Maju Public Library, Howrah
Moni-hara
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
TUOLI, LIERA
আট আনা-সংস্করণ গ্রন্থমালার-৩য় গ্রন্থ
w
মণিহাৱা
(
উপন্যাস)
৪। 302.
. . • ৫ ৬ গ ৭১
শ্ৰী শ্ৰপতিমােহন ঘােষ
এণত।
মুখার্জি বােস এণ্ড কোং,
কর্ণওয়ালিস ৰিন্ডিংস, কলিকাতা।
১মঃ
মূল্য • আনা।
LANARES
জ্যোতিশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়,
মুখার্জি বােস এণ্ড কোং
কর্ণওয়াসিম বিসি,
১নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলিকাতা।
CALLA.
শীতলচন্দ্র ভট্টাচার্য
১৪এ রামতনু র লেন, কলিকাতা
উৎসর্গ মাছ-চরণে
No text on this page.
মণিহাৱা ।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
গুণে যাহা ছিল না—নামে সেইটুকু ভরাইয়া তুলিবার
জন্যই বাপ মা এই মেয়েটির নাম দিয়াছিল অনিন্দ্যা! পাড়।
গাঁয়ে এ নাম একান্ত দুলত ছিল। অথচ কোথা হইতে
তাহার বাপ মা এই দুলভ নামটি সংগ্রহ করিয়া আনিয়া-
ছিলেন প্রতিবাসীদের তাহা জানিবার আদৌ আবশ্যক
বিবেচনা হয় নাই। যে হেতু চাক্ষুষ পরিচয়ই, এই নিখুৎ
মেয়েটিকে জানিবার পক্ষে যথেষ্ট অবকাশ দিয়াছিল।
তাহার নাক মুখ চোক, চলন বলন ভঙ্গী, কোন্ থানটা
রাখিয়া কোন থানটার উপমা দিবার উপায় ছিল না।
অনিন্দ্যা ছিল নিন্দার বাহিরে
একদিন সহর হইতে তাহার পিসী আলিয়া ভ্রাতা
গােষ্ঠবিহারীকে ডাকিয়া কহিল। দাদা এ মেয়ের-বে
তুমি কোথায় বিয়ের ঠিক করছো তা ত ভেবে পাইনে
ভদ্রলােকের ঘরে পড়বে কি ?
২ মণি-হারা • গােষ্ঠ হাসিয়া কহিল অদৃষ্ট যেখানে লিখেছে— জনৈক প্রতিবাসী কহিল তবু ঐ মেয়েকে, বুকহতে নামানােই নাই। অনিন্দ্যা কোথায় ছিল ; লাফাইতে লাফাইতে ছুটিয়া আসিয়া কহিল । বাবা তুমি যে বলেছ বনের হরিতকীর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে। বেহায়া মেয়ের রকম দেখিয়া অনিন্দ্যার পিসী একবারে থ হইয়া গেলেন। অনিন্দ্য। কিন্তু একটু গ্রাহ্য ও না করিয়া তাহার পিতার গলা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল চলাে বাবা কলকে ফুলের একটা ডাল পেড়ে দেবে, আমার পুতুলের বিয়ে ডাল ভাত চচ্চরি বঁধতে হবে। অনিন্দ্যার মা তাহার ঠাকুরঝীকে দেখাইয়া কহিলেন দেখ ঠাকুরঝী মেয়েটীকে যে বকে ঝকে একটু সভ্য ভব্য করবে। তারও মাথাটি উনি পাচ্ছেন। অনিন্দ্যার পিতা বলিত মেয়ে আমার একটু দুষ্ট হইয়া জন্মিয়াছে তাই বলিয়া ত তাহাকে এখন হইতে কড়া শাসনে কোনের বউটি করিয়া গড়িয়া তুলিতে পারি না। এগারাে বৎসর বয়স পর্যন্ত যখন এইরূপ পিতার অষণা প্রশ্রয়ে একশত খানা প্রথম ভাগ ছিড়িয়া ও “পার- লৌকিকের পাত পর্যন্ত পৌঁছিল না উপরন্তু আত্মীয়
প্রথম পরিচ্ছেদ
স্বজনদের যথেষ্ট পরিবেদনার কারণ হইয়া দাঁড়াইল।
তখন তাহার মা মেয়ের মাথা বাঁধা হইতে পা কামাইয়া
দেওয়া পর্যন্ত সকল ভার তাহার অযােগ্য পিতার প্রবে
তুলিয়া দিয়া শষ্য গ্রহণ করিলেন।
মেয়ের ভাবনাতেই যে তিনি শয্যা গ্রহণ কবিলেন
তাহা নহে সংসারে আসিয়া যতটুকু খাটুনি খাট। তাহ'র
উচিত ছিল, তাহার অতিরিক্তই খাটিতে হইয়াছিল
তাহার উপর আরও কয়েকটি ছেলে মেয়ের ভারে দেহ
এক বারেই ভাঙিয়া পড়িল। এবং আস্তে আস্তে সংসাবেব
হাজার জালা যন্ত্রণা এড়াইয়া এই বাংলা দেশেরই মেয়েদের
মত নিঃশব্দে ঘুমাইয়া পড়িলেন। মৃত্যুর পরও দৃষ্টি
তার যেন, কি একটা প্রসন্ন মঙ্গল আশীৰ্বাদ জড়াইয়া
ছিল ।
সংসারের মধ্যে হঠাৎ এই মৃত্যুর আনাগােনায় আর
যেই যতটা আঘাত পাউক অনিন্দ্যার দিকে আঘাতটা
মােটেই পৌছিল না। দিন কতক খুব কাদিল অন=
দেখিল তাহার চুল বাঁধা হইল না বলিয়া কাহারও ধরা
পাকড় নাই,-কাটা ফিতা রাস্তায় ফেলিয়া দিয়া আসিলেও
কেহ তিরস্কার করিতে নাই,-উপরন্তু কেই একটা কথা
বলিলে পিতা তাহারই পক্ষ হইয়া পড়িতেছে তখন সে
৪ মণি-হারা বাঁচিল। একবারে হাঁপ ছাড়িয়াই বাঁচিল। এবং তাহার পিঠের উপরে এলাে চুলের গােছা উলু বনের মত বাসু হিল্লোলে দুলিয়া বেড়াইতে লাগিল। বৎসরাবধি বিবাহের কথাও কেহ তুলিল না। অনিন্যার আনন্দের সীমা নাই। তাহার দলের যতগুলি সই সাঙাতি ছিল জনে জনে বলিয়া আসিল বনের হরিতকীর সহিতই তাহার বিবাহ পাকা হইয়া গিয়াছে, এবং সে চিরকাল বাপের বাড়িতেই থাকিতে পাইবে। পড়শীরা ভৎসনা করিয়া কহিল ওরে রাক্ষুসী ভর নাই তােকে বিবাহ করিতে কোনাে রাজার ছেলেই ডিঙা বাহিয়া সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হইয়া এখন পর্যন্ত পোঁছিবে না। তুই এই গ্রামের রাখাল বালক লইয়াই থাকিবি। অথচ এই অনিই ছেলের দলে দাড়াইয়া যখন কোন দুরান্তগামী পথিক তাহাদের গ্রামের রাস্তাদিয়া চলিয়া যাইত তখন পথিক দৃষ্টি পথের বহির্ভূত হইলে ভাঙা অশ্বথ গাছের গুড়িটায় পঁড়াইয়া চীৎকার করিয়া ছড়া ; “কোন বা দেশের রাজার ছেলে- কোন বা দেশে ঘর-
প্রথম পরিচ্ছেদ
যাইত।
আমার সঙ্গে চলে তুমি
হবে আমার বর !
অনর্গলই বকিয়া যাইত।
কেহই এই প্রহেলিকাময়ী মেয়েটির দুষ্টামী কোন পথে
যাইবে তাহার ঠিক করিতে পারিত না। তবে তাহার
ছােট খুড়তুত ভাইটি আসিয়া যখন খুব খানিক কিল চড়
কসিয়া দিত—তখন তাহাকে অনেকটা সিধা রাস্তায় পাওয়া
নচেৎ নহে। অনিন্যার দাদা রাসবিহারী বলিত।
ও রাক্ষুসী চিরআইবুড় হয়েই গ্রামে থাকবে।
গােষ্ঠ বলিত তাই থাকুক। তাই বলিয়া উহাকে কেহ
মারিতে ধরিতে বা বকিতে পাইবে না। গােষ্ঠর একটা
সাহস ছিল সে যখন চাকরী করিয়াছে তখন যে গােপনে
হাজার খানেক টাকা পুজি করিয়া রাখিয়াছে সেই টাকাতে
নিশ্চয় ভাল পাত্র একটা জুটাইতে পারিবে। সে অল্প
বয়স হইতে পটোয়ারীর কৰ্ম্ম করিয়া বুঝিয়াছে টাকায়
যখন সাদা কালো হয় তখন কালো মেয়ের পাত্র জুটিবে না
কেমন কথা। মেয়ের সকল আবদার সকল উপদ্রব
আপনার সুগভীর স্নেহ দিয়া ঢাকিয়া লইত।
একে একে তাহার সকল সঙ্গিনীদেরই বিবাহ হইয়া
বাইতে লাগিল। অনিন্দ্যাও বিবাহ বাড়ীর তৈল হরিদ্রা
মণি-হারা লাগিল। খুব আভাঙ করিয়া মাখিয়া নদীর জলে ডুব দিয়া আসিতে যে কেহ সে সময় তাহার বিবাহ কথা পাড়িতে লাগিল তাহার গায়ে জল ছোঁচিয়া গাল মন্দ করিয়া কহিতে লাগিল-আমি জন্মেই বিয়ে করবে না তােদের কি- আসল কথা তাহার বাপকে ছাড়িয়া কোথাও এক- ‘দন থাকিতে হইবে ভাবিলে শিহরিয়া উঠিত ; বাপও এই মেয়েটিকে ফেলিয়া অন্যত্র একদিন কাটাইতে পারিতেন না —যদিই কোন দিন কাজের গতিকে জেলার সদরে বা আর কোথাও রাত্রিটা কাটাইতে হইত তবে কেবলি ভাবিতেন আহা মেয়ে আমার হয়ত এতক্ষণ বাবা বাবা করিয়া সারা হইয়া যাইতেছে, সৰ্ব্বোপেক্ষা বাড়ীর ছেলেরা যে অসহায়ে তাহার উপর অনেক কিল চড় বৰ্ষণ করিয়া যাইতেছে এইটেই বড় করিয়া তাহার ভাবনার বিষয় হইয়া দাঁড়াইত। এমন করিয়াও পিতার স্নেহ পক্ষপুট ছায়ার-অসীম নির্ভরতার মাঝখানে, অনিন্দ্যার বেশী দিন কাটিল না— তাহাকে একদিন কাপড় চোপড় পড়াইয়া খুব খানিকটা নারিকেল তৈলে মাথার রুক্ষ কেশগুলি জব, জবে করিয়া বাধিয়া দিয়া এক কন্যা দর্শনার্থী বৃদ্ধের সম্মুখে আনিয়া হাজির করা হইল। আসিতে কি চাহে। পিতার মিনতিতে ও প্রলোভনে প্রথম পরিচ্ছেদ ৭ আসিতে রাজী হইল যদি, কিন্তু কন্যাদর্শনার্থীর একটা কথার উত্তর দিল না কেবল ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। এই আগন্তুক বৃদ্ধকে কোনরূপ গাল মন্দ দিবার উপায় ছিল না যেহেতু পিছনে যমের মত তাহার খুবতুত ভাই গা বসিয়া ছিল—এবং গােলমাল করিলে সে মারিবে বলিয়া শাসাই- যাছেও তাই, নহিলে আজ সে যাই হউক একটা খণ্ড প্রলয় বাধাইয়া দিত। কিন্তু তাহার পিতার উপর আজ বড় রাগ হইল। সন্ধ্যার সময় গায়ের সমস্ত কাপড় জামা খুলিয়া ফেলিয়া বাপের কাছে আসিয়া অভিমান রুদ্ধস্বরে কহিল। বাবা তােমার ঘরে কি ভাত একবারে ফুরিয়েছে তাই আমাকে বিদেয়-করবার এত চেষ্টা-তা আমি যাবো একবারেই যাবাে-বলিয়া ফোঁপাইয়া ফোপাইয়া কঁদিতে লাগিল। তাহার পিতার চক্ষেও জল দেখা দিল। সযত্নে স্নেহভরে কন্যার অশ্রুটুকু মুছাইয়া দিয়া কোলে বসাইয়া কহিল । না মা তাের বিয়ে-আমি এমন জায়গায় দেব তােকে যে দিন মন নিয়ে আসতে পারবে, আর তুইও পাব্বি। অদৃষ্ট বিধাতা মনে মনে হাসিলেন। পরদিন যখন কন্যাদর্শনার্থী কন্যা অপছন্দ করিয়া চলিয়া গেল তখন গােষ্ঠর ভগ্নী, রাণী আসিয়া কহিল কেমন দাদা।
মণি-হারা হলো কিনা এখন তােমার ব্রহ্মময়ীকে নিয়ে কোথায়,ভাসবে আসাে। তখন যে বলতে আমার কালো রূপে জগত আলাে করা মেয়ে,—দশের বাকি ফলছে কিনা গােষ্ঠবিহারী একথার কি জবাব দিবে ভাবিয়া পাইল না -সকলে ত তাহারই উপরে দোষ চাপাইতেছে সত্যই কি তাহার এই দুষ্ট মেয়েটির জন্য সেই দায়ী ? তাহার-জন্ম নক্ষত্ৰই যে তাহাকে উশৃঙ্খল করিয়া দিয়াছে, তুমি আমি মানুষে তাহার কি করিব-গােষ্ঠ আশ্বাস দিয়া কহিল- দেখাে আমি বলছি এখন ও যত মন্দ আছে কালে তত ভালই হবে। এদিকে বিবাহের বয়স ক্রমেই স্বত বাড়িয়া যাইতে লাগিল সরল গােষ্ঠবিহারীর ললাট পট্টে চিন্তার রেখাগুলি তত কুঞ্চিত হইয়া উঠিতে লাগিল।—গােষ্ঠ তাহার বন্ধু সূর্যকান্তকে ডাকিয়া পাঠাইল। অপেক্ষাকৃত কিছু প্রফুল্ল ভাবে সেদিন সূৰ্য্যকান্ত গােষ্ঠ- বিহারীর সহিত দেখা করিতে আসিল। আসিয়াই কহিল ওহে ভায়া কতকটা-কতকটা যেন নিমরাজী- গােষ্ঠ চমকাইয়া কহিল বল কি সূর্য্য কহিল - গােষ্ঠ কহিল আমার যে কালাে মেয়ে হে, তথাপি !
প্রথম পরিচ্ছেদ ৯ সূর্য কহিল। তথাপিও- গােষ্ঠ সূৰ্য্যর হাতটা চাপিয়া কহিল বল দেখি ব্যাপারটা কি— সূয্য কহিল আমি কিছু বেশী টাকাই কবলে ফেলে- ছিলাম, টাকায় কি না হয়— গােষ্ঠ কহিল সে আমি ও জানি তবু বলি কি, কি করে কথা তুলতে সাহস করলে-বুঝি তাদের গােমস্তা••• সূৰ্য্য কহিল । আমি প্রথমেই হাজার টাকা দিয়ে কথা আরম্ভ করে ছিলাম। তারা উঠেছে দু’হাজার, আমি এগেয়েছি দেড় হাজার পর্যন্ত-বলে এসেছি কাল পাকা উত্তর দিয়ে যাবাে। গােষ্ঠ কহিল কিছু ভাবনা নাই ভাই আমাদের গতর খাটানাে পয়সা তবু লােকে দেখাতে পারবো যে কি রকম জায়গায় কুট করেছি। সূৰ্য্য কহিল নিশ্চয়ই হাজার হােক মরা হাতি লাক টাকা। গােষ্ঠ বার বার আশ্চর্য হইয়া কহিতে লাগিল—যাই হোক ভাই তুমি বাহাদুর আছে। সূৰ্য্য কহিল তবে শােনা—তাদের গােমস্তাটাকে নিয়ে প্রথম ত গেলাম কর্তার কাছে, কর্তা ত আমলই দিলেন না মণি-হারা তারপর অন্দরে•••জানােই ত তাদের সেই দালানে বাড়ি কোথায় লাগে তার কাছে আমাদের এই মেটে ঘর- ওপরের দিকে চেয়ে দেখি আট দশটা জানলার খড়, খড়ি ফর ফর করে খুলে গেল, বলবাে কি ভায়া আমার যেন তখন সীতার অগ্নি পরীক্ষার মত পরীক্ষাই আরক্ত হয়ে গেল। একখানা কার্পেটের আসন ত পেলাম বসতে, কিন্তু আমি ত আর তখন বসতে যাইনি—গিয়েছি কাজ উদ্ধার করতে একবারেই গিন্নীরাণীর পাদুটো না জড়িয়ে ধরে বল্লাম উদ্ধার করতে হবে! গােষ্ঠ শ্রদ্ধায় দুই চক্ষু অশ্রু পূর্ণ করিয়া কহিল । আপনার সহােদর ভেয়ে যা না পারে তুমি যে তাই করেছ বন্ধু। সূৰ্য্য কহিল। ও কিছু না দাদা তােমারও ঘাঝে কন্যাদায় আমারও ঘাঝে নয় কি-তারপর হাজার হােক বনেদি . ঘরের মেয়ে ত, বল্লেন আমার ত বাপু মৌলিকে কখনও কাজ নাই—তবে যখন ধরছে। তখন ১৫০০ হাজার টাকা পণ আর পাচশাে বরাভরণ হলে পারি, যদিও এখন তারা দুহাজারের ঘর নয়-তবু মেয়েটা সংশে পড়বে ভেকে আমি আর কথা কাটাকাটি করলাম না-বল্লাম কাল এসে উত্তর দিয়ে যাবো।
প্রথম পরিচ্ছেদ ১১ গােষ্ঠ কহিল সেই মেজ ছেলেটি ত ? সূৰ্য্যকান্ত কহিল । ছেলেত নয় যেন রাজপুত্তর। গােষ্ঠর ইচ্ছ। রাজপুত্রের হস্তেই কথা। সম্প্রদান করিবে। এখন ব্যাপারটা এই পুষ্প গ্রাম হইতে কিছুদূরে বারুই- পুরে একঘর নামজাদা বড়লােক ছিল। ভাগ্যলক্ষ্মী যদিও এই বড় মানুষদের অতি বড় বড়মানুষিতে কয়েকটা সরিকি মকর্দমার স্কন্ধে চড়িয়া ইতিমধ্যেই অন্তর্ধান করিয়াছেন— তথাপি ঠাট বাট ও আদব কায়দ। সেই সাবেকী ধরনেরই রহিয়া গিয়াছে, অতিথি অভাগত আসিলে এখনও সেইরূপই আশ্রয় পায় এবং ঠাকুর বাড়িতে এখনও নহবতের আলাপ সেই অতীত দিনের মতই কড়ি কোমলে ঝঙ্কত হইয়া উঠে, কিন্তু এই অতীত গৌরবেব গরিমাটুকু বহন করিতে এই কটি মুমুর্ষ প্রায় জমিদার পুত্রের বক্ষের অনেকগুলি পঞ্জর যে ভাঙ্গিরা গিয়াছে তাহা তাহাদের কোটরপ্রবিষ্ট চক্ষুর উজ্জ্বল দীপ্তিতেই প্রকাশ পায়। দেশের লােক এই জমিদার বাড়ি সম্বন্ধে বাহিরে যাহাই বলুক কিন্তু মুখে এখনও জয়গান গাহিতে বাধ্য। ঘটনা সুত্রে এই জমিদার বাড়ির একটি পুত্রের সহিত অনিন্দ্যার বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপিত হইয়া পড়িয়াছে এখন ১২ মণি-হারা “প্রজাপতির ভাবিতে” যাহা হয়। বারীনের বাপ হরকুমার দেখিলেন--যদি এক সঙ্গে দুই হাজার টাকা পাওয়া যায় মন্দ কি? ছেলের বিদ্যাবুদ্ধি যাহ, তাহাতে তাহার পক্ষে দুই হাজার প্রাপ্তির আশা স্বপ্ন বলিলেই হয়। আপন প্রথম পুত্রের বিবাহে কিছু পাইয়াছিলেন বটে কিন্তু তখন নাম ভাকটা এমন ধারা বিলুপ্ত হইয়া যায় নাই। অথচ এক- কালে দুই হাজার টাকায় একটা মহাজনকে ও সন্তুষ্ট করিতে পারা যাইবে। পরদিন যখন সূৰ্য্যকান্ত দুই হাজার টাকাতেই মত দিয়া গেল তখন হরকুমার মােটেই আপত্তি করিলেন না। বরং সূর্যকান্তকে খুব ঘটা করিয়া খাওয়াইয়া ছাড়িয়া দিলেন। এবং তসরের চায়না কোটটীর উপরে যে একটা বিলাতী খেলো চাদর জড়াইয়া গিয়াছিল সেটা শুভ বিবাহের চিহ্ন স্বরূপ-রংএ একবারে ডুবাইয়া দিলেন। প্রতিবাসীরা কহিল এতদিনে বারীনের বিবাহের ফুল ফুটিল ! সুকান্ত কহিল আমরাও প্রতিমা সাজাইতেছি।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
মেয়ে দেখানর হাঙ্গামটা যাহাতে না পােহাইতে হয়,
বিহারী এইরূপ কোন মতলব সূৰ্যকান্তের মাথায় আছে
কি না—জানিতে চাহিল।
সূর্যকান্ত কহিল এ তাে আর বেশী কথা নয় ।
চেষ্টা করে যে টাকার অনাটন যাতে না ঘটে।
বিহারী কহিল আমার পুজির শেষ কপর্দকটি পর্যন্ত
আমার মেয়ের বিবাহ যজ্ঞে উজার করে ঢেলে দিব।
সূর্যকান্ত কহিল তবে নিশ্চিন্ত থাকো। আমি কাকে
বলে এসেছি মেয়ের রং যদিও একটু ময়লা বটে কিন্তু
সাক্ষাৎ একবারে পটের প্রতিমা-কৰ্ত্তার দেখায় অদেখায়
কোন মতামত আছে বলে মনে হয় না।
কথাবার্তা হইতেছে এমন সময় পাতাসী বাগিনী আসিয়া
কহিল ওগাে তােমরা তােমাদের মেয়ে বেশ সাজাওগে-জামাই
নিজে মেয়ে দেখতে আসবেন। আজ সন্ধ্যার সময় বা
আসেন। আমি ওধার দিয়ে আমাদের কুটুম বাড়ি
গিয়েছিলাম খোজ পেয়েছি।
গােয় হতাশ হইয়া কহিল। তবে ৰােধ হয় আমার
মেয়ের বরাতে রাজপুত্র নাই।
১৪
মণি-হারা
সূৰ্য্যকান্ত উৎসাহ দিয়া কহিল ঘাবরাও কেন বন্ধু ।
এ সূজ্জ্যি যখন রয়েছে তখন কোন ভাবনারই কারণ নাই।
গােষ্ঠ কহিল কি করে কি কৰ্বে ঠিক করেছ ?
সূৰ্য্য কহিল আমি রাণী দিদিকে ডেকে সব বন্দোবস্ত
ঠিক করে নেব।
গােষ্ঠ কহিল আমার যে ভাই বড় ভাবনা হচ্চে, মেয়ে
আমার ত সাজতে গুজতে মােটেই চাইবে না—তার উপর
রংটাও ময়লা।
সূৰ্য্য একটা ধমক দিয়া কহিল—যা ও আপনার
কাজ দেখ গে, কোথায় মাছ দুধ ক্ষীর মেলে তার চেষ্টা
গােছ আর বেশী কথা না বলিয়া আস্তে আস্তে
বাড়ির বাহির হইয়া গেল। কিন্তু তাহার মনের ভিতরে
উদ্বেগটা একটা শূলের মতই ফুটিতে লাগিল। একবার
মনে করিল ছুটিয়া বাড়ী গিয়া মেয়েকে বলিয়া আসি
মা এই কটা দিন যা বলি শােনাে আমার কথা সে
ঠেলিতে পারিবে না। আবার ভাবিল গনেশ হয় ত
এতক্ষণ তাহাকে তাহার অবাধ্যতার জন্য প্রহার করিতেছে।
মেয়ের কান্নটাও যেন তাহার কানের কাছে স্পষ্ট বাজিয়া
উঠিল গােষ্ঠ আর পথ খুঁজিয়া পাইল না। কোথায় দুধ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১৫
মাছের বন্দোবস্ত করিবে, ফিরিয়া আসিয়া বাহিরের পরচালি
নামানাে রােয়াকটায় কেমন বিষন্ন ভাবে বসিয়া পড়িল।
সূজ্জি ছুটিয়া আসিয়া কহিল এলে দুধ ক্ষীরের খবর
দিয়ে-~-
গােষ্ঠ অম্লান বদনে কহিল না !
সৃজ্জি রাগিয়া কহিল তবে থাকলে তােমার মেয়ের
বিয়ে আমি চল্লাম।
বিহারী কহিল রাগিসনে ভাই—আমি যেন শােনলাম
অণি আমার পথের ধারে দাঁড়িয়ে কাদচে-তাই আর
যেতে পারলাম না। এখন আর তার কান্না শুনতে
পাচিনে-
সূচ্ছি কহিল এমন নীরেট মূৰ্থও তােমার মত দুটি
যদি এ ভূভারতে থাকে মেয়েকে তােমার কোথায় সাজানো
গােজান হচ্ছিল । এইবার তুমি সামনে দাঁড়াও তা হলে
রক্ষে রাখবে।
গােষ্ঠ তাড়াতাড়ি উঠিয়া কহিল—আমি যাবাে না ভাই
তবে দেখিস সে মা হারা মেয়ে, তাকে কেউ যেন অনর্থক
বকে ঝকে, সে আবার বকা ঝকাটা মােটেই সইতে
বিহারী চলিয়া গেল !
১৬
মণি-হারা
সুজ্জি খুব গােপনে একটা ঘরের মধ্যে রাণীর মেয়ে
মনমােহিনীকে তালিম দিতে লাগিল। মনমােহিনী দুবার
অনিন্দ্যার নাম উচ্চারণ করিয়া কহিল তুমি যাও সৃজ্জি
মামা। আমি অনিন্দ্যা এই নাম খুব বলতে পারবো !
সূজ্জি কহিল দেখিস ভুলবি যদি বেত খাবি-আর
ঐ অন্ধকারটাকে দাঁড় করালে জামাই ত সদ্য সদ্যই
চলে যাবে তাতে ভুলটি নাই—মনমােহিনী নিজের রূপ
খাতিতে একটু গর্বিত হইয়া প্রস্তুত হইয়াই রহিল।
সূচ্ছি চুপি চুপি তাহার রাণী দিদিকে কহিল খবরদার
রাণী দিদি রাত্রের বেলায় যদি তারা আসে একবারে
এমন ধারা বেমালুম কাজ সেরে নেবাে যে কাকে বকেও
কেউ জানতে পারবে ।
রাণীদিদি সূজ্জির এই বুদ্ধি চাতুর্য্যে বিস্মিত হইয়া গেল।
সন্ধ্যার সময় সত্যই গাড়ী হাঁকাইয়া বর আসিয়া উপস্থিত
বরের সঙ্গে আবার বরের একটা বন্ধুও আসিয়াছেন।
সূৰ্য্যকান্ত সকলকেই যথাযােগ্য আপ্যায়ণে আপ্যায়িত করিয়া
চারিদিকে আহার উদ্যোগের ধূম লাগাইয়া দিল!
বারীন বিনীত ভাবে সূৰ্য্যকান্তকে কহিল দেখুন আমাদের
আজ রাত্রির মধ্যেই বাড়ি ফিরতে হবে। শুধু একবার
মেয়েটিকে দেখা ছাড়া•••
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১৭
সূৰ্য্যকান্ত কহিল সে ত দেখবেই বাবা তার আগে
দু পাচদিন না এখানে থেকে না মিষ্টি মুখ করিয়ে কি
ছেড়ে দিতে পারি-
বারীদের বন্ধু শেখর কলিকাতায় চাকরী
করে,
সপ্তাহান্তে বাড়ী আসিয়া থাকে, সে ত একথায় একবারে
মৎকাইয়া উঠিল। তাহার উপর তার প্রেয়সী সবে
এই কয়েকদিন মাত্র পিতৃগৃহ হইতে স্বামীগৃহে পদার্পণ
করিয়াছেন। ব্যস্ত হইয়া কহিল, আপনাদের খাওয়া
দাওয়ার কোন যোগাড় করতে হবে না। আমরা এক্ষুনিই
চলে যাবো।মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য মেয়েটিকে দেখা ;
বলিয়া আজকাল এই যে ফ্যানটা উঠিয়াছে, তাহার .
বিরুদ্ধে অনেকখানিই প্রতিকুল সমালােচনা তুলিয়া গেল।
কহিল, “এ একবারেই বিশ্রী ইহার তুলনায় সেকাল কত
ভাল ছিল।
আসল কথা ঘড়ির কাটা তাহাকে বিব্রত করিয়া
তুলিতেছিল-হিলে নিজের বিবাহেও কনে দেথিতে
তিনিও কসুর করেন নাই।
সূর্যকান্ত কহিল “বিলক্ষণ—এই এত উদ্যোগ আয়ােজন
একি মাটি হবে বলতে চাও বাপু সকল-যদি একান্তই না
থাকা হয়, কাল ভােরে বরং রওনা হবার কথা বলতে পারি।”
১৮
মণি-হারা
শেখর বিষন্ন দৃষ্টিতে বারীনের মুখের দিকে তাকাইয়া
কহিল, “ভাই ব্রাদার তুমি এখানে তিষ্ঠহ। আমার যাহা
বাহান্ন তাহা তিপ্পান্ন, রাত্রি দশটার মধ্যে বাড়ী পৌছিতেই
হবে।
বারীন জনান্তিকে জানাইল তবে মেয়ে নিয়ে এসে
দেখানর ক্ষতিটা কি ?
সূৰ্য্যকান্ত কহিল, “এই সন্ধ্যার আঁধারেই—?”
শেখর কহিল, “তাতে বেশী কিছু বাধবে না—মুখের
চেহারাখানা ত দেখে নিতে পারা যাবে—রং কালো হলেও
শুধরে নিতে পারা যায়, কিন্তু মুখখানা--ওর নাম কি
সূৰ্য্যকান্ত মেয়ে আনিতে আদেশ করিল। মেয়ে আগে
হইতেই সাজানো গােজানো ছিল। সন্ধ্যার অন্ধকারে
একটি ছােট মঙ্গলঘট হাতে লইয়া কন্যা আসিয়া তাহাদের
চরণে প্রণত হইল।
বারীন কন্যার নাম জিজ্ঞাসা করিল—
অকম্পিত কণ্ঠে উত্তর আসিল অনিন্দ্য সুন্দরী।
শেখর সােৎসাহে বলিয়া উঠিল, “পরিষ্কার নাম।
বিহারী ঘােষেদের বাড়ী হইতে ফিরিয়া আসিবার
পূৰ্বেই সূৰ্য্যকান্ত ভাবী জামাতাকে কিছু সামান্য জলযােগ
করাইয়া গাড়ীতে উঠাইয়া দিল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১৯
গ্রাম ছাড়িয়া গাড়ী যেখানে নদীর বাঁকের কাছে ঘুরিয়া
অদৃশ্য হইবে সেইখানে একটা বালীর ঢিবির উপর দাড়াইয়া
উচ্চৈঃস্বরে কয়েকটি বালক ও বালিকা গাহিয়া উঠিল।--
“বঁধুকখন এলি, কখন গেলি, কখন ধরলি বান
কোন্ ফাঁকেতে বিধে নিলি বুনােপাখীর প্রাণ?
বলা উচিত এ গান তাহারা গ্রামােফোনের রেকছেই
শুনিয়াছিল।
গােষ্ঠবিহারী গ্রামান্তর হইতে দই দুগ্ধের বায়না দিয়া
ফিরিয়া আসিতেছিল পথেই কন্যার সহিত সাক্ষাৎ হওয়াতে
কহিলেন, “আয় মা-রাস্তায় দাড়িয়ে আজও কি তাের
গােলমাল করবার দিন আছে—চল ঘরে যাই।”
অনিন্দ্যা পিতার হাতটা শক্ত করিয়া চাপিয়া ধরিয়া
কহিল, “না বাবা আমিত গান গাইনি, দত্তবুড়ি ফটকে
দাকে শিখিয়ে দিলে, তাই ফটুকে ওদের পেছন পেছন
গেয়ে এলাে-
গােছ কহিল, “বেশ চ!”
কন্যা দেখার পর্বটা যখন গােষ্ঠবিহারী শুনিল খুব
সহজেই মিটিয়া গিয়াছে তখন গােষ্ঠ বুঝিল তাহার কন্যার
অদৃষ্টে একবারে নিরধার দুঃখই নাই, সুখের মুখ সে
দেখিতে পাইবে।
মণি-হারা
পাড়ার লােক শত মুখে প্রশংসা করিয়া কহিল যদি
অনির ওখানে বিবাহ হয়, তবে বলতে হবে তার বহু
ভাগ্যি, অনেক দিন শিব পূজা করে তবে এমন বর পাবে।
এমন গড়ন সৌষ্ঠব পুরুষ সচরাচর চক্ষে ঠেকে না
বলিলেই হয়।
গােষ্ঠ মনে মনে সকলের কাছে কৃপা ভিক্ষা করিয়া
কহিল-“তােমরা আশীর্বাদ করে। আমার কালো মেয়ের
জীবন সুখময় হউক।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
বিবাহের দিন স্থির হইয়া গেল। কিন্তু গ্রাত্র হরিদ্রার
পূর্বরাত্রে অনিন্দ্যা এমন বাকিয়া, কঁদিয়া, কাটিয়া অনর্থ
করিতে লাগিল, কার সাধ্য তাহাকে সান্তনা দেয়-তাহার
পিতা আসিতেই পিতার গলাটা জড়াইয়া কহিতে লাগিল
বাবা এনি করেই কি এই অভাগী মেয়েটাকে বিদেয়
করতে হয়—মা থাকলে তুমি এনি পারতে?
