Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Diwan-e-makhfi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দিওয়ান-ইমখী
•••(জেক্উন্নিসা)...
বিজয়কৃষ্ণ নােম
প্রকাশক
কেদারনাথ চৌধুরী
নৈহাটী, (২৪ পরগণা)
মূল্য-১১
প্রিন্টারপ্রভাতচন্দ্র রায়
ক গৌরাঙ্গ প্রেস,
৫।৬নং চিন্তামণি দাশ লেন, কলিকাতা
অতীতের গর্ভশায়ী চিন্তা আর কৰ্ম্মের বাঁধন,
অনাগতে প্রসারিতে সাধে যারা প্রাণের সাধম
পার্থিবারে ব্রহ্মপুত্রে নিখিলের নরনারী-হিয়া,
মহিমার ধ্বংসস্তুপে মুক্তিমন্ত্র ফিরিছে খুঁজিয়া ;
মহান আদর্শ আর দার্শনিক সত্যের শিখরে
যাদের অগস্ত্য-তৃষা পিপাসার বারিধারা ধরে;
জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে চাহে যারা মহত্বের জয়,
দল বাঁধি দলান্তরে করে নাকো ঘৃণা কিম্বা ভয় ;
নারীহৃদি-উৎস-পথে উৎসারিত সুমহতী বাণী
তাহাদের করপদ্মে সমর্পিছে ছছাট এক প্রাণী।
শ্রীবিজয়কৃষ্ণ ঘােষ
No text on this page.
জেব-উন্নিসার উদ্দেশে
তােমার নিকুঞ্জ আজি জনশূন্য, সম্রাট-নন্দিনি !
নাচিয়া ছুটিত যেথা শ্যামপত্র তরুবীথি দিয়া
চলােৰ্মি-মুখরা, ক্ষীণা, গতিশীলা-কানন-তটিনী,
আজি সেথা ধূ ধূ মরু ভগ্ন কুঞ্জ-তােরণ বেড়িয়া ;
বিশুদ্ধ গােলাপবাগ ; বুলবুল উড়ে গেছে আজ
স্মৃতি শুধু মধুময় অন্তরীক্ষে করিছে বিরাজ।
তুমি নাই, তবু ভক্ত কহে যেথা ভগবৎ-কথা,
ধর্মপ্রাণ তীর্থকামী বেদীমূলে মেলে যেথা আসি,
বহু পুণ্যকণ্ঠে সেথা কঁপে তব ছন্দের বারতা,
সম্মানিত তব নাম, গান তব সেথা অবিনাশী।
বহে আজো তব বাণী সন্ধানীর নয়নের আগে
সে পরম-পুরুষেরে, রূপ যার ধ্যান-লােকে জাগে ।
বিজাতি, বিভিন্নভাষী—তবু আজ আমরাও তাই
পশি’ সে রহস্যঘন কবিতার উপবনে তব
যেথা তুমি হােমানলে বাসনারে করেছিলে ছাই,
সঙ্গীত-কল্লোলে তব তুলিতেছি ধ্বনি অভিনব।
আশা,-বধি বাক্যজালে, স্বপ্ন তব নিগুঢ় আত্মার,
অমর বিহঙ্গশিশু,অগ্নিপক্ষ,অতীন্দ্রিয়তার ।
No text on this page.
অনুবাদকের নিবেদন ফার্সি ভাষা পড়তে পারবার শক্তি আমার নেই, অথচ জেব-উন্নিসা তার বাণীকে ঐ ভাষাযােগেই প্রকাশ করেছিলেন। এ অবস্থায় ঐ বাণীকে বঙ্গবাণী করে তুলতে গেলে যা করা দরকার, এ পুস্তিকায় তাই করা হয়েছে; অর্থাৎ পাশ্চাত্য চিত্ত তার কবি-আত্মাকে যে রূপ দিয়েছে, তার পরিচয়-গ্রহণ। ঐ পরিচয়কেও ভাষান্তরিত করতে গিয়ে মূলের হুবহু অনুবাদ আমি করিনি—এমন কি, স্থানে স্থানে তাকে নির্মূলও করেছি। তা ছাড়া, যে সমস্ত নাম, নির্দেশ ও ঐতিহ্য বিশেষভাবে জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক সম্পত্তি, তাও যথাসম্ভব পরিহার করে সেই বস্তুকেই লক্ষ্যস্থানীয় করেছি যা’ নামরূপ-মুক্ত বলেই সাৰ্বজনীন। যারা ফার্সি ভাষা জানেন, অথচ ও ভাষার সম্পদ বাংলায় ভাষান্তরিত করার ক্লেশ এড়াতে চান, ইংরাজী ভাষার মধ্যপথে পারস্য-প্রসূনকে বঙ্গভাষায় আহরিত দেখে, যে সস্তা মন্তব্যে তারা অনুবাদককে নগদ বিদায় দিতে চাইবেন, তা হয়তাে—“সাত নকলে আসল খাস্তা।” ও-জাতীয় মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হবার অধিকার রাখিতে, কারণ আসল ও নকলের প্রভেদ সম্পর্কে সতর্কতা আমার ধাতুগত নয়। আমার বিশ্বাস, যাকে আমরা মৌলিক বলি, তারও মূল অন্যত্র থেকে যায় ; আর সে মূল অতীতের কোনাে গ্রন্থে যদি বা নাও হয়, বিশ্বস্রষ্টার গ্রন্থে তাে বটেই। কবি-আত্মার আসল রূপ কোন্ দেশকালের কোন বিশেষ ভাষার অন্তরে ধরা আছে, তা আজ পর্যন্ত অনাবিস্কৃত; এবং আশা করি, অনন্তকাল তা’ অনাবিষ্কৃতই থাকবে। যদি কোনাে রূপান্তরিত কাব্য নিখুতভাবে মূলানুগ না হয়েও, জীবন্তবৎ হয়ে থাকে, তবে ঐ রূপান্তর ব্যর্থ নয় ; অন্যথায় মূলের প্রতি সারমেয়লাঞ্ছন প্রভুভক্তি-সত্ত্বেও তা’ অসার্থক। প্রত্যেক কবিতার শীর্ষদেশে একটী করে' শিরােনাম দিয়েছি । যে পুস্তিকা এ অনুবাদের ভিত্তি, তাতে ওরূপ শিরােনামা নেই। আধুনিক সাহিত্যিক-মণ্ডলে সুপরিচিত, কবি শ্রীযুক্ত সুবােধ রায়, এ পুস্তিকার একটা পরিচয়পত্র লিখে দেওয়ায় সাদরে তা’ গ্রন্থ-কলেবরে রক্ষা করেছি। বিজয়কৃষ্ণ ঘােষ
No text on this page.
কবি-পরিচয় কাব্যপ্রসুন অতিশয় কমণীয় বস্তু। একদেশের মাটি থেকে অন্য দেশের মাটিতে নিয়ে গেলে, প্রায়ই সে বাঁচেনা, আর বাঁচলেও তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তির ঐশ্বৰ্য্য ও মাধুৰ্য্য এমনি হ্রাস পায় যে, সেই টবের ফুলে আর কাগজের ফুলে বড় বেশি তফাৎ, মনে হয় না। কাব্য ও সাহিত্যকে ভাষান্তর করতে গিয়ে তার প্রাণান্তের এই ‘ট্রাজেডি’ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের চোখে পড়ে। এই অবাঞ্ছিত সর্বনাশ থেকে বিদেশী বা বিভাষী কাব্যকে রক্ষা করা যেতে পারে যদি মালী হন দুপটু। আর, তাকেই প্রকৃত বিশেষজ্ঞ ফুলমালী বলা যেতে পারে, যিনি বােটানী পড়ে নয়—ফুলের সাহচৰ্য্য ক'রে ফুলের ভাষা বােঝেন, ফুলের প্রাণস্পন্দন অন্তরে অনুভব করেন। মাটি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনেও ফুলকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার ‘আর্ট’ এই রকম দরদী শিল্পীরাই জানেন। শ্ৰীযুক্ত বিজয়কৃষ্ণ ঘােষ এই রকম একজন কুশলী ও দরদী আর্টিষ্ট ; তার উপর তিনি নিজে কবি। কাব্যের মর্মকথা তাঁর কাছে অতি সহজ সুন্দর ভাবে সুপরিস্ফুট হয়ে ওঠে—সে-কাব্য বিদেশী ভাষায় লেখা হলেও। এর প্রমাণ তিনি বহু- দিন পূর্বেই দিয়েছেন, যদিচ সেদিনের কথা আধুনিক অধিকাংশ পাঠকই জানেন না, বা জালেও ভুলে গেছেন। উপহারের ব্যবসায় বেশ দু'পয়সা করবার আশায় বিদেশী কাব্যানুবাদের ছেলে-ভুলানাে সংস্করণ প্রকাশের রেওয়াজ যখনও চলেনি, তখন ইনি করেছিলেন ওমর খৈয়ামের কাব্যানু- বাদ। বাঙ্গালার কোনাে তরুণ প্রণয়ীর সাকী বা প্রণয়িনীর হাতে হয়তাে সে কাব্যানুবাদ পৌছয়নি, কিন্তু তখনকার লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক ও কবি-প্রমথ চৌধুরী, কালিদাস রায় প্রভৃতি—এখনও সেই কাব্যানু- বাদের মাধুৰ্য্য ও বৈশিষ্ট্য বার বার স্মরণ করেন। বিজয়বাবুর মত সুপ্রাচীন কবির কাব্যানুবাদ সম্বন্ধে আমার মত লােকের এই কয়টি কথা বলবার দরকারই হত না, যদি না তিনি গত ১৩১৪ বছর সম্পূর্ণ নীরব v/ নিশ্চেষ্টর মধ্যে আত্মগােপন করে থাকতেন। তবে আনন্দের কথা এই যে, এতদিন পরে হলেও এই কুনাে কবি নিজের গৃহকোণ ছেড়ে আবার জনসাধারণের সামনে এসে দাড়াচ্ছেন। তঁার ওমর খৈয়াম যে রকম সমঝদারদের প্রশংসা লাভ করেছিল, দিওয়ান-ই-মখ ফী’ও অনায়াসে তা করবে। এই সঙ্গে কবিবরের কাছে আমাদের নিবেদন যে, আবার যেন তিনি দেখা দিয়েই ডুব না মারেন। এখন থেকে মাঝে মাঝে তার দেখা পেলে, শুধু আমরাই নয়, স্বয়ং বঙ্গভারতী যে খুসী হবেন, সে কথা আমরা জোর করে বলতে পারি। ইতি- চুচুড়া পঞ্চমী ১৩৪৪ শ্রীসুবােধ রায় জেব-উন্নিসার সংক্ষিপ্ত পরিচয় শৈল-কাঠিন্যের পটভূমি থেকে নিঃসারিত নির্মল-সলিলা নিঝরিনীর মততা, আজ থেকে প্রায় তিনশাে বছর আগে জন্মলাভ করে’ মােগল- সম্রাট ঔরংজীবের জ্যেষ্ঠা কন্যা জেব-উন-নিসা, আড়াই শশা বছর পূর্বে ভূগর্তে দেহরক্ষা করেছেন। “জেব-উন-নিসা” কথাটীর অর্থ—“ললনা- কুল-গৌরব”—আর এইজন্যেই বােধ করি, তার অসামান্য প্রতিভা যে কাব্য-নৈপুণ্যপ্রকাশ করে গিয়েছে, তার শ্যামলিমা আজো পাণ্ডুর হয়নি। এমন কোনাে ধারাবাহিক জীবনচরিত পাওয়া যায় না যাতে জেব- উন্নিসার জীবন-কাহিনী যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ। এর কারণ, উত্তর- জীবনে পরুষ পিতার কোপ-দৃষ্টির বিষয়ীভূত হওয়ায়, রাষ্ট্র-সভার কোনাে চরিতকারই তার নামটা পৰ্যন্ত মুখে আনতে সাহস করতেন না। শৈশবকাল থেকেই তার মধ্যে মনীষার লক্ষণ দৃষ্ট হয়, এবং তাকে যথােচিত শিক্ষা দেবারও ব্যবস্থা করা হয়। সাত বছর বয়সে তার স্মৃতিশক্তির এতই উৎকর্য ঘটে যে, গােটা কোরাণ-শরিফ তিনি গড় গড় করে মুখস্ত বলে যেতেন। এই ঘটনায় পূলকিত হয়ে উঠে ঔরংজীব নাকি এমন একটা বিরাট ভােজের আয়ােজন করেছিলেন যাতে দিল্লী নগরীর বিশাল ময়দানে রাজ্যের যত সৈন্যসামন্ত ভূরিভােজনে পরিতৃপ্ত হয়, তিরিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দীনদুঃখীদের মধ্যে বিতরিত হয়, এবং সমস্ত অফিস-আদালত দুদিন ধরে বন্ধ থাকে। মতান্তরে, ঐ টাকাটা জেব-উন্নিসাকেই নাকি দেওয়া হয়েছিল—ভােজর আয়ােজনে ব্যয়িত হয়নি। কোনাে বিদূষী মােগল মহিলার হাতে তার শিক্ষাভার পড়ে এবং চার বছরের মধ্যেই আরবী ভাষায় তাঁর দখল জন্মায় ; অতঃপর গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞান অধ্যয়নে প্রবৃত্ত হয়ে ও-দুটী শাস্ত্রেও তিনি দ্রুত উন্নতি লাভ করেন। এক সময়ে কোরাণের ভাষ্য লিখতেও তিনি আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু এ-কার্যে পিতার কাছ থেকে বাধা পান। কৈশাের-জীবন থেকেই -- / তিনি কবিতা রচনা সুরু করেছিলেন, আর তার প্রাথমিক রচনাগুলি আরবী ভাষায় লেখা। জনৈক আরবীয় পণ্ডিত তার ঐ সব রচনা পড়ে অভিমত প্রকাশ করেন—“এগুলি যারই লেখা হক, তিনি ভারতবর্ষীয়, কবিতাগুলি বুদ্ধি-উজ্জ্বল ও জ্ঞানগর্ভ হলেও, এর প্রকাশ-পদ্ধতি ভারতীয় ; বিস্ময়কর শুধু এই যে, একজন বিদেশীর পক্ষে আরবীভাষায় এতখানি দখলও সম্ভব হয়েছে।” এই