Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Swapan-pasaree

Majumder, Mohitalal · 2010/01/2

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্বপন-পসারী
শ্ৰীমােহিতলাল মজুমদার
প্রণীত
ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস -
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট কলিকাতা

প্রকাশক
কি জঞ্জ
ইণ্ডিয়া পাবলিশিং হাউল
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
কান্তিক প্রেস •
২২, মুকিম ফ্রীট, কলিকাত
একালাচাদ দালাল কর্তৃক মুদ্রিত।
মূল্য
বাধা •

ভূমিকা স্বপন-পরীর অধিকাংশ কবিতা ‘ভারতী’-পত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল, এক্ষণে ‘ভারতী’রই মেহচ্ছায়ায় পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইল। প্রথম-বয়সের রচনা ইহাতে একটিও নাই। গত দশবৎসরে যাহা লিখিয়াছি, তাহার মধ্যে যাহা মাসিকে প্রকাশিত হইয়াছে তাহারি কতক বাদ দিয়া, বাকি রচনাগুলি একত্র করিয়া দিলাম ; অপ্রকাশিত কবিতা দুই-চারিটি মাত্র আছে। উচ্চৈঃশ্রবা’-শীর্ষক কবিতাটি ভিক্টর হিউগাের অনুসরণে লিখিত। ‘বেদুঈন’-নামক কবিতাটি মােসলেম-ভারত’-সম্পাদক বহু সমাদরে চিত্র-সম্বলিত করিয়া তাহার সুন্দর পত্রিকাখানিতে প্রকাশিত করিয়া আমার মত ক্ষুদ্র লেখকের যথেষ্ট সম্মান করিয়াছেন, এজন্য আমি তাহার নিকট কৃতজ্ঞ। স্বপন-পরীর মুখপত্রের পরিকল্পনাটি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী বন্ধুবর শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র রায়, বি, এসি মহাশয়ের প্রতিভা ও বন্ধু-প্রীতির নিদর্শন। এই ধরণীর ফুল্ল-শ্যামল পসরাখালি যেন মুর্তি পরিগ্রহ করিয়া, জাগর-রাজ্যের অপর পায়ে দাঁড়াইয়া, নীল নৈশকাশের চন্দ্রমণ্ডলে আপনার যে প্রতিচ্ছায়া দেখিতেছে, চিত্র-কবি তাহাকেই স্বপন বলিয়াছেন—সে যেন বাস্তব অপেক্ষাও সত্য! কান্তিক প্রেসের সুযােগ্য কর্মচারী আমার পরম প্রীতিভাজন শ্ৰীযুক্ত কমলাকান্ত দালাল গ্রন্থখানির মুদ্রণব্যাপারে কব্যাতিরিক্ত যত্ন ও . পরিশ্রম করিয়া আমার বিশেষ সহায়তা করিয়াছেন, এজন্য তিনিও আমার ধন্যবাদভাজন। শ্রীপঞ্চমী শ্ৰীমােহিতলাল মজুমদার ১৩২৮ সাল

No text on this page.

তােমাকে

No text on this page.

ग ৪০ ৩ • ০ ০ ০ কবিতা স্বপন-পসারী রূপ-তান্ত্রিক দিদার চোখের-দেখা পুরূরবা বসন্ত-আগমনী ৬০০ ১১ ৮০০ ১৩ . ১৫ ২৮ ৮ । চূত-মঞ্জরী ২ ন ••• r E ৪৪। ০ ০ ০ কিশােরী নারী শ্রাবণ-রজনী চুড়ির আওয়াজ ভাদরের বেলা be ৩৪ ••• ০ ০ ৫ ••• 82 ০ ০ ••• . * * ৪৩ পরম-ক্ষণ তারকা ও ফুল ••• ৪৫ ০০০ ৪৬ মৃত্যু ক্ষ্যাপা . . ••• ৫৪ ০ ০ + ৫৫ ০ ০ ০ অমৃতের পুত্র অ-মানুষ অঘাের-পন্থী পাপ নাদিরশাহের জাগরণ ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ । ৬৪ পৃ ৬ . . ••• ৮ । ••• ৮১ নাদিরশাহের শেষ মহামানব আবির্ভাব দেবেন্দ্রনাথের সনেট কবির প্রতি উচ্চৈঃশ্রবা ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৮৭ ০০ ০ ৮৯ :: কলস-ভরা ০৫০ ৪০০ ৯৭ ঘরের বাঁধন গজল-গান . . . ••• సన ৫০ হাফিজের অনুসরণে * •• ••• ••• ••• ৮০০ ৫০০ ১০৯ শেষ-শয্যায় নূরজাহান বেদুঈন্ পূর্ণিমা-স্বপ্ন ০ ০ ০ ১২১ ০৫০ ১৩৪ • ৮০ . . . ১৩% ••• ১৩৯ প্রেম ও সতীধৰ্ম্ম কৰ্ম্মফল ••• ••• ১৪১ ১২ ••• ••• ৪৩ ৫০০ ১৪৬ লীলা ভ্রান্তিবিলাস আঁধারের লেখা কামনা ৫ . ০ ০ ০ ১৪৯ ••• . ••• ১৫২ স্বপন-পী

No text on this page.

বন- পসারী করি দ্বারে দ্বারে স্বপনের ফিরি- স্বপন-ব্যাপারী আমি, নাহি জহরত—পান্না কি হীরা, মুকুতার হার দামী। ভুলের ফুলের মােহন মালিক গাঁথিয়াছে হের স্বপন-বালিকা। যে বীণা বাজাতে আলাে-নীহারিকা ছায়াপথে যায় আমি- তারি সুরে হেঁকে পথ চলি ডেকে, স্বপন-পসারী আমি। বাসবেরধনুবরণ-সুষমা নীলিমায় মিলি যায়- পটগুলি দেখ সেই রঙে আঁকা মৃণালের তুলিকায়।

শপন-পরী
গােলাপ–আঁকা এ চুন-রাগে !
রং হেসে চায়-বসন্ত জাগে,
ডালিম-দানার রস যেন লাগে
অধরের কিনারায়
পটগুলি দেখ কোন্ রঙে আঁকা
মৃণালের তুলিকায়।
==
একখানি ছৰি এই যে হেথায়-
চেয়ে দেখ এর পানে।
এমনটি আর দেখেছ কোথায়,
বল দেখি কোন্‌খানে ?
চেয়ে দেখ শুধু আঁখিতে ইহার,
ভঙ্গিমা দেখ অধর-রেখার,
ললাট বেড়িয়া সন্ধ্যা-আঁধার
কেশ-রচনার ভাণে
ছায়া-সুষমার মােহিনী অপার
চেয়ে দেখ এইখানে।
মর্ত-মর যত দাহ আছে,
-বাসনার মরীচিকা,
আত্মার আধি, নিদারুণ ব্যাধি
ললাটের তলে লিখা।

স্বপন-পলারী
নিবিড়-আঁধার কেশ-তপােবনে
সুকায়ে রেখেছে ঋষি-ধ্যানধনে,
ফুরিছে অধর-গােলাপ-কাননে
অলকার ভােগশিখা ।
মানবের আশা-নিরাশার সীমা
ও দুটি নয়নে লিখা ।
জোগাচিকণ গুণ্ঠন এই
আঁধার-কবরী-ঢাকা-
পরায়ে দেখ গাে প্রেয়সীর মুখে,
বুঝিবে কি সুধামাখা।
তারার চুমকি-কালাে পেশােয়াজ,
মখমল সাজ, সুকোমল ভাঁজ,
পাড়ে লতা-পাতা-কুসুমের কাজ,
নাহি যে দাগটি আঁকা।
এ চারু বসন-বিভবে সাজিলে
হাসিটি যাবে না ঢাকা।
এনেছি আরসী-মানস-সংসী,
বিৰিত বুকে তার
যে ছায়া তােমারি, আকাশ-সকাশে
পড়েছে অসীমাকার।

স্বপন-পরী
হেরিবে সেখানে আননে তােমার,
শত-পারিজাত-বরণ-বিহার।
শতদল-দল বাসন-ব্যথার,
আঁখির বিজুলীহার।
এনেছি আরসী, সবটুকু তব
বিম্বিত বুকে যার।
অনাদিকালের অসীম-দেশের
গােপন নাট্যলীলা
দেখিবারে চাও? ধর অঙ্গুরী-
খচিত মােহিনী-শিলা।
যে-স্বপন তুমি দেখিয়াছ রাতে
মনে নাই যাহা জাগিয়া প্রভাতে,
তবু আঁকা আছে হৃদয়ের পাতে
জল-রেখা রঙ্গিলা-
সেই জলছবি ফুটাইবে কবি
অপরূপ সেই লীলা।
দেখিবে যেখানে লতার বিতানে
জোনাকির দীপ বালা–
ফুলে-ফুলে সেথা অতি চুপিসারে
বিলসিছে পরীবালা ।
গভীর জ্যোৎলা-নিশীথে জাগিয়া
হেরিবে তােমার বাতায়ন দিয়া,

স্বপন-পসারী
কিরণে কে আসে নামিয়া
দুলায়ে মৃণালমাল
শধবল একটি কমল
গাঁথিয়াছে তায় বালা।
পাহাড়ের ধারে শিখরসমীপে
তারাটি যেতেছে দেখা, .
রূপার নূপুর বাজায়ে তটিনী-
নটিনী চলেছে একা।
বকার তার মিলায় আকাশে,
ফিসফিকথা কভু বা বাতাসে,
চারিদিকে যেন কত চোখ ভাসে,
আলােকে পলক ঢাকা-
সারাটি আকাশে অপি বিরিয়া
কে আছে চাহিয়া একা।
-
হােথায় কুয়াস-তুষার-পুরীতে
উষার মাধবী-বন,
হেরি একদা গিরিরাজ-বালা
যৌবন-অচেতন।
ত এলাইয়া শৈল-সােপানে
ঘুমায় অবােরে বহর শিথানে,

স্বপন-পী পূর্ণিমা-চাদ অতি সাবধানে করে মুখে চুন ! রূপেরি বাসরে চিরঘুমধােরে তাই বালা অচেতন। ধূধূধূ সুদূর প্রান্তর-পথে শীতশেষ-নীতে মরিয়া গিয়াছে জল-সােহাগিনী কুমুদের সরসীতে। বিশীর্ণ-ফায় তুরগ-আসীন ছুটিয়াছে যুবা-বীর নিশিদিন, কহে কাতর স্বর হ’ল ক্ষীণ, নারে সে যে পাসরিতে- অপ্সরী-প্রিয়া গেল মিলাইয়া অধর না পরশিতে। দেব-দানবের মন্থনে আজও অসীম সাগরনীল অমৃতের ফেণা ছিটায় আকাশে, বায়ু কাপে ঝিমি তারি মাঝখানেকুল তােল, খসি পড়ে পায় কুহেলি-নিচোল- স্বপন-পসামী নিখিল ভুবন করি উতবােল, অমিলের করি মিল, সেই ইন্দিরা উরিছেন আজও- সাগর তেমনি নীল। অঞ্জন এই আছে সবশেষে মণি-সট-ভরা, আন-ঘন-রস-সরসিত, দিবসের জালাহ। দরশে হইবে পরশ উদয় । ঘুচে যাবে খেদ, যত ভেদ-ভয়, কায়া আর ছায়া-বৃথা সংশয়, স্বর্গ হইবে ধরা- লও কিনে লও স্বপন-পসরা দিবসের জালাহরা ! ও খানি? কিছু না, বাঁশের বাঁশিটি- যারে তারে নাহি সাজে, ইবে সে-জন, যে-জন বুঝিবে লাগিবে তাহার কাজে। এমনি বাজালে বাজিবে বের সে যেন কোথাদুর প্রেতপুর।

স্বপন-পরী
নিশা-বায়ু বহিছে বিধুর
হহার আগার মাঝে-
মানবের পদ-পরশের ধ্বনি
কভু না সেথায় বাজে।
থাক্ থা–ওরে বাজারে কি কাজ?
থাকু শুধু ওই খানি।
আর যাহা আছে সব তুলি লও,
কিছু না কহিষ বাণী।
যেজন শুনাবে,—জীবন-মরণ
একই আলােকেতে চিরজাগরণ,
বাশীতে করিবে সে-শ্বাস ভরণ
বেসুরা’কে বশে আনি---
তারে বাঁশ দিয়ে স্বপন-পসরা
ধুলায় ফেলিব টানি।
১

তান্ত্রিক
কনক-কমল-রূপে
প্রেম যদি ফুটে উঠে
তবেই আমার মানস-মরাল
অলস-পক্ষ-পুটে
চকিতে জাগিয়া উঠে।
ফুলের হিয়ার মধু,
চাহিনা চাহিনা, বঁধু!
রেশমী-রঙীন্ পাপড়ি যদি না
চারিধারে পড়ে লুটে’!
আমি বুলবু,
গােলাপরি গান গাহি।
আমি সে শিশির,
প্রভাত-অক্ষণে চাহি!
আমি পতঙ্গ, রূপানলে যাই ছুটে

স্বপন-পরী ক্রন্দন-মাের সঙ্গীত সে যে। হাসিতে অরাশি। আমার দেবতার সে যে ! পূজা নয়, ভালােবাসি। আঁধারে মন্ত্র ভুলি, আলােক-তুফানে হৃদয়-জড়িমা টুটে। সুন্দর লাগি ভালােবাসা মােন- অর-আঁখি ফুটে। ১ দিদার পেয়ালা যে ভপূর্ব- আয় আয়, ধ ধ ! বেলায় সব রে কেঁদে ঝরে ঝঝ! দিল করে হায়-হায়, দিলদার আয় না ! আহা, যেন আবছা ফিরে কেউ যায় না। গুগ্গুলে মশগুল বিকুল হ-ভ! কার ছায়া জ্যোৎস্নায়। রাতরে শােগােল দিখােল খেয়ালি । কলিজায় দিক্ দোল। —দিল নয় ভােয়ালি। দূৰ কৰু আসাে জামিয়ার কুত্তিয়, স্বপন-পরী গেয়ে যা’ না আ-খাে- ওক্ত যে ফুর্তির । বড়-মিঠা শং! ফে পেলি, কাণে বাজে নওব। চোখে লাগে দেখালি। দি-মিল-মফিল- ভাজা-র সরায়ের করে তুলি রঙ্গিল, আয় ভাই মুসাফের। এই ঘাসে পাতি আর পান্নার গালিচা, হাসিতেই লুটে যায় বার বাগিচা। থাক তােলা আলবােলা- পেয়ালায় মুখ ধর! চেয়ে দে, মন-ভােলা, 1 দুনিয়া কি সুন্দর।

চোখের
ঘাটের পথে বটের ছায়াতলে
একটু দাড়ায় অন্য-মনের ছলে,
একটু আঁধার একটু আলাের মেলা
যুইটি ফোটার বেলা!
ভুরুর কোণা সুরু কোথায়—নজর নাহি চলে,
হয় না ঠাহর চুলের ছায়াতলে।
ঠোঁটের রাঙা-চোখের হাসি কালাে
নিশীথ-সাগর-সাতার-দেওয়া
বাঁকা-চাদের আলাে-
চাই না আমার-চাই না অধিক আর,
ওই টুকুতেও নেই যে অধিকার।
ভিক্ষা বলে যেটুকু পাই ভালো-
ঠোঁটের ঈষৎ রাঙা হাসি, চোখের হাসি কালাে।
গাঁয়ের পথে ফিরব যখন সবে-
প্রাণের ভিতর সােণার সারং বাজে।

স্বপন-পরী
পিছন হতে কেমন জানি কেন
ববের ক্ষেতে বাতাস বারেক নিঃসিল যেন!
ফুলল হবে আকাশ তবু অন্ত-মেঘের ভাজে,
গাঁয়ের পথে ফিরব যখন সাঝে।
এলা কাটে জ্যোৎস্না আমার শূন্য-আঙিনাতে,
ঝাঁ-ঝা করে বিজন রাতি, ঝি ঝি তখন মাতে।
যতেক স্বপন বকের পাখার মত
চোখের আগে ভিড় করে সব কত?
টাটকা-টানা একটি ছবি ফুটৰে সবার সাথে,
ফুটফুটে মাের জ্যোৎজা-আঙিনাতে
এনি করে মনটি চুরি কোরাে।
যেখান-সেখান ঘুরে বেড়ায়
কাচপােকাটি খােলরা!
মেরে যেখাে কোটোয় তুলে
গােলাপ যখন পবে চুলে,
টিপ্ করে’, সই, কপালটিতে পােরন।
এমনি করে মনটি চুরি কোরাে।
১৪

পুরূরবা দিনশেষে রাত্রি এল, শারদ-শর্বরী কেটে গেল বহুক্ষণ ভুবন-ভবনে! গৌরী-গােধূলির ভালে রৌপ্য-দীপাধার কখন্‌ উঠেছে জলি’!-সন্ধ্যা জ্যোত্মমুখী রচিল কনকবেণী কানন-কুলে। অতিমুক্ত, কর্ণিকার, পুনাগ, পাটল বিথারিল দেবতার নিভৃত শয়ন পুষ্পেচ্ছাসে, ফুলবনবীথিকার তলে। ক্রমে উর্ধে, আরাে উদ্ধে, স্ফটিক-বিমানে আরােহি’ আকাশবত্মে প্রবেশিল শশী উন্মাদনী যামিনীর নিশীথ-বাসরে। তখনাে ভ্ৰমিছে একা অরণ্যগহনে, নদীতীরে, পর্বতের সঙ্কট-শিখরে প্রিয়াহা পুরূরবাহৃত-উত্তরীয়, ছিন্নবাস, নগ্নশির, উন্মাদের মত । অতিদুর গিরীশের নীহার-বলয়ে বিচ্ছুরিত হাস ধাঁধিছে নয়ন- যেন এক অট্টহাসি দিগন্ত-প্রসারী বিপিছে বিরহীর বৃথা অন্বেষণ।

স্বপন-পরী অরণ্যগভীরে, বনশাখা-অন্তরাল নিত্য-অন্ধকারে, জনমিছে দৃষ্টি-ভ্ৰম-- তিমিরপটলে যেন তরল সরসী! । দুলিছে তাহারি তলে দীপাবলিসম অযুত আলােক- বিনহে খদ্যোতিকা ! অপূর্ব সে মরীচিকা কানন-আঁধারে। গন্ধলতিকায়, কুসুমিত তৃণস্তরে, বিথান বসনপ্রান্ত গিয়াছে লুটিয়া প্রিয়ার, প্রয়াণ-পথ সুরভিত করি’! সচকিত কুরঙ্গীর কস্তুরী-সুবাস তাহারি নিশাস যেন! জ্যোৎস্না হেথা-হাের্থ লেগে আছে তরুশাখে, ব্রততীবিতানে— শুভ্র-চীনাংক-শােভা। ঝিল্লীর ঝঙ্কার কাহার মঞ্জীরঙও ? কার দীর্ঘশ্বাস নীড়প্ত বিহঙ্গের পক্ষ-বিধুননে ! গুঞ্জরিছে মুখে তার ভাব-গদগদ অসদ্ধ বাণী-হৃদিসিন্ধুমন্থশেষ সুধার বুদ্বুদ যেন অধরের ফাকে। চলিতে চরণ বাজে কভু শিলাতটে, কঠিন কণ্টকে কভু, দৃঢ় বল্পীফাসে- স্বপনে-উন্মীলনেত্র চলে পুরূরবা সরষােষা উর্বশীর অলীক সন্ধানে।

পুরূরবা
সহসা কাননতলে অসম্ভব বিভা ।
স্থিরদীপ্ত সৌদামিনী, প্রখর-ভাস্বর,
দীর্ঘাত, অতর্কিতে খসি স্বর্গ হতে
ভরিল পাদপস্থলী।
সহ শাখার
অনন্ত সে রন্ধময় জালায়ন দিয়া
ঢালিল কৌমুদী-ধারা মেঘমুক্ত শশী
আরােহিয়া গগনের গম্বুজ-শিখরে ;
নিদ্রাতুরা ধরণীর দু’নেত্ৰ উপরি
ফুটিয়া উঠিল যেন স্বর্ণশতদল
উচ্চবৃন্তে, তাহারি সে নাভিপদ্মনালে।
মুহূর্তে সে বরবপু হ’ল রূপান্তর
অটল-নিটোল-শুভ্র মৰ্ম্মর-পুত্তলে!
কুটিল সে কেশদাম অংসবিলম্বিত
মুহূর্তে শােভিল যেন কিরণ-কিরীটি ।
নিস্তার নয়ন বেন হারাইল দিশা।
বক্ষ সুবিশাল ধরিল তুহিন-কান্তি-
চাহি উৰ্দ্ধমুখে দাড়াইল পুরূরবা,
জ্যোৎস্নাধারা শিরে ধরি নব গঙ্গাধর।
অপলক নেত্র তার অলােকসুষমা
গণ্ডষে সাগরসম করিল নিঃশেষ,
তীব্র বাসনা-রণনে মম্মমূল যেন
বীণার তত্রীর মত হারাল কম্পন।

স্বপন-পরী
প্রিয়ার পীরিতি যেন দিকে দিকে দিকে
উথলিল লাবণ্যের মত!
সে মিলন
অহরহ-কোথা নাই বিরহ-কল্পনা।
নাহি মৃত্যু, নাহি জরা,—মহাকাল যেন
সহসা নিশ্চল। আলাে-আঁধারে দ্বন্দ্ব
ঘুচে গেল মানবেরি পিপাসার সাথে ।
অবগাহি অফুরন্তু জ্যোতির প্রপাতে
দেহ হ’ল ছায়াহীন, মৃত্যুজয়ী প্রেম
ধরিল সৰ্বাঙ্গ-শুভ্র মুৰ্ত্তি আপনার
কোনােখানে নাই তার বিষের কালিমা।
পরক্ষণে তেমনি চকিতে মুদে গেল
জ্যোতিঃশতদল। স্বপ্নভঙ্গে পুরূরবা
অলস-অবশ-দেহ বসিল ভূতলে।
আবরিল আঁখি তার আঁধার-অঞ্চলে
বনস্থলী, লেপি’ দিল পুনঃ স্নেহভরে
সর্ব-অঙ্গে ম্লানচ্ছায় চন্দ্রিকা-চন্দন।
আলােক-বন্যার সেই গভীর প্লাবনে
স্থির ছিল জলজ কুসুম, উর্ধমুখে,
বৃন্ত দৃঢ় করি’; যবে বন্যা গেল সরি,
নমিয়া পড়িল শির-লুটাইবে বুঝি
আপনারি পাদমূলে পঙ্কিল শয়নে।
১৮

পুর
অনচ্ছ আলােকে তাই নয়নের কোণে
বাহিরিল দুই বিন্দু তরল মুকুতা,
অবরুদ্ধ বাসনার অরুদ্ধ আবেগে।
কি-এক সঙ্গীত--যেন বিয়ােগ-রাগিণী,
আত্মারি সে আৰ্ত্তরব-সারাচিত্ত ভরি’
ধ্বনিয়া উঠিল তার সকল শিরায় ।
মৰ্ম্মকোষে দেহপদ্মমধুর তাড়না
একসাথে ফুটাইল পঞ্চেন্দ্রিয়-দল,
রূপের কিরণরশ্মি পান করিবারে।
অমনি সে বাণবিদ্ধ কেশরীর মত
উৰ্দ্ধশ্বাসে, আন্দোলিয়া কেশরকাপ
ছুটে গেল বনান্তরে, উত্তান আননে,
রক্তসিক্ত পদে। তার রােদন-আরাব
সমস্ত কান্তার বাহি’ পঁহুছিল শেষে
পৰ্বতকরে, অতি দুর দুরান্তরে
হ’ল প্রতিধ্বনি ; শিহরিল তারাস্তোম
অনন্ত সে বব্যামপথে-প্রৌঢ়া নিশীথিনী
ফিরিয়া বাঁধিল তার বিশীর্ণ কবরী।
পার বদনে বিধু হেরিল তাহারে।
সে যে তারি বংশধর—প্রতিষ্ঠান-পতি
ঐল পুরূরবা। সেই পূৰ্ব্ব-ইতিহাস

স্বপন-পরী
যৌবনের মধুময় মােহের কাহিনী
অরিল বিষাদে সােম ; সে কলঙ্ক-লেখা
এখনাে বাজিছে বুকে—তবু কি মধুর !
তখনাে সিঞ্চিত ওঠে অমৃত নবীন,
তরুণী সে পৌৰ্ণমাসী রাতি!-ব্রহ্মচারী
পারিল না ফিরাবারে নিষিদ্ধ চুম্বন।
গুরুপত্নী তারা ধরিল সন্তান তার
আপন জঠরে—সেই পুত্র বুধ হতে
জনমিল পুরূরবা, ইলার তনয়।
কভু নর, কভু নারী-ইলার কাহিনী
বিচিত্ৰতর! তাই সে অপূৰ্ব্বজন্মা
লভিল অহীন-কান্তি বীর পুরূরবা
ধরাতলে প্রথম সে পূর্ণমানবতা।
একদা নেহারি তায় চৈত্ররথবনে,
প্রগভে প্রসাদ তার যাচিল উর্বশী
উন্মদনা অপ্সরা সে অমর-আলােক !
স্বর্গের লাবণ্য হরি’ আনিল ধরায়
চন্দ্রবংশ-অবতংস বীর পুরূরবা।
নন্দনে যে ফুল ঝরি’ ফুটিল না আর,
ফুটিল সে পুঞ্জে-পুঞ্জে ধৰণীর বনে,
উর্বশীর রাগারুণ নয়ন-আলোকে-
ফুটিল অমরী-বা মানবের প্রেমে।

পুরুরবা সেই প্রেম, সেই বধু-ফিরে গেছে আজ আপন আলয়ে, তারি সােবক পুরূরবা উন্মাদ ভ্ৰমিছে ঘুরি কান্তারেগহনে। যবে রাত্রি আয়ুঃশেষ, তিমির-অলকে ফুটিছে ধূসরচ্ছায়া অটবীসীমায়, ক্লান্তিহর শীতস্পর্শ নিশান্ত-সমীরে কে যেন বুলায় ধীরে অতি সুকোমল করাঙ্গুলি, জ্বরতপ্ত ললাটে চিবুকে, স্বেদলিপ্ত শিরােহমুলে! আচম্বিতে জ্যোৎস্না নিবে’ গেল, প্রভাত-গােধুলি চালিল কলসী-জল তরল তিমিরে ; শুধু উর্দ্ধে চিত্রসম চন্দ্রের বদনে তখনাে জাগিছে জ্যোৎস্না নিশীথ-লাঞ্ছন। এতক্ষণে পার হয়ে শীর্ণ শক্তিমতী উত্তরিল পুরূরবা অম্ভোজের তীরে। একটি পুন্নাগ-তরু সরল-সুঠাম- তারি দেহে দেহ রাখি’, বাহ বাঁধি বুকে, ডুবায়ে চরণযুগ মুঞ্জাতৃণবনে, দাড়াল সলিৎ-হারা হীন উদাস ত্রয়ােদশীপাধিপ প্রতিষ্ঠান-পতি।

বপন-পরী সম্মুখে সরসী-জলে সরােজ-শয়নে ঘুমায়ে পড়েছে অলি মধুপান-শেষে, দুলিছে নলিন-দোলা জলের দোলনে। ধূপধূসমােচ্ছাস বাষ্প-যবনিকা গােপন নেপথ্য রচি আবরিছে দিক প্রাচীমুখে,—যেন কারা অন্তরীক্ষ-পথে স্বপ্ন-জাগরের মাঝে করে আনাগােনা। যেন কারা—মানার্থিনী-তেয়াগি বসন, নামিয়াছে পদ্মবনে অন্তোজ-সরসে, পূর্ব-সােপান-শিখরে রাখি দীপটিরে শুকতারকার, সাজাইয়া সযতনে রতনভূষণরাজি আকাশ-কুটিমে। কাঞ্চন-কফুক পরে মুকুতার সি থী আবরিয়া অস্বচ্ছ জরীর প্রাবারে, ঢালিয়াছে পার্শ্বে তার সঙ্গঃ-চমনিত নকসিন্ধুবার। গাঁথিবে বিনােদ কাঞ্চী মাধবী-মুকুলে বুঝি ? কেশর-কলাপে গড়িবে গুণ্ঠন ? কি যেন আশ্বাস-সত্বে মুদিল মদিরদৃষ্টি, মেলিল যখন- সুবঙ্কিম দীর্ঘায়ত আঁখির তােরণে ফুরিছে অমৃত-ভাতি দিব্য-চেতনার। তখন সুদূর দিক্‌চক্রবাল-রেখা ২২

পুকরবা
হয়ে গেছে রূপান্তর জ্যোতির বলয়ে,
ধূম্র-গিরিশ্রেণী গাঢ় নীলাঞ্জনে লেখা-
ক্ষৌমবস্ত্রপটে যেন চিত্রনাবলী ।
পলে পলে নব শােভা উঘারি’ উঘারি’
কে করিছে নেত্রসেবা ? মুগ্ধ পুরূরবা
বিস্মৃতি-বিস্মিত,—ভুলিয়াছে এত ত্বরা
কামরূপা অপ্সরার অপার মােহিনী,
অসীম ছলনা!
সহসা সরসী-বুকে
দুলিল সলিল, ভিন্ন কুহেলির ফাঁকে
ফুটিল আভাসে কার শুনাংশুক যেন!
লীলায়িত বাহুভঙ্গি!--কি মধুর হাসি
মুহূর্তেকে মিসাইল পাটল অধরে!
তখনি চিনিল তাবে; বর্ষ সহস্রেও
যার সাথে ছিল নিত্য নবপরিচয়।
তাই সে প্রসারি’ বাহু, উন্নমিত মুখে,
উচ্চারিল নব-ঋক্‌ সত্য-সমুজ্জ্বল
প্রেমের প্রণব-মন্ত্র তাহারি উদ্দেশে।
কোথায় চলেছ অয়ি জাতি-রূপিণী
জায়া মাের। শুন্য করি’ এ দেহ-দেউল ?

