার্থ ভাব পরমেশ্বরই জানেন, এ অভিযথার্থ বটে, যেহেতু তেঁহ সৰ্বান্তর্বর্তী, কিন্তু মনুষ্যে ও বাহ্ চিহ্নের দ্বারা সে ভাব বােধ করিতে পারেন। নতুবা দুষ্ট ও শিষ্ট কিরূপে বােধ হইতেছে, হস্তপদাদির কোন বৈলক্ষণ্য নাই, সকলেই দুষ্ট কি সকলেই শিষ্ট কেন না হয়। অতএব দুষ্টের লক্ষণ যাহাতে মনের যথার্থ ভাব বােধ হয়, তাহা শাস্ত্রে কহিতেছেন। যথা পরাশরঃ। বাহৈবিভাবয়েল্লিঙ্গৈ- ভাবমস্তগতং নৃণাং। স্বরবর্ণোঙ্গতাকারৈশ্চক্ষুষ চেষ্টিতেন চ । অর্থাৎ সুবােধ লােকেরা বাহ চিহ্নের দ্বারা দুষ্টের অন্তর্গত ভাব বােধ করিবেন, সেই বাহ চিহ্ন, গদগদম্বর বৈবর্ণ ইঙ্গিত আকার চক্ষু ও চেষ্টা। এবং কলির জ্ঞানীদিগের অন্তর্গত ভাব যােগবাশিষ্ঠের বচনান্তরের দ্বারাও বােধ হইতেছে। [৫৩] যথা। সৰ্বে ব্রহ্ম বদ্যিন্তি সম্প্রপ্তে চ কলৌ যুগে। নাতিষ্ঠন্তি মৈত্রেয় শিশ্নেরপরায়ণাঃ। অর্থাৎ পাপ কলিকাল প্রবল হইলে সকলেই মুখে আমি ব্ৰহ্ম জানি এই কথামাত্র কহিবেক, হে মৈত্রেয়, কিন্তু কেহ ব্ৰহ্মজ্ঞানের অনুষ্ঠান করিবে না, যেহেতু সকল লােক শিখােদবপরায়ণ হইবেক, অর্থাৎ বেশ্যাসেবন ও যােদরপুরণ মাত্ৰকেই স্বর্গসাধন করিয়া জানিবেক। এ বচনের যথার্থ লক্ষণাক্রান্ত কলির জ্ঞানী মহাশয়েরা, তাহা অপক্ষপাতী মহাশয়দিগের অগােচর কি, যদি বিশেষ অনুধাবন না করিয়া থাকেন, তবে কিঞ্চিনােযােগ কৰিলেই অবগত হইবেন। অতএব পরমেশ্বরকে মনের যথার্থভাবে সাক্ষী করিয়া সামান্য মনুষকেই প্রতারণা করা অসাধ্য ইহাতে সৰ্বান্তৰ্বৰ্ত্তী জগৎসাক্ষী যে পরমেশ্বর, তাঁহাকে কিরূপে তাহার প্রতারণা করিতে ইচ্ছা করেন, এ প্রকার দুর্বোধ কেবল ঈশ্বরের বিড়ম্বনা বিনা কি বােধ হইতে পারে। এবং কলির জ্ঞানী মহাশ[ ৫৪ ]য়েরা বিষয় ব্যাপারে আসক্ত, কি অনাসক্ত, এই দুয়ের অনুভবের সম্ভাবনা কি, প্রথম পক্ষের বিলক্ষণ অনুভব ৪০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী হইতেছে, দুৰ্জ্জনেরা সজ্জনকে চিরকালই দুৰ্জন কহিয়া থাকে, তাহাতে কি দুর্জনের সজ্জনের সজ্জনত্ব দূর হয়। উভয়ভ্রষ্ট মহাশয়েরাই চিরকাল সজ্জননিন্দক, যেমন জবনেরাই ব্রাহ্মণাদির নিক, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের কি দুবুদ্ধি, জনকাদির বৈষয়িক ব্যাপারে নিজমনঃকল্পিত নিন্দকের উল্লেখ করিয়া আপনারদিগেরাে জ্ঞানিত্ব সিদ্ধ করিতে ইচ্ছা করেন, যেমন সচ্চিদানন্দ শ্রী শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা দৃষ্টান্ত দিয়া পরদারগমনেও দোষাভাব সিদ্ধ করিয়া থাকেন, ভাল, জিজ্ঞাসা করি, কোন গুণসাগর উত্তমের দৃষ্টান্তে কোন দোষসাগর অধমের কি দোষরাশি খণ্ডন হয়, এবং রত্নাকর সমুদ্রের সহিত ও সুধাকর চন্দ্রের সহিত কি কূপের ও জ্যোতিরিঙ্গনের কোন অংশে দৃ[ ৫৫ ]ষ্টান্ত হয়, আর ইদানীন্তন জ্ঞানীদিগের বিষয়ে জনকাদির দৃষ্টান্তের এ তাৎপৰ্য্য নহে যে, এহরা তাহার- দিগের তুল্য, এই বাক্যের দ্বারা শিষ্টাচরণে এইরূপ বােধ হয় কি না যে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগের মনেই এইরূপ অভিমান আছে যে, সকল লােক আমারদিগকে জনকাদির তুল্য জ্ঞান করিয়া থাকেন, এ প্রকার ভ্রান্ত কে আছে যে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগকে জনকাদির তুল্য জ্ঞান করে, যদ্যপি অশ্বনােম অতি নিৰ্ম্মল এবং শূকর কুশমূলাহারীও হয়, তথাপি মলিন শ্বেত চামরের এবং অভক্ষ্যভক্ষক গাের কোন অংশে কি কখন তুল্য হইতে পারে ? এবং যথার্থজ্ঞানীর বিপক্ষ কে আছে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর বিপক্ষ সৰ্ব্বকালেই আছে, কিন্তু অন্য যুগের ন্যায় ক্ষত্রিয় রাজা হইলে দুৰ্বল বিপক্ষ, কি প্রবল বিপক্ষ, তাহা বিলক্ষণরূপেই বােধ করিতেন, এবং সুজন ও দুর্জন সর্বকালেই আছে, সে সত্য, কিন্তু যে মহাশয়রা নারদকে দাসীপুত্র, ব্যাস[ ৫৬ ]দেবকে ধীবরকন্যাজাত, পঞ্চ পাণ্ডবকে জারজ, ব্রহ্মাকে কন্যাগামী, মহাভারতকে উপন্যাস, দেবপ্রতিমাকে মৃত্তিকা, এবং শালগ্রামকে শিলা বলিয়া উপহাস করিয়া থাকেন, তাঁহারা সুজন, কি দুর্জন, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি। এবং কোন্ দুর্জন দুগ্ধকে তক্র, শর্করাকে বালুকা, শ্বেত চামরকে অশ্বললাম, সুবর্ণকে পিত্তল, পদ্মপুষ্পকে তগর, সিংহকে কুকুর ও অশ্বকে গর্দভ বলিয়া নিন্দা করে, এবং কোন্ সুজনই বা তকে দুগ্ধ, বালুকাকে শর্করা, অখলােমকে শ্বেতচামর, পিত্তলকে স্বর্ণ, তগৰপুষ্পকে পদ্ম, কুকুরকে সিংহ ও গর্দভকে অশ্ব বলিয়া প্রশংসা করেন? কিন্তু কাৰ্যানুরােধে দণ্ডবাহককে কর্ণধার অর্থাৎ দাড়ীকে মাঝি বলিয়া উপহাস করিয়া থাকেন, “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা, তাহাদিগকে তৃতীয় প্রশ্নে যে, আত্মতত্ত্বজ্ঞানী কহিয়াছেন, সেও সেইরূপ উপহাসমাত্র” তাহাতেই বুঝি, কর্ণধার সম্বােধনে দণ্ডবাহকের ন্যায়ে] [ ৫৭] আহলাদে গদগদ হইয়া ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় আপনার জ্ঞানিত্ব যথার্থ করিতে প্রাণপণ যত্ন করিতেছেন, যেমন দৈবাৎ বৃহৎ নীলের কুণ্ডে পতিত, পরমায়ুর বলে পুনরুখিত ধূর্ত শৃগাল, আপনার দিব্য নীল বর্ণ দেখিয়া বন্য পশুগণের নিকটে আপনার প্রতি বনদেবতার অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া পশুর রাজা হইতে বহু যত্ন করিয়াছিল, কিন্তু যুগসহস্রে শত সহস্র যঙ্গেও কি কাক শুক, গর্দভ অশ্ব, এবং কুকুর সিংহ হইতে পারে, এ অনর্থ চেষ্টামাত্র, যেমন সেই নীল- বর্ণ শৃগাল, পশুগণকে প্রতারণা করিয়া কিঞ্চিৎ কাল পশুর রাজা হইয়া পশ্চাৎ স্বভাবদোষে নষ্ট হইয়াছিল, তেমন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ও চর জীবগণের নিকটে কিঞ্চিৎ কাল নি পাষণ্ডপীড়ন প্রকাশ করিয়া পশ্চাৎ স্বভাবদোষে সেই নীল জম্বুকের দশা প্রাপ্ত হইবেন, অথবা যেমন চটক খঞ্জনের নৃত্যশিক্ষায় যত্ন করিয়া লাভে হইতে আপনার নৃত্য বিস্মৃত হইয়াছিল, তা[ ৫৮ ]হার সেইরূপই হইবেক, এবং দুর্জন কিম্বা সুজন, দোষ ও গুণ এই উভয়ের একমাত্রের সম্ভাবনা স্থলে কি কহিয়া থাকেন? ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—ঐ ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর লিখিত যােগবাশিষ্ঠবচনে•• অভিমান কর এ পৃথক কথা । [•••৫৯] ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষী প্রত্যুত্তর।ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় প্রথমতঃ স্বীকার করেন যে, যে ব্যক্তি বিষয়সুখে আসক্ত অথচ কহে যে, আমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী সে সুতরাং কৰ্ম্মব্রহ্মো- ভয়ভ্রষ্ট, অতএব সে অন্ত্যজের ন্যায় ত্যজ্য, পশ্চাৎ কহেন, যে ব্যক্তি ব্ৰহ্মকে না জানে সেই কহে যে, আমি ব্ৰহ্মকে জানি, কিন্তু যে ব্যক্তি জানে, সে কদাচ কহে না, তবে দুর্জন ও খলেরা মিথ্যা অপবাদ দেয় যে, তুমি আপনাকে ব্রহ্মজ্ঞানী কহিয়া থাক। ভাল, জিজ্ঞাসা করি, এই কপট বাক্যের দ্বারা এই বােধ হয় কি না যে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় আপনাকে আপনি ব্রহ্মজ্ঞানী কহিতেছেন, অতএব তেঁহ উভয়ভ্রষ্ট ও ত্যজ্য হয়েন কি না? এবং সেই অপবাদ যথার্থবাদ হয় কি না? এবং যথার্থবক্তা দুর্জন ও খল কি, যে যথার্থবক্তাকে দুৰ্জ্জন ও খল কহে, সেই দুর্জন ও খলের মধ্যে অতি[ ৬০ ]পূৰ্ব্ব হয়? অপক্ষপাতী মহাশয়েরা যথার্থ বিবেচনা করিবেন, যদি কহেন, যে না জানে, সেই কহে, যে জানে, সে কহে না, এ বাক্যের এ তাৎপৰ্য নহে যে, আপনাকে ব্ৰহ্মজ্ঞানী কহা, কিন্তু যথার্থ ব্ৰহ্মজ্ঞানীর স্বরূপ বর্ণনমাত্র, তবে সে কথান্তর, এ কারণ অসম্বদ্ধ প্রলাপ মাত্র, এবং দুর্জন খলে মিথ্যা অপবাদ দেয় যে, তুমি আপনাকে ব্রহ্মজ্ঞানী কহিয়া থাক, এই ক্রোবােক্তি অনর্থ এবং তেঁহ যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী হইলেও এই ক্ৰোধােক্তি করিতেন না। যদি তত্ত্বজ্ঞানীর ন্যায় দুই চারি, কথা কহিলেই যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী হয়, তবে কে না হইতে পারে ? এবং চৈত্রোৎসব সময়ে ইতর লােকসকলকেও যথার্থ সংন্যাসী কেন কহা যায় ? এবং বেশমাত্রধারী হইলেও তাহার সেইরূপ হয়, যেমন এক মেষপালক, ব্যাঘ্র হইতে মেষগণ রক্ষণার্থ রাত্রিযােগে কৃষ্ণবর্ণ কম্বলে সৰ্বাঙ্গ বেষ্টিত করিয়া মহিষবেশধারী হইয়া বহুকাল মেষ রক্ষা করিত, পশ্চাৎ এক সুবুদ্ধি ব্যাঘ্ৰ কতৃক [ ৬১ ] সেই মেষগণের সহিত সেই মেষপালক ভক্ষিত হইয়াছিল, সে যাহা হউক, শম, দম, উপম, তিতিক্ষা, সমাধান, শ্রদ্ধা, অমান ও অদম্ভ ইত্যাদি সকল বিষয় জ্ঞানীদিগের সাধনাবস্থায় যত্নসাধ্য এবং সিদ্ধাবস্থায় স্বভাবসিদ্ধ হয়, তাহা গীতা ও তাহার টীকাকার শ্রীধরমিকতৃক বর্ণিত আছে, কিন্তু যদি ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের অপূৰ্ব্ব ধৰ্ম্মসংহিতার ১১ পৃষ্ঠে ১১ পর্ভূক্তিতে লিখিত প্রণব ও গায়ত্রী এই দুই নিগূঢ় শাস্ত্রে নঞ পূৰ্ব্ব শমদমাদি কলির জ্ঞানীদিগের সাধনাবস্থায় যত্নসাধ্য এবং সিদ্ধাবস্থায় স্বভাবসিদ্ধ হয়, তবে কলির জ্ঞানী মহাশয়দিগকে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী কহিয়া নিন্দা করা ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের অতি অনুচিত, অতএব তাহাদিগকে ভাক্ত- তত্ত্বজ্ঞানীরে অধম কহা যায় না, যেহেতু, তাহাদিগের প্রণবাদি নিগুঢ় শাস্ত্রের নিগুঢ় অর্থের অনুসারে বন্ধ্যাপুত্রের ন্যায় ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী অপ্রসিদ্ধ হয়। পরন্তু প্রথমতঃ বেদান্তে ৪২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ব্ৰহ্মজিজ্ঞা[ ৬২ ]সার অধিকারীর লক্ষণ কহিয়াছেন। যথা। ইহামুত্র ফলভােগবিরাগনিত্যা- নিত্যবস্তুবিবেকশমাদিসাধনষকসম্পন্মুমুক্ষুত্বানি অধিকারিবিশেষণানি। অর্থাৎ যে জন ইহলােকে ও পরলােকে ফলভােগকামনারহিত এবং এই পদার্থ নিত্য, এই পদার্থ অনিত্য, এইরূপ বস্তুবিবেচনাকর্তা এবং শম, দম, উপম, তিতিক্ষা, সমাধান ও শ্রদ্ধা, এই সাধনষটুকবিশিষ্ট এবং মুমুক্ষু হয়েন, তেঁহ ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার অধিকারী। জ্ঞানসাধনের প্রকার ভগবদগীতার এয়াে- দশাধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কহিয়াছেন। যথা। অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরাজ্জবং। আচাৰ্য্যোপাসনং শৌচং স্থৈৰ্যমাত্মবিনিগ্রহঃ । ইন্দ্রিয়াৰ্থে বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ। জন্ম- মৃত্যুজব্যাধিঃখদোযানুদর্শনং। অসক্তিভিষঙ্গঃ পুত্ৰদারগৃহাদিযু। নিত্যঞ্চ সমচিত্তত্ব- মিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু । মমি চানন্যযােগেন ভক্তিরব্য[ ৬৩ ]ভিচারিণী। বিবিদেশসেবিত্বম- রতিজ্জনসংসদি। অধ্যাত্মজ্ঞাননিত্যত্ব তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনং। এতজ জ্ঞানমিতি প্রােক্তমজ্ঞানং যদতােহথা । অর্থাৎ যে ব্যক্তি জ্ঞানসাধক হয়েন, তেঁহ অভিমান, দম্ভ ও হিংসা পরিত্যাগ করিবেন, ক্ষমাশীল ও সরলান্তঃকরণ হইবেন এবং শুচি, স্থিরচিত্ত ও সংযত হইয়া আচার্যের উপাসনা করিবেন। ইন্দ্রিয়ের বিষয়সকলে বৈরাগ্যবিশিষ্ট ও নিরহঙ্কার হইবেন, এবং পুনঃ পুনঃ জন্ম, মৃত্যু, জরা, নানা ব্যাধি ও নানা দুঃখ, এইরূপে সংসারের নানা দোষ দশন করিবেন। স্ত্রী পুত্র গৃহাদিতে প্রীতি ত্যাগ ও পুত্ৰাদির সুখে ও দুঃখে সুখদুঃখ ত্যাগ করিবেন এবং ইষ্ট ও অনিষ্ট উভয়েতেই সমভাব হইবেন। ব্রহ্মরূপ আমাতে অনন্যচিত্তে অচলা ভক্তি, নিভৃত স্থানে বসতি, প্রাকৃত জনসভাতে অতি, অধ্যাত্মজ্ঞানে নিত্যত্বজ্ঞান এবং তত্ত্বজ্ঞানের অর্থ দর্শন করিবেন, এই সকল জ্ঞানের প্রকার, ইহার [ ৬৪ ] বিপরীত জ্ঞানবিরােধী যে মান ও দম্ভ প্রভৃতি তাহা সৰ্বথা ত্যজ্য। এবং ভগবদগীতার দ্বিতীয়াধ্যায়ে তত্ত্বজ্ঞানীর লক্ষণ এইরূপ কথিত আছে। যথা। দুঃখেঘদ্বিগ্নমনা সুথেষু বিগতস্পৃহঃ। বীতরাগভয়ক্রোধ স্থিতধীৰ্ম্মনিরুচ্যতে । অর্থাৎ দুঃখেতে অনুদ্বিগ্নচিত্ত, সুখেতেও নিস্পৃহ, বিষয়ানুরাগশূন্য, অভয়, অক্রোধ, এবং মুনি অর্থাৎ মৌনশীল যে মনুষ্য, তাহার নাম স্থিতধী অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানী। এবং ব্ৰহ্মপ্রাপ্তির প্রকারও ভগবদগীতার অষ্টাদশাধ্যায়ে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ কহিয়াছেন। যথা। সিদ্ধি- প্রাপ্তো যথা ব্ৰহ্ম তথাগপতি নিবােধ মে। সমাসেনৈব কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা। বুদ্ধা বিশুদ্ধয়া মুক্তো ধৃত্যাত্মানং নিয়ম্য চ। শব্দাদী বিষয়া ত্যক্ত। রাগদ্বেষো ব্যুদস্য চ। বিবিক্তসেবী লঘাশী যতবাক্কায়মানসঃ। ধ্যানযােগপরাে নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাতিঃ। অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধ পরিগ্রহং। বিমুচ্য নি ৬৫ ]ৰ্ম্মমঃ শান্তো ব্ৰহ্মভূয়ায় কল্পতে । অর্থাৎ হে অর্জুন, স্ব স্ব জাতীয় কর্মের দ্বারা সিদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া ব্রহ্মোপাসকের যেরূপে ব্ৰহ্মপ্রাপ্তি, হয়, তাহা শ্রবণ কর, জ্ঞানের যে উৎকৃষ্টা নিষ্ঠা, তাহা তােমাকে সংক্ষেপে কহি, সাথিক বুদ্ধিযুক্ত হইয়া সাত্বিক ধৈৰ্য্যাবলম্বনে নিশ্চলা বুদ্ধি করিয়া শ্রবণাদি পঞ্চেন্দ্রিয়ের শাদি পঞ্চ বিষয় এবং তাহাতে রাগ ও কােষ ত্যাগ করিবেন, পশ্চাৎ শুদ্ধদেশবাসী, লঘাশী, সংযতবাক্য, সংযতকায়, সংযতমানস, ব্ৰহ্মধ্যানে তৎপর এবং সর্বদা বৈরাগ্যাবলম্বী হইয়া অহঙ্কার, বল, শ, কাম, ক্রোধ ও প্রতিগ্রহাদি ত্যাগ করিয়া মত্ততাশূন্য, শাস্তিরসে পরিপূর্ণ হইলে ব্রহ্মাহং পাষণ্ডপীড়ন ৪৩ অর্থাৎ আমি ব্ৰহ্ম এইরূপ নিশ্চলমতি হইয়া স্থির হইবার যােগ্য হয়েন। অতএব এই সকল দৃঢ়তর শাস্ত্রপ্রমাণের অনুসারে কলির জ্ঞানী মহাশয়েরা ভা, কি অভাক্ত হয়েন? অপক্ষপাতী মহাশয়দিগের কি বােধ হয়? ভাই বােধ হইবেক, যেহেতু তাহারা আপনারদিগের ( ৬৬ না অধিকারাবস্থা, না সাধনাবস্থা, না সিদ্ধাবস্থা, এক অবস্থাও স্বীকার করিতে পারিবেন না, এ কি দুরবস্থা, যদ্যপি পরমেশ্বরকে সাক্ষী করা, এই এক প্রকার প্রতারণার উপায় তঁাহারদিগের আছে, তাহাতেই প্রথমাবস্থায় অবােধ লােকদিগের নয়নে ধুলি প্ৰক্ষেপ করেন, তথাপি অপক্ষপাতী সুবােধ লােকদিগের নিকটে কিরূপে প্রতারণা করিবেন, পূর্বেও শ্রীগুরুগােপেশ্বর প্রভৃতি অনেক প্রতারক ছিল, তাহাদিগের প্রতারণাই বা কোন্ সুবােধ লােকদিগের অবােধ হইয়াছিল, তাহারদিগের নিকটে এহারা কোন্ কীটস্য কীট হইবেন এবং লজ্জায় জলাঞ্জলি প্রদান না করিলেই বা সাধনাবস্থার স্বীকার কিরূপে করিবেন, যদ্যপি অপক্ষপাতী মহাশয়েরা কহেন যে, তঁাহারা কি আজি: লজ্জাকে জলাঞ্জলি দিয়াছেন, না অনেক কাল দিয়াছেন, তথাপি সিদ্ধাবস্থায় মুনি শব্দ শ্রবণে অবশ্যই মৌনী হইবেন, কিন্তু তাহাতে অপক্ষপাতী মহাশয়েরা মৌন সম্মতিলক্ষণং, এই বচন দৃষ্টি[ ৬৭ ]তে সিদ্ধাবস্থায় তাহারদিগের স্বীকার করা বােধ করিবেন না, যেহেতু অজপালকে তুরঙ্গবলের আধিপত্য কদাচ সম্ভব হয় , তবে যে তাহারা ব্ৰহ্মত্বপ্রাপ্তিস্বরূপ অত্যুচ্চ ফলের গ্রহণেচ্ছায় অতি সুগম বােধে পুনঃ পুনঃ হস্তোত্তোলন করেন তাহাতে কেবল হাস্যাস্পদ হওয়া এবং উভয়ভ্রষ্টতার দৃঢ়তা করা বিনা কি বােধ হইতে পারে ? তাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।-কোন এক বৈষ্ণব যে আপন... নিন্দিত করিয়া জানিবেন কি না ? [৬৮] ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর প্রত্যুত্তর।প্রথমতঃ ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের পূর্বোক্ত লিখনানুসারে ভক্ত বৈষ্ণব ও ভক্ত শাক্ত ধপুষ্পের ন্যায় অলীক ; দ্বিতীয়তঃ কি বৈষ্ণব, কি শাক্ত, যে কোন উপাসক যদি নানাবেশধারী নটের ন্যায় ও মায়াবী রাক্ষসের ন্যায় কোন ব্যক্তিকে কখন বামাচারী, কখন ভােগী, কখন যােগী, কখন বা ব্রহ্মজ্ঞানী দেখিয়া অঙ্কুশাঘাতের দ্বারা মত্ত হস্তিমূর্খের দর্পশান্তির ন্যায়, দুর্জনের দৌজ্জন্য শাস্তির নিমিত্ত প্রিয় বচনের দ্বারা উপদেশ না করিয়া অপ্রিয় ভয় প্রদর্শন বচনের দ্বারা উপদেশ করেন এবং স্ব স্ব শক্তির অনুসারে স্ব স্ব ধর্মানুষ্ঠানেও রত থাকেন, তবে সেই বৈষ্ণব আদি উপাসকেরা যথার্থ বৈষ্ণবাদি এবং ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী ও সৰ্বজনহিতৈষী না হইয়া ভাবৈষ্ণবাদি ও নিন্দুকের মধ্যে অতিশয় নিন্দিত কিরূপে হয়েন? এবং যেমন কলির জ্ঞানী মহাশয়েরা যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী হইয়া আপনাদিগকে যথার্থ তত্ত্ব[৬৯]জ্ঞানী করিয়া মানেন, তেমন বৈষ্ণবাদি উপাসকেরা, ভাক্ত বৈষ্ণবাদি না হইয়া আপনাদিগকে ভক্ত বৈষ্ণবাদি কিরূপে মানিতে পারেন? এবং অভাক্ত উপাসকদিগের অভিমান করা সর্বথা অসম্ভব, যেহেতু ভাদিগেরই অভিমান অঙ্গের ভূষণ ও জীবনধন এবং যদ্যপি বৈষ্ণবাদি পঞ্চোপাসক আপনার উপাসনার সর্ব অনুষ্ঠান করিতে অশক্ত হয়েন, তথাপি পাপক্ষয় ও মােক্ষপ্রাপ্তি তাঁহাদিগের অনায়াসলভ্য, যেহেতু ৪৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী 3 বিষ্ণু প্রভৃতি পঞ্চ দেবতার নাম স্মরণমাত্রেই সর্বপাপক্ষয় ও অন্তে মােপ্রাপ্তি হয়। যথা কাশীখণ্ডে। উমানামামৃতং পীতং যেনেহ জগতীতলে। ন জাতু জননীস্তন্যং স পিবেৎ কুম্ভসম্ভব। উমেতি দ্বাক্ষরং মন্ত্রং যােহহর্নিশমনুস্মরেৎ। ন স্মরেৎ চিত্রগুপ্তস্তং কৃতপাপমপি দ্বিজ । অর্থাৎ হে অগস্ত্য, যে ব্যক্তি এই জগতীতলে উমানামস্বরূপ অমৃত পান করিয়াছেন, তেঁহ কদাচ জননীর স্তনপান করেন না। যে ব্যক্তি সর্বদা [৭০] উমা এই দ্ব্যক্ষর মন্ত্র স্মরণ করেন, তেঁহ পাপী হইলেও চিত্রগুপ্ত তাহাকে স্মরণ করেন না। ব্রহ্মবৈবর্তে। শিবেতি শব্দমুচ্চাৰ্য লভে সৰ্বশিবং নরঃ। পাপস্নো মােক্ষদো নৃণাং শিবনে প্রকীর্তিতঃ। শিবেতি চ শিবং নাম যস্য বাচি প্ৰবৰ্ত্ততে। কোটিজন্মজ্জিতং পাপং তস্য নশ্যতি নিশ্চিতং। অর্থাৎ শিব এই শব্দ উচ্চারণ করিয়া মনুষ্য সৰ্ব্বকল্যাণভাজন হয়েন, যেহেতু শিব মনুষ্যদিগের পাপনাশ ও মােক্ষ দান করেন, সেই হেতু তেঁহ শিবনামে খ্যাত হয়েন। যে ব্যক্তির মুখ হইতে শিব এই শুভদায়ক নাম নির্গত হয়, তাহার কোটিজন্মজ্জিত পাপ তৎক্ষণাৎ অবশ্য নষ্ট হয়। পদ্মপুরাণে। পরদাররত: পাপী পরহিংসাপকারক। মুক্তিয়াতি সংশুদ্ধো হরের্নামানু- কীৰ্ত্তনাৎ । নামােহস্য যাবতী শক্তিঃ পাপনিৰ্হরণে হরেঃ। তাবৎ কৰ্ত্তং ন শক্কোতি পাতক পাতকী জনঃ । মহাভারতে। কৃষ্ণেতি ম[৭১]ঙ্গলং নাম যস্য বাচি প্ৰবৰ্ত্ততে। ভস্মীভবন্তি রাজেন্দ্র মহাপাতককোটয়ঃ ॥ অর্থাৎ পরদাররত পাপী পরহিংসক ও পরাপকারক যে মনুষ্য, সেও হরির নামানুকীৰ্ত্তনে নিস্পাপ হইয়া মুক্ত হয়, পাপহরণে হরিনামের যত শক্তি, পাতকী জন তত পাপ করিতে শক্ত হয় না। হে রাজেন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ এই মঙ্গল নাম যে ব্যক্তির মুখ হইতে নির্গত হয়, তাহার কোটি মহাপাতক ভস্মত্ব পায়। ভবিষ্যাত্তরে। দ্বাদশাদিত্য- নামানি প্রাতঃকালে পঠের। সৰ্বপাপবিমুক্তাত্মা দুঃস্বপ্নঞ্চ বিনশ্যতি । যঃ স্মরেৎ প্রাতরুখায় ভক্ত্যা নিত্যমতন্দ্রিত। সৌখ্যমায়ুস্তথাবােগ্যং লভতে মােক্ষমেবচ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে দ্বাদশ আদিত্যের নাম পাঠ করেন, তেঁহ সৰ্বপাপ হইতে মুক্ত হয়েন ও তাহার দুঃস্বপ্ন নষ্ট হয়। যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে গাত্রোখান করিয়া ভক্তিপূৰ্ব্বক নিত্য দ্বাদশ আদিত্যের স্মরণ করেন, তাহার সুখ, আয়ু, আরােগ্য ও মােক্ষ হয়। স্কান্দে গণেশং প্রতি শিববাক্যং। ত্বা স্তুতিং [৭২] মহাপুণ্যাং স্মৃতৃৈতান্ বিনায়কা। জন্তুর্বির্নৈ বাধ্যেত পাপেভ্যোহি প্ৰহীয়তে। যে ত্বাং স্মরন্তি করুণাময় বিশ্বমূৰ্ত্তে সর্বৈনসামপি ভুবাে ভুবি মুক্তিভাজ। তেষাং সদৈব হরসীহ মহােপসৰ্গা স্বৰ্গাপবর্গমপি সংপ্রদাসি তেভ্যঃ। অর্থাৎ হে গণেশ, সর্ববিঘ্ন- নায়কদিগের মহাপুণ্যজনক স্তব শ্রবণ ও তাহাদিগকে স্মরণ করিয়া জীব সকল বিঘ্ন হইতে ও পাপ হইতে মুক্ত হয়। হে করুণাময়, যাহারা তােমাকে স্মরণ করেন, তাহারা সর্বপাপের আলয় হইলেও মুক্তিভাজন হয়েন এবং তাহাদিগের উপসর্গসকল নষ্ট হয় এবং তুমি তাহার- দিগকে স্বর্গ ও অপবর্গও প্রদান কর। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়, জ্ঞান ও কর্ম এই দুইকে অনুগ্রহপূর্বক তুল্যরূপে স্বীকার করিয়া আপনার আপাদ মস্তক পৰ্যন্ত সর্বাঙ্গে লিপ্ত দোষপঙ্কের প্রক্ষালনার্থ বহু যত্ন করিয়া উপায়ান্তর দেখিয়া বৃশ্চিকভয়ে পলায়মান ব্যক্তির ভ্রান্তি[৭৩]প্রযুক্ত সর্পমুখে পতনের স্যায় পশ্চাৎ পাষণ্ডপীড়ন ৪৫ জ্ঞানের প্রতি করুণাবলােকনপূর্বক কৰ্ম্ম হইতে জ্ঞানের উত্তমত্ব স্বীকার করিয়া নিজ দোষপঙ্ক প্রক্ষালনে পুনৰ্বার বহু যত্ন করিতেছেন, কিন্তু তাহাতে সেই দোষপঙ্ক কেবল বজ্রলেপ ও অনাড়ী পর্যন্ত প্রবিষ্ট হইবেক, যেমন কোন ব্যক্তি কেশাগ্র পর্যন্ত আর্দ্র মলে লিপ্তনিমিত্ত পশ্চাৎ তাহার প্রক্ষালনের প্রয়াসে ব্যগ্রচিত্ত হইয়া অজুমাত্র প্রমাণ জলে আচ্ছন্ন মহাপঙ্ক হ্রদে ঝম্প প্রদান করিলে তাহাতে প্রক্ষালনের বিষয় কি, বরঞ্চ সেই আদ্র মল নব দ্বারের দ্বারা তাহার অন্তরেও প্রবিষ্ট হয়। ভাল, ক্ষতি কি, যদি সে পথেও তাহাদিগের সর্বাঙ্গলিপ্ত মলপঙ্কের প্রক্ষালন হয়, তবে তাহাতেও অত্যন্ত আহলাদের বিষয়, যেহেতু যেমন পাপীদিগের পাপমােচনাৰ্থ পরমেশ্বর প্রায়শ্চিত্তের ও পুণ্যতীর্থের সৃষ্টি করিয়াছেন, তেমন ধৰ্ম্মসংস্থাপনা- কাক্ষিসকলকেও তন্নিমিত্তই সৃষ্টি করিয়াছেন, তবে যে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের মধ্যে [৭৪] সেই সকল ব্যক্তিকে ভাবান্তরে ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী বলিয়া উপহাস করেন, সে তাহারদিগের তামস স্বভাবপ্রযুক্ত, তামসিকদিগের ধর্মই এই যে, কুসঙ্গ কুব্যবহার ও ধাম্মিক লােক দেখিলে উপহাস করা, কিন্তু ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা তাহাতে তাহাদিগের প্রতি অসন্তুষ্ট নহেন, কারণ ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের শ্রীজগন্নাথদেবকেই নিম্বকাষ্ঠ কহিয়া ব্যঙ্গ করিয়া থাকেন এবং শ্ৰীশালগ্রামচন্দ্রকে ও ভস্ম করিয়া চূর্ণ করিতে ইচ্ছা করেন, তাহাতে ধৰ্ম্ম- সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিকে উপহাস করা তাহাদিগের কোন্ বিচিত্র, বরঞ্চ ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা তঁাহারদিগের মঙ্গলার্থে প্রতিনিয়ত ধর্মের নিকটে এই প্রার্থনা করিতেছেন যে, হে ধৰ্ম, এই দুষ্টান্তঃকরণ দুর্জনদিগের দুঃস্বভাব দূর কর। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—জ্ঞান ও কর্ম এই দুইকে সমানরূপে...আত্মজ্ঞান তাহা হইতে মুক্তি হয়। [৭৮] ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-যদ্যপি জ্ঞানের প্রাধান্য মদিবচনে কথিত আছে, তথাপি কৰ্ম্ম ব্যতিরেকে জ্ঞান হইতে পারে না, অতএব কৰ্ম্মবিষয়ে ভগবদগীতাতে শ্রীভগবানের বাক্য। যথা। ন কৰ্ম্মণামনারম্ভাষ্কৈৰ্মং পুরুষােহন্দুতে। ন চ সংসদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ॥ অর্থাৎ কর্মের অনুষ্ঠান ব্যতিরেকে পুরুষের কদাচ জ্ঞান জন্মে না এবং কৰ্ম্মের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি বিনা কেবল সন্ন্যাসেও মােক্ষ প্রাপ্তি হয় না। অতএব যােগবাশিষ্টেও সেইরূপ দৃষ্ট হইতেছে। যথা। উভাভ্যামেব পক্ষাভ্যাং যথা থে পক্ষিণাং গতিঃ। তথৈব জ্ঞানকর্মভ্যাং সিদ্ধির্ভবতি নান্যথা। অর্থাৎ যেমন উভয় পক্ষের দ্বারা পক্ষিগণের আকাশে গতি হয়, তেমন জ্ঞান ও কর্ম এই উভয় পক্ষের দ্বারাই মনুষদিগেরও মােক্ষপ্রাপ্তি হয়, নতুবা হয় না। অতএব ভগবদ্গীতাতে পুনর্বার শ্রীভগবানের বাক্য। যথা। য[৭৯ ]জ্ঞাে দান তপঃ কর্ম ন ত্যজ্যং কাৰ্যমেব তৎ। যজ্ঞাে দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাং। এতাপি হি কৰ্ম্মাণি সঙ্গ ত্যক্ত। ফলানি চ। কৰ্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমং ॥ নিয়ত তু সন্ন্যাস: কলাে নােপপদ্যতে। মােহাত্তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীৰ্তিতঃ দুঃখমিতত্যব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াৎ ত্যজেৎ স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ। কাৰ্য্য- মিত্যেব ষং কৰ্ম্ম নিয়তং ক্রিয়তেইৰ্জ্জুন। সঙ্গ ত্যক্ত। ফলঞ্চৈব স ত্যাগঃ সাত্বিকো মত !

৪৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী অর্থাৎ যজ্ঞ দান ও তপস্যা ইত্যাদি কৰ্ম্ম কদাচ ত্যজ্য নহে, অবশ্যই কর্তব্য, যেহেতু যজ্ঞাদি কর্ম বিবেকীদিগের চিত্তশুদ্ধির কারণ হয়। এই সকল কর্ম কতৃত্বাভিমান ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া অবশ্যই কর্তব্য, হে অর্জুন, আমার এই মতই উত্তম। কর্মের পরিত্যাগ কর্তব্য নহে, যদি মােহপ্রযুক্ত পরিত্যাগ করে তবে সে ত্যাগকে তামস কহা যায় । কৰ্ম্ম দুঃখ- [ ৮০ জনক হয়, এই দুৰ্ব্বদ্ধিপ্রযুক্ত কায়ক্লেশভয়ে যদি কৰ্ম্ম ত্যাগ করে, তবে সে ত্যাগকে তামস ত্যাগ কহা যায়, তাহাতে ত্যাগের ফল হয় না। হে অর্জুন, কৰ্ম্ম অবশ্যই কর্তব্য, এই জ্ঞান করিয়া কতৃত্বাভিমানশূন্য ফলকামনারহিত হইয়া যে কর্মের অনুষ্ঠান করে, তাহার নাম সাত্বিক ত্যাগী এবং সেই ত্যাগকেই সাত্বিক কহা যায়, ফলতঃ কর্মের অকরণের নাম কৰ্মত্যাগ নহে, কিন্তু কতৃত্বাভিমান ফলকামনাশূন্য হইয়া যে কর্মকরণ, তাহার নাম কৰ্মত্যাগ। অতএব ভগবদগীতার তৃতীয়াধ্যায়ে অর্জুনের প্রতি শ্রীভগবানের উপদেশ। যথা। তস্মাদসক্তঃ সততং কাৰ্যং কৰ্ম্ম সমাচর। অসক্তো হ্যাচরন্ কৰ্ম্ম পরমাপ্নোতি পূরুষঃ। যদাচরতি শ্রেষ্ঠত্ত- দেবেরাে জনঃ। স যৎ প্রমাণং কুরুতে লােকস্তদনুবর্ততে । ন মে পার্থাস্তি কৰ্তব্যং ত্ৰিযু লােকে কিঞ্চন। নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বৰ্ত্ত এব চ কৰ্ম্মণি । যদি হহং ন বৰ্ত্তেয়ং জাতু কৰ্ম্মণ্য- [৮১ ] ততিঃ । মম বর্তানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ। উৎসীদেযুরিমে লােকা ন কুৰ্যাং কৰ্ম্ম চেদহ। সঙ্করস্য চ কৰ্ত্তা স্যামুপহামিমাং প্রজাঃ ॥ সা: কৰ্ম্মণ্যবিদ্বাংসাে যথা কুৰ্বস্তি ভারত। কুৰ্যাদ্বিদ্বাংস্তথাহসক্তশ্চিকীষু লোকসংগ্রহং। অর্থাৎ হে অর্জুন, সেই হেতু নিষ্কাম হইয়া সর্বদা অবশ্য কর্তব্যরূপে বিহিত নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠান কর, যেহেতু নিষ্কাম কৰ্ম্ম করিলে মনুষ্যের চিত্তশুদ্ধি ও জ্ঞানের দ্বারা মােক্ষ প্রাপ্তি হয়। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যে আচরণ করেন ইতর লােকেও সেই আচরণ করে এবং শ্রেষ্ঠ লােক যাহাকে প্রমাণ করেন, অন্য লােকও তাহারই পশ্চাৎবর্তী হয়। আমার কর্তব্য কোন কর্ম নাই এবং ত্রিভুবনেও অপ্রাপ্ত কোন বস্তু নাই যে তাহার প্রাপ্তির নিমিত্ত কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিব, তথাপি আমিও কর্মে প্রবৃত্ত হইতেছি। যদি আমি কৰ্ম্ম না করি, তবে কায়ক্লেশভয়ে কেহ কৰ্ম্ম করিবেক না, সকলেই আমার ব্যবহারের [ ৮২ ] পশ্চাৎবর্তী হইবেক। আমি কৰ্ম্ম না করিলে কোন লােক কর্ম করিবেক না। তবে ক্রমে কৰ্ম্মলােপে বর্ণসঙ্কর হইয়া তাবৎ লােক নষ্ট হইবেক। যেমন অজ্ঞানী লােকেরা ফলকামনায় কৰ্ম্মানুষ্ঠান করে, তেমন জ্ঞানী লােকেরাও লােকসংগ্রহের নিমিত্ত নিষ্কাম হইয়া কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিবেন। অতএব ভগবদ্গীতার চতুর্থাধ্যায়ে শ্রীভগবদবাক্য। এবং জ্ঞাত্ব কৃতং কর্ম পূৰ্বৈাপি মুমুক্ষুভিঃ। কুরু কৰ্ম্মাণি তস্মাৎ ত্বং পূৰ্বৈ পূৰ্ব্বতরং কৃতং । অর্থাৎ এই প্রকার জ্ঞান করিয়া পূৰ্বের মুমুহু লােকেরাও কর্মানুষ্ঠান করিয়াছেন, হে অর্জুন, অতএব তুমি কর্মের অনুষ্ঠান কর, পূৰ্বে জনকাদিও কৰ্ম্ম করিতেন, অতএব ভগবদ্গীতার পঞ্চমাধ্যায়ে অর্জুনের প্রশ্ন। শ্রীভগবানের উত্তর। অর্জুন উবাচ। সন্ন্যাসং কৰ্ম্মণাং কৃষ্ণ পুনর্যোগঞ্চ শংসসি। যচ্ছে । এতয়ােরেকং তন্মে ঐহি সুনিশ্চিত। অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন, হে কৃষ্ণ, আমি তােমার মুখে সন্ন্যাস ও কৰ্ম্মযােগ এণ করিলাম, [ ৮৩ ] কিন্তু এই দুয়ের মধ্যে যে উত্তম লেয়ঙ্কর হয় তাহা আমাকে নিশ্চয় করিয়া কহ। ভগবানুবাচ ।

পাষণ্ডপড়ন ৪৭ সন্ন্যাসঃ কৰ্ম্মযােগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ। তয়ােহি কর্মসন্ন্যাসাং কর্মযােগাে বিশিষতে। শ্রীভগবান্ উত্তর করিলেন, হে অর্জুন, সন্ন্যাস ও কর্মযােগ এই উভয়ই মােক্ষসাধন, কিন্তু তাহার মধ্যে সন্ন্যাস হইতে কৰ্মযােগ শ্রেষ্ঠ হয় । এই সকল শাস্ত্ৰপ্রমাণের অনুসারে কর্মের আবশ্যকতা ও উত্তমতা এবং কর্মী ও ভাক্তকৰ্মত্যাগী এই উভয়ের মধ্যে কাহার উৎকৃষ্টতা হয়, তাহা অপক্ষপাতী মহাশয়েরাই বিবেচনা করিবেন, যেহেতু নিষ্কাম কৰ্ম্মের মােক্ষসাধনত্ব ভগবদ্গীতা কহেন। কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত। মনীষিণ। জন্মবন্ধবিনিমুক্তাঃ পদং গচ্ছত্যনাময়। অর্থাৎ বুদ্ধিযুক্ত পণ্ডিত লােকেরা কর্মজন্য ফলকামনা পরিত্যাগ করিয়া কৰ্ম করতঃ জন্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া মােক্ষপদ প্রাপ্ত হয়েন। কর্মজন্য স্বর্গাদি ভােগাভা[ ৮৪ ]বপ্রযুক্ত বিষ্ণুপ্রীত্যর্থ কৰ্ম্মও বন্ধনের হেতু হয় না, অতএব বিষ্ণুপ্রীত্যর্থ কর্মেরও মােক্ষসাধনত্ব ভগবদ্গীতায় শ্রীভগবান্ কহিয়াছেন। যথা। যজ্ঞার্থাৎ কৰ্ম্মণােহন্যত্র লােকোয়ং কৰ্ম্মবন্ধন। তদর্থং কৰ্ম্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর। অর্থাৎ হে অর্জুন, যে কৰ্ম্ম বিষ্ণুপ্রীতিকামনায় কৃত না হয়, সেই কৰ্ম্মেই লােক কৰ্ম্মবন্ধনগ্রস্ত হয়, ফলতঃ বিষ্ণুপ্রীতিকামনায় কৃত কৰ্ম্ম মােক্ষসাধন, অতএব তুমি কতৃত্বাভিমানশূন্য হইয়া বিষ্ণুপ্রীত্যর্থ কৰ্ম্ম কর । অতএব মােধৰ্ম্মে অকামনার ও বিষ্ণুপ্রীতিকামনার তুল্যত্ব দর্শন হইতেছে। যথা। নিষ্কামঃ কুরু কৰ্ম্মেহাতঃ কৈবল্যঋেদিচ্ছসি তাত। বিষ্ণুপ্রীত্যৈ কৰ্ম্ম ভাবি তদৈবহি নিত্যং শৰ্ম্ম । অর্থাৎ হে তাত, তুমি যদি কৈবল্যের ইচ্ছা কর, তবে নিষ্কাম অথবা বিষ্ণুপ্ৰীতিকাম হইয়া কৰ্ম্ম কর, তাহাতেই তােমার নিত্যসুখ বস্তুতঃ ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগের না কৰ্ম্মজন্য [ ৮৫] সুখবােধ, না জ্ঞানজন্য সুখবােধ আছে, তঁাহার উভয়ভ্রষ্ট, না জানেন কৰ্মীর ফল, না জানেন জ্ঞানীর ফল, অতএব তাহারদিগের কর্মের ও জ্ঞানের এবং কর্মীর ও জ্ঞানীর যে বিশেষ বিবেচনা করা, সে কেবল শুকপক্ষীর রাধাকৃষ্ণ২ বাক্যের ন্যায়, বরঞ্চ তাহাতে তাহাদিগের সেইরূপ হাস্যাস্পদ হইতে হয়, যেরূপ এক কপর্দকের বণিক, কুবেরের ধনসংখ্যায় বাঞ্ছা করিলে এবং হস্তমাত্ৰপরিমিত জলে কেশাগ্র পর্যন্ত মগ্ন হয় যে ব্যক্তির, সে সমুদ্রজলের পরিমাণ করিতে উদ্যত হইলে এবং এক শূকর আপনার চতুষ্পদ দর্শন করিয়া আপনাকে দ্বিপাদ মনুষ্য হইতে শ্রেষ্ঠ ও চতুষ্পদ হস্তীর সমান কহিলে হাস্যাস্পদ হয়। এ দৃষ্টান্ত দিবার এই তাৎপৰ্য্য মাত্র যে, কেবল শ্রুতির আবৃত্তি মাত্রেই লােক তত্ত্বজ্ঞানী হয় না, তাহা হইলে এক্ষণে মেচ্ছেরাও তত্ত্বজ্ঞানী হইতে পারে, যেহেতু এক্ষণে অনেক স্নেচ্ছেই শ্রুতির আবৃত্তি করিয়া থাকে, ম্লেচ্ছদি[ ৮৬ ]গের নিকটে বেদ যজ্রপ কম্পান্বিতকলেবর হন, অল্পবিদ্য ব্যক্তির নিকটেও তদ্রুপ। অতএব স্মৃতি বিভেত্যল্পঞতাৰেদো মাময়ং প্রহরিষ্যতি । অর্থাৎ অল্পক্ষত, ফলতঃ অল্পবিদ্য মনুষ বেদের ব্যাখ্যা করিতে উদ্যত হইলে বেঙ্গের সর্বাঙ্গে কম্পজ্বর হয়, যেহেতু বেদের মনে এই ভয় জন্মে যে, এই অল্পবিদ্য দাম্ভিকশিয়ােমণি অসদর্থকল্পনাস্বরূপ শাণিত খগের দ্বারা আমাকে এক্ষণে প্রহার করিবেক। পর যােগী তিন প্রকার হয়, যােগারূঢ়, যুক্ত ও পরম। অপ্রতিষ্ঠিত শব্দের অর্থ হইবেক।

৪৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী যােগারূঢ়। কি আশ্চৰ্য্য, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়, মনে আপনি পরমযােগী হইয়া অনুচর মহাশয়সকলকে অপ্রতিষ্ঠিত নামে প্রসিদ্ধ করিয়া তাহাতে কৌতুকাবিষ্ট হইয়া তাহারদিগের লােভ প্রদর্শনার্থ আকাশের চন্দ্র হস্তে প্রদানের ন্যায় পুনৰ্বার যােগভঙ্গেও উৎকৃষ্ট ফল শ্রবণ করাই[ ৮৭ ]তেছেন যে, অপ্রতিষ্ঠিত যােগী যােগভ্রষ্ট হইলেও সেই পুণ্যকারী ব্যক্তির কদাচ দুর্গতি হয় না, বরঞ্চ পূৰ্বদেহত্যাগানন্তর পুণ্যকারী ব্যক্তির লােকে বহুকাল বাস করিয়া পশ্চাৎ শুচি অথচ শ্ৰীমান্ যে লােক, তাহার গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। ভাল, যদি নগরান্তবাসী মহাশয়ের বাকৃসিদ্ধির গুণে যাহাকে যাহা যাহা কহেন, সে তাহাই হয়, তবে অনুচর মহাশয়সকলকে অপ্রতিষ্ঠিত যােগী কহিয়া কেন অধম পতিত করেন, আরও কিঞ্চিৎ লজ্জা ভয় পরিত্যাগ করিলেই তাহাদিগেরাে উত্তম মধ্যম কল্প হইতে পারে, কলির প্রথমাবস্থাতেই এই পর্যন্ত বাকৃসিদ্ধি হইয়াছে, বুঝি মধ্যাবস্থাতে তাহার বাকৃসিদ্ধির প্রভাবে অনুচর মহাশয়েরাও বা গুরুপদে অভিষিক্ত হয়েন, কিন্তু শাস্ত্র দৃষ্টি করিলে প্রমাণ ঘটিবে, প্রধান ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরি নিজে অধম কল্পেও স্থান পাওয়া ভার হইবে, তাহাতে অনুচর মহাশয়েরা কোন কল্পে স্থান পাইবেন, তা[ ৮৮হার বিশ্বাসঘাতকতা ও মতের অস্থিরতাযুক্ত ম্লেচ্ছদিগের কল্পেও স্থান প্রাপ্তির সন্দেহ। ভগবদ- গীতাতে শ্রীভগবান্ জ্ঞানীর লক্ষণ কহিতেছেন। যথা। যদা হি নেন্দ্রিয়াৰ্থে ন কৰ্ম্মধনু- সজ্জতে। সৰ্বসংকল্পসংন্যাসী যােগারূঢ়স্তদোচ্যতে । জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থাে বিজিতেন্দ্রিয়। যুক্ত ইত্যুচ্যতে যােগী সমলােষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ। যদা বিনিয়তং চিত্তমাত্মন্যেবাবতিষ্ঠতে । নিস্পৃহঃ সৰ্বকামেভ্যো যুক্ত ইত্যুচ্যতে তদা। আত্মোপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যােহৰ্জ্জুন। সুখ বা যদি বা দুঃখং স যােগী পরমাে মত। অর্থাৎ যে কালে যে মনুষ্য ইন্দ্রিয়ের বিষয়সকলে ও কর্মে আসক্ত না হন ও সৰ্ব্বসঙ্কল্প ত্যাগ করেন, সে কালে সে মনুষ্যকে ঘােগারূঢ় কহা যায় । যে যােগী জ্ঞান ও বিজ্ঞান এই দুয়ের বিবেচনা করিয়া তৃপ্তান্তঃকরণ, পরমাত্মার ধ্যানে নিহত ও জিতেন্দ্রিয় হয়েন এবং মৃত্তিকা, পাষাণ ও কাঞ্চন, ইহাতে তুল্য জ্ঞান করেন, তাহার নাম যুক্ত যােগী। [ ৮৯] এবং যে কালে যে ব্যক্তির চিত্ত কেবল আত্মাতেই স্থিরতর হয়, আর যে মনুষ্য সর্বকামনারহিত হয়েন, তাহাকে সেই কালে যুক্তঘষাগী কহা যায় *। হে অর্জুন, যে যােগী সৰ্ব্বভূতে আপনার সমান দর্শন করেন, এবং যাহার সুখ দুঃখে সমান ভাব, তাহার নাম পরমযােগী *। এই শাস্ত্রদৃষ্টিতে অপক্ষপাতী মহাশয়দিগের কি বােধ হয়, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরা যােগারূঢ়, যুক্ত ও পরমযােগী, এই তিনের কি হইতে পারেন, যােগারূঢ়ের লক্ষণ শ্রবণেই প্রধান ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ই মুদ্রিতনয়ন ও অধােবদন হইবেন, অধিকন্তু অনুচর- দিগের মুখানি দর্শনে ও অপ্রিয় বচনে একে উভয়ভ্রষ্ট, পুনৰ্বার স্থানষ্টই বা হয়েন, কি, কি করেন, কিছু বলা যায় না, ইহাতে অনুচর মহাশয়েরা ইহার কোন্ লক্ষণের লক্ষ্য হইতে পারিবেন আস্ফালনই বা কিরূপে করিবেন এবং কাকের বালকহস্তস্থিত পিষ্টক গ্রহণের ন্যায় অপ্রতিষ্ঠিত যােগর ফলই বা কিরূপে অনায়াসে গ্রহণ ক[ ৯০ ]রিবেন, অতএব ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ে জ্ঞানীর ফল, কি উভয়ষ্টের ফল, কোন্ ফল পাইতে পারিবেন, তা তাঁহারাই পাষণ্ডপীড়ন ৪৯ বিবেচনা করিবেন। এবং । প্রাপ্য পুণ্যকৃতাং লােকানুষি শাশ্বতীঃ সমা। চীনা শ্ৰীমতাং গেহে যােগভ্রষ্টোভিজায়তে। অর্থাৎ অপ্রতিষ্ঠিত যােগী যােগভ্রষ্ট হইলেও পুণ্যকারী লােকদিগের লােকে বহুকাল বাস করিয়া পশ্চাৎ শুচি অথচ শ্ৰীমান্ যে মনুষ, তাহার গৃহে জন্মেন, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের লিখিত এই ভগবদগীতার শ্লোকে যােগ শব্দে তাঁহার অভিপ্রেত কোন্ যােগ, জ্ঞানযােগ, কি কৰ্ম্মযােগ, কি সাংখ্যযােগ, যদ্যপি জ্ঞানযােগ তাহার অভিপ্রেত হয়, তথাপি এক্ষণে কহিতে লজ্জিত হইবেন, যেহেতু, তাহাতে পরমেশ্বরকে সাক্ষী করিয়া নিস্তার পাওয়া ভার, ৫২ পৃষ্ঠে ৪ পঙক্তিতে পূৰ্বেই তাহার বিস্তার করিয়াছি, কিন্তু কৰ্ম্ম- যােগ কহিতে সাহস করিতে পারেন, যেহেতু তাহারা অনাসক্ত হইয়া বৃথাকেশচ্ছেদন, সুরা- [ ৯১ ]পান, যবনীগমন, অবৈধ হিংসা ও শৈববিবাহ, ইত্যাদি অনেক সৎকৰ্ম্ম করিতেছেন, এবং যেমন সাংখ্যদর্শনে যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা ও সমাধি, এই অষ্টাঙ্গ যােগ লিখিয়াছেন, তেমন যদি কলির জ্ঞানীদিগের নিগূঢ় সাংখ্যদর্শনে মিথ্যাবচন, পরনিন্দা, বৈধ কৰ্ম্মত্যাগ, স্বস্ত্রীতে জলাঞ্জলি, অবৈধ হিংসা, বৃথাকেশচ্ছেদন, সুরাপান ও যবনীগমন, এই অষ্টাঙ্গ যােগ লিখিত থাকে, তবে সাংখ্যযােগ কহিতেও সাহস করিতে পারেন, কিন্তু তাহার ফল অপুণ্যকারী ব্যক্তিদিগের লােকে বহুকাল বাস করিয়া পশ্চাৎ মনুষ্যলােকে অশুচি অথচ অশ্ৰমান্ যে লােক, তাহার গৃহে জন্ম হইবে কি না? বস্তুতঃ ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের লিখিত ভগবদগীতার ঐ শ্লোকে যােগ শব্দের অর্থ আত্মসংযমযােগ, অথবা ধ্যানযােগ, যেহেতু ভগবদ্গীতার ষষ্ঠাধ্যায়ের সে শ্লোক, ষষ্ঠাধ্যায়ের নাম আত্মসংযমযােগ, অথবা ধ্যানযােগ, সেই [২] আত্মসংযমযােগ দুঃসাধ্য, বিষয়ান্তরসঞ্চারের লেশসত্ত্বেও তাহা সম্ভব হয় না, ভগবদ্গীতার আত্মসংযমযােগ দৃষ্টি করিলেই শিরঃকম্পন ও বাক্যবােধ হইবেক, অতএব যদি তাহারা আপনারদিগের সেই আত্মসংযমযােগও স্বীকার করিতে সাহস করেন, তবে তাহারদিগকে সাহসিক, অত্যন্ত প্রতারক, লজ্জালেশশূন্য, ছিন্ননাসিক ও ছিন্নকর্ণ কে না কহিবেন। এবং সকল ধর্মের মধ্যে আত্মতত্ত্বজ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, এই বিষয়ে পণ্ডিতাভিমানী মহাশয় যেমন এক মনুবচন প্রকাশ করেন, তেমন কলিযুগে কেবল দানের শ্রেষ্ঠত্ববােধক মনুর অন্য বচনও দৃষ্ট হইতেছে। যথা। তপঃ. পরং কৃতযুগে ত্রেতায়াং জ্ঞানমুচ্যতে। দ্বাপরে যজ্ঞ- মেবাহুদানমেকং কলৌ যুগে । অর্থাৎ সত্যযুগে তপস্যামাত্র, ত্রেতাযুগে জ্ঞানমাত্র, দ্বাপরে যজ্ঞমাত্র, এবং কলিযুগে কেবল দান শ্রেষ্ঠ হয় । এবং যেমন পণ্ডিতাভিমানী মহাশয়ের লিখিত মনুবচনে জ্ঞানের [৯৩] মােক্ষসাধনত্ব বােধ হইতেছে, তেমন ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর পূর্বলিখিত ভগবদগীতাদির অনেক শ্লোকেই কর্মেরও মােক্ষসাধনত্ব জ্ঞান হইতেছে। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—অন্যের সংসৰ্গাধীন জ্ঞানাবলম্বনের নিমিত্তে যত্ন করিলে তাহাকে গড্ডরিকাবলিকার ন্যায় লিখিয়াছেন অতএব•••এ দুয়ের বিবেচনা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা করিবেন। সংপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।—ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের তাৎপৰ্য্য এই যে, যদি কোন ব্যক্তি শাস্ত্র ও যুক্তির অনুসারে জ্ঞানপথ অবলম্বন করেন, অন্য ব্যক্তিও সেইং রামমােহন-গ্রন্থাবলী শাস্ত্র ও যুক্তি দৃষ্টি করিয়া জ্ঞানাবলম্বনের নিমিত্ত তদ্ব্যক্তির পশ্চাৎ২ গমন করেন, তবে সে স্থানে গড্ডলিকাবলিকা ন্যায়ের প্রয়ােগ কিরূপে হইতে পারে, যেহেতু শাস্ত্র ও যুক্তি অন্বেষণ না করিয়া অগ্রগামী ব্যক্তির পশ্চাৎগামী হইলে সে স্থানে গড্ডলিকাবলিকার ন্যায়ের প্রয়ােগ গ্রন্থকারেরা করিয়া থাকেন, ভাল, জিজ্ঞাসা করি, অন্য ব্যক্তি, জ্ঞানাবলম্বনের নিমিত্ত যে ব্যক্তির পশ্চাৎ২ গমন করেন, সে ব্যক্তির জ্ঞানিত্বাভিমান, এই তাৎপর্যের [৯৬] অনুসারে বােধ হয় কি না। যদ্যপি সেই অভিমানীর অভিমান যথার্থ ই হয়, তথাপি তাহার সে প্রকার জ্ঞান বানরের গললগ্ন মুক্তাহারের ন্যায় এবং পঞ্চদশীর বনানুসারে তাহাতে ও কুকুরেতে অবিশেষ হয় কি না? যথা পঞ্চদশ্যাং। বুদ্ধাদ্বৈতসতস্তত্বং যথেষ্টাচরণং যদি। শুনাং তত্ত্বদৃশাঞ্চৈব কো ভেদোহশুচিভক্ষণে । অর্থাৎ নিত্য অদ্বৈত যে পরমাত্মা, তাহার তত্ত্ব জ্ঞাত হইয়াও যদি জ্ঞানী যথেষ্টাচরণ করেন, তবে অশুচিদ্রব্য ভক্ষণ বিষয়ে তাহাতে ও কুকুরেতে ভেদ কি? এই শাস্ত্ৰদৃষ্টিতে জ্ঞানীরা কদাচ যথেষ্টাচরণ করেন না, কিন্তু মিথ্যাভিমানী মহাশয়েরা এই শাস্ত্রকে নিন্দার্থবাদ বলিয়া তুচ্ছ জ্ঞান করেন এবং যথেষ্টাচরণেও প্রবৃত্ত হয়েন, অতএব যদি কোন ব্যক্তি কুযুক্তি ব্যবহার ও অশাস্ত্র প্রমাণের অনুসারে কুকর্ম করে, তাহা দেখিয়া হিতাহিত কৰ্তব্য- কর্তব্য বিবেচনাশক্তিবিশিষ্ট বিশিষ্টসন্তানেরাও বিবেচনা না করিয়া [১৭] সেই কুকর্মপঞ্চাননের পশ্চাদ্বর্তী হয়, তবে সে স্থানে পণ্ডিতেরা গড্ডলিকাবলিকার ন্যায়ের প্রয়ােগ করিতে পারেন, কি সদযুক্তি সদ্ব্যবহার সংপ্রমাণের অনুসারে অবৈধ কর্মের ত্যাগ এবং সন্ধ্যাবন্দনাদি নিত্যকর্ম ও পিতৃমাতৃকৃত্য প্রভৃতি বৈধ কর্মের অনুষ্ঠান করিয়াছেন ও করিতেছেন, যে সকল পূৰ্ব পূৰ্ব্ব পুরুষেরা ও বিশিষ্ট মহাশয়েরা, তাহাদিগের সেই কৰ্ম্ম দেখিয়া বিশিষ্ট লােকেরা তৎপশ্চাদৰ্ত্তী হইলে সেই স্থানে গড্ডলিকাবলিকার ন্যায়ের প্রয়ােগ করিতে পারেন, তাহা বিজ্ঞ মহাশয়েরাই বিবেচনা করিবেন, এবং সর্বসম্মত প্রসিদ্ধ গ্রন্থে কোন উপাস্য দেবতার উপাসনার অপ্রাপ্তিতে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের সন্দেহ আছে, তাহার প্রশ্ন করিলেই সন্দেহ ভঞ্জন হইবেক, এবং দুর্জয় মানভঙ্গ প্রভৃতি কালিয়দমন যাত্রার অন্তর্গত, তাহার প্রমাণ, শ্ৰীভাগবতের দশম স্কন্ধে ৩২ দ্বাত্রিংশৎ অধ্যায়ে আছে এবং রামযাত্রা-[৯৮]র প্রমাণ হরিবংশে বর্জনাভবধে প্রশ্নোত্তরে আছে, যদি সন্দেহ হয়, তবে সেই পুস্তক দৃষ্টি করিলেই নিঃসন্দিগ্ধ হইবেন। মলিনচিত্ত ব্যক্তিদিগের দুর্জয় মানভঙ্গাদি দর্শনে চিত্তের মালিন্য হওয়া কোন্ আশ্চৰ্য্য, তাহাদিগের কন্যা ভগিনী ও পুত্রবধু প্রভৃতি দর্শনেও এ প্রকার হইতে পারে, যাহারা সুসংস্কৃত অথচ অন্যের মসংস্কার পরিষ্কার করণে সচেষ্ট, তাহাদিগের মসংস্কার হওনের প্রসক্তি কি, কিন্তু অসংস্কৃত কুসংস্কার ব্যক্তিদিগেরই মসংস্কার হওনের সর্বতােভাবে সম্ভাবনা এবং যে কোন ভাবে ঈশ্বরের প্রসঙ্গমাত্রেই পুণ্য জন্মে, তাহা শ্রীমদ্ভাগবতেও দৃষ্ট হইতেছে। যথা। কামাৎ ষােত্তয়াৎ নেহাৎ যথা' ভক্তেশ্বরে মনঃ। আবেশ্য তদঘং হিকা বহবঃ সদগতিং গতাঃ ॥ সাৱেত্যং পারিহান্য ন্তে এ হেলনমেব বা। বৈকুণ্ঠনামগ্ৰহণমশেষাধহরং বিহু। অর্থাৎ কামভাবে দ্বেষভাবে ভয়প্রযুক্ত স্নেহপ্রযুক্ত [৯৯] কিম্বা ভক্তিভাবে পরমেশ্বরে মননিবেশ পাষণ্ডপীড়ন ৫১ করিয়া অনেকেই নিস্পাপ হইয়া সদগতি প্রাপ্ত হইয়াছেন। সঙ্কেতে পরিহাসে তোভে কিম্বা অবহেলায় যদ্যপি ঈশ্বরের নাম গ্রহণ করে, তথাপি সৰ্বপাপক্ষয় হয়। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—আর ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী প্রথম প্রশ্নে লিখেন যে ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানীরা ...বাসনা করি। ইতি। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর। বহু বিজ্ঞ জনের অগােচর যে শাস্ত্র, তাহার নাম নিগূঢ় শাস্ত্র, শ্রুতি স্মৃতি প্রভৃতি শাস্ত্র প্রায় তাব্যক্তির[১০০]ই গােচর হয়, অতএব তাহাকে নিগূঢ় শাস্ত্র কিরূপে কহা যায়, ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের জিজ্ঞাসার এই তাৎপর্য যে, ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানী মহাশয়েরা যে নিগূঢ় শাস্ত্রের অনুসারে অভক্ষ্য ভক্ষণ অপেয় পান ও অগম্যাগমন ইত্যাদি সৎকর্মের অনুষ্ঠান করিতেছেন, সে নিগূঢ় শাস্ত্রের নাম কি ? কি দুঃসাহস, ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানী মহাশয়েরা শ্রুতিস্মৃতিপুরাণাদি প্রমাণের অনুসারে অতি সুগম কৰ্ম্মকাণ্ডে অশক্ত হইয়া অতি দুর্গম জ্ঞানকাণ্ডে প্রবৃত্তি করিতেছেন, যেমন একজন সামান্য পশুরক্ষণে অসমর্থ হইয়া হস্তিরক্ষণে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, কিন্তু পশ্চাৎ তাহার যে দুর্গতিশ্রবণ আছে, তাহারদিগেরাে বুঝি সেই দুর্গতি হইবেক। কি আশ্চর্য, সুরাচাৰ্য্য সুরাসঙ্গে পরম রঙ্গে অচৈতন্য হইয়া শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দ অদ্বৈত অবতারকে এবং তদুপাসক সকলকে অমান্য ও জঘন্য জ্ঞানে অম্লানবদনে অতিসামান্যের ন্যায় ব্যঙ্গ ও নিন্দা করিয়াছেন, তাঁহার পিতা ও [১০১] মাতা চিরকাল যে গৌরাঙ্গাবতারাদির সাধন ও তদভক্তগণের অধরামৃত পান করিয়া উদ্ধার হইয়াছেন, সেই আপন কুলদেবতাকে কুলমূষলের ন্যায় উক্তি করিয়াছেন, ধিকৃৎ এ নরাধমের কি গতি হইবেক, পিতামাতার বহুজাজ্জিত সুতপুঞ্জপুঞ্জের ফলেই এতাদৃশ সুসন্তান জন্মিয়া কুল উজ্জ্বল করে। অতএব নীতিশাস্ত্রে। একেপি কুবৃক্ষেণ কোটরস্থেন বহ্নিনা। দহতে তদ্বনং সৰ্ব্বং কুপুত্রেণ কুলং যথা। অর্থাৎ বনস্থ এক কুবৃক্ষেতে কোটরস্থ বহ্নির দ্বারা সেই সকল বন দগ্ধ করে, যেমন কুপুত্রে সমস্ত কুল দগ্ধ করে। পদ্মে। অবতারা হরেস্তত্তন্নাম ভক্তাংশ্চ নিন্দতি। অবমতি দেবর্ষে নারকী স জনােহধমঃ। অর্থাৎ হে নারদ, হরির অবতাবসকলকে অবতারের নামসকলকে, ও ভক্তবর্গকে যে নরাধম নিন্দা ও অবজ্ঞা করে, সে নারকী হয়। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী পণ্ডিতাভিমানী জানিতে বাসনা করিয়াছেন যে, গৌরাঙ্গাবতারাদির ভক্তগণে কোন্ শাস্ত্র- প্রমাণে [১২] কলিকিন্বিষনাশন তত্তদবতারের সাধন করেন, হায় একাল পর্যন্ত দুরদৃষ্টপ্রযুক্ত সৎসঙ্গাভাবে ভগবৎশাস্ত্র কর্ণকুহরেও প্রবিষ্ট হয় নাই, এ কারণ এতাদৃশ দুরাচার ও পাষণ্ড ব্যবহার দেখিতেছি এবং মিথ্যাজ্ঞানী অভিমানে ভজনসাধনবিহীনে বৃথা কালক্ষেপণ হইয়াছে। তথাচাং। গতং জন্ম গতং জন্ম গতং জন্ম নিরর্থকং। কৃষ্ণচন্দ্রপদদ্বন্দ্বভাজনং ভাবনং বিনা। সাধু পরমালাদিত হইলাম, বুঝিলাম যে, এক্ষণে এ নরাধমের প্রতিও শ্রীগৌরাঙ্গচন্ত্রের করুণাকটাক্ষপাত হইয়াছে, কি করুণাসাগর শ্রীগৌরাঙ্গাবতার, অনিচ্ছাপূর্বক অন্তঃকরণে স্মরণ করিলেও করুণা বিতরণ করেন। হে ধর্মজি বৈড়ালতি, এই পরমার্থসাধন প্রমাণ নানী পুরাণ ও সংহিতাদিতে আছে, তাহা যদ্যপি পাষণ্ড ভণ্ড পঞ্চমকারসাধক ত্ৰিপণ্ড নিকটে অবক্তব্য ও অপ্রকাশ্য হয়, তথাপি যুগ্নদাদির এক্ষণে ভগবৎ[১৩]শাস্ত্র শ্রবণে অধিকার হইতে ৫২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী পারে, যেহেতু স্বকীয় উত্তরাভাসে মনস্তাপে পাপের হ্রাস দেখিতেছি, এবং সুরভিসুরারসসিক রসনা হইতে শ্রীগৌরাঙ্গ এই পতিতপাবন নাম নির্গত হইয়াছে, অতএব সুরাচাৰ্য সম্প্রতি কিঞ্চিৎ ভগবংশাস্ত্ৰপ্ৰমাণ শ্রবণ করিতে যােগ্য হইতে পারেন। যথা। অনন্তসংহিতায়াং। ধৰ্মসংস্থাপনার্থায় বিহরিষ্যামি তৈরহং। কালে নষ্টং ভক্তিপথং স্থাপয়্যিাম্যহং পুনঃ। কৃষ্ণশ্চৈতন্যগগৗরাঙ্গেী গৌরচন্দ্র শচীসুতঃ। প্রভুর্গেীরহরির্গেীয়রা নামানি ভক্তিদানি মে ইত্যাদি। অর্থাৎ আমি সেই মূর্তিতে অবতীর্ণ হইব। কালেতে নষ্ট যে ভক্তিপথ, তাহার পুনৰ্বার সংস্থাপন করিব। আমার এই সকল নাম ভক্তিদায়ক হয়। কৃষ্ণ, চৈতন্য, গৌরাঙ্গ, গৌরচন্দ্র, শচীত, প্রভু, গৌরহরি ও গৌর। এবং এই কলিযুগে ভগবানের ভক্তরূপে অবতারের প্রমাণ পুরাণান্তরেও শ্রবণ করিতেছি। যথা মাৎস্যে। শৃণু ব্ৰহ্মবিদাং শ্রেষ্ঠ ত্রিজগমােহকারণং। দ্বাপরে যঃ স্বয়ং কৃষ্ণঃ [১০৪] সােহবধূতঃ কলৌ যুগে ॥ অর্থাৎ হে নারদ, ত্রিজগতের মােহকারণ শ্রবণ কর, যিনি দ্বাপরে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, তিনিই কলিযুগে অবতীর্ণ। ভগবদগীতায়াং। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহং পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাং। ধৰ্ম্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে। অর্থাৎ হে অর্জুন, যেই কালে ধৰ্ম্মের গ্লানি ও অধৰ্ম্মের বৃদ্ধি হয়, সেই কালে সাধুদিগের পরিত্রাণের ও পাপীদিগের বিনাশের নিমিত্ত এবং ধৰ্ম্মসংস্থাপনার্থ আমি যুগে অবতীর্ণ হই। ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের বিবেচনাসিদ্ধ এই হয় যে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য বিনা আর গত্যন্তর নাই, যেহেতু, এতাদৃশ পাপিষ্ঠকে জগাইমাধাইনিস্তারক ব্যতিরেকে আর কে পরিত্রাণ করিবেন, এবং নববিধ পাপকারী কি প্রকার উদ্ধার হইবেক এ প্রকার সন্দেহ করিবা না, যেহেতু ঈদৃশ মহামহাপাতকীয়রা উদ্ধা-[১৫]ােপায় জগদগুরু শ্রীমহাদেব, পদ্মপুরাণের উত্তর খণ্ডে আজ্ঞা করিয়াছেন। যথা। বিপ্রক্ষত্রিয়বিটশূদ্রা সরাষ্যজজারজা। কানীনগােলকশ্চৈব পিতুর্জাতাশ্চ ক্ষেত্ৰজাঃ। ব্রহ্মচারী গৃহস্থশ্চ বানপ্রস্থাে যতিস্তথা। যদ্যেতে পাপিনাে বিপ্র মহাপাতকিনােপি বা। উপপাতকিনশ্চাতিপাপিনাে হনুপাপিন। ভ্ৰষ্টাচারা পাষণ্ডা স্বস্বধৰ্ম্মবিবর্জিতা। জীবহত্যার ব্রাত্যা নিন্দকান্ডাজিতেন্দ্রিয়াঃ। পশ্চাৎ জ্ঞানসমুৎপন্ন আমােঃ কৃষ্ণপ্রসাদতঃ ॥ ততন্তু যাবজ্জীবন্তি হরিনামপরায়ণাঃ। শুদ্ধান্তেহবিলপাপেভ্যঃ পূৰ্বজেভ্যো হি নারদ। সংসারবিষয়ালিপ্তাঃ সৰ্বধৰ্ম্মবহিষ্কতাঃ। মুক্তাস্তে সর্বতন্তস্মাদুশ্চন্তো হরেজি। বিশেষতঃ কলিযুগে কৃষ্ণনামৈব কেবলং। ত্যক্ত। নাস্ত্যেব দেবর্ষে লােকস্য গতিরন্যথা। ব্ৰহ্মহা মদ্যপ স্তেয়ী হজ্ঞানাদগুরুতল্লগঃ। ভবার্ণবং তনেদন্তে কৃষ্ণনামপরায়ণঃ। ঋগ্বেদেহি যজুৰ্বেদ সামবেদোহপথৰ্ব্বণ। অধীনে যেনাে-[১০৬]ক্ত হরিরিত্যক্ষদ্বয়ং ' অর্থাৎ ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণ, বর্ণসঙ্কর, অন্ত্যজ, জারজ, কানীন, গােলক, পিতৃজাত, ক্ষেত্ৰজাত, ব্রহ্মচারী, গৃহী, বানপ্রস্থ ও যতি, যদি এ হার পাতকী, মহাপাতকী, উপপাতকী, অতিপাতকী, কি অনুপাতকী, এবং আচারভ্রষ্ট, পাষণ্ড, স্বধর্মচ্যুত, জীবহত্যারত, ব্রাত্য, নিন্দক ও অজিতেত্রিয় হন, কিন্তু পশ্চাৎ গুরু কৃষ্ণচন্দ্রের প্রসাদে জ্ঞান প্রাপ্ত হইলে পরে হরিনামপরায়ণ হইয়া যাবৎ কাল জীবন ধারণ করেন, হে নারদ, তঁাহারা তাবৎ কাল অনুক্ত পাষণ্ডপীড়ন সর্বপাপ এবং পূর্বোক্ত মহাপাতকাদি হইতে মুক্ত হন, এবং যদ্যপি সংসারবাসনাতে লিপ্ত ও সর্বধৰ্ম্মবহিষ্কৃত হন, তথাপি হরিনামােচ্চারণে তাহাদিগের সর্বপাপক্ষয় হয়, বিশেষতঃ কলিযুগে কৃষ্ণনাম বিনা জীবের অন্য গতি নাই, যদ্যপি মনুষ্য ব্ৰহ্মহা, মদ্যপ, চৌর, গুরুতল্পগও হয়, তথাপি হরিনামপরায়ণ হইলে অন্তকালে ভবসমুদ্রের পার হইতে পারে এবং যে ব্যক্তি, হরি এই অক্ষর[১০৭]দ্বয় উচ্চারণ করিয়াছে, সে চারি বেদ অধ্যয়ন করিয়াছে, অতএব এতদ্বচনােক্ত সৰ্বলক্ষণাক্রান্ত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তির এতদ্বচনােক্ত সৎপথাবলম্বন অবশ্যই কর্তব্য, নতুবা ঘাের থাকিতে ঘাের নরক হইতে কিরূপে নিস্তার পাইবেন *। ইতি * শ্ৰীমদ্ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষিবিরচিতে পাষণ্ডপীড়ননামক প্রত্যুত্তরে উন্মত্ত প্রলাপখণ্ডনাে নাম প্রথমােল্লাসঃ সমাপ্তঃ। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর দ্বিতীয় প্রশ্ন। যাহারা বেদ স্মৃতি পুরাণাক্ত স্বস্বজাতীয় শূদ্র ইতি নিদ্দিশে। পঞ্চমকারসাধক, বিতর্ককারক ও যবনবেশধারক মহাশয় ভ্রান্তি প্রযুক্ত উপযুক্ত বিতর্ক পরিত্যাগ করিয়া অনুপযুক্ত পঞ্চ বিতর্কের দ্বারা কেবল আপনার কুতর্কতাকিকতা ও বাচালতা প্রকাশ করিতেছেন। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।--ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী সদাচারসদ্ব্যবহারহীন..স্বদোষ দর্শনে অন্ধের যজ্ঞসূত্র ধারণ বৃথাও হইতে পারে । ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।—পণ্ডিতাভিমানী লিখেন যে, ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর দ্বিতীয় প্রশ্নে সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দে তাহার কি তাৎপৰ্য্য তা স্পষ্ট বােধ হয় না, এ কি অবােধ, ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর ঐ প্রশ্নে সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দের অব্যবহিত পূৰ্বেই স্বস্ব- জাতীয় এই শব্দ লিখিত আছে, তাহাতে স্বীয় জাতির সদাচার সদ্ব্যবহার এই তাৎপৰ্য্যই সুস্পষ্ট বােধ হইতেছে, তবে যে অনুপস্থিত অর্থের কল্পক ও পরদোষমাত্ৰদৰ্শক অভিমানী মহাশয় পূর্ববর্তী স্বস্বজাতীয় শব্দ দৃষ্টি না করিয়া উপাসকের সদাচার সদ্ব্যবহার এই তাৎপর্য বােধে কিম্ভুতকিমাকার নানাপ্রকার বিতর্ক করেন, তাহাতে তাহাকে কি পণ্ডিত কহা যায় ? ভাক্ততত্ত্ব[১১৬]জ্ঞানী মহাশয়দিকে এ অনুযােগ করাও অনুচিত, কারণ, স্বভাবের কাৰ্য্য অনিবাৰ্য, তঁাহারদিগের স্বভাবই এই যে, বৃক্ষের মূল স্পর্শ না করিয়া অগ্রে আরােহণ করা, যেমন তঁাহারা মােফলের যে সাধনরূপ বৃক্ষ, তাহার মূল যে কর্মকাণ্ড, তাহা স্পর্শ না করিয়া জ্ঞানকাণ্ডস্বরূপ অগ্র অবলম্বন করিয়া থাকেন, ভাল, জিজ্ঞাসা করি, তাহাদিগের এ বিবেচনাও নাই যে, কোন আচারের ব্যতিক্রম হইলে যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয়, উপাসকের আচারের ব্যতিক্রম হইলে বরং উপাসনারি ত্রুটি হইতে পারে, ইহাই যুক্তিসিদ্ধ হয়, যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয়, ইহাতে কি শাস্ত্র, কি যুক্তি, তাহা বৃহস্পতিবাে অগােচর, ব্রাহ্মণজাতির ত্রিকালীন সন্ধ্যোপাসনাদির অকরণে যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয়, ৫৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ইহা কে না কহিবেন, শাস্ত্র ও যুক্তি অধিক মাত্র। স্মৃতি। তত্র নান্ত্যাদয়রা যত ন স ব্রাহ্মণ উচ্যতে। অর্থাৎ ত্রিসন্ধ্যাতে যে ব্যক্তির আদর না [ ১১৭ ] থাকে, তাহাকে ব্রাহ্মণ কহা যায় না, অতএব উপাসকের সদাচার সদ্ব্যবহারের বিষয়ে নানা বিতর্করূপ অনর্থ বাক্য প্রয়ােগে কেবল ব্যয়কৰ্ত্তার ব্যয়াধিক্য ও মুদ্রাকারকের আয়াধিক্য বিনা কোন প্রয়ােজন দেখা যায় না। সদাচারের লক্ষণ মনু কহিয়াছেন। যথা। সরস্বতী- দৃষত্যোদেবনদ্যোৰ্যন্তরং। তং দেবনিম্মিত দেশং ব্ৰহ্মাবর্তং প্রচক্ষতে । তস্মিন্ য আচারঃ পাৰম্পৰ্য্যক্রমাগতঃ। বর্ণানাং সান্তরালানাং স সদাচার উচ্যতে । অর্থাৎ সরস্বতী দৃষদ্বতী এই দুই দেবনদীর মধ্যস্থ যে দেশ, তাহা দেবতার নিম্মিত, তাহার নাম ব্ৰহ্মাবৰ্ত্ত, সেই ব্ৰহ্মবর্তে ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের ও অন্যান্য জাতির পুরুষপরম্পরায় ক্রমে আগত যে জাতির যে আচার, সে জাতির সে আচারকে সৰ্বদেশেই সদাচার কথা যায়, সেই সদাচার ব্রাহ্মণের শৌচাচরণ বৈধ স্নান আচমন ও ত্ৰিসন্ধ্যোপাসন ইত্যাদি। তদ্বিপরীত আচার অসদাচার হয়। অহঙ্কার হিং-[১১৮]সাদ্বেষাদিরহিত, সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, ধার্মিক ও শাস্ত্রজ্ঞ যে মনুষ্য, তাহার নাম সাধু, সেই সাধুপরম্পরায় আগত অতি প্রাচীন যে ব্যবহার তাহার নাম সদ্ব্যবহার, সেই সদ্ব্যবহার বেদের ন্যায় প্রমাণ ও ধর্মের অনুমাপক হয়। অতএব স্মৃতি। ব্যবহাবােহপি সাধুনাং প্রমাণং বেদবম্ভবেৎ। অর্থাৎ সাধুদিগের যে ব্যবহার, সেও বেদের ন্যায় প্রমাণ হয়, যেহেতু, তঁাহারা সৰ্ব্বশাস্ত্রের পারদর্শী। কাত্যায়নঃ। ব্যবহারে হি বলবান্ ধৰ্ম্মন্তেনাবহীয়তে। অর্থাৎ সন্দেহস্থলে ও বিবােধস্থলে ব্যবহার বলবান্ হয়, যেহেতু সেই ব্যবহারের দ্বারা ধর্মের অনুমান করা যায়। পুরাণাদি পাঠস্থলে, নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরােত্তমং। দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব ততাে জয়মুদীরয়েৎ। এই শ্লোকের পাঠের ব্যবহার এবং নানা মুনিবচন সত্ত্বে বিধবার বিবাহের নিবৃত্তির ব্যবহার এবং মদ্যপানে ও হিংসায় প্রা-[১১৯]বর্তক প্রমাণ সত্ত্বেও তাহার অকরণের ব্যবহার ইত্যাদি সদ্ব্যবহার হয়, ইহার বিপরীত অসদ্ব্যবহার। অতএব বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই বিবেচনা করিবেন যে, যাহার ব্রাহ্মণ জাতি হইয়া বেদ স্মৃতি পুরাণ উল্লম্বনপূর্বক ব্রিসন্ধ্যোপাসনাদি পরিত্যাগ এবং অবৈধ হিংসা, সুরাপান, যবনীগমন ও শৈববিবাহাদি অদ্ভুত সৎকর্মের সর্বদা অনুষ্ঠান করেন, তাহাদিগের যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয়, কি যাহারা তিস্মৃতিপুরাণাদিতে শ্রদ্ধাপূর্বক ব্রিসন্ধ্যোপাসনাদি পরিত্যাগ করেন এবং অবৈধ হিংসা, সুরাপান, যবনীগমন ও শৈববিবাহ ইত্যাদি অপূর্ব সদনুষ্ঠানের কথাকে কর্ণকুহরেও স্থান দেন না, তাহাদিগের যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয় ? এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়, এক্ষণে কবিরাজ গোঁসাই প্রভৃতিকে গৌরাঙ্গসম্প্রদায়ের মহাজন কহিবেন না; কিন্তু তাহার পূর্বপুরুষেরা চিরকাল কহিয়াছেন ও তাহাদিগের আচার ও ব্যবহার[১২]কেও সদাচার সদ্ব্যবহার বলিয়া ব্যবহার করিতেন, তাহা দৃষ্ট ও শ্রুত আছেন এবং তেঁহ এতাদৃশ দিব্যজ্ঞানের অনুদয়কালে তাহাদিগকে মহাজন কহিতেন কি না, তাহা আপনিও জ্ঞাত আছেন। এবং বৈষ্ণবাদি পঞ্চোপাসকের উপাসনার কোন অংশে পাষণ্ডপীড়ন ক্রটি হইলেও তাহাদিগের যাহাতে শ্রেয় হয়, তাহা ৬৯ পৃষ্ঠে ৬ পঙক্তিতে পূর্বেই কহিয়াছি, কিন্তু যাঁহারা ব্রাহ্মণ জাতি হইয়া তজাতির অত্যাবশ্যক কর্মেও জলাঞ্জলি প্রদান করিয়াছেন, তাহারা স্বধৰ্ম্মচ্যুত, কি যাহারা আদরপূৰ্ব্বক তজ্জতির আবশ্যক কর্ম করিতেছেন, তাহারা স্বধর্মচ্যুত হন? এবং আপনার দোষদর্শন দূরে থাকুক, যাহারা পরের নিন্দা করিবার নিমিত্ত পরকীয় প্রশ্নের পূর্বাপর দর্শনেও অসমর্থ, তাহারা অন্ধ ও তাঁহাদিগের যজ্ঞসূত্ৰধারণ মিথ্যা, কি যাহারা শাস্ত্ৰত ও লােকত: স্বধর্মচ্যুত ও দুষ্কর্মান্বিত ব্যক্তি সকলের ঐহিক ও পারত্রিক ( ১২১ ] দুঃখ দর্শন করিয়া তাহাদিগকে সদুপদেশ করিতেছেন, তাহারা অন্ধ ও তাহাদিগের যজ্ঞসূত্ৰধারণ মিথ্যা হয় ? ভাক্ততত্বজ্ঞানীর উত্তর।ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী বৃদ্ধ ব্যাঘ্র বিড়ালতপস্বীর যে দৃষ্টান্ত সুবােধ লােকেরা জানিবেন। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগের এ বাক্যের এই তাৎপৰ্য যে, বৃদ্ধ ব্যাঘ্র ও মার্জার তপস্বীর দৃষ্টান্ত ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের প্রতিই শােভা পায়, যেহেতু, তাহারা বাহে লােক [১২৩] নিকটে সর্বদা আপনারদিগের শুদ্ধাচার, ধাৰ্মিকতা, সরলতা, ক্রিয়ানিষ্ঠতা, দয়া, অহিংসা প্রকাশ করিয়া অন্তরে তাহার বিপরীত আচরণ করেন, তাহারদিগের এ তাৎপৰ্য আশ্চৰ্য্য নহে, ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের বিষয়ে এ প্রকার অনুভব হইতে পারে, কারণ, স্বীয় স্বীয় স্বভাবের অনুসারেই ইতর ললাকে পরকীয় স্বভাবেরাে অনুভব করিয়া থাকে। তথাচ নীতিশাস্ত্রে। স্বকীয়েন স্বভাবেন পরেমিতরে জনাঃ। স্বভাবান পরিগৃহুন্তি ব্যবহারেণ পণ্ডিতাঃ । অর্থাৎ ইতর লােকেই স্বকীয় স্বভাবের দ্বারাই পরকীয় স্বভাবেরাে অনুভব করে, কিন্তু পণ্ডিতেরা সদসদ্ব্যবহারের দ্বারাই অন্যের স্বভাব বােধ করেন, যেমন ব্যভিচারিণী স্ত্রী ও পারদারিক পুরুষ তাবৎ স্ত্রীকে ও তাবৎ পুরুষকেই ব্যভিচারিণী ও পারদারিক অনুভব করিয়া থাকে, কারণ, তাহাদিগের এই নিশ্চয় আছে যে, সকলেরি চিত্ত- বিকার সমান, অতএব আমরাও যেরূপ ( ১২৪ ] ব্যবহার করি অন্যেও সেইরূপই ব্যবহার করিয়া থাকে, তবে বিশেষ এই যে, আমরা ব্যক্ত, অন্যে অব্যক্ত, কিন্তু সে অবােধেরা এ বিবেচনা করে না ও দেখে না যে, কোন প্রকারে গােপন করা যায় না যে ক্রোধ লােভ শােকালি, তাহার বশীভূত হইয়া কেহই কিং গর্হিত কৰ্ম্ম আচরণ না করেন, কেহ বা সেই ক্রোধাদিকে বশীভূত দাস করিয়া পরম সুখী হইতেছেন, অতএব ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের ওই সকল অদ্ভুত বাক্য শ্রবণ করিয়া ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা অসন্তুষ্ট নহেন, বরঞ্চ কৌতুকাবিষ্ট আছেন, মদ্যপানে মত্ত কিম্বা উন্মত্ত ব্যক্তিদিগের নৃত্যগীত ও অদ্ভুত বাক্য শ্রবণ করিয়া কোন জন কৌতুকাবিষ্ট না হন, কিন্তু বিজ্ঞ ব্যক্তিদিগের এই বিবেচনা করা আবশ্যক যে, যাহারা সন্ধ্যাবন্দনাদি পিতৃমাতৃশ্রাদ্ধাদি ত্যাগ, গঙ্গা তুলসী শালগ্রামাদিতে অশ্রদ্ধা ও সুরাপান যবনী- গমনাদিতে প্রবৃত্তি করেন তাহারদিগ্‌কে সদুপদেশ দ্বারা তদ্বিষয় [ ১২৫ ] হইতে নিবৃত্ত করান যে সকল ব্যক্তি, তাহাদিগের প্রতি বৃদ্ধ ব্যাঘ্র ও মার্জার তপস্বীর দৃষ্টান্ত উচিত হয়, কি, যাহারা বাহে কপটভাব প্রকাশের দ্বারা অবােধ লােক সকলকে প্রতারণা করিয়া রামমােহন-গ্রন্থাবলী বালকহস্তে আকাশের চন্দ্ৰসমর্পণের ন্যায় তাহাদিগকে বাক্যমাত্রেই অনায়াসে ব্রহ্মসাক্ষাৎকার করাইয়া এই সকল পূর্বোক্ত গর্হিত কর্মে পুনঃ পুনঃ প্রবৃত্তি জন্মান, তাহাদিগের প্রতি বৃদ্ধ ব্যাঘ্র ও মার্জার তপস্বীর দৃষ্টান্ত উচিত হয়? এবং পদ্মপুরাণের উত্তর খণ্ডে, স্বকপােলকল্পিত শাস্ত্রের দ্বারা মােহজনক, অথচ বিষ্ণু ও বৈষ্ণবের নিন্দক যে ব্যক্তি, তাহার নরক শ্রবণ হইতেছে। যথা। তিস্মৃতিসদাচারবিহিতং কর্ম শাশ্বতং। স্বং স্বং ধর্মং প্রযত্নেন শ্রেয়ােহথীহ সমাচরেৎ। স্ববুদ্ধিরচিতৈঃ শাস্ত্রৈমোহয়িত্ব জনং নরাঃ। বিষ্ণুবৈষ্ণবয়ঃ পাপা যে বৈ নিন্দা প্রকুৰ্বতে। তেন তে নিরং যান্তি যুগানাং সপ্তবিংশতিং। অর্থাৎ শ্রুতি স্মৃতি সদাচারবিহিত যে কৰ্ম্ম, [ ১২৬ ] সেই নিত্য হয়, আপনার মঙ্গলার্থ লােক যত্নপূৰ্ব্বক স্ব স্ব ধর্মের অনুষ্ঠান করিবেন, স্ববুদ্ধিরচিত শাস্ত্রের দ্বারা লােকসকলকে মুগ্ধ করিয়া যে পাপিষ্ঠ নরাধমেরা বিষ্ণু ও বৈষ্ণবের নিন্দা করে, সে পাপিষ্ঠেরা সেই পাপে সপ্তবিংশতি যুগ পর্যন্ত নারকী হয় * পরন্তু, বৈষ্ণবের তিলক সেবনে ও শৈবাদির ত্রিপুণ্ড ধারণে কিঞ্চিৎকাল বিলম্বে কি দুরদৃষ্ট এবং ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানীদিগের নৃতন ব্রাহ্ম্য বস্ত্র ও চৰ্ম্মপাকা, যাহা যবনদিগের ব্যবহাৰ্য্য ও যে বস্ত্ৰসকলকে যবনেরা ইজের ও কাবা প্রভৃতি কহিয়া থাকে ও যে চৰ্ম্মপাদুকার যাবনিক নাম মােজা, সেই বস্ত্র পরিধানে ও সেই চৰ্ম্মপাদুকা বন্ধনে দণ্ডদ্বয় দণ্ডচতুষ্টয় কাল বিলম্বেই বা কি শুভদৃষ্ট জন্মে, তাহার শ্রবণের প্রত্যাশায় রহিলাম। অধিকন্তু অদ্য পরমালাদিত হইলাম, কারণ, অনেক কালের পরে অনেক অন্বেষণে এক্ষণে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহা-[ ১২৭ ]শয়দিগের নিগূঢ় শাস্ত্র দর্শন করিলাম, যে নিগূঢ় শাস্ত্রে নির্ভর করিয়া তাহারা শৈববিবাহ, যবনীগমন ও সুরাপানাদি অনেক সৎকর্মের অনুষ্ঠান এবং ছাগীমুণ্ড, বহতুণ্ড, হংসা ও কুকুটা ভােজন করিয়া থাকেন। তাঁহাদিগের সেই নিগূঢ় শাস্ত্র এই। যেনােপায়েন দেবেশি লােক: শ্রেয়ঃ সমশ্ন তে। । তদেব কাৰ্যং ব্রহ্মজ্ঞৈরিদং ধৰ্মং সনাতনং। এই নিগূঢ় শাস্ত্রের যথার্থ স্পষ্টার্থ এই, যে উপায় লােকের শ্রেয়স্কর হয়, ব্রহ্মজ্ঞানীদিগের তাহাই কর্তব্য, তাহাদিগের সেই ধৰ্মই নিত্য। এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগের কল্পিত নিগুঢ়ার্থ এই যে, ব্রহ্মজ্ঞানীরা বাহে বেশের কিম্বা আলাপের কিম্বা ব্যবহারের দ্বারা যাহাতে আপনাকে শুদ্ধসত্ত্ব ও সিদ্ধপুরুষ জানিতে পারে, তাহা করিবেন না, কিন্তু তন্ত্রশাস্ত্রোক্ত মদ্যমাংস ভােজনাদি গহিত কৰ্মই করিবেন, যাহাতে অনেকে অশ্রদ্ধা করে, এই সকল কথা শুনিয়া হাসি[ ১২৮ ]ও পায় দুঃখও হয়। ভাল, জিজ্ঞাসা করি, যদি এই সকল গর্হিত কর্ম করিলেই লােক ব্ৰহ্মজ্ঞানী হয়, তবে হাড়ি ঢােম চাড়াল ও মুচি ইহারা কি অপরাধ করিয়াছে, ইহাদিগকেও কেন ব্ৰহ্মজ্ঞানী না কহা যায়, তাহারা ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়সকল হইতেও এই সকল কর্মে বরং অধিকই হইবেক, নন কোন মতেই হইবেক না, অধিকন্তু তাহারা রাজপথের মধ্যে কত প্রকার হাস্য- কৌতুক নৃত্যগীত অঙ্গভঙ্গ রঙ্গরস করে, কেহ বা পীত্ব পীত্ব পুনঃ পীত্ব পপাত ধরণীতলে, এই তন্ত্রোক্ত শ্লোকের অযথার্থ যথাশ্রুত অর্থ দর্শন করায়, অর্থাৎ পান করিয়া পান করিয়া পুনর্বার পান করিয়া রাজপথের প্রান্তে বস্তুহিত, ধূল্যবলুষ্ঠিত, আলুলায়িতকেশ, মৃতবেশ হইয়া পথ লােসকলকে উপস্থ দর্শন করাইয়া ধ্যানস্থ হয়, কেহ বা এই প্রকার পরম ব্রহ্মে লীন হয় যে, পাষণ্ডপীড়ন কুকুরাদিতে স্বগামাংস ভােজন করিলেও ধ্যানভঙ্গ হওয়া [ ১২৯ ] দূরে থাকুক, ভঙ্গ করে , অতএব তাহাদিগকে পরম ব্রহ্মজ্ঞানী কহিলেও কহা যায় ইতি শ্ৰীমদ্ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষিবিরচিতে পাষণ্ডপীড়ননামক প্রত্যুত্তরে সন্দেহভঞ্জনাে নাম দ্বিতীয়ােল্লাসঃ সমাপ্ত ॥ ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষার তৃতীয় প্রশ্ন। ব্রাহ্মণ সজ্জনের অবৈধ হিংসাকরণ •••নামুত্রাপি সুখং কচিৎ। দুষ্টান্তঃকরণ দুর্জনদিগের আন্তরিক ভাব বােধ করিতে বুঝি বিধাতাও ভগ্নোদ্যম, তাহাতে সরলান্তঃকরণ সজ্জনেরা সে ভাব কিরূপে বােধ [ ১৩০ ] করিতে পারেন, দেখ, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়, দোষের সান্নিপাতিক বিকারগ্রস্ত হইয়া মদ্যমাংসাদি ভােজনের লােভে ও বিকার শান্তির আশায় এক্ষণে বামাচারস্বরূপ ঔষধ পান করিতেছেন, যেমন কোন সান্নিপাতিক বিকারের রােগী রােগশান্তির বাঞ্ছায় ও কুপথ্য ভােজনের আকাঙ্ক্ষায় বিষপ্রয়ােগ করে, কিন্তু তাহাতে রােগ শান্তির বিষয় কি, কেবল বিষজ্বালায় প্রাণ যায়, অধিকন্তু আত্মঘাতীও হইতে হয়, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগেরাে তাহাতে সে দোষের শাস্তি দূরে থাকুক, বরং দ্বিগুণ বৃদ্ধিই হইবেক, অধিকন্তু ছিলেন গুপ্ত ভক্ত বামাচারী ও ব্যক্ত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী, এক্ষণে হইলেন ব্যক্ত ভাক্ত বামাচারী, তাহার অভিপ্রায় এই যে, লােকে জ্ঞানীও কহিবেক, অথচ কৌল ধর্মপ্রযুক্ত কেহ নিন্দা করিবেক না, স্বচ্ছন্দ মদ্য মাংস ভােজনাদিও করা যাইবেক, যেমন, বুদ্ধিমতী বেশ্যা যৌবনাবস্থার অভাবে দুরবস্থার ভয়ে যৌবনের [ ১৩১ ] হ্রাসােপক্রমেই বৈষ্ণবী হয়, তাহার মনের মানস এই যে, বৈষ্ণবী বলিয়া কেহ অশ্রদ্ধা করিবেক না, ভিক্ষাবৃত্তি অবাধে হইবেক, বেশ্যাবৃত্তিও নির্বিঘ্নে চলিবেক, আৰ্ত্ত হইলে বুদ্ধিভ্রংশ হইয়া লােকের কিং দুরবস্থা না হয়, হায় এ কি অদৃষ্ট, এত কষ্ট, তথাপি না তিকুল, না বৈষ্ণবকুল, এ কুল ও কুল, দুই কুল নষ্ট, যে পথে যান সেই পথেই অনিষ্ট, এক পথে সিংহ, এক পথে ব্যা, পুনর্বার যে উভয়ভ্রষ্ট সেই উভয়ভ্রষ্ট। অতএব ভগবদগীতা কহেন যে, জীব যত্নপূৰ্ব্বক স্বয়ং আত্মার উদ্ধার করিবেন, আত্মাকে কদাচ অবসন্ন করিবেন না, সুকৃতির দ্বারা আত্মাই আত্মার বন্ধু ও দুষ্কৃতির দ্বারা আত্মাই আত্মার রিপু হয়েন। যথা। উদ্ধরোত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ। আত্মৈব হাত্মনাে বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ । ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—ধর্মাধর্ম খাদ্যাখাদ্য শাস্ত্রবিহিত হইয়াছে.••অপূর্বধৰ্ম্ম- সংস্থাপনাকাজী হইবেন। ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।—ধর্মকে পুনঃ পুনৰ্বার নমস্কার, ধর্মের কি মহিমা অপার, বুঝি ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের মনস্কাম পূর্ণ হয়, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের দুর্বোধ দূরে যায়, কি মধুর বচন শুনিতে পাই, অন্তঃকরণে পুলকিত হই, দুষ্ট ভুজঙ্গের প্রচণ্ড তুণ্ড হইতে কি অমৃত নির্গত হয়, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের বিষময় বদন হইতেও দেবপূজা পিতৃষজ্ঞ নিবেদন ৫৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ও অপ্রেক্ষিত মাংসের অভােজন ইত্যাদি বাঙময় সুধার[১৩৫]সের ক্ষরণ হয়, কর্ণকুহর শীতল হইল, সকল দুঃখ দূরে গেল, কিন্তু মনের সন্দেহ দূর হয় না, বিশ্বাসও জন্মে না, দুষ্ট লােক তিরস্কৃত হইলে ধৰ্মকাহিনী শ্রবণ করায় যাহাতে ধাৰ্মিকরূপে লােকের জ্ঞান হয়। সে যাহা হউক, নানারূপধারী উদররি ভাবামাচারী মহাশয় কহেন যে ধৰ্ম্ম- সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা কিরূপে জানিয়াছেন যে, আমরা অনিবেদিত মাংস ভােজন ও পরমহর্ষে ছেদন করিয়া থাকি, তাহারা কি তৎকালে উপস্থিত হইয়া তৎকৰ্ম্ম করিতে দর্শন করিয়াছেন। এ স্থানে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর, কি ভ্রান্তি, দর্শনের অপেক্ষা কি, দশের মুখে কে হস্ত প্রদান করে, দশের বচনই সত্যাসত্যের প্রমাণ হয়, অতএব সাক্ষিস্থলে ও বিচারস্থলে অনেকের বাক্যের প্রামাণ্য দৃষ্ট হইতেছে, কি শুভ, কি অশুভ, দশের মুখ হইতে যাহা নির্গত হয় তাহা কদাচ অন্যথা হয় না, ধৰ্মই আবির্ভূত হইয়া দশের মুখ হইতে সুরব ও কুরব প্রকাশ করেন, [১৩৬] দেখ মহাকবি কালিদাসের পারদাদোষ কোন্ ব্যক্তির দৃষ্ট হইয়াছে, কিন্তু অদ্যাপি লােকে খ্যাত আছে, এবং কোন্ মদ্যপ, পারদারিক ও চোরই বা সাক্ষী করিয়া মদ্যপানাদি করিয়া থাকে, কোন্ প্রকৃত ধাম্মিকই বা আপনার ধর্মানুষ্ঠান আপনি প্রকাশ করিয়া থাকেন, তবে ঐ উত্তম ও অধমের সুখ্যাতি ও কুখ্যাতি কিরূপে প্রকাশ হয়, কেই বা প্রকাশ করে। এবং যিনি তাব্যক্তির পিতৃযজ্ঞ দেবজ্ঞ নিবৰ্ত্তক, তাঁহার প্রেক্ষিত ও নিবেদিত মাংস ভােজনই বা কোন অবােধ বােধ করিবেক, অতএব ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা সত্যকে জলাঞ্জলি দিয়াছেন, কি ভাবামাচারী মহাশয় দিয়াছেন, তাহা অভাক্ত বামাচারী মহাশয়েরাই বিবেচনা করিবেন। বস্তুতঃ প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানীর হিংসামাত্রই অবিহিত হয়, কিন্তু যে২ কৰ্ম্মে হিংসার বিধি আছে, সেই সকল কর্মে তাহাদিগের প্রতি অনুকল্পের বিধান করিয়াছেন, অ| ১৩৭]তএব যাহারা তত্ত্বজ্ঞানী অভিমান করেন, অথচ ঐ বিধান উল্লম্ফন করিয়া আত্মপুষ্টি কারণ পশুছেদনেও তৎপর হয়েন, তাহারা নিজ কর্মদোষে সুতরাং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী এবং পশুছেদনের পাপে নরকগামী অবশ্যই হইবেন। মনুঃ। মধুপকে চ যজ্ঞে চ পিতৃদেবতকর্মণি। অজৈব পশবাে হিংস্যা নান্যত্ৰেত্যব্রবীন্মঃ। গৃহে গুরাবরণ্যে বা নিবসন্নাত্মবান্ দ্বিজঃ। নাবেদবিহিতাং হিসামাপদ্যপি সমাচরেৎ। অর্থাৎ মধুপর্ক, যজ্ঞ, পিতৃকৰ্ম্ম ও দৈব কৰ্ম্ম, এই সকল কর্মেই পণ্ডহিংসা করিবেক, অন্যান্য কর্মে করিবে , মনু এই আজ্ঞা করিয়াছেন। এবং জ্ঞানবান ব্রাহ্মণ স্বগৃহে গুরুগৃহে কিম্বা অরণ্যে বাস করতঃ আপদকালেও বেদবিহিতভিন্ন হিংসা করিবেন না। এই মনুবচনে অবৈধ হিংসার বিষয় কি, কিন্তু অবৈধ হিংসার নিষেধে প্রকারান্তরে বৈধ হিংসামাত্রের প্রাপ্তি হইতেছে, অতএব অগস্ত্যসংহিতা ও মহাকালসংহিতা তঁাহার[১৩৮]দিগের বৈধ হিংসাকাে নিষেধ করিয়া হিংসার স্থলে তাহার অনুকল্প বিধান করিতেছেন। অগত্যসংহিতা। হিংসা চৈব ন কর্তব্য বৈধহিংসা চ রাজসী। ব্রাহ্মণৈঃ সা ন কর্তব্যা যতস্তে সাত্ত্বিক মতাঃ অর্থাৎ কি বৈধ কি বৈধ কেহ হিংসাই করিবে না, বৈধ হিংসা যদ্যপি কর্তব্য হয়, তথাপি সে বাসী, পাষণ্ডপীড়ন অতএব ব্রাহ্মণেরা বৈধ হিংসাও করিবেন না, যেহেতু তাহারা সাত্ত্বিক, এ স্থানে কোন নিপুণমতি কহেন যে, ব্ৰহ্মজ্ঞানীর সর্বশাস্ত্রেই অহিংসা দর্শনে এবং ব্রাহ্মণ জাতির শাস্ত্রান্তরে বৈধ হিংসার বিধি শ্রবণে এই বচনে ব্রাহ্মণ শব্দে ব্রাহ্মণ জাতি নহে, কিন্তু ব্ৰহ্মকে জানেন, এই ব্যুৎপত্তির অনুসারে ব্রাহ্মণ শব্দে ব্ৰহ্মজ্ঞানী, এই অর্থ সুতরাং বক্তব্য হয়। মহাকালসংহিতা। বানপ্রন্থে ব্রহ্মচারী গৃহস্থাে বা দয়াপর। সাত্ত্বিকে ব্রহ্মনিশ্চ যশ্চ হিংসাবিবর্জিত। ন দঃ পশুবলিমনুকল্পং চর্যপি। অর্থাৎ বানপ্রস্থ, ব্রহ্মচারী [ ১৩৯ ] আর দয়াবান্ গৃহস্য, এবং সাত্ত্বিক, ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ও হিংসাবজ্জিত ব্যক্তি, এহারা পশুবলিদান করিবেন না, কিন্তু যে স্থানে বলিদানের আবশ্যকতা হয়, সে স্থানে অনুকল্পের আচরণ করিবেন। এই সকল শাস্ত্রের উল্লম্বনপূর্বক এক জীব, অপর জীবের জীবন, এই ঔদরিকদিগের সম্মত শাস্ত্রে নির্ভর করিয়া যাহারা উদরদরী সম্ভরণার্থ পশুছেদন করেন, সে ঔদরিক পাপিষ্ঠদিগের প্রতি পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ কহিতেছেন। পদ্মপুরাণে উত্তরখণ্ড। ভূতানি যেই হিংসন্তি জলস্থল- চরাণি চ। জীবনার্থং হি যান্তি কালসূত্ৰগতিং নরাঃ । মাংস ভােজনাতত্র পূয়শােণিতপায়িন। মজ্জন্তশ্চাবশা: পঙ্কে দষ্টাঃ কীটৈরধােমুখাঃ। অর্থাৎ এই মর্ত্যলােকে যাহারা অজ্ঞান অল্পবল জলচর কিম্বা স্থলচর যে কোন পশুকে মদমত্ত বলদপিত হইয়া আত্মপুষ্টির নিমিত্ত বধ করে, সে ব্যাধের কালসূত্ৰগতি পায় অর্থাৎ নরকা[ ১৪০ ]ন্তে জন্ম, মরণান্তে নরক, এইরূপে পুনঃ পুনঃ সংসারেই ভ্রমণ করে, এবং সেই মাংসের ভােজনে পূরশােণিতপায়ী হয় অর্থাৎ পূজ ও রক্তের পান করে এবং তাহারা অবশ ও অধােমুখ হইয়া মহাপঙ্কে মগ্ন হয়, কীটেরা সর্বদা দংশন করে। ব্রহ্মবৈবর্তে প্রকৃতিখণ্ড। লােভাৎ ভক্ষণার্থায় জীবিনং হন্তি যাে নরঃ। মজ্জকুণ্ডে বসেৎ সােপি তদ্ভাজী লক্ষবৎসর। অর্থাৎ যে পাপিষ্ঠ জীব লােভপ্রযুক্ত আত্মভক্ষণার্থ অন্য জীবকে বধ করে, তাহার ও তভোজীর মকুণ্ডে লক্ষ বৎসর পর্যন্ত বাস হয়। এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় কহেন যে, ধৰ্মসংস্থাপনা- কাঙ্ক্ষীরা পরমেশ্বরকে চৌৰ্য্য পারদাৰ্য দোষের অপবাদ দিয়া থাকেন, এ অতি আশ্চৰ্য্য, কারণ, তাহারাই ভগবান আত্মারাম শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রকে ব্রজগােপিকাদিগের দধিদুগ্ধনবনীতচোর, বসনতস্কর ও পারদারিক বলিয়া চিরকাল ব্যঙ্গ বিদ্রুপ উপহাস করিয়া আসিতেছেন, এক্ষণে বুঝি ধর্মসং[ ১৪১ ]স্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের প্রতি দোযােল্লেখের অন্য কোন উপায় দর্শন না করিয়া অগত্যা এই অপবাদ দিতেছেন, ভাল, এও অত্যন্ত আহাদের বিষয়, বুঝিলাম যে, তাঁহাদিগের দুর্বোধ দূর হওনের উপক্রম হইতেছে, যেহেতু তাহার পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের চৌৰ্যপারদাৰ্য্যকে এক্ষণে অযথার্থবােধ করিতেছেন। এবং শ্রীভগবানের জনন ও মরণ কি প্রকারে অযথার্থ কহা যায়, যেহেতু ভগবদগীতায় শ্রীভগবান্‌ই কহিতেছেন। যথা। ভগবানুবাচ । বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মনি তব চার্জন। বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মনি তব চাৰ্জ্জুন। তান্যহং বব সৰ্বাণি ন ত্বং বেখ পরন্তপ । অর্থাৎ ভগবান্ কহিতেছেন, হে অর্জুন, তােমার ও আমার বহু জন্ম গত হইয়াছে, কিন্তু তুমি মায়ার বশীভূত হইয়া পূৰ্ববৃত্তান্ত তাবৎ বিস্মৃত, আমি মায়ারহিত, এ কারণ আমার সকল স্মরণ হয়। এই শ্লোকে শ্রীভগবানের জন্ম বােধ রামমােহন-গ্রন্থাবলী অতএব হইতেছে। জাতস্য হি ধ্ৰুবাে মৃত্যুধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ। তস্মাদপরিহাহেৰ্থে ন ত্বং [ ১৪২ ] শােচিতুমহসি । অর্থাৎ জাত ব্যক্তির মৃত্যু ও মৃত ব্যক্তির জন্ম অবশ্যই হয়, হে অর্জুন, অতএব অবশ্য ভবিতব্য বিষয়ে শশাকের বিষয় কি। এই শ্লোকে জন্ম হইলেই মৃত্যু হয়, ইহা অবধারিত হইয়াছে। বস্তুতঃ। অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সৰ্বমিদং ততং। বিনাশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কৰ্ত্ত, মহতি । নাহং প্রকাশঃ সৰ্বস্য যােগমায়াসমাবৃতঃ। মূঢ়াহয়ং নাভিজানাতি লােকো মামজমব্যয়ং। অর্থাৎ যে ব্ৰহ্ম কর্তৃক এই সকল জগৎ বিস্তৃত হইয়াছে, তাহাকে অবিনাশি জানহ,অক্ষয় যে ব্ৰহ্ম, তাহার বিনাশ করিতে কেহ যােগ্য নহেন। আমি সকলের নিকটে প্রকাশ নহি অর্থাৎ ভক্তের নিকটেই প্রকাশ পাই, জন্মমৃত্যুরহিত আমাকে যােগ মায়াতে আবৃত মূঢ় লােক বিশেষরূপে জানে না, এই ভগবদগীতার শ্লোকে শ্রীভগবানের জন্মমৃত্যুহিত্য বােধ হইতেছে। এবং বিষ্ণুপুরাণে [ ১৪৩] যােগমায়ার প্রতি শ্রীভগবদবাক্য। যথ। প্রাবৃটকালে চ নভসি কৃষ্ণাষ্টম্যাং মহানিশি। উৎপৎস্যামি নবম্যাঞ্চ প্রসূতিং ত্বমবাসি । অর্থাৎ বর্ষাকালে শ্রাবণ মাসে কৃষ্ণাষ্টমীতে মহানিশায় আমি উৎপন্ন হইব, তুমি নবমীতে জন্মগ্রহণ করিবে। অগস্ত্যসংহিতায়াং। চৈত্রে মাসি নবম্যান্তু জাতত রামঃ স্বয়ং হরিঃ। অর্থাৎ চৈত্র মাসে শুক্লনবমীতে স্বয়ং হরি, রামরূপে জাত হইয়াছিলেন। এই বিষ্ণুপুরাণের ও অগস্ত্যসংহিতার বচনে পরমেশ্বরের জন্ম শ্রবণ হইতেছে। এবং মহাভারতে ও রামায়ণে তাহার মৃত্যুর বিবরণও দেখিতেছি। পরমেশ্বরের জন্ম মৃত্যু শব্দ প্রয়ােগ লােকের ব্যাবহারিক মাত্র, কিন্তু বাস্তব নহে, ফলত: পরমেশ্বরের আবির্ভাব ও তিরােভাবকেই লােকে জন্মমৃত্যু কহিয়া ব্যবহার করেন, যেমন, সৰ্ব্বদা বিদ্যমান সুর্যের যে দর্শন ও অদর্শন, তাহাকেই উদয় ও অস্ত কহিয়া ব্যবহার করা যায় । অতএব অ-[ ১৪৪ গস্ত্যসংহিতায়াং। আবিরাসীৎ সকলয়া কৌশল্যায়াং পরঃ পুমা। অর্থাৎ সেই পরম পুরুষ, ফলতঃ পরমেশ্বর, কৌশল্যাতে কলার সহিত আবির্ভূত হইয়াছিলেন। মার্কণ্ডেয়পুরাণে। দেবানাং কার্যসিদ্ধমাবির্ভবতি সা যদা। উৎপন্নেতি তদা লােকে সা নিত্যাপ্যভিধীয়তে । অর্থাৎ সেই ভগবতী, যে কালে দেবগণের কাৰ্যসিদ্ধার্থ আবির্ভূত হয়েন, সেই কালে সেই ভগবতী নিত্যা হইলেও তাহাকে লােকে উৎপন্না করিয়া কহেন। তথেত্যুক্ত। ভদ্রকালী বভূবাহিতা নৃপ। অর্থাৎ হে নৃপ, সেই ভদ্রকালী ভগবতী যােগমায়া, দেবগণকে অভীষ্ট বর প্রদান করিয়া অন্তর্হিত হইয়াছিলেন। স্মৃতি। উদয়াস্তমনাখ্যং হি দর্শনাদর্শন রবে। অর্থাৎ সৰ্ব্বদা বিদ্যমান রবির যে দর্শন ও অদর্শন, তাহার নাম উদয় ও অন্ত। ইহাতেও যদি ঐ ব্যঙ্গকৰ্ত্তার ব্যঙ্গের সর্বাঙ্গ ভঙ্গ না হয়, তবে তাহাকেই জিজ্ঞাসা করি যে, তিনি মনুষের [১৪৫ ] জন্ম মৃত্যু কহিয়া থাকেন কি না? পরমার্থ বিবেচনায় মনুষের জন্ম মৃত্যু কহা যায় না। অতএব অর্জুনের প্রতি শ্রীভগবদবাক্য। ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিয়ায় ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়। অজো নিত্যঃ শাশ্বতােবয়ং পুরাণে ন হতে হতমানে শরীরে। বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহাতি নবােহপরাণি। তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী। অর্থাৎ এই আত্মা নিত্য ॥