অভিমত শোনার পর থেকে আপন মাতৃভাষা ফার্সিতেই তিনি আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন। জেব-উন্নিসার শিক্ষক শাহ রুস্তাম গাজী নামক এক পণ্ডিত ব্যক্তি সাহিত্য-রচনায় তাকে উৎসাহিত করেন। শুধু তাই নয়,এ-কবির সাহিত্যিক রুচি নিয়ন্ত্রণেও তার প্রভাব প্রভূত সহায়তা করে। প্রথম প্রথম ইনি গােপনে লিখতেন, কিন্তু শিক্ষকটা ছাত্রীর খাতায় সে-সব রচনার নিদর্শন দেখতে পান, তাতে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বদ্ধমূল বিশ্বাস নিয়ে ওরংজীবকে অনুরােধ করেন, যেন তিনি ভারতবর্ষ, পারস্য কাশ্মীর প্রভৃতি দেশের কবি-কুলকে দিল্লীতে আনাবার ব্যবস্থা করেন, যাতে সম্রাটকুমারীর চারিদিকে একটী কবি-সংসদ গড়ে উঠতে পারে। বিস্ময়কর এই যে, ওরংজীব স্বয়ং কাব্য-অসহিষ্ণু ও কবি বিদ্বেষী হওয়া সত্ত্বেও,এমন কি পাঠাগারে ও অন্তঃপুরে বিদ্যার্থী ও বেগমগণ কর্তৃক হাফিজের গ্রন্থ অধ্যয়ণ বিশেষ ভাবে নিষেধ করলেও,-জেব-উন্নিসার অনুকুলে, নিয়মের চেয়ে ব্যতিক্রমটারই মান রাখেন। জেব-উন্নিসার পরিধিমণ্ডলে যে-সব কবি দেখা দেন,-নাশির আলি, সায়াব, শামসােয়ালি উল্লা, ব্রাহ্মণ ও বেরাজ তাদের অন্যতম। নাশির আলি সিরহিন্দ থেকে আসেন ; দৈন্যের কাছে নতিস্বীকার না করার খ্যাতি তাঁকে বিখ্যাত করে তুলেছিল ; ঐশ্বর্যের দ্বারে হাত পাততে তিনি ঘৃণা বােধ করতেন। তাঁর কাব্য জেব-উন্নিসার প্রশংসমান দৃষ্টির প্রসন্নতা লাভ করেছিল; এমন কি অনেকে মনে করতে যে ইনি জেব উন্নিসার প্রতিদ্বন্দ্বী কবি। মধ্যে মধ্যে জেব-উন্নিসার ‘কবি-পরিষদ’-মণ্ডলে কৃত্রিম কাব্য-সমরের ব্যবস্থা ঘটতত। একজন কোনাে একটী বিশে পদ রচনা করলেন, কোনাে বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন, অথব কোনাে সমস্যার কথা পাড়লেন ; আর একজন হয় অনুবাদ, আর না ০ হয় প্রতিবাদ করে প্রথমকে সমর্থন বা তার বিরুদ্ধতা করলেন। এই ভাবে যে কাব্য-কোলাহল বা বাদানুবাদের সৃষ্টি হত, জেব-উন্নিসা সেই বুদ্ধির যুদ্ধে একরকম অপ্রতিদ্বন্দ্বীই হয়ে উঠেছিলেন। পিতামহ শা-জাহানের ইচ্ছানুযায়ী তিনি ছিলেন,-দারা সেকোর পুত্র, তার জাঠতুতাে ভাই,-সােললমান সেকোর বাগদত্তা; কিন্তু ওরংজীব এ বিবাহ ঘটতে দিতে আগাগােড়ই অনিচ্ছুক ছিলেন। অন্য অনেকেও তার পানিপ্রার্থী ছিল, কিন্তু বিবাহ ব্যবস্থার আগে বিবাহার্থীদের চিত্তসম্পদ তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চাইতেন। এই সব প্রার্থীদের মধ্যে একজন ছিলেন, ইরানের দ্বিতীয় শা আব্বাসের পুত্র মির্জা ফারুখ। জেব-উন্নিসা তাঁকে দিল্লীতে আসতে লেখেন। কেমন করে পারিষদ পরিবৃত হয়ে তিনি দিল্লীতে এসেছিলেন, কেমন করে আপন প্রমােদোদ্যানে অবগুণ্ঠিত-আননা সম্রাট-তনয়া তাকে অভ্যর্থনা করেছিলেন, তার বিবরণী আজো বিদ্যমান। বেচারা ঐ অভ্যর্থনাউপলক্ষে এমন একটা মিষ্টান্নের প্রার্থনা জেব-উন্নিসার কাছে জানায়, যার অর্থান্তর ‘চুম্বন’ও বােঝাতে পারে। ফলে, অপমানিতা কবি প্রত্যুত্তরে জানান—“আপনার প্রার্থিত বস্তুর জন্যে আমাদের পাক- শালায় আবেদন জানাবেন।” অতঃপর, তিনি পিতাকে জানান যে, সুদর্শন ও পদস্থ হওয়া সত্ত্বেও মির্জা ফারুখের আচরণ তিনি:ভদ্রোচিত মনে করেন নি, সুতরাং তাকে পানিদান করতেও প্রস্তুত নন। রাজপ্রাসাদে জেব-উন্নিসার স্বাধীনতা ছিল অবাধ ; সে-সময়কার বহু পণ্ডিতদের সঙ্গে তিনি পত্ৰ-ব্যবহার করতেন, এবং দরকার হলে তাদের সঙ্গে বিচারেও প্রবৃত্ত হতেন। জেব-উন্নিসা ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠতাত দারা সেকোর নয়নের মণি ; দারার বিদ্যাবত্তা, চিত্তের ঔদার্য্য ও আত্মার আলােক প্রথম জীবনে তার মনকে প্রভাবান্বিত করে। সময়ে সময়ে দরবার গৃহে এসে পিতার পারিষদ-সভাকেও তিনি সাহায্য করতেন -কিন্তু তার মুখ বরাবর অবগুণ্ঠনের আড়ালেই থাক্তাে। সম্ভবত “জীবন-স্বামীর আবির্ভব কাল পর্যন্ত অবগুণ্ঠিত ভাবে প্রতীক্ষা করার রূপকটী তার খুবই পছন্দসই ছিল ; অথবা এমনও হতে পারে যে, পর্দানশীন জীবনের মাধুৰ্য্য তিনি উপলব্ধি করতেন।
. কথিত আছে, কোনো-এক কৃত্রিম কাব্য-সমরে নাশির আলি জেব- উয়িসার অবগুণ্ঠনকে উপলক্ষ্য করে বলেন :- “ওগাে, শশাঙ্কলাঞ্ছন! গুণ্ঠনখানি খােলাে একবার—যাচি, নেহারি’ ও-রূপ, চিত্ত-সাগর পুলকে উক্ নাচি দেখি—ঢেকে রাখাে অবগুণ্ঠনে কষিত সে কোন কাঞ্চণ।” জেব-উন্নিসা তদুত্তরে জানান :- “খুলিব না মুখাবরণ ; খুলিলে—কি জানি—পতঙ্গ যত, হয়তাে লভিবে মরণ। গােলাপে তেয়াগি, অবাক্ এ-মুখে, চেয়ে রবে বুলবু, লক্ষ্মীর কৃপা-ভিক্ষা ভুলিয়া যত ব্রাহ্মণ-কুল, প্রাণের মমতা ছাড়ি হয়তাে বা এই মুখমধুলােভে ছেড়ে দেবে ঘরবাড়ী। কচি কিশলয়-ফাকে, লুকানাে ফুলের মৰ্ম্মে কোথায় সুরভিত প্রাণ ঢাকা থেকে যায়- কেহ কি দেখেছ তাকে ? আমিও যে সেইরূপ রচনার মাঝে খুলে খুলে ধরি আমার আপন রূপ ; করি’ সেথা অবতরণ ভুবন আমারে লউক খুঁজিয়া খুলিব না মুখাবরণ।” এ কাহিনী ঐতিহাসিক কিনা জানিনে, কিন্তু অসত্য নয় ; যেহেতু ওতে সুন্দরের ছায়াপাত ঘটেছে। জেব-উন্নিসার মধ্যে একটা গভীর ধর্মপ্রাণতা ছিল; এবং তিনি ছিলেন সুফী। ওরংজীব, ও তার এই মেয়েটির প্রকৃতিগত প্রভেদ, বক্ষ্যমান কাহিনীটা থেকে পরিস্কার বুঝতে পারা যাবে আপনার চতুর্দিকে ওতঃপ্রােত বিশ্ব-সৌন্দর্যে মুগ্ধ মনখানি নিয়ে, একদিন প্রমােদোদ্যানে বেড়াতে বেড়াতে জেব-উন্নিসা আপন মনে ০ o বলছিলেন-“আমার সুখের উপকরণ হিসাবে চারটীমাত্র বস্তু দরকার- সুরা, ফুল, খরস্রোতা তটিনী, আর জীবন-স্বামীর স্নিগ্ধদৃষ্টি।” অনুচ্চকণ্ঠে বারংবার ঐ কথাগুলি আবৃত্তি করতে করতে যখন উদ্যানে পদচারণা করছেন, তখন দেখা যায়—অদুরে বৃক্ষতলস্থ এক মৰ্ম্মর-বেদীতে দাড়িয়ে ওরংজীব গভীর চিন্তামগ্ন। দেখেই ভয়ে তার প্রাণ উঠলাে কেঁপে—কে জানে ঐ বিলাস-চিন্তামূলক উক্তি সম্রাটের কানে পৌঁছেচে কি না? কিন্তু, মুখ ফসকে যা বেরিয়ে গিয়েছে তার জন্যে এখন ভয় পাওয়াই ভীরুতা ; কাজেই সম্রাটের মূর্তি যেন চোখেই পড়েনি, এই ভাব দেখিয়ে আবৃত্তির জের টেনে বলতে লাগলেন—“হ্যা, চারটা মাত্র বস্তু—প্রার্থনা, উপবাস, অশ্রু আর অনুতাপ !” রাজকোষ থেকে বছরে যে চার লাখ টাকা জেব-উন্নিসা পকেট- খরচা পেতেন, তার অধিকাংশই তিনি বিধবা ও অনাথাদের প্রতিপালনে, পণ্ডিত ব্যক্তিদের উৎসাহ-বর্ধনে, এবং মক্কা ও মদিনায় যাত্রী প্রেরণে ব্যয় করতেন। সুন্দর সুন্দর গ্রন্থ-সংগ্রহ করে একটী গ্রন্থাগার তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান গ্রন্থ সমূহের নকল নেবার জন্যে নিপুণ লিপি-বিশারদ নিযুক্ত করেছিলেন। তার কবিযশঃ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং নানা স্থানের সাহিত্যিকেরা তার অভিমত পাবার আশায় স্বরচিত পুস্তকাদি তার কাছে পাঠাতেন। ঐ সকল পুস্তকের দোষ বা গুণ অনুযায়ী তিরস্কার বা পুরস্কার বিতরণে, তার পক্ষ থেকেও কার্পণ্য ঘটুতাে না। কথিত আছে, জেব-উন্নিসার কণ্ঠস্বর এমন সুমধুর ছিল যে তার কোরাণ-আবৃত্তি শুনে শ্রোতারা অশ্রু সম্বরণ করতে পারতাে না। জীবনে তিনি ছিলেন নম্র, সদালাপী, সহিষ্ণু ও অসাধারণ ধৈৰ্যশীল। তাঁর নৈপুণ্য কাব্য-কলাতেও যেমন ছিল, যুদ্ধ-বিদ্যাতেও তেমনি প্রকাশ পেয়েছে, আর সে যুদ্ধ নারীপ্রকৃতিসুলভ বাকযুদ্ধই নয়। সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে যে-সব ঐতিহাসিক মালমশলা পৌছেছিল, তাতে তিনি তার “রাজসিংহ” উপন্যাসে জেব-উন্নিসাকে মসী-কলঙ্কিত বর্ণে একেছিলেন। স্যার যদুনাথ সরকার ১৯১৬ সালের জুলাই মাসে ‘মডার্ণ রিভিউ' পত্রে প্রকাশিত “Love-affairs of zeb- ৭/০ un-nisa” শীর্ষক প্রবন্ধে তঁাকে ভিন্নতর আলােকে দেখিয়েছেন। আকিল খাঁ নামক জনৈক পদস্থ কর্মচারী-সম্পর্কে জেব-উন্নিসার যে প্রেম- ঘটিত জনরব আছে, স্যার যদুনাথ তার অসম্ভাব্যতা দেখিয়েছেন। বঙ্কিমের উপন্যাসে আকিল খাকে আমরা পাইনে। আকিল খা-সম্পর্কিত প্রেম-কাহিনীর উৎস কোথায় বা তার অযৌক্তিকতা কতদূর, তা’ শ্ৰীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ও তার “মােগল-বিদূষী” পুস্তিকায় ঐতিহাসিক উপাদানের সাহায্যে প্রমাণ করবার জন্যে প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছেন। “জেবুন্নিসা কলঙ্কিনী ছিলেন কি না” শীর্ষক অধ্যায়ে ব্রজেন্দ্রের যুক্তি-নৈপুন্য আকিল খাঁকে প্রেম- স্বর্গচ্যুত করতে হয়তো বা কৃতকাৰ্যও হয়েছে। হয়তো বা বলছি এই জন্যে যে, ঐতিহাসিক যুক্তির ব্যুহ-ভেদে আমার বুদ্ধি অনিপুণ। আকিল খা ছাড়া আর একজনের নামও কাহিনীকারেরা জেব- উন্নিসার নামের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছিলেন—তিনি মহারাষ্ট্রীয় নেতা শিবাজী। স্যার যদুনাথের উক্ত প্রবন্ধে প্রকাশ—ভূদেব মুখখাপাধ্যায় ঐ কাহিনীতে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর “অঙ্গুরীয়-বিনিময়” উপন্যাস কেঁদেছিলেন। আমরা আশা করি, স্যার যদুনাথ ও-বইটী পড়ে দেখেন নি—পড়লে, বােধকরি, তাতে ‘রােশেনারা’কেই পেতেন, জেব-উন্নিসাকে নয়। যাই হােতূ, শিবাজী-ঘটিত প্রেম-জ্বর স্যার যদুনাথ, এবং পরবর্তীকালে শ্ৰীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ ছুটিয়ে দিয়েছেন। তারা বলেন—উহা “ঐতিহাসিক