Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dadabhai Naorajir Jeebani
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দাদাভাই নাওরাজির জীবনী
কলিকাতা জাতীয় বিদ্যালয়ের অধ্যাপক
ণ্ডি
প্রীত।
শ্রীমােক্ষদাচরণ সামাধ্যায়ী কর্তৃক
"
প্রাপ্তি স্থান-- ৩২ বিশ্বনাথ মতিলাল নেন।
মায়াতােষ মুখখাপাধ্যায় কর্তৃক
প্রকাশিত।
৩২ ন বিশ্বনাথ মতিলাল লেন।
১৮৫৫ খৃষ্টাব্দে
বিদ্যোদয় প্রেস,
প্রিন্টার–পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী।
৮২ কাণীঘােষ লেন, কলিকাতা
অবতণিকা। দাদা ভাই ! বাস্তবিকই তুমি দাদা ভাই। ভারতবাসীকে তুমি সহােদরের মত ভালবাসিতে, তাই ভারতবাসীও তােমাকে দাদার মত মান্য করিত। অগ্রজের ন্যায় সেবা করিতে, তাই ভারত, বাসীও তােমাকে কনিষ্ঠ সহােদরের মত ভালবাসিত। তােমার পিতামাতা তােমার সার্থক নাম রাখিয়া ছিলেন। আমি বলি তুমি কেবল ভারতের দাদা ভাই নহে—তুমি পিতা, তুমি মাতা, তুমি বন্ধু, তুমি ত্রাতা, সকল রকমের আত্মীয় তুমি ছিলে। নিজের পুত্রকে সকলেই শিক্ষা দেয়, সকলেই মানুষ করে, ভুমি কিন্তু সকল ভারতবাসীকে শিক্ষা দিয়া মানুষ করিয়া তুলিয়াছ। মা নিজের শিশুকে যত্ন করিয়া পালন করে, তুমি সকল ভারত- বাসীকে পুত্ৰাধিক স্নেহ করিতে। অনেক পিতামাতা স্বার্থ পরবশ হইয়াও প্রতিপালন করে, ও শিক্ষা দেয়, সন্তান বড় হইলে উপার্জন করিয়া খাওয়াইবে এ চিন্তাও অনেকের থাকে। তুমি ভারতবাসীকে শিক্ষা দিয়াছ কেবলই ভারতবাসীর কল্যাণের জন্য, নিজে বিন্দুমাত্র সুখী হইবার জন্য নহে। তাই বলি, তুমি ভারতবাসীর পিতামাতা অপেক্ষাও অধিক ছিলে। কিন্তু আমরা
৩০
এমনই কৃতঘ্ন যে তুমি থাকিতে ত তােমার জন্য কিছু করিই
নাই, মৃত্যুর পরেও তােমার স্মৃতি অন্তরে অঙ্কিত রাখিবার যােগ
তেমন কিছু করি নাই।
শৈশবাবধি তােমার নাম শুনিয়াছি এবং তােমার প্রতি
নিতান্তই সম্মানের ভাৰ অন্তরে ধারণ করিছি। কিন্তু
ভালবাসিতে পারি নাই—ভাবিয়াছি তুমি কত বড়, আমি কত
ছােট, বড় ছােটয় কি ভালবাসা হয় ? যখন কলিকাতায় আসিলে,
কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করিতে—আমরা হাবড়া ষ্টেশন হইতে তােমায়
শােভাযাত্রা করিয়া আনিতে গেলাম। দেখিলাম কলিকাতার
রাস্তা সকল লােকে লােকারণ্য, অট্টালিকা
সমূহ পুষ্পরাজি
সুশােভিত, সর্বত্র তােমার জয় জয়কার, আমাদের যেমন আনন্দ
তেমনই ভয়, পাছে প্রার্থনা পূর্ণ না হয়! ভারতে দুইটি দল হইয়া
পড়িয়াছে, জানি না তুমি কোন দলের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ কর।
যখন সভাপতিরশাসনে তুমি ‘স্বরাজ’ ধ্বনি বিঘােষিত করিলে
তখন আর আনন্দের সীমা রহিল না—মনে হইল লােক সমুদ্র
পার হইয়া গিয়া তােমায় জড়াইয়া ধরি ও একবার ভাল করিয়া
কোলাকুলি করি।
যখন তােমার সহিত আলাপে দেখিলাম বিরক্তির লেশ নাই,
সদা হাসিমুখে সদালাপ, সুপ শ্মশ্রুর মধ্য হইতে মধুর হাসিরাশি
যেন সাদা মেঘে বিদ্যুতের বিকাশ বলিয়া বােধ হইতে লাগিল।
তখন আমাদের সকল ভয় দূর হইয়া গিয়াছে, তােমাকে নিতান্তই
আপনার জন বলিয়া মনে হইয়াছে, আর নানা আশায় নানা
ভরসায় মন পুলকিত হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু যখন তুমি পরলােক গমন করিলে তখন শােকাগ্নি নিতান্তই প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল, শােকে দুঃখে নিতান্তই অবসন্ন হইয়া পড়িলাম। তখন হইতেই তােমার জীবনী লিখিব ভাবিয়াছিলাম ; কিন্তু প্রকৃত জীবনী লিখিতে হইলে যেরূপ পরিশ্রম, অনুসন্ধান ও অর্থের প্রয়ােজন তাহ আমার ছিল না, তাই পারিয়া উঠি নাই । সংপ্রতি দেখিলাম কিছু কিছু অসম্পূর্ণ জীবনী ভাষান্তরে বাহির হইয়াছে, আমিও ভাবিলাম বাঙ্গালায় কিছু করি। কাগজ অতি দুল্য, ছাপাখানার ব্যয় ভয়ঙ্কর, তাই অতি সংক্ষেপে দুই চারি কথা লিখিয়া হস্ত কণ্ডয়ন নিবৃত্তি করিলাম। প্রেসে দিয়া দেখি টাকা দিয়াও, কাজ আদায় করা আমার কৰ্ম্ম নহে। তাই অনন্যোপায় হইয়া শ্ৰীযুক্ত মায়াতােষ মুখোপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হইলাম। তিনি অনুগ্ৰহ করিয়া প্রকাশ করাতে ইহা মুদ্রিত হইল এবং উৎসাহ প্রকাশ করাতে আরও বড় বড় লােকের জীবনী প্রকাশ করিবার আশা রহিল। ভাষার আড়ম্বরে ফনদীর জলের মত প্রয়ােজনীয় বিষয়গুলি ক্লেশসাধ্য করা জীবনী লিখিবার লক্ষ্য নহে মনে করিয়া বিষয়ের তুলনায় ভাষার দিকে মােটেই লক্ষ্য করা হয় নাই। যদি পাঠকগণ—ইহাতে একান্তই অরুচি প্রদর্শন করেন, তবে পরবর্তী সংস্করণে ও অপর জীবনীতে তাহাই করিতে ইচ্ছা রহিল। শ্রীমােক্ষদাচরণ দেবশর্মা।
No text on this page.
দাদাভাই নাওরাজি শৈশব । ভারত গৌরব দাদাভাই নারাজি ১৮২৫ খ্রীষ্টাকে ওঠা সেপ্টেম্বর বম্বের অন্তর্গত একজন পারশি পুরােহিতের ঘরে জন্ম- গ্রহণ করেন। যখন তাহার বয়স চার বৎসর, তখন তাহার পিতার মুত্যু হয়। তখন তাহার মাতা একাকিনী, তিনি তাঁহার পিতা ও মাতার কাজ করেন অর্থাৎ লালন পালন ও শিক্ষা দান, তাহার মাতাকেই করিতে হয়। মাতার অবস্থা দেখিয়া তাহার মাতুল নিতান্তই কাতর হন এবং ভগ্নী ও ভাগিনেয়কে সাহায্য করিতে আরম্ভ করেন। দাদাভাই নাওরাজি এলফিষ্টোন কলেজের অতি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি শৈশব হইতেই বিদ্যার এরূপ উন্নতি দেখাইতে লাগিলেন যে, সমপাঠা ছাত্রদের মধ্যে কেহই তাহার সমকক্ষ ছিল না। বিদ্যালয়ে যে সকল পুরস্কার দেওয়া হইত, ( ৬ ) তাহার প্রথম পুরস্কার দাদাভাইয়ের ক্লাসের অপর কোনও ছাত্র ‘পাইতে পারে নাই। এজন্য সে সময়ে তাহার সমপাঠিগণ অনেকেই আপনাকে ভাগ্যহীন বলিয়া মনে করিত—ভাবিত আমি কেন দাদাভাইয়ের সমপাঠী হইলাম। কিন্তু বিদ্যালয় ত্যাগের পরে দাদাভাইকে সমপাঠী বলিয়া পরিচয় দিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিত। ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দে শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া তিনি এফিষ্টোন কলেজ ত্যাগ করেন। তখনকার বোম্বাই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি { Chief Justice ) ও শিক্ষা সম্মিলনীর সভাপতি আস্কিন সাহেব, এই নব্য যুবকের বিদ্যা, বুদ্ধি ও কাৰ্যকুশলতার পরিচয় পাইয়া এত মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, দাদাভাইকে ব্যারিষ্টারী শিখাইবার জন্য বিলাতে পাঠাইতে চাহিলেন। তিনি বলিলেন, তাহার পাশি সমাজ যদি তাহার বিলাতে পড়িবার অর্ধেক খরচ দেয়, তবে তিনি নিজে অর্ধেক খরচ দিবেন। কিন্তু আহিন সাহেবের সে আশা ফলবতী হইল না, কারণ পাছে, দাদাভাই বিলাতে গিয়া খৃষ্টান হন, এই ভয়ে পাশি সমাজ তাহার বিলাত যাত্রায় অনুমােদন করিল না। পার্শিগণের জরােস্তিয় ধৰ্ম্ম খ্রীহুদি ধৰ্ম্মের ন্যায় গোঁড়ামী পূর্ণ। গবর্ণমেন্টের কেরাণীগিরিতে বা অন্য শিক্ষাহীন কাৰ্যে তাহার মন গেল না। তিনি ঐ এলফিষ্টোন কলেজেই প্রধান দেশীয় সহ- কারী কার্যে নিযুক্ত হইলেন। ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে তিনি ঐ কলেজেই গণিত ও প্রাকৃতিক দর্শনের সহকারী অধ্যাপকের কাৰ্য্য প্রাপ্ত
**
( ৭ )
চন। ক্রমে তিনি সেখানে স্বয়ং অধ্যাপক হন এবং ১৮৫৪ খ্ৰীষ্টাব্দে
ঐ কাজে স্থায়ী হন। এই কাজ তাহার পক্ষে অতিশয় গৌরবের
ছিল ; কেন না, ভঁহার পূর্বে কোন ভারতবাসীই গণিতের
অধ্যাপক হইতে পারেন নাই। কিন্তু তিনি ঐ কাজ পরে ত্যাগ
করিলেন। কারণ বিলাত যাওয়া তাঁহার একান্তই আকাক্ষার
“বষয় ছিল। ক্রমাগত সেই সুযােগ খুজিতে লাগিলেন। অচিরেই
হার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের একটি সুযােগ ঘটিল। কামা
এণ্ড কোং নামক একটি পার্শ কম্পেনির তিনি অংশী ছিলেন।
“তনি উহা পরিচালনের ভার নিয়া ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডে যাত্রা
( Services to Bombay.)
