Bally Sadharan Granthagar
Gharer Dak
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ঘরের ডাক
শ্রীবিশ্বপতি চৌধুরী
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০১ ও ২০৩১১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
১৩২৮ সাল
মূল্য ২,
এফাশক
মহরিদাস ২০১৮
চট্টোপাধ্যায়
গুরুগ
গলকাতা।
কণওয়ালি
চট্টোপাধ্যায়
প্রসঙ্গ
প্রিন্টার—অবিনাশচন্দ্র মণ্ডল
৭৭ নং হরিঘােষ ষ্ট্রীট, সিদ্ধেশ্বর প্রেস
কলিকাতা।
তা !! 7. . } ...
ধা, ছবি &কিলে ডিবেন
উপহার
সচিত্র বঙ্কিম-গ্রন্থাবলী দুর্গেশনন্দিনী।-ছয়খানি একবর্ণের ও তিন- খানি বহুবর্ণের চিত্ৰশােভিত। বিংশ (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ২ টাকা। কপালকুণ্ডলা।-সাতখানি একবর্ণের ও এক- খানি বহুবর্ণের চিত্ৰশােভিত। এয়ােদশ (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ১০ টাকা দেবী চৌধুরাণী-একখানি বহুবর্ণের অপূর্ব চিত্ৰভূষিত। একাদশ (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ২০ টাকা। চন্দ্রশেখর।~-একখানি বহুবর্ণের চিত্রালঙ্কত। অষ্টম (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ১০ টাকা। রজনী। -একখানি ত্রিবর্ণের চিত্রভূষিত। ষষ্ঠ (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ১০ টাকা। আনন্দ নই।-একখানি বহুবর্ণের সুন্দর চিত্র আছে। দশম (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ১০ টাকা। ইন্দিরা।-একখানি বহুবর্ণের চিত্রালঙ্কত। অষ্টম (রাজ) সংস্করণ। মূল্য ১০ টাকা। কৃষ্ণকান্তের উইল।—একখানি এক বর্ণের ও তিনখানি বহুবর্ণের চিত্ৰশােভিত। অষ্টম (রাজ) সংস্করণ। মুল্য ১০ টাকা। বিষবৃক্ষ।-একখানি বহুবর্ণের চিত্ৰশােভিত। রাজ-সংস্করণ। মূল্য ১০ টাকা। মৃণালিনী।-একখানি বহুবর্ণের চিত্ৰশােভিত। রাজ-সংস্করণ। মূল্য ১০০ টাকা।
যন্ত্রের ভাক
ক্ষীরী গয়লানীর মেয়ে লক্ষ্মীর চেহারাখানা এতই সুন্দর
ছিল যে, সে যদি গয়লার ঘরে না জন্মাইয়া কোন রাজা-
রাজাড় ঘরে জন্মাইত, তাহা হইলেও বােধ হয় নেহাত
বেমানান দেখাইত না। কপালটা কিন্তু তার আদবেই ভাল
ছিল না। বয়স যখন তার ১১ কি ১২ বছর, সেই সময় তাদের
গ্রামে এক পাদ্রী-সাহেবের শুভাগমন হয় এবং তারই ফলে
তার বাপ গােকুলচন্দ্র হঠাৎ একদিন অন্ধকার হইতে আলােয়
যাইবার জন্য অতিরিক্ত রকম ব্যস্ত হইয়া উঠে। গােকুলের
ছিল অনেক টাকা দেনা, এত টাকা যে, ঘরবাড়ী বিক্রী
করিয়াও সব শােধ হয় না, উপরন্তু জেলের ভয়ও থাকিয়া
যায়। এমনি সময় পাদ্রী-সাহেব তার পরমার্থের ঝুলিটি
কঁাধে করিয়া হঠাৎ তাদের গ্রামে আসিয়া দেখা দিলেন।
ঘরের ডাক
২
পাদ্রী-সাহেবকে নির্জনে পাইয়া গােল একদিন
জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার ধর্ম কি দেয় সাহেব।”
সাহেব চোখ বুজিয়, বুকে হাত দিয়া উত্তর দিলেন,
“পরমার্থ ।
গােকুল গলার স্বরটাকে যথাসম্ভব নামাইয়া লইয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “সাহেব, আমরা সামান্য লােক, পরম লােভ
আমাদের শােভা পায় না। পরমটাকে বাদ দিয়ে যা থাকে
তা কি তােমার ধৰ্ম্ম দেয় না সাহেব ?”
পাদ্রী-সাহেব একটু হাসিয়া উত্তর দিলেন, “দরকার হলে
তাও দেয় বৈকি।
তার পর হঠাৎ একদিন জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া সুদূর
মাদ্রাজে পলায়ন, সেখানের একটা গির্জায় দীক্ষা-গ্রহণ,
ইত্যাদি ইত্যাদি।
মাদ্রাজে আসিয়া গােকুল তার স্ত্রী-কন্যা লইয়া যে জায়গায়
আস্তানা গড়িয়াছিল, সেটা খৃষ্টান-পল্লী। ষ্টেশনের ধারেই
একটা ছােট চাচঁ আছে, তারই আশে-পাশে বিশ-পঁচিশটি
ছােট ছােট একতালা বাড়ী, অধিকাংশই বিলিতি টালিতে
ছাওয়া ; এ ছাড়া একটা লম্বা ব্যারাকের মতও আছে। এই
ব্যারাকের দু-তিনটি করিয়া ঘর লইয়া এক-একটি ফিরিঙ্গী-
পরিবার বাস করিত। গােলরা এই ব্যারাকেরই দুটি ঘর
ঘরের ডাক লইয়াছিল। ব্যারাকের মধ্যে আর যারা থাকিত, তাদের মধ্যে গার্ড, ইঞ্জিন-ড্রাইভার, টিকিট-চেকার এবং ঐ শ্রেণীর লােকই বেশ। তা ছাড়া নীচ-জাতীয় যে-সব হিন্দু বা মুসলমান পাদ্রী- সাহেবদের বিশেষ কৃপা লাভ করিয়া দূর-দেশ হইতে ভিটা . মাটি ছাড়িয়া নিরাশ্রয় হইয়া আসিত, তারাও ব্যারাকের মধ্যে স্থান পাইত। পাদ্রী-সাহেবের দল টালি-ছাওয়া আশপাশের বাড়ী- গুলিতেই থাকিতেন এবং সময় সময় সৎশিক্ষা দিবার জন্য ব্যারাকের মধ্যে উদয় হইতেন। এখানে এদের একটি সমিতির মত ছিল এবং প্রতি সপ্তাহে ধৰ্ম্মপ্রচারের জন্য একটি করিয়া পত্রিকা প্রকাশিত হইত; তার মধ্যে থাকিত নিজ ধৰ্ম্মের অযথা প্রশংসা এবং পরধৰ্ম্মের উপর অযথা কটাক্ষ- পাত। গগাকুলচন্দ্র নিকটস্থ একটা চটকলে ৩০ টাকা মাইনর একটা চাকুরী পাইয়াছিল। তার ঘরভাড়া বাদে যা বাচিত, তা থেকে সংসার-চালান তার পক্ষে দিন দিন অসম্ভব হইয়া উঠিতে লাগিল। একদিন পাদ্রী-সাহেবকে গিয়া সে বলিল, সাহেব, যে দেনার দায়ে ধৰ্ম্ম পর্যন্ত ত্যাগ কলুম, সেই দেনাই যে আবার ঘাড়ের উপর এসে পড়ল বােলে। এখন উপায় ?
ঘরের ডাক সাহেব চক্ষু বুজিয়া উত্তর দিলেন, “উপায় সেই সৰ্ব্ব- শক্তিমান্ ভগবান, তিনি ছাড়া মানুষের, ইত্যাদি। কাজেই গােকুলকে অন্য উপায় দেখিতে হইল। সে নিজের চাকরী বজায় রাখিয়া সন্ধ্যার পর হইতে অন্য আর-এক জায়গায় উপরি কাজ করিতে আরম্ভ করিল এবং তাহারই ফলে তার সংসারটি এক-প্রকারে টিকিয়া গেলেও সে নিজে বেশীদিন টিকিতে পারিল না। এ যখনকার কথা বলিতেছি, লক্ষ্মীর বয়স তখন ১৫ কি ১৬ হইবে। কে কাছের একটা মেয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়া দেওয়া হইয়াছিল এবং সে এমনি অখণ্ড মনােযােগের সহিত লেখাপড়া আরম্ভ করিয়াছিল যে, জাত-ফিরিঙ্গীর মেয়েগুলো পর্যন্ত তার সহিত আঁটি উঠিতে পারিত না । গােকুলচন্দ্রের মৃত্যুর পর সংসার যখন একেবারেই অচল হইয়া উঠিল, তথন লক্ষ্মীর-মা পাদ্রী-সাহেবের পায়ে গিয়া পড়িল, “আমাদের বাঁচান্ আপনি।” পাদ্রীসাহেব কিন্তু এবারও ভগবানের উপর বরাত দিয়া দিব্য নিশ্চিত হইলেন। কিন্তু ক্রীশ্চান-পাড়ার সকলে লক্ষ্মীর মার দুরবস্থার কথা টের পাইয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিল না। তাদেরই চাদার উপর নির্ভর করিয়া এই দুটি প্রাণী সে যাত্রা কোন রকমে টিকিয়া গেল।
ঘরের ডাক
লক্ষ্মীমা লক্ষ্মীকে বলিল, “এমনি ধারাটি যদি হিন্দু-
সমাজে ঘটুততা, তা হলে উপােস করে মরুলেও কেউ চেয়ে
দেখুত না।”
স্কুলের কাপড় ছাড়িতে ছাড়িতে লক্ষ্মী উত্তর দিল, “বাজে
বােকো না মা।”
“কেন, এদের সমাজ কি ভাল নয় ?”
“কে তা বলছে ?”
“তবে?
“তবে আবার কি ? তুমি নিজেই গড়ছ, নিজেই
ভাচো, আমি ত কোন কথাই বলিনি।”
“তা ত জানি, তবু জিজ্ঞাসা কছি, তাের কি এদের
ভাল লাগে না।
লক্ষ্মীর-মার এই একটা মস্ত ভয় হইয়াছিল, তার মেয়ের
জীবনটি না তারই মতন একেবারে নষ্ট হইয়া যায়। তাই সে
নিজেকে ক্রমাগত সাবধান করিয়া রাখিত, কোনদিন যেন
লক্ষ্মী না টের পায়, তার দেহটা যখন সেমিজ এবং গাউনের
একটা অচল পুটলির মত এক পাশে নিসাড় হইয়া পড়িয়া
রহিয়াছে, ঠিক সেই সময়টিতে তার মনটা প্রেতের মত সুদূর
বাংলাদেশের কোন একটি পল্লীগ্রামের আশেপাশে তারই
সুখ-দুঃখের স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া ঘুরিয়া
ঘরের ডাক • মরিতেছে। যে বিড়ম্বনাটা সে নিজে ভােগ করিতেছে; সেটা যে কতবড় কদাকার, তা সে হাড়ে হাড়ে মালুম পাইয়াছিল বলিয়াই বাংলাদেশ সম্বন্ধে মেয়ের একটু মমতা দেখিলেই মনে মনে সে শিহরিয়া উঠিত। তবে তার মনে ভরসা ছিল এই একটা যে, তার পক্ষে সেটাকে মন থেকে ত্যাগ করা একেবারেই অসম্ভব না হইলেও না হইতে পারে; কেন না, সে শৈশব থেকেই এই সমাজে মানুষ হইয়া আসিতেছে ;সে-সমাজের ও দেখিলই বা কতটুকু আর ভােগ করিলই বা কতটুকু। কেবল এইটুকু সাবধান হইতে হইবে, ওর ছেলেবেলাকার ক্ষীণ স্মৃতির যে রেখাগুলো দিন দিন ম্লান হইয়া আসিতেছে, তাহার উপর কেহ যেন আসিয়া দাগ বুলাইয়া না যায়। লক্ষ্মীর অবস্থা হইয়াছিল কিন্তু আসলে অন্য রকম। যে সমাজ, যে আবহাওয়া ছাড়িয়া সে চলিয়া আসিয়াছে, তারই চৌকাঠের ধারে দাঁড়াইয়া সে তার ভিতরের জিনিষ- গুলােকে এমনি অস্পষ্টভাবে দেখিয়া লইয়াছে, যাহা দিয়া তার সম্বন্ধে সে কোন একটা নির্দিষ্ট ধারণায় আসিয়া পৌছাইতে পারে না-কল্পনার তুলি না বুলাইয়া। কাজেই সত্যকার চেয়ে সেটা তার কাছে অনেক বেশি সুন্দর হইয়া দেখা দিয়াছিল এবং ঐ একই কারণে তার মনটা ঘরের ভাক ০ ভাৱ সেই অসমাপ্ত-জীবনের অবশিষ্টাংশটুকু দিবা-স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে বর্তমান জীবনের বাতায়নের ধারে দ্বিপ্রহরের কৰ্ম্মকোলাহলের মধ্যেও অন্যমনস্ক হইয়া বসিয়া থাকিত। তারপর কিন্তু হঠাৎ সে একদিন এমনি সজাগ হইয়া উঠিল এবং যে সমাজের সদররাস্তায় সে এতদিন পথ- ভােলা পথিকের মত ঘূরিয়া ঘুরিয়া মরিতেছিল, তারই ঘরকন্নার মধ্যে হঠাৎ একদিন এমনি কোল-ঠেসা হইয়া ঢুকিয়া পড়িল যে, দেখিয়া শুনিয়া সকলে অবাক্ হইয়া গেল। আজ কয়েক মাস হইল লক্ষ্মী লেখাপড়া শেষ করিয়া খুব উৎসাহের সহিত মেয়ে-স্কুলের মাষ্টারী করিতে সুরু করিয়া দিয়াছে এবং পাদ্রী-সাহেবদের পত্রিকায় হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে সে যে-সব কড়া প্রবন্ধ লিখিতে সুরু করিয়াছে, তার ঝাঝ পাদ্রী-সাহেবদের লেখাকেও হার মানাইয়া দেয়। সম্প্রতি সে আবার পাদ্রী-সাহেবদের সমিতিতে গিয়া এই বলিয়া নাম লেখাইয়া আসিয়াছে যে, সে রাজীবন কুমারী থাকি খৃষ্টধর্ম প্রচার করিতে থাকিবে এবং এ ছাড়া অন্য কোন চিন্তাও সে মনে আসিতে দিবে না। সমিতির যিনি মাথা, তিনি মাথা নাড়িয়া যাহা বলিলেন, তার সারধর্ম এই যে, ঈশ্বরের মাতা কুমারী মেরীর বিশেষ কৃপা যাদের উপরে পড়ে, তাদের মুখে যে স্বর্গীয় ভাব ফুটিয়া উঠে, লক্ষ্মীর মুখে তিনি ঘরের ডাক তারই আভাস স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছেন এবং ইহার মধ্যে একটি কথাও অতিরঞ্জন নয়। যিনি পৃষ্ঠ তিনি এই বাক্যের পৃষ্ঠপােষকতা করিয়াই, ক্ষান্ত হইলেন, আর যিনি গােকুল- চন্দ্রকে প্রথম আবিষ্কার করেন, তিনি যাহা বলিলেন, তাকে স্পষ্ট করিয়া বলিলে দাঁড়ায় এই যে, অন্য সবাই যাহা টের পাইয়া আজ বাহাদুরী কিনিতেছেন, সাত বছর আগেই তিনি তাহ টের পাইয়াছিলেন; অর্থাৎ তিনি শুধু ধাৰ্ম্মিক নন, ভবিষ্যদ্দশী মহাপুরুষও বটে। আশেপাশের ফিরিঙ্গীর দল, যারা এই খাঁটি বিলিতী সাহেবদের সহিত ভাল করিয়া কথা কহিবার অধিকারটুকুও পাইত না, তাহারা কিন্তু নানা কথা বুটাইতে সুরু করিয়া দিল এবং তাদের রটনার সমস্ত ঝাঁঝটা আসিয়া পড়িতে লাগিল লক্ষ্মীর চেহারাখানার উপর। লক্ষ্মী যেমনটি হইলে লক্ষ্মীর মা নিশ্চিন্ত হইবে বলিয়া আশা করিয়াছিল, লক্ষ্মী যেদিন ঠিক তেমনিটি, এমন কি, তার চেয়ে অনেকটা বেশিও হইয়া উঠিল, সেদিন লক্ষ্মীর মা বিছানার উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া ঠিক ছােট মেয়ের মত করিয়া গড়াগড়ি দিয়া কাদিতে লাগিল। এ জিনিষটাকে সে যে একদিনের তরেও চায় নাই একথা তার মন তখনি কেবল জানিতে পারিল যখন জিনিষটা নিজে হইতে আসিয়া সুমুখে দাড়াইয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, “আমি এসেছি।”
কেবল অচেনা বলিয়াই যে জীবন এবং সমাজটা তার
কাছে স্বপ্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, সেই জীবন এবং সমাজটার
মােহ যে স্বপ্নের মতই অলীক এবং অনর্থক, অনেক, তর্কের
পর এই সত্যটাকে মনের মধ্যে এক জায়গায় অতি কষ্টে
খাড়া করিয়া তুলিয়া লক্ষ্মী যে মুহূর্তে চোখ কচলাইয়া উঠিয়া
বসিল, সেই মুহূৰ্ত্ত হইতে সে খুব সাবধান হইয়া জাগিয়া
বসিয়া রহিল, আবার কোন-একসময় সে যেন ভুলিয়া
ঘুমাইয়া না পড়ে।
লক্ষ্মীর সহিত সেদিন তার কলেজ-জীবনের এক
অধ্যাপকের সহিত পথে হঠাৎ দেখা হইয়া গেল। ইনি
লক্ষ্মীকে খুব স্নেহ করিতেন। একথা সে-কথার পর তিনি
লক্ষ্মীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আচ্ছা, ইংরেজ কবিদের মধ্যে
তােমার সবচেয়ে কাকে ভাল লাগে, লুসী ?”
সে উত্তর দিল, “কাউকেই না।”
সাহেব আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন, তুমি
ত কোনদিন কবিদের উপর এমন নিষ্ঠুর ছিলে না, আজ
তবে
-
ঘরের ডাক
“তার কারণ আজ টের পেয়েছি। কবিরা বড়
বাজে বকেন এবং শুধু শুধু একটা ব্যাপারকে বাড়িয়ে এত
খানি করে তােলেন। তবুও ওঁদের ভালবাসতে আমার
বিশেষ আপত্তি থাকতাে না মিঃ জোন্স, যদি ওঁদের ও-মােগট।
এত সংক্রামক না হোততা।”
“অর্থাৎ তুমি বলতে চাও তােমার মনটা দিন দিন
কবিভাবাপন্ন হয়ে আছিল?”
“ঠিক তাই।”
“তাতে ক্ষতি কি, লুসী ?”
‘সামান্যকে বড় করে দেখতে পাওয়াটা সুখের তাদেরি
মিঃ জোন্স, যাদের সামান্যটা হচ্ছে লাভ, তা সে এক পয়সাই
হােক আর আধ পয়সাই হােক; কিন্তু সামান্যটা যাদের
কাছে নিছক লােক্সান, তারা কি উল্টো পথটাকেই
ধরূবে না?”
“কিন্তু তুমি যে গােড়াতেই গলদ করে বসেছ লুসী ;
কবিদের কাছে লােকসান বলে যে কোন কথাই নেই, আর
সেইজন্যই তারা অত সাহস করে সব জিনিষকে যখন-তখন
বাড়িয়ে দেখতে পারে।”
লক্ষ্মী নিজেও ঠিক এই কথাটাই একদিন বলিত, আজ
কিন্তু সে এ-কথায় ঠিক মনের সহিত সায় দিয়া উঠতে
ধরের ডাক
পারিল না। লােকসান বলিয়া কোন কথাই নাই, একথা
বুকে হাত দিয়া যে কেউ বলিতে পারে, এ-কথা বিশ্বাস
'করিতে তার মন কিছুতেই রাজি হইতে চাহিল না।
বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া সে তার মাকে ডাকিয়া বলিল,
“হিন্দুসমাজের জন্যে এখনও তােমার মাঝে মাঝে মন কেমন
করে, নয় মা?” এবং উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই বলিয়া
উঠিল, “তা তাে হতেই পারে, কিন্তু হয় বলেই তাে আর
সেটা সত্য নয়। তুমি বলবে, মন যেটাকে চায় সেইটেই
সত্য; কিন্তু মন নিজেই যে ভয়ানক মিথ্যা কথা বলে।
আজ তাকে অভ্যাস করাও একটা জিনিষ, সে বলবে,
এইটেই ভালো ; কাল তাকে অভ্যাস করাও আর-একটা
জিনিষ, সে বলবে সেইটেই ভালো ; তবুও মানুষ মনকে যে
এত বড় বলে স্বীকার করে, তার কারণ এ নয়, যে, সে এই
সব অভ্যাস এবং সংস্কারের সঙ্গে বেশ সহজে খাপ খাইয়ে
চলতে পারে, তার কারণ এই যে, সে সময় সময় উল্টো পথও
ধরূতে জানে,-যা তুমি এ সব কথা বুঝবে না মা।”
কথাটা শেষ করিয়াই লক্ষ্মী অন্যমনস্কভাবে ঘরময় পাচারি
করিয়া বেড়াইতে লাগিল।
তর্ক জিনিষটাকে লক্ষ্মী খুব ভালবাসিত, তার কারণ,
এটা সে বার বার লক্ষ্য করিয়া আসিয়াছে, যে, না ভাবিয়া-
•
ঘরের ভক চিন্তিয়া যা-তা একটা তর্ক করিতে করিতেও এমন- কথা অনেক সময় তার মুখ দিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছে, যাহা সে বলিবার সময় অন্তরের সহিত বলে নাই, কিন্তু পরে যাহাকে অন্তরের জিনিষ করিয়া লইতে তাহাকে বিশেষ বেগ পাইতেও হয় নাই। আজ এই যে এতগুলাে কথা সে বলিল, ইহার মধ্যে একটা কথাও সে অনুভব করিয়া বলে নাই, কিন্তু যখন বলা হইয়া গেল, তখন সে প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিল সেই গুলােকে অন্তরের জিনিষ করিয়া লইতে। কিছুদিন হইল যে ডােম-পরিবারটি জনৈক পাদ্রী-সাহেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ সুদূর বাংলা দেশ হইতে এখানে আসিয়া হাজির হইয়াছে, তাদেরই করােগেটের ছাউনিটার মধ্যে সেদিন সন্ধ্যার সময় পা দিয়াই লক্ষ্মী হঠাৎ সাত হাত পিছাইয়া আসিল। ঘরের এক কোণে মিট মিট করিয়া একটা মেটে প্রদীপ জ্বলিতেছে, আর সেই আধ-আলো আধ- অন্ধকারের মধ্যে একটি স্ত্রীলােক দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়া দাড়করান কি একখানা ছবির কাছে এমনি নির্মমভাবে মাথা ঠুকিতেছে, যে, তাহার ভরে ঘরে টিনের ছাদটা পর্যন্ত থাকিয়া থাকিয়া ঝন্ ঝন্ শব্দে বাজিয়া উঠিতেছে। লক্ষ্মী তাকে দুই হাতে জড়াইয়া ধরিয়া উঠাইবার চেষ্টা করিতেই
ঘরের ডাক
সে হঠাৎ ছিটকাইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল এবং
পাশের ঘরে গিয়া ঝনাৎ করিয়া খিল আটিয়া দিল।
বাড়ী ফিরিয়া লক্ষ্মী তাহাকে কিছু না বলিয়া নীরবে
আপনার শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িল।
তার মা আসিয়া ডাকিল, “এর মধ্যেই শুলি যে বড় ?
মাথা ধরেছে বুঝি?*
সে বালিশের উপর হইতে মুখ না তুলিয়াই উত্তর দিল,
“তা এইবেলা দুটি খেয়ে নে না-পরে বাড়লে ত আর
খেতে পাবিনি।”
লক্ষ্মী চুপ করিয়া রহিল।
“শুছি, নিয়ে আসবাে তা হলে?”
লক্ষ্মী এবার বিরক্ত হইয়া উত্তর দিল, “একদিন না খেলে
মানুষ কিছু মরে যায় না মা-তুমি মিথ্যে মিথ্যে বিরক্ত
কোরাে না বলছি।”
লক্ষ্মীর না লক্ষ্মীকে বিলক্ষণ চিনিত, কাজেই আর দ্বিরুক্তি
না করিয়া আপনার কাজে চলিয়া গেল।
পরদিন সকালে উঠিয়া লক্ষ্মী ডাইরী লিখিতে বসিল,
যাদের মন চিন্তাশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলে শুধু কেবল
অভ্যাস এবং সংস্কারের পিছনে পিছনে ছায়ার মত চলতে
ঘরের ডাক
১৪
থাকে, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্দশা হচ্ছে এই যে,
ভগবানের মঙ্গলময় ইচ্ছা যখন তাদের ভিন্ন-পথে নিয়ে যায়,
তখন তারা মনে করে পথ হারিয়ে ফেলেছে এবং তারই
জন্যে প্রাণপণ-বলে আর্তনাদ করে ওঠে; সে আৰ্তনাদ শুনে
যাদের মন গলে যায়, তারা নিতান্তই দুৰ্বল, ভগবানের
পতাকা বইবার শক্তি তাদের নেই।”
ইহার কিছুদিন পরে একদিন সকালবেলা বাহির হইতে
ঘুরিয়া আসিয়া কাপড় জামা ছাড়িতে ছাড়িতে লক্ষ্মী বলিয়া
উঠিল, “আমি যে কাল বাংলাদেশে যাচ্ছি মা।”
পাশের ঘর হইতে তার মা উত্তর দিল, “কি
রকম?”
হাসিতে হাসিতে সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া লক্ষ্মী বলিল,
“তােমার বাংলাদেশ ত আর রাক্ষসের দেশ নয় গাে, যে,
অত আঁৎকে উঠছো।”
তার মা তাকে অনেক করিয়া বুঝাইয়া-সুঝাইয়া যাহাতে
যাওয়া না হয় তাহারই চেষ্টা করিতে লাগিল-লক্ষ্মী কিন্তু
জি ধরিয়া বসিল, সে যাইবেই।
“তা কতদিনে ফিছিস্?”
“বড়-জোর এক সপ্তাহ,-তার বেশি নয়, রেভারেও,
হােয়াইট ছ-দিনের কারে যাচ্ছেন। মন্দ কি মা, সঙ্গী
১৫ ঘরের ডাক পাওয়া গেছে, একবার দেখেই আসি না ; অন্ততঃ দেশ- ভ্রমণটা ত হবে।” সন্ধ্যার কিছু পূৰ্ব্বে লক্ষ্মীর বাংলার একটি ছােট পল্লী- ষ্টেশনে আসিয়া নামিয়াছে। ষ্টেশনটির ডানদিকে ইংরেজ- কর্মচারীদের গুটিকতক ছােট ছােট কোয়ার্টার্স, কয়লা ফেলা রাস্তা ক্রোটোনের কেয়ারী দিয়া ঘেরা, আর বাঁদিকে ছােট একটি পল্লী তার বধূদের মতই গাছপালার ঘন আবরণের মধ্যেও সঙ্কুচিত হইয়া নীরবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তখন সন্ধ্যার ম্লান ছায়া ভাবুকের দৃষ্টির মত কিছু না-চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটুকু মাত্র লইয়া এই নীরব পল্লীখানির মুখের উপর আসিয়া পড়িয়াছিল। ষ্টেশন হইতে বাহির হইয়া যে পথটি বাঁশঝাড় আর বেড়ার আড়ালে আড়ালে বাকিয়া-চুরিয়া গ্রাম- খানির ভিতর চলিয়া গিয়াছে, তাহারই পানে চাহিয়া লক্ষ্মীর মনে হইতে লাগিল, সে যদি একছুটে ঐ পথটা ধরিয়া সিধে চলিয়া যায়, তাহা হইলে—কিন্তু তাহা হইলে কি হয় ? ত সে জানে না। তার পা-দুটো তার নিজের অজ্ঞাতসারে কখন এক সময় ঐ দিকেই অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিতেছিল, এমন সময় পাদ্রীসাহেব তার হাত ধরিয়া ফিরাইয়া বলিল, ওদিকে নয় লুসী, আমাদের যেতে হবে ডান-দিকে।” কেন, ওদিকে কি তার স্থান নাই ?--আছে বৈ কি -
যরের ডাক
।
তাহা না হইলে ঘন ঝােপের ফাকে ফাকে ঐ যে ছােট ঘােট
কুটীরগুলি মাঝে মাঝে মুখ বাড়াইয়া তার দিকে চাহিয়া
রহিয়াছে, ওদের দৃষ্টি এমন করুণ এবং সজল হইল কেন?
রাত্রে শয্যায় শুইয়া লক্ষ্মীর কান্না আসিতে লাগিল, কিন্তু
এই যে কান্না, ইহার মধ্যে সে আজ এমনি একটি খাটি সুর
খুঁজিয়া পাইতেছিল যাকে নিছক কল্পনা বলিয়া উড়াইয়া
দিতে তার একটুও প্রবৃত্তি হইতেছিল না। তার মনে
হইতেছিল, এই ত সে স্থান পাইয়াছে—তবে কে বলে
ওদিকে তার স্থান নাই ?
পরদিন সন্ধ্যার কিছু পূৰ্ব্বে লক্ষ্মী কাউকে কিছু না বলিয়া
হঠাৎ এক সময় সেই গ্রামের পথটাকে ধরিয়া চলিতে সুরু
করিয়া দিল। পথখানি নীরব নির্জন-জনমানবের সাড়া-
শব্দ নাই, কেবল পথের ধারে ধারে, ঝােপ-ঝাড়ের আড়ালে
আড়ালে যে দু-একটি কুটীর মাঝে মাঝে উকি মারিতেছিল,
তাদেরই ভিতর হইতে দৈবাৎ কোন ছােট ছেলের কান্নার
আওয়াজ স্বপ্নের মত ভাসিয়া আসিতেছিল। পথটা যেখানে
আসিয়া তিনমুখাে হইয়া তিন দিকে চলিয়া গিয়াছে, সেই
মােড়ের মাথায় একটা অনেক কালের প্রকাণ্ড দীঘীর জীর্ণ
বাঁধা ঘাটের উপর আসিয়া লক্ষ্মী নীরবে বসিয়া পড়িল। তখন
সন্ধ্যা বেশ গাঢ় হইয়া ঘনাইয়া আসিয়াছে; দীঘীর পরপারের
ঘরের ডাক
জীর্ণ সংস্কারবিহীন জোড়া-মন্দিরে কে প্রদীপ জ্বলিয়া দিয়া
গিয়াছে, তাহারি ক্ষীণ শিখাটি চঞ্চলভাবে আঁকিয়া-বাঁকিয়া
দীঘীর কাল জলে অনেকখানি পর্যন্ত নামিয়া গিয়াছে।
লক্ষ্মী চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া এই-সব দেখিতে লাগিল
ইহারাই ত একদিন তার বুকের আঙ্গিনায় ছুটাছুটি করিয়া
বেড়াইত, সেই ত নিজে তাদের ঘাড় ধরিয়া বাহির করিয়া
দিয়া দরজায় খিল আঁটিয়া দিয়াছিল, আজ একটু ফাক
পাইয়া কখন তাহারা দুড়দাড় শব্দে ঢুকিয়া পড়িয়াছে,
একটু সঙ্কোচ নাই—অভিমান নাই, ঠিক ঘরের ছেলের
মত। হঠাৎ কার পায়ের শব্দে লক্ষ্মী চাইয়া উঠিল ;
চাহিয়া দেখে, কলসী-কঁাথে একটি বধূ পুকুরঘাটে জল
লইতে আসিতেছে। বধূটি দূর হইতে অন্ধকারে লক্ষ্মীকে
ভাল করিয়া বােধ হয় দেখিতে পায় নাই অথবা দেখিতে
পাইলেও পাড়ার মেয়ে বলিয়া
হয়ত ভুল
করিয়াছিল, কিন্তু কাছে আসিয়া লক্ষ্মীর সেই অপরূপ
পােষাক দেথিয়া সে উদ্ধশ্বাসে বিপরীত দিকে ছুটিতে
লাগিল। লক্ষ্মী চীৎকার করিয়া উঠিল, “ভয় নেই, আমি
তােমাদেরই।” তার স্বর কপিতেছিল।
বাসায় ফিরিতেই পাদ্রী-সাহেব জিজ্ঞাসা করিল, “গ্রামের
দিকে গেছলে বুঝি ?
দূর হইতে
ঘরের ডাক
১৮
লক্ষ্মী সংক্ষেপে উত্তর দিল-“হু।
“তা কেমন দেখলে বল।”
লক্ষ্মী অত্যন্ত গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, “যা দেখলুম তা
. অনুভব করবার, বার নয়, কাজেই আমাকে মাপ করবেন,
রেভারেও হােয়াই।”
রেভারেণ্ড একটু হাসিয়া বলিলেন, “তুমি মুখে বলে
বেড়াও বটে কাব্য জিনিষটাকে তুমি মােটেই পছন্দ কর না,
আসলে কিন্তু তােমার প্রাণটা দস্তুর-মত কাব্যময় এবং
আমার মনে হয়, এত বেশি যে অতটা না হলেও চলতো।”:
লক্ষ্মী কোন উত্তর না দিয়া সে ঘর হইতে বাহির হইয়া
গেল।
পরদিন সকালবেলা শয্যা হইতে উঠিয়া লক্ষ্মী মনে মনে
স্থির করিল অমন করিয়া সে আর মনকে যা-তা করিতে
দিবে না; ঐ যে বধূটি কাল তাহাকে দেখিয়া ছুটিয়া পলাইয়া
গেল, সে কি এই কথাই জানাইয়া গেল না, যে, তােমার
সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই—তুমি দূর হয়ে যাও
এখান থেকে ?--তবে! না, না, মনকে অমন করিয়া শুধু
কেবল বাতাসে বাতাসে লাফালাফি করিয়া বেড়াইতে সে
আর দিবে না—কখনই না। তারপর সকাল কাটিয়া গেল
দুপুর আসিল; দুপুর কাটিয়া গেল, বিকাল আসিল ; তারপর
;
ঘরের ডাক আসিল সন্ধ্যা, দিবসের সমস্ত তর্কবিতর্কের উপর বিশ্বাসের আশীৰ্বাদটির মত। লক্ষ্মী ছটফট্ করিতে করিতে বাহির হইয়া পড়ি। আবার সেই পথ, যে পথের শেষ হইয়াছে সেইখানে যেখানে পল্লীবধূ পুকুরপাড়ে দাঁড়াইয়া তাকে হাত নাড়িয়া বলিতেছে—“ফিরে যাও, ফিরে যাও?” আবার সেই পুকুর- ঘাট; ঐ ত দেখা যায় তার ভাঙ্গা-ঘাটের পাড়গুলো বাঁশ- ঝাড়ের ফাকে ফাকে। লক্ষ্মীর বুক দুরদুর করতে লাগিল। কাছে গিয়া সে দেখে, কে একজন জলের দিকে মুখ করিয়া গালে হাত দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিয়াছে ; আরাে কাছে গিয়া দেখে, যে ব্যক্তি বসিয়া আছে, সে পুরুষ- মানুষ এবং সম্ভবতঃ তরুণ যুবা। মানুষের পিছন-দিকটা যে মানুষের সম্বন্ধে এত কথা বলিতে পারে, লক্ষ্মী তাহা আগে কখন জানিত না। লােকটি গালে হাত দিয়া অন্যমনস্ক- ভাবে বসিয়া ছিল ; মাথার তার ঝড় ঝাঁকড়া কোড়া চুলের রাশ—এলোমেলাে ভাবে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত, গৌরবর্ণ পিঠখানি তার অনাবৃত, কিন্তু মুখখানি তার ?কেমন তা কে জানে! জানে বৈকি সে! না দেখিয়াই সে যে অনেকক্ষণ তাহা দেখিয়া লইয়াছে—আর সেইটাই যে তার প্রকৃত রূপ। সে মুখখানি সুন্দর কি না--কে জানে, কিন্তু সে যে নিতান্তই করুণ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই ; সমুখের কাল জলে ঘরের ডাক মেন সন্ধ্যার ছায়াখানি যেমন করুণ, ঠিক তেমনি করুণ। তার পর? অপরিচিত যুবক কখন এক সময় উঠিয়া দাড়াইল, লক্ষ্মীর দিকে একবার মাত্র তাকাইল এবং কোন কথা না বলিয়াই অন্ধকার-পথে চলিতে সুরু করিয়া দিল। লক্ষ্মী সেই অস্পষ্ট-দেখা অচেনা লােকটির দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া ভাবিতে লাগিল-এ কোথায় থাকে, না জানি এই গাঁয়ের বুকটির মাঝখানে? কে জানে এর ঠিক-ঠিকানা? পথের ধারের একটা প্রকাণ্ড বাশ- ঝাড়ের শুকনাে পাতাগুলােকে নাড়া দিয়া যে উদাস হাওয়াটা বহিয়া গেল, সে বলিল, “আমিও কি জানি কোথায় আমার ঠিক-ঠিকানা ?”