তত্ত্ব নহে—গল্প”। যদি বলা যায়—প্রেম’ জিনিসটা প্রাগৈতিহাসিক, এবং ওটী ‘রস, যার কারবার ঐতিহাসিকের চোখে ধূলাে দিয়েই প্রেমিকেরা চালিয়ে থাকে; তার উত্তরে ঐতিহাসিক বলেন—“সমসাময়িক কোনাে ফার্সী ইতিহাস দূরে থাক, মারাঠী ভাষায় লিখিত শিবাজীর কোনাে জীবনী-লেখকও ও-ব্যাপারে সাক্ষ্য দেননি।” এ-যুক্তির পর হার মানতেই হয়, কেননা, সাক্ষী না রেখে প্রেমে পড়া যে জেব-উন্নিসার পক্ষে কবি-জনােচিত হয়নি, তা অবশ্য স্বীকার্য। তা ছাড়া যদুনাথ বাবু ইংরাজীতে, এবং ব্রজেন্দ্র বাবু বাংলায়, আর একটা যুক্তিও দিয়েছেন ; সেটী এই—“অন্য কোনাে কারণে না হােল্ক একমাত্র জেব-উন্নিসার সুশিক্ষা, সুরুচি ও সৌন্দর্যবােধই যে তাহাকে ৭/০ শিবাজীর ন্যায় অশিক্ষিত, অভব্য দক্ষিনী হিন্দুর সহিত ‘প্রেম’-বিনিময়ে বিরত করিত, ইহা স্বাভাবিক ; সুতরাং কাহিনীটা কেবল অনৈতিহাসিক নহে, পরন্তু অস্বাভাবিক।” ঐতিহাসিকের ঐ কৌতুক-উদ্দীপক স্বভাব-বিজ্ঞান সম্বন্ধে আলােচনা করবাে না; কেন না, জেব-উন্নিসার কোনাে প্রণয়ী ছিল কি না—আর থাকলে, সে-প্রণয়ী অকিল খাঁ না শিবাজী না অন্য-কেউ-ও-দুর্ভাবনায় কোনাে দিনই আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেনি আমি ধরে নিয়েছি, জেব-উন্নিসা কাউকে না কাউকে নিশ্চয়ই ভালবেসেছিলেন ; অতএব মানুষের সবচেয়ে-যা-বড়-কলঙ্ক—ভাল না বাসা—ত। তঁাকে স্পর্শ করেনি। ধরে নিয়েছি—“সুশিক্ষা, সুরুচি ও সৌন্দৰ্যবােধ পূর্ণতা ও পরিণতির জন্যে “ভালবাসা”রই অপেক্ষা রাখে। আরও ধরে নিয়েছি, স্বর্গীয় বন্ধু মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের “ভারতীয় বিদূষী” পুস্তিকায় বিবৃত নিমােস্কৃত সুন্দর বিবৃতিটীর সম্ভাব্যতা : “লােকমুখে শিবজীর বীরত্বগাথা শুনিয়া মনে মনে জেবুন্নিসা তাহাকে শ্রদ্ধা করিতেন। জয়সিংহের প্ররোচনায় আমদরবারে উপস্থিত শিবজীকে যবনিকা-অওরাল থেকে জেব-উন্নিসা প্রথম দেখেন এবং সেই বীরমুৰ্ত্তির চরণে অত্মদান করেন। প্রাপ্য-সম্মান হইতে বঞ্চিত করিয়া ঔরংজীব শিবাজীকে বিক্ষুব্ধ করেন, এবং সভাসদ ও অমাত্যবর্গ তাহাতে কৌতুক অনুভব করে। ইহাতে জেব-উন্নিসার হৃদয় দুখে উদ্বেলিত হয়। সভাভঙ্গে অভিমান মিশ্রিত দৃঢ়ম্বরে তিনি পিতাকে বলেন—প্রকাশ্য সভায় বীরের অসম্মান করা ভাল হয় নাই এবং সঙ্গে সঙ্গেই কাদিয়া t ফেলেন। ; ঔরংজীব বিস্ময়ে কন্যার মুখের দিকে চান, এবং ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া বলেন—“বুঝিরাছি, শয়তানের ফাদে পা দিয়াছ ; উত্তম, কাফের যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তবে তােমাদের পরিণয়ের ব্যবস্থা করিব। পিতার এই কথায় জেব-উন্নিসা লজ্জায় লাল হইয়া উঠেন, এবং অন্যায়ের প্রতিবিধান করিতে আসিয়া নিজের দৌর্বল্যটা প্রকাশ করিয়া ফেলায় নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দেন। সেইদিন হইতে আপনার প্রেম, সঙ্কোচে ও গােপনে আপনার মধ্যেই পোষণ করেন।
।।
শক্তকন্যাকে বিবাহ করিলে শিবাজীর তেজ পাছে খর্ব হয়, সেইজন্য
তিনি কখনও শিবাজীর কাছে আপন প্রেম প্রকাশ করেন নাই।
মহত্ত্বের যে উচ্চশিখরে তাহাকে স্থাপিত দেখিয়াছিলেন, নিজের তৃপ্তির
জন্য কখনও তাহাকে সেই স্থান হইতে নামাইতে চাহেন নাই.••••” এর
চেয়ে সুন্দর কিছু আমি কল্পনা করতে পারিনে।
ঔরংজীবের পুত্র আকবর পিতৃদ্রোহী হওয়া সত্ত্বেও, জেব উন্নিসা
তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাখায় পিতার অবিশ্বাসের কারণ হন; ফলে
সালিমগড় দুর্গে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। দীর্ঘকাল তাকে ঐ
কারা-জীবন যাপন করতে হয় ; এবং কারাবাসকালে নিম্নলিখিতরূপ:
তিক্ত কবিতা তার হাত থেকে বেরােয়ঃ-
“নিগড়নিবদ্ধপদে কী সুদীর্ঘ এ কাল-যাপন।
সখা যত, শত্রু আজি
আগন্তুক আত্মপরিজন।”
“বন্ধুগণ যদি চাহে মাের নামে কলঙ্ক লেপিতে,
নিষ্কলঙ্ক রাখিবারে, সে-নাম, কি-হবে, ফিরি, উৎকণ্ঠিত চিতে ?”
“দুঃখ-কারাগার হতে মুক্ত হতে চাসনে, মরমী,
রাজনীতি-পথ নহে মুক্তি-মার্গ তাের।”
“চরম-বিচার-সভা আহুত না হয় যতদিন
মুক্তি-আশা নাহি তাের, ওরে মাের মরম-আসীন?”
“দুঃখ, অনুতাপ, অ, অতৃপ্ত বাসনা,
সঞ্চয় করিতে প্রাণে ছড়ায়েছি জীবনের সােনা।"
১১ দীর্ঘ তাের নির্বাসন ; ওরে গুহা লীন, দীর্ঘ তাের ব্যগ্র অভিযান, প্রতীক্ষার কাল তাের চলিবে প্রবাহি, বহি বুকে প্রজ্জ্বলিত প্রাণ ; নিজ-গেহে ফিরিবার দুর্নিবার আশা, জীয়ায়ে রেখেছে তােরে, জানি কিন্তু কোথা তাের গৃহ, কোন্ পথ বল, গেছে সেথা রে হতভাগিনি। বর্ষপরে বর্ষ গেছে পথ-চিন্তু মুছি পরিত্যক্ত বালুকা-প্রসারে ; যুগান্তের ধূলি-রাশি পবনে উড়িয়া, পুঞ্জীভূত তার সিংহদ্বারে। . - বিচার-আসনে বসি’ আমারে ডাকিয়া, যদ্যপি কহেন ভগবান যত দুঃখ সহেছিস অনুপাতে তার, আনন্দ করিব তােরে দান”- নন্দন-কানন-ভরা আনন্দের ভার, ডুবে যাবে মাের হাহাকারে ; আশীৰ্বাদ-বারিধারা মাের শিরে যদি ঝরে পড়ে অনর্গল ধারে— তথাপি জগৎ-নাথ যিনি, বেদনা-ভাণ্ডার মাের হৃদয়ের কাছে, সুনিশ্চিত রহিবেন ঋণী। ; সাতদিন মাত্র রােগ ভােগ করেই জেব-উন্নিসা গত হন এবং তার অন্তিমকালীন ইচ্ছানুযায়ী লাহােরের সন্নিকটস্থ নয়াকট নামক স্থানে, তঁার আপন উদ্যানে সমাহিত হন। স্বর্ণচূড়, সুন্দর ও মৰ্ম্মর রচিত হলেও, আজ সেই সমাধিমন্দির বিনষ্ট-বৈভব ও পরিত্যক্ত ; মােগল- সাম্রাজ্যের ধ্বংসসন্মুখ দুদ্দিনে এই সমাধিটাও ধ্বংসাবশেষে পিরণত হয়েছে। হাওদাসমেত হস্তীর প্রবেশ-উপযােগী সুবৃহৎ তােরণদ্বার আজও খাড়া আছে বটে; কিন্তু নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে এক শাজাহানের সালিমার-বাগ ছাড়া যার অনুরূপ দ্বিতীয় উদ্যান ছিল না, তা আজ প্রায় নিশ্চিতু। তরঙ্গায়িত শস্যক্ষেত্র আজ ঐ উদ্যানের ভগ্ন-প্রাচীর আবৃত করে দিগন্ত-বিস্তৃত। জেব-উন্নিসার মৃত্যুর ৩৫ বৎসর পরে, ১৬২৪ খৃষ্টাব্দে, তার ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত রচনাবলী “দিওয়ান-ই-মখ ফি”—ব। গােপনতমের কাহিনী- নামে সংগৃহীত হয়। ৪২১টী গজল ও কতকগুলি রুবাই এই সংগ্রহে প্রকাশ পায় ; পরে, ১৭৩০ খৃষ্টাব্দে আরও কতকগুলি গজল পূৰ্ব্ব-সংগ্রহের সংখ্যাবৃদ্ধি করে।
১/০ } } দিওয়ান-ই-মখ ফির কবিতাগুলি সুফী-সাধনার বিশেষত্ব-বর্জিত নয়। প্রিয়তমের প্রতিমার আশ্রয়ে ভগবানের উপাসনা—যে প্রিয়তম পূজা হলেও নিষ্ঠুর, যিনি প্রেমার্থিনীকে আলােক-রেখা-হীন নিরাশার গহ্বরে নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করেন না, কিন্তু পরিণামে তার মুম্ষু প্রাণে ক্ষীণ আশার একটু আলােক-রশ্মিপাত করেন—সুফী-সাধন- প্রণালী তারই অন্বেযু। সংসার-অরণ্য-পথের দুর্গম গহন-যাত্রায় তিনি মৃগ-রূপী মানবাত্মাকে ব্যাধের মতন তাড়না করে চলেছেন :- “শান্তি নাই, শান্তি নাই,—শিকারের প্রাণী আমি, পাছে পাছে ফিরিছে শিকারী, স্মৃতি সে তোমারি ; পলাইতে-লুটি ভূমে ; আমনি অমারে ঘেরি’ উঠে পড়ে তব মায়া-পাশ, কৃষ্ণ-কেশরাশ। কে ভাঙিবে তব কারা? কোথা আছে মর-হিয়া করে না যা, গােপনে বপন- তােমার স্বপন? অন্যান্য সুফী-কবিতার সমধর্মী হয়েও জেব-উন্নিসার কবিতায় এমন একটী স্বকীয় সৌরভ আছে, যা বিশেষভাবে ভারতীয়। ধৰ্ম্ম-সমন্বয়ের প্রবণতায় তাঁর প্রতিভা আকবরের চিত্ত-সম্পদের উত্তরাধিকারিণী। তিনি যে কেবলমাত্র ইস্লাম-সভ্যতার সঙ্গেই পরিচিত ছিলেন, তা নয় ; হিন্দু-সভ্যতা ও পারসীক জরাথুস্ত্রীয় ধর্মবাদও তিনি জানতেন। তার রচনার বিশেষ গৌরব এই যে, পরম্পরাগত বিচিত্র ধর্ম-নীতিকে একটা ঐক্যসূত্রে গেঁথে তুলে, সুফী-সাধন-রীতির সঙ্গে তাদের ঐক্যতান করে দিয়েছেন। কোনাে কোনাে কবিতায় সূর্যকে তিনি ভগবৎ প্রতীকরূপে স্তুতি জানিয়েছেন। বারংবার মন্দির ও মসজিদকে তিনি পরস্পরের অবিরােধী ও সম্পূরক বলেই প্রচার করেছেন। ভগবৎসত্ত্বা যে উভয়কেই আচ্ছাদন করে বিদ্যমান, এবং যে-কোনটীর মধ্য থেকেই সমান সাফল্যের সঙ্গে তাঁর আরাধনা চলতে পারে, এ-সত্য তিনি প্রাণের সমস্ত উত্তাপ দিয়েই মানতেন :-
১০০
--
+
“নহি মসলি—আমি রে পৌত্তলিক,
মাের প্রেয়সীর প্রতি মা-সকাশে দাড়ায়ে আনত-শির,
পৃজি’ তারে নির্ভীক।
ব্ৰহ্ম-সাধক, ব্রাহ্মণ আমি নহি-
ছুড়ে ফেলে দিয়ে যজ্ঞােপবীত, প্রিয়ার চঁচর কেশ
কণ্ঠে আমার বহি।”
তর্ক উঠতে পারে যে, এ-কবিতার উক্তি “নারীর উক্তি” হতেই
পারে না, সুতরাং জেব-উন্নিসার লেখা নয়। উত্তরে তর্ক ভােলা যেতে
পারে,-রবীন্দ্রনাথ “নারীর উক্তি” লিখেছেন, সুতরাং তিনি পুরুষই নন।
পীর বা ধৰ্ম্ম-গুরুর মহিমাও তার বহু কবিতায় কীর্তিত হয়েছে।
তিনি ভগবান ও মানুষের মধ্যবর্তী মিলন-সেতু; প্রভাত-সমীর যেমন
প্রাচীরবেষ্টিত পুষ্পেদ্যান থেকে সৌরভ বহন করে এনে উদ্যানের
বহিদ্বারে প্রতীক্ষ্যমান অল্প-সৌভাগ্যশালীদের বিতরণ করে, পীর বা
গুরুও জেবের মতে তদনুরূপ।
ভারতীয় ইসলাম-সমাজে ‘দিওয়ান-ই-মখ ফি’র অধ্যয়ন বহুধা-ব্যাপ্ত
ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। বিশেষ বিশেষ পর্বোপলক্ষে ও বিখ্যাত
সাধুবৃন্দের সমাধি-প্রাঙ্গনে এর কবিতা ভক্তজনেরা আবৃত্তিও করে
থাকেন। অতএব মানব-জীবনের কাম্য অমরতা থেকে জেব-উন্নিসা
বঞ্চিত নন।
অনুবাদক।
No text on this page.