অনিন্দ্যার পিসী মুখটা
মুখটা বাঁকাইয়া কহিল মেয়ের সব
ন্যাকামী, তের চোদ্দ বয়স হতে গেল—বিয়ে করতে হবে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তা জানেন না ?-পড়শীর আর আর অনেক কাবতী
জননী, কতকটা গােষ্ঠবিহারীকে শােনাইয়াই কহিতে লাগিল
হাদের গর্ভে এইরূপ কন্যা জন্মিলে তাহাকে সূতিকাগৃহেই
মুন দিয়া মারা হইত।
গােষ্ঠ কন্যাকে বুকে করিয়া বাহির হইয়া গেল। বুঝল
চারিদিক হইতে একটা ভাবী বিভীষিকা, কন্যাকে ব্যাকুল
করিয়া তুলিয়াছে।
এমন সময় জামাই বাড়ী হইতে আইবুড় ভাতের তর
লইয়া আট দশটা লােক গােছ বিহারীর বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ
করিল। সতরঞ্চী গালিচা খেলনা পুতুল হইতে আরম্ভ করিয়া
কাপড় সাবান বাস তৈল গল্পের বহি কিছুই বাদ যায় নাই।
বিহারী সাগ্রহে কন্যাকে ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া দেখাইতে
লাগিল।
এই দেখ মা তােমার শ্বশুর শাশুরীরা কত
ভালবাসেন তােমায় -তুমি যা চাও বাসতেল সাবান তরল
আলতা রেশমী চুড়ি-কাপড়
অনিন্দা কাপড় চোপড় দুবার নাড়িয়া চাড়িয়া কহিল
এসব আমার কিছুতে দরকার নাই বাবা। তুমি বলে দাও
বর যেন পাল্কী চড়ে আমাদের বাড়ী না আসে, বিহারী
হাসিয়া কহিল আমি বলে দেব বর আসবে না, কিন্তু তার
আগে তােকে ত কাল গায়ে হলুদটা নিতে হচ্ছে।
২২ মণি-হারা অনিন্দ্যা কহিল শুধু গায়ে হলুদটা ত ? বিহারী কহিল হা। অনিন্যা কহিল তা আমি নেব বাবা, কিন্তু বিয়ে কিছুতে করবো না, তা’বলে রাখছি, বিয়ে দিলে দেখিস্ বাবা আমি মরে যাবাে ! ফুটিয়া বশিবার ভাষা অনিন্দ্যার নাই -নহিলে তাহার অনুভব হইতেছিল, যেন তাহার বুকের ভিতরটা আঁধার হইয়া আসিতেছে। যেন এই বিবাহ বাড়ীর আনন্দ কোলাহলের পশ্চাতে একটা আকাশ ভরা হাহাকার তাহারই জন্য প্রতীক্ষা করিয়া আছে-এ রােশনাই আলো —বাদ্যি ঘণ্টা, যেন তাহাকেই সমারােহের সহিত বিসর্জন দিবার জন্য–প্রস্তুত হইয়া দাড়াইতেছে, তাহার একটা কথা আপনার মনেই উঠিত, পড়িত, যে কালাে মেয়ের সুখ এ জীবনে নাই। তাহাকে বাবা ছাড়া কেহ ভাল বাসে না আর বাসিবেও না! তাহার সমবয়সী পিস্তুতাে ভগ্নী মােহিনী যদিও একবার চুপে চুপে বলিয়া গেল শ্বশুর। তাহার, তাহাকে খুব ভাল বাসিবে কিন্তু কথাটা তাহার যেন কেমন বিশ্বাস হইল না, তাহার মনে হইল যেন, সবাই আজ মিষ্টি কথার ছদ্মবেশে তাহাকে ভুলাইতে আসিয়াছে। তবু হাজার চক্ষের জলের নিষেধ সত্ত্বেও তাহার গাত্র-
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
২৩
হরিদ্রা হইয়া গেল, এবং পড়শীরা আইবুড়ো ভাতের নিমন্ত্রণ ও
খাইয়া গেল ! অনিন্দ্যা বুঝিল আর তাহার নিষ্কৃতি নাই।
তাহাকে সাত সমুদ্র পারের দেশে যাইতেই হইবে; কোথায়
বুহিবে গ্রামের অশথ বৃক্ষের শীতল ছায়া, কোথায় রহিবে
রাধা গােবিনজীর ভাঙা নাটমন্দির, ঘরের পাশের নদিটাও
আর, সে দেখিতে পাইবে না। ফটিক্ গণেশ তাহারাও কেহ
তাহার খোঁজ লইতে যাইবে না! রাত্রির অন্ধকারে চুপি
চুপি তাহাদের চণ্ডীমণ্ডপের সম্মুখে সিংহ বাহিনীর পাটা-
তনের উপর মাথা লুটাইয়া কহিতে লাগিল, হে মা দুর্গা
তােমার পায়ে পড়ি মা, আমার বিয়ে ভেঙ্গে দাও।
তােমার খাড়া দিয়ে আমায় কেটে ফেল। আমি এদের
ছাড়িয়া ত যাইতে পারিব না,—কিছুতে না।
মােহিনী-ই ছিল এখন অনিন্দ্যার প্রহরী, খুঁজিতে
আসিয়া দেখিল-অনিন্দ্য ঠাকুরের পাটাতনে ঢক ঢক
করিয়া মাথা খুঁড়িতেছে।
মােহিনী খুব খানিক তিরস্কার করিয়া বাড়ীর মধ্যে
লইয়া গেল।
অনিন্দ্যা দেখিল কোথাও নিস্তার নাই মা, সিংহবাহিনীও
তাহার বিপক্ষে-বালিকার যাহা শেষ অবলম্বন, চক্ষের
জলেই বুক ভাসাইতে লাগিল।
২৪ মণি-হারা সহসা দ্বিপ্রহর রাত্রে পাত্রটি হইতে সংবাদ আসিল পাত্রের মাতা কন্যার রং কালো শুনিয়া বিবাহ স্থগিত রাখিতে ইচ্ছা করিয়াছেন, যদি আর দুইশত টাকা কন্যার রংএর দরুণ ধরিয়া দেওয়া হয় তবেই বিবাহ হইবে, নচেৎ নয়। বিহারীর ত একবারে চক্ষু স্থির।-সূৰ্য্যকান্ত ও ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিল না—ভদ্রলােকের ব্যবহারে এমন দুর্ব্যবহার আসিতে পারে—যে লোক এ সংবাদ লইয়া আসিয়াছিল তাহার কাছেও তন্ন তন্ন করিয়া খোঁজ লইয়া যখন জানা গেল কথা একবারে খাঁটি, স্বয়ং পাত্রের মাতা এ হুকুম জারী করিয়াছেন। তখন সূৰ্য্যকান্তকেও একটু ভাবিতে হইল। গােষ্ঠকে কহিল গােষ্ঠদা, কাজ যখন আরম্ভ করা গেছে তখন ছেড়ে দেব না। তবে তাদের ভদ্র-আনীর বহরটা খুব দেখা গেল, পাত্রও স্বয়ং কন্যা দেখতে এসেছিলেন, অথচ গায়ে হলুদের পর বল্লেন কিনা অমত- আচ্ছা শেষ তাকাত লড়ে দেখা যাবে। এত রাত্রি পর্যন্ত অনিন্দ্যাও ঘুমায় নাই, জাগিয়াছিল বাহির হইয়া আসিয়া কহিল বাবা কোথায় তুমি এত টাকা পাবে, বনের হরিতকীর সঙ্গে বিয়ে দিলে ত আর টাকা খরচ হতো না! ওদিকে বিদেয় করে দাও।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
এত রাত্ৰি পৰ্য্যন্ত অনিন্দা জাগিয়াছিল দেখিয়া সকলে
বিস্মিত হইয়া গেল। অনিন্দ্যার পিসী কহিল
মাগাে ভদ্ৰমানুষের ব্যবহার দেখে যা বােঝা যাচ্ছে, তাতে
অনিন্দ ঠিকই বলেছে, বনের হরিতকীই একালের মেয়েদের
উপযুক্ত বর! সূর্যকান্ত কহিল দাড়াও তােমর গােলমাল
করো না। আমি শুদ্ধ এক বার বারুইপুর গিয়ে দেখে
আসছি-গােছ কহিল আর গােলমালেও কাজ নাই
দু’হাজার টাকা যদি দিতে পারলাম, আর “বােঝার উপর
শাক আঁটি দুইশত টাকায় কত বাধবে বলগে-দেবো,
সূৰ্য্যকান্ত কহিল দেবাে বল্লেই দেওয়া হবে-হলাে না হয়
তারা বড়লােক, তবু আদালত খােলা রয়েছে।
গােষ্ঠ ব্যস্ত হইয়া কহিল
কহিল ওকথা
মনেও ঠাই
দিও না ভাই, এখন আমরা মেয়ের বাপ, তারা
বরের বাপ, এখনও
দেশে মেয়ের
বাপদের
পরে
এই রকম লাঞ্ছনা চলবে—পাৰ্তাম
যদি মেয়ের বিবাহ বন্ধ করতে--মেয়ে, যদি স্বয়ম্বর হবার
সুযােগ পেতাে, তাহলে কথা ছিল, কিন্তু তাতে উপায় নাই।
একটা পাজর ভাঙ্গিয়া দীর্ঘশ্বাস আকাশের উপর দিয়া
ঈশ্বরের দরবারের দিকে ছুটিয়া গেল। ভাের রাত্রে টাকা
লইয়া বারুইপুরের লােৰু চলিয়া গেল।
২৬
মণি-হারা
-।
আর মধ্যে দিনমানটা মাত্র
বাকী। রাত্রির
বেলাতে রাজা জামাই আসিয়া উপস্থিত হইবেন।
নিজের দৈন্য যেন চারিদিকে মূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া
তাহার চক্ষের সম্মুখে বিভীষিকা জাগাইতে লাগিল
বিহারী, যে আসে সকলকেই বলে কাজে লাগিয়া
যাও, কিন্তু নিজে যে কোন্ কাজে লাগিয়া পড়িবে—তাহার
ঠিকানা করিতে পারে না! দেখিয়া শুনিয়া সূর্যকান্ত ও
রাসবিহারী গােষ্ঠকে একটা ঘরে পুরিয়া রাখিয়া কহিল।
তুমি এইখানে পড়ে থাকো—বাইরের কোন কাজ দেখার
প্রয়ােজন তােমার নাই। লুচি ভাজা হতে ঝাড় লণ্ঠন টাঙান
পর্যন্ত সব আমাদের পরে ভার।
গােষ্ঠ কহিল আমায় বাঁচালি তােরা। অনিন্দ্যাকে ডাকিয়া
কহিল একবার আয় মা—আজ শেষ তােকে বুকে করে
নেই—কাল থেকে ত পর হয়ে যাবি। রাণীসুন্দরী এই
সময় এ ধার দিয়া কোথায় যাইতেছিল, কথাটা তাহার কাণে
গেল, হন হন করিয়া আসিয়া কহিল।-বলি হাগা দাদা
তােমার বুদ্ধি শুদ্ধি একেবারে কি লােপ পেয়ে গেছে? মেয়ের
বিয়ে ত্রিসংসারে কেউ দেয় না? তােমার মুখ দিয়ে বেড়াচ্চে
ওসব কি অমুলে কথা-
গােষ্ঠ কহিল তােরা গােলমাল করিসনে-সত্যই বিয়ে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ ২৭ দিলেই মেয়ে আর আপনার থাকে না। কাল হােক দুদিন পরেই হােক মেয়ে পরই হয়ে যায়—তাতে যে মাপের, কোন কষ্ট আছে তা নয়, তবে কি জানিস্ তবু কঁদতেও হয়- অনিন্দ্য তাহার পিতার পায়ের কাছটিতে বসিয়া পড়িয়া কহিল বাবা তুমি আমায় শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে আমি কখনােই সেখানে যাবাে না। তােমার মত ত কেউ ভালবাসবে না বাবা। গােষ্ঠ কন্যার চক্ষু মুছাইয়া দিয়া কহিল অনিন্দ্য কঁাদিসনি মা আমি যে এত টাকা খরচ করচি, সে তোরি চকের জলের দিকে চেয়ে, আমি ব্ৰহ্মময়ীকে ডাকচি-আমার ব্রহ্মময়ীর চখের জল তিনি মােছাবেনই- ঝাড় লণ্ঠন বাদ্যি ঘটা করিয়া জামাই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বরযাত্রীর দল বাইজীদের লইয়া একটা বাড়ীতে নৃত্যে পড়িয়া গেল। ক্রমে বিবাহের লগ্ন উপস্থিত, অনিন্দ্যা বুঝিল আর তাহার নিস্তার নাই। কোথাও যে পালাইবে তাহারও পথ, পাঁচজনে বন্ধ করিয়াছে সৰ্ব্বদাই তাহার চারিধারে কড়া পাহারা অনিন্দ্যার মনে হইল, যেন তাহাকে বন্দী করিতেই চারিদিক হইতে এত সমারােহ করিয়া সকলে আসিয়াছে
২৮
মণি-হারা
অনিন্দ্যা একঘটি জল খাইয়া বলিল, বাবাকে একবার
ডেকে দাও।
পিতা আসিয়া কহিল ; কিছুই ভয় নাই মা তােমার
একবার বিবাহটা ত হয়ে যাক তারপর দুদিন পরে
আবার যে তােমার ঘর সেই ঘরেই এসে থাকবে। অনিন্দ্য।
চক্ষুর জল মুছিতে মুছিতে ছাঁদনা তলায় বসিল।
জ্ঞানহীন বালিকাই তাহার প্রিয়তমের গলে বরমাল্য
দিবে!
পুরােহিত একগাছি ফুলের মালা দিয়া দুইজনের হাত
আঁধিয়া দিয়া শালগ্রাম শিলার সম্মু খে-মন্ত্রপাঠ করাইতে
লাগিলেন, অনিন্দ্য একটা মন্ত্র উচ্চারণ করিল কিনা
সন্দেহ। বয়দেবতাই দুই একটা মন্ত্র বলিল -তাহারও
মনে কেমন একটা সন্দেহ বাজিতেছিল যে মেয়ে সে
দেখিয়াছিল—সেই মেয়ে-ত এ-নয়-এযে একবারে কালাে
বারীন একবার ভাবিল, রাত্রি জাগিয়া হয়ত তাহার
বৃষ্টি বিভ্রম হইয়াছে !-আবার ভাবিল অল্পে অল্পে লোকের
মুখে যাহা শুনিয়াছি, তাহার সঙ্গে দেখিতেছি ঠিক মিল
হইয়া যাইতেছে, কিন্তু কালাে বরণের দরুণও দুই শত
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
টাকা মূল্য ধরিয়া লওয়া হইয়াছে। আর তাহার বলিবার
পথ ত কিছু নাই।
বাসর ঘরে ঢকিয়া তাহার সব দ্বন্দ্ব মিটিয়া গেল
বুঝিল মস্ত একটা ফাঁকি! ফকির সেরা এই যে—জাল
মেয়ে দেখাইয়া তাহার বিবাহ দেওয়া হইয়া গিয়াছে।
গোজ হইয়া মুখটা ভারী করিয়া বসিয়া রহিল।
প্রতিবেশিনীরা আসিয়া কহিতে লাগিল, ওহে বর মুখটা
একটু খােল, কাল ত সকালে আমাদের অনিন্দ্যাকে নিয়ে
পালাবেই জানি, তবু
জানি, তবু আমাদের মধ্যে ত
মধ্যে ত এতদিন
সে ছিল, দুটো কথা কও—মনে ধরলো কি না বলো,
বহু জন্ম শিব পূজা করে এমন গুণ নিধিটিকে
পেয়েছে-
বর পাশ ফিরিয়া শুইয়া পড়িল।
মােহিনী বাহির হইতে জানালার ধারে দাঁড়াইয়া কহিল
গঙ্গাকে ভাব ফুটকড়াই মানে তবে যদি কথা কন—
কথার আওয়াজটা যেন কোন পরিচিতার মতই স্বামী-
নের কাণে গেল। বারীণ খাড়া হইয়া উঠিয়া কহিল
ও মেয়েটি কে-
রাণী সুন্দরী প্রতিবেশিনী দিদি সাজিয়া, বাসরে আসিয়া
ছিলেন তিনি প্রথমটা আসিতে চাহেন নাই, তবে তাহার
ও-৩
মণি-হারা
গলা সম্বন্ধে একটা খ্যাতি আছে বলিয়া পাচজনে ধরিয়া
আনিয়াছিল। রাণীসুন্দরী কহিলেন ও তােমার সম্পর্কে
ঠাকুরঝী হয়।
বারীণ কহিল বিবাহ হয়ে গেছে কি ?
রাণী কহিল না।
বারীণ কহিল মেয়ে দেখতে এসে আমার মনে হচ্চে
ঐ মেয়েটিকেই যেন দেখেছিলাম, তাইতে আমার পছন্দ ও
হয়েছিল।
রাণী একমুখ হাসিয়া কহিল বল কি, তা হলে ওর
বরাত বলতে হবে। কিন্তু জেনাে ভাই তুমি যা ভাবছে
তা মােটেই সত্য নয় ! আর আমাদের অনিন্দ্যই বা
কি মন্দ হে-রং টুকুই যেন একটু ময়লা,ত-এ-পাড়াগাঁয়ে
রােদবাতাসে ঘুরে বেড়ায়, একটু বয়স হলে আর যত্নে
থাকলে, দেখবে-ওই কালাে রূপের জন্যই পাগল হতে
হবে। অনিন্দার ঘােষ্টাটা খুলিয়া দেখাইয়া কহিল, দেখ
দেখি চোক মুখের গড়ন!-যেন ঠাকরুণটি অনিন্দ্যা
তখন দুই চক্ষের জলে ভাসিয়া যাইতেছিল।
সারা রাত্রি, একরকম বিনিদ্র অবস্থায় থাকিয়া বারীণ
সকাল বেলায় বাহিরে আসিয়া উপস্থিত হইল। শেখরকে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ ডাকিয়া অক্ষেপের সুরে কহিল। তােমাদের মত আমি শুধু বরযাত্রী হয়ে এলেই ভাল করতুম, রাজশেখর রাজশেখর কহিল কেন হে। প্রেয়সী তােমার... বারীণ কহিল চুপ কর ভাই সে কি আর একটা মেয়ে মানুষ । আমি টাকার তােড়া বিবাহ করেছি, টাকা নিয়েই ঘরে ফিরে যাই। রাজ শেখর কহিল কেন হে রং একটু ময়লা হলেই বুঝি সব মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল। ভিতরটা একটু পরখ করে দেথ, তারপর বলল-রাজশেখর দুটা উদাহরণ ও বিশেষণ দিয়া দুকথা বেশ বুঝাইয়া দিল। বারীণ একটা কথাও শুনিতে চাহিল না। কহিল ওহে রাজ- শেখর যদি বন্ধু বলে শ্রদ্ধা করতে চাও, তবে এই বৎসরের মধ্যে আর একটি মেয়ে দেখে দিও। অন্ধকারের সঙ্গে বর কন্না সে কিছুতে আমি করতে পারবো না। শেথর কহিল আচ্ছা চতুর্থ পরিচ্ছেদ। বিদায়ের সময় পিতা পুত্রী উভয়কেই বোঝানো দুঃসাধ্য হইয়া দাড়াইল। অনিন্দ্যাকে যদিও কাপড় চোপড় গহনা ৩২ মণি-হারা গাঁটি পরাইয়া একরকম থে থম করিয়া রাখা গেল। কিন্তু গােষ্ঠবিহারীকে কিছুতে বােঝান গেল না। এদেশের রীতি ছিল মেয়েকে বিদায় দিবার সময় পিতাকে কতকগুলি ইদুমমাটা লইয়া মেয়ের সামনে দাড়াইতে হইত। কন্যা বলিত এতদিন যা খেয়েছি তােমার, তা এই মাটী দিয়ে শােধ দিলাম। গােষ্ঠবিহারী মাটি চারটি হাতে করিয়া, ভাবিতেছিল মেয়ের মুখ হইতে কি করিয়া এই কথা শুনিয়া লইয়া ঘরে ফিরিয়া যাইবে। এত দিনকার দেনা পওনা এক- মুষ্টি মাটিতেই চুকিয়া যাইবে ? আর বাপ, যে এত স্নেহ করিয়াছে, বুকে করিয়া মানুষ করিয়াছে, তার পরিণামে মাটিছাড়া কিছুই নাই ? জীবনটা যেন তাহার দীর্ঘ শ্বাসের পাথর দিয়া গড়া বলিয়া মনে হইতে লাগিল। সময় বহিয়া যায় দেখিয়া রাণী সুন্দরী তাহার দাদার হাতটা চাপিয়া কহিল। দাদা ভাববার সময় নাই। মেয়ের কাছ হতে মাটি ফিরিয়ে নাও! বিদায় দিতে হবে ! গােষ্ঠ চক্ষু মুছিয়া কহিল দাড়া আমি ভাবছি, এই মা হারা মেয়েকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলাম মেয়ে আমার মাটি দিয়ে শােধ নাই দিলে; এমনি শ্বশুর ঘর হতে আয়ক না- চতুর্থ পরিচ্ছেদ সূর্যকান্ত একটা ধমক দিয়া কহিল, ওহে বিহারী তােমার কান্না কি কিছুতে গেল না, মেয়েকে যদি কোন রকমে ঠাণ্ডা করে নেওয়া গেল, তােমায় ঠাণ্ডা করবে কে বল দেখি-মাটি নিয়ে ভাবছো কি, জানো না? জীবনটাই যে মাটি দিয়ে তৈরি-তুমিও মাটি, তােমার মেয়ে ও মাটি, আর দেনা পাওনার শােধ বােধও ঐ মাটি দিয়ে—কাজ সেরে ফেল শীগগীর-এ আমাদের হিন্দুর নিয়ম, চক্ষের জলের বর্ষণ দিয়া মাটি পৰ্বটা শেষ হইয়া গেল যদি, মেয়ে তখন পিতার গলা জড়াইয়। কঁদিতে লাগিল গোষ্ঠ ও চোখের জল মুছিয়া কহিল, কাদিসনি মা তিন দিন পরে তােমায় নিয়ে আসবে। রাণীসুন্দরী জামাই বারীন্দ্রমােহনের হাত ধরিয়া কহিল- দেখ বাবা, অনিন্দ্যা এখন তােমার হাতেই পড়লো, তুমিই এখন তার ইহকাল, পরকাল, সব্বস্ব-যেন অনাদর না হয়, যেন কালাে বলে পায়ে ঠেল না; মেয়েমানুষের স্বামী ছাড়া অন্য গতি নাই। বারীন্দ্র চক্ষু মুদ্রিত করিয়া বসিয়া রহিল। মনে মনে ভাবিতে লাগিল, এই ইনিই আবার গতরাত্রে বাসর জাগাইয়াছিলেন। বেহারারা পাল্কী তুলিয়া দিল। ইংরাজী বাজনা, মাদ্রাজি বাজনা সব এক সঙ্গে এক তালে বাজিয়া
৩৫
মণি-হারা
উঠিল, বিহারী ভাবিল তাহার হৃদয়ৰনের কমলটিকে তুলিয়া
লইয়া যাইবার জন্য এ কি সমারােহ আসিয়াছিল।
সবাই উন্মত্ত হইয়া সম্মুখেরদিকে চলিতেছে। এই পিতার
হৃদয়টার পানে ত কেই ফিরিয়াও চাহিল না। বিহারী
নিজেই আকুল হইয়া নিজের মাথার চুল টানিয়া ছিড়িতে
লাগিল।
পাড়া প্রতিবেশী, রাণীসুন্দরী সকলে বিহারীকে বুঝাইতে
আসিল, বিহারী কাহারও কথা নিতে পারিল না।
কহিল, তােমরা একট, আমায় নিষ্কৃতি দাও, ওর মায়ের
কান্নাটাও ৰে গামারি কাছে জমা করা আছে। আমি
একট, কঁাদি, ওর ত আমি শুধু বাবা নই, অনেকখানা মাও
যে বটি।
সকলে ব্যখিত হইয়া সরিয়া দাড়াইল।
গােয় মেয়ে মানুষের মত ঘিনাইয়া বিনাইয়া দিতে
লাগিল। মা আমার বাধারঘরের মাণিক ছিল, আমার
কালােরূপে ভুবন আলো করিয়া ছিল। ইত্যাদি
পঞ্চম পরিচ্ছেদ পঞ্চম পরিচ্ছেদ অনিন্দ্যা শ্বশুরবাড়ী আসিল, আসিতেই তাহাকে কেন্দ্র মণ্ডলে রাখিয়া, চারিদিক হইতে তারস্বরে এমন সব বচন সুধা ক্ষরিত হইতে লাগিল যে, অনিন্দ্যার মনে হইল আগুনের খাপড়ার উপর পড়িলে বুঝি ইহার চাইতে ভাল হইত। সে তাহাদের সংসারে প্রবেশ করিল না, কোন কাজের গায়েই হাত দিল না—অথচ তাহার দোষের সংখ্যা নাই। প্রথমতঃ বিবাহের দানসামগ্রী গুলাকে লক্ষ্য করিয়া তাহার পিতার উপরে খুব একচোট বর্ষণ হইয়া গেল- বেচারা গােষ্ঠ এখানে উপস্থিত ছিল না তাই রক্ষা-নহিলে সৰ্বস্ব খুয়াইয়া কন্যাকে কোথায় সমৰ্পণ করিয়াছে, বুঝিয়া শরশ্যা আশ্রয় গ্রহণ করিত। বাদীদের পাতাসী অনিন্যার সঙ্গে আসিয়া ছিল- অনিন্দ্য পাতাগীকে কহিল ও পাতাসী তুই বাড়ী যা, গিয়ে বাবাকে পাঠিয়ে দিগে, আমার এখানে আর একদণ্ড মন টিকছে না। পাতাসী চুপে চুপে আশ্বাস দিয়া কহিল—ত করো না দিদি, দেখ ত বিকাল বেলায় তিনি এলেন বলে অনিন্দ্যার কিন্তু একদণ্ড মন তিতিতে ছিল নাদিকা
মণি-হারা
শশুর বাড়ী বলিয়া থাকিতে পারিত, তবু চারিদিক হইতে
এই অস্ত্র বাক্যবাণ যে একবারে অসহ–অধম ঝি মাগী
গুলা পৰ্যন্ত তাহার রূপ লইয়া ব্যঙ্গ করিতে লাগিয়াছে।
অনিন্দ্যা হী হইয়া উঠিতে লাগিল। তাহার উপর
শুনিতে লাগিল, তাহার বর দেবতাটিও এই কালাে মেয়েকে
বিবাহ করার লজ্জায়, ঘরে থাকিতে চাহিতেছেন না।
অনিন্দ্য সংকল্প করিল-পলাইতে হইবে।
ক্রন্দন নহে। তাহার সেই পূর্বজীবন যেন ফিরিয়া
আসিত্তে লাগিল। সেই মুক্ত বিহঙ্গমের মত উদার-উন্মুক্ত
অবাধ জীবন!
আসিয়া অবধি দুইদিন ধরিয়া কাহারও সহিত বড়
একটা আলাপ করিতে পারে নাই ;-তাহার বড় বা দুইবার
যাহা খাওয়াইয়া যাইত। নহিলে পাতাসী ব্যতীত তাহার
কথা কহিবারও সুযোেগ কাহারও সহিত ছিল না। আর
বাহাৱা বালক বালিকা কথা কহিতে আসিত রূপের
কথা তুলিয়া তাহারাও, অনিন্দাকে খাটো করিবারই
চেষ্টা করিত। ভাল কথা বলিতে পারে এমন পাড়া-
প্রতিবেশীরা আপনার আপনার গৃহ কাজ লইয়াই ব্যস্ত।
অনিন্দ্যায় মনে হইতে লাগিল যেন এ মরুভূমির দেশ।
এখানে একটা সহানুভূতি নাই, একটা মিষ্ট বাক্য নাই,
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
৩৭
যে বাড়ী
আছে শুধু রূপ লইয়া আলােচনা-মাগো কালাে মেয়ে
কি ভারতে জন্মায় না ?
কথা ছিল অষ্টমঙ্গলা পর্যন্ত থাকিয়া, পাতাসী অনিন্দ্য
ও জামাই বারীনকে লইয়া জোড়ে পুষ্পগ্রামের বাড়ী
ফিরিবে, কিন্তু অনিন্দ্যা যখন কেবলই ব্যস্ততা দেখাইতে
লাগিল, তখন বাধ্য হইয়া পাতাসীকে বিদায় লইবার জন্য
গিন্নীর কাছে অনুমতি চাহিতে দাড়াইতে হইল।
কাত্যায়নী কহিলেন, “এমন মেয়েকে
হতে বিদায় করতে পেরেছে ওর বাপ, তাই ঢের
আবার নিয়ে যাওয়ার কথা কেন ? ও অসভ্য মেয়েকে
নিয়ে কতকাল যে ভুগতে হবে জানিনে, একবারে চাল
চলন হতে সব বেয়াক্কায় ! আমাদের অমন ছেলের জন্য
অমন মেয়েও ভগবান রেখেছিল ;-হায়রে টাকা! তুমি
মেয়ের বাপকে বলো, নিয়ে যাবো বল্লেই অমনি পাঠানাে
হবে না-দানসামগ্রী যা দিয়েছে ফিরিয়ে নিয়ে যদি
ভাল বদলে দিতে পারে, তবেই পাঠাবে। নইলে নয়।
দেখি বাপ সােহাগী মেয়ের বাপের সােহাগ কতদূর পর্যন্ত
পৌছায়—
অনিন্যা পাতাসীকে কহিল, “পাতাসী, তুই কেবল
বাবাকে পাল্কী নিয়ে আসতে বলবি আর কিছু না
মণি-হারা
কাত্যায়নী তাহার ঠাকুরঝির হাতটা ধরিয়া হড় হড,
করিয়া টানিয়া আনিয়া কহিল, “ঠাকুরঝি, দেখ একবার
মেয়ের বুকের পাটাটা দেখ! রাক্ষুসে মেয়ের ভয়ের একটু
লেশমাত্র নাই—দৃঢ় হস্তে অনিন্দ্যার এলােচুলের কয়েক
গােছ চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন আমার সামনে কথা কইতে
তাের একটু বাধলাে না? ধরে, বেধে, যদি এইখানে রােদে
ফেলে রাখি, দুই বেলা করে চাবুক দিয়ে চাবকাই, তাের
বাবার—বাবার সাধ্য আছে—নিয়ে যেতে পারে ?”