মাদ্রাজে ফিরিয়া আসিয়াই লক্ষ্মী তার মাকে বলিল,
“দেখ মা, এতদিন মনে করেছিলুম বিয়ে করব না, কিন্তু
আজ দেছি মেয়েমানুষের পক্ষে ওটা নেহাতই দরকার।”
মেয়ের মুখের পানে তাকাইয়া লক্ষ্মীর-মা জিজ্ঞাসা
করিয়া উঠিল, “কেন বল দেখি ?”
উত্তর দিল, “তা না হলে কাজের বড় ব্যাঘাত
হয়। মানুষের প্রাণ যেটাকে চায়, সেটাকে ভােগ না
করে তফাতে সরে দাড়ানাে মানেই তার দর বাড়িয়ে দেওয়া।
আমার মনে হয়, তার চেয়ে সােজা উপায় হচ্ছে তাকে ভােগ
করা ; তাহলে তার মােহটা কেটে যায়, মনটা রাতদিন
কেবল গুলিখােরের মতন বাজে স্বপ্ন দেখতে থাকে না।”
লক্ষ্মীর মা আবার জিজ্ঞাসা করিল, “হঠাৎ এ খেয়াল
তাের কেন এলাে বল্ দেখি?*
খুব টানিয়া হাসিবার চেষ্টা করিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল,
“কেন আসতে কি নেই ?”
রাত্রে অন্ধকারে শয্যায় শুইয়া লক্ষ্মী ভাবিতে লাগিল,
কে ঐ যুবক, কেনই বা তার মনটা এমন করিয়া এই
ঘরের ডাক ২২ { অজানা লােকটার পিছনে পিছনে ছুটিতেছে ? এতদিন সে কত কল্পনাকেই না বাস্তব দিয়া ঠেকাইয়া রাখিতেছে, কিন্তু এ কল্পনাটাকে ত কোন বাস্তব দিয়াই ঠেকাইয়া রাখিতে পারিতেছে না, তবে কি এটা কল্পনা নয়-এটা সত্য? না, তা হতেই পারে না, এটা কল্পনাই—একবারে নিছক্ কল্পনা। ইহার মধ্যে বাস্তব হচ্ছে এই যে, চোখ কান বুজিয়া এক- জনকে বিবাহ করিয়া ফেলিলেই এ ছেলেমানুষীটা এক নিমেষে কোথায় চলিয়া যাইবে। এ সকল জিনিষ নাটক- নভেলের মধ্যে খুব বড় জিনিষ হইতে পারে, কিন্তু আসল- জীবনে ইহার দাম খুব বেশি নয়। কিন্তু মনের তলায়, অনেক দূরে বে লােকটি ভারি আস্তে কথা কয়, সে আপনার মনে বিড়বিড় করিয়া বকিয়া যাইতে লাগিল, “না, এইটাই সত্য, আর ঐ যে যাকে হােক্ একজনকে চোক কান বুজিয়া বিবাহ করিয়া ফেলিবার কথা বলিতেছ, ঐটাই হচ্ছে কল্পনা। তারপর গলার স্বরটাকে আরাে ক্ষীণ করিয়া লইয়া সেই অন্তরবাসী লােকটি বলিয়া যাইতে লাগিল, “এতদিন যে- সব সত্যকে কাছে আসিতে দাও নাই, দেখিতে পাইতেছ না, তাহারাই দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাসিতেছে ঐ অপরিচিত যুবকটীর আড়াল হইতে, আর বলিতেছে, আমাদের এতদিন চিনিতে পার নাই, তাই ত আজ তােমার যৌবনের মাঝখানটিতে
ঘরের ডাক
যুবকের বেশে আসিয়াছি। তুমি হয়ত আশ্চৰ্য্য হইতেছ,
এতদিন ত অনেক সত্যকেই তর্কের মুখােদ মুখে পরিয়া ছােট
ছেলের মত করিয়া ভয় দেখাইয়া আসিয়াছ—তবে আজ
কেন তাহা পারিতেছ না? তার কারণ, তাহার.যে কখন
এক সময় টের পাইয়া গিয়াছে ওটা মুখােদ, আর ত তাহাদের
ভয় দেখাইতে পারিবে না। আজ যে মুখােসের দুই পাশ দিয়া
তােমার নিজের কানের ডগা দুটো কথন এক সময় উকি
মারিয়া ফেলিয়াছে--আর ত উপায় নাই। তার পর এই যে
যুবক, এ ত আর একদিনেই এতবড়টি হইয়া উঠে নাই,
ইহার ও ত শৈশব ছিল, বাল্য ছিল, কৈশাের ছিল, তখন
তুমি ইহাকে তাচ্ছিল্য করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছিলে, বলিয়া-
ছিলে, “তােকে চাহি না, তুই চলে যা”; আজ হঠাৎ এতদিন
পর সে যখন তার পরিপূর্ণ যৌবনটি তােমার চোখের সম্মুখে
মেলিয়া ধরিল, তখন তুমি ভাবিলে, এমনটি ত কখন দেখি
নাই! ইঙ্কাই ত সত্য, একদিনের নয়, দুদিনের নয়, সারা
জীবনের একটু একটু করিয়া জমান সত্য; ইহাকে কল্পনা
বলিয়া উড়াইয়া দিবে আজ কোন্ অছিলায় ?
পরদিন সকালে উঠিয়া লক্ষ্মী ডাইরী লিখিতে বসিল,
“অতীত চিরকালই অতীত এবং তা ফেরে না বলেই এত
সুন্দর। কিন্তু বর্তমানের মধ্যে যে সুন্দরকে দেখতে পায়,
ঘরের ডাক
২৪
তার সে দেখা শুধু দেখা নয়, পাওয়াও বটে। আজ থেকে
সুন্দরকে শুধু দূর থেকে দেখেই সন্তুষ্ট থাকবে না, তাকে দুই
হাতে করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধবাে।”
সদ্যদীক্ষিত যে ডােম-পরিবারটির কথা পূৰ্বে বলিয়াছি,
তাহাদেরই একটি ১১১২ বৎসরের কালাে মােটা-সােটা
মেয়ের সহিত লক্ষ্মীর ভারী ভাব হইয়া গিয়াছিল। মেয়েটি
ভারি গায়পড়া। আজ দুপুর বেলা তাকে নিজের ঘরে
একলা পাইয়া লক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা ফেলী, বল্ ত,
আমি যদি বিয়ে করি ত কাকে কব।”
ফেলী একখানা রংচংএ ছবির বই লইয়া ভারি মাতিয়া
উঠিয়াছিল, কথাটা সে শুনিয়াও শুনিল না।
লক্ষ্মী তার হাত হইতে ছবির বইখানা কাড়িয়া লইয়া
বলিয়া উঠিল, “আগে জবাব দে, তবে দেখতে দেবাে।”
সে বিরক্ত হইয়া বলিল, “কি বলছ বলাে না।”
“বছিলুম আমি যদি বিয়ে করি ত কাকে করব বল্
ফেলী প্রথমটা ভাবিয়াছিল, লক্ষ্মী তাহার সহিত ঠাট্টা
করিতেছে, তাই সে কেবল হাসিতেই লাগিল। কিন্তু লক্ষ্মী
२०
ঘরের ডাক
যখন তাকে অনেক করিয়া বুঝাইয়া বলিল যে, না সত্যই সে
ঠাট্টা করিতেছে না এবং পাত্র-নির্বাচনের ভারটা সত্যই
তার উপর দিয়া সে নিশ্চিন্ত হইতে চায়, তখন ফেলী হঠাৎ
এমনি গম্ভীর হইয়া উঠিল যে, তাহা দেখিয়া লক্ষ্মীর হাসি
সাম্লান দায় হইয়া উঠিল।
সে ভারি মুরব্বির মত বলিতে
আরম্ভ করিল, “তা যদি বলােত আমাদের হরিপুরের
বলাই দাস,—তুমি হাসছ লক্ষ্মী-দিদি, মাকে বরং জিজ্ঞেস্ করে
দেখাে, সে কত নেকা-পড়া শিখেছে-* এই অবধি বলিয়াই
লী থামিয়া গেল, তায় চোখ দুটো হঠাৎ কোথা হইতে
জলে ভরিয়া আসিল।
তাকে বুকের মধ্যে খুব জোরে চাপিয়া লক্ষ্মী বলিয়া
উঠিল, “কি হয়েছে রে ফেলি।
সে ডুকাইয়া কঁদিয়া উঠিল, “বাড়ীর জন্যে আমার বডড
মন-কেমন কছে লক্ষ্মী-দিদি।
আজ বিকাল হইতেই টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতে
সুরু করিয়াছিল। পথ ঘাট সব একবারে কাদায় কাদা।
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্ব্বে লক্ষ্মী নিজের ঘরের জানালাটির ধারে চুপ
করিয়া বসিয়া ছিল। আজ কে জানে কেন তার ভয়ানক
কান্না আসিতেছিল। তার মনে হইতেছিল, ঐ যে ফেলীর
কান্না, ঐটাই আজ বিশ্বব্যাপী হইয়া উঠিয়াছে, তাই আকাশ
ঘরের ডাক
কঁদিতেছে, বাতাস কাঁদিতেছে আর সঙ্গে সঙ্গে কঁদিতেছে
তার মনটাও। হঠাৎ একসময় কি ভাবিয়া সে ডাকিয়া
উঠিল, “মা !”
“কেন রে-বলিয়া পাশের ঘর হইতে তার মা আসিয়া
চৌকাঠের উপর দাঁড়াইল।
“আচ্ছা মা, আমরা যদি আবার হিন্দুসমাজে ফিরে যাই,
তাহলে কি হয় ?”
অত্যন্ত উৎকণ্ঠিতভাবে লক্ষ্মীর মা বলিয়া উঠিল, “এ.
আবার কোন্ দেশী খেয়াল তাের বল্ দেখি লক্ষ্মী ! একেই
বলে সুখে থাকতে ভূতে কিলােনাে।”
“আহা, আমি কি সত্যি-সত্যিই যাচ্ছি নাকি-
বাধা দিয়া তার মা বলিয়া উঠিল, “তবে ও-কথা জেনে
তাের লাভ কি শুনি?”
অত্যন্ত জোর করিয়া টানিয়া হাসির চেষ্টা করিয়া
লক্ষ্মী বলিল, “আমার জন্যে বছি না গাে, বছি অপরের
জন্যে।”
“অপরের ভাবনা অপরে ভাববে, সে খোঁজে তাের এত
দরকার কি বল ত।”
কথাটা যে একেবারেই ফাকা,তার মধ্যে যে
আন্তরিকতার ছিটা-ফোটা মাত্র নাই, ইহাই জোর করিয়া
২৭
ঘরের ডাক
প্রমাণ করিবার জন্য লক্ষ্মী হঠাৎ অত্যন্ত অস্বাভাবিক ভাবে
হাসিয়া উঠিয়া বলিল, “ভয় নেই না, তােমাদের তেত্রিশ-কোটি
দেবতার একটিও আমার স্কন্ধে ভর করে বসেন নি আমি
কেবল কথার কথা বছি মাত্র।”
লক্ষ্মীর মা যেন দম্ ছাড়িয়া বাঁচিল, সে অত্যন্ত
তাচ্ছিল্যের সুরে বলিতে লাগিল, “মুখে আগুন আর কি,
তারা আবার ফিরিয়ে নেবে !-যে একবার তাদের সমাজ
থেকে বেরিয়ে এসেছে, তার আর সে-মুখাে হবার জো
নেই।”
অত্যন্ত জোর করিয়া হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “তবে ত বড়
বয়েই গেল।”
লক্ষ্মীর মা কি বলিতে গিয়া হঠাৎ থামিয়া গেল। তার
চোখ-দুটো সহসা জলে একেবারে পূর্ণ হইয়া উঠিল। সে-
দিকে চাহিয়া লক্ষ্মী কি একটা কাজের অছিলা করিয়া
সে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
লক্ষ্মী চলিয়া গেলে পর লক্ষ্মীর মা শয্যার উপর গিয়া
শুইয়া পড়িয়া গড়াগড়ি দিয়া কঁদিতে লাগিল, আর বলিতে
লাগিল, “ওগাে তেত্রিশ-কোটি দেবতা, তােমরা কেন
আমাদের এমন করে তাড়িয়ে দিলে, আমি যে এখনও
তােমাদের বই আর কাউকে জানি না।”
চিদম্বরম নামক জনৈক মাদ্রাজী ব্যারিষ্টারের সহিত
লক্ষ্মীর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। ভদ্রলােকের বয়স অল্প, কিন্তু
ইহারই মধ্যে সে বেশ পশার জমাইয়া লইয়াছিল।
চিদম্বরমের ছিল দুপুরুষে খ্রীষ্টান্। তার বাপ একজন বড়
ধৰ্ম্মপ্রচারক ছিলেন এবং খৃষ্টান্মহলে ধাম্মিক লােক বলিয়া
তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। চিদম্বরমের এক ভগ্নী ছিল লক্ষ্মীর
সহপাঠী, সেই সূত্রেই তাহার সহিত লক্ষ্মীর আলাপ হয় এবং
এই আলাপ ক্রমে এমনি গাঢ় হইয়া জমিয়া বসিতে আরম্ভ
করে যে অনেকের ধারণা হইয়াছিল, পরিণামে এটা বন্ধুত্বের
নীচু ক্লাস হইতে ডবল-প্রমােশন পাইয়া হঠাৎ একদিন
দাম্পত্যের উচু ক্লাসে গিয়া উঠিবে।
সে দিন সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে লক্ষ্মী চিদম্বরমদের বাহিরের
ঘরের মধ্যে হঠাৎ ঢুকিয়া পড়িয়া একজন বেহারাকে ডাকিয়া
বলিল, “তােমার মাষ্টার বাড়ী আছেন কি?
সে অভিবাদন করিয়া বলিল, “হাঁ আছেন, বসুন, খবর
দিচ্ছি।”
২৯
ঘরের ডাক
লক্ষ্মী অত্যন্ত অস্থিরভাবে একটা চেয়ার টানিয়া বসিয়া
“পড়িল।
অল্পক্ষণ পরেই সিগারেট টানিতে টানিতে চিদম্বরম
আসিয়া মৃদু হাস্য করিয়া বলিল, “কি সৌভাগ্য আমার !”
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “আমার বিশেষ একটা
কথা আছে আপনার সঙ্গে-আপনার হাতে বােধ হয় এখন
বিশেষ কোনো কাজ নেই।”
অবাক হইয়া লক্ষ্মীর মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া
চিদম্বরম বলিল, “আমার আর এখন কাজ কি লুসী, আমি
শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলুম আর তােমার
লক্ষ্মী চিদম্বরমের প্রণয়-প্রলাপের মিথ্যা ভাষণ মাঝপথে
থামাইয়া দিয়া গম্ভীর হইয়া বলিল, “তবে বসুন।”
একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া বসিয়া চিদম্বরম বলিল,
কোনাে খারাপ সংবাদ নয় ত?”
তা বলতে পারি না, হয়ত ভাল, আবার হয়ত খারাপও
হতে পারে।”
চিদম্বরম কি একটা কথা বলিতে যাইতেছিল, সে-কথা
কানে না তুলিয়াই লক্ষ্মী হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “আমি আপনার
কাছে এসেছি জাতে—আপনি কি আমাকে বিবাহ করতে
রাজি আছেন?
ঘরের ডাক S চিদম্বরম অবাক হইয়া এই অদ্ভুত মেয়েটির মুখের পানে চাহিয়া রহিল। “আমার দেরী করবার একটুও সময় নেই মিঃ চিদম্বরম—হ কি না, একটা কথা কেবল বলে দি।” সেই ভাবেই তার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া চিদম্বরম বলিল, “তা অত উত্তেজিত হচ্ছ কেন লুসী,—আমি কি তােমাকে “তা হলে রাজী আছেন ?” “একথা আবার জিজ্ঞাসা করছ লুসী!” “আচ্ছা তা হলে আসি, কাল আবার দেখা হবে,” বলিয়া লক্ষ্মী হঠাৎ চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইল। “এখুনি যাবে কোথায় লুসী—একটু ঠাণ্ডা হও, আমি যে কিছুই বুতে পারছি না-হঠাৎ এমন করে— “না আজ আর বব না, মাথাটা বড় ধরেছে, সকাল- সকাল গিয়ে শুয়ে পড়ি,” বলিয়া লক্ষ্মী চঞ্চভাবে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। চিদম্বরম তবু ডাকিল—“লুসী!” সে চলিতে-চলিতেই উত্তর দিল, “কাল আবার দেখা হবে মিঃ চিদম্বরম ; আজ আর বতে পাছি না।”
ঘরের ডাক
বাড়ী ফিরিয়া জামা কাপড় ছাড়িতে ছাড়িতে লক্ষ্মী
ডাকিল, “মা!”
পাশের ঘরে বসিয়া লক্ষ্মীর মা লক্ষ্মীর একটা
ছেড়া জামা সেলাই করিতেছিল,—উত্তর দিল, “কি
বছি।”
“নিজের বিয়ের সব পাকাপাকি করে এলুম যে।”
জামা ফেলিয়া উঠিয়া আসিয়া লক্ষ্মীর মা বলিল, “সত্যি
বছি, না ঠাট্টা করছি ?”
“না মা সত্যি বছি, একটুও ঠাট্টা কছি না, মি:
চিদম্বরম রাজী হয়েছেন।”
“তা বেশ,” বলিয়া লক্ষ্মীর মা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া
রহিল।
জামার বােম খুলিতে খুলিতে লক্ষ্মী বলিল, “তুমি
ত কৈ শুনে খুব আল্লাদ করাল না মা, পাত্তর বুঝি তােমার
পছন্দ হয়নি ?”
“না চেঁচালে বুঝি আর আনন্দ করা হয় না, তার পর
পাত্তরের কথা যদি বলি ত অমন পাত্তর কজনের ভাগ্যে
জোটে ব ত ?”
একটা শুষ্ক হাসি হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “না মা, আমি
বেশ বুঝতে পারছি, তােমার একটুও আহলাদ হয়নি।
১১১
ঘর হইতে হঠাৎ বাহির হইয়া গিয়া লক্ষ্মীর মা বলিল,
“না হয়েছে ত নেই নেই,-তুই এখন খাবি আয় দেখি,
ভাত যে জুড়িয়ে গেল। তার গলার আওয়াজ ঠিক
স্বাভাবিক ছিল না।
লক্ষ্মীর-মার মনে সত্যই একটুও আনন্দ হয় নাই, যদিও
সে অনেকদিন হইতে ঠিক ইহাই চাহিতেছিল। চিদম্বরমকে
লক্ষ্মীর মা বিলক্ষণ জানিত এবং ইহাও জানিত যে, এই
যুবকটির হাতে পড়িলে লক্ষ্মী ভবিষ্যতে সুখী হইতে পারিবে।
তবু কেন যে তার আনন্দ হইল না, তা সে নিজেই বুঝিতে
পারিল না। মনের অনেক দূরে এক কোণে অত্যন্ত
ক্ষীণ একটা আশার শিখা নিব-নিব করিয়া জ্বলিতেছিল,
আজ হঠাৎ সেটিও নিভিয়া গেল, এ শােক কি
তাহারই ?
পরদিন চারিদিকে বটিয়া গেল, লক্ষ্মীর সহিত চিদম্বরমের
বিবাহ ঠিক হইয়া গিয়াছে।
রেভারেণ্ড হােয়াইটের কানেও সে কথা গিয়া উঠিয়াছিল,
তিনি লক্ষ্মীকে ডাকিয়া বলিলেন, “শুনে খুব খুসী হলাম
লুসী।”
ঘাড় হেঁট করিয়া লক্ষ্মী বলিল, আমি মনে করেছিলুম
বিবাহ না করে
ঘরের ডাক
বাধা দিয়া রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “গার্হস্থ্যই সবচেয়ে
বড় ধৰ্ম্ম লুসী, সেজন্যে দুঃখিত হবার কোনাে কারণ
নেই।”
বিকালের দিকে নিজের ঘরের জানালার ধারে লক্ষ্মী
চুপ করিয়া বসিয়া ছিল, কাল তার বিবাহ। মনটা তার
আদবেই, ভাল ছিল না, বুকের ভিতরটা যেন কেবল কাদিয়া
কাদিয়া উঠিতেছিল। কিছুক্ষণ এইভাবে চুপ করিয়া বসিয়া
থাকিয়া হঠাৎ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া দরজার দিকে মুখ
ফিরাইয়াই সে বলিয়া উঠিল, “ওখানে অমন চোরের মতন
চুপটি করে দাড়িয়ে কেন রে ফেলী ?”
অত্যন্ত সন্তর্পণে ঘরের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ করিয়া
সে বলিল, “তুমি যদি বকো ?”
তাকে জোর করিয়া পাশে টানিয়া বসাইয়া লক্ষ্মী বলিল,
“কেন, কি করেছি তুই, যে বকূব ?”
“আমি আবার সেই কথা বলতে এসেছি লক্ষ্মী-দিদি।”
তার চোখ-দুটো ছলছল করিয়া উঠিল।
তাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া লক্ষ্মী বলিল, “ত
বা রে পাগলী, তাতে আর হয়েছে কি ?”
“তুমি বে সেদিন বকুলে।”
“আচ্ছা, আজ আর বব না, কি বছিস্ বল্ দিখি।”
ঘরের ডাক
৩৪
লক্ষ্মীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া চাহিয়া থাকিয়া
ফেলী সহসা বলিয়া উঠিল, “তুমি ওখানে বিয়ে কোরো না
লক্ষ্মী-দিদি।”
“কেন, তাতে কি হয় বল্ ত?”
“না না, ও যে কিরিষ্টান, ওর সঙ্গে বুঝি বিয়ে করতে
আছে ?”
“খৃষ্টানরাও ত মানুষ ফেলী।”
“তা হােগে, ওরা যে কিরিষ্টান।”
“আমরাও ত কিরিষ্টান।”
ফেলী মাথার চুলগুলা ঝাড়াইয়া মাথা নাড়িন্না বলিয়া
উঠিল, “আমরা ওদের মতন কিরিষ্টান নই কথখনাে !”
“তুই ছেলেমানুষ, সব কথা বােৰুবার তাের এখন শক্তি
হয়নি ফেলী—তুই চুপ করে থাক্।”
লাফাইয়া উঠিয়া ফেলী বলিল, “আচ্ছা, তুমি মা-কালীর
দিব্যি করে বলে দেখি, এদের তােমার একটুও ভাল
লাগে ?”
লক্ষ্মী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। ফেলী হাত মুখ নাড়িয়া
বকিয়া যাইতে লাগিল, “বল না বল! তা আর বলতে হয় না
লক্ষ্মী-দিদি, আমি সে অনেকদিন টের পেয়েছি—মুখে তুমি
যাই বল না কেন।
ঘরের ডাক অত্যন্ত করুণভাবে তার মুখের পানে চাহিয়া লক্ষ্মী বলিল, “তুই কেমন করে জাল রে ফেলী ?* “তা না হলে সেদিন আমাদের দেশের কথা শুনতে শুনতে তােমার চোখ দিয়ে * তাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া লক্ষ্মী হঠাৎ কঁদিয়া ফেলিল, “আমি কি করি-বল্ দেখি ফেলী—তুই আমাকে বলে দো-আমি যে এমন করে আর পারি না।” ফেলী অবাক হইয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া বহিল। রাত্রে শয্যায় শুইয়া লক্ষ্মী মনের সহিত অনেক তর্ক- বিতর্ক করিয়া অবশেষে স্থির করিল, “কোনাে দুৰ্বলতাকে সে আর কাছে আসিতে দিবে না। কেন, ইহারাও ত মানুষ ; হইলই বা খৃষ্টান্, তাহাতেই বা ক্ষতি কি! মানুষের পরিচয় এ নয় যে সে খ্রীষ্টান্ কি হিন্দু, মানুষের পরিচয় কেবলমাত্র এই যে, সে মানুষ এবং একই ভগবানের সন্তান। (জাত্যভি- মান মানুষকে যে কদৰ্য্য এবং বিশ্রী সঙ্কীর্ণতার বুলি পড়া- পাখীর মত করিয়া মুখস্থ করাইয়া দেয়, অন্ধ-মানুষ মনে করে উহাই সত্যের বাণী—কিন্তু সে যে কতবড় মিথ্যা, তা মানুষ একবারও ভাবিয়া দেখে না এবং এই অসত্য দাম্ভিকতাকে মানুষ যে এত জোর করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিয়া পড়িয়া আছে,
যরের ডাক
ইহাই আশ্চৰ্য। এই অসত্যের বন্ধন হইতে আজ সে মুক্ত
হইবেই। হয়ত জীবনে সে সুখী হইতে পারিবে না, হয়ত
জীবনটা তার একেবারেই ব্যর্থ হইয়া যাইবে, কিন্তু জীবনের
সার্থকতাকে কি ওজন করিতে হইবে সুখ-দুঃখের দাড়ি-
বাটখারায় ? সত্যকে পাইবার জন্য এই যে দুঃখকে বরণ
করিয়া লওয়া, ইহারই মধ্যে কি জীবনের প্রকৃত সার্থকতা
আপনার অচল আসনখানির উপর বসিয়া নাই ? ফেনী
আজ যে কথা বলিল, তাহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। সত্যই
সে ইহাদিগকে মনের সঙ্গে আজও ভালবাসিতে পারে নাই,
কিন্তু কোনো জিনিষ ভাল কি মন্দ তার বিচার ত আর
মানুষের ভাল লাগা না-লাগার উপর নির্ভর করে না। পারে,
নাই বলিয়াই ত আজ তাকে জোর করিয়া পারিতে হইবে।
প্রতিকূল অবস্থার সহিত দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়াই ত মানুষের
প্রকৃত জীবন উৎসারিত হইয়া উঠে, আর সেইখানেই ত
মানুষ মানুষ।
লক্ষ্মী সহসা শষ্যা ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িয়া মাথার শিয়রের
জানালাটার ধারে গিয়া নীরবে বসিয়া পড়িল। চারিদিক
নীরব নিস্তব্ধ, কোথাও একটু-মাত্র জাগরণের সাড়া নাই,
এত নিস্তব্ধ যে তার নিজের বক্ষের স্পন্দনটুকু পর্যন্ত সে
শুনিতে পাইতেছিল। মাথার উপরকার দিগন্তবিস্তৃত ঐ
ঘরের ডাক
কালাে আকাশটা তার কোটি কোটি
চক্ষু মেলিয়া লক্ষ্মীর
মনের ভিতরকার সমস্ত কথাগুলােকে যেন পড়িয়া ফেলিবার
চেষ্টা করিতেছিল।
অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া থাকিয়া হঠাৎ একসময়
সে ঝনাৎ করিয়া জানালাটা বন্ধ করিয়া দিয়া শয্যায় আসিয়া
শুইয়া পড়িল এবং পাঁচ বৎসরের ছােট বালিকার মত করিয়া
ফোপাইয়া কোপাইয়া কঁদিতে লাগিল।
৬
পরদিন অতি প্রত্যুষে উঠিয়া-লক্ষ্মী চিদম্বরমদের বাড়ীতে
গিয়া সুমুখে একজন ভৃত্যকে পাইয়া বলিল, “তােমার মাষ্টার
উঠেছেন কি?
সে বলিল, “না, ওঠেন নি, এখুনি উঠবেন ; বাইরের ঘর
খুলে দিচ্ছি--একটু বসুন।”
সে বলিল, “না, এখুনি ডেকে দাও; বল—বিশেষ
দরকার আছে।”
অল্পক্ষণ পরে চোখ কচলাতে কচলাইতে নামিয়া
আসিয়া চিদম্বরম বলিল, “কি খবর লুসী ? তার পর ভাল
করিয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া শশব্যস্তে বলিয়া উঠিল,
তােমার অসুখ করেছে নাকি।-কাল কি সারারাত
ঘুমােওনি!”
লক্ষ্মী চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। চিদম্বরম আবার
কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া হঠাৎ লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল,
“আমাকে মাপ করবেন মিঃ চিদম্বরম—আমি কথা রাতে
ঘরের ডাক,
পারলুম না।”--তার স্বর উত্তেজনায় কাঁপিয়া কঁাপিয়া
উঠিতেছিল।
আশ্চৰ্য্য হইয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া চিদম্বরম বলিল,
“তুমি কি যে বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না যে
লুসী!”
মাটীর দিকে চোখ রাখিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমি এখন
বিবাহ করব না মিঃ চিদম্বরম,-আমাকে মাপ করুন
আপনি।
কাহারও মুখে একটি কথা নাই। কিছুক্ষণ পরে চিদম্বরম
বলিল, “তুমি কি আর কাউকে বিবাহ করতে চাও লুসী?”
কম্পিত-কণ্ঠে লক্ষ্মী বলিল, “বিবাহ যদি কতুম তা হলে
আপনাকে ছাড়া আর কাউকেই করতুম না—আমি একে-
বারে বিবাহ করব না, ঠিক করেছি।”
“এ কথা ত অনেক দিন আগেই বলেছিলে লুসী, আমিও
তােমার আশা ত্যাগ করেই বসেছিলুম—তার পর হঠাৎ
কেন যে-*
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমাকে ক্ষমা করূবেন
আপনি—আমি আপনার উপর যথেষ্ট অত্যাচার করেছি--
কিন্তু নিতান্তই দায়ে পড়ে।
এই সময় হঠাৎ চিদম্বরমের ভগ্নী আসিয়া সেই কক্ষে
ঘরের ভাক
৪
প্রবেশ করিল,-এবং ঠাট্টার সুরে হাসিতে হাসিতে বলিল,
“তােমরা অবাক কলে দেখছি,আর কটা ঘণ্টা বুঝি আর
সবুর সইছে না—* সে আরাে আনেক কথা বলিত, কিন্তু
হঠাৎ দুজনের মুখের দিকে চাহিয়া খামিয়া গোল।
}
দেখিতে দেখিতে কথাটা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল।
চিদম্বরমের মত একজন ধনী এবং সন্ত্রান্ত যুবক যে লক্ষ্মীকে
বিবাহ করিতে রাজি হইয়াছে, এই চিন্তাটাই অনেক ফিরিঙ্গী-
যুবতীর পক্ষে অসহ্য হইয়া উঠিয়াছিল ; আজ তাহারা হাঁপ
ছাড়িয়া বাঁচিল এবং কথাটাকে লইয়া খুব খানিকটা ঘােলাইয়া
তুলিতে লাগিল—বলিল, “আমরা আগে থেকেই জানি ৩-
বিয়ে হতে পারে না, নেহাৎ হাতে পায়ে ধরে রাজি করেছিল,
তা সে টিকবে কেন, মানুষের মন ত, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাহারা ঠিক করিয়াছিল, চিদম্বরমই নিজে হইতে বিবাহ
ভাঙ্গিয়া দিয়াছে।
রেভারেণ্ড, হােয়াইটের কানেও এ সংবাদ গিয়া
পৌছিয়াছিল, তিনি লক্ষ্মীকে ডাকিয়া বলিলেন, “হঠাৎ এ
আবার কি খেয়াল লুসী?”
ঘাড় হেঁট করিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমার খুবই অধ্যায়
হয়েছে রেভারেণ্ড, কিন্তু কি করব-আমি নাচার।”
৪১ ঘরের ডাক “কেন?” “কেন, তা ঠিক বলতে পারি না রেভারেণ্ড—আমার বিবাহ করতে এখন আদৌ ইচ্ছে হচ্ছে না।” “বিবাহ করতেই ইচ্ছে হচ্ছে না, না কেবল এইস্থানে বিবাহ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না, সেটা বলতে পার লুসী?” “তাও বলতে পারি না রেভারেণ্ড,-আমার মনে হয়, আমার ন ব দুর্বল হয়ে পড়ছে।” “ন, # দুর্বল হয়ে পড়ছে !–কোন্ বিষয়ে লুসী?” এক চুপ করিয়া থাকিয়া লক্ষ্মী বলিল, “খৃষ্ট-ধৰ্ম্মে আর তেমন আস্থা রাতে পাছি না আমি।” রেভারেণ্ড, শশব্যস্তে বলিয়া উঠিলেন, “বল কি! এমন- ধারা হঠাৎ হােলদা কেন, আমি ত কিছুই বুঝতে পাছি না লুসী!” লক্ষ্মী চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। রেভারেণ্ড, হােয়াইট কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “এ তাবটা তােমার আমি একদিন মাত্র লক্ষ্য করেছিলাম,তুমি বােধ হয় বুঝতে পাছ, কোন্ দিনের কথা বছি।” ঘাড় হেঁটু করিয়া লক্ষ্মী বলিল, “না, ঠিক বুঝতে পাছি মনে পড়ছে না লুসী, আমরা তখন বাংলা দেশে;
ঘরের ডাক
৪২
একদিন সন্ধ্যার সময় গ্রামের দিকে বেষ্কাতে গিছলে—ফিরে
আসতে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কেমন দেখলে ?