ােেহ্মইয়ে কার্য্যক্ষেত্র।
ছাত্র জীবনেই তাহার অধ্যয়ন ব্যতীত নানারূপ দেশ
হতকর কাৰ্যে মন যায়। অধ্যাপক হইয়া তাহার সুযােগ বৃদ্ধি হয়।
তাহার উদযােগে বোম্বাইয়ে স্টুডেন্টস্ লিটারারী মিসেলিয়ানি
Students' Literary Miscellany ) attestati sa
প্রকাশিত হইয়াছিল। অধ্যক্ষ পেটন সাহেবের সাহায্যে তিনি
একটি সাহিত্য ও বিজ্ঞান সমিতি প্রতিষ্ঠিত করেন। ঐ সমিতি
অদ্যাপি বঘেনগরীতে বর্তমান। উক্ত পত্র এই সমিতি হইতে
( ৮ ) প্রচারিত হইত। দাদা ভাই ঐ কাগজে প্রবন্ধ লিখিতেন। গুজরাটি ও মারহাটি ভাষার আলােচনা করিবার জন্য তিনি ধ্যানপ্রসারক মণ্ডলী” নামে উক্ত সমিতির শাখা সমিতি প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ঐ মণ্ডলীতে যথারীতি বক্তৃতা করিতেন। তিনি ভারতের উন্নতির জন্য স্ত্রীশিক্ষা একটি নিতান্তু প্রয়ােজনীয় বিষয় মনে করেন। চারিদিক হইতে ইহার বিরুদ্ধে নানারূপ যুক্তি তর্ক ও আপত্তি হইতে লাগিল। তিনি সকল আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেন। একদা সাহিত্যবিজ্ঞান সমিতির এক অধিবেশনে যেরমনি গান্ধি নামক এক ব্যক্তি স্ত্রী-শিক্ষার উপকারিতা সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। সভাপতি পেটন সাহেব প্রত্যেক সভ্যকেই শিক্ষা বিষয়ে উদ্যোগী হইতে অনুরােধ করেন। দাদা ভাইর নেতৃত্বে কয়েকজন সভ্য, মেয়েদের পড়িবার জন্য বােম্বাইয়ে নানা স্থানে ক্লাস খােলেন এবং অবসর সময়ে নিজেরাই পড়াইতে থাকেন। উক্ত ক্লাসগুলিই শেষে সাহিত্য- বিজ্ঞান সমিতির মারহাটি এবং পাশি বালিকা বিদ্যালয় নামে অভিহিত হয়। মারহাটি বিদ্যালয় এখনও উক্ত সমিতির হস্তে রহিয়াছে। পাশি বিদ্যালয়গুলি জুয়ােস্ত্রি বালিকা বিদ্যালয়ে হস্তে পতিত হয়। দাদাভাই বম্বে প্রদেশে স্ত্রী-শিক্ষার প্রথম পথ প্রদর্শক। তিনি বম্বে সমিতি, ইরানীফ, পাশি ব্যায়াম সমিতি, বিধবা-
( ৯ )
বিবাহ সমিতি, ভিক্টোরিয়া ও এলার্ট, মিউজিয়ম্ প্রভৃতি স্থাপনের
প্রধান উদ্যোগী ছিলেন। ১৮৫১ খৃষ্টাব্দে সত্যবাদী নামে একখানা
গুজরাটী সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রচার করেন। বাস্তবিক এই সময়
মধ্যে তিনি অসাধারণ বিজ্ঞতা, বুদ্ধিমত্তা, কাৰ্যতৎপরতা, সাহসিকতা
ও কর্তব্যপরায়ণতা প্রদর্শন করেন।
ভারতবাসী ও সিভিল সারভিস
পরীক্ষা ।
19
ইংলণ্ডে পদার্পণ করিয়াই দাদাভাই
তুমুল
রাজনীতিক
আন্দোলন আরম্ভ করেন। তাহার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত
এই আন্দোলন অক্ষুণ্ণ ছিল।
অনেক সুযােগ্য ভারতবাসী নিয়ােজন (nomination)
অভাবে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করিতে পারে না। দাদাভাই
সর্বাগ্রে এই বিষয়ে মনােযােগী হন। ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দে নিয়ােজন
প্রথা রহিত হইয়া প্রতিযােগিতা পরীক্ষার প্রবর্তন হয়। প্রথম
প্রতিযগিতা পরীক্ষায় প্রবেশ লাভেছু ব্যক্তিগণের মধ্যে আর..
এইচ, ওয়েদিয়া ( R. H. Wadia) নামক জনৈক ভারতবাসী
ছিলেন। তিনি পাশি সমাজের পুরুষসিংহ। সিবিল সাৰ্বিসের
কমিশনারগণ, বয়স উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে বলিয়া তাঁহার আবেদন
অগ্রাহ করেন। এই বিষয়ে উক্ত প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি এবং
( ১০ ) । কমিশনারগণের ভিতরে অনেক লেখালেখি চলিয়াছিল। নাওরাজী তৎকালে ইংলণ্ডে ছিলেন। তিনি জন ব্রাইট (Mr. John Bright) নামক তাহার জনৈক বন্ধুর সাহায্যে ওয়েদিয়ার বয়স সম্বন্ধে কোন প্রকার আপত্তি না করার জন্য আন্দোলন উপস্থিত করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ তিনি তাহাতে কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। যাহা হুউক, এই আন্দোলন হইতেই ঠিক এক সময়ে ইংলণ্ডে এবং ভারতবর্ষে সিবিল সাব্বি পরীক্ষা গ্রহণের আন্দোলন উপস্থাপিত হয়। এই বিষয় সম্বন্ধে নাওরাজী ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার সহিত পত্র ব্যবহার করিতে থাকেন এবং চারিজন সত্যের সহানুভূতি প্রাপ্ত হন। কিন্তু অধিকাংশ সভ্যই তাহার বিরুদ্ধ হইয়াছিলেন। নারাজী কিন্তু কিছুতেই তাহার আন্দোলন হইতে বিরত হইলেন না। তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ অধ্যবসায়ের সহিত তিনি আন্দোলন চালাইতে থাকেন। অবশেষে ১৮৯৩ খৃঃ অঃ পালিয়ামেন্টের সাধারণ সভায় অধিকাংশ সভ্যের ভােটের দ্বারা বিলাতে একই সময়ে পরীক্ষা গ্রহণের নিয়ম বিধিবদ্ধ হয়। বিলাতের জনসাভ্রমণকে ভারত- বর্ম সম্বন্ধে শিক্ষা দান। ইংলণ্ড গমনের অল্পকাল পরেই দাদাভাই দেখিতে পাইলেন যে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে বিলাতের লােক সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ। ইংরেজগণ { ১১ } ৪ ভারতের শাসনকর্তা, সুতরাং ভারতবর্ষ সম্বন্ধে ইংরেজগণকে অভিজ্ঞ করিতে পারিলে ভারতেরই সুবিধা বলিয়া তিনি এবিষয়ে মনােযােগ দেন এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি মিঃ ডব্লিউ, সি, ব্যানার্জির সাহায্যে লণ্ডন ভারতীয় সভা (London Indian Society) নামে এক সমিতি স্থাপন করেন। উক্ত সমিতি অনেক বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া আজ পর্যন্তও বৰ্ত্তমান আছে। অবশেষে তিনি ইষ্ট ইণ্ডিয়া এসােসিয়েসন নামে এক বৃহত্তর সমিতি স্থাপন করেন, তাতে শুধু ভারতবাসীই প্রবেশ লাভ করিত না, 'ভারতের প্রত্যেক মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিই ইহাতে প্রবেশ লাভ করিত। এই মহৎকাৰ্য্য সিদ্ধির জন্য তিনি ভারতীয় রাজগণের এবং প্রধান প্রধান ধনীগণের নিকট হইতে চাদা সংগ্রহ করিয়া এই সমিতির অর্থের উন্নতি করেন। চাদা দাদিগের মধ্যে বরদার গাইকোয়ার, সিন্ধিয়া, হােলকারের মহারাজা এবং কচ্ছ প্রদেশের ও বাহাদুর বিশেষ প্রসিদ্ধ। উক্ত সমিতির প্রথম অবস্থায় ভারতের উন্নতি বিধানে অনেক প্রয়ােজনীয় কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান কস্মিয়াছে। ঐ সমিতি হইতে যে মাসিক পত্র প্রচারিত হইত, তাহা ভারতীয় রাজনীতি এবং অর্থনীতির গভীর তত্ত্ব পরিপূর্ণ ছিল। Sir Charles Trevelyan এবং Sir Bartle Fareর ন্যায় অনেক অবসর প্রাপ্ত উদার হৃদয় শাসনকৰ্ত্ত। ঐ সকল পত্রিকা পাঠ করিতেন এবং ঐ সকল লিখিত বিষয়ের অনেক আলােচনা করিতেন। ডব্লিউ, সি, ব্যানার্জি ( ১২ ) হিন্দু আইন সম্বন্ধে ও P. M. Mehta শিক্ষা সম্বন্ধে তত্ত্বানুসন্ধান করিতেন; কিন্তু দাদাভাই বহু বিষয়ের গবেষণা করিয়া উক্ত পত্রিকায় লিপিবদ্ধ করিতেন। পরলােক গত Mr. Robert Knight ভারতীয় আয় ব্যয় সম্বন্ধে অতি সূক্ষ্ম হিসাব ঐ পত্রিকায় প্রকাশ করিতেন। তিনি অন্যান্য নানাবিধ সংস্কারেরও পক্ষপাতী ছিলেন। স্বায়ত্ত শাসন সম্বন্ধে যে সকল পত্রিকা প্রকাশিত হইত, তাহাতে বােশ্বয়ের বিখ্যাত ব্যবস্থাপক সভা এবং পরলােকগত Mr. Ansley opfo আগ্রহসহকারে লিখিতেন। দাদাভাই ইউরােপের নানা স্থানে ভারতবর্ষের সম্বন্ধে বক্তৃতা করিয়া ঘুরিয় বেড়াইতেন। খবরের কাগজে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে নানা কথা লিখি- তেন। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে সাধারণ ইউরােপবাসীর ভ্ৰম অপনয়নের জন্য, ঐ সকল পত্রিকা শিক্ষিত সমাজে পঠিত হইবার জন্য তিনি উৎসাহ প্রদান করিতেন এবং ভারতবর্ষের সেক্রেটারীর (Secre - tary of State for India) সহিত পত্র ব্যবহার করিতেন। লগুন সহস্থিত ব্যবসায়ের পতন। ১৮৬২ খৃঃ অঃ নাওরােজী ক্যামাসের (Camas) যৌথ কারবার হইতে পৃথক হইয়া নিজেই একটা কারবার স্থাপন
( ১৩ )
করেন। ১৮৬৬ খ্ৰীঃ অঃ অন্য একজন হিন্দু ভদ্রলােক যখন
দেউলীয়া হইয়া যাইতে ছিলেন, তখন তাহাকে রক্ষা করিতে
যাইয়া নাওরাজির ব্যবসায়ের পতন
নারাজীর
ব্যবসায়ে সততা এবং সাধুতার খ্যাতি ছিল বলিয়া সকলে
তাহাকে বিশ্বাস
করিত।
অতএব যখন তিনি তাঁহার
দেনা পাওনার ভার নিঃসঙ্কোচে উত্তয়ণগণের হাতে অর্পণ
করিলেন, তখন তাহারা নারাজীর সম্বন্ধে বিহিত ব্যবস্থা
এবং সহানুভূতি প্রদর্শন না করিয়া থাকিতে পারিলেন না।
ইংলণ্ডের ব্যাঙ্কের গভর্ণর তাহার একজন উত্তমর্ণ। তিনি স্বয়ং
তাহার সততার প্রশংসা করিয়া নাওয়াজীকে পত্র লিখিয়া ছিলেন।
তাহার বন্ধু বান্ধবদিগের নিকট হইতে কিছু ঋণ করিয়া এবং
উত্তমর্ণদিগের দয়ার উপরে নির্ভর করিয়া তিনি দেনা হইতে মুক্তি
লাভ করেন। এবং ১৮৬৯ খৃঃ অঃ বােৰায়ে প্রত্যাবর্তন করেন।
বোেম্বাই প্রত্যাবর্তন।
বিলাতে অবস্থানকালে তিনি ভারতের মঙ্গলকামনায় এত
পরিশ্রম করিয়া ছিলেন যে, তিনি বােদায়ে প্রত্যাবর্তন করিলে
Sir P, M, Mehtaর উদ্যোগে নারাজীর সম্মানার্থে বােষে
নগরবাসীর এক বিরাট শশাভাযাত্রার অনুষ্ঠান হয়। সকল
শ্রেণীর লোকের সমবেত সভায় তাহাকে অভিন্দন পত্র এবং
( ১৪ )
অনেক টাকা উপহার প্রদান করা হয়, আর তাহার প্রতিকৃতি গ্রহণ
করা হয়। ঐ সকল টাকা পয়সা তিনি নিজের কোন কাজে
খরচ করেন নাই। সৰ্বসাধারণের উপকারার্থে তিনি ঐ সকল
অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। তাহার প্রতিকৃতি রক্ষা কল্পে একটী ফণ্ড
স্থাপিত হয় এবং তাহার তৈলচিত্র প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত
টাকার সুদ হইতে থাকে। ১৯০০ খৃঃ অঃ তাহার প্রতি কৃতি
প্রস্তুত হইলে ফ্রেমজি কোয়ানজি বিদ্যালয়ে মহামতি রাণাড়ের
সভাপতিত্বে উহার আবরণ উন্মােচিত হয়। উক্ত আবরণ উন্মােচন
সভায় রাণাড়ে একটি সারগর্ভ বক্তৃতা করেন। উহাই শেষ বক্তৃতা।
ইহার কিছুদিন পরেই রাণাড়ে অকালে প্রাণ ত্যাগ করেন।
-
কোকেই কমিটি।
The Fawcett Committee.
