Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Farasi Birangana Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কৱাসী-বীরাঙ্গনা
(জোয়ান্ দার্কের জীবন-চরিত ও কার্যকলাপ)
শ্রীনগেন্দ্রকুমার গুহ রায়
প্রথম সংস্করণ
মূল্য পাঁচ সিক।
প্রকাশক
পরিমলবিহারী রায়
সরস্বতী লাইব্রেরী
৯, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা
দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণ
জ্যৈষ্ঠ-১৩৪০
প্রিন্টার
শ্রীশৈলেন্দ্রনাথ গুহ রায় বি-এ
শ্রীসরস্বতী প্রেস লিঃ,
১, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা
=নিবেদন= ‘ফরাসী বীরাঙ্গনা আমার সাহিত্যক-জীবনের প্রথম গ্রন্থ। বাংলার প্রধান প্রধান মাসিক ও সাময়িক পত্রিকার এবং খ্যাতনামা মনীষী ও লব্ধপ্রতি সাহিত্য-সেবকগণের নিকট হইতে ফরাসী বীরাঙ্গন। উচ্চ প্রশংসা লাভ করিয়াছিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও সম্ভবতঃ ঐতিহাসিক গ্রন্থ বলিয়াই, প্রথম সংস্করণের এক হাজার পুস্তক নিঃশেষিত হইতে বৎসর পাঁচেক সময় লাগিয়াছে। গ্রন্থখানির যখন দ্বিতীয় পুনমুদ্রণের সময় হইয়াছিল, তখন আমি অন্তরীণে আবদ্ধ ছিলাম। অন্তরীণ-মুক্তির পরে ‘সরস্বতী- লাইব্রেরীর’ কর্তৃপক্ষ গ্রন্থ-প্রকাশের ভার নিয়াছিলেন। কিন্তু, নানা কারণে তঁাহারা যথাসময়ে পুনমুদ্রণের ব্যবস্থা করিয়া উঠিতে পাবেন নাই। আমার নিজের ঔদাসীন্যও ইহার জন্য কতেকাংশে দায়ী। ব্যস্ত কৰ্ম্ম-জীবনের আকর্ষণে কিছুকালের জন্য সাহিত্য-লােক হইতে দূরে সরিয়া পড়িয়াছিলাম বলিয়া এ বিষয়ে আমার আগ্রহ-উৎসাহও তেমন ছিল না। গ্রন্থখানির দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণে যে সুদীর্ঘ বিলম্ব, ইহাই তাহার কারণ।
গ্রন্থে সংযােগ করিবার মত নূতন কোনাে উপাদান পাইলাম না। প্রথম সংস্করণে স্থান ও ব্যক্তির নাম-বাচক ফরাসী শব্দ- গুলিকে বিশুদ্ধভাবে বাংলায় অক্ষরান্তরিত করিতে পারি নাই। এবারে তাহা করা হইল। ফরাসী ভাষায় সুপণ্ডিত ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের শ্ৰীযুত নীরােদ চন্দ্র চৌধুরী মহাশয় আমাকে সাহায্য করিয়া উপকৃত করিয়াছেন। জ্যৈষ্ঠ-১৩৪০ বিনীত-গ্রন্থকার প্রথম সংস্করণে গ্রন্থকারের নিবেদন বৰ্ত্তমান গ্রন্থের উপসংহার ব্যতীত আর সমুদয় অংশই তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের প্রভাতে ধারাবাহিক সন্দৰ্ভাকারে প্রকাশিত হইয়াছিল। স্থানে স্থানে যৎসামান্য পরিবর্তন ও নূতন কথা সংযােগ করিয়া উহা গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হইল। উপসংহার সম্পূর্ণ নৃতন করিয়া লিখিত হইয়াছে। সুপ্রভাত-সম্পাদিকা শ্রদ্ধেয়া শ্ৰীযুক্তা কুমুদিনী মিত্র বি-এ, সরস্বতী মহােদয়া সর্বপ্রথম আমার এই অকিঞ্চিৎকর সন্দর্ভ পাঠ করিয়া আমাকে উৎসাহ-দান করেন এবং উহা তাহার পত্রিকায় প্রকাশ করিয়া অনুগৃহীত করেন। তাঁহার ন্যায় একজন বিদুষীর উৎসাহ না পাইলে আমি এ কাৰ্য্যে এতদূর অগ্রসর হইতে পারিতাম কিনা সন্দেহ। এই নিঃস্বার্থ স্নেহানুগ্রহের জন্য আমি তঁাহার নিকট চিরকৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রহিলাম । আমার পূজনীয় শিক্ষাগুরু, বঙ্গ-বিশ্রুত ঐতিহাসিক লেখক পণ্ডিত সখারাম গণেশ দেউস্কর ও আৰ্যনারী-প্রণেতা খ্যাতনামা সাহিত্যিক, অধ্যাপক কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত এম, এ, দয়া করিয়া গ্রন্থখানি দেখিয়া দিয়াছেন। এজন্য তাহাদিগকে সভক্তি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। চক্রবর্তী-চাটার্জী কোম্পানীর পরিচালক বিদ্যোৎসাহী শ্ৰীযুক্ত অহীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এম, এস, সি ও তদীয় বন্ধুদ্বয় আমাকে উৎসাহ-দান করিয়াছেন এবং এ গ্রন্থ প্রকাশের ভার গ্রহণ করিয়া আমাকে উপকৃত করিয়াছেন। তরুণ তাহাদের নিকট আমি চিরঋণী রহিলাম। এতদ্ব্যতীত যে সমুদয় বন্ধু-বান্ধবের নিকট হইতে আমি এ বিষয়ে নানা প্রকারে সহায়তা ও উৎসাহ পাইয়াছি, তাহাদিগকেও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। যে গরীয়সী মহিলার অলৌকিক বীরত্বকাহিনী ও কার্যকলাপ এ গ্রন্থে বিবৃত হইয়াছে, তিনি বিদেশিনী হইলেও জননী-জাতির গৌরব। এই বিশ্ব-বিশ্রুত বীরাঙ্গনার কর্মময় জীবনে একাধারে ভগবৎ-প্রেম, স্বদেশানুরাগ, স্বজাতি-প্রীতি ও রাজভক্তির অপূর্ব সমাবেশ দৃষ্ট হইবে। এ গ্রন্থ পাঠে যদি জননী জাতির একজনও উপকৃত হন এবং যাহারা শক্তি-স্বরূপিণী জননী-জাতিকে পুরুষঃ- পেক্ষা হীন-শক্তি জ্ঞান করিয়া উপেক্ষা করিয়া থাকেন, তাহাদের মধ্যে একজনও যদি এই গ্রন্থালােচনা দ্বারা জননী-জাতির প্রতি শ্রদ্ধাবান্ হইয়া উপেক্ষার ভাব পরিহার করেন, তবে শ্রম সফল জ্ঞান করিব। আশ্বিন- বিনয়াবনত ১৩১৯ বঙ্গাব্দ । গ্রহকার উৎসর্গ- * st হল আজ যে মহাপুরুষ সনাতন ধর্মের উদ্ধার-মানসে ধন-সম্পদ, প্রিয়-পরিজন ও যশঃ-প্রতিপত্তি ত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছায় দুঃখ-দারিদ্র্যকে বরণ করিয়া লইয়াছেন, যিনি ভােগৈশ্বর্যের পরিবর্তে বৈরাগ্যকে অঙ্গাভরণ করিয়াছেন, যিনি বিশ্বজননীর চরণতলে আত্মনিবেদন করিয়া ত্যাগের মাহাত্ম প্রচার করিয়াছেন, যাহার মধুর-মূরতি-চিন্তনে এ পাপ-প্রবণ হৃদয় পবিত্রতার অনাবিল ধারায় অভিষিঞ্চিত হয়, যাহার কর্মের দ্যুতি ও প্রতিভার প্রভা স্মরণ করিলে এ দুৰ্বল দেহে অপূৰ্ব্ব শক্তির স্ফুরণ হয়, এবং যাহাকে গুরুভাবে অর্চনা করিয়া নিজকে কৃতার্থ জ্ঞান করি, সেই সত্যব্রত, জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী, মহামন্ত্রের একনিষ্ঠ সাধক আমার পরমারাধ্য আচাৰ্য-দেবের পবিত্র নামে এই পুণ্য-কাহিনী উৎসর্গ করিলাম। জন্মদিন শ্রীচরণাশ্রিত অকৃতী শিষ্য গ্রন্থকার
No text on this page.
শ্রীনগেন্দ্রকুমার গুহ রায় প্রণীত
গ্রন্থাবলী-
১০
১০
১০
১। ফরাসী বীরাঙ্গনা ( দ্বিতীয় পুনমুদ্রণ )
২। স্বাধীনতার কথা
স্বরাজ সাধনায় বাঙ্গালী
৪। নিবেদন ( কাব্য গ্রন্থ )
পঞ্চব্যঞ্জনের আত্মকথা ( রস-রচনা )
বিবেকানন্দ-প্রসঙ্গ
০
ছাপা নাই
চন্দ্রহাস-বিষয়া
=সূচী-পত্র =
মায়ের কোলে
•••
১
p০০
মন্ত্রে দীক্ষা
২১
pre
সমর-প্রাঙ্গণে
১
মত্রের সাধন
৩
০০০
কারাগারে
৭১
১০৭
অনল-কুণ্ডে
উপসংহার
১১৩
then meni.
**Women have more heart and imagination
Enthusiasm arises froin imagination
self-sacrifice springs from the heart. They
are therefore by nature more heroic than herocs.
And when this heroism becomes supcrnatural it
is from woman that the wonder must be expected
Men would stop at valour."
-LAMARTINE
"The Martyr may perish at the stake, but the truth for which he dies may gather new lustre from his sacrifice. The Patriot may lay his head upon the block, and hasten the triumph of the cause for which he suffers. The memory of a great life does not perish with the life itself, but lives in other minds." -SMILES -মায়ের কোলে
“ভাঙ্গা আশা উঠিবে যুড়িয়া,
দীপ শিখা উঠিবে স্ফুরিয়া
দুটি দিন মা’র কোলে আয়।”
কামিনী রায়--
No text on this page.
++ -হস্তে বীরাঙ্গন ফরাসী বীরাঙ্গনা -মায়ের কোলে জন্ম- পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ফ্রান্স, দেশে যে যােড়শবর্ষীয়া বীর বালিকা দাসত্ব-নিগড়-বদ্ধ স্বদেশের প্রনষ্ট স্বাধীনতা-রত্নের পুনরুদ্ধার-মানসে পল্লী-জননীর স্নিগ্ধ বক্ষ হইতে চির বিদায় লইয়া শশাণিত-রাগ-রঞ্জিত, ভৈরব-হুঙ্কার-মুখরিত সমর-প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হইয়া- ছিলেন—যিনি নিপীড়িত স্বদেশবাসীর দারিদ্র্য ও অত্যাচার-জনিত করুণ মৰ্ম্মোচ্ছ্বাসে ব্যথিত হইয়া তদূবিমােচন-প্রয়াসে সর্বত্যাগিনী হইয়াছিলেন—যিনি একাধারে ভগবৎ-প্রেম ও স্বদেশপ্রেমের ফরাসী বীরাঙ্গনা প্রতিমূর্তি ছিলেন—যাহাকে সভ্যতাভিমানী বর্তমান খ্রষ্টান জাতির পূর্ব-পুরুষগণ জীয়ন্ত দগ্ধ করিয়া পশু- প্রকৃতির পরিচয় দিয়াছেন—সেই বীরাঙ্গনার অলৌকিক চরিত্রের পরিচয় নানা প্রকারেই শিক্ষাপ্রদ। এই বীরাঙ্গনার কৰ্ম্মপূত জীবনে এক দিকে যেমন ভগবৎ- প্রেম ও স্বদেশপ্রেমের মধুর সমাবেশে অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব শক্তির ক্রীড়া পরিলক্ষিত হয়, অপর দিকে তেমনই রমণী-হৃদয়ে পুরুষােচিত দৃঢ়তা, সঙ্কল্প-সাধনে তৎপরতা, বিপৎকালে ধৈৰ্য্য ও সহিষ্ণুতা ও সর্বোপরি সুখ-দুঃখে, সম্পদ-বিপদে ও হর্ষ-বিষাদে নিয়ত ভগবানে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় নির্ভর পরিলক্ষিত হয়। যৎকালে ক্যালে হইতে বাের্দো অবধি ফ্রান্স, দেশের উত্তর ও পশ্চিম প্রদেশ সমূহে এবং পেরী ও রুয়'। নগরীতে ইংরাজের বিজয়-বৈজয়ন্তী সগর্বে ইংলণ্ডাধিপতি পঞ্চম হেনরীর আধিপত্য ঘােষণা করিতেছিল, নিরীহ প্রজাকুল উদ্ধত ইংরাজ সৈন্যের অযথা অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া উঠিয়াছিল, দুর্বিষহ অত্যাচার-সহনে অক্ষমতা হেতু ফরাসীরা হিংস্র-জন্তু-সমাকুল বন্ধুর পৰ্বতারণ্যে আশ্রয় লইতেছিল, পরাধীনতার নির্মম নিষ্পেষণে ধ্বংসসন্মুখ ফরাসী প্রজাকুলে মৃত্যুর পূর্বাভাস ৪
মায়ের কোলে
সূচিত হইতেছিল, তাহার কিছুকাল পূর্বে লরেন্
প্রদেশের প্রান্তভাগ-স্থিত দরেমি গ্রামে ১৪১২ খ্ৰীষ্টাব্দে
জনৈক কৃষকের গৃহে জোয়ান্ দার্কের জন্ম * হয়।
বংশ পরিচয়
জোয়ান্ দার্কের পিতা জাক্ দার্ক সামান্য একজন
কৃষিজীবী ছিলেন। তদীয়া মাতা ইসাবেলা রােমী
সাতিশয় ধর্মপরায়ণা ও কর্তব্যনিষ্ঠা রমণী ছিলেন।
তিনি পুণ্যভূমি রােম্ দর্শন করিয়া “রােমী” উপাধিতে
ভূষিত হইয়াছিলেন। সে-কালে রােম্ খ্ৰীষ্টানদিগের
প্রধান তীর্থক্ষেত্র বলিয়া পরিগণিত ও বহুসংখ্যক
ধৰ্ম্ম-বীরের পুণ্য সমাধি-ভূমি ছিল বলিয়া যাহারা
রােমের তীর্থক্ষেত্র পরিভ্রমণ করিয়া আসিতেন, তাহারা
পুণ্যাত্মা বলিয়া সম্মানিত হইতেন; এবং “রােমী” এই
জোয়ান্ দার্কের কোন্ খ্রীষ্টাব্দে জন্ম হয়, এ বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন
মত দৃষ্ট হয়। কাহারও মতে ১৪১০ খ্ৰীষ্টাব্দে তাহার জন্ম হয় ; আবার কাহারও
মতে ১৪১২ খ্ৰীষ্টাব্দই ঠিক। আমরা এই শেষােক্ত মতেরই পােষকতা করি।
কারণ ১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দে বিচারালয়ে তাহার বিচার আরম্ভ হয়। তৎকালে
তিনি বিচারকদিগের প্রশ্নের উত্তরে একস্থলে বলিয়াছিলেন যে, তাঁহার বয়স
উনবিংশতি বৎসর। সুতরাং তদনুযায়ী ইহা প্রতিপন্ন হয় যে তিনি ১৪১২
খ্রষ্টাব্দেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।
ফরাসী বীরাঙ্গনা
তন্মধ্যে
ধার্মিকতা-সূচক উপাধিতে ভূষিত হইতেন। জোয়ানের
তিনটি ভ্রাতা ও একটি ভগিনী ছিল।
জোয়াই সর্বকনিষ্ঠা। জন্ ফিদেজা, জন্ গাস",
জন্ পেতীৎ, জন্ ক্যালভিন্ প্রভৃতি কতিপয় ব্যক্তি
সে-কালে ফ্রান্স, দেশে খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী সাধু পুরুষ বলিয়া
পূজিত ও বিখ্যাত ছিলেন। জোয়ানের ধর্মপ্রাণ
পিতা-মাতা এই সাধু পুরুষদিগের পবিত্র নামানুসারে
কন্যাকে “জোয়ান্” নামে অভিহিত করিয়াছিলেন।
জোয়ান্ (Joan) শব্দটি জ। (Jean) পদেরই অপভ্রংশ।
জোয়ানের গ্রামের লােকেরা তঁাহাকে জেয়নে
(Jeanette) এবং ফ্রান্সের জন-সাধারণ জেয়া
(Jehanne) বলিয়া ডাকিত। তাঁহার অপর নাম
ছিল “লা পুসেল” অর্থাৎ কুমারী। অনেকে তাহাকে
“জোয়ান্ অব আর্ক” এবং “জান, দার্ক”ও বলিয়া
থাকেন ।*
* The family name was Darc, and the name of the Maid
of Orlcans was therefore Jeanne Darc, not Jeanne d'Arc as
commonly written ; but the latter has the sanction of general
usage. ("Historian's History of the World" by Henry Smith
Williams. Vol. XI, Page 197.)
মায়ের কোলে বাল্যকাল- যে-পরিবারে জোয়ানের জন্ম হয়, তাহা “দার্ক” নামে পরিচিত ছিল। এই দার্ক পরিবারে ধর্মপ্রাণ ও পুণ্যশীল পিতা-মাতার ক্রোড়ে লালিত-পালিত হইয়া ও তাহাদের ভগবৎ-প্রেম-নিষিক্ত, সরল, সরস, পূত জীবনের পুণ্য সংস্পর্শে থাকিয়া জোয়ান্ শৈশব হইতেই ভগবচ্চরণে আত্মসমর্পণ করিতে শিখিয়াছিলেন। তিনি কখনও কখনও পিতার সহিত কৃষিক্ষেত্রে যাইতেন, কখনও-বা রন্ধনশালায় বন্ধনকার্যে মাতার সহায়তা করিতেন, আবার কদাচিৎ মাতার পাশ্বে উপবেশন করিয়া শিল্প-কৰ্ম্ম-শিক্ষায় মনােযোগী হইতেন। মাতার নিকট হইতে বাইবেলের ধৰ্ম্মোপদেশ এবং পুরাকালীন বীরপুরুষগণের স্বদেশ ও স্বধৰ্ম্ম-সেবায় আত্মােৎসর্গের বিস্ময়ােদ্দীপক কাহিনী শুনিয়া তাহার হৃদয়ে স্বার্থ- ত্যাগের আদর্শ বদ্ধমূল হইয়াছিল। বিশেষতঃ বয়াে- বৃদ্ধির সহিত স্বদেশবাসী দুঃস্থ নরনারীর মর্মন্তুদ আৰ্তনাদ-শ্রবণে বিদেশীয় উদ্ধত-প্রকৃতি অত্যাচারী সৈন্যগণের হস্তে তাহাদের অযথা নিপীড়ন দর্শনে তঁাহার করুণ হৃদয়ে ব্যাকুলতার সঞ্চার হইতে লাগিল।
ফরাসী বীরাঙ্গনা
সশস্ত্র ও উদ্ধত ইংরাজ সৈন্যগণের অত্যাচার-ভয়ে
ভীত হইয়া পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসী অসহায় নরনারী যখন
তাহাদের গৃহে আশ্রয়-প্রার্থী হইত, তখন জোয়ান্
তাহাদিগকে সযত্নে আশ্রয়-দান করিয়া বিপদ হইতে
রক্ষা করিতেন। এক সময়ে তাহার বাসভূমি দমূরেমি
গ্রামও মদোন্মত্ত, উচ্ছঙ্খল সৈন্যগণ দ্বারা আক্রান্ত
হইয়াছিল। তখন আত্মরক্ষাৰ্থ ভঁহাদেরও গ্রাম
পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক অরণ্যে আশ্রয় লইতে হইয়াছিল।
পরে যখন সৈন্যগণ গ্রাম পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল,
তখন তঁাহারা গ্রামে প্রত্যাবর্তন করিয়া দেখিলেন,
গ্রামের ধৰ্ম্মমন্দির ও অধিকাংশ গৃহ ভস্মীভূত এবং
গ্রামখানি বিধ্বস্ত ও জনশূন্য হইয়াছে। এই শােচনীয়
দৃশ্যে জোয়ানের হৃদয় অধিকতর অভিভূত হইল।
তিনি স্বভাবতঃই দয়াবতী ও কোমল-হৃদয় ছিলেন,
এবং পরসেবা করিতে ভালবাসিতেন। যখনই তিনি
গ্রামবাসী কাহারও উৎকট পীড়ার সংবাদ পাইতেন,
তখনই রােগীর শয্যা-পার্শ্বে উপস্থিত হইয়া তাহার
যথােচিত সেবা-শুশ্রুষা করিতেন। ভগবানে তাহার
অচলা ভক্তি এবং স্বধর্মে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল। পাশ্চাত্য
দেশে সাধারণতঃ এই শ্রদ্ধার অভাব। তিনি ঈশ্বরে-
মায়ের কোলে পাসনাকে প্রধান কর্ত্তব্য বলিয়া জ্ঞান করিতেন। তাই ধৰ্ম্মমন্দিরের উপাসনাদি ও অন্যান্য ধর্মবিষয়ক অনু- ষ্ঠানাদিতে সাগ্রহে যােগদান করিতেন। তৎকালে গ্রামে বিদ্যালয় ছিল না বলিয়া তিনি বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারেন নাই। কিন্তু যে ভক্তিতে ঈশ্বর লাভ হয় এবং পূত-চরিত্রা হইয়া আদর্শ-জীবন যাপন করা যায়, সেই ভক্তিতত্ত্ব তিনি শৈশবে মাতার নিকটে যথেষ্ট প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি নির্জনতা ভালবাসিতেন। গৃহ-সংলগ্ন শ্যামল প্রাঙ্গণে উপবিষ্ট হইয়া তিনি উন্মুক্ত বিশাল নীলাম্বর, দূরস্থিত অভ্রভেদী পৰ্বতমালা এবং তরুলতা-পরি- শােভিত নির্জন বনভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য সন্দর্শন- পূৰ্ব্বক সাতিশয় আনন্দানুভব করিতেন। তঁাহার পিতামাতা তরুণ বয়সে তাহার এই প্রকার নির্জন-বাসে অস্বাভাবিক অনুরাগ ও সাংসারিক বিষয়ে ঔদাসীন্যের জন্য তাহাকে তিরস্কার করিতেন; এবং তিনি যাহাতে বিবাহ করিয়া সাংসারিক সুখের অধিকারিণী হন, তজ্জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেন।# জোয়ানের অসামান্য * In her own family she encountered not only resistance but temptation ; for they attempted to marry her, in hope of
ফরাসী বীরাঙ্গনা
রূপ-লাবণ্য এবং অপর দিকে তঁাহার পূত চরিত্রের
বিমল প্রভা ও বিনয়-নম্র স্বভাব গ্রামবাসী যুবকগণের
হৃদয় স্বভাবতঃই আকর্ষণ করিল। অনেক যুবক তাহার
সহিত পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হইবার প্রস্তাব করিলেন।
জোয়ান্ সে সকল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া পুণ্যবতী
ভার্জি-মেরীর (Virgin Mary) ন্যায় আজীবন
কৌমার-ব্রত পালন করিবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করিলেন।
কিন্তু ইহাতেও তিনি নিস্তার লাভ করিতে পারিলেন
। জনৈক যুবক তাহাকে লাভ করিবার বাসনায়
অন্ধ হইয়া তুল্-এর (Toul ) ধৰ্ম্মবিচারালয়ে হার
বিরুদ্ধে এই মর্মে এক অভিযােগ আনয়ন করিলেন,
যে, জোয়ান্ ভঁহাকে বিবাহ করিবেন বলিয়া ধৰ্ম্মতঃ
প্রতিশ্রুত হইয়াও এখন সে প্রতিশ্রুতি-পালনে অসম্মতি
জ্ঞাপন করিতেছেন। এই অভিযােগ উত্থাপিত হওয়ায়
সকলে ভাবিলেন, জোয়ানের ন্যায় মৃদু-প্রকৃতি শান্তি-
প্রিয়া ও সুশীল। বালিকা কিছুতেই ইহার প্রতিবাদ
করিতে অগ্রসর হইবে না। সুতরাং এবার তাঁহাকে
সংসার-ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিতেই হইবে; ফলে তাহার
winning her back to more rational notions as they considered.
(History of France by M. Michelet, Translated by G. H.
Smith. Vol. II. Page 123).