দিওয়ান-ই-নকী
বন্দনা
===
সর্বাগ্রে তােমায়
যার করুণার শুভ্র অভ্ৰমাল ফুটাইতে চায়
এ-কুঞ্জে গােলাপ-পুঞ্জ—জানাই প্রণতি।
এ-কাব্যের আদি হােক ধন্য পরা-ভক্তি-বন্দনায়
ছন্দে থাক্ অনাদির জ্যোতিঃ।
তৃষ্ণা অফুরাণ
তােমার প্রীতির লাগি’, কঁাদাইছে দেহমনপ্রাণ ;
অণুপরমাণুময় এ দেহ নশ্বর
ফুকারে সর্বাঙ্গ দিয়া-‘অংশ মােরা, তুমি পূর্ণ গান
অংশে তব মােরাও ঈশ্বর।
তরঙ্গ-উল্লাস
তব প্রেম-প্লাবনের—উদ্বেলিয়া করিতেছে গ্রাস
মর্ত্যজীবনের তরী আকুল বন্যায় ;
ভাসিলে সে তরণী, উদ্ধারিবে কোন্ অবিনাশ
প্রেম-মগ্ন আত্ম-চেতনায় ?
দিওয়ান-ই-মফী
ক্রীতদাস-সম
আঁধারের শক্তিপুঞ্জ অপসারি’ অজ্ঞানের তমঃ
মাের গতিপথ হতে পলাবে উধাও,-
যদি গাে একটী ফুল মাের সাজি হতে প্রিয়তম
হাসিমুখে তুলে তুমি নাও।
ইদানীং আর
ঝরে না কপােল বাহি’ বারবার নয়ন-আসার ;
প্রাণের বেদনা ওষ্ঠ জানাতে না চায় ।
মৰ্ম্মের শােণিত-বিন্দু ধরি’ শুধু মুক্তার আকার
দুলে ওঠে আঁখির পাতায়।
সহ কর তবে
হে মাের প্রাণের প্রাণ। দুঃখ তব একান্ত নীরবে ;
জানি তা অপার--তবু কর পরিহার
লালসা-লুলিত রাত্রি। স্থির জেনাে, পাবে সে বৈভবে
যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নাহি আর।
১
প্রার্থনা ওগাে তুমি, যার করুণার গড়া-মৰ্ত্ত ও অমরতা ; যার নিশ্বাস প্ৰাণবায়ুরূপে জীবে জীবে কহে কথা; উজ্জ্বল যেন রয় জ্বালালে নিজে যে আশার মশাল শুভ ও শক্তিময় । উঠেছে দুলিয়া অন্তরে, প্রিয়, প্রেম-সাগরের জল ; তােলে কল্লোল তব করুণার নিঝর নিরমল উপর হইতে চাই- তােমার আশীষে জুড়াও, জুড়াও ভক্তপ্রাণের দাহ। পুণ্য-দেউল মন্দিরমাঝে, মসজিদে, গির্জায়, অথবা যাত্রী-চরণ-চিহে, তীর্থের রেনুকায়, তুমিই তো প্রাণনিধি- যেথা বিধাতার পূজার অর্ঘ্য, সেখানেই মাের বিধি। বন্দিব প্রাণে প্রভাতখানিরে, অশ্রু-উষ্ণশ্বাসে ; হােমশিখানলে দহিয়া মৰ্ম্ম পাঠাবে নীলিমাকাশে একটী দীরঘ শ্বাস- করিতে আমার মনােমুকুরের বাসনার কালি নাশ। দাও চোখে মাের, তব আঁখিলাের, ওগাে নেপথ্যচারি। প্রাণের দাহনে বর্ষণ কর অজস্র ধারা তারই তপ্ত বেদনা তাপে, প্রতি নির্গত নিশ্বাসে মাের বঘ্নিশিখা যে কাপে। ৩
সাধনা
হে পরম ভাগবত, এ জগতীতলে
অভয় পতাকা তব,
প্রাণ-উদ্দীপক,
নিত্য
খুলে চলে।
প্রবল প্রত্যয় তব প্রসারিয়া যায়
মরুদরী-সিন্ধুশৈল অবলীলাভরে
প্লাবিয়া বন্যায় ।
শুচিস্মিত মােন তব যুগ্ন ওষ্ঠদু’টী
নব-কুকলিকার মুক্ত দল সম
ধীরে ওঠে ফুটি’ ;
জ্যোতিঃর প্রপাতসম মধ্যপথে তার
পড়ে ঝরি’ জ্ঞানগর্ভ প্রেমােল বাণী
উদাত্ত উদার।
সত্যদীপ্ত হিরন্ময় সে বাণীপরশে
লােকারণ্যে ফলে স্বর্ণ; অরণ্যের পাখী
গাহে তা’ হরষে।
প্রেমানন্দে হেরি’ তব যে মূরতিখানি,
পরম সুন্দর ওগাে হৃদয়-হরণ।
জানি, আমি জানি
সে মূর্তির সমতুল এ বিশ্ব প্রকৃতি
গড়িতে পারেনি কিছু ; সঙ্গোপনে তারে
আঁকে শুধু ধূতি।
সে-রূপমাধুরী-পান-পিপাসিত-হিয়া
স্বেচ্ছাসুখে চলিয়াছে বৈরাগ্যের পথে
বিশ্ব পাশরিয়া,
৪
সাধনা
অনুসরি’ চরণের চিহুগুলি তব,
যাবৎ না পারে তারে প্রাণ দিতে প্রাণে
উচ্চারি’ প্রণব।
কোন্ প্রাণে করি তবু বঞ্চিত আত্মায়
সে-আনন্দ-স্বপ্ন হ’তে, উৎগ্রীব সে সদা
যার প্রতীক্ষায় ?
কিম্বা আরাে বেশী-যেথা মৰ্ম্ম আছে জাগি
সযত্ন-পােষিত মাের সেই ব্যথাগুলি
কেমনে তেয়াগি ?
সত্যই যে সেথা হ’তে রক্তবিন্দু ঝরে
যেথায় নিষ্ঠুর প্রেম বিধিল হৃদয়
সুনিৰ্ম্মল শরে।
হে বন্ধু ! নয়ন মেলি’ দেখ সেথা চাহি’-
ক্ষতমুখ হতে যেথা টুপায়ে টুপায়ে
চলেছে প্রবাহি’
আরক্ত নিঝরধারা অবিরাম-ধারে –
ফুটিয়া উঠিতে শেষে, সুগন্ধ-সুন্দর
পুষ্পপুঞ্জাকারে।
সংসার-সঙ্কটে, হায়, যে কন্টকদল
শতছিন্ন করে মাের শ্রান্ত পথচারী
চরণের তল,
সে-কাটাও ধন্য হয় গােলাপে কুসুমি।
সত্ত্বার নিভৃতে মাের, ওগাে গৃঢ়তম
আমি-হরা তুমি।
নিরুদ্ধ যদ্যাপি তব স্বরগের দ্বার
কি লাগিয়া অভিযােগ ? স্বর্গভূমি হতে
উন্মুক্ত, উদার,
দিওয়ান-ই-মখী
নাহি কি নির্ভর-ভূমি তােমারি মাঝারে ?
সৃষ্টিস্থিতি পূর্ণ করি’ বিরাজে যেজন
চির আপনার,
মনশ্চক্ষে চাই শুধু মুখপানে তার।
স্বর্গ-সােপানের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর সেতু,
দোলে অনুরাগে
নিদ্রাহীন তা’র দুটী নয়নের আগে ।
হৃদয় আপনি শুয়ে সে-চিরবন্ধুর
অভ্যর্থনা-হেতু
গড়িয়া তুলিবে তার স্বর্গজয়ী সেতু।
অনুভূতি চকিতে পুলকবিদ্ধ হয় ব্যগ্র অন্তর আমার, মুক্তগতি গন্ধবহ, বহি’ যবে পক্ষপুটে তার বিতরিয়া যায় মােরে গন্ধ তব বিদ্যমানতার। বিরহ-যামিনী মাের যাপি’ তাই আশায় আশায় যাবৎ না দুলে ওঠে তন্দ্রাতুর নয়ন-সীমায়-- অপরূপ রূপ তব, নিশি জাগি যাহার তৃষায় । ; তােমার ইঙ্গিতে বিশ্ব তমসায় নেহারিল জ্যোতিঃ তােমারি বিধান-পথে নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ-গতি, চলে সে অপাপবিদ্ধ, পরমেশে জানাতে প্রণতি। পরমেশ,পাপীতাপী, প্রেরণা ও কৃপা লভে যার, আপনি দুজ্ঞেয় রহি’ মৰ্ম্ম যিনি অন্য সবাকার- সন্ধান রাখেন যিনি প্রয়ােজনে লুকানাে হিয়ার। আর তুমি গুরুদেব দীপ্ত ধ্রুব-নক্ষত্রের দ্যুতি। অমরার অধিবাসী শ্রেষ্ঠতম আত্মার বিভূতি ! জানায়াে ধারে যত মানবের প্রাণের আকুতি। তুমিই তাে সে মুকুর, বক্ষে যার অরুণের ভাতি, —না, তুমি আপনি যে অনির্বাণ ত্রিদিবের বাতি, আর কিছু নাহি হেরি আলােকান্ধ দু’নয়ন পাতি। ৭
প্রেমের পথ
দীর্ঘ ও সর্পিলগতি, অন্ধকার প্রেমতীর্থ-পথ,
কত না কুহকজাল পাতা তার অলিতে গলিতে ;
পড়িয়া নয়ন-ফাদে পদ্মদলে বদ্ধ অলিবৎ
কঁদে প্রাণ ; যাত্রী তবু ব্যগ্র সদা সে-পথে চলিতে।
স
কোন্ মধুলােভে সেথা অহরহ ছুটেছে মধুপ?
আরক্ত কপােল 'পরে মসীকৃষ্ণ তিল একতিল ।
কিসে গড়া প্রেমজাল ? কে জেনেছে তাহার স্বরূপ ?
তরঙ্গিত এলােকেশ মন্দবায়ে আন্দোলন-শীল ।
অহােরাত্র অবিরাম চলে সেথা প্রেম-মহােৎসব,
ফিরিতেছে পানপাত্র এক হাত হতে অন্য হাতে ;
নিঃশেষে ও স্বেচ্ছাসুখে কর পান আনন্দ-আসব,
জাগে যদি উন্মাদনা—ভাগ্য সে তাে, ভয় কিবা তাতে।
অতি সােজা অনুযােগ ; দীর্ঘশ্বাস সহজ সন্তাপে ;
ক্রন্দনে প্রাণের জ্বালা সারা বিশ্ব জুড়াইতে চায়।
সগর্বে ও সঙ্গোপনে পুষে রাখ বুকে মনস্তাপে,
শুষে নে বেদনা-বিষ নির্বিকার নিতল আত্মায় ।
ঐ তত জ্যোতিঃর মূল-ঐশী উৎস, আদিম, উদার ;
অফুরন্ত করুণার কল্পধেনু ওইখানে রাজে ;
নিষ্প্রভ ‘মুসা’র কান্তিযবে করি’ ও-উৎস বিদার
প্রাণে সে দুলিয়া উঠে, দীপ্তমুখে জ্যোতির্ময় সাজে।
প্রেমের পথ
নিশার উৎসব-রস, যােগায় সে উষারে উল্লাস ;
পাঠায় ফিরিয়া উষা যামিনীর
শূন্য
মৰ্ম্মকোষে
আনন্দ-স্বপন তার ; কভু তাই ঘটে নাকো হ্রাস
পারস্পৰ্য-সুত্রে গাঁথা শান্তি-গর্ভ আত্মার সন্তোষে।
কিন্তু কহ প্রাণাধিপ! কোথা চলে ভােজ-আয়ােজন ?
কাহারা উল্লাসে মাতে পানাহার-উৎসব-মন্দিরে ?
