Makardah Saraswat Library, Howrah
Kichukkhan
Front matter
४११,
Sasa
और असामान
No text on this page.
কিছুক্ষণ
শ্ৰীৰলাইচাঁদ মুখােপাধ্যায়
(বনফুল)
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দেড় টাকা
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে
শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য্য দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
অগ্রগামী কবি
শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রীচরণেষু
ভাগলপুর
১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৩০০
No text on this page.
কিছুক্ষণ
No text on this page.
সময়ের স্রোত বহিয়া চলিয়াছে। সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-তারা, সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়, জন্ম-জীবন- সব চলিয়াছে। কত আশা-নিরাশা, আনন্দ-অবসাদ, স্তুতি-নিন্দা, সুন্দর-কুৎসিত, কালস্রোতের ঘূর্ণাবর্তে লীলায়িত হইয়া উঠিতেছে। অদৃশ্য ভবিষ্যতকে লক্ষ্য করিয়া—কিম্বা হয়ত লক্ষ্য না করিয়াই—নিখিল বিশ্ব ভাসিয়া চলিয়াছে। আমিও চলিয়াছি। গরুর গাড়ীর গাড়ােয়ানটাকে বলিলাম—“তুই ট্রেণটা ফেল করাবি দেখছি—একটু হাঁকিয়ে চ”। ফলে সে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দিয়া মন্থরগতি বলীবর্দযুগলকে উত্তেজিত করিবার চেষ্টা করিল। গতিবেগ সামান্য একটু বাড়িল বটে কিন্তু তাহা এমন নয় যে নিশ্চিত হওয়া যায়।
কিছুক্ষণ
বন্ধুর গ্রাম্যপথ।
যতদূর দৃষ্টি চলে চাহিয়া আছি। চোখে পড়িতে
দূরে তালগাছের সারি। ঋজু বলিষ্ঠ দেহ লইয়া আকাশে
বুকে
নিজেদের বৈশিষ্ট্য অকিয়া রাখিয়াছে। তাহারে
আশপাশের ঘনসন্নিবদ্ধ বৃক্ষশ্রেণীকে এতদূর হইতে চে
যায় না। নগণ্য জনতার মত উহারা দিগন্তরেখা
আড়াল করিয়া রাখিয়াছে মাত্র। ডানদিকের এক
ঝােপ হইতে একটা শৃগাল হঠাৎ বাহির হইয়া এদি
ওদিক চাহিতে লাগিল। তাহার পর হঠাৎ আমার
সাড়া পাইয়া সচকিত হইয়া ছুট দিল। সঙ্গে সঙ্গে
দেখি আর একটা। গাড়ােয়ান গরু দুইটিকে আর একব
সম্ভাষণ করিয়া আমাকে বলিল
“গতিক ভাল লয়-
“কিসের গতিক ?”
“দু দুটো গিয়ে শেয়াল ডানদিকেই, লক্ষণ ভাল লা
“তাই নাকি?”
“লয় ত কি, কাগ, শেয়াল আর সাপ এ তিন
জানােয়ার ভারি ইয়ে জানবেন আপনি। হনুমান
বটে—”
“বাজে! কলিকালে ওসব আর ফলে না।”
৪
কিছুক্ষণ
গাড়ােয়ান খানিকক্ষণ কিছু বলিল না।
বােধহয় অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছিল। হঠাৎ গরুর
পিঠে এক ঘা লাঠি বসাইয়া দিয়া সে কহিল—“আমার
হাতে হাতে ফল দেখা আছে। শােনা কথা লয় যে বলব
ইয়ে- আরে ই শালার বয়েলটাও একের লম্বর হারামজাদ”
বলিয়া সে বলদটার পৃষ্ঠদেশে সশব্দে আর এক ঘা
কসাইয়া দিয়া শুরু করিল।
তাহার কাহিনী এই
যে, প্রায় বৎসর খানেক পূৰ্ব্বে
সে সবাইগঞ্জের হাট হইতে মথুর মাঝির সঙ্গে ফিরিতে-
ছিল! ফিরিবার পথে ঠিক তাহার বাঁ পাশ ঘেষিয়া
প্রকাণ্ড একটা সাপ চলিয়া যায়। সে সাপ তাহার
গণেশকেই লইতে আসিয়াছিল। তাহা সে তখন জানিতে
পারে নাই।
জিজ্ঞাসা করিলাম-“গণেশ কে ?”
“আমার ছেলে বাবু। ইয়া দামাল দুরন্ত ছেলে ছিল
আমার গণেশ !”
“তাকে সাপে কামড়ে দিলে নাকি? সঙ্গে ছিল
তােমার ?”
“সঙ্গে থাকবে কিসের লেগে। বলছিলাম না
আপনাকে—ভারি বিতিকিচ্ছি জানােয়ার ওগুলা ! বাড়ী,
কিছুক্ষণ
যেতে না যেতেই শুনলাম গণশার অসুখ—পেট নামছে
বমিও খুব। পহর খানেক রাত হতে না হতেই সব খতম।
ওসব কলেরা মলেরা আমি বুঝি না বাবুলিয়তি ওকে
টানছিল !–চ, চ, বাবা আর একটুকুন বাকী-একটু
চলে চ-.”
গাড়ােয়ানের কর্কশস্বর কোমল হইয়া আসিয়াছিল—
গরু দুইটি তাহার শশাকের সুযােগ লইয়া যতদূর সম্ভব
মন্থরগতিতে চলিতে লাগিল! আমিও খানিকক্ষণের জন্য
ভুলিয়া গেলাম যে এই ট্রেণটা আমার ফেল করা চলিবে
ল! কাল আমার কলেজ খুলিবে এবং আমার পারসে
টেজ’ টায়ে টায়ে আছে । গাড়ীর ছইএর ভিতর হইতে
মুখ বাহির করিয়া সামনে পথের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া
রহিলাম। দেখিলাম একজোড়া খঞ্জন পাখী পুচ্ছ
দোলাইয়া পথের ধারে চরিয়া বেড়াইতেছে।
ট্রেণ ছাড়ে নাই। আমার ট্রেণ আসেই নাই। শীঘ্র আসিবার সম্ভাবনাও ছিল না। শৃগাল দর্শনের ফল হয়ত। পশ্চিমগামী একখানা গাড়ী লাইনচ্যুত হইয়াছে। এ গাড়ীখানা না উঠিলে অন্য কোন গাড়ী আসা অসম্ভব। সমস্ত ট্রেণ- খানার যাত্রীরা সেই ক্ষুদ্র ষ্টেশনটির প্ল্যাটফর্মে নামি এক বিচিত্র জনতার সৃষ্টি করিয়াছে। আমিও গিয়া তাহাদের দলে যােগ দিলাম। অপরিচিত জনতা। একটি লােক আমার চেনা নয়। নিজের বিছানা ও সুটকেসটি ষ্টেশনের কোথায় নিরাপদে রাখা যায় চিন্তা করিতেছি এমন সময় টেলিগ্রাফ অপারেটর বাবুটি সহাস্যমুখে আমাকে সম্বােধন করিলেন। “এই যে সার, আপনিও জুটে গেছেন দেখছি ! এই ট্রেণে যাচ্ছিলেন বুঝি!” “যেতে আপনারা দিচ্ছেন কই ? আপাততঃ এ জিনিসগুলাে কোথায় রাখি বলুন দেখি ! চারিদিকে যা ভীড়-” ৭ কিছুক্ষণ . “এই যে এখানে রেখে দিন না—” বলিয়া তিনি তঁাহার আপিসের একটা কোণ দেখাইয়া দিলেন। ভদ্রলােকের সঙ্গে আলাপ ছিল। ছুটির প্রারম্ভে যখন মামার বাড়ী আসিতেছিলাম তখন গাড়ীতে ভদ্রলােকের সঙ্গে পরিচয় হয়। সিগারেট আদান প্রদান করিতে করিতে আলাপটা ঘনিষ্ঠই হইয়া- ছিল। মনে পড়িতেছে যে সেই স্বল্প আলাপের মধ্যেই জানিতে পারিয়াছিলাম যে ভদ্রলােকের পরিবারের নাম খিনােদিনী এবং সে স্বামীর কাছে আসিয়া থাকিতে উৎসুক ; কিন্তু রেল-কোম্পানি এমন কৃপণ যে কিছুতেই ভাল একটা কোয়ার্টার তাহাকে দিতেছে না। ভদ্র- লােকের নাম মাখনলাল। বেশ মন-খােলা লােক। প্রায় মাসখানেক পূর্বে একদা উভয়ে এই ষ্টেশনে নামিয়া- ছিলাম। মাখনবাবু আসিয়া কাজে জয়েন করিয়া ছিলেন এবং আমি মামার বাড়ী চলিয়া গিয়াছিলাম। এই অপরিচিত জনতার মধ্যে মাখনবাবুকে পাইয়া এবং তাঁহার ভদ্র ব্যবহার দেখিয়া ভাল লাগিল। নিকটস্থ টুলটিতে উপবেশন করিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম—“কি করিয়া ট্রেণটা হঠাৎ এমনভাবে পড়িয়া গেল।”
কিছুক্ষণ
মুচকি হাসিয়া মাখনবাবু বলিলেন--“গাঁজা-অর্থাৎ
আমাদের রামদীনের কীৰ্ত্তি !”
“রামদীন কে ?”
“পয়েন্টসম্যান”
“পয়েন্টম্যান্ গাঁজা খেয়ে এই কীর্তি করেছে ?
বলেন কি মশাই ?”
গলা খাটো করিয়া মাখনবাবু বলিলেন—“তাসল
ফ্যাক্ট হল এই। তবে আমরা রামদীনকে বাঁচাবার চেষ্টা,
করছি। আপনি যেন কথাটা বলে বেড়াবেন না !”
সহসা টেলিগ্রাফের কলটা টষ্ট করিয়া উঠিল এবং
মাখনবাবু আমার দিকে পিছন ফিরিয়া বসিয়া টক টরে
সুরু করিয়া দিলেন। তাহার পর হঠাৎ আমার দিকে
ফিরিয়া বলিলেন—“সমস্ত দিন ভােগান্তি আছে আঞ্জ।
রিলিফ ট্রেণ সন্ধ্যের আগে পাওয়া যাবে না। আবার
কল কথা কহিয়া উঠিল--আবার মাখনবা সাড়া দিলেন।
আমি উঠিয়া বাহিরে আসিলাম।
বাহিরে আসিয়া দেখি ষ্টেশন প্ল্যাটফর্মের কোণে যে
জলের কলটা আছে তাহার সম্মুখে বহু লােকের ভীড়।
কয়েকজনের উচ্চ কণ্ঠস্বর শােনা যাইতেছে।
একটি শীর্ণকান্তি লােক তারস্বরে চীৎকার করিতেছে।
কিছুক্ষণ রগের শিরগুলা ফুলিয়া উঠিয়াছে।—“একশবার বলব 'আমি। সেকেন কেলাসের টিকিট আছে বলে কি তােমার বাবুর বেশী তেষ্টা নাকি আমাদের চেয়ে ! ইস ভারি সেকেন কেলাস ফলাতে এসেছে আমার—স বলছি—” ভৃত্য-স্থানীয় একটি ছােকরা একটি প্রকাণ্ড কুঁজায় জল ভরিতেছিল। সে অবিচলিতকণ্ঠে উত্তর করিল- “আমার ভরা হােক আগে ! হড়বড় কোরাে না” চাকরটির গায়ে ফরসা হাতকাটা ফতুয়া, কানে একটি অর্ধ-দগ্ধ বিড়ি। বেশ চালাক চতুর চেহারা। শীর্ণ ভদ্রলােক বলিলেন-“তােমার ওই দিগগজ কুঁজা ভরতে ত সন্ধ্যে হয়ে যাবে। সর আমার এই ছােট ঘটিটা ভরে নি আগে ভৃত্য কোন জবাব না দিয়া জল ভরিতে লাগিল। শীর্ণকান্তি লােকটি বলিতে লাগিল-“ওহে, কথার জবাব দাও না কেন হে তুমি। আচ্ছা বেল্লিক ছােকরা ত—” “মুখ সামলে কথা বলবেন আপনি “মুখে এক থাবড়া মারব তােমার। ডে'পাে ছােকরা কোথাকার!” “এই ভীড়ের মধ্যে কাৰু বাপের সাধ্যি আছে আমার গায়ে হাত দি দিকি—” ১০
==
কিছুক্ষণ
“বাপ তুলে গালাগালি দেবার জায়গা পাওনি আর।
ব্যাটাচ্ছেলে --হারামজাদা
“মুখ সামলে কথা বলবেন আপনি
একজন দীর্ঘাকার বলিষ্ঠ কাবুলীওলা বৃথা বাক্যব্যয়
করিয়া আগাইয়া গেল এবং এক ঝটকায় ছােকরাকে
সরাইয়া দিয়া নিজের বদনা ভরিতে সুরু করিয়া দিল।
সেই কাবুলী-ঝকার প্রাবল্যে যাহা প্রত্যাশিত তাহাই
ঘটিল। কুঁজা ভাঙিয়া গেল এবং ভৃত্য ভূশায়ী হইল।
ঠিক সঙ্গে সঙ্গে ওয়েটিং রুম হইতে এক আৰ্ত্ত নারী-কষ্টে
আকৃষ্ট হইয়া ফিরিয়া দেখিলাম একটি মহিলা নিতান্ত
অসহায়ভাবে বলিতেছেন
“ওমা-কি হবে গাে ! কাবলেটা ছটকে মেরে
ফেল্লে যে গাে !”
আইনত এইবার আমার পৌরুষ জাগ্রত হওয়ার
কথা। কিন্তু ব্যাপার দেখিয়া আমি ফিক্ করিয়া হাসিয়া
ফেলিলাম। হাসি অবশ্য বেশীক্ষণ টিকিল না—কর্মক্ষেত্রে
শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ হইতেই হইল।
ওয়েটিং রুম হইতে একজন বৃদ্ধ গােছের ভদ্রলােক
বাহির হইলেন। পুরু লেন্সের চশমা পরা।
মহিলাটিকে বলিলেন--“তুই ভেতরে যা’—আমি দেখছি।”
ভদ্রলােক
কিছুক্ষণ
বলিয়া তিনি আগাইয়া আসিলেন। আসিয়া
“ছট্ট,–এই ছট্ট” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিয়া অসহায়-
ভাবে এদিক ওদিক চাহিতে লাগিলেন। আমার সহিত
চোখােচাখি হইতেই একটু আগাইয়া আসিয়া বলিলেন
“বড় মুস্কিলে পড়া গেল। বিধবা মেয়েটা কাল থেকে
নিরস্তু উপবাসী অথচ জল যােগাড় করা মুস্কিল ব্যাপার
দেখছি।' ওই কাবলের সঙ্গে যােঝর সামর্থ্য আমার
ত নেই। ওরে ছট্ট-এ ব্যাটা চাকর আহা বাক্যবাগীশ !
আবার কার সঙ্গে বচসা শুরু করেহে !”
তখন আমাকে বলিতে হইল “আমাকে একটা কিছু
পাত্ৰ দিনত চেষ্টা করে দেখি যদি জল আনতে পারি !”
ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি আমার হাত দুটি ধরিয়া
বলিজেন—“অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। দেখুন যদি
পারেন। যা ভীড়-”
ফিরিয়া দেখিলাম কাবুলীওলা বেশ স্বচ্ছন্দে সমস্ত
কলটা অধিকার করিয়া মুখ-প্রক্ষালন করিতেছে এবং
অন্ততঃ পঞ্চাশজন প্যাসেঞ্জার বিরক্তি-বিদ্রুপ-হতাশাময়
ভঙ্গীতে তাহাকে ঘিরিয়া নানা গ্রামে চীৎকার করিতেছে।
ছটও উঠিয়াছে এবং সেই শীর্ণকান্তি লােকটিকে নিকটে
পাইয়া বাচনিক বীররসের অবতারণা করিতেছে।
১২
কিছুক্ষণ আমি বৃদ্ধ ভদ্রলােকটিকে বলিলাম-“একটা কিছু পাত্র দিন তাহলে “আসুন” ভদ্রলােকের পিছু পিছু ওয়েটিং রুমে ঢুকিয়া অ্যালু- মিনিয়মের একটা ঘটি লইয়া কলের দিকে অগ্রসর হইলাম। ভীড় ঠেলিয়া কাবুলীওলার নিকটস্থ হওয়াই মুস্কিল। হিন্দু, মুসলমান, মাড়ােয়ারী, বাঙালী, বেহারী সকলেই জমাট বাঁধিয়া রহিয়াছে। সকলেরই লক্ষ্য । কলটার উপর কেহই কিন্তু অগ্রসর হইতে পারিতেছে । গাড় হস্তে এক বেঁটে ভদ্রলােক একটু তফাতে দাড়াইয়াছিলেন। তিনি আমাকে অযাচিতভাবে উপদেশ দিলেন- “ও ব্যাটার হয়ে যাক আগে, তারপরু এবন মশাই। কেন মিছিমিছি সকালবেলায় গাে-ঋদক ব্যাটার হাতে মার খেয়ে মরবেন।” “দেখি—” ভীড়ের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলাম এবং কাহাকেও ঠেলিয়া, কাহারও পা মাড়াইয়া, কাহাকেও অনুনয় করিয়া, কাহারও পাশ কাটাইয়া কাবুলীওলার নিকটস্থ হইলাম। সে তখন তােড়ে কল খুলিয়া দিয়া মাথা ফাদক
কিছুক্ষণ
ধুইতেছে। আমি কাছে আসিতেই সে আমার ঘটিটার
দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসুভাবে আমার দিকে চাহিল।
চাহিবামাত্র আমি তাহাকে ভাঙাভাঙা হিন্দিতে বুঝাইয়া
বলিলাম যে একটি জেনানি অত্যন্ত পিপাসার্ত্ত, তাহার
জন্য জল অবিলম্বে প্রয়ােজন—সুতরাং কলটা একবার
ছাড়িয়া দেওয়া দরকার।
—“জরুর”
কাবুলীওলা তৎক্ষণাৎ কল ছাড়িয়া দিল।
এত অল্প
আয়াসে ব্যাপারটা মিটিয়া গেল দেখিয়া বিস্মিত হইলাম।
কাবুলীওলার প্রতি রাগের ভাবটা কমিয়া আসিল। ঘটি
অর্ধেক ভরা হইয়াছে এমন সময় কাছায় টান পড়িল।
ফিরিয়া দেখিলাম সেই বেঁটে ভদ্রলােকটি একমুখ হাসিয়া
আমাকে নিতেছে—“এই ফাকে আমার গাড়টাও ভরে
দিন না শাই। আপনাকে যখন ভরতে দিয়েছে।
পুলিশে কাজ করেন বুঝি আপনি-হেঁ হেঁ তাই—”
আমি কোন উত্তর দিলাম না। আমার ঘটি পরিপূর্ণ
হইলে সরিয়া দাঁড়াইয়া ভদ্রলােককে বলিলাম-“এইবার
নিন না—” কিন্তু কাবুলীওলা সে সুযােগ তাহাকে দিল না।
আমি সরিয়া যাইতেই সে আসিয়া কল দখল করিল
এবং বাকী সকলে নিস্ফল কোলাহল করিতে লাগিল।
১৪
কিছুক্ষণ ভীড় ঠেলিয়া জলের ঘটিটি লইয়া সন্তর্পণে ওয়েটিং- রুমের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। বৃদ্ধ দ্বারেই দাড়াইয়াছিলেন। তাঁহার বিধবা কন্যাও দেখিলাম পিছনে দাড়াইয়া আছেন। আশা করিতেছিলাম তিনি আমার এই অসাধ্যসাধনে পুলকিত হইয়া আমায় ধন্যবাদ দিবেন এবং ওই পিপাসিতা বিধবাটি সকৃতজ্ঞ দৃষ্টির দ্বারাও আমাকে অন্তত পুরস্কৃত করিবেন। কিন্তু কিছুই হইল না ! মেয়েটি বলিল—“ও জল আমি খাব কি করে?” ভদ্রলােক বলিয়া উঠিলেন—“কেন?” তারপর হঠাৎ আমার পায়ের দিকে চাহিয়া হতাশ- ভাবে বলিয়া ফেলিলেন—“এ সব মাটি হল।” মেয়েটি বলিল—“তুমি কে বলে দিলেন কেন বাবা,—ওঁর কি অত খেয়াল আছে!” “আরে বা–হিন্দু বিধবার জন্যে জুতাে পায়ে দিয়ে জল আনে না কি কেউ !” অপরাধী পাদুকাযুগলের প্রতি চাহিয়া আমি একটু সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলাম। বৃদ্ধ আমার দিকে ফিরিয়া বলিলেন—“আরে বাতাতে কি হয়েছে। জলটা অন্য কাজে ০ ১৫
৫
কিছুক্ষণ
লাগবে। ভীড়টা কমুক একটুজল পাওয়া যাবে
এখুনি—”
কি করিব ভাবিতেছি এমন সময় সােরগােল করিতে
করিতে টেলিগ্রাফ মাষ্টার মাখনলাল আসিয়া হাজির।
“আরে মশাই, আপনাকে খুঁজে খুঁজে আমি হয়রা।
হঠাৎ কোথায় ডুব মারলেন ? ওকি, হাতে জলের ঘটি
কেন?”