মায়ের কোলে
ঔদাসীন্য দূর হইবে, সংসারে আসক্তি জন্মিবে। কিন্তু
জোয়ান্ বিচারালয়ে উপস্থিত হইয়া দৃঢ়তার সহিত
বিচারককে বলিলেন--“আমার বিরুদ্ধে আরােপিত
অভিযােগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কল্পনা-প্রসূত। আমি
কাহাকেও বিবাহ করিবার জন্য কখনও প্রতিশ্রুত হই
নাই।” বিচারক তাহার সরল উক্তির সত্যতা উপলব্ধি
করিলেন এবং আরােপিত অভিযােগ হইতে তাহাকে
মুক্তি প্রদান করিলেন।
জোয়ানের জীবন-স্রোত সম্পূর্ণ বিপরীত গতি
অবলম্বন করিল, সংকল্প অধিকতর দৃঢ় হইল এবং
পতিত স্বদেশবাসীর উদ্ধার-সাধনের মহতী আকাঙক্ষা
তাহার হৃদয়ে দুর্দমনীয় হইয়া উঠিল; কিন্তু ‘শ্রেয়াংসি
বহুবিদ্যানি’। মহদুদ্দেশ্যপ্রণােদিত হইয়া মানুষ
যখন সিদ্ধিলাভাশায় কঠোর সাধনায় প্রবৃত্ত হয়, তখন
দুর্লঙ্ঘ্য বিপদরাশি তাহার পথ রুদ্ধ করিয়া দাড়ায়।
দুৰ্বল-চিত্ত ব্যক্তিরা তদ্দর্শনে ভীত ও শঙ্কিত হইয়া
প্রত্যাবর্তন করে ; আর যাহারা সংযমী, দৃঢ়চিত্ত ও
ঈশ্বর-নিষ্ঠ, তাহারা সর্ব প্রকার বিপজ্জাল ভেদ করিয়া
লক্ষ্য-পথে অগ্রসর হয়, এবং মেঘ-মুক্ত সূর্যের ন্যায়
দ্বিগুণ প্রভায় মণ্ডিত হইয়া জগৎকে উদ্ভাসিত করে।
;
ফরাসী বীরাঙ্গনা -ফ্রান্স-দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা ১৪১৫ খ্রীষ্টাব্দে ইংলণ্ডের রাজা পঞ্চম হেরী আজীকোর্ল্ডের যুদ্ধে ফরাসীদিগকে পরাস্ত করিলেন। ইহার দুই বৎসর পরে তিনি পুনরায় ফরাসীদিগের রাজ্য আক্রমণ করিয়া নৰ্মান্দি জয় করিলেন। ফরাসী ভূপতিদিগের মধ্যে তখন আত্মবিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছিল। এই আত্মবিদ্রোহে বার্গাণ্ডির ভূপতি জন্ (John, Duke of Burguidy) এক পক্ষের নেতা ছিলেন। তিনি রাজপুত্র চালস্-দোফা ও অন্যান্য ফরাসী নেতৃবর্গের সম্মুখে নিহত হইলেন। তাঁহার পুত্র ফিলিফ্ ইহাতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। পিতৃ-হত্যার প্রতিশােধ লইবার জন্য তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির স্বার্থে পদাঘাত করিয়া ইংরাজের সহিত মিত্ৰতা করিলেন। ইহার ফলে একদিকে ফরাসীদিগের শক্তির হ্রাস হইল, পক্ষান্তরে ইংরাজদিগের শক্তি বৃদ্ধি পাইল। ফরাসীদিগের তদানীন্তন রাজা ষষ্ঠ চালস ইংরাজ- দিগের এই বর্ধিত ও মিলিত শক্তি দমন করিতে অক্ষম হইয়া ১৪২০ খ্রীষ্টাব্দে ইংলণ্ডাধিপতি পঞ্চম হেন্ত্রীর সহিত সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ হইলেন। ইংলণ্ডাধিপতি সন্ধির মায়ের কোলে সর্তানুসারে ফরাসী-রাজের কন্যা কেথারীকে বিবাহ করিলেন; এবং তাহার অবর্তমানে ফ্রান্সের ভাবী উত্তরা, ধিকারী মনােনীত হইলেন। ইহার ফলে উত্তর ফ্রান্সের অধিকাংশ প্রদেশই ইংলণ্ডাধিপতির আধিপত্য স্বীকার করিল। কিন্তু রাজপুত্র দোষ্ণা দক্ষিণ ফ্রান্সে ইংরাজ- দিগের বিরুদ্ধে উখিত হইলেন, এবং পিতৃসিংহাসন দাবী করিলেন। সুতরাং দোফঁাকে দমন করিবার মানসে ইংলণ্ডাধিপতি পুনরায় ফরাসীদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই ৪২২ খ্রীষ্টাব্দে পঞ্চ- ত্রিংশৎ বৎসর বয়সে তাহার মৃত্যু হইল। ফরাসী রাজা চাল ও জামাতার মৃত্যুর পর দুই মাসের মধ্যে ইহলােক পরিত্যাগ করিলেন। ইহার পর ইংলণ্ডাধি- পতির শিশু-পুত্র হেল্পী (ষষ্ঠ হেরী) ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইলেন। এই শিশু- পুত্রের খুল্লতাত বেফোর্দের ভূপতি (Duke of Bedford) $1819 অভিভাবক-স্বরূপ রাজ্য-শাসনের ভার গ্রহণ করিলেন। দোফার ন্যায় দুর্বল নৃপতি চতুর ও দক্ষ শাসনকর্তা বেফোর্দের শক্তি খর্ব করিতে পারিলেন না। এ দিকে ফরাসীরাও অন্তরের সহিত তাঁহার পক্ষ সমর্থন করিল না। কারণ তাঁহার মাতা ফরাসী বীরাঙ্গনা ইসাবেলার (Isabella ) চরিত্রে জনসাধারণ সন্দিহান ছিল। সুতরাং দোফা চালসের পুত্র নহে, তাহাদের ধারণা জন্মিল। এই জন্যই ফরাসীরা দোর্ফার প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন করে। এই প্রকার আরও নানাবিধ কারণে রাজ্যের অবস্থা অতীব শশাচনীয় হইয়া পড়িল। ভূস্বামীদিগের মধ্যে আত্মবিদ্রোহ উপস্থিত হইল, উদ্ধত সৈন্যগণ গ্রামের পর গ্রাম লুণ্ঠন- পূৰ্ব্বক জনশূন্য করিতে লাগিল, অধিকাংশ প্রদেশ ইংরাজের দাসত্ব স্বীকার করিল। ফরাসী ঐতিহাসিক লামাবৃতি ( Lamartine) ফ্রান্সের তৎকালীন অবস্থা বর্ণনা করিতে গিয়া একস্থলে বলিয়াছেন :- Thus the king seeking in vain his subjects amongst his people, the people vainly seeking their king in the monarchy; the Frenchman fruitlessly looking for his country in France ; such the state of the nation. # was * See Lamartine's "Memoirs of Celebrated Characters' Vol ll, Page 59. ১৪ মায়ের কোলে অর্থাৎ রাজা দেখিলেন, জনসাধারণের ভিতর তাহার প্রজা বলিতে কেহ নাই ; জনসাধারণ দেখিল, যথেচ্ছ শাসনের বাহুল্যে দেশে রাজা বলিতে কেহ নাই; এবং ফরাসীরা দেখিল, ফ্রান্সে তাহাদের স্বদেশ বলিবার কিছুই নাই। দৈববাণী শ্রবণ ও স্বর্গীয়-দূতের -সাক্ষাৎ লাভ- স্বদেশের এই প্রকার হেয় বন্ধন-দশা এবং দৈন্য- পীড়িত ও পতিত স্বদেশবাসীর যন্ত্রণা জোয়ানের অসহ্য হইয়া উঠিল। জন্মভূমির এই হীন চিত্ৰ ভঁহার হৃদয়ে নিয়ত প্রতিফলিত হইতে লাগিল। কি উপায়ে স্বদেশের দাসত্ব মােচিত হইতে পারে, এবং কি উপায়েই বা বিদেশীর অত্যাচার হইতে স্বদেশবাসী নিষ্কৃতি পাইতে পারে, ইহাই তাহার একমাত্র চিন্তার বিষয় হইয়া দাঁড়াইল। তিনি নির্জনে বসিয়া ভগবানের নিকট ব্যাকুল-হৃদয়ে করুণ প্রার্থনা জানাইতেন, এবং মনে মনে চিন্তা করিতেন—“ভগবান কি এই পতিত দেশকে উদ্ধার করিবেন না। তিনি কি নিপীড়িত স্বদেশবাসীর দুঃখ-দৈন্য মােচন করিবেন না? নিরীহ ফরাসী বীরাঙ্গনা স্বদেশবাসী কি চিরদিনই এই পূতিগন্ধময় দাসত্ব- নরকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকিবে ? ভগবান কি তাঁহাদের জন্য মুক্তিদাতা প্রেরণ করিবেন না ?” অবশেষে একদিন গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যার প্রাক্কালে ধৰ্ম্ম- মন্দিরের প্রাঙ্গণের প্রান্ত-দেশে দিব্য-আভা-বিশিষ্ট আলােক-রশ্মি অকস্মাৎ তঁাহার নয়ন-গােচর হইল। মুহুর্ত্তেক পরেই সে দিক হইতে দৈববাণী শুনিতে পাইলেন—“জোয়ান্, পূতচরিত্রা হও; ভগবানে আত্মনির্ভর কর।” ইহা শুনিয়া তিনি সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন! ইহার পরেও অপর এক সময়ে আর একবার তিনি ঐ প্রকার দৈববাণী শুনিতে পাইয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি চতুর্দশ কি পঞ্চদশ বৎসরে পদার্পণ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ঘটনার পরেও পুনরায় দুইজন স্বর্গীয়-দূত দিব্য-পরিচ্ছদে ভূষিত হইয়া তাহাকে সশরীরে দেখা দিলেন। তাহারা বলিলেন—“জোয়ান, দোকঁার সাহায্যার্থ যুদ্ধে প্রবৃত্ত স্বদেশকে উদ্ধার কর।” জোয়ান বিস্ময়- বিস্ফারিত-নেত্রে তাহাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া ভৗতি-বিজড়িত অৰ্দ্ধস্ফুট-স্বরে কহিলেন—“আমি রমণী, কি করিয়া যুদ্ধ করিতে হয় জানিনা।” তাহারা
মায়ের কোলে
-
প্রত্যুত্তর করিলেন—“কেথারি ও মার্গারেৎ স্বয়ং
তােমার সাহায্য করিবেন।” জোয়ান্ তদগত-চিত্তে
এই সকল শুনিলেন। কথিত আছে, ইহার পর প্রায়ই
তিনি স্বর্গীয়-দূতের সাক্ষাৎ পাইতেন। তাহারা
যখন অন্তর্ধান করিতেন, তখন তিনি সাশ্রনয়নে ও
আবেগ-পূরিত-কণ্ঠে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিতেন,
“আমাকেও তােমাদের সঙ্গিনী করিয়া লইয়া যাও।”
জোয়ান্ যে দৈববাণী শুনিয়াছিলেন, তাহা
ভগবদ্বাণী—যে স্বর্গ-দূতের সাক্ষাৎ পাইয়াছিলেন, তাহা
ভগবদ্দর্শন। পাশ্চাত্য জগতে ইহা বিশ্বাস-যােগ্য বলিয়া
লােকে মনে করিতে না পারে; কিন্তু প্রাচ্য জগতে
ইহা সহজেই বিশ্বাসযােগ্য বলিয়া গৃহীত হইবে।
মানুষের পক্ষে যে ভগবদ্দর্শন সম্ভবপর, এ কথা জড়বাদী
পাশ্চাত্যেরা সহজে বিশ্বাস করিতে না পারেন; কিন্তু
আমাদের ভারতবর্ষের একজন সাধারণ ব্যক্তিও ইহা
অভ্রান্ত সত্য বলিয়া জানে, যে, ব্যাকুল-চিত্তে ভগবানকে
ডাকিলে তাহার দর্শন লাভ হয় ; ভোগ-বাসনা
ত্যাগ করিয়া সমাহিত-চিত্তে সাধনা করিলে মানবের
অবিদ্যা দূরীভূত হয়, তাহার অন্তর্নিহিত ব্ৰহ্ম জাগ্রত
হয় ; সে নিজ আত্মাতেই ভগবদ্দর্শন পায়। অনেকে
১৭
ফরাসী বীরাঙ্গনা
জোয়ানের স্বর্গ-দূত-দর্শন ও দৈববাণী-শ্রবণের কথা
একেবারে ভিত্তিহীন বলিয়া মনে করেন ; এবং উহা
তাঁহার বিকারগ্রস্ত মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত কাহিনী
বলিয়া তুচ্ছ করেন।
কিন্তু জনৈক ইংরাজ লেখক
“The Patriot Martyr” নামক গ্রন্থের এক স্থলে
লিখিয়াছেন :-
Socrates never ceased to profess himself
guided by an internal voice, to which he paid
implicit obedience, and on which he relied
for counsel in cases of difficulty. When
this silent monitor left him he felt that his
career was ended. Even the great Napoleon,
whom no one will accuse of superstitious
weakness, was subject to this mysterious
influence. On the eve of his celebrated
invasion of Russia, when the tension of his
mind must have been extreme, he frequently
thought he heard a voice calling him by
name, and so audibly that he would leave
his apartment inquiring, “who called me ?"
১৮
মায়ের কোলে Why should less credit be given to the ayowals in this respect of a young and insophisticated village maiden, whose whole life was an exemplification of sincerity and truth, who never ceased to appeal to "the voices," and who died attesting their reality, than has been given to more exalted personages ? অর্থাৎ সক্রেতীশের বিশ্বাস ছিল, তিনি একটা অন্ত- র্নিহিত বাণী দ্বারা চালিত হইতেন। এই জন্য কখনও তিনি এই বাণী অবহেলা করিতেন না। অনেক সময়ে গুরুতর বিষয় উপস্থিত হইলে তিনি অন্তর্নিহিত প্রেরণার উপর নির্ভর করিতেন। যখন তাহাতে আর এই প্রেরণা অনুভূত হইত না, তখন তিনি বুঝিলেন তাহার মৃত্যু নিকটবর্তী। এমন কি, নেপােলিয়ানের ন্যায় কুসংস্কার- শূন্য বিশ্ববিজয়ী বীরপুরুষ—তিনিও এই প্রকার রহস্যময় প্রেরণা দ্বারা চালিত হইতেন। রুষিয়া আক্রমণের পূৰ্ব্বে তাহার মনােবৃত্তি-সমূহ যখন অত্যন্ত উত্তেজিত ছিল, তখন তিনি অনেক সময় শুনিতেন, কে যেন তঁাহার নাম ধরিয়া ডাকিতেছে। এই আহ্বান তিনি
ফরাসী বীরাঙ্গনা
এত সুস্পষ্টরূপে শুনিতেন, যে, তিনি তাহার প্রকোষ্ঠ
হইতে বাহির হইয়া আসিতেন এবং ডাকিয়া জিজ্ঞাসা
করিতেন, “কে আমায় ডাকিল?” সক্রেতীশের ন্যায়
মনস্বী ব্যক্তির ও নেপােলিয়ানের ন্যায় বীরপুরুষের
পক্ষে যদি এই সব কথা সত্য হইতে পারে, তবে
জোয়ানের ন্যায় একজন সরল-প্রকৃতি গ্রাম্য বালিকার
কথা কেন বিশ্বাসযােগ্য বলিয়া গৃহীত হইতে পারিবে
না? কারণ, তাঁহার সমস্ত জীবনে তিনি সরলতা ও
সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়াছেন এবং মৃত্যুর পূর্বেও
তাহার দৈববাণী সত্য বলিয়া ঘােষণা করিয়াছেন।
-মন্ত্রে দীক্ষা- “লইলাম প্রিয় কৰ্ম্ম, মাতৃ-সেব। মহাধর্ম, সার্থক করিব জন্ম দৃঢ় এ প্রতিজ্ঞ মনে।” চণ্ডীচরণ-
-মন্ত্রে দীক্ষা
-
সাধন-পথের অন্তরায় ও তৎসমুদায় দূরীকরণ।
জোয়ানের স্বর্গীয়-দূতের সহিত সাক্ষাৎ-লাভের কথা
অধিক দিন লুক্কায়িত রহিল না। ক্রমে ক্রমে সে কথা
তাঁহার পিতা-মাতারও কর্ণগােচর হইল। সরল ও
আশু-প্রত্যয়-প্রবণ মাতৃ-হৃদয়ে এ কথা সহজেই মুদ্রিত
হইল বটে; কিন্তু পিতার হাতে প্রতীতি জন্মিল না।
তিনি সাতিশয় ধর্মপরায়ণ হইয়াও এবং এইরূপ ঘটনা
ধৰ্ম্ম-গ্রন্থানুসারে সম্ভবপর জানিয়াও কন্যার কথায়
আস্থা স্থাপন করিতে পারিলেন না। তিনি কন্যাকে
শাসাইলেন এবং রুক্ষ-স্বরে বলিলেন-“আর যদি তাের
মুখে কখনও যুদ্ধে যাওয়ার কথা শুনিতে পাই, তবে
তাের প্রাণ বধ করিব।”
২৩
ফরাসী বীরাঙ্গনা পিতার এই প্রকার রুদ্র-মূর্তি-দর্শনে ও প্রতিকূল- মত-শ্রবণে জোয়ানের কোমল হৃদয় চিন্তা-ভারাক্রান্ত হইয়া পড়িল। এক দিকে পিতার কঠোর আদেশ ও অপর দিকে পরাধীনা স্বদেশ-জননীর আকুল আহ্বান- এই পরস্পর-বিরােধী ভাব-দ্বয়ের অবিশ্রান্ত ঘাত- প্রতিঘাতে তাহার তরুণ হৃদয় আলােড়িত ও মথিত হইতে লাগিল। তিনি দেখিলেন—পিত্রাদেশ-পালন তাহার পক্ষে যেরূপ কৰ্তব্য কৰ্ম্ম, লক্ষ লক্ষ স্বদেশবাসীর দুর্দশা-মােচনে আত্মােৎসর্গ তদপেক্ষা কোনও অংশে অল্প পুণ্যজনক নহে; বরং শেষােক্ত কৰ্ত্তব্যই তঁাহার নিকট অধিকতর গুরুতর বলিয়া বিবেচিত হইতে লাগিল। অনেক চিন্তার পর তিনি এই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন যে, পিতৃ-আজ্ঞা পালন অপেক্ষা দেশ-রক্ষার প্রয়ােজনীয়তা ও গুরুত্ব অধিক ; সুতরাং স্বদেশ-জননীর আকুল আহ্বানে কর্ণপাত করাই তিনি শ্রেয়স্কর বলিয়া স্থির করিলেন । কিন্তু পিতার আদেশে উপেক্ষা-পূৰ্ব্বক প্রকাশ্য-ভাবে যুদ্ধে গমন করা অসম্ভব জানিয়া, তিনি কৌশলে গৃহ ত্যাগ করিবার সংকল্প করিলেন। আঁদ্রে লাক্সার (Andre Laxart) নামক তাহার এক পিতৃব্যের পত্নী ২৪ মন্ত্রে দীক্ষা রােগ-শয্যায় শায়িতা ছিলেন। তাঁহার সেবাশুশ্রুষা করিবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করিয়া তিনি পিতার অনুমতি ক্রমে পিতৃব্যের গৃহে গমন করিলেন। তঁাহার পিতৃব্যের হৃদয় অসামান্য উদারতায় পরিপূর্ণ ছিল জানিয়া, তাহার নিকট স্বীয় মহান সংকল্পের বিষয় জ্ঞাপন করিলেন। এরূপ সরলতা ও আবেগের সহিত তিনি পিতৃব্যের নিকট স্বীয় মনােভাব ব্যক্ত করিলেন যে, তাহার হৃদয় মুগ্ধ হইল। জোয়ানের ন্যায় তরুণ- বয়স্কা বালিকাকে এই প্রকার বিপ্ন-সঙ্কুল মহান্ ও পবিত্র ব্ৰত অবলম্বনে অগ্রবর্তিনী দেখিয়া তিনি সাতিশয় মুগ্ধ হইলেন এবং তাঁহাকে যথাসাধ্য সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। এই প্রকার একজন বহুদর্শী, বুদ্ধিমান্ ও প্রৌঢ়- বয়স্ক আত্মীয়ের আশ্রয়-লাভে জোয়ানের আশা ও উৎসাহ শতগুণ বর্ধিত হইল। জোয়ান তঁাহার পিতৃব্যকে ভােকুলার-এর (Vaucouleurs) শাসনকর্তা বােদ্রিকু-এর (Baudricourt) নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে এই শুভ সংকল্পের বিষয় জ্ঞাপন করিতে অনুরােধ করিলেন । কিন্তু সে অনুরােধের ফল জোয়ানের পক্ষে অনুকূল হইল না। গর্বিত ২৫ ফরাসী বীরাঙ্গনা ; শাসনকর্তা কৃষক-বালিকার পবিত্র আকাঙক্ষাকে উন্মত্তের প্রলাপ বলিয়া উপেক্ষা করিলেন; এবং আঁদ্রে লাক্সারূকে বলিলেন—“আপনার ভ্রাতুস্পুত্রীকে বিশেষ-রূপে শাসন করিয়া পিতার নিকট প্রেরণ করুন।” তিনি (জোয়ানের পিতৃব্য) ইহাতে ভগ্ন- মনােরথ হইয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং জোয়ানের নিকট সমুদায় বিবৃত করিলেন। পিতৃব্যের মুখে গর্বিত শাসনকর্তার প্রতিকূল মতের কথা শ্রবণ করিয়া, জোয়ান্ একটু চিন্তান্বিতা হইলেন। কিন্তু মুহুর্তের জন্য ও নিরাশ হইলেন না। তিনি সংকল্প করিলেন, শাসনকর্তার নিকট স্বয়ং উপস্থিত হইয়া তাহাকে স্বীয় অভিপ্রায় পুনরায় জ্ঞাপন করিয়া তাহার মত পরিবৰ্ত্তনের চেষ্টা করিবেন। অতঃপর পিতৃব্যকে সমভিব্যাহারে লইয়া তিনি পদব্রজে ভেকুলা নগরে যাত্রা করিলেন । পথিমধ্যে কখনও স্নেহময়ী মাতার স্নেহ-সম্ভাষণ, কখনও করুণাময় পিতার নিঃস্বার্থ করুণ ব্যবহার, কদাচিৎ ভ্রাতা-ভগিনীর মধুময় প্রীতি-বাক্য, আবার কখনও বা শৈশব-স্মৃতি-বিজড়িত শান্তিময়ী পল্লীভূমির ছায়াময় চিত্রখানি তাহার স্মৃতি-পথে উদিত হইয়া মন্ত্রে দীক্ষা তাঁহাকে আকুল করিয়া তুলিতেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই বন্দিনী স্বদেশ-জননীর অশ্রুসিক্ত, বিষাদময় মুখচ্ছবি হৃদয়-মধ্যে উদিত হইয়া সে সকলের মােহকে বিনষ্ট ও হৃদয়ে অভিনব উৎসাহ-বেগ সঞ্চারিত করিত। যথা সময়ে তিনি নগরে পৌছিয়া জনৈক আত্মীয়ের গৃহে আশ্রয় লইলেন; এবং পিতৃব্যকে শাসনকর্তার নিকট প্রেরণ করিয়া স্বীয় আগমন-বার্তা জানাইলেন। শাসনকৰ্ত্তা বালিকার এই প্রকার অধ্যবসায়-দর্শনে সাতিশয় বিস্মিত হইলেন এবং তঁাহার সহিত সাক্ষাৎকারের বাসনা প্রকাশ করিলেন। ; জোয়ান্ শাসনকর্তার সমীপে উপস্থিত হইলেন ; এবং যথা-বিহিত শিষ্টাচার-প্রদর্শনপূর্বক তাহাকে অভিবাদন করিলেন। সেই নিরক্ষর কৃষক-বালিকার বিনয়-নম্র শিষ্টাচার ও অনিন্দ্যসুন্দর, দিব্য দেহ- কান্তি-দর্শনে শাসনকর্তার হৃদয়ে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। তিনি জোয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন । “তুমি কি জন্য আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাহিয়াছিলে ?” “আমি ভগবানের নামে রাজাকে এই সংবাদ ২৭
ফরাসী বীরাঙ্গনা
-
জানাইতে আসিয়াছি যে, তিনি যেন এই ধৰ্ম্ম-যুদ্ধে
পশ্চাৎপদ না হন।”
তদুত্তরে শাসনকর্তা বলিলেন :-
“রাজার কাৰ্যাকার্য্যের উপর আমার কোন হাত
নাই। আমার মতামতের উপর তিনি নির্ভর
করেন না।”
“এ রাজ্য দোর্ফার নিজস্ব নহে। ভগবানই ইহার
অধিকারী। কিন্তু তাহার ইচ্ছা যে, তিনি রাজপদে
অধিষ্ঠিত হন এবং সুশৃঙ্খলার সহিত রাজ্য শাসন
করেন। শত্রুপক্ষের অপরিমেয় বাধা-বিঘ্ন সত্ত্বেও তিনি
রাজ-সিংহাসন প্রাপ্ত হইবেন; এবং রিমস্ (Rheims)
নগরে তঁাহার রাজ্যাভিষেক উৎসব সম্পাদন করিবার
জন্য আমি ঈশ্বর কর্তৃক আদিষ্ট হইয়াছি।”
শাসনকৰ্ত্তা বালিকার এই সমুদায় তেজোগর্ভ উক্তি
শ্রবণ করিয়া বিস্মিত হইলেন; এবং বিষয়টা অত্যন্ত
গুরুতর মনে করিয়া প্রধান ধর্মযাজকের সহিত পরামর্শ
করিলেন। তৎপর তিনি ধর্মযাজককে সঙ্গে লইয়া
জোয়ান্ যে আত্মীয়ের গৃহে অবস্থিতি করিতেছিলেন,
তথায় উপস্থিত হইলেন ; এবং ধর্মশাস্ত্রানুমােদিত
উপায়াবলম্বনে যথারীতি তাঁহার পরীক্ষা করিলেন।
২৮
মন্ত্রে দীক্ষা পরীক্ষান্তে তাহাকে “ঈশ্বরানুগৃহীতা” বলিয়া ধৰ্ম্ম- যাজকের বিশ্বাস হইল। এই ঘটনা অচিরাৎ নগরময় রাষ্ট্র হইয়া পড়িল এবং তত্ৰত্য আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই জোয়ানকে দেখিবার জন্য সমবেত হইতে লাগিল। শাসনকর্তা জোয়া-সংক্রান্ত আনুপূর্বিক সমুদয় ঘটনা তাঁহার উর্দ্ধতন কর্মচারী ডিউ-অব- লরেন্কে (Duke of Lorraine) জানাইলেন; এবং জোয়ানকে ভৎসমীপে প্রেরণ করিয়া নিজে দায়িত্ব হইতে মুক্ত হইলেন। জোয়ান্ যখন ডিউকের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গমন করিলেন, সে সময় ডিউ অত্যন্ত পীড়িত ছিলেন। তিনি জোয়ানের বালিকা-সুলভ সরলতা ও পুণ্য-প্রদীপ্ত বদন-মণ্ডল নিরীক্ষণ করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলেন; এবং জোয়ান্ প্রকৃতই ঈশ্বরাদেশে দেশােদ্ধার- কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইয়াছেন কিনা, তাহা বিশেষ-রূপে পরীক্ষা করিলেন। জোয়ানের সহিত কথােপকথন কালে তাঁহার অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পাইয়া ডিউক তাহার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবান হইলেন এবং তিনি যে “ঈশ্বরানুগৃহীতা” তাহা অসন্দিগ্ধ-চিত্তে বিশ্বাস করিলেন। অতঃপর জোয়ান ডিউকের নিকট হইতে ;