অনিন্দ্য শান্তির বহরটা শুনিয়া সেইখানটায় পাড়ায়।
উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। ও-গো বাবা
গাে তুমি কোথায় আছে। এরা আমায় মেরে ফেলে।
শ্বাশুড়ীর হাতটা ঠেলা দিয়া আছাড় বিছাড করিয়া পড়িতে
লাগিল। পাতাসীও থামাইতে পারিল না।
সহসা চীৎকার শুনিয়া বাড়ীর সকলেই চারিদিক হইতে
ছুটিয়া আসিতে লাগিল। কাত্যায়নীও রাগের মাথায়
কসিয়া দুই চড় লাগাইয়া দিলেন। বাড়ীময় লােক ভর্তি
হইয়া গেল। কাত্যায়নী জনে জনে কহিতে লাগিলেন,
“এই ঠাকুরঝিকে জিজ্ঞেস করাে, ওই কোয়াকেরে মেয়েকে
কি বলিছি, শুধু বলেছি এখন পাঠাবো না- এতেই
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
কৰ্ত্তাও এসময় এখানে কান্না শুনিয়া উপস্থিত হইলেন।
কাত্যায়নী গলায় কাপড় দিয়া কৰ্ত্তার পায়ে মাথা নােয়াইয়া
কহিলেন, তুমি এমন সর্বনেশে মানুষ গাে—আমার তেমন
সােনার ছেলের গলায়, এমনি একটা কালো পেঁচা
বেঁধে দিয়েছো-ও গাে তোমার টাকাই
কৰ্ত্তা কোন কথা কহিবারই সুযােগ খুঁজিয়া পাইলেন
না। পাতাসীকে কহিলেন “ওগাে বাছা মেয়েটিকে তুলে
মুখে জলটল বাতাস টাতাস দাও ? তার পর বাড়ী যাও,
গিয়ে মেয়ের বাপকে পাঠিয়ে দাওগে, যা হয় পাঠানাে না
পাঠানো, তিনি এলে সব বন্দোবস্ত ঠিক করা যাবে।
কাত্যায়নী রাগিয়া কহিলেন, “তুমিই যত নষ্টের
গােড়া।”
কৰ্তা কহিলেন, “আমি না তুমি ? আমি দরদস্তুব
করে ছিলাম ? না তুমি করেছিলে ? দুই হাজার টাকা
আর দুইশত টাকা, এক দুই করে, গণে কে ঘরে তুলে
ছিল ?•••
গিন্নী কহিলেন, “আমি না হয় টাকাটাই গলে ধরে
তুলেছিলাম-কি দর ঠিক করেছিলাম—মেয়ে ত তােমরাই
দেখে এসেছিলে।
মণি-হারা
কা কহিলেন, “তাও তােমার পুত্র।
জনৈক প্রতিবাসিনী কহিলেন, “আরও তােমাদের
কৰ্ত্তা গিন্নীর ঝগড়া বাধিয়ে কাজ নাই, যা হয়ে গেছে
তা ত ফিরবে না।
এখন বধুকে বুঝাও, শিখাও। এই
মেয়ে নিয়ে ত ঘর করতে হবে।
কাত্যায়নী হাত নাড়িয়া ঝঙ্কার দিয়া বলিয়া উঠি-
লেন, কখনও না—এই বৎসরে ছেলের
আবার বিয়ে
দিয়ে নিয়ে আসবে—তবে ছাড়বে। ঐ মেয়ে নিয়ে
বারীনকে ঘরকন্না করতে দেবাে,--আমি বেঁচে থাকতে
নয় । এইখানেই ওকে রাখবাে আর বদিগিরি
করবাে।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
পাতাসী পুষ্পগ্রাম চলিয়া গেল। সারাদিনমানটাই অনিন্দ্যা
একপ খায় দায় নাই। অপরাহ বেলায় তাহার যা
রমা যাহা দুইটি খাওয়াইয়া গিয়াছিল? শ্বাশুরীয় কড়া হুকুমে
তাহারও দুদও কাছে বসিয়া উপজেশ দিবা, কি তাহার
বেদনার উপর একটু স্নেহের হাত বুলাইবার অবসর
তাহার নাই।
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ
৪১
সন্ধ্যার আঁধার, অনিন্দ্যার বুকের উপরেও যেন
আঁধার ঘনাইয়া আনিতে লাগিল। এদিকে পশ্চিম আকাশের
গায়ে খানিকটা কালোমেঘ জমিয়া উঠিতেছিল, অনি-
ল্যার মনে হইল ওটা যেন কালাে পাহাড়ের মত তাহার
মাথার উপর এখনি ভাঙ্গিয়া পড়িবে।
এদিকে সম্মুখে ফুলশয্যার রাত্রি,বাড়ীতে ফুলের মালা ও
ফুলের ছড়াছড়ি হইয়া যাইতেছে। যাহাকে লইয়া ফুলশয্যা
হইবে সেই শুধু বঞ্চিত।
অনুষ্ঠানটা পূর্ণ হইবে বটে,
কিন্তু সর্বাঙ্গীন হউক না হউক তাহা দেখিবার কারও
আবশ্যক নাই। পুষ্পময়ীর খোঁজ নাই, কিন্তু অভিনয়
চলিবে। এই প্রাণহীন তাগুবােৎসবে বাড়ীর ছেলেমেয়েরা
পর্যন্ত মাতিয়া উঠিয়াছে।
সন্ধ্যার সময় অনিন্দ্যা একবার, একাকী পুকুরঘাটের
দিকে যাইতেছিল বলিয়া ঘরের মধ্যে রুদ্ধ হইল। খাঁচার
মধ্যে যে একটুখানি আলো বাতাস আসিতেছিল, তাও
বন্ধ হইয়া গেল। এখন শুধু ঘরের মধ্যে অন্ধকার ! আর
অন্ধকারকেই ঘেরিয়া উচু উচু ইটের দেওয়াল !-তাহ এত
শক্ত যে, হাজার ধাক্কা দিলেও একটু ঝাপিয়া উঠে না।
মুক্তির আর কোন উপায় নাই।অথচ অনিন্যাকে মুক্ত
হইতেই হইবে। একবার অন্ধভাবে ঘরের মধ্যটা দিয়া ঘুরিয়া
৪২ মণি-হারা আসিল, কিছুই পাইল না। দুটা তুলা বাহির করা ছেড়া বালিশ পড়িয়া ছিল তাহারই উপর হাত ঠেকিল। একটা মুষিকও লাফাইতে লাফাইতে পলাইয়া গেল। অনিন্দ্যার মনে হইতে লাগিল যেন ঘরটায় আগুন লাগাইয়া, সেও এই আগুনে পুড়িয়া মরে—কিন্তু হাতের কাছে একটা দেশলাইয়ের বাক্সও পাইল না। তখন কান্না—আর কান্না এই কাটুকু না থাকিলে বােধ কয় ফাটিয়া মরিয়া যাইত। রাত্রি যখন প্রায় দশটা তখন তাহার কাগৃহের দরজা খুলিয়া গেল। অনিন্দ্যার জা রমা খানিকটা দুধ আর খানফকে লুচি আনিয়া কহিল, “খাও, খেয়ে ফুল- শয়ায় চলাে, জানো আজ তােমার ফুলশয্যা!” অনিন্দ্যা একবার রমার মুখের দিকে, চাহিল। খুজিয়া দেখিতে চাহিল কালো মেয়ের লাঞ্ছনায় সেও একটু সহানুভূতির অশ্রু বহিয়া আনিয়াছে কি না—হায়রে কালো রূপ!-তাহারও চক্ষে একবিন্দু অশ্রু কোথায় ? অনিন্দ্যা তাহার কম্পিত প্রায় ওষ্ঠ চাপিয়া কহিল, “আমায় তােমরা একট বাইরেও ঠাই দেবে না ? আমি যে আর সইতে পাচ্ছি না গাে। রমা সহানুভূতির স্বরে কহিল ঠাই পাৰে বৈ কি ভাই, সােজা রীতিতে চলো, তুমিই আবার এই ঘরের লক্ষ্মী হবে। যেন
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
৪৩
অনিন্দ্যা দেখিল এও সেই বাধি বুলিই বলে, অনিন্দ্যার
হৃদয়ের খবর জানিয়া ত কেহ উত্তর দেয় না। তাহার
বাবার জন্য তাহার বুক যে ফাটিয়া ভাঙ্গিয়া যাইতেছে,
দুধের বাটিটা ঠেলিয়া দিয়া সেইখানেই অঞ্চল বিছাইয়া
শুইয়া পড়িল। রমা কহিল, তাের কপালে অনেক দুর্গতি
আছে, আমি কি করবো বরমা চলিয়া যাইতেছিল
কি ভাবিয়া হঠাৎ অনিন্দ্যা উঠিয়া পড়িয়া কহিল, তােমরা
দুটো খেতেও দেবেনা?—বলিয়া লুচির ডিল্টা ধরিয়া
ফেলিল।
রমা কহিল, খা না ভাই! আমি ত তাের জন্যই এনে
ছিলুম।
অনিন্দ্যা লুচি কয়েকখানা খাইয়া, দুধবাটীটাও চুমুক
দিয়া খাইয়া ফেলিল, কহিল মাগাে—এত পাতলা দুধ ও
এর খায়।
রমা কহিল তােমার কর্তাটিকে বলো, পুরু দুধ রোজ
করে এনে দেবেন।
অনিন্দ্যা কহিল, আচ্ছা।
রমার যেন প্রহেলিকা ঠেকিতে লাগিল। এ বয়সের
মেয়ের মুখে যে রকম কথা মানানাে উচিত, অনিন্দ্য। ত
তাহাও বলিতেছে না অথছ মাঝে মাঝে এমন বাকিয়া
৪৪
মণি-হারা
দাড়াইতেছে কেন? লজ্জা সরমও কি একট, নাই ?
এ কি উচ্ছল প্রকৃতি ?
ফুলশয্যার ঘরে যখন ডাকিয়া লইয়া গেল, তখনও
কোন কথাটি কহিল না, একেবারেই গিয়া বিছানাতে
শুইয়া পড়িল। ফুলের মালাটা শুধু খুলিয়া রাখিল। রমা
উপদেশ দিতে লাগিল, অনিন্দ্য। একটা কথাও কাণে
করিল কি না সন্দেহ।
বাহির হইতে কত্রী কাত্যায়নী কহিতে লাগিলেন,
দেখেছিস বড় বৌ ও ঢেটি মেয়েটার যােলমান। বজ্জাতি,
নইলে ফুলশয্যার বিছানায় যে শুতে হয়, তাতে বেশ জন।
অাছে।
রমা কহিত হাঁ এখন তােমাই ছেলেটিকে পেলে হয়
কাত্যায়নী কহিলেন, আমার ছেলে ত ওর বিছানায়
যাবেই না। যাবে ঐ একবার নিয়ম রক্ষা করতে-ঘরের
মধ্যে, ওর সঙ্গে কথাই কি আমি কইতে দেবে ? বারীন।
বারীন!
বারীন একবার ঘয়ের মধ্যে ঢুকিয়াই ফুলের মালাটা
বিছানার দিকে ছুড়িয়া দিয়া দ্বয়ের বাহির হইয়া গেল।
বা ডাকিয়া কহিল, ঠাকুর পাে একবার দেখেই যাও
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ
৪৫
কালো বলেই পায়ে ঠেলে না। আর এনিই বা কি
কালে। এখানেও ভালবাসা পাবে।
বারীন মােটেই শুনিল
।
তাহার চটিজুতার
আওজটা কয়েকবার ফটফট করিয়া একেবারে উঠান
ঘুরিয়া, তারপর বাহিরের দিকে মিলাইয়া গেল।
রমা কহিল, অনিন্দ্যা ঘরে একলা থাকতে পাবে ত?
অনিন্দ্য কহিল পারিব।
রমা কহিল কবাট বন্ধ করে যাই ?
অনিন্দ্য কহিল, পায়ে পড়ি তােমাদের ঐ টুকু করলে
দম আটকে মরে যাবো, আমার ছেলে বেলা হতে
এরকম বন্ধ করা ঘর সয়না।
রমা কহিল আচ্ছা কাজ নাই আমি পাশের ঘরেই
রইলুম, কিছু দরকার হয় ডাক দিলেই আমাকে পাবে।
অনিন্দ্যা কহিল আচ্ছা।
রমা তাহার স্বামী উপীনকে কহিল, দেখ, মা যতটা
বলছেন ততটা ত মেজো বৌকে বােধ হচ্ছে না—রং একটু
কালাে তা তাে দেখে শুনেই করেছ। আর টাকাও নিয়েছ,
একবারেই এতটা ধ ধ মা যা করাটা ভাল হয়নি,
ছেলে মানুষ ঘরে গেছে।
উপীন কহিল মেয়ে মানুষের দপ্তরই ঐ, বিয়ের পর
মণিহারা
প্রথম শ্বশুর বাড়িটা তাদের যমের বাড়ী বলেই মনে
হয়। মা বাপ ভাই ভগ্নী সবাইকে ছেড়ে আসতে হয়
কিনা-
অনেক রাত্রে তন্দ্রাভঙ্গে অনিন্দা জানালাটার দিকে
চাহিয়াছে, তাহার চোখের সামনে সহসা একটা উজ্জল
তারা, গাছের ফাঁকের আড়াল দিয়া জ্বল জ্বল করিয়া
এলিতে লাগিল। এমন দীপ্তি যেন তারার আলােয়
সে কখনও দেখে নাই। ধক করিয়া মনে হইল যেন
তাহার মা ঐখান হইতে হাত বাড়াইয়া তাহাকে ডাকিতে
ছেন। মেয়ের লাঞ্ছনায় ও তারালােকেও তার ঘুম হয়
নাই, তাই মেয়ের দুঃখে ধরার দিকে নামিয়া আসিতে-
তাড়াতাড়ি বিছানা হইতে উঠিয়া ডাকিল মা--কোথা
ইতে উত্তর আসিল, যেন আয়-আয়-অনিন্দাও ত
তাহাই চায়, তাহার একটা আশ্রয় চাই-ই। বাবা না
লইতে আসে, তবু তাহাকে বপের পরেই যাইতে হইবে
নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে দুঙ্গারগুলা খুলিয়া বাহিরে আসি
ভাইল।শের দশমীর চন্দ্র উদয় হইতেছিল। আর
সে তারাটাও ঠিক মাথার উপর জল অল: করিতেছিল--
আশে পাশের গাছ পালায়া নিযুতি, প্রাচীর পার্শ্বের
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ
৪৭
কলাগাছের একটা পাতাও কম্পিত হয় নাই।নিদ্রিত
অজগরের মত পথটা ধূ-ধূ করিতেছে।
অনিন্দ্যার মনের সব বন্ধনগুলা যেন টুটিয়া গেল। ।
তাহার ভিতর হইতে কে যেন বলিল। অনিন্দ্যা ঐ-ত
তাের জগত, ঐ পথেই ত তােকে চলতে হবে, বেড়িয়ে
প।
অনিন্দ্যা আর তিলাদ্ধ বিলম্ব করিল না। নিশিথিনী
অঙ্ক বাহিয়া নিশিথিনীরই একটি তরঙ্গের মত অনিন্দ্য
অদৃশ্য হইয়া গেল। তাহার পায়ের যে একজোড়া জোড়া
ছিল সেটা বিছানায় ফেলিয়া রাখিয়া আসিয়াছিল।
গহনা তাহার গা হইতে শাশুড়ী খুলিয়া লইয়া রাখিয়া-
ছিল, সেই জঙ্ক কোন কিছুই ভাবনা তাহার ছিল না।
খালি পথ...আর পথ••• এপথের শেষই বা কোথায়
আরম্ভই বা কোথায়? তাহা কে জানে? অনিন্দা জানে
পথে বাহির হইয়া পড়িলে এক জায়গায় না এক জায়গায়
চলাৰ শেষ আছেই--
৪৮
মণি-হারা
সপ্তম পরিচ্ছেদ ।
ভাের রাত্রে ঘুম ভাঙ্গার পর রমা ভাবিল, দেখিয়া
আসি-নববধূ কি করিতেছে। সে ঘুমাইয়া আছে কি
বসিয়া আছে দেখা যাইবে।
উঠিয়াই দেখিল। ঘরের দোর খােলা। সে ইচ্ছা
করিয়াই দ্বয়ের দোর খুলিয়া রাখিয়াছিল, ভাবিয়াছিল
যদি রাত্রে তাহার ঠাকুরপাে আসিয়া শয্যায় আশ্রয় নেয়।
তবে দরদালানের দুয়ার সে বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিল যদিও,
কিন্তু একবারে খিল আটিয়া দেয় নাই, দেখিল, দরদালান ও
হা হা করিতেছে—এবং অস্পষ্ট চালােকে কয়েকটা
ছিল গােলাপ পৈঠায় ছড়ান রহিয়াছে, দেখিতে পাইল ।
রম। আলাে জালিয়া ঘরে আসিয়া ডাকিল, নতুনবে
বিছানায় হাত দিয়া ডাকিল,নতুন বৌ-কিন্তু কোথায় নতুন
বৌ, শষ্যায় ছিন্ন হার গড়াগড়ি যাইতেছে, ছােট ছােট ফুলের
তােড়াগুলিও এলাইয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে। শুধু যখন সে
শয্যা হইতে নামিয়াছে,তখন কয়েকটা গােলাপ তহাদের ব্যথা
ভরা হৃদয়ের গােপন আর্তনাদের মত, গৃহ প্রাঙ্গনে ছড়াইয়া
পড়িয়া আছে।
রমা তাড়াতাড়ি তাহার স্বামীকে ডাকিয়া কহিল
সপ্তম পরিচ্ছেদ
৪৯
যেন
ওগাে ওঠো-নতুন বৌকে যে ঘরে দেখতে পাই না
ঠাকুরপো ত এসে কোথাও ডেকে নিয়ে গেল না?
ছাৎ করিয়া ঘুমটা ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় উপীন, উঠিয়াই
কহিল বল কি? শয্যা ও গৃহের সর্বাং খুজিয়া দেখিল
যখন রমার কথাই সর্বাংশে সত্য, তখন উপেন তাহার
মাকে ও অন্যান্য জনকে ডাকিয়া দিয়া বাহিরে বারীণ
যেখানে শয়ন করে সেখানে গেল। বারীণ ঘুমাইয়া ছিল
উঠিয়া সবটা শুনিয়া একবারে আকাশ হইতে
পড়িয়াছে এই ভাবে চমকিয়া উঠিয়া-কহিল, আমি সে
“অন্ধকারের বিন্দু বিসর্গ জানি না।
উপেন্দ্র দেখিল সর্বনাশ! মায়ের কাছে ছুটিয়া আসিয়া
কহিল মা তুমিই এই সর্বনাশের গােরা, এসে অবধি
একদও তাকে ঘঁপ ফেলতে অবসর দাওনি। নিশ্চয়
ধিৎকারে সে জলে ডুবে মরেছে। এখন থেজো, কোথায়
ডুবলাে।
কাত্যায়নী ভয়ে এতটুকু হইয়া জড়সর ভাবে কহিলেন,
তােমরা ত সবাই শুনেছ বাছা, আমি সে মেয়েকে কি
এমন বলেছি। আর অমন ধারা কোন্ শাশুড়ীই বা
না বলে থাকে, ভয়ে চীৎকারও করিতে পারিতেছিলেন
, ও নিজের দোষটাকেও স্বীকার করিয়া লইতে পারিতে
৪
মণিহারা
ছিলেন না; নিজেই খিড়কীর ঘাটটা ওকিছু দুর অবধি
জল পর্যন্ত খুজিয়া আসিয়া রমাকে কহিলেন, হুঁ বউ
উপীনকে জিজ্ঞেস করে দেখি-কলেয়া হয়েছে বলে•••
কর্তা ধমক দিয়া কহিলেন একটা পাপ হয়েছে তাই
মাথা পেতে স্বীকার করে না। আবার তার উপরে
মিখ্যার ভার চাপাবে?
কাত্যায়নী কপাল চাপড়াইয়া কহিতে লাগিলেন,
*ওগো আমি জানি যে, আমার কপাল মন্দ, নইলে এমনই
বা হবে কেন ? আর তুমি সর্বনেশে লােকটি নইলে
এগ্রহ ঘটবেই বা কেন? দেশ জুড়ে দেনা করেছ এখন
ছেলে বেচে দেনা উসুল করবার মতলবে আছে।
কর্তা একটা তীব্র কটাক্ষ করিয়া কহিলেন, লােক
‘পাঠাও।
আর মায়া কান্না কেঁটে লােকজড় করতে
হবে না, পুষ্পগ্রামের দিকে
লােক পাঠাতেই হচ্ছে,
উপেন্দ্র নিজেই পুষ্পগ্রামের দিকে যাত্রা করিল।
প্রভাত হইতেই চারিদিকে ঢি ঢি পড়িয়া গেল,এবং আড়ালে
আড়ালে কাত্যায়নীকেই ইহা দী করিতে প্রতি
বেশিনী মােটই ই করি না। কাত্যায়নী
কেবলই ঘর বাহির করিতে লাগিলেন। ঐত্তি মেয়ে যে
তাহা এটা পারে ফাল, আহা যেন এতক্ষণে হুস
সপ্তম পরিচ্ছেদ
হইল। ঘরে হাড়ী আর চাপে না। সকলে হায় হায়
করিতেছে, এমন সময় গােষ্ঠবিহারী আসিয়া গলার কাপড়
দিয়া কাত্যায়নীর পা দুটা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল ।
দোহাই বেহান, আমার অবুঝ মেয়ে, আপনারা বুঝি একট
বকেছেন তাই রাতের বেলায় একলাই চলে গেছে।
কাত্যায়নী মাথার ঘােমটাটি খুব জবর করিয়া টানিয়া
দিয়া ঘরে আসিয়া গর্জিতে লাগিলেন, পুচ্ছবিমর্পিত
সর্পিণীর গর্জনও যেন তত ভয়াবহ নহে।
তার পর হাড় জ্বালানী নতুন বৌএর গুণ ব্যাখ্যা।
কাত্যায়নী জনে জনে ডাকিয়া কহিতে লাগিলেন-তােমরা
যে এতক্ষণ আমার দোষ দিচ্ছিলে এইবার দেখ, সে
মেয়ের বুকের পাটা কতদুর ? তাকে পায়ের নখ হতে
মাথার চুল পৰ্যন্ত আগাগােড়া না আঘাতলে সে মেয়ে কি
কখনও বশ হবে, মনে করেছ ?
প্রতিবেশিনীর মুখে কাপড় দিয়া কহিল, “তাও সত্যি
বাছা এমন দস্যি বউ তােমাদের এবাড়ীতে কেন,এ পরশেই
আসে নাই।
M
কাত্যায়নী জনান্তিকে গােঠবিহারীকে কহি দিলেন,
তােমাদের সােনার চাঁদ মেয়েকে ঘরেই রাখিয়া দাও।
মণি-হারা ও মেয়েতে আমাদের প্রয়ােজন নাই। আমরা আবার ছেলের বিবাহ দিয়া দিব। গােছ বলিয়া পাঠাইল। “কুসন্তান যদি বা হয় কুমাতা কখনও নয়। দোষও ত ক্ষমা করতে হয়। ঘরের ভিতর হইতে তীব্রকণ্ঠে উত্তর আসিল না-না-না ! গােষ্ঠ ভাবিতে ভাবিতে ঘরে চলিয়া গেল। অষ্টম পরিচ্ছেদ। বারীনেরও গঞ্জনার সীমা নাই, ছেলের দল পর্যন্ত তাহাকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিতে আরম্ভ করিয়াছে এমন পুরুষ, একটা বউ বশ করিবার সে সাধ্য নাই। একবারে পলাইয়া গেল। হায়রে বউ-তুইত শুধু একলাই পলাইলি না। বারীন- কেও শুদ্ধ যে পলাইতে হইবে। ছুটি ফুরাইবার পূর্বেই বারীন আপনার কর্মস্থান কলিকাতায় চলিয়া আসিল। কলিকাতায় আসিয়া অনেকটা হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। তবু তাহার সন্দেহ হইতে লাগিল, এখানকার বাতাসে পর্যন্ত যেন একটা ধিকাৰু মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে—এ ধিক্কার ক তাই ?
নবম পরিচ্ছেদ বড় রাগ হইতে লাগিল। বন্ধুবান্ধবেরা যখন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল কি হে, শুভকাৰ্য্য সব সমাধা হয়ে গেল, তখন বারীন নানারকম মিথ্যা গল্প ফদিয়া তাহার বিবাহ- ভঙ্গের একটা কৌতুককাহিনী বলিয়া গেল। বন্ধুরা কহিল আবার বিবাহ করাে। বারীন কহিল রাজী আছি যদি তেমন সৎ মেয়ে পাই। বন্ধুর কহিল,মেয়ের অভাব কি, হাজার মেয়ে গড়াগড়ি যাইতেছে। বারীন কহিল আমার মায়ের ও হুকুম, বিবাহ করিতেই সুযােগ বুঝিয়া বারীনের বন্ধু রাইচরণ, বারীনের সহিত খুব ঘনিষ্ঠতা করিয়া ফেলিল। রাইচরণ কহিতে লাগিল তাহার প্রতিবেশির এক পরমাসুন্দরী কন্যা আছে, দেখিয়া আসিতে হইবে। ঘটা করিয়া এক রবিবারে কন্যাও দেখিয়া আসা হইল। মেয়ে তাহার পছন্দ হইল। এবার আর কালাে মেয়ে নহে। গায়ের রং যেন ঠিকরিয়া পড়িতেছে। এ মেয়ের নামটিও মােহিনী, বারীন তাহার বন্ধুকে কহিল প্রথম যে জাল মেয়েটিকে আমাদের দেখাইয়াছিল •
মণি-হারা
তাহারও নামছিল মােহিনী, বন্ধু রাজশেখর সে কথার
সমর্থন করিল।
বারীন কহিল তাহার মাকে পত্র লিখিয়া মত জানিয়া
উত্তর দিবে। সপ্তাহের মধ্যে মত আসিয়া গেল, মা লিখিয়া-
ছেন তুমি একেবারে দিন স্থির করিয়া ফেল।
কিন্তু মধ্যে এক বাধা জুটিয়া গেল, কর্তা হরকুমার,
কহিতে লাগিলেন, সে হইবে না। আর একবার কালো
মেয়েকে আনিয়া দেখা যাউক, তার পরেও যদি পলায় অন্য
ব্যবস্থা হইবে।
বলিতে কহিতে একবৎসর কাটিয়া গেল। এদিকে
একবৎসরের মধ্যেও যখন শোনা গেল, অনিন্দ্যার মােটেই
পরিবর্তন হয় নাই, তখন কাত্যায়নী তাহার কালো বউকে
আনিবার নাম পৰ্য্যন্ত মুখে আনিলেন না। আসল কথা
যে টাকা তিনি পাইয়াছিলেন, সে টাকায় তাহার মন উঠে
নাই, আরও দক্ষিণা চাহিতেছিলেন ও দানসামগ্রী
বেশী রকম পাইবার আশা করিতেছিলেন।
গােষ্ঠবিহারী যখন জানাইল আর কিছু দেওয়া ত দূরের
কথা, উপরন্তু দেনায় আকণ্ঠ ডুৰিা গিয়াছে,তখন কাত্যায়নী
মনে মনে যে পন্থা ঠিক করিয়াছিলেন, সেই পন্থাতেই লাগিয়া
নবম পরিচ্ছেদ
গেলেন। বারীনকে পত্র লিখিলেন একেবারেই বিবাহে
দিন স্থির করিয়া ফেল।
বারীন পত্রোত্তরে জানাইল বিবাহ সেখানে হইবে
বটে, কিন্তু কন্যার ঠিক আপনার বলিতে কেহ নাই, এক
কাকা আছেন তিনি কোন গতিকে, অল্প স্বল্প টাকায় দায়
উদ্ধার করিতে পারিলেই বাঁচেন। পয়সা করি আশানু-
রূপ মিলিবে না।
কাত্যায়নী লিখিলেন, পয়সা করি ত খুব ভােগ করিয়া
দেখিয়াছি, এখন আমার রূপ চাই। রূপ নহিলে আমার
ধর মানাইবে না।
উপেন্দ্ৰ কহিল মা পাগল হইয়াছেন। মা জানাইলেন,
মা ত পাগল হয় নাই-মা বিষের জ্বালায় জর্জরীভূত হইয়া
গিয়াছেন। তাহাকে এ মনের কঁাটা তুলিয়া ফেলিতে হইবে।
আয়ােজন চলিতে লাগিল। এবার কর্তাকেও ছাপাইয়া,
-এক দিন কালীঘাট যাইবার নাম করিয়া, কাত্যায়নী
কলিকাতা চলিয়া গেলেন। এবং সেখান হইতে গােয়-
বিহারীকে পত্র লিখিলেন। আমার পুত্রের আবার বিবাহের
দিন স্থির হইয়া গিয়াছে, পারাে যদি, হাজার টাকা লইয়া
আই, নহিলে বিবাহের কথা একবারেই পাকা, এবং সেই
সঙ্গে কন্যারও চিরবৈধব্য অবধারিত।
মণি-হারা
কাত্যায়নী ভাবিয়াছিলেন এই রকম কড়া কথা লিখিয়া
দিলে, গোষ্ঠ টাকা আনিতে পথ পাইবে না। তখন আর যায়,
কোথায়-বিবাহ হইতেছিল দুদিন আগে, না হয় দুদিন
পরেই হইবে। অথচ ফাঁকতালে
অথচ ফাঁকতালে কিছু টাকাও আদায়
হইয়া যাইবে।
কাত্যায়নী মতলবটা আঁটিয়াছিলেন ঠিক, কিন্তু,
কোথায় কালাে মেয়ের বাপ? এযে একখানা চিঠি দিয়াও
কোন খোজ খবর লয় না•••তবে কি তাহাই মত যে
তাহাদের জামাইএর পুনর্বার বিবাহ হইয়া যাউক ?
বারীন কহিল, তাহাই মত মা, দেখিতেছ না একখানা
পত্র দিয়াও খোঁজ লওয়া নাই।
রাইচরণ আসিয়া কহিল, আর গড়িমাসিতে দরকার
কি? একবারেই দিন পাকা করিয়া দাও, পরও ভাল দিন
আছে ঐ দিনেই এতকাৰ্য্য সমাধা হইয়া যাইবে।
বারীনও তাহাই চায় গত বৎসরের বিবাহ দিনের
স্মৃতিটা বড় প্রবলভাবে তাহাকে দোলাইয়া যাইতেছিল।
বারীনের মনে হইতেছিল,আর একটা বিবাহ ব্যতীত তাহার
এ লজ্জার কঁাটা উলীত হইয়া যাইবে না !
বিবাহ হইল বটে কিন্তু কত ধূমধামের সহিত নহে।
নবম পরিচ্ছেদ
৫৭
নবম পরিচ্ছেদ।
সংসারের কায লইয়াই গােষ্ঠবিহারী মাতিয়া ছিল।
মেয়ের বিবাহের সময় যে দেনাটা হইয়াছিল ; তাহার
ইচ্ছা ছিল, এই বৎসরকার চাষের ফশলে সেটার কতকটা
শােধ করিয়া ফেলিবে। সেই জন্য গেষ্টর দিন রাত্রি জ্ঞান
ছিল না। হৈ হৈ করিয়া মাঠে মাঠে ঘুরিয়া বেড়াইতে
ছিল। জামাই বারীনবাবু যে আবার বিবাহ করিতে উদ্যত
হইয়াছেন স্বপ্নেও তাহার সে কথা মনে আইসে নাই।
অথচ অতি অসম্ভবও একদিন সত্য হইয়া দুঃস্বপ্নের
বিভীষিকা দেখায়, যখন এই রকম বাস্তবের লৌহচক্র তলে
জীবনটা নিষ্পেষিত হইতে থাকে।
গােষ্ঠ মাঠের কাৰ্য ফেলিয়া সূৰ্য্যকে ডাকাইয়া পত্ৰখানা
দেখাইল।
সূৰ্য কহিল, ব্যাপার কিহে মেয়ের দোষ নাই, ঘাট নাই,
ওমনি ছেলের এক বারে বিবাহের দিন স্থির। বিবাহের
সময় ছোট মেয়ে ভয়ে একটা কি কাজ করিয়া ফেলিয়াছে,
তাহারই জন্য এই শান্তি, শাক চুরিতে ফাঁসির হুকুম ?
গােষ্ঠ কহিল, আমার বয়াতে সুখ নাই ভাই, তুমি আমি
৫ মণি-হারা তার কি করবাে। নইলে মেয়েরই বা ওরকম মতলব হবে কেন? গােছ মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল। সূর্যকান্ত কহিল সে হইবে না। একবার দেখিতে হইবে। একরকম টানিয়া হেঁচড়াইয়া সূৰ্য্যকান্তই, গােষ্ঠবিহারীকে বারুইপুর লইয়া গেল। যেখানে সংবাদ শুনিয়া কারও চক্ষু স্থির। কর্তা কহিলেন কই আমি ত এর বিন্দুবিসর্গও জানিনে। পত্র- থানার তারিখ দেখিয়া কহিলেন, এযে দেখছি অনেকদিন কায়ই পত্র। আপনারা এতদিন পরে পত্র পেয়েছেন ? গােষ্ঠবিহারী কহিল। গ্রহ যখন ঘটে, তখন এম্নি করিয়াই ঘটে এই পত্র এলাে কিনা চিঠি আসবার নির্দিষ্ট দিনের সাত দিন পরে- কৰ্তা কহিলেন, চলুন। এবার আমাকেও যাইতে হইতেছে। দেখা যাউক খুব সম্ভব এখনও বিবাহ হইয়া যায় নাই। গােষ্ঠ কহিল, না বেহাই মশাই, আমার মন বলছে বিবাহ হয়ে গেছে এ মিথ্যা হতে পারে না। সেইদিনই তিনজনে কলিকাতা রওনা হইয়া গেলেন
নবম পরিচ্ছেদ
এদিকে আচা আচা কথাটাও পুষ্প গ্রামের মধ্যে রাষ্ট্র
হইয়া গিয়াছিল।
পাড়ায় স্ত্রীমহল অনিন্দ্যাকে বলিতেছিল,অনিন্দ্যা তাের
স্বামী যে আবার বিয়ে করতে চাইছে। তু যেয়ে একবার
হাতে পায়ে ধরে দেখগে না।
অনিন্দ্য হাত ঘুরাইয়া কহিল, মরণ। বিয়ে করলো
তা আমার কি।
প্রতিবেশীরা কহিল, আমার কি তখন বুঝবি, যখন
এখানেও ঠাঁই পাবি না ওখানেও না। আজ হাস,খেল, গান
গা, হায় হায় তাের মা, এমন অলক্ষণা মেয়েই রেখে গিয়ে
তেমন জামাই••• শুনচি কেবল তােরই জন্য আবার
বিয়ে করতে বসেছে!
অনিন্দ্যা একবার দাড়াইয়া কথাটা শুনিল, তারপর
চলিয়া গেল কোন উত্তর প্রত্যুত্তর করিতে পারিল না।
বাড়ীর মধ্যেও যখন প্রবেশ করিল, তখন বাড়ীর খুড়ি,
জেঠি, ভাই সকলে তাহার উপর খড়গহস্ত হইয়া উঠিল,
সকলেই একবাক্যে কহিল এমন মেয়েও তুই ভূভারতে
এসেছিলি। তুই গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারতিনে-- ?