বলিলাম।
মাখনবাবু হাসিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, তার জন্যে
ভাবনা কি ? আপনার মেয়ের জন্যে জলটল সব আমি
বাসা থেকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও কলের আশা ছেড়ে
দিন”
তাইরুপির আমার দিকে ফিরিয়া বলিলেন—“আসুন
আপনি জুড়িয়ে যাচ্ছে।”
জলের ঘটিটা নামাইয়া দিয়া মাখনলালের অনুবৰ্ত্তী
হইলাম। যাইতে যাইতে মাখন আমাকে কনুই দিয়া
এক খোঁচা মারিয়া জ নাচাইয়া বলিলেন—“কেল্লা মার
দিয়া। বুঝলেন ? কোয়ার্টার পেয়ে গেছি। ওয়াইফকে
এনে ফেলেছি। খান না এখন কত চা খাবেন আপনি।”
বলিয়া ভদ্রলােক হাে হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।
কিছুক্ষণ
পরমুহূর্তেই আবার গম্ভীর হইয়া চিন্তিতস্বরে সুরু কহিলেন
—“ট্রেণখানা ডিরেড, হয়ে বড় যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়ে
গেল। রামদীনটাকে ‘এনি হাউ’ বাঁচাতে হবে। আমাদের
মাষ্টার মশাইও উঠে পড়ে লেগেছেন। দেখা যাক কতদূর
কি করা যায়। ব্যাটা গাঁজা খেয়েই মরেছে কি না, তা
হলে লােক ভাল। ওই ত নিজের কোয়ার্টারটা
আমায় ছেড়ে দিয়েছে। তা না হলে বিমুকে আমি
আনতে পারতাম না কি ? ব্যাটা গ্রেট সাের্। বললে,
আমাকে ‘হুজুর বহু মায়িকা লিয়ে আনেন—আমি
টিশনে শুতব। হামার ত জৰু উরু কোই নেহি আছে।
ব্যাটা আবার বাঙলা বলে সত্যি ব্যাটার তিনকুলে
কেউ নেই। লােক ভাল।১.মাষ্ট করেছে ব্যাটাকে
গাঁজাতে—
আমি বলিলাম—“ছােটবাবুর কোয়ার্টার নেই–
অথচ পয়েন্টসম্যানের কোয়ার্টার আছে এ কি রকম
ব্যবস্থা—”
“কোয়ার্টার থাকবে না কেন? ওই যে দেখুন না
রিপেয়ার হচ্ছে—ঢিমে তেতালা চালে-” বলিয়া তিনি
দূরে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইলেন।
মাখনবাবুর সহিত কথা কহিতে কহিতে চলিতেছিলাম
কিছুক্ষণ .
এবং লক্ষ্য করিতেছিলাম কত বিভিন্ন জাতীয় যাত্রী এই
•ছােট ষ্টেশনটিতে আটকাইয়া পড়িয়াছে।
একটা মেলা বসিয়া গিয়াছে যেন।
ট্রেণ লাইনচ্যুত হইয়াছে প্রায় ঘণ্টা দুই হইল। এই
দুর্ঘটনার আকস্মিকতা প্রথমে সকলের মনকে নিশ্চয়ই
যথেষ্ট নাড়া দিয়াছিল—এখন দুই ঘণ্টা পরে সে ভাবটা
আর নাই। এই দুর্ভাগ্যটাকে মানিয়া লইয়া এখন
সকলে খানিক ক্ষণের জন্য থিতাইয়া বসিয়াছে। ঘােট
বড় নানা দলে বিভক্ত হইয়া সকলে নিজ নিজ সুবিধা
অধমণে তৎপর হইয়াছে।
আরশেলি-রবে তানুলম্বিত গলাবন্ধ কোট গায়ে
একটি মরে সপরিবারে একস্থানে বসিয়া আছে
দেখিলাম। মাথায় হলুদরঙের পাগাড় বহুপাকে পাকান।
মুখে ভীত-বিনীত-চতুর ভাব। চক্ষু চারিদিকে ঘুরিতেছে।
গোঁফজোড়া ঝুলিয়া পড়িয়াছে। কাছেই দুই তিনজন
ঘোমটা দেওয়া মহিলাও বসিয়া আছে। হাতে ও পায়ে
মােটা মোটা গােল গােল গহনা পরা, পরণে লাল ও
হলুদ রঙের ছাপা শস্তা জরির পাড় বসান কাপড়, অঙ্গে
প্রায় তদনুরূপ ওড়না। যদিও ঘােমটা দেওয়া কিন্তু
১৮
কিছুক্ষণ
অনর্গল কিড়ির মিড়ির করিয়া বকিয়া চলিয়াছে।
আমাদের নিকটবর্তী হইতে দেখিয়া মাড়ােয়ারি ভদ্রলােক
সসম্ভ্রমে দাড়াইয়া উঠিয়া সেলাম করিল এবং মাখনবাবুকে
জিজ্ঞাসা করিল যে ট্রেণ ঠিক হইতে কত বিলম্ব
হইতে পারে।
মাখনবাবু বলিলেন—“খবর ত দিয়েছি আমরা।
এখন প্রভুরা দয়া করবেন তবে না সব ঠিক হবে।” বলিয়া
মাখনবাবু হাসিয়া আমার দিকে চাহিলেন।
আর এটু
অগ্রসর হইয়া দেখিলাম একদল মুসলমান গােল হইয়া
বসিয়া আহারে প্রবৃত্ত হইয়ছে। তাহাদের সঙ্গে পা ছয়
বছরের একটি মেয়েকে দেখি বেশ লাগিল। ফুটফুটে
সুন্দর মুখখানি-ডাগর চোদুতে সুম। লাগান।
মাথায় লম্বা বেণী পরণে কমলা রঙের লা পায়জামা-
গায়ে ঘন-নীল রঙের আঙ রাখা। সৰ্ব্বদাই ছটফট
করিতেছে। আমাকে দেখিয়া অকারণে মুখবিকৃতি করিয়া
জিভটা বাহির করিয়া
মুখ
অন্যদিকে ফিরাইয়া লইল।
একটি কুচকুচে কালো ভারতীয় ক্রিশ্চান সাহেব
তাহার সুসজ্জিত মেমসাহেবসহ একটু দুরে তফাত
দাড়াইয়াছিলেন। মেমসাহেবটির বর্ণও মর্মান্তিক।
হাদের ভাবগতিক দেখিয়া মনে হইল যেন তাঁহার
কিছুক্ষণ স্পর্শদোষ বাঁচাইয়া এই দূষিত জনতার মধ্যে কোনক্রমে • দয়া করিয়া দাড়াইয়া আছেন। সাহেবটির হাতে একটি অর্ধ-দগ্ধ বৰ্ম্মা চুরুটমেমসাহেবের হাতে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। মেমসাহেব মুখে প্রচুর পাউডার মাখিয়াছিলেন। এই দারুণ গ্রীষ্মকালে ঘর্মাক্ত কালো মুখে পাউ- ডারের প্রাচুর্য দেখিয়া একটা উপমা হঠাৎ মনে উদয় হয়—যেন মাগুর মাছকে কুটিবার পূর্বে ছাই মাখান হইযাছে। সাহেব একটু আগাইয়া আসিয়া মাখনবাবুকে প্রশ্ন 16-1 say, how long are we to wait in this hell of a station- নির্বিকার-চিত্তে মাখবাবু বলিলেন—“Can't say” সাহেব একটু রাগতস্বরে উত্তর দিলেন—“If I cannot reach my place to-day I shall sue the Railway Company~" মাখনবাবু এ কথার কোন উত্তর দিলেন না। খানিক দূৰু আগাইয়া গিয়া কেবল নিম্নস্বরে বলিলেন— “বেটাচ্ছেলে!” এবং আমার দিকে চাহিয়া একটু হাসিলেন। আরাে একটু অগ্রসর হইয়া দেখা গেল কয়েকটি ২০
উগ্রতা।
সবের
কিছুক্ষণ
যুবক এক জায়গায় জমায়েত হইয়া হাস্যপরিহাসে বেশ
মশগুল হইয়া উঠিয়াছে। যুবকগুলির চেহারা বেশবাস
কথাবার্তা বৈচিত্রময়। কাহারও পরিধানে ঢিলা পায়জামা,
কেহ কাপড়টাকে কায়দা করিয়া পায়জামার মত করিয়া
পরিয়াছে, জুলফি গোঁফ ও দাড়িতেও অতি আধুনিকতার
কোন অভাব নাই। অভাব
দেখিলাম ভব্যতার। একটি ট্যারাগােছের ডােকরা
কোমরে হাত দিয়া দুলিয়া দুলিয়া হাে হো মিম।
হাসিতেছিল।
ইহাদের এত আনন্দের উ•স কি তাহাও পরক্ষণেই
আবিষ্কার করিলাম। নিকটেই দেখিলাম একটি কমবয়সী
মেয়ে একেবারে একাকিনী একটি
সুটকেসের উপর
বসিয়া আছে। কাছাকাছি তাহার কোন আত্মীয়-স্বজন
আছে বলিয়া মনে হইল না। মেয়েটি গম্ভীরভাবে দূরে
মাঠের দিকে চাহিয়া বসিয়া আছে। তাহার পাশেই খুব
সম্ভবত তাহাকে কেন্দ্র করিয়াই যে সব চটুল আলােচনা
চলিতেছিল তাহা যে তাহার কানে যাইতেছে মুখ দেখিয়া
তাহা বােঝা গেল না। তথাপি আমার মনে হইল
মেয়েটির চোখে যেন একটা বিরক্ত বিপন্নভাব ফুটিয়া
উঠিয়াছে।
একবার মনে হইল তাহাকে জিজ্ঞাসা করি
কিছুক্ষণ যে তাহার কোন সাহায্য আমি করতে পারি কি না— কিন্তু সঙ্কোচ হইল—পারিলাম না। একটু দূরে দুম দুম করিয়া কয়েকটা বন্দুকের আওয়াজ শােনা গেল। জিজ্ঞাসা করিলাম—“বন্দুকের শব্দ কেন মাখনবাবু ?” মাখনবাবু বলিলেন—“গােটা দুই সায়েব ছিল মশাই ফেস্ট-সে। তারা ট্রেণ ছাড়বার কোন সম্ভাবনা না দেখে লুক ঘাড়ে করে বেরিয়ে পড়লেন। আম্পর্ধা দেখুন না মশাই—যাবার সময় মাষ্টার মশাইকে বলে গেলেন যে তারা না আসা পর্যন্ত যেন ট্রেণ ছাড়া না হয়। তার কাছাকাছিই থাকবেন-ট্রেণ ঠিক হলে তাদের যেন খবর পাঠান হয়। লবাবপুত্তর সব ! মাষ্টার মশাইকে আমি চোখ টিপছিলুম যেন তিনি ওসব কথা গ্রাহ্য না করেন! কিন্তু মাষ্টার মশাই আমাদের সায়েব দেখলেই একেবারে গলে যান! সেলাম করে হাত কচলে বলে দিলেন “ইয়েস সার-ইয়েস সার- যত সব-” মাখনবাবুর কোয়ার্টারের সম্মুখীন হইয়াছিলাম। মাখনবাবু বাহির হইতেই চীৎকার করিলেন—“কই বিন্দু
কিছুক্ষণ
—চা রেডি ত ! আমার সেই বন্ধুটিকে ধরে এনেছি।
চা দাও”
বিমু ওরফে বিননাদিনীর কোন সাড়া পাওয়া গেল
। মাখনবাবু তখন আমাকে দাড়াইতে বলিয়া ভেতরে
গেলেন। মাখনবাবুর কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম—“সে
কি! চায়ের জল এখনও চড়াও নি?”
“আমার ত পাঁচটা হাত নয়! বাসন মেজে, ঘর ধুয়ে
এই ত সবে কাপড়টি ছেড়েছি। বন্ধু আবার কি ?”
শুনিয়া একটু অস্বস্তি বােধ করিতে লালিম।
মাখনবাবু বাহিরে আসিয়া সহাস্যমুখে আমাকে বলিলেন
—“আসুন, আসুন ভেতরে আসুন—আগেকার চাটা
ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, বিষ্ণু সেটা আর দিতে চায় না।
জল চড়াচ্ছে। আসুন
গেলাম।
ভিতরে একটিমাত্র ঘর।
সেইটিই বসিবার ও শুইবার ঘর বলিয়া মনে হইল।
আরও দুই একটি ছােটখাটো ঘর আছে। সেগুলি বােধ
হয় রান্না ভাঁড়ারের কাজে নিয়ােজিত। সঙ্কীর্ণ উঠানে
একটা ধূমায়িত কয়লার উনানের সামনে বসিয়া বিষ্ণু
প্রাণপণে হাওয়া করিয়া চলিয়াছে। পরণে একখানি
কিছুক্ষণ :
আধময়লা শাড়ি। হাতে কয়েকগাছি সবুজ রঙের কাচের
চুড়ি ঝুন ঝুন্ করিয়া বাজিতেছে।
চতুর্দিক ধুমাচ্ছন্ন।
মাখনবাবুর জবরদস্ত আতিথেয়তা যে এই বধূটিকে
বিব্রত করিতেছে তাহা মনে মনে বুঝিতেছিলাম। কিন্তু
কি করিয়া ভদ্রভাবে উদ্ধার পাই কিছুতেই মাথায়
আসিতেছিল না।
মাখনাবু খুব আন্তরিকতার সহিত বলিলেন “আসুন,
আ-আমাদের ঘর দোর। পায়রার খােপ বললেও
চলে ! এ বড় ধুয়া হল যে
এই বলিয়া তিনি কপাটটা
বন্ধু করিয়া দিলেন। কপাটটা বন্ধ করিয়া দেওয়াতে
আমার যেন দমবন্ধ হইবার উপক্রম হইল। আমি
বলিলাম “কপাটটা খুলে দিন”
“আরও ধোঁয়া ঢুকবে যে মশাই-এ ধোঁয়া এখনি
বেরিয়ে যাবে। দাড়ান না জানালাটা খুলে দি বেশ
করে। ঘরটার এই একটা সুবিধে আছে দক্ষিণ দিকটা
বেশ গোলা—” বলিয়া তিনি জানালাটা খুলিয়া দিলেন।
তাহার পর বলিলেন “একটু কি অসুবিধে জানেন
জানালাটা খুলে দিলে একটু বে-আবরু হয়ে পড়ে।
দাড়ান দেখি চায়ের জলটার কতদূর” বলিয়া তিনি
২৪
কিছুক্ষণ
আবার কপাটটা খুলিয়া বাহিরে গেলেন। এই ধূমাচ্ছন্ন
ঘরটা হইতে মুক্তি পাইলে যেন বাঁচি। অথচ মাখনবাবুর
মনে কষ্ট দিতেও সঙ্কোচ হইতেছে। মাখনবাবু বাহিরে
তাঁহার স্ত্রীকে নিম্নস্বরে কি সব বলিতেছিলেন শুনিতে
পাইলাম না। মাখনবাবু ঘরে ঢুকিতেই একটা বুদ্ধি
মাথায় খেলিয়া গেল।
“ওয়েটিং-রুমে সেই বিধবাটিকে জল দিয়ে আসতে
হবে—ভুলে গেলেন বুঝি। বাঃ! দিন একটু
দিয়ে আসি।”
“হা হা, ঠিক ত। তা আপনি যাবেন কেন।
আপনি বসুন না। আমি গিয়ে দিয়ে আসছি।”
“না না আমিই গিয়ে দিয়ে আসি।
জুতাে পায়ে
দিয়ে গেলে হবে না আবার
মাখনবাবু হাসিয়া বলিলেন—“কেন আমি খালি
পায়ে যেতে পারি না নাকি ! চিরটা কাল খালি পায়েই
কেটেছে মশাই, ম্যাটিক ক্লাসে ওঠবার পর তবে জুতো
পায়ে দিয়েছি।”
আমি বললাম-“না শুধু জুততার কথা নয়, আপনার
হাতে যদি আবার না খান। আপনি ত ব্রাহ্মণ নন।
বিধবাটি একটু বেশী নিষ্ঠাবতী বলে মনে হল”
২৫
কিছুক্ষণ
মাখনবাবু পরাস্ত হইয়া বলিলেন-“তাহলে ত নাচার
মশাই। আচ্ছা আপনিই যান তাহলে চট করে যান।
বেশী দেরী করবেন না যেন সেখানে। চা হয়ে গেল
বলে। বিনু ‘হাউ ফার’?” বলিয়া মাখনবাবু বাহিরে
গেলেন এবং বলিলেন-“আগে একঘটি জল দাও ।
ঘটিটা মাজা আছে ত?”
বিনু উত্তর দিল-“ঘটি আবার মাজলাম কখন ?”
“কখন মেজেছ তা জিগ্যেস করিনি। মাজা আছে
কি না।”
“কাল মেজেছিলাম সকালে
“আচ্ছা ওতেই হবে। একঘটি জল দাও। ঘরে
খাবার-টাবার কিছু আছে ? স্রেফ ছােলা গুড় ? বেশী
নেই? আরে যা আছে তাই দাও না—তুমি বেশী কথা
বাড়িও না।”
একঘটি জল ও একটি পাথর বাটিতে কিছু ছােল
ভিজান ও গুড় লইয়া নগ্নপদে ওয়েটিং-রুম অভিমুখে
ওনা হইয়া গেলাম। কোথাকার কে অচেনা বিধবা
'তাহার জন্য জল বহিয়া লইয়া যাইতেছি! পারিপার্শ্বিক
ঘটনার এমন সমাবেশ হইয়াছে যে কিছুই অসঙ্গত মনে
ইতেছে না। বরং না করিলেই যেন অশােভন হইত
কিছুক্ষণ
ষ্টেশন প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম সেই
কমবয়সী মেয়েটি সুটকেসের উপর তেমনই ভাবে বসিয়া
আছে এবং তাহার নিকটে নানা ছাঁদের সেই যুবক গুচ্ছ
তেমনি হাসাহাসি করিতেছে।
২৭
নিষ্ঠাবতী বিধবাকে তৃষ্ণার জল দান করিয়া পুণ্য- সঞ্চয় করা আমার ভাগ্যে ছিল না। গিয়া দেখিলাম তিনি একাদশীর পারণ শেষ করিয়াছেন। ভৃত্য চট্ট, খবরটি দিল। বৃদ্ধ ভদ্রলােক দেখিলাম ওয়েটিং রুমের এককোণে বসিয়া আহ্নিক করিতেছেন। ভদ্রলােকের ধপধপে শাদা গায়ের রঙ। নগ্নগাত্রে শুভ্র উপবীত শােভা পাইতেছে। দৃশ্যটা বেশ ভাল লাগিল। বিধবাটিকে উদ্দেশ করিয়া অনুচ্চকণ্ঠে কহিলাম—“এগুলাে তাহলে ফিরে রেখে আসি ?” ভদ্রমহিলা কোন উত্তর না দিয়া মাথার ঘােমটাটা একটু টানিয়া সরিয়া বসিলেন। আমার সহিত বাক্যালাপ করিতে অনিচ্ছুক বুঝিলাম। ফিরিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময় ছট্ট, ভৃত্য আসিয়া বলিল যে বাবুর পূজা এখনই হইয়া যাইবে—মাইজি আপনাকে একটু অপেক্ষা করিতে বলিতেছেন। অপেক্ষা করিয়া রহিলাম। মানুষ চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে পারে না। ২৮ কিছুক্ষণ বসিয়া বসিয়া বিধবাটিকেই লক্ষ্য করিতে লাগিলাম। অল্প বয়স। কুড়ির বেশী বলিয়া মনে হয় না। ইহারই মধ্যে জীবনের আনন্দ-দীপটি নিভিয়া গিয়াছে। থান কাপড়, আভরণহীন অঙ্গ, মুখখানি বিষাদ মাখানাে। আজিও আমাদের সমাজে অসহায় বিধবার সংখ্যা অগণিত। দ্বিতীয়বার বিবাহ করাটা আজও আমাদের হিন্দু বিধবাদের সংস্কারে বাধে। এখনও তঁাহারা ইহাকে পিপ বলিয়াই মনে করেন। আমার নিজেরও বিধবা বােন আছে। বাল-বিধবা। বাবা আবার তাহার বিবাহ দিতে চাহিয়াছিলেন। সে কিছুতেই বিবাহ করিতে রাজী হয় নাই। কৃচ্ছ সাধন করিয়া সে এই জীবনটাকে নিষ্পিষ্ট করিয়া ফেলিতে চায়। “ও-এই যে আপনি এসেছেন দেখছি। বন, s বসুন- আমি উঠিয়া দাড়াইয়াছিলাম। ভদ্রলােক চশমা পরিধান করিতে করিতে বলিলেন—“এ সব কি এনেছেন আপনি ?” “মাখনবাবু পাঠিয়ে দিয়েছেন আপনাদের জন্যে।” “মাখনবাবুটি বুঝি সেই ভদ্রলোেক, যিনি তখন আপনাকে ডেকে নিয়ে গেলেন ? আরে বাঃ, ছােলা-
কিছুক্ষণ
গুড় এনেছেন দেখছি ! দুষ্প্রাপ্য জিনিস আজকাল।
মিন্ট, খাবি?”
মিণ্ট, মাথা নাড়িয়া অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন।
“আচ্ছা, আমিই চারটি খাই তাহলে।”
ছােলা চিবাইতে চিবাইতে ভদ্রলােক বলিতে লাগিলেন
—“বুড়ো হয়েছি—কিন্তু ছােলা এখনও বেশ চিবুতে পারি।
সিক্রেট কি জানেন? নিমের পঁাতন!” বলিয়া সহাস্যমুখে
চিবাইতে লাগিলেন।
“ট্রেণটা কখন ছাড়বে বলতে পারেন মশাই ?”
“শুনছি ত সন্ধ্যার আগে নয়।”
“তাই নাকি? আপনি কোথা যাবেন?”
“কোলকাতা-
“তাহলে ত আপনার আরাে ঢের দেরী। আমাদের
গাড়ী না ছাড়লে ত আপনার গাড়ী আসবে না। কি
মুস্কিল।”
একটু থামিয়া ভদ্রলােক আবার বলিলেন--“এইটুকু
শুধু ভগবানের দয়া যে কারাে কোন আঘাত লাগে নি।”
“আজ্ঞে হ্যা”
ভদ্রলােকের স্নিগ্ধ গম্ভীর মূর্তি দেখিয়া কেমন যেন
সম্ভ্রম হইতে লাগিল। খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া
কিছুক্ষণ
বৃদ্ধ আবার বলিলেন, “বড় খুসী হলাম আপনাকে দেখে।
কোলকাতায় কি করেন আপনি ?”
“পড়ি”
“পড়েন? কোন কলেজে ?”
“মেডিকেল”
“আরে বাঃ। কোন ইয়ার হল ?”
“
সিথ, ইয়ার চলছে-”
“আরে বাঃ! তাহলে ত ডাক্তার হয়েই গেছ তুমি
আই মিন্ আপনি।”
সসঙ্কোচে বলিলাম –“আমাকে ‘তুমি’ই বলুন।”
ভদ্রলােক হঠাৎ গম্ভীর হইয়া গেলেন। কিছুক্ষণ
চুপচাপ। উঠি উঠি করিতেছি এমন সময় তিনি
বলিলেন—“বিনােদ বলে কাউকে চিনতে বিনােদন
বিহারী মৈত্র। তােমার চেয়ে কিছু সিনিয়র-বছর
চারেকের।”
বলিলাম-“না, চিনি না। কেন?”