ফরাসী বীরাঙ্গনা
বিদায় লইয়া পুনরায় তােকুলা নগরে প্রত্যাবর্তন
করিলেন।
ইতিমধ্যে এই সমুদায় ঘটনা রাজা দোষ্ণার
কর্ণগােচর হইল ; এবং জোয়ানের উক্তির সমর্থন করিয়া
কতিপয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও পদস্থা মহিলা রাজার নিকট
আবেদনপত্র প্রেরণ করিলেন। সুতরাং এ বিষয়ে
রাজার মনোেযােগ বিশেষরূপে আকৃষ্ট হইল। তৎকালে
সিনে'। নগরে রাজসভার অধিবেশন হইত। তথায়
উপস্থিত হইয়া রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য
জোয়াকে আহ্বান করা হইল।
এই সমস্ত কথা যখন তাহার নিজ গ্রামে পৌছিল,
তখন তাহার পরিবারস্থ লােকেরা তােকুলা নগরে
ছুটিযা আসিলেন; এবং তাহাকে যুদ্ধে গমনের সংকল্প
হইতে বিরত করিবার জন্য নানাপ্রকারে চেষ্টা।
করিলেন। কিন্তু জোয়ান্ কিছুতেই সংকল্প-চ্যুত
হইলেন না। তিনি তাহাদিগকে বিনয়-নম্র-বচনে
সান্তনা দিয়া বলিলেন :-
“জন্মভূমির সেবা করাই আমার সর্বপ্রধান কর্তব্য।
সে মহান্ কর্তব্যের নিকট আপনাদের স্নেহ-মমতা অতি
সুতরাং আমি কৰ্ত্তব্য-ভ্রষ্ট হইতে পারব না।”
মন্ত্রে দীক্ষা তাহার এই প্রকার উক্তি শুনিয়া আত্মীয়-স্বজন যার- পর-নাই ক্ষুন্ন হইলেন। হইলেন। এইরূপে মাতৃভূমির কল্যাণ- কামনায় আত্মীয়-স্বজনের প্রাণে দারুণ শেলাঘাত করিয়া, তাহাদের আজন্ম-পােষিত স্নেহ-মমতার মধুর বন্ধন জন্মের মত ছিন্ন করিয়া, এবং পার্থিব সুখ-শান্তির আশায় জলাঞ্জলি দিয়া জোয়ান নির্ভীকচিত্তে মৃত্যুকে আপনার ক্রীড়া-সহচর-রূপে বরণ করিয়া লইলেন। সৈনিক-জনােচিত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হইয়া, কটীতটে শাণিত কৃপাণ লম্বিত করিয়া, জোয়ান্ অশ্বারােহণে সিনে। নগরে যাত্রা করিলেন। তাহাকে সিনে। পর্যন্ত পেঁৗছাইয়া দিবার জন্য কয়েক জন অশ্বারােহী তাহার সঙ্গে চলিল। ভােকুলার হইতে সিনে। প্রায় ৪৫০ মাইল দূরবর্তী ; এবং সমগ্র পথটি অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল। তথায় পৌছিতে হইলে ইংরেজাধিকৃত প্রদেশ এবং দুর্গম পার্বত্য ভূমি অতিক্রম করিতে হয়। তিনি এই সমুদায় বিঘ্ন-বিপদ- সঙ্কুল দুর্গম পথ অতিক্রম করিয়া প্রায় দুই সপ্তাহ পরে সিনে। নগরে পৌছিলেন। তথায় নির্দিষ্ট সময়ে তিনি রাজ-দরবারে উপস্থিত হইলেন।, অতুলৈশ্বৰ্য-মণ্ডিত রাজকীয় দরবার-গৃহের ;
ফরাসী বীরাঙ্গনা বৈচিত্র্যময় সৌন্দৰ্য-দর্শনে তিনি স্তম্ভিত হইলেন। তাহাকে পরীক্ষা করিবার মানসে রাজা পূৰ্ব্ব হইতেই রাজ-সভায় আত্ম-গােপন-পূৰ্ব্বক ছদ্মবেশে অমাত্য ও অনুচরবর্গের মধ্যে অবস্থিতি করিতেছিলেন। কারণ তিনি মনে করিয়াছিলেন যে, জোয়ান্ যদি সত্য-সত্যই ভগবদ্দর্শন লাভ করিয়া থাকেন, তবে নিশ্চয়ই তাহাকে চিনিয়া লইতে পারিবেন। রাজসভার বিপুল ঐশ্বর্য- শােভিত রাজ-পুরুষগণের মধ্য হইতে জোয়ান্ রাজাকে চিনিয়া বাহির করিলেন; এবং তাহার সমীপবর্ত্তী হইবা মাত্র নতজানু হইয়া তাহাকে অভিবাদন-পূৰ্ব্বক ‘রাজা বলিয়া সম্বােধন করিলেন। ছদ্মবেশী রাজা ইহাতে বাধা দিয়া বলিলেন-“আমি ত রাজা নই।” জোরা ইহাতে বিচলিত না হইয়া বলিলেন ঃ- “মহামহিমান্বিত দোফা। বিশ্ব-সম্রাটু পরমেশ্বরের এই দৈববাণী আপনার নিকট প্রচার করিতে আসিয়াছি যে, আপনি নির্ভীক-চিত্তে বীরের ন্যায় রিস্ নগরে ( Rheims ) অগ্রসর হউন। তথায় আপনার রাজ্যা- ভিষেক উৎসব নিব্বিবাদে সমাধা হইবে।” জোয়ান্ সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত হইয়াও বহু- জনাকীর্ণ রাজ সভার মধ্য হইতে তাহাকে কি প্রকারে
মন্ত্রে দীক্ষা
চিনিয়া লইলেন, ইহা ভাবিয়া রাজার অত্যন্ত বিস্ময়
বােধ হইল। এই ঘটনায় জোয়ানের প্রতি তাঁহার
শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সঞ্চার হইল। তিনি জোয়াকে
“ঐশীশক্তি-সম্পন্না” বলিয়া স্থির করিলেন কিন্তু
রাজ্যের হিতৈষী, ধাম্মিক ও শিক্ষিত ব্যক্তিগণের
মতামত গ্রহণ না করিয়া তিনি জোয়াকে যুদ্ধে প্রেরণ
করিতে সাহসী হইলেন না। এই জন্য তিনি
জোয়াকে পােয়াতিয়ে ( Poitiers ) নগরে প্রেরণ
করিলেন।
তথায় মহাসভার ( Parliament) এক অধিবেশন
হইল। রাজ্যের বহুদর্শী, শাস্ত্রজ্ঞ ধর্মযাজক, খ্যাতনামা
রাজনীতিবিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিভাশালী অধ্যাপক
ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ সে অধিবেশনে যােগদান
করিলেন। জোয়ান্ সে মহাসভায় সম্মিলিত মনীষি-
গণের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। সভাস্থ সুধীমণ্ডলী
তঁাহাকে নানাপ্রকার প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। একজন
জিজ্ঞাসা করিলেন :-
“জোয়ান্, তুমি না বলিয়াছ পরমেশ্বর ফ্রান্সকে
দাসত্ব-মুক্ত করিবেন। যদি তাই হয়, তবে আর
সৈন্য-সামন্তের প্রয়ােজন কি ? বিনা যুদ্ধেই ত
ফরাসী বীরাঙ্গনা
দেশােদ্ধার হইতে পারে !” ইহাতে জোয়ান্ বিন্দুমাত্র
অপ্রতিভ না হইয়া তেজঃপূর্ণ-স্বরে প্রাজ্ঞের ন্যায়
প্রত্যুত্তর করিলেন :—“মানব
কর্মকর্তা; পরমেশ্বর
ফলদাতা। আমরা সশস্ত্র সৈন্য-সামন্ত লইয়া যুদ্ধ
করিব।
পরমেশ্বর আমাদিগকে বিজয়-গৌরবে
গৌরবান্বিত করিবেন।”
জোয়ানের এই প্রকার যুক্তিপূর্ণ ও ওজস্বিনী
বাণী শুনিয়া সভাস্থ সুধীমণ্ডলী অত্যন্ত প্রীত হইলেন।
কিন্তু সের্গ।
(Seguin) নামক পােয়াতিয়ে
বিশ্ববিদ্যালয়ের
একজন অধ্যাপক জোয়ানের
“ভগবদ্দর্শনের” কথায় প্রত্যয় স্থাপন করিতে পারিলেন
না। তিনি জোয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন -
“তুমি যে স্বর্গীয় বাণী শুনিতে পাইয়াছিলে, তাহা
কিরূপ স্বরে উচ্চারিত হইয়াছিল ?” জোয়ান্ এই
প্রশ্ন শুনিয়া একটু বিরক্তি অনুভব করিলেন; এবং
তীব্র-স্বরে উত্তর করিলেন -“সে স্বর আপনার
অপেক্ষা অধিকতর সুললিত ছিল।”
জোয়ানের নিকট হইতে এই প্রকার প্রত্যুত্তর পাইয়া
অধ্যাপকের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল।
বলিলেন :—“তুমি যদি সত্য-সত্যই ঈশ্বরর্তৃক
কণ্ঠস্বর
তিনি পুনরায়
৩৪
মন্ত্রে দীক্ষা প্রেরিত হইয়া থাক, তবে তােমার অলৌকিক কাৰ্য- কলাপ দ্বারা আমাদিগকে তাহার নিদর্শন দেখাও।” তদুত্তরে জোয়ান্ দৃঢ়তাব্যঞ্জক-স্বরে বলিলেন :- “অলৌকিক কাৰ্যকলাপ দ্বারা কোন্ নিদর্শন দেখাইতে আমি এখানে আসি নাই। আমাকে সসৈন্যে অলেয়। নগরে প্রেরণ করুন। অলেয়ার উদ্ধারই আমার “ঐশীশক্তির” একমাত্র নিদর্শন হইবে।” এইরূপ তর্ক-বিতর্ক ও আলােচনার পর সভ্যগণ জোয়ানের প্রতি অনুকূল হইলেন। তাহার পক্ষে যে ভগবানের সাক্ষাৎ লাভ করা অসম্ভব নয়, তাহা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিলেন; এবং তাহাকে যুদ্ধে প্রেরণ করিতে সম্মত হইলেন। তাঁহারা জোয়ান্ সম্বন্ধে রাজাকে এই তিনটি মন্তব্য লিখিয়া পাঠাইলেন । (১) খৃষ্টধৰ্ম্মে জোয়ানের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও অচলা ভক্তি পরিলক্ষিত হইয়াছে। (২) তিনি যে ঈশ্বরাদিষ্ট হইয়া দেশােদ্ধারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, ইহাতে অবিশ্বাস করিবার কিছুই নাই। কারণ বিধাতার কৃপায় সবই সম্ভবপর । (৩) জন্মভূমির উদ্ধার্থ রমণীও পুরুষ-বেশে যুদ্ধ
ফরাসী বীরাঙ্গনা
বাইবেলে
এই
প্রকার
করিবার অধিকারিণী।
দৃষ্টান্তের উল্লেখ আছে।
—রাজ-আজ্ঞা ও যুদ্ধ-যাত্রা
পােয়াতিয়ের সুধী-মণ্ডলীর নিকট হইতে এই
প্রকার অনুকূল মন্তব্য প্রাপ্ত হইয়া রাজা অত্যন্ত
আনন্দিত হইলেন; এবং রাজ্যের সর্বত্র এই মর্মে এক
ঘােষণাপত্র প্রচার করিলেন যে “ফ্রান্স, দেশকে
বৈদেশিকের দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিয়া রাজাকে
ফ্রান্সের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করাইবার জন্য কুমারী
জোয়ান্ দার্ক ঈশ্বর কর্তৃক আদিষ্ট হইয়াছেন বলিয়া
নিজকে প্রকাশ করিতেছেন। রাজা
এই
কুমারীকে বিবিধ উপায়ে পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন ;
এবং তাহার চরিত্র ও কার্যকলাপ সম্বন্ধে প্রকাশ্যে ও
গোপনে অনুসন্ধান করিয়া
বিশেষরূপে অবগত
হইয়াছেন যে, তিনি সম্পূর্ণ পূত-চরিত্রা, ধর্মপরায়ণ,
ঈশ্বরে নিষ্ঠাসম্পন্না, সরল-হৃদয় ও সত্যবাদিনী।
অধিকন্তু, রাজ্যের প্রসিদ্ধ ও খ্যাতনামা ধৰ্ম্মশাস্ত্রফিৎ,
স্বয়ং
মন্ত্রে দীক্ষা ; ?? রাজনীতিবিৎ ও প্রতিভাশালী অধ্যাপকগণ সম্মিলিত হইয়া এই কুমারীকে পরীক্ষা করিয়াছেন; এবং তাহার সম্বন্ধে অনুকূল মন্তব্য প্রকাশ করিয়া তাহাকে যুদ্ধে প্রেরণ করিতে অভিমত প্রদান করিয়াছেন। বিশেষতঃ, এই কুমারীর জন্ম-বৃত্তান্ত ও জীবনের কাৰ্য- কলাপ সম্বন্ধে নানা প্রকার অলৌকিক ও আশ্চৰ্য্য ঘটনার কথা শুনতে পাওয়া যায়। সুতরাং তাহাকে যুদ্ধে প্রেরণ করা রাজা সম্পূর্ণরূপেই যুক্তিযুক্ত মনে করেন; এবং তদ্বারা রাজ্যের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হইবে বলিয়া বিশ্বাস করেন, আপামর জনসাধারণ রাজার এই ঘোষণাপত্র পাঠ করিয়া পরম সন্তোষ প্রকাশ করিল। কয়েক জন উচ্চপদস্থ সমর-তত্ত্ববিৎ বীরপুরুষ জোয়াকে প্রত্যহ যুদ্ধ-বিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগিলেন। অল্প কালের মধ্যেই অসি-যুদ্ধ, ভল্ল-চালনা, ব্যুহ রচনা ও সমরনীতি-সংক্রান্ত যাবতীয় কাৰ্যে জোয়ান্ বিশেষ পারদর্শিতা ও নৈপুণ্য লাভ করিলেন। অতঃপর তিনি যুদ্ধে গমনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। সৰ্বাঙ্গ শুভ্রোজ্জ্বল বৰ্ম্ম-চৰ্ম্মে আবৃত করিলেন। তাহার কাটদেশের এক পার্শ্বে পঞ্চশ-চিহ্নাঙ্কিত শাণিত ফরাসী বীরাঙ্গনা কৃপাণ * ও অপর পার্শ্বে লৌহ-বিনির্মিত সুতীক্ষ্ণ কুঠার বিলম্বিত হইল। তিনি কর-তলে ইষ্টদেবতা যীশু খ্রষ্টের নামাঙ্কিত ও শ্বেত-পদ্ম-লাঞ্ছিত উন্নত পতাকা ধারণ করিলেন। এইরূপে বিচিত্র রণরঙ্গিণী-বেশে সজ্জিত হইয়া, কৃষ্ণবর্ণ অশ্বে আরােহণ-পূৰ্ব্বক বহুসংখ্যক সৈন্য-সামন্ত-সমভিব্যাহারে তিনি ব্লোয়া (Blois) নগরে যাত্রা করিলেন। তথায় সহস্র সহস্র নরনারী তাহাকে সাদরে অভ্যর্থনা করিল। ভগবচ্চরণ-স্পর্শ- পূত বীরাঙ্গনার শুভ আগমনে পরাধীনতা-লাঞ্ছিত প্রজাগণের নৈরাশ্য-মগ্ন হৃদয় আশার নবীনালােকে উদ্ভাসিত হইল, পরাভব-খিন্ন অবসাদগ্রস্ত সেনাদলের মধ্যে নব জীবনের স্পন্দন অনুভূত হইল। সর্বত্র অপূৰ্ব উৎসাহ-তরঙ্গ হিল্লোলিত হইতে লাগিল। জোয়ান্ প্রথমতঃ সৈনিকদিগের চরিত্র-সংশােধনে মনােনিবেশ করিলেন। তাহার আদেশক্রমে সৈনিক- দিগের মধ্যে দূত-ক্রীড়া বন্ধ হইল, অশ্লীল আমােদ- * এই তরবারী সম্বন্ধে এইরূপ আখ্যায়িকা প্রচলিত আছে যে, জোয়ানের নির্দেশানুসারে নিকটবর্তী কোন একটী ধৰ্ম্ম-মন্দিরের বেদীর পশ্চাতে মৃত্তিকা-গর্ভে এই তরবারী পাওয়া গিয়াছিল। জোয়ান্ বলিয়াছিলেন যে, তিনি দৈববাণীর সাহাযয উক্ত তরবারীর অস্তিত্বের কথা অবগত হইয়াছিলেন। ৩৮
মন্ত্রে দীক্ষা
প্রমােদ ও হাস্য-পরিহাস নিষিদ্ধ হইল। সৈন্যগণ
যাহাতে ঈশ্বরােপাসনায় নিয়মিত-রূপে যােগদান করিয়া
ধৰ্ম্মভাবে অনুপ্রাণিত হইতে পারে, তিনি তজ্জন্য
বিশেষ নিয়ম বিধিবদ্ধ করাইলেন। এইরূপে জোয়ান্
স্বর্গীয় মাধুৰ্য-মণ্ডিত পবিত্র চরিত্রের পুণ্য প্রভাবে
সৈন্যদিগের
মধ্যে যুগান্তর উপস্থিত করিলেন।
তাঁহাদের নিদ্রিত আত্মাকে
পুনরুদ্বুদ্ধ করিয়া
তাঁহাদিগকে মাতৃ-যজ্ঞে আত্মাহুতি প্রদান করিবার
জন্য দীক্ষিত করিলেন; এবং বহু-বর্ষ-ব্যাপিনী সুষুপ্তি ও
জড়তা দূরীভূত করিয়া সেখানকার শিথিল কৰ্ম্ম-প্রবাহকে
বেগবান করিলেন।
;
৩৯
No text on this page.
-সমর-প্রাঙ্গণে-
“পীড়িতের আর্তনাদ, দুঃখীর রােদন,
কোমল কিশাের প্রাণে সহিল না আর।”
নবীনচন্দ্র
- সমর-প্রাঙ্গণে -অলেয়া-নগর উদ্ধারের আয়ােজন- ১৪২৮ খ্রীষ্টাব্দের অক্টোবর মাসের প্রথম ভাগে ইংরাজের। অলেয়। নগর অবরােধ করিলেন। এই নগরটি লােয়ার (Loire) নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত ; এবং একটী সুরক্ষিত সেতু দ্বারা নদীর অপর তীরের সহিত সংযুক্ত। সেতুর এক পার্শ্বে একটী সুরক্ষিত ক্ষুদ্র দুর্গ। নগরবাসীদিগকে এই দুর্গের পার্শ্ব দিয়া যাতায়াত করিতে হইত। কারণ ইহাই নগরের প্রবেশদ্বার ছিল। ফরাসীদিগের অপরিমেয় বাধা-বিঘ্ন ইংরাজেরা বহু চেষ্টার পর অক্টোবর মাসের শেষ ভাগে এই ক্ষুদ্র দুর্গ অধিকার করিলেন। অল্প কালের মধ্যেই নগরের নিকটস্থ কয়েকটি স্থানেও তাহাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হইল। ৪৩
ফরাসী বীরাঙ্গনা
এই প্রকার প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও অলেয়। নগরের
উদ্ধার্থ জোয়ান্ ১৪২৯ খ্ৰীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের শেষ
সপ্তাহে ব্লোয়া নগর হইতে অলেয়। নগরে যাত্রা
করিলেন। যাত্রা-কালে তিনি ফরাসী সৈন্যাধ্যক্ষ
দ্যুনােয়ার প্রেরিত সৈন্যগণকে বলিলেন :—“যে পথে
অল্প সময়ের মধ্যে অলেয়। নগরে উপস্থিত হওয়া যায়,
সেই পথ দিয়া আমাকে লইয়া যাও।” কিন্তু সৈন্যগণ
তাহাদের অধ্যক্ষের নির্ধারিত পথ দিয়া তাহাকে লইয়া
গেল। জোয়ান্ নগরের সমীপবর্তী হইয়া দেখিতে
পাইলেন, তাঁহাকে ইংরাজ-অধিকৃত সেতু অতিক্রম
করিয়া নগরে প্রবেশ করিতে হইবে। তিনি বুঝিলেন,
সৈন্যগণ তাহাকে প্রতারিত করিয়া এই পথে আনয়ন
করিয়াছে। ইহাতে সৈন্যগণের প্রতি তিনি অত্যন্ত
রুষ্ট হইলেন। কিন্তু অনুসন্ধানে যখন তিনি জানিতে
পারিলেন যে, দ্যুনােয়ার আদেশানুসারেই সৈন্যগণ
তাহাকে বিপরীত পথে লইয়া আসিয়াছে, তখন
দ্যুনােয়ার প্রতি তাহার অত্যন্ত ক্রোধ জন্মিল। দ্যুনােয়া
পূৰ্ব্ব হইতেই নিকটবর্তী দুর্গের প্রাচীরে আরােহণ
পূৰ্ব্বক জোয়ানের আগমনের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।
জোয়ান্ সসৈন্যে নদী-তীরে পৌছিতেছেন দেখিয়া
৪১
সমর-প্রাঙ্গণে
দ্যুনােয়া দুর্গ-প্রাচীর হইতে অবতরণ করিলেন; এবং
তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে একখানি ক্ষুদ্র
তরণী-সংযােগে নদীর অপর তীরে গমন করিলেন।
জোয়ানের সমীপবর্তী হইয়া দ্যুনােয়া তাহাকে সসম্মানে
অভিবাদন করিলে জোয়ান্ বিরক্তি-সহকারে তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিলেন –“আপনি কেন আমাকে এই পথে
আনিবার জন্য আপনার সৈন্যগণকে আদেশ দিয়া-
ছিলেন?” তদুত্তরে ন্যুনােয়া বিনীতভাবে বলিলেন -
“এ পথ সর্বাপেক্ষা নিরাপদ
নিরাপদ বলিয়াই অপরাপর
সেনানায়কের পরামর্শে ঐরূপ আদেশ দিয়াছিলাম।”
জোয়ান্ অধিকতর অসন্তোষ-প্রকাশ-পূৰ্ব্বক
বলিলেন--“তবে ভগবানের আদেশ অপেক্ষা আপনাদের
আদেশেরই কি গুরুত্ব অধিক ?”
তৎপর দিবস ২৯শে এপ্রিল জোয়ান্ সসৈন্যে নিরা-
পদে নগরে প্রবেশ করিলেন। ইংরাজেরা উপেক্ষা
বশতঃ তাহাকে কোন প্রকার বাধা প্রদান করিলেন
। নগরে প্রবেশ করিয়া তিনি প্রথমেই ধৰ্ম্ম-মন্দিরে
গমন করিলেন; এবং তথায় ঈশ্বরােপাসনায় প্রবৃত্ত
হইলেন। উপাসনান্তে তিনি সমস্ত নগর পরিভ্রমণ
করিলেন। তাহার আগমনে নগরবাসীদিগের হৃদয়ে
৪৫
ফরাসী বীরাঙ্গনা আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হইল। বহু লােক তাঁহার দর্শন-লাভের আশায় এবং তাঁহার অমৃতময়ী উপদেশ- বাণী শ্রবণের মানসে মহােল্লাসে সমবেত হইতে লাগিল। সহস্র সহস্র নরনারী উচ্ছসিত-কণ্ঠে জয়ধ্বনি করিয়া নগরের নির্জীবতা দূরীভূত করিল। অযথা রক্তপাতে বসুন্ধরা কলুষিত করা এবং অনর্থক নরহত্যায় অশান্তির সৃষ্টি করা জোয়ানের সম্পূর্ণ প্রকৃতি- বিরুদ্ধ ছিল। এই কারণে ইংরাজের যাহাতে বিনা রক্তপাতে ফ্রান্স, পরিত্যাগ করেন, তজ্জন্য তিনি যথােচিত উপায় অবলম্বনে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি ইংরাজদিগের শিবিরে এই মর্মে একখানি পত্র প্রেরণ করিলেন -- “ইংলণ্ডের অধীশ্বর, তদধীন ভূস্বামী ও সৈন্যাধ্যক্ষ- গণ! আমি ভগবানের আদেশে স্বদেশােদ্ধারে প্রবৃত্ত হইয়াছি। অতএব আপনাদিগের নিকট সনির্বন্ধ অনুরােধ যে, আপনারা কোন প্রকার গােযােগ উপস্থিত না করিয়া ফ্রান্স, পরিত্যাগ করুন। আর সৈনিকগণ ! তােমাদিগকেও সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-কৰ্ত্তা বিশ্ব-বিধাতার নামে বলিতেছি যে, তােমরা কোন প্রকার অশান্তির সৃষ্টি না করিয়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ৪৬
সমর-প্রাঙ্গণে
হে রাজন্ ! আমি আপনাকে পুনরায় বিশেষ
রূপে বলিতেছি যে, যদি ইহার ব্যতিক্রম হয়, তবে
নিশ্চিত জানিবেন, আপনাদিগকে ইহার উপযুক্ত
প্রতিফল ভােগ করিতে হইবে। পক্ষান্তরে আপনারা
যদি শান্তি স্থাপন করিতে প্রয়াসী হন, তবে আমরা
আপনাদিগের সহিত পরমানন্দে সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ
হইব ; এবং আপনাদিগকে সাদরে অভ্যর্থিত করিব।”
ইংরাজ-শিবিরে যখন এই পত্র পঠিত হইল, তখন
ইংরাজ কর্মচারীদিগের মধ্যে বিষম উত্তেজনার সঞ্চার
হইল। তাহারা জোয়ানের পত্রখানিকে অবমাননা-সূচক
জ্ঞান করিলেন। যে পত্র-বাহক ইংরাজ-শিবিরে পত্র
লইয়া গিয়াছিলেন,ইংরাজেরা তাহার প্রতি নানাপ্রকার
দুর্ব্যবহার করিলেন এবং তাহাকে শৃঙ্খলিত করিয়া
কারাগারে আবদ্ধ করিলেন । ইংরাজদিগের এই
;
*
(a) Laughter, ridicule, and sneering jibes, were the
only answer this letter produced from the besiegers. They
called her a jade and a cow-kecper. They dishonourably
kept her herald a prisoner. (Lamartinc's "Menoirs of
Celebrated Characters." Vol II, Page 83).
(6) ইংরাজ সেনাপতি সাফো (Suffolk) ফরমী-দূতকে লক্ষ্য করিয়া
বলিয়াছিলেন ।
....... Plant a stake! for by nay God
He shall be kalendered of this new faith
৪৭
ফরাসী বীরাঙ্গনা
প্রকার ব্যবহারে জোয়ান্ যার-পর-নাই ক্ষুন্ন হইলেন।
কিন্তু তথাপি তাহার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল না। ফরাসী-
দিগের দুর্গের নিকটেই ইংরাজদের একটি শিবির
সন্নিবিষ্ট ছিল। ইহা দেখিয়া জোয়ান্ দুর্গ-শিখরে
আরােহণ-পূৰ্ব্বক তাহার পত্রোল্লিখিত প্রস্তাবটি স্বয়ং
উচ্চৈঃস্বরে ইংরাজদিগকে জ্ঞাপন করিলেন। ইহাতে
ইংরাজ কর্মচারীদিগের ভাবান্তর হওয়া দূরে থাকুক,
তাঁহাদের উত্তেজনা অধিকতর বৃদ্ধি পাইল। সার
উইলিয়ম্ গ্লেসূদে (Sir William Glasdale) নামক
একজন ইংরাজ সেনানায়ক তদুত্তরে জোয়াকে নিতান্ত
হীন-জনােচিত অভদ্র-ভাষায় ভৎসনা করিলেন। +
ইহাতে জোয়ান্ ইংরাজ কর্মচারীদিগের ব্যবহারে দুঃখ
প্রকাশ করিলেন। সে যাহা হউক, এই ঘটনায় যুদ্ধ
অনিবার্য হইয়া উঠিল ; জোয়ান্ অনন্যোপায় হইয়া
সমরায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন।
First martyr, (Robert Southey's "Joan of Arc Book
vI, IPage 95).
Here Glasdale overwhelmed her with abuse, calling
her cowherd and prostitute. (Michelet's History of France,
Translated by G. H. Smith. Vol II, Page 127).