পাষণ্ডপীড়ন উৎপত্তিরহিত ও আদিপুরুষ, অতএব তেঁহ না জন্মেন ও না মরেন, না জন্মিয়াছেন ও না জন্মিবেন এবং শরীরনাশে তাহার নাশ হয় না, যেমন, মনুষ্য পুরাতন বসন ত্যাগ করিয়া নৃতন বস্ত্র পরিধান করে, তেমন, আত্মা জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করিয়া অন্য দেহে গমন করেন। কি কৌতুক, নগরান্তবাসী মহাশয়ের কর্মকাণ্ড ললাপের সময়ে জ্ঞানকাণ্ডে নির্ভর, আর অভক্ষ্য ভক্ষণাদির সময়ে আগমে নির্ভর, কখন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী, কখন বা ভাবামা-[ ১৪৬ ] চারী, বুঝি বা ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী সকলকে ও তেঁহ সেই প্রকার কৌতুকাবিষ্ট ও অবিবেচকশ্রেষ্ঠ করেন, যেমন, এক মূখ চতুর মনুষ্য পণ্ডিতমণ্ডলীর মধ্যে উপস্থিত হইয়া পণ্ডিতমণ্ডলীমণ্ডিত সভাপ্রবিষ্ট নিমিত্ত বিশিষ্ট বােধে পণ্ডিতবর্গ কতৃক তুমি কোন্ বিদ্যাব্যবসায় কর এই প্রকার জিজ্ঞাসিত হইলে আপাতত আপনার মূর্খতা প্রকাশভয়ে চতুরতা প্রকাশ করিলেন, তদ্দেশে দার্শনিকের বাহুল্যপ্রযুক্ত কহিলেন যে, আমি স্মৃতিশাস্ত্র- ব্যবসায়ী, তাহাতে লজ্জিত হইয়া তদ্দেশে বেদান্তের প্রচরােপ প্রচার না থাকাতে ধূর্ততা প্রকাশ করিলেন যে, আমি বেদান্তী, তাহাতেও তিরস্কৃত হইয়া পলায়নের উপক্রমে কহিলেন যে, আমি তন্ত্রশাস্ত্র ব্যবসায় করিয়া থাকি, তাহাতেও অপমানিত হইয়া অগত্যা অধােমস্তকে অতিকষ্টে কৃষ্ণমুখে কহিলেন, আজ্ঞা আমি কৃষিকৰ্ম্ম করিয়া থাকি, এই বাক্য শ্রবণ করিয়া পণ্ডিতব[ ১৪৭ ]র্গের কৌতুকাবিষ্টে মুক্তকণ্ঠে প্রচণ্ড উপহাস্য করিয়াছিলেন যে, তুমি কৃষিকর্মের উপযুক্ত পাত্র বট, তাহা বাক্যের ও আকারের দ্বারাই বােধ হইতেছে, শরীরটিও বিলক্ষণ হৃষ্টপুষ্ট দেখিতেছি, তুমি বুঝি কৃষিকর্মে অতি উৎকৃষ্ট হইবা, একা সমস্যা সুকবে পরীক্ষা, অর্থাৎ এক সমস্যাতেই সুকবির পরীক্ষা হয়, আমরা অবিবেচনাপ্রযুক্ত তােমার বিদ্যা ব্রাহ্মণ্য বােধ না করিয়া তােমাকে এ প্রশ্ন করিয়াছিলাম, কিন্তু আমারদিগের সমুচিত ফল হইয়াছে, এক্ষণে আপনি আপনার কর্মে প্রস্থান করুন, কিছু মনে করিবেন না, সে যাহা হউক, তাহাকে জিজ্ঞাসা করি যে, তাহার অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতাতে লিখিত, বেদোক্তেন বিধানেন ইত্যাদি মহানিৰ্বাণবচনে লােকযাত্রা শব্দে কেবল মদ্য মাংস ভােজনাদি, এই অর্থই কি মহাদেব তাহার কাণে কহিয়াছেন ? আর ঐ বচনে জ্ঞানীদিগের স্বস্ব ধর্মানুসারে নিবেদিত মাংসাদি ভােজনই বা কি[ ১৪৮ ]রূপে প্রাপ্ত হয়, এবং স্ব উপাসনা শব্দেই বা তাহার অভিপ্রেত কি, যদি পঞ্চ দেবতার মধ্যে দেবতাবিশেষের উপাসনা হয়, তবে কেবল ভােজনকালেই তাহার স্মরণপ্রযুক্ত সুতরাং তেঁহ ভাক্তকৰ্মীর অন্তঃপ্রবিষ্ট হইবেন, যদি ব্রহ্মোপাসনাই হয়, তবে ব্রহ্মের উদ্দেশে পশুঘাতের ও নিবেদনের বিধি ও মন্ত্রাদি কোন্ শাস্ত্রে লিখিত আছে, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি। যাহারা শৃগালাদি কতৃক দষ্ট, কিম্বা যে কোন প্রকারে দুষ্ট, অর্থাৎ না দেবতার ইষ্ট, না বিশিষ্টের অভীষ্ট, এবং অতিকৃশাঙ্গ কি কাণব্যঙ্গ অথবা অতি শিশু ছাগলসকলকে অত্যল্প মূল্যে ক্রয় করিয়া স্কুলাঙ্গ হইবার আশায় তাহার মধ্যে কাহারাে বা পুরুষাঙ্গ হানি পূৰ্ব্বক উত্তম আহারাদির দ্বারা প্রতিপালন করতঃ প্রতিনিয়ত সুনিরীক্ষণ ও সর্বাঙ্গে অঙ্গুলির দ্বারা ভােজনের উপযুক্তানুপযুক্তত্ব পরীক্ষণ করিয়া যৎকালে রামমােহন-গ্রন্থাবলী ] বিলক্ষণ হৃষ্টপুষ্টাঙ্গ দর্শন করেন, তৎকালে প[ ১৪৯ ]রম হর্ষে স্ববন্ধুবান্ধববর্গের সহিত স্বহস্তে বহু প্রহারে ছেদনানন্তর দের পূরণ করিয়া থাকেন, তাহারা যদি কোন গৌরাঙ্গোপাসককে দৈবাৎ কেবল স্বহস্তে মৎস্য বধ করিতে দর্শন করিয়া আপনাকে উৎকৃষ্ট তাহাকে অপকৃষ্ট বােধ করেন, তবে তাহার মধ্যস্থ করা নগরান্তবাসী মহাশয়কেই উচিত হয়, যেহেতু যােগ্য ব্যক্তিকেই লােকে যােগ্য কৰ্ম্মে নিযুক্ত করিয়া থাকেন, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় ইহার কোন্ বিষয়ে বঞ্চিত, সকল বিষয়েই পণ্ডিত। অতএব শাস্ত্রে কহেন। জানন্তি তদ্বিদ। অর্থাৎ যে লােক যে বিষয়ে বিজ্ঞ, সেই লােকই সে বিষয়ের বিশেষ মৰ্ম্মজ্ঞ হয়েন। অতএব বিষয়বিশেষে মধ্যস্থবিশেষ, নারদও কহিয়াছেন। যথা। বেশ্যা প্রধান যাস্তত্ৰ কামুকাস্তগৃহােষিতা। তৎসমুখে কাৰ্যেষু নির্ণয় সংশয়ে বিদুঃ । অর্থাৎ বেশ্যাদিগের বিবাদে সংশয় উপস্থিত হইলে তাহারাই নির্ণয় করিবেক, যাহার [ ১৫০ প্রধানা বেশ্যা ও বেশ্যাদিগের গৃহবাসী প্রধান কামুক। ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা এ সকল বিষয়ে বঞ্চিত, এ কারণ তঁাহারদিগের নিকটে অতি নিন্দিত ঈশ্বর স্থানে এই প্রার্থনা যে, তাহারদিগের নিকটে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগকে প্রশংসিত না হইতে হয়, অতএব ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরা ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগকে অপূর্ব অধর্ম ইত্যাদি কত২ ব্যঙ্গোক্তি ও শ্লেষােক্তি করেন। এবং যাহারা প্রতিপালনাদির দ্বারা বিশ্বাস জন্মাইয়া পশ্চাৎ সেই পশুকে বধ করেন, তাহাদিগের প্রতি শ্রীমদ্ভাগবত কহিতেছেন। যথা। যে ত্বনেবংবিদেহসন্তঃ স্তব্ধাঃ সদভিমানিন। পশূ হন্তি বিশ্রাঃ প্ৰেত্য খাদন্তি তে চ তান্ । অর্থাৎ যাহারা এই পূর্বোক্ত শাস্ত্র না জানে এবং অসাধু, অথচ আমরা সাধু এই অভিমান করে, এবং স্তব্ধ অর্থাৎ কাৰ্যাকাৰ্য্য বিবেচনারহিত, [ ১৫১] আর প্রতিপালনাদির দ্বারা বিশ্বস্ত, সে পাষণ্ডের সেই প্রতিপালিত পশুর যে প্রকারে হিংসা করে, সেই পশু পরলােকে সেই পাষণ্ডদিগকে সেই প্রকারে হিংসা করিয়া ভােজন করে। পর, “অনিবেদ্য ন ভুঞ্জীত মৎস্যমাংসাদি করুন।” এ বচনে মৎস্যমাংসাদি তাবৎ দ্রব্যেরি স্বতঃ কিম্বা পরতঃ সামান্যতঃ দেবতাকে অনিবেদিত ভােজনের নিষেধ প্রাপ্ত হইতেছে, অন্যথা, অন্যে অন্যের নিবেদিত দ্রব্য এবং এক দেবতার উপাসক, দেবতান্তরের প্রসাদ ভােজন করিতে পারেন না, অতএব “অং বিষ্ঠা পয়াে মুত্রং যদ্বিষ্ণোরনিবেদিতং”। এই বচনে সামান্যতঃ অবিশেষে অনিবেদিত অজলে মলমূত্রত্ব কীৰ্ত্তনৰূপ নিন্দা শ্রবণ হইতেছে, এ স্থানে বিষ্ণু শব্দে যথাশ্রুত অর্থ করা যায় না, যেহেতু, শক্তি প্রভৃতিকে নিবেদিত দ্রব্যেও নিন্দাপ্রাপ্তি হয়, এবং স্বম্ব ইষ্টদেবতাও কৰা যায় না, যেহেতু দেবতান্তরকে নিবেদিত দ্রব্যেও তমিন্দাপ্রাপ্তি প্রযুক্ত অন্যো[ ১৫২ ]পাসকের অন্য দেবতার প্রসাদ ভােজনে বাধা জন্মে, অতএব এ বচনে বিষ্ণু শব্দে দেবমাত্ৰে তাৎপৰ্য, ইহাতে কোন দোষ সম্ভাবনা নাই, অতএব পুরুষের রাগপ্রাপ্ত যে মৎস্যমাংসাদি ভােজন, তাহাতে পুরুষের রাগাভাবে নিবৃত্তি ও রাগসত্বে প্রবৃত্তি জন্মে, যে ব্যক্তির রাগপ্রযুক্ত মৎস্যমাংসাদি ভােজনে প্রবৃত্তি হয়, সে ব্যক্তি স্বীয় ইষ্টদেবতার প্রতি তাহার ভক্তিশ্রদ্ধার আধিক্যপ্রযুক্ত সুতরাং সেই ইষ্টদেবতাকেই নিবেদন পাষণ্ডপীড়ন করিয়া ভােজন করেন, যদি স্বীয় ইষ্টদেবতাকে অনিবেদ্য যে দ্রব্য তাহাতে প্রবৃত্তি হয়, তবে স্বতঃ কিম্বা পরতঃ দেবতান্তরের নিবেদিত করিয়া ভােজনে তঁাহার বাধা কি। যেহেতু দেবতাকে অনিবেদিত দ্রব্যের ভােজনেই শাস্ত্রীয় নিষেধ প্রাপ্ত হইতেছে। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।মৎসরতা কি দারুণ দুঃখের কারণ হয়।•••কে নিবারণ করিতে পারিবেক ইতি । ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-এ স্থানে কি ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী কি ধৰ্ম্মসংস্থাপনা- কাজী, উভয়েরি ভ্রান্তি, ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর সজ্জনতাতে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর মৎসতার ভ্ৰম, এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ভােগে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর ঐচ্ছিক ভােগের ভ্রম, সজ্জনের এই স্বভাব যে, সদ্বংশজাত ব্যক্তিসকলকে অসৎ কর্মে অসৎ সঙ্গে ও অসৎপথগমনে প্রবৃত্ত দেখিলে তাহারদিগকে তাহারা সদুপ[ ১৫৪ ]দেশ সদযুক্তি ও সৎকথার দ্বারা নিবৃত্ত করান, তাহাতেও যদি না হয়, তবে অন্ততঃ প্রিয়ভৎসন ভয়প্রদর্শন পুরস্কার ও তিরস্কারও করিয়া থাকেন, এবং তাহারদিগের নিমিত্ত সর্বদা অন্তঃকরণে অত্যন্ত ক্লেশও পান, চিন্তাও করেন যে, কি প্রকারে এই সৎসন্তানেরা অসদুত্ত হইতে নিবৃত্ত হইয়া সদৃত্ত হইবেন, তাহাতেই দুৰ্জ্জনেরা নিজ দৌর্জন্যের গুণে ঐ সজ্জনদিগের সৌজন্যকে দৌৰ্জন্য করিয়া ব্যাখ্যা করেন, ও নানাপ্রকার ব্যঙ্গ বিদ্রুপও করিয়া থাকেন, এবং অন্তঃকরণে অবিরত এই চিন্তাও করেন যে, এমন দিন কি হবে যে, ধর্মাধর্ম খাদ্যাখাদ্য ও গম্যাগম্য বিচার যাবে, আমরা নিষ্কণ্টকে স্বেচ্ছানুসারে স্বচ্ছন্দপূৰ্ব্বক স্ব স্ব অভিলাষ সাধন করিব, যেমন ভাঙখােয়র প্রার্থনা করে যে, মা গঙ্গে তুমি যদি হও ভঙ্গে, তবে ডুবুকি ডুবুকি যাও চুমুকি চুমুকি খাও। তঙ্করেরা ও পারদারিকেরা ও প্রার্থনা করিয়া থাকে যে, কবে অ[ ১৫৫ জক রাজ্য হবে যে, স্বচ্ছন্দ চৌৰ্য পারদাৰ্য্য করিব, যদি দুষ্টের মনােভিলাষ সম্পূর্ণ হইত, তবে জগতের কিং অসম্ভব অমঙ্গল অসম্ভাবিত রহিত, দুষ্টের মনােরথও পূর্ণ হয় না, মনস্তাপও দূর হয় না, যেমন দরিদ্রের মনােরথ ও মনস্তাপ। বরঞ্চ আশাবায়ুতে মনের আগুন দ্বিগুণ হয়, পশ্চাৎ কিঞ্চিৎ- কাল প্রারব্ধ কৰ্ম্মতভাগ করিয়া সেই অগ্নিতেই দগ্ধ হইয়া লীলা সম্বরণ করেন। কেহ কাহারো প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ভােগ কদাচ নিবারণ করিতে পারেন না, তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ, কীটভক্ষক পক্ষী, গবাদি ও শূকর, ইহারা উত্তম আহারের দ্বারা গৃহস্থের গৃহে প্রতিপালিত হইলেও প্রারকের গুণে পতঙ্গ, উচ্ছিষ্ট পত্র ও মলমূত্র ভক্ষণে ব্যাকুল হয়, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগেরে মদ্য- মাংসারি ভােজন সেই প্রকার প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ভােগ, অতএব তাহারা সে কৰ্মভােগ কি প্রকারে ত্যাগ করিবেন, সজ্জনদিগের সদুপদেশে বা কি করিতে পারে, ধৰ্ম্মসংস্থাপনা[ ১৫৬ ]কাকীর পূৰ্বে ভ্রান্তিপ্রযুক্ত এ মৰ্ম্ম অজ্ঞাত ছিলেন, এক্ষণে তাহাদিগের সে ভ্রম দূর হইয়াছে, মমাংসাদি কদৰ্য্য ভােগই ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের প্রারব্ধ ভােগের উপযুক্ত, যে ব্যক্তি যে প্রকার হয়, তাহার প্রায় ভােগও সেই প্রকার, অতএব উত্তমাধম মধ্যম ভেদে ত্রিবিধ প্রকার ভােগ ভগবদ্গীতা কহেন। যথা। আহারপি সৰ্বস্য ত্রিবিধাে ভবতি প্রিয়। যজ্ঞপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু। আয়ুঃসত্ত্ববলাবােগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ। বস্যাঃ মিঃ স্থিরা স্বদ্যা ৬৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ। কটলবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরুক্ষবিদাহিনঃ। আহারা রাজসস্রেষ্টা দুঃখ- শােকাময়প্রদাঃ। যাতযামং গতরসং পূতি প্যুষিতঞ্চ যৎ। উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভােজনং তামসয়িং ॥ অর্থাৎ সাত্তিক রাজসিক ও তামসিক এই তিন প্রকার মনুষ্যের আহারও তিন প্রকার, এবং যজ্ঞ তপস্যা ও দান, ইহাও তিন প্রকার হয়, [ ১৫৭] তাহার ভেদ শ্রবণ কর, যে ভােগ ভােক্তার আয়ুঃ উৎসাহ বল আনােগ্য সুখ ও প্রীতির বন্ধক এবং মধুর স্নিগ্ধ স্থির ও হৃদগত হয়, সেই ভােগ সাত্ত্বিকের প্রিয়, তাহার নাম সাত্ত্বিক এবং কটু অম্ল লবণ অত্যুষ্ণ অতিতীক্ষ অতিরুক্ষ কিম্বা সর্ষপাদিজাত যে ভােগ, সেই ভােগ রাজসপ্রিয়, তাহার নাম রাজসিক, তাহাতে দুঃখ শােক ও বােগ জন্মে। প্রহরাতীত বিরস দুর্গন্ধ পযুষিত উচ্ছিষ্ট অথবা অস্পৃশ্য, এই প্রকার যে কদৰ্য্য ভােগ, সেই তামসদিগের প্রিয়, তাহার নাম তামসিক ইতি। * | শ্ৰীমদ্ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষিবিরচিতে পাষণ্ডপীড়ন নামক প্রত্যুত্তরে দুর্জনহৃদয়বিদারণে নাম তৃতীয়াের্লাসঃ সমাপ্তঃ । ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর চতুর্থপ্রশ্নঃ। অনেক বিশিষ্টসন্তান যৌবন ধন প্রভুত্ব অবিবেকতাপ্রযুক্ত কুসংসর্গগ্রস্ত হইয়া...অন্ত্যাঃ মেচ্ছষবনাদয় ইতি কুল্লুকভট্ট। কপট ব্রতচারী ম্লেচ্ছবেশধারী ভাবামাচা[ ১৫৯ ]রী মহাশয় আপনারদিগের বৃথা কেশচ্ছেদন, সুরাপান, জবনীগমন, সংপ্রতি স্বয়ং স্বমুখে স্বহস্তে ব্যক্ত করিয়া কেবল আপনার দিগের জবকারত্ব, মদ্যপত্ব ও জবনজাতিত্ব প্রকাশ করিতেছেন, ইয়দ্দিনে এক্ষণে ধৰ্ম্মের গুণে বাক্যমনের অনৈক্য দূর হইয়া তাহার ঐক্য হইতেছে, আরও হইবেক, কুন্দ্যন্ত্রের মুখে কাষ্ঠের বকভাবের অভাব কত কাল হয়। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—যৌবন ধন প্রভুত্ব অবিবেকতাপ্রযুক্ত লজ্জা ও ধর্মভয় পরিত্যাগ করিয়া...অসৎ প্রবৃত্তির সম্ভাবনা না হইবেক। ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর—যৌবনং ধনসম্পত্তিঃ প্রভুত্বমবিবেকতা। একৈকমপ্যনায় কিমু তত্র চতুষ্টয়ং। অর্থাৎ যৌবন, ধন, প্রভুত্ব ও অবিবেকতা, এই চতুষ্টয়, প্রত্যেকেও সকল অনর্থের কারণ হয়, ইহাতে যে সকল ব্যক্তির প্রতি ঐ চতুষ্টয়ের সম্পূর্ণ অনুগ্রহ, সে সকল ব্যক্তির কি অঘটনঘটনার সম্ভাবনা না হয়। এই নীতিশাস্ত্রীয় বচনের এ তাৎপৰ্য নহে যে, এই যৌবনাদি চতুষ্টয় ব্যক্তিমাত্রেরি অনর্থের কারণ, কিন্তু দুঃশীল দুজ্জনদিগেরি সকল অনর্থের সাধন হয়, তাহার সাক্ষী রাবণ, বেণ, দুর্যোধন [ ১৬১ ] প্রভৃতি, দেখ, রাবণের দৌবৃত্তের বৃত্তান্তের অন্ত করিতে বুঝি অনন্তও অশক্ত হইবেন, বেণ রাজার বাল্যকালেই পিতৃবিদ্যমানে ধন ও প্রভুত্বের অভাবেও কেবল অবিবেকতাতেই কি পুণ্য প্রতিষ্ঠা প্রকাশ না হইয়াছে, এবং দুৰ্য্যোধনাদির দৌর্জন্যই বা তাহাদিগের গুণ বর্ণনে কি পাষণ্ডপীড়ন ৬৫ অবর্ণিত আছে এবং সুশীল সুজনদিগের যৌবনাদি কদাচ অনিষ্টের সাধন হয় না, তাহার প্রমাণ অতিকায়, বিভীষণ, জনক ও অর্জুন প্রভৃতি। ইতিহাস পুরাণে তাহাদিগের উপাখ্যান শ্রবণে পাপাত্মারাে পাপ মােচন ও বিশিষ্ট জ্ঞান জন্মে। এবং ইদানীন্তন অনেক দুৰ্জ্জন ও সুজনেরও যৌবনাদিতে দৌৰ্জন্য ও সৌজন্য প্রকাশ হইতেছে, দেখ কেহ ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষি- রূপে বিখ্যাত, কেহ২ ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানিরূপে নিন্দিত হইতেছেন। অতএব নীতিশাস্ত্রের বচনাস্তরে দুর্জন ও সুজনের বিদ্যাদির বিপরীত ফল দৃষ্ট হইতেছে। যথা। বিদ্যা বিবা[ ১৬২ ]দায় ধনং মদায় শক্তিঃ পরেষাং পরিপীড়নায়। পলস্য সাধধাব্বিপরীতমেতৎ জ্ঞানায় দানায় চ রক্ষণায়। অর্থাৎ দুর্জনের বিদ্যা, ধন ও বল, এই তিন বিবাদ, মত্ততা ও পরপীড়নের নিমিত্ত হয়, সুজনে তাহার বিপরীত, ফলতঃ সুজনের বিদ্যা, ধন ও বল, এই তিন জ্ঞান দান ও পরক্ষণের কারণ হয়। অতএব সুশীল সুজনদিগের কি পিতার বিদ্যমানতায়, কি অবিদ্যমানতায়, কি অধিক সহকারীতে, কি অল্প সহকারীতে, কোন কালে কোন ক্রমেই যৌবনাদির প্রভুত্ব হয় না, এবং তাহার ফল ও জন্মে না। বর্ষা সহকারীতে কি সমুদ্রের জল বৃদ্ধি হয়, কি কৃষ্ণপক্ষেও জ্যোতিরিঙ্গনের উত্তম জ্যোতিঃ হয়, এবং পাষাণে বীজ বপন করিলে কি তাহার অঙ্কুর জন্মে, কি অমৃতফলের তরুতে বিষফল জন্মে, অতএব তাহারদিগের বৃথা কেশচ্ছেন, সুরাপান, সম্বিদাভক্ষণ, যবনীগমন, ও বেশ্যাসেবন সর্বকালেই অসম্ভব, শাসনও অ[১৬৩]সম্ভব, কিন্তু নগরবাসীর অদ্যাপি যবনীগমনের চিহ্ন প্রকাশ হইতেছে, যেহেতু, নিজ বাসস্থানের প্রান্তেই যবনীগমনের ধ্বজপতাকা রােপণ করিয়াছেন। সম্বিদাপান সুরাপানতুল্য হয় কি কারণে ও কি প্রমাণে তাহা জানিতে বাসনা করি ? এবং ধর্ম- সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের মধ্যে কোন ব্যক্তির যৌবনাবস্থাতেও কেশের শুরুদৃষ্টি হইতেছে, যদি তাহারা যবনের কৃত কলপের দ্বারা কেশের কৃষ্ণতা করিতেন, তবে শুক্লতার প্রত্যক্ষ, কি সপক্ষ, কি বিপক্ষ, কাহারাে হইত না, দেখ, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগের বৃদ্ধাবস্থার চিহ্ন, কেবল দন্তভঙ্গ, তাহাও কোন২ মহাত্মা কৃত্রিম দন্তের দ্বারা আচ্ছন্ন করেন, কেহ বার্ধক্যের প্রত্যক্ষ ভয়ে মেষের ন্যায় বক্ষঃস্থলেবাে লােম কৰ্ত্তন করিয়া থাকেন, এবং কি বালক, কি যুবা, কি বৃদ্ধ, সকলেই মুণ্ডিতমুণ্ড, তাহাতে বৃদ্ধদিগেরাে সেই মুণ্ডিতমুণ্ডের ও কৃষ্ণকুণ্ডের কেশেনাে শুক্লতা-[১৬৪ ]ষ্টি কখন কাহারাে হয় না, ইহাতে বুঝি ঐ মহাত্মা গৃহজাত কলপ কিম্বা কালির দ্বারাই ঐ মুণ্ডিতমুণ্ডের ও কৃষ্ণকুণ্ডের অপূৰ্ব্ব শােভা করিয়া থাকেন। ভক্ত- তত্ত্বজ্ঞানীদিগের এও এক প্রকার বিধিকৃত দণ্ড, এবং তাহারদিগের অবিরত অবিহিত আচরণ নিমিত্ত অপরাধের মস্তক মুণ্ডন ও মুখে মসীলেপন, এই দণ্ড উপযুক্তও বটে, অতএব সম্প্রতি তাদৃশ অপরাধে রাজশাসনাভাবপ্রযুক্ত বিধাতা তাহাদিগের দ্বারাই তাহাদিগের দণ্ড করিতেছেন। পরন্তু, যদি প্রধান ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর মানিত হইয়া কোন ক্ষুদ্র ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানী মিথ্যাবাণী কহেন যে, ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের মধ্যেও কোন ব্যক্তিকে যবনীগমনাদি করিতে আমরা দর্শন করিয়াছি, তবে সেই সাক্ষীর প্রামাণ্য কিরূপে হইতে পারে, যেহেতু, শাস্ত্রে তাদৃশ দুষ্ট ব্যক্তিদিগের অসাক্ষিত্ব কহিতেছেন। যথা নারদ। স্তেনাঃ সাহসিকাণ্ডা ৬৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী কিতবা [১৬৫]বঞ্চকাস্তথা। অসাক্ষিণস্তে দুষ্টত্বাৎ তেষু সত্যং ন বিদ্যতে ॥ অর্থাৎ চোর, ডাকাইত, স্বাভাবিক ক্রোধী, ও জুয়াচোর, এই সকল ব্যক্তিতে সত্য সম্ভব হয় না, ইহারা দুষ্টত্বপ্রযুক্ত অসাক্ষী হয়। যাজ্ঞবল্ক্য। স্ত্রীবালবৃদ্ধকিতবমত্তোন্মত্তাভিশস্তকা। রঙ্গাবরি- পাষণ্ডিকূটকৃদ্ধিকলেন্দ্রিয়াঃ । পতিতাপাৰ্থসম্বন্ধিসহায়রিপুতস্করা। সাহসী দৃষ্টদোষ নিধুতা- দ্যাসাক্ষিণঃ। অর্থাৎ স্ত্রী, বালক, অশীতিপর বৃদ্ধ, কিতব, মত্ত, উন্মত্ত, অপবাদগ্রস্ত স্ত্রীজীবী, পাষণ্ড, মিথ্যালিপিকারকাদি, বিকলেন্দ্রিয়, পতিত, সুহৃদ অর্থসম্বন্ধী, অর্থাৎ যাহার জয় পরাজয়ে যাহার জয় পরাজয় হয়, সহায়, রিপু, তস্কর, সাহসী, মিথ্যাবাদিরূপে খ্যাত ও জ্ঞাতিবর্গ কতৃক ত্যক্ত, ইহারা সাক্ষী হয় না, যদি এক প্রধান চোর আত্মকাৰ্য সাধনার্থ অন্য ক্ষুদ্র চোর অর্থাৎ লােকে যাহারদিগকে সিন্দাল, গাঁটকাটা, জুয়াচোর, হাটচোর ও ঘাটচোর কহিয়া [১৬৬] থাকে, তাহাদিগকে সাক্ষী মানিলে তাহাদিগের সাক্ষ্য গ্রাহ্য হইত, তবে পৃথিবীতে কেহ সাধু হইতেন না। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।—ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীকে জানা উচিত যে...প্রায়শ্চিত্ত পূর্ব২ শাস্ত্রকারেরাই লিখিয়াছেন। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় লিখেন যে, প্রয়াগ ও পিতৃমবণাদি ব্যতিরিক্ত বৃথা কেশচ্ছেদ করিবেক না, এই নিষেধে বৃথা শব্দের দ্বারা নৈমিত্তিক কেশচ্ছেদের নিষেধ বুঝায় না, অতএব পণ্ডিতাভিমানী মহাশয়কে জানা উচিত যে, প্রয়াগাদি সপ্ত, আর প্রায়শ্চিত্ত ও চূড়া, এই নয় প্রকার কেশচ্ছেদের নিমিত্ত হয়, তাহার কোন নিমিত্ত[১৬৮]প্রযুক্ত যে কেশচ্ছেদন, তাহারি নাম নৈমিত্তিক কেশচ্ছেদন, বৃথা শব্দের দ্বারা এই নববিধ নিমিত্তের অতিরিক্ত নিমিত্তপ্রযুক্ত যে কেশচ্ছেদন, তাহারি নিষেধ প্রাপ্ত হইতেছে। যথা। প্রয়াগে তীর্থযাত্রায়াং মাতাপিত্রোমুতে গুরৌ। আধানে সােমপানে চ বপনং সপ্তসু স্মৃতং । অর্থাৎ প্রয়াগ, তীর্থযাত্রা, মাতৃমরণ, পিতৃমরণ, গুরুমরণ, গর্ভাধান ও সােমরসপান, এই সপ্তবিধ নিমিত্তে কেশবপন করিবেক, ইহা মাদি কতৃক কথিত আছে। প্রায়শ্চিত্তে ও চূড়াতে কেশচ্ছেদন প্রসিদ্ধই আছে । অতএব যেমন প্রয়াগ, তীর্থযাত্রা, ইত্যাদি কেশচ্ছেদনের নিমিত্ত, তেমন মস্তকের ভারলাঘব ও যবনীমনােরঞ্জন ইত্যাদিও কেশচ্ছেদনের নিমিত্ত হয়, এবং যেমন ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর লিখিত গঙ্গায়াং ভাস্করক্ষেত্রে ইত্যাদি বচনে প্রয়াগাদিনিমিত্তক কেশচ্ছেদের নিষেধ বুঝায় না, তেমন যবনীমনােরঞ্জনাদি- নিমিত্তক কেশচ্ছেদনেরও নিষেধ বুঝ[১৬৯]য় না, এই প্রকার যে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের অভিপ্রায়, তাহা কোন প্রকারেই সিদ্ধ হইতে পারে না, যেহেতু, ধর্মশাস্ত্রে যবনীমনােরঞ্জনাদিকে কেশচ্ছেদনের নিমিত্ত কহেন না, যদি যবনীমনােরঞ্জনাদির নিমিত্ত তাহারদিগের কেশচ্ছেন কর্তব্য তবে ত্বচ্ছেদনও আবশ্যক হয় কি না? যদ্যপি উপদংশ বােগেই তাহাদিগের বচ্ছেদনও ধকৃত হইয়াছে, তথাপি যাবনিক মন্ত্রাদিরূপ অঙ্গের বৈগুণ্যে প্রধানেরাে বৈগুণ্য হইয়া থাকিবে, কিন্তু অঙ্গের অসিদ্ধিতেও প্রধানের সিদ্ধি হয়, এ প্রকার ব্যবস্থাও কোন স্থানে কোন পণ্ডিতেরা কহিয়া থাকেন যে, গৃহদাহে দগ্ধ ব্যক্তির পুনৰ্ব্বার কুশপুত্তলিকা পাষণ্ডপীড়ন ৬৭ দাহ করিবেক না, যেহেতু, দহ ধাতুর অর্থ যে ভস্মীকরণ, তাহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ হইতেছে, মন্ত্রাদিরূপ অঙ্গের বৈগুণ্যে তাহার বাধ জন্মে না, তদ্রুপ এ স্থলেও উপদংশয়ােগে ত্বকচ্ছেদন হইলে সেই পণ্ডিতদিগের মতে সেই মহাত্মাদি[১৭০]গের মন্ত্রাদির অভাবেও ত্বচ্ছেদন- সংস্কার সিদ্ধ হইতে পারে, যেহেতু, ছিদ ধাতুর অর্থ যে ছেদন, তাহার বাধ হয় নাই। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের মধ্যে অনেকে সর্বদাই কিচ্ছ পরিধান করিয়া থাকেন, কেহ২ কেবল পূজাদিকালে। আর ক্ষুৎ, প্রপতন, ও জম্ভণ অর্থাৎ হাঁচি, ভূমিতে হঠাৎ পতন, ও হই, ইহাতে জীব, উত্তি, ও অঙ্গুলিধ্বনি, শাস্ত্রানুসারে সকলেই গুরুপরম্পরা ব্যবহারদৃষ্টিতে অভ্যাসবশতই করিয়া থাকেন, আর এই সকল স্থানেও বৃথা কেশচ্ছেদনে কেবল ব্ৰহ্মহত্যার পাপ শ্রবণে ইহাদিগের তুল্যতা হয় না, তবে হইতে পারে, যদি দীপ্তিকারকত্ব প্রযুক্ত চন্দ্র সূর্যের ও দীপের তুল্যতা হয়। অতএব ইহার বিবেচনা করা আবশ্যক, দেখ, বৃথা কেশচ্ছেদনে শিখাবিরহে সুতরাং শিখবন্ধনের অভাবে সেই শিখারহিত ব্যক্তির তৎকৃত সন্ধ্যাবন্দনাদি কর্মের প্রত্যহ বৈগুণ্য জন্মে, যেহেতু, শিখা[ ১৭১ ]বিশিষ্ট হইয়া কৰ্ম্ম করিবেক, এই বিধি আছে, তথাচ স্মৃতি। গায়া তু শিখাং বা নৈঋত্যাং ব্রহ্মরন্ধতঃ { জুটিকাঞ্চ ততাে বদ্ধা ততঃ কর্ম সমারভেং। অর্থাং কৰ্ম্মকর্তা প্রথমতঃ গায়ত্রীর দ্বারা ব্রহ্মরন্ধ, হইতে নৈঋত কোণে শিখা বন্ধন করিয়া পশ্চাৎ সকল কেশ এক বন্ধন করিবেক, তদনন্তর কৰ্ম্মারম্ভ করিবেক, অতএব শিখার অভাবে ক্রমে ঐ পাপ মহাপাতকতুল্য হয়, যেমন উপপাতক ক্রমে বৃদ্ধি হইয়া মহাপাতককেও লঙ্ঘন করে, এবং ক্রমে ব্রাহ্মণ্যাদিররা হানি হইতে থাকে, ক্ষুৎ, প্ৰাপতন ও জ্বণ ইত্যাদি স্থলে জীব, উত্তিষ্ঠ ও অঙ্গুলিধ্বনি, এই শব্দ না করিলে এতাদৃশ কোন দোষ দৃষ্ট হয় না, অতএব বৃথা কেশচ্ছেদনকে সাধারণ পাপ কিরূপে কহা যায়, তাহার এ প্রকার সাধারণ প্রায়শ্চিত্তই বা কিরূপে হইতে পারে, প্রয়াগাদিতে কেশচ্ছেদনে কিন্তু সে ব্যক্তির সে দোষ হয় না, যেহেতু তাহাতে বিধি আছে। এবং পণ্ডিত[ ১৭২ ]ভিমানী মহাশয় অন্য দুই বচন লিখিয়াছেন, তাহার তাৎপৰ্য্যার্থ এই যে, অন্নদানে ও সুবর্ণাদিদানে ব্রহ্মহত্যাকৃত পাপের ক্ষয় হয়, সে যথার্থ বটে, কিন্তু তাহাকেই ইহা জিজ্ঞাসা করি যে, পুস্তকে লিখিত প্রায়শ্চিত্ত পাপনাশক, কি আচরিত প্রায়শ্চিত্ত পাপনাশক হয়, যদি প্রথম কল্প তাহার সম্মত হয়, তবে কাহারাে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় না, যদি দ্বিতীয় কল্পে নির্ভর করেন, তবে তাহারদিগের কিরূপে নিস্তার হয়, যেহেতু পণ্ডিতাভিমানীর লিখিত অনুদানের পাপনাশকতা- বােধক বচনে স্ত্রীপুত্ৰাদিপরিজনবর্গকে যে অনুদান, তাহার তৎপাপনাশকতা কহিতে পারিবেন না, কারণ, তবে তৎপাপে প্রায়শ্চিত্তের অভাব প্রসঙ্গ হয়, স্ত্রীপুত্ৰাদিকে অনুদান কে, না করিয়া থাকে, অতএব ঐ বচনে অনুদান শব্দে অনুদানব্রত কহিতে হইবেক, যাহাকে লােকে সদাব্রত কহিয়া থাকে, যেহেতু ঐ বচন অতিথিসেবা প্রকরণে লিখি[ ১৭৩ ]ত আছে, সে প্রকার অনুদান ভক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের মধ্যে কে করিয়া থাকেন, যে কহিবেন, কহিলেই বা কে প্রত্যয় করিবেক, কাহারো তাহার দর্শন, কাহারাে২ বা শ্রবণ হইতেছে, এবং সুবর্ণাদি- দানে সাধারণ পাপের ক্ষয় হয়, ইহাও যথার্থ, যদ্যপি তাহারাও কদাচিৎ২ সুবর্ণদান করিয়া ৩৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী থাকেন, তথাপি তাহাতে তৎপাপের ক্ষয় হয় না, যেহেতু তৎপাপে পুনঃপুনৰ্বার প্রবৃত্ত হইলে তাহার নিবৃত্তি কোন প্রকারেই হইতে পারে না, অতএব গঙ্গাস্নানস্থলে সে প্রকার বচনও দেখিতেছি। যথা। কুৰ্যাৎ পুনঃ পুনঃ পাপং ন চ গঙ্গা পুনতি তং। অর্থাৎ যে ব্যক্তি পুনঃপুনৰ্বার পাপ করে, তাহাকে গঙ্গাও পবিত্র করেন না, যদি বল, যেমন গৃহস্থেরা প্রতিদিন পঞ্চসুনাজনিত পাপ করিতেছে, এবং প্রতিদিন পঞ্চ যজ্ঞের দ্বারা তাহার নাশও হইতেছে, তেমন আমারদিগেরও পুনঃ পুনঃ বৃথাকেশচ্ছেদনাদিনিমিত্ত পাপের পুনঃ পুনঃ সুবর্ণাদি [ ১৭৪ ] দানরূপ প্রায়শ্চিত্তে নাশ হইবার বাধা কি। তাহার উত্তর, সুনাশকে অতিক্ষুদ্র কীটাদি বধের স্থান, সে পাঁচ প্রকার হয়, চুল্লী যাহাকে চুলা কহে, পেষণী অর্থাৎ শিললােড়া ইত্যাদি, উপস্কর যাহাকে খেঙ্গরা কহে, কণ্ডলী অর্থাৎ যাহাতে নিক্ষেপ করিয়া ধান্যাদির তুষাদি পরিহরণ করা যায়, আর উদককুম্ভ, এই সকল স্থানে প্রতিদিন অতি ক্ষুদ্র কটাদির অবশ্যই নাশ হয়, তাহার বারণ কোন প্রকারে করা যায় না, কিন্তু তাহাতে গৃহস্থদিগের না সঙ্কল্প, না যত্ন আছে, অতএব পাঠ, হােম, অতিথিসেবা, তর্পণ ও বলিবৈশ্বদেব, এই পঞ্চ যজ্ঞেতেই তৎপাপ ক্ষয় হয়, ইহা শাস্ত্রে কহিয়াছেন, ইহাতে পুনঃপুনৰ্বার অতিযত্বপূৰ্ব্বক কৃত যে বৃথা কেশচ্ছেদনাদিনিমিত্ত পাপ, তাহার ক্ষয় সুবর্ণাদিদানে কি প্রকারে হইতে পারিবেক, পুন:- পুনৰ্বার তাদৃশ পাপকারী লােকেরা পাপকর্মে [ ১৭৫ ] রত হয়, তাহাদিগের নিস্তার, সর্বপাপনাশিনী পতিতপাবনী ত্রিভুবনতারিণী গঙ্গাও করেন না, ইহা গঙ্গাবাক্যাবলীর বচনে বােধ হইতেছে। যথা। যষ্টিবিসহস্রাণি গঙ্গাং রক্ষন্তি সর্বদা। নিবার্যভক্তাংশ্চ পাপ- কর্মরতাংস্তথা। অর্থাৎ যষ্টিসহ বিঘ্নকারকেরা সর্বদা গঙ্গাকে রক্ষা করেন, তাহাদিগের এই কৰ্ম্ম যে, অভক্ত কিম্বা পাপকর্মে রত যে সকল লােক, তাহারদিগকে বারণ করিবেন। পরন্তু ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় অন্য এক বচন লিখেন, তাহার অর্থ এই যে, আমি ব্ৰহ্ম, এই প্রকার চিন্তা ক্ষণমাত্ৰকাল করিলেই সকল পাপ নষ্ট হয়, কিন্তু তঁাহাকেই এই জিজ্ঞাসা করি যে, এই প্রায়শ্চিত্তের উপদেশ কাহার প্রতি করেন, যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানীদিগের পাপাভাবপ্রযুক্ত তাহা দিগে ]র প্রতি অসম্ভব, যেহেতু যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানীদিগের আত্মার স্বরূপভূমিতল তত্ত্বজ্ঞান- স্বরূপ দহনে সংদগ্ধ এবং বাসনাস্বরূপ সলিলের সম্বন্ধাভাবে শু[ ১৭৬ ], অতএব মরুভূমিতুল্য, তাহাতে সৎকর্ম ও দুষ্কৰ্মস্বরূপ বীজ বপন করিলে তাহা হইতে ধৰ্ম্ম ও অধর্মের অঙ্কুর জন্মে অতএব ভগবদগীতা ও যােগশাস্ত্র কহিতেছেন। যথা। যথৈধাংসি সমিস্কোহগ্নিভস্মসাৎ কুরুতেইৰ্জ্জুন। জ্ঞানাগ্নিঃ সৰ্ব্বকৰ্ম্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা । অর্থাৎ যেমন প্রজ্বলিত সামান্য অগ্নি সামান্য কারাশিকে ভস্ম করে, তেমন প্রজ্বলিত তত্ত্বজ্ঞানস্বরূপ অগ্নি প্রারব্ধ কৰ্ম্ম ব্যতিরেকে সুকৃতদুষ্কৃতকর্মস্বরূপ কারাশিকে ভস্ম করেন। ভিতে হৃদয়গ্রস্থিচ্ছিদ্যন্তে সৰ্বসংশয়ঃ । ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাৎপরে। অর্থাৎ সেই পরাৎপর যে পরম ব্ৰহ্ম তেঁহ দৃষ্ট হইলে ফলতঃ তত্ত্বজ্ঞান জন্মিলে সে ব্যক্তির হৃদয়গ্রন্থির ভেদ হয়, অর্থাৎ মিথ্যা- জ্ঞানজন্য বাসনার নাশ হয়, এবং সকল সংশয়ের ছেদ হয়, অর্থাৎ ঈশ্বরের অস্তিত্ব নাস্তিত্ব ও জীব ব্রহ্মের ঐক্য অনৈক্য ইত্যাদি সংশয় নষ্ট হয়, [ ১৭৭ ] এবং সকল কর্ম ক্ষয় হয়, অর্থাৎ পাষণ্ডপীড়ন এব চ। সুকৃত দুস্কৃত কৰ্ম্ম হইতে ধৰ্ম্মাধর্মের অঙ্কুর জন্মে না। যদি ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের প্রতি কহেন, তবে তাহাও অসম্ভব, যেহেতু ব্ৰহ্মপুরাণীয় বচনানুসারে তাদৃশ দুষ্ট পাপিষ্ঠদিগের প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা শােধন হয় না। যথা। চিত্তমন্তর্গতং দুষ্টং তীর্থস্নানে ন শুধ্যতি । শতশােথ জলৈধৌত সুরভাণ্ডমিবাশুচিং। ন তীর্থানি ন দানানি ন ব্ৰতানি ন চাশমা। দুষ্টাশয়ং দম্ভরুচিং পুনন্তি ব্যথিতেন্দ্ৰিয়ং। অর্থাৎ অন্তর্গত দুষ্ট যে চিত্ত, তাহা তীর্থস্নান করিলে শুদ্ধ হয় না, যেমন জলেতে শত২ বার ধৌত হইলেও সুরাভাণ্ড অশুচিই থাকে, ফলতঃ যেমন শত২ বার জলপধত হইলেও সুরাভাণ্ড শুচি হয় না, তেমন দুষ্টচিত্ত লােকেরা প্রায়শ্চিতের দ্বারা শুদ্ধ হয় । এবং দুষ্টাশয় দাম্ভিক ও অবশেন্দ্রিয় মনুষকে কি তীর্থ, কি দান, কি ব্রত, কি কোন আশ্রম, কেহ পবিত্র করেন না। অতএব কুৰ্ম্মপুরাণে ক্রিয়ারহিত যথেষ্টা[ ১৭৮ ]চারী ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের মরণান্ত অশৌচ কহিয়াছেন। যথা। ক্রিয়াহীনস্ত মুখস্য মহারােগিন যথেষ্টাচরণ্যার্মরণান্তমশৌচকং। অর্থাৎ ক্রিয়াহীন, ফলত: নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়ারহিত এবং মূখ, ফলতঃ অর্থসহিত গায়ত্রীহিত এবং মহারােগী, ফলতঃ মধুমেহদি বােগ গ্রস্ত এবং যথেষ্টাচরণ, ফলতঃ দূতক্রীড়া, মদ্যপান ও বেশ্যাদি ইহাতে আসক্ত, ইহারা প্রত্যেকেই যাবজ্জীবন অশুচি থাকে, ইহা মাদি কহিয়াছেন। ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।-ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী বচন লিখিয়াছেন যে ব্রাহ্মণ সুরাপান করিলে.. পাতকগ্রস্ত এবং ব্রাহ্মণ্যহীন হইবেন। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় সৌভ্রামণীযজ্ঞে সুরাপানে এক শ্রুতিকে প্রমাণরূপে দর্শন করান, তাহাতে এই বােধ হইতেছে, যে তাহারা সর্বদাই সুরা[১৮৩]পানার্থে সৌভ্রামণীষজ্ঞমাত্র করিয়া সুরাপান করিয়া থাকেন, অতএব তাহারদিগকে ভাক্তযাজ্ঞিক কহিলেও কহা যায়, সে যাহা হউক, মৈথুন, মাংসভােজন ও মদ্যপান পুরুষের ঐচ্ছিক হয়, তাহাতে নিয়ম, বিনা বিধি সম্ভব হয় না, কৰ্ম্মবিশেষে তাহাতে যে শাস্ত্র আছে, সেও রাগী ব্যক্তির পক্ষে নিয়ম কিন্তু নিবৃত্তিধৰ্ম্মরত মুমুক্ষুর পক্ষে নহে। সেই স্থলে বিধি কহা যায়, যে স্থলে অত্যন্ত অপ্রাপ্ত বিষয়ের প্রাপ্তির নিমিত্ত কথন হয়, সেই বিধি, প্রতিদিন ব্রাহ্মণ সন্ধ্যা করিবেন, গ্ৰহণাদিতে শ্রাদ্ধাদি করিবেক, আর স্বৰ্গকামাদি ব্যক্তি অশ্বমেধযাগাদি করিবেক, ইত্যাদি, এবং পুরুষের ইচ্ছাতেই যে বিষয়ের প্রাপ্তি হয়, তাহার প্রাপ্তির নিমিত্ত যে শাস্ত্র, তাহার নাম নিয়ম, সেই নিয়ম ঋতুকালে ভাগ্যাগমন, ভ্রাতৃদ্বিতীয়াতে ভগিনীহস্তে ভােজন আর শ্রাদ্ধের শেষ দ্রব্য ভক্ষণ করিবেক ইত্যাদি। অতএব মদ্যপানাদি স্থলে যে বিধির আকার[১৮৪]শাস্ত্র দর্শন করা যায়, সে বিধি নহে, কিন্তু নিয়ম, তাহার উল্লানে শাস্ত্রে দোষশ্রবণযুক্ত নিষিদ্ধকালে ভােজনে ও পানে তদ্দ ব্যের আঘ্রাণমাত্ৰ বিহিত হয়, অতএব কলিযুগে মদ্যপানে নিষেধ দর্শনে যে স্থানে মদ্যপানে নিয়ম আছে, সে সকল স্থানে মদ্যের আম্রাণ গ্রহণই যুক্তিসিদ্ধ হয়, অতএব শ্রাদ্ধে শেষ দ্রব্য ভােজনের নিয়ম রক্ষার্থে উপবাসদিনে শেষ দ্রব্যের আম্রাণের শাস্ত্র ও ব্যবহার দৃষ্ট হইতেছে, অতএব শ্রীমদ্ভাগবতে যজ্ঞাদিতে মদ্যপানাদি স্থলে সর্বকালে আম্ৰাণাদিই সুস্পষ্ট করিয়াছেন। যথা। লােকে ব্যবায়ামিষ- ৭০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী মদ্যসেবা নিত্যা হি জন্তোর্নহি তত্র চোদনা । ব্যবস্থিতিস্তেষু বিবাহযজ্ঞসুগ্রহৈস্তা নিবৃত্তিনিষ্টা। যদঘাণভক্ষে বিহিতঃ সুরায়াস্তথা পশােরালভনং ন হিংসা। এবং ব্যােয় প্রজয়া ন বত্যৈ ইমং বিশুদ্ধং ন বিদুঃ স্বধৰ্মং। অর্থাৎ ইহলােকে মৈথুন, মাংসভােজন ও মদ্যপান, ইহাতে সকল জীবের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হইতেছে, [১৮৫] কিন্তু তাহাতে বিধি নাই, তবে যে ঋতুকালে ভাৰ্যাগমনে, যজ্ঞে পশুহননে ও সৌভ্রামণীযাগে সুরাসেবনে প্রবর্তক শাস্ত্র দেখিতেছি, সে কেবল রাগী ব্যক্তির প্রতি জানিবা, মুমুক্ষু লােক তাহাতে সৰ্বথা বিরক্ত হইবেন, যেহেতু, সৌভ্রামণীষাগে সুরাপান অবিহিত, কিন্তু আম্রাণমাত্ৰ বিহিত, এবং অন্যান্য যজ্ঞে পশুর হিংসা অকৰ্ত্তব্যা, কেবল তাহার আলভন বিহিত হয়, অর্থাৎ যথেষ্টাচরণ করিবেক , এবং স্ত্রীসঙ্গ ও সন্তানাৰ্থ বিহিত হয়, সুখাৰ্থ নহে, মুর্থ লােকেরা এই বিশুদ্ধ স্বধৰ্ম্ম না জানিয়া নানা দুষ্কর্ম করিতেছে এবং সৌভ্রামণীযজ্ঞে সুরাস্থলে শ্রুতিতে সমরসই শ্রুত আছে। বস্তুতঃ কলিযুগে ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের মদ্য অদেয়, অপেয় ও অগ্রাহ্য হয়, ইহা নানা পুরাণাদিতে ও নানা তন্ত্রে দৃষ্ট হইতেছে, অতএব মদ্যপানাদির যে সকল শাস্ত্র, তাহা সত্যাদি যুগেই ব্যবহাৰ্য্য, ইহা সুরাচাৰ্য মহাশয়ের অবশ্যই স্বীকা[১৮৬]র করিতে হইবেক, যেহেতু কলিযুগ অধিকার করিয়া ব্ৰহ্মপুরাণ, কালিকাপুরাণ এবং উশনাঃ কহিতেছেন। ব্ৰহ্মপুরাণং। নরাশ্বমেধৌ মদ্যঞ্চ কলৌ বর্জং দ্বিজাতিভিঃ। অর্থাৎ দ্বিজাদি সকল ফলতঃ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বৰ্ণ কলিযুগে নরমেধ ও অশ্বমেধ যাগ এবং মদ্য ইহার বর্জন করিবেন। কালিকাপুরাণং। স্বগাত্ররুধিরং দত্বা হাত্মহত্যামবাপ্ন যাৎ। মদ্যং দত্ব ব্রাহ্মণস্তু ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে। অর্থাৎ কি ব্রাহ্মণ, কি অন্য বর্ণ, স্বশরীরের রুধির দান করিলে আত্মহত্যার পাপে লিপ্ত হয়েন এবং ব্রাহ্মণ মদ্যপান করিলে ব্রাহ্মণ্য হইতে হীন হন। উশনাঃ। মদ্যমদেয়মপেয়ম- নিগ্রাহ্য। অর্থাৎ মদ্য অদেয়, অপেয় ও অগ্রাহ্য হয়। উশনার বচনে মদ্যের অদেয়ত্ব অপেয়ত্ব ও অগ্রাহ্যত্ব শ্রবণ প্রযুক্ত ব্ৰহ্মপুরাণের বচনে বর্জন শব্দের ঐ প্রকার অর্থ, এবং কালিকাপুরাণের বচনেও দানশব্দে পান ও গ্রহণ বক্তব্য হয়। এবং ব্রহ্মপুরাণের বচনে কলি- যুগ শ্রবণ প্রযুক্ত কালিকাপু[১৮৭]রাণে ও উশনার বচনেও কলিযুগের সম্বন্ধ করিতে হইবেক। এ স্থানে কলিযুগে মদ্যের নিষেধপ্রযুক্ত অনেক নব্য প্রাচীন সৰ্বজনমান্য গ্রন্থকারেরা মদ্যপানাদি স্থলে মদ্য প্রতিনিধিদানাদিয়রা নিষেধ করিয়াছেন, তঁাহারদিগের অভিপ্রায় এই যে, যৎকর্মে যদ্ব্য বিহিত ও অনিষিদ্ধ হয়, তৎকর্মে তদ্দ ব্যের অভাবে তাহার প্রতিনিধিরূপে দ্রব্যান্তরের গ্রহণ যুক্তিসিদ্ধ হয়, যেমন শ্রদ্ধে মধুর অভাবে তৎপ্রতিনিধিরূপে গুড়াদির গ্রহণ, কিন্তু প্রধানের নিষেধস্থলে তাহার প্রতিনিধিরূপে দ্রব্যান্তরের গ্রহণ অযুক্ত, অতএব মাংসাষ্টকা শ্রাদ্ধে কলিযুগে গােমাংসের নিষেধপ্রযুক্ত শাস্ত্রে তাহার প্রতিনিধি বিধান না করিয়া হরি- বংশাদিতে বিহিত যে মৃগমাংসাদি, তাহার অভাবে তাহার প্রতিনিধিরূপে পায়সের বিধান করিয়াছেন। অতএব যাহারা শাস্ত্রীয় নিষেধ উল্লজ্জন করিয়া কলিযুগে নিষিদ্ধ মদ্যাদির ব্যবহার করিতে পারেন, [১৮৮] তাহারা বুঝি কলিযুগে নিষিদ্ধ অন্য মহামাংসও ব্যবহার করিয়া থাকেন এবং উশনার বচনে অদেয় ইত্যাদি শব্দ বিষ্ণুবাচক হয়, এই কথা কহিয়া পাষণ্ডরা ও পাষণ্ডপীড়ন ৭১ – ঐ বচনের এই প্রকার অর্থ কল্পনা করিয়া থাকে যে, মদ্য বিষ্ণুকে দেয়, বিষ্ণুর পেয় ও বিষ্ণুর গ্রাহ হয়, যে পাষণ্ডেরা পরদারান্ ন গচ্ছেৎ পরধনং ন গৃহীয়াৎ অর্থাৎ পরদার গমন করিবেক না এবং পরধন অপহরণ করিবেক না, ইত্যাদি স্থলে শিরশ্চালনে নঞ এই কথা কহিয়া এই প্রকার অর্থ করে যে, সর্বদা পরদার গমন ও পরধন অপহরণ করিবেক, সে পাষণ্ডরাও এক্ষণে ব্ৰহ্মপুরাণে ও কালিকাপুরাণে মগ্যের নিষেধ দর্শনে উশনার বচনেও মদ্য অদেয় অপেয় ইত্যাদি স্থানে অশব্দ নিষেধাৰ্থ অবশ্যই কহিবেন । পাষণ্ডের লক্ষণ পদ্মপুরাণ কহিতেছেন। ত্বসম্ভক্ষ্যােনাদিরতা লােক। নিরন্তরং। শিবে পাষণ্ডিনাে জ্ঞেয়া ইহাতে নাত্ৰ সংশয়ঃ । যে বেদ- সম্মতং কাৰ্যং [১৮৯] ত্যান্য কৰ্ম্ম কুৰ্ব্বতে। নিজাচারবিহীন যে পাষণ্ডাস্তে প্রকীর্তিতা। অর্থাৎ ভগবতীর প্রতি শিব কহিতেছেন, হে শিবে, যে সকল লােক নিরন্তর অভক্ষ্যভক্ষণে ও অপেয় পানে রত হয়, তাহারদিগকে পাষণ্ড করিয়া জানিবে । এবং যাহারা বৈদিক কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া অন্য কৰ্ম্ম করে আর স্বস্ব জাতীয় সদাচারহীন হয়, তাহারদিগ কে শাস্ত্রে পাষণ্ড করিয়া কহিয়াছেন। সিদ্ধলহরীতন্ত্রে । পশুভাবে সদা সিদ্ধির্নান্যভাবে কদাচন। দিব্যবীরমতং নাস্তি কলিকালে সুলােচনে। অর্থাৎ হে পাৰ্বতি, কলিযুগে পশুভাবে সৰ্ব্বদা সিদ্ধি হয়, অন্য ভাবে কদাচ হয় না, যেহেতু কলিকালে দিব্যভাব ও বীরভাব নাই। ব্রহ্মতন্ত্রে। ধস্মিন্ তন্ত্রে মদ্যপানং তত্তন্ত্ৰৰ সত্যসম্মতং। কলৌ ন সম্মতং মদ্যং মৈথুনং ন চ সম্মত। পশুভাবাৎ পরে ভাবব নাস্তি নাস্তি কলেমতঃ । অর্থাৎ হে পাৰ্বতি, যে তন্ত্রে মদ্যপান উক্ত আছে, সে তন্ত্র সত্যযুগের সম্মত, [১৯০]কলিযুগে মদ্য ও মৈথুন সম্মত নহে, এবং পশুভাব হইতে উত্তম ভাব নাই নাই। কালীবিলাসতন্ত্রে । মদ্যং মৎস্য তথা মাংসং মুদ্রাং মৈথুনমেবচ। শ্মশান- সাধনং ভদ্রে চিতাসাধনমেবচ। এতত্তে কথিতং সর্বং দিব্যবীরমতং প্রিয়ে। দিব্য- বীরমতং নাস্তি কলিকালে সুলােচনে ৷ কলৌ পশুমতং শস্তং যত সিদ্ধীশ্বরাে ভবেৎ। ত্রিসন্ধ্যং স্নানদানঞ্চ হবিষ্যাশী জিতেন্দ্রিয়ঃ । ত্রিসন্ধ্যং পূজয়েদ্দেবীং ত্রিসন্ধ্যং কবচং পঠেৎ। ত্রিসন্ধ্যং শতনামানি পঠেং সংসিদ্ধিহেতুকাৎ। ইতি তে কথিতং দেবি সৰ্ব্বজাতি সম্মতং । অর্থাৎ হে প্রিয়ে, মদ্য, মৎস্য, মাংস, মুদ্রা ও মৈথুন, এই পঞ্চ মকার আর শ্মশানসাধন ও চিতাসাধন, এই দিব্যমত ও বীরমত তােমাকে কহিয়াছি, কিন্তু কলিকালে দিব্যমত ও বীরমত নাই, কেবল পশুমত প্রশস্ত, যাহাতে সিদ্ধি হয়, ত্রিস[১৯১]ন্ধ্যায় স্নান ও দান করিবেক এবং হবিষ্যাশী ও জিতেন্দ্রিয় হইবেক এবং সিদ্ধির নিমিত্ত ত্রিসন্ধ্যায় দেবীর পূজা, কবচ পাঠ ও শতনাম পাঠ করিবেক, সৰ্বজাতিতে সম্মত এই পশুভাব তােমাকে এক্ষণে কহিলাম । অতএব যদ্যপি এই সকল শাস্ত্র ও যুক্তিস্বরূপ প্রচণ্ড মার্তকিরণে উজ্জল জগন্মশুল দর্শন করিয়া ভাবামাচারী মহাশয়ের লিখিত মনুবচন ও তন্ত্রবচনের অযথার্থ অর্ধস্বরূপ পেচক ভীত ও মুদ্রিতলােচন হইয়া উৎকৃষ্ট স্থানে অপকৃষ্ট ও অপদস্থ হওয়াতে পণ্ডপাষণ্ডমণ্ডলীস্বরূপ অস্থানস্থ অধম অন্ধকারাবৃত শাকোট বৃক্ষের অর্থাৎ শেওড়া গাছের অন্তরেই প্রচ্ছন্নভাবে আচ্ছন্ন হইবেক, তথাপি ব্যক্ত ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী গুপ্ত ভাবামাচারীদিগের মুখ শ্যামল এবং ৭২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ধাম্মিকদিগের মুখ উজ্জ্বল করিবার নিমিত্ত কিঞ্চিৎ বিশেষ লিখন আবশ্যক হয়। ভাবামাচারী মহাশয় স্বমত সাধন কারণ [১৯২] মদ্য, মাংস ও মৈথুনের অবচ্ছেদাবচ্ছেদে বিধান দর্শন করাইবার আশায়, ন মাংসভক্ষণে দোষ ইত্যাদি মনুবচনের শেষ দুই পাদ অপহরণ করিয়া প্রথম দুই পাদ দর্শন করাইয়াছেন, তাহার কারণ এই যে, শেষ দুই পাদ দর্শন করাইলে তঁাহারদিগকে চতুষ্পদ হইতে হয়, কিন্তু ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের এই প্রতিজ্ঞা যে, ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগকে চতুপাদ না করিয়া ক্ষান্ত হইবেন না, অতএব যদ্যপি ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানীদিগের অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতার অত্যল্প উত্তর প্রত্যুত্তর করণের ষােগ্য হয়, তথাপি ধর্ম- সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা কি প্রত্যুত্তরের যােগ্য কি অযােগ্য, প্রতি বাক্যের প্রতি পদের প্রত্যুত্তর প্রকাশ করিলেন, কারণ পূৰ্বে এক অতি বিখ্যাত বিজ্ঞ প্রধান পণ্ডিত প্রথমতঃ উৎকৃষ্ট বােধে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর সহিত বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইয়া পশ্চাৎ অপকৃষ্ট বােধে নিবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহাতেই ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় গুঢ়াভিমানী এবং অনেক কাল [১৯৩]অবধি অনেক অবােধের নিকটেই সৰ্বজয়ী, এইরূপে খ্যাত আছেন, অতএব ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের প্রত্যুত্তর, সৰ্বাংশে অষ্টগুণ উৎকৃষ্ট হইলেও তাহাদিগের নিকটে অপকৃষ্ট হওনের সম্ভাবনা, কি জানি, যদি কেহ কহেন যে, ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকক্ষীদিগের বয়সের নব্যতা এবং বিদ্যার অল্পতা, সুতরাং সৰ্বাংশের প্রত্যুত্তর করিতে অসমর্থ হইয়াছেন, এবং যদ্যপি ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীদিগের বিবেচনায় ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের প্রত্যুত্তরসমুদয়ই প্রত্যুত্তর করণের অযােগ্য অবশ্যই হইবেক, তথাপি উত্তম কিম্বা অধম, যাহা হউক, যদি প্রত্যেক বাক্যের প্রত্যেক পদের প্রত্যুত্তর না করিয়া যথাশক্তি দুই এক বাক্যের প্রত্যুত্তর করণ ও নানাপ্রকার অনুপযুক্ত কটুভাষণদ্বারা আপনাকে প্রত্যুত্তরকর্তা ও সদ্বক্তা এইরূপে খ্যাত করেন, তবে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা তাহার প্রত্যুত্তর করিবেন না, কারণ, তাহাতেই কি পক্ষ[ ১৯৪ ]পাতী কি অপক্ষপাতী বিজ্ঞ ব্যক্তিদিগের তাবতেরি বােধ হইবেক। যদি ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা কটুবাক্য কহিতেন, তবে ভাক্ততত্ত্ব- জ্ঞানীদিগের অনেকের অনেক ব্যক্ত অব্যক্ত আত্যন্তিক মর্মান্তিক যথার্থ কটুবাক্য আছে, তাহা কহিলেও কি কিছু কহিতে পারিতেন না, বিশিষ্ট বিজ্ঞ ব্যক্তিদিগের তাহা অবক্তব্য, সে যাহা হউক, ভাবামাচারী মহাশয়ের লিখিত মনুবচনের পূৰ্ব্বাপরের বচন ও কুলুক ভট্টের ব্যাখ্যা প্রকাশ করা গেল, তাহাতেই বিজ্ঞ ব্যক্তিদিগের নিকটে তদ্বচনের যথার্থ তাৎপৰ্যার্থ প্রকাশ হইবেক। মনুঃ। বর্ষে বর্ষেহশ্বমেধেন যাে যজেত শতং সমাঃ। মাংসানিচ ন খাদ্যেস্তয়ােঃ পুণ্যফলং সমং । ফলমূলাশনৈর্মে ধৈমুন্ননাঞ্চ ভােজনৈঃ। ন তৎ ফল- মবাপ্পেতি যন্মাংসপরিবর্জনাৎ | মাংস ভক্ষয়িতামুত্র যস্য মাংসমিহাদ্মহং। ন মাংসভক্ষণে দোষাে ন মদ্যে ন চ মৈথুনে। প্রবৃত্তিরেষা ভূতানাং নিবৃত্তিস্তু মহাফলা। অর্থাৎ [ ১৯৫ ] যে ব্যক্তি শত বর্ষ পৰ্যন্ত প্রতি বৎসর অশ্বমেধ যাগ করে এবং যে ব্যক্তি যাবজ্জীবন মাংস ভােজন না করে, সেই দুই ব্যক্তির স্বর্গাদি পুণ্যফল তুল্য হয়। পবিত্র ফলমূল ভক্ষণে ও মুনিদিগের ভােজনযােগ্য অন্নের ভােজনে যে ফল না হয়, মাংসের অভােজনে সে ফল জন্মে। ইহলােকে যাহার মাংস আমি ভােজন করি, পরলােকে আমার মাংস সে ভােজন করিবেক।