পণপসামী
হের ওই পূর্বাশার উদয়-দুয়ারে
এখনি দাড়াবে আসি হৈমবর্তী উষা
সদ্যঃ-প্রাণহী-বেশে। কোন অপরাধে
কি ছলে ত্যজিলে মােরে, কহ তা উর্বশি।
নিত্যজ্যোৎস্না নিত্যপুষ্প নন্দনের লাগি
বিরহী হৃদয় তব ?
তাই উদাসীন
মৰ্ত্তমুখে—সদ্যপাতি ধরার কুসুমে ?
তা ত’ নহে।
রচিয়াছি হৃদয় প্রসারি’
তােমার মন্দির দেরি নন্দন-অধিক
রূপময় উপবন, আনন্দ-হিন্দোল।
স্বপ্নজন পরা’য়েছি নেত্ৰ-ইন্দীবরে—
মাের মুখে চেয়ে তব অকুন্ঠিত আঁখি
শিথিল নিমেষপাত। পশ্ন-অগ্রভাগে
দুলিল অশ্রুর বিন্দু, শিশির যেমতি
শিরীষ-কেশরে। সুনিবিড় আলিঙ্গনে
উপজিল হৃদিতলে মধুর বেদনা,
নীল-ভৃঙ্গ বিলসিল উরস-কমলে-
সফল হইল তব যৌবন-প্রসূন।
যষ্টিশত-শতাব্দের অযুত রজনী
এই হদিপাত্র ভরি’ যে-সুধা ঢালিয়া
পিয়াইনু এতকাল—তারি মােহাবেশে
২৪

বা ০ বিলম্বিত চন্দ্রোদয়ে রহিতে জাগিয়া নিদাঘ-যামিনী কত অলিন্দের পরে, হেরিবারে জ্যোৎস্না মাের সুখসুপ্ত মুখে অধর অধীর হ’ত চুম্বন-লালসে! ছিলে নাকি সুখী ? তােমার অম্লান রূপ- দেবতাকাঙ্ক্ষিত, ধন্য, অনির্বচনীয় ! রাজ্যসুখ তুচ্ছ করি’ চেয়েছি আমি ধরণীর পতি, তুমি তাই পণ দিয়ে জিনিয়া লইলে মাের কৌমার অতুল- অ-স্বর্গীয়, দেবতা-দুল্লভ। স্বর্গ হতে রূপ আসে নামি’, ধরার অনর্ঘ দান মানবের প্রেম, -এ দোহার বড় কে যে বুঝিবারে নারি । তবু কহ সত্য করি, আর কেহ ওই ফুল্প রক্তাধর পানে নিমেষে-সর্বস্বহারা চেয়েছে এমন ? ও-কটাক্ষে সুধাপাত্র হাত হতে খসি’ পড়েছে কভু কি কারাে ত্রিদশ-মণ্ডলে ? তি। তিষ্ঠ। এত ত্বরা ফিরায়ে না মুখ। অয়ি মানস-নিষ্ঠুরে ! কর অন্তরাল আমার নয়ন হতে উষার অঞ্চল। ওই না হেরিনু সেই মরণমােহিনী- অনির্বাণ কামনার অশেষ ইন্ধন, ২৫ স্বপন- পরী উর্বশীর বিবসনা-শােভা। কি বলিলে? দৈবাধীনা তুমি? ফিরিতেছ দেবদেশে দুখস্বর্গে, দেবতার সুখচৰ্য্যা লাগি ? তােমারে নয়নে অশ! থাক থাক তবে, আমার সকল ব্যথা নিয়েছ হরিয়া অশ্রুমুখি ! কিন্তু ওই মৰ্ত্ত-মনােহর অনুপম নেভূষা কোথায় লুকাবে অমর-সভায় ? যেয়াে না, যেয়ো না প্রিয়ে। মাগি লও স্বর্গ হতে চির-নিৰ্বাসন, চেয়াে না অমৃত, এসাে মরি দু’জনায় ! অজর-অমর হয়ে নিত্যের নন্দনে থেকো না অরূপ রূপে --অনিত্য-সদনে অন্তহীন মৃত্যুস্রোতে এস গাে নামিয়া। নব-নব জন্ম-বিবর্তনে আঁখিযুগ চিনি’ ল’বে আঁখিযুগে, চির পিপাসায় ! বার বার হারায়ে হারায়ে ফিরে পাব দ্বিগুণ-সুন্দর! আবার বিচ্ছেদ-কালে ফুটিবে চুম্বন যেই মৰ্ম্মান্তু হরষে ওষ্ঠপুটে, তারি গন্ধ-মকরন্দ-লােভে লুকায়ে নামিবে মর্ত্যে সকল দেবতা। নিত্যেরে কে বাসে ভালাে ? চিরস্থির ধ্রুব অনন্ত-রজনী কিম্বা অনন্ত-দিবস ?

পুরূরবা
নহি তা’য় অনুরাগী ; আমি চাই আলো
ছায়ারি পশ্চাতে; চাই ছন্দ, চাই গতি,
রূপ চাই ক্ষুব্ধ-সিন্ধু-তরঙ্গ-শিয়রে-
ধরিতে না ধরা যায়, পলকে লুটায়।
নীরবিল পুরূরবা,
কোথায় উর্বশী।
রেখে গেছে হাসিধানি প্রভাতের মুখে
করুণ-কোমল,—বিদায়ের মত নয়।
আবার কোথায় যেন হইবে মিলন।
সেই কথা লিখি দিয়া সােণার অক্ষরে,
মিলাইল মধুবৰ্ণ বিবাহ-দুকুল
মেঘস্তরে ; শূন্যমনা মুগ্ধ পুরূরবা
হেরিল গরনীল মৌনী গিরিমালা
বালারুণ-রক্তরাগে অমৃতায়মা!
ર૧

আগমনী যাই-যাই করে শীত চলে গেল সেদিন কুহেলি-প্রাতে, আজি সন্ধ্যায় বসন্ত এল, পঞ্চমী-চাদ সাথে। কত দিন পরে আজিকে ফিরিল ধরণীয় বরণীয়- দক্ষিণ-বায়ে উড়িয়াছে তার পরাগ-উত্তরীয়। রাজার নকীব বাস-পিক ফুকারিল দিক্-পথে হয়েছে সময় ঋতু-অধিপের আসিবার ফুল-রথে ! পতঙ্গ-পাখী মধুপপুঞ্জে মুখরিত দশ দিশি, কি নেশা বিলায় মাতাল বাতাস গানে ও গন্ধে মিশি। সারা দিনমান গাইয়াছে গান-বসন্ত-আগমনী, অরুণ উঠেছে তরুণ-বদন নবীন আশার খনি। পল্পব-মুখে চুম্বন সম আলােকের পিচকারী। সুরভি নেশায় মশগুল-করা মধুভরা ফুলঝারি আম্রমুকুলে ভরেছে দুকুল সকল বনস্থলী, গ্রাম-পথে-পথে সজিনার ফুলে দিয়েছে জাঞ্জলি। আলিপনা এঁকে বসন্ত-পঞ্চমী-আবাহন- ঘরে-ঘরে আজ হয়ে গেছে পূজা, সুমধুর আমােকন। ২৮

বস-আগমনী
;
কাননে কাননে শুনিয়া ফিরেছি সকল পাখীর শিস,
থাবিহীন ক্ষেত্র-সীমায় আহরি’ যবের শীষ
স্তব্ধ গভীর নিথর সলিলে আকাশ দেখিছে মুখ,
গুঞ্জন-ভরা বাতাসের খাসে কভু বা কঁপিছে বুক,
ডাহুক-ডাহুকী পক্ষ ভিজায়,—এমন সরসীতীরে
আর্জ-শীতল মৃত্তিকা পরে শরবনে এনু ফিরে।
আতপ্ত দিবা-দ্বিপ্রহরের আলােক-মদিরা পিয়ে
রসালসে দেহ এলায়েছি মাের ছায়া-তরুতলে গিয়ে
শিয়রে আমার চাহিয়াছে দুটি আঁখি-সম নীল-ফুল,
তাহারি স্বপন দেখেছি জাগিয়া, কেবলি করেছি ভুল!
পথ দিয়ে যবে ঘরে ফিরিয়াছি দিবসের পরিশেষে,
বালকের মত বাকস-বৃন্ত চুষিয়া, একেলা হেসে
ধূলার উপরে হেরিলাম ছবি, অফুট-রেখায় অকা
ছায়াখানি মাের চলিয়াছে পাশে—মদনের ধনু বাকা
উদিয়াছে চাদ, দেখিনু তখন আকাশের পানে চাহি,
অলখিতে ওঠে মাঠ-বাট ক্ষীণ জ্যোৎস্নায় অবগাহি’!
বনবালাদের কবরী-কুসুম ঘােটা-আঁধারে ঢাকা,
মৃদু-সৌরভ কোনােমতে তবু যায় না লুকায়ে রাখা !
নেবু-মঞ্জরী-মন্থরবাস অন্তরে গিয়ে পশে,
কেদারবাহিনী-দখিনা-বাতাসে কত কথা কহিল সে।

স্বপন-পরী
কতদিন পরে ঘরে ঘরে আজ বাতায়ন খুলিয়াছে।
সােহাগিনী ওই করবীর ঝাড় পাশে তার দুলিয়াছে।
ঝি ঝি ঝি বহিছে সমীর, বাঁশীর রাগিণী ভাসে,
আজিকে চঁদিনী-দোয়ার তলে প্রাণ খুলে কারা হাসে।
এমন সময়ে যদি কেহ ডাকে কাণে-কাণে, ‘প্রিয়তম’
গীত গেয়ে পারি উত্তর দিতে প্রতিধ্বনির সম।
মরমের কথা কহেনি যে-জন, আজিকে কহিবে যে সে,
কঠিন-হৃদয় আজিকে হইবে কৃতার্থ ভালােবেসে।
মনে হ’ল আজ জীবনের যত নিরাশার পরাভব,
রঙীন এ রাতি, বাসনার বাতি যত আছে জ্বালাে সব !
তৃণভূমি পরে বসিয়া ক্ষণেক হেরিলাম নিশানাথে,
বুঝিনু আবার বসন্ত এল পঞ্চমী-ঊদ সাথে।
৩০

মঞ্জরী
কালি রজনীতে এসেছিল কারা ধরণীর উপবনে
নন্দন হ'তে বসন্ত যবে নামিল সঙ্গোপনে ?
নূপুর তাদের শােনে নাই কেহ নীরব গভীর রাতে ?
মৃদু-সঙ্গীত মিলাইয়া যায় বাসন্ত-বন-বাতে।
সহকার-শাখে আঁকা ছিল বুঝি মঙ্গল-আলিপন~~
মুকুলােম্মুখ পল্লবদলে মৌন নিমন্ত্রণ ?
তাই বুঝি তারা জ্যোৎস্না-চিকণ কুয়াশায় ঢাকি’ দিশা,
চূত-মণ্ডপে যাপিল গােপন মধুর মাধবী-নিশা।
চুম্বন-মধু কনক-হা বিতরিল তারা কত
আদর-সােহাগ মান-অভিমান সব আমাদেরি মত।
প্রণয়-রভসে মুকুতাকলাপ মালা হতে পড়ে খসি’--
ভ্রুক্ষেপ নাই, পিন্ধন-বাস ভুলে যায় দিতে কসি।
অপরের বুক বাহুডােরে বাঁধা, শিয়রে কবরী খােলা,
প্রেমিক-প্রেমিকা মিলন-শয়নে চিরদিন আলাভােলা ।
রজনীর শেষে জ্যোৎস্নার দেশে পরীরা মিলা’য়ে গেল,
প্রতি পল্লবে রতি-পরিমল পরীর বিলা’য়ে গেল।

কিশােরী
নাকের নােক কোথা রেখে এলি ? ঘঁালা ও পােড়ারমুখী!
দিদি শুধালেন, রাধারাণী বলে আমি কি এখনাে খুকী।
কাঁচপােকা টিপ কপালে এখনন, ছাড়েনি পুতুল-খেলা ;
রাগ-অভিমান, কাদাকাটা-হাসি লেগে আছে সারাবেলা।
সেধে’ ভাব-করা যেমন, তেমনি চিটি কাটিতে পটু,
বৌদিদিদের পরিহাসে হারি’ রাগিয়া কহিবে কটু।
সকলের আগে শিব-পূজা তার ; ভিজাচুল একরাশ
পিছনে গােছানাে, পাছে সরে যায়-চুলের ফিতার ফাস।
চুড়ী কয়গাছি ক্ষণে-ক্ষণে বাজে, ঝম্-ঝম্ বাজে মল,
আধ-মুকুলিত উরস পরশি হার করে ঝলম।
জোড়াভুরু আর অলকার মাঝে পঞ্চমী-চাদ পাতা,
ডাগর চোখের সরল চাহনি অশ্রু-হাসিতে গাঁথা।
ফুল জিনি’ নাসা পেলব নিখুঁত নিশ্বাসে কেঁপে উঠে,
অতি পবিত্র চিবুক-ভঙ্গি, কি ভাষা ওষ্ঠপুটে!
ললিত-কোমল কপােল তাহার শত চুম্বন-আঁকা-
বাপের, মায়ের, সােদর-স্নেহের আদর-সােহাগ-মাখা!
অঞ্জলি-ভরা জবাটি ছিড়িয়া ভরিল যখন ডালা,
জবা সে ত’ নয়—আমারি হৃদয় হরিল কিশােরীবালা !

নারী রাজার ছেলে তােমায় নিয়ে সােণার রথে তুলে প্রাসাদে তার প্রবেশ করে সিংহ-দুয়ার খুলে; রতন-ভূষণ মণির মালায় সাজিয়ে গাখে মুখ- বুকের ভিতর জাগছে তবু দুঃখহীনের দুথ ! পথের পাশে পর্ণ-কুটীর বেড়ায় আড়াল-করা, শাঁখা-শাড়ীর অতুল শােভায় ঘরটি আছে ভরা ? তৃণের ডালায় ফুলের মতন সেই যে আয়ােজন রাজার ছেলে ভাবছে তবু-সেই বা কেমন ধন। কোথায় নারী! কোথায় তারি হৃদয়-রতন খানি। বিশ্ববিজয় সিংহাসনের কোথায় ঠাকুরাণী! সেই যে সিথায় নখের মুখে একটু সিদুর টানা- দেখছে তেমন উজল কিনা রাণীর মুকুটখানা। ভিজা-মাটী কাদার পরে শিউলি যেমন ঝরে তেমনি যখন রূপের রাশি লুটায় দুখীর ঘরে, রাণীর মুকুটখানির কথা প্রেমীর মনে জাগে- নারীর পূজার তরেই সে যে রাজার বিভব মাগে। ৩ শ্রাবণ- রজনী সেদিন বরষা-রাতি, ঘন ঘাের মেঘে জ্যোৎস্না ডুবেছে, বাতাসে নিবেছে বাতি। সাঁই-সাই করে’ গাছের পাতায় থেকে থেকে নামে জল, কখনাে মেঘের আড়ালে ফুটিছে চন্দ্রিকা সুবিমল। বাতায়ন-পথে মাঠ-ঘাট-বাট যতদূর যায় দেখা সকলের পরে ছায়া-আলােকের সজল চিত্রলেখা। আকাশে কোথাও মসীর মতন জমাট মেঘের স্তুপ, কোথাও ধূসর মুক্তাবরণ আলিপনা অপরূপ । আলোক যেখানে অধিক ফুটেছে সেখানে দুধের বান, কালাে মেঘ-আড়ে চন্দ্রবিন্দ্ব তিলকের উপমান। একবার ফিরে চাহিয়া দেখিনু প্রিয়া ঘেঁসে আছে শুয়ে, কঠিন কেয়ূর বাজিছে পারশে, মুখখানি আছে নুয়ে ; তুলিয়া ধরিয়া বারেক চাহিমু, কি করিল বলি শুন, নয়নে নয়ন বারেক রাখিয়া দুহাতে ঢাকিল পুনঃ। নাকের মােলক দোলাইয়া দিয়া চিবুক পরশি যবে কহিলাম, কিবা মানায়েছে তােমা।নােলক পরিলে কবে?

শ্রাবণ-মজনী
উপহাস ভাবি’ নােলক তখনি নাকের ভিতরে জি
লাজে মরে গিয়ে মুখ লুকাইয়ে প্রিয়া রহে চোখ বুজি।
যখনি কিন্তু মুখ-পানে চাই তখনি পড়ে গাে ধরা—
চুরি-করে-চাওয়া চপল নয়ন ভয়ে মুদে যায় ত্বরা।
এমনি করিয়া অর্ধ-রজনী আলসে-বিলাসে কাটে,
জ্যোৎঙ্গা-রূপসী মেঘ-গুণ্ঠন খুলিল আকাশ-বাটে।
চরাচর-জোড়া ছায়া-আলাে-বােনা মিহি জরীর জাল
অসীম শােভার স্বপনে বাঁধিল ধরণীরে সুবিশাল।
মেঘ-আড়ে যবে জ্যোৎস্না ফুটিয়া সিক্ত ধরণী-মুখ
চুম্বন করে, মনে পড়ে মাের কবেকার সুখ-দুখ !
শ্রাবণ-নিশীথে নবীনা রাধার প্রাণখানি ধুকধুক—
জানিয়াছি কেন ভরি’ আছে হেন বাঙালী কবির বুক।
আমারি দেশের আষাঢ়-গগনে নবীন-নীরদ-ছায়া
স্থলে-জলে রচে বরষেবরষে বৃন্দাবনের মায়া।
গােঠে যায় ধেনু, মাঠে বাজে বেণু আমারি শ্যামল দেশে-
দিনী উঠিলে ফুটি ফুটিলে কদমতলায় কে সে?”
মান-অভিমান, বিরহ-মিলন, অভিসার অভিরাম
যাহারে ঘেরিয়া উছলিছে গীতি যুগ-যুগ অবিরাম,
মুকুল-বয়সী, গােকুলে বসতি, হৃদয়ে পীরিতি-মধু-
রাইকিশােরীর রূপ-গুণ হয়ে আমারি কিশােরী-বধু।

স্বপন- পরী - মেঘের আঁধারে সাঁঝের আঁধার কিছু নাহি চেনা যায়, প্রদীপ সাজায়ে শাখটি বাজায়ে প্রণমে দেবতা-পায়, বিকালে-কুড়ানাে বকুলের রাশ, ছিল যা থালায় ঢালা- তাই নিয়ে সারা সন্ধ্যাটি কাটে গাঁথিয়া দীর্থ মালা। রাধিকারি সখী সে কমল-মুখী কিশােরী বঙ্গবালা, তাহারি স্নেহের সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ঘরে হয় জ্বালা। নবনীত জিনি’ রূপের নিছনি, পুষ্পকেশর কেশ, কবরী ঘেরিয়া যুথিকার মালা, নীলাম্বরীর বেশ, মিলনের বুকে বিরহের ভয়, হাসিতে অঙ্গ মেশে এমন হাসিতে এমন কাদিতে কেবা পারে কোন্ দেশে! বাহিরে ঝরিছে জল অবিরল, বায়ু করে মাতামাতি ; এত কাছে শুয়ে বুকে মাথা থুয়ে তবু ভয় সারারাতি। কণ্ঠ আমার বেড়িয়া ধরেছে কখন ঘুমের ঘােরে, অতি সুকোমল ‘নােয়া-পরা ছােট একটি বাহুর ডােরে। ঘুমন্ত মুখে ঘােটা খসেছে, উসুখু চুলগুলি সন্তর্পণে নয়ন হইতে ললাটে দিলাম তুলি। কপােলে এলিছে মাণিকের মত কাণের রতন-দুল, শিথানে পড়েছে কখন খসিয়া খোপার দু’চারি ফুল। ঈষৎ-ভিন্ন অধর-পাতায় হাসিটি করিছে খেলা, মুদিত চোখের পাপড়ি-কিনারে স্বপন-শােভার মেলা।

শ্রাবণ-রজনী
বারেক চাহিমু আকাশের পানে, বারেক ধরণী-পানে,
সঘন বরষা ঘনায় আবার, ঘন চিকুর হানে।
একটু জ্যোৎস্না খসিয়াছে শুধু কোন্ সে মেঘের ফাকে
আমারি ঘরের বালিস-আলিশে, হৃদয়ে ধরি তাকে ;
শ্রাবণের গান, কবিতার ভাণ—সকলি হারা’য়ে গে,
বিভাের-পরাণে নিমীল-নয়ানে চুমিয়া সকলি পেনু।

চুড়ির
আওয়াজ
চুড়ির আওয়াজ, আর কিছু নয়, একটু নিঝুনি—
কতবার যে কতই সুরে বাজে তাহাই শুনি।
সােনার হাতে সােনার চুড়ি, কে কার অলঙ্কার ?
নয় সে শােভা, বধূই জানে চুড়ি কি ধন তার!
ঘুরিয়ে দিয়ে ছােট্ট দুটি কোমল কর-মূল,
আড়াল থেকে চমকে দিয়ে করায় কত ভুল!
শব্দ-তাড়িত প্রাণের তারে জানায় কত কথা,
কেউ জানেনা লাজুক বধুর চুড়ির মুখরতা ।
নিশীথ-রাতের গােপন-গভীর মিলন-মধু’র আশে
তরুণ যুবার নিদ্রাকাতর নয়ন মুদে আসে;
চমকে ওঠে, কোথায় যেন বাজল কাকণ কার!
কই - কোথা নয়! ওই যে বাজে, শুনছি পরিস্কার।
সকল নীরবতার মাঝে কি-ওই বাজে কানে ?
দুয়ার-পাশে ওই যে বাজে, বাজছে সে কোন্‌খানে?
কাণ সে বাজায় আপন মনে, শাসন নাহি মানে,
সত্যি-বাজায় মিথ্যা-বাজায় প্রভেদ নাহি জানে!

চুড়ির আওয়াজ
এমন সময় ঝুনঝুনিয়ে বাজল বারান্দায়
চুড়ির আসল সাততারাটি, তন্দ্রা ছুটে যায়।
কি সুর বাজে সকল শিরায় শিরশিরিয়ে রে।
একটু শুধু রুস্তুন্ আর রিঝিনিয়ে রে।
গুম-ভাঙা দমকা-হাওয়ার পরশ লাগে গায়,
সকল ফুলের সকল সুবাস জাগল লহমায় !
আঁধার ঘরে আচম্বিতে জ্যোৎস্না ফিনিক্ ফোটে।
শীতের শেষে প্রথম যেন কোকিল ডেকে ওঠে।
মান-ভরে আজ আছেন তিনি-নাইক’ কথা মুখে,
তিনটি দিনের পরে বােধ হয় প্রাণ গলেছে দুখে।
দোষটি আমার ছিল যাহা, দেখেন তাহা নিজের
বুকের ব্যথা বাড়ছে, তবু যায় কি মানের সে জের!
ঘন ঘন বাজিয়ে চুড়ি সামনে দিয়ে যাওয়া,
আমার ঘরেই খুজতে আসেন, যায় না কি যে পাওয়া।
চুড়ি বলে, একবারটি কওনা কথা ডেকে,
জুড়াই ব্যথা বুকের 'পরে মাথা বারেক রেখে’!
কইব কেন ? হ’বই আমি হ’বই বেরসিক,
শুব চুড়ির মধুর আওয়াজ, থাকব এখন ঠিক।
বাজুক এখন ঝন্ঝনিয়ে, বাজুক রেগে কেঁদে,
বাজুক আবার নরম সুরে-মাছ কেন বেঁধে ?