৪৮
সমর-প্রাঙ্গণে —অলেয়-উদ্ধারের সূচনা, যুদ্ধারম্ভ ৬ই মে (১৪২৯ খ্ৰীঃ অঃ) তারিখে জোয়ানের নিকট এইরূপ সংবাদ আসিল যে, ইংরাজদিগের নূতন এক দল সৈন্য নগরাভিমুখে অগ্রসর হইতেছে। এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া তিনি সেনাপতি ন্যুনােয়াকে বিশেষরূপে সাবধান করিয়া দিলেন যে, বিপক্ষীয় সৈন্যগণ নগরের সমীপবর্তী হইলেই যেন তাহাকে সংবাদ দেওয়া হয়। ইহার পূর্বে সমরায়ােজনে কয়েক দিন অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করিয়া তিনি ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই কারণে কিঞ্চিৎ বিশ্রাম নিতান্ত আবশ্যক মনে করিয়া স্বীয় বিশ্রাম-ভবনে গমন করিলেন; এবং অল্প কাল মধ্যেই নিদ্রাভিভূত হইয়া পড়িলেন। এ সুযােগে দুনােয়া অপরাপর সেনানায়ক- গণকে সমভিব্যাহারে লইয়া সসৈন্যে ইংরাজ-অধিকৃত “বাস্তি-দে-লুপ” নামক একটা দুর্গ (Bastile de Loup) আক্রমণ করিলেন। কিন্তু এদিকে অকস্মাৎ জোয়ানের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তৎক্ষণাৎ তিনি শয্যা পরিত্যাগ করিলেন; এবং তাহার অনুচরকে বলিলেন :- “শীঘ্র অস্ত্র-শস্ত্র দাও। মনে হইতেছে যেন ; •• ৪ ৪১ ফরাসী বীরাঙ্গনা যুদ্ধক্ষেত্রে আমার উপস্থিতি নিতান্ত প্রয়ােজন হইয়াছে।” এইরূপে তিনি যখন অত্যন্ত ব্যস্ততার সহিত সমর- সাজে সজ্জিত হইতেছিলেন, তখন হঠাৎ নগরের তােরণ-দ্বারের নিকট হইতে ভীষণ কোলাহল শ্রুত হইল। তৎক্ষণাৎ তিনি অশ্বারােহণে সেদিকে বিদ্যুদ্বেগে ছুটিয়া গেলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ইংরাজের প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করিতেছে—আর ফরাসীরা তাহাদিগের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে অক্ষম হইয়া রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতেছে। ফরাসী সৈন্যের এই দুর্দশা-দর্শনে জোয়ানের কোমল হৃদয় শেল-বিদ্ধ হইল, প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলে কালিমার সঞ্চার হইল। কিন্তু ইহাতে তিনি স্বল্পমাত্র বিচলিত হইয়া ছত্রভঙ্গ সৈন্যগণকে সন্নদ্ধ করিতে লাগিলেন এবং উৎসাহ-বাক্যে তাহাদিগকে অনুপ্রাণিত করিলেন। তাহার উদ্দীপনাময়ী বাণী শ্রবণে ফরাসী সৈনিকদিগের হৃদয় রণােন্মাদে উন্মত্ত হইয়া উঠিল। তাহারা পুনরায় অমিত-তেজে ইংরাজদিগকে আক্রমণ করিল। জোয়ান্ বিপুল বাহিনীর অগ্রবর্তিনী হইয়া সমর-পথে পরিচালিত হইতে লাগিলেন। তরঙ্গ-তাড়িত তৃণগুচ্ছের ন্যায় •• ইংরাজ-চমূ সমর-প্রাঙ্গণে: পর্যুদস্ত হইতে লাগিল। বীৰ্যবতী বীরাঙ্গনার অপ্রতিহত আক্রমণে ইংরাজেরা পরাজিত হইল। অচিরে ফরাসীরা ইংরাজাধিকৃত দুর্গ অধিকার করিল। জোয়ানের অসামান্য রণ-নৈপুণ্য ও অলৌকিক সৈনাপত্যের পরিচয় পাইয়া ফরাসী যােদ্ধগণ সকলেই স্তম্ভিত ও বিস্মিত হইলেন। কিন্তু তাহার এই প্রকার অপ্রত্যাশিত জয়-লাভে তাঁহাদের মধ্যে কতিপয় যশােলি, ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির হৃদয়ে জোয়ানের প্রতি ঈর্ষার সঞ্চার হইল। জোয়াকে পুনর্বার যুদ্ধ করিবার সুযােগ দান করিলে তাহাদের যশােহানি হইতে পারে, এই আশঙ্কায় সেনাপতি ন্যুনােয়া জোয়ানের নিকট সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন; এবং ইহাও জ্ঞাপন করিলেন যে, সম্প্রতি ইংরাজদিগের বিরুদ্ধে আর কোন অভিযান প্রেরণ করা সমর- পরিষদের (Council of War) সভ্যগণের অভিপ্রেত নহে। জোয়ান্ তদুত্তরে বলিলেন “আপনারা পরিষৎ লইয়াই থাকুন। আমি আমার কর্তব্য করিয়া যাইব। কল্যকার যুদ্ধের জন্য সৈন্যগণ প্রস্তুত হউক। আমার আরও অনেক কাজ করিবার আছে।”
ফরাসী বীরাঙ্গনা
পরদিন ৭ই মে তারিখে জোয়ান্ প্রত্যুষে গাত্রোখান
করিয়াই সমরায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন; এবং বহুসংখ্যক
সৈন্য লইয়া ইংরাজদিগের অপর একটা সুরক্ষিত দুর্গ
আক্ৰমণ করিলেন। পূর্ব দিনের সংগ্রামে জোয়ান্ যে
অদ্ভুত বীরত্ব ও অলৌকিক সাহসের পরিচয় প্রদান
করিয়াছিলেন, তাহাতে হীনশক্তি হতােদ্যম ফরাসী
সৈন্যগণের হৃদয়ে এক অপূর্ব বলের সঞ্চার হইয়াছিল।
তাই ৭ই মের যুদ্ধে তাহারা বিপক্ষ দলকে পরাহত
করিবার মানসে অতুল বিক্ৰম প্ৰকাশ করিয়াছিল। কিন্তু
ইংরাজেরা বীরের জাতি, রণে নিপুণ, সাহসে দুর্জয় ও
অধ্যবসায়ে অটল। তাহারাও ফরাসীদিগের আক্রমণ
প্রতিহত করিবার জন্য প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।
ইংরাজ-সেনাপতি
গ্লেসূদেল বীরােচিত পরাক্রমের সহিত
সৈন্য চালনা করিতে লাগিলেন। অসিতে অসিতে
ঝণৎকার, বল্লমে বল্লমে সংঘর্ষ, যুযুৎসুগণের মুহুর্মুহু
কোদণ্ড টঙ্কার, নিক্ষিপ্ত শর-সমূহের শন্ শন্ শব্দ,
অশ্বের হ্রেষা-ধ্বনি, আহতের মর্মভেদী আৰ্তনাদ ও
উন্মত্ত-প্রায় সৈন্যগণের বিকট চীৎকারে সমরাঙ্গণের
দৃশ্য ভয়াবহ হইয়া উঠিল। পরস্পরের জিঘাংসা প্রবল
হইতে প্রবলতর হইতে লাগিল।
মন্ত্রের সাধন- “শরীরং বা পায়েয়ং কার্যং বা সাধহয়য়ং।
-মন্ত্রের সাধন -অলেয়। উদ্ধার দীর্ঘ কাল এইরূপ তুমুল সংগ্রামের পরও ইংরাজের আত্মসমর্পণ করিতেছে না দেখিয়া, জোয়ান্ দুর্গে প্রবেশ করিবার মানসে একখানি অধিরােহণীর সাহায্যে দুর্গ- প্রাচীরে আরােহণ করিলেন। এমন সময়ে সহসা শত্রু-নিক্ষিপ্ত শর তঁাহার গ্রীবাদেশে প্রবেশ করিল। তিনি হত-চৈতন্য হইয়া দুর্গ-পরিখার মধ্যে নিপতিত হইলেন। ইংরাজের। তাহাকে ধৃত করিবার জন্য ছুটিয়া আসিলেন। কিন্তু ফরাসী-সৈন্যগণ তাহাতে বাধা প্রদান করায় অগ্রসর হইতে পারিলেন না। জোয়ানের ক্ষতস্থান হইতে অনর্গল রক্তধারা নির্গত হইতে লাগিল। দুঃসহ যন্ত্রণার আবেশে তিনি উদগত অশ্রু-প্রবাহ রুদ্ধ করিতে পারিলেন না। ইহাতে তাঁহার রমণী-সুলভ দৌর্বল্য প্রকাশ পাইল। কিন্তু ফরাসী বীরাঙ্গনা মুহুৰ্ত্ত মধ্যেই তাহার চৈতন্য-সঞ্চার হইল; এবং তাহার উপর যে গুরুতর কর্তব্য-ভার ন্যস্ত রহিয়াছে, সে কথা স্মরণ পড়িল। তিনি স্বীয় দুর্বলতার জন্য লজ্জিত হইলেন; এবং তৎক্ষণাৎ সাহস-পূৰ্ব্বক স্বহস্তে বিদ্ধ শর উৎপাটিত করিয়া ক্ষতস্থানে ঔষধ প্রয়ােগ করিলেন। অতঃপর কিয়ৎক্ষণের জন্য নির্জনে বসিয়া ঈশ্বরােপাসনা করিলেন। উপাসনান্তে পুনরায় যুদ্ধ করিতে উদ্যত হইলেন। সেনাপতি ন্যুনােয়া দুর্গ-জয়ের কোন আশা নাই দেখিয়া রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিবার পরামর্শ করিতে লাগিলেন। জোয়ান্ সেই কাপুরুষােচিত পরামর্শ অগ্রাহ্য করিয়া পুনরায় সৈন্য সমাবেশ-পূৰ্ব্বক ইংরাজ- দিগকে দ্বিগুণ উৎসাহে আক্রমণ করিলেন। ইংরাজের অধিকক্ষণ যুঝিতে পারিলেন না। অচিরে ফরাসীরা তাহাদিগকে পরাভূত করিয়া দুর্গ অধিকার করিয়া লইলেন। ইংরাজ-সেনাপতি গ্লেসূদে ও তঁাহার কতিপয় অনুচর প্রাণভয়ে ভীত হইয়া লােয়ার ( Loire) নদীর সেতুর উপর দিয়া পলায়ন করিতে- ছিলেন। অকস্মাৎ একটা গােলার আঘাতে সেতুর এক পার্শ্ব ভাঙ্গিয়া পড়িল। হতভাগ্য সেনাপতি
মন্ত্রের সাধন
সামুচরে নদীগর্ভে প্রাণত্যাগ করিলেন। এই শােচনীয়
দৃশ্য দেখিয়া কোমল-হৃদয় বীরাঙ্গনা অশ্রু-সম্বরণ
করিতে পারিলেন না। এই যুদ্ধে
ইংরাজ-পক্ষের প্রায়
আট সহস্র এবং ফরাসীদিগের শতাধিক সৈন্য নিহত
হইয়াছিল। *
পূৰ্ব দিনের যুদ্ধে
পরাভূত হওয়ায় ইংরাজের
উপায়ান্তর না দেখিয়া ৮ই মে তারিখে সদল-বলে
অলেয়। নগর পরিত্যাগ করিলেন। এইরূপে মহাপ্রাণ
বীরাঙ্গনার দুর্দমনীয় সাহসে, অতুলনীয় বীরত্বে ও
অসামান্য রণ-কৌশলে ইংরাজ কর্তৃক অবরুদ্ধ নগরের
অলেয়। নগরের মুক্তির পর
নগরবাসী নর-নারী আনন্দে বিহ্বল হইল; এবং
একবাক্যে জোয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতে
লাগিল। কিন্তু তিনি ভগবানের কৃপাকেই তঁাহার
সাফল্যের সর্ব প্রকার নিদান বলিয়া নির্দেশ করিতেন।
জোয়ানের সর্বাবস্থায়ই ভগবানে দৃঢ় নির্ভর ছিল।
পুনরুদ্ধার হইল।
An ancient chronicler says : "The English lost 8000
or 9000 men, the French only 110 or 120, which shows
clearl that it was the work of the Most High."
(The Patriot Martyr. Page 38)
ফরাসী বীরাঙ্গনা আনন্দে অধীর হইয়া কখনও তিনি ভগবানের দয়ার কথা বিস্মৃত হন নাই। অলেয়। নগরের উদ্ধারের পর জোয়ানের উপদেশানুসারে ঈশ্বরােপাসনার এক বিশেষ বন্দোবস্ত হইল। বহুসংখ্যক নরনারী সে উপাসনায় কৃতজ্ঞচিত্তে যােগদান করিল। উপাসনান্তে এক বিরাট উৎসব- যাত্রা সমস্ত নগর প্রদক্ষিণ করিল। অলেয়। উদ্ধারের পর হইতে বীরাঙ্গনা “অলেয়ার কুমারী” (Maid of Orleans) নামে খ্যাত হইলেন। ; পরবর্তী যুদ্ধ ও চালস্-এর রাজ্যাভিষেক বৃথা কালক্ষেপ করা অনুচিত মনে করিয়া জোয়ান্ সসৈন্যে পুনরায় ব্লোয়া ( Blois ) নগরে যাত্রা করিলেন; এবং তথা হইতে তু (Tours) নগরা- ভিমুখে অগ্রসর হইলেন। সম্রাট দো তৎকালে উক্ত নগরে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় জোয়ান্ সম্রাট কর্তৃক সাদরে ও সসম্মানে অভ্যর্থিত হইলেন। তিনি দোফঁাকে ইংরাজদিগের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযানে সহায়তা করিতে বলিলেন ; এবং রিম মন্ত্রের সাধন নগরাভিমুখে অগ্রসর হইয়া তথায় তাঁহাকে রাজপদে অভিষিক্ত হইবার জন্য অনুরােধ করিলেন। কাপুরুষ দোা অমিত-তেজ বীরাঙ্গনার অপ্রমেয় বীরত্বের সম্যক্ পরিচয় পাইয়াও প্রথমতঃ তাহার প্রস্তাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। পরিশেষে জোয়ানের নানা প্রকার অনুনয়-বিনয় ও যুক্তিবাদে তাহার মত-পরিবর্তন হইল। তদনুসারে তিনি ডিউ-অব-আলাসে-এর (Duke of Alencon ) নেতৃত্বে একদল সৈন্য জোয়ানের সাহায্যার্থ প্রদান করিলেন। জোয়ান্ সম্রাট প্রদত্ত নূতন সৈন্যদল লইয়া অলেয়। নগরে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। অতঃপর তথা হইতে দশ মাইল দূরবর্তী জাগো (Jargeau) নামক স্থানে ইংরাজ- দিগকে আক্রমণ করেন। উভয় পক্ষে তুমুল সংগ্রাম বাধিয়া উঠিল। ইংরাজ-সৈন্য ডিউক-অব, সাফোক্-এর (Duke of Suffolk) আজ্ঞাধীনে থাকিয়া প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে লাগিল। কিন্তু পূত-চরিত্রা বীরাঙ্গনার অব্যাহত শক্তির নিকট ইংরেজেরা পুণ্য- সলিলা ভাগীরথীর প্রবহমান খরস্রোত-মুখে ঐরাবতের ন্যায় ভাসিয়া গেল। সাফোকের ন্যায় তেজস্বী সেনাপতিও জোয়ানের হস্তে বন্দী হইলেন।
ফরাসী বীরাঙ্গনা
জাগোতে (Jargeau) ইংরাজদিগকে পরাজিত
করিয়া জোয়ান্ সসৈন্যে 6975°tfsi (Beaugency)
নামক স্থানে অগ্রসর হইলেন, এবং তথাকার দুর্গ বিনা
ক্লেশেই অধিকার করিয়া লইলেন।
অতঃপর ১৮ই জুন (১৪২৯ খ্রঃ) তারিখে পাতেই
নামক (Patay) গ্রামে উভয় পক্ষের আর এক ভীষণ
সংঘর্ষ হইল। তপস্বিনী বীর-ললনার দুর্জয় পৌরুষ ও
দীপ্ত তেজে ইংরাজের বীৰ্য-বহ্নি নিষ্প্রভ হইয়া পড়িল।
ফরাসীদের হস্তে এবারও তাহাদের পরাজয় ঘটিল।
তেলতের ন্যায় রণ-নিপুণ ও সপ্রতিভ সেনাপতিও
বন্দী হইলেন; এবং ফাষ্টোফ-এর (Fastolfe) ন্যায়
সাহসী ও পরাক্রমশালী যােদ্ধাও রণে
ভঙ্গ দিয়া
পলায়ন করিলেন।
যে কয়টী যুদ্ধের চিত্র অঙ্কিত করা হইল তাহাতে
রণজেত্রী বীরাঙ্গনার অলৌকিক শক্তির পরিচয় সম্যক্
পরিলক্ষিত হইবে। কিন্তু পরাজিত ও আশ্রিত শত্রুর
প্রতি তিনি কি প্রকার ব্যবহার করিতেন, আহত ও
বিপন্নের প্রতি কিরূপ সহানুভূতি দেখাইতেন—এ স্থলে
তাহারও আভাস প্রদত্ত হইতেছে।
অলেয়। উদ্ধার কল্পে প্রথম যে যুদ্ধ হইল, তাহাতে
••
মন্ত্রের সাধন বহুসংখ্যক ইংরাজ ফরাসী-সৈন্যের হস্ত হইতে প্রাণরক্ষার মানসে ধর্মযাজকের পরিচ্ছদ পরিধান-পূৰ্ব্বক আত্ম- গােপন করিয়াছিলেন। উন্নত-হৃদয়া বীরাঙ্গনা তাহা- দিগকে সাদরে আশ্রয় দান করিলেন; এবং পাছে তঁাহার অধীন দুবৃত্ত সৈন্যগণ তাহাদিগের প্রতি কোন প্রকারে অত্যাচার করে, এই ভয়ে তিনি তাহাদিগকে স্বীয় বাস-ভবনে যত্ন-পূৰ্ব্বক রাখিলেন * দ্বিতীয় যুদ্ধে ইংরাজ সেনাপতি গ্লেসদে ও তাহার কতিপয় অনুচর প্রাণভয়ে ভীত হইয়া পলায়ন-কালে যখন নদীগর্ভে নিমজ্জিত হইতেছিলেন, তখনকার শােচনীয় দৃশ্য দেখিয়া জোয়ান্ বিপন্ন শত্রুগণের জন্য শােক প্রকাশ করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত যখনই যুদ্ধাবসান হইত, তখনই দেখা যাইত, জোয়ান্ নিহত ব্যক্তিদিগের জন্য শােকাকুল-চিত্তে অশ্রু-বিসর্জন করিতেছেন। আহতদিগের পরিচর্যায় তিনি স্বয়ং নিযুক্ত হইয়া স্বহস্তে তাঁহাদের ক্ষতস্থান বাঁধিয়া *Many of the English who had put on the priestly habit by way of protection was brought in by the l'ucelle, (i.e. Joan) and placed in her own house to ensure their safety; she knew the ferocity of her followers. (Michelet's History of France. Translated by G. H. Smith ; Vol II. Page 127)
ফরাসী বীরাঙ্গনা
দিতেন; এবং মরণােন্মুখ ব্যক্তিকে সান্ত্বনা প্রদান করিয়া
তাহার আত্মাকে শীতল করিতেন ।* আশ্রিত ও
পরাজিত শত্রুর প্রতি এ প্রকার সদ্ব্যবহার, বিপন্নের
প্রতি এ হেন সমবেদনা, আহতের পরিচৰ্য্যায় এরূপ যত্ন
ও চেষ্টা-প্রকৃত বীর-ধৰ্ম্মের কি সুন্দর দৃষ্টান্ত, মহত্ত্বের
কি মনােরম নিদর্শন,এবং স্বভাব-কোমল ও সেবাপরায়ণ
রমণী-হৃদয়ের কি অনুপম আলেখ্য।
পাতেই নামক গ্রামে যে যুদ্ধ হইয়া গেল, তাহার
প্রায় চার সপ্তাহ পরেই দো্যার রাজ্যাভিষেকের
আয়ােজন করা হইল। রিস্ নগর রাজ্যাভিষেকের
জন্য নির্দিষ্ট হইল। কিন্তু তখনও ঐ নগর শত্ৰুদিগের
হস্তগত ছিল। রিস্-এর প্রধান ধর্মযাজক(Archbishop
of Rheims), রাজমন্ত্রী, সভাস-বর্গ ও কয়েক সহস্র
সৈন্য সমভিব্যাহারে লইয়া দোফা মহাসমারােহে
রিস নগরের অভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
বীরাঙ্গনার অপূৰ্ব্ব যুদ্ধ-জয় ও বীরত্বের কাহিনী পূর্ব
* She dismounted, gave, her briddle to her page, raised
the wounded from the ground, and dressed their wounds
with her own hands. (L.amartine's "Memoirs of Celebrated
Characters." Vol II. l'age 92).
মন্ত্রের সাধন হইতেই দেশময় রাষ্ট্র হইয়া পড়িয়াছিল। সুতরাং পথিমধ্যে যে সমুদয় স্থান শত্ৰুদিগের অধিকৃত ছিল, তাহার সমস্তই একে একে বশ্যতা স্বীকার করিল। ১৬ই জুলাই (১৪২৯ খ্রঃ) রাজা পাত্র-মিত্র-সহ নির্বিঘ্নে রিমস্ নগরে প্রবেশ করিলেন। পর দিবস ১৭ই জুলাই রবিবার রিম-এর প্রাচীন ধৰ্ম্ম-মন্দিরে রাজ্যাভিষেকোৎসব আরম্ভ হইল। দোফা রাজকীয় পরিচ্ছদ পরিধান-পূৰ্ব্বক বেদীর নিকট গমন করিলেন; এবং নতজানু হইয়া এই মর্মে শপথ করিলেন যে রাজ্য-মধ্যে যাহাতে সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে, খ্ৰীষ্ট-ধৰ্ম্মের মর্যাদা রক্ষিত হয়, এবং প্রজাকুলের সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায়, প্রতি তিনি দৃষ্টি রাখিবেন। এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পর সম্মিলিত জন- সঙ্রে বিপুল জয়ধ্বনি ও আনন্দোচ্ছ্বাসের কোলাহলের মধ্যে তাহাকে রাজমুকুটে ভূষিত করা হইল। এইরূপে দোফা ‘সপ্তম চালস নামে অভিহিত হইয়া ফ্রান্সের সিংহাসনে আরূঢ় হইলেন। অভিষেক-কালে জোয়ান্ তঁাহার খ্ৰীষ্ট-নামাঙ্কিত ও শ্বেত-পদ্ম-লাঞ্ছিত পতাকাখানি হস্তে ধারণ-পূৰ্ব্বক রাজার পার্শ্বে দণ্ডায়মান ছিলেন।
ফরাসী বীরাঙ্গনা উৎসব-ক্রিয়া সমাধা হইলে পর, তিনি রাজার সম্মানার্থ হস্তস্থিত পতাকা অবনমিত করিয়া তাহার সম্মুখে নতজানু হইলেন। তখন উপস্থিত জন- মণ্ডলীর দৃষ্টি তৎপ্রতি আকৃষ্ট হইল ; এবং সকলেই তাহার পূত-কণ্ঠ-বিনিঃসৃত বাক্য শ্রবণ করিবার অভিলাষে উদ্গ্রীব হইয়া পড়িল। জোয়ান্ ভাব- বিচলিত-কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন -“রাজ! যাহার অলঙ্ঘনীয় আদেশে রিম নগরে আপনার রাজ্যা- ভিষেকের আয়ােজন করিয়াছি, আজ সেই মঙ্গলময় বিধাতার শুভ ইচ্ছা পূর্ণ হইল। অদ্য হইতে আপনি যথারীতি রাজ-পদে অধিষ্ঠিত হইলেন; ফরাসী জাতি সর্ব বিষয়ে আপনার আজ্ঞাধীন হইবে।” ; —প্যারী-নগরের যুদ্ধ ও পতনের পূর্বাভাস উপযুপরি কয়েকটি যুদ্ধে জয়লাভ করাতে জোয়ানের যশােরাশি দেশময় ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। সৈন্যগণ তাহার ইঙ্গিতে পরিচালিত হইতে লাগিল, এবং রাজাও তাহার প্রতি সবিশেষ শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন। এ অবস্থায় জোয়ান্ ইচ্ছা করিলে ৬৪
মন্ত্রের সাধন
বিনা-ক্লেশেই সম্মানসূচক উচ্চ রাজ-পদে অধিষ্ঠিত
হইয়া অপরিমেয় প্রভুত্ব বিস্তার করিতে পারিতেন।
কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রণােদনায় তিনি দেশােদ্ধারের
পবিত্ৰ-ব্রত উদ্যাপনে প্রবৃত্ত হন নাই। তাই প্রভুত্ব ও
সম্মান লাভের আকাঙ্ক্ষাকে কখনও হৃদয়ে স্থান পাইতে
দেন নাই। তথাপি রাজা কৃতজ্ঞতার নিদর্শন-স্বরূপ
জোয়াকে সম্মানসূচক সনন্দ প্রদান করিলেন, এবং
তাঁহার জন্মস্থান দমূরেমি গ্রামকে যাবতীয় রাজ-কর
হইতে অব্যাহতি দিলেন।
অলেয়। নগরকে দাসত্বের নাগ-পাশ হইতে মুক্ত
করা, এবং রাজাকে ফ্রান্সের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করা--
এই ব্ৰত গ্ৰহণ করিয়া জোয়ান্ কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ।
হইয়াছিলেন। এইক্ষণ তাহার ব্রত সম্পূর্ণরূপে
উদ্যাপিত হইয়াছে দেখিয়া তিনি রাজার নিকট স্বীয়
পল্লী-ভবনে প্রতিগমন-পূৰ্ব্বক মাতাপিতা ও আত্মীয়-
স্বজনের সহিত গার্হস্থ্য-সুখে কাল যাপন করিবার
অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু রাজা সে প্রস্তাবে
কিছুতেই সম্মত হইলেন না। কারণ তিনি জানিতেন,
জোয়ানের অনুপস্থিতিতে সৈন্যদিগের মধ্যে নিরুৎসাহ
ও শৈথিল্যের সঞ্চার হইবে। বিশেষতঃ সম্প্রতি তিনি
ফরাসী বীরাঙ্গনা প্যারী-নগর আক্রমণ-পূৰ্ব্বক ইংরাজদিগকে তথা হইতে বিতাড়িত করিবার সংকল্প করিয়াছেন। জোয়ানের অভাবে তাঁহার সে সংকল্প সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা একেবারে বিলুপ্ত হইবে। সুতরাং জোয়ানের নানা প্রকার অনুরােধ সত্ত্বেও রাজা তাহাকে যাইতে দিলেন । কিন্তু জোয়ান্ ইহা অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন যে, তাহার প্রতি ভগবান যে কৰ্ত্তব্য-ভার ন্যস্ত করিয়াছিলেন, তাহা সমাধা হইয়াছে। বিশেষতঃ আর কোন নূতন কার্যে ব্রতী হইবার জন্য তিনি ভগবৎ-প্রেরণা অনুভব করেন নাই। তথাপি একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও, রাজার অনুরােধে তাহাকে পুনরায় যুদ্ধ- যাত্রা করিতে হইল। ৮ই সেপ্টেম্বর (১৪২৯ খ্রীঃ অঃ) জোয়ান্ প্যারীনগর আক্রমণ করিলেন। এই তারিখে খ্ৰীষ্টানদিগের একটি পৰ্বদিন ছিল। তথাপি রাজাদেশ অনতিক্ৰমণীয় মনে করিয়া নিজের একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি এই কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। ইংরাজেরা পূৰ্ব্ব হইতেই প্যারী-নগরকে ফরাসীদিগের আক্রমণ হইতে রক্ষা করিবার সবিশেষ বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। জোয়ান্ বীরােচিত পরাক্রমের সহিত যুদ্ধ করিয়াও জয়লাভ মন্ত্রের সাধন করিতে পারিলেন না। ইংরাজদিগের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া তাহার অধিকাংশ সৈন্য পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল। তথাপি জোয়ান্ শত্রু-হস্তে পরাজিত হইয়া প্রত্যাগমন করা অপেক্ষা রণক্ষেত্রে প্রাণ-বিসর্জন দেওয়া শ্রেয়স্কর মনে করিয়া অল্পসংখ্যক সৈন্য লইয়াই অবিচলিত-ভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। এদিকে ফরাসীদিগের অন্যতম সেনা-নায়ক ডিউক্-অব- আলসোঁ যুদ্ধ-জয়ের কোন সম্ভাবনা না দেখিয়া, এবং জোয়ান্ অচিরে শত্রু-হস্তে পতিত হইবেন জানিয়া, তাঁহাকে বল-পূৰ্ব্বক যুদ্ধক্ষেত্র হইতে অপসারিত করিলেন। এই যুদ্ধে প্রায় পনর শত সৈন্য আহত হইয়াছিল। এই ভীষণ নর-শােণিত-পাতের অপরাধ ও জাতীয় পৰ্বদিনে প্যারীনগর আক্রমণ-পূৰ্ব্বক খ্রীষ্টধর্মের অবমাননা করার জন্য জোয়ানের প্রতি অন্যায়-রূপে দোষারােপ করা হইয়াছিল। # কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে This was contrary to the advice of Pucelle ; her voice warned her to go no further than St. Denys. Fifteen hundred men were wounded in this attack, which she was wrongfully accused of having advised..................... (Alichelet's History of France Translated by Sinith. Vol. II Page 132).