ইহার অল্পদিন পরে নাওরাজী ভারতের আয় ব্যয় সম্বন্ধে
হিসাব নিকাশ করিবার জন্য ফোকেট কমিটি নামে যে কমিটি
বসিয়াছিল, তাহাতে সাক্ষ্য প্রদান করিবার জন্য বিলাতে
প্রত্যাবর্তন করেন।
কমিটির নিকটে তিনি যে সকল বিষয় প্রস্তাব করিয়া ছিলেন,
তন্মধ্যে ভারতের দরিদ্রতা এবং অতিরিক্ত হারে কর প্রদানের
প্রস্তাবনাই সবিশেষ উল্লেখযােগ্য। এ বিষয়েই দাদাভাই অনেক
( ১৫ ) গবেষণা করিয়াছিলেন। সাক্ষ্য প্রদান কালে ভারতবাসীর গড়ে বার্ষিক আয় ২০ টাকা, এই কথার উল্লেখ করিয়া তিনি একটু হাসিলেন মাত্র। কিন্তু তাহাতে ভারত প্রবাসী অনেক ইংরেজ কর্মচারী তাহার উপর অসন্তুষ্ট হইলেন। এ বিষয়ে অনেক বাদানুবাদ আরম্ভ হইল ; কিন্তু দাদাভাই নির্ভীক ভাবে আন্দোলন চালাইতে লাগিলেন। ১৮৭৩ খৃঃ অঃ ভারতের দরিদ্রতার (Poverty of India) নাম দিয়া তিনি যে পুস্তিকা প্রণয়ন করেন, তাহাতে দরিদ্রতা সমর্থক প্রমাণ প্রয়ােগাদি সন্নিবেশিত হইয়াছিল । ইহারই সাত বৎসর পরে ঐ পুস্তিকা ভারতের অবস্থা (Condi-. tion of India) নামে একটু বৃহৎ কলেবরে প্রকাশিত হয়। কয়েক বৎসর পরে ভারতের অর্থ মন্ত্রী ( Finance Minister) দাদাভাইর মতের সমর্থন করিলে তিনি অতি সন্তুষ্ট হন। অর্থ মন্ত্রী, কর্মচারী দ্বারা অনুসন্ধানের ফলে জানিয়াছিলেন যে, ভারতবাসীর গড়ে বার্ষিক আয় ২৭ টাকার অধিক নহে।. নারাজী ভারতের শাসন পদ্ধতির দোষ উদঘাটন করিয়া যে সব কথা বলিয়াছিলেন, তন্মধ্যে ভারতশাসন ব্যাপারে অত্যধিক ব্যয়, প্রতি বৎসর ভারত হইতে বিলাতে অপর্যাপ্ত অর্থের রপ্তানি এবং উচ্চপদে ভারত- বাসীর বিনিয়ােগ সম্বন্ধে ইংরেজ জাতির অবিচার বিষয়ে আন্দোলনই সবিশেষ উল্লেখযােগ্য।
( ১৬ ) বরান দেওন্নান। ১৮৭৪ খৃঃ অঃ নাওরাজী বরােদা রাজ্যের দেওয়ানের পদে অভিষিক্ত হইয়া বােম্বাই প্রত্যাবর্তন করেন। মুলহার রাও গাইকোয়ারের কু-শাসনে তখন বরােদার অবস্থা অতি সঙ্কটজনক হইয়া উঠিয়াছিল। নওরাজীর হাতে যে কাজের ভার অর্পিত ছিল তাহা অতি কঠিন। স্থানীয় ইংরাজ রেসিডেন্ট তাহার প্রতি- কূলচরণ করিতে লাগিলেন ; এবং তাহার অধীনস্থ অন্যান্য স্বেচ্ছাচার কর্মচারীর ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়িয়া তাঁহাকে বিব্রত হইতে হইয়াছিল। কিন্তু কিন্তু নাওরাজির স্বভাবসিদ্ধ অধ্যবসায়ের বলে উপযুক্ত কর্মচারীর সাহায্যে তাহার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। যদিও তিনি দুই বৎসরের কিছুদিন কম দেওয়ানের পদে নিযুক্ত ছিলেন, তথাপি তিনি ঐ অল্পদিনের মধ্যেই শাসন- সংস্কার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ফৌজদারী ও দেওয়ানী বিচারে যে সকল দোষ প্রবেশ করিয়াছিল, তিনি সমূলে তাহার উচ্ছেদ সাধন করেন। তথাকার রেসিডেন্ট Colonel Phayre এর সহিত তাহার মতের অমিল ছিল কিন্তু ভারতমন্ত্রী Lord Salisbuiry নারাজীর মতেরই সমর্থন করিতেন।
( ৭ )
Activities in Bombay.
বােম্বাইরে কর্মপটুতা।
বরোদার দেওয়ানী ছাড়িয়া দিয়া তিনি বােম্বাই প্রত্যাবর্তন
করেন এবং মিউনিসিপাল করপােরেশনের (Municipal corpor
ation) সভ্য শ্রেণী ভুক্ত হন। লর্ড লিটনের কু-শাসনে
অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত হইয়া তিনি কিছুকাল নীরবে থাকিলেন।
কিন্তু রাজ প্রতিনিধির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সর্বসাধারণের
কাজে যােগদান করিলেন। তিনি পুনরায় করপােরেশনে
{ corporation) প্রবেশ লাভ করিলেন এবং ১৮৮৫ খৃ অঃ
পর্যন্ত তাহাতেই নিযুক্ত রহিলেন। এই সময়ে তিনি সর্বসাধারণের
জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়াছিলেন। শেষ সময়ে বােম্বাইয়ের
গভর্ণর লর্ড রে ( uord Reaty) তঁাহাকে তথাকার ব্যবস্থাপক
সুভার সভ্যপদ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান করেন কিন্তু তিনি বেশী
দিন উক্ত পদে থাকেন নাই। পালিয়ামেন্টে প্রবেশ লাভ করিয়া
তথায় নিজ দেশের অভাব অভিযোেগ জানাইবার জন্য তিনি ১৮৮৬
খৃঃ অঃ আর একবার ইংলণ্ডে যাত্রা করেন। যাত্রা করার পূর্বেই
ভারতের জাতীয় মহাসভার (congress) প্রথম অধিবেশন হয়
এবং এই প্রথম অধিবেশন বম্বেতেই হইয়াছিল। দাদা ভাই
এই কংগ্রেসে নিতান্ত উৎসাহের সহিত যােগ দেন।
२
( ১৮ ) পালিস্নামেন্টে প্রবেশ । ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে দাদাভাই নাওরাজি পুনরায় ইংলণ্ডে গমন করেন এবং সেখানে গিয়া দেখিতে পান ইংলণ্ডে পালিয়ামেন্টো সভ্য হওয়ার ধুম পড়িয়া গিয়াছে, তিনিও তাহাতে যােগ দিলেন । তিনি হলবর্ণের সভ্যগণ কর্তৃক উদারনীতিকদলের পদ প্রার্থ বলিয়া গৃহীত হইলেন; কিন্তু কিছুতেই পার্লিামেন্টের সভ্য হইতে পারিলেন না। এমন কি ইংলণ্ডের প্রধান মন্ত্রী গ্লাভূষ্টোন্ দাদা ভাইকে সভ্য করিবার জন্য নিতান্ত ইচ্ছুক ছিলেন কিন্তু তাহাতে কুফলই ফলিল ; কারণ লর্ড গ্লাডষ্টোও সেই সময়ে ইংলণ্ডের লােক মতের বিরুদ্ধে আয়লণ্ডের স্বায়ত্ব শাসন প্রবর্তনের চেষ্টায় ছিলেন, কাজেই গ্লাড ষ্টোনের সকল কাজে ইংলণ্ডের জন সাধারণ বিরােধী হইয়া দাড়াইয়াছিল। এই জন্য দাদাভাইর সভ্যনিয়ােগ কাৰ্যেও সকলে বাধা দিল। এবার আর তাহার কোন আশাই রহিল না। একেত দাদাভাই ইংরেজের পদদলিত কৃষ্ণকায় জাতি, তাহাতে আবার তিনি উদারনীতিক দলের লােক। এই দুইটা অসুবিধা স্বত্বেও তিনি ১৯৫০টী ভােট যােগাড় করিয়া- ছিলেন। কিন্তু তাহাতে কি হইবে, বিরুদ্ধে হইল ৩৬৫টি ভােট। তিনি পালিয়ামেন্টে প্রবেশ লাভ করিতে না পারিলেও ইংলণ্ড পরিত্যাগ করিলেন না। পরবর্তী নিয়োগে সভ্য হইবার জন্য দ্বিগুণ উৎসাহে কাজে লাগিয়া গেলেন। ঐ ১৮৮৬ খ্ৰীষ্টাব্দের
( ১৯ )
শেষ ভাগে দাদাভাই ভারতের জাতীয় মহা সভায় কলিকাতার
অধিবেশনে সভাপতির পদে বরিত হইয়া ভারতবর্ষে প্রত্যাগমন
করেন।
১৮৮৭ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে তিনি পাবলিক সাভিস
কমিশনে নিতান্ত সন্তোষজনক সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাহারই
আন্দোলনে এই পাবলিক সার্ভিস কমিশন বসিয়াছিল। ইহার
কিছুদিন পরে পালিয়ামেন্টে প্রবেশ লাভ করিবার বাসনায় তিনি
পুনরায় ইংলণ্ডে গমন করেন। পাঁচ বৎসরের চেষ্টায় ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে
তিনি উদারনীতিক সভ্যরূপে পার্লিয়ামেটে নিযুক্ত হইলেন।
ইংলণ্ডে দাদাভাইর এই সম্মান লাভে ভারতের সকল প্রদেশের
সকল লোেক অত্যন্তই আনন্দিত হইয়াছিল। কিছুদিন পরে আর
একজন পার্শি পালিয়ামেণ্টের সভ্য হইয়াছিলেন এবং দাদাভাইই
তাহার সেই প্রদর্শক ছিলেন।
পালিন্নামেজে তাঁহার প্রথম
বক্তৃতা।
১৮৯২ খৃষ্টাব্দের ৯ই আগষ্ট তারিখে দাদাভাই পালিয়ামেন্টে
প্রথম বক্তৃতা করেন। এই বক্তৃতাই তাহার প্রতি জনসাবারণের
মন আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইয়াছিল। তাহার বক্তৃতা এই
( ২০ ) “সভ্য শ্রেণীভুক্ত হওয়া মাত্রই বক্ত মঞ্চে দাঁড়াইয়া বক্তৃতা করা যদিও অজ্ঞ তার পরিচায়ক হউক, তথাপি আমার বক্তৃতা করার সংপ্রতি একান্ত দরকার হওয়ায়ই আমি বাধ্য হইয়া আজ বক্ত মঞ্চে দাড়াইলাম। ইংরেজদের পক্ষ হইতে আমার নিযুক্তি একটী অনন্য সাধারণ ঘটনা। ইংরেজ শাসনের শতাব্দী পরে ইংরেজ কর্তৃক ভারতবাসীর প্রথম পার্সিয়ামেন্টে প্রবেশ লাভ, ভারতের ইতিহাসে এমন কি ইংরেজ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একটা নতুন ঘটনা। ইংরেজ শাসনই যে ভারতের পক্ষে সম্পূর্ণ উপযােগী, তাহা বৰ্তমান শতাব্দীর প্রথম ভাগে, যখন তাহারা এই দেশের সমস্ত ভার গ্রহণ করেন, তখনই তাহাদের সুন্দর শাসনপ্রণালী, ন্যায় বিচার এবং উদারতা দেখিয়া নিঃসংশয়ে বুঝিতে পারা গিয়াছিল। ক্রমে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা, সভ্যতা এবং রাজনীতি বিস্তারের চেষ্টা চলিতে লাগিল। এদেশের যুবক বৃন্দের এতদিন ও বনতি হইয়া আসিতেছিল ; আজ তাহারা ইংরেজদের আগমনে তাহাদের উন্নত ভাষার সাহায্যে, নানা বিষয় শিক্ষালাভ করিয়া ক্রমশঃ রাজনীতি ক্ষেত্রে উন্নত হইয়া উঠিল । তাহারা যেন নূতন জীবন প্রাপ্ত হইল।' ইংরেজ শাসন কর্তারা এ দেশের লােককে