অনিন্দ্যর চক্ষু দিয়া কয়েক ফোঁটা জল, গড়াইয়া
পড়িল।
মণি-হারা কলিকাতায় পৌছিয়া গােষ্ঠ যাহা আশা করিয়াছিল দেখা গেল সত্যই বিবাহ হইয়া গিয়াছে। ইহাতে বারীনেরও একটু বাধে নাই, বারীনের মায়েরও একটু বাধে নাই। কর্তা যখন তর্জন গর্জন করিয়া দুকথা গৃহিনী কাত্যায়নীকে শােনাইলেন, তখন কাত্যায়নী তীব্র ঝাঁঝের সুরে কহিলেন। হলো যেন বিবাহই হয়ে গেছে, তবু এতটা দোষের কি হয়েছে শুনি। তােমারই পিতামহর ক’টা বিবাহ ছিল মনে আছে? পুরুষ মানুষ ষটা খুসি বিবাহ করবে। এ বউকেও পছন্দ না হয় আরও করবে। তাই বলে জুটে পুটে যে এসেছে। সাতপাক ফিরিয়ে দেবে না কি—আর ঐ মিন্সেটিও যে এসেছেন কেন চিঠি পেয়ে আসতে পারেন নি?-টাকাই বড়•••এখন থাকুন টাকা বুকে দিয়ে•••কালাে মেয়েকে আমাদের মত স্বরে দিতে দুহাজার একহাজারে কিছু হয় না। আরও বেশী কিছু দিতে হয়। আর দানসামগ্রী গুলাও- কথার শেষ দিকটাতে খুব একটা জোর দিয়া গেলেন বাহিরে গােষ্ঠ, সূর্যকান্ত অপেক্ষা করিতেছিল, কথাগুলা পরিক্ষাই তাহাদের কর্ণে গেল । সূর্যকান্ত কহিল ওহে বন্ধু আর নয়—বেরিয়ে পড়।
নবম পরিচ্ছেদ
=
এরা রাক্ষসের দণ-পয়সার জন্য না করতে পারে জগতে
এমন অসাধ্য এদের কিছুই নাই।
গােষ্ঠ অভিভূতের মত বসিয়া পড়িয়াছিল। তাহার
আর ভাবনা করিবার ও কিছু সাধ্যে কুলাইতেছিল না।
এই বড় মানুষের ঘরে মেয়েটিকে দিবে বলিয়া সে কি
চেষ্টাই না করিয়াছিল, তাহার যথা সৰ্ব্বস্ব নােটের তাড়ায়
মুড়িয়া, এই বড়লােকের বাড়ীতে আনিয়া হাজির করিয়া-
ছিল। সৰ্বস্ব খােনর পরিনাম এই হইল? হায়রে
অদৃষ্ট।••••••
তাহার কানের কাছে কলিকাতা নগরীর এই জন
কোলাহল,যেন উন্মত্ত এক তাণ্ডবের মত শুনাইতে লাগিল।
রক্তপিপাসীর দল খঙ্গা হাতে করিয়া ছুটিয়াছে, আর
পেছন পেছন বদ্ধ হস্ত তাহার কন্যা, অনিন্দা কাদিতে
কাদিতে চলিয়াছে। কোথায় কোন্ বেদীমূলে তাহার বলি
হইবে, কে জানে,তাহাকে রক্ষা করিতেও কেহ নাই!••••••
এই দিবাস্বপ্নে গােষ্ঠবিহারী একবারে যেন উন্মাদ হইয়া
গেল। ছুটিয়া বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া কাত্যায়নীর
পায়ের কাছে পড়িয়া মাথা কুটিয়া কহিতে লাগিল।
হে রাক্ষসী, হে দেবী, আমার মেয়ের বুকের রক্তে কতটুকু
তােমার পিপাসা নিবৃত্ত হইবে ? তাহাকে ত বলি দিলে
৬২
মণি-হারা
—এ বাপের হৃদয় খানির দিকে ত চাইলে না।
ভেঙ্গে পিষে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তারপর উঠিয়া বাহিরে
আসিল, বাড়ীটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিল ।
আমি অন্য অভিশাপও তােমাদের দেব না। যেমনি বিনা
দোষে আমার কন্যার সর্বনাশ করলে, তেমনি এই বাপের
বুকের ব্যাথা একদিনও যেন ভােগ করো। যেন আমার
এই দীর্ঘশ্বাসের বেদনায় তােমাদের গৃহে ভুমিকম্প উপস্থিত
হয়। যেন তােমাদের সব ঐশ্বৰ্য্য আমার মেয়ের সৌভাগ্যের
সঙ্গে, গলে খসে ধূলি হয়ে শুন্তে ছড়িয়ে পড়ে। যদি ঈশ্বর
থাকেন তবে আমার এ অভিশাপ মিথ্যা হবে না।
সূর্যকান্ত, পাগল বিহারীকে ধরিয়া বাড়ীর বাহির
করিয়া লইয়া আসিল।
কৰ্ত্তা কাত্যায়নীকে কহিলেন, শুলে ত গিন্নী এ
অভিশাপের একটা বর্ণও মিথ্যা হবে না। তােমার
প্রলয়ঙ্করী বুদ্ধির বহরে, আর এই সুখলােলুপ পুত্রের
ব্যবহারে, সংসারে বিষের বাতি জ্বলে যাবে।
ৰামীন ও তাহার মাতা দুই জনেই মস্তক অবনত
করিয়া রহিল। কাত্যায়নী মুখ তুলিতে তুলিতে আর
তুলিতে পারিলেন না, কেমন যেন হঠাৎ একটা ভয়ে স্ত
হইয়া গেলেন।
দশম পরিচ্ছেদ
৬৩
দশম পরিচ্ছেদ ।
এতদিন পরে অনিন্দ্যার একি হইল? তাহার বুকের
ভিতর হইতে যে একটা কান্না বাহির হইয়া আসিতে
চাহিতেছে, একান্নাটা এতদিন তাহার কোথায় ছিল? কোন্
মগ্ন আঁধারের গভীর অতলতায়?
জন্মিয়া অবধি সে অনেকদিন অনেক বার কাদিয়াছে
বটে, কিন্তু এমন ধার নয়—এযে তাহার বুকের ভিতরটা
আলােড়িত হইয়া যাইতেছে। সমুদ্র মন্থনের মত ? চেষ্টা
করিয়াও এ কান্নার প্রতিরােধ ত ঘটিয়া উঠিতেছে না। এ
যেন বহুদিন একটা উৎসের মুখ রুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল, হঠাৎ
পাথরখানা সরিয়া গিয়াছে। এখন শুধু কান্না—আর কান্না।
কাদাও দেবতা, এই অশ্রু ধারায় তাহার ভিতরের
অনেকখানি গ্লানিই ধুইয়া মুছিয়া যাইতেছে ।
লোকে বলিতেছে, তাহার স্বামীর আবার বিবাহ
হইলেই বা, সে ত স্বামীকে চাহে নাই, স্বামী তাহার একটা
দুইটা, দশটা বিৰহ করিয়া আসিলে কোন কালে সে ত
একবার প্রক্ষেপও করিত না। সে যে অসঙ্কোচে আপনার
অধিকার-আধারের বুকের উপর ছড়াইয়া আসিয়াছিল।
তবে আবার আজ কিসে বাঁধন? স্বামী হইতে যতদূর সে
৬৪ মণি-হারা চাহিয়াছিল, ততদূরই তাহার মিলিয়াছিল, তবে দূর আজ নিকট হইয়া আসিতেছে কেমন করিয়া? জাগাও জাগাও । যাদুকর! আজ তােমার যাদু দণ্ডে একটা সুপ্ত পাষাণের ঘুম ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। এ জাগরণে একটা মােহ আছে, সে মােহ এই, অন্ধ- কারের পরপারে আলাের জগৎ যে কত সুন্দর তাহাই বুঝাইয়া দিবার জন্য * কিন্তু বড় অসময়ে জাগিল অনিন্দ্যা,যখন তাহার দেবতা বিমুখ হইয়া চলিয়া গিয়াছেন। তখন আসিল পূজার অর্থ লইয়া- অনিন্দার সই আসিয়া ডাকিল অনিন্দ্যা। অনিন্দ্য। তত বেলা পর্যন্ত বিছানায় পড়িয়াছিল। উঠে নাই। সই কহিল, হ সই তােমার কি কোন অসুস্থ করেছে ? অনিন্দ্যা ভিতর হইতে ধরাকণ্ঠে কহিল, হাঁ ভাই অসুখই সই কহিল কৰাটা খােল না ভাই কথা আছে। অনিল্যা ভাবিল কোন সংবাদ আছে-তাড়াতাড়ি কৰাটটা খুলিয়া ফেলিল-মাথার চুলগুলি তখনও তাহার উঙ্কো খুস্কো চক্ষের কোনে ও তখন লাগিয়া ছিল।
দশম পরিচ্ছেদ
সই, অনিন্দ্যার পানে চাহিয়া কহিল। এই যে সই তুমি
কঁছিলে।
অনিন্দ্য। মুখটা ফিরাইয়া কহিল মরণ•••তখনও তাহার
বােধকে বাহিরে প্রকাশ হইতে দিতে কি লজ্জা!
সই কহিল, তােমার বাবা ফিরে এসেছেন !
অনিন্দ্যা কহিল, না।
সই কহিল বড় দুঃখের কথা ভাই, তখন কারও কথা
শুলি নে, এখন জম্ম ভাের কা, পায়ে ধ, দুয়ে হয়ে পড়ে
থাক।
অনিন্দ্য তাহা শুনিতে চাহিল না।
কয়েকটা বাসন গেলাস লইয়া পুকুর ঘাটে ধুইতে
গেল ! যেদিন তাহার সুখ ছিল, সৌভাগ্য ছিল—বাপের
আদরের দুলালী ছিল, তখন কেহই গায়ে পড়িয়া তাহার
একটা সুসংবাদের কথা শুনাইতে আইসে নাই, আর আজ
যেই দুঃখের দিন পড়িয়াছে, অমনি প্রত্যুষেই সই আসিয়া
উঠাইতেছে, আত্মীয়তা করিয়া বলিতেছে ভাই ওঠো!
তােমার কপাল পুড়িয়াছে।
অনিন্দ্যা বাসন ধুইয়া রাখিয়া কতকগুলা শারে সিদ্ধ
কাপড় লইয়া নদীর ঘাটে কাচিতে গেল। বাড়ীতে তাহার
আদৌ মন বলিতেছিল না। চারি দিক হইতে তাহাকেই
মণিহারা
অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কেবলি বলাবলি চলিতেছিল—ওগাে
কালো মেয়ে তােমার কপাল ভাঙ্গিয়াছে।
কাপড় কাচিতেছে এমন সময় চাহিয়া দেখিল দাটে
একখানা নৌকা আসিয়া লাগিল । নৌকায়, আরােহী
আর কেহ নাই, তাহার পিতাই নৌকা হইতে নামিলেন ।
পিতার মুখ চক্ষু একি--এযে একবারে লাল হইয়া গিয়াছে,
যেন কতদীর্ঘ দিন ঝর বাতাসের সঙ্গে যােঝ বুঝি করিয়া-
আসিয়াছেন। মাথার চুল একবারে রুক্ষ, বিবর্ণ--
অনিন্দ্যা বাবা বলিয়া ডাকিতে যাইয়াও ডাকিতে
পারিল না। ভয়ে স্তব্ধ হইয়া গেল । বাবাও ত অনিন্দ্যা
বলিয়া ডাকিলেন না। কেমন করিয়া একি হইয়া গেল ?
নৌকাখানা ঘাটে সােয়ারী নামাইয়া দিয়া আবার
বাকের পথে অদৃশ্য হইয়া গেল।
বিহারী অবােধ্য, বিজ, বিজ, ভাষায় কি বলিতে বলিতে
অনিন্দ্যার দিকেই আসিতে লাগিল।
অনিন্দ্য চাহিয়া দেখিল মাতালের পদদ্বয়ের মত তাহার
পিতার পদযুগল টলিয়া পড়িতেছে।
অনিন্দা কাপড় কাচা ফেলিয়া পিতাকে ধরিতে
আসিল। বিহারী মত্ত স্বরে কহিল চুনি সরে দাড়া-
খানিক স্তব্ধ হইয়া অনিন্দ্যার মুখের দিকে চাহিয়া দাড়াইয়া
দশম পরিচ্ছেদ
৬৭
রহিল। তারপর অস্বাভাবিক কেমন এক হুঙ্কার ছাডিস।
ঘাটে যে একটা বহুদিনের পরিত্যক্ত কলসী পডিয়া ছিল
সেইটা কুড়াইয়া বালুপূর্ণ করিতে লাগিল।
অনিন্দ্য ব্যাকুল হইয়া পিতাকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল
বাবা এমন কচ্চো কেন বাবা•••কি হয়েছে তােমার••• এল
? এষে মরার কলসী বাবা—ছুতে নাই। তুমি নৌকা
হতে নেমেই এমন হয়ে গেলে কেন বাবা? কেউ কি 'ক?
তােমায় খাইয়েছে ?
দুই হাত দিয়া পিতার মুখে হাত বুলাইতে লাগ""।
বিহারী সবলে অনিন্দ্যার হাতটি সরাইয়া দিয়া সই
বালুপূর্ণ কলসীটাতে, নিজের চাদরখানার লম্বা দিকটা দিয়া
বাঁধিতে লাগিল। তার পর দৃঢ় হস্তে অনিন্যাকে ধরিয়া
ফেলিয়া অনিন্দ্যার গলায় সেই বালুপূর্ণ কলসীট, দর
দিয়াই বাঁধিয়া দিতে লাগল।
অনিন্দ্যা ভয়ে মূচ্ছ। যাইবার মত হইয়া গিয়াছি..
তথাপি পিতার কোলের উপর ছিল বলিয়া, মৃত্যুভয়টা
একবারও মনে উদিত হয় নাই। তবু চীৎকার কবি
উঠিল।
বিহারী কহিল, “কাঁদিনি, তোকে মুক্তি দিচি
তুই আমার আদরের মেয়ে ছিল কিনা—তাই তোর
মণিহারা কপাল ভেঙ্গেছে দেখে, তাের বাবা তাের বিসর্জনের আয়োজন করেছে। অনিন্দ্যা প্রাণপণ বলে তাহার বাবাকে ঠেলিয়া দিয়া কহিল, দোহাই বাবা! তুমি যা বলবে তাই শুনবো, যেখানে যেতে বলবে-সেইখানেই যাবাে। আমার মেরে ফেলাে না-তােমার পায়ে পড়ি বাবা! বিহারী তখন উন্মত্ত ! কণ্ঠস্বরেও কেমন এক প্রবল মত্ততা জড়িত। কহিতে লাগিল, ভেবেছিস তােকে মারতে চাইছি, তাের বুকে বাজছে, আর আমার বুকে বাজছে না—তুই যে আমার সর্বস্ব ছিলি অনিন্দ্য! আমার ছেলেদের চেয়ে•••আমার আত্মার চেয়ে, যে তোকে ভাল- বাসতুম-সেইজন্য ভূমিষ্ঠ হবার পর একদিনও বুকে হতে নামাইনি। তুই আমার ব্রহ্মমরি ছিলি। আজ বিসর্জন । আমার ব্রহ্মময়ীর বিসর্জন! আমার শ্যামা মায়ের বিসর্জন। আমার কালাে মেয়ের বিসর্জন। সবলে ছুড়িয়া দিতে যাইবে, এমন সময় নিজেই মূর্মিত হইয়া পড়িয়া গেল ! অনিন্দ্যার চীৎকারে তখন কাছের চাষী বাসীর দল ছুটিয়া আসিতেছিল।
দশম পরিচ্ছেদ
অনিন্দ্যা গলার কলসীটা খুলিয়া ফেলিয়া বাবার পায়ের
উপর হাত রাখিয়া কঁদিতে লাগিল।
গ্রামেরও দু-পাঁচজন আসিয়া উপস্থিত হইল। সকাল
বেলায় নদীর ঘাটে গ্রামের লােক ভাঙ্গিয়া পড়ি।
কেহই কিন্তু বিহারীর ব্যাধির অবধারণ করিতে পারল
।
ডাক্তার আসিয়া কহিল আপােপ্লেক্সির ভাব ।
হইতেও পারে, না-ও পারে—মনের ভিতরে খুব একটা
আঘাত লেগেছে, বাড়ী নিয়ে যাওয়া হউক।
সূৰ্য্যকান্ত সে আঘাতের সম্ভাবনাটাও জামাইয়ের
পুনর্বিবাহে ঘটিতে যে পারে তাহা বলিয়া গেল।
অনিন্দ্যাকে যে তাহার পিতা ডুবাইয়া দিতে গিয়াছিল
-সে কথাটা অনিন্দ্যা কাহাকেও না জানাইয়া পিতার
শয্যাতেই পড়িয়া রহিল। সে ভাবিল, পিতার মনে তাকে
বিসর্জন দিবার কল্পনা কখনও উদয় হইত না কেবল
চোখের কাছে শূন্য কলসীটা পড়িয়াছিল দেখিয়া, নিজেকে
সামলাইতে না পারিয়া এইরকম করিয়া ফেলিয়াছিলেন।
মনে মনে শত ঠাকুর দেবতাকে অনিন্যা ডাকিতে লাগিল,
ঠাকুর আমার বাবার রােগ তোমরা ভাল করে দাও।
এর পর হতে বাবা আমায় যা বলবেন, তাই শুনলা
৭০
মণিহার।
শশুরবাড়ী যেতে বলেন তাই যাবো, বনবাসে যেতে বলেন,
-ভাই যাবে।”
দেবতারা তাহার কথায় কর্ণপাত করিয়াছিল কি না
কে জানে!
একাদশ পরিচ্ছেদ।
করিত।
দ্বিতীয়বার বিবাহ করিবার পর, বারীনের আর ছােট
একটা বাড়ীতে থাকা হইল না। নব পরিণীতাকে লইয়া
আলাহিদা বাসা ভাড়া লইতে হইল। মধ্যে দিন কতক
খুড়শ্বশুরের বাড়ীতেই পত্নীকে রাখিয়া আসা যাওয়া
খুড়শ্বশুর মহাশয় স্পষ্টই একদিন কহিলেন।
এ রকম নবাবী চাল আমাদের এখানে খাটিবে না।
আলাহিদা বাষার বন্দোবস্ত দেখ। রাইচরণ কহিল, ওহে
বেজায় ছােটলােক, এখন কাজ উদ্ধার হয়ে গেছে কি না?
নববধূকে যে দেশের বাড়ীতে পাঠাইবে, সে পথও পিতা-
ঠাকুর মহাশয় বন্ধ করিয়া গিয়াছেন, সেই জন্য বারীনও
মাগ করিয়া বলিয়াছে, দেশের মুখ সে আর দেখিবে না।
বাসা বদলাবদলিতে প্রথম দিন কত তাহার
একাদশ পরিচ্ছেদ
৭১
একটু অসুবিধা
ঠেকিয়াছিল। তার পর যতই দিন
যাইতে লাগিল, ততই যেন সে সৌভাগ্যের মুখ দেখিতে
পাইল। লােকে কহিল। পয়মন্ত মেয়েটি। আপিসে
যত মাহিনা পাইত, তাহার উপর আর বিশ টাকা বাড়িয়া
গেল। এই সময়ে বিবাহের বৎসরদেড় অন্তে একটি
কন্যারত্নও তাহার জন্মলাভ করিল।
বন্ধু রাজ শেখর কন্যা দেখিতে আসিয়! কহিল, এই
কন্যাই তােমার পাতকের প্রায়শ্চিত্ত করবে বন্ধু । যঃ -
করে' •
বারীন কহিল, কি রকম?•••••
রাজশেখর কহিল জানো না? তােমার প্রথম পক্ষের
শশুরের মনস্তাপ! ভেবেছে। এতটা দীর্ঘশ্বাস এমনি
বিফলে যাবে? যিনি একরকম তােমারি ব্যবহারে উন্মাদ
আর স্তম্ভিত হয়ে গেছেন।
বারীন কহিল, কেন আমার ব্যবহারের দোষটা কোথায়
দেখলেন তিনি।
রাজশেখর কহিল কোথায় দেখলেন ঠিক তা আমি বলতে
পাৰিনে, কিন্তু তােমারি ব্যবহারে উন্মাদ হয়েছেন এটা
বলতে পারি-
বারীন কহিল, হােক তার জন্য আমি দায়ী নই।
१२
মণিহার
আমি জীবনে সুখ চাই, সৌভাগ্য চাই, রূপসী পত্নী চাই,
পরের দুঃখ হবে ভেবে, আমি নিজের জীবনটাকে জ্বালাময়
করে তুলতে পারি নে, তার যেমনি কালো মেয়ে ছিল,
তেমনি কালাে পাত্রও ত পেতে পারতেন।
রাজশেখর কহিল, পারতেন ঠিক, কিন্তু টাকা গুলির
কথা, ভেবে দেখা উচিত ছিল, তােমরা যে একদিকে
কন্যা, আর একদিকে টাকা মেপে নিয়েছিলে।
বারীন কহিল, সেটা একটা মস্ত দমবাজী। মেয়ে
ভাল না হলে কিছুতে রাজী হতাম না, লক্ষ টাকা দিলেও
না !
?
রাজশেখর কহিল এখন সুখী হয়েছে
বারীন কহিল হাঁ!
রাজশেখর চলিয়া গেল। বারীন রাজশেখরের এই
হঠাৎ আগমনের কারণটা ভাল হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল
না?—জশেখর তাহার নবজাত কন্যার দিকে লক্ষ
করিয়া কেন একথা বলিয়া গেল ? নিশ্চয় ঈর্ষান্বিত•••তাহার
সৌভাগ্য দেখিয়া ঈর্ষান্বিত ছাড়া আর কিছুই নয়। ডাকিল,
মােহিনী।
মােহিনী ছেলে কোলে করিয়া ততক্ষণ ভিতরে দাড়াইয়া
রাজশেখরের সকল কথাই শুনিয়াছিল, নাইবার জন্য
একাদশ পরিচ্ছেদ
তৈলের বাটি ও গামছা আনিয়া দিয়া কহিল, রাজশেখর
বাবু এসে ছিলেন না?
বারীন কহিল হাঁ !
মােহিনী কহিল, দেশের সব সংবাদ ভাল।
বারীন কহিল হা, কিন্তু দেখ ও ত সংবাদ দিতে
আসা নয়•••আমার সৌভাগ্যে ঈর্ষা করতে আসা, মাইনে
বেরেছে শুনে, কারও সােয়ান্তি নেই।
মােহিনী কহিল নাই বটে, আমিও ঘরের ভিতর হাত
সব শুনলুম। কিন্তু আমার এই মেয়ের দিকে চেয়ে
পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে সে ত সৈতে পারব না।
বারীন কহিল, ঐজন্য ত আমার আরও আক্ষেপ হচ্চে,
আমায় দশকথা বললে হয়ত সইতে পারতাম, কিন্তু এই শুদ্ধ
অপাপবিদ্ধ কন্যা আমার•••ষে সংসারের বুকে ফুটে উঠেছে••
একটি শতদলের মত, ভগবান কার পাতকের প্রায়শ্চিত্তের
জন্য তাকে পাঠিয়েছে কেউ বলতে পারে ? 'ওরা তর্ক
করে বলে ছেলে মেয়েকেও পিতার কৰ্ম্মফলের বোঝা
বইতে আমি এমনি কি দুষ্কর্ম করে ফেলেছি
যার জন্য আমার এই মেয়েটিকে-ওটা কিছু নয় বুঝেছ
কালো বউএর বাপ, থম্বু হয়ে গেছে, তাই আমাকে
দিয়ে সাজিয়ে, দেশের লােক একটা গল্প তৈরি করে
* # ৬
৭৪
মণিহারা
নিচ্ছে। তা নিক, গল্পের শেষ দিকটাতে আমি একবারে
শূন্য।
মােহিনী তাহার রাঙ্গা মেয়েটিকে স্তন্য পান করাইতে
করাইতে মেয়ের মুখখানি মুছাইয়া দিতে দিতে কহিল।
আমি জীবনে টাকা পয়সার কামনা করিনি, ধন দৌলতেরও
বর মাগিনি, চেয়েছি, এই সন্তান•••ভগবান তা আমায়
দিয়েছেন। এই মেয়ের দিকে চেয়ে যে কেউ একটা
কথা বলে যাবে সে আমার অসহ্য !
বারীন কহিল, আমি বারণ করে দেব, আমি তাদের
বলবাে তােমরা আমায় যাই খুসি বলতে পারে, অর্থপিশাচ
রূপােন্মাদ, কি আর কিছু—কিন্তু আমার এই স্ত্রী এবং
ক। এরা আমার কিছুতে কোথাও নাই। এরা শুদ্ধ স্ত্রী
আর কথা••
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
দিন যেমন চলে, তেমনি চলিতে লাগিল, বিহারীর
বুকে শুধু যে ঘ-টা বাজিল সেইটা আর সারিল না। বিহারী
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
বাড়ার আবার সবাই হাসি, গাহিল, বিহারীর
পরে শুধু, সেই ব্যথাটা একটা, চিহ্ন রাখিয়া মুদ্রিত রহিয়া
গেল। বিহারী আর কথা কহিতে পারিল না। শুন্তি-
তের ন্যায় জগতের দিকে এক করুণ দৃষ্টিপাত করিয়া
চাহিয়া রহিল। কন্যার দুঃখে বাপের যে এমন অবস্থা
হইতে পারে, ইতিপূর্বে এ দেশের লােক এরূপ কোথাও
দেখে নাই। সকলে একবাক্যে কহিল পিতৃহৃদয় বটে ।
সেই সঙ্গে অনিন্দ্যাকে ধিক্কার দিতে কেহই
কেহই ত্রুটি
করিল না, সকলেই বলিতে লাগিল, “অনিন্দ্য। তুই যদি
ফুলশয্যার রাত্রে পলাইয়া না আসিতিস, তবে তার স্বামী
আবার দ্বিতীয় বিবাহ করিত ন এবং তাের বাপেরও এ
অবস্থা ঘটিত না।
অনিন্দ্যা তাহার সইকে কহিল ভাই আমার অদৃষ্ট।
তােমরা আমার সুখের জন্য হাজার চেষ্টা করিলেও অদৃষ্টের
হাত এড়াইব কি করিয়া ? নির্জনে বসিয়া যে পাতক
করিয়াছি তাহার ফল ৩ ভােগ করিতে হইবে।
অনিন্দ্যা তাহার পিতার সেবা করে, পিতাকে খাওয়ায়
দাওয়ায়, পিতাকে লইয়াই পড়িয়া থাকে, সংসারের সহিত
আপনাকে আর পুরামাত্রায় খাপ খাওয়াইতে পারে না।
তবে চক্ষু দুটা আছে, চাহিয়া দেখিতে হয়। তাহার সই
মণিহারা
শুধু কালো
সাতীরা শ্বশুর বাড়ী হইতে বাপের বাড়ী পাল্কা
চড়িয়া আসে, যায়, আনন্দ করে, কাহারও কাহারও
সন্তান হইয়াছে, তাহারা সেই গুলি কোলে লইয়া তাহাদের
বাড়ী বেড়াইতে আসে, সে শুধু চাহিয়া দেখে। আর হৃদয়ের
অতি নিভৃতে একবিন্দু অশ্রু গলিয়া, ঝরিয়া যায়।
তাহার সবই ছিল, সবই হইতে পারিত।
রংটুকু, আর বাপের আদরটুকু, লইয়া আসিয়াছিল বলিয়া
কোথাও আপনাকে খাপ খাওয়াইতে পারিল না। না
বুঝিয়া জীবনটাকে আপনার আপনিই ব্যর্থ করিয়া ফেলিল।
জাগরণের প্রথম প্রভাত হইতে তাহার অশ্রু, আজ ও
তাহার অমাত্রই সম্বল•••সারা জীবনটাই সে কঁদিয়া
অতিবাহিত করিবে।
এমন সময় হঠাৎ আবার বিহারীর ব্যায়াম বাড়িয়া
গেল। কদিন হইতে তাহার চক্ষের জল আর থামিল
না। কথা কহিবারও সাধ্য নাই। কি যে বেদনা তাহা
জানাইবারও কাহাকেও সে সামর্থ্য নাই। বাড়ীর লােকে
আবার ডাক্তার ডাকিতে গেল।
এর আসিয়া কহিল, এ সেই সন্ন্যাস রােগই--তবে
এ দেড়বৎসর বিয়ের ঘােরেই পড়েছিল। শেষ মুহূর্তে,
সম্ভব, খুব অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান ফিরিয়া আসিতে পারে-
ক
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ ৭৭ অনিন্দ্যা পিতার পায়ের উপর পড়িয়া কাদিতে লাগিল বাবা আমার কি উপায় করে বাবে গাে। বিহারী দুই হাত দিয়া অনিন্দ্যার মাথাটা নাড়িয়া দিতে লাগিল যেন এ একটা তার সান্ত্বনা দেওয়া•••বাছা কি করবি বল এষে তাের নিয়তি। বিহারীর ভগ্নী রাণীসুন্দরী কহিল, “দাদা আবার তােমার সুখের দিন ফিরে আসবে তুমিই শুধু তা দেখতে পাবে না! অদৃষ্টের বিড়ম্বনা।••• সূৰ্য্যকান্ত আসিয়া কহিল, তােরা চুপ ক ও একটু শান্তিতে মরু। ওর যা সুখ হবে তা ওর আর জানতে বাকী নাই। আবার ওর জামাই আসবে, মেয়ের সুখ হবে, হৃ••• রাণী কহিল, দেখি দেখি আমার এ বাক্যি মিথ্যে হবে না। বিছানার উপর পড়িয়া বিহারী ইঙ্গিতে সূৰ্য্য- কান্তাকে ডাকিল। সূৰ্য্যকান্তের কাণের গােড়ায় মুখটা লইয়া অস্পষ্টস্বরে কহিল রাসবিহারী রাসবিহারী তাহার পুত্রের নাম। রাস আসিলেই পুত্রের একটি হাত ধরিয়া, অনিন্দ্যার একটি হাত ধরিয়া উভয়ের মুখের দিকে ফ্যা ফ্যাল করিয়া
মণিহারা
;
চাহিয়া রহিল, যেন ইঙ্গিতে জানাইতে চায় ; “রাস অনিন্দ্যা
রহিল ইহাকে দেখিও।
ডাক্তার কহিল, বুকের এমন একটা নারী ছিড়ে গেছে
যাতে কথা কইবার আর কোন সামর্থ্য নাই। ও কিহৃদয়
হীন জামাতা।
রাসবিহারী কহিল জামাতাকে হৃদয়হীন কি করে
বলি বলুন। তিনি যখন জামাই মাত্র, বলুন যে আশ্চৰ্য্য
অদৃষ্ট এই কালো মেয়ের•••ও যে পথ দিয়ে চলে যাবে সে
পথের মাটি পৰ্যন্ত জল শুকিয়ে যাবে। আমাদের গো-
স্থালীটা ছারখার হয়ে গেল।
দাদার স্নেহ যে কতদূর পৌঁছিবে। অনিন্দ্যা এইখানেই
তাহার কতকটা আন্দাজ করিয়া লইল।
কিন্তু সে অনু-
যােগ করিবে কাহার কাছে যাইয়া? • মা থাকিলে বরং মাকে
একটা কথা বলা চলিত। অভাগিনীর কপাল দোষে মা-ও
আগে হইতে চলিয়া গিয়াছেন।
একদিন অনিন্দ্যার পিসী কহিল, “অনিন্দ্যা আমার
সঙ্গে কলকাতায় যাবি, সেখানে তাের স্বামী রয়েছেন,
হাজার হােক স্বামী বটে ত কেঁদে কেটে পরলে আর
কোথায় ঠেলে ফেলৰে।•••একটু ঠাই দেবেই দেবে। এর
দাসী চাকরও ত একটা রাখতে হয়। •••
দাদশ পরিচ্ছেদ ৭৯ স্বামী থাক- অনিন্দ্যা প্রথমটা ঘাড় নাড়িয়া সম্মতি দিল, বলিল যাইব। তার পর কি ভাবিয়া হঠাৎ তাহার পিসীমাকে কহিল, “না পিসী ও কথা আর বলো না। তেও যখন স্বামী অদৃষ্টে নাই তখন স্বামীর কাছে ভিক্ষা করতে যাবাে ? ভিক্ষে করতে হয় এইখানেই করবাে। এত আমার বাপের ভিটে বটে, এখানে আমার কোন লজ্জা নাই! এইখানেই ধানসিদ্ধ করবো, মুরি চাল ভাজবে। দুবেলা হরিনাম নেবো। আমার এইখানই ভালো। রাণীসুন্দরী মনে করিয়াছিল একবার বেয়ে চেয়ে দেখিব। ইতিমধ্যে বিহারীর মৃত্যু হওয়াতে, সব গোলালে চাপা পড়িয়া গেল। সে মস্তফা, রাণীসুন্দরীর অনিন্দ্যাকে কলিকাতা লইয়া যাইবার আশা ত্যাগ করিতে হইল। এ জগতে অনিন্যার যে একটা আশ্রয়স্থল ছিল, তাহাও ভাঙ্গিয়া গেল। এখন কেবল কাতুক অগিনী। চক্ষের জলে আপনার পাতকের প্রায়শ্চিত্ত করুক। স্বামী ত ত্যাগ করিয়াছেনই—মানুষেও কোন্ দিন আবর্জন বলিয়া ত্যাগ করে।•••তুমি বলিবে অনিন্দ্যার কি দোষ সে বালিকা ছিল। বালিকা বুদ্ধিতে যাহা করিয়াছে তাহার কি ক্ষম। নাই ? কিন্তু নাই। যখন বাঙ্গালীর ঘরে কন্যা হইয়া
মণিহারা
জন্মিয়াছ তখন মাতৃন্ত, হইতে তাহাম স্বামীর ঘর স্বামীর
সংসার চিনিতে পারা উচিত ছিল।
কঁদো অভাগিনী, দেশের মানুষ তােমার দুঃখে গলিকে
। কালাে রূপ লইয়া আসিয়া আরও অমার্জনীয়
অপরাধ করিয়াছ।
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
অনিন্দ্যা মনে করিয়াছিল হাজার দুঃখ কষ্টের মধ্যে সে
বাপের ঘরেই থাকিবে। বাপ মৃত্যুকালে যে ভাইএর হাতে
হাতে তাহাকে সপিয়া গিয়াছে, সে ভাই তাহাকে আশ্রয়
দিবে; অন্ততঃ একমুষ্টি, অল্পের কাঙালিনী হইয়া তাহাকে
শশুর বাড়ীর দিকে মুখ করিয়া থাকিতে হইবে না।
কিন্তু অদৃষ্ট যাহার গােরা হইতে বাদী, তাহার আবার
;
পিতার মৃত্যুর পর হইতে ভাই রাসবিহারী তাহার উপর
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ
৮১
এমন তর্জন গর্জন আরম্ভ করিল, যাহাতে বােঝাইতে
লাগিল সেই যেন তাহার পিতার মৃত্যুর একমাত্র কারণ।
অনিন্দ্যার আশা ভাঙ্গিয়া গেল। দেখিল যে ডাল
আশ্রয় করিয়া সে একটু বাঁচিতে চাহিতেছে, সেই ডালই
ভাঙ্গিয়া যাইতেছে। ছেলে বেলায় গল্পে, যে সমস্ত দুঃখিনী
কঙ্কাবতীর কাহিনী শুনিয়াছিল তাহাদের সকলেরই শেষে
একটা না একটা আশ্রয় মিলিয়াছিল। কিন্তু তাহার আশ্রয়
মেলা ত দূরের কথা, নিজের সহােদর ভাইএর দৃষ্টি পৰ্য্যন্ত,
তাহার দিকে চাহিয়া বিষ হইয়া গিয়াছে। এত বড় কঠিন
বাস্তবের সম্মুখীন কখন হইতে হইবে—অনিন্দ্যা তাহা
কল্পনাও করে নাই। নিজের অদৃষ্টের দিকে চাহিয়া নিজেই
আশ্চর্য হইয়া গেল। অনিন্দ্য। তাহার সইকে ডাকিয়া
সব ভাঙ্গিয়া বলিতে লাগিল। দাদার সে দিনকার বউটা
পর্যন্ত যে তাহাকে দশকথা শুনাইতে আরম্ভ করিয়াছে
তাহাও বাদ পড়িল না।
সই কহিল শুনবে ভাই। তবে শােনো। আমরা জানি
মেয়ে মানুষের স্বামীর ঘরই একমাত্র চরম আশ্রয় স্থল।
সুখে,দুঃখে, আনন্দে বেদনায়, সেখানকার ধুলামাটি পৰ্যন্ত যে
আশ্বাস দেয়, বাপের ঘরের সােনার সিংহাসনে ও বুঝি সে
আখাস দিতে পারে না। তারা যেন বলে
তারা যেন বলে তুই আমাদের
•
মণি-হারা
আমাদের দুঃখের ঘরেও তুই থাক। পারবি কি ভাই? স্বামী
ত্যাগ করেছেন,করুন•••তার ভিটে করে পড়ে থাকতে ?