ভদ্রলােক একটু থামিয়া বলিলেন—“সে আমার
৯.
ছেলে।”
“কোথায় প্র্যাকটিস করছেন? চাকরি পেয়েছেন
নাকি?”
কিছুক্ষণ
“পাগল হয়ে গেছে সে। এখন পাগলা-গারদে
আছে।”
নিদারুণ সংবাদটা যেন বুলেটের মত আসিয়া বিধিল।
ভদ্রলােকও কিছু বলেন না। আমিও বলিবার কথা কিছু
খুজিয়া
পাইতেছিলাম না। মনে হইল বিধবা যুবতীটি
একদৃষ্টে যেন আমার দিকে চাহিয়া আছেন। ফিরিয়া
দেখিলাম সত্যই তাই। আমাকে মনোেযােগী দেখিয়া
তিনি আবার সসঙ্কোচে মাথায় কাপড়টা টানিয়া সরিয়া
বসিলেন।
উঠিয়া পড়িলাম।
“চল্লাম এখন। মাখনবাবু চা খাওয়ার নেমন্তন্ন
করেছেন। দেরী হয়ে যাবে”
ভদ্রলােক অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাই
বলিলেন-“মাখনবাবু কে ?
“যে ভদ্রলােক আপনাদের এই ছােলা গুড় পাঠিয়ে
দিয়েছেন—
“ও হা হা—আরে বা ভুলেই গেছলাম।
তাকে
আমার ধন্যবাদ দিও।
ভদ্রলােকের মনের মেঘটা যেন কাটিয়া গেল। আমি
নমস্কার করিয়া চলিয়া আসিতেছিলাম। ভদ্রলােক বলিলেন
৩২
কিছুক্ষণ
—“তুমি বাবা, চা-টা খেয়ে এসে আবার। এখানে
কতক্ষণ থাকতে হবে বলা ত যায় না। একটু গল্প-সল্প •
করা যাবে”
“আচ্ছা
প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়া অন্যমনস্ক হইয়া চলিয়াছিলাম।
“বাবুজি--এ বাবুজি-”
ফিরিয়া দেখিলাম ডাকিতেছে সেই বেণী-দোলান
মুসলমানের মেয়েটি। আমি ফিরিতেই মূখটি ছুচলাে
করিয়া টুকটুকে লাল জিভটি বাহির করিয়াই
ছুট দিল।
দুষ্ট, মেয়ে !
একটু দূর গিয়াই সেই বেঁটে ভদ্রলােকের সঙ্গে
দেখা।
=
“নমস্কার দারােগাবাবু-
কি আশ্চর্য্য, ভদ্রলােক সত্যই যে আমাকে দালােগ
ঠাওরাইয়াছেন ! ভদ্রলােকের ভুলটা ভাঙাইতে ইচ্ছা
করিল না। স্মিতমুখে প্রতিনমস্কার করিলাম।
তিনি বলিলেন-“ওই হালুয়াই ব্যাটাকে
একটু
কিছুক্ষণ
শাসিয়ে দিতে পারেন আপনি? লুচির সের একটাকায়
চড়িয়ে দিয়েছে। এ কি মগের মুলুক না কি মশায় !
আমরা না হয় নিরুপায় হয়ে পড়েছি, তাই বলে গলায়
ছুরি দেবে ও?”
“কোন হালুয়াই ?”
“ওই যে ইষ্টিশানের ওপারে আছে এক ব্যাটা।
কোনােকালে এক পয়সার বিক্রি হত না, আজ ব্যাটার
মরশুম পড়ে গেছে।”
“আমার শাসন কি শুনবে ও?”
“নিশ্চয় শুনবে। পুলিসের গুতােয় বড় বড় চোর
শায়েস্তা হয়ে যায়, ও ব্যাটা ত সামান্য হালুয়াই।”
আগাইয়া গেলাম।
কাছে
সেই শীর্ণকান্তি ভদ্রলােক—যিনি কলের
চীৎকার জুডয়াছিলেন—দেখিলাম স্নান সমাপন
করিয়াছেন। একটি লাল গামছা পরিয়া মন্ত্রোচ্চারণ
করিতেছেন। ভদ্রলােকের বাহুমূলে প্রকাণ্ড মাদুলি
রুদ্রাক্ষ-গলদেশেও তাবিজ-জাতীয় কি একটা
দুলিতেছে। তিনি নগ্নগাত্রে গামছা পরিয়া বােধহয়
৩৪
১ কিছুক্ষণ সূৰ্য্যস্তব পাঠ করিতেছিলেন। তাহার কাছে একটি পাঁচ ছয় বৎসরের বালক আবদার জুড়িয়া নাকে কঁদিতেছে। “খিদে পেয়েছে দাদু—ওরা সবাই লুচি জিলিপি খাচ্ছে আমিও খাব—হু হু দাদু- ভদ্রলােক মন্ত্র ভুলিয়া খাকাইয়া উঠিলেন। “আরে জ্বালিয়ে খেলে ত দেখছি এটা। তােকে লুচি জিলিপি খাওয়াব বলে কি পয়সা সঙ্গে করে এনেছি নাকি। মাত্র ট্রেণ ভাড়াটি নিয়ে ত বেরিয়েছিলাম- তখন কি জানি এমন হবে। চুপ কর” বলি। আবার তিনি মন্ত্রে মন দিলেন। = “হিং হিং লিজিয়ে বাবু—আচচা হিং—” কাবুলিওলাটি তাহার জোব্বাজাব্বা পরিধান করিয়া ব্যবসায় মুরু করিয়া দিয়াছে। আমাকে দেখিয়া সেলাম করিয়া কাছে আসিল। হাসিমুখে বলিল-“হিং—হিং বাল হিং। চাকু বালা চাকু—আলি জামনি-বড়িয়া চাকু - লিজিয়ে বাবুসাব-” '
কিছুক্ষণ
আমার প্রয়ােজন ছিল না। অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়া
আগাইয়া গেলাম।
একস্থানে একটা গামছাওলাকে ঘিরিয়া দেখিলাম
অনেক যাত্রী গামছাই খরিদ করিতেছে। একজন দুগ্ধ
বিক্রেতা হঠাৎ কোথা হইতে আসিয়া গরম দুধ ফেরি
করিয়া বেড়াইতেছে। সেই মাড়ােয়ারিটি মনে হইল
এইমাত্র দুগ্ধপান শেষ করিয়াছেন—কারণ তাহার হাতে
গেলাস এবং গোঁফে দুধ। মাড়ােয়ারি ভদ্রলােক গোঁফে
লাগা দুধটুকুও অপচয় করিতে চান না। ঠোট ও জিভকে
নানা প্রকারে বাঁকাইয়া গোঁফটিকে আয়ত্ত করিবার চেষ্টা
করিতেছেন দেখিলাম।
সুটকেসের উপর যে মেয়েটি বসিয়াছিল এবং যাহাকে
কেন্দ্র করিয়া একদল ছোকরা ঘুরঘুর করিতেছিল
সেই মেয়েটি দেখিলাম উঠিয়া দাড়াইয়াছে এবং কুলির
মাথায় সুটকেসটা চাপাইয়া দিয়াছে। আমাকে দেখিয়া
বলিল—“দয়া করে আপনি বলে দিতে পারেন
কিছুক্ষণ মেয়েদের বসবার আলাদা জায়গা এখানে কোথাও আছে কিনা” অযাচিতভাবে একটি ছােকরা বলিল—“আপনার ত আর সেকেণ্ড ক্লাস টিকিট নেই। এখানে তা ছাড়া যে ফিমেল ওয়েটিং রুম আছে তাতে তিল ধারণের স্থান নেই। বেশ ত বসে আছেন আপনি—থাকুন না।” বুঝিলাম মহিলাটি একটু বিপন্ন হইয়াছেন। বলিলাম -“আচ্ছা, আসুন আমার সঙ্গে—”। আসুন’ বলিয়া আহ্বান ত করিলাম, কিন্তু কোথায় লইয়া গিয়া তাহাকে যে স্থান দিব তাহা জানি না। মাখনবাবুই ভরসা। দেখি, কতদূর কি করিতে পারি। ঘাড় ফিরাইয়া দেখিলাম দুই তিনটি ছােকরা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া আছে। তাহাদের দৃষ্টির অর্থ সুপরিষ্কার- কোথা হইতে এ লােকটা আসিয়া জুটিল। মাখনবাবুর বাড়ীতে আসিয়া দেখি মাখনবাবু নাই। তাঁহার স্ত্রী একটি ময়লা গামছায় করিয়া চা ছাকিতেছেন। আমাকে দেখিয়া ভদ্রমহিলা শশব্যস্ত হইয়া উঠিয়া দাড়াইলেন এবং মাথার ঘােমটাটা টানিয়া দিলেন। জিজ্ঞাসা করিলাম—“মাখনবাবু কোথা গেলেন?” প্রথমে কোন উত্তরই তিনি দিলেন না। তখন আমি ৩৭, কিছুক্ষণ বলিলাম-” এই মেয়েটিকে একটু বসান ত আপনার কাছে। দেখি আমি মাখনবাবু কোথায় গেলেন- কুলিটি এবং তাহার পিছু পিছু মেয়েটিও আসিয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়াছিল। কুলি সুটকেসটি নামাইয়া রাখিল এবং মেয়েটী আগাইয়া বিনুর কাছে গেল দেখিয়া আমি বলিলাম—“আপনি একটু বসুন এখানে। আমি দেখি মাখনবাবু কোথা গেলেন।” এইবার ফিস্ ফিস্ করিয়া বিষ্ণু সেই মেয়েটিকে বলিল—“উনি গেছেন দোকানে খাবার আনতে !” “আচ্ছা, দেখি আমি—”
হালুয়াই এর দোকানে সত্যই ভীষণ ভীড়।
প্রত্যহ সন্ধ্যাকালে রামায়ণ পাঠ করিতে করিতে সে
যে রাবণকে অকুণ্ঠিতচিত্তে গালি দিত আজ যদি কোন
মন্ত্রবলে একদিনের জন্যও সে সেই রাবণ হইতে পারিত
অন্ততঃ সেই রাবণের দশটা মুণ্ড ও বিশটা হাত আয়ত্ত
করিতে পারিত—তাহা হইলে বেচারা বাঁচিয়া যাইত।
দুই হাতে সে কত লুচিই ভাজিবে এবং একটা মুখে
কত লােকের সহিতই বা কথা কহিবে। অথচ দুই
মাইলের মধ্যে তাহার এই একখানি দোকান এবং
অকস্মাৎ এতগুলি বুভুক্ষিত লােকের জন্য তাহা প্রস্তুত
ছিল না।
“ওটা তােমার ছাশ্চা, না ছােরা হে ! একটাকা
সের লুচির দাম। বল কি তুমি। ওরে চ চ, আর
লুচি খেতে হবে না তােকে”
১ কিছুক্ষণ “হু হু দাদু- সেই শীর্ণকান্তি ভদ্রলােক ও তাহার নাতি আসিয়া জুটিয়াছেন দেখিলাম। নাতির হাত ধরিয়া তিনি হিড়হিড় করিয়া টানিয়া লইয়া গেলেন। “এই আমাকে একপাে লুচি আর একটু তরকারি দাও ত--- “এই শুতা হায়—এক সের পুরি, আউর আধা সের জিলেবি গরম গরম ভাজকে দেও- “পানতােয়া--আছে ?-পানতােয়া ?” “এই—এই—আরে মােলাে ব্যাটা কথাই কয় না যে! ওহে, শুনছ, দুসের. লুচি আর আলুর দমবাসি কি ওটা ?” এই প্রকার নানাকণ্ঠের নানা চীৎকারকে অগ্রাহ্য করিয়া বশি হালুয়াই দ্রুতবেগে লুচি ভাজিয়া চলিয়াছে। অন্য কোন দিকে মন দিবার মত বাড়তি ফুরসৎ তাহার এখন নাই। দুই বৎসর পূর্বে প্রদত্ত এক সন্ন্যাসীর তাবিজের ফল বুঝি ফলিতেছে। দৈবানুগৃহীত এই দুর্ঘটনা। ইহার অন্তরালে যে মঙ্গল এবং শনির পূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান, তাহা আর কেহ না বুঝুক বশি হালুয়াই বুঝিতেছিল। 8 ০ কিছুক্ষণ বশি ভাজিতেছে এবং তাহার ভাই বাড়ি বিক্রয় করিতেছে। চাকর বুলাকি লুচি বেলিতেছে এবং দরকার পাশের কড়াতে-চড়ান তরকারিটাতে খুন্তি চালাইতেছে। চতুর্দিকে চাহিয়া দেখিলাম মাখনবার পাত্তা নাই। সেই মাড়ােয়ারি ভদ্রলােক দেখিলাম একটু দূরে একস্থানে দাঁড়াইয়া এই জন্নতা লক্ষ্য করিতেছেন। গোঁফ পরিষ্কার, দুধের চিহ্নটুকুও আর সেখানে নাই। আমাকে দেখিয়া তিনি কারণে আবার সেলাম করিলেন। আমিও প্রতি-নমস্কার করিয়া ভীড়ের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলাম। মাখনবাবুকে খুজিয়া বাহির করা শক্ত দেখিতেছি। ভদ্রলােক ' গেলেন কোথায় ? অনেক কষ্টে ভীড় ঠেলিয়া বনশি হালুয়াইএর সান্নিধ্য- লাভ করিলাম । তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম—“মাখনবাবু কোথায় জান ? বশি উত্তর দিল না। দশখানা লুচি কড়াতে ছাড়িয়াছে এবং ছাৰ্চা সঞ্চালন করিয়া চেষ্টা করিতেছে ঘি বেশী না পােড়ে। বশি লােকটি বেঁটে, রঙ, কালাে, দুই চারি গাছা গোফ আছে কি না আছে—মাথার সামনের দিকে চুল নাই বলিলেই সে তখন একসঙ্গে ৪১ কিছুক্ষ চলে। চক্ষু দুইটি হইতে একটি চাপা চতুরতা উকি মারিতেছে। পেটটি প্রকাণ্ড। দেহের মধ্যে ওই অবয়বটিই সর্বাগ্রে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফতুয়া সেটিকে আবৃত করিতে পারে নাই—বস্ত্র লাঞ্ছিত হইয়া সরিয়া গিয়াছে। নাভির বহু নিয়ে নীবিবন্ধন। সমস্ত উদর- দেশ উন্মুক্ত আলােকে প্রকৃষ্টরূপে প্রকাশিত। বশির সেজন্য লেশমাত্র সঙ্কোচ নাই। সে পার্শ্ববর্তী বুলাকিকে মাঝে মাঝে অস্ফুটস্বরে কি যেন বলিতেছে এবং একাগ্র- মনে লুচি ভাজিয়া চলিয়াছে। অন্যদিকে খেয়াল দিবার মত অবসর তাহার নাই। আমি আর একবার চেষ্টা করিলাম। “মাখনবাবু কোথায় জান ?” এবার বেশ একটু চীৎকার করিয়াই বলিলাম। সম্ভবত আমার উচ্চ কণ্ঠস্বরে আকৃষ্ট হইয়াই বশি বলিল --“মাখখনবাবু ? ভিতােরে আসেন” ‘আসেন’ মানে অবশ্য আছেন। ঢুকিয়া পড়িলাম ভিতরে। কোথা মাখনবাবু ? বশি অঙ্গুলি সঙ্কেতে একটি ক্ষুদ্র দ্বারের দিকে দেখাইয়া দিল। মাখনবাবু কি বনশির অন্তঃপুরে ঢুকিয়াছেন না কি ? গেলাম আমিও। গিয়া দেখি ০২ কিছুক্ষণ মাখনবাব উবু হইয়া বসিয়া একটি কুলিজাতীয় লােকের দ্বারায় কি যেন করাইতেছেন। তামাকে দেখিয়া সােল্লাসে বলিয়া উঠিলেন—“ওয়ে ক—ওয়েল কম্ -নিকি করাচ্ছি!” তাহার পর একটু থামিয়া বলিলেন—“অন্যদিন হলে বনশি নিজেই করে দিত। আজ ব্যাটার ফুরসৎ নেই। আমাকে হাতজোড় করে বল্লে ‘হুজুর, রামদীনকে দিয়ে বানিয়ে নেন—আমি ভেজে দিচ্ছি। নিকি জিনিসটা আবার ব্যাপার সারা করে করলে হয় না কি না-ড ড—আর একটু উল্। বেলতে আর কতক্ষণ যাবে ! ময়দা মাখাটাই আসল- রামদীন সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গাড়িয়া চক্ষু বুজিয়া ময়দার তালটার উপর ঘুসি চালাইতে সুরু করিল। 'আমার ভয় হইতে লাগিল থালাটা না ভাঙিয়া যায়। মাখনবাবুরও দেখিলাম সে ভয় হইয়াছে। কারণ তিনিও কলিলেন—“আস্তে-আস্তে- হঠাৎ বাহিরের কলরবটা যেন বাড়িয়া উঠিল--“মাৱে —ভাগা দেওশালে কো-
কিছুক্ষণ
বনশির কণ্ঠস্বর শুনিলাম।
ব্যাপার কি দেখিবার জন্য বাহিরে আসিলাম।
আসিয়াও কিন্তু সহসা কিছু বুঝিতে পারিলাম না।
ভীড়ের মধ্যে একটা আবৰ্ত সৃষ্টি হইয়াছে এইটুকু মাত্র
বােঝা গেল।
বনশিকে জিজ্ঞাসা করাতে সে বাঙলা ভাষায় বলিল
“ও কুসু নেই ‘আসে’ বাবু—এক শালা লৌণ্ডা জিলেবি
চোরাথা থা—”
এমন সময় ভীড়ের ভিতর হইতে একটা আর্ত শিশু-
কণ্ঠ কঁদিয়া উঠিল—কে যেন তাহাকে মারিতেছে।
বাহির হইয়া আসিলাম। ছােট ছেলেকে কেহ মারিতেছে
কি? ভীড়ের ভিতর ঢুকিয়া পড়িলাম। অনেক
ঠেলাঠেলি গুতাগুতির পর
ঘটনাস্থলে
পৌছিয়া
দেখিলাম—ছােট ছেলেই বটে। কে যেন তাহার গালে
একটা চড় মারিয়াছে—বেশ জোরেই মারিয়াছে—
পাঁচটা আঙুলের দাগ বসিয়া গিয়াছে। ছেলেটা
সেই শীর্ণকান্তি ভদ্রলােকের নাতি।
সত্যই সে
জিলাপি চুরি করিয়াছিল। শীর্ণকান্তি ভদ্রলােককে
আশে পাশে কোথাও দেখিতে পাইলাম না।
ঠোঙা জিলাপি কিনিয়া ছেলেটীর
ছেলেটীর হাতে দিলাম
এক
কিছুক্ষণ এবং তাহাকে ভীড় হইতে টানিয়া বাহিরে লইয়া আসিলাম। “তােমার দাদু কোথা ?” জিলাপিতে কামড় দিতে দিতে সে বলিল- “টেশনে” একটু হিতােপদেশ দিবার ইচ্ছা হইল। বলিলাম –“ছি, ছি, তুমি চুরি করেছিলে ? ছি-” “আমার খিদে লেগেছে যে! দাদুকে বল্লাম কত দাদু দিলে না কিনে” ইহার উপর আর কোন কথা চলে না। এখন ছেলেটাকে তাহার দাদুর জিম্ম করিয়া দিতে পারিলে বাঁচি। এই ভীড়ে ছাড়িয়া দিলে হারাইয়া যাইতে পারে। তাহাকে প্ল্যাটফর্মের দিকেই লইয়া চলিলাম। একটু দূর গিয়াই সেই শীর্ণকান্তি ভদ্রলােকের দেখা মিলিল ! তিনিও নাতির খোঁজে আসিতেছিলেন। সমস্ত বিবরণ তাঁহাকে বলিলাম। শুনিয়া তিনি একেবারে রুখিয়া উঠিলেন। হঠাগা, পাজী ছোঁড়া !-শাল্টীর চৌধুরি বংশের ছেলে তুমি তুমি গিয়েছ জিলিপি চুরি করতে। এত বড় নােলা কিছুক্ষণ } তােমার। মেরেই ফেলব আজ-খুন করে ফেলব হারামজাদাকে” আমি ছেলেটাকে আড়াল করিয়া দাড়াইলাম। “শাস্তি ওর যথেষ্ট হয়ে গেছে মশাই-আর কিছু বলবেন । ছেলেমানুষ- কিন্তু শাল্টীর চৌধুরী বংশের মহিমা ক্ষুন্ন হইয়াছে। শীর্ণকান্তি ভদ্রলোেক কোন কথাই শুনিতে চাহেন না। “বলব না ! বলেন কি আপনি! কেটে পুঁতে ফেলব ওকে তুফি ঝাড়, মারি আমি অমন বংশধরের মুখে। নচ্ছার কুলাঙ্গার” উচ্চৈঃস্বরে এতগুলি সংস্কৃত শব্দ একসঙ্গে উচ্চারিত হইতেছিল শােক জমিয়া গেল। ‘বি হয়েছে মশাই ?” “বাপার কি?” “চুরি গেল না কি কিছু ?” দুইজন বেহারি নিম্নস্বরে বলাবলি করিতে লাগিল “বা, বাউরা মালুম হােত হ্যায়-- এঞ্চোখ গেলেন সার”—মাখনবাবুর কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। ভীড় ঠেলিয়া বাহির হইয়া আসিবার পূর্বে শীর্ণকাল্কি ভদ্রলােককে অনুরােধ করিয়া আসিলাম তিনি '
কিছুক্ষণ
যেন আর মার-ধাের না করেন। তথাপি তিনি ছাড়িলেন
—তাড়া করিলেন। নাতি জিলাপির ঠোঙা ফেলিয়া
দৌড় দিল। ঠোঙা মাটীতে পড়িতে না পড়িতেই একদল
কুকুর হুমড়ি খাইয়া আসিয়া তাহার উপর পড়িল।
ছেলেটী সেই যা একটি খাইয়াছিল—বাকীগুলি কুকুরের
পেটে গেল।
।
৪৭
গরম গরম নিমকি লইয়া মাখনবাবু ও আমি বাসায় ফিরিতেছিলাম। পিছনে পিছনে আসিতেছিল রামদীন। মাখনবার আমার দিকে চাহিয়া বাম চক্ষুটা ঈষৎ কুঁচকাইয়া বলিলেন- ছেন ত মহাপ্রভুকে ! এরই কীর্তি।” বুঝিম রামদীনের কথা বলিতেছেন। এক বাঁচাবেন বলছিলেন না ? কি উপায়ে ?” মামার কথা শেষ করিতে না দিয়া বামহাতের তর্জনী ঠোঁটের উপর চাপিয়া মাখনবার তৰ্জন করিয়া উঠিলেন— “তা-ই! উচ্চারণ করবেন না ও কথা-জানা- জানি হয়ে গেলেই সর্বনাশ।” তাহার পর এদিক ওদিক চাহিয়া নিম্নবরে বলিলেন “বেশ করে চা-টা খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে একটা পরামর্শ করতে হবে। মাষ্টারমশাইকে ডেকে আনা যাবে। আপনার মত পাকা-মাথা একটা পাওয়া গেছে-ব্যাটার কপাল ভাল- ত ৪৮ অ কিছুক্ষণ “আমি এ বিষয়ে আর কি পরামর্শ দেব আপনাদের “বাঃ—আপনি বয়সে ছােট হলেও শিক্ষিত লােক- আপনার বুদ্ধির দামই আলাদা। আমার নিজের বিদ্যে ম্যাটিক অবধি। আর মাষ্টার মশায়ের পেটেও-প্রাই- ভেটলি বলছি—এক পিলে ছাড়া আর কিছু নেই। কোন রকমে ‘ইয়ে সার’ ‘ননা সার’ ‘ভেরি গুড, সার’! আপনি এসে গেছেন এ ব্যাটার পরম সৌভাগ।” মিনিট খানেক নীরব থাকিয়া বলিলাম-“পনার বাসায় আর একজন অতিথি এনে জুটিয়েছি। আপনার স্ত্রীর কাছে তাকে বসিয়ে এসেছি- মাখনবাবু চলিতে চলিতে থামিয়া পড়িলেন “হােয়া ? আবার কে অতিথি মশাই? জাগে বললে নিকি কিছু বেশী নিতাম যে!” “ওতেই যথেষ্ট হবে, চলুন- চলিতে চলিতে মাখনবাবু বলিলেন-“লােকটি কে “একটি স্ত্রীলােক—” আবার মাখনবাবু দাড়াইয়া পড়িলেন। “স্ত্রীলােক ? ডােবালেন দেখছি। কে ? সেই ওয়েটিং রুমের বিধবা নাকি ? আচ্ছা লােক আপনি। ওর জন্যে ১ ত ৪৯ কিছুক্ষণ আপনার অত মাথা ব্যথা কেন ? ছােলা-টোলা ত সব দিয়ে এলেন !” “না, না, এ সে নয়—আর একজন।” “আর একজন? উঃ, আপনাকে নিয়ে আর পার। গেল না! আচ্ছা লােক ত আপনি। ওসব টেনডেন্সি ছাড়ুন মশাই এই ভীড়ের মধ্যে। কি মুস্কিল! বলিয়া সস্মিত মুখে আমার মুখের দিকে চাহিলেন। একটু থামিয়া আবার বলিলেন—“কে ইনি? আগে চিনতেন নাকি?” “না” “ সূতিক লােক আপনি মশাই—” মূখনবাবুর বাসার সমীপবর্তী সমীপবর্তী হইয়াছিলাম। দেখিলাম জানালায় বিনু দাড়াইয়াছিলেন। আমাদের দেখিয়া সম্মাি গেলেন। শুনিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম মাখনবাবু রামদীনকে বলিতেছেন- “ওরে তুই মাষ্টার মশায়ের বাড়ী থেকে একখানা চেয়ার বোঁ করে নিয়ে আয় ত। বাইরেই বসা যাক্। আমার চেয়ারটাও বার করি। ভেতরে একে জায়গা কম, তার ওপর আপনি” বলিয়া আমার দিকে চাহিয়া একটু হাসিলেন। আমিও তাড়াতাড়ি বলিলাম-“হ্যা, সেই ভালাে-বাইরেই বেশ হবে।” রামদীন উদ্ধশ্বাসে একখানা চেয়ার লইয়া আসিল। মাখনবাবুও একখানা ছােট চেয়ার এবং তাহার পর একটা ছােট টেবিলও বাহির করিয়া আনিলেন। টেবিলটা নামাইয়া দিয়া মাখনবাবু এদিকে ওদিকে চাহিতে লাগিলেন—যেন কি খুজিতেছেন। “কি খুজছেন? পয়সা-টয়সা পড়ে গেল না কি?” “না,পয়সা নয়। খুজছি একটা সাইজ, মাফিক ইট!” «ইট?” “হা টেবিলটা একটু ইয়ে কিনা, মানে পধ চারটে সমান নয়। একটা পায়ার তল ছােট্ট ইট না, দিলে—এই যে পেয়েছি।” টেবিলটাকে ঠিকমত বসাইয়া মাখনবাবু বলিলেন- “এইবার অল রাইট! দেখি চায়ের কতদূর কি হল” বলিয়া তিনি ভিতরে চলিয়া গেলেন। গরুড় পক্ষীটির মত হাত জোড় করিয়া রামদীন নিকটে দাড়াইয়াছিল। তাহাকে লক্ষ্য করিতে লাগিলাম।
কিছুক্ষণ
অ টি সাঁটি গড়নের লােকটি। পরণে রেলের জামা
ও পাগড়ী।
মুখের দিকে চাহিলেই প্রথমে চোখে
পড়ে লাল চক্ষু দুটি এবং কপালের ও রগের স্ফীত
শিরাসমূহ।
জিজ্ঞাসা করিলাম—“তােমার নাম রামদীন?”
