Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Swami-shishya Prasanga Part 2

2010/04/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্বামি--শিষ্য প্রসঙ্গ ২ ভাগ

No text on this page.

স্বামি-শিষ্য প্রসঙ্গ
২য় ভাগ
স্বামী ধ্রুবানন্দ গিৰি
সঙ্কলিত
ভােলানন্দ সন্ন্যাসাশ্রম
বরিশাল
মূল্যম
১৩৮ সন।

প্রকাশক
স্বামী বিশ্বেশ্বরানন্দ গিরি,
ভােলানন্দ সন্ন্যাসশ্রম,
বরিশাল।
প্রিন্টার
মহেন্দ্রনাথ দত্ত,
শ্রীসরস্বতী প্রেস,
১নং রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট,
কলিকাতা।

উৎসর্গ যাহার অমৃতময়ী রচনাবলী এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হইল, সেই প্রেমের আধার, করুণার মূর্তি বিদেহমুক্ত, শ্ৰীশ্রীগুরুদেব শ্রীমৎ স্বামী ভােলানন্দ গিরি মহারাজের শ্রীশ্রীচরণ- কমলে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি ভক্তি ও প্রেমের নিদর্শনস্বরূপ অর্পিত হইল। । শ্রীচরণাশ্রিত স্বামী ধ্রুবানন্দ গিরি

No text on this page.

মঙ্গলাচরণম গুরুর চরণে নমি কৃপার নিধান। প্রকাশ করি এ গ্রন্থ লওহে ধীমান । মাতা, পিতা, সুহৃদাদি, দেব, নৃপ, প্রাণ- সদ্ গুরু সবার শ্রেষ্ঠ বিনি দেন জ্ঞান ধম্মের সােপান আদি মরণ ভাবনা। মৃত্যুকে স্মরিতে কভু ভুলনা ভুলনা । মৃত্যুচিন্তা বৈরাগ্যেরে উদিত করাবে। অসার সংসার প্রতি স্পৃহা তেয়াগিব। দস্ত অহঙ্কার আদি মহামোেহদলে। ভস্মসাৎ করাইবে বৈরাগ্য অনলে। তৎপরে নিষ্কাম কৰ্ম্মে কবে প্রবৃত্তি। যাহা হতে হবে তব জ্ঞানের উৎপত্তি। জ্ঞানালােকে দেখা যাবে আত্মা সর্বময়। আত্মতত্ত্ব পরিপকে ব্রহ্মজ্ঞ নিশ্চয়।

No text on this page.

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
দ্বিতীয় ভাগ
প্রথম পরিচ্ছেদ।
নাসততা বিদ্যতে ভাবােনাভাবােবিদ্যতে সতঃ।
উভয়ােরপি দৃষ্টান্তনয়ােস্তত্ত্বদর্শিভিঃ । গীতা-২০১৬৷৷
(মস্তিষ্ক-বিকার যেরূপ মিথ্যা প্রতীতির কারণ হয়,সেইরূপ
অবিদ্যা জগৎ ভ্রমের কারণ হয় ] মায়াতীতের নিকট জগতের
অস্তিত্ব নাই।
আরতি ও মহিম স্তোত্রাদি পাঠান্তে শিষ্য ও কয়েকজন
সাধু স্বামিজীর নিকট বসিয়া আছেন।
শিষ্য। বাবা! বেদান্ত বলে, যেমন রঞ্জুতে সর্পভ্রম
হয়, সেইরূপ
ব্রহ্মে জগৎ ভ্রম হয় ; বস্তুতঃ যেরূপ
সেই সর্প মিথ্যা ও রঞ্জু সত্য, সেই প্রকার জগৎ মিথ্যা এবং
ব্ৰহ্মই সত্য। কিন্তু মনে এই সংশয় আসে যে প্রকৃতপক্ষে
সর্প বলে একটি সত্য বস্তু প্রত্যক্ষ করি এবং তাহার সংস্কার
হয়; পরে সর্পাকৃতি অপর একটি বস্তু
দেখে সেই

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ।
২
জগৎ
সংস্কারের ফুরণ হয়ে রজ্জুতে সর্পজ্ঞান আরােপিত
হয়। সুতরাং ব্রহ্মেও যদি এইরূপ
বোধ
আরােপিত হয়ে থাকে তাহলে জগৎ নামে প্রকৃত
একটি জিনিষ আছে যার সংস্কারের উদয় হওয়ায় ব্রহ্মে জগৎ
ভ্রম হচ্ছে। আর যেমন সপের সহিত রঞ্জুর সাদৃশ্য আছে,
সেইরূপ ব্রহ্মে এবং জগতেও সাদৃশ্য আছে ; তাহলে জগৎ
মিথ্যা কি করে হল ?
স্বা। বেশ প্রশ্ন করেছ! একটি লােক ঘুরূতে ঘুরতে
শুয়ে পড়ল। তখন তার মনে হল যেন জগৎটাই ঘুছে ;
কিন্তু বস্তুতঃ কি জগৎ ঘুছে। যা’র মস্তিক ভাল, তার
কাছে ত জগৎ ঘুরছে না।—সেইরূপ যারা অজ্ঞান দ্বারা
আচ্ছন্ন রয়েছে তাদের কাছেই জগৎরূপ একটি বস্তু প্রতিভাত
কিন্তু যারা মায়াতীত তাদের কাছে জগৎ বলে কোন
জিনিষই নাই।
এখন যদি বল যে এই অজ্ঞানতা কোত্থেকে এল ; এর
উত্তর নাই। এই জন্যই মায়াকে অনাদি বলে । মায়ার
উৎপত্তি কোত্থেকে হ’ল তা কেউ বলতে পারে না।
হচ্ছে;
* ‘সদেব সৌম্যেমগ্ৰমাকীং’ নেহ নানাস্তি কিঞ্চন’ ‘তত্র কো
মােহঃ কঃ শােক একত্বমনুপশ্যতঃ--ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য হইতে প্রতিপন্ন
হয় একমাত্র পরমাত্মাই সৎ পদার্থ ; এবং যেমন ভাল করিয়া দেখিলে
বুঝিতে পারা যায় যে মৃত্তিকা ব্যতিরেকে ঘট বলিয়া কিছুই নাই, তন্তু
ব্যতিরেকে পট বলিয়া কিছুই নাই সেইরূপ তত্ত্বদর্শিগণ অর্থাৎ যাহারা

প্রথম পরিচ্ছেদ
আবার দেখ মিথ্যাবস্তু দ্বারা সত্যবস্তুর জ্ঞান হয়। যেমন
ইন্দ্রজালে আমগাছ হ’লআম হ’ল; যে কখনও আম দেখেনি
তাকে ঐ ফলটি দেখিয়ে বলা হ’ল—এই দেখ আম’। কিন্তু
বাস্তবিক কি ওটি আম ?
শি। না ও ত মিথ্যা ।
স্বা। আচ্ছা, কিন্তু তার পর মনে কর ঐ কৃত্রিম আমটি
দেখিয়ে ঐন্দ্রজালিক চলে গেল,পরে ঐ ব্যক্তি বনে গিয়ে উক্ত
প্রকার প্রকৃত আম দেখে আম ব’লে চিন্‌তে পাল ও খেতে
লাগল এবং খেয়ে মহাতৃপ্তিলাভ কবুল। সেইরূপ গুরু শিষ্যকে
ইন্দ্রজালের আমরূপ এই মিথ্যা জগৎ
অবলম্বন করিয়া
সকল বস্তুর যথার্থ স্বরূপ অবগত হইয়াছেন তাহাদের দৃষ্টিতে সৎপদার্থ
হইতে বিভিন্ন অজ্ঞান, জীব, জগৎ প্রভৃতি কোনও বস্তুর সত্ত্বা বা
অস্তিত্বই নাই ; উহারা বন্ধ্যাপুত্রের ন্যায় অলীক। এখন যদি কেহ
জিজ্ঞাসা করে বন্ধ্যাপুত্র কোথা হইতে আসিল, তাহা হইলে যেরূপ
সেই প্রশ্ন নিরর্থক হয়, সেইরূপ যদি প্রশ্ন হয় অজ্ঞান কোথা হইতে
আসিল তাহা হইলে তাহার কোনও উত্তরই হইতে পারে না, মাত্র এই
বলা যাইতে পারে অনির্বচনীয় লৌকিক দৃষ্টিতে অজ্ঞান অনাদিকাল
হইতে চলিয়া আসিতেছে দেখা যায়, কিন্তু বিবেকীগণের নিকট
অজ্ঞানের কোনকালেই অস্তিত্ব নাই।
আচায্য গৌড়পাদ
বলিয়াছেন :-
অসতো মায়য়া জন্ম তত্ত্বতত নৈব যুজ্যতে।
বন্ধ্যাপুত্রোন তবেন মায়য়া বাইপি জায়তে *
(মাণ্ড ক্য কারিকা, অদ্বৈত প্রকরণ-২৮ শ্লোক)

{
৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
বনের সত্য আমরূপ ব্ৰহ্মকে উপলব্ধি করান। ‘জগৎ মিথ্যা,
জগৎ মিথ্যা বললে বাস্তবিকই সত্যবস্তুর দিকে দৃষ্টি
পড়ে * ;-অর্থাৎ সচ্চিদানন্দ স্বরূপ আত্মাই সত্য এইরূপ
ধারণা হতে থাকে। আর যেমন ইন্দ্রজালের আমের অস্তিত্বই
নাই, সেইরূপ বস্তুতঃ জগতেরও অস্তিত্ব নাই।
[
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
যথাের্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্নতে চ যথা পৃথিব্যাােেষধয়ঃ সম্ভবন্তি,
যথা সতঃ পুরুষাৎ কেশলােমানি তথাৎ সম্ভবতীহ বিশ্বম্।
মুণ্ডঃ উঃ ১১৭ ঃ
স্থল সূক্ষ্ম বা কারণ শরীর ডােক্ত নহে—জীবাত্মা
ভােক্তা ]
হরিদ্বার-৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮টা। আরতি
ও মহিম স্তবাদি পাঠান্তে শিষ্য কেদারনন্দজী, শিবানন্দজী ও
অপর দুইজন সাধু স্বামীজীর নিকট বসে আছেন। স্বামিজীর
শরীর অসুস্থ।
স্বা-শিষ্যকে) দেখ, একটু দুর্বল মনে ক’ছি।
সারাদিন ত’ বেশ ছিলেম, কিন্তু মহিমু স্তোত্র পাঠ কতে
একটু কষ্ট বােধ হচ্ছিল।
দৃশ্যং নাস্তীতি বােধে মনসাে দৃশ্য মার্জনম্ ।
সম্পন্নঞ্চেৎ তদোৎপন্না পরা নিৰ্বাণনিৰ্বতিঃ।
যােগবাশিষ্ঠ

। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
শি। স্থূল শরীর অম্নময় কোষ, অন্ন না পেলেই দুর্বল
হবে, এটি প্রকৃতির ধর্ম।
স্বা। হাঁ, ঠিক বলেছ, আচ্ছা বলত ভােগ করে কে ?
শি।
স্থূল শরীর।
স্বা। যদি স্থূল শরীরই ভােগ করে, তবে মৃত্যুর পর ত
শরীর পড়ে থাকে ; চোখ, মুখ, কাণ সকলই পূৰ্ব্ববৎ থাকে,
কিন্তু তখন ভােগ করতে পারে না কেন ?
শি। সূক্ষ্ম শরীরের সত্ত্বায় স্কুল শরীর ভােগ করে
থাকে। মৃত্যুর পর সূক্ষম
মৃত্যুর পর সূক্ষম শরীর স্থল শরীর পরিত্যাগ করে
চলে যায়,কাজেই স্থূল শরীরেই বাসনা কামনার নিবাস এবং
সূক্ষ্ম শরীর বাসনানুযায়ী স্কুল শরীর ধারণ করে বিষয়ভােগ
করে থাকে।
পঞ্চপ্রাণমনাে বুদ্ধি দশেন্দ্রিয় সমন্বিতম্ ।
শরীরং সপ্তদশভিঃ সূক্ষ্মং তৎ লিঙ্গমুচ্যতে । (পঞ্চদশী)
অর্থাৎ প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান,—এই পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ
জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কৰ্ম্মেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি এই সপ্তদশ অবয়বে নির্মিত
শরীরকে সূক্ষ্ম শরীর বা লিঙ্গ শরীর বলে।
হস্ত মস্তকাদি সম্পন্ন পুরুষের হিতা’ নামে প্রসিদ্ধ নাড়ী আছে।
কেশাগ্রের সহস্রভাগের সম পরিমাণ সূক্ষ্ম ও শুক্ল, নীল, পিঙ্গল, হরিত
ও লােহিতবর্ণ রসে পরিপূর্ণ দেহব্যাপী নাড়ী-সমূহের অভ্যন্তরে উল্লিখিত
সপ্তদশ অবয়বসম্পন্ন লিঙ্গশরীর অবস্থান করে।
সমুদয় বাসনা
লিঙ্গশরীর আশ্রয় করিয়া থাকে।
বৃহদারণ্যক-২৭২২০ ‘গ’ভাষ্য।
২৭২২

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ।
শি।
স্বা। তাহলে সূক্ষম শরীর স্বয়ং ভােগ করতে পারে না।
শি। স্থূলশরীর ভােগায়াতন দেহ; সূক্ষ্ম শরীর তার
সাহায্যে ভােগ করে। সূক্ষ্ম শরীর স্বয়ং ভােগ করতে পারে
বলেই পাপীরা মৃত্যুর পর নারকীয় দেহ ধারণ করে এবং
পুণ্যাত্মারা দেব দেহ ধারণ করে স্বর্গ ভােগ করে।
স্বা। সূক্ষ্ম শরীরে শরীরের সাহায্য বিনা যদি ভােগ
হয়, তবে লােকে দেব প্রতিমা তৈয়ারী করে তাতে প্রাণ
প্রতিষ্ঠা করে কেন? তাতে ভগবানের ধ্যান করে কেন?
ভগবান এসে দেখা দেবেন মনে করে ধ্যান করে
থাকে; কিন্তু ভগবান যে সূক্ষ্ম শরীরে এসে তাদের ভােগ
গ্রহণ করেন, এ তাদের কল্পনা মাত্র।
[ ঈশ্বর ভক্তাধীন বলিয়া প্রতীয়মান হইলেও প্রকৃতপক্ষে
অসঙ্গ, অকর্তা, ও নির্বিকার ]
স্বা। আচ্ছা, ভগবান ত স্বাধীন, তাহলে লােকে তার
মূর্তি ধ্যান করলে তিনি আসেন কেন ?
শি। তা আসবেন না কেন! চিন্তার বলে তাকে
আসতেই হবে।
স্বা। তবে তিনি স্বাধীন হলেন কি করে ? প্রায়
আদেশ যদি রাজাকে শুনতে হয়, তবে তাকে কি স্বাধীন
,
বলা যায় ?
শি। ভগবান স্বাধীন নন, তিনি ভক্তের অধীন।
গীতায়ও আছে--

| দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
৭
সমােহহং সৰ্ব্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোহস্তি ন প্রিয়।
যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়িতে তেষু চাপ্যহম্ ।
গীতা-৯২৯।
অর্থাৎ আমি সৰ্ব্বভূতেই সমভাবে বিদ্যমান। আমার
প্রিয় বা দ্বেষ্য কেহ নাই, কিন্তু আমাকে যাহারা ভক্তিপূর্বক
ভজনা করেন, তাঁহারা (স্বভাবতঃ) আমাতেই অবস্থান
করেন এবং আমিও ( স্বভাবতঃ ) সে
সকল ব্যক্তির
মধ্যে অবস্থান করি।
তা হলে ভগবান একদেশী ?
শি। তা বৈকি ; যখন তিনি ভক্তের পক্ষপাতী তখন ত’
তিনি একদেশীই।
স্বা। হাঁ, দ্বৈতভাবে দেখতে গেলে তাকে অনেকটা সেই
প্রকারই মনে হয় বটে; কিন্তু বস্তুতঃ তিনি একদেশী নন। সে
দিনের ইন্দ্রজালের আমের গল্প মনে আছে ত’?
শি। হাঁ, আছে।
পুত্র, ভগবান বস্তুতঃ কাহাকে
কোন কর্মে নিযুক্ত করেন এবং
ফলও
দেন না। লােকে অজ্ঞানদ্বারা আবৃত হয়ে আমি
কাজ কছি’–এই কাজ করলে এই ফল পাব,
-এই প্রকার মনে করে থাকে এবং তদনুযায়ী মায়াবিম্ভিত
ফলও পেয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রজালের আম
যেমন সম্পূর্ণ মিথ্যা, সেইরূপ কর্তা, ক্রিয়া, কৰ্ম্ম ও কর্মফল
তদ্বং

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
॥
এবং কৰ্ম্মের প্রেরয়িতা ও ফলদাতা সমস্তই মিথ্যা, ভগবান
সৰ্ব্বদাই অসঙ্গ, অকর্তা ও নির্বিকার।
শি। হাঁ, এ ঠিক বলেছেন। গীতায়ও আছে -
“ন কর্তৃত্বং ন কৰ্ম্মাণি লােস্য সৃজতি প্রভু।
ন কৰ্ম্মফলসংযােগং স্বভাবস্তু প্ৰবৰ্ত্ততে গীতা, ৫ (১৪)।
অর্থাৎ ঈশ্বর জীবের কর্তৃত্ব, কর্মসকল বা কৰ্ম্মফল সংযােগ
সৃষ্টি করেন না, কিন্তু স্বভাব (অবিদ্যাই) কর্তৃত্বাদিরূপে প্রবৃত্ত
হইয়া থাকে।
স্বা। হাঁ, বৎস! এবার মনে ঠিক বসে গিয়েছে।
শি হাঁ, কিন্তু আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর এখনও হয়
নাই।
স্বা। কি প্রশ্ন ?
শি। ভােগ কে ভােগে এবং কেন ভােগে ?
স্বা। জীবাত্মা ভােগে। * মাকড়সা দেখেছ ?
শি। ।।
‘ন চ মাং তানি কৰ্ম্মাণি নিবন্তি ধনঞ্জয় ।
উদাসীনবদাদীনমসক্তং তেষু কর্ম ।”
—গীত-৯৯
অসঙ্গে ন হি সিজ্জতে”—উপনিষদ
চাতুৰ্বৰ্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকৰ্ম্মবিভাগশঃ ।
তস্য কৰ্ত্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকৰ্ত্তারমব্যয়ং গীতা ৪১৩
* আত্মেন্দ্রিয়মনােযুক্তং ভােক্রেত্যাহুমনাবণ”।-কঠ ৫৮ শ্লো।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
৯
স্বা। মাকড়সা যেমন নিজের ইচ্ছায় জাল রচনা করে
তার ভিতর নিজে জড়িয়ে যায়, সেইরূপ জীবাত্মা বাসনারূপ
জাল রচনা করে তার ভিতর আবদ্ধ হয় এবং তদনুরূপ
তােগায়তন শরীর পেতে থাকে।
[সূক্ষ্ম শরীর স্থল শরীর ব্যতীরেকেও সুখ দুঃখাদি ভােগ
করিতে পারে]
শি। আর একটি প্রশ্ন আছে।
স্বা। কি প্রশ্ন ?
শি। সূক্ষ্ম শরীর দ্বারা কি বাস্তবিকই ভােগ করা যায় না?
স্বা।
কেন যাবে না? স্বপ্নে কখনও কখনও মিঠাই
প্রভৃতি খাও বলে মনে হয় কিনা ?
শি। হাঁ, স্বপ্নে ত’ কতই মনে হয়। কখনও ভয় হয়,
কখনও আনন্দ হয় কখনও মিঠাই খাচ্ছি মনে হয়, আরও
কত কি!
স্বপ্নে কে ভােগ করে ?
শি। সূক্ষ্ম শরীর দ্বারা জীবাত্মা ভােগ করে।
স্বা।
এখন তার প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছে ত’ ?
স্বপ্নের ভােগ ত’ আর সত্য নয়। সূক্ষ্ম শরীর
জাগ্রতাবস্থায় জাগতিক বস্তু সকল ভােগ কতে পারে কি ?
[জাগ্রত স্বপ্ন ও সুষুপ্তি সকলই স্বপ্নবৎ মিথ্যা]
স্বা। জাগ্ৰদবস্থা, স্বপ্নাবস্থা, সুসুপ্তাবস্থা সকলই স্বপ্নবৎ
মিথ্যা।
# স্বপ্নাবস্থায় স্বপ্নদৃষ্ট বস্তু সকল সত্য বলে মনে হয়
* তস্য জয় আবসথায় স্বপ্ন (জাগ্রৎস্বল্পসুষুপ্তাখ্যাঃ) ঐতরেয়-৩২১১২
শি।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ ; বটে, কিন্তু জাগ্রত হলে সেগুলি মিথ্যা বলে প্রতীত হয় । তদ্রুপ জাগ্ৰদবস্থার স্বপ্নও (অর্থাৎ জাগ্ৰদবস্থার ইন্দ্রিয়গােচর পদার্থ সমুদয়) মিথ্যা; কারণ তত্ত্বজ্ঞান হলে জাগতিক বস্তু সমূহকেও মিথ্যা বলেই ধারণা হয়ে থাকে। * স্বপ্নাবস্থা ৫।৬ ঘণ্টা স্থায়ী থাকে, আর জাগ্ৰদবস্থা একটু দীর্ঘকাল স্থায়ী। বস্তুতঃ উভয়ই স্বপ্ন। সূক্ষ্ম শরীরের বলেই স্থূল শরীর সব কাজ করে। সূক্ষ্ম শরীরই স্থূল শরীর রচনা করে নেয়। [ সূক্ষ্ম শরীরও স্থূল শরীরের ন্যায় গমনাগমন করিতে পারে ) শি। সূক্ষ্ম শরীর কি কোথাও যেতে পারে ? ‘জ্ঞাতে দ্বৈতং ন বিদ্যতে’-মাণ্ডুক্যকারিকা ১৮ শ্লোক। ‘অদ্বৈতে স্থৈর্যমায়াতে দ্বৈতে চ প্রশমংগতে। পশ্যন্তি স্বপ্নবােক চতুর্থাং ভূমিকামিতঃ-যােগবাশিষ্ঠ। * বৃহদারণ্যক শ্রুতিতে লিখিত আছে-পুরুষের দুইটি স্থান আছে, একটি বর্তমান জন্ম, অপরটি পরলােকরূপ স্থান। ইহলােক ও পরলােকের মধ্যবর্তী যে স্থান তাহা হইতে যাহার উৎপত্তি সেই স্থানের নাম স্বপ্ন বা সন্ধ্য স্থান। এইখানে জীব পরলােক পাইবার জন্য পূর্বসঞ্চিত জ্ঞান ও কর্ম সংস্কারগুলি অবলম্বন করিয়া ইহলােক ও পরলােক নিরীক্ষণ করিতে থাকে, এবং ইহলােকের কৰ্ম্মরাশির বিরাম হইলেই বাসনাময় অপর স্বপ্নদেহ রচনা করে। এই সময় আদিত্যাদি বাহজ্যোতির অভাবে আত্মজ্যোতি দ্বারা সম ব্যবহার নিস্পন্ন হয়, এবং জীব আত্মীয় দীপ্তিদ্বারা বাসনাবােশিষ্ট অন্তঃকরণ বৃত্তি সমূহ প্রকাশ করে এবং অন্তঃকরণের বৃত্তিই তখন সর্বপ্রকার বাসনা সহকারে গ্রাহবিষয়রূপে প্রকাশ পাইতে থাকে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১১ স্বা। কেন পারবে না; মৃত্যুর পর স্থূল শরীর ত এখানে পড়ে থাকে! সূক্ষ্ম শরীর চন্দ্রলােক সুৰ্য্যলােক প্রভৃতি ভেদ করে যায়। শি। মনুষ্যযােনির সুক্ষ্ম শরীর এবং পিপীলিকা প্রভৃতি অন্যান্য যােনির সূক্ষ্ম শরীর মধ্যে কি কোন প্রভেদ আছে ? স্বা। , যে যােনিতেই হাে’ না কেন সূক্ষ্ম শরীর এক প্রকার। সূক্ষ্ম শরীরের কখনও বিনাশ হয় না। হাতীর দেহে সূক্ষ্ম শরীর যতটুকু, পিঁপড়ের দেহেও ততটুকু। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে শরীরমাত্রই মিথ্যা। জ্ঞান হলে শরীরত্রয় (স্কুল, সূক্ষ্ম ও কারণ) আর থাকে না। # তখন আমি অব্যয়, অখণ্ড, অদ্বিতীয় বলে জ্ঞান হয়। সুক্ষ্ম শরীর সেই অখণ্ড চৈতন্যের সত্ত্বায় কাজ করে থাকে; চৈতন্যই সৰ্ব্ব- শক্তির মূল—তুইই সেই চৈতন্য । সমুদায় শরীর হতে নিজেকে পৃথক্‌ জেনে নিজের স্বরূপের প্রতি দৃষ্টি দিসনা কেন ? ছিলে সৰ্বদেশী, এখন নিজেকে ভাবছ একদেশী। শি। জ্ঞান হলে আমি সর্বদেশী বলে মনে হয়ে থাকে। কিন্তু তৎপূৰ্ব্বেত একদেশী বলেই মনে হয় । • চৈতন্য। সমুদায় জ্ঞানদেব তু কৈবল্যৎ প্রাপ্যতে যেন মুচ্যতে ইতি সুতে। কৈবল্যং- কেবল আত্মার ভাব অর্থাৎ দেহাদি শূন্যতা। # “যস্যানুবিত্ত প্রতিবুদ্ধ আত্মহস্মিন্ সন্দেহে গহনে প্রবিষ্ট স বিশ্বকৃৎ স হি সর্বস্ত কৰ্ত্তা, তস্ক লােকাঃ স ঔ লােক এব—য। বৃহ, ৪ অঃ, ব্রা, ৩ শ্লোক ১২ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ জ্ঞান নিত্যপ্রাপ্ত, সাধ্য নহে—অবিদ্যা বলে কোন বস্তু নাই জ্ঞান আবার হবে কিরে ? তুই ত জ্ঞান স্বরূপই।* জিনিসের উৎপত্তি আছে, তার ত’ বিনাশও অনিবার্য। জ্ঞানের যদি উৎপত্তিই হবে, তবে তার ধ্বংশও হবে। * গীতার ১৮ অধ্যায়ের ৫০ শ্লোকে জ্ঞান নিষ্ঠার বর্ণণপ্রসঙ্গে ভাষ্যকার বলিয়াছেন—“সৰ্বত্ৰ হি বুদ্ধাদ্দিদেহান্তে আত্মচৈতন্যাভাসতাত্মভ্রান্তি কারণমিত্যত আত্মবিষয়ং জ্ঞানং ন বিধাতব্যং ?”—অর্থাৎ মনুষ্য পণ্ড পক্ষী প্রভৃতি সকলে যে ভ্রান্তি বশতঃ মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়, দেহ প্রভৃতিকে আত্মা বলিয়া মনে করে ইহার কারণ আত্মচৈতন্যাবভাসতা সকলেরই আছে ; অর্থাৎ ‘আমি আছি’ এইরূপ একটা জ্ঞান সকলেরই আছে ; সুতরাং আত্মজ্ঞান অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ; ফলতঃ আত্মবিষয়ক জ্ঞানের বিধান করিবার আবশ্যকতা নাই। তবে আবশ্যক কি? তদুত্তরে আচাৰ্য্য বলিতেছেন—“নামরূপাদ্যনাত্মধ্যারােপণ নিবৃত্তিরেব কাৰ্য। নাত্মচৈতন্য- বিজ্ঞান, সৰ্বেরভুপগম্যতে অবিদ্যাধ্যারােপিত সৰ্বপদার্থকারৈরেব বিশিষ্টতয়া গৃহমাণত্বাৎ*—অর্থাৎ আত্মাতে যে নাম ও রূপের আরােপ তাহারই নিবৃত্তি করিতে হইবে, আত্মচৈতন্যের বিজ্ঞান করিতে হইবে ; যেহেতু আত্মজ্ঞান অবিদ্যা দ্বারা সকল পদার্থে আরােপিত হইয়া সেই সেই পদার্থের আকারে সর্বদাই বিশিষ্টভাবে প্রাপ্ত হওয়া যায় । শ্রুতিও বলিয়াছেন—ন হি বিজ্ঞতুর্বিজ্ঞাতেঃ বিপরিত্নাপাে বিদ্যতে” “বিজ্ঞানমানন্দং ব্ৰহ্ম”, “সত্যং জ্ঞানমানন্দং ব্রহ্ম” “বিজ্ঞতারমরে কেন বিজাণীয়াৎ ‘ন বিজ্ঞাতের্বিজ্ঞাতারং বিজানীয়া ইত্যাদি। তাৎপৰ্য এইযে শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তির নিকট স্বয়ং প্রভা জ্ঞান মেঘ অপসারিত হইলে সূর্যের ন্যায় আপনা আপনিই প্রকাশিত হন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শি। আমি যদি জ্ঞান স্বরূপই হ'লাম, তবে এই অজ্ঞানতা কি করে আচ্ছন্ন করল ? অজ্ঞানতা বলে বস্তুতঃ কোন জিনিষই নাই, উহা মিথ্যা। (ক) যেমন মা শিশুকে বলে “ঐ দেখ জুজু আসছে, শীঘ্র চোখ বােজ’। শিশু জুজুর ভয়ে, চক্ষু বুজিয়ে মনে মনে তার একটা রূপ কল্পনা করে নেয়—যেন তার বড় বড় পা, বড় বড় দাত, বড় বড় নখ, ইত্যাদি। কিন্তু, যেমন প্রকৃত পক্ষে জুজু বলে কোন বস্তুই নাই, শিশু মাত্র জুজুর নাম শুনে সেটাকে সত্য ভেবে ভয়ে বিহ্বল হয়ে থাকে, সেইরূপ অজ্ঞান, জন্ম মৃত্যু, জরা, বন্ধন, মুক্তি প্রভৃতি কিছুই তাের নাই, তুই কেবল শুনে শুনে সেগুলিকে সত্য ভেবে শিশুর মত ভয়ে বিহ্বল হয়েছি। অজ্ঞান, জন্ম, মৃত্যু, প্রভৃতি সকলই জুজুর মত মিথ্যা, তাের সংকল্প দ্বারাই সেগুলির সৃষ্টি হয়েছে, সমুদায় সংকল্প ছেড়ে দিলেই নিজেকে বিশ্বের আধার, সৃষ্টি, স্থিতি, ও প্রলয়ের কর্তা বলে জ্ঞান হয়। (খ) (ক) ধম্মা য ইতি জায়স্তে, জায়ন্তে তে ন তত্ত্বতঃ । জন্মমাযােপমং তেষাং স য মায়া ন বিদ্যতে। ন কাছে বিদ্যতে দেব ন পাষাণে ন মৃন্ময়ে। ভাবে হি বিদ্যতে দেবঃ ভস্মাৎ ভায়রা হি কারণ - মাণ্ড ক্য-কারিকা |—অর্থাৎ অবিদ্যমান বা অসৎ পদার্থেরই নাম মায়া সুতরাং তাহা বস্তুভূত নহে। (খ) সহস্রাঙ্কুর শাখাত্ম ফলপল্লবশালিন। অন্য সংসারবৃক্ষস্য মনােমূল মহারঃ।

১৪ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ শি। এই জগত তােরই একাংশে স্থিত। (গ) মনে কর, তুই যেন এই সাড়ে তিন হাত পরিমিত দেহই; এই দেহের একাংশে যেমন নখ ও চুল আছে, সেইরূপ আত্মার (তাের স্বরূপের) একাংশে এই জগৎ অবস্থিত। তা হলে ভগবান বলে কোন বস্তু নাই। [ সঙ্কল্প হইতেই দেবাদির আবির্ভাবসঙ্কল্প আত্মার —আত্মা অবাঙ, মানসােগােচর ] ভগবান্ আছে কি নাই এ তাের মনের কল্পনা। যে যে প্রকার কল্পনা করে, তার কাছে সেই প্রকার বস্তুই যে নৃসিংহ-দেবকে কল্পনা করে, তার কাছে নৃসিংহ- অাসে। সঙ্কল্পমেব তন্মধ্যে সঙ্কল্লোপশমেন তৎ। শােষয়ামি যথাশােষমেত সংসারােদপঃ। যােগাবশিষ্ঠ উপগম প্রকরণ-১৬। বিগতবাসন্নমাপ্ত বিপিগতা। মুপগতং মন আত্মতযােদিতম্। যদভিবাঞ্ছতি তদ্ভবতি ক্ষণাৎ সকলশক্তিময়য় হি মহেশ্বর। ঐ ঐ -৮৯৬৮ (গ) অথবা বহুনেতেন কিং জ্ঞাতেন তবাৰ্জুন। বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎসমেকাংশেন স্থিতো জগৎ। গীতা-১০২ পরমেবাক্ষরং প্রতিপদ্যতে, স যে হি টবৈ তদচ্ছায়মশরীরং লােহিতং শুভ্ৰমক্ষরং সেদয়তে বস্তু সৌম্য। স সর্বজ্ঞঃ সর্বো ভবতি। প্রশ্ন ৫১১০

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দেব এসে উপস্থিত হন। যে কালী, শিব, বা বিষ্ণুর সঙ্কল্প
করে, তার কাছে কালী, শিব বা বিষ্ণু এসে উপস্থিত হন।
বস্তুতঃ এসব সংস্কল্পানুযায়ী এসে থাকে। (ক) যার কোন
প্রকার সঙ্কল্প নাই, তার নিকট এসবই মিথ্যা বলে মনে হয়।
আচ্ছা বলত এ সংকল্প কার ?
শি। আমার।
স্বা। তুই কে ?
শি। আমি আত্মা।
স্বা। আত্মা নাম কে রেখেছে, তুইইত ; নয় কি
? তাের
সংকল্পই আত্মা প্রভৃতি নাম রেখেছে।
শি। হাঁ ঠিক। “নামরূপাতীতােহহ”।
(ক) যথা বীজাহক্ষা ব্যোম ব্যাপগতি কালতঃ
তস্মৈবেদং স্বসঙ্কল্পাৎ সম্বেদ্যমসখিতম্ ॥
যদেব ভাবত্যে তদেৰ ভবতি ঋণাৎ।
দেৰৰ নাসৌ সুয়ােরক্ষো যক্ষঃ কিং কিন্নারােজন।
আত্মৈবাদ্যৰিসিন্যা জগন্নাটুং নৃত্যতি । বােগাশিষ্ঠ
উপশমপ্রকরণ ৯১৮৭২
হরিরাত্ম। হি ভূতানাং তস্য যৎ প্রতিভাষতে।
তত্তথৈব ভবত্যান্ড সৰ্বমাত্মৈব কারণম্।
যােগবশিষ্ঠ উপশমকরণ ৪২১৮

১৬
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বা। “নামরূপাতীতােহহ” এও ত তাের কল্পনা দ্বারাই
সিদ্ধ হয়েছে।
শি। ।।
বস্তুতঃ তুই যে কি বলা যায় না। “যতো।
বাচো নিবৰ্ত্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ”। (ঙ)
শি। সাধন বলে সূক্ষ শরীর কি দেখা যায় ?
স্বা। হাঁ, সাধন বলে সূক্ষ্ম শরীরকে স্থূল শরীরের সম্মুখে
দণ্ডায়মান দেখতে পাওয়া যায়।
সেই দিনের কথােপকথন এই খানেই শেষ হইল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
অবশ্যম্ভাবিভাবানাং প্ৰতীকারো ভবেদ্যদি।
তদা দুঃখৈন লিপ্যেরম্নলরাম যুধিষ্ঠিরা।
--তৃপ্তিদীপ--১৫৬। পঞ্চদশী
[ প্রারব্ধভােগ অনিবাৰ্য্য-ঔষধাদি নিমিত্ত মাত্র ]
হরিদ্বার, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮টা।
(ক) ন ত চক্ষুর্গচ্ছতি ন বা গচ্ছতি নাে মনঃ।
ন বিদ্যে। ন বিজানীমে যখৈতদশিষ্যাং।
অন্যদেব তদৰিদিতাদখাে অবিদিতাদধি। কেন, ৩৪
অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ তন্নাসদুচ্যতে । গীতা, ১৩১২

শি।
শি।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
১৭
আরতি পাঠের পর শিষ্য ও কয়েকজন সাধু স্বামিজীর
নিকট বসিয়া আছেন।
বাবা, আপনাকে ডাক্তার যে ঔষধ খেতে বলেছেন
সে ঔষধ ডাক্তার খানায় পাওয়া যায় কি ?
স্বা। রেখে দে, ঔষধ খেয়ে কি হবে? ঔষধ খেলেই যদি
বাঁচা যেত তাহলে রাণী ভিক্টোরিয়া রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড
প্রভৃতির মৃত্যু হ’ল কেন ? তাদের কি ডাক্তার বা ঔষধের
অভাব ছিল ?
ঔষধ খেলে মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা পাওয়া যায়না
বটে, কিন্তু রােগের সাময়িক উপশম হয়ে থাকে ত’ ?
স্বা। না, একথা ভুল। গোরক্ষনাথের একটি ফোঁড়া
হয়েছিল। তিনি বার বৎসর সেই ফোঁড়ার জন্য কষ্ট
পাচ্ছিলেন, কোনও ডাক্তার কবিরাজকে দেখাননি।
বছর পরে একটি বুটি ( ঔষধ ) এসে তাকে বললে আমাকে
বেটে ঐ ফোড়াতে লাগাও। গােরক্ষনাথ বললেন---এই
বার বৎসর হ’ল এই ফোড়া থেকে কষ্ট পাচ্ছি, তার
মধ্যে তুমি একদিনও এমন কথা বলনি, আর আজ বলছ
কেন ? বুটি বলে—তােমার প্রারব্ধ কৰ্ম্মের বার বৎসর
ভােগ ছিল, এখন তা পূর্ণ হয়েছে, কাজেই এখন ঐ
ফোড়াতে ঔষধ না দিলেও শুকিয়ে যাবে । কিন্তু আমাকে
যদি বেটে লাগাও তাহলে জগতে আমার একটু নাম হবে
যে অমুক বুটির গুণেই বার বৎসর যে কেঁাড়া সারেনি তা’আজ