শিক্ষানুযায়ী সুবিধা দানেও কুণ্ঠিত হইলেন না। ইংলণ্ডের জন সাধারণ যে বক্তদানের স্বাধীনতার (freedom of speech) জন্য নিজেদের রক্তপাত পর্যন্ত করিয়াছিল, সেই স্বাধীনতা তােমরা প্রদান করিয়াছ। তাহারই বলে আজ ভারতবাসী তােমাদের সম্মুখে দাড়াইয়া তাহাদের অভাব অভিযােগ জাপন করিতে { ২১) পারিতেছে। সেই স্বাধীনতা বলে আজ ভারতবাসী পার্সিয়ামেন্ট মহাসভার সভ্যরূপে পরিগণিত হইয়া নির্ভয়ে তাদের বক্তব্য প্রকাশ করিতে পারিতেছে। যে বাক স্বাধীনতার (freedom of speech) জন্য ভারতের একপ্রান্ত হইতে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত আনন্দোচ্ছাস বহিয়া যাইতেছে, তাহারা নবজীবন প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহার জন্য তােমরাই বিশেষরূপে প্রশংসনীয়। ইংরেজ জাতির স্বাধীনতা প্রিয়তা এবং ন্যায়ের পক্ষপাতিত্ব গুণ থাকাতেই আজ আমরা বা স্বাধীনতা প্রাপ্ত হইয়াছি। ভারতবাসী যে পালিয়া- মেণ্টের সভ্য হইবার অধিকার প্রাপ্ত হইয়া তাহাদের অভাব অভিযােগ জানাইতে সমর্থ হইয়াছে সেই জন্য আমি ভারতবাসীর পক্ষ হইতে ইংরাজদিগকে অন্তরের সহিত ধন্যবাদ জ্ঞান করিতেছি। কোন ভারতবাসী যদি একজনের মাত্র তাের সাহায্যে পালিয়ামেন্টে কোন বিষয় উথাপন করেন এবং ৩ হ। যদি ন্যায় সঙ্গত আবেদন হয়, তবে শত শত সভ্য তাহার সম ন করিবে। এই সত্যের বলেই শিক্ষিত ভারতবাসী আগ্রহে সকল কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিতেছে এবং নিরাশ না হইয়া অভাব দূরীকরণার্থে ক্রমাগত আন্দোলন চালাইয়া যাইতেছে। সেন্ট্রাল ফিবেরী (Central Finsbary) একজন ভারতবাসীকে সভ্য নিযুক্ত করিয়া ভারতের কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছে এবং ইংরেজ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বিখ্যাত হইয়া রহিয়াছে। এই ঘটনা, ইংরেজ সাম্রাজ্যের ভিত্তি অতিশয় দৃঢ় করিয়াছে এবং ইংরেজ ও ভারতবাসীর সম্বন্ধ অতিশয় ঘনিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছে। আমার ( ২২ ) বােধ হয় লক্ষ লক্ষ গােরা সৈন্য ভারতবর্ষে পাঠাইলে এমন ফল ফলিত না। প্রধান মন্ত্রী গ্লাভষ্টোন ( Gladstone) বলিতেন যে ইংলণ্ড এবং ভারতবর্ষ এক সােণার তারে নিবদ্ধ। যতদিন পর্যন্ত ভারতবাসী ইংরেজদের ন্যায়বিচার ইত্যাদি সদ্গুণে সন্তুষ্ট থাকিবে, ততদিনই ইংরেজ সাম্রাজ্য স্থায়ী হইবে এবং আমি একথা নিঃসংশয়ে বলিতে পারি যে, আমরা যদি যুক্তি সঙ্গত ভাবে কোনও বিষয়ে আবেদন করি, তবে যতদিন পরেই হউক আমরা তাহা পাইবই। আপনারা যে এতক্ষণ ধৈৰ্য্য সহকারে আমার কথা শুনিয়াছেন, সেইজন্য আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিতেছি এবং আমি কামনা করিতেছি যে ইংলণ্ড ও ভারতবর্ষের এই সম্বন্ধ যেন অধিক দিন স্থায়ী হয়। আমি ভারতের শাসন সংস্কার সম্পর্কে ক্রমে দুচার থার অবতারণা করিব এবং আশা করি তাহা যদি যুক্তিযুক্ত হয় হবে আপনাদের সহানুভূতি প্রাপ্ত হইব।” Service in Parliament. পালিন্নামেটাে চাকুরী পার্লিামেন্টে প্রবেশ করিয়াই ইংরেজদিগকে ভারত সম্বন্ধে সচেতন করিয়া তােলা নাওরাজীর সর্ব প্রধান কাজ হইয়া দাঁড়াইল। তিনি সার উইলিয়ম ওয়েডারবর্ণ (Sir William Wedderburn) এবং পরলােক গত মিঃ ডব্লিউ, এ, কেইন (Mr. W. S. Cain)।
( ২৩ )
নামক দুই মহাত্মার সাহায্যে ইণ্ডিয়ান পার্সিয়ামেন্টেরী কমিটি নামে।
এক কমিটি স্থাপন করেন। এই কমিটি অনেকদিন ভারতের
উন্নতিজনক অনেক কাজ করিয়াছে। পালিয়ালেন্টে প্রবেশ লাভ
করিবার পর বৎসরই মিঃ হারবার্ট পলকে (Mr. Herbert Paul)
দয়া ভারতবর্যে এবং বিলাতে একই সময়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা
হওয়ার আন্দোলন উপস্থিত করান। যদিও ইহাতে গভর্ণমেন্ট
বিরােধী ছিলেন তথাপি অধিকাংশ সত্যের ভােটের দ্বারা ইহা পাশ
হইয়াছিল।
এই কার্যের জন্য ভারতবাসীর নিকটে বিশেষ
ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছিলেন।
লাহাের কংগ্রেসের সভাপতি।
বম্বে হইতে
এই বৎসরের শেষ ভাগে লাহােরের কংগ্রেসে নবম অধিবেশনে
তিনি সভাপতিরূপে ভারতে পদার্পণ করেন।
লাহোের যাইতে যে সকল ষ্টেশনে গাড়ী দাঁড়াইয়াছিল সেই সকল
স্থানের লােকেরাই তাহাকে অতি সমারোহের সহিত অভ্যর্থনা
করিয়াছিল। লাহাের হইতে প্রত্যাবর্তন কালে এলাহাবাদের
অধিবাসিগণ তাহাকে এক অভিনন্দন পত্র প্রদান করে। তাহার
আগমনে লাহােরে অতিশয় আনন্দোচ্ছাস হইয়াছিল। যুবকের
তঁাহার গাড়ী নিজেরা টানিয়া লইয়া গিয়াছিল একং এই সকল
খবর ইউরােপের সমস্ত সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। এই
( ২৪ ) সম্বন্ধে ভারতবন্ধু সার উইলিয়ম্ হান্টার টাইমস নামক সংবাদ পত্রে যাহা লিখিয়াছিলেন, নিম্নে তাহার অনুবাদ প্রদান করা গেল। “যেরূপ আনন্দোচ্ছাসের সহিত বর্তমান বর্ষের কংগ্রেসের সভাপতিকে অভ্যর্থনা করা হইয়াছিল তাহা বিস্ময়জনক। দাদাভাই কেবলমাত্র পার্লিয়ামেন্টের প্রথম ভারতীয় সভ্য মহেন। তাহার প্রথম জীবন অতিশয় উন্নত, মধ্য জীবন নিরাশার ঘাের তমসাচ্ছন্ন এবং শেষ জীবন অক্লান্ত কৰ্ম্মও অধ্যবসায়ের আদর্শস্থল। এলফিনৃষ্টোন্ কলেজের ছাত্র এবং প্রফেসর ১৮৫৫ খ্রীঃ নিজের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য বোম্বে হইতে ইংলণ্ডে গমন করেন এবং বৃদ্ধবয়সে পারিবারিক দুঃখ কষ্টের ভিতরে একমাস পূৰ্ব্বে তিনি প্রত্যাবর্তন করেন। ভারতের রাজপ্রতিনিধিকে (Viceroy) ষত সমাদরে অভ্যর্থনা করা হইয়াছিল, তাহাকে ঠি তেমনিভাবে অভ্যর্থনা করা হইয়াছিল। লাহোরে যে ভাবে তাহার অভ্যর্থনা করা হয়, রণজিৎ সিংহের পরে আর কেহ তেমন অভ্যর্থনা প্রাপ্ত হন নাই। কেবল তাহারই জন্য কংগ্রেস পাটি পার্লিামেন্টে এবং ভারতীম ব্যবস্থাপক সভায় প্রভুত্ব করিতে পারিতেছে। যে পারিবারিক দুঃখ কষ্টের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, তা তাহার একমাত্র পুত্রের মৃত্যু।
( ২৫ )
Evidence before the Welbey Commission,
ওয়েলবি কমিশনের নিকভ
সাক্ষ্যদান ।
“অল্পদিন মাত্র পালিয়ামেন্টে অবস্থানকালে দাদাভাই যে সকল
প্রয়ােজনীয় কাৰ্য সাধন করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে ১৮৯৬ খ্ৰীঃ অঃ
ভারতের আয় ব্যয় পরীক্ষার জন্য রয়াল কমিশন (Royal
Commission) নিযুক্ত করা বিশেষ ভাবে উল্লেখ যােগ্য।
দাদাভাই নিয়েও এই কমিশনের সভ্য ছিলেন। সার উইলিয়াম
ওয়েডারবর্ণ এবং মিঃ ডব্লিউ, এস কেইন তাহার সহযােগী ছিলেন।
ওয়েলবি এই কমিশনের সভাপতি ছিলেন বলিয়া ইহার নাম
ওয়েলবি কমিশন হইয়াছিল। দাদাভাই নিজে এই কমিশনে সাক্ষ্য,
প্রদান করিয়াছিলেন। তাহার সাক্ষ্যে তিনি ভারতের রাজনীতি
এবং অর্থনীতির জটিল বিষয়ের অবতারণা করিয়াছিলেন। নিম্নে
তাহার সাক্ষ্যের সারাংশ প্রদত্ত হইল।
“আমি এই কমিশনের হস্তে ছয় দফা ছাপান মন্তব্য প্রদান
করি। এই মন্তব্যগুলির প্রামাণ্য বিষয়ে আমার বিশ্বাস আছে
এবং কমিশন ইচ্ছা করিলে আমায় জেরাও করিতে পারেন।
(a) ব্যয়ের হিসাব।
(b) ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে অভিযােগ।
(e) অভিযােগের প্রকৃত নিরাকরণ।
১৮৩৩ খৃঃ যে আইন বিধিবদ্ধ হইয়াছে ১৮৫৪ খৃঃ মহারাণী,
দােষণা বাণীতে তাহারই প্রতিধ্বনি করা হইয়াছে এই ঘােষণাবাণী সারা ভারতবাসীকে উচ্চপদের অধিকার প্রদান করা হইয়াছে। দেশের অর্থব্যয়—দেশবাসীর মতামত সাপেক্ষ হওয়া উচিত। তাহাতে ইংরেজ এবং ভারতবাসী উভয়েই উপকৃত হইবে। এবং উভয় জাতির ভিতরে ঘনিষ্টতা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে। কিন্তু অর্থনীতি সম্বন্ধে যে নিয়ম বিধিবদ্ধ হইয়াছিল, তদনুসারে কাৰ্য্য হইতেছে না। বিদেশীয় শাসন প্রণালীতে রাজনৈতিক হিসাবে যে সকল দোষ থাকিবার সম্ভব, তাহা আছে। তাহা আমার উপরােক্ত প্রস্তাবনা হইতেই বেশ বুঝিতে পারা যাইবে। আমার উপরােক্ত ছয় প্রস্ত প্রস্তাবনায় ভারতের প্রত্যেক প্রদেশের উৎপন্ন শস্যের পরিমাণ, কি পরিমাণে ঐ শস্য নিজেদের জন্য ব্যয় হয় এবং এদেশ হইতে মাল রপ্তানী করিয়াই আমরা অন্যদেশ হইতে কি পরিমাণ টাকা প্রাপ্ত হইতেছি, ইত্যাদি বিষয়ের আলােচনা করিয়াছি। আমি বলিতেছিযে এ দেশের শাসন কাৰ্যে উচ্চ বেতনে ইংরেজ কৰ্ম্মচারীর নিয়ােগ। বিদেশীয় বণিকদিগের এদেশে আসিয়া বাণিজ্য বিস্তার, সম্রাটের সহিত অন্য কোথাও যুদ্ধ বাঁধিলে ভারতবর্ষ হইতে তাহার খরচ যােগান ইত্যাদিই ভারতেই দারিদ্র্য এবং অধঃপতনের কারণ। আমি প্রস্তাব করিতেছি যে, যাহাতে ভারতের এবং বিলাতের উভয় স্থানের উপকার হয়, এমন ভাবে ন্যায় ও ধর্মের পক্ষপাতী হইয়া ভারত শাসন করাই ইংরেজের ইচ্ছ। অর্থ ব্যয় ইত্যাদি