“হাঁ,হুজুর” যেন হাঁড়ির ভিতর হইতে শব্দ হইল।
এমন সময় মাখনবাবু ফিরিয়া আসিলেন। হাসিয়া হাত
দুইটি উল্টাইয়া বলিলেন—
“এগেন্ কোল্ড সার ! ফের জল চড়িয়েছে—ফাইভ,
মিনিটস কমার! ততক্ষণ আমি মাষ্টারমশাইকে ডাকি
একটু-আপনার সঙ্গে আলাপটা হয়ে যাক্। হা—বাই
দি বাইওই মেয়েটি ত কিছু খেতে চাইছে না মশাই।
বলছে শুধু বসে থাকতে পেলেই ওর যথেষ্ট। স্ট্রেজ
ক্যারান্টার ! সাধারণত লােকে বসতে পেলেই শুতে
চায়। এ একেবারে ঠায় বসে আছে—নট নড়নচড়ন
নটু কিচ্ছ। বিমু বল্লে স্পিকটি নট্-মুখ বুজে চুপচাপ,
বসে আছে। আপনি একটু বলে কয়ে দেখুন না, যদি
একটু চা খাওয়াতে পারেন—”
আমি হাসিয়া বলিলাম .. “দরকার কি জোর
জবরদস্তি করবার। খেতে বলেছেন ওই যথেষ্ট। তা
৫২
কিছুক্ষণ
ছাড়া আমিও ত ওঁকে চিনি না যে গিয়ে অনুরােধ করব।
আমার সম্পূর্ণ অচেনা। প্ল্যাটফর্মে কতকগুলাে ছোড়া
ওঁকে বিরক্ত করছিল তাই আমাকে উনি বল্লেন ফিমেল
ওয়েটিং রুমটা দেখিয়ে দিতে আমি আপনার বাসাতেই
নিয়ে এলাম।”
“বেশ আছেন আপনি” বলিয়া হাসিয়া মাখনবাবু
মাষ্টার মশাইকে ডাকিতে গেলেন।
ষ্টেশন মাষ্টারের বাসা নিকটেই।
একটু পরেই ষ্টেশন মাষ্টার মহাশয় আসিলেন।
ভদ্রলােকের হাঁপানি আছে লক্ষ্য করিলাম। তাহার
গায়েও রেলের জামা। গলায় একটা বেমানান গােছের
সবুজ মাফলার। কঁচা পাকা দাড়ী গোঁফে মুখমণ্ডল ,
সমাচ্ছন্ন। চোখের তারা দুইটি সর্বদাই যেন কুঞ্চিত
যুগলে কিছু দেখিবার চেষ্টা করিতেছে—অথচ আবার
মাঝে মাঝে সম্মুখের দিকেও চট্ করিয়া চাহিয়া
দেখিতেছে। আমার দিকে চকিতে চাহিয়া আবার
ঊর্ধনেত্র হইলেন। আমি নমস্কার করাতে একবার
ক্ষণিকের জন্য
আমার দিকে চাহিয়া প্রতি-নমস্কার
করিলেন।
মাখনবাবু বলিলেন-“এরই কথা বলছিলাম।”
৫৩
।
কিছুক্ষণ “ও” বলিয়া মাষ্টার মহাশয় নিকটস্থ চেয়ারটাতে বসিয়া হাঁপাইতে লাগিলেন। রামদীন চা ও নিকি লইয়া আসিল। মাষ্টার মহাশয় ও আমার সম্মুখে এক পেয়লা করিয়া চা ও প্রচুর নিকি আগাইয়া দিয়া মাখনবাবু বলিলেন- “খেতে খেতে আলাপটা হােক সার” মাষ্টার মহাশয় হাত নাড়িয়া অতি কষ্টে বলিলেন “খাবাও টাবার খাব না-ওসব চলবে না। খেলেই হাঁপানি বাড়ে। চা বরং চলতে পারে একটু। এ সময় আমি খাইও এক ‘কপ” বলিয়া তিনি একটা পেয়াল। নিজের দিকে, টানিয়া লইয়া পকেটে কি যেন খুজিতে লাগিলেন। দুইটি পকেটই খুজিলেন কিন্তু ঈপ্সিত বস্তু পাওয়া গেল না। মাখনবাবু হাসিয়া বলিলেন- “লেফট বিহাইণ্ড, বুঝি !-ওরে রামদীন-- রামদীন বাড়ীর ভিতরে ছিল। দৌড়াইয়া বাহির হইয়া আসিল। রামদীন আসিতেই মাখনবাবু বলিলেন -“ওরে দৌড়ে গিয়ে বাবুর আপিঙের কৌটোটা নিয়ে আয় ত!” রামদীন দৌড়িল । মাষ্টার মশাই উৰ্ধনেত্র হইয়া চক্ষু মিটমিট করিতে ৫৪
বলে
কিছুক্ষণ
করিতে বলিলেন—“বালিশের নীচে আছে
দিন”
মাখনবাবু আবার চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“ওরে
রামদীন শােন-বালিশের নীচে আছে, বুঝলি ?”
“হঁ, হুজুর”
রামদীন চলিয়া গেল।
রামদীন না আসা পর্যন্ত আমরা সকলেই রানীর
পথপানে চাহিয়া রহিলাম। আপিঙের কৌট। * আস।
পর্যন্ত জমিবে না। যদিও বেশী দেরী হয় নাই,
মাখনবাবু তথাপি অধীর হইয়া উঠিলেন “এ বেটা
গাঁজাখােরকে নিয়ে আর পারা যায় না এমন
সময় রামদীনকে দেখা গেল বেচারা দৌড়াইয়াই
আসিতেছে।
একগুলি অহিফেন গলধঃকরণ করিয়া এবং তৎপরে
চায়ের পেয়ালায় একটা চুমুক দিয়া মাষ্টার মশাই
বলিলেন—“ব্যাপার যা দাড়িয়েছে চাকরি বােধ হয়
আর থাকে না। আচ্ছা মাখনবাবু, আমি ভাছি এ
ভদ্রলােককে আমাদের এ সব ব্যাপারে জড়ান কি
০
ঠিক হবে?”
মাখনবাবু নড়বড়ে টেবিলটা চাপড়াইয়া বলিলেন
•৫৫
কিছুক্ষণ “সারটেলি—নিশ্চয়ই। আমাদের এখন কারুরই মাথার ঠিক নেই। আপনারও নেই—আমারও নেই। অর্থাৎ কি ভাবে দোষটা অপরের ঘাড়ে চাপান যায়—সেই পরামর্শটা—” মাষ্টার মহাশয়ের সন্ধানী নয়নযুগল ঘনঘন মিমিন্টু করিতে লাগিল। তিনি গভীর চিন্তামগ্নভাবে আর এক চমক চা পান করিলেন। আমার সহিত এই সব গোগনী, অথচ প্রয়ােজনীয় বিষয়ে আলােচনা করিতে মাষ্টার মহাশয়ের মন সরিতেছিল না। আমার নিজেরও মনােগত অভিপ্রায় ছিল না এই সব ব্যাপারে নিজেকে জড়াইয়া ফেলিতে। কিন্তু মাখনবাবু -ছােড়। তিনি কনুই দিয়া আমার পিঠে একটা খোঁচা দিয়া বলিলেন—“বলুন না মশাই, কার ঘাড়ে দোষটা চাপান যায়—” বলিয়াই তিনি ঘাড় ফিরাইয়া একবার চতুর্দিক দেখিয়া লইলেন--অপর কেহ আমাদের কথা- বার্তা শুনিতেছে কি না। এক রামদীন ছাড়া কাছে-পিঠে আর কেহ ছিল না। মাখনবাবু বলিলেন—“এই রামদীন—সিগ্রেট লে আও”। রামদীন চলিয়া গেলে আমি বলিলাম- “রামদীনকে বাঁচাতে হলে হয় ড্রাইভারের দোষ দিতে হয়,
কিছুক্ষণ
হয় ইঞ্জিনের দোষ দিতে হয়–না হয় রেল লাইনের
দোষ দিতে হয়। এর মধ্যে কোনটা সম্ভবপর হতে
পারে ভেবে দেখুন আপনারা”—মাষ্টার মশাই নিমেষের
জন্য আমার পানে চাহিয়া আবার উর্ধনেত্র হইলেন।
তঁাহার চোখের পাতা খুব ঘন ঘন ওঠা-নামা করিতে
লাগিল।
মাখনবাবু আমার চিন্তা-প্রণালী দেখিয়া মুগ্ধ ক্ষঙ্গিক
দৃষ্টিতে মাষ্টার মহাশয়ের দিকে চাহিয়া রহিলেন।বিটা
যেন—দেখিলেন ত, কেমন গুছাইয়া জিনিসটাকে বলিলেন
ইনি। মাষ্টার মহাশয় উৰ্দ্ধ-দৃষ্টি হইয়া হাঁপাইতেছিলেন
তিনি মাখনবাবুর এই পুলকিত
মুখচ্ছবি. দেখিতে
পাইলেন না। বুঝিলাম তাহার পক্ষে বেশী কথা বলা
কষ্টকর।
মাখনবাবুকে আমি আবার বলিলাম---“তাছাড়া
আমার আর একটা কথা মনে হচ্ছে এখন।
ইঞ্জিন আর রেল লাইনের দোষ দেওয়া যায়, কিন্তু ভেবে
দেখছি ও দুটো বােধ হয় খাটবে না”
“কেন? হােয়াই ?” বিজ্ঞভাবে মাখনবাবু বলিলেন।
মাষ্টার মশাই হাঁপাইতে হাঁপাইতে মনােযােগসহকারেই
আমাদের কথাবার্তা শুনিতেছিলেন। তাঁহার চিন্তাগ্রস্ত
৫৭
বল্লাম বটে
কিছুক্ষণ
মুখে ও দ্রুত নড়নশীল চোখের পাতায় তাহা প্রতীয়মান
হইতেছিল।
আমি বলিলাম, “ইঞ্জিন আর রেল লাইন যে ঠিক
আছে তাত যে কোন ইঞ্জিনিয়ার এসেই ধরে ফেলবে।
রামদীনকে বাঁচাতে হলে ড্রাইভারের নামে দোষ চাপান
ছাড়া আর কোন বৃদ্ধি ত মাথায় আসছে না—”
খনবাবু সােৎসাহে বলিয়া উঠিলেন—“তাত ঠিক।
কি ২ ? কেমন করে ?”
“সেটা ভেবে দেখতে হবে। বলতে পারেন ড্রাইভার
-মাতাল অবস্থায় এই কাণ্ড করেছে—কিম্বা ওই রকম
একটা কিছু
মাষ্টার মহাশয়ের নয়নযুগল অল্পক্ষণের জন্য আমার
মুখপানে নিবদ্ধ হইয়া আবার উর্ধ্বগামী হইল। মুখমণ্ডলে
ক্ষণিকের জন্য যেন একটা আনন্দের আলাে ফুটিয়া উঠিল।
তিনি একটু থামিয়া থামিয়া বলিলেন—“আমিও রিপাের্ট
করেছি তাই। ড্রাইভার ফাউণ্ড ড্রাঙ্ক। এখন কথা
হচ্ছে” বলিয়া তিনি চায়ের বাটিতে আর একটা
চুমুক দিলেন।
মাখনবাবু বলিলেন-“আপনি
রিপাের্ট করে
দিয়েছেন অলরেডি ?”
৫৮
কিছুক্ষণ
“হা হা, আরে এই সামান্য বুদ্ধিটা কি আর আমার
ঘটে নেই—অ্যাদ্দিন চাকরি করছি। হাঃ! কি মনে
করাে তুমি আমাকে।”
মাখনবাবু হাসিয়া বলিলেন “গ্রেট মেন্ থিঙ্ক,
অ্যালাই” মাষ্টার মহাশয় কিছু না বলিয়া হাঁপাইতে
লাগিলেন। এই উত্তেজনাটুকুতে তাহার হাঁপানিটা যেন
বাড়িয়া গেল। চা টুকু নিঃশেষ করিয়া মাষ্টার পশই
উঠিয়া গেলেন । যাইবার সময় বলিয়া গেলেন, “আপনারা
দুজনে ভেবে-চিন্তে দেখুন জিনিসটাকে ! ‘ভ্রাঙ্ক’ বল্লেই
ত হবে না। প্রমাণের উপর সেটাকে দাড় করাতে
হবে ত?”
নিকিতে একটা কামড়
দিয়া
মাখনবাবু
বলিলেন
“সারটেলি—নিশ্চয়ই !”
বামদীন এক প্যাকেট সিগারেট লইয়া আসিল।
একটা সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে আমি বলিলাম--
“যাই, প্ল্যাটফর্ম টায় একবার ঘুরে ফিরে আসি।”
মাখনবাবু বলিলেন, “বেশী দেরী করবেন না যেন।
রান্না প্রায় শেষ হয়ে গেল। আপনি আমার এখানে
খাবেন—সেকথা অবশ্য বলাই বাহুল্য। রান্না প্রায়
হয়ে এল।
আর হ্যা—আপনি ওই মেয়েটিকে
=
কিছুক্ষণ
বলে কয়ে দেখুন না, যদি একটু কিছু খাওয়াতে
পারেন:
আমি বাধা দিয়া বলিলাম-“আপনার স্ত্রী সে সব
ঠিক করবেন এখন। আমার এ রকমভাবে বলাটা কি
ভাল দেখায় ? ভেবে দেখুন না !”
মাখনবাবু চায়ের বাটিতে চুমুক দিতেছিলেন। বাটিটা
নামূইয়া বলিলেন—“হ্যা, বিষ্ণু ওসব বিষয়ে খুব ওস্তাদ
আছো পরকে এমন আপন করতে পারে! গিয়ে হয়ত
দেখব দুজনে হরিহর-আত্মা হয়ে বসে আছে। কিছু বলা
যায় না—” বলিয়া মাখনবাবু এতদূর হইতে অনর্থক উকি
ঝুকি দিয়া অন্তঃপুরের অবস্থাটা, পৰ্যবেক্ষণ করিবার চেষ্টা
করিতে লাগিলেন।
আমি বলিলাম-“একটু ঘুরে আসি তাহলে।”
“যান – বেশী দেরী করবেন না।” তাহার পর
হাসিয়া বলিলেন—“আর কাউকে জোটাবেন না
যেন ?”
চলিয়া যাইতেছিলাম। মাখনবাবু আবার পিছু
ডাকিলেন।
“দিস ফেলাের কথাটাও
একটু ভাববেন।
সমস্যা। ড্রাঙ্ক বল্লেই ত হবে না -প্রমাণ করতে হবে।”
৬০
কিছুক্ষণ আমি হাসিয়া বলিলাম—“রামদীনকে বলুন না ড্রাইভার- টাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে যদি সত্যিই একটু মদ খাওয়াতে পারে। বিনা পয়সায় পেলে হয়ত খেতেও পারে।” মাখনবাবুর মুখ উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন “দেখি–মন্দ বুদ্ধি নয় এটা। মাথা বটে আপনার ! ৬১ প্ল্যাটফর্মের ভিতর দিয়া চলিতেছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়িল সেই বেণী-দোলান মেয়েটি রেল- লাইনের বেড়া-দেওয়া তারের উপর সঁড়াইয়া লাফাইয়া লাফাইয়া দুলিতেছে। আমাকে দেখিতে পাইল না। পাইলে তাহার টুকটুকে লাল জিবটুকু বাহির করিয়া মুখভঙ্গীসহকারে ঠিক অভ্যর্থনা করিত। একবার মনে করিলাম ডাকি মেয়েটিকে। কিন্তু তাহা আর ঘটিয়া উঠিল না। নিকটেই একটা গােলমাল উঠিল। একদল লােক তালগােল পাকাইয়া একটা কোলাহলের সৃষ্টি করিয়াছে। নিকটে গিয়া দেখি সেই কাবুলিওলা একটি যুবকের হাত চাপিয়া ধরিয়াছে এবং মার্জার-কবলিত মূষিকের ন্যায় যুবকটি চিচি করিতেছে। কৌতূহল হইল। ভীড় ঠেলিয়া ভিতরে • গেলাম। কাবুলি আমাকে দেখিয়া বলিল—“উজুর, আপ দেখিয়ে—আপ বাল। আমি ইফ, ক দিজিয়ে—” বলিয়া সে যাহা বলিল তাহার মর্মার্থ এই যে এই যুবকটি কাবুলিটির নিকট ছুরি কিনিবে বলিয়া ৬২
কিছুক্ষণ
একটি ছুরি চাহিয়া লয় এবং ছুরির ধার আছে কিনা
তাহা পরীক্ষা করিবার জন্য নিজের হাতের নখগুলি
কাটিতে থাকে। দুইটি হাতের সমস্ত নখ নিপুণভাবে
কাটিয়া এখন ছােকরা ছুরিটি এই অজুহাতে ফিরাইয়া
দিতে চায় যে ছুরিটি আশানুরূপ তীক্ষ্ণ নহে। তদুত্তরে
কাবুলিওলা বলিতেছে যে ছুরির ধার আছে কিনা তাহ
সে এখনই সর্বসমক্ষে প্রমাণ করিয়া দিবে এই বেইমানের
নাসিকা ছেদন করিয়া। যুবকটির দিকে চাহিয়া তাহাকে
চিনিতে পারিলাম। সেই ট্যারা ছােকরা। একাকিনী
ভদ্রমহিলাটির সম্মুখে একটু আগেই দাত বাহির করিয়া
হাসিতেছিল।
তাহাকে বলিলাম-“আপনি চুরি যখন নেবেন না,
তখন মিছিমিছি কেন ওর ছুরি দিয়ে নখ কাটলেন?”