স্বপন-পসারী মিথ্যে করে ঘুমিয়ে যখন পড়ব ধীরে ধীরে, এটা-সেটা রাখার ছলে বাজুক ঘুরে ফিরে। হাতের চুড়ি এমন যখন বলছে মুখের বােল- কাজ কি কথায়? শুনছি বেশ ওই মধুর গণ্ডগােল! মনে পড়ে, শেষবার সেই একজামিনের পড়া- দুই ঘরেতে দু’জন আছি, শাসন বড়ই কড়া। বলে ডেকে, কাল সকালে ঘুমটি ভাঙার পর মুখটি তােমার দেখার যেন পাই গাে অবসর। থাকূব আমি দুয়ার ধরে তােমার দুয়ার চেয়ে, দেখব শুধু একটি পলক, লাজের মাথা খেয়ে। রাত্রি জেগে ভোয়ের সে-খুম ভেঙেও ভাঙে না ! কাণে আসে কিসের আওয়াজ ? থেমেও থামে না। বুকের ভিতর কেমন বাজে চুড়ির রিনিঝিনি, ভােরের ভজন এ কোন সুরে গাইছে ভিখারিণী। আকুল হয়ে কঁাদন যেন ফিরছে নিরাশায়— “ওগাে জাগাে, ডাকছি আমি, সময় বয়ে যায়। দুয়ার খুলে তাকিয়ে দেখি, বিউনি খােলার ছলে ভােরা-কালো চুলের মুলে আঙুল দ্রুত চলে। একে একে সাপটা আর চিরুণ, প্রজাপতি, সব নেমেছে—খোপার সে কি অপূৰ্ব দুর্গতি।

চুড়ির-আওয়াজ
খুলছে না ক’ ফিতার গিরা, ফসটি ধরে টানে,
অমনি চুড়ি বালার পরে কি ঝঙ্কারই হানে।
অবাক হয়ে দেখনু চেয়ে চোরের চতুরালি,
দুষ্ট চুড়ির দুষ্টামী সে, নুতন দূতিয়ালী!
চুড়ির আওয়াজ—আর কিছু নয়, একটু নিঝুনি-
কতই সুরে কতবার সে বাজে তাহাই শুনি।
১)

ভাদরের
বেলা
ভাদরের বেলা আদরে কাটিয়া যায়-
এটা, ওটা, সেটা—প্রাণ তবু কি সে চায় ।
ভিজা বায়ু বয়,
দিন মেঘময়,
এমন আঁধারে একরাশ চুল কেমনে শুকাবে হায়,
কেন ভুল কর ? কি হবে বাঁধিয়া—কেবলি যা খুলে যায়।
-
এলাে-খোঁপা আজ দু’হাতে বঁধিয়া নাও,
যুথিকার হার উহাতে দুলায়ে দাও।
কাণে দোলে আজ ওই যে দোদুল দুল
আঁখি দুটি মাের হেরিয়া হরকুল !
গণ্ড-গ্রীবায়
নবনীত ভায়।
কেতকী-কেশর-গৌর তােমার ভুজ-শাখা সবলয়
মনটি আমার কেমন করিয়া আজিকে কাড়িয়া লয়!
নীলশাড়ী খুলি’ পােরাে না খয়েরী খানি,
খয়েরের টিপে
ভুরু ভেঙ্গে দাও রাণি !
মুখর নূপুর
আজ শুধু ভালাে কালাে চুড়ী আর কঁকণের রুণিমুনি,
বকুলের মালা গাঁথ বসি’ বালা, দেখি, আর তাই শুনি।
করি দাও দূর !
82

পরম-ক্ষণ
তােমার সাথে একটি রাতে
বদল হল মিলন-মালা
একটি প্রহর সুখের লহর,
একটি নিমেষ সুধায়-ঢালা।
তােমার খোঁপার পাপড়ি চাপার
বল আমার শিথান পরে,
টুটুল শরম, রূপটি পরম
ফুটল তখন ক্ষণেকতরে !
বাহুর শাখা-পরীর পাখা।
বুকের পরশ সব ভােলায় ।
আলস-রসে আবেশ-বশে
চাউনি দোলে চোখ-দোলায়!
কালো-ফুলের গন্ধ-চুলের
উথলে ওঠে নিশাস-বশে,
ঠোটের ঠোঙায় চুমায়-চুমায় ।
চুমুক দিলাম হাসির রসে।

স্বপন-পসারী
তােমার সাথে মিলন-রাতে
সেই পরিচয় নিবিড়তম।
ক্ষণেক লাগি দুজন জাগি
গৌরী-হর-মূৰ্ত্তি সম!
দেহের মাঝে আয়া রাজে-
ভুল সে কথা, হয় প্রমাণ ;
আত্মা-দেহ ভিন্ন কেহ
নয় যে কভু-এক সমান।
তাই ত তােমায় দেহের সীমায়
ধরতে পারি আলিঙ্গনে
দুই'এর ক্ষুধা একের সুধা
কেবল ত সেই পরম-ক্ষণে।
সকল প্রাণে পুলক বানে
স্বর্গ আসে ধরায় নামি’
একটি বোটায় ফুল সে ফোটায়
তােমার তুমি আমার আমি।
৪

তারকা
ও ফুল
সে ডাকি কহিল, পথের ধূলায় লুটি,
সেফালির মত সকরুণ আঁখি দুটি
‘লহ, ওগাে মােরে লহ,
নিষ্ঠুর তুমি নহ।
এর ফুল ! কেন উঠেছিলে ফুটি?
কেমনে কুড়াব-জোড়া যে এ হাত দুটি !
সে কি কহিল সাঁঝের গগনে ফুটি,
তারকার মত সুগভীর আঁখি দুটি
‘বন্ধু, তােমারে চাই,
এই আকাশের ঠাঁই।
সুদুর স্বপন। কে দিবে আমারে ছুটি ?
মাটির ঢেলায় চাপা যে চরণ দুটি।
সে যবে কহিল নখেতে ককণ খুটি,
রমণী আমার—আনত ননদুটি—
‘ব্যথার নিশীথে প্রিয়,
আমারে জাগায়ে দিও।
তারা আর ফুল একসাথে ওঠে ফুটি।
বিরহে স্বপন, মিলনে সে ভরে ঠি।
১৫

মৃত্যু মৃত্যুরে কভু চোখােচাখি দেখিয়াছ শিহরি সভয়ে সহসা কঁাধের কাছে? দুইটি আঙুলে পরশি তােমার দেহ দুটি কথা বলি’-শােনননি সে আর কেহ- কি যেন সে ভাষা, অর্থ কিছু না আছে, ধ্বনি নয় যেন প্রতিধ্বনির মত, নিমেষের মাঝে করিয়া মুচ্ছাহত আঁখি না মেলিতে আঁধারে সে মিশিয়াছে? অথবা যেন সে পথের প্রান্তে আসি, এখন চলি অচেনা সাথীর প্রায়, সহসা আপন পরিচয় পরকাশি চেয়েছে কভু কি উপহাসি’ ইসারায় ? চতুর চাহনি কুটিল হাসিতে ভরা- যেন সে তােমারি কুশল-প্র-করা, ভীষণ-নীরবে বারেক বাঁকায়ে গ্রীবা সমুখে ঝুকিয়া চোখ দিয়ে চোখ ধরা, জিজ্ঞাসে যেন-মধুর ভঙ্গী কিবা ! ৪৩

‘চিনিলে না মােরে, কেমনে ভুলিয়া আছ।
মৃত্যুরে হেন মুখােমুখি দেখিয়াছ?
কবির কাব্যে বঁধু’ বলে তারে ডাকা,
ধর্মের নামে পরিচয় করে থাকা-
সে কথা বলি না, দেখেছ কভু কি তারে,
বাহির-দুয়ারে সম্মুখে একেবারে ?
রক্তনয়ন, বিকটবদন, হাসিতে রক্ত ঝরে,
নিশ্বাসে বা হরে।
কণ্ঠে রঞ্জু, জিহ্বা বিগলিত, ভীষণ দশনমালা,
শ্মশানের ধুম, চিতা-বহ্নির জালা-
এ সব দেখেছ, আহ্বান শুনেছ ?
ডেকেছে কি নাম ধরে
সুখ-রজনীর ভােরে ?
আঁধারে হার দীপ্ত-নয়ন
বাঁকা’য়ে দেখেছে তােরে ?
জীবনের আশা কিছু পূরে নাই,
মেটে নি প্রাণের কোনাে কামনাই,
স্বজন-সধার দুরে,
নির্বান্ধব পুরে
হঠাৎ ধরিয়া কেশেতে তােমার
গনিয়াছে বার বার ?
১৭

স্বপন-পরী
জীবন-চক্র হয় নাই ঘােরা,
খােলা হয় নাই একটিও তাের।
মায়ার মদিরা-মােহে,
অতি চঞ্চল ছুটিতেছে স্রোত হৃদয়-ধমনী-লােহে ;
আদি ও অন্ত কিছু নাহি বুঝি,
চলিয়াছি পথে অতি সােজাসুজি,
খেনসম হেন কালে,
পাখা-ঝটপট রক্ত-নখরে
তুলে নিয়ে যাবে আপন বিবরে,
আঁধার গহ্বরে তার !
আমি জেগে রব, সকল চেতনা
রহিবে, সহিব সকল বেদনা-
এত ভালবাসা, এত চেনা-শােনা,
সকলি স্বপনসার!
ঘাতকের অসি ঝলসিছে দিনরাতি,
আঁধার কারায় কঠিন শয়ন পাতি
মরণের সাথে সন্ধি করিতে চায়,
গণিতেছে দিন ভীষণ প্রতীক্ষায়-
বন্দীজনের জীবন-শেষের মত
• মরণ-জন্ম নিকট হইছে যত,
জীবন-চেতনা ততই বাড়িছে হায়!
।
৪৮

মৃত্যু অথবা যা-রােগীর মতন পেয়েছে যেজন মরুপ-নিমন্ত্রণ। বিষকটু সেই মরণ-পাত্র নয়ে বসে আছে দিবস-রাত্র- সারা প্রাণ শিহরায়, চুমকিতে চমকায়! দর-দর-ধারা নয়নের জল মিশিছে তাহাতে শুধু অবিরল নিদারুণ বেদনায় । জীবনের আলাে কত মধুময় নিবিবে এখনি নাহি সংশয়, পাণ্ডুর মুখ, শুষ্ক অধর, দিন-দিন ক্ষীণ কণ্ঠের স্বর, মৃদু-উত্তাপে তনু জর-জর, নিশ্বসে ব্যথা লাগে! আকুল নয়নে সবারে সে চায়, এত লােক সব হাসিয়া বেড়ায় কাতর কণ্ঠে সব দেবতায় জীবন-ভিক্ষা মাগে! নাহি কোনাে পথ, নাহিক উপায়, মরণ টানিছে ধরিয়া দু’পায়, ss

স্বপন-পসারী
জীবন তাহারে করেছে বিদায়
বহু বহু দিন আগে।
ক্রমে দেহ হয় অস্থির মালা,
স্ফীত নাসিকায় অগ্নির জ্বালা,
ওষ্ঠ কালিমাময়!
ললাটে শিশির ঘৰ্ম্ম-বিন্দু,
চক্ষুর জ্যোতিঃ প্রভাত-ইন্দু,
যেন পৃথিবীর নয়!
যেন সে ঢুকেছে সমাধি-গহ্বরে,
অতিদুর কোন পাতাল-বিবরে—
স্তব্ধ বিজনালয়।
সেথা হতে দুই গবাক্ষ খুলে,
চাহিয়া দেখিছে গেছে কিনা ভুলে
মানবের মেলা, মানবের খেলা,
--কি যেন সে বিস্ময়!
দেখেছ কি হেন মৃত্যুর বিভীষিকা
ক্ষণেক টুটিয়া জীবনের মরীচিকা
নিবিয়াছে দীপশিখা
হঠাৎ প্রমােদরাতে ?
বল দেখি সে কি ভীষণ আঁধার ।
কুদ্ধ-নিশাসে সে কি হাহাকার।

মৃত্যু আছে কি তাহার কোনো প্রতিকার- আছে মানবের হাতে ? ধর্মের ধ্বজা রেখে দাও দূরে-- মন্ত্রে-তন্ত্রে প্রাণ নাহি পূরে। আমি চাই এই জীবনেরে জুড়ে বুকে করি ল’ব সব, জীবনের হাসি জীবনের কলরব। জীবনের শােক,জীবনের দুখ, জীবনের আশা, জীবনের সুখ- পরাণ আমার চির-উৎসুক লইতে পাত্র ভরি। উচ্ছল-ফেন-মদিরার মত কাণায় কানায় বুদ শত অধরে তুলিব ধরি’ ধরণীর রস জীবনের রস যত। শিরা-উপশিরা স্নায়ুতে স্নায়ুতে, কীচকর, যেমন বায়ুতে ভরিয়া লইব জগতের খাস সুখ-দুঃখের বিলাস-বাঁশরী-তানে, সুর দিব আমি হাস্য-অ-গানে, টা’ব ঝরাব ফুল-পল্লব বারমাস।

স্বপন-পরী
নিশীথ-আকাশে তারকার রাজি
ভরি’ দিবে মাের স্বপনের সাজি,
নীরব আঁধার-রাতে।
ঈশানের কোণে মেঘ হবে জমা,
ধরণী হইবে অতি মনোেমা ।
দিগঙ্গনারা পিঙ্গল হাসে,
শাখা তুলি’ তরু নাচে উল্লাসে
বঞ্জ-বাবাতে-
তাণ্ডবে মাতি জাগিব বিপদ-রাতে।
তার পর যবে কবে--
দুখে দুখ নাহি রবে,
সুখ, সেও আর নাহিক ছলিবে,
জীবন-ক্লান্ত চরণ টলিবে,
বাহুযুগ ক্ষীণ হবে-
ঝিরিঝিরি নিশা-বায়
ফুল যথা মুরছায়,
তেমনি মুদিব আঁখি
ধরণীতে মাথা রাখি’
আমার ‘আমি’টা একেবারে শেষ হােক,
করিব না কোনাে শােক,
মৃত্যুর পরে চাহিব না কোনাে সুন্দর পরলােক।

ক্ষ্যাপা
শিশুর মত সরল হেসে উঠল ক্ষ্যাপা খিলখিলিয়ে
জ্যোৎস্না-মেয়ের ওষ্ঠ চুমি’, ঝড়ের সাথে দি মিলিয়ে।
প্রাণের গানের মন্ত্র গেয়ে করলে সােণা ইট-পাথর,
ফুলের মুঠি উঠল ফুসি’ সাপের ফণায় কিলবিলিয়ে।
সােণার লােভে আসিস ছুটে’ ?--বিষের ভয়ে পিছ-পা তাের !
-বলেই আবার দুধেয় হাসি হাসলে ক্ষ্যাপা খিলখিলিয়ে।
উঠল নিশায় কঁাদন তাহার আকাশ-সেতার ঝুনঝুনিয়ে,
ছিন্ন-মেঘের ফাকে-ফাকে তারার আগুন-ফুল নিয়ে !
চোখের কোণে ফিকি ফোটে, রক্ত কিনা যায় না চেনা-
ভালােবাসার লােকটী যে তার কোলের উপর যায় ঘুমিয়ে ।
“
দিপিয়ারা, ঘুমাও, ঘুমাও! রাত্রি অনেক, আর নাচে না।”
-বলেই বুকে বসিয়ে ছুরী, ডুকরে কঁদে কোন্ খুনী এ!
কিসের কঁাদন, কিসের হাসি? কে বলে দেয়-কোন্ সেয়ানী?
বাঁধন-হারার ছন্দ-মাতন-বলবে কেৰা-খুব সে জানি?
এক তালে সে আগুন জ্বালায়, আরেক তালে ফুল ফুটিয়ে
অবাক করে’, বেহুশ করে সবার হিয়া নেয় সে টানি।
বুঝমানেরা বুঝতে নারে, দিলদারই দেয় শির লুটিয়ে ;
কে যে ক্ষ্যাপায় !-কোন্ ক্ষ্যাপা সে লুকিয়ে বাজায় বংশীখানি।

অমৃতের
পুত্র
নীরব জোৎস্না-রাত্রি, গ্রাম-পথ দিয়া
গেয়ে চলে পান্থ একা আপনার মনে ;
বনের প্রাচীর যেন আছে দাড়াইয়া
দুইধারে, ভােলা ছাদ!—পড়িছে নয়নে
উর্ষাকাশ, আলােকিত চন্দ্রগণে।
নাহি কেহ, কোথা নাই। নিম্নে প্রসারিয়া,
গেছে পথ কতদূরে!—আজ তার হিয়া
জানিবারে নাহি চায়, আর কতক্ষণে
পঁহুছিবে ঘরে ; চলিয়াছে নিরুদ্দেশে
উর্দ্ধমুখে গেয়ে গান, প্রাণ মুক্ত করি,
কর্মক্লান্ত দিবসের রৌদ্রতাপ-শেষে,
প্রাণ তার গান হয়ে পশে কোন দেশে!
‘অমৃতের পুত্র তােরা।'—ঋষিমন্ত্র স্মরি’
আনন্দে-বিষাদে মাের আঁখি এল ভরি’!
৫৫

অ-মানুষ
ওগাে আমার হাত ধােররা না,—যে হও তুমি—সরে, সরাে!
আমার মুখে কেউ চেয়াে না--মানুষ যে নই! এ কি করাে?
চক্ষে দেখ–কিসের নেশা ?
সে-রস ত’ নয় আঙুর-পেষা ।
পূজার প্রসাদ আমার লাগি আবার কেন থালায় ধরে ?
ওগাে আমার হাত ধরে না, বন্ধু! প্রেমিক।-সরাে-সরাে!
আমার লাগি কাঁদছে বসে বিজন-অকূল-অন্ধকারে
সব-হারানাে পথের শেষে-সর্বনাশের হাহাকারে-
ঘােটা-পরা মিথ্যাময়ী,
সেই যে আমার সর্বজয়ী।
জনমকালে কখন্‌ সে যে জড়িয়েছিল কণ্ঠ-হারে-
একটি চুমায় বন্ধ করে রাখল প্রাণের নিশাসটারে।
মিথ্যা কেন গন্ধ-প্রদীপ জ্বালাে মিলনশন-ঘরে ?
গুঞ্জরিলে বৃথাই তােমার সােহাগ-গাথা কানের পরে!
ভেবেছিলাম হয় ত’ এবার
বুঝব দরদ প্রেমের সেবার
কাচের মতন নয়ন-তারায় এবার বুঝি পলক পড়ে।
মিথ্যা আশা! চাদের কিরণ ঠিকরে সেথায় আগুন ঝরে।

স্বপন-পরী
আমি তােদর কেহই যে নই। দেহের আমার নেই যে ছায়া।
আমি যাহার আপন—তারাে নেই যে আমার মতন কায়!
নদীর ধারে ভাঙন যেথায়,
ঘরখানি মাের বাঁধূব সেথায়-
শ্মশান-স্বপন-বিভীষিকায় করবে আদব সে মাের জায়।
জনম-জনম এমৃনি কাটে, ঘুচল না ত’ ছায়ার মায়া।
র

অঘোর-পন্থী
কাচের পেয়ালা ভেঙে ফে তােরা, লওরে অধরে তুলি
—শশানের মাটী লাগিয়াছে যা’য়-মড়ার মাথার খুলি!
ভাবে বুদ হয়ে, বুদবুদে ভরা,
বাসনার রঙে রাঙা-রঙ করা,
নীর নাহি যায়-বহ্নির প্রায় রায় পড় গাে চুলি’
টিটকারী দাও মৃত্যুরে, লও মড়ার মাথার খুলি
চুমুকে চুমুক দাও বার বার,
পড় গাে সবাই ঢুলি।
আমরা ডরি না মৃত্যুরে কেউ-শবশিব একাকার!
জীবন-সুরায় নিঃশেষ করি’ দেখি যে তলানি-সার।
তখন মাথাটি রিম্ ঝিম্ করে,
ব্ৰহ্মর বুঝি ফেটে পড়ে।
জ্ঞান হয়, এই জগৎ যেন রে মড়ারই মাথার খুলি
কঠিন, সুগােল—সবটাই খােলসুরায় ভরিয়া তুলি
চুমুকে চুমুক দাও বার বার,
পড় গাে সবাই ঢুলি।

স্বপন-পরী জলে যাক বুক-বুকের পাঁজর। ঢাললা খাও, ঢালকা খাও। কঙ্কাল-ভাঙা করােটির বাটি সবারে ঘুরায়ে দাও। শুনিছ কি গান গায়িতেছে তারা- মরণের পরে গিয়াছে যাহারা? -সে-গান শুনিয়া শিহরি’ আকাশে তারকা উঠিছে দুলি। টিটকারী দাও মৃত্যুরে তবু, আমরা তাহাতে ভুলি। টিটকারী দাও, দাও টিটকারী পড় গাে সবাই চুলি। জীবন মধুর ! মরণ নিঠুরতাহারে দলিব পায়, যতদিন আছে মােহের মদিরা ধরণীর পেয়ালায় । দেবতার মত কর সুধাপান- দূর হয়ে যাক্ হিতাহিত জ্ঞান। আমরা বাজাব প্রলয়-বিষাণ শম্ভুর মত তুলি’- টিটকারী দাও মৃত্যুরে, ধর মড়ার মাথার খুলি! চুমুকে চুমুক দাও বার বার, পড় গাে সবাই ঢুলি। দেহের সকল রক্তকণিকা উতরােল উতরােল। ওকি ও মধুব হাস্য বিকাশি’ জগৎ দিতেছে দোল। অপরূপ নেশা—অপরূপ নিশা। রূপের কোথাও নাহি পাই দিশা

আঘাের-পন্থী
সােণা হয়ে যায়, সােণা হয়ে যায় শ্মশানভ-ধূলি ?
টিটকারী দাও মৃত্যুরে, ধর মড়ার মাথার খুলি ।
চুমুকে চুমুক দাও বার বার
পড় গাে সবাই দুলি’!

পাপ
পাপ কোথা’ নাই—গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান!
গেয়েছিল, আললা বায়ু নদীজল তরুলতা—মধুমা!
প্রেম দিয়ে হেথ। শােধন-করা যে কামনার সােমরস,
সে রস বিরস হতে পারে কভু ? হবে তা’য় অপশ!
সাগর যখন মন্থন করি উঠিল অমৃত, শশী
দেব-দানবের ঈর্ষার জ্বালা তখনি উঠিল খসি
ছিল না যখন কোজাগর-শশী, ছিল না যখন সুধা,
ছিল না তখন রূপের পিপাসা, ছিল না তখন ক্ষুধা।
শশীপাশে রাহু, অমৃতে গরল—আদিম সে অভিশাপ
তাই হ’তে শেষে লভিল জনম সুখ-পরিণাম পাপ ;
কলঙ্ক তবু করে কি আবিল শশধর-কররাশি ?
ওটুকু নয়ন-সলিল বিহনে মধুর হত কি হাসি?
দানবের আশা বিফল করিতে দেবতা গড়িল ধরা,
লুকায়ে রাখিল অমৃত-ভাণ্ড, জীবনে আনিল জরা।
অজর হইতে চাহিল দানব, স্বরগে পাতিল থানা,
মানবের রূপে দেবতা ভরিল প্রেমের পেয়ালাখানা।

পাপ
বু সে ভুলিতে পারিল না আজও দানবের রােষ-ভয়,
ঈর্ষার আলা এখনো দহিছে, ঘুচিল না সংশয় !
তবু চেয়ে থাকে স্বরগের পানে অমর-জীবন লাগি,
আপনারি মায়া মরণের ছায়া হেরিয়া সৰ্বত্যাগী ।
দানবের দল হাসে খল খল, হেরি তার পরাজয়-
যে-প্রেম তাহারা ভুঞ্জিতে নারে, তারে তারা পাপ কয় ;
যে-মরণ তারা মরিতে জানে না, তাহারে গরল বলে।
জানে না, গরল নীল হয়ে আছে মৃত্যুজিতের গলে।
=
কামনার মণি, বাসনার সােনা, আশার রতন-খনি-
জানে না-জীবন কল্পলতিকা, ধরণী কি ধনে ধনী।
বেদনার মূলে বিকাইছে তাই নাম হ’ল তার পাপ!
এইটুকু দিতে তবুও কৃপণ, হায় এ কি অভিশাপ !
পাপ কারে বলে ? হৃদয়ে ফোটে যা যৌবন-মধুমাসে ?
যার সৌরভে অবশ পরাণ কভু কাঁদে কভু হাসে?
সাগরের মত আকুলি-ব্যাকুলি পূর্ণিমা-চঁদ লাগি ?
যে-তৃষা জুড়াতে চাহে এ হৃদয় পায়ে ধরি’ কৃপা মাগি’ ?
পাপের লাগিয়া ফুটিয়াছে হেন অতুল অবনীফুল ?
রসে রূপে আর সৌরভে যার চরাচর সমাকুল।
পরতে পরতে দলে দলে যার অমৃত-পরাগ-ভরা--
মধুহীন যারে করিবারে নারে শােক তাপ ব্যাধি জরা!