তুমি বলে, “দেখিনি, শুধু অনুভব করেছি। এইবার মনে
পড়ছে লুসী।”
অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া লক্ষ্মী বলিল, “ছ।”
“আমি তখনি বলেছিলুম, কাব্যের দিকটা তােমার মধ্যে
বড্ড বেশী প্রবল হয়ে উঠেছে-তুমি তখন আমার কথায়
কানই দাওনি।”
লক্ষ্মী কোনাে কথা বলিল না, চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
কিছুক্ষণ পরে রেভারেণ্ড, আবার বলিতে লাগিলেন,
“আমার মনে হয়, মনে হয় কেন, এটা খুব সত্যি যে,
তুমি বড় বেশী কাল্পনিক। সেদিন তুমি যে অভিভূত
হয়ে পড়েছিলে, সে অভিভূত হবার মধ্যে আর কিছুই ছিল
, ছিল যা, সে কেবল নিছক কল্পনা। আসল কথা, বাংলা-
দেশের পল্লীগ্রাম যে তােমাকে অত মুগ্ধ করেছিল, সে তার
ধৰ্ম্ম দিয়েও নয়, সভ্যতা দিয়েও নয়, কেবল প্রাকৃতিক
সৌন্দৰ্য্য দিয়ে। তুমি কিন্তু এমনি পাগল যে, মনে করে
বলে, এর মধ্যে ধর্ম ও সমাজের প্রেরণাও আছে—
বাস্তবিক কিন্তু তা আদবেই নয় ; তুমি নিজেই ভেবে দেখ
কেন লুসী।”
৪৩
ঘরের ডাক
জানালার ভিতর দিয়া নীল আকাশের দিকে চাহিয়া
লক্ষ্মী বলিল, “বােধ হয় তাই হবে।”
“বােধ হয় কেন,নিশ্চয়ই তাই। তা না হলে, তাদের
সমাজ দেখলে না, ধৰ্ম্ম দেলে না, তাদের নৈতিক জীবনের
সঙ্গে একদিনও পরিচিত হলে না, অথচ হঠাৎ তাদের দিকে
ঝুকে পড়লে—এ কি কখনও হয়? অনেক সময় বাইরেটাকে
দিয়ে মানুষ ভিতরের বিচার করে থাকে। কিন্তু সেটা ভয়ানক
ভুল। বাংলার পল্লীগ্রামের বাইরের দৃশ্য যেমন সুন্দর এবং
প্রশান্ত, তার ভিতরের দৃশ্য ঠিক তেমনি বিকট এবং সঙ্কীর্ণ ।
তুমি তার বাইরেটাই দেখেছ, ভিতরটা ত আর দেখনি লুসী।
তােমার উচিত দিন-কতক ওদের সমাজের ভিতরটাও দেখে
আসা—তা হলে বুঝতে পাবে আমার কথা সত্যি কি
। চুপ করে থেক না লুসী, উত্তর দাও; আমি বুঝতে
পেরেছি তােমার অনুতাপ এসেছে, কিন্তু মানুষের ভুল ত
হতেই পারে, তার জন্যে অত দুঃখিত হবার বিশেষ কারণ
নেই।”
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া লক্ষ্মী বলিল, “বােধ হয়
আপনার কথাই ঠিক—আমি বড় বেশী কল্পনাপ্রবণ। এবার
থেকে চেষ্টা করব একটু একটু করে বাস্তবের মধ্যে ফিরে
আসতে। অমন করে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ঘুরে বেড়িয়ে কোনো
ঘরের ডাক
৪৪
লাভ নেই।” কথাটা শেষ করিয়াই সে বলিল, “আজ তবে
আসি মি: হােয়াই।”
“তা, এস, কিন্তু আমি যে-সব কথা বল্লম, সেগুলাে
একটু ভেবে দেখতে চেষ্টা কোরাে।”
সে-কথার কোনাে জবাব না দিয়া লক্ষ্মী আস্তে আস্তে
ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
৭
সেদিন সকাল-বেলা লক্ষ্মী বাজারের দিকে যাইতেছি, এমন
সময় হঠাৎ কোথা হইতে ছুটতে ছুটিতে আসিয়া ফেলী তার ।
হাত ধরিয়া টানাটানি করিতে করিতে বলিল, “আমাদের
বাড়ী চল না লক্ষ্মী-দিদি।”
অত্যন্ত গম্ভীরভাবে লক্ষ্মী বলিল, “তুই এখন যা, আমার
অনেক কাজ আছে।” তার গলার স্বরে এতটুকু রস ছিল না।
সহসা লক্ষ্মীর হাত ছাড়িয়া দিয়া ফেণী অবাক হইয়া তার
মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
সেদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র না করিয়া লক্ষ্মী পথ চলিতে আরম্ভ
করিল। কিছুদূর গিয়া পিছনের দিকে ফিরিয়া চাহিয়া সে
দেখিল, ফেলী সেই ভাবেই অবাক হইয়া তার দিকে চাহিয়া
রহিয়াছে। সে আস্তে আস্তে ফিরিয়া আসিয়া তার মাথার
ধীরে ধীরে হাত বুলাইয়া দিয়া বলিল, “আজ সন্ধ্যের সময়
তােদের বাড়ীতে যাব এখন ফেলী, এখন বড় কাজ আছে
কিনা।
ঘরের তাক ৪৬ ফেলী কোন কথা বলিল না। রুদ্ধ অভিমান বুকের মধ্যে নীরবে পূরিয়া সে পাথরের মূর্তির মত খাড়া দাড়াইয়া রহিল। ফেলী আজ কদিন হইতে লক্ষ্য করিয়া আসিতেছে, তার লক্ষ্মী-দিদি আজকাল আর তাকে কাছে ঘেঁসিতে দিতে চায় ; কিন্তু এমন-ধারাটা সে যে কেন করে, তা ফেলী কোন- মতেই বুঝিয়া উঠিতে পারিত না, কেন, কি অপরাধ করিয়াছে সে । কিন্তু ফেলী না বুঝিলেও ইহার মধ্যে একটা নিগৃঢ় কারণ ছিল ; সে কারণটা হইতেছে এই যে, লক্ষ্মী ফেলীকে মনে মনে ভয় করিত। শত শত যুক্তি তর্ক যখন তাদের বাড়ীর মত ক্রমেই উচু হইয়া উঠিতেছে, ঠিক সেই সময় হঠাৎ কোথা হইতে আসিয়া এই আহাম্মক মেয়েটি একটি মাত্র টু দিয়া সমস্ত ধুলিসাৎ করিয়া দিয়া যাইত; এমনি অদ্ভুত তার ক্ষমতা। সে যুক্তি- তর্ক গড়িতে জানিত না, কিন্তু ভাঙ্গিতে জানিত অসাধারণ। ভাবে। তার কথার মধ্যে যুক্তি খুব বেশী থাকিত না, কিন্তু যাকে পাইবার জন্য যুক্তি, তাহা যথেষ্ট পরিমাণে থাকিত। এইজন্য লক্ষ্মী তাকে ভয়ানক ভয় করিত। এই মেয়েটির সম্মুখে কোন যুক্তিই যে টেকে না, অথচ এই যুক্তি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র যে তার হাতে নাই। আসুক না রাজ্যশুদ্ধ
89
ঘরের ডাক
তাকিকের দল, তাদের জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা এবং
বইপড়া-বিদ্যা লইয়া, সে তাল ঠুকিয়া আসরে গিয়া নামিবে ;
কিন্তু এই মহারথীর হাতে যে আছে নাগপাশ, সে যে
আসিয়াই হাত পা সমস্ত বন্ধ করিয়া দেয়, যুদ্ধ করিবার
সামর্থ্যই যে থাকে না, সেই ত মুস্কিল।
লক্ষ্মী যে ফেলীকে আমল দিত না, তার জন্য সে নিজের
মনের কাছে এই বলিয়া জবাবদিহি করিত যে, সে নিছক
কল্পনাকে লইয়া আর ঝিমাইবে না, সত্যের অরুণাললাকে
ভয়ানক-ভাবে সজাগ হইয়া উঠিবে এবং যে-সকল পদার্থ
তাকে সত্যের কাছ হইতে ক্রমেই মায়া এবং কুসংস্কারের
দিকে হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া যাইতেছে, ফেলী তাহাদেরই
একজন। তার কথায় কুসংস্কার, তার অঙ্গভঙ্গীতে কুসংস্কার
তার দৃষ্টিতে—এমন কি তার নিশ্বাসেও-কুসংস্কার। নিজেকে
বাঁচাইতে হইলে তার কাছ হইতে সর্বদা তফাতে থাকিতে
হইবে। এই যে সে ছেলেমানুষী করিয়া বিবাহ ভাঙ্গিয়া
দিল, ইহার মধ্যে যা আছে, সে কেবল কুসংস্কার আর
সংকীর্ণতা। ছি ছি, কি ভয়ানক অন্যায়টাই না সে করিয়া
ফেলিয়াছে। বিবাহ করা তার খুব উচিত ছিল, কিন্তু এখন
ত আর উপায় নাই, লােকে তাহা হইলে কি বলিবে?
সে-দিন সন্ধ্যার সময় বাড়ী ফিরিয়া লক্ষ্মী জামা কাপড়
ঘরের এক ৪ ছাড়িতেছিল, এমন সময় তার মা আসিয়া বলিল, “হােয়াইট সায়েবের চাপাশি তােকে ডাকতে এসেছিল, আমি বলে দিয়েছি, এলেই পাঠিয়ে দেবাে। লক্ষ্মীর আর জামা কাপড় ছাড়া হইল না, সে সেই ভাবেই বাহির হইয়া পড়িল। রেভারেণ্ড, টেবিলের ধারে বসিয়া একখানা চিঠি লিখিতেছিলেন, এমন সময় লক্ষ্মী গিয়া অভিবাদন করিয়া দাড়াইল। চিঠি লিখিতে লিখিতেই রেভারেও বলিলেন, “এই যে এসেছ,আজ একটা খুব সুসংবাদ আছে লুসী ! বেসােবছি। গল্পী একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া বসিল। চিঠি লেখা শেষ করিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “দেখ লুসী, আমাদের ধৰ্ম্মে বলে মানুষ যেটা অন্তাবুর সঙ্গে চায়, সেটা পেতে তার একটুও বিলম্ব হয় না। এই সেদিন তােমাকে বল্লুম না, বাংলাদেশের ভিতরটা যে কি ভয়ানক কদৰ্য্য, তা তুমি না দেখলে বুঝতে পাবে না? আমি সেদিন ভগ- বানের কাছে অন্তরের সঙ্গে প্রার্থনা করেছিলুম, তিনি যেন তােমাকে শীঘ্রই সে অবসর দেন। আমার প্রার্থনা ভগবান শুনেছিলেন, তাই আজ হঠাৎ টেলিগ্রাম এসে হাজির, কালই আমাদের পূর্ববঙ্গের দিকে রওনা হতে হবে। সেখানে
89
ঘরের ডাক
নমঃশূদ্র বলে অবনত-শ্রেণীর যে হিন্দুরা বাস করে, তাদের
উপর হিন্দুসমাজ এমনি ভয়ানক অত্যাচার শুরু করে দিয়েছে
যে, তারা সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করূতে বাধ্য
হয়েছে। এই সময় আমরা গিয়ে যদি আমাদের এই পবিত্র
এবং উদার খৃষ্টধর্ম তাদের মধ্যে প্রচার করতে পারি, তা হলে
বিশেষ ফললাভের আশা আছে। আমার ইচ্ছা, তুমিও
আমার সঙ্গে চল, তাতে করে ফল হবে এই যে, বাংলাদেশের
ভিতরটা স্বচক্ষে দেখে আসতে পারবে। কি বল লুসী
তােমার কি যেতে কিছু আপত্তি আছে?”
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আপত্তি ?
, আপত্তি আর কি ?”
“এবার কিন্তু অনেকদিন থাকতে হবে লুসী, বােধ হয়
৩৪ মাসের এদিকে আর ফেরা হচ্ছে না।
“তা হলে মাকেও সঙ্গে নিতে হয়।”
“নিশ্চয়ই।--তা না হলে তিনি থাকবেন কোথায়।
সেবাকার মত ত আর ২৪ দিনের জন্যে যাচ্ছ না যে,
কটা দিন যেখানে হােল্ক এক জায়গায় কাটিয়ে দেবেন।”
“আপনারা কি কালই যাচ্ছেন ?
“হাঁ, কালই, সন্ধ্যার ট্রেনে। কেন, তােমার কি অসুবিধা
হবে? তা হলে না হয় একদিন পেছিয়ে দিই।”
ঘরের ডাক
“না, অসুবিধা আর কি।”
বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া লক্ষ্মী তার মাকে ডাকিয়া বলিল,
কাল আমাদের এখান থেকে যেতে হচ্ছে যে মা।*
“কি রকম!”
“কি রকম কি আবার।-পূৰ্ব্ববঙ্গে যেতে হবে।”
এ আবার কোন্ দেশী খেয়াল শুনি !”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “খেয়াল না মা, এটা আমার
পক্ষে খুব দরকারী; এবার এই যে বাংলা দেশে যাচ্ছি,
ফেবার সময় সেখানকার আদানি সমস্ত কুসংস্কার সেখানেই
ঝেড়ে ঝুড়ে ফেলে দিয়ে আবাে,-ঠাট্টা নয় মা, সত্যি সত্যি
বছি।”
“কি পাগলের মতন বছিস বল্ দেখি।”
‘পাগলের মতন আদবেই বছি না মা,আসল কথা,
কাল আমরা রেভারেণ্ড হােয়াইটের সঙ্গে পূৰ্ব্ববঙ্গের দিকে
রওনা হচ্ছি।”
অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া তার মা বলিল, “কেন
শুনি !”
ধৰ্ম্মপ্রচারের জন্যে।”
লক্ষ্মীর মা কি বলিতে যাইতেছিল, সে বাধা দিয়া বলিয়া
উঠিল, “যাব যখন বলেছি, তখন যাবই মা; তােমার ইচ্ছে
ঘরের ডাক
হয় তুমি এইখানে থেকে যেতে পার, কিন্তু এ কথাও বলে
রাখছি, ৩৪ মাসের এদিকে আর ফিছি না।”
অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া লক্ষ্মীর মা বলিল, “তবে কি করে
থাকব শুনি।
“তাই ত বলছি আমার সঙ্গে চল।”
লক্ষ্মীর মা কোন কথা বলিল না,-মুখখানা ভার করিয়া
ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল এবং পাশের ঘর হইতে শুনাইয়া
শুনাইয়া বলিতে লাগিল, “মরণও হয় না ছাই!”
পরদিন সকালে উঠিয়া লক্ষ্মীর হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল,
সেই যে সেদিন পথের মধ্যে ফেলীর সহিত তার সাক্ষাৎ
হইয়াছিল, তার পর হইতে সে একটিবারের জন্যও তার
সহিত দেখা করিতে আসে নাই—সম্ভবতঃ সে অভিমান
করিয়াছে।
তাদের এই বিদেশে যাওয়ার কথাটা ফেলী এখন পর্যন্ত
জানে না, তাহা না হইলে সে কখনই নিশ্চিন্ত থাকিতে
পারিত না-সমস্ত অভিমান এক মুহূর্তে ঝাড়িয়া ফেলিয়া
ছুটিয়া আসিত। লক্ষ্মীর বুকখানা স্নেহ-মমতায় ভরিয়া উঠিল।
ফেলীকে যে সে কত ভালবাসে, তা আজ সে প্রথম বুঝিতে
পারিল ;-না না, যাইবার পূর্বে তার সঙ্গে একবার দেখা
করিয়া যাইতেই হইবে, অভিমানের ভারি পাথরটা তার হােট
ঘরের ডাক
বুকখানির উপর চাপাইয়া রাখিয়া সে কখনই যাইতে পারিবে
—যাইবার সময় সেটাকে তুলিয়া দিয়া যাইবে। মাত্র
তিন কি চার মাসের জন্য সে বিদেশ-বিদেশ ? হাঁ বিদেশই
বৈ কি-যাইতেছে, কিন্তু তবুও ফেলীর জন্য তার মনটা
আজ কাঁদিয়া কাঁদিয়া উঠিতেছিল,মনে হইতেছিল, সে
ছাড়া ফেলী বােধ হয় একদণ্ডও টিকিতে পারিবে না, যেন
তার জন্যই ভগবান ফেলীকে গড়িয়াছেন।
ফেলীদের বাড়ীর দরজার কাছ হইতে লক্ষ্মী ডাকিল,
“ফেলী।”
শতছিন্ন একখানি ময়লা কাপড় পরিয়া অত্যন্ত শুষ্কমুখে
ফেলী আসিয়া তার সমুখে দাড়াইল, কিন্তু কোন কথা
বলিল না।
“তুই আমাদের বাড়ী আর যাস্ না কেন রে?” বলিয়া
লক্ষ্মী তার হাত ধরিল।
একটা শুষ্ক হাসি হাসিয়া সে বলিল, “এমনি।”
“এখন ত তাের কাজ নেই, চ না বাজারের দিকে একটু
"
ঘুরে আসি।”
উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই লক্ষ্মী তাকে টানিয়া
লইয়া চলিল, সেও দ্বিরুক্তি না করিয়া নিঃশব্দে চলিতে
লাগিল।
ঘরের ডাক
কিছুদূর গিয়া লক্ষ্মী বলিল, “তুই আমার ওপর রাগ
করেছি, নয় রে ?
সে বলিল, “কৈ না। তার গলার স্বর ভার ।
“তবে এ কদিন দেখা করিসনি কেন?”
“এমনি।”
একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমরা কাল
এখান থেকে চলে যাচ্ছি যে ফেলী,—তাের মন কেমন করূবে?”
এক নিমিষে অভিমানের সমস্ত বুছকি-বাচক ঘাড় হইতে
নামাইয়া দিয়া অত্যন্ত উৎকণ্ঠিতভাবে ফেলী বলিয়া উঠিল,
“কোথায় যাবে লক্ষ্মী-দিদি ?”
“সে অনেক দূরে ফেলী-
“কেন?”
“দরকার আছে।”
লক্ষ্মীর হাতটাকে অত্যন্ত জোর করিয়া চাপিয়া ধরিয়া
ফেলী বলিয়া উঠিল, “না না, যেও না-আমি যেতে
দেবাে না।”
পথের মাঝখানেই নিজের কোলের মধ্যে ফেলীকে
টানিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “কেন রে?”
অত্যন্ত করুণস্বরে ফেলী বলিল, “আমি তা হলে কি করে
থাববা?”
ঘরের ডাক
৫৪
তার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে দিতে লক্ষ্মী বলিল,
“তিন চার মাস পরেই ত আবার ফিরে আছি ফেলী!
ফেলী কোন কথা শুনিল না, বলিল, “আমি কিছুতেই
যেতে দেবাে না।”
“বড্ড দরকারী কাজ যে ফেলী, না গেলেই যে নয়।”
সে বলিল, “তবে আমাকেও নিয়ে চল।”
লক্ষ্মী ভয়ানক মুস্কিলে পড়িয়া গেল—বলিল, “সে কি
হয় রে পাগলী, তাের মা বাপই বা ছাড়বে কেন আর
আমিই বা নিয়ে যাই কি বলে—সে হয় না ফেলী—সে
হয় না ।”
“বাবা-মাকে আমি যদি রাজি করতে পারি, তা হলে
নিয়ে যাবে ?”
“আচ্ছা, তুই ত রাজি করেই আগে আয়, তারপর দেখ
যাবে অখন।”
লক্ষ্মীর হাত ছাড়াইয়া সহসা ফেলী উল্টাদিকে ছুটিতে
আরম্ভ করিল।
শশব্যস্ত হইয়া লক্ষ্মী পেঁচাইয়া উঠিল, “কোথায় যাচ্ছি
তুই ?”
ছুটিতে ছুটিতেই সে উত্তর দিল, “বাবা-মাকে বলতে।”
লক্ষ্মী ডাকিল, “শােন্ শাে।”
ঘরের ডাক
সে বলিল, “তুমি বাড়ী যাও, আমি এখুনি যাচ্ছি লক্ষ্মী-
দিদি।”
লক্ষ্মী অবাক্ হইয়া পথের মাঝখানে দাড়াইয়া রহিল।
একি মােহ ! কোথাকার একটা নীচ-জাতের মেয়ে আসিয়া
কেমন করিয়া যে তার হৃদয়টা অধিকার করিয়া বসিল, তাহা
সে নিজেই বুঝিয়া উঠিতে পারিল না। এখানে এত তােক
ত আছে, কিন্তু এমন করিয়া কেহ ত তার বুকের মাঝখানে
বাসা বঁধিতে পারে নাই।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া সে নিজের মনে বলিল, “না
নিয়ে গিয়েই বা থাকি কি করে। তার পর আস্তে আস্তে
সে বাড়ীর পথ ধরিয়া চলিতে আরম্ভ করিল।
ট্রেনে উঠিবার সময় রেভারেণ্ড হােয়াইট ফেলীকে দেখিয়া
বলিয়া উঠিলেন, “এ ভূতটাকেও সঙ্গে নিচ্ছ নাকি লুসী ?*
ফেলীকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া লক্ষ্মী বলিল,
“ওকে ছাড়া আমার একদণ্ডও যে টেক্বার যো নাই মিঃ
হােয়াই।”
“তােমার সব কাজেই একটু বাড়াবাড়ী চাই, নয় লুসী।”
বলিয়া রেভারেণ্ড প্ল্যাটফৰ্ম্মের উপর পাচারি করিতে
লাগিলেন।
ফরিদপুর জেলার একটা ছােট গ্রামে আসিয়া লক্ষ্মীর।
উপস্থিত হইয়াছে। সেখানে অনেক-কেলে একটা গির্জ
ছিল—তাহারই সংলগ্ন একটা একতালা ছােট বাড়ীতে
তাহারা আস্তানা গাড়িয়াছিল। এই গির্জার সমস্ত ভার
একজন দেশী পাদ্রী-সাহেবের হাতে ন্যস্ত ছিল, এর নাম
রেভারেণ্ড গুই। গুই-সাহেবের সংসারটি নেহাৎ ছােট
ছিল না—তা মাথা গুণিলে এক ডজনেরও কিছু বেশী হই
দাড়ায়। তার স্ত্রীর নাম ছিল জগদম্ব না ঐরকম ভার
-ওকেল গােছর কি একটা, তিনি কিন্তু সেটাকে বদলাইয়া
নাম রাখিয়াছিলেন হাল্কা কোমল লিলি। লিলি ! লিলির
চেহারাখানা ছিল একটা বুনো মােষের মত ;
কালাে এবং ঠিক তেমনি বা ততােধিক মােটা। ইহার
উপর আবার মার অনুগ্রহে তার সর্বশরীর ঠিক মৌচাকের
আকার ধারণ করিয়াছিল। পাড়ার বকাটে ছোঁড়ারা আদর
করিয়া র নাম রাখিয়াছিল টোপফেলা গদি।
ঘরের ডাক রেভারেণ্ড গুইয়ের কন্যা ছিল সৰ্বশুদ্ধ ছয়টি এবং পুত্র ছিল পাঁচটি। বড় মেয়েটির নাম ডাের। এই গত পৌষ মাসে তার দ্বাবিংশ জন্মােৎসব হইয়া গিয়াছে, কিন্তু সে এমনি স্থূলকায় হইয়া পড়িয়াছিল যে তার বয়স অনুমান করা মানুষের পক্ষে সম্ভবপর হইয়া উঠিত না। তাহাকে বালিকা বলিলেও লােকে বিশ্বাস করিতে বাধ্য হইত, আবার প্রৌঢ়া বলিলেও কেহ সহজে অবিশ্বাস করিতে পারিত না। তার কিন্তু ধারণা ছিল তার মত সুন্দরী ভূভারতে নাই—অন্ততঃ গড়নটা তার একেবারেই নিখুৎ। তার পরের মেয়েটি মার মত না হইয়া বাপের ধাতটাই পাইয়াছিল, অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ- প্রপীড়িত দেশ হইতে সদ্য প্রত্যাগত নরনারীর সহিত তার দেহের যথেষ্ট সৌসাদৃশ্য দেখা যাইত। সে কিন্তু বলিয়া বেড়াইত, চেহারাখানা তার একেবারেই মেমেদের মত, কেবল যা রংএর তফাৎ। বড় বােনকে সে ভেতাে বাঙ্গালীর মেয়ে বলিয়া ঠাট্টা করিত এবং মনে করিত তার গড়নটাই আসল বিলাতী। তার চেয়ে ছােটটির বয়স মােটে দশ বৎসর ; সে কিন্তু এখন হইতেই নিজের চেহারা সম্বন্ধে একটা স্থির-সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিল এবং ঠিক করিয়া লইয়াছিল তার
ঘরের ডাক
৫৮
চেহারার মধ্যে মেমত্ব যে পরিমাণে আছে, অন্য কোন বােনের
মধ্যে তা নাই
বাকি তিনটি বােন্ নিতান্তই শিশু।
ছেলেদের মধ্যে বড়টির বয়স ১৬; বাদ বাকি ৪টি দুএক
বৎসরের ব্যবধান রাখিয়া চলিতেছিল।
রেভারেণ্ড হােয়াইটকে এই অপরিচিত স্থানে আসিয়া
একটুও অসুবিধা ভােগ করিতে হয় নাই। মিঃ গুই এবং
তার বড় মেয়ে ভােরা তাঁদের অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া যাইবার
জন্য পূৰ্ব্ব হইতেই ষ্টেশনে অপেক্ষা করিতেছিলেন।
তাহাদের সহিত একদল দেশী-খৃষ্টানের ছেলেও আসিয়া-
ছিল। ইহারা সকলেই বাঙ্গালী এবং অল্পদিন হইল স্বধৰ্ম্ম
ত্যাগ করিয়াছে।
রেভারেণ্ড হােয়াইট এবং লক্ষ্মী প্রভৃতি প্লাটফর্মে
নামিতেই ভােলা একটা ফুলের মালা তার গলায় পরাইয়া
দিল এবং বালকের দল সারি দিয়া দাঁড়াইয়া এই উপলক্ষে
রচিত একটা বাঙ্গলা গান গদগদভাবে গাহিতে শুরু করিয়া
দিল ।
রেভারেণ্ড প্রথমেই গুই-সাহেবের সহিত লক্ষ্মীর পরিচয়
করাইয়া দিলেন, বলিলেন, “এ-রকম উচ্চশিক্ষিত এবং
ধর্মপ্রাণ বালিকা আমি এদেশে আর একটিও দেখিনি।”
ঘরের ডাক
উত্তরে মিঃ গুই ঘাড় নাড়িলেন মাত্র, কিন্তু কোন
জবাব দিলেন না। তিনি মনে মনে ভাবিলেন, ভােরার
সহিত রেভারেণ্ডের পরিচয় নাই বলিয়াই একথা বলিতে
পারিলেন।
তার পর ডােরার বাপ ভােরার সহিত রেভারেণ্ডের
পরিচয় করাইয়া দিলেন--বলিলেন, “এটি আমার বড় মেয়ে।
এর গুণের পরিচয় আমি নিজে দিতে চাই না—আলাপ হলে
নিজেই জাতে পাবেন।”
রেভারেণ্ড মনে মনে হাসিলেন ; মুখে কিন্তু বলিলেন,
“হাজার হােক আপনারই মেয়ে ত।”
তার পর লক্ষ্মী এবং ভােরার পালা। লক্ষ্মীই প্রথমে
কথা কহিল, “আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশী হলুম
মিস্ গুই?”
সে জোর করিয়া টানিয়া হাসিয়া বলিল, “আমিও কম
খুসী হইনি মিস্ ঘােষ !” তার কথার মধ্যে এতটুকুও
আন্তরিকতা ছিল না।
সত্যই লক্ষ্মীকে দেখিয়া ডােরা এতটুকুও খুসী হয় নাই,
বরং কিঞ্চিৎ ক্ষুন্নই হইয়াছিল। এই অপরিচিত মেয়েটি
এমনই সুন্দর যে, তার মনে হইতে লাগিল হয় ত বা সে তার
চেয়েও দেখিতে ভাল।
ঘরের ডাক
লক্ষ্মীর-মা এবং ফেলীর দিকে প্রথমটা কেহ ফিরিয়াও
তাকায় নাই, ভাবিয়াছিল, উহারা ঝি বা ঐ শ্রেণীর একটা
কিছু হইবে; কিন্তু এ ভাবটা লক্ষ্মী বেশীক্ষণ থাকিতে দিল
না। হতভম্ব ফেলীকে সহসা নিজের কাছে টানিয়া লইয়া
সে বলিল, “নতুন জায়গা তাের কেমন লাগছে রে ফেলী ?”
সে অত্যন্ত ক্ষীণ-স্বরে উত্তর দিল, “বেশ।”
মিঃ গুই জিজ্ঞাসা করিল, “এটি কে মিস ঘােয ?”
লক্ষ্মী নিঃসঙ্কোচে বলিল, “আমারই ছােট বােন, আর
উনি হচ্ছেন আমার মা।”
গ্রামের জমিদার শ্ৰীযুক্ত ভবতােষ রায়চৌধুরীর সমাজের
উপর খুব বেশী জোর খাটিত না, কিন্তু তার উপর সমাজ
যে জোর খাটাইত, তাহা নির্বিবাদে মাথা পাতিয়া লইবার
শক্তি ছিল তার অসাধারণ। সমাজের অন্ধ সংস্কারগুলির
বিরুদ্ধে কেহ কিছু বলিলেই তিনি বলিতেন, “বিশ্বাসে
মিলিবে কৃষ্ণ, তর্কে বহু দূর, অতএব বাপু হে তর্ক কোরে
না, সব জিনিষকে বিশ্বাস করতে শেখ, তা না হলে ক্লিছুই
হবে না।” ইহার পর কেউ কিছু বলিলে তিনি বলিতেন,
এর ওপর আর কথা কোয়াে না বাপু, এ হচ্ছে শাস্ত্রের
বচন, ঋষি মুনিদের মুখের কথা। বস্তুতঃ ভবতােষ বিশ্বাস
করিতেন না এমন জিনিষ বােধ হয় মেয়েরাও খুজিয়া
পাইত না।
ভবতােষের দুইবার বিবাহ হয়। প্রথমা স্ত্রী নিস্তারিণী
দেবী একটি মাত্র পুত্র রাখিয়া স্বৰ্গগতা হন, তারপর ভবতােষ
ঘরের ডাক
৬২
আবার বিবাহ করেন, তখন তার বয়স পঞ্চাশের চৌকাঠ
পার হইয়া গিয়াছে, এবং তাঁর প্রথম-পক্ষের সন্তান নলিনী-
কান্ত তখন প্রায় সাবালক হইয়া উঠিয়াছে।
ভবতােষের দ্বিতীয়-পক্ষের স্ত্রী শ্রীমতী নন্দরাণী দেবীর
বয়স আজও ২২ পার হয় নাই, সে নলিনীর চেয়েও
৩ বৎসরের ছােট, কিন্তু নলিনীর সহিত সে এমনি ভাবে
ব্যবহার করিত, যেন ঠিক সময়ে সন্তান প্রসব করিলে তারও
আজ অতবড় একটি ছেলে হইত। নন্দরাণীর উপযুক্ত বা
অনুপযুক্ত কোন বয়সেই যখন সন্তান-সম্ভাবনা দেখা গেল না,
তখন পাড়ার সকলেই তাহাকে সমবেদনা জানাইতে আরম্ভ
করিল; সে কিন্তু একটুমাত্র দ্বিধা না করিয়াই বলিত, নলিনী
আমার বেঁচে থাক্, আমার ছেলের অভাব কি—ও একাই
আমার একশ। পাড়ার সকলে আড়ালে বলিত, হাজার
হােক কলকাতার মেয়ে কিনা; থিয়েটার দেখেছে অনেক,
একটু এক্ট করবে না?
নলিনীকান্ত ছিল ঠিক তার বাপের উল্টা। ভবতােষ
ছিল যেমন নিষ্ঠাবান্ সে ছিল ঠিক সেই পরিমাণেই ম্লেচ্ছ।
তার এই ম্লেচ্ছপনাটা ক্রমে এতদুর বাড়িয়া উঠিয়াছিল যে, সে
ও-পাড়ার গয়লা-গিন্নীর রান্নাঘরে পাত পাতিয়া পৌষপার্বণের
দিন বেশ করিয়া একপেট পিঠা খাইয়া আসিতে পর্যন্ত
ঘরের ক
এতটুকু দ্বিধা করে নাই। পাড়ার সকলে একবারে ছিছিতে
বাতাস ছাইয়া ফেলিল।
ভবতােষ ডাকিয়া বলিলেন, “তাের কি পরকালেও
ভয় নেই ছাই।”
সে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, কোন কথা বলিল না।
নলিনী বাড়ীর ভিতর যাইতেই নন্দরাণী বলিল, “উনি
খুব রাগ করলেন?”
হাসিতে হাসিতে সে বলিল, “তা কলেন বৈকি!”
“কি বললেন ?”
“বলেন, ‘তাের কি পরকালেরও ভয় নেই ছাই ?
“তুমি কি বলে ?”
“বলুম ‘আছে বলেই ত গয়লা-মাসীর হাতের রান্না
সাত-তাড়াতাড়ি খেতে গেলুম।”
“ইস, অত সাহসে আর কাজ নেই।”—বলিয়া নন্দরাণী
আপনার কাজে চলিয়া গেল।
নলিনী গতবৎসর বি-এ পাশ দিয়া ঘরে বসিয়া রহিয়াছে।
তার ইচ্ছা ছিল, ওকালতীটা পাশ দেয়; কিন্তু এই সময়
হঠাৎ তার মাথার মধ্যে পল্লীসংস্কারের খেয়ালটা এমনি
ভয়ানকভাবে ঢুকিয়া যায় যে, তিন বৎসর ধরিয়া আইন পড়া
তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে।
ঘরের ভাক
৬৪
বাংলাদেশের শিরায় শিরায় তখন স্বদেশী আন্দোলনের
গরম রক্তটা টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে এবং নলিনীর
মাথার মধ্যে তারি ঝাঁঝটা রীতিমতভাবে কাজ করিতেছিল।
গ্রাম হইতে মাইলটা দূরে নমঃশূদ্রদের লম্বা বস্তি।
দেখিতে দেখিতে তাহারাও মাথা চাড়া দিয়া উঠিল—কেন
আমরা এমন ভাবে সমাজের অবজ্ঞা আর ঘৃণা কুড়াইয়া
পশুর মত জীবন কাটাইতে থাকিব--আমরাও মানুষ,
তােমরাও মানুষ। ব্রাহ্মণেরা হই হই করিয়া গিয়া পড়িল,
“অমন কথা মুখে আলেও পাপ হয়।” তারা বলিল,
“তবে কাজে দেখাতে চেষ্টা করব।”
ব্রাহ্মণেরা এবার সত্যই ভয় পাইল। আর কিছু না
হােক অন্ততঃ প্রহারকে, কেননা নমঃশূদ্ররা সংখ্যায় এবং
দৈহিক-বলে তাদের চেয়ে অনেক বেশী ক্ষমতাশালী, এবং
সবচেয়ে ভয়ের কথা-তারা ব্ৰহ্মতেজকে ভয় করিতে
ভুলিয়া গিয়াছে।
এই পতিত অস্পৃশ্য জাতিটার সহিত নলিনীকান্তের
পূৰ্ব হইতেই একটু দহরম-মহরম ছিল। এই সেদিন
ইহাদের পল্লীতে যখন হঠাৎ ভয়ানক রকম মহামারী এবং
বিচিকা দেখা দেয়, সে সময় সে ইহাদের জন্য অনেক
করিয়াছিল, যথা, জল ফুটাইয়া খাওয়াইবার ব্যবস্থা,
ঘরের গল্প
বিনামুল্যে ক্লোরােডাইন বিতরণ, ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া
ইহাদের জন্য সে একটা ছােটখাট স্কুল খুলিয়া দিবারও
চেষ্টা করিয়াছিল ; অবশ্য এখন পর্যন্ত সেটা কার্যে পরিণত
হয় নাই। আজ তাহারা যখন সমাজের কঠোর শাসন
পায়ে দলিয়া একজোট হইয়া মারমূর্তি ধারণ করিল, তখন
পাড়াসুদ্ধ লােক একই সঙ্গে বলিয়া উঠিল, ইহার মধ্যে
নলিনীর নিশ্চয়ই হাত আছে এবং তাহারই কুপরামর্শে এই
পরম নিরীহ জাতটা হঠাৎ এমন ভাবে ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে।
বস্তুতঃ কিন্তু ইহার জন্য সে খুব বেশী দায়ী ছিল না।
নমঃশূদ্রদের সর্দার নিধিরামকে গিয়া নলিনী বলিল,
তাদের ব্যাপারখানা কি বল্ ত রে?”
সে হাত জোড় করিয়া বলিল, “আপনিও ও-কথা যদি
বলেন, তাহলে আমরা দাড়াই কোথায় বলুন দাদাঠাকুর !”
একটু হাসিয়া নলিনী বলিল, “তোদের হঠাৎ এমন মাথা
গরম হয়ে উঠলাে কেন বল দেখি?”
সে বলিল, “হবে না দাদাঠাকুর! একটু ভেবে দেখেন
খ। ব্রাহ্মণেরা না হয় দেবতার জাত--তারা মাথায়
রইলেন, কিন্তু ধােপা নাতে এরাও কি দো? তারা
আমাদের কাপড় কাচবে না, বলবে, “ওরা ছােট-লােক;
নাপিতরা আমাদের খেউরি করবে না, বলবে, “ওদের চুলে
যরের ডাক
নাইতে হয়’ ; তবে আমরা যাই কনে বলেন ত! বলেন
আমাদের অন্যায়টা কি হয়েছে ?
মৃদুভাবে তার পিঠ চাপড়াইয়া নলিনী বলিল, “তা ত
বুঝলুম। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি-
আজন্মকাল থেকেই ত এই ভাবে চলে আসছে, এ
ত আর কিছু নূতন নয়—তবে হঠাৎ এমন কি হােলাে
যে,—জিব কাটিয়া, ঘাড় নাড়িয়া এবং অন্য নানাপ্রকার
অঙ্গভঙ্গী করিয়া সে বলিল, “আপনার মুখে ওকথা সাজে
কি দেবতা? আপনিই না দুদিন আগে আমাদের কাছে
নেচার দিয়ে গেছেন, “তােরা জেগে ওঠ, ঘুমিয়ে থাকিস
নে-মানুষ হ’!