“ধার নেই মশাই ওর ছুরিতে”.
“ধার নেই ত দশটা আঙুলের নখ অমন সুন্দরভাবে
কাটলেন কি করে ?”
“জুট বাৎ মৎ বােন্না—”—কাবুলি গৰ্জন করিয়া
উঠিল।
ট্যারা ছােকরাটি বলিল—“তাছাড়া অত দাম দিয়ে
ছুরি কে নেবে মশাই—দাম বলছে আড়াই টাকা—”
কিছুক্ষণ
দো
রূপপয়া মে দেগা,
নাফা ছােড়
“আচ্ছা,
দিয়া-”
আমি বলিলাম—“কাজটা ঠিক হয় নি আপনার।
এর সঙ্গে যখন দরদস্তুর করেছেন, হাতের নখ কেটেছেন,
তখন নেওয়া উচিত আপনার ছুরিটা—”
“আমার কাছে অত পয়সা এখন নেই ত”
“আপনার বন্ধুবান্ধবদের কাছে দেখুন। আপনারা ত
একদল ছিলেন—
“আপনি যখন বলছেন তাই দেখি।
এই হাত
ছােড়াে” কাবুলি হাত ছাড়িয়া দিল।
কাবুলিকে বলিলাম-বেচারার নিকট পয়সা নাই।
বন্ধুবান্ধবদের নিকট হইতে জোগাড় করিয়া আনিতেছে।
কাবুলিওলা ছােকরার পিছু পিছু গেল। আমি এদিক
ওদিক চাহিয়া দেখিলাম ছােকরার বন্ধুবান্ধবদের কাহাকেও
দেখিতে পাইলাম না। সব সরিয়া পড়িয়াছে।
আর একটু আগাইয়া যাইতেই সেই মাড়ােয়ারি
ভদ্রলােকের সঙ্গে দেখা হইল। তিনি এবারও আমাকে
সেলাম করিলেন। শুধু সেলাম করিয়াই এবার ক্ষান্ত
রহিলেন না, নিকটে আসিয়া সসম্ভমে বলিলেন যে
আমার সহিত তাহার গােপন একটা পরামর্শ আছে-
৩
কিছুক্ষণ
আমি যদি অনুমতি করি—বিস্মিত হইলাম। আমার
সহিত কি গােপন পরামর্শ থাকিতে পারে ?
একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিলাম-“বেশ ত, বলুন”-
তিনি বলিলেন যে এখানে অনেক লােকজন রহিয়াছে—
পরামর্শটা প্ল্যাটফর্মের বাহিরে হওয়াটাই সমীচীন।
আমি তখন বলিলাম যে ওয়েটিং রুমে এক ভদ্রলােকের
সহিত দেখা করিতে যাইতেছি সেটা না সারিয়া এখন
আমি প্ল্যাটফর্মের বাহিরে যাইব না। তিনি কি অপেক্ষা
করিবেন ?
“বহুত খুব!”
আমি ওয়েটিং-রুমে ঢুকিয়া পড়িলাম। মাড়ােয়ারিটি
চঞ্চলভাবে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করিয়া বেড়াইতে
লাগিলেন।
ওয়েটিং রুমে ঢুকিয়া দেখিলাম বৃদ্ধ বিছানা বিছাইয়া
বেশ জমিয়া বসিয়া একটি বহি পড়িতেছেন, তাহার
বিধবা কন্যাটি পট্টবস্ত্র পরিধান করিয়া ঘরের এককোণে
ষ্টোভে রান্না চড়াইয়া দিয়াছেন।
“এসস, এসাে--আরে বা–চা-টা খাওয়া হয়ে
গেল ?
বল বস,
এই বিছানাতেই বস না
তুমি”
কিছুক্ষণ
ভদ্রলােক মহা উৎসাহে আমাকে আপ্যায়িত করিয়া
বসাইলেন।
জিজ্ঞাসা করিলাম—“কি বই পড়ছেন ওটা?”
ভদ্রলােক বইখানা লুকাইবার চেষ্টা করিয়া বলিলেন
“ও একটা বাজে বই বলে মনে হবে তােমার। আমার
কিন্তু বেশ লাগে—”
বিধবা মেয়েটি দেখিলাম মুচকি মুচকি হাসিতেছে।
আমি আবার বলিলাম—“কি বই ?”
“আমার এই বয়সে ‘পিগ্রিম প্রগ্রেস্ বা গীতা
বা ওই রকম কিছু একটা পড়া উচিত; কিন্তু খুব ভাল
লাগে আমার এই বইখানা—” বলিয়া বইটা আমার
হাতে দিলেন।
দেখিলাম—“অ্যালিস্ ইন্ ওয়ান্ডার ল্যাণ্ড”। বলা
বাহুল্য আশ্চৰ্য্য হইয়া গেলাম। আরও দুই তিনখানা
বই কাহে পড়িয়া আছে দেখিলাম। বলিলাম—“বইটা
ত খুব ভাল বই। ছােট ছেলেমেয়েদের এমন বই আর
হয় নি”
ম্লান, হাসিয়া ভদ্রলােক বলিলেন—“ভেবেছিলাম
নাতিনাতনীদের নিয়ে বুড়াে বয়সে এই বইগুলাে আবার
বেশ জমিয়ে পড়ব—কিন্তু ভগবান আমার কপালে
;
কিছুক্ষণ
সে সুখ ত আর লেখেন নি। তাই একা একাই
পড়ি--
চুপ করিয়া রহিলাম।
একটু পরে জিজ্ঞাসা করিলাম—“আপনারা খুব গোঁড়া
হিন্দু-না ?”
তিনি হাসিয়া বলিলেন—“না, মােটেই না! তবে
আমার মেয়ে কিছুদিন থেকে বলিয়া তিনি চকিতে
একবার কন্যার প্রতি চাহিয়া দেখিলেন—“ও কিছুদিন
থেকে ভয়ানক গোঁড়া হয়ে উঠেছে।”
আমি বলিলাম-“কিছুদিন থেকে, মানে? আগে
গোঁড়া ছিলেন না।”
“না মােটেই না। কলেজে পড়া মেয়ে কি সহজে
গোঁড়া হয় ? ও বি-এ পাশ করেছে আজ বছর চারেক
হল—তাই না মিণ্ট ?”
মিন্ট, কিন্তু দেখিলাম আমাদের দিকে পিছন ফিরিয়া
বসিয়া আলু ছাড়াইতেছেন। বৃদ্ধের কথায় একটু মাথা
নীচু করিলেন মাত্র।
—“হঁা- চার বছরই” বলিয়া বৃদ্ধ চুপ করিয়া
গেলেন।
মিণ্ট নীরবে তরকারী কুটিতে লাগিলেন। আমি
৬৭
কিছুক্ষণ
অ্যালিস্ ইন্ ওয়ান্ডার ল্যানডের” পাতাগুলা উল্টাইয়া
ছবি দেখিতে লাগিলাম। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া বৃদ্ধ
আবার বলিলেন-“বরাত, বরাত—সবই অদৃষ্ট। অদৃষ্ট
ছাড়া পথ নেই। বুঝলে বাবা ? বিধাতার বিধানকে
মেনে নেবার মত মনের শক্তি থাকার দরকার। আমার
ওইটের অভাব ছিল বলেই এত কষ্ট পেলাম।” বলিয়া
বৃদ্ধ একটু হাসিলেন।
একটু চুপ করিয়া আবার শুরু করিলেন—“বিধাতার
বিধানকে মেনে নেওয়াই উচিত। বিনােদ পাগল হয়ে
গেছে—পাগলা গারদে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি ত।
মিন্টু বিধবা হয়েছিল সেটাকেও এমনি ভাবে মেনে
নিলেই চুকে যেত। কিন্তু আমি গেলাম বিধাতার উপর
টেক্কা দিতে! বিধাতা সে কথা শুনবেন কেন—আরে
!” বলিয়া আবার একটু হাসিলেন।
ঠাৎ মিণ্ট বৃদ্ধের দিকে ফিরিয়া বলিলেন –“আচ্ছা
বাবা, নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা বাইরের পাঁচজনকে শুনিয়ে
লাভ কি ? এ সব কি বলে বেড়াবার মত কথা ?”
আমি বলিলাম-“থাক থাক, দরকার কি ওসব
কথার। এবার আমাকে উঠতেও হবে—” বলিয়া উঠিবার
উপক্ৰম করিলাম।
৬৮
কিছুক্ষণ বৃদ্ধ একটু : অপ্রতিভ হইয়াছিলেন। বলিলেন— “এরই মধ্যে উঠবে কোথায়? ট্রেণের ত এখন ঢের দেরী। আমাদের এইখানেই যখন রান্না হচ্ছে তখন এইখানেই চারটি খাও না” “আমার আপত্তি নেই তাতে। কিন্তু মাখনবাবুর বাড়ীতে আমার জন্যে রান্না হচ্ছে শুনলাম- “ও—আচ্ছা সেখানেই খেও তাহলে। তবু বস একটু। এর মধ্যেই রান্না নিশ্চয়ই হয়ে যায় নি” “না, তা বােধহয় হয় নি। আচ্ছা বসছি একটু” বলিয়া আবার বসিয়া পড়িলাম। কিন্তু স্বচ্ছন্দভাবটা যেন আর ফিরিয়া পাইলাম না। বৃদ্ধ উচ্ছসিত হইয়া বলিতে লাগিলেন—“হ্যা বস বস, কোথায় যাবে এখন। মেডিকেল কলেজের ছেলে দেখলেই আমার বিনােদকে মনে পড়ে। হয়ত কোন যুক্তি নেই, কিন্তু মেডিকেল কলেজের ছাত্র শুনলেই তাকে নিজের লােক বলে মনে হয়- অর্থাৎ কথা অসমাপ্ত রাখিয়াই ভদ্রলােক থামিয়া গেলেন। খানিকক্ষণ নীরবেই কাটিল। আমি কেমন যেন একটু অস্বস্তি বোধ করিতেছিলাম। এর মধে, ৬৯ কিছুক্ষণ কোন ছুতায় উঠিয়া পড়িতে পারিলে বাঁচি। এমন সময় বৃদ্ধ আবার বলিয়া উঠিলেন— “মিণ্ট, তুই রাগ করলি, কিন্তু তুই ভেবে দেখ দিকি, এ-সব কথা চেপে রাখা উচিত কি ? শিক্ষিত লােক- মাত্রকেই সমাজের গলদের কথাটা বলা উচিত—কারণ হয়ত ওঁরা এর প্রতিকার করতে পারবেন। আমার মনে হয় খবরের কাগজে লেখালেখি করে সকলের চোখে আঙুল দিয়ে সব দেখিয়ে দেওয়া দরকার। সম্ভব হলে এসব লােককে পুলিশের হাতে দেওয়া কৰ্ত্তব্য। শরীরের কোথাও যদি ঘা হয়ে পচে যায় সেটাকে লুকিয়ে রাখতে হবে ? আরে বাঃ!” তাহার চশমার পুরু লেন্স দুইটি আলােকপাতে অত্যন্ত চক্চক্ করিতে লাগিল। তিনি উত্তেজিত স্বরে বলিতে লাগিলেন— “না, না, শােন তুমি। তােমার শােনা উচিত। প্রত্যেক শিক্ষিত লােকের জানা উচিত, কি রকম পাজি সমাজে আমরা বাস করি। মিণ্ট, বিধবা হবার পর আমি তার আবার বিয়ে দিয়েছিলাম। সে একরকম জোর করে। মিণ্টকে অনেক কষ্টে রাজী করালাম। মিন্ট, যদি রাজী হল—আত্মীয়-স্বজনেরা ঘােরতর আপত্তি করলেন। আমি দেখলাম—আরে বাঃ, আত্মীয়-স্বজনদের ৭
বললেন
কিছুক্ষণ
মন রাখতে গেলে নিজের বিবেককেই অগ্রাহ্য করতে হয়।
লেখাপড়া শিখেছি তাহলে কিসের জন্যে ! পাত্রের জন্য
খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলাম।”
বলিয়া ভদ্রলােক একটু চুপ করিয়াই আবার আরম্ভ
করিলেন—“একদিন সকাল বেলা বসে আছি একটি
নিরীহ গােছের লােক এসে দেখা করলেন।
আমার বিজ্ঞাপন তিনি দেখেছেন এবং আমার মেয়েকে
বিয়েও করতে রাজী আছেন। তিনিই পাত্র, বুঝলে।
বিধবা-বিবাহ নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ আলােচনা হল—
ছেলেটির কথাবার্তা শুনে আমার বেশ ভাল লাগল।
ছেলেটি দেখতেও বেশ ভদ্র নিরীহ। তারপর ছেলেটি
বল্লে যে বিধবা-বিবাহ করলে কিন্তু আত্মীয়-স্বজন সবাই
তাকে ত্যাগ করবে। একরকম নিঃসম্বল নিঃসহায় হয়ে
পড়তে হবে তাকে। সুতরাং কিছু পণ চাই—অন্ততঃ
পাচ হাজার টাকা না পেলে তার পক্ষে এ বিবাহের
দায়িত্ব নেওয়া সম্ভবপর নয়। আমি ভেবে দেখলাম
কথাটা ঠিকই—সমাজকে
ত চিনি।
গেলাম”
বৃদ্ধ আবার চুপ করিলেন।
মিন্টর দিকে ফিরিয়া দেখিলাম—সে
দেখিলাম—সে একমনে
রাজী হয়ে
৭১
কিছুক্ষণ
তরকারিই কুটিতেছে।
বৃদ্ধ আবার বলিয়া উঠিলেন
“উঃ, সবই বরাত। আমার রােক চড়ে গিয়েছিল।
ছােকরাটি বল্লে সে গােপনেই বিয়ে করতে চায় তাতেও
রাজী হয়ে গেলাম। বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে হয়ে
যাবার মাসখানেক পরেই ছােকরা একদিন নিরুদ্দেশ।
কোন পাত্তা নেই। তারপর শুনলাম এবং খোঁজ-খবর
করে জানলাম যে কথাটা সত্যি–ছােকরার আরও দু’
দুবার বিয়ে হয়েছে—পত্নী দুটিও জীবিতা। ভেবে দেখ
• একবার ! মিণ্ট, তারপর থেকে যে নিষ্ঠা শুরু করেছে
তা প্রায় আত্মহত্যারই সামিল-অর্থাৎ—এই দারুণ
গ্রীষ্মে নিবন্ধু উপবাসটা—কিন্তু করবেই ত, মানে ওর
মনের অবস্থাটা-করবে না? আরে বাঃ-”
বৃদ্ধ অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিলেন।
আমি বলিলাম-“আমি বুঝেছি সব। আপনি একটু
স্থির ২ন—
“স্থির হব বৈ কি! আমরা অতি ধীর স্থির বিচক্ষণ :
জাতি যে-আরে বা—অস্থির হওয়া আমাদের ধাতেই
নেই। একটু অস্থির প্রকৃতির হলে ওই জুয়াচোরটা
এতদিন খুন হয়ে যেত, আর আমি এতদিন ফাসি যেতাম।
কিন্তু আমরা রাজা উজির মারি মুখে। সত্যি সত্যি
৭২
কিছুক্ষণ
মারি মশা আর ছারপােকা-ময়লা বিছানায় বসে বসে।
আসল কাজ কিছু করতে পারি না-ইংলণ্ডে মেয়েরা কত
অসতী তারই হিসেব করতে আমরা ব্যস্ত—আমরা-
এমন সময় ফেন উৎলাইয়া জ্বলন্ত ষ্টোভটা হঠাৎ
নিভিয়া গেল। মিন্ট, উঠিয়া সেইদিকে গেলেন।
বৃদ্ধ ভদ্রলােক সেদিকে একবার চাহিয়া আবার শুরু
করিতেছিলেন। আমি কিন্তু উঠিয়া পড়িলাম।
“মাখনবাবুদের রান্না বােধ হয় হয়ে গেছে—এইবার
আমি যাই”
বাহির হইয়া আসিলাম। আসিবার সময় মিন্টর
পানে একবার চাহিয়া দেখিলাম-কিছু দেখা গেল না।
নিৰ্বাপিত ষ্টোভটার সম্মুখে সে আমাদের দিকে পিছন
ফিরিয়া বসিয়া আছে।
বাহিরে আসিতেই মাড়ােয়ারি ভদ্রলােকটির সহিত
দেখা হইল।
তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন।
অতিশয় সসঙ্কোচে এবং অত্যন্ত সবিনয়ে মাড়ােয়ারি ভদ্রলােক যে কথাটি আমাকে বলিলেন তাহাতে শুধু বিস্মিত নয় চলচ্ছক্তিরহিত হইয়া পড়িলাম। চলিতে- ছিলাম–দাড়াইয়া পড়িতে হইল। মাড়ােয়ারিও দাড়াইলেন এবং উভয় হস্ত নাড়িয়া এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে যে কথা আমাকে বুঝাইতে লাগিলেন তাহার মর্মার্থ গ্রহণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব হইলেওঁ তদনুসারে কার্য করা সম্ভবপর ছিল না। সেকথা তঁহাকে বলিতেই তিনি তৎক্ষণাৎ প্রস্তাব করিলেন যে আমাকে, মাখনবাবুকে এবং মাষ্টার মহাশয়কে পান খাইবার জন্য কিছু দিতে তিনি প্রস্তুত আছেন-কাৰ্যটি কিন্তু করাইয়া দিতে হইবে। ব্যাপার নিম্নলিখিত রূপ। বশি হালুয়াই মাড়ােয়ারিটির পূর্বপরিচিত। সহসা এতগুলি লােকের ক্ষুধা মিটাইবার সঙ্গতি বশি হালুয়াই- ৭
কিছুক্ষণ
এর নাই। সুতরাং এই মরশুমে শেঠজির সহিত বশির
দেখা হইয়া যাওয়াতে রামজির কৃপাই প্রমাণিত
হইতেছে। ক্যাপিটালের জন্য আর তাহাকে ভাবিতে
হইবে না। প্রাক্তন বন্ধু বশির উপকারার্থে শেঠজি
“শও দোশ” খরচ করিতে পশ্চাৎপদ নহে। কিন্তু
তৎপূর্বে তিনি আমাদের কৃপা-প্রার্থনা করিতে চাহেন।
অর্থাৎ তিনি চাহেন যে আমি মাখনবাবু এবং মাষ্টার
মশাই পান খাইয়া এমন একটা “কারবােয়াই” করি যে
ট্রেণখানা অন্তত আরাে চব্বিশ ঘণ্টা যেন এখানে পড়িয়া
থাকে। তাহা না থাকিলে অনর্থক এতগুলা টাকা খরচ
করিয়া আটা ঘিউ এবং তরকারির জন্য চার ক্রোশ
দূরবর্তী সাধুগঞ্জের বাজারে যাওয়ার কোন অর্থ হয় না।
কাছাকাছি যত আটা, ঘি এবং তরকারি ছিল বশি সব
কিনিয়া লইয়াছে এবং তাহাও নিঃশেষিতপ্রায়। সাধুগঞ্জে
যাইবার জন্য সে শেঠজিকে পীড়াপীড়ি করিতেছে।
শেঠজিরও যাইতে বিশেষ কোন আপত্তি নাই। কি
তৎপূর্বে তিনি আমাদের কৃপা-প্রার্থনা করেন।
করিলে পান অবশ্য আমরা খাইতে পারি।
আমি জানাইলাম আমাকে এসব কথা বলা বৃথা -
কারণ আমিও একজন প্যাসেঞ্জার মাত্র। মাখনবাবু বা
৭৫
কিছুক্ষণ
মাষ্টার মহাশয়ের সহিত আমার ঘনিষ্ঠতা নিতান্তই
আকস্মিক।
ইহা শুনিয়া তিনি মােটেই বিচলিত হইলেন না।
মৃদু মৃদু মাথা নাড়িয়া অর্ধনিমীলিত নেত্রে তিনি যাহা
বলিতে লাগিলেন তাহার প্রতিবাদের ভাষা খুঁজিয়া
পাইলাম না। তিনি এমন কোন রক্ত করিলেন না
যাহা যুক্তির দ্বারা খণ্ডন করা যায়। তিনি বলিতে
লাগিলেন যে আমার সহিত মাখনবাবু ও মাষ্টার
মহাশয়ের যে কোন সম্পর্ক নাই তাহা তিনি অবগত
আছেন। সমস্ত ‘পাক্কা’ খবরই তিনি সংগ্রহ করিয়াছেন
এবং ইহাই, সার বুঝিয়াছেন যে আমি যদি মাখনবাবু ও
মাষ্টার মহাশয়কে
একটু অনুরােধ করি তাহা হইলেই
কাৰ্যটি নিষ্পন্ন হইয়া যায়। একথা তিনি ভাল করিয়া
জানিয়াই তবে আমার নিকট আসিয়াছেন।
সামান্য পান খাইতে আপত্তি কি ?