ফরাসী বীরাঙ্গনা ন্যায়তঃ ও ধৰ্ম্মতঃ তিনি যে এজন্য দায়ী নহেন, তাহা পূৰ্বেই বলা হইয়াছে। জোয়ান্ এতাবৎ কাল কোন যুদ্ধেই পরাজিত হন নাই। তাহার জীবনের এই প্রথম পরাজয়ে তিনি মৰ্ম্মে মর্মে মরিয়া গেলেন, এবং ভাবী অমঙ্গলের পূর্বাভাস হৃদয়ে যার-পর-নাই ক্ষুন্ন হইলেন। অনুভব করিয়া শেষ যুদ্ধ ও শত্রু-হস্তে পতন- = প্যারী-নগরের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় জোয়ানের হৃদয়ে যে নিদারুণ আঘাত লাগিয়াছিল, তাহা তিনি মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হইতে পারেন নাই। আত্ম- বমাননার সে জঘন্য স্মৃতি প্রতি মুহূর্তে তাহার কোমল হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিল। প্যারী হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি বুর্জ (Bourges) নামক স্থানে গমন করিলেন, এবং তথায় শীত-ঋতু যাপন করিলেন। রাজাও সিনে নগরে ফিরিয়া গেলেন। জোয়ান্ বসন্ত-ঋতুর প্রারম্ভে পুনরায় সৈন্য-সমাবেশ করিলেন, শত্রু-কর্তৃক অবরুদ্ধ কঁপিয়ে এবং
মন্ত্রের সাধন
(Compiegne) নামক অপর একটি নগরের উদ্ধার্থ
যাত্রা করিলেন। ১৪৩০ খ্রীষ্টাব্দের ২৩-এ মে তারিখে
তিনি সসৈন্যে নগরে প্রবেশ করিলেন। তদনন্তর
তিনি তঁাহার স্বাভাবিক বল-বীৰ্য্য ও পরাক্রমের সহিত
শত্রুপক্ষের দুর্গ আক্রমণ করিলেন। কিয়ৎকাল
সংগ্রামের পরই জোয়ানের সৈন্যগণ শত্রুপক্ষের
আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে অক্ষম হইয়া পলায়ন করিতে
লাগিল। জোয়ান্ পলায়মান সৈন্যগণকে ফিরাইয়া
আনিলেন, এবং তাহাদিগকে পুনরায় শ্রেণীবদ্ধ করিয়া
যুদ্ধ করিতে
লাগিলেন। কিন্তু ফরাসী-সৈন্যগণ
প্রাণভয়ে ভীত হইয়া এবারও পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল।
জোয়ান্ দ্বিতীয় বার তাহাদিগকে উৎসাহ-বাক্যে
ফিরাইয়া আনিলেন। পরিশেষে জয়-লাভের কোন
সম্ভাবনা না দেখিয়া তিনি তঁাহার সৈন্যগণকে যুদ্ধক্ষেত্র
পরিত্যাগ করিবার আদেশ দিলেন। সৈন্যগণ এই
আদেশ প্রাপ্তি-মাত্রই ক্ষিপ্রগতিতে রণক্ষেত্র
পরিত্যাগ করিল। জোয়াও কতিপয় শরীর-রক্ষক
সৈন্য সহ যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হইলেন।
এমন সময় সহসা শত্রু-সৈন্য তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া
ও তদীয় অনুচরবর্গ অসীম
ফেলিল। জোয়ান
ফরাসী বীরাঙ্গনা
পৌরুষের সহিত শত্রুর
আক্রমণ ব্যর্থ করিতে
লাগিলেন। অকস্মাৎ শত্রুপক্ষীয় একজন সৈনিক
তাহাকে অশ্ব হইতে বলপূর্বক আকর্ষণ করিয়া ভূতলে
পাতিত করিল। জোয়ান তৎক্ষণাৎ উঠিয়া দাড়াইলেন,
এবং আত্মরক্ষার্থ নির্ভীক-চিত্তে অস্ত্র-চালনা করিতে
লাগিলেন। এ দিকে শত্রুপক্ষীয় সৈন্যগণ দলে দলে
আসিয়া তাঁহার উপর পতিত হইল। জোয়ান্ আর
আত্মরক্ষা করা সম্ভবপর নহে দেখিয়া শত্রুপক্ষের
সাহায্যকারী জনৈক দেশদ্রোহী ফরাসীর (Bastard
of Vendome) হস্তে আত্মসমর্পণ করিলেন। এই
দেশদ্রোহী ভঁহাকে ডিউক্-অব-বার্গাণ্ডির প্রধান
সেনাপতি কাউন্ট-দে-লিঞি-র হস্তে অৰ্পণ করিল।
বলা বাহুল্য, ইহারা উভয়েই জোয়ানের স্বজাতীয় ও
স্বদেশবাসী। অনেকে অনুমান করেন, জোয়ানের পক্ষীয়
কয়েকজন নীচাশয় সেনানায়ক তাহার বিমল কীর্তি-
সঞ্চয়ে ঈর্ষান্বিত হইয়া শত্ৰুদিগের নিকট হইতে
উৎকোচ-গ্রহণ-পূৰ্ব্বক কৃতম্লের ন্যায় তাহাকে ধরাইয়া
দিয়াছিল।
৭০
কারাগারে
“তােমার অশ্রুতে অশ্রু করিব বর্ষণ।
হৃদয়ের রক্ত দিয়া পারি যদি মুছাইতে
একবিন্দু, হবে মম সার্থক জীবন।”
নবীনচন্দ্র
কারাগারে
—কারা-কাহিনী
জোয়ান্ বন্দিনী হইলেন। পাষাণ-প্রাচীরবেষ্টিত
কারা-গৃহে তাহার স্থূল দেহ শৃঙ্খলিত হইল বটে, কিন্তু
তাহার হৃদয় কিছুতেই অবনমিত হইল না।
সে অতি-
মানুষ তেজ ও অলৌকিক বল-বীৰ্য্য মুহুর্তের জন্যও হ্রাস
পাইল না। প্রকৃত বীর-ধৰ্ম্মানুসারে জোয়ানের প্রতি
সদ্ব্যবহার করাই তাহার শত্ৰু-গণের পক্ষে বিধেয় ছিল।
কিন্তু তঁাহার শত্রুগণ এ স্থলে সেই চিরন্তন নীতি
উল্লম্বন করিয়া তাহাকে সাধারণ বন্দীদিগের শ্রেণীভুক্ত
করিয়াছিল। # কারাগারে বন্ধন-দশায় জোয়ানের
* There was no possible reason, why Joan should not be
regarded as a prisoner of war, and be entitled to all the
courtesy and good usage, which civilized nations practise
towards enemies on these occasions. She had never in her
military capacity, forfeited, by any act of treachery or cruelty
her claim to that treatment. She was unstained by any civil
crime. (David Hume's History of England, Vol III,
Page 155).
१७
ফরাসী বীরাঙ্গনা প্রতি যেরূপ ব্যবহার করা হইয়াছে, তাহাকে ছলে, বলে, কৌশলে যে প্রকার নির্যাতন করা হইয়াছে, তাহা নিতান্ত নীতিহীনতা, নৃশংসতা ও কাপুরুষতার পরিচায়ক। ১৪৩০ খ্রষ্টাব্দের ২৩-এ মে জোয়ান্ শত্রু-হস্তে বন্দিনী হন; পরবর্তী বৎসরের (১৪৩১ খ্রঃ অঃ) জানুয়ারী মাসে তাহার বিচার আরম্ভ, এবং ৩০এ মে তাহা সমাপ্ত হয়। সুতরাং তাঁহাকে পূর্ণ এক বৎসর কারা-যন্ত্রণা ভােগ করিতে হয়। কঁপিয়েনের (Compiegne) যুদ্ধে পরাজিত হইয়া বন্দিনী হওয়ার পর হইতে জোয়ান্ সেনাপতি কাউন্ট- দে-লিঞি-র (Count de Ligny)তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই সেনাপতি লুকসেম্বুর্গের (Luxemburg) সামন্ত- ভূপতির অধীন এক জন ভূস্বামী ছিলেন। সুতরাং তাহার ইংরাজ-প্রভুর মনস্তুষ্টির জন্য তিনি জোয়াকে উক্ত ভূপতির হস্তে সমৰ্পণ করিবার সংকল্প করিলেন। কাউন্ট-এর পত্নী তঁাহার এই ঘৃণিত সংকল্পের বিষয় অবগত হইয়া তাহাকে সে পাপ-পথ পরিত্যাগ করিবার জন্য নানা প্রকারে অনুনয়-বিনয় করিলেন। তিনি স্বামীর চরণ-তলে পতিত হইয়া নিতান্ত কাতর ভাবে জোয়ানের মুক্তি ভিক্ষা করিলেন। কিন্তু এই এমন কি ৭৪ কারাগারে অন্তঃপুর-চারিণী ললনার হৃদয়ে যে মহদ্ভাব স্থান-লাভ করিয়াছিল, পাপিষ্ঠ কাউন্ট-এর হৃদয়কে তাহা স্পর্শও করিতে পারিল না। কাউন্ট, বিজাতির নিকট আত্ম- বিক্রয় করিয়া স্বদেশ ও স্বজাতিকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছেন। তাহার স্বার্থ-বধির কর্ণকুহরে পত্নীর এ করুণ প্রার্থনা স্থান পাইল না। তিনি তাহার প্রভু ডিউ-অব-লুকসেবুর্গের হস্তে জোয়াকে সমর্পণ করিলেন। এই সহৃদয় ইংরাজ- সামন্ত বন্দিনী শত্রু-রমণীর প্রতি কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করেন নাই। তিনি জোয়াকে আপনার বােরেভােয়া (Beaurevoir) নগরস্থ প্রাসাদে লইয়া গেলেন। তথায় তাহার পরিবার-ভুক্ত মহিলাগণ তাহার প্রতি সাতিশয় সম্মান ও সৌজন্য প্রকাশ করিতেন। তাহাদের অনুরােধে জোয়ান্ সৈনিক-বেশ পরিত্যাগ-পূৰ্ব্বক ভদ্রমহিলার যােগ্য পরিচ্ছদ ধারণ করিলেন। দুবৃত্ত সৈনিকগণের হস্ত হইতে আত্ম- সম্মান রক্ষাকল্পেই তিনি ঐরূপ পুরুষ-জনােচিত বেশ- ভূষায় সজ্জিত হইয়াছিলেন। কিছুদিন এইভাবে কালাতিপাত করার পর, জোয়ানের হৃদয় তাহার স্বদেশবাসীর জন্য অতীব চঞ্চল ৭৫ ফরাসী বীরাঙ্গনা হইয়া উঠিল। তিনি হৃদয়াবেগ সংবরণ করিতে না পারিয়া এক দিন গােপনে প্রাসাদ-প্রাচীর হইতে লাফাইয়া পড়িয়া পলায়নের চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ভূমিতলে নিপতিত হইয়া গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হওয়ায় তাহার সে চেষ্টা ব্যর্থ হইল। তিনি পুনরায় প্রাসাদে নীত হইলেন। অল্পকাল মধ্যেই লুকসেবুর্গের আত্মীয়গণের আন্তরিক যত্নে ও পরিচর্যায় তিনি আরােগ্য লাভ করিলেন। এই ঘটনার পর ডিউ-অব-লুসেমবুর্গ, জোয়াকে তাঁহার নিকট রাখা নিরাপদ নহে মনে করিয়া ডিউ অব-বার্গাণ্ডির নিকট প্রেরণ করিলেন। অতঃপর ডিউকের আদেশক্রমে জোয়ান্ স্কার্প (Scarpe) নদীর তটস্থ আ (Arras) নগরের সুরক্ষিত কারাগৃহে অবরুদ্ধ হইলেন। কিয়দিন পরে তাহাকে আর নগর হইতে ক্রোতােয়া (Crotoy) নামক স্থানে স্থানান্তরিত করা হইল। অতঃপর জোয়ান জনাকীর্ণ রাজ-পথের মধ্য দিয়া প্রহরি-পরিবেষ্টিত হইয়া সাধারণ বন্দীর ন্যায় শৃঙ্খলিত- অবস্থায় কয়। নগরের দুর্গে নীত হইলেন। অশিক্ষিত ও চরিত্রহীন সৈনিকগণের ক্ষমতাধীনে তাহাকে
কারাগারে
কাল-যাপন করিতে হইবে দেখিয়া,
দেখিয়া, তিনি পুনরায়
পুরুষ-জনােচিত পরিচ্ছদ ধারণ করিলেন। এই স্থানে
কারাবাস-কালে কাউন্ট-দে-লিঞি (Count de
Ligny), আল-অব-ওয়ারউইক্ (Earl of Warwick)
ও অপর একজন সম্ভ্রান্ত ইংরাজকে সমভিব্যবহারে লইয়া
জোয়ানের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলেন। জোয়ানের
বন্ধন-দশা দর্শনে কাউন্ট পরিহাস-পূৰ্ব্বক বলিলেন -
“জোয়ান, আমি
তােমায় কারামুক্ত করিতে
আসিয়াছি। কিন্তু তুমি প্রতিজ্ঞা কর যে, আমাদের
বিরুদ্ধে আর কখনও অস্ত্রধারণ করিবে না।” বন্দিনী
বীরাঙ্গনা এই পরিহাস-বাক্য সহ্য করিতে না পারিয়া
তিরস্কার-ব্যঞ্জক-স্বরে নির্ভীক-চিত্তে উত্তর করিলেন :-
“আপনি আমায় উপহাস করিতেছেন। আমায়
কারামুক্ত করিবার আপনার কোন অধিকার নাই,
সেরূপ ইচ্ছাও নাই। আমি বেশ জানি, ইংরাজের।
আমার প্রাণনাশ করিবেন। তাহাদের ধারণা, আমার
মৃত্যুতে ফ্রান্স, তাঁহাদের হস্তগত হইবে। কিন্তু সে আশা
তাহাদের বৃথা হইবে। ইংরাজের। যদি সংখ্যায়
লক্ষ গুণেও বৃদ্ধি পান, তথাপি ফ্রান্স, তাহাদের
অধীনতা স্বীকার করিবে না।”
৭৭
ফরাসী বীরাঙ্গনা জোয়ানের এই বীরােচিত বাক্য কাউন্ট-এর সহচর ইংরাজটির অসহ্য হইয়া উঠিল । বীর-চূড়ামণি ইংরাজ- ভূপতি ক্রোধােন্মত্ত হইয়া সৰ্বাঙ্গ-শৃঙ্খলিত, নিরাশ্রয় জোয়ানের বুকে শাণিত ছুরিকা বিদ্ধ করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু আল-অব-ওয়ারউইক্ তঁাহার এই কাপুরুষােচিত কাৰ্যে বাধা দান করিলেন। এতদ্ব্যতীত কারাগারের সামান্য প্রহরীরা পৰ্য্যন্তও তাঁহার সহিত দুর্ব্যবহার করিত। প্রসিদ্ধ ইংরাজ-ঐতিহাসিক তাণার সাহেব (Turner) যেরূপ মৰ্ম্মস্পর্শিনী ভাষায় জোয়ানের কারা-যন্ত্রণার বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহাও এস্থলে উদ্ধত হইল। তিনি বলেন : “Her feet and legs were fettered to a strong chain, which traversed the end of her bed, and was locked to large piece of wood, five feet long. Another chain was fastened around the middle of her thin and spare body so that she could not move from her place. (* See Michelet's History of France Translated by Smith. Vo. II. Page 145) ৭৮ কারাগারে "A cage of iron was sworn to have been made for her, in which she was fastend by the neck, feet and hands, from the time of her arrival at Rouen to the first day of her trial"* অর্থাৎ তাহার পদদ্বয় সুদৃঢ় লৌহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ করা হইয়াছিল। পাঁচ ফুট দীর্ঘ একটা প্রকাণ্ড কাষ্ঠ- খণ্ডের সহিত সেই শৃঙ্খল সংযুক্ত হইয়াছিল। এই শৃঙ্খলের দৈর্ঘ্য এতদূর ছিল যে, ইহা তাঁহার (জোয়ানের) শয্যা-প্রান্ত অতিক্রম করিয়াছিল। অপর একটা শৃঙ্খল দ্বারা তঁাহার ক্ষীণ দেহের মধ্য দেশ এরূপ ভাবে বেষ্টন করা হইয়াছিল, যেন, তিনি স্থানচ্যুত হইতে না পারেন। একটি লৌহ-পিঞ্জরও তাহার জন্য নির্মিত হইয়াছিল। রুয়। নগরে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় হইতে বিচার-কাৰ্য্য আরম্ভ হওয়ার প্রথম দিবস পর্যন্ত, তাহাকে ইহার ভিতরে গ্রীবাদেশ ও হস্ত- পদাদি বদ্ধ অবস্থায় রাখা হইয়াছিল। জোয়ান্ যখন শত্রু-হস্তে এই প্রকার অসহনীয় কারা- যন্ত্রণা ভােগ করিয়া প্রাণশক্তি হারাইতেছিলেন, তখন See Turner's History of England, Vol 11, Page 593.
ফরাসী বীরাঙ্গনা
অকৃতজ্ঞ ও অপদার্থ রাজা চাল নিশ্চেষ্ট-ভাবে কালাতি-
পাত করিতেছিলেন। যাহার কঠোর সাধনা-বলে ও
বিজয়িনী শক্তির প্রভাবে চালর্স পর-হস্তগত রাজ্য
পুনরধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, এবং যাহার
অলৌকিক বীরত্বে ও জীবনব্যাপী সংগ্রামের ফলে তিনি
রাজ-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন, সেই বীরাঙ্গনার
উদ্ধারকল্পে তিনি কোন প্রকার যত্নই করেন নাই।
তাহার এই অমার্জনীয় অকৃতজ্ঞতার দরুণ ইতিহাস
তাহাকে চিরদিনের তরে কৃষ্ণবর্ণে চিত্রিত করিয়া
রাখিয়াছে।
বিচার-প্রহসন
জোয়ান্ যখন রুয়া নগরের কার-গৃহে শারীরিক ও
মানসিক যন্ত্রণা ভােগ করিয়া দিনের পর দিন, শরীর
ক্ষয় করিতেছিলেন, তখন শত্রুগণ তাহার ধ্বংসের পথ
অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। তাহারা জোয়ানের
বিচারায়ােজনে মনােনিবেশ করিল। সামরিক
বিচারালয়ে তাহার বিচার হইলে তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত
হইতেন না। কারণ যুদ্ধ করিতে যাইয়া যাহারা
नुन, नत्रातन मन
No text on this page.
কারাগারে
শত্রু-হস্তে ধৃত হন, তাহারা বীর-ধৰ্ম্মানুসারে সকল
সভ্য জাতির নিকটই অবধ্য। কিন্তু জোয়ানের
অপূৰ্ব্ব রণ-নৈপুণ্য ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় পাইয়া
ইংরাজেরা যার-পর-নাই শঙ্কিত হইয়াছিলেন। তাঁহার
ন্যায় একজন অসাধারণ প্রতিপত্তিশালিনী শত্রু-পক্ষীয়
রমণীকে জীবিত রাখা কোন প্রকারেই নিরাপদ মনে
করিলেন না। এই কারণে তাঁহার অস্তিত্ব-লােপের
বাসনায়, তঁাহাকে ‘শয়তানের শিষা’ ও ‘প্রচলিত
ধর্মের বিরুদ্ধ-চারিণী” বলিয়া বিচারার্থ ধর্মযাজকদিগের
হস্তে অৰ্পণ করিলেন।
তৎকালে কোশে। (Cauchon) নামক জনৈক
ফরাসী, বােভে (Beauvais) নগরস্থ ধৰ্ম্মমন্দিরের
অধ্যক্ষ (Bishop) ছিলেন। ইনি স্বার্থসিদ্ধির জন্য
বিদেশীর নিকট আত্ম-বিক্রয়-পূৰ্ব্বক স্বদেশ ও স্বজাতিকে
সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। এক্ষণে জোয়ানের বিরুদ্ধে
ডাকিনী-বৃত্তির (witchcraft) অভিযােগ আনয়ন করাই
তিনি ইংরাজদিগের অনুগ্রহ-লাভের একটি প্রধান
উপায় বলিয়া মনে করিলেন। কোশের আনুকূল্য
লাভ করায় ইংরাজদিগের সঙ্কল্প-সিদ্ধির পথ সরল হইয়া
গেল। জোয়ান্ তখনও ডিউক্-অব-বাগাণ্ডির
৮১
ফরাসী বীরাঙ্গনা তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই কারণে ফ্রান্সের ধর্ম-সংক্রান্ত বিচারালয়ের প্রধান প্রতিনিধি’ (Vicar General of Inquisition) ২৬-এ মে (অর্থাৎ জোয়ানের ধৃত হওয়ার তিন দিন পরে) ডিউকে এই মর্মে এক পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন যে,—“জোয়ান্ নামী যে রমণী আপনার নিকট বন্দিনী হইয়া আছে, আমার বিশ্বাস, সে প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধ-চারিণী। সুতরাং ধর্ম ও ন্যায়ের নামে আমরা পবিত্র ধর্মাধিকরণের (Holy Inquisition ) পক্ষ হইতে তাহাকে বিচারার্থ এখানে প্রেরণ করিতে আপনাকে অনুরােধ করিতেছি।” বলা বাহুল্য যে, ইংলণ্ডের কার্দিনা-অব-উই- চেষ্টারের (Cardinal of Winchester) আদেশ- ক্রমেই ভাইকা ঐরূপ পত্র লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু ডিউ-অব-বার্গাণ্ডি (Duke of Burgundy) ভাইকারের প্রেরিত পত্রানুসারে কাৰ্য্য করিতে সম্মত হইলেন না। তখন প্যারীর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়- গণ জোয়ানকে বিচারার্থ ধর্মাধিকরণের হস্তে অর্পণ করিবার জন্য ডিউকের নিকট পৃথক পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন। প্যারী নগর তখন ইংরাজদিগের শাসনাধীন ছিল। সুতরাং সেখানকার শ্রেষ্ঠ লােকেরা
কারাগারে
তাঁহাদিগের মুখাপেক্ষী হইয়া কাৰ্য্য করিতে বাধ্য
হইতেন। ডিউ ইংরাজদিগের সহিত নানা প্রকার
স্বার্থ-সূত্রে জড়িত ছিলেন বলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
কর্তৃপক্ষীয়গণের আদেশ উপেক্ষা করিতে পারিলেন
। এদিকে দেশদ্রোহী কোশেও ইংলণ্ডাধিপতি
ষষ্ঠ হেন্ত্রীর নিকট এইরূপ অভিপ্রায় জ্ঞাপন করিলেন
যে, জোয়ান্ তাহার অধিকারভুক্ত সীমার মধ্যে ধৃত
হওয়ায়, তিনি জোয়ানের বিচার-ভার স্বয়ং
স্বয়ং গ্রহণ
করিতে ইচ্ছুক আছেন।
হেরী এই পত্র পাঠে আনন্দিত হইয়া ১২ই জুন
(১৪৩০ খ্রঃ) তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়কে লিখিয়া
জানাইলেন,—“জোয়ানের বিচারকার্যের ভার
বােভে নগরের ধর্মাধ্যক্ষ কোশে। ও পবিত্র ধর্মাধি-
করণের প্রতিনিধির উপর অর্পিত হইল।” যে সময়ে
জোয়ানের বিচার-সম্বন্ধে এইরূপ আদেশ প্রচারিত
হইতেছিল, সেই সময়ে ইংরাজদিগের অধিকৃত আরও
দুইটী নগর ফরাসীদিগের হস্তগত হয়। কালি-
অব-উইনচেষ্টার (Cardinal of Winchester) এই
অশুভ লক্ষণ দর্শনে অত্যন্ত চিন্তান্বিত হইলেন; এবং
ফরাসী-রাজ চার্লস একটি প্রেত-বিদ্যা-সম্পন্ন নারীর
ফরাসী বীরাঙ্গনা সহায়তায় রাজপদে অভিষিক্ত হইয়াছেন—ইহা প্রমাণ- পূৰ্ব্বক তঁহাকে সভ্য-জগতের নিকট হীন করিবার অভিপ্রায়ে, অতিরিক্ত আড়ম্বরের সহিত ইংলণ্ডাধীশ্বর ষষ্ঠ হেীর রাজ্যাভিষেকের আয়ােজন করিলেন। ২রা ডিসেম্বর (১৪৩০ খ্রঃ) ইংলণ্ডাধিপ হেী প্যারী নগরে নগরে প্রবেশ করিলেন। তথায় তঁাহার রাজ্যাভিষেক উৎসব সমাধা হইল। জোয়ানের বিচার- কাৰ্য্য আরম্ভে বিলম্ব হইতেছিল দেখিয়া রাজা হেনরী ঐ বিষয়ে ত্বরা করিবার জন্য পুনরাদেশ করিলেন। এই আদেশ পাইয়া বিসপ, কোশে। (Cauchon ) দ্বিগুণ উৎসাহে বিচারায়ােজনে নিবিষ্ট-চিত্ত হইলেন। জোয়ানের নিষ্কলঙ্ক চরিত্র সম্বন্ধে যাহাতে দূষণীয় প্রমাণ সংগৃহীত হইতে পারে, তজ্জন্য তঁাহার জন্মস্থান দমূরেমি গ্রামে গুপ্তচর প্রেরিত হইল। কোন কোনও ঐতিহাসিক বলেন, তাহার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য সংগ্ৰহাৰ্থ অপরাপর স্থানেও গুপ্তচরেরা গমন করিয়া- ছিল * ক্ষুধিত গৃধ্র যেমন গলিত শবের অন্বেষণে সর্বত্র * But, as in the greatest judicial investigation in history, it was necessary to obtain false witnesses, in order to accomplish the object in view, so the enemies of the maid were in some difficulty to procure such evidence as would incriminate her. (The Patriot Martyr.-Page 85.) ৮৪
কারাগারে
ঘুরিয়া বেড়ায়, ইহারাও তেমনি নানা স্থান পরিভ্রমণ
করিল। কিন্তু কোথাও জোয়ানের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ
করিতে পারিল না। যেখানেই এই সকল গুপ্তচরেরা
জোয়ানের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়াছিল, সেখানেই
জনসাধারণ তাহার এই বিপদে সহানুভূতি জ্ঞাপন
করিয়াছিল ;-কেহ কেহ বা তাহার সদ্গুণাবলীর কথা
বলিতে বলিতে অশ্রুপাত করিয়াছিল, এবং কেহ-বা
তঁাহার নানা প্রশংসাবাদ করিয়াছিল ।
বিচার-কাৰ্য্য আরম্ভ
১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই জানুয়ারী জোয়ানের বিচার
আরম্ভ হইল। ধৰ্ম্মাধ্যক্ষ কোশে। ও ধর্মাধিকরণের
প্রতিনিধি বিচারাসনে উপবেশন করিলেন। আট জন
বহুদর্শী ব্যবহার-বিশারদ (Lawyers) ও অন্যান্য
কতিপয় সম্রান্ত ব্যক্তি বিচারকার্য্যের সহায়তা করিবার
জন্য বিচারালয়ে উপস্থিত হইলেন। জোয়াকে
‘ডাকিনী’ ও ‘প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধ-চারিণী” বলিয়া
অভিযুক্ত করিবার জন্য প্রধান বিচারপতি কোশে। যে
সমুদয় প্রমাণ সংগ্রহ করিয়াছিলেন, উপস্থিত ব্যক্তি-
ফরাসী বীরাঙ্গনা
দিগের মধ্যে অধিকাংশের মতানুসারে তাহা নিতান্ত
অপৰ্যাপ্ত বলিয়া প্রতিপন্ন হইল। ইহাতে কোশে।
অনন্যোপায় হইয়া পরবর্তী অধিবেশনের জন্য স্বেচ্ছানু-
সারে কয়েক জনকে বিচারকার্যের সাহায্যকারী রূপে
মনােনীত করিয়া লইলেন ; এবং যাহাদের সহিত তাহার
মতের অনৈক্য হইয়াছিল ও যে সমুদয়
স্বাধীন-চিত্ত
ব্যক্তি তাঁহার স্বেচ্ছাচার বিচার-প্রণালীতে বাধা
দিবার চেষ্টা করিতেছিলেন, তাহাদিগকে অপসারিত
করিলেন ।
এইরূপে সিদ্ধিপথের কণ্টক দূরীভূত ও বিচারের
যাবতীয় উপকরণ সুচারুরূপে সজ্জিত হইলে পর,২.-এ
ফেব্রুয়ারী জোয়াকে বিচালয়ে উপস্থিত করা হইল।
সেই-দিনকার অধিবেশনে কোশে। জোয়াকে
বিচারকদের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিবার জন্য
অনুরােধ করিলেন। এস্থলে বলা আবশ্যক যে, সে-
কালের বিচার-পদ্ধতি বৰ্ত্তমান কালের মত ছিল না।
অভিযুক্তকে জেরা করা দোষাবহ বলিয়া গণ্য হইত না।
এই কারণে কোশে। প্রমুখ বিচারকগণ জোয়াকে জেরা
করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। তদুত্তরে জোয়ান্
বলিলেন,-আপনারা আমায় কি প্রশ্ন করিবেন,
কারাগারে তাহা আমি জানি না। হয়ত এমন কোন প্রশ্ন করিতে পারেন যে, আমি তাহার উত্তর দিতে পারিব ।” তিনি তাহার দৈব-বাণী-সংক্রান্ত ঘটনা ভিন্ন আর সমুদয় বিষয়েই সরলভাবে উত্তর দিতে স্বীকৃত হইলেন। কিন্তু বিচারগণকে জানাইলেন যে, যদি তাহার শিরচ্ছেদও করা হয়, তথাপি তিনি দৈববাণীর বিষয় কিছুই বলিবেন না। জোয়ানের এই প্রকার দৃঢ়তাব্যঞ্জক উত্তর সত্ত্বেও কোশে। তাঁহাকে দৈববাণীর বিষয়ে সত্য প্রকাশ করিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। পরবর্তী ২২-এ ও ২৪-এ তারিখের অধিবেশনেও তাহাকে ঐ বিষয়েই পুনরায় পীড়াপীড়ি করা হইল। কিন্তু তিনি পূর্বের ন্যায় অটল রহিলেন। বিচারকগণ তাহার বয়সের কথা জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন যে, তাহার বয়স প্রায় উনবিংশ বৎসর। তৎপর জোয়ান্ বিচারকগণ-সমীপে তাহার শৃঙ্খল-বন্ধন- জনিত যন্ত্রণার অভিযােগ করিলে, কোশে। প্রত্যুত্তরে বলিলেন,—“তুমি পলায়নের চেষ্টা করিয়াছ বলিয়াই, তােমাকে বাধ্য হইয়া শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া রাখিতে হইয়াছে।” উত্তরে জোয়ান্ নির্ভীকভাবে বলিলেন, ৮৭
ফরাসী বীরাঙ্গনা
“আমি যে পলায়নের চেষ্টা করিয়াছি, সে কথা সত্য।
এরূপ চেষ্টা কোন বন্দীর পক্ষে দূষণীয় নহে।”
চতুর্থ দিবসের অধিবেশনে জোয়ান্ সমস্ত সঙ্কোচ
পরিহার করিলেন, এবং তিনি যথার্থই যে দৈব-বাণী
শ্রবণ করিয়াছিলেন, সে কথাও স্বীকার করিলেন।
কিন্তু দৈব-বাণী তঁাহাকে কি আদেশ করিয়াছিল, তাহা
প্রকাশ করিয়া বলিবার জন্য বিচারকগণ তাহাকে
পীড়ন করায়, জোয়ান্ প্রত্যুত্তরে বলিলেন,—“আমি
তৎসমুদয় প্রকাশ করিতে পারি না। আপনাদের
প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অপেক্ষা স্বর্গ-দূতকে অসন্তুষ্ট
করিতে আমি অধিক ভয় করি। আমার প্রার্থনা,
এ বিষয়ে আমায় কিছু জিজ্ঞাসা করিবেন না।” একথা
শুনিয়া কোশে। বলিলেন,-“সত্য কথা
পাপ ?” জোয়ান্ দৃঢ়তার সহিত প্রত্যুত্তর করিলেন,
“স্বর্গ-দূত
আমায় যে আদেশ দিয়াছেন,
তাহা আপনাদের
নয়, রাজার
উচ্ছ্বসিত হৃদয়াবেগ সম্বরণ করিতে না পারিয়া তিনি
আরও বলিতে লাগিলেন,—“আমি ঈশ্বরের নিকট
হইতে আসিয়াছি; এখানে আমার কোন প্রয়ােজন
নাই। যাহার নিকট হইতে আসিয়াছি, আমাকে
বলা কি
জন্য।”
;
কারাগারে
•
তাঁহার নিকট প্রেরণ করুন। আপনারা বলিতেছেন
আপনারাই আমার বিচার-কর্তা। ভাবিয়া দেখুন,
আপনারা কি করিতেছেন। সত্যই আমি দেব-প্রেরিত ;
তবে জানিয়া রাখুন,
আপনারা স্বেচ্ছায়ই বিপন্ন
হইতেছেন।”
জোয়ানের এই তেজস্বিতাপূর্ণ বাক্যে গর্বিত
বিচারকগণ যারপরনাই উত্তেজিত হইলেন, এবং
নিতান্ত হীন-প্রকৃতি লােকের ন্যায় জোয়াকে অন্যায়
ও জটিল প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। তাহারা জিজ্ঞাসা
করিতে লাগিলেন,—“জোয়ান্ তােমার কি বিশ্বাস
হয় যে, তুমি দেবানুগ্রহ প্রাপ্ত হইয়াছে ?” বলা
বাহুল্য যে, এ প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে হাঁ’ কিম্বা ‘না’ বলা
উভয়ই বিপজ্জনক। কারণ, ‘না’ বলিলে প্রতিপন্ন
হইত যে, জোয়ান্
দেবানুগ্রহ হইতে বঞ্চিত।
পক্ষান্তরে ‘। বলিবার পথও জোয়ানের পক্ষে
রুদ্ধ ছিল। যেহেতু এই পাপ-প্রলােভন-পূর্ণ জগতে
নিতান্ত দাম্ভিক ভিন্ন কেহই দৃঢ়তা সহকারে বলিতে
পারেন না যে, “আমি দেবানুগ্রহ প্রাপ্ত হইয়াছি।”#
* Michelet's History of France, Translated by Smith
Vol. II. Page 141.