আঁখিদুটী রাখি প্রাণে, হের বন্ধু, রেখেছি গােপন,
আমার নৈবেদ্যথালা স্মরি’ কোন্ বাসনা-বন্দীরে।
৯
দহন
অযত্ন-রক্ষিত মাের প্রাণের সম্পদ
লুণ্ঠিত আজিকে তাই লাজে মরে যাই ;
জানি–আপনারি দোষে ঘটেছে বিপদ
নিজেরে বঞ্চিত জেনে তবু ব্যথা পাই।
;
জেলেছি আপন হাতে আগুন বেদীতে
দীপাগারে আবরিত অগ্নিশিখা সম,
দেহের আড়ালে রহি’ বাসনা এ-চিতে
অগ্নি-জিহ্বা আস্ফালিয়া দহে অঙ্গ মম।
১;
পুড়ে পুড়ে মূঢ়চিত্ত হয় যদি ছাই
তবেই নিস্কৃতি আর নিবৃত্তি দুঃখের ;
তবেই তােমার প্রেম-জ্যোৎস্নালােকে পাই
শান্তি—যা’ অনধিগম্য আসক্তি-মুখের।
অতল পাথার-তলে চলিয়াছি নামি’
অসমর্থ ক্লান্ত তনু ভাসিতে উপরে ;
রহিয়া প্রেমের নীরে নিমজ্জিত আমি
ভেসে চলি প্লাবনের স্তর হতে স্তরে।
নিঃসঙ্গ অন্তর ছিল যেন বনভূমি
পায় নি সে যতদিন প্রীতির পরশ ;
ভাস্বর করিল প্রেম সে হৃদয় চুমি’
নন্দনকানন হ'তে আজি তা’ সরস।
1
১০
দহন
উঠু কামনাগুলি কুসুমে বিকশি’
স্তোত্র হােতূ ব্যথা যত ; বিরহী এ প্রাণ
আরাধ্যের ধ্যানাসনে রাধারূপে বসি’
ধ্বনিয়া তুলুক মৃত-সঞ্জীবনী গান।
আহরিতে শস্যকণা ক্ষেত্ৰপানে ধাই,
মিটাতে প্রাণের ক্ষুধা, বিহঙ্গের প্রায় ;
প্রয়াসের পরিণামে শস্য নাহি পাই,
মেলে যা’--তা’ অশ্রু শুধু অজস্র ধারায়।
যােগ দিও জ্ঞান-বিজ্ঞ, প্রেমের উৎসবে,
পান-পাত্ৰটীরে শুধু রেখাে সাবধানে ;
আমার যা অংশ-আমি শুষেছি নীরবে-
তােমাদের পাত্র রেখাে লুকাইয়া প্রাণে।
তন্দ্রালস, লাে মরমী, তাের আঁখি দুটী ;
আসেনি কাহিনী আজো সমাপ্তির কাছে
তবু হিয়া পড়ে ঘাের অবসাদে লুটি—
খুজে নে, উহার লাগি’ শান্তি কোথা আছে।
১১
প্রেম-তৃষ্ণা
ভরা কটালের বানে উদ্বেলিত নদী যথা ধায়
রসের উচ্ছ্বাসে করি’ অভিষিক্ত তীরতরুরাজি
সেইরূপ প্রেম তব বহে মাের শিরায় শিরায়,
অন্তরের তন্ত্রী যত ওঠে তায় রসােল্লাসে বাজি’।
নিত্য নিপীড়ন-তপ্ত করি মাের কঠিন হৃদয়
যাবৎ পাষাণ-প্রাণ নাহি করে স্ফুলিঙ্গ-উদগার,
চকিত-স্ফুরণে ঘেরি’ যাবৎ না বিকশিত হয়
প্রেমের বিদ্যুৎ তব,-বহি চিত্তে পিপাসা যাহার।
কে চাহ বিশ্বাস-বল ?—এস হেথা আশ্রয়ের লাগি,
হের বিস্ফুলিঙ্গগুলি, এ-বক্ষ জনমভূমি যার ;
থাকিলে প্রত্যয়-দৃষ্টি, দেখিতে গাে, রহে হেথা জাগি
সেই শুভ্র দীপ্তি যাহে ধন্য আজো ‘সিনাই-পাহাড়।
এস প্রেম-নিমন্ত্রণে, সজ্জিত এ মিলন-সভাতে ;
লহ আপনার অংশ, সম্মানিত হােতূ পানাধার
নেহার সঞ্চিত সুরা আমাদের অশ্রুবিন্দু পাতে,
সুরাপাত্র নেত্রগুলি, অফুরন্ত নীর-ধারা তার।
তবু, যত করি পান-মন্ত্রে যেন হই সম্মােহিত,
স্বপ্নে, স্বপ্ন-দৃশ্যে আর মহানন্দে তলাইয়া যাই;
বেদনার মদিরায় হৃদি-রক্ত হয় তরঙ্গিত,
বুঝিনা বাঁচিয়া আছি, কিম্বা দেহে প্রাণ আর নাই।
১২
প্রেম-তৃষ্ণা
দুঃখের নিবিড় বন, দৃশ্যমান-এ-ভুবন-মাঝে
বাসনার পশুরাজ বীরদর্পে করে বিচরণ ;
বিশ্বাসের বৰ্ম্ম পরি’ চল যাই শিকারীর সাজে,
পাইলে প্রবল বাধা সভয়ে সে ছেড়ে যাবে বন।
.
ক্ষণে ক্ষণে ওঠে হিয়া আকুলিয়া আনন্দ-সঙ্গীতে
সহর্য দিবসগুলি পূর্ণ করি’ স্তুতি ও বন্দনে ;
হায়রে, অশুভ শক্তি তবু আসে চিত্ত আচ্ছাদিতে
চিন্তায় চিতাগ্নি জ্বালি’, দাবানল হৃদয়-নন্দনে।
১৩
আত্মাহুতি
দীপ্ত আঁখিপাতে তব যে সৌন্দৰ্য্য উথলায়, ওগাে প্রিয়তম,
কেমনে তা প্রকাশি ভাষায় !
ধন্য মানি—তুচ্ছ প্রাণ ও-দিঠির প্রতিদানে পুস্পাঞ্জলিসম,
পারি যদি ডালি দিতে পায়।
ভালবাসি’ ঐ তব ঘনকৃষ্ণ কেশরাশি, মহাজাতি যত
উদ্দীপিত যুগ যুগ ধরি’
একথা শুনিয়া নাকি আক্ষেপে ভরিয়া ওঠে ধাৰ্মিক-সমাজ
সরমেতে শিহরি’ শিহরি’!
মর্মন্তুদ যন্ত্রণায় শতছিন্ন মৰ্ম্মমূলে, অহর্নিশি আজ
বহে মাের অশ্রুর প্রপাত
কিন্তু বাজে যার প্রাণে দৃষ্টির আঘাত তব, কোনােকালে তার
পােহাবে কি বিরহের রাত !
তােমার চরণমূলে, হে উদ্ধত প্রিয় মাের, দিয়াছি লুটায়ে
গৰ্বোন্নত আমার ললাট
বেড়িয়া তােমার হিয়া রহি বক্ষবাস সম, তবু কেন কও
“এ শুধুই প্রণয়ের ঠাট” ?
“মজনুর প্রেম-বলে বলী হয়ে চল তবে, রে গােপন হিয়া,
উপত্যকা-পথে বেদনার
উৎসর্গের নব-সাজে সাজিয়া আহুতি দিতে, সে-প্রেম পরম
প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলি যার ।
১৪
উপেক্ষিতা
কর সাকী, তব করণীয়;
“চন্দ্রকান্ত পাত্রে মাের ঢালল সেই স্বর্ণাভ পানীয়,
দীপ্তি যার বালারুণ-রাগে
-ধুম্র পানাধার হ’তে বাহিরিয়া নয়নের আগে
উছলি’ পিয়ালাখানি পড়িবে গড়ায়ে
মেঘ-লােক হতে যথা পড়ে উষা আলােকে ছড়ায়ে ।
নেহার এ ভাগ্যহত হিয়া
ভগ্ন, দীর্ণ, অবসন্ন—সন্তাপে যা রয়েছে তাপিয়া ;
বিগলিয়া অশ্রুবাষ্প-নীরে
ব্যথা যার আঁখি-পাতে দুলে উঠে ঝরে পড়ে ধীরে ;
তবু আছি প্রতীক্ষায়, দাহ আছে তাই
হব রে হৃদয়-হীনা, হিয়া যবে পুড়ে হবে ছাই। .
;
জানিতে ছিল না মাের বাকী,
তােমার ও শপথের আগাগােড়া একেবারে ফাকি
চিত্ত হতে তাই চিরতরে
মূছি’ সে শপথবাণী, দুয়ার রুধিয়াছিনু ঘরে ।
জনমিনু কেন হায় হেন পাপমুগে
নিষ্ঠুর নিয়তি আর কৃতঘ্ন প্রণয় যার বুকে ?
তথাপি নে আনন্দ খুজিয়া
কে জানে রে কোন্ ভাগ্য তাের লাগি আছে অপেক্ষিয়া ।
দৃঢ়ভিত্তি এই বসুধার
ভূকম্পনে বিকম্পিয়া হয়ে যেতে পারে চুরমার ;
হয়তাে বা, মৃদুমন্দ বহে যে মলয়
শূন্যগর্ভ জীবনের স্ফীতি-গর্বে ঘটাবে প্রলয়।
প্রবুদ্ধতা
এ নহে প্রার্থনা মাের, হে করুণাময়
শক্তি ও সম্পদ যেন পাই ;
চাহি নিরালায় এক কানন-কুটীর,
যার রম্য ছায়ায়:সদাই
ক্ষীয়মান পরমায়ু যতক্ষণ নাহি হয় ক্ষয়-
এই পৃথী-পাত্র ভরি’, ত্রিদিবের স্বপ্নে স্পন্দমান
সুধাধারা করে’ চলি পান ;
চাহি—সে নিভৃত-নীড়ে, স্নেহ-প্রাণ সবাদের ভিড়।
নীলাকাশে গেয়ে ফেরে আকুল পাপিয়া
সদ্য-ফোটা গােলাপের কলি
শিহরে ফুলের বনে শুনিয়া সে তান
গন্ধ-মধু পবনে উছলি ।
কিন্তু কী প্রাণান্ত-শ্রমে পুস্পােদ্যান ওঠে যে হাসিয়া
জানে তা উদ্যান-রক্ষী। শীতাতপ করিয়া বরণ
খেটেছে সে অক্লান্ত-চরণ,
কত না কণ্টক তারে করিয়াছে আঘাত প্রদান।
সৌন্দর্য্যের নাহি নাশ—সে চির-অমর ;
হের—দীপ্ত তপনের তেজে
আলােকিয়া ভুমণ্ডল পুলক-প্রভায়
নিত্যকাল বিরাজিত সে যে ;
১৬
প্রবুদ্ধতা
হােক স্তুতিগানে তব মুখরিত বিশ্ব-চরাচর
এ দানের লাগি ; আর—যুগে যুগে বিশ্বজন-মাঝে
গণ-চিত্ত-নিয়ন্ত্রণকাজে
পাঠাও জগত-গুরু—তারও লাগি’ নতি তব পায়।
৬
বরিষ করুণা-ধারা আমাদের শিরে;
মর-হিয়া কত না দুৰ্বল !
কি-করুণ, কি-ভঙ্গুর এ মর্ত্য-জীবন!
অন্বেষিয়া বিস্মৃতি-অতল
উৎকণ্ঠায় ফিরি যবে বিক্ষুব্ধ হৃদয়-সিন্ধুতীরে—
আর তুমি, অন্তৰ্য্যামি, জানাে, বিশ্বে নিঃসঙ্গ হৃদয়
সহ করে কী সে পরাজয়
রক্ষা করে আমাদের, বিদূরিয়া ব্যথা অসহন।
সুখী সেই প্রজ্ঞাবান, জেনেছে যে স্থির
দুঃখ-সুখ আসলে অভেদ,
শিখেছে যে আত্মবশে যাপিত জীবন
উপেক্ষিয়া হর্ষ কিম্বা খেদ।
বসন্তের পুষ্পভার, হেমন্তের উজল শিশির
চক্ষে যার একাকার—তাহারেও চাহ শিখাইতে।
বক্তৃতার সাধ যদি চিতে
একান্তই জাগে—বকো; কিন্তু তার নাহি প্রয়ােজন।
সর্বনাশা প্রেম যদি রথের সারথি,
ঐ পথে চলিবি যদি রে,-
মুক্ত মরুভূর বক্ষ কর তবে সার
পিছুপানে তাকানে ফিরে ;
১৭
দিওয়ান-ই-মুখী
;
যা বা থাকুক প্রাণহােক লাভ, কিম্বা হােক ক্ষতি,
চলে যা’ ক্ৰক্ষেপহীন, বেদনায় রহি’ অবিচল
খুজিস্ নে তীর কিম্বা তল
অপার, অপরিসীম প্রেম-সিন্ধু-সলিলেতে আর।
ওরে মন! নীড় ছাড়ি’ পক্ষী-শিশু যবে
প্রথম সে উড়িবারে চায়,
বারংবার বাতাসেতে পক্ষ ঝাপটিয়া
ক্রমাগত ভূপৃষ্ঠে লুটায়,
শেষে ধরা পড়ে কঁাদে ; সেইরূপ উৎসাহ-গরবে
মেলিয়া দুর্বল পক্ষ অবশেষে পড়ে গেলি ধরা ;
ভাগ্য তাের আজ দুঃখ-ভরা,
আপন বাসনা-জালে চির-বন্দী মরিস কাদিয়া।
১৮
উল্লাস
জাগৃহি, জাগৃহি প্রাণ বসন্ত দূয়ারে ;
গােলাপী অধরে হাসি ফুটাক গােলাপ,
মল্লিকা উঠুক ফুটি’ প্রান্তরে কান্তারে
দারুব্রহ্মরসে সাকী যােগা প্রলাপ।
চলিতে নিষিদ্ধ পথে কি-হেতু বিমুখ
নিঠুর বঁধূয়া মাের? কটাক্ষে তােমার
মরণে বরিতে যারা সদা সমুৎসুক,
তাদের মুখের পানে চাও একবার ।
কেহ পূজে ইষ্টদেবে মন্দিরে পশিয়া,
কেহ গৃহাঙ্গনে, কেহ পরিজন-সনে ;
মাের চিঘন! তুমি রভসে রসিয়া
আনন্দ-বেদীতে রাতজা মরমে গােপনে।
১৯
নির্জন-চিন্তা
ছিল বন্ধু অগণন, বহি যারা দুঃখে সুখে ভাগী
মাের সাথে কাটাইত দিন;
আর তারা নহে মাের ; সঙ্গীহারা, একান্ত একাকী
আমি আজ নির্জনে স্বাধীন।
;
জামসিদ, কৈকোবাদ—নিরর্থক নাম মাত্র আজ,
ধূলি-ম্লান পিয়ালা তাদের ।
অতীতের দুঃখে সুখে এ-কালের মানব-সমাজ
টানে নাকো দুর্ভাবনাজের।
মােরা বৰ্তমান-বাসী, উষর বালুকা-বত্ম ধরি’
শ্রান্তপদে চলেছি সদাই
মনস্কামনার গড়া সেই স্বপ্ন-ভূমি লক্ষ্য করি’
চিনু যার কোনােখানে নাই।
আমি চলি অনুসরি’ জ্ঞানীদের পদ-চিহ্নগুলি ;
ধরি দৃঢ় প্রসারিয়া পাণি,
যত অতিবাহি’ ঐ কণ্টকিত শুষ্ক পথধূলি—
বাঞ্ছিতের উত্তরীয়খানি।
,
নির্জন-চিন্তা বিনাশিল কত হিয়া, হে প্রেম, ভােমার তরবারি, আরাে কত নাশিবে কে জানে! তােমার কল্যাণ তবু নিরন্তর কাম্য যে সবারি, সাধ্য কার—অভিযােগ আনে। নও অন্বেষিতে ইষ্টমূৰ্ত্তি পশি’ যবে মন্দির-প্রাঙ্গনে ইতস্ততঃ ফেলিবি চরণ- সন্তর্পণে যাস্ মখফী-দেখিস্ রে, বিহঙ্গমগণে উড়ায় ও পাদ চারণ। ২১
প্রত্যয়
ভাতিল যে স্বর্গ-দ্যুতি ঘেরি’ ওই ‘সিনাই’-পাহাড়
যুক্তিযুদ্ধ কেন তার লাগি’?
কোনাে যুক্তি নাহি মাের—বিশ্ব যদি করে অস্বীকার,
এ-প্রাণে প্রমাণ রবে জাগি।
প্রত্যয়ের তাপে তপ্ত হিয়া মাের পঞ্জরের মাঝে
প্রেমান করেছে বিস্তার ;
সমগ্র সিন্ধুর বারি—বিন্দুসম মনে হয় তা যে
তীব্র তৃষা জুড়াইতে তার ।
আকণ্ঠ-কলুষ পঙ্কে মগ্ন আমি, চলিব কিরূপে
হজ-তীর্থযাত্রীদের দলে ?