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
সেরে গেল ! হে পুত্র! প্রারব্ধ ভােগ করতেই হবে, ঔষধে
কিছুই করতে পারে না; তবে এই ডাক্তারের কাছে যাই এসব
ব্যবহারিক সত্ত্বা রক্ষা করবার জন্য। বাহিরে ত্যাগীর ভাব
যত কম দেখিয়ে পারা যায় ততই ভাল। ভিতরে অনাসক্ত
থেকে বাহিরে আসক্তের মত সকল কাজ করে যেতে হয় ;
—লােকে দেখে মনে করবে খুব বিষয়ী, সুতরাং বৃথা বিরক্ত
করতে আসবে না। আর বাহিরে যদি খুব ত্যাগীর ভাব
দেখাও অথচ অন্তরে আসক্তি থাকে তাহলে মহা মুস্কিল ;
—লােকে এসে বিরক্ত করবে ও সাধনে ব্যাঘাত দেবে, অন্তরে
শান্তি মিলবে না। কলসী গুড়ে পরিপূর্ণ করে যদি মাত্র
কয়েকখানা পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা যায়, তা হলে মাছিতে
নষ্ট করে না, কিন্তু ভিতরে পাতা ভরা আর কলসীর মুখে
একটু গুড় রাখলে মাছি ভ্যান, ভ্যান, করবেই
শি। সাধনে যে মন বসে না !
সিদ্ধি লাভ করা চাই কিন্তু সাধনে ইচ্ছা নাই,
ক্ষুধা আছে কিন্তু রাঁধতে ইচ্ছা করে না। অর্থাৎ বুঝতে
হবে যে প্রকৃত পক্ষে ক্ষুধাই নাই; ক্ষুধা থাকলে কি আর
রেধে পারে ?
[ প্রকৃত বৈরাগ্যের স্বরূপ—বৈরাগ্য মনে ]
স্বা। বৈরাগ্য ত’ সকলেরই আছে। শৈশব অবস্থার
উপর এখন তাের কি রকম বৈরাগ্য! সে অবস্থার কথা
এখন একবারও মনে হয় না; এর পর আবার বাৰ্ধক্য

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
উপস্থিত হলে বর্তমান যৌবনাবস্থার উপরও বৈরাগ্য হবে।
প্রকৃত বৈরাগ্য কি রকম জানি ?—যেমন মল মূত্রের উপর।
মল মুত্র ত্যাগ করে এসে তার উপর আর মন যায় না, সেই
মল মূত্র ত তােরই পেটে উৎপন্ন হয়েছিল, কিন্তু তবু কি
বৈরাগ্য। সেটা কুকুরে খেলে, না কাকে খেলে,না পচে গেল
সেদিকে আদৌ দৃষ্টি নাই! তেমনি এই দেহের উপর যখন ঐ
রকম অনাসক্তি হবে তখন বুঝবি হ। কিছু বৈরাগ্য হয়েছে।
কেবল বাড়ী ঘর ছাড়লেই বৈরাগ্য হয় না, বৈরাগ্য চাই মনে,
ঘরে বসেও সাধন করা যায়। আসল কথা, বৈরাগ্য না
থাকূলে বনে গেলেও কোন লাভ নাই, আর বৈরাগ্য থাকূলে
ঘরে বসেও সাধনা করা চলে।
[অভ্যাস ও বৈরাগ্যের অভাব—সিদ্ধি লাভের অন্তরায়]*
সাধনে মন বসে না কেন ? একঘুমের পর ব’সে যাত’
আসনে, দুলু ঢুলু নয়নে ভগবানের গুরুমহারাজের ধ্যান
* পতঞ্জলির যােগসূত্রে উক্ত হইয়াছে দৃষ্টানুবিকবিষয়বিতৃষ্ণস্য
বশীকার সংজ্ঞা বৈরাগ্যম্। তৎ পরং পুরুষ খ্যাতেগুণবৈতৃষ্ণম্।
অর্থাৎ দৃষ্ট বিষয় ও শাস্ত্রোক্ত বিষয় এই উভয় বিষয়েই সম্পূর্ণ নিষ্পহ
হইলে বশীকার নামক বৈরাগ্য জন্মে। ইহার। আমার বশ্য, আমি
ইহাদের বশ্য নহি—এইরূপ জ্ঞানকে বশীকার বৈরাগ্য বলে। এইরূপ
বৈরাগ্য আত্মদর্শনাভ্যাস হইতে উৎপন্ন হয়। ইহাকে যােগশাস্ত্রে
ধৰ্ম্মমেঘ ধ্যান বলে। ধর্মমেঘাখ্য ধ্যানাভ্যাসের ফলে গুণের প্রতি অর্থাৎ
প্রকৃতির প্রতি বাস্তবিক বিতৃষ্ণা জন্মে। পতঞ্জলি যােগসূত্রম্ ---১৫১৬

২০
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
কত, দেখি কোথায় থাকে দেহাধ্যাস! এই রকম ধ্যান
কতে কতে দেহাধ্যাস মােটেই থাকে না।
ব্ৰহ্ম চিন্তা
করতেই থাক। যারা ব্ৰহ্মচিন্তায় মগ্ন থাকে তারা প্রারব্ধ
বশে কোন ভােগ উপস্থিত হলেও একটু বিচার করে সেই
ভােগ থেকে মনকে প্রতিনিবৃত্ত করে, আবার ব্রহ্মচিন্তায় মগ্ন
যেমন রেলগাড়ী চলছেই, কিন্তু যেখানে প্রারব্ধভােগ
রূপ ষ্টেশন আসে সেখানে কিছুকাল থেমে আবার চলতে
থাকে।
[ পদ্ম ও বিচারশীল সাধক }
পদ্ম ফুল থাকে জলে, উৎপত্তিও জলে, কিন্তু সূৰ্য্যদেব, যিনি
পৃথিবীর জল শােষণ করেন, তিনি যেই উদিত হন অমনি
আনন্দে প্রস্ফুটিত হয়, আর চন্দ্র, জল বৃদ্ধি করা যার কাজ,
তিনি উদিত হলেই আপনা আপনি মুদিত হয়ে যায়।
সেইরূপ বিচারশীল ব্যক্তি ব্ৰহ্মচিন্তা জগতের মিথ্যাত্ব প্রতি-
পাদন করে তা জেনেও এই জগতে জন্ম গ্রহণ করে এবং
এই জগতে বাস করে নিয়ত সেই ব্ৰহ্মচিন্তায়ই মগ্ন থাকেন,
আর সংসার বৃদ্ধির কারণ বাসনাদির উদয় হ'লে মনকে বাসনা
হ’তে প্রতিনিবৃত্ত করেন। তােদের মনে বোধ হয় এখন
আর কামাদির উদয় হয় না, কারণ এখানে কামিনীর কোন
প্রকার সংস্রব নাই, ক্রোধও দেখছি অনেকটা কম হয়েছে ।
অন্য কিছু বললে ক্রোধ খুব কম হয়, কিন্তু আমি দু একটা
কঠোর কথা বললে আমার উপর ত’ একটু ক্রোধ হয়ে থাকে ?

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তােকে যখন বলি—“কনে বউ হয়ে বসে আছ,তখন কি তাের
রাগ হয় না?
সকল সময় হয় না, কোন কোন সময় হয়।
শি।
নেয়।
[ “বিবেকী বিচারদ্বারা ক্রোধ দমন করেন” ]
স্বা। উইঢিপির ভিতর অনেক সাপ বাস করে, লােকে
তা বুঝতে পারে না, কিন্তু বংশীরব করলেই সাপগুলো
বাইরে এসে ফণা তােলে, তখন সাপুড়ে সেইগুলােকে ধরে
তাদের বিষদাত ভেঙ্গে দেয় ও নির্জীব করে খেলার জিনিস
ক'রে
সেইরূপ এই দেহরূপ উইঢিপিতে
ক্রোধাদিরূপ সাপ সৰ্ব্বদা বাস করছে, তাদের বিষদাত
আছে কিনা দেখবার জন্য গুরু শিষ্যকে কঠোর বচন বলেন।
তখন শিষ্যের অন্তঃকরণে সেই ক্রোধাদিরূপ সাপ সকল ফণা
বিস্তার করে নিজমূর্তি ধারণ করে। যে শিষ্য বিচারশীল
ও বিবেকী সে, বানর যেপ্রকার সাপের মাথা ধরে ঘসূতে
থাকে এবং যে পর্যন্ত সাপের মাথা সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ না হয়
সে পৰ্য্যন্ত কিছুতেই ছাড়ে না, সেইরূপ বিচারদ্বারা ক্রোধাদি
রিপুকে দমন ক’রূতে চেষ্টা করে এবং যে পর্যন্ত তারা
সম্পূর্ণরূপে বশীভূত হয়ে সাধনে সহায়তা না করে সে পর্যন্ত
অনবরত তাদের সঙ্গে যুদ্ধ ক’তে থাকে। ক্রোধের উদয়
হলে এই রকম বিচার করূতে হয়—আমি অন্যায় করেছি,
সে জন্য যদি আমাকে কেহ তিরস্কার করে, তাহলে আমার
ক্রুদ্ধ হওয়া কোন প্রকারে উচিত হয় না—অন্যায় করেছি

২২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
আবার ক্রোধও ক’বাে? আর যদি অন্যের দ্বারা কৃত কোন
কুকর্মের জন্য আমাকে কেহ তিরস্কার করে তবু আমার
ক্রোধ করা উচিত নয়, কারণ আমি ত’ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ
নির্দোষ,-যে আমাকে দোষী বলে তিরস্কার কছে সে
নিজেই তার জন্য শেষে অনুতপ্ত হবে, আমি সে জন্য মনে
বিক্ষোভ এনে অশান্তি সৃষ্টি করি কেন ?
রাত্রি অধিক হওয়ায় আলোচনা শেষ হইল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
স্বপৌরুষৈকমধ্যেন স্বের্গিতত্যাগরূপিনা।
মনঃ প্রশমমাত্ৰেণ বিনা নাস্তি শুভা গতিঃ।
—যােঃ বাঃ উৎপত্তি প্রকরণ।
[দৈহিক ভােগ রন্ধের অধীন, কিন্তু আধ্যাত্মিক উন্নতি
পুরুষকার সাপেক্ষ]
হরিদ্বার, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১ সাল। দিবা ১০টা।
শিষ্য স্বামিজীর কাছে শিবপুরাণ পড়িতেছে ; শিবপুরাণে
ধৰ্ম্মসংহিতার দ্বাবিংশ অধ্যায়ে তপস্যার প্রভাব বর্ণিত
হইয়াছে। সেখানে তপস্যাব্যতীত কিছুই হয় না, এইরূপ
লেখা আছে—স্বামিজীকে পাঠ করে শুনাইতেছে।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ স্বা। দেখেছিস্ তপস্যাব্যতীত কিছুই হয় না। তােরাত, তপস্যা করি না। আমার দোষ দিতে পাবি না, বলবি যে স্বামিজীর কাছে এতদিন রইলুম, কই কিছুই হল না। আমার দোষ নাই, তপস্যা না করলে আমি কি করব ? পিতামাতা পুত্রকে বড় করে বিবাহ দিল, এখন পুত্রের সন্তান হলে কি পিতামাতা দায়ী? পুত্র যদি স্ত্রীসঙ্গ না করে তা হলে সন্তান কি করে হতে পারে ? সেইরূপ গুরু শিষ্যকে সাধন দিয়েছেন, কিন্তু শিষ্য যদি সাধনারূপ পত্নীর সঙ্গ না করে, অর্থাৎ তপস্যা না করে (১) তাহার জ্ঞানরূপ পুত্র বা মােক্ষ কি করে হবে? সমস্তই শিষ্যের পুরুষকারের উপর নির্ভর করে, অতএব সর্বপ্রযত্নে পুরুষকারের আশ্রয় গ্রহণ করে থাক। দৈহিক ভােগ প্রারব্ধ অনুযায়ী, কিন্তু আধ্যাত্মিক উন্নতি পুরুষকার সাপেক্ষ। (ক) (১) মনশ্চেন্দ্রিয়াণাঞ্চ ঐকাগ্রং পরমংতপঃ। ইতি স্মৃতি,অর্থাৎ মন এবং ইন্দ্রিয়গণের একাগ্রতাসাধন করাই পরম তপস্যা। (ক) গীতার ১৩ অধ্যায়ের ২৩ শ্লোকের ভাষ্যে আচাৰ্য্য বলিয়াছেন, ‘যথা পূৰ্ব্বং লক্ষ্যবধায় মুক্ত ইষুধ যাে লক্ষ্যবেধােত্তরকালমপি আর বেগক্ষয়াৎ পতনেনৈব নিবৰ্ত্ততে এবং শরীরারম্ভকং কৰ্ম্ম শরীর স্থিতি প্রয়ােজনে নিবৃত্তেইপি অসংস্কার বেগক্ষয়াৎ পূৰ্ব্ববৎবৰ্তত এব’, অর্থাৎ যেমন লক্ষ্যভেদ করিবার উদ্দেশ্যে ধনুক হইতে প্রক্ষিপ্ত শর লক্ষ্যভেদ করিবার পরও কিছুক্ষণ আরবেগ ক্ষয় করিয়া তবে ভূমিতে পতিত হইয়া নিবৃত্ত হয়, সেইরূপ যে সকল কর্ম এই বর্তমান শরীরের আরম্ভক

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
আপদমস্তকমহং মাতাপিতৃবিনির্মিত।
ইত্যেমষা নিশ্চয়ে রাম বন্ধায়াসদ্ধিলােকনা।
সা কালসূত্ৰপদবী সা মহাবীচিবান্তরা ।
সা ত্যাজ্য সৰ্ব্বযত্নেন সর্বনাশেইপুপস্থিতে।
স্পষ্টব্যা সা ন ভবেন সমাংসেব পুঙ্কসী। যােঃ বাঃ
[দেহই নরক, দেহের সহিত মিত্ৰতা করিলে সাধন ভজন
হইতে পাবে না]
হরিদ্বার, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৯০টা।
ভােজনান্তে শিষ্য স্বামিজীর নিকট উপবিষ্ট।
--
স্ব। আজ ক’টার সময় স্নান করেছ ?
শি। ভাের ৫টায় ।
তাহারা শরীরস্থিতিরূপ প্রয়ােজনের নিবৃত্তি হইলেও যতক্ষণ তাহাদের
সংস্কাররূপ বেগ বিদ্যমান থাকিবে ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্বের ন্যায় থাকিবে।
ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে শরীরের আরম্ভক কর্ম সমূহের এক মাত্র ভােগের
দ্বারা ক্ষয় করিতে হইবে সুতরাং পুরুষকার দ্বারা সেই সকল অবশ্যম্ভাবী
ভােগর প্রতীকার হইতে পারে না। কিন্তু ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি”
‘ব্ৰহ্মবেদ ব্ৰহ্মৈব ভবতি’ ‘ন স ভূয়ােহভিজায়তে’ ইত্যাদি শ্রুতি ও স্মৃতি
বাক্যাদি দ্বারা জানা যায় যে আত্মজ্ঞান দ্বারা কর্মবীজ সকল দগ্ধ হইলে
উহারা আর অঙ্কুরের উৎপাদক হয় না। আত্মজ্ঞানের মুখ্য উপায় পুরুষ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
কেন, ৩টায় উঠতে পার না?
শি। আজ ৩টায় উঠেছিলাম, কিন্তু শরীর একটু খারাপ
লাগল তাই একটু শুয়ে পড়লাম ; তার পর ৫টার সময় উঠে
ছিলাম।
স্বা। দূর বেটা, ৩টার সময় উঠে কি আর শুতে আছে ?
শরীর যা আর থাক্‌, প্রতিদিন ৩টার সময় উঠে শৌচ করে
স্নান করে, সাধনে বসতে হয়। দেহের সঙ্গে কোন প্রকার
মিত্রতা রাখতে নাই। দেহ যাদের কাছে পরম মিত্র বলে মনে
হয় তারা আর কি করে রাত ৩টার সময় স্নান করবে-
বিশেষতঃ শীতকালে ? কিন্তু যারা দেহকে শত্রু বলে মনে করে
তারাই ঐ প্রকার কঠোরতা অবলম্বন করতে পারে। প্রকৃত
পক্ষে দেহের মত শত্রু আর নাই। “কো নক:–স্বদেহঃ
প্রযত্নসাপেক্ষ বিচার প্রভৃতি। সুতরাং পুরুষকারের প্রয়ােগ দ্বারাই
আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও মােক্ষলাভ সম্ভব। যােগবাশিষ্ঠে উক্ত হইয়াছে ।
চিরমারাধিতােহপপ্যষ পরমপ্রীতিমানপি।
নাবিচারতত জ্ঞানং দাতুং শক্লোতি মাধবঃ । উপমশ প্রকরণ ৪৩১০
মূখ্যঃ পুরুষত্বাম্বো বিচারঃ স্বাত্মদর্শনে।
গৌণণবরাদিকোহেতুৰ্ম্ম খ্যহেতু পরােভব। ঐ ৪৩১১
অস্তি চেদিন্দ্ৰিয়াক্রান্তিঃ কিং প্রাপ্যং পূজনৈঃ ফলম্ ।
নাস্তি চেদিক্ৰিয়াক্রান্তিঃ কিং প্রাপ্যং পূজনৈঃ ফলম্ ॥ ঐ ৪৩২২
বিচারােপশমাভ্যাং হি ন বিনাসাছতে হরিঃ।
বিচারােপশমাভ্যাঞ্চ মুক্তস্যাজকরেণ কিম্ ।
ঐ
৪৩২৩

২৬
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
নিজের দেহই নরক, এই নরকের উপর যার প্রীতি
রয়েছে সে কি করে সাধনে উন্নতি করতে পারে ? এই দেখনা,
আমি বৃদ্ধ হয়েছি, রােগে ভুগছি, তবুও ৩টার সময় প্রত্যহ
স্নান কছি। যখন শরীরের নােম দেখা যায় না, সেই সময়
স্নান করলে প্রকৃত স্নানের ফল পাওয়া যায়। (হাসিতে
হাসিতে) তা কে করে বাবা ! দেহ যে দুঃখ পায়। কেহ
একটু কঠোর কথা বললেই তার উপর ক্রোধ হয়।
[বিচার অবলম্বন করিয়া নিন্দুকের প্রতি ক্রোধ পরিহার
করিতে হয় ]
আচ্ছা বস্ত’ নিন্দুকেরা আমাদের শত্রু না মিত্র ?
শি। মিত্র। তারা আমাদের দোষ কীৰ্ত্তন করে, তাতে
আমাদের দোষের প্রতি দৃষ্টি পড়ে ও আমরা সেইগুলি
সংশােধন ক’রূতে চেষ্টা করি।
স্বা। মুখে বল বটে মিত্র, কিন্তু যখন কেউ নিন্দে করে,
তখনত তার উপর একটু ক্রোধ আসেই ?
তা’ আসলেও বস্তুতঃ তারা মিত্র।
স্বা। কেউ নিন্দে কলে যখন তার উপর ক্রোধ হবে
তখন এই রকম বিচার করিস্ :—ক্রোধ কার উপর কচ্ছি ?
যদি ঐ ব্যক্তির দেহের উপর করে থাকি, তবে দেহ ত’ জড়,
অনিত্য পঞ্চভূতের—তার উপর আবার ক্রোধ কিসের ? আর
যদি আত্মার উপর ক্রোধ করে থাকি তবে আমার অত্মাি এবং
শি।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ ওর আত্মা যখন একই তখন আর ক্রোধের স্থান কোথায় ?(১) আর যে নিন্দে করে, তাকে জিজ্ঞাসা কবি “ভাই তুমি কাকে নিন্দে করছ ? যদি বল আমার দেহকে, তবে বলি দেহ ত’ পঞ্চভূতের সুতরাং মিথ্যা। এর নিন্দা করে কি লাভ? এত নিজেই নিন্দিত ও ঘৃণিত,-“অস্তি জায়তে বর্ধতে বিপরিণ- মতে অপক্ষীয়তে বিনশ্যতি “ইতি ষট্‌বিকারবান্। আর যদি বল-দেহাতীত আমাকে নিন্দা কছে, তবে বলি দেহাতীত আমি ও তুমি ত’ একই বস্তু, তবে তােমাকে তুমি নিন্দে ক’ছ, তা বেশ! এতে যদি তােমার আনন্দ লাভ হয় তা কর। এই প্রকার বলে নিন্দুকও অপ্রতিভ হয়ে যাবে। যা’ এখন দশটা বাজে, গিয়ে শয়ন কর, নচেৎ শেষ রাত্রে উঠতে পারবি না। (১) আত্মানং যদি নিন্দন্তি, নিন্দন্তি স্বয়মেব হি। শরীরং যদি নিন্দকি, সহায়াস্তে মতা মম। নিন্দাবমানবত্যন্ত ভূষণং যস্য যােগিনঃ। ধীবিক্ষেপ কথং তস্য বাচাটৈ ক্রিয়ামিহ । অর্থাৎ যদি লােকে আমাকে (আত্মাকে) নিন্দা করে তবে তাহারা নিজেই আপনাদের ‘আত্মাকে’ নিন্দা করিতেছে (কারণ আত্মা সকলেরই এক)। আর যদি তাহারা আমার শরীরের নিন্দা করে তবে ত’ তাহারা আমার বন্ধু (কারণ শরীর বিবিধ দোষের আকর, ইহা আমাকে স্মরণ করাইয়া দেওয়ায় তাহারা আমার বন্ধুর কাজই করিতেছে)।

যষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
“একং সৎ বিপ্ৰা বহুধা বদন্তি।
তত্র কো মােহঃ কঃ শােকঃ একত্বমনুপশ্যতঃ।” ঈশ।৭
হরিদ্বার, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮০ টা।
পরমার্থবস্তু এক ও সৰ্বগত]-অদ্বৈতভাবে উপাসনা হয়।
আরতি ও মহিমুস্তবাদি পাঠান্তে শিষ্য ও দুই একজন
সাধু স্বামিজীর নিকট উপবিষ্ট আছেন। স্বামিজী নিজে
নিজে শ্লোক আবৃত্তি করিতেছেন :-
“একো দেবঃ কেশবব বা শিবব বা।
একং মিত্ৰং ভূপতি বা যতি ।।
একে। বাসঃ পত্তনে বা বনে বা।
একা নারী সুন্দরী বা দরী ।” (১)
(১) অর্থাৎ-দেব অর্থাৎ দ্যোতনশীল নিখিলজগতের প্রকাশক পরব্রহ্ম,
অথবা ক্রীড়নশীল অর্থাৎ জীবজগতাদি প্রপঞ্চে অনুষ্যত থাকিয়া যিনি
লীলা করিতেছেন সেই পরমেশ্বর একই, (স্ব স্ব রুচি অনুসারে )
কেহ তাহাকে কেশব রূপে কেহ বা শিবরূপে চিন্তা করিয়া থাকেন।
সেইরূপ ভূপতিই হউন বা সন্ন্যাসীই হউন (যদি উভয়ে কাহারও প্রতি
মিত্রভাবাপন্ন হন) তবে তাহাদিগের উভয়ের কাৰ্য্য স্বতন্ত্র হইলেও
মৈত্রীভাব একইরূপ হইয়া থাকে। নগর কা অরণ্য উভয়স্থানেই
বাসরূপ কাৰ্য্য সমভাবেই সিদ্ধ হইয়া থাকে। (গৃহস্থের পক্ষে) সুন্দরী
স্ত্রী ও (সন্ন্যাসীর পক্ষে) পর্বত গুহ। ইহারা, উভয়েই সঙ্গিনী হইয়া
মানবের ধর্মাচরণের সহায়তা করিয়া থাকে।

ঘষ্ঠ পরিচ্ছেদ
শি।
শি।
স্বা। (শিষ্যকে) কিরে, এর অর্থ বুঝেছিস্?
শি। আজ্ঞে হা।
স্বা। বলত।
একজন দেবতারই উপাসনা কৰ্ত্তব্য, কেশবের অথবা
শিবের।
স্বা। শিব কাকে বলে, নিরাকার না সাকার ?
সগুণ ব্ৰহ্ম সাকার।
স্বা। আচ্ছা, কাল ত’ শিবের সহস্র নাম পড়েছিলি, তার
মধ্যে দেখি নাই কি যে জগতের সমস্ত নামই শিবের ?
শি। আজ্ঞে হাঁ।
এই প্রকার নাম বিভিন্ন, কিন্তু জিনিস একই ;
কেহ বলে আল্লা, কেহ যিশু, কেহ রাম, কেহ শিব, কেহ কৃষ্ণ,
আর কত কি। যে দিকেই দৃষ্টি পড়ে সকলই শিব,—এই
প্রকার ধারণা করতে চেষ্টা করবে। (ক) সকলই যখন শিব
(ক) ব্ৰহ্মকে কি উপায়ে সম্যকরূপে জানা যাইতে পারে এই প্রশ্নের
উত্তরে শ্রুতি বলিয়াছেন :-
‘প্রতিবােধবিদিতং মমমৃতত্বং হি বিতে’-- কেন ১২৪)
-অর্থাৎ আমাদিগের ঘটপটাদি যাবতীয় বস্তুবিষয়ক প্রত্যেক বুদ্ধিবৃত্তিই
আত্মবিষয়ীভূত বা আত্মপ্রকাশ্য । সুতরাং প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিতেই আত্মা
প্রকাশকরূপে বিদ্যমান আছেন। এইরূপে শিবস্বরূপ আত্মা সৰ্ব্ববােধের
প্রকাশক এই ধারণা করিতে করিতে মুমুক্ষু ব্যক্তি আত্মবিদ্যাসমুৎপাদিত
বীর্য্যের দ্বারা মৃত্যুভয় নিবারণে সমর্থ হয়।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ তখন তুইও শিব,—এই প্রকার অদ্বৈত ভাবে উপাসনা চলে। (খ) ‘আত্মৈবেদং সং’ ‘ব্রহ্মবেদং সৰ্ব্বং ইত্যাদি শ্রুতিপ্রমাণের সাহায্যেও বিদ্বান্ আত্মস্বরূপ ব্ৰহ্মকে সৰ্বত্ৰ সৰ্বস্বরূপেই দেখিয়া থাকেন। (খ) দ্বৈতভাবে উপাসনা লক্ষ্য করিয়া গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন— জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে যজন্তোমামুপাসতে। একত্বেন পৃথকত্বেন বহুধা বিশ্বততা মুখগীঃ ৯ অঃ ১৫ শ্লো। অনন্য শ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনা পযপাসতে। তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যােগক্ষেমং বহাম্যহং । গঃ ৯ অঃ ২২ মাোঃ। পঞ্চদশী রচয়িতা বিদ্যারণ্যমুনীশ্বর বলিয়াছেন :- উত্তরষ্মিংস্তাপনীয়ে শৈব্যপ্রশ্নেইম কাঠকে। মাকাদৌ চ সৰ্বত্ৰ নিগুপােপাস্তিরীরিত। অনুষ্ঠান প্রকারােহস্যা পঞ্চীকরণ ঈরিতঃ। ধ্যানদীপ-৬৩৬৪ অর্থাৎ উত্তর তাপনীয় উপনিষদে, কঠোপনিষদে ও মাণ্ডুক্য উপনিষদাদি বহু শ্রুতিতেই নিগুণ উপাসনার কথা আছে, এবং তাহার, অনুষ্ঠানপ্রকার পঞ্চীকরণ প্রসঙ্গে উক্ত হইয়াছে - তথা বেদান্তেভ্যো ব্ৰহ্মতত্বমখণ্ডেকরসাত্মক। পরােক্ষবগমৈতদমস্মীত্যুপিসতে। ধ্যানদীপ-১৪ গো অর্থাৎ-বেদান্ত শাস্ত্র হইতে অখণ্ডকরসাম্বরূপ পরব্রহ্মতত্ত্ব পরােক্ষ- ভাবে অবগত হইয়া আমিই সেই পরব্রহ্মস্বরূপ এইরূপ উপাসনা করিবে।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
শিষ্য চুপ করিয়া বসিয়া আছে, স্বামিজী কিছুক্ষণ চুপ
করে থেকে পরে বলিলেন।
[ দেশের ও দশের উপকারের জন্য শাস্ত্রপাঠ প্রয়ােজন ]
স্বা। কিন্তু দেশের উপকার করা প্রয়ােজন। দেশ
আজকাল অধঃপতনের চরম সীমায় উপস্থিত। দেশের ও
দশের উপকার করতে হলে শাস্ত্রাদির প্রয়ােজন। নিজের
জন্য “ব্ৰহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা, জীবে। ব্ৰহ্মৈব নাপরঃ”—ইহাই
যথেষ্ট। এটি উপলব্ধি করতে পারলেই “কৃতকৃত্যশ্চ ভারত
(অর্থাৎ কৃত-কৃত্য হইতে পারা যায়)। কিন্তু অপরকে
বুঝতে হলে শাস্ত্রের দরকার। সেইজন্য শাস্ত্র পড়া চাই।
এই প্রকার অন্যান্য কথার পর স্বামিজী আবার বলিতে
লাগিলেন।
স্বা। যদি কখন কায়িক, মানসিক বা বাচনিক কোন
পাপ হঠাৎ হয়ে যায় তবে তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত।
কত প্রকার ব্ৰত, প্রায়শ্চিত্ত রয়েছে।
আজকাল ওসব অনেকে জানেই না।
স্বা। তােদর দ্বারা চান্দ্রায়ণ ব্রতই অনুষ্ঠিত হতে পারে
, কৃচ্ছ-চান্দ্রায়ণ ব্রত ত’ দুরের কথা।
শি। চান্দ্রায়ণ ব্রতের নিয়ম কি ?
স্বা। শুক্লপক্ষের প্রতিপদের দিন একগ্রাস অন্ন খেতে
হয়, দ্বিতীয়ার দিন দুই গ্রাস, তৃতীয়ার দিন তিন গ্রাস,
এই প্রকারে রােজ রােজ এক এক গ্রাস বাড়িয়ে’ পূর্ণিমার দিন
শি।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
১৫গ্রাস, আবার কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদের দিন ১৪ গ্রাস, দ্বিতীয়ার
দিন ১৩ গ্রাস, তৃতীয়ার দিন ১২ গ্রাস-এই প্রকার রােজ
একগ্লাস কম করে অমাবস্যার দিন একগ্লাস খেতে হয়। (১)
শি। কৃচ্ছ,-চান্দ্রায়ণ ব্রতের নিয়ম কি ?
স্বা। প্রথম দিন খালি জল খেয়ে থাকতে হয়, দ্বিতীয়
দিন একটি ছােট ফল খেতে হয়। তৃতীয় দিন কিছুই খেতে
নাই, চতুর্থ দিন পেট ভরে এক সন্ধ্যা ভােজন ক’তে হয় ;
এই প্রকার নিয়ম পালন করে প্রত্যেক চতুর্থ দিনে অন্ন
খেতে হয়।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
“পারসমৈ অরু সন্তমৈ বড়ো অন্তরে জান।
বহ লােহা কাঞ্চন করে, যহ করে আপসমান।”
বিচারমালা; ২০১৬
স্পর্শমণি ও সাধু।
হরিদ্বার, ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৯টা।
আহারান্তে শিষ্য স্বামিজীর নিকট উপবিষ্ট আছে।
স্বা। বর্ত’ স্পর্শমণি বড় না সাধু বড়? (২)
(১) (এইখানে চান্দ্রায়ণের সম্বন্ধে শাস্ত্রীয় প্রমাণ প্রভৃতি লিখিলে
ভাল হয়) -
( ২) স্পর্শমণি অপেক্ষা সাধু দুই কারণে অধিকতর কল্যাণপ্রদ।
প্রথম কারণ এই যে, স্পর্শমণি জড় লৌহকে স্বর্ণে পরিণত করিতে পারে
.

সপ্তম পরিচ্ছেদ
শি। সাধু বড়।
স্বা। কেমন করে? স্পর্শমণি লােহাকে সােনা করে
দেয়, আর সােনাতে কত রকম সুখ ভােগের জিনিস হয় ;
তার চেয়ে সাধু বড় হ’ল কি রকম করে ?—সাধু ত’ টাকা
কড়ি দেয় না ?
শি। সাধু লােককে ব্ৰহ্মবি করে দেয়।
স্বা। হাঁ, তা ঠিক, কিন্তু উপযুক্ত অধিকারী চাই। মুমুক্ষু
মিলে ত’ গুরু (সদ্গুরু) মিলে না, আবার গুরু মিলেত’
উপযুক্ত (মুমুক্ষু) শিষ্য মিলেনা। যেখানে উপযুক্ত শিষ্য
ও সদ্গুরুর মিলন হয় সেইখানেই অধ্যাত্মবিদ্যার ঠিক ঠিক
ফুরণ হয়। (৩)
স্বর্ণকার যে প্রকার ভাল সােনা পেলেই খুব খুসী হয়,
দর্জি যেমন ভাল কাপড় পেলেই আহলাদিত হয়, সেইরূপ
সদ্গুরু উপযুক্ত শিষ্য পেলে অত্যন্ত আনন্দিত হন। স্বর্ণকার
মাত্র, কিন্তু সাধু মনুষ্যের ভববন্ধন মােচন করিয়া তাহাকে চিরশান্তি
প্রদান করিতে পারেন। দ্বিতীয় কারণ এই যে, স্পর্শমণি লৌহকে
কাঞ্চনে পরিণত করিতে পারে সত্য, কিন্তু আত্মভাবে অর্থাৎ স্পর্শমণিতে
পরিণত করিতে পারে না, কিন্তু সাধু শিষ্যকে শুধুই শান্তি প্রদান
করেন এমত নহে—তাহাকে আত্মজ্ঞান প্রদান করিয়া আত্মরূপ
( অর্থাৎ ব্রহ্মরূপ) করিয়া লন। জ্ঞানী অজ্ঞানী শিষ্যকে জ্ঞানী বা
নিজতুল্য করেন।
(৩) আশ্চর্যেহস্য বক্তা, কুশলােহস্য লব্ধা।
আশ্চৰ্যজ্ঞাতা কুশলাশিষ্ট। কঠঃ ২য় বল্লী ও শ্লোক।

৩৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
যেমন সােনাকে আগুণে পুড়িয়ে সুন্দর সুন্দর গহনা প্রস্তুত
করে এবং দর্জি যেমন কাপড় কেটে সুন্দর সুন্দর পােষাক
প্রস্তুত করে, সেইরূপ সদ্গুরুও উপযুক্ত শিষ্যকে কঠোরভাবে
শাসন করে ধীরে ধীরে ব্রহ্মরূপ করে দেন। আচ্ছা, সাধু
কাকে বলে ?
[ ব্ৰহ্মবেদিতা অজ্ঞানীর দৃষ্টিতে—ব্ৰহ্মবিদের দৃষ্টিতে
জ্ঞানী অজ্ঞানী ভেদ নাই। ]
শি। যিনি ব্রহ্মবিদ অর্থাৎ ব্ৰহ্মকে জেনেছেন তাকেই
সাধু বলা যায়।
স্বা। যিনি ব্ৰহ্মবি তার কাছে ত’ আর সাধু অসাধু এই
প্রকার কোন ভেদই থাকে না! (১)
শি—তাঁর কাছে থাকে না বটে, কিন্তু জগতের কাছে ত’
(১) যিনি প্রকৃত ব্ৰহ্মবিদ তাহার প্রজ্ঞা যাহা কিছু আছে তৎসমস্তই
এক অখণ্ড অচল বিজ্ঞান-ঘন পরমাত্মা-এইরূপ আকার ধারণ করে,
সুতরাং তাহাতে ‘আমি জ্ঞানী বা সাধু এবং অমুক অজ্ঞানী বা অসাধু
এইরূপ ভেদবুদ্ধি সম্ভব হয় না। কেণােপনিষদে আছে :-
যস্যামতং তস্য মত মতং যস্য ন বেদ সঃ।
অবিজ্ঞতং বিজানতাং বিজ্ঞাতং অবিজানতাম্।
অর্থাৎ যে মনে করে ব্রহ্মকে জানিনা বস্তুতঃ সেই তাহাকে জানে ?
আর যে মনে করে ব্রহ্মকে জানি বস্তুতঃ সে ভঁহাকে জানে না।
( কারণ ] যাহাদের সম্যক জ্ঞান আছে তাহাদের নিকট ব্ৰহ্ম অবিদিত
বলিয়া মনে হয় আর যাহারা সম্যক জ্ঞানঃহিত তাহাদের নিকটই ব্ৰক্ষ
বিজ্ঞাত বলিয়া প্রতিভাত হন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ
ব্ৰহ্মবিদ ও অজ্ঞানী, এ দুয়ের ভেদ আছে; সুতরাং মাত্র
ব্ৰহ্মবিদই সাধু বলে অভিহিত হয়ে থাকেন।
[ গৈরিক বস্ত্র পরিধানের উদ্দেশ্য, সত্ত্বগুণের উদ্দীপনা মাত্র।]
স্বা। আচ্ছা, তাহলে গেরুয়া কাপড় পরার কোন
প্রয়ােজন নেই ?
শি। না, কোনই প্রয়ােজন নেই-সাধুতা মনে, বাহিরে
গেরুয়া কাপড় পরুলেই সাধু হওয়া যায় না।
স্বা। তাহলে এত লােক যে গেরুয়া পরে বেড়াচ্ছে
তাদের কি বলবি ? সন্ন্যাসীরা গেরুয়া রংএর কাপড় প’ছে,
উদাসীরা অন্য রংএর—এ সবের উদ্দেশ্য কি ?
শি। শুধু সম্প্রদায় বৃদ্ধি করার জন্য ঐ নিয়ম করা
হয়েছে।
স্বা। আচ্ছা, আমি, তুই এবং অন্যান্য সকলে না হয়
বিষাদী, দীর্ঘসূত্ৰী কিন্তু, যিনি প্রথমতঃ গেরুয়া বস্ত্রের প্রচলন
করে গেছেন সেই আচাৰ্য্য দেব (শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য) ত’ জ্ঞানী
মহাপুরুষ ছিলেন !–এর যদি কোন উপকারিতা নাই থাকবে,
তাহলে তিনি এরূপ প্রথার প্রচলন করে গেলেন
কেন ?
শি। গেরুয়া প’লে মনে একটু সাত্ত্বিকভাবের উন্মেষ হতে
পারে, তাতে কোন পাপকাজ করতে ইচ্ছে হলেও “আমি
সাধু হয়েছি, একাজ ক’রূলে লােকে আমায় কি বলবে”—এই
রকম একটা ভয় এসে অনেক সময় সেই কাজ থেকে বিরত
করে থাকে।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বা। হাঁ, লােককে কাঁদতে দেখলে, কঁাদা আসে, হাসতে
দেখলে হাসি পায়, এইরূপ গেরুয়া পরা লােককে দেখলে
তা’র সাধুতা থাক্ আর না, থাক্ ঐ কাপড় দেখেই লােকের
মনে সত্ত্বগুণের উদয় হয়, আর তারা অভিমান ত্যাগ করে
তার কাছে মাথা অবনত করে। গেরুয়া কাপড় সত্ত্বগুণের
উদ্দীপক।
এই কথা বলিতে বলিতে স্বামিজী মহারাজের মুখমণ্ডলে
এক অপূৰ্ব্বভাবের উচ্ছাস দেখা গেল ; তিনি সেই ভাবে
পরিপ্লুত হয়ে বলিতে লাগিলেন—“সকলই চিন্ময়, সকলই
চিন্ময়, সাধু অসাধু কোথায়? সকলই চিন্ময়।” শিষ্য চুপ
করিয়া রহিল। কতক্ষণ পরে স্বামিজী বলিলেন-“যা”
দশটা বেজেছে’ এখন যা’ নইলে শেষ রাত্রে উঠতে
পারবিনে।
এ
অষ্টম পরিচ্ছেদ
“চিন্ময়ং ব্যাপিতং সৰ্ব্বং ত্রৈলােক্যং সচরাচরং।
তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।”
“অব্যক্তা হি গতিদুঃখ দেহবদ্ভিবাপ্যতে।” গীতা-১২১৫
[ যাহার দেহাত্মবুদ্ধি যায় নাই তাহার উপাস্য উপাসক
সম্বন্ধ রক্ষা করা একান্ত প্রয়ােজন, কিন্তু তত্ত্বদর্শীর নিকট এক
অখণ্ড চৈতন্যই বিদ্যমান।]
হরিদ্বার, ২৮শে জ্যেষ্ঠ, ১৩৩১ সাল, দিবা ৪টা।