পাষণ্ডপীড়ন ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের স্বীয় স্বীয় অধিকারানুসারে শাস্ত্রবিহিত অনিষিদ্ধ যে ভক্ষণ, পান ও মৈথুন, তাহাতে কোন দোষ হয় না, যেহেতু মাংস ভক্ষণে, মদ্যপানে ও মৈথুনে যে প্রবৃত্তি, সে ভূতদিগের স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম, কিন্তু শাস্ত্রীয় নিয়মিত অনিষিদ্ধ মদ্যপান ও মৈথুন ইহার নিবৃত্তিতে সেই মহাফল হয়, যে মহাফল মাংসের বর্জনে হয় । এবং কুলার্ণবমহানিৰ্বাণতন্ত্র মাত্ৰদৰ্শী ভাবামাচারী মহাশয় কলিকালে জাতিমাত্রের বিশেষতঃ ব্রাহ্মণের মদ্যপানে কুলাবের ও [ ১৯৬ ] মহানিৰ্বাণের বচন দর্শন করাইয়া তাহাতে ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর চতুর্থ প্রশ্নে লিখিত মাদিবচনের সহিত বিরােধপ্রযুক্ত নিজপাণ্ডিত্যের প্রভাবে বিরােধভঞ্জনার্থ মীমাংসাও করিয়াছেন যে, ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর লিখিত স্মৃতিপুরাণ- বচনে কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানে যে নিষেধ, সে অসংস্কৃতের অর্থাৎ অশােধিত মদ্যের আর মহানিৰ্বাণাদির বচনে মদ্যপানের যে বিধি, সে সংস্কৃতের অর্থাৎ শশাধিত মদ্যের এবং পুনর্ধার তাহার দৃঢ়তার কারণ শিবরা নাস্তি শিরােব্যথা, ইহার ন্যায় দৃষ্টান্তও কহিয়াছেন, যেমন নাস্তিকেরা জগতের উৎপত্তিস্থিতিসংহারকর্তা কেহ নাই, এই কথা কহিয়া অরণ্যস্থ বৃক্ষে তাহার দৃষ্টান্ত দর্শন করায় এবং মদ্যপানে পাণ্ডিত্য প্রকাশের নিমিত্ত তাহার ইতিকৰ্তব্যতাও দর্শন করাইয়াছেন, কিন্তু তাহারা প্রথমতই কুলার্ণবাদি তন্ত্র মাত্র দর্শন করিয়া চিরকাল মদ্যপানে বিহবল হইয়া [ ১৯৭ ] শাস্ত্রান্তর দর্শন করিতে অসমর্থ প্রযুক্ত কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানে বিধি দিতেছেন, তাহা প্রত্যক্ষ হইতেছে, যেহেতু ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণ অধিকার করিয়া কালীবিলাসতন্ত্রে মহাদেব কলিযুগে মদ্য শশাধনের নিষেধ করিয়াছেন। যথা। ন মদ্যং প্রপিবেদেবি কলিকালে কদাচন। পীত্ব পীত্ব পুনঃ পীত্ব পুনঃ পততি ভূতলে । উথায় চ পুনঃ পীত্ব পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে। ইত্যাদি বচনং দেবি সত্যত্ৰেতাৰ্দ্ধসম্মতং । পীত্বা মদ্যং কলৌ দেবি ব্রহ্মহত্যা পদে পদে। সত্যত্ৰেতাপরাদ্ধেযু প্রশস্ত মদ্যশােধনং। ন কসে শােখনং মদ্যে নাস্তি নাস্তি বরাননে। ন কর্তব্যং কলৌ মদ্যপানঞ্চ নগনন্দিনি । অর্থাৎ মহাদেব ভগবতীর প্রতি কহিতেছেন যে, হে দেবি, কলিকালে কদাচ মদ্যপান করিবেক না, পান করিয়া পান করিয়া পুনর্বার পান করিয়া পুনর্বার ভূমিতলে পতিত হয়, উখিত হইয়া পুনৰ্বার পান করিয়া পুনর্জন্ম হয় না, ইত্যাদি বচনসকল [ ১৯৮] সত্যযুগ ও ত্রেতাযুগের অর্ধ পর্যন্ত সম্মত হয়, কলিযুগে মদ্যপান করিলে পদে পদে ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়। সত্যযুগে ও ত্রেতাযুগে মদ্যশােধন প্রশস্ত হয়। কলিযুগে মদ্যশশাধন নাই নাই। এবং মদ্যপানও কর্তব্য নহে। অতএব কালীবিলাসতন্ত্রে মদ্যশােধনের নিষেধ দর্শনে ভাবামাচারীর যে কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানের ব্যবস্থা, তাহার এক্ষণে কি দুরবস্থা হইবেক, শান্তরের অপ্রদর্শন নিমিত্ত ভ্রান্তিম্বৰূপ মহাকুঙ্কুটিকাতে আচ্ছন্ন ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর চতুর্থ প্রশ্নলিখিত যে মদিবচনস্বরূপ সূৰ্য, তাহার প্রচণ্ড কিরণে এক্ষণে ঐ ব্যবস্থার শাখাপল্লব কি দগ্ধ হইবে না, অর্থাৎ কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যনিষেধে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর লিখিত মদিবচন ও কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপান বিধানে ভাবামাচারীর কুলার্ণবাদিবচন, উভয়ের পরস্পর যে বিরােধ, [ ১৯৯] পুনর্বার সেই বিরােধ এবং পূর্বোক্ত ব্ৰহ্মপুরাণাদির সহিতও বিবােধ হয়। এবং ৭৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী শ্ৰীক্রমে। তান্তরের সহিত বিরােধও দৃষ্ট হইতেছে । যথা মহাকালসংহিতায়াং। মঙ্গং দা মহেশান্যৈ ব্রাহ্মণ্যদেব হীয়তে। চণ্ডালত্বমবাপ্নোতি সৰ্ব্বকৰ্ম্মবিবজ্জিত। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ মহাদেবীকে মদ্যদান করিলে ব্রাহ্মণ্য হইতে হীন, সৰ্ব্বকৰ্ম্মরহিত ও চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হয়েন। ন দদ্যাৎ ব্রাহ্মণাে মদ্যং মহাদেব্যৈ কথঞ্চন । বামকামাে ব্রাহ্মণােপি মদ্যং মাংস ন ভক্ষয়েৎ ॥ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ মহাদেবীকে মদ্য দান করিবেন না, এবং বামাচারী ব্রাহ্মণও নিশ্চয় মদ্যমাংস ভােজন করিবেন না। বারাহীতন্ত্রে । মৎস্যং মাংসং তথা মদ্যং মৈথুন পরমেশ্বরি। মানুষেণ বলিং পঞ্চ ব্রাহ্মণাে ন স্মরেৎ কলে। অর্থাৎ কলিযুগে ব্রাহ্মণেরা মৎস্য, মাংস, মদ্য, মৈথুন ও নরবলি, এই পঞ্চের স্মরণ করিবেন না। অতএব এ স্থানে এই সংশয় হইতেছে যে, শাস্ত্ৰ[২০]সকলের পরস্পর বিরােধপ্রযুক্ত সকল শাস্ত্রই অপ্রমাণ, কি সকল শাস্ত্রই প্রমাণ, তাহাতে এই অনর্থ উপস্থিত, যদি সকল শাস্ত্র অপ্রমাণ কহা যায়, তবে শাস্ত্র উচ্ছিন্ন ও নাস্তিকতা প্রসঙ্গ হয়, যদি সকল শাস্ত্রই প্রমাণ হয়, তবে উভয় পথেই ব্রাহ্মণ পাপী হন, মদ্যপান করিলে নিষিদ্ধ কর্মের করণে আর না করিলে বিহিত কৰ্ম্মের অকরণে, যেহেতু ভাবামাচারীর কুলার্ণবাদি তন্ত্রের বচনে কলিযুগেও ব্রাহ্মণের মদ্যপানে বিধি দেখিতেছি, আর ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর লিখিত মদ্যাদি স্মৃতি, পুরাণ ও তন্ত্রান্তর, এই সকল শাস্ত্রে কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানে নিষেধও দেখিতেছি, অতএব এক শাস্ত্রের প্রামাণ্য, অন্য শাস্ত্রের অপ্রামাণ্য অবশ্যই কহিতে হইবেক, তাহাতে যুক্তি ও প্রমাণ কুৰ্ম্মপুরাণে হিমালয়ের প্রতি মহাদেবের বাক্য। যথা। যানি শাস্ত্রাণি দৃশ্যন্তে লােকেহস্মিন্ বিবিধানি চ। তিস্মৃতিবিরুদ্ধানি নিষ্ঠা তেষাং হি তামসী ॥ করাল[২০১]ভৈরবঞ্চাপি জামলং নাম যৎ কৃতং। এবংবিধানি চান্যানি মােহনার্থানি নিচ। ময়া সৃষ্টান্যনেকানি মােহায়ৈং অর্থাৎ ইহলােকে তিস্মৃতিবিরুদ্ধ নানা প্রকার যে সকল শাস্ত্র দৃষ্ট হইতেছে, তাহার যে নিষ্ঠা, সে তামসী, ফলতঃ তিস্মৃতিবিরুদ্ধ শাস্ত্রে কেহ কদাচ শ্রদ্ধা করিবা না, যেহেতু তদনুসারে কৰ্ম্ম করিলে তামসী গতি হয়, এবং করালভৈরব নামে ও জামল নামে যে তন্ত্র কৃত হইয়াছে, আর এই প্রকার অন্য যে তন্ত্র আমার রচিত হয়, তাহা কেবল লােকমােহনার্থ জানিবা এবং এই প্রকার অন্য যে তন্ত্র আমি সৃষ্টি করিয়াছি, তাহা এই ভবার্ণবে তামসিক লােকদিগের মােহের কারণ মাত্র হয়, ফলতঃ সে সকল তন্ত্রে কেহ কোন কালে শ্রদ্ধা করিবা না। অতএব কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপান বিষয়ে ভাবামাচারীর লিখিত যে কুলার্ণবের ও মহানিৰ্ব্বাণের বচন, তাহারি অপ্রামাণ্য অবশ্যই কহিতে হইবেক, যেহেতু সেই[২০২] সকল তন্ত্র তিস্মৃতিবিরুদ্ধ ও নানাতন্ত্রবিরুদ্ধ, এ কারণ কল্পিত আগম হয়, তাহাকে অসদাগম কহা যায়। এবং পদ্মপুরাণে শ্রীদুর্গার প্রতি শ্ৰীমহাদেব কল্পিত আগমের অন্য কারণও কহিয়াছেন। যথা। নমুচ্যাদ্যা মহাবীৰ্য্যা দেবানপ্যতিশেরতে। অজেয়া: সর্বদেবানাং তপােনিখুঁতকল্মষাঃ । ত্বমেব তান্ মহাদৈত্যান্ জেতুমহসি কেশব। ইত্যাক হরির্বাক্যং দেবনাঞ্চ ভয়াত্মকং। তানবধ্যা বিদিত্বাথ মামাহ পুরুষােত্তমঃ । ভগবানুবাচ । বঞ্চ রুদ্র মহাবাহো মােহনার্থং সুন্বিষাং। পাষাচরণং ধং কুরুষ সুসম । মােহনানিচ পাষণ্ডপীড়ন ৭৫ শাস্ত্রাণি কুল চ মহামতে। কপালভস্মচৰ্মাস্থিচিহ্নান্যমরপূজিত । ত্বমেব ধুত্ব তান্ লােকান্ মােহয় জগয়ে। তথা পাশুপতং শাস্ত্ৰং ত্বমেব কুরু সুব্রত। কালশৈবপাষণ্ডমহাশৈবাদি- ভেতঃ। অবলম্ব মতং সম্যক্ বেদবাহং দ্বিজাধমাঃ ভস্মাস্থিধারিণঃ সর্বে বভূবৃন্তে ন সংশয়। মত[২০৩]মেতদষ্টভ্য পতন্ত্যেব ন সংশয়ঃ । কপালভচৰ্মাস্থিধারণং তৎ কৃত ময়া। পাষণ্ডিশৈবশাস্ত্ৰন্তু যথােক্ত কৃতবনহং॥ মৎশক্ত্যা বৈ সমাবিশ গােতমাদিজিনপি। বেদবাহানি শাস্ত্রাণি সম্যগুজানি চানঘ। ইমং মন্ত্রমবষ্ট ভ্য মাং দৃষ্ট। সৰ্ব্বরাক্ষসাঃ। ভগবদ্বিমুখাঃ সৰ্ব্বে বভূবুস্তমসাবৃতাঃ । ভস্মৃস্থিধারণং কৃত্বা মহােগ্রতমসাবৃতাঃ। মামেব পূজয়ামাসুর্মাংসাসূচন্দনাদিভিঃ । অত্যবিষয়াসক্তা: কামক্রোধসমন্বিত শক্তিহীনা নিব্বীৰ্য্যা জিতা দেবগণৈশুদা । সৰ্বধৰ্ম্মপরিভ্রষ্টাঃ কালে যান্ত্যধমাণ গতিং। কঙ্কালশৈবপাষণ্ড- মহাশৈবাদিকং মতং । অসদাগমমিত্যাহুঃ কুচরণমেব চ। ইহমু গমিষ্যন্তি নরক ত্বতিদারুণং । যে মে মতমবষ্টভ্য চরন্তি পৃথিবীতলে। সৰ্ব্বধৰ্ম্মে ৮ রহিতা যান্তি নিরয়ং এবং দেহিতার্থায় বৃত্তিৰ্দেবি বিগহিত। বিভােরাজ্ঞং পুরস্কৃত্য কৃতং ভস্মৃস্থিধারণং । বাহচিহ্নমিং দেবি মােহনা[২০৪]র্থং সুরদ্বিষাং। অর্থাৎ শ্ৰীমহাদেব কহিতেছেন, হে ভগবতি, কল্পিত আগমের কারণ শ্রবণ কর। পূর্কে তপস্যার দ্বারা নিস্পাপ, সকল দেবতার অজেয় নমুচি প্রভৃতি মহাবলপরাক্রান্ত দানববর্গের দেবগণকে অতিক্ৰমণ করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহাতে দেবগণের ভগবান্ হরিকে নিবেদন করিলেন যে, হে কেশব, তুমি সেই মহাদৈত্য- গণকে জয় করিতে যােগ্য হও, পরে শ্রীভগবান্ দেবগণের এই সভয় বাক্য শ্রবণ করিয়া সেই দৈত্যগণকে অবধ্য জানিয়া আমাকে কহিয়াছিলেন। শ্রীভগবান্ কহিতেছেন, হে রুদ্র, তুমি দৈত্যদিগের মােহনাথ পাষণ্ডধৰ্ম্ম ও মােহনার্থ শাস্ত্র প্রকাশ কর, এবং নৃকপাল, ভস্ম ও চর্ম ধারণ করিয়া জগতের লােকসকলের মােহ জন্মাও, সেই প্রকার কঙ্কাল, শৈব, পাষণ্ড, মহা- শৈব ইত্যাদি নামভেদে পাশুপত শাস্ত্র প্রকাশ কর, তাহাতে বেদবিরুদ্ধ সেই সকল মত অবলম্বন করিয়া [২০৫] দ্বিজাধমেরা সকলেই ভস্মাস্থিধারী হইবেক, পরে তাহারদিগের মতাবলম্বন করিয়া সকল দৈত্যেরা ক্ষণকাল মাত্রে নিশ্চয় আমাকে পরিত্যাগ করিবেক, পশ্চাৎ ঐ মত আশ্রয় করিয়া অবশ্য নরকে পতিত হইবেক, হে পাৰ্বতি, আমি সেই হেতু কপাল ভস্ম চর্ম ও অস্থি ধারণ করিয়াছি এবং ভগবদ্বাক্যানুসারে পাষণ্ডাদি পাশুপত শাস্ত্র ও প্রকাশ করিয়াছি, তদনন্তর আমার শক্তি, গৌতমাদি দ্বিজসকলকে আকর্ষণ করিয়া সেই সকল বেদবিরুদ্ধ শাস্ত্র সম্যক প্রকারে কহিয়াছিলেন, ঐ মন্ত্রে বিশ্বাস করিয়া আমাকে দেখিয়া সকল রাক্ষস তমােগুণে আবৃত হইয়া ভগবানকে পরিত্যাগ করিয়া ভস্মৃস্থিধারী হইয়া আমাকেই মাংস ও রাদির দ্বারা পূজা করিয়াছিল, পশ্চাৎ যে কালে সেই দৈত্যের ক্রমে অত্যন্ত বিষয়াসক্ত কামক্রোধযুক্ত শক্তিহীন ও অতি ক্ষীণ হইল, সেই কালে দেবতারা তাহাদিগকে জয় করিয়া- ছিলেন, তাহারা সর্বধর্ম[২০৬]পরিভ্রষ্ট হইয়া কালক্রমে অধমা গতি পাইবেক। সেই কঙ্কাল, শৈ, পাষণ্ড ও মহাশৈবাদি শাস্ত্রকে অসদাগম কই যায়, তাহার আচরণ করিয়া লােকসকল ইহলােকে ও পরলােকে অতি দারুণ নরক পাইবেক, যাহাৱা আমার এই মত অবলম্বন করিয়া রামমােহন-গ্রন্থাবলী পৃথিবীতে কৰ্ম্ম করিবেক, তাহারা সর্বধৰ্ম্মরহিত হইয়া সৰ্ব্বদা নরকে বাস করিবেক, আমি দেবতারদিগের হিতার্থ এই প্রকার শাস্ত্র প্রচার করিয়াছি, তাহা নিন্দিত জানি। হে দেবি, আমি ভগবানের আজ্ঞা গ্রহণ করিয়া যে অস্থি ধারণ করিয়াছি, তাহা কেবল অসুরদিগের মােহনার্থ বা চিহ্ন মাত্র। এবং বরাহপুরাণেও কল্পিত আগমের কারান্তর কথিত আছে, সেই কল্পিত আগমের এই সকল শ্লোক। গােমাংস ভক্ষয়েন্নিত্যং পিবেদমরবাণীং। গঙ্গাযমুনয়ােৰ্ম্মধ্যে বালণ্ডাং তপস্বিনীং । হস্তে প্ৰগৃহ তাং রাং বলাৎকারেণ [২০৭] যােজয়েং। মাতৃযােনিং পরিত্যজ্য বিহরেং সৰ্বযােনি। স্বারপরদারে যথেচ্ছং বিহরে সদা। গুরুশিষ্য প্রণালী ত্যজেং হিমাচরন্ ॥ অর্থাৎ। প্রত্যহ গােমাংস ভক্ষণ ও সুরাপান করিবেক, এবং গঙ্গা যমুনার মধ্যে তপস্বিনী বালণ্ডার হস্ত গ্রহণ করিয়া বলাৎকারে তাহাকে মৈথুন করিবেক, এবং মাতৃযােনি পরিত্যাগ করিয়া সকল যােনিতেই বিহার করিবেক এবং কি স্বদার কি পরদার স্বেচ্ছানুসারে সর্বযােনিতেই বিহার করিবেক, কেবল গুরুশিষ্য প্রণালী ত্যাগ করিবেক, অতএব যদি ভাবামাচারী মহাশয়েরা কল্পিত আগমে শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া সুরাপানে আসক্ত হন, তবে তাহাদিগের কল্পিত আগমের উক্ত অন্য২ কৰ্ম্মও উপযুক্ত হয় কি না? পশ্চাৎ মহাদেব নিজ ভক্তগণকেও ঐ সকল কল্পিত আগমের অনুষ্ঠানে উদ্যত দেখিয়া তাহাদিগের রক্ষণার্থ ফেৎকারীতন্ত্রে ঐ সকল তন্ত্রের যথার্থ অর্থ করিয়াছেন। মহানিৰ্বাণাদিও কল্পিত [২৮] ও অসদাগম হয়, যেহেতু তিস্মৃতিবিরুদ্ধ, অতএব ভাবামাচারীদিগের মহা- নির্বাণে নির্ভর করিয়া নরকে নিৰ্ব্বাণ বিনা প্রকৃত নির্বাণের বিষয় কি, যদ্যপি তথাপি অভ্যাস- দোষবশতঃ পুনৰ্ব্বার মহানিৰ্বাণে নির্ভর করেন, তবে তাহার এই প্রকার অর্থে নির্ভর করা তাঁহাদিগের উচিত হয়। “কলৌ যুগে মহেশানি ব্রাহ্মণানাং বিশেষতঃ। পর্ন স্যাৎ পশু স্যং পর্ন স্যাং মমায়া। অতএব দ্বিজাতীনাং মদ্যপানং বিধীয়তে। দ্বেষ্টারঃ কুলধৰ্ম্মাণাং বারুণীনিকাশ্চ যে। শপচাদধমা জ্ঞেয়া মহাকিষিকারিণঃ ॥” এই মহানিৰ্বাণের বচনে পশুন স্যাৎ ইত্যাদি স্থানে নঞর অর্থ নিষেধ নহে, কিন্তু শিশ্চালন এবং পুনঃ পুনঃ পশুৰ্ন স্যাৎ এই শব্দ প্রয়ােগে নিশ্চয় অর্থবােধ হইতেছে, তাহাতে এই অর্থ স্থির হয় যে, কলিযুগে বিশেষতঃ ব্রাহ্মণেরা কি পশু হইবেন না, ফলতঃ অবশ্যই পশু হইবেন, অতএব যাহারা কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপান বিধান করে, এবং যাহার [২০৯) কুলধৰ্ম্মের ফলত: গ্রামনগরাদির কিম্বা স্বজাতীয়গণের ধর্মের দ্বেষ করে, এবং বারুণীনিক ফলতঃ শিবশক্তির নিন্দা করে, তাহারা মহাপাতকী ও অন্ত্যজ হইতেও অধম হয়। যদ্যপি ভাবামাচারী মহাশয় কহেন যে, কলো যুগে মহেশানি ইত্যাদি মহানিৰ্বাণের বচন শিববাক্য, আর যানি শাস্ত্রণি দৃশ্যন্তে লােকেস্মিন্ বিবিধানি চ ইত্যাদি কুৰ্ম্মপুরাণীয় বচন বেদব্যাসবাক্য, অতএব বেদব্যাসবাক্যের দ্বারা শিববাক্যের বাধ কি প্রকারে জন্মান যায়, তথাপি সেই কুৰ্ম্মপুরাণীয় বচনকে শিববাক্য বলিয়া তাহাতে তাহাদিগের শ্রদ্ধা করিতে হইবেক, যেহেতু তঁাহারা সাধন প্রকরণের শিববাক্য ব্যতিরেকে তাবৎ শিববাক্যেই আদর করিয়া থাকেন, যেমন মহাভারতনামক ইতিহাসের অন্তর্গত ভগবদগীতার ভগবদবাক্যত্ব পাষণ্ডপীড়ন ৭৭ প্রযুক্ত হতে প্রদ্ধা করিতেছেন, যদি কি শিববাক্য, কি পুরাণাদির বাক্য, যাহাতে সুরাপানাদির বিধি আছে, [২১০ ] কেবল তাহাতেই শ্রদ্ধা করেন, এবং অন্য পুরাণাদি শাস্ত্র ধূর্তপ্রলাপ অর্থাৎ মিথ্যা কহেন, তবে তাহাতে ধর্ম সংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা কর্ণদ্বয়ে হস্তদ্বয় আচ্ছাদন করিবেন, যেহেতু সে বাক্য অশ্রোতব্য ও অগ্রাহ্য । অতএব স্মৃতিশাস্ত্র কহিতেছেন। বেদাঃ প্রমাণং ঋতয়ঃ প্রমাণং ধৰ্মার্থযুক্তং বচনং প্রমাণং। যস্য প্রমাণং ন ভবেৎ প্রমাণং কত কুৰ্য্যাধচনং প্রমাণং। অর্থাৎ বেদ, স্মৃতি ও ধৰ্মাৰ্থযুক্ত বচন, ফলতঃ ইতিহাস পুরাণাদির বাক্য, এই সকল প্রমাণ হয়, কিন্তু যে ব্যক্তির সম্বন্ধে এই সকল প্রমাণ অপ্রমাণ হয়, তাহার বাক্য প্রমাণ করিয়া কে গ্রহণ করে। বিরুদ্ধাবিরুদ্ধ নানা প্রকার শাস্ত্র সন্দশনে সন্দিগ্ধ হইয়া হিমালয় মহাদেবকে এই প্রশ্ন করিয়াছিলেন যে, বিরুদ্ধাবিরুদ্ধ নানাবিধ শাস্ত্র দর্শন করিতেছি, ইহার মধ্যে কোন শাস্ত্র ব্যবহাৰ্য, কোন্ শাস্ত্র বা অব্যবহার্য তাহাতে সকল আগমের কর্তা ও তত্ত্ববেত্তা শ্রীমহাদেব [ ২১১] স্বয়ং উত্তর করিয়াছিলেন যে, তিস্মৃতিবিরুদ্ধ যে সকল শা, তাহা অব্যবহার্য। এবং ভগবতীর প্রতি শ্ৰমহাদেব কল্পিত আগমের যে কারণ কহিয়াছেন, তাহাও পদ্মপুরাণে ও বরাহপুরাণে দেদীপ্যমান আছে, সেই সকল বাক্যই কূৰ্মপুরাণে ও পদ্ম- পুরাণে এমপ্রমাদাদিরহিত বেদব্যাস কতৃক অবিকল লিখিত হয়, যেমন মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণার্জুন- সম্বাদ তৎকতৃক লিখিত হইয়াছে, এ কারণ সেই কূৰ্ম্মপুরাণীয় ও পদ্মপুরাণীয় শিববাক্যের দ্বারা ভাক্তবামাচারীর লিখিত কলৌ যুগে মহেশানি ইত্যাদি শ্ৰতিস্মৃতিবিরুদ্ধ মােহনার্থ কল্পিত অসদাগম, সুতরাং সকলের অগ্ৰাহ হইবেক, ইহাতে কোন আশঙ্কা নাই। অতএব বৃহস্পতি কহিতেছেন। বেদার্থে যঃ স্বয়ং জ্ঞাতস্তত্ৰাজ্ঞানং ভবেৎ যদি। ঋষিভিনিশ্চিতে তত্র কা শৰু স্যান্মনীষিণাং। অর্থাৎ বেদাদি শাস্ত্রের যে অর্থ স্বয়ং জ্ঞাত হইয়াছে, তাহাতে যদি সংশয় উপস্থিত হয়, তবে ঋষি[২১২]গণ কতৃক সেই অর্থ নিশ্চিত হইলে পণ্ডিতদিগের আশঙ্কার বিষয় কি। অতএব কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানে ভাবামাচারীর যে অধিকারিভেদে ব্যবস্থা, তাহার দুরবস্থাপযুক্ত তাহারা এক্ষণে স্মৃতিপুরাণাদি শাস্ত্রোক্ত ব্ৰহ্মহত্যাদি দোষগ্রস্ত হইয়া মদ্যপানে নিরস্ত কিম্বা নরকস্থ হইবেন কি না? কালভেদে বিষয়ভেদে ও অধিকারিভেদে ব্যবস্থা সেই স্থলে হয়, যে স্থলে অকল্পিত শাস্ত্রদ্বয়ের পরস্পর বিরােধ হয়, কল্পিত ও অকল্পিত শাস্ত্রের পরস্পর বিরােধস্থলে কিন্তু কল্পিত শাস্ত্রের অপ্রামাণ্যই সৰ্বজনের মান্য, যেমন সমূলক স্মৃতিপুরাণাদির পরস্পর বিরােধে বিষয়াদিভেদে ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু সমূলক ও অমূলক স্মৃতি পুরাণাদির পরস্পর বিরােধে অমূলকই ত্যজ্য এবং এক শাস্ত্র অমান্য করিলে তাহাতে কি অন্য শাস্ত্র অমান্য হয়, তিতির বিরােধে স্মৃতির অমান্যতায় কি শ্রুতির অমান্যতা হয়, কি মনুস্মৃতি [ ২১৩] ও অন্য স্মৃতির বিরােধে অন্য স্মৃতির অমান্যতায় মনুস্মৃতির অমান্যতা হয়, বরঞ্চ অধিক মান্যতাই হইতেছে। যদি বল যেমন পুরাণে তন্ত্রের হেয়ত্বসূচক বচন আছে, তেমন তন্ত্রেও পুরাণাদির হেয়ত্বসূচক বচন দেখিতেছি, তাহা গ্রাহ করিলে পুরাণ ও তন্ত্র পরস্পর খণ্ডিত হইয়া উচ্ছিন্ন হয়। যথা ভাগবতে। নিমগানাং যথা গঙ্গা দেবানামচুতে যথা। বৈষ্ণবানাং যথা শঙ্কু ৭৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী পুরাণানামিদং তথা । ব্রহ্মবৈবর্তে। প্রাণাধিকা যথা রাধা কৃষ্ণ প্রেয়সীষু চ। ঈশ্বরী যথা লক্ষ্মী পণ্ডিতে সরস্বতী ॥ তথা সৰ্বপুরাণানাং ব্রহ্মবৈবর্তমেব চ। অর্থাৎ যেমন নদীর মধ্যে গঙ্গা, দেবতার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ ও বৈষ্ণবের মধ্যে মহাদেব শ্রেষ্ঠ, তেমন পুরাণের মধ্যে শ্রীভাগবত এবং যেমন শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সীর মধ্যে রাধা প্রাণাধিকা, ঈশ্বরীর মধ্যে লক্ষ্মী ও পণ্ডিতের মধ্যে সরস্বতী, তেমন সকল পুরাণের মধ্যে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ শ্রেষ্ঠ হয়, অন্য পুরাণেও এই প্রকার আছে। মহানিৰ্ব্বাণে [২১৪]। নানেতিহাসযুক্তানাং নানামার্গ প্রদশিনাং। বহুলানাং পুরাণানাং বিনাশাে ভবিতা তুবি। মন্মার্গবিমুখা লােকা: পাষণ্ড ব্ৰহ্মঘাতিন। অতত মত- মুৎস্য যােহন্মতমুপায়ে । ব্রহ্মহ। পিতৃহা স্ত্রীঃ স ভবেন্নাত্ৰ সংশয়ঃ । মদ্বক্তদুখিতং ধর্ম ত্যান্য ধমীহতে। অমৃতং স্বগৃহে ত্যক্ত। ক্ষীরমার্কং স বাতি। ষড় দর্শনমহাকূপে পতিতাঃ পশবঃ প্রিয়ে। ন জানন্তি পরং তত্ত্বং বৃধা নশ্যন্তি পাৰ্বতি । অর্থাৎ ভগবতীর প্রতি মহাদেব কহিতেছেন। হে পাৰ্বতি, নানা ইতিহাসযুক্ত ও নানা পথপ্রদর্শক যে পুরাণশাস্ত্র, তাহার নাশ হইবেক, আমার এই পথে বিমুখ যে সকল লােক, তাহারা পাষণ্ড ও ব্রহ্মবাতক হয়, অতএব আমার এই মত পরিত্যাগ করিয়া যে অন্য মত আশ্রয় করে, সে ব্ৰহ্ম, পিতৃ ও স্ত্রীঘ্ন হয়, ইহাতে সন্দেহ নাই, আর আমার মুখ হইতে নির্গত ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া যে, [২১৫] অন্য ধর্মের আশ্রিত হয়, সে স্বগৃহস্থিত অমৃত ত্যাগ করিয়া অকক্ষীর অর্থাৎ আকন্দের আটা বাঞ্ছা করে, এবং ষড়দর্শনস্বরূপ মহাকূপে পতিত হইয়া পশুগণের: পরম তত্ত্ব জানিতে পারে না, কেবল বৃথা নষ্ট হইতেছে। এ স্থানে বিজ্ঞ ব্যক্তিসকলে বিবেচনা করিবেন যে, পুরাণে তন্ত্রের নিন্দাবােধ হয়, কি তন্ত্রে পুরাণের নিন্দা জ্ঞান হইতেছে, শীভাগবতাদির শ্লোকে কেবল তত্ত গ্রন্থের উত্তমতা কহিতেছেন, অতএব তত্ত গ্রন্থে লােকের শ্রদ্ধাতিশয়ার্থ তত্তচনকে তদ গ্রন্থের স্তাবক কহা যায়, একের অতিবাদে অন্যের নিন্দা কুত্রাপি কেহ কহিবেন না এবং কূর্মপুরাণে ও পদ্মপুরাণে সর্বতন্ত্রকা মহাদেব স্বয়ং মীমাংসক হইয়া পূর্বে হিমালয়ের প্রতি ও ভগবতীর প্রতি শাস্ত্রের যে মীমাংসা কহিয়াছিলেন, তাহাই বেদব্যাস প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাতে তন্ত্রশাস্ত্রের নিন্দার প্রসঙ্গও নাই, কেবল লােকে কি তন্ত্র গ্রাহ কি [২১৬] অগ্রাহ্য তাহার নির্ণয় করিয়াছেন, যদি এক ব্যক্তি রত্নপরীক্ষক, বহু রত্নের মধ্যে কোন রত্বকে অপকৃষ্ট কহেন, তবে তাহাতে কি রত্নজাতির নিন্দা হয়, কি সেই বাক্য যে প্রকাশ করে, তাহাকে নিক কহা যায়, যে নিন্দিত সেই নিন্দিত হয়, কিন্তু সেই নিন্দিত বন্ত সকল লােকের অগ্রাহ্য হয় না, যাহারা নিন্দিত, তাহাদিগেরি গ্রাহ্য হয়। মহানিৰ্বাণাদি তন্ত্রের বচনে কি কেবল পুরাণাদি শাস্ত্রের নিন্দাবােধ হইতেছে, যেহেতু সৈই বচনে তৎপথবিমুখ ব্যক্তিসকলের প্রতি পাষণ্ড ও ব্রহ্মঘাতক ইত্যাদি শব্দ প্রয়ােগ এবং পুরাণাদি শাস্ত্রকে অর্ককীর এবং যড় দর্শনকে কুপ কহিতেছেন। উত্তমের রীতি এই যে, পরের প্রশংসার দ্বারা আপনিও প্রশংসিত হন, অধমে তাহার বিপরীত, অর্থাৎ পরের নিলার দ্বারা আপনি প্রশংসিত হইতে ইচ্ছা করে, তাহাও কি হয়, পরের যে নিল সে পরের নহে, তাহাতে কেবল আপনিই নিন্দিত হয়, কি [২১৭] হার নিন্দা করে, তেঁহ নিন্দিত হইলেও প্রশংসিত হন, যেহেতু প্রশংসিত পাষণ্ডপীড়ন ব্যক্তির স্বভাব এই যে, প্রশংসিতেরি স্বরূপাখ্যান প্রশংসা করেন, নিন্দিতের এই সুভাষ যে, প্রশংসিতেরি নিন্দা করে, ইহা প্রসিদ্ধই আছে। যদ্যপি আক্তবামাচারী মহাশয় কহেন যে, মহানিৰ্বাণাদি তন্ত্র অসদাগম, এ কারণ অগ্রাহ্য ও অপ্রমাণ হইলেও তথা প পুরাণাদির মতাবলম্বী ও মহানিৰ্ব্বাণাদির মতাবলম্বী এই উভয়েরি তুল্য ফল, যেহেতু পুরাণাদির মতাবলম্বীদিগের ইহলােকে নানাবিধ ব্রতনিয়মাদি তপঃক্লেশে ক্লিষ্ট হইয়া পরলােকে পরম সুখ হইবেক, আর মহানিৰ্বাণাদি অসদাগমের মতাবলম্বীদিগের ইহলােকেই যথেষ্ট মদ্যমাংসাদি আহারে হৃষ্টপুষ্ট হইয়া স্বচ্ছন্দ যবনীগমনাদি নানাবিধ সুখ সম্ভোগ হইতেছে, পরলােকে কাহার কি হয়, তাহা কে দেখিয়াছে ও দেখিবেক, ভাল, যদি ভাক্তত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরা হতপরলােক হইয়াও ধৰ্মসংস্থা[ ২১৮ ]পনাকাঙ্ক্ষীদিগকে জয় করিতে ইচ্ছা করেন, তবে বৌদ্ধেরা কি অপরাধ করিয়াছে, বরঞ্চ তাহারদিগকে ও উত্তম কহা যায়, যেহেতু তাহাদিগের মতে যদ্যপি পরলােক নাই, এবং সুগন্ধি পুষ্পমাল্য দিব্যাঙ্গনাদি সম্ভোগজনিত সুখ ও দশদণ্ডাভ্যন্তরে অভিলষিত দ্রব্যভােজনই স্বর্গ এবং মৃত্যুই অপবর্গ হয়, তথাপি তাহারা অহিংসাকে পরম ধৰ্ম কহিয়া থাকে, তােমরা হিংসাকেই পরমধৰ্ম্ম করিয়া কহ। এবং মহানিৰ্ব্বাণের সহিত যদি কলিযুগে ব্রাহ্মণাদির মদ্যপান নিৰ্ব্বাণ হইলেন, তবে তাহার পরিসংখ্যা বিধি ও সুতরাং নির্বাণ হইবেক, যেমন সর্প পলায়ন করিলে তাহার সহিত পুচ্ছও পলায়ন করে। এবং ধর্মসংস্থাপনা- কাজীর লিখিত স্মৃতিপুরাণাদিবচনে ব্রাহ্মণাদির মদ্যপানে নিষেধ দর্শনে শূদ্র ভক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরা লম্ফ উল্লম্ফ প্রলম্ফ প্রদান করিবেন না, যেহেতু শূদ্ৰ কমলাকরত পরাশরবচন দর্শন করিলে [২১৯ ] তাঁহাদিগেরাে বাক্যরােধ ও হৃদরােধ হইবেক। যথা পরাশর। তথা মদ্য পানেন ব্রাহ্মণীগমনেন চ। বেদাক্ষরবিচারেণ শূদ্ৰশ্চাণ্ডালং ব্ৰজেৎ | অর্থাৎ শুদ্ৰজাতি যদি মদ্যপান, ব্রাহ্মণীগমন কিম্বা বেদের বিচার করেন, তবে তাহাদিগের চণ্ডালজাতি প্রাপ্তি হয়। এবং স্বপক্ষ কিম্বা বিপক্ষ হইবেন, শ্ৰীকালীশঙ্কর নামে এক ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে উত্থাপিত করিয়া ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীকে জয় করিবার আশায় ভাবামাচারী মহাশয় আষাঢ় মাসে চতুর্থ দিবসে তাহার এক প্রশ্ন ও আপনার উত্তর প্রকাশ করেন, সে এই প্রকার হয়। হতে দ্রোণে কর্ণে চ বিনিপাতিতে। আশা বলবতী রাজন্ শলো জেষতি পাণ্ডবান্। অর্থাৎ যেমন কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধযজ্ঞে ভীষ্ম, দ্রোণ ও কর্ণ নষ্ট হইলে কুরুশ্রেষ্ঠ, পাণ্ডববিজ্ঞয়ার্থ শল্যকে বধােপস্থ করিয়া প্রেরণ করিয়াছিলেন, আশা কি বলবতী, শল্যও পাণ্ডব জয় করিবেক, সেই শল্যও এই [২২০ ] সকল স্মৃতিপুরাণতন্ত্রযুক্তিদৃষ্টান্তস্বরূপ অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারা এই মহাবাগ যুদ্ধে বাপেবতার প্রত্যর্থ আগতমাত্রেই ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী কর্তৃক নিহত হইলেন, যেমন কুরু- পাণ্ডবের যুদ্ধযজ্ঞে যজ্ঞেশ্বরের প্রত্যর্থ আগতমাত্রেই প্রকৃত শল্য, মহারাজ যুধিষ্ঠির কতৃক হত হইয়াছিলেন। সেই প্রশ্ন ও উত্তর যাহাদিগের দৃষ্টিগােচর হইয়াছে, তাহাদিগের বিলক্ষণ বােধ হইবেক। তাহার সংক্ষেপে বিবরণ করা যাইতেছে। প্রশ্ন। ধর্মসংস্থাপনা- কাজীর চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে আপনি তন্ত্রের প্রমাণ লিখিয়াছেন, এ স্থানে আমার জিজ্ঞাস্য হতে ভীষ্মে রামমােহন-গ্রন্থাবলী এই যে, কুৰ্ম্মপুরাণে যানি শাস্ত্রণি দৃশ্যন্তে লােকেহস্মিন্ বিবিধানি চ। তিতিবিরুদ্ধানি নিষ্ঠা তেষাং হি তামসী। ইত্যাদি বচন লিখিয়াছেন, ইহার সিদ্ধান্ত আপনারা কি করেন। উত্তর, আমরা ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে ২৩ পৃষ্ঠে ২০ পঙক্তি অবধি ওই প্রশ্নের উত্তর দুই প্রকার লিখিয়া[ ২২১ ]ছি, প্রথম, এক শাস্ত্রকে অমান্য করিলে অন্য শাস্ত্র মান্য হইতে পারে না, দ্বিতীয়, এ স্থানে বিরােধই হয় না, যেহেতু, সংস্কৃত ও অসংস্কৃত ভেদে এবং অধিকারিভেদে মদ্যপানের বিধি ও নিষেধ, অধিকন্তু সকল শাস্ত্রই মান্য হয়, যদ্যপি স্মৃতিপুরাণাদিই মান্য ও তন্ত্র অমান্য হয়, তথাপি উভয়ের উভয় রক্ষা পায়, স্মৃতিপুরাণাদির মতাবলম্বীদিগের পরলােক ও তন্ত্রমতাবলম্বীদিগের ইহলােক। তাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর উত্তর।-যবনী কি অন্য জাতি পরদার মাত্র গমনে সেই জাতি প্রাপ্ত অবশ্যই হয়েন। ইতি। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর প্রত্যুত্তর।-যদ্যপি পূর্বোক্ত স্মৃতিপুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রস্বরূপ অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারাই শৈববিবাহেরাে নামাকর্ণ চ্ছিন্ন হইয়াছে, তথাপি এ স্থানে কিঞ্চিৎ বিশেষ উক্তির নিমিত্ত পুনৰ্ব্বার প্রবৃত্ত হইতেছে, শিবােক্ত তন্ত্রশাস্ত্র অমান্য করিলে তন্ত্রোক্ত মন্ত্ৰগ্ৰহণাদি নিরর্থ হইয়া তাহারদিগের পরমার্থও নষ্ট হয় এ যথার্থ, কিন্তু শিবােক্ত অকল্পিত তন্ত্র যাহারা মান্য করেন, তাহারদিগের পর মার্থ হানির বিষয় কি, পরন্তু শিবােক্ত মােহনর্থ কল্পিত তন্ত্রে ( ২২৪ ] যাহারা নির্ভর করিয়া যথেষ্টাচার করেন, তাহাদিগের কি পরমার্থ হইবেক? এবং খাদ্যাখাদ্য ও গম্যাগম্য শাস্ত্রানুসারেই হয়, অতএব বিশিষ্ট লােকেরা যথার্থ শাস্ত্রানুসারেই তাহার ব্যবহার করিয়া থাকেন, কিন্তু যাঁহারা অযথার্থ কল্পিত শাস্ত্রে শ্রদ্ধা করিয়া খাদ্যাখাদ্যের ও গম্যাগম্যের বিচার না করেন, তাহারদিগকে মেচ্ছ কি পশু কথা যাইতে পারে, এবং এই শৈব বিবাহে বয়স ও জাতির বিচার নাই, কেবল সপিণ্ডা ও সধবা হইলেই হইতে পারে, কিন্তু এ স্থানে শৈব বিবাহের ব্যবস্থাপক মহাশয়কে এই ব্যবস্থা জিজ্ঞাসা করি যে, যাহারা যবনীগমনে ও বেশ্যাসেবনে সর্বদা রত, তাহারদিগের স্ত্রীও বিধবাতুল্যা, যদি তাহারা সপিণ্ডা না হয় তবে ঐ সকল স্ত্রীকে শৈব বিবাহ করা যায় কি না? পরন্তু, অস্বর্গং লােকবিদ্বিষ্টং ধৰ্ম্যমপ্যাচরে তু অর্থাৎ লােকের বিদ্বিষ্ট যে বৰ্ম্ম, তাহা শাস্ত্রীয় হইলেও স্বর্গের বিরােধী হয়, তাহা বিশিষ্ট লােকের আচরণীয় নহে, এই মনুবচনে যে কর্ম লােকের [ ২২৫ ] ব্যে হয়, সে অবশ্যই নরকের কারণ, অতএব বিশিষ্ট লােকে কদাচ তাহার অনুষ্ঠান করিবেন না, এই প্রকার বােধ হইতেছে, অতএব শৈববিবাহ যথার্থ হইলেও সনদগের কদাচ কৰ্ত্তব্য হয় না। এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতার ২৪ পৃষ্ঠের ১৪ পঙক্তি অবধি ২৫ পৃষ্ঠের ৪ পঙক্তি পৰ্যন্ত, আর ২৬ পৃষ্ঠের ৮ পঙক্তি অবধি ১১ পঙক্তি পৰ্য্যন্ত যে সকল কটুবাক্য আছে, তাহার প্রত্যুত্তর পূর্বেই করা গিয়াছে, পুনঃ পুনঃ করণে কেবল পৌনরুক্ত ও লােকের বৈরক্ত হয়। অলমতিপল্লবিতেন ইতি ॥ শ্ৰীমদ্ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষিবিরচিতে পাষণ্ডপীড়ননামক প্রত্যুত্তরে কোলকুলহৃৎকম্পনাে নাম চতুর্থোঞ্জাসঃ সমাপ্ত। গ্রন্থঃ সম্পূর্ণ। শকাব্দ ১৭৪৪। বাঙ্গলা সন ১২২৯। ২০ মাঘ শ্ৰমতা ধীমতা কেন ধর্মসংস্থাপনাবিনা। নিবন্ধোহয়ং কৃতঃ কেন কুতিনা সহকারিণা । সন্মতি সদগতিং শান্তি সম্পত্তি যা ধাম্মিকাঃ। বিদ্রুব দ্রুত পতাঃ পাষণ্ডাঃ কর্মকণ্টকাঃ। ইতি

পথ্য প্রদান
[ ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত )
১১

পথ্য
প্রদান
সমগনুষ্ঠানাক্ষমতজ্জন্যমনস্তাপবিশিষ্টকর্তৃক
কলিকাতা
সংস্কৃত মুদ্রান্ত্রে মুদ্রাঙ্কিত হইল।
শকাব্দ ১৭৪৫
MEDICINE
FOR THE SICK
OFFERED
BY
ONE WHO LAMENTS
HIS INABILITY TO PERFORM
ALL RIGHTEOUSNESS.
CALCUTTA,
PRINTED AT THE SUNGSCRIT PRESS.
1828.

পরমেশ্বরায় নমঃ। ; ভূমিকা বাস্তবিক ধর্মসংহারক অথচ ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী নাম গ্রহণপূর্বক যে প্রত্যুত্তর প্রকাশ করিয়াছেন তাহা সমূদায়ে দুই শত অষ্টাত্রিংশৎ পৃষ্ঠ সংখ্যক হয়, তাহাতে দশ পৃষ্ঠ পরিমিত ভূমিকা গ্রন্থারম্ভে লিখেন ওই দশ পৃষ্ঠে গণনা করা গেল যে ব্যঙ্গ ও নিন্দাসূচক শব্দ ভিন্ন স্পষ্ট কটুক্তি বিংশতি শব্দ হইতে অধিক আমাদের প্রতি উল্লেখ করিয়াছেন; এইরূপ সমগ্র পুস্তক প্রায় দুৰ্ব্বাক্যে পরিপূর্ণ হয়। ইহাতে এই উপলব্ধি হইতে পারে যে দ্বেষ ও মৎসরতায় কাতর হইয়া ধৰ্মসংহারক শাস্ত্রীয় বিবাদছলে এইরূপ কটুক্তি প্রয়ােগ করিয়া অন্তঃকরণের ক্ষোভ নিবারণ করিতেছেন, অন্যথা দুৰ্বাক্য প্রয়ােগ বিনা শাস্ত্রীয় বিচার সর্বথা সম্ভব ছিল। ধৰ্ম্মসংহারককে এবং অন্যকে বিদিত আছে যে তাহার প্রতি এরূপ অথবা এতদধিক দুৰ্বাক্য প্রয়ােগে আমাদের বরঞ্চ আমাদের আশ্রিত ব্যক্তিদেরও সম্পূর্ণ ক্ষমতা আছে, যেহেতু তাহাদের সহিত ধৰ্ম্মসংহারকের কদুক্তির আদান প্রদানে পরিপূর্ণ লিপি সকল অদ্যাপিও ব্যক্ত রহিয়াছে, কিন্তু আমরা স্বয়ং তিন কারণে দুৰ্ব্বাক্যের বিনিময় হইতে ক্ষান্ত রহিলাম। প্রথমত, যে কেহ উত্তরে কটুক্তি শুনিবার আশঙ্কা করিয়া আপন অধীন ভিন্ন অন্য ব্যক্তির প্রতি গর্হিত বচন প্রয়ােগ করিতে সমর্থ হয়, তাহার প্রতি উত্তরে কটুক্তি কথনের প্রয়ােজন যে তাহার ক্ষোভ ও লজ্জা ও মনঃপীড়া এ সকল না হইয়া কেবল ততুল্য নীচত্ব সেই উত্তর প্রদাতার স্বীকার মাত্র হয়, সুরতাং (নীচস্যোচ্চৈভাষাঃ সুজনঃ স্ময়তে ন শােচতে তাভিঃ। কাকভেকখর- শব্দাৎ বদ কো নগরং বিমুঞ্চতে ধীরঃ)। দ্বিতীয়ত, বালক ও পশ্বাদির হিতকরণে ও চিকিৎসাসময়ে তাহারা আস্ফালন ও চীৎকার এবং বিরুদ্ধ করিবার চেষ্টা যদি করে ও হিংসাতে প্রবৃত্ত হয় তাহাতে ওই অবােধ প্রাণীর চীৎকারাদির পরিবর্ত না করিয়া দয়ালু মনুষ্যেরা তাহাদের হিতেচ্ছা হইতে ক্ষান্ত হয়েন না, সেইরূপ আমাদের হিতৈষার বিনিময়ে ধৰ্ম্মসংহারকের বিরুদ্ধ চেষ্টায় ও দ্বেষ প্রকাশে আমরা রাগাপয় হইয়া ওই প্রত্যুত্তরের উত্তরে শাস্ত্রীয় উপদেশের দ্বারা ততােধিক স্নেহ প্রকাশ করিতেছি। তৃতীয়ত, ভাগবতে লিখেন (ঈশ্বরে, তদধীনেযু, বালিশে, দ্বিষৎসু চ। প্ৰেমমৈত্রীকৃপােপেক্ষা যঃ কৰােতি স মধ্যমঃ) পরমেশ্বরে প্রেম, তাহার অধীন ব্যক্তিসকলের সহিত মিত্ৰতা, মূখ ব্যক্তিদিগ্যে কৃপা, ও দ্বেষ্টাদের প্রতি উপেক্ষা যে করে সে মধ্যম হয়, অতএব সাধ্যানুসারে ধর্মসংহারকের প্রতি উপেক্ষাই কর্তব্য হয়।

বিজ্ঞাপন। আমাদের নিন্দার উদ্দেশে ধর্মসংহারক আপন প্রত্যুত্তরের নাম “পাষণ্ড পীড়ন” রাখেন তাহাতে বাগদেবতা পঞ্চমী সমাসের দ্বারা ধর্মসংহারকের প্রতি যাহা যথার্থ তাহাই প্রয়ােগ করিয়াছেন। প্রয়ােজন পৃষ্ঠে (তদুত্তরস্বরূপেণ) ইত্যাদি দ্বিতীয় শ্লোকের দ্বারা যে দুৰ্বাক্য আমাদের উদ্দেশে উল্লেখ করিয়াছিলেন, তাহাতে বাগদেবতা “তৎ” পদের উদ্দেশ্য প্রশ্নচতুষ্টয়কে দেখাইয়া ওই সকল দুৰ্বাক্য ধর্মসংহারকের প্রতি উল্লেখ করেন। আমাদের নিন্দোদ্দেশে ধৰ্ম্মসংহারক “নগরান্তবাসী” এই পদ প্রয়ােগ পুনঃ২ করিয়াছেন, অথচ বাগদেবতার প্রভাবে এ শব্দের প্রতিপাদ্য তিনি যে স্বয়ং হয়েন তাহা স্মরণ করিলেন না। প্রত্যুত্তর প্রকাশের দিবস সন ১২২৯ শাল ২০ মাঘ লিখেন কিন্তু এ নগরস্থ অনেক সজ্জনের নিকট প্রকাশ আছে যে বৈশাখ মাসে প্রত্যুত্তরের বিতরণ হয় ইতি । ১২৩০, ১৫ পৌষ । সম্যগনুষ্ঠানামঃ তজ্জন্যমনস্তাপবিশিষ্ট নমাে জগদীশ্বরায়। প্রথমত তিন পৃষ্ঠের অধিক স্বীয় প্রশ্ন ও আমাদের দত্ত উত্তরের কিয়দংশ লিখিয়া, ধর্মসংহারক চতুর্থ পৃষ্ঠে যে প্রত্যুত্তর দেন তাহার তাৎপৰ্য এই যে সম্যগনুষ্ঠানাক্ষম আপনাকে ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী স্বীকার করিয়াছেন অথচ ভাক্ত শব্দের অর্থ জানেন না “ইদানীন্তন কৰ্মীদের সন্ধ্যা বন্দনাদি ও নিত্য পূজা হােমাদি পিতৃ- মাতৃকৃত্য যাত্রা মহােৎসব জপ যজ্ঞ দান ধ্যান অতিথিসেবা প্রভৃতি শ্রুতিস্মৃতি বিহিত নিত্যনৈমিত্তিক কাম্য কৰ্ম্ম সর্বদা দর্শন ও শ্রবণ করিতেছেন তথাপি স্বয়ং প্রকৃত লক্ষণাক্রান্ত ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী হইয়া সম্পূর্ণ কিম্বা অসম্পূর্ণ কম্মিসকলকে কোন্ শাস্ত্রদৃষ্টিতে নিরপরাধে ভাক্ত কৰ্ম্মী কহিয়া নিন্দা করেন”। উত্তর।—আমাদের পূর্ব উত্তরে কোনাে ব্যক্তিবিশেষের নিয়ম ছিল না কেবল সাধারণ কথন আছে অর্থাৎ “কি ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী কি অভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী" “এক ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী ও এক ভাক্তকৰ্ম্মী” তাহার দ্বারা আমরা আপনাদের প্রতি কিম্বা অন্য কোনো অসম্পূর্ণ জ্ঞানীর প্রতি ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী শব্দের উল্লেখ করিয়াছি এমৎ উপলব্ধি দ্বেষপরিপূর্ণ চিত্ত ব্যতিরেকে অন্যের কদাপি হয় না বিশেষত “সম্যগনুষ্ঠানাম” এই নাম গ্রহণই উত্তরদাতার অসম্পূর্ণ জ্ঞানানুষ্ঠানকে ব্যক্তরূপে জানাইতেছে অধিকন্তু ওই উত্তরের ৭ পৃষ্ঠের শেষে ওইরূপ সাধারণ মতে লিখা আছে “যে কোনাে এক বৈষ্ণব যে আপন ধর্মের লক্ষাংশের একাংশ অনুষ্ঠান করে না—সে যদি কোন শাক্তের এবং কোনাে ব্ৰহ্মনিষ্ঠের স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানে ত্রুটি দেখিয়া তাহাকে ভক্ত ও নিন্দিত কহে—তবে তাহাকে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা নিন্দকের মধ্যে অতিশয় নিন্দিত জানিবেন কি না” এই সাধারণ প্রশ্ন এক ব্যক্তির কি শাক্তত্ব ও ব্রাহ্মত্ব উভয়ের ব্যঞ্জক হইতে পারে? বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন। যদি কেহ এমৎ নিয়ম করেন যে অসম্পূর্ণ শ্রবণমননবিশিষ্ট জ্ঞানাবলম্বী ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী শব্দের বাচ্য হয় তবে তাহার অবশ্য উচিত হইবেক যে অসম্পূর্ণ কর্মীর প্রতিও ভাক্তকৰ্ম্মিপদের উল্লেখ করেন কিন্তু এ নিয়ম কি আমাদের কি ধৰ্ম্মসংহারকের উভয়ের তুল্য গ্লানিকর হয়। ঐ পৃষ্ঠের শেষে ধর্মসংহারক আপনাকে সেই সকল কর্মীদের মধ্যে গণনা করিয়াছেন যাঁহাদিগ্যে লােকে “শ্রুতিস্মৃতিবিহিত নিত্যনৈমিত্তিক কাম্য কৰ্ম্ম সর্বদা করিতে দর্শন ও শ্রবণ করিতেছেন” এ নিমিত্ত তিস্মৃতিবিহিত নিত্য নৈমিত্তিক কৰ্ম্ম যাহা কর্মীর অবশ্য কর্তব্য তাহার কিঞ্চিৎ এ স্থলে লিখিতেছি এই প্রার্থনা যে পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন যে লােকেরা এ সকলের অনুষ্ঠান ৮৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী করিতে ধৰ্মসংহারককে সর্বদা দেখিতেছেন কি না। (স্মাৰ্তধৃত বচনকল। প্রাতরুখায় কর্তব্যং যদ্বিজেন দিনে দিনে ইত্যাদি। ব্রাহ্মে মুহুর্তে উত্থায় স্মরেৎ দেববন্ মুনীন। মূত্রপুরীযােৎসর্গং কুৰ্যাৎ দক্ষিণাং দিশং দক্ষিণাপরান্বেতি। তদ্দেশপরিমাণমাহ। মধ্যমেন তু চাপেন প্রক্ষিপে, শরত্ৰয়ং। অন্তধায় তৃণভূমিং শিরঃ প্রাবৃত্য বাসস। স্নানং সমাচরেৎ প্রাতর্দন্তধাবনপূর্বকং। অশ্বক্রান্তে রথক্রান্তে বিষ্ণুক্রান্তে বসুন্ধরে। মৃত্তিকে হর মে পাপং যন্ময়া দুষ্কৃতং কৃতং)। ইহার অর্থঃ। প্রাতঃকালে উত্থান করিয়া দ্বিজ সকল যে২ কর্ম প্রতিদিন করিবেন তাহা লিখিতেছি। ব্রাহ্ম মুহূর্তে অর্থাৎ চারি দণ্ড রাত্ৰি থাকিতে গাত্রোখান করিয়া প্রধান দেবতা ও ঋষিগণের স্মরণ করিবেন। বাটীর দক্ষিণ কিম্বা নৈঋত কোণে মলমূত্র পরিত্যাগ করিবেন তাহাতে দেশের পরিমাণ এই যে মধ্যবিধ এক ধনু লইয়া তিন শর প্রক্ষেপ করিবেন অর্থাৎ ঐ শরক্ষেপপরিমিত ভূমি পরিত্যাগ কৰ্ত্তব্য। তৃণের দ্বারা ভূমিকে আচ্ছাদন করিয়া ও বস্ত্রের দ্বারা মস্তকাচ্ছাদনপূর্বক মল মূত্র পরিত্যাগ করিবেন। পরে দন্ত বনানন্তর অশ্বক্রান্তে রথক্রান্তে ইত্যাদি মন্ত্রের দ্বারা গাত্রে মৃত্তিকা লেপনপূর্বক প্রাতঃকালে স্নান করিবেন। পুস্তকবাহুল্য ভয়ে প্রতিদিনকৰ্তব্য কর্মের মধ্যে প্রাতঃকর্তব্যের কিঞ্চিৎ লেখা গেল আর ব্রাহ্ম মুহূৰ্ত অবধি প্রদোষ পৰ্যন্ত দিবসকে আট ভাগ করিয়া প্রত্যেক প্রত্যেক ভাগে যে২ কৰ্ম্ম কৰ্ত্তব্য তাহারও কিঞ্চিৎ২ সংক্ষেপরূপে লেখা যাইতেছে। ( অগ্নিহােত্র জুহুয়াদাদ্যন্তে দ্যুনিশােঃ সদা) অর্থাৎ আদ্যভাগে ও অন্তভাগে অগ্নিহােত্র করিবেন। (দ্বিতীয়ে চ ততাে ভাগে বেদাভ্যাসসা বিধীয়তে) অর্থাৎ দ্বিতীয় ভাগে বেদের অধ্যয়ন বিচার অভ্যাস জপ ও অধ্যাপনা করিবেন। (তৃতীয়ে চ তথা ভাগে পােয্যবর্গার্থসাধনং) অর্থাৎ তৃতীয় ভাগে স্ব২ বৃত্তি দ্বারা ধনােপাৰ্জন করিবেন। (চতুর্থে চ তথা ভাগে স্নানার্থং মৃদমাহরেৎ) অর্থাৎ চতুর্থ ভাগে পুনঃ স্নান নিমিত্ত মৃত্তিকা হরণ করিবেন। (পঞ্চমে চ তথা ভাগে সংবিভাগে যথার্থতঃ) অর্থাৎ পঞ্চম ভাগে নিত্যশ্রাদ্ধ বলি বৈশ্বদেব ক্ষুধার্ত জীবে অন্ন দান পশ্চাৎ অবশিষ্ট ভােজন ইত্যাদি করিবেন। (ইতিহাসপুরাণাদ্যৈঃ ষষ্ঠসপ্তমকৌ নয়েৎ) অর্থাৎ ষষ্ঠ সপ্তম ভাগকে ইতিহাস পুরাণাদির আলােচনাতে যাপন করিবেন। (অষ্টমে লােকযাত্রায়াং বহি সন্ধ্যা সমাচরেৎ) অর্থাৎ অষ্টম ভাগে লােকযাত্রা ও গ্রামের বহির্ভাগে যাইয়া সন্ধ্যা বন্দনা গায়ত্ৰীজপ ইত্যাদি কৰ্ম্ম করিবেন। যাঁহারা ধর্মসংহারককে প্রত্যহ দেখিতেছেন তাঁহারাই মধ্যস্থরূপ মীমাংসা করিবেন অর্থাৎ যদি ধৰ্ম্মসংহারককে পথ্য প্রদান ৮৭ ; প্রতিদিন এ সকল কর্ম অবাধে করিতে দেখেন তবে সম্পূর্ণ কর্মীদের মধ্যে সুতরাং তাহাকে গণিত করিবেন; যদি তাহারা কহেন যে প্রায় এ সকল কর্ম ধর্মসংহারক প্রত্যহ করিয়া থাকেন কোনাে দিবস করিতে অসমর্থ হইলে প্রত্যবায় পরিহারের নিমিত্ত প্রায়শ্চিত্ত করেন তবে সুতরাং তিনি অসম্পূর্ণ কর্মী এই পদবাচ্য হইবেন; অথবা যদি তাহারা দেখেন যে সূর্যোদয়ের ভূরিকালানন্তর গাত্রোখান করিয়া ধৰ্মসংহারক স্বগৃহে আতুরের ন্যায় প্রাতঃকৃত্য করেন পরে দ্বিতীয় ভাগে কর্তব্য বেদাভ্যাসের স্থানে গ্রাম্যালাপ ও লােকনিন্দা করিয়া থাকেন, তৃতীয় ভাগে কর্তব্য যে সুবৃত্তিতে ধনেপাৰ্জন তাহার স্থানে শূদ্ৰবৃত্তি দ্বারা দিবসের ভূরিকালকে ক্ষেপণ করেন, আর চতুর্থ ভাগে কর্তব্য মৃত্তিকা গ্রহণপূর্বক পুনঃ স্নান ও সন্ধ্যাদি স্থানে, এবং পঞ্চম ভাগে কর্তব্য কর্মের স্থানে, সূচীবিদ্ধ যবনব্যবহারযােগ্য বস্ত্র পরিধান পূৰ্ব্বক মেচ্ছ যবন অন্ত্যজ ইত্যাদির সহিত বেষ্টিত হইয়া ম্লেচ্ছগৃহে স্থিতি করেন ; ও অষ্টম ভাগে কর্তব্য হােমাদি স্থানে ধূম্র পানে ও ব্যসনে কাল যাপন করেন তবে ঐ মধ্যস্থেরা বিবেচনা মতে ধৰ্ম্মসংহারকের প্রতি ভাক্তকৰ্ম্মিপদের উল্লেখ করা উচিত জানেন অবশ্য করিবেন আর ঐ স্বধৰ্ম্মবিহীন বিশিষ্ট সন্তান আপনাকে উত্তম কর্মী জানাইয়া অন্যের স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠান নাই এই পরিবাদ দিয়া সমাজমধ্যে বাহুবাদ্যপূৰ্ব্বক যদি আস্ফালন করেন তবে তাহারাই ঐ সাধুসন্তানের প্রতি ধৃষ্ট পদের প্রয়ােগ করা উচিত বুঝেন অবশ্যই করিবেন। ৮ পৃষ্ঠের শেষে লিখেন যে “স্বধর্মানুষ্ঠানের সাবকাশ সময়ে স্মৃতিশাস্ত্র- প্রমাণানুসারে সাময়িক কৰ্ম্ম ও রাজকৃত ধর্মের অনুষ্ঠানকর্তাকে নিরন্তর পরধর্মানুষ্ঠাতা কহিয়া নিন্দা করেন”। উত্তর “স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানের সাবকাশ সময়” এই পদের প্রয়ােগাধীন অনুভব হয় যে সাময়িক কৰ্ম্ম ও রাজকৃত ধর্ম এ দুই শব্দের দ্বারা বনােপাৰ্জনাদি বিষয়কৰ্ম্ম তঁাহার অভিপ্রেত হইবেক অতএব নিবেদন, যে পণ্ডিতেরা ধৰ্ম্মসংহারককে সর্বদা দেখিতেছেন তঁাহারাই বিবেচনা করিবেন যে তিনি স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানের সাবকাশ সময়ে স্মৃতিশাস্ত্রানুসারে সাময়িক কর্ম ও রাজকৃত ধর্মের অনুষ্ঠান করেন কি ধনােপার্জনের সাবকাশ সময়ে যৎকিঞ্চিৎ স্বধৰ্ম্মাভাসের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন যেহেতু তাহারা অবশ্য জানেন যে ব্রাহ্মণের স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানের সাবকাশ কাল যাহাতে ধনােপাৰ্জন কৰ্তব্য তাহা দিবসের অন্ধ্র প্রহর হয় অতএব তাহারা এরূপ দম্ভোক্তি সত্য কি মিথ্যা ইহা অনায়াসে জানিতে পারিবেন। ৯ পৃষ্ঠে দশ পংক্তি অবধি যাহা লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে যদি ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী ও ভাক্তকৰ্ম্মী উভয়ে স্বস্ব ধর্মানুষ্ঠানরহিত হয়েন কিন্তু তাহার মধ্যে ডাক্ত bobou ; রামমােহন-গ্রন্থাবলী তত্ত্বজ্ঞানী আপনাকে লােকে সিদ্ধ ও উত্তমরূপে প্রকাশ করেন তবে ঐ ভাক্তকৰ্মী তাঁহাকে উপহাস করিতে পারেন কি না। উত্তর।—ধর্মসংহারক ভাক্তকৰ্ম্মী কি অসম্পূর্ণ কর্মী হয়েন, পূৰ্বলিখিত কর্মীদের নিত্যকর্মের বিবেচনা দ্বারা এবং ধর্ম- সংহারকের প্রত্যহ অনুষ্ঠানের অবলােকন দ্বারা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তাহার নির্ণয় করিবেন; অথবা আমরা ভাক্তজ্ঞানী কিম্বা অসম্পূর্ণ জ্ঞানানুষ্ঠায়ী হই, ইহার নিশ্চয়ও সেইরূপ পরের লিখিত শাস্ত্রানুসারে পণ্ডিত লােক যেন করেন; পূর্ব উত্তর লিখিত মনুবচন (জ্ঞানেনৈবাপরে বিপ্র যজন্ত্যেতৈৰ্মখৈঃ সদা। জ্ঞানমূলাং ক্রিয়ামেং পশ্চন্তো জ্ঞানচক্ষুষা)। কোনাে ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থেরা গৃহস্থের প্রতি যে যজ্ঞ শাস্ত্রে বিহিত আছে তাহা সকল কেবল জ্ঞান দ্বারা নিষ্পন্ন করেন, সে কিরূপ জ্ঞান তাহা পরাব্ধে কহিতেছেন, তঁাহারা জ্ঞানচক্ষু যে উপনিষৎ তাহার দ্বারা জানেন যে পঞ্চ যজ্ঞাদি সকলের উৎপত্তির মূল জ্ঞানস্বরূপ পরব্রহ্ম হয়েন অর্থাৎ জ্ঞাননিষ্ঠ গৃহস্থদের পঞ্চ যজ্ঞাদি অনুষ্ঠানের স্থানে পরব্রহ্ম পঞ্চযজ্ঞাদি তাবতের মূল হয়েন এই মাত্র চিন্তন উপনিষৎ আলােচনার দ্বারা তাহাদের আবশ্যক হয়। তথা (যথােক্তাপি কৰ্ম্মাণি পরিহায় দ্বিজোত্তমঃ। আত্মজ্ঞানে শমে চ স্যাঘেদাভ্যাসে চ যত্নবান্) পূর্বোক্ত কর্মসকলকে পরিত্যাগ করিয়াও ব্রাহ্মণ আত্মজ্ঞানে, ইন্দ্রিয়নিগ্রহে, প্রণব উপনিষদাদি বেদাভ্যাসে যত্ন করিবেন অর্থাৎ আত্মার শ্রবণ মননে ও ইন্দ্রিয় নিগ্রহে ও বেদাভ্যাসে যত্ন করা ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণের আবশ্যক হয়। বর্ণাশ্রমাচার কৰ্ম্ম অবশ্যই ত্যাগ করিবেক এমত তাৎপৰ্য নহে কিন্তু জ্ঞানসাধনের অন্তরঙ্গ কারণ যে আত্মার শ্রবণ মনন ও শম ও বেদাভ্যাস ইহারই আবশ্যকতা জ্ঞাননিষ্ঠের প্রতি হয়, মনুটীকাৰ্ধত কৌষীতশ্রুতিঃ (অথ বৈ অন্যা আহুতয় অনন্তরস্তাঃ কর্মমযয্যা হি ভবন্ত্যেবং হি তস্য এতৎ পূৰ্বে বিদ্বাংসােহগ্নিহােত্রং জুহবাঞ্চঙ্কুরিতি) পূর্বোক্ত কর্মময়ী আহুতিসকল জ্ঞাননিষ্ঠদের এই হয় আর এই জ্ঞানসাধনরূপ অগ্নিহােত্র পূর্ব২ জ্ঞাননিষ্ঠেরা করিয়াছেন; অতএব বিজ্ঞ লােক বিবেচনা করিবেন যে যাহাদের প্রতি ধৰ্ম্মসংহারক ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী পদের প্রয়ােগ করিয়াছেন সে সকল ব্যক্তিরা ব্ৰহ্ম জগতের মূল হয়েন এরূপ চিন্তন করেন কি না যেহেতু মনুষ্য ভূরিকাল যদ্বিষয় ভাবনা করে তদ্বিষয়ের আলাপ ও উপদেশ প্রায় ভূমিকাল করিয়া থাকে এবং তাহাদের প্রণব ও উপনিষদাদি বেদভ্যাসে ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহে সম্যক প্রকারে কি অসম্যক্ প্রকারে যত্ন আছে কি না ইহাও বিবেচনা করিবেন তখন অবশ্যই নির্ধারণ করিতে সমর্থ হইবেন যে তাঁহারা ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী কি অসম্পূর্ণ জ্ঞানানুষ্ঠায়ী হয়েন, ইহার বিশেষ বিবরণ জ্ঞান কর্ম বিচার হলে পরে লেখা যাইবেক। এবং কোন্ পক্ষে • ২ পথ্য প্রদান ৮৯ যথা ঐ আপনার উত্তমতা প্রকাশ ও সর্বপ্রকারে আপনার ধর্মানুষ্ঠানের গৰ্ব ও কোন্ পক্ষে আপনার অধীনতা ও দম্ভরাহিত্য তাহা পরস্পর উত্তর প্রত্যুত্তর সৃষ্টি করিলে বরঞ্চ উভয়ের গৃহীত নামের অর্থ বিবেচনা করিলেই বিজ্ঞ লােক জানিতে পারিবেন, যেহেতু এক জন ধর্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী ও ধৰ্ম্মসংস্থাপক নাম দ্বারা আপনি কেবল ধাম্মিক হয়েন এমত নহে বরঞ্চ ধৰ্ম্মসেতুর রক্ষকরূপে আপনাকে জানাইতেছেন। প্রত্যুত্তরের প্রয়োজনপত্রে ধর্মসংহারক স্পৰ্দাপূর্বক লিখেন “দুষ্টানাং নিগ্রহার্থায় শিষ্টানাং ত্রাণহেতবে। ধর্মসংস্থাপনার্থায় স্বর্গারােহণসেতবে” ইত্যাদি। প্রায় সেই প্রকারে যেমন ভগবান্ কৃষ্ণ গীতাতে কহিয়াছেন (পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাং। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে)। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি এই নাম গ্রহণ করেন যে “সম্যগনুষ্ঠানাক্ষম তজ্জন্য মনস্তাপবিশিষ্ট অর্থাৎ আপন ধৰ্ম্মের সম্যক অনুষ্ঠানে অসমর্থ এ নিমিত্ত মনস্তাপবিশিষ্ট হই। ৫ পৃষ্ঠের শেষে আপনিই এই আশঙ্কা করেন যে “যদি বল ন্যায়াজ্জিত ধনেই যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম সিদ্ধ হয় অন্যায়াজ্জিত ধনে কৰ্ম্ম সিদ্ধ হয় না অতএব অন্যায়াজ্জিত ধন দ্বারা কর্মকরণপ্রযুক্ত ধৰ্ম্মসংস্থাপনকারী কর্ম করিলেও ভাক্তকৰ্ম্মী হয়েন” পরে আপনিই সিদ্ধান্ত করেন যে অন্যায়াজ্জিত ধনে কৰ্ম্ম করিলে মীমাংসাদি শাস্ত্রানুসারে কৰ্ম্ম সিদ্ধ হয়। উত্তর।—ধৰ্ম্মসংহারকের ধন ন্যায়ােপার্জিত অথবা অন্যায়ােপার্জিত হয় তাহা তিনিই বিশেষ জানেন কিন্তু যে বৃত্তি ব্রাহ্মণের ধনােপাৰ্জনে সৰ্ব্বথা নিষিদ্ধ হয় সে বৃত্তির দ্বারা ধৰ্ম্মসংহারক ধনােপাৰ্জন করিতেছেন কি না তাহা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা এই লিখিত মনুবচনে দৃষ্টি করিয়া বিবেচনা করিবেন, মনুঃ ( ঋতামৃভ্যাং জীবেত্ত, মৃতেন প্রমৃতেন বা। সত্যান্তাভ্যামপি ব ন শ্ববৃত্ত। কদাচন। ঋতমুশিলং প্রােক্তমমৃতং স্যাদযাচিতং। মৃতন্তু যচিতং ভৈক্ষ্য প্রমৃতং কর্ষণং ঘৃতং। সত্যানৃতন্তু বাণিজ্যং তেন চৈবাপি জীব্যতে। সেবা বৃত্তিরাখ্যাতা তস্মাত্তাং পরিবর্জয়েৎ)। ঋত, অমৃত, মৃত, প্ৰমৃত, ও সত্যান্ত, এই সকল বৃত্তির দ্বারা ব্রাহ্মণ ধনােপাৰ্জন করিবেন; শবৃত্তি দ্বারা কদাপি করিবেন না। উঞ্ছবৃত্তি ও শিলবৃত্তিকে ঋত শব্দের অর্থ জানিবে। আর অমৃত শব্দে অযাচিত ও মৃত শব্দে যাচিত ও প্রমৃত শব্দে কৃষিকৰ্ম্ম ও সত্যান্ত শব্দে বাণিজ্য ও শবৃত্তি শব্দে সেবাবৃত্তি ইহা জানিবে, অতএব সেবাবৃত্তি ব্রাহ্মণ কদাপি করিবেন না। মনুর দশমাধ্যায়ে সেবা শব্দের অর্থ টীকাকার লিখেন। সেবা পরজ্ঞাসম্পাদনং। অর্থাৎ পরের আজ্ঞা সম্পন্ন করাকে সেবা কহি এবং পদ্মপুরাণে দশমাধ্যায়ে (ঈশ্বরং বৰ্তনাথায় সেবন্তে মানবা যথা। তথৈব মতিমন্তাপি সেবন্তে পরমেশ্বরং)। যেমন প্রভুকে • నం রামমােহন-গ্রন্থাবলী জীবিকানিমিত্ত লােকে সেবা করে সেইরূপ পণ্ডিতেরা পরমেশ্বরের সেবা করেন। বিরাট পর্ব (নাহমস্ত প্রিয়ােস্মীতি মত্বা সেবেত পণ্ডিতঃ) আমি রাজার প্রিয় এমত জ্ঞান করিয়া পণ্ডিতে রাজার সেবা করিবেক না। মহাকবিপ্রণীত শ্লোক (নাথে পুরুষােত্তমে জিগমেকাধিপে চেতসা সেব্যে স্বস্য পদস্য দাতরি বিভৌ নারায়ণে তিষ্ঠতি। যং কঞ্চিৎ পুরুষাধমং কতিপয় গ্রামেশমপ্রদং সেবায়ৈ মৃগয়ামহে নরমহাে মূঢ়া বরাকা বয়ং) প্রভু লােকশ্রেষ্ঠ ত্রিজগতের অদ্বিতীয় অধিপতি অন্তঃকরণের দ্বারা সেব্য হইলে আপন পদের দাতা এরূপ নারায়ণ সত্ত্বে, পুরুষাধম কতিপয় গ্রামের অধিপতি অল্পদাতা যে কোনাে মনুষ্যকে সেবার নিমিত্ত যত্নবিশিষ্ট থাকি । আমরা কি নীচ ও মৃঢ় হই। এখন পণ্ডিতেরা এ সকল প্রমাণ দৃষ্টি করিয়া বিবেচনা করিবেন যে ম্লেচ্ছসেবা করিয়া সৎকর্মীদের মধ্যে গণিত হইবার অভিমান করা ব্রাহ্মণের উচিত হয় কি না। ১২ পৃষ্ঠে লিখেন যে ব্রাহ্মণ শূদ্রা গ্রহণে পতিত হয়েন ইহা যে বচনে প্রাপ্ত হইতেছে তাহার তাৎপৰ্য এই যে ব্রাহ্মণ যথার্থ পতিত হয়েন এমত নহে কিন্তু অসৎপ্রতি গ্রহজন্য পাপমাত্ৰ হয় যেহেতু অসৎ প্রতিগ্ৰহজন্য পাপে ও সুরাপানাদিতে বিস্তর বৈলক্ষণ্য। উত্তর।-কর্মীদের প্রতি যে কর্মে পাতিত্য ও অধমত্বকথন আছে অর্থাৎ এ কৰ্ম্ম করিলে কম্মী পতিত হয় তাহার স্পষ্টার্থ পরিত্যাগ করিয়া ধৰ্ম্মসংহারক কহেন, এ স্থলে পতিত হওন তাৎপর্য নহে কিন্তু ঐ২ ক্রিয়াতে কিঞ্চিৎ দোষকথন শাস্ত্রের তাৎপৰ্য হয় আর জ্ঞাননিষ্ঠদের প্রতি কোনাে অবিহিত কৰ্ম্ম করিলে যে দোষশ্রবণ আছে সে সকল বাক্যের স্পষ্টার্থ ই গ্রহণ করেন কিন্তু তাহারও তাৎপৰ্য কিঞ্চিৎ দোষ কথন হয় ইহা কদাপি স্বীকার করেন এরূপ পক্ষপাতাধীন ব্যবস্থা পণ্ডিতের আদরণীয় হয় কি না তাহারাই বিবেচনা করিবেন। ১২ পৃষ্ঠের শেষে ধর্মসংহারকের শূদ্রসম্পর্ক নাই লিখিয়াছেন অতএব তাহার শূদ্রসম্পর্ক প্রমাণ করা উদ্বেগজনক সত্য বাক্য ব্যতিরেকে হইতে পারে না সে আমাদের নিয়মের বহিভূত হয় যে শাস্ত্রীয় বিচারে কটুক্তি না হইতে পারে তবে অন্য কেহ তাহা প্রমাণ করে আমাদের হানি লাভ নাই। আর শূদ্ৰাসনে উপবেশনের বিষয়ে ১৩ পৃষ্ঠে লিখেন “যে বিশিষ্ট শূদ্রের আপনিই পৃথক্‌ আসনে উপবিষ্ট হয়েন” তাহার উত্তর এই যে যাহারা ধৰ্ম্মসংহারককে সর্বদা দেখিতেছেন তাহারাই ইহার মীমাংসা করিবেন যে ধৰ্ম্মসংহারক সৎ শূদ্র হইতে পৃথগাসনে বইসেন কি সৎ শূদ্র ও অসৎ শূদ্র বরঞ্চ যবনাদির সহিত একাসনে বসিয়া থাকেন, এ বিষয়ে পথ্য প্রদান ৯১ আমাদের বাকলহ নিরর্থক। অধিকন্তু ১৩ পৃষ্ঠে লিখেন যে “শূদ্রযাজনাদিকরণে যে সকল দোষশ্রুতি আছে সে তাবৎ অসৎ শূদ্র অত্যজাদিপর, যেহেতু চারি বর্ণ চারি যুগেই প্রসিদ্ধ আছেন তাহাদের ক্রিয়া কৰ্ম্ম ষটকৰ্ম্মশালী ব্রাহ্মণ সকল চিরকাল করিয়া আসিতেছেন এবং অদ্যাবধি সৎশূদ্রযাজী ও আশূদ্রযাজ। বিদিগের পরস্পর তুল্যরূপ মান্যমানকতা কুটম্বতা ও আহার ব্যবহার সর্বদেশেই হইতেছে”। উত্তর।—এ নবীন ধৰ্ম্ম সংস্থাপন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন যে ব্রাহ্মণের . শূদ্রযাজনে দোষ নাই ইহাতে দুই প্রমাণ দিয়াছেন প্রথম এই যে “চারি বর্ণ চারি যুগেই প্রসিদ্ধ আছেন” কিন্তু এ স্থলে ধৰ্ম্মসংহারককে জানা উচিত ছিল যে যেমন চারি যুগে চারি বর্ণ আছেন সেইরূপ তাহাদের মধ্যে উত্তম অধম পতিত ইহাও চারি যুগে হইয়া আসিতেছেন, তাহা পূর্ব২ কালীন শাস্ত্রেই দৃষ্ট হইতেছে। মনুঃ ( যাবত সংস্পৃশেদঙ্গৈব্রাহ্মণ শূদ্রযাজকঃ ! তাবতাং ন ভবেদ্দাতুঃ ফলং দানস্থ পৌৰ্ত্তিকং) শূদ্রযাজক ব্রাহ্মণ যত ব্রাহ্মণের পংক্তিতে বসিয়া আহার করে, সে সকল ব্রাহ্মণেতে দান করিলে দাতার শ্রাদ্ধীয় ফলপ্রাপ্তি হয় না। টীকাকার কুল্লুকভট্ট শূদ্র শব্দ এ স্থলে অসৎশূদ্র অন্ত্যজাদিপর হয় এমৎ লিখেন নাই। প্রায়শ্চিত্তবিবেকে, যমঃ (পুরােধাঃ শূদ্ৰবৰ্ণস্য ব্রাহ্মণাে যঃ প্রবর্ততে। স্নেহাদর্থপ্রসঙ্গাদ্বা তস্য কৃচ্ছ বিশশাধনং) যে ব্রাহ্মণ স্নেহপ্রযুক্ত অথবা ধনলােভে শূদ্রবর্ণের পৌরােহিত্য ক্রিয়া একবারও করে সে ঐ পাপক্ষয়ের নিমিত্ত প্রাজাপত্য ব্ৰত করিবেক। সাক্ষাৎ শূদ্ৰবৰ্ণ প্রাপ্ত হইতেছে। এবং অযাজ্যযাজন প্রায়শ্চিত্তের প্রতিজ্ঞাতে ঐ বিবেককার লিখেন। ( অথ শূদ্রাতিরিক্তাযাজ্যযাজনপ্রায়শ্চিত্তং) শূদ্র ভিন্ন অন্য অজ্য যাজনের প্রায়শ্চিত্ত কহিতেছি। ইহাতে শূদ্র ও শূদ্র ভিন্ন পতিতাদি উভয়ের অযাজ্যত্ব প্রাপ্ত হইতেছে। মিতাক্ষরাতেও লিখেন (অত উপপাতক- সাধারণ প্রায়শ্চিত্তং শূদ্ৰাদ্যযাজ্যযাজনে ব্যবতিষ্ঠতে) অর্থাৎ উপপাতক সাধারণের যে প্রায়শ্চিত্ত তাহার ব্যবস্থা শূদ্র প্রভৃতি অজ্যযাজনে জানিবে । এ স্থলেও শূদ্ৰবৰ্ণ ও তদিতরের অযাজ্যত্ব প্রাপ্ত হইতেছে। শূদ্রযাজকের নির্দোষত্বে দ্বিতীয় প্রমাণ ধৰ্ম্মসংহারক লিখেন যে “সৎশূদ্রযাজী ও অশূদ্রযাজী ব্রাহ্মণেদের পরস্পর তুল্যরূপে মান্যমানকতা কুটম্বতা আহার ব্যবহারও সৰ্ব্বদেশেই হইতেছে”। উত্তর।—ইদানীন্তন ব্যবহার দেখিয়া মদিবচনের সঙ্কোচ করা এ ধৰ্মসংহারক হইতেই সম্ভবে, যেহেতু এই ব্যবস্থানুসারে ধর্মসংহারক কহিবেন যে শুক্রবিক্রয়ী ও অশুক্রবিক্রয়ী উভয়ের পরস্পর মান্যমানকতা কুটম্বতা আহার ব্যবহার অদ্যাবধি দেখিতেছি অতএব শুক্রবিক্রয়ী নির্দোষ হয় এবং কহিবেন যে ম্লেচ্ছসেবী ও এ বচনে রামমােহন-গ্রন্থাবলী অম্লেচ্ছসেবী উভয়ের পরস্পর মান্যমানক কুটম্বতা আহার ব্যবহার দেখিতেছি অতএব ম্লেচ্ছসেবী ব্রাহ্মণ দোষী হয় না এখন সৎকর্মীরা বিবেচনা করিবেন যে এ মহাশয় নিশ্চিত ধৰ্ম্মসংহারক হয়েন কি না। ১৩ পৃষ্ঠের শেষে লিখেন যে “ব্রাহ্মণের শূভ্রমত্রের সহিত একাসনে উপবেশন পাতিত্যজনক নহে যেহেতু অন্ত্যজ জাতি বৈষ্ণব হইলে সেও বিশ্বপবিত্রকারক হয়” এবং ইহার প্রমাণের নিমিত্ত ব্ৰহ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তের বচন লিখিয়াছেন যে চণ্ডাল যবনাদিও বৈষ্ণব হইলে পবিত্রকারী হয়। উত্তর।-যদ্যপি এ সকল মাহাত্ম্যসূচক বচনের যথাশ্রুত অর্থকে ধৰ্ম্মসংহারকের মতানুসারে স্বীকার করা যায় তবে শূদ্র বৈষ্ণবের বরঞ্চ চণ্ডালাদি বৈষ্ণবেরও সহিত একাসনে বসিলে পাপের নিমিত্ত না হইয়া পবিত্রতার কারণ অবশ্য হয়; কিন্তু এরূপ মাহাত্ম্য- সূচক বচন শাক্ত শৈবাদির প্রতিও দেখিতেছি, যথা কুলানচন্দ্রিকাবৃত কুলালীতন্ত্রে (কৌলিকো হি গুরু সাক্ষাৎ কৌলিকঃ শিব এব চ। কৌলিকন্তু পিতা সাক্ষাৎ কৌলিকো বিষ্ণুৱেব হি) কৌলিক সাক্ষাৎ গুরু ও শিব ও পিতা ও বিষ্ণুস্বরূপ হয়েন। মহানিৰ্ব্বাণ তন্ত্রে ( অহো পুণ্যমাঃ কৌলাস্তীর্থরূপা স্বয়ং প্রিয়ে। যে পুন্যাত্মসন্ধাচ্ছেশ্বপচপামরান্) স্বয়ং তীর্থস্বরূপ কৌল সকল কি পুণ্যবন্ত হয়ে যাঁহারা আপন সম্বন্ধ দ্বারা ম্লেচ্ছ চণ্ডাল পামর সকলকে পবিত্র করেন। কুলার্ণবে ( শপচোপি কুলজ্ঞানী ব্রাহ্মণাদতিরিচ্যতে। কৌলজ্ঞান- বিহীন ব্রাহ্মণঃ পচাধমঃ ) চণ্ডালও যদি কুলজ্ঞানী হয় তবে সে ব্রাহ্মণ হইতেও শ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণ যদি কুলজ্ঞানহীন হয়েন তবে তিনি চণ্ডাল অপেক্ষাও অধম হয়েন। স্কালে ( শিবধর্মপরা যে চ শিবভক্তিরতাশ্চ যে। শিবব্রতধরা যে বৈ তে সৰ্ব্বে শিবরূপিণঃ) যাহারা শিবধর্মানুষ্ঠানে রত ও শিবের ভক্ত এবং শিবব্রতধারী তাঁহার সাক্ষাৎ শিবস্বরূপ হয়েন। অতএব এতদ্দেশের ক্ষুদ্র ও অন্ত্যজ সকলে প্রায় শাক্ত শৈব বৈষ্ণব এই তিন ধর্মের এক ধৰ্ম্মাক্রান্ত হয়েন, আর প্রত্যেক ধর্মবিশিষ্টের প্রতি ভূরি মাহাত্মসুচক বচন দেখিতেছি যে তাহারা নিজে পবিত্র ও অন্যকে পবিত্র করেন এই রীতিক্রমে ধৰ্মসংহারকের মতে কি শূদ্র কি অন্ত্যজ ইহাদের সহিত একাসনােপবেশনে ও ব্যবহারে কোনাে দোষের সম্ভাবনা রহিল নাই, সুতরাং তাঁহার মতে শূদ্র ও চণ্ডালাদির বিষয়ে ব্রাহ্মণের প্রতি যে নিয়ম শাস্ত্রে কহিয়াছেন তাহার স্থল প্রায় এ দেশে প্রাপ্ত হয় না এবং শূদ্রাদির সহিত যেরূপ ব্যবহার লিখেন তাহারও প্রায় নির্বিষয়তাপত্তি হইল অতএব সৎকর্মীরা বিবেচনা করিবেন যে ধৰ্ম্মসংহারকের এ ব্যবস্থা তাঁহাদের গ্রহণযােগ্য হয় কি না।

