Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dhan-kheath Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
দান-প্ৰত
জসীম উদ্দীন
এম্পায়ার বুক হাউস
১৫, কলেজস্কোয়ার, কল্পিকা
প্রকাশক
মােহাম্মদ বদরুদ্দোজা
এম্পায়ার বুক হাউস
১৫নং কলেজ স্কোয়ার
কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
পৌষ ১৩৩৯
এক টাকা
নিউ সরস্বতী প্রেস
প্রিন্টারমিহির চন্দ্র ঘােষ,
২৫/এ মেছুয়াবাজার ষ্ট্রীট,
কলিকাতা
পরম শ্রদ্ধাস্পদ সার হাসান সুহরাওয়ার্দি খেদমতে বাঙালী মুসলমান সারা দেশ ভরি ঝিমাইছে এক জো গােরস্থান। অতীত তাহার ধুয়ে মুছে গেছে, পরি’ কলঙ্কটিকা, কুড়াইছে সুখে যুগের যুগের অভিসম্পাত শিখা। চলে খানসামা আদালী আয়া কুলী মজুরের দল চলে গাড়ােয়ান কোচ মান চাষ করি মহা কোলাহল। হুজুরে হুজুরে ‘সেলাম ঠুকিয়া কপালে প'ড়েছে দাগ ভিখারীর মত খুটিয়া খাইছে দয়ার কণিকা ভাগ। তাহাদের মাঝে কে দাড়ালে আসি, মে কুহেলির দেশে প্রথম উদয় অচল শিখরে জবাকুসুমের বেশে। ‘সরস্বতী’ সে কবে চলে গেছে, শূন্য আসনে তার যত অযােগ্য কলঙ্ক লেখা লিখে গেল যার যার। তুমি সেইখানে বসিলে আসিয়া, মহা গৌরবে তব হীন বঙ্গের নব নালন্দা হ’ল আজি অভিনব। ‘সরস্বতী’র বড় আদরের ভাষার দুলালী মেয়ে হাসিছে সে মৃত পিতারে তাহার তােমার মাঝারে পেয়ে। শুনিয়াছি কোন সুদূর অতীতে শাহান শাহেরা কেব দিয়েছিল এই বঙ্গভাষারে প্রথম স্নেহের সেবা। আপন হস্তে পরাল কণ্ঠে মণিমাণিকের হার-- মহারৌরব নরক হইতে করি রে উদ্ধার। সে সব আজিকে অতীত কাহিনী, মাটির ঢাকনী তলে গােরস্থানের আঙিনায় তারা ঘুমাইছে কুতুহলে। নিজেদের যত গ্লানি ছড়াইছি সেই কবরের পর উপরে আমার পর অধম তাদের বংশধর। তাহাদের মাঝে কে আসিলে তুমি, গৌরবে বুক ভরে সরস্বতীর মন্দিরে ঠাঁই পেল ভাষা তব বরে। এক মুসলিম ধুলি হতে তারে করেছিল আহরণ আর মুসলিম দিল আজ তারে নব রূপ আভরণ। অনাগত যুগে এদেশের যত মুসলিম ভাই বােন ইহাদের কথা স্মরি’বুকে পাবে পুলকের শিহরণ।
সারাদেশ আজ মাতামাতি করে সাম্প্রদায়িক রণে সরস্বতীর সারথী হইলে তুমি সে অশুভ খনে। আকাশের মত বুকখানি তব, তাহার ছায়ার তলে মুসলিম আর হিন্দু আজিকে গলাগলি পথে চলে। বাহিরে কলহ হীন সংগ্রাম, এতটুকু ধ্বনি তার তােমার সরস্বতীর কুটীরে পশেনি একটি বার। এসবের তরে আজিকে তােমারে জানাব না তলিম গৌরবে বুক ভরিবনা বলে তুমি মহা-মূসলিম। এমনি বড় ত কতজন হয়, উর্কে তাদের গই তাকাইতে যেয়ে ক্ষুদ্র আমরা ঘাড় ভেঙে পড়ে যাই। আকাশের দেশে বসতি তাদের, মাটির প্রদীপ জ্বালি’ মিছেই আমরা গৌরব গাহি’ গায়েতে মাখাই কালি । আকাশ হইতে নামেন তাহারা, স্কন্ধে করিয়া ভর বাের উপরে বােঝারে চাপায় মােদের মাথার পর। তােমারও বসতি তেমনি উর্ধে, তবু হয় সন্দেহ মাটির ঘরের ব্যথা জান তুমি, নহ তাহাদের কেহ। আকাশ হইতে হয়ত পাইবে বহুদূর দেখিবারে অনেক উর্ধে আবাস র’চেছ তাই আকাশের ধারে। দূরে বহুদূরে মাটির কুটীরে অনাহারী ভাই বােন হয়ত করিছ আকাশে বসিয়া তাহাদের দরশন। হয়ত তােমার মণিদীপ জ্বালা প্রাসাদের ছায়াতল ভিজে যায় সেই হতভাগাদের স্মরিয়া চোখের জল। হয়ত মেঘের পারা- কোনদিন তুমি ধরায় লুটাবে লইয়া করুণা-ধারা। তােমার মনের যেটুকু জেনেছি যেটুকু পেয়েছি স্নেহ আমার আকাশ ধরণী ব্যাপিয়া জাগে এই সন্দেহ। তব তরে তাই সাজায়ে এনেছি এ মাের ধানের খেত সুদূর গাঁয়ের আশা নিরাশার বেদনার সঙ্কেত। গােবিন্দপুর ফরিদপুর } গুণমুগ্ধ জসীম উদ্দীন এই বইএ ধানখেত বানান করিতে আমি ‘ক্ষ ব্যবহার করি নাই। যদিও “ক্ষেত্র” হইতে “খেত” শব্দের উৎপত্তি কিন্তু খেত উচ্চারণ করিতে আমরা ক্ষর ধনি রাখি না। ‘বাপের বাড়ীর কথা’ ও ‘রাখালের রাজগী’ কবিতা দুইটি আমার অনেক কালের লেখা। ইহাতে প্রথম বয়সের কঁচা হাতের অনেক ছাপ আছে। সেকালে কবিতা দুইটি কারও কারও ভাল লাগিয়াছিল। আর এই বইএর সঙ্গতি হিসাবেও ইহাদের মূল্য আছে বলিয়া কোন রকম পরিবর্তন না করিয়া কবিতা দুইটিকে এই পুস্তকে স্থান দিলাম। বইএর দাম যথাসম্ভব অল্প রাখার ব্যবস্থা করা হইল। মৌলবী মহফুজার রহমান খাঁ সাহেব না হইলে হয়ত এই পুস্তক ছাপান আমার পক্ষে অসম্ভব হইত। কারণ কবিতাগুলির কপি আমার কাছে ছিল । নানান মাসিক পত্র ঘাটিয়া তিনি এই বিক্ষিপ্ত রচনাগুলির পঞ্চোদ্ধার করিয়াছেন। সুসাহিত্যিক বিনােদভূষণ ঘােষ, প্রসিদ্ধ গল্প লেখক বিমল মিত্র, কিশাের শিল্পী শ্ৰীমান্ আবুল কাশেম ও আরও কয়েক জন বন্ধু এই পুস্তক প্রকাশে আমাকে নানা ভাবে সাহায্য করিয়াছেন। ইহাদের সবারই কাছে কৃতজ্ঞ রহিলাম। আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ গবাদা (ব্ৰতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ) এই পুস্তকের সুন্দর প্রচ্ছদ পটখানি আঁকিয়া দিয়াছেন। হাকেও আমার সহস্র ধন্যবাদ । উ
কবির আর সব বই
রাখালী
নক্সী কাঁথার মাঠ
বালুচর
রঙিলা নায়ের মাঝি
সুজন বে’দের ঘাট
* 1 *
যন্ত্রস্থ
সূচীপত্র বিষয় ধান খেত পল্পী বর্ষা ০ ০ ০ জলের ঘাট ••• ৮ . * ৮ ০ ০ ১৭ ১৫ । ০ ০ २७ + ০ + কৃষাণী দুই মেয়ে মুন্সী সাহেব স্বপন প্রিয়া ফুলের পূজারী.. বাপের বাড়ীর কথা বালুচর অবেলায় রাখালের রাজগী নিমন্ত্রণ যাব আমি তােমার দেশে পলাতক দিদারুল আলম স্মরণে এই গাঁয়ে তুমি রহিও গাে মেয়ে ••• ••• ৪০ ০ ••• ৪৩ ••• ৪৯ ০৮০ ৮ । ৩ ••• ••• ৫৪ ) ••• ১৬ ** ••• ০ ০৫ ০৫ কারে আমি চাই বামুন বাড়ীর মেয়ে আজি পুষ্পের জনমের তিথি পুরাণ পুকুর চৌধুরীদের রথ তুমি আমাদের কবি ফুপুর কবরে কাটা ধানের বিদায় কবি পরিচিতি... ০০০ ৭৬