নলিনী স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। নিধিরাম বকিয়া
যাইতে লাগিল, “সেদিন গদাধরের ছােট ছেলেটা রাস্তায়
চলতে চলতে না-দেখে শিরােমণি-ঠাকুরকে ছুঁয়ে ফেলেছিল,
শিরােমণি-ঠাকুর তাকে হাতের লাঠির বাড়ি কি মারটাই না
মালে! আর এদিকে ঐ শিরােমণি-ঠাকুরই একদিন
সন্ধ্যের সময় পুকুরঘাটে বনমালীর বড় মেয়েটাকে একলা
পেয়ে অপমান করূতে গিয়েছিল-ভাগ্যি আমরা গিয়ে
পড়েছিলুম, তা না হলে কি হতে বলেন ত ? কেন,
বনমালীর মেয়েও ত আমাদেরই জাত,—তাকে ছুলে জাত
৬৭
ঘরের ডাক
যায় না?-চুপ করে থাকবেন না দেবলেন, হক
বছি, কি মিছে বছি।”
নীরবে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া নলিনী বলিল,
“একশবার হক বলছিস্ নিধে।—তােরা শুনিস্ নে ওদের
কথা-তােরা চেষ্টা কর মানুষ হতে।
নিধিরাম তখন জোড়-হস্ত হইয়া বলিল, “আপনাকে কিন্তু
একটু দেখতে শুতে হবে দো-আমরা ত লেখা-পড়া
জানি না
বাধা দিয়া নলিনী বলিল, “সেজন্যে কিছু ভাবি নে
তােরা—মাথার ওপর-ওপরওয়ালা আছেন।”
রেভারেণ্ড হােয়াইট আসিয়া খুব উৎসাহের সহিত কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন। আজ কয়দিন হইতে নমঃশূদ্রের দলে দলে আসিয়া খ্রীষ্টান্ হইতে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে ;- অধিকাংশই অবশ্য চাকরি এবং পয়সার লােভে। সাময়িক উত্তেজনাও কতকটা কাজ করিয়াছিল। রেভারেণ্ড হােয়াইটের প্রথম দিনের বক্তৃতাতেই প্রায় ২০ ঘর, খ্রীষ্টান্ হইয়া যায় এবং ১৬ ঘর ভাবিয়া পরে বলিবে বলিয়া প্রতিশ্রুত হয়। সেদিনকার বক্তৃতায় হােয়াইট সাহেব তার অপূর্ব বাংলাভাষায় যাহা বুঝাইয়া বলেন, তার সারমর্মটা হচ্ছে এই যে, তাহারা যদি খ্রীষ্টান্ ধর্ম গ্রহণ করে—তাহা হইলে তাহাদের অন্নবস্ত্রের জন্য তিনি দায়ী—এবং তাহারা যাহাতে ভবিষ্যতে উচ্চ উচ্চ রাজপদ পাইতে পারে, তাহার জন্যও তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করিবেন, হিন্দুসমাজের মত করিয়া তাহাদের দূরে ঠেলিয়া দিবেন না। তাহারা নির্বিশেষে উচ্চ- পদস্থ বিলাতী সাহেবদের সহিত মিশিতে পারিবে এবং তাহাদের জন্য স্বাধীনতার সমস্ত দ্বারই মুক্ত থাকিবে।
ঘরের ডাক
সন্ধ্যার কিছু পূর্বে আপনার পাঠাগারে বসিয়া নলিনী
খবর পাইল, প্রায় ৩০ ঘর নমঃশূদ্র এক কথায় খ্রীষ্টান্ হইয়া
গিয়াছে।
ঠাকুর-ঘরে বসিয়া নন্দরাণী পঞ্চপ্রদীপ সাজাইতেছিল,
এমন সময় বাহির হইতে নলিনী ডাকিল, “ছােট-মা।”
“কেন নলিন্!”
“শুনেছ, আজ ক’ঘর নমঃশূদ্র খ্রীষ্টান্ হয়ে গেছে ?”
“কৈ, না!”
“প্রায় ৩০ ঘর !~-এর জন্যে কে দায়ী বল ত ছােট মা?”
“দায়ী ?—দায়ী তারাই।—কে তাদের মাথার দিব্যি
দিয়েছিল খ্রীষ্টান্ হতে ?”
“দায়ী তারা ?—আমরা তাদের ওপর অত্যাচার কব,
তাদের ছায়া মাড়ালে ঘেন্নায় মরে যাব, তাদের ছুঁয়ে ফেলে
সাতবার করে চান করে আ, তারা তবুও আমাদের পায়ের
তলায় পড়ে পড়ে আমাদের এই অমানুষিক অত্যাচার নীরবে
সহ কতে থাকবে?
একটু হাসিয়া নন্দরাণী বলিল, “তা আমার ওপর রাগ
করলে কি হবে নলিন্! আমি ত আর বিধান দিইনি।”
স্বরটাকে একটু নরম করিয়া লইয়া নলিনী বলিল,
“তােমাকে বলছি না ছােট মা, আমি বলছি আমাদের
ঘরের ডাক
;
নিজেদেরকেই; তােমাদের কোন কথা বলবার মুখ আমাদের
আছে কৈ যে বশ্ব ? বরং তােমাদের কাছ থেকে আমাদের
অনেক কথা অনেক অভিযােগ শাের আছে এবং তােমরা
যে বল না, এইটেই আমাদের সবচেয়ে আক্ষেপের কথা।”
কথাটাকে মাঝখানে হঠাৎ চাপা দিয়া নন্দরাণী বলিয়া
উঠিল, “হচ্ছিল ওদের কথা, ওদের কথাই হােক না নলিন্।”
নন্দরাণী নলিনীর সকল কথারই সমর্থন করিত।
খুব বেশী বুঝুক না বুঝুক, এটা সে বেশ অনুভব করিতে
পারিয়াছিল যে, প্রত্যেক মানুষ ভগবানের সন্তান এবং তাদের
মধ্যে উচ্চনীচের বিচার করাটা মানুষের পক্ষে আদপেই ভাল
কাজ নয়। এ শিক্ষা সে তার বাপের কাছ হইতে পাইয়া-
ছিল। তার বাপ কলিকাতায় কোন ইংরেজি কলেজে
দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন এই পড়াশুনা ছিল তার খুব
বেশী। তিনি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার ভার মাইনে-করা
মাষ্টারের হাতে না দিয়া নিজেই লইয়াছিলেন এবং ছেলে-
মেয়েদের যতদূর সম্ভব লেখাপড়া শিখাইয়াছিলেন ; কাজেই
নলিনীর এই-সকল বড় বড় কথা সে অতি সহজেই বুঝিতে
পারিত। কেবল, স্ত্রীলােকদের উপর সমাজ যে আদপেই
ন্যায়-বিচার করিতেছে না, একথাটা সে বুঝিত না নয়-
প্রাণপণে বুঝিতে চাহিত না। কেবল এই একটিমাত্র
৭১ ঘরের ডাক জায়গায় আসিয়া সে হঠাৎ ফাকি দিয়া পাশ কাটাইয়া পলাইতে চাহিত। তার কারণও ছিল যথেষ্ট। যে সময় বৃদ্ধ ভবতােষের সহিত তাহার বিবাহ হয়, তখন তার পিতা স্বর্গারােহণ করিয়াছেন। এটা সে খুব জানিত যে, তার পিতা জীবিত থাকিলে এ বিবাহে কখনই মত দিতেন না, কেননা, তার নিজেরই এ বিবাহে একটুও মত ছিল না। কিন্তু তার পিতার মৃত্যুর পর মামারা হইয়াছিলেন বাড়ীর কৰ্ত্তা এবং তার বিবাহের সমস্ত বরাত পড়িয়াছিল তাহাদেরই হাতে। এই ভাবে তার বিবাহ হইয়া গেল। বিবাহের পর অনেকদিন পর্যন্ত সে নিজেকে সামলাইয়া উঠিতে পারে নাই,—ক্রমাগতই মনে হইত, এ বিবাহ বিবাহই নয়, এ কেবল মন্ত্র-উচ্চারণের একটা ভেীবাজী মাত্র। তার পর কিরূপে কে জানে হঠাৎ একদিন সে নিজেকে এমনি ভয়ানক ভাবে ভাঙ্গিয়া চুরিয়া বাইয়া ফেলিল যে, নিজের দিকে চাহিয়া সে নিজেই অবাক হইয়া গেল। পিতার সমস্ত শিক্ষা সে দুনিয়ার আর-সমস্ত বস্তুতেই সমানভাবে চালাইয়া আসিতে লাগিল, অচল করিয়া ফেলিল কেবল স্ত্রীলােক- সম্বন্ধে। স্ত্রীলােকদেরও যে একটা স্বাধীন সত্তা আছে, তাহাদেরও যে মানুষ হইবার অধিকার আছে এবং স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন প্রবৃত্তি আছে, এ কথাটা সে খুব ভাল যয়ে সক १२ মতেই জানিত ; কিন্তু বিবাহের কয়েক বৎসর পর হইতেই এ শিক্ষাটাকে সে প্রাণপণ-বলে দোমড়াইয়া মােছড়াইয়া একবারে ভেতা করিয়া ফেলিতে লাগিয়া গেল। এ সম্বন্ধে চিন্তা করাই সে বন্ধ করিয়া দিল এবং অন্য কেউ এ সম্বন্ধে কিছু বলিলে শুনিতে চাহিত না,ভয়ে শিহরিয়া উঠিত। তার মনে হইত, তার এই অনেক কষ্টে অর্জিত পাতিব্ৰত্য- টুকু ঐখান দিয়া কবে একদিন রাতারাতি তাকে জানিতে দিয়া হঠাৎ এক সময় পলাইয়া যাইবে—তাকে ধরিয়া রাখা তার দায় হইয়া উঠিবে। ইহাতে করিয়া ফল হইয়াছিল এই যে, যে সমাজকে সে এতদিন ঘাের অত্যাচারী এবং স্বার্থপর বলিয়া মনে মনে অবজ্ঞা করিত, তাহাকে আজ আর সে সাহস করিয়া যখন-তখন অমন ভাবে মনে মনে গাল পাড়িতে পারে না, কেন না তাহা হইলে সে গাল যে সর্বপ্রথমেই তারই গায়ে আসিয়া পড়িবে। নলিনী বলিল, “ওরা যে এতদিন এমন করে মুখটি টিপে সমস্ত সহ্য করে আসছে--এই না ওদের বাহাদুরী।” “তাই বলে খ্রীষ্টান্ হয়ে যেতে হবে?” “না হয়ে করে কি শুনি! তুমি ত সব খবর রাখ না ছােট-মা; নাপিত ধােপ, কেউ ওদের কাজ করূতে চায় , বলে ওরা ছােট-জাত। অথচ তাহারাই যখন আবার ৭৩ ঘরের ডাক খ্রীষ্টান্ হয়ে যায়, তখন সেই-সব নাপিত আর ধােপারাই গিয়ে তাদের কাজ করে দিয়ে আসতে এতটুকুও এদিক ওদিক করে না। বলে বলে, ‘ওরা যে এখন রাজার জাত। এর মানে কি এই দাড়ায় না ছােট মা, যে, নমঃ- শূদ্রের চেয়ে বাজার জাত আমাদের ঢের বেশী আপনার লােক ? “তা ত হয় নলি, কিন্তু খ্রীষ্টান্ না হয়ে বাধা দিয়া নলিনী বলিয়া উঠিল, “বছ, খৃষ্টা না হয়ে অন্য কোন উপায় করে না কেন—এই ত ?-কি করবে শুনি ?* “সেটা অবশ্য ভেবে দেখতে হয় “ঢের ভেবে দেখেছি ছােট মা, এক উপায়, ওদের সঙ্গে ভালাে ব্যবহার করা, ওদের সঙ্গে মানুষের মত ব্যবহার করা--তাছাড়া উপায় নেই, কিন্তু সে আমাদের সমাজ কিছুতেই করবে না। চক্রবর্তী-খুড়াকে সে কথা বলুম- ‘তাই বলে কি জাতধৰ্ম্ম সব খােয়াতে যাব?—চুলােয় যাক্ ওরা।’-এর ওপর আর কোন কথা আছে ? একটু আ-আন্তা করিয়া নন্দরাণী বলিল, “অন্যায় তিনি বলেন, ঘরের ডাক ৭৪ অন্যায় বটে?-ঘাের অত্যাচার। তুমি সব বােঝ ছোেট- মা-তবু কেন যে অমন কথা বল বুঝতে পারি না-বল না, অত্যাচার নয় ? একটু হাসিয়া নন্দরাণী বলিল, “আমরা মেয়েমানুষ, অতশত বুঝি না বাপু।” খুব বােঝ তুমি ছােট-মা; আমার মনে হয় খুব কম পুরুষ-মানুষই তােমার মতন বােঝে ; তুমি ইচ্ছে করে ফাকি দাও।” বলিয়া বিমর্ষভাবে নলিনী সেখান হইতে চলিয়া গেল। একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া নন্দরাণী ঠাকুর-ঘরের খুঁটিনাটি কাজের মধ্যে নিজেকে জোর করিয়া হারাইয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতে লগিল।
১২
বৈকালের দিকে মিঃ গুইয়ের বাহিরের ঘরে বসিয়া লক্ষ্মী,
রভারেণ্ড হােয়াইট এবং ডােরা কথাবার্তা কহিতেছিল।
“আমার মনে হয় আর কিছুদিন এই ভাবে চলতে পালে
পূরােপুরি একশ জনকে দীক্ষিত করতে পারূব-কি বল
লুসী?”—কথাটা শেষ করিয়া রেভারেও পাশ্বে উপবিষ্ট লুসীর
মুখের দিকে চাহিল।
“তা হতে পারে বলিয়া লুসী অন্যমনস্কভাবে ইংরেজী
মাসিকের পাতা উল্টাইয়া যাইতে লাগিল।—তার কথার
মধ্যে এতটুকুও উৎসাহ ছিল না।
ভােরা বলিয়া উঠিল—“ভগবান করুন, একশ কেন এক
হাজারও হতে পারে রেভারেণ্ড।
তার কথায় কান না দিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন,
“তােমার শরীরটা কি আজ ভাল নেই লুসী ?—মাথা ধরেছে
বুঝি ?”
একটা শুষ্ক হাসি হাসিয়া সে বলিল, “তেমন বিশেষ
কিছু নয়—বগটা একটু টিপটিপ করছে।”
ঘরের এক ৭৬ একটা কৃত্রিম হাসি হাসিয়া ডােরা বলিয়া উঠিল, “এখন আমাদের মধ্যে যে-সব আশা এবং উৎসাহের কথা হচ্ছে; তা শুনে তােমার মাথা-ধরা সেরে যাওয়া উচিত ছিল মিস লুসী !” উত্তরে লক্ষ্মী একটু হাসিল মাত্র—কিন্তু কোন উত্তর দিল না। রেভারেণ্ড বলিলেন, “আমার মনে হয় মানসিক পরিশ্রমটা তােমার কিছু বেশী হয় লুসী।” লক্ষ্মী কোন কথা বলিবার পূর্বেই ডােরা বলিয়া উঠিল, “আমাকেও ডাক্তারে ঐ কথা বলে রেভারেণ্ড ; বাবা সেই- জন্যে আমার পড়াশুনো আজকাল একরকম প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন।” তার কথা শেষ হইবার পূৰ্বেই ডােরর মেজো বােন্ বিলি কোথা হইতে ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া ঘরে পা দিয়াই বলিয়া উঠিল, “আজ আমাদের কি সৌভাগ্যের দিন রেভারেণ্ড!—এই মাত্র আরাে দশ জন এসে নাম লিখিয়ে গেছে-কাল তারা দীক্ষা নিতে আসবে,-ওঃ আমার যা আনন্দ হচ্ছে।” “খুব সুখের কথা মিস্ বিলি,” বলিয়া রেভারেণ্ড চোখ হইতে চশমাটা খুলিয়া লইয়া রুমাল দিয়া মুছিতে লাগিলেন।
৭৭
ঘরের ডাক
বিলি আবার বলিতে লাগিল,-“কি বিশ্ৰী জাত এই
,—এদের না আছে ধৰ্ম্ম, না আছে সভ্যতা, না
আছে কিছু-একটা অসভ্য বর্বর জাত বলেই হয় ;
আমাদের ধর্মে এলে বুঝতে পাবে, কি অন্ধকারেই এতদিন
ছিল।—ওঃ, সেই কথা ভেবে আমার আজ যা আনন্দ হচ্ছে
মিঃ হােয়াইট !–মনে হচ্ছে আজ এই মুহূর্তে আমার মাথার
উপর যদি একটা বাজ এসে পড়ে, তা হলেও বােধ হয় একটু
কষ্ট হবে না।'—কথাটা শেষ করিয়া সে সম্মুখস্থ টেবিলটার
উপর খুব জোরে একটা কিল মারিল।
তার কথা শেষ হইতে না হইতেই ডােরা দাড়াইয়া উঠিয়া
অত্যন্ত জোরে হাতমুখ নাড়িয়া বলিতে সুরু করিয়া দিল,
“আমার মনে হয়, এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন জাতটাকে মানুষ করতে
গিয়ে প্রভু যীশুর মত করে যদি ক্রুশে বিদ্ধ হতে হয় ত
তাতেও রাজি আছি।”
কথাটা ঠিক শেষ হইয়াছে এমন সময় বাহির হইতে
একটি বাঙ্গালী যুবক বলিয়া উঠিল, “ঘরে ঢুকতে পারি
কি ?”–গায়ে তার আধময়লা একটা টুইলের সার্ট–পরণে
তথৈবচ একটা মােটা ধুতি।মুখখানি কিন্তু অতি সুন্দর।
সেদিকে মুখ ফিরাইয়া ডােরা কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা,
দিয়া হােয়াই বলিলেন, “কি বল্বার আছে ঘরে এসে বলুন!”
.
৭৮
ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া
তাহার উপর বসিয়া পড়িয়া যুবক বলিল, “আপনার নামই
বােধ হয় রেভারেণ্ড হােয়াইট!”
“হাঁ, আপনার কি দরকার আমার সঙ্গে ?”
“আমি জানতে এসেছি, আপনারা যে এ-রকম জোর
করে সবাইকে ধরে ধরে খ্রীষ্টা করছেন, এটা কি ভাল
করছেন?”
ঘর-সুদ্ধ লােক অবাক হইয়া এই অদ্ভুত লােকটির মুখের
দিকে চাহিয়া রহিল।
অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন,
“আপনার কাছে সে-জন্যে জবাবদিহী করূতে আমি বাধ্য
নই বােধ হয়।”
এতটুকু মাত্র উত্তেজিত না হইয়া অত্যন্ত ধীরভাবে যুবক
বলিল, “আমি ত সে ধরণের কোন কথা আপনাকে বলিনি
মিঃ হােয়াইট ; আমি কেবল জিজ্ঞাসা করূতে এসেছি মাত্র
উত্তর দেওয়া না-দেওয়া সে আপনার ইচ্ছাধীন।
রেভারেণ্ড কি বলিতে যাইতেছিলেন, তার মুখের কথা
কাড়িয়া লইয়া ভােরা বলিয়া উঠিল, “আমরা একজন অসভ্য
দেশী লােকের সঙ্গে কথা কইতে রাজী নই—আপনি সটান
চলে যেতে পারেন।
ঘরের ডাক
কি বলিতে গিয়া লক্ষ্মী হঠাৎ থানিয়া গেল।
ভােরাকে থামাইয়া দিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “ যদি
বলেন ত আমার প্রথম কথা হচ্ছে এই যে, জোর করে যে
আমরা এদের খ্রীষ্টান্ কছি—একথা আপনি কোখেকে
শুনলেন?”
“যারা খ্রীষ্টা হয়েছে-তাদেরি মুখে !”
“তাদের মুখে ?-কি রকম! তারা নিজে হতে যেচে
এসে নাম লিখিয়ে গেছে।”
বিলি কি বলিতে যাইতেছিল, তার কথা চাপা দিয়া যুবক
বলিয়া উঠিল, “দৈহিক বল প্রয়ােগ করলেই কেবল জোর
করা হয় না মিঃ হােয়াইট-তা ছাড়াও অন্য রকমে মানুষে
মানুষের উপর জোর খাটাতে পারে।-লােভ দেখিয়ে নিজের
কাজ করিয়ে নেওয়া—এটা কি কম জবরূদস্তি বলতে
চান ?
“না, তা বলছি না আমি, কিন্তু আমরা যে লােভ দেখিয়ে
তাদের দলে টেনে আছি, একথা আপনাকে কে বলে ?
“লােভ দেখানি আপনারা? আপনারা তাদের
বলেননি যে, আপনাদের ধর্মে এলে তাদের ভাল ভাল চাকরি
দেবেন, তারা যাতে সুখে থাকতে পারে তার জন্যে চেষ্টা
ঘরের এক
৮
“হাঁ, বলেছিই ত—কিন্তু দোষ কি তাতে ?-আপনাদের
সমাজে থেকে যে ভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে, তাতে করে ওর
কোনকালেও মাথাচাড়া দিয়ে যে উঠবে, সে সম্ভাবনা,
একটুও নেই। তাই আমরা-
বাধা দিয়া যুবক বলিয়া উঠিল, “বেশ ত আপনারা ওদের
ওঠা না, সে ত ভাল কথা। কিন্তু সত্যই কি আপনারা
সেইজন্যে ওদের খ্রীষ্টা করছেন ?—তা যদি হয়, তা হলে
আমার একটুও দুঃখ নেই মিঃ হােয়াইট!—আর তা হলে
আমি আসতুমও না আপনার কাছে।”
তবে কিসের জন্যে মনে হয় !”
“আমার মনে হয় শুধু কেবল নিজেদের বাহাদুরীর সংখ্যা
বাড়াবার জন্যে।”
“শুধূ এই-জন্যে ?”
“আশ্চর্য হবেন না মিঃ হােয়াইট ; পৃথিবীর ইতিহাসে
শত শত বৎসরব্যাপী যুদ্ধের কাহিনী আজও বলছে যার
কারণ আর কিছুই না, শুধু কেবল বীরত্বের স্বার্থের সংখ্যা
বাড়ানাে।”
চেয়ারের উপর সােজা হইয়া বসিয়া হােয়াই বলিলেন,-
“চুলােয় যা আপনার পৃথিবীর ইতিহাস ; আমরা যা
কছি তার মধ্যে শুধু যে কেবল ঐ ক্ষুদ্র এবং নীচ
==
স্বার্থটুকুই রয়েছে—এ কথা আপনি জোর করে বলতে পারেন না। একটু হাসিয়া যুবক বলিল, “না, তা পারি না বটে কিন্তু আপনি ত পারেন,আপনিই বলুন দেখি, তাছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য আপনার আছে কি?” টেবিল চাপড়াইয়া হােয়াইট বলিলেন, “নিশ্চয়ই আছে এবং সেইটেই হচ্ছে প্রবল। পাশ হইতে বিলি বলিয়া উঠিল, “ওরা তার কি বুঝবে মিঃ হােয়াইট ;—যাদের না আছে সভ্যতা, না আছে— পশ্চাৎ হইতে লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “অসভ্যতা কোরাে বিলি !” হঠাৎ কি ভাবিয়া যুবক বলিয়া উঠিল, আজ পর্যন্ত যাদের আপনারা খ্ৰীষ্টান্ধৰ্ম্মে দীক্ষিত করে নিয়েছেন, বলতে পারেন, তাদের ক’জনকে আপনার বড় চাকুরি দিয়েছেন- ক’জনের সঙ্গে আপনার ঠিক সমানভাবে মেশেন—ক’জনের সুখদুঃখের জন্যে আপনারা দায়ী হয়েছেন?” “কেন,—সকলের জন্যেই। “সকলের জন্যেই।”—কথাটা শেষ করিয়াই যুবক সহসা উঠিয়া দাড়াইয়া অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বলিল, “আমাকে মাপ করূবেন মিঃ হােয়াইট-মানুষ যে মিথ্যা কথাকেও এত
ঘরের ডাক
৮২
জোরের সঙ্গে বলতে পারে, আমি তা কখন স্বপ্নেও ভাবৃতে
পারিনি ;-আমাকে মাপ করবেন আপনারা,-অনেকক্ষণ
কষ্ট দিলুম।”—বলিয়া যুবক সহসা বেগে ঘর হইতে বাহির
হইয়া গেল।—সকলে স্তম্ভিত হইয়া সেই দিকে চাহিয়া রহিল।
যুবক চলিয়া গেলে পর মিঃ হােয়াইট ইজি-চেয়ারের
উপর গা এলাইয়া দিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া বৃহিলেন—একটি
কথাও বলিলেন না।
ঘরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া ডােরা প্রথমে কথা কহিল,
“কি অসভ্য লােক! জানে মানুষের সঙ্গে কথা কইতে,
না জানে কিছু।”
কিন্তু কাহারও নিকট হইতে কোন উত্তর আসিল না।
এই সময় হঠাৎ ঝড়ের বেগে সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়া
মিঃ গুই বলিয়া উঠিলেন, “কোন বাঙ্গালী কি আপনার
সঙ্গে এইমাত্র দেখা করতে এসেছিল মিঃ হােয়াইট?”
সেইভাবে ইজিচেয়ারে শুইয়া থাকিয়াই হােয়াইট
বলিলেন, “হাঁ, এসেছিলেন।”
“খুব খানিকটা লম্বাই-চওড়াই করে গেল বুঝি ?
“না, একটুও না।”—বলিয়া হােয়াইট চুপ করিলেন
“ওকে ঘেঁসতে দেবেন না মিঃ হােয়াইটও লােক বড়
সুবিধের নয়
ঘরের ডাক
অত্যন্ত উৎসাহের সহিত ডাের বলিয়া উঠিল, “আমরাও
এতক্ষণ সেই কথাই বলছিলুম বাবা,উনি বিশ্বাস করতে
চান না।”
রেভারেণ্ড কোন কথা বলিলেন না,—চুপ করিয়া বসিয়া
বহিলেন!
মিঃ গুই আবার আরম্ভ করিলেন, “তা ছাড়া ওর দ্বারা
আমাদের যথেষ্ট কাজের ব্যাঘাত ঘটতে পারে ;-ও হচ্ছে
এখানকার জমিদারের ছেলে—ইচ্ছে করলে চাই-কি দু-
পয়সা
চেয়ারের উপর খাড়া হইয়া উঠিয়া বসিয়া রেভারেণ্ড
বলিয়া উঠিলেন, “জমিদারের ছেলে।—আমি মনে করেছিলুম
কোন গরিব লােক হবে।”
“না, আদপেই গরিব লােক নয়-বেশ দস্তুরমত বড়-
লােক,—কিন্তু এমনি অসভ্য যে, একটা ভাল জামাকাপড়
পতেও শেখেনি।”
এ কথার কেহ কোন উত্তর দিল না।
লক্ষ্মীর দিকে চাহিয়া রেভারেণ্ড দেখিলেন-তার
মুখখানা একবারে রাঙ্গা হইয়া উঠিয়াছে।
((
দুপুর বেলায় খাওয়া-দাওয়া সারিয়া শয়নকক্ষের সমুখের
বারান্দায় বসিয়া নন্দরাণী চুল শুখাইতেছিল, এমন সময়
ভবতােষ আসিয়া অত্যন্ত বিরক্তভাবে বলিয়া উঠিল, “এমন
করে কি মানুষে পারে ?”
সসম্ভ্রমে উঠিয়া বঁাড়াইয়া নন্দরাণী বলিল, “কেন, কি
হয়েছে ?
“হবে আর কি ছাই—আমার মাথা আর মুণ্ডু।”
“কি হয়েছে বল না!”
“নলেটা মৃত রাজ্যের ছােটলােকের সঙ্গে মিশে একেবারে
কেলেঙ্কারী আরম্ভ করেছে-ভদ্রসমাজে আমার মুখ দেখান
ভার হয়ে দাড়িয়েছে।”
একটু হাসিয়া নন্দরাণী বলিল, “কেন দোষ কি হয়েছে
তাতে ?”
“দোষ হয়নি ?--ব্যাটারা সমাজদ্রোহীতাদের সঙ্গে
কথা কওয়াও পাপ-আর ও কিনা স্বচ্ছন্দে তাদের সঙ্গে
আমাদেরই নিন্দে করে বেড়াচ্ছে।
ঘরের ডাক
“তা করবে না?-দোষ ত তােমাদেরই-ওরা যে
সমাজদ্রোহী হয়ে উঠেছে, সে ত তােমাদেরই অত্যাচারে।”
“আমাদের অত্যাচারটা তুমি কোন্খানটায় দেখলে
ওনি?”
“অত্যাচার নয় ? ধােপা-নাপিতেরা পৰ্য্যন্ত ওদের কাজ
করূতে চায় না, অথচ তারাই যখন খৃষ্টান্ হয়ে যাচ্ছে, তখন
ধােপা-নাপিতেরা অনায়াসে তাদের বাড়ীতে গিয়ে কাজ করে
আছে,-একি কম—
বাধা দিয়া ভবতােষ বলিয়া উঠিল, “সব বুঝলুম, মেনে
নিলুম ধােপা নাপিত ওদের কাজ করে না বলে ওদের
নিজেদেরই সে কাজগুলো করে নিতে হয় এবং তাতে করে
ওদের খাটুনিও কিছু বাড়ে; কিন্তু সামান্য একটু খাটুনী
বাঁচাবার জন্যে ধৰ্ম্মত্যাগ করাটা কি উচিত?”
একটু হাসিয়া নন্দরাণী বলিল, “ভুল বুঝেছ তুমি,
এখানে কি শুধু পরিশ্রমটাই হয়েছে ওদের যত কিছু বিরক্তির
মূল ?--ঐ পরিশ্রমের আকার ধরে -
মাঝখানে হঠাৎ থামিয়া গিয়া নন্দরাণী বলিল, “এই ধরনা
কেন, তােমার প্রজাদের কেউ যদি,-কিছু না-শুধু তােমার
পিঠে আস্তে আস্তে একটা চড় মেরে যায় তা হলে তুমি
কি কর?”
যরের ডাক
৮৬
লাফাইয়া উঠিয়া ভবতােষ বলিল, “তা হলে ব্যাটাকে
ধরে সেইখানেই বুকে বাশ ডলে ছেড়ে দেবাে না! এত বড়
স্পর্ধা! আমার গায়ে হাত।”—সে এমনি ভাব-ভঙ্গী করিতে
আরম্ভ করিয়া দিল, যেন সত্যই কেউ তার গায়ে হাত
দিয়াছে এবং সত্যই তার বুকে বাশ ডলিবার ব্যবস্থাও হইয়া
গিয়াছে।
অতি কষ্টে হাসি সালাইয়া নন্দরাণী বলিল, “কেন, সে
বেচারা করেছে কি ?—তােমার পিঠে শুধু আস্তে আস্তে
একটা চড় মেরেছে বই ত নয়।”
চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া ভবতােষ চেঁচাইয়া উঠিল, “কি !
আমার মান তাতে করে কতখানি খাট হয়েছে সেটা ভেবে
দেখ দেখি ;-গরিবের ঘরের মেয়ে তুমি মানের কি
বুঝবে ?
প্রাণপণ-শক্তিতে হাসি চাপিয়া নন্দরাণী বলিল, “তা হলে
বুঝলে,-ঐ যে চড় মারা ওটা শুধু চড় মারা নয়—ওর মধ্যে
রয়েছে আর-একটা জিনিষ—সেটা হচ্ছে আত্মসম্মান
সেখানে ঘা পড়লে মানুষ পাগল হয়ে ওঠে।”
অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে ভবতােষ বলিয়া উঠিল, “বাজে
বােকো না তুমি,ওদের আবার মান অপমান ?
“ওদের মান নেই ?”
ঘরের ডাক
“না, ওদের মান নেই,যা জান না, তা নিয়ে তর্ক
কতে এসাে না, কখন বেদান্ত-দর্শনের নাম শুনেছ ?”
স্বামীর মুখের দিকে অবাক হইয়া চাহিয়া থাকিয়া সে
বলিল, “শুনেছি।”
হাত মুখ নাড়িয়া ভবতােষ বলিল, “সেই বেদান্ত-দর্শনে
কি লিখছে জান?”
“কি লিখছে শুনি?”
“লিথুছে যে, নমঃশূদ্র জাতির মান অপমান বলে কোন
পদার্থই নেই—ও জিনিষটা ভগবান্ ওদের মধ্যে একেবারেই
দেন নি।”
নন্দরাণীর দম্ ফাটিয়া হাসি আসিতেছিল~-অতি কষ্টে
নিজেকে সামলাইয়া লইয়া সে বলিল, “তা হবে।”
“তা হবে নয়—একবারে ঠিক এই কথাই লেখা আছে
তাতে ; শ্লোকটা আমার ঠিক মনে পড়ছে না এখন, ঐ যে
কি বলে-
ভবতােষ চলিয়া গেলে পর নন্দরাণী নিজের কক্ষে আসিয়া
পালঙ্কের উপর শুইয়া পড়িল। নিজের উপর তার ভয়ানক
রাগ হইতেছিল। কেন সে সচরাচর মেয়েদের মত শুধু
কেবল রাধাবাড়ার ছােট্ট শিক্ষাটুকুর মধ্যেই নিজেকে ডুবাইয়া
রাখে নাই ; মার.কথা না শুনিয়া কেন সে তার পিতার
বরের ডাক
৮
কথামত কাজ করিতে গেল ;-কেন সে তার মার কথা
ঠেলিয়া, যার সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ জীবনের কোন সম্পর্ক নাই
এমন সব বই পড়িতে গেল? আজ এই যে স্বামীর মূখ।
দেখিয়া অশ্রদ্ধায় তার বুকটা ভরিয়া উঠিল, এর জন্য দায়ী
কে? না, না, সে আর কখন উচু চিন্তা করিবে না,
ছেলেবেলাকার সমস্ত শিক্ষা সে ভুলিয়া যাইবে ;—সে জ্ঞানী
হইতে চায় না সে তার মার মত সতী হইতে চায়।
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্ব্বে নলিনী আসিয়া বলিল, “তুমি এখনও
শুয়ে আছ যে ছােট-মা ?*
বালিস হইতে মুখ না তুলিয়াই সে বলিল, “এমনি।”
ঘরের মধ্যে পাচারি করিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে নলিনী
বলিল, “আমাদের সমাজটা এমনি বিশ্রী হয়ে গেছে যে--
কৃথাটাকে সমাপ্ত হইতে না দিয়াই নন্দরাণী বলিয়া
উঠিল, তা আমি কি করব শুনে!-আমরা মেয়েমানুষ,
মেয়েমানুষের মতন থাব-ও-সব বড় বড় কথায় আমাদের
কাজ কি শুনি। তার গলার স্বর ভাঙ্গা-ভাঙ্গা।
অবাক হইয়া নলিনী তার মুখের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া
রহিল।
১৪
দুপুর-বেলায় নিজের ঘরে বসিয়া লক্ষ্মী কি একখানা বই
পড়িতেছিল, এমন সময় ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া ফেলী বলিল,
“সে দিন যে লােকটা এসেছিল না? সেই যে ফর্সা মতন।
সে জমিদারের ছেলে নয় লক্ষ্মী-দিদি, সে পাঠশালার
গুরুমশায়।
পুস্তক হইতে মুখ তুলিয়া লক্ষ্মী বলিল, “দুর পাগলী!”
“মাইরি বছি লক্ষ্মী-দিদি,-আমি নিজের চক্ষে দেখেছি
--বড় রাস্তার মােড় একটা পাঠশালা আছে না?-তারি
মধ্যে বসে বসে সে গুরুমশাইগিরি করছে।”
“বলিস কি রে!”
“হ। লক্ষ্মী-দিদি ;-আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিলুম,
ডেকে জিজ্ঞেস করলে, “তুমি বুঝি হােয়াইট সায়েবদের সঙ্গে
এসেছ?’-আমি বলুম, হু।*
“তা শুনে তিনি কি বলেন?
“বলে, ‘দেশের জন্যে তােমার মন কেমন করে না?
“তুই কি বলি ?
“বলুম, খুব করে।
ই
ঘরের ডাক
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কি ভাবিয়া লক্ষ্মী বলিল,
“বলিনি কেন, মন কেমন করলেই বা করব কি, তারা ত
আর আমাদের জাতে ফিরিয়ে নেবে না—-কাছে গেলে দুর
দু করে তাড়িয়ে দেবে।”
অত্যন্ত করুণকণ্ঠে ফেলী বলিল, “তারা সত্যি সত্যি
তাড়িয়ে দেবে না কি লক্ষ্মী-দিদি ?”
*দেবে না?নিশ্চয়ই দেবে!—সাধে ওদের দু’চক্ষে
দেখতে পারি না ফেলী।”
ইহার কিছুদিন পর, একদিন বিকালের দিকে ফেলীকে
লইয়া লক্ষ্মী গ্রামের পাশ দিয়া যে ছােট নদীটি বহিয়া
যাইতেছে, তাহারই তীরে গিয়া বসিয়া ছিল।
ফেলী চুপ করিয়া বসিয়া থাকিবার মেয়ে নয়—সে
অনর্গ বকিয়া যাইতেছিল—লক্ষ্মী মাঝে মাঝে কেবল হু
দিয়াই ক্ষান্ত হইতেছিল।
হঠাৎ কি ভাবিয়া ফেলী বলিয়া উঠিল ; “আমাদের দেশে
ঠিক এমনি নদী আছে লক্ষ্মী-দিদি, তার নাম ঝুড়াে-
নদী।”
লক্ষ্মী বলিল, “হু।”
ফেলী আবার বকিতে শুরু করিল, “ওঃ, তাতে যা মাছ
লক্ষ্মী-দিদি ! নাইতে গিয়ে আমরা গামছা দিয়ে কত ধরুতুম,
-
উঠিল,
কেউ দু’গণ্ডা, কেউ তিন গণ্ডা-ঘােট ঘােট পুটিমাছ—তা
বলে কি আর রুই-কালা।”
লক্ষ্মী সায় দিল, হু।”
তুমি সাঁতার দিতে পার লক্ষ্মী-দিদি ?”