পথ্য প্রদান ১৪ পৃষ্ঠের শেষে শূদ্র হইতে বিদ্যাভ্যাসের বিষয়ে মনুবচন লিখেন (শ্ৰদ্ধানঃ শুভাং বিদ্যামিত্যাদি) পরে তাহার ব্যাখ্যা করেন “অর্থাৎ শ্রদ্ধান্বিত হইয়া শূদ্র হইতেও উত্তম বিদ্যা গ্রহণ করিবেক”। উত্তর।—এ বচনের বিবরণে টীকাকার কুল্লকভট্ট পূর্বাপর গ্রন্থের ঐক্যতার নিমিত্ত, শুভ বিদ্যা শব্দে উত্তম বিদ্যা না লিখিয়া “দৃষ্টশক্তি” অর্থাৎ সাক্ষাৎ শুভকারী যে গারুড়াদি বিদ্যা তাহা শূদ্র হইতে গ্রহণ করিবেক ইহা লিখিয়াছেন অতএব পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন যে টীকাকার কুল্লকভট্টের ব্যাখ্যা মান্য কি ধৰ্ম্মসংহারকের ব্যাখ্যা গ্রাহ্য হইবেক। ১৫ পৃষ্ঠ অবধি লিখেন যে ( উদিতে জগতীনাথে ) ইত্যাদি বচনে প্রাপ্ত হইতেছে যে সূর্যোদয়ানন্তর দন্তধাবন করিলে সে পাপিষ্ঠের বিষ্ণুপূজায় অধিকার থাকে না, তাহার “তাৎপৰ্যার্থ এই যে অশাস্ত্রীয় দন্তধাবনাদিকর্তা অসম্পূর্ণ অধিকারী এ কারণ অসম্পূর্ণ ফল প্রাপ্ত হয়। উত্তর-কৰ্ম্মীর প্রতি নিষিদ্ধাচরণে যে সকল দোষশ্রবণ আছে তাহা অসম্পূর্ণ ফলের কারণ হয় ইহা ধৰ্ম্মসংহারক সিদ্ধান্ত করেন আর জ্ঞানাবলম্বীদের প্রতি অবিহিত অনুষ্ঠানে যে সকল দোষশ্রবণ আছে তাহা অসম্পূর্ণ জ্ঞানের কারণ না হইয়া সে এককালে জ্ঞানসাধনের অধিকারকে নষ্ট করে ইহাই বারংবার ব্যবস্থা দেন এরূপ পক্ষপাতীকে পণ্ডিতেরা যাহা উচিত হয় কহিবেন, অধিকন্তু লিখেন যে সূর্যোদয়ানন্তর মুখ প্রক্ষালন ইত্যাদি কর্তার সংস্কারের ক্রটিতে কৰ্ম্মের যে বৈগুণ্য জন্মে তাহা বিষ্ণু স্মরণ দ্বারা সম্পূর্ণ হয় ( অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতােপি বা। যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহাভ্যন্তরঃ শুচিঃ) ইত্যাদি বচন প্রমাণ দিয়াছেন। উত্তর। যদি এই বচন দ্বারা কৰ্ম্মানুষ্ঠায়ীর অপবিত্রতা ও সংস্কারের ত্রুটিজন্য দোষ নিবৃত্তি হয় এমৎ স্বীকার করেন তবে জ্ঞানানুষ্ঠায়ীদের দোষ ক্ষালনের বিষয়ে যে সকল বচন আছে তাহাকেও তাহাদের ত্রুটি মার্জনার কারণ অঙ্গীকার করিতে হইবেক। যােগশাস্ত্রে (সােহং হংসঃ সকৃৎ ধ্যাত্বা সুকৃতে দুষ্কৃতােপি বা। বিধুতকঃ সাধুঃ পরাং সিদ্ধিং সমশুতে) সুকৃত কি দুস্কৃত ব্যক্তি ব্রহ্মের সহিত জীবেব ঐক্য জ্ঞান ও জীবের সহিত ব্রহ্মের ঐক্য ভাব একবার করিলেও সাধক সৰ্ব পাপ ক্ষয়পূর্বক সম্পূর্ণ সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়। কুলার্ণবে (ক্ষণং ব্ৰহ্মাহমম্মীতি যঃ কুৰ্যাদাত্মচিন্তনং। তৎসৰ্বপাতকং নষ্যেৎ তমঃ সূর্যোদয়ে যথা) জীব ব্রহ্মের অভেদ চিন্তা ক্ষণমাত্র করিলেও সকল পাপ নষ্ট হয় যেমন সূর্যোদয় অন্ধকার নষ্ট হয়। বস্তুত অধিকারিভেদে পাপক্ষয়ের উপায় ও পুরুষার্থ সিদ্ধির কারণ ভগবান্ কৃষ্ণ গীতার চতুর্থাধ্যায়ে, যাহাতে স্তুতিবাদের আশঙ্কা নাই, পঞ্চবিংশতি শ্লোক অবধি একত্রিংশৎ শ্লোক পর্যন্ত লিখিয়াছেন, ভগবদ্গীতা পুস্তক ৯৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী সর্বত্র সুলভ এই নিমিত্ত এবং এ গ্রন্থবাহুল্য ভয়ে মূল শ্লোক না লিখিয়া তাহার অর্থ লিখিতেছি। ২৫ শ্লোকার্থ কোন ব্যক্তি কর্মযােগী তাহারা শ্রদ্ধাপূর্বক দেবতাকেই যজন করেন, আর কোন ব্যক্তি জ্ঞানযােগী তাহারা ব্ৰহ্মরূপ অগ্নিতে ব্ৰহ্মাৰ্পণরূপ যজ্ঞ দ্বারা যজন করেন। ২৬ শ্লোকার্থ, কোন ব্যক্তি নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী তাহারা ইন্দ্রিয়সংযমরূপ অগ্নিতে শ্ৰোত্রাদি ইন্দ্রিয়কে হবন করেন অর্থাৎ ইন্দ্রিয়কে নিরােধ করিয়া প্রাধান্য রূপে সংযমের অনুষ্ঠানে স্থিতি করেন। অন্য২ গৃহস্থেরা ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে শব্দাদি বিষয়কে হবন করেন অর্থাৎ বিষয়ভােগকালেও আত্মাকে নিলিপ্ত জানিয়া ইন্দ্রিয়ের কৰ্ম্ম ইন্দ্রিয়েই করে এই নিশ্চয় করেন। ২৭ শ্লোকার্থ, অন্য২ ধ্যাননিষ্ঠ ব্যক্তিরা জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কৰ্ম্মেন্দ্রিয় ও প্রাণাদি বায়ু এ সকলের কৰ্ম্মকে জ্ঞান দ্বারা প্রজ্জ্বলিত যে আত্মার ধ্যানরূপ যােগস্বরূপ অগ্নি তাহাতে হবন করেন—অর্থাৎ সম্যক্ প্রকারে আত্মাকে জানিয়া তাহাতে মনস্থির করিয়া বাহে নিশ্চেষ্টরূপে থাকেন। ২৮ শ্লোকার্থ, কোন ব্যক্তিরা দানরূপই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন, আর কেহ২ তপােরূপ যজ্ঞ করেন, আর কেহ২ চিত্তবৃত্তি নিরােধ যজ্ঞ করেন, ও কেহ২ বেদপাঠরূপ যজ্ঞ করেন, ও কেহ যত্নশীল দৃঢ়ত ব্যক্তিরা বেদার্থজ্ঞানরূপ যজ্ঞ করেন। ২৯ শ্লোকার্থ, কোন ব্যক্তি পূরক ও কুম্ভক ও রেচক ক্রমে প্রাণায়ামরূপ যজ্ঞপরায়ণ হয়েন। ৩০ শ্লোকার্থ, কোন ব্যক্তি আহার সঙ্কোচ দ্বারা ইন্দ্রিয়কে দুর্বল করিয়া ইন্দ্রিয়বৃত্তিকে লয় করেন। এই দ্বাদশ প্রকার ব্যক্তিরা স্ব২ অধিকারের যজ্ঞকে প্রাপ্ত হয়েন আর পূর্বোক্ত স্ব২ যজ্ঞের দ্বারা স্বকীয় পাপকে ক্ষয় করেন। ৩১ শ্লোকার্থ, স্ব২ যজ্ঞের অবসরকালে অমৃতরূপ বিহিতান্ন ভােজনপূর্বক ব্ৰহ্মজ্ঞান দ্বারা নিত্য ব্ৰহ্মকে প্রাপ্ত হয়েন, ইহার মধ্যে কোনাে যজ্ঞ যে না করে সে মনুষ্যলােকও প্রাপ্ত হয় না পরলােকমুখ কি প্রকারে তাহার হয়। গীতাবাক্যে যাহাদের বিশ্বাস আছে তঁাহারা কৰ্ম্মযােগের অভ্যাস দ্বারা যেমন পাপ ক্ষয়ের স্বীকার করেন সেইরূপ জ্ঞানযােগ ও নৈষ্ঠিক যােগ ও ধ্যানযােগ প্রভৃতির দ্বারাও পাপ ক্ষয়ের অঙ্গীকার অবশ্য করিবেন। ১৭ পৃষ্ঠে লিখেন যে “প্রায়শ্চিত্তবিশেষ ব্যতিরেকে কেবল মুখের দ্বারা কে ভােজন করে এবং কোন বিশিষ্ট লােক আসনারূঢ়পাদপূৰ্ব্বক ভােজন এবং দক্ষিণ হক স্পর্শ বিনা বাম হস্তে জলপাত্র গ্রহণ করিয়া জলপান করেন”। উত্তর, আসনে পাদমারােপ্য ইত্যাদি অত্রিবচন যাহা আমরা প্রশ্নচতুষ্টয়ের উত্তরে লিখিয়াছিলাম তাহা দ্বারা ইহা প্রমাণ করা তাৎপৰ্য ছিল না যে বিশিষ্ট লােক সকলেই আসনে পাদ স্থাপনপূর্বক ভােজন এবং বাম হস্তে পাত্র গ্রহণ করিয়া জল পান ও কেবল পথ্য প্রদান ৯৫ মুখের দ্বারা আহার করেন, সেই উত্তরের ৫ পৃষ্ঠে দেখিবেন যে আমাদের এ সকল বচন লিখিবার উদ্দেশ্য এই ছিল যে কৰ্ম্মীদের প্রতি অবৈধ কর্ম করণে যে সকল দোষশ্রবণ আছে তাহাকে ধৰ্ম্মসংহারক ইহা কহিতে সমর্থ হইবেন যে এ সকল যথার্থ নহে কেবল নিন্দার্থবাদ কিন্তু জ্ঞানীর প্রতি অবিহিতের অনুষ্ঠানে যে সকল দোষশ্রবণ আছে সে সকল যথার্থ হয় আমাদের এই তাৎপৰ্য্যকে ধৰ্ম্মসংহারক আপনিই এই প্রত্যুত্তরে পুনঃ দৃঢ় করিয়াছেন, বরঞ্চ এই পত্রের পরপৃষ্ঠে স্পষ্টই লিখিয়াছেন যে “অত্রিবচনে তাদৃশ অন্নের গােমাংস তুল্যত্ব ও তাদৃশ জলের সুরাতুল্যত্ব কীৰ্ত্তন যেমন তর্পণ স্থানে সুবর্ণ রজতের তিলপ্রতিনিধিত্ব কথন দ্বারা তিলতুল্যত্ব কীৰ্ত্তন” এরূপ পক্ষপাতের বিবেচনা পণ্ডিতেরা করিবেন। ১৯ পৃষ্ঠে পুনরায় যাহা নিন্দাছলে লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে জ্ঞান- ষ্ঠানের কোন অংশ অস্মদাদিতে পাওয়া যায় না কিন্তু তাহাদের স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠানে যদি কোনাে দোষ থাকে সে তিলপ্রমাণ মাত্র, ইহার উত্তর ৩ পৃষ্ঠাবধি ১১ পৃষ্ঠ পৰ্যন্ত লেখা গিয়াছে পণ্ডিতেরা তাহাতেই অবলােকন করিবেন পুনরুক্তির প্রয়ােজন নাই। প্রশ্নচতুষ্টয়ের উত্তরে আমরা লিখিয়াছিলাম যে কোন ব্যক্তিরা তিন পুরুষ মেচ্ছের দাসত্ব করেন তাহাতে ধৰ্ম্মসংহারক দাস শব্দের প্রয়ােগ বিষয়ে তর্জনপূর্বক লিখিয়াছেন যে বেতন লইয়া কৰ্ম্ম যে করে তাহার প্রতি দাস শব্দের প্রয়ােগ হইতে পারে না ইহার প্রমাণের নিমিত্ত মিতাক্ষরাধৃত (শুষকঃ পঞ্চবিধঃ ) ইত্যাদি নারদ- বচন উদাহরণ দিয়াছেন যাহার তাৎপৰ্য্য এই যে কর্মকর চারি প্রকার, ও গৃহজাত প্রভৃতি পঞ্চদশ প্রকার দাস হয়, পরে ২৪ পৃষ্ঠে লিখিয়াছেন যে “এই সকল দেদীপ্যমান শাস্ত্র সত্ত্বেও ইদানীন্তন রাজকীয় ব্যাপারে নিযুক্ত লােক সকলকে ভৃতক কিম্বা অধিকৰ্ম্মকৃৎ না কহিয়া মেচ্ছের দাস এই শব্দ প্রয়ােগকর্তাকে অপূৰ্ব্ব পণ্ডিত কহা যায় কি না”। উত্তর-গ্রন্থান্তরে দৃষ্টি করা ধৰ্ম্মসংহারককে উচিত ছিল তবে অবশ্য জানিতেন যে দাস শব্দের প্রয়ােগ সামান্যরূপে ভূতক ও আজ্ঞাবহের প্রতিও হয় কিন্তু মিতাক্ষরাতে যে স্থলে কর্মকর শব্দের সমভিব্যাহারে দাস শব্দের প্রয়ােগ আছে সে স্থলে কর্মকর ভিন্ন যে গৃহজাতাদি পঞ্চদশ প্রকার দাস তাহাকেই বুঝায় যেমন “গােবলীবর্দ” ইহাতে যদ্যপি গােশব্দ সামান্যত গবী ও বলীবর্দ উভয়কেই কহে তথাপি বলীবর্দ শব্দের সাহচর্য প্রযুক্ত স্ত্রীগবীকেই এ স্থলে বুঝায়, বস্তুতঃ সামান্য ভৃতক এবং আজ্ঞাবহেও দাস শব্দের প্রয়ােগ শাস্ত্রে এবং মহাকবিপ্রয়ােগে প্রাপ্ত হইতেছে। সিদ্ধান্তকৌমুদীর উণাদি প্রকরণে পঞ্চম পাদে কোশ প্রমাণ দিতেছেন (দাসঃ সেবকশূদ্ৰয়ােঃ) সেবাকারী মাত্রকে এখানে দাস কহিয়াছেন ৯৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী এবং ( তমধীষ্টো ভূততাভূত) ইত্যাদি পাণিনিসূত্রের ব্যাখ্যাতে ভৃত শব্দের অর্থ স্মাৰ্ত্ত- ভট্টাচাৰ্য লিখেন যে ( ভূতে ভৃতিগৃহীততা দাসঃ) অর্থাৎ বেতন গ্রহণপূর্বক যে কৰ্ম্ম করে তাহার প্রতি দাস শব্দের প্রয়ােগ হয়, এবং মহাভারতে কৰ্ম্মকরের প্রতি দাস শব্দের প্রয়ােগ দেখিতেছি, যুধিষ্ঠিরের প্রতি ভীষ্মবাক্য ( অর্থ পুরুষাে দাসসা দাসস হর্থে ন কস্যচিৎ। ইতি সত্যং মহারাজ বদ্ধোস্মৰ্থেন কৌরবৈঃ।) পুরুষ অর্থের দাস কিন্তু অর্থ কাহার দাস নহে হে মহারাজ ইহা সত্য অতএব কৌরবেদের নিকট অর্থের দ্বারা বদ্ধ আছি। ইহাতে এই ব্যক্ত হইল যে বেতনের দ্বারা কি পালনের দ্বারা অর্থ গ্রহণ করিলে দাস হয় যেহেতু বেতন বিনা কুরু হইতে পণ গ্রহণ ভীষ্মদেবের প্রতি কদাপি সম্ভব নহে; বিরাট পর্বে ভীমের প্রতি দ্রৌপদীর বাক্য ( ত্বমেব ভীম জানীষে যশ্নে পার্থ সুখং পুরা। সাহং দাসীত্বমাপন্না ন শান্তিমবশা লভে ) হে ভীম তুমি আমার পূর্বসুখ জান এখন দাসীত্ব প্রাপ্ত হইয়া পরাধীনতাপ্রযুক্ত পূৰ্ব্ববৎ সুখকে পাই না। দ্রৌপদী বিরাটের গৃহে সৈরন্ধ্রীরূপে ছিলেন আর সৈরন্ধী সে স্ত্রীকে কহি যে পরের গৃহে স্ববশে থাকে শিল্পকর্ম করে, অমর (সৈরী পরবেশস্থা স্ববশা শিল্পকারিকা) কিন্তু সৈরঞ্জী শব্দে গৃহজাতাদি পরবশ নীচকৰ্ম্মকারিণী স্ত্রীকে কহে ভারতের টীকাকারও সৈরন্ধ্রী শব্দের ব্যাখ্যাতে পরিচারিকা ও দাসী দুই শব্দকে এক পৰ্যায়রূপে লিখিয়াছেন। পদ্মপুরাণে সত্যধৰ্ম্ম রাজার প্রতি ইন্দ্রের বাক্য (নমস্তে পৃথিবীপাল ত্বং হি পুণ্যবতাং বরঃ। নিজদাসস্বরূপং মামাজ্ঞাপয় করােমি কিং) হে পৃথিবীপালক পুণ্যবাদের মধ্যে তুমি শ্রেষ্ঠ হও তােমাকে নমস্কার করি, তােমার যে দাসস্বরূপ আমি আমাকে আজ্ঞা কর আমি কি করি। এ স্থলে ইন্দ্রের আজ্ঞাবহত্ব ব্যতিরেক নীচকৰ্ম্মকারী দাসত্ব সম্ভবে না। এবং মিতাক্ষরাতেও আচারাধ্যায়ে দাস শব্দ ও কর্মকর শব্দকে একপর্যায় লিখিয়াছেন। অতএব ধর্মসংহারক বেতন গ্রহণপূর্বক ম্লেচ্ছর কর্মকরণ দ্বারা এবং স্নেচ্ছের আজ্ঞাবহন দ্বারা ম্লেচ্ছদাস এই শব্দের প্রয়ােগস্থল হয়েন কি না— পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন। আর ধর্মসংহারক ২৫ পৃষ্ঠে নারদবচন লিখেন যে স্বধর্মত্যক্ত ব্যক্তি নীচ লােকের দাসত্ব করিতে পারে ইহার দ্বারা ধৰ্ম্মসংহারকের তাৎপৰ্য বুঝি ইহা হইতে পারে যে আপনার স্বধর্ম ত্যাগ অগ্রে প্রতিপন্ন করিয়া ম্লেচ্ছাসত্বে যে দোষ তাহা হইতে নির্দোষ হয়েন। ধর্মসংহারক ৩২ পৃষ্ঠে লিখেন যে “বিষয় ব্যাপারের নিমিত্ত যাবনিকাদি বিদ্যাভ্যাস তত্ত্বজ্জাতি ব্যতিরেকে তাহা কি রূপে হইতে পারে।” উত্তর।—ইহা শাস্ত্রে প্রাপ্ত হইয়াছে যে বৃদ্ধ পিতামাতা ও পথ্য প্রদান সাধ্বী ভাৰ্যা ইত্যাদির পালনের নিমিত্ত অকাৰ্য্যও করিতে পারে কিন্তু একপুত্র পিতা, যাঁহার অনেক লক্ষ টাকা আছে এমত ব্রাহ্মণের সন্তান শাস্ত্রবিরুদ্ধ যবন- বিদ্যাভ্যাস ও যবনসঙ্গ যদি বিষয় ব্যাপারছলে করেন তবে তাহাকে উত্তম কর্মীর মধ্যে গণ্য করা সম্ভব হয় কি না পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন। ৩৫ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে শূদ্রাসনে উপবেশন বিষয়ে লিখেন যে “এমত কোন্ শূদ্র আছে যে সৰ্বারাধ্য ভূদেব ব্রাহ্মণ পণ্ডিতাদিকে দেখিয়া অভ্যুত্থান ও ভিন্নাসন প্রদান করে এবং যুগধর্ম প্রযুক্ত বিষয় ব্যাপারে নিযুক্ত অহরহঃ অবিরত সমাগত দ্বিজের প্রতি পৌনঃপুন্য গাত্রোখানাসম্ভবেও তাহারা প্রয়ােজনাধীন স্বতন্ত্রাসনে উপবেশন করেন।” উত্তর, যে সকল লােক ধৰ্ম্মসংহারীকাক্ষীকে প্রত্যহ শূদ্রাদির সহিত উপবেশনাদি ব্যবহার করিতে দেখিতেছেন তাহারাই বিবেচনা করিবেন যে এরূপ প্রত্যক্ষের অপলাপকাতে সত্যের লেশ আছে কি না। ৩৬ পৃষ্ঠে যাহা লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে ম্লেচ্ছকে দেশভাষা অধ্যাপন করিলে পাপ হয় না, তাহাতে প্রমাণ মনুবচন দিয়াছেন যে বৃদ্ধ মাতা পিতা, সাধ্বী স্ত্রী, শিশু পুত্র ইহাদের পােষণ নিমিত্ত শত অকাৰ্য্য করিলেও দোষ হয় না। উত্তর, বৃদ্ধ মাতাপিতা প্রভৃতির পােষণার্থ অন্য শত ২ উপায় থাকিতেও ম্লেচ্ছকে অধ্যাপনা করিয়া ব্রাহ্মণে ধনােপাৰ্জন করিলে পাপভাগী হয়েন কি না তাহা পাপ পুণ্যের বিচারকর্তা বিশেষ জানেন, কিন্তু আমাদের লিখিবার তাৎপৰ্য এই ছিল যে কোন ব্যক্তি আপনি ম্লেচ্ছকে অধ্যাপনা পৰ্যন্তও করেন যদি তিনি অন্যকে ম্লেচ্ছসংসর্গী কহিয়া নিন্দা করেন, তবে অতিশয় ধৃষ্টরূপে গণিত হয়েন কি না। ৩৭ পৃষ্ঠে ন্যায়দর্শনের ভাষাপরিচ্ছেদকে ছাপা করিয়া ম্লেচ্ছাদি নিকটে বিক্রয় জন্য দোযযাদ্ধারের বিষয়ে লিখেন যে সে গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রয় করণের কারণ ইহা বােধ কেন না করা যায়, যে পাষণ্ড খণ্ডন নিমিত্ত ও ছাপা করিবার ব্যয়ের পরিশােধ নিমিত্ত প্রকাশ করা গিয়াছে। উত্তর, যাহারা ঐ গ্রন্থকে পাঠ করিয়াছেন এবং ছাপা পুস্তকের আয় ব্যয়ের বিশেষ জানেন তাহারা বিবেচনা করিবেন যে পূর্বোক্ত কারণে ঐ গ্রন্থকে প্রকাশ ও বিক্রয় করিয়াছেন কি উপার্জনাৰ্থে করেন কিন্তু যদি তাঁহার ন্যায়দর্শনের ভাষাপরিচ্ছেদের প্রকাশ করিবার তাৎপৰ্য পাষণ্ড ও নাস্তিক দমন ইহা বােধ করা যায় তবে আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তির বেদান্তবৃত্তির ভাষা করণের তাৎপৰ্য নাস্তিকমতের খণ্ডন ও পশু পামর লােককে কৃতাৰ্থকরণ ইহা কেন গ্রাহ হয়। ৩৮ পত্রে ৪ পংক্তিতে অপবাদ দেন যে আমাদের মধ্যে কেহ “অর্থ সহিত রামমােহন-গ্রন্থাবলী •• বেদমাতা গায়ত্রীই ম্লেচ্ছহস্তে সমৰ্পণ করিয়াছেন”। উত্তর, যাহারা পরমেশ্বরের প্রতি নানাবিধ কুৎসা ও অপবাদ গান বাদ্যপূৰ্ব্বক দিতে পারেন তাহারা যে মনুষের কুৎসা করিবেন ইহার আশ্চর্য্য কি ; যদি এমত আশঙ্কা হয় যে আমাদের কেহ গায়ত্রীর অর্থ না দিলে ম্লেচ্ছ কি প্রকারে ঐ মন্ত্রের অর্থ জানিলেন তবে সে আশঙ্কা কর্তাকে উচিত যে কালেজে যাইয়া ম্লেচ্ছভাষার পুস্তক সকল দৃষ্টি করেন যাহাতে বিশেষরূপে জানিবেন যে ৪০ বৎসরের পূর্বে গায়ত্রীর অর্থ দেশাধিপতিরা জানিয়াছেন ও শ্রীরামপুরে পাদরি ওয়ার্ড সাহেবের প্রকাশিত ইংরেজী গ্রন্থে গায়ত্রী প্রভৃতি বেদমন্ত্রের অর্থ পূৰ্বাবধি লিখিত আছে কি না আর কোন্ ব্যক্তি দ্বারা কেরি সাহেব ও অন্য পাদরিরা গায়ত্রী প্রভৃতির অর্থ প্রথমে প্রাপ্ত হইয়াছেন এ সকলের নিদর্শন কেরি সাহেব প্রভৃতিই বর্তমান আছেন। ৪১ পৃষ্ঠে ৮ পংক্তি অবধি কোন বচন নিন্দার্থবাদ আর কোন বচন যথার্থবাদ ইহার ব্যবস্থা ধৰ্ম্মসংহারক লিখিয়াছেন “যে২ বচনে পাপবিশেষ ও প্রায়শ্চিত্তবিশেষ এবং নরকবিশেষ উক্ত নাই কেবল কৰ্ত্তার ভয়প্রদর্শন মাত্র, সেই বচন নিন্দার্থবাদ হয় এবং প্রথম উত্তরে আমাদের লিখিত (শূদ্ৰান্নং শূদ্রসম্পর্ক ) ইত্যাদি বচনকে নিন্দার্থবাদ কহিয়াছেন। উত্তর, যে২ বচনে পাপবিশেষ ও প্রায়শ্চিত্তবিশেষ এবং নরকবিশেষ উক্ত নাই সেই২ নিন্দার্থবাদ, তাহার এই বাক্যের গ্রাহ্যতার নিমিত্ত কোনাে প্রাচীন কিম্বা নবীন স্মাৰ্ত্ত গ্রন্থের প্রমাণ লেখা উচিত ছিল অন্যথা তাহার ঐ স্বরচিত ব্যবস্থার কি প্রামাণ্য আছে অধিকন্তু “পাপবিশেষ ও প্রায়শ্চিত্তবিশেষ এবং নরকবিশেষ উক্ত নাই কেবল কৰ্ত্তার ভয়প্রদর্শন মাত্র সেই২ বচন নিন্দার্থবাদ হয়” এই ব্যবস্থাকে এবং তাহার দত্ত ইহার উদাহরণের বচন সকলকে পরস্পর মিলিত করিয়া বিবেচনা করা যাইতেছে তাহাতে ভয় প্রদর্শন বিষয়ে তাহার দত্ত উদাহরণের প্রথম বচন এই হয় (“অজ্ঞাত্বা ধৰ্ম্মশাস্ত্রাণি প্রায়শ্চিত্তং বদন্তি যে। প্রায়শ্চিত্তী ভবেৎ পূতস্তৎপাপং তেষু গচ্ছতি) অর্থাৎ ধর্মশাস্ত্রানভিজ্ঞ লােক প্রায়শ্চিত্তের উপদেশক হইলে পাপী পাপমুক্ত হইবেক কিন্তু তেঁহ তৎপাপভাগী হইবেন” এখন জিজ্ঞাসা করি যে মূখ ব্যক্তি অথচ প্রায়শ্চিত্তোপদেশকৰ্ত্তা তাহার কি পাপসূচক এই বচন না হইয়া “কেবল কর্তার ভয়প্রদর্শন মাত্র” হয়, দ্বিতীয়তঃ (কৃতম্নে নাস্তি নিষ্কৃতিঃ ) অর্থাৎ কৃতপ্নের নিষ্কৃতি নাই ইহাও কি কর্তার ভয়প্রদর্শন মাত্র হয়, তৃতীয়তঃ কুসুম্ভং নালিকাশাকং বৃন্তাকং পুতিকাং তথা। ভক্ষয় পতিতশ্চ স্যাপি বেদান্তগাে দ্বিজঃ। অর্থাৎ কুসুম্ভশাক নালিকা শাক ও ক্ষুদ্র বার্তাকী ও পূতিকা এই সকল দ্রব্য ভক্ষণে বিপ্র বেদপারগ হইলেও পতিত হয়েন ইহাও পথ্য প্রদান ৯৯ “কেবল কার ভয়প্রদর্শন মাত্র” তবে ধর্মসংহারকের ব্যবস্থানুসারে “কেবল” ও “মাত্র” এই দুই অন্য নিবারক পদের প্রয়ােগ দ্বারা ঐ সকল কর্মকরণে ভয় প্রদর্শনেই তাৎপৰ্য হয় বস্তুত কিঞ্চিৎও পাপ জন্মে না, কিন্তু ঋষিবাক্য ইহার বিপরীত দেখিতেছি (নিন্দিতস্য চ সেবনাৎ ) অর্থাৎ নিন্দিত কর্মের অনুষ্ঠান করিলে নরকে গমন হয়। এখন পণ্ডিত লােক বিবেচনা করিবেন যে এ ব্যবস্থা ধর্মশাস্ত্রসম্মত কি ধৰ্ম্ম ললাপের কারণ হয় ; বরঞ্চ প্রত্যুত্তরের পূর্বাপর আলােচনা করিলে দেখিবেন যে তাহারি পূর্বাপর বাক্যের সহিত এ ব্যবস্থা সৰ্বথা বিরুদ্ধ হইতেছে। পরে ইহার বিপরীত উদাহরণের আলােচনা করা যাইতেছে অর্থাৎ পাপবিশেষ কিম্বা প্রায়শ্চিত্তবিশেষ কিম্বা নরকবিশেষ ইহার উল্লেখ থাকিলে সে যথার্থবাদ হইবেক যেমন (পূতিকা ব্ৰহ্মঘাতিকা) ইহাতে পাপবিশেষের উল্লেখ আছে অতএব নিন্দার্থবাদ না হইয়া ওই ব্যবস্থানুসারে যথার্থবাদ হইতে পারে। ক্রিয়াযােগসার ( স্নানকালে পুষ্করিণ্যাং যঃ কুৰ্যাদযুধাবনং। তাবৎ জ্ঞেয়ঃ স চণ্ডালাে যাবগঙ্গাং ন পশ্যতি) অর্থাৎ স্নানকালে পুষ্করিণীতে দম্ভধাবন করিলে সে ব্যক্তি যে পৰ্যন্ত গঙ্গা দর্শন না করে তাবৎ চণ্ডাল থাকে। এ বচনে প্রায়শ্চিত্ত- বিশেষের শ্রবণ আছে অতএব ধৰ্ম্মসংহারকের মতে যথার্থবাদ হইয়া গঙ্গার দূরস্থ অনেক ব্যক্তির ভূরি কাল চণ্ডালত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারেন না। পরে ৪২ পৃষ্ঠে ১০ পংক্তিতে লিখেন যে “যে২ বচন কৰ্ত্তার নরক, প্রায়শ্চিত্ত- বিশেষ ও ত্যাগাদির প্রতিপাদক সেই২ বচন যথার্থবাদ হয় যথা (স্ত্রীতৈলমাংসসম্ভোগী পৰ্বম্বেতেষু বৈ পুমা। বিম্মুত্রভােজনং নাম প্রয়াতি নরকং মৃতঃ।) অর্থাৎ এই পঞ্চ পৰ্বে স্ত্রীসঙ্গী, তৈলাভ্যঙ্গী ও মাংসভােজী পুরুষ বিষ্ঠামূত্রভােজন নামক নরকে গমন করে”। উত্তর। প্রথমত জিজ্ঞাস্য এই যে তিনি যদি আপন বাক্যকে ঋষি- বাক্য না জানেন তবে এই ব্যবস্থার প্রামাণ্যর নিমিত্ত প্রাচীন কিম্বা নবীন কোনাে স্মার্তের বাক্যকে প্রমাণ দিতেন, দ্বিতীয়ত জিজ্ঞাস্য এই যে এইরূপ কর্তার প্রায়শ্চিত্ত এবং নরকপ্রতিপাদক ভূরি বচন দেখিতেছি যেমন পূর্বোক্ত পদ্মপুরাণীয় বচন, সেইরূপ স্কন্দপুরাণে ( বিং বা তুলসীং দৃষ্ট। ন নমেদ্য নরাধমঃ। স যাতি নরকং ঘােরং মহারােগেণ পীড্যতে ) বিশ্ব কিম্বা তুলসী দৃষ্ট হইলে যে ব্যক্তি নমস্কার না করে সে নরাধম ঘােরতর নরকে যায় ও মহারােগে পীড়িত হয়। এ বচনেও ঘাের নরক এবং মহারােগ শ্রবণ আছে যাহার প্রায়শ্চিত্তের কর্তব্য হয় অতএব ওই ব্যবস্থানুসারে যথার্থবাদ হইবেক, সুতরাং যাঁহারা এই দুই বৃক্ষকে দেখিয়া নমস্কার না করেন তাহাদের প্রতি ঘাের নরক এবং মহারােগের অবশ্য ভবিতব্যতা স্বীকার রামমােহন-গ্রন্থাবলী করিতে হইবেক। ক্রিয়াযােগসারে ( যেন নাচরিতং স্নানং গঙ্গায়াং লােকমাতরি। আলােক্য তন্মুখং সদ্যঃ কৰ্ত্তব্যং সূৰ্যদর্শনং) যে ব্যক্তি লােকমাতা গঙ্গাতে স্নান না করিলেক তাহার মুখ দর্শন করিয়া তৎক্ষণাৎ সূৰ্য্য দর্শন করিবেক। এ বচনেও প্রায়শ্চিত্তবিশেষের শ্রবণ আছে সুতরাং তাহার মতে যথার্থবাদ হইবেক অতএব কাশ্মীর ভ্ৰবিড় ও মহারাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের অনেকেই দূরে স্থিতি প্রযুক্ত গঙ্গাস্নান করেন নাই এ নিমিত্ত এরূপ পতিত হইবেন যে তাহাদের দর্শন মাত্র সূৰ্যদর্শনরূপ প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবেক। যথা (ন দৃষ্টা যেন সরিতাং প্রবরা জহ্নকন্যকা। তস্য ত্যাজ্যানি সৰ্বাণি অন্নানি সলিলানি চ) অর্থাৎ নদীশ্রেষ্ঠ যে গঙ্গা তাঁহার দর্শন যে ব্যক্তি না করিয়াছে তাহার অন্ন জল সকল ত্যাজ্য হয়। এ স্থলেও অয় জলের অগ্রাহ্যতার দ্বারা যথার্থবাদ হইলে অনেকেই দূরদেশস্থ ব্যক্তিরা এ ব্যবস্থানুসারে পতিত রহিলেন। কুলতন্ত্রে (কৌলাচাররতাঃ শূদ্র। বন্দনীয়া দ্বিজাতিভিঃ। অকুলীনা দ্বিজা দেবি ত্যাজ্যাঃ স্যুঃ স্বজনৈরপি।) অর্থাৎ কৌলাচাররত শূদ্র সকল দ্বিজদেরও বন্দনীয় হয় আর কৌলাচারহীন দ্বিজের স্বজনেরও ত্যাজ্য হয়েন। এ স্থলেও ত্যাজ্য শব্দ শ্রবণ দ্বারা যথার্থবাদ হইতে পারে অর্থাৎ ব্রাহ্মণেরা কোলাচারহীন হইলে স্বজনেরও ত্যাজ্য হয়েন। পূর্বোক্ত যােগবাশিষ্ঠবচন (সংসারবিষয়াসক্তং ব্ৰহ্মজ্ঞােহম্মীতি বাদিনং। কৰ্ম্মব্রহ্মোভয়ভ্রষ্টং তং ত্যজেদন্ত্যজং যথা) অর্থাৎ সংসারসুখে আসক্ত অথচ কহে যে আমি ব্ৰহ্মকে জানি সে কৰ্ম্ম ব্ৰহ্ম উভয়ভ্রষ্ট ব্যক্তিকে অন্ত্যজের ন্যায় ত্যাগ করিবেক। যে কোনাে ব্যক্তি সংসারসুখে কি আসক্ত কি অনাসক্ত হইয়া এরূপ কহে যে ব্ৰহ্মস্বরূপকে আমি জানি সে মূঢ় এবং ত্যাগযােগ্য যথার্থ ই হয় ইহা স্বীকার করিতে আমরা কদাপি সঙ্কোচ করি না কিন্তু এ বচনও ধর্মসংহারকের প্রথম ব্যবস্থানুসারে ভয় প্রদর্শন মাত্র নিন্দার্থবাদ হইতেছে, যেহেতু এ বচনে “পাপবিশেষ, নরকবিশেষ, কিম্বা প্রায়শ্চিত্ত- বিশেষ” উক্ত নাই। যদি ধৰ্ম্মসংহারাকাতক্ষী কহেন যে তাহার দ্বিতীয় আজ্ঞা অর্থাৎ ত্যাগ শব্দের উল্লেখ থাকিলে যথার্থবাদ হয়, তদনুসারে ঐ পূর্বের বচনপ্রাপ্ত সংসারী ব্যক্তি ত্যাজ্যই হয়; তবে তাহার দ্বিতীয় ব্যবস্থামতে এই উত্তরের ৪২ পৃষ্ঠে লিখিত বচনের প্রমাণে যাহাতে ত্যাগ শব্দের প্রয়ােগ আছে ধৰ্ম্মসংহারকও পরের বরঞ্চ স্বজনেরও সর্বথা ত্যাজ্য হইবেন। এই স্বকপােলকল্পিত ধর্মসংহারকের ব্যবস্থাদ্বয়কে তাঁহার আজ্ঞা এই শব্দ প্রয়ােগ আমরা করিলাম ইহার কারণ এই যে প্রাচীন অথবা নবীন কোনাে স্মার্কের প্রমাণ এই ব্যবস্থাদ্বয়ের প্রামাণ্যর নিমিত্ত লিখেন না সুতরাং তাহার আজ্ঞাস্বরূপে ঐ দুই ব্যবস্থাকে গণনা করিতে হইয়াছে। ফলত । ;

পথ্য প্রদান শাস্ত্ৰকৰ্ত্তা ও সংগ্রহকারদের মতে ধৰ্ম্মসংহারকের বিশেষ নিয়মের অন্যথায় সামান্যত নিষেধ ও প্রত্যয়শ্রবণ পাপসুচক হয়। বস্তুত শাস্ত্রের অপলাপ করিবার দোষ ধর্মসংহারকের প্রতি দেওয়া বৃথা। কিন্তু এই মাত্র তাহাকে কহিতে যুক্ত হয় যে মহাশয় দ্বেষ ও পৈশুন্যপ্রযুক্ত দুৰ্বাক্য কহাইবার জন্যে বেতন দিতে কদাপি কাতর নহেন ইহা প্রত্যক্ষ দেখিতেছি তবে কোনাে বিজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারা প্রত্যুত্তর কেন না লেখাইলেন, তাহা হইলে এরূপ শাস্ত্রবিরুদ্ধ ও সর্বলােকগহিত দুৰ্বাক্য সকলে গ্রন্থ পরিপূর্ণ হইত না কিন্তু বিশেষ বিবেচনা করিলে এ দোষও দেওয়া তাহার প্রতি উচিত হয় না যেহেতু এরূপ অশাস্ত্র ও দুৰ্ব্বাক্য কহিতে বেতন পাইলেও পণ্ডিত লােক কেন প্রবৃত্ত হইবেন। ৪৯ পৃষ্ঠে ও পংক্তিতে লিখেন যে “লােকমুখে সতত অত্যন্ত অনুরক্তচিত্ত নিমিত্ত সর্বদাই ব্ৰহ্মজ্ঞানের অনুষ্ঠানে আসক্ত ও বিরক্ত হয়--এতাদৃশ পাপিষ্ঠ নরাধমেরা কর্ম ও ব্রহ্ম হইতে ভ্রষ্ট ও অন্ত্যজের ন্যায় ত্যাজ্য হয়। উত্তর, যে ব্যক্তি সুখাসক্ত হইয়া সৰ্ব্বদাই ব্ৰহ্মজ্ঞানের অনুষ্ঠানে অসক্ত ও বিরক্ত হয় সে পাপিষ্ঠ নরাধম হইতেও অধম বরঞ্চ ভাক্ত কৰ্ম্মীর তুল্য হয় অতএব ধর্মসংহারকই বিবেচনা করুন যে ব্যক্তি সুখাসক্ত হইয়া জ্ঞানানুষ্ঠানে বিরক্ত হয় ইহার উদাহরণস্থল তিনি হয়েন কি না। পুনরায় ওই পৃষ্ঠে লিখেন যে “ব্ৰহ্মজ্ঞানের প্রতি মৌখিক প্রীতি মাত্র এবং কর্মকাণ্ডের অকরণার্থ আমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী আমার কর্মকাণ্ডে প্রয়ােজন কি ইহা কহিয়া লােক সকলকে প্রতারণা করেন” ইহার উত্তরে আমরা এই কহিব যে যে কোনাে ব্যক্তি কেবল মৌখিক জ্ঞানানুষ্ঠান জানায় অথচ এই অভিমান করে যে আমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী হই এবং এই ছলে কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া লােককে প্রতারণা করে সে ব্যক্তি ভাক্তজ্ঞানী বরঞ্চ ভাক্ত কৰ্মী হইতেও নরাধম হয়, সেইরূপ যে কোনাে ব্যক্তি জ্ঞানানুষ্ঠানে অসক্ত ও বিরক্ত হয় আর লােককে প্রতারণাৰ্থ কহে যে আমি সৎকৰ্ম্মী আমার জ্ঞান সাধনে কি প্রয়ােজন, কর্ম দ্বারাই কৃতার্থ হইব সেও ভাক্ত কৰ্মীর মধ্যে অবশ্য গণিত হইবেক। বস্তুতঃ যে কোনাে কারণে হউক জ্ঞানানুষ্ঠানে যাহার বৈরক্ত হয় তাহার পর ভাগ্যহীন অন্য কে আছে। কেনশ্রুতিঃ। ইহ চেদবেদীদথ সত্যমস্তি নচেদিহাবেদান্মহতী বিনষ্টিঃ। ইহ জন্মে মনুষ যদি পূর্বোক্ত প্রকারে অতীন্দ্রিয়রূপে আত্মাকে জানেন তবে তাহার পুরুষার্থ সিদ্ধ হয় আর যদি মনুষ্য ইহ জন্মে আত্মাকে না জানেন তবে তাহার মহান্ বিনাশ হয়। কুলাবে, সুকৃতৈমানবব ভূত্ব জ্ঞানী চেমােমাপ্লয়াৎ। তথা, সােপানভূতং মােক্ষস ১০২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী মানুষ্যং প্রাপ্য দুর্লভং। যস্তারয়তি নাত্মানং তস্মাৎ পাপতরােত্র কঃ। অর্থাৎ বহু জন্মের পুণ্যসঞ্চয় দ্বারা মনুষ্য হইয়া যদি জ্ঞানী হয় তবে তাহার মুক্তি হইবেক। মােক্ষের সােপান অর্থাৎ সি ড়ি যে মনুষ্যজন্ম তাহা পাইয়া যে আপনার ত্ৰাণ জ্ঞান দ্বারা না করিলেক তাহার পর পাপী আর কে আছে। ৫. পৃষ্ঠে ৫ পংক্তিতে লিখেন যে “আপন অপূৰ্ব্ব ধর্মসংহিতার ২ পৃষ্ঠে ১৬ পংক্তিতে যােগবাশিষ্ঠবচনের তাৎপৰ্যার্থ লিখিয়াছেন যে ব্যক্তি সংসার সুখে আসক্ত হইয়া ইত্যাদি অতএব পূৰ্বলিখনের বিস্মরণে যােগবশিষ্ঠবচনের পুনৰ্ব্বার স্বমত রক্ষণার্থ অন্যার্থ কল্পনা করিয়া যােগবাশিষ্ঠের বচনার কথনেও নিরর্থ নানা বাক্যোচ্চারণে উন্মত্তপ্রলাপ ইত্যাদি।” উত্তর, আমাদের প্রথম উত্তরের দ্বিতীয় পৃষ্ঠে যাহা লিখিয়াছিলাম তাহা সমুদায় প্রথমত লিখিতেছি অর্থাৎ “যে ব্যক্তি সংসার- সুখে আসক্ত হইয়া আমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী এমৎ কহে সে কৰ্ম্ম ব্ৰহ্ম উভয়ভ্রষ্ট ত্যাজ্য হয়” আর ঐ যােগবাশিষ্ঠবচনান্তরের অর্থ যাহা প্রথম উত্তরের পঞ্চম পৃষ্ঠে লিখিয়াছিলাম তাহাকেও পুনরুক্তি করিতেছি “( বহিব্যাপারসংরম্ভো হৃদি সঙ্কল্পবর্জিতঃ। কৰ্ত্তা বহিরকর্তান্তরেবং বিহর রাঘব। অর্থাৎ বাহেতে ব্যাপারবিশিষ্ট মনেতে সঙ্কল্প ত্যাগ আর বাহিরেতে আপনাকে কৰ্ত্তা দেখাইয়া ও মনেতে অকর্তা জানিয়া হে রামচন্দ্র লােকযাত্রা নির্বাহ কর অতএব জ্ঞানাবলম্বী অথচ বিষয়ব্যাপারযুক্ত ব্যক্তিকে দেখিয়া দুই অনুভব হইতে পারে এক এই যে মনেতে আসক্ত হইয়া ব্যাপার করিতেছে দ্বিতীয় এই যে আসক্তি ত্যাগপূর্বক বিষয় করিতেছে ইত্যাদি” এই দুই বচনের অর্থ যাহা লেখা গিয়াছিল তাহা পরস্পর অন্যার্থ হইয়া প্রলাপােক্তি হয় কি ইহাকে প্রলাপপাক্তি কথনের কারণ কেবল ধৰ্ম্মসংহারকের দ্বেষ পৈশুন্য হয় তাহা পণ্ডিত লোেক বিবেচনা করিবেন। ৫১ পৃষ্ঠে ৩ পংক্তিতে লিখেন যে “ঐ জনকাজুনের লৌকিকাচার দৃষ্টিতে কলির জ্ঞানী মহাশয়দের লৌকিকাচার কর্তব্য, কি সন্ধ্যা বন্দনাদি পরিত্যাগ ও সাবানের দ্বারা মুখ প্রক্ষালন ক্ষুরিকৰ্ম্ম ইত্যাদি লােকবিরুদ্ধ কৰ্ম্মই কর্তব্য হয়।” উত্তর, সাবানের দ্বারা মুখ প্রক্ষালন ও ক্ষুরিকৰ্ম্ম ইত্যাদি ধৰ্ম্মসংহারকের স্বপ্ন সুতরাং ইহার উত্তর দিবার প্রয়ােজন রাখে নাই; এই উত্তরের ৯ পৃষ্ঠ অবধি ১১ পৃষ্ঠ পৰ্যন্ত আমরা লিখিয়াছি তাহা দৃষ্টি করিবেন যে জ্ঞাননিষ্ঠদের সর্বপ্রকারে আবশ্যক আত্মচিন্তন এবং ইন্দ্রিয় দমনে যত্ন ও প্রণব উপনিষদাদির অভ্যাস হয়, সন্ধ্যা বন্দনাদি চিত্তশুদ্ধির কারণ হয়েন অতএব ইহার পরিত্যাগের আবশ্যকতা কুত্রাপি লেখা যায় না। পরে ধর্মসংহারক ঐ পৃষ্ঠে তন্ত্রবচন লিখেন যে ( শিবতুলল্যাপি •• পথ্য প্রদান যাে যােগী গৃহস্থশ্চ যদা ভবেৎ। তথাপি লৌকিকাচারং মনসাপি ন লঙ্ঘয়েৎ) অর্থাৎ গৃহস্থ যােগী শিবতুল্যও যদি হয়েন তথাপি লৌকিকাচারের লঙ্ঘন মনেও করিবেন না। আমরা প্রথম উত্তরের ১৯ পৃষ্ঠের নবম পংক্তিতে এই পরের বচন লিখি যে (“বেদোক্তেন বিধানেন আগমেনে বা কলৌ। আত্মতৃপ্তঃ সুরেশানি লােকযাত্ৰাং বিনিবহেৎ) জ্ঞাননিষ্ঠের। সৰ্ব্ব যুগে বেদোক্ত বিধানে আর কলিযুগে বেদোক্ত অথবা আগমমাক্ত বিধানে লােকাচার নির্বাহ করিবেন” অতএব লােকাচার নির্বাহের বিষয়ে যাহারা এই পূর্বোক্ত বচনকে আপন আচার ও ব্যবহারের সেতুম্বরূপ জানেন তাহাদের প্রতি পরিবাদপূৰ্ব্বক ( তথাপি লৌকিকাচারং মনসাপি ন লঙ্ঘয়েৎ ) এ বচনের উপদেশ করা কেবল দ্বেষ ও পৈশু- নিমিত্ত হয় কি না পণ্ডিতের বিবেচনা করিবেন। কিন্তু ইহাও জানা কর্তব্য যে লােকাচার রক্ষার্থে বালকের ক্রীড়ার ন্যায় কোনাে২ লােকের উপাসনার অনুষ্ঠান কদাপি জ্ঞাননিষ্ঠের কর্তব্য নহে। মুণ্ডকশ্রুতিঃ ( অবিদ্যায়াং বহুধা বৰ্ত্তমান বয়ং কৃতার্থা ইত্যভিমন্যন্তি বালাঃ। বালাঃ। যৎ কর্মিণো ন প্রবেদয়ন্তি রাগাত্তেনাতুরাঃ ক্ষীণলােকাশ্চ্যবন্ত ) অর্থাৎ জ্ঞানের বিরােধী ব্যাপারে বহু প্রকারে রত হইয়া বালকের ন্যায় অভিমান করে যে আমরা কৃতকাৰ্য্য হই যেহেতু এইরূপ কৰ্ম্মিসকল স্বর্গাদিতে অনুরাগপ্রযুক্ত পরম তত্ত্বকে জানিতে পারে না সেই হেতুক দুঃখাৰ্ত্ত হইয়া কৰ্ম্মফলের ক্ষয় হইলে স্বর্গাদি হইতে চ্যুত হয়। মহানিৰ্বাণ, (বালক্রীড়নবৎ সৰ্ব্বং নামরূপময়ং জগৎ। বিহায় ব্রহ্মনিষ্ঠা যঃ স মুক্ত কৰ্ম্মবন্ধনাৎ) নামরূপাত্মক বস্তু সকল বালকের ক্রীড়ার ন্যায় অস্থায়ী হইয়াছেন তাহা ত্যাগ করিয়া ব্ৰহ্মনিষ্ঠ হইলে কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হয়। ঐ পৃষ্ঠে লিখেন যে “কর্মীদের বিপরীত কৰ্ম্ম না করিলে কলির জ্ঞানী হওয়া হয় না।” উত্তর, আমাদের পূর্ব উত্তরের ১৭ পৃষ্ঠের ৫ পংক্তিতে এই বচন লেখা যায় যে (“যেনেপায়েন দেবেশি লােকঃ শ্রেয়ঃ সমশুতে। তদেব কাৰ্যং ব্রহ্মজ্ঞৈরিদং ধৰ্মং সনাতনং”। অর্থাৎ যে২ উপায় লােকের শ্রেয়স্কর হয় তাহাই কেবল ব্ৰহ্মনিষ্ঠের কৰ্তব্য এই ধৰ্ম্ম সনাতন হয়) যদি ধৰ্ম্মসংহারকের মতে লােকের শুভ চেষ্টা কর্মীদের বিপরীত হয় তবে কর্মীদের বিপরীত কৰ্ম্ম করা এ অংশে সুতরাং হইল। আমরা পূর্ব উত্তরের ৬ পৃষ্ঠে ৩ পংক্তি অবধি লিখিয়াছিলাম যে “জ্ঞানাবলম্বী অথচ বিষয়- ব্যাপারযুক্ত ব্যক্তিকে দেখিয়া দুই অনুভব হইতে পারে এক এই যে মনেতে আসক্ত হইয়া ব্যাপার করিতেছেন দ্বিতীয় এই যে আসক্তি ত্যাগপূৰ্ব্বক ব্যাপার করিতেছেন যেহেতু মনের যথার্থ ভাব পরমেশ্বরই জানেন, তাহাতে দুৰ্জ্জন ও খল ব্যক্তিরা ৫ ১৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী বিরুদ্ধ পক্ষকেই গ্রহণ করিয়া থাকেন। আর সজ্জন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উত্তম পক্ষকেই গ্রহণ করেন—যেমন জনকাদির রাজ্য শাসন ও শত্রু দমন ইত্যাদি বিষয় ব্যাপার দেখিয়া দুৰ্জ্জনেরা তাহাদিগকে বিষয়াসক্ত জানিয়া নিন্দা করিত এবং ভগবান্ কৃষ্ণ হইতে অর্জুন জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া যুদ্ধ এবং রাজ্য করিলে পর দুৰ্জ্জনেরা তাহাকে রাজ্যাসক্ত জানিয়া নিন্দিতরূপে বর্ণন করিত, ইহা পূৰ্ব্ব২ও দৃষ্ট আছে। তাহার উত্তরে ধর্মসংহারক ৫২ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে লিখেন যে “মনুষ্যেও বাহ চিহ্নের দ্বারা সে ভাব বােধ করিতে পারেন নতুবা দুষ্ট ও শিষ্ট কিরূপে বােধ হইতেছে” এবং পরাশরের বচন ওই পৃষ্ঠে লিখিয়াছেন যাহার অর্থ এই যে স্বর বর্ণ ইঙ্গিত আকার চক্ষু চেষ্টা এই সকল বাহ চিহ্নের দ্বারা মনুষ্যের অন্তর্গত ভাব বােধ করিবেক। অতএব এই বাহ্য লক্ষণের প্রমাণে ইদানীন্তন জ্ঞাননিষ্ঠদের প্রথম পক্ষই, অর্থাৎ আসক্তিপূর্বক ব্যাপার করিয়া ভাক্তজ্ঞানী হয়েন, ইহাই ধর্মসংহারকের স্থির হইয়াছে। উত্তর, এরূপ বাহ লক্ষণকে ছল করিয়া নিন্দা করা ইহাও কেবল ইদানীন্তন হয় এমত নহে, বরঞ্চ পূর্ব যুগের দুর্জনেরাও যখন জনকাৰ্জ্জুন প্রভৃতি জ্ঞানীদিগকে নিন্দা করিত তখন তাহাদিগকে নিন্দার হেতু জিজ্ঞাসিলে এইরূপই উত্তর দিত যে “স্বর, বর্ণ, ইঙ্গিত, আকার চক্ষুঃ চেষ্টার দ্বারা আমরা জানিয়াছি যে ঐ জ্ঞাননিষ্ঠেরা আসক্তিপূৰ্ব্বক বিষয়কৰ্ম ও শত্রুবধ স্ত্রীসঙ্গ এবং ঐশ্বৰ্য ভােগ করিতেছেন সুতরাং কৰ্ম্ম ব্ৰহ্ম উভয়ভ্রষ্ট হয়েন” অতএব দুর্জনেরা সর্বকালেই পরনিন্দা করিবার নিমিত্ত দোষ আরােপ করিতে ত্রুটি করে নাই। ৫৩ পৃষ্ঠে যােগবাশিষ্ঠের বচন কহিয়া লিখিয়াছেন (সৰ্বে ব্রহ্ম বদিষন্তি সংপ্রাপ্তে চ কলৌ যুগে। নানুতিষ্ঠন্তি মৈত্রেয় শিশ্নোদরপরায়ণাঃ) কলিযুগ প্রাপ্ত হইলে সকল লােক ব্ৰহ্ম এই শব্দ কহিবেক কিন্তু হে মৈত্রেয় শিশ্নোদরপরায়ণেরা অনুষ্ঠান করিবেক না। যােগবাশিষ্ঠে ভগবান্ রামচন্দ্রকে সম্বােধন করিয়া বশিষ্ঠদেব উপদেশ করেন এ বচনে মৈত্রেয়ের সম্বােধন দেখিতেছি। সে যাহা হউক, যাহারা২ ব্ৰহ্ম কহে এবং শিশ্লোদরপরায়ণ হইয়া অনুষ্ঠান করে না তাহারাই এ বচনের বিষয় হয় ইহা সর্বথা যুক্তিসিদ্ধ বটে কিন্তু বচনে “সৰ্ব” শব্দ আছে ইহাকে নির্ভর করিয়া এমৎ অর্থান্তর যদি কল্পান, যে যাহারা২ কলিতে ব্ৰহ্ম কহিবেন তাহারা সকলে শিশশ্লাদরপরায়ণ হয়েন তবে ভগবান্ গােবিন্দাচাৰ্য ভগবান্ শঙ্করাচাৰ্য শ্রীধর স্বামী প্রভৃতি যাহারা জ্ঞানানুষ্ঠান কলিযুগে করিয়াছেন তাঁহাদের সকলকে এ বচনের বিষয় কহিতে হইবেক, ইহা কেবল রাগান্ধের কর্ম হয় কি না পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন। অধিকন্তু কলির প্রভাব বর্ণনে এরূপ “সর্ব” শব্দ কথন সকল ধর্মের পথ্য প্রদান এ সকল প্রতিই আছে তাহাকে কলির দৌরাত্ম্যসূচক অঙ্গীকার না করিয়া যথার্থই স্বীকার করিলে কোন ধর্ম আছে এমত স্থির হয় না, ক্রিয়াযোগসারে (কলৌ সৰ্ব্বে ভবিষ্যস্তি পাপকর্মরতা জনাঃ। বেদবিদ্যাবিহীনাশ্চ তেষাং শ্রেয়ঃ কথং ভবেৎ) অর্থাৎ কলিযুগে সকল লােকই পাপক্রিয়ারত এবং বেদবিদ্যাবর্জিত হইবেক অতএব তাহাদিগের মঙ্গল কি প্রকারে হইবেক। স্মাৰ্তধৃত বচন ( বিপ্রাঃ শূদ্রসমাচারাঃ সন্তি সৰ্ব্বে কলৌ যুগে) ব্রাহ্মণ সকল শূদ্রের আচারবিশিষ্ট কলিযুগে হইবেন। বচনেও সৰ্ব্ব শব্দ প্রয়ােগ দেখিতেছি অতএব কলিদৌরাত্মসূচক না কহিয়া ও সর্ব শব্দের সংকোচ না করিয়া ধৰ্ম্মসংহারক যদি যথার্থবাদ কহেন তবে উভয় পক্ষের ' সমান বিনাশ হইতে পারে . আমরা লিখিয়াছিলাম যে পূর্ব২ কালীন দুৰ্জ্জনেরাও জনকাৰ্জ্জুনাদিকে নিন্দা করিত। এ নিমিত্ত ৫৪ এবং ৫৫ পৃষ্ঠে আমাদের আত্মশ্লাঘা দর্শাইয়া অনেক শ্লেষ ও ব্যঙ্গোক্তি করিয়াছেন, অতএব এ স্থলে পূর্ব উত্তরে যাহা লিখিয়াছিলাম তাহার পুনরুক্তি করিতেছি “এ উদাহরণ দিবার ইহা তাৎপৰ্য নহে যে জনকাদি ও অর্জুনাদির তুল্য এ কালের জ্ঞানসাধকেরা হয়েন অথবা ইদানীন্তন জ্ঞানসাধকদের বিপক্ষেরা তাহাদের মহাবলপরাক্রম বিপক্ষেদের তুল্য হয়েন তবে এ উদাহরণ দিবার তাৎপৰ্য এই যে সৰ্ব্বকালেই দুর্জন ও সজ্জন আছেন, দুর্জনের সর্বকালেই স্বভাব এই যে কোন ব্যক্তির প্রতি দোষ ও গুণ এ দুয়েরি আবােপ করিবার সম্ভাবনা থাকিলে সেখানে কেবল দোষেরি আরােপ করে কিন্তু সজ্জনের স্বভাব তাহার বিপরীত হয় অর্থাৎ দোষ গুণ দুয়ের আরােপ সত্ত্বে কেবল গুণেরি আরােপ করিয়া থাকেন।” ক্রিয়াযােগসার, (দুষ্টানাং কৃপাপানাং চরিত্রমিদমদ্ভূতং। নিস্পাপ- মপি পশ্যন্তি স্বাত্মমানেন পাপিনং) দুষ্ট ও পাপীদের এই অদ্ভুত চরিত্র হয় যে নিস্পাপ ব্যক্তিকেও আপনার ন্যায় পাপী জানে। অতএব এই পূৰ্ব উত্তরের বাক্যের দ্বারা আমাদের শ্লাঘা অথবা আপনার অপকর্ষতা প্রকাশ করা হইয়াছে ইহা পণ্ডিতের। বিবেচনা করিবেন। ৫৫ পৃষ্ঠে ৭ পংক্তিতে লিখেন যে “এ প্রকার ভ্রান্ত কে আছে যে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়দিগকে জনকাদিতুল্য জ্ঞান করে,” অধিকন্তু সৌজন্য প্রকাশপূৰ্ব্বক ওই পৃষ্ঠে লিখেন যে ইদানীন্তন জ্ঞানীদের সহিত জনকাদির সেই সাদৃশ্য যাহা অশ্বললাম ও শ্বেতচামরে এবং অভক্ষ্যভক্ষক শূ শূকরে ও গবীতে পাওয়া যায়। উত্তর, ধৰ্ম্ম- সংহারকের মুখ হইতে সৰ্ব্বদা অশুচি নিঃসরণ হওয়াতে আমাদের হানি কি এবং ইদানীন্তন জ্ঞাননিষ্ঠদেরও জনকাদির সহিত যে দৃষ্টান্ত দিয়াছেন তাহাতেও আমরা ১ঃ রামমােহন-গ্রন্থাবলী দুঃখিত নহি, কিন্তু ধর্মসংহারক ইহা জানেন কি না যে জনক ও অর্জুনাদির নিন্দক দুৰ্জ্জন ও আধুনিক জ্ঞাননিষ্ঠদের নিন্দক দুৰ্জ্জন এ দুইয়ে সেই সাদৃশ্য যাহা করাল ব্যাঘ্রে ও ধুর্ত শৃগালে দৃষ্ট হয়। ৫৬ পৃষ্ঠের শেষ পংক্তিতে আরম্ভ করিয়া লিখেন যে “নারদকে দাসীপুত্র ও ব্যাসকে ধীবরকন্যাজাত, পঞ্চ পাণ্ডবকে জারজ, ব্রহ্মাকে কন্যাগামী, মহাভারতকে উপন্যাস, দেবপ্রতিমাকে মৃত্তিকা এবং শালগ্রামকে শিলা বলিয়া উপহাস করিয়া থাকেন তাহারা সুজন কি দুৰ্জ্জন জানিতে ইচ্ছা করি”। উত্তর, নিন্দা উদ্দেশে ঐ সকল মহানুভাবকে যাহারা এরূপ কহে তাহারা অবশ্যই দুর্জন বটে কিন্তু এইরূপ কথন মাত্রে যদি দুর্জনতা সিদ্ধ হয় তবে ঐ সকল বৃত্তান্ত, যে সকল গ্রন্থে কহিয়াছেন সে সকল গ্রন্থকারেরা ও তাহার পাঠক ধৰ্ম্মসংহারক প্রভৃতিরা আদৌ দুর্জন হইবেন। দাসীপুত্র নারদ ও ধীবরকন্যাজাত ব্যাস ইত্যাদি পৌরাণিক বৃত্তান্ত লােকে প্রসিদ্ধই আছে সুতরাং তাহার প্রমাণ লিখনে প্রয়ােজন নাই কিন্তু শেষের দুই প্রস্তাবের প্রমাণের প্রাচুর্য নাই এ নিমিত্ত তৃহার প্রমাণ দিতেছি। প্রথম ভারতাদির উপন্যাস কথন। মহাভারত আদিপর্ব ( লেখকো ভারতস্যাস্য ভব ত্বং গণনায়ক। ময়ৈব প্রােচ্যমান মনসা কল্পিতস্য চ) আমি যে কহিতেছি ও মনের দ্বারা কল্পিত হইয়াছে যে ভারত তাহার লেখক হে গণেশ তুমি হও । শ্ৰীভাগবত (যথা ইমান্তে কথিত মহীয়সাং বিতায় লোকে যশঃ পরেযুষাং। বিজ্ঞানবৈরাগ্যবিবক্ষয়া বিভো বচো বিভূতির্ন তু পারমার্থং) রাজারা যশকে লােকে বিস্তার করিয়া মরিয়াছেন তােমাকে এ কথা সকল কহিলাম তাহার তাৎপর্য এই যে বিষয়ে অসার জ্ঞান ও বৈরাগ্য হইবেক এ কেবল বাক্যবিলাস অর্থাৎ বাক্যক্রীড়া মাত্র কিন্তু পরমার্থযুক্ত নয়। দ্বিতীয় প্রতিমা বিষয়ে। যথা শ্ৰীভাগবতে দশমস্কন্ধে (যস্যাত্মবুদ্ধিঃ কুণপে ত্ৰিধাতুকে স্বধীঃ কলত্রাদিযু ভৌম ইজ্যধীঃ। যত্তীৰ্থবুদ্ধিশ্চ জলে ন কহিঁচিজ্জনেভিজ্ঞেযু স এব গােখরঃ) অর্থাৎ যে ব্যক্তির কফপিত্তবায়ুময় শরীরে আত্মবুদ্ধি হয় আর স্ত্রী পুত্রাদিতে আত্মভাব ও মৃত্তিকানিৰ্মিত প্রতিমাদিতে পূজ্য বােধ আর জলে তীর্থ বােধ হয় কিন্তু এ সকল জ্ঞান তত্ত্বজ্ঞানীতে না হয় সে গরুর গাধা অর্থাৎ অতি আহ্নিকতত্ত্বধৃত শাতাতপবচন (অল্প, দেবা মনুষ্যাণাং দিবি দেবা মনীষিণাং। কাষ্ঠলােষ্টেষু মূখাণাং যুক্তস্যাত্মনি দেবতা) জলেতে ঈশ্বর বােধ ইতর মনুষ্যের হয় আর গ্রহাদিতে ঈশ্বর বােধ দৈবজ্ঞানীরা করেন আর কাষ্ঠ লােষ্ট ইত্যাদিতে ঈশ্বর বােধ মূর্খেরা করে কিন্তু জ্ঞানীরা আত্মাতেই ঈশ্বর বােধ করেন। ঐ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে লিখেন যে কোন দুর্জন দুগ্ধকে তক্র ও শর্করাকে বালুকা, মূঢ়।

পথ্য প্রদান ১০৭ চামরকে অশ্বনােম-কহিয়া নিন্দা করে” উত্তর, অনেক দুর্জন এমত ছিলেন এবং আছেন যে উত্তমকে অধম কহিয়া থাকেন, সর্বদেবােত্তম মহাদেবকে দক্ষ কি দেবাধম কহে নাই, আর তনুচিত শাস্তি সে নিন্দুকের কি হয় নাই। পুনরায় লিখেন যে “কোন্ সুজনই বা তক্রকে দুগ্ধ ও বালুকাকে শর্করা, অশ্বলােমকে চামর-কহিয়া প্রশংসা করেন” উত্তর, উত্তমেরা স্বল্পকে বৃহৎ ও ক্ষুদ্রকে মহৎ কহিয়া প্রশংসা করিয়াছেন, পুরাণে স্তুতিবাদ সকল তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হয়। মহাভারতের আদিপর্বে গরুড়ের প্রতি দেবতাদের উক্তি (ত্বমন্তকঃ সৰ্বমিদং ধ্রুবাবং।) হে গরুড় নিত্যনিত্যস্বরূপ সমুদায় জগৎ তুমি হও। বস্তুত পরনিন্দাই দুর্জনের জীবনােপায় হয়। আমরা প্রথম উত্তরে লিখিয়াছিলাম যে ব্রহ্মনিষ্ঠ এমত কহেন না যে আমি ব্ৰহ্মকে জানি অতএব যে এমত কহে সে অবশ্যই কৰ্ম্ম ব্ৰহ্ম উভয়ভ্রষ্ট হয়, এবং কেন- শ্রুতি ইহার প্রমাণ লিখিয়াছিলাম তাহাতে ধৰ্ম্মসংহারক ৫৯ পৃষ্ঠে ১২ পংক্তিতে লিখেন যে “এই কপট বাক্যের দ্বারা এই বােধ হয় কি না যে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় আপনাকে আপনি ব্ৰহ্মজ্ঞানী কহিয়াছেন অতএব তিনি উভয়ভ্রষ্ট ও ত্যাজ্য হয়েন কি না” উত্তর, যােগবাশিষ্ঠের বচন নিন্দার্থবাদ না হইয়া যথার্থবাদ যদি হয় তবে উভয়বিভ্রষ্ট ও ত্যাজ্য সেই হইবেক যে সংসারসুখে আসক্ত হইয়া কহে যে আমি ব্ৰহ্মকে জানি। তাহাতে এ দুইয়ের প্রথম দোষের বিষয়ে, অর্থাৎ সংসারে আসক্তি, এ অপবাদে দুর্জনের মুখ হইতে নিস্তার নাই যেহেতু কি ইদানীন্তন কি পূর্বযুগে গৃহস্থ ব্ৰহ্মনিষ্ঠেদের বিষয়ব্যাপার দেখিয়া কেহ বিষয়াসক্তির দোষ তাহাদিগকে দিলে ইহার অপ্রমাণ করা লােকের নিকট দুষ্কর হয়, কিন্তু দ্বিতীয় দোষের অপবাদ দিলে দুর্জনকে নিরুত্তর অনায়াসে করা যায়, যেহেতু তাহাদের প্রকাশিত শত পুস্তক আছে এবং সর্বদা কথােপকথন করিয়া থাকেন ওই সকলের দ্বারা প্রমাণ হইবেক যে তাহারা সর্বদাই স্বীকার করেন যে ব্ৰহ্মস্বরূপ কোন মতে আমরা জানি না এবং পরমেশ্বরের পরিচ্ছিন্ন হস্ত পদ শিশ্নোদর আছে অথবা তিনি যথার্থ আনন্দরূপ শরীরে স্ত্রীসংসর্গ ও অশুচি পরিত্যাগাদি ক্রিয়া করিয়াছেন ইহা কদাপি কহেন না অতএব দুর্জনের যাবৎ প্রমাণ করিতে না পারেন যে আমরা ব্ৰহ্ম জানিয়াছি এমত স্পর্ধা করিয়া থাকি তাবৎ আমাদের প্রতি, ব্ৰহ্মস্বরূপ জানি, এ প্রাগলভ্যের উল্লেখ করা তাহাদের কেবল দ্বেষ ও পৈশুন্যের জ্ঞাপক মাত্র হইবেক। ৬১ পৃষ্ঠে যাহা লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে প্রণব ও গায়ত্রী এ দুয়ের জপ মাত্রে অথচ বিহিতানুষ্ঠানরহিত হইলে কোন মতে জ্ঞানানুষ্ঠানের অধিকার হয় না।