পারো যদি নিশ্চয় বলছি একদিন কুল পাবেই
অনিন্দ্য প্রকাশ্যে কিছু বলিতে পারি না। কিন্তু
মনে মনে ঠিক করিল, সইএর কথাটা একবার পরখ করিয়া
দেখিতে হইবে। তাহা ছাড়া, শুধু ভাতের টান ব্যতীতও
আর একটা কেমন টান তাহায় নারীতে বাজিতেছিল ; ইচ্ছ।
করিয়াও অনিন্দ্যা পিছাইয়া আসিতে পারিতেছিল না। যেন
দিগ্বিজয়ী ঠাকুর, তাহার রথ হাঁকাইয়া রাজপথের উপর দিয়া
চলিয়াছেন, হাজার লােক রথের কাছি ধরিয়াছে, সে কাছি
ধরিতে পারে নাই তবু ভিরের মধ্যে তাহার অঞ্চল বাধিয়া
গিয়াছে। তাহাকেও যাইতে হইবে। ওগাে ঠাকুর দয়া-
কর। পাছে ফেলে রেখােনা! দয়াল দেবতা সঙ্গে নাও।
সঙ্গে নাও!
সেদিন রাসবিহারী আর তাহার পত্নী একসঙ্গে কহিল,
এরকম সারাদিন এখানে কঁদিয়া কাটিয়া চলিবে না।
আপনার পথ দেখিয়া লও। তুমি যেখানেই থাকিবে, সেই
খানেই আগুন লাগিবে।
অনিন্যা কহিল কোথায় যাবো, তাই বলিয়া দাও।
আমার কোথায় আশ্রয় আছে।
-
ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ
৮৩
রাসবিহারীর বউ কহিল, কেন শ্বশুর বাড়ী
রাসবিহারী স্বয়ং কহিল, শ্বশুর বাড়ীতে না পােয়,
যমের বাড়ী চলে যেতে পারে, তাতেও কারও আপত্তি
নাই । তুমি এই যে কবছর এখানে আছে,সে কবছর মাঠের
দুৰ্বাটি অবধি ফলিতেছে না—ফশল হওয়া ত দূরের কথা-
অনিন্দ্যা আর অনুযােগ করিল না।
পাতাসী বাদিনী তাহার শ্বশুর বাড়ী চিনিত,
পাতাসীকেই ডাকিয়া পাঠাইল। পাতাসীকে চুপি চুপি
কহিল পাতাসী পারিবি। দেখছিস দুর্গতির আর সীমা
নাই, তাই ভাবছি শেষ দেখিয়া তারপর মনে যা আছে তাই
করিয়া যাইব। আমি ত সে গ্রামের পথ ঘাট ভাল চিনিনি,
আর তুইও, সঙ্গে একবার গিয়েছিলি। তােকে সবাই
নেও।•••
পাতাসী কহিল যাইব।
অনিন্দ্যা কহিল তবে ভােরের বেলায় আসি।
অনিন্দার ত সম্বল এখানে কিছুই নাই। শ্বশুরবাড়ী
হইতে যে সব জিনিষ পাইয়াছিল, ভাজঠাকরুণ তাহা দখল
করিয়া বসিয়াছেন। নিজের সম্বলের মধ্যে দুখানা মােটা
কাপড়, আর শ্বশুর বাড়ীর সম্বন্ধের দিনের একখানা পাতলা
সাড়ী, ঐখানি মাত্র পড়িয়া কোথাও যাওয়া যাইতে পারে-
-
৮৪
মণি-হার।
অতিথি হইয়া কোন গতিকে স্বামীর ভিনম একটু স্থান
করিয়া লইতে চলিয়াছে, তাহার পক্ষে এ আর ভাল কাপড়
পড়িয়া যাওয়া সাজে না। গহনা গাটি যাহা ছিল তাহাও
দাদা মহাশয় খােরাকী বাবদ কাটিয়া লইয়াছেন। গহনার
দিকে অনিন্দ্যার ঝোক ও কথন ছিল না। তবু ভাবি
সােনার বালা দুগাছি যদি দেয়,•••হাজার হােক সে সধবা ত ?
দাদার কাছে চাহিতেই ভাজঠাকরুণ এমন উত্তর দিল,
আর ও বালার কথা অনিন্দ্যা মুখেও আনিতে পারিল না।
কেবল কহিয়া আসিল কাজ নাই। তােমরা পরিয়া সুখী
এত লাঞ্ছনা এত গঞ্জনা-তবু ভােরের বেলায় যখন
এই বাড়ী জন্মের মত ছাড়িয়া যাইবে বলিয়া জাগিয়া উঠিল ;
তখন কেন তাহার বুকের ভিতরটা এমন করিয়া মুষরিয়া
উঠিতে লাগিল ? সারারাত্রি সে কঁদিয়াছে বটে,কিন্তু এমন
ধারা তাহাব ভিতরটায় ত রক্ত পাত হইয়া যায় নাই, যেন
তাহার ভিতরকার নারী হৃদয়টার দম বন্ধ হইয়া মরিবার
উপক্রম হইল ! যেন প্রাণ বায়ুই বা বাহির হইয়া যায় ।
দুঃখ যাহার ললাট নিয়তি—এত শীঘ্র মরিবারই তাহার
সে অবসর কোথায় ?
আজম্মের স্মৃতি সব, মুহূর্তে অ অ করিয়া উঠিতে
এয়ােদশ পরিচ্ছেদ
লাগিল।
ওই পেয়ারা গাছটির তলায় ছেলে বেলা হইতে
খেলাপাতি সাজাইয়া আসিয়াছে, ঐখানে তাহার সেদিন
অবধি সেই ঘর কন্নার সামগ্রী পড়িয়াছিল। ধানের
গােলার পাশে তার সঙ্গিনীদের লইয়া খেলিতে বাসত,
ফটিক গণেশ কতজনে তাহার হাতের বাঁধা ভাত খাইয়া
আনন্দ করিয়া গিয়াছে। আর ঐ যে বড় ঘর খানি,ঐখানে
তাহার কত যে স্মৃতি, চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া আছে,কে তাহার
সংখ্যা করিবে? ঐবরেই তাহার বাসর হইয়াছিল, ঐ ঘরেই
আবার তাহার বাপের শেষের শয্যা পাতা ছিল ; আর ঐ
কোনটিতে কখন কখন বাপকে ফেলিয়া ভাবিতে বসিত।
পৃথিবী যেমন চলে, তেমনি চলিবে, এ গ্রামের একজনার ও
অনিন্দ্যার বিয়ােগ হেতু বাজিবে ন!! সবাই হাঁপ ফেলিয়া
বলিবে আপদের বিদায় হইয়া গিয়াছে।
ঘাটের পথে পুরনারীরা কোলাহল করিতে করিতে
যেমন প্রত্যহ চলে তেমনি চলিবে, অনিন্যার কথা কেই
আলােচনাতেও আনিবে না। নদীর জলে আবার কত
অনিন্দ্যা নাহিয়া যাইবে। এ অনিন্দ্যার খোঁজও হইবে
। গ্রামের ঘাট বাট প্রত্যেক স্থানের স্মৃতি অনিন্দ্যার
মনে চিরকাল জল জল করিতে থাকিবে। শুধু তাহারাই
মনে রাখিবে না। মনে রাখিতেন যিনি, ভাল বাসিতেন
৮৬
মণি-হরা
যিনি, তিনি যখন চলিয়া গিয়াছেন-তখন আর কে
অনিন্দাকে মনে করিয়া রাখিবে ?
ঘরের বাহির হইয়া অবধি অনিন্দ্যার কত কথাই মনে
হইতেছিল। সহসা সম্মুখের পিতৃশ্মশানের দিকে দৃষ্টি পড়ায়,
পাতাদীকে কহিল, দাড়াও, বাবার শ্মশানটাতে প্রণাম করে
আসি—তখনও গাছে পালায় একটু রাত্রি ছিল। পাতা
দুর্গানাম করিতে করিতে দাঁড়াইয়া রহিল।
অনিন্দ্যা চিতার সম্মুখে নতজানু হইয়া প্রণাম করিয়া
কহিল, বাবা জন্ম জন্মান্তরে যদি, মানুষ হইয়া জন্ম নিই বাব
তবে তােমাকেই যেন বাবা পাই, আর তুমি যেন এমন
কন্যা না পাও। এই কন্যার দুঃখে এক দিন সুখ পাও নাই ;
কোটী কোটী চরণে প্রণাম করি বাবা।•••আমি তােমার
চরণে কোটী কোটী অপরাধে অপরাধীনী।...
পাতাসী ডাকিল এসােগে বেলা হয়ে যাবে।
অনিন্দ্যা কহিল, যখন বেরিয়েছি তখন যাবােও..তবে
দুদণ্ড বাবার চিতাটার সামনে দাড়িয়ে একটু কেঁনে নিই ,
আহা বাবা আমার ত নয় যেন দেবতা ছিলেন।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
৮৭
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
পথে আসিতে আসিতে অনিন্দ্যা জিজ্ঞাসা করিল, হা
পাতাসী দিদি, পথে কোথাও গঞ্জ টঞ্জ মেলে না—তাহলে
তুই দুটো খাওয়া দাওয়া করে নিতিস্।
পাতসী কহিল রাস্তা ত সামান্য ক্রোশ তিনেক হবে,
জলখাবারের বেলা নাগাই পৌছে যাবে, দরকার কি
গং,-
অনিন্দ্যা কহিল দ্যাখ, বেরিয়ে এসেছি যখন, তখন
শ্বশুরের ভিটেতে যাবােই—তবে বলছিলাম কি সন্ধ্যে নাগাদ
যেতে পারলেই যেন ভাল হতাে, এ দিন মন,পাড়ার লােক
সব ভেঙ্গে পড়বে ..একত তাদের কোন আহ্বান নাই, পত্র
নাই। যাচ্চি মুখ লুকিয়ে•••আঁধাররাত হলে ভাল হয়
না ?-তুই ভেবে দেখ না পাতাসী-আমি আর কি
বাবা-
পাতাসী ভাবিয়া কহিল তুমি মন্দ বলো নাই অনিন্দ্যা-
একটু গা ঢাকি আঁধার হলেই যেন ভাল ! গায়ের ভিতর
দিয়ে দিনের বেলায় যেতে হবে। কতজনে কে গা,-কাদের
বো, কি বৃত্তান্ত জানতে চাইবে। বারুইপুরের কাছে যে
গােপালগঞ্জ আছে সেই খানেই দিনমানটা কাটিয়ে দেওয়া
মণি-হারা
যাবে। দুপয়সা
দুপয়সা দিলেই একবেলার দরুণ থাকবার ঘর
ভাড়া পাওয়া যায়। ভাবনা কি ?-আর তোমারও ত
হাটা হাটি বড় একটা অভ্যেস নাই।
অনিন্দ্যা কহিল,না।
পাতাসী খানিক বাদে পথে চলিতেই চলিতেই কহিল
ক-বছর আগে যদি, আজকের মত এম্নি বুদ্ধিটুকু তােমার
হতে অনিন্দ্যা•••তাহলে আজ এমন ধারা মুখ লুকিয়ে
তােমায় যেতে হতো না.••জমিদার বাড়ীর বৌ, কত পাল্কী
ঘােরা ছুটতাে তোমার সঙ্গে-
অনিন্দ্যা কহিল বরাত।••"তুই আমি কি করবো
বল্••দেখলি ত বাবা আমার, তার মেয়ের জন্য খরচ
পত্র করতে কসুর করেন নাই, চেষ্টারও বাকী
রাখেন নাই, তা এ পােড় কপালে সুখ নাই কি করবাে?
স্বামী থাকতেও স্বামী পেলাম না শ্বশুরের ভিটে থাকতেও
একট আশ্রয় নাই। দ্যাখ পাতাসী যত কিছু অদৃষ্ট!
পাতাসী কহিল তা যা বলেছ। আমাকে দিয়েই দেখ
আমার অসুর অবতার স্বামী ছিল। দেশে কলেরা
এসে ভরা ষােল বছরে বিধবা হয়ে গেলাম•••সে আর
কতদিনের কথা • নইলে আমাকেই কি আজ দেশে দেশে
ঘুরতে হতাে,আমারি ভাত কে খায় তার ঠিক নাই,পাতাসী ও
চতুর্দশ পরিচেছদ
অদৃষ্টের আলােচনায় আপনার জীবনের দুঃখের কাহিনী
খুঁটিয়া খুঁটিয়া কহিয়া যাইতে লাগিল । পথের কষ্ট চক্ষের
জলে ভাসিয়া যাইতে লাগিল।
গােপালগঞ্জে প্রবেশ করিতেই চারিদিক হইতে দোকান
দাররা ডাকিতে লাগিল। এসো গো মাঠাকুরাণরা আমাব
ঘরে ভাল খাবার দাবার থাকবার বন্দোবস্ত আছে।
পাতাসী সকলকে হাত নাড়িয়া অসম্মতি জানাইয়া,
তাহার পরিচিত এক দোকান ঘরে উঠিয়া পড়িল ।
দোকানদারকে কহিল, দণ্ড দুই এখানে থাকিব তারপর
উঠিয়া যাইব।
পরিচিত খরিদ্দার বলিয়া দোকানদার আশ্রয় দিতে
মােটেই ইতস্ততঃ করিল না। পাতাসীর পশ্চাতের ভদ্র
ঘরের মেয়েটীর দিকে নজর পডিয়া আরও বরং বেশী কিছু
খাতির করিয়াই জায়গা দিল।
তারপর পাতাসীর পরিচিত রামীর মা বামীর মা, ঝির
দল, আসিয়া পাতাসীর সহিত আলাপ জমাইয়া তুলিল।
অনিন্দ্য পাতাসীকে আপনার পরিচয় দিতে বারণ করিয়া .
ছিল। পাতাসী অনিন্দ্যাকে কলু বৌ বলিয়া লােকের কাছে
জানান দিতেছিল।
একজন টেরিকাটা টপ্পাবাজ মােকদের ছােক বলিল
মণি-হারা এতো কলু বৌ বলে ধরবার যাে নাই—পাতাসী, এ যে একবার সাক্ষাৎ শ্যামা মা। পাতাসী অনিন্দ্যাকে ঘরের দিকে বসিতে বলিল। অনিন্দ্যা দেখিল জগতে তাহার অপেক্ষাও দুঃখী, মানুষ বাঁচিয়া রহিয়াছে, তাহারা প্রতিদিন প্রত্যুষে কাছের গ্রাম হইতে উঠিয়া আসিয়া, এই গঞ্জের দোকানদারদের ঘর ঝাটানো বাসনমাজা কাজগুলি সারিয়া যায় ; বিনিময়ে যে পয়সা পায় তাহাতেই তাহাদের দিন গুজরাণ হয়। হাজার দুঃখ কষ্টের মধ্যেও হাসিমুখ লইয়া তাহারা চলিয়া যাই- তেছে। অনিন্যা পাতাসীকে ডাকিয়া কহিল, চলো পাতাসী আর বেলা নাই। পাতাসী উঠিয়া অনিন্দ্যাকে কহিল। কিছু মিষ্টি সন্দেশ নিয়ে যাবে না? সেখানে তােমার বড় যার দুটো ছেলে পিলে আছে। অনিন্দা কহিল তাও বটে। কিন্তু পাতাসী হাতে যে একটি পয়সা নাই। পাতাসী কহিল। আচ্ছা সে পয়সার জন্য ভাবনা নাই ওনি হাতেই কি যাওয়া যায় ? ময়রাকে রসগােল্লা ও পানতুয়ায় দেড়সের দিতে বলিল।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
ক!
অনিন্দা কহিল, অনেক দাম হবে না?
পাতাসী কহিল তা হােক। এখন এসো।
অনিন্দ্যা কহিল। আমি সইএর কাছে একটা টাকা
পাবে, চাইবার কথা মনে হয়। তুই আমাধু
নিস্।
পাতাসী কহিল তাই নিব। সে টাকা পাইবার প্রত্যাশা
না করিয়াও নিজের পয়সা দিয়াই সন্দেশ কিনিয়া লইল।
অথচ সেটুকু ভাঙ্গিয়া অনিন্দ্যাকে বলিল না।
না। হাজার
দুঃখী কাঙ্গালী সে হউক, তাহার মধ্যে ত মনুষ্যত্ব 'একট,
আছে-
সন্ধ্যার অন্ধকারে, যখন তাহার গ্রামে ঢকিল ।
তখন পল্লীগ্রামের পথে লােক চলাচল বড় একটা নাই।
এখানে সেখানে দুপাঁচজন পাড়ার ছােকরা একটা একটা
ঘরের বাহিরের রােয়াকে বসিয়া জটলা করিতেছে তামাক
খাইতেছে, যাহার কৌতুহল হইতেছে, পথিক দিগকে
কোথা যাবে কাদের বাড়ী যাবে, বলিয়া প্রশ্নও করিতেছে।
পাতাসী সকলকে এক উত্তর দিল, বড় বাড়ী যাইব।
বড় বাড়ীর উপর আর কাহার কথা কহা চলে না, চুপ
করিয়াই যাইতে লাগিল।
৯২
মণি-হারা
বাড়ীর দুয়ারে আসিয়া কিন্তু, অনিন্দ্যার বুকের ভিতরটা
ভয়ে, বেদনায় দূর দূর করিয়া কাপিয়া উঠিল, সন্ধা
বেলা হইতেই তাহার বুকটা গুর গুন্ করিতেছিল বটে,
কিন্তু এমন ধারা নয়।
একদিন যে সে এখানে রাজ্ঞীর গৌরবে প্রবেশ করতে
পারিত সে কথা তাহার মনে হইতেছিল না। তাহার
মনে হইতেছিল এই,বড় বাড়ীর চারিদিক হইতে যদি একটা
ব্যঙ্গ উচ্ছসিত হইয়া তাহাকে ধিক্কার দিতে আইসে ; তাহা
হইলে সে কোথায় দাড়াইবে ? তাহা হইলে, তাহার
একুল ওকুল দুকুলই যে নাই। তাহার মনে হইল
যেন সে সর্বনাশের সাগর কিনারায় দাড়াইয়াছে, মাত্র
একটি ঢেউয়ের অপেক্ষা—তারপর সব শেষ•••কিন্তু যদি
ভগবান করুণা করেন, তাহা হইলে সে বাঁচিতেও
পারে।
অনিন্দ্যা পাতাসীকে কহিল, খিড়কীর পথ দিয়া চলো,
সম্মুখ দিয়া নয়।
অনিন্দ্যা খিড়কীর দুয়ারের কাছটিতে দাঁড়াইয়া রহিল,
পাতাসী বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া খবর দিতে গেল ।
আর এক মুহুর্ত মাত্র সময়, এই এক মুহুর্তের মধ্যে অনি-
দ্যার নিয়তি লিপির আর একটা অধ্যায় সমাধা হইয়া
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
যাইবে। সান্ধ্য আকাশের নক্ষত্র গুলি যেন করুণা বি.
লিত নেত্রে অনিন্দ্যার দিকে চাহিয়া রহিল ।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
রম। তখন সন্ধ্য বেলায় রান্নাঘরে ছেলেদের দুটি
খাওয়াইয়া লইতেছিল। একে ম্যালেরিয়ার সময়, তাহাতে
ও এক বার অসুখও তাহাদের হইয়া গিয়াছে। রমা তাহার
সংসারে ছেলে ক টিকে লইয়াই কা কাটাইতেছি,
কালো বউ এর অদৃষ্টে কি ঘটিতেছে না ঘটিতেছে, এই
লইয়া মাথা ঘামাইবার সময় কখন তাহার হয় নাই।
পাতাসা বাড়ী প্রবেশ করিয়া ডাকিল, কইগে! বাড়ীতে
কে আছে।• • •আমরা এলাম।
রমা ঘরের ভিতর হইতে কহিল কে গা তােমরা
পাতাসী কহিল একবার বাইরে বেরিয়ে এসেই দেখ না—
“ওম এযে পুষ্প গ্রামের দেখছি সব ভাল আছে?”
পাতাসী সন্দেশের হাড়িটা রােয়াকে রমার সামনে
নামাইয়া কহিল, হ। আমি একলাই আসি নি বাছা,
তোমাদের মেজো বউ শুদ্ধ এসেছে-
১৪
মণি-হারা
“মেজো বউ ? বলকিগাে কোথায় ?
পাতাসী কহিল, বাইরে দাড়িয়ে রয়েছে, এখন তােমরা
আশ্রয় দিলে দাড়ায় কোথায় ?•• বাপের ঘরে এদ্দিন ছিল
তা বাপও ত আর নাই।
“ওমা আসবে বই কি?•••এও ত তাই ঘর সংসার,
পুত্র বিশ্বেশ্বরকে কহিল ওবিশু তাের কাকীমা এসেছেন বুঝি
ডেকে নিয়ে আয়, আমি ততক্ষণ হাতটা ধুয়ে ফেলি,
বিকেও ডাকিতে যাইতে হইল না। অনিন্দ্যাই আসিয়া
রমার চরণে প্রণতা হইল।
রমা হাত ধরিয়া উঠাইয়া কহিল, ওমা এষে
বারে চেনবার যে নাই। তিন বৎসর আগেকার
মেজেবউ ত এ নয় । হায় হায় এমন প্রতিমা খানি
দেখতে পেলে, বুঝি ঠাকুরপােকে আর একটা বিয়ে করতে
হতাে না।-হত ধরিয়া ঘরে উঠাইয়া লইয়া গেল।
বরের আলােতে দেখিল, নারীর দুই চক্ষু বহিয়া জলের
ধারা ছুটিয়া যাইতেছে। তা কঁদিবারই কথা—এ যে নিজের
ঘরে নিজে অতিথি—এতবড় বেদনা আর কোথায় আছে-
বা পাতাসীকে কুয়ারপারে পা ধুইয়া আসিতে ও বসিতে
বলিয়া বিশু পুটিকে কহিল, যা তােরা তােদের খুড়ি-
মাকে প্রণাম করে আয়।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
বিশু কহিল, কোন্ খুড়িমামা ?
রমা কহিল পুষ্পগ্রামের
“বিশু ঘাড় নাড়িয়া কহিল, দিদিমা যাকে বলে কালে।
বউ।”
রমা পুত্রকে
পুত্রকে একটা ধমক দিয়া কহিল, যা বল্লুম
নে আয়।
বিশু পুটি দুজনেই তাহার কাকীকে প্রণাম করিবার
জন্য সম্মুখে দাড়াইতেই, কাকীমা তাহাদের কোলে তুলিয়া
অজস্র চুম্বন করিয়া ফেলিল।
বিশু তাহার খুড়িমার কোলে বসিয়া কহিল, দিদিমা
ত এখানে নাই কাকীমা, দিদিমা কদিন হলো কলকাতায়
চলে গেছে। জালে কাকীমা, দিদিমা বড় আমাদের
বকেন!
পাতাসী পা ধুইয়া আসিয়া কহিল, গিন্নী মা কি
এখানে নাই নাকি বড় বউ ?
রমা কহিল, তিনি ত এখানে বড় একটা থাকেন
, কখন কার অসুখ বিসুখ হলে এক আধবার দেখা
দিয়ে যান।তা ও দুপাঁচ দিনের মত।
রমা পাতাসীকে জল খাবার দিয়া, কিছু মিষ্টান্ন লইয়া
অনিন্দ্যার কাছে আসিল।
'
মণি-হারা
অনিন্দ্য জোর হাত করিয়া কহিল, দোহাই দিদি
মাপ করাে; আগে দেখি ভাগ্যের বিধান কতদূরে-
রমা কহিল ভাগ্যের কি দেখবে তুমি? তােমার
ঘর তুমি এখানে এসেছ, থাকবে...তাতে কারও কিছুই ত
বলবার নাই •••কর্তা ত, মাঝে একবার তােমায় নিতে
লােক ও পাঠিয়ে ছিলেন, তখন তােমার বাপের অসুখ,
ভাইরা বুঝি বলে দিয়েছিল পাঠানাে হবে না।” কৰ্ত্তা ত
মাঝে মাঝে প্রায়ই তােমার নাম করেন।
রমা চলিয়া গেলে অনিন্দ্য সকল মিষ্টান্নটুকু বিশু
পুটু দুই ভাই বােনকে ভাগ করিয়া খাওয়াইয়া দিয়া
নিজে একটু জলমুখে দিয়া ডাকিল, দিদি।
রম রান্না ঘর হইতে কহিল, যাচ্ছি ভাই অনেক
কথাই তােমার সঙ্গে আছে, হটো ভাত চড়িয়ে দি, সঙ্গের
মেয়েলােকটিও এসেছেন। আর ত ঝি বামুন রাঁধুনী
নাই, এখন নিজে নিজেই সব রান্না বাড়া করে নিতে
মেজো বউ
উপরে কর্তা আহ্নিক করিতেছিলেন।
কথাটা অম্লাধিক তাঁহার কাণে গিয়াছিল। তিনি বিশুর
নাম ধরিয়া উপর হইতেই কহিলেন। বিশ্বেশ্বর বাড়ীতে
কে এলো ভাই!
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
৯৭
রমা অপেক্ষাকৃত কিছু চাপা গলায় বিশ্বেশ্বরকে কহিল, বল
তাের দাদা মশাইকে, পুষ্পগ্রামের মেজো খুঁড়িমা এসেছেন।
বিশ্বেশ্বর চেঁচাইয়া কহিল, পুষ্পগ্রামের মেজো খুড়িমা
দাদামশাই...বিশু তাহার মাকে কহিল, মা খুড়িমা দাদা-
মশাইকে প্রণাম করতে যাবেন না ?
রমা কহিল, যাবে বৈ কি।
বিশু আবার চেঁচাইয়া কহিল, তােমাকে এখুনি খুড়িমা
প্রণাম করতে যাবেন দাদা মশাই !
কর্তা হরকুমার তাহাদিগকে শােনাইয়া একটু উচু
গলায় কহিলেন। এত দিনের পর শ্বশুর বাড়ীর সংসার
বলে মনে পড়েছে ?-সবুদ্ধি যে ঘটে এসেছে তবু
ভালো। বড় বউকে কহিয়া দিলেন, ওগাে বড় বউমা।
একটু বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখে দিও বাছা।-বেচারীর পিতা-
ঠাকুরটিও মারা গেছেন !
বাবার নামে অনিন্দ্যার বেদনা উচ্ছসিত হইয়া উঠিল ।
ফোঁপাইয়া কঁদিয়া ফেলিল।
রমা তেমনি চাপা নিচু স্বরে কহিতে লাগিল। এই
বার আপনি ওর বাবা হােন্। এতদিন ছেলে বলে ত
মনে পড়েনি। ছেলে যখন লাজ লজ্জার মাথা খুইয়ে
এলো, তখন আদর করে রেখে দিন।
১৮ মণি-হারা বৃদ্ধ, রমার কথা শুনিতে পাইয়াও কিছু উত্তর দিতে পারিলেন না। উত্তর দিবে যে, সে এখন তাহার নব- পরিনীতাকে লইয়া কলিকাতায় পড়িয়া আছে। বৃদ্ধ আবার আহ্নিকে বসিয়া গেলেন। বাড়ীর সকলের খাওয়া দাওয়া হইলে পর, রমা অনি দ্যাকে ডাকিয়া, তাহাদের রাত্রের আহার সারিয়া লইল। তারপর একটা ঘরে অনিন্দ্যাকে বসাইয়া রাখিয়া কহিল তুমি একটু অপেক্ষা করে। আমি আসতেছি। বলিয়া চলিয়া গেল। অনিন্দ্য ঘরের চারিধার তাকাইয়া-বুঝিল এই ঘরেই তাহার ফুলশয্যা হইয়াছিল। সে কতদিনকার কথা, ঘরের সকল দ্রব্যেরই নাড়াচাড়া হইয়া গিয়াছে। ফুলশয্যা রাত্রির একটা চিহ্নও আজ চক্ষে পড়ে না। একটা শুষ্ক ফুল অবধি না। রমা আসিয়া কহিল, এখনও বসে রয়েছ মেজ বউ । আমি একটু কৰ্ত্তাটির পায়ে তেল দিয়ে আসতে গিয়েছিলুম একটু পায়ে তেল না হলে তার ঘুম হয় না, কৰ্ত্তাটি কে বুঝেছ ? তােমার ভাঙ•• অনিন্দ্যা কহিল, প্রতিদিনই দিয়ে দিতে হয়? কথাটা বলিয়া ফেলিয়া কেমন অপ্রতিভ হইয়া গেল। রমা কহিল, রােজই নয় ত কি একদিন? তুমিও যদি
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
৯৯
কোনদিন কাটিকে পাও তখন বুঝবে।
এ যে নারীর
কৰ্তব্য—ভাই।
অনিন্দ্যা হাসি, কান্নায় মিশাইয়া কহিল, “আমি ত আর
সে সুযােগ জীবনে পাই নি•••জীবনে পাবাে যে কখনাে সে
আশাও নাই, জান্তাম না দিদি, আমায় মাপ করাে।
রমা হাসিয়া কহিল, পাগল ! বিছানাটা পাতিয়া দিতে
দিতে কহিল, মনে পডে মেজ বউ, এই ঘরে তােমার ফুলশয্যা
হয়েছিল ?
অনিন্দ্যা কহিল মনে পড়ে, কতদিনের কথা •••তবু
চোখের সামনে সব যেন ঝছে।
রমা কহিল কি করব ভাই, ঠাকুরপােরও ঠিক বিবা-
হটা কার ইচ্ছা ছিল না। ঐ যে তার মা-টি, তার আর
সবুর সৈল না। ছেলেটির বিবাহ দিইয়ে দিলেন তবে
ছাড়লেন।তােমাকে ত রান্না ঘরে বসে সব কথাই বলেছি।
বাস্তবিক মেয়েমানুষ হয়ে মেয়েমানুষের কদর তিনি
বুঝলেন না।
অনিন্দ্যা কহিল, আমিও তােমায় একেবারেই বলেছি ত
দিদি। অদৃষ্ট। অদৃষ্ট ছাড়া দেখলাম পথ নাই। নইলে
আমার জন্য আমার বাপ ত্রুটি কিছুই করেন নি।
রমা কহিল, সে ভাই আমি জানি।
মণি-হারা
বিছানাটা পাতা সমাপ্ত করিয়া তার পর হাসিয়া
তাকের দিকটায় অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইয়া কহিল,
সব হলো তােমার মেজ বউ-শুধু স্বমীটিকে একবার
এসময় কাছে এনে দিতে পারলুম না, ঐটুকু যা মনে কষ্ট
রয়ে গেল ! ঐখানে তােমার দেবতাটির ফটোগ্রাফ আছে
দেখতে সাধ যায়, দেখাে।•••বলিয়া রমা বাহির হইয়া গেল।
পাতাসীকেও শুইবার জায়গা করিয়া দিয়া আসিয়া, ঘরের
প্রত্যেক দোরটির শিকল বন্ধ হইয়াছে কি না দেখিয়া,
আবার অনিন্দ্যার ঘরের সম্মুখ দিয়া যাইবার সময় কহিল,
আমরাও উপরের ঘরেই রইলাম! ভয়ের কোন কারণ
নাই।
অনিন্দা কহিল না দিদি, আমার জন্যে কোন ভয় নাই
তুমি শােও গে।
রমা চলিয়া গেল!
অনিন্দ্যা খানিক বিছানাটায় এ পাশ ও পাশ করিয়া
উঠিয়া পড়িল। প্রদীপটা মিট মিট করিয়া জ্বলিতেছিল।
অনিন্দ্যা সেটা আরও একট উল্কাইয়া উজ্জল করিয়া দিল।
আজ তাহার হৃদয়ের তরঙ্গ কত ? সহজেই কি নিদ্রা আইসে?
বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ, তিন কালের তিনটা অনিন্দ্যা
সার দিয়া আসিয়া যেন এই ঘরের মধ্যে দাড়াইয়া গেল
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ ১০১ আজ তিন জনের কথা তাহাকে শুনিতে হইবে। আজ তিনটা অনিন্দ্যাই ব্যথিত, কে তাহাদের সান্ত্বনা দিবে? আশা দিবার যিনি, তিনি নাই—ভরসা দিবার যিনি, তিনি নাই। তবু এইখানেই একট, স্থান করিয়া লইয়া থাকিতে হইবে, নহিলে ত্রিসংসারে কোথাও স্থান নাই। কঁদো- তিনকালের অনিন্দ্যা কাঁদো-আসিয়াছ, কঁদিয়া•••তােমায় যাইতেও হইবে কাদিয়া-- একবার ইচ্ছা হইল, স্বামীর ফটোগ্রাফটা দেখি কিন্তু ক্ষোভে লজ্জায় সে ধারটাতেই অগ্রসর হইতে পারিল না। ভাবিল, এত অবহেলায় যিনি ত্যাগ করিয়া আসিতে পারিয়া- ছেন, তাহার কাছে কি গুণ লইয়া আবার দাড়াইতে পারিব ? তাহার অভিমানিনী নারীহৃদয় যেন দুঃখে ও বেদ- নায় মাটিতে মিশিতে চাহিল—জগতে আর সকলের কাছে নিঃসঙ্কোচে হাত পাতিয়া দাড়াইতে পারা যায়। কিন্তু নিজের স্বামী:••যাহার অপেক্ষা আপনার জন জগতে আর কেহ নাই।•• তাহার কাছে অতিথি হইয়া দাড়াইতে যে একবারে মাথা কাটা যায়। অনিন্দ্যা দীপ নিভাইয়া শুইয়া পড়িল। কিন্তু ঐ দীর্ঘ শীর্ষ তালবৃক্ষের পান্তরালে একটি ভাস্বর নক্ষত্র, তাহার চক্ষের সম্মুখে কি উজ্জ্বল আভাই বিকীর্ণ করিতে লাগিল।
মণি-হারা
অনিন্দ্যার মনে হইল, ঐ নক্ষত্র অনেকদিন আগে একবার
নামিয়া আসিয়াছিল--আজও আবার নামিয়া আসিতেছে।
জ্যোতির্ময় হস্ত প্রসারিত করিয়া যেন অনিন্দ্যাকে
ডাকিতেছে। অনিন্দ্য চমকিয়া উঠিল
অস্পষ্ট তন্দ্রাঘােরে স্বপ্ন দেখিল যেন তার মা শিয়রে
বসিয়া কাঁদিয়া কহিতেছেন। চলে আয় আভাগী, এ
পৃথিবীতে তাের স্থান নাই। তুই মন্দভাগ্য, মানুষ তােরে
আশ্রয় দিবে না।
তন্দ্রাভঙ্গে অনিন্দ্যা শিহরিয়া উঠিল। কিন্তু হতাশ
হইতে পারিল না, ভাবিল এটা দুঃস্বপ্ন।
ষােড়শ পরিচ্ছেদ।
• কয় দিনের মধ্যে অনিন্দ্যা যেন নুতন এক জগতে
প্রবেশ করিল, এ জগত তাহার সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল,
অথচ অন্তরে অন্তরে ইহাই সে আকাঙ্ক্ষা করিয়া আসিতে-
ছিল। তাহাকে একটু চেষ্ঠা করিতেও হইল না। তাহার
অধিকারে কোন্ মায়াময়ী অদৃশ্য প্রকৃতি তাহাকে প্রতিষ্ঠা
করিয়া দিয়া গেল ?—জয় টীকা বহন করিয়া আনিল
যােড়শ পরিচ্ছেদ বিশু আর পুটি।—তাহারা যে আহারে বিহারে “খুড়িমা খুড়িমা করিয়া জ্বালাইতে লাগিল। এ উপদ্রবটুকুও কি আরামের।-তাহার ভিতরকার “মা”র যে আর সুস্থির থাকিবার উপায় নাই। মহাশয় ও তাহার সেবার দাবী করিতে লাগিলেন। ভাশুর উপেন্দ্রনাথ, ভাঁড়ারের চাবি অনিন্দ্যার উপরে দিয়া বড় বউকে ও অধিকার ছাড়িয়া দিতে বলিলেন। অনিন্দ্যার আবার কি চাই ? সাম্রাজ্য ৩ তাহার এই খানে•• এখানে সে সেবা করিবার অধিকার পাইয়াছে, পূজা করিবার অধিকার পাইয়াছে। আর তাহার কি আকাঙ্ক্ষা করিবার আছে ? এখানে রূপের আলােচনা নাই, ধন- গর্বের আত্মপ্রাধান্ত নাই। এখানে সে শুধু মা, জননী কল্যাণী, গৃহলক্ষ্মী—এখানে অনিন্দ্যার কোন নিন্দা নাই, তবে আফশেষ এই—প্রেমের পত্নী সে হইতে পারিল না। বেদনাটা কাটার মত তাহাকে বিধিতে লাগিল। গােপনে পূজার জন্য ফটোগ্রাফ একখানা পাইয়াছিল যদি ; কিন্তু সেখানে ফুলচন্দন ছাড়া আর কিছু দিবার অধিকার তাহার নাই। পূজারিণীর মত দেবতার দ্বারে আসিয়া শুধু অঞ্জলি দিয়া যাইবে—একবার দেখিতে পাইবে না-দেবতা তাহার পূজা গ্রহণ করিয়া তাহার ভক্তিকে সার্থক করিল কি না- }
১০৪
মণি-হারা
শুদ্ধ পূজা।•••তাই কি অন্তরের টানে ? একটা প্রচ্ছন্ন
বেদনার গীতি কি ইহার মধ্যে স্তবের আকারে পূঞ্জীভূত
হইয়া ছিল না? একবার চক্ষে দেখিলেনও না -শুধ,
লােকমুখে “কালাে” শুনিয়া চলিয়া গেলেন।
রমা তাহার বেদনাটা ধরিয়া ফেলিল। কহিল, মেজ
বৌ, ঠাকুর পােকে, একখানা পত্র লিখে দি, কেমন ?
কেবল লিখে দিই, যে কালােরূপ চক্ষে না দেখিয়া ভুল
করিয়াছ, আজ স্বচক্ষে দেখিয়া চৰ্ম্মচক্ষুর সার্থক করে।
অনিন্দ্যা জোর হাত করিয়া কহিল, দোহাই দিদি
এ অপমানটা হতে তুমি আমায় রক্ষা করাে!—তিনি শুধু
তােমার চিঠির খাতিরে আসবেন, তা তাে সৈতে পারবাে
। যখন তিনি আমায় গ্রহণ করেছিলেন, তখন কি শুধ
খাতিরেই আমায় নেবার কথা ছিল ? উপরে ধৰ্ম্মদেব
সাক্ষী ছিলেন—না ? তার চেয়ে এ আছি ভালাে
রমা কহিল, তােমার ভাশুর বলছিলেন বারীনকে
একবার চিঠি দিয়ে এ বাড়ীতে আনা হউক। দুই স্ত্রীও
অনেকের থাকে।
অনিন্দা কহিল, না দিদি কাজ নাই, তুমি বুঝিয়ে
বলল, বউ-ঠাকুরকে—আবার একজনের মননক্ষুন্ন হবে।
তাতে তার সন্তান হয়েছে। আমার কি, আমার এ উপেক্ষা
যােড়শ পরিচ্ছেদ
সয়ে গেছে...কিন্তু আমার সতীন সে সৈতে পারবে কেন?
তবে আমার পক্ষে একটা আক্ষেপ এই.. স্বামী থাকতেও
একদিন চক্ষে দেখলুম না।
রমা কহিল, না সে হবে না, তুমি লিখিতে পারাে না।
আমি তােমার হয়ে পলিখে দেব। লিখবাে, কালো
বউএর নাথ-একদিন তােমায় দেখা দিতেই হবে।
অনিন্দ্যা হাসিয়া কহিল, দিদি তুমি বড় দুষ্ট।
ইতিমধ্যে কাত্যায়নী ঠাকুরাণী একদিন বারীনের বড়
কন্যা সুহাসিনীকে লইয়া, কলিকাতা হইতে এবাড়ীতে
উপস্থিত হইলেন। তঁাহার এখন এ অসময়ে আসিবার
দরকার ছিল না। তথাপি যখন শুনিলেন, এতদিনের পর
কালবৌ আসিয়াছে ; তখন কালবোকে একবার দর্শনটা
দিয়া আসা,দরকার বিবেচনা করিলেন।সে মা-বাপ
হারাইয়াছে বলিয়া সহানুভূতিতেও গলিয়া নহে। পরখ
করিয়া লইতে, তাহার রাজ্যের প্রজা হইয়া ঠিক শাসনে
আসিয়াছে কি না?
কিন্তু লােকমুখে যে টুকু শুনিয়াছিলেন, তাহাতে
তাঁহার চিত্ত বেশ সুস্থির হইতে পারে নাই। যাহারাই
যে পাড়াবেড়ানীর দল, একদিন কাত্যায়নীর সহিত
তারস্বরে সুরে সুর মিশাইয়া বলিয়াছিল। এমেয়ে দেশের
গণি-হারা
কলঙ্ক, তাহারাই আবার বলিল কি না—এ মেয়ে দেশের
সকল বৌকে টেক্কা দিয়েছে, যেমনি কাজকম্মে—তেমনি
ব্যবহারে
বাড়ী আসিয়া দেখিলেন, এ যে সত্যই আর এক
বউ। এ কালো ত অাঁধার কালো নয়। এ যে শ্যাম
ধরিত্রীর একটা উজ্জল তরঙ্গ!
কাত্যায়নী ঘরে প্রবেশ না করিতেই, অনিন্যা শ্বাশুড়ীর
পা দুটি ধােয়াইয়া দিয়া গামছা করিয়া পা মুছাইয়া লইল।
যাহা বড় বউও কোন দিন পারে নাই-অনিন্দ্য তাহাই
করিল। কিন্তু কাত্যায়নী সেয়ানা মেয়েমানুষ-ভাবিলেন
চতুর মেয়ের,শ্বাশুরীকে বশ করিয়া—স্বামী হস্তগত করিবার
এও একটা ফন্দী হইতে পরে-মুখে কহিলেন যদিও,
“খুব হয়েছে বাছা আর নয়”—কিন্তু মনে মনে কহিলেন
তােমায় আরও অনেকখানি দেখিতে হইবে।
অনিন্দ্য তাহার সতীনের মেয়েটিকে একেবারে বুকে
করিয়া ছাদের দিকে লইয়া গেল। তাহা দেখিয়া ঘােট
পুট, একট, ঈর্ষা না করিয়াও পারিল না। তাহার মাকে
কহিল, মা, কাকী রাঙ্গা দিদি নিলে।
রমা কহিল, দুষ্ট মেয়ে-রাঙ্গা দিদি যে ওর মেয়ে, তা
জানিস?
মােড়শ পরিচ্ছেদ
১০৭
এ কথায় কী মনে মনে একট, হাসিলেন, বাহিরে
কোন কথা বলিয়া হাল্কা হওয়া তার স্বভাব নয়। নহিলে
এবাড়ীর বাহিরে হইলে—অনিন্দ্যার এই মাতৃত্বটা লইয়া
একট রঙ্গ করিতেন। বলিতেন “মা না বিয়ালো বিয়ালে
মাসী-ঝাল খেয়ে নলো পাড়াপ্রতিবাসী।
অনিন্দ্যা ছাদের উপর সুহাসিনীকে দুধ সনেশ খাওয়াইতে
খাওয়াইতে, সুহাসিনীর দিকে ক্ষণে ক্ষণে চাহিয়া তাহার কি
জানি কেমন হইয়া যাইতে লাগিল। ভাবিল এই কন্যা
যার ঔরসে জন্মিয়াছে, না জানি তিনি কত সুন্দর! কন্যার
মুখে যখন এ লাবণ্য, তথন না জানি তাহার চারিধারে
কত সৌন্দর্যই ঝরিয়া পড়িতেছে।
সুহাসিনী তাহার এই নূতন মায়ের দিকে চাহিয়া
তাহার দুটি ছল ছল নেত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল,
আচ্ছা মা তুমি কাদছো কেন?
অনিন্দ্য ব্যাকুল আগ্রহে সুহাসিনীর মুখে একটা চুম্বন
দিয়া কহিল, কই মা আমি ত কঁদিনি
সুহাসিনী কহিল, ঐ কঁাদচো যে দেখতে পাচ্ছি—
অনিন্দ্য চক্ষু মুছিয়া কহিল না ও কিছু না, হয়ত চোখে
কিছু পড়ে থাকবে কি জানি-তাের এই পােড়াকপালী
১০৮
মণি-হারা
মায়ের চক্ষু দুটিও ডব, ভবে।•••আচ্ছা সুহাস, মা,এর আগে
আমার নাম কখন শুনেছিলি?
সুহাস যদিও পাঁচ বৎসরের মাত্র মেয়েটি, তথাপি
কথাতে একটি ধনি ছিল। কহিল। শুনিনি? মার মুখে
তােমার কথা হাজার বার শুনেছি, শুনেছি, তুমি আমার
সৎমা, আমার বাবার সঙ্গে তােমার প্রথম বিয়ে হয়ে-
ছিল। তাইতেই ত তােমায় একবার দেখতে এলুম !
তুমিই আমার সত্য—কেমন মা?
অনিন্দ্যা আর সামলাইতে পারিল না। তাহার চক্ষু
দিয়া আপনি জল গড়াইয়া পড়িল। কহিল কি করে
ব’লবাে বল্।•••আমিও শুধু শুনেছি মাত্র...নইলে আমি
কেউইনই—ভিখারিণী...তাের বাবার দুয়ারে, তাের মায়ের
দুয়ারে ভিক্ষা করতে বেরিয়েছি—ভিক্ষা চাইছি, কত ভিক্ষা
চাইছি, বলছি আমায় দাও! মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে
বাঁচতে হলে যা চাই.• দাও—আশ্রয় দাও ! সন্তান দাও !
আরও কত কি-জালি সুহাস—এই চাই চাই বলতে
বলতে:আমিও কতকটা পাগল হয়ে
হয়ে গিয়েছি।তুই
বুঝতে পাচ্চিসনে—আমি পাগল...
সুহাস ঘাড় নাড়িয়া কহিল, বুঝতে পাচ্চি মা। গামার
ভয় কচ্চে—তুমি ব’কোনা। আমায় নীচে নিয়ে চলাে।
সােড়শ পরিচ্ছেদ
অনিন্দ্য উন্মাদিনীর লক্ষণেই দাড়াইয়াছিল।
চক্ষের
সম্মুখে এইদৃশ্য যেন তাহার আর সহ্য হইতেছিল না। সেও
ত আজ সবই হইতে পারিত। কি দোষে বঞ্চিত হইল ?
কে তাহাকে বঞ্চিত করিল ? রূপের অভাব ? রূপের
অভাবটাই কি সব চেয়ে বড় অভাব? ভিতরটা একবার
পরখ করিয়া দেখিয়া লওয়া ত উচিত ছিল। রূপই যদি
বড় মনে হইয়াছিল—বিবাহের সময়ে একবারে অস্বীকার
পাইলেই ত চলিত।
অনিন্দ্যা আপনার মনেই আপনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন
তুলিত, আর অধৈৰ্য্য হইয়া পড়িত। অথচ খুলিয়া কাহাকে
বলিবারও সে সাহসে কুলাইত না। রমাকে পর্যন্ত কোন
কথা বলিতে সঙ্কোচে মরিয়া যাইত। সতীনের কন্যাকে
তাই বুকে পাইয়া বুকের কথাগুলি তাহারেই সম্মুখে
উদঘাটিত করিয়া দিল।
সুহাস যে কিছুই বুঝিতে পারিতেছিল না—অনিন্দ্যা ও
সেটা জানিতেছিল, তবু তাহার নিবেদন করিয়া দিবার
দরকার হইয়া পড়িয়াছিল। আকাশ, বাতাস, উপরের
দেবতা, যাহারা একদিন তাহার বিবাহ রাত্রে সাক্ষী
হইয়াছিল তাহারাই শুনিল।
খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অনিন্দ্যা কহিল।
১১০
-মণি-হারা
আচ্ছা সুহাস-তাের বাবার মুখে আমার কথা কখন
শুনিস্ নি?•••
সুহাস কহিল, শুনিনি মা—কখনও শুনিনি—একদিনও
না।
অনিন্দ্যা কহিল, তাহলে ভুলে গেছে-জানিস্••
সন্ধ্যা আকাশে তাহার কণ্ঠস্বরটা যেন একটা কান্নার
মত শােনাইল ।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।
সেদিন বারীন্দ্র আফিস হইতে বাসায় ফিরিয়া আসিয়া
একথানি পত্র পাইল। পত্ৰখানার হস্তাক্ষর দেখিয়া যাহা
চিনিল, তাহাতে, এ হস্তাক্ষর যে তাহার পরিচিত নহে তাহা
বুঝিল।
হাত মুখ ধুইয়া কিছু জলযােগ করিয়া তবে পত্রখানা
পড়িতে বসিল। কিন্তু একি এযে একবারে নুতন সম্বোধন।
লিখিয়াছে, প্রিয়তম। অনিন্দ্যার গতি! এতদিন পরেও
কি দুঃখিনীর অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় নাই ? আমি ত
জানি না কি অপরাধে অপরাধী আমি, তবু•••আপনি যে
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
১১১
দোষে দোষী ঠাওরাইয়াছিলেন এতদিনেও তাহার কি একটা
দোষ খণ্ডিল না? না—খণ্ডিত হউক-শুদ্ধ একবার
চোখের দেখা দেখিতে আসাতেও কি অপরাধ ? ইচ্ছা
করিলে আমিও যাইতে পারিতাম ! কিন্তু বিনানুমতিতে
যাই যা দেখা করিলে—অপরাধ হইবে ভাবিয়া পারি নাই।
অহল্যা পাষাণী, হাজার বৎসর পরেও শ্রীরামচন্দ্রের পদ
স্পর্শ পাইয়া উদ্ধার হইয়াছিলেন। আমি কোন অপরাধে
অপরাধি না হইলেও যে একবার স্পর্শ চাই। স্পর্শ চাই
আপনার চরণের—নহিলে আমার মুক্তি কোথায় ?•••নারী-
জন্মের সব সাধ সব আশা বিসর্জন দিয়াছি কিন্তু, এ
আশাটুকু ত এখনও বিসর্জন দিতে পারিনি, ভাবিতেছি
মুক্ত হইব.••আপনার অবহেলার পদ স্পর্শেও একালো সােনা
হইয়া যাইবে। ইতি সেবিকা কালো বউ।
সমস্ত পত্ৰখানা যেন বারীণের হৃদয়ে, অপরূপ কাব্য
কথার মত শােনাইতে লাগিল। এরূপ পত্র ত সে আশাও
করে নাই। একবার ভাবিল কালো বউ, এ রকম করিয়া
কি পত্র লিখিতে পারিবে ? আবার ভাবিল, সে নহিলে
এতটা আবেগ, পত্রের ছত্রে ছত্রে এমন করিয়া কে
মিশাইতে পারিত?
কালাে বউ যে লিথিতে পড়িতে জানিত না, তাহা
১১২
মণি-হারা
তাহার মনে হইল না। বিবাহের পরও একখানা পত্র
পাইয়াছিল সে হস্তাক্ষর অন্য রূপ ছিল বটে, হইতে পারে
সে সময় অপরে কেহ লিখিয়া দিয়া থাকিবে। কিন্তু এই
সত্য—এই সত্য পত্র! এতদিনের পর তাহার হৃদয়ের
বাঁধ ভাঙ্গিয়াছে, সে ডাকিয়াছে।সে চাহে.••তাহার
প্রিয়তমকে।
বারীন সম্প্রতি, তাহার দ্বিতীয় পত্নীর সহিত বেশ, ভাল
করিয়া মিশিতে পারিতেছিল না। তাহার ভিতরে ভিতরে
কেমন একটা বিতৃষ্ণার ভাব জাগ্রত হইয়া উঠিতে ছিল।
মােহিনী চাহে যেন তাহাকে গ্রাস করিয়া ফেলিতে, এমন
করিয়া দাসীর মত নত হইয়া ত সে চলিতে চাহে না।
তাহার উপর বৎসর বৎসর সে কন্যা সন্তানই জন্ম দিতেছে।
এটাও বারীনের একটা মস্ত ভাবিবার কথা।
একবার ভাবিল একটা বিবাহও তাহার না করা
উচিত ছিল আবার তথনি ভাবিল। না-পুরুষ হইয়া যখন
জন্মিয়াছি—তখন এই পৃথিবী খানাকে ভাল করিয়াই
ভােগ করিয়া যাইতে হইবে।
ভাকিল মােহিনী।
মােহিনী তখন ছেলেকে, দুধ খাওয়াইতেছিল। কহিল
“এখন সে যাইতে পারিবে না।”
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
বারীন কহিল, আসিবার জন্যই ডাকিনি। বলছিলাম
বারুইপুর হতে পত্র এসেছিল।
মােহিনী উঠিয়া আসিয়া কহিল, সুহাসিনী ভাল আছে,
এখনও তার দিদিমা তাকে এখানে নিয়ে আসছে না কেন?
“থাকলেই বা-দিদিম ছাড়াও ত আর একটি শােক
আছে।”
“ওমা কালাে বউ এখনও সেখানে আছেন নাকি ?
“শুধু আছেনই না।—গৃহস্থালীর সব ভাই এখন
তার উপরে
“তাহলে তুমিও একবার ওমনি যাও।”
সেই মনেই করছি”
মােহিনী কহিল, যাবে. ••বল কি ? তা অসম্ভবও না—
আর ত রূপের আকর্ষণ নাই ! যে রূপ ছিল, তা তােমারই
লালসার আগুণে আহুতি দিতে ফুরিয়ে গেছে। এখন
নতুনের দিকে ছুটতে মন ছুটবে বৈকি!
বারীন কহিল, জানাে আমরা পুরুষ।
আমরা উপায় ও
করবো। আমরা ভােগও করবো ।
“তা জান্তাম, সেই জেনেই একদিন বলেছিলাম,
সতীনকে ও ঘরে নিয়ে এসাে। তখন ত্যাগ সহজ ছিল--
আর আজ...দিনের পর দিন, বন্ধনে জড়িত হয়ে যাচ্ছি।
১১৪
*. মণি-হারা
এখন ভবিষ্যৎ ভেবে আমায় চলতে হচ্ছে, শুধু ত এখন আর
আমি একলাটি নই। তিটে তিনটে মেয়ে পার করতে
এখন তােমার পক্ষে চলে যাওয়াই যে সহজ।
যাও ভােগ করো। সমস্ত জীবনই কেবল ভােগ করাে।
সেও রূপের ডালি সাজিয়ে বসে আছে। তুমি তাকেও
জাহান্নমের পথ দেখিয়ে এসাে।
সেও বুঝবে!
সরল
বিশ্বাসের কি পরিণাম !
বিরক্ত ভাবে মুখটা ঘুরাইয়া বারীন কহিল। পায়ের
তলায় দাসী হয়ে যার থাকবার কথা, তার এত কথা শােভা
পায় না! জানো মােহিনী, তােমার এই লেকচারে তােমার
ধম্ম ক্ষুন্ন হচ্ছে, এবং তুমি স্ত্রীজাতির সতীধৰ্ম্মের অবমাননা
করছে।
মােহিনী গলায় কাপড় দিয়া কহিল মাপ করো। এতটা
না সইতে হলে, কাকা আমায় এক সতীন বর্তমানে, তার
উপরে আমায় দিয়ে দেবেন কেন? পৃথিবীতে কোথাও যে
আশ্রয় নাই—বলিতে বলিতে নীচের ঘরে—এই স্বামীর
জন্যই খাবার তৈরী করিতে নামিয়া গেল এবং
সেখানে ডাকা ডাকি করিয়া কাঁদিতে লাগিল।
বন্ধু রাজশেখর দেখা করিতে আসিলে, কহিল—ভাই
‘ক
আপ। এখন আর একবার বাড়ী যাবারও নাম
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
১১৫
করবার উপায় নাই। বুড়ো বাপ আছেন, তাকেও
একবার দেখা করতে যেতে পাবাে না ? বলো ত এ কি
অন্যায় আবদার?•••
রাজশেখর মুখ টিপিয়া কহিল, আবদারের অনেক
বাকী। দাড়াও যখন এক একটি মেয়ে পার করবে,
তখন আবদারের বহর দেখবে।তখন তুমি পঞ্চাশ টাকা,
মাহিনার কেরাণী, এই নজির দেখাইলে চলিবে না। পাচ
গণিত দশকের ধাক্কা সামলাইতে হবে। বারীন
বিরক্তির সুরে কহিল কি জঞ্জাল! এই মধ্যবৃত্ত গৃহস্থের
ঘরে, লােকের বিবাহ করাটাই জঞ্জাল আগে বুঝলে
আমি একটা বিবাহ ও করতুম না। দেশটা এতেই নেবে
যাচ্ছে•••
রাজশেখর হাসিতে লাগিল।
এদিকে পত্র লেখিকাটি, কেবলই অপেক্ষা করিতে-
ছিলেন। কখন পত্রোত্তর আইসে। প্রতিদিনই ঝিকে
জিজ্ঞাসা করে, দেখিয়া আম, তোদের মেজোবাবু মেজো বউ
এর নামে কোন পত্র লিখিল কি না।
মেজোবউ তখনও তাহার বড় জায়ের কীত্তি জানে
নাই। সে দিবারাত্র সংসার লইয়াই মগ্ন হইয়া ছিল।
সেদিন যখন তাহার নামে একখানা পত্র জাসিল, এবং সে
১১৬ মণিহারা পত্রখানা তাহার শাশুড়ী কাত্যায়নী ঠাকুরাণী পৰ্যন্ত দেখিলেন, তখন সে লজ্জায় মরিয়া গেল। সে ত আর লিথিতে পড়িতে জানিত না। বড়বউ রমাই তাহার পত্র পড়িয়া দিল। অনিন্দ্যা কহিল দিদি তুমি কি অন্যায়ই করেছ ? এর আগেও যে একখানা পত্র লিখেছ তা জান্তাম না। এসব মতলব পাও কোথা হতে তার ঠিক নাই। ছি ছি শাশুরীই বা কি মনে করবেন ভাববেন? আমার এই ঘর- কন্না করা, পূজা আশ্রয় করা, কেবলি বাহ্যিক। কেবলি ভান, আমি যে স্বেচ্ছায় এ দাসীপনায় ভত্তি হয়েছি তাতে। আর তিনি ভাবতে পারবেন না।-বলবেন, দিন কিনে নেবার জন্যেই সুযােগ খুঁজে বেড়াচ্ছি, তারি জন্য তলায় তলায় স্বামীকে পত্ৰলেখা হচ্ছিল। আর সেই পত্র আমার সতীনই যদি দেখে, কি ভাবে ? রমা হাসিয়া কহিল, তাের ভাবনার বালাই নিয়ে আমি মরে যাই মেজোবউ। নিজে দুঃখে কষ্টে পড়ে থেকে পচবো, অথচ মুখ ফুটে নিজের অধিকারের জন্য একটা কথাও কাউকে বলবাে না-সেই বা কেমন কথা? এই শ্বশুর বলাে, ভাশুর ব’লল, জা বলো, ছেলে মেয়ে বলে। ঠিক আপনার জন এরা কেউ নয়। তােমার চরম দুঃখের
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
১১৭
দিনে এরা কেউ নাই। কারণ এদেরও যে একটা একটা
পরম বন্ধন রয়েছে। সেই জন্যই তাের আপনার জনটিকে
পরে আনবার জন্য যে একটু চাকুরী করেছিলাম-সেটা কি ,
অন্যায় হয়েছে ভাবি? আর পুরুষ মানুষ একটু মিথ্যাই
ভালবাসে।••একটু মিনতি করে, তুমি রাজা, মহারাজা
তুমি দেবতা বলে গাইতে পারলে যদি গলে জল হয়ে যায়,
মন কি—বিশেষ তার উপরে আর কেউ নন। ইহকাল
পরকালের দেবতা স্বামী-ভাগ্যিস পত্র লিখেছিলাম
তাই তুমি কালো বউ-তােমাকে প্রিয়তমা পৰ্যন্ত লিখতে
পেরেছেন।
অনিন্দ্য খানিক চুপ চাপ থাকিয়া কহিল, না দিদি
আপনাকে ব্যবসার হাটে দাড় করাবাে না—তা যতই
দুর্গতির মধ্যে পচি। রূপ ত কোন জন্মে নাইই। হাজার
দুঃখ কষ্ট সয়েও এই খানেও যে পড়ে থাকনুম, তুমি
তাও নষ্ট করলে বোধ হয়।—এর পর হতে পাচজনে যে
আমায় “চিঠি নেকানী” বলে আঙ্গুল বাড়িয়ে হেসে যাবে,
সে সৈতে পারবে না। শ্বশুর মশায় কাশী যাবো বলছেন
যদি যান, আমি ও সঙ্গে যাবাে।
রমা কঁাদ কঁাদ প্রায় হইয়া কহিল, মেজোবউ তুই এই
সব ছেলে পিলের মায়াও ভূলতে পারবি ?
১১৮
মণি-হারা
অনিন্দ্যা কহিল কি করবো? যেতে ত চাইনি—কিন্তু
বােধ হয় তাও ভূলতে হবে।
রমা অনিন্দ্যার হাতে ধরিয়া কহিল, দোহাই মেজো।...
আমারি চিঠি লেখার জন্য চলে যাবো বলিসনে-তাহলে
আমি বাঁচবো না। সত্যই আমি তােকে ভালবাসি-মায়ের
পেটের ছােট বােনটির মতই তােরে দেখি, যদি অের সুখ
হবে ভেবে, একটা অন্যায় কাৰ্যও করে থাকি তাই বলে
সেটা দোষ বলে ধরবি
অনিন্দ্য মুহূর্তে প্রফুল্ল হইয়া রমাকে জড়াইয়া ধরিয়া
কহিল না দিদি।-আমি কায়মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা
যদি আবার আমার মেয়ে জন্ম হয়, তবে যেন
তােমাকেই জা রূপে পাই। আমার দুঃখের দিনের এমন
বন্ধু পৃথিবীতে তােমার মত কেহ নাই।
?
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।
মাঝখানে সাতটা বৎসর কাটিয়া গেল। তবু আসিব
বলিয়া বারীন একবারও বারুইপুরের দিকে আসিতে
পারিল না। ইহার মধ্যে কত ছুটি পাইয়াছে সে, কত
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
১১০
সুযােগও আসিয়াছে তাহার—তবু মােহিনীর বন্ধন এড়াইয়া
একটি বারও কালাবউএর সহিত দেখা করিবার সে
সুযােগ করিয়া তুলিতে পারিল না। একবার মাঝখানে
বড় বউকে শুদ্ধ কলিকাতায় কালীঘাট দেখিবার নিন্ত
করিয়া আনিবার মতলব করিয়াছিল । কিন্তু অনিন্দ।
তেমন ভাবে কিছুতে আসিতে চাহে নাই।
ইহার মধ্যে কৰ্ত্তা হরকুমার কাশী চলিয়া গেলেন ।
অনিন্দ্যাও শ্বশুর মহাশয়কে ধরিয়া পরিয়া, কাশীতেই
নিজের শেষ দিন কয়টা কাটাইবার সঙ্কল্প করিয়া সঙ্গে
চলিয়া গেল।
কাত্যানীর দিন কতক কাশী থাকিবার ইচ্ছা ছিল,
কিন্তু এই বারুইপুরেই কাশী জানিয়া, আর অতদূরে
যাইতে পারিলেন না। বিশেষ মেজো বউ যখন গেল,
তখন স্বামীর জন্য দেখিবার শনিবার লােকেরও তেমন
আর প্রয়ােজন নাই। ছেলে মেয়েরা কত কাঁদি,
কাটিল, অনিন্দ্যা নির্মমভাবেই সে কান্না দলিয়া চলিয়’
গেণ।
যেন এ সংসারের মধ্যে তাহার আর পােষাইতেছি
না। ক্রমাগত আপনার সহিত আপনি যুদ্ধ বিগ্রহ করিয়া
ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার চিত্ত এখন এমন
১২০
মণি-হারা
দেবতার আশ্রয়ের জন্য ব্যকুল হইয়া উঠিয়াছিল—যেখানে
তাহার জীবনের সব তাপ, সব গ্লানি, অশ্রুজলে নিবেদন
করিয়া সার্থক হইতে পারে।--সেই জন্য সে আর কাহারও
নিষেধ মানিল না। বাহির হইয়া পড়িল।
হরকুমারও বুঝিলেন অভাগিনীর শূন্য হৃদয়টাতে যাই
হউক একটা সন্ত্বনা
ত চাহি, সধবায় বিধবা হইয়া
কতকাল কাটাইবে ? তিনিও কতকটা ইচ্ছা করিয়াই
বিশ্বেশ্বরের পদ প্রান্তে, এই বিশ্বের উপেক্ষিত-বঞ্চিতা
তাপিতা-নারীটিকে টানিয়া লইয়া গেলেন।
বারুইপুরে দুদিন একটু অভাব অনুভূত হইল। দুদিন
একটু সকলকে বাজিল। তারপর দিন যেমন চলিতে থাকে
তেমনি চলিতে লাগিল।
রমার মনে কেবল একটা বেদনা রহিয়া গেল যে,
অনিন্দ্যা তাহারই কৃতকাৰ্য্যতার ভারে পীড়িত হইয়া
হয়ত চলিয়া গেল।—সে ত সংসারের কাজ কৰ্ম্ম লইয়া
একরূপ
নিশ্চিন্ত হইয়াই ছিল। সেই—তাহার প্রাণে
আকাঙ্ক্ষা আনিয়া দিয়াছিল—বলিয়াছিল নারী জন্ম লইয়া
আরও পাইবার আছে, সেই জন্য একবার তাহাকে
ষড়যন্ত্রের মধ্যেও টানিয়া আনিয়াছিল—এবং তাহার দেবতার
কাছ হইতে পত্রও আনিয়াছিল, যে দেবতা তাহাকে করুণা
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
১২১
করিতে পারিত। দীর্ঘ সাত বৎসর এই অপেক্ষায় রাখিয়াও
ছিল। তারপর আর মিথ্যা দিয়া কতদিন ঠেকাইয়রাখিবে ?
অনিন্দ্যা পাষাণকে পূজা করিয়া আর কতদিন কাটাইবে ?