লক্ষ্মী কোন উত্তর দিল না।
তাকে একটা ঠেল। দিয়া ফেলী বলিয়া
“বল না।”
কি বলছিস তুই ?”
“বছি, তুমি সাঁতার জান ?
“না।”
“আমি খুব সাঁতার জানি লক্ষ্মী-দিদি
"
-আমাদের বাড়ীর
কাছে সেওড়া-দীঘি বলে একটা ভারী দীঘি আছে, আমি
মাঝখান-বরাবর যেতে পারি--তাতে একবার একটা কুমীর
এসেছিল লক্ষ্মী-দিদি ;-তুমি শুস্থ না বুঝি ?”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “খুব শুছি-তুই বল
।”
“সেই কুমীরটা ছিদামের ছােট ভাই বলাইকে জলের
ভিতর টেনে নিয়ে গেছলো—সে
মরে গেল লক্ষ্মী-
দিদি !”
এই অবধি বলিয়াই ফেলী হঠাৎ চীৎকার করিয়া উঠিল,
ঘরের ডাক ও দিকে চেয়ে দেখ লক্ষ্মী-দিদি, পাঠশালার সেই গুরুমশাইটা পাসী বেয়ে আছে।” হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া সেই দিকে চাহিয়া লক্ষ্মী দেখিল, সত্যই তীর হইতে বিশ হাতটা দূরে একটা পাসী ভাসিয়া আসিতেছে এবং তাহারই উপর দাঁড়াইয়া রহিয়াছে- সেদিনকার সেই অপরিচিত যুবকটি ; অস্ত-রবির শেষ রশ্মিটুকু তার মুখখানির উপর আসিয়া পড়িয়া তার সেই সুন্দর মুখখানিকে আরো সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। তাহারা যেখানে বসিয়া ছিল, ঠিক্ তাহারই পাশে আসিয়া পাল্সী ভিড়িল। পাী হইতে তড়া করিয়া লাফাইয়া পড়িয়াই ফেলীকে দেখিয়া যুবক একটু হাসিল ; তার পর লক্ষ্মীর দিকে চোখ পড়িতেই অত্যন্ত সম্ভ্রমের সহিত হাত তুলিয়া নমস্কার করিয়া বলিল, “আপনাকে সেদিন হােয়াইট সাহেবের ঘরে দেখলুম প্রতিনমস্কার করিয়া লক্ষ্মী বলিল, “হাঁ, আমি তার সঙ্গেই মান্দ্রাজ থেকে এসেছি।” একটু হাসিয়া যুবক বলিল, সেদিন আমার ব্যবহারে আপনারা বােধ হয় ক্ষুন্ন হয়েছেন- হঠাৎ রাগারাগি করে চলে আসাটা বােধ হয় ভাল হয়নি।”
ঘরের এক
শশব্যস্তে লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “আপনি তা হলে আমাদের
সম্বন্ধে ভুল ধারণা করেছেন দেখছি। আমরা একটুও
ক্ষুন্ন হইনি—বরং আপনার সত্যপ্রিয়তার জন্যে মনে মনে
যথেষ্ট প্রশংসা করেছি।
একটু ভাবিয়া যুবক বলিল, “সত্যপ্রিয়তা খুব ভাল
জিনিষ সন্দেহ নেই; কিন্তু সেটাকে প্রকাশ করূতে গিয়ে
মানুষ অনেক সময় এমনি কর্কশ হয়ে পড়ে যে, সেটা শ্রোতার
মধ্যে সত্যপ্রিয়তার জন্যে ভালবাসা জন্মাতে ত পারেই না,
উপরন্তু তার মনের মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার করে দেয়।
জন্যে মানুষকে কোন কারণেই কর্কশ হতে নেই।
কর্কশ, তার দ্বারা জগতের কোন কাজই হয় না।”
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিল, “কিন্তু আপনি ত সেদিন বিশেষ
কর্কশ হননি।”
“না হলেই অবশ্য ভাল।”—তার পর হঠাৎ কথাটাকে
ঘুরাইয়া লইয়া সে বলিল, “এ-জায়গাটা আপনাদের লাগছে
কেমন ?”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমার ত খুব ভালই
লাগছে, আমরা পাড়াগেঁয়ে তােক সহরে আটক থেকে
হাঁফিয়ে উঠেছিলুম—এখানে এসে তবু যেন একটু হাঁফ ছেড়ে
বেঁচেছি।”
ঘরের ডাক
৯৪
;
“আপনার তা হলে সহরের চেয়ে পল্লীগ্রামই ভাল লাগে
দেখছি; অনেকে কিন্তু আছেন যারা সহর ছাড়া একদণ্ডও
টিকতে পারেন না।”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “ভগবাকে ধন্যবাদ ; তিনি
আমাকে তাদের দলে ফেলেন নি।
“ঠিক বলেছেন আপনি।” কথাটা শেষ করিয়াই হাত
তুলিয়া একটা নমস্কার করিয়া যুবক বলিল, “আপনার সঙ্গে
আলাপ করে খুব খুশী হলুম-আজ একটু কাজ আছে-
বেশীক্ষণ আলাপ কতে পারলুম না, কিছু মনে করবেন
—আর একদিন আপনার সঙ্গে দেখা কব এখন।”
কথাটা শেষ করিয়াই যুবক হন্ হন্ করিয়া চলিয়া
গেল।
যুবক চলিয়া গেলে পর লক্ষ্মী আবার নদীর তীরে আসিয়া
বসিল—তখন সূর্য ডুবিয়া গিয়াছে এবং পরপারের গাছপালা
সব ঝাপসা হইয়া আসিয়াছে।
লক্ষ্মীর মনের মধ্যে তখন একটা কথা ক্রমাগতই ঘুরিয়া
ফিরিয়া জাগিতেছিল,–এই অপরিচিত যুবকটি, ভােরা এবং
বিলির দলে তাকে মনে মনে ফেলিয়া দেয় নাই ত? সেদিন
এই অসভ্য মেয়ে দুটো যে অভদ্র ব্যবহার করিয়াছিল তাহারই
কষ্টিপাথরে তার ভদ্রতা এবং শিক্ষাকে যাচাই করিয়া এই
ঘরের ডাক
যুবকটি তার সম্বন্ধে একটা বিশ্রী ধারণায় উপনীত হয় নাই
ত?-লক্ষ্মীর ভয়ানক আপৃশেষ হইতে লাগিল, কেন সে
ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিল না যে, সে ওদের মনে মনে ঘৃণা
করে এবং ওদের শিক্ষা ভদ্রতা হইতে তার শিক্ষা এবং ভদ্র
অনেক উচ্চাঙ্গের।
হঠাৎ তাকে একটা ঠেলা মারিয়া ফেলী বলিয়া উঠিল,
“বাড়ী যাবে না লক্ষ্মী-দিদি ?”
ধড়মড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া লক্ষ্মী বলিল, “যাবাে
বৈ কি!”
পথে চলিতে চলিতে ফেলী বলিল, “গুরুমশাইটি বেশ
লােক, নয় লক্ষ্মী-দিদি ?---কেমন সােন্দর দেতে---তােমার
চেয়েও ফর্সা।”
লক্ষ্মী কেবল বলিল, “হু।”
বেলা প্রায় ১২টার সময় ভবতােষ আহারে বসিয়াছিল
এবং সমুখে বসিয়া নন্দরাণী দেখাশুনা করিতেছিল।
দুধের বাটিটার মধ্যে একমুঠা ভাত ফেলিয়া দিয়া
ভবতােষ বলিল, “যে রকম হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে আমার ত
মনে হয় নলেটাকে কোন্ দিন সমাজ থেকে তাড়িয়ে
দেবে।”
শশব্যস্তে নন্দরাণী বলিয়া উঠিল, “কেন, কেউ কিছু
বছে নাকি?”
“বছে বৈকি! সেদিন স্মৃতির বছিল, ও নাকি
নিধের ছোঁয়া জল খেয়েছে—
বাধা দিয়া নন্দরাণী বলিল, “জল খেয়েছে বই ত নয়।”
অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া ভবতােষ বলিল, “ওদের ছায়া
মাড়ান পর্যন্ত শাস্ত্রে নিষিদ্ধ—সে খবর রাখ?*
নিজেকে সাইয়া লইয়া নন্দরাণী বলিল, “তা বটে।”
গলাকে বথাসম্ভব খাদে নামাইয়া লইয়া ভবতােষ বলিল,
“সব জিনিষ একটু তলিয়ে বুঝতে হয় রাণী—যা মুখে আসে
বল্লেই ত আর চলে না।
১৭
ঘরের ভাক
বুহিল।
নন্দরাণী কোন কথা বলিল না-চুপ করিয়া বসিয়া
সে প্রাণপণ-শক্তিতে চেষ্টা করিতেছিল, মুখে ত
স্বামীর কোন কথায় প্রতিবাদ করিবেই না—এমন কি,
মনে-মনেও না।
নন্দরাণীর এই একটা মস্ত ভয় ছিল, বৃদ্ধ বলিয়া সে তার
স্বামীকে অবজ্ঞা করিতেছে না ত? স্বামী যদি তার যুবক
হইত, রূপ যৌবন যদি তার অক্ষুন্ন থাকিত, তাহা হইলে
অনায়াসে কথায় কথায় সে তার বিরুদ্ধাচরণ করিতে পারিত ;
কেন না, সেখানে আর অন্য কোন গলদ থাকিত না। কিন্তু
ভবতােষের বিরুদ্ধে সে কিছু বলিলেই পরমুহূর্তেই তার মনের
ভিতর হইতে কে বলিয়া উঠিত,-“এ শুধু কথার প্রতিবাদ
নয়; ইহার মধ্যে লুকাইয়া রহিয়াছে বার্ধক্যের প্রতি অবজ্ঞা
এবং নিজের অসম্পূর্ণ এবং অতৃপ্ত যৌবনের দিকে চাহিয়া
বৃদ্ধ স্বামীর প্রতি অযথা কটাক্ষপাত।” সে যখন স্বামীর
বিরুদ্ধে কোন কথা বলিত, তা সে মুখেই হােক আর মনে-
মনেই থােক, তার মধ্যে যে সুরটি বাজিতে থাকিত, সে ত
অবিমিশ্র নয়, তার মধ্যে মিশ্র হইয়া রহিয়াছে যে, আরো
অনেক সুর, যা সে আদবেই চায় না। তাই সে স্বামীর
বিরুদ্ধে কোন কথা মুখেও বলিতে চাহিত না, মনেমনেও
।
১
স্বামী খাইয়া উঠিয়া গেলে পর নন্দরাণী সেই পাতেই
বসিয়া গেল এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধার সহিত আহার শেষ করিয়া
নিজের ঘরে পালঙ্কের উপর গিয়া শুইয়া পড়িয়া ভাবিতে
লাগিল, “না না, এতদিনকার সমস্ত শিক্ষা সে ভুলিয়া যাইবে
-এবার নূতন করিয়া নিজেকে গড়িয়া তুলিবার পালা।
সংস্কার সংস্কার বলিয়া সে আর যখন-তখন চেঁচাইয়া মরিবে
। সংস্কারই ত সব ; ঐখানেই ত জগতের যত কিছু
সৌন্দৰ্য্য, যত কিছু রস, যত কিছু কাব্য। যুক্তি-তর্ক বলিবে,
যে স্বামীকে আমি নিজে হতে চাহি নাই, মন্ত্র এবং সমাজ
কেমন করিয়া তাকে আমার মধ্যে আনিয়া দিবে ? কিন্তু
ও ত নিছক তর্কের কথা ;-ও ছাড়া আর-একটা জিনিষও
মানুষের মধ্যে আছে যেটা তর্কের চেয়ে অনেক বড় জিনিষ
সেটা হচ্ছে কাব্য। এই কাব্যই ত মানুষকে ক্রমাগত
সাবধান করিয়া দিতেছে—তারা যেন শুধু কেবল শুষ্ক যুক্তি-
তর্কের মধ্যে সত্যকে খুঁজিয়া বাহির করিবার ব্যর্থ চেষ্টায়
ঘুরিয়া না মরে। সংস্কারের হাত হইতে মুক্ত হওয়াই যদি
সব-চেয়ে বড় শিক্ষা হয়, তাহা হইলে সে শিক্ষা ত পশুদের
মধ্যে স্বভাবতই বহিয়া গিয়াছে। এই যে স্বামীকে সে
ভালবাসিতে পারিতেছে না, ইহার মধ্যে রহিয়াছে কেবল
কাব্যেয় অভাব। তা না হইলে বিবাহ নিজেই ত একটা
ঘরের ডাক কুসংস্কার। কেন মানুষ একজনকে লইয়াই সুখে থাকিবে ; —আজ তার একজনকে ভাল লাগিতেছে, কাল আর- একজনকে ভাল লাগিয়া যাইতে পারে ত!তবু যে মানুষ একজনকে লইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে চায়, ইহাই ত কাব্য ; ঐখানেই ত মানুষ পশু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। মানুষ যতই সভ্য হইয়া উঠিতেছে, তাদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা ততই কমিয়া আসিতেছে, এর কারণ আর কিছুই না--কেবল এই যে, মানুষের সভ্যতা যুক্তি-তর্ক অপেক্ষা কাব্যের উপরেই নির্ভর করে বেশী। এই যে তার বৃদ্ধ স্বামী, একে সে তর্ক কিম্বা যুক্তি দিয়া হয় ত কোন কালেও পাইবে না, কিন্তু কাব্যের ভিতর দিয়া এখনই : সে তার স্বামীকে পাইতে পারে। ভগবাকেও ত মানুষ ঠিক এই ভাবেই পাইয়াছে। তারা যদি শুধু কেবল যুক্তি-তর্ক থা টাইয়া তাকে পাইতে চেষ্টা করিত, তাহা হইলে কোন কালেও হয়ত পাওয়া যাইত না ; কিন্তু কাব্য আসিয়া হাসিয়া বলিল, “এই ত তিনি *----না, , সে আর কখন যুক্তি-তর্ক খাটাইবে না। যুক্তি-তর্ক কিছুই নয়—একবারে ভুয়াে। বাহিরের ঘরে বসিয়া নলিনী কি একখানা বই পড়িতে ছিল, নন্দরাণী হঠাৎ গিয়া বলিয়া উঠিল, “দেখ নলিন, আমার মনে হয় যুক্তি-তর্কটা কিছুই নয়, আসল জিনিষ হচ্ছে বিশ্বাস।”
ঘরের ডাক একটু হাসিয়া নলিনী বলিল, “কিন্তু বিশ্বাসটা যে তর্কের চেয়ে বড় জিনিষ এ কথাও যে মানুষ যুক্তি-তর্ক করে তবে বলে ছােট-মা।” নন্দরাণী হতাশ হইয়া একটা চেয়ারের উপর বসিয়া পড়িল। বইটাকে মুড়িয়া ফেলিয়া নলিনী বলিল, “আসল কথা বিশ্বাস এবং তর্ক, এ দুটো বড় বেশী পৃথক্ জিনিষ নয়, ছােট- মা। যুক্তি না করে মানুষ এক কণাও বিশ্বাস কতে পারে না, আবার কিছু না কিছু বিশ্বাস না করে মানুষ একটুও যুক্তি করতে পারে না।” কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া থাকিয়া নাণী হঠাৎ এক সময় ঘর ছাড়িয়া চলিয়া গেল। নলিনী কিল, “ছােট-মা!” কোন উত্তর আসিল না ।
১৪
আজ বিকালে লক্ষ্মী বেড়াইতে বাহির হয় নাই,—নিজের
ঘরের জানালার ধারে চুপ করিয়া বসিয়াছিল। শরীরটা
তার তত ভাল ছিল না; আগের দিন রাত্রে অল্প অল্প জ্বর
এখন আর জ্বর নাই বটে, তবে শরীরটা
বড় দুর্বল।
জানালার সমুখেই গির্জার প্রকাণ্ড উদ্যান, তাহাতে
বড় বড় দেবদারু এবং শিশুগাছ সারিবন্দিভাবে দাড়াইয়া
রহিয়াছে এবং তাহাদের আড়াল দিয়া অদূর গ্রামের ইতস্তত
বিক্ষিপ্ত কুটীরগুলি মাঝে মাঝে দেখা যাইতেছে। জানালার
বারে বসিয়া লক্ষ্মী ভাবিতেছিল, রেভারেণ্ড তাহাকে যে
কথা বলিয়াছিলেন তা খুব ঠিক। এই বাংলা দেশটার
প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে এমনই একটা মাদকতা আছে,
যা মানুষকে অভিভূত করিয়া ফেলে। এর বাহিরটা যেন
বিশ্ব-দুনিয়াকে ডাকিয়া বলিতেছে, “আয় আয়”। কিন্তু
এর ভিতরটা কি ভয়ানক বিশ্রী। সেখানে আহ্বানের বাঁশী
ধুলায় পড়িয়া লুটাইতেছে -বাজিতেছে কেবল বিদায়ের
ঘরের ডাক
১০২
করুণ সুর—কেবল বিদায় আর বিদায়। কিন্তু এই যে
সঙ্কীর্ণতা, এই যে কেবলি বিসর্জন আর বিসর্জন, ইহার
সুরটি এত করুণ হইয়া তার কানের ভিতর দিয়া মরমে
গিয়া পশিতেছে কেন? এই যে খাপছাড়া কুসংস্কারগুলো,
এই যে জাতিভেদের বেসুরা বেতালা চীৎকারগুলো, ইহাদের
ভিতর হইতে সে এত করুণ সুর খুঁজিয়া পাইল কোথা
হইতে ?
সে সুর এত করুণ যে, তার কান্না পায়।
হিন্দুসমাজের এই-সব সঙ্কীর্ণতা, এই-সব কুসংস্কার লইয়া
সে প্রবন্ধের মধ্যে কত ঠাট্টা বিদ্রুপই না করিয়াছে, কিন্তু
সেটা কি তার প্রাণের জিনিষ ? না, না, তা হইতেই
পারে না !
সে আজ আশ্চৰ্য্য হইয়া গেল, এই এত বড়
একটা করুণ এবং বিষাদময় ব্যাপার লইয়া সে কি করিয়া
এত ছেলেমানুষী করিতে পারিয়াছিল। না, না, এসব
হাসি-ঠাট্টার জিনিষ নয় ; এর মধ্যে যা আছে, সে কেবলি
কান্না আর কান্না। এই যে সেদিন সেই অপরিচিত
যুবকটির সঙ্গে নদীতীরে তার দেখা হইল, সে ত ধনীর
সন্তান, ইচ্ছা করিলেই সে ত যথেষ্ট বিলাসিতা করিতে
পারে, কিন্তু ইচ্ছা করিয়াই সে তা করে নাই। যে দেশের
অন্তঃকরণ শুধুই কেবল কঁদিতেছে আর কাদিতেছে, সে
দেশের লােক হাসিবে কিরূপে? তাই যুবকের মুখে
ঘরের ডাক বিষাদের ছায়া, তাই উদাস হাওয়ার মতই তার উত্তরীয় উড়িতেছে। লক্ষ্মীর মনে হইতে লাগিল, এই অপরিচিত ধনী-সন্তানটির এই যে বৈরাগ্য, এই যে সকল থাকিতেও রিক্ততা, এ কেবল তাদেরই জন্য—সমাজকে ছাড়িয়া যারা চলিয়া গিয়াছে এবং ফিরিবার জন্য কঁদিয়া কঁদিয়া বেড়াই- তেছে অথচ ফিরিতে পারিতেছে না। তাই ত নমঃশূদ্রদের সে মার মত করিয়া আগলাইয়া রহিয়াছে, পাছে তারা। পালাইয়া যায়। রেভারেণ্ড বলিতে চান, বাংলা দেশের বাহিরটার সহিত তার ভিতরের একটুও মিল নাই ;—আছে বৈকি ! তার বাহিরটাও কঁদিতেছে—তার অন্তরটাও কঁদিতেছে, সে কান্না অত্যন্ত করুণ। হঠাৎ ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া ফেলী সেই কক্ষে প্ররেশ করিয়াই বলিয়া উঠিল, “আজ কোথায় গেছলুম বল দেখি, লক্ষ্মী-দিদি।” অত্যন্ত অন্যমনস্ক ভাবে লক্ষ্মী বলিল, “কি জানি।” “তবু বল দেখি।” “কি করে জানব বন্!” “আন্দাজ কর দেখি--কখনই বলতে পাবে
ঘরের ডাক
১৪
জানালার ধার হইতে উঠিয়া আসিয়া কেরােসিনের
ল্যাম্পটা জ্বালিতে জালিতে লক্ষ্মী বলিল, “কোথায় গেলি
বল্ না!”
“পারূবে না বলতে ?—হেরে গেছ ?”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আচ্ছা, হেরেই গেছি।
কোথায় গেছলি বল্ না।”
একগাল হাসিয়া ফেলী বলিল, “গুরুমশাইদের বাড়ী।”
তারপর মুখখানাকে সহসা গম্ভীর করিয়া সে বলিতে
'লাগিল, “ওঃ, কত বড় দালান লক্ষ্মী-দিদি, তিন-চার মহল
বাড়ী।”
অত্যন্ত আগ্রহের সহিত লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “তুই একলা
গেছলি নাকি?”
“একলা বাবাে কেন? গুরুমশাই, না না ঐ* হঠাৎ
মাঝখানে কথাটাকে চাপা দিয়া সে বলিয়া উঠিল, “গুরু-
মশায়ের আসল নাম নলিনী-বাবু, তা ত জান না লক্ষ্মী-
দিদি!”
বাধা দিয়ে লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “তার পর কি হলো
বল্ না।”
“তার পর আর কি হবে?-নলিনী-বাবু আমাকে তার
মার কাছে নিয়ে গেল,-ওঃ, নলিনী-বাবুর মা যা সুন্দরী
ঘরের ডাক
লক্ষ্মী-দিদি-সে নলিনী-বাবুর আসল মা নয় লক্ষ্মী-দিদি,
সৎ-মা।
অত্যন্ত আগ্রহের সহিত লক্ষ্মী বলিল, তিনি তােক
দেখে কি বল্লেন ?”
“বলে, এস মা এস।”
“তুই কি কলি ?”
“আমি গলায় কাপড় দিয়ে পেন্নাম কলুম।”
“তার পর ?”
হঠাৎ কি ভাবিয়া ফেলী বলিয়া উঠিল, “সেই কথাটা
জিজ্ঞাসা করেছি লক্ষ্মী-দিদি।
“কোন্ কথাটা রে?”
“সেই যে আমরা দেশে থেকে গেলে দেশের লােকে
আমাদের সঙ্গে কথা কইবে কি না ।
লক্ষ্মী সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিয়া উঠিল, “কি বল্লেন ?”
অত্যন্ত করুণ-কণ্ঠে ফেলী বলিয়া উঠিল, “কিছুই বলে
না লক্ষ্মী-দিদিকে বল কঁাতে লাগলো।”
“কাতে লাগলো ?*
“হ লক্ষ্মী-দিদি।”
লক্ষ্মী আবার জানালার ধারে গিয়া বসিল। চারি-
দিকে তখন অন্ধকার ঘনাইয়া আসিয়াছে। তার মনে
ঘরের ডাক
হইতে লাগিল, ঐ যে নলিনী-বাবুর মার কান্না, ঐখানেই
বাংলা দেশের প্রকৃত অন্তঃকরণটা ধরা পড়িয়া গিয়াছে।
সেখানে তাদের জন্য ঘৃণা অবজ্ঞা এতটুকুও সঞ্চিত হইয়া
উঠে নাই।
সেখানে আছে কেবল তাদের বুকে করিয়া
লইতে না পারার জন্য আকুল মৰ্ম্মবেদনা। তাই বাংলাদেশ
অমন উদাস-নয়নে তার মুখের পানে রাতদিন চাহিয়া থাকে।
ভক্তি স্নেহ
মমতায় যক্ষ্মীর বুকখানা ভরিয়া উঠিতে
লাগিল।
মুখখানাকে ভার করিয়া ফেলী বলিল, “আমাদের তাহলে
দেশের লােকে ফিরিয়ে নেবে না লক্ষ্মী-দিদি ?”
তাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া লক্ষ্মী বলিল, “নেবে
বৈকী ফেলী—আমাদের বাংলাদেশ কি এমনিই পাষাণ রে!”
পদিন শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়া লক্ষ্মীর মনে হইতে
লাগিল, গতরাত্রে সে যেন একটা আবােলতাবােল স্বপ্ন
দেখিয়াছিল--এবং তারি ঘােরটা যেন এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ
কাটে নাই। কাল সন্ধ্যার সময় সে যে-জানালাটার ধারে
গিয়া বসিয়াছিল,—সেই দিকে চাহিয়া তার মনে হইতে
লাগিল, ঐখানে বসিয়া গতকল্য সে একটা অত্যন্ত অলীক
দিবাস্বপ্ন দেখিয়াছিল। কিন্তু স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেলেও তার
ঘােরটা যেমন বুকের উপর চাপিয়া বসিয়া থাকে, লক্ষ্মীর
১০৭
ঘরের ডাক
বুকের উপর গতকল্যকর করুণ স্বপ্নটার বিষাদময় ভাবটি
ঠিক তেমনি করিয়া তখন পর্যন্ত চাপিয়া বসিয়া রহিয়াছে।
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে ফেলীকে লইয়া লক্ষ্মী নদীর দিকে
যাইতেছিল -পথে হঠাৎ নলিনীর সহিত দেখা।
দূর হইতে হাত তুলিয়া নমস্কার করিয়া নলিনী বলিয়া
উঠিল, “ভাল আছেন আপনি?”
প্রতিনমস্কার করিয়া সে বলিল, “অমনি কেটে যাচ্ছে।
আপনার খবর ভাল ?”
“মন্দ কি!” বলিয়া নলিনী নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল।
কি ভাবিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “দেখুন, আপনার
আমার একটা কথা আছে,এখন কি আপনার শােম্বার
সময় হবে ?
“বিলক্ষণ, বিলক্ষণ, আমাকে অত কাজের লােক
ঠাওরাবেন না।” বলিয়া নলিনী হঠাৎ হাে হাে করিয়া হাসিয়া
উঠিল, সে হাসি শিশুর হাসির মতই সরল এবং সুন্দর!
সে হাসিতে যােগদান না করিয়াই লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল,
“আমার প্রথম কথা, আপনি পায়ে জুতাে দেন না কেন?”
একটু হাসিয়া নলিনী বলিল, “দরকার হয় না বলে।”
“সকলের দরকার হয়, আর আপনারই দরকার
হয় না কেন ?
ঘরের ডাক
Sobo
রাস্তার ধারের বাঁশঝাড় হইতে একটা সরু কঞ্চি
ভাঙ্গিয়া লইয়া নলিনী উত্তর দিল, “সকলের দরকার ত আর
সমান নয়। আপনার কাছে যেটা দরকারী আমার কাছে
সেটা হয়ত কিছুই না—একেবারেই বাজে। আবার আমার
কাছে যেটা নেহাতই বাজে, আপনার কাছে হয়ত সেইটেই
সবচেয়ে দরকারী।
কিছুক্ষণ দুজনেই নীরবে পথ চলিতে লাগিল। কিছুদূর
গিয়া লক্ষ্মী হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “সেদিন আপনি রেভারেণ্ড
হােয়াইটের কাছে অভিযোেগ করতে গেছলেন, তারা কেন
দেশী লােকেদের জোর করে ধরে খৃষ্টা করেন। আপনি
বতে চান--তাদের লােভ দেখিয়ে প্রথম দলে টেনে আনা
হয়, তারপর তাদের দিকে আর কেউ ফিরেও তাকায় না,
এই ত?”
“তাই; আপনিই বলুন না, তাই করা হয় কি না।”
“আমার বক্তব্য আমি পরে বলবাে ;-এখন আপনার
কথাটাই তর্কের খাতিরে না হয় মেনে নেওয়া গেল।”
“বেশ, এইবার আপনার কি বব্বার আছে বলুন।”
“আমি বছিলুম কি, যাদের লােভ দেখিয়ে খৃষ্টান্ করা
হয়, তারা যখন ধর্মত্যাগ করে দেখে যে, যে-সব সুবিধা
পাবার জন্য তারা ধৰ্ম্মত্যাগ করেছে, তার একটাও পাবার
ঘরের ডাক
আশা নেই, তখন তাদের যে আশেষ রাবার আর জায়গা
থাকে না-সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনারা যদি
সেই সময় গিয়ে তাদের আবার স্বধৰ্ম্মে ফিরিয়ে আনেন, তা
হলে ত সব গােলমালই চুকে যায়। পরের দোষটা দেখবার
পূর্বে নিজেদের দোষগুলাে শুধরে নিলেই কি ভাল হয় না?”
“আপনি ঠিক কথাই বলেছেন-এবং সেজন্যে প্রাণপণে
চেষ্টাও করছি—কিন্তু পেরে উঠছি না।”
অত্যন্ত আগ্রহের সহিত লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “চেষ্টা
কছেন না কি ?”
“হ, চেষ্টা করছি; কালও নমঃশূদ্রদের একটা সভা করে
প্রস্তাব করেছি, যে-সব নমঃশূদ্র ফিরে আসতে চার-তাদের
যেন সমাজে তুলে নেওয়া হয়।”
“তাতে তারা কি বলে ?
“তারা এখন পর্যন্ত কিছু ঠিক করে উঠতে পারে নি,
বলেছে, ভেবে পরে বলবে।” কথাটা শেষ করিয়াই লক্ষ্মীর
মুখের দিকে চাহিয়া নলিনী হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “কিন্তু এর
জন্যে আপনার এত আগ্রহ কেন বলতে পারেন ?”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমার নিজের সমাজ নয়
বলেই কি তাদের সম্বন্ধে আমার কোন আগ্রহ থাকতে
নেই ?”
গরের ডাক
১১০
কি ভাবিয়া নলিনী হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “মাপ করবেন,
আমার কিন্তু মনে হয়, আপনি ঠিক সত্যি কথা কছেন না ”
অত্যন্ত জোর করিয়া টানিয়া হাসিবার চেষ্টা করিয়া লক্ষ্মী
বলিয়া উঠিল, “হঠাৎ এ-সন্দেহ হবার কারণ ?”
একটু ইতস্তত কৰিয়া নলিনী বলিল, “আমার মনে হয়,
ঠিক এই জায়গাটাতেই আপনার ব্যথা।”
লক্ষ্মীর মুখ শুকাইয়া একেবারে এতটুকু হইয়া গিয়াছিল
সে অতি কষ্টে টানিয়া হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল, “ঠিক
বুঝতে পারলুম না আপনার কথা।”
খুব বুঝতে পেরেছেন আপনি !” বলিয়া সে লক্ষ্মীর
মুখের পানে আর-একবার চাহিল। সে দৃষ্টি সহ্য করা লক্ষ্মীর
পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর হইয়া উঠিয়াছিল—সে চুপ করিয়া গেল,
একটি কথাও বলিল না।
কিছু দূর গিয়া নলিনী বলিল, “আপনি কি আমাদের
সমাজে আবার ফিরে আসতে চান ?”
তেমনি ভাবেই মাটির দিকে চাহিয়া লক্ষ্মী উত্তর দিল,
“বোধ হয় চাই-কিন্তু সেটা হয়ত দুর্বলতা,হয়ত না
চাওয়াই উচিত, হয়ত*
বাধা দিয়া নলিনী বলিয়া উঠিল, “অমন করে সত্যকে
মুক্তির জাল দিয়ে বাঁধূতে চেষ্টা করবেন না।
ঘরের ডাক
সে আরাে কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া লক্ষ্মী
বলিয়া উঠিল, “গল্প করতে করতে অনেক দূর এসে পড়েছি
বেশী দূর আর যাবাে না—আজ এইখান থেকেই বিদায়
নিচ্ছি।-নমস্কার নলিনী-বাবু।
হঠাৎ নিজেকে সামলাইয়া লইয়া শশব্যস্তে নলিনী বলিয়া
উঠিল, “ঠিক বটে, আমারও অত খেয়াল ছিল না। তার পর
কি ভাবিয়া বলিয়া উঠিল, “কিছুই কিছু না, বুঝলেন কিনা ;
আপনারও ভুল হতে পারে-আমারও ভুল হতে পারে।
নমস্কার-নমস্কার।”
রাত্রে শয্যায় শুইয়া লক্ষ্মীর মনে হইতে লাগিল, কি
দুৰ্বলতাটাই না সে আজ প্রকাশ করিয়া ফেলিল। তার
মন হিন্দুসমাজে ফিরিয়া যাইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে
বলিয়াই যে ফিরিয়া যাইতে হইবে এমন ত আর কোন কথা
নাই।-লক্ষ্মীর মাথা খুঁড়িয়া মরিতে ইচ্ছা যাইতে লাগিল,
কেন সে এ কথাটা বুঝাইয়া দিয়া আসিতে পারিল
—কেন সে নীরবে পরাভব স্বীকার করিয়া ফিরিয়া
আসিল।
ঠিক সেই রাত্রেই বাড়ী ফিরিয়া নলিনী তার ছােট-মাকে
গিয়া বলিল, “দেখ ছােট-মা, মনটা আজ বড় খারাপ হয়ে
গেল।”
ঘরের ডাক
১১২
মেঝের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া নন্দৰাণী কৃত্তিবাসী
রামায়ণ পড়িতেছিল—বলিল, “কেন, কি হয়েছে ?”
“একটি খৃষ্টা-মেয়ের সঙ্গে পথে দেখা হােললা, তার ভারি
ইচ্ছে আবার আমাদের সমাজে ফিরে আসে—কিন্তু
বাধা দিয়া নন্দরাণী বলিয়া উঠিল, “তবে মরতে সমাজ
ছেড়েছিল কেন?”
অত্যন্ত ক্ষুন্নভাবে নলিনী বলিল, “অমন নিষ্ঠুর হােয়য়া
, ছােট-মা !”
বইটাকে মুড়িয়া উঠিয়া-বসিয়া নন্দরাণী বলিল, “তা কি
করূবাে শুনি।”
করবে না কিছু, তা জানি-তবু তাদের জন্যে দুঃখ
প্রকাশ করবার অধিকারটুকুও ত ভগবান আমাদের দিয়ে-
ছেন,—সে সৌভাগ্য থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে রেখে
ফল কি ছােট-মা।”
অত্যন্ত করুণ-কণ্ঠে নন্দরাণী বলিল, “আমাকে আর
জ্বলিও না নলিন্! মেয়েমানুষ হয়ে জম্মেছি—মেয়েমানুষের
মতনই থাকতে দাও ; ওসব বড় বড় কথা শুনিয়ে মাথা
খারাপ করে দিও না।”
কথাটা শেষ করিয়াই হঠাৎ কাজের অছিলা করিয়া
নন্দরাণী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। নলিনী নির্জন
এ
১১৩ বরের ডাক কক্ষে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তার মনে হইতে লাগিল, এই যে দুটি নারী, এরা দুজনেই অপূৰ্ব্ব ; একজন তর্ক- যুক্তির দ্বারা সত্যকে হারাইবার চেষ্টা করিতেছে, কেননা সত্য তার কাছে হাসিমুখে আসে নাই—আসিয়াছে তার রুদ্র-মূৰ্ত্তি লইয়া। আর-একজন অন্ধবিশ্বাসের দ্বারা সত্যকে ভুলিবার চেষ্টা করিতেছে, কেননা সত্য তার কাছেও হাসি- মুখে আসে নাই,-আসিয়াছে তার রুদ্রমূৰ্ত্তি লইয়া। কিন্তু এরা জানে না যে, সত্য যখন আসে, তা সে হাসিমুখেই আসুক আর রুদ্রমূৰ্ত্তি লইয়াই আসুক,-তাকে বরণ করিয়া লওয়াই মঙ্গল,কেননা, সে যে সত্য—তাকে যে ঠেকাইয়া রাখা যায় না। দুপুর-বেলায় আরামকেদারায় শুইয়া লক্ষ্মী ভাবিতেছিল, নলিনীকান্ত নিশ্চয়ই তাকে অশিক্ষিত এবং আহাম্মক ভাবিয়াছে। সেদিন কেন সে অমনভাবে নিজেকে ধরা দিয়া ফেলিল ? সে যদি শুধু কেবল বলিত, হ, হিন্দুসমাজে ফিরিয়া যাইতে তার ইচ্ছা আছে, অথবা জোর করিয়া বলিত, না উক্ত সমাজে ফিরিয়া যাইতে তার একটুও ইচ্ছা নাই, তাহা হইলে তার এই দৌর্বল্যটা এমন ভাবে ধরা পড়িয়া কেন সে একটা কথা বলিয়া ফেলিয়া আবার সেটাকে জোড়াতাড়া দিয়া মেরামত করিয়া লইবার চেষ্টা যাইত না।
ঘরের ডাক
১১৪
করিল ; লজ্জায় তার মাথা খুড়িয়া মরিতে ইচ্ছা হইতে
লাগিল। তার মনে হইতে লাগিল, একবার যদি সে বাগে
পায়, তাহা হইলে এই যুবকটিকে তর্কে হারাইয়া বেশ করিয়া
গায়ের ঝাল মিটাইয়া লয়। কিন্তু এই যুবকটি এমনি চালাক
এবং সতর্ক যে তর্কের দিক দিয়া যখন আঁটিয়া উঠিতে পারে না,
তখন ধাঁ করিয়া তর্ক ছাড়িয়া মানুষের ব্যক্তিগত দোষগুণের
কথা পাড়িয়া বসে। প্রথম যেদিন সে রেভারেণ্ড হােয়াইকে
তর্কযুদ্ধে একেবারে কোণঠেস করিয়া ধরিয়াছিল, সেদিনও
তার হস্তে ছিল ঐ একই অস্ত্র।
ওযুদ্ধের মাঝখানে হঠাৎ মানুষকে বুকে হাত দিয়া
শপথ করিতে বলাটা একেবারেই শিষ্টাচার নয়। কিন্তু এই
যুবকটি ঐরূপ অধ্যায় যুদ্ধই বরাবর করিয়া আসিতেছে।
সেদিন সে যে তাহাকে অমন ভাবে ফস্ করিয়া অপ্রস্তুতে
ফেলিয়া দিল, সেও ত ঐ একই অন্যায় অস্ত্র ব্যবহার করিয়া ।
এতে আর বাহাদুরীর কি আছে ? কাল যদি সে কোনও
উপায়ে এই যুবকটির সম্বন্ধে কোন একটা দুৰ্বলতার কথা
শুনিতে পায় আৰু তর্কের মাঝখানে হঠাৎ সেইখানটিকে
ঘা দিয়া বসে, তাহা হইলে সেও কি ঠিক তাহারই মত
অপ্রস্তুতে পড়িয়া যাইবে না? এ ভাবে সকলেই ত জিতিতে
পারে। হঠাৎ কি ভাবিয়া লক্ষ্মী ডাকিয়া উঠিল, “ফেলী।”
ঘরের ডাক
ঘরের কোণের বারান্দায় বসিয়া ফেলী একটা কুকুরছানার
সহিত আলাপ জমাইবার চেষ্টা করিতেছিল—উত্তর দিল
“কেন লক্ষ্মী-দিদি।”
“শুনে যা একবার !”