স্বপন-পরী
চিররােগী -সেও চাহে তার পানে, তৃষিত নয়ন দুটি।
বুড়ারও অরদ-অধরে মধুর হাসিটি উঠিছে ফুটি।
হায়-হায় করে চিরদুখী যেই—সেও কি ছেড়েছে আশা?
বিমুখ হইয়া বসে থাকে যেই—নাই তার ভালােবাসা।
পাপ কারে বলে ? সুখ-খুজে’-ফেরা আঁধার কুটিল পথে ?
কে বলেছে তার ঘুচিবে না ঘোর, জাগিবে না কোন মতে ?
আছে তাররা শােভা, আঁধারের বিভা—সেও যে অমৃতরস ।
দেবতাত্মার অগতি কোথায় ? সকলি তাহার বশ!
ত্যাগ নহে, ভােগ-ভােগ তারি লাগি, যেইজন বলীয়া,
নিঃশেষে ভরি’ লইবারে পারে, এত বড় যার প্রাণ।
যে জন নিঃস্থ, পঞ্জর-তলে নাই যার প্রাণ-ধন,
জীবনের এই উৎসবে তার হয় নি নিমন্ত্রণ।
কত যুগ কত জনম ধরিয়া কত হাহাকার করি,
ধরণী-মাতার স্তন সে আঁকড়ি তুলিবে অধরে ধরি,
স্পন্দিত হবে স্তব্ধ হৃদয়, ক্রন্দন করি’ শেষে
জুড়াবে জীবন, অজানা হরষে অবশে উঠিবে হেসে।
ভুল করিবারে পাবে অধিকার, পাপ সে জানিত যারে
একটি মধুর চুম্বনে দিবে সারা প্রাণ একেবারে !
শতবার করি’ পুড়িয়া মরিবে বাসনা-বহ্নি-মুখে-
মরি মরি শেষে অমর হইবে প্রেমের স্বর্গসুখে।

পাপ
পাপ কোথা নাই—গাহিয়াছে ঋষি, অমৃতের সন্তান!
গাহিয়াছে, আললা বায়ু নদীজল তরুলতা মধুমা!
প্রেম দিয়ে হেথা শােধন-করা যে যজ্ঞের সােমরস।
সে রস বিরস হতে পারে কভু-হ’তে পারে অপশ।

নাদিরশাহের
জাগরণ
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত।
কাল-নিশাবসান।
নাদির ! নাদির!
কার আহ্বান আকাশে বাতাসে আজ!-
মেঘে-চাপা বাজ ! আওয়াজ তবু সে মিঠা যেন এস্রাজ !
চঁদ ডােবে যেথা পাহাড়ের চূড়ে—বিরাট প্রেতের কায়া !
আক্রোশে যেন ডাক দিয়ে ফেরে ইরাণ-বীরের ছায়া।
কতকাল ধরি’ বালুকার তালু ‘আমু-শির-দরিয়ার
পায় নি পরশ তুরাণী টুটির রক্তের ফোয়ারার
খি হতে সিন্তা-
সারা মুলুক জুড়ে বসে আছে ইল্পত আফগান!
নাদির ! নাদির !
ওই ডাকে শােন, মাথায় আগুন জ্বলে।
থির হয়ে যায় চোখের পলক অন্ধকারের তলে।
মনুচেহরের সেনাপতি ওই অঞ্জলি ভরি’ আনে
‘হেলমদ’-বারি, পান করি তায় কি আশা জাগিছে প্রাণে।

নাদিশাহের জাগরণ রােস্তমমরি সে বিশাল মুষ্টি দেখাল কৃপাণ-ধরা- বক্ষে বাহুতে একি উল্লাস, বিজয়-অশনি-ভরা । দিকে দিকে জয়রব- হাহাকার করে ফেরুপাল যত-নরবলি-উৎসব। নাদির ! নাদির!—শুনিয়াছি আমি, উঠিয়াছি তাই জাগি ইস্পাহানের গুলাব-বাগানকে ছােটে তাহার লাগি। সিরাজী-শরাব, দ্রাক্ষার চুনী করে নাই চোখ রাঙা শাহজামসী-প্রাসাদের ভিতহেৰি নাই সে কি ভাঙা। উত্তর হ’তে হুহুহুহু হাওয়া ছুটে আসে দিশাহারা, লাফাইয়া ছােটে কণার জল শ্বেতচমরীর পারা । তুহিন, তুষাররাশি। বাজ-বিদ্যুৎতারি মাঝে প্রাণ উঠিয়াছে উল্লাসি। নাদির ! নাদির!—আর কাজ নাই, বুঝিয়াছিকারে বলে- মাটীতে এ মাথা রাখিবার আগে দলে নেওয়া পার তলে। পশু-মেষ যেই পালন করেছে—মানুষ-মেষের দল তারি দুর্বার তরবারে যাবে একেবারে রসাতল। ধরণী হইতে মুছিয়া ফেলিব দুর্বলতার গ্লানি লুটাই পা’য় হীরার মুকুট, রাজা আর রাজধানী। কাবুল কান্দাহার দিল্লী হিরাট মেশেদ গজনী নিশাপুর পেশাবার।

স্বপন-পরী
ইস্পাহানের ইস্পাত হ’তে রক্তের ধোঁয়াশায়
নিবিবেনা কভু—প্রাণের মম ঘুচাইব সবার।
কোহি-রহমতে ‘চেহেমিনার গড়েছিল জাজা-
আমিও গড়িব কঁচামাথা দিয়ে, দেহ করি খান্ খান !
লক্ষণীর গল-শৃঙ্খল বাজিৰে সমুখে পিছে,
তখতের পরে চড়িয়া শুনিব বান্দারা গায় নীচে-
‘ধন্য নাদির শাহ।
মারিবে, তবুও একবার দেখি—অভাগারে ফিরে চাহ।
‘নাদির! নাদির ! নারীর জঠরে জন্ম কি তাের নয়।
পাপ-শয়তান কুহরিছে কাণে কাপুরুষ-সংশয় !
খােদার বালা একান্ যেই—নাই তার নিস্তার,
চিবাইয়া খাবে আপন কলেজা। যদি সে ফেরেস্তার
‘আখেরি-জমানা-দিনের নিশানা তুলিবারে চায় ধরি’--
মরণের পরে দোজোকে’ নামিবে দু’বার করিয়া মরি।
-হাহা, মাের হাসি পায় ।
মমতার চেয়ে আর কিছু পাপ আছে নাকি দুনিয়ায়।
বুলবুল আর বসরার গু নয় শুধু আল্লার
বঞ্জ-বাজনা মরু-মরীচিকা আরো যে চমৎকার।
শুধু মিটমিটে তারার লাগিয়া আকাশের শামিয়ানা ।
ধুমকেতু আর উকার দলে পাতে নি সেথায় না?

নাদিরশাহের জাগরণ
শিশুর অধরে মার পয়ােধরে মিলায় খেলার ছলে,
তেমনি খেলার খেয়ালে ছড়ায় মারীবিষ থলে-জলে!
বাহবা কি বাহবা রে।
আল্লার মত দিলাওয়ার যেই-এ খেলা খেলতে পারে।
বাম হাতখানি তুলিয়াছে উষা ‘পামীর’-পাহাড়-চুড়ে,
আগুনের বাণ অরুণের ওই উড়িল কুয়াসা ফুড়ে।
আলােকের বিষ-বল্লম ছুড়ি রাত্রির কালাে বুকে
পূবের শিকারী নীল-বালুচরে দাড়াইল রাঙা-মুখে !
উহারি মতন উর্ধে উঠিবে এই প্রাণ-বাজপাখী,
‘হিন্দু-তাতার-তুরাণী-শােণিত।—চীৎকার করে ডাকি।
-ইরাণ! গানের রাণি !
রক্তপাগল নাদির তুহার পীড়ন করিবে পাণি।
গানের মহিমা কিছু নাই নাই, চোখ জলে ভেসে যায়।
মূখ সে কবি গানেরই নেশায় বিকাইত বােখারায়।
গজনীর রাজা দিয়েছিল দাম? মনে নাই তার ব্যথা ?
তারি শােকে কবি তেয়াগিল প্রাণ, হাসি পায় শুনি কথা।
সাকী ও পেয়ালা, শ্লোক দুই-চারি-জীবনের দান এই।
নাইশাপুরের ধূলিতলে তাই অস্থিখানাও নেই।
দাস যারা গান গায়
ভীরু-হৃদয়ের ভিখারী পিপাসা গানেই মিটাতে চায়।

স্বপন-পসারী।
দূর করে দাও গােলাবের মালা! পেয়ালা ভাঙ্গিয়া দাও।
‘নাদির। নাদির।'—শুধু ওই-সুরে পার ত’ আবার গাও।
কত বড় আমি-একবার চোখে হেরিবারে গুধু চাই,
অধীর হয়েছে, বক্ষ-কারায় শুধু সেই কামনাই ।
বর্ষাফলকে ঝলসি’ উঠেছে মধুর রক্তরেখা,
ছায়াখানি মাের পড়িয়াছে পিছে—যতদূর যায় দেখা।
কাবুল কান্দাহার
গজনী হিরাট দিল্লীতে ওই ওঠে বুঝি হাহাকার।

নাদিরশাহের
স্থানান্তর-মধ্যস্থ শিবির।
কাল-হত্যা-রাত্রি, নিশীথ।
তুমি চলে যাও এখনি এ রাতে উজবেগ-সর্দার।
আমি একা রব’-কোনাে ভয় নেই, দেরী আছে মরিবার।
কে মারে আমারে এখনাে ছেড়েনি আকাশের গ্রহতারা।
জমি ফাটিয়া নীলশিখা কই? প্রলয়ের বারিধারা ?
অতলের তলে এখনাে নামেনি আলবােরজের চূড়া।
সুলেমান আর হিন্দুকুশের পাঁজর হয়নি গুড়া।
আমি না শাহানশাহ।
কার ভয়ে বাজ আকাশে ফিরিৰে এখনি ?-বাহারে বাহা।
চলে যাও ফিরে ইমাম জাফর! ডেকে দিও দুরাণীরে
কাল প্রাতে যেন আফগান-সেনা বাড়ায় শহর ঘিরে।
কাল, কোহিনুর-তাজ শিরে আর তখত-তাউসে চড়ি’,
আর একবার খুন-খুশ বােজ, খেলিব পরাণ ভরি।
দিল্লীর শাহ রেখেছিল পা’য় উষ্ণীষ তরবার,
তাই নিয়ে যাও, পরে যেন কাল আবদালি-সন্দার।
আলির বংশধর।
মনে থাকে যেন ইমাম হােসেন, কারবালা-প্রান্তর।

স্বপনপসারী
শেখ শিয়া সুফী দরবেশ যতবাঁচে না যেনই কেহ,
কাটিয়া পাড়িবে সবার মুণ্ড, খণ্ড করিবে দেহ!
ওমরাহদের শ্মশ্রুবাহারে পাকাও পলিতাধূপ!
ভাঙ্গা-মগজের চৰ্ব্বি-চেরাগে রােশনাই হবে খুব।
জাফর! তােমার কাফেরগুলাকে রাখিব না কাল প্রাতে,
‘বােজ, কেয়ামত দেখাে দাড়াইয়া জুম্মা-ৰাড়ীর ছাতে।
কোনাে কথা নয় আর।
যাও, চলে যাও ! এবার জবাব জেনাে এই হাতিয়ার।
=
আঃ বাঁচা গেল! তবু মনে হয়, কে যেন রহিল পাছে।
না, কেহ নয়,—আমারি ও ছায়া পর্দায় পড়িয়াছে।
একি হল, একি! বড় তাজ্জব !– ছায়া নয়, ও যে ছবি!
একবার সেই দেখেছি ওরে, ভুলে গিয়েছি সবি
দিল্লি-শহরে দুইপহরের মহামারী-চীৎকার,
একা বসেছি, মসজে সেই রুক্‌নৌদ্দৌলার,-
হঠাৎ দেয়ালে ছায়া !
ঠিক এইমত ঘুরে গেল মাথা, হঠে গেল চৌপায়া
দূর দুর! আরে দেখ দেখ—যেন পাহাড়ী সাপের চোখ।
অবশ করিয়া বেহুস করিল, হরিল সকল রােখ!
ওর পানে চেয়ে সেদিনের মত আজো আগে আফসােস,
মনে পড়ে যায় বালক-কালের দিনগুলি নির্দোষ।
৭০

নাদিরশাহের শেষ
দেখ, শয়তান মিলাইয়া যায় স্মরণে সে কথা আনি,
চোখ দিয়ে বুকে বিষ ঢেলে দিয়ে, মাথায় মুগুর হানি।
-এ কি হল, হায় হায় !
এ বুড়া-বয়সে সে দিনের মত আবার দাড়ান’ যায়।
-
মাথা হতে যেন সকল রক্ত শুষে নেয় নাভি-শিরা !
কি যেন বাঁধন বেঁধেছিল বুকে, খুলে যায় তার গিরা!
‘হাশিশ’ খাওয়ায়ে অজ্ঞান করে রেখেছিল এতদিন--
‘জমজম’-জলে ধুয়ে দিল মাথা দিলদার কোন্ জিন।
রক্তের নেশা একেবারে যেন ছুটে যায় লহমায়-
পরীর আঙুলে পরাইল চোখে স্তাম্বুলি সুৰ্ম্মায় ।
—ডুবে যাই, গলে যাই।
তাজ শমশের ফেলে দিনু এই, কিছুতেই কাজ নাই।
নাদির !
এখনি ভুলে গেলে তুমি দুনিয়ার দুষমন্!-
বাতিল করেছ কায়কোবাদের ধৰ্ম্ম-সিংহাসন।
কোটী শবদেহে দেয়াল তুলিয়া আল্লার আসমান
আঁধারিয়া, তুমি দিনের জলুস করিয়া দিয়াছ স্নান!
পাথরে আছাড়ি মারিয়াছ শিশু, জননীর কোল ছিড়ে।
ক্রোশ হতে ক্রোশ আগুন দিয়েছ মানুষের সুখ-নীড়ে।
আপন ছেলের চোখ
নখে করি’ ছিড়ি’ উপাড়ি’ ফেলেছ, কিছু কর নাই শােক।

স্বপন-পরী সে নহে নাদিম, মানুষ নহে সে।—খােদারি সে কারসাজি। শয়তান, সেও পারে কি এমন দেখাবারে ভােজবাজি ? স্থির হও মন। ভেবে দেখি আজ, কে করেছে সেই খেলা-- আমি ত মানুষ সবারি মতন, কাদা ও মাটীর ঢেলা। বুকে মানাে ছুরি, গলগল করে’ বাহিরিবে রাঙা-জল, এই দেখ চোখে এখনি অঞ করিতেছে টটল, -এত কুদরৎ তার! আল্লা তালা-আবর! এ যে মতলব যােঝা ভার। বারুদের মত কালো-মেঘে বাজ তােপ দাগে-দেখ নাই। আগুন ছুটিয়া পাহাড়ের মুখে—কত দেশ হ’ল ছাই! সাগরের জল-স্তম্ভনে আর ভূমিকম্পনে যার হুকুম তামিল করে দেবদূত পৃথিবীতে বারবার ইসারায় তারি জেগেছিল দূর ইরাণের সীমানায় যুবা আক্সারী, নাদির—এ নাম দিয়েছিল বাপ মা’য়। মেষপালকের আজি দুনিয়ার সেরা দুষমন্ নাম,—এ কাহার কারসাজি ? সেই কথা মাের ছিল নাক’ মনে, থাকে না বােধ হয় কালে ; ভুলেছিনু, আমি মানুষ যে শুধু ভেবেছি, বড় আবােরা লক্ষপণ হানিবার কালে ভুলেছিনু এক প্রাণ- সে যে সেই মত করে ধুক ধুক, তেমনি দয়ার দান! ৭২

নাদিরশাহের শেষ
তারি সাথে আজ মুখােমুখী করে দিয়ে গেল মাঝরাতে।
দেখিতেছি তা’য় আগাগােড়া ছুরি মারিয়াছি এই হাতে-
রহিম রহমান্!
নাদির তােমার বান্দাই বটে, যত হােক বেইমান্ ।
নাদির। নাদির!-সাড়া নাহি দেয়, একেবারে মরিয়াছে।
আরে শয়তান। শয়তানী তাের বেইমানী ধরিয়াছে।
সেই বাহু এই লােহার সমান, ওই সেই করবাল।
তুর্কি-শােণিত-মেহেদির রঙে নখ যে এখনাে লাল।
বােখারা-বিজয়-উৎসব-দিনে নর-শির-পর্বত
করে নাই খুশী, ক্ষীণ মনে হ’ল দরবার-নহত!-
আজ তার হ'ল ভয়।
নাদির! নাদির! এতদিনে তাের এই হ’ল পরিচয়।
মরিয়াছি আমি। চলে গেছি আজ সেই পাহাড়ের ধারে-
প্রেত হয়ে আজ সন্ধান করি, জীবনে ভুলেছি যারে!
জ্যোৎস্নার মত প্রভাত-রৌদ্র মিশে আছে কুয়াসায়,
বি-ঝিক্ করে বহিছে নদীটি গিরিদের পা’য়-পায়,
দেবদারুশাখে জড়ায়েছে লতা সােণালি ঝুমুকাভরা,
আখরােট-সারি ঝুরিছে শিশিরে, আপেল পাকিবে ধরা
এই সেই গ্রামপথ !
এর ধূলা ছেড়ে চেয়েছি আমি বাদশাহী মসনদ।

আপন-পরী নওয়ােজ-বেলা হ’ল অবসান, আকাশে সুতালী চাঁদ- তরুণী ইরাণী সারাদিন কত পাতিয়াছে ফুল-ফদি। কস্তুরী-কালাে পশমিনা চুলে বিনায়ে চামেলি-মালা আজ গােলাবের অপমান কেন ? গজল গাওনি বালা? আঙুরের রস কোথা পেয়ালায় ? তহমিনা। তহমিনা। চাও, কথা কও! কোথা’ সুখ নাই নাদিরের তােমা বিনা আজ নওরােজ-রাতে আশেক এসেছে, যৌতুক দিতে দিল তার ওই হাতে। কবেকার কথা! আমি ভুলেছিনু, তহমিনা ভুলিল না ! স্বপনেও তার চোখদুটি মাের মুখ পরে তুলিল না। তুষার-রশ্মি অচপল দুটি সন্ধ্যা-তারার মত নয়নে বিধিল বড় ঘৃণাভরে হৃদয়ের এই ক্ষত। লুটাই পা’য়, বলি-বাচাও! সঞ্জীবনী সে পাতা জেনেছিল তার মায়ের নিকটে, আর কেহ জানে না তা’! তহমিনা চলে যায়, দূরে দূরে! শেষে মিশে গেল ওই আকাশের তারকায় চাঁদ ডুবে গেল, নিবে’ যায় ওই ‘পাবি ‘মুশতারা- একি থ-থম্ করে আসমা নীল-ইস্পাত পারা। মাঝখানে তার আগুনের চাকা ঘুরে ঘুরে’ উঠে নামে। জল-বালু পার হয়ে আসে মুৰ্দারা তামে। ৭৪

নাদিরশাহের শেষ
ঘূর্ণি ঘুরিছে দক্ষিণে বামে-রক্তের দরিয়ায়।
ৰ, দুধ, করে বাতাস, যেন সে মার খেয়ে মুরছায়।
ঢল যেন তরবারে
সারা ময়দান ঝন্‌ ঝন্ করে, ফেটে যায় হাহাকারে।
কি ঘাের পিপাসা! জিহ্বা-তালু যেন ফুলে যায় সবাকার
কালো হয়ে গেল ওষ্ঠ-অধর, জল নাই ভিজাবার।
দূরে দেখা যায় ঝণা ঝরিছে, কাছে গেলে আর নাই
এ কি দিগী আল্লা গাফুর! মাফ চাই, মাফ চাই।
আঃ বাঁচা গেল! বােখার ছুটেছে!—কি যেন আওয়াজ হয় ?
বাহিরে বুঝি বা পাহারা-বদল? না, ও কিছুই নয়।
খােদা যে মেহেরবান!
স্বপনে এখনি দেখাইল তাই হাশরের ময়দান।
কে পশিল ওই চোরের মতন? কারা আসে পাছে পাছে ?
দুরাণীর লােক-হাঁ হাঁ বুঝিয়াছি—এস ভাই, এস কাছে
কিরীচ খােলা যে! আরে বেতমিজ, বুজ দেল কাপুরুষ!
নাদির দাঁড়ায়ে সমুখে তােদের, এখনাে হয়নি ।
হা হা, হঠে যায় মারিবে, তবুও স্বর শুনে’ হঠে যায়।
আয় চলে আয়, ধৰু গৰ্দান, কাজ নাই তামাসায়।
আফসারী সর্দার।
তুমিও এসেছ।-বংশের কাটা ঘুচাইবে এইবার ?

স্বপন-পরী ভয় নাই, এস—নাদির মরেছে! নহিলে এখনাে তুমি দাঁড়ায়ে রয়েছ মাথা না নােয়ায়ে-জানু পাতি’ মাটী চুমি’! ফেলিয়া দিয়াছি তাজ দেখ ওই, কাছে নাই হাতিয়ার তােমাদেরো আগে পেয়েছি সমন মৃত্যুফেরেস্তার। এসেছিস বড় ওকৃত বুঝিয়া, তা না হলে কুকুর! আর কিছু আগে বুঝিতাম তােরা কত বড় বাহাদুর! নসীবের কেরামত!- এতদিনে বুঝি শেষ হয়ে এল জাহান্নামের পথ ! তার রেখে ধ তরবার! আহমদ আবদালি এখনি আসিবে, শিরগুলা কাটি কুত্তারে দিবে ডালি’! পিঠে কেন ? আহা, ঘাড়ে মারে ফের! স্থির হয়ে মার বুকে বড় সে কঠিন!—খুব করে’ ছুরি বসাও, মরিব সুখে। আহাহা আল্লা! বহুৎ মেরেছি, মরিতেও জানি তবে। বিচারের কালে এ-কথা ধরিয়া, গুনা কিছু মাফ হবে? শেষ হয়ে গেল-বাপ- ইরাণের ধ্বজাইরাণের গ্লানি—বিধাতার অভিশাপ। ৭৬

মহামানব
জন্ম তােমার হয়েছিল কবে ঋষির মনে
এই ভারতের মহামনীষার তপের ক্ষণে।
সর্বমানবে অভেদ করিয়া দেখিল খারা-
তাই তােমায় দেখেছে প্রথম, জেনেছে তারা।
তার পর তুমি যুগে যুগে এলে মূরতি ধরি’-
অমৃত পিয়ালে মৃত্যু-সাগর মথিত করি।
কুরুক্ষেত্রে বাজিল শঙ্খ মাভৈঃ-রবে।
প্রথম-প্রেমিক শাক্যসিংহ উদিল ভবে।
পাপ-পশ্চিমে ভগব-কৃপা দানিল ঈশা !
আরও একজন সন্তানে দেখাল দিশা।
সেই এক বাণী-মূর্তি ধরিয়া আসিলে তুমি।
হে জীবব্ৰহ্ম-অভভদ। তােমার চরণ চুমি।
হে প্রাণ-সাগর । তােমাতে সকল প্রাণের নদী
পেয়েছে বিরাম, পথের প্লাবন-বিয়ােধ নােধি।

স্বপন-পসারী
হে মহামৌনি, গহন তােমার চেতন-তলে
মহাবভুক্ষাবারণ তৃপ্তি-মন্ত্র জলে।
ধন্বন্তরি! মন্বন্তর-মন্থ-শেষ
তব করে হেরি অমৃতভাণ্ড—অবিদ্বেষ।
জগত-জনের বেদনা-সমিধ, কুড়ায়ে সবি-
সেই ইন্ধনে ঢালিলে আপন প্রাণের হবি।
পরিলে ললাটে মহাবেদনার ভ-টীকা,
জীবন তােমার হােম-হুতাশন উদ্ধ শিখা ?
শঙ্কাহরণ আহিতাগ্নিক পুরােধা তুমি।
যজ্ঞজীবন দৈবত। তব চরণ চুমি।
নিরাময় দেহে বহিছ সবার ব্যাধির ভার।
তুমি নমস্য, সবারে করিছ নমস্কার।
চিরতমিস্রাহরণ তােমার নয়ন-কুলে
অন্ধ-আঁখির অন্ধকারের অ4 দুলে।
অর্ধ-অশন বিরলসন হে সন্ন্যাসি,
তুমিই সত্য সংসাতলে দাঁড়ালে আসি।
আদিকাল হতে কতকাল তুমি এমনি রত ।
হে মহাজাতক। জাতক-চক্র ঘুরিবে কত?
কতবার দিবে আপনারে বলি যাগের যুপে
ছােট-“আমি”গুলি ভরিয়া তুলিবে তােমার রূপে!
প

মহামানব
চিনেছি তােমারে, যুগে যুগে অবতীর্ণ তুমি।
হে বােধিসত্ত্ব ।
তােমার চরণ চুমি।
-
ধ্যানীর ধেয়ানে আসন তােমার চিরন্তন,
ইতিহাসে যবে ধরা দাও, সে যে পরম-ক্ষণ।
দেশে-দেশে তব শুভ-আগমনবার্তা রটে,
তােমার কাহিনী কীৰ্ত্তন হয় দেউলে মঠে।
পরে যেই দিন তােমারে ভুলিয়া তােমার নাম
জপ করে সবে নিজেরি লাগিয়া অবিশ্রাম
নরে ভুলে গিয়ে শুধু নারায়ণ’-মন্ত্র পড়ে,
মনের মতন স্বার্থসাধন মুর্তি গড়ে
জগত-অন্ধ জগদানলে করিয়া হেলা
রতনে-ভূষণে সাজায় কেবলি মাটীর ঢেলা-
জগজ্জীবন-মূৰ্ত্তি ধরিয়া এস গাে তুমি।
মানবপুত্র! মৈত্রেয়! তব চরণ চুমি।
এস গাে মহান্ অতীত-সাক্ষী হে তথাগত।
হের এ ধরণী মরণ-শাসনে মুচ্ছাহত।
কাটার মুকুট মাথায় পরিয়া মানব-রাজ!
গাহ জয়, গাহ মানবের জয়, গাহ গাে আজ।
মহাব্যাধি-ভার কর গাে হরণ পরশি কর—
ধন্য হউক নিজেরে নিরখি’ নারী ও নয়।

স্বপন-পরী
আর বার ডাক ঘরে ঘরে, এস আমার পিছে,
ভয়ের সাগর হেঁটে পার হও, ভয় যে মিছে।
মৃতজনে পুনঃ নাম ধরে ডাক’ মৃতক-নাথ।
প্রেতভূমে আজি একি হুলাহলি যােদন সাথ।
সূতিকালয়ের শােভা ধরে যত শ্মশানভূমি
মহাদেব নয়, মহামানবের চরণ চুমি।

আবির্ভাব
আঁধার রজনী বাধা পল যবে নিশীথের জিঞ্জিরে,
হােরা, পল—সব অচল হইল অস্ত-উদয়-তীরে।
গঙ্গা-কাবেরী-কৃষ্ণার কূলে কলহীন জলরাশি,
ক্ষত-দেহে শুধু ফুৎকার করি’ কঁদিছে শ্মশান-বাসী ;
গলিত শবের বসার মশালে নিবারিয়া নিশাচরে,
কোনােমতে তার প্রাণী ধরিয়া রেখেছে দেহের ঘরে।
আকাশে কোথাও জ্বলে না প্রদীপ, উদাসীন দেবতারা ।
প্রাচী-মালঞ্চ পুষ্পবিহীন, বায়ু সে শিশিরহারা ।
রঞ্জনহীন বক্ষ-শােণিত উছলিয়া নাকে-মুখে,
হেথা-হােথা ঝরি’ আমিষের লােভে ভুলাইছে জম্বুকে।
চীৎকার করি’ উঠিছে কেহ বা ডাক্ত-সূৰ্য হেরি’
নাচে উল্লাসে পাগলের মত মরণ-শয়ন ঘেরি’!
পশ্চিমে হােথা-আঁধার ছাড়ায়ে, জীবনের ঐপারে—
প্রলয়-রাত্রে দ্বাদশ সূৰ্য্য উদিয়াছে একেবারে ।
আলাে নাই, তার উত্তাপে গলে অনাদি সে হিমালয়
অগ্নি-বাপ, তরল অনল ছুটিছে ভারতময়।
বিধাতার আদি-কীর্তির এই সব-শেষ জঞ্জাল
এতদিনে বুঝি মুছিয়া ফেলিবে নিৰ্মম মহাকাল !
৮১