শেষকালে তাহাকে বাহির হইতেই হইল।
রমার এক দিনকার একটা ঘটনা মনে পড়িল ।
একদিন বাড়ীতে কিসের একটা উৎসব, বাড়ীতে লােক
গি গিস্ করিতেছে ; অনিন্দ্যা যে ঘরে থাকিত সেই
ঘরেই ভাঁড়ার হইয়াছে ; অনিন্দ্য তাহার পূজা আহ্নিকের
আর একটু সময় করিয়া লইতে পারিতেছে না।
শাশুড়ী যখন উপর হইতে ক্রমাগতই তাড়াতাড়ি পূজা
সারিয়া লইবার জন্য তাগিদ দিতে লাগিলেন, তখন
এই বড় বউই তাহার একটা চৌর্য্য ধরিয়া ফেলিয়া
কি নাকালটাই তাহাকে দিয়াছিল—অভাগিনী পায়ে
ধরিয়া কঁদিয়াছিল পৰ্যন্ত—সে চুরি ডাকাতি ও কিছু করে
নাই অথচ চৌৰ্য্য অপবাদটা তাহাকে লইতে হইয়া
ছিল। আবার সে চুরীর ধনকে দেখাইয়া দিয়াছিল, এই বড়
বৌ-কুলুঙ্গির পরে এ বাড়ীর মেজো বাবুর যে ফটো-
গ্রাফটি ছিল, সেটিকে সে প্রতিদিন স্কুলে চন্দনে অভিষিক্ত
করিয়া সেখানে মাপা নেয়াইয়া চলিয়া আসিত। এবং
সেখানে তাহার ছােট বাক্সটি দিয়া ছবিখানিকে আড়াল
১২২
মণি-হারা
করিয়া ঢাকা থাকিত। ছেলেদের বলিত ওখানে ঠাকুর
আছেন হাত বাড়াতে নাই। ছেলেরাও সে কথায় ভূলিয়া
থাকিত। কিন্তু বড় বউকে ত সে আর ছাপাইতে
পারিল না। বড় বউ কহিল, এই যে মেজো-তবে যে
বলি স্বামী আমার কেউ নয় !-মেজো তখন বড়বউএর
পায়ে ধরিয়া কঁদিয়া কহিল।-দোহাই দিদি, কাউকে
বলল না-বলো যদি আত্মহত্যা করবোতােমর সতী
ভাগ্যবতী, প্রত্যক্ষ দেবতার পূজা করো—আমি অভাগিনী
ছবির উপর দিয়েই আমার ভক্তি ছড়িয়ে আসি।
ভক্তিতে যে কিছু প্রাণ আছে-কি সত্যি আছে-তা নয়
কেবল পরকাল ভেবে ; এজন্মে ত এই ফল হলাে-
আনাত্তি জন্মে যেন পতি পূজা করে পতির আদর
পাই—আর কিছু না। তারপর তার সে কি কান্না!
বড়বউ যতক্ষণ না স্বীকার করিল যে কাহাকেও বলিব না
ততক্ষণ তাহাকে আটক করিয়া রাখিল।
কথাটা মনে পড়িয়া বুমার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হইয়া
পড়িল। এই জন্য যখন তখন ঐ ঘরটার মধ্যেও প্রবেশ
করিতে তাহার মনটা কেমন কুণ্ঠিত সঙ্কুচিত হইয়া পড়িত।
হাজার প্রয়ােজন হইলেও ও ঘরে ভারার করিতে
চাহিত না, এবং যে কেহ নবাগত ঘরের মধ্যে পদার্পণ
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
করিত, তাহাকেই কুলুঙ্গিটি দেখাইয়া বলিত ওখানে
মেজো বউএর পূজার সামগ্রী আছে, সাবধানে চলিয়ে !
মােটের মাথায় বড়বউ রমারই হৃদয় যা কিছু তার
জন্য মাঝে মাঝে কঁদিয়া উঠিত।
তাই সাত বৎসরের পর বারীন যখন কন্যার বিবাহের
নিমন্ত্রণের জন্য বারাইপুর আসিয়া উপস্থিত হইল, তখন
সব চেয়ে বেশী রাগ হইল এই রমারই
রমা কহিল। এতদিনের পর আসতে পারলে পাষাণ ?
••আর কয়মাস আগে আসতে পারলে না? তার একবার
চক্ষে দেখার সাধটাও মিটতো।
বারীন কহিল, সত্যই তার মন কি—আমার দিকে
পড়েছিল বড়বউ ?
“কেন চিঠিতে দেখতে পাওনি ? তুমিও ত চিঠির
উত্তর পর্যন্ত দিয়েছিলে।”
দিয়েছিলাম বটে, কিন্তু তারপরে
মনে হয়েছিল
মেজোবউ লিখতে পড়তে জান্তো না।”
রমা দৃঢ়স্বরে কহিল, তা নাই জানুক, তবু সে লেখায়
তার সায় ছিল—এ কথাটা ত মানতে হবে। পুরুষ এতদূর
পাষাণ হতে পারে তােমাকে দেখবার আগে তা মনে
হয় নি, কিন্তু এখন দেখলাম—বলিতে বলিতে তাহার স্বর
১২৪
মণি-হারা
কম্পিত হইয়া উঠিল। কম্পিত স্বরে কহিল, সাতটা বৎসর
এখানে অপেক্ষা করে পড়ে রইলাে—তবু একটি দিনের
তাকে
দেখা দিয়ে যাবার—সে সুযােগ করে
নিতে পারলে না ? আজ এলে ? আচ্ছা পত্রই যেন
তার মিথ্যে ? একবার দেখসে দেখি-বলিয়া রমা বারীন্দ্রকে
টানিয়া মেজো বউএর ঘরের মধ্যে লইয়া গেল ।
কুলঙ্গীটার পর্দা সরাইয়া ফটোগ্রাপটা দেখাইয়া কহিল,
দেখ দেখি—প্রতিদিন ফুল চন্দন দিয়ে পূজাকরে এনি
করে, সাতটা বৎসর কাটিয়েছে, তােমার কোন ছেলে
বেলাকার ফটোগ্রাফ,তবু সেই রত্তি সে সাতরাজার ধন
মানিকের মত—সন্তর্পণে বুকের কাছে জড়িয়ে রেখে
দিয়েছিল।—যখন কাশী যায় তখনও নিয়ে যেতে চেয়ে-
ছিল—আমিই নিয়ে যেতে দিইনি, বল্লুম-বিসর্জন দে।
সাতবৎসর পূজা করেছি—আর দরকার নাই ! পাষাণের
দেবতা হলে সে-ও কেঁপে উঠতে ••আর তুমি মানুষ তাতে
মােহিনী স্কন্ধের উপরে•••একদিন ইচ্ছাও হয়নি ?
এখানে আছে বলে দেশের গণ্ডীটাও মারালে না !
অথচ আজ ভাল মানুষটির মত বলতে পারলে সে কি
আমায় চেয়েছিল? ঠাকুরপাে পুরুষ তােমরা অনেক উপায়
সুপায়ই করাে--মেয়েমানুষের মন তােমরা চিনলে না? কবে
?
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
১২৫
একদিন বালিকা বয়সে ভয়ে এখান হতে পালিয়ে গিয়ে-
ছিল, তার জন্য সারাজীবনটা তাকে আগুনে পােড়ালে
সে গুনে গুমে পুড়ে খাক হয়ে গেছে সত্য।—কিন্তু সে
আগুনের তাত পপাহাতে হবে তােমাদেরও
বারীন স্তম্ভিত হইয়া গেল। মেয়ে মানুষ এত নিঃশকে
তার পূজার ঘরে ধূপটির মতই যে পুড়িয়া ছাই হইতে
পারে, তাহা তাহার ধারণাই ছিল না।-চিন্তিত ভারাক্রান্ত
হৃদয়ে অনিন্দ্যার শূন্য খাটখানার ধারে বসিয়া পড়িল ।
রমা কহিল, যতই লেখা পড়া শেখাে তােমরা—যতই
উপার্জন করে। তােমরা মানুষকে মনস্তাপ দেওয়ার
ফল একটা আছেই--তা এ জন্মেই হোক, আর পর
জন্মেই হােক। এর দও তােমায় নিতেই হবে।
এমন সতী সাধ্বী পাছে তােমার অমঙ্গল হয় ভেবে, একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নি। শুধু মুখে বলেছে “দিদি আমার
কপাল ভাল নয়।” ঠাকুরপো ! শুধু কালেরূপটাই চকুে
ঠেকেছিল।—সেই কালো রূপের নীচে যে প্রাণখান।
আছে তার দিকে ত নজর পড়ে নি!—তবু তােমায়
ভাগ্যবান বলতে হবে—আজ পর্যন্ত মােহিনীর অদরও
সমান ভােগ কচ্চো।
বারীন অনেকক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া কহিল। মেয়ের বিয়েটা
১২৬ মণি-হারা চুকে চুকে যাক্! তারপর আমি মনে কচ্চি, ছুটি না পেলেও আমার আপনার লোক কাউকে দিয়ে মেজোবৌকে আতে পাঠাবো। তা হলে আসবে না? আমি পত্রে লিখবো যে আমার আপিসের ছুটি নাই।” “তা হয়ত অতে পারে, কিন্তু জিজ্ঞাসা করি এতদিন কি একটি লােক জুটে নাই ?” বলিয়া রমা কম্ম করিতে গৃহান্তরে চলিয়া গেল। বারীন সেই খানটাতেই বসিয়া রহিয়া গেল। এই গৃহের সমস্ত আসবাব, এমন কি কড়িকাঠগুলা পৰ্যন্ত যেন অনিন্দ্যারই প্রতিনিধি হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। যেন তাহাদেরও একটা একটা করুণ দৃষ্টি রহিয়াছে••• তেমনি জলভরা•••অভিমান ভরা। বারীনের কতদিন আগেকার ফুলশয্যার রাত্রির কথাটা মনে পড়িল। সে রাত্রিতে সে একবার বিছানার ধার- টতেও আইসে নাই, বাহির হইতে অতি অবহেলায় মালাগাছটা ছুড়িয়া দিয়া চলিয়া গিয়াছিল। আর সে•• সেই অনাদরের মালাটিও তার দেবতার দেওয়া মনে করিয়া সষত্নে বক্ষে ধরিয়া রাখিয়াছিল। বারীন মাথা তুলিতে পারিল না। আজ তাহার তেজ, গর্বই বা কোথায় গেল? এই বিরাট, মহান, মহিমান্বিত ৪
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
১২৭
তীর্থে—সে যেন অভিভূত হইয়া যাইবার মত হইয়া পড়িয়া-
ছিল। এতটা নিঃশব্দে আত্মাহুতি-ফলাকাঙ্খ রহিত
হইয়া•••উপন্যাসেও যেন এরকম কাহিনী সুদুলভ ! একটা
চোখের দেখার, পৰ্য্যন্ত কামনা ছিল না।
বাহিরে আসিয়া বড় বউকে কহিল। বড়বউ আমার
পাতকের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। সুহাসের বিয়েটা
চুকে
গেলেই—বিয়েতে যদি তারা নাই আসছে, আমি বিয়ের
পরই যাবো কিম্বা নিশ্চয়ই লােক পাঠাযযা।
উনবিংশ পরিচ্ছেদ।
সুহাসিনীর বিবাহ হইয়া গিয়াছে, বিবাহের দুর্যোগের
কথা আর সবিস্তারে বলিবার আবক নাই। কয়েক দিন
পরে বারীন, একদিন তাহার মায়ের পায়ের কাছটায় নিতান্ত
ক্ষুন্ন ভাবে বসিয়া পড়িয়া কহিল। মা তােমার গৌরীদানের
বেশ ফল হলো। তখনই বলেছিলাম, এত অল্প বয়সে
মেয়ের বিয়েতে কাজ নাই। বলে কবে মরে যাই—সুহাসের
বিয়েটা দেখে যেতে দিবিনে? এথন জামাইএর হাই
সামলাও। শুনছি দানসামগ্রী চেন ঘড়ি নাকি জামাইএর
১২ 'মণি-হারা পছন্দ হয়নি—তারা মেয়ে পাঠাবােনা বলেছে। সেই অত-বত্তি মেয়ে সে কি শ্বশুর বাড়ীতে থাকতে পারে ? কি বলবাে বলাে ? কাত্যায়নী চক্ষু কাপালে তুলিয়া কহিলেন, সে কিরে— সে যে আমার দুধের মেয়ে, তাকে পাঠাবােনা বলতে পারে, এমন পাষণ্ডও ইহ সংসারে আছে ? কাছেই রমা ছেলেদের খাবার পরিবেশন করিতেছিল আর থাকিতে পারিল না। কয়দিন হইতেই সুযােগ প্রতীক্ষা করিতেছিল, বলিবার সময়ও যে তাহার না ঘটিয়াছিল এমন নহে। কিন্তু শাশুড়ীর দোর্দণ্ড প্রতাপের সম্মুখে ঠিক খাড়া হইয়া বলাও যে এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। আজ দেখিল পাষাণ গলিতে আরম্ভ করিয়াছে, এই সুযোেগে সেও আর ছাড়িল না—বলিয়া উঠিল এমন পাষণ্ড ঘরে ঘরেই আছে। তারপর জনান্তিকে কহিল। পরের মেয়ে ঘরে এলে, যখন তাকে বন্ধ করে রাখা যেতে পারে—তখন ঘরের মেয়ে পররে ঘরে গিয়ে আটকা থেকে যাবে—সেটা ত আর বড় বেশী আশ্চৰ্য্য নয়। সবাই পাওনা দার- পাওনা আদায় করবে তবে ছাড়বে। কাত্যায়নী কহিলেন, আমাদেরও ত বাছা ছেলের বিবাহ হয়েছে এমন ধারা ত দেখিনি। মেয়ে পাঠাবাে না
উনবিংশ পরিচ্ছেদ
১২৯
একদিনের তরে বলিনি। টাকা-দানসামগ্রী পছন্দ না হলে
দুকথা বলা যেতে পারে বটে। আমাদের তত দামী দামী
অলঙ্কারপত্র, খাট, বিছানা, তাও অপছন্দ? জানি না বাপু
কি রাজা বাদশা তারা।—নিজের কপালটা চাপরাইয়া
কহিলেন, ওরে বাপরে এসংসারটা কি কসাই খানা হয়ে
গেল?
রমা ছেলেদের যেমন খাওয়াইতেছিল,তেমনি খাওয়াইতে
খাওয়াইতে জনান্তিকে কহিল । কসাইখানা—তােমরাই যে
করেছ ঠাকরুণরা—তােমাদের মেয়ে ছিলনা তাই ছেলের
মা হয়ে মেয়েদের বাপ-মাদের দরদ একটু বােঝনি—এখন
বােঝ। নিজের বুক দিয়ে বােঝে
কথাটা বারীনের কর্ণে গেল। বারীন কহিল, ঠিক
বর্ণছে বড় বউ, মাকে একটু একটু শুনিয়ে শুনিয়েই বলে।
প্রায়শ্চিত্ত হােক। আমার ত যথেষ্ঠ হচ্ছে-
কাত্যায়নী কহিলেন, ও বারীন তুই আজ একবার যা
বাবা, বাছা আমার পাল্কীতে ওঠবার সময় দুটি
গত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে গেছে
দিদিমা, আমায় তিন দিন পরে নিয়ে এসো। সে যে
আমার দুধের মেয়ে বারীন।
রমা কহিল। ওমনি ८८६ মেয়ে मवाद।
-
১৩০
মণি-হারা
কি করবে বলে ).••কসাইদের ত আর দয়া মমতা
নাই!
বারীন কহিল, ঠিক হচ্ছে—আমায় পায়ের ধূলাে দাও
বড় বৌ।
সংসারে মা-দের একটু শিক্ষা হউক। নিজের
বুকে না বাজলে শেলের মর্ম বােঝা যায় না। উচ্চৈঃস্বরে
কহিল,শুনেছ মা•••এখনও হাজার টাকার মকদ্দম...পারবে
দিতে? আমি ঠিক করেছি আমার আর মেয়েতে প্রয়ােজন
নাই। যাই হােক নিজের ও জ্ঞানকৃত পাপও ত একটা
রয়েছে। মেজো বউ এর কথাটা ত উড়িয়ে দিলে, চলবার
জো নাই।
কাত্যায়নী কঁদিয়া কহিলেন, তুই যা বাবা-মেজে।
বউকে কষ্ট দেওয়ার দরুণ যদি এই শাস্তি হয়,তুই আজই
কাশীতে গিয়ে মেজে বউএর কাছ হতে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে
আয়—আর তুইও ত যাবােও বলেছিলি।
বারীন কহিল, দাড়াও আটটা বৎসর যেতে দাও।
তবে আবার কথা পেরাে।
কাত্যায়নী কহিলেন না বাবা তুই আজই যা, সুহাসের
মুখখানি মনে পড়ে যে একদণ্ড স্থির হতে পাচ্ছিনে-সে যে
আমার সাক্ষাৎ গৌরী। বরং মেজো বউকে শুদ্ধ সঙ্গে
করে ও নিয়ে আসতে পারি!
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ “আজ যে গরজ বড়বলিয়া রমা গৃহান্তরে চলিয়া গেল। এবং একখানি পত্র বারীনের হাতে দিয়া কহিল। এই পত্র মেজো বউ তাদের বাড়ীওয়ালার মেয়েকে দিয়ে লিখিয়ে আমায় পাঠিয়েছে। পড়ে দেখ। এতদিনের পর তুমি স্বয়ং গেলেও আসবে কিনা সন্দেহ। অনেক দেরীতে যাচ্ছে। ধরতে পারে কিনা ভাববার কথা। পত্র পড়ে তবু কতকটা বুঝতে পারবে। বারীন সাগ্রহে রমার হাত হইতে পত্ৰখন লইয়া পড়িতে লাগিল- অনিন্দ্যা লিখিয়াছিল। দিদি শুনিতেছি সুহাসের বিবাহ! শ্বশুর মহাশয়ের কাছ হইতেই এ খবর শােনা গেল। বিশ্বেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি সুহাস আমার ভাল বরের হাতে পডিয়? সুখেই থাকুক। হতভাগিনী আমি। আমার এমন একটা পয়সা সম্বল নাই—যে সুহাসের নামে, তার শুভদিনটি স্মরণ করে কিছু পাঠাই ! টাকাই কখন চক্ষে দেখিলাম না, তা টাকা পাঠাইব ? তুমি তার বিবাহে যাইও। আর আমার হইয়া একটা আশীৰ্বাদ করিয়া আসিও। ! অধিক কি বলিব। দিদি তুমি জানিতে চাহিয়াছিলে কাশীতে কেমন আছো? খুলিয়াই বলিতেছি, এতটা শান্তি, এতটা তৃপ্তি
১৩২
মণি-হারা
জীবনে কখন পাই নি—জীবনের সব মায়ার বন্ধনগুলি যেন
এখানে আসিয়া একে একে টুটিয়া পড়িতেছে। অপূৰ্ব্ব
মহিমাময় দেবতা। সংসারের সাধ, আশা, যাহা তুমি আমায়
সব্বদাই শােনাইতে—এবং যে বসে আমারেও ডুবাইয়া
মারিবার উপক্রম করিয়াছিলে—এই দেবতার ঠাইয়ে আসিয়া
সে মােহ আমার কাটিয়া যাইতেছে। দেখিতেছি, আমার
অপেক্ষাও অনেক অভাগিনী ঠাকুরের পদপ্রান্তে শরণ
লইতে আসিয়াছে। একটা জন্ম এই রকম ব্যর্থ হইয়াই
কাটিয়া যাউক। আমি এবার কামনা করিতেছি, ঠাকুর
আর যেন আমার জন্ম না হয়। তুমিও আমায় ঐ
আশীৰ্ব্বাদ করিও দিদি
পত্রখানা শেষ করিয়া বারীন কহিল। মা আজই
রাতে,—আজই রাত্রে আমার কাশী রওনা হতে হবে।
মাঝে আর দুটি দিন মাত্র ছুটি আছে। ঠিক হবে,
ঠিক হবে, এবারে
একবারে নিয়েই আসবো।
বড় বউ একটু পরিহাস করিয়া কহিল, হ নিয়েই
এসােগে—আমরা এখানে বাসর সাজাই।
মােহিনী অন্তরালে দাড়াইয়া এতক্ষণ সমস্তই শুনিতে-
ছিল। আর একটা প্রবল বিষের জ্বালায় ভিতরে ভিতরে
ছট ফট করিয়া উঠিতেছিল। অথচ স্বামী যে সতীন
!
উনবিংশ পরিচ্ছেদ
আনিতে যাইবে, তাহাতে তাহার নিষেধ করিবার ও ৮ে,
জোর চলিয়া গিয়াছিল। কারণ এটা
কারণ এটা তাহাকে শুনিতে
হইয়াছে যে, হাজার হোক অনিন্দ্যারও তাহার স্বামীর পরে
একট। দাবী আছে, তাহার অধিকার তাহাকে ছাডিয়া
দিতে হইবে।
বারীন উপরের ঘরে উঠিতেই মােহিনী কহিল, কি
গো ।-বড় যে তাড়াতাড়ি—আর সবুর সৈছে না বুঝি ?
বারীন কেবল মােহিনীর মুখের দিকে একবার চাহি
কোন উত্তর দিল না। দেরাজ হইতে কয়েকখানা নােট
বাহির করিয়া মনিব্যাগটায় রাখিয়া দিল।
মােহিনী সম্মুখে দাড়াইয়া ভঙ্গীর সহিত হাত নাডিয়?
কহিল, মনেও ঠাই দিও না-সতীনের সঙ্গে একসঙ্গে ঘর
কন্না করবাে? তােমার আজ দরদ বেশী লেগেছে-যাও।
আর ত অন্ধকার নাই,মেঘ কেটে গেছে। ফুট ফুটে জ্যোৎস্না
-গা ঢেলে দাও। কিন্তু জেনে রেখাে আমারও নাম
মােহিনী
বারীন তীব্র স্বরে কহিল। একবার চোখের দেখা
দেখে আসতেও তােমার বুক ফেটে যাচ্ছে ?—আর সে যে
তার সমস্তটা জন্ম•••সম্মুখ হতে সরে দাড়াও! আমি আজ
সাধেই বেরিয়ে পড়িনি। ধৰ্ম্মের দিক হতেও যে একটা
১৩৪
মণি-হারা
মনে
নাড়া খেতে হচ্ছে,••মেয়েটাকে যে তার শ্বশুর পাঠাতে
চাচ্ছে না তার খবর রাখাে?
“কেন কালো রাণী এসেই আমার মেয়ে উদ্ধার করে
নিয়ে আসবেন নাকি? বলতে লজ্জা করে না? যেদিন
আমার গা ছুয়ে শপথ করে ছিলে, যদি কালাে বউএর সঙ্গে
জীবনে কথা কই-তবে সে আমার স্ত্রী নয়।
পড়ে না ?
বারীন চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, দূর হও সর্বনাশ,
মেয়ে মানুষের মন যে এতটা নীচ হতে পারে তা কখনও
ভাবিনি, তার সঙ্গে কিছু ঘর কন্নাও পাতাতে যাচিনে, তবু
এই রকম ? নরক! নরক! আমার চারিদিকে নরকের
আগুন জ্বলে উঠেছে। বলিয়া সিড়িতে পা বাড়াইল ।
একবারে দরবন করিয়া নামিয়াও যাইতে পারিল না।
তাহাকে যে কাণ পাতিতে হইল, এবং দেখিতেও হইল
মােহিনী কি করিতেছে।
মােহিনী দরজার কাছটাতে উবুর হইয়া পড়িয়া কহিতে
লাগিল বেশ-যাও। কালাে বউকে এনে ঘরের বাণী
করাে—কিন্তু আমার দেখা আর পাচ্ছে না। আমার
শেষ ! জেনো সংসারে আমি ধন দৌলত সম্পদ কিছুই
চাইনি।
কেবল চেয়েছি তোমায়—যতদিন রূপ ছিল,
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
১৩৫
যৌবন ছিল—তত দিন নিজের সীমানার মধ্যে তোমায়
পরেও রেখে ছিলাম। তারপর বহুদিন পরে যখন
যৌবনের জোয়ার নেবে গেল। তখন তুমি যাচ্চো-যাও।
সুখ পাবে না। মেয়েকে শ্বশুর বাড়ী হতে পাঠাচ্চে না
সে দুঃখ আমার বুকে যতটা না বাজচে-তােমার ব্যবহার
আমাকে উন্মাদিনী করে তুলেছে। তুমিও রেলে উঠবে
আর আমারও মনে যা আছে তাই করবে।
বারীন জানিত এই রকম চীৎকার করা তাহার
স্বভাব। এবং এই রকমই ভয় দেখাইয়া---যতবার সে
রেলে উঠিতে গিয়াছে, ততবারই কাদিয়া লুটাইয়াছে।
বারীন ভাবিল, কঁদুক সে-আর ফিরচিনে, কোন কথা না
বলিয়া বাহির হইয়া পড়িল।
মােহিনী দেখিল, যখন বারীন সত্যই এবার তাহার
এ কান্নাটাও দলিয়া চলিয়া গেল।
গেল। তখন আর তাহার
কোন আয়োজনই বৃথা।অনেক কষ্টে যে রূপের ঠাটাকে
সে সুরমা দিয়া, সােনার পাতা দিয়া, মােক করিয়া রাখিতে
চাহিয়াছিল ; সেটার দৈন্য যখন ধরা পড়িয়াছে।তখন
তাহার মরণের সঙ্গেই আত্মীয়তাই শ্রেয়।
সে যখন উঠিয়া দাড়াইল তাহার মনে হইল, যেন তাহার
সব সৌভাগ্য, সব গর্ব, একটা ঘৃণিত সরীসৃপের মত সৰ্বাঙ্গ
১৩৬ মণি-হারা বাহিয়া পায়ের নীচে দিয়—স্বামীর পশ্চাৎ পচাৎ, পাপ ধাপে নামিয়া গেল। বড় জায়ের কাছে বাহির হইতেও প্রবল একটা সঙ্কোচ আসিতেছিল। কিন্তু মনের ভীষণ সংকল্পটাকে এক- বারেই স্থির নিশ্চয় করিয়া উপর হইতে নীচে নামিয়া গেল। এবং প্রায় প্রত্যেকের কাছেই বলিয়া বেড়াইতে লাগিল। “সূৰ্য্য যে গরিমায় উঠে সেই গরিমাতেই অস্ত যায়। রমা কথাটা ভাল হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারিয়া কহিল । ওকি হেঁয়ালী আওরাচ্ছে। মােহিনী বউ ? যেন আমরা মুখ সুখই বটে। আর তােমার কর্তাটি অনেক নাটক নভেলই তােমায় পড়িয়েছেন। তবু বুঝিয়ে বল্লে ও ত আমরা বুঝতে পারি। মােহিনী তীব্র দৃষ্টিতে একবার রমার দিকে মুখ ফিরাইয়া, তারপর গজ, গজ, করিতে করিতে অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া চলিয়া গেল। রমা হাসিয়া কহিল আশ্চর্য মেয়ে মানুষ ! কাছে সুন্দরী ঝি দাড়াইয়া ছিল ;-পশ্চিম দিকে আঙ্গুল বাড়াইয়া দেখাইয়া অতি আস্তে কহিল,কাশী, মা-বুঝেছ ? আর অন্য কারণ নাই। ইঙ্গিতে বুঝাইল, কাহারও ইহাতে কিছু বলিবারও যে উপায় নাই।
উনবিংশ পরিচ্ছেদ ১৩৭ “ওমা আমায় খুলে বল্লেই ত হতো—এমন তাকাত- তা ত জানিনি। এখন বুঝছি ঠাকুর পাে এ আট দশ বৎসরেও কেন একবার সময় করে নিতে পারেনি। ও রাঙ্গা বউ আমায় কেন বল্লিনে—একটু তার জন্য দুঃখও হয় নাই ?-কি আশ্চর্য্য। মােহিনী বিদ্যুৎ শিখার মত অন্তরাল হইতে বাহির হইয়া আসিয়া, দীপ্ত স্বরে কহিল, আশ্চর্য্য আশ্চর্য্য যে কচ্চো—কোন খানটায় আমার আশ্চর্য্য দেখলে ? কোলের ছেলেটাকে ধুপ করিয়া নীচে ফেলিয়া রাখিয়া আবার কোমর বাঁধিতে লাগিল। ছেলেটা কঁাদিয়া মরিবার উপক্রম হইল। অথচ রমা একবার লইতে গেলেও এমন করিয়া পায়ে করিয়া আটকাইল, যে রমার এ রণচণ্ডিকা মূৰ্ত্তির দিকে চাহিয়া ভয় হইয়া গেল। মােহিনী থামিল না বলিতে লাগিল। 'ওরে বাপরে এতো আত্মীয়তা করতে আসা নয়—আমার কপালে আগুন লাগাতেই আসা।–বিয়ে দেখতে ও আসা নয়, রঙ্গ দেখতেই আসা-নইলে দাত বের করে আহলাদে আটখানা হয়ে ঝীমাগীদের সঙ্গেও কেউ জটলা করতে পারে? তা লাগাও সর্বনাশীরা যত দূর সাধ্যে কুলায়—চারিদিকে বিষের আগুন জালাও! একবারে যেন লােকটাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
১৮
মণি-হারা
“ঠাকুর পাে যাও! ঠাকুরপাে যাও!” কি দরদ !
পােড়াকপালীর কথাটা কেউ ত একবার ভাবে নি। কিন্তু
আমিও বলে রাখছি—যতক্ষণ আমার জীবন আছে, ততক্ষণ
একঘরে দুজনাকার ঠাই কিছুতেই হবে না। কিছুতে না-
একজনকে না একজনকে মরতেই হবে। যেমন ঝড়ের
মত আসিয়াছিল, তেমনি ঝড়ের মত চলিয়া গেল। রমা
স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিল, একটা কথাও তাহার মুখ দিয়া
আর বাহির হইতে পারিল না। ঝি মাগিটাও ভয়ে অনেক
আগে দৌড় দিয়াছিল।
বিংশ পরিচ্ছেদ।
আজ রবিবার, আজ তাহাদের কাশী হইতে আসিবার
দিন। মােহিনী সকাল বেলায় যখন নিদ্রা হইতে জাগিয়া
উঠিল—তখন তাহার মূৰ্ত্তি কি অস্বাভাবিক আকার প্রাপ্ত
হইয়াছে। মুখ চোখ একবারে বিবর্ণমাথার কালাে চুলের
রাশ পিঠ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ঘরের বড় আয়না থানায়
দিকে দৃষ্ট পড়িতেই মােহিনী ঘৃণায় মুখ ফিরাইয়া লইল।
বিংশ পরিচ্ছেদ
কাত্যায়নী কহিলেন, কি হয়েছিল গো-কাল, রাত্রের
বেলায় মেজ বৌ। ছােট মেয়েটা যে কাল সারারাত
চেঁচিয়েছে।
“শত্রু ওরা !
ওকে মরবার রােগে ধরেছে।-বলিয়া
অস্বাভাবিক উত্তেজনায় মেয়েটার পিঠে একটা চাপড়
দিয়া, কলতলা হইতে উপরের দিকে উঠিতে লাগিল।
কাত্যায়নী মােহিনীর স্বভাবে ভালরূপই অভ্যস্ত
ছিলেন। ভাবিলেন, মেয়েটাকে মারিয়া খুন করিবে।
মেয়েটাকে টানিয়া ধরিয়া নিজের কোলে তুলিয়া লইলেন।
মােহিনী একটা বক্র কটাক্ষে কহিল, বড় যে আলুনে
টস্।
এদের নিয়ে ভূগতে হয় তবে বুঝতে পারি।
“ওরে বাপরে ছেলে জন্মালে কোন মাকেই না ভূগতে
হয় ? তুমি ত বরং ঝি চাকরের হাতে দিয়ে রেহাই
পেয়েছ। সেজে গুজেই দিন কাটিয়েছ। এইবার তােমার
সাজও ঘুচবে-তেজ ও ঘুচবে-বলিয়া কাত্যায়নী ছেলে-
টাকে চুপ করাইতে লাগিলেন।
মােহিনী খানিক কটু মট্ করিয়া কাত্যায়নীর দিকে
তাকাইয়া তারপর একটা রুদ্ধ ক্ষোভের বেদনার ভারেই
যেন টলিতে টলিতে উপরের দিকে উঠিয়া গেল।
তােরঙ্গে দামী কাপড় চোপড় ও গহনা যে গুলাে
১৪০
মণি-হারা
ছিল, সেগুলা বিশ্বস্ত ঝির দ্বারা মেয়ের শ্বশুর বাড়ীতে
পাঠাইয়া দিল। ঝি গোপন পথ দিয়া খুব সন্তর্পণে
সেগুলা লইয়া গেল।
মােহিনী ঝিকে বার বার করিয়া বলিয়া দিল । দেখে।
খবরদার। এবাড়ীর একটা কাক পর্যন্ত জানতে সেন
না পারে।
ঝি হাত নাড়িয়া জানাইল সেজন্য তাহার মােটেই
চিন্তা নাই।
মােহিনী সারা রাত্রি এই সঙ্কল্প করিয়াছিল--সতান
যে এই গৃহে আসিয়া তাহার সৌভাগ্যের ভাগ লইবে—সে
কল্পনাও তাহার পক্ষে অসহ! এই সজ্জিত গৃহ, যে
গৃহের প্রত্যেকটি সজ্জ। সে কত যত্ন করিয়া কত কষ্ট,
সহিয়া সাজাইয়াছে, এই ফুল তােলা মশারি, এই দামী
মেহগ্নীর খাট, ঐ চিত্রপট, এসব কি সেই কালাে বউকেই
সমানে সমান ভাগ দিতে হইবে বলিয়া আমেরিকা জাপান
হইতে আনিয়াইছিল ? সংসারে যে কেহই—যত বড় সাধু
তপস্বি হউক-আপনার অধিকার আছে জানিলে কে সহজে
ছাড়িয়া যাইবে? যখন সে আসিয়া এই সজ্জিত গৃহের পানে
তাকাইবে, আর মনে মনে ভাবিবে ইহাতে তাহারও অংশ
আছে। তখন? বাপের বাড়ী হইতে সে ও ত কিছু আনিতে
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৪১
পারে নাই। সবই ত তাহার স্বামীর উপার্জনের সম্পত্তি।
দুদিন পরে চুল চিরিয়া ভাগ লইবার দাবী করিতে ছাড়িবে
কি ? কেন ছাড়িবে ?