Sobo রামমােহন-গ্রন্থাবলী উত্তর, প্রণব ও গায়ত্রীর জপ মাত্রেই লােক শমদমাদিতে প্রবৃত্ত হইয়া জ্ঞানের দ্বারা কৃতার্থ হয় ইহার প্রমাণ শ্রুতি ও মনু প্রভৃতি শাস্ত্র আছেন মনুঃ (ক্ষরন্তি সৰ্ব্বা বৈদিকো জুহােতিযজতিক্রিয়া। অক্ষরস্তুক্ষয়ং জ্ঞেয়ং ব্রহ্ম চৈব প্রজাপতিঃ ) বেদোক্ত হােম যাগাদি সকল কর্ম কি স্বরূপতঃ কি ফলত বিনষ্ট হয় কিন্তু প্রণবরূপ যে অক্ষর তাহাকে অক্ষয় জানিবে যেহেতু অক্ষয় যে ব্ৰহ্ম তেঁহাে তাহার দ্বারা প্রাপ্ত হয়েন। (জপ্যেনৈব তু সংসিদ্ধেৎ ব্রাহ্মণো নাত্ৰ সংশয়ঃ । কুৰ্যাদয় বা কুৰ্য্যান্মৈত্রো ব্রাহ্মণ উচ্যতে ) ব্রাহ্মণ কেবল প্রণব ব্যাহৃতি ও গায়ত্রী জপের দ্বারাই সিদ্ধ হয়েন ইহাতে সংশয় নাই অন্য কর্ম করুন অথবা না করুন, ইহার জপের দ্বারা সর্বপ্রাণীর মিত্র হইয়া ব্ৰহ্ম প্রাপ্তির যােগ্য হয়। ইহাতে টীকাকার লিখেন যে মােক্ষ প্রাপ্তির উপায় কেবল প্রণব হয়েন এ কথন প্রণবের প্রতি যেহেতু অন্য উপায়ও শাস্ত্রে লিখিয়াছেন। কঠশ্রুতিঃ ( এতদ্ধ্যেবাক্ষরং ব্ৰহ্ম এতদ্ধ্যেবাক্ষরং পরং। এতদ্ধ্যেবাক্ষরং জ্ঞাত্ব যাে যদিচ্ছতি তস্য তৎ ) এই প্রণব হিরণ্যগর্বরূপ হয়েন এবং পরব্রহ্মস্বরূপও হয়েন ইহার দ্বারা উপাসনাতে যে যাহা বাসনা করে তাহার তাহাই সিদ্ধ হয়। মুণ্ডকশ্রুতিঃ ( প্রণববা ধনুঃ শররা হাত্মা ব্রহ্ম তল্লক্ষ্যমুচ্যতে। অপ্রমত্তন বেদ্ধব্যং শরবৎ তন্ময়াে ভবেৎ ) প্রণব ধনুস্বরূপ, জীবাত্মা শরস্বরূপ, পরব্রহ্ম লক্ষ্য। স্বরূপ হয়েন, প্রমাদশূন্য চিত্তের দ্বারা ওই লক্ষ্যকে জীবস্বরূপ শরের দ্বারা বেধন করিয়া শরের ন্যায় লক্ষ্যের সহিত এক হইবেক। সাধনকালে শমদমাদি অন্তরঙ্গ কারণ হয়েন কিন্তু সে কালে সম্পূর্ণরূপে শমদমাদিবিশিষ্ট হওনের সম্ভব হয় না যেহেতু সম্পূর্ণরূপে শমদমাদিবিশিষ্ট হওয়া সিদ্ধাবস্থার স্বাভাবিক লক্ষণ হয় তাহা সাধনাবস্থায় কিরূপে হইতে পারে। বস্তুতঃ শমদমাদিতে যাহার যত্ন নাই সে জ্ঞাননিষ্ঠ পদের বাচ্য কি হইবেক বরঞ্চ মনুষ্য পদের বাচ্যও হয় না, অতএব শমদমাদিতে যত্ন জ্ঞানাভ্যাসে অবশ্য করিবেক এমত নিয়ম সৰ্ব্বথা আছে। মনুঃ (আত্মজ্ঞানে শমে চ স্যাদোভ্যাসে চ যত্নবান্) অর্থাৎ আত্মজ্ঞানে ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহে এবং প্রণব উপনিষদাদি বেদাভ্যাসে ব্রাহ্মণ যত্ন করিবেন ইতি প্রথম প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরে স্নেহপ্রকাশকো নাম প্রথম পরিচ্ছেদঃ ১১ পৃষ্ঠের শেষ পংক্তি অবধি লিখেন যে প্রথমত বেদান্তে ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার অধিকারীর লক্ষণ কহিয়াছেন, ঐহিক ও পারত্রিক ফলভােগবৈরাগ্য, আর কি নিত্য বন্তু কি অনিত্য বস্তু ইহার বিবেচনা, ও শমদমাদি সাধন, আর মুক্তিতে ইচ্ছা এই সকল ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার অধিকারীর বিশেষণ হয়। উত্তর, ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার প্রতি পথ্য প্রদান সাধনচতুষ্টয়াদিকে বেদান্তে ও গীতাদি মােক্ষশাস্ত্রে কারণ লিখিয়াছেন কিন্তু ইহ জন্মে এ সকল বিশেষণ উত্তম অধিকারীর বিষয়ে হয় অর্থাৎ এরূপ বিশেষণাক্রান্ত হইলে ইহ জন্মেই ব্ৰহ্ম জানিবার ইচ্ছা মনুষ্যের জন্মে কিন্তু পূর্বজন্মকৃত সুকৃতের দ্বারা ঐহিক সাধনচতুষ্টয় ব্যতিরেকেও মনুষ্যে ব্ৰহ্ম জানিবার ইচ্ছা হইয়া থাকে, বেদান্তের ৩ অধ্যায় ৪ পাদ ৫১ সূত্র (ঐহিকমপ্যপ্রস্তুত প্রতিবন্ধি তদ্দর্শনাৎ ) যদি প্রতিবন্ধক না থাকে তবে অনুষ্ঠিত সাধনের দ্বারা ইহ জন্মে অথবা জন্মান্তরে ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তি হয় যেহেতু বেদে দেখিতেছি ( গৰ্ভস্থ এব বামদেবঃ প্রতিপদে ব্রহ্মভাবং) গৰ্ভস্থ যে বামদেব তিনি ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইয়াছেন অর্থাৎ তাহার ঐহিক কোনাে সাধন ছিল নাই সুতরাং পূর্বজন্মের সাধনের দ্বারাই জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়াছেন। ভগবদগীতা (পূৰ্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশােপি সঃ) সেই পূর্বজন্মের জ্ঞানাভ্যাসের দ্বারা ব্যক্তি অবশ হইয়া জ্ঞান সাধনে যত্ন করে। শাস্ত্রে সাধনচতুষ্টয়কে ব্রহ্মজিজ্ঞাসার কারণ কহিয়াছেন অতএব যখন কোন ব্যক্তিতে ব্ৰহ্ম জানিবার ইচ্ছা উপলব্ধি হয় তখন অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবেক যে এরূপ ইচ্ছার কারণ যে সাধনচতুষ্টয় তাহা ইহ জন্মে অথবা পূর্বজন্মে এ ব্যক্তির হইয়াছে নতুবা কারণ না থাকিলে কিরূপে কাৰ্যের সম্ভাবনা হয়। ভগবদগীতাতেও ইহাকে পুনঃ২ দৃঢ় করিয়া কহিয়াছেন ( চতুৰ্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনােৰ্জ্জুন। আর্তো জিজ্ঞাসুরথার্থী জ্ঞানী চ ভরতৰ্ষভ) স্বামীর ব্যাখ্যা, পূর্বজন্মের সুকৃতের দ্বারা চারি প্রকার ব্যক্তিরা আমাকে ভজন করেন প্রথম আৰ্ত্ত, দ্বিতীয় জিজ্ঞাসু, তৃতীয় অর্থার্থী, চতুর্থ জ্ঞানী। ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার অধিকারের কারণ সাধনচতুষ্টয় লিখিয়াছেন সেইরূপ শাক্ত শৈব বৈষ্ণব সৌর গাণপত্য ইত্যাদি তাবৎ উপাসনাতেই অধিকারের কারণ বাহুল্যরূপে লিখেন, তন্ত্রসারধৃত বচন (শান্তো বিনীতঃ শুদ্ধাত্মা শ্রদ্ধাবান্ ধারণক্ষম। সমর্থশ্চ কুলীনশ্চ প্রাজ্ঞ সচ্চরিতাে যতিঃ। এবমাদিগুণৈযুক্তঃ শিযয্যা ভবতি নান্যথা) শমগুণবিশিষ্ট অর্থাৎ অন্তরিন্দ্রিয়ের নিগ্রহবিশিষ্ট ও বিনয়যুক্ত, চিত্তশুদ্ধিবিশিষ্ট, শাস্ত্রে দৃঢ়বিশ্বাসী, ও মেধাবী, বিহিত কৰ্ম্মানুষ্ঠানক্ষম, আচারাদি গুণযুক্ত, বিশেষদর্শী, সচ্চরিত্র, যত্নশীল ইত্যাদি গুণবিশিষ্ট হইলে শিষ্য হয় অন্যথা শিষ্য হইতে পারে এ বচনে “শিষ্যো ভবতি নান্যথা” এই বাক্যের দ্বারা এ সকল বিশেষণকে সাকার উপাসনা বিষয়ে দৃঢ়তররূপে কহিয়াছেন। যদি ধৰ্ম্মসংহারক কহেন যে ‘এ সকল বিশেষণ উত্তমাধিকারী শিষ্যের প্রতি হয় কিন্তু মধ্যম ও কনিষ্ঠাধিকারে • এ সমুদায়ের নিয়ম নাই যেহেতু এরূপ সঙ্কোচ না করিলে সাকার উপাসনাতে অধিকারী প্রায় পাওয়া যাইবে না এবং জ্ঞানসাধন বিষয়ে সাধনচতুষ্টয়ের সম্পূর্ণরূপে যেমন ।

১১০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ইহ জন্মেই হওয়া আবশ্যক, এমৎ না কহিলে ব্রহ্মোপাসনার প্রবৃত্তিতে বাধা জন্মান যায় না” উত্তর, এরূপ কথন ধৰ্ম্মসংহারকের আশ্চৰ্য্য নহে, কিন্তু পূৰ্ব্বলিখিত বেদান্ত- সূত্র ও ভগবদগীতার প্রাপ্ত স্পষ্টার্থকে যাঁহারা অমান্য করেন তাঁহাদের সহিত আমাদের শাস্ত্রীয় বিচার নাই। ৬৪ পত্রে ২ পংক্তি অবধি লিখেন যে তত্ত্বজ্ঞানীর লক্ষণ ভগবদগীতাতে কহিয়াছেন ( দুঃখেনুদ্বিগ্নমনঃ সুখে বিগতস্পৃহঃ। বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীমু- নিরুচ্যতে) দুঃখেতে অনুদ্বিগ্নচিত্ত ও সুখেতে নিস্পৃহ ও বিষয়ানুরাগশূন্য, ভয় ক্রোধ রহিত এবং মুনি অর্থাৎ মৌনশীল যে মনুষ্য তাহার নাম স্থিতধী অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানী হয়। উত্তর, এ সকল স্বাভাবিক লক্ষণ সিদ্ধাবস্থায় হয় কিন্তু সাধনাবস্থায় এ সমুদায় বিশেষণ ব্যক্তিতে নিয়ম করিলে সিদ্ধাবস্থা ও সাধনাবস্থা উভয়ের ভেদ থাকে না, গীত (বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে। বাসুদেবঃ সৰ্ব্বমিতি স মহাত্মা সুদুল্লভঃ) চারি প্রকার ভক্তের মধ্যে চতুর্থ জ্ঞানী তাহাকে সর্বোত্তম কহিয়া তাহার সুদুল্ল ভত্ব কহিতেছেন যে এই চতুর্থ ভক্ত অর্থাৎ জ্ঞাননিষ্ঠ কিঞ্চিৎ২ পুণ্য বৃদ্ধির দ্বারা অনেক জন্মের অন্তে আত্মজ্ঞানকে লব্ধ হইয়া চরাচর এই সমস্ত জগৎ বাসুদেবই হয়েন এই ঐক্য জ্ঞানে অর্থাৎ সর্বত্র আত্মদৃষ্টিরূপে আমার ভজন করেন অতএব সেই অপরিছিন্ন দ্রষ্টা অতিশয় দুল্লভ হয়েন। অর্থাৎ অনেক জন্ম সাধনাবস্থার পরে সিদ্ধাবস্থা জন্মে ( প্রযত্নাদ্যতমানস্তু যােগী সংশুদ্ধকিন্বিষঃ। অনেকজন্মসংসিদ্ধস্ততে যাতি পরাং গতিং) স্বামী, যদি পূর্বোক্ত প্রকারে অল্প যত্নবিশিষ্ট জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি পরজন্মে পরম গতিকে প্রাপ্ত হয় তবে যে ব্যক্তি উত্তরােত্তর জ্ঞানাভ্যাসে অধিক যত্ন করে এবং সেই অনুষ্ঠানের দ্বারা নিস্পাপ হয় সে ব্যক্তি অনেক জন্মেতে সমাধির দ্বারা সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানী হইয়া ততােধিক শ্রেষ্ঠ গতিকে প্রাপ্ত হইবেক ইহাতে আশ্চর্য কি। এই গীতাবাক্যানুযায়ী ভাগবত শাস্ত্রেও সাধনাবস্থার অনেক প্রকার কহিয়াছেন, শ্ৰীভাগবতের একাদশ স্কন্ধে তৃতীয়াধ্যায়ে (সৰ্ব্বভূতেষু যঃ পশ্যেৎ ভগবদ্ভাবমাত্মনঃ। ভূতানি ভগবত্যাত্মষে ভাগবতােত্তমঃ । ঈশ্বরে তদধীনেযু বালিশে দ্বিষৎসু চ। প্রেমমৈত্রীকৃপােপেক্ষা যঃ করােতি স মধ্যমঃ। অচর্চায়ামেব হরয়ে পূজাং যঃ শ্রদ্ধয়েহতে। ন তদ্ভক্তেষু চাষুে স ভক্তঃ প্রাকৃতঃ মৃতঃ ) স্বামী, জ্ঞানপক্ষে এবং “যা” কহিয়া ভক্তি পক্ষেও ব্যাখ্যা করিয়াছেন তাহার প্রথম পক্ষ লিখিতেছি। সকল জগতে আপনাকে ব্ৰহ্মস্বরূপে অধিষ্ঠিত এবং ব্ৰহ্মস্বরূপ আপনাতে জগৎকে যে দেখে অর্থাৎ সর্বত্র আত্মদৃষ্টি যে করে সে উত্তম । ভাগবত হয়। ঈশ্বরে প্রীতি ও ঈশ্বরের ভক্তদের প্রতি সৌহার্দ ও মুর্থে কৃপা আর পথ্য প্রদান ১১১ দ্বেষ্টাতে উপেক্ষা যে করে সে মধ্যম ভাগবত হয়। ভগবানকে প্রতিমাতে যে শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক পূজা করে, ও তঁাহার ভক্ত সকলে ও ভক্ত ভিন্ন ব্যক্তি সকলে সেইরূপ পূজা না করে সে কনিষ্ঠ ভাগবত হয়। অতএব সাধন অবস্থা ও সিদ্ধাবস্থার প্রভেদ এবং সাধন অবস্থাতে উত্তম মধ্যম কনিষ্ঠ ইত্যাদি ভেদ ভগবদগীতা প্রভৃতি তাবৎ মােক্ষশাস্ত্রে করেন। সিদ্ধাবস্থার ধর্ম সাধনাবস্থায় কেন নাই এবং উত্তম সাধকের লক্ষণ মধ্যম ও কনিষ্ঠাদি সাধকেতে কেন নাই এই ছল গ্রহণ করিয়া নিন্দা করা কেবল দ্বেষ ও পৈশুন্য হেতু ব্যতিরেক কি হইতে পারে। ভগবদগীতাতে যেমন (দুঃখেম্বনুদ্বিগ্নমনা) ইত্যাদি বচনে জ্ঞানীর লক্ষণ লিখিয়াছেন সেইরূপ ভক্তের লক্ষণও লিখেন। যথা (সমঃ শত্রী চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়ােত। শীতােষ্ণ- সুখদুঃখে সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ। তুলনিন্দাস্তুতিমে নী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ। অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান মে প্রিয়াে নরঃ) শত্রুতে মিলেতে সমান ভাব, আর মান অপমান, শীত উষ্ণ, সুখ দুঃখ, ইহাতে সমান ভাব এবং বিষয়াসক্তিরহিত ও নিন্দা স্তুতিতে সমান ও মৌনবিশিষ্ট, যথাকথঞ্চিৎ প্রাপ্ত বস্তুতে সন্তুষ্ট, একস্থান- বাসহীন, এবং আমার প্রতি স্থিরচিত্ত এই প্রকার ভক্তিবিশিষ্ট মনুষ্য আমার প্রিয় হয়। ক্রিয়াযােগসারে (বৈষ্ণবেষু গুণাঃ সৰ্বে দোষলেশােন বিদ্যতে। তস্মচ্চতুর্মুখ ত্বঞ্চ বৈষ্ণববা ভব সম্প্রতি) সমুদায় গুণ বৈষ্ণবে থাকে দোষের লেশও থাকে না অতএব হে ব্রহ্মা তুমি বৈষ্ণব হও। এ স্থলে এ সকল লক্ষণ উত্তম ভক্তের হয় ইহা স্বীকার না করিয়া ধৰ্ম্মসংহারকের মতানুসারে প্রথম সাধনাবস্থায় স্বীকার করিলে বিষ্ণুভক্ত পদের প্রয়ােগ প্রায় অসম্ভব হইবেক। সুতরাং কি সাকার উপাসনায় কি জ্ঞান সাধনে সিদ্ধাবস্থা ও সাধনাবস্থা এ দুইয়ের প্রভেদ এবং সাধন অবস্থায় উত্তম মধ্যম কনিষ্ঠাদি প্রভেদ পূৰ্বকালে ঋষিরা ও গ্রন্থকারেরা স্বীকার করিয়াছেন অতএব ইদানীন্তনও তাহা স্বীকার করিতে হইবেক। ৬৫ পৃষ্ঠের শেষ পংক্তি অবধি লিখেন যে “তাহারা ( অর্থাৎ আমরা), আপনার- দিগকে না অধিকারাবস্থা না সাধনাবস্থা না সিদ্ধাবস্থা এক অবস্থাও স্বীকার করিতে পারিবেন না” উত্তর, আমরা আপনাদের সাধনাবস্থাই সর্বদা স্বীকার করি সেই সাধনাবস্থা অধিকারিভেদে নানাপ্রকার হয়, ভগবদগীতাতে ( অমানিত্বমদম্ভিং) ইত্যাদি পাঁচ বচন, যাহা ধৰ্মসংহারক ৬২ পৃষ্ঠের ১২ পংক্তি অবধি লিখিয়াছেন, অর্থাৎ মান ও দম্ভ ও রাগদ্বেষ ত্যাগ ও বিষয় সকলে বৈরাগ্য ও ইষ্ট, অনিষ্ট উভয়তে সমভাব ইত্যাদি বিশেষণাক্রান্ত কোনো সাধক হয়েন। ভগবদগীতাতে লিখেন (যুক্তঃ কৰ্ম্মফলং ত্যক্ত। শান্তিমাগ্লোতি নৈষ্ঠিকীং। অযুক্ত এবং ঐ ১১২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে) অর্থাৎ ঈশ্বরেকনিষ্ঠ হইয়া ফলত্যাগপূর্বক অগ্নিহােত্রাদি কৰ্ম্ম করিয়া নৈষ্ঠিকী শান্তি যে মুক্তি তাহা প্রাপ্ত হয়েন, ঈশ্বরবহির্মুখ ব্যক্তি ফল কামনাপূৰ্ব্বক কৰ্ম্ম করিয়া নিতান্ত বদ্ধ হয়। এইরূপ নিষ্কাম কৰ্ম্মানুষ্ঠান বিশিষ্ট কোনাে সাধক হয়েন। ভগবদগীতাতে ভূরি সাধনের উপদেশের পরে গ্রন্থ- শেষে ভগবান্ পুনরায় সাধনান্তরের উপদেশ দিতেছেন (সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রঙ্গ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ) সকল ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া আমি যে এক আমার শরণ লও, বর্ণাশ্রমাচার ধর্ম ত্যাগ করিলে তােমার যে পাপ হইবেক সে সকল পাপ হইতে আমি তােমার মােচন করিব। ভগবান্ মনুও তাবৎ বর্ণাশ্ৰমাচার কহিয়া গ্রন্থশেষে ইহারি তুল্যার্থ বচন কহিয়াছেন (যথােক্তাপি কৰ্ম্মাণি পরিহায় দ্বিজোত্তমঃ। আত্মজ্ঞানে শমে চ স্যাৎ বেদাভ্যাসে চ যত্নবান্। এতদ্ধি জন্মসাফল্যং ব্রাহ্মণস্য বিশেষতঃ। প্রাপৈতৎ কৃতকৃত্যোহি দ্বিজো ভবতি নান্যথা) পূর্বোক্ত কৰ্ম্ম সকলকে ত্যাগ করিয়াও আত্মজ্ঞানে ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহে ও প্রণব উপনিষদাদি বেদাভ্যাসে ব্রাহ্মণ যত্ন করিবেন, আত্মজ্ঞান ও বেদাভ্যাস ও ইন্দ্রিয় দমন দ্বারা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য এ সকলের, বিশেষত ব্রাহ্মণের, জন্ম সফল হয় যেহেতু এই অনুষ্ঠান করিয়া দ্বিজাতিরা কৃতকৃত্য হয়েন, অন্য প্রকারে কৃতকৃত্য হয়েন না। আর কোন ব্ৰহ্মনিষ্ঠ অথচ গৃহস্থ সাধকেরা পরের লিখিত বিশেষণাক্রান্ত হয়েন, গীতা ( শব্দাদীঘিষয়ানন্যে ইন্দ্রিয়াগ্নিযু জুতি) অর্থাৎ বিষয় ভােগকালেও আত্মাকে নির্লিপ্ত জানিয়া ইন্দ্রিয়ের কৰ্ম্ম ইন্দ্রিয়ই করেন এই নিশ্চয় করিয়া স্থিতি করেন। ইহারি তুল্যার্থ বচনকে বিশেষরূপে ভগবান্ মনুঃ গৃহস্থ- ধৰ্ম্মের প্রকরণে লিখিয়াছেন, ৪ অধ্যায় ২২ শ্লোক ( এনেকে মহাযজ্ঞা যজ্ঞ- শাস্ত্রবিদো জনাঃ। অনীহমানা সততমিেিয়ম্বেব জুতি) অর্থাৎ যে সকল ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থের বাহ এবং অন্তর যজ্ঞানুষ্ঠানের শাস্ত্রকে জানেন তাহারা বাহ্য কোনাে যজ্ঞাদির চেষ্টা না করিয়া ব্ৰহ্মজ্ঞানের অভ্যাস দ্বারা চক্ষুঃ শ্রোত্র প্রভৃতি যে পাঁচ ইন্দ্রিয় তাহার রূপ শব্দ প্রভৃতি পাঁচ বিষয়কে সংযম করিয়া পঞ্চ যজ্ঞকে সম্পন্ন করেন। পুনরায় অন্য সাধনের প্রকার গীতাতে কহেন ( অপানে জুতি প্রাণং প্রাণেইপানং তথাহপরে। প্রাণাপানগতী রুদ্ধা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ) অর্থাৎ কোন২ ব্যক্তি পূরক ও কুম্ভক ও রেচকক্রমে প্রাণায়ামরূপ যজ্ঞপরায়ণ হয়েন। এ লে স্বামিধৃত যােগশাস্ত্রবচন (সঃকারেণ বহির্যাতি হংকারেণ বিশেৎ পুনঃ। প্রাণত্র স এবামহং স ইতি চিন্তয়েৎ) অর্থাৎ নিশ্বাসের সময় প্রাণবায়ু সঃ কহিয়া বহির্গমন করেন, প্রশ্বাসের সময় হং কহিয়া প্রবিষ্ট হয়েন, অতএব সােহং হং সঃ, ইহারি চিন্তন পথ্য প্রদান ১১৩ সাধক করিবেক। ভগবান্ মনু ওই গৃহস্থধর্মপ্রকরণে ততুল্যার্থ বচন কহিতেছেন ২৩ শ্লোক (বাচ্যেকে জুতি প্রাণং প্রাণে বাচঞ্চ সৰ্ব্বদা! বাচি প্রাণে চ পন্তো যজ্ঞনিবৃতিমক্ষয়াং) অর্থাৎ কোন ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থ পঞ্চ যজ্ঞস্থানে বাক্যেতে নিশ্বাসের হবন করাকে ও নিশ্বাসে বাক্যের হৱন করাকে অক্ষয় ফলদায়ক যজ্ঞ জানিয়া বাক্যেতে নিশ্বাসের হবন আর নিশ্বাসে বাক্যের হবন করেন। পুনরায় অন্য সাধনপ্রকার গীতাতে লিখিয়াছেন (ব্ৰহ্মাগ্লাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবােপজুহৃতি) কোন ব্যক্তি ব্ৰহ্মরূপ অগ্নিতে ব্ৰহ্মাৰ্পণরূপ যজ্ঞ দ্বারা যজন করেন। ভগবান্ মনুঃ ২৪ শ্লোকে তল্যার্থ লিখেন ( জ্ঞানেনৈবাপরে বিপ্র যজন্ত্যেতৈৰ্মখৈঃ সদা। জ্ঞানমূলাং ক্রিয়ামেং পশন্তো জ্ঞানচক্ষুষা)। কোন ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থের গৃহস্থের প্রতি যে যজ্ঞশাস্ত্র বিহিত আছে তাহা সকল ব্ৰহ্ম জ্ঞানের দ্বারা নিষ্পন্ন করেন তাঁহার জ্ঞানচক্ষুদ্বারা অর্থাৎ উপনিষদের দ্বারা জানিতেছেন যে পঞ্চ যজ্ঞাদি সকল ব্ৰহ্মাত্মক হয়েন। ইহার উপসংহারে ভগবান্ কুল্লক ভট্ট লিখেন যে (শ্লোকত্রয়েণ ব্রহ্ম- নিষ্ঠানাং বেদসংন্যাসিনাং গৃহস্থানামমী বিধয়ঃ ) বেদোক্ত কৰ্ম্মানুষ্ঠানত্যাগী অথচ ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থদের প্রতি এই সকল বিধি কহিলেন। জ্ঞান প্রতিপত্তির নিমিত্ত নানাবিধ সাধন কহিলেন ইহার প্রত্যেকেতে উত্তম মধ্যম কনিষ্ঠ সাধক হইয়া থাকেন। বৈষ্ণব শাস্ত্রেও সেইরূপ মােক্ষোপায় সাধন নানাপ্রকার লিখিয়াছেন, শ্ৰীভাগবতে একাদশস্কন্ধে ২৯ অধ্যায় ১৯ শ্লোক ( সর্বং ব্ৰহ্মাত্মকং তস্য বিদ্যুয়াত্ম- মনীষয়া। পরিপশম্নপরমেৎ সৰ্ব্বতে মুক্তসংশয়ঃ । অয়ং হি সৰ্ব্বকল্পানাং সমীচীননা মতাে মম। মদ্ভাবং সৰ্ব্বভূতেষু মনােবাক্কায়বৃত্তিভিঃ) সৰ্ব্বত্র ঈশ্বর ব্যাপ্ত আছেন এই অভ্যাসের দ্বারা প্রাপ্ত হয় যে জ্ঞান তাহা হইতে সকল জগৎ ব্ৰহ্মাত্ম বােধ হয়, অতএব যখন সর্বত্র ব্রহ্মদৃষ্টিরূপ জ্ঞানের স্থিরত্ব হইল তখন সংশয়হীন হইয়া ক্রিয়ামাত্র হইতে নিবৃত্ত হইবেক। যদ্যপিও মোক্ষ সাধনে নানা উপায় আছে কিন্তু মনােবাক্য কায় এ সকলের দ্বারা সর্বত্র ঈশ্বরদৃষ্টি ইহা সকল উপায় হইতে শ্রেষ্ঠ হয় এই আমার মত। এবং এই পরের লিখিত শ্ৰীভাগবতীয় শ্লোকের অবতরণিকাতে নানাবিধ সাধনার প্রকার ভগবান শ্রীধরস্বামী বিবরণ করিতেছেন, (য এতান মৎপথাে হিত্বা ভক্তিজ্ঞানক্রিয়াত্মকান্। ক্ষুদ্রান্ কামাংশ্চলৈঃ প্রাণৈযন্তঃ সংসরন্তি তে) একাদশস্কন্ধ ২১ অধ্যায় স্বামী, (তদেবং গুণদোষব্যবস্থার্থং যােত্ৰয়মুক্তং তত্র চ জ্ঞানভক্তিসিদ্ধানাং ন কিঞ্চিৎ গুণদোষৌ। সাধকানান্তু প্রথমতাে নিবৃত্তকৰ্ম্মনিষ্ঠানাং যথাশক্তি নিত্যনৈমিত্তিকং কৰ্ম্ম সত্ত্বশােধকত্বগুণঃ, তদকরণং নিষিদ্ধকরণঞ্চ তন্মলীমসকণাৎ দোষঃ তন্নিবর্তকত্বাচ্চ প্রায়শ্চিত্তং গুণ। বিশুদ্ধসত্ত্বানা ১১৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী জ্ঞাননিষ্ঠানাং জ্ঞানাভ্যাস এব সিদ্ধিনিমিত্তত্বগুণঃ। ভক্তিনিষ্ঠানান্তু শ্রবণকীৰ্ত্তনাদি- ভক্তিরেব গুণঃ, তদ্বিরুদ্ধং সর্বং উভয়েষাং দোষ ইত্যুক্তং ইদানীন্তু যে ন সিদ্ধাঃ নাপি সাধকাঃ কিন্তু কেবলং কাম্যকৰ্ম্মপ্রধানাস্তেষাং সকলদোষান্ প্রপঞ্চয়িষ্য আদৌ তানতিবহির্মুখ নিতি, য এতানিতি ) অর্থাৎ গুণ দোষের পৃথক করিবার নিমিত্ত পূৰ্ব যে তিন প্রকার যােগ কহিলেন তার মধ্যে জ্ঞানসিদ্ধ ব্যক্তির অথবা ভক্তি- সিদ্ধ ব্যক্তির কোন প্রকারেই পাপ পুণ্য নাই, কিন্তু সাধকেদের মধ্যে যাঁহারা কৰ্ম্মফল ত্যাগ করিয়া কৰ্ম্ম করেন তাহাদের যথাশক্তি নিত্যনৈমিত্তিক কৰ্ম্মানুষ্ঠান গুণ হয় যেহেতু নিষ্কাম কৰ্ম্ম দ্বারা চিত্তের শুদ্ধি জন্মে, যথাশক্তি কৰ্ম্ম না করাতে এবং নিষিদ্ধ কৰ্ম্ম করাতে দোষ হয়, যেহেতু এ দুই কারণে চিত্তের মালিন্য জন্মে। চিত্তশুদ্ধির দ্বারা জ্ঞাননিষ্ঠ যাঁহারা হইয়াছেন তাহাদের কেবল জ্ঞানাভ্যাস গুণ হয় যেহেতু জ্ঞানাভ্যাসের দ্বারা জ্ঞানের পরিপাক জন্মে। ভক্তিনিষ্ঠ ব্যক্তিদের শ্রবণ কীৰ্ত্তনাদি ভক্তির তানুষ্ঠান গুণ হয়। জ্ঞাননিষ্ঠের ও ভক্তের আপন নিষ্ঠার বিরুদ্ধাচরণ দোষ হয় ইহা কহিয়াছেন, এখন যাহারা না সিদ্ধ না সাধক কিন্তু কেবল কাম্য কর্মে রত হয়েন তাহাদের সকল দোষ গুণ বিস্তাররূপে কহিবেন, প্রথমে সেই বহির্মুখ কাম্য কর্মীর নিন্দা করিতেছেন ( য এতান্) ইত্যাদি শ্লোক দ্বারা অর্থাৎ যাহারা আমার কথিত ভক্তিপথ ও জ্ঞানপথ ত্যাগ করিয়া চঞ্চল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ক্ষুদ্র কামনার সেবা করে তাহারা সংসারে পুনঃ পুনঃ জন্মে। জ্ঞাননিষ্ঠদের মধ্যে উত্তম সাধনাবস্থা যে ব্যক্তিদের হয় নাই তাহাদের প্রতি ধৰ্ম্মসংহারক কহেন “যে তােমাদের না অধিকার- বস্থা না সাধনাবস্থা না সিদ্ধাবস্থা” অতএব ধৰ্ম্মসংহারককে জিজ্ঞাসা করি যে তিনি বিষ্ণু উপাসনা বিষয়ে অধিকারাবস্থায় হয়েন কি সাধনাবস্থায় কি সিদ্ধাবস্থায় আছেন, বিষ্ণু প্রভৃতি উপাসকের অধিকারাবস্থায় এই সকল লক্ষণ হয়, তন্ত্রসারত বচন (শান্তো বিনীতঃ শুদ্ধাত্মা) ইত্যাদি, যাহা ৬৭ পৃষ্ঠে ৯ পংক্তিতে লেখা গিয়াছে অতএব বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন যে অন্তরিন্দ্রিয় ও বাহেন্দ্রিয় নিগ্রহ প্রভৃতি ওই বচনপ্রাপ্ত বিশেষণ সকল তাহাতে আছে কি না। এবং ঐ উপাসনায় সাধনাবস্থার লক্ষণ সকল এই হয়। বৈষ্ণব গ্রন্থে (তৃণাদপি সুনীচেন তরােরপি সহিষ্ণুনা। অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ) তৃণ হইতে নীচ আপনারে জানে এবং বৃক্ষ হইতেও সহিষ্ণু হয়, আত্মাভিমানশূন্য কিন্তু অন্যের সম্মানদাতা এমত ব্যক্তি সৰ্ব্বদা হরিসংকীৰ্ত্তন করিতে পারে। ভগবদগীতা, (সমঃ শর্তেী চ মিত্রে চ তথা মানাপমানিয়ােঃ) ইত্যাদি অর্থাৎ শত্রু মিত্রে মান অপমানে সমান বােধ করিলে ভক্ত ব্যক্তি ভগবানের প্রিয় হইবেক। তথা, (মচ্চিত্ত। মগতপ্রাণা পথ্য প্রদান ১১৫ বােধয়ন্তঃ পরম্পরং। কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ)। অর্থাৎ যাহারা আমাতেই চিত্ত ও আমাতেই সৰ্বেন্দ্ৰিয় রাখে ও আমার গুণকে পরস্পর জানায় ও সর্বদা আমার কীৰ্ত্তন করে ইহার দ্বারা পরমালাদ প্রাপ্ত হইয়া নিবৃত্ত অতএব বিজ্ঞ লােক সকল দেখিবেন যে পূৰ্ব্বলিখিত বচনপ্রাপ্ত সাধনাবস্থার লক্ষণ সকল তাহাতে আছে কি না। পরে ভক্তির সিদ্ধাবস্থার লক্ষণ (তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূৰ্ব্বকং। দদামি বুদ্ধিযােগং তং যেন মামুপন্তি তে । তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ । নাশয়াম্যাত্মভাবস্থা জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা) অর্থাৎ এইরূপ নিরন্তর উদযুক্ত হইয়া প্রীতিপূৰ্ব্বক ভজন যাহারা করেন তাহাদিগগে আমি সেই জ্ঞানরূপ উপায় প্রদান করি যাহাতে তাহারা আমাকে প্রাপ্ত হয়েন। তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ করিয়া তাহাদের বুদ্ধিতে অবস্থানপূর্বক অজ্ঞানজন্য যে অন্ধকার তাহাকে দেদীপ্যমান জ্ঞানরূপ দীপের দ্বারা নষ্ট করি। অর্থাৎ তঁাহাদিগগে জ্ঞান প্রদান করিয়া মুক্তি দি। এখন ওই বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই দেখিবেন যে ভগবানের দত্ত তত্ত্বজ্ঞান যাহা ভক্তির সিদ্ধাবস্থায় প্রাপ্ত হয় তাহার দ্বারা ধৰ্ম্ম- সংহারকের সর্বত্র ভগবদ্দষ্টি হইয়াছে কি না। সুতরাং ইহার কোনাে এক অবস্থা স্বীকার করিলে তাহার মতেই তাহার নিস্তার নাই, অর্থাৎ পূর্বোক্ত প্রমাণে না অধিকারাবস্থা না সাধনাবস্থা না সিদ্ধাবস্থ। ইহার এক অবস্থাও স্বীকার করিতে পারিবেন না যদি এরূপ কহেন যে “পূর্ব২ বচনে বিষ্ণুভক্ত বিষয়ে যে সকল বিশেষণ অধিকারাবস্থার ও সাধনাবস্থার কহিয়াছেন সে উত্তম অধিকারী ও উত্তম সাধকের প্রতি হয় কিন্তু ব্যক্তিভেদে সাধনাবস্থা উত্তম মধ্যম কনিষ্ঠ ইত্যাদি নানাপ্রকার হয়” তবে ধর্মসংহারকই বিবেচনা করিবেন যে এরূপ কথন প্রতীক ও অপ্রতীক উভয় উপাসনাতে নির্বাহের কারণ হইবেক এবং শাস্ত্রেরও অপলাপ হইবেক না। যথা মাণ্ডুক্যভাষ্যধৃত কারিকা ( আশ্রমাস্ত্রিবিধা হীনমধ্যমমাৎকৃষ্টদৃষ্টয়ঃ ) অর্থাৎ আশ্রমীরা তিন প্রকার হয়েন, হীনদৃষ্টি, মধ্যমদৃষ্টি, উত্তমদৃষ্টি । আমরা পূর্ব উত্তরে লিখিয়াছিলাম যে কোন এক বৈষ্ণব যে আপন ধর্মের লক্ষাংশের একাংশও অনুষ্ঠান করেন না ও বিপরীত ধর্মানুষ্ঠান করিয়া থাকেন তিনি যদি কোন ব্ৰহ্মনিষ্ঠের ত্রুটি দেখিয়া তাহাকে ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী ও নিন্দিত কহেন তবে তাহাকে নিন্দকের মধ্যে অতিশয় নিন্দিত করিয়া পণ্ডিতেরা জানিবেন কি না। ইহাতে ধৰ্ম্মসংহারক ৬৮ পৃষ্ঠের পৃষ্ঠের ২ পংক্তিতে লিখেন যে “পূর্বোক্ত লিখনানুসারে ভাক্ত বৈষ্ণব ও ভক্ত শাক্ত খপুষ্পের ন্যায় অলীক” উত্তর, জ্ঞাননিষ্ঠদের যথােক্ত অনুষ্ঠানের ত্রুটি হইলে ধর্মসংহারক তাহাকে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী উৎসাহপূৰ্ব্বক কহেন রামমােহন-গ্রন্থাবলী কিন্তু আপন ধর্মের লক্ষাংশের একাংশ অনুষ্ঠান না করিয়াও ভাক্ত বৈষ্ণব পদের প্রয়ােগপাত্র হইবেন না ইহা স্থাপনা করিতে যত্ন করেন, এ পক্ষপাতের বিবেচনা পণ্ডিতেরা করিবেন। ৩৯ পৃষ্ঠের ৬ পংক্তিতে লিখেন যে “যদ্যপি বৈষ্ণবাদি পঞ্চোপাসক আপনার উপাসনার সকল অনুষ্ঠান করিতে অশক্ত হয়েন তথাপি পাপ ক্ষয় ও মােক্ষ প্রাপ্তি তাহাদের অনায়াসলভ্য, যেহেতু বিষ্ণু প্রভৃতি পঞ্চ দেবতার নাম স্মরণ মাত্রেই সৰ্ব পাপ ক্ষয় ও অন্তে মােক্ষ প্রাপ্তি হয় এবং ইহার প্রমাণের নিমিত্ত নামমাহা - সূচক কাশীখণ্ড প্রভৃতির বচন লিখিয়াছেন। উত্তর, সে সকল বচন স্তুতিবাদ কি যথার্থবাদ হয় এ বিচারে আমরা প্রবৃত্ত নহি কিন্তু এই উত্তরের ২৪ পৃষ্ঠের ৫ পংক্তি অবধি ২৭ পৃষ্ঠ পৰ্যন্ত জ্ঞাননিষ্ঠদের পাপক্ষয় ও পুরুষার্থসিদ্ধি বিষয়ে যাহা আমরা লিখিয়াছি তাহার তাৎপৰ্য এই যে জ্ঞানাবলম্বীদের জ্ঞানাভ্যাস প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ হয়, সংপ্রতি সেই স্থলের লিখিত বচন সকলের কিঞ্চিৎ লিখিতেছি (সােহং হংসঃ সকৃৎ ধ্যাত্বা সুকৃতাে দুস্কৃতােপি বা। বিধূতকল্মষঃ সাধুঃ পরাং সিদ্ধিং সমশ্নতে।) অর্থাৎ সুকৃত কিম্বা দুস্কৃত ব্যক্তি জীব ও ব্রহ্মের ঐক্যজ্ঞান একবার করিলেও সর্বপাপক্ষয়- পূৰ্ব্বক পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ভগবদগীতার চতুর্থ অধ্যায়ে ৩০ শ্লোকে (সৰ্ব্বেপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষয়িতকল্মষাঃ) এই দ্বাদশপ্রকার ব্যক্তিরা স্ব২ যজ্ঞকে প্রাপ্ত হয়েন ও পূর্বোক্ত স্ব২ যজ্ঞের দ্বারা স্বকীয় পাপকে ক্ষয় করেন। বৈষ্ণব শাস্ত্রেও স্ব২ অধিকারে পৃথক পাপ ক্ষয়ের উপায় যাহা কহিয়াছেন তাহাও লিখিতেছি, শীভাগবত একাদশস্ক, বিংশতি অধ্যায় ২৬ শ্লোক (যদি ২৬ শ্লোক (যদি কুৰ্য্যাৎ প্রমাদেন যােগী কৰ্ম্ম বিগর্হিতং। যােগেনৈব দহেদঘাে নান্যত্তত্র কদাচন। স্বে স্বেধিকারে যা নিষ্ঠা স গুণঃ পরিকীৰ্ত্তিতঃ ) স্বামী, যদি প্রমাদেতে জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি গর্হিত কৰ্ম্ম করে সেই পাপকে জ্ঞানাভ্যাসের দ্বারা দগ্ধ করিবেক তাহার অন্য প্রায়শ্চিত্ত নাই। স্বামীর অবতরণিকা পরশ্লোকে, শাস্ত্রে কথিত প্রায়শ্চিত্ত ব্যতিরেক জ্ঞানযোগে কিরূপে পাপক্ষয় হইবেক অতএব এই আশঙ্কা নিবারণার্থে পরের শ্লোকে কহিতেছেন, আপন২ অধিকারে যে নিষ্ঠা তাহাকে গুণ কহি এক অধিকারে অন্য প্রায়শ্চিত্ত যুক্ত হয় না । এ স্থলে জিজ্ঞাস্য এই যে ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত কাশীখণ্ড প্রভৃতির বচন যদি যথার্থবাদ হইয়া দেবতা প্রভৃতির নাম গ্ৰহণাদি সাধনার ত্রুটি জন্য দোষ ও অন্য কুকর্মজন্য পাপক্ষয়ের কারণ হয়, তবে পূর্বের লিখিত গীতাদিবচনের প্রামাণ্য দ্বারা জ্ঞাননিষ্ঠদের পাপক্ষয়ের উপায় জ্ঞানাভ্যাস অবশ্যই হইবেক, ইহা ধৰ্ম্মসংহারক যদি স্বীকার না করেন কিন্তু পণ্ডিত ব্যক্তিরা অবশ্য অঙ্গীকার করিবেন।

পথ্য প্রদান ১১৭ , ৭৮ পৃষ্ঠে এক পংক্তি অবধি লিখেন যে “যদ্যপিও জ্ঞানের প্রাধান্য মাদিবচনে কথিত আছে তথাপি কৰ্ম্ম ব্যতিরেকে জ্ঞান হইতে পারে না” আর ইহার প্রমাণের নিমিত্ত (ন কৰ্ম্মণামনারম্ভানৈকৰ্মং পুরুষােতে) ইত্যাদি ভগবদগীতার বচন লিখিয়াছেন। উত্তর, যদি এ স্থলে এমৎ অভিপ্রেত হয় যে ঐহিক কৰ্ম্ম ব্যতিরেকে জ্ঞান হইতে পারে না তবে এ সৰ্বথা অগ্রাহ্য যেহেতু এরূপ ব্যবস্থা তাবৎ শাস্ত্রের বিরুদ্ধ হয়, বেদান্তের প্রথম সূত্রের ব্যাখ্যায় প্রথমে প্রশ্ন করেন যে “কাহার অনন্তর ব্রহ্মজিজ্ঞাসা হয়” এই আকাক্ষাতে ভগবান্ ভাষ্যকার আদৌ আশংকা করিলেন। যে “কর্মের অনন্তর ব্রহ্মজিজ্ঞাসা হয় এরূপ কেন না কহি” পরে এই পূৰ্বপক্ষের সিদ্ধান্ত আপনিই করেন যে ( ধৰ্মজিজ্ঞাসায় প্রাগপ্যধী তবেদান্তস্য ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসোপ- পত্তেঃ ) অর্থাৎ বেদান্তের অধ্যয়নবিশিষ্ট ব্যক্তির কৰ্ম্ম জানিবার পূর্বেও ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসা অতএব ঐহিক কৰ্ম্মের তার ব্রহ্মজিজ্ঞাস। হয় এমং নিয়ম নাই। ইহাতে পাঁচ হেতু ভায্যে লিখেন, প্রথম এই যে, কর্মের অঙ্গ জ্ঞান হয়েন না। দ্বিতীয়, অধিকৃতাধিকার নাই। তর্থাৎ যেমন দক্ষিণীয় যাগের অধিকারী হইয়া অগ্নিষ্টোমের অধিকারী হয়, সেইরূপ কর্মে অধিকারী হইয়া জ্ঞানে অধিকারী হয় এমৎ নিয়ম নাই। তৃতীয়, কর্ম ও জ্ঞান উভয়ের ফলে ভেদ আছে। অর্থাৎ কর্মের ফল স্বর্গাদি আর জ্ঞানের ফল মােক্ষ হয়। চতুর্থ, জিস্যের ভেদ আছে। অর্থাৎ পূৰ্ব্বমীমাংসাতে জিজ্ঞাস্য যে কৰ্ম্ম তাহা পুরুষের চেষ্টার ধান হয়, আর উত্তর- মীমাংসাতে জিজ্ঞাস্য যে ব্ৰহ্ম তিনি নিত্যসিদ্ধ হয়েন। পঞ্চম, উভয়ের বিধিবাক্যের ভেদ দেখিতেছি। অর্থাৎ কর্মের বিধায়ক যে বিধিবাক্য সে আপন বিষয় যে কর্ম তাহাতে পুরুষের প্রবৃত্তি নিমিত্ত আপন অর্থ বােধ প্রথমে করান পরে সেই কৰ্ম্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্তি দেন, আর ব্রহ্ম বিষয়ে যে বিধিবাক্য সে কেবল পুরুষের বােধ জম্মান প্রবৃত্তি দেন না। যদ্যপিও মিতাক্ষরাকার পূজ্যপাদ বিজ্ঞানেশ্বরের এ প্রকার অভিপ্রায় ছিল যে সংন্যাসশ্রম ব্যতিরেক মুক্তি হয় না, তথাপিও তিনি স্বীকার করিয়াছেন যে কোনাে এক পূৰ্ব্বজন্মের সংন্যাস পরজন্মে গৃহস্থের মুক্তির কারণ হয়। যাজ্ঞবল্ক্য (ন্যায়াজ্জিতধনস্তত্ত্বজ্ঞাননিষ্ঠোইতিথিপ্রিয়। শ্রাদ্ধকৃৎ সত্যবাদী চ গৃহস্থােপি বিমুচ্যতে) ন্যায়েতে ধনােপাৰ্জন যে করে এবং জ্ঞাননিষ্ঠ হয় ও অতিথিকে প্রীতি এবং শ্রাদ্ধ করে ও সত্যবাক্য কহে এরূপ গৃহস্থও মুক্তি প্রাপ্ত হয়। বানপ্রস্থ প্রকরণের শেষে মিতাক্ষরাকার লিখেন (যদপি গৃহস্থােপি বিমুচ্যতে ইতি গৃহস্থাপি মােক্ষপ্রতিপাদনং তৎ ভবান্তরানুভূতপারিব্রজ্যস্ত্যেবগন্তব্যং) অর্থাৎ এ বচনে গৃহস্থ মুক্ত হয় যে লিখেন সে জন্মান্তরে সংন্যাস লইয়াছেন এমত গৃহস্থপর হয়।

১১৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী “কৰ্ম্ম ব্যতিরেকে জ্ঞান হইতে পারে না” এ কথনের দ্বারা যদি ধৰ্ম্মসংহারকের এমত অভিপ্রেত হয় যে ইহ জন্মের কিম্বা পূৰ্ব্বজন্মের কর্ম বিনা জ্ঞান হয় না, তবে ইহা শাস্ত্রসিদ্ধ বটে যেহেতু বেদান্তের তৃতীয় অধ্যায়ের ১ পাদের ৫১ সূত্র ( যাহার বিবরণ এই উত্তরের ৬৬ পৃষ্ঠের ২ পংক্তিতে করিয়াছি) এই অর্থকে প্রতিপন্ন করেন। এবং ইহাতে শ্রুতি প্রমাণ দিয়াছেন, যথা (গৰ্ভস্থ এব বামদেবঃ প্রতিপেদে ব্ৰহ্মভাবং) গৰ্ভস্থ যে বামদেব তিনি ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অর্থাৎ তাহার ঐহিক কোন কৰ্ম্ম সবিতে পারে না সুতরাং জন্মান্তরের সাধন দ্বারা তাহার ব্রহ্মভাব হইয়াছে। ভগবদ্গীতাও ইহা পুনঃ২ দৃঢ় করিয়া প্রতিপন্ন করিয়াছেন তাহার কিঞ্চিৎ আমরা ওই ৬৬ পৃষ্ঠ অবধি লিখিয়াছি কৰ্মকৰ্তব্যতার বিষয়ে গীতার যে সকল বচন লিখিয়াছেন তাহার বিষয় কোন্ ব্যক্তি হয়েন ইহার প্রভেদ জানা আবশ্যক, গীতাতে কোন স্থলে কৰ্ম্ম করিবার নিমিত্তে প্রেরণ করেন যথা (এপি তু কৰ্ম্মাণি সঙ্গ ত্যক্ত। ফলানি চ। কৰ্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমং) এই সকল কর্ম আসক্তি ও ফলকামনা পরিত্যাগপূর্বক কর্তব্য হয় হে অর্জুন এ নিশ্চিত উত্তম মত আমার জানিবে । এবং কোন স্থানে কর্ম ত্যাগের উপদেশ দেন ও সেই ত্যাগ নিমিত্ত পাপ হইলে পরমেশ্বরের শরণবলে তাহার মােন হয় এমত লিখেন, যথা ( সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মােক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ) অর্থাৎ সকল কর্ম পরিত্যাগ করিয়া আমি যে এক আমার শরণাপন্ন হও, বর্ণাশ্রমাচারের ত্যাগজন্য যে পাপ তােমার হইবেক তাহা হইতে আমি তােমাকে মােচন করিব শােক করিও না। এবং কোন স্থানে গীতাতে লিখেন যে ব্যক্তিবিশেষের কৰ্ম্মত্যাগজ পাপ স্পর্শে না এবং তাহার বাঞ্ছিত ফলােৎপত্তিতে অন্য কোন বস্তুর অপেক্ষা নাই, যথা (নৈব তস্য কৃতেনার্থে। নাকৃতেনেহ কশ্চন। ন চাস্য সৰ্ব্বভূতেষু কশ্চিদৰ্থব্যপায়ঃ) সেই জ্ঞানীর কৰ্ম্ম করিলে পুণ্য হয় না এবং কৰ্ম্ম না করিলেও পাপ হয় না, আব্ৰহ্ম কীট পৰ্যন্ত তাবৎ জগতে তাহার মােক্ষ- প্রাপ্তি বিষয়ে জ্ঞান ব্যতিরেকে অন্য কোনাে উপায় আশ্রয়ণীয় হয় না। অতএব এই সকল বচনের ঐক্য নিমিত্তে কোন্ অধিকারে বর্ণাশ্রমাচার কৰ্ম্মের আবশ্যকতা এবং কোন অধিকারে অনাবশ্যকতা ইহার বিশেষ জ্ঞানের সর্বথা অপেক্ষা করে, নতুবা বচন সকলের পূর্বাপর অনৈক্য হইয়া অপ্রামাণ্যর আশঙ্কা হয়। বেদান্তের তৃতীয় অধ্যায়ে চতুর্থ পদে অধিকারের বিশেষ বিবরণ করিয়াছেন, তাহার প্রথম সূত্র (পুরুষার্থোতঃশব্দাদিতি বাদরায়ণঃ) বেদান্তবিহিত আত্মজ্ঞান হইতে পুরুষার্থ । সিদ্ধ হয়, বেদব্যাসের এই মত যেহেতু বেদে ইহা কহিয়াছেন, শ্রুতিঃ (তরতি পথ্য প্রদান ১১৯ শােকমাত্মবিৎ ) আত্মজ্ঞানবিশিষ্ট ব্যক্তি শােকের কারণ সংসার হইতে উত্তীর্ণ হয়েন ( ব্ৰহ্মবিদাপ্নোতি পরং) ব্রহ্মজ্ঞানবিশিষ্ট পরব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয়েন (স সৰ্বাংশ্চ লােকানাপাতি সৰ্বাংশ্চ কামান ) সেই আত্মনিষ্ঠ সকল লােককে প্রাপ্ত হয়েন এবং সকল কামনাকে প্রাপ্ত হয়েন, ইত্যাদি শ্রুতিঃ। ইহার পর দ্বিতীয় সূত্র অবধি ২৪ সূত্ৰ পৰ্যন্ত জৈমিনির মতকে লিখেন এবং তাহার খণ্ডন করিয়া ২৫ সূত্রে ঐ প্রথম সূত্রের অনুবৃত্তি করিতেছেন ( অতএব চাৰ্গন্ধনাদনপেক্ষা ২৫) যেহেতু কেবল আত্মজ্ঞানের দ্বারা পুরুষার্থ সিদ্ধ হয় অতএব অগ্নিহােত্র প্রভৃতি আশ্ৰমকৰ্ম্ম সকলের অপেক্ষা নাই। এই সূত্রের দ্বারা সংশয় উপস্থিত হয় যে আ ত্ম জ্ঞান সর্বপ্রকারে কর্মের অপেক্ষা করেন না কি কোনাে অংশে কৰ্ম্মের অপেক্ষা করেন, তাহার মীমাংসা পরের সূত্রে করিতেছেন (সৰ্ব্বাপেক্ষা চ যজ্ঞাদিতেরশ্ববৎ ২৬) আত্মজ্ঞান আশ্রম- কৰ্ম্ম সকলের অপেক্ষা করেন, যেহেতু বেদে যজ্ঞাদিকে বিদ্যার কারণ কহিয়াছেন এমত শুনিতেছি, শ্রুতিঃ ( তমে তং বেদানুবচনেন ব্রাহ্মণ। বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন দানেন তপসানাশকেন) সেই যে এই আত্মা তাহাকে ব্রাহ্মণের বেদ পাঠের দ্বারা এবং যজ্ঞ দান তপস্যা এবং উপবাসের দ্বারা জানিতে ইচ্ছা করেন। যেমন অশ্বকে লাঙ্গলে যােজন না করিয়া রথে যােজন করেন সেইরূপ আত্মজ্ঞানের ইচ্ছার উৎপত্তির নিমিত্ত যজ্ঞাদির অপেক্ষা হয় কিন্তু আত্মজ্ঞানের ফল যে মুক্তি তদর্থে যজ্ঞাদির অপেক্ষা নাই। ২৬, যদি কহেন যে “ঐ যজ্ঞাদি শ্রুতিতে “বিবিদিষন্তি” এই পদ আছে, অর্থাৎ ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞাদির দ্বারা আত্মাকে জানিতে ইচ্ছা করেন, কিন্তু আত্মাকে যজ্ঞাদির দ্বারা জানিতে ইচ্ছা কর, এমত বিধি তাহাতে নাই অতএব ওই শ্রুতি কেবল পুনঃকথন মাত্র” এই কোটের উপর নির্ল্ডর করিয়া পরের সূত্র কহিতেছেন (শমদমাদ্যপেতঃ স্যাত্তথাপি ? তদ্বিধেস্তদঙ্গতয়া তেষামবানুষ্ঠেয়ত্বাৎ ২৭) যদি কেহ পূর্বোক্ত কোটি করেন যে ঐ যজ্ঞাদি শ্রুতিতে “কর” এমত বিধি- বাক্য নাই, তথাপিও জ্ঞানার্থী শমদমাদিবিশিষ্ট হইবেন যেহেতু আত্মজ্ঞান সাধনের নিমিত্ত শমদমাদির বিধান বেদে করিয়াছেন এবং যাহার বিধান বেদে আছে তাহার অনুষ্ঠান আবশ্যক হয় (২৭) বস্তুতঃ পূর্বের লিখিত যজ্ঞাদি শ্রুতি ভাষ্যকারের মতে বিধিবাক্যের ন্যায় হয়, অতএব উভয়ের অর্থাৎ আশ্রমকর্মের ও শমদমাদির অপেক্ষা আত্মজ্ঞান করেন, তাহাতে প্রভেদ এই যে আত্মজ্ঞানের যে ইচ্ছা তাহা যজ্ঞাদি কর্মের অপেক্ষা করে, এ নিমিত্ত আশ্রমকৰ্ম্মকে আত্মজ্ঞানের বহিরঙ্গ কারণ কহেন, ও আত্মজ্ঞানের ইচ্ছা এবং আত্মজ্ঞানের পরিপাক এ দুই শমদমাদির অপেক্ষা করেন এ নিমিত্ত শমদমদিকে জ্ঞানের অন্তরঙ্গ কারণ কহিয়াছেন (২৭) পরে ৩৫ সূত্ৰ পৰ্যন্ত ১২০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী প্রাণবিদ্যার এবং আত্মজ্ঞানের ইচ্ছা যাহাদের নাই তাহাদের আশ্রমকর্মের আবশ্যকতার বিধান করিয়া :৬ সূত্রে এই পরের আশঙ্কার নিরাস করিতেছেন, যে আত্মজ্ঞান বর্ণাশ্রমকর্মের নিতান্ত অপেক্ষা করেন কিম্বা কোনাে অংশে নিরপেক্ষ হয়েন, তাহাতে এই সূত্র লিখেন ( অন্তরা চাপি তু তদ্দষ্টেঃ ৩৬) আশ্রমকৰ্ম্মরহিত ব্যক্তিরও জ্ঞানের অধিকার আছে যেহেতু বেদে দৃষ্ট হইতেছে, রৈক ও বাচাবী প্রভৃতি আত্মজ্ঞানীদের আশ্রমকৰ্ম্ম ছিল না কিন্তু তাহাদের পূর্বজন্মীয় সুকৃতির দ্বারা জ্ঞান সাধনে প্রবৃত্তি হইয়াছিল ( ৩৬)। তদনন্তর আশ্রমকৰ্ম্মবিশিষ্ট ও আশ্রমকৰ্ম্ম- রহিত এই দুই সাধকের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ হয় তাহা পরের সূত্রে কহিতেছেন ( অতস্তি তরজ্যায়ে। লিঙ্গাচ্চ) আশ্রমকৰ্ম্মরহিত সাধক হইতে আশ্রমকৰ্ম্মবিশিষ্ট সাধক জ্ঞানাধিকারে শ্রেষ্ঠ হয়েন যেহেতু শ্রুতি স্মৃতিতে আশ্ৰমীর প্রশংসা করিয়াছেন। সমূদায়ের তাৎপৰ্য এই যে আত্মজ্ঞান উৎপন্ন হইলে তাহার ফল যে মুক্তি তৎপ্রাপ্তির নিমিত্ত অগ্নীন্ধনাদি বর্ণাশ্রমকর্মের অপেক্ষা নাই, তবে লােকসংগ্রহের নিমিত্ত কোন জ্ঞানীরা (যেমন বশিষ্ঠ জনকাদি) বর্ণাশ্রমকর্মের অনুষ্ঠান করিয়াছেন, এবং লােকামুরােধ না করিয়া কোন জ্ঞানীরা (যেমন শুক ভরতাদি) বর্ণাশ্রমাচারের অনুষ্ঠান করেন নাই, তাহাতে ওই আশ্রমী জ্ঞানী ও অনাশ্রমী জ্ঞানী দুইয়ের মধ্যে কাহাকেও পুণ্য পাপ স্পর্শ করে নাই। (অতএব চাগ্নীহ্মনাদ্যনপেক্ষা) অর্থাৎ পরিপক্ক জ্ঞানীর কর্মের অপেক্ষা নাই। বেদান্তের ৩ অধ্যায়ের ৪ পাদের এই ২৫ সূত্রের বিষয়, এবং ( নৈব তস্য কৃতেনাৰ্থে নাকৃতেনেহ কশ্চন) অর্থাৎ তাহাদের পাপ পুণ্য ও কর্তব্যাকৰ্তব্য নাই। ইত্যাদি গীতাবচনের বিষয় এই জ্ঞানীরা হয়েন। ( সর্বাপেক্ষা চ যজ্ঞাদিতেরশ্ববৎ ) অর্থাৎ জ্ঞানেচ্ছার প্রতি আশ্ৰমকৰ্ম্ম সকলের অপেক্ষা আছে, বেদান্তের ৩ অধ্যায়ের ৪ পাদের এই ২৬ সুত্রের বিষয়, ও ( এতাদ্যপি তু কৰ্ম্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত। ফলানি চ) অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধির জন্যে কামনা ত্যাগ করিয়া আশ্রমকৰ্ম্ম করিবেক, ইত্যাদি গীতাবচনের বিষয় মুমুক্ষু কর্মীর হয়েন। ( অন্তরাচাপি তু তদ্দষ্টে) অর্থাৎ জ্ঞানাধিকারে বর্ণাশ্ৰমাচারের অপেক্ষা নাই, বেদান্তের ৩ অধ্যায়ের ও পাদের এই ৩৬ সুত্রের বিষয়, ও (সৰ্ব্বধৰ্ম্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ) অর্থাৎ বর্ণাশ্রমাচার ত্যাগ করিয়া আমি যে এক পরমেশ্বর আমার শরণ লও, ইত্যাদি গীতাবচনের বিষয় বর্ণাশ্রমচাৰকৰ্ম্মরহিত মুমুক্ষু ব্যক্তিরা হয়েন। অতএব অজ্ঞানতা প্রযুক্ত কিম্বা দ্বেষ পৈশুন্যতা হেতু এক সূত্রের ও এক বচনের বিষয়কে অন্য সূত্র অন্য বচনের বিষয় কল্পনা করিয়া শাস্ত্রের পরস্পর অনৈক্য 1 পথ্য প্রদান ১২১ স্থাপন করা কেবল শাস্ত্রের প্রামাণ্যর সঙ্কোচ করা হয়। বর্ণাশ্রমধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান কি পর্যন্ত আবশ্যক এবং কোন অবস্থায় অনাবশ্যক হয় যদ্যপিও পূৰ্বে বিবরণপূর্বক ইহা লিখা গিয়াছে, সংপ্রতি বােধগমের নিমিত্ত সেই সকলকে একত্র করিয়া লিখিতেছি; জ্ঞান সাধনে ইচ্ছা হইবার পূর্বে চিত্তশুদ্ধির নিমিত্ত নিষ্কামরূপে বর্ণাশ্রমাচারের অনুষ্ঠান আবশ্যক হয়, ইহার প্রমাণ পশ্চাতের লিখিত শ্রুতি ও স্মৃতি হয়েন। শ্রুতিঃ (তমেতং বেদানুবচনেন ব্রাহ্মণ। বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন দানেন তপসানাশকেন) ও পূর্বোক্ত বেদান্তের তৃতীয় অধ্যায়ের ৪ পাদের ২৬ সূত্র, এবং ( এপি তু কৰ্ম্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত। ফলানি চ) ইত্যাদি ভগবদগীতাবাক্য, ও (নিবৃত্তং সেবমান ভূতাঙ্গত্যেতি পঞ্চ বৈ) ইত্যাদি মনুবচন, ও ( অস্মিল্লাকে বর্তমানঃ স্বধৰ্ম্মস্থানঃ শুচিঃ। জ্ঞানং বিশুদ্ধমাপ্লেতি মদ্ভক্তিং বা যদৃচ্ছয়া) ইত্যাদি ভাগবত শাস্ত্র এই অর্থকে দৃঢ়রূপে কহিতেছেন। জ্ঞান সাধন সময়ে প্রণব উপনিষদাদির শ্রবণ মনন, দ্বারা আত্মাতে একনিষ্ঠ হইবার অনুষ্ঠান ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহে যত্ন ইহাই আবশ্যক হয়, বর্ণাশ্রমাচারকৰ্ম্ম করিলে উত্তম কিন্তু অকরণে হানি নাই, ইহা পশ্চাতের লিখিত শ্রুতি ও স্মৃতি কহেন। শ্রুতিঃ ( শান্তা দান্ত উপরতস্তিতিক্ষুঃ সমাহিত ভৃত্ব আত্মবােত্মানং পশ্যতি) অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয়নিগ্রহবিশিষ্ট, দ্বন্দসহিষ্ণু, চিত্ত- বিক্ষেপককৰ্ম্মত্যাগী, সমাধানবিশিষ্ট হইয়া আপনাতেই পরমাত্মাকে দেখিবেক, তথা শ্রুতিঃ (অথ বৈ অন্যা আহুতয়ােহনরস্তাঃ কৰ্ম্মময্যে। ভবন্তি এবং হি তস্য এত পূৰ্বে বিদ্বাংসােহগ্নিহােত্রং জুহবাঞ্চঃ) ইহার অর্থ ১১ পৃষ্ঠে দেখিবেন, তথা শ্রুতিঃ ( আচাৰ্যকুলাৎ বেদমধীত্য যথাবিধানং গুরােঃ কৰ্ম্মাতিশেষেণ অভিসমাবৃত্য কুটুম্বে শুচৌ দেশে স্বাধ্যায়মধীয়ানো ধাম্মিকান বিদধদাত্মনি সৰ্বেন্দ্রিয়াণি সংপ্রতিষ্ঠাপ্য অহিংস সৰ্বাণি ভূতানি অন্যত্র তীর্থেভ্যঃ স খন্থেবং বর্তয় যাবদাযুষং ব্রহ্মলােক- মভিসম্পদ্যতে, ন স পুনরাবর্ততে ন স পুনরাবর্ততে) অর্থাৎ যথাবিধি আচার্যের কৰ্তব্য কৰ্ম্ম করিয়া অবশিষ্ট কালে অর্থসহিত বেদাধ্যয়নপূৰ্ব্বক সমাবর্তন করিয়া কৃত- বিবাহ ব্যক্তি গৃহস্থধর্মে থাকিয়া শুচি দেশে বেদাভ্যাস করিবেক, এবং পুত্র ও শিষ্য সকলকে ধৰ্মিষ্ঠ করত, বাহ কৰ্ম্ম ত্যাগপূর্বক আত্মাতে সকল ইন্দ্রিয়কে উপসংহার করিয়া আবশ্যকের অন্যত্র হিংসা ত্যাগপূর্বক যাবজ্জীবন উক্ত প্রকারে অনুষ্ঠান করিয়া দেহান্তে ব্ৰহ্মলােক প্রাপ্ত হইয়া ব্ৰহ্মলােকস্থিতি পর্যন্ত তথায় থাকিয়া পশ্চাৎ মুক্ত হইবেক, তাহার পুনরাবৃত্তি নাই তাহার পুনরাবৃত্তি নাই। তথা শ্রুতি ( আত্মৈবাে- পাসীত) (আত্মানমেব লােকমুপাসীত ) অর্থাৎ কেবল আত্মার উপাসনা করিবেক। জ্ঞানস্বরূপ আত্মারই কেবল উপাসনা করিবেক। ইত্যাদি শ্রুতি এবং বেদান্তের তৃতীয় রামমােহন-গ্রন্থাবলী অধ্যায়ের চতুর্থ পদের ৩৬ সূত্র যাহার অর্থ ৯৬ পৃষ্ঠে লেখা গেল, এবং মনুবচন ( যথােক্তাদ্যপি কৰ্ম্মাণি পরিহায় দ্বিজোত্তমঃ) তথ। (জ্ঞানেনৈবাপরে বিপ্র যজন্ত্যে- তৈৰ্মখৈঃ সদা) ইত্যাদি, ও গীতাবাক্য ( সৰ্ব্বধৰ্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ) ইত্যাদি স্মৃতি ইহার প্রমাণ হয়েন। ভাগবতশাস্ত্রেও এইরূপ নিত্য নৈমিত্তিক কৰ্ম্মানুষ্ঠানের সীমা করিয়াছেন, শ্ৰীভাগবতে একাদশস্কন্ধে ২০ অধ্যায়ে ১০ শ্লোক ( তাবৎ কৰ্ম্মাণি কুৰ্ব্বীত ন নিৰ্বিতে যাব। মৎকথাশ্রবণাদৌ বা শ্রদ্ধা যাবন্ন জায়তে) আর্থাৎ আশ্ৰম কৰ্ম্ম তাবৎ করিবেক যে পর্যন্ত কৰ্ম্মে দুঃখবুদ্ধি হইয়া তাহার ফলেতে বিরক্ত না হয়, অথবা যে পর্যন্ত আমার কথা শ্রবণ কীৰ্ত্তনাদিতে অন্তঃকরণের অনুরাগ না জন্মে। এই শ্লোকের অবতরণিকাতে ভগবান্ শ্রীধর স্বামী লিখেন (কাম্যকৰ্ম্মসু প্ৰবৰ্ত্তমান সর্বাত্মনা বিধিনিষেধাধিকার ইত্যুত্তরাধ্যায়ে বক্ষত্যি, নিষ্কামকৰ্ম্মাধিকারিণস্তু যথাশক্তি, সচ জ্ঞানভক্তিযােগাধিকারাৎ প্রাগেব, তদধিকৃত- যােস্তু স্বল্পঃ, তাভ্যাং সিদ্ধানাঞ্চ ন কিঞ্চিৎ, সাবধি কর্মযােগমাহ তাবদিতি) অর্থাৎ কাম্যকর্মে যে ব্যক্তি প্রবৃত্ত তাহার প্রতি সর্বপ্রকারে বিধিনিষেধের অধিকার হয় ইহা পরের অধ্যায়ে কহিবেন, কিন্তু নিষ্কাম কৰ্ম্মানুষ্ঠানে যে ব্যক্তি প্রবৃত্ত তাহার প্রতি সাধ্যানুসারে কর্ম কর্তব্য হয়, ঐ সাধ্যানুসার কৰ্ম্মানুষ্ঠানের তাবৎ অধিকার যাবৎ জ্ঞান কিম্বা ভক্তি সাধনে প্রবৃত্ত না হয়, এ দুইয়ের একে প্রবৃত্ত হইলে অতিশয় অল্প কর্তব্য হয়, এবং জ্ঞান কিম্বা ভক্তির দ্বারা সিদ্ধ ব্যক্তির কিঞ্চিৎও কর্তব্য নহে, পরের শ্লোকে কৰ্ম্মানুষ্ঠানের সীমা লিখিলেন ( তাবৎ কৰ্ম্মাণি ) পুনরায় ওই অধ্যায়ের ১৯ শ্লোক (যদারম্ভে নিব্বিপ্নে বিরক্ত সংযতেন্দ্রিয়ঃ । অভ্যাসেত্মননা যােগী ধারয়েচলং মনঃ) স্বামী, যখন আবশ্যক কৰ্ম্মানুষ্ঠানে দুঃখ বােধের দ্বারা উদ্বিগ্ন ও তাহার ফলেতে বিরক্ত হয়, তখন ইন্দ্রিয়কে সংযত করিয়া জ্ঞানাভ্যাসের দ্বারা পরমাত্মাতে মনকে স্থির করিবেক। ২২ শ্লোক, (এষ বৈ পরমাে যােগাে মনসঃ সংগ্রহঃ স্মৃতঃ। হৃদয়জ্ঞত্বমন্বিচ্ছন্ দম্যস্যে বাৰ্বতে মুহুঃ ) স্বামী, ক্রমশ মনকে বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া আত্মাতে স্থির করা পরম যােগের উপায় হয় এ নিমিত্ত এই সাধনকে পরমযােগ কহিয়াছেন যেমন অদম্য অশ্বকে দমন করিবার সময় তাহার অভিপ্রায় মতে কিঞ্চিৎ যাইতে দিয়া পুনরায় তাহাকে অশ্ব গ্রাহ রঞ্জুতে ধারণপূর্বক আপন বাঞ্ছিত পথে লইয়া যায়। ২৩ শ্লোক (সাংখ্যেন সৰ্বভাবানাং প্রতি- লােমানুলােমত। ভবাপ্যয়াবনুধ্যায়েমনন যাবৎ প্রসীদতি) অর্থাৎ মন কিঞ্চিৎ বশীভূত হইলে তত্ত্ববিবেকের দ্বারা মহদাদি পৃথিবী পর্যন্ত তাবৎ বস্তুর ক্রমে উৎপত্তি, ও ব্যুক্রমে নাশ চিন্তা করিবেক যে পর্যন্ত মনের নৈশ্চল্য না হয়। ভাগবতশাস্ত্রে পথ্য প্রদান কথিত কৰ্ম্মানুষ্ঠানের যে সীমা লেখা গেল তাহা ভগবদগীতার অনুরূপ কথন হয়। গীতা (আরুরুক্ষোমুনেৰ্যোগং কৰ্ম্ম কারণমুচ্যতে। যােগারূঢ়স্য তস্যৈব শম: কারণমুচ্যতে) জ্ঞানারােহণে যে ব্যক্তির ইচ্ছা তাহার ঐ আরােহণে বর্ণাশ্রমাচার কৰ্ম্ম কারণ হয়, সেই ব্যক্তি যখন যােগারূঢ় হইল তখন তাহার জ্ঞান পরিপাকের নিমিত্ত চিত্তবিক্ষেপকারী কৰ্ম্মের ত্যাগ ঐ জ্ঞান পরিপাকের কারণ হয়। সেই যােগারূঢ় তিন প্রকার হয়েন। প্রথম ( যদা হি নেন্দ্রিয়াথেষু ন কৰ্ম্মস্বনুষজতে। সৰ্বসঙ্কল্পসংন্যাসী যােগারূঢ়স্তদোচ্যতে ) যে কালো সকল সঙ্কল্পকে মনুষ্য ত্যাগ করে, অতএব ইন্দ্রিয় বিষয় সকলো ও কর্মে আসক্ত না হয় সে কালে তাহাকে যােগারূঢ় কই যায়। এ প্রকার ব্যক্তি কনিষ্ঠ যােগরূঢ় হয়েন, কিন্তু উত্তম যে নিষ্কামকৰ্ম্মী তাহার তুল্য বরঞ্চ শ্রেষ্ঠ হয়েন, যেহেতু ( এনপি ? কৰ্ম্মাণি) ইত্যাদি গীতার অষ্টাদশাধ্যায়ে ষষ্ঠ শ্লোকের এবং ( কাৰ্যমিত্যেব যৎ কর্ম ) ইত্যাদি নবম শ্লোকের প্রমাণে, উত্তম যে নিষ্কাম কর্মী তাহারও সংকল্পত্যাগাধীন কর্শে আসক্তি ও ফল- কামনা থাকে না, অর্থাৎ কর্তৃত্বভিমান থাকে নাই, কিন্তু জ্ঞানারােহণে উপক্রম না হওয়াতে নিত্য নৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠান থাকে। পরে গীতাতে পূর্ব হইতে শ্রেষ্ঠ যােগারূঢ়ের লক্ষণ কহিতেছেন। ( জ্ঞানবিজ্ঞানতৃপ্তাত্মা কূটস্থে বিজিতেন্দ্রিয়ঃ । যুক্ত হত্যুচ্যতে যােগী সমলােষ্ট্ৰাশ্মকাঞ্চনঃ ) অর্থাৎ গুরূপদেশ জ্ঞান ও পরােক্ষানুভব ইহার দ্বারা তাহার অন্তঃকরণ তৃপ্ত হইয়াছে অতএব নিব্বিকার ও বিশেষরূপে ইন্দ্রিয়জয়বিশিষ্ট হয়েন এবং মৃত্তিকা ও পাষাণ ও স্বর্ণ ইহাতে সমান দৃষ্টি তাহার হয়, তাহাকে যুক্ত যােগারূঢ় কহি। যুক্ত যােগারূঢ়কে পূর্বোক্ত যােগারূঢ় হইতে উত্তম কহিলেন যেহেতু আত্মজ্ঞানে সম্পূর্ণ তৃপ্তি ও নিব্বিকার ভাব ও বিশেষরূপে ইন্দ্রিয় জয় ও পাষাণ ও সুবর্ণে সম ভাব এ সকল বিশেষণ কনিষ্ঠ যােগারূঢ়ে নাই, এ নিমিত্ত তেঁহে যুক্ত যােগারূঢ়ের তুল্যরূপে গণিত হয়েন না। পরে মধ্যম যােগারূঢ় হইতেও শ্রেষ্ঠের লক্ষণ কহিতেছেন (সুন্মিযুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষবন্ধু। সাধুধপি চ পাপেষু সমবুদ্ধিবিশিষ্যতে) অর্থাৎ স্বভাবত যিনি হিতাকাঙ্ক্ষী ও স্নেহবশে যিনি উপকারী হয়েন ও বৈরী ও উদাসীন এবং মধ্যস্থ ও দ্বেষের পাত্র ও সম্পর্কীয় ও সদাচার ব্যক্তি ও পাপী এ সকলে সমান বুদ্ধি যাঁহার তিনি সৰ্বোত্তম যােগারূঢ় হয়েন। যেহেতু এ সকল লক্ষণ না মধ্যমে না কনিষ্ঠ যােগারূঢ়ে প্রাপ্ত হয় । এইরূপ বিষ্ণুভক্তিপ্রধান গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত তাহাতে যদ্যপিও নানাবিধ প্রতিমা পূজার বিধি আছে, কিন্তু তাহারও অবধি ওই শাস্ত্রে করিয়াছেন, অর্থাৎ কি পৰ্য্যন্ত প্রতিমাদি পূজা করিবেক ও কোন অধিকারে করিবেক না বরঞ্চ করিলে পরমেশ্বরের ১২৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ১৮। অবজ্ঞা, উপেক্ষা, দ্বেষ, নিন্দা তাহাতে হয়, সে সীমা এই, তৃতীয় স্কন্ধে ত্রিংশৎ অধ্যায়ে ( অহং সর্বেষু ভূতেষু ভূতাত্মবস্থিতঃ সদা। তমবজ্ঞায় মাং মঃ কুরুতেইচ্চাবিড়ম্বনং যাে মাং সর্বেষু ভূতেষু সম্ভমাত্মানমীশ্বরং। হিত্বাৰ্চ্চাং ভজতে মৌঢ্যাৎ ভস্মবে জুহােতি সঃ ১৯। দ্বিতঃ পরকায়ে মাং মানিনে ভিন্নদশিনঃ। ভূতেষু বদ্ধবৈরস্য ন মনঃ শান্তিচ্ছতি ২০। অহমুচ্চাবচৈব্যৈঃ ক্রিয়য়ােৎপন্নয়াইনঘে। নৈব তুষেহচ্চিতেহচ্চায়াং ভূতগ্রামাবমানিনঃ ২১। অৰ্চ্চায়াম…য়েত্তাবদীশ্বরং মাং স্বকৰ্ম্মকৃৎ। যাব বেদ স্বহৃদি সৰ্ব্বভূতেঘবস্থিতং ২২। আত্মনশ্চ পৱস্থাপি যঃ করােত্যন্তনােদরং। তস্য ভিন্নদৃশশা মৃত্যুৰ্বিদধে ভয়মুম্বনং ২৩॥ অথ মাং সৰ্ব্বভূতেষু ভূতাত্মানং কৃতালয়ং। অৰ্হয়োনমানাভ্যাং মৈাহভিম্নেন চক্ষুষ ২৪।) অর্থাৎ বিশ্বের আত্মস্বরূপ যে আমি, সকল জগতে সর্বদা স্থিতি করি এবংবিশিষ্ট আমাকে অনাদর করিয়া পরিচ্ছিন্নরূপ প্রতিমাতে মনুষ্য পূজারূপ বিড়ম্বনা করে। ১৮। আমি যে সর্বত্র ব্যাপক আত্মস্বরূপ ঈশ্বর আমাকে ত্যাগ করিয়া মূঢ়তাপ্রযুক্ত যে প্রতিমার পূজা করে, সে কেবল ভস্মে হবন করে। ১৯। অন্যের শরীরস্থ আমি তাহার দ্বেষের দ্বারা যে আমাকে দ্বেষ করে এমন মানী ও ভিন্নদশী ও অন্যের সহিত বদ্ধবৈর যে ব্যক্তি তাহার চিত্ত প্রসন্নতাকে প্রাপ্ত হয় না। ২০। অন্যের নিন্দাকারী ব্যাক্তিরা আমাকে নানাবিধ দ্রব্যের আহরণ দ্বারা প্রতিমাতে পূজা করিলে আমি তাহাতে তুষ্ট হই না। ১১। সৰ্ব্বভূতে অবস্থিত যে আমি আমাকে আপন হৃদয়স্থ যে কাল পর্যন্ত না জানে তাবৎ প্রতিমাতে স্বকৰ্ম্মবিশিষ্ট হইয়া পূজা করিবেক । ২২। আপনার ও পরের ভেদ মাত্রও যে ব্যক্তি করে সেই ভিন্নদ্রষ্টা পুরুষের প্রতি মৃত্যুরূপে আমি জন্মমরণরূপ অতিশয় ভয় প্রদর্শন করাই। ২৩। এখন কি কর্তব্য তাহা কহি, আমি যে বিশ্বের আত্মা সর্বত্র বাস করিয়া আছি আমার আরাধনা দানের দ্বারা, ও অন্যের সম্মানের দ্বারা, ও অন্যের সহিত মিত্রতার দ্বারা, ও সমদর্শনের দ্বারা, করিবেক। ২৭। অধ্যাত্মবিদ্যার উপদেশকালে বক্তারা আত্মতভাবে পরিপূর্ণ হইয়া পরমাত্মা- স্বরূপে আপনাকে বর্ণন করেন, অথচ তাহাদের উপাধি সম্বন্ধাধীন পুনরায় স্থানে ভেদ প্রদর্শন বিশেষণাক্রান্ত করিয়াও আপনাকে কহেন, অর্থাৎ পরমাত্মাকে অন্য- রূপে উপদেশ আর আপনাকে স্বতন্ত্র বিশেষণাক্রান্তরূপে বর্ণন করেন; অতএব অধ্যাত্ম উপদেশে পরমাত্মা স্বরূপে বক্তার যে কথন, তাহার দ্বারা সেই পরিচ্ছিন্ন ব্যক্তিবিশেষে তাৎপৰ্য্য না হইয়া পরমাত্মাই প্রতিপাদ্য হয়েন, ইহার মীমাংসা বেদান্তের প্রথমাধ্যায়ের প্রথম পাদের ৩০ সূত্রে করিয়াছেন। আশঙ্কা এই উপস্থিত পথ্য প্রদান ১২৫ হইয়াছিল যে কোষীতকিব্রাহ্মণােপনিষদে ইন্দ্র আপনাকে পরব্রহ্মস্বরূপে উপদেশ করেন ( প্রাণােহস্মি প্রজ্ঞাত্মা তং মামায়ুমৃতমিত্যুপিস্ব) জ্ঞানস্বরূপ জীবনদাতা ও মরণশূন্য যে ব্ৰহ্ম তাহা আমি হই আমার উপাসনা করহ। ( মামেব বিজানীতি) কেবল আমাকেই জান। এ সকল শ্রুতি পরব্রহ্মের বিশেষণকে কহিতেছেন কিন্তু ইন্দ্র ইহার বক্তা, অতএব ইন্দ্রের পরব্রহ্মত্ব এ সকল শ্রুতি দ্বারা প্রতিপন্ন হয়, এই আশঙ্কার নিরাস পরের সূত্রে করিতেছেন। (শাস্ত্রদৃষ্টা তৃপদেশে বামদেববৎ) ৩০। ইন্দ্র এ স্থলে “অহং ব্ৰহ্ম” এই শাস্ত্ৰদৃষ্টি দ্বারা আপনাকে পরব্রহ্মস্বরূপ জানিয়া কহিয়াছেন যে আমাকেই কেবল জান” “আমার উপাসনা কর” যেমন বামদেব ঋষি আপনাকে সাক্ষাৎ পরব্রহ্মস্বরূপে উপদেশ করিয়াছেন। শ্রুতিঃ ( অহং মনুরভবং সূৰ্যশ্চেতি) বামদেব কহিতেছেন যে, “আমি মনু হইয়াছি ও সূৰ্য্য হইয়াছি” কিন্তু ঐ অধ্যাত্ম উপদেশের মধ্যে ইন্দ্ৰ উপাধিবশে পুনরায় ভেদদৃষ্টিতেও আপনাকে কহিতেছেন ( ত্ৰিশীর্ষণং বামহনং) ত্ৰিশীর্ষা যে বৃত্রাসুরের জ্যেষ্ঠ বিশ্বরূপ তাহাকে আমি নষ্ট করিয়াছি। অর্থাৎ এরূপ ক্রুর কাৰ্য সকল করিয়াও আত্মজ্ঞানবলে আমার কিঞ্চিৎ মাত্র হানি হয় না। বস্তুত ঐ সকল পরমাত্মপ্রতিপাদক শ্রুতির বক্তা ইন্দ্র হইয়াছেন, অথচ তাহাতে পরিচ্ছেদবিশিষ্ট যে ইন্দ্র তাহার সাক্ষাৎ পরব্রহ্মত্ব প্রতিপন্ন হয় না, কিন্তু অপরিচ্ছিন্ন পরমেশ্বরে তাৎপৰ্য হয়। সেইরূপ ভগবান্ কপিলও অধ্যাত্ম উপদেশে কহিতেছেন, ভাগবতে ৩ স্কন্ধে ২৫ অধ্যায়ে ( বিসৃজ্য সৰ্বানন্যাংশ্চ মামেবং বিশ্বতােমুখং। ভজ্যনন্য ভক্ত্যা তা মৃত্যো- রতি পারয়ে) অর্থাৎ তাবৎ অন্যকে পরিত্যাগ করিয়া আমি যে বিশ্বস্বরূপ আমাকে যে ব্যক্তি অন্য ভক্তির দ্বারা ভজন করে তাহাকে আমি সংসার হইতে তারণ করি। এ স্থলে ভগবান্ কপিল পরমাত্মাস্বরূপে আপনাকে বর্ণন করিতেছেন কিন্তু ইহা তাৎপৰ্য তঁাহার নহে যে তাবৎ অন্যকে পরিত্যাগ করিয়া ব্যক্তিবিশেষ, অর্থাৎ হস্তপাদাদির দ্বারা পরিচ্ছিন্ন যে কপিল তন্মৰ্ত্তির উপাসনা করিবেক। পুনরায় কপিলের উপাধিসম্বন্ধ দ্বারা ঐ উপদেশের মধ্যে আপন দৈহিক বিশেষণ সকল, যেমন “হে মাতঃ” ইত্যাদি, যাহা পরব্রহ্মের বিশেষণ হইবার সম্ভব নহে, তাহার দ্বারা ভেদ সূচনাও করিতেছেন। (অত্রৈব নরকঃ স্বর্গ ইতি মাতঃ প্রচক্ষতে) হে মাতা ইহলােকেই স্বর্গ নরকের চিহ্ন হয়। এই মীমাংসা তাবৎ অধ্যাত্ম উপদেশে ঋষিরা ও আচার্য্যেরা করিয়াছেন। সংপ্রতি এ পরিচ্ছেদকে পশ্চাৎ লিখিত শ্রুতিবাক্যে ও মহাকবিপ্রণীত শ্লোকের দ্বারা সমাপ্ত করিতেছি, শ্রুতিঃ ( যস্মিন্ পঞ্চ পঞ্চ জনা আকাশশ্চ প্রতিষ্ঠিতঃ তমেব রামমােহন-গ্রন্থাবলী মন্য আত্মানং বিদ্বান্ ব্ৰহ্মামৃতােহমৃতং) অর্থাৎ যে পরব্রহ্মকে আশ্রয় করিয়া প্রাণ, চক্ষু, শ্রোত্র, অন্ন, মন, এই পাঁচ ; দেবতা, পিতৃলােক, গন্ধর্ব, অসুর, যক্ষ, এই পাঁচ ; ও চারি বর্ণ ও অন্ত্যজ ; এই পাঁচ ; অর্থাৎ জগৎ ও আকাশ স্থিতি করেন সেই মরণশূন্য আত্মা যে ব্ৰহ্ম তাহাকেই কেবল আমি মনন করি এবং এই মনন দ্বারা আমি জন্মমরণশূন্য হই। মহাকবি ভর্তৃহরিশ্লোক, ( মাতমেদিনি, তাত মারুত, সখে তেজঃ, সুবন্ধো জল, ভ্রাতৰ্যোম, নিবদ্ধ এষ ভবতামন্ত্যঃ প্রণামাঞ্জলিঃ। যুগ্ম- সঙ্গবশােপজাতসুকৃতােদ্রেকফুরন্নিৰ্ম্মলজ্ঞানাপাস্তসমস্তমােহমহিমা লীয়ে পরে ব্রহ্মণি ) হে মাতা পৃথিবী, ও পিতা পবন, হে সখা তেজঃ, হে অতিমিত্র জল, হে ভ্রাতা আকাশ, তােমাদিগ্যে প্রণামের নিমিত্ত অন্তকালীন এই অঞ্জলি বন্ধ করিতেছি ; তােমাদের সম্বন্ধাধীন উৎপন্ন যে সুকৃতপুঞ্জ, তাহার দ্বারা প্রকাশস্বরূপ যে নির্মল জ্ঞান, তাহা হইতে দূর হইয়াছে সম্পূর্ণ মােহের প্রাবল্য যে ব্যক্তি হইতে, এমন যে আমি সংপ্রতি পরব্রহ্মে লীন হইতেছি। ইতি প্রথম প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরে সর্বহিত- প্রদর্শকো নাম দ্বিতীয় পরিচ্ছেদঃ । ৮৬ পত্রে যাহা লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে আমরা বেদের অসদর্থ কল্পনা করিয়া থাকি। উত্তর, বেদের যে সকল ভাষা বিবরণ আমরা করিয়াছি তাহা গৃহমধ্যে লুক্কায়িত করিয়া রাখিয়াছি এমত নহে, তাহার ভূরি পুস্তক অন্যত্র প্রচলিত আছে এবং বেদান্তভাষ্য ও বাৰ্তিকাদি পুস্তক সকল ও এই নগরেই মহানুভব ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের নিকটে এবং রাজগৃহে আছে, অতএব আমাদের কৃত ভাষাবিবরণের কোনাে এক স্থানে অসদর্থ দৰ্শাইয়া তাহার প্রমাণ করিবার সমর্থ হইলে এরূপ যদি লিখিতেন তবে হানি ছিল না, নতুবা অত্যন্ত অজ্ঞান ব্যতিরেক দ্বেষ ও পৈশুন্যতার বাক্যে কে বিশ্বাস করিয়া শাস্ত্রে অশ্রদ্ধা ও স্বীয় পরমার্থ লােপ করিবেক। এ যথার্থ বটে যে বেদার্থ ব্যাখ্যা করিবার যােগ্য আমরা নহি যেহেতু শ্রুতির বিশেষ বেত্তা মাদি ঋষিরা হয়েন, কিন্তু ওই সকল ঋষির ও ভাষ্যকারের ব্যাখ্যানুসারে আমরা প্রণব গায়ত্রী ও উপনিষদাদি বেদের বিবরণ করিয়াছি এবং করিতেছি ; সকল স্মৃতি ও ভাষ্যগ্রন্থ সর্বত্র প্রাপ্ত হয় এবং পরস্পর ঐক্য করিয়া শুদ্ধাশুদ্ধ বিবেচনা করিবার যােগ্য জ্ঞানবান্ মাত্রেরই আছে। বাস্তবিক জ্ঞানবান্ ব্যক্তির দ্বেষবশে যথার্থকে অযথার্থ কদাপি কহেন না, আমাদের এই এক মহৎ ভরসা আছে এবং তাহারা ইহাও বিশেষরূপে জানেন যে বেদার্থ দুরূহ হইয়াও মহর্ষিদের বিবরণ দ্বারা সর্বথা জ্ঞেয় হইয়াছেন। (বেদান্যাের্থ স্বয়ং জ্ঞাতস্তত্ৰাজ্ঞানং ভবেদি।