অষ্টম পরিচ্ছেদ
৩৭
স্বা। ভােরে উঠে স্নান করি বটে, কিন্তু শিবজীর
অর্চনা ত’ আদৌ করিস্ না! শিবজীর মাথায় একটু জল
ঢেলে দিয়েই চলে যাস্। এরকম বেগার দিয়ে চলে যা
কেন ?—গিরিও এই রকম সামান্য একটু জল দিয়ে চলে
যায়।
শি। পূজো করব কাকে? বেদান্ত ব’লছে সকল মূর্তিই
মিথ্যা।
স্ব। হ্যা, ঠিক বটে, কিন্তু বেদান্ত কি শরীরটাকে সত্য
ব’ছে ?
শি। না, শরীরটাকেও মিথ্যা বলছে।
স্বা। তাহলে শিব পাথরের মূর্তি, তার পূজা করা উচিত
নয়—এ ভাবটা যেমন মনে বসে গেছে, এ শরীরটাও মিথ্যা,
এর সুখ দুঃখের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার কোন প্রয়ােজন নাই--
এ ভাবটাও তেমনি মনে বসে যায় না কেন? একদিন
খাবার না জুটলেই হায় হায় করতে থাক, একটু অসুখ
হলেই “বাবারে,” “মারে” বলে চাচাতে থাক, তখন শরীর
মিথ্যা এ জ্ঞান কোথায় থাকে? শিব পূজা ক’তে বললেই
মস্ত বড় বেদান্তী বনে যাস, কিন্তু শরীরটাকে পালন করবার
সময় আর বেদান্তের কথা মনে থাকে না। বাঃ বেদান্তীর
দল! আচ্ছা, শরীরটা যখন মিথ্যা, তখন মিথ্যে শরীরের
মিথ্যা শিবকে পূজা করায় আপত্তি হয় কেন? শিবও মিথ্যা
এবং শরীরও মিথ্যা, সুতরাং এ দুটী ত’ স্বজাতি ; এদের
মধ্যে পরস্পর সম্বন্ধ থাকা ত’ একান্ত প্রয়ােজন এবং বস্তুতঃ

৩৮ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ আছেও; তা হলে যারা ‘শিব’ ‘কৃষ্ণ’কে বেদান্তের দোহাই দিয়ে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু তাদের নিজেদের দেহের উপর সম্পূর্ণ আসক্তি রয়েছে দেহাত্ম-বুদ্ধি ছুটে নাই, তারা নাস্তিক ব্যতীত কি হতে পারে ? (ক) শি। তা ঠিক। দেহাত্ম-বুদ্ধি দূর হলে ‘শিব’ ‘কৃষ্ণ প্রভৃতি দেবতাদের স্বতঃই মিথ্যা বলে মনে হয় ; তখন আর হইতে হয়। (ক) তাৎপৰ্য এই যে যাহারা দেহাভিমানী অর্থাৎ পাঞ্চভৌতিক দেহ, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি ‘আমি’ বা ‘আমার এইরূপ যাহাদিগের বুদ্ধি এবং ইহাদিগকে সত্য বলিয়া জানে, তাহারা এই পাঞ্চভৌতিক জগতের নিয়ন্তা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিতে বাধ্য। সুতরাং যদি দেহাভিমানী ব্যক্তি প্রমাদবশতঃ ঈশ্বরে অবজ্ঞা করে তাহাকে তজ্জনিত পাপে লিপ্ত মীমাংসকগণও বলিয়া থাকেন, “বলবদনিষ্ঠান বন্ধীষ্ঠ- সাধনত্বজ্ঞানং প্রবৃত্তেকারণং। আর যিনি প্রকৃত জ্ঞানী অর্থাৎ যাহার আমি অসঙ্গ নির্লেপ অকর্তা ও অভােজা, দেহ মন বুদ্ধি প্রভৃতির সাক্ষ্য এইরূপ জ্ঞান হইয়াছে, তিনি বিক্ষেপ-সমাধি পূজা প্রভৃতি সমস্তই বিকারী মনেরই ধৰ্ম তঁাহার সহিত তাহাদিগের কোনও সম্পর্ক নাই এইরূপ জানেন ; সুতরাং সেই সকল কৰ্ম্ম তাহার জ্ঞানের বাধক হয় না এবং প্রারব্ধানুসারে তাঁহার বাটীর দেবার্চন, স্নান ও শৌচাদিতে প্রবৃত্ত হইলেও অথবা তাহার বুদ্ধি দেবতাধ্যানে নিবিষ্ট হইলেও তাহাতে তাহার কোনও প্রকার ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না, পরন্তু তাহার তাদৃশ বাবহারের দ্বারা অজ্ঞানীদিগের তত্ত্ববােধ হয় বলিয়া তিনি সেই সকল অনুষ্ঠানই করিয়া থাকেন। অতএব দেখা গেল কি অজ্ঞানী কি প্রকৃত জ্ঞানী উভয় পক্ষেই পূজা ধ্যান প্রভৃতি শাস্ত্রোক্ত ব্যবহার অপরিতাজ্য।

অষ্টম পরিচ্ছেদ
“মিথ্যা, মিথ্যা বলে চেঁচাতে হয় না, যাহার দেহাত্ম-বুদ্ধি
নাই তা’র ত’ এক অখণ্ড চৈতন্যই উপলব্ধি হয়ে থাকে।
{ জীব ও ঈশ্বর পরস্পরের ভেদ—জীব কূপের ও ঈশ্বর
সমুদ্রের মণ্ডুক ]
“সমানে বৃক্ষে পুরুষাে নিমগাহনীশয়া শােচতি মুহমানঃ”।
জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশমস্য মহিমামিতি বীতশােক।
যদা পশ্যঃ পশ্যতে রুক্যবৰ্ণং কৰ্ত্তামশিং গুরুষং ব্ৰহ্মযােনিম্।
তদা বিদ্বান্ পুন্যপাপে বিধূয় নিরঞ্জনঃ পরমং সাম্যমুপেতি।
মুণ্ডকঃ ১।২৩
স্বা। হাঁ, বৎস! এবার ঠিক বুঝেছ ; আচ্ছা জীবও
ঈশ্বরের মধ্যে ভেদ কি ? জীব অল্পজ্ঞ, ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, কেমন
নয় কি ?
শি। হাঁ, যদি দ্বৈতবাদ স্বীকার করা যায়,যদি মায়ার
অস্তিত্ব স্বীকার করা যায়, তবে জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে ঐ
প্রকারের ভেদ আছেই, কিন্তু বস্তুতঃ জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে
কোনই ভভদ নাই, এক সর্বব্যাপী আত্মাই বিরাজমান
আছেন।
স্বা। জীব কূপের মণ্ডুক এবং ঈশ্বর সমুদ্রের মণ্ডুক
এইমাত্র ভেদ।
কূপের মণ্ডক মনে করে—আমি এই
কূপের মধ্যে আবদ্ধ আছি, এর চেয়ে বেশী দূরে যাবার
আমার শক্তি নাই, আর সমুদ্রের মণ্ডুক মনে করে—আমি
কোন প্রকারে আবদ্ধ নই, এই অসীম
অসীম অনন্ত সমুদ্রে
আমি ইচ্ছানুযায়ী যেখানে সেখানে যেতে পারি ; সে

৪০ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ নিজেকে এই প্রকার মহান্ ভেবে থাকে। ঐ সমুদ্রের মণ্ডুক একদিন কূপের মকের কাছে বেড়াতে গেল। কূপমণ্ডুক তাকে জিজ্ঞাসা ক'লে “ওহে তুমি কোথায় থাক ?” সমুদ্রের মণ্ডুক ব’ললে সমুদ্রে।” “সমুদ্রে।” কূপের মণ্ডক জিজ্ঞাসা ক'লে “সমুদ্র কত বড়?” সমুদ্রের মণ্ডুক ব’লে “খুব বড়।” কূপমণ্ডুক একটি লাফ দিয়ে কূপের কতটুকু অংশ ঘেরাও করে বললে “এত বড়?” সমুদ্রের মণ্ডক ৰ’লে “না এর চেয়ে অনেক বড়।” কূপের মণ্ডুক তখন লাফ দিয়ে কূপের সবটা ঘেরাও করে জিজ্ঞাসা ক’রূলে-“এত বড়?” সমুদ্রের মণ্ডক বললে-“না এর চেয়ে অনেক বড়।” তখন কূপমণ্ডুক ব’ললে “যাও, এর চেয়ে বড় হতেই পারে না, তুমি মিথ্যা ব’ছ।” সমুদ্রের মণ্ডক তখন কুপের মককে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে বললে “এখন দেখাও ত’ সমুদ্র কত বড়?” কূপের মণ্ডক তখন অসীম সমুদ্র দেখে চুপ হয়ে গেল,সীমা কি করে ঠিক কবে স্থির ক’তে পারলে । ঈশ্বর সমুদ্রের মণ্ডক এবং জীব কূপের মক। বস্তুতঃ बक ও কদ্বয়ের মধ্যে কোন ভেদ নাই—মাত্র একজন জানে যে সে অসীম অনন্তে বিরাজমান, তার কোন সীমা নাই ; অপরটি অজ্ঞানবশতঃ নিজেকে কূপরূপ দেহের মধ্যে আবদ্ধ মনে করে। জীবরূপ কূপের মণ্ডুক যখন ঈশ্বররূপ সমুদ্র- মণ্ডকের কৃপায় ব্রহ্মরূপ সমুদ্রে নীত হয়ে নিজেকে অসীম অনন্তে বিরাজমান বলে অনুভব করে তখন সেও ঈশ্বরত্ব প্রাপ্ত হয় ও সর্বজ্ঞ হয়। গঙ্গাজল সর্বদাই পৰিত্ৰ, কিন্তু

অষ্টম পরিচ্ছেদ
৪১
একঘড়া গঙ্গাজল যদি নর্দামায় ঢেলে দেওয়া হয়, সেই গঙ্গা
জল কি আর পবিত্র বলে গণ্য হয় ?
[আত্মা গঙ্গার জল, জীব নামার জল]
শি। না নর্দামায় পড়ে গঙ্গাজলও অপবিত্র হয়ে যায়।
স্বা। সেইরূপ আত্মা সৰ্ব্বদাই পবিত্র, কিন্তু নর্দামারূপ
এই দেহের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় অপবিত্র বলে মনে হয় ;
বস্তুতঃ আত্মা সৰ্ব্বদাই পবিত্রশুদ্ধবুদ্ধঅপাপবিদ্ধ।
শি। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে এই নর্দামারূপ দেহ
কোথেকে উৎপন্ন হ’ল, এর কারণ কি?
এ প্রকার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা তাের উচিত হয় নি।
আচ্ছা যখন জিজ্ঞাসা করেছ তখন এর উত্তর অবশ্য দিতে
হবে ; এতে কোন ক্ষতি নাই। আচ্ছা বায়ুর মধ্যে ঘূর্ণিবায়ু
কেন এবং কবে সৃষ্টি হ’লএবং কবেই বা লয় হ’ল বলতে পার
কি ?
শি।
।
স্বা। সেইরূপ আত্মারূপ বায়ুর মধ্যে দেহরূপ ঘূর্ণিবায়ু
কবে এবং কেন সৃষ্টি হয়েছে এবং কবেই বা এর লােপ হবে
তা কেউ বলতে পারে না।
উপরােক্ত কথােপকথনের পর স্বামিজী অন্যান্য ভক্তগণের
সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন।

নবম পরিচ্ছেদ
“নাবিদ্যা নাপি তৎকাৰ্যং বােধং বাধিতুমহতি”।
তৃপ্তিদীপ ২৭ শ্লোক পঞ্চদশী।
[ অবিদ্যা মিথ্যা সুতরাং বােধের বাধক নয়।]
হরিদ্বার, ১লা আষাঢ়, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৯৯০ টা।
ভােজনান্তে শিষ্য স্বামিজীকে ঔষধ খাওয়াইল। ঔষধ
খাইয়া স্বামিজী শিষ্যকে প্রশ্ন করিলেন,--“ভােগের দ্বারা কি
ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন হয় ?”
শি। না, তা কি করে হবে। যযাতি রাজাও বলে
গেছেন,
“ন জাতু কামঃ কামানামুপভােগেন শামতি।
হবিষ কৃষ্ণবৈ ভূয় এবাভিবতে।”
মনুসংহিতা-২৯৪
অর্থাৎ কাম্যবস্তুসকল ভােগ করিয়া কামনার শাস্তি হয়
না, অগ্নি ঘৃতাহুতির দ্বারা যেরূপ উত্তরােত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়,
কামও উপভােগের দ্বারা সেইরূপ উত্তরােত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া
থাকে।
স্বা। হাঁ, ঠিক বলেছ। ঘৃত দ্বারা অগ্নি নির্বাপিত
করবার চেষ্টা করা যেরূপ মূখতার পরিচায়ক, উপভােগদ্বারা
কাম দমনের চেষ্টা করাও সেইরূপ। শান্তিলাভ ক’রুতে

নবম পরিচ্ছেদ
৪৩
স্বা।
হলে জিতেন্দ্রিয় হতে হয়। জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি শান্তিলাভ
ক’তে পারে, ভােগীব্যক্তি নয়। আচ্ছা, লােক ভােগে
আসক্ত হয় কেন ?
শি। অবিদ্যা বশতঃ ভােগকে সুখের কারণ মনে করে
লােকে ভােগে লিপ্ত হয়ে থাকে।
স্বা। কেরাসিন্ তেল কখনও অগ্নিকে চেপে রাখতে
পারে না। সেইরূপ অবিদ্যাও বিদ্যাকে চেপে রাখতে
পারে না; তবে তাের অবিদ্যা হতে ভয় কেন?
শি। অবিদ্যাকে সত্য মনে করে ভয় হচ্ছে।
এক ব্যক্তি বলছে বন্ধ্যার পুত্র এসে তাদের
মােকদ্দমা মিটমাট করে দেবে। আর একজন বলছে
পটে চিত্রিত পুতুলদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া হচ্ছে।একি
সম্ভব ?
শি। তা কি করে সম্ভব হবে ? বন্ধ্যা স্ত্রীর পুত্র হতেই
পারে না, এবং পটে চিত্রিত পুতুল ত’ জড়, তাদের মধ্যে
বিবাদ কি করে হতে পারে ?
স্বা। তদ্রুপ অবিদ্যা মিথ্যা; সুতরাং অবিদ্যা হতে
ভয় কেন?
শি। অবিদ্যা যদি মিথ্যাই হবে, তবে অবিদ্যাকে
আমরা আশ্রয় করি কেন ? যে বস্তুর অস্তিত্ব নাই, সে
দিকে ত’ মন কখন যায় না ! ·
স্বা। কেন যাবে না? বুদ্ধিমান ব্যক্তি চিত্রিত পুতুল
;

৪৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
কখন ধ’রূতে যায় না সত্য, কিন্তু শিশু ত’ আগ্রহের সহিত
ধরে, আবার কখন বা ছেড়ে দেয় !
শি। শিশু অজ্ঞান। বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানে যে পটের
পুতুল মিথ্যা, কিন্তু শিশু ত’ তা বােঝে না !
স্বা। শিশুর জ্ঞানও নাই, অজ্ঞানও নাই,—শিশু জ্ঞান
ও অজ্ঞানের পরপারে। সে যদি পুতুলকে সত্য বলে মনে
করত তাহলে সেটা কখন ধ’রছে কখন বা ছাড়ছে, এ
রকম ক’ত না। বস্তুতঃ শিশু পুতুলটা সত্য বা মিথ্যা
কিছু মনে করে না, সুতরাং পুতুলটা ধরুক্ বা ফেলে দিক,
তাতে তার কিছু ক্ষতি হয় কি ?
শি। না যে জিনিষটার অস্তিত্ব নাই, তার দ্বারা ক্ষতি
কি করে হবে ?
স্বা। তা হলে পুতুল শিশুর কোন বিষয়ে বাধক নয়।
শি। না।
স্বা। সেইরূপ অবিদ্যাও জীবের বাধক নয়। পুতুল
যেরূপ বস্তুতঃ মিথ্যা অবিদ্যাও সেইরূপ মিথ্যা।
এইরূপ কথােপকথন হইতেছে এমন সময় কলিকাতা
নিবাসী ডাক্তার দেবেন্দ্র বাবু (মুখখাপাধ্যায়) স্বামিজীর
নিকট আসিয়া উপবেশন করিলেন। স্বামিজী পুনরায়
বলিতে লাগিলেন,-“কিন্তু মুখে এইরূপ ‘মিথ্যা’ ‘মিথ্যা
বললেই জ্ঞানী হওয়া যায় না, এই রকম শুষ্ক জ্ঞানীর
নরকে গমন হয়।

নবম পরিচ্ছেদ
৪৫
[ ভক্তিহীন শুষ্ক-জ্ঞানীর নরকে গমন হয় ]
শি। ( বিস্মিত হইয়া) জ্ঞানী নরকে গমন করে—এ
কি করে সম্ভব হয়
স্বা। ভক্তিহীন জ্ঞানকে শুষ্ক-জ্ঞান বলে। শুষ্ক-জ্ঞানী
নরকে গিয়ে অশেষ যন্ত্রণা ভােগ করে। শিবপুরাণে
পড় নাই যমদূতেরা পাপীর শরীরের মাংস কেটে তাকে
খেতে দেয়—তপ্ত লৌহ-পিণ্ডে চেপে ধরে ?
শি। হাঁ।
স্বা। শুদ্ধ-জ্ঞানীদেরও ঐ প্রকার শাস্তি হয়ে থাকে।
শি। জ্ঞানীদেরও শাস্তি হয় এ কি প্রকার কথা?
স্বা। প্রকৃত জ্ঞানীর নয়। শুষ্ক-জ্ঞানীর ও ভক্তিহীন
জ্ঞানীর। আচ্ছা জ্ঞান ও ভক্তির মধ্যে কি প্রভেদ ?
শি। জ্ঞান ও পরাভক্তি একই জিনিস।
স্বা। পরাভক্তির কথা ছেড়ে দে, অপরাভক্তিই ধ না।
ভক্তি ব্যতীত জ্ঞান হয় না। যারা ভক্তি না মেনে কেবল
জ্ঞান জ্ঞান করে তাদের শুষ্ক-জ্ঞানী বলে।
দেবেনবাবু। হাঁ, (শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি
কবিতা উল্লেখ করিয়া) রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরও ভক্তির সহিত
ভগবানের কাছে “আমাদের জ্ঞান দাও, অন্ধকার হতে
আলােকে নিয়ে যাও” ইত্যাদি বলে প্রার্থনা করেছেন।
কিন্তু এ ভক্তি পরা না অপরা।
স্বা। হাঁ বৎস। এ প্রকার ভক্তির নাম অন্ধ ভক্তি,
অন্ধ ভক্তিও শুষ্ক-জ্ঞানের চেয়ে বড়। অন্ধ ভক্তিতে ভক্ত

৪৬
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
নিজেকে সকলের ছােট মনে করে, তাতে সে মনে শান্তি পায়,
কিন্তু শুষ্ক-জ্ঞানী নিজেকেই (শরীরকে) শিব ভেবে সকলের
চেয়ে বড় মনে করে ও অহঙ্কারে স্ফীত হয়, কাহাকেও
গ্রাহ্য করে না। তাদের ভাব হয় -
যদা কিঞ্চিজজ্ঞােহহং দ্বিপ ইব মান্ধঃ সম্ভবং
তদা সর্বজ্ঞােইস্মীত্যভবদবলিপ্তং মম মনঃ।
( যদা কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ গুরুজনসকাশাদধিগতং
তদা মূখোশ্মীতি জ্বর ইব মদো মে ব্যপগতঃ )।
বৈরাগ্যশতক, ৯৯ শ্লো।
যখন কিঞ্চিৎ জ্ঞানলাভ করিয়া হস্তীর ন্যায় মান্ধ হইয়া-
ছিলাম, তখন আমার মন ‘আমি সৰ্বজ্ঞ’ এইরূপ অভিমানে
লিপ্ত হইয়াছিল। (কিন্তু যখন গুরুজনদিগের নিকট
হইতে কিছু কিছু জ্ঞানলাভ করিলাম, তখন আমি মুখ,
এইরূপ ধারণা হইতে লাগিল সুতরাং পূৰ্বে জ্বরের ন্যায়
আমার যে অহঙ্কার হইয়াছিল তাহা অপগত হইল।)
“শাস্ত্রে অহংব্ৰহ্মাস্মি” প্রভৃতি মহাবাক্য পড়ে আমিই
অর্থাৎ দেহ ব্ৰহ্ম এই ভেবে মূর্খেরা হাতীর মত মান্ধ হয়,
আর আপনাকে সর্বজ্ঞ মনে করে, কিন্তু বস্তুতঃ তার মন
বিষয় ভােগে লিপ্ত থাকে। একেই বলে শুষ্ক-জ্ঞানী এবং এই
সকল মূখদেরই অন্তে নরকভােগ হয়। আচ্ছা, রিপুগণ
তােমাদের বাধক না সাধক ?
দেবেন বাবু। বাধক।

নবম পরিচ্ছেদ
৪৭
[ কাম ক্রোধাদি রিপুগণের গতি ফিরাইয়া দিলে তাহারা
সাধকের সহায়ক হয়, বাধক হয় না ]।
স্বা। বেটা, এরা সাধক। ভগবানে কাম না থাকলে
তাতে ভালবাসা কি করে হয় ? কাম আছে বলেই ভগবানকে
ভালবাসতে শিখেছি,আর এই ভালবাসা হলেই মুক্তিলাভ হয়ে
থাকে। এইরূপ বিষয়ের উপর ক্রোধ না থাকূলে কি ভগবানের
প্রতি অনুরাগ হ’ত? ব্ৰহ্মানন্দের প্রতি লােভ না থাকলে
কি কেউ সাধন ভজন করত ? গুরুর প্রতি মােহ না থাকলে
কি আর কেউ গুরুসেবা করত? “আমি ব্ৰহ্ম” এই প্রকার
অভিমান না থাকলে কি কেউ জীবন্মুক্ত হতে পারত’? বিষয়
সকল অত্যন্ত হেয়, বিষয় থেকে মানুষের দুঃখ ব্যতীত সুখ
হয় না—এইরূপে বিষয়ের নিন্দা (দোষ দর্শন) না ক’রূলে,
কি আর মুক্তি লাভের ইচ্ছা হয় ? সুতরাং বুঝলে এরা
(রিপুগণ) সকলেই সাধকের সহায়ক, মাত্র এদের গতি
ফিরিয়ে দিতে হবে। স্ত্রীপুত্রের প্রতি ভালবাসাকে ভগবানের
দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে, লােকের উপর ক্রোধ না করে
বিষয়ের প্রতি ক্রোধ করতে হয়। এই প্রকারে রিপুগণের
গতি ফিরিয়ে দিতে হয়।

দশম পরিচ্ছেদ
যাবানর্থ উদপানে সৰ্বত্ৰ সংগ্ৰুতােদকে।
ভাবান্ সৰ্বেযু বেদেষু ব্ৰহ্মণস্য বিজানতঃ ।
{ জিজ্ঞাসুর পক্ষে গুরু ও শাস্ত্রের প্রয়ােজন-জ্ঞানীর
নহে।]
হরিদ্বার, ৬ই আষাঢ় ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮০ টা।
আরতি, মহিমস্তোত্র ও স্তবাদি পাঠ করিয়া শিষ্য
কলিকাতার হাইকোর্টের উকীল মােহিনী বাবু (চক্রবর্তী),
ডাক্তার দেবেন বাবু (মুখখাপাধ্যায়) ও অপর দুই একজন
ভক্ত স্বামিজীর নিকট বসিয়া আছেন। দেবেন বাবু
স্বামিজীকে প্রণাম করিলে স্বামিজী বলিলেন -
স্বা। (দেবেন বাবুর প্রতি) আচ্ছা, প্রণাম করলে কি
হয় ?
দেবেন বাবু। যে প্রণাম করে তার কিছু লাভ হয়।
যে প্রণাম করে তার লাভ হলে যাকে প্রণাম
করে তার ক্ষতি হয়। যেখানে লাভ আছে সেখানে ক্ষতি
আছে।
দেবেন বাবু চুপ করিয়া রহিলেন; কিয়ৎক্ষণ পরে
স্বামিজী পুনরায় বলিলেন।
;

দশম পরিচ্ছেদ ৪৯ স্বা। “নাম রূপ সব মিথ্যা জান কাকে কর প্রণাম ?” দেবেন বাবু। তাহলে কাহাকেও প্রণাম করা কি অকৰ্তব্য ? স্বা। নাম রূপ সব মিথ্যা, এই প্রকার জ্ঞান যার হয়েছে, যে সর্বত্র এক অখণ্ড-চৈতন্যই উপলব্ধি কচ্ছে, তার গুরু-শিষ্য ভেদ থাকে না, সুতরাং সে কাকে প্রণাম কবে ? জিজ্ঞাসুর পক্ষে গুরু ও শাস্ত্রের প্রয়ােজন; কিন্তু জ্ঞানীর পক্ষে কোন কিছুরই প্রয়ােজন নাই। তবে জ্ঞান হইলেও গুরুকে প্রণাম করতে হয়, ব্যবহারিক সত্তা ঠিক রাখার জন্য। গুরুকে প্রণাম না করলে নিমকহারামী হয়। যে গুরু ও শাস্ত্র কৃপায় জ্ঞান লাভ হয়, জ্ঞান লাভের পর যদি তাদের অবজ্ঞা করা যায়, তাহলে কি কৃতঘ্নতা । হয় না? তৎপরে অন্যান্য কথার দেবেন বাবু। আজ্ঞে, হাঁ। পর স্বামিজী ভক্তিপ্রসঙ্গে বলিতে লাগিলেন- নিস্তুতির্ণিনমস্কারে নিঃস্বকার এবচ। চলাচলনি কেত যতির্যাদৃস্থিকোভবেৎ প্রদক্ষিণম নস্তস্য হ্যদ্বয় কুতে। নাস্তিঃ। দ্বিতীয় নাই, প্রণামকর্তা ও প্রণম্য কোথায় ? [জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই অবস্থা ত্রয়ের বিয়ােগে সুখ ও সংযােগে দুঃখ হয় ।] ৪

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বা। শরীরের কোন অঙ্গের উপর দিয়ে পােকামাকড়
চলে গেলে অন্য কোন কারণে চুলকানি হলে হাত যেরূপ
সেই সেই জায়গায় গিয়ে চুলকানি দূর করে দেয়, সেইরূপ
ভক্তির উদয় হলে ভক্তিই কামাদি রিপুগণকে মন থেকে দূর
করে দেয়। আচ্ছা তােমাদের ত’ স্ত্রীপুত্র প্রভৃতি সংযােগে
সুখ ও বিয়ােগে দুঃখ হয়, কিন্তু এমন কোন জিনিষ আছে
কি যার সংযােগে দুঃখ, বিয়ােগে সুখ হয় ?
দেবেন বাবু। (ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া) কামাদি রিপুগণের
সংযােগে দুঃখ এবং বিয়ােগে সুখ হয়।
স্বা। কামাদি রিপুর ত’ কখন বিয়ােগ হয় না। (দেবেন
বাবুকে চিন্তাকুল দেখিয়া) বেশী দূরে যেও না, নিকটেই
আছে। দেবেন বাবু নিরুত্তর)।
স্বা। মল ও মূত্রের বিয়ােগে আনন্দ হয় ; চোর, বাঘ,
সাপের সংযােগে দুঃখ এবং বিয়ােগে সুখ।
দেবেন বাবু। ( আনন্দের সহিত) আজ্ঞে, হাঁ, এ ঠিক।
স্বা। সেইরূপ, জাগ্ৰৎ স্বপ্নদি এই অবস্থায়ের সংযােগে
দুঃখ ও বিয়ােগে সুখ হয়।
[ যােগীর ভগবান্ ও ভােগীর ভগবানে প্রভেদ ]
এক ভদ্রলােক পুত্রের বিবাহ দিয়ে সুন্দরী পুত্রবধূ, লক্ষ
টাকা আর কুড়ি পঁচিশ খানা গ্রাম' পেয়েছিল। এই সব
পেয়ে তার মনে আর আনন্দ ধরে না। দুই একদিন পরে
ছেলেটি হঠাৎ মারা গেল, এবং পিতা পুত্রে “হরিবােল,
হরিবােল” বলে শ্মশানে দাহ ক’তে নিয়ে গেল। দুই দিন

দশম পরিচ্ছেদ
পূর্বে সেই ব্যক্তির কি অবস্থা ছিল এবং এখন তার
কি অবস্থা হ’ল ভেবে দেখ ! লােক এক জনই, কিন্তু তার
পূর্বের ও পরের মনােভাব কিরূপ বিভিন্ন । দুই দিন পূর্বে
যে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল আজ সে দুঃখ সাগরে নিমগ্ন।
এইরূপ ভগবান্ একই, কিন্তু যােগীর হৃদয়ে তিনি আবেগের
সহিত বিরাজমান, আর ভােগীর হৃদয়ে তিনি উদাসীনের মত
থাকেন। অতএব ভােগের আকাঙ্ক্ষাকে মনে স্থান দিও না।
দেবেন বাবু। মন তত ভােগই চায়।
[মনের কথা শুনতে নাই]
“অস্য সংসারবৃক্ষ সর্বোপদ্রবদায়িণঃ।
উপায় এক এবাস্তি মনসঃ স্বস্য নিগ্রহঃ ।”
—যযঃ বাঃ।
মনের কথা শুনতে নাই। মনের কথা না শুনলে
অচিরে শান্তিলাভ হয়। এক বৃদ্ধ চাষা বােজ লাঙ্গল কঁাধে
করে মাঠে চাষ করতে যেত। একদিন এক সাধু ঐ মাঠের
কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে দেখে চাষ বিনয় করে বললে,
“ঠাকুর, কৃপা করে আমাকে এমন কিছু উপদেশ দিন যাতে
আমি ভবসাগর পার হয়ে যেতে পারি”। সাধু মনে মনে
ভাবলেন,“তাই ত, এত’ নিরেট মূখ চাষা, এর বুদ্ধি মােটা, একে
ব্ৰহ্মজ্ঞানের উপদেশ দিই, না ভগবদ্ভক্তির উপদেশ দিই, না
তটস্থ লক্ষণের দ্বারা উপদেশ দিই ! এর মােটা বুদ্ধিতে এসব
সহজে প্রবেশ করবে না। যাকে মনের কথা শুনতে নিষেধ
করি।” এই ভেবে সাধু চাষাকে “মনের কথা শুনিস না” এই

৫২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
বলে চলে গেলেন। চাষা সেই উপদেশ শুনে লাঙ্গল কঁাধে
নিয়ে দাড়িয়ে পড়ল। চাষার মন বললে, “বাপু হে, লাঙ্গলটি
কঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখ না, কেন বৃথা কষ্ট পাচ্ছ?”
চাষা ব’ললে “ওরে মন, এই ষাট বছর ধরে তাের আজ্ঞানুবর্তী
হয়ে চলেছি, কিছু শান্তি পাই নি, এখন আর তাের
আজ্ঞানুযায়ী হয়ে চলব না; এখন গুরুর আজ্ঞানুযায়ী হয়ে
চলব, আমি তাের কথা শুনব না।” এই বলে চাষা রােদেই
লাঙ্গল কঁাধে করে দাড়িয়ে রইল। কতক্ষণ পরে বাহের
বেগ হ’ল, মন বলে, “বাপু হে, ব’সে বাহেটাত করে নেও।”
চাষা ব’ললে, তাের কথা কিছুতেই শুনব না, এতদিন হ’ল বাহ্য
অনেক করেছি, এখন আর তাের কথা শুনব না”
এই বলে চাষ পূর্বের মত দাড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে
মন ব’ললে,-“বাপু হে, দারুণ ক্ষুধা লেগেছে, এখন গিয়ে
কিছু খেয়ে এস না!” চাষ পূর্বের ন্যায় বললে, “আমি
পাব না, গুরুর আজ্ঞা অবহেলা করে তােমার কথা শুনব
।” এইরূপে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে চাষা ঐ ভাবে
সাত দিন দাড়িয়ে রইল। সাত দিন পরে বিষ্ণুর আসন
টল। বিষ্ণু লক্ষ্মীকে বললেন, “লক্ষ্মি, ঐ দেখ একটি
লােক গুরুর আজ্ঞা পালন ক’ব-মনের কথা শুনব না, বলে
সাতদিন অনাহারে অনিদ্রায় একভাবে পঁড়িয়ে আছে, তুমি
এখনই গিয়ে একে অন্ন দিয়ে এস।” লক্ষ্মী বিষ্ণুর আজ্ঞা
শুনে একথালা উৎকৃষ্ট খাদ্যাদি নিয়ে চাষার কাছে উপস্থিত
হয়ে বললেন,-“ওহে কৃষক, এই খাদ্য সামগ্রী আহার

দশম পরিচ্ছেদ
;
কর, তােমার জন্য নিয়ে এসেছি।” চাষা জিজ্ঞাসা করলে,
“তুমি কে ?” লক্ষ্মী বললেন, “আমি লক্ষ্মী, বৈকুণ্ঠ থেকে
বিষ্ণু আমাকে পাঠিয়েছেন।” চাষা ব’ললে, “আমি লক্ষী
টক্ষ্মী বুঝিনা, তােমার হাতে ঐ খাবার দেখে আমার মন
টপাটপ করে খেতে চাচ্ছে, কিন্তু আমি ত’ আর মনের কথা
শুনব না, সুতরাং শীঘ্র এখান হতে চলে যাও।” কাজেই
লক্ষ্মী অনন্যোপায় হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে গিয়ে বিষ্ণুর কাছে
আদ্যোপান্ত সমস্ত ব্যাপার বললেন। তখন বিষ্ণু স্বয়ং
খাবার নিয়ে চাষাকে খেতে বললেন। চাষা পূর্বের ন্যায়
জিজ্ঞাসা করলে, “তুমি কে?” বিষ্ণু বললেন, “আমি
হরি।” চাষ। ব’ললে, “আমি হরি টরি বুঝি না; তােমার
হাতে খাবার দেখে আমার মন গপাগপ করে খেতে চাচ্ছে,
কিন্তু আমি ত’ আর মনের কথা শুনব না; সুতরাং তুমি
সত্বরই এখান হতে চলে যাও।” বিষ্ণু দেখলেন মহা
ভক্ত না খেয়ে মরে যাচ্ছে, কি করি! তখন
কোনও উপায় না দেখে তিনি কৃষকের গুরুর কাছে গিয়ে
বললেন,-দেখুন ত’ আপনি কি সর্বনাশ করেছেন।
গুরু ব’ললেন,-“কি হয়েছে ?” বিষ্ণু বললেন, “আপনি
কৃষককে মনের কথা শুনতে নিষেধ করেছেন, তাই
শুনে’ সে আজ পর্যন্ত না খেয়ে মরতে বসেছে।” তখন
গুরু আশ্চর্য হয়ে বিষ্ণুকে বললেন, “দেখুন, আমার কাছে
উপদেশ চাইলে, আমি চাষকে মনের কথা শুনতে বারণ
করেছিলাম, কিন্তু সে যে ঠিক তাই করবে আমি স্বপ্নেও
বিপদ,

৫৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
তা ভাবিনি। বিষ্ণু বললেন, “এ লােকটা প্রকৃত অধিকারী
ছিল, তাই গুরুবাক্য অন্তরে বসে গেছে, আপনারা
অনধিকারীকে উপদেশ করলে আমার কষ্ট পেতে হয় না,
কারণ তাদের উপদেশ এক কান দিয়ে প্রবেশ করে আর
এক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়, কিন্তু আপনারা যদি প্রকৃত
অধিকারীকে উপদেশ দেন, তাহলে আমার বড় কষ্ট ভােগ
করতে হয়। এই দেখুন, এই কৃষককে খাওয়াবার জন্যে
আমাকে কত কষ্ট পেতে হচ্ছে। আপনি তার কাছে চলুন,
আপনি র’ললে সে খেতে পারে।” তখন বিষ্ণু ও গুরু উভয়ে
এক সঙ্গে চাষার কাছে চললেন। চাষার নিকট উপস্থিত
হ’য়ে গুরু চাষাকে বললেন, “কিরে, বিষ্ণু খাবার নিয়ে
এসেছেন, তুই খাচ্ছিস, না কেন ?” চাষা ব’ললে, “গুরুজি,
ষাট বছর মনের কথা শুনে কোন শান্তি পাই নি, কিন্তু এই
সাত দিন আপনার উপদেশ পেয়ে মনের কথা না শুনে বড়ই
শান্তি পাচ্ছি, চতুর্দশ ভুবনের আনন্দ আমি এখানে বসেই
উপভােগ কচ্ছি, মন ত’ চাচ্ছে বিষ্ণুর হাত থেকে খাবার
গপাগপ খেয়ে ফেলতে, কিন্তু আমি মনের কথা শুনব না।”
তখন গুরু বললেন, “আচ্ছা, আমার কথা শুনবে কি?” চাষা
বললে, “আপনার কথা নিশ্চয়ই শুনব, আপনারই কৃপায়
আমি এত আনন্দ লাভ করেছি, আপনার কথা না শুনলে
আমি কৃতঘ্ন হব।” গুরু বললেন, “তবে লাঙ্গল নামিয়ে রেখে
শৌচ করে এসে এই খাদ্যাদি আহার কর।” তখন কৃষক
তাহাই করিল। বিষ্ণু চাষার একনিষ্ঠা ও গুরুভক্তি দেখে

