Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Chotoloker Chele Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ছােটলােকের ছেলে
a) Y;
গ্রীষ্মলপক্ষ ভাপা
তীয় সংস্করণ
জৈাই-১১৫২
এম, সি, সরকার এণ্ড সখ লিমিটে,
১৪, কলেজ স্কোযার, কলিকাতা
১৪, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
এ, সি, সরকার এ সন্স লিঃ হইতে
শ্ৰীঅপূৰ্ব্বকুমাব বাগচি কর্তৃক
প্রকাশিত
( প্রকাশক কর্তৃক সত্ব রক্ষিত ]
প্রিন্টার—ঐজিতেন্দ্রনাথ দত্ত।
লক্ষ্মীবিলাস প্রেস লি।
১৪নং জগন্নাথ দত্ত লেন, কলিকাতা।
যারা নিজেদেব চবিত্র-গৌরনে
নিজেদের কর্মশক্তিতে,
জাতির ভাগ্য গড়ে তুলছে
বাংলার সেই ছেলেমেয়েদের হাতে
এই ঘােট বইখানি
অৰ্পণ করিলাম
গ্রন্থকার
No text on this page.
ছােট লােকের ছেলে জীবনে যাব। বড় হযেছেন, যাদের নাম ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে, তাদের অধিকাংশই জন্মগ্রহণ কবেছেন দুঃখ- দারিদ্রেব মধ্যে, লালিত-পালিত হয়েছেন নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে। শুধু প্রতিভায নয়, শুধু দৈব-কৃপাষ নয়, পাথব-ভাঙ্গা পবিএম কবে, পদে পদে পথে পাথৰ ঠেলে ফেলে তাব এগিয়ে এসেছেন সবার সামনে। দুঃখ-দাবিদ্র্য নান। বকমেৰ আছে। অর্থেব অভাব একমাত্র বাধা নয়, যদিও সেটা মস্ত বড় বাধা। দবিত্র ঘবে জন্মগ্রহণ কবা এক ব্যাপাব,-সাজেব নিম্নস্তবে, সকলের অবজ্ঞা আব উদাসীনতার মধ্যে জন্মগ্রহণ কবা আর এক রকম ব্যাপাব। ব্যাধেব ছেলে একলব্য ব্রাহ্মণ দ্রোণকে গুক পায় নি—সূতপুত্র কর্ণেব চবম-সৌভাগ্য যে, তিনি দুৰ্য্যোধনকে বন্ধুরূপে পেয়েছিলেন । পয়েছিলেন। সমাজের উচ্চস্তরে যাবা থাকেন, তারা দরিদ্র হলেও, সমাজে মধ্যে থাকেন। কিন্তু সমাজের নিম্নস্তরে যার জন্ম গ্রহণ করেন, তা সমাজে বাইরে জন্ম গ্রহণ করেন। দরিদ্র তাে তাবা বটেই, তা ছাড়া তারা অভিশপ্ত।
ছােট লােকের ছেলে
শুধু আমাদের দেশে নয়, গ্রীস, নােম, আমেবিকা, ইংলণ্ড,
জার্মানী, সব দেশেই সমাজেব নিম্নস্তবে যাবা জন্মগ্রহণ করেন,
তারা সমাজের অবজ্ঞার মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেন। প্রাচীন
গ্রীস ও রােমের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, গৰু-ছাগলের
মত এই সব নিম্নস্তবেব মানুষদেব বেচাকেনা করা হত।
নিগ্রোদেব দুর্দশার কথা আমরা সবাই জানি। এই সেদিনও
পৰ্য্যন্ত নিগ্রো ক্রীতদাসদেব নিয়ে যে কি নিষ্ঠুব ব্যবহার করা
হয়েছে, তা ভাবলে লজ্জিত হতে হয়। য়ুববাপে যে এই
সামাজিক বাধা এখন একেবারে উঠে গিয়েছে তা নয়, তবে
সেখানে ধীরে ধীবে এই বাধা চলে যাচ্ছে।
কিন্তু আমবা দেখতে পাই, এই সব-রকমেব বাধা-বিপত্তি
ঠেলেও মানুষের মত মানুষ সবহারাদেব মধ্যে জেগে উঠেছে।
জগতের সর্বোচ্চ আসনে যারা বিরাজ কবছেন, দের
অনেকের শৈশবের দিকে ফিরে চাইলে দেখতে পাই, কেউ
কামারের ঘরে, কেউ কুমােরের ঘবে, কেউ চাষীর ঘরে, কেউ
ক্রীতদাসের ঘরে, কেউ বা মুচীব ঘবে খেলা করে বেড়াচ্ছেন।
তাদের মধ্যে থেকে এসেছে বড় বড় কবি, জগৎ-শ্রেষ্ঠ শিল্পী,
জাতির শিক্ষা-দাতা, ধৰ্ম্ম-গুক, যুদ্ধের নেতা, জগতের ইতিহাসে
তাঁরা সবাই অক্ষয় স্বর্ণাসনে বিরাজ করছেন। যারা ঘােট
জাতের ছেলেদের আজও সমাজের বাইরে দাড় করিয়ে
রেখেছে, তারাই দেখি, এই সব কৃতী ছােট জাতের ছেলেদের
২
ছােট লােকের ছেলে
প্রতিমূর্তির সামনে স্তব করছে। সেই স্তব সার্থক হবে শুধু
তখনই, যখন মানুষ সমাজ থেকে জন্মগত অভিশাপের চিহ্নকে
একেবাবে মুছে ফেলতে পারবে। কয়েকজন মুচী আর মুচীর
ছেলের গল্প তােমাদের বলছি। ইংরেজীতে একটা প্রবাদ
etce, the cobbler should stick to his last, efte
মুচীর উচিত সব চামড-সেলাই-করা সূচের দিকেই দৃষ্টি
রাখা। কিন্তু জগতের অত্যন্ত সৌভাগ্য
যে কয়েকজন মুচীর
ছেলে এই প্রবাদ বাক্যকে মানতে পারেন নি।
।।
....
। .
.
আমাদের বাংলা দেশ, আমাদের বাংলা সাহিত্য, যার সঙ্গে
অতি ঘনিষ্ঠ ভাবে সংযুক্ত, তাবই কাহিনী প্রথমে আরম্ভ করি।
উইলিয়াম কেবীব নাম আজ বাংলা গদ্য-সাহিত্যের ইতিহাসের
প্রথম পাতায় লেখা বয়েছে। বর্তমান বাংলা গদ্য-সাহিত্যেব
তিনি একজন আদি-প্রবর্তক এবং জনক। তাবই প্রেরণায়
এবং সাধনায় বাংলা গদ্য-সাহিত্য নব-রূপ পবিগ্রহ করেছে।
শ্ৰীযুক্ত সুনীতিকুমাব চট্টোপাধ্যায় মহাশ্য তঁাব বাংলা ভাষা ও
সাহিত্যেব সুবিখ্যাত ইতিহাসে ভূমিকায় বলেছেন, কেবা এবং
তার সহকর্মী মিশনাবীবা আমাদেব নমস্য।
উইলিয়াম কেবী অবশ্য মুচীব ঘবে জন্মগ্রহণ করেন নি।
কিন্তু তিনি নিজে মুচী হয়েছিলেন। নদাম্পটনশায়াবেব
পাবি গ্রামে এক দবিদ্ৰ সংসাবে ১৭৬১ খৃষ্টাব্দে তিনি
জন্মগ্রহণ করেন। সেই গ্রামে একটি ছােট পাঠশালা ছিল—
তার বাবা সেই পাঠশালায় গুরুগিরি করতেন। তাতে কবে
অতি কষ্টে তাদের সংসার চলত। গ্রামের ছেলেব। যতটুকু
শিক্ষা পেতে পাবে কেরীব বাবা তাকে তা শিখিয়েছিলেন, কিন্তু
ছেলে একটু বড় হতেই তিনি দেখলেন যে, ছেলেকে আর
পড়াবার সামর্থ্য তঁাব নেই। তাব চেয়ে ছেলে যদি কোন রকমে
৪
ছােট লােকের ছেলে
দু’এক পয়সা আনতে পাবে, তাহলে সংসাবেব কিছু সুবিধে
হ্য। এই চিন্তা করে তিনি কেরীকে এক মুচীব সঙ্গে জুটিয়ে
দিলেন। তাঁদেব গ্রামেব পাশে হাটন বলে আর একটি
গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে একজন মুচী ছিলেন। ভাবই সঙ্গে
ঘুরে ঘুবে কেবী মুচীব কাজ কবে বেড়াতে লাগলেন। তখন
উইলিয়াম কেরী
কি কেউ কল্পনাও করতে পারত, সেই হাটন গ্রামের
নগণ্য মুচীটির সঙ্গে সুদূর বাংলা দেশের সাহিত্য ও শিক্ষার
একদিন এত ঘনিষ্ঠ যােগ গড়ে উঠবে ? যে-লােক বিদ্যাসাগর
বঙ্কিমের আবির্ভাব-লগ্নকে সফল করে তুলেছিলেন, সেই লােক
একদিন দূর হল্টন গ্রামে লােকের হেঁড়া জুতাে সারিয়ে
ছােট লােকের ছেলে
বেড়াতেন। ভাবতেও বিস্ময় লাগে কোত্থান থেকে কি ভাবে
কখন এক জাতির সঙ্গে আর এক জাতির বন্ধন গড়ে উঠে।
পরের জুতাে সেলাই করে দু’পয়সা রােজগার করেই কিন্তু
বালক কেরীর মন নিশ্চিন্ত থাকতে পারত না। তিনি পড়াশােনা
ছাড়লেন না। লেখাপড়া শেখবার এক দুর্বার বাসনা তাব
অন্তরে সদা-সর্বদাই জাগ্রত ছিল এবং তার জন্যে যে কোনও
পরিশ্রম করতে তিনি কখনও কুষ্টিত হতেন না।
তিনি স্থির করলেন যে, গ্রীকভাষায় যে-বাইবেল লেখা
আছে, যার থেকে ইংবেজী বাইবেল অনূদিত হয়েছে, সেই
গ্রীকবাইবেল তিনি পড়বেন। তিনি গ্রীকভাষা শিখতে আরম্ভ
করলেন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রাচীন গ্রীকভাষা শিখে,
তিনি গ্রীক-বাইবেল পডতে আরম্ভ করলেন।
তখন তিনি
স্থির কবলেন যে, বাইবেল প্রথমে লেখা হয়েছিল হিব্রু ভাষায়,
সেই মূল গ্রন্থ পড়তে হবে। তিনি প্রাচীন হিব্রু ভাষা শিখতে
আরম্ভ কবলেন। কিছুকাল পরে তিনি হিব্রুভাষায় আদ্যন্ত
বাইবেল পড়ে ফেললেন।
সেই অপূৰ্ব্ব ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ পডে, খৃষ্টান ধর্ম প্রচাবের জন্য
তিনি জীবন-উৎসর্গ করলেন। তবই প্রেবণায় তার কয়েকজন
বন্ধু মিলে একটি মিশন গড়ে তােলেন। সেই মিশনের প্রতিনিধি-
স্বরূপ আর একজন মিশনারীকে সঙ্গে নিয়ে ১৭৯৩ সালের শেষে
তিনি বাংলাদেশে এসে পৌছন।
ছােট বােকেব ছেলে অনেকের ধারণা যে বৃটিশ-সরকার-প্রেরিত মিশনারী হিসাবে তিনি আমাদের দেশে এসেছিলেন। কিন্তু সে কথা সত্য নয়। বব সেই সময়কাব বিববণ থেকে যতদূর জানা যায, তাতে স্পষ্টই বােঝা যায় যে, বৃটিশ সরকারের অজ্ঞাত সাবে এবং অমতে, শুধু নিজেব অন্তরে প্রেরণায় কেরী বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৮৩৪ সালের ১১ই জুনের ‘সমাচার দর্পণে’ ডাঃ কেরীব মৃত্যু উপলক্ষে তার যে জীবনী প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে লেখা রয়েছে, “ডাঃ কেবী সাহেব কোম্পানী বাহাদুরের অনুমতি না পাইয়াও ডেন্মার্কীয় এক জাহাজ আরােহণে ভারতবর্ষে আগত হইলেন।” এই থেকে বােঝা যায় যে, কেবী একান্ত নিজের প্রেরণাতেই জ্ঞান-বিতরণেব মহৎ-উদ্দেশ্যে প্রণােদিত হয়ে, লুকিয়ে ডেনমার্ক-দেশের এক জাহাজে বাংলায় আসেন। এবং এখানে পৌছিয়ে যাতে ভাবত-গবর্ণমেণ্ট কোন রকমে জানতে না পাবেন, সেই উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতা থেকে ২০ মাইল দূবে টাকিব কাছে এক জঙ্গলে চাষ-আবাদ কবে জীবন- যাপন করতে লাগলেন। অতিকষ্টে এবং অত্যন্ত দাবিদ্রের মধ্যে সংগােপনে সেই জঙ্গলে তাকে বাস করতে হযেছিল। সেই সময় অড়নি বলে একজন সাহেব মালদহেব কাছাকাছি এক জায়গায় নতুন নীলকুঠী স্থাপন কবেছিলেন। কেবী এই অডনী সাহেবের
ছােট লােকের ছেলে
কাছে তার দুর্দশার কথা নিবেদন কবাতে, তিনি তাকে
তার নীলকুঠীব ম্যানেজার করে দেন এবং অডনী সাহেবই
চেষ্টা-চবিত্র কবে বৃটিশ ভাবতে থেকে প্রচাবকাৰ্য কবার জন্য
ভারত-গবর্ণমেন্টের অনুমতি পাইয়ে দেন।
এই সমযেব পৰ থেকে বাংলা দেশেব সাহিত্য ও শিক্ষা
আন্দোলনের সঙ্গে তা কেবীব নাম অতি ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত
হতে থাকে। ১৮০০ সালেব ১০ই জানুযাব' এবামপুরে এসে
তিনি বিখ্যাত বামপুর মিশনেব প্রতিষ্ঠা কবেন। ১৮০১ সালে
যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ডাঃ কেবী
সেই কলেজেব বাংলা, সংস্কৃত এবং মহাৰাষ্ট্ৰ ভাষাব অধ্যাপক
নিযুক্ত হন। শ্ৰবামপুব মিশন প্রেস থেকে তিনি বাংলার
অন্যতম আদি-সংবাদপত্র ‘সমাচাব দপণ বাৰ কবলেন। বাংলা
গছে ইতিহাস বিজ্ঞান প্রভৃতি বই লিখতে আবন্ত কবলেন।
আগেই বলেছি যে, বাংলা গদ্য-সাহিত্যের তিনি অন্যতম প্রবর্তক
এবং জনক। তারই উদ্যোগে এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের
আশ্রয়ে আমাদের গদ্য-সাহিত্য গড়ে উঠে। বাংলা সাহিত্যের
ইতিহাসে ভাঃ কেরব মাহাত্ম এবং কীর্তি চিবস্মবণীয় হয়ে
থাকবে।
একদিন যে তাকে পবেব জুতাে সেলাই কবে বেড়াতে
হয়েছিল, সে স্মৃতিতে তিনি লজ্জিত হতেন না। তিনি