পথ্য প্রদান ১২৭ ঋষিভিনিশ্চিতে তত্র কা শঙ্কা স্যান্মনীষিণাং) অর্থাৎ বেদের অর্থ যদি স্বয়ং করিতে সংশয় হয় তবে তাহার যথার্থ অর্থে ঋষিরা যে নির্ণয় করিয়াছেন তাহার দ্বারা পণ্ডিতেদের সংশয় থাকিবার বিষয় কি। আমরা প্রথম উত্তরে লিখিয়াছিলাম যে প্রথমতঃ যে ব্যক্তি শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক জ্ঞান সাধনে প্রবৃত্ত হইয়া পশ্চাৎ যত্ন না করিয়া ব্ৰহ্ম প্রাপ্তি হইতে ভষ্ট হয় সে ব্যক্তি পর২ জন্মে পূর্বের প্রবৃত্তির ফলে জ্ঞান সাধনে যবিশিষ্ট হইয়া মােক্ষ প্রাপ্ত হয়, আর ইহার প্রমাণের নিমিত্ত (অতিঃ শ্ৰদ্ধয়ােপেতে যােগাস্কলিত মানসঃ। অপ্রাপ্য যােগ- সংসিদ্ধিং কাং গতিং কৃষ্ণ গচ্ছতি ) ইত্যাদি ভগবদগীতার প্রমাণ দিয়াছিলাম তাহাতে ৮৬ পৃষ্ঠের ১১ পংক্তিতে ধৰ্ম্মসংহারক লিখিয়াছেন যে আমরা প্রতিষ্ঠিত শব্দের তার্থ “যােগারূঢ়” কহি। উত্তর, এরূপ মিথ্যাপবাদের পরহার নাই যেহেতু আমাদের উত্তরের ৯ পৃষ্ঠে ২ পংক্তি অবধি লিখিয়াছি যে “যে ব্যক্তি প্রথমতঃ শ্রদ্ধান্বিত হইয়া জ্ঞানাভ্যাসে প্রবৃত্ত হয় পশ্চাৎ যত্ন না করে এবং জ্ঞানাভ্যাস হইতে বিরত হইয়া বিষয়াসক্ত হয়—সে ব্যক্তি জ্ঞানের অসিদ্ধতা প্রযুক্ত মুক্তিকে না পাইয়া নিরাশ্রয় ও ব্রহ্মপ্রাপ্তিতে বিমূঢ় হইয়া ছিন্ন মেঘের ন্যায় নষ্ট হইবেক কি না” এ স্থলে জ্ঞানবান ব্যক্তিরা দেখিবেন যে ভগবান শ্রীধর স্বামীর ব্যাখ্যানুসারে অপ্রতিষ্ঠিত শব্দের অর্থ “নিরাশ্রয়” লেখা গিয়াছে, অতএব ইহার বিপরীতবক্তাকে যাহা উচিত হয় তাহারাই কহিবেন। পরে ৮৯ ও ৯০ পৃষ্ঠে স্বীয় নীচ স্বভাবাধীন এই মােক্ষশাস্ত্রের বিচারে গীতা- বচনের ক্রোড় পংক্তি সকলে নানা ব্যঙ্গ ও কটুক্তিপূৰ্ব্বক ৯০ পৃষ্ঠের ১০ পংক্তিতে লিখিয়াছেন যে “এই ভগবদগীতার শ্লোকে যােগ শব্দে তাহার অভিপ্রেত কোন যােগ, জ্ঞানযােগ কি কৰ্মযােগ কি সাংখ্যযােগ ?” উত্তর, ভগবদগীতার ওই যােগােপায় প্রকরণে ( তং বিদ্যাঃখসংযােগবিয়ােগং যােগসংজ্ঞিতং) এই শ্লোকের ব্যাখ্যাত ভগবান শ্রীধরস্বামী যােগ শব্দের প্রতিপাদ্য কি হয় তাহার বিবরণ স্পষ্টরূপে করিয়াছেন যে “পরমাত্ম ও জীবাত্মার ঐক্যরূপে চিন্তন, যাহা সকল দুঃখ নাশের প্রতি কারণ হইয়াছে, তাহা যােগশব্দের প্রতিপাদ্য হয় আর নিষ্কাম কৰ্ম্মেতে যে যােগ শব্দের প্রয়ােগ আছে সে ঔপচারিক হয়” অতএব আমরা (অতি শ্রদ্ধয়ােপেতে যােগাচ্চলিতমানসঃ) এই শ্লোকের ব্যাখ্যাতে শ্ৰীধরস্বামীর ব্যাখ্যানুসারে যােগ শব্দের অর্থ প্রথম উত্তরের ৯ পৃষ্ঠে ২ ও ৩ পংক্তিতে “জ্ঞানাভ্যাস” অর্থাৎ পরমাত্মা ও জীবাত্মার পুনঃ২ ঐক্য চিন্তন ইহা লিখিয়াছি অতএব এরূপ বিবরণ করিবার পরে ধর্মসংহারকের পূর্বোক্ত তিন কোটীয় প্রশ্ন করা অর্থাৎ “যােগশব্দে ১২৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী জ্ঞানযােগ কি কৰ্ম্মযােগ কি সাংখ্যযােগ অভিপ্রেত হয়” ইহা উচিত হয় কি না তাহার বিবেচনা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা করিবেন ঐ গীতাবচনসকলের সাক্ষাৎ স্পষ্টার্থে আশঙ্কা কেবল নাস্তিকে করিতে পারে কিন্তু যাহার শাস্ত্রে কিঞ্চিৎও শ্রদ্ধা আছে সে কদাপি সংশয় করে না। ৮৯ পৃষ্ঠে ৭ পংক্তিতে লিখেন যে “ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়েরা যােগারূঢ়, যুক্ত, ও পরম যােগী এই তিনের কি হইতে পারেন”। উত্তর, আমাদের পূর্ব উত্তরের ৯ পৃষ্ঠে ব্যক্ত আছে যে যােগারূঢ়, কিম্বা যুক্ত যােগারূঢ়, অথবা পরম যােগারূঢ়, ইহার মধ্যে যে কোন অবস্থা ব্যক্তি প্রাপ্ত হয়েন, ইহ জন্মে অথবা পরজন্মে তাঁহার পুরুষার্থ- সিদ্ধির কি আশ্চর্য্য, বরঞ্চ যাহারা জ্ঞানযােগের কেবল জিজ্ঞাসু মাত্র হইয়া থাকেন অথচ দুর্ভাগ্যবশে সাধনে যত্ন না করেন তাহারাও পরজন্মে কৃতার্থ হয়েন। ভগবদগীতায় ওই জ্ঞানাভ্যাস প্রকরণে ভগবান কৃষ্ণ ইহার বিশেষ সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, যথা ( জিজ্ঞাসুরপি যােগস্য শব্দব্রহ্মাতিবৰ্ত্ততে ) অর্থাৎ আত্মতত্ত্বকে কেবল জানিতে ইচ্ছা মাত্র করিয়াছে এমত ব্যক্তিও পরজন্মে যােগাভ্যাস দ্বারা বেদোক্ত কৰ্ম্মফলকে অতিক্রম করে অর্থাৎ মুক্ত হয়। এ সকল বাক্যার্থকে নাস্তিকেরা যদি দ্বেষপ্রযুক্ত অববােধ করিতে না পারেন তাহাতে আমাদের সাধ্য কি। ৯২ পৃষ্ঠে ৯ পংক্তিতে লিখেন যে “সকল ধর্মের মধ্যে আত্মতত্ত্বজ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয় এ বিষয়ে পণ্ডিতাভিমানী মহাশয় যেমন এক মনুবচন প্রকাশ করিয়াছেন তেমন কলিযুগে দানের শ্রেষ্ঠত্ববোধক মনুর অন্য বচনও দৃষ্ট হইতেছে যথা (তপঃ পরং কৃতযুগে ত্রেতায়াং জ্ঞানমুচ্যতে। দ্বাপরে যজ্ঞমেবাহুর্দানমেকং কলৌ যুগে) উত্তর, এ স্থলে ধৰ্ম্মসংহারকের এমত তাৎপর্য হইবেক যে “মনু কোন স্থানে জ্ঞানকে শ্রেষ্ঠ কহেন আর কোনাে স্থানে দানকে শ্রেষ্ঠরূপে বর্ণন করেন অতএব পূর্বাপর তানৈক্য প্রযুক্ত মনুর প্রামাণ্য নাই” যেহেতু এ প্রকার কথনের সম্ভাবনা শুদ্ধ নাস্তিক বিনা হয় না। বস্তুতঃ ভগবান্ মনু এ স্থলে দানের প্রশংসাতেই জ্ঞানের প্রশংসা ফলত করিয়াছেন, যে তাবৎ দানের মধ্যে শব্দব্রহ্ম দান উত্তম হয় যাহার দ্বারা পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হয়েন। যথা, মনুঃ ( সৰ্ব্বেষামেব দানানাং ব্ৰহ্মদানং বিশিষ্যতে) সকল দানের মধ্যে ব্রহ্মদান শ্রেষ্ঠ হয় । তথা মনুঃ (ব্রহ্মদো ব্ৰহ্মসার্ফিং) ব্ৰহ্মদান করিলে ব্ৰহ্মভাব প্রাপ্তি হয়। সর্বশাস্ত্রে যেখানে যজ্ঞদান তপস্যা প্রভৃতি কর্মের বিশেষ প্রশংসা করেন তাহার তাৎপৰ্য এই যে এ সকল কর্ম ইহ জন্মে কিম্বা পরজন্মে জ্ঞানেচ্ছার প্রতি কারণ হয়, শ্রুতিঃ (তমেতং বেদানুবচনেন ব্রাহ্মণা বিবিদিষন্তি যজ্ঞেন দানেন তপসানাশকেন) সেই যে এই পরমাত্মা তাহাকে ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞ, দান, তপস্যা, উপবাস এ সকলের দ্বারা জানিতে পথ্য প্রদান ১২৯ ইচ্ছা করেন। অর্থাৎ এ সকল কৰ্ম্ম আত্মজ্ঞানেচ্ছার কারণ হয়। তাহাতে যে যুগে যে কৰ্ম্মানুষ্ঠান বাহুল্যরূপে করিয়াছেন সেই যুগে তাহারই প্রাধান্যরূপে বর্ণন করেন, কিন্তু শ্ৰতি স্মৃতি প্রমাণ দ্বারা সর্বযুগেই এই নিয়ম যে (যজ্ঞেন দানেন তপসা- নাশকেন) অর্থাৎ যজ্ঞ দান তপস্য। ব্ৰত ইত্যাদি কর্মের অনুষ্ঠানকে উত্তম ব্যক্তিরা জ্ঞানেচ্ছার উদ্দেশে করিয়াছেন। ভগবদগীতাতেও জ্ঞান হইতে কৰ্ম্মকে ও ভক্তিকে শ্রেষ্ঠ কহিয়া পরে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ লিখেন যে কৰ্ম্মের ও ভক্তির দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হইলে জ্ঞান প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ কৰ্ম্মকে জ্ঞানের উপায় কহিয়া প্রশংসা করিলে ফলত জ্ঞানেরই প্রশংসা করা হয়, যথা ( সংন্যাসঃ কর্মযােগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ। তয়ােস্তু কর্মসংন্যাসাৎ কৰ্ম্মযােগো বিশিষত। সংন্যাসন্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তম- যােগত। যােগযুক্তো মুনিব্রহ্ম ন চিবেশাধিগচ্ছতি) সংন্যাস ও কর্মযােগ উভয়েই মুক্তিসাধন হয়েন তাহার মধ্যে কর্মসংন্যাস অপেক্ষা কর্মযোগ শ্রেষ্ঠ হয়। অতএব হে অর্জুন নিষ্কাম কৰ্ম্মের দ্বারা চিত্তশুদ্ধ না হইলে কর্মসংন্যাস দুঃখের কারণ হইবেক, কিন্তু নিষ্কাম কৰ্ম্মের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি যাহার হইল সে ব্যক্তি কর্মত্যাগী হইয়া শীঘ্ৰ ব্ৰহ্ম প্রাপ্ত হয়। সেইরূপ দ্বাদশাধ্যায়ে ভক্তিকে জ্ঞান হইতে শ্রেষ্ঠ কহিতেছেন, যথা ( ময্যাবেশ মনে। যে মাং নিত্যযুক্তা উপিসতে। শ্রদ্ধয়া পরয়ােপেতাস্তে মে যুক্ততম মতাঃ) ২ শ্লোকঃ স্বামী, আমাতে যাহারা মনকে একা গ্র করিয়া মনিষ্ঠ হইয়া পরম শ্রদ্ধাপূর্বক আমার উপাসনা করে তাহার জ্ঞাননিষ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠ হয় । (ক্লেশােহধিক তরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসা। অব্যক্ত: হি গতি খং দেহবত্তিরপ্যতে) ৫ অব্যক্ত পরব্রহ্মে যাহাদের চিত্ত আসক্ত তাহাদের ভক্ত অপেক্ষা ক্লেশ অধিক হয়, যেহেতু অব্যক্ত পরমাত্মাতে নিষ্ঠা দেহাভিমানী ব্যক্তির দুঃখেতে হয়। (ময্যেব মন আধৎসু ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়। নিবসিষ্যসি ময্যেব অত উৰ্দ্ধং ন সংশয়ঃ ) আমাতেই মনকে ধারণ কর ও আমাতে বুদ্ধিকে রাখ তাহার পর আমার প্রসাদে জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া দেহান্তে আমাতেই লীন হইবে । জ্ঞান হইতে ভক্তিকে শ্রেষ্ঠ দ্বাদশ অধ্যায়ে এবং জ্ঞান হইতে কৰ্ম্মকে শ্রেষ্ঠ পঞ্চম অধ্যায়ে কহিয়া শ্রেষ্ঠত্বে কারণ কহিলেন যে বিনা কৰ্ম্ম কিম্বা বিনা ভক্তি জ্ঞান সাধনে ক্লেশ হয়, কিন্তু উভয় স্থলে এবং দশম অধ্যায়ের ১০ ও ১১ শ্লোকে ইহা সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে কর্মের এবং ভক্তির ফল জ্ঞান হয় অতএব ওই দুইয়ের প্রশংসাতে জ্ঞানেরই প্রশংসা হয়। ৯২ পৃষ্ঠের শেষ অবধি লিখেন “যেমন পণ্ডিতাভিমানী মহাশয়ের লিখিত বচন দ্বারা জ্ঞানের মােক্ষসাধনত্ব বােধ হইতেছে তেমন ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর পূর্বলিখিত গীতাদির অনেক শ্লোকেই কম্মেরও মােক্ষসাধনত্ব প্রাপ্ত হইতেছে”। উত্তর, পণ্ডিতেরা ১৭ রামমােহন-গ্রন্থাবলী বিবেচনা করিবেন যে ধৰ্মসংহারকের লিখিত গীতাবচনে কি অন্য কোনাে বচনে “যেমন” জ্ঞানকে সাক্ষাৎ মােক্ষকারণ কহিয়াছেন “তেমন” কর্মকে কি কোন স্থানে মােক্ষের সাক্ষাৎ কারণরূপে বর্ণন করিয়াছেন? অধিকন্তু যে প্রকার জ্ঞানের সাক্ষাৎ মােক্ষসাধনত্ব আছে সেই প্রকার কৰ্ম্মেরও যদি সাক্ষাৎ মুক্তিসাধনত্ব হয়, তবে পরের লিখিত শ্রুতি স্মৃতির কিরূপ নিৰ্বাহ হইবেক, তাহারাই ইহার বিবেচনা করিবেন। শ্রুতিঃ (তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যুতেহয়নায় ) (তমাত্মস্থং যেনুপশ্যন্তি ধীরাস্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাং) (নান্যঃ পন্থা বিমুক্তয়ে)। মনুঃ (প্রাপ্যৈতৎ কৃতকৃত্যোহি দ্বিজো ভবতি নান্যথা) অর্থাৎ জ্ঞান মুক্তির সাক্ষাৎ কারণ হয়ে অন্য কোনো সাধন মুক্তির সাক্ষাৎ কারণ হয় না। বেদান্তে ও গীতাদি মােক্ষশাস্ত্রে নিষ্কাম কৰ্ম্ম প্রবাহকে ইহ জন্মে কিম্বা পরজন্মে চিত্ত- শুদ্ধির কারণ কহেন, চিত্তশুদ্ধি আনেচ্ছার কারণ হয়, জ্ঞানেচ্ছা শ্রবণ মননাদি সাধনের কারণ, সেই সাধন জ্ঞানােৎপত্তির কারণ, আর জ্ঞান মােক্ষের সাক্ষাৎ কারণ হয়েন, যেমন কষণাদি ক্রিয়া ক্ষেত্রের উর্বরা হইবার কারণ হয়, আর উর্বরা হওয়া উত্তম শস্যের কারণ, শস্য তণ্ডুলের কারণ, তণ্ডুল ওদনের কারণ, ওদন ভােজনের কারণ, ভােজন তৃপ্তির কারণ, অতএব কোন্ শাস্ত্রজ্ঞ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি এমত কহিবেন যে তৃপ্তির কারণ “যেমন” ভােজন হয় “তেমন ক্ষেত্রের কৰ্ষণাদি ক্রিয়াও তৃপ্তির '? কারণ হয়। ৯৫ পৃষ্ঠে যাহা লিখেন তাহার তাৎপৰ্য এই যে অন্যান্য লােকের জ্ঞানাবলম্বনের নিমিত্ত কোনাে ব্যক্তির পশ্চাৎ গমন করেন সেই ব্যক্তি আপনাকে জ্ঞানী করিয়া মানিতেছেন। উত্তর, আমাদের প্রথম উত্তরের ১০ পৃষ্ঠে লিখিয়াছি যে এ স্থলে দুই প্রকার ব্যক্তি সকল দেখিতেছি এক এই যে, বেদ ও বেদশিরােভাগ উপনিষদ্‌সম্মত ও মনু প্রভৃতি তাবৎ শাস্ত্রসম্মত- যে আত্মােপাসনা হয় ইহা বিশেষরূপে নিশ্চয় করিয়া, এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ যে২ বস্তু সে সকল নশ্বর অতএব সেই নশ্বর হইতে ভিন্ন পরমেশ্বর হয়েন, ইহা যুক্তিসিদ্ধ জানিয়া সেই অনির্বচনীয় পরমেশ্বরের সত্তাকে তঁাহার কাৰ্য্য দ্বারা স্থির করিয়া তাহাতে যে শ্রদ্ধা করে, তাহার প্রতি গড্ডরিকাবলিকা শব্দের প্রয়ােগ করা উচিত হয়, কি যে ব্যক্তি এমত কোন মনঃকল্পিত উপাসনা যাহা কেবল অন্যে করিতেছে এই প্রমাণে পরিগ্রহ করে এবং যুক্তি হইতে এককালে চক্ষুমুদ্রিত করিয়া দুর্জয় মানভঙ্গ যাত্রা ও সুবলসম্বাদ ইত্যাদি হাস্যাস্পদ কর্ম, কেবল অন্যকে এ সকল করিতে দেখিয়া সেই প্রমাণে অনুষ্ঠান করে, এমত ব্যক্তির প্রতি গভরিকাবলিকা শব্দের প্রয়ােগ উচিত হয় ? এখন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা পথ্য প্রদান করিবেন যে প্রথম প্রকার ব্যক্তিরা স্বীয় বিবেচনা ও শাস্ত্রান্বেষণ দ্বারা পরমেশ্বরে শ্রদ্ধা করেন এরূপ যদি স্পষ্টার্থের দ্বারা প্রথম উত্তরে প্রাপ্ত হয়, তবে তাহাদিগকে পশ্চাদ্বৰ্তিরূপে আমরা লিখিয়া আপনাকে জ্ঞানী অভিমান করিয়া থাকি এমত অপবাদ যিনি দিতে সমর্থ হয়েন তিনি দ্বেষান্ধ হয়েন কি না। ৯৭ পৃষ্ঠে যাহা লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে সদযুক্তি ও সদ্ব্যবহার ও সৎ- প্রমাণের অনুসারে যাহার! কৰ্ম্ম করেন এবং পূর্ব২ লােকেদের পশ্চাদ্বী হয়েন তাহারা গড়ডরিকাবলিকার ন্যায় হয়েন না। অতএব ধর্মসংহারককে জিজ্ঞাসা করি যে বালিশে পৃষ্ঠ প্রদান ও তাম্রকুট পানপূর্বক আপন ইষ্ট দেবতার সঙকে সম্মুখে নৃত্য করাইয়া আমােদ করা কোন সদযুক্তি ও সৎপ্রমাণ হয় ? এবং দুর্জয় মান যাত্রায় নাপিতিনীর বেশ ইষ্ট দেবতার করা কোন্ সদযুক্তি ও সৎ প্রমাণ হয় ? বেসস, কেসসা, বড়াইবুড়ী ইত্যাদির দ্বারা ইষ্ট দেবতার উপহাস করা কোন সদযুক্তি ও সৎ প্রমাণ হয় ? কেবল দশ জনে করিয়া থাকে এই অনুসারে যদি এ সকল নিন্দিত কৰ্ম্ম কেহ করেন, তবে তাহার প্রতি, গডকিওলিকার ন্যায় করিতেছেন, এরূপ কহা যাইতে পারে কি না। ৯৮ পৃষ্ঠের শেষ অবধি লিখেন যে “দুর্জয়মানভঙ্গ প্রভৃতি কালীয় দমন যাত্রার অন্তর্গত হয় তাহার প্রমাণ শ্ৰীভাগবতের দশমস্কন্ধে ৩২ অধ্যায়ে আছে এবং রাম- যাত্রার প্রমাণ হরিবংশে বজ্ৰনাভবধে ও প্রদ্যুম্নেত্তরে আছে যদি সন্দেহ হয় তবে সেই পুস্তক দৃষ্টি করিলে নিঃসন্দিগ্ধ হইবেক” । উত্তর, এ আশ্চৰ্য্য চাতুর্য যে স্থলে এক বচন লিখিলে যথেষ্ট হয় তথায় গ্রন্থবাহুল্য জন্যে ভূরি বচন পুনঃ২ ধৰ্মসংহারক লিখিয়াছেন, কিন্তু এ স্থলে দুর্জয়মান ও বড়াই বুড়ীর যাত্রা ইত্যাদির প্রমাণের উদ্দেশে শ্ৰীভাগবতের দ্বাত্রিংশদধ্যায়ে ও হরিবংশে প্রেরণ করেন, যেহেতু সামান্থাকারে লিখিলে হঠাৎ অশাস্ত্রকথন ব্যক্ত হইতে পারে না, অতএব বিজ্ঞ লােকে বিবেচনা করিবেন যে এ স্থলে ভাগবতের এক দুই বচন দুর্জয় মানে নাপিতিনীর বেশ ধারণের বিষয়ে ধৰ্ম্মসংহারকের লেখা উচিত ছিল কি না? যদ্যপিও ভাগবতে ও হরিবংশে দৃষ্ট হয় যে ভগবান কৃষ্ণ ও তাহার পরিচরেরা পরস্পর বিলাসপূৰ্বক কেহ কাহারে প্রহার ও পদাঘাত ও পরস্পর উচ্ছিষ্ট ভােজন করিয়াছেন এবং অন্যান্যের বেশও ধরিয়াছেন ; যদি সেই দৃষ্টিতে ইদানীন্তন উপাসকেরা ওইরূপ আচরণ করেন তবে আপন২ উভয় লােক নষ্ট অবশ্যই করিবেন কি না, অন্যেরা করিতেছে এ নিমিত্ত করিতেছি এই প্রমাণে যদি করেন তবে দুষ্কৃত হইতে নিবারণ কি হইবেক কেবল গড়ডরিকাপ্রবাহের মধ্যে পতিত হইবেন। = ১৩২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী পৃষ্ঠে লিখেন যে “মলিনচিত্ত ব্যক্তিদের দুর্জয় মানভঙ্গাদি দর্শনে চিত্তের মালিন্য হওয়া কোন আশ্চর্য্য তাহারদিগের কন্যা ভগিনী পুত্রবধু প্রভৃতি দর্শনেও এই প্রকার হইতে পারে”। উত্তর, (তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ )। এই গীতাবাক্যানুসারে যাহা ধৰ্ম্মসংহারককেও বিদিত থাকিবেক, ও সামান্য যুক্তি মতে, অগম্যাগমনে ও স্ত্রীলােকের সহিত বহু প্রকার ক্রীড়াতে ও নানাবিধ ব্যভিচার ভজনে ও সাধনে যে ব্যক্তিরা সর্বদা চিত্ত মগ্ন করেন তাহা হইতে কন্যা ও ভগিনী ও পুত্রবধু প্রভৃতি দর্শনে চিত্তমালিন্যের অধিক সম্ভাবনা হয় কি না ইহার মধ্যস্থ ধৰ্ম্মসংহারকই হইবেন। ঐ পৃষ্ঠে সৰ্বভাবেতে ভগবানের আরাধনা করিতে পারে, ইহার প্রমাণের উদ্দেশে শ্ৰীভাগবতের বচন ধৰ্ম্মসংহারক লিখিয়াছেন, যে কামে অথবা ঘেষে কিম্বা ভক্তিতে ইত্যাদি কোন ভাবে ঈশ্বরে চিত্ত নিবেশ করিলে উত্তম গতি প্রাপ্তি হয়, এবং অবহেলাক্রমে ভগবামােচ্চারণ করিলে পাপক্ষয়কে পায়। যদি ধৰ্ম্মসংহারকের এই ব্যবস্থা স্থির হইল যে এই সকল মাহাত্ম্যসূচক বচনে নির্বর করিয়া ভক্তি শ্রদ্ধাতে তাহার স্মরণ কীৰ্তন করিলে যে পুণ্য হইবেক তাহা দ্বেষ ও অবহেলাতেও হইতে পারে তবে বড়াই বুড়ীর দ্বারা ও বাসুয়া প্রভৃতির প্রমুখাৎ ব্যঙ্গ বিদ্রুপে ভগবানকে যে পৰ্যন্ত পরিপূর্ণ করিতে পারেন করিবেন আমাদের হানি লাভ ইহাতে নাই। ধর্মসংহারক ১০০ পৃষ্ঠ অবধি ১০৫ পর্যন্ত গৌরাঙ্গকে বিষ্ণু অবতার প্রমাণ করিতে উদ্যত হইয়া অনন্তসংহিতা এই গ্রন্থ কহিয়া বচন সকল লিখেন, যথা ( ধৰ্ম্মসংস্থাপনার্থায় বিহরিষ্যামি তৈরহং। কালে নষ্টং ভক্তিপথং স্থাপয়িষ্যাম্যহং পুনঃ। কৃষ্ণশ্চৈত্যগৌরাঙ্গেী গৌরচন্দ্রঃ শচীসুতঃ। প্রভুগৌরহরিগৌরাে নামানি ভক্তিদানি মে। ইত্যাদি)। উত্তর, এ ধৰ্মসংহারকের ব্যবহার পণ্ডিতেরা দেখুন, গৌরাঙ্গকে প্রাচীন ও নবীন গ্রন্থকারেরা কেহ কোন স্থানে বিষ্ণুর অবতার কহেন নাই, বরঞ্চ ঐ গৌরাঙ্গমতস্থাপক তৎকালীন গোসাইরা, যাঁহাদের তুল্য পণ্ডিত ও মতে জন্মে নাই, তাহারা যদ্যপিও গৌরাঙ্গকে বিষ্ণুরূপে মানিতেন কিন্তু কোন প্রসিদ্ধ গ্রন্থে এ অনন্তসংহিতার বচন সকল লিখেন নাই, যাহাতে গৌরাঙ্গ বিষ্ণুর অবতার হয়েন ইহা স্পষ্ট প্রাপ্ত হয়, এখন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন, যে এমত ব্যক্তি হইতে কি কি বিরুদ্ধ কৰ্ম্ম না হইতে পারে যিনি গৌরাঙ্গকে অবতার স্থাপনের নিমিত্ত এ সকল বচনকে ঋষিপ্রণীত কহিয়া লােকে প্রসিদ্ধ করেন; কিন্তু পণ্ডিতেরা এ সকল কল্পনাতে কদাপি ক্ষুব্ধ হইবেন না, যেহেতু যে সকল পুরাণ ও সংহিতাদি শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ টীকা না থাকে তাহার বচনের প্রামাণ্য প্রসিদ্ধ পথ্য প্রদান সংগ্রহকারের ধৃত হইলেই হয়, এই সর্বত্র নিয়ম আছে, তাহার কারণ এই যে এরূপ ধৰ্ম্মসংহারক সৰ্ব্বকালেই আছেন, কখন গৌরাঙ্গকে অবতার করিবার উদ্দেশে অনন্ত- সংহিতার নাম লইয়া দুই কি দুই শত অনুষ্ট” ছন্দের শ্লোক লিখিতে অক্লেশে পারেন, কখন বা নিত্যানন্দের অবতার স্থাপনার জন্যে নাগসংহিতা কহিয়া দুই চারি বচন লিখিবার কি অসাধ্য তাহাদের ছিল, কখন বা ফণিসংহিতা নাম দিয়া অদ্বৈতের প্রমাণের নিমিত্ত চারি পাঁচ শ্লোক প্রমাণ দিতে পারিতেন, বরঞ্চ কর্কটসংহিতার নাম লইয়া এই ধৰ্ম্মসংহারকের ধৰ্ম্মসংস্থাপক রূপে অবতীর্ণ হওয়ার প্রমাণ দিতে সেই সকল লােকের আশ্চৰ্য্য কি, অতএব ওই সক। নেক হইতে এইরূপ ধৰ্ম্মচ্ছেদের নিবারণের নিমিত্ত পণ্ডিতেরা পূৱাণ সংহিতাদির প্রমাণের বিষয়ে এই নিয়ম করিয়াছেন, অর্থাৎ প্রসিদ্ধ টীকাসম্মত অথবা প্রসিদ্ধ ঐকধৃত ব্যতিরেক সামান্যত বচনের গ্রাহ্যতা নাই, যদ্যপি এই নিয়মের অন্যথা করিয়া প্রসিদ্ধ টীকারহিত ও অন্য গ্রন্থকারের ধৃত বিনা পূরাণ সংহিত। তন্ত্রাদি শাস্ত্রের নামােল্লেখ মার বচনের প্রামাণ্য জন্মে তবে তন্ত্ররত্নাকরের প্রমাণ গৌরাঙ্গ ও তৎসম্প্রদায়ের উচ্ছেদে কারণ কেন না হয়েন ? যথা (বটুক উবাচ। হতে তু ত্রিপুরে দৈত্যে দুর্জয়ে ভীমকর্মণি। তদানশৎ কিং তদ্বীৰ্যং স্থিতং বা গণনায়ক। তদহং শ্রোতুমিচ্ছামি বদতে ভবতঃ প্রভাে। বেত্তা হি সৰ্ববাৰ্তানাং ত্বাং বিনা নাস্তি কশ্চন। গণপতি রুবাচ । স এষ ত্রিপুরে দৈত্যো নিহতঃ শূলপাণিনা। রুষয়। পরয়াবিষ্ট আত্মানমকরােত্রিধা । শিবধর্ম- বিনাশায় লােকানাং মােহহেবে । হিংসাৰ্থঃ শিবভক্তানামুপায়ানস্জদ্বন্ অংশেনছেন গৌরখ্যঃ শচীগর্তে বভূব সঃ । নিত্যানন্দে দ্বিতীয়েন প্রাদুরাসীহা- বলঃ। অদ্বৈতাখ্যস্তৃতীয়েন ভাগেন দনুজাধিপঃ। প্রাপ্তে কলিযুগে থােরে বিজহার মহীতলে । ততে দুরাত্মা ত্রিপুরঃ শরীরৈস্ত্রিভিরাসুরৈঃ। উপবায় লােকানাং নারীভাবমুপাদিশৎ। বৃষলৈবৃষলভিশ্চ সন্ধরৈঃ পাপযােনিভি। পূরয়িত্ব মহীং কৃৎস্নং রুদ্রকোপমদীপয়ৎ। বহবব দানবাঃ ক্রুর দুশ্চেষ্টাস্ত্রিপুরানুগাঃ। মানুষং দেহমাশ্ৰিত্য অনুপাত- ভেজুস্তাংস্ত্রিপুরাংশজা। মহাপাতকিনঃ কেচিদতিপাতকিন পরে। কিনশ্চাষে উপপাতকিনােহপরে। সৰ্বপাপযুতাঃ কেচিৎ বৈষ্ণবাকারধারিণঃ । শলা বঞ্চয়ামাসুমায়াধ্বান্তবিহ্বলান্ । প্রথমং বর্ণয়ামাসুঃ সাক্ষাদ্বিষ্ণুং সনাতনং। কেনােপায়েন দেবেশ দ্বিতীয়মতুলং শেষং তৃতীয় মহেশ্বরং। বটুক উবাচ । ত্রিপুরােহভূৎ পুনভুবি। ক আসন্ সঙ্গিনস্তস্য বিস্তরেণ বদস্ব মে।) ইহার সংক্ষেপ ‘বিবরণ এই যে বটুকভৈরব ভগবান্ গণেশকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে ত্রিপুরাসুর হত হইলে পর তাহার আসুর তেজ নষ্ট হইল কি তাহার নাশ হইল না, আমাকে হে ১৩৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ; গণনায়ক কহ যেহেতু তােমা ব্যতিরেক অন্য এরূপ সৰ্ব্বজ্ঞ নাই। তাহাতে ভগবান্ গণেশ কহিতেছেন যে ত্রিপুরাসুর মহাদেবের দ্বারা নিহত হইয়া শিবধর্ম নাশের নিমিত্ত তিন পুরের স্থানে গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত এই তিন রূপে অবতীর্ণ হইল, পরে নারীভাবে ভজনের উপদেশ করিয়া ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী ও বর্ণসঙ্করের দ্বারা পৃথিবীকে পরিপূর্ণ করিয়া পুনরায় মহাদেবের কোপকে উদ্দীপ্ত করিলেক, আর তাহার সঙ্গী যে সকল অসুর ছিল তাহারা মনুষ্যবেশ ধারণ করিয়া ঐ ত্রিপুরের তিন অবতারকে ভজনা করিলেক ঐ সকলের মধ্যে কেহ২ মহাপাতকী, অতিপাতকা, উপপাতকী, অনুপাতকী ; আর কেহ সর্বপাপযুক্ত ছিল তাহারা বৈষ্ণববেশ ধারণ করিয়া অনেক শরলান্তঃকরণ লােককে মায়ারূপ অন্ধকারের দ্বারা মুগ্ধ করিয়াছে, সেই ত্রিপুরের প্রথম অংশকে সাক্ষাৎ বিষ্ণু, দ্বিতীয় অংশকে শেষস্বরূপ বলরাম, তৃতীয় অংশকে মহাদেবরূপে, তাহার বিখ্যাত করিলেক। ইহা শ্রবণ করিয়া বটুক কহিলেন যে কি উপায়ের দ্বারা ত্রিপুরাসুর পুনরায় পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে ও তাহার সঙ্গী কে ছিল তাহা বিস্তার করিয়া আমাকে কহ। হ্রান্থবাহুল্যভয়ে তাবৎ প্রকরণ লেখা গেল না, যাহাদের অধিক জানিতে বাসনা হয় ঐ মূল গ্রন্থ অবলােকন করিবেন; এ গ্রন্থের প্রসিদ্ধ টীকা নাই এবং এ সকল বচন প্রসিদ্ধ সংগ্রহকারের ধৃত নহে এ নিমিত্ত আমাদের এবং তাবৎ পণ্ডিতেদের নিয়মানুসারে এ সকল বচনকে লিখিতে বাসনা ছিল না কিন্তু ধৰ্ম্মসংহারক লেখাইলে কি করা যায়। ৯৯ পৃষ্ঠে ১৬ পংক্তিতে নিগূঢ় শাস্ত্রের অর্থ করেন যে “বহু বিজ্ঞ জনের অগােচর যে শাস্ত্র তাহার নাম নিগূঢ় শাস্ত্র” পরে ১০০ পৃষ্ঠে ৪ পংক্তিতে কহেন “যে নিগূঢ় শাস্ত্রের অনুসারে অভক্ষ্য ভক্ষণ অপেয় পান ও তাগম্য। গমন ইত্যাদি সৎকর্মের অনুষ্ঠান করিতেছেন সে নিগূঢ় শাস্ত্রের নাম কি” উত্তর, ধৰ্ম্মসংহারকের এই লক্ষণ দ্বারা সম্প্রতি জানা গেল যে চরিতামৃতই নিগুঢ় শাস্ত্র হয়ে যেহেতু পণ্ডিত লােক- সমাগমে চরিতামৃতে ডাের পড়িয়া থাকে তাহার কারণ এই যে বহু বিজ্ঞ জনের বিদিত না হয়, ও পঙ্গতে অভক্ষ্য ভক্ষণাদি ও উপাসনায় অগম্যাগমন বর্ণন ওই চরিতামৃতে বিশেষরূপে আছে অতএব ওই লক্ষণ দ্বারা চরিতামৃত সুতরাং নিগূঢ় শাস্ত্র হইলেন। গৌরাঙ্গ যাহার পরব্রহ্ম ও চৈতন্যচরিতামৃত যাহার শব্দব্রহ্ম তাহার সহিত শাস্ত্রীয় আলাপ যদ্যপিও কেবল বৃথা শ্রমের কারণ হয়, তথাপি কেবল অনুকম্পাধীন এ পর্যন্ত চেষ্টা করা যাইতেছে। ইতি শ্ৰীধৰ্ম্মসংহারকের প্রথম প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরে অনুকম্পাসূচকো নাম তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ। সমাপ্তং প্রথম প্রশ্নোত্তরং। •• দ্বিতীয় প্রশ্নোত্তর। ধৰ্ম্মসংহারকের দ্বিতীয় প্রশ্নের তাৎপৰ্য্য এই ছিল, যে সদাচার সদ্ব্যবহারহীন অভিমানীর যজ্ঞােপবীত ধারণ নিরর্থক হয়, তাহার উত্তরে আমরা লিখিয়াছিলাম যে সদাচার ও সদ্ব্যবহার শব্দ হইতে তাহার যদি এ অভিপ্রায় হয়, যে তাবৎ উপাসকের ও অধিকারীর যে আচার ও ব্যবহার তাহাকেই সদাচার ও সন্ধ্যবহার কহা যায়, তবে তাবৎ উপাসকের ও অধিকারীর আচার ও ব্যবহার এক ব্যক্তি হইতে এককালে কদাপি সম্ভব হয় না; যেহেতু বৈষ্ণব ও কোল প্রভৃতির আচার ও ব্যবহার পরস্পর অত্যন্ত বিরুদ্ধ হয়, এমতে ধৰ্ম্মসংস্থারকের এবং অন্যের কাহারও যজ্ঞােপবীত ধারণ সম্ভব না। দ্বিতীয়ত যদি আপ২ উপাসনাবিহিত যে সমুদায় আচার তাহাই সদাচার সদ্ব্যবহার ইহ বৰ্ম্মসংহারকের অভিপ্রেত হয়, এবং তাহার তকরণে যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয়, এমতে যে ব্যক্তি আপন উপাসনার সমুদায় আচার করিতে সমর্থ না হয়ে তার যজ্ঞােপবীত ধারণে অধিকার না থাকে তবে প্রায় একালে যজ্ঞােপবীত ধারণে অধিকার প্রাপ্ত হইবেক না। তৃতীয়ত সদাচার ও সদ্ব্যবহার শব্দ দ্বারা আপন২ উপাসনাবহিত যথাশক্তি অনুষ্ঠান করা ধর্ম- সংহারকের যদি অভিপ্রেত হয়, ও যে২ অংশের অনুষ্ঠানে ত্রুটি জন্মে তন্নিমিত্ত মনস্তাপ ও স্ব ধর্মবিহিত প্রায়শ্চিত্ত করিলে যজ্ঞসূত্র ধারণ বৃথা হয় না, তবে এ ব্যবস্থানুসারে ধর্মসংহারকের এবং অন্য অন্য ব্যক্তিরও যজ্ঞােপবীত রক্ষা পায় । চতুর্থ যদি ধৰ্মসংহারক কহেন যে মহাজন সকল যাহা করিয়া আসিতেছেন তাহারই নাম সদাচার সদ্ব্যবহার হয়, তাহাতে জিজ্ঞাস ছিল যে মহাজন শব্দে কাহাকে স্থির করা যায় ; যেহেতু গৌরাঙ্গায় বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের কবিরাজ গোসাই, রূপসনাতন জীব প্রভৃতিকে মহাজন কহিয়া থাকেন এবং তাহাদের গ্রন্থ ও আচারানুসারে আচরণ করিতে উদ্যত হয়েন, এবং শাক্তসম্প্রদায়ের কোলের বিরূপাক্ষ, নির্বাণাচাৰ্য, ও আগমবাগীশ প্রভৃতিকে মহাজন কহিয়া তাহাদের আচার ও ব্যবহারকে সদাচার কহেন, এবং রামানুজী বৈষ্ণবেরা রামানুজ ও তৎশিষ্য প্রশিষ্যকে মহাজন কহিয়া তাহাদের আচারকে সদাচার জানেন এবং তদনুসারে অনুষ্ঠান করেন, এবং নানকপন্থী ও দাদূপন্থী প্রভৃতিরা পৃথক ব্যক্তি সকলকে মহাজন জানিয়া তাহাদের ব্যবহার ও আচারানুসারে ব্যবহার ও আচার করিয়া থাকেন। একের মহাজনকে অন্যে মহাজন কহে না এবং ঐ সকল মহাজনের অনুগামীরা পরস্পরকে নিন্দিত ও অশুচি কহিয়া থাকেন; অতএব ধর্মসংহারকের এরূপ তাৎপৰ্য হইলে সদাচার ও সদ্ব্যবহারের ১৩৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ধারী হয়। নিয়মই থাকে না সুতরাং একের মতে অন্য সদাচার সদ্ব্যবহারহীন ও বৃথাযজ্ঞােপবীত- পঞ্চম যদি ধৰ্ম্মসংহারকের এমৎ অভিপ্রায় হয় যে আপন পিতৃ পিতামহ যে আচার ও ব্যবহার করিয়াছেন তাহার নাম সদাচার ও সদ্ব্যবহার হয় তথাপিও সদাচারের নিয়ম রহিল না এবং শাস্ত্রের বৈয়র্থ হয়, যেহেতু পিতা পিতামহ অতিশয় অযােগ্য কৰ্ম্ম করিলে সে ব্যক্তি সেই অযােগ্য কৰ্ম্ম করিয়াও আপনাকে সদাচারী কহিতে পারিবেক এবং ধর্মসংহারকের মতে সেই অযােগ্য কর্মকর্তার যজ্ঞােপবীত রক্ষা পাইবেক ও সদাচাররূপে গণিত হইবেক। ইহার প্রত্যুত্তরে কতিপয় পৃষ্ঠ ব্যঙ্গ ও দুৰ্ব্বাক্যে পরিপূর্ণ করিয়া ধৰ্ম্মসংহারক ১১৫ পৃষ্ঠে 1 পংক্তিতে লিখিয়াছেন, “ঐ প্রশ্নে সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দের অব্যবহিত পূৰ্বেই স্বল্প জাতীয় এই শব্দ লিখিত আছে তাহাতে স্বীয়, জাতির সদাচার সদ্ব্যবহার এই তাৎপৰ্য্য সুস্পষ্ট বােধ হইতেছে”? উত্তর, ইহার দ্বারা বিজ্ঞ লােক বিবেচনা করিবেন যে স্ব২ জাতীয় শব্দ কহাতে আমাদের ঐ পাঁচ কোটির মধ্যে কোন কোটির নিরাস হইতে পারে, স্ব জাতির যে সদাচার তাহা আপন২ উপাসনার অনুগত হয় ; এক জাতিতে চারি জন বর্তমান আছেন তাহার মধ্যে এক ব্যক্তি গৌরাঙ্গমতের বৈষ্ণব হয়েন, দ্বিতীয় ব্যক্তি রামানুজমতের বৈষ্ণব, তৃতীয় দক্ষিণাচার শাক্ত, চতুর্থ কৌল, তাহাতে প্রথম ব্যক্তি গৌরাঙ্গমতের প্রধান ব্যক্তিদের যে আচার ও ব্যবহার তাহাকে সদাচার ও সদ্ব্যবহার কহিয়া মৎস্য ভােজন মাংসত্যাগ ও বলিদানে পাপ বােধ ও সর্বথ। তুলসীকাষ্ঠমালা ধারণ, চৈতন্যচরিতামৃতাদি পাঠ ও পঙ্গতে ভােজন করেন কিন্তু সেই সম্প্রদায়নিষ্ঠ ব্যক্তি সকল তাহাকে সদাচারী ও সদ্ব্যবহার কহেন কি না? আর অন্য তিন জন সে ব্যক্তির দোয়ােল্লাস করেন কি না? দ্বিতীয় ব্যক্তি রামানুজ ও তন্মতের প্রধান প্রধানের আচারকে সদাচার সদ্ব্যবহার জানেন ও তদনুসারে মৎস্য মাংস উভয়ের ত্যাগ ও ভােজনকালে, ক্ষৌরকালে, আর অশুচি বিসর্জনে তুলসীকাষ্ঠমালার ত্যাগ ও আবৃত স্থানে ভােজন এবং সঙ্কটেও শিবালয়ে গমনের নিষেধ করিয়া থাকেন, ওই মতের অন্য ব্যক্তিরা তাহাকে সদাচারী সদ্ব্যবহারী কহেন কি না, যদ্যপিও অন্য ২ মতাবলম্বীরা বিশেষরূপে শিবদ্বেষ প্রযুক্ত দোষাবিষ্ট ও পতিতরূপে তাঁহাকে জানেন, তৃতীয় ব্যক্তি দক্ষিণাচার শাক্ত তিনি তম্মতের প্রধান ব্যক্তিদের আচারকে সদাচার ও সদ্ব্যবহার জানিয়া দেবীপ্রসাদ মৎস্য মাংস ভােজন ও বলি প্রদানে পুণ্য বােধ ও পঙ্গত ভােজনে পাপ জ্ঞান করেন, চতুর্থ ব্যক্তি কুলধৰ্ম্ম সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তিদের আচারকে সদাচার জানিয়া বিহিত তত্ত্বত্যাগীকে পশুরূপে জ্ঞান ও তত্ত্ব স্বীকার ও আরাধনাকালে তুলস্যাদির স্পর্শ ত্যাগ করিয়া থাকেন। ঐ চারি পথ্য প্রদান ১৩৭ জনকে জিজ্ঞাসা করিলে প্রত্যেকে কহিবেন যে আমার জাতির মধ্যে অনেকেই পরম্পরায় এইরূপ আচার করিয়া আসিতেছেন এবং ঐ সকল স্ব২ জাতীয় প্রধান ব্যক্তিদের কৃত গ্রন্থ ও ব্যবহার এবং তত্তৎপ্রতিপাদক শাস্ত্রপ্রমাণ দেখাইয়া আপন২ ব্যবহারকে ও আচারকে সদাচার ও সদ্ব্যবহার কহিবেন; এবং ধৰ্ম্মসংহারক যে সদাচার ও সদ্ব্যবহারের লক্ষণ করিয়াছেন তদনুসারেই প্রত্যেকের আচারকে “স্ব২ জাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহার” কহা গেল বস্তুত ওই সকল ব্যবহার পরস্পর অতি বিরুদ্ধ হইয়াও প্রত্যেকের প্রতি সদ্ব্যবহার প্রয়ােগ হইল। অতএব স্ব২ জাতীয় এই অধিক শব্দ প্রয়োগ করিয়া এরূপ আস্ফালনের কারণ কি, যেহেতু যেমন সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দ দ্বারা পাঁচ কোটি পূর্ব উত্তরে লিখিয়াছিলাম সেইরূপ স্ব, জাতীয় শব্দপূৰ্ব্বক সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দেও সমান রূপে পাঁচ কোটি সংলগ্ন হয়, কেন না। প্রত্যেক জাতিতে নানাপ্রকার উপাসনা করিয়া থাকেন। ওই পাঁচ কোটির উদাহরণ পুনরায় দিতেছি অর্থাৎ স্ব২ জাতীয় সদাচার শব্দে কি স্ব২ জাতীয় তাবৎ উপাসকের ও অধিকারীর যে আচার তাহার নাম স্ব২ জাতীয় সদাচার হইবেক ? কি স্ব২ জাতীয়ের মধ্যে আপনং উপাসনাবিহিত সমুদায় আচারকে স্ব২ জাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দে কহেন ? কি স্ব২ জাতীয়ের মধ্যে আপন২ উপাসনাবিহিত আচারের যথাশক্তি অনুষ্ঠানকে স্ব২ জাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহার কহেন ? কিম্বা স্ব২ জাতীয় পৃথক্‌২ মহাজনেরা যাহা করিয়াছেন তাহার নাম সদাচার সদ্ব্যবহার হয় ? কিম্বা স্ব২ জাতিতে আপন২ পিতৃ পিতামহ যাহা করিয়াছেন তাহাকে স্ব২ জাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহার শব্দে কহেন ? প্রত্যেক জাতিতে নানাপ্রকার পরস্পর বিপরীত উপাসনা করিয়া থাকেন, অতএব স্ব২ জাতীয় শব্দ দিলেও ওই পাঁচ কোটি তদবস্থ রহিল এখন ধৰ্মসংহারককে নিবেদন করি তিনি ঐ পূর্বোক্ত চারি প্রকার ব্যক্তির একের আচারকে সদাচার ও অন্যের আচারকে অসদাচার কহিতে পারিবেন না, যেহেতু বিনিগমনাবিরহ হয় অর্থাৎ বিশেষ নিয়ামক সম্ভবিতে পারে না, তাহাদের প্রত্যেকে স্ব২ জাতীয় মহাজনকে এবং তত্তৎমা শাস্ত্রকে আপন২ উপাসনাবিহিত আচারের ও ব্যবহারের প্রমাণার্থে নিদর্শন দিবেন, আর এ চারি ব্যক্তির অনুষ্ঠিত আচার সকলকে স্ব২ জাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহার কহিলে তাহা এক ব্যক্তি হইতে এককালে কদাপি সম্ভবে না, সুতরাং স্ব২ জাতীয়ের মধ্যে আপনং উপাসনাবিহিত আচারের যথাশক্তি অনুষ্ঠানকে স্ব২ জাতীয় সদাচার সদ্ব্যবহার কহিলে কি ধৰ্ম্মসংহারকের কি অন্যের যজ্ঞােপবীত রক্ষা পাইবার উপায় হয়। ১১৬ পৃষ্ঠে ৯ পংক্তিতে ধৰ্ম্মসংহারক লিখেন “যে কোন আচারের ব্যতিক্রম হইলে ১৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী যজ্ঞােপবীত বৃথা হয়, উপাসকের আচারের ব্যতিক্রম হইলে বরং উপাসনারই ত্রুটি হইতে পারে ইহাই যুক্তিসিদ্ধ হয় যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয় ইহাতে কি শাস্ত্র কি যুক্তি তাহা বৃহস্পতিরও অগােচর”। উত্তর, গৌরাঙ্গীয় সম্প্রদায়ের ভূরি বৈষ্ণবেরা বর্ণ বিচার না করিয়া পঙ্গতে ভােজন ও অধরামৃত গ্রহণ করেন ইহাতে-অন্যোপাসকেরা এ আচারকে বিষ্ণুধৰ্ম্মের বিপরীত জানিয়া তাহাদিগকে পতিত বৃথাযজ্ঞােপবীতধারী জানেন বরঞ্চ এ নিমিত্ত পূৰ্বে পূৰ্বে জাতি বিষয়ে কত বিরােধ উপস্থিত হইয়াছে, এবং ঐ বৈষ্ণবেরা কৌল উপাসকের আচারকে ব্যতিক্ৰম কহিয়া বৃথাযজ্ঞােপবীতধারী এই বােধে নিন্দা করেন, রামানুজসম্প্রদায়ে কি মৎস্যভােজী কি মৎস্যমাংসভােজ উভয়কেই বৃথাযজ্ঞােপবীতধারী কহেন এবং ঐ সকলে পরস্পরকে পতিত কহিবার নিমিত্ত বচন প্রমাণ দেন; অথচ ধৰ্ম্মসংহারক কহেন যে উপাসনাবিহিত আচারের ত্রুটি হইলে কেবল উপাসনারি ত্রুটি হইতে পারে। যদি ধৰ্ম্মসংহারকের এমৎ অভিপ্রায় হয় যে স্ব২ উপাসনাবিহিত আচারের ত্রুটি হইলে কেবল অনুষ্ঠানের বৈগুণ্য হয়, যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয় না, তবে তাহার এ কথন আমাদের তৃতীয় কোটিতে গতার্থ হইয়াছে, অর্থাৎ আপন২ উপাসনার অনুষ্ঠানে যদি ত্রুটি হয় তবে মনস্তাপ ও বিহিত প্রায়শ্চিত্ত করিলে তাহার যজ্ঞােপবীত ধারণ বৃথা হয় না এ মতে সুতরাং ধৰ্ম্মসংহারকের ও অনেকের যজ্ঞোপবীত রক্ষা পায়। ১১৭ পৃষ্ঠে সদাচারের প্রমাণ মসুবচন লিখিয়াছেন, যথা ( সরস্বতীদৃষত্যোদেব- নদ্যোৰ্যদন্তরং। তদ্দেবনির্মিতং দেশং ব্রহ্মাবর্তং প্রচক্ষতে। তস্মিন্ দেশে য আচারঃ পারম্পৰ্য্যক্রমাগতঃ । বর্ণানাং সারালানাং স সদাচার উচ্যতে )। উত্তর। বচনের অর্থ যাহা টীকাকার লিখিয়াছেন সে এই যে এ সকল দেশে প্রায় শ্লোকের জন্ম হয় এ কারণ ঐ সকল দেশীয় ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণের ও সঙ্কর জাতির পরম্পরা- ক্রমে আগত যে ব্যবহার যাহা আধুনিক না হয় তাহাকে সদাচার শব্দে কহা যায়, অতএব এ বচনের দ্বারা ইহা প্রাপ্ত হইল যে, যে সম্প্রদায়ে পরম্পরাক্রমে আগত যে আচার তাহা সেই উপাসনাবিশেষে সদাচার শব্দের প্রতিপাদ্য হয় অতএব এ মনুবচন আমাদের কোটিকে প্রমাণ করিতেছে ; কেন না কোলসম্প্রদায়েরা আপন মহাজন- পরম্পরাতে আগত কুলাচারপ্রবাহকে সদাচাররূপে দেখাইতেছেন এবং রামানুজী ও গৌরাঙ্গীয় প্রভৃতি সম্প্রদায়ের আপন অঙ্গীকৃত মহাজনপরম্পরাতে আগত আচার প্রবাহকে সদ্ব্যবহাররূপে দেখাইতেছেন, অতএব জিজ্ঞাসি যে এ মনুবচন দ্বারা আমাদের কোন্ কোটির কি নিরাস করিয়াছেন। ১১৮ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে লিখেন যে স্মৃতিঃ ( ব্যবহারােপি সাধুনাং প্রমাণং পথ্য প্রদান বেদবত্তবেৎ ) অর্থাৎ সাধু ব্যক্তিদের যে ব্যবহার সেও বেদের ন্যায় প্রমাণ হয়। উত্তর, যদ্যপিও এই বচনে ( সময়শ্চাপি সাধুনাং প্রমাণং বেদবদ্ভবেৎ ) এই পাঠ স্মাৰ্ত্ত ভট্টাচাৰ্য লিখিয়াছেন, তথাপি যদি কোনাে অন্য স্মৃতিতে ঐ ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত পাঠ থাকে তাহা হইলেও আমাদের পূর্বোক্ত চতুর্থ কোটিতে পৰ্য্যবসান হয় ; অর্থাৎ লােকে আপন২ সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তিদিগ্যেই মহাজন ও সাধু জ্ঞান করিয়া থাকেন, যেহেতু তাহাদের আচার ব্যবহারকে সাধু ব্যক্তির আচার ও ব্যবহার না জানিলে তাহার অনুষ্ঠানে কেন প্রবৃত্ত হইতেন, কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের লােকে তাঁহাদিগ্যে সাধু ও মহাজন কি কহিবেন বরঞ্চ তদ্বিপরীত জানেন। ১১৮ পৃষ্ঠের প্রথমে, স্বয়ং ধৰ্ম্মসংহারক সাধুর লক্ষণ করিয়াছেন যে “অহঙ্কার হিংসা দ্বেষাদিরহিত সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ধার্মিক ও শাস্ত্র যে মনুষ্য তাহার নাম সাধু”। উত্তর, এ স্থলে হিংসা শব্দে তাবৈধ হিংসা ধৰ্ম্মসংহারকের অভিপ্রেত অবশ্য হইবেক নতুবা বশিষ্ঠ, অগস্ত্যাদি ও তাবৎ যাজ্ঞিক ও বিহিত মাংসভােজী মুনিদের কাহারও সাধুত্ব থাকে না, অতএব ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত যে সাধু শব্দের লক্ষণ তাহ আপন২ সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তিতে ছিল ইহা সকলেই কহেন, নতুবা আপন সম্প্রদায়ের মহাজনকে অহঙ্কারী, হিংসক, দ্বেষ্টা, অসত্যবাদী, অজিতেন্দ্রিয়, অধাম্মিক, অশাস্ত্রজ্ঞ জানিলে তাহাদের মতে অনুগমন করিতে কেন প্রবৃত্ত হইতেন। ১৬ পৃষ্ঠে ৭ পংক্তিতে সন্ধ্যা করণের আবশ্যকতা দর্শাইবার নিমিত্ত বচন লিখিয়াছেন। উত্তর, যাজ্ঞবল্ক্য লিখেন যে (স। সন্ধ্যা স চ গায়ত্রী বিধাভূত প্রতিষ্ঠিতা) সেই সন্ধ্যা সেই গায়ত্রী দ্বিরূপে অবস্থিত আছেন, অতএব প্রণব গায়ত্রী দ্বারা পরব্রহ্মের উপাসনা যাহারা করেন সন্ধ্যোপাসনা তাহাদের অবশ্য সিদ্ধ হয়। মনুঃ (ক্ষরন্তি সৰ্ব্বা বৈদিকে। জুহােতিযজতিক্রিয়া। অরং ক্ষয়ং জ্ঞেয়ং ব্রহ্ম চৈব প্রজাপতিঃ ) হােম যাগাদি যে বেদিক ক্রিয়া তাহা সকল স্বরূপতঃ এবং ফলতঃ নষ্ট হয় কিন্তু প্রণবরূপ যে অক্ষর তিনি ফলতঃ এবং স্বরূপতঃ অক্ষয় হয়েন যেহেতু তজ্জপের ফল ব্ৰহ্মপ্রাপ্তি সে অক্ষয় হয়, আর বাচ্য বাচকের অভেদ লইয়া সেই প্রণব প্রজাপতি যে পরব্রহ্ম তৎস্বরূপ কহা যান, তথা ( ওঁকারপূৰ্বিকাস্তিস্রো মহাব্যাহৃত- যােইব্যয়াঃ। ত্রিপদা চৈব গায়ত্রী বিজ্ঞেয়ং ব্রহ্মণে মুখং) প্রণব ও তিন ব্যাহৃতি ও ত্রিপদা গায়ত্রী এই তিন নিত্য ব্ৰহ্ম প্রাপ্তির দ্বার হইয়াছেন । কিন্তু ধৰ্ম্মসংহারককে জিজ্ঞাসা করি যে আত্মােপাসনার নিত্যতাবোেধক বেদে ও মাদি স্মৃতিতে যে সকল বিধি আছে তাহার উল্লঙ্ঘন করিলে বিধির উল্লঙ্ঘন হয় কি না? যথা (আত্মা বা অরে ভ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্যে নিদিধ্যাসিতব্যঃ) অর্থাৎ শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসনের ১৪০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী দ্বারা আত্মার সাক্ষাৎকার করিবেক। (আত্মানমেবােপাসীত ) কেবল আত্মারি উপাসনা করিবেক। মনুঃ ( সৰ্বমাত্মনি সম্পশেৎ সচ্চাসচ্চ সমাহিতঃ। সৰ্বমাত্মনি সম্পশ্যন্ নধৰ্ম্মে কুরুতে মনঃ) সৎ বস্তু ও অসদ্বস্তু এ সকলকে ব্ৰহ্মাত্মকরূপে জানিয়া ব্রাহ্মণ অনন্যমনা হইয়া জীবব্রহ্মের ঐক্য চিন্তা করিবেক যেহেতু সকল বস্তুকে ব্ৰহ্মস্বরূপে আত্মার সহিত অভেদ জানিয়া অধর্মে মন করেন না। শ্রুতিঃ ( যােহন্যাং দেবতামুপাস্তে অস্যোসাবম্নোহমস্মি ন স বেদ, যথা পশুরেবং স দেবানাং।) যে ব্যক্তি আত্মা ভিন্ন অন্য দেবতার উপাসনা করে আর কহে যে তিনি অন্য আর আমি অন্য উপাস্য উপাসকরূপে হই সে যথার্থ জানে না; যেমন পশু সেইরূপ দেবতাদের সম্বন্ধে সে ব্যক্তি হয়। কুলার্ণবে প্রথমে জ্ঞানী হইলে মুক্ত হয় ইহা কহিয়া পরে কহেন (সােপানভূতং মােক্ষশ্য মানুষ্যং প্রাপ্য দুর্লভং। যস্তারয়তি নাত্মানং তস্মাৎ পাপতরােত্র কঃ ॥) মােক্ষের সােপান অর্থাৎ সিড়ি হইয়াছে যে মনুষ্যদেহ তাহা প্রাপ্ত হইয়া যে ব্যক্তি আত্মাকে ত্রাণ না করে তাহার পর অতিশয় পাপী আর কে আছে। ১২০ পৃষ্ঠে ৮ পংক্তিতে ধর্মসংহারক লিখেন যে “হারা ব্রাহ্মণ জাতি হইয়া তজ্জতির অত্যাবশ্যক কৰ্ম্মেও জলাঞ্জলি প্রদান করিয়াছেন তাহারা স্বধৰ্ম্মচ্যুত কি যাঁহারা আদরপূৰ্ব্বক তজ্জাতির অবিশ্যক কৰ্ম্ম করিতেছেন, তাহারা স্বধৰ্ম্মচ্যুত হয়েন”। উত্তর, এই উত্তরের ৯ পৃষ্ঠে গৃহস্থ ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যে আবশ্যক কৰ্ম্ম তাহা এবং ৩ পৃষ্ঠ অবধি কর্মীদের যে আবশ্যক কৰ্ম্ম তাহা বিবরণপূৰ্ব্বক লিখা গিয়াছে। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন যে কোন্ পক্ষে জলাঞ্জলি প্রদানের উল্লেখ করা যায়। ১১৮ পৃষ্ঠের ১৬ পংক্তিতে লিখেন যে “নানা মুনিবচন সত্ত্বে বিধবার বিবাহের নিবৃত্তির ব্যবহার এবং মদ্য পানে ও হিংসার প্রবর্তক প্রমাণ সত্ত্বেও তাহার অকরণের ব্যবহার ইত্যাদি সদ্ব্যবহার হয় ইহার বিপরীত অসদ্ব্যবহার”। উত্তর, বিধবার বিবাহ তাবৎ সম্প্রদায়ে অব্যবহাৰ্য্য হইয়াছে সুতরাং সদ্ব্যবহার কহাইতে পারে না, কিন্তু বিহিত মদ্যপান ও বৈধহিংসা সল্লোকেদের মধ্যে অনেকের ব্যবহার্য অতএব তত্তৎপক্ষে সে সর্বথা সদাচার ও সদ্ব্যবহারে গণিত হইয়াছে। এই প্রকরণের শেষে যাহা লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে পূর্বপুরুষের আচার ও ব্যবহারকে মনুষ্যে সদাচার সদ্ব্যবহাররূপে স্বীকার করিয়া থাকেন। উত্তর, ইহার সিদ্ধান্ত আমরা প্রথম উত্তরের পঞ্চম কোটিতেই করিয়াছি যে কেবল আপন২ পূর্বপুরুষের আচার ও ব্যবহার যদি সদাচার সদ্ব্যবহার হয় তবে সদাচার ও সদ্ব্যবহারের নিয়মই থাকে না পথ্য প্রদান ১৪১ এবং শাস্ত্রের বৈফল্য হয়, যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তি আপন পিতৃ পিতামহের কি ধর্মাংশের কি অধর্মাংশের ব্যবহার দৃষ্টিতে ব্যবহার করিলে এই মতানুসারে সদাচারী ও সদ্ব্যবহারী হইবেক ; বিশেষত পুরাণে ও ইতিহাসে এবং লৌকিক প্রত্যক্ষে স্থানে দেখিতেছি যে লােকে পূৰ্বপুরুষের উপাসনা ও আচার ভিন্ন উপাসনা ও আচার করিয়া আসিতেছেন ইহাতে শাস্ত্ৰত, ধৰ্ম্মত, লােকত, কোন হানি হয় নাই। ধৰ্ম্মসংহারক ওই দ্বিতীয় প্রশ্নে কহেন যে যাহারা নিজে সদাচারহীন, অথচ আপনাকে ব্ৰহ্মজ্ঞানী করিয়া মানেন, তাহাদের তবে অনাদরপূৰ্ব্বক যজ্ঞসূত্র বহন কেবল বৃদ্ধ ব্যাঘ্র মার্জার তপস্বীর ন্যায় বিশ্বাস জন্মাইবার কারণ হয়। তাহাতে আমরা প্রথম উত্তরের ১৬ ও ১৭ পৃষ্ঠে উভয় পক্ষের বেশ ও আলাপ ও ব্যবহার দর্শাইয়া লিখিয়াছিলাম যে এ দুয়ের মধ্যে কে বিড়ালতপস্বীর ন্যায় হয়েন তাহা পণ্ডিতেরা প্রণিধান করিলে অনায়াসে জানিতে পারিবেন। ইহার প্রত্যুত্তরে ধর্মসংহারক ১২৩ পৃষ্ঠে ৫ পংক্তিতে লিখেন যে “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের বিষয়ে এ প্রকার অনুভব হইতে পারে, কারণ স্বীয় স্বভাবের অনুসারেই ইতর লােকে পরকীয় স্বভাবেরা অনুভব করিয়া থাকে”। উত্তর, এই কথন দ্বারা ধৰ্ম্মসংহারক আপনাকেই আদৌ দোষী প্রমাণ করিলেন, যেহেতু তিনি অন্যের প্রতি ইহ উল্লেখ করেন যে তাহাদের যজ্ঞসূত্র বহন কেবল বিশ্বাস জন্মাইবার জন্যে বৃদ্ধ ব্যাঘ্র মার্জার তপস্বীর ন্যায় হয়, সুতরাং তাহার স্বীয় স্বভাব এইরূপ হইবেক যাহার দ্বারা অন্যের স্বভাবের এই প্রকার অনুভব করিয়াছেন ; সে যাহা হউক পুনরায় প্রার্থনা করি যে বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আমাদের প্রথম উত্তরের ১৬ ও ১৭ পৃষ্ঠে লিখিত যে উভয় পক্ষের বেশ ও ব্যবহারাদি দেখিয়া বিবেচনা করিবেন যে কোন পক্ষে বৃদ্ধ ব্যাস্র মার্জার তপস্বীর উপমা শােভা পায় । ২৫ পৃষ্ঠে লিখেন যে স্বকপােলকল্পিত শাস্ত্রে মােহ করেন। অতএব ধর্ম- সংহারককে জিজ্ঞাসা করি, যে প্রণব কি স্বকপােল কল্পিত হয়েন ? কি গায়ত্রী ও দশােপনিষৎ বেদান্ত, যাহা আমাদের উপাসনীয় হইয়াছেন, তাহা স্বকপােলকল্পিত হয়েন ? ও বেদান্তদর্শন এবং মনুস্মৃতি ও ভগবদগীতা ও প্রসিদ্ধ সংগ্রহকারধৃত বচন সকল, যাহা ব্যতিরেক অন্য বচন কোন স্থানে আমরা লিখি না, সেই সকল শাস্ত্র কি স্বকপােলকল্পিত হয়েন? অথবা গৌরাঙ্গকে অবতার সিদ্ধ করিবার নিমিত্ত অনন্তসংহিতা কহিয়া ১০৩ পৃষ্ঠে যে সকল বচন এবং ১২৫ পৃষ্ঠে (স্ববুদ্ধি- রচিতৈঃ শাস্ত্রৈমোহয়িত্ব। জনং নরা। বিষ্ণুবৈষ্ণবয়ােঃ পাপ যে বৈ নিন্দা প্রকুৰ্বতে)। ইত্যাদি বচন যাহা কোনাে প্রসিদ্ধ টীকাসম্মত নহে এবং কোনাে ;

১৪২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী মান্য সংগ্রহকারের ধৃত নহে, সে স্বকপােলকল্পিত হয় ? ইহা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন। ১২৬ পৃষ্ঠে ৯ পংক্তিতে লিখেন যে “নূতন ব্রাহ্ম্য বস্ত্র ও চর্মপাদুকা যাহা যবনদিগের ব্যবহাৰ্য্য ও যে সকল বস্তুকে যবনেরা ইজের ও কাবা প্রভৃতি কহিয়া থাকে ও যে চৰ্ম্মপাদুকার যাবনিক নাম মােজা সেই বস্ত্র পরিধানে ও সেই চৰ্ম্মপাদুকা বন্ধনে দণ্ডদ্বয়, দণ্ডচতুষ্টয় কাল বিলম্বেই বা কি শুভদৃষ্ট জন্মে তাহার শ্রবণের প্রয়াসে রহিলাম। উত্তর, বস্ত্র বিষয়ে এরূপ ব্যঙ্গোক্তি তাহার এক মতে করিতে পারেন, স্বহারা স্বভাবাধীন নিন্দক, অথচ বাহে কেবল ত্রিকচ্ছ সর্বদা পরিধান ও উত্তরীয় গ্রহণ আর মৃগচৰ্ম্মাদির পাদুকা ধারণ করেন, কিন্তু যে ব্যক্তি এক পেঁচা পাগ অথবা গােটাদেয় টোপী ও আজানুলম্বিত আস্তানের কাব ও রঙ্গমিশ্রিত গােটাদেয়া চাদর যাহা নীচ যবনের ব্যবহার করিয়া থাকে তাহা পরিধান করেন, যদি তিনি সাদা কাবা কি সাদা বস্তু যাহা বিশিষ্ট যবনেরা ও বিশিষ্ট পাশ্চাত্য হিন্দুরা পরিধান করেন তাহা অন্যে ব্যবহার করে ইহা কহিয়া তাহাদিগ্যে ব্যঙ্গ করেন তবে এরূপ ধৰ্মসংহারকের প্রতি কি শব্দ উল্লেখ করা যায়। ১২৭ পৃষ্ঠে অনেক অযােগ্য ভাষা যাহা অতি নীচ হইতেও হঠাৎ সম্ভব হয় না তাহা কহিয়া পরে ১৩ পংক্তিতে লিখেন যে “ব্রহ্মজ্ঞানীরা বাহে কোন বেশের কিম্বা আলাপের কিম্বা ব্যবহারের দ্বারা যাহাতে আপনাকে শুদ্ধসত্ত্ব ও সিদ্ধ পুরুষ জানিতে পারে তাহা করিবেন না কিন্তু তন্ত্রশাস্ত্রোক্ত মদ্য মাংস ভােজনাদি গহিত কৰ্ম্মই করিবেন যাহাতে অনেকে অশ্রদ্ধা করে”। উত্তর, পূৰ্বোত্তরলিখিত বচন, যাহা বিশ্বগুরু আচাৰ্যদের ধৃত হয়, তদনুসারে তন্ত্রশাস্ত্রপ্রমাণে জ্ঞানাবলম্বীদের মধ্যে অনেকে আহারাদি লােকযাত্রার নির্বাহ করেন, ইহার নিন্দকের প্রতি যাহা বক্তব্য পরমারাধ্য মহাদেবই কহিয়াছেন অতএব আমরা অধিক কি লিখিব ( যে হস্তি খলাঃ পাপাঃ পরব্রহ্মোপদেশিন। স্বদ্রোহং তে প্রকুৰ্বস্তি নাতিরিক্ত যত স্বতঃ )। যে খল পাপীরা পরব্রহ্মাপাসকের অনিষ্ট করে সে আপনারই অনিষ্ট করে যেহেতু তাহারা আত্মা হইতে ভিন্ন নহেন। এই তন্ত্রশাস্ত্রপ্রমাণে ভগবান কৃষ্ণ ও অর্জুন ও শুক্রাচার্য্য ও ভগবান্ বশিষ্ঠ প্রভৃতি সাধু ব্যক্তিরা পান ভােজনাদি করিয়াছেন এ ধৰ্মসংহারককে বুঝি তাহা অবগত হইয়া না থাকিবেক। মিতাক্ষরাধৃত ব্যাসবচন। (উভৌ মধ্বসক্ষীণৌ উভভৗ চন্দনচর্সিতো। একপর্যঙ্করথিনৌ দৃষ্টো মে কেশবাজুনৌ।) আমি কৃষ্ণাৰ্জ্জুনকে এক রথে স্থিত চন্দনলিপ্তগাত্র মাধ্বীক মদ্যপানে মত্ত দেখিলাম।

পথ্য প্রদান ১৪৩ ১২৮ পৃষ্ঠে পীত্ব পীত্ব পুনঃ পীত্ব। এই বচনকে ব্যঙ্গে লিখিয়া বিহিত মদ্যপান যাঁহারা করেন তাহাদের সাম্য হাড়ি ডােম চণ্ডাল যাহারা অবিহিত মদ্য পান করে তাহাদের সহিত করিয়াছেন। উত্তর, বিহিত ও অবিহিত এ বিচার না করিয়া কেবল আহারের একতা লইয়া যদি পরস্পর সাম্যের কারণ ধৰ্ম্মসংহারকের মতে হয়, তবে তাহার মতে আরণ্য শূকর এবং সেই মনুষ্যবিশেষের যাহাদের কেবল ফলমূল কদ আহার হয় উভয়ের আহারের ঐক্য লইয়া পরস্পর কেন তুল্যতা না হয় ? এবং কেবল দুগ্ধাহারীর সহিত ছাগ মেষাদির বৎসের সহিত আহারের ঐক্যতা লইয়া সাম্য কেন না হয় ? বস্তুতঃ দ্বেষ পৈশুন্য ও মৎসরতাতে নিতান্ত মুগ্ধ না হইলে এরূপ সাম্য কল্পনা ধৰ্ম্মসংহারক হইতে কদাপি হইত না। পরমেশ্বর শীঘ্র ইহাকে এরূপ দ্বেষপাশ হইতে মুক্ত করুন । ইতি দ্বিতীয় প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরে অতিদয়া- বিস্তারােনাম চতুর্থপরিচ্ছেদঃ। সামপ্তং দ্বিতীয় প্রশ্নোত্তরং। তৃতীয়প্রশ্নোত্তর ধর্মসংহারকের তৃতীয় প্রশ্নের তাৎপৰ্য এই যে পরমেশ্বরনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ছাগলাদি ছেদ করণ ঐহিক পারত্রিক নাশের কারণ হয়। ইহার উত্তরে মনু প্রভৃতির বচন প্রমাণপূৰ্ব্বক আমরা লিখিয়াছিলাম যে বৈধ হিংসাতে ও বিহিত মাংসাদি ভােজনে দোষ নাই এবং ব্ৰহ্মনিষ্ঠ ব্যক্তিদের আহারাদি লােকযাত্র। নির্বাহ বেদোক্ত বিধানে অথবা তন্ত্রানুসারে কলিযুগে কর্তব্য, অতএব বিহিত হিংসা ও বিহিত মাংস ভােজনে নিন্দার উল্লেখ বৌদ্ধ কিম্বা ধৰ্ম্মসংহারক ব্যতিরেকে অন্য কেহ করে না। ইহার প্রত্যুত্তরে ১২৯ পৃষ্ঠ অবধি যে সকল কটুক্তি করিয়াছেন তাহার কিঞ্চিৎ লিখিতেছি। ১৬ পংক্তি, “দুষ্টান্তঃকরণ দুৰ্জনদিগের আন্তরিক ভাব বােধ করিতে বুঝি বিধাতাও ভগ্নোদ্যম”। ১৩১ পৃষ্ঠে ৫ পংক্তিতে “হায়২ এ কি অদৃষ্ট এত কষ্ট তথাপি না তাঁতিকুল না বৈষ্ণবকুল একুল ওকুল দুই কুল নষ্ট”। ১৩৮ পৃষ্ঠে “ভাক্ত তত্ত্ব- জ্ঞানীদের দুর্বোধ দূরে যাউক কি মধুর বচন শুনিতে পাই অন্তঃকরণে পুলকিত ১৪৭ পৃষ্ঠে ১৬ পংক্তিতে “লােকযাত্রা শব্দে কেবল মদ্যমাংস ভােজনাদি এই অর্থ কি মহাদেব তঁাহার কানে২ কহিয়াছেন” এখন বিশিষ্ট লােকেরা বিবেচনা করিবেন যে শাস্ত্রীয় বিচারে এ সকল উক্তি পণ্ডিতেরা করেন কি জঘন্য নীচেরা এই সকল কটুক্তিকে সরস ব্যঙ্গ বােধ করিয়া ও তদ্যােগ্য লােকের প্রশংসার নিমিত্ত হই”।