একাদশ পরিচ্ছেদ
তার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন ও অন্তে তাকে মােক্ষ প্রদান
করলেন।
এইরূপ আলােচনার পর সমাগত সকলে উঠিয়া গেলেন।
৭
একাদশ পরিচ্ছেদ।
হরিদ্বার, ৭ই আষাঢ়, ১৩৩১ সাল, বেলা ৩টা।
(যথা পৰ্বত ধাতুনাং দহন্তে ধমতং মলাঃ ।
তথেন্দ্রিয়কৃত দোষা দহন্তে প্রাণনিগ্রহাৎ।)
[ মন্ত্রজপ ও প্রাণায়াম ]
শিষ্য স্বামিজীকে ডাকের চিঠি পড়িয়া শুনাইতেছে ;
পাঠান্তে শিষ্য প্রশ্ন করিল :-
শি। বাবা!
বাবা! প্রাণায়ামের সহিত গুরু, শিব, বিষ্ণু
প্রভৃতি নাম জপ না করে প্রাণায়াম না করে শুধু ইষ্টমন্ত্র
( গুরুদত্ত বীজমন্ত্র ) জপ করা কি ভাল নয় ? (১)
(১) স্বামিজী প্রত্যহ প্রাতে ও সন্ধ্যায় যাহার ভগবানের যে নাম
প্রিয় সেই নাম প্রত্যেক শ্বাস ত্যাগের সহিত ৩০ বার মালা জপ
করিতে উপদেশ করিয়া থাকেন। এক প্রশ্বাসে ৩০ বার জপ করিয়া
মালার একটি না সরাইয়া এক মালা (১০৮ দানা) শেষ করিতে হয়।
এই প্রকার প্রাতে ১ মালা ও সন্ধ্যায় ১ মালা জপ করিলে মনঃস্থির
করিয়া ভজনা করা সহজ হয়। এই উপদেশ লক্ষ্য করিয়া উক্ত প্রশ্নটি
করা হইয়াছিল।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বা। হা বেটা। ইষ্ট মন্ত্র যত বেশী জপ করা যায়
ততই ভাল। যার মন জপে একবার বসে গিয়েছে, তার
প্রাণায়ামের আর দরকার নেই। কিন্তু যাদের মন জপে
বসে না, জপ করতে বসলে মন চঞ্চল হয়, তাদের জন্যই
শিব, গুরু, বিষ্ণু প্রভৃতি যে কোন একটি ভগবানের নামের
সহিত প্রাণায়ামের বিধান করা হয়েছে। প্রাণায়ামের
বলে মন রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন আর চঞ্চল হয় না।
প্রাণায়ামের সহিত ইষ্টমন্ত্র জপ করা যায় না ?
স্বা।
কেন যাবে না ? এক শ্বাসে ৩০ বার গুরু বা
- শিবের নাম জপ না করে একি ৫ বার ইষ্টমন্ত্র জপ করুলেই
হয়।
এই প্রকার অন্যান্য কথার পর শিষ্য উঠে চলে গেল।
শি।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
হরিদ্বার, ১লা ভাদ্র, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮ টা।
[ দেহাভিমান পরিত্যাগ কর, সকল সমস্যাই পূর্ণ হইবে।]
“অবন্ত ইমে দেহ। নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ ।
অনাশিনােহপ্রমেয়স্য তস্মাদ্যুধ্যস্ব ভারত৷”
এ-গীঃ ২'অ ১৮ শ্লো।
“বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহাতি নবােহপরাণি।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণ- ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।” গীতা-২২২। আরতি ও মহিমস্তোত্রাদি পাঠান্তে শিষ্য ও কয়েকজন ভক্ত স্বামিজীর কাছে বসিয়া আছেন। জাগথ্রি হইতে একজন হিন্দুস্থানী ভক্ত আসিয়াছেন। স্বামিজী তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন। স্বা। আচ্ছা, শিবজীর এক নাম বিশ্বম্ভর নয় কি ? ভক্ত। হঁ্যা। স্বা। “বিশ্বং বিভৰ্ত্তি” ইতি বিশ্বম্ভরঃ, যিনি বিশ্বকে ভরণ করেন, তাহার নাম বিশ্বম্ভর। তবে আর তােমার চিন্তা কি ? তুমি যখন বিশ্বের মধ্যেই আছ, তখন ত’ তিনি তােমাকেও ভরণ করবেনই; আর যদি তােমাকে অন্ন না দেন তবে ত’ তােমাকে তার বিশ্বের বাইরে রাখতে হবে, সে অবস্থা ত’ মুক্তাবস্থা, সুতরাং হয় তিনি তােমাকে ভরণপােষণ করবেন, নচেৎ তােমাকে মুক্তি দিবেন। তবে আর সংসার কি প্রকারে চলবে,স্ত্রী, পুত্র প্রভৃতি কি খাবে—এ প্রকার চিন্তা করে বৃথা কালক্ষেপ মাথা খারাপ করবার প্রয়ােজন কি ? ভক্ত। জাত’ বুঝেও বুঝি না; মােহে ভুলে আছি। স্বা। দেহাধ্যাসই যত সর্বনাশের মূল, দেহাধ্যাস ছেড়ে দেও। পাঁচজন লােকের একটা কড়া ( রন্ধনপাত্র) ছিল। এক ব্যক্তি কোন সময় “কাজ হয়ে গেলে ফিরিয়ে দেব” ;

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ বলে তাদের কাছ থেকে কড়াটা ব্যবহার করতে নিয়েছিল। কাজ শেষ হলে পর ঐ কভার পাঁচজন মালিক কড়াটা ফেরৎ চাইল। সে ব্যক্তির কড়াটার উপর লােভ এত প্রবল হ’ল যে সে কড়াটি দিতে রাজী হ’ল না, অধিকন্তু ব’ললে কড়া তার, সেই পাঁচজন প্রকৃত মালিকের নয়। তখন কড়ার মালিক অগত্যা পুলিশে খবর দিতে বাধ্য হ’ল। পুলিশ লােকটাকে কড়া ফিরিয়ে দিতে বলায়, সে কড়াটি তার নিজের বলে দাবী করলে। কাজেই বিচার হ’লবিচারে আসামীকে জেরা করা হ’ল“কবে তুমি কড়া তৈয়ার করেছিলে? তৈয়ার করেছিল? কত ওজন” ?-ইত্যাদি। সে কোনও উত্তর দিতে পারল না। তখন কড়ার প্রকৃত মালিকদের ঐ সকল প্রশ্ন করা হল এবং তারা সে সকল প্রশ্নের যথাসম্ভব উত্তর দিল। ফলে কড়া ঐ পাঁচজনের প্রমাণ হল, এবং ঐ ব্যক্তি মিথ্যা দাবী করেছে প্রমাণিত হওয়ায়, পুলিশ লােক- টিকে যৎপরােনাস্তি প্রহার করল। প্রহারের চোটে লােকটি কাতর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং কড়াটি ফিরিয়ে দিল। তদ্বৎ পঞ্চভূতের এই দেহকে “আমার দেহ” বলে দখল করে আছ ; কিছুতেই এর অভিমান (অর্থাৎ ‘এটা আমার এই বুদ্ধি ) ছাড়তে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু যখন পুলিশরূপ যমদূত উপস্থিত হবে এবং তােমাকে তাড়না করবে তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও একে ছাড়তে বাধ্য হবে। অতএব যমদূতের আস- বার ও তাড়না ভােগ করবার পূর্বেই কি দেহাধ্যাস ত্যাগ করা উচিত নয় ? দেহ ছাড়তে এত ভয় কেন? জাগরি ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ ঘর ছেড়ে যদি হরিদ্বারে কি হৃষীকেশে ঘর নির্মাণ করে বাস করতে হয়, তাতে কি দুঃখ আছে ? ভক্ত। না। স্বা। তবে এই দেহ-ঘর ত্যাগ করে অন্য দেহ-ঘরে যেতে তােমার দুঃখ হয় কেন ? দেহ ত’ ঘর, তুমি তার মধ্যে বাস ক’রছ। তুমি ত’ আর নষ্ট হও না, দেহ নষ্ট হয় তাতে তােমার কি ক্ষতি ? এই প্রকার অন্যান্য কথার পর ভিক্ষার সময় উপস্থিত হইলে সমাগত শিষ্য ও ভক্তগণ উঠিয়া চলিয়া গেল। ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। [অবাঙমানসগােচর অবস্থাই জ্ঞানীর প্রকৃত অবস্থা] “ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি নবাগ গচ্ছতি নােমনাে”—কেন। হরিদ্বার, ১৩ই ভাদ্র, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮ || আরতি ও মহিমস্তোত্রাদি পাঠান্তে শিষ্য স্বামিজীর কাছে বসিয়া আছেন; শিষ্য প্রশ্ন করিল। শি। বাবা, কৰ্ম্মকাণ্ড ও উপাসনা কাণ্ডের মধ্যে ভেদ কি? অগ্নিহোত্রাদি,অথবা অশ্বমেধ যজ্ঞাদিই বােধ হয় কৰ্ম্ম- কাণ্ডের অন্তর্গত ? স্বা। হাঁ। শিষ্য। উপাসনা কাকে বলে ? ৪ ০

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বা। ঠাকুরজীর (ভগবানের) সেবা করা, পূজা করা,
তার গুণকীর্তন করা বা ধ্যান করা ইত্যাদিকে উপাসনা
বলে। আর এক প্রকার উপাসনা আছে তার নাম ‘অহংগ্রহ
উপাসনা। (১)
শি। সেটি কি প্রকার ? “অহং ব্ৰহ্ম” এই ভাবের
সাধনা কি ?
স্বা। হাঁ, “অহং ব্ৰহ্মাস্মি”—এই ভাবের সাধনা করার নাম
‘অহংগ্রহ’ উপাসনা।
শি। 'অহংব্ৰহ্ম এই ভাবের সাধনাও যদি উপাসনার
অন্তগত হয়, তবে জ্ঞানকাণ্ড কাকে বলে ?
“যত বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসাসহ”—এই
ভাবে অবস্থানই জ্ঞানকাণ্ডের লক্ষ্য। সে অবস্থা লাভ করলে
‘আমি ব্ৰহ্ম’ একথা বললেও লজ্জা বােধ হয়। তখন কে
কাকে বলে, নাম রূপের অতীত সে অবস্থা। (২)
(১) জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে যজন্তো মামুপাসতে।
একবেন পৃথকবেন বহুধাবিশ্বততমুখ ।
-৯১৫ গীতা
(২) ‘অহংব্ৰহ্মাস্মি’ এই মহাবাক্যের বাচ্যার্থ “আমি অর্থাৎ অন্তঃকরণ
বিচ্ছিন্ন জীবচৈতন্যই উপাধি বিনিমুক্ত হইয়া শশাধিত হইলে ব্ৰহ্ম অর্থাৎ
অপরিচ্ছিন্ন ব্ৰহ্মচৈতন্য, যেমন কয়লা ও হীরক। ব্ৰহ্মচৈতন্য এইরূপে
অপরিচ্ছিন্নতা বা অন্তঃকরণরাহিত্য নির্দেশ করলে উহা একটি ভৈয়
পদার্থের ন্যায় বুঝায়, কিন্তু বস্তুতঃ ব্রহ্ম বাক্য ও মনের অগােচর অর্থাৎ
অনিৰ্দেশ্য। জীবচৈতন্যের জীবও মিথ্যাকল্পিত উপাধি মাত্র।
সুতরাং ‘অস্মি” এই বাক্যের দ্বারা ব্ৰহ্মচৈতন্যের অপৰিছিন্নতা, জ্ঞেয়তা

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ শি। দ্বৈত ভাবে উপাসনা করিলে কি মুক্তিলাভ হতে পারে? প্রভৃতি উপাধি এবং জীবচৈতন্যের জীবত্ব উপাধি নিবারণ করিয়া এক মাত্র অখণ্ড চৈতন্য পূৰ্ণানন্দ জ্ঞানস্বরূপকেই লক্ষ্য করা হয়; এবং ইহাই ‘অহং ব্ৰহ্মাশ্মি” এই মহাবাক্যের লক্ষ্যার্থ। যেমন গৃহস্থ দেবদত্ত সন্ন্যাসী হইয়া যদি বলে“আমিই সেই”তাহা হইলে দেবদত্তের সন্ন্যাসীত্ব ও গৃহীত্ব বাদ দিয়া “আমি” ও “সেই” এই দুই পদের একত্ব প্রতিপাদন করা হয়, সেইরূপ। অতএব দেখা গেল যে ‘অহংব্ৰহ্মাস্মি’ একথা বলিতে গেলে জীবের জীবত্ব অঙ্গীকার করিয়াই এক অখণ্ড সচ্চিদানন্দই লক্ষ্য করা হয়। কিন্তু যে সকল মহাত্মাগণের তত্ত্বনিশ্চয়ের দৃঢ়তাবশতঃ জীব- ভাব ক্ষীণ হইয়াছে, সুতরাং যাহারা অহরহঃ অখকৈরস সচ্চিদানন্দেই অবস্থিতি করেন, তাহাদের ‘অহংব্ৰহ্মাস্মি’ বলিতেও লজ্জা বােধ হইবে সন্দেহ কি ? ঈদৃশ মহাত্মাগণকে লক্ষ্য করিয়া উক্ত হইয়াছে। “বাসুদেবঃ সৰ্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভ।” জ্ঞানী ত্মৈবমে মতম্।” দর্শনাদর্শনে হিত্বা স্বয়ং কেবলরূপতঃ। যস্তিষ্ঠতি স তু ব্ৰহ্মন্তু হ্ম ন ব্ৰহ্মবিৎ স্বয়ং।”—স্মৃতি। “ত্যজ ধর্মমধৰ্ম্মঞ্চ উভে সত্যানুতেত্যজ। উভে সত্যানুতে ত্যক্ত। যেন ত্যজসি তং ত্যজ ।” বৃহস্পতি। তত্র কোঃ মােহ কঃ শােক একত্বমনুপশ্যতঃ। } ঈশঃ ৭। স্বামিজী উল্লিখিত অবস্থাকেই প্রকৃত জ্ঞানীর অবস্থা বলিয়া নির্দেশ করিতেছেন বলিয়া বােধ হয়।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
[ দ্বৈতভাবে উপাসনায়ও মুক্তিলাভ হইতে পারে। ]
কেন হবে না, ধ্রুব, প্রহলাদ প্রভৃতির কি মুক্তি হয়
নি? মুক্তি কয় রকম বলত?
শি। চার প্রকার। (১)
স্বা। কি কি ?
(১) “তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূৰ্ব্বক।
দদামি বুদ্ধিযােগংতং যেন মামুপন্তিতে।”
১০। ১০ গীত
“তেমেবানুকম্পার্থমহম জ্ঞানং তমঃ ।
নাশয়াম্যাত্মভাবস্থা জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।”
'।১১ গীতা
প্রীতিপূৰ্ব্বক ভজনাপর সেই সতত যুক্ত সাধকগণকে আমি সেই
বুদ্ধিযােগ দান করিয়া থাকি, যাহাদ্বারা তাহারা আমাকে প্রাপ্ত হইয়া
থাকেন। তাহাদিগের উপরই দয়াপরবশ হইয়া আমি তাহাদের
অন্তঃকরণে আত্মসত্তার প্রকাশ পূৰ্বক, দীপ্তিময় তত্ত্বজ্ঞানরূপ দীপ দ্বারা
তাহাদের অজ্ঞানজনিত তমােগুণকে নষ্ট করিয়া থাকি ।
“কিমর্থং কস্য বা তৎপ্রাপ্তিপ্রতিবন্ধহেতােনশকং বুদ্ধিযােগং
তেষাং ভক্তানাং দদাসীত্যাকাঙ্কায়ামাহতেশামেব কথং নাম শেয়ঃ
স্যাৎ ইত্যনুকম্পার্থং দয়াহেতেরহমজ্ঞানজম্ অবিবেকতাে জাত
মিথ্যাপ্ৰত্যয়লক্ষণং মােহান্ধকারং তমাে নাশয়ার্মি আত্মভাবস্থা
আত্মনােভাবােইস্তকরণাশয়ঃ তস্মিবে স্থিত: সন্।” শাং ভাষ্য ১•১১
-গীতা। অত্যার্থ -তােমাকে পাইবার প্রতিবন্ধক কিরূপ বস্তুর নাশক
সেই বুদ্ধি যােগ তােমার ভক্তগণের মধ্যে কাহাকে কিসের জন্যই ৰা
--

এয়ােদশ পরিচ্ছেদ শি। সামীপ্য, সাযুজ্য, সারূপ্য, সালােক্য। “আমি ব্ৰহ্ম” এ জ্ঞান না হলে যখন কৈবল্য লাভ হয় না,তখন দ্বৈত- ভাবে (অর্থাৎ আমি ভগবানের দাস, ইত্যাদি ভাবে) উপাসনা ক’রুলে মুক্তি কি প্রকারে সম্ভাবনা হয়? দান করিয়া থাক, এই প্রকার আকাঙ্ক্ষার সমাধান করিবার জন্য ভগবান বলিতেছেন যে—কি প্রকারে তাহাদের মােক্ষ লাভ হইবে ?-এই প্রকার ভাবনায় অনুগ্রহ করিবার জন্য আমি অবিবেক হইতে উৎপন্ন মিথ্যা জ্ঞানরূপ “তম” মােহান্ধকারকে “আত্মভাবস্থ” অন্তঃকরণাশয়স্থিত হইয়া বিনষ্ট করিয়া থাকি। (কিসের দ্বারা নষ্ট করি ?) জ্ঞানদীপ দ্বারা। কেহ কেহ বলেন দ্বৈতভাবে সাধনা করিলে মুক্তিলাভ হয় না, কারণ যেখানে দ্বৈত সেখানেই নাম, রূপ বর্তমান-নাম, রূপ মায়ার কাৰ্য, সুতরাং অদ্বৈতে স্থিত না হওয়া পর্যন্ত মায়ার অধীন থাকিতে হয়, কাজেই দ্বৈতে মুক্তিলাভ অসম্ভব। বাদীদিগের এই মত ভ্রান্ত। বিশেষরূপে অনুধাবন করিয়া দেখিলেই বুঝিতে পারা যাইবে যে দ্বৈত ভাবেই মুক্তিলাভ সহজ সাধ্য—আপনাকে ভগবান হইতে পৃথক মনে করিয়া তাহার চিন্তায় দিবারাত্রি রত থাকিলে, তিনি কৃপাপরবশ হইয়া ভক্তের হৃদয়ে তত্ত্বজ্ঞানরূপ দীপ প্রজ্বলিত করিয়া, সংসারহেতু অনাদি অবিদ্যা বা তমকে নষ্ট করিয়া দেন—অজ্ঞান নষ্ট হইলে বা তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হইলে জীব স্বতঃই মুক্ত হইয়া যান-তখন নিজেকে অখণ্ড, নির্বিকার, অজ ও অমর বলিয়া মনে হয় এবং সর্বত্রই এক অখণ্ড চৈতন্যের উপলব্ধি হয়নাম, রূপ তখন স্বতঃই মিথ্যা বলিয়া মনে হয়। গীতায় দ্বাদশ অধ্যায়েও শ্রীভগবান দ্বৈতভাবে খুক্তিলাভ সহজসাধ্য এবং অদ্বৈতভাবে ক্লেশদায়ক বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন-

৬৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বা। সারূপ্যমুক্তির অর্থ কি ?
শি। ভগবানের যে রূপ ভক্তের সেই রূপলাভের নামই
সারূপ্য মুক্তি।
স্বা। অর্থাৎ বিষ্ণুর চিহ্ন শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম তার
ভক্তও ধারণ করে এবং অবিকল বিষ্ণুর মত হয়ে যায়-নয়
কি ?
শি। হা।
স্বা। তবে তাের অদ্বৈতবাদের কি হানি হ’ল? ভক্তও
যখন ভগবান হয়ে গেল, তখন ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ এ জ্ঞান তার
হল কি না ? (১)
শি। হাঁ, আমার শঙ্কা নিবৃত্ত হইয়াছে।
“মাবেশ্য মনে যেমাঃ নিত্যযুক্তা উপিসতে।
শ্রদ্ধয়া পরয়ােপেস্তেমেযুক্ততমা মতাঃ ॥” ১২২ গীতা
“ক্লেশােহধিকতরন্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্।
অব্যক্তা হি গতিদুঃখং দেহবত্তিরপতে।” ২২৫ গীতা
২
(১) ভাগবতে আছে যে ভক্তশিরােমণি নারদ ভগবদ্দর্শন লাভের
অনুভূতি বর্ণনা করিয়া বলিয়াছিলেন, “নাপমুভয়ং মুনে” অর্থাৎ হে
মুনে, আমি উভয় অর্থাৎ আমি এবং তুমি দেখি নাই।
ভগবৎ অঃ ১৫-১৯ শ্লো।
।

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
ব্ৰহ্মা যেন কুলালবন্নিয়মিত ব্ৰহ্মাণ্ড ভাণ্ডোদরে
বিষ্ণুৰ্যেন দশাবতার গ্রহণে ক্ষিপ্তো মহাসংকটে
রুদ্ৰো যেন কপালপানিপুটকে ভিক্ষাটনঙ্কারিত
সূৰ্য্যো ভ্রাম্যতি নিত্যমেব গগনে তস্মৈ নমঃ কর্মণে।
{ প্রারন্ধের ভােগ দৈবাধীন, কিন্তু আধ্যাত্মিক উন্নতি
পুরুষকার সাপেক্ষ ]
হরিদ্বার, ২৬শে ভাদ্র, ১৩৩১ সাল, বেলা ১২টা।
শিষ্য স্বামিজীর নিকট চিঠি পড়িতেছে। পিরােজপুরের
(বরিশাল) জাতীয় আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্ৰীযুক্ত অন্নদা-
প্রসাদ সেন স্বামিজীর নিকট ব্যাধির জন্য কষ্ট পাইতেছেন
বলিয়া দুঃখ করিয়া পত্র লিখিয়াছেন। পত্ৰ শুনিয়া স্বামিজী
বলিলেন :-
স্বা। লিখে দে-কায়িকা পাপের ফল কুষ্ঠব্যাধি প্রভৃতি
আর কায়িকা পুণ্যের ফল রাজপদাদি লাভ। মানসিক
পাপের ফল অন্ধ হওয়া, আর মানসিক পুণ্যের ফল দিব্য চক্ষু
লাভ। সেইরূপ বাচনিক পাপের ফল বােবা হওয়া, আর
বাচনিক পুণ্যের ফল বিদ্যালাভ। এইগুলি ঈশ্বরের নিয়ম।
নিজের পুরুষকারের দ্বারা উন্নতিলাভ করতে হয়।
তৎপরে অন্যান্য কথার পর,শিষ্য উঠিয়া গেল। সেইদিনের
কথােপকথন সমাপ্ত হইল।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।
[ সন্ন্যাসীর প্রণম্য কে ? ]
“নিঃস্তুতির্ণিনমস্কায়াে নিঃস্বধাকার এব চ।
চলাচলনিকেতশ্চ যতির্যাদৃচ্ছিকে ভবেৎ।” মাণ্ডুক্য,
গৌড়পাদীয়কারিকা, ২৩৭
হরিদ্বার, ৭ই কার্তিক, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮০টা।
রাত্রে এক ঘণ্টা করিয়া শিষ্য স্বামিজীকে “বিচারমালা” (১)
পড়িয়া শুনায়। শিষ্য স্বামিজীর কাছে বসে আছে।
শি। বাবা, পূৰ্বাশ্রমের পিতামাতা গুরুজনের সঙ্গে
যদি কোন দিন সাক্ষাৎ হয়, তবে প্রণাম করব কি ?
স্বা। হাঁ, মাতাকে প্রণাম করবি।
শি। পিতাকে নয় ?
স্বা। হাঁ, তাকেও করতে পার।
পিতৃব্য কিংবা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রভৃতিকে প্রণাম
করব কি ?
স্বা। পিতামাতা ছাড়া আর কাকেও প্রণাম করতে নাই।
পিতামাতাকে (২) প্রণাম করলে, তাতে তাঁদের প্রত্যয় হয়,
5
(১) ‘বিচারমালা’—উদাসী সাধু শ্ৰীঅনার্থদাসজী বিরচিত একখানি
হিন্দি বেদান্ত গ্রন্থ।
(২) “আশাম্বরে নির্ণমস্কারােন স্বধাকানাে ন নিন্দাস্তুতির্যাদৃচ্ছিকে।
ভবেৎ ভিক্ষু-পরমহংসােপনিষৎ।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
কিন্তু তারা তােক প্রণাম করলে তাের কোন পাপ হয় না।
কারণ তুই চতুর্থাশ্রমী (অর্থাৎ সন্ন্যাসী), আর তারা গৃহস্থ।
সন্ন্যাসী ব্রাহ্মণেরও গুরু, কাজেই সন্ন্যাসীদের প্রণাম করা
সকলেরই কর্তব্য। (১) শাস্ত্ৰ পূৰ্বাশ্রমের পিতামাতাকে
প্রণাম করা সন্ন্যাসীর পক্ষে নিষিদ্ধ বলেছেন, কিন্তু আমাদের
আচাৰ্য (শঙ্করাচাৰ্য) সন্ন্যাসগ্রহণ করেও তাঁর মাতাকে
প্রণাম করেছিলেন ও তার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পাদন করাইয়া-
ছিলেন, সেই জন্য অধুনা আমাদেরও মাতাকে প্রণাম করা
উচিত। কারণ :-
“যদ্দাচরতি শ্রেষ্ঠতদেবেতরােজন।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লােক স্তদনুবৰ্ত্ততে।” (গীঃ ৩২১)
(অর্থাৎ শ্রেষ্টব্যক্তিগণ যেরূপ আচরণ করিয়া থাকেন,
অন্যান্য সাধারণ ব্যক্তিগণও তাহারই অনুসরণ করিয়া
থাকে। শ্রেষ্ঠগণ যাহা প্রমাণ বলিয়া স্থির করেন, অন্যান্য
ব্যক্তিগণও তাহার মর্যাদা রক্ষা করেন)।
শঙ্করাচাৰ্য্য সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে মাতার অনুমতি
প্রার্থনা করলে, ‘মাতা তাকে মৃত্যুর সময় দেখা দিবে এই
প্রতিজ্ঞা করিয়ে অনুমতি দিয়েছিলেন ; তাই তিনি সন্ন্যাসের
(১) যতিঃ পরমহংসস্তু তুৰ্য্যাখ্যঃ প্রতিবােদিত
যমৈশ্চ নিয়মৈযুক্তো বিষ্ণুরূপী ত্রিদন্তভৃৎ। ইতি স্মৃতি।
অগ্নিরুদ্বিজাতিনাং বর্ণানাং ব্রাহ্মণােগুরু
পতিরেকোগুরুীণাং সর্বস্যভ্যাগতত গুরুঃ মঃ।

৩৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
পরও পূৰ্ব্বপ্রতিজ্ঞা পালন করবার জন্য মাকে প্রণাম
করেছিলেন। পূৰ্বাশ্রমের নাম, গােত্র প্রভৃতি কারও কাছে
বলতে নেই।
এইরূপ কথাবার্তার পর বিচারমালা পাঠ আরম্ভ হইল।
যােড়শ পরিচ্ছেদ।
ভগবান তত্ত্ববেত্তার যােগক্ষেম বহন করেন।]
“অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যােসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যােগক্ষেমং বহাম্যহম্।”
গীঃ ৯১২২।
হরিদ্বার, ১৬ই কার্তিক, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৯টা।
শিষ্যের বিচারমালা গ্রন্থ পাঠান্তে স্বামিজী বলিলেন “এখন
খেয়ে শুয়ে পড়”। স্বামী ব্রহ্মানন্দজী ও টাকী স্কুলের
(২৪ পরগণার) শিক্ষক রামগতি দত্ত মহাশয় আজ
বিচারমালা পাঠ শুনিতেছিলেন। ব্রহ্মানন্দজী স্বামিজীর
গায়ে চাদর ঢাকা দিতে যাইতেছিলেন এমন সময়ে স্বামিজী
বলিলেন -
এই মুর্দার (মৃত দেহের ) চাদর মুর্দাই নিজে
ঠিক করে নেবে, তােদের কিছু করবার দরকার নেই। নিজের
মুর্দা নিজে পােড়ানই ভাল।

যােড়শ পরিচ্ছেদ শি। নিজের মৃতদেহ কি কেউ নিজে পােড়াতে পারে ? কেন পারবে না? (১) তত্ত্বজ্ঞান হলে ত’ তত্ত্ব- দর্শীর কাছে দেহের কোন অস্তিত্বই থাকে না, তার কাছে দেহ ভস্ম বলে পরিগণিত হয়, সুতরাং তার দৃষ্টিতে ত’ দেহ পুড়েই গেল। তবে দেখছ তত্ত্বজ্ঞান হবার পরও তত্ত্ববেত্তার দেহ আহার করে, নিদ্রা যায়, ভােগ করে ; তাতে তত্ত্ববেত্তা পুরুষের কোন সত্তা নাই। প্রারব্ধানুযায়ী দেহের ভােগ হয়ে থাকে, ভগবান তাঁর (তত্ত্বাবত্তার) দেহের যত্ন লন। গীতায় আছে “যােগক্ষেমং বহাম্যহম্” অর্থাৎ তিনি যােগ ক্ষেম বহন করেন। যােগ অর্থে অপ্রাপ্তবস্তুর প্রাপ্তি, ক্ষেম অর্থে প্রাপ্তবস্তুর রক্ষা—সে কাৰ্য ভগবানই করেন। জ্ঞানীর সঙ্গে তার সম্পর্কই নাই। প্রকৃতপক্ষে তত্ত্বজ্ঞানীর দেহব্যবহার স্বপ্ৰযত্নবিনা পরমেশ্বরের দ্বারা সংসাধিত হয়। ছান্দোগ্য উপনিষদেও এইরূপ লিখিত আছে, যথা :-( ৮১২৩) ‘নােপজনং স্মরদিং শরীরং স যথা প্রযােগ্য আচরণে যুক্ত এবমেবায়মস্মিন্ শরীরে প্রাণাে যুক্ত। ইতি। (১) তাৎপর্য এই যে তত্ত্বদশী আত্মস্বরূপের উপলব্ধি করিয়াছেন অথবা দেহ কি বস্তু তাহা তিনি বলিয়াছেন, সুতরাং নিজের শরীরকে তিনি স্মরণই করেন না; ফলত প্রারব্ধানুসারে যে কোনও প্রকারে দেহের যেরূপ অবস্থা হউক না কেন তাহাতে তাহার কোন ক্ষতিবৃদ্ধি নাই।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
অর্থাৎ ব্ৰহ্মবিৎ জন-সন্নিহিত এই শরীরকে স্মরণ করেন
অশ্ব প্রভৃতি যেরূপ রথাদি বহনে নিযুক্ত হয়, ঠিক
সেইরূপই এই প্রাণ এই শরীরে নিযুক্ত আছে।
ভাগবত স্মৃতিতেও আছে :—(১১১৩৩৬)
‘দেহং বিনশ্বরমবস্থিতমুখিতং বা
সিদ্ধা ন পশ্যতি যতােহধ্যগমৎস্বরূপ।
দৈবাদুপেতমথ দৈবশাদপেতম্
বাসস যথা পরিকৃতং মদিমদাঙ্ক।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
[ ব্ৰহ্ম কি মুখে বলা যায় না, তাই নানা শাস্ত্রের নানা মত ।]
“অন্যদেব তদ্বিদিতাদগােহবিদিতাদধি !” কেণঃ উঃ
“যতে বাচো নিবৰ্ত্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ।” গীতা
হরিদ্বার, ২২শে কার্তিক, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৮টা।
শিষ্য স্বামিজীর নিকট “সার সূক্তাবলী” গ্রন্থ পড়িতেছে।
সার সূক্তাবলীর কেবলমাত্র এক অধ্যায় অবশিষ্ট থাকিলে
স্বামিজী বলিলেন।
ব্য।
এক অধ্যায় বাকী আছে এখন রেখে’ দে, কাল
রবিবার কালই শেষ করবি, আর অন্য কোন পুস্তক পড়তে
আরম্ভ করবি।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
৭১
শি।
শি।
শি। কোন্ পুস্তক পড়ব ?
স্বা। (একটু চিন্তা করিয়া) আচ্ছা “মণিরত্নমালাই
পড়িস। পুস্তকখানি খুব ছােট, বড় বড় পুস্তক পড়ে ত’ তুই
আমাকে শুনাতে পারবি না।
কোন্ পুস্তক ?
স্বা। উপনিষদের ভাষ্য।
কেন পারব না। ভাষত’ বেশী শক্ত বলে
আমার মনে হয় না।
স্বা। আচ্ছা যদি পারি ভ’ উপনিষদ্‌ই পড়ে শুনাস।
শি। কোন্ উপনিষদ্ পড়ব ?
প্রথমতঃ ঈশােপনিষদ্‌ই পড়িস।
শি। ঈশােপনিষদ্ সকল উপনিষদের অপেক্ষা ছােট
বটে, কিন্তু সকলের চেয়ে দুর্বোধ্য।
স্বা। হাঁ, ঈশােপনিষই সকল উপনিষদের সার।
শি। উপনিষদ পড়ে যাব, যেখানে কঠিন মনে হবে
আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করব, আপনি বলে দেবেন।
স্বা। আমি কি জানি উপনিষদের ? আমি ত’ চাষা,
আমি ওসব পড়েছি ?
শি। আপনি ত’ পড়েন নাই, কারণ আপনি অকর্তা।
স্বা। না, উপনিষদের ব্যাখ্যা পণ্ডিতলােকেই করতে
পারে।
শি। পণ্ডিতলােকের অনুভূতি নাই, কিন্তু আপনার
অনুভূতি আছে; কাজেই আপনার বাখ্যাই প্রকৃত ব্যাখ্যা

৭২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
হবে। জ্ঞানী ছাড়া অন্যলােকে উপনিষদের প্রকৃত অর্থ জানে
শি।
স্বা। জ্ঞানী কে ?
শি। যাঁর তত্ত্বজ্ঞান হয়েছে।
তত্ত্বজ্ঞান কি করে হয় ?
গুরু ও শাস্ত্রোপদেশে।
[ শাস্ত্র আত্মরক্ষার্থ যষ্টিস্বরূপ, কিন্তু উপায় গুরূপদেশ
প্রতিপালন ও গুরুকৃপা।)
‘ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং মহাজনাে যেন গতঃ স পন্থা।
স্বা। শাস্ত্র ত’ কবির কল্পনা মাত্র। হিন্দুরা বেদ মানে,
মুসলমানেরা কোরাণ মানে, খৃষ্টানেরা বাইবেল মানে ;
যাদের শাস্ত্র তাদের কাছেই মিঠে, অন্যের কাছে ত’ নয়।
শি। হাঁ, তবে কি শাস্ত্র সব মিথ্যা? বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে
বিভিন্ন মত দেখা যায়, তা হলে সত্য
তা কোটি তার
কিছুই ঠিক নাই।
স্বা। যা বেটা, নাস্তিক হচ্ছিস্ কেন ? বনে কত
প্রকার লাঠি পাওয়া যায়, একখানা লাঠি বন থেকে ঘরে এনে
রেখে দিলে কি তাতে আত্মরক্ষার কাজ হয় না ?
শি। তা’ ত’ হয়।
স্বা। সেইরূপ শাস্ত্ররূপ অনন্ত বন থেকে বেদ, কোরাণ,
বাইবেল রূপ যে কোন একটা লাঠি নিলেই আত্মরক্ষা করা
যায়। তবে এই যে বিভিন্ন মত এর কারণ আছে।

সপ্তদশ পরিচ্ছেদ ; [ ব্ৰহ্ম কি কেহ মুখে বলতে পারে না—সেই জন্য নানা শাস্ত্রের নানা মত] ব্ৰহ্ম কি তা কেউ মুখে বলতে পারে না—“অবাঙ- মনসােগােচর”; কিন্তু তার উপমা দেবার ছলে নানা মুনি নানা কথা বলে গেছেন। যেমন এক কুমারী কন্যার বিবাহ হয়ে গেল ; সে কয়েকদিন পরে তার পূর্বের সঙ্গিনী কুমারীদের কাছে এসে বলতে লাগল “আহা। স্বামী কি জিনিস। ধন্য স্বামী। ধন্য স্বামী, ইত্যাদি। সঙ্গিনীরা জিজ্ঞাসা ক’রুলে, “কি দিদি, স্বামীর কাছে কি সুখ পেলে যে সর্বদা যেন আনন্দ সাগরে ডুৰে আছ ? সে সুখ কি জিলিপির সঙ্গে মাঠা (ঘােল) খেলে যে প্রকার হয় সেই রকম, বা লাড়ু, পেঁড়া খাওয়ার মত, আম আঙ্গুরের মত ?” দিদি তখন আর কি করে বােঝাবে! তবুও কুমারীদের সে সুখ বােঝাতে চেষ্টা করে বললে, “লাছুর চেয়েও মিষ্টি।” কিছুদিন পরে সঙ্গীনীদের মধ্যে আর এক জনের বিয়ে হ’ল। তখন সেও বলতে লাগল “আহা, স্বামী কি ধন ! ধন্য স্বামী!” ইত্যাদি। তার পর দুজনে মিলেই “ধন্য স্বামী, ধন্য, স্বামী” বলতে লাগল, আর হাত ধরাধরি করে একটু একটু মুচকে মুচকে হাসতে লাগল। প্রকৃত পক্ষে স্বামী সুখ যে কি তা যেমন বিবাহ না হলে বােঝা যায় না, সেইরূপ প্রকৃত ব্ৰহ্মসুখ কি তা ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার হলে বােঝা যায় না। নানা শাস্ত্রে কেবল মাত্র কৃত্রিম ব্যাখ্যা করেছে কেউ বলেছে লাড্ডর চেয়ে বেশী মিষ্টি, কেউ

৭৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
বলেছে পেঁড়ার চেয়ে, আরও কত কি! মােটের উপর ওসব
নিয়ে ঝগড়া না করে গুরুমহারাজের চরণতলে বসে তাঁর
উপদেশ অনুযায়ী চললে তার কৃপায় সকলই একদিন লাভ
হবে।
তদেতৎ ইতি নিৰ্দেষ্টং গুরুনাপিন শক্যতে—সাংখ্যপ্রবচন
'
ভাষ্য, প্রথম অধ্যায়, বিজ্ঞানভিক্ষু।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।
‘মুনি’ বা ‘মৌনী’ কে?
“মনঃ প্রসাদ সৌম্যত্বং মৌনমাত্মবিনিগ্রহঃ।
ভাবসং শুদ্ধিরিত্যেৎ তপে। মানসমুচ্যতে।” গীতা, ১৭১৬
হরিদ্বার, ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৩৩১ সাল, রাত্রি ৭০টা।
আরতি ও মহিমুস্তোত্রাদি পাঠান্তে শিষ্য ব্ৰহ্মানন্দজী,
বিশ্বেশ্বরানন্দজী, চিদানন্দজী ও কেদারানন্দজী স্বামিজীর
নিকট উপবিষ্ট আছেন। ব্ৰহ্মানন্দজী স্বামিজীকে প্রণাম
করিলে স্বামিজী বলিলেন :
স্বা। বাঃ তপস্বী! ( ক্ষণকাল পরে,) আচ্ছা, তপস্বীর’
-
অর্থ কি?
ব্ৰহ্মানন্দ। যে নিজের ধর্ম পালন করে তাকেই ‘তপস্বী’
বলে।