৮৯
ফরাসী বীরাঙ্গনা
বিশেষতঃ খ্ৰীষ্টান সমাজে আপনাকে দেবানুগৃহীত
বলিয়া প্রচারিত করা নিতান্ত দোষাবহ বলিয়া বিবেচিত
হইয়া থাকে। কিন্তু জোয়ান্ ইহাতে কিঞ্চিত্র
অপ্রতিভ না হইয়া প্রকৃত খ্ৰীষ্ট-ভক্তের ন্যায় উত্তর
করিলেন,—“যদি আমি দেবানুগ্রহ না পাইয়া থাকি,
তবে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমায় তঁাহার অনুগ্রহ
প্রদান করেন। আর যদি পাইয়া থাকি, তবে
প্রার্থনা—তিনি যেন আমায় তাহা হইতে কখনও বঞ্চিত
করেন।”
তিনি আরও বলিলেন :-“আহা!
আমি যদি সত্য সত্যই দেবানুগ্রহ হইতে বঞ্চিত হইয়া
থাকি, তবে আমার ন্যায় ঘােরতর পাপীয়সী এ জগতে
আর কে আছে ? কিন্তু আমাতে যদি কোন প্রকারের
পাপ থাকিত, তবে নিশ্চয় আমি দৈব-কাণী শুনিতে
পাইতাম না। আমার একান্ত ইচ্ছা,-যেন আমার
ন্যায় প্রত্যেকেরই উহা শ্রবণ-গােচর হয়।” জোয়ানের
এই প্রাজ্ঞােচিত উত্তরে বিচারকগণের উত্তেজনা ও
বিদ্বেষ শতগুণ বৃদ্ধি পাইল। তাহারা হতবুদ্ধি হইয়া
অনেকক্ষণ পর্যন্ত বিচারকার্য স্থগিত রাখিলেন।
অতঃপর পুনরায় দ্বিগুণ তেজের সহিত তাহারা
বিচার-কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন, এবং জোয়ানের সর্বনাশ
কারাগারে সাধনের অভিপ্রায়ে তাহাকে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। এইরূপে চতুর্থ দিবসের অধিবেশন সমাপ্ত হইয়া গেল। পঞ্চম দিবসের অধিবেশনে বিচারকগণ জোয়াকে নিতান্ত নীচ ভাবের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। তৎপর জোয়াকে ‘শয়তানের শিষ্য। বলিয়া প্রতিপন্ন করিবার উদ্দেশ্যে তাহার প্রতি কতগুলি অন্যায় ও অবান্তর প্রশ্ন করা হইল। বিচারকগণ জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তুমি নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি, তুমি যে মূর্তি দেখিতে পাইয়াছিলে, তাহা যথার্থই স্বর্গ- দূতের ?” জোয়ান্ প্রত্যুত্তরে নির্ভয়ে বলিলেন,—“হাঁ, আমি এইরূপ বিশ্বাস করি । ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস যতটা স্থির, এ বিষয়ও ততটা দৃঢ়।” তৎপর তাহার পতাকা সম্বন্ধে ও অপরাপর বিষয়ে তঁাহাকে প্রশ্ন করা হইল। —তুমি কি সৈন্যগণকে বল নাই যে, তুমি যে রকমের পতাকা ব্যবহার কর, তাহা শুভ ফল প্রদান করিবে -না, আমি এইমাত্র বলিয়াছি যে, বীরের ন্যায় ইংরাজদিগের সম্মুখীন হও, আমি তােমাদের অনুসরণ করিব। । ৯১
ফরাসী বীরাঙ্গনা
—আচ্ছা, যে সব লােক তােমার হস্তপদ ও
পরিচ্ছদাদি চুম্বন করিত, তাহারা কোন্ উদ্দেশ্যে চালিত
হইয়া আসিত ?
—তাহারা আপনা হইতেই আসিত। কারণ
আমি কখনও তাহাদের কোন অনিষ্ট করি নাই; বরং
তাহাদের সেবায় নিজকে যথাসাধ্য নিয়ােজিত
করিতাম।
বলা বাহুল্য, কোশের মনােনীত এসেসরগণের
( বিচারকার্য্যের সাহায্যকারী) মধ্যেও কেহ কেহ
এইরূপ অবান্তর প্রশ্নের প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। কিন্তু
এই প্রতিবাদে কোন সুফল ফলিল না। পক্ষান্তরে
এই সকল বিরুদ্ধবাদিগণকে বিচারালয়ে উপস্থিত
থাকিয়া, জোয়ানের অনুকূলে মন্তব্য প্রকাশ করিবার
সুযােগ প্রদান করা কোশে। সমীচীন মনে করিলেন
না। তিনি অচিরে তাহাদিগকে পদচ্যুত করিলেন।
অতঃপর ১০-ই হইতে ১৭ই মার্চ তারিখের মধ্যে যে
কয়েকটি অধিবেশন হইল, তাহাতে কোশে অত্যল্প
সংখ্যক এসেসর লইয়া সম্পূর্ণ গােপনে বিচার-কাৰ্য্য
পরিচালিত করিলেন। এতদ্ব্যতীত বিচারের স্থানও
পরিবর্তিত করা হইল। প্রথমতঃ রুয়ারি রাজকীয়
কারাগারে। প্রাসাদেই বিচারকার্য সম্পন্ন হইত। কিন্তু পরে কোশের আদেশানুসারে তত্রত্য কারাগারের অভ্যন্তরে বিচারের স্থান নির্দিষ্ট হইল। তথায় জন- সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। বিচার- কক্ষের দ্বার রুদ্ধ করিয়া জোয়াকে নানা প্রকার সঙ্গত ও অসঙ্গত প্রশ্ন করা হইত। ১৭ই মার্চের পর প্রথম যে অধিবেশন হইল, তাহাতে বিচারকগণ জোয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “পিতা মাতার বিনানুমতিতে গৃহত্যাগ করা কি তােমার উচিত হইয়াছে ?” -“হার আমায় ক্ষমা করিয়াছেন। আমি ভগবানের আদেশ পালন করিয়াছি। সুতরাং যদি শত সহস্র পিতামাতাও আপত্তি করিতেন, তথাপি গৃহত্যাগ করা আমার পক্ষে অন্যায় হইত না। কারণ ভগবানের আদেশ পাইয়াছিলাম।” —“জাতীয় পৰ্বদিনে প্যারী নগর আক্রমণ করা কি উচিত হইয়াছে ?” —“অবশ্য জাতীয় পৰ্বদিন পালন করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।”
ফরাসী বীরাঙ্গনা
—“বােরেভােয়া নগরের প্রাসাদ হইতে তুমি
লাফাইয়া পড়িয়াছিলে কেন?”
—“আমি শুনিতে পাইয়াছিলাম, কঁপিয়ে-এর
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলকে নির্বিচারে হত্যা করা
হইবে; এবং আরও জানিয়াছিলাম যে, আমাকেও
ইংরাজদিগের নিকট বিক্রয় করা হইবে। সুতরাং
তাঁহাদের অধীন হওয়া অপেক্ষা আমি মৃত্যুই শ্রেয়স্কর
মনে করিয়াছিলাম।
—“তুমি যে অঙ্গুরীয় ধারণ করিতে, তাহাতে কি
কোন ঐন্দ্রজালিক শক্তি ছিল ? যুদ্ধক্ষেত্রে তুমি
বারংবার তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত করিতে কেন ?
—“কারণ তাহাতে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের নাম অঙ্কিত
ছিল।”
এইরূপে নানা প্রকার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াও
বিচারকগণ জোয়াকে অপরাধিনী বলিয়া প্রতিপন্ন
করিতে পারিলেন না। অতঃপর জোয়ান্ ধৰ্ম্ম-মন্দিরের
কর্তৃপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে সম্মত আছেন
কিনা, বিচারকগণ তাহাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা
করিলেন। জোয়ান্ তদুত্তরে বলিলেন,--“আমি
ভগবৎ-প্রেরিত হইয়া কাৰ্য করিয়াছি। সুতরাং
৯৪
কারাগারে
আমার সমুদয় কার্যের জন্য আমি একমাত্র তাঁহারই
নিকট আত্মসমর্পণ করিতেছি।” বিচারকগণ পুনরায়
জিজ্ঞাসা করিলেন,—“আর এই ধৰ্ম্ম-মন্দিরের কর্তৃ-
পক্ষের নিকট ? তিনি প্রত্যুত্তরে বলিলেন :—“আমি
আর কোনও উত্তর দিব না।”
জোয়ানের এই প্রকার প্রত্যুত্তরে বিচারালয়ে
বিষম গােলযােগের সঞ্চার হইল। বিচারক ও
এসেসরগণের মধ্যে মতভেদ উপস্থিত হইল।
একজন এসেসর এইরূপ অভিমত জ্ঞাপন করিলেন যে,
জোয়ান্ শুধু এক ঈশ্বর ভিন্ন পােপ, বিসপ, প্রভৃতি
ধৰ্ম্ম-যাজক —ইহাদের কাহাকেও মানে না। অপর
একজন ব্যবহার-বিশারদ ব্যক্তি বলিলেন যে, এই
প্রকারে অভিযুক্ত বালিকাকে কোন ব্যবহারাজীবের
পরামর্শ গ্রহণের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা নিতান্ত
ন্যায়-বিরুদ্ধ কাৰ্য্য হইয়াছে। আর দুইজন ধৰ্ম্ম-যাজক
এইরূপ সিদ্ধান্ত প্রকাশ করিলেন যে, জোয়ানের বিচার
ধৰ্ম্ম-গুরু স্বয়ং পােপর তত্ত্বাবধানে হওয়াই সমুচিত।
জোয়ানের ভগবানে আত্মসমর্পণ করার উক্তি
হইতে তাহার সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, জোয়ান্
প্রকৃতপক্ষে পােপের নিকটই আত্মসমর্পণ করিয়াছে।
ফরাসী বীরাঙ্গনা জোয়ান্ যে প্রকৃত-প্রস্তাবে পােপের নিকট বিচার প্রার্থনা করিতে পারেন, তাহা তাহাকে সুস্পষ্টরূপে বুঝাইয়া দেওয়া তাহারা কর্তব্য বলিয়া মনে করিলেন। যদিও আসামীর সহিত গােপনে সাক্ষাৎ করা, কিম্বা আসামীকে কোন প্রকারের উপদেশ প্রদান করা, সে কালে বিধি-সঙ্গত ছিল না, তথাপি কোশের অন্যায় বিচার-প্রণালীর মূলে কুঠারাঘাত করা একান্ত কর্তব্য বিবেচনা করিয়া তাহারা এস্থলে সে বিধির উল্লঙ্ঘন- পূৰ্ব্বক কারাগৃহে প্রবেশ করিলেন, এবং জোয়াকে পােপের নিকট বিচার প্রার্থনা করিতে উপদেশ দিলেন। তদনুসারে পর দিবস অধিবেশনের প্রারম্ভেই জোয়ান্ পােপের নিকট যথাবিধি বিচার প্রার্থনা করিলেন। বলা বাহুল্য যে, এই প্রার্থনায় কোশে। যার-পর-নাই ক্রোধান্বিত হইলেন; এবং তৎক্ষণাৎ কারাগারের প্রহরিগণকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, জোয়ানের সহিত কেহ সাক্ষাৎ করিয়াছিল কি ? কোশের ক্রোধ দেখিয়া, তদবধি এই ধৰ্ম্ম-যাজক-দ্বয় ও পূর্বোক্ত ব্যবহার-বিশারদ ব্যক্তি বিচারালয়ে উপস্থিত হওয়া বন্ধ করিলেন, এবং এসেসরের পদও পরিত্যাগ পদও পরিত্যাগ করিলেন। তাহাদের কারাগারে পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সুবিচারের যে সামান্য একটু আশা ছিল, তাহাও লােপ পাইল। এদিকে কোশে। জন, লােহেয়ার নামক রুয়ার একজন বিখ্যাত ও বিজ্ঞ ব্যবহারাজীবকে বিচার সংক্রান্ত কাগজ-পত্র দেখাইলেন। ঐ ব্যক্তি সমস্ত কাগজ-পত্র পাঠ করিয়া কোশের সম্পূর্ণ প্রতিকূলে মন্তব্য প্রকাশ করিলেন, এবং তাঁহার বিচার-পদ্ধতিতেও দোষারােপ করিলেন। একজন প্রসিদ্ধ ব্যবহারাজীবের এই প্রকার প্রতিকূল মত সত্ত্বেও কোশে। নিরস্ত হইলেন না। জোয়ান্ এযাবৎ বিচারকদিগের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তরে যাহা যাহা বলিয়াছেন, কোশে। তৎসমুদয় হইতে একজন কূট-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যবহারাজীবের সহায়তায় কতগুলি অভিযােগ প্রস্তুত করিয়া লইলেন। অধিকন্তু কোশের মনােনীত নূতন এসেসরগণও জোয়ানের বিরুদ্ধে অভিমত প্রকাশ করিলেন। সুতরাং তাহার সংকল্প-সিদ্ধির বিশেষ ব্যাঘাত ঘটিল না। অতঃপর ইষ্টার-পর্বের পূৰ্ব সপ্তাহে জোয়ান্ পীড়িত হইলেন। এই সপ্তাহের রবিবার দিন ধৰ্ম্ম- মন্দিরের উপাসনায় যােগদান করিবার জন্য তাহার ৯৭ ৭ ফরাসী বীরাঙ্গনা হৃদয় অত্যধিক ব্যাকুল হইয়া উঠিল। কিন্তু তিনি সেই পৰ্ব্বদিনেও পাষাণ-প্রাচীরবেষ্টিত অন্ধকারময় কারা-গৃহের নির্জন কক্ষে অবরুদ্ধ থাকিতে বাধ্য হইলেন। রবিবার অতীত হইল, সােমবারও গত হইল। তথাপি কারা-কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত হইল না। তৎপর মঙ্গলবার দিবস তিনি পুনরায় বিচারালয়ে নীত হইলেন। এই দিনকার অধিবেশনে কোশে। তাহাকে অভিযােগের বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করিয়া শুনাইলেন। তখন বিচারকগণ তঁাহার পুরুষ-বেশ সম্বন্ধে বলিলেন যে,যাহারা জাতীয় বেশভূষা ও আচার-ব্যবহার পরিত্যাগ করে, তাহারা ধৰ্ম্ম- শাস্ত্রানুসারে দোষী, এবং ঈশ্বরের দৃষ্টিতেও নিতান্ত ঘৃণাহ। জোয়ান্ রমণী হইয়াও তাহার জাতীয় পরিচ্ছদ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পুরুষ-জনােচিত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হইয়াছেন,—ইহাই বিচারকদিগের নিকট সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক গুরুতর অপরাধ বলিয়া বিবেচিত হইল। বিচারকগণের এই সিদ্ধান্ত হইতে তৎকালীন সামাজিক অবস্থা, শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের সংকীর্ণতা এবং ধর্মশাস্ত্রের মূল তত্ত্বের প্রতি ঔদাসীন্য প্রতিপন্ন হয়। জোয়ান্ বিচারকগণের এই উক্তির প্রত্যুত্তরে প্রথমতঃ ১৮
কারাগারে
কিছুই বলিলেন না। পরে তিনি ইহার যথার্থ উত্তর
দিবার জন্য এক দিনের সময় প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু
সে প্রার্থনা অগ্রাহ্য হইল। তখন জোয়ান্ বলিলেন :-
“আমি ঠিক বলিতে পারি না, কখন আমি এ বেশ
পরিত্যাগ করিব।”
জোয়ান্ কেন পুরুষ-বেশ পরিত্যাগ করিতে সম্মত
ছিলেন না, তাহা তিনি রমণী-সুলভ লজ্জা বশতঃ
বিচারকদিগের নিকট প্রকাশ করিতে পারেন নাই।
প্রকৃত কথা এই যে, কারাগারে তঁাহার প্রতি নানা
প্রকার নৃশংস অত্যাচার অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। সে
সমুদয় বিবরণ কারা-কাহিনীতে বিশদরূপে বিবৃত করা
হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত তিন জন অসভ্য সৈনিক-পুরুষ
তঁাহার উপর পাহারা দিবার জন্য দিবারাত্রি তাহার
প্রকোষ্ঠে অবস্থান করিত।
পরবর্তী রবিবার—ইষ্টার-পৰ্বদিন জোয়ান্ অত্যন্ত
পীড়িত হইয়া পড়িলেন। কথিত আছে, ঐদিন তিনি
অন্যান্য আহাৰ্য্য দ্রব্যের সহিত বিসপের প্রেরিত
একখণ্ড মৎস্য উদরস্থ করিয়াছিলেন। ইহাতে তাঁহার
রুগ্ন দেহের দৌর্বল্য ভয়ানক-রূপে বদ্ধিত হইল, এবং
তিনি মুমূর্ষ দশায় পতিত হইলেন। অনেকে অনুমান
ফরাসী বীরাঙ্গনা করেন, বিসপ, কোশে। এই ক্লেশ-দায়ক বিচার-ভার হইতে অব্যাহতি লাভের আশায় জোয়াকে মৎস্যের সহিত বিষ প্রয়ােগ করিয়াছিলেন। কিন্তু আল-অব- ওয়ারউইক ( Earl of Warwik) এই সংবাদ শুনিয়া বলিলেন যে, তাঁহাকে কিছুতেই এভাবে মরিতে দেওয়া হইবে না। যে প্রকারেই হউক তাঁহাকে রােগমুক্ত করিতেই হইবে। উঁহার বহু চেষ্টার ফলে ও বিজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তায় জোয়াকে মৃত্যুর হস্ত হইতে রক্ষা করা হইল। জোয়ান্ ধীরে ধীরে আরােগ্য-লাভ করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি এতদূর দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, শয্যা হইতে মাথা তুলিতেও কষ্ট অনুভব করিতেন। এ অবস্থায় ১৮-ই এপ্রিল (১৪৩১ খ্রঃ) তারিখে জোয়ান্ যখন রােগ-ক্লিষ্ট-দেহে, অবসন্ন-মনে নির্জন কারা-কক্ষের এক কোণে শায়িতা ছিলেন, তখন হৃদয়হীন বিচারকেরা তথায় প্রবেশ করিয়া তাহাকে অপরাধ স্বীকারপূর্বক আত্মসমর্পণ করিবার পুনরায় পীড়াপীড়ি করিলেন। কারণ ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে পারিলে, তাহাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা সহজসাধ্য হইত। কিন্তু জোয়ানের দৃঢ়তা পূৰ্ব্ববৎ বলবতী ।
কারাগারে ক্ষীণ-কণ্ঠে দৃঢ়তার রহিল। তিনি কিছুতেই তাহাদের কথায় আপনাকে ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া স্বীকার করিতে সম্মত হইলেন না। তখন তাহারা ক্রোধান্বিত হইয়া জোয়াকে ভীতি প্রদর্শনপূর্বক বলিলেন –“যদি তুমি আমাদের আদেশানুসারে কাৰ্য্য করিতে স্বীকৃত না হও, তবে তােমার উপর নানা প্রকার নির্যাতন করা হইবে, এবং ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া তােমাকে আমরা পরিত্যাগ করিব।” রুগ্না বালিকা সহিত উত্তর করিলেন –“আমি প্রকৃত খ্ৰীষ্টান। যথা-বিহিত-রূপে খ্ৰীষ্ট-ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছি, এবং প্রকৃত খ্ৰীষ্ট-ভক্তের ন্যায়ই মৃত্যুকে আমি সানন্দে আলিঙ্গন করিব।” তৎপর ২রা মে একজন ধর্মযাজক পুনরায় তাহাকে ধৰ্ম্ম-মন্দিরের কর্তৃপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করিবার জন্য অনুরােধ করিলেন। জোয়ান্ এবারও দৃঢ়তার সহিত প্রত্যুত্তর করিলেন –“যিনি স্বর্গ-মর্ত্তের বিধান-কর্তা, আমি একমাত্র তাঁহারই নিকট আত্ম- সমৰ্পণ করিয়াছি।” ধৰ্ম্মযাজকটি ইহাতে ধৈৰ্য্যচ্যুত হইয়া কহিলেন—“তবে আমরাও তােমাকে জীয়ন্ত দগ্ধ করিয়া মারিব। তােমার শারীরিক শাস্তির ব্যবস্থা না করিলে, তুমি আমাদের কথানুসারে কাৰ্য্য করিবে না।”
ফরাসী বীরাঙ্গনা
অতঃপর ১১ই মে তাহারা পুনরায় কারা-কক্ষে
প্রবেশ করিলেন, এবং পূর্ববৎ ভীতি-প্রদর্শন-পূৰ্ব্বক
কহিলেন—“জোয়ান্ এখনও পথে আইস, ঘাতককে
ডাকিয়া পাঠান হইয়াছে। এবার তােমায় নির্যাতন
করা হইবে।” জোয়ান্ ইহাতে কিঞ্চিত্র ভীত না
হইয়া বীরােচিত ওজস্বিতার সহিত কহিলেন :
“ভগবানই আমার জীবনের একমাত্র নিয়ন্তা। আমি
তঁাহারই উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতেছি। আপনারা
যদি আমার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলেন, তবু আমি
কিছু বলিব না।” জোয়ানের এই প্রকার বীরােচিত
উত্তরে কোশের সমুদয় চেষ্টা ব্যর্থ হইল।
এদিকে প্যারী নগরস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের
কর্তৃপক্ষীয়েরা এই বিচারের প্রাথমিক বিবরণ পাঠ
করিয়া জোয়ানের প্রতিকূলে মন্তব্য প্রকাশ করিলেন,
ও কোশে-র বিচার-পদ্ধতির সাধুবাদ করিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়গণের নিকট হইতে এই
প্রকার অনুকূল মন্তব্য প্রাপ্ত হইয়া কুটিল-মতি বিচারক
ও এসেসরগণ জোয়াকে জীয়ন্তে দগ্ধ করিবেন সিদ্ধান্ত
করিলেন। কিন্তু ইহাতেও তাঁহাদিগের
ইংরেজের সবিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন না। কারণ জোয়া-
১০২
কারাগারে নের নিকট হইতে একটা স্বীকারােক্তি লিখাইয়া লইয়া তদ্দারা তাহাকে ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া প্রমাণ-পূৰ্ব্বক প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা, এবং ফরাসী-রাজ চালস্ এইরূপ একটি ধর্মদ্বেষিণী বালিকা দ্বারা পরিচালিত হইয়াছেন বলিয়া, তাহাকে সভ্য জগতের নিকট হীন করাই তাহাদিগের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। সুতরাং ইংরাজের জোয়ানের নিকট হইতে স্বীকারােক্তি করাইয়া লইবার জন্য অপর একজন সুচতুর ধর্ম- যাজককে তাহার নিকট প্রেরণ করিলেন। কিন্তু জোয়ান্ ভঁহাকেও কহিলেন –“যদি আমি অনল- কুণ্ডেও নিক্ষিপ্ত হই, তথাপি যাহা বলিয়াছি তাহা প্রত্যাহার করিব না।” এইরূপে জোয়ানের বিষয় কোনও শেষ মীমাংসা হইতেছে না দেখিয়া কার্দিনাল অস্থির হইয়া উঠিলেন। বিশেষতঃ জনসাধারণের সহানুভূতি ক্রমে ক্রমে জোয়া- নের প্রতি আকৃষ্ট হইতেছিল। এই কারণে কার্দিনাল প্রকাশ্য স্থানে সর্বসাধারণের সমক্ষে বিচারের পরি- সমাপ্তি করিবার সংস্কল্প করিলেন। তদনুসারে ২৩-এ মেরুয়। নগরের কোন এক প্রসিদ্ধ ধৰ্ম্ম-মন্দিরের সমীপ- বৰ্ত্তী বিস্তৃত প্রাঙ্গণে বিচারের স্থান নির্দিষ্ট হইল।
ফরাসী বীরাঙ্গনা কার্দিনাল স্বয়ং তথায় উপস্থিত ছিলেন। বিচারক, ধৰ্ম্ম-যাজক, এসেসর ও ব্যবহারাজীব ব্যতীত আরও বহু সংখ্যক লােক বিচারকার্য নিরীক্ষণ করিবার জন্য সমবেত হইয়াছিল। বিচার আবম্ভের পূর্বে কোশের পক্ষীয় একজন লােক জোয়ানের সমীপবর্তী হইয়া তাহাকে বলিলেন— “জোয়ান্! এখনও বলিতেছি সময় আছে। তুমি শুধু আমাদের উপদেশানুসারে একটা স্বীকারােক্তি- মূলক দলিলে স্বাক্ষর কর। তাহা হইলে তােমাকে নিশ্চয়ই ইংরাজদিগের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া ধৰ্ম্ম- মন্দিরের তত্ত্বাবধানে রাখিব।” ধৰ্ম্ম-মন্দিরে থাকিতে পাইবার কথা শুনিয়া জোয়ান্ তাহাতে স্বীকৃত হইলেন। কিন্তু তিনি লিখিতে জানিতেন না। সুতরাং তাহাদের প্রদত্ত দলিলে তিনি সম্মতি জ্ঞাপনার্থ স্বহস্তে একটি ‘কুশ’ চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিলেন। ইংরাজদিগের অভীষ্ট সিদ্ধ হইল। কিন্তু জোয়ান্ যে আশার বশ- বর্তিনী হইয়া ‘স্বীকারােক্তি’ করিয়াছিলেন,তাহা অচিরাৎ স্বপ্নে পরিণত হইল। প্রধান বিচারপতি কোশে। দণ্ডাজ্ঞা পাঠ করিতে উঠিয়া বলিলেন -“জোয়ান্। যে কারাগৃহ হইতে আসিয়াছ পুনরায় তথায় প্রতিগমন ১০ ৪ , অগ্নিকাণ্ড বারাঙ্গনা
No text on this page.