জানতেন, অপরের ক্ষতিকর এবং অন্যায় না হলে, যে-কোনও
ছােট লােকের ছেলে
কাজ সমান মর্য্যাদাব। যখন তার প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছে,
তখন এক সভায এক উদ্ধত রাজ-কর্মচাবী তাকে শুনিয়ে
জনান্তিকে বলেছিলেন—লােকটা জুতো তৈবী কবত শুনতে
পাই। কথাটা শুনতে পেয়ে কেবা বিনীতভাবে উত্তর
দিয়েছিলেন, আজ্ঞে না, আপনি একটু ভুল শুনেছিলেন, আমি
জুততা তৈরী কবতাম না, আমি জুতাে মেবামত কবতাম, একজন
অতি সামান্য মুচী ছিলাম।
কেবী যে-সময় জন্মগ্রহণ কবেছিলেন, তার প্রায় দেড়শ বছর আগে ইংলণ্ডেই আব একজন মুচী জগৎ-ব্যাপী এক বিরাট আন্দোলনেব সৃষ্টি করে যান। তার নাম হল জর্জ ফস্। ধৰ্ম্ম এবং সমাজ-সংস্কাবেব দিক থেকে জর্ল্ড ফসেব নাম শুধু ইংলণ্ডেব ইতিহাসে নয়, সমগ্র যুববাপের ইতিহাসে চিবস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি সেদিন অমানুষিক কষ্ট এবং নির্যাতন সহ্য কবে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, আজ সেই প্রতিষ্ঠান জাতি- ধৰ্ম্মনির্বিশেষে বিশ্বেৰ আৰ্তসেবায় আত্মনিযােগ কবেছে। যুবােপেব ইতিহাস পড়তে গেলেই, কোয়েকাব (Quaker) বলে একটি শব্দের সঙ্গে পবিচিত হতে হয়। এই কোয়েকার অনুষ্ঠানেব বর্তমান নাম হল, সোসাইটি অব ফ্রেৎস্ (Society of Friends)। এই নাম থেকেই এই অনুষ্ঠানের আদর্শ বােঝ যায়। এর সকল দেশে, সকল জাতিব দুঃস্থ লােককে আপনার লােক মনে কবেন। কষ হক, জার্মান হক, নিগ্রো হক, দুঃস্থ মানব মাত্রেই একই দেশের লােক। তারা ধৰ্ম্মেব বাইবের আড়ম্বর আর ভডঙ মানেন না। তারা বলেন, প্রত্যেকেব ধৰ্ম্ম তার অন্তরের নিভূততম সাধনার জিনিষ। একমাত্র বাইরের অনুষ্ঠান হ’ল – যদি ধার্মিক হও, জাতি-নির্বিশেষে আৰ্ত্ত লােকের ছােট লােকের ছেলে সেবা কর, কুসংস্কাব দূৰ কব, মিথ্যাচাব দূর কর এবং এই কাজে * প্রত্যেক লােকেব পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকা উচিত। আজ কোয়েকাবরা জগতেব দূব দূবাস্তব প্রদেশ পর্যন্ত তাদের বান্ধব- সঙঘ গড়ে তুলেছেন—জগতের বড় বড় আন্তর্জাতিক বিপদে তাঁরা। অকাতবে সাহায্য কবেন। কিন্তু যে-ব্যক্তি এই আদর্শ এবং অনুষ্ঠান যুবােপে প্রচাব কবে গিযেছিলেন, সেই জর্জ ফক্স সেদিন তার এই আত্মপ্রকাশের জন্য ভয়াবহভাবে নির্যাতিত হযেছিলেন। গির্ভাব যাব পুববাহিত ছিলেন, ফসেব কথা তাদের মনঃপূত হয় নি-কারণ ফস তাদের অনুষ্ঠানেব আর বাহ্য- আড়ম্ববেব অসারতা প্রচার কবে বেড়াতেন। জনতা কখনও তাকে বুঝেছে, কখনও তাকে প্রহাব কবেছে , এক কারাগার থেকে আব এক কাবাগাবে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, কিন্তু তবুও এই অশান্ত চল্লিশ বছর ধবে সকল বকম নির্যাতন সহ্য কবে, মানব-ধৰ্ম্মেব কথা দেশ-দেশান্তরে পবিভ্রমণ কবে প্রচার কবে বেড়িয়েছেন। এবং তাবই আবির্ভাবের ফলে সেদিন সমগ্র যুবােপের চিন্তা-ধাবা একটা নতুন অভিব্যক্তি লাভ করেছিল। খৃষ্টান-ধৰ্ম্ম যখন বাইবের আচার অনুষ্ঠানে বিড়ম্বনায় তার সার মৰ্ম্মের কথা ভুলে যেতে বসেছিল, সেই সময় জর্জ ফস্ তাকে সেই অপমৃত্যু থেকে বক্ষা পাবাব নতুন প্রেরণা দিয়ে যান।
ছােট লােকের ছেলে
কিন্তু তিনিও ছিলেন একজন মুচী। তার বাবা ছিলেন
তাঁতী। ১৬২৪ খৃষ্টাব্দে লিসেস্টাবশায়াবে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
পায়ের জুতা মােজা খুলে জর্জ ফস পথে প্রচারকার্যে ব্যস্ত
ছোট লােকের ছেলে অতি সামান্য লেখাপড়া তিনি শিখেছিলেন। সেটুকু লেখাপড়ায় এত বড় একটা বিশ্বব্যাপী আন্দোলন চালান যায় না। কিন্তু তব মনে ছিল অগাধ বিশ্বাস আব শক্তি। তার ধারণা ছিল যে, কোন দৈব শক্তি তাকে সাক্ষাৎভাবে চালিয়ে নিযে বেড়াচ্ছে। চুপ কবে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তিনি উম্মদেব মত লাফিয়ে বাস্তায় বেবিযে পড়তেন, পাযেব জুতো মােজ ছুডে দুবে ফেলে দিতেন, নগ্নপদে পথে পথে জ্বলন্ত অঙ্গাবতুল্য বাণী প্রচাব করে বেড়াতেন। ধন্মেব নামে যারা ভণ্ডামী কবে, জীবনেব নামে যারা জাতিকে অপমান কবে, তাদেব সকলের বিরুদ্ধে তীব্র অভিশপ্ত বাণী এইভাবে তিনি সমগ্র যবােপের মধ্যে ছড়িয়ে বেড়ান। তখন তিনিই ছিলেন তব দলের একমাত্র নেতা এবং একমাত্র শিষ্য। কোন দল ছিল না তাব, তিনি ছিলেন একা। একা এইভাবে চল্লিশ বছর ধবে যুববাপের সমস্ত দেশে, ইংলণ্ডের সর্বত্র, আমেবিকায়, প্রশান্ত মহাসাগবেব দ্বীপে দ্বীপে, যেখানে দরিদ্র লােকদেব সমবেত দেখতে পেরেছেন, সেইখানেই তব মনে কথা প্রচাব কবেড়ুেন। এক গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে আব এক গ্রামে এসেছেন, এক কারাগার থেকে ছুটি পেযে আর এক কাবাগাবে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু কোনও দিন, কোন কিছুরই ভয়ে তার অন্তবেব কথা প্রকাশ কবতে তিনি বিন্দুমাত্র কুষ্ঠিত হতেন না। অনেক সময পাগল বলে গ্রামেব লােকেরা ছিল মেরে মেবে তাকে বার কবে দিয়েছে, কিন্তু তব অসামান্য
ছােট লােকের ছেলে
-
চরিত্রবল এবং নির্ভীকতা দেখে ক্রমশঃ দেশে দেশে এক
শ্রেণীর লােক অন্ধ অনুষ্ঠানে বিকদ্ধে মাথা তুলে উঠতে লাগল।
তারাও নিজেদেব কোয়েকাব বলে পরিচয় দিতে লাগল এবং
দেখতে দেখতে সেদিন ফসেব প্ৰেৰণাৰ মহাসাগবের এক তীব
থেকে অন্য তীর পর্যন্ত দেশে দেশে এক নতুন শ্রেণীব লােক মাথা
তুলে উঠল—তাবা অন্তবেব ধৰ্ম্মকে শ্রেষ্ঠধৰ্ম্ম বলে ঘােষণা কবল
—আৰ্তসেবাকে শ্রেষ্ঠ কম্ম বলে মেনে নিল। ফসেব মত
তার অনুচরদেরও নানাভাবে নির্যাতিত হতে হয়েছিল। ফসের
জীবদ্দশায় একবার প্রায় একই সময় বিভিন্ন দেশের কাবাগাবে
প্রায় হাজার জন কোয়েকব কাবারুদ্ধ ছিলেন
ফকস্ যখন কারাগাবে অবরুদ্ধ থাকতেন, সেই সময় •িনি
তার আত্মজীবনী লিখতেন। তঁাব এই আত্মচরিতখানি জগতের
শ্রেষ্ঠ কয়েকখানি আত্মচবিতেব মধ্যে স্থান পায়।
ফসেব কথার সঙ্গে সঙ্গে যুবােপেব আব একজন বড়
ধৰ্ম্মপ্রচারকের কথা আপনা থেকে মনে পড়ে যায়। তিনি
হলেন জাৰ্মাণীর মার্টিন লুথাব। ফসের পূর্বে তিনিই যুববাপে
বজ্রনির্ঘোষে তাঁব বাণী প্রচার কবে গিয়েছিলেন। সমস্ত
মুনােপকে তিনি সজোরে নাড়া দিয়েছিলেন। তার সেই
নব আন্দোলনে একজন কবি তাকে সব চেয়ে বেশী সাহায্য
করেছিলেন—তিনি হলেন তার বন্ধু হানস্ শ্যা (Hans
Sachs)। ১৪৯৪ খৃষ্টাব্দে জাৰ্মাণীর নুরেমবুর্গ প্রদেশে তিনি
১;
ছােট লােকের ছেলে জন্মগ্রহণ করেন। তার এগার বছর আগে মার্টিন লুথাৰ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মার্টিন লুথার যে সংস্কারকাৰ্য আৰম্ভ কবেছিলেন, স্যাকস্ তার সঙ্গীত এবং কাব্যের মধ্যে দিযে তাকে জাৰ্ম্মাণীব সামান্যতম চাষীব কাছেও পৌঁছে দেন। সেই সময়কার জাৰ্মাণীর তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং সঙ্গীত- রচয়িতা। সেই জন্যে সমালােচকগণ বলেন যে—“Sachs preached Martin Luther better than Martin Luther preached himsell", অর্থাৎ মার্টিন লুথার নিজের কথা যতখানি না প্রচার করতে পেরেছিলেন, শ্যা তার চেয়ে ঢের বেশী প্রচার করেছিলেন মার্টিন লুথারের কথা। জাৰ্মাণীর এই বরেণ্য কবি, তিনিও ছিলেন মুচী। নিজের গ্রামে মুচীর কাজ শেখার পর তিনি স্থির কবলেন যে, তিনি জুতাে তৈরী করা ভাল করে শিখবেন। সমস্ত জাৰ্মাণী তিনি ঘুরে বেড়াতে লাগলেন—যেখানে কোন ভাল মুচী দেখতে পান, তার কাছে গিয়ে কাজ আদায় করে আবার অন্যত্র চলে যান। এই ভাবে সারা দেশ ঘুরে বেড়ানােব ফলে জাৰ্ম্মাণীর অন্তরের সঙ্গে প্রথম যৌবনেই তার একটা ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়ে যায়। যখন তিনি সুরেমবুর্গে ফিরে এসে জুতাের দোকান খুললেন, সেই সময় তার মনে এক অপরূপ সঙ্গীত জেগে উঠে। মার্টিন লুথারের প্রদীপ্ত বাণী সে সুরকে জাগিয়ে তুলল। শ্যা সঙ্গীতে, কাব্যে সেই বাণীকে জাতির দ্বারে পৌঁছে দিলেন।
ছােট লােকের ছেলে
জগতেব আব এক মহাপুৰুষ মুচীব ঘবে জন্মগ্রহণ করে
কাব্য-কলার ক্ষেত্রে অক্ষয়-কীর্তি বেখে গিয়েছেন। তিনি
হলেন কৃষ্টফাব মালে, শেল্পীয়ায়েব বন্ধু, সহকর্মী এবং
ইংলণ্ডেব নাটক এবং রঙ্গমঞ্চেৰ অন্যতম আদি প্রাণ-দাতা।
তিনি ক্যান্টাবব্যাবীব এক মুচীব যবে জন্মগ্রহণ কবেন বটে,
তবে কোনও দিন তাকে পবেব জুতাে সেলাই কবতে হয় নি।
সােজাসুজি তিনি ক্যামব্রিজে পড়তে যান এবং সেখান থেকে
সসম্মানে বি-এ ডিগ্রী পান।
যৌবনেই তিনি দেহত্যাগ কবেন। কিন্তু তারই মধ্যে যে
অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন, তাতে
সমালােচকব বলেন, যাদুর মত এবাব ছুঁযেই তিনি ইংলণ্ডের
নাটক এবং বঙ্গমঞ্চকে নতুন জীবন দিয়ে যান। তব আসবার
আগে, ইংলণ্ডেব বঙ্গমঞ্চে যে সব নাটক অভিনীত হত, তাব
কথাবার্তা যেমন কুৎসিৎ ছিল, তেমনি তাব মধ্যে কোন নাটকে
লক্ষণ ছিল না। মালে এসে সর্বপ্রথম ভাল নাটক লিখে সেই
অভাব দূর কবলেন এবং সেই সময় তাব এতদূর প্রতিষ্ঠা হয় যে,
কেপীয়াবও তাব প্রভাব এড়াতে পারেন নি।
3
যখন বাক অব পিটু-এব বক্ততায় সমস্ত ইংলণ্ড মুহুর্মুহু
সচকিত হয়ে উঠছিল, সেই সময় ইংলণ্ডে এক আধ-অন্ধকার
কুঠুরীতে বসে একটি ছেলে জুতো সেলাই করতে করতে তার
অপব চাবজন নিবৰ কৰ্ম্ম-সঙ্গীকে সেই সব বক্তৃতা পড়িয়ে
শোনাত। সব সময় বালক সব কথা বুঝতে পাব না। অনেক
কথারই মানে তখন সে জানত না। পরামর্শ কবে সবাই মিলে
চঁাদা দিয়ে একখানা অভিধান কেনা হ’ল। অভিধান সংগ্রহের
পব সেই মুচীব আডডায় অবসরকালে পূবােদমে আবাব বক্তৃতা
শােনাৰ পালা চলতে লাগল ।
ছেলেটিব নাম রবার্ট ব্লুমফিল্ড, অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংলণ্ডের
এক জন যশস্বী কবি। ব্লুমফিল্ডেব নাম
অবশ্য ইংরেজী
সাহিত্যের বড় বড় কবিদের সঙ্গে উচ্চারিত হয় না কিন্তু
তব জীবদ্দশায় তিনি যথেষ্ট খাতি অর্জন কবেছিলেন।
গ্রাম-জীবনের চিত্র তিনি সুন্দব এবং মধুররূপে আঁকতে
পাবতেন। তাঁর কাব্যের নাযক শুধু চেয়েছিল,
To plough and sow and reap and mow