স্বপন-পসারী
দশ-সহস্র-বর্ষের সেই অপূর্ব অভিনয়
শেষ হয়ে গেছে—এখনাে তবু যে শেষ হইবার নয় ।
দেব-দানবের বিষম-বীর্যে মহাপারাবার মথি’
কালােকালকুট কণ্ঠে ধরিয়া অমৃত মিলাল তথি!
পুরুষােত্তমে বরিল হেথায় বিশ্বের মনােরমা !
সত্য রাখিতে আপনা বেচিল-সুত, জায়া নিরুপমা।
আপনি করেনি স্বর্গ-কামনা, তবু সে স্বর্গ লাগি
মহাতপস্বী দানিল অস্থি দেব-কল্যাণ মাগি।
পিতার আদেশে মৃত্যু-সদনে সত্যের সন্ধানে
পশিল বালক-ব্রাহ্মণ সেই, চির-নির্ভয় প্রাণে।
রাজা আর ঋষি-দু’এর সন্ধি ঘটিল একের নামে।
গােলােক-নিবাসী রাজা হ’ল আসি, কমলারে লয়ে বামে ।
এই মত কত পুরাণ-কাহিনী-কল্পনা সে ত’ নয়।
প্রাণের মাঝারে অহরহ তার হেরিয়াছে অভিনয়।
ইতিকা হেথা দেবতার লীলা, দেবলীলা ইতিহাস
( মানব-মনের গহন-গুহায় নটনাথ করে বাস!)
সেই সে বিরাট নাট্যশালায় দুলিতেছে যবনিকা-
নাটকের শেষে চলে প্রহসন, নাম তার বিভীষিকা।
হেথায় ললাটে প্রথম ফুটিল তৃতীয় নয়নতারা ।
গঙ্গোতরী-ফেন-তরঙ্গে উথলিল হাসি-ধারা !
৮২

আবির্ভাব
মন্ত্রদ্রষ্টা মানবে শুনাল অমৃতের অধিকার
আপনা ও পর, দ্যুলােক-ভূলােক আনন্দে একাকার!
শিব-সুন্দর-সত্য-স্বরূপ আপনারে চিনি ল'য়ে
মুক্তি-সাধন শক্তিমন্ত্র সাধিল অকুতােভয়ে !
দেবতাদমন মানব-মহিমা—এই তার পরিণাম !
অন্ধকারায় সভয়ে জপিছে প্রেত-পিশাচের নাম।
বুকে হেঁটে আর লাল-পাক ঘেঁটে কোনােমতে বেঁচে থাকা।
মুখে মুখ দেয় পথের কুকুর-তা’ও যেন সুধামাখা!
আঁধারে হাতাড়ি’—হাত-ধরাধরি—টলিছে এ ওর গায়।
পিপাসা মিটায় নয়নের জলে, তবু না মরিতে চায়।
এমন সময়ে কোথা হতে ওঠে তিমির-গগন ভেদি
আবাহন-গান, স্তোত্র মহান—আবিরাবিম এধি!
কাহার কণ্ঠে কুমারী-উষার বােধনমন্ত্র-বাণী
বাণের মতন প্রাণ-কোদণ্ডে ভীম টঙ্কার হানি',
ধ্রুবলােকে পশি’ ফিরিয়া আনিল আলােকের সন্ধান।
চেতন-দুয়ারে ভ্রান্তি-কবাট ভেঙ্গে হ’ল খান্-খা!
আড়ষ্টশির পঙ্গু-সমাজ বাড়া’য়ে শীর্ণ গ্রীবা,
স্পন্দবিহীন স্তিমিত নয়নে লভিল কি যেন বিল
উষার বাতাস বয়ে গেল যেন শিহরিয়া কলেবর
ভয়ের স্বপন ছুটে যায় আজ শত-শতকের পর।

স্বপন-পরী
অমৃত-সায়রে গাহন করিয়া এ কোন্ গগন-চারী
নিবিড় নিশীথে নেমে এল হেথা, ‘শিবােহহং উচ্চারি।
অসিত আকাশ নীল হয়ে এল আত্মাহুতির শেষে।
ম্লান হয়ে এল মােহের দীপালি প্রভাতের উদ্দেশে।
নর-নারায়ণ-পদরজঃ মাখি’, মাটিতে লুটায়ে শির,
বদ্ধ-জনেরে বক্ষে বাঁধিল আপনি-মুক্ত বীর।
শুষ্ক হৃদয়-তমসার তীরে অগ্নিহােত্র জলি’
সাগর-পারের তীর্থ-সলিলে আঁখি দিল প্ৰক্ষালি।
শিহরি’ সভয়ে হেরিল তখন বিশ-কোটী নর-নারী-
হ’ল না প্রকাশ মুক্তি বিভাত কোন্ বাধা অপসারি’!
উদয়-তােরণে অসাড়-শরীর পড়ে আছে উষা-সতী-
দিব্যহাসিনী নিৰ্মলা ঊষা-পরমা সে বেদবতী!
লম্বিতে নারি’ লাঞ্ছিত সেই সত্যের ঘরণীরে
আঁধার-বিজয়ী অরুণের রথ বার-বার যায় ফিরে।
-
কত-না দম্ভ করেছিল কত প্রাণহীন মতিমা
পিশাচ-সিদ্ধ, আঁধার-বিলাসী—মুক্তি করিবে দান।
কম্পিত করে পলিতার বাতি মলিন কামনা-খুমে
ধরিছে কখনাে পরের সমুখে, আপনি ঢুলিছে ঘুমে
তর্ক-কুটিল পাটোয়ারী-নীতি-মৃতজনে জীয়াইতে !
শকুনের সাথে রফা হয় শেষে শবদেহে ভাগ নিতে।
৮ঃ

আবির্ভাব
কত-না মন্ত্র পড়িল আবেগে কত-না মনীষি-ঋষি-
সুপ্তি-গভীরে ক্ষণিক চেতনা-স্বপনে যায় সে মিশি!
কত-না সাধক বীর-বিক্রমে দুয়ারে হানিল কর
এক-সে মন্ত্র পড়িল না মনে, লুটাইল ভূমি’পর।
কোন্ জাদু জানে এ নবপন্থী!—একি ভাব, একি ভাষা।
অনলদগ্ধ শুদ্ধ চরিত!-উদ্দাম ধায় আশা।
জয়ভেরী তার বাজে কি বাজে না—সে ভাবনা নাই বটে।
লিখিল না কেহ নামটী তাহার উদ্ধত ধ্বজ-পটে।
কোন্ পথে সে যে কোন্ দিক দিয়ে হেথায় দাড়াল আসি-
মৌসুমী-বায়ু সঙ্গে যেমন সুমেদুর মেঘরাশি—
সে কথা কেহই জানিবার আগে হঠাৎ দেখিল দেশ,
নব-শ্রাবন্তি—জেরুজালেমের-অপরূপ একি বেশ ।
অধরে তাহার মৌন-মহিমা, ললাটে অমৃত-ভাতি!
নয়নে গভীর প্রসাদ-দীপ্তি, হেরিছে প্রভাত রাতি।
ক্ষীণ তনু, তবু বর্জে রুখিতেঝড়েরে বাধিতে জানে।
উদ্যতফণা কালীয় তাহার বাঁশির শাসন মানে।
জন-সমুদ্রে কল্লোল ওঠে—অবতার। অবতার।
রুদ্ধ-নিশাসে হেরিছে ভারত নবলীলা বিধাতার।
৮৫

দেবেন্দ্রনাথের সনেট হে দেবেন্দ্র, কি সুন্দর তােমার সনেট। কাব্যলক্ষ্মী সাজে যেন বাসন্তী দুকূলে ! মদন-মােহিনী যেন প্ৰদানিল ভেট। গােলাপের স্বপ্ন যেন হেমন্ত-মুকুলে! একবাটী পূর্ণ যেন নারিঙ্গীর রস। কবিতা-বিহগী যেন বসে ক্ষুদ্র ফুলে- মুয়ে পড়ে বৃন্ত তার বেদনা-বিবশ। গােলাপী আতর যেন!-একরাশ চুলে এক ফোটা করি’ দেয় সুরভি-মধুর। দখিণা-বাতাসে রাখি বাতায়ন খুলে’-- তবুও তেমনি বাস অলকে বধুর, সারারাত্রি বিছানায় গন্ধ ভু-ভু ! বঙ্গবিভারতীর সিত-সিথিমূল সনেট- সিরে কবি করেছ অতুল !

কবির প্রতি তােমার কবিতা নহে লীলা-পুষ্প, কুঙ্কুম কেলির অগুরু-গুগগুল-ধূমে মিশে গন্ধ চম্পা-চামেলির! অমরী-মজীর-গুঞ্জ মিশে যায় আরাত্রিক-গানে- সৌন্দৰ্য-স্বপনে চিত্ত ডুবে যায় মঙ্গলের ধ্যানে। রূপ-পিপাসায় তব অরূপের তৃষা জেগে রয়, প্রেম মহামহিমায় মরণে হাসিয়া করে জয়! প্রেম যেথা ধরিয়াছে সুধাগু বৈজয়ন্ত-বিভা, যে-কবি ধরায় প্রেমে আনিয়াছে বৈকুণ্ঠের দিবা- প্রেম-ধৰ্ম্মী ভারতের সেই দুই দুল্লভ সম্পদ, প্রেমযােগী চণ্ডীদাস, মমতাজ প্রেম-কোকনদ- হিন্দুর সে ভাবমূর্তি, মােসলেমের গম্ভীর গম্বুজে অর্পিয়াছ উপায়ন, ভক্তি-প্রেম-শতদল—অম্লান অম্বুজে। রূপ-রসে টলমল, কবে তব হৃদিপাত্র ভরি’ উছলিল ভাবধারা ? কোন্ স্বপ্ন দিবা-বিভাবরী ভরিয়াছে আঁখি তব ? সারদার শ্রীচরণমূলে সর্ব-সমর্পণ করি’ আছ তুমি দুঃখ-সুখ ভুলে’! কবে মাত তুলি নিলা অঙ্কে তােমা, চুমিল নয়নে-- অধরে চুমিল শেষে !-নেহারিলে ভুবনে-ভুবনে

স্বপন-পরী
শতচ আলােকিছে অপরূপ রূপ-বৃন্দাবন।
বাজিল ও বাক্যন্ত্রে সুমধুর মুরলী-বাদন!
দিল কি অঞ্জলি ভরি’ দেবীর সে মানসমরাল
চয়নিয়া চঞ্চপুটে পুণ্ডরীক ফুল্ল সমৃণাল!
তাই তব গীতি-পুষ্পে নিত্য হেন মধু-পরিমল !
তাই হেন সুবিশদ স্বচ্ছ ভাষা—পূর্ণস্ফুট, উজ্জ্বল, অমল!
সৌন্দর্য্যের জ্যোৎস্নাঙ্কিত একপদী লয়েছে তােমারে
বনভূমি-শেষে চিরসুন্দরের দেউল-দুয়ারে !
যেথায় মধুর মন্দ্রে মন্ত্রারতি হয় দেবতার
বসিয়া পড়েছ সপি আপনার নৈবেদ্য-সম্ভার।
চঞ্চল সে চন্দ্রদ্যুতি-সসীম সে সুষমার শেষে
পঁহুছিতে আকিঞ্চন কবি তব, শাশ্বতের দেশে।
রস-সাগরের কূলে উদিয়াছে একটি অরুণ
সেই শােভা হেরিবারে কবি, তব ক্রন্দন করুণ!
জন্ম-মৃত্যু দুই দ্বারে করিবারে এক হরিদ্বার,
জীবাননে চানন হেৰিবারে আকূতি তােমার !
তােমার বৈষ্ণবী গতি, সুবিচিত্র বরগুজমালা
নবরঙ্গে নববঙ্গবাণীকুঞ্জ চিরদিন করুক উজালা ।

উচ্চৈঃশ্রবা প্রাণপণে তার রশ্মি পাকড়ি ধরিনু পক্ষিরাজে- পেশীগুল ফুলে শিরায় ধরিল গিরা ! অতি-দুর্দম উন্মদ-বেগ রুদ্ধ করার কাজে কুঞ্চিত ভাল, আঙলেতে কালশিরা ! ঐরাবতের মত উঠেছিল সাগর-ফেনার স্রোতে, মাতেজা সেই দিব্য তুরগবর ! আহার তাহার প্রতিদিন হয় অরুণের হাত হতে তারার প্রাসাদে, আলাের থালার পর। অতুলন গতি! অমিত মহিমা! কিছুতে মানে না বশ- ক্রমাগত ধায় উদ্ধ-আকাশ-পানে। গভীর-স্বনন হ্রেষারবে ভরি’ প্রতিপলে দিক্-দশ, গগনের নীল খিলানে সে খুর হানে। এই অপরূপ অদ্ভুত প্রাণী—চড়িয়া তাহারি পরে, সুরার পাত্র স্বর্গের দিকে ধরি, তারার শিখায় মশাল জ্বালায়ে লইয়া যে যার করে কবিরা সবাই ছােটে বায়ু সরি’!

স্বপন-পরী
তারি নিশ্বাসে বহে মৃদুগীতি, গরজয় মহাগান
সে কি ভয়রাশি, বাসনার সন্তাপ !
পিধান হইতে ঝলসিয়া উঠে তরবারি দ্যুতিমান।
নৃপতি-হৃদয়ে উলসয় মহাপাপ!
সৃষ্টির শেষ-ভবিষ্যতের প্রলয়ের নীল-রাতে,
মৃত্যু, নিরাশা—দুই দানবেরে বহি
উধাও ছােটে সে, কালো ডানা মেলি নিসাড় ঝঞ্চাবাতে-
দ নিবে যায় তাহারি আড়ালে রহি'।
অন্ধমুনির রােদনের রবে, ভীমের কঠিন পণে,
যেমন উচিত-নাসা-বিস্কার হয় ;
কবি যে-ছন্দে বিশ্বরূপের ধেয়ান গীতায় ভণে--
তারি তালে-তালে পড়িছে চরণচয় !
গলিত ফলের উপরে—দেখ, সে মােয়ায় তরুর শাখা ।
জননী যেন সে মৃত-সুত লয়ে কাঁদে।
তাহারি কারণে অশােক-কাননে আনন অমাখা!
গান্ধারী তাই নয়নে বসন বাঁধে!
কল্পলােকের যাত্রী মহা!—থামেনা অর্ধ-পথে !
উড়িছে কেশর, সদাই ত্বরিত গতি।
অসম্ভবেরি অতল-পরশ নহিলে সে কোনমতে
অধীর গমন-শাসনে করে না মতি।

উচ্চৈঃশ্রবা
তড়িতের চেয়ে চকিত-গমনে ধেয়ে চলে দিশি-দিশি,
লােকালােক-গিরি-শিখরে সহসা বসে।
হেমন্দনে বাহন হয় সে, যখন সপ্তঋষি
প্রহরক্লান্ত, বিবশ তালসে।
মহানীল ব্যোমে বিহরে স্বাধীন উদাস অকুতােভয় !
একমুখে ধায় কভু সে মেরুর পানে।
রাশিমেখলার নাগরদোলায় দোল খেতে সাধ হয়-
ভীমবুর্ণনে ভয় নাই তার প্রাণে!
করে সে প্রয়াণ ঊর্ধ-আকাশে কুজঝটি ভেদ করি,
উতরিতে চায় অসীম-পন্থ-শেষে-
অন্ধ-ভমস ঘনমসীময় সঙ্কোচে যায় সরি
হেরিয়া নবীন দিবালােক যেই দেশে।
অবাত্মনসগােচর তাহার সেই পথ হতে ফিরে,
অতি-অসহন দহন-দৃষ্টি দিয়া
নিরখি’ বারেক ক্ষীণপ্রাণ এই মানুষ-কীটামুটিরে,
হিম করি’ দেয় ভয়-কম্পিত হিয়া।
অশান্ত বটে!—ধরি’ তবু তা’য় চালায় আপন পথে,
বহুসাধনায়, কত কবি মতিমা।
মহাগর পার হয়ে যায় চড়ি’ তায় কোনােমতে,
-জ্ঞানী নয় যেথা এক পাও আগুয়ান।

স্বপনপরী
জগত-জনের প্রাণমন শুধু তাহারি শাসন মানে,
যম—সেও নমে, হইবারে নির্ভয়!
গরি প্রাঙ্গণ মাৰ্জন করি’ সারাদিন-অবসানে
বিদুর নীরবে খুদ-কুঁড়া খুঁটি জয় !
প্রাণ চমকিয়া যার পথে কভু দেখা দেয় একবার,
সেজন জীবনে পাবেনা সুখের লেশ।
তার দিবসের সকল প্রহরে গােধূলি-অন্ধকার
প্রাণ জর্জর, নিরাশার নাহি শেষ!
পিঠ থেকে পড়ে অনেক সওয়ার বহুদূর পশ্চাতে
কোথায় হারায়—ধূলায় ধূসর দেহ!
ক্ষমা সে জানে না, দয়া নাই তার,ফলে তাই হাতে হাতে
স্পৰ্দ্ধাৰ ফল-আঁটিতে পারেনি কেহ!
আগুনের-ফুল-ঝমকরা বক্ষের দুই পাশ
স্ফুরিত গর্বে, নিজ বিক্রমে ধায়।
বীর ভবভূতি, শেপীয়র, কৌশলে ধরি’ রাশ
দিয়েছিল বটে কবিতার বেড়ী পায় ।
আমি তবু তার ঘুরাইয়া দিমু ভাবনা সে দিশাহারী
-স্বর্গ-নরক, রাজাদের ইতিহাস।
নিয়ে গেনু তায়ে- আঁধার-বিলাসী অসীম-আকাশচারী-
মাঠে-মাঠে যেথা ফুল ফোটে বারােমাস।

উচ্চৈঃশ্রবা নিয়ে গেনু ধরে মাঠের মাঝারে সুরভি তৃণের পাশে, যেথায় মধুর প্রভাতে পুলক-ভরা ফুটিছে-টুটিছে রাখালিয়া-গীতি চুম্বনে কলহাসে, অমরার শােভ পলকে ধরিছে ধরা ! নিকটে তাহার নদীতীর-ভূমি, সেখানে লই তারে— যেথায় জনমে সুকোমল পদাবলী! সুনীল সলিলে কণ্টক শােভে শ্লোকের কমল-হারে, ত্রিদল-ত্রিপদী ফুটে আছে গলাগলি! অক্ষি-গােলকে বিদ্যুৎ হানি’ তরজে তুরগবর, বিদ্যুৎ সে যে খা-ফলক প্রায়। সিন্ধুর বুকে ঝড়ের দাপটে গর্জে যেমন স্বর- সেইমত তার পঞ্জর উথলায়। সে যে হাহা করে, ছুটে যেতে পুনঃ অজানার উদ্দেশে, পৃথিবীর মায়া-বাঁধন কাটিতে চায়। নীলশিখা সম নিশ্বাস তার ফুসিছে সর্বনেশে, চোখে তার তিন-ভুবনের জ্যোতি ভায়। সুরার সাধক তান্ত্রিক যত নর-নারী অগণন সেই সাথে সব চীৎকার করি ওঠে। সহসা আকাশে একসারি মুখ গম্ভীর-দরশন- বিকটাক্ষ নয়নের পাঁতি ফোটে।

স্বপন-পরী তারকারা এবে জ্বলিতে জ্বলিতে গগনের গম্বুজে শিহরি’ কপিল শুনি সে আৰ্ত্তর, কঁপে যথা দীপ, রমণী যখন তুলসীর বেদী পূজে, থরথরি’ হাতে, সন্ধ্যাপবন পর! যতবার রুষি ঝাপটিল তার দু’পাখা অাঁধা-কালাে— আঘাতি অধীর পাংশু আকাশ-গায়, ততবার তত তারকাপুঞ্জ নিয়ে তাদের আলো, গভীর আঁধারে অসীমায় ডুবে যায় ! আমি তবু তার কেশরের মুঠি ধরেছিনু দৃঢ় বলে, দেখাই তারে স্বপনের ফুলবন- প্রকৃতি যেথায় বিলাস-লীলায় মুনিদেরাে মন ছলে, জোনাকীরা জ্বলে শিলাগৃহে অগণন ! দেখাই তারে ছায়া-তরুদল সুদুর মাঠের শেষে, আষাঢ়েরধারা-পরশে-রঙীন ঘাস- নন্দন বলি’ বাখানে যে ঠাই কবিগণ সবদেশে, যার গানে তারা বাঁশিতে ভরিছে শ্বাস। এ-হেন সময়ে দেখিলেন পথে কবিগুরু বাল্মীকি, শুধালেন, ‘বাছা, চলেছ এ কোন কাজে ? কহিলাম, “তাত! উচ্চৈঃশ্রব-এ সেই পৌরাণিকী চরাইতে যাই স্বর্গ-দুরগরাজে! ৯০

কলস-ভরা
ফাগুন-বেলা পড়ে এল বুকটি জলে না জুড়াতে
কলস-ভরা শেষ হবে সই, মনের কথা না ফুরাতে।
শাড়ীর রাঙা-পাড়ের রেখা
জলের তলে যায় যে দেখা!
এখনাে যে ছায়ায় নাচে চোখের তারা ঢেউয়ের সাথে ।
কালো নদী আলােয়-ভরা, মন যে আমার তাইতে মাতে।
থাকতে নারি জলকে এসে চোখের উপর ঘােটা ফেদে,
একটুখানি সাঁতার-খেলায় বিউনি আমার নিইনি বেঁধে।
পদ্মটিরে ভাসিয়ে দিতে,
ভেজা চুল নিংড়ে নিতে
একটু সবুর সইবে না তাের! প্রাণ যে আমার উঠছে কেঁদে ।
সাজ না হতেই কি হবে তাের আতা পরে’ বিউনি বেঁধে ?
এখনাে দেখ, অনেক বেলাবনের মাথায় জুলুছে আলাে।
গানের তরী যায় যে ভেসে-সুদূর সে সুর শােনায় ভালাে।
এম্‌নি কি তাের কাজের ত্বরা?
সত্যি হ’ল কলস-ভরা !
হ’লই যদি, কঁাখের ও-জল নদীর জলে আবার ঢালাে !
জলের কালাের চেয়ে ভালাে ঘরের আলােব না, হলো ?

স্বপন-পসারী
ফিব ঘরে অলসপ্রাণে মদপদে বন্ধ্যাপারা-
পশ্চিমে ওই ফুলবাগানে তুলবে গােলাপ সন্ধ্যাতারা।
ঘােষ্টা টেনে লাজের ভাণে,
চেয়ে আপন পায়ের পানে,
কলস ভরে উঠ ব যখন, আকাশ তখন আলােক-হারা ।
যাবার পথে পড়বে ঝরে’ সিক্ত-দেহের কঁদন-ধারা ।

ঘরের বাঁধন
বেরিয়ে-পড়া এতই সােজা ?-বারে বারে তুই যে বলি ?
কানু-পিরীত-নেশায়-রঙীন্ অন্ধকারে তুই যে চলি।
পায়জোরে তাের ঝমঝমাঝম
ছিটকে পড়ে শঙ্কা-সরম !
কা-ফণী সে লুটায় ফণা, পায়ের তলায় যখন দলি।
আলতা পরায় পথ যে তােরে, গহন বনে যখন চলিস্
কাটা দলিস।
তােমার মাতাল-দেহের দোলায় মুচ্ছ হানে বাঘের চোখে।
বাদল-রাতের নিবিড় কাজল গলছে অলখ-চন্দ্রলােকে।
আকুল তােমার কেশের রাশে
জোনাক-পাতি যখন হাসে-
খুনীর ছুরী, বাঁধন-ডুরী—শিথিল যে হয় ঘুমের ঝোকে !
চাইতে নারে কেউ যে তােমার সাগর-নীল ঐ ডাগর চোখে
-পাগল-চোখে।

স্বপন-পরী
বেরিয়ে-পড়া নয় ত’ সহজ!-সে কাজ শুধু তােরেই সাজে,
ফাগুন ফুলের মালা গাঁথে যে-জন আগুন-খেলার মাঝে।
মধুবনের মঞ্জরী সে
ভৰুছে নিশাস মন্দ-বিষে,
কামনা যার মনের কোণেই গুমরে মরে শতেক লাজে-
বেরিয়ে-পড়া তার কি সাজে নিশীথ-রাতে পথের মাঝে,
স্বপন-মাঝে।
শ্যাম যে আমার নামটি ধরে ডাক দিল না, হায় অভাগী ।
সারা জনম গোঁয়াই একা—মনে-মনেই শ্যাম-সােহাগী ।
কুলকে আমি সাধে ডরাই ?
শক্ত করে তারেই জড়াই।
বাঁশীর ও-সুর বছে না ত’—আমার তরেই সে বিবাগী ।
নাম ধরে ডাক ডাকূল না ত—এমন কপাল! হায় অভাগী।
ঘর-সােহাগী।
০৮

গজল-গান গুনা-বাগে ফুল বিকুল, নাশপাতি গালে গাল দিলে লালে-লাল হল বােস্তানে ! ঘাসের সবুজ সাটিনে নীলের আবছায়া, সরাইখানায় মেতেছে মাতাল খােশ-গানে ! কহিল সহেলি, আজ যে গানের নওরােজা। ফুল দলে চল, কেন গাে ফলের বও বােঝা? সে কোন্ শরাবে করিলি বেহেঁশ- মতানা নার্গিসাক্ষি। কি কথা আমার কো’ কাণে। বড় মিঠা মদ। ফের পেয়ালায় ভ সাকী। হরদম দাও! আজ বাদে কাল শুরু কি?

স্বপন-পসারী
তার সে ভুরুর এটুকু চাদ
আধ-ঢাকা
‘রােজা’র উপােস ভেঙে দিল যেন
‘ইদ’-রাতে !
রাত হল দিন সেই আতশের
রােশনা’য়ে-
দিন হ’ল রাত, নয়নে নামিল
নিদ প্রাতে।
ইয়ারা! তােমার পিয়ালা শপথ
সেই দিনই
শবক-নার পথটি প্রথম
নেই চিনি।
পথে বাহিরিং, পিরাহান্ মাের
মদ-মাখা
সেই দিন হতে ঠাই নাই আর
‘ঈদগা’-তে !
বড় মিঠা মদ। ফের পেয়ালায় ভর সাকী!
হদ দাও।-আজ বাদে কাল ভসা কি ?