সে আসিতেই লক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করিল, “তাদের সমাজে
ফিরিয়ে নেবার কথা তুই বুঝি নলিনী-বাবুর কাছে কোন
দিন পেড়েছিলি?*
অত্যন্ত উৎসাহের সহিত হাত মুখ নাড়িয়া ফেলী সুরু
করিল, “হাঁ, পেড়েছিলুম লক্ষ্মী-দিদি ; নলিন-বাবু বল্লে,
“তুই অত ভাবিনে ফেলী, আমি তােদের জন্যে”
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “তুই বুঝি আমার নাম
করেছিলি ?”
লক্ষ্মীর মুখের দিকে চাহিয়া ভয়েভয়ে ফেলী বলিল, “হাঁ,
বলেছিলুম।”
“কি বলেছিলি শুনি ?”
“আমি কি নিজে হতে বলেছি; তিনি যে জিজ্ঞাসা
করলেন।”
“কি জিজ্ঞাসা করলেন ?”
অত্যন্ত জড়সড় হইয়া ফেলী বলিল, “জিজ্ঞেস করলে,
কে তােকে ও-কথা বলতে শিখিয়ে দিয়েছে ?”
ঘরের ডাক
১১৬
অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া লক্ষ্মী বলিল, “তুই বুঝি তাই
আমার নাম করে দিলি ?”
লক্ষ্মীর আপাদমস্তক জ্বলিয়া গেল। সে কোন কথা
বলিয়া অস্থিরভাবে ঘরময় পাচারি করিয়া বেড়াইতে
লাগিল। তার মনে হইতে লাগিল, ছুটিয়া গিয়া নলিনীকে
বলিয়া আসে, “সমাজ এবং ধৰ্ম্ম-সংস্কারে না নামিয়া পুলিসের
গােয়েন্দাগিরি করিলেন না কেন---তাহা হইলে নাম কিনিতে
পারিতেন। ছিঃ ছিঃ কি নীচত! লক্ষ্মীর নিজের উপর
রাগ হইতে লাগিল ; প্রথম দিন এই যুবক যখন রেভাবেও
হােয়াইটকে অযথা আক্রমণ করিয়া চলিয়া গেল, তখন সে
এই লােকটির উপর একটুও বিরক্ত হয় নাই। তার এই
অন্যায় যুদ্ধটাকে সেদিন সে সত্যপ্রিয়তা বলিয়া প্রশংসা
করিয়াছিল ;-ওঃ কি ভয়ানক ভাবেই সেদিন সে এই চতুর
লােকটির দ্বারা প্রতারিত হইয়াছিল। আজও সে কথা মনে
হইলে লজ্জায় মাথা কাটা যাইতে থাকে।
. সমস্ত দিনের পর রাত্রে শয্যায় শুইয়াও লক্ষ্মী এই অসহ্য
চিন্তাটার হাত হইতে অব্যাহতি পাইতে পারিল না। ক্রমা-
গতই তার মনে হইতে লাগিল, একদিন না একদিন সে
এই যুবকটিকে নিশ্চয়ই জানাইয়া দিবে যে, তার দ্বারা সে
১১৭ ঘরের এক একটুও অভিভূত হয় নাই এবং শিক্ষা ও জ্ঞানে সে তার চেয়ে অনেক বেশী অগ্রসর। তার মনে হইতে লাগিল, ঠিক সেই মুহূর্তে নলিনীও তার নিভৃত শয়নকক্ষে শয্যায় ইয়া শুইয়া নিশ্চয়ই তাহারই কথা ভাবিতেছে এবং মনে মনে তাকে বেচারী বলিয়া দয়া প্রকাশ করিতেছে। তার সেই যুবতী বিমাতাটিকে ডাকিয়া তাহারই কথা নানা ছাদে বলিতেছে। সেই অশিক্ষিতা, সঙ্কীর্ণচিত্ত স্ত্রীলােকটি হয়ত তাহারই সঙ্গে যােগ দিয়া কতই না সহানুভূতি প্রকাশ করিতেছে। সে আজ তাহাদের দয়ার পাত্র—আর কিছুর । কেননা, সে যে বেচারা, সে যে নির্বোধ,—সে যে দয়াপ্রার্থী। তার মনে হইতে লাগিল, এই যুবকটিকে যেদিন সে দেখাইতে পারিবে যে, সে আদপেই দয়াপ্রার্থী নয়, সে সাধারণ স্ত্রীলােক অপেক্ষা অনেক বড় এবং যে-সকল দেশী খৃষ্টানদের দলে ফেলিয়া তাহাকে সে তাহাদেরই এক- জন ভাবিয়া অনধিকার দয়া প্রকাশ করিতেছে, তাহাদের সহিত তার তুলনাই হয় না, এই সত্যটা যেদিন সে কোন উপায়ে জানাইয়া দিতে পারিবে, সেই দিন—কেবল সেই দিনই সে সুস্থির হইতে পাব্রিবে—তার পূর্বে নয়। পরদিন সকালে উঠিয়া লক্ষ্মী চা খাইতেছিল, এমন সময় ঘরের ভাক ১১৮ রেভারেণ্ড হােয়াইট আসিয়া সেই কক্ষে প্রবেশ করিলেন- হাতে তার একখানি ইংরেজী দৈনিক পত্র। একটু হাসিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “তুমি ধােধ হয় নলিনীকান্ত রায়চৌধুরীকে চেন।” রেভারেণ্ডের হাসির মধ্যে বেশ একটু শ্লেষ ছিল। বিরক্তভাবে লক্ষ্মী বলিল, “হ চিনি, কেন তাতে কি হয়েছে।” হয় নি কিছু”-বলিয়া রেভারেণ্ড লাল পেন্সিলের দাগ- কাটা খবরের কাগজের একটা অংশ তার চোখের সমুখে টেবিলের উপর মেলিয়া ধরিলেন। অবাক হইয়া সেই অংশটার দিকে চাহিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “কি হয়েছে ? এই প্রবন্ধটা তারই লেখা কিনা, তাই তােমাকে পড়তে দিলুম ; সমস্তটা পড়তে হবে না, কেবল দাগ-দেওয়া অংশটা পড়লেই হবে।” লক্ষ্মী একনিশ্বাসে পড়িয়া যাইতে লাগিল-“নিজেদের সমাজের দিকে চাহিলে চোখের জল ধরিয়া রাখা দায় হইয়া এই সেদিন জনৈক দেশী খৃষ্টা-মহিলার সহিত আলাপ হইল। ইনি শুধু যে খৃষ্টান্ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়াছেন তাহা নয়, নিজে একজন ধর্মপ্রচারক বলিলেও অত্যুক্তি হয় উঠে।
১১৯
ঘরে ডাক
=
। নাম করিব না; তার সহিত একদিনের আলাপেই
স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম, সমাজ যদি তাকে ফিরাইয়া লয়,
তাহা হইলে এখুনি তিনি ফিরিয়া আসিতে রাজী আছেন,
কিন্তু হায়রে, এমনি আমাদের সমাজ।”
খবরের কাগজটা ছুড়িয়া দূরে ফেলিয়া দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া
উঠিল, “আমাকে পড়তে দেবার অর্থ ?”
পােড়া সিগারেটটাকে জানালা গলাইয়া বাহিরে ফেলিয়া
দিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “অর্থ তুমি নিজেই খুঁজে নাও না
লুসী!”
লক্ষ্মীর মুখখানা লাল হইয়া উঠিল। চেয়ার ছাড়িয়া
উঠিয়া দাড়াইয়া সে বলিয়া উঠিল, “খবরের কাগজে মিথ্যে
মিথ্যে মানুষকে অপদস্থ করবার ক্ষমতা শুধু পুরুষদেরই
নেই মিঃ হােয়াইটু-মেয়েদেরও আছে। আমিও, সহজে
ছাড়ছি না।”
একটু হাসিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “এ যে তােমার
অন্যায় কথা লুসী। তুমি বলতে পার, আর তিনি লিখতে
পারেন না। তুমি হয়ত বলবে, আমি বলেছি তার কাছে
চুপিচুপি, তিনি সে কথা সংবাদপত্রে ছাপাতে গেলেন কি
করূতে। কিন্তু সে কথাও বলবার জো নেই,—তিনি তােমার
নাম প্রকাশ করেন নি।”
ঘরের ডাক
অত্যন্ত বিরক্তভাবে লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “আমি তার
কানে ধরে ওকথা বলতে গেছলুম, নয়?” তার গলার স্বর
কঁপিতেছিল।
একটু থতমত খাইয়া রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “সে
অবশ্য আলাদা কথা। তুমি যদি কিছু না বলে থাক তাহলে
ত কোন কথাই ওঠে না।”
সে কথার কোন জবাব না দিয়াই লক্ষ্মী ফুলিতে ফুলিতে
ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
দুপুরবেলা তার মা হঠাৎ একমুখ হাসি লইয়া লক্ষ্মীর
কক্ষে প্রবেশ করিয়াই বলিয়া উঠিল, “যা শুনছি, তা সত্যি
নাকি রে লক্ষ্মী ?”
লক্ষ্মী কি একখানা বই পড়িতেছিল,-মুখ না তুলিয়াই
বলিল, “কিসের কি শুছ ?”
“ঐ যে ওদের ভােরা বছিল, এখানে কে একজন
জমিদারের ছেলে তােকে নাকি বিয়ে করবে বলেছে।”
চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইয়া লক্ষ্মী হঠাৎ চীৎকার
করিয়া উঠিল, “তােমরা সবাই মিলে আমাকে পাগল করে
দেবে নাকি মা ?”
অত্যন্ত ত্রস্তভাবে লক্ষ্মীর মা বলিয়া উঠিল, “কেন, কি
হয়েছে রে লক্ষ্মী ?”
বরের ডাক
লক্ষ্মী কোন কথা বলিল না—চেয়ারের উপর বসিয়া
পড়িয়া টেবিলের উপর মাথা রাখিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া দিতে
লাগিল।
রাত্রে শয্যায় শুইয়া লক্ষ্মী ভাবিতে লাগিল, সে যেরূপে
হউক দেখাইবে যে, ঐ সঙ্কীর্ণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু-সমাজটার
জন্য সে এতটুকুও লালায়িত নয়,-সে উক্ত সমাজকে মনে
মনে যথেষ্ট ঘৃণা করে এবং এই সমাজের প্রত্যেক লােককে
সে অপদার্থ বলিয়া জানে।
পরদিন সকালে শয্যা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া, লক্ষ্মী হঠাৎ
রেভারেণ্ডের ঘরে প্রবেশ করিয়া বলিল, “দেখুন, আমার
ইচ্ছে, আজকে আপনাদের যে সভা হবে, তাতে আমিও কিছু
বলি।”
অবাক হইয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া রেভারেণ্ড
বলিলেন, “ঐ নমঃশূদ্রদের মাঝখানে ?”
হ। কেন, তাতে কি হয়েছে?”
“না, হবে না কিছু, তবে কিনা ছােটদের ভিড়ের
মাঝখানে তােমার কষ্ট হবে—এইজন্যে বলছি।”
“না না, আমার তাতে কিছু এসে যাবে না রেভারেণ্ড !”
অবাক হইয়া রেভারেণ্ড তার মুখের পানে চাহিয়া
রহিলেন
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে বাড়ী ফিরিয়া নলিনী নন্দরাণীকে ডাকিয়া
বলিল, “সেই যে সেদিন তােমাকে একজন দিশী খৃষ্টান্-মেয়ের
কথা বলিনি ছােট-মা ?সে আজ এমনি সুন্দর বক্তৃতা
দিলে।”
“কি বলে ?”
• “সে যা বল্লে, সবই আমাদের সমাজকে গাল দিয়ে, কিন্তু
তার মধ্যে এমনি সব যুক্তি-তর্ক আছে, যা সহজে মানুষের
মাথায় আসে না। বলিহারি মাথা ছােট না। আমার সঙ্গে
তার মতের মিল এক জায়গায়ও নেই, কিন্তু তবু আমার বড়
ভাল লাগলো। সে যা কিছু বল্লে, তার একবিন্দুও তার
মনের কথা নন, কিন্তু নিজের মনকেও যে মানুষ এত সুন্দর
করে ঠকাতে পারে, তা আমার ধারণাতেই ছিল না,
ছােট-মা।”
কথাটা নন্দরাণীর আদবেই ভাল লাগিল না। পে
কিঞ্চিৎ বিরক্ত হইয়া বলিল, “তােমার ঐ এক কথা নলিন ;
সে বেচারা হয়ত তার মনের কথাই বলেছে, তােমার মতের
সঙ্গে মেলেনি বলেই সেটা আন্তরিক নয় ?
১২৩
ঘরের ডাক
নলিনী বুঝিল, সে না বুঝিয়া হঠাৎ নন্দরাণীর ব্যথার
জায়গাটিতে ঘা দিয়া ফেলিয়াছে। নন্দরাণীও যে ঐ খৃষ্টানী
মেয়েটির মত করিয়াই আজ পর্যন্ত নিজেকে ঠকাইয়াই
আসিয়াছে। একটু থতমত খাইয়া নলিনী বলিল, “কে
জানে, হয়ত আমার ভুল হয়েছে । কিন্তু সেদিন মেয়েটি
আমার সঙ্গে যে-সব কথা কইলে, তা থেকে ত মনে হয়,
সে আমাদের সমাজকে যথেষ্ট ভালবাসে।”
নন্দরাণী ফেস্ করিয়া উঠিল, “ভালই যদি বাসে, তবে
গাল দিতে যাবে কেন শুনি!”
কি বলিতে গিয়া নলিনী হঠাৎ থামিয়া গেল এবং
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “মানুষের জীবনে কি
নতুন,
ছােট-মা ?”
নলিনী যে কথাটা বলিতে গিয়াও বলিয়া উঠিতে পালি
, সে কথাটা যে কি, নন্দরাণীর তাহা বুঝিয়া লইতে
একটুও দেরী হইল না।
সেদিন রাত্রে শয্যায় শুইয়া নলিনীর বুকের মধ্যে লক্ষ্মীর
কথাই ঘুরিয়া ফিরিয়া বাজিতে লাগিল। আজ এই যে
লক্ষ্মী হিন্দুসমাজকে এমন ভয়ানক ভাবে আক্রমণ করিল,
ইহার জন্য সে দুঃখিত হইয়াছিল যথেষ্ট ;-হিন্দুসমাজের জন্য
নয়—লক্ষ্মীর জন্য। লক্ষ্মীর সমস্ত বক্তৃতার মধ্যে সে স্পষ্ট
এমন ঘটনা
ঘরের ডাক
১২৪
দেখিতে পাইতেছিল, তার অন্তরের ব্যথা-মূর্তিটিকে। এ যেন
শুধু কেবল অভিমান আর অভিমান।
লক্ষ্মী মনে করিয়াছিল তার এই বক্তৃতার বিষ নলিনীকে
সারারাত জ্বালাইয়া পােড়াইয়া একেবারে অতিষ্ঠ করিয়া
তুলিবে এবং যতই সে এ কথা ভাবিতেছিল, ততই তার
মন আনন্দে নাচিয়া নাচিয়া উঠিতেছিল। কিন্তু সে জানিত
, এই অদ্ভুত হাড়জালানে লােকটি আরও বেশী করিয়া
তাহাকে নিতান্ত বেচারী বলিয়া মনে মনে দয়া প্রকাশ
করিতেছে।
অনেক রাত পর্যন্ত নলিনী ঘুমাইতে পারিল না।
মনে হইতে লাগিল, “এই যে মেয়েটি আজ এত সব কড়া
কথা বলিল, এ সমস্তই তাহাকেই উদ্দেশ করিয়া। তার
মনে হইতে লাগিল, তাহার নিকট হইতে এই মেয়েটি
অনেকখানি আশা করে বলিয়াই এত কথা বলিল এবং
ইহার দ্বারা এই মেয়েটি তাহাকে জানাইতে চায় যে, সে তার
উপর অনেকখানি দাবী রাখে।”
আজ কদিন হইল করাচি হইতে একটি মিশনারীদের
মেয়ে এখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। বয়স তার
তিরিশের ভিতর। চেহারাটি বেশ সুন্দর এবং বক্তটাও
বিলাতী। এই মেয়েটির সহিত লক্ষ্মীর খুব আলাপ হইয়া
গিয়াছিল।
আজ সন্ধ্যার সময় লক্ষ্মী বেড়াইতে যায় নাই, আপনার
কক্ষে বাতি জ্বলিয়া টেবিলের ধারে বসিয়া কি একখানা
বই পড়িতেছিল। এমন সময়ে মেরী বেড়াইয়া ফিরিল।
মাথার টুপি এবং হাতের ঝােলান ব্যাগটা টেবিলের উপর
রাখিয়াই সে বলিল, “আজ সন্ধ্যাটা বড় সুন্দরভাবে
কেটেছে লুসী !”
বই হইতে মুখ তুলিয়া লক্ষ্মী বলিল, “অর্থাৎ?”
একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া তাহার উপর বসিয়া পড়িয়া
মেরী বলিল, “একজন ভারী চমৎকার লােকের সঙ্গে আজ
আলাপ হয়ে গেল।”
কেন কে জানে, লক্ষ্মীর মনে হইল, এই চমৎকার
লােকটি নলিনীকান্ত ছাড়া আর কেউ নয়। এই চতুর
ঘরের ডাক
লােকটি তাহাকেও অভিভূত করিয়া ফেলিবার জন্য নিশ্চয়ই
মােহ-জাল বিস্তার করিয়াছে। মুহূৰ্ত্তমধ্যে তার মনটা
কেমন যেন ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল।—মুখে সে বলিল, “কে
সে ভাগ্যবান্ পুরুষ শুনি !”
“নামটা আমার ঠিক মনে পড়ছে না—তিনি এই
গ্রামেরই জমিদারের ছেলে। কিন্তু এনি সাদাসিধে যে,
চোখে দেখে তা আদবেই ধরার জো নেই।”
কথাটাকে নেহাতই যেন উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিয়া
লক্ষ্মী অত্যন্ত সাধারণভাবে একটু হাসিয়া বলিল, “ওঃ-~-
তুমিনলিনীকান্তবাবুর কথা বলুছ ?”--তার পর একটু
থামিষ বলি, “হ্যা, লােক নেহাৎ মন্দ নয়।”
একটু বিরক্ত হইয়া মেরী বলিল, “কেবল ‘মন লােক
নয় বল্লেই বােধ হয় তার সঠিক পরিচয় দেওয়া হয় না
লুসী!
হাসিবার চেষ্টা করিয়া লক্ষ্মী বলিল, “তবে কি তাকে
মহাত্মা বতে হবে না কি ?”
*কি ঠিক বল্তে হবে তা আমি এখন পর্যন্ত ভেবে
দেখিনি। তবে সে রকম লােক যে বড় একটা মানুষের
চোখে পড়ে না—এ কথা খুব জোর করেই বলতে
পারি।”
এ'
১২৭
ঘরের ডাক
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমি ত আর তােমার
মতন জহুরী নই বাে যে, এক মিনিটে রত্ন চিনে ফেল্ব।”
একটু যেন আশ্চর্য্য হইয়া গিয়া মেরী বলিল, “নলিনী-
বাবুর সুখ্যাতি তােমার এত খারাপ লাগে কেন লুসী ?
একটা কাষ্ঠহাসি হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “খারাপ লাগে ?
কেন, তিনি আমার কি করেছেন ?—আমিও ত তাকে
সুখ্যাতিই কছি মেরী ; তা বলে যাকে-তাকে মহাত্মা
বলতে ত আর পারি না। কথাটা শেষ করিয়া লক্ষ্মী
অত্যন্ত হাল্কাভাবে জোর করিয়া টানিয়া একটু হাসিল। •
একটু বিরক্ত হইয়া মেরী বলিল, “নলিনী-বাবুকে বােধ
হয় তােমার ঐ যার-তার মধ্যে না ধরলেই ভাল হয় লুসী !”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমার ত মনে হয় সাধারণ
লােকের সঙ্গে তাঁর বেশী কিছু পার্থক্য নেই; তবে কিনা,
আগেই ত বলেছি, তােমরা হচ্ছ জহুরী লােক, হয়ত রত্ন
এবং কাচের পার্থক্য আমাদের চেয়ে তােমাদের চোখেই
পড়ে বেশী।” কথাটা লক্ষ্মী খুব ঠেস্ মারিয়া বলিল।
অত্যন্ত গম্ভীরভাবে মেরী বলিল, “জহুরী বা রত্নের কথা,
হচ্ছে না লুসী! আসল কথা তুমি তাকে ঠিক চিনতে পার
নি। অথবা তিনি তােমার কাছে কোনদিন নিজেকে ঠিক
ধরা দেন নি *
১৮
ঠিক এই সময় সেই কক্ষে মিসেস্ ওই আসিয়া প্রবেশ
করিলেন। প্রসঙ্গটাও মাঝখানে হঠাৎ চাপা পড়িয়া গিয়া
থামিয়া গেল।
মেরীর মুখে নলিনীর এই প্রশংসা লক্ষ্মীর একটুও
ভাল লাগে নাই। বিশেষ সে যখন বলিল, নলিনীকে সে
ঠিক চিনিতে পারে নাই এবং নলিনীও তার কাছে আপনাকে
ঠিক ধরা দেয় নাই, তখন তার সমস্ত মনটা একেবারে বিষাক্ত
হইয়া উঠিয়াছিল। এই কটা-চামড়া মেয়েটি মনে করিয়াছে
নলিনীকে সে-ই কেবল যা চিনিয়াছে—আর কেউ চিনিতে
পারে নাই। কিন্তু সে যখন এ অঞ্চলেও আসে নাই, তখন
এই নলিনীকান্তকে সেই ত প্রথম আবিষ্কার করিয়াছিল,
সেই ত প্রথম তার সত্যপ্রিয়তার প্রশংসা করিয়াছিল। আজ
মেরী. যে তার মুখের উপর বলিয়া গেল, নলিনীকে সে
চিনিতে পারে নাই, এর বিষটা লক্ষ্মীর সমস্ত শরীরের মধ্যে
বেন চনচন্ করিয়া ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিল। কে জানে,
কেন তার মনে হইতে লাগিল নলিনীর প্রশংসা মেরীর পক্ষে
নেহাতই অনধিকার-চৰ্চ্চা। কিন্তু নলিনী নিজেই যদি তাকে
এ অধিকার দিয়া থাকে। এই যে প্রশংসা, এ প্রশংসা যদি
দুতফা হয়। তার মনে হইতে লাগিল, নলিনী নিশ্চয়ই তার
ছােট-মার কাছে এই অপরিচিতা মেয়েটির সম্বন্ধে কত কথাই
১২৯
ঘরের ডাক
বলিতেছে ;—হয়ত বলিতেছে—এমন মেয়ে সে আর
কখন জীবনে দেখে নাই, হয়ত বলিতেছে-এর কাছে লুসী
দাড়াইতেই পারে না, তাকে লক্ষ্য করিয়া নিশ্চয়ই বলিতেছে,
তাকে দেখিলে দয়া হয়, কেন না সে দয়ার পাত্রী, কেন না
অদৃষ্ট তাহাকে অশেষ প্রকার বিড়ম্বনায় বিড়ম্বিত করিয়াছে
এবং জীবনটা তার নেহাতই শােচনীয়। কিন্তু এই যে নূতন
মেয়েটি একে দেখিলে মনের মধ্যে শ্রদ্ধা জাগিয়া উঠে,
মাথা আপনি নত হইয়া যায়। হয়ত এই কথার সহিত সেই
অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীটিও সায় দিতেছে। লক্ষ্মীর
দম্ ফাটিয়া কান্না আসিতে লাগিল।
ইহার কিছুদিন পর একদিন বৈকালে লক্ষ্মী গ্রামের মেটে
পথ ধরিয়া ষ্টেশনের দিকে বেড়াইতে যাইতেছিল, হঠাৎ
একটা মােড় বাঁকিয়াই দেখে, নলিনী এবং মেরী অত্যন্ত
নিবিষ্টভাবে গল্প করিতে করিতে তাহার দিকে
আসিতেছে।
দূর হইতে তাকে দেখিতে পাইয়া মেরী বলিয়া উঠিল,
“কি আশ্চর্য! ঠিক তােমার কথাই হচ্ছিল আর তুমি
সশরীরে এসে হাজির—আচ্ছা মজা ত?”
একটু আশ্চৰ্য্য হইয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমার কথা ?”
সমুখের দিকে অগ্রসর হইয়া নমস্কার করিয়া নলিনী
ঘরের এক
১৩০
বলিল, “কেন, আপনার কথা হওয়াটা কি খুব একটা অদ্ভুত
ব্যাপার নাকি, মিস্ লুসী ?*
হাসিবার চেষ্টা করিয়া লক্ষ্মী বলিল, “কতকটা অদ্ভুত
বৈকি!—আমি মহাত্মাও নই, ক্ষণজন্মাও নই—সাধারণ
একবারে অতি সাধারণ মানুষ।”
অবাক হইয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া নলিনী বলিল,
“এর অর্থ ত কিছুই বুঝলুম না মিস্ লুসী! মহাত্মা এবং
ক্ষণজন্মা পুরুষ ছাড়া কারুর কথা মানুষ কি বলে না ?”
লক্ষ্মী এ কথার কি একটা জবাব দিতে যাইতেছিল,
হঠাৎ বাধা দিয়া মেরী বলিয়া উঠিল, “নাও, তােমাদের কথা-
কাটাকাটি এখন রাখ দেখি।” তারপর লক্ষ্মীর দিকে
চাহিয়া বলিল, “কত দূর যাচ্ছ বল দেখি আগে ?” মেরী
বুঝিতে পারিয়াছিল, লক্ষ্মীর প্রত্যেকটি কথার মধ্যে কতখানি
টিটকারি লুকাইয়া রহিয়াছে, তাই সে এই সকল কথাবার্তাকে
আর অধিক দূর অগ্রসর হইতে দিতে সাহস করিল না ;
কে জানে, কেঁচো খুড়িতে খুড়িতে কখন হঠাৎ সাপ বাহির
হইয়া পড়িবে।
কি বুঝিয়া নলিনীও হঠাৎ কথার স্রোত অন্যদিকে
ফিরাইয়া লইল-বলিল, “শুনছিলুম, এখানে এসে অবধি
আপনার প্রায়ই জ্বর হয়, অথচ আপনি অনাচার করূতেও
ঘরের এক ছাড়েন না, এ ভারী অন্যায় কিন্তু, একটা ওষুধ-টোষুধ ব্যবহার করেন না কেন?” একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আপনি দেখছি আমার খোঁজখবরও মাঝে মাঝে রাখেন।*কথাটা বলিয়া ফেলিয়াই লক্ষ্মী মনে মনে হঠাৎ ভয়ানক রকম সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল ; তার মনে হইতে লাগিল, তার ভিতরের অনেক কথাই ঐ একটি মাত্র কথার ছিদ্র দিয়া গলিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছে। কথাটার মধ্যে যে অভিমানের সুরটুকু বাজিতেছিল, তাহা এতই সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল যে, মেরী এবং নলিনীর কাছে তাহা ধরা পড়িয়া যাইতে একটুও বিলম্ব হইল না। তাহারা বেশ বুঝিতে পারিল—এই কথার মধ্যে বেশ একটি প্রচ্ছন্ন অভিমান লুকাইয়া রহিয়াছে। কেবল এই অভিমানের কারণটা তাহারা কেউ নিরূপণ করিতে পারিল না। নলিনী বলিল, “কেন, আপনার খোঁজখবর কি আমি রাখি না মনে করেন,—-মিস মেরীকে বরং জিজ্ঞাসা করে দেখুন- বাধা দিয়া একটা কাষ্ঠহাসি হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আমি ঠাট্টা কছিলুম মাত্র ; আপনি বুঝি মনে করলেন আমি সত্যি সত্যি বলছি।
ঘরের ডাক
কথাটাকে একেবারে শূন্যে উড়াইয়া দিয়া মেরী বলিল,
“তুমি এখন যাচ্ছ কোথায় বল দেখি ?”
ষ্টেশনের দিকে।”
“কেন, কাজ আছে নাকি?”
“না, তেমন বিশেষ কিছু না।”
নলিনী বলিল, “তবে আসুন না নদীর দিকে একটু
বেড়িয়ে আসি।”
হঠাৎ কি ভাবিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “না, আপনারা
বান--আমাকে ষ্টেশনের দিকে একবার যেতে হবে। এবং
উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই ষ্টেশনের পথ ধরিয়া চলিতে
আবৃন্ত করিল।
লক্ষ্মী ষ্টেশনের দিকে গেল না, এদিক ওদিক্ ঘুরিয়া
একটু পরেই বাড়ী ফিরিয়া আসিল এবং সন্ধ্যার অন্ধকারে
নির্জন কক্ষে বাতি নিবাইয়া দিয়া চুপ করিয়া একটা ইজি-
চেয়ারের উপর পড়িয়া রহিল। তার মনে হইতে লাগিল,
সমস্ত জীবন ধরিয়া সে যাহাকে চাহিতেছিল এবং আর-একটু
হইলেই যাহাকে পাইত, হঠাৎ কোথা হইতে কে আসিয়া যেন
তার সেই চির-ঈপ্সিত জিনিষটিকে এক নিমিষে চুরি করিয়া
লইয়া গিয়াছে—পড়িয়া রহিয়াছে কেবল তাহারই বুকভাঙ্গা
অবসাদ। কিন্তু সে ত কোনদিনই নলিনীকে চায় নাই এবং
ঘরের ডাক
|
তাকে পাইবার জন্য কোন দিনও ত তার মন এতটুকুও
লালায়িত হইয়া উঠে নাই,তবে আজ হারাইবার সম্ভাবনায়
তার মন এমন করিয়া আকুল হইয়া উঠিতেছে কেন?
হঠাৎ কি ভাবিয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া লক্ষ্মী বাতি
জ্বলিল, তার পর কি ভাবিয়া কালিকলম লইয়া চিঠি লিখিতে
বসিল।—চিঠি যাহাকে লিখিল, সে চিদম্বরম। সে শিথিল
*এসে অবধি কাজের ঝঞ্চাটে আপনাকে একটিও পত্র
দিতে পারি নি, সেজন্য বিশেষ লজ্জিত আছি। আপনার
উপর বারবার যে-সব অত্যাচার করেছি, সেই সব কথা মনে
করে আজ এই সুদূর বিদেশে আপনার জন্যে আমার প্রাণ
কেঁদে কেঁদে উঠছে,—মনে হচ্ছে, ছুটে গিয়ে পায়ে ধরে ক্ষমা
চেয়ে আসি। এবার দেশে গিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে
বদলে ফেব। এতদিনে বুঝতে পেরেছি, আপনি ছাড়া
আমার আপনার বলতে আর দুনিয়ায় কেউ নেই
ইত্যাদি ইত্যাদি।
চিঠি লেখা শেষ করিয়া সে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া
রহিল, তার পর কি ভাবিয়া চিঠিখানাকে টুকরা টুকরা
করিয়া ছিড়িয়া জানালা গলাইয়া পাশের বাগানে ফেলিয়া
এবং তার পর বাতিটাকে ফু দিয়া নিবাইয়া দিয়া আবার
অন্ধকারে ইজিচেয়ারের উপর গিয়া শুইয়া পড়িল।
১৭
ইহার দু-চারদিন পর একদিন প্রাতঃকালে লক্ষ্মী টেবিলের
ধারে বসিয়া একখানা খবরের কাগজ পড়িতেছিল, এমন
সময় কোথা হইতে একরাশ বুনাে ফুল লইয়া ফেলী আসিয়া
উপস্থিত হইল।
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “ভাের-বেলা উঠে কোথায়
গেছলি রে ফেলী ?—এই বুনো ফুল তুলতে বুঝি ?—আচ্ছা
পাগলী ত তুই!”
অত্যন্ত গম্ভীরভাবে ফেলী বলিল, “শুধু ফুল তুলতে
গেছলুম বুঝি,-কত কাজ করে এলুম তা ত আর জান
གi ༣༧
ধীরে ধীরে তার পিঠ চাপড়াইয়া লক্ষ্মী বলিল, “কি
রাজ-কাৰ্যটা করে এলি শুনি?”
অত্যন্ত গম্ভীরভাবে ফেলী বলিল, “সে কত কাজ।
পরেশ ধােপার ছেলের জন্যে ইষ্টিশানের কাছ থেকে ওষুধ
কিনে এনে দিলুম,-ছুতােরদের লাটুর জন্যে” এই অবধি
বলিয়াই হঠাৎ মধ্য-পথে থামিয়া গিয়া সে বলিয়া উঠিল,
“মেরী-বিবি খুব ভাল মেয়ে লক্ষ্মী-দিদি। নলিনী-বাবু আর
ঘরের ডাক
মেরী-বিবি লাটুকে যে ক'রে বাঁচিয়েছে, সে মা-গঙ্গাই
জানেন।
হঠাৎ যেন চকাইয়া উঠিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “মেরীর
সঙ্গে নলিনী বাবুর খুব ভাব হয়ে গেছে, নয় রে
ফেলী ?”
=
=
হাত মুখ নাড়িয়া ফেলী বলিতে লাগিল, “ও বাবা,
তা আবার হয় নি,—দুজনে রাতদিন একসঙ্গে থাকে ;
আমাকেও নলিনীবাবু -”
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “রাতদিন একসঙ্গে থেকে
দুজনে কি করে রে ফেলী ?”