And be a farmer's boy
ব্লুমফিজ্জেব বাবা দৰ্জীর কাজ করতেন। তাতে কোন
১৭
ছোট লােকের ছেলে
রকমে কায়-ক্লেশে তাদের সংসার চলত। রুমফিল্ড জন্মাবাব
এক বছর পূবেই তার বাবা পবলােকগমন করেন। সেই
নিদারুণ অসহায় অবস্থা
মধ্যে তিনি
লালিত-পালিত
হয়েছিলেন। দশ বছর বয়সে ভাব এক কাকা তাকে সেই
মুচীর আড়ায় ঢুকিয়ে দেন। সেইখানে যে চাবজন সঙ্গী
তিনি পেয়েছিলেন, তাবা তার ব্যবহার এবং বুদ্ধিতে এতদূব
মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল যে, যত বকমে পারত তাবা সেই বালককে
সাহায্য করতে চেষ্টা করত। এই ভাবে বালক চারজন মুর্চীব
সহৃদয়তায় জুতাে সেলাই কবতে করতে লেখাপড়া শিখতে
আরম্ভ করে। বিনিময়ে রােজ সন্ধ্যাবেলা কাগজ থেকে
নানারকমের কবিত। সে তাদের পড়িয়ে শােনাত ।
একদিন বালক নিজেই গােপন একটি কবিতা লিখে এক
কাগজের অফিসে দিয়ে এল। বালক সবিস্ময়ে দেখে যে, পহেব
সংখ্যাতেই তার সেই কবিতাটি ছাপা হয়েছে। সেদিন সেই
মুচীর আড্ডায় কি উল্লাস ! সেইদিন থেকে ব্লুমফিলডেব জীবনে
এক নতুন ধাবা এসে পড়ল। তার মৃত্যুতে ইংলণ্ডেব কবিমহল
থেকে তব বিদায়-স্মৃতি উপলক্ষে বহু কবিতা লেখা হয়েছিল
এবং সেদিন তারা সকলেই আশা কবেছিলেন, “while fields
shall blooni thy name shall live ”-yofaa 2:77793
মাঠে মাঠে তৃণ-ফুল
ফুটবে, হে কবি, ততদিন তােমার
নাম বেঁচে থাকবে।
ছোট লােকের ছেলে
ইংলণ্ডের সাহিত্যের ইতিহাসে আব একজন মুচী ছিলেন।
তার নাম অন্য এক কারণে আজও ইংরেজী সাহিত্যের ইতিহাসের
পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে। তবে তাব জন্যে তিনি বা তার
প্রতিভা বিশেষ দায়ী নয়। ১৬৬৭ খৃস্টাব্দে বিচার্ড স্যাভেজ
বলে একজন লােক জন্মগ্রহণ কবেন। তিনি বলতেন যে, তাব
পূৰ্বপুৰুষেবা খুব সম্ভ্রান্ত-বংশীয ছিলেন, কিন্তু তাকে জুতো
শেলাই কবেই দিন চালাতে হত। সেই সময় ইংলণ্ডে ডাঃ
জনসনও জন্মগ্রহণ কবেছেন। যখন জনসনেরও খুব দুরবস্থা
তখন তার সঙ্গে স্যাভেজেব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়। ডাঃ জনসনের
চেষ্টাতেই পরে স্যাভেজ সেই সময়কার একজন মস্ত বড়
সাংবাদিক হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত হন প্রকৃতির
লােক ছিলেন। লােকের কুংস। প্রচার করে তিনি টাকা
বােজগাব কবতেন। এ সব সত্ত্বেও তার লেখবার শক্তির
জন্য সেই সময়কাব অধিকাংশ বডলােকেব সঙ্গে তঁাব বন্ধুত্ব হয়।
যখন তিনি মারা যান, তখন ডাঃ জনসন্ Life of Savage
নাম দিয়ে তার একটি ছােট্ট জীবনী লিখে বার করেন । যে-
লােকের জীবন লেখা হয়েছে, তার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখবার
জন্য কোন জীবনী প্রয়ােজন ছিল না, কিন্তু যে-ভাবে সেই
জীবনী খানি লেখা হযেছে, ইংবেজী সাহিত্যের ইতিহাসে তার
একটা মূল্য আছে। এই বইখানি সংক্ষেপে জীবন-চরিত লেখার
রীতির একটা অতি সুন্দব নিদর্শন এবং সেইজন্যে ডাঃ জনসনের
ছােট লােকের ছেলে
যখন
নামের সঙ্গে রিচার্ড স্যাভেজের নামও আজ পর্যন্ত বেঁচে
আছে।
আমেবিকাব শ্রেষ্ঠ
শ্রেষ্ঠ সন্তানদের
মধ্যে একজন কবিকে
যুক্তরাষ্ট্রেব লােকে আজও বৎসরে বৎসরে শ্রদ্ধায় স্মরণ
করে। তিনি হলেন কবি জন গ্রিলিফ হুইটিয়ার।
নবীন উদ্যমে তাবা যুক্ত বাষ্ট্রকে গড়ে তুলেছিলেন, সেই সময় এই
কবি তঁার সহজ, সুন্দব কাব্যে মধ্যে দিয়ে যা কিছু সুন্দর, যা
কিছু মহান, যা কিছু কল্যাণকর, তারই বাণী প্রচার কবে, সেই
নব-মহাদেশ স্রষ্টাদের মনে এক মহৎ কৰ্ম্ম-প্রেরণা এনে
দিয়েছিলেন। আজও পর্যন্ত ভাব কাব্য স্বচ্ছ, পবিষ্কার
চিন্তাধারায় এবং মানব কল্যাণ ধৰ্ম্মে প্রাণবন্ত হয়ে আছে।
১৮০৭ খৃষ্টাব্দে এক দরিদ্র চাষীব ঘবে দুইটিয়ার জন্মগ্রহণ
করেন। তার বাবা তাকে মুচীব কাজ শেখান। গ্রামে
চাষীদের বুট সেলাই করে তিনি বােজগার কবতেন। সেই
সময় থেকে দুইটিয়ার গােপনে কবিতা লিখতেন। সেই সময়
উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসন-এর নাম যুবােপ এবং আমেরিকার
চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। নিগ্রোদেব ক্রীতদাস-প্রথা
থেকে মুক্ত করে দেবার জন্য গ্যারিসন জীবন উৎসর্গ করেন
এবং এই আন্দোলন চালাবার জন্যে দেশে দেশে তিনি খববেব
কাগজ প্রতিষ্ঠা করেন। হুইটিয়ার সােজা গ্যারিসনের কাছে
একটি কবিতা পাঠিয়ে দিলেন। সেই কবিতা পড়ে গ্যারিসন
ছােট লােকের ছেলে
স্বয়ং খুজতে বেলেন, কোথায় আছে সেই ছদ্মবেশী প্রতিভা।
খুঁজতে খুঁজতে এসে দেখেন যে, তার কবি হাভাবহিন গ্রামে
এক গাছতলায় বসে ভাবী ভারী সব বুট মেবামত করছেন।
হুইটিয়াবের বার্ধক্যে জগতেব বুধমণ্ডলী সমবেত হয়ে
তাকে অভিনন্দিত কবেন। কিন্তু সেদিন তিনি তার কিশাের
কালের কথা তুলে যান নি। তাই বৃদ্ধ বয়সে, যাদেব কাছে
জীবনের কর্মের প্রথম দীক্ষা পেয়েছিলেন, তাদেরই স্মরণ কবে
এক অপূর্ব কবিতা তিনি রচনা করলেন, কবিতাটির নাম হল
চৰ্ম্ম-ব্যবসায়ীর জাতীয় সঙ্গীত The Anthem of the Gentle
Craft of Leather
আমেবিকার যুক্তবাষ্ট্রেব ইতিহাসে আব একজন মুচীর নাম
জর্জ ওয়াশিংটনের নামের পাশে আজও অমলিন হয়ে বিরাজ
করছে। তার নাম হ’ল রােজাব শারমা। যুক্তরাষ্ট্রের
স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে তব নাম চিরকালের জন্য
সংযুক্ত হয়ে গিয়েছে। যুক্তবাষ্ট্রের বিখ্যাত স্বাধীনতা-ঘােষণাপত্রে
জর্জ ওয়াশিংটনের স্বাক্ষরের সঙ্গে রােজার শারমানের স্বাক্ষরও
অমলিন ভাবে বিরাজ করছে। রােজার শারমান বাইশ বছর
পৰ্যন্ত মুচীগিরি করে সংসার চালিয়েছিলেন এবং সেই কাজের
অবসরে লেখাপড়া শিখে তিনি ওকালতী পাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের
কংগ্রেসের সত্য হন। যখন ইংলণ্ডের সঙ্গে আমেরিকার সংঘর্ষ
উপস্থিত হয়, তখন শাবমান আমেরিকার পক্ষে যােগদান
ছােট লােকের ছেলে
করেন এবং সেই সংগ্রামের তিনি একজন বিশিষ্ট নায়ক
ছিলেন।
ইংলণ্ডেব যুদ্ধ-বিগ্রহেব ইতিহাসে আমরা একজন বিখ্যাত
নৌ-সেনাপতির পরিচয় পাই—যিনি যৌবন পৰ্য্যন্ত গ্রামে গ্রামে
পরে ছে ডা-জুতাে সেলাই কবে বেড়িয়েছিলেন। আজ তিনি
ইংলণ্ডেব সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতী সন্তানদের সঙ্গে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেব
সমাধি-প্রাঙ্গণে সমাহিত হয়ে আছেন। তার নাম হল স্যার
ক্লাউডিসলে শভে। ১৬৫০
১৬৫০ খৃষ্টাব্দে নরফোক-অঞ্চলের এক
গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহণ কবেন। याद জন নারবােবোব
সুনজবে আসার দরুণ তিনি যুদ্ধে জাহাজে চাকরী পান ।
সেখান থেকে একটার পর একটা অসমসাহসিক কাজেব ফলে
তিনি ইংলণ্ডের নৌসেনা-বিভাগেব বিয়াব-আডমিরাল হয়েছিলেন।
একদিন সমুদ্রপথে সিসিলি দ্বীপের কাছে কুসাব মধ্যে পথ
হাবিয়ে তঁাব জাহাজ এক পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে
যায়। দু’হাজার লােক সমেত শভেল সমুদ্রে ডুবে যান। তার
দেহ খুজে পাওয়া গেলে, ইংলণ্ডে নিয়ে এসে মহাগৌববে
ওয়েস্টমিনিষ্টার অ্যাবের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।
ক্রমওয়েলেব সময়ে ইংলণ্ডে একজন মুচী নিজের শক্তিতে
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসেছিলেন। তাঁর নাম হল
কর্ণেল জন হিউস। যখন ইংলণ্ড অত্যাচারী চার্লস স্টুয়ার্টকে
বিতাড়িত করবাব সংগ্রামে মেতে উঠেছিল, সেই সময় হিউসন
ছোট লােকের ছেলে ক্রমওয়েলেব সৈন্যদলে যােগদান করেন এবং ব্যক্তিগত শোৰ্য্যের বলে তিনি ক্রমওযেলের রাজত্বে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারপতি হয়েছিলেন। বাজা যার্টের ফাসীর হুকুম তিনিই দিয়েছিলেন। যখন বেস্টোরেশন ফিবে আসে, তখন তিনি ইংলণ্ড থেকে পালিয়ে যান। সেই সময় রাজাব দৰে লােকেরা তার ব্যয় চিত্র ছাপিয়ে বাস্তায় বিলি করেছিল—সেই ব্যঙ্গ-চিত্রে তাকে দেখান হয়—একদিকে মুচী, অন্যদিকে সৈনিক, একহাতে মুচীর লস, অন্যহাতে তববাবি। ইংলণ্ডেব ইতিহাসে খ্যাতনামা আবও কয়েকজন মুচী আছেন—তাদেব নাম সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করছি। কবি টমাস্ কুপাব , উইলিয়াম গিফোড—যখন ইংলণ্ড নেপােলিয়ানের বিৰুদ্ধে যুদ্ধের আয়ােজন কবছিল, সেই সময় গিফোর্ড খবরের কাগজের মারফত ইংলণ্ডেব জনমত গড়ে তােলেন—জেমস ল্যাকিংটন, ইংলণ্ডেব প্রাচীন পুস্তক-প্রকাশকদের মধ্যে সৰ্বশ্রেষ্ঠ। সর্বশেষে আব একজন মুচীব কাহিনী বলে এই অধ্যায় শেষ কৰব। তিনি কোনও কাব্য বচনা কবেন নি, কোনও যুদ্ধ জয় করেন নি, কোনও বাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে তার নাম লেখা নেই। তিনি তার নিঃশব্দ জীনে দরিদ্র পথের- ছেলেদেব কুডিযে, তাদেব শিক্ষা দিযে জাতির উপযুক্ত নাগরিক করে তুলতেন। তাঁর সেই সাধনা থেকে আজ দরিদ্র অনাথ
ছােট লােকের ছেলে
ছেলেদের শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য ইংলণ্ডের বিখ্যাত স্যাফটারি
সােসাইটি গড়ে উঠেছে। তার নাম হ’ল জন পাউণ্ড। তিনি
ত্রিশ বছরের নিঃশব্দ সাধনায় যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তােলেন, তাঁর
মৃত্যুর পর লর্ড স্যাফটসবারি তাকে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত
করেন। সেই জন্য তাবই নাম অনুসারে উক্ত প্রতিষ্ঠানের
আজ নাম হয়েছে স্যাফটসবাবি সােসাইটি। লর্ড স্যাফটুসবারি
গর্ব করে বলতেন,—আমি জন পাউণ্ডেবই শিষ্য ।
যখন তার পনেরো বছৰ বয়স, সেই সময় পড়ে গিয়ে তার
একটা পা ভেঙ্গে যায়। সেই পা একেবারে বাদ দিয়ে দিতে
হয়েছিল। সেই জন্যে লােকে তাকে খোঁড়া জন পাউণ্ড বলে
ডাকত। একটা পা চলে যাওয়ার দরুণ পাউণ্ড মহাবিপদে
পড়লেন। কি করে রােজগার করবেন ? তিনি মুচীর কাজ
শিখতে আরম্ভ করলেন। ৩৭ বছর পর্যন্ত অন্য মুচীর সঙ্গে
কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার পর, তিনি স্থির করিলেন যে,