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
স্বা। হাঁ!—আচ্ছা, মুনি’ শব্দের অর্থ কি ? বশিষ্ঠ
বিশ্বামিত্র প্রভৃতি এঁদের ‘মুনি’ বলা হয় কেন? আর ‘মৌনী’
শব্দেরই বা প্রকৃত অর্থ কি ?—কায়িক মৌন, বাচনিক মৌন,
মানসিক মৌন ?
ব্ৰহ্মানন্দ। সাধারণতঃ যারা কথা বলেন না তাদেরই
‘মৌনী’ বলা হয়, কিন্তু মৌন’ শব্দের লক্ষ্যার্থ মানসিক
মৌনিত্ব।
স্বা। হাঁ, যাদের মন চৈতন্যের মনন করতে করতে
লয় হয়েছে, চিত্তে আর কোনও প্রকার সঙ্কল্প বিকল্প উঠেন
তাহার প্রকৃত ‘মুনি’ (১) বা ‘মৌনী’ (২) বলিয়া অভিহিত
হন। সেই জন্য বশিষ্ঠ প্রভৃতি মুনিদিগকে ‘মুনি’ বলা হয়।
তসে, হয়ত বলতে পার বশিষ্ঠের একশত পুত্র ছিল,আর তিনি
‘‘মুনীনাং (অর্থাৎ) মননশীলানাং সর্বপদার্থজ্ঞানিনা”—গীতা
১৭ শ্লো, শাঙ্কর ভাষ্য।
(২) “মৌনং বাকসংযমােহপি মনঃসংযমপূর্বকো ভবতীতি কানে
কারণমুচ্যতে মনঃসংযমাে মৌনমিতি।” গীতা ১৭১৬ শে শাং ভাষ্য।
যস্মাদ্বাচো নিবৰ্ত্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ।
যন্মোনং যােগীভিগম্যং তদ্বদেৎ সৰ্ব্বদা বুধৈঃ ॥
বাচো যন্নিবর্তন্তে তদ্বক্তং যন্ন শক্যতে।
প্রপঞ্চো যদি বক্তব্যঃ সােহপি শব্দবিবর্জিত।
ইতি তাববেন্মোনং সতাং সহজসংজ্ঞিতম্।
গিরা মৌমং হি বানাং প্রযুক্তং ব্রহ্মবাদিভিঃ ॥”
অপরােহ্মানুভূতি।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
যজ্ঞাদি কাজ করাইতেন, তবে তাঁকে তত্ত্ববেত্তা জীবন্মুক্ত
মহাপুরুষ কি করে বলা যেতে পারে। এর উত্তর শরীরের
ভােগ অনিবাৰ্য ; (১) শরীর যেজন্য উৎপন্ন হয়েছে সে
ভােগ ভুগতেই হবে। প্রারব্ধ ভােগ অবশ্যম্ভাবী।
ব্ৰহ্মানন্দজী। তবে পুরুষকার দ্বারা কি কিছুই হতে
পারে না।
[ একমাত্র ভােগের দ্বারা প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ক্ষয় হয় ]
‘প্রারব্ধকৰ্মনাং তােগাদেব ক্ষয়।
স্বা। পুরুষকার দ্বারা পারমার্থিক পথে উন্নত হওয়া যায়,
কিন্তু দৈহিক ভােগ খণ্ডন করা যায় না? এক গুরু শিষ্যকে
বললেন—“তুই বিরক্ত হয়ে বিচরণ ক, কোনও প্রকার
ভােগে লিপ্ত হ’সনি”। শিষ্য গুরুর আজ্ঞা পেয়ে বললে,
—“গুরুদেব ! তবে আমি বনে গিয়ে বাস করি। কারণ
লােকালয়ে থাকলে নানাপ্রকার ভােগ আমার কাছে এসে
উপস্থিত হবে”। এইরূপ কথাবার্তার পর গুরু ও শিষ্য
উভয়ে এক গভীর অরণ্যে চলে গেলেন।
অরণ্যে গিয়ে
শিষ্য এক জায়গায় আসন পেতে বসে গেলেন আর গুরু
কিছুদূরে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে এক রাজা মৃগয়া ক’রূতে
ঐ বনে এসে উপস্থিত হলেন। বনে তাবু খাটান হ’লআর
(১) গীতায় ভগবান বলিয়াছেনঃ-
‘সদৃসং চেষ্টতে স্বস্যা প্রকৃতেজ্ঞানবানপি।
প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি ॥”
গীতা, ৩৩৩

৭৭
•
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
রাজার লােকজন তাদের জন্য নানাবিধ আহাৰ্য প্রস্তুত কতে
লাগল। ভােজনের সময়ের কিছুপূৰ্বে হঠাৎ শিষ্যের দিকে
রাজার চোখ পড়ে গেল। শিষ্যকে দেখে তাহাকে ভােজন
করাবার ইচ্ছা হ’ল এবং তিনি তাকে ভােজন করতে
অনুরােধ করলেন। শিষ্যকে অগত্যা রাজার অনুরােধ রক্ষা
ক’রূতে হ’ল; কিন্তু তিনি গুরুদেব নিকটে আছেন জাতে,
সুতরাং রাজাকে তার গুরুদেবকেও নিমন্ত্রণ ক’তে বললেন।
রাজা তাই করলেন এবং অমাত্যদের পাঠিয়ে দিয়ে গুরুকেও
আমন্ত্রণ করে আলেন। তারপর গুরু ও শিষ্য উভয়েই
রাজপ্রদত্ত উৎকৃষ্ট অনুপানাদি গ্রহণ করলেন। বাচ্চা,
প্রারব্ধ ভােগ এই রকমে হয়ে থাকে; যেখানেই যাওনা
কেন, প্রারব্ধ ভােগ তাের সঙ্গে সঙ্গেই যাবে, পুরুষকার দ্বারা
কেবলমাত্র ধর্মরাজ্যে উন্নতিলাভ করা যায়। (১)
ব্ৰহ্মানন্দজী। পুরুষকার দ্বারা উন্নত হওয়া যায় বটে,
কিন্তু মনকে জয় করা বড়ই কষ্টসাধ্য।
[ প্রকৃত শিষ্য কে ?]
“সৰ্বম্বং গুরবে দদ্যাৎ”
স্বা। “তন, মন, ধন,
কর গুরুকে অর্পণ।
(১) ‘হেয়ং দুঃখমনাগতম্ ॥” পাতঞ্জলিং যােগসূত্ৰসাধনপদ,১৬ শ্লো।
অতীতস্য ব্যতিক্ৰান্তত্বাৎ বর্তমান তু পরিত্যক্ত মশকত্বাৎ অনাগতমেব
সংসারদুঃখং হেয়ং হাতব্যং। ভবিষ্যঃখনাশায়ৈ যতিব্যমিত্যু-
পদেশঃ।

৭৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
যে তন (শরীর) মন ও ধন তিনটিই গুরুদেবকে অর্পণ
করতে পারে সেই প্রকৃত শিষ্য। মন গুরুকে অর্পণ করলে
মনে সঙ্কল্প বিকল্প আর কি করে উঠবে ?
ব্ৰহ্মানন্দজী। মন গুরুকে অর্পণ করাই ত’ মুস্কিল।
সে তুমি জান ভাই। উত্তম অধিকারী হলে
সকলই হতে পারে। জনক রাজা এক সভা করলেন। সভায়
রাজ-সিংহাসনের সম্মুখে প্রকাণ্ড এক আসন পাতা হল।
রাজা ইতিপূর্বে প্রচার করে দিয়েছিলেন যে, যে ব্যক্তি তার
প্রশ্নের ঠিক উত্তর দিয়ে তার সংশয় দূর করে দিয়ে তাকে
মুক্তির অধিকারী করে দিতে পারবেন, তিনি ঐ আসনে
ব’সবার অধিকারী। অনেক বড় বড় ঋষি সভায় উপস্থিত
ছিলেন, কেউ সেই আসনে বসতে সাহস করলেন না। অষ্টা-
বক্র মুনি ঐ সভায় যাচ্ছিলেন; পথে এক বৃদ্ধা একঝুড়ি
ঘুটে নিয়ে বসেছিল, অষ্টাবক্র মুনিকে দেখে বললে—“এই
ঝুড়িটি আমার মাথায় তুলে দাও”। মুনি তাই করলেন।
তারপর বৃদ্ধা জিজ্ঞাসা করলে,-“তুমি কোথায় যাচ্ছ
ঠাকুর ?” মুনি বললেন,—“রাজসভায়
যাচ্ছি”। বৃদ্ধা
বলে,-“তুমি এই ছেলেমানুষ, তােমার দেহটিও আঁকা
বাঁকা, সেখানে কত বড় বড় ঋষি গেছেন, রাজার কথার
জবাব দিতে পারছেন না, আর তুমি সেখানে গিয়ে কি
করবে ?” মুনি বললেন,—“হ’লই বা দেহ ছােট বা আকা-
বাঁকা, মনত’ আর তা নয়। এই দেখ, আমার হাতের এই
কমণ্ডলুটা আঁকা-বাঁকা, কিন্তু এর ভিতরে যে জল আছে সে
।

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
৭৯
জলত’ আর আঁকা-বাঁকা নয়”! বৃদ্ধা মুনির কথা শুনে মনে
মনে ভাবলে, মুনিটি দেখছি সামান্য ছেলে নয়, এর ভেতরে
বােধ হয় কিছু সার বস্তু আছে। তখন তাঁকে ঘুটের ঝুড়ি
তুলে দিতে বলে অপরাধ করেছে ভেৰে ক্ষমা চাইলে।
অষ্টাবক্র মুনি বললেন, “তা'তে দোষ কি? একটা দেহের
দ্বারা অপর একটা দেহের সাহায্য হ’ল তাতে আমার কি
ক্ষতিবৃদ্ধি ?” তারপর অষ্টাবক্র মুনি সভায় উপস্থিত হলেন
এবং তিলমাত্রও দ্বিধাবোেধ না করে রাজ-সিংহাসনের সম্মুখে
যে আসন পাতা ছিল তাইতে বসে পড়লেন। রাজা তার
যথাযােগ্য পূজা অভ্যর্থনা করে প্রশ্ন করলেন। মুনি সে
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রাজাকে বললেন,-“আগে আমাকে
দক্ষিণা দাও তারপর প্রশ্ন করাে।” রাজা বললেন,
“আপনি কি চান ?” মনে মনে ভাবলেন—মুনি হয়তাে হাতী,
ঘােড়া, টাকা, কড়ি প্রভৃতি চাইবেন; কিন্তু অষ্টাবক্র মুনি সে
সব কিছুই চাইলেন না, ব’ললেন,-“তােমার মনটী আমায়
দক্ষিণা দাও।” রাজা আর কি করেন, প্রতিশ্রুত হয়েছেন
দক্ষিণ দিতে হবে, কাজেই মনটী অষ্টাবক্র মুনিকে দিতে
হ’ল। তখন আর প্রশ্ন করে কে ? মনত গুরু নিয়ে ফেলে-
ছেন। গুরুমূৰ্তিতেই মন নিবিষ্ট হয়ে রইল, সঙ্কল্প বিকল্প
আর উঠবে কোখেকে ? উত্তম অধিকারী হলে সকলই
হতে পারে বাচ্চা।
এইখানেই,আলােচনা সমাপ্ত হইল।

উনবিংশ পরিচ্ছেদ
“অশ্বত্থামেনং সুবিরূঢ়মূলং, অসঙ্গশস্ত্ৰেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।”
গীতা, ১৫ অঃ, ৩ শ্লোক।
“ততঃ পদং তৎপরিমার্শিতব্যং যস্মিন্ গ ন নিবৰ্ত্তন্তি ভূয়।
ভতমেব চাদ্যং পুরুষং প্রাপদ্যে যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্ৰস্ত পুরাণী।”
ঐ ১৫৪।
হরিদ্বার, ১৪ই শ্রাবণ, ১৩৩২ সাল, সময় রাত্রি ৯ টা।
[ দেহে মমতাই শ্রম বিমুখতার মূল কারণ, সুতরাং সর্বথা
পরিত্যজ্য।]
আরতি ও মহিম্নস্তোত্রাদি পাঠান্তে স্বামিজী শয়ন করিয়া
আছেন। শিষ্য স্বামিজীকে বলিল :-
শি। বাবা ! একজন বৃদ্ধ দীক্ষা চাচ্ছে, দীক্ষা নিয়ে
সাধন ভজন করবে।
স্বা। এখানে থেকে সে ত’ আশ্রমের কোন কাজ কতে
পারবে না ?
শি।
বৃদ্ধ, ৬৭ বছর বয়স, তার দ্বারা শারীরিক কোন
সেবা হতে পারে না। তাকে ব্রহ্মচর্য দিৱ, অন্যত্র গিয়ে ভজন
আমার চেয়েও কি বৃদ্ধ ?
শি।
བ། !

উনবিংশ পরিচ্ছেদ
৮১
তবে আমি কাজ করতে পারছি, সে পারবে না
কেন ? তােদের একি রকম কথা ?
শি। আপনার কথা স্বতন্ত্র, আপনার ব্রহ্মচর্যের বল
আছে, কিন্তু এ বৃদ্ধের ত’ আর তা নাই।
এ বৃদ্ধের নাই বটে, কিন্তু তােদের ত’ আছে,
তােরা কেন শারীরিক পরিশ্রম করতে কুণ্ঠিত হ’?
শি। আমরা অলস, দেহাধ্যাস ত’ যায় নাই, সেই জন্যে
দেহের একটু কষ্ট হলেই কষ্ট মনে হয়।
এখানে এসেছিস্ কেন, দেহাধ্যাস রাখতে, না
ছুটাতে ?
শি। ছুটাতে।
তবে কাজ করতে চাস না কেন? (১)
শি। শুধু শারীরিক পরিশ্রম করলেই যদি দেহধ্যাস
ছুটত, তবে ত কুলি-মজুররাও মুক্তপুরুষ হত । সাধন
না করলে ত’ কিছু হবে না, তাই সাধন-ভজন করতে ইচ্ছা
হয়।
স্বা। কে নিষেধ করে? ভাের ৬টা থেকে ১টা পর্যন্ত
একাসনে বসে থাক্‌ দেখি, আমি কোন কাজ করতে বলব না।
শি। বৈরাগ্য নাই, তাই সাধন-ভজনে মন লাগে না,
বৈরাগ্য থাকলে কিআর সাধন না করে থাকা যায়? তীব্র
১) দুঃখমিতত্যব ষৎকর্ম কায়ক্লেশভয়াৎ ত্যজেৎ।
সকৃ রাজসং ত্যাগং নৈৰ ত্যাগফলং লভে।
গত ১৮৮ শ্লো।

৮২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
বৈরাগ্য যার হয়েছে, সে কি আর রাত্রে ঘুমাতে পারে ?
বাবা, এই রকম বৈরাগ্যলাভের উপায় কি ?
[দেহাভিমান সকল বাসনার মূল কারণ, সুতরাং বাসনাসমূহের
সমূলে ধ্বংস করিতে হইলে দেহাভিমান ত্যাগ করিতে হইবে]
স্বা। গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে গাছটাও শুকিয়ে যায়
কি?
শি। না।
স্বা। কিন্তু গাছের মূলটা ধ্বংস করতে পারুলে পাতা
শুদ্ধ সমস্ত গাছটাই নষ্ট হয়ে যায়। সেইরূপ একটি একটি
বিষয় থেকে মনকে টেনে নেবার চেষ্টা করলে বাসনার সমূলে
নাশ হয় না, কিন্তু এই শরীর থেকে মনটা টেনে নিলে বাসনা
কামনা স্বতঃই নষ্ট হয়ে যায়; আর সঙ্গে সঙ্গে তত্ত্বজ্ঞানের
উদয় হয় ; সুতরাং এই নশ্বর শরীরটা আমি নই, এ শরীর
রক্তমাংসের একটি খাঁচা’—এই প্রকার চিন্তা ক’রূতে থা;
এই থেকেই বৈরাগ্যের উদয় হবে । সৰ্ব্বদা সন্তোষকে
আশ্রয় করে থাক্।
[ সন্তোষ আশ্রয় করিয়া ইন্দ্রিয়গণের তৃপ্তিসাধন করিতে হয়,
ভােগের দ্বারা ইন্দ্রিয়গণের তৃপ্তিসাধন করা যায় না।]
এক ব্যক্তির একটি পরমাসুন্দরী কন্যা ছিল। তিনি
প্রচার করে দিলেন,-“আমি পাঁচটা ছাগল দেব, যে
ব্যক্তি তাদের খাইয়ে তৃপ্ত করতে পারবে, তাকে আমার
কন্যা দান করব।” অনেক বড় বড় রাজা কন্যালােভে ঐ
ছাগল পাঁচটাকে পেট ভরে খাওয়ালেন, এবং কয়েকদিন

উনবিংশ পরিচ্ছেদ ১৩ পরে কন্যার পিতাকে ছাগলগুলাে ফিরিয়ে দিলেন ; কিন্তু কন্যার পিতা সভায় বসে ছাগল পাঁচটাকে যেই ডালেন, ছাগলগুলাে এসে তার হাত থেকে কয়েকটি গাছের ডাল আগ্রহের সহিত খেলে। তখন কন্যার পিতা রাজাদিগকে বললেন,—“কই, আপনারা আমার ছাগল ক’টাকে তৃপ্ত করে খাওয়াতে পারেন নি, কারণ তারা খেয়ে তৃপ্ত হলে আমার হাতের এই ডালগুলাে আগ্রহের সহিত খেত না ; সুতরাং আপনারা আমার কন্যালাভের অযােগ্য।” এইরূপে যত বড় বড় রাজা ও ধনী ছিলেন, তারা সকলেই ব্যর্থ- মনােরথ হয়ে চলে গেলেন, সেই সময়ে একটি দরিদ্র বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি সভাস্থলে কন্যার পিতাকে বললে,-“মহাশয়, আপনি ছাগল পাঁচটি আমাকে দিন, আমি তাদের খাওয়াইয়ে তৃপ্ত করে আপনার কন্যার পাণিগ্রহণ করব।” সভায় যে সব বড় বড় রাজা ও অন্যান্য লােক ছিলেন, সকলেই সেই কথা শুনে হাসতে লাগলেন। সে যাই হোক, কন্যার পিতা ঐ লােকটির কথায় কোন প্রতিবাদ না করে ছাগলগুলি তাঁকে দিলেন। লােকটি ছাগল ছাগল ক'টাকে একটা ঘরে নিয়ে বন্ধ করে আস্তে আস্তে একটা ছুচ দিয়ে তাদের জিব ফুটো করে দিলে। ছাগলগুলাের জিব থেকে খুব রক্ত বেরুতে লাগল। একটু রক্তপড়া থালে লােকটি ছাগলগুলাের মুখ বেশ করে ধুয়ে বেঁধে দিল। তার পর ৪৫ দিন হয়ে গেলে ঐ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি ছাগলক’টাকে নিয়ে এসে সেই কন্যার পিতাকে বললে,-“মহাশয়, আপনি যদি

৮৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
;
এদের গাছের ডালপাতা কিছু খেতে দিয়ে পরীক্ষা করতে
চান, তবে প্রথমে সে গুলাে ভাল করে গুণে ' দেখুন,
তার পর পরীক্ষা করে দেখবেন।” কন্যার পিতা তাই
ক’লেন। তার পর সেই ব্যক্তি সভাস্থলে ছাগল
পাঁচটাকে ছেড়ে দিল। পূর্বের মত কন্যার পিতা ছাগল
ক’টাকে কয়েকটি গাছের ডালপালা দেখাইয়ে ডালেন,
এবার ছাগলগুলাে সেই ডালপালায় মুখ লাগাল বটে,
কিন্তু তাদের জিবগুলাে বেদনায় ফুলে ছিল বলে একটা ডালও
খেতে পারলে না; সুতরাং ডালপালা একটিও মূল না, যেমন
তেমনি রইল। তাই দেখে সকলে খুব আশ্চর্য হয়ে গেল,
এবং ঐ ব্যক্তির প্রশংসা করতে লাগল। কন্যার পিতাও
অগত্যা ঐ দরিদ্র লােকটীকেই কন্যাদান করলেন। এই
প্রকার পাঁচটি ছাগলরূপ পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলিকে (চক্ষু, কর্ণ,
নাসিকা, জিহ্বা ও ত্ব) যতই বিষয়ভােগে লাগাবে, তাদের
কখনও তৃপ্তি হবে না, কিন্তু ছুচ রূপ সন্তোষ দ্বারা তাদের
ভােগ থেকে নিবৃত্ত করতে পারলে কন্যারূপী ব্ৰহ্মবিদ্যা লাভ
হয়ে থাকে। (১)
অজ্ঞানেও চৈতন্য আছে—কিন্তু এই চৈতন্য সামান্য
চৈতন্য, বিশেষ-চৈতন্য নহে।]
শি। আচ্ছা, চৈতন্যতে ব্যাপক, তবে কি অজ্ঞানেও
চৈতন্য আছে ?
(১ সন্তোষাদমসুখলাভং।
(পতঞ্জলি যােগসূত্ৰসাধনপদ, ৪২।)

উনবিংশ পরিচ্ছেদ ৮৫ শি। কেন থাকবে না? অজ্ঞানে চৈতন্য না থাকলে ত’ তাের চৈতন্য (ব্ৰহ্ম একদেশী হয়ে যায়। শি। অজ্ঞানের মধ্যেও ব্রহ্ম (চৈতন্য) থাকলে অজ্ঞানের অস্তিত্ব কি করে স্বীকার করা যায় ? ব্ৰহ্ম জ্ঞানস্বরূপ ; জ্ঞান ও অজ্ঞান কি একত্র থাকতে পারে ? রাত্রি ও দিন কি এক সঙ্গে থাক্‌তে পারে ? স্বা। কাঠের দ্বিতর অগ্নি (তার্থাৎ তেজ) আছে, তাতে কাঠের অস্তিত্বের কোন হানি হয় কি? না, কাঠের ভিতর যে তেজ আছে, সেটা ঘর্ষণ দ্বারা প্রজ্বলিত হয়েই কাঠ দগ্ধ করতে পারে, কিন্তু তার পূৰ্বে পারে ।। স্বা। সেইরূপ অজ্ঞানেও চৈতন্য (ব্ৰহ্ম) আছে, কিন্তু তা’তে তাও ••, কোন ক্ষতি হয় না; এই চৈতন্যকে সামান্য- চৈতন্য বলে! সামান্য-চৈতন্যই সৰ্বব্যাপক আকাশৰৎ ; এই চৈতন্য দ্বারা কারও কোন ক্ষতি বা লাভ হয় না। কিন্তু বিশেষ-চৈওয়েটু জ্ঞানের উদয় হয়। বিশেষ-চৈতন্যের কাছে অজ্ঞান হাতে পারে না। অন্তঃকরণ-সংযুক্ত সামান্য- চৈতন্যৰেই বুিশেষ-চৈতন্য বলা যায়। এই প্রকার অন্যান্য কথার পর শিষ্য নিজের কাজে চলে গেল।

বিংশ পরিচ্ছেদ
বৃত্তয়স্তু তদানীমত্মাতা অপ্যাত্মগােচরাঃ
স্মরণাদনুমীয়ন্তে ব্যখিতস্য সমুখিতা।
১৫৬ পঞ্চদশী।
বৃত্তি দ্বারাই ব্ৰহ্মানন্দ ভােগ হর-চৈতন্য এই বৃত্তির
আধার, মন নহে। ]
হরিদ্বার, ২১শে আশ্বিন, ১৩৩২ সাল, রাত্রি ৯টা।
আরতি ও মহিম্নস্তোত্রাদি পাঠান্তে শিষ্য স্বামী
ব্ৰহ্মানন্দজী এবং অন্যান্য সকলে স্বামিজীর নিকট উপবিষ্ট।
স্বামিজী প্রশ্ন করিলেন -
স্বা। (ব্ৰহ্মানন্দজীকে লক্ষ্য করিয়া) আচ্ছা, তাের
নামত ব্ৰহ্মানন্দ ; বলত ব্রহ্মানন্দ ভােগ করে কে।
ব্ৰহ্মানন্দজী। জীবাত্মাই ভােগ করে।
স্বা। জীবাত্মা কাকে বলিস্? জীবের আত্মা ও ব্ৰহ্ম এ
দুয়ের মধ্যে ত’ কোন ভেদ নাই; এক আত্মা অন্য আত্মাকে
ভােগ করে বললে ত’ আত্মা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। শরীর ত’
জড়-ব্ৰহ্মানন্দ ভােগ করে কে ?
শি। ব্রহ্মে ডােক্তা, ভােগ ও ভােগ্য এই ত্রিপুটী
থাকতে পারে না, কারণ ব্ৰহ্ম সদা একরস, অদ্বিতীয়।
তবে ব্রহ্মানন্দ ভােগ করে কে? যদি বলিস
আত্মাই আত্মার আনন্দ ভােগ করে, তা হতে পারে না;
;

বিংশ পরিচ্ছেদ
৮
কারণ দ্বৈত না হলে ভােগ কি করে হবে? কেউ ত’ ভােগ
করবে, সে কে বা কি?
এই প্রশ্নের পর শিষ্য চুপ করিয়া রহিলেন, পরে স্বামিজী
মহারাজ বলিলেন :-
সে জিনিষটী বৃত্তি। বৃত্তি দ্বারাই ব্ৰহ্মানন্দ ভােগ
হয়।
শি। বৃত্তি অন্তঃকরণ চতুষ্টয়ের (মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও
অহংকার) ধর্ম। এখন যদি বলেন, “বৃত্তি দ্বারা ব্ৰহ্মানন্দ ভােগ
হচ্ছে” তবে-
“যনসা ন মনুতে যেনাহুম নাে মত।
দেব ব্ৰহ্ম ত্বং বিদ্ধি ননদং যদিদমুপাসতে ॥” (১)
এই বাক্যটি মিথ্যা হয়।
[ ব্ৰহ্মাকার বৃত্তি হইলে—ঐ বৃত্তির জনক অন্তঃকরণাদি
থাকে না ]
স্বা। না, তা হবে কেন? বৃত্তিটা মন হতেই উৎপন্ন
হয় বটে, কিন্তু ব্ৰহ্মাকার বৃত্তি হ'লে মনাদি অন্তঃকরণ থাকে
, সেগুলির তখন লয় হয়ে যায়।
যদিও বৃত্তির জনক অন্তঃকরণ, তবু ঐ বৃত্তির উৎপত্তি
হলে অন্তঃকরণ আর থাকে না, অন্তঃকরণ ধ্বংস প্রাপ্ত হয়-
যেমন বারুদ হ’তে অগ্নি উৎপন্ন হয়ে আবার অগ্নিই বারুদকে
ভস্ম করে, সেইরূপ।
(১) কেনােপনিষৎ ; প্রঃ অঃ ৫ শ্লোঃ।

৮৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
মন
[ ব্ৰহ্মাকার বৃত্তি কিরূপ?]
মনের দ্বারা কখনও ব্রহ্মোপলব্ধি হতে পারে না।
থেকে উৎপন্ন বৃত্তিদ্বারাই তাহার উপলব্ধি হয়, তখন মন টন
থাকে না। তুই এখানে বসে আছিস ; আর তোর
কলিকাতার কোন লােকের চিন্তায় মগ্ন আছে ; এখানে
বাস্তবিক পক্ষে মন কলিকাতায় যায় নি, মনের বৃত্তিই
কলিকাতায় গিয়েছে,কত পাহাড় পৰ্ব্বত, নদ নদী অতিক্রম
করে গিয়েছে। ঐ সব পাহাড় পর্বত, নদ নদী ঐ বৃত্তির
সাধকও নয় বা বাধকও নয় ; ঐ বৃত্তি চৈতন্যের আশ্রয়ে চলে
থাকে, চৈতন্য তার আধার। এইরূপে বৃত্তিই ব্রহ্মানন্দ ভােগ
করে থাকে।
[ জীবন্মুক্তের শরীরপাত পর্যন্ত ব্ৰহ্মাকার বৃত্তি থাকে ]
শি। তাহলে মুক্ত পুরুষেরও দ্বৈতভাব থাকে, একবৃত্তি
ও এক ব্রহ্মানন্দ।
স্বা। হাঁ, মুক্ত পুরুষের যে পৰ্যন্ত শরীর বর্তমান থাকে,
সে পৰ্যন্ত ঐ বৃত্তিও থাকে। ঐ বৃত্তিদ্বারাই ব্রহ্মানন্দ ভােগ
করে জীবন্মুক্ত মহাপুরুষ জীবন যাপন করে থাকেন। কিন্তু
শরীর নাশের সঙ্গে সঙ্গে উক্ত বৃত্তিও নাশ হয়। তখন ঠিক
ঠিক অদ্বৈত হওয়া যায়—“একমেবাদ্বিতীয়” সে অবস্থায় ঐ
বৃত্তিও আর থাকে না।
[ মােহকে বৈরাগ্য দ্বারা, ক্রোধকে ক্ষমা দ্বারা, ও
লােভকে সন্তোষ দ্বারা জয় করিবে।]

বিংশ পরিচ্ছেদ
কিছুক্ষণ পরে ক্রোধ প্রসঙ্গে স্বামিজী বলিতে
লাগিলেন।
স্বা। (শিষ্যের প্রতি) কারও উপর ক্রোধ করি
নি। যদি কারও কট কিতে হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার হয়, তখন
মনে করবি শব্দ আকাশের গুণ”—সুতরাং মিথ্যা মিথ্যাবস্তু
দ্বারা আমার হৃদয়ের শান্তিভঙ্গ হতে দিব কেন ?” এই রকম
বিচার করে মনকে শান্ত রাখতে হয়। আর কারও ব্যবহারে
ক্রোধের উদ্রেক হ'লে মনে করবি-শরীর ও পঞ্চভূতের,
সুতরাং মিথ্যা; সেই মিথ্য। শরীরের ব্যবহারে ক্রোধ করবার
অবসর কোথায় ? সর্বোপরি ক্ষমার আশ্রয় গ্রহণ করবি ।
শত্রু মিত্র সকলকেই ক্ষমা করে যাবি ; তাহলেই শান্তি
মিলবে। কান ও মােহকে বৈরাগ্য দ্বারা, ক্রোধকে ক্ষমা
দ্বারা, ও লােভকে সন্তোষ দ্বারা জয় করবি। ক্রোধ
সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করলে কাজ চলে না ; তাই লােকের
শাসনের জন্য একটু ক্রোধ রাখতে হয়।
[ গুণভেদে ক্রোধ স্থিন প্রকার ]
সত্ত্বগুণের ক্রোধ রাখবি,
তমোগুণের
ক্রোধ বিষবৎ পরিত্যাগ করবি। । সত্ত্বগুণের
যেমন,জলের উপর রেখা টানা—জলের উপর রেখা টানা
মাত্রই জলের সঙ্গে মিশে যায় ; সেইরূপ সত্ত্বগুণের ক্রোধ
যার উপর হয়, তাকে সামান্য একটু তিরস্কার করলেই ক্রোধ
চলে যায়। রজোগুণের ক্রোধ যেমন,-বালির চরের উপর
বালির ঢেলা রাখা; বালির ঢেলা বাতাস এলে বালির চরের
;

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
সঙ্গে মিশে যায় । কিন্তু আপনা আপনি বালির সঙ্গে মিশে
যায় না। সেইরূপ রজোগুণের ক্রোধ কারও উপর হলে, তাকে
অনেকক্ষণ তিরস্কার করলে বা অন্য কেউ এসে যিনি ক্রোধ
করেছেন, তাকে যদি বুঝিয়ে বলে যে, ‘লােকটির বিশেষ
দোষ নাই, ওকে ক্ষমা করুন, তবে যায়। আর তমােগুণের
ক্রোধ যেমন, জলের সঙ্গে তেলের এক সঙ্গে হওয়ায় দুইটির
কস্মিন্ কালেও মিল হয় না। সেইরূপ তমােগুণের ক্রোধ
যার উপর হয়, সে ব্যক্তি যিনি ক্রোধ করেছেন তার কাছে
ক্ষমা চাইলেও তার ক্রোধ যায় না, আজীবন থেকে যায়।
তমােগুণী যার উপর ক্রুদ্ধ হয়,তাকে প্রকাশ্যে বিশেষ তিরস্কার
করে না, কিন্তু তার দোষ মনে মনে রেখে দেয়, সেই জন্য
তার ক্রোধ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অতএব বৎস!
ও তমােগুণের ক্রোধ না করে, প্রয়ােজন হলে সত্ত্বগুণের
ক্রোধকে আশ্রয় করাে।
[ যিনি দেহাভিমানশূন্য রিপুগণ তঁাহাকে আক্রমণ করিতে
পারে না।]
শি। বাবা! রিপুগণকে জয় করা বড়ই মুস্কিল।
যে ব্যক্তির কাছে স্ত্রী, জমি ও টাকা আছে, তার
কাছেই কালেক্টর এসে খাজনা চায়, কিন্তু যার কাছে সে
সকলের একটিও নেই, তার কাছে কালেক্টর খাজনা চায় কি ?
শি। না।
স্বা। তদ্বৎ হে পুত্র ! যার দেহাধ্যাস আছে, যে
দেহকেই আত্মা বলে মনে করে, তার মনে কামাদি রিপুগণ
স্বা।

একবিংশ পরিচ্ছেদ
১১.
;
আসবেই; আর যার দেহে আত্মবুদ্ধি নেই, যিনি আপনাকে
দেহাতীত বলে জেনেছেন, তাঁর কাছে রিপুগণ আসতেই
পারে না। অতএব সৰ্বপ্ৰযত্নে দেহাধ্যাস ছাড়তে চেষ্টা কর ।
একবিংশ পরিচ্ছেদ।
“যজ্ঞানাং জপযজ্ঞােহস্মি”—গীতা
হরিদ্বার, ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩ সাল। রাত্রি ৭টা।
আরতি প্রভৃতি পাঠান্তে শিষ্য প্রভৃতি স্বামিজীর নিকট
বসিয়া আছে।
শিষ্য। (স্বামিজীকে) বাবা !
গ’হে ছছুন্দর অহি মরে তজৈ ছগনকী হান।
জল পায়ে সুখ হােত হৈ, নর সতসঙ্গ এমাণ ।
বিচারমালা। শিষ্য আশঙ্কা ২৭৷
-এই শ্লোকটির অর্থ কি ?
স্বামিজী। সাপ ইদুর মনে করে ছুচোকে ধরে—এখন
যদি ছুচোটাকে খেয়ে ফেলে, তাহলে চোখ মুখ ফেটে
সাপটার মৃত্যু অনিবাৰ্য, আর যদি ছেড়ে দেয়, তাহলেও
সাপের চোখ দুটি নষ্ট হয়ে যায়। এই উভয় সঙ্কটে কি
করলে সাপটা রক্ষা পেতে পারে ? তাই বলছে—“জল
পায়ে সুখ হােত হৈ” অর্থাৎ সাপটা যদি কোনও রকমে

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
জলে প্রবেশ করতে পারে, তবেই সুখ হয়, অর্থাৎ সে ঐ
উভয় সঙ্কট হতে রক্ষা পেতে পারে।
শিষ্য। এর অর্থ কি ?-- ছুচোকে গিললে সাপের মৃত্যু
হবে কেন, আর ছাড়লেই তার চোখ যাবে কেন?
তারপর জলের মধ্যে প্রবেশ করলেই বা সে বিপদ থেকে
রক্ষা পায় কি করে ?
স্বামিজী। ছুচোর মাংস ভারি গরম ও দুর্গন্ধ, ছুচো খেলে
গরমের জন্যে সাপের মুখ চোখ ফেটে মৃত্যু হয়, আর ছাড়লেও
সেই কারণে চক্ষু দুটী নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ছুচোটাকে
মুখে ক'রে সাপ যদি খুব ঠাণ্ডা জলে গিয়ে প্রবেশ করে,
তাহলে জলের ঠাণ্ডাতে ছুচোর শরীরের গরমটা কেটে যায়
আর সাপ ও ছুচো উভয়েই অত্যন্ত শীতল হয়ে যায়, তখন
ছুচোক ছেড়ে দিলে সাপের কোন প্রকার হানি হয় না; সে
শরীরে জোর পায়। সেইরূপ জীব ষিয় গ্রহণ করেও দুঃখ
ভােগ করে, আবার ত্যাগ করলেও শান্তি পায় না। বিষয়াসক্ত
জীবের এই উভয় সঙ্কট থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র উপায়
হচ্ছে সৎসঙ্গ। সংসঙ্গে। গুণে বের অহংকার, অভিমান
ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় ; সুতরং বিষয়ের সহিত সংযােগে
বা শিয়ােগে দুঃখ পায় না, এবং ক্রমশঃ আধ্যাত্মিক জীবন
লাভ করে চিরশান্তি পায়। অতএব সর্বদা সৎসঙ্গে দিন
যাপন করা উচিত।
[ জপ কিরূপে করিতে হয় ? জপের মাহাত্ম ]
কিছুক্ষণ পরে জপ প্রসঙ্গে স্বামিজী বলিতে লাগিলেন।

একবিংশ পরিচ্ছেদ
স্বামিজী। মন ভগবান্ বা আত্মায় নিবদ্ধ করে জপ
করতে পারলে প্রকৃত কল্যাণ লাভ হয়।
শিষ্য। আজ্ঞে হাঁ, তা ঠিক বটে। মন ভগবানো বা
আত্মায় নিবদ্ধ না করে জপ করলে কোন লাভ হয় না।
স্বামিজী। দূর বেটা! তুই যে একেবারে নাস্তিক হয়ে
যাচ্ছি।
এ রকম সিদ্ধান্তে আশা তাের উচিত হয়নি।
খালি জপ করলে যদি কোন লাভ না হবে, তবে গীতায়
“জ্ঞানাং জপযজ্ঞােহস্মি” একথা বলার মানে কি ? জপ
করবার সময় মন কখনও আত্মাভিমুখী হয়, কখনও বা বহি-
বিষয়ে বেড়িয়ে বেড়ায়, তাতে কোন ক্ষতি নাই ; জপ করতে
করতে শেষে মন আপনিই ভগবান্ বা আত্মায় লয় হয়ে যায়।
জপ যত বেশী করা যায়, ততই ভাল । জপ করতে করতেই
শেষে তৈলধারাবৎ মন ব্রহ্মচিন্তায় মগ্ন থাকে।
( কৃতঘ্নতা দোষ নিবারণের জন্য ও লােকসংগ্রহের জন্য
ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষও জপাদি করিয়া থাকেন।
শিষ্য।
সে অবস্থালাভ করতে পারলে ও আর জপের
দরকার হয় না।
স্বামিজী। হাঁ, প্রয়ােজন হয় না বটে, কিন্তু কৃতঘ্নতা দোষ
দূর করবার জন্যে আর লােকসংগ্রহার্থে তখনও জপ করা
উচিত। ধূলির গল্প মনে আছে ত ?
শিষ্য।
আজ্ঞে হঁ, আছে। (১)
(১) গল্পটি এই এক ব্যক্তি অত্যন্ত দারিদ্র্যপীড়িত হইয়া দেবংশে
ঐশ্বৰ্য্যলাভ হইবে, এই বিশ্বাসে প্রত্যহ পথের ধূলা ইতস্তত সঞ্চালন
1