চোখ দুটোকে যতদূর সম্ভব বিস্ফারিত করিয়া, গালে হাত
দিয়া অবাক্ হইয়া ফেলী বলিল, “ওমা!—তুমি বুঝি কিছু
জান না!—অবাক করলে তুমি লক্ষ্মী-দিদি !-নলিনী-বাবু
যে একটা ছােট হাস্পাতাল খুলেছে ; সেইখানেই ত দুজনে
রাতদিন থাকে ;—আমিও ত সেইখানে-
লক্ষ্মী সহসা ঘর ছাড়িয়া উঠিয়া বাগানে গিয়া পায়চারি
করিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিল। তার মনে হইতে লাগিল,
এই যে, ছায়ার মত, সহকারীর মত, বন্ধুর মত, আত্মীয়ের
মত মেরী নলিনীর সুখ-দুঃখের সহিত ক্রমেই নিজেকে
জড়াইয়া ফেলিতেছে, এ সৌভাগ্যটা একদিন তারই প্রাপ্য
ঘরের ডাক
ছিল। সে চেষ্টা করিলেই এ সৌভাগ্যটা অনায়াসে লাভ
করিতে পারিত; কিন্তু তখন ইহার জন্য একটুও চেষ্টা করে
নাই;—মনে করিয়াছিল, হাতের কাছে যে জিনিষ রহিয়াছে,
যেদিন ইচ্ছা হাত বাড়াইয়া তাহাকে তুলিয়া লইলেই চলিবে,
তার জন্য তাড়াতাড়ির কোন দরকার সে বােধ করে নাই।
কিন্তু যাহাকে অনায়াসে পাওয়া যায়, হারাইবার সময় নে
তাহাকে অনায়াসে হারানও যাইতে পারে, এ সত্যটা তখন
তার মাথার মধ্যে আসে নাই।
ফেলীর কথা শুনিয়া আজ তার মনে হইতে লাগিল,
অল্প অল্প করিয়া যে জিনিষটিকে সে তৈরি করিয়া তুলিল,
একদিন হঠাৎ কোথা হইতে কে আসিয়া তার সেই অনেক
যত্নে-তৈরি-করা জিনিষটিকে নিজের বলিয়া দাবী করিয়া
বসিল এবং তাহাকে দূরে ঠেলিয়া ব্রাখিল। কেন সে
একবারও চেষ্টা করে নাই, কেন সে পাইয়াও এমন করিয়া
স্বেচ্ছায় হারাইল,এখন যে আর কোন উপায় নাই।
একবার মনে হইল, মান-অভিমান দূরে ফেলিয়া রাখিয়া
নলিনীর কাছে ছুটিয়া গিয়া বলে, “আমাকেও তােমার ব্রতে
দীক্ষিত করে নাও।” কিন্তু না না, তা হইতেই পারে না!
নলিনী ফেলীকে পর্যন্ত টানিয়া লইল, কিন্তু তাকে একবার
এসম্বন্ধে কোন কথা বলাই প্রয়ােজন বােধ করিল না। তার
১৩৭
ঘরের ডাক
পর, যেখানে সে জোরের উপর গিয়া একদিন দাড়াইতে
পরিত, সেখানে আজ মেরীর
লক্ষ্মীর কান্না আসিতে লাগিল ; তার মনে হইতে লাগিল,
তার এই খাপছাড়া বিড়ম্বনাময় জীবনের একটি জায়গায়
সে অতিকষ্টে অতি সন্তর্পণে যে শান্তিময় একটি বাসা
বাঁধিয়াছিল, একদিনের একটি মাত্র ঝঞ্চাবাতে তার সেই
বড় সাধের বাটি কোথায় উড়িয়া চলিয়া গেল, পড়িয়া
রহিল কেবল তাহারই দু-একটা অবশিষ্ট খড়-কুটে।
১৮
নলিনী যে লক্ষ্মীকে ভুলিয়া গিয়াছিল, ঠিক তা নয়। সে
যখন প্রথম এই ছােট হাসপাতালখানি খুলিবার সঙ্কল্প করে,
তখন হইতেই সে মনে মনে ঠিক করিয়াছিল লক্ষ্মীকে ইহার
কথা জানাইবে এবং সে যাহাতে এই দেশহিতকর কাৰ্য্যে
তাক সহায়তা করে, তার জন্য তাহাকে বুঝাইয়া বলিবে ।
কেন না, স্ত্রীলােক-রােগীদের জন্য তার সহায়তা একান্তই
প্রয়ােজনীয় হইয়া উঠিয়াছিল।
যখনকার কথা বলিতেছি, তখন পর্যন্ত মেরী আসে
নাই।. নলিনী মনে করিয়াছিল, প্রস্তাব করা মাত্রই লক্ষ্মী
আগ্রহসহকারে তার সহায়তার জন্য ছুটিয়া আসিবে। ঠিক
এমনটি আশা করা নলিনীর পক্ষে খুব অসঙ্গত হয় নাই।
কেন না, এটা সে বেশ বুঝিতে পারিয়াছিল যে, লক্ষ্মী মুখে
যাই বলুক না কেন, হিন্দুসমাজকে সে প্রাণের সহিত ভালবাসে
এবং এই সমাজের দুর্ভেদ্য বৃহটার মধ্যে প্রবেশের দ্বার
খুঁজিয়া পায় নাই বলিয়াই সে এতদিন বাহিরে বাহিরে ঘুরিয়া
মরিতেছে। তাই সে আশা করিয়াছিল, সমাজ-সেবার জন্য
ঘরের ডাক
এই যে আহ্বান, এ আহ্বান শুনিয়া, সে স্থির থাকিতে
পারিবে না—নিশ্চয়ই ছুটিয়া আসিবে। এমনি একটা
অখও বিশ্বাস লইয়া সে লক্ষ্মীর সহিত তাদের বাড়ীতে এক
দিন দেখা করিবার জন্য গিয়াছিল। লক্ষ্মী তখন বাড়ীতে
ছিল না। সে ফিরিতেছিল, এমন সময় মিঃ গুই এবং
রেভারেণ্ড হােয়াইট তাকে ডাকিয়া বলিল, “দেখুন,
আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, এমন করে যখন তখন
নির্লজ্জের মত লুসীর সঙ্গে গােপনে সাক্ষাৎ কতে আসবেন
; জানেন, এর জন্যে বেচারাকে তার মার কাছ থেকে কি
ভয়ানক লাঞ্ছনা এবং অপমান সহ্য করতে হয় !”
বলা বাহুল্য, এর এক বিন্দুও সত্য নয়। কিন্তু নলিনীর
পক্ষে এ জিনিষটাকে সত্য বলিয়া ধরিয়া লইতে একটুও বাধা
ছিল না এবং সেই হইতে সে মনে মনে সঙ্কল্প করি, আর
কখন সে লক্ষ্মীর ছায়া পৰ্যন্ত মাড়াইবে না, এমন কি, তার
সম্বন্ধে মনে মনেও কোন দিন চিন্তা করিবে না। সে নিজের
মনটাকে তােলপাড় করিয়া তন্ন তন্ন করিয়া খুজিতে লাগিল,
কোথাও একটুও গলদ জমা হইয়া উঠিয়াছে কি না--না,
কোথাও ত কিছু নাই—কিন্তু লক্ষ্মীর মনের মধ্যে কি
হইয়াছে তা কে জানে! হয়ত কিছু হইয়াছে, হয়ত কোথাও
একটা কিছু গজাইয়া উঠিবার উপক্রম করিতেছিল এবং
ঘরের ডাক
১৪০
তার মার চক্ষে সেটা ধরা পড়িয়াংগিয়াছে, তাই তিনি চটি
গিয়াছেন। না না !-সে তফাতে থাকিবে, এমন করিয়া
নিজেকে অপরাধী করিয়া তুলিবে না।
লক্ষ্মী কিন্তু ভাবিয়াছিল অন্যরূপ ;–কেন না, সে এসকল
ব্যাপারের বিন্দুবিসর্গও জানি না। সে মনে করিয়াছিল,
সেদিন হিন্দুসমাজের বিরুদ্ধে সে যে বক্তৃতা দিয়াছিল, তাহারই
জন্য নলিনী তার উপর চটিয়া গিয়াছে এবং তার আশা ত্যাগ
করিছ। অবশ্য এইটাকেই সে আসল কারণ বলিয়া ধরিয়া
লয় নাই। কারণ, এটা সে স্পষ্ট জানিত যে, এই অসহ্য
প্রত্যাখ্যানের আসল কারণটা প্রচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে এই
নবাগতা শ্বেতাঙ্গ যুবতীটির রূপযৌবনের মধ্যে।
রূপ আছে, যৌবন আছে এবং তাহার উপর মানুষের মন
অধিকার করিবার অনেক কৌশলই তার জানা আছে।
এই যে সে এমন করিয়া উঠিয়া-পড়িয়া সমাজসেবায় নিজেকে
নিয়ােজিত করিয়া দিয়াছে---ইহা কি আন্তরিক ? না না,
তা হইতেই পারে না—এ কেবল নলিনীর চিত্ত অধিকার
করিবার ছল মাত্র।
সেদিন সকালবেলা রেভারেণ্ড হােয়াইট আপনার কক্ষে
একটা বেতের চেয়ারে বসিয়া খবরের কাগজ পড়িতেছিলেন।
এমন সময় লক্ষ্মী গিয়া একথা-সেকথার পর বলিল,
“আপনাকে আজ কদিন থেকে একটা কথা বব বন্ধ
মনে করছি, কিন্তু এ পর্যন্ত আর বলা হয়ে ওঠে নিমেরী
দিন দিন বড় বাড়িয়ে তুলছে।”
অত্যন্ত উৎকণ্ঠিতভাবে রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন,
“কেন, কি হয়েছে লুসী ?”
“সে নলিনী-বাবুর সঙ্গে অতিরিক্ত বুকম মিশতে আরও
করেছে।”
মুখখানাকে ভার করিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “হুঁ, সেটা
আজ কদিন থেকে লক্ষ্য কছি বটে।”
একটু আমতা-আম্ করিয়া লক্ষ্মী বলিল, “আর
তাছাড়া নলিনী-বাবুর সঙ্গে তার সম্পর্কটা দিন দিন যে-রকম
হয়ে আসছে—তাকে আর ঠিক বন্ধুত্ব বলা চলে না।”
অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিয়া রেভারেণ্ড বলিয়"
উঠিলেন, “ডােরাও সেদিন আমাকে ঠিক ঐ কথাই বলছিল
ঘরের ডাক
১৪২
বটে।
এমন জালে কে ওকে এখানে আসতে লিখৃত!-
'আমি আজই ওর বাপকে চিঠি লিখে দিচ্ছি-না না, এ সব
আস্কারা দেওয়া কখনই উচিত নয়। ডােরাও কাল আমাকে
ঠিক ঐ কথাই বলেছিল--আমি তার কথা তখন বিশ্বাসই
করিনি--আর বিশ্বাসই বা করি কি করে ?—যাক্, আমি
আজই এর একটা যাহােক্ ব্যবস্থা কছি।”
লক্ষ্মী আবার বলিল, “সে আজকাল যে-রকম বাড়াবাড়ি
কৰুেতুলেছে—কোন্ দিন, না শুতে হয় সে হিন্দু হয়ে
গেছে।”
“আশ্চৰ্য্য কি।” বলিয়া রেভারেণ্ড অত্যন্ত অস্থিরভাবে
ঘরময় পাচারি করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। তার পর কিছু
ক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিতে লাগিলেন, “তা হলে
আমাদের মুখ দেখাবার আর জাগা থাকবে না। কি
কুক্ষণেই ওকে আতে লিখেছিলুম!তখন কে জান্ততা ও
এমনধারা কেলেঙ্কারী করে ববে ? না না! আমাকে এর
একটা ব্যবস্থা করতেই হচ্ছে দেছি; আর ঐ ছােরাটিকেও
একটু শিক্ষা দিয়ে দিতে হচ্ছে-বড় বাড়িয়ে তুলেছে!”
সেই দিনই বৈকালে মেরীকে ডাকিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন,
“তােমার নামে অনেক কথা শুনতে পাচ্ছি মেরী—আমার
ইচ্ছে নয় তুমি আর এখানে থাক।”
১৪৩ ঘরের ডাক অত্যন্ত বিরক্তভাবে মেরী বলিয়া উঠিল, “অপরাধ।” ব্লগে জ্বলিয়া উঠিয়া রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “অপরাধ যথেষ্ট হয়েছে—তা না হলে শুধু-শুধু যেতে বতুম না।” অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের স্বরে মেরী বলিয়া উঠিল, “তবু, কি অপরাধটা একবার শুনি?” সপ্তমে চড়িয়া উঠিয়া রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “ভদ্র- লােকের মত কথা কইতে শেখ মেরী?” একটুও বিচলিত না হইয়া ঠিক তেমনি কঠোরবেই মেরী বলিয়া উঠিল, “সে শিক্ষাটা আমার বােধ হয় আপনারই সবচেয়ে দরকার হয়ে পড়েছে।” রাগে জ্বলিয়া উঠিয়া রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “মুখ সামলে মেরী—আমি আজই তােমার বাবাকে চিঠি লিখে দিচ্ছি।” একটু হাসিয়া মেরী বলিল, “কি লিখবেন শুনি !” রাগে কপিতে কাপিতে রেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “লিবো আপনার মেয়ের চরিত্র অত্যন্ত জঘন্য হয়ে উঠেছে ; সে একজন বাঙ্গালী যুবকের সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই- অত্যন্ত কঠোর-স্বরে মেরী বলিয়া উঠিল, “মেরী আজ পর্যন্ত কোন মিথ্যাকেই ভয় কতে শেখেনি মিঃ হােয়াইট! আপনার যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। আমি আপনাকে ঘরের ডাক ১৪৪ মানুষের মধ্যেই গণ্য করি না।” কথাটা শেষ করিয়াই সে ঝড়ের বেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া চলিয়া গেল। ইহার কিছুদিন পর একদিন এক ক্ষান্তবর্ষণ সন্ধ্যায় লক্ষ্মী আপনার শয়নকক্ষের বাতায়নের ধারে চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। সমস্ত দিন বর্ষণের পর এই কিছুক্ষণ হইল বৃষ্টি থামিয়া গিয়াছে এবং তাহারই সজলতা মৌনসন্ধ্যার সেই করুণ এবং বিষাদময় ক্ষণটিকে আরাে করুণ করিয়া তুলিয়া- ছিল সে একবার বাতি জ্বালিয়াছিল, কিন্তু বালা হাওয়ায় সেটা হঠাৎ নিবিয়া যাওয়ায় দ্বিতীয়বার আর জ্বলে নাই- অন্ধকারেই বাতায়নের ধারে নীরবে আসিয়া বসিয়া পড়িয়া- ছিল। বাহিরে তখন পর্যন্ত বাঁশঝাড়ের বুকের মাঝখানে বাতাস কাঁদিয়া কঁদিয়া ফিরিতেছিল এবং কালো মেঘগুলো থাকিয়া থাকিয়া গুমরিয়া মরিতেছিল। লক্ষ্মীর মনটাও আজ কাঁদিতেছিল,তার মনে হইতেছিল, এই ক্ষান্তবর্ষণ মোন-সন্ধ্যার বুকের মাঝখানটিতে যে করুণ সুরটি অনবরত কাদিয়া কঁদিয়া উঠিতেছে, তার সমস্ত জীবনটা যেন তাহারই সুরে সুর মিলাইয়া বাজিয়া উঠিতে চায়। তার সমস্ত জীবনটাই যেন ঠিক এমনি একটি কান্নাভরা আষাঢ়- সন্ধ্যার একটিমাত্র অশ্রুবিন্দু হইয়া গড়িয়া উঠিয়াছে। হঠাৎ পিছন হইতে কে ডাকিল—লুসী!”
১৪৫
বয়ের ডাক
লক্ষ্মী ফিরিয়া চাহিল, কিন্তু কোন কথা বলিল না।
অন্ধকারে আবার কে ডাকিল, “লুসী, তুমি বােধ হয়
শুনেছ, আমি কাল এখান থেকে চলে যাচ্ছি।”
একটুমাত্র চঞ্চল না হইয়া অত্যন্ত স্থির এবং আকণ্ঠে
লক্ষ্মী বলিল, “কেন যাচ্ছ মেরী ?*
“কেন ?—সে কথা তােমরাই আমার চেয়ে বেশী জান
লসী” বলিয়া মেরী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিল।
অত্যন্ত করুণ-কণ্ঠে লক্ষ্মী বলিল, “আমি ত কিছুই জানি
না মেরী।”
“তুমি কিছুই জান না?—মিথ্যে কথা বােলল না লুসী !”
তার পর একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া মেরী আবার বলিল,
“আমার নিজের জন্যে আমি একটুও দুঃখিত নই লুসী—দুঃখ
আর একজনের জন্যে ; তােমরা কতবড় একটা জীবন যে
জন্মের মত মাটি করে দিয়েছ, তা যদি বুঝতে ?”
অত্যন্ত ক্ষীণ এবং আর্দ্র কণ্ঠে লক্ষ্মী বলিল, “কেন ?”
“কেন ?—এখানকার ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব নলিনী-বাবুকে
কি হুকুম দিয়েছেন শােন নি ?”
ঠিক তেমনি নির্বিকারভাবেই লক্ষ্মী উত্তর দিল,“কে না।”
“তুমি যে আশ্চৰ্য্য করলে লুসী—তুমি মিথ্যে কথা বছ
না ত ?*
ঘরের ডাক
১৪৬
}
অরুদ্ধ-কণ্ঠে লক্ষ্মী উত্তর দিল, “না, মিথ্যে কথা বলছি
মেরী ।”
অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে মেরী বলিয়া উঠিল, “আমার
নামে তুমি রেভারেণ্ড হােয়াইটের কাছে কোনদিন কোন
কথা বলনি?”
“বলেছি।”
“কি বলেছ ?”
*বলেছি, নলিনী-বাবুকে তুমি ভালবাস।”
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া মেরী বলিল, “তার পর
রেভারেণ্ড হােয়াইট ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের কাছে গিয়ে নলিনী-
বাবুর নামে যে-সব মিথ্যা অভিযােগ রটিয়ে এসেছেন, তুমি
তার কিছুই জান না ?”
কম্পিত-কণ্ঠে লক্ষ্মী বলিল, “না, জানি না মেরী !”
অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে মেরী বলিতে লাগিল, “তিনি
ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের কাছে গিয়ে বলেছেন, নলিনী-বাবু
গ্রামের ছােটলােকদের ধরে ধরে রাজদ্রোহী করে তুলছে
এবং সেদিন হরিহরপুরে যে ডাকাতি হয়ে গেছে, তিনি
তাতে লিপ্ত ছিলেন।
লক্ষ্মী একটি কথাও বলিল না—কাঠের মত শক্ত হইয়া
দাড়াইয়া রহিল।
১৪৭
ঘরের তাক
একটু থামিয়া মেরী আবার বলিতে লাগিল, “প্রমাণ
অভাবে ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব নলিনী-বাবুকে গ্রেপ্তার করূতে
পারেন নি, কিন্তু আদেশ জারী করেছেন, তিনি আর কখন
গ্রামের ছােটলোেকদের সঙ্গে মিশতে পারবেন না এবং
তাকে সারাজীবন পুলিসের নজরবন্দির মধ্যে থাকতে হবে।”
লক্ষ্মী তেমনি নিৰ্বাক্ হইয়াই বসিয়া রহিল। মেরী
আবার বলিল, “অর্থাৎ তার কৰ্ম্মজীবনটাকে একবারে নষ্ট
করে দেওয়া হয়েছে।”
কিছুক্ষণের জন্য ঘরখানি নিস্তব্ধ হইয়া গেল। বাহিরে
তখন আবার ঝম ঝম শব্দে বৃষ্টি শুরু হইয়াছিল এবং মাঝে
মাঝে সন্ধ্যার অন্ধকার চিরিয়া ফেলিয়া বিদ্যুৎ চমকাইয়া
উঠিতেছিল।
কিছুক্ষণ এইভাবে চুপ করিয়া থাকিয়া মেরী বলিল,
“আমি কালই এখান থেকে চলে যাচ্ছি লুসী ; যাবার সমর
তােমাকে একটা কথা বলে যাওয়া নেহাৎ দার বলে
মনে হােলো, তাই একবার দেখা করে যেতে এলুম।”
অশ্রুসিক্তকণ্ঠে লক্ষ্মী বলিল, “কি কথা মেরী?”
গলাটাকে পরিষ্কার করিয়া লইয়া মেরী বলিল, “তােমার
ধারণা, আমি নলিনী-বাবুকে ভাল বেসে ফেলেছি ; তা নয়
লুসী ; আমি তাকে বড়-ভায়ের মত ভক্তি করি; অন্য কোন
ঘরের ডাক
১৪৮
।
দৃষ্টিতে আজ পর্যন্ত তাঁর মুখের দিকে তাকাই নি। আর,
তিনিও আমাকে ছােট বােনের মত করেই আজ পর্যন্ত
স্নেহ করে এসেছেন, অন্য কোন ভাব তার মনে একদিনের
তরেও স্থান পায় নি।
লক্ষ্মী সে কথার কোন উত্তর দিল না, কেবল চাপ
গনায় বলিয়া উঠিল, “তুমি যেও না মেরী?”
সজল-কণ্ঠে মেরী বলিল, “আমাকে যেতেই হবে লুসী ;
ম্যাজিষ্ট্ৰেটের আদেশ, আমাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এ গ্রাম
ত্যাগ করে যেতে হবে।”
কম্পিত-কণ্ঠে লক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করিল, “কেন?”
“তা ঠিক জানি না, জানি কেবল এই যে চলে যেতে
হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
লক্ষ্মী আর একটি কথাও বলিল না, চুপ করিয়া বাহিরের
দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল।
কতক্ষণ এইভাবে বসিয়া ছিল তা সে নিজেই জানিতে
পারে নাই। কখন একসময় ফেলী ডাকিল, “লক্ষ্মী-দিদি?”
চমকাইয়া ফিরিয়া চাহিয়া সে বলিল, “কেন রে
ফেলী ?”
অত্যন্ত বিষাদময়-কণ্ঠে ফেশী বলিল, “নলিনী-বাবুর কি
হয়েছে লক্ষ্মী-দিদি ?
১
১৪১
'ঘরের ডাক
‘ল ত জানি না ফেলী,” বলিয়া লক্ষ্মী জানালার ভিতর
দিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল। তখনও ঝুপ ঝুপ্
করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছিল ; আকাশ যেন মেঘের কালাে
আঁচলখানিতে মুখ ঢাকিয়া কঁদিতেছে।
ফেলী আবার বলিল, “আমি আজ বিকেলবেলা নলিনী।
বাবুকে খবর দিতে গেছলুম,-ননি সেরার মেয়ের বড় জ্বর
হয়েছে ; সেকথা শুনে নলিনী-বাবু আমাকে বুকের ভেতর
জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো লক্ষ্মী-দিদি!*
লক্ষ্মী কেবল বলিল, “হু'।”
পরদিন সকাল দশটার ট্রেনে মেীর যাইবার কথা;
অতি প্রত্যুষে উঠিয়া লক্ষ্মী কাহাকে কিছু না বলিয়া বাড়ী
ছাড়িয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে
এদিক ওদিক ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। তার পর যখন
১০টা বাজিয়া গেল, তখন সে ধীরে ধীরে বাড়ী ফিরিয়া
আসিল।
মেরী যে-ঘরখানিতে থাকিত তাহারই সম্মুখ দিয়া যাইবার
সময় সে একবার ঘরখানির দিকে চাহিয়া দেখিল ঘরখানি
শূন্য পড়িয়া রহিয়াছে—তার চোখ ফাটিয়া কান্না আসিতে
লাগিল।
পরদিন প্রাতঃকালে রেভারেণ্ড হােয়াইট গির্জার সমুখের
বাগানটাতে অন্যমনস্কভাবে বেড়াইতেছিলেন। এমন সময়
লক্ষ্মী আসিয়া কোনরূপ ভূমিকা না করিয়াই হঠাৎ বলিয়া
উঠিল, “আমরা মাদ্রাজ যাবাে কবে রেভারেও ?”
একটু হাসিয়া রেভারেণ্ড বলিলেন, “এখানে বুঝি আর
মন টিক্ছে না তােমার ?”
“না, একটুও না, এখুনি যদি কেউ নিয়ে যায় ত চলে
যাই।” বলিয়া লক্ষ্মী নতমুখে চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল।
মন দাড়ির মধ্যে ধীরে ধীরে অঙ্গুলি সঞ্চালন করিতে
করিতে রেভারেও বলিলেন, “আমি ত পূর্বেই বলেছিলুম
লুসী, দু-একদিন বাংলাদেশ লাগে ভালো, কিন্তু কিছুদিন
থাকলেই সব পুরাণাে হয়ে যায়। শুধু কেবল প্রাকৃতিক
সৌন্দৰ্য্য মানুষকে কদিন ভুলিয়ে রাখতে পারে লুসী?”
সে কথার কোন জবাব না দিয়া লক্ষ্মী বলিল, “তা হলে
আমরা কবে এখান থেকে যাচ্ছি ?”
“যেদিন তােমরা বলবে ; যে জন্যে আমার এখানে আসা
তা ত হয়ে গেছে লুসী, এখন তােমরা যেদিন বলবে আমি
তৈরি হয়ে থাকবে।” বলিয়া রেভারেণ্ড আবার পাচারি
করিতে লাগিলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া লক্ষ্মী আবার বলিল,
‘আমার ইচ্ছে কালই আমরা এখান থেকে চলে যাই।”
ঘরের ভাৰ
হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইয়া লক্ষ্মীর মুখের দিকে চাহিয়া
বেভারেণ্ড বলিয়া উঠিলেন, “এত তাড়াতাড়ি কেন
লুসী ?”
লক্ষ্মী বলিল, “আমার আর একদণ্ডও এখানে মন টিক্ছে
রেভারেণ্ড।”
একটু বিরক্ত হইয়া রেভারেও বলিলেন, “তােমার কি
সবেতেই একটু বাড়াবাড়ি চাই লুসী! মন ত আমারও
টিকছে না, কিন্তু তাই বলে কি এখুনি ছুটতে হবে ?”—-
তার পর সুরটাকে একটু নরম করিয়া লইয়া বলিলেন,
“আমি চারিদিক ভেবে চিন্তে দেলুম, এই রবিবারের আগে
আমাদের যাওয়া হতেই পারে না। আজ হােলাে গিয়ে
তােমার মঙ্গলবার—তাহলে মাঝে কেবল চারটে দিন বৈল
বৈ ত নয়—এই কটা দিন আর থাকতে পারবে না ?
“পারবাে” বলিয়া লক্ষ্মী আস্তে আস্তে চলিয়া গেল।
সমস্ত দিন গেল। সন্ধ্যা আসিল। লক্ষ্মীর মন হু হু
করিতে লাগিল। তার মনে হইতে লাগিল, বাংলাদেশ
যেন সন্ধ্যার মলিন বস্ত্রখানি পরিয়া তাহার শয়নকক্ষের
বাতায়নটির ধারে আসিয়া দাঁড়াইয়া তার মুখের দিকে করুণ
নয়নে চাহিয়া রহিয়াছে।—সে ছটফট করিয়া জান্নাটা
বন্ধ করিয়া দিল এবং আলাে আলিয়া সমুখের আলমারি
যরের না ,
১৫৪
শিরােমণি আবার বকিতে সুরু করিলেন,-“কি দয়ার শরীর
ছিল দাদার আমার ! একদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
শিরােমণি-দা মুখখানা আজ অমন
আজ অমন ভাব-ভার ঠেছে
কেন ?” এই অবধি বলিয়াই গলাটাকে যথাসম্ভব কাপাইয়া
এবং গদগদ করিয়া তুলিয়া শিরােমণি শুরু করিলেন, “এমন
দরদী বন্ধুই যদি কেড়ে নিলে, তবে এ হতভাগাকেও সেই
সঙ্গে টেনে নিলে না কেন মধুসূদন ?—এমন করে আর কত
দিন বাঁচতে হবে দয়াময় ?” কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া এবং
উত্তরীয়-প্রান্তটা শুষ্ক চোখ দুটোর উপর একবার বুলাইয়া
লইয়া শিরােমণি আরম্ভ করিলেন, “হা, কি বছিলাম,
আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তােমার মুখখানা আজ
অমন বিষাদময় দেখছি কেন শিরােমণি-দা ? সত্যই সেদিন
মনটা বড়ই ভারাক্রান্ত ছিল ; গিন্নীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে নিয়ে
সেই সবে বকাবকি করে আসছি—বল্পম, মেয়েটা চোখের
উপরে কলাগাছের মত দিন দিন বেড়ে উঠছে চৌধুরীমশাই
—এদিকে হাতে একটি পয়সা নেই যে খরচপত্তর করি,
পাত্রের বাজার কি রকম চড়া তা ত আপনার জাতে বাকী
নেই ?—হাঁ, বুকের ছাতি বটে, এ ত আর ওপারের নরেশ
রায় নয়-এ হচ্ছে ভবতােষ রায়চৌধুরী, যার নাম কলেও
দিন ভাল যায়। কৰ্ত্তা বল্লেন কি জান বাবা ?--বল্লেন,
;
ঘরের ডাক
‘তােমার মেয়ে আর আমার মেয়ে কি ভিন্ন শিরোমণি-দা।
কত হলে তােমার মেয়ের বিয়ে হয় বল ত—চার হাজার ?
অন্য কেউ হলে চার হাজারই আদায় করে বসত,আমি ত
আর তা পারিনে বাবা, এ ত আর পরের সঙ্গে কাবার নয়
যে কেবল নিজের গণ্ডাই বুঝে নেবে,—বলুম,—“আরে
রামচন্দ্র—দু-হাজার হলে ভেসে যাবে যে। তিনিও চার
হাজারের নীচে নামবেন না, আমিও দু-হাজারের উপর
উঠবে না। এমনি করে প্রায় একঘণ্টা ধস্তাধস্তির পর
শেষকালে তিন হাজারে রফা হয়ে গেল। কর্তা বলেন,
‘কবে আছি কবে নেই শিরােমণি-দা, ষ্ট্যাম্প-কাগজ এনে
সই করিয়ে নিন্! আমি বল্লম, ‘খেপেছেন নাকি চৌধুরী
মশাই ; নলিনী ত আপনারই ছেলে, সে বেঁচে বর্তে থাক,
চারহাজার কেন, চার লাখের জন্যও ভাবি না। আর তা
ছাড়া, আজ যদি বাবা তুমি আমার কথা নাই বা বিশ্বাস কর,
তাহলেও কি কিছু আসে যায় মনে করেছ নলিনী ? কিছুমাত্র
, কিছুমাত্র না! যে জিনিষ হারালুম, তার তুলনায় তিন
হাজার টাকা যে ভস্মমুষ্টিও নয় বাবা ! হায় হায়, কি জিনিষই
কেড়ে নিলে দীনবন্ধু !—তােমার লীলা তুমিই বােঝ
দয়াময়!”—বলিয়া স্মৃতির জার ভিতর দিয়া বাহিরে
নীলাকাশের দিকে উদাস-নয়নে চাহিয়া রহিলেন।
ঘরের ডাক নলিনী তবুও কথা কহিল না-চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। ইহার তিন দিন পরে একদিন সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে 'নন্দ- রাণী আপনার শয়নকক্ষের বাতায়নের ধারে চুপ করিয়া বসিয়া ছিল, এমন সমর পিছন হইতে আসিয়া নলিনী ডাকিল “ছােট-মা !” মুখ না ফিরাইয়া নন্দরাণী উত্তর দিল, “কি নলিন। মেঝের উপর উপু হইয়া বসিয়া নলিনী বলিল, “আর কটা দিনই বা মাঝে রইলাে ছোট-মা,—দায়ােদ্ধার হতে হবে ত? এখন থেকে জোগাড়যন্তর না কবুলে ত হয়ে উঠবে না!” “তা আমি কি করবো বাবা!—সে তুমি বুঝবে।” “তা ত বুঝবাে ছােট-মা, কিন্তু তােমার সঙ্গে পরামর্শ না করে ত আর কোনাে কাজ করতে পারি না?—শিরােমণি- কাকা বলছিলেন দানসাগর করতে-~আমার কিন্তু আসবেই তা ইচ্ছে নয় ছােট-মা!-অপদার্থ ঐ বামুনগুলাের পিছনে অত টাকা খরচ না করে আমার ইচ্ছে সেই টাকা দিয়ে বাবার নামে একটি ইস্কুল খুলে দেবাে—তুমি কি বল ছােট-মা ?” কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া নন্দরাণী বলিল, “ইস্কুল খুলতে হয় পরে খুলাে নলিনী, কিন্তু তার কাজটির যেন একটুও অঙ্গহানি না হয়। সাতপুরুষ ধরে এই বংশে যেমন সকলের কাজ হয়ে এসেছে, ঠিক সেই ঠাটুটি যেন বজায় ১৫৭ ঘরের ডাক থাকে। আজ তিনি নেই বলে আমরা যদি নিজেদের মন- গড়া করে তাঁর শেষকাজ সম্পন্ন করি, তাহলে সেটা মােটেই ভাল হবে না নলিনী।” নলিনী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। নন্দরাণী আবার বলিতে লাগিল, “তিনি থাকতে যে সব কাজ করতে ইচ্ছে হলেও করূতে পারিনি, আজ যদি সেইসব কাজ করি, তাহলে সেটা দিয়ে কি এই বােঝা যাবে না নলিনী যে তার এই মৃত্যুটাকে আমরা নিজেদের অজ্ঞাতসারে এতদিন ধরে চেয়ে আছিলুম ?* নলিনী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল ;-ইহার বিরুদে, কোন যুক্তি-তর্ক সে মনে-মনেও কল্পনা করিতে পারিতেছিল । এই সময় ঝি আসিয়া খবর দিয়া গেল, “রাণী-মা, কাশী থেকে আপনার মা এসেছেন।” “আচ্ছা, বৃত্তির বেলায় কথা হবে এখন ছােট-মা”- বলিয়া নলিনী নীরবে চলিয়া গেল। সন্ধ্যার পর মেঝের উপর আঁচল বিছাইয়া শুইয়া নন্দরাণী আকাশ-পাতাল ভাবিতে লাগিল, জীবনের গতিকে সে আজ কোন্ দিকে ফিরাইবে?—যে একঘেয়ে পথটাকে ধরিয়া সে এতটা রাস্তা চোক কান বুজিয়া আসিয়াছে, সেই পথটাকে p ঘরের ডাক ১৫ ? ধরিয়াই কি সে আবার চলিতে থাকিবে—ঠিক তেমনি একঘেয়ে ভাবে ?—কিন্তু—তাই বা সে করিতে যাইবে কেন ?—আজ ত তার অবাধ মুক্তি! আজ ত সে শৈশবের শিক্ষা এবং স্বাধীন চিন্তার ধারাকে মুক্ত করিয়া দিয়া তাহারই স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়া দিব্য নিশ্চিন্তভাবে ভাসিয়া যাইতে পারে ; আজ কোন বাধাই ত তার পথরুদ্ধ করিয়া দাড়াইবে না। হঠাৎ নন্দরাণীর বুকটা ছাঁৎ করিয়া উঠিল—তবে কি সে এতদিন ধরিয়া নিজের অজ্ঞাতসারে স্বামীর মৃত্যু কানাই করিয়া আসিতেছিল নন্দরাণীর দম্ ফাটিয়া কান্না আসিতে লাগিল, না, না, স্বামী জীবিত থাকিতে জীবনটা তার যে একঘেয়ে পথটাকে ধরিয়া চোখ কান বুজিয়া এতদিন ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে, সেই পথটা ধরিয়াই তাকে, জীবনের শেষ-মুহূর্ত পর্যন্ত চলিতে হইবে, একটুও নড়চড় করিবার ক্ষমতা তাহার নাই। স্বামীর জীবদ্দশায় যদিই বা সে কোনদিন নিজের স্বাধীন চিন্তাকে মাথাচাড়া দিয়া উঠিবার অবসর দিয়া থাকে, আজ আর সে তাহাও পারে না-স্বপ্নেও না। নিজের অসমাপ্ত এবং অচরিতার্থ যৌবনের দিকে চাহিয়া সে কি আজ বৃদ্ধ স্বামীর মৃত্যুর বিনিময়ে নিজের বাকি জীবনের সুখ- স্বচ্ছন্দতাকে কিনিয়া লইবে? সধবা-জীবনের সমস্ত অসমাপ্ত ঘরের ডাক আকাঙ্ক্ষা সে কি আজ বৈধব্যের ভিতর দিয়াই সার্থক করিয়া তুলিবে? না, না, তা হইতেই পারে না! বৈধব্যই যদি 'আসিল ত রাজ্যসুদ্ধ অভাব এবং রিক্ততা সইয়াই সে আসুক!—শুধু কেবল বৃদ্ধ বলিয়াই স্বামীর মৃত্যুকে সে এমন হাসিমুখে বরণ করিয়া লইতে পারিবে না--কখনই -কিছুতেই না। রাত্রে নলিনী আসিয়া বলিল, “কি ঠিক করলে, ছােট- মা ?” অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে নন্দরাণী বলিল, “দানসাগর করতেই হবে নলিনী, এর যেন একটুও নড়চড় না হয় ; আর শিরােমণিঠাকুর যা যা বলেন, তা যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়।” অবাক্ হইয়া তার মুখের দিকে চাহিয়া নলিনী বলিল, “বেশ ত, তাই হবে, তার আর হয়েছে কি ছােট-মা।” নিজেকে সামলাইয়া লইয়া নন্দরাণী বলিল, “চিরকাল যা চলে আসছে তা ত আর আমরা বন্ধ করতে পারি না নলিনী।” অনেক রাত্রে মেঝের উপর একটা কম্বল বিছাইয়া হাতের উপর মাথা রাথিয়া শুইয়া নন্দরাণী ভাবিতে লাগিল, “স্ত্রীলােকের পক্ষে যা সকলের চেয়ে বড় অভিসম্পাত,
ঘরের ডাক
সেই অভিসম্পাতই ত আজ তার উপর আসিয়া পড়িয়াছে,
কিন্তু বুকখানা ত তার ভাঙ্গিয়া একেবারে চূরমার হইয়া
যায় নাই। স্বামীর অভাব সে ত বুকের মাঝখানে খুব
বেশী অনুভব করিতে পারিতেছে না, জীবনটা ত তার
একেবারে শূন্য এবং ব্যর্থ হইয়া উঠে নাই। তবে কি সে
তার স্বামীকে কোনদিন ভাল বাসিতে পারে নাই ?—তবে
কি এতদিন ধরিয়া সে কেবল সতীত্বের অভিনয় করিয়া
আসিতেছিল মাত্র ? না না, বৃদ্ধ-স্বামীর অভাবকে দিয়া সে
নিজের জীবনের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার পথ একেবারে
চিররুদ্ধ করিয়া দিবে ; বৈধব্যকে সে বক্ষের প্রত্যেক পঞ্জর
দিয়া অনুভব করিবে।
২১
সকালে উঠিয়া লক্ষ্মী আপনার ঘরের জাল্লার ধারে
চুপটি করিয়া বসিয়া ছিল। নলিনীর পিতৃবিয়ােগের কথা,
সে ইতিপূৰ্বেই শুনিয়াছিল, কিন্তু সেই কথাটাই আজ নূতন
করিয়া তার বুকের মাঝখানে বার বার জাগিয়া উঠিতেছিল।
তার মনে হইতেছিল নলিনীর বুকে সে যে আঘাত দিয়াছে,
সেই তটাই দগদগে করিয়া তার চোখের সমুখে মেলিয়া
ধরিবার জন্যই বিধাতাপুরুষ সেই পুরাতন ক্ষতটার উপর
আজ নূতন করিয়া এই দারুণ আঘাতের খোঁচাটাকে বসাইয়া
দিয়াছেন। স্বর্গের যত দেবতা আজ যেন তাকে জব্দ
করিবার জন্যই একজোট হইয়া কোমর বাঁধিয়া দাঁড়াইয়াছে।
কি ভাবিয়া লক্ষ্মী হঠাৎ ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িল এবং
অত্যন্ত অন্যমনস্কভাবে বাগানময় পাচারি করিয়া বেড়াইতে
লাগিল। কিছুক্ষণ পাচার করার পর ঘরে ফিরিয়া সে দেখিল
টেবিলের ধারে একটা চেয়ারের উপর ফেলী মুখখানি চুন
করিয়া বসিয়া আছে। তার মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলাইয়া
দিতে দিতে লক্ষ্মী বলিল, “তুই অমন চুপটি করে বসে বসে
কি ভাবছিস্ রে ?