মােহিনী আজ শেষবার তাহার আদরেয় জিনিষ গুলির
পানে করুণ দৃষ্টিপাত করিয়া তাকাইয়া লইল।—সে-ও
যেমন নিভিবার আগে একবার উজ্জ্বলতম প্রভায় জ্বলিয়া
উঠিয়া—তারপর নিভিয়া যাইবে এই সঙ্কল্প করিয়াছে,
এই আসবাব গুলিকেও তেমনি একবার উজ্জ্বল করিয়া
লইয়া আগুন লাগাইয়া যাইবে—তাহার আসিয়াছিল
তাহার সঙ্গে—যাইবে ও তাহার সঙ্গে।-তাই বলিয়া
সতীনের সৌভাগ্যের দিনে--তাহারা সমারােহ করিয়া
দাড়াইয়া রহিবে না।
সকল ঘর-কন্না ঝাড়া পেছা করিয়া, প্রত্যেক
আসবাবের তলায় তলায়, কেরােসিন তৈলে ভিজা টুকরা
টুরা ন্যাকরা সাজাইয়া রাখিতে লাগিল। সতীনের
গাড়ীর শব্দ যেই বাড়ীর দুয়ারে আসিয়া থামিবে, ওমনি
সে-ও একসঙ্গে ঘরে বাহিরে আগুন ধরাইয়া দিবে।
অতীত দিনের উজ্জল স্মৃতিগুলি, আজ তাহাকে ব্যঙ্গ
করিয়া তাহার কাছ হইতে চক্ষের জল আদায় করিয়া
লইতে লাগিল।
১৪২
মণি-হারা
ফাল্গুন মাসের দিবস। আকাশে কোথাও মেঘের
সম্ভাবনা ছিল না। অপরাহ্নের দিকে সবুজ দিগম্ভাবলের
পার্শ্বে, একখানা কালাে মেঘ রাহুর মত দারুণ বুভূক্ষা লইয়া
আকাশ ছাইয়া উঠিতে লাগিল। অপরাহ্নের স্বর্ণালােকটুকু
মেঘের গায়েই তাহার দীপ্তিটুকু ঢালিয়া দিয়া, মেঘের পরেই
অদৃশ্য হইয়া গেল। তারপর বৃষ্টি ! একবারে মুষল ধারে
বৃষ্টি !—যেন ধরণীর বুকের ভিতর যে অশ্রুটা জমাট বাধিয়া
গিয়াছিল। সেটা মেঘের আকারে উৎক্ষিপ্ত হইয়া অসীম
আকাশের একপ্রান্তে দাঁড়াইয়া বৃষ্টি ধারায় ঝরিয়া গেল।
মানুষে যে কান্না চাপিয়া রাখিয়া রক্ত ধারায় আপনাকে
রঞ্জিত করিয়া লইতে পারে।—জীব জননী ধরণী মাতার ত
সে সাধ্য নাই ।--তাহাকে যে জীব প্রতিপালন করিতে
হইবে।
মােহিনীরও এটা মন লাগিল না। ভাবিল—তাহার
শেষ বাসরের বিদায় গতিকে বর্ষা রজনীর কলধ্বনির সঙ্গে
মিশাইয়া দিয়া—অপরূপ এক রোদন সঙ্গীতে মুখর করিয়া
দিবে। সে যখন মরিবে•••তাহার মৃত্যুর পরও ঝম্ ঝম
বীণার তারে অদৃশ্য মমতাময়ী তাহার এই ব্যথিত কন্যার
জন্য চোখের জলের গান গাহিয়া,লােক লোকান্তরে সে কথা
রাষ্ট্র করিয়া দিবে। এমন কি ঈশ্বরের দরবার পর্যন্ত।
!
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৪৩
বৈকাল হইতেই সাজ সজ্জা করিয়া ফেলিয়াছিল। ঝিকে
বলিয়া রাখিয়াছিল, আজ তাহার শরীর অসুখ, গতরাত্রে
ছেলেরা সারারাত্রি তাহাকে আলাইয়াছে। অাজ সে
একলাই থাকিবে ।
যে বিলাতী খোঁপা বাঁধিলে -যে গহনা পরিলে–যে রং
লাগাইলে এককালে সে মানুষের চোখে পরী বলিয়া ধাঁধা
লাগাইতে পারিত। আজ সে অনেক দিনের পরে সেই
রকমই আয়ােজন করিতে লাগিয়া গেল। কবে কোন
প্রথম যৌবনে তার সৌভাগ্যের দিনে, স্বামী তাহার ইটালীয়
ধরণে একটা গাউন তৈয়াৰী করিয়া দিয়াছিল। ( এবং
যাহাতে সে স্বামীর কাছ হইতে পরী রাণী আখ্যা পাইত।
সেটাকে শুদ্ধ পরিতে বাদ দিল না। দুই ভ্রুর মধ্যে
হীরকটাকেও ঝুলাইয়া দিল। যতবার সাজ পরিয়াছে
ততবারই আয়না দিয়া মুখ দেখিয়াছে।
দেখিয়াছে। এতদিন পরে,
তবু তাহার রূপের এতটুকু কমতি হয় নাই। দেহের
প্রতি আর ততটা যত্ন ছিল না-তাই যাহা হউক-নাহলে
কটাক্ষে ভুবন জয় করিবার সে শক্তিবােধ হয় এখনও
লুপ্ত হয় নাই।
লম্বা বারান্দাটায় পায়চারি করিয়া বেড়াইতে লাগিল।
তাহার মনে হইল যেন মেঘেরাও বলাবলি করিতেছে ওগো
০ ০
১৪৪
মণি-হারা
সুন্দরী! ওগো অপরূপ! এরূপ যে পৃথিবীর নয় ।
ইন্দ্রলােকের ঐশ্বৰ্য্য।
হায় গো এত রূপ! তবু তাহার স্বামীর চক্ষে ধরিল না?
শেষে-কালাে রাণী রই জয় হইল। ললাট লিখন! মাথায়
হাত দিয়া কোচটায় বসিয়া পড়িল।
নারী জানিত না। রূপের জন্যই মানুষ মানুষের চরণে
দাসখত লেখে না। যাহা প্রকৃত রূপ সে ধূপেরই মত
একটা সুগন্ধের ধূমে আপনাকে নিঃশেষে উৎসর্গ করিয়া
বুকের ভিতর জমাট হইয়া বসে।
পাশের ঘরের জানলার দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহার
বড় জা তাহার দিকে জানলা দিয়া মুখ বাড়াইয়া এক দৃষ্টিতে
চাহিয়া রহিয়াছে। সে-ও বােধ হয় এইরূপ—এই সজ্জাই
দেখিতেছিল। দেখুক! দেখুক। তাহার চক্ষু সার্থক
হউক!
সেদিন জায়ের সহিত তাহার গণ্ডগােল হইয়াছিল নহিলে
মােহিনীর ইচ্ছা হইয়াছিল, ‘জা’কে একবার ডাকিয়া তাহার
মুখ দিয়া নিজের অসামান্য রূপের বর্ণনাটা শুনিয়া লইত ।
কিন্তু থাক--আর প্রয়ােজন নাই।
এমন সময় সই দ্বারে আঘাত করিয়া ডাকিল, সই•••
প্রথম আহ্বানটা মােহিনীর কর্ণে গেল না।
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৪৫
শুনলুম নাকি
সই, দ্বারে মৃদু আঘাত দিতে দিতে বলিতে লাগিল,
আজ তােমার সয়া বাড়ীতে নাই সই•••তাই এই বালার
দিনটাতে ভাবলুম, সইএর কাছেই খানিক জটলা করে
বিরহটাকে জুরিয়ে নিয়ে
আসি।
তােমার কর্তাটিও আজ ঘরে নাই। সই, ও-সই (কবাট
খুলিয়া গেল ) একি সই আজ যে বড় সজ্জা !•••
মােহিনী কবাট বন্ধ করিয়া দিয়া কেমন যেন উন্মনা
ভাবে কহিল, হা সই।•••নেভবার আগে দীপ একবার
উজ্জ্বলতম প্রভায় জ্বলে উঠেছে।
সই কহিল, সে কি রকম সই ?
“রূপের পরীক্ষা দিতে হবে।•••আর অন্য কারণ নাই।
বুঝেছ ? এখন বলল ত বলল-ত সই !•••কেমন মানিয়েছে।
আজ এক বার শেষবার তাদিকে ডেকে এনেছি।যারা
এতদিন আমায় ভােলাবার সম্মােহন মন্ত্রটি দিয়েছিল।
হীরকহার—এই সজ্জা—হাত দিয়া দিয়া দেখাইতে লাগিল।
সই কহিল সে কি সই ?•••ভােলাবে আবার কাকে ?
এত দিনের পরেও ভােলাবার নতুন আয়ােজন করতে হয়
নাকি?
মােহিনী, শূন্তে দুই বাহু তুলিয়া যেন ভবিষ্যতের একটা
বিরাট শূন্যতার পানে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিল। যেমন
১৪৬
মণিহারা
দিনকাল পরেছে।তােমাদের পেছনে ত একটা করে
সতীন নাই।•••কেমন করে বুঝবে বলে ভাই
সই তাহার সইএর বেদনায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া
কহিল। এতদিনের পর•••তিনি, আবার তোমার সতীন
আনতে বেরিয়েছেন না কি ? দুঃ••তাও কখন হয়? মিথ্যে
কথা!•••
“খানিক রাত্রির পর এসাে—দেখবে কতটা সত্যি–পূর্ণিমা
তার রূপের রাজ্যের বাতিগুলাে—সব এক সঙ্গে জেলে দিয়ে
দেউলে হয়ে যাচ্চে•••আর অন্ধকার নীচে হতে পাতাল
ফুরে•••নাগ কন্যার মত তার জীবন জোরাহাহাকার
নিয়ে ছুটে আসচে তােমরা দেখে তখন। কি লজ্জা!
কি লজ্জা!
মােহিনী একবারে দুই হাত দিয়াই মুখটা ঢাকিয়া
ফেলিল।
সইও ভাল বুঝিতে পারিল না। সে শুনিয়াছিল
মােহিনীর যে সতীন আছেন তিনি একটি অন্ধকার। এমন
কি “যাহা স্পর্শ পর্যন্ত করেন তাও কালী হইয়া যায়। অবশ্য
এ রকম বিশেষণ দিয়া অন্ধকারের বর্ণনা কাহিনী, শ্রবণ
সে-ও তাহার সইএর কাছ হইতেই শুনিয়াছিল। তথাপি
তাহার অবিশ্বাস হইতে লাগিল। অথচ সইএর কথা
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৪৭
বার্তা, ভাব ভঙ্গী, যে প্রকার-তাহাতে মিথ্যা বলিবার ও
যাে নাই। মােহিনীর হাতটা ধরিয়া কহিল। আমি নিশ্চয়
বলছি মিথ্যে—ছেলে পিলের মা, আচ্ছা আমার গা ছুয়ে
বলো দেখি, সত্যি
মােহিনী দুই হাত, তাহার সইএর স্কন্ধের পরে রাখিয়া
বিগলিত বেদনার দাহে কহিতে লাগিল। তাই বলে।
সই মিথ্যাই হােক। কিন্তু যদি সত্য হয়!•••যদি সত্য হয়
এই যে আমার এতদিনকার সাজানাে ঘর কান্না !•••আমার
সুখের দুঃখের আনন্দ উৎসবের স্মৃতি, যেখানকার প্রত্যেকটি
ইট পাথরেও পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আছে।•••সে সব সমান
অংশে আর একজনকে ভাগ দিয়ে•••ভিখারীর মত দুয়ারে
দাড়িয়ে থাকা..সে কি আমার সাধ্য ? তাই ঠিক করেছি
যদি নিতান্তই সত্য হয় তবে সমারােহের সঙ্গে মৃত্যুকেই
বরণ করবে তবু।
সই বাধা দিয়া মােহিনীর মুখটাতে দুই হাত চাপা দিয়া
কহিল । পাগনিশ্চয় তােমাকে•••তার কোন কারণ হেতু
রাগাবার বাসন-তুমি ছেলে পিলের মা—তাতে সেদিন
জামাই হয়েছে, দেখাে, কোথায় গেছেন-আবার আজই
ফিরে আসছেন। আমিও ত আজ নতুন নহি, আমি
তাকেও চিনি।
১৪৮ মণি-হারা - দুদ্দিনের তিমির রাতের মাঝে, দূরে হঠাৎ চকিতের মত আশার আলােকেও যেমন মানুষকে চকিত করিয়া তুলে, তেমনি সইএর এই স্নিগ্ধ সরসবাক্যগুলি একটা সান্ত্বনার মতই মােহিনীকে স্পর্শ করিল। মােহিনী তাহার সইএর হাতটা চাপিয়া কহিল- সত্যই সই তুমি আমায় ভালবাসাে--মায়ের পেটের বােনের মত। তাকেও যেমন চিনে আসছো--আমাকেও ত তেমনি চিনে আসছে--দেখেছ ত এই মিথ্যে ঠাট, বাট বজায় করতে আমায় কত-না চেষ্টা পেতে হয়েছে। রূপটা•••সূৰ্ম্মা, এই মেয়ের মা হয়ে পৰ্য্যন্ত•••শুধু ভেবেছি • কি জানি যদি গুণনিধি ফাঁকি দিয়ে যান। কিন্তু সেদিন যেন দেখলুম আমার কটাক্ষটা ব্যর্থ হয়ে গেল.••তাই আজ আর একবার শেষ আয়োজন করে বেরিয়ে পড়লুম। ভাবলুম-যদি তাই সত্য হয়, তবে এক আসনে দুজনাকার ঠাই হবে না। কিছুতে না। তাই- আর বলিতে পারিল না। শেষ সজ্জায় সজ্জিত হইয়াও যেন তাহার জীবনটার পরে মমতা ফিরিয়া আসিতে লাগিল। এই ফলে জলে পূর্ণ এমন শ্যামা বসুন্ধরা !•• সই কহিল খুলে ফেলে সই এ সব! রাত অনেকটা হয়ে এলে প্রায় !...আজ চলুম। কিন্তু আমি তােমায়
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৪৯
সত্যই বলছি খ্যাপামীতে আপনাকে ভরিয়ে রেখো না।
তুমি যদি সারা জীবন স্বামীকেই ধ্যান করে এসে থাকো।
তবে স্বামীকে, ফিরে দাঁড়াতেই হবে—যতই বিমুখত
দেখান।
নাই।
সই বাহির হইয়া গেল।
মােহিনী কহিল, আলো দেখাইব?
সই কহিল, প্রয়ােজন নাই।
বাহিরে তখন ও অন্ধকার আকাশে মেঘ কাটে
তিমির রাত্রি, যেন পারার্থী যাত্রী “না”য়ের মত
অনন্ত সমুদ্রের কিনারায় খেয়া সাজাইয়া অপেক্ষা করতে-
ছিল।
সম্মুখের ভয়ের ভাবনার গুমােটা অপসারিত
হইলেই হয়।
ঘরির দিকে চাহিয়া দেখিল, রাত্রি প্রায় আটটা
বাজিয়া গিয়াছে। মােহিনী আবার অস্থির হইয়া উঠিল।
শুনিতে পাইল। বড় জা রমা যেন চাকরকে বলিতেছে
গাড়ী লইয়া যাও। তাহাদের আসিবার সময় হইয়াছে।
আর মােটেই মিথ্যা নয়। তাহারা সব চলিল।—এই
মােহিনীর অদৃষ্টে আগুন জ্বালাইবার নিমিত্ত-তাহাদের
কি আয়ােজনের ধূমই পড়িয়া গিয়াছে। আজ সবাই
তাহার বিপক্ষে-বাড়ীর চাকরটা পর্যন্ত—যে মুহুর্ত পৃঝেও
মণি-হারা
তাহাদের বাড়ীর এই মাঠাকুরাণীর একটা আদেশ পাইবার
জন্য লালায়িত হইয়া রহিত। যাহার আদেশ ঈশ্বরের আদেশ
বলিয়া মান্য করিত। পলকেই সে, সমস্তেরই কি গাত
বিপর্যয় !•••মানুষের কাছে অতীতটা একবারে কিছুই নয়।
অপূৰ্ব প্ৰহেলিকাময় এই জগত। যতক্ষণ হাত,
মুখের উপর পর্যন্ত খাদ্য তুলিয়া দিতে পারিতেছে-ততক্ষণই
হাত আপনার-তারপর আর কিছুই নয়। মােহিনী উন্মাদ
প্রায় হইয়া উঠিল। একবার ডাকিল ধন্নিলাল।
মেঘ বৃষ্টি মাথায় করিয়া ধরিলাল দ্রুত তাহার মনিবের
কাজে চলিয়া যাইতেছে। আহ্বানটা পর্যন্ত কাণে গেল
? “অকৃতজ্ঞ জানােয়ার” কিন্তু সে ত কিছুই নয়। প্রস্তুত
হও মােহিনী । আর মােটেই বিলম্ব নাই। ইচ্ছা হয়
একবার সংসারের সহিত শেষ দেখা দেখিয়া লও।
প্রায় ডজন খানেক হাপ বাতি ঘরে জ্বালাইয়া দিল।
এই বাতি যখন পুড়িয়া শেষ হইয়া যাইবে তখন আপনিই
সব জ্বলিয়া উঠিবে—এই গৃহের কোথাও বাদ যাইবে না।
তৈলাক্ত বস্ত্র ও গুলি তাহার স্মৃতির কঙ্কাল স্তুপের
উপরে ইন্ধন রাশির মত সজ্জিত হইয়াছিল।
দেরাজ হইতে একটা ঔষধের শিশি বাহির করিয়া
ফেলিল। গৃহস্থালীর জন্য এসব সঞ্চয় মােহিনীই একদিন
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৫১
করিয়াছিল। সুখের দিনে যাহা রােগের প্রতিষেধ হইয়া
দাড়াইয়াছিল, দুঃখের দিনে তাহা মৃত্যু সহচর হইয়া
দাড়াইল। অদৃষ্ট আর কাহাকে বলে? মােহিনী বিষের
শিশিটির শিপি খুলিয়া ফেলিয়া খানিক ভাবিল। একবার
কন্যাদের ও জামাতার মুখখানি স্মরণ হইল। আবার
রাখিয়া দিল, ভাবিল। যেই সত্যই গাড়ী দ্বারে আসিয়া
পৌছিবে ওমনি মুখে ঢালিয়া দিবে। ইংরেজদের মত
ওয়েল লড়িবার ত উপায় নাই-নহিলে তাহাই সৰ্ব্বাপেক্ষা
উত্তম ছিল। গৃহের চারিদিকের বাতিগুলির জীবন প্রদীপ
গলিয়া গলিয়া ক্ষয় হইয়া যাইতেছিল।ঘড়িতেও নয়টা
বাজে ঘরির কঁাটাও যেন দ্রুততালে প্রহর বাজাইয়া
চলিয়াছে—তাহারও দুদও অধিকক্ষণ বাঁচিয়া থাকিতে
দিবার সে ফুসৎ নাই। মােহিনী আবার শিশিটা নাড়িয়া
রাখিয়া দিল।
এমন সময় বাহির দরজায় একখানা গাড়ীর শব্দ
আসিয়া থামিয়া গেল। একবারে কি স্পষ্ট ঘর্ঘর আওয়াজ।
মােহিনীর পা হইতে মাথা পর্যন্ত—সমস্ত শিরা উপশিরা
গুলা কণ্টকিত হইয়া উঠিল। আর বিলম্ব করিতে পারিল
না। ঐ যে বড় জা আলাে লইয়া তাহাদের আহ্বান
করিয়া আনিতে বাহির হইল । দুয়ার খােলার শব্দটা
মাণ-হারা কি ভীষণ! মােহিনী চোখ বুজিয়া ঔষধের শিশি গলায় ঢালিয়া দিল ! একবারে সবটা-কালােবউ এইবার আইস। রাজত্ব করিতে।•••কিন্তু তথাপি মনে থাকে যেন সতীনের প্রতিহিংসা লইতে হইবে। একবার উপর হইতে ঝুকিয়া জানলার ফাক দিয়া দেখিয়া লইতে চাহিল। কিন্তু অন্ধকারে ভাল কিছু নজর হইল না। শুধু ছায়া।•••কালােবউএর ছায়া ত মহাকালােতে মিশাইয়া গিয়াছে, বাকী অন্ত ছায়া- গুলা প্রেতের মত প্রাঙ্গণে সারি দিয়া দাড়াইয়াছে। মােহিনী সশব্দে জালা বন্ধ করিয়া দিল।—ঘরের মধ্যে বেড়াইতে লাগিল যেন পুচ্ছ বিমর্দিতা ভুজঙ্গিনী, পায়ের শব্দে, শেল্প আলমারী গুলা শুদ্ধ কঁপিয়া কঁপিয়া উঠিতে লাগিল। হঠাৎ গােটা কয়েক কাচের পুতুল পরস্পর ঠোকাঠুকি হইয়া নীচেয় পড়িয়া ভাঙ্গিয়া গেল। অনেকক্ষণই যে অতিবাহিত হইয়া যায়। মােহিনীর চক্ষু জড়াইয়া আসিতে লাগিল। রমা গাড়ীর শব্দ পাইবামাত্র তাড়াতাড়ি বাহিরে বাহির হইয়া কহিল ঠাকুরপাে এলে সব তােমরা ? গাড়ী হইতে বারীনই আগে নামিয়া পড়িয়াছিল- বারীন কহিল ।
বিংশ পরিচ্ছেদ
রমা কহিল, মেজোবউ কই ?
বারীন গম্ভীর স্বরে কহিল, বাবাকে জিজ্ঞাসা করো।
বুম মাথায় ঘােমটা-একটু টানিয়া দিয়া কহিল
বাবাও এসেছেন নাকি ?
হরনাথ আপনার বিপুলায়তন দেহখানি অতিকষ্টে
গাড়ী হইতে বাহির করিয়া ধরাকণ্ঠে কহিলেন, মা•••হারিয়ে
এসেছি, সে অনাদৃতা অভিমানিনী--বিশ্বেশ্বরের চরণে তার
ব্যথা নিয়ে গিয়েছিল, বিশ্বেশ্বর তাকে টেনে নিয়েছেন।
বা স্তম্ভিত হইয়া গেল। এতটার সে কল্পনাও করে
নাই। শশাকোদ্বেলিত কণ্ঠে কহিল, কিসে কি হলো
ঠাকুরপাে--বল-বল শুনি, যাবার সময়ও সে বলে গিয়ে-
ছিল—আশীৰ্ব্বাদ করে দিদি আর যেন ফিরে না
ན་
আসতে হয়। সতাই তাই হলাে ? রমার চোখ দিয়া টস
টস্ করিয়া জল পড়িতে লাগিল।
বারীন কহিল, সে কি বলবো বৌ সে যেন আমারি
জন্য অপেক্ষা করছিল—ঠিক একবারে আমারি জন্য•••
একটা কথাও হলো না। হাতে হাত রেখে ওমি চলে
গেল। চোখের জলটাও আমার দেখলাে না-কাল ওলা-
উঠোয় ধরেছিল কি না। তার উপর সে শরীরের উপর
মােটেই যত্ন করতাে না। শীতের দিন হয়ত সারারাত্রি ভিজে
o মাণ-হারা কাপড়ে কাটিয়েছে। বাবার মুখে সব শুনবে এখন••• চলাে-নেয়ে ধুয়ে ঘরে ওঠা যাক্। শুক্ল পক্ষকে সুসংবাদ দাও গে= রমা অনিন্দ্যার নাম ধরিয়া কঁদিতে কাদিতে উপরে উঠিতে লাগিল। বলিতে লাগিল মােহিনী বউ আর তােমার দ্বেষ, হিংসে, গােসার, দরকার নাই ভাই- তােমার যা কণ্টক—আপনিই সরে গেছে।-এখন তােমার নিষ্কণ্টকে রাজত্ব! রাজত্ব করাে- ঠেসান কবাটটা ঠেলিতেই দেখিল একি ব্যাপার ? ঘর ময় আলাে হইয়া গিয়াছে বতিগুলা ধূ ধূ করিয়া পুড়িতেছে। গৃহের সমস্ত আসবাব রাশিও পুড়িতেছে। আর সেই প্রজ্জ্বলিত অগ্নির দিকে মােহিনী উন্মাদিনীর মত চাহিয়া আছে। রমা ডাকিল, মেজ বউ ? মােহিনী মস্বরে কহিল, চুপ করো...দাড়াও! আর ক্ষণেক অপেক্ষা করতে বলো•••তারপর আমি ঘর ছেড়ে দিয়েই যাচ্ছি!—আর একট, বাকী—এরা আমার সৌভা গাের সহচর ছিল, আমার সঙ্গেই সবাই চলে যাবে।-- রমার চোখের জলটা ভয়ে থামিয়া গেল। সতীন আসিবে বলিয়া মেয়ে মানুষের এতটা নিষ জন্মিতে পারে
বিংশ পরিচ্ছেদ
১৫৫
বুম এই প্রথম দেখিল। সতীনকে ভাগ দিতে হইবে
বলিয়া কাপড় চোপর গুলাতে পর্যন্ত আগুণ ধরাইয়া
দিয়াছে। কিন্তু তাহার দাড়াইয়া দেখিবার ও আর সে
সময় নাই। ঘরের কড়ি কাঠেই বা আগুন লাগে।
রমা চীৎকার করিয়া ডাকিল, ঠাকুপাে এস এধারে-
এদিকে তােমার মােহিনী বউএর কাণ্ড দেখে যাও।
একবারে আগুন জ্বেলে দিয়েছে—ঘর কন্না ময় আগুন।
আগুন।
আগুনের নাম শুনিয়া সকলেই ছুটিয়া আসিয়া
উপস্থিত হইল। বারীনও উপস্থিত হইল। কাত্যায়নী
হরনাথ, তাহারাও পশ্চাৎ আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
মােহিনী উন্মাদিনীর মত চীৎকার করিয়া কহিল,
এসেছো। সব–দাড়াও। আর মুহুর্ত মাত্র বিলম্ব •••তারপর
আমি ছেড়েই দিচ্চি সব। বারীনের পায়ের কাছটাতে এক
গাছ। হাতের কাছের বকুলমালা ছুড়িয়া দিয়া কহিল ।
এই নাও গাে দেবতা! যে মালায় এতদিন আমায়
জরিয়ে রেখেছিলে—সে মালা—আবার তুমিই ও। যে
মনের মত তাকেই দিও। বলিয়া যেন অসহ বেদনা
ভরে মেঝের উপরটাতেই হাত রাখিয়া বসিয়া পড়িল ।
কাত্যায়নী চীৎকার করিয়া, গােলমাল করিয়া কহিলেন
।
মণি-হারা
ও রাক্ষসী যেন পাগলই হয়েছে•••আগুন নেভাবার ব্যবস্থা
করাে। দমকল ডাকাওগে-ঘর থানা কি তােমাদের
চোখের সামনে পুড়ে যাবে—তাই দেখবে? ওরে ও ধন্নি
লাল। ও বারীন। নিজেই একটা কলসী করিয়া জল
আনিয়া ছিটাইতে লাগিলেন।
হরনাথ কহিলেন, আশ্চৰ্য্য সতীনের বিষ। তিনি
ফায়ার বিগ্রেডে টেলি ফে। করিতে নামিয় গেলেন।
বারীন কহিল, এযে কিছুই বুঝতে পাচিনে, এতটা
রিষ আগে তা ত জান্তুম না-বেশ, সংকল্পই যদি ছিল, তবে
আগে সতীনটাকে দেখেই তবে আগুন দেওয়া ত উচিত
ছিল। কোথায় সে-
মােহিনী জোর হাত করিয়া সেই উন্মাদ কণ্ঠে কহিল,
আর ভুলিও না গো—অনেক ভূলিয়েছ।•••অনেক সােহাগ
করেছ। এতটা ফকি, জানতাম না নিয়ে এলে কালো
রাণীকে-আট ঘােড়ার রথে চড়িয়ে•••মনে করেছ শুনতে
পাই নি ? গাড়ীর চাকায় শব্দ যে মেঘের ডাককেও
ছাপিয়ে আসছিল। শুনেছি গো—শুনেছি—আমার বুকে
সে আওয়াজ বেজেছে-
বারীন কহিল, বুঝিয়ে বললাে বড় বউ। বলাে যে
সে কালো বউ, ওলাউঠোয় কাশীতেই চলে গেছে। আর
বিংশ পরিচ্ছেদ
তােমার সুখের পথে কাটা হ’তে আসবে না, বুঝিয়ে
বলে।
মােহিনী জড়িত কণ্ঠে কহিতে লাগিল, বােঝাবে
আর কাকে? আমারই বা কতক্ষণ? আর মিথ্যে মায়ায়
ভূলবো না। অনেক ছলনাই করেছ।•••দশবৎসর ছলন।
করেছ।•••আমার সৌভাগ্যের সঙ্গে...আমার জীবনেরও
শেষ ••তাই এ সজ্জা ! মনে ধরে কি গাে-মনে ধরে..?
একটা আশঙ্কায় রমা তাড়াতাড়ি মােহিনীকে চাপিয়া
ধরিয়া দেখিল, একটা তীব্র গন্ধ, তাহার মুখ হইতে নির্গত
হইতেছে। ব্যস্ত হইয়া ডাকিল। ঠাকুরপো দেখ দেখি
বােধ হচ্চে আগুন লাগিয়েও এর আশা মেটে নি, বিষ ও
খেয়েছে-এই যে লাল ভাঙচে।
মােহিনী রমার কোলটাতে চলিয়া পড়িয়া কহিল,
হ দিদি বিষই খেয়েছি•••এক সঙ্গে জীবন, যৌবন, ঐশ্বর্য
সবারই মুলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছি•••এখন দেখুক দাড়ায়ে
ঐ সর্বনেশে•••শুধু কি তাই ? মরণের পরও প্রেত হয়ে
প্রতিহিংসা নেব।
রমা কাঁদিয়া কহিল, হায় অভাগিনী কার সর্বনাশ
করতে কার সর্বনাশ করলি? তুই যে নিজের সর্বনাশ
নিজে ডেকে আনলি—এমন স্বামী কন্যা ফেলে কি না বিষ
১৫৮
মণি-হারা
খেলি? ••তাের সতীনও কি এলাে? তাের স্বামী যাবার
আগেই বিশ্বেশ্বরের বুকে তার ভার নামিয়ে রেখেছিল।
এখন তুইও গেলি?ডাক্তার ডাকাও ঠাকুরপো-ডাক্তার
ডাকাও। বাচলেও বাঁচতে পারে-
বারীন এতক্ষণ স্তম্ভিতর ন্যায় হইয়া গিয়াছিল। ।
তাহার মনে হইতেছিল পৃথিবী যেন তাহার পদ নিম্নে
কঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে। আস্তে আস্তে সরিয়া আসিয়া
কহিল। ডাক্তার ডেকে আর কি হবে বড় বউ ? জীবনে
সুখ হবে না জানি, ঐ যে মা-টিকে দেখছোউনিই আমার
সমস্ত জীবনটাকে জ্বালিয়ে দিলেন। কি যে মেয়ের বাপের
টাকার পরে তার লােভ ছিল-একটা জীবন নষ্ট করে
দিলে। সে দীর্ঘশ্বাস কি বিফল হয়? সাতবৎসর আগে-
কার বেহারী বাবুর অভিশাপ মনে পড়ছে•••ম-মনে
পড়ছে কি!
কাত্যায়ণী মােহিনীর শীর্ণ প্রায় মুখের উপর পড়িয়া
কহিলেন ওরে বারীন, তাতে কি আমি একলাই দোষী ?
তুই কিছু জানতিসনে ?•••ওঠো মা আমার ওঠো! তুমি যে
রাঙ্গা বউমামা মােহিনী! রাজরাজেশ্বরী !
ধন্নিলাল, যা বাবা শীগগীর ডাক্তার নিয়ে আয়—এখনও
মুখ চোখ নীল হয়ে যায়নি।
ওয়ে
= = = = = = = বিংশ পরিচ্ছেদ ধন্নিলাল আর কালবিলম্ব না করিয়া তাহার মুনিব- ঠাকরুণের আদেশ পালন করিতে ছুটিয়া বাহির হইয়া গেল। সমাপ্ত। দাশ ০. ()
এই গ্রন্থকারের লেখা বই .
মুখাচ্ছি বােস এণ্ড কোং ও অন্যান্য দোকানে পাওয়া যায়-
১। ভালবাসা।প্রিয়জনের হাতে উপহার
দিবার সুন্দর সামগ্রী। ভারতী বলেন, লেখকের বিশ্লে
ষণাত্মক উপন্যাস লিখিবার শক্তি আছে, ভাষায় ভাব
আছে-প্রাণ আছে, আজকালকার অতি অল্প লেখকের
উপন্যাসেই এরূপ রচনাশক্তির পরিচয় পাই। মূল্য ১২
এক টাকা মাত্র।
২। মায়ার শৃঙ্খলা-বাঙলার কন্যাদায়গ্রস্থ
জীবনের করুণ কাহিনী। প্রবাসী বলেন, প্রাঞ্জল মার্জিত
ভাষায় রচিত। এই উপন্যাসখানি পাঠ করিয়া আমরা
যথেষ্ট আনন্দ পাইয়াছি, লেখক হৃদয় দিয়া বইখানি
লিখিয়াছেন, সেইজন্য তাহার বক্তব্যগুলি সহজেই পাঠকের
চিত্ত স্পর্শ কয়ে। মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে গ্রন্থকারের শক্তির
পরিচয় পুস্তকের অনেক স্থলেই পরিস্ফুট। মূল্য ॥y•
দশ আনা মাত্র।
৩। শুভদৃষ্টি।-মনােজ্ঞ গল্পসমষ্টি। মুনার
বাধাইলাম ॥ আট আনা মাত্র।
৪। স্বর্ণ-মরু।-যুবকদের পড়িবার একান্ত
উপযােগী। ইহাতে ভাবিবার ও বুঝিবার অনেক আছে।
দাম ॥ আট আনা মাত্র।
স্বয়ম্বরা।-স্বর্গ হইতে যেন একটা সুর
নামিয়া আসিয়া, পৃথিবীর উপর দিয়া একটা অসহ পুলক
আঁকিয়া গিয়াছে। দাম ১• দেড় টাকা মাত্র।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.