গজল গান কালাে-কন্তুরীজুলফি যে তার ঘা’ করে। বিছার মতন নড়ে সে গালের গুলবাগে! চিবুকের সেই তিলটি যে তার দি-দাগা”!- এতদিনে মাের স্বস্তি-সুখের পিয়ারী। ভুল ভাগে। ও তাের ঠোঁটের দুখানি লাল চুনী জুড়াবে দরদ,-আমি সে স্বপন- জাল বুনি! মজুর গােরে এখনাে যে তার বুক জুড়ে লায়লী-অধর-লালা-ফুলটির মূল জাগে। বড় মিঠা মদ। ফের পেয়ালায় ভ সাকী । হরূদম দাও!-আজ বাদে কাল ভসা কি?

স্বপন-পসারী
গােলাব গুলাে যে লাল হয় লাজে।
মউ-ভরা
পিয়ালা কারেও পিলায়, এমন
দেখছি নে-
পিয়াসী চামেলি বেলী যে মুখানি
চুণ করে !
কতদুর হতে বুলবুল আসে
দেশ চিনে।
শিরীন শরাব বড় যে রঙীন্।
কয় সাকী
যত নেশা হাে, রাতটি ফুরালে,
রয় তা কি ?
তােমার সুর-সুরায় যে জন
মস্তানা,
হুশ হবে তার আখেরি-জমানা-
শেষদিনে।
!
বড় মিঠা মদ! ফে পেয়ালায় ভর সাকী ।
দম্ দাও!-আজ বাদে কাল ভসা কি?

হাফিজের
অনুসরণে
আগর আ তুকে শীরাজী
বেদ, আরদ দিলে মারা।
বখালে হিন্দুরশ, বখশম
সমরকন্দ, ও বােখারা ।
শিরাজের সেই তুরাণী রূপসী
বে-দরদী,
যদি কোনােদিন দর বােঝে এ সুখ-হারার,
লাল সে গালের কালাে তিল্‌টির বদলে গাে,
দিয়ে দিতে পারি সমরকন বােখারা আর।
যেটু শরাব পড়ে আছে শেষটালাে সাকী।
বেহেশতেও সে জায়গা এমন আছে না কি?-
রােনাবাদের নীল নহরের
কিনারাটি
গু-গলাগলি গলিটি এমন মুসার ?

স্বপন-পসারী
বে-শরম এই চুড়িগুলা সব চারিপাশে,
সারাটা শহর গুজার করে—ভারি হাসে !
ধৈরষ মাের লুটে নেয় এরা
করিব কি
তাতার-দ্য ভেঙ্গে ফেলে যেন ঘর-দুয়ার !
পিয়ারা আমার বড় যে রূপসী !-চাহে না সে
এমন গরীব-অভাজন তারে ভালােবাসে,
কাজ নাই তার সুম্মা-মেহেদী,
জবী-ফিতা
চায় না পরিতে টিপ, পুতিমালা খোঁপায় তার !
চলুক শরাব, রবাবে ছড়িটি টানাে সাকী।
আঁধার-ধাধার জওয়াব মেলে না—জানো না কি ?
কেউ সে বােঝেনি, কেউ বুঝিবে না
কথাটা কি-
সারা দুনিয়ায় পাবে না খুঁজিয়া সমঝদার
য়ুসুফের রূপ দিন দিন যে গাে ফুটে ওঠে
কুমারী-রম শরম যে তার পায়ে লােটে।
জুলায় খার ঐ আবরু এবার
গেল টুটে
ইজ্জত্ রাখা ভার হ’ল সেই লজ্জিতার !
!
=
১০৪

হাফিজের অনুসরণে
আখেরে যাদের ভালাে হয়, সেই যুবারা যে
প্রাণের অধিক জ্ঞান করে এই ধরা-মাঝে-
বুড়াদের কথা, নীতির বচন।
তবে শােনাে-
মন রে! তােমার প্রাণের কথা সে চমৎকাব!
গাল দিলে তুমি সেই যে আমার ভালো কথা।
বেঁচে থাকো তুমি, এমন সুহৃদ পাব কোথা?
তবু মনে হয়, চিনি-গড়া ওই
চুনী দুটি
কেমনে ঢালে গাে বিষ-কটু এই বচন-ধার!
গীত শেষ হ’লসার হ’ল গাঁথা মােতিমালা !
এস গাে হাফিজ! গাও দেখি হেন সুধা-ঢালা-
শুনিতে শুনিতে নিশীথিনী যেন
দিশাহারা,
খুলে ফেলে দেয় তারার জড়ােয়-সিথিটি তার ।

ইরাণী
যৌবনেরি মউ-বনে সে মাড়িয়ে চলে ফুলগুলি ।
দুপুর-বিজন ঝরূণাতলায় একলা বসে চুল খুলি।
পূর্ণিমারই ঢেউ উঠেছে রূপ-সায়রের মাঝখানে
থির রহে না মােতির মালা, উঠছে কাণের দুল দুলি’!
ফুলের ফিতায় বিনায় বেণী ফাল্গুনেরি দিনটিতে,
দুষ্ট-অলক বশ মানে যে কঙ্কণেরি কিকি-তে।
হাত দুখানি খোপার 'পরে, বাহুর বাঁকে জওসমের
ঝুমকো দু’টি দুলছে, সে কি আলিঙ্গনের ইঙ্গিতে ?
মখমলেরি বিছনা’পরে ঘুমায় কোলে সারঙ্গী,
নীল রঙিলা কাচের থালায় আনার-আঙুর-নারী-
একটি ছােট টুকরা-ফালি টুকটুকে-লাল তরমুজের
রাঙা ঠোটে ঠেকায় শুধু মুখে দেওয়া বারণ কি?

ইরাণী
কালােডানার খেত-মরালী !-স্নানের ঘরে হাম্মামে
ছড়িয়ে পড়ে চুলের পালক শুভ্র-তনুর ডান-বামে!
গােলাবফুলের তাজটি মাথায়, জাফরাণী-রং পায়জামা-
যুবতী নয়, বালক-কিশাের বা এসে তাঞ্জামে!
রাতের বেলায় জ্বালিয়ে বাতি মুকুরে তার মুখ দ্যাখে,
কঁচল খানি খুলেই আবার মুচকি হেসে বুক ঢাকে!
দর্পণে সে চুম্ দেবে তার গালের টোলে লাজ-রাঙা—
ঠোটেই পড়ে ঠোঁটের চুমা, তাই ত’ প্রাণে দুথ থাকে।
বাসর-দোসর বরের বুকে অঘােরে ঘুম যায় না সে
স্বপন ভেঙ্গে হঠাৎ জেগে প্রিয়ের পানে চায় না সে ;
সুম্মা-ঘােয়া দুধের শিশির গােলাব-গালে গড়ায় না,
ফুটলে হাসি বঁধুর মুখে, সুখের গজল গায় না সে।
আপন প্রেমেই আপনি বিভাের, প-পিয়াসা পায় না যে
রূপের ছায়া ধরবে চোখেপুৰুষ শুধুই আয়না যে।
হাওয়ায়-ওড়া ওড়না-আড়ে দৃষ্টি কি তার দুরন্ত।
গুরু উরুর গুমর-ভরা জোড়-পায়েলা পা’য় বাজে ।
১০৭

স্বপন-পসারী
জ্যোৎস্না-জরী ঘাসের ফরাস-ছায়ারা সব কোণ খুজে
‘সবাে’র সারির তলায় জোটে, নিঝুম রাতির মন বুঝে’!
তারার-চোখে আলাের ধাঁধা-ঠাউরে’ না পায় কোন্ তিথি ।
বুদ হয়ে উঁদ গড়িয়ে পড়ে বাদশা-বাড়ীর গম্বুজে।
‘নিশি’র ডাকে তখন যে তার মন্-মহলের খিল খােলা!
সেতার খানায় কি সুর হানে! দুছে নিশার নীল দোলা !
ঝাঁটাখানা দুলছে মাথায়, ফণির ফণায় মণির প্রায় !
শিরায় শিরায় গানের গমক—সুরের সুরায় দিভােলা।
=
গানের শেষে হাতটি ধরি হেনায়-রাঙা তুলতুলে-
সকল বাঁধন শিথিল তখন, নিবন্ত চোখ চুল-দুলে!
সাহস-ভরে অধর পরে দিলাম চুপে -িমােহর
নুইয়ে প’ল গােলাক-শাখা, ঘুমিয়ে পল বুলবুলে!
১০৮

শেষ-শয্যায়
নূজহা
স্থান-শাহাের।
কাল-দিৰাবসান।
[প্রাসাদের এক নিভৃত কক্ষে নােগশয্যায় নুরজহান; পায়ের
দিকে খােলা-জানালার ধারে প্রধান সহচরী জোহরা বলি
আছে। ভিতরের দিকে বড় বড় খিলানময় জানি-দার
অতিদীর্থ বারান্দা। প্রাসাদ-সংলগ্ন উদ্যানের একাংশে বিশেষ
করিয়া সাইপ্রেস (সয়ে) গাছগুলি দেখা যাইতেছে।
বাহিরে দুরে জাহাঙ্গীরের সমাধি শাহদারা।
জোহরা
সারারাত কাল ঘুমাওনি বুঝি ? সারাদিন আজ জাগিলে না যে !
বেলা পড়ে এল, শাহী-নহত, প্রহর-ঘণ্টা মহলে বাজে।
না-রাঙা আললাটি পড়েছে মিনার-চূড়ায় শাহদারায়,
এমন সময়ে তুমি যে গাে রাজ বসে থাকো থির আঁখি-তারায়।
মুয়াজ্জে ওই মসজিদে ধরে সন্ধ্যা-আজা মগরবের,
পিলু-বারােয়ায় বাঁশিটি ফোঁপায়—কোথায় বিদায়-উৎসবের।
ফোয়ারায় জল ঢালিছে পাথরেশােনা যায় যেন আরাে সে কাছে।
কে-নখ নীলা কবুতর আলিসার পরে আর না নাচে।

স্বপন-পরী
ঘরের দেয়ালে দূর-বাগানের পাতা-ঝিলমি কঁপিছে ছায়া,
দুধে’-পাথরের খিলানের গা’য় আকাশের লাল মেঘের মায়া !
ওঠো একবার! নওরাতি আজ-শেষ-নওয়ােজ হয়ত এই !
এদিনের মত স্মরণ-বাসর তােমার নসীবে আর যে নেই
—পাদিশা-প্রেয়সী
নূরজহা!
জেগেআছছা মাগাে-তাই ত’! দেখি যে চোখের কোণায় জল গড়ায়-
গােস্তাথি মাফ কর হজরত! প্রাণ যে আমার ভুল করায় !
শুভদিনে আজ চোক চাহিলে না, ওক্ত যে সব বহিয়া যায়।
আজিকার দিনে খােদার দুয়ারে জানাবে না শেষ-প্রার্থনায় ?
এইখানে তুমি বসিবে, গায়িব গজ-ইলাহী-তােমারি গান,
আজ নওরাতি-জ্বালাবে না বাতি ? সাজাবে না তার গােলাব-দান?
ওকি হাসিমুখ।-চাহনি তােমার হঠাৎ হ’ল যে কেমনতর।
হঠাৎ অচেনা মনে হয় তােমা!—আজিকে কেন মা এমন কর?
নূরজাহান্
কেন মিছে ভয় করিস জোহরা? তুই যে আমার ছােট বহি।
শাহ-বেগমের গরব কোথায়। তােরও চেয়ে আমি অধম হীন।
আজ নওরাতি?-জ্বালানে বাতি মরণ-শিয়রে আমার ঘরে
যত বাতি আছে জ্বালা’তে বলে’ দে শাহা-শাহার সমাধি 'পরে।
মাের তরে আর নামাজ নাহি রে, পাতি নে আর মুসল্লায়,
বিশ্বপতির দরবারে মাের সকল আরজ, আজ ফুরায়।

শেষ-শষ্যায় নুরজহা
দেহের-মনের ঈদগাহে মাের—মেহেরাবে জ্বলে হাজার বাতি।
আজ থেকে তাই অনন্ত মাের চির-মিলনের সে নওরীতি।
তুই জেগে থাক সেহেলি আমার—শেষ সহচরী !-মাথার পাশে,
বাদামের জলে আফিম্ মিশায়ে দিস্ বারেবার- যাতনা নাশে!
আজ রাতে আর ঘুমা’ না আমি, ঘুমেরি মাঝারে রহিব জেগে,
তুই চেয়ে দেখ-কবরে কখন্‌ বাতি নিবে যায় বাতাস লেগে ।
ঘুমাও ঘুমাও! আর জাগা’ব না, মেজাজ তােমার ভালাে যে নাই
সারাদেহে এ যে আগুনের জালা ! উঠিতে আজিকে পার নি তাই?
বক্সীরে আমি খবর করিগে, হাকিম আসেনি এবেলা কেন?
মরিয়ম আর সখিনা-বাঁদীরে বলে দেই—থাকে হাজির যেন।
নূরজহান
এত করে বলি, বুঝিস্ নে তুই! বােস্, কাছে আয়, হয়নি কিছু।
বুড়া হ’লি তবু বুদ্ধি হ’ল না, মিছে ঘুরে মলি আমার পিছু।
আজ যে আমার সব ঘুচে গেছে-সব শােক-দুখ, সব বালাই।
এ-বিশ বছর যার ধ্যান করি, কাল তার দেখা পেয়েছি ভাই।
মাফ পেয়েছি যে – ছুটি আজ থেকে, হুকুম মিলেছে খােদা-তালার
সকল যাতনা জুড়াইয়া গেছে, অবসান আজ সব জ্বালার।
সারারাত কাল স্বপন পেয়েছি, দিনে তা জপেছি ঘুমের ভাণে,
মগ রব-বেলা ডাকিলি যখন, শান্তি নেমেছে সারাটি প্রাণে।
১১১

স্বপন-পরী
আর বেশীখন নয় রে জোহরা, রাতটা বুঝি বা হয় না তাের
মিছে শােক তুই কেন বা করি,আজ শেষ—আজ ছুটি যে মাের।
কাদিনে তুই-এত সুখে তবু কান্না দেখিলে কান্না আসে।
মেহমমতার সব শেষ, তবু দুঃখের নেশা ঘুচিল না সে।
জোহরা
কি যে বল তুমি আলি-হজরত! এতবড় শােক মানুষে পায় !
কি হয়ে, কি বেশে, ধরা হ’তে আজ চুপে-চুপে তুমি নাও বিদায় !
সুখ কোথা রাণি ?-মহারাণী মাের! হিন্দ-রাজের শাহ-বেগম।
চেয়ে দেখ, ওই তাহার শিয়রে আলাে যেন আজ জ্বলিছে কম ।
অগাধ আকাশে ওই যে হােথায় টুকরা যেন সে জরীন্ ফিতা
ওরি মত হাসি তুমিও হেসাে না, ভুলে গেলে তুমি আছিলে কি তা!
আমি যে দেখেছি ওই চুলরাশ রুমাল খুলিয়া পড়িত খসে’-
একাকার হত ঝিনুক-বসানো আবলুসে-গড়া তখতপােষে!
চোখের পাতার রেশমী ঝালরে হামামে দাড়া’ত জলের ফোঁটা।
সুৰ্ম্মা আঁকিতে হত না কখনো, হাসিতে ঝরিত মুক্তা গােটা !
ওই হাতে ধরি’ হাতিয়ার, ফের আঙুলে বুনেছ ফুলের ছবি !
ওই পায়ে তুমি পায়েল। পরিয়া বীর দলিয়াছ!ভুলেছ সবি ?
মরণ-ডঙ্কা কণ্ঠে বেজেছে, বেজেছে সাহানা—পরীর সুর।
চাহনি তােমার শের-মােগলের শরাবের নেশা করেছে দুর!
সেই-চোখে আজ আঁধার নামিছে, সেই-মুখে আজ স্বপন-হাসি-
এত দুখ তব সুখ হ’ল আজ! সেইগুলা ছিল দুঃখরাশি?
১১২

শেষ-শয্যায় নুরজহান্
কারে ভুলাইছ ?—কার কাছে তুমি হাসিয়া রুধিছ চোখের জল ?
কায়মনে আমি সেবিনু তােমায়, আমারে ভুলাতে কেন এ ছল?
ওই হাসি তুমি পােরে না ও মুখে, বাঁধিও না ওই চোখের বাঁধ,
পায়ে মাথা রেখে কেঁদে নিই আজ, মিটাইয়া মাের মনের সাধ ।
মরেছে বটে সে ভাইঝি তােমার---আরজমন্দ ভাগ্যবতী,
অমন তখত-তাউসে বসিয়া কাদে তার লাগি দুনিয়াপতি।
যােলটি-বছরে-জমানো অশ্রু জমাটু-পাথরে হ’তেছে গাঁথা,
প্রেয়সীর শেষ-শয়ন বিছা'তে মাটিতে বেহেশত, তুলেছে মাথা।
দী-দুনিয়ার মালিক যে জন তাঁর নাকি বড় স্যায়-বিচার।
মমতাজ পায় তাজের শিরােপা, নূজহানের কাফন সার !
নুরজহান্
চুপ চুপ। ওরে অবােধ ভিখারী! বলিস্ নে আর অমন কথা।
আমারি মনের শেষ মলাটুকু তােরও প্রাণে দেখি জাগায় ব্যথা।
যা ছিল আমার সব ভালাে ছিল-খােদার শ্রেষ্ঠ দোয়ার দান।
যা ঘটেছে মাের সারাটি জীবনে, গােড়া থেকে শেষ—সব সমান ।
এক তিল তার দেখি না যেতিতা—সবই যে শিরী!করি না শােক,
সব পাপ-তাপ দম্ভ-বিলাস—কামনার পথে অমৃতলােক।
জন্ম যাহার পথের মরুতে, মেটেনি প্রথম স্তনের তৃষা
তনুটি তাহার অনলের শিখা, মনটি যে তার হারায় দিশা!
আগুনের লােভ করেছে যে-জন, আপনি সে-জন ভশেষ ।
মন খানি বুঝে’ মাতাল যে-জন-পরা’য়েছে সেই রাণীর বেশ!

স্বপন-পসারী
আমার পিপাসা সেই নিয়েছিল--আপন পাত্র গরলে ভরি’!
ভুলা’য়ে রাখিল হীরার মুকুটে, নিজে তখতের পায়াটি ধরি’!
কোনো জ্ঞান মাের ছিলনা তখন—কোথায় চলেছি কিসের খোঁজে,
চিনেছিল শুধু একজন সেই, প্রেম যার আছে সেই যে বােঝে !
রংমহলের হু-পরী-দলে নামটি দিল সেনূরমহল।
ঘােড়শীর রূপে মজেছিল সে কি ? যৌবন শেষ—তবু চপল।
আমার মাথায় তাজ দেখেছিলিদু-মজান্মােতি-বাহার?
তারি শােকে তাের ধারা বয় চোকে! বেইমা, দাও দোষ খােদার!
তাের দোষ নেই, আমিও বুঝিনি, দেখিনি তখন এমন করে’
শাহ-বেগমের নকল খেলায় আসলের নেশা গেছিল ধরে’!
মমতাজ !—আহা, রুহু যেন তার খােশ হালে রয় আল্লা তালা!
গগন-সমান গম্বুজ গড়ি খুম সাজায় অশ্রু-ডালা ।
মরণের পরে শশাকের নিশানা অমর যে জন করিতে চায়
আপনারে তার দেয় নি বিলা’য়ে—প্রেমেও গর্ব। হায়রে হায়!
আমারে যেজন ভালােবেসেছিল, নিজের মাথার মুকুট খুলে’-
হিন্দুর মত প্রতিমায় তার অর্পিল সব, আপনা ভুলে’ !
মহলের নূর ছিল যেই তার, তাহারে করিল নূজহান!
জীবনেই তারে জয়মালা দিল, ফিরায়ে নিল না আর সে দান!
আল্লারে মাের হাজার শােক-চলে গেল আগে আমায় রেখে,
সেই দিন হ’তে বুঝেছি জোহরা, বুঝি নাই যাহা নিকটে থেকে।
যে-বাতাস তাের নাকের নিশাস তার চেয়ে বড় দখিনে-হাওয়া-
মরিয়া যেদিন বুঝাইয়া দিল, ছেড়ে দিনু সব দাবী ও দাওয়া।
১১৪

শেষ-শয্যায় নূরজহান্ রূপের গর্কে ধিক্কার হ’ল-মরিল যেদিন শের আক, না গেল, ‘র’-সেও ঘুচে গেল, নির্বিষ হ’ল এ দেহ-মন। তার পর হতে এ বিশ বছর একে একে সব গিয়েছে ধুয়ে, জীবনের যত সুখ-দুখ-ফুল ফল হয়ে আজ পড়িছে নুয়ে ! বােস্তা আর গুলেস্তানের রূপটি ধরেছে সব হায়াত- সাপ-শয়তান বুলবুল হ’য়ে গায়িছে সারাটি জ্যোৎস্নারাত। যত শােভা,-সে যে বাসনারি রূপ! রূপের জগৎ কী সুন্দর! বাসনায় বাঁশী বেজে উঠে যার, ঘুচে যায় তার ইহ ও পর। আগুনে যেমন সব বিষ যায়, প্রেমেও তেমনি সকলই শুচি- কামনার কালি তাহার পরশে জ্বলজ্বল করে-হীরার কুচি। তবু একটুকু আছিল আমার কলিজার তলে ব্যথার দাগ, কোনােমতে তারে মুছিতে পারিনি-সেইটুকু ঘাের রক্তরাগ। জোহরা আম্মা-বেগম, কহিও না আর-ভয়-ভয় করে এসব শুনে। এ যেন তােমার জ্বরের খেয়াল, এত জোর পাও কিসের গুণে? আরে একি হল! দেখ, দেখ !যেন আগুন লেগেছে শাহদারায়। এত আলো হােথা কিসে হ’ল আজ? এত বাতি আজ কারা পােড়ায়? আহা,তুমি কেন?-উঠো না, উঠো না!—আহা-হা, আবার ঘুরিল মাথা। কি যে চাও তুমি আমারে বল না! কেন এতখন বকিলে যা’-তা’? শরবৎ দিব ?—ঘুমের আরক?—শামাদান তবে শিয়রে দিই ? ও-দেহে তােমার আছে আর কিবা ! চোখদুটি এই মুছায়ে নিই।

স্বপন-পসার।
নূরজাহান
আমার কাহিনী তুই বুঝিবি না, বুঝেছে সে কথা আর একজন ।
দুনিয়ায় মাঝে দরদী যেথায়, করিবে অশ্রু বিসর্জন।
যেদিন চেয়েছি কবরে তাহার ব্যথায় গুমরি গভীর রাতে,
অমনি আলাে সে জ্বলেছে দ্বিগুণ—আগুনের মত ঝঙ্কাবাতে।
একটু সে দাগ কিছুতে মােছে নি–তখতে বসিয়া ভুলিনি তবু!
তাও মুছে গেছে এপারে থাকিতে-স্বপনে সে আশা করিনি কভু।
জানিস্ জোহবা ! দর্শন দিতে বসেছি যখন দেওয়ানি-খাসে,
ঝবােকার তলে প্রজারা দাড়ায়-সেও দেখি আছে দাড়ায়ে পাশে।
সেই আলিকুলী শের-আফক—দৃপ্ত-সহাস, অমন বীর !
বক্ষবাট যেমন বিশাল তেমনি ললাট, উচ্চশির!
ম্লানমুখে সে যে রয়েছে দাড়ায়ে, ধূলায়-রক্তে ভরেছে বেশ ।
বুক-ফাটা সে কি নীরব চাহনি !-কি যেন আরজ করিছে পেশ ।
মুচ্ছার বশে টলিতে টলিতে ঘরে ফিরে গেছি পাঙাশ মুখে,
চীৎকার যেন গলায় চাপিয়া লাইলীরে মাের টেনেছি বুকে।
কতকাল হল, আর ত’ দেখি নি। তবু ভুলি নাই—ভােলা কি যায় ।
মরণ-ধূসর মুরতি তাহার মনের মাঝারে মূচ্ছ। পায়।
সব দুখ যবে সুখ হয়ে গেল, সব সুখ হ’ল মুক্তি-সেতু,
মরণে যখন লভিব বিরাম—সেই হ’ল শেষ দুঃখ-হেতু!
তার সাথে মাের মিলনের পথে মরণেও বাদ সাধিল সেই।
এ কি এ বিষম গজব তােমার প্রেমময় ! প্রেমে মাফ, কি নেই?