ঘরের ডাক
১৬২
সে কথার কোন জবাব না দিয়া ফেলী বলিল, “আমরা
আর-রবিবারে এখান থেকে চলে যাব নাকি লক্ষ্মী-দিদি ?”
একটু হাসিয়া লক্ষ্মী বলিল, “তুই এ খবর কোথেকে
পেলি রে ?”
“হােয়াইটায়েব ওদের ভােরাকে বলছিলেন, তাই
গুলুম—আমি কিন্তু যাব না লক্ষ্মী-দিদি।
“তুই যাবি নি–সে কি ?—বাপ-মাকে ছেড়ে তুই
এখানে থাকবি?”
মুখ নীচু করিয়া ফেলী বলিল, “নলিনীবাবু বলছিলেন,
বাবা-মাকে তিনি এখানে আনিয়ে নিজের কাছে রেখে
দেবেন। ওরা ছেড়ে দেবে না' নাকি লক্ষ্মী-দিদি ?*--তার
চোখ দুটো ছলছল করিতেছিল।
লক্ষ্মী কাঠের মত শক্ত হইয়া বসিয়া রহিল, তার পর
হঠাৎ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, “আমার জন্যে
তাের একটুও মন কেমন করবে না ফেলী ?”
ফেলী এবার কাদিয়া ফেলিল ;সে বলিল, “তােমার
পায়ে পড়ি লক্ষ্মী-দিদি, তুমিও এখান থেকে যেও না!”
রােরুদ্যমান ফেলীকে লক্ষ্মী আপনার বুকের মধ্যে
প্রাণপণ-বলে চাপিয়া ধরিল।
২২
আজ লক্ষ্মীরা মাদ্রাজ যাইবে। সকালে উঠিয়া লক্ষ্মী
আপনার জামা কাপড় প্রভৃতি একটা চাড়ার তােরঙ্গের
মধ্যে গুছাইয়া রাখিতেছিল। মনটা আজ তার ভিতর
হইতে কেবলি গুমরিয়া গুমরিয়া কঁদিয়া উঠিতেছে। তার
মনে হইতেছিল, কে যেন তাকে ডাকিয়া ডাকিয়া ফিরিয়া
গিয়াছে, এখনও বাতাসে বাতাসে ঘুরিয়া মরিতেছে তাহাই
তপ্ত দীর্ঘনিশ্বাস।
তােরঙ্গের মধ্যে জামাকাপড় প্রভৃতি গুছাইয়া, চাবিবন্ধ
করিয়া দিয়া লক্ষ্মী উঠিয়া দাড়াইল এবং ঘরময় অত্যন্ত
অন্যমনস্কভাবে পাচার করিয়া বেড়াইতে লাগিল। কিছুক্ষণ
এইভাবে পাচারি করিয়া বেড়াইয়া সে টেবিলের ধারে একটা
চেয়ারের উপর গিয়া অস্থিরভাবে বসিয়া পড়িল এবং একটা
পুরাতন বাঁধানাে ইংরেজী মাসিক পত্রিকা খুলিয়া অত্যন্ত
অন্যমনস্কভাবে তার পাতা উল্টাইয়া যাইতে লাগিল, কিন্তু
কোথাও মনঃসংযােগ করিতে পারিল না।
হঠাৎ এক সময় বইখানাকে মুড়িয়া টেবিলের উপর
রাখিয়া দিয়া লক্ষ্মী উঠিয়া দাঁড়াইল এবং ধীরে ধীরে
ঘরের ডাক
১৬৪
বাতায়নের ধারে গিয়া বসিল। এই সেই বাতায়ন যাহার
ভিতর দিয়া ক্ষান্তবর্ষণ কত নীরব সন্ধ্যায় বাংলাদেশ তার
মলিন বস্ত্রখানি পরিয়া তার দিকে করুণনয়নে চাহিয়া চাহিয়া
ফিরিয়া গিয়াছে, বাতাসে বাতাসে আজিও দুরিয়া মরিতেছে
তার আকুল ক্রন্দন ; লক্ষ্মীর চোখে জল আসিল। হঠাৎ
কি ভাবিয়া জালাটাকে বন্ধ করিয়া দিয়া লক্ষ্মী উঠিয়া
আসি এবং টেবিলের ধারে আসিয়া আবার সেই মাসিক
পত্রিকা খুলিয়া পড়িবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ
বাসর পর সে বইখানাকে বিরক্তভাবে টেবিলের
উপর রাখি দিয়া উঠিয়া দাড়াইল এবং বেশ পরিবর্তন
না করিয়াই পথে বাহির হইয়া পড়িল।
শেষরাত্রে এক পশলা বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে—এখনও
আকশে বাতাসে তাহারই সজলত করুণ হইয়া ভাসিতে
পথের দুই পাশের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড শিশুগাছগুলির
পাতা হইতে তখন পৰ্যন্ত ফোটা ফোটা জল ঝরিতেছিল,-
সারারাত দিয়া কাঁদিয়া এইমাত্র তারা যেন একটু শান্ত
হইয়াছে।
খানিকটা পথ চলিয়া আসিয়া লক্ষ্মীর হঠাৎ খেয়াল হইল
সে নদীর কাছ-বরাবর আসিয়া পড়িয়াছে। আর একটা
মােড় বাকিলেই নদীর রূপালী রেখাটি দূর হইতে তার
ঘরের ডাক
=
চোখে আসিয়া পড়িবে, কিন্তু ঠিক এই সময়টিতে নলিনী যে
নদীতীরে বেড়াইতে আসে–আজিও নিশ্চয় আসিয়াছে-
লক্ষ্মী ফিরিল ;—অনেকটা পথ সে চলিয়া আসিল—তার
3 কি ভাবিয়া আবার নদীর দিকে চলিতে লাগিল।
নদীর কাছ-বরাবর আসিয়া লক্ষ্মী দেখিল, জলের ধারে ।
একটা প্রকাণ্ড অশ্বথ-গাছে ঠেস্ দিয়া নলিনী বসিয়া
রহিয়াছে, দেহ তার ক্ষীণ,দৃষ্টি তার করুণ এবং উদাস।
এমনেকদিন আগেকার একটা কথা লক্ষ্মীর হঠাৎ মনে
পড়িয়া গেল-প্রথম যেবার সে রেভারেও হােয়াইটের
সহিত বাংলাদেশে আসে, এ ততদিন আগেকার কথা ;-
তার মনে পড়িয়া গেল, ঠিক এমনি নীরব এক কোনায়
বাংলাদেশের নির্জন এক পল্লীগ্রামে ঠিক এমন একটি
তরুণ যুবককে সে দেখিয়াছিল, দৃষ্টি তার ঠিক এমনি করণ
এবং উদাস। ধূসর সন্ধ্যার আবৃছায়ার মধ্যে সেদিন যে
মুখখানি সে ভাল করিয়া দেখিয়া লইতে পারে নাই,
আজিকার এই ক্ষান্তবর্ষণ শুরুণ প্রভাতের অরুণালােকে
কে সেই করুণ মুখখানিকে তার চোখের সমুখে এমন স্পষ্ট
করিয়া আঁকিয়া দিয়া গেল ! ওগাে অপরিচিত, আজ এমনি
সুন্দর করিয়া ধরা দিবে বলিয়াই কি সেদিন পরিচয় না
দিয়া চলিয়া আসিয়াছিলে ?
ঘরের ডাক নীরবে আসিয়া পিছন হইতে লক্ষ্মী ডাকিল,-“নলিনী- বাবু!”—সে স্বর অত্যন্ত ক্ষীণ এবং অস্পষ্ট—এত ক্ষীণ যে অন্যমনস্ক নলিনীর কানে সে স্বর গিয়া পৌছাইলই না। মানুষ হঠাৎ খেয়ালের মাথায় একটা বিপদজনক কিছু করিতে গিয়া হঠাৎ টের পাইয়া যেমন শিহরিয়া উঠিয়া সাবধান হইয়া যায়, ঠিক তেমনিভাবে লক্ষ্মী হঠাৎ নিজেকে এক নিমেষে সালাইয়া লইল এবং অত্যন্ত সাবধানে নিশ্বাস পৰ্য্যন্ত রুদ্ধ করিয়া পা টিপিয়া টিপিয়া অনেকটা পথ ফিরিয়া আসিয়া একটা নিরাপদ এবং সােয়াস্তির নিশ্বাস ছাড়িয়া বাচিল। ওঃ কি জোর বৎ তার! নলিনীবাবু যদি তার ডাক শুনিতে পাইতেন? লক্ষ্মীর সমস্ত শরীর ঝিম্ ঝিম্ করিতে লাগিল,—সে আজ একটা প্রকাণ্ড ফাড়ার হাত হইতে বাঁচিয়া গিয়াছে। মাদ্রাজে ফিরিয়া আসিয়া লক্ষ্মী তার পূর্বজীবনের সহিত বর্তমান জীবনের ঠিক্ যে জায়গাটায় ছাড়াছাড়ি হইয়াছিল, সেই ফাঁকের জায়গাটুকুকে একটা যাহােক কিছু দিয়া জোড়াতাড়া দিয়া মেরামত করিয়া তুলিবার জন্য প্রাণপণ- শক্তিতে চেষ্টা করিতে বসিয়া গেল। কিন্তু মাঝখানের ঐ ফাঁকটুকু আয়তনে ছােট হইলেও তলার দিকটায় সে এতই
১৬৭
গরের ডাক
গভীর যে, তাকে ভরা করিয়া তুলিবার মত মাল-মসলা
সে এই এতবড় প্রকাণ্ড দুনিয়াটার মধ্যে কোথাও খুঁজিয়া
পাইল না—তার দম্ ফাটিয়া কান্না আসিতে লাগিল।
মাদ্রাজে ফিরিয়াই সে সব-প্রথম সাক্ষাৎ করিল চিদম্বরমের
সহিত।
চিদম্বরম বলিলেন, “বাংলাদেশ তােমার কেমন লাগল
মিস্ লুসী ?*
সে অত্যন্ত খাপছাড়াভাবে উত্তর দিল—“মন্দ কি!
একটু হাসিয়া চিদম্বরম বলিল, “হােয়াইট সাহেব কিন্তু
ঠার চিঠিতে বরাবর লিখেছেন—বাংলাদেশ তােমাকে
একেবারে অভিভূত করে ফেলেছে বলেই হয় এবং তুমি
নাকি বাংলাদেশকে রীতিমত ভালবেসে ফেলেছ।”
একটা ঢােক গিলিয়া লইয়া লক্ষ্মী বলিল, “সেটাকে ঠিক
ভালবাসা বলা চলে না মিঃ চিদম্বরম। এই ধরুন না কেন,
যদি কোন লােককে চোখের সমুখে অনাহারে মরুতে দেখেন,
তাহলে আপনার মনে কি তার উপর একটা দয়ার ভাব
আপনা হতে জেগে উঠে না ?-এও অনেকটা সেই ধরণের ;
বাংলাদেশ না হয়ে এটা যদি পৃথিবীর অন্য যে-কোন দেশ
হােতো, তাহলেও এর চেয়ে এতটুকুও কম দয়া হােত না
মিঃ চিদম্বরম।”
ঘরের ডাক
১৬৮
একটু হাসিয়া চিদম্বরম বলিল, “আমার কিন্তু মনে হয়,
জিনিষটা ঠিক তা নয় মিস্ লুসী !—একদিন আমার মনকেও
আমি ঐভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু আজ দেখছি
জিনিষটা আসলে তা নয়। আমিও একদিন আমার স্বজাতীয়
মাদ্রাজী-সমাজের দুঃখ-দৈন্যের দিকে চেয়ে নিজের ভিতরকার
সহানুভূতিকে তােমারি মতন একটা সুবিধামত সাদাসিবে
ব্যাখ্যার ভিতর দিয়ে বােঝবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আজ
দেছি, মানুষের জন্যে মানুষের যে সহানুভূতি, এ সহানুভূতি
শুধু সেইটুকু মাত্র নয়, তাছাড়াও অনেক জিনিষ এর মধ্যে
লুকিয়ে রয়েছে মিস্ লুসী!*
অন্য নানান কথার মধ্যে লক্ষ্মীএই কথাটিকে হারাইয়া
ফেলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।
বাড়ী ফিরিয়া লক্ষ্মী দেখিল, ফেলী তার ঘরে টেবিলের
ধারে একটা চেয়ারের উপর চুপটি করিয়া বসিয়া
রহিয়াছে।
তার মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে লক্ষ্মী
বলিল, “আজ যে বড় লক্ষ্মী মেয়েটির মত এখানে চুপটি করে
বসে আছি-কতক্ষণ এসেছিস্ রে তুই ?”
সে কথার কোন জবাব না দিয়া ফেলী বলিল, “সে
কথার কি হােলাে লক্ষ্মী-দিদি ?”
• ঘরের ডাক
কাপড় ছাড়িতে ছাড়িতে লক্ষ্মী বলিল, “কোন কথার
বল্ দেখি ?*
লক্ষ্মীর মুখের দিকে মিনতিকরুণ-নয়নে চাহিয়া ফেলী
বলিল, “আমাদের নলিনী-বাবুর কাছে পাঠিয়ে দেবার ?”
কাছে আসিয়া ফেলীর ছােট্ট মাথাটিকে নিবিড়ভাবে
নিজের বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া লক্ষ্মী বলিল, “তাের কি
এখানে ভালাে লাগছে না ফেলী ?”
ভাঙ্গা-গলায় ফেলী বলিল, “একটুকুও না লক্ষ্মী-দিদি-
আমার রাত দিন কেবল কান্না পায়---তােমার পায়ে পড়ি
লক্ষ্মী-দিদি আমাদের পাঠিয়ে দাও।”
লক্ষ্মী চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল।
ফেলী আবার বকিয়া যাইতে লাগিল, “আর, তুমিও
এখানে থেকো না লক্ষ্মী-দিদি-আমাদের সঙ্গে
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “তাের ভাল লাগে না,
তুই না হয় নাই রইলি ফেলী, তাই বলে আমাকেও যেতে
হবে ?”
হঠাৎ চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইয়া ফেলী বলিল,
“তোমার কখনও এখানে থাকতে ভাল লাগতে পারে না
লক্ষ্মী-দিদি—এ আমি জোর করে বলতে পারি—এদের
সঙ্গে নাকি আবার কারুর থাকতে ভাল লাগতে পারে !
ঘরের ভাক •
১৭০
না লক্ষ্মী-দিদি, তুমি আমাকে মিছিমিছি ভােলাতে চেষ্টা
কোরো না বছি।” সে আরো কত কি বকিতে যাইতেছিল,
হঠাৎ লক্ষ্মী গম্ভীর-গলায় বলিয়া উঠিল, “তােকে জ্যাঠামী
করতে হবে না ফেলী।”
কথাটা শেষ করিয়াই লক্ষ্মী সেই আস-সন্ধ্যার
আবছায়ার মধ্যে জানলার ধারে নীরবে আসিয়া বসিল।
আকাশে এক এক করিয়া তারা ফুটিয়া উঠিতেছিল।
পথের মােড়ে শিরীষ-গাছটায় বিশ্রামার্থী পাখীদের জায়গা
কুলাইয়া উঠিতেছিল না। থাকিয়া থাকিয়া পাখা ঝাপ্টাইয়া
তারা উপরে উঠিরা পড়িতেছিল, আবার আসিয়া বসিতে-
ছিল। কিন্তু ক্রমে কলরব থামিয়া গেল ; সবকটি পাখীই
গুছাইয়া জায়গা করিয়া রাতটুকুর জন্য পাতার আড়ালে
আশ্রয় লইল। সেইদিকে চাহিয়া চাহিয়া লক্ষ্মীর মনে হইতে
লাগিল, যত দ্বন্দ্ব কি কেবল মানুষের সঙ্গে মানুষের
ইহাদের মধ্যে ত কোন দ্বন্দ্বই নাই, তাই এক টি পাখীকেও
অভিমান করিয়া চলিয়া যাইতে হইল না। কিন্তু মানুষ
যে মানুষ !—তার দ্বন্দ্ব কোনমতেই বুঝি ঘুচিবে না।
ফেলী কখন উঠিয়া চলিয়া গিয়াছিল। লক্ষ্মীর মনে
হইল, সে নিষ্কৃতি পাইয়াছে। আঁচলে মুখ ঝাঁপিয়া
এতদিনকার রুদ্ধ অশ্রুর বাধ আজ এই অবসরে খুলিয়া দিল।
১৭১
ঘরের ডাক
তার আজ ক্লান্তি বােধ হইতেছে—সুখ দুঃখ দুয়েরই ক্লান্তি
আদর-অনাদরের এই দ্বন্দ্ব তার আর ভাল লাগে না।
করজোড়ে দেবতার কাছে কৃপাভিক্ষা করিতেও তার
ক্লান্তি বােধ হইতেছে। আশাহীন, উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন
এই শূন্য জীবনটাকে লইয়া সে করিবে কি। কিন্তু থাক
এখন নিজের ভাবনা, সারাজীবন ধরিয়া সে ভাবনার
যথেষ্ট অবসর আছে--এখন ফেলীর মুক্তির পথ তাকে
আগে করিতে হইবে—আহা বেচারা সরল ছােট্ট হেলী
লক্ষ্মীর চোখে জল আসিল। লক্ষ্মীকে জুতা পরিতে দেখিয়া
তার মা জিজ্ঞাসা করিল-“রাত্তির-বেলায় আবার কোথায়
বেরুচ্ছিস্?
সে বলিল, “বিশেষ কাজ আছে।”
রেভারেণ্ড হােয়াইট টেবিলের ধারে বসিয়া কেরােসিনের
আলােতে কি একখানা বই পড়িতেছিলেন, লক্ষ্মী হঠাৎ
গিয়া বলিয়া উঠিল, “হরিপুর থেকে যে ডােম-পরিবারটিকে
আজ বছরখানেক হােলাে এখানে আনা হয়েছে, তাদের
ছেড়ে দিতে হবে আপনাকে।
অবাক হইয়া লক্ষ্মীর মুখের দিকে চাহিয়া হােয়াইট
বলিলেন, “তাদের ধরে রেখে দিয়েছে কে লুসী ?-তুমি
যে পাগলের মত কথা বল্ছ!”
ঘরের ডাক
১৭২
আচ্ছা না-হয় তারা নিজে হতেই এসেছে, কিন্তু মানুষ
ভুলও ত করে ফেলে, মানুষের কর্তব্য কি নয় তাদের সেই
ভুলগুলােকে শুধরে দেওয়া ?”
রেভারেও একটু হাসিয়া উত্তর দিলেন, “মানুষ যদি
সা করেও হঠাৎ সত্যকে পেয়ে যায়, তাহলে তুমি কি বলতে
চাও লুসী তাকে তার ঐ ভুলটুকুর জন্যে সত্য থেকে দূরে
ফেলে দিতে হবে ?
ল সুম এই কথার উত্তরে কি বলিতে যাইতেছিল, পাদ্রী
সাহেব ভারী গম্ভীরভাবে বলিয়া উঠিলেন, “আমাকে আগে
শেষ কতে দাও লুসী !–আমি বছিলুম কি, এই যে
ডোম-পরিবার, এরা ভালমন্দ না বুঝেই এসেছে স্বীকার
করি, কিন্তু আমরা ত জানি ওরা ভালাের দিকেই এসেছে ?”
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “আমরা জানলেই ত
আর হবে না, জানতে হবে ওদের নিজেদের।”
“জানবে লুসী জাবে,আজ না জানে, কাল জাবে,
কানা না জানে, পশু জান্বে ; তুমিও একদিনে কিছু জাননি
লুসী!”
ছটফট করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া লক্ষ্মী ঘরময় পাচারি
করিয়া বেড়াইতে লাগিল। একটা কথা সাহস করিয়া
বলিয়া ফেলিলেই আজিকার তর্কে সে জিতিয়া যায় ; সে যদি
১৭৩
ঘরের ডাক,
একবার কেবল সাহস করিয়া মুখ ফুটিয়া বলিতে পারে যে,
নানা; সে আজ পর্যন্ত কিছুই বুঝিতে পারে নাই, মনটা
তাৱ আজিও ঐ ডােম-পরিবারটির মত করিয়াই গুমরাইয়া
গুমাইয়া মরিতেছে, তাহা হইলেই সব কথার মীমাংস।
একমুহূর্তেই হইয়া যায়, কিন্তু সে সাহস তার কই ?
কিছুক্ষণ পাচারির পর চেয়ারের উপর বসিয়া পড়িয়া
লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “আপনি যা বললেন তা খুব ঠি,
বে, আজ না হয় কাল, কাল না হয় পশু ওরাই ইবচেয়ে
বড় গলা করে চেঁচিয়ে উঠবে, এই বলে যে ওরা খুব জিতে
গেছে। ভগবান্ যাদের অপদার্থ করে গড়েছেন, তাদের
লক্ষণই এই মিঃ হােয়াইট, যে, তারা যখন হেরে যায়, তখন
হারকে হার বলে স্বীকার করবার মত সাহসও তার সেই
সঙ্গে হারিয়ে ফেলে। এরা যেদিন চেঁচিয়ে উঠবে এই বলে
যে ওরা জিতে গেছে, সেইদিন থেকেই এদের প্রকৃত হার
সুরু হবে—এ আমি খুব জানি।”
“তােমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পাছি না লুসা।
ওরা যদি কোন দিন বলে যে সত্যসত্যই ওরা আমাদের
ধম্মকে • অন্তরের সঙ্গে গ্রহণ করেছে, তা হলে তা থেকে
যে তােমার কথাটাই প্রমাণ হয়ে যায়, এমন নিশ্চয়তা ত
কিছুই দেখছি না লুসী! তারা যে একদিন না একদিন
ঘরের ক
১৭৪
সত্য সত্যই এটাকে অন্তরের সঙ্গে গ্রহণ কবে, অন্ততঃ
গ্রহণ কবুলেও করূতে পারে, তার প্রমাণ তুমি নিজে।”
লক্ষ্মী চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং মুহূৰ্তমধ্যে
ঝড়ের মত ছিটকাইয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
রাত্রে শয্যায় শুইয়া লক্ষ্মী ভাবিতে নাগিল, এই যে
ফেলীর হইয়া সে এতক্ষণ রেভারেণ্ড হােয়াইটের সঙ্গে এত
তর্কবিতর্ক করিয়া আসিল—এসব তর্কই ত নয় কেবল ?
এই যে এত কথা সে আজ বলিয়া আসিল, ইহার মধ্যে সব
কথাই কি তার অন্তরের ?-না, সেই সময়টুকুর জন্য
বাহির হইতে ধার করিয়া আনা ?—পরক্ষণেই ফেলীর সেই
কান্নাভরা করুণ মুখখানি তার মনে পড়িয়া গেল ;—সে
মনে মনে চীৎকার করিয়া উঠিল, “না না, এর মধ্যে ভেজাল
এতটুকুও নেই, এর সবখানিটাই খাঁটি—এত হৃদয়হীন নয়
সে!” কিন্তু এ ত শুধু ফেলীর হইয়া পড়িতে যাওয়া নয়,
এ যে নিজের হইয়া পড়িতে যাওয়াও বটে—তার কি ?
লক্ষ্মীর কান্না আসিতে লাগিল। তার মনে হইতে লাগিল,
তার সেই অনেকদিনকার চুকাইয়া দেওয়া শৈশব-আধময়লা
একখানি ডুরে কাপড় পরিয়া তার মাথার শিয়রে দাড়াইয়া
বলিতেছে, “আমিও কি একদিন কম কেঁদেছিলুম, তাই ত
ফেলীর কান্না আজ তােমার প্রাণে এত আঘাত করে
১৭৫
ঘরের ডাক
গেল।” লক্ষ্মী শিহরিয়া উঠিল, তবে কি তার যৌবনটাও
ঐ ফেলীর মার মত করিয়াই একটা অস্পষ্ট ছবির সামনে
দিনরাত মাথা খুঁড়িয়া মরিতেছে?
পরদিন সকালে উঠিয়া লক্ষ্মী তার মাকে ডাকিয়া বলিল,
--“এখানে আর আমাদের থাকা হলো না মা!”
“তবে কোন্ চুলােয় যাবি শুনি?”
“মনে করেছি ফরিদপুরে গিয়ে থাকবে।
“ফরিদপুর ?—সেই গুইসাহেবের দেশে নাকি ?
“হাঁ, গুইসাহেবদের গ্রামেই বটে--কিন্তু তাই বলে
তাদের বাড়ীতে গিয়ে উঠছি না মা।”
“তবে কোথায় থাকবি?”
“কেন, গায়ের ভিতরে একটা ছােটখাট কুঁড়ে বানিয়ে ?
অবাক হইয়া মেয়ের মুখের পানে চাহিয়া লক্ষ্মীর মা
বলিল,-“হিন্দুসমাজের ভিতরে নাকি?”
ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পাচারি করিতে করিতে লক্ষ্মী
বলিল,-“নিশ্চয়ই।”
“তারা যে আমাদের ছায়া পৰ্যন্ত মাড়বে না লক্ষ্মী ।”
লক্ষ্মীর মার চোখ ছলছল করিয়া আসিল।
“তারা আমাদের কাছে আসবে না বলেই ত আমরা
তাদের কাছে যাচ্ছি না!তুমি ভাবছাে পাগলামী কছি ?
ঘরের ডাক
১৭৬
মা, একটুও পাগলামী করছি না—সত্যি বছি এবার
গায়ে গিয়ে বাস করূবাে।”
লক্ষ্মীর মা কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া
উঠিল, 'আগে আমাকে সব কথা বলতে দাও মাতার পর
তােমার যা খুসী হয় বলো!-দেখ মা,—সত্য সব সময়
সকলের কাছে হাসিমুখে আসে না;—আমাদের কাছে সে
এসেছিল তার বিকট-মূর্তি নিয়ে, তাই তুমিও ভয়ে চোখ
বুজেছিলে, আমিও ভয়ে চোখ বুজেছিলুম-ঠিক্ কথা বছি
কিনা বুঝে দেখ মা! তুমি মনে করেছ আমি তােমার ভিতরের
কথা কিছুই জানতে পারিনি—কিন্তু তা নয় মা,আমি
তােমার মনের সব কথাই পড়ে ফেলেছিলুম,—প্রকাশ
করিনি কেবল এই ভয়ে, পাছে সত্যের সেই বিকট চেহারা
খানা আমাকেও একদিন স্বীকার করে নিতে হয়—মানুষের
মন, কি ভয়ানক দুর্বল মা!—তুমিই প্রথম সেই সত্যের
বিকট চেহারাখানা দেখুঁতে পেয়েছিলে--তখনও আমি খুব
ছোট—দুনিয়ার সমস্ত সত্যকে চোখ মেলে দেবার মত দৃষ্টি
তখন পর্যন্ত আমার ফোটেনি; তুমি মনে করেছিলে, এই যে
বিকট সত্য, যা রাতদিন তােমার চোখের সমুখে দীর্ঘকাল
ছায়া ফেলে ঘুরে ঘুরে মছে, আমাকে তার সেই ভয়ঙ্কর
মুখখানা দেখৃতে দেবে না। তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে পাছে আমি
১৭৭
ঘরের ডাক
ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পেরে যাই, এই ভয়ে তুমি আমার
কাছে কত সাবধান হয়েই না চলেছিলে না !—কতদিন কত
দুঃখ, কত চোখের জল, কত যন্ত্রণাকেই না তুমি বুকের
ভিতর জমিয়ে তুলেছ, মুখ চোখ দিয়ে তার একটুও আভাস
বাইরে প্রকাশ হতে দাওনি, পাছে আমি দেখে ফেলি, পাছে
আমার জীবনটাও তােমারি মতন ব্যর্থ হয়ে যায় । কিন্তু
সত্য কখন চাপ থাকে না মা! সে আপনিই আপনার পথ
করে নিলে একদিন আমার এই বুকের মাঝখানে--আনি
* শিউরে উঠলুম, তারপর তােমারি মতন তাকে অস্বীকার
করবার জন্য হঠাৎ একদিন উঠে পড়ে লেগে গেলুম।-তুমি
অমন করে চেপে কেঁদো না মা! কাদতে হয় গলা ছেড়ে
কঁাদ, দুঃখ যখন ভিতরে জমা হয়ে উঠেছে, তখন তাকে।
আত্মপ্রকাশ কতে দাও মা-চেপে রেখো না আমার
জন্যেও না-নিজের জন্যেও না।”
হঠাৎ ডুরাইয়া কঁদিয়া উঠিয়া লক্ষ্মীর মা বলিয়া
উঠিল, “কাবার সময় সারাজীবনে অনেক পাবাে লক্ষ্মী-
তুই কিন্তু একবার ভেবে দে—কি করতে বসেছি--
তারা যে তােকে একদণ্ডও টিকতে দেবে না লক্ষ্মী।”
ভাঙ্গা-গলায় লক্ষ্মী বলিল, “তারা টিকতে দেবে সে
আশা করে আমরা যাচ্ছি না মা-'আমরা যাচ্ছি নিজের
ধরের ডাক
১৭৮
টিকে থাকূব বলে ;--তুমি সব কথা ঠিক বুঝতে পারছে
, নয় মা? খােলসা করে বছি শোন ;-সেখানে গিয়ে
আমি গাঁয়ের ভিতর একটা ছােট-খাট মেয়ে-ইস্কুল খুলে
ব, সেখানে ছােট ছােট মেয়েদের প্রাণ ঢেলে লেখাপড়া
শেখাবে-তারপর মনে মনে ইচ্ছা আছে, একটি ছােট
হাস্পাতালও খুলবাে। এই ত পাওয়া ! তারা আমাদের
যেটুকু দেবে, সেইটুকুই কি কেবল পাওয়া মা?—আমরা
নিজে হ’তে যেটুকু আদায় করে নেবাে, সে পাওয়ার কি
ফোনই দাম নেই বলতে চাও?” তারপর কিছুক্ষণ চুপ
করিয়া থাকিয়া লক্ষ্মী হঠাৎ আবার আরম্ভ করিল, “আজ
আর কোন সত্যকেই চাপা দিতে চাই না মা--তা সে
যতই অপ্রিয় হােক না কেন ; সে কথা নিজের কাছেও
এতদিন লুকিয়ে এসেছি--জে তােম। কাছেও সে কথা
বলতে আমার এতটুকু বাধা নেই,--আমি নলিনী-বাবুকে
'ভালোবাসি—হাঁকৃপা কোরাে না মা—আমি নিজেই সব
কথা গুছিয়ে বছি ;- তুমি বলছ, যাকে পাওয়া যাবে
না তাকে ভালবেসে সারাজীবন দগ্ধে মরে লাভ কি, কিন্তু
মা, তােমার ওকথা আর শুছি না ? হিন্দুসমাজকে
তুমি আমি দুজনেই ভালবেসেছি, কিন্তু তাকে পাব না
এই ভয়ে দুজনেই সেই ভাবাসাকে এতদিন অস্বীকার
১৭৯
ঘরের ডাক
করে এসেছিলুম-অস্বীকার টিকলো কি মা?-টেকে না
মা-মিথ্যা কখন বেশীদিন টেকে না ”
অরুদ্ধকণ্ঠে লক্ষ্মীর মা বলিল, “তাদের সঙ্গে মানিয়ে
চলতে পারবি নে যে লক্ষ্মী।”
অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “যাদের আমর
চাই না, তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এতদিন চলতে পারলুম,
আর যাদের আমরা চাই, তাদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবে
না মা?”
“আমরা ত চাই, কিন্তু তারা যে চায় না বাছা!”
“নাই বা চাইলে তারা,--আমরা ত চাই, তা হলেই
হলো, আর, যখন চাই তথন পাবই ; তারা না দেয়, তাদেরও
যিনি দিয়েছেন, তিনি দেবেন।
“তুই বুঝছি না লক্ষ্মী, কত বড় শক্ত কাজে হাত
দিচ্ছি--
বাধা দিয়া লক্ষ্মী বলিয়া উঠিল, “কঠিন যে তা জানি
মা। তবু আমি পারবো। আমি জানি না, এ জোর আমার
কোথা থেকে আসছে। মা, মানুষ অন্ধনিয়তির সঙ্গেও
ত লড়তে ছাড়ে না, আর যে বাধা মানুষের তৈরী, তাকেই
কি কেবল আমরা ভয় কব ? দুঃখ আছে মাছি, কিন্তু
তার কাছ থেকে আমি পালিয়ে ছাড়ান পেতে চাই না
ঘরের ডাক
১৮০
মা। যদি পারি, এ দুঃখকে আমি জয় করব, আর যদি না
পারি, তবে আমার দুঃখভােগ দিয়ে আমার একান্ত আপনার
যারা তাদের দুঃখের সাধনাকে একটু অস্থতঃ অগ্রসর করে
রেখে যাব। কোনো আশা আছে কি না জিজ্ঞাসা
করছ ?আশা কাকে বলে জানি না। একটা কথা
জানি, যে-দুঃখের কাছ থেকে আমরা পালাতে চেষ্টা
করেছিলুম, সে দুঃখ মানুষের সৃষ্টি, যে বাধাকে ভয় করে-
ছিলুম, সে বাধাও মানুষেরই তৈরী। আমরা মানুষ। আমরা
যে মানুষ এই আমার একমাত্র আশা মা!”
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.