তিনি আলাদা একটা মুচীব দোকান খুলবেন। একটা ছােট্ট
কাঠের ঘর ভাড়া নিলেন। কিন্তু একজন লােক তাে চাই
সাহায্য করবার জন্যে। তার একজন ভাইপাে ছিল, সে-ও
খোড়া। নিজে খোঁড়া বলে, সেই বালকটির প্রতি তার
একটা স্বাভাবিক করুণা ছিল। সেই ছেলেটিকে নিয়ে তিনি
মুঢ়ীর দোকান খুললেন।
তিনি নিজে বিবাহ করেন নি, সমস্ত অপভ্য-স্নেহ সেই
২৪
ছােট লােকের ছেলে
ছেলেটির উপর গিয়ে পড়ল। হঠাৎ তার মনে হ'ল—ছেলেটিকে
তিনি লেখাপড়া শিখাবেন। কিন্তু সঙ্গী বা সহপাঠি না পেলে
হয়ত তার পড়ায় মন বসবে না, এই ভেবে তিনি স্থির করিলেন
যে, এর দু’একজন সহপাঠী যােগাড় করতে হবে । কিন্তু
সেই মুচীর আজ্ঞায় কে ছেলে পাঠাবে ? তখন জন পাউণ্ড
স্থির করলেন যে, পথে পথে কত অনাথ বালক ঘুরে বেড়ায়
ছিন্নবাসে, ক্ষুৎপিপাসায় কাতর, তাদের নিয়ে এসে তো তিনি
লেখা পড়া শেখাতে পাবেন। এই চিন্তা তাকে অস্থির করে
তুলল। তিনি বলেন রাস্তায, অনাথ বালকের খোঁজে।
কিন্তু তারা পড়তে আসতে চায় না। তখন তিনি এক উপায়
ঠিক করলেন। পকেটে খাবার নিয়ে পথে পথে ঘুবে বেড়াতে
লাগলেন। খাবারের লােভ দেখিয়ে একে একে তাদের জোটাতে
লাগলেন। যা কিছু বই সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, সেইগুলি
আর রাস্তার হাবিল কুড়িয়ে তিনি ভাব স্কুল খুললেন। স্কুলে
চল্লিশটি ছাত্র হ’ল ।
প্রত্যেক ছেলেকে পড়তে শুনতে এবং কাজ চালাবার মত
অঙ্ক শিখিয়ে তিনি ছেড়ে দিতেন এবং প্রত্যেককে তিনি যে কাজ
জানতেন অর্থাৎ মুচার কাজ, তাই শেখাতেন। ক্রমশঃ ক্রমশঃ
তাঁর ছাত্রের সংখ্যা বাড়তে লাগল এবং যে-সব ছেলে একদিন
খেতে না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুবে বেড়াত, তারা লেখাপড়া
শিখে বাইরে গিয়ে ভদ্রভাবে রােজগার কবতে আরম্ভ করল।
২৫
ছোট লােকের ছেলে
এই ভাবে ত্রিশ বছর পবে জন পাউণ্ড মুর্চীর কাজ করতে
করতে, সেই ভাঙ্গা ঘরে বসে জাতিব সব চেয়ে বড় একটা
কল্যাণ অনুষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন কবে গিয়েছিলেন।
ছেলেবেলায় যাব। পবেব জুতো সেলাই কাব বেড়িয়েছে,
কেমন করে তারা বড় হয়ে জগতে অক্ষয় কীর্তি বেখে যেতে
পেবেছে, তার কাহিনী গত অধ্যায়ে বলেছি। ক্রীতদাসের ঘরে
জন্ম গ্রহণ কবে, ক্রীতদাসের জীবন যাপন করে, যারা সমাজের
বাধা-নিষেধকে ঠেলে ফেলে দিয়ে, মানুষের সমাজে শ্রেষ্ঠ মানুষ
হয়েছেন, আজ তাদেবই কাহিনী বলব।
ঈশপের নাম আজ জগতের সব জাতিব ছেলেবাই জানে।
অ'জ ঈশপেব নাম প্রত্যেক সভ্যজাতিব ঘবে যবে ধ্বনিত
হচ্ছে—কারণ প্রত্যেক সভ্যজাতিব ছেলেমেয়েদেব শিক্ষাজীবন
আবম্ভ হয়, ঈশবে গল্প পড়া থেকে। কিন্তু তিনি ছিলেন
একজন ক্রীতদাস। মানব-চবিত্রকে তিনি ভিতর থেকে দেখতে
শিখেছিলেন এবং ক্রীতদাস জীবনেব নান। লাঞ্ছনার মধ্যে থেকে
নানা প্রকৃতিব মানুষ সম্বন্ধে তব গভীব অভিজ্ঞতা জন্মগ্রহণ
করেছিল। তঁাব বাসনা হ'ল—তাব সেই সব অভিজ্ঞতার
কথা জগৎকে শােনাবেন। কিন্তু তিনি ছিলেন ক্রীতদাস।
ক্রীতদাসেব মুখে মনিবদেব চবিত্র-সমালােচনা মনিবরা সহ
কববেন কেন ? সেই জন্য ঈশপ গল্প বলার এক নতুন কায়দা
আবিষ্কার কবলেন। সেই সব গল্পের মধ্যে কোথাও একটি
২৭
ছোট লােকের ছেলে
মনুষ্য-চরিত্রের উল্লেখ নেই। তার গল্পের নাযক, পশু, পাখী
ইত্যাদি বন্য জন্তুরা। কিন্তু তাদের মুখ দিয়ে এবং তাদের
গল্পের মধ্য দিয়েই তিনি মানব-চরিত্রে কাহিনী বলতে
লাগলেন। বিচিত্র বলে সেই সব গল্প শুনতে গ্রীসের লােকদের
ভাল লাগত। তাবা ঈশপকে ঘিরে সেই গল্প শুনত । এমন
কি, গ্রীক সুন্দরীবাও তব গল্প বিমুগ্ধ হয়ে শুনত।
লিডিয়ার রাজা ইসাস ঈশপের প্রতিভায় বিমুগ্ধ হয়ে
তাকে কিনে নিয়ে স্বাধীন করে দেন। কিন্তু একবাব এক
ঝগড়া মেটাতে গিয়ে ঈশপ গ্রীকদেব রােষে প্রাণ হাবান।
কথিত আছে যে, খৃঃ পূঃ ৫৬১ অকে তাকে এক পাহাড় থেকে
ফেলে দিয়ে মেরে ফেলা হয়।
২৮
প্রাচীন গ্রীস এবং বােমে যে সব জগঞ্জয়ী পণ্ডিত এবং
দার্শনিক জন্ম গ্রহণ কবেছিলেন, এপিকটেটা হলেন তাদের
একজন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের নামের সঙ্গে
আজও তব নাম উচ্চাবিত হয়। তিনি ছিলেন একজন
ক্রীতদাসেব ক্রীতদাস। তব যিনি মনি ছিলেন, তিনি ছিলেন
মহাবাজ নীবােব ক্রীতদাস। তার নাম ছিল এপাফ্রোডিটাস।
নীরো সন্তুষ্ট হয়ে তাকে স্বাধীন করে দেন। এপাফ্রোডিটাস
নিজে স্বাধীন হয়ে এপিকটেটাসকে ক্রীতদাস রাখলেন এবং
ক্রীতদাস থাকার সময় তিনি যে-সব লাঞ্ছনা ভােগ করেছিলেন,
তাব শতগুণ লাঞ্ছনা তার নিজের ক্রীতদাসকে দিতে লাগলেন।
একদিন খেলাচ্ছলে তিনি এপিটেটাসেব একটা পা নিয়ে
একটা কাঠেব উপব দোমড়াচ্ছিলেন—মাটির পুতুলের আঘাত
লাগতে পাবে না, ক্রীতদাসেবও লাগা উচিত নয়। যখন চাপ
খুব বেশী পডেছে তখন একান্ত স্বাভাবিকভাবে শান্তকণ্ঠে
এপিটেটা একবার শুধু বললে—আর একটু চাপ দিলেই
ভেঙ্গে যাবে ! এমনই ছিল তার ধৈৰ্য ও প্রশান্তি।
মধ্যযুগে বড়লােকেরা যেমন তাদের সঙ্গে একজন করে
“ভাড” বাখতেন, সেকালে প্রাচীন গ্রীসে সঙ্গতিপন্ন লােকের
ছোট লোকের ছেলে
সেই রকম একজন কবে দার্শনিক পুষতন। প্রাচীন গ্রীসেব
বড়লােকদের সেই ছিল বিলাসিতা। তাব। যেখানে থাকতেন
বা যেখানে যেতেন, আসর জমাবার জন্য একজন মাইনে-কব।
দার্শনিক সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এপফ্রাডিটাসেরও সখ গেল
যে, তিনি তার সঙ্গে একজন দার্শনিক রাখবেন।
এপিকটেটাসেব প্রকৃতি এবং বুদ্ধি দেখে তিনি স্থিব করলেন
যে, তার ক্রীতদাসকেই তিনি দার্শনিক রূপে গড়ে তুলবেন।
তার এই সদিচ্ছার জন্য এপিটেটাসেব পা-ভাঙ্গাব অপবাধ
জগৎ আজ ভুলে যেতে পারে।
সেই সময় কফাস বলে একজন গ্রীক দার্শনিকের কাছে
এপিকটেটা মানব চবিত্র এবং দর্শনবিদ্যায় শিক্ষালাভ কবলেন।
তাঁর জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হ'ল। দিনের পর দিন গভীবতম
আত্মচিন্তাব পর এপিটেটাস্ পরম জ্ঞান লাভ করলেন।
সময় তিনি অর্থ দিয়ে নিজের স্বাধীন ক্রয় করেন।
স্বাধীন হয়ে তিনি তব মনের কথা প্রচার করে বেড়াতে
লাগলেন। মানুষের জীবনকে উন্নত কৰবাব জন্য, ভ্রান্তপথ
পথিককে পথ দেখাবার জন্য, দেশে দেশে জ্ঞানী গুণী তপস্বীব
যে-সব কথা প্রচাব কবে গিযেছেন, এপিটটাসেব বাণীও সেই
সব অমব উক্তিব অন্তর্ভুক্ত। তিনি প্রচার কবলেন যে,
জীবনের
এবং অনাবিল আনন্দ থেকে নিজেকে
জোর করে সরিয়ে এনে, অন্ধকাব যবে কোণে নিজেকে
ছােট লােকের ছেলে আটক রেখে মানুষ আত্মােন্নতিকে খর্ব করে। নাবিক যেমন তীরে দাড়িয়ে উৎকর্ণ হয়ে শােনে, কখন সমুদ্রেব ওপার থেকে জাহাজ আসবে তাকে নিয়ে যাবার জন্যে, তেমনি এই পৃথিবীতে থেকে, পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভােগের মধ্যে মানুষ যেন সেই সাগরতীরের নাবিকের মত উৎকর্ণ হয়ে থাকে, কখন আসবে জীবনাতীতের আহ্বান। তিনি প্রচার করলেন যে এই মর্ত্ত্য-জীবনে মানুযেব সব চেয়ে বড় সম্পদ হ’ল, সদ জ্ঞান-তৃষ্ণা, সত্যকে জানবার জন্য নিত্য আকুতি। কিন্তু রােমের যিনি শাসক ছিলেন, তিনি এই সব কথা শুনে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। একাধার থেকে তিনি দার্শনিকদের বােম থেকে নির্বাসিত কবতে লাগলেন এবং কালক্রমে এপিকটেটাও নােম থেকে চিব-নির্বাসিত হলেন। রােম থেকে নির্বাসিত হয়ে তিনি গ্রীসে এলেন। প্রথম- জীবনে মনিবেব কৃপায় তিনি খও হয়ে গিয়েছিলেন। গ্রীসে এসে নগরের বাইরে এক ছােট্ট কুঁড়েঘরে অতি দরিদ্র ভাবে তিনি অবশিষ্ট জীবন যাপন করেন। তার ছেলেপুলে আত্মীয়- স্বজন কেউ ছিল না। তবে তাব পাণ্ডিত্যের কথা শুনে তরুণ ছাত্রেরা এসে সেই বুডেঘবের ছায়ায় বসে তার বাণী শুনে যেত। কিন্তু তার সেই একক জীবনের একটি সাখী ছিল। তাকে তিনি পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন। সেকালে গ্রীসে গরীব
ছােটলােকের ছেলে
গৃহস্থেব সংসারে যখন ছেলেমেয়ের সংখ্যা খুব বেড়ে যেত,
তখন কোন কোন নিষ্ঠুর লােক নিজেদের নব-জাত শিশুকে
একটা মাটির পাত্ৰতে রেখে মাঠে ফেলে যেত। এপিকটেটাস
এই বকম একটি পরিত্যক্ত শিশুকে কুড়িয়ে নিয়ে এসে মানুষ
কবেন। কুঁড়েঘরে সেই ছিল তার একক জীবনের সাথী।
তাঁর মৃত্যুর পর যখন বােমে এন্টনিয়াস সম্রাট হয়েছিলেন,
তখন তিনি বলেছিলেন, “এই ক্রীতদাসের বাণী অনুসরণ করে
নিজেকে সম্মান করতে শিখেছি, দেশকে ভালবাসতে শিখেছি
এবং কোন দিন এই দু’য়ের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব অনুভব
করিনি।”
৭
শুধু সম্রাট এ্যান্টনিয়াস কেন, জগতের কত লােক, কত
বন্ধুহীন আদিনে এই মহাপুরুষের বাণী থেকে শক্তি সঞ্চয়
করেছে, ক্লান্ত চবণে আবার তাদের চলবার শক্তি এসেছে।
মহাপুরুষেরা যে সব বীজ ছড়িয়ে যান, কোথায় কখন যে তা
অঙ্কুবিত হয়ে উঠবে, তা কেউ বলতে পারে না। প্রায় দু’হাজার
বছর আগে ক্রীতদাস আমাসিস আপনার মনে নানা রকমের
পাত্রে গায়ে প্রাচীন গ্রীসের সামাজিক জীবনের নানা অপরূপ
চিত্র একে গিয়েছিলেন। দু’হাজার বছরের বিস্মৃতির ব্যবধান
এডিয়ে তারই কযেকটা টুকরাে সহসা আর এক দূর দেশের
তরুণ কবির চিত্তে এমন এক অপূর্ব প্রেরণা এনে দিল,
যার ফলে সেই দেশের সাহিত্য অপূৰ্ব্ব কবিতায় মন্ত
হয়ে উঠল। প্রাচীন গ্রীক পাত্রের গায়ে আঁকা সেই ছবি দেখে
কী ভাব জগৎ-খ্যাত কবিতা Odes to the Grecian Urn
লেখবার প্রেরণা পান। কোথায় ইংবাজ কবি কীটস্ আর
কোথায় প্রাচীন গ্রীসেব ক্রীতদাস আমাসিস! একজনের
আলো এমনি করেই আর একজনের প্রদীপ জ্বালিয়ে তোেল।
তাই মানব-সভ্যতার দেয়ালী অনির্বাণ ভাবে আজও জ্বলছে।
প্রাচীন গ্রীস থেকে যুরােপের মধ্যযুগে আসা যাক। যােড
শতাব্দী। তখনও ক্রীতদাস প্রথাব বাজত্ব চলছে। সেই
সময় যুবরাপে জগতের একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ
সার্ভেন্টিস ঘানি টানিতেছেন
করেন। তার নাম হ’ল সার্ভেন্টিস,—ডন্ কুইকজোর অমর
স্রষ্টা। সম্রান্ত ঘরে জন্মগ্রহণ করেও, দুর্ভাগ্যবশতঃ তাকেও