ও আমার সােনার খেতের ধান,
সারা মাঠে জড়িয়ে আছিস
এই কলজেখান।
চার ধারে তাের লুটিয়ে আকাশ
কালাে বনের দোলায় বাতাস ;
কঁচা শীতের রােদ ঝরে গায়
শিশু রবির দান ;
সাধ করে কি মাটির সাথে
বানাই মাটির ঘর,
ধানের পাতার বাতাস যে পাই
'য়ে মাটির পর ;
ঝলমল বসন টানি
দোলে মাটির স্বরগ খানি
গর্ব হ'লে মাটিতে তাই
ছােয়াই মাটির প্রাণ।
ধান খেত
পথের কেনারে পাতা দোলাইয়া করে সদা সঙ্কেত
সবুজে হলুদে সােহাগ ঢুলায়ে আমার ধানের খেত।
ছড়ায়-ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে,
ঝকে আর ঝাঁকে নিয়ে পাখিগুলি শুয়েছে মাঠের পরে।
কৃষাণ ক’ণের বিয়ে হবে তার হলদি কোটার শাড়ী,
হলুদে ছােপায় হেমন্ত রােজ কচি রােদ-রেখা নাড়ি।
কলমী লতায় গহনা তাহার গড়ার প্রতীক্ষায়
ভিন্-দেশী বর আসা যাওয়া করে প্রভাত সাঁঝের না’য়।
পথের কেনারে মাের ধানখেত, সবুজ পাতার পরে
সােণার ছড়ায় হেমন্তরাণী সােণা হাসিখানি ধরে।
শরৎ সে কবে চলে গেছে তার সােণালী মেঘের ছটা
আজো উড়িতেছে মাের এই খেতে ধরিয়া খানের জটা।
মাঝে মাঝে এর পাকিয়াছে ধান, কোনখানে পাকে নাই,
সবুজ শাড়ীর অঞ্চলে যেন ছােপ লাগিয়াছে তাই।
অঙ্গান গাঁয়ের কৃষাণকুমারী এইখান দিয়ে যেতে
সােণার পায়ের চিহ্নগুলিয়ে গেছে এর বুকে পেতে।
২.
ধান খেত
মাের ধানখেত, এইখানে এসে দাড়ালে উচ্চশিরে
মাথা যেন মাের দুইবারে পারে সুদূর আকাশটিরে।
এইখানে এসে বুক ফুলাইয়া জোরে ডাক দিতে পারি,
হেথা আমি করি যা খুসী তাহাই, কারাে নাহি ধার ধারি ।
হেথায় নাহিক সমাজ-শাসন, নাহি প্ৰজা আর সাজা,
মাের খেত ভরি ফসলেরা নাচে, আমি তাহাদের রাজা।
এইখানে এসে দুঃখের কথা কহি তাহাদের সনে
চৈত্র দিনের ভীষণ খরায় আষাঢ়ের বরিষণে।
কৃষাণী-ক’ণের কঁকণের ঘায়ে ছিড়িয়া বুকের চাম
এই ধান খেত নয়নের জলে ভাসিয়েছি অবিরাম।
এইখানে বসে রাতের বেলায় বাশের বাঁশীর সুরে
মাের ব্যথাখানি ছড়ায়েছি তার সুদূর কৃষাণ-পুরে।
এই ধানখেতে লুকাইয়া তার গােপন স্মৃতির চিন্
দেখিয়া দেখিয়া কাটিয়া গিয়াছে কত না দীর্ঘ দিন।
পথের কেনারে দাড়ায়ে রয়েছে আমার ধানের খেত,
আমার বুকের আশা নিরাশার বেদনার সঙ্কেত।
বকের মেয়েরা গাঁথিয়া যতনে শ্বেত পালকের মালা,
চারি ধারে এর ঘুরিয়া ঘুরিয়া সাজায় সােণার ডালা।
তাল-বৃক্ষের উচু বাসা ছাড়ি বাবুই পাখির দল