পাব কি রে তীর্থ-ফল, স্বর্গদূত যদি চুপে চুপে
নিজে আসি’ লয়ে যান ছলে ?
জ্ঞানের সাম্রাজ্য-মাঝে রুদ্ধ হয়ে আসে শ্বাস মাের,
ক্লান্ত আমি যুক্তির সীমায়,
আয়রে প্রেমের বন্যা, যােজনান্তে নিজরাজ্যে তাের
আমারে লইয়া যাবি, আয়।
আশ্চৰ্য্য! যখনি আমি দাড়াই ও সমুদ্রের তীরে
নতশিরে তরঙ্গ মিলায় ।
উজ্জ্বল সত্যের পথ নেহারিবে সৰ্ব্বজনে কি রে
দীপ্ত মাের চিত্ত-বর্তিকায়।
..
২২
যদিও দুদ্দিনে আজ রহি সৰ্ব আনন্দে বঞ্চিত,
যন্ত্রণার নাহি হেরি ওর ;
দে অদৃষ্ট, তবু তাের শেষ-শাস্তি ভাণ্ডার-সঞ্চিত,
দীন-বন্ধু আজো আছে মাের।
গ
বলল তো অন্তরতম! পাপ-সে কি স্বকৃত আমার ?
শান্তি—তা কি আমারি পাপের ?
সে কি শারীরিকী-না সে অনশ্বর গােপন আত্মার
জন্মান্তের গ্রহচক্র-ফের ?
আত্ম-সান্ত্বনা
হায় রে অবােধ মাের হিয়া,
অযত্ন-শৈথিল্য তাের তাজ্জব করেছে আজি মােরে !
নাহি কি অন্তরে তাের ইচ্ছাবেগ ফেলিতে চূর্ণি য়া
যে-বাধা বাঞ্ছিত হতে দূরে তােরে রাখিয়াছে ধরে?
•
চেয়ে দেখ, ঐ পুষ্পকলি
উঠিছে যা বিকশিয়া ছিন্ন করি’ শ্যাম বহির্বাস ;
অল্প তার আয়ুটুকু যাপে রে সে কানন উজলি’
প্রকাশি’ সৰ্বাঙ্গ দিয়া ইসুফের’ লাবণ্য-আভাস ।
১;
ছুটে যা রে মলয়-সমীর
কেঁদে কেঁদে অন্ধদৃষ্টি ‘ইয়াকুবে’ শুনাইয়া আয়
সে বারতা, শুনিলে যা’ মুছিবে সে নয়নের নীর,
বার্ধক্যের অন্ধকার লুপ্ত হয়ে অরুণ-আভায়।
সুদীর্ঘ প্রেমের পথ ধরি’
কত না দুৰ্ব্বহ ব্যথা, মুজপৃষ্ঠে টেনেছে হৃদয় ;
তাই পরিশুদ্ধ হিয়া শক্তিতে উঠেছে আজ ভরি’
ক্লেশে বা কর্মের ভারে মানে না সে তাই পরাজয়।
২৪
আত্ম-সান্ত্বনা
ধন্য মানি আমি ভাগ্যবতী ;
বিশ্বজয়ী সেকেন্দর—নিষ্প্রভ করেছি তার যশ ;
কে চা তৃষ্ণার বারি, হেথা আয়--আমার নিয়তি
মিলায়েছে দেখা তার, বুকে যার সুধার কলস।
অশ্রু-ধৌত সুনির্মল প্রাণ
শান্তিরে পেয়েছি বুকে-নাহি চাই অন্যতর ত্রাণ,
নাহি আর কর্মে রুচি, নাহি রে মালিন্য বাসনার ;
ধারিব না বিচারক, স্বর্গ কিম্বা নরকের ধার ।
২৫
নিরাশের আশা
৭
'
জ্বলিল রে হুতাশন অন্তরের মাঝে পুনরায়,
দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে লভিয়া বীজন,
লেলিহান হ’ল সে শিখায় ;
আর বুঝি পারে নারে ক্ষীণ মাের হৃদয়-পিঞ্জর,
দ্রুত-সঞ্চালিত-পক্ষ আত্মা-পাখীটীরে
রাখিতে এ বুকের ভিতর।
পাষাণ গলিয়া গিয়া অশ্রু-নদী করিত সৃজন
যদি সে বুঝিত কভু, কোন্ সে বেদনা
মৰ্ম্ম মাের করে নিপীড়ন
কি-যেন-অনর্থ-পাত-সশঙ্কিত অন্তরের তলে
ভাসে অশরীরী বাণী—“তবু তােল ত্বরা,
ছুটে চল মরু-যাত্ৰী-দলে।
তাের নির্যাতন, প্রেম, মর্মে মর্মে গুমরি গুমরি
সকলের অলক্ষিতে আঁখি-নীরে ভেসে .
সহিয়াছি দীর্ঘকাল ধরি।
নিঃস্ব আমি সত্য, তবু টুটেনিরে এখনাে গরব ;
উদগ্রীব জনতা সনে হাতেমের ভােজ
মিশিবে না মাের কলরব।
কত না বিচ্ছেদ-রাত্রি নিঃসঙ্গ যাপিনু প্রতীক্ষায়,
হারাণাে হিয়ার আলাে যদি ফিরে পাই,
তারি লাগি উদগ্র আশায় -
পরিত্যক্ত নিরালায় চিত্তের বৈধব্য-পথে মাের,
২৬
নিরাশের আশা ঝরিল অ-পরিশেষ বন্যাবারি-প্রায় মৰ্ম্ম-গলা রক্ত-অশ্রু-লাের- দুঃখের পাবক তবু প্রাণে মাের আশা দেয় আনি’ সুগন্ধ কুসুমপুঞ্জে লভে রূপান্তর, শুষ্ক মাের ফুলমালাখানি। প্রেম বাঁধিয়াছে মােরে নিগড়েতে সুনির্মমতম, ঘােচেনি বিশ্বাস তবু;-পাদমূলে তব প্রভুভক্ত সারমেয় সম, ঘুরিতেছি দীনা আমি যাচি’ তব প্রীতি কণাটুকু। মখ ফী রে ! যদ্যপি তাের বুক-ভাঙা শ্বাস পরশিত সাগরের বুক, আলােকের রেখাহীন তুহিন সে অতল পাথার মেলি’ দিত উর্ধে এক অনির্বাণ শিখা, জ্বালা তাের করিতে উদগার। ২৭
দুঃখের দান
প্রেম! আমি তব দাসী।
শ্বেত করবীর পাপড়ীর কোল রঞ্জিয়া অনুরাগে
গাঢ়তর এক হরিৎ-কান্তি যেমন বিকশি’ রয় ;
আমার মৰ্ম্মে বাসনার ফুল জাগে রে, তেমনি জাগে
নেহার, তাহার প্রগাঢ়তাটুকু, কলঙ্ক-মসীময়,
সকলি ছাপায়ে উঠিতেছে উদ্ভাসি।
জাগে এ গরব প্রাণে-
সারা দুনিয়ার মৰ্ম্ম-গােলাপ খুঁজেছি জীবন-ডাের ;
তথাপি আজিও:শ্রান্তিবিহীন, আকুল অন্বেষণে,
বিনা অনুযােগে, হেলায় ছিড়িয়া বিঘ্ন-বাধার ডাের,
চলি আগুসরি’ উন্নত শিরে জীবন-রণাঙ্গনে
গরিমার দ্যুতি তাই এ শিরস্ত্রাণে।
অয়ি কল্যাণী ব্যথা!
বুকের মানিক দুঃখ আমার ! অতৃপ্তি সুমধুর !
মৃত্যুবিজয়ী রে মাের বাসনা! পিপাসা দুঃশাসন!
অন্তর মাের পঞ্জর-তলে আজিকে শতধা-চুর,
আত্মার মণি-পদ্মের লাগি’ বৃথাই অনুক্ষণ
মাথা খুঁড়ে মরে চিত্তের কাতরতা।
২৮
দুঃখের দান হৃদি-মালঞ্চে মম, আশীষ বিতরি পড়িতেছে ঝরি’ তব করুণার আলো। ওগাে প্রিয়তম, শুভ্র তাহার দীপ্তিতে হােতূ লীন- বাসনা-মলিন, দীনহীন মাের এ-কায়ার ছায়া কালাে, নিষ্প্রভ করি’ তপনের জ্যোতিঃ নাহি জ্বলে যতদিন বিরহী এ-প্রাণ প্রভায় উজলতম। সবিনয়ে রহি দূরে ; কাবা-প্রাঙ্গনে ঘােরে শত শত ধর্মাচারীর দল, আমার কণ্ঠ মিলায় না সুর তাদের ভজন-গানে ; তবু এহিয়ার তারে তারে কাপে তারি গান অবিরল, আর, উহাদের প্রার্থনা হ’তে খাটো নহে তারা মানে— খােদার দৃষ্টি গভীর মরমপুরে। ওরে বিষন্ন প্রাণ, ব্যথা-হতাশার মরুপার হতে চেয়ে দেখ, আঁখি তুলে প্রেম-নিশ্বাস আসিছে ভাসিয়া প্রভাত-সমীর-প্রায়, ঝরিয়া পড়িছে অশ্রু-মুকুতা আঁখি-পল্লবে দুলে উর্বর করি’ কুকানন ; গােলাপ জাগিছে তায়, বসন্তে তারা পাঠাইছে আহ্বান। ২৯
নবােদ্যম
আনন্দ-আসব মম আজি স্বাদ-হারা,
ভুবন-নিবাস মাের—উষর সাহারা ;
শ্যামদুৰ্বা নাহি আর, আছে কুশাঙ্কুর ;
বসন্ত নিঃশেষে শেষ-জীবন বেসুর।
আনন্দ খুজিয়াছিনু, সীমা কোথা পাই,
শূন্য বাহু উন্ধে মেলি-সখা কেহ নাই ;
ক্ষমারূপী ভগবানে না লভিলে প্রাণ,
বিশীর্ণ তৃণের চেয়ে শুষ্ক মাের গান।
তবু হে গােপন বঁধূ! চাও মুক্ত-আঁখি-
হয়তাে হতাশা হ’তে বড় তৃপ্তি বা
দু’চরণ ক্লান্ত যদি প্রেম-পথে চলি
ফুটাবে নূতন শক্তি নব পুষ্পকলি।
দুর্গম-যাত্রী জীবনের শান্তি হরি’, আমারে তাড়না করি’, চলেছিস রে প্রেম নির্মম! তথাপি উদ্ধত তাের প্রকৃতি হইতে মাের অন্তরের গৰ্ব নহে কম। অতিক্রমি’ সৰ্ব্ব যন্ত্রণায় প্রাণের বিশ্বাস মম, জলিবে নক্ষত্রসম, যত তারে দলিবি ঘৃণায়। ভাঙিয়া,পড়েছে জানি হিয়ার মুকুরখানি প্রতিকূলে মাের বাসনার ; দিওনা দিওনা তবু করুণার কণা কভু, হে জীবনদেবতা আমার । বরং প্রশংসমান আঁখি হের এ হিয়ার গৰ্ব্ব-দুঃখেরে করিয়া খৰ্ব, উচ্চশিরে যুঝিছে একাকী। ভেবাে না পরম সুখে, বাঞ্ছিতের অভিমুখে, চলিয়াছি আনন্দে আরামে ; কঁদে হিয়া অবসাদে, চরণে চরণ বাঁধে, পদক্ষেপ বারবার থামে অভিপ্রেতে যত অনুসরি ; সুদুর্গম যাত্রাপথ, তবু চলে মনােরথ, উত্তরিতে শান্তিরাজ্যেপরি। *** রাত্রির আঁধার ঠেলি’ আতন্দ্র নয়ন মেলি রে মখফী, উপরে দেখ, চেয়ে দুঃখের সেনানীদল, ছত্রভঙ্গ হতবল, উৰ্দ্ধশ্বাসে পলাইছে ধেয়ে ; আসে উষা-হতাশা মিলায় অত্যাশ্চর্য ইন্দ্রজাল—প্রার্থনার শরজাল অভিভূত করিয়াছে তায়। ৩১
ছায়াবাজী
রে স্বজন-পরিত্যক্ত! কতকালে বল
আবার দেখিবি তাের সে কাননখানি, পুষ্প-সমুজ্জ্বল ?
চিত্তের উদ্যানটীরে রেখে দে পৃথক, নিজেরি মাঝারে,
সুপবিত্র, শুভ্র ফুলহারে ;
ভুলে যারে-অবরুদ্ধ পিঞ্জর-মাঝারে
পক্ষী যথা ভুলে যায়, উড়িত একদা, নীল-পারাবারে
প্রসারি যুগল-পক্ষ , ভুলে যায়, অরণ্যের গান ;
ভাবে বিশ্ব—তা’র খাচা-খান !
নাহি তবু, নাহি তাের বিন্দুমাত্র ভয়
প্রেম-বাগুরায় বদ্ধ নিঃসঙ্গ নীরব, রে মাের হৃদয়।
বিচ্ছেদের নিদারুণ উদ্বেগ-যন্ত্রণা, নহে কভু তার
প্রেমে প্রাণে একাকার যার।
সকরুণ প্রতীক্ষায় মােরা ক্লেশ পাই,
প্রিয়ের আননখানি আকুল আবেগে, দেখিবারে চাই
বৃথাই রে, যতদিন অন্তরের মূলে নবারুণ-রাগে
নব-জাত আশাটী না জাগে।
অটল বিশ্বাস তাের, তাপসী-হৃদয় !