১৪৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী হয়, উল্লেখ করিয়া থাকে, সে যাহা হউক আমাদের নিয়মানুসারে এ সকল কটুক্তির উত্তর দিবার প্রয়ােজন নাই কিন্তু ঐ সকল পৃষ্ঠের মধ্যে যে কিঞ্চিৎ শাস্ত্রীয় কথা আছে তাহার উত্তর লিখিতেছি। ১২৬ পৃষ্ঠে লিখেন যে “তত্ত্বজ্ঞানীর হিংসা মাত্রই অবিহিত হয় কিন্তু যে কর্মে হিংসার বিধি আছে সেই সকল কর্মে তঁাহারদিগের প্রতি অনুকল্পের বিধান করিয়াছেন”। উত্তর, তত্ত্বজ্ঞানী শব্দের মুখ্যার্থ প্রাপ্তজ্ঞান ব্যক্তিরা হয়েন, তাহাদের প্রতি কৰ্ম্মেরি বিধি নাই সুতরাং কর্মের অঙ্গ যে হিংসা তাহার অনুকল্প সুদূরপরাহত ভগবদগীতা (নৈব তস্য কৃতেনাৰ্থো নাকৃতেনেহ কশ্চন) অর্থাৎ জ্ঞানীর কৰ্ম্ম করিলে পুণ্য নাই এবং কৰ্ম্ম ত্যাগে পাপ হয় না। বিশেষত তত্ত্বজ্ঞানীদের মধ্যে কেহ যেমন জনক বশিষ্ঠাদি যখন লােকসংগ্রহের জন্যে যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন তখন বিহিত হিংসাও করিয়াছেন, অতএব তত্ত্বজ্ঞানীর প্রতি অনুকল্পের বিধি দিয়াছেন এরূপ কথন এ মতেও অযুক্ত হয়। তত্ত্বজ্ঞানী শব্দে যদি প্রাপ্তজ্ঞান না কহিয়া জ্ঞানেচ্ছুক অভিপ্রেত হয় তবে তঁাহারা সাধনাবস্থায় দুই প্রকার হয়েন তাহার উত্তম কল্প বর্ণাশ্রমাচারবিশিষ্ট সাধক ও কনিষ্ঠ কল্প বর্ণাশ্ৰমাচারহীন সাধক, তাহাতে বর্ণাশ্রমাচারবিশিষ্ট সাধকের হিংসাত্মক নিত্য নৈমিত্তিক যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম কর্তব্য হয়। যাহা এই পুস্তকের ৯৬ পৃষ্ঠ অবধি বিস্তাররূপে লিখা গিয়াছে এবং যজ্ঞীয় মাংস ভােজনের আবশ্যকতা মনুবচনে প্রাপ্ত হইতেছে যথা মনুঃ ( নিযুক্তস্তু যথান্যায়ং যে। মাংসং নাত্তি মানবঃ। স প্ৰেত্য পশুতাং যাতি সম্ভবানেকবিংশতিং) যে ব্যক্তি যজ্ঞাদিতে নিযুক্ত হইয়া মাংস ভােজন না করে সে মৃত্যু পরে একবিংশতি জন্ম পশু হয়। বরঞ্চ ভগবান্ মনু ঐ প্রকরণে লিখেন যে ( এঘর্থে পশূন্ হিংস বেদতত্ত্বার্থ- বিদ্বিজঃ। আত্মানঞ্চ পশৃংশ্চৈব গময়ত্যুত্তমাং গতিং) এ সকল কর্মে পশু হিংসা করিয়া বেদার্থবিজ্ঞ দ্বিজেরা আপনাকে ও পশুকেও উত্তমা গতি প্রাপ্ত করান। পূর্বোক্ত ভগবদগীতা ও বেদান্ত এবং মনুবচনের বিপরীত যে কোনো মত থাকে সে প্রশংসনীয় নহে। ১৩৭ পৃষ্ঠে ( মধুপর্কে চ যজ্ঞে চ) ইত্যাদি মনুর দুই বচন লিখিয়াছেন। তাহার দ্বারা আমাদের পূর্বলিখিত যে (দেবান্ পিতুন সমভ্যর্চ্য খাদ মাংসং ন দোষভাক) ইত্যাদি বচনেরই পােষক হইয়াছে অর্থাৎ বৈধ হিংসাতে কদাপি দোষ নাই। ১৩৮ পৃষ্ঠে অগস্ত্যসংহিতার বচন লিখেন যে (হিংসা চৈব ন কর্তব্য। বৈধহিংসা চ রাজসী। ব্রাহ্মণৈঃ সা ন কৰ্তব্যা যতন্তে সাত্বিকা মতাঃ) কি বৈধ কি অবৈধ হিংসা মাত্রই করিবে না যেহেতু বৈধ হিংসাও রাজসী হয়, ব্রাহ্মণেরা সত্বগুণাবলম্বী পথ্য প্রদান ১৪৫ চ। হয়েন অতএব তাহা করিবেন না। আর ঐ পৃষ্ঠে মহাকালসংহিতার বচন লিখেন যে (বানপ্রস্থে ব্রহ্মচারী গৃহস্থাে বা দয়াপর। সাত্বিকে। ব্ৰহ্মনিশ্চ যশ্চ হিংসা- বিবজ্জিত। তে ন দঃ পশুবলিমনুকল্পং চর্যপি) অর্থাৎ বানপ্রস্থ, ব্রহ্মচারী, আর দয়াবান্ গৃহস্থ, এবং সাত্বিক, ও ব্রহ্মনিষ্ঠ, ও হিংসাবিবর্জিত ব্যক্তি, ইহার পশু বলিদান করিবেন না, কিন্তু যে স্থানে বলিদানের আবশ্যকতা হয় সে স্থানে অমুকল্পের আচরণ করিবেন। উত্তর, এ সকল বচনে এবং অন্য যে২ বচনে বৈধ হিংসার দোষ ও অকর্তব্যতা লিখেন সে সকল সাংখ্যমতের অন্তর্গত, কিন্তু গীতামত- বিরুদ্ধ এবং মনুবাক্যবিপরীত হয়, গীতা (ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কৰ্ম প্ৰাহু মনীষিণঃ। যজ্ঞদানতপঃকৰ্ম্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে। এতান্যপি তু কৰ্ম্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত। ফলানি কর্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমং) অর্থাৎ যজ্ঞ প্রভৃতি কৰ্ম্মেতে হিংসাদি দোষ আছে এ নিমিত্ত সাংখ্যেরা যজ্ঞাদি কৰ্ম্মকে অকৰ্তব্য কহেন, আর মীমাংসকেরা কহেন যে যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম ত্যাগ করিবে না; কিন্তু এ সকল কর্ম যাহাকে সাংখ্যেরা নিষেধ করেন ও মীমাংসকেরা বিধি দিতেছেন তাহা আসক্তি ও ফল ত্যাগপূৰ্ব্বক কর্তব্য হয় হে অর্জুন নিশ্চিত আমার এই উত্তম মত। ইত্যাদি বচনে বৈধ হিংসার অনুমতি ব্যক্তরূপে কহিয়াছেন । বেদান্তের ৩ অধ্যায়ে ১ পদে ২৫ সূত্র ( অশুদ্ধমিতি চেন্ন শব্দাৎ ) যজ্ঞাদি কৰ্ম্ম হিংসামিশ্রিত প্রযুক্ত অশুদ্ধ অর্থাৎ পাপজনক হয় এমৎ নহে যেহেতু বেদে তাহার বিধি দিয়াছেন। এবং স্মার্ত প্রভৃতি তাবৎ নবীন ও প্রাচীন নিবন্ধকারেরা ভগবদ্গীতার এবং মনুবাক্যানুসারে ও বেদান্ত ও মীমাংসাদর্শনের প্রমাণে বৈধ হিংসার কর্তব্য লিখিয়াছেন এবং বৈধ হিংসাতে যে সকল দোষশ্রুতি আছে তাহাকে মম্বা দিবাক্যের বিরুদ্ধ সাংখ্যমতীয় জানিয়া আদর করেন নাই। (ব্রাহ্মণৈঃ সা ন কর্তব্যা যতস্তে সাত্বিকা মতাঃ ) এই অগস্ত্য- সংহিতাবচনের টীকা এইরূপ ধৰ্ম্মসংহারক ১৩৮ পৃষ্ঠে লিখেন “এ স্থানে কোনো নিপুণমতি কহেন যে ব্রহ্মজ্ঞানীর সৰ্ব্বশাস্ত্রেই অহিংসা দর্শনে এবং ব্রাহ্মণ জাতির শাস্ত্রান্তরে বৈধ হিংসাবিধি শ্রবণে এই বচনে ব্রাহ্মণ শব্দে ব্রাহ্মণ জাতি নহে কিন্তু ব্ৰহ্মকে জানেন এই ব্যুৎপত্তির অনুসারে ব্রাহ্মণ শব্দে ব্রহ্মজ্ঞানী এই অর্থ সুতরাং বক্তব্য হয়।” উত্তর, এ বচনে ব্রাহ্মণের হিংসা ত্যাগের কারণ লিখেন, যে তাহারা সাত্বিক হয়েন ইহাতে ব্রাহ্মণ শব্দে ব্রাহ্মণ জাতিরই গ্রহণ হয়, ব্রাহ্মণেরা সত্বগুণপ্রধান হয়েন অতএব শম দমাদি তাহাদের প্রাধান্যরূপে কৰ্ম্ম হয় ( চাতুর্বর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ) এ শ্লোকের ব্যাখ্যাতে ভগবান্ শ্রীধর স্বামী সত্ত্ব প্রধান ব্রাহ্মণ হয়েন এই বিবরণ করিয়াছেন, এবং গীতার অষ্টাদশাধ্যায়ে লিখেন ( শমম দমশুপঃ ১০ ১৪৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ; শৌচং ক্ষান্তিরাজ্জবমেব চ। আনং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্ৰহ্ম কৰ্ম্ম স্বভাবজং) শম, দম, তপস্যা, শুচিতা, ক্ষমা, শরলতা, শাস্ত্রার্থজ্ঞান, অনুভব, আস্তিক্যবুদ্ধি, এ সকল সত্ত্বগুণপ্রধান যে ব্রাহ্মণ তাহাদের স্বাভাবিক কৰ্ম্ম হয়। অতএব সাংখ্যমতীয় অগস্ত্যসংহিতাবচনের স্পষ্টাৰ্থ এই যে যদ্যপিও যজ্ঞীয় হিংসা কর্তব্য হইয়াছে তথাপি ব্রাহ্মণেরা সাত্ত্বিক হয়েন ও শমদমাদি তঁাহাদের কর্ম এ কারণ বৈধ হিংসাও তাহাদের কৰ্তব্য নহে। অতএব এরূপ মুখ্য ও স্পষ্টার্থের সম্ভাবনা সত্ত্বে বিপরীতার্থের কল্পনা যে নিপুণমতি করিয়াছেন তিনি ধর্মসংহারক কিম্বা তাহার সহায় হইবেন; অধিকন্তু ব্ৰহ্মনিষ্ঠের প্রতিও বিহিত হিংসার নিষেধ নাই, ছান্দোগ্যশ্রুতিঃ ( আত্মনি সৰ্বেন্দ্রিয়াণি সংপ্রতিষ্ঠাপ্যাহিংস সর্বাণি ভূতানি অন্যত্র তীর্থেভ্যঃ) পরমাত্মাতে ইন্দ্রিয়সকল সংযােগ করিয়া বিহিত ব্যতিরেকে হিংসা করিবেন না। এবং পুরাণ ইতিহাসেতেও বশিষ্ঠ, ব্যাস, প্রভৃতি জ্ঞানীরা বিহিত হিংসা ও বিহিত মাংসাদি ভােজন আপনারা করিয়াছেন ও জনক যুধিষ্ঠির প্রভৃতি যজমানকে অশ্বমেধাদি হিংসাযুক্ত কৰ্ম্ম করাইয়াছেন, এইরূপ মহাকালসংহিতার ওই বচন সাংখ্যমন্তর্গত হয় বিশেষত ওই বচন বলিদানপ্রকরণে লিখিত হইয়াছে ইহাতেও তাবৎ বৈধ হিংসার অনুকল্পের অনুমতি বােধ হয় নাই। ১৩৯ পৃষ্ঠে পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তের বচন লিখেন তাহাতেও বৈধ হিংসার নিষেধ নাই কেবল জীবনার্থ ও স্বভক্ষণার্থ নিষিদ্ধ করিয়াছেন ইহা সর্বশাস্ত্ৰসিদ্ধান্ত সম্মত বটে। ১৪৫ পৃষ্ঠের শেষে লিখেন যে “কখন ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী কখন বা ভাবামাচারী” এবং ১৩০ পৃষ্ঠেও এইরূপ পুনঃ কথন আছে, কিন্তু ধর্মসংহারকের এরূপ লিখিবাতে আশ্চৰ্য্য কি যেহেতু তাহার এ বােধও নাই যে কুলাচার সর্বথা ব্ৰহ্মজ্ঞানমূলক হয়েন। সর্বত্র সংস্কার বিষয়ে বামাচারের মন্ত্র এই হয় (একমেব পরং ব্ৰহ্ম স্কুল- সুময়ং ধ্রুবং) এবং দ্ৰব্যশােধনে সর্বত্র বিধি এই (সৰ্ব্বং ব্রহ্মময়ং ভাবয়েৎ) এবং কুলধাতুর অর্থ সংস্ত্যান, অর্থাৎ সমূহ অর্থে বর্তে, অতএব সমূহ যে বিশ্ব তাহা কুল শব্দের প্রতিপাদ্য যাহা মহাবাক্যের তাৎপৰ্য্য হইয়াছে। কুলাৰ্চনদীপিকাত তন্ত্র- বচন ( অনেকজম্মনামন্তে কোলজ্ঞানং প্রপদ্যতে। ব্রতক্রতুতপস্তীর্থদানদেবার্চনাদিযু। তৎফলং কোটিগুণিতং কোলজ্ঞানং ন চান্যথা। কোলজ্ঞানং তত্ত্বজ্ঞানং ব্রহ্মজ্ঞানং তদুচ্যতে) তথাচ ( জীব প্রকৃতিতত্ত্বঞ্চ দিককালাকাশমেব চ। ফিত্যপতেজোবায়ব কুলমিত্যভিধীয়তে। ব্ৰহ্মবুদ্ধা নির্বিকল্প এতেষাচরণঞ্চ যৎ। কুলাচারঃ স এবাষ্টে ধর্ষকামার্থমােক্ষদঃ) পথ্য প্রদান ১৪৭ ১৪৮ পৃষ্ঠে ১৭ পংক্তিতে লিখেন যে “স্ব স্ব উপাসনা শব্দেই বা তাহার অভিপ্রেত কি—যদি ব্রহ্মোপাসনাই হয় তবে ব্রহ্মের উদ্দেশে পশুহাতের ও নিবেদনের বিধি ও মন্ত্রাদি কোন্ শাস্ত্রে লিখিত আছে তাহা জানিতে ইচ্ছা করি।” উত্তর, যাহার কিঞ্চিৎও শাস্ত্রজ্ঞান আছে তিনি অবশ্যই জানেন যে দেবতারাই কেবল যজ্ঞাংশভাগী হয়েন অতএব পরব্রহ্মের উদ্দেশে পশুঘাতের ও নিবেদনের বিধি ও মন্ত্রাদি কোন্ শাস্ত্রে লিখিত আছে এ প্রশ্ন করা সর্বপ্রকারে অযােগ্য হয়, বস্তুত (ব্ৰহ্মাৰ্পণং ব্ৰহ্ম হবিব্রহ্মাগ্নৌ ব্ৰহ্মণ মৃতং। হ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্ৰহ্মকম্মসমাধিনা) এবং ( ব্ৰহ্মাৰ্পণেন মন্ত্রেণ পানভােজনমাচরেৎ ) এই প্রমাণানুসারে ব্ৰহ্মাৰ্পণমন্ত্রের উল্লেখ পূৰ্ব্বক ব্রহ্মনিষ্ঠের পান ভােজন বিহিত হয় এবং পরব্রহ্মের সর্বময়ত্ব প্রযুক্ত ও তদ্ভিন্ন বস্তুর যথার্থত অভাবপ্রযুক্ত, পান ভােজন দ্রব্যের নিবেদন তাহার প্রতি সম্ভব নহে। অধিকন্তু অন্য দেবতার উদ্দেশে দত্ত যে সামগ্রী তাহা ভক্ষণের নিষেধ ব্ৰহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থের প্রতি নাই, ধৰ্ম্মসংহারক আপনিই স্বীকার করিয়াছেন যে অন্যে অন্যের নিবেদিত দ্রব্য ভােজন করিতে পারেন। ১৫১ পৃষ্ঠে ৫ পংক্তিতে লিখেন যে “অনিবেদ্য ন ভুঞ্জীত মৎস্যমাংসাদি কিঞ্চন, এ বচনে মৎস্য মাংসাদি তাবৎ দ্রব্যেরি স্বতঃ কিম্বা পরতঃ সামান্যত দেবতাকে অনিবেদিত ভােজনের নিষেধ প্রাপ্ত হইতেছে, অন্যথা অন্যে অন্যের নিবেদিত দ্রব্য এবং এক দেবতার উপাসক দেবতান্তরের প্রসাদ ভােজন করিতে পারেন না।” এরূপ কথনের দ্বারা ইহাও স্বীকার করিয়াছেন যে কোন দেবতাবিশেষের নৈবেদ্য ভােজন দ্বারা সেই দেবতাবিশেষের উপাসক হয় না। ১৪৭ পৃষ্ঠে ১৪ পংক্তিতে লিখেন যে “বেদোক্তেন বিধানেন ইত্যাদি মহানিৰ্বাণ- বচনে লােকযাত্রা শব্দে কেবল মদ্য মাংস ভােজনাদি এই অর্থ কি মহাদেব তাহার কানে কহিয়াছেন” আমাদের প্রথম উত্তরের ১৯ পৃষ্ঠে ঐ পূর্বোক্ত বচনের অর্থ এইরূপ লিখা গিয়াছে যে “জ্ঞানে যাহার নির্ভর তিনি সর্বযুগে বেদোক্ত বিধানে আর কলিযুগে বেদোক্ত কিম্বা আগমােক্ত বিধানে লােকাচার নির্বাহ করিবেন” অর্থাৎ ব্ৰহ্মনিরাে লৌকিক ব্যবহার কলিতে আগমােক্ত বিধানে করিতে সমর্থ হয়েন, এই বিবরণে মদ্য মাংস ভােজন এ শব্দও নাই, তবে সর্বদা মদ্য মাংস খাইবার লালসাতে ধৰ্মসংহারক স্বপ্নে এবং জাগ্ৰদবস্থায় কেবল মদ্য মাংসই দেখিতে পান, সুতরাং এরূপ প্রশ্ন করা তঁাহার কি আশ্চর্য্য যে “লােকযাত্রা শব্দে কেবল মদ্যমাংসাদি ভােজন এই অর্থ কি মহাদেব তাহার কানে কহিয়াছেন” বস্তুত শাস্ত্র- কর্তাদের গ্রন্থপ্রকাশের তাৎপৰ্য এই যে ওই সকল শাস্ত্র মনুষ্যের সাক্ষাৎ কিম্বা ১৪৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী পরম্পরায় কর্ণগােচর হয়, অতএব ভগবান্ মহেশ্বর ওই বচনপ্রাপ্ত “যাত্ৰা” শব্দের অর্থ আমাদের কর্ণে পরম্পরায় ইহা কহিয়াছেন যে সাংসারিক ব্যবহার অর্থাৎ সংস্কার ও বিত্তোপাৰ্জন, পােয্যবর্গ পালন ও আহারাদি, যাহা গৃহস্থের জন্যে ইহলােক নির্বাহে আবশ্যক, তাহা আগমােক্ত বিধানে সম্পাদন করিবেন (লােকস্তু ভুবনে জনে ইত্যমরঃ, যাত্রা স্যাৎ পালনে গতো ইতি) এবং ভগবান্ শ্রীধর স্বামী (শরীর- যাত্রাপি চ তে ন প্রসিদ্ধ্যেদকর্মণঃ) এই গীতাবচনের অর্থে লিখেন যে, কৰ্ম্মমাত্রও যদি তুমি না কর তবে শরীর নির্বাহও হইতে পারে না, এ স্থলে শরীরযাত্রা শব্দে শরীর নির্বাহ শ্ৰীধর স্বামীর কর্ণে ভগবান কৃষ্ণ কহিয়াছিলেন কি না ইহার নিশ্চয় ধৰ্ম্মসংহারক অদ্যাপি বুঝি করেন না। আর ঐ বচন অবলম্বন করিয়া ১৪৭ পৃষ্ঠে ১৭ পংক্তিতে দ্বিতীয় প্রশ্ন করেন যে “ঐ বচনে জ্ঞানীদের স্ব২ ধৰ্ম্মানুসারে নিবেদিত মাংসাদি ভােজনই বা কিরূপে প্রাপ্ত হয়”। উত্তর, আগমমাক্ত বিধানে যদি সংসার নিৰ্বাহাৰ্থ আহারাদি করিতে ব্ৰহ্মনিষ্ঠ সমর্থ হইলেন তবে ব্ৰহ্মাৰ্পণ সংস্কারে আগম- বিহিত মাংসাদি ভােজন অবশ্য প্রাপ্ত হইল ইহার বিশেষ বিবরণ পরিচ্ছেদের শেষে লিখা গেল পণ্ডিতেরা যেন অবলােকন করেন । আমরা প্রথম উত্তরের ১৮ পৃষ্ঠে লিখিয়াছিলাম যে “ধৰ্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীরা কিরূপে জানিয়াছেন যে অনিবেদিত মাংস ভােজন ও পরম হর্ষে ছেদন কেহ করিয়া থাকেন তাহার বিশেষ লিখেন নাই তিনি কি তত্তৎকালে উপস্থিত হইয়া নৃত্য কি উৎসাহ করিতে দর্শন করিয়াছেন” ইহার উত্তরে ধর্মসংহারক ১৩৫ পৃষ্ঠে লিখেন যে “ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর কি ভ্রান্তি, দর্শনের অপেক্ষা কি, দশের মুখে কে হস্ত প্রদান করে দশের বচনই সত্যাসত্যের প্রমাণ হয়”। উত্তর, দশের মুখই প্রমাণ এই নিয়ম যদি ধৰ্ম্মসংহারক করেন তবে এ বিশিষ্ট সন্তান আমাদের প্রতি যে পান ও হিংসার উল্লেখ করিবেন ততােধিক ওই দশ মুখ প্রমাণ দ্বারা তাহার অতি মায়ের ও অতি প্রিয়ের বর্ণনবাহুল্য আছে কিন্তু আমরা সে উদ্বেগজনক বাক্য কহিব না। ১৪৮ পৃষ্ঠে লিখেন যে “অতি শিশু ছাগলকে অল্প মূল্যে ক্রয় করিয়া কাহার বা পুরুষাঙ্গ হীনপূৰ্ব্বক উত্তম আহারাদি দ্বারা পালন করত— —অঙ্গুলির দ্বারা ভােজনের উপযুক্ততানুপযুক্তত্ব পরীক্ষণ করিয়া যখন বিলক্ষণ হৃষ্টপুষ্টাঙ্গ দর্শন করেন তৎকালে পরম হর্ষে বন্ধু বান্ধবের সহিত স্বহস্তে বহু প্রহারে ছেদনানন্তর দের পূরণ করিয়া থাকেন” উত্তর, এরূপ অলীক কথন যাহার স্বাভাবিক চিত্ত তাহা হইতে কদাপি হয় না, যদ্যপি এ অমূলক মিথ্যার সমুচিত উত্তর এই ছিল যে হিন্দুর সর্বথা, অভক্ষ্য যে পশু তাহার বৎসের ঐরূপ পালন ও পরে হিংসন ধৰ্মসংহারক স্বয়ং পথ্য প্রদান ১৪৯ করিয়া থাকেন কিন্তু অদ্যাবধি কে কোথায় অলীক বক্তা ব্যলীকের সহিত রাগান্ধ হইয়া অলীক কথন করিয়াছে। ১৪৬ ও ১৪৭ পৃষ্ঠে যাহা লিখেন তাহার তাৎপৰ্য্য এই যে এক ব্যক্তি পণ্ডিতসভাতে আপনাকে বৈদিক, স্মা, তান্ত্রিক রূপে প্রকাশ করাতে তাহাদের বিচার দ্বারা আপনাকে পশ্চাৎ কৃষিকৰ্ম্মকারী স্বীকার করিলেন। উত্তর, পণ্ডিতসভাতে এরূপ অপণ্ডিতের পাণ্ডিত্য প্রকাশে তাহার কেবল লজ্জাকর হয়, সেইরূপও অপণ্ডিতমণ্ডলীতে যথার্থ কথনের দ্বারা পণ্ডিতও অপমানিত হইয়াছেন ইহাও শ্রুত আছে যেমন মূর্খদের সভাতে কোনাে এক পণ্ডিত শাক, শাল্মলি, বক, ইহা কহিয়া তিরস্কৃত হইয়াছিলেন যেহেতু তাহারা শগ শিমুল বগ ইহাকেই শুদ্ধ জ্ঞান করিত। আমরা প্রথম উত্তরের ১৯ পৃষ্ঠে লিখি যে “পরমেশ্বরকে জন্ম মরণ চোৰ্য পারদাৰ্য্য ইত্যাদি দোষকে যথার্থ জানিয়া অপবাদ দিতে পারেন” তাহার উত্তরে প্রথমত ১৪১ পৃষ্ঠে ৭ পংক্তিতে লিখেন যে “শাভগবানের জন্ম,ও মরণ কি প্রকারে অযথার্থ কহা যায় এবং জনন মরণের প্রমাণের উদ্দেশে গীতা, বিষ্ণুপুরাণ, অগস্ত্যসংহিতাদির বচন লিখিয়াছেন পরে আপন এই পূর্বোক্ত বাক্যের অন্যথা করিয়া সিদ্ধান্তে ১৪৩ পৃষ্ঠে ১৩ পংক্তিতে লিখেন “অতএব পরমেশ্বরের জন্ম মৃত্যু শব্দ প্রয়োেগ লােকের ব্যবহারিক মাত্র কিন্তু বাস্তব নহে। অধিকন্তু ৪৫ পৃষ্ঠের ১ পংক্তিতে লিখেন যে “পরমার্থ বিবেচনায় মনুষ্যেরও জন্ম মৃত্যু কহা যায় না”। উত্তর, এ প্রমাণ বটে যে কি জীবের কি ভগবান্ রামকৃষ্ণ প্রভৃতির “পরমার্থ বিবেচনায় জন্ম মৃত্যু কহা যায় না” তবে কি প্রকারে ১১১ পৃষ্ঠে ৭ পংক্তিতে ধৰ্ম্মসংহারক লিখিলেন যে “ভগবানের জনন ও মরণ কি প্রকারে অযথার্থ কহ যায়” এখন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন যে আমরা লিখিয়াছিলাম যে ধৰ্ম্মসংহারক পরমেশ্বরে জন্ম মরণাদি দোষকে যথার্থ বােধে দিতে পারেন তাহ। তাহাদেরই প্রথম বাক্যানুসারে প্রমাণ হইল কিনা। ভগবদগীতাশ্লোকের অর্থকে যে অন্যথা কল্পনা করিয়াছেন তাহার যথার্থ বিবরণ লিখা আবশ্যক জানিয়া লিখিতেছি (বহুনি মে ব্যতীতানি) এই শ্লোকের ব্যাখ্যাতে ১৪১ পৃষ্ঠে ১৫ পংক্তিতে লিখেন যে “আমি মায়ারহিত এ কারণ আমার সকল স্মরণ হয়” কিন্তু শ্রীধর স্বামী লিখেন যে ( অলুপ্তবিদ্যাশক্তিত্বাৎ ) অর্থাৎ আমার বিদ্যা মায়া, যাহার প্রকাশ স্বভাব হয়, সুতরাং আমার সকল স্মরণ হয়। এবং ইহার পরশ্লোকে স্পষ্টই কহিতেছেন (প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া) আমি শুদ্ধসত্ত্বস্বরূপ আপন মায়াকে স্বীকার করিয়া শুদ্ধ ও তেজস্বী সত্ত্বাত্মক মূর্তিবিশিষ্ট হইয়া অবতীর্ণ হই। অতএব মূর্তি যদ্যপিও বিশুদ্ধ, তেজস্বী, সত্ত্বগুণাত্মক হয়েন তথাপিও সে ১৫০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী মায়াকাৰ্য্য। এবং ঐ অর্থকে আরাে দৃঢ় করিতেছেন শারীরকভাষ্যধৃত স্মৃতি ( মায়া হে ময়া সৃষ্ট। যক্ষ্মাং পশ্যসি নারদ। সৰ্ব্বভূতগুণৈযুক্তং নৈবং মাং জ্ঞাতুমহসি) হে নারদ সৰ্ব্বভূত গুণবিশিষ্ট আমাকে যে দেখিতেছ এ মায়ার সৃষ্টি আমি করিয়াছি কিন্তু এরূপ আমাকে যথার্থ জানিবে না। অধ্যাত্মারামায়ণে (পশ্যামি রাম তব রূপমরূপিণণাপি মায়াবিড়ম্বনকৃতং সুমনুষ্যবেশং) হে রাম রূপহীন যে তুমি তােমার যে এই সুন্দর মনুষ্যবেশ দেখিতেছি সে কেবল মায়াবিড়ম্বনাতে কৃত হয়। দেবী- মাহাত্ম ( বিষ্ণুঃ শরীরগ্রহণমহমীশান এবচ। কারিতাস্তে যতােহতত্ত্বাং কঃ স্তোতু শক্তিমান্ ভবেৎ) অর্থাৎ যেহেতু বিষ্ণু ও আমি এবং মহাদেব আমরা যে শরীর গ্রহণ করিয়াছি, হে মহামায়, সে তুমি আমাদের দ্বারা করিয়াছ অতএব কে তােমাকে স্তব করিতে সমর্থ হয়। বিষ্ণুর অনিবেদিত মৎস্য মাংস ভােজনের বিষয়ে দোষ ক্ষালনের নিমিত্ত ১৫২ পৃষ্ঠে ১০ পংক্তিতে লিখেন “যদি স্বীয় ইষ্টদেবতাকে অনিবেদ্য যে দ্রব্য তাহাতে প্রবৃত্তি হয় তবে স্বতঃ কিম্বা পরত দেবতান্তরের নিবেদিত করিয়া ভােজনে তঁাহার বাধা কি যেহেতু দেবতাকে অনিবেদিত দ্রব্যের ভােজনেই শাস্ত্রীয় নিষেধ প্রাপ্ত হইতেছে”। উত্তর, এ বিধি বিষ্ণুপাদকের প্রতি সম্ভবে না, যেহেতু স্মাৰ্ত্তধৃত বহ্বচগৃহপরিশিষ্টচনে এবং নানা বৈষ্ণবশাস্ত্রের প্রমাণে বিষ্ণুপাসকের অন্যদেবতা- নৈবেদ্য ভক্ষণে প্রায়শ্চিত্তশ্রুতি আছে যথা (পবিত্রং বিষ্ণুনৈবেদ্যং সুরসিদ্ধর্ষিভিঃ মৃতং। অন্যদেবস্য নৈবেদ্যং ভুক্ত। চান্দ্রায়ণং চরেৎ ) দেবতা, সিদ্ধগণ ও ঋষি- সকল ইহারা বিষ্ণুনৈবেদ্যকে পবিত্র করিয়া জানেন অন্য দেবতার নৈবেদ্য ভক্ষণ করিয়া চান্দ্রায়ণ ব্রত করিবেক। বাস্তবিক এই ব্যবস্থার দ্বারা ইহা জানাইয়াছেন যে ধৰ্ম্মসংহারকের মৎস্যাদিতে এ পর্যন্ত লােভ যে তাহার স্বীয় ইষ্টদেবতার অনিবেদিত হইলেও তাহাকে স্বত কিম্বা পরত দেবতান্তরকে দিয়া ভােজন করেন, অতএব ১৪৮ পৃষ্ঠে যাহা লিখেন “যদি পঞ্চ দেবতার মধ্যে দেবতাবিশেষের উপাসনা হয় তবে কেবল ভােজনকালেই স্মরণ প্রযুক্ত সুতরাং তেঁহ ভাক্ত কৰ্মীর অন্তঃপ্রবিষ্ট হইবেন” সেই কথনের বিষয় তেঁহ আপনিই হইলেন কি না। ১৫৩ পৃষ্ঠে লিখেন যে “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীর সজ্জনতাতে ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর মৎসরতার ভ্রম এবং ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানীর প্রারন্ধের ভােগে ধৰ্ম্মসংস্থাপনকাক্ষীর ঐহিক ভােগের ভ্রম, সজ্জনের এই স্বভাব যে সদ্বংশজাত ব্যক্তি সকলকে অসৎ কর্মে প্রবৃত্ত দেখিলে তাহাদিগ্যে সদুপদেশ দ্বারা নিবৃত্ত করান তাহাতেও যদি না হয় তিরস্কার করিয়া থাকেন” উত্তর, কোন ব্যক্তিবিশেষেরা দেদীপ্যমান শাস্ত্রের প্রমাণের দ্বারা যে কৰ্ম্ম করেন তাহাকে অন্য কোনাে ব্যক্তি অসৎ কৰ্ম্মরূপে প্রমাণ করিবার ইচ্ছুক পথ্য প্রদান হইয়া পরে প্রমাণ করিতে অসমর্থ হইয়াও সেই সকল ব্যক্তির প্রতি কুকৰ্মী ও তাহাদের আহারকে অশুচি ইত্যাদি পদের উল্লেখ করেন, ইহাতেও তাহাকে মৎসর না কহিয়া যদি সুজনের মধ্যে গণিত করা যায় তবে দুৰ্জ্জন ও মৎসর পদের বাচ্য প্রায় দুর্লভ হইবেক। বস্তুত সজ্জনেরা যদি কাহারাে আহারকে দূষ্য ও কর্মকে নিন্দিত জানেন তথাপি যে পর্যন্ত বিচারপূর্বক তাহার দূষ্যত্ব প্রমাণ না করিতে পারেন কদাপি ভােজ্য ও ভােক্তার প্রতি দুৰ্বাক্য কহেন না, বরঞ্চ বিচারে পরাস্ত করিলেও তঁাহার সৌজন্যের বাধ্য হইয়া নীচের ভাষা কদাপি কহিতে সমর্থ হয়েন না। ১৫৫ পৃষ্ঠে লিখেন “কেহ কাহারাে প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ভােগ কদাচ নিবারণ করিতে পারেন না তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ কীট পক্ষী গবাদি ও শূকর, ইহারা উত্তম আহার দ্বারা গৃহস্থের গৃহে প্রতিপালিত হইলেও প্রারক্কের গুণে পতঙ্গ উচ্ছিষ্ট পত্র ও মলমূত্র ভক্ষণে ব্যাকুল হয়”। উত্তর, এ উদাহরণের দ্বারা ধৰ্মসংহারক স্বহস্তলগ্ন খগের দ্বারা আপন মস্তকছেদ করিয়াছেন, যেহেতু বিশেষ ধনবত্তা থাকিতেও পশুরও অগ্রাহ্য দ্রব্যকে সর্বাগ্রে ভক্ষণ করিতেছেন আর দেবতা এবং বশিষ্ঠাদি ঋষিরা ও রামকৃষ্ণ প্রভৃতি মূৰ্ত্তিরা যে মাংস দুর্লভ জানিয়া আহার করিতেন, তাহা ত্যাগ করিয়া পর্যষিত শাক ও তিক্ত পত্রাদিকে অতি প্রিয় আর জ্ঞান করেন অতএব তাহার প্রতিই তাহার উদাহরণ অবিকল সঙ্গত হয়। :৫৬ ও ১৭৭ পৃষ্ঠে গীতার বচনানুসারে আহারের সাত্ত্বিক ও তামসতা কহিয়াছেন “যে ভােগ ভােক্তার আয়ু, উৎসাহ, বল, আরােগ্য, সুখ ও প্রীতির বর্ধক এবং মধুর স্নিগ্ধ স্থির ও হৃদগত হয় সেই ভােজন সাত্ত্বিকের প্রিয় তাহার নাম সাত্ত্বিক—প্রহরাতীত, বিরস, দুর্গন্ধ, পযুষিত, উচ্ছিষ্ট, অথবা অস্পৃশ্য এই প্রকার যে কদৰ্য ভােগ সেই তামসদিগের প্রিয় তাহার নাম তামসিক”। উত্তর, বিজ্ঞ লােক ঐ দুই বচনের অর্থ বিবেচনা করিবেন যে আয়ু উৎসাহ বল আরােগ্য ইত্যাদিবৰ্ধন গুণ ঘূত মাংসাদি আহারে থাকে কি ঘাস মৃত মৎস্য ইত্যাদি আহারে জন্মে। বচনস্থ (রাঃ) এই পদের অর্থ শ্রীধর স্বামী লিখেন যে ( রসবন্তঃ ) ধর্মসংহারক লিখেন (মধুরঃ) আর শেষ বচনস্থ (অমেধ্যং) এই পদের অর্থ স্বামী লিখেন যে ( অভক্ষ্য কলঞ্জাদি) কিন্তু ধর্মসংহারক লিখেন ( অস্পৃশ্য )। সংপ্রতি পূর্বোক্ত বিবরণকে বােধসুগমের নিমিত্ত সংক্ষেপে লিখিতেছি, সাস্থ্যমতে এবং অন্য কোন শাস্ত্রে বৈধ হিংসাতেও পাপ লিখিয়াছেন, পরন্তু মঘাদি স্মৃতি ও মীমাংসা, বেদান্তাদি শাস্ত্রে ও ভগবদগীতাতে এবং প্রাচীন নব্য সংগ্রহেতে বিহিত হিংসা ১৫২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী গুড় চিনি পাপজনক নহে ইহা লিখেন ; তাহাতে ভগবান্ মহেশ্বর বিহিত হিংসাকে যুক্তি দ্বারা সঙ্গত করিয়া ভূরি তন্ত্রে তাহার কর্তব্যতার আজ্ঞা দিয়াছেন, তথা কুলতন্ত্রে (জলং জলচরৈমিশ্রং দুগ্ধং গােমাংসনিঃসৃতং। অন্নানি মেদজাতানি নিরামিষং কথং ভবেৎ ) অর্থাৎ লােকে নিরামিষ ভােজনের সম্ভাবনা নাই যেহেতু জল পান ব্যতিরেক মনুষ্যের প্রাণ ধারণ হয় না সে জল মৎস্য, শামুক ও ভেক, সর্পাদির ক্লেদে মিশ্রিত হয় এবং জলীয় কীট যাহা সূক্ষ্মদর্শনযন্ত্রের দ্বারা সকলেরি প্রত্যক্ষসিদ্ধ সেই সকল কীটেতেও জল পরিপূর্ণ হইয়াছে অতএব জল পান দ্বারা ঐ ক্লেদ পান ও কীট ভক্ষণ হইতে পরিত্রাণ নাই, সেইরূপ দুগ্ধ গোমাংস হইতে নিঃসৃত হয় যেহেতু গবীর আহারের পরিমাণে ও আহারের গন্ধানুসারে দুগ্ধের পরিমাণ ও গন্ধ হইয়া থাকে ইহা দেখিয়াও বয়ঃপ্রাপ্ত জ্ঞানবান্ ব্যক্তিরা তাহা পান করেন আর তাবৎ অন্ন গােধূমাদি মধুকৈটভের শরীর যে এই মেদিনী তাহা হইতে উৎপন্ন হয়, এবং মনুষ্য ও পশ্বাদি তাবৎ জীবের মৃত শরীর ও শরীরের ত্যক্ত ক্লেদ ইহা প্রতক্ষ্য মৃত্তিকারূপে অল্পকালেই পরিণত হইতেছে যাহাতে শস্যাদি উৎপন্ন হয়, পরে সেই শস্য সকলের আহার হইয়াছে। বিশেষ আশ্চৰ্য্য এই যে যাহারা বিহিত আমিষ ভােজনে উৎসাহপূৰ্ব্বক নিন্দা করেন তাঁহারাই স্বয়ং অবিহিত আমিষ ভােজন বারম্বার করিয়া থাকেন। প্রভৃতি দ্রব্যে পিপীলিকা কীটাদি পতিত হইবাতে তাহার শরীরনির্গত রসে ওই সকল বস্তু মিশ্রিত হয়, তাহা প্রত্যক্ষ দেখিয়া সেই২ দ্রব্যকে পানযােগ্য করিবার নিমিত্ত জলসংযুক্ত করেন, পরে ছানিবার সময়ে ঐ দ্রব্যের ও মৃত পিপীলিকা কীটাদির সুল অংশ পরিত্যাগ করিয়া সূক্ষ্ম অংশের গ্রহণ করিয়া থাকেন, সেইরূপ ঘৃতাদিতে পতিত কীট পিপীলিকাদির রসকে অগ্নিসংযােগ দ্বারা নিঃসৃত করিয়া পরে ছানিবার দ্বারা তাহার স্কুল অংশ বর্জন ও সূক্ষ্ম অংশ গ্রহণ করেন, সেইরূপ প্রত্যক্ষ- সিদ্ধ মৃত মক্ষিকা ও তাহার বৎস ও ক্লেদ এ সকল সম্বলিত চাকের পিপীড়নপূর্বক মধু গ্রহণ ও পান করেন। এইরূপ নানাবিধ প্রত্যক্ষসিদ্ধ আমিষ ভােজন শত বচন থাকিলেও বস্তুত নিরামিষ ভােজন হইতে পারে না, তবে বচনবলে এ সকলের দোষ নিবারণের যত্ন করা উভয় পক্ষেই সমান হয় অর্থাৎ বিহিত মাংস ভােজনের নির্দোষত্বে এইরূপ শত২ বচন আছে। অতএব বাস্তবিক নিরামিষের অসম্ভাব্য প্রযুক্ত অবিহিত আমিষের নিষেধপূর্বক বিহিত আমিষের বিধান ভগবান্ পরমারাধ্য করিতেছেন, কুলার্ণবে (তৃপ্ত্যর্থং সর্বদেবানাং ব্রহ্মজ্ঞানােবায় চ। মধুমাংসানি তৃষ্ণয়া চেৎ স পাতকী) সৰ্ব্বদেবতার তুষ্টির ও ব্রহ্মজ্ঞানের উৎপত্তির নিমিত্ত মধু ও মাংস সেবন করিবেক, লােভপ্রযুক্ত অবিহিত ভােজন করিলে পাতকী সেহবত পথ্য প্রদান হয়। ইতি তৃতীয় প্রশ্নের দ্বিতীয় উত্তরে ভূরিকৃপাবলােকো নাম পঞ্চমপরিচ্ছেদঃ সমাপ্তং তৃতীয়প্রশ্নোত্তরং। ; চতুর্থ প্রশ্নের উত্তর ধৰ্ম্মসংহারক ১৬০ পৃষ্ঠে (যৌবনং ধনসম্পত্তিঃ প্রভুত্বমবিবেকতা। একৈকমপ্যনর্থায় কিমু তত্র চতুষ্টয়ং) এই শ্লোককে অবলম্বন করিয়া ১৪ পংক্তি অবধি লিখেন যে “এই নীতিশাস্ত্রের বচনের তাৎপৰ্য্য নহে যে এই যৌবনাদি চতুষ্টয় ব্যক্তিমাত্রেরি অনর্থের কারণ কিন্তু দুঃশীল দুর্জনদিগের সকল অনর্থের সাধন হয়” এবং রাবণ ও বিভীষণাদির দৃষ্টান্ত দিয়া পরে ১৬১ পৃষ্ঠের ১১ পংক্তিতে লিখেন যে “ইদানীন্তন অনেক দুর্জন, ও সুজনেরও যৌবনাদিতে দৌর্জ্য ও সৌজন্য প্রকাশ হইতেছে।” উত্তর, আমাদের প্রথম উত্তরে সামান্যতঃ কথন ছিল যে কেহ পিতা অবর্তমানে যৌবন, ধন, প্রভুত্ব, অবিবেকতাপ্রযুক্ত অনর্থ করিতেছেন; কেহ বা পিতা বিদ্যমান প্রযুক্ত ধন ও প্রভুত্ব তাহার নাই কেবল যৌবন ও অবিবেকতাপ্রযুক্ত নানা অনর্থকারী হয়েন। তাহাতে আমাদের এই বাক্যকেই ধৰ্ম্মসংহারক বস্তুত আপন প্রত্যুত্তরে দৃঢ় করিয়াছেন যে যৌবন, ধন, ইত্যাদি দুর্জনেরি অনর্থের কারণ হয়, সংপ্রতিক ব্যক্তির কাৰ্য দেখিয়া দৌর্জন্য কিম্বা সৌজন্য বিবেচনা করা উচিত,-ধৰ্ম্মসংহারকের সেরূপ বিভব ও অমাত্য ও সৈন্য সেনাপতি নাই যে যাহার প্রতি দ্বেষ হয় তাহাকে বধ কিম্বা দেশ হইতে নির্যাপনরূপ অনর্থ করিতে পারেন, কেবল কিঞ্চিৎ বিভব আছে যাহার দ্বারা ছাপা করিবার ব্যয়ে কাতর না হয়েন, তাহাতেই প্রমত্ত হইয়া শাস্ত্রীয় বিচারস্থলে প্রশ্নচতুষ্টয়ের ও প্রত্যুত্তরের ছলে এরূপ দুৰ্বাক্য, যাহা অতি নীচেও কহিতে সঙ্কোচ করে, তাহা স্বজন ও অন্যকে কহিয়া নানা অনর্থের মূলীভূত হইতেছেন। যদি শাস্ত্রীয় বিচার অভিপ্রেত ছিল তবে চণ্ডাল, কুকুর, শূকর, ইত্যাদি পদ প্রয়ােগ বিনা কি শাস্ত্রীয় বিচার হইতে পারে না। এবং ঐ পৃষ্ঠেতে আপন সৌজন্যের প্রমাণ লিখেন যে “কেহ ধর্মসংস্থাপনাকাক্ষিরূপে বিখ্যাত” যদি স্বগৃহীত নাম লােকের সদ্গুণের প্রমাণ হয় তবে মনসাপােতার দ্বিজরাজ সর্বোত্তমরূপে মান্য কেন না হয়েন। ১৬২ পৃষ্ঠের শেষে লিখেন যে “সুশীল সুজনদিগের—বৃথা কেশচ্ছেদন, সুরাপান, সম্বিদা ভক্ষণ, যবনীগমন ও বেশ্যা সেবন সর্বকালেই অসম্ভব”। উত্তর, এ যথার্থ বটে, অতএব ধর্মসংহারকে যদি ইহার ভূরি অনুষ্ঠান দৃষ্ট হয় তবে দুর্জন পদ প্রয়ােগ ১৫৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী তাহার প্রতি সঙ্গত হয় কি না? শৈব ধৰ্ম্মে গৃহীত স্ত্রীকে পরস্ত্রী কহিয়া নিন্দা করিয়াছেন, অতএব জিজ্ঞাসি যে বৈদিক বিবাহে বিবাহিত স্ত্রীসঙ্গে পাপাভাবে কি প্রমাণ? সেও বাস্তবিক অর্ধাঙ্গ হয় না, যদি স্মৃতিশাস্ত্রপ্রমাণে বৈদিক বিবাহিত স্ত্রীর স্ত্রীত্ব ও তৎসঙ্গে পাপাভাব দেখান তবে তান্ত্রিকমন্ত্ৰগৃহীত স্ত্রীর স্বস্ত্রীত্ব কেন না হয়, শাস্ত্রবােধে স্মৃতি ও তন্ত্র উভয়েই তুল্যরূপে মান্য হইয়াছেন একের মান্যতা অন্যের অমান্যতা হইবাতে কোনাে যুক্তি ও প্রমাণ নাই। ১৬৩ পৃষ্ঠে ৪ পংক্তিতে সম্বিদার সুরাতুল্যত্বে প্রমাণ চাহিয়াছেন। উত্তর, যে শাস্ত্রানুসারে মন্ত্র গ্রহণ ও উপাসনা করিতেছেন, সেই শাস্ত্রেই দিব্য, বীর, পশু, তিন ভাব উপাসকেদের লিখেন, তাহাতে পশু ভাবে মাদক দ্রব্য মাত্রের নিষেধ করিয়াছেন, যথা কুলাৰ্জনচন্দ্রিকাবৃত কুজিকাতন্ত্র (পত্রং পুষ্পং ফলং তােয়ং স্বয়মমবাহরেৎ পশু। ন পিবেম্মাদকদ্রব্যং নামিষঞ্চাপি ভক্ষয়েৎ ) তথা (সম্বিদা- সবয়ােমধ্যে সম্বিদেব গরীয়সী)। ১৬৩ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে লিখেন যে “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদের কোনাে ব্যক্তির যৌবনাবস্থাতেও কেশের শুক্লতা দৃষ্ট হইতেছে, যদি তাহারা যবনের কৃত কলপের দ্বারা কেশের কৃষ্ণতা করিতেন তবে শুক্লতার প্রত্যক্ষ কি সপক্ষ কি বিপক্ষ কাহারাে হইত না”। উত্তর, ধর্মসংহারকের নিয়মই এই যে প্রত্যক্ষ প্রলাপ ও অযথার্থ কথনের দ্বারা জগৎকে প্রতারণা করিবেন, অদ্যাবধি এমৎ কলপ কোথায় জন্মিয়াছে যে একবার গ্রহণে কেশের শুক্ল কি সপক্ষ কি বিপক্ষ কাহারও প্রত্যক্ষ না হয় ? কলপ দিবার দুই তিন দিবস পরে কেশ বৃদ্ধি হইবার দ্বারা তাহার মূলের শুক্ল সপক্ষ বিপক্ষ সকলেরি প্রত্যক্ষ হয়। আর এই পৃষ্ঠের শেষে ধর্মসংহারক বুঝি স্বপ্নে দেখিয়া লিখিয়াছেন যে অস্মদাদির মধ্যে কোনাে ব্যক্তি কৃত্রিম দন্ত ও মেষের স্যায় বক্ষঃস্থলের লােম মুণ্ডন ও সমুদায় মস্তকের মুণ্ডন করিয়া থাকেন, এ উম্মত্ত- প্রলাপের কি উত্তর আছে, যদি কোনাে ব্যক্তি অসুদাদির মধ্যে বার্ধক্যের প্রত্যক্ষ- ভয়ে এরূপ করিয়া থাকেন, যাহা আমরা জ্ঞাত নহি, তবে তিনি ধৰ্ম্মসংহারকেরই তুল্য এতদংশে হইবেন। ১৬৪ পৃষ্ঠে ১১ পংক্তিতে লিখেন যে “যদি প্রধান ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানীর মানিত হইয়া কোনাে ক্ষুদ্র ভক্ত তত্ত্বজ্ঞানী মিথ্যা বাণী কহেন যে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষীদিগের মধ্যেও কোনাে ব্যক্তিকে যবনীগমনাদি করিতে আমরা দর্শন করিয়াছি, তবে সেই সাক্ষীর প্রামাণ্য কিরূপে হইতে পারে, যেহেতু শাস্ত্রে তাদৃশ দুষ্ট ব্যক্তিদিগ্নের অসাক্ষি কহিতেছেন”। উত্তর, প্রামাণ্যভয়ে সাক্ষীকে দুষ্ট কহা কেবল পথ্য প্রদান ধৰ্ম্মসংহারকেরই বিশেষ স্বভাব হয় এমৎ নহে, কিন্তু সামান্যত চোর ও ব্যভিচারী তত্তদ্দোষ প্রমাণ হইবার সময়ে সাক্ষীকে দুষ্ট ও অপ্রমাণ কহিয়াই থাকে, বরঞ্চ গ্রামের সকল লােককে আপন বিপক্ষ কহিয়া নিস্তারের পথ অন্বেষণ করে, কিন্তু চোর দুরাচার জগতের মুখ রুদ্ধ করিয়া অস্বীকারবলে কবে নিস্তার পাইয়াছে। ১৬৭ পৃষ্ঠে ১৬ পংক্তিতে ধৰ্ম্মসংহারক লিখেন যে “প্রয়াগাদি সপ্ত আর প্রায়শ্চিত্ত চূড়া এই নয় প্রকার কেশ ছেদের নিমিত্ত হয় তাহার কোন নিমিত্তপ্রযুক্ত যে কেশ ছেদ তাহার নাম নৈমিত্তিক কেশ ছেদ পরে ১৬৮ পৃষ্ঠে ৪ পংক্তিতে এই বচন লিখেন “( প্রয়াগে তীর্থযাত্রায়াং মাতাপিত্রোগুরৌ মৃতে। আধানে সােমপানে চ বপনং সপ্তসু স্মৃতং)—প্রায়শ্চিত্ত ও, চূড়াতে কেশ ছেদন প্রসিদ্ধই আছে” এ স্থলে জিজ্ঞাস্য এই যে ঐ বচনপ্রাপ্ত যে বপন শব্দ তাহার তাৎপৰ্য যদি সৰ্বকেশমুণ্ডন হয়, তবে প্রয়াগ ও প্রায়শ্চিত্তাদি স্থলে কেবল ঐ বচনানুসারে ব্যবস্থার ব্যবহার দেখা যায় কিন্তু পিতৃ মাতৃ গুরু মরণে ও আধানাদিতে ঐ বচন প্রাপ্ত ব্যবস্থার অনাদর দেখিতেছি, আর যদি শিখা ব্যতিরিক্ত মুণ্ডন ওই বচনস্থ বপন শব্দের অর্থ হয়, তবে প্রয়াগ ও প্রায়শ্চিত্তাদি স্থলে ঐ বচনপ্রাপ্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধ ব্যবহার দৃষ্ট হইতেছে, তাহাতে অন্য বচনের সহিত একবাক্যতা করিয়া মিতাক্ষরাকার প্রয়াগেও শিখা ব্যতিরিক্ত কেশ বপন অঙ্গীকার করেন, কিন্তু স্মাৰ্ত্ত ভট্টাচাৰ্য প্রয়াগাদিতে বচনান্তর প্রমাণে সৰ্বমুণ্ডন কৰ্তব্য কহিয়াছেন, সেইরূপ পূর্ণাভিষেকীরা বিশেষ সংস্কারে শিখা ত্যাগে পাপবুদ্ধি করেন না। যদি আমাদের মধ্যে মস্তকের উৰ্দ্ধভাগে গ্রন্থিবন্ধন- যােগ্য কেশের বপন কেহ করিয়া থাকেন, তদ্বিষয়ে আমরা প্রথম উত্তরে ২১ পৃষ্ঠে লিখিয়াছি যে “এরূপ ক্ষুদ্র দোষে মহাপাতকশ্রুতি যে সকল বিষয়ে আছে তাহার ক্ষয়ের নিমিত্ত ওইরূপ অল্পায়াসসাধ্য অন্নহিরণ্যাদি দানরূপ উপায়ও আছে” অর্থাৎ নিন্দাবচনপ্রাপ্ত ব্ৰহ্মহত্যাদি পাপ স্তুত্যৰ্থ বচনপ্রাপ্ত ব্ৰহ্মহত্যাদির প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা নাশকে পায় এবং ইহার প্রমাণের নিমিত্ত আমরা তিন বচন লিখিয়াছিলাম, যাহার তাৎপৰ্য্য এই ছিল যে অন্ন হিরণ্যাদি দানে ব্রহ্মহত্যাদি পাপক্ষয় হয় আর ক্ষণমাত্রও জীব ও ব্রহ্মের ঐক্য চিন্তা করিলে সর্বপাপ নষ্ট হয়। তাহার প্রত্যুত্তরে ধর্মসংহারক ১৭০ পৃষ্ঠে ১৫ পংক্তি অবধি লিখেন যে “বৃথাকেশচ্ছেদনে শিখাবিরহে সুতরাং শিখা- বন্ধনের অভাবে সেই শিখারহিত ব্যক্তির তৎকৃত সন্ধ্যা বন্দনাদি কর্মের প্রত্যহ বৈগুণ্য জন্মে” পরে ১৭১ পৃষ্ঠে স্মৃতিবচন লিখিয়া ৮ পংক্তিতে লিখেন যে “শিখার অভাবে ক্রমে ঐ পাপ মহাপাতকতুল্য হয় যেমন উপপাতক ক্ৰমে বৃদ্ধি হইয়া মহাপাতককেও লঙ্ঘন করে এবং ক্রমে ব্রাহ্মণ্যাদিরও হানি হইতে থাকে” উত্তর, রামমােহন-গ্রন্থাবলী এ আশ্চৰ্য্য ধৰ্ম্মসংহারক, আপন প্রত্যুত্তরের ১৫ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে লিখিয়াছেন “উদিতে জগতীনাথে ইত্যাদি বচনের এ তাৎপৰ্য নহে যে সূর্যোদয়ানন্তর দন্ত- ধাবনকর্তা বিষ্ণুপূজাদিরূপ কৰ্ম্মে অনধিকারী হয়, যেহেতু দন্তধাবন স্নান ও আচমন তাবৎ কর্মের কতৃসংস্কাররূপ অঙ্গ, তাহার যথােক্ত কাল ও মন্ত্রাদির বৈগুণ্যে অনধিকারিকৃত কৰ্ম্মের ন্যায় যথােক্তকাল মাদিরহিত দম্ভধাবনাদিকৰ্ত্তার কৃত দৈব ও পৈত্ৰ কৰ্ম্ম অসিদ্ধ হয় না এবং প্রতিদিনকৰ্তব্য সন্ধ্যা বন্দনাদি বিষ্ণুপূজাদি কৰ্ম্ম যথাকথঞ্চিপে কৃত হইলেও সিদ্ধ হয়” এখন পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন যে ধৰ্ম্মসংহারক আপনি সূর্যোদয়ের ভূরি কালানন্তর প্রত্যহ প্রায় গত্রোখান করেন এ নিমিত্ত লিখেন যে “যথােক্ত কাল দন্তধাবনাদিরহিত কৰ্ত্তার কৃত দৈব ও পৈত্র কর্ম অসিদ্ধ হয় না এবং প্রতিদিনকৰ্তব্য সন্ধ্যা বন্দনাদি বিষ্ণুপূজাদি কৰ্ম্ম যথাকথঞ্চিপে কৃত হইলেও সিদ্ধ হয়” কিন্তু ধৰ্ম্মসংহারকের দ্বেষ ব্যক্তির প্রতি ব্যবস্থা দিতেছেন, যে শিখাবন্ধনাভাবে প্রত্যহ বৈগুণ্য জন্মিয়া ঐ পাতক ক্রমে মহাপাতককেও লঙ্ঘন করে এবং ক্রমে ব্রাহ্মণ্যাদিরও হানি হইতে থাকে, অথচ সূর্যোদয়ের পূর্বে গাত্রোত্থানের অভাবে প্রত্যহ ক্রিয়াবৈগুণ্য হইলেও সেই পাপ ক্রমে বৃদ্ধি হইয়া ধৰ্মসংহারকের প্রতি মহাপাতক হয় না; অতএব দ্বেষেতে যে মনুষ্য অন্ধ হইয়া পূর্বাপর এরূপ অনম্বিত কহেন তিনি শাস্ত্রীয় আলাপের যােগ্য কিরূপে হয়েন। ১৭২ পৃষ্ঠের ১৫ পংক্তিতে লিখেন যে “স্ত্রী পুত্ৰাদিকে অন্ন দান কে না করিয়া থাকে? অতএব ঐ বচনে অনুদান শব্দে অনুদানব্রত কহিতে হইবেক” আমরা প্রথম উত্তরে এরূপ লিখি নাই যে স্ত্রী পুত্রকে ও বেতন গ্রহীতা ভৃত্যকে অনুদান করিলে পাপক্ষয় হয়, অতএব কিরূপে এ আশঙ্কা করিতে ধৰ্ম্মসংহারক সমর্থ হইলেন? আর সামান্য অনুদানাপেক্ষা অনুদানব্রতে ফলাধিক্য বটে কিন্তু ও বচনে যে অনুদান পদের তাৎপর্য অনুদানব্রতই হয় তাহার প্রমাণ লিখা ধৰ্ম্মসংহারকের উচিত ছিল, যেহেতু সামান্য অনুদানে পরম ফল প্রাপ্ত হইয়াছে ইহা ক্রিয়াযােগর প্রভৃতি পুরাণে ও ইতিহাসে দৃষ্ট হয়। কেশছেদন বিষয়ে ১৭৩ পৃষ্ঠে ? পংক্তিতে লিখেন যে “সুবর্ণাদি দানে সাধারণ পাপের ক্ষয় হয় ইহাও যথার্থ, যদ্যপি তাহারাও কদাচিৎ২ সুবর্ণদান করিয়া থাকেন তথাপি তাহাতে তৎপাপের ক্ষয় হয় না, যেহেতু তৎপাপে পুনঃপুনৰ্ব্বার প্রবৃত্ত হইলে তাহার নিবৃত্তি কোনাে প্রকারে হইতে পারে না” এবং ওই প্রকরণে এক বচন লিখিয়াছেন যে পুনঃ২ পাপ করিলে তাহাকে গঙ্গা পবিত্র করেন না; এবং ১৭৪ পৃষ্ঠের শেষের পংক্তিতে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে “পুনঃপুনৰ্ব্বার তাদৃশ পাপকারী লােকেরা পাপকর্মে রত হয় তাহাদের নিস্তার সর্বপাপনাশিনী পতিতােস্কারিণী পথ্য প্রদান ত্রিভুবনতারিণী গঙ্গাও করেন না”। উত্তর, কর্মনিষ্টের প্রতি ব্রাহ্ম মুহুর্তে উত্থান প্রভৃতি যাহা২ বিহিত তাহাকে ধৰ্ম্মসংহারক পুনঃ, ত্যাগ ও যবনস্পশাদি যাহা২ সর্বথা নিষিদ্ধ তাহার প্রত্যহ অনুষ্ঠান করিয়াও, গঙ্গাস্নান দ্বারা না হউক কিন্তু গৌরাঙ্গকৃপাতে হরিনামবলে সেই সকল হইতে মুক্ত হইয়া কৃতার্থ হয়েন, কিন্তু অন্যে একজাতীয় পাপ পুনঃ করিলে তাহার গঙ্গাস্নানাদিতেও নিষ্কৃতি নাই এই ব্যবস্থা দেন; অতএব এ ধৰ্ম্মসংহারকের চরিত্র পণ্ডিতেরা বিবেচনা করুন, বিশেষত ওই প্রত্যুত্তরের ১০৪ পৃষ্ঠে ১৩ পংক্তিতে লিখেন যে “ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানীর শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য বিনা আর গত্যন্তর নাই” পরে ১০৫ পৃষ্ঠের ও পংক্তি অবধি লিখেন যে (যদ্যেতে পাপিনাে বিপ্র মহাপাতকিনােপি বা। জীবহত্যারতা ব্রাত্যাঃ নিকাশ্চাজিতেন্দ্রিয়া। পশ্চাৎ জ্ঞানসমুৎপন্না গুরােঃ কৃষ্ণপ্রসাদত। ততস্তু যাবজ্জীবন্তি হরিনামপরায়ণাঃ। শুদ্ধাস্তেহখিলপাপেভ্যঃ পূৰ্বজেভ্যোপি নারদ ) এ স্থলে যাবজ্জীবনের পাপ ও জীবহত্যা পুনঃ২ করিয়াও হরিনামবলে ধৰ্ম্মসংহারকেরা মুক্ত হইবেন কিন্তু অন্যে যদি কেশচ্ছেদন মাত্র বারম্বার করেন তাহার নিষ্কৃতি সুবর্ণদানে ও গঙ্গাস্নানেও হয় না। এরূপ ধৰ্ম্মসংহারক প্রায় দৃশ্য নহে। ১৭৫ পৃষ্ঠে ১০ পংক্তিতে লিখেন যে “ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানী মহাশয় অন্য এক বচন লিখেন তাহার তাৎপর্য এই যে আমি ব্ৰহ্ম এই প্রকার চিন্তা ক্ষণমাত্র কাল করিলেই সকল পাপ নষ্ট হয় কিন্তু তাহাকেই এই জিজ্ঞাসা করি যে এই প্রায়শ্চিত্তের উপদেশ কাহার প্রতি করেন, যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানীদিগের পাপাভাব প্রযুক্ত তাহাদের প্রতি অসম্ভব”। উত্তর, সর্বজনপ্রসিদ্ধ সৰ্ব্বশাস্ত্রসম্মত ইহা হয় যে জ্ঞানীর সিদ্ধাবস্থায় পাপ পুণ্যের সম্বন্ধ তঁাহার সহিত থাকে না, অতএব তাঁহারা ঐ কুলার্ণববচনের বিষয় কদাপি নহেন ; বেদান্তের ৪ অধ্যায় ১পাদ ১৩ সূত্র (তদধি- গমে উত্তরপূর্বাঘয়ােরশ্লেষবিনাশৌ তথ্যপদেশাৎ ) ব্ৰহ্মজ্ঞান উৎপন্ন হইলে পূর্ব- পাপের বিনাশ ও পরপাপের স্পর্শাভাব ব্যক্তিতে হয়, যেহেতু বেদেতে এইরূপ উপদেশ আছে। কিন্তু জ্ঞানসাধনাবস্থায় পাপের সম্ভাবনা আছে সুতরাং জ্ঞানানুষ্ঠায়ীরা এ বচনের বিষয় হয়েন, যে ক্ষণমাত্রও আত্মচিন্তা করিলে পাপ হইতে মুক্ত হইবেন ইহার বিশেষ বিবরণ এই দ্বিতীয় উত্তরের ২৫ পৃষ্ঠে ও ৮৫ পৃষ্ঠে লেখা গিয়াছে তাহার অবলােকন করিবেন। ধৰ্ম্মসংহারক ১৭৭ পৃষ্ঠে ২ পংক্তিতে লিখেন যে এই প্রায়শ্চিত্তের উপদেশ: “যদি ভাক্ত তত্ত্বজ্ঞানীদের প্রতি কহেন তবে তাহাও অসম্ভব যেহেতু ব্ৰহ্মপুরাণবচনানুসারে তাদৃশ দুষ্ট পাপিষ্ঠদিগের প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা শােধন হয় না এবং ব্ৰহ্মপুরাণীয় বচন রামমােহন-গ্রন্থাবলী লিখেন তাহার অর্থ এই যে “অন্তর্গত দুষ্ট যে চিত্ত তাহা তীর্থস্নান করিলেও শুদ্ধ হয় যেমন জলেতে শত২ বার ধৌত করিলেও সুরাভাণ্ড অশুচি থাকে” অত্যদ্ভুত এই যে ওই প্রত্যুত্তরের ৬৯ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তিতে ধৰ্ম্মসংহারক লিখিয়াছেন যে “যদ্যপি বৈষ্ণবাদি পঞ্চোপাসক আপনউপাসনার সর্ব অনুষ্ঠান করিতে অশক্ত হয়েন তথাপি পাপক্ষয় ও মােক্ষ প্রাপ্তি তাঁহাদিগের অনায়াসলভ্য যেহেতু বিষ্ণু প্রভৃতি পঞ্চ দেবতার নাম মাত্রেই সর্বপাপক্ষয় অন্তে মােক্ষ প্রাপ্তি হয়” দেবতার উপাসনা বিষয়ে বিশেষ২ প্রায়শ্চিত্ত ব্যতিরেকও কেবল তাহাদের নাম স্মরণ মাত্রেই পাপক্ষয় ও মােক্ষপ্রাপ্তি হয় ইহাকে স্তুতিবাদ না কহিয়া ধৰ্ম্মসংহারক যথার্থ স্বীকার করেন, কিন্তু জ্ঞানসাধনে কোন পাপ উপস্থিত হইলে তৎক্ষয় বিষয়ে শত২ বচন থাকিলেও ধৰ্ম্মসংহারক তাহার অন্যথার জন্যে এই প্রকার চেষ্টা সকল করেন যে “অন্তর্গত দুষ্ট যে চিত্ত তাহা তীর্থস্নান করিলেও শুদ্ধ হয় না” “দুষ্টচিত্ত লােকেরা প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা শুদ্ধ হয় না এবং দুষ্টাশয় দাম্ভিক ও অবশেয়ি মনুষ্যকে কি তীর্থ কি দান কি ব্ৰত কি কোন আশ্রম কেহ পবিত্র করেন না”। উত্তর, এ সকল ব্ৰহ্মপুরাণীয় বচনকে নিন্দার্থবাদ না কহিয়া যদি দুষ্টচিত্ত প্রভৃতির পাপকে বজ্রলেপরূপে ধৰ্ম্মসংহারক স্বীকার করেন, তবে তাহারই মতে দুষ্টচিত্ত ব্যক্তি সকলের কি নাম স্মরণে কি আত্মচিন্তনে এ দুয়ের একেও তুল্যরূপে নিস্তারাভাব। ১৭৮ পৃষ্ঠে (ক্রিয়াহীন মূখস্য মহাবরাগিণ এব চ। যথেষ্টাচরণস্যাহুর্মরণান্ত- মশৌচকং) এই বচন লিখিয়াছেন। উত্তর, এ বচন অবলম্বন করিয়া স্ব২ ধৰ্ম্মানুষ্ঠায়ীকে, ও সার্থ গায়ত্রীবেত্তাকে, ও সুস্থশরীরকে, শাস্ত্রবিহিত আচরণবিশিষ্টকে, ক্রিয়াহীন, মূখ, মহারােগী, যথেষ্টাচারী কহিতে সকলেই দ্বেষপ্রযুক্ত সমর্থ হয় কিন্তু পরমেশ্বর যেন আমাদিগ্যে ঘেষান্ধ না করেন। ১৭১ পৃষ্ঠের শেষ পংক্তি অবধি লিখেন যে “পণ্ডিতাভিমানী মহাশয় অন্য দুই বচন লিখিয়াছেন তাহার তাৎপৰ্য এই যে অনুদানে সুবর্ণাদি দানে ব্ৰহ্মহত্যাকৃত মহাপাপও ক্ষয় হয় কিন্তু তাহাকেই জিজ্ঞাসা করি যে পুস্তকে লিখিত প্রায়শ্চিত্ত পাপনাশক কি আচরিত প্রায়শ্চিত্ত পাপনাশক হয়”। উত্তর, আমাদের পূর্ব উত্তরে এমৎ লিপি কোন স্থানে নাই যাহার দ্বারা ইহা বােধ হইতে পারে যে পুস্তকে লিখিত প্রায়শ্চিত্তেও পাপক্ষয় হয় অতএব এ প্রশ্ন ধর্মসংহারকের সর্বথা অযুক্ত, বস্তুত আমাদের লিখিবার এমৎ তাৎপৰ্য ছিল যে ক্ষুদ্র দোষে বৃহৎ পাপশ্রবণ যে স্থানে আছে অর্থাৎ হাঁচিলে জীব না কহিলে ব্ৰহ্মহত্যাপাপ হয়, সেই স্থলে সামান্য দান ও নাম স্মরণ, যাহাতে ব্ৰহ্মহত্যাদিপাপ নাশ হয় কহিয়াছেন, তত্তপাপের পথ্য প্রদান ১৫৯ প্রায়শ্চিত্তস্থানীয় হইতে পারে অর্থাৎ কেবল বচনপ্রাপ্ত ব্ৰহ্মহত্যাদি পাপ প্রায় সামান্য অনুদান নামস্মরণাদিতে যায়, ইহাতে ধৰ্ম্মসংহারকের এরূপ প্রশ্ন সর্বদা অযােগ্য হয়, যেহেতু অনেকের অনুদান ও নাম স্মরণ করা কেবল পুস্তকে লিখিত না হইয়া কর্তা হইতে নিষ্পন্ন হইতেছে তাহা ধৰ্ম্মসংহারক রাগান্ধ হইয়া দেখিতে যদি না পান কিন্তু অন্যের প্রত্যক্ষ বটে। ১৩৯ পৃষ্ঠের তৃতীয় পংক্তিতে লিখেন “ধৰ্ম্মশাস্ত্রে যবনীমনােরঞ্জনাদিকে কেশচ্ছেদের নিমিত্ত কহেন না”। উত্তর, কেশচ্ছেদন বেশ্যার মনােরঞ্জন কারণ কথা বদলাে ব্যাঘাত হয়, বরঞ্চ কেশ ধারণ, বিন্দু প্রদান, অলকা তিলকা বিন্যাস বেশ্যার মনােরঞ্জনের কারণ হইতে পারে। পরেই লিখেন যে “যদ্যপি উপদংশ রােগেই তাহাদিগের ত্বচ্ছেদন বিধিকৃত হইয়াছে”। উত্তর, শাস্ত্রীয় বিচারে এই সকল নিন্দিত উক্তি কিরূপ মহাব্যলীক হইতে সম্ভব হয় তাহা বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিবেচনা করিবেন, এইরূপ পূৰ্বপুরুষের উল্লেখপূর্বকও স্থানে অলীকোক্তি করিয়াছেন তাহার যথােচিত উত্তর লিখিয়া যদ্যপিও আমরা ছাপা করিতে পাঠাইয়াছিলাম কিন্তু পূৰ্ব্বনিয়ম স্মরণে তাহা হইতে পরে ক্ষান্ত হওয়া গেল তদনুরূপ এ সকল কদৰ্য্য ভাষার উত্তর দিতেও নিরস্ত থাকিলাম। ইতি চতুর্থ প্রশ্নে দ্বিতীয়ােত্তরে ক্ষমাপ্রচুররা নাম ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। •• ধৰ্ম্মসংহারকের চতুর্থ প্রশ্নের তাৎপর্য এই ছিল যে ব্রাহ্মণ সুরাপান করিলে ব্ৰহ্মহত্যাপাপগ্রস্ত এবং ব্রাহ্মণ্যহীন হয়েন ; তাহার উত্তরে আমরা লিখিয়াছিলাম যে ব্রাহ্মণাদি কলিতে সুরাপান করিবেন না এরূপ বচন শাস্ত্রে দৃষ্ট হইতেছে, সেইরূপ কলিতে উপাসনাভেদে ব্রাহ্মণাদি সুরাপান করিবেন এরূপ বচনও শাস্ত্রে দৃষ্ট হয় অতএব উভয় শাস্ত্রের পরস্পর বিরােধ হইবাতে পরমারাধ্য মহেশ্বর আপনিই তাহার সিদ্ধান্ত করিয়াছেন ( অসংস্কৃতঞ্চ মদ্যাদি মহাপাপকরং ভবেৎ ) অর্থাৎ যে স্থলে কলিতে ব্রাহ্মণাদির প্রতি মদিরার নিষেধ দৃষ্ট হইতেছে সে অসংস্কৃতমদিরাদিপর জানিবে, ও যে স্থলে কলিতে ব্রাহ্মণাদির মদিরা পানে বিধি দেখিতেছি তাহা সংস্কৃত- তাহার প্রত্যুত্তরে ১৮৩ পৃষ্ঠে ১৩ পংক্তিতে ধর্মসংহারক আদৌ লিখেন যে “পুরুষের ইচ্ছাতেই যে বিষয়ের প্রাপ্তি হয় তাহার প্রাপ্তির নিমিত্ত যে শাস্ত্র তাহার নাম নিয়ম সেই নিয়ম ঋতুকালে ভাৰ্যাগমন—ইত্যাদি অতএব মদ্য পানাদি স্থলে যে বিধির আকার শাস্ত্র দেখা যায় সে বিধি নহে কিন্তু নিয়ম” অর্থাৎ মদিরা পান পুরুষের ইচ্ছাপ্রাপ্ত হয় তাহার নিমিত্ত যে বিধির আকার শাস্ত্র দেখা যায় মদ্যপর হয়।

রামমােহন-গ্রন্থাবলী - তাহাতে মদিরা পানের নিয়ম অভিপ্রেত হয়। উত্তর, ধৰ্ম্মসংহারকের এরূপ কথন আমাদের পূর্ব উত্তরের কোনাে বাধা জন্মায় না, যেহেতু পুরুষের ইচ্ছাপ্রাপ্ত মদ্য মাংসাদি ভােজন বটে, তাহার পান ভােজন উদ্দেশে সংস্কারাদি বিধি কহিয়া নিয়ম করিয়াছেন, অতএব ব্যক্তির রাগপ্রাপ্ত ঋতুকালীন ভাৰ্যাগমনের আবশ্যকতার ন্যায় অধিকারিবিশেষের সংস্কৃত মদিরা পানে আবশ্যকতা রহিল। ১৮৪ পৃষ্ঠে শ্ৰীভাগবতের দুই বচন লিখিয়া পরে ১৮৫ পৃষ্ঠের ৬ পংক্তিতে অর্থ লিখেন যে “সৌভ্রামণীযাগে সুরাপান অবিহিত, কিন্তু আম্রাণ মাত্ৰ বিহিত”। উত্তর, ভাগবত শাস্ত্র বৈষ্ণবাধিকারে হয়, তথাচ ভাগবতে (শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণমমলং যদ্বৈষ্ণবানাং প্রিয়ং) অতএব সৌভ্রামণী যাগে সুরার আঘ্রাণ ভাগবতে যে কহিয়াছেন তাহা বৈষ্ণবাধিকারে কহিলেই সঙ্গত হয়, নতুবা অন্য শাস্ত্রের সহিত বিরােধ জন্মে ঐ ভাগবতেই কহেন যে (স্বে স্বেধিকারে যা নিষ্ঠা স গুণঃ পরিকীৰ্ত্তিতঃ ) স্বীয় অধিকারে মনুষ্যের যে নিষ্ঠা তাহাকে গুণ কহি। দ্বিতীয়ত, বচনান্তরের দ্বারা কলিকালে তন্ত্রোক্ত সংস্কারে সুরা সেবন ও তাহার গ্রহণের পরিমাণ প্রাপ্ত হইতেছে, ও শীভাগবতে বৈদিকানুষ্ঠানে যজ্ঞীয় সুরার ঘ্রাণ লইবার অনুমতি দেন, কিন্তু তান্ত্রিক অধিকারে এ অনুমতি নহে; অতএব পরস্পর শাস্ত্রের একবাক্যতা নিমিত্ত ভাগবতীয় বচনকে কেবল বৈদিক যজ্ঞ বিষয়ে কহিতে হইবেক। ১৮৬ পৃষ্ঠে ৩ পংক্তিতে ব্রহ্মপুরাণীয় বচন লিখেন (নরাশ্বমেধৌ মদ্যঞ্চ কলৌ বর্জং দ্বিজাতিভিঃ) অর্থাৎ নরমেধ, অশ্বমেধ, ও মদ্য, দ্বিজাতিরা কলিতে ত্যাগ করিবেন। উত্তর, ইহাতে শ্রৌত অশ্বমেধাদি যাগসাহচর্যে মদিরার নিষেধ কলিযুগে কহিয়াছেন অর্থাৎ সত্য ত্রেতা দ্বাপরে যে বিধানে মদ্য পান করিতেন তাহা কলিতে অকৰ্তব্য আর ঐ তিন যুগে বেদোক্ত বিধানে মদ্যাচরণ ছিল ইহা শাস্ত্রে দৃষ্ট হইতেছে, অতএব এ বচন দ্বারা তন্ত্রশাস্ত্রোক্ত উপাসনাবিশেষে সংস্কৃত মদিরার নিষেধ নাই সুতরাং আমাদের পূৰ্বোত্তরের সিদ্ধান্তের অন্তর্গত হইল। অধিকন্তু এ নিষেধকে সামান্যত যদি কহ তথাপি যাহার সামান্যত নিষেধ থাকে অথচ বিশেষ২ বিধিও তাহার দৃষ্ট হয়, তখন সেই বিশেষ স্থল ভিন্ন ওই সামান্য নিষেধকে অঙ্গীকার করিতে হয়, যেমন পুত্রকে মন্ত্র দিবেন না এই সামান্য নিষেধ আছে আর জ্যেষ্ঠ পুত্রকে মন্ত্র দিবার বিশেষ অনুমতি দিয়াছেন; অতএব জ্যেষ্ঠ পুত্র ভিন্ন পুত্রেরা ঐ সামান্য নিষেধের বিষয় হয়েন কিন্তু জ্যেষ্ঠ পুত্র বিধিপ্রাপ্ত হইলেন, সেইরূপ কলিতে মদ্যপানের সামান্য নিষেধ আছে, এবং অধিকারিবিশেষে সংস্কৃত মদ্য কলিতে পান। করিবেক এমত বিশেষ বিধিও দেখিতেছি, অতএব কলিতে তন্ত্রোক্ত সংস্কৃত ভিন্ন ;

পথ্য প্রদান داد মদ্যের পান ওই নিষেধের বিষয় হয়েন কিন্তু সংস্কৃত মদ্য প্রাপ্ত হইলেন। দ্বিতীয়ত ওই পৃষ্ঠে ধর্মসংহারক কালিকাপুরাণীয় বচন লিখেন (মদ্যং দা ব্রাহ্মণস্তু ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে) এবং উশনার বচন লিখেন (মছমদেয়মপেয়মনিগ্রাহং) এ দুই বচন দ্বারা না কলিযুগে মদ্যপানের নিষেধ, না সংস্কৃত মদ্যপানের নিষেধ, এ দুয়ের একেরাে কথন নাই, কিন্তু সামান্যত মদ্যপানের নিষেধ প্রাপ্ত হয়, অতএব সংস্কৃত মদ্যপান বিধায়ক বিশেষ বচন দ্বারা ওই কালিকাপুরাণের ও উশনাবচনের বিষয় অসংস্কৃত মদ্যকে অবশ্য কহিতে হইবেক। ১৮৭ পৃষ্ঠে ২ পংক্তিতে লিখেন যে “এ স্থানে কলিযুগে মদ্যের নিষেধ প্রযুক্ত অনেক নব্য প্রাচীন সৰ্বজনমান্য গ্রন্থকারের মদ্য পানাদি স্থলে মদ্যপ্রতিনিধি দানাদিরও নিষেধ করিয়াছেন”। উত্তর, পশ্বাদি অধিকারে মদিরা পানের নিষেধ প্রযুক্ত তৎপ্রতিনিধির নিষেধও অবশ্যই যুক্ত হয়, সুতরাং গ্রন্থকারেরা এ অধিকারে প্রতিনিধির নিষেধ করিতেই পারেন, কিন্তু সেইরূপ সর্বজনমান্য অন্য ২ গ্রন্থকারের। পশ্বাদি ভিন্ন অধিকারে বিহিত মদ্যের গ্রাহত্ব ও তদভাবে তাহার প্রতিনিধি দান এরূপ ব্যবস্থা দিয়াছেন, অতএব অধিকারিভেদে উভয়ের মীমাংসা অবশ্য কর্তব্য হয়। কুলা…নদীপিকাধৃত কুলার্ণববচন ( বিজয়ায়। বটী কাৰ্য্যা সুরাশুল্ক্যালিসংযুতা। মুখ্যাভাবে তু তেনৈব তর্পয়েৎ কুলদেবতাং) সময়াতন্ত্রে চ ( দ্রব্যাভাবে তাম্রপাত্রে গব্যং দদ্যাঘৃতং বিনা) মদ্যমাংসযুক্ত সম্বিদার বটিকা করিয়া মুখ্য মদ্যাদির অভাবে তাহার দ্বারা কুলদেবতার তর্পণ করিবেক। মদ্যের অভাবে ঘৃতব্যতিরিক্ত গব্যকে তাম্রপাত্রে রাখিয়া তাহা প্রদান করিবেক। ১৮৮ পৃষ্ঠে ১৬ পংক্তি অবধি পদ্মপুরাণীয় বচনপ্রমাণে পাষণ্ডের লক্ষণ করিয়াছেন তাহার তাৎপর্য এই যে, যে সকল লােকেরা অভক্ষ্য ভক্ষণে অপেয় পানে রত হয় তাহাদিগ্যে পাষণ্ড করিয়া জানিবে এবং যে বেদসম্মত কাৰ্য্য না করে ও স্ব২ জাতীয় আচার ত্যাগ করে তাহারা পাষণ্ড হয়। উত্তর, যাহারা বেদ ও স্মৃত্যাদি শাস্ত্রে অপ্রাপ্ত কেবল চৈতন্যচরিতামৃতীয় উপাসনা করেন ও স্ব২ জাতীয় আচার ত্যাগ করিয়া অন্ত্যজাদির সহিত পঙ্গতে তত্তৎস্পৃষ্ট অখাদ্য ও অপেয় আহার করেন তাঁহার যথার্থরূপে ঐ লক্ষণাক্রান্ত হয়েন কি না ইহা ধৰ্মসংহারকই বিবেচনা করিবেন। ১৮৯ পৃষ্ঠে ৯ পংক্তি অবধি কলিতে পশুভাব ব্যতিরেক দিব্য ও বীরভাব নাই ইহার প্রমাণের উদ্দেশে সিদ্ধলহরীতন্ত্র প্রভৃতির বচন লিখিয়াছেন, তাহা সক্ষেপে লিখিতেছি (দিব্যবীরমতং নান্তি কলিকালে সুলােচনে। পশুভাবাৎ পরে ভাবাে নাস্তি নাস্তি কলেমত। কলৌ পশুমতং শস্তং যত সিদ্ধীশ্বরাে ভবেৎ)। উত্তর, ১৬২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ; প্রথমত এ সকল বচন কোন্ গ্রন্থকারের ধৃত তাহা ধৰ্মসংহারকের লিখা উচিত ছিল ; দ্বিতীয়ত এ সকল বচনের সহিত শাস্ত্রান্তরের বিরোেধ না হয় এ নিমিত্ত ইহাকে পশুভাবের স্তুতিপর অবশ্যই মানিতে হইবেক, যেহেতু কলিকালে বীরভাব সর্বথা প্রশস্ত এবং অন্য ভাবের অপ্রশস্ততাবােধক বচন সকল যাহা প্রসিদ্ধ টীকাপ্রাপ্ত ও প্রসিদ্ধ সংগ্রহকারের ধৃত হয় তাহা আমরা পূৰ্বোত্তরে লিখিয়াছি, সম্প্রতিও তদ্ভিন্ন অঙ্গ ২ বচন লিখিতেছি। কুলাৰ্চনদীপিকাধৃত কামাখ্যাতন্ত্রে ( জম্বুদ্বীপে কলো দেবি ব্রাহ্মণস্তু বিশেষতঃ। পশুর্ন স্যাৎ পশুর্ন স্যাৎ পশু স্যামাজ্ঞয়া ) মহানিৰ্বাণে ( কলৌ ন পশুভাবােহস্তি দিব্যভাবঃ কুততা ভবেৎ। অতত দ্বিজাতিভিঃ কাৰ্যং কেবলং বীরসাধনং। সত্যং সত্যং পুনঃ সত্যং সত্যং সত্যং ময়ােচ্যতে। বীরভাবং বিনা দেবি সিদ্ধির্নাস্তি কলৌ যুগে) ইহার সংক্ষেপার্থ, কলিকালে জম্বুদ্বীপে বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ কদাপি পশুভাব আশ্রয় করিবেন না। কলিতে পশুভাব হইতে পারে না, দিব্যভাব কিরূপে হয় অতএব দ্বিজেরা কলিতে কেবল বীরসাধন করিবেন। এখন আমাদের লিখিত বীরভাবের প্রশস্ত্যসূচক এই সকল বচন ও ধর্ম- সংহারকের লিখিত পশুভাবের প্রশস্ত্যসূচক বচন উভয়ের পরস্পর অনৈক্য দেখাইতেছি, যেহেতু তাহার লিখিত বচনে কলিতে পশুভাবেই সাধন প্রশস্ত হয় এবং তাহার দ্বারা কেবল সিদ্ধি জন্মে ইহা বােধ হয়, আর আমাদের লিখিত পূর্ব২ সংগ্রহকারভৃত বচনে ইহা প্রাপ্ত হইতেছে যে কলিতে বীরসাধনই প্রশস্ত ও তাহার দ্বারাই কেবল সিদ্ধি হয় ; অতএব এরূপ বিরােধস্থলে সংগ্রহকারেরা সৰ্ব্ব- সামঞ্জস্যে এইরূপ মীমাংসা করিয়াছেন যে পশুভাবের বিধায়ক যে সকল বচন তাহা সেই অধিকারে পশুভাবের স্তুতিপর হয় এবং বীরভাবের বিধায়ক বচন সকল তদধিকারে তাহার মাহাত্মজ্ঞাপক হয়, যেমন বিষ্ণুপ্রধান গ্রন্থে ব্রহ্মা ও মহেশ্বর হইতে বিষ্ণুর প্রাধান্য বর্ণন দ্বারা ও বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের সর্বোত্তমত্ব কথনের দ্বারা ভগবান্ বিষ্ণুর এবং তদ্ধৰ্ম্মের স্তুতিমাত্ৰ তাৎপৰ্য হয়, রামায়ণে ( অহং ভবন্নাম জপ কৃতার্থে বসামি কাশ্যামনিশং ভবান্যা) মহাদেব কহিতেছেন যে হে রাম আমি তােমার নাম জপেতে কৃতকাৰ্য্য হইয়া নিরন্তর ভবানীর সহিত কাশতে বাস করি ; এবং শিব- প্রধান গ্রন্থে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু হইতে শিবের প্রাধান্য বর্ণন ও শৈব ধর্মের সর্বোত্তমত্ব কথন দ্বারা ভগবান্ মহেশ্বরের ও মাহেশ্বর ধৰ্ম্মের স্তুতি বােধ হয়, মহাভারতে দানধর্মে (রুদ্রভক্ত্যা তু কৃষ্ণেন জগ্যাপ্তং মহাত্মনা) অর্থাৎ মহাদেবে ভক্তির দ্বারা কৃষ্ণ জগদ্ব্যাপক হইয়াছেন; আর শক্তিপ্রধান তন্ত্রাদিতে বিষ্ণু প্রভৃতি হইতে শক্তির ;

পথ্য প্রদান ১৬৩ প্রাধান্য বর্ণন ও তদ্ধৰ্ম্মের সর্বোত্তমত্ব কথন শক্তির স্তুতিসূচক হয়, নির্বাণতন্ত্রে (গােলােকাধিপতিদেবি স্তুতিভক্তিপরায়ণঃ। কালীপদপ্রসাদেন সােহভবল্লোক: পালক) অর্থাৎ গােলােকের অধিপতি যে কৃষ্ণ তিনি স্তুতিভক্তিপরায়ণ হইয়া কালীপদপ্রসাদের দ্বারা লােকপালক হয়েন। এই সকল স্থলে এরূপ কথনের দ্বারা কোনাে দেবতার লঘুত্ব অথবা অন্য হইতে তাহার ঈশ্বরত্বপ্রাপ্তি এমৎ তাৎপৰ্য নহে, অন্যথা প্রত্যেক বর্ণনকে স্তুতিপর স্বীকার না করিয়া যথার্থ অঙ্গীকার করিলে পরস্পর স্পষ্ট বিরােধােক্তির দ্বারা কোনাে শাস্ত্রের প্রামাণ্য থাকে না। প্রায় ব্ৰতমাত্রেই কহেন যে এ ব্রত সকল ব্রতের উত্তম হয় তাহাতে সেই ব্রতের স্তুতিই তাৎপৰ্য হয় অন্য ব্রতের লঘুত্ব তাৎপৰ্য নহে, বরঞ্চ ধর্মসংহারক আপনিই প্রথমত আপন প্রত্যুত্তরের ২১৩ পৃষ্ঠে শ্ৰীভাগবতের ও ব্রহ্মবৈবর্তের বচন লিখিয়াছেন, যাহার সংক্ষেপ অর্থ এই যে, সকল পুরাণের মধ্যে শ্রীভাগবত শ্রেষ্ঠ হয়েন এবং সকল পুরাণের মধ্যে ব্রহ্মবৈবর্ত শ্ৰেষ্ঠ হয়েন এ দুইয়ের পরস্পর বিরােধের মীমাংসা আপনিই পুনরায় এইরূপে ২১৫ পৃষ্ঠে ৮ পংক্তিতে করেন “যে শ্ৰীভাগবতাদির শ্লোকে কেবল তত্তৎগ্রন্থের উত্তমতা কহিতেছেন অতএব তত্তগ্রন্থে লােকের শ্রদ্ধাতিশয়ার্থ তত্ত- বচনকে তত্তৎ গ্রন্থের স্তাবক কহা যায় একের স্তুতিবাদে অন্যের নিন্দা কুত্রাপি কেহ কহিবেন না” বিশেষত ধর্মসংহারকের লিখিত পশুভাবের প্রশস্ত্যবােধক বচনে কলিতে বীরভাব নাই এই প্রাপ্ত হয়, আর বীরভাবের প্রশস্ত্যবােধক বচন যাহা আমরা লিখিয়াছি তাহাতে স্পষ্ট লিখেন যে কলিযুগে জম্বুদ্বীপে বীরভাব ব্রাহ্মণের অবশ্য কর্তব্য অতএব উভয় বচনের একবাক্যতা করিবার উপায়ান্তরও আছে যে কলিযুগে বীরভাব সামান্যত প্রশস্ত নহে ইহা ওই সিদ্ধলহরীবচনে লিখেন কোনাে দ্বীপের বিশেষ করেন না, আর কামাখ্যাতন্ত্রের বচন প্রমাণে জম্বুদ্বীপে বীরভাবের বিশেষ কর্তব্য প্রাপ্ত হয় অতএব জম্বুদ্বীপ ভিন্ন দ্বীপান্তরে বীরভাবের অপ্রশস্ত্য মানিলেও উভয় বচনের বিরােধলেশও থাকে না। ১৯১ পৃষ্ঠের শেষ পংক্তি অবধি লিখেন যে “ভাক্ত বামাচারী মহাশয় স্বমত সাধন কারণ মদ্য মাংস মৈথুনের অবচ্ছেদাবচ্ছেদে বিধান দর্শন করাইবার আশয়ে (ন মাংসভক্ষণে দোষঃ) ইত্যাদি মনুবচনের শেষ দুই পাদ অপহরণ করিয়া প্রথম দুই পাদ দর্শন করাইয়াছেন তাহার কারণ এই যে শেষ দুই পাদ দর্শন করাইলে তাহাদিগ্যে চতুষ্পদ হইতে হয়”। উত্তর, গ্রন্থবাহুল্য দ্বারা কালবাহুল্যে বেতন- ৰাহুল্যের আশা আমাদের নাই, সুতরাং পূৰ্বোত্তরে মনুবচনের পূৰ্বাৰ্ধ লিখিয়া তাহার বিবরণে পরাদ্ধের তাৎপৰ্য্য এবং পূর্ব২ বচনের অভিপ্রায় লিখা গিয়াছিল, ১৬৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী প্রথম উত্তরের ২২ পৃষ্ঠে ১৬ ও ১৭ পংক্তি “( ন মাংসভক্ষণে দোষাে ন মদ্যে নচ মৈথুনে) অর্থাৎ প্রবৃত্তি হইলে যে প্রকার মদ্যপানে ও মাংস ভােজনে এবং স্ত্রীসংসর্গে বিধি আছে তাহা করিলে দোষ নাই” পরার্ধের যে তাৎপৰ্য, ( অর্থাৎ নিবৃত্তি না হইয়া “প্রবৃত্তি হইলে” বিহিত মাংসাদি ভােজনে দোষ নাই) তাহাও ওই বিবরণে প্রাপ্ত হইয়াছে এবং পূর্ব২ বচনের অভিপ্রায়ও লিখা গিয়াছে অর্থাৎ “যে প্রকার মদ্য পানে ও মাংস ভােজনে এবং স্ত্রীসংসর্গে বিধি আছে তাহা করিলে দোষ নাই” অতএব পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন যে পরার্ধ না লেখাতে তাহার প্রয়ােজন লেখা হইয়াছে কি না? আর ইহাও বিবেচনা করিবেন যে যে প্রকার বিধি আছে এই শব্দ- প্রয়ােগাধীন “মদ্য মাংস ও মৈথুনের অবচ্ছেদাবচ্ছেদে বিধান দর্শন করাইবার আশয়ে ঐ পূৰ্বাৰ্দ্ধকে আমরা লিখিয়াছিলাম কি কেবল বিহিত মদ্য মাংস ও বিহিত স্ত্রীসঙ্গ বিষয়ে আমরা লিখি, পরে তাহারাই যাহা উচিত হয় ধর্মসংহারককে বুঝাইবেন। ১৯৫ পৃষ্ঠে ১৬ পংক্তি অবধি লিখেন যে “কুলার্ণবমহানিৰ্বাণতন্ত্রমাত্ৰদৰ্শী ভাক্ত বামাচারী মহাশয় কলিকালে জাতিমাত্রের বিশেষত ব্রাহ্মণের মদ্যপানে কুলার্ণব ও মহানিৰ্বাণের বচন দর্শন করাইয়া তাহাতে ধর্মসংস্থাপনাকাক্ষীর চতুর্থ প্রশ্নে লিখিত মম্বাদির বচনের সহিত বিরােধপ্রযুক্ত নিজ পাণ্ডিত্যের প্রভাবে বিরােধ ভঞ্জনার্থ মীমাংসাও করিয়াছেন যে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর লিখিত স্মৃতিপুরাণবচনে কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানে যে নিষেধ সে অসংস্কৃতের অর্থাৎ অশােধিত মদ্যের, আর মহানিৰ্বাণাদিবচনে মদ্যপানের যে বিধি সে সংস্কৃতের অর্থাৎ শশাধিত মদ্যের”। উত্তর, ধৰ্ম্মসংহারক এ স্থলে লিখেন যে কুলার্ণবমহানিৰ্বাণতন্ত্রমাত্ৰদৰ্শী আমরা হই, সুতরাং এরূপ অধিকারভেদে কলিযুগে মদ্য পানের নিষেধের ব্যবস্থা ও অধিকারভেদে তাহার পানাদির বিধি দিয়াছি ; অতএব তাহাকে জিজ্ঞাসা করি যে ভগবান্ মহেশ্বরও কি কুলার্ণবমহানিৰ্ব্বাণ মাত্ৰদৰ্শী ছিলেন যে এইরূপ সিদ্ধান্ত অধিকারিভেদে করিয়াছেন। তথা কুলার্ণবতন্ত্রে ( অনাম্ৰেয়মনালােক্যমস্পৃশ্যঞ্চাপ্যপেয়ং। মদ্যং মাংসং পশুনান্তু কৌলিকানাং মহাফলং) অর্থাৎ মদ্য মাংস পশুদের ঘ্রাণের পানের অবলােকনের ও স্পর্শনের যােগ্য নহে, কিন্তু বীরদের মহাফলজনক হয়। তথাচ (স্বেচ্ছয়া বর্তমানে যাে দীক্ষাসংস্কারবর্জিত। ন তস্য সদগতিঃ কাপি তপস্তীৰ্থব্রাদিভিঃ) অর্থাৎ দীক্ষা ও সংস্কারহীন হইয়া যে স্বেচ্ছাচারে রত হয় তাহার তপস্যা ও তীর্থ ও ব্ৰতাদির দ্বারা কদাপি সদগতি নাই। এবং জিজ্ঞাসা করি যে তন্ত্রশাস্ত্ৰপারদর্শী কুলা…নদীপিকাকার কি কুলার্ণবমহানিৰ্বাণমাত্রদর্শী ছিলেন যে আমাদের বহুকাল পূর্বে এইরূপ সিদ্ধান্ত পথ্য প্রদান তিনি করেন ? কুলা…নদীপিকায়াং (পূর্বোক্তবচনেভ্যো ব্রাহ্মণানমপি সুরাপান- মায়াতি তত্র ব্রাহ্মণদৌ নিষেধমাহ, ব্রহ্মহত্যা সুরাপানং ইত্যাদি, ব্রাহ্মণাে ন চ হন্তব্যঃ সুরা পেয়া ন চ দ্বিজৈঃ। রুদ্রযামলে, বেদত্যাগাৎ মদ্যপানাৎ শূদ্ৰদার- নিষেবণাৎ। তৎক্ষণাজ্জায়তে বিপ্ৰশ্চণ্ডালাদপি গঠিত। শ্রী ক্ৰমেচ, ন দাহ্মণণা মদ্যং মহাদেব্যৈ কদাচন, ইত্যাদিনিষেধাৎ ব্রাহ্মণানাং কুলা…নাভাব ইতি চেয়, ব্রাহ্মণমুদ্দিশ্য সুরাপানাদৌ যদ্যন্নিষেধনমুক্তং তদনভিষিক্তব্ৰাহ্মণপরং। তথাচ নিরুত্তরতন্ত্রে, অভিষেকং বিনা দেবি ব্রাহ্মণাে ন পিবেৎ সুরাং। ন পিবেম্মাদক- দ্রব্যং নামিষঞ্চাপি ভক্ষয়েৎ। কৃতাভিষেকে বিপ্রে মদ্যপানং বিধীয়তে। অভিষেকে কৃতে বিপ্রঃ সুরাং দদ্যাৎ যুগে যুগে। বিজয়াং রত্নকল্পাঞ্চ সুরাভাবে নিযােজয়েৎ। তথা, অভিষেকেণ সৰ্ব্বেষামধিকারাে ভবেৎ প্রিয়ে। অভিষেকে কৃতে প্ৰিা ব্ৰহ্মত্বং লভতে ধ্রুবং, এতেন ব্রাহ্মণানাং সুরাপানাদৌ যদ্যন্নিষেধনমুক্তং তদনভিষিক্তব্ৰাহ্মণ- পরমেবাবগন্তব্যং) ইহার অর্থ, কুলাৰ্চনদীপিকাতে পূর্বোক্ত বচনসকলের দ্বারা ব্রাহ্মণেরও সুরাপান প্রাপ্ত হইল তাহাতে ব্রাহ্মণাদির নিষেধ কহিয়াছেন ব্রহ্মহত্যা সুরাপানং ইতাদি মহাপাতক হয়, ব্রাহ্মণ বধ করিবেক না ও দ্বিজেরা সুরাপান করিবেন না, বেদের ত্যাগ ও মদ্যপান এবং শূদ্ৰপত্নীগমন ইহার দ্বারা ব্রাহ্মণ তৎক্ষণাৎ চণ্ডাল হইতে অধম হয়েন, ব্রাহ্মণ মহাদেবীকে কদাপি মদ্যদান করিবেন না ইত্যাদি নিষেধ দর্শনে ব্রাহ্মণের কোলধৰ্ম্ম অকর্তব্য হয় এমত কহিতে পারিবে না, যেহেতু ব্রাহ্মণকে উদ্দেশ করিয়া সুরা পানাদিতে যে২ নিষেধ কহিয়াছেন তাহা অভিষিক্ত ভিন্ন ব্রাহ্মণপর হয়, নিরুত্তরতন্ত্রে লিখেন, অভিষেক ব্যতিরেকে ব্রাহ্মণ সুরাপান করিবেন না এবং অন্য মাদক দ্রব্য ও আমিষ ভক্ষণ করিবেন না কিন্তু ব্রাহ্মণ অভিষেকী হইয়া মদ্যপান করিবেন অভিষিক্ত হইলে ব্রাহ্মণের সর্বযুগেই মদ্যদান কর্তব্য হয়, সুরার অভাবে রত্নতুল্য সম্বিদা প্রদান করিবেন, অভিষেক দ্বারা সকলের অধিকার হয় অভিষিক্ত হইলে ব্রাহ্মণ ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়েন ; অতএব ব্রাহ্মণের উদ্দেশে সুরাপানাদিতে যে নিষেধ কহিয়াছেন তাহা অবশ্যই অনভিষিক্তব্ৰাহ্মণপর জানিবে; এবং দীপিকাকারের পূৰ্ব্ব, কালীকল্পলতাকার প্রভৃতি অতি প্রাচীন আচার্য্যেরাও এইরূপ মীমাংসা করিয়াছেন তাহারাও কি কুলার্ণবমহানিৰ্বাণমাত্রদশী ছিলেন ? কালীকল্পলতাসারে মদ্যপানের বিধায়ক ও নিষেধক নানা শাস্ত্রীয় বচন লিখিয়া পশ্চাৎ সমাধান করেন যে (দেবতাধিকারভাবভেদেন তত্তচ্ছাস্ত্রবচনােখিত- বিরােধী সমাধেয়ঃ ) দেবতা অধিকার ও ভাবভেদে সেই২ শাস্ত্রের বচন হইতে উৎপন্ন যে পরস্পর বিরােধ তাহার সমাধা করিবে। সেই অভিষেক দুই প্রকার হয় এক ;