শেষ-শয্যায় নুরজাহান
কাল রাতে তার জবাব পেয়েছি, হুকুম মিলেছে খােদা-তা’লার।
সকল যাতনা জুড়াইয়া গেছে, অবসান আজ সব জ্বালার।
চোক যদি থাকে দেখে নে জোহর, আজিকার এই সুখের হাসি-
শিশিরে-বােয়া সে গুলশন্ নয়?-নওশার লাগি’ ফুলের ফাঁসি ?
আলিকুলী আর আসিবে না ফিরে, আসিলেও আর চিনিবে না সে।
জরা-যৌবন এক যার কাছে—সেই বাঁধি ল’বে বাহুর পাশে।
এই শাদা-চুলে সিথির সীমায় চুমা দিবে সে যে অশেষ মেহে-
চিরযৌবন-রৌশন্ রূপ ফুটিবে আমার জীর্ণ দেহে !
জোহরা ! জোহরা ।-
জোহরা
কি বলিবে বল, চুপ কর কেন আম্মাজান?
নূরজাহান্
ওই শােন-ওই !
এশার ওক্ত-মজিদে ও যে দেয় আজান !
নূরজহান
না না, ও যে দূর বাঁশীর আওয়াজ!-শাে দেখি তুই কাণটি পেতে
মাঝে মাঝে আমি কেবলই শুনি যে—শুনি ওই সুর দিনে ও রেতে।
জ্যোৎস্নায় যেন জুড়াইয়া দেয়—ক্লান্ত নয়ন মুদিয়া আসে!
কখনাে গভীর আঁধার-নিশীথ, দুই চোকে দেখি শিশির ভাসে।
, না—কাজ নেই, সেই ভালো—আমি একাই ঘুমাব।সে যদি কাঁদে।
কোথায় কোথায়! দূর-বহুদূর ! মাটির বাঁধনে তারে কি বাঁধে।
১১৭

স্বপন-পসারী
জোহরা
আর কথা নয়—চোক জলে ভাসে! কপালে তােমার হাত বুলাই
ঘুমাও দেখি মা একটু এখন, আমি বসে হেথা পাখা চুলাই।
নূরজাহান্
তবু, দেহখান-যেখানে সে থাক্তার দেহ থেকে রবে না দূরে,
দেখিস্ তাহার কবরের ছায়া পড়িবে আমার বুকটি জুড়ে’!
ওরা যে বােঝে না, ভাবে—কত পাপ!—কত সে পিপাসা প্রেমের নামে।
শা’জহা তাই বিচারে বসেছে, দিবে না আমারে শুইতে বামে ।
আমি ত’ চাহি নি’ মৰ্ম্মর-বাস-শাদা ধবধবে পাথরে-গাঁথা !
ধুলামাটী, সে যে জীবের জননী!—আর কার কোলে রাখিব মাথা ?
এই ধরণীর দুলালী আমি যে, ধূলায়-কাদায় ভরি’ আঁচল
ঢেলা ভেঙে আমি বুনেছি ফসল—রাঙা হৃদি-ফুল, অশ্রু-ফল !
শুধু পাশটিতে, একটু সে কাছে,তা’ও সহিল না শাহজহা!
মমতাজ বুঝি দিব্য দিয়েছে ? তাজের মহিমা হইবে ম্লান?
জোহরা
ওই দেখ দেখি, ব্যথা নাকি নেই? সব মুছে গেছে-সকল জাল ?
বুকের ভিতরে সব চাপ আছে, কপালে বি ধিছে কাটার মালা !
আমি যে তােমার মন ভাল জানি, কেঁদেছি কত যে ও-মুখ চেয়ে !
চোক ফেটে জল দেখেছি গড়ায় আপনি তােমার গণ্ড বেয়ে।
শেষ সাধটুকু, তাও পুরিবে না? মানুষের বুক এত পাষাণ।
পাথরের রূপে মজিয়া করেছে কঠিন আপন কলিজাখান!
১১৮

শেষ-শয্যায় নুজহান্ নূরজহান == খসে-পড়া বড় তারার মতন এতটা আকাশ আসিলে বেয়ে- লাল হয়ে গেল পাণ্ডুর রাতি তােমার দেহের আলােক পেয়ে ! চেনাবের তীর-পিপাসা-অথির কেঁদে কেঁদে বয় পাহাড়ে নদী, তােমার-আমার চেনা সে চেনার – এই গাছ-তলে বস’গাে য দ ! বগােলাপের চেয়ে আছে দেখ, হাসিমুখে নাই ভাবনাটুকু সুন্দরী ওরা, রূপের পসরা।-তবু কোনাে দিন পায়নি দুথ । অশ্রু-শিশিরে আতরের বাস, ঝরা-পাপড়িও কেমন চায়। ফুলের মতন হওয়া কি বারণ ?—রূপ র’বে বিনা দুথের দায় । কি এনেছ ভরি স্ফটিক-সুরাহি ?—কওসর হতে আবে-হায়াত? তুমি আগে পিও, তােমার আননে এখনাে ঘােচনি কালিমাপাত! স্বর্গের সুর এই সে তহুর !–আনিয়াছ ভরি’ আমারি তণে ? চুমুকে-চুমুকে সব ব্যথা যাবে! সব স্মৃতি নাকি উদাস করে ? তুমি চাও না সে!-কোনাে দুখ নেই ?—এখনাে নয়নে নেশার ঘাের। কোন্ মদ পিয়ে মাতােয়ারা তুমি এত অচেতন, হে প্রিয় মাের ? আমি যে পারি না সহিতে সকল, দাও দাও মাের কণ্ঠে ঢালি’-- শুধু দুখ নয়!--সুখ, সেও যাবে ?--সব বুকখান করিয়া খালি। শুধু যাবে না সে নূরজহানের শাহী-দরবার—শের-আফক ? যাবে তারি সাথে কুমারী-মেহের-শাহজাদা—আর সে-চুম্বন ? নিষ্ঠুর তুমি!-টলিছে না হাত !-মিশা’লে না ফোটা অখির জল। ব্যথা নাই।তবে সুখও নাই বুঝি ? তবে কেন এলে—কেন এ ছল?

স্বপন-পসারী । ‘ভালােবাসিয়াছি তােমারে পিয়ারী, তার বেশী মাের চাহি না সুখ, ‘কওসরু-বারি তহুরা-শরাব তুমি পান কর, জুড়াও বুক! ‘আমার বলিয়া কিছুই নাহি যে—আমার পুণ্য, আমার পাপ- যা’ করেছি ফের করিতে যে পারি, কিসের দুঃখ, কি পরিতাপ ? ‘তুমি পান কর, ভুলে যাও সব, কঁদিও না আর সে সব স্মরি’- মাগিয়া এনেছি তােমারি লাগিয়া এ-পানি খােদার আরশ ধরি। ‘দুখ যদি সুখ না হয় সাধনে, প্রেম-সে যে শুধু পিয়াস-জ্বালা ! ‘কর পান কর, সব ভুলে যাও ! নামাইয়া দাও ব্যথার ডালা। আর বলিও না! বুঝিয়াছি সব—ওরে অভাগিনী অবােধ নারী! আজ শেষ! আজ সকল গর্ব-অভিমান দিনু চরণে ডারি’! আমারে কুড়ায়ে ধুলি হ'তে নাও, গেঁথে নাও বুকে মােতির সাথে- কণ্ঠে দুলিব, ধুয়ে গেছি আজ তব নয়নের আলােক-পাতে! মিটিয়াছে ক্ষুধা, চাহি না ও সুধা!—ফিরাইয়া দিও দয়ার দান! আর জাগিবে না, কাদিবে না আর জাহাঙ্গীরের নূরজন্। আজ নওরাতি জ্বেলে দেরে বাতি, হেনা দিয়ে দিস দুখানি হাতে- সুৰ্মায় চোক ডাগর করে দে-চুমিবে সে মাের নয়নপাতে। জোহরা আবেগম, বাতি নিবে যায়,-জ্বালাইয়া ফের দিব কি তবে? আকাশে দেখি যে বাদল নেমেছে।-বাতাস উঠেছে—ওমা কি হবে? ঘুমাইলে বুঝি ? ঘুমাও ঘুমাও! কাজ নাই মিছা জাগিয়া আর ওই হােথার আলাে নিবে গেল! কবর আঁধার শাহদারার ।

বেদুঈন
এই দুনিয়ায় ডরি না কাহারে, আই প্রজা আমরা রাজা!
আমাদের গ্লানি হিংসা যে করে—আমাদের হাতে পাবেই সাজা।
তবু আমাদের পশ্চিমে-পূবে কালাে করে আছে সফেদ বালি,
শাদা হাতে যেন উল্কির দাগ—পােড়া-হাঁড়ি আর চুলার কালি !
কোমরে-বাঁধা সে ভারী তলােয়ার আধা-সিধা আর আধেক-বাঁকা,
হতে জল-তােল দড়ির মতন দীঘল বা রক্ত-মাখা!
বক-জোসম্মা’দের গােষ্ঠী-জানে তারা খুবই মােদের কিরা-
শত্রু-নিপাত না করে আমরা ভিজাই না চুল, খুলি না গিরা।
হেজাজবংশে ভেজাবে না মুখ ঘােলা কাদা-মা ‘দেদা’র জলে,
আমাদের উট দুধে-ভরা-বাঁট, চরে না শুকনা কাটার দলে !
এই দুনিয়ায় ডরি না কাহারে, আমরাই প্রজা আর রাজা !
আমাদের সাথে বাদ সাধে যেই, আমাদের হাতে পাবেই সাজা!
ভােরের তারাটী ওঠে নি যখনো—পাহাড়ের তলে শিকলে-বাঁধা,
হাওয়ারা সবাই ঘুম থেকে জেগে সবে ফের শুরু করেছে কাদা;
বুড়ারা ঘুমায়, জোয়ানেরা জেগে খিখি-দানা খাওয়ায় উটে,
পরে, পেয়ালায় ঘােড়ারই দুধের শরাব সদ্য ফেনায়ে উঠে।
ভােরের পেয়ালা কাণা-ভাের ভরি’ হাতে-হাতে দেয় হাসিনা-সাকী,
চোক্‌ জ্বলে ওঠে, আকাশের কোলে জ্বলে ওঠে লাল পুবের চাকী।

স্বপন-পসারী মা-বাটা সে পাথরের মত চকচকে-তেলা ঘােড়ার পিঠে মালেক, কায়েস, আমি—তিন জন লাফাইয়া ঠুকি পায়ের গিঠে। ছােট-করে’-ছাঁটা চুলগুলি তার, গলাটী যেন সে তালের কোড়া পালক-লাগানাে তীরের মতন ছুটে যায় মাের আরব-ঘােড়া। সামনে বালুতে দড়ি বুনে’ দেয় ঝি-ঝির ধীর ভােরের হাওয়া, পিছনে কিছু না -সব মুছে যায়, ধূলা-কুয়াশায় যায় না চাওয়া! ভাহিনে মিলায় মােগেমীরগিরি, সিতাব-কাতান্তবি-চুড়া, ‘কানাবেল’-বনে দাড়ায় সাথীরা, ধুয়ে লয় মুখে বালির গুড়া। আমার ঘােড় সে ছােটে পূরা দম-টগ বগ, সেই আওয়াজ বা কি! বন্ বন্ বেগে উড়ে যায়, যেন ছেলেদের হাতে ঘুরণ-চাকী। মাজেল-পাহাড় ওই দেখা যায়,-হােথা কেহ নাই, কেহই নাই। ওইখানে ছিল তবরেজু-দলে দুধে-ধােয় এক চমরী-গাই। দড়ি-দড়া-খুটি উপাড়ি’ তুলিয়া চলে গেছে কোন্ ভােরের রাতে, রুটি সেকিবার পাথরের টালি ফেলে গেছে শুধু তাঁবুর খাতে ! নীল শিরা যেন ডেরার নিশানা লেগে আছে ওই বালির গায়। থমামের পাতা ঝরে গেছে সব, মুড়া তালগাছ হায় রে হায় ! ওগাে সুন্দরী সােখা-কুমারীনবারা ! আমার নয়ন-তারা ! কোন্ বালিয়াড়ি-গিরির আড়ালে, সবজির বাগে হইলে হারা? উটের দোলনে দুলে দুলে’ কেঁদে, হুড়িয়া ভেঙে বালির ঢেউ, কোন্ দূর কালো রাত্রির দেশে চলে গেছ তুমি--জানে না কেউ। ২২

বেদুঈন
নিঝুম মরুর কোথা সাড়া নেই, শব্দ মিলায় পায়ের তলে-
তােমারি গােঙানি-ফোঁপানির তালে ঘুন্টি বাজে সে উটের গলে।
বুঝি বা সে-দিন আকাশের জিন্ তুলেছিল নীল-তাবুর সারি-
পর্দার ফাঁকে হাতছানি দেয় দশ আঙুলের ঝিলিক মারি’!
হঠাৎ তাদের তলা থেকে যেন আগুনের ধোঁয়া এগিয়ে আসে,
মাথার উপরে মেঘ-শকুনেরা ডানা মেলে যেন হাওয়ায় ভাসে!
মুখখানি গুজে’ পড়েছিলে গিয়ে কোন্ সে কঠিন পাহাড়-পায়-
কত কি যে লেখা ভীষণ আঁখরে রাজাদের নাম তাহার গা’য়!
সেইখানে বুঝি ফুরিয়েছে সব শত্রুর হাত এড়াতে গিয়ে
চলে গেলে তুমি রাত্রির দেশে ঐ আকাশের কিনারা দিয়ে।
দূরে দেখা যায় ওই যে দেয়াল, মিনার উঠেছে কুয়াসা কুঁড়ে-
খাপ-খােলা যেন খাড়া তলােয়ার-আলােট ঝলিছে তাহার চুড়ে!-
হিন্দার বেটা অরু হােথায় পেতেছে শহর গােলাম-খানা,
ওইখান থেকে—বাচ্ছা বাদীর আমাদের পরে দেয় সে হানা!
মাটির বুরুজ, পাথরের টালি, দুয়ারে শিকল, লােহার বেড়া
ফাটকে-আটক বাস করে হােথা হাজার হাজার মানুষ-ভেড়া।
ঘরে-ঘরে করে দুষমনী ওরা, পিঠে মারে ছুরী পিছন থেকে ।
বুকে বল্লম বেঁধেনি কখনো-লড়াই-এর কথা কাগজে লেখে।
কমজাত, যত!—রক্ত রেখেছে ঠাণ্ডা দেহের পিপেয় ভরে’-
এক শ তার করেনি খরচ, বুড়াে হয়ে যায় শুকিয়ে মরে।

স্বপন-পরী রং-বেরঙের সাজ করে ওরা, শাদা-চোখে হয় সুম। টানা ! মজলিসে বসে মিঠে মদ খায়, পিঠে ঠেস দিয়ে তাকিয়াখানা! রেশম পশম মুক্তার মালা ঘরে বসে ওরা সওদা করে, খুনের বদলে সোনার টাকায় ভােলায় ইম-সওদাগরে! ভাের হ’তে সাঁঝ, সাঁঝ হ’তে ভাের, ভল্ভ করে মাছির পারা ! দি-ততালপাড় জা-আচান্ খুনের সােয়াদ পায় নি তারা। বান্দামহলে সর্দারী করে হিন্দার বেটা অ-রাজা- আমাদের পায়ে জিঞ্জির দেবে।শিরদাঁড়া দেখি বেজায় তাজা! একবার পাই!--দাতে টুটি কেটে খাল খানা তার ফেলাই ফেড়ে । হাড়-মাস করি পাখীর খােরাক, মুণ্ডুটা ফেলি বালিতে গেড়ে! – খুনে জ্বলে ওঠে বাজের আগুন, সাপটিয়া ধরি ঝড়ের ঝুটি। আমান-জোড়া পেয়ালায় মাের রৌদ্র-শরাব দুপুরে লুটি! বালির পাথার-কিনারায় ওঠে ঢেউ সে মােদের সঁবুর সারি, পলকে মিলায়, কোথা ভেসে যায় ! দেখেছে এমন দুনিয়াদারী ? মাটির বাঁধনে বাঁধে না মােদের, পথহারা মরু-পান্থ মােরা! বালির মালিক!—বুনিয়াদ কোথা? কোনােখানে নেই স্মৃতির ভােরা! ঘর-বাঁধা আর মন-বাঁধা আর জান্-বাধা-রাখা কাহারাে কাছে! ধিক ধিক্ ওরে হিন্দার বেটা! মাের হাতে তাের মৃত্যু আছে! শমশের ? সে ত’ মেয়েদের হাতে পাক-দেওয়া ফিতা রেশমী দড়ি! ঝকঝকে-মুখ বল্লম? সে ত’ ছেলেদের হাতে খেলার ছড়ি। ১২

বেদুঈন
মরণের ভয় নেই আমাদের, মুর্দার তরে কে শােক করে ?
বড় ঘৃণা হয়—মরদ কেহই মরে’ উঠে পড়ে ফের না মরে।
‘নূর কাজ নেই। নার’ চাই মােরা—জীবনের সার উত্তেজনা।
ফুসে-ওঠা শুধু জ্বলজ্বল-চোখ-একদম-খাড়া সাপের ফণা!
একটী নিমেষে শেষ করে দেওয়া, বােমার মতন কলিজা-ফাটা !
এক চীৎকারে দম ছুটে যাক! এক লাফে শেষ রাস্তা-হাঁটা।
চুপ করে থাকা মাটি পানে চেয়ে, একঘেয়ে বাঁচা দিনের দিন--
‘আয়লার মাঠে সোঁতার মতন শুষে’ যায়, শেষে থাকে না চিন্।
বুজদে যত কমবক্তেরা!-চোরের মতন বাচিবি কি রে !
এই হাতে আয় গর্দান নিই, এই ছাের আয় বসাই শিরে।
বান্দার দল! গৰ্ব কিসের ? আমাদের চেয়ে তােরা না বড়।
বুকের রক্ত মাথায় ওঠে না, শিরাও ফোলে না-কাঁদনে দড়।
পাঁজরে বিধিলে বর্শার ফলা-ভেঙ্গে যায় যবে হাড়ের পাশে,
দাঁতে ঠোট চেপে রক্ত গড়ায়, তবুও মােদের কান্না আসে?
জোয়ান যে-জন শক্ত জিনিয়া বেঁধে নাহি আনে দু’দশ বাঁদী,
রমণী তাহার ধিক্কার দেয়, তঁাবুর দরজা রাখে সে বাঁধি।
হারিয়া যে-জন পলাইয়া আসে লুঠের বখরা ফেলিয়া দিয়া
সন্তানে তার আছাড়িয়া মারে, স্তন মুখ হতে কাড়িয়া নিয়া !
চোখের ভিতরে কুটার মতন শত্রুর বিষ বুকেতে পােষে!
আপনার হাত ছুরিতে কাটিয়া খুন দেখে লয় অধীর রােষে।
রাত্রে যখন পুরুষেরা ফিরে মদের পেয়ালা ভরিয়া তােলে,
বীরের জবান শুনিয়া তাদের মাতালের মত দেহটী দোলে।
১২

স্বপন-পরী
দুনিয়ার সেরা আওরাত, এরা-রমণী মােদের, কন্যা, মাতা-
এদের কণ্ঠে শিকলি পরা’বে? অরু, তােমার কয়টা মাথা ?
ওই দেখা যায়, চলিয়াছে কারা ওগারা-বনের পথটী ধরে’-
উটের বহর দুলে দুলে চলে, বালির উপরে ছায়াটী করে।
নামাল জমির পাড় বেয়ে চলে, কখনাে আড়াল, কখনাে নীচু
মালেক, কায়েস্ ওই যে হােথায়!—আরও তিন জন নিয়েছে পিছু !
এই ত’ আগুন-খেলিবার বেলা, খুনের ওক্ত বাতাসে বাজে
চরাচরময় তলােয়ার যেন আকাশে ঘুরায়ে কে ওই ভাজে!
খুনে-রােদ্দর দু’চোখে আমার ঠিকরিয়া হানে আলাের ধাঁধা ।
ঠেলা দেয় বুকে আগল ভাঙ্গিতে—পাগল রক্ত মানে না বাধা!
ঝিঝিম্ করে আকাশ-কিনারে অলখ-সেতার আগুন-গানে!
মায়াবী-মরুর ইবলিশ ওই আর না কাহারো শাসন মানে!
দিকে দিকে নাচে তা-থেই তা-থেই, বালু-দেহ ধরি, দু’বাহু তুলি,
এক পায়ে শুধু আঙুলে দাঁড়ায়ে শিস্ দেয় দেখ ডাহিনে দুলি।
তখনি আবার লুটাইয়া পড়ে, কিছুখন রহি পারিল না যে!
সারাটা আকাশ একখানা যেন ঝঝিরের মত ঝিমিকি বাজে।
হু হু-হু-উ- ডাকে দুরে ওই সাথীরা আমায় বা তুলি,
রক্তে আমার তুফান তুলেছে, বক্ষ আমার উঠিছে ফুলি'।
আগুনের কণা দু’দিকে ছিটায়ে বাতাস ফুড়িয়া ছুটেছে ঘােড়া।
মাথার উপরে চাকা ঘুরে যায়, বোও-বোও করে কাণের গােড়।

বেদুঈন
ওরা আসে ওই !-ওই যে হােথায় দাড়াইল নামি’ বালুর পরে,
মেয়েরা রয়েছে উটের উপরে পর্দায়-ঘেরা হাওদা-ঘরে ।
‘হিরা’য় চলেছে ?-নােমানের প্রজা? গিয়েছিল কোথা বাদীর হাটে
রূপ-জহরতে বােঝাই নিয়েছে, সােণা বেশী আর নেই ক’ গাঁটে
চট্‌পট্ সেরে নাও এই বেলা—আকাশে দেখি যে আঁধির ঘটা।
-হয়রা করে আরে বজাত ! ছিড়ে ফেলে দিই মুণ্ড কটা।
কেয়াবাত, ! আরে সাব্বা ভাই!-লড়াই ? বাহবা !—এই ত’ চাই।
খুন পিচকিরী চোখে মুখে দাও! জান্ দাও, জান্নাও রে ভাই।
খা-খা চারিদিক, ঝা-ঝ ঝিমি-ঝিমি-আওয়াজ যেন সে আলােয় বাজে!
চিহি-হি-হি-হিহি-চীৎকার! আর হুঙ্কার ঘন তাহারি মাঝে।
আরে এই বার-বাস্!-বল্লম ঢুকে গেছে কেটে মাথার খুলি
কাঠের হাতল শিহরিয়া ওঠে, শিড়-শিড়, করে আঙুল গুলি!
ফাঁক হয়ে গেল মাথার খিলান্, চক্ষু-কোটর রক্তে ভরে-
মুঠা-মুঠা যেন নার্গিস ফুল কুটিকুটি হয়ে দুধারে ঝরে।
পর্দার ফাকে একখানা মুখ পলকে বাড়া’য়ে লুকাল ফের
চোখে জল তার, হাসিমুখ তবু!—এমন তামাসা দেখেছি ঢের।
‘াৎ করে তবু খুনের আগুন নিবে’ গেল যেন নিমেষ তরে-
চোখ-জ্বাল-করা লাল কুয়াসায় ফিকে জাফরান্-রংটী ধরে!
বাহবা !–অনি মেরেছে পাঁজরে দুষম ওই জোসে ছুরী!
ভেঙ্গে গেল সে ত কাঁটার মতন! লাথি খেয়ে নিজে পড়িল ঘুরি’!
বুটি ধরে তার মাথাটী নামা’য়ে লইল মালেক একটা ঘায়ে-
ধড়ফড় করে ধড়টা শুধুই, ঠোকাঠুকি করে দুইটা পায়ে।
১২৭

স্বপন-পরী
সব শেষ! আর একটা মরদ খাড়া নেই, সব ভির্মি গেছে।
নাও দেখে নাও, জেবে ও থলিতে, ছালার ভিতরে কি সব আছে
মদের মােশক, চামড়ার শিশি, ডাের-কাটা ওই ঘাঘুরিগুলা!
ওরে আর নয়! আঁধির পাহাড় দেখা যায়—ওই উড়েছে ধূলা।
সব পয়মাল—লােকসান ভাই! দিন যে নিবায় দুপুর-রাতে।
লক্ষ ঘােড়ায় সওয়ার হয়ে আসে কারা ওই চাবুক হাতে।
শুধু ওরি হাতে নিস্তার নেই, জি-সর্দার পাগলা ও যে !
ওর সাড়া পেয়ে আসমানে ওই দিনের মালিকও আড়াল খোঁজে।
থাক পড়ে থাক্‌ উটের বােঝাই, সারি সারি ওই গােলাব-দানি-
পেয়ালা ভরিতে ঘাঘুরি ঘোরাতে বড় মজবুত—খুব সে জানি !
তবু ফেলে চ!-দেখ না দখিনে ডাকাতের দল গর্জে আসে।
দাপটে তাদের আলাের ফোয়ারা কালাে হয়ে যায় ধোঁয়ার রাশে!
ছেড়ে দাও ঘােড়া, রাশ ফেলে দাও, ছুটে যাক্ ওর যেথায় খুশী !
আরে বেলিক! কি হবে এখন হাওয়ার উপরে বৃথায় রুষি
কথা না বলিতে ছুট দিল দেখ ! জানােয়ার নয়—এরা যে পরী।
বাতাসেরও আগে আগাইয়া যায়, বিপদের পানে পিছন করি’!
গলাটা বাড়ানো - সিধা একবােখা, রক্তচক্ষু ঠেলিয়া ওঠে।
চার-পায়ে বাজে একটী অওয়াজ, যেন সে মাটীতে ঠেকে না মােটে
এইবার এল !—দমকি দমকি’ বালির ধাক্কা ধমক মারে!
একখানি কালো কাফনে ঢাকিল দুনিয়ার মুখ অন্ধকারে।
বাপ! একি জ্বলে! চোখে-মুখে লাগে বালির কণা যে আগুন-দানা।
তারি মাঝে তবু ছােটে দিশাহারা, বাহাদুর দেখ—মানে না মানা !
!
১২

বেদূঈন
কোন্ পথে যায় কিছু বুঝি না যে, যায়—শুধু এই সাড়াটী আছে!
আর সবাকার হাল কি যে হ’ল!-কত দূরে তারা রহিল পাছে।
আঁধির জোয়ার থেমে গিয়ে শেষে একাকার হ’ল রাত্রি-দিবা-
আকাশের কানা ছাপয়ে এখন থির হয়ে দেখ রয়েছে কিবা ।
থেমে যায় কেন হঠাৎ এখানে? দম হারাল কি?-লুটাবে ভুয়ে?
যাড়-বুক এ যে ফেনায় ভরেছে! এখনিসটান পড়ে বা শুয়ে !
জিতা রও বেটা !-মেরি জান্ ওহহ! বুক রাখ, তুই আমার বুকে-
আর কোথা নয়, এক পাও নয়!নহিলে আবার পড়িবি ধুকে।
ঘাের কেটে যায়, আঁধিও ফুরায়—এইবার বুঝি ফস হয় ?
সৰু-স করে পাতার উপরে বাতাস যেন না হােথায় বয়?
শুকনো ডালের খড়, খড়, আর পাখীর পাখার শব্দ ও যে!
-ওরে শয়তান ! সারা ময়দান ছুটেছিলি বটে ইহারি খোঁজে।
ওই দেখা যায় ওশারের সারি, খেজুরের বন ওই যে হােথা-
এ যে দেখি সেই ওগরা-বাগান!—এমন ছায়াটী নেই যে কোথা ।
কালাে-পশমের বােকা ছিড়িয়া দেখা দিল মাের সবজা-হুরী-
নাকে-মুখে মাের পিয়ালা পিয়ায়, পুরাণাে সে গান হাওয়ায় পুরি’!
আয়, দুইজনে মুখ দেই জলে, পান করি ওই পিয়াস-পানি-
ঝর্ণা-ঝরা ও ‘দারাতজুলের খুব চিনি নীল আয়না খানি।
এইখানে এলে ঘুম-ঘুম করে—দেহখানা যেন এলিয়ে যায় !
আগেকার কথা সব মনে পড়ে, কে যেন কোথায় লুকিয়ে চায়!
১২৯