ব্ৰহ্মণি-যােজিত-চিত্ত ব্রাহ্মণের চেয়ে, অল্প কভূ নয় ;
জীর্ণ দেহ বহে তার শতগ্রন্থি-শিরা, রক্তমাংস-তলে,
উপবীত যথা তার গলে।
৩২
-- ছায়াবাজী জানাে কেহ-প্রেমিকের কিবা, পরিণতি ? কোন্ ভবিষ্যের পানে টানিতেছে তারে, নিষ্ঠুরা নিয়তি। বিঘােযিবে উচ্চকণ্ঠে খেয়ালী জগত, তার প্রতিকূলে, “দাও ওরে বসাইয়া শূলে” ! তবে আর বৃথা কেন অনুযােগ, ব- বাজিছে বলিয়া দুটী পায়ে গুরুভার, চরণ-শৃঙ্খল ? তাের চেয়ে সমধিক মানাইত কোথা, দুৰ্ব্বহ এ ভার ? সহিবার শক্তি এত কার ? শৈলপৃষ্ঠে রহি’ রত অসাধ্য চেষ্টায় যেরূপে জীবন-রণে পরিশ্রান্ত-হিয়া, কাদি হতাশায়, মৃত্যুর চরণে শেষে লইল শরণ, প্রেমী ফাহাদ রে হৃদয়, তারি মত কঁদ! == কণ্টক-কঙ্কর-ময় দেখ, ও প্রান্তর ক্ষত পদ-চিন্তু তাের একে এলি যার বক্ষের উপর ; জনশূন্য অনুৰ্ব্বর ঐ ভূমিতলে, তাের রক্ত-ছাপ- ফুটাবে রে অজস্র গােলাপ। হে প্রেম! ভাবিয়াছ কি, এ নিষ্ঠা আমার ডরিবে পরিতে গলে মরণের ফাসি করি’ কণ্ঠহার তাই যদি ইচ্ছা তব ? তােমার মহিমা দীপ্তি যদি পায়, সগর্বে সহিব যন্ত্রণায়। ১; রে মখ ফী! নিয়তি তাের এই যদি হয়-- নিকুঞ্জ-কুটীর হ’তে নিৰ্বাসিত দূরে, জীবনের ক্ষয় ; কেন ক্ষোভ ? স্বপ্নমাত্র মনুষ্য-জীবন ; আমরা যে আছি, হাসি, কাঁদি, ভালবাসি--ছায়াবাজী, শুধু ছায়াবাজী! ৩৩ -- । কঃ পন্থা? রাখিত রাজন্যবর্গ নিরাপদ রাজসিংহাসন, কভূ না জানিত কেহ পরাজয়-গ্লানি সে কেমন, বিজয়-বাহিনী যদি না চালাতত তুরস্কীয়-দলে প্রতি রাজশির হতে তাজগুলি পাড়িতে ভূতলে। তেমনি, মােদের ভাগ্য তােমার নেতৃত্ববলে বলী না হইলে, মহাত্ম তুচ্ছ হ’ত আমাদের বিজয়-গরিমা যত, ব্যর্থ হ’ত যাবতীয় রণ। লভিলি পতঙ্গ তুই কি-মহত্ব, কতই না বল করিয়া বহির স্তুতি! ছিল তাের অদৃষ্টের ফল- প্রেম ও মৃত্যুর মােহে মুগ্ধ হবি, নারিবি সহিতে স্ফুলিঙ্গের জ্বালা, তবু স্পর্ধাভরে পারিবি দহিতে। বহি-প্রদক্ষিণ-রত আত্মভােলা রে পতঙ্গ! বিলক্ষণ আছে তাের জানা, একাকার হয়ে যাবি বাসনার সাথে তাের, উপেক্ষিলে মরণের মানা। ওরে ও নিষ্ঠুর প্রেম! যবে শেষ বিচারের দিনে দাড়াবি খােদার পাশে লয়ে তাের অত্যাচার-ঋণে, চলেছি করি’ যত নিরীহের হৃদি-রক্ত-পাত, উদ্ধত মস্তকে তাের হানিবে বজ্রের প্রতিঘাত, সেদিন বিচারভূমি তরঙ্গিত শােনিতের কালিমায় হবে কৃষ্ণতম, হােসেনের হৃদি-রক্তে কলঙ্কিত কার্বালা’র তৃণ-ভূমি-সম। তথাপি সান্ত্বনা, ওগাে বিচারক, করুণ-হৃদয়, পাপীদের প্রতি তব চিত্ত কভূ হবে না নিদয় ; তাদের বিক্ষুব্ধ বক্ষ যত আত্মগ্লানির বাহন, সহে তারা নিরন্তর সন্তাপের যে মহা-দাহন, - ৩৪
কঃ পন্থা
।
দংশি’ বুকে যে দারুণ লজ্জা আজ অনুতপ্ত করিছে তাদের,
বল তাে বিচারকা! পাপের উচিৎ শান্তি, উহাতেই হয়নি কি ঢের ?
মরীচিকা-মােহে মজি’ এ-ভুবন-মরুভূ-মাঝার,
উদভ্রান্ত কত না পান্থ হারায়েছে পথরেখা তার।
তথাপি প্রেমের শুভ বাহুর সঙ্কেত লাভ করি’
কত না পথিক গেছে ও-পথের সঙ্কটেতে তরি’ ;
মজনুর মত যদি পথহারা পান্থ কেহ ঘুরে মরে মরুর দুস্তরে,
প্রেম দেখাইয়া পথ, অতিক্রমি’ বিঘ্নবাধা তাহারে লইয়া আসে ঘরে।
.
অটলতা
সকল চাওয়া পূর্ণ যেথায়, সেই বাগানের কোলে
যায়নি কোনােই পথ,
তৃষ্ণা-কাতর মােদের নয়ন-লুব্ধ চকোর বৎ
তােমার রূপের চন্দ্রিকা-পান-স্বপ্নে বিভাের—তবু
পলক তরেও পায় না তারা কভু
দেখতে সে লাবণ্য যাহা তােমার মুখে দোলে।
৯s
তাই তাে ঝরে ধারায় ধারায় নয়ন-জলের ঝারি,
হৃদয়-ভাঙা ‘শ্বাসে
অপূর্ণ মাের বাঞ্ছাগুলির করুণ স্মৃতিই ভাসে ;
তাইতাে বৃথা অনুশােচন জাগায় বারে বারে,
বাগানটী সেই-যেথায় পেয়ে তারে
হারিয়েছি, আর পাইনে দেখা ; ভুলতে তবু নারি।
*
রাজপ্রাসাদে কি ফল তবে, রাজ্যে কিবা কাজ ?
কেনই বা সম্পদ ?
ঘুচুক না—যা বিশ্বে যােগায় অহঙ্কারের মদ !
প্রাণের দারুণ অপমানের এ দুর্দিনেও তবু
রাজার সুরাপাত্র সম, প্রভু
তােমায় স্মরি’ উর্ধে ধরি ভাগ্যটী মাের আজ।
মখ ফী রে তুই হােনে হতাশ; নাই গজালাে ঘাস
তপ্ত মরুর বুকে
নয়ন-সলিল-সেচনে তাের , কিন্তু সে কোন্ সুখে
খােদার কৃপায় অবিশ্বাসী বিজ্ঞ জনের দল
ছড়িয়ে চলে তর্ক-কোলাহল,
অনন্ত র কৃপা যখন সৃষ্টিতে প্রকাশ ?
বেদনার সুখ
আমার সবুজ কুঞ্জ অভিষিক্ত অশ্রুর নীহারে,
আত্মার অদৃশ্য পথে প্রবাহিত গােলাপী সুবাস
মদির পরশে তার, চিত্তে আনে ভােরের আভাস ;
রে সাকী, পিয়ালা আন্-ঐ দেখ, নিকুঞ্জ-মাঝারে
*
আমাদের উৎসবেরে বিতরিতে গৌরবের প্রভা,
পশিছে নিশীথ-রাতে ঝিকিমিকি উষার কিরণ ;
জানিস—নিশার বুকে ও কোন্ আলাের শিহরণ ?
স্বরগের দ্যুতি-দীপ্ত আমারি ও হৃদি-রক্ত-জবা।
দুঃখের পিয়ালা হ’তে প্রাণ ভরে করিয়াছি পান,
ভালবাসি ব্যথারাশি আহত এ হৃদয়খানির,
ক্ষত না শুকাতে তাই ছিড়ে তারে করি চৌচির,
বেদনার মাঝে আমি পেয়েছি রে আনন্দ-সন্ধান।
কেন বা সম্মতি তবে দিব বল্ সােহাগ-সমীরে
বিক্ষুব্ধ করিতে চিত্ত-মৃদুমন্দ মলয় বাতাস
বিপর্যস্ত করে যথা সুবিন্যস্ত প্রিয়া-কেশপাশ ?
আমি যে নিরাশা-পথে চলিয়াছি সৌভাগ্যের তীরে।
করিস্ নে ভয়-যদি অভ্যন্তরে প্রার্থনা-গৃহের
ক্ষীণ কপূরের শিখা অকস্মাৎ হয় নির্বাপিত ;
দীর্ঘশ্বাস-মূলে মাের যে অনল নিত্য-প্রজ্বলিত,
নবীন আলােক-শিখা, দীপ্ততর, জাগাবে সে ফের।
,
৩৭
দিওয়ান-ই-মখী
বহে যে সুগন্ধী বায়ু উষার আঁচলখানি ঘেরি’
যায় না কি, ওরে মখ ফী, হরি’ লয়ে প্রাণমন তাের
দূরান্তরে,-আনন্দের স্বর্গলােকে; যাহে দিন-ভাের
নন্দন-সুরভি রহে স্নেহে তাের সর্ব অঙ্গ বেড়ি’ ?
জ্ঞান ও প্রেম
প্রেম-উন্মাদনা মাের তাবৎ বিশ্বের ঘৃণা
শিরে মম আনিয়াছে টানি’ ;
জগতের নির্মমতা এড়াইতে ছুটি তাই
খুজে খুজে শান্তি-নীড়খানি।
s
চাই নিজ অধিকারে একখানি উপবন
নিরজন অরণ্যের ছায় ;
চিত্রের সমতা যেথা নাশিতে সংসারীজন
সংশয়ী নয়নে নাহি চায়।
প্রেমের চরণমূলে আপনা বিকাতে চায়
অথচ আঁকড়ি রহে প্রাণ,
এ-হেন প্রেমিক যদি সেবা করে প্রণয়ের
তবে তার মরি কি সম্মান।
প্রথম যৌবনে মাের শুধায়েছি—কোথা পথ ?
প্রেম-~-সে সাধিয়াছিল বাদ ;
পিচ্ছিল প্রেমের পথে ঘটিল পতন, টা,
জ্ঞান শেষে ঘুচাল প্রমাদ।
হৃদয়-মুকুর আজ মাজিয়া উজল করি,
আত্মরূপ মনের নয়নে
আনন্দের প্রতিবিম্বে যাবৎ না ফুটে উঠে
‘রসে’ ধরে ‘রূপে’র আসনে।
দিওয়ান-ই-মখ ফী
শােকান্ধ-নয়নযুগ-‘ইয়াকুব’ সম আজ
জগতের যাবতীয় মুখ
নিরর্থক মাের কাছে ; কেন আঁখি, যায় যদি
তােমাপানে চাহিবার সুখ ?
৪
--
আমরণ
কতকাল লুকাবি রে প্রজ্জ্বলিত হিয়া।
ধ ধক্ শিখাগুলি, ঐ দেখ, আসে বাহিরিয়া ।
তাের ঐ দীর্ঘশ্বাস-বাষ্পরাশি-তলে,
আকাশের যত তারা স্নানদীপ্তি লুকাবে সদলে।
*
মরুপথে, অন্তরের প্রেম-তাড়নায়,
বালুকা-বিবর্ণ-শিরে ভ্রাম্যমান মজনুর প্রায়,
লয়লার দরশন যাচি’ চিরদিন,
ব্যর্থ-আঁখিজলে মাের আয়ু হবে নিরন্তর ক্ষীণ।
প্রেমালােক দীপ্ত আত্মা কভু নাহি ডরে
অজ্ঞান জগত যদি চতুর্দিকে ঘােষে তারস্বরে
“ফেরে যে প্রেমের পথে সে ঘাের উন্মাদ”
জানে সে-অন্তরে তার জাগে কোন্ আনন্দের স্বাদ,
প্রজ্ঞান কেমনে তার কানে কানে কয়-
“প্রেমাঞ্জনে যে-স্বপন দেখা যায়—স্বপ্ন তাহা নয়”।
দেখ, মখ ফী চেয়ে দেখ, কি-ঔদ্ধত্যভরে
মানবের বুকে বুকে প্রেম নিত্য সগর্বে বিচরে।
ওই দেখপ্রেমিকের হৃদি-রক্ত-স্নানে
কি-গাঢ় রক্তিম আভা বিকীরিত তাহার কৃপাণে।
৪১
বসন্তে
বসন্তের সমাগমে নেহারিলে ফুলের বাগান,
মুক্তকণ্ঠ পাপিয়ার আনন্দে গাহিয়া উঠি গান ;
মেলিয়া ছলনা-জাল সুচতুর মালাকর আসি’
বাঁধিতে চাহিলে মােরে—গােলাপের মত আমি হাসি।
পরশি নিকুখানি বহে যে প্রভাত-সমীরণ,
আমার নয়নে মনে আনে না সে সুখের স্বপন ;
অকর্মণ্য গন্ধবহ পারে না আনিতে উপহার
তব উত্তরীয়-গন্ধ যত্নে বহি’ পক্ষপুটে তার।
উদ্যানের বহিদ্বারে প্রতীক্ষায় রহি আমি জাগি’ ;
আপনারে হতভাগ্য কি হেতু ভাবিব এর লাগি ?
পবিত্র তােরণে তব নিত্য রব উদ্বেগে আকুলি’
যুগল-নয়ন-পহ্মে মুছে দিতে তােরণের ধূলি।
এ চিত্ত-বিহগী মাের জালে তব পড়িয়াছে বাঁধা ;
বৃথা উড্ডয়ন চেষ্টা, বৃথা তা’র নিরন্তর কাদা
সত্য সে বন্দিনী,তবু, বাঁধিতে কি পারে তব পাশ
উঠিছে আকাশে তার বক্ষভেদী যত দীর্ঘশ্বাস ?