( ২৭ )
বিষয়ে প্রভু এবং দাস ভাবে ব্যবহার করিলে চলিবে না। দুই
জাতির সহিতই সমব্যবসায়ীর মত ব্যবহার করিতে হইবে।
ভারতবর্ষে ইংরেজদের প্রাধান্ত স্থাপন তাহাদের একান্ত
ইচ্ছ। কিন্তু তজ্জন্য তাহারা এক কপর্দকও খরচ করিতে নারাজ।
এ অল্প কয়েকটা বিষয় ছাড়া তাহাদের আধিপত্য বিস্তারের
উপায় করিতে যত খরচ আবশ্যক হয়, তাহা দরিদ্র ভারতের ঘাড়েই
চাপান হইয়া থাকে।
আইন কানুন, শান্তি স্থাপন ইত্যাদি ভারতের উপকারের
অন্য ; কিন্তু তাহাতেও তাহাদের স্বার্থ আছে। কেন না সুশৃঙ্খলা
তাহাদেরই উন্নত শাসন প্রণালীর পরিচায়ক। ভারতের সুশাসন
এবং রক্ষা কল্পে যত খরচ, তাহা ইংরেজ রাজত্ব না থাকিলেও
ভারতেরই বহন করিতে হইত। কিন্তু তেমনই আবার ইংরেজ
রাজত্ব না থাকিলে সমস্ত রাজ কর্মচারীর কাৰ্য্য ভারতবাসীরই
প্রাপ্য হইত।
বিলাতে নিযুক্ত বিলাতবাসীর বেতনাদি ইংরেজ দিবে এবং
ভারতে ভারতবাসীর বেতনাদি ভারত বহন করিবে। আর
ভারতের ইংরেজ কর্মচারী ও বিলাতে ভারতীয় কর্মচারীদিগের
বেতন শক্তি সামর্থ্যানুযায়ী প্রদত্ত হইবে। এই ব্যবস্থার আর
একটু সংস্কার করিলে এই করিতে পারা যায় যে, বিলাতের এবং
ভারতের ইংরেজ কর্মচারীদিগের বেতন বিলাত এবং ভারতের
সমানভাবে ভাগ করিয়া দেওয়া উচিত।
সৈনিকবিভাগ, নৌবিভাগ এবং সিভিল সার্ভিস ইত্যাদি
( ২৮ )
ব্যাপারে সুযােগ সুবিধা অনুসারে খরচাদি প্রদানেরও স্বত
ব্যবস্থা দেওয়া উচিত।
১৮৫৪ খঃ ভারতসীমান্তের বাহিরে যে
বাহিরে যে সকল যুদ্ধ বিগ্রহ
চলিয়াছে, তাহা লর্ড সেলিবেরির মতে ভারত সাম্রাজ্যের
সহিত প্রত্যক্ষ ভাবে না হউক, অন্ততঃ পরােক্ষ ভাবে জড়িত।
কাজে কাজেই ভারতবর্ষ ইহার অধিকাংশ খরচ দিতে বাধ্য।
কারণ তাহাতে ভারতেরই উপকার।
১৮৮২ খৃঃ অঃ হইতে ১৮৯১ খৃঃ পর্যন্ত ১৩৯ কোটি টাকা,
ভারতের আয় হইতে ভারত সীমান্তের বাহিরের ব্যাপারে ব্যয়
করা হইয়াছে। এই টাকার কিয়দংশ সম্রাটের যিনি ধনমন্ত্রী
(Exchequer), তাহার ভারতবর্ষকে ফিরাইয়া দেওয়া উচিত।
কর্ণেল হেনা আফগান বুদ্ধের যে তালিকা প্রদান করিয়াছেন,
তাহাতে তিনি দেখাইয়াছেন যে, ঐ যুদ্ধে ৭১৪৫০০০০০ টাকা
খরচ হইয়াছে। তন্মধ্যে ইংরেজ সরকার মাত্র ৫০০০০০০
পাউণ্ড দিয়াছেন। বাকী ভারতবর্ষ দিয়াছে। ডিবন সায়ারের
ডিউক বলিয়াছেন যে, ভারতবর্ষে সুশাসন করিতে হইলে-
প্রত্যেক কার্যে সুদক্ষ ও বুদ্ধিমান্ ভারতীয় কর্মচারী নিযুক্ত
করা উচিত। ডাব্লিউ হান্টার বলেন যে, ভারত শাসন ব্যাপারে
ভারতীয় লােকেরই নিয়ােগ একান্ত আবশ্যক। এবং বাজার"
দর হিসাবে তাহাদের বেতন দেওয়া উচিত। আমি এই সকল
প্রস্তাবের সম্পূর্ণ সমর্থন করিতেছি। এরূপ করিলে ভারতের
অষৎ অর্থব্যয় নিবারিত হইতে পারে।
( ২৯ )
লড সেলিসবেরী মহীশূরে এই প্রথা অবলম্বন করিয়া
অতি সুফল পাইয়াছেন। কিন্তু ভারতের অন্যান্য ইংরেজ
প্রবাসীরা এই মতের বিরোধী ছিলেন। এই প্রথা অবলম্বনে
মহিশুরে সর্ব প্রকারের উন্নতি হইয়াছে ভারতের ইতিহাসে ইহা
একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতের সর্বত্র এই প্রথা অবলম্বন
করিলে বিশেষ সুফলের আশা করা যাইতে পারে।
ইংরেজ শাসনের উপকারিতা, আমি অতি আনন্দের সহিত
স্বীকার করিতেছি। বিশেষতঃ এই শাসনে সুবিচার, শিক্ষা
প্রচার, মুদ্রান্ত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয়গুলি বিশেষ উল্লেখ
যােগ্য। কিন্তু আয়ব্যয় সম্বন্ধে, ভারতবাসীর কোন হাত না
থাকাতে এবং মহারাণীর ঘােষণা বাণী অনুসারে, ভারতবাসীকে /
উচ্চপদে নিয়ােগ না করাতে, ভারতের শাসনপ্রণালীর যথেষ্ট
ক্রট পরিলক্ষিত হইতেছে। আর ভারতবাসীও ক্রমশঃ দরিদ্র
হইয়া পড়িতেছে ।
পার্লিামেস্টে প্রবেশে
অক্ষম ।
১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে ইংলেণ্ডের উদারনীতিক দলের লােকেরা কাৰ্য্য
পরিত্যাগ করিলেন এবং নূতন নিয়ােগে তাহাদের বিরােধীরা
নির্বাচিত হইলেন। দাদাভাই যে দলে যােগ দিয়াছিলেন,
তাহাদের সহিত অপর সাধারণের সহানুভূতি নাথাকাতে তিনি
ভােটে হারিলেন । এই উপলক্ষে তিনি ভারতের সংবাদপ
যে সংবাদ পাঠান তাহা পাঠে স্পষ্টই বুঝা যায় যে তিনি অকৃত
কাৰ্য্য হইলেও দমিয়া যান নাই।
সংবাদ।
“আমি আজ প্রায় অর্ধ-শতাব্দী কাল ব্যাপিয়া রাজনীতিক,
সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ক ব্যাপারের আন্দোলনে নিযুক্ত আছি ও
তাহাতে অন্যান্য লােকের ন্যায় কখনও কোন বিষয়ে কৃতকার্য
কোন বিষয়ে অকৃতকার্য হইতেছি। কিন্তু আমি কখনও কোন
কৃতকাৰ্যতায় অতিশয় আনন্দিত বা অকৃতকাৰ্যতায় অতিশয়
দুঃখিত হই নাই। উদার নীতিক দলের অন্যান্যের যে দক্ষ।
আমারও সেই দশা হইয়াছে। কিন্তু ফল হউক আর না হউক
কাজ করিয়া যাইতেই হইবে। আমি চিরকাল এই মূল মন্ত্র
অবলম্বন করিয়া কাজ করিয়া আসিতেছি এবং আজীবন তাহাই
করিব। যতদিন আমি সুস্থ থাকিব ততদিন দেশের সেবা
নিশ্চয়ই করিব। আমি আবার পালিয়ামেন্টের সাধারণ সভায়
প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিব। কেন না ভারতের শাসন সংস্কার
এবং অভিযােগের নিবারণ করিতেই হইবে। ভারতের মঙ্গলে
বিলাতের মঙ্গল। ইংরেজের ভারতে অবস্থান এবং ভারত শাসন
( ৩ ) ম্বিন্ধেই আমি পূৰ্বে অনেক আলােচনা করিয়াছি, ভবিষ্যতে মারও করিব। ভারতে এক নূতন শক্তির সৃষ্টি হইতেছে । যদি ইংরেজ রাজনীতিকগণ, ইংরেজ শাসক ও ব্যবস্থাপকগণকে ভারতের উন্নতি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি সম্বন্ধে সদুপদেশ না দেন, তবে ঐ অভিনব শক্তি জাগরিত হইয়া ইংরেজ-শাসনের বিরুদ্ধে দাড়াইবে। অতএব যাহাতে এমন কোন ঘটনা না ঘটিতে পারে, আমি সতত সে জন্য চেষ্টিত আছি। আমার অকৃতকাৰ্যতায় ভারতবাসীর নিরাশ হওয়া উচিত নহে। ইংরেজগণ ভারতবর্ষ সম্বন্ধে ক্রমশই সজাগ হইয়া উঠিতেছেন এবং ভারতের দুঃখ ঘুচাইতে তাহার ক্রমে সচেষ্ট হইতেছেন।” দাদাভাইর পালিয়ামেন্টে প্রবেশের অকৃতকাৰ্য্যতায় বাস্তবিক ভারতবাসীর অতীব দুঃখ হইয়াছিল। এই সম্বন্ধে “ইণ্ডিয়ান টাইমস পত্রে যাহা লিখিত হইয়াছে তাহা দেখাইতেছি। “দাদা- ভাইর পালিয়ামেন্টে প্রবেশে অকৃতকার্যতায় ভারতে তঁাহার বন্ধু-বান্ধবগণের মনে যে নিরাশার ভাব আসিয়াছে, তাহাতে আমরা নিতান্ত দুঃখিত। তিনি ভারতশাসন সম্বন্ধে যে সকল মত প্রকাশ করিতেন, তাহাতে যদিও আমাদের (Anglo Indians. মতের কোন মিল নাই,তথাপি তাহাকে আমরা অতি সদাশয়, উন্নত হৃদয় ও ভারতহিতৈষী বলিয়া অস্বীকার করি না।” ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে দাদাভাই নাওরাজি ভারতবর্ষ ত্যাগ করিয়া ইংলণ্ডে গমন করেন এবং ১৯০৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তথায় বাস করেন । বিলাতে তিনি বাড়ী ঘরও করিয়াছিলেন, তথাপি তিনি বিলাতী ( ২ ) হন নাই। তাহার স্বাভাবিক অধ্যাবসায়ের সহিত জন্মভূমি ভারতবর্ষের জন্য অনবরত অনবরত খাটিতেন। ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দ তিনি ভারতবাসীকে নৌ বিভাগে গ্রহণ করার জন্য লেখালেখি করিতে খাকন; কিন্তু তাহাতে সম্পূর্ণ অকৃতকার্য হন। কিন্তু নৌ বিভাগের কর্তাদের বুঝাইয়া দেন যে, ভারতবাসীকে কোন অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখিলে, মহারাণীর ঘােষণ-বাণীর বরুদ্ধাচরণ করা হয় ইহা ভাল নহে। মুদ্রাবিষয়ক সমিতি। ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে দাদাভাই মুদ্রাবিষয়ক কমিটির নিকট, ভারতের স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন সম্বন্ধে এক মন্তব্য প্রকাশ করেন এবং তৎসম্বন্ধে লণ্ডনের টাইমস্ পত্রে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, তাহার মর্ম এই- “মুদ্রার মূল্যের হ্রাস বৃদ্ধির সহিত অন্তবাণিজ্যের কোনরূপ ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। কিন্তু ভারতের রৌপ্য মুদ্রার সহিত স্বর্ণ মুদ্রার বিনিময়ে ভারতের অনেক ক্ষতি হয়। কারণ অন্য দেশে যখন স্বর্ণের মূল্য হ্রাস বৃদ্ধি হয়, তখন ভারতবর্ষ তাহাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হােমচাৰ্জ নামে আমরা প্রতি বৎসর বিলাতে যে টাকা পাঠাইয়া থাকি তাহাতে যথার্থ দেয় মুদ্রা অপেক্ষা অনেক অধিক মুদ্রা দিতে হয়, কেন না তাহা রৌপ্য মুদ্রার স্থলে স্বর্ণ মুদ্রায় দিতে হয়। রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে যদি প্রজাগণকে স্বর্ণ মুদ্রায় খাজানাদি দিতে হয়, তবে গবর্ণমেন্ট অনেক বেশী পান এবং প্রজা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