১৬৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী পূর্ণাভিষেক দ্বিতীয় শাক্তাভিষেক তাহার ক্রম ও অনুষ্ঠানের বিবরণ তন্ত্রশস্ত্রে দেখিবেন। ধৰ্ম্মসংহারক ১৯৭ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তি অবধি কালীবিলাসতন্ত্রের বচন লিখেন তাহার তাৎপৰ্য এই যে ভূরি পান কলিতে করিবে না এবং পান করিয়া পুনরায় পান করিয়া ভূমিতলে পতিত হয় পরে উখিত হইয়া পুনর্বার পান করিলে পুনর্জন্ম হয় ইত্যাদি বচন সকল সত্যাদি যুগে সম্মত হয় কলিযুগে মদ্যপান করিলে পদে২ ব্ৰহ্মহত্যার পাপ হয় সত্য ত্রেতা যুগে মদ্য শােধন প্রশস্ত হয় কলিযুগে মদ্য শশাধন নাই এবং কলিতে মদ্যপান নাই। উত্তর, এই কালীবিলাসতন্ত্রের বচন কোন গ্রন্থকারের ধৃত হয় তাহা ধৰ্ম্মসংহারককে লেখা কর্তব্য ছিল, দ্বিতীয়ত, ইহার প্রথম দুই বচন কলিযুগে অধিক পানের নিষেধ করণ দ্বারা বিহিত এবং শাস্ত্রোক্ত পরিমিত পানের অনুমতি দিতেছেন, কিন্তু পরের বচনে প্রাপ্ত হইতেছে যে কলিযুগে মদ্য শশাধন নাই এবং মদ্যপান কৰ্তব্য নহে, তাহার তাৎপৰ্য এই যে পশুদের মদ্যপান ও মদ্য শশাধন কৰ্ত্তব্য নহে, কালীকল্পলতাধৃত কুলতন্ত্রবচন (সুরায়াঃ শােধনং পানং দানং তর্পণমন্বিকে। পশূনাং গর্হিতং দেবি কৌলানাং মুক্তি- সাধনং) মদিরার শােধন, পান, দান, তর্পণ, পশুদের সম্বন্ধে নিন্দিত কিন্তু কৌলেদের সম্বন্ধে মুক্তিসাধন হয়। তৃতীয়ত, ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত বচনকে কুলাৰ্চন- দীপিকাধৃত বচন সকলের সহিত একবাক্যতা করিয়া অভিষেকী ভিন্ন ব্যক্তির মদ্য- শােধনে ও মদ্যপানে অধিকার নাই, ইহা অবশ্য স্বীকার করিতে হইবেক যেহেতু ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত বচনে সামান্যত পান শােধনের নিষেধ করিয়াছেন ও দীপিকাবৃত বচনে অভিষেকী ব্যক্তির মদ্য শােধন ও পান কর্তব্য হয় ইহা প্রাপ্ত হইয়াছে, অতএব অভিষেকী ভিন্ন ব্যক্তি ওই কালীবিলাসবচনপ্রাপ্ত নিষেধের বিষয় হইবেন। চতুর্থ, সত্যাদি যুগে তত্ত্ব গ্রহণে আগমােক্ত অনুষ্ঠান ছিল না উদগীথ, শতরুদ্ৰী, দেবীসূক্ত প্রভৃতি শ্রুতিমন্ত্রে তত্ত্বশােধনের বিধি ছিল, অতএব কলিতে যে শােধন ও পান নিষেধ তাহা বৈদিক মন্ত্রমাত্রে শােধন ও বৈদিক পান নিষেধ হয় অর্থাৎ তান্ত্রিক মন্ত্রসাহিত্য বিনা কলিতে তত্ত্ব শােধন নাই যেহেতু ঐ কালীবিলাসতন্ত্রে সত্য ত্রেতাতে শশাধনের প্রশস্ত্য লিখিবাতে সত্যাদি কালে বিহিত যে বৈদিক শােধন তাহার প্রশস্ত্য প্রথমে জানাইয়া পরে ওই শােধনের নিষেধ দ্বারা ইহাই ব্যক্ত করিলেন যে কলিতে বৈদিক শােধন ও পান অকৰ্তব্য হয়, তথাহি কুলার্ণবে (কুলদ্ৰব্যাণি সেবন্তে যেইন্যদর্শন- মাশ্রিতাঃ। তদঙ্গরােমসংখ্যাতত ভূতযােনিযু জায়তে) যে ব্যক্তি তন্ত্র ভিন্ন শাস্ত্র আশ্রয় করিয়া কুলদ্রব্য গ্রহণ করে তাহার শরীরস্থ লােমসংখ্যায় প্রেতযােনিতে জন্ম পায় পথ্য প্রদান ( উদগীথরুদ্ৰশতকৈদেবীসূক্তেন পাৰ্বতি। কৃদিষু দ্বিজাতীনাং বিহিতং তত্ত্ব- শােধনং। তন্ন সিদ্ধং কলিযুগে কলাবাগমসম্মতং। বৈদিকৈস্তান্ত্ৰিকৈৰ্মন্ত্রৈস্তানি শােধয়েৎ কলৌ )। অর্থাৎ উগীথ, শতরুদ্র, দেবীসূক্ত, ইত্যাদি বৈদিক মন্ত্র দ্বারা সত্যাদি যুগে দ্বিজেদের তত্ত্ব শােধন বিহিত হয়। কলিযুগে তাহা সিদ্ধ নহে, অতএব কলিতে তান্ত্রিক এবং বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা দ্রব্যের শােধন করিবেক। তৃতীয়ত, সর্বত্র সিদ্ধান্তশাস্ত্রে তত্ত্ব গ্রহণের নিষেধ যে স্থানে আছে তাহাকে দেবতাবিশেষের উপাসনাভেদে কহিয়াছেন ও যে স্থানে বিধি আছে তাহাও মন্ত্রবিশেষে ও দেবতা- বিশেষে অঙ্গীকার করেন, তথাচ কুলা…নদীপিকা (নম্বহে তহি আগমােক্তবিধানেন পঞ্চতত্ত্বেন কলাবখিলদেবতা পূজনীয়েত্যায়াতি-অত দেবীপুরাণে চীনতন্ত্রে কুলাবল্যাঞ্চাহ, মহাভৈরবকালােয়ং শিবস্য বামনায়ক। শ্মশানভৈরবী কালী উগ্রতারাচ পঞ্চমী) ইত্যাদি। অর্থাৎ পঞ্চতত্ত্বের দ্বারা দেবতা পৃজা আবশ্যক হয় ইহা কহিয়া পশ্চাৎ সিদ্ধান্ত করেন যে কলিতে তত্ত্বদ্রব্যের দ্বারা সকল দেবতার পুজা প্রাপ্ত হইল, এমৎ নহে কিন্তু দেবীপূরাণ চীনতন্ত্র কুলাবলীতন্ত্রে কহিয়াছেন যে মহাদেবের মহাকালভৈরবমূৰ্ত্তির উপাসনায় এবং শ্মশানভৈরবী ও মহাবিদ্যাদির উপাসনায় তত্ত্বের অনুষ্ঠান কর্তব্য হয়, এইরূপ বিবরণ করেন। সময়াতন্ত্রে ( যে ভাবা যস্য বৈ প্ৰােক্তাস্তৈর্ভাবৈদি নাéয়েৎ। বিরুদ্ধভাবমাশ্ৰিত্য ভষ্টো ভবতি সাধকঃ) যে দেবতার যে ভাব বিহিত হইয়াছে সে ভাবে তাহার অর্চনা না করিয়া যদি তাহার বিরুদ্ধ ভাব আশ্রয় করে তবে সে সাধক ভ্রষ্ট হয়। তথাচ ( অধিকারি- বিশেষেণ শাস্ত্রাণাক্তাতশেষতঃ ) অধিকারিবিশেষে নানা শাস্ত্র কথিত হইয়াছেন। দেবতাবিশেষে অধিকারবিশেষে ও সংস্কারভেদে তত্ত্ব গ্রহণের কর্তব্যতা ও অকৰ্তব্যত্ব স্বীকার না করিয়া উভয় পক্ষের লিখিত বচনসকলের পরস্পর অনৈক্য বােধ করিয়া তাহার মীমাংসা নিমিত্ত ধর্মসংহারক ২০০ পৃষ্ঠে ৮ পংক্তি অবধি লিখেন যে “ভাক্ত বামাচারীর কুলার্ণবাদি তন্ত্রের বচনে কলিযুগেও ব্রাহ্মণের মদ্যপানে বিধি দেখিতেছি, আর ধর্মসংস্থাপনাকাঙক্ষীর লিখিত মন্থাদি স্মৃতি পুরাণ ও তন্ত্রান্তর এই সকল শাস্ত্রে কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপানে নিষেধও দেখিতেছি অতএব এক শাস্ত্রের প্রামাণ্য অন্য শাস্ত্রের অপ্রামাণ্য অবশ্যই কহিতে হইবেক” পরে এই ব্যবস্থাকে দৃঢ় করিবার উদ্দেশে ১৬ পংক্তি অবধি স্মাৰ্ত্তধৃত কুৰ্ম্মপুরাণীয় বচন লিখেন (যানি শাস্ত্রাণি দৃশ্যন্তে লােকেস্মিন্ বিবিধানি চ। তিস্মৃতিবিরুদ্ধানি নিষ্ঠা তেষাং হি তামসী। করালভৈরবঞ্চাপি যামলং নাম যৎ কৃতং। এবম্বিধানি চাঙ্গানি মােহনার্থানি তানিচ। ময়া সৃষ্টানেকানি মােহায়ৈং ভবার্ণবে) ইহলােকে তিস্মৃতিবিরুদ্ধ নানাপ্রকার ন ১৬৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী যে সকল শাস্ত্র দৃষ্ট হইতেছে তাহার যে নিষ্ঠা সে তামসী, ফলত তিস্মৃতিবিরুদ্ধ শাস্ত্রে কেহ কদাচ শ্রদ্ধা করিবে না যেহেতু তদনুসারে শ্রদ্ধা করিলে তামসী গতি হয়, এবং করালভৈরব নামে ও যামল নামে যে তন্ত্র কৃত হইয়াছে এবং এইপ্রকার যে অন্য তন্ত্র আমার কথিত হয় তাহা লােকের মােহনার্থ এবং এইপ্রকার অন্য যে তন্ত্র আমি সৃষ্টি করিয়াছি তাহা এই ভবার্ণবে তামসিক লােকের মােহ নিমিত্ত হয়। পরে ২০১ পৃষ্ঠে ১৫ পংক্তি অবধি সিদ্ধান্ত করেন “অতএব কলিযুগে ব্রাহ্মণের মদ্যপান বিষয়ে ভাক্ত বামাচারীর লিখিত যে কুলার্ণবের ও মহানিৰ্বাণের বচন তাহারি অপ্রামাণ্য অবশ্যই কহিতে হইবেক যেহেতু সেই সকল তন্ত্র তিস্মৃতিবিরুদ্ধ ও নানা তন্ত্রবিরুদ্ধ এ কারণ কল্পিত আগম হয় তাহাকে অসদাগম কহা যায় তাহার পর ২০২ পৃষ্ঠের ৫ পংক্তি অবধি ধৰ্ম্মসংহারক পদ্মপুরাণীয় বচন যাহা প্রসিদ্ধ টীকা- সম্মত ও সংগ্রহকারধৃত নহে লিখেন, তাহার তাৎপৰ্য এই যে বিষ্ণুভক্ত অসুরদিগ্যে মােহ করিবার নিমিত্ত স্বয়ং বিষ্ণুর অনুমতিক্রমে মহাদেব বেদবিরুদ্ধ আগম রচনা ও নিজে ভস্মাস্থি ধারণ করিয়াছিলেন। প্রথম উত্তর, এ সকল বচনে তিস্মৃতিবিরুদ্ধ তন্ত্রকে মােহনার্থ কহেন, কিন্তু উপাসনা ও সংস্কারবিশেষে তত্ত্ব গ্রহণ করিতে কুলার্ণব মহানিৰ্বাণাদি নানা তন্ত্রে যে কহিয়াছেন তাহা শ্রুতিস্মৃতিবিরুদ্ধ কদাপি নহে, যেহেতু সত্যাদি যুগে যে শ্ৰেীত মদ্যসেবাবিধি প্রাপ্ত ছিল কলিতে তাহারি নিষেধ স্মৃতিতে করেন, কিন্তু মহাবিদ্যাদি দেবতাবিশেষের উদ্দেশে তন্ত্রোক্ত বিশেষ সংস্কারে মদ্যমাংস গ্রহণের নিষেধ কোনাে শ্রুতি স্মৃতিতে নাই, যাহার দ্বারা ঐ সকল কুলার্ণবাদি তন্ত্র শ্রুতিস্মৃতিবিরুদ্ধ হইতে পারে, বরঞ্চ কুলার্ণবাদি তন্ত্রে কি প্রকার মদ্য শ্রুতিস্মৃতিনিষিদ্ধ হয় তাহার বিবরণ কহিয়া শ্রুতি স্মৃতির ন্যায় তাহার পুনঃ২ পান ও দানকে নিষেধ করিয়াছেন, যথা কুলর্ণবে ( বৃথাপানন্তু দেবেশি সুরাপানং তদুচ্যতে। যন্মহাপাতকং জ্ঞেয়ং বেদাদিষু নিরূপিতং)। তথা (তস্মাদবিধিনা মদ্যং মাংসং সেবেত কোপিন। বিধিবৎ সেবতে দেবি তরসা ত্বং প্রসীদসি) অর্থাৎ ভােগাৰ্থ যে অবিহিত মদ্যপান তাহার নাম সুরাপান জানিবে যাহাকে বেদাদি শাস্ত্রে মহাপাপজনক কহিয়াছেন অতএব অবিধানক্রমে কোনাে ব্যক্তি অবিহিত মদ্যপান ও মাংস ভােজন করিবে না, কিন্তু হে দেবি যথাবিধানক্রমে যে ব্যক্তি সেবন করে তাহাকে তুমি শী প্রসন্ন হও। যেমন স্মৃতি সংহিতা ও পুরাণাদিতে কলিযুগে অল্পের জাতিভেদে বিশেষ নিয়ম করিয়াছেন, অধম জাতির পক অম্ন উত্তম জাতির ভােজ্য কলিতে নহে এইরূপ সামান্যত নিষেধ স্মৃতি পুরাণ প্রভৃতিতে করেন, কিন্তু, উৎকখণ্ড গ্রন্থে জগন্নাথের নিবেদিত হইলে সৰ্বজাতিকে একত্র হইয়া অল্প সেবন পথ্য প্রদান ১৬৯ ; করিতে জগন্নাথক্ষেত্রে বিশেষ বিধি দেন, ইহাতে উৎকখণ্ডকে শ্রুতিস্মৃতিবিরুদ্ধ শাস্ত্র কোনাে গ্রন্থকার কহেন না, এবং তদনুসারে জগন্নাথক্ষেত্রে বিষ্ণুকাঞ্চি প্রভৃতি বিড়দেশস্থ ব্রাহ্মণ ব্যতিরেক সৰ্বজাতি তন্নিবেদিত অল্প ব্যঞ্জন একত্র ভােজন করিয়াও পাপগ্রস্ত ও জাতিভ্রষ্ট হয়েন না, কেন না শ্রুতি স্মৃতিতে সামান্যত অপকৃষ্ট বর্ণের স্পৃষ্ট অন্নাদির ভােজন কলিতে নিষিদ্ধ করিয়াছেন, কিন্তু উৎকলখণ্ডে বিশেষ স্থানে বিশেষ দেবতাকে বিশেষ মন্ত্রের দ্বারা নিবেদিত অন্ন ব্যঞ্জনাদি অপকৃষ্ট জাতির সহিতে খাইতে আজ্ঞা দেন, সেইরূপ মদিরা গ্রহণের সামান্যত নিষেধ স্মৃতিতে দৃষ্ট হইতেছে আর বিশেষ অধিকারে বিশেষ দেবতার উদ্দেশে সংস্কারবিশেষে তন্ত্রশাস্ত্রে মদ্যমাংসের গ্রহণে বিধি দিতেছেন; অতএব কুলার্ণব ও মহানিৰ্বাণাদি কৌলধৰ্ম্ম- বিধায়ক তন্ত্র উৎকলখণ্ডের ন্যায় তিস্মৃতিবিরুদ্ধ কদাপি নহেন, সুতরাং ঐ স্মাৰ্তধৃত বচনানুসারে ও পদ্মপুরাণবচন সমূলক হইলে তদনুসারে ওই সকল তন্ত্র অমান্য হইলেন । অধিকন্তু পদ্মপুরাণীয় যে বচন লিখেন তাহা প্রমাণ কি অপ্রমাণ নিশ্চয় করা যায় না যেহেতু সর্বত্র প্রচলিত পদ্মপুরাণীয় ক্রিয়াযােগর মাত্র হয় অন্যথা পঞ্চাশৎপঞ্চসহস্ৰশ্লোকসংযুক্ত সমুদায় পদ্মপুরাণ অপ্রাপ্য এবং এ সকল বচন কোনাে সংগ্রহকারের ধৃত নহে, যদিও ঐ সকল পদ্মপুরাণীয় বচন সমূলক হয় তথাপি তাহার দ্বারা কেবল বেদবিরুদ্ধ তন্ত্রবচনের অমান্যতা হইবেক কিন্তু এ সকল বিরুদ্ধ তন্ত্রের মান্যতায় কোনাে হানি নাই। আর স্মাৰ্ত্তধৃত কূৰ্ম্মপুরাণবচনের অর্থ সুসঙ্গতই আছে যেহেতু তাহার প্রথম শ্লোক এই ( যানি শাস্ত্রাণি দৃশ্যন্তে লােকেস্মিন্ বিবিধানি চ। শ্রুতি স্মৃতিবিরুদ্ধানি নিষ্ঠা তেষাং হি তামসী ) ইহা পশ্চাৎলিখিত মনুবচনের সমানার্থ হয় ( যা বেদবাহাঃ স্মৃতয়াে যাশ্চ কাশ্চ কুদৃষ্টয়ঃ। সৰ্বাস্তা নিষ্ফলা: প্ৰেত্য তমােনিষ্ঠ। হি তাঃ স্মৃতা।) অর্থাৎ বেদবিরুদ্ধ শাস্ত্র অগ্রাহ্য হয়। স্মাৰ্ত্তত ওই কূৰ্ম্মপুরাণীয় দ্বিতীয় শ্লোক এই যে (করালভৈরবঞ্চাপি যামলং নাম যৎ কৃতং। এবম্বিধানি চান্যানি মােহনার্থানি তানি চ। ময়া সৃষ্টানেকানি মােহায়ৈষাং ভবার্ণবে) অর্থাৎ করালভৈরব যামলাদি তন্ত্রে নানাবিধ মারণ উচ্চাটন প্রভৃতি কর্মসমূহ কহিয়াছেন সেই সকল শাস্ত্র কর্মে প্রবৃত্তি দিয়া লােককে মােহযুক্ত করিয়া পুনঃ২ সংসারে জন্মমরণরূপ দুঃখদায়ক হয়েন, নিষ্কামী ব্যক্তিরা তাহার অনুষ্ঠান করিবেন না। কুৰ্ম্মপুরাণবচনে এরূপ লিখিবাতে ঐ সকল তন্ত্রের শাস্ত্রত্বে অপ্রামাণ্য হয় না। যেমন ভগবদগীতাতে কহেন (ত্রৈগুণ্যবিষয়। বেদা নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবাৰ্জ্জুন) স্বামী, বেদসকল কামনাবিশিষ্ট যে অধিকারী তাহাদের কর্মফলের সম্বন্ধপ্রতিপাদক হয়েন তুমি নিষ্কাম হও। অর্থাৎ ফলপ্রদর্শক বেদসকল কামনাবিশিষ্টকে সংসারে বেদা- ১৭০ রামমােহন-গ্রন্থাবলী মুগ্ধ করেন তুমি নিষ্কাম হইলে সেই সকল বেদের বিষয় হইবে না। তথাচ ভগবদগীতা ( যামিমাং পুষ্পিতাং বাচং প্রবদন্ত্যবিপশ্চিতঃ। বেদবারতাঃ পার্থ নান্যদস্তীতি- বাদিনঃ।) স্বামী, যে মূঢ় ব্যক্তিরা বিষলতার ন্যায় আপাতত রমণীয় যে সকল ফলশ্রুতিবাক্য তাহাকে পরমার্থসাধন কহে এবং চাতুর্মাস্য যাগ করিলে অক্ষয় ফল হয় ইত্যাদি ফলপ্রদর্শক বেদবাক্যে রত হয় আর ইহা হইতে শ্রেষ্ঠ ঈশ্বরতত্ত্ব প্রাপ্য নয় ইহা কহে তাহাদের তত্ত্বজ্ঞান হয় না। এই মােক্ষধৰ্ম্ম উপদেশে স্বগাদিফল- প্রতিপাদক বেদকে পুস্পিতবাক্য অর্থাৎ বিষলতার ন্যায় আপাতত রমণীয় পশ্চাৎ দুঃখদায়ক ইহা কথনের দ্বারা ঐ কর্মকাণ্ডীয় বেদের অপ্রামাণ্য হয় এমৎ নহে, কিন্তু কেবল মুমুক্ষুর তাহাতে প্রয়ােজনাভাব ইহা জানাইয়াছেন। এবং মুণ্ডকশ্রুতি (প্লবা হেতে অদৃঢ়া যজ্ঞরূপা অষ্টাদশােক্তমবরং যে কৰ্ম্ম। এতচ্ছে হয় যেহভিনন্দন্তি মূঢ়া জরামৃত্যুং তে পুনরেবাপিয়স্তি ) অষ্টাদশাঙ্গ যজ্ঞরূপ কৰ্ম্ম তাহা সকল বিনাশী হয় এই বিনাশী কৰ্ম্মকে যে সকল মূঢ় ব্যক্তি শ্রেয় করিয়া জানে তাহারা ফল ভােগের পর পুনঃ২ জন্ম মৃত্যু জরাকে প্রাপ্ত হয়। এ স্থলে শ্রুতি আপনিই কৰ্ম্মকাণ্ডীয় শ্রুতির অনাদর দেখাইতেছেন কিন্তু ইহাতে কর্মকাণ্ডীয় শ্রুতির অপ্রামাণ্য হয় না। সেইরূপ ওই কুৰ্ম্মপুরাণীয় বচনের দ্বারা মারণ উচ্চাটনাদি কবিধায়ক তন্ত্রের অনাদর তাৎপৰ্য্য হয় কিন্তু অপ্রামাণ্য তাৎপৰ্য নহে। দ্বিতীয় উত্তর, স্মাৰ্ত্ত ভট্টাচাৰ্য্য যিনি ঐ কুৰ্ম্মপুরাণীয় বচন লিখেন তাহার অভিপ্রায় যদি এরূপ হইত যে কুৰ্ম্মপুরাণ- বচনানুসারে ওই সকল তন্ত্রের শাস্ত্রত্ব নাই, তবে যামলাদি তন্ত্রের বচনকে প্রমাণ বােধে স্বীয় গ্রন্থে কদাপি লিখিতেন না। তৃতীয় উত্তর, ২০৬ পৃষ্ঠে ১৩ পংক্তিতে বরাহপুরাণের উল্লেখ করিয়া কল্পিত আগমের লক্ষণ দেখাইবার নিমিত্ত বচনসকল ১৫ পংক্তি অবধি লিখিয়া তাহার অর্থ ২০৭ পৃষ্ঠে ও পংক্তিতে লিখিয়াছেন “অর্থাৎ প্রত্যহ গােমাংস ভক্ষণ ও সুরাপান করিবেক এবং গঙ্গা যমুনার মধ্যে তপস্বিনী বালণ্ডার হস্ত গ্রহণ করিয়া বলাৎকারে তাহাকে মৈথুন করিবেক এবং মাতৃযােনি পরিত্যাগ করিয়া সকল যােনিতে বিহার করিবেক এবং কি স্বদার কি পরদার স্বেচ্ছানুসারে সযােনিতে বিহার করিবেক কেবল গুরুশিষ্যপ্রণালী ত্যাগ করিবেক” পরে ঐ সকল বচনে নির্ভর করিয়া মহানিৰ্বাণাদিকে ওই সকল দূষ্য আগমের মধ্যে গণিত করিয়াছেন, এ নিমিত্ত মহানিৰ্বাণ ও কুলার্ণবের কতিপয় বচন এ স্থলে লিখা যাইতেছে যাহার দ্বারা পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন, যে ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত বরাহপুরাণীয় বচনপ্রাপ্ত কুকর্মোপদেশ সকল ওই সকল তন্ত্রে দৃষ্ট হইয়া ধৰ্মসংহারকের মতানুসারে ওই সকল তন্ত্র অসদাগমের মধ্যে গণিত হয়েন, কি ধৰ্ম্মসংহারকের পথ্য প্রদান ১৭১ বলাৎকারেণ যাে লিখিত ওই সকল কুকৰ্ম্ম অর্থাৎ গােমাংস ভক্ষণ অপরিমিত সুরাপান, বলাৎকারে স্ত্রীসংসর্গ, ও তাবৎ পরস্ত্রীগমন ইত্যাদি পাপকর্মের নিষেধ তাহাতে প্রাপ্ত হইয়া সদাগমরূপে সিদ্ধ হয়েন। মহানিৰ্বাণতন্ত্রে একাদশশাল্লাসে ( অসংস্কৃতমুরাপানাৎ শুদ্ধ্যেদুপবসঁহং। ভুক্ত, পিশােধিতং মাংসমুপবাসন্বয়ং চরেৎ। গচ্ছেদপি চণ্ডালযােষিতং। বধস্তস্য বিধাতব্যে ন ক্ষন্তব্যঃ কদাপি সঃ। ভুঞ্জানাে মানবং মাংসং গােমাংসং জ্ঞানতঃ শিবে। উপােষ্য পক্ষং শুদ্ধঃ স্যাৎ প্রায়শ্চিত্তমিদং স্মৃতং। পিবতিশয়ং মদ্যং শােধিতস্থাপশােধিতং । ত্যাজ্যে ভবতি কৌলানাং দণ্ডনীয়ােপি ভূভৃতঃ ) অর্থাৎ অসংস্কৃত সুরাপান করিলে ত্রিরাত্র উপবাস করিয়া পাপ হইতে মুক্ত হয় আর অশােধিত মাংস ভােজন করিলে দুই দিন উপবাস করিবেক । যে ব্যক্তি চণ্ডালের স্ত্রীকেও বলাৎকারে গমন করে রাজা তাহার বধ করিবেন কদাপি ক্ষান্ত হইবেন না। যে ব্যক্তি মানুষের মাংস এবং গােমাংস জ্ঞানপূর্বক ভােজন করে এক পক্ষ উপবাস তাহার প্রায়শ্চিত্ত হয়। শােধিত কি অশােধিত মদ্য অতিশয় পান করিলে কৌলের ত্যাজ্য ও রাজদণ্ডের যােগ্য হয় ( কামাৎ পরস্ত্রিয়ং পশ্যন্ রহঃ সম্ভাষয় স্পৃশ। পরিষজ্যোপবাসেন বিশুদ্ধ্যেদ্বি- গুণক্রমাৎ । মাতরং ভগিনীং কন্যাং গচ্ছতে নিধনং দমঃ) অর্থাৎ কামপূর্বক পরস্ত্রীর দর্শন ও নির্জন স্থানে সম্ভাষণ, স্পর্শন কিম্বা আলিঙ্গন করিলে ক্রমশ এক, দুই, তিন, চারি উপবাসের দ্বারা শুদ্ধ হইবেক। মাতা ভগিনী কিম্বা কন্যা ইহাদিগ্যে গমন করিলে তাহার মৃত্যুদণ্ড হয়। কুলার্ণবে ( অসংস্কৃতং পিবন্ মঙ্গং বলাৎকারেণ মৈথুনং। আত্মার্থং বা পশূন্ নিন্ রৌরবং নরকং ব্ৰজেৎ ) অসংস্কৃত মদ্যপান ও বলাৎকারে স্ত্রীসঙ্গ এবং আপনার নিমিত্ত পশুবধ করিলে রৌরব নরকে যায়। তথা প্রথম উল্লাসে, (স্বস্ববর্ণাশ্ৰমাচারলঙ্ঘনাদ্দ,প্রতিগ্ৰহাৎ। পরস্ত্রীধন- লােভাচ্চ নৃণমায়ুঃক্ষয়ে ভবেৎ। বেদশাস্ত্রাগনভ্যাসত্তথৈব গুরুবঞ্চনাৎ। নৃণমায়ু ক্ষয়ে ভূয়াদিন্দ্রিয়াণামনিগ্রহাৎ) আপন২ বর্ণাশ্রমাচারের লঙ্ঘন দ্বারা ও নিন্দিত প্রতিগ্রহের দ্বারা এবং পরস্ত্রীতে ও পরধনে লােভ ইহার দ্বারা মনুষের পরমায়ু ক্ষয় হয়। আর বেদশাস্ত্রাদির অনভ্যাস ও গুরুবঞ্চনা এবং ইন্দ্রিয়ের অনিগ্রহ ইহাতে মনুষ্যের আয়ু ক্ষয় হয়। চতুর্থ উত্তর, ভূরি তন্ত্রশাস্ত্রে পুনঃ সত্য প্রতিজ্ঞা করিয়া ভগবান্ মহেশ্বর কহিয়াছেন যে বীরভাব ও তত্ত্ব গ্রহণ কলিযুগে সর্বদা প্রশস্ত ও সিদ্ধিদায়ক হয়েন, আর পশুভাব যাহা কহিয়াছি সে পশুদের মােহনর্থ জানিবে। তথাহি কুলার্ণবে দ্বিতীয় উল্লাসে। (পশুশাস্ত্রাণি সৰ্বাণি ময়ৈব কথিতানি বৈ । মূৰ্ত্তন্তরঞ্চ গবৈ মােহনায় দুরাত্মনাং। মহাপাপবশাণাং বাঞ্ছা তেম্বেব জায়তে।

১৭২ রামমােহন-গ্রন্থাবলী তেষাঞ্চ সদগতিনাস্তি কল্পকোটিশতৈরপি।) অন্য মূর্তি ধারণ করিয়া দুরাত্মাদের মােহন নিমিত্ত আমিই পশুশাস্ত্র সকল কহিয়াছি মহাপাপবিশিষ্ট মনুষ্যদের হাতেই কেবল বাঞ্ছা হয় শত কোটি কল্লেও তাহাদের সম্মতি নাই। তাহাতে যদি ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত কুৰ্ম্মপুরাণ পদ্মপুরাণ ও সিদ্ধলহরীর বচন প্রমাণে বীরাধিকারীয় কুলার্ণব ও মহানিৰ্বাণাদি তন্ত্র সকল মােহনার্থ অসদাগম হয়েন, আর আমাদের ঐ পূৰ্ব্বলিখিত বচনপ্রমাণে পশ্বধিকারীয় তন্ত্র সকল মােহনার্থ অসদাগম হয়েন আর ওই২ বচনকে উভয় ধর্মের স্তুতিপর স্বীকার করা না যায়, তবে শিবপ্রণীত সকল শাস্ত্রের বৈয় ও অপ্রামাণ্য এককালেই হইল, এবং সর্বজ্ঞ ও ধর্মসেতুরক্ষাকর্তা পরমারাধ্য ভগবান্ মহেশ্বরের মিথ্যাবাদিত্বে ও আপ্তপুরুষত্বে শঙ্কা জন্মে এবং মহেশ্বরপ্রণীত শাস্ত্রের যদি অপ্রামাণ্য হয় তবে ভগবান্ পরমেষ্ঠীর প্রণীত বেদশাস্ত্রেরও অপ্রামাণ্যর প্রসক্তি কেন না হয়? যেহেতু শাস্ত্রে তুল্যরূপে উভয়কেই সর্বজ্ঞ আপ্ত ও সত্যস্বরূপ একাত্ম কহিয়াছেন, সুতরাং একের বাক্যো- ঘনে অন্যের বাক্যোল্লঙ্ঘন হইতেই পারে, অত এব ধর্মসংহারক আপন এই ব্যবস্থার দ্বারা যে “এক শাস্ত্রের প্রামাণ্য, অন্য শাস্ত্রের অপ্রামাণ্য অবশ্যই কহিতে হইবেক” বেদাগম সর্বশাস্ত্রের উচ্ছেদক হয়েন কি না? এবং “ধৰ্ম্মসংহারক” এই নাম তাঁহার উচিত হয় কি না পণ্ডিতেরা বিবেচনা করিবেন। যদ্যপিও ধর্মসংহারক পশুধৰ্ম্মবিধায়ক তন্ত্রকে শাস্ত্রত্বে মান্য কহিয়া বীরধর্মবিধায়ক তন্ত্রের অপ্রামাণ্যর ব্যবস্থা দিলেন, কিন্তু ভগবান্ মহেশ্বর ইহার বিপরীত সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, অর্থাৎ তাবৎ তন্ত্রের প্রামাণ্য কহিয়া অধিকারিভেদে পরস্পরের অনৈক্যের মীমাংসা করেন। মহানিৰ্বাণ (তন্ত্রাণি বহুক্তোনি নানাখ্যানান্বিতানি চ। সিদ্ধানাং সাধকানাঞ্চ বিধানানি চ ভূরিশঃ। যথা যথা কৃতাঃ প্রশ্নঃ যেন যেন তথা তস্যোপকারায় তথৈবােক্তং ময়া প্রিয়ে। অধিকারিবিশেষেণ শাস্ত্রাণাক্তাশেষতঃ। স্বে স্বেহধিকারে দেবেশি সিদ্ধিং বিন্দন্তি মানবাঃ) অর্থাৎ নানা আখ্যানযুক্ত অনেকপ্রকার তন্ত্র কহিয়াছি, সিদ্ধ ও সাধকের নানাপ্রকার বিধান কহিয়াছি—যে সময়ে যাহার দ্বারা যে রূপ প্রশ্ন হইয়াছিল তখন তাহার উপকারের নিমিত্ত তদনুরূপ শাস্ত্র কহিয়াছি—অধিকারভেদে নানাবিধ শাস্ত্র কথা গিয়াছে আপন২ অধিকারে মনুষ্য সকল সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েন। এখন জিজ্ঞাস্য এই হইতে পারে যে ধৰ্মসংহারকের ব্যবস্থা মান্য হইয়া কি সকল শাস্ত্র উচ্ছন্ন হইবেক? কি ভগবান্ মহেশ্বরের আজ্ঞা শিরােধার্য হইয়া শাস্ত্রসকল রক্ষা • যদা যদা। পাইবেক ?

পথ্য প্রদান ১৭৩ ২১২ পৃষ্ঠে ১৪ পংক্তিতে কুলার্ণবাদি তন্ত্রের অমূলকত্ব স্থাপনের উদ্দেশে ধর্ম- সংহারক লিখেন যে “সমূলক ও অমূলক স্মৃতি পুরাণাদির পরস্পর বিরােধে অমূলকই ত্যাজ্য হয়”। উত্তর, কৃৰ্ম্মপুরাণবচনরচনাকে আমরা প্রত্যক্ষ দেখিয়াছি ও কেবল কুলধৰ্ম্মবিধায়ক তন্ত্রের প্রকাশ সময়ে আমরা বিদ্যমান ছিলাম না এমৎ নহে, বস্তুত এ দুইয়ের এক প্রত্যক্ষসিদ্ধ নহে, কিন্তু কি পুরাণ কি তন্ত্র উভয়ের প্রামাণ্যর কারণপরম্পরা ও পূৰ্বৰ আচাৰ্য ও সংগ্রহকারদের বাক্য হইয়াছেন অতএব উভয়ের তুল্য প্রমাণ থাকিতে পুরাণের সমূলকত্ব ও এই সকল তন্ত্রের অমূলক কথন ধৰ্ম্মসংখাদক হইতেই হয়। ওই পৃষ্ঠের ১৭ পংক্তি অবধি লিখেন যে “তিস্মৃতির বিরােধে স্মৃতির অমান্যতায় কি শ্রুতির অমান্যতা হয়, মনুস্মৃতি ও অন্য স্মৃতির বিরােধে অন্য স্মৃতির অমান্যতায় মনুস্মৃতির অমান্যতা কি হয়”। উত্তর, শাস্ত্রে দৃষ্ট হইতেছে যে শ্রুতিস্মৃতিবিরােধে শ্রুতির মান্যতা এবং মনুস্মৃতি ও অন্য স্মৃতির বিরােধে মনুস্মৃতির মান্যতা হয়, সুতরাং তদনুরূপ ব্যবহার হইয়াছে, কিন্তু ইহা কোন্ শাস্ত্রে লিখিত আছে যে পুরাণ ও তন্ত্র- শাস্ত্রে বিরােধ হইলে পুরাণই মান্য হইবেন ? অথবা পুরাণে লিখিত যে মহেশ্বরােক্তি তাহা তন্ত্রলিখিত মহেশ্বরবাক্য হইতে শ্রেষ্ঠ হয়? বরঞ্চ ইহাই দৃষ্ট হয় যে পুরাণ যেরূপ আপনার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণন করেন সেইরূপ তন্ত্রে পুরাণাদি হইতে তন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব কথন আছে; বিশেষত ওই কূৰ্ম্মপুরাণীয় বচনে তিস্মৃতিবিরুদ্ধ শাস্ত্রকেই কেবল তামস কহিয়াছেন তাহাতেও এরূপ কথন নাই যে পুরাণবিরুদ্ধ তন্ত্র অগ্রাহ্য হয়, অথবা কি শ্রুতিসম্মত কি শ্রুতিবিরুদ্ধ স্মৃতিমাত্রেরই সহিত যে তন্ত্র বিরুদ্ধ সে অগ্রাহ হয় ; কেবল ধর্মসংহারক দক্ষপক্ষ আশ্রয় করিয়া মহেশ্বরপ্রণীত শাস্ত্রের অপমান করিতেছেন। আদৌ ধর্মসংহারক আপন অজ্ঞানতার প্রাবল্যে কুলধৰ্ম্মবিধায়ক তন্ত্রমাত্রকে অসদাগম স্থির করিয়া, ২০৮ পৃষ্ঠে ৭ পংক্তি অবধি (কলৌ যুগে মহেশানি ব্রাহ্মণানাং বিশেষতঃ। পশুর্ন স্যৎ পশুর্ন স্যাৎ পশুর্ন স্যামাজ্ঞয়া।) ইত্যাদি বচনের উল্লেখপূর্বক ১১ পংক্তিতে লিখেন যে “এই মহানিৰ্বাণের বচনে পশুর্ন স্যাৎ ইত্যাদি স্থানে নঞর অর্থ নিষেধ নহে কিন্তু শিশ্চালন এবং পুনঃ২ পশুর্ন স্যাৎ এই শব্দ প্রয়ােগে নিশ্চয় অর্থও বােধ হইতেছে, তাহাতে এই অর্থ স্থির হয় যে কলিযুগে বিশেষতঃ ব্রাহ্মণেরা কি পশু হইবেন না, ফলত অবশ্যই পশু হইবেন” ইত্যাদি। উত্তর, আপন প্রত্যুত্তরের ১৮৮ পৃষ্ঠের ৬ পংক্তিতে ধর্মসংহারক লিখেন যে “যে পাষণ্ডেরা পরদারা ন গচ্ছেৎ পরধনং ন গৃহীয়াৎ, অর্থাৎ পরদার গমন করিবেক ১৭৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী •• কহিতে তত্তল তন্তুল্য ব্যক্তিরা এবং পরধন অপহরণ করিবেক না, ইত্যাদি স্থলে শিরশ্চালনে নঞ, এই কথা কহিয়া এই প্রকার অর্থ করে যে, সর্বদা পরদার গমন ও পরধন হরণ করিবেক, সে পাষণ্ডেরাও এইক্ষণে ব্ৰহ্মপুরাণে ও কালিকাপুরাণে মদ্যের নিষেধ দর্শনে উশনার বচনেও (মদ্য অদেয় অপেয়) ইত্যাদি স্থানে অশব্দ নিষেধাৰ্থ অবশ্যই কহিবেন” অর্থাৎ শাস্ত্রের স্পষ্টার্থ ত্যাগ করিয়া নঞর অর্থ শিশ্চালন কহিয়া যে অর্থান্তর করে তাহাকে এ স্থলে ধৰ্ম্মসংহারক পাষণ্ড কহিলেন কিন্তু আপনিই পুনরায় ( পশুর্ন স্যাৎ ) ইত্যাদি স্থলে অন্য শাস্ত্রের পােষক বচন থাকিতেও ইহার স্পষ্টার্থ ত্যাগ করিয়া নঞর অর্থ শিরশ্চালন জানাইয়া অর্থান্তরের কল্পনা করিতেছেন কি আশ্চৰ্য্য ধৰ্ম্মসংহারক স্বমুখেই আপন পাষণ্ডত্ব স্বীকার করিলেন, অধিকন্তু ধৰ্ম্ম- সংহারকের দর্শিত এই শিরশ্চালন অর্থে নির্ভর করিয়া তাহার লিখিত ( ন মদ্যং প্রপিবেন্দেবি )-(ন কলৌ শােধনং মদ্যে ) ইত্যাদি বচনকে মদ্যপানবিধায়ক অন্য ২ বচনের সহিত একবাক্যতা করিয়া নঞর অর্থ শিরশ্চালন কহিতে কেন না সমর্থ হয়েন ? এবং এইরূপ ব্যাখ্যা কেন না করেন যে (ন মদ্যং প্রপিবেদ্দেবি) প্রকৃষ্টরূপে মদ্য কি পান করিবেক না, ফলত অবশ্যই পান করিবেক (ন কলো শশাধনং মদ্যে) কলিতে কি মদ্যের শশাধন নাই, ফলত অবশ্যই শােধন আছে, সুতরাং ধৰ্ম্মসংহারক এইরূপ ব্যাখ্যার পথ দৰ্শাইয়া স্বাভিলষিত ধৰ্মনাশের উদ্দেশে তাবৎ শাস্ত্রকে উচ্ছন্ন করিতে বসিয়াছেন। পরে ঐ পৃষ্ঠে ( অতএব দ্বিজাতীনাং) ইত্যাদি একস্থানস্থ বচনকে অন্যস্থানীয় বচন ( দ্বেষ্টারঃ কুলধৰ্ম্মাণাং) ইত্যাদির সহিত অম্বয় করিয়া যে প্রলাপ ব্যাখ্যান করিয়াছেন তাহা পণ্ডিতেরা যেন অবলােকন করেন। ২০৯ পৃষ্ঠে ৫ পংক্তি অবধি লিখেন যে “যদ্যপি ভক্ত বামাচারী মহাশয় কহেন যে (কলৌ যুগে মহেশানি) ইত্যাদি মহানিৰ্বাণের বচন শিববাক্য আর (যানি শাস্ত্রাণি দৃশ্যন্তে) ইত্যাদি কূৰ্ম্মপুরাণীয় বচন বেদব্যাসবাক্য অতএব বেদব্যাসবাক্যের দ্বারা শিববাক্যের বাধ কি প্রকারে জন্মান যায়, তথাপি সেই কূৰ্ম্মপুরাণবচনকে শিববাক্য বলিয়া তাহাতে তাহাদিগের শ্রদ্ধা করিতে হইবেক”। উত্তর, আমরা পূৰ্বেই পুনঃ২ কহিয়াছি যে কি শিববাক্য কি দেবীবাক্য কি ব্যাসাদি ঋষিবাক্য সকলই শাস্ত্রবােধে মান্য হয়েন, অতএব ধৰ্ম্মসংহারকের এরূপ লেখা যে “তথাপি সেই কুৰ্ম্মপুরাণীয় বচনকে শিববাক্য বলিয়া তাহাতে তাহাদিগ্যে শ্রদ্ধা করিতে হইবেক” সৰ্বথা অযােগ্য, বিশেষত ধৰ্ম্মসংহারকের লিখিত এ কূর্মপুরাণীয় বচন শিবশাস্ত্রের কোনাে মতে বাধক নহে যাহা আমরা এই দ্বিতীয় উত্তরে ২২৮ পৃষ্ঠের ১৩ পংক্তি অবধি ২৪৩ পৃষ্ঠের ৩ পংক্তি পর্যন্ত বিবরণপূর্বক লিখিয়াছি; অধিকন্তু ভগবান ৩ পথ্য প্রদান ১৭৫ বেদব্যাস কাশীখণ্ডে স্বয়ং সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে পরমারাধ্য মহেশ্বরের মাহাত্মের স্বল্পতা দর্শাইয়া যদি কদাপি কোনাে উক্তি স্বতঃ পরত করিয়াছেন তাহাতে পরমারাধ্যের হেয়ত্ব সূচনা না হইয়া তাহারি হস্তস্তম্ভন ও কণ্ঠরােধ ইত্যাদি বিড়ম্বনার কারণ হইয়াছিল, এইরূপ তন্ত্ররত্নাকরেও প্রাপ্ত হইতেছে তথাহি ( হতদর্পস্তদা ব্যাসাে ভৈরবেণ মহাত্মনা। কম্পিততারুশিরগ্রীবস্ততঃ কাশ্য বিনির্যযযৗ। তেনাহুতাঃ সুরনদী যমুনা চ সরস্বতী। গােদাবরী নর্মদা চ কাবেরী বাহুদা তথা। দেব দেবৰ্ষয়ঃ সিদ্ধা ইচ্ছন্তোপি হিতং মুনে। ভৈরবস্ত ভয়াদ্দেবি ন জগুবাসসন্নিধৌ! ভগ্নোদ্যমাে নিরানন্দঃ শােকসংবিগ্নমানসঃ। কিং করােমি ক গচ্ছামি জল্পতি স্ম পুনঃ পুনঃ ।) অর্থাৎ বেদব্যাস দ্বিতীয় কাশীনির্মাণে উদ্যত হইয়া কেবল ক্ষোভ প্রাপ্ত হইলেন। পুনরায় ২১১ পৃষ্ঠের প্রথম অবধি কুলধৰ্ম্মবিধায়ক তন্ত্রকে শ্রুতিবিরুদ্ধ অপবাদ দিয়া অগ্রাহ্য কহিয়াছেন ইহার উত্তর ২২৮ পৃষ্ঠ অবধি বিশেষরূপে লিখা গিয়াছে অতএব পুনরায় আড়েনে প্রয়ােজনাভাব। ভাগবতের, ব্ৰহ্মবৈবর্তের ও তন্ত্রের বচন লিখিয়া পরে ২১৬ পৃষ্ঠে ৮ পংক্তি অবধি লিখেন “যে মহানিৰ্বাণাদি তন্ত্রের বচনে কেবল পুরাণাদি শাস্ত্রের নিন্দা বােধ হইতেছে যেহেতু সেই বচনে তৎপথবিমুখ ব্যক্তিসকলের প্রতি পাষণ্ড ও ব্রহ্মঘাতক ইত্যাদি শব্দ প্রয়ােগ এবং পুরাণাদি শাস্ত্রকে অর্কক্ষীর এবং ষড়দর্শনকে কুপ কহিতেছেন, উত্তমের রীতি এই যে পরের প্রশংসার দ্বারা আপনিও প্রশংসিত হয়েন অধমে তাহার বিপরীত।” উত্তর, প্রথমত সাদৃশ্য দ্বারা কোনাে শাস্ত্রের প্রতি “অধম” এ পদ প্রয়ােগ করা অতি অধম ও ধর্মসংহারক হইতেই সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, পুরাণাদি শাস্ত্রের নিন্দা কথন তন্ত্রশাস্ত্রে আছে তাহার প্রমাণের উদ্দেশে ধৰ্ম্মসংহারক লিখেন যে “সেই বচনে তৎপথবিমুখ ব্যক্তিসকলের প্রতি পাষণ্ড ও ব্রহ্মঘাতক ইত্যাদি শব্দের প্রয়ােগ এবং পুরাণাদি শাস্ত্রকে অর্কক্ষীর ও ষড়দর্শনকে কুপ কহিতেছেন”। উত্তর, তন্ত্রে দেখিতেছি যে তন্ত্রশাস্ত্রবিমুখ ব্যক্তিকে পাষণ্ড কহেন যথার্থই বটে যেহেতু তন্ত্রমতবিমুখ ব্যক্তি প্রায় এদেশে অপ্রাপ্য, কিন্তু ধর্মসংহারকের লিখিত পদ্মপুরাণীয় বচন সমূলক হইলে তাহাতে স্পষ্ট শিবশাস্ত্রকে পাষণ্ডশাস্ত্র কহিয়াছেন অতএব বিবেচনা কর্তব্য যে সাক্ষাৎ নিন্দোক্তি কোথায় লিখিত আছে। তৃতীয়ত, যেমন আগমে শিবপথবিমুখকে পাষণ্ড কহেন সেইরূপ ভাগবতাদি বিষ্ণুপ্ৰধান গ্রন্থে বিষ্ণুভক্তিবিমুখকে চণ্ডাল ও অন্য উপাসককে দুৰ্বাক্য কহিয়াছেন, এইরূপ মাহাত্মপ্রদর্শক নিন্দাবােধক বচনের দ্বারা ভাগবতাদি গ্রন্থ কি অধম ইইবেন ? (বিদ্বিষড় গুণযুতাদরবিন্দনাপাদারবিন্দবিমুখাৎ শপচং বরিষ্ঠং।

১৭৬ রামমােহন-গ্রন্থাবলী বিনােপসৰ্পত্যপরং হি বালিশঃ লাঙ্গুলেনাতিতৰ্ত্তি সিন্ধুং ) ভাগবত, তাবৎ গুণযুক্ত ব্রাহ্মণ যদি বিষ্ণুপাদপদ্মবিমুখ হয়েন তবে তাহা হইতে চণ্ডালকে শ্রেষ্ঠ করিয়া মানি। বিষ্ণুর প্রতি দেবতাদের বাক্য, সর্বশ্রেষ্ঠ ভগবান্ ব্যতিরেকে অন্যের শরণাগত যে হয় সে মূখ কুকুরের লাঙ্গল অবলম্বন করিয়া সমুদ্র পার হইতে বাসনা করে। চতুর্থ, মহেশ্বরমত ত্যাগ করিয়া অন্য মত গ্রহণ করিলে সেই মতকে অকক্ষীর তন্ত্র- বচনে কহিয়াছেন ইহা ধৰ্ম্মসংহারক লিখেন; বস্তুত এই বাক্যানুসারে ব্যবস্থাও দৃষ্ট হয় যেহেতু তন্ত্রমত ত্যাগ করিয়া অন্য মতে উপাসনাদি এদেশে কেহ করেন না। পঞ্চম, ষড় দর্শনকে কূপশব্দ তন্ত্রে কহিয়াছেন ধৰ্ম্মসংহারক লিখেন, উত্তর, পরম তত্ত্বকে ত্যাগ করিয়া যাহারা ষড়দর্শনবাদে রত হয়েন তাঁহাদের প্রতি ষড়দর্শন কূপম্বরূপ হইবেন তন্ত্রবচনের এই তাৎপৰ্য, ইহাতে ষড়দর্শনের নিন্দা অভিপ্রেত নহে যেহেতু কুলার্ণবে ষড় দর্শনকে মুক্তিসাধন ও ভগবানের অঙ্গস্বরূপ কহিয়াছেন, কুলর্ণব ('দর্শনেষু চ সর্বেষু চিরাভ্যাসেন মানবাঃ । মোক্ষং লভন্তে কোলে তু সদ্য এব ন সংশয়ঃ ) তথা ( ষড়দর্শনানি স্বাঙ্গানি পাদোঁ কুক্ষিকরে শিরঃ। তেষু ভেং হি যঃ কুৰ্য্যামাঙ্গচ্ছেদ এব হি) সকল দর্শনেতে চিরকাল অভ্যাসের দ্বারা মনুষ্য মােক্ষ প্রাপ্ত হয় আর কুলধৰ্ম্মে তৎক্ষণাৎ মুক্ত হয় ইহাতে সংশয় নাই। পাদদ্বয় হস্তদ্বয় উদর ও মস্তক এই আমার ছয় অঙ্গ ষড়দর্শন হয়েন ইহাতে যে ভেদজ্ঞান করে সে আমার অঙ্গচ্ছেদ করে। ২১৭ পৃষ্ঠে ৬ পংক্তি অবধি লিখেন যে “ভাক্তবামাচারী মহাশয় কহেন যে মহানিৰ্বাণাদি তন্ত্র অসদাগম এ কারণ অগ্রাহ্য ও অপ্রমাণ হইলেও তথাপি পুরাণাদির মতাবলম্বী ও মহানিৰ্বাণাদির মতাবলম্বী এ উভয়েরই তুল্য ফল” ইত্যাদি। উত্তর, পূৰ্ব্ব প্রমাণের দ্বারা কুলধৰ্ম্মবিধায়ক মহানিৰ্বাণ, কুলার্ণবাদির সদাগমত্ব ও শাস্ত্রত্ব সিদ্ধ হওয়াতে এ কোটি আমাদের প্রতি সম্ভব হয় না, যেহেতু যাঁহারা এ সকল কুলধৰ্ম্মবিধায়ক তাবলম্বী হয়েন তাহাদের ইহলােকে ভােগ এবং পরলােকে মােক্ষ- প্রাপ্তি দ্বারা ধৰ্মসংহারকের সহিত কদাপি ফলেতে সমতা সম্ভব নহে, (যত্ৰাস্তি ভােগবাহুল্যং তত্র মােস্য কা কথা। যােগেপি ভােগবিরহঃ কৌলভয়মতে) অর্থাৎ বৌদ্ধাদি অধিকারে যাহাতে বিহিতানুষ্ঠান বিনা ভােগের বাহুল্য আছে, তথায় তথায় মােক্ষের সম্ভাবনা নাই আর যােগাদি অধিকারে মােপ্রাপ্তি হয় কিন্তু তাহাতে ভােগের অপ্রাপ্যতা পরন্তু কৌলধৰ্ম্মে ভােগ ও মােক্ষ উভয় প্রাপ্তি হয়। তবে যে সকল লােক কেবল যুক্তিতেই নির্ভর করেন তাহাদের নিকটে এ কোটি অন্য কোটিয়ের সহিত সম্ভব হয়, অর্থাৎ যদি কুলধৰ্ম্মবিধায়ক তন্ত্রশাস্ত্র এবং আপাতত পথ্য প্রদান ১৭৭ কুলধৰ্ম্মনিষেধক স্মৃতিশাস্ত্র উভয়ই সত্য হয়েন তবে উভয়ধর্মাবলম্বীদের পরলােক সিদ্ধ হইবেক, অধিকন্তু কৌলের ইহলােকে ভােগ রহিল, যদি উভয় শাস্ত্র মিথ্যা হয়েন তাহাতে যদ্যপিও উভয়মতাবলম্বীদের পরলােকসিদ্ধি হইবেক না তথাপি ওই স্মাৰ্ত্তদের নিষ্ফল ঐহিক যন্ত্রণা রহিল, যদি উভয়ের মধ্যে এক সত্য ও অন্য মিথ্যা হয়েন অর্থাৎ কুলধৰ্ম্মবিধায়ক শাস্ত্র সত্য হয়েন ও আপাতত কুলধৰ্ম্মনিষেধক স্মৃতিশাস্ত্র মিথ্যা হয়েন তবে কৌলিকের উভয় সদগতি হইল, আর ওই২ স্মৃতি- মতাবলম্বীদের উভয় লােক ভ্রষ্ট হইবেক, অথবা তাহার অন্যথাতে অর্থাৎ ওই আপাতত কুলধৰ্ম্মনিষেধক স্মৃতি সত্য ও কুলধৰ্ম্মবিধায়ক শাস্ত্র মিথ্যা যদি হয়েন তথাপি কৌলিকের ইহলােকে স্বচ্ছন্দতা রহিল আর ওই স্মৃত্যবলম্বীদের কেবল পরলােক সিদ্ধ হইতে পারে ; এই অংশে উভয় ধর্মের এক প্রকার তুল্যফলদাতৃত্ব কেবল থাকে। এ কোটিচতুষ্টয় কেবল যুক্তিপর ব্যক্তিদের নিকট কুলধৰ্ম্মের প্রশংসার প্রতি কারণ হয়। ২১৮ পৃষ্ঠের ১৪ পংক্তিতে লিখেন যে “ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাক্ষীর লিখিত স্মৃতি- পুরাণাদিবচনে ব্রাহ্মণাদির মদ্য পানের নিষেধ দর্শনে শূদ্র ভাক্ততত্ত্বজ্ঞানী মহাশয়ের লম্ফ উল্লম্ফ প্রলম্ফ প্রদান করিবেন না যেহেতু শূদ্র কমলাকরধৃত পরাশরবচন দর্শন করিলে তাহাদিগেরও বাক্যরােধ ও হৃদ্বোধ হইবেক, যথা পরাশরঃ (তথা মদ্যস্য পানেন ব্রাহ্মণীগমনেন চ। বেদাক্ষরবিচারেণ শূদ্ৰশ্চণ্ডালং ব্ৰজেৎ ) শূদ্ৰজাতি যদি মদ্য পান ব্রাহ্মণীগমন কিম্বা বেদের বিচার করেন তবে তাহাদের চণ্ডাল জাতি প্রাপ্তি হয়”। উত্তর, ধৰ্ম্মসংহারক এই ব্যবস্থা দিলেন যে শূদ্রের সুরাপান সুদূর, যদি মদ্য পানও শূদ্রে করে তবে চণ্ডাল হয়, কিন্তু মিতাক্ষরাকার ও প্রায়শ্চিত্তবিবেককার প্রভৃতি গ্রন্থকারেরা মম্বাদি ঋষিবচনে নির্ভরপূৰ্ব্বক ইহার অন্যথায় ব্যবস্থা দেন। মনুঃ ( তস্মাহ্মণরাজন্যে বৈশ্যশ্চ ন সুরাং পিবেৎ ) বৃহ্যাজ্ঞবল্ক্য (কামাদপি হি রাজন্যে বৈশ্যো বাপি কথঞ্চন। মদ্যমেবাসুরাং পীত্বা ন দোষং প্রতিপদ্যতে ) অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ ইহঁারা সুরাপান করিবেন না, অর্থাৎ অবিহিত সুরাপান করিবেন না, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য যদি স্বেচ্ছাধীন অর্থাৎ দেবােদ্দেশ ব্যতিরেকও সুরাভিন্ন মদ্যপান করেন তবে দোষ প্রাপ্ত হয়েন না। পরে মিতাক্ষরাকার সিদ্ধান্ত করেন (ত্রৈবর্ণিকানাং জন্মপ্রভৃতি পৈষ্টীনিষেধ ব্রাহ্মণস্য তু মদ্যমাত্র- নিষেধােপু্যুৎপত্তিপ্রভৃত্যেক, রাজবৈশ্যয়ােস্তু ন কদাচিদপি গৌড্যাদিমদ্যনিষেধ, শূদ্রস্য তু ন সুপ্রতিযেখাে নাপি মদ্যপ্রতিষেধ) অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য এই তিন বর্ণের জন্ম অবধি পৈষ্টীমুরা নিষিদ্ধ হয় আর ব্রাহ্মণের প্রতি জন্ম অবধি ১৭৮ রামমােহন-গ্রন্থাবলী ; মদ্য মাত্রের নিষেধ। ক্ষত্রিয় বৈশ্যের গৌড়ী প্রভৃতি মদ্যের কদাপি নিষেধ নাই অর্থাৎ রাগতও নিষিদ্ধ নহে আর শূদ্রের প্রতি সুরা কিম্বা মদ্য এ দুইয়ের একও নিষিদ্ধ নহে। প্রায়শ্চিত্তবিবেককার নানা মুনিবচনের বিচার করিয়া পরে সিদ্ধান্ত করেন (তদেবং পৈষ্টীনিষেধবৈর্ণিকানাং গৌড়ীমাধ্বীনিষেধ ব্রাহ্মণানামেব) তথা, (রাজাদীনান্তু গৌড়ীমাধ্বীপ্রভৃতিসকলমদ্যপানে ন দোষঃ) অর্থাৎ ব্রাহ্মণাদি তিন বর্ণের পৈষ্টী সুরা নিষিদ্ধ হয় আর কেবল ব্রাহ্মণের প্রতি গৌড়ী মাধ্বীর নিষেধ হয়। ক্ষত্রিয়াদি বর্ণের গৌড়ী মাধ্বী প্রভৃতি সর্বপ্রকার মদ্যপানে দোষ নাই। এখন জিজ্ঞাসা করি যে মনু যাজ্ঞবল্ক্যর অনুশাসনে ও মিতাক্ষরা ও প্রায়শ্চিত্তবিবেকের ব্যবস্থা দ্বারা শূদ্রের বৈধাবৈধ মদ্যপানে দোষাভাব মানিতে হইবেক, কি ধৰ্ম্মসংহারকের ব্যবস্থানুসারে ঐ সকলের সিদ্ধান্ত অন্যথা হইয়া শূদ্রের মদ্যপান নিষিদ্ধ ইহাই স্থির করা যাইবেক। ধৰ্ম্মসংহারক শূদ্র কমলাকরধৃত কহিয়া যে পরাশরের বচন লিখেন তাহা শূদ্র কমলাকরত অথবা শূদ্র পদ্মাকরধৃতই বা হউক সমূলক যদি হইত তবে মিতাক্ষরাকার, কুল্লুক ভট্ট, প্রায়শ্চিত্তবিবেককার, ইহারা অবশ্যই লিখিয়া ইহার মীমাংসা করিতেন ; যদ্যপিও ওই পরাশরবচন সমূলক হয় তবে মঘাদি অন্য স্মৃতির সহিত একবাক্যতা করিবার জন্যে ব্রাহ্মণের গ্রাহ যে শ্ৰোত যজ্ঞীয় মদিরা তাহারি নিষেধ পরাশরবচনে শূদ্রের প্রতি অভিপ্রেত হইবেক, অন্যথা মম্বাদি স্মৃতির সহিত একবাক্যতা থাকে না। এতদ্ভিন্ন শূদ্রের মদ্যপানবিধায়ক শত২ বচন তন্ত্রশাস্ত্রে দৃষ্ট হইতেছে এবং ওই শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ সংগ্রহকারেরা তদনুরূপ ব্যবস্থা দিয়াছেন। এ স্থলে পুনরায় স্মরণ দেওয়াইতেছি যে স্মৃতিতে যে স্থানে ব্রাহ্মণের বিষয়ে মদ্যপানের নিষেধ কহিয়াছেন সে অবিহিত কামত মদ্যপর হয়, যেহেতু (ন মাংসভক্ষণে দোষাে ন মদ্যে ন চ মৈথুনে) ইত্যাদি মঘাদিস্মৃতিতে তাহারা বিহিত মদ্যপানে দোষাভাব স্বয়ং কহিয়াছেন। ২১৯ পৃষ্ঠের ৭ পংক্তি অবধি ২২১ পৃষ্ঠের ৯ পংক্তি পর্যন্ত যাহা লিখিয়াছেন তাহার তাৎপৰ্য এই যে স্বপক্ষ কিম্বা বিপক্ষ শ্ৰীকালীশঙ্কর নামে এক ব্যক্তিকে ধৰ্ম্মসংহারকের পরাভবের আশয়ে আমরা উত্থাপিত করিয়াছিলাম তিনি বাগদেবতার প্রীত্যর্থে স্মৃতিপুরাণাদিস্বরূপ অস্ত্রশস্ত্রের দ্বারা ধর্মসংহারক কতৃক আগত মাত্রেই নিহত হইলেন; কিন্তু ধর্মসংহারক কি উপায়ে আর কি বচনরূপ শস্ত্রে তাঁহাকে নিহত করিলেন তাহার বর্ণও লিখেন না, বিবরণ যদি লিখিতেন তবে বিবেচনা করা যাইত যে তাহাদের কোন পক্ষে জয় পরাজয় হইয়াছে। ২২১ পৃষ্ঠের ১০ পংক্তিতে শৈবশক্তি গ্রহণের অপ্রামাণ্যর উদ্দেশে লিখেন যে পথ্য প্রদান ১৭৯ এতবিধায়ক তন্ত্রশাস্ত্র মােহনার্থ কল্পিত আগম হয়। উত্তর, ওই সকল মহেশ্বরপ্রণীত শাস্ত্র সর্বথা প্রমাণ ইহা আমরা ২২৮ পৃষ্ঠের ১৩ পংক্তি অবধি ২৪৩ পৃষ্ঠ পৰ্যন্ত বিবরণপূর্বক লিখিয়াছি তাহাতে যেন পণ্ডিতেরা দৃষ্টি করেন, অতএব সৰ্ব্বনিয়ন্তার আজ্ঞানুসারে অনুষ্ঠান করিলে কদাপি পাপ স্পর্শ ও যমতাড়না হইতে পারে না, যেহেতু ভগবান্ রুদ্র যমেরও যম হয়েন। ২২৪ পৃষ্ঠে ১৭ পংক্তি অবধি লিখেন যে “লােকের বিদ্বিষ্ট যে কর্ম তাহা শাস্ত্রীয় হইলেও স্বর্গের বিরােধী হয় তাহা বিশিষ্ট লােকের আচরণীয় নহে এই মনুবচনে যে কৰ্ম্ম লােকের ছেষ্য হয় সে অবশ্যই নরকের কারণ-অতএব শৈব বিবাহ যথার্থ হইলেও সজ্জনদিগের কদাচ কৰ্তব্য নহে”। উত্তর, কেবল বিশিষ্ট লােকের দ্বেষ্য ও প্রিয় এই বিবেচনায় ধর্মাধর্ম স্থির করাতে যে আপত্তি ও যে দোষ হয় তাহা বিশেষরূপে এই দ্বিতীয় উত্তরের চতুর্থ পরিচ্ছেদে ১৩৭ পৃষ্ঠ অবধি ১৫৪ পৃষ্ঠ পৰ্য্যন্ত লিখা গিয়াছে, বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তাহা অবলােকন করিয়া ইহার সিদ্ধান্ত করিবেন; বস্তুত তঁাতি, শুড়ি, সুবর্ণবণিক ও কৈবর্ত এবং কতিপয় বিশিষ্ট লােক ওই সকল তন্ত্রকে এবং তদুক্ত অনুষ্ঠানকে যদিও দ্বেষ করিয়া থাকেন কিন্তু ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থাদি ভূরি বিশিষ্টের। ওই মহেশ্বরশাস্ত্রকে পরমপুরুষার্থসাধন ও অতি প্রিয় জ্ঞান করিয়া স্ব স্ব অধিকারে তাহার অনুষ্ঠান করেন, অতএব তন্ত্রোক্ত ধৰ্ম্ম সকল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বেষ কি হইবেন, সৰ্ব্বথা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশিষ্টরূপে মাই হইয়াছেন। ধৰ্ম্মসংহারক ২২৪ পৃষ্ঠে ১১ পংক্তি অবধি নবীন এক প্রশ্ন করেন যে “এ স্থানে শৈব বিবাহের ব্যবস্থাপক মহাশয়কে এই ব্যবস্থা জিজ্ঞাসা করি যে যাহারা যবনী- গমনে ও বেশ্যাসেবনে সৰ্ব্বদা রত তাহাদের স্ত্রীও বিধবাতুল্যা, যদি তাহারা সপিণ্ড না হয় তবে ঐ সকল স্ত্রীকে শৈব বিবাহ করা যায় কি না”। উত্তর, স্মৃতি ও তন্ত্র উভয় শাস্ত্রানুসারে স্বস্ত্রীবঞ্চক পুরুষ সৰ্বথা পাপী হয়েন, কিন্তু ভর্তা বর্তমানে স্ত্রীর বৈধব্য, কি মহেশ্বরশাস্ত্রে কি স্মৃতিশাস্ত্রে লিখেন না; তবে ভর্তা বিদ্যমানেও বৈধব্যের স্বীকার এবং তাহার সহিত অন্যের বিবাহের বিধি ধৰ্ম্মসংহারকের মতানুসারে তাহার ক্রোড়স্থই আছে, অর্থাৎ পাঁচ শিক। গাের্সইকে দিলেই স্বামী থাকিতেও পূর্ব- বিবাহের খণ্ডন হইয়া স্ত্রীর বৈধব্য হয়, আর পাঁচ শিকা পুনরায় প্রদানের দ্বারা তাহার সহিত অন্যের বিবাহ পরে হইতে পারে, অতএব ধর্মসংহারক এরূপ বৈধব্যের ও পুনরায় বিবাহের উপায় আপন করস্থ থাকিতে অন্যকে যে প্রশ্ন করেন সে বুঝি তাঁহার স্বমতের প্রবলতার নিমিত্ত হইবেক।

Stro রামমােহন-গ্রন্থাবলী •• ১৯৩ পৃষ্ঠে ও অন্য স্থানে আপন প্রত্যুত্তরে ধর্মসংহারক আপনার উত্তর প্রদানের নানাবিধ প্রগলভ্য করিয়াছেন তাহার উত্তর এই যে ফলেন পরিচীয়তে; যখন আমরা স্বনিয়মানুসারে লােকান্তরপ্রাপ্ত দত্তজার সহিত ভূরিশ উত্তর প্রত্যুত্তর অনিচ্ছুক হইয়াও করিয়াছি, সুতরাং সেই নিয়মে ধৰ্ম্মসংহারকের সহিতও উত্তর করিতে হইয়াছে ইহাতে খেদ কি ? শাস্ত্রীয় সদালাপের অবকাশকালে কৌতুকার্ধেও কিঞ্চিৎ কাল ক্ষেপণ করিতে হইয়াছে। এই দ্বিতীয় উত্তরের সমুদায়ের তাৎপৰ্য এই যে পরমেষ্ঠীগুরুর আজ্ঞাবলম্বন করিয়া পরমার্থসাধন ও ঐহিক ব্যবহার অবশ্য কর্তব্য হয় এবং নিন্দক মৎসরেরা সৰ্ব্বধা উপেক্ষণীয় হইয়াছে। ইতি চতুর্থপ্রশ্নে দ্বিতীয় উত্তরে অতিপ্রিয়করাে নাম সপ্তম পরিচ্ছেদঃ । সমাপ্তং চতুর্থপ্রশ্নোত্তরং। দ্বিতীয়ােরং সমাপ্তং ।

কায়স্থের সহিত মদ্যপান বিষয়ক বিচার [ ১৮২৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত ]

No text on this page.

পরমেশ্বরায় নমঃ কোনাে বিশিষ্টবংশােদ্ভব কায়স্থ কহিয়া থাকেন যে “এ কি কাল হইল, আমাদের বর্ণের মধ্যে অনেকেই মদ্য পান করিয়া ধৰ্ম্ম লােপ করিতেছে ; ইহার অতি নিন্দনীয় সুরতাং এ সকল লােকের সহিত আলাপ করা কর্তব্য নহে” অতএব ঐ কায়স্থ মহাশয়কে নিবেদন করি যে ধৰ্ম্ম এবং অধর্ম ইহার নিয়ম শাস্ত্রে করেন, বৃক্ষের মধ্যে অশ্বথ বিশেষ পুণ্যজনক ও নদীর মধ্যে গঙ্গা অনন্ত শুভদায়ক ইহাতে শাস্ত্র প্রমাণ হন, লােকদৃষ্টিতে অন্যাপেক্ষা বিশেষ চিহ্ন প্রাপ্ত হয় না। সেইরূপ খাদ্যাখাদ্য বিষয়েও শাস্ত্র প্রমাণ হন; শূদ্রের প্রতি মদ্যপানে অধৰ্ম্ম নাই তাহার প্রমাণ মনু, যথা তস্মাৎ ব্রাহ্মণরাজন্যে বৈশ্যশ্চ ন সুরাং পিবেৎ। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য ইহারা সুরাপান করিবেন না। বৃহ্যাজ্ঞবস্ক্যঃ।—কামাদপি হি রাজন্যে বৈশ্যা বাপি কথঞ্চন। মদ্যমেবাসুরাং পীত্বা ন দোষং প্রতিপদ্যতে। ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য যদি স্বেচ্ছাধীন অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশ ব্যতিরেকেও সুরা* ভিন্ন অন্য মদ্যপান করেন তত্রাপি দোষ প্রাপ্ত হন না। দ্বিতীয় প্রমাণ ; মিতাক্ষরা ও প্রায়শ্চিত্তবিবেক, যাহার মতে সমুদায় ভারতবর্ষে এ সকল বিষয়ের ব্যবস্থা মান্য হইয়াছে, তাহাতে দৃষ্ট হইতেছে। মিতাক্ষরা, যথা বৈগ্নিকানাং জন্মপ্রভৃতি পৈনিষেধঃ ব্রাহ্মণস্য তু মদ্যমাত্ৰনিষেধােপু্যুৎপত্তি- প্রভৃত্যেব রাজবৈশ্যয়ােস্তু ন কদাচিদপি গৌড্যাদিমদ্যনিষেধ শূদ্রস্য তু ন সুরাপ্ৰতিষেধধ নাপি মদ্যপ্ৰতিষেধ। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন বর্ণের জন্ম অবধি পৈষ্টী সুরা নিষিদ্ধ হয় আর ব্রাহ্মণের প্রতি জন্ম অবধি মদ্য মাত্রের নিষেধ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের প্রতি গৌড়ী প্রভৃতি মদ্যের কদাপি নিষেধ নাই অর্থাৎ রাগতও নিষিদ্ধ নহে; আর শূদ্রের প্রতি সুরা এবং মদ্য এ দুইয়ের একও নিষিদ্ধ নহে। * এ স্থানে সুর শকে পৈষ্টী মদিরাকে কহি। + এ স্থলে ব্রাহ্মণের প্রতি যে মত নিষেধ করিলেন, তাহা অবিহিত মদ্য বিষয়ে জানিবে, যেহেতু “সৌভ্রামণ্যাং সুরাং গৃত্নীয়াৎ” ইত্যাদি শ্রুতি এবং “ন মাংসভক্ষণে দোষো” ইত্যাদি বিচন ও নানাবিধ তন্ত্রবচনের সহিত একবাক্যতা করিতে হইবেক।

১৮৪ রামমােহন-গ্রন্থাবলী প্রায়শ্চিত্তবিবেক যথা তদেবং পৈষ্টনিষেধস্ত্রৈবর্মি কানাং গৌড়ীমাধ্বীনিষেধস্তু ব্রাহ্মণানামেব। তথা, রাজাদীনান্তু গৌড়ীমাধ্বীপ্রভৃতিসকলমদ্যপানে ন দোষঃ। ব্রাহ্মণাদি তিন বর্ণের পৈষ্টী সুরাপান নিষিদ্ধ হয়, আর কেবল ব্রাহ্মণের প্রতি গৌড়ী মাধ্বীর নিষেধ হয়; কিন্তু গৌড়ী মাধ্বী প্রভৃতি সর্বপ্রকার মদ্যপানে ক্ষত্রিয়াদি বর্ণের দোষ নাই। এই সকল দেদীপ্যমান শাস্ত্রের প্রমাণ মান্য কি ঐ কায়স্থ মহাশয়ের অযােগ্য জল্পন গ্রাহ্য হইবেক। আর এরূপ শাস্ত্রসম্মত ব্যবহার নিন্দনীয় হয় কি এ ব্যবহারকে যে নিন্দা করে সে নিন্দনীয় হয় ? বিশেষত ঐ কায়স্থ মহাশয় কহিয়া থাকেন যে তাহার পূর্বপুরুষ কান্যকুজে ছিলেন তথা হইতে গৌড়রাজ্যে আইলেন অতএব প্রত্যক্ষ কেন না দেখেন যে কাকুজস্থ কায়স্থেরা এই শাস্ত্ৰপ্রমাণে পরম্পরানুসারে মদ্যপানে কদাপি পাপ জানে না। যদি কেহ স্বলাভের উদ্দেশে মূখ ভুলাইবার নিমিত্ত শূদ্ৰ কমলালয় ইত্যাদি গ্রন্থের নাম গ্রহণপূর্বক, শূদ্রের মদ্যপান নিষেধ বিষয়ে স্বকপােলকল্পিত শ্লোক পাঠ করেন, তবে বিশিষ্টবংশােদ্ভব কায়স্থ মহাশয়কে বিবেচনা করা উচিত হয় ; যে এরূপ শ্লোক যদি সমূল হইত, তবে প্রায়শ্চিত্তবিবেককার ও মিতাক্ষরাকার যাহারা সৰ্ব্ব- শাস্ত্রের সামঞ্জস্য করিয়া ব্যবস্থা সকল স্থির করিয়াছেন, তাহারা অবশ্যই ইহার উল্লেখ করিয়া সমাধান করিতেন। প্রসিদ্ধ গ্রন্থকারের ধৃত যে বচন নহে তাহার অর্থদৃষ্টিতে ইদানীন্তন কোন নূতন ব্যবস্থার কল্পনা যদি প্রমাণ হয়, তবে এক দুই শ্লোক কিম্বা কতিপয় পত্রের কোন এক গ্রন্থ রচনা করিতে যাহার শক্তি আছে সেও নানাবিধ নূতন ব্যবস্থার প্রচার করিতে পারে; কিন্তু তাহা বিজ্ঞ লােকের নিকট প্রথমত গ্রাহ্য হইবেক না, এবং তাহার যােগ্য উত্তর ঐ প্রকার স্বকপােলরচিত শ্লোক ও গ্রন্থের দ্বারা অন্য ব্যক্তিও কোন্ দিতে না পারেন। এখন এই প্রতীক্ষায় রহিলাম যে ঐ কায়স্থ মহাশয় ইহার প্রত্যুত্তর শী লিখিবেন, কিম্বা নিন্দা হইতে বিরত হইবেন। ইতি শকাব্দ। ১৭৪৮। শ্রীরামচন্দ্র দাস।

সম্পাদকীয় চারি প্রশ্নের উত্তর ৬ এপ্রিল ১৮২২ তারিখের ‘সমাচার দর্পণে ধৰ্মসংস্থাপনাকাভিক্ষ-প্রেরিত ‘চারি প্রশ্ন’ মুদ্রিত হয়। এই প্রশ্নচতুষ্টয়ের উত্তরস্বরূপ রামমােহন ১৮২২ খ্রষ্টাব্দের মে মাসে ‘চারি প্রশ্নের উত্তর’ পুস্তিকা (পৃ. ২৬) প্রকাশ করেন। পথ্য প্রদান ‘চারি প্রশ্নের উত্তর পুস্তিকার প্রত্যুত্তরে ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙক্ষী ‘পাষণ্ডপীড়ন’ প্রচার করেন। পরবর্তী ডিসেম্বর মাসে ‘পাষণ্ডপীড়নে’র উত্তরস্বরূপ রামমােহনের ‘পথ্য প্রদান’ (পৃ. ২৬১) পুস্তকখানি প্রকাশিত হয়। ধৰ্ম্মসংস্থাপনাকাঙ্ক্ষী নন্দলাল ঠাকুর ইহার কোন প্রত্যুত্তর দিবার ব্যবস্থা করেন নাই। উভয় পক্ষের মৃত্যুর পর নন্দকুমার কবিরত্ন ভট্টাচাৰ্য ১৭৮০ শকে (ইং ১৮৫৮ ?) “পাষণ্ডপীড়ন ও পথ্য প্রদান পুস্তকের সঙ্গতাসঙ্গত বিচার” ‘বিবাদভঙ্গার্ণব’ (পৃ. ১১১) পুস্তক প্রচার করেন। কায়স্থের সহিত মদ্যপান বিষয়ক বিচার এই পুস্তিকার মূল সংস্করণ আমরা দেখি নাই; ইহা রাজনারায়ণ বসু ও আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ-সম্পাদিত ‘রাজা রামমােহন রায়-প্রণীত গ্রন্থাবলি (ইং ১৮৮০) হইতে পুনর্মুদ্রিত হইল। উক্ত গ্রন্থাবলীর “প্রকাশকের শেষ বিজ্ঞাপনে” (পৃ. ৮০৭ ) আছে - কল্পিত রামচন্দ্র দাসের নামে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছে। শূদ্রের মদ্যপান করা অশাস্ত্রীয় নহে; বিহিত মদ্যপানে ব্রাহ্মণ প্রভৃতি বর্ণেরও অধিকার আছে ; ২৪

১৮৬
রামমােহন-গ্রন্থাবলী
শাস্ত্রানুসারে মদ্যপান করিলে ধৰ্ম ললাপ হয় না; এই সকল মত প্রদর্শন এই গ্রন্থের
উদ্দেশ্য। পথ্য প্রদান গ্রন্থের সপ্তম পরিচ্ছেদেও ঐ বিষয়ের বিচার আছে।
‘চারি প্রশ্নের উত্তর’ ও ‘পাষণ্ডপীড়ন’ পুস্তকের স্থলে স্থলে বন্ধনীমধ্যে যে সংখ্যা
দেওয়া হইয়াছে, উহা মূল পুস্তকের পত্রাঙ্ক।

শুদ্ধিপত্র ১৩৫১ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে প্রকাশিত রামমোহন-গ্রন্থাবলীর ৩য় খণ্ডের (সহমরণ ) শেষে যে “বিশেষ দ্রষ্টব্য” অংশ আছে, তাহা বর্জনীয় এবং সেই স্থলে বর্তমান শুদ্ধিপত্র গ্রহণ করিতে হইবে।] পৃষ্ঠা পংক্তি ১৪ এমত पपर ৬ এবং ১। ২৫-২৬ এবং ২০-২১ ইমা নারীবিধবা ইত্যাদি ইমা নাৰীবিধবা সুপত্নী- নেন সর্দিষা সংশি। অনশবােহনমীবা: সুরাঃ আমােহন্ত জনমাে যােনিমত্রে। [ ১•১৮৭] ১১ ১৬ ২০ ২৩ নিদ্ধত্তেতু বৃং মৃত্যক্ত নিবৃত্তে তু খাদ্ধং ঘৃত্যক্তা ১৭ ১১ ২ পরা ২• ২৩ ১ ২৮ ৮ বিষয়ক বিধায়ক কেন [ না ] হয়। অনুকূল অনুকূল্য সকোটজে। সহােটজে। [ বার?] দ্বারা যে তিনি যে গান্ধারী তিনি করিবেন। করিবে। সংবা সম্বাদ সহমরণব্যার্থং সহমরণস্তুত্যর্থং রােগিণে পথ্য নােগণেহপখ্যং ২৭ পৃষ্ঠায় ১৭ পৃষ্ঠায় ২৮ পৃষ্ঠায় ২৪ পৃষ্ঠায় खौगाए ২৯ পঙক্তির শেষে * তারকা চিহ্ন সহযােগে নিম্নোক্ত পাদটীকা বসিবে, এই পুস্তকে যে যে স্কুলে দাড়ি-চিহ্ন মুদ্রিত হইয়াছে, মূল পুস্তকে সেই সেই স্থলে ফুলষ্টপ-চিহ্ন ২৮ ১ ৩৪ , ১ • ৩৫ ৪১ ৪৩ ১৪ মে ৪৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rammohan Granthabali Vol. 6

Author
Not Available
Title
Rammohan Granthabali Vol. 6
File name
Rammohan Granthabali Vol. 6
Text
OCR done
Citation
1822
Published
2009/08/29
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
194
Library
Mohiary Public Library,andul, Howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Rammohan Roy
DLI number
511314
Barcode
4990010018473.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
mHYTdDJCAqp
Download PDF

Rammohan Granthabali Vol. 6