রে অমূল্য দুঃখ-লভ্য মৃত্যুহীন প্রাণ-বিহঙ্গম
বৃথা তােরে খুঁজে ফিরি ; অতিক্রমি’ শাসন সংষম
তাের লাগি’ সৰ্ব্ব হিয়া ব্যাকুলিয়া ওঠে, তবু হায়
পক্ষ-প্রধুনন তাের কল্পনার উর্ধে রয়ে যায় ।
৪২
লক্ষ্যভ্রষ্ট করি’ মােরে, রে অরাতি, রেখেছিস ধরি’
কিন্তু শােন্-যদি তুই সাগর গর্ভেও অবতরি’
আমার আক্রোশ হতে আপনারে লুকাইতে চা—
সেখানেও পশি’ তােরে দহিবে জলন্ত মাের শ্বাস ।
আনন্দে কানন কোলে, বুলবুল, ঢা তাের গান,
বক্ষের মঞ্জুষা তাের ভরে দিতে, বসন্তের দান
মখফী এনেছে জিনি’; কিন্তু তার আপন হিয়ায়
হতাশী হিমেল বায়ু হাহাকারে ডুকারিয়া ধায়।
কবি-বেদন বল মােরে, ওরে প্রেম, একি রীতি তাের ?•••কেন মাের আমিত্ব হরিয়া অন্তর মন্থন করি’ চাস্ নে রাখিতে ধরি’ চরণের সেবিকা করিয়া ? অপার প্রজ্ঞার তাের কে কবে পেয়েছে পার- কে জেনেছে প্রেমী কত সহে জগত যখন তারে বাতুল বলিয়া বুঝি, ঘৃণা আর অবজ্ঞায় দহে। আপনার হৃদয়ের শােনিত পিপাসু আমি, চাহি তাহে সাগর সৃজিতে; সৰ্বস্ব ঘুচায়ে মাের ডালি দিতে চাই প্রাণ পাদমূলে তাের রিক্ত চিতে। বিরহ দাহনে দহি’ পড়িতেছে মুরছিয়া হিয়া মাের বেদনার ভারে আয়রে সঙ্গীতসুধা লয়ে রসধারা তাের, অসীমায় মুক্তি দে আমারে। বসে রই ভস্মন্তুপে রুষ্ট আকাশের তলে হতবুদ্ধি আয়ুবের প্রায় দুখনিশি অবসানে উষার বিকাশ সম আশা তবু আঁখি মেলি চায়। জনহীন শৈলবক্ষে হর্ষ বেদনার দ্বন্দ্বে অভিভূত ‘ফরহাদ সম আশা আর নিরাশায় আমিও ঘুরেছি বহি’ ব্যথা ও বাসনা বুকে মম। তবু তাের গুপ্ত কথা, রে মখ ফী, ছড়ায়ে গেছে সুনিশ্চিত সারা বিশ্বময়। ‘ইসুফের’ রূপবাশি কা’র চোখে না পড়েছে, হাটে যবে হ’ল সে বিক্রয়। 83 দিশারী মদ্যপাত্র কেন ওষ্ঠে ধর ? উদ্যানের পুষ্পরাজি যােগায় যে গন্ধের আঘ্রাণ, আবেগ-মাধুর্যময় তাদের সে অনায়াস দান আনে প্রাণে মাদকতা, স্বর্গীয় যা’ সমধিকতর। ক্ষমা কর মােরে, এ মিনতি, • প্রীতি-সম্মেলনে যদি সুরার পরশ নাহি চাই; আমি করিয়াছি পান, যে পানীয়, তুল্য তার নাই, সুমিষ্ট সৌরভে তার অহহারাত্র আমি মুগ্ধমতি। এ হৃদয় যেন কোনাে পাখী আনন্দে আকাশপথে কোনােদিন গাহেনি যে গান, দুঃখের পিঞ্জরবাসে চিররুদ্ধ রহি’ ম্রিয়মান স্বপ্নে-দেখা ফুলবনে নিজমনে বিহরে একাকী। অনুযােগ সাধে কি জানাই ; এ তনুর প্রতি অনু, ওরে ও নির্মম নীলাকাশ । কাদি তাের অত্যাচারে মুহুর্মুহু ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস- বিষন্ন মলিন দিন ছাড়া কি রে দেয় তাের নাই ? কথা রাখ, নিঠুরা নিয়তি! দে মােরে আনন্দঘন একখানি বসন্তের দিন যার অবকাশে এই রুদ্ধপ্রাণে বেজে ওঠে বীণ স্বপ্তস্বরা, অর্থভরা ; আসে ওই মৃত্যু ক্ষিপ্রগতি। ৪৫
দিওয়ান-ই-মখফী
দীনা আমি সত্য অতিশয়
আমার রিক্ততা তবু কৃপাভিক্ষু নহে এই ভবে ;
আজো জলে মৰ্ম্মতলে দৃপ্ত আত্মা আপন গৌরবে ;
সহিবার শক্তি আজো স্পর্ধাভরে বক্ষে জেগে রয়।
কতকাল, কতকাল আর
নিঃসঙ্গ বিক্ষোভে পূর্ণ এই কারা-প্রাচীরের পারে
মুক্তির পরশ-হারা রহিব রে আঁধারে আঁধারে
অন্ধ ‘ইয়াকুব’-সম ঝরাইতে নয়ন-আসার ?
যদিও এ গরবিনী হিয়া
বাহন-বিচ্যুত আজি বিলুণ্ঠিত ধরার ধূলায়
নিঠু নিয়তি-হস্তে নিদারুণ প্রহারের ঘায় ;
তবু জানি-এ-চরণ লক্ষ্যভূমে উত্তরিবে গিয়া।
জীবন-মরুভূ-পথ বাহি
প্রেম-তীর্থ লক্ষ্য করি’ যাত্রী যবে চলে সারি সারি
হে মাের অন্তরতম, জানি আমি, তাদের দিশারী
তােমারি চরণ-চিহ্নে অমর গৌরবে রবে চাহি’।
৪৬
দিব্য-দৃষ্টি
যুঝেছি সুদীর্ঘকাল কত না ব্যথিত ব্যর্থতায়
তাের সাথে, বৈরি মাের ; পরিণামে তবু লভি নাই
জয়ের গৌরব-কণা ।
কৃতঘ্নতা লুকায়ে হিয়ায়
সম্মুখ হইতে তাের নিত্য
শুধু
নিজেরে সরাই।
তাই তাে রে লােলজিহ্ব হতাশার তীব্র হুতাশন
ক্ষিপ্ৰ দৃপ্ত শিখা মেলি’ নিরন্তর উৰ্দ্ধমুখে ধায় ;
নিরুদ্ধ বেদনা-বাপ না মানিয়া আঁখির শাসন
অন্ধ নীলিমার পানে অশ্রু-বারি লিখন পাঠায়
ভাবি—উৎসব-সভা আমারে রেখেছে দূরে বলি
ঘুচেছে আনন্দ-তৃষা? যে-স্বপন জাগিত এ প্রাণে
আজো তার অবশেষ রহিয়াছে হৃদয় উজলি’ ;
শিরায় শিরায় মাের স্মৃতি তার বাজে সুরে-তানে।
১৮
সত্য, নিরাশ্বাসে ভরা নিবন্ধ এ গােলকধাঁধায়,
নাহি হেরি—কোন্ পথে এড়াইব যন্ত্রণার হাত ;
তবু, প্রার্থনার বলে কোনােকালে পাবােনাকি, হায়
একটা প্রসন্ন দিন-একখানি শান্তিময় রাত ?
এতই অভাগী আমি—যদিই বা সহিষ্ণু আশায়
প্রাণপণে করি শ্রম যতক্ষণ না পড়ি লুটায়ে
পারিনাকো প্ৰক্ষালিতে, যে-কালিমা দাগ রেখে যায়
অথবা যে-ধূলি লাগে মাের মনােমুকুরের গায়ে।
৪৭
দিওয়ান-ই-মখ ফী
দীনা সুনিশ্চয়—তবু, দুৰ্বলও তাে অল্প আমি নহি।
অস্থির-সঙ্কল্প-হেতু
পারিনা তাে নির্ভয়ে খুলিতে
যে-গােপন রত্নকোযে আমার সম্পদ-ভার বহি;
কৈ পারি সে-সম্পদ বিছাইতে মাের অঙ্কটীতে।
তবু, হে অন্তরতম, দিব্য দৃষ্টি লভি’ কোনদিন
হের যদি এ জগৎ, মায়ান্বিত, বর্ণ লীলাময়
ফকীরের ছিন্নবাস, মনে হবে—তা’র পাশে দীন
সম্রাটের পরিচ্ছদ, হীরা, মুক্তা, মাণিক্যনিচয় ।
৪৮
কেন ?
অধীর অঙ্গুলি মাের অতিরিক্ত ব্যস্ততা-কারণ
খুলিতে অদৃষ্ট-গ্রন্থি হইল না পূর্ণ-মনস্কাম,
জীবনের ব্যর্থতায় বিষন্নতা এবে অকারণ,
মিছে ভাব-বিধি মােরে বাম।
বিস্ময়ে অবাক হই—অন্তরের অতলে আমার
মধুর-দাহনশীল বাসনা-বহির শিখাখানি
নিভিয়া নিঃশেষ আজি ; দাহগুলি করিতে উদ্ধার
করেছি শিখারও প্রাণহানি।
১
আশার উদ্যানে মাের সাফল্যের কুসুম-কলিকা
মেলিয়া নয়ন কভূ হেরিল না উদার গগন ;
জীবনের পথে মাের আলােকের বরাভয়-শিখা
তমসায় রহিল মগন ।
*
হে কৃতঘ্ন প্রিয়তম, বন্ধু তব সীমাসংখ্যাহীন ;
কত লােকে বাসে ভাল, কত তব ভালবাসা পায়,
দেয় তারা সারা হিয়া, কেন লবে এ হৃদয় দীন ?
কেন তুমি চাহিবে আমায়?
৪৯
শেষ আশা
পূর্ণ কর, হে স্বতঃপ্রকাশ,
তােমার যাহারা ভক্ত, তাহাদের অন্তরের আশ ;
গুরুভারাক্রান্ত চিত্তে বহে যারা দুৰ্ব্বহ জীবন
বহিমান বর্জ লয়ে দিওনা তাদের দরশন।
পারিনা সহিতে আমি আর
তােমার বিচ্ছেদ আর তিক্ত এই মৰ্ম্মগ্লানিভার
নিপীড়িতা আমি, প্রভু, মুক্ত কর আমার আত্মায় ;
ক্লান্ত, ক্ষিন্ন, ভগ্নবুকে—মগ্ন আমি, হের, হতাশায়।
০
মানবের ওগাে বন্দনীয়।
খুলিয়া বন্ধন-রজু বন্দিনীরে কোলে টেনে নিও ;
রক্ষা তারে কর’ প্রভু—যেরূপে করিয়াছিলে ত্রাণ
কূপ হ’তে ‘ইউসুফে’-রূপে যার চন্দ্র ম্রিয়মান।
অলেশ আজিকে নিঃশেষ ;
যে-উৎস যােগাতে জল, শুষ্ক শূন্য তার তলদেশ।
দাও তব শান্তিবারি, হে মহান, আমি অতি হেয়
অনুতাপ-অশ্রুসিক্ত ধূলিকণামাত্র মুষ্টিমেয় ।
আশা তবু নব নব রাগে
ফুলে ফুলময় হয়ে ফোটে মাের বাসনার বাগে ;
অগ্নি-শিখা হইতেও পারে নাকি বিধির বিধানে,
কিংশুকের হাসিমুখ তাকাইতে আকাশের পানে ?
দীপিকা সিনাই—আরবদেশীয় পাহাড়। হজরত মহম্মদ ঐখানে ভগবৎ-প্রেরণা লাভ করেন। মজনুবহু উপাখ্যানে আখ্যাত লয়লার প্রণয়ী। কথাটার অর্থ ‘উন্মাদ। সাকীমদ্যপাত্র-বাহিকা। ইয়াকুব বা Jacob-ভ্রাতৃগণ কর্তৃক ক্রীতদাস-রূপে বিক্রীত পুত্র জোসেফের শােকে ইনি অন্ধ হইয়া যান; পরে তাহার নিকট আনীত (পুত্রের) পরিচ্ছদ-আম্রাণে পুনরায় দৃষ্টিলাভ করেন। আলেকজেন্দর—পারস্যের কাব্য-সাহিত্যে চরম সৌভাগ্যবানের প্রতীক হিসাবে এই নামটী ব্যবহৃত হয় ; অপর পক্ষে ‘ডেরিয়াস’ চরম অভাগার দৃষ্টান্ত। হাতেম—প্রাগ-মুসলীম যুগের আরবদেশীয় বিখ্যাত দানবীর। তিনি কখনও প্রার্থীকে বিমুখ করিতেন না। একজন তাহার শির প্রার্থনা করায় তিনি উহা দান করেন ও ঐভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হন। রুস্তম-ফার্দ সীর শাহনামার নায়ক-পারস্যের বিখ্যাত বীর। ফরহাদ-প্রাচ্য উপাখ্যানের বিখ্যাত প্রেমিক। ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে যিনি বাদশাহ খসরুর মহিষী হইয়াছিলেন, সেই সিরিনকে ইনি ভালবাসিতেন। তিনি ছিলেন একজন সারা পারস্যের প্রথিতযশা ভাস্কর। পাছে প্রেমে প্রতিদ্বন্দ্বী হন এই আশঙ্কায় তাহার অনুরাগ অন্য পথে চালিত করিবার জন্য বাদশাহ তাহার উপর এক অসম্ভব কৰ্ম্মভার প্রদান করেন। সিরিন Joui Shir বা দুগ্ধ-নদীর জন্য আবদার করায় Beysitoun পর্বতমালার পথে যে সমস্ত পাহাড়শ্রেণী খাড়া থাকিয়া অপরপ্রান্তের নদীগুলির প্রবাহ রােধ করিতেছিল তিনি সেইগুলি ভাঙ্গিয়া নদীকে বাধামুক্ত করিতে আদিষ্ট হন।
এe
কৃতকার্য হইলে সিরিন তাহার হইবে, এই সর্তে তিনি রাজী
হন এবং বৎসরের পর বৎসর প্রাণান্ত পরিশ্রমে যে আশ্চৰ্য্য
খাত খনন করাইয়া আনেন আজও তাহা দেখিতে পাওয়া
যায়। কৃতকার্য হইতে কয়েকদিন মাত্র যখন বাকী আছে
আছে, তখন শঙ্কিত বাদশাহ দূতমুখে ফরহাদের নিকট সিরিনের
অমূলক মৃত্যু-সংবাদ পাঠান। সেই সংবাদে পৰ্বতশীর্ষ হইতে
ঝম্প-প্রদানে ফরহাদ আত্মহত্যা করেন।
ইসুফ -ইয়াকুবের পুত্র জোসেফ ; অমানুষিক সৌন্দর্যময় কন্দর্প-কান্তি
যুবক ; কথিত আছে, সমগ্র পৃথিবীতে যত সৌন্দৰ্য্য ছড়ানাে
আছে, তাহার কি অংশ তঁাহার রূপগঠনে স্রষ্টা ব্যয়,
করিয়াছিলেন।
No text on this page.
No text on this page.