Publication of his book, তাহার পুস্তক প্রণয়ন। ১৯০২ খৃঃ তিনি Poverty and Un-British Rule in India নাম দিয়া এক পুস্তক প্রণয়ন করেন। মাসিক পত্রে ও সাময়িক ত্রে তিনি যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং সরকার বাহাদুরের সহিত শাসন সংস্কার সম্বন্ধে যে সব পত্র ব্যবহার করিয়া- ছিলেন তাহাই এই পুস্তকে সন্নিবেশিত হইয়াছিল। বর্তমানে দাদাভাইয়ের বক্তৃতাও উহাতে সন্নিবেশিত হওয়াতে ঐ পুস্তকের কলেবর অত্যন্ত বৃদ্ধি হইয়াছে। এই পুস্তক ভারতের অর্থনীতি ' এবং ভারত সম্বন্ধে অন্যান্য সারগর্ভ তত্ত্বে পরিপূর্ণ। এই পুস্তকে ভারতের ক্রমশঃ দারিদ্র বৃদ্ধির কারণ বলিতে যাইয়া তিনি উল্লেখ করিয়াছেন-ভারত হইতে প্রতি বৎসর ৩০কোটি পাউণ্ড ইংলণ্ডে চলিয়া যাইতেছে। উৎপরিবর্তে আমরা এক কপর্দকও ফিরিয়া পাইতেছি না। ইহার নিরাকরণ করিতে হইলে ইংরেজদের পরিবর্তে ভারতবাসীকেই ভারত শাসন ব্যাপারে নিযুক্ত করা । উচিত। তিনি পরিশেষে কোন সংবাদ পত্রের সম্পাদকের নিকট যাহা বলেন তাহাতেই তাহার রাজনীতিক মত পরিস্ফুট হইয়াছিল । তাহাও এই পুস্তকেই স্থান পাইয়াছে। নিম্নে তাহার মর্ম প্রদত্ত হুইল।
( ৩৪ )
“কিছুদিন ইংরেজ এবং ভারতবাসীর মধ্যে অর্থনীতি লইয়া
বিরােধ চলিতেছে। ইংরাজের ভারতে ইংরেজী শিক্ষা প্রবর্তন
করিয়া খুব উপকার সাধন করিয়াছেন। কিন্তু তাহারা অন্যান্য
বিষয়ে ভারতের যে ক্ষতি সাধন করিতেছেন তাহার তুলনায় এই
উপকার অতি তুচ্ছ। ভারতের উপর তাহারা অত্যাচার করিতে
আরম্ভ করিয়াছেন। ভারতের অর্থ তাহারা শােষণ করি:
নিতেছেন। এমন কি, আজ পৰ্যন্তও ঠিক ঐ ভাবেই চলিতেছে ।
প্রথমে'যে শশাষণের পরিমাণ দুই, এক কোটি পাউণ্ড মা-
ছিল, তাহা আজ এই ১৫০ বৎসরে ৩০ কোটি পাউণ্ডে পরিণত
হইয়াছে। এই অর্থ ভারত ছাড়া আর অন্য কোন দেশ যদি এক
বৎসরে খরচ করিত, তবে তাহারা এতদিনে একেবারে ধ্বংস
হইয়া যাইত। তাহারা এত অর্থ দণ্ড দিতেছে অথচ তাহার :
দেশের কোন উচ্চপদ প্রাপ্ত হইতেছে না। বিদেশ বাস
শাসনে প্রায় সর্বত্রই দোষ দেখিতে পাওয়া যায়।
কর্মচারীর সংখ্যা এদেশে ক্রমশঃই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতেছে ; সঙ্গে সঙ্গে
ভারতের অর্থ ক্রমে বেশী মাত্রায় বিলাতে যাইতেছে।
ফকে
ভারত দরিদ্র হইয়া পড়িতেছে। কাজেই দুতিক্ষে, মহামারীতে
এ দেশের অনেক লােক মরিতেছে। যাহারা বাচিতেছে তাহারাও
অনাহারে কষ্ট পাইতেছে। এদেশে খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ হয় না।
কেবল টাকার:অভাবে হয় মাত্র। যে অর্থ তাহারা এদেশ হইতে
শোষণ করেন, তাহাই আবার মূলধন হইয়া এদেশে বাণিজ্য
করিতে আসে, কিন্তু তখন পূব্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক অর্থ শােষণ
( ৩৫ )
করিয়া লইয়া যান। একদিকে তাহারা ভারতকে এরূপ শশাষণ
করিতেছেন, অন্যদিকে আবার ভারতবাসীকে তাহারা অতি হেয়
জ্ঞান করিতেছেন। ইংরেজেরা তাহাদের প্রতিজ্ঞার একবর্ণও
প্রতিপালন করেন নাই। ঘােযণীবাণীর কোনও কথা অনুসারে
কাজ করেন নাই। যাহারা কর প্রদান করিবে, অর্থব্যয় সম্বন্ধে
তাহাদের কোন মতামত থাকিবে না; ইহা অতি অবিচার।
আমাদের শাসনকর্তার বিদেশী। তাহারা লুণ্ঠন করিলে লুষ্ঠিত
অর্থ বিদেশে যাইবে। কিন্তু দেশী লােক লুণ্ঠন করিলে অর্থ দেশে
থাকে এবং তাহাতে দেশের অনেক কাজও হইতে পারে।
দাদাভাইয়ের পুস্তকের প্রস্তাবনা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। নিম্নে
তাহার মর্ম প্রদত্ত হইল।
ইংরেজদের এই কু-শাসন ভারতের পক্ষে যেমন অনিষ্টজনক,
বিলাতের পক্ষেও তেনি। আবার তাহাদের সু-শাসন উভয়
ছুশের পক্ষেই উপকারী।
ইংরেজ জাতি যদি ভারতবর্ষ সম্পর্কে সজাগ হন এবং সু-শাসন
তঁাহারা যদি তাহাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন এবং
ঘােষণাবাণী অনুসারে কাজ করেন, তাহা হইলে কিছুদিন পরেই
দেখিতে পাইবেন যে উভয় দেশই অত্যন্ত উন্নত হইয়াছে।
John Bright (জন ব্রাইট) বলিয়াছেন যে, ভারতের
মঙ্গলে বিলাতের মঙ্গল। আমরা ভারতকে দুই প্রকারে শােষণ
করিতেছি। এক প্রকার বেতনাদিতে, অন্য প্রকারে বাণিজ্য
দ্বারা। বাণিজ্য দ্বারা অর্থ আনয়ন প্রথাই আমি প্রকৃষ্ট মনে করি।
করেন;
( ৩৮ )
তাহাতে ভারতও ধনী হইতে পারে; ইংরেজ ত পারেই। ইংরেজের
কেন এই সুন্দর পদ্ধতি দেখিতে পাইতেছেন না ?
Congress of Social democrats.
সমাজ সংস্কাবাদীগণের
কংগ্রেস ।
১৯০৫ খৃঃ দাদাভাই ভারতের প্রতিনিধি রূপে আমষ্টারডামে
অন্তর্জাতিক সামাজিক মহাসভায় যােগদান করেন। এই সভায়
নাওরাজী ভারত গভর্ণমেন্টের উপর দোষারোপ করিয়া অনেক
কথাই বলিয়াছিলেন। উপস্থিত জনমণ্ডলীর মধ্যে একজন
বলিয়াছিলেন যে উক্ত সভায় দাদাভাই ৮০ বৎসর বয়সে যে জীবনী-
শক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন তাহাতে তাহাপেক্ষা ৩০
বৎসর কম বয়সের লােকেরাও হিংসা না করিয়া থাকিতে পারে না।
সভার এক প্রান্ত হইতে অন্ত প্রান্ত পর্যন্ত তাহার স্বর স্পষ্ট
শুনিতে পাওয়া গিয়াছিল । ১৯০৬ খৃষ্টাব্দে যখন তিনি
কলিকাতার জাতীয় মহাসমিতির সভাপতিরূপে আগমন করেন,
এই সময় মধ্যে তিনি নানা সভায় বক্তৃতা করিয়া নানা খবরের
কাগজ ও মাসিক কাগজে প্রবন্ধ লিখিয়া ভারতের সেবা করিয়া-
ছিলেন। তিনি একবারের বেশী পালিয়ামেন্টের প্রবেশাধিকার
( ৩৭ ) লাভ করিতে পারেন নাই, কিন্তু তিনি বড়লাটকে এবং ভারতের সেক্রেটারীকে ভারতের দরিদ্রতা সম্বন্ধে মনােযােগ আকর্ষণ করাইতে যে চেষ্টা করিয়াছিলেন তজ্জন্য ভারতবাসী মাত্রই তাহার নিকট কৃতজ্ঞ। তাহার কাৰ্য্য পদ্ধতির মধ্যে কোন প্রকার স্বার্থের গন্ধ ছিল না। ইংরেজদের ন্যায় বিচারের উপর তাহার খুব বিশ্বাস ছিল বলিয়াই ভারতের উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়াছিলেন। গােখেল বলিয়াছিলেন যে দাদাভাই জগতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণের মধ্যে একজন। বােম্বের একজন বৃদ্ধ সম্পাদক বলিয়াছিলেন যে, এমন লােক লাখে একজন মিলে কি না সন্দেহ। যদিও তিনি মাঝে মাঝে আবশ্যক বােধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করিতেন, তথাপি সাধারণতঃ তাহার বক্তৃতার ভাৰা অতি প্রাঞ্জল, গভীর, স্বদেশ হিতৈষিতার পরিচায়ক এবং উচ্চ আশ পরিজ্ঞাপক ছিল। দাদাভাইর জীবনকে প্রত্যেকেরই আদর্শ করা উচিত। তিনি নিজ জীবনের ৩০ বৎসর কাল স্বদেশ সেবায় নিয়ােগ করিয়া- ছিলেন। বর্তমান যুবকবৃন্দ যদি তাহার জীবনের কিয়দংশও অনুকরণ করিতে পারে, তবে ভারতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়। The Calcutta Congresa, কলিকাতা জাতীন্ন মহাসমিতি। লর্ড কার্জনের শাসনকালের শেষ সময়েই ভারতের অনেক দুঃখ দুর্দশা ঘটিয়াছিল। আমলাতন্ত্র ( Bureaucracy) শাসন-
( ৩৮ )
প্রণালীর অত্যাচার উৎপীড়ন ক্রমশ: ঘনীভূত হইতে লাগিল।
লর্ড মিন্টোর শাসনকালে এদেশবাসী যে কিছু শান্তি উপভােগ
করিয়াছিল, তাহা ক্রমে অত্যাচারে পরিণত হইতে লাগিল।
ক্রমে একদল উচ্চশিক্ষিত এবং উত্তেজনাশীল লােক ইংরেজদের
ন্যায় শাসনে বিশ্বাস হারাইলেন এবং ইংরেজদের নিকটে আর
ভিক্ষুকবৃত্তি অবলম্বন করিবেন না বলিয়া মনস্থ করিলেন। কিন্তু,
বুদ্ধ কংগ্ৰেসবাদীরা ঐ ভিক্ষুকবৃত্তি অবলম্বনই ভাল মনে করিলেন।