বুঝিলাম এখানে সত্যভাষণ নিস্ফল।
একটু কৌতুক বােধও হইল।
বলিলাম-“আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখছি-
বলিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম। একটু গিয়া
দেখিলাম তিনি পিছু পিছু আসিতেছেন। তঁাহাকে
৭৬
কিছুক্ষণ ডাকিয়া বলিলাম যে তিনি যদি পিছু পিছু আসেন তাহা হইলে কিন্তু কার্যসিদ্ধি হওয়া শক্ত। এ কথায় যাদুমন্ত্রের মত কাজ হইল। ভদ্রলােক তৎক্ষণাৎ আমার সঙ্গ ছাড়িয়া দিলেন। কিন্তু যাইবার পূর্বে বলিয়া গেলেন যে আমার দয়ার উপর “ভরােসা” করিয়া তিনি তাহা হইলে সাধুগঞ্জের হাট অভিমুখে যাত্রা করিতেছেন। হাসিয়া উত্তর দিলাম—“আচ্ছা” “নমস্কার- ফিরিয়া দেখি সেই বেঁটে ভদ্রলােক। একটি লাল রঙের কোট বাহির করিয়া পরিধান করিয়াছেন। হাতেও একটি বেঁটে গােছের বর্মা চুরুট। এত বেঁটে বৰ্মা চুরুট ইতিপূৰ্বে দেখি নাই। তাঁহাকে নমস্কার করিয়া আগাইয়া গেলাম। ११ কিছুদূর গিয়াই মাখনবাবুর সহিত দেখা হইল। তিনি আমাকে ডাকিতে আসিতেছিলেন। দূর হইতেই তিনি চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“ভীষণ কাণ্ড মশাই-শীগগীর আসুন।” “কি হল ?” “আরে ওই যে মেয়েটা আপনি রেখে গেলেন—ও মুচির মেয়ে। ভাগ্যে রান্নাঘরে ঢােকে নি—ঢুকলে ত সব হাঁড়িকুঁড়ি ফেলে দিতে হত। কি মুস্কিল ! অজ্ঞাত- কুলশীলকৈ এই জন্যেই আশ্রয় দিতে নেই শাস্ত্রে বলেছে। আরে না-না আপনাকে অত কাচুমাচু হতে হবে না। আপনার দোষ কি? বাইরে থেকে দেখে ত কিছু 'বােঝধার জো নেই আজকালকার দিনে! সবাই ফিটফাট— আমি শুনিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম-“বুঝলেন কি করে?” ৭৮
কিছুক্ষণ
“আরে সে নিজেই বল্লে কি না! এ ধারে মেয়েটি
বেশ ইয়ে আছে—
“নিজেই বল্লে ?”
“হঁ্যা। বিমু খাওয়ার জন্যে খুব জিদ করতে লাগল।
তখন মেয়েটি বল্লে যে আমি তাহলে আপনাদের থালা
গেলাস এটো করব না—সব জেনে-শুনে যদি এটো
করতে দেন তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। কিন্তু আমার
প্রথমেই আপনাদের জানানাে উচিত যে আমি মুচির
মেয়ে’। এই শুনেই ত বিনুর পিলে চমকে গেল।”
বলিয়া মাখনবাৰু হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।
জিজ্ঞাসা করিলাম—“মেয়েটি এখন আছে কোথায় ?
আপনাদের বাড়ীতেই ?”
মাখনবাবু আমার পিঠ চাপড়াইয়া বলিলেন—“নো
ননা, সার। ভয় নেই—সে নিজেই চলে গেছে-
“কোথায়?”
“আলগােছে একখানা নিমকি খেয়ে সে ওই রাস্তা
দিয়ে চলে গেল। বলে গেল আমি গ্রামের ভােটা
একটু ঘুরে আসি। জিনিসপত্র সব আমার বাসাতেই
পড়ে আছে-
কি বলিব কথা খুঁজিয়া পাইতেছিলাম না।
কিছুক্ষণ
মাখনবাবু অনর্গল বকিয়া যাইতেছিলেন।
“আজ সব মাটি হয়েছিল আর একটু হলে !
রামীন ব্যাটা এ্যাণ্ড, পাবদা মাছ জোগাড় করে
এনেছে, আর বিনু করেছে তার ঝাল। বিমুর হাতের ঝাল
কোনদিন খান নি-খেলে আর ভুলতে পারবেন না।
সিপ্লি বিউটিফুল ! ও বেটি ছুয়ে দিলেই সব ভেস্তে
গিয়েছিল আর একটু হলে-
মাখনবাবুর বাড়ীর কাছে আসিয়া পড়িয়াছিলাম।
মাখনবাবু, জিজ্ঞাসা করিলেন—“চান করবেন ত
আপনি ?”
“ইচ্ছে ত আছে। কিন্তু এখন আবার কাপড়টা
ভেজাব কি না ভাবছি,
‘কাপড় দিচ্ছি আমি মশাই—চান করুন। চান না
করলে চলে এই গরমে” বলিয়া মাখনবাবু ভিতরে
চলিয়া গেলেন।
বাহিরে দাড়াইয়া দাড়াইয়া শুনিতে পাইলাম মাখনবাবু
বলিতেছেন—“এ কি পাবদা মাছগুলাে এখনও কিছু
কর নি? তােমাকে বলে গেলাম ঝাল করতে
“এ বেলা থাক না আর। কালকের বাসি মাছের
টক ত আছে একখােরা। পাবদাগুলাে বরং ভেজে
স
কিছুক্ষণ রাখি ওবেলা হবে। শরীরটাও ভাল নেই—কেমন যেন জ্বর জ্বর করছে- “না না, তা কি হয়। ভাল করে ঝাল কর মাছ- গুলাের ! ভদ্রলােককে আমি বললাম যে তােমার হাতের ঝাল খেলে তিনি জীবনে সেকথা ভুলতে পারবেন না” “আহা!” “কর কর, বুঝলে-” “উমুন ত নিভে গেছে। তােমার যত অনাছিষ্টি- “কুছ পরােয়া নেই—রামদীনকে ডেকে দিচ্ছি” আমি দেখিলাম এ ভাবে দাড়াইয়া দাম্পত্যালাপ চুরি করিয়া শােনাটা ঠিক নয়। একটু সরিয়া পায়চারি করিতে লাগিলাম। মিনিটখানেক পরেই মাখনবাবু একখানা কাপড়, গামছা এবং একটা চায়ের পেয়ালায় করিয়া খানিকটা তৈল লইয়া দর্শন দিলেন। তেল মাখিতে মাখিতে প্রশ্ন করিলাম—“কাছাকাছি পুকুর কোথাও আছে ? একটা ডুব দিয়ে আত্মতাম তাহলে মাখনবাবু বলিলেন-“খুব কাছাকাছি নেই। তবে একটু দূরে গেলেই—আধ মাইলটা—একটা ভাল পুকুর
কিছুক্ষণ
পেতে পারেন। এই যে রাস্তাটা সােজা চলে গিয়ে ওই
মন্দিরটার পাশ দিয়ে বেঁকে গেছে—ওই রাস্তা।
মন্দিরটার পাশ দিয়ে গিয়ে রাস্তাটা দু-দিকে ভাগ হয়ে
গেছে -আপনি বাঁ দিকেরটা ধরে সোজা চলে গেলেই
পুকুর পাবেন।
বেশ ভাল পুকুর।
যান তাহলে দেরী
করবেন না -”
মাথায় একটু তেল চাপড়াইয়া বাহির হইয়া পড়িলাম।
কিছুদূর অগ্রসর হইয়া দেখিলাম যে রাস্তার মােড়টায়
যেখান হইতে আমাকে বাঁকিয়া পুকুরের রাস্তা ধরিতে
হইবে সেইখানটায় অনেকগুলি লােক জমিয়াছে এবং
একটা গােলমাল হইতেছে।
দ্রুতপদেই যাইতেছিলাম—গতিবেগ আরও একটু
বাড়াইলাম।
ভীড়ের নিকটবর্তী হইয়া দেখিলাম একটা গরুর
গাড়ীর একটা চাকা রাস্তার পাশের একটা গর্তে পড়িয়া
গিয়াছে। শীর্ণ গরু দুইটি প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে বটে
কিন্তু তাহাদের সাধ্যে কুলাইতেছে না !
গাড়ােয়ান সে কথা শুনিবে কেন ?
তাহার হাতে লাঠি আছে-গায়ে শক্তি আছে। সে
প্রাণপণে লাঠিবাজি ও গলাবাজি করিয়া লােক জমাইয়া
৮২
,
কিছুক্ষণ
ফেলিয়াছে। লােকও দেখিলাম জমিয়াছে অনেকগুলি
আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই এই পাজর-বাহির-করা ঘাড়ে-
ঘা বলদ দুইটির বদমায়েসি সকৌতুকে নিরীক্ষণ
করিতেছে। আশ্চৰ্য্য পাজি গরু। এত মার খাইতেছে
তবু জোর করিয়া টানিয়া গাড়ীটাকে গর্ত হইতে
তুলিবে না !
“পেজোমি তােদের বের করছি থাম—
ক্রুদ্ধ গাড়ােয়ান তড়াক্ করিয়া লাফাইয়া পড়িল এবং
গাড়ীর সামনে গিয়া গরু দুইটির মুখের উপর নাকের
উপর লাঠি চালাইতে লাগিল। গাড়ােয়ান এবং দর্শকবৃন্দ
সকলেই হিন্দু। গােজাতির উপর তাহাদের শাস্ত্রীয়
অধিকার আছে। বলিবার কিছু নাই।
গাড়ােয়ানের হাত ব্যথা হয় নাই। সুতরাং সে হাত
চালাইতেছিল। আমি আর থাকতে না পারিয়া' বলিয়া
উঠিলাম—
“ওহে, আর মেরাে না ! এসে বরং আমরা সবাই
মিলে ঠেলেঠুলে গাড়ীটাকে তুলে দি ওপরে-
“আরে থামেন বাবু আপনি। এ গরুকে আপনি
চেনেন না ! দেখুন না আমি শায়েস্তা করে
ছাড়ব”
=
কিছুক্ষণ
বলিয়া সে আবার মার সুরু করিল।
“চোড় দেও—মাৎ মারাে”
দেখি সেই কাবুলিওয়লা আসিয়া হাজির হইয়াছে।
“চোড়াে—”
সে তাহার বলিষ্ঠ দেহ লইয়া আগাইয়া গেল এবং
প্রথমেই গিয়া গরু দুইটাকে খুলিয়া দিল।
“এই আগা সায়েব-কেয়া করতা”- বলিয়া
গাড়ােয়ান প্রথমটা একটু বাধা দিবার চেষ্টা করিয়াছিল
কিন্তু কাবুলিওলার মুখে সে যে ভাব দেখিল তাহাতে সে
আর বেশী কিছু বলা নিরাপদ মনে করিল না।
“তুম্ আমি নেহি-জানবর হ্যায়
বলিয়া কাবুলি গরু দুইটিকে হাঁকাইয়া নিকটেই
বাঁধিয়া রাখিয়া আসিল। এইবার সে আমাকে দেখিতে
পাইল। সেলাম করিয়া সহাস্যে সে বলিল—“আইয়ে
বাবু সাব, ঘােড় হাত লাগা দিজিয়ে –
বলিয়া সে নিজেই প্রথমে গিয়া জোয়ালে কঁধ দিল।
তাহার দেখাদেখি গাড়ােয়ান এবং আরও দুই একজন
আগাইয়া গেল।
আমি এবং আর বাকী সকলে
গাড়ীটার পিছন হইতে ঠেলিতে লাগিলাম। অনেক
ঠেলাঠেলির পর গাড়ীটা পথে উঠিল। কাৰ্যসমাধা
-
৮৪
কিছুক্ষণ
করিয়া কাবুলিওলা পস্তু ভাষায় খানিকটা কি বলিয়া
গেল-বুঝিলাম না, ঝ এবং ‘z এর একটা ঝড়
বহিয়া গেল! পরিশেষে সে আমাকে আবার সেলাম
করিয়া বিদায় লইল-কহিল এ ট্রেনে সে যাইবে না,
কারণ ট্রেন ছাড়িবার কোনই ঠিক নাই। উপস্থিত সে
গ্রামান্তরে যাইতেছে।
কাবুলিওলা চলিয়া যাইবার পর গাড়ােয়ান গজর
গজর করিতে লাগিল।
“উঃ শালা গােঙার এসে আমার সব নয়-ছয় করে
দিয়ে গেল। মাল গেছে পড়ে—একবেলা যাবে এখন
কুড়ােতে। এই—এই-একটি দানায় কেউ হাত দিও
বলছি- ”
সত্যই পিছনের একটা ফাটা বস্তা হইতে কিছু ,
ছােল রাস্তার ধুলার উপর পড়িয়া গিয়াছিল এবং তাহার
উপর হুমড়ি খাইয়া কয়েকজন পড়িয়াছিল বােধ হয়
কুড়াইয়া দিবার জন্যই। কিন্তু গাড়ােয়ান তাহাদের এই
উপচিকীর্ষাকে অমিল দিল না—দাত খিচাইয়া, তাড়া
করিয়া গেল।
পার্শ্ববর্তী একটি লােককে জিজ্ঞাসা করিলাম “এই
আগা সায়েব এই অঞ্চলেই থাকে নাকি?”
৫
•
কিছুক্ষণ
সে বলিল যে আগা সায়েব কোথায় যে থাকে তাহা
তাহার জানা নাই—তবে এই অঞ্চলে সে প্রায়ই ঘােরে।
অনেকেই তাহার কাছে টাকা ধার লয়। অত্যন্ত চড়া
সুদ। মাসিক টাকা প্রতি দুই আনা ! তাহার পর
নিম্নস্বরে সে জানাইয়া দিল যে এই মঙ্গল গাড়ােয়ানই
তাহার নিকট টাকা ধারে। তাই তাহার কার্যে বাধা
দিতে সাহস পাইল না। তা না হইলে
আমার আর বেশী শুনিবার আগ্রহ ছিল না।
মাখনবাবুর নির্দেশমত বাম দিকের রাস্তাটা ধরিয়া মাঠের
দিকে অগ্রসর হইয়া গেলাম।
কিছুদূর গিয়াই সম্মুখে একটা প্রকাণ্ড মাঠ। মাঠের
বুক চিরিয়া একটি পায়ে-চলা সরু পথ বিসর্পিত রেখায়
দিগন্তে মিলাইয়া গিয়াছে। কাছে দূরে কতকগুলি গরু
চৗরভেহে। পাশেই কয়েকটি রাখাল বালক ডাংগুলি
খেলিতেছে। তাহাদেরই একজনকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা
করিলাম পুকুরটা কোন দিকে। তাহারা বলিল যে সােজা
কিছুদূর গেলেই পাওয়া যাইবে।
উদার বিস্তীর্ণ মাঠে চলিতে চলিতে মনটা কেমন যেন
উদাস হইয়া গেল। চাহিয়া দেখিলাম মেঘলেশহীন
নীলাম্বর খর-রৌদ্রে পুড়িয়া যাইতেছে।
বহু উদ্ধে
কিছুক্ষণ চক্রাকারে কতকগুলি শকুনি উড়িয়া বেড়াইতেছে। একটা গরুর পিঠে একটা কাক বসিয়া তাহার পুরাতন ক্ষতটাকে ঠোকরাইয়া রক্তাক্ত করিয়া তুলিয়াছে। আরও একটু দূরে গিয়া দেখিলাম বিস্ফারিত-চঞ্চু শালিক- দম্পতি আমাকে দেখিয়া উড়িয়া গেল। রৌদ্র-দগ্ধ ধূসর মাঠের উপর দিয়া হাঁটিয়া চলিয়াছি। পুষ্করিণী কতদূরে আছে কে জানে! ৮৭ স্নান সমাপন করিয়া উঠিয়াছি এমন সময় মনে হইল পুকুরের ওপারে সেই মেয়েটি যেন একা একা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমাকে বােধ হয় দেখিতে পায় নাই। ওপারে একটা গাছের তলায় হেঁট হইয়া একমনে কি যেন কুড়াইতেছে। একটা কি যেন গাছ রহিয়াছে ওপারে। সিক্ত কাপড়টি কাচিয়া গামছায় বাঁধিয়া ওপারের দিকে অগ্রসর হওয়া গেল। একটু দূরে গিয়াই বুঝিলাম সেই মেয়েটিই বটে। কাছাকাছি হইতেই মেয়েটি আমার দিকে ফিরিয়া চাহিল ! আমি নমস্কার করিলাম। মেয়েটি প্রতি-নমস্কার করিয়া নীরব হইয়া রহিল। নীরবতা আমাকেই ভঙ্গ করিতে হইল। মেয়েটির বয়স কম—তাহাকে ‘তুমি’ বলিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তাহার মুখে-চোখে এমন কি একটা আছে যে বলিতে বাধে। বলিলাম- “এখানে একা একা কি করছেন?”
-
কিছুক্ষণ
মেয়েটি হাসিয়া বলিল—“জাম কুড়ােচ্ছ। কেমন
সুন্দর জাম দেখুন ত”
সত্যই বেশ সুন্দর বড় বড় জাম।
অনেকগুলিই
সংগ্রহ করিয়াছে দেখিলাম।
—“খাবেন? নিন, না !”
“না, এখন আর খাব না। আমাকে ভাত খেতে
হবে এখুনি গিয়ে। চান করতে এসেছিলাম
মেয়েটি মুচকি মুচকি হাসিয়া বলিতে লাগিল “আমার
জাতের কথা টের পেয়ে গেছেন বুঝি ? ফলের বেলায় ত
দোষ নেই শুনেছি। আমার মা ঝুড়ি করে জাম, বৈঁচি,
কুল ফেরি করে বেড়াতেন—
“না না, সেজন্য নয়। আমার নিজের ও-সব কোন
সংস্কার নেই—আচ্ছা দিন দু-চারটে—তা নাহলে আপনার
বিশ্বাস হবে না”
জাম চিবাইতে চিবাইতে বলিলাম-“এখানে একা
একা কি আর করবেন ? চলুন ষ্টেশনের দিকেই যাওয়া
যাক -
মেয়েটি চুপ করিয়া রহিল।
“বাঃ, ওই দিকে একটা কি সুন্দর জাম পড়ে রয়েছে
দেখুন। থামুন, আনি ওটাকে
৮৯
কিছুক্ষণ পাশেই একটা কঁটা ঝােপের ভিতর একটা পাকা পুষ্ট জাম পড়িয়াছিল। মেয়েটি অতি সন্তর্পণে ঝুকিয়া হাত বাড়াইয়া সেটিকে হস্তগত করিল। বলিলাম –“এইবার চলুন তাহলে” “আপনি যান। আমি এখন যাব না—একটু পরে আসছি” ইহার পর আমার চলিয়া আসাই উচিত ছিল। কিন্তু মাখনবাবুর বাড়ী হইতে মেয়েটির অকস্মাৎ অন্তর্ধানে মনে আঘাত পাইয়াছিলাম। অপ্রত্যাশিত ভাবে ইহাকে আবার এখানে পাইয়া ছাড়িয়া যাইতে ইচ্ছা করিল না। মুচির মেয়ে? মুচির ঘরে এমন মেয়ে হয় তাহা আমার জানা ছিল না। মেয়েটির চোখে মুখে এমন একটা বুদ্ধির জ্যোতি রহিয়াছে যাহা ভদ্র মেয়েদের মুখেও খুব বেশী দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না। একটু ইতস্ততঃ করিয়া আবার বলিলাম, “মাখনবাবুর স্ত্রী আপনাকে ঠিক কি বলেছেন জানিনা কিন্তু আমাদের সাধারণ হিন্দু ঘরের প্রচলিত সংস্কার কাটিয়ে ওঠা সকলের পক্ষে সহজ নয়। এটা আপনার বােঝা উচিত- মেয়েটি তাড়াতাড়ি প্রতিবাদের সুরে বলিল-“না না, মাখনবাবুর স্ত্রী আমাকে তেমন কিছু ত বলেন নি।
কিছুক্ষণ বললেই বা কি করতুম। মুচির মেয়ে হয়ে এদেশে এর চেয়ে আর বেশী কি সম্মান আশা করতে পারি বলুন- আমি বলিয়া ফেলিলাম—“আপনাকে দেখে সত্যি কিন্তু মুচির মেয়ে বলে মনে হয় না। সত্যি বলছি--” মেয়েটি গাছের ও পাশটায় সরিয়া গিয়া ঝুকিয়া পড়িয়া বােধহয় আর একটা জাম কুড়াইতে গেল। তাহার মুখ দেখিতে পাইতেছিলাম না। রঙীন কাপড়ের প্রান্তটুকু শুধু দেখা যাইতেছিল। আমিও ঘুরিয়া গাছের ও পাশটায় গেলাম। গিয়া বলিলাম --“চলুন চলুন—এখানে একা নির্জন মাঠের মাঝে থাকা ঠিক নয়।” “নির্জন জায়গাই আমাদের পক্ষে নিরাপদ ! কেন, আপনি আমাকে শুধু শুধু বিপদের মধ্যে ডেকে নিয়ে যেতে চাইছেন ? প্ল্যাটফর্মের ওপর অসভ্য একদল ছেলে বিরক্ত করছিল তাই দেখে আপনি নিয়ে গেলেন এক ভদ্রলােকের বাসায়। সেখান থেকেও ফিরে আসতে হল। তার চেয়ে আমি এইখানে বেশত আছি !” “আপনি বেশ আছেন তাত দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু আপনাকে এখানে এরকম ভাবে ফেলে রেখে যেতে আমার কেমন ইচ্ছে হচ্ছে না—” “না না, ও কিছু নয়, আপনি যান। আমার জন্যে কিছুক্ষণ এতটা কষ্ট স্বীকার করেছেন এর জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।” “বেশ ত ধন্যবাদ আপনার গ্রহণ করলাম ; কিন্তু এবারে চলুন। আপনাকে এই মাঠের মাঝখানে একা ফেলে রেখে আমি যাব না। আপনি যদি না যান এই আমিও বসলাম-” বলিয়া নিকটস্থ একটি প্রস্তর-খণ্ডের উপর বসিয়া পড়িলাম। একটি জাম মুখের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া মেয়েটি হাসিয়া বলিল, “আচ্ছা একগুয়ে লােক ত আপনি। আমার জন্যে এতখানি কষ্ট স্বীকার আপনি কেন করছেন বলুন দেখি—হাড়ি মুচির কত মেয়ে রাস্তায় ঘাটে কতভাবে ত রােজ অপমানিত হচ্ছে—সকলের জন্য আপনি ত এতটা ব্যস্ত হন না। আমার জন্যেই বা এতটা ব্যস্ত হতে আমি দেব কেন আপনাকে ? একজন নীচ- জাতীয়ার জন্য ব্যস্ত হবার কারণই বা কি থাকতে পারে ?” “জাত আপনার যাই হােক—তাতে কিছু এসে যায় । আপনাকে নিজেদের সমশ্রেণীর বলে মনে হচ্ছে তার প্রধান কারণ বােধহয় আপনি ফরসা জামা কাপড় পরে রয়েছেন -” কিছুক্ষণ “আর কোন কারণ নেই ত?” প্রশ্নটা শুনিয়া মনে মনে একটু লজ্জা পাইয়া গেলাম। মুখে বলিলাম, “কারণ হয়ত অনেকগুলিই আছে। সবগুলাে না-ই শুনলেন।” কিছুক্ষণ নীরবে কাটিল। “নিতান্তই ছাড়বেন না যখন—চলুন তবে।” “চলুন।” নির্জন মাঠের ভিতর দিয়া খররৌদ্রে দুইজনে হাঁটিয়া চলিয়াছি। দুইজনেই নির্বাক। নীরবতাই ভাষাময় হইয়া উঠিয়াছে। হঠাৎ মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞাসা করিল “আপনি করেন কি ?” “আমি পড়ি” “কি পড়েন ? কোথায় ?” “কোলকাতায়—মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ি!” “ও, সেইজন্যই ঠিক ‘ডায়াগনােসিস্ করেছেন- মেয়েটির মুখে ইংরেজি কথা শুনিয়া চমকাইয়া উঠিলাম।
কিছুক্ষণ
“কিসের ‘ডায়াগনােসিস”
“থাক্-ও কিছু নয়--
বলিয়া একটু হাসিয়া মেয়েটি চুপ করিয়া গেল।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটিল।
কাহারও মুখে কথা নাই।
একটু পরে মেয়েটিই আবার কথা কহিল ।
“আপনাকে একটা কথা বলছি। কাউকে বলবেন
কিন্তু। আপনি ঠিকই ধরেছেন—আমি মুচির মেয়ে
নই। আমি কায়স্থের মেয়ে---
দাড়াইয়া পড়িলাম।
“কায়স্থের মেয়ে ? তবে আপনি নিজেকে মুচির
মেয়ে বলে পরিচয় দিলেন কেন?”