স্বপন-পসারী
না, মনে হয়—এখনি ছুটিয়া ফের বুকে কারো বসাই চুরি!
ছায়া-শরবৎ লাগে না যে মিঠা, গন্ধটুকু গিয়েছে চুরি !
সেই মুখ, আর সেই চোক, আর চাউনি সে তার ভুলব না যে
বাচ্ছার পানে হরিণীর মত ফিরে-ফিরে চাওয়া পথের মাঝে।
এই বনে, ঠিক ওই খানটীতে—জলের কিনারে প্রথম দেখা,
হয়রাণ হয়ে কেড়ে নিয়ে শেষে কত দূর ছুটে গেছিনু একা!
বুক ছিড়ে ফের কেড়ে নিয়ে গেল দুষমন্!-তা’র তালাস করি,
এই ছােরা তার ছাতিতে বসাব! শান্ দিই দশ বছর ধরি’!
বুড়া হই—তবু মরিবার আগে একবার যদি ভাগ্যে জুটে,
সারাটা জোয়ান-বয়স আমার ছুরীর মুঠাতে আসিবে ছুটে’!
অনেক দেখেছি, অনেক খেলেছি—আওরাত নিয়ে দিলের খেলা,
বর্শার চেয়ে ভস-হারাণাে চোট পেয়েছিনু তাহারি বেলা ।
তারি মুখখানি মনে করে আমি গান বেঁধেছিঃ দিওয়ানা হয়ে
তেমন ব্যথা যে পাইনি কোথাও! ছুরি-ছােরা ? সে ত’ গেছেই স’য়ে ।
বড় ঘুম পায়! সেই গান গেয়ে ঘুমাই খানিক ঠাণ্ডা ঘাসে-
‘দারাত-জুলের নামে গাঁথা সেই সুরটী পরাণ ছাইয়া আসে।
গান
ঠোঁটের কুঁড়ি সিরিঙ্গা-ফুল, চোখের দু’কোণ রাঙা,
দড়ির মতন মিহি মাজা, হাসি ডালিম-ভাঙা।

বেদুঈন রংটা যে তার খেজুর-মেতি চাইতে চমৎকার তাঁবুর-ডেরায়-আগুন-দেওয়া রূপের জলুস তার । চমকে ফিরে চাইলে পরে রাতের আলো দিনেই ঝরে। মুখের হাওয়ায় সুবাস হারায় ইরাক-দেশের গুল। চুমার সােয়দ-হায়রে, সে যে তুহার জলের তুল!- দি-দরদী নীল-দরিয়া দারাতু-জুল-জুল। উটপাখী তার ডিম-জোড়া কি লুকিয়েছে ওই বুকে ? নাচতে গেলে পলার মালা দুই দিকে যায় ঠুকে’! কাঁধ বেয়ে সে খেজুর-কাদি-মেহেদি-রং চুল- কোমর-বাঁধন পেরিয়ে যে যায়—পিয়াসে আকুল। ধরলে কঁকাল মুখ সে ফেরায়, বাপের চেয়ে ভাইকে ডরায়, কইতে কথা থমকে' থামে বােবল বুলবুল, গলার আওয়াজ ঠিক যেন সে তােমারি কুলকুল। দি-দরদী নীল-দরিয়া দারাত-জু-জুল। গাল দুখানি টুকটুকে হয় যখন শরাব পিয়ে, বড় নরম নজর যখন আধেক ঝুঁজে গিয়ে ১১

বপন পসারী
খসরু তখন খেয়াল হারায়, দব, দবিয়ে রগ,
নেশার আগুন ভেল্কি লাগায়—দিল করে ডগ মগ্ন।
সবার মাঝে লাফিয়ে পড়ে
ছিনিয়ে নে যাই ঘােড়ায় চড়ে-
পিঠে যখন বর্শা হানে-বুকে জড়াই ফুল।
তুহার পানেও চাইনে ফিরে’, এম্‌নি সে হয় ভুল!
দিল-দরদী নীল-দরিয়া দারাত-জুল-জুল!
ঘুম ভেঙে যায়, ওকি ও হােথায় ?--আঁধারে কে দেয় মশাল জালি’!
রূপালি জলের ঝাপটায় ধুয়ে সাজায় আকাশে তারার ডালি ।
রাত হয়ে গেছে, হাওয়ারা আবার থেকে থেকে সব ঘুমিয়ে পড়ে,
ধু ধু চারিধার! শাদা-কালােয় ঢেউ তুলে’ যেন বাতাসে নড়ে!
কালি-
ঝুভরা খেজুরের ডাল, পিছনে সোনার মদের বাটী--
নীল শামিয়ানা উপরে দুলিছে, নীচে বালি-মােড়া দরাজ পাটী!
পরীদের রাণী ঘুম থেকে উঠে খােল পেশােয়াজ, পরে না আর
আসমাগাঙে সিধা ঝাপ দেয়, দেখ না কেমন হ’তেছে পার।
স্বপনের মত শরাবের নেশা বিলাইছে দেখ আলাের সাকী ।
সারা দুনিয়াটা গুজার করে, বুদ হয়ে যায় বনের পাখী।
এত আলো, তবু চোখে বেশী লাগে ছায়াটী—কেমন পড়েছে ঘাসে।
এত ঘন, আর এত কালাে-সে যে দোসরের মত রয়েছে পাশে।
১২

বেদুঈন দুরে মাঝে মাঝে ঢলু বালুচর চক-চক করে জলের মত- পিপাসায় ভুলে’ ঘুরে’ উড়ে যায়, ডানা ঝেড়ে’ ওই পাখীরা কত। এত রাতে আর কাজ নেই মিছে কত দূর সেই তাবুতে ফিরে, ঘােড়া হুশিয়ার–কাণ খাড়া রেখে চরিবে হেথায় আমারে ঘিরে। রাতের চেরাগ, নিবে’ গেলে হবে এই ময়দানে আরেক খেলা- হতাশী হাওয়ায় সওয়ার হয়ে ছুটিবে কাহারা নিশীথ-বেলা। মরে গিয়ে তবু গােরের আঁধারে ঘুম নাহি যায়-বেড়ায় রুখে’! দীঘল বর্শা আকাশে হানিয়া রক্ত ছুটায় তাহার মুখে। হস্-হাস করে কালাে-কালাে ছায়া পলক ফেলিতে নিরুদ্দেশ। জীবনে যাহারা বাঁচিতে জানেনি, মরাও তাদের হয়নি শেষ। সচ্চিা জবান, জোয়ানের বাহু, বল্লম আর ঘােড়র রাশ, দুষমন্-লােহু, দোস্তি-শরাব, আর খুলে রাখা থলির ফাস এই সব নিয়ে খােশ নাম যার রটেনি কখনন আপন দলে, বুজদেল আর কমজোরী হয়ে লুটিল না কিছু আকাশ-তলে- হাল দেখ তার—হাওয়ায়-ছায়ায় হায়-হায় করে, ঘুম যে নাই। মরদ না হয়ে, মুর্দা হয়ে সে সারা ময়দান ঘুরিবে তাই। ১৩

পূর্ণিমা
স্বপ্ন
মন্দ পবন বহিছে হেথায়,
সন্ধ্যা-তপন ওই ডুবে যায়
সােণালি মাখায়ে মেখে,
ফুলেরা উঠেছে জেগে।
রজনীগন্ধা-হেনার সুবাস
বিবাহের স্মৃতি-সুখ-অধিবাস
জাগাইছে আজ মনে,
পরশিছে মুখে বাতাসের বাস
বহুবিধ চুম্বনে!
পশ্চিমে ওই বরণ-বিধার
যেন নহবত-গতি-উৎসার
অস্তাচলের বুকে।
নন খামার করে তাহা পান
মধুর স্বপন-সাব সমান ।
১৬

পুণিমাবপ্ন
সেই গানে টুটে বকুলের প্রাণ,
সেই সুরে ছােটে আবীরের বান
সন্ধ্যামণির মুখে।
লাল হয়ে উঠে গােলাপ-আনন,
ফুটি-ফুটি করে শেফালির মন
সােণার বোঁটায় মুখে
চলে গেছি আমি স্বপনের পুরে
জাগর-জীবন হতে বহুদূরে,
জগৎ-সীমার শেষে।
নীল-ফুলে-ভরা কুঞ্জ-বিতানে
চেয়ে আছি আমি কার মুখপানে-
হয়ে গেছি ভাের রূপমধাপানে,
চেয়ে আছি অনিমেষে।
থির-বিজুরীর জ্যোতির বিস।
মাণিক ঠিকরে-অনুপম হাস।
কথা নাহি কিছু তা-
নিখিল-মৰ্ম্ম-নীরব-আভাস
ভাসে আর ডুবে যায়।

স্বপন-পসারী যে কথা বলিতে কথা না জুয়ায়, মুখর কণ্ঠ মূক হয়ে যায়, নাহি শ্রবণের অধিকার যায়, নয়ন ওনায়, নয়ন বুঝায়- সুন্দর সেই বাণী, — তাহারি আভাস খানি ও-রূপ মাঝারে যেন চমকায়, স্বপন ধন্য মানি। রূপের প্রভায় ঝলসে নয়ন- সীমা নাই, সীমা নাই। এক-এক করে করিয়া চয়ন দেখাবার নহে তাই। সে ত নহে শুধু দেহ-বিভঙ্গ, কালো আঁখি আর কেশ-তরঙ্গ, বি-অধরে মুকুতা-সঙ্গ, সে যে সবই রূপ!—সে যে অনঙ্গ- দিব্য আলােক-বিভা! শেষ-দিগন্তে পূর্ণ-প্রকাশ দিবা । স্বপন মিলায়ে যায়, জাগিতেছি পুনরায় ১৬

পূর্ণিমা-স্বপ্ন
নীলফুলে-ভরা কুঞ্জ-বিতানে
চেয়ে নাই আর রূপসীর পানে,
ধীরে উদিয়াছে ওই যে ওখানে,
আলােকিয়া নীলিমায়-
পূর্ণিমা চাদ । স্বপন মিলায়ে যায়।
১৩৭

কল্পনা = কবি যারে কাব্যে লেখে, পােটো যারে পটে-- কনা সে নয় ধু, জগতেরও বটে। দুই জনই দেখিয়াছে চোখ দিয়ে তারে- বিষয়ে ব্যাকুল তাই, তাই বারেবারে ছল আর রূপ আর সঙ্গীত-কলায়, কতবার কত রূপে ধরিবারে চায়। সেই সত্য, সেই রূপ এত সীমাহীন- জীবনের উষা হতে সন্ধ্যা, সারাদিন, কত সুরে কত রঙ্গে নারিল ফুটাতে, কল্পনাও হার মানি’ রহিল লুটাতে। সেই সত্য এতবড়?--ক্ষুদ্র হয়ে গেল কবির কল্পনা, তুলি শীর্ণ হয়ে এল। কবি সে কঁদিয়া মরে, শিল্পী উনমনা ; মােরা বলি’ এও বেশী—এ শুধু কল্পনা। ১৩

প্রেম ও
সতীধর্ম
তােমায় রিলে লাজে মরি যে পাথালি?
পবামী-গর্ব যার সে কি আর সী!
সবা’পরে সমচিত্ত!—সকলেই পতি।
নির্বিকার, সমভাব-সতীত্বের ডালি।
তাই সে ভারত-কাব্যে পৌরুষ প্রজালি
উৰােধিলে বীরবৃন্দে নায়িকা-মুরতি।
নহ-নারী, প্রেম তােমা করেছে প্রণতি
দূর হতে—তুমি তারে তর্জনী সঞ্চালি
করেছ বিদায়। বীরের সহধর্মিণী
তুমি শুধু-নারী-ধৰ্ম্ম প্রেম সে কোথায়?
তা’ হলে পারিতে কভু হে বরবৰ্ণিনি,
সভিতে সতীত্ব-খ্যাতি-কুখ্যাতির প্রায় ?
কারেও বাস নি ভালো, হে পঞ্চরঞ্জিনী,
তােমার সতীত্ব-সে যে কেবলি বৃথায় !
তবু কবি-সত্যদশী ঋষি-সুত যিনি,
ব্যাস সে বিশালবুদ্ধি, প্রণমি তাহায়-

স্বপন-পরী
একটু কলঙ্ক ঢালি’ সতীত্ব-প্রভায়
করিলা তােমারে তবে মানস-মােহিনী
বেদনাকামনাময়ী মানব-গেহিনী!
অর্জুনেরে ভালােবাসা—পাপ-পসরায়
টানিতে চরণ টলে স্বরগ-সীমায় ।
সেইটুকু সত্য তব জীবন-কাহিনী।
পার্থ ফিরে চেয়েছিল বক্ষে তুলিবারে-
মৃত্যুশরাহত সেও, মমতা-দুর্বল।
কৃষ্ণসখা! গীতা-মন্ত্র ভুলি একেবারে
লভিলে একি এ গতি ?-সকলি বিফল।
এ কি চিত্র –ধন্য কবি !
দেবতা মুছিল অশ্রু।—মানব বিবল ।
স্বর্গের দুয়ারে
১৪

কৰ্ম্মফল
কৰ্ম্মফলে ভিন্ন গতি তােমার আমার
হবে না মিলন বুঝি জন্মান্তে আবার!
আমারে ত্যজিবে তুমি, উচ্চতর কুলে
লভিবে জনম প্রিয়া, সব যাবে ভুলে’!
এই যে আমারে চেয়ে অনিমিখ-আঁখি,
ঘুমাইলে পাছে ভােলো-নহ যে একাকী,
তাই নিদ্রা নাহি যাও পারে। যতক্ষণ,
নিদ্রিত আমার বক্ষে রাত্রি-জাগরণ!-
সেই তুমি পরজন্মে গৃহ-বাতায়নে-
আমি পান্থ ক্লান্ত এক পড়িব নয়নে ;
সহসা সদয় হয়ে অতিথি-সৎকার
করিবে কি যেন ভেবে ! কি চমৎকার !
বৃদ্ধ বিধি ভুলে গেছে প্রেমের নিয়ম।
কৰ্ম্ম-বন্ধ? এ যে ঘাের অকৰ্ম্ম বিষম ।
১৪১

তােমারে বেসেছি ভালাে, সেই ভালােবাসা কত জন্ম কত যুগ করিব সাধন। কত ব্যথা, বিরহের অশ্রু অকারণ- কত পাপ, কত তাপ, আশা ও নিরাশা। তিল তিল করি সেই প্রেম স্বার্থনাশা ঘুচাবে সকল দ্বন্দ্ব, টুটিবে বাঁধন-- ভবজন্ম-কল্পবৃক্ষে শ্রীহরিচন্দন ফুটিবে, সার্থক করি’ অমৃত-পিপাসা! আমি যবে তুমি হ’বসাধনার শেষ !- সেইবার হ’ব শুদ্ধ বুদ্ধ-অবতার, ঘুচিবে প্রেমের তবে পাত্ৰ-কাল-দেশ, পুচিবে বিরহ-মােহ, বৃথা অহঙ্কার। লভিৰ নিৰ্বাণ-মুক্তি ভাজি দীপাধার বুবে আলল, নাহি রবে অনলের লেশ। ১৪

লীলা
তুমি একদিন শুভদ-শারদ প্রাতে
মালতী-শেফালি তুলে দিলে মাের হাতে-
দু’মুঠি চাপিয়া বুকে
দেখে হাসি মুখে,
—কি আলাে চুমিল নিমীল-নয়ন-পাতে।
তুমি একদিন ফাগুন-দিনের শেষে
লালে-লাল হােরি খেলিলে আপনি হেসে !
আমি ধরিলাম ডালা,
অশােক-চাপার মালা,
হৃদয়ে কি জানি পুষিৰু সর্বনেশে ।
সুকাইলে সখা, দুখানি আঁখির আড়ে-
তা হেরি আমার হিয়ার আরতি বাড়ে।
পিপাসা-পানীয়-তলে
কি গুড় মিশালে ছলে-
পিয়ে পিয়ে তবু সে যাের নে কি ছাড়ে।
১৪৩

স্বপন-পসারী
তুমি একদিন গভীর বরষা-রাতে
টুটাইলে ঘাের, বজ্র-ঝঞ্চাবাতে-
বিষ্ণুচক্র সম,
প্রিয়া-দেহ নিরুপম
কাটি’ উড়াইলে মৃত্যু-কুঠারাঘাতে।
আজ সখা, তুমি চির-তুহিনের দেশে
বসায়েছ মােরে জরতী-লীলার বেশে।
তুষার মরুর আলো-
তাও যে লাগিছে ভালাে।
আঁধারে তবুও ‘অরােরা উঠিছে হেসে !
তবু ভাবি সখা, একি এ তােমার রীতি।
ভাবি, কেন হেন চুরী-ছল নিতি-নিতি?
একেবারে যদি বলে ফেল—“ভালবাসি,
আছে তায় হানি? তাই ভেবে আমি হাসি।
এমন পাগল কভু হেরি নাই ওরে ।
এমন চপল হইলে কেমন করে ?
দাড়ালে না কেন স্বরূপ-অরূপ-বেশে
একেবারে মাের প্রাণের দুয়ারে হেসে’?
আবীরে ও ফুলে, নারীর নয়নে চুলে,
কত খেলা তুমি খেলিলে ধরম ভুলে’!
১৪৪

লীলা লাজে মরে যাই তােমার চরিত অরি’ লােভে পড়ে ভালবাসি তােমারে, হরি? তুমি করে দিলে মদের দারুণ নেশা, তা’ লাগি ধরিলে আপনি গুড়ির পেশা। রচিলে পেয়ালা কত না মশলাদার। তার পর ভেঙ্গে করে দিলে চুমার। তারপর যবে বিষের পিপাসা ঘাের হুতাশে দহিল এ দেহ জনম-ভাের- তখন গােপনে আঁধারের অভিসারে বাঁধিলে আমারে তােমার বাহুর হারে। সাঁপিলে অধরে অমৃত-শিশির চুমা, বুকেতে বাঁধিয়া কহিলে, “ঘুমা রে ঘুমা’! তার পর বুঝি জেগে র’বে সারারাত ? এরূপ দেরিতে হবে না নিমেষপাত। মরি মরি সখা, বলিহারি প্রেম তাের। তবু হাসি আমি, হে শঠ-কপট-চোর। ১৫

ভ্রান্তি-
বিলাস
তােমারে বাসিব ভাল, তাই বার-বার
এত ব্যথা-দাগা-দেওয়া—এত লুকাচুরী!
তােমারে যে বাসি ভালাে—স্বভাব আমার।
আপনা-হারাণাে সে যে ব্যথার মাধুরী!
তুমি স্থির নও কভু !-বার বার ফিরে
শুনিতে বাসনা-আমি ভালবাসি কি না।
বিশ্বাস শােধন কর মাের আঁখিনীরে।
তুমি ভালবাস ফিরে’—আমি ত’ চাহি না !
হায় সখা! সতী আমি,-কোন্ ভ্ৰমবশে
তুলে দিলে শিরে মাের কলঙ্ক-পসরা।
তাই যুগ-যুগ ধরি’ কি মােহ-রভসে
রচিলে মায়ার সৃষ্টি—জন্ম-মৃত্যু-জরা !
আপনার প্রেম তুমি দিলে মাের বুকে,
আপনি হইলে নিঃস্ব ভিক্ষামুখ লাগি।
কাঞ্চনবরণী রাধা!—তুমি কালামুখে
দ্বারে তার দাড়াইলে প্রেমকণা মাগি।
১৪৬

ভ্রান্তিবিলাস সব প্রেম তারে দিয়ে শেষে অবিশ্বাস। সে যে তােমা করিয়াছে সর্বসমর্পণ ! অগ্নিপরীক্ষারও পরে তবু বনবাস! বারেবারে তাই তার এ-হেন দহন । - সৃষ্টি হতে এতকাল এই যে পীড়ন- এত কালি, এত ধূলা, এত পাপ-তাপে, তবু কি মরেছি আমি? নবীন জীবন জন্মে জন্মে লভিয়াছি প্রেমের প্রতাপে। লােকে বলে, লীলা এই আমি সে মানি না। তােমার বুকের 'পরে রেখেছি এ মাথা, চেয়েছি ঘুমন্ত মুখো—আমি কি জানি না তােমার মনের মনে জাগে কোন্ ব্যথা ? তােমার নিশ্বাসে খসি’ দুলােক-ভূলােক মর্মরিছে মর্মভেদী করুণ ক্রন্দন ! অশ্রু, আর যবাঙ্কুর-পাণ্ডুর আলােক ব্যেপে আছে দিক্-দেশ—অসীম বন্ধন। আমারে সংহরি’ লও আপনার মাঝে, রেখাে না পৃথক করে বৃন্দাকুঞ্জবনে। বিরহের ছল করি’ নটবর-সাজে ভুঞ্জিতে মিলন-মধু-মজিলে স্বপনে ! ১৪৭ স্বপন- পরী একে-দুই কাজ নাই, দু’য়ে-এক ভাললা ! -তুমি-আমি বাঁধা র’ব নিত্য-আলিঙ্গনে। নিবে যা রাধিকার নয়নের আলাে- রাধার মরণ হােক তােমার জীবনে। ঘুচে যাক চিরতরে এ ভ্রান্তিবিলাস মুক্ত হও, পূর্ণ হও, তৃপ্ত হও স্বামি। আমি-প্রেম, তুমি-প্রাণ-বারি ও পিয়াস একপাত্রে রহে যেন,—দ্বন্দ্ব যাক্ থামি’? ১৪৮

আধারের
লেখা
আঁধারে আঁখর চিনিতে নারিনু, কি লিখিনু নাহি জানি
আঁখির সমুখে ধরি নাই তারে জ্বালা’য়ে প্রদীপখানি।
আঁধারের কালি কালির লিখন একাকার করি’ দিল,
ধরা পড়িল না—মনের আঁধারে যে কথা লুকারে ছিল।
আমার পরাণ গাহে যেই গান, কে দিবে তাহাতে সুর ?
যমজ হৃদয় কোথা পাব খুজে’?—সবই যে পৃথক দূর!
আলােকে সবার চোখের উপরে লিখিতে নারিনু তাই,
আঁধারে লুকায়ে কি কথা লিখিনুসরমে মরিয়া যাই।
থা, পড়ে থাক্‌ এ লিপি-লিখন, কাজ নাই ঠিকানায়।
আলােক আলিয়া কি হবে পড়িয়া আঁধারের রচনায় ?
কি কথা লিখি—অর্থ তাহার পড়িবে না কভু ধরা,
যা উড়ে যা পথের পাথরে, বাতাসের মুখে ত্বরা।
যদি কোনােদিন পহুছিতে পারে কাহারাে সে ফুলবনে,
পুথি মুদি রাখি’ আলসে চাহিয়া বসে কেই বাতায়নে
ঘরের প্রদীপ বাতাসে নিবেছে, আকাশে আসে নি শশী,
শুধু সে মধুর আঁধার-মদিরা পিয়িছে একেলা বসি’!
১৪৯

স্বপন-পসারী নহে সে যােজন-যুগ-যুগান্ত-দূর নিকষের পাতে অলােক-আশােক-আঁখরের পাঁতি ফুটিতেছে কার হাতে। চেয়ে তারি পানে, অমৃতের ধ্যানে অপলক আঁখিদুটি-- প্রাণের পিপাসা-পাবক তাহাতে অচপল রহে ফুটি! নিয়ে নিবিড় আঁধারে লুকায়ে ফুটিয়াছে যেই ফুল- দখিণ-সমীরে সৌরভ তার আলােড়িছে প্রাণমূল ! প্রভাতে না হয়—দুই দিনে যার ঝরিবে কেশর-দল, সে কেন এমন সােহাগ জানায়ে প্রাণ করে চঞ্চল। ক্রমে চুলে’ আসে বাতায়ন-পাশে চাহনি-ক্লান্ত আঁখি, শিশির-স্বিন্ন তপ্ত-ললাট করতলে দেয় রাখি। স্বপনের রসে ডুবিল অবশে পিপাসা-আতুর হিয়া, চেতন-গহনে ফুল-মধু সনে দুখ গেল মিলাইয়া! টুকে লাল, কেহ বা গােলাপী, কেহ বা শুভ্রদল ! মদির-রভসে ওই পতঙ্গ জড়াইয়া পদতল চুলিয়া পড়িছে অহিফেন-ফুলে, জোড় করি’ দুই পাখা কত রং তা’য়—আমারি মনের বাসনার মত আঁকা। গােলাপের মধু রহিল পড়িয়াহ’ল না সে পান করা, শুধু সৌরভ-রূপ তার যে গাে সকল পিপাসাহরা! কামিনী হােথায় ঝরে যায়-যায়, ঝরাই যে তার শােভা। মরণের ব্যথা কত সে সুরভি-মরণই যে মনােলােভ !

আঁধারের লেখা
আকাশের তারা বকুলের মত ঝরিছে তরুর মূলে।
পুথির লিখন কণ্টকী-লতা—তাও ভরে গেছে ফুলে।
মধু-সৌরভ-সৌরভ-মধু! মধু, আর শুধু মধু!
আপনারি প্রাণ দুইখান হয়ে হ’ল বর, হ’ল বন্ধু!
একখানি তার ফুলের মতন ছড়াইল চারিদিকে,
আরখানি তার প্রজাপতি হয়ে বুক দিল ফুলটিকে।
পাপড়ি কি পাখা—চেনা নাহি যায়, কার মধু কার মুখ।
নাহি গুঞ্জন, শুধু ভুঞ্জন! শুধু সুধাপান—শুধু সুখ!
এমনি স্বপন দেখিয়াছে রাতে—প্রভাতে তাহারি পথে
হেঁড়া-পাতা থানি বাতাসে উলটি পড়িবে না কোনমতে ?
কৌতুকভরে উৎসুক-আঁখি বুলাইবে হেথা-হােথা-
আঁধারের লিপি এমন আলােকে পড়িবে কি কেহ কোথা ?

কামনা
সবুজ বোঁটায় সব দলগুলি দুলাইব থরে থরে,
মধু-পিপাসায় রঙের নেশায় ভুলাইব মধুকরে-
সার্থক হবে ক্ষণ-সৌরভ অসীম অর্থভরা,
মনােবীজরাশি ছড়াইব আমি নব-নবীনের তরে।
মাটীর পৃথী বিদারণ করি’ শতমুখে শত রস
মায়ুতে-শােণিতে শুষিয়া লইব, হােক্ তায় অপযশ
হৃদয়ে আমার যত সাধ আছে ফুটাই শতদলে—
জীবন-সায়রে ফুটিয়া উঠিব অপরূপ তামরস!
আকাশের তারা যেমন জ্বলিছে—জ্বলুক অসীম রাতি,
ওর পানে চেয়ে ভয়ে মরে যাই, চাহি না অমৃত-ভাতি।
ধরার কুসুম বার-বার হাসে, বার-বার কেঁদে যায়-
আঁধারে-আলােকে শিশিরে-কিরণে আমি হব তার সাথী।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Swapan-pasaree

Author
Majumder, Mohitalal
Title
Swapan-pasaree
File name
Swapan-pasaree
Text
OCR done
Citation
1921
Published
2010/01/2
Publisher
Indian Publishing House,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
168
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Majumder, Mohitalal
DLI number
511502
Barcode
4990010018642.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
n0DFSack5Lj
Download PDF

Swapan-pasaree