ক্রীতদাসের জীবন যাপন করতে হয়।
যখন স্পেন গৌরবের সর্বোচ্চ শিখরে সমাসীন, সেই সময়
৩
ছােট লােকের ছেলে
স্পেনে ১৫৪৭ খৃষ্টাব্দে সার্ভেন্টস জন্মগ্রহণ করেন। তার
বাবা অস্ত্র-চিকিৎসক ছিলেন। যৌবনের প্রারম্ভেই সার্ভেটিস
সৈনিকরূপে যুদ্ধে যােগদান করেন এবং স্পেন ত্যাগ করে
ক্রমান্বয়ে পাঁচ বছর কাল তুর্কীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে
অসমসাহসিকতার পরিচয় দেন। পাঁচ বছর ঘর-ছাড়া হয়ে
যুদ্ধক্ষেত্রে কেটেছে।
ঘরের জন্য মন কাতর হয়ে উঠল।
সেনাপতির কাছে ছুটির জন্য আবেদন কয়, তিনি তাঁর বীরত্বে
সন্তুষ্ট হয়ে বাড়ী যাবার ছুটি দিলেন। একটা নৌকা নিয়ে তিনি
স্পেনের দিকে যাত্রা করলেন।
পথে জলদস্যুরা তার নৌকা আক্রমণ কবে তাকে বন্দী
কবল। আফ্রিকার আজিয়াবস্ শহরে তখন ক্রীতদাস বেচা
কেনার একটা মস্ত বড় ঘাঁটি ছিল। সমুদ্র-পথ-যাত্রী খৃষ্টানদের
বন্দী করে জলদস্যুরা ক্রীতদাস হিসেবে তাঁদের আলজিয়ার
এ বিক্রী করত। সার্ভেন্টিকেও তারা আলজিয়ামে এক
দাস-ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রী কবে গেল।
সেই দাস-ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হাসান নামে একটি লােক
সার্ভেন্টিসকে কিনে বাড়ী নিয়ে গেল। সে অঞ্চলে ক্রীতদাসরা
হাসানের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে উঠত, এমনি নিষ্ঠুর ছিল
সে। কিন্তু সেই হাসান নতুন ক্রীতদাসটিকে কঠোর শাস্তি
দিলেও, শত-অপরাধেও গুরুতর কোন আঘাত করত না।
সারাদিন-রাত ঘানি টানানাে, বা খেতে না দেওয়া, বা এক
ছােট লােকের ছেলে সপ্তাহ ধরে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় অন্ধকার ঘরে ফেলে রাখা হাসানের কাছে দয়ার সামিল ছিল। বহু ক্রীতদাসকে সে ফাসী দিয়েছে—কথায় কথায় বহু ক্রীতদাসের যে কোনও অঙ্গচ্ছেদ করেছে। বার বার সার্ভেন্টিস্ লুকিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন, বারে বারই তিনি ধবা পড়েছেন। স্পেনের সৌভাগ্য যে হাসান সার্ভেন্টিকে মেরে ফেলে নি। এই দুরন্ত ক্রীতদাসটিব জীবনহানি বা অঙ্গচ্ছেদ করতে হাসানের কোথায় যেন বাধতো। একবার সার্ভেন্টিসের শাস্তি হ’ল, দু’হাজার কোডার প্রহাব। কিন্তু সেবারও হাসান দয়া দেখিয়ে পাঁচ মাস শুধু তঁাকে অন্ধকার ঘবে কাবারুদ্ধ করে বেখে দিল। এই ভাবে পাঁচটি বছর কেটে গেল। ওধারে স্পেনে তব দরিদ্র পিতা সন্তানেব জন্য পাগল হয়ে উঠলেন। বহু অনুসন্ধানের পর তিনি খবর পেলেন যে, তার পুত্র আলজিয়ার্সে ক্রীতদাসের জীবন যাপন করছেন। এক সদাশয় সন্ন্যাসী সার্ভেন্টিসের পিতার অবস্থা দেখে তার পুত্রকে ফিরিয়ে আনবার ভার নিলেন। সার্ভেন্টসের বাবা সর্বস্ব বেচে সেই সন্ন্যাসীর হাতে তিনশাে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তাকে আলজিয়ামে পাঠালেন। কিন্তু হাসানের মন তাতে টললাে । পাঁচশাে স্বর্ণমুদ্রাব কমে সার্ভেন্টিকে সে কিছুতেই ছেড়ে দিতে চাইল না। সন্ন্যাসী হাসানের হাতে-পায়ে ধরল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হ’ল না—পাঁচশো স্বর্ণমুদ্রা চাই-ই। .
ছোট লোকের ছেলে
নিরুপায় হয়ে তিনি আফ্রিকার উপকূলে যে-সব যুবােপীয়
বণিক আসা যাওয়া করত, তাদের কাছে ভিক্ষা করতে
লাগলেন। বহুদিন এইভাবে ভিক্ষার পর, আর দু’শাে স্বর্ণমুদ্রা
সংগ্রহ করে, মুক্তি-মূল্য দিয়ে তিনি সার্ভেটিকে বাড়ী ফিরিয়ে
আনলেন।
সার্ভেটিসের অবশিষ্ট জীবন ঘােতর দারিদ্র্যের মধ্যে
অতিবাহিত হয়। ফিরে এসে তিনি একটা চাকরী জোগাড়
করলেন বটে, কিন্তু তার মাইনে হ’ল বছরে ত্রিশ পাউণ্ড।
তিনি লিখতে আরম্ভ করলেন, কিন্তু সেদিকেও ভাগ্যদোষে
তিনি এক প্রবল বাধা পেলেন। সেই সময় স্পেনের নাটা-
সাহিত্যের জন্মদাতা লােপদ্য ভেগা,(যার চেয়ে বেশী নাটক
জগতের কোনও নাট্যকার আজও লিখতে পারেন নি, তিনি
প্রায় দু'হাজার নাটক লিখেছিলেন এবং তাদের মধ্যে প্রায়
৪০০ খানি এখনও প্রচলিত আছে )-স্পেনের সাহিত্য-জগতে
একাধিপত্য করছিলেন। সার্ভেন্টিসের সমস্ত নাট্য রচনা-
প্রচেষ্টাকে তিনি বাধা দিতে লাগলেন। ক্রমশঃ ভেগা
প্রকাশ্যভাবে তার শত্রুতা করতে লাগলেন। সার্ভেটি দরিদ্র,
অজ্ঞাত ক্রীতদাসের চাবুকের দাগ তার সর্বাঙ্গে। তিনি
সাহিত্য-সমাজেও স্থান পেলেন না।
যখন আমরা ডন কুইজো আর স্যাঙ্কো-পাঞ্জার হাস্যকর
কাহিনী পড়ি, তখন যেন স্মরণে রাখি যে, সুতী দারিদ্র এবং
ছােট লােকের ছেলে
সুনিবিড নৈরাশ্যের মধ্যে থেকে সেদিন সার্ভেন্টিস্ হাসতে
পেরেছিলেন, লােককে হাসাতে পেরেছিলেন। পঞ্চান্ন বছর
বয়সে তিনি এই অমব কাহিনী রচনা কবেন, কিন্তু সেদিন
স্পেনে কেউ-ই এই লেখার জন্যে সার্ভেন্টিকে অভিনন্দিত কবে
নি—তার বই বিক্রীও হয় নি। ভেগার দল থেকে, তাকে ব্যঙ্গ
করে, এক অতি কুৎসিত বই প্রকাশিত হয়। কিন্তু আজ
বাইবেল ছাড়া ডন কুইজোর কাহিনী জগতের যত বিভিন্ন
ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এমন আর কোনও বই হয়নি।
যে-কলম্বাস স্পেনের হাতে একটা মহাদেশ তুলে দিয়েছিলেন,
স্পেন সেদিন তাকে কারারুদ্ধ কবে সম্মান দেখিয়েছিল ,
যে-সার্ভেন্টিস্ সাহিত্য জগতে স্পেনকে অমর করে গেলেন,
তার জীবদ্দশায় স্পেনের একটি সন্ত্রান্ত লােকও তার কোনো
খবর নেয়নি। সেদিনকার রণ-মত্ত স্পেন ডন্ কুইকজোর
গ্রন্থকারকে জানত না।
ডন কুইজোর কাহিনী লেখার কয়েক মাস পরেই তিনি
মারা যান। মৃত্যুশয্যায় ওষুধ বা পথ্যের জন্য একটিও পয়সা
তার ছিল না। একজন লােক দয়াপরবশ হয়ে কিছু দান করে
যায়। সেই অজ্ঞাতনামা লােকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে, সেই
মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তিনি একখানি চিঠি লেখেন। সেই তার
শেষ-রচনা।
এবং আজও পর্যন্ত স্পেন জানে না কোথায় তাঁর দেহ
ছােট লােকের ছেলে
সমাহিত হয়েছিল। এ রকম অবজ্ঞাত ভাৰে বােধ হয়
জগতের আর কোনও প্রতিভাকে জগৎ থেকে বিদায় নিতে
হয় নি।
তার জীবনের এই নিদারুণ নৈরাশ্যের সঙ্গে ডন কুইজোর
বিদ্বেষহীন, তিক্ততাহীন অট্টহাসি মিলিয়ে দেখলে বােঝা যায়
যে, সার্ভেন্টিসের গৌরব কোথায়।
০
এ পর্যন্ত যাদের কাহিনী বললাম, তাঁরা ছিলেন খৃষ্টান
ক্রীতদাস। কিন্তু সার্ভেন্টিস্ যে শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন,
সেই শতাব্দী থেকেই খৃষ্টান-জগৎ আফ্রিকার কালো নিগ্রোদের
নিয়ে তিন শতাব্দী ধরে যে নিৰ্ম্মম নিষ্ঠুর ক্রীতদাস-ব্যবসায়
চালিয়ে এসেছে, সঙ্ঘবদ্ধ নিষ্ঠুরতার ব্যাপকতার দিক থেকে,
তার তুলনা জগতের ইতিহাসে নেই। তিন শতাব্দী ধরে,
স্পেন, পর্তুগাল, ইংলণ্ড, আমেরিকা এবং হলাও নিগ্রো
ক্রীতদাসদের নিয়ে যে অমানুষিক বর্বরতার পরিচয় দিয়েছিল,
তার কলঙ্ক-কালিমা কোনও দিন মুছে যাবে না।
স্পেনই প্রথম এই নির্মম কাজে যুরােপকে পথ দেখায়।
স্পেনের অত্যাচারে যখন পশ্চিম-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের আদিম
রেড-ইণ্ডিয়ানরা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেল, তখন সেই বিজয়ােন্মত্ত
জাতির পরিচালকদের মাথায় হঠাৎ একটা নতুন বুদ্ধি এল—
তারা স্থির করলেন যে, আফ্রিকার নিগ্রোরা রেড-ইণ্ডিয়ানদের
চেয়ে ঢের বলিষ্ঠ, অতএব নিগ্রোদের ধরে ক্রীতদাস করে রাখা
বাক।
১৫১০ খৃষ্টাব্দে স্পেনের রাজার হুকুমে পঞ্চাশ জন
নিগ্রোকে ধরে আনা হল। দূর হয়তী-দ্বীপে স্বর্ণ খনি
ছােট লােকের ছেলে
আবিষ্কৃত হয়েছে-সেইখানে তাদের কুলীর কাজ করতে হবে।
এই হ’ল সূত্রপাত।
এই ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে একজন ইংরাজ
আফ্রিকা থেকে ৩০• হতভাগ্য নিগ্রোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে নিয়ে
গিয়ে পশ্চিম-ভারত দ্বীপপুঞ্জে স্পেনিয়ার্ডদের কাছে বিক্রী
করেন। তাতে তার প্রচুর লাভ হয়। ইংরাজদের মধ্যে তিনিই
হলেন প্রথম ক্রীতদাস-ব্যবসায়ী। তার নাম জন হকিস্।
রাজ্ঞী এলিজাবেথ জন হকিনকে “নাইট” উপাধি দিয়ে
সম্মানিত করেন।
১৬১৯ খৃষ্টাব্দে হলাণ্ডের একটি জাহাজ ভার্জিনিয়ার
জেমসটাউন বন্দরে এসে উপস্থিত হলাে। জাহাজের ক্যাপটেন
সেখানকার নতুন উপনিবেশকারীদের ডেকে ঘােষণা করলেন
যে, তাঁর জাহাজে বিক্রীর জন্য “জ্যান্ত মাল” সব আছে।
জাহাজের খােলে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় কুডিজন “নিগার” পডে
আছে। তারাই হ’ল ক্যাপটেনের “জ্যান্ত মাল”। সেই সময়
নতুন উপনিবেশকারীদের লােকজনেরও বিশেষ প্রয়ােজন ছিল।
তাঁরা সাগ্রহে তাদের কিনে নিলেন। সেই দিন থেকে
আমেরিকায় নিগ্রো-নির্যাতনের অতি শশাচনীয় পর্বের সুফ
০১
ছােট লােকের ছেলে
আফ্রিকার গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে, যুগােপীয় বণিকরা
আমেরিকার বন্দরে বন্দরে মানুষ বিক্রী করে, দু’পকেট পয়সা
ভরিয়ে নিয়ে চলে আসতাে। সে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার কাহিনী
এখানে বলতে চাই না। শুধু এই কথা বললেই যথেষ্ট
হবে যে, ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডে মাত্র লিভারপুল, ব্রিস্টল এবং
লন, এই তিন বন্দবে তিনশাে আশীখানি জাহাজ শুধু মানুষ
বিক্রী করার কাজেই ব্যবহৃত হত। এবং তখন যুরােপের
বন্দরে বন্দরে জাহাজী-জিনিষের যে-সব দোকান ছিল, তাতে
ঢুকলেই সর্বপ্রথম দেখা যেত, চারিদিকে ঝুলছে লােহার
শৃঙ্খল, হাত-কড, পায়ে-লাগাবার বেডী, লােহা-বাঁধানাে নানা
ডিজাইনের কোডা, দাস-শাসনের সব যন্ত্র। ঊনবিংশ শতাব্দীর
মাঝামাঝি সভ্য-জাতিদের ঘরে ক্রীতদাসদের সংখ্যা দেখে
সত্যই বিস্মিত হতে হয়।
আমেরিকায় তখন, ৪,০০,০০০
জন ক্রীতদাস ছিল।
বৃটিশ উপনিবেশে
ফরাসী উপনিবেশে ২৫,০০০
ডাচ, উপনিবেশে
২৭,০০০
স্পেন এবং পর্নগীজ উপনিবেশে
০ ০
০ ০ ০
৪
১
»
ব্রেজিলে
এই সব লক্ষ লক্ষ ক্রীতদাসের উপর যে অমানুষিক
০২
ছোটলােকের ছেলে
অত্যাচার করা হত, তার কথা বিস্তৃতভাবে এখানে বলার কোন