শুনিয়া মেয়েটি একটু হাসিয়া বলিল—“আপনি
মহাভারত নিশ্চয়ই পড়েছেন। কুন্তীপুত্র কর্ণ চিরকাল
নিজেকে অধিরথসূত বলে পরিচয় দিতেন তা জানেন ত ?
আমারও অবস্থা অনেকটা তাই”,
“কি রকম?”
“দাড়িয়ে পড়লেন কেন! চলুন না, যেতে যেতে সব
বলছি-
চলিতে লাগিলাম।
ছিল। কিছুক্ষণ মেয়েটিও বলিতে লাগিল—“আমার বাপ মায়ের নাম আমি বলব না। কোথায় আমাদের বাড়ী তাও আপনার জানবার দরকার নেই। এইটুকু শুধু জেনে রাখুন যে ভদ্রকায়স্থ ঘরে আমি জন্ম গ্রহণ করেছিলাম। আমার মা উপযুপরি দশটি মেয়ে প্রসব করার পর আমাকে প্রসব করেছিলেন। আমাকে প্রসব করার সঙ্গে সঙ্গেই মা অজ্ঞান হয়ে যান। সেই সুযােগে আমার ঠাকুমা তখন নাকি আঁতুড় ঘরেই আমাকে বিলিয়ে দেন—সেই ধাত্রী হাড়িনীকে। বাবারও নাকি তাতে মত মায়ের জ্ঞান হবার পর মাকে জানানাে হয় যে একটা মরা মেয়ে হয়েছিল এবং তা ফেলে দেওয়া হয়েছে- বলিয়া মেয়েটি হঠাৎ চুপ করিয়া গেল। “তারপর ?” “তারপর আর কি ? আমিই সেই একাদশ কন্যা !” এ রকম অসম্ভব কথা জীবনে কখন শুনি নাই। মেয়েটি হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি ? না হবারই কথা। এর একটি বর্ণ কিন্তু মিথ্যে নয়। খবরের কাগজেও বেরিয়েছিল- বলিবার কিছু ছিল না। মনে হইতেছিল এসব ৯৫ •
মনে হইতে
মৃ
কিছুক্ষণ
প্রসঙ্গ না তুলিলেই বােধহয় ভাল হইত।
ছিল মেয়েটিকে অবিশ্বাস করিতে পারিলে যেন বাঁচিয়া
যাইতাম। কিন্তু অবিশ্বাস করিবার কোন হেতু খুজিয়া
পাইতেছিলাম না। সমাজকে ত চিনি।
জিজ্ঞাসা করিলাম, “হাড়ি আর মুচি এক নাকি ?
আপনি পরিচয় দিচ্ছেন মুচির মেয়ে বলে, অথচ বলছেন
আপনার ঠাকুমা হাড়িনীকে—”
মেয়েটি হাসিয়া উত্তর দিল—“আপনি
ভুল
লাইন
ধরেছেন। ডাক্তার না হয়ে উকীল হলে আপনার বেশী
পসার হত। ঠাকুমা বিলিয়ে দিয়েছিলেন হাড়িনীকে—
হাড়িনী আবার আমাকে বিক্রি করে দেয় এক মুচিকে !
মুচির বাড়ীতেই আমি মানুষ হয়েছি—মুচি মায়ের দুধ
খেয়েই আমার এই দেহ পুষ্ট!”
“আমার কিন্তু একটা বিষয়ে খুব আশ্চৰ্য্য লাগছে
মুচির বাড়ীতে আপনি এরকম শিক্ষা পেলেন কি করে?”
“কেন মুচিরা মানুষ নয় না কি?”
মেয়েটির চোখে একটা ক্রুর ব্যঙ্গ যেন ক্ষণিকের জন্য
মূর্ত হইয়া উঠিল।
“মানুষ নয় তা আমি বলছি না—”
“এই সব মুচি মেথররা আধমরা ভদ্রলোেকদের চেয়ে
কিছুক্ষণ
ঢের বেশী জীবন্ত—তা জানেন ? তবে এটা ঠিক মুচির
ঘরে বরাবর থাকলে আমি লেখাপড়াও শিখতে পারতাম
, কিছুই না। ভাগ্যে ক্রিশ্চান মিশনারিরা এদেশে
এসেছিল তাই আমাদের গতি হয়েছে-
“আপনি ক্রিশ্চান না কি ?”
“হ্যা, আমি ক্রিশ্চান। মিস্ মার্থা দাস এখন
আমার নাম। আমি কিন্তু মুচির মেয়ে বলেই নিজের
পরিচয় দিতে ভালবাসি। বিশেষত হিন্দু সমাজে...”
মেয়েটির চোখের দৃষ্টিতে ক্ষণিকের জন্য একটা ব্যঙ্গের
বিদ্যুৎ যেন চকমক করিয়া উঠিল ।
“আপনার বাপ মা এখনও বেঁচে আছেন ?”
“না, তাঁরা মারা গেছেন শুনেছি। অন্যান্য আত্মীয়
স্বজন কে কোথায় আছেন জানিনা।
আছেন জানিনা। খোঁজ নিতে
প্রবৃত্তিও হয় না। ক্রিশ্চান মিশনারিদের কাছেই আমি
মানুষ। তাদেরই আশ্রয়ে ছেলেবেলাটা আমার মান্দ্রাজ
অঞ্চলে কেটেছে—শুধু ছেলেবেলা কেন—এ দেশে আমি
অল্প কয়েকদিনই হল এসেছি-
“বাঙলা ভুলে যান নি ত!”
“আমাদের এক মিশনারি মেম সুন্দর বাঙলা
জানতেন। তিনিই আমাকে বাঙলা পড়িয়েছিলেন খুব
স
-
৫
১)
কিছুক্ষণ
যত্ন করে। তিনি বলতেন আমি বাঙালীর মেয়ে
বাঙলাটা আমার ভাল করে শেখা উচিত। তার
কাছে আমি বাইবেলও যেমন পড়েছিলাম রামায়ণ
মহাভারতও পড়েছিলাম। তার আগ্রহ আর উৎসাহ
থাকলে আমার বাঙালীত্বও এতদিনে লােপ
পেয়ে যেত!”
জিজ্ঞাসা করিলাম “এদেশে আপনি ফিরে এসেছেন
আবার কি সূত্রে ?”
“একটু দরকার আছে—
বলিয়া মেয়েটি একটু যেন লজ্জিত হইল।
আমি আবার প্রশ্ন করিলাম।
“আপনি এ দেশের মেয়ে হয়ে মান্দ্রাজে চলে গেলেন
কি করে ?
“সে অনেক কথা। আমার মুচি বাবা আর মুচি মা
এদেশে অন্ন সংস্থান না করতে পেরে মাদ্রাজের দিকে চলে
* যান একটা চাকরি পেয়ে। আমার বাবা জুতাের খুব
ভাল কারিগর ছিলেন। সেখানেও কিন্তু তারা সুখে
থাকতে পারেন নি।
পারেন নি। আমার বাবা অত্যন্ত মাতাল
ছিলেন। সে অনেক কথা। ক্রমে তঁার চারিটি
গেল—মহাকষ্ট। শেষকালে এক পাদ্রির অনুগ্রহে শেষ
কিছুক্ষণ জীবনটা তারা একটু শান্তি পেয়েছিলেন। সেই সময়েই আমরা সবাই ক্রিশ্চান হয়ে যাই- ষ্টেশনের নিকটবর্তী হইয়াছিলাম। মেয়েটি বলিল-“এলাম ত আপনার সঙ্গে—এখন যাই কোথায় বলুন । সকলের ব্যবহার দেখে বড় কষ্ট পাই—সত্যি বলছি। নিজেকে, বাঙালী বলে পরিচয় দিতে লজ্জা করে—” আমি বলিলাম—“আপনি মাখনবাবুর বাসাতেই আসুন না। তাতে কি হয়েছে?” “না, না, মাপ করবেন, আমি এখন ওখানে যাবনা। বিশেষত এখন আপনাদের খাওয়া দাওয়ার সময়- মেয়েটি সােজা প্ল্যাটফর্মের দিকেই আগাইয়া গেল। আমি মাখনবাবুর বাড়ীর দিকে গেলাম। সেখানে গিয়া দেখি মাখনবাবু নিজেই রান্না করিতে লাগিয়া গিয়াছেন। আমার সাড়া পাইয়া বাহির হইয়া আসিলেন। ধোঁয়ায়, দুই চক্ষু লাল-জল পড়িতেছে। কোমরে গামছা বাঁধা কাপড়ে হলুদের ছােপ-হাতে হাতা। আমাকে দেখিয়া বলিলেন—“আপনার দেরী দেখে একটু পায়েস চড়িয়ে দিলাম। হয়ে গেল বলে-আর দেরী নেই—টেন মিনিটুস” কিছুক্ষণ বলিয়া আবার তিনি ধুমাচ্ছন্ন রান্নাঘরে ঢুকিয়া পড়িলেন। রান্নাঘর হইতেই চীৎকার করিয়া বলিলেন- “আমার ঘরে টেবিলের ওপর আয়না চিরুণী আছে— ঘরে ঢুকিতেই মাখনবাবুর স্ত্রী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। মনে হইল তিনি যেন শুইয়া ছিলেন। শুনিলাম তঁাহার শরীর খারাপ।
আহারাদির পর দেখা গেল বেলা তিনটা বাজিয়াছে।
পাবদা মাছের ঝাল সত্যই ভাল হইয়াছিল। পান
চিবাইতে চিবাইতে মাখনবাবু বলিলেন “আপনি একটু
বসুন সার—আমি দেখে আসি রামদীন ব্যাটা কতদূর কি
করলে—আপনি শুয়ে পড়ন না ততক্ষণ !”
আমি একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিলাম,“আপনার স্ত্রীর
খাওয়া হয়ে গেছে কি? তার শরীরটা ভাল নয় শুনলাম-”
“হ্যা, শরীরটা তেমন সুবিধে নেই বলছিল। মুড়ি
দিয়ে ত পাশের ঘরটায় শুয়েছে। জ্বরটর এসেছে
বােধহয়! ম্যালেরিয়ায় ত প্রায়ই ভােগে। আচ্ছা, দেখি
দাড়ান” বলিয়া মাখনবাবু পাশের ঘরে চলিয়া গেলেন।
একটু পরে পাশের ঘর হইতেই আমাকে ডাকিলেন—
“শুনে যান”
গেলাম। গিয়া দেখি মাখনবাবুর স্ত্রী জ্বরে অচৈতন্য
হইয়া পড়িয়াছেন। কপালে হাত দিয়া দেখিলাম--গা
পুড়িয়া যাইতেছে।
কিছুক্ষণ
মাথায় জলপটি দিয়া হাওয়া করিতে বলিলাম।
শশব্যস্ত হইয়া মাখনবাবু বলিলেন, “সিরিয়াস্ বুঝছেন
নাকি কিছু ?”
“না-জ্বরটা একটু বেশী হয়েছে কিনা—তাই ওই
রকম করে রয়েছেন। কুইনিন পাওয়া যাবে এখানে ?”
“ছিল ত আমার কাছেই কয়েকটা গুলি। দেখি
দাড়ান। ও ঘরে র্যাক্টায় ছিল মনে হচ্ছে—
“আপনি আগে মাথায় জল দিয়ে ভাল করে বাতাস
করুন। আমি দেখছি র্যাটা খুঁজে ফিরিয়া আসিয়া
ব্যাকটা খুঁজিয়া দেখিলাম। একটি খালি কুইনিনের
টিউব রহিয়াছে। কুইনিন নাই।
মাখনবাবু এই শুনিয়া ওঘর হইতেই চীৎকার করিয়া
বলিলেন-মাষ্টার মহাশয়ের বাসায় পাওয়া সম্ভব। মাষ্টার
মহাশয়ের বাসাতে গেলাম। পাশের বাড়ী। সেখানে
গিয়া দেখি মাষ্টার মহাশয় বাসায় নাই—ষ্টেশনে
গিয়াছেন। একটি দশবছরের ছেলে বাসা হইতে বাহির
হইয়া এই খবরটি দিল। তাহাকে বলিলাম যে মাখন
বাবুর স্ত্রীর খুব জ্বর হইয়াছে—বাড়ীতে যদি কুইনিন থাকে
একটু চাই। খােকা বাড়ীর ভিতরে চলিয়া গেল এবং
একটু পরেই কুইনিন পিল কয়েকটা লইয়া হাজির হইল।
১০২
কিছুক্ষণ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেখিলাম একটি আধময়লা-কাপড়-পরা আধঘােমটা দেওয়া মহিলাও বাহির হইলেন এবং একটু দূরে আমার পিছু পিছু আসিতে লাগিলেন। মাষ্টার মহাশয়ের স্ত্রী বােধহয়। ফিরিয়া দেখি মাথায় জল দেওয়াতে বিনুর জ্ঞান হইয়াছে। মাখনবাবু প্রাণপণ শক্তিতে হাওয়া করিয়া চলিয়াছেন। “পেলেন কুইনিন সার?” “হঁ্যা, পেয়েছি” “মাষ্টার মশায়ের হল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার—এই যে স্বয়ং লক্ষ্মীও এসে হাজির হয়ে গেছেন দেখছি। আসুন বৌদিচাঙ্গা করে তুলুন। এসব আমার কৰ্ম্ম নয়-- বলিয়া মাখনবাবু উঠিয়া দাড়াইলেন এবং মাষ্টার মহাশয়ের স্ত্রী বিমুর শিয়রে গিয়া বসিলেন। “বাস্ নিশ্চিন্দি! এইবার দেখা যাক রামদীন ব্যাটা কদ্দর কি করলো কুইনিনটা কি এখনই দিয়ে দিতে হবে?” “দিলেই ভাল হয়—দুটো পিল দিন- আমার হাত হইতে কুইনিনের পিলগুলি লইয়া মাষ্টার মহাশয়ের স্ত্রীর হাতে সেগুলি দিয়া মাখনবাবু বলিলেন-
কিছুক্ষণ
“শুনলেন ত? দুটো পিল দিয়ে দিন এখুনি-জাস্ট
নাউ ! বুঝলেন ?”
মাষ্টার মহাশয়ের স্ত্রী ঘাড় কাৎ করিয়া জানাইলেন
যে তিনি বুঝিয়াছেন এবং ফিস্ ফিস্ করিয়া বলিলেন যে
আমরা বাহিরে গেলেই তিনি পিল দুইটি খাওয়াইয়া
দিবেন।
মাখনবাবু আমাকে বলিলেন, “চলুন সার, তবে বাইরে
যাই। বৌদি এসে গেছেন যখন, তখন আর কিছু দেখবার
দরকার নেই। কিছুক্ষণ পরে চাই কি উনি চা-ও খাইয়ে
দেবেন আমাদের
ফিস্ ফিস্ করিয়া বৌদি আবার বলিলেন-“ও
বাড়ীতে যান না—চায়ের জল বসানই আছে। খােকনকে
বল্লেই সে সব ঠিক করে দেবে-
সস্মিত দৃষ্টিতে মাখনবাবু আমার দিকে চাহিয়া
বলিলেন-“শুনলেন ত ?”
“চলুন আমরা বাইরে যাই” বলিয়া আমি মাখন
বাবুকে টানিয়া বাহিরে লইয়া আসিলাম। মাখনবাবু
বলিলেন-“রামীন ব্যাটা করে কি করলে একবার
দেখতে হচ্ছে। ব্যাটাকে একট। টাকা দিয়েছি ত
অনেকক্ষণ হল-”
১
১০৪.
১ কিছুক্ষণ “কেন?” “ড্রাইভার ব্যাটাকে যদি ফুলে ফালে মদ খাওয়াতে পারে- হঠাৎ আমার মনের ভিতরটাতে কে যেন একটা মােচড় দিয়া গেল। এই চক্রান্তে সত্যই যদি ড্রাইভারের চাকরিটা যায়। আমি অনর্থক ইহার মধ্যে নিজেকে জড়াইলাম কেন ? নিতান্ত নিরীহ একটা লােককে ষড়যন্ত্র করিয়া এমন ভাবে- “কি ভাবছেন সার ?” “কিছু না—” এমন সময় দূরে দেখা গেল সেই মাড়ােয়ারি ভদ্রলােক দাড়াইয়া আছেন। আমাদের দেখিয়া আবার সেলাম করিলেন। ইহার কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম। সব মনে পড়িয়া গেল। মাখনবাবুকে বলিলাম—“আবার এক ফ্যাসাদে পড়েছি মশাই- “কি ফ্যাসাদ ?” আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা মাখনবাবুকে বলিলাম। মাখনবাবু নির্দিকারচিত্তে বলিলেন,“কত টাকা দিতে চায় ?” “সে দরদস্তুর ত করি নি। টাকা নেবেন নাকি ৩) সত্যি ?” ১০৫ ০
কিছুক্ষণ
“সারটেলি ! টাকা পেলে ছাড়তে আছে ?”
বলিয়া মাখনবাবু হাতছানি দিয়া তাহাকে ডাকিলেন।
মাভােয়ারি ভদ্রলােকও ইহারই জন্য ওৎ পাতিয়া ছিলেন
বলিয়া মনে হইল। আমি বলিলাম—“আপনারা তাহলে
কথাবার্তা চালান। আমি প্ল্যাটফর্মটার খবর নিয়ে
আসি একবার। সেই মেয়েটি আবার ফিরে এসেছে
জানেন ত ?”
“কোন মেয়েটি ? সেই মুচির মেয়ে?”
“হঁা-”
“কেমন করে জানলেন আপনি ?”
“পুকুর ধারে ছিল। আমার সঙ্গেই ফিরে এসেছে
প্ল্যাটফর্মের দিকে গেছে। খবর নিয়ে আসি একবার”
“মুচির মেয়েকে নিয়ে আর অত বেশী মাখামাখি
করবেন না। ওসব টেনডেনসি ছাড়ুন। মরুকগে ও
“না মাখামাখি করব কেন? আপনি শেঠজির সঙ্গে
ততক্ষণ আলাপ করুন । আমি এখনি ফিরে
আসছি-*
শেঠজি আসিয়া পড়িয়াছিলেন।
মাখনবাবু তঁাহার সঙ্গে কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন।
আমি প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়িলাম।
কিছুক্ষণ
প্ল্যাটফর্মে ঢুকিয়া একটা হাসির হবু শুনিতে
পাইলাম। দেখিলাম সেই ছােকরার দল হাসিতেছে।
হাসির উপকরণ এবারে তাহারা নিজেরাই সংগ্রহ
করিয়াছে। তাহাদের নিজেদের মধ্যেই একজন দেখিলাম
ঘােমট। দিয়া বউ সাজিয়া বসিয়া আছে। তাহার সম্মুখে
একটি ছােকরা অঙ্গভঙ্গী সহকারে গাহিতেছে-
কাদের কুলের বউ গো তুমি
কাদের কুলের বউ
বাকী সকলে হাে হাে করিয়া হাসিতেছে।
একটু দূরে একটা গাছতলায় দেখিলাম সেই ইণ্ডিয়ান
ক্রিশ্চান দম্পতি বেশ গুছাইয়া বসিয়াছেন। একটা
বেতের বাক্স হইতে খাদ্য দ্রব্যাদি বাহির হইয়াছে।
পাউরুটি, মাখন এবং একটা জ্যামের শিশি দূর হইড়েই
বেশ দেখা যাইতেছে। লাল চোঙ-ওল একটা শস্তা
গ্রামােফোনে একটা বিলাতী প্রচলিত গৎ বাজাইয়া
তাহারা ভােজন-ব্যাপারে ইউরােপীয় আবহাওয়া সৃষ্টিরও
প্রয়াস পাইয়াছেন দেখিলাম। কতকগুলি অর্ধ-নগ্ন
গ্রাম্য বালকবালিকা কিছুদূরে দলবদ্ধভাবে দাঁড়াইয়া এই
১০৭
কিছুক্ষণ ক্রিশ্চান-দম্পতির সঙ্গীতময় ভােজনবিলাস সবিস্ময়ে নিরীক্ষণ করিতেছে। সেই মেয়েটিও সেখানে গিয়া হাজির হইয়াছে দেখিলাম। ধৰ্ম্মগত মিল থাকাতে আলাপ-পরিচয়ে বেশ একটা হৃদ্যতা ফুটিয়া উঠিয়াছে বলিয়া মনে হইল। উহাদের নিকট যাওয়া সঙ্গত হইবে কিনা চিন্তা করিতেছি এমন সময় মাখনবাবু উৰ্দ্ধশ্বাসে আসিয়া বলিলেন- “একটু তাড়াতাড়ি আসুন সার ! বড় বিপদে পড়েছি —রামীন ব্যাটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ আমাদের ‘এনকোয়্যারিং অফিসর এখুনি আছেন ট্রলি করে। ড্রাইভারটারও পাত্তা নেই।” “আমি তার কি করব ?” “আহা, আসুনই না আমার সঙ্গে। ওদিকে চা-ও হয়ে গেছে। নিন একটা সিগ্রেট নিন। মাথা ঠিক রাখুন এ সময়ে ! আপনি ঘাবড়ালেই ত গেছি আমরা— বলিয়া তিনি ফস্ করিয়া একটা দিয়াশলাই জ্বালাইয়া ধরিলেন, “আসুন সার—চলুন—‘নাে টাইম টু লুজ,” মহা বিপদে পড়িয়াছি এ ভদ্রলােককে লইয়া! অথচ এড়াইবার উপায় নাই। ১৮ কিছুক্ষণ ১) গেলাম সঙ্গে। বাহিরে আসিতেই কনুই দিয়া আমাকে একটা খোচা দিয়া মাখনবাবু সহাস্যে বলিলেন—“টোপ গিলিতং !” “তার মানে ?” “তার মানে মান ড্রাইভারচন্দ্র খুব টেনে বেহুস হয়ে পড়ে আছেন ওই ওদিককার গুমটির ধারে। আপনার প্ল্যান কোয়াইট সাকসেসফুল!” “রামদীন কোথায় ?” “চা করছে, আসুন- “আপনার স্ত্রী কেমন আছেন ?” “বিমু অল রাইট। বল্লাম ত বৌদি যখন গেছেন তখন নাে ফিয়ার !” নিজেকে আবার কেমন যেন অপরাধী মনে হইতে লাগিল। ড্রাইভারটার যদি চাকরি যায় ! ষড়যন্ত্রের মধ্যে নিজেকে অনর্থক জড়াইলাম ! “ওফিক নয় সার-এদিকে আসুন। চা হচ্ছে মাষ্টার মশায়ের বাসায় উভয়ে মাষ্টার মহাশয়ের বাসাতে প্রবেশ করিলাম।
প্ল্যাটফর্মের কোলাহলটা যেন হঠাৎ বাড়িয়া উঠিল। “সায়েব এল বােধ হয়-- মাখনবাবু উদ্বিগ্ন মুখে উঠিয়া পড়িলেন। মাষ্টার মশাই উৰ্দ্ধ-নেত্র হইয়া চক্ষু মিট মিট করিতে লাগিলেন। আমি বলিলাম—“আপনারা বসুন। আমি দেখে আসি চট করে ব্যাপারটা কি মাখনবাবু বলিলেন, “যাবার সময় আপনি রামদীনটাকে একটু পাঠিয়ে দিয়ে যান ত। একটু শিখিয়ে পড়িয়ে রাখা দরকার ব্যাটাকে।” আমি বাহিরে আসিয়া দেখিলাম রামদীন দাড়াইয়া আছে। তাকে ভিতরে যাইতে বলিয়া সােজা প্ল্যাট- ফৰ্ম্মের দিকে অগ্রসর হইয়া গেলাম। প্ল্যাটফর্মে গিয়া যাহা দেখিলাম তাহাতে আমার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল ! দেখিলাম সেই ক্রিশ্চান মেয়েটিকে ঘিরিয়া আবার সেই অশিষ্ট যুবকদল মহাকলরব সুরু করিয়াছে। আমি ১১০
কিছুক্ষণ
আগাইয়া আসিয়া বলিলাম—“আবার আপনারা ওকে
অপমান করছেন?”