কারাগারে
কর, এবং তােমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত-স্বরূপ মৃত্যুকাল
পৰ্যন্ত অনুতাপ করিয়া কালাতিপাত কর।”
প্রতারণামূলক দণ্ডাজ্ঞা শুনিয়া জোয়ান্ নিরতিশয় ক্ষুন্ন
হইলেন। যে পশু-প্রকৃতি সামরিক কর্মচারিগণের হস্ত
হইতে আত্মসম্মান রক্ষাকল্পে তিনি নিতান্ত অনিচ্ছা
সত্ত্বেও এই প্রকার স্বীকারােক্তি’ করিলেন, পুনরায়
তাহাদেরই তত্ত্বাবধানে কালাতিপাত করিতে হইবে
জানিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ স্বীকারােক্তি প্রত্যাহার
করিলেন। ইহাতে সৈনিকদিগের মধ্যে ভয়ানক
উত্তেজনার উদ্ভব হইল, এবং বিচারকগণও বিষম সমস্যায়
পতিত হইলেন। সে-দিনকার জন্য বিচার-কাৰ্য্য স্থগিত
রহিল, এবং জোয়াকে কারাগারে স্থানান্তরিত করা
হইল।
ঐদিন রজনীতে জোয়ান্ যখন পুরুষ-বেশ পরিত্যাগ
করিয়া নৈশ-পরিচ্ছদ পরিধান-পূৰ্ব্বক শয্যায় গমন
করিলেন, তখন ইংরাজ-পক্ষীয় কৰ্মচারিগণ চক্রান্ত
করিয়া তাহার অজ্ঞাতসারে ঐ পুরুষ-বেশ অপসারিত
করিলেন, এবং তৎস্থানে রমণী-জননাচিত পরিচ্ছদ
রাখিয়া দিলেন। সুতরাং পর দিবস তঁাহাকে বাধ্য হইয়া
রমণীর বেশ গ্রহণ করিত হইল। পর দিন কারা-
ফরাসী বীরাঙ্গনা ধ্যক্ষের তঁাহার রমণীর পরিচ্ছদ অপমৃত করিয়া তৎ- স্থানে পুরুষ-পরিচ্ছদ রাখিয়া দিলেন। তিনি প্রত্যুষে গাত্ৰোথান করিয়া দেখিলেন, তাঁহার রমণী-বেশ অপসৃত হইয়াছে। সুতরাং তিনি পুনরায় পুরুষ-বেশই পরিধান করিলেন। ইহাতে অভীষ্ট-সিদ্ধির পথ সরল হইয়া গেল। কারণ খৃষ্টীয় শাস্ত্রানুসারে এরূপ ব্যবহার অত্যন্ত দোষাবহ ও প্রাণদণ্ডের যােগ্য। এই কারণ পর দিবস ধৰ্ম্মাধ্যক্ষ কোশে। ধর্মাধিকরণের প্রতিনিধি ও অপরাপর এসেসরগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া কারাগারে জোয়ানের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। তখন জোয়ান্ বলিলেন -“অন্য পরিচ্ছদ না পাওয়ায় আমি পুনরায় পুরুষ-বেশ গ্রহণ করিয়াছি। আমি এখনও এ বেশ পরিত্যাগ করিতে প্রস্তুত আছি। আমায় এ কারাপার হইতে ধৰ্ম্ম-মন্দিরে প্রেরণ করুন। কিন্তু তাহার এই সমুদয় কথায় বিচারকগণ কর্ণপাত করিলেন না।
অনল-কুণ্ডে
“মরণের সাথে খেলিতে খেলিতে,
এসেছি মা এতদূরে,
ডাকিছে আবার সাধের মরণ,
সুনীল মেঘের পুরে।”
মানকুমারী-
অনল-কুণ্ডে বিচার কাৰ্য্যের পরিসমাপ্তি- প্রাণদণ্ডের আদেশ হইল । ২৯-এ মে তারিখে কোশে। এই আদেশ প্রচার করিলেন যে, আগামী কল্য ধর্মদ্বেষিতার অপরাধে জোয়ানের জীবন্ত দেহ অনল-কুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইবে। রুয়া নগরের একটি পুরাতন বাজারে বধ্যভূমি নির্দিষ্ট ৩০-এ মে প্রাতে ৯ ঘটিকার সময় জোয়ান রমণী-বেশে সজ্জিত হইয়া বধ্যভূমিতে নীত হইলেন। তথায় তিনটি মঞ্চ প্রস্তুত হইয়াছিল। একটির উপরে ইংলণ্ডের রাজকীয় সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল ; অপরটিতে ধৰ্ম্মাধ্যক্ষ কোশে, ধর্মাধিকরণের প্রধান প্রতিনিধি, এসেসর ও ধর্মযাজকগণ সমাসীন ছিলেন। তৃতীয়টি স্তুপীকৃত সমিধ-রাশিতে প্রস্তুত ; তদুপরি একটি দীর্ঘ কাষ্ঠখণ্ডের সহিত সৰ্বাঙ্গ শৃঙ্খলিত অবস্থায় বীর- বালিকা জোয়ান্কে দণ্ডায়মান করান হইয়াছিল। তঁাহার মস্তকের উপরে একখানি কাষ্ঠ-ফলক স্থাপিত ফরাসী বীরাঙ্গনা মূৰ্ত্তি- করিয়া তাহাতে “স্বধৰ্মত্যাগিনী, ধর্মদ্বেষিণী, পূজক”—এই কয়টি কথা খােদিত করা হইয়াছিল। প্রথমতঃ একজন পুরােহিত যথারীতি উপাসনা- কাৰ্য্য সমাধা পূৰ্ব্বক জোয়ানের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন –“যাও জোয়ান, শান্তিতে ইহধাম ত্যাগ কর। তুমি স্বধৰ্মত্যাগিনী, সুতরাং আমরা তােমায় আর রক্ষা করিতে পারি না।” অতঃপর জোয়ান্ নতজানু হইয়া কৃতাঞ্জলি-পুটে কিয়ৎক্ষণ ভগবদারাধনা করিলেন, এবং পরে উপস্থিত জন-মণ্ডলীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন –“আপনারা সকলে আমার আত্মার কল্যাণ-কামনায় ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিবেন।” তিনি এরূপ আবেগের সহিত এই বাক্যগুলি উচ্চারণ করিয়াছিলেন, যে, তঁাহার শত্রুগণের মধ্যেও অনেকে অশ্রু-সংবরণ করিতে পারিলেন না। দেশ- দ্রোহী কোশের চক্ষু হইতেও কয়েক বিন্দু অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। কোশে। চক্ষু মুছিয়া দণ্ডাজ্ঞা পাঠ করিয়া শুনাইলেন :- “তুমি শয়তান দ্বারা পরিচালিত হইয়া অপকর্ম করিয়াছ। সুতরাং আমরা তােমায় স্বধর্মত্যাগিনী বলিয়া প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলাম।” ১১০
শেষ দৃশ্য
বীরাঙ্গনার আত্মত্যাগ
-)*(-
বীর-বালিকা মৃত্যু অনিবার্য জানিয়া ভগবানের
উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিলেন, এবং একটি ক্রুশ-দণ্ডের
প্রার্থনা করিলেন। একজন ইংরাজ তাহার হস্তস্থিত
যষ্টি দ্বারা একটি কুশ’ প্রস্তুত করিয়া জোয়াকে
প্রদান করিলেন। জোয়ান্ উহা আশীৰ্বাদ-নিৰ্ম্মাল্যের
ন্যায় ভক্তিভরে বক্ষে ধারণ করিয়া মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত
হইলেন।
এদিকে বেল। প্রায় দ্বিপ্রহর হইল। রৌদ্র-দীপ্ত
গগনাঙ্গন হইতে
হইতে মধ্যাহ্ন-মার্তণ্ডের প্রচণ্ড তাপ
অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় বিচ্ছুরিত হইয়া বসুধা-তল উত্তপ্ত
করিয়া তুলিতেছিল। তখন জোয়ান্ যে কাষ্ঠরাশির
উপর দণ্ডায়মান ছিলেন, সৈনিকগণের আদেশক্রমে
ঘাতক তাহাতে অগ্নিসংযােগ করিয়া দিল। দেখিতে
দেখিতে অনল-শিখা সংহার-মূর্তি
পরিগ্রহ-পূৰ্ব্বক
লেলিহান রসনা বিস্তার করিয়া বীরাঙ্গনার গাত্র স্পর্শ
ফরাসী বীরাঙ্গনা করিল। জোয়ান্ প্রথমে শঙ্কিত হইয়া ‘জল’ বলিয়া একবার চীৎকার করিয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু পর- মুহুর্তেই তিনি সে দৌর্বল্য পরিহার করিলেন। তাহার হৃদয়ে এক অভিনব বলের সঞ্চার হইল। মানবী তখন দেবীর ন্যায় বলিয়া উঠিলেন :- “আমি নিশ্চয়ই প্রতারিত হই নাই। যে বাণী আমার শ্রবণ-গােচর তাহা সত্যই ভগবদ্বাণী।” মুহূৰ্ত্ত-মধ্যে বিশ্ব-বিধ্বংসী অনল-শিখায় ক্ষণজন্মা দেব-বালার পুণ্য-পূত দেহ ভস্মীভূত হইয়া গেল। হইয়াছিল, উপসংহার
‘কলঙ্ক-কর্দম-কালি,
ধুয়ে দিলে রক্ত ঢালি,
হােমানলে হুতি দিলে ও দেব-হৃদয়,
নিবারিতে মাতৃ-অশ্রু প্রাণ-বিনিময় !”
মানকুমারী-
উপসংহার —)*(- আত্মােৎসর্গের ফল তপস্বিনী বীরাঙ্গনা জন্মভূমিকে ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী জ্ঞানে পূজা করিতেন, স্বজাতিকে প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালবাসিতেন, এবং রাজাকে দেবতা-জ্ঞানে ভক্তি করি- তেন। স্বদেশ, স্বজাতি ও সম্রাটের হিত-কামনায় জীবনের প্রথম ঊষায় স্বাধীনতা-দেবীর মঙ্গল-মন্দিরে তিনি হাসি-মুখে আত্ম-দান করিলেন। সেই আজন্ম- পবিত্র বীর-ললনার অপাপবিদ্ধ দেহের অনাবিল রুধির- ধারায় দেবী-মন্দির রঞ্জিত হইল, বহু দিবসের পুঞ্জীকৃত পাপ-কালিম। বিধৌত হইল, পরাধীনতার পঙ্কিলতা দূরীভূত হইল। হইল। বিধাতার ইঙ্গিতে তিনি যে মহাব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন, ভােগ-বাসনা ত্যাগ করিয়া, পার্থিব স্নেহের বন্ধন ছিন্ন করিয়া, জীবন পর্যন্ত পণ করিয়া তাহা উদ্যাপন করিয়া গেলেন। অলেয়। নগরকে বৈদেশিকের দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত এবং সম্রাটকে রাজ-সিংহাসানে প্রতিষ্ঠিত করিয়া জন্মভূমির সর্বাঙ্গীণ স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করিয়া ফরাসী বীরাঙ্গনা দেওয়াই তঁাহার জীবনের ব্রত ছিল। ইহাই তাহার নিকট বিধাতার আদেশ-বাণী-রূপে প্রেরিত হইয়াছিল। তিনি নিষ্কাম ও নিঃস্বার্থভাবেসে স্বর্গীয় আদেশ-বাণী পালন করিয়াছেন। তাহার জীবদ্দশায়ই তিনি জন্ম- ভূমিকে অনেক পরিমাণে শৃঙ্খল-মুক্ত দেখিয়া গেলেন। ডি-ফ্লাভি নামক একজন অর্থ-পিশাচ দেশ-দ্রোহীর বিশ্বাসঘাতকতায় ও ষড়যন্ত্রে জোয়ান্ শত্রু-হস্তে নিপতিত হইয়াছিলেন। দীর্ঘ কাল নানা প্রকার প্রকার পৈশাচিক অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া পরিশেষে তিনি অনল-কুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইলেন। তঁাহার নশ্বর দেহ অনল-কুণ্ডের জ্বালাময়ী শিখায় ভস্মীভূত হইল। পাছে, বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজা করিয়া পুনরায় ফরাসী জাতি স্বদেশ-প্রেমে অনুপ্রাণিত হইয়া উঠে, এই ভয়ে ইংলণ্ডের একজন প্রধান ধর্মাধ্যক্ষের (Cardinal of winchester) আদেশক্রমে জোয়ানের চিতাভস্ম নদীগর্ভে নিক্ষিপ্ত হইল। * যে অমিত-তেজা বীর-ললনার অলৌকিক * Winchester had the embers of her pyre swept into the Seine that there might remain upon the soil of France no Vestige of the body or soul of the peasant girl who fought for its liberty. (Lamartine's "Memoirs of Celebrated Characters." Vol 11. Page 128 ).
উপসংহার বীর্যবত্তায় ইংরাজের বীৰ্য-বহ্নি নিষ্প্রভ হইল, যাহার অনুপ্রাণনায় ফরাসী জাতি সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল, যাহার আত্মত্যাগের মহিমা-মণ্ডিত দৃষ্টান্তে বিশ্ব-জগৎ স্তম্ভিত হইল, সেই শত্রু-রমণীর স্মৃতির শেষ নিদর্শন পর্যন্ত ধরা-পৃষ্ঠ হইতে বিলুপ্ত করাই ইংরাজগণ সমীচীন মনে করিলেন। এই কারণে বীরাঙ্গনার পবিত্র শ্মশান ক্ষেত্রের ভস্মরাশি—পুণ্য-স্মৃতির অন্তিম নিদর্শনটুকুও তাঁহার রক্ষিত হইতে দিলেন না। কিন্তু চিতা-ভস্মের সঙ্গে সঙ্গে যদি আদর্শ-জীবনের স্মৃতি লােপ পাইত, তবে জগতে আত্মত্যাগের ফল বৃথা হইত। ইংলণ্ডেরই এক- জন চিন্তাশীল মনীষী আত্মত্যাগের মহিমা কীর্তন করিতে যাইয়া এক স্থলে বলিয়া গিয়াছেন - The Martyr may perish at the stake, but the truth for which he dies may gather new lustre fron his sacrifice. The Patriot may lay his head upon the block, and liasten the triumph of the cause for which he suffers. The inemory of a great life does not perish with the life itself but lives in other minds. * See Duty by Smiles, chapter V.
ফরাসী বীরাঙ্গনা অর্থাৎ ধৰ্ম্ম-প্রাণ সাধু দাহনদণ্ডে বিধ্বস্ত হইতে পারেন, কিন্তু যে সত্যের জন্য তিনি প্রাণ-ত্যাগ করেন, তাহা এই আত্মােৎসর্গের প্রভাবে নব প্রভায় মণ্ডিত হয়। দেশ-ভক্ত বীর বধ্য-কাষ্ঠে মুণ্ডপাত করিতে পারেন, কিন্তু যে উদ্দেশ্য-সাধনে তিনি যন্ত্রণা ভােগ করেন, তাহা অনতিবিলম্বে সিদ্ধ হয়। কোন মহাপুরুষের স্মৃতি তঁাহার জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে কদাপি বিলুপ্ত হয় না, বরং পরকীয় হৃদয়ে তাহা জাগরূক থাকে। সমগ্র ফ্রান্সের স্বাধীনতালাভ ফরাসী জাতির পরবর্তী বাইশ বৎসরের ইতিহাস পৰ্যালােচনা করিলে পাশ্চাত্য মনীষীর এই জ্ঞান-গর্ভ উক্তির সত্যতা প্রমাণিত হইবে। জোয়ান্ ফ্রান্সের বিভিন্ন নগর-সমূহ শত্রুর কবল হইতে উদ্ধার করিয়া, এবং ইংরাজদিগের প্রধান প্রধান সেনাপতিগণকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া জন্মভূমির পবিত্র অঙ্গ হইতে দাসত্ব- শৃঙ্খল অনেকাংশে উন্মােচন করিয়াছিলেন সত্য, কিন্তু বৈদেশিকদিগকে সম্পূর্ণরূপে দেশ হইতে বহিস্কৃত করিয়া ১১৮ উপসংহার যাইতে পারেন নাই। কারণ সমগ্র দেশের দাসত্ব মােচন করা তাহার বিধাতৃ-নির্দিষ্ট ব্রতের অঙ্গীভূত ছিল না। তিনি শুধু স্বাধীনতা-দেবীর মঙ্গল-মন্দিরের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বজাতির বন্ধন-মােচনের পথ নিষ্কণ্টক করিয়া যাইবার জন্যই ঈশ্বরাদিষ্ট হইয়া কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ। হইয়াছিলেন। সুতরাং ফ্রান্স হইতে তখনও ইংরাজাধিকার লুপ্ত হয় নাই। নর্মান্দি, প্যারী ও পঁতােয়াজ প্রভৃতি প্রধান প্রধান জনপদ- সমূহে তখনও ইংরাজগণ আধিপত্য করিতেছিলেন। এতদ্ব্যতীত তাঁহার স্থানে স্থানে দুর্গাদি নির্মাণ করিয়া লুপ্তবিশিষ্ট অধিকার দৃঢ়-প্রতিষ্ঠ করিয়া রাখিতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন। কিন্তু বিধির বিধানে তাহাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হইল। সে জাতীয় দুর্দিনেও ফ্রান্সে রাজা, প্রজা এবং সামন্ত-ভূপতিগণের (Dukes) মধ্যে অন্তৰ্বিপ্লবের অবসান হয় নাই। কিন্তু বীরাঙ্গনার আত্ম-উৎসর্গের পর-বৎসর হইতে অর্থাৎ ১৪৩১ খ্রঃ হইতে ১৪৪০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই নয় বৎসর কালের মধ্যেই ফ্রান্সের রাজ- নৈতিক গগনে বিধাতার কৃপায় সুবাতাস বহিল। ইহার ফলে ফরাসীদিগের মনােমালিন্য দূরীভূত হইল, ফ্রান্সের
ফরাসী বীরাঙ্গনা
সামন্ত-ভূপতিগণ ও প্রকৃতিপুঞ্জ অন্তৰ্বিবাদের কথা
বিস্মৃত হইয়া রাজার সহিত আসিয়া মিলিত হইল,
সমগ্ৰ ফরাসী জাতি জাতীয় দুর্যোগের ভিতরও পুনরায়
আলােকের সন্ধান পাইল। বিচ্ছিন্ন দেশবাসীর এই
শুভ মিলনের ফলে ইংরাজগণ প্যারী-নগর হইতে বহিস্কৃত
হইলেন— ফ্রান্স রাজ্যের একটি প্রসিদ্ধ নগর হইতে
তাহাদিগের আধিপত্য চিরতরে লুপ্ত হইল। বলা
বাহুল্য, ফ্রান্সের রাজনৈতিক
গগনে উদীয়মান
স্বাধীনতা-সূর্যের জ্যোতির্ময় কিরণচ্ছটায় ইংলণ্ডের
পররাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব-প্রভা ম্লান হইতে লাগিল।
এই জাতীয় মিলনের পর হইতে রাজ্যের সর্বপ্রকার
কল্যাণের সূত্রপাত হইল। অতঃপর ১৪৪০ খ্রীষ্টাব্দ
হইতে ১৪৫৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তের বৎসর কালের মধ্যে
ফরাসী-রাজ সপ্তম চালস্ রাজ্যের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি-
বিধানে তৎপর হইলেন। তিনি শাসন-বিভাগ
সামরিক বিভাগের নানাবিধ সংস্কার করিলেন। এই
সংস্কারের বলে রাজ-কাৰ্যে শৃঙ্খলা স্থাপিত হইল, এবং
ফ্রান্সের শক্তি বৃদ্ধি পাইল। সুতরাং আর অধিক কাল
ইংরাজগণ তিষ্ঠিতে পারিলেন না। তাহাদিগের শক্তি
ক্রমশঃ খর্ব হইয়া পড়িল এবং ১৪৫৩ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসীরা
১২০
উপসংহার তাহাদিগকে দেশ হইতে সম্পূর্ণরূপে বহিস্কৃত করিয়া দিল। ফ্রান্সের চরণ হইতে বৈদেশিক দাসত্ব-শৃঙ্খল স্বলিত হইল। বীরাঙ্গনা আত্ম-উৎসর্গ করিয়া পতিত স্বদেশবাসিগণের মধ্যে যে অবিধ্বংসী শক্তি সংক্রামিত করিয়া গিয়াছেন, তাহারই ফলে ফ্রান্সে স্বাধীনতা- দেবীর মঙ্গল-মন্দির প্রতিষ্ঠিত হইল, ফ্রান্স-রাজ্য পরাধীনতার নাগ-পাশ হইতে মুক্ত হইয়া অপূর্ব স্বর্গরাজ্যে পরিণত হইল, ফরাসী জাতি দেবাচিত সৌভাগ্যের অধিকারী হইল। বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজা ১৪২৯ খ্ৰীষ্টাব্দে বীরাঙ্গনা যখন শত্রু-হস্তে বন্দিনী হইয়া কারাগারে অবরুদ্ধ হইলেন, তখন ফ্রান্সের রাজা ও অধিবাসিগণ এত দূর মােহাবিষ্ট ছিলেন যে, তাঁহারা বীরাঙ্গনার মুক্তির জন্য কোনও প্রকার চেষ্টাই করেন নাই। পতিত জাতির এপ্রকার মােহাবেশ ও রাজস্য- বৃন্দের এরূপ ঔদাসীন্যের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নিতান্ত বিরল নহে। সে যাহা হউক, এইক্ষণ ফ্রান্সের
ফরাসী বীরাঙ্গনা
অধিবাসিবৃন্দ এবং রাজা চালস্ স্বাধীনতা-লাভের সঙ্গে
সঙ্গে স্বৰ্গগত বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজার নানাবিধ
আয়ােজন ও ব্যবস্থা করিয়া পূৰ্ব্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত
করিতে যত্নবান হইলেন।
বীর-ললনার স্বর্গারােহণের উনিশ বৎসর পরে
অর্থাৎ ১৪৪৯ খ্ৰীষ্টাব্দে চালস্ যখন রুয়া নগরকে
ইংরাজদিগের দাসত্ব-বন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া একপ্রকার
নিরাপদ হইলেন, তখন তিনি সর্বাগ্রে সেই নৃশংস
বিচারকদিগের পাপানুষ্ঠানের আমূল বৃত্তান্ত সংগ্রহ
করিবার জন্য একজন প্রতিনিধি নিযুক্ত করিলেন।
তৎকালে যাহারা ঐ বিচারকার্যে সহকারীরূপে নিযুক্ত
ছিলেন, তাহাদিগের সাক্ষ্য গ্রহণ করিয়া এই প্রতিনিধি
তৎসমুদয় লিপিবদ্ধ করিলেন। রাজা এই অনুসন্ধানের
লিখিত বিবরণ অনেকানেক প্রাজ্ঞ মনীষী ও বহুদর্শী
ব্যবহারাজীবের নিকট মতামতের জন্য উপস্থিত
করিলেন। বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ উহা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা
করিয়া বীরাঙ্গনা-সংক্রান্ত বিচার-পদ্ধতির দোষারােপ
করিলেন, এবং সেই নৃশংস দণ্ডাজ্ঞাকে ন্যায়-বিগর্হিত
ও নিয়ম-বিরুদ্ধ বলিয়া অভিমত দিলেন।
রাজা চাল এই প্রকার অনুকূল অভিমত পাইয়াই
১২২
উপসংহার
নিরস্ত হইলেন না। তিনি সর্বসমক্ষে পূত-চরিত্রা
বীরাঙ্গনার নির্দোষিতা প্রতিপন্ন করা আবশ্যক মনে
করিলেন, এবং তরুণ প্রধান ধর্মযাজকগণের মনোেযােগ
এ বিষয়ে আকর্ষণ করিলেন। ইহার ফলে তাহারা
পূর্বোক্ত রাজ-প্রতিনিধির অনুসন্ধানের বিবরণ পরীক্ষা
করিলেন, এবং
তৎকালীন বিচারের নানাবিধ
প্রয়ােজনীয় তথ্য সংগ্রহ করিলেন। অবশেষে ১৪৫৬
খ্রষ্টাব্দের ৭ই জুলাই তারিখে রাজ্যের প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ
ধৰ্ম্মনিষ্ঠ যাজকগণ ও মন্দিরের অধ্যক্ষগণ রুয়া নগরের
ধৰ্ম্ম-মন্দিরে মিলিত হইয়া এইরূপ ঘােষণা করিলেন
যে জোয়ানের বিরুদ্ধে আরােপিত ধর্মদ্বেষিতা ও
ডাকিনী-বৃত্তির অভিযোেগ মিথ্যা, বিচার-পদ্ধতি ভ্রান্তি
পূর্ণ ও শঠতা-মূলক এবং দণ্ডাজ্ঞা ন্যায়-বিরুদ্ধ হইয়াছে।
এতদ্ব্যতীত স্বদেশীয়গণের মধ্যে যাহারা বীরাঙ্গনাকে
শত্রু-হস্তে সমৰ্পণ করিয়া দেশ-দ্রোহিতার পরিচয়
দিয়াছিল, আর যাহারা ঐ নৃশংস বিচার-কাৰ্য্যে সহায়তা
করিয়া ঘােরতর পাপানুষ্ঠান করিয়াছিল, তাহাদিগকেও
দেশ-বৈরী বলিয়া ঘােষণা করা হইল।
রুয়। নগরের যেই ধৰ্ম্ম-মন্দিরে বসিয়া কয়েক বৎসর
পূৰ্বে অরাতি-কুল বীরাঙ্গনার প্রতি দণ্ডাজ্ঞা প্রচার
ফরাসী বীরাঙ্গনা করিয়াছিল, আজ ছাব্বিশ বৎসর পরে সেই মন্দিরেই মিলিত হইয়া ফ্রান্সের প্রসিদ্ধ ধর্মযাজকগণ উহা ন্যায়-বিরুদ্ধ বলিয়া ঘােষণা করিলেন। ইহা পূৰ্বেই বিবৃত হইয়াছে যে, বীৰ্য্যবতী বীরাঙ্গনা অলৌকিক সাধনার বলে অলেয়। নগরকে পরাধীনতার নাগ-পাশ হইতে মুক্ত করিয়া সমগ্র ফ্রান্স্ রাজ্যের স্বাধীনতার পথ নিষ্কণ্টক করিয়া দিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য যে, ভদ্দেশবাসিগণ কৃতজ্ঞতার নিদর্শন-স্বরূপ তাঁহার বৃদ্ধা জননীকে ভরণপোেষণার্থ একটি বৃত্তি প্রদান করিয়াছিলেন। ১৪৩৮ খ্রীষ্টাব্দে এই বৃত্তি-দানের বন্দোবস্ত হয়। তিনি আমরণ উহা সুখ-স্বচ্ছন্দে ভােগ করিয়া যান। অতঃপর ১৪৫৮ খ্রীষ্টাব্দে জরাগ্রস্ত মাতা পরলােক গমন করিলে পর, এই বৃত্তি রহিত করা হয়। এতদ্ব্যতীত, ফ্রান্সের অধিবাসিগণ নানা স্থানে বীরাঙ্গনার মৰ্ম্মর-মুর্তি প্রতিষ্ঠিত করিয়া তাহার স্মৃতি-পূজা করিয়াছেন। রুয়া নগরের যেই স্থানে তিনি অনল- কুণ্ডের জ্বালাময়ী শিখায় ভস্মীভূত শিখায় ভস্মীভুত হইয়াছিলেন, দেব-বালার পদ-রজঃ-পূত সেই পবিত্র শ্মশান-বক্ষে তাহার স্বর্গ-গত আত্মার সম্মানার্থ ১৪৫৬ খ্রীষ্টাব্দে একটি প্রস্তর-নির্মিত ক্রুশদণ্ড স্থাপিত হইয়া- ১২৬
উপসংহার
ছিল। অধুনা উহা স্থানান্তরিত করিয়া তৎস্থানে
দেবীর মর্মরময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছে।
অদ্যাবধি ঐ পবিত্র শ্মশান-ভূমি বীরাঙ্গনার নামে
অখ্যাত হইয়া থাকে।
১৪২৯ খ্ৰীষ্টাব্দে ৮ই মে তারিখে বীরাঙ্গনা অলেয়।
নগরকে বৈদেশিকগণের দাসত্ব-শৃঙ্খল হইতে মুক্ত
করিয়াছিলেন। নগরবাসিগণ পরলােকগত বার ললনার
স্মরণার্থ প্রতি বৎসর ঐ দিন উৎসবের অনুষ্ঠান করেন,
এবং তদুপলক্ষে ধৰ্ম্ম-মন্দিরে বিশেষ উপাসনা হয়।
তথায় প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ বা সুললিত ভাষায় বক্তৃতা
করিয়া বীরাঙ্গনার মাহাত্ম কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ফ্রান্সের ধর্ম-মন্দিরের
অধ্যক্ষ ও যাজকগণের মধ্যে, এই বীরমহিলাকে
সাধু-মহাত্মাগণের (Saints ) শ্রেণীভুক্ত করিয়া লওয়া
সম্বন্ধে মতের প্রাবল্য দেখা দিয়াছিল। এতদর্থে
১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দে একটি প্রস্তাব যথারীতি উত্থাপিত হয়।
পরবর্তী বৎসরের ৬ই জানুয়ারী বীরাঙ্গনাকে প্রকাশ্য
* On the eighth of May, the anniversary of deliverance,
an annual fete is held at Orleans; and monu:nents have
been erected there and at Rouen to the memory of the maid.