প্রয়ােজন নেই। যে সব মহাত্মা এই জঘন্যতম পাপ থেকে
বর্তমান সভ্যতাকে বকা কবে গিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে একটা
সুস্থ-সবল, ধৰ্ম্ম-প্রবণ, কষ্টসহিষ্ণু, ক্ষমাশীল এবং চরিত্রবান
বিরাট জাতিকে শশাচনীয় অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে
গিয়েছেন, তাঁরা জগতের নমস্য। সেই সব অবজ্ঞাত নিপীড়িত
মানুষের মধ্যে থেকে, সমস্ত সভ্য জগতের অবজ্ঞা, অপমান
এবং আঘাত সহ্য করে, যে সব মহাপুৰুষ স্বজাতির কল্যাণে,
মনুষ্যত্বের কল্যাণে, সভ্যতার কল্যাণে আত্মনিয়ােগ করে
বিমুখ পৃথিবীতে আত্ম-প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন, তাদের
কয়েকজনের কাহিনী এখানে বলছি।
১০
১৮১৭ খৃষ্টাব্দে আমেরিকার মেরীল্যাণ্ড প্রদেশে
প্রদেশে এক
ক্রীতদাসীর গর্ভে ফ্রেডারিক ডগলাস্ (Frederick Douglas)
জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন নিগ্রো ক্রীতদাসী। তার
বাবা ছিলেন একজন বর্বর শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস প্রভু।
একদিন মনিবদের কথাবার্তা লুকিয়ে শুনতে গিয়ে ডগলাস
বুঝতে পারলেন যে, তাঁর সতেরাে বছর বয়স হয়েছে। কার
কত বয়স তা-ও তারা জানত না। নির্যাতন অসহ্য হওয়ায়
ফেডারিক একদিন লুকিয়ে পালিয়ে যায়।
সেই সময় আমেরিকায় এবং ইংলণ্ডে একদল লােক এই
নিষ্ঠুর দাস-ব্যবসায়ের উচ্ছেদের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন।
স্পষ্টতঃ দুটি ভাগে তখন আমেরিকা বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল
একদল যারা ক্রীতদাসপ্রথার বিরুদ্ধে, আর একদল যারা
ক্রীতদাস-প্রথাকে চালাতে চান। শেষােক্ত দলই তখন সংখ্যায়
এবং শক্তিতে প্রবল ছিল। যারা ক্রীতদাসপ্রথার বিকল্কে
সেদিন আন্দোলন করতেন, তাঁরা ভয়াবহভাবে নির্যাতিত হতেন।
কত মহাপুরুষকে এই জন্য আত্ম-বিসর্জন দিতে হয়েছে।
ফ্রেডারিক সৌভাগ্যবশত
এই দলের একজন মহাপুরুষের
আশ্রয় পান এবং তার কাছেই তিনি লেখা-পড়া শিখেন। যখন
ছােট লােকের ছেলে নি নিজেদের অসহায় অবস্থার কথা বুঝতে পারলেন, তখন তিনি পণ করলেন যে, ক্রীতদাস-প্রথার উচ্ছেদে যদি প্রয়ােজন হয় জীবন উৎসর্গ কবতে হবে। সমগ্র আমেরিকা পায়ে হেঁটে তিনি বক্তা দিয়ে বেড়াতে লাগলেন। আমেরিকায় আজও পৰ্য্যন্ত যত শ্রেষ্ঠ বক্তা জন্ম- গ্রহণ করেছেন, ফ্রেডারিক তাঁদের মধ্যে একজন। অসাধারণ ছিল তার বাগ্মিতা। ক্রমশঃ তিনি বিশুদ্ধ দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। একে নিগ্রো, তাতে আবার ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন করছেন—যে কোনও মুহূর্তে তার মৃত্যু-সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তিনি তা ক্ৰক্ষেপ করেন একদিন এক তুমুল ঝডের বাতে পালিয়ে গিয়ে এক জাহাজে উঠলেন। জাহাজেব কেবিন সব বন্ধ। জাহাজের একই কেবিনে নিগ্রো এবং শেতাঙ্গ থাকবার আইন ছিল না। সেই শীতের বাত্রিতে তুমুল ঝড়-জলের মধ্যে ফ্রেডারিক ডেকে দাড়িয়ে বইলেন। সেই জাহাজের যিনি কাপ্টেন ছিলেন, তিনি অন্তরে দাস প্রথার বিরুদ্ধেই মত প্রকাশ কবতেন, কিন্তু কাৰ্যগতিকে তিনি প্রকাশ্যভাবে সে মত জাহির করতেন না। ফ্রেডারিকের সেই দুরবস্থা দেখে দয়াপরবশ হয়ে, আইন রক্ষা করে কি করে তাকে কেবিনে আনা যায়, সে কথাই তিনি চিন্তা করতে লাগলেন। অসভ্য রেড-ইণ্ডিয়ানবা শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে এক কেবিনে যেতে ৪৫
হােট লােকের ছেলে
পারে কিন্তু নিগ্রোরা নয়। সেই জন্যে কায়দা করে তিনি
প্রশ্ন করলেন,
“তুমি তাে রেড-ইণ্ডিয়ান হে ?
ক্যাপ্টেন আশা করেছিলেন, বিপন্ন নিগ্রো তার এই প্রশ্নের
সুবিধা গ্রহণ করবে।
সেই ঝডের মধ্যে মাথা তুলে ফ্রেডারিক উত্তৰ দিলেন,
আপনি ভুল বুঝেছেন, আমি নিগ্রো !
ক্রমশঃ আমেরিকায় এই ক্রীতদাস-প্রথা নিয়ে তুমুল যুদ্ধ
বাধলাে । সেই যুদ্ধের আয়ােজনে এবং যুদ্ধে ফ্রেডাবিক
আব্রাহাম লিঙ্কলনের সব চেয়ে বড় সহায় হযেছিলেন। তার
বাগিতায় অসাধাবণ শক্তি এবং তার চরিত্র-বল দেখে আব্রাহাম
লিন্কল পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। দাস-প্রথা-
উচ্ছেদের ইতিহাসে ফ্রেডারিকের নাম, লিন্কলন, গ্যারিসন,
জন ব্রাউন, উইলবারফোস প্রভৃতির সঙ্গে একসুরে উচ্চারিত
হতে পারে।
১৮৬৩ খৃষ্টাব্দেব জানুয়ারী মাসে যেদিন আব্রাহাম
লিন্কল ঘােষণা করলেন, অতঃপর আমেরিকায় আর কেউ
ক্রীতদাস থাকবে না, সেদিন ফ্রেডারিক ছিলেন তারই পাশে।
কিন্তু আইনত এই প্রথার উচ্ছেদ হয়ে গেলেও, তখনও
অনেক কাজ বাকি ছিল। ফ্রেডারিক বুঝলেন যে, সেইদিন
থেকে নতুন কাজ সবে শুরু হ’ল মাত্র। কারণ, এতদিন পর্যন্ত
ছােট লােকের ছেলে
যারা এইভাবে নিষ্পেষিত হয়েছিল, তাদের নতুন করে গড়ে
তুলতে হবে, তাদের শিক্ষা দিতে হবে, তাদের এই নতুন জগতের
উপযুক্ত করে সকল দিক থেকে গড়ে তুলতে হবে—নতুবা শুধু
ক্রীতদাস হওয়া থেকে আইনত মুক্তি পেলেই এই বিরাট
জাতি বাঁচার মতন করে বেঁচে থাকতে পারবে না। অবশিষ্ট
জীবন ফ্রেডারিক সেই মহাব্রত উদ্যাপনে নিজেকে নিযুক্ত
করলেন।
আমেরিকার নতুন রাষ্ট্র ফ্রেডাবিকের অসামান্য প্রতিভাকে
যােগ্য মর্যাদা দিল। নতুন রাষ্ট্রের বহু উচ্চপদে তিনি
ক্রমান্বয়ে অধিষ্ঠিত হন। ১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে তিনি হাতী
উপনিবেশের আমেৰিকান মন্ত্রী এবং কন্সাল-জেনারেল হন।
সেই কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করে তিনি আবার
আমেরিকায় ফিরে এলেন। তখন তিনি বৃদ্ধ—তার ব্যস
আটাত্তর বৎসর। নিগ্রোদের উপযুক্ত শিক্ষা-ব্যবস্থার জন্যে
তিনি প্রবলভাবে আন্দোলন শুরু করলেন। একদিন এক
বক্তৃতা-সভা থেকে বক্তৃতা দিয়ে বাড়ী ফেরবার পথে হঠাৎ তার
সৰ্ব্ব-শরীর অবশ হয়ে এল। বাড়ীর দরজায় ঢুকতেই তার
অবশ দেহ কেঁপে পড়ে গেল। সেখান থেকে আর তিনি
উঠতে পারেন নি। সেইখানেই মৃত্যু এসে তার মহৎ জীবনের
যবনিকা টেনে দেয়।
৪৭
ফ্রেডাবিক যে-আদর্শ প্রচারের জন্ম জীবন উৎসর্গ করে
গেলেন, আর একজন নিগ্রো এসে তাকে সার্থক করে তুললেন।
সেই মহাপুরুষের নাম বুকাব টি, ওয়াশিংটন। শুধু নিগ্রোদের
মধ্যে নয়, আমেরিকার নাগরিকদের মধ্যে এত বড় মানুষ গুটি
দুই তিন জন্মগ্রহণ করেছেন মাত্র।
ক্রীতদাস হযেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কেমন করে
ক্রীতদাস-জীবনের লাঞ্ছনার মধ্যে থেকে তিনি নিজের এবং
স্বজাতিব উন্নতির জন্য জীবনব্যাপী সাধনায় সার্থকতা লাভ
করেছিলেন, তার অপরূপ কাহিনী তিনি তব জগৎ-খ্যাত
আত্ম-চরিতে বর্ণনা কবে গিয়েছেন। তাঁব আত্ম চরিত “আপ,
কম শ্রেভাবি” (Up From Slavery) প্রত্যেক ছাত্রের
পড়া উচিত। অসম্ভব কষ্ট স্বীকার করে তাঁকে লেখাপড়া
শিখতে হয়েছিল। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী
পাবার পর, তিনি স্থির করলেন যে, সেই নিবর নিগ্রোজাতির
শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং অসাধ্য-সাধনের পর তিনি
নিগ্রো ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য বিখাত হাপটন ইনষ্টিটিউট
এবং টাকাজী ইনষ্টিটিউটের প্রতিষ্ঠা করেন।
টাকাজী ইনষ্টিটিউট আজ একটা বিরাট জাতির মুক্তির
ছােট লােকের ছেলে
সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া বহু বিদ্যালয় তিনি প্রতিষ্ঠা
করেন এবং নিগ্রোদেব শিক্ষা-ব্যবস্থার জন্য সমস্ত জগৎ থেকে
তিনি একটা স্থায়ী অর্থভাণ্ডাব গড়ে তােলেন।
১৯২৭ সাল
পর্যন্ত এই অর্থভাণ্ডার থেকে নিগ্রো ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য
চাব হাজাব শিক্ষায়তন গড়ে ওঠে এবং সেই বিবাট কীর্তির মূলে
ছিল, এই একটি লােকেব অনন্যসাধাবণ সাধনা ও প্রতিভা।
আজ এই সব প্রতিষ্ঠান থেকে নিগ্রোদেব মধ্যে বড় বড় ডাক্তার,
উকীল, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, এবং আবিষ্কারক
জন্মগ্রহণ করছেন। কয়েক বছর আগে যাদের পিতা-মাতারা
নিজেদের বয়স পর্যন্ত বলতে পাবতেন না, আজ তাদের মধ্যে
প্রায় দুশাে সংবাদপত্র নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। প্যেরীর
সঙ্গে উত্তব-মেরুতে যাবা প্রথম পৌছেছিলেন, তাঁদের মধ্যে
একজন দুঃসাহসী নিগ্রো আবিষ্কাবকও ছিলেন। তার নাম
হ’ল ম্যাট হেন্সন্। আল জনস, এলা শেফার্ড প্রভৃতি
জগৎখ্যাত নিগ্রো গায়কদেব সঙ্গীতে আজ যুরােপ ও আমেরিকা
মুখবিত।
৪
এই জাগরণ-উন্মুখ জাতির মধ্যে যে সব কবি ও সাহিত্যিক
জন্মগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে উইলী স্যু’বয়ের নাম
বিশ্ব-সাহিত্য-সমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। আমেবিকার
শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যে আজ তাঁর নাম পরিগণিত হয়।
তাঁর জগৎখ্যাত গ্রন্থ “দি সােল অব এ ব্ল্যাক-ফোক” (The
Soul of a Black-Folk ) সমস্ত যুবােপ এবং আমেরিকাকে
সচকিত কোরে তােলে। নিগ্রোদের অন্তর-বেদনাকে এমন ভাবে
আর কেউ রূপ দিতে পারে নি। সেই বেদনার অপূর্ব ভাষা
তার লেখনী থেকে বেরিয়েছে-
"Straining at the armposts of thy throne, we
our shackled hands and charge thee,
O God, by the bones of our stolen fathers, by the
tears of our dead mothers-surely Thou, too, art
not white, O Lord, a pale, bloodless, heartless
raise
Thing ।”
—তােমার সিংহাসনের স্পর্শলাভের জন্য, হে প্রভু, এই
আমাদের শৃঙ্খলিত বাহু আজ উত্তোলন করেছি। অপহৃত
পিতৃ-পিতামহদের বিলুপ্ত অস্থির দোহাই, জননীদেব বিস্মৃত
ছােট লােকের ছেলে
অশ্রুর দোহাই, হে বিশ্ব-প্রভু, আজ তােমাকে জিজ্ঞাসা করি,
তুমিও কি শ্বেত-বর্ণের ? তুমিও কি এদের মত এমনি শ্বেতাভ,
হৃদয়হীন, করুণাহীন ?
নিগ্রো জাতির সম্মিলিত কংগ্রেসে ডু’বয় অবহেলিত
জাতিকে আহ্বান করে সেদিন বলেছিলেন, “What you are,
I was, what I am you may become !"