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ স্বা। সেইরূপ কৃতঘ্নদোষ দূর করবার জন্য, বৃত্তি সর্বদা ব্ৰহ্মাকার হলেও জপ করা উচিত। জপের বলে অসম্ভবও [ জপের বলে অসম্ভবও সম্ভব হয়। ] সম্ভব হয়। এখানে একটি কুলি ছিল। লােকটি মােটা- বুদ্ধি, কিন্তু সবলচিত্ত ছিল। একদিন একদিন কল্যাণপুরীজী আমাকে বললেন, “স্বামিজী ! এর একটু কল্যাণ করুন, একে করিয়া তন্মধ্যে মণিরত্ন প্রভৃতি কিছু মূল্যবান্ পদার্থ আছে কি না আগ্রহের সহিত অন্বেষণ করিত। একদিন এক দয়ালু ধনাঢ্য ব্যক্তি ঐ ব্যক্তির এই অদ্ভুত অধ্যবসায় ও আগ্রহাতিশয্য লক্ষ্য করিয়া করুণাপরবশ হইয়া তাহার জন্য গােপনে ধূলির মধ্যে বস্তুতঃই একটি মণি নিক্ষেপ করিয়া দিলেন। পরদিবস যথারীতি বুলি পরীক্ষা করিতে করিতে ঐ ব্যক্তির সেই মণিটি নয়নগােচর হইল এবং উহা দৈববশে লব্ধ হইয়াছে মনে করিয়া তাহার আনন্দের সীমা রহিল না। মণিটি মহামূল্যবান ছিল; সুতরাং তদ্বারা তাহার দারিদ্র্যদুঃখ অপনোদিত হইল বটে, কিন্তু তথাপি সে প্রত্যই ধূলি সঞ্চালন কার্য করিতে বিরত হইল না। ধনাঢ্য ব্যক্তি তাহার ঈদৃশ অচরণ দেখিয়া আরও বিস্মিত হইলেন এবং অত্যন্ত কোতুহলপরবশ হইয়া সে ব্যক্তি তৎপ্রদত্ত মণি পাইয়াছে কিনা জিজ্ঞাসা করিলেন। ঐ দরিদ্র ব্যক্তি মণিপ্রাপ্তি স্বীকার করিলে ধনাঢ্য ব্যক্তি তাহাকে পুনরায় ধূলি পরীক্ষা করিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তদুত্তরে সে বলিল, “মহাশয় ! ধূলি পরীক্ষা-কার্ষের ফলে আমি এই মণি লাভ করিয়া নিদারুণ দারিদুঃখের হাত হইতে নিস্তার লাভ করিয়াছি। এক্ষণে যদি আমি ঐ কাৰ্য্য পরিত্যাগ করি, তাহা হইলে আমি কৃত্যু বলিয়া পরিগণিত হইব। আমার দৈনিক কৰ্তব্য পরিত্যাগ না করার ইহাই একমাত্র কারণ।”

একবিংশ পরিচ্ছেদ
৯৫
মন্ত্র দিন”। আমি বললাম, “এর মােটা বুদ্ধি একে মন্ত্র দিয়ে
কি লাভ? আচ্ছা, আপনি যখন বলছেন, তখন এর একটু
উপকার করব।” তারপর ঐ লােকটিকে ডেকে আমি
“পঞ্চাক্ষর” মন্ত্র দিলাম ও গলায় কষ্ঠী বেঁধে দিলাম। আর
বললাম –“দেখ, আজ হতে তুমি সাধু হয়েছ, আমার
শিষ্য হয়েছ, এখন আর তুমি কুলি নও। এখন কাজ
ছেড়ে দিয়ে কোন শিবমন্দিরে বসে যত পার জপ কর”।
লােকটি ছিল ভোলাভালা ও সরল, সে ত’ আমার কথা
শুনে এক শিবমন্দিরে গিয়ে অহর্নিশি জপ করতে
লাগল। লোকে স্ব-ইচ্ছায় যা খেতে দিত তাই খেত।
দুই বৎসর এই ভাবে জপ করতে করতে লােকটির ইষ্ট
দর্শন হ’ল। শিবজী তাকে দর্শন দিলেন। তারপরও
সে ঐ মন্দির পরিত্যাগ করলে না। ইতিমধ্যে গ্রামের
কয়েকটী যুবতী তাকে নির্জনে পেয়ে নানাপ্রকার অন্যায়
আচরণ করতে লাগল। লােকটী তাদের ব্যবহারে বিরক্ত
হয়ে শিবজীকে বললে—“হে শিবজী, দেখুন এরা আমাকে
বৃথা কষ্ট দিচ্ছে।
” দেখতে দেখতে এর ২৪ দিনের
মধ্যেই যুবতী কয়টী কলেরা রােগে মারা গেল। তখন
গ্রামের সকল্পে ঐ সাধুটিকে সাক্ষাৎ কালসৰ্প মনে করে
ভয় ও সেবা করতে লাগল। যে যে কামনা করে
তার সেবা করত, শিবজী তার সে কামনা পূর্ণ করতে
লাগলেন। দেখ, সাধু নিজে কাউকে বর বা শাপ সহজে
দেন না, তাঁর আরাধ্য দেবতাই ভক্তের মান রক্ষা করবার

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
জন্যে তার সেবকের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করেন, এবং অনিষ্ট
কারীরও সৰ্ব্বনাশ করেন। অতএব জপুকে তুচ্ছ বলে
অবহেলা করিসূনে। জপের মত উৎকৃষ্ট সাধন আর নাই। *
এই প্রকার অন্যান্য কথার পর সকলে প্রস্থান করিলেন ।
.
দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ।
“দৃশ্যতে ত্বয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষ্ময় সূক্ষ্মদর্শিভিঃ।”
(কঠঃ উ ৩১২)
হরিদ্বার, ২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩। রাত্রি ৭টা।
[ ব্ৰহ্ম অতিশয় সূক্ষ্মবুদ্ধিৰ গম্য-স্থূল বুদ্ধি-গম্য নহেন।]
স্বামিজীর নিকট শিষ্য প্রভৃতি উপবিষ্ট আছেন।
স্বা। { শিষ্যকে লক্ষ্য করিয়া) গরুর জন্য ঔষধ
এনেছ কি ?
শি। আজ্ঞে, হাঁ, এনেছি, ৫০ টাকা দাম নিয়েছে।
তা এতই খরচ হচ্ছে, গরুর ঔষধের জন্যও না
হয় কিছু টাকা গেল। গো-সেবা একান্ত কর্তব্য। ডাক্তার
গরুকে কি খেতে দিতে বলেছে ?
শি। খাবার কথা আবার কি বলবে, এত আর মানুষ
নয়!
.
* জপাৎ সিদ্ধি।

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
স্বা। না বেটা, তা বলে থাকে।
দেখ, আকবর
বাদশাহের রাজত্বের সময় একজন বড় হিন্দু কবিরাজ
ছিলেন। মুসলমান হাকিমেরা বাদসাহের সভায় একদিন
নিজেদের স্পর্ধা দেখাবার জন্য তাঁকে বললেন, “ওহে
কবিরাজ মহাশয়, তুমি আর চিকিৎসা শাস্ত্রের কি জান?”
তারপর নিজেদের পারদর্শিতা সম্বন্ধে নানাপ্রকার শ্লাঘা
করতে লাগল। বাদসাহ খুব বুদ্ধিমান্ ছিলেন। তিনি বললেন,
-“আচ্ছা, তােমাদের পরস্পর ঝগড়া করে কাজ নেই;
আমি একজন রােগী দেখাব, তার
ব্যারামটা কি,
আর কি ঔষধ ও পথ্য দেওয়া দরকার, তা যে ঠিক ঠিক
বলতে পারবে, তাকেই সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক
বলে মানতে হবে। আমার বেগম পীড়িত, তার হাতে
একটা সূতাে বেঁধে পর্দার ভিতর দিয়ে সেই সূততটি
তােমাদের হাতে এনে দেব ; দেখি, সেই সূতত পরীক্ষা
করে যে রােগীর ব্যারাম ও ঔষধ ঠিক করে বলতে পারবে,
তাকেই সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বৈদ্য বলা যাবে। এই বলে
বাদসাহ গােপনে নীচের তলায় একটা মহিষের শৃঙ্গে একটা
সূততা বেঁধে চারতলার ঘরে হাকিমদের হাতে সূতােটি দিয়ে
রােগ নির্ণয় করতে বললেন ; কিন্তু হাকিমরা সুতা হাতে
নিয়ে রােগ ঠিক করতে পারলেন না। তারপর সেই কবি-
রাজ মশায়ের হাতে সূতা দেওয়া হল।
তিনি অনেক
পরীক্ষা করে বললেন,-“জাহাপনা। এর পথ্য ৫ সের
বনােলা, ৫ সের খইল ও ৫ সের চানা (বুট)।” হাকিমরা আর

১৮ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ বাদসাহের সভার অন্যান্য লােকেরা ত’ শুনে হেসেই খুন; বেগমের জন্য পথ্যের ব্যবস্থা হ’ল খইল, বনােলা ও চানা- তাও আবার বােজ ১৫ সের করে। কিন্তু বাদসাহ কবি- রাজকে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন ; আর তারপর ব্যাপারটা কি প্রকাশ করে বললেন। বাদসার কথা শুনে সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেল। আর কবিরাজ মশায়কে অজস্র ধন্যবাদ দিতে লাগল এবং মুক্তকণ্ঠে তাকে সকলে বৈদ্য-শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করল। সেইরূপ হে পুত্র! যাদের অতিশয় সূক্ষ- বুদ্ধি আছে, তারা বিবেকবলে পঞ্চকোষের (১) পরে আছেন যে ব্ৰহ্ম, তঁাকে জ্ঞাত হয়ে থাকেন; কিন্তু স্থূলবুদ্ধি অজ্ঞানী লােকেরা ব্ৰহ্মকে কখনও জানতে পারে না। তৎপরে অন্যান্য কথার পর স্বামিজী মহারাজ প্রশ্ন করিলেন [ বিভিন্ন পন্থার সাধককে নিৰ্বিশেষ আত্মতত্ত্বে উপনীত করিবার কৌশল—তাহাদিগের উপাস্য ও অভিমত মার্গে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিয়া ধীরে ধীরে যুক্তির সাহায্যে উপদেশ করা। ] স্বা। আচ্ছা, তােরা ত’ বেদান্তবাদী, কিন্তু বলত যারা তােদের মত মানে না, তাদের কি করে নিজেদের মতে আবি ? তাদের কাছে যদি বলিস,—“তােমাদের মত বা (১) অনুময় কোষ স্থূলদেহ। প্রাণময় কোষ, মনােময় কোষ ও বুদ্ধি বা বিজ্ঞানময় কোষত্ৰয়ে সূক্ষ্মদেহ। আনন্দময় কোষ কারণশরীর

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
ইষ্ট মিথ্যা, আমাদের মত বা ইষ্ট সত্য”। তাহলে তারা
ত' তােদের কথা
শুবে না।
ধর আর্যসমাজীরা,
তাদের কি করে বুঝুবি ? তারা ত’ শ্রাদ্ধ প্রভৃতি প্রেতকাৰ্য্য
মানে না; কিন্তু আকার সাকার নিরাকার মানে। জানি,
তাদের সাকার কি ?
শি। বােধ হয় অগ্নি, কারণ অগ্নিতে তারা হােম করে
থাকে।
স্বা। না বেটা! তাদের সাকার—ঈশ্বর, নিরাকার-ব্ৰহ্ম।
শি। আচ্ছা। তারা তবে ঈশ্বর ও ব্ৰহ্ম মানে, তবে
আমাদের সঙ্গে ত’ মিল আছে।
স্বা। নারে না ! আগে শােন, তারপর বলিস্। তারা
ঈশ্বর, ব্ৰহ্ম মানে বটে; কিন্তু বলে যে জীব চিরকালই
ঈশ্বরের দাস থাকবে, জীব কখনও ঈশ্বর হতে পারে না, আর
ঈশ্বরও কখনও ব্ৰহ্ম হতে পারে না।—যেমন ধানগাছ কখনও
তুষ হতে পারে না এবং তুষ কখনও চাল হতে পারে না।
এখানে ধানগাছ হ’ল জীব, তুষ ঈশ্বর আর চাল ব্ৰহ্ম।
শি। আচ্ছা, তাদের মুক্তি কি রকম?
স্বা। তারা বলে যে, সাধনায় সিদ্ধ হলে সিদ্ধপুরুষ
ভগবানের কাছে কাছে লক্ষ বছর বাস করে ফের জন্মগ্রহণ
করে। এই রকম ৰলার উদ্দেশ্য এই যে, পুনর্জন্ম স্বীকার না
করলে ধীরে ধীরে সকল জীবই যখন মুক্ত হয়ে যাবে, তখন
সৃষ্টির ললাপ হবে। কিন্তু তা হতে পারে না; কারণ সৃষ্টি
অনাদিকাল থেকে চলে আসছে, আর অনন্তকাল পর্যন্ত চলবে।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
আমি দয়ানন্দ স্বামিজীকে (আৰ্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী
দয়ানন্দ সরস্বতী) বলতাম,দেখুন, আমরা দুজনেই
সরকারী চাকুরী করেছি, তার মধ্যে আমি পেনসন্ নিয়ে
এসেছি, আমার আর কোন চিন্তা নেই; কিন্তু আপনি ছুটি
নিয়ে এসেছেন মাত্র, এখন ধরুন, যুদ্ধ বেধেছে—আপনার
এখনও চাকুরীর ভয় আছে, কাজেই ছুটীর সময় কেটে গেলেই
আপনাকে ফের যুদ্ধে যেতে তলব হবে।
শি। তাদের শঙ্কা ত’ ঠিক। যদি মুক্ত পুরুষের
পুনরায় আসতে না হয়, তাহলে ক্রমে ক্রমে সকলেই যখন
মুক্ত হয়ে যাবে, তখন সৃষ্টি কি করে থাকবে ?
স্বা। মুক্ত পুরুষের পুনরায় আসতে হয় না—তা’
তােকে কে বললে ?
শি। কেন, গীতায় আছে,-“যগত্বা ন নিবন্তে
তদ্ধাম পরমং মম।”
স্বা। তাহলে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকে কি বলবি,
তিনি কেন শরীর ধারণ করলেন ? (১)
(১) এখানে তিনি বলিলেন যে, মুক্তপুরুষও ইচ্ছা করিলে পুনর্জন্ম গ্রহণ
করিতে পারেন এবং জগতের কল্যাণের জন্য তাঁহারা জন্মগ্রহণ করিয়া
থাকেন।–“যগত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম”-এই শ্লোকটির
তাৎপৰ্য এই যে, মুক্ত পুরুষ জন্ম-মৃত্যুর অধীন নহেন, পরন্তু ঈশ্বর যে
প্রকার স্বেচ্ছায় লােকহিতার্থ জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন, মুক্ত পুরুষও সেই
প্রকার জন্মগ্রহণ করেন। স্বামিজীর মতে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তদ্রুপ
স্বেচ্ছায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ ১০১ শি। তিনি পূর্বে সিদ্ধপুরুষ ছিলেন না, এই শরীরেই সিদ্ধ হয়েছেন। স্বা। আচ্ছা! শ্ৰীকৃষ্ণ কেন জন্ম নিলেন? তিনি কি মুক্ত পুরুষ ছিলেন না ? শি। বাঃ, তিনি ত’ সাক্ষাৎ ঈশ্বর। “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অত্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্”। গীতা ৪৭ অর্থাৎ যে যে সময় প্রাণিগণের অভ্যুদয় ও মােক্ষের সাধন বর্ণ ও আশ্রমরূপ ধৰ্ম্মের গ্লানি (হানি) হয়, হে ভারত, এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ( উদ্ভব) হয়, তখনই আমি মায়াবশে আত্মদেহ নিৰ্মাণ করিয়া থাকি।--সেই জন্যই তিনি জন্ম- গ্রহণ করিয়া থাকেন। স্বা। আচ্ছা, এখন আবার তুইত ঈশ্বরকে পৃথক মনে করে সৃষ্টির কর্তা বলে মেনে নিয়েছিস! আচ্ছা বলত, ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন, ঈশ্বর ও মায়ার উপাদান ও নিমিত্ত-কারণ কি ? শি। ব্ৰহ্মই সকলের কারণ। স্বা। তাহলে ব্ৰহ্মই ঈশ্বরকে নির্মাণ করেছেন ? শি। না, তা কেন ? তাহলে ত ব্ৰহ্ম কর্তা হয়ে যায়। তবে তুই এর সমাধান কর। শি। সমাধান ত শ্রুতি করেছেন-“যথা পুরুষাৎ স্বতঃ কেশলােমানি তথা অক্ষরাৎ সম্ভবতীহ বিশ্বম্ !” (১) অর্থাৎ (১) মুণ্ডকোপনিষদ ।

১০২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
যেমন পুরুষের শরীরে কেশ ও ললাম আপনা হতেই জন্মায়,
তার জন্যে শরীরকে সেই সকল কেশ ও লােমাদির কর্তা বলা
যায় না, সেইরূপ ব্ৰহ্ম হ'তে ঈশ্বর, মায়া এবং সমস্ত পদার্থের
সহিত এই ব্রহ্মাণ্ড উৎপন্ন হয়ে থাকে, কিন্তু সেজন্য
ব্ৰহ্মকে কর্তা বলা যায় না।
স্বা। তাের শ্রুতি ত’ আর সাহেব লােক মানবে না,
তাদের কি করে বুঝবি ?
শি। কেন, শরীর হতে কেশ-লােমের উৎপত্তি হয়, এ
কথা তারাও স্বীকার করতে বাধ্য।
স্বা। দেখ, কোন লােককে নিজের মতে আনতে হ'লে
আগে সে যার উপাসক ও সে যে মতাবলম্বী সেই উপাস্য ও
মতে শ্রদ্ধা দেখিয়ে ধীরে ধীরে তর্ক ও যুক্তির সাহায্যে তার
নিজের উপাস্যকে তাের নিজের উপাস্যের পাশে দাড় করিয়ে
দেখাতে হয় যে, বস্তুতঃ দুজনেই এক ; তখন তাের কথায়
তার শ্রদ্ধা হবে ; আর যদি তা না করে আগে থেকেই তার
মত ও উপাস্য মিথ্যা ও তাের মত ও উপাস্যই সত্য, এই রকম
বুঝাতে চেষ্টা করি, তাহলে তাের কথায় তার শ্রদ্ধা
আসবে না।
আচ্ছা, মত ত’ অনেক রকমের আছে, এই দেখ না
গৌতম, পতঞ্জলি প্রভৃতি নানা ঋষির নানা মত--তারপর
বিশিঙ্কাদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ প্রভৃতি কত মত। ।
কোনটার সঙ্গে কোনটার মিল নেই, এখন এই সব মতের
শেষ পরিণাম কোথায় ?

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
এই কথা বলিয়া স্বামিজী শিষ্যের উত্তরের অপেক্ষা না
করিয়া নিজেই বলিতে লাগিলেন,-এর
শেষ পরিণাম
হচ্ছে—(১) অধ্যারােপ ছেড়ে দিয়ে সকলের অপবাদ করে
একমাত্র শিবম্বরূপে স্থিত হওয়া। বিভিন্নপথ শিষ্যদের
( অজ্ঞানীদের) জন্য। যে যে রকমের অধিকারী,তা’কে সেই
রকমের উপদেশ দিতে হয়। নিরেট মূখ চাষাকে যদি কাগজ
কলম ও কালির সাহায্যে উপদেশ দাও তবে সে বুঝবে না,
তা’কে লাঙ্গল,জমি এই সকলের দৃষ্টান্ত দিয়ে উপদেশ দিতে হয়,
তবেই উপদেশ তার হৃদয়ঙ্গম হবে। সেইরূপ লােহারকে
( কৰ্ম্মকারকে) হাতুড়ি অগ্নি প্রভৃতির দৃষ্টান্তে উপদেশ দিতে
হয়। এইরূপ বিভিন্ন রকমের অধিকারীকে বিভিন্ন রকমের
উপদেশ দেওয়া দরকার; আর সেইজন্যই বিভিন্ন মতের সৃষ্টি।
বস্তুতঃ এ সকলের অপবাদ করে যখন নিজস্বরূপে স্থিত হওয়া
যায়, তখন
ন মৃত্যু ন শঙ্কা ন মে জাতিভেদ,
পিতা নৈব মে নৈব মাতা ন জন্ম।
ন বন্ধু ন মিত্রং গুরুনৈব শিষ্যঃ,
চিদানন্দরূপঃ শিবােহহম্ শিবােহহম্ ।
অর্থাৎ ভেদাভেদ কিছুই থাকে না। (২)
(১) এয়ীসাঙ্খং যােগঃ পশুপতিমতং বৈষ্ণবমিতি,
প্রভিন্নে স্থানে পরমিদমদঃ পথ্যমিতি চ।
রুচীনা বৈচিত্র্যাজুকুটিলতানাপথজুষাং,
নণামেকো গম্যমসি পয়সামব ইব। মহিমন্তোত্র।
(২) শ্ৰীমচ্ছঙ্করাচার্য্যকৃত “নির্বাণাষ্টকম্” (আত্মষটকম্)।

- ত্রয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ। হরিদ্বার, ১লা পৌষ, ১৩৩৩। রাত্রি ৭০টা। ধ্যায়ত বিষয়া পুংসঃ সঙ্গন্তেষুপজায়তে। সঙ্গাৎ সংজায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধােহভিজায়তে। গীঃ ২২৬৷৷ [ সঙ্গদোষই মােহাদির কারণ ] জনৈক ভক্ত স্বামিজীকে প্রশ্ন করিলেন- বাবা! লােকের ছেলে হলেই তার উপর মায়া আসে কি করে ? জন্মাবার আগে ত’ মায়া ছিল না। স্বামিজী। তুমি তােমার জীবনের বিষয় আলোচনা করলেই বুঝতে পারবে। দেখ, তােমার যখন ৪৫ মাস বয়স ছিল, তখন তুমি খুব হাসতে খেলতে, তখন তােমার কারও উপর স্নেহ-মমতা ছিল না; কিন্তু বাপ-মা,ভাই-বােন প্রভৃতি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে থাকতে থাকতে তাদের আদর-যত্ন পেতে পেতে তাদের আপনার ভাবতে লাগলে; কাজেই ক্রমশঃ তাদের মায়ায় ফ’সে ( আবদ্ধ হয়ে গেলে। আবার দেখ, তখন পর্যন্তও তােমার স্ত্রীর প্রতি তােমার মায়া-মমতা কিছুই ছিল না; কারণ তখন বিবাহ হয় নি। যে তােমার স্ত্রী হবে, সে অন্য পরিবারে মানুষ হচ্ছিল। কিন্তু বিবাহের পর স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে থাকতে পরস্পরের প্রতি ভালবাসা হ’ল, এবং সেই ভালবাসায় মুগ্ধ হলে। সেইরূপ পুত্রের উপর মমতাও •

এয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ
তার সঙ্গে থাকতে থাকতে, তাকে আদর-যত্ন করূতে করতে
জন্মাল। আগে থেকেই যে হল একথা বলা যায় না।
বৎস! সঙ্গ-দোষই মায়ার কারণ।
ভক্ত। হাঁ, বাবা। আমি এবার ঠিক বুঝেছি।
| সংসারে কোথাও সুখ নাই, দেবতারাও সংসারী হইয়া
সঙ্গদোষে দুঃখভাগী হন।]
এক যুবক সাধু গুরুকে দুঃখ করে বললে,
“গুরুদেব, সাধু হয়ে ত কোন লাভ নেই, দোরে দোরে ভিক্ষা
করে খেতে হয় । এর চেয়ে গৃহস্থই সুখী, অতি দরিদ্র যে
গৃহস্থ সেও আমার চেয়ে সুখী।” গুরুজী বললেন,
“না বেটা! গৃহস্থরা তাের চেয়েও দুঃখী। ঐ যে গৃহস্থ
দেখছ, ধনবান্ শেঠ (জমিদার) বসে আছে, সেও তোর
চেয়ে দুঃখী।” শিষ্য বলে,-“তা কি করে হয় ? শেঠের
গাড়ী-ঘােড়া, দাস-দাসী থাকা সত্ত্বেও সে আমার চেয়ে
দুঃখী হ’ল কি করে ?” গুরুজী বললেন, “আচ্ছা, তুই
ঐ শেঠের ঘরে আজ ভিক্ষা করে আয়। ভিক্ষা হয়ে
গেলে তাকে জিজ্ঞাসা করবি - সে সুখী না দুঃখী।” গুরুর
কথামত শিষ্য শেঠের বাড়ী আতিথ্য গ্রহণ করলে এবং
তারপর গুরুর আজ্ঞানুসারে শেঠকে জিজ্ঞাসা করলে,
“আচ্ছা, শেঠজী। আপনি সুখী না দুঃখী ?” শেঠ
বললে,-“মহারাজ, আমার মত দুঃখী এজগতে আর নেই ;
দেখুন, আমার ঘরে যুবতী বিধবা কন্যা ও যুবতী বিধবা
পুত্রবধু; তাদের মলিন মুখ অহরহ যতই আমার চোখে
-

! ৩ ১০৬ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ পড়ে, ততই আমার হৃদয়ে যে কি নিদারুণ শােকাগ্নি হুহু করে জ্বলে, তা আপনাকে আর কি বলব।” শিষ্য তখন বুঝতে পারলে যে বিষয়বৈভব সত্ত্বেও গৃহস্থেরা সাধুদিগের চেয়ে বাস্তবিক কত দুঃখ ভােগ করে। অন্যের কথা কি, বিষ্ণু, মহেশ্বর পর্যন্ত দেবতাদেরও গৃহস্থ হ'য়ে কত দুঃখ ভােগ করতে হয়। বিষ্ণু মহেশ্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এক সময়ে কৈলাসে গিয়েছিলেন। মহেশ্বর বিষ্ণুর কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করলেন—তার উত্তরে বিষ্ণু বললেন,-দেবাদিদেব । আমার আবার কুশল কোথায়, আমার ত’ চিরকালই দুঃখ। শিব বললেন,-“সেকি কথা দেব ? আপনি এই ত্রিজগতের পালনকর্তা, আপনাকে চিরকাল দুঃখভােগ করতে হয়, এ কি রকম কথা?” বিষ্ণু বললেন,“দেখুন আপনি আমার শয়নস্থান বিহিত করেছেন সাগরবক্ষে কাল- সাপের উপরে ; একে পাশ ফিরলেই সমুদ্রে পড়বার ভয়, আবার বাসুকী মাথায় সহস্রফণা বিস্তার করে যখন ফোস্ ফোস করেন, তখন তার মুখের ফেনায় আমার সর্বাঙ্গ ভিজে যায়। এই ত’ গেল থাকার কষ্ট ; তারপর আমার গৃহিণী যিনি, তিনি সদাই চঞ্চলা, এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারেন । তারপর দেখুন, আমার একটি মাত্র পুত্র, তা তাকেও আপনি ভস্ম করেছেন। কাজেই আমার সুখ কোথায়?” বিষ্ণুর এইসকল কথা শুনে কোনও উত্তর না করতে পেরে মহাদেব চুপ করে রইলেন। তারপর বিষ্ণু মহাদেবের কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করায় মহেশ্বর বললেন,—“সখে !

এয়ােবিংশ পরিচ্ছেদ
১০৭
আমার অবস্থাও তােমার মতন।” বিষ্ণু বললেন,-“সে কি।
আপনি জগতের প্রলয়কা যােগিরাজ, আপনার আবার
দুঃখ ?” মহেশ্বর বললেন,—“বল’ব আর কি, দুটি যে পুত্র
আছেন, তাদের ত’ ঝগড়া লেগেই আছে। কার্তিক বলে-
গণপতির ইদুর তা’র ময়ুরের খাবার চুরি করে খায়। আবার
গণেশ বলে, কার্তিকের ময়ূর তা’র ইদুরকে খালি ঠোকরায়।
এই নিয়ে ভাই ভাই ঝগড়ার আর বিরাম নাই, কাজেই
আমার চিরশান্তি কোথায় ?
বস্তুতঃ সংসারের কেহই সুখী নয়। কীটপতঙ্গ থেকে
ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর পর্যন্ত সকলেই সঙ্গদোষে মােহাক্রান্ত
হয়েছেন।
রাজা ভর্তৃহরি রাজ্যৈশ্বৰ্য্য পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়ে
দেশে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এক যুবতী তার মনােহর রূপ
দেখে জিজ্ঞাসা করলেন,—“মহারাজ! আপনি এই নবীন
বয়সে বাপ,মা,স্ত্রী,পুত্র পরিত্যাগ করে কেন এ কঠিন প্রব্রজ্যা
অবলম্বন করেছেন?” তদুত্তরে রাজা বললেন,—“মাতঃ !
আমি বাপ, মা, স্ত্রী, পুত্র কাউকেও পরিত্যাগ করি নি।
আমার মাতা, পিতা, স্ত্রী, পুত্র, ভ্রাতা, ভগ্নী সকলেই সঙ্গে
সঙ্গে আছেন। যদি বলেন—আমার পিতা, মাতা প্রভৃতি
আত্মীয়স্বজনকে ত চোখে দেখতে পাচ্ছেন না, তবে
শুনুন,
“ধৈৰ্যং যস্য পিতক্ষমা চ জননী শান্তিশ্চিরং গেহিনী,
সত্যং সুমুরয়ং দয়া চ ভগিনী ভ্রাতা মনঃসংযমঃ।”

১৮৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
শয্যা ভূমিতলং দিশােহপি বসনং জ্ঞানামৃতং ভােজন
হেতে যস্য কুটুম্বিননা বদ সখে কস্মাদ্ভয়ং যােগিনঃ।”
বৈরাগ্যশতক ৯৮ শ্লোক।
ধৈৰ্য যাহার পিতা, ক্ষমা যাহার জননী, শান্তি যাহার
বনিতা, সত্য যাহার পুত্র, দয়া যাহার ভগিনী, মনঃসংযম
যাহার ভ্রাতা, ভুতল যাহার শয্যা, দশদিই যাহার বসন
এবং জ্ঞানামৃত যাহার আহার—হে সখে! এতাদৃশ কুটুম্ব
(সহায়) পরিবৃত সেই যােগিগণের আর কোন্ বিষয় হইতে
ভয় হইতে পারে ?
হাতে টাকা নেই, বাড়ীতে অতিথি এসে ভিক্ষা
চাচ্ছে, এ অবস্থায় অতিথিসৎকার করতে না পারলে কি
পাপ হয় ?
স্বা। না, সামর্থ্য থাক্‌তেও না দিলে পাপ হয় বটে,
কিন্তু সামর্থ্যের অভাবে অতিথি সৎকার না করলে
পাপ হয় না। সাধ্যানুসারে না দেওয়াই পাপ। যার
যতদূর সাধ্য সে তদনুসারে দানাদি করবে।
ভূক্ত। ছেলেদের পড়ার সময় শাসন করা কি অন্যায় ?
স্বা। না, শাসন না করলে পড়াশুনা হয় না।
অযােগ্য ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া যেমন পাপ, আর সাধারণতঃ
দণ্ডযােগ্য ব্যক্তিকে দণ্ড না দেওয়াও তেমনি পাপ। চোর,
দুৰ্বত্ত, পাপী প্রভৃতি লােককে দণ্ড না দিলে সমাজের বিশেষ
ক্ষতি হয়, সুতরাং সেটা পাপ। আবার সুশীল শান্ত ব্যক্তিকে
অযথা কাজে বা কর্কশ কথায় বৃথা দুঃখ দিলে পাপ হয়।

চতুব্বিংশ পরিচ্ছেদ
[ ধৈৰ্য্য অবলম্বন করিয়া ক্রোধের বেগ সংবরণ করিতে
হয়।]
ক্ত। কারও উপর ক্রোধ হলে কি করা উচিত?
স্বা। যার উপর ক্রোধ হয়েছে, তার কাছ থেকে চলে
যাওয়া উচিত, আর মনে মনে বিচার করা উচিত যে, ক্রোধ
চণ্ডাল, চণ্ডালের দাস হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মূল
কথা ক্রোধের উদয় হলে সর্বান্তঃকরণে ধৈৰ্য্য ধারণ করা
একান্ত কর্তব্য। (১)
চতুর্কিংশ পরিচ্ছেদ
ভেদাভেদৌ সপদি গলিতৌ পুণ্যপাপে বিশীর্ণে,
মায়ামােহৌ ক্ষয়মধিগতো নষ্টসন্দেহবৃত্তিঃ।
শব্দাতীতং ত্রিগুণরহিতং প্রাপ্যতত্ত্বাবধােধং
নিস্ত্রৈগুণ্যে পথি বিচরতাং কো বিধিঃ কো নিষেধ।
(শুকাষ্টক)
(১) শক্লোভীহৈব যঃ সােঢ়ং প্রাকৃশরীরবিমােণাৎ।
কামক্রোধােঙবং বেগম স মুক্তঃ স সুখী নরঃ গীতা ৫২৩
অর্থাৎ এই লােকেই(জীবিত অবস্থায়) যে ব্যক্তি মরণের পূৰ্বকাল
পৰ্য্যন্ত কাম ও ক্রোধ হইতে উৎপন্ন বেগ (যাহার নিমিত্ত অনন্ত) সহন
করিতে সমর্থ হন, তিনিই যুক্ত (যােগী) এবং ইহলােকে তিনিই সুখী
।

;
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
হরিদ্বার, ৬ই পৌষ, ১৩৩৩ সাল। দিবা ১টা।
শিষ্য স্বামিজীর নিকট উপবিষ্ট।
[ দান, গ্রহণ, পাপ, পুণ্য প্রভৃতি অজ্ঞানীর পক্ষে
জ্ঞানীর নিকট সকলই ব্ৰহ্মময়।]
স্বা। ( শিষ্যকে) তােদের ত’ ভিক্ষা করে খেতে হয়
ও হবে ; অন্যের দানগ্রহণ করতে হয়। বলত’ দান গ্রহণ
করলে পাপ হয়, না পুণ্য হয় ?
শি। পাপ হয়।
স্বা। হাঁ, গ্রহীতার পাপ বৃদ্ধি হয়, আর দাতার পাপের
লাঘব হয়। এ নিয়ম অজ্ঞানীর পক্ষে। জ্ঞানীর কিন্তু
পাপও নাই পুণ্যও নাই; তার কাছে দাতা, গ্রহীতা সকলই
শিব। “বাসুদেবঃ সৰ্বমিতি স মহাত্মা সুদুলভঃ।”
শি। এ রকম জ্ঞান লাভ করা অতি দুষ্কর।
স্বা। বৃক্ষ পৃথিবী থেকে রস আকর্ষণ করে পুনরায়
ফলফুলাদিরূপে পৃথিবীকেই দেয়। সেইরূপ এই শরীরও
পঞ্চভূত হতে উৎপন্ন হয়েছে, পুনরায় তা’তেই লয় পাবে।
এইরূপ বিচার করে সর্বদা শরীর থেকে আপনাকে পৃথক্‌ মনে
কর, এতেই জ্ঞানলাভ হবে।
[ আত্মদর্শনের ফল—একবার নিজের ঘর দেখা হয়ে
গেলে, আর অশান্তি প্রভৃতির ভয় থাকে না।]
শি। চিত্তে শান্তি সকল সময় থাকে না কেন?
স্বা। সাধনে পরিপক্ক না হলে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি লাভ
হয় না। একবার নিজের ঘর দেখা হয়ে গেলে আর কোন

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ
১১১
থাকে । সময়ে সময়ে মন বিষয়ে ধাবমান
হয়ে অশান্ত হলেও বিশেষ ক্ষতি নাই। সাধন
করতে করতে শেষে মন তৈলধারাবৎ আত্মচিন্তায় মগ্ন
থাকবে। সে অবস্থায় চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের সহিত রূপাদি
তন্মাত্রার সংযােগ হলেও সাধকের মনে কোন প্রকার বিকার
উপস্থিত হয় না। কেহ স্তুতি বা নিন্দা করলেও মনে
বিক্ষেপ হয় না। সাধন করলে এই অবস্থা লাভ হয়।
অতএব সাধন কর।
পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ
যৎ করােষি যদশ্নাসি যজুহােসি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ মদর্পণ।
শুভাশুভফলৈরেবং মােক্ষ্যসে কৰ্ম্মবন্ধনৈঃ।
সন্ন্যাসযােগযুক্তাত্ম বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।
গীতা ৯২৭, ২৮
হরিদ্বার। ১০ই পৌষ ১৩২০। রাত্রি ৭টা
[ মায়ার শক্তি অতি মহীয়সী—অসম্ভবকে সম্ভব করে ]
স্বা। হাতী কখনও ঘাসের ভিতর লুকিয়ে থাকতে পারে
কি? সমুদ্রকে কখনও ঘড়ার মধ্যে রাখা যায় কি ?
শিষ্য। না।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
?
স্বা। পারা যায়। এই দেখ, সমুদ্রবৎ মহান্ আত্মাকে
এই দেহরূপ ঘড়ার মধ্যে রাখা হয়েছে,—তুই এত বড় মহান্
সর্বব্যাপক হয়েও আপনাকে সাড়ে তিনহাত লম্বা এই দেহের
বেশী ভাবতে পাচ্ছি না। আর হাতীকেও ঘাসের ভিতর
রাখা যায়—এই দেখনা, এত বড় হাতীরূপী মহান্ আত্মা
ঘাসরূপ ইন্দ্রিয়ের ভিতর লুকিয়ে রয়েছে। ইন্দ্রিয়ভােগে
মত্ত হয়ে নিজের প্রকৃত শৌর্য ভুলে গিয়েছি। অসম্ভব
কিছুই নেই। মায়া অঘটনঘটনপটীয়সী, মায়া অসম্ভবকেও
সম্ভব করতে পারে।
[ নিষ্কাম কৰ্ম্ম আত্মজ্ঞানলাভের প্রকৃষ্ট উপায়।]
শি। আত্মজ্ঞানলাভের প্রকৃষ্ট উপায় কি
স্বা। নিষ্কাম কৰ্ম্ম। যা কিছু করি ভগবানের প্রীত্যর্থে ;
এই ভাবে কৰ্ম করলে ভগবান প্রীত হন ও ধীরে ধীরে
ভঁর কৃপায় অন্তঃকরণ শুদ্ধ হয়ে আত্মজ্ঞান লাভ হয়; কিন্তু
এ রকম কৰ্ম্মকেও ঠিক ঠিক নিষ্কাম কৰ্ম্ম বলা যায় না, কারণ
এ রকম কৰ্ম্মেও মুক্তির ইচ্ছা লােকে করে থাকে। ঠিক
ঠিক নিষ্কাম কৰ্ম্ম হয় তখন, যখন দেহে আত্মভাব থাকে না।
[ মুসলমান ও খৃষ্টান ধর্মের মতে মুক্তি মৃত্যুর পর লভ্য,
কিন্তু হিন্দুমতে জীবন্মুক্তি আছে।]
হিন্দু শাস্ত্রের মতই ঠিক।
স্বা। “জীবতঃ কঃ ? নিরুদ্যমাে যঃ।”
জীবিতাবস্থায়ই মৃতবৎ হওয়া যায়, যখন কোনরূপ উদ্যম
থাকে না। আমাদের শাস্ত্রে বলে যে, জীবিতাবস্থায়ই মুক্তি