ইংরেজদের সততার উপরে বিশ্বাস করিয়া তাহার আইনসঙ্গত
আন্দোলনের (Constitutional agitation) বিরােধী হইলেন
এবং কংগ্রেসের আবশ্যকতা সম্বন্ধে প্রশ্ন করিলেন। এখন
নিজেদের ঘরেই দু’টী দল গঠিত হইল। এমন অবস্থায় কে এই
বিবাদ মীমাংসা করিবে, ইহা একটা সমস্যা হইয়া দাঁড়াইল।
কাজেই দাদাভাইকে সভাপতিরূপে জাতীয় মহাসভায় আহ্বান
করা হইল। ১৯০৭০ খৃষ্টাব্দে এই সম্বন্ধে “ইণ্ডিয়ান রিভিউ”তে যাহা
প্রকাশিত হইয়াছিল তাহার মর্ম নিম্নে প্রদত্ত হইল।
“দাদাভাইর সভাপতিত্বে সমস্ত দলাদলি চূর্ণ হইয়া গেল।
কংগ্রেসে কোন তর্কের বিষয় উপস্থিত হইলে তাহাতে নানা
লােকের নানা মত হইবেই, কিন্তু তিনি এমন সুন্দর ভাবে যুক্তি তর্ক
প্রদর্শন করিলেন যে আর কোন দলাদলি থাকিল না। উভয়
দলে আপােষ মীমাংসা হইল এবং সর্বসম্মতিক্রমে বিদেশী বর্জন
( Boycott) নীতি অবলম্বন করা হইল। যাহারা বাহির হইতে
দলাদলির প্রভাবে কংগ্রেস ভাঙ্গিয়া যাইবে এমন আশা করিতেছিল
( ৩৯ )
তাহারা অত্যন্ত মর্মাহত হইল। কংগ্রেসের কাৰ্য্য সুন্দররূপে
নিৰ্বাহিত হইল। সভাপতি সকলকে অধ্যবসায় অবলম্বন করিতে
বলিলেন। তিনি বলিলেন যে এখন নিরাশ হইবার সময় নহে।
এখন অধ্যবসায় সহকারে কাৰ্য্য করিতে হইবে। আবার উভয়
দলে শান্তি স্থাপিত হইল। দাদাভাই এই শান্তিকা। ক্রমে
আন্দোলন ঘনীভূত হইয়া আসিল। দাদ ভাইকে এই সময়ে দেশের
লােক যে ভাবে অভ্যর্থনা করিয়াছিল, তিনি জীবনে এমন অভ্যর্থনা
আর কখনও প্রাপ্ত হন নাই।
দাদাভাই সভাপতিরূপে যে বক্তৃতা দান করিয়াছিলেন তাহ
অতিশয় সারগর্ভ ছিল। তিনি বহু দিবসাবধি দেশে এবং বিদেশে
যে জ্ঞান সঞ্চয় করিয়াছিলেন, এই সভায় তাহারই পরাকাষ্ঠা
দেখাইলেন। তিনি সকলের সহিত একত্র হইয়া ভারতে স্বায়ত্ত
শাসনের দাবী করিয়া বসিলেন। এই স্বায়ত্ত শাসনই সমস্ত
দেশের লােকের আদর্শ হইয়া উঠিল। দেশে অন্য কোন নেতা
এমন ভাবে এমন কোন অধিকারে আজ পর্যন্ত দাবী করিতে
পারেন নাই। লর্ড মলির উদারতার উপরে তার খুব বিশ্বাস
ছিল। তিনি মহারাণীর ঘােষৎবাণী হইতে ভারতবাসীর
কতকগুলি মূল্যবান্ অধিকারের বিষয় উল্লেখ করেন এবং
সৰ্বশেষে নিম্নলিখিত কয়েকটা কথা বলিয়া তাহার বক্তব্য শেষ
করেন।
“আমি কতদিন আর বাঁচিব তাহা জানিনা। আমাদের
অদৃষ্টে কি আছে না আছে তাহাও আমার অজ্ঞাত। যদি
( ৪০ )
অন্তরেয় সহিত কিছু বলিতে হয়, তবে বলির, হে ভারতবাসি
তােমরা একতা অবলম্বন কর এবং স্বায়ত্ব শাসন লাভ করিয়া
আমাদের দেশের যে হাজার হাজার অধিবাসী দরিদ্রতায় ডুবিয়ং
গাছে, তাহাদের রক্ষা কর। এবং তােমাদের ক্রমােন্নতি হউক
এই আমার একান্ত বাসনা।
দেশবাসী কতই না আগ্রহের সহিত তাহার কথা শুনিয়াছিল
==
Congress and Birthday Messages.
কংগ্রেস এবং তাহার জন্মদিনে
হোেষণাবলী ।
।
তাহার জীবনের অবশিষ্ট বার বৎসরকাল তিনি তাহার
জন্মভূমি ভারসেবা (Versaba) নামক স্থানে স্বীয় পৌত্রীদের
তত্বাবধানে দুৰ্বল দেহ লইয়া অবস্থান করেন। প্রবল ইচ্ছা
থাকা সত্বেও তিনি দুর্বলতা বশতঃ কোন কাজ করিতে পারিতেন
; কিন্তু সময় সময় তিনি দেশের লোকদের অনেক গুরুতর
বিষয়ে উপদেশ প্রদান করিতে কুষ্ঠিত ছিলেন না।
দলে দলে স্বদেশপ্রেমিকগণ মাঝে মাঝে তাহার বাড়ীতে
গিয়া উপস্থিত হইতেন এবং সহানুভূতি প্রাপ্ত হইতেন। ' তিনি
স্বদেশপ্রেমে তাহাদের উৎসাহ প্লইতেন: বৎসর বৎসর
( ৪১ ) । তিনি কংগ্রেসে যে সংবাদ পাঠাইতেন, তাহা আগ্রহের সহিত পরিগৃহীত হইত। এবং দেশবাসীর পক্ষ হইতে কংগ্রেস তাহাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর তাহার জন্মদিন। উপলক্ষে তাঁহাকে দেশের লোেক, যে সকল অভিনন্দন-পত্র প্রেরণ করিতেন তাহার উত্তরে দাদাভাই যাহা বলিতেন, তাহাই অতিশয় মূল্যবান্ হইত। ইহাতে সমস্ত দেশের বড় বড় ঘটনার উল্লেখ থাকিত। অনেক লােকের অনেক ত্যাগের দৃষ্টান্তে পূর্ণ থাকিত। ১৯১১ খৃঃ সম্রাটের ভারত আগমন উপলক্ষে তাহার অষ্টাশীতিতম জন্মােৎসবের যে ঘোষণাবাণী প্রচার করেন, তাহাতে তিনি ইংরেজ রাজের উপরে অনেক বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন। পর বৎসরের সংবাদে তিনি লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক পাবলিক সারভিস কমিশন নিয়ােগ, ভারত সেবক-সমিতির (Servant of India Society) কার্যাবলি ডাক্তার রাসবিহারী ঘােষ এবং সার তারকনাথ পালিতের বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দান এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতবাসীদের অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলােচনা করেন। দক্ষিণ আফ্রিকা সম্বন্ধে তিনি আমাদের দেশবাসী উপনিবেশ সমূহে, বিশেষতঃ দক্ষিণ আফ্রিকায় যে কষ্ট ভােগ করিতেছে তাহা অতি অসহ। বর্তমানে
( ৪২ )
তাহাদের উপর যে আইন জারি হইয়াছে, তাহাতে বােধ হয় যে
গভমেন্ট তাহাদের সম্বন্ধে একেবারে নির্বিকার। কিন্তু আমি
এখনও আশা করিতেছি যে, সরকার বাহাদুর তাহাদের উপুর ন্যায়
বিচার করিবেন।
বর্তমান যুদ্ধ এবং দাদাভাইয়ের
থােষণাবাণী ।
স্বদেশ-নেতা দাদাভাই যুদ্ধ আরম্ভ হইতেই দেশবাসীকে লক্ষ্য
করিয়া অনেক কথা বলেন। প্রথমে তিনি লেডি হার্ডিঞ্জের
মৃত্যুতে শােক প্রকাশ করিয়া বলেন :-
বর্তমান যুদ্ধে পৃথিবীর কি অবস্থা হইবে তাহা কে জানে।
এই যুদ্ধ ব্যাপারে ভারতবর্ষের স্থান কোথায়—আমরা ইংরেজদের
প্রজা। এখন ভাবিয়া দেখ আমাদের কি কর্তব্য। ভারতবর্ষ
যদি তাহাদের পূর্বের উন্নত অবস্থা ফিরিয়া পাইতে চায়, তবে
তাহা ইংরেজদের নিকট হইতে পাইতে হইবে। আমরা
ইংরেজদের প্রজা ইহাই আমাদের গৌরবের বিষয়।
আমি জীবনে কোন দিন বৃটিশ শাসনের টীকা টিপ্পনী ছাড়া
প্রশংসা করি নাই। এবং মাঝে মাঝে অনেক অপ্রীতিকর কথা
বলিতেও কুণ্ঠিত হই নাই। কিন্তু আমি আজ অন্তরের সহিত
বলিতেছি যে, সভ্য জগৎ মাত্রই ইংরেজদের নিকটে কোন না
( ৪৩ )
কোন বিষয়ে ঋণী। অতএব প্রত্যেক ভারতবাসীর যথাশক্তি
তাহাদের এই বিপদে সাহায্য করা উচিৎ। এ দেশের রাজা
প্রজা ইতিপূৰ্বেই তাহাদের সাহায্য করিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যতদিন না তাহাদের জয় হয়, ততদিনই তাহাদের সাহায্য করা
অতীব দরকার।
তাহার একোনশত জন্মােৎসব অতি সমারােহের সহিত সম্পন্ন
হইয়াছিল। অসংখ্য অভিনন্দন-পত্র প্রাতঃকাল হইতে আসিতে
লাগিল। লর্ড হার্ডিঞ্জ যে তার ( Telegram) পাঠাইয়াছিলেন
তাহা এই :--
তােমার জন্মােৎসব উপলক্ষে আমি আনন্দ প্রকাশ করিতেছি,
আমি আশা করি তুমি দীর্ঘজীবি হও। লােকে তােমাকেই
আদর্শ করুক।
তদুত্তরে দাদাভাই বলেন :-
আমার জন্মােৎসবে আপনি আনন্দ প্রকাশ করিয়া যে সংবাদ
প্রেরণ করিয়াছেন, তাহা আমি অন্তরের সহিত গ্রহণ করিতেছি
এবং আপনাকে ধন্যবাদ দিতেছি। আমি আশা করি যে, এই
জগৎব্যাপী যুদ্ধ অচিরেই থামিয়া যাইবে এবং ভারতবাসী চিরকাল
রাজভক্ত থাকিয়া ন্যায় বিচার ইত্যাদি প্রাপ্ত হইবে।
বােম্বায়ের গভর্ণর, অন্যান্য লােকের অভিনন্দনের উত্তরে তিনি
বলেন:-
আমার জন্মােৎসব উপলক্ষে আপনারা যে আনন্দ প্রকাশ
করিয়াছেন, তজ্জন্য আমি আপনাদিগকে অন্তরের সহিত ধন্যবাদ
( ৪৪ ) দিতেছি। সমরের অবস্থা বড় সঙ্কটজনক এবং এই সময়ে প্রত্যেক ভারতবাসীরই ইংরেজদিগকে প্রাণপণে সাহায্য প্রদান করা উচিৎ। ইংরেজের। এ ক্ষেত্রে অতিশয় ন্যায়নিষ্ঠার পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। অতএব অচির ভবিষ্যতে তাহাদের জয়লাভে প্রত্যেকেরই আনন্দ প্রকাশ করা উচিৎ। এই শেষ জন্মােৎসবের আর একটা বিশেষত্ব এই যে, বােম্বাইয়ের মহিলা সম্প্রদায় তাহার নিকট ডেপুটেশন (Depu tation) পাঠাইয়াছিলেন। হিন্দু, মুসললান এবং পার্শি ইত্যাদি সকল সম্প্রদায় হইতেই তাহার নিকট ডেপুটেশন গিয়াছিল । হায়দরাবাদের পক্ষ হইতে সরােজিনী নাইডড গিয়াছিলেন । যমুনাবাই গুজরাটী স্ত্রীমণ্ডল হইতে এক অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন। ভারতে স্ত্রী-শিক্ষার জন্য দাদাভাই রেভারেণ্ড অষ্টেল চেম্বালেনের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া বলেন- “ভারতে স্ত্রী-শিক্ষার উন্নতিকল্পে ভারতের সেক্রেটারী অষ্টেন চেম্বারলেন যাহা করিয়াছেন, তজ্জন্য আমার অনেক বন্ধু সার উইলিয়ম ওয়েডারবর্ণ এবং অন্যান্য লােকেরা তাহাকে যে অভিনন্দন-পত্র প্রদান করিয়াছেন, তজ্জন্য আমি অতিশয় আনন্দিত হইয়াছি। ভারতবর্যের লােক যদি এই স্ত্রী-শিক্ষার আন্দোলনটা অন্তরের সহিত সমর্থন করেন তবে ভারতের বড়ই উপকার হইবে।”