সেই ট্যারা ছােকরাটি ছিল।
সে আগাইয়া আসিয়া বলিল, “কিছু অপমান করিনি
মশাই। ভীড়ে যেতে যেতে ওঁর গায়ে আমার একটু গা
ঠেকে গিয়েছিল—উনি হঠাৎ আমাকে গালাগালি
দিয়ে বল্লেন ‘ইডিয়ট'। আমি বরং ভালভাবে
বল্লাম-দয়াময়ি, রাগ করছ কেন—দয়া কর—দয়া
পরম ধর্ম।”
বলিয়া ছােকরা ফিক্ করিয়া একটু হাসিয়া ফেলিল।
ছােকরার মুখের হাসির উপরই একটি প্রকাণ্ড চড় বসাইয়া
দিলাম।
আর একটি ছােকরা প্রতিবাদ করিতে
যাইতেছিল তাহাকেও এক ঘা দিলাম।
“ছি, ছি মারামারি করবেন না ওসব ছােটলােকদের
সঙ্গে। আসুন—বাইরে আসুন”
আমার রুদ্রমূৰ্ত্তি দেখিয়া ভীরুর দল ছত্রভঙ্গ হইয়া
পড়িয়াছিল। আরও নানা লােক আসিয়া ভীড় করিয়া
দাড়াইয়া নানারূপ প্রশ্নে আমাকে বিব্রত করিয়া তুলিল।
আমি এদিক ওদিক চাহিয়া মেয়েটিকে দেখিতে পাইলাম
না। একটু দূরে দেখিলাম লাল কোট পরিয়া সেই বেঁটে
•১১১
কিছুক্ষণ ভদ্রলােকটি আমার দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করিয়া আরও দুই তিনজন লােককে কি যেন বলিতেছেন। আমার সহিত চোখােচাখি হইতেই তিনি চুপ করিয়া গেলেন এবং মুখে একটা হাসি টানিয়া আনিয়া বলিলেন- “নমস্কার দারােগা বাবু” এবং সরিয়া দাড়াইলেন। “মেয়েটি কোন দিকে গেল দেখেছেন?” তিনি অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া দেখাইয়া দিলেন যে মেয়েটি গেট দিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে এবং তাহার পর আমার দিকে পিছন ফিরিয়া বিপরীত দিকে অগ্রসর হইয়া গেলেন। পুলিশের লােকের সহিত বেশী বাক্যালাপ করাটা তিনি নিরাপদ বিবেচনা করিলেন না বােধ হয়। বাহিরে গেলাম। বাহিরে গিয়াই মাখনবাবুর সঙ্গে দেখা। “সায়েব এল না কি ?” “না। সেই মেয়েটি কোথা গেল দেখেছেন?” “হাসে ত আমার বাসায় গিয়ে ঢুকল ফের। আমি দাড়িয়েছিলাম মশাই – কিছু বলতে পারলাম না। মহা মুস্কিল হল দেখছি—জাতজন্ম আর কিছু রইল না— ১১২
এমন সময় হঠাৎ তিনজন সাহেব আসিয়া হাজির।
একজনের কাধে রক্তাক্ত একটা বুড়ী।
এ কি কাণ্ড!
সাহেবেরা প্রথমেই আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল যে
নিকটে কোন ডাক্তার আছে কি না। কাছাকাছি
হাসপাতালই বা কতদূর।
মাখনবাবু শশব্যস্ত হইয়া মাষ্টার মশাইকে ডাকিয়া
দিলেন। সাহেবের নাম শুনিয়া মাষ্টার মহাশয় তাড়াতাড়ি
টুপিটা মাথায় দিয়া হাত কচলাইতে কচলাইতে আসিয়া
হাক্তির হইলেন। আমি একটু দূরে সঁড়াইয়া ইহাদের
কথাবার্তা শুনিতে লাগিলাম।
সাহেবেরা তিনজন সেই ফাষ্ট ক্লাসের যাত্রী।
নিকটবর্তী ঝিলে পক্ষী-শিকার করিতে গিয়াছিলেন।
এই খুঁটেকুড়ানী বুড়ীটা ঝিলের ধারে গােবর কুড়াইয়া,
বেড়াইতেছিল। এক সাহেবের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া
বুড়ীকে লাগিয়াছে।
সাহেবেরা মহা ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছেন।
ষ্টেশন মাষ্টারকে বলিতেছেন শুনিলাম যে যত টাকাই
খরচ হউক না কেন—বুড়ীকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিতে
হইবে।
কিছুক্ষণ - হাসপাতাল কতদূরে ? মাষ্টার মহাশয় জানাইলেন যে প্রায় মাইল চারেক দূরে একটি সরকারি হাসপাতাল আছে। সাহেবেরা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন কাছাকাছি আর কোন মেডিক্যাল হেল্প’ পাওয়া সম্ভব কি না। আর কোন ডাক্তার নাই ? মাখনবাবু হঠাৎ আগাইয়া আসিয়া বলিলেন – “হিয়ার ইজ, ওয়ান্ মেডিকেল কলেজ স্টুডেন্ট সার— ভেরি এক্সপার্ট- আমাকে আগাইয়া আসিতে হইল। বুড়ীকে পরীক্ষা করিয়া বুঝিলাম যে যদিও আঘাত গুরুতর—কিন্তু হাসপাতালে লইয়া গিয়া উপযুক্ত চিকিৎসাদি করিলে বাঁচিয়া যাওয়াও অসম্ভব নহে। বাহিরে ইহার চিকিৎসা হইতে পারে না—বিশেষত এ স্থানে। এই কথা শুনিবামাত্র একটি কুলিকে সঙ্গে লইয়া সাহেব তিনজন চার মাইল দূরবর্তী হাসপাতাল অভিমুখে পদব্রজে রওনা হইয়া গেলেন। পালকি কিম্বা ভুলি না পাওয়া যাওয়াতে বুড়ীকে কাধে করিয়াই তুলিয়া লইয়া গেলেন। ১১৪
কিছুক্ষণ
তাহারা চলিয়া গেলে মাখনবাবু বলিলেন--“দেখলেন
শালার ব্যাটাদের কাণ্ড!”
মাষ্টার মহাশয়
মহাশয় উর্ধনেত্রে মিটিমিটি করিয়া
বলিলেন -“পুলিশ কেস হলে আবার সাক্ষী ফাক্ষি
দিতে না হয় !
এ এক ভারি হাঙ্গামায় পড়া গেল
দেখছি”
এমন সময় ষ্টেশন প্ল্যাটফর্মে আবার একটা কলরব
শােনা গেল। রামদীন উর্ধ-শ্বাসে ছুটিয়া আসিয়া খবর
দিল যে ঐলি করিয়া দুইজন সাহেব আসিয়াছেন।
মাষ্টার মহাশয়ের টুপি পরাই ছিল।
তিনি সােজা চলিয়া গেলেন।
মাখনবাবুও পিছু পিছু গেলেন।
আমিও গেলাম।
একজন খাঁটি শ্বেতাঙ্গ—আর একজন ব্রাউন রঙের।
তবে ব্রাউন রঙের হইলেও তিনি একজন পদস্থ অফিসার
তাহা মাষ্টার মহাশয় ও মাখনবাবুর ব্যবহারে বােঝা গেল।
মাষ্টার মশাই দেখিলাম হাত কচলাইতেছেন ও ভুল
ইংরেজিতে বলিতেছেন যে দোষ ড্রাইভারের
১১৫
হয় নাই
কিছুক্ষণ
লােকটা মাতাল অবস্থায় সিগন্যাল অগ্রাহ্য করিয়া ফুল
ফোসে” ষ্টেশনে ট্রেন ‘ইন’ করিয়াছিল।
শ্বেতাঙ্গ সাহেবটি মুখ হইতে পাইপ নামাইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন—কোন যাত্রী জখম হইয়াছে কিনা।
শুনিয়া নিশ্চিন্ত মনে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন যে ড্রাইভার
কোথায় ?
মাখনবাবু বলিলেন যে সে মত্ত অবস্থায় গুটির
ধারের রাস্তায় শুইয়া আছে। ট্রেণ ডিরেল্ড হইবার পর
সে ক্রমাগত মদ খাইতেছে।
সাহেব বলিলেন—“লে আস্ সি হি”—
সকলে অগ্রসর হইলাম।
গেট হইতে বাহির হইয়া কিছুদূর অগ্রসর হইয়াছি
এমন সময়ে মাখনবাবুর বাসা হইতে সেই খৃষ্টান মেয়েটি
বাহির হইয়া সানন্দে বলিয়া উঠিল—“হ্যালাে পল
—ইউ আর হিয়ার ! বাই গড়। হ্যভ, ইউ বিনু
ট্রান্সফার ?”
“মার্থা ? হােয়াট ব্রিংস ইউ হিয়ার ?”
“আই ওয়াজ, অন্ মাই ওয়ে টু ইউ !”
ব্রাউন রঙের সাহেবটি সবিস্ময়ে দাড়াইয়া পড়িলেন।
মার্থ। তখন আসিয়া সােচ্ছাসে বর্ণনা করিতে লাগিল
১১৬
কিছুক্ষণ
যে তাহাকে আশ্চৰ্য্য করিয়া দিবার অভিপ্রায়ে কোন
খবর না দিয়াই সে তাহার কাছে যাইতেছিল। হঠাৎ
পথে এই বিপদ।
তাহার পর তাহারা গল্প করিতে করিতে আগাইয়া
গেল। তাহাদের কথা-বার্তা আর শুনিতে পাইলাম না।
শ্বেতাঙ্গ সাহেবটিও দেখিলাম সহাস্যমুখে হাটটা একটু
খুলিয়া মার্থাকে অভিবাদন করিলেন।
মাখনবাবু চুপি চুপি আমার কানে কানে বলিলেন
“সারলে দেখছি সার। ওই সাহেব হচ্ছে পি, ডব্লিউ,
এ মেয়েটার সঙ্গে বেশ ভাব আছে দেখছি।
মাগী আমাদের নামে না লাগায়!” আমি কোন উত্তর
দিলাম না।
আমার কিছু ভাল লাগিতেছিল না।
গুমটির নিকট পোঁছিয়া দেখা গেল ড্রাইভার রাস্তার
ধারে শুইয়া আছে। পাশে একটা মদের বােতলও
রহিয়াছে। তাহার একজন অৰ্দ্ধমত্ত সঙ্গী তাহার নিকট
বসিয়া তাহাকে উঠাইবার বৃথা চেষ্টা করিতেছে। ড্রাইভার
কিন্তু বেহুস। শুধু বিড় বিড় করিয়া কি বকিতেছে।
কাছেই একটা ঝােপের ধারে দেখিলাম সেই ফুটফুটে
বেণীদোলান মেয়েটি সন্তর্পণে পা বাড়াইয়া একটা
১১৭
আই।
কিছুক্ষণ
প্রজাপতি ধরিবার চেষ্টা করিতেছে। সহসা এতগুলি
লােকের সমাগমে সে অন্যমনস্ক হইয়া গেল-প্রজাপতি
উড়িয়া গেল।
সাহেবেরা গিয়া ড্রাইভারকে দেখিতে লাগিলেন।
ভাঙা হিন্দীতে শ্বেতাঙ্গ সাহেবটি ড্রাইভারের সঙ্গীটিকে
প্রশ্ন করিলেন যে ড্রাইভার কখন হইতে মদ খাইতেছে।
সে সত্য কথাই বলিল। সে বলিল যে এখানে ট্রেণ
‘ডিরেণ্ড’ হইবার পর তবে তাহারা মদ খাইয়াছে।
ষ্টেশনের পয়েন্টম্যান্ রামদীন সাক্ষী আছে।
ষ্টেশন মাষ্টার চক্ষু মিট মিট করিয়া ইংরেজীতে
বলিলেন-“অল্ ফলস্
অবিশ্বাস করিবার কিছু ছিল না।
হঠাৎ সেই ব্রাউন রঙের সাহেবটি মাখনবাবু ও আমার
দিকে ফিরিয়া ইংরেজিতে বলিলেন যে এই বিপদে আমরা
তঁাহার বাগদত্তা পত্নীর প্রতি যে সদ্ব্যবহার করিয়াছি
তাহার জন্য তিনি আমাদের নিকট কৃতজ্ঞ।
ওই মেয়েটি ইহার বাগদত্তা পত্নী !
মাখনবাবুর চক্ষু কপালে উঠিল।
তিনি ও মাষ্টার মহাশয় উভয়েই নত হইয়া এখন
তাঁহাকে সেলাম করিলেন।
১১৮.
কিছুক্ষণ সাহেবের কাৰ্য শেষ করিয়া আবার ষ্টেশনের দিকে ফিরিলেন। আমার আর ষ্টেশনে ফিরিতে ইচ্ছা করিতে- ছিল না। সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছিল। মাখনবাবুকে বলিলাম—“আমি একটু বেড়িয়ে আসি। আসি। আপনারা যান” সকলে চলিয়া গেলে আমি ড্রাইভারের সেই মুসলমান সঙ্গীটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম যে ওই সবুজ ওড়না-পরা মেয়েটি কাহার। মেয়েটি দেখিলাম একটু দূরে আবার প্রজাপতি ধরিবার চেষ্টা করিতেছে। লােকটি বলিল যে মেয়েটি এই ড্রাইভারেরই মা-মরা মেয়ে। বাপ যখন যেখানে যায় প্রায়ই মেয়েটিকে সঙ্গে করিয়া লইয়া যায়। সংবাদটা শুনিয়া কেমন যেন হইয়া গেলাম। অজ্ঞাত- সারে ইহার কি সর্বনাশটাই করিয়াছি। একবার। ভাবিলাম সমস্ত কথা প্রকাশ করিয়া দিই। কিন্তু মাখনবাবুর কথা স্মরণ করিয়া তাহা পারিলাম না। অন্যমনস্ক ভাবে মাঠের দিকে অগ্রসর হইলাম। ১১৯
কতক্ষণ হাঁটিয়াছিলাম খেয়াল ছিল না। সন্ধ্যা
অনেকক্ষণ উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছিল। হঠাৎ এক নিস্তব্ধ
প্রান্তরের মধ্যে আসিয়া পড়িলাম। জটিল শাখা-
প্রশাখাময় বিরাট কি একটা গাছ দূরে দাড়াইয়াছিল।
কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্র তাহার আড়ালে উঠিতেছে দেখিতে
পাইলাম। কোথাও একটু বসিতে পাইলে যেন
বচিতাম।
পা দুইটা ব্যথা করিতেছিল।
ধীরে ধীরে গাছটার দিকেই অগ্রসর হইলাম।
গাছের নিকটবর্তী হইতেই তীক্ষ্ণ তীব্র স্বরে অন্ধকারকে
চিরিয়া একটা শকুনি ডাকিয়া উঠিল। ডানার ঝট্পটু,
শুনিয়া বুঝিলাম এই গাছেই বােধ হয় শকুনিদের
বাসা আছে।
দূরে কোথায় একটা ফেউ ডাকিতে লাগিল। গাছটার
ও-পাশে গিয়া দেখি একটা উচু মত ঢিবি রহিয়াছে।
তাহাতেই উঠিয়া বসিলাম। উঠিয়া বসিয়া পূর্ব দিগন্তে
১২০
কিছুক্ষণ
চাহিয়া রহিলাম। চঁাদ উঠিতেছে। আকাশে মেঘের
চিহ্ন নাই। ফঁকা মাঠে ঝির ঝির করিয়া সুন্দর বাতাস
বহিতেছে।
একটু ভয়-ভয় করিতেছিল। তবু কিন্তু ভালই
লাগিতেছিল। চাঁদ আর একটু উঠিলে দেখিতে পাইলাম
যে একটু দূরে একটা ছােট নদীও রহিয়াছে। ঢিপি
হইতে নামিয়া সেই দিকেই গেলাম। শীর্ণস্রোতা নদীটির
উপর ক্ষীণ জ্যোৎস্না পড়িয়া সেই নির্জন প্রান্তরে এমন
একটা শােভার সৃষ্টি হইয়াছিল যাহা দেখিয়া আমি মুগ্ধ
হইয়া গেলাম।
সেই নদীরধারেই একটি ফঁকা জায়গা বাছিয়া
বসিলাম। হঠাৎ সমস্ত আকাশ উদ্ভাসিত করিয়া প্রকাণ্ড
উল্কাপাত হইয়া গেল। সমস্ত মাঠটা আলােকিত হইয়া
উঠিল।
সমস্ত দিনের অবসাদে শরীর মন ক্লান্ত। মাঠের
মাঝে হাওয়াটুকু বেশ মিষ্ট লাগিতেছিল। লম্বা হইয়া
শুইয়া পড়িলাম।
ভাবিলাম একটু বিশ্রাম করিয়া ষ্টেশনের দিকে যাওয়া
যাইবে।
নিদ্রাভঙ্গ হইলে চাহিয়া দেখি একটু দূরে দাউ দাউ
০
কিছুক্ষণ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। কাছেই কতকগুলি লােক বসিয়া আছে। তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িলাম। লােকগুলির নিকটে গেলাম। ইহারা মড়া পােড়াইতেছে ! যাহা জ্বলিতেছে তাহা চিত। আমি এতক্ষণ শ্মশানে শুইয়া ছিলাম ! রাত্রি কত হইয়াছে ? একজন বলিল -“বারটা হবে” ধারটা ? সমস্ত ষ্টেশনের দিকে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হইলাম। ষ্টেশনে পৌছিয়া দেখি চারিদিক নিস্তব্ধ। মাখনবাবু বসিয়া টেলিগ্রাফ-যন্ত্রে টক্কা : টরে করিতেছেন। যাত্রীদের লইয়া ট্রেন চলিয়া গিয়াছে। একজনও নাই। আমি নির্বাক হইয়া দাড়াইয়া রহিলাম। যাহাদের লইয়া সমস্ত দিন এত উৎসাহে এত আগ্রহে এত সত্য- মিথ্যার জাল বুনিতেছিলাম তাহারা অতর্কিতে এমন করিয়া ফেলিয়া গেল ! আর জীবনে দেখা হইবে না। ধীরে ধীরে মাখনবাবুর কাছে গেলাম। মাখনবাবু বলিলেন, “অনেকক্ষণ আপনি বেড়ালেন ত । কিছুক্ষণ সার। আপনারও ট্রেন এল বলে। সিগন্যাল দিয়েছে। আপনার জন্যে রুটি করিয়ে রেখেছি। খাবেন কি? সময় কিন্তু নেই - ” “থাক দরকার নেই– “আচ্ছা—ওয়েট এ মিনিট—আপনার সঙ্গে খাবার- গুলাে বেঁধে দিই না হয়- শশব্যস্ত হইয়া মাখনবাবু চলিয়া গেলেন। আমি একা নির্জন প্ল্যাটফর্মে সিগন্যালটার দিকে চাহিয়া দাড়াইয়া রহিলাম...ওই ট্রেন আসিতেছে। একটু পরেই আমিও আর এখানে থাকিব না।
গ্রন্থকার প্রণীত অন্যান্য পুস্তক
২)
মুতন ধরণের অপূর্ব উপন্যাস
দ্বৈরথ
বৈতরণী তীরে
slo
বনফুলের গল্প ১e
তৃণখণ্ড
বনফুলের কবিতা
২
১
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.