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ ১১৩ লাভ করা যায়, কিন্তু মহম্মদ ও যীশু খৃষ্টের মতে মৃত্যুর পর মুক্তি। শি। কোন মত সত্য ? আমাদের বেদান্ত মতই ঠিক। আমাদের হিন্দুদের মধ্যেই কত মত আছে ; ওরকম নানা লােকের নানা মত থাকেই, কিন্তু বস্তুতঃ আমিই সৰ্বব্যাপী, সৃষ্টিস্থিতি-প্রলয়ের কৰ্ত্তা, জগতের আধার-স্বরূপ-উপলব্ধি করাই সাধনার উদ্দেশ্য। [মহাপুরুষেরা বিভিন্ন স্তরের অধিকারীদিগের জন্য বিভিন্ন মত প্রচার করিয়াছেন।] শি। তবে যীশুখৃষ্ট, মহম্মদ প্রভৃতি এরা কি সিদ্ধ- পুরুষ ছিলেন না, সিদ্ধপুরুষ হলে তারা এ রকম বিকৃত মত প্রচার করবেন কেন ? স্বা। তঁারাও সিদ্ধপুরুষ ছিলেন, কিন্তু অধিকারী ভেদে মতের বা উপদেশের পার্থক্য করা উচিত। মা ও ছেলেদের গল্প মনে আছে ত’ ? ছেলেদের স্বাস্থ্য অনুসারে মা কোন ছেলেকে লাড়ু খেতে দেন, কাউকে খিচুরী দেন, আবার কাউকে বা সাগু দিয়ে থাকেন। (১) আজ্ঞে । । স্বা। সেইরূপ সিদ্ধপুরুষরাও বিভিন্ন স্তরের অধিকারী- দিগের জন্য বিভিন্ন মত প্রচার করে থাকেন। শি। (১) স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ প্রথম খণ্ডের ২৯ পৃষ্ঠা দেখুন। ৮

১১৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
[ হিন্দুধর্ম অনাদি অপৌরুষেয় বেদমূলক, সুতরাং অনাদি
অন্যান্য ধর্মের ন্যায় কোনও ব্যক্তিবিশেষের মত বা অনু-
শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত নহে।]
হিন্দুধর্ম বেদের শাসনে চলছে, কোন ব্যক্তির শাসনে
নয়; বেদ অনাদি, অপৌরুষেয় আর “তত্ত্বমসি,” “অয়মাত্মা
ব্ৰহ্ম,” “প্ৰজ্ঞানমানন্দং ব্ৰহ্ম” ও “অহং ব্ৰহ্মাস্মি”—এই চারিটি
চারি বেদের মূল মহাবাক্য। সুতরাং হিন্দুধর্মই সকল ধর্মের
আদি, আর এই ধৰ্ম্ম নিরাকার ব্রহ্মের সঙ্গে আপনার একত্বের
শিক্ষা দিয়েছে। বৌদ্ধধৰ্ম্ম, মুসলমানধৰ্ম্ম, ও খৃষ্টানধর্ম
প্রভৃতি ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, সুতরাং অনাদি নয়।
[ হিন্দুধৰ্মই প্রধানতম ধৰ্ম্ম, তৎপরে এক এক মহা-
পুরুষের অভ্যুদয়ে রুচিভেদে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের বা
ধৰ্ম্মের সৃষ্টি।]
“ত্রয়ী সাংখ্যং যােগঃ পশুপতিমতং বৈষ্ণবমিতি
প্রভিন্নে প্রস্থানে পরমিদমদঃ পথ্যমিতি চ।
রুচীনাং বৈচিত্র্যাজু-কুটিল-নানাপথজুষাং
নৃণামেকো গম্যস্তমসি পয়সামৰ্ণব ইব।”
মহিম্নস্তোত্র-৭ শ্লোঃ ৭।
শি। খৃষ্ট, মহম্মদ প্রভৃতির জন্মের পূর্বে খৃষ্টান,
মুসলমান প্রভৃতি এরা কোন সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল?
পূৰ্বে সকলেই আৰ্যজাতির (হিন্দুজাতির) অনুশাসনে
• ছিল। আৰ্যদিগের মধ্যেও কৈই সাধনে ও বিদ্যাবুদ্ধিতে
উন্নতিলাভ করে অধিকারী বুঝে ও সময়ের উপযােগী করে

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ ১১৫ এক একটা মত প্রচার করে গেছেন। তাদের সেই সেই মতের অনুযায়ী এক একটী সম্প্রদায়ের বা ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এইরূপ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা আপন আপন ধর্ম- প্রবর্তকের পূজা করে থাকে। যেমন বৌদ্ধেরা বুদ্ধের পূজা করে , খৃষ্টানেরা যীশুখৃষ্টের, মুসলমানেরা মহম্মদের, জৈনেরা অহতের ইত্যাদি। কিন্তু হিন্দুধর্ম কোনও ব্যক্তির অনুশাসনের দ্বারা চালিত নয়। হিন্দুরা অনাদিকাল থেকে অপৌরুষেয় বেদকে মেনে চলে আসছে। তবে হিন্দু- দের মধ্যেও এই যে বিভিন্ন মত, তার কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন রুচি অনুসারে বেদের একই শব্দকে বিভিন্ন লােকে বিভিন্ন অর্থ করেছেন। যেমন দ্বৈতবাদীরা “তত্ত্বমসি” এই বাক্যের ‘তস্য-ব-অসি’—অর্থাৎ তাহার তুমি হও এইরূপ অর্থ করেছেন; তাই থেকে তারা শিক্ষা দেন যে, জীব ভগবানের চিরদাস। আর অদ্বৈতবাদীরা ‘তত্ত্বমসি’ এই মহাবাক্যের ‘তৎ -ত্ব-অসি” অর্থাৎ তিনি তুমি { হও) এই অর্থ করে আপনাদিগকে ব্ৰহ্ম হ’তে অভিন্ন বলে জানতে ইচ্ছা করেন। যেমন “ম” এই অক্ষরটি বিভিন্ন লােকের রুচি অনুসারে বিভিন্ন ভাবের সূচনা করে থাকে। সেই রকম—যে মাংসপ্রিয় সে ‘ম’ এই অক্ষরে মাংসকে লক্ষ্য করা হয়েছে মনে করে থাকে ; আর যে মদ্যপায়ী সে ‘ম’ ; এও * যেমন ‘দ’ অক্ষর (বৃহদারণ্যকের ৫ম অধ্যায়ে) প্রজাপতি দেব মানব ও অসুরকে বলেন, ও তাহাতে তাহারা দাসত ও দও ও ফয়ন্তং বুঝিয়া লয়।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
এই অক্ষরে মদের কথাই বলা হয়েছে মনে
করে ;
কিন্তু যে মাতৃভক্ত সে ‘ম’ এই অক্ষর উচ্চারণের উদ্দেশ্য
মাতৃচরণ-স্মরণ করা ভিন্ন আর কিছুই বুঝে না। এইরূপে
হিন্দুরা চিরকাল অপৌরুষেয় বেদ মেনে চলে আসছে এবং
বেদবাক্যের নানা রকম অর্থ করে নানা রকম ধৰ্ম ও সম্প্রদায়
হয়েছে সত্য, কিন্তু যথার্থ তত্ত্বজ্ঞনি হলে বেদের অনুশাসনও
চলে যায়। তত্ত্বদর্শী গুরু ও বেদও অতিক্রম করে থাকেন।
শি। বাবা ! এ রকম জ্ঞানলাভের উপায় কি ?
এ ত’ ভাই, সাধনের জোরে মনের সংকল্প রুক্‌তে
পারলে তবেই হতে পারে।
ষড়বিংশ পরিচ্ছেদ।
ব্যাধস্যাচরণং ধ্রুবস্য চ জয়াে বিদ্যা গজেন্দ্রস্য কা,
কা জাতির্বিদুরস্ত যাদবপতেরুগ্ৰস্য কিং পৌরুষ ।
৯” কুবজায়াঃ কমনীয়রূপমধিকং চিত্তং সুদামােধনং, ৫ * * *
ভক্ত্যা তুষ্যতি কেবলং নচ গুণৈর্ভক্তিপ্রিয়য়া মাধবঃ।
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যােসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যােগক্ষেমং বহাম্যহম্।
গীতা-৯১২২৮
হরিদ্বার, ১৪ই পৌষ, ১৩৩৩, রাত্রি ৭টা।
* যাবানর্থ উদপানে সর্বতঃ সং তােদকে। তাবান সর্বেষু বেদেষ্ণু
ব্রাহ্মণস্য বিজানতঃ । গীতা

ষড়বিংশ পরিচ্ছেদ
১১৭
;
[ উপাস্য বড় না উপাসক বড়।]
স্বামিজী। (জনৈক মাদ্রাজীসাধুর প্রতি) আচ্ছা বলত
উপাস্য বড়, না উপাসক বড় ?
মাদ্রাজীসাধু। উপাস্য বড় ; উপাস্য বড় না হলে উপাসক
সেই উপাস্যের উপাসনা করবে কেন ? উপাস্য শ্রেষ্ঠ, তাই
উপাসক অন্নাদি তাকে নিবেদন করে তবে গ্রহণ করেন।
স্বা। তাহলে প্রথমে উপাস্যকে স্নান করান হয় না
কেন ? উপাসক আগে স্নান করেন, তারপর উপাস্যকে স্নান
করান কেন ?
মাঃ সাধু। হা!
স্বা। বাস, তােমার মত খণ্ডন হয়ে গেল ? (সহাস্যে )
কথাটা কি জান, প্রকৃতপক্ষে উপাস্যের অর্থাৎ ভগবানের
ভােগের জন্যে অনেক সময় অন্ন দেওয়াই হয় না, ভগবানকে
দেওয়া হয় কেবল নামে। তার প্রমাণ এই দেখ, ভােগ
আগে উপাসক আন্দাজ করে নেয় যে, সে নিজে কি পরিমাণ
খেতে পারবে—ঠিক সেই বুঝে ভােগটা দেবে। তবেই বােঝ,
উপাস্যকে ভােগ দেবার আগে নিজকেই ভােগ দেওয়া হল।
মাঃ সাধু। হাঁ স্বামিজী! এ ঠিক।
[ ভক্তি ও প্রেমই মুখ্য সাধনা-কৰ্ম্ম নহে। ]
স্বা। ( শিষ্যকে লক্ষ্য করিয়া) দেখেছিস্ কৰ্ম্মকাণ্ডীদের
দর্প এইভাবে চূর্ণ ক’তে হয়। { মাদ্রাজী সাধুর প্রতি।
ধ্যানকার প্রথমে ফুল নিজ মস্তকে দেয় ; ধ্যান করিয়া ফুল
উপাস্যকে দেয়।

১১৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
;
প্রকৃত কথা কি জান, মনে ভক্তি চাই। বাহিরে পূজা পাঠ
হচ্ছে, কিন্তু অন্তরে ভক্তি নেই; দিনরাত নিজের শরীর
পােষণেরই চিন্তা—কিসে শরীরে আরাম পাব, এই চিন্তাতেই
মগ্ন—এরকম কৰ্ম্মে বিশেষ ফল হয় না। বাহিরে কর্মকাণ্ডে
নিযুক্ত না থাকলেও যদি অন্তরে ভক্তি থাকে, তাহলে
ধীরে ধীরে মুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া যায়। আমাদের
ত’ অন্তরে ভক্তি নেই, শুধু বাহিরে ভক্তি দেখাচ্ছি। তাতে
কি কাজ হবে ? সরলভাবে ভক্তির সহিত ভগবানের
উপাসনা করলে তবে মুক্তি পাওয়া যায়। আমরা ত’
তা’ করি ন', আমরা ভগবাকে আমাদের দাস ভেবে
নিয়ে—ক্ষুধা পেলে, “ভগবান্ অন্ন দাও,” ব্যারাম হ'লে,
“ভগবান্ রােগ মুক্ত কর, এই রকম ফরমা’জ করে
বিরক্ত করি ; তিনি যেন আমাদের কাছে কতই ঋণী,তাই
যখন যা দরকার হবে তাই দিতে বাধ্য।
[ ভগবান্ সত্য সত্যই ভক্তের যােগক্ষেম বহন করেন,-এ
জনৈক ভগবদ্ভক্তের কথা। ]
মাঃ সা । তা’তে দোষ কি? অৰ্জ্জুন ভগবানের শ্রেষ্ঠ
ভক্ত ছিলেন-সেই অৰ্জ্জুনও ত’ ভগবাকে নিজের সারথথ্য
নিযুক্ত করেছিলেন।
স্বা। হাঁ, অর্জুনের প্রেম হলে সে প্রকার করা যায়,
তাতে দোষ নেই ;-প্রেমের রাজ্যে সকলই সম্ভব ;
প্রেমাস্পদের কাছে যে কোন রকমের আবদার করা যায়।
প্রকৃত প্রেম যদি হয়, তবেই গীতায় যে আছে “যােগক্ষেমং

ষড়বিংশ পরিচ্ছেদ
বহাম্যহম” সে বাক্যটি ঠিক উপলব্ধি করা যায়।
কাছে ভগবান্ অন্নবস্ত্র প্রভৃতি সব কিছু নিয়ে পিছু পিছু
দৌড়ান। এক পণ্ডিত ও ভক্ত ব্রাহ্মণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার টীকা
লিখছিলেন। “তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যােগক্ষেমং বহাম্যহম্”
এই শ্লোকের টীকা লিখবার সময় তার মনে খটকা হ’ল
ভগবান্ সত্যই কি অন্নবস্ত্রাদি ভক্তের যা কিছু দরকার
ভক্তের জন্য চাকরের মত সেই সব বয়ে নিয়ে যা ?-
ভগবান্ এত হীনের মত কাজ করেন, একথা আমি লিখতে
পারব না। মনে মনে এই রকম ভােলপাড় করে টীকা
লেখা বন্ধ করে চাল ডাল কিনতে বাজারে গেলেন।
এদিকে ভক্তবৎসল ভগবান্ স্বয়ং ঐ ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ
করে চাল ডাল প্রভৃতি মাথায় করে এসে ব্রাহ্মণ-পত্নীকে
দিয়ে গেলেন। ব্রাহ্মণপত্নী জিনিষগুলি রেখে দিলেন। তার
পর কিছুক্ষণ পরে ব্রাহ্মণ বাজার থেকে আবশ্যকীয় জিনিষপত্র
কিনে বাড়ীতে এসে ব্রাহ্মণীকে সেগুলি রেখে দিতে
ব’ললেন। ব্রাহ্মণের আদেশ শুনে ব্রাহ্মণী বললেন,
“তুমি এইমাত্র এত জিনিষ পত্র দিয়ে গেলে, আমি
সেগুলো সব হাঁড়ী কলসীতে ভরে রেখেছি। । আবার
কেন এত জিনিষ নিয়ে এলে ? আর ত’ রাখবার পাত্র
নেই, এগুলি এখন ‘রাখি কোথা ?” ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীর কথা
শুনে অবাক হয়ে গেলেন, বললেন,-“সে কি ? কৈ
আমি ত’ এর আগে কিছু জিনিষ পত্র নিয়ে আসিনি।
তুমি কি বলছ?” ব্রাহ্মণ-পত্নী বললেন,—“তুমি এইমাত্র

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
নিজে জিনিষ পত্র নিয়ে এসে এখনই আবার ব’লছ ‘আমি
আনিনি’ এর কারণ কি আমি বুঝতে পারছি না।” ব্রাহ্মণ
তাই শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন,-“ব্যঙ্গ করবার
সময় নয়, ঠিক করে বল।
ঠিক করে বল—তুমি কোথা হতে এসব জিনিষ
পেলে”? ব্রাহ্মণী বললেন,—“আমি শপথ করে বলতে
পারি যে তুমিই এসব জিনিষ দিয়ে গেছ।” তখন ব্রাহ্মণের
হুস হ’ল। তিনি বুঝতে পারলেন, তাকে শিক্ষা দেবার জন্য
সত্য সত্যই ভগবান্ নিজে মাথায় করে ভক্তের বােঝা বয়ে
রেখে গেছেন। তারপর তিনি—“যােগক্ষেমং বহাম্যহম্”
এই শ্লোকটির যথাযথ টীকা লিখলেন।
হৃদয় যত কোমল হবে—-আপনাকে যত ছােট বলে
মনে করবে, ততই শান্তির অধিকারী হবে।
হতে পারে, সে তত উচ্চে আসন পায়। দেখ, ধূলা সব
চেয়ে ছােট, কিন্তু সে বাদসাহের মুকুটের উপর যেয়েও
বসে। নিজের মনে যদি কোন প্রকার হিংসা দ্বেষ না থাকে,
তবে জগতে কেহই তােমার প্রতি হিংসা দ্বেষ করবে না।
[ ভগবান্ নিষ্কপট ও নিরভিমানী ভক্তের দাস হয়ে
থাকেন। ]
দুইজন সন্ন্যাসী ও এক বৈরাগীর কথা।
দুজন সন্ন্যাসী রামেশ্বরে যাচ্ছিলেন। ৭৮ ক্রোশ পথ
হেঁটে তারা রাত্রে এক জায়গায় ধুনি জ্বালিয়ে পরস্পর বেদান্ত
আলােচনা কচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটা থালায়
পুরী, তরকারী, মােহনভােগ, দুধ প্রভৃতি সাজিয়ে এনে
যে যত ছােট

বড়বিংশ পরিচ্ছেদ
১২১
সাধুদের আহার করতে বললেন। সাধুরা বললেন, “তুমি
কে আগে তার পরিচয় দাও, তারপরে তােমার অনুগ্রহণ
করতে পারি, কাউকে না জেনে শুনে তার অনুগ্রহণ আমরা
করি না।” সে ব্যক্তি উত্তর করলেন, “আপনারা দ্বিধা
করবেন না, আমি নীচ জাতি নই, আমার অন্ন আপনারা
স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারেন ; অদূরেই আমার ঘর,
আপনারা ক্ষুধার্ত দেখে এই খাদ্য সামগ্রী নিয়ে এসেছি,
ভােজন করুন।” সাধুরা বাস্তবিকই ক্ষুধায় অত্যন্ত পীড়িত
হয়েছিল ; কাজেই আর কোন আপত্তি না করে সেই সকল
খাদ্যসামগ্রী ভােজন করলেন। লােকটি থালা দিয়ে
প্রস্থান করলেন। তার কিছুক্ষণ পরেই একটি প্রকাণ্ড বাঘ
এসে ধুনির কাছে উপস্থিত হল। সাধুদ্বয় বাঘকে বললেন,
‘দেখ, তাের সামনে দু’খানা রুটি রয়েছে, (অর্থাৎ ব্যাঘ্রের
খাদ্য দুইটি মনুষ্য-শরীর—সেই সাধুদ্বয়) ক্ষুধার্ত হয়ে
থাকিস্ ত খেয়ে নে, আর যদি ক্ষুধা না থাকে তাহলে চুপ
করে বসে থাক্।” বাঘ সাধুদের কথা শুনে চুপ করে ধুনির
কাছে বসে রইল। সাধুরা পূর্বের ন্যায় আলােচনা করতে
লাগলেন। আলােচনা শেষ হলে বাঘটি উঠে যেন সাধুদের
নমস্কার করে অদূরে এক বৈরাগী ধুনী করে বসেছিল, তার
কাছে গেল। বৈরাগী বাঘ এসেছে দেখে, তাকে লােহার
ছেকা দেবে এই মনে করে তার চিমটেটা ধুনিতে পােড়াতে
দিলে। বাঘ সেইখানে বসে রইল। তারপর চিমটেটা
আগুনে পুড়ে যেই লাল হ’লবৈরাগী সেই চিমটে নিয়ে

১২২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
।
যেই বাঘকে প্রহার করতে যাবে, বাঘ হঠাৎ বৈরাগীর
পিছনে গিয়ে তার ঘাড়টি ধরে ধুনির ভেতর ঠেসে ধরলে--
বৈরাগীর দাড়ি, চুল, সব পুড়ে গেল। (১) তারপর বাঘটা
সেখান থেকে চলে গেল। পরদিন তােরে সন্ন্যাসীদ্বয়
বৈরাগীটিকে জিজ্ঞাসা করলেন,—“কিহে রামজী! তােমার কি
হয়েছে। বৈরাগী বলল, “দেখ বাবা, রামজী কি করেছেন,
আমাকে ধুনিতে ঠেসে ধরেছিলেন, চুল দাড়ি সব পুড়ে
গিয়েছে।” সন্ন্যাসীদ্বয় বললেন,-“আমাদের কাছেও ত
তােমার রামজী এসেছিলেন, কিন্তু আমাদের কোনই অনিষ্ট
করেন নি, তুমি কি করেছিলে ঠিক করে বলত?” তখন
বৈরাগীটি যে বাঘকে চিমটে ছেকা দেবার সংকল্প করেছিল,
তা’ বললে। এখন বুঝতে পারলে, সন্ন্যাসী দু’জনের মনে
বাস্তবিক কোনও কপটতা ছিল না, তারা বেদান্তে যে এই
শরীরের মিথ্যা প্রতিপাদন করে, তাহা যেমন ঠিক ঠিক
উপলব্ধি করেছিলেন, সেইরূপ কাজের সময় আপনাদের
পাঞ্চভৌতিক দেহ দু’টি অকিঞ্চিৎকর জেনে বাঘের আহাৰ্য্য
বলে তাকে উপহার দিতে কুণ্ঠিত হন নি।
দিতে কুণ্ঠিত হন নি। বাঘও তাদের
কোনরূপ অনিষ্ট না করে শিষ্যের মত আদেশ পালন করলে ;
আর বৈরাগী দেহাভিমান ও কপটতা আশ্রয় করে মনে
বাঘের অনিষ্টসাধন করবার
করলে,
মনে
১) “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাং স্তথৈব ভজাম্যহম্।”
৪১১, গীতা,

সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ
১২৩
বস্তুতঃ সেই
সুতরাং তার সমুচিত ফল লাভ করলে।
অন্তর্যামীই মনুষ্যমূর্তি ধারণ করে ঐ সন্ন্যাসী দু’জনের
ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য থালায় করে অন্ন বহন করে দিয়েছিলেন।
(যেখানে সন্ন্যাসীরা ধুনি জ্বালা’য়ে বসেছিলেন, তার ৫৬
মাইলের মধ্যে লােকের বসবাস ছিল না। আবার তিনিই
বাঘের মূর্তি ধ’রে সন্ন্যাসীদের ও বৈরাগীকে পরীক্ষা করে
বৈরাগীর কপটাচারের যথােচিত শাস্তি দিলেন। প্রকৃত
প্রস্তাবে তাকে যে যে প্রকারে ভাবে তিনি তাকে সেই
প্রকারই ফলদান করেন। যে নিষ্কাম ও নিরভিমান হয়ে
তার উপাসনা করে, তিনি বাস্তবিকই তার দাস হয়ে থাকেন।
সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ
সমােহ সৰ্ব্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোহস্তি ন প্রিয়।
যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্ ।
৯২৯, গীতা।
হরিদ্বার, ১৮ই পৌষ, ১৩৩৩। রাত্রি ৭টা।
মহিমাদি পাঠান্তে শিষ্য জনৈক, মাদ্রাজী সাধু ও অন্যান্য
সকলে স্বামিজীর নিকট উপবিষ্ট আছেন।
[ ভগবান্ ন্যায়বান্।]
মাদ্রাজী সাধু। (স্বামিজীর প্রতি) স্বামিজী ! ভগবান
ন্যায়কারী অথবা অন্যায়কারী ?

১২৪
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
স্বামিজী। ভগবান, ন্যায়কারী, তাই সকল জীবকেই
তিনি চোখ, কাণ, নাক, মুখ, যার যা দরকার, দিয়েছেন ;
এই তঁার ন্যায়কারিতার প্রমাণ।
মাঃ সা। তবে কেহ দুঃখী, কেহ সুখী কেন ?
স্বা। তা” যার যেমন কর্ম সে সেই রকম ফলভােগ
করে থাকে। পাপের ফল দুঃখ, পুণ্যের ফল সুখ।
[ শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি যাকে ইচ্ছা ভগবান্ বলা যায়—দেহ
হ’তে আপনাকে পৃথক কর, দেখবে তুমিই সব।]
মাঃ সাধু। এক ব্যক্তি শিবের নাম জপ করতে করতে
হঠাৎ তার মুখ দিয়ে ‘কৃষ্ণ” নাম উচ্চারণ হতে লাগল।
-এর অর্থ কি ? শিবই ত’ ভগবান্।
স্বা। যাকে ইচ্ছা ভগবান্ বলতে পার।
মাং সাধু। না, আমি ত’ শিবকেই ভগবান বলে জানি।
স্বা। তা হােক্! তুমি শিব, তুমিই ভগবান। আপনাকে
দেহ হইতে পৃথক কৰে ফেল, দেখবে তুমিই সব।*
মাঃ সাধু। দেহ হতে পৃথক না হলে জ্ঞান হয় না?
বশিষ্ঠাদি তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিদেরও ত’ দেহ ছিল! তবে কি তারা
অজ্ঞানী ছিলেন ?
[ দেহ হতে আপনাকে পৃথক করার অর্থ দেহের মায়া
পরিত্যাগ করা,-দেহ ত্যাগ করা নয় ]
স্বদেহ হইতে আত্মা বিলক্ষণ ধারণা হইলে এ ধারণাও অসে
যে, এইরূপ সব দেহ হইতে সব দেহী পৃথক্‌, সব দেহে একই দেহী তাই
দেখে সেই সব। “দেহী নিত্যমধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্য ভারত।” গীতা

সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ ১২৫ সেই কন্যার স্বা। দূর, তােমার কিছু বুদ্ধি নেই দেখছি! দেহ হতে পৃথক হওয়ার অর্থ দেহ পরিত্যাগ করা নয়, দেহের মায়া পরি- ত্যাগ করা। এক ব্যক্তির একটি কন্যা ছিল। পূৰ্ব্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ দেশ থেকে নানা লােক পণিগ্রহণ করতে এল। কিন্তু কন্যার পিতা তাদের কাউকেও পছন্দ করলেন না। তারপর অপর এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্বন্ধ স্থির হ’লআর বাগদান হয়ে গেল। কিছুকাল পরে এক- দিন কন্যাটি পিতার কোলে বসে আছে, এমন সময় তিনজন লােক এসে কন্যার বিবাহের কথা উত্থাপন করল। কন্যার পিতা বললেন, “আমার কন্যাদান হয়ে গেছে।” তারা বলল, “সে কি ? মিছে কথা ; কন্যা আপনার কোলে বসে, আর আপনি বলছেন, ‘কন্যাদান হয়ে গেছে ? এখন বলত কন্যার পিতা কি মিছে কথা বলছেন? মাঃ সাধু। না; কারণ পিতা যখন বাগদান করেছেন, তখন কন্যাদান হয়ে গেছে। স্বা। জাগ্রৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই অবস্থায় মিথ্যা এবং চতুর্থ তুরীয় অবস্থাই সত্য। এখানে যে প্রকার কন্যার পিতার কন্যার উপর কোন দাবী বা অধিকার নাই, কিন্তু কন্যার সঙ্গে খেলছে, তদ্রুপ এই শরীরের মায়া (শরীরের উপর দাবী বা অধিকার) ত্যাগ করে মহাত্মার এই শরীর নিয়ে খেলা করে থাকেন। ইহাকেই বলে ‘দেহ হ'তে পৃথক হওয়া। আর দেখ, এই দেহ ত’ পঞ্চভূতের, তােমার নয়, তবে তুমি এর মায়া পরিত্যাগ করতে পার না কেন?

১২৬
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
;
বৈরাগ্য ও কঠোর সাধনার দ্বারা দেহের মায়া ত্যাগ
করা যাইতে পারে ।
সাধু কৃষ্ণাশ্রম ও ভূমাশ্রম।
মাঃ সা। কি উপায়ে দেহের মায়া ত্যাগ করা যায় ?
স্বা। তীব্র বৈরাগ্য ও কঠোর সাধনের দ্বারা দেহের
'মায়া ত্যাগ করা যায়।
মা। ধরালীতে (গঙ্গোত্তরী হইতে ১২ মাইল নীচে )
কৃষ্ণাশ্রম ও ভূমাশ্রম নামে দুটী সাধু আছেন ; তারা খুব
কঠোর তপস্যা করছেন ।
স্বা। হাঁ, তাদের মনােবৃত্তি উপরে উঠে গিয়েছে, লেংটা
থাকে, শীতে বরফের উপর দিয়ে খালি পায়ে চলে যায়,
—দেহের প্রতি আদৌ লক্ষ্য নাই।
মাঃ সা। তা’ বলতে পারি না, দেহ থেকে পৃথক হতে
পেরেছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। ধরালীর পাণ্ডারা
ধরালীর অপর পার দিয়ে গঙ্গোত্তরী যাবার জন্য একটা রাস্তা
প্রস্তুত করা যােক বলে চিহিরীর রাজার কাছে এক দরখাস্ত
করবে মনে করে, সেখানকার সাধুদের দস্তখত নিয়েছিল।
আমি তখন সেখানে ছিলাম। আমাকে তারা দস্তখত করতে
বলেছিল। দস্তখত করলে তাদের যদি উপকার হয়, এই
ভূমাশ্রম স্বামিজী ১৩৩৫ সনের ভাদ্রমাসে কাশ্মীর অমরনাথ
দর্শন করিয়া প্রত্যাবর্তন করিবার সময় তুষারপাতে দেহত্যাগ
করিয়াছেন।

সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ
১২৭
ভেবে আমি দস্তখত করেছিলাম। কিন্তু কৃষ্ণাশ্রমকে দস্তখত
করতে বলায় সে দস্তখত করলে না। অধিকন্তু, ‘আমাকে
এখানেও বিরক্ত করছ”, এই বলে সেখান থেকে গঙ্গোত্তরীর
দিকে চলে গেল। আমি শরীর থেকে পৃথক’ এ রকম জ্ঞান
যদি হয়ে থাকে তবে সে দস্তখত করতে আপত্তি করলে
কেন? সে ত’ তাহলে নিরাকার ব্ৰহ্মস্বরূপ হয়ে গেছে, তবে
আর দস্তখত করতে তার কি ক্ষতি বৃদ্ধি হতে পারে ?
[ আত্মারামের সকলই শােভা পায় আত্মারামের বিধি
নিষেধ নাই ]
ভাই, এ রকম বলা তােমার উচিত নয়।
মহাত্মাদের খেলা বােঝা কঠিন। কৃষ্ণাশ্রম খুব উন্নত, তার
কাৰ্যকলাপে দোষ দর্শন করা আমাদের মূখ । মহাত্মারা
যাই করুন না কেন, তাই তঁাদের শােভা পায়। রাজার
পােষাক পরে রাজগদীতে বসলেও যেমন শােভা পায়, আবার
ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে ভিক্ষে করে বেড়ালেও তাদের তেমনি
শােভা পায়। আত্মারাম হতে পারলে তার পক্ষে কোন
বিধি নিষেধ থাকে না; তঁার মাহাত্ম বেদ, ভগবান, ব্রহ্মা,
বিষ্ণু, শিব পৰ্যন্তও বর্ণনা করতে পারেন না, আমি তুমি ত’
কোন ছার।
[ হরিদ্বারের স্বাধুর আশ্চৰ্য্য মাহাত্ম—গঙ্গা ও যমুনার
সাধুর নিকট আগমন ও পদরজে পাপ প্রক্ষালন ]
এই হরিদ্বারে তখন জঙ্গল ছিল, বড় বড় বাঘ ভাল্লুক
থাকত। তখন ৪৫ শত লােক একত্র হয়ে বন্দুক প্রভৃতি
L

১২৮
স্বামী-শিষ্য প্রস
অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে হরিদ্বারে স্নান করতে আসত। সেই সময়,
এক রাজা অনেক লোেক সঙ্গে নিয়ে স্নান করতে এসে বি-
কেশ্বর শিবের কাছে আজ্ঞা করেছিলেন। তারই কাছে এক
পাহাড়ের গুহায় এক সাধু তপস্যা করছিলেন। সাধুকে
দেখে তার কাছে গিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে করতে
জিজ্ঞাসা করলেন,—“মহারাজ, আপনি বােধ হয় খুব
ভােরে গঙ্গাস্নান করে এসেছেন?” সাধু উত্তর করলেন,
“না বৎস! আমি প্রত্যহ গঙ্গা স্নান করি না ; কোন বিশেষ
পৰ্বেপলক্ষে ইচ্ছা হয় ত’ করে থাকি। তবে এখানে
ব’সেই রােজ আমার গঙ্গাদর্শন হয়ে থাকে।” সেই কথা
শুনে সাধুর উপর রাজার একটু অশ্রদ্ধা এল ; তিনি ভাবলেন,
‘আমরা এতদূর থেকে কত কষ্ট করে গঙ্গাস্নান করতে এসেছি,
আর এই ব্যক্তি গঙ্গার কাছে থেকেও গঙ্গাস্নান করে না,
এ কি রকম? সাধু রাজরি মনােগত ভাব বুঝতে পেরে
রাজাকে বললেন,—“তােমরা একটু অপেক্ষা কর, আমি
শৌচ করে আসছি।” সাধু চলে গেলে রাজা দেখলেন
একটি শ্যাম ও একটি লাল রংএর গরু ঐ গুহার কাছে এসে
ধূলােয় গড়াগড়ি দিতে লাগল। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দেবার
পর দু’টি গরুরই রং সাদা হয়ে গেল। রাজা দেখে অবাক
হয়ে গেলেন, কারণ কি কিছু বুঝতে পারলেন না।
তারপর সাধু যখন ফিরে এলেন, রাজা তাকে ঐ গরুদের
বিষয় উল্লেখ করে তাদের রং সাদা হয়ে যাওয়ার কারণ
জিজ্ঞাসা করলেন। সাধু বললেন,-“ঐ গরুদেরই

১২৯
সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ
জিজ্ঞাসা করুন ; ওরা সব বলবে”। গরু দু’টি ইতিমধ্যে
অনেক দূর চলে গিয়েছিল। রাজা দৌড়ে তাদের কাছে
গিয়ে, তারা কি করে সাদা হ’ল জিজ্ঞাসা করলেন।
গরু দুটির মধ্যে একটি উত্তর করলে,-“বৎস, আমি গঙ্গা,
আর ইনি যমুনা। পাপীরা আমাদের জলে স্নান করে বলে
তাদের পাপে আমার শরীর শ্যামবর্ণ হয়ে যায়, আর যমুনার
শরীর লালবর্ণ হয়; সেই জন্যে প্রত্যহ আমরা উভয়ে এখানে
এসে একবার ঐ সাধুর চরণ-ধুলায় লুষ্ঠিত হই, তাতেই
আমাদের সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। তাইতে আমাদের রং
সাদা হয়ে যায়।” গঙ্গার এই কথা শুনে রাজা আরও
অবাক হয়ে গেলেন। আর সাধুর আশ্চৰ্য্য মাহাত্ম্য বুঝতে
পারলেন ও তার প্রতি খুব শ্রদ্ধা দেখাতে লাগলেন।
[ গঙ্গা সকলের পাপ গ্রহণ করেন, সাধুগণ গঙ্গার পাপ
বহন করেন, সাধুদিগের পাপ নাগ্নিতে ভস্মীভূত হয়।]
বেটা! সাধুর মাহাত্ম্য বুঝা বড় কঠিন। ভগীরথ যখন
পৃথিবীতে গঙ্গা নিয়ে এলেন তখন গঙ্গা বলেছিলেন,—“যত
পাপী আমার জলে স্নান করবে; সুতরাং তাদের পাপ আমাকে
গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু আমার পাপ কে গ্রহণ করবে ?”
তখন সাধুরাই গঙ্গাস্নান করবার ছলে গঙ্গার পাপ গ্রহণ
করতে রাজী হয়েছিলেন। সেই সময় গঙ্গা সাধুদের জিজ্ঞাসা
করেছিলেন,-“আপনারা আমার পাপগ্রহণ করবেন বটে,
কিন্তু আপনাদের পােপ গ্রহণ করবে কে?” তাতে
সাধুরা বললেন, “আমাদের পাপ জ্ঞানাগ্নিতে ভস্ম হয়ে

১৩০
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
যাবে,
তা আর কাহারও গ্রহণ করতে হবে না ।
‘জ্ঞানানিদগ্ধকৰ্ম্মাণ’!”
[ ইষ্টনিষ্ঠা রাখিলে সাধু হওয়া যায়।]
মাঃ সা। ঠিক ঠিক সাধু হবার উপায় কি ?
স্বা। ইষ্টনিষ্ঠা রাখতে হয়, তবেই সাধু হওয়া যায়।
রাম তার ইষ্টদেবের পূজার একটি ফুল কম হওয়ায় নিজের
চক্ষু দিতে উদ্যত হয়েছিলেন ; আর আমরা পূজা করার সময়
আমাদের ২৪টি ফুল কম হলে বলি,-“তাতে আর কি
হয়েছে।
মাঃ সা। এ রকম ভক্তি ত্রেতাযুগেই সম্ভব, কলিতে হতে
পারে না।
কেন সম্ভব নয়। কবীর ত’ এই কলিকালেরই
লােক। তিনি ভগবানের পরম ভক্ত ছিলেন। হীনজাতি-সস্তৃত
পরম ভক্তকে সকলে শ্রদ্ধা করে বলে, ব্রাহ্মণগণ তাঁর প্রতি
ঈর্ষাযুক্ত হয়ে তাকে লােকের কাছে অপদস্থ করবে বলে
কবীরকে কিছু না বলে একদিন গ্রামের লােককে ‘কবীরের
বাড়ী কাল নিমন্ত্রণ’ বলে জানিয়ে এল।
[ ভক্ত কবীরের গৃহে ভগবানের আগমন ও
কবীরের লজ্জানিবারণ ]।
তাই শুনে পরদিন গ্রামবাসিগণ অভুক্ত হয়ে কবীরের
বাড়ী গিয়ে উপস্থিত হল। কবীর তখন বাজারে কাপড়
বেঁচিতেছিলেন। তিনি ব্যাপারটা কি বুঝতে পেরে
খাবার দাবার কিছু নেই কি করে এত লােককে খাওয়াবেন,
;

সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ ১৩১ • পরে এই ভেবে লােকলজ্জার ভয়ে একটা ঝোপের ভিতর গিয়ে লুকিয়ে রইলেন। এদিকে ভক্তবৎসল ভগবান্ কবীরের দুরবস্থা দেখে, কবীরের মূর্তি ধারণ করে এসে সকলকে খুব পরিতৃপ্ত করে ভােজন করালেন ও দক্ষিণা দিলেন সকলে আপন আপন বাড়ীতে চলে গেলেন। ভগবান্ খুজে খুজে কবীরকে একটা কাটার ঝােপের ভিতরে দেখতে পেলেন ; সেখান থেকে কবীরকে নিয়ে এসে দুজনে একত্র আহার করলেন। [কলিযুগ মাহাত্ম-কলিযুগে ভগবান্ লাভ করা অল্প আয়াসসাধ্য। ] কলিতেই ভগবান্ লাভ করা সহজ। কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জান্বার উদ্দেশ্যে ব্যাসদেবের কাছে কতিপয় ঋষি এসে উপস্থিত হলেন। ব্যাসদেব তখন নদীতে স্নান করতে নেমেছেন। ঋষিরা নদীতীরে দাড়িয়ে রইলেন। ব্যাসদেব তিনটি ডুব দিলেন। প্রথম ডুব দিয়ে উঠে বললেন, “কলি ধন্য ”। দ্বিতীয় ডুব দিয়ে উঠে বললেন, “শূদ্ৰ ধন্য”। তৃতীয় ডুব দিয়ে উঠে বললেন, “নাম ধন্য”। ঋষিরা তখন ব্যাসদেবকে তঁার ঐ তিনটি উক্তির অর্থ কি জিজ্ঞাসা করায় ব্যাসদেব বললেন,-“কলি ধন্য’ অর্থাৎ অন্যান্য যুগে এক লক্ষ বৎসর সাধনা ক'রে যা হয়, কলিকালে ১০ঘন্টায় তাই হবে। শূদ্ৰ ধন্য’ এর অর্থ এই যে, কলিকালে শূদ্রদের পূজা হবে। ‘নাম ধন্য’ এর অর্থ এই যে, কলিকালে যাগ- যজ্ঞ না করেও কেবলমাত্র নাম করলেই সকল উদ্দেশ্য ১৩২ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ ; পূর্ণ হবে।” ঋষিরা বললেন,-“আমরা যে সকল প্রশ্ন করব মনে করেছিলাম, সে গুলির উত্তর পেয়েছি। আমরা কলির জীবের মঙ্গল লাভের প্রকৃষ্ট উপায় কি তাই জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলাম ; এখন বুঝলাম কলিকালে একমাত্র নামই সার—নামৈব নামৈব নামৈব কেবলম্।” মাঃ সা। পুরাণে ভক্তির কথা আছে। পুরাণ না প'ড়ে খালি বেদান্ত পড়লে শুফজ্ঞান হয়। শুষ্ক জ্ঞানীকে চণ্ডালবৎ পরিত্যাগ করবে। (১) তারা নিজেকেও ঠকায়, অন্যেরও সর্বনাশ সাধন করে। তারা “ব্ৰহ্মবার্তায়াং কুশলাঃ বিষয়ানুরাগিনঃ।” অর্থাৎ বেদান্ত- চর্চায় খুব নিপুণ বটে, কিন্তু বিষয়াসক্ত। অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ। শান্তেঃ সমং তপাে নাস্তি সন্তোষান্ন পরং সুখম্। তৃষ্ণায়া ন পরে ব্যাধিন ধৰ্ম্মো দয়ায়াঃ পর। হরিদ্বার ২৭শে পৌষ, ১৩৩৪, রাত্রি ৭টা। স্বামী মুকুন্দগিরি ও রণজিৎ সিংহ [ কে বা দরিদ্রো হি—বিশালতৃষ্ণঃ।] আরতি ও মহিমুস্তবাদি পাঠান্তে শিষ্য যােগেশবাবু (১) যন্ত্রাস্তি ভােগবাহুল্য তত্র মােস্য ক। কথা। সাংসারিক খাসক্ত ব্ৰহ্মচেতাহস্মি বাদিন। কর্মব্রহ্মোভয়ভ্রষ্টং তং ত্যজেদন্ত্যজ যথা।

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
১৩৩
f
প্রভৃতি স্বামিজীর নিকট বসিয়া আছেন। নানা প্রসঙ্গের
পর স্বামিজী মহারাজ বলিলেন –
স্বা। তখন চণ্ডীর পাহাড়ে মুকুন্দগিরি নামে এক
জন সাধু থাকতেন। পাঞ্জাবের রণজিৎ সিং একদিন এক
থালা মােহর, কিছু ফল ও বস্ত্রাদি উপহার নিয়ে মুকুন্দ
গিরিজীকে দর্শন করতে এলেন।
রাজা রণজিৎ সিংয়ের
উপহারের জিনিষগুলি দেখে মুকুন্দগিরিজী রণজিৎ সিংকে
বললেন,—“বেশ ভালই হয়েছে। ঠাণ্ডা লাগলে বস্ত্রগুলি
গায়ে দেওয়া যাবে, ক্ষুধা পেলে ফলগুলি খাওয়া যাবে,
কিন্তু মােহরগুলি দিয়ে কি করব ? আচ্ছা, ভাই।
আমিত’ কোথাও গেলে একটা না একটা জিনিষ ভুলে
ফেলে যাই; আর তুমি এতবড় রাজ্যটা কি করে চালাচ্ছ।”
রণজিৎ সিং বললেন,-“এ আর কি কষ্ট! আমি যদি
বিলাতটাও আমার শাসনাধীনে আনতে পারি, তাহলে
বুদ্ধিপ্রভাবে বিলাতটাও সুচারুরূপে শাসন করতে পারি।”
সেই কথা শুনে মুকুন্দগিরিজী বললেন,-“ওঃ! তােমার
এখনও এত লালসা রয়েছে ! তাহলে তােমার মত দরিদ্র
আর কে আছে? এ মােহরগুলি তােমারই প্রাপ্য।”
এই বলে মুকুন্দগিরিজী মােহরগুলি রণজিৎ সিংকে প্রত্যর্পণ
করলেন। রণজিৎ সিং সেই অর্থে ঐ চণ্ডীদেবীর মন্দির
তৈয়ারী করলেন। রণজিৎ সিং অত্যন্ত সাধুভক্ত ছিলেন।
* হরিদ্বারে গঙ্গার অপর পারে এক পাহাড়ের উপর চণ্ডীদেবীর
মন্দির আছে, এইজন্য লােকে ঐ পাহাড়কে চণ্ডীর পাহাড় বলে।

১৩৪ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ গৈরিক কাপড় পরা লােক দেখলেই তিনি প্রণাম করতেন। রণজিৎ সিংয়ের গৈরিক কাপড় পরা লোেক মাত্রের উপর এই রকম অচলা ভক্তি দেখে, একদিন একটা লােক একটা গাধার গায়ে গেরুয়া কাপড় বেঁধে তাঁর কাছে নিয়ে গেল। রণজিৎ সিং সেইটাকেও প্রণাম করলেন। যােগেশ। রণজিৎ খুব শূর-বীর ছিলেন ? স্বা। হাঁ, তাঁর সেনাপতি হরিসিংয়ের নামে এখনও কাবুল ও পেশােয়ারের লোেক শিহরিয়া উঠে। তৎপরে নানা প্রসঙ্গের পর স্বামিজী পুনরায় বলিতে লাগিলেন, স্বা। আমিও রােজ ১২১৪ মাইল ঘুরে ঘুরে আলেক ॥ মেজে স্বহস্তে পাক করে সাধুদের খাইয়েছি। যােগেশ। এত কষ্ট করার কি দরকার ? কেন, এই শরীরটার দ্বারা যত কাজ নেওয়া যায়, ততই ভাল। শরীরের প্রতি সর্বদা বীতস্পৃহ থাকতে হয়। শরীরটাকে যত কম আরামে রাখবে,শরীরটা তত সুস্থ থাকবে ও আত্মলাভের উপযােগী হবে। অলস ব্যক্তি দ্বারা আত্ম- লাভ হয় না। ৯ সান্ন্যাসীদের মধ্যে এক সম্প্রদায় ‘আলেক’ শব্দ উচ্চারণ করিয়া দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিয়া ক্ষুন্নিবৃত্তি করে। আলেক শব্দটি পরমার্থ শব্দবাচ্য। ক আলস্যং হি মনুষ্যাণাং শরীরন্থে মহা রিপুঃ। নাস্তাদম-সমাে বন্ধুঃ কুৰ্ব্বাণাে নাবসীদতি।

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
১৩৫
যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।
প্রেতাত্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ ।
১৭৪, গীতা
{ কল্পনাদ্বারাই অনেক সময় ভূতপ্রেতাদির সৃষ্টি হয়। ]
হরিদ্বার, ১লা মাঘ, ১৩৩৪, রাত্রি ৭টা।
মহিমাদি পাঠের পর
কয়েকদিন হইল হরিদ্বারে মােহান্ত কৰ্ত্তার সিংয়ের আশ্রমে
পূজারির গৃহে অগ্নিসংযােগ হওয়ায় পূজারির শরীর দগ্ধ
হইয়াছিল। তিন দিবস হাসপাতালে অবস্থিতির পর
উহার মৃত্যু হইয়াছে। শুনা গেল, কৰ্ত্তার সিংয়ের পূজারির
মৃতদেহ বাদ্যসহকারে শ্মশানঘাটে নীত হইতেছে দেখিয়া
হরিদ্বারের হাসপাতালের কম্পাউণ্ডারের বালক-পুত্র গৃহে
ফিরিয়া তাহার মাতাকে ঐ শবের শ্মশান-যাত্রার কথা বলিয়া
তৎক্ষণাৎ মূচ্ছিত হইয়া পড়ে। পরে মূচ্ছ। ভঙ্গ হয় বটে,
কিন্তু তাহার পরেও তিন চারি দিন যাবৎ আহার করিতে
বসিলেই তাহার মূচ্ছা হইতেছিল। কম্পাউণ্ডারের স্ত্রীর
আশঙ্কা হইল যে পুত্রের শরীরে প্রেতের আবেশ হইয়াছে।
কম্পাউণ্ডার কিন্তু প্রেতের অস্তিত্ব বা আবেশ মানিতে প্রস্তুত
অদ্য কম্পাউণ্ডার মহাশয় স্বামিজীর নিকট আসিয়া
পুত্রের বিষয় আদ্যোপান্ত কীৰ্ত্তন করিলেন।
সকল কথা
শ্রবণ করিয়া স্বামিজী বলিলেন :-
স্বা। ভূতের ভয় করাে না, মনই যত অনর্থের
মূল
নন।

স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
ধর, একজনের ব্যারাম হয়েছে। ডাক্তার মােয়র
ব’ললেন, ‘কফ খুব বেড়ে গেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে কিছু
ঔষধের ব্যবস্থা করলেন। তারপর ওঝারা এলেন; তারা
বললেন, মানুষটাকে ভূতে পেয়েছে, ভূত ছাড়াবার জন্য
অমুক অমুক জিনিষ চাই। এদিকে আবার জ্যোতিষীরা
ব’ললেন,—“নিশ্চয় কোন গ্রহ কূপিত হয়েছেন, ৭০ বছর
থাকবে। তার মধ্যে একজন বললেন, ‘গ্রহ-শান্তির জন্য
একটা কাল ঘােড় ও কাল কম্বলের দরকার। রােগীর আত্মীয়
সব জিনিষ এনে দিলেন, কিন্তু রােগের কিছুই উপশম হ’ল
; তখন আর একজন জ্যোতিষী বললেন, না হে, না, একটা
মহিষ, একটা কাল পাঁঠা ও কাল কাল কতকগুলি কম্বল
হলে ভাল হবে। ফের জ্যোতিষী মহাশয়ের হুকুম মত সব
জিনিষ আনা হল। কিন্তু ব্যারাম পূর্ববৎ রহিল। তৃতীয়
জ্যোতিষী ভাবলেন, তাইত সকলেই ত’ একটা একটা কথা
বলে কিছু না কিছু আদায় করলে, আমি বা ছাড়ি কেন?
তিনি অনেক ভেবে চিন্তে শেষকালে বললেন, “ওসব কিছু
নয়। কাল পাঁঠা ও মুরগী হলে নিশ্চয়ই সারবে।” বেগতিক
দেখে রােগী তখন বললেন, “বাপু, গ্রহ ত, ৭০ বছর পরে
আমার সর্বনাশ করবে, তােমরা দেখছি দু’দিনের মধ্যেই
আমায় পথে দাড় করে দিতে চাও।”
এই প্রসঙ্গের পর স্বামিজী শিষ্যকে কিঞ্চিৎ ভস্ম আনিয়া
“ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধন। উর্বারুকমিব বন্ধনা-
তোমুক্ষীয়মামৃতাৎ।” এই মন্ত্র পড়িয়া কম্পাউণ্ডারকে দিতে

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
১৩৭
।
;
আদেশ করিলেন। শিষ্য ঐ ভস্ম লইয়া স্বামিজীর সম্মুখে স্থাপন
করিলেন। জনৈক সন্ন্যাসীর অনুরােধে স্বামিজী ঐ ভম্মে
হস্তস্থাপন পূৰ্ব্বক উক্ত মন্ত্র পাঠ করিয়া কম্পাউণ্ডারের হস্তে
প্রদান পূর্বক বলিলেন, “তােমার ঔষধে তােমার স্ত্রীর বিশ্বাস
নাই; এই ভস্ম নিয়ে যাও,এতে বিশ্বাস হবে—ছেলের মাথায়
লাগিয়ে দিলেই ব্যারাম সেরে যাবে। কি জান, বিশ্বাস
হলে কিছুই হয় না। যেখানে বিশ্বাস হবে, সেখানে
ফল হবেই। গুরু বললেন-“তুমি ব্ৰহ্ম। শিষ্য গুরুর
বাক্যে বিশ্বাস করে দিনরাত ‘আমি ব্ৰহ্ম এই ভাবে ,
বিভাের হয়ে গেল। যতই শাস্ত্র পড়ক—“আমি ব্ৰহ্ম”
ভাব আর ছুটে না; বস, জীবন্মুক্ত হয়ে গেল! শিশুর হাতের
আঙ্গুল কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে—শিশু কঁদছে।
ফু দিয়ে বললেন,—“যা, মন্ত্র পড়ে ফু দিলাম, তাের
ব্যথা সেরে গেছে।” শিশুর মাতৃবাক্যে বিশ্বাস হ’ল
আনমনে খেলতে গেল, ব্যথা নাই। সঙ্গীরা বললে,
“ওরে, তাের হাত থেকে রক্ত পড়ছে।” কিন্তু শিশু বললে,
“যা, তােয়া মিথ্যা বলছিস, মা বলেছেন সেরে গেছে”।
শিশুর বিশ্বাসের বলে বস্তুতঃই ব্যথা সেরে গেল। ভূত প্রেত
ওসব মনের দ্বারাই অনেক সময় সৃষ্টি হয়। আমি তখন
একটা জঙ্গলে ; রােজ এক ব্যক্তি আমাকে দুধ দিয়ে যেত।
—পথে শ্মশান পড়ে। একদিন শ্মশানে একটা মৃতদেহ দেখে
লােকটি আমাকে বললে,“স্বামিজী ! আজ ভূতের হাত
থেকে বড় বেঁচেছি।” আমি বললেম, “আচ্ছা, ভাই! এই
মা একটি

১৩৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
তাওয়ার নীচের কালী হাতের পাতায় মেখে যাও ; যদি
ভূত আসে, তবে জোরে তার দুই গালে দুই চড় দিও, তাহলে
এই কালি তার গালে লাগবে ; কোন্ ভূতটি তােমায় কষ্ট
দিচ্ছিল জানতে পেরে আমি তার শাস্তির বিধান করব।”
ঐ লােকটী শ্মশানে গিয়ে তাই কলে। তারপর
আমার নিকটে এসে বললে,—“স্বামিজী ! আজ ভূতকে
এমন করে চড় মেরেছি যে তার অনেকদিন মনে থাকবে।”
আমি লােকটিকে একখানা আরসিতে মুখ দেখতে বলে
বললাম, “দেখত, কালি দেখছি তাের মুখেই লেগেছে, তবে
তুইই ভূত। বস্তুতঃ মনের কল্পনা দ্বারাই অনেক সময় ভূতের
সৃষ্টি হয়।
কম্পা। তবে কি ভূত প্রেত বস্তুতঃই নাই ?
[ ভূত-প্রেতাদি বাস্তবিক আছে—ভূতযােনি ও রুদ্রাক্ষ ]
স্বা। না বেটা আছে। একটি মুসলমান সিপাহীর ভাই
সিপাহীর সঙ্গে দেখা করবার মানসে আসবাব নিয়ে জঙ্গল
দিয়ে যাচ্ছিল—জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় খুব নাচ, তামাসা
ও বাদ্যাদি হচ্ছিল। সিপাহীর ভাই সকলকে জিজ্ঞাসা
করলে,-“এখানে কি হচ্ছে ?” উত্তর হইল,-“আমরা সব ভূত।
আজ আমাদের বড় আনন্দ, আমাদের মধ্যে একজন পেতনী
আছে, তার আজ বিয়ে হবে। একটি লােকের আজ মৃত্যু
হবে, মৃত্যুর পর সে ভূত হবে—তার সঙ্গে এই পেতনীর বিয়ে
হবে।” সিপাহীর ভাই বলল,“আচ্ছা; লােকটি কে? তার
বাড়ী কোথায় ?” উত্তর হল,—অমুক ব্যক্তি, অমুক

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
১৩৯
অমুক তহসিল,-ইত্যাদি। লােকটির যে পরিচয় পাওয়া
গেল সে তার ভায়েরই, সুতরাং তার ভায়েরই আসন্নমৃত্যু।
লােকটী তাই শুনে কালবিলম্ব না করে তার ভায়ের কাছে
উপস্থিত হ'ল। সিপাহী ভাইকে যেই চেয়ে দেখল,
তৎক্ষণাৎ এক বন্দুকের গুলিতে তার মৃত্যু হ’ল। অৰ্ধশায়িত
অবস্থায় দেহটি একটা গাছে ঠেকিয়ে রাখা হল। অন্যান্য
সিপাহীরা তার কবর দেবে মনে মনে স্থির কল্লে ; সিপাহীর
ভাই বিষন্ন মনে বাড়ী চলে গেল। পথে উক্ত জঙ্গলে
আবার সেই ভূতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল ; কিন্তু এবার দেখলে
তাদের আর সে আনন্দ নেই, সকলেই নিরুৎসাহ ভাবে
বসে আছে। তাই দেখে সিপাহীর ভাই বললে,-“কি হে
তােমাদের এমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন ?” ভূতেরা বললে,
“দেখ, যে লােকটির মরে ভূত হয়ে আমাদের পেতনীর সঙ্গে
বিয়ের কথা ছিল, সে লােকটি মরবার সময় যে গাছের
গােড়ায় শুয়ে ছিল, সেইখানে রুদ্রাক্ষের আধখানা আছে ।
সেই রুদ্রাক্ষের স্পর্শে শিবদূতেরা এসে সেই লােকটিকে
শিবলােকে নিয়ে গেছে—কাজেই আমাদের পেতনীর আর
বিয়ে হ’ল না।” এই কথা শুনে সিপাহীর ভাই আশ্চর্য হয়ে
গেল এবং কথাটা সত্য কিনা পরীক্ষা করবার জন্য পুনরায়
মৃত ভ্রাতার নিকটে গিয়ে দেখলে বাস্তবিকই সেই গাছটির
নীচে রুদ্রাক্ষের আধখানা আছে। সে ঘরে এসে স্ত্রী, পুত্র,
মােরগ, কুকুর যে যেখানে ছিল সকলের গলায় রুদ্রাক্ষ বেঁধে
দিল। সিপাহী ছিল মুসলমান; মুসলমান সমাজ তার এই

১৪০
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
কাণ্ড দেখে তাকে একঘরে করল। কিন্তু সে বললে যে, সে
একঘরে হতেও রাজী আছে, রুদ্রাক্ষের মাহাত্ম্য সে প্রত্যক্ষ
দেখেছে, সে তা অস্বীকার করতে নারাজ।
জনৈক হিন্দুস্থানী সন্ন্যাসী বলিলেন, “কাশীতেও নাকি
অনেক ভূত আছে ?”
স্বা। হাঁ, সেখানে লাট-ভৈরব আছেন, তিনি কাশীর
ভূতদের শাস্তি দেবার জন্য অন্যান্য যােনিতে পাঠান।
পাপের ফল ভুগতেই হবে। কাশীতে মর আর যেখানেই
মর, পাপ, পুণ্য, বাসনা, কামনা, সঙ্গে সঙ্গে যায়—তার ফল
ভােগ অনিবাৰ্য। কাশীতে মরলেই যদি মুক্তি হয়, দুশ্চরিত্র
ও সাধুর গতি যদি একই হয়, তাহলে সৃষ্টির নিয়ম বদলে
যায়, তাহলে আর কেউ সাধন ভজন করত না। “কাশ্যাং
মরণান্মুক্তিঃ”—এখানে কাশঃ অর্থ ব্ৰহ্মতত্ত্বপ্রকাশঃ, অর্থাৎ
যে অবস্থায় ব্ৰহ্মতত্ত্ব প্রকাশিত হয়, সেই অবস্থায় দেহত্যাগ
হলে মুক্তিলাভ হয়। সাধনবলে এই ব্ৰহ্মতত্ত্বের প্রকাশ
হয়।
হরিদ্বার, ১৪ই মাঘ, ১৩৩৪, রাত্রি ৭টা।
[ অজ্ঞানী সত্যবস্তু (আত্মা) মিথ্যা বলিয়া মনে করে
এবং মিথ্যাবস্তু (জগৎ) সত্য বলিয়া মনে করে। ']
“বাচারম্ভনং বিকারনামধেয়ং মৃত্তিকা এব সত্যং।
বয়া ব্যাপ্তমিদং বিশ্বং ত্বয়ি প্রােডং যথার্থতঃ।
শুদ্ধ-বৃদ্ধ-স্বরূপং মাগমঃ ক্ষুদ্রচিত্ততা।”—উপনিষৎ "
Ak ৫ * *

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
১৪১
স্তবাদি পাঠান্তে শিষ্য, উত্তর কাশীনিবাসী স্বামী
মনীষানন্দ গিরি প্রভৃতির সহিত নানা কথা প্রসঙ্গে স্বামিজী
বলিতে লাগিলেন :-
স্বা। কাম অর্থ বাসনা। সংকল্প হতেই কামের উৎপত্তি
হয়; যার কোন প্রকার সংকল্প নাই, তার বাসনাও নষ্ট
হয়ে যায়। ( হিন্দুস্থানী সাধু নারায়ণ গিরির প্রতি)
আচ্ছা, তােমার নাম কি ? প্রথমতঃ বল, তুমি কে,—তুমি
হাত, পা, নাক, মুখ,
মুখ, চোক, কাণ, এইগুলির মধ্যে
কোটি ?
নারায়ণ গিরি। আমার নাম পূৰ্বে ছেদীলাল ছিল,
এখন নারায়ণ গিরি হয়েছে।
স্বা। (মনীষানন্দজীর প্রতি) দেখুন স্বামিজী! ভারি
মজা, জগৎটাকে একনিমিষেই উড়ান যায়—শ্রুতি, স্মৃতি,
বেদেরও দরকার হয় না। এই দেখুন, এক প্রশ্নেই জগতের
অস্তিত্ব চলে যাবে। (নারায়ণ গিরির প্রতি) আচ্ছা,
বলত তােমার নাম কি ? হাতের নাম হাত, পায়ের নাম
পা, কেমন ? তবে ছেদীলাল কার নাম? একখাপে দু’খানা
তলােয়ার ত’ রাখা যায় না?—যদি বল শরীরের নাম
ছেদীলাল, শরীরের নাম ত’ হল শরীর, তার নাম ছেদীলাল
আবার কি করে হ’ল ?
নারায়ণ। (কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া) তবে আমি কে?
স্বা। উল্টা জ্ঞান হচ্ছে, মিথ্যাকে সত্য ও সত্যকে
মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে।

১৪২
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
!
মনীষানন্দজী। হ মহারাজ।
যা নিশা সৰ্ব্বভূতানাং তস্যাং জাগৰ্ত্তি সংযমী ।
যস্যাং জাগ্ৰতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতাে মুনে।
(গীতা ২৬৯ )
অজ্ঞানীর কাছে সত্য বস্তুর প্রকাশ নাই, জ্ঞানীর কাছে
মিথ্যাবস্তুজগতের অস্তিত্ব নাই।
স্বা। হাঁ। স্বামিজী যে জিনিষ সত্য, অজ্ঞানী
তা’ ধরতে পারে না; যে জিনিষ মিথ্যা তাই নিয়েই ব্যস্ত
তাই নিয়েই ভয়।
[ জুজু যেমন আত্যন্তিক মিথ্যা, রঞ্জু-সর্প দৃষ্টান্তে সর্পও
সেইরূপ আত্যন্তিক মিথ্যা ]
(শিমাের প্রতি) রজ্জ-সর্প দৃষ্টান্ত দিলে ত’ বলবি সর্প
নামে কোন সত্য বস্তু আছে। আচ্ছা, জুজু নামে ত’ কোন
সত্য বস্তু নাই—কিন্তু জুজুর নামে শিশুর কত ভয় হয় ? মা
বলেছেন,-“জুজু এসেছে”; বস্ অমনি ভয়ে অস্থির, সে ভয়
আর যায় না। মা বললেন,—“বাবা, ও-ঘর থেকে একটা
পেয়ালা নিয়ে আয়ত; পেয়ালা ভরে তােকে দুধ খেতে
শিশু বললে, “না, মা, ওঘরে জুজু আছে,
ওঘরে আমি যাব না। গেলে জুজু খেয়ে ফেলবে।”
তারপর মা বাবা বললেন, “না রে, জুজু নেই, মরে
গিয়েছে। কিন্তু তাতে শিশুর বিশ্বাস হ’ল না। জুজুর
ভয় তবুও লেগে রইল।
মা জুজু যে আকারের বলেছেন,
জুজুর সেই আকৃতিই দাড়িয়ে গেল। কিন্তু বস্তুতঃ জুজুর
দেব।”

অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
১৪৩
মনী।
কোনও আকার নেই ; জুজু মিথ্যা। আচ্ছা, এই জুজুর ভয়
কি করে যেতে পারে ?
মনীষানন্দজী। বড় হলে, জ্ঞান হলে আপনিই চলে
যায়।
স্বা। হ। তা ত’ যাবেই, কিন্তু শৈশব অবস্থা থেকে
যাবার কোন উপায় আছে কি?
।
[ সিপাহী যেরূপ শিশুর ভ্রান্তি অপনােদনের
প্রথমতঃ মিথ্যা জুজুর মূর্তি নির্মাণ করিয়া পশ্চাৎ তাহার
বিনাশ সাধন করে, সদ্গুরু ও সৎশাস্ত্র সেইরূপ অজ্ঞানীর
নিকট প্রথমতঃ জগতের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া পশ্চাৎ
তদ্বিষয়ে সত্যত্ববুদ্ধির নিরসন করেন।
স্বা। তাও আছে। শিশু জানে যে, সিপাহী (দ্বারবান্
প্রতীহারী প্রভৃতি) চোর ও দুশ্চরিত্র লােককে ধরে প্রহার
করে। পিতা একজন সিপাহীকে আদেশ করলেন,
“ওহে! জুজু আমার বাচ্চাকে ভারি ভয় দেখাচ্ছে ও কষ্ট
দিচ্ছে ! জুজু ঐ ঘরে আছে, তুমি শীঘ্র গিয়ে তাকে মেরে
ফেল।” প্রভুর আদেশ পেয়ে সিপাহী অমনি একটি
লাঠিতে কাপড় জড়িয়ে জুজু প্রস্তুত করে সেই ঘরে গিয়ে
হাতে হাতে খুব জোরে চড় মারতে লাগল, আর নিজে
নিজে হু হু করে কাতর শব্দে চীৎকার করতে লাগল।
পিতা শিশুকে বললেন,-“ঐ শােন্, সিপাই জুজুকে মারছে,
আর জুজু হু হু করে কঁদছে”। পিতার কথা শুনে
৭

১৪৪ স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ শিশুর মনে খুব আনন্দ হল। তারপর সিপাহী বললে,- “বাবুজী। জুজুকে ত’ মেরে ফেলেছি, এখন আর জুজু কাঁদছে না, জুজু মরে গিয়েছে।” বাবু বললেন,-“আচ্ছা জুজুকে এখানে নিয়ে এস”। তখন সিপাহী জুজুকে শিশুর কাছে এনে দেখালে। শিশু জুজু মরেছে দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হ’ল। মাকে, দাদাকে হেঁসে হেঁসে সংবাদ দিয়ে এল,—বললে, “মা, দাদা, সবাই দেখে যাও জুজু মরে গিয়েছে। আবার নিজেও এসে জোরে জুজুকে প্রহার করতে লাগল, আর বলতে লাগল,-“কেমন, এতকাল আমায় ভয় দেখিয়েছিস,আজ দেখ, তাের কি গতি হয়েছে।” সেই দিন থেকে শিশু আনন্দে সকল ঘরে বেড়াতে লাগল, তার জুজুর ভয় নষ্ট হয়ে গেল। সেইরূপ জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতি সমস্ত কল্পিত বস্তু, সমুদয়ই মিথ্যা। শি। শিশুর মা শিশুকে জুজুর ভয় দেখিয়েছে, আমা- দের কে দেখালে ? স্বা। তােমাদের জগতের ভয় অনাদিকাল হতে বর্তমান ; এই জন্যই মায়াকে অনাদি বলে। সদগুরুরূপী সিপাহী ঐ জগৎ-ভ্রমরূপ জুজুকে মারতে সক্ষম, অন্য কেহ নয়। জুজু নাই; কিন্তু সিপাহী যেমন জুজুর কল্পিতরূপ প্রস্তুত করে পশ্চাৎ তাকে বিনাশ করে ; তক্রপ জগৎ বস্তুতঃ নাই, কিন্তু চারি বেদ, ছয় দর্শন ও অষ্টাদশ পুরাণ প্রথমতঃ জগ- তের উৎপত্তি স্বীকার করে, পশ্চাৎ যুক্তি তর্ক দ্বারা তার নিরসন করেছেন। কিন্তু এই প্রকার জ্ঞান হওয়া কঠিন। ;

স্বামী-শিষ্য প্রস ১৪৫ মনীষানন্দজী। তবে “মনুষাণাং সহষুে”—কচিৎ কারও হয়। # স্বা। হঁা, স্বামিজী। কচিৎ কারও হয়। যতই বন্ধন থেকে মুক্তির উপায় করা যায়, ততই বন্ধন দৃঢ় হয়। সাধুরা জগতের ভােগ ত্যাগ করে দু’মুঠী অন্নের জন্য পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। কুকুরবৃত্তি অবলম্বন করে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে। লােকে দিলে দু’মুঠো খায়। যেখানে সেখানে পড়ে থাকে, ভাল কাপড় পড়ে না, কত কষ্ট করে তিতিক্ষা করে। কিসের জন্য ? তারাও কি জাগতিক লােকের মত ভােগ সুখ করতে পারত না ?—তা, পারত। তবে তাদের বৈরাগ্য হয়েছে—সেই বস্তুকে পাবার জন্য। কিন্তু এত কষ্ট করেও তা মিলে না—এমনই মায়া-মায়া অঘটনঘটন- পটীয়সী-এর কথা আর কি বলব। “মনুষ্যাণাং সহৰুে কশ্চিদ্ যততি সিদ্ধয়ে। যততমপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ।” গীত, সপ্তম অধ্যায় ৩য় লােক।

পরিশিষ্ট ; আলাের সাহায্য ব্যতীত চক্ষু দেখিতে পায় না, চক্ষু ব্যতীত অন্যান্য ইন্দ্রিয় আলাের বর্তমানেও দেখিতে পায় না; তপ মুমুক্ষু সদ্গুরুর সাহায্য বা কৃপা ব্যতীত ব্ৰহ্মলাভ বা ভগবদ্দর্শন করিতে পারে না কিন্তু সদগুরু প্রাপ্ত হইলেও অমুমুক্ষু ব্যক্তি ব্ৰহ্মলাভ বা ভগবদ্দর্শন করিতে পারে না। অতএব মুমুক্ষু ও সদগুরুর সমন্বয়েই ঠিক ঠিক অধ্যাত্ম ভাবের স্ফুরণ হয়। সাধনে বসিলে মন ছুটাছুটি করিলেও শরীরকে আসনে বসিয়ে রাখতে হয়। কিছুক্ষণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও জোর করে আসনে বসে ধ্যান করিবার চেষ্টা করিলে মন শেষে স্বতঃই ধ্যানে লেগে যায়। অতএব প্রত্যহ অন্ততঃ একাসনে বসে থাকতে চেষ্টা কর। প্রথমতঃ প্রকৃত ভক্ত হও—যাহা কিছু করি ভগবানের প্রীত্যর্থে করি, এই প্রকার দ্বৈতভাবে চল; তারপর অদ্বৈত- ভাব আসিবে। নদী যে রাস্তা দিয়েই যাক্ না কেন সমুদ্রে পড়িবেই ; তজপ সাধক যে কোন পন্থা অবলম্বন করেই সাধন করিতে থাকুক না কেন পরিশেষে মুক্ত হবেই। সুতরাং অন্যের কথায় কর্ণপাত না করে যে কোন পথ ধরে সেই পথেই ধীরে ধীরে চলিতে থাক। ২৩ ঘণ্টা

পরিশিষ্ট
১৪৭
কন্যার বয়স পঁচিশ বৎসর হলেও পুরুষসঙ্গম ব্যতীত
তাহাদের সন্তান হতে পারে না; তদ্রুপ তুমি যতই শাস্ত্র
ধ্যয়ন এবং সাধন ভজন কর না কেন সদগুরুর আশ্রয়
ব্যতীত তােমার জ্ঞান বা মুক্তি হতেই পারে না।
মন তােমার কি হয়—স্বামী, প্রভু, ভৃত্য বা অন্য কিছু ?
মন ত’ ক্লীবলিঙ্গ সুতরাং সে স্বামী, প্রভু বা ভৃত্য কিছুই হতে
পারে না। তুমি পুংগিঙ্গ হয়ে ক্লীবের কথা শুন্ছ কেন?
মনের কথা শুনিও না, শান্তি মিলিবে।
ক্লীব ব্যক্তি যদি পুরুষ বা স্ত্রী জাতির মধ্যে যায় তাহলে
সে হাস্যাস্পদ হয় ও দুঃখ ভােগ করে; কিন্তু ক্লীবজাতির
( স্বজাতির) ভিতর গেলে আনন্দই পেয়ে থাকে ; দুঃখের
লেশমাত্রও থাকে না। মন ক্লীবলিঙ্গ—তাহাকে পুরুষ বা
স্ত্রীর কাছে যেতে দিলে সে দুঃখ পাবেই। ব্ৰহ্ম ক্লীবলিঙ্গ,
সুতরাং মনকে ব্রহ্মে লয় করে দিলে তার কোন দুঃখ
থাকে না।
কোন পুরুষ বা স্ত্রীকে ভালবাসিও না, কারণ তাদের
বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী এবং তজ্জনিত দুঃখও অবশ্যই ভােগ
করতে হবে। আত্মা বা ঈশ্বরকে ভালবাস তাহাদের সঙ্গে
কোনদিন বিচ্ছেদ হবে না, সুতরাং চিরশান্তি মিলিবে।
মন চঞ্চল হ'লে প্রাণায়াম কর নতুবা নাসিকার অগ্রভাগ
দেখ অথবা ব্যায়াম কর ; তাহলে মন শান্ত হবে।
গুরু গুরু জপ
এই তাের তপ

১৪৮
স্বামী-শিষ্য প্রসঙ্গ
মুক্তি চাও ত কোন পুরুষ বা স্ত্রীর সঙ্গে মিশিও না,
নির্জনে বসে ভগবানেৱ চিন্তা কর ।
সুখাসনে বা পদ্মাসনে বসে সাধন করিও।
মন চঞ্চল হলে একশ্বাসে ৩৪ বারইষ্টমন্ত্র জপ করিও,
মন শান্ত থাকিলে একশ্বাসে দুই বা একবার জপ করিও।
সাধনের সময় দৃষ্টি নাসিকাগ্রে রাখিও।
নাম জপিবার সময় নামের অর্থ চিন্তা কর এবং ইষ্টমূর্তির
ধ্যান কর।
ধ্যানের সময় মন হৃদয়ে থাকিবে।
নাম প্রাণায়াম করিবার সময় নিজে শুনিতে পারা যায়
এই প্রকার ধীরে ধীরে শব্দ উচ্চারণ করিতে পার; অন্যে
যেন শুনিতে না পায়।
জপ করা এবং নাম করা একই জিনিষ।
( একাগ্র বৃত্তি)
বৃত্তির স্থিতিকে ধ্যান বলে। নাম ও ধ্যান একই সময়
করিতে চেষ্টা কর। ধ্যান গাঢ় হলে বাহিক জপ স্বতঃই
বন্ধ হয়ে যায়।
চলিতে ফিরিতে সর্বদাই জপ করিতে চেষ্টা কর ; যে
নাম তােমার ভাল লাগে ( গুরু, শিব, বিষ্ণু, কালী প্রভৃতি )
তাহাই জপ কর ; কিন্তু সব সময় একই নাম জপ করিও।
প্রাতঃকালে যখন শরীরের লােম, দৃষ্টিগােচর হয় না,
তখন সাধনে বস, সুৰ্য্যদেব দৃষ্টিগােচর হলে উঠিও। সন্ধ্যার
সময় সূৰ্য্য দেখে বস, নক্ষত্র দেখে উঠ।
•

পরিশিষ্ট ১৪৯ কামের উপদ্রব হওয়া মাত্রই ব্যায়াম কর, তাহাতেও উপ- দ্রব সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত না হলে ব্যায়ামের পর প্রাণায়াম কর। কাম রিপুর হাত হতে রক্ষা পাইতে চাও ত একান্তে শয়ন বা বাস করিও না, কোন লােকের কাছে (বৃদ্ধ হইলেই ভাল হয়) শয়ন করিও। একান্তে থাকিলে কুচিন্তা আসিতে পারে। সর্বদা লােক মধ্যে থাকি তাহলে মন চঞ্চল হলেও লোক লজ্জার ভয়ে কুকাৰ্য হতে বিরত থাকিবে। একান্তে থাকিলে রক্ষা পাওয়া মুস্কিল * বৈরাগ্যবানের সঙ্গ করিলে বৈরাগ্য লাভ হয়। প্রকৃত ভক্ত সর্বত্রই তাহার ইষ্টমূর্তি দর্শন করেন কালী ভক্ত কালী; বিষ্ণুভক্ত বিষ্ণু, শিবভক্ত শিব এবং গুরুভক্ত গুরু। শিশুর মধ্যে অহংকার নাই, তাই তাকে সকলেই আদর করে ও ক্রোড়ে রাখে । তুমি যদি নিরভিমানী ও বিনয়ী হ তােমাকেও হরি ক্রোড়ে তুলে নিবেন। 1 পরিশিষ্ট সমাপ্ত এ ব্যবস্থা বৈরাগ্যহীন ব্যক্তির জন্য, কিন্তু বৈরাগ্যবানের পক্ষে নির্জন থাকাই যুক্তিযুক্ত। গীতায় শ্রীভগবানও বলিয়াছেন- “একাকী যতচিত্তাত্মা নিরাসীরপরিগ্রহ, সমঃ সঙ্গবিবর্জিত বিবক্ত- সেবী লঘাশী”—ইত্যাদি।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Swami-shishya Prasanga Part 2

Author
Not Available
Title
Swami-shishya Prasanga Part 2
File name
Swami-shishya Prasanga Part 2
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/04/16
Publisher
Bholananda Sanyashram, Barishal
Language
Sanskrit
Pages
164
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essays
Keywords
Mantrajap O Pranayam
DLI number
510947
Barcode
4990010016327.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
mnVGrz9BxMs
Download PDF

Swami-shishya Prasanga Part 2