( ৪৫ ) দাদাভাইয়ের পুস্তকাগার। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তিনি তাহার লাইব্রেরীর পুস্তকগুলি বােম্বে প্রেসিডেন্সি এসােসিয়েশনের হস্তে প্রদান করেন। তাহাতে এমন অনেক মুল্যবান্ পুস্তক ছিল, যাহা পাঠ করিয়া দেশের শিক্ষিত লােকের একটা নূতন আলােকের সন্ধান পাইয়াছে। বাজনৈতিক আন্দোলনকারীদের কাজের অনেক সুবিধা হইয়াছে। বোেম্ব বিশ্ববিদ্যালয় । তাহার জীবনীর প্রথম ভাগেই তিনি শিক্ষার জন্য যাহা যাহা করিয়াছেন তাহার আলােচনা করা গিয়াছে। তিনি নিজে উচ্চ ইংরেজী শিক্ষিত লােক। কাজেই তিনি শিক্ষা বিস্তারে খুবই সচেষ্ট ছিলেন। তিনি খবরের কাগজে অনেক সময়েই তাঁহার রাজনৈতিক মন্তব্য সকল প্রকাশ করিতেন। তিনি একজন উচ্চ শ্রেণীর সম্পাদক ছিলেন। ১৯১৬ খৃঃ বােম্বায়ের বিশ্ববিদ্যালয় লর্ড ওয়েলিংডনের সভাপতিত্বে একটা বিশেষ সভার অধিবেশন করিয়া তাহাকে ডাক্তার অব ল (Dotcor of Law) উপাধি প্রদান করেন। তার জীবনের অপরাহ্ন বেলায় তিনি তাঁহার সংস্কার কাৰ্য্যের সুফলের আশা দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। কাজেই তিনি স্বাধীনতাপ্রিয় ইংরেজ জাতির ন্যায় বিচারের উপর ভারতবাসীকে বিশ্বাস স্থাপন করিতে অনুরােধ করিয়াছিলেন।
( ৪৬ )
ভারসেবাতে যখন তিনি নীরব জীবন যাপন করিতেছিলেন,
তখনও ভারতের অনেক বড় বড় লােক তাহার বাড়ীতে যাইতেন
এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে অনেক পরামর্শ গ্রহণ
করিতেন।
দাদাভাইয়ের সহযােগীগণ।
জীবনের শেষ বার বৎসর তিনি ভারসেবায় নীরবে কাটাইয়া
ছিলেন, মাত্র মধ্যে একবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দান গ্রহণ
করিবার বােম্বে আসিয়াছিলেন। কর্তব্য সাধন
দ্বারা যে সন্তুষ্টি মানুষের আসিতে পারে, তিনি তাহার অধিকারী
হইয়াছিলেন। যে সকল লােক তাহার কার্যের সহযােগী ছিলেন,
তাহারা একে একে শরৎকালের বৃক্ষপত্রের ন্যায় ঝরিয়া পড়িতে
লাগিলেন। সার উইলিয়াম ওয়েডারবার্ণ তাহার নিকট রীতিমত
পব্যবহার করিতেন।
কিন্তু তাহার অপর বন্ধু এ, ও,
হিউম
সাহেবের মৃত্যুতে তিনি অতিশয় দুঃখিত হইয়াছিলেন। ভারতেও
গােপালকৃষ্ণ গােখেল এবং ফেয়ােজদা মেটা প্রভৃতি মনীষিগণ
পরলােকগমন করিলেন। তঁাহারও আর বেশী দিন বাকী থাকিল না
১৯১৭ খৃঃ ১লা জুন প্রাতে তাহার অসুখের কথা শুনিয়া ভারতের
লােক অতিশয় শঙ্কিত হইল। অপরাহ্নে তাহার অবস্থা একটু
ভাল হইলে সকলেই আবার আনন্দিত হইল। ২রা জুন চিকিৎসার
জন্য তাঁহাকে বােম্বাইনগরে স্থানান্তরিত করা হইল। কিন্তু তাহাতে
( ৪৭ ) কোন ফল ফলিল না। তার দিন শেষ হইয়া আসিয়াছিল। ৩০শে জুন তারিখে দাদাভাই শেষ নিশ্বাস ফেলিলেন। তাহার কন্যাগণ পৌত্র পৌত্রীগণ সকলেই তাহার শেষ সময়ে উপস্থিত ছিল। মৃত্যুর আধঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত তিনি সজ্ঞানে ছিলেন। তাহার মৃত্যুর চারিদিন পূৰ্ব্ব হইতেই তিনি অতিশয় দুর্বলতা বশতঃ বেশী কথা কহিতে পারিতেন না। তথাপি সমস্ত জগতের বিশেষতঃ ভারতের সমস্ত বিবরণ জানিবার জন্য খুব উদগ্রীব ছিলেন। তঁাহার জামাতা মিরাদিনা এবং পৌত্রগণ তাহাকে খবরের কাগজ পড়িয়া শুনাইত শেষ মুহূর্তে তিনি তাহার জনৈক বন্ধু সার জর্জ বার্ডউড সাহেবের মৃত্যতে অতীব দুঃখিত হন। মৃত্যুর পরদিন পালিটানা আলয়ে (যেখানে তিনি মৃত্যুর কয়েক- দিন পূর্বে আসিয়া বাস করিতেছিলেন) তাহার সৎকার কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হয়। তাঁহার মৃতদেহ যখন সৎকারার্থে নেওয়া হয়, তখন পঞ্চদশ সহস্রাধিক লােক তঁাহার অনুগামী হইয়াছিল। ভারতের সৰ্বশ্রেণীর নেতাগণের মধ্যে, সার জেমসেজি, জিজিবাই, সার দিস ওয়াচা, সার সাপুরজি ব্রোচ, সার চিমনলাল শীতলবাদ, সার নারায়ণ চন্দ্রাবারকর, মিঃ ভি, এ শ্রীনিবাস শাস্ত্রী, মিঃ কে নটরঞ্জন, মিঃ জিন্না প্রভৃতি মনীষিগণ উপস্থিত ছিলেন। সৎকার কাৰ্য শেষ হইয়া গেল, সার নারায়ণ চন্দ্রাবারকর তাহার মৃতাত্মার উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটা কথা বলেন। “এ কথা বলিলে বোধ হয় অত্যুক্তি হইবে না যে, তিনি তাহার সৎচিন্তা, সৎকাৰ্য্য দ্বারা ভারতের উন্নতি করিবার জন্য দ্বিতীয় ( ৪৮ ) জবােন্তার রূপে এ দেশে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কেবল মাত্র পার্শিরা নহে, ভারতের সর্বশ্রেণীর লােকেরা দাদাভাইকে আপনার লােক বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিল। তাহার মৃত্যুতে আজ ভারতের অনেক ক্ষতি হইয়াছে। অথবা আমরা মনে করিতে পারি যে তিনি মরেন নাই। যে সূৰ্য্য ৯৩ বৎসর পর্যন্ত আলােক প্রদান করিয়াছে তাহা অস্তমিত হইয়াছে মাত্র। আবার নূতন ভারতে নূতন উদ্যমে অবতীর্ণ হইবেন। অতএব আমাদের এখান হইতে বিদায় হওয়ার পূর্বে আমাদের এই প্রতিজ্ঞা করা উচিত যে, তাহারই পবিত্র আদর্শ গ্রহণ করিয়া আমাদের ঐ রকমই স্বদেশ প্রেমিক ও অধ্যবসায়ী হওয়া উচিত।” মৃত্যুর পর চারিদিক হইতে অসংখ্য পত্র ও টেলিগ্রাম আসিতে লাগিল। বােম্বায়ের তৎকালীন গভর্ণর লর্ড ওয়েলিংডন দিন ওয়াচকে যে পত্র লেখেন তাহা উল্লেখযােগ্য। “আশা করি তুমি অবশ্য দাদাভাইর পরিবারবর্গকে আমার সমবেদনা জানাইবে । বড়ই দুঃখের বিষয়, আমি তাহার সৎকারের সময় উপস্থিত হইতে পারি নাই। কারণ আমি রবিবারে মাত্র তাহার মৃত্যু সংবাদ পাইয়াছি, কিন্তু তখন আর যাওয়ার সময় ছিল না।” ৰােম্বাই প্রেসিডেন্সি এসােসিয়েশন, সার দি ওয়াচার নেতৃত্বে যে সংবাদ প্রেরণ করিয়াছিলেন, তাহা এই ;- “সৰ্বসম্মতিক্রমে তিনি ভারতের রাজনীতিক এবং অর্থনীতিক আন্দোলনের জন্মদাতা ছিলেন। তিনি ভারতের স্বরাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শ ছিলেন। তাহারই আদর্শে ভারতের নেতৃবৃন্দ ( ৪৯ ) {। গড়িয়া উঠিয়াছিল। তিনি আদর্শ স্বদেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশবাসী তাহাকে অতি সম্মানের চক্ষে দেখিতেন। তিনি অদম্য উৎসাহী এবং অক্লান্ত অধ্যবসায়ী ছিলেন। তিনি সরলতা এবং পবিত্রতার অবতার ছিলেন। তিনি অতুল কর্তব্যনিষ্ঠ এবং রাজভক্ত ছিলেন। পুরুষ পরম্পরাক্রমে তাহারই আদর্শ ধরিয়া ভারত গঠিত হইয়া উঠিবে।” মিঃ সুরেন্দ্র ব্যানার্জি বােম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে দাদাভাইর তৈল- চিত্রের আবরণ উন্মােচন করেন। তাঁহার স্মৃতিরক্ষা কল্পে অনেক পাঠাগার ইত্যাদি স্থাপিত হইয়াছে। পার্শীরাও তঁাহার স্মৃতিরক্ষা- 'কল্পে যথেষ্ট করিয়াছে। তাহার জীবনীতে আমাদের অনেক শিক্ষনীয় বিষয় আছে। অতএব হে ভ্রাতৃবৃন্দ, তিনি আমাদিগকে যাহা বলিয়াছেন, তাহা স্মরণ রাখিতে হইবে। যিনি কখন কোনপ্রকার বিপদে আপদেই সত্যের অপলাপ করেন নাই, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া দেশের সেবা করিয়া গিয়াছেন, যিনি ৯৩ বৎসর কাল পর্যন্ত নিঃস্বার্থভাবে জীবন যাপন করিয়া গিয়াছেন, জীবনে মরণে আমাদিগকে তঁহারই বাণী অনুসরণ করিয়া চলিতে হইবে।
পণ্ডিত শ্ৰীমোক্ষদাচরণ সামাধ্যায়ী প্রণীত
পুস্তকাবলী।
পাণিনীয় মহাভাষ্যের বঙ্গানুবাদ।
ডিমাই ৮ পৃষ্ঠার ৮০০ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ। মূল্য ৩০ টাকা।
লােকমান্য তিলকের জীবনী (যন্ত্রস্থ )
যাহার মত অবলম্বনে রাশিয়া স্বাধীন হইয়াছে, যাহার মতে দীক্ষিত
হইয়া মহাত্মা গান্ধী বর্তমান রাজনীতি প্রচার করিতেছেন।
সেই
স্বনামধন্য
কাউন্ট টষ্টয়ের জীবনী (যন্ত্রস্থ )
ফরাসি ও রুশিয়ার রাষ্ট্রবিপ্লব ( যন্ত্রস্থ )
সামবেদীয় সন্ধ্যাবিধি
আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ত্রিবিধ
ব্যাখ্যা সম্বলিত। মুল্য • দুই আনা।
No text on this page.
SAYA
SECO
PRESS
CALL UTTA
Ciwan
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.