-“তােমরা আজ যা আছ, একদিন আমিও তাই ছিলাম।
আমি আজ যা হয়েছি, তােমরাও একদিন তাই হতে পার।”
এই চরম আশ্বাস-বাণীর পিছনে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিফল,
জীবনের নিঃশব্দ আবেদন রয়েছে।
আজকের জগতে যাবা দেশে দেশে সমাজের এবং রাষ্ট্রের
শীর্ষস্থান অধিকার কবে আছেন, তাদের অনেকেই একদিন
একান্ত অবজ্ঞাত অবস্থায় সমাজের অতি নিম্নস্তবে জন্মগ্রহণ
কবেন। কারুর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল কামারশালায়,
কেউ খেলা কবে বেড়িয়েছে কুলী-ধাওডায়, কাউকে বসে
থাকতে হয়েছে সবাইখানার দবজায়। কিন্তু সেই অবজ্ঞাত
অবস্থা থেকে, তাঁদেব মধ্যে থেকেই এমন সব লােক তৈরী
হয়েছেন, যাঁদেব অঙ্গুলী হেলনে আজ সমস্ত পৃথিবী টলমল করে
ওঠে।
ইতালীব পিদাপ্পিয়াে গ্রামেব এক ছােট্ট সবাইখানাব পাশে
গ্রামের কামাবশালা। সেই কামাবশালায় বসে একটী দুবন্ত
ছেলে বাপের সঙ্গে লােহা পিটোয়। কে জানতাে সেই ছেলে
হবে মুসােলিনী, একটা জাতিব ভাগ্য-বিধাতা ?
কিছুদিন আগে মি হার্ডিঞ্জ
হার্ডিঞ্জ ছিলেন, আমেবিকার
যুক্তরাষ্ট্রেব সভাপতি।
জগতের মধ্যে এ রকম
রকম গৌরব
এবং সম্মানের আসন নেই বল্লেই চলে। তিনি ছেলেবেলায়
ছােট লােকের ছেলে গরু-ছাগল চরিয়ে বেড়াতেন। সারাদিন মাঠে মাঠে রাখাল- বালকদের মত গৰু-ছাগল চবিয়ে রাত্রিতে বাড়ী ফিরে এসে তিনি পড়তে বসতেন। অন্তরে তার অদম্য বাসনা ছিল যে তিনি সকলের মধ্যে সকলের সমান হবেন, লেখাপড়া শিখে সমাজের ওপরে গিয়ে উঠবেন। এক কৃষকের কাছে তিনি কাজ করতেন। গৰু চরাতে হতাে, গরুর জন্যে খড় কুটতে হতো, ঘাস কাটতে হতাে। কিন্তু এ সবের মধ্যে তিনি একাগ্রচিত্তে লেখাপড়া শিখে চলেছিলেন। নিজে নিজে তিনি এতদূর অগ্রসর হলেন যে তিনি এক জায়গায় একটা স্কুল মাষ্টারী জুটিয়ে নিলেন। স্কুল মাষ্টারী করতে করতে তিনি প্রেসের কাজ শিখতে লাগলেন উদ্দেশ্য, খবরেব কাগজ বাব করবেন। তার জন্যে তিনি নিজেকে গড়ে তুলতে লাগলেন, একেবারে নীচে থেকে। একটা প্রেসে তিনি প্রথম কম্পােজিটরের কাজ শিখতে লাগলেন। কম্পােজিটবে কাজ শিখে তিনি একে একে প্রেসের অন্য সমস্ত বিভাগের কাজও হাতে কলমে শিখে ফেল্লেন। তখন তিনি একখানি খবরের কাগজ বার করলেন। এই খবরের কাগজের লেখা থেকে তাঁর জীবনের একটা নতুন ধারার সূত্রপাত হলাে। দেখতে দেখতে ভিড় ঠেলে তিনি ধাপের পর ধাপ এগিয়ে চলতে লাগলেন—একেবারে সবার নিচে থেকে সবার ওপরে।
ছােট লােকের ছেলে ফ্রান্সের ভূতপূর্ব প্রধান মন্ত্রী ব্রিয় ছিলেন একজন সামান্য সরাইওয়ালার ছেলে। হের ইবার্ট, মহাযুদ্ধের পর যিনি জাৰ্মাণ রিপাব্লিকের প্রেসিডেন্ট হন, তিনি দরজীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। যেকোশ্লোভাকিয়ার জগৎ-খ্যাত প্রেসিডেন্ট ডাঃ মাসারিক মুসসালিনীর মত একজন সামান্য কর্মকারের ছেলে। বর্তমান কশিয়ার ভাগ্য-বিধাতা স্টালিন, ইংলণ্ডের ভূতপূর্ব-প্রধান মন্ত্রী রামসে ম্যাকডােনাল্ড, তারা দীন-মজুরের ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তারা সকলেই তাদের কর্মের দ্বারা, তাঁদের সাধনার দ্বারা, তাদের চরিত্রের দ্বারা যে গৌরব অর্জন করেছেন, তা কোন জন্মসূত্রে পাওয়া সম্ভব নয়। ৫৪
১৪
আজ আমাদের সামাজিক জীবনে, যাদের আমরা অস্পৃশ্য
করে রেখেছি, তাদের মধ্যে এক নতুন জাগরণের স্পন্দন দেখা
দিয়েছে। সেই আন্দোলনের নেতা হলেন ডাঃ আম্বেদকর।
হিন্দু-সমাজের এই সুচিন্তিত অপমান-আঘাতের প্রতিবাদে
তিনি তার স্বজাতীয়দের নিয়ে ধৰ্ম্মান্তব গ্রহণ করতে চলেছেন।
তাব এই ব্যবহারে অনেকেই ক্ষুন্ন হয়েছেন, অনেকে আশঙ্কিত
হয়েছেন। অনেকে বলেছেন, এ ভাবে ধৰ্ম্মের বন্ধন ছিন্ন কবে
যাবাব কি প্রয়ােজন ? মানুষ হযে মানুষের কাছে, শুধু
সমাজের নিম্নস্তরে জন্মগ্রহণ কবার জন্যে, যে অপমান, যে-গ্লানি
এবং যে-বাধা তাকে পদে পদে পেতে হয়েছে, তাতে যে-
মানুষের মন বিদ্রোহী না হয়, বুঝতে হবে যে সে-মানুষের কোনও
প্রয়ােজন নেই। ডাঃ আম্বেদকর তার নিজের মুখে তার জীবনী
যে-ভাবে বলেছেন, এখানে তাই তুলে দিলাম,
“রত্নগিরি জেলার সামান্য এক গ্রামে আমি জন্মগ্রহণ
করি। ছেলেবেলায় গ্রামে যতটুকু সম্ভব ততটুকু লেখাপড়া
শিখি। এখানে আপনাদের মনে রাখতে হবে, আমি জন্মগ্রহণ
করেছি, যাদের আপনারা বলেন অস্পৃশ্য জাতি, তাদের মধ্যে।
হােট লােকের ছেলে
সুতরাং স্কুলে আমি আমার সহপাঠীদের সঙ্গে এক জায়গায়
বসতে পেতাম না। আমি এবং আমার মত যারা, তাদের
স্কুল-ঘরের বাইরে অপেক্ষা করতে হতাে। যদি কোন শিক্ষকের
দয়া হতো, তিনি পড়াতেন, নইলে কোন কোন শিক্ষক এসে
নামমাত্র জিজ্ঞাসা করে যেতেন, আমরা বাড়ীতে পড়েছি কি না।
এই ভাবে আমাদের লেখাপড়া শিখতে হয়েছে।
আমার বাবাকে এই সময় সাব যেতে হয়। সাবা
হাইস্কুলে আমাকে ভর্তি কবে দেওয়া হলাে, কিন্তু অন্য সব
ছেলেদের সঙ্গে এক বেঞ্চে আমি বসতে পেতাম না। আমাকে
ক্লাসের শেষে আলাদা এক বেঞ্চে বসতে হতো। কারণ, আমি
অস্পৃশ্য জাতির ছেলে।
আমার সংস্কৃত পড়তে বিশেষ ইচ্ছে হয়, কিন্তু সংস্কৃতের
যিনি পণ্ডিত ছিলেন, তিনি আমাকে দেব ভাষা শিক্ষা দিতে রাজী
হলেন না । কারণ, আমি অস্পৃশ্য জাতির ছেলে।
আমাকে বাধ্য হয়ে পার্সী পড়তে হলাে।
আমার বাবা সবকারী সৈন্য-বিভাগে কাজ করতেন এবং
পঞ্চাশ টাকা করে পেনসন পেতেন। অনেক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত
হিন্দু-ভদ্রলােকের চেয়ে আমার বাবা ঢেব বেশী সম্রান্ত ছিলেন।
কিন্তু জীবনে তিনি নাপিতকে দিয়ে ক্ষৌরকাৰ্য করাতে পারেন
নি। যখনই চুল কাটবার দরকার হতাে, তখন আমার বােনই
আমাদের নাপিতের কাজ করত।
ছােট লােকের ছেলে
সারা-তে ক্রমশ আমাদের জীবন-যাত্রা নির্বাহ করা
সামাজিক দিক থেকে দুর্বহ হয়ে ওঠায়, আমরা বােম্বেতে চলে
এলাম। সেখানে আমি এলফিনস্টোন কলেজে ভর্তি হলাম।
ভাগ্যক্রমে সেই কলেজে পড়বার সময় আমার সঙ্গে মহামান্য
বরােদার গায়কোয়াডের সাক্ষাৎ হয় এবং তিনি আমার পড়বার
জন্যে একটা বৃত্তির বন্দোবস্ত করে দেন।
বি-এ পাশ করার পর আমি বরােদাব সৈন্য বিভাগে
কাজ পেলাম। আমাদের স্বজাতীয় লােকদেব জন্যে
একটা আলাদা ব্যারাক ছিল। সেইখানে আমার বাসস্থান
হলাে।
কিন্তু সৈনিকের কাজে আমার মন বসলো না। আমি
গায়কোয়াড়ের বৃত্তিতে পড়বাব আমেরিকা যাত্রা
করলাম। আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি
পি-এইচ, ডি উপাধি অর্জন করে দেশে ফিলাম।
দেশে ফিরে এসে আমি কি অভিনন্দন পেলাম জানেন ?
বরােদায় বাস করবার জন্যে একটা বাড়ী বা একখানি ঘব আমি
পাই নি। কারণ আমি অস্পৃশ্য জাতির লােক।
অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করলাম। আশা ছিল,
অধ্যাপক হলে থাকবার জন্যে বাসস্থান পাবে। কিন্তু উত্তরে
জানতে পারলাম যে, গায়কোয়াড চান যে আমি যেন তার
হিসাব-বিভাগে কাজ করি।
জন্যে
ছােট লােকের ছেলে
কিন্তু মানুষ আমি, বাসস্থান না হলে থাকি কোথায় ?
যেখানেই যাই, সেখান থেকেই ফিরে আসতে হয়। কেউ-ই
আমাকে জেনে-শুনে বাড়ীতে থাকতে দিতে চায় না। অবশেষে
থুবতে যুবতে এক পাগী ধবমশালায় এসে পড়লাম। সেই
ধরমশালা দেখা-শােনা করবার ভার যার ওপর ছিল, সে
আমাকে একটা ঘরে থাকতে দিতে রাজী হলো, কিন্তু তার
সর্ত হলাে যে আমাকে নাম বদলে পাসী নাম নিয়ে থাকতে
হবে।
অগত্যা তাই কবতে হলাে। পার্সী নাম নিয়ে সেই ধরম
শালাব একটা ঘরে আশ্রয় পেলাম, কিন্তু বেশী দিনের জন্য
নয়। কেমন করে একজন পার্সী জানতে পারলাে যে আমি
পার্সী নই, একজন অস্পৃশ্য জাতিব লােক, ছদ্মনাম নিয়ে
সেখানে আছি। হঠাৎ দেখি একদল পাসী লাঠি নিয়ে
আমার ঘরের সামনে জমায়েৎ হয়েছে। তাদেব হুকুম, সেই
দণ্ডে ঘর ছেড়ে চলে না গেলে তারা আমায় সেইখানেই
মেরে ফেলবে। তাদের হাতে পায়ে ধরে বল্লাম, একুনি
কোথায় যাব ? তারা যেন দয়া কবে আমাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
সময় দেন।
তারা তাতে সম্মত হলে, আমি ধরমশালা থেকে বেরিয়ে
গিয়ে সােজা স্যামুয়েল যােশীর সঙ্গে দেখা করলাম। একসময়ে
তিনি আমাকে তার সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু
৫
ছোট লােকের ছেলে
সমস্ত ব্যাপার বলতে, তিনি আমাকে আশ্রয় দিতে সম্মত
হলেন না।
সেখান থেকে মিঃ কুদাল্কারের কাছে গেলাম। তিনি
আমাকে থাকতে দিতে রাজী হলেন বটে, কিন্তু সেইসঙ্গে
জানালেন যে, যদি চাকবে একবার জানতে পারে, তাহলে
তাব। সকলে কাজ ছেড়ে চলে যাবে, আব চার পাওয়া
যাবে না ।
দেখলাম, নিরুপায় ।
আমি বরােদা ত্যাগ করলাম। বরােদা ত্যাগ করে, সমস্ত
ঘটনা পত্র-যােগে গায়কোয়াডকে জানালাম। তিনি নিজে
আমাকে ববােদয় ফিরে আসবাব জন্যে লিখলেন। বরােদায়
ফিবে গিযে ষ্টেট গেষ্ট হাউসে উঠলাম। সেখানে কুডি দিন
ছিলাম। প্রতিদিন ছ' টাকা করে আমাকে দিতে হতো।
কিন্তু মহামান্য গায়কোয়াডের দর্শন কিছুতেই পেলাম না।
অগত্যা আবার ফিরে যেতে হলাে।
আপনারা হয়ত বলবেন, এ সব বহুদিন আগেকার কথা।
তবে এই মাস কয়েক আগেকার কথা শুনুন। সােপালাতে
আমাদের এক সভা ছিল বলে আমাকে সােপাল যেতে হয়।
একটা ট্যাক্সীওয়ালার সঙ্গে আমাদের ঠিক হয় যে, সে
আমাদের কাজে যাতায়াত করবে এবং তাকে পঁচিশ টাকা
অগ্রিম দেওয়া হয়। সে সেই পঁচিশ টাকা অগ্রিম নিয়েই
৫৯
ছোট লােকের ছেলে
পালিয়ে যায়। একটীও টোঙ্গাওয়ালা আমাদের নিয়ে যেতে
রাজী হলাে না। বােম্বেতে হিন্দু নাপিতেরা আমাদের
কৌৱকাৰ্য্য করে না এবং মুসলমান নাপিতে সুবিধা বুঝে যা
দাবী করে, তা না দিলে তারা ক্ষুবে হাত দেয় না। যেদিন
বরােদায় আশ্রয়ের অভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে,
সেদিনের কথা স্মরণ করলে, আজও চোখে জল আসে।”
হিন্দু পুরাণে বামচন্দ্র গুহক চণ্ডালের সঙ্গে মিতালী কবেন,