( Southey's Joan of Arc -- Preface)
ফরাসী বীরাঙ্গনা
ঘােষণা দ্বারা সেইন্ট’ বা ‘সাধু-মহাত্মা’ আখ্যায়
অভিহিত করা হইল। * এতদ্ব্যতীত ফ্রান্সের
সেনা-দলের মধ্যে বীরাঙ্গনার পবিত্র স্মৃতি আজও পর্যন্ত
পূজিত হইয়া আসিতেছে। শুনিলে বিস্মিত হইতে
হয় যে, সশস্ত্র সৈন্য-দল জোয়ানের স্বগ্রামের পার্শ্ব
দিয়া যাতায়াত-কালে সসম্মানে অভিবাদন করিয়া
তেজস্বিনী বীর-ললনার স্বর্গ-গত আত্মার অভিনন্দন
করিয়া থাকে। বীর-পূজার কি সুন্দর পদ্ধতি! মহতের
স্মৃতি-অর্চনার কি মনােজ্ঞ নিদর্শন। *
* See Encyclopaedia Britanica, Vol XV Eleventh edition.
† The French people have not forgotten Joan d'Arc.
Many statues have been erected to her memory. She has
been an object of veneration to generation after generation
of French soldiers. When a regiment marches through
Domremy, the soldiers always halt and present arms in
honour of her birth place. It is touching to hear of the
custom having survived so long, and the memory of the
maiden heroine being stiil kept green by the country she
served so faithfully.
(Smiles' Duty. Chapter V. P. 128).
১২৬
বীরাঙ্গনা-সম্বন্ধে মনীষিগণের মতামত এইক্ষণ আমরা চিন্তাশীল মনীষিগণের মতামত আলােচনা করিয়া বর্তমান প্রবন্ধের পরিসমাপ্তি করিব। যদিও জোয়ান্ ইংলণ্ডের পক্ষে শত্রু-রমণী ছিলেন, এবং ইংরাজদিগকে যুদ্ধের পর যুদ্ধে পরাজিত করিয়া ইংলণ্ডের শক্তিকে বিধ্বস্ত করিয়াছিলেন, তথাপি অনেকানেক চিন্তাশীল ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ ইংরাজ-লেখক এই শত্রু-রমণীর প্রসঙ্গ নিরপেক্ষভাবে আলােচনাকরিয়া সত্যপ্রিয়তা ও উদারতার পরিচয় দিয়াছেন। আমরা যে সমুদয় ব্যক্তির মতামত আলােচনা করিয়াছি, তন্মধ্যে বিশ্ব-বিশ্রুত কবি সেক্ষপিয়র ভিন্ন ইংলণ্ডের আর সমুদয় লেখকই বীরাঙ্গনার প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করিয়াছেন। টার্ণার ( Turner ), গ্রিন ( Green ) প্রভৃতি ঐতিহাসিকগণ নিরপেক্ষভাবে তৎকালীন বিবরণাদি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। চিন্তাশীল মনীষী স্মাইলস্ (Smiles) * বীরাঙ্গনার প্রসঙ্গ শ্রদ্ধার সহিত অবতারণা করিয়া উদারতার পরিচয় দিয়াছেন। ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ কবি সাদি (Southey) এই বীর- Duty by Smiles, Chapter V, CourageEndurance.
ফরাসী বীরাঙ্গনা ললনার মহনীয় গুণগ্রামে মুগ্ধ হইয়া নিরপেক্ষ ও উদার ভাবে তাহার মহিমা কীৰ্ত্তন করিয়া গিয়াছেন। তিনি তাহার “জোয়ান্-অব-আর্ক” নামক কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় লিখিয়াছেন :- It has been established as a necessary rule for the epic that subject should be national. To this rule I have acted in direct opposition, and chosen for the subject of my poem, the defeat of the English. If there be any readers, who can wish success to an unjust cause, I desire not their approbation. অর্থাৎ মহাকাব্য রচনা-সম্বন্ধে এইরূপ একটি নিয়ম সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া দাড়াইয়াছে যে, কাব্যের বর্ণিত বিষয় জাতীয়-ভাবের পরিপােষক হওয়া কর্তব্য। আমি এই নিয়মের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছি, এবং ইংরাজের পরাজয় আমার কাব্যের বর্ণনীয় বিষয় বলিয়া মনােনীত করিয়া লইয়াছি। পাঠকগণের মধ্যে যদি এমন কেহ থাকেন যে, শুধু তাঁহার স্বদেশ কোন ন্যায়-বিরুদ্ধ কার্যে লিপ্ত ছিল বলিয়াই তিনি ঐ ১২৮
উপসংহার
অন্যায় উদ্দেশ্যেরও সফলতা কামনা করিতে পারেন,
তবে আমি তাহার অনুমােদন কামনা করি না।
ইংরাজ-কবির এই উক্তি প্রকৃত মহানুভবতার
পরিচায়ক, সন্দেহ নাই। এতদ্ব্যতীত তিনি উক্ত
কাব্যগ্রন্থের অনেকানেক স্থলে বীরাঙ্গনার ভূয়সী
প্রশংসা করিয়াছেন, এবং তাহাকে ঈশ্বর-প্রেরিত
( Mission’d Maid) ও ভগবৎ-প্রতিনিধি বলিয়া
স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। অপর একজন লেখক
বিলাতের একখানি শ্রেষ্ঠ মাসিক-পত্রে বীরাঙ্গনার
চরিত্র আলােচনা প্রসঙ্গে একস্থলে বলিয়া গিয়াছেন
যে, জোয়ান্ যে প্রকার অলৌকিক বীরত্ব ও তেজস্বিতার
পরিচয় দিয়া স্বদেশের দাসত্ব মােচন করিয়াছেন,
ইতিহাসে ঐ প্রকার দৃষ্টান্ত বিরল। অদ্যাবধি পৃথিবীতে
* (১) কবি একস্থলে নায়কের মুখ দিয়া জোয়ানকে Prophetess
বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। (See Robert Southey's Joan o Arc.
Book II, Page 38.)
(২) অপর একস্থলে Priest এর মুখ দিয়া কবি বলিয়াছেন :-
"Thou art indeed the Delegate of Heaven
What thou hast said surely thou shall perform.
We ratify thy mission. Go in peace."
( Book III, page 50.)
১২৯
ফরাসী বীরাঙ্গনা কি পুরুষ কি নারী কোন মানবই ঐরূপ কাৰ্য্য সাধন করিয়া যাইতে পারেন নাই। আজ যে ফরাসীরা জাতীয় ভাবে উদ্বুদ্ধ হইয়া একটি পরাক্রান্ত জাতি- রূপে গঠিত হইয়া উঠিয়াছে, ইহার মূলে এই গরীয়সী মহিলার তেজোদীপ্ত জীবনের পবিত্র স্মৃতি নিহিত আছে। # জার্মানীর একজন প্রসিদ্ধ কবি বীরাঙ্গনার প্রসঙ্গ আলােচনা করিয়া একস্থলে বলিয়াছিলেন :- "Who thirst now for thy blood will worship thee " op অর্থাৎ আজ যাহারা তােমার রক্ত পান করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছে, তাহারাই একদিন তােমার পূজা করিবে। সত্যই কবির ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইয়াছে। তাই, যে ইংরাজ জাতির পূর্বপুরুষগণ এককালে বীরাঙ্গনার শােণিত-ধারায় বসুধা কলঙ্কিত * "Never, in the history of the world, has such a task been accomplished by any other mortal being, man or woman, "It was her spirit and the memory of her life that an imated her countrymen and created a nation" ( Joan of Arc by Oscar Parker, in the English Illustrated Magazine of August i9o9) † Schiller's Maid of Orleans, Translated by Bethune.
উপসংহার
করিবার জন্য লালায়িত হইয়াছিলেন, আজ তাহাদেরই
ভবিষ্যদ্বংশীয়গণ তাঁহার পবিত্র জীবন-কাহিনী আলােচনা
করিয়া বীর-ললনার স্মৃতি-পূজা করিলেন। কিন্তু পূর্বেই
বলিয়াছি যে, মহাকবি সেক্ষপিয়র এই জগত-পূজ্য।
দেব-বলার অবমাননা করিয়াছেন। তিনি তাঁহার
একখানি নাট্য-কাব্যের অনেক স্থলে বীরাঙ্গনাকে
‘ভ্ৰষ্টা’, ‘পিশাচ-সিদ্ধা’, ‘পাপিষ্ঠ।' প্রভৃতি জঘন্য
আখ্যায় অভিহিত করিয়াছেন। *
জোয়ানের ন্যায় পূত-চরিত্রা, ধৰ্ম্মপ্রাণ ও সাধ্বী
বীরাঙ্গনার প্রতি এ প্রকার ভাষা-প্রয়ােগ করা কবির
পক্ষে সঙ্কীর্ণতা কি উদারতার পরিচায়ক হইয়াছে, তাহা
সুধীগণ বিচার করিবেন। বলা বাহুল্য যে, এ প্রকার
বিদ্বেষ-প্রসূত বাক্যে আদর্শ-জীবনের স্মৃতি ম্লান হওয়া
ত দূরের কথা, বরং অধিকতর উজ্জ্বল হইয়াই উঠে ।
* কবি একস্থলে সেনাপতি 'Talbotএর মুখ দিয়া বলিয়াছেন :
“Foul fiend of France, and hag of all despite
"Pucelle, that witch, that damned sorceress".
অপর একস্থলে Burgandyর মুখ দিয়া বলিতেছেন ?
"Vile fiend and shameless courtezan".
( See Shakespeare's King Henry VI. Act III scene Il )
১৩১
ফরাসী বীরাঙ্গনা ফরাসী মনীষিগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক লা মাতিন্ * ও মিলে + বীরাঙ্গনার পবিত্র জীবন- কাহিনী শ্রদ্ধার সহিত বিবৃত করিয়া প্রকৃত স্বদেশা- নুরাগের পরিচয় দিয়াছেন। মিলে একস্থলে লিখিয়াছেন :- “Yes, whether considered religiously or patriotically, Jeanne Darc was a Saint." opefte কি ধৰ্ম্ম কি স্বদেশ-হিতৈষণা—যে কোন দিক হইতে বিচার কর না কেন, জোয়ান্ দাক ‘সাধু-মহাত্মা (Saint) আখ্যায় ভূষিত হইবার যােগা। আমাদের স্বদেশীয় লেখকগণের মধ্যেও যাহারা বীরাঙ্গনার প্রসঙ্গ অবতারণা করিয়াছেন, তাহারা নিরপেক্ষ বিচার দ্বারা প্রকৃত উদারতার পরিচয় দিয়াছেন। বঙ্গের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক এই মহীয়সী রমণীকে ফ্রান্সের দেবী’ নামে অভিহিত করিয়াছেন। # অপর একজন চিন্তাশীল, অজ্ঞাতনামা * See Lamartine's Memoire of celebrated characters" + Michelet's History of France Translated by Smith vol. II, Reign of Charles VII, + ১৩১৬ সনের আষাঢ় মাসের নব্যভারতে শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত দেবীপ্রসন্ন রায় চৌধুরী লিখিত “ফ্রান্সের দেবী” শীর্ষক প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য।
উপসংহার স্মৃতি লেখক বীরললনার স্বদেশানুরাগ বুদ্ধদেবের বিশ্ব- প্রেমের সহিত তুলনা করিয়া গিয়াছেন। * বাস্তবিকই আদর্শ-জীবনের স্মৃতি কখনও লােপ পায় । তাই, দেশ-বিদেশে পৃথিবীর প্রত্যেক সভ্য জাতির মধ্যেই বীরাঙ্গনার পবিত্র পূজিত হইয়া আসিয়াছে। ধন্য দেবী। ধন্য তােমার স্বদেশানুরাগ। ধন্য তােমার রাজ-ভক্তি। ধন্য তােমার ভগবৎ-প্রেম! তােমার সাধনা সফল হইয়াছে। কৈশােরে তুমি যে মহাব্ৰত গ্রহণ গ্রহণ করিয়া করিয়া কৰ্ম্মক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে নামিয়াছিলে, যৌবনের প্রথমেই তাহা উদযাপিত করিয়া অমর- লােকে চলিয়া গেলে। ভাগ্যবতী সে-জননী—যিনি * "China in Asia and France in Europe, are the two countries that have best known how to make the public spirit into religion. This is the fact that made Joan of Arc a possibility. A peasant girl in a remote village could brood over the sorrows of her country till she was possessed by the feeling that there was much pity in Heaven for the fair realm of France. An idea like this was like the compassion of a Buddha, and nowhere but in France could it have been applied to the country". (Nation making-Karmayogin Vol 1. No 36)
ফরাসী বীরাঙ্গনা
তােমায় গর্ভে ধারণ করিয়া পবিত্র হইয়াছেন; মহান্
সে জাতি-যে তােমায় ‘আপনার’ বলিয়া গৌরব
করিবার সুযােগ পাইয়াছে; ধন্য সে শ্মশান-ভূমি-
যে-স্থানের ধূলিকণার সহিত তােমার পুণ্য স্মৃতি জড়িত
হইয়া রহিয়াছে ; পবিত্র সে নদী-সলিল—যাহার সহিত
তােমার চিতাভস্ম চিরতরে মিশাইয়া গিয়াছে।
-সমাপ্ত
১৩৪
ফরাসী বীরাঙ্গনা
প্রশংসাপত্র
প্রবাসী (ভাদ্র-১৩২০ ) বিশুদ্ধ ওজস্বিনী ভাষায়
ও সহমর্মিতার সহিত বর্ণিত হইয়াছে। স্বদেশসেবাব
এই পুণ্যাবদান সকলেরই পাঠ করা উচিত। এইরূপ
বিদেশী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কাহিনী সংগ্রহ
বঙ্গভাষা সমৃদ্ধিশালিনী ও প্রাণবতী হইবে। এই
পুস্তকের সমাদর হইবে আশা করি।
ভারতী (ভাদ্র—১৩২০ ) জোয়ানের জীবনের
ধারাবাহিক কাহিনীটি লেখক বেশ সুশৃঙ্খলভাবে
গুছাইয়া বলিয়াছেন।
সতেজ, সরল, রচনা
ভঙ্গীতেও প্রাণ আছে। এরূপ গ্রন্থের সঙ্কলনে জাতীয়
সাহিত্যে এক স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার
সঞ্চার হয়,
কাজেই লেখকের উদ্যমের প্রশংসা না করিয়া থাকা
যায় না।
বিজয়া ( শ্রাবণ-১৩২০ ) ‘ফরাসী বীরাঙ্গনা
বঙ্গসাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান পাইবার যােগ্য। গ্রন্থখানির
ভাষা যেমন প্রাঞ্জল ও ওজস্বিনী, ভাবও তেমনি হৃদয়-
গ্রাহী।
দেশীয় নরনারী এই বইখানি পাঠ করিলে
০
অনেক শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে সহায়তা লাভ করিবেন,
ইহাতে সন্দেহ নাই।
সুপ্রভাত (বৈশাখ-১৩২০) বীরাঙ্গনার জীবনী
লিখিবার উপযুক্ত ওজস্বিনী ভাষায় গ্রন্থকার পুস্তকখানি
লিখিয়াছেন। বীরাঙ্গনার জীবনের
সমুদয় তথ্য
ইহাতে সন্নিবেশিত হইয়াছে।
উদ্বোধন (ভাদ্র-১৩২০) পড়িলে নারীজাতির
উপর যথার্থই শ্রদ্ধার সঞ্চার হইয়া থাকে।
হিতবাদী ( ১৬ই ফাল্গুন-২৩২৩ বঙ্গসাহিত্যের
পরিপুষ্টি করিলেন। গ্রন্থের ভাষা সরল অথচ সাধু,
পুস্তকের লিখনভঙ্গীও সুন্দর গ্রন্থখানি সুখপাঠ্য
হইয়াছে। ইহা বাঙ্গালী পাঠকগণের নিকট সমাদৃত
হইবে।
Bengalee (July 16 1913) “Farashi Birangana" or the
Heroine of Trance" is au excellent book in Bengali, In a
language made vigorous and impressive by the sonorous
compounds, rich imagery and apt and fresh illustrations
the writer has told the story of this illustrious heroine in a
manner that leaves nothing to be desired.
প্রবাহিনী (৭ কার্তিক-১৩২১)-ফরাসী বীরাঙ্গনা
পাঠ করিয়া আমরা আশা-ভঙ্গের মনস্তাপ পাই নাই।
লিখন-ভঙ্গীর গুণে গ্ৰন্থখানি সুখপাঠ্য হইয়াছে। ইহা
০ যেরূপ বিস্তৃত, পরিশুদ্ধ, আড়ম্বর শূন্য ও প্রাঞ্জল ভাষায় লিখিত, তাহাতে আশা করা যায় যে, সৰ্বসাধারণের নিকট ইহার আদর হইবে। স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়—পুস্তকখানির ভাষা সরল ও সুন্দর এবং উহাতে প্রচুর রচনা-নৈপুণ্য প্রদর্শিত হইয়াছে। সারদাচরণ মিত্রজোয়ান অব আর্কের চরিত্র- কাহিনী বস্তুতঃ বীরাঙ্গনার কাহিনী। ধর্ম ও ধৰ্মার্থ দেশ-মােচনই তাহার প্রধান জীবনােদ্দেশ্য। সেই পুণ্যশ্লোকার জীবনী সকলেরই পাঠোপযুক্ত। আপনিও সরল ভাষায় সুন্দররূপে তাহার ব্যাখ্যান করিয়াছেন। স্যার আশুতােষ চৌধুরী—আপনার ফরাসী বীরাঙ্গনা পড়িয়া আনন্দ লাভ করিয়াছি। গ্রন্থখানি সুন্দর ও সুপাঠ্য হইয়াছে। অশ্বিনীকুমার দত্ত-ফরাসী বীরাঙ্গনা পড়িয়া আনন্দিত হইয়াছে। শ্ৰীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত-ফরাসী বীরাঙ্গনা পাঠ করিয়া আনন্দ লাভ করিয়াছি। গ্রন্থকার তাহার প্রথম উদ্যমে বেশ সফলতা দেখাইয়াছেন। বীরাঙ্গনার রমণীয় চরিত্রও বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে। শ্ৰীযুক্ত সত্যচরণ শাস্ত্রী—ফরাসী বীরাঙ্গনা পাঠ
করিয়া সুখী হইলাম। বিষয়-নির্বাচন বেশ হইয়াছে,
ভাষা হৃদয়গ্রাহী।
কৃবি শ্রীযুক্ত মানকুমারী বসু-ফরাসী বীরাঙ্গনা
খুব সুন্দর বােধ হইল। তােমার প্রতিভার নিকট
আমরা অনেক আশা কবিতেছি।
ভক্টর নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত—তােমার ফরাসী
বীরাঙ্গনা অতি উপাদেয় হইয়াছে। বরনারী জিনি
দার্কের উদ্দীপনাপূর্ণ জীবনী তুমি যেরূপ ওজস্বিসী
ভাষায় ও সুনিপুণ রচনা-চাতুর্যের সহিত বর্ণনা করি-
য়াছে তাহা বিশেষ
প্রশংসনীয়। আমি গ্ৰন্থখানি
আদ্যোপান্ত পরম আনন্দ ও ঔৎসুক্যের সহিত পাঠ
করিয়াছি ; কোন স্থানেই ইহা অরুচিকর মনে করি
নাই। তােমার সাহিত্য-সেবার চেষ্টা ও উদ্যম বিশেষ
প্রশংসনীয়। তুমি যে ফল লাভ করিয়াছ তাহাও
a
উত্তম।
অধ্যাপক শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত—তােমার
ভাষা বড় সুন্দর হইয়াছে। প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত
সমান ভাবে ভাষার বড় মনােম একটি সরল গাম্ভীৰ্য্য
রক্ষিত হইয়াছে। মাতৃভাষার উপর তােমার যে বেশী
গভীর অধিকার জন্মিয়াছে, প্রত্যেক পাঠক তাহা
অনুভব করিবেন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.