এবং সেই কাহিনী পড়ে সাত্ত্বিক হিন্দু চোখ সজল হয়ে ওঠে,
কিন্তু হিন্দুর জীবনে গুহক চণ্ডাল চণ্ডালই ।
কিন্তু সকলেব চেয়ে আশ্চর্যোব ব্যাপাব যে, আমাদের দেশে
যত সাধু-সজ্জন এব° মহাপুৰুষ জন্ম গ্রহণ কবেছেন,
সকলেই এই জাতিগত ভেদাভেদেব বিৰুদ্ধে কথা প্রচার কবে
গিয়েছেন। মহাপুৰুষ কবীব তার একটী দোহাতে লিখছেন,
“কীব তেবে জাতকো সব-কোই হাসনহার
বলিহারী ওয়া জাতকে। জো সিমবে সৃজন হার।
ধরণী আকাশ-কী কারুগাহ, বানায়ী
চন সুরজ দুই নাল চালায়ী। ।।
কবীর জাতিতে ছিলেন জোলা। তাই লােকে তাকে উপহাস
করতো, জোলাব ছেলে আবার ধৰ্ম্ম-কথা বলে। সেই সব
কথা শুনে কবীব ওপরের দোহাটী লিখেছিলেন। সেঁহাটীর
মানে হলো,
“ওবে কবীব, তােব জাত নিয়ে তােকে সবাই উপহাস
ছােট লােকের ছেলে
করছে। বলিহারী ঐ জাতের আদি-পুরুষকে যে স্মবণ কবে—
কারণ সেই ভগবান স্বয়ং-ই তাে একজন শ্রেষ্ঠ তাঁতী। ধরণী
এবং আকাশকে কাবখানা তৈরী করে তিনি চঁাদসূযের দুই
মাকু হরদম্ চালাচ্ছেন।”
পঞ্চদশ শতাব্দীর একেবাবে গােড়ার দিকে ভারতবর্ষে
একজন মহাপুৰুষ জন্মগ্রহণ কবেন, তার নাম হলাে রামানন্দ।
তিনি ভেদাভেদের ঘােরতর শত্রু ছিলেন। তিনি পরম আনন্দে
উপযুক্ত বিবেচনা কবলে সকলকেই দীক্ষা দিতেন এবং তার
শিষ্যের মধ্যে তথাকথিত অস্পৃশ্য জাতীয় লােকের সংখ্যা খুব
বেশী ছিল। তার সেই অস্পৃশ্য জাতীয় শিষ্যেরা ভারতের
মধ্যযুগকে তাদের চরিত্র এবং সাধনায় আলােকিত কবে
আছেন। কবীর হলেন তারই শ্রেষ্ঠ শিষ্য ।
কবীরের জন্ম সম্বন্ধে নানারকমের কিম্বদন্তী আছে। তার
মধ্যে বহু-প্রচলিত এক কিম্বদন্তী হলাে, কবীর কাশীর এক
বিধবা ব্রাহ্মণকন্যার পুত্র। ব্রাহ্মণকন্যা
ব্রাহ্মণকন্যা জন্মমাত্রই পুত্রকে
কাশীর ‘লহব তালাব’ নামে যে পুষ্করিণী আছে, তাতে একটা
পদ্মপাতায় শুইয়ে ভাসিয়ে দেয়। সকাল বেলা নিমা বলে
এক জোলা জাতীয় স্ত্রীলোেক আর তার স্বামী নুর আলী
সেইখান দিয়ে এক বিয়ের নিমন্ত্রণে যাচ্ছিল। তৃষ্ণার্ত হয়ে
৬২
ছোট লােকের ছেলে
সেই পুকুরে জল খেতে গিয়ে নিমার দৃষ্টি পদ্মপাতায় সেই
সদ্যজাত শিশুর উপর পড়লাে। শিশুব সুন্দর সুরত (ঐ)
মােহন-মুরত ( মূর্তি ) এবং কমল-নৈন” (নয়ন) দেখে জোলা
দম্পতি শিশুটীকে তাদের ঘরে নিয়ে গিয়ে মানুষ করতে
থাকে।
পদ্মপাতা থেকে কুড়িয়ে এনে, তারা ছেলেটিকে নিজের
ছেলের মতই মানুষ কবতে লাগলাে। যথারীতি নামকরণের
সময় কাজী সাহেবকে ডেকে ছেলের নামকৰণ কৰা হলাে।
কাজী সাহেব কোরাণ খুলতেই তার প্রথম দৃষ্টি পড়লাে “কবী”
শব্দটীর ওপর। তিনি ছেলেটীব
তিনি ছেলেটী নাম রাখলেন, কবীর।
“কবীর” মানে হলাে, মহান, পরমেশ্বর।
কাশী হিন্দু প্রধান জায়গা। মুব আলীব যাবা প্রতিবেশী
তারা সকলেই হিন্দু! বালক কবীব
বালক কবীব হিন্দু ছেলেমেয়েদের
সঙ্গেই খেলা কবে, তাদের সঙ্গে ঘুবে বেড়ায়।
তার জীবনের আসল ঘটনা সম্বন্ধে এখনও আমরা বিশেষ
কিছু জানি না। যেমন করে রাত্রি বেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে
থাকে, গােপনে ফুলের বুকে মধু জমা হয়, আমবা কেউ-ই
জানতে পাবি না, যেমন আমরা জানি না কেমন কবে কোথা
থেকে কুঁডির বুকে কে এনে দেয় সুবাস, তেমনি জানি না
মানুষের মনে কেমন করে কখন জাগে দিব্য জ্ঞান, যার সুবাদে
দিদিগন্ত যায় ভরে।
ছােট লােকের ছেলে
কবীব লেখাপড়া জানতেন না কিন্তু অপূৰ্ব্ব কবিতার
মধ্যে দিয়ে তিনি সহজ জ্ঞানের যে পথ দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন,
তা ভাবতেব সভ্যতাৰ সঙ্গে অবিনাশী হয়ে থাকবে।
জানি না, কোথা থেকে কেমন ভাবে সে দিবা-জ্ঞান তার অন্তরে
এসেছিল।
তিনি লেখাপড়া জানতেন না বটে কিন্তু অন্তরে ছিল
তীব্র জ্ঞানের পিপাসা ।
তখন গুৰু বামানবে না ভাবতে
এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত ধ্বনিত হচ্ছে।
তিনি ঠিক কবলেন যে, তিনি বামানন্দকেই তব গুরু করবেন,
তাব কাছ থেকেই তিনি দীক্ষা নেবেন।
এই ব্যাপার সম্পর্কে একটা গল্প আছে। বামানন্দ
পৰম আনন্দে কবীবকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন
মুসলমান জেলাকে ব্রাহ্মণ বামানন্দ যে অনায়াসে দীক্ষা দিলেন,
এ কথা মেনে নিতে জাত-ওয়ালাদেব মনে লাগে। তাই
তাব এই দীক্ষা-দেওয়ার ব্যাপার নিয়ে
গল্পেব সৃষ্টি
কবলেন।
গুক বামানন্দ তাে মুসলমান জেলাকে তার শিষ্য করতে
পাবেন না। কিন্তু কবীবের মন শােনে না, তিনি রামানন্দের
কাছেই দীক্ষা নেবেন। সাক্ষাৎভাবে বামানন্দ তাকে দীক্ষা
দিতে অস্বীকার করলেন। তখন কবীব এক কৌশল অবলম্বন
৬৪
ছােট লােকের ছেলে
তিনি জানতেন যে রামানন্দ প্রত্যহ সূর্যোদয়ের আগে আধ
অন্ধকারে গঙ্গাস্নান সেরে আসেন। একদিন গঙ্গার ঘাটের
সিডিতে কবীর পড়ে রইলেন। আধ-অন্ধকারে দেখতে না
পেয়ে রামানন্দ কবীরের গায়ের ওপর পা দিয়ে ফেললেন।
একটা মানুষের গায়ে পা লেগেছে বুঝতে পেরেই রামানন্দ বলে
উঠলেন, “রাম রাম।”
তখন কবীর ভূমি-শয্যা ছেড়ে উঠে বল্লেন, হে গুক
রামানন্দ, এই তো তােমার দীক্ষা পেলাম।
কবীর যতনি জীবিত ছিলেন, তিনি প্রচার করে গিয়েছেন,
ভগবানের রাজ্যে ভেদ নেই।
প্রতিদিন তিনি দু’খানি করে কাপড় বুনতেন। ভগবান
যাকে যে কাজ করতে দিয়েছেন, সেই কাজ করেই সে পারে
ভগবানের পূজা করতে। একখানি কাপড় গরীব-দুঃখীদের
দান করতেন, আর একখানি বেচে
একখানি বেচে সংসার চালাতেন।
প্রতিদিন বাজারে গিয়ে তিনি নিজে কাপড় বেচতেন। কিন্তু
তাতে তাঁর ধৰ্ম্ম-সাধনাব কোন ব্যাঘাত ঘটে নি। আজ
কবীরের নামে ভারতের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত
পর্যন্ত প্রত্যেক ভারতবাসীর মাথা শ্রদ্ধায় নত হয়। জোলার
ঘরে কে জন্মেছিল, সে কথা আজ তার অপরূপ জীবনের মধ্যে
কোথায় হারিয়ে গিয়েছে।
যখন তাঁর মৃত্যু হয়, তখন কথিত আছে যে, তাঁর হিন্দু এবং
ছােট লােকের ছেলে
মুসলমান শিষ্যদের মধ্যে তার শবদেহ নিয়ে ঝগড়া বেধে যায়।
হিন্দু শিষ্যরা বলেন যে, তাঁরা কবীরের দেহ হিন্দুশাস্ত্রমত দাহ
করবেন ; মুসলমান শিষ্যরা বলেন তারা কবীরের দেহ যথারীতি
সমাহিত কববেন। এই নিয়ে যখন দুই দলে তুমুল ঝগড়ার
উপক্রম হলাে, তখন তঁাব মৃতদেহেব আবরণ সরিয়ে দেখা
গেল যে, সেখানে তার মৃতদেহ নেই। তার বদলে একরাশ
সদ্যফোটা দুগ্ধ-শুভ্র পদ্মফুল ।
জগতের সমস্ত উত্থান-পতন, সমস্ত দলাদলি এবং বিরােধের
মাঝখানে সেই জোলাব ঘরের ছেলেব জীবন অম্লান শতদলেব
মত আজও ফুটে বয়েছে। তার মুখের কথা, প্রাণের বাণী, লক্ষ
লক্ষ তাপিত বুকে অমৃত সান্ত্বনা এনে দিচ্ছে।
১৬
গুরু বামানন্দেব আর একজন শিষ্য
আর একজন শিষ্য ছিলেন, যিনি
সেদিনকাব উচ্চশ্রেণীর সমাজে স্থান পান নি, কিন্তু আজ যিনি
সকল মানুষের মনেব আসন দখল কবে আছেন। তার নাম
হলাে ইদাস। একদিন ব্রাহ্মণেরা তাঁর সঙ্গে একাসনে বসতে
বাজী হন নি, আজ ভাবতেব সমস্ত ব্রাহ্মণ গদগদ চিত্তে তঁার
কাহিনী পড়ে অশ্রুবিসর্জন কবেন ।
কবীর ছিলেন তাতী, রুইদাস ছিলেন আরও হতভাগ্য।
তিনি ছিলেন চামার। চামারের ঘরে তিনি জন্মেছিলেন।
কিন্তু কোথা থেকে কে বলতে পাবে, সেই চামাবের ঘরে জন্মে
তিনি অন্তরে নিযে এসেছিলেন অনন্যসাধাবণ ভগবদু-প্রেম।
জুতা সেলাই করে, জুতাে তৈবী কবে তার দিন চলতাে।
তাতেই পেতেন তিনি প্রভূত আনন্দ। সেই কাজের মধ্যে
তিনি রাতদিন ডুবে থাকতেন।
একদিন কথিত আছে যে, রুইদাস যখন আপনার মনে
জুতাে সেলাই করছেন, সেই সমষ এক সন্ন্যাসী তার দ্বারস্থ
নিকট থেকে কিছু প্রার্থনা করতে বললেন।
সন্ন্যাসীব দিকে চেয়ে রুইদাস বল্লেন, প্রভু, আমার তাে কোন
প্রার্থনা নেই। জুতাে তৈরী কবি, তাই কেচে যা পাই, তাতে
হয়ে, তাঁব
ছােট লােকের ছেলে
আনন্দে দিন চলে যায়। চাইবাব মতো কোন প্রার্থনাই
আমার নেই।
“সন্ন্যাসী তবু বল্লেন, না তােমাকে চাইতেই হবে। তােমার
মত সাধু লোেক কেন এত কষ্ট কবে জীবন কাটাবে। এই
নাও, আমি তােমাকে একটুকবে পাথব দিচ্ছি, এই পাথর যাতে
হোয়াবে, সেই জিনিসই সােনা হয়ে যাবে ।
এই বলে সন্ন্যাসী, ইদাসকে দেখাবার জন্যে, যে-যন্ত্র দিয়ে
সে জুতাে সেলাই করে, সেই যন্ত্রটীতে সেই পাথব ছোয়ালেন।
দেখতে দেখতে লােহার জিনিস সােনা হয়ে গেল।
তাই না দেখে রুইদাস চীৎকার কবে বলে উঠলেন, একি
করলে সন্ন্যাসী! একি আমার সর্বনাশ কবলে । আমার
লােহার জিনিসটা নষ্ট কবে দিলে । আমি কাজ করবাে কি
দিয়ে ।
কিন্ত চেয়ে দেখেন, সামনে কেউ কোথাও নেই। হাতে
তার সেই পরশমণি !
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে, রুইদাস যখন জুততা সেলাই
করছিলেন, সেই সময় আবার সেই সন্ন্যাসীর আবির্ভাব
হলাে।
শান্ত কণ্ঠে সন্ন্যাসী রুইদাসকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন,
রুইদাস, তােমাকে পরশমণি দিয়ে গেলাম, তুমি আবার জুতাে
সেলাই করছে কেন ? সে পরশমণি কোথায় ?
ছােট লােকের ছেলে
বিনীত কণ্ঠে কইদাস বল্লেন, প্রভু, তোমার পরশ-মণি তুমি
ফিরিয়ে নিয়ে যাও। এই চালে তাকে খুঁজে রেখেছি।
এমনি নিলোভ, এমনি ভক্ত ছিলেন রুইদাস। তাঁর অপূৰ্ব্ব
জীবনের কথা শুনে দলে দলে লােক তঁাব আশ্রয় নিতে লাগলাে ।
এক বাণী ভাব মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে তব শিষ্য হন। রাণীর সেই
অপকীৰ্তিব ফলে ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। একদিন রাণী
এক বিবাট ব্রাহ্মণ-ভােজনের আয়ােজন করলেন। সেই ভােজে
রুইদাসকেও আমন্ত্রণ কবলেন। ব্রাহ্মণেরা যখন জানতে পারলেন
যে, ইদাসে সঙ্গে একাসনে বসে খেতে হবে, তখন তারা সকলে
আসন পবিবর্তন কবে অন্যত্র বসবার আয়ােজন করতে লাগলেন।
কিন্তু যেখানে বসতে যান, সেইখানেই তারা দেখেন, তাদের পাশে
রুইদাস বসে আছেন।
কইদাস সর্বত্র বয়েছেন, সৰ্বলােকে এবং সর্বকালে।
তাকে বাদ দিয়ে, হে ব্রাহ্মণ, তােমার পংক্তি ভােজন সম্ভব
নয়!
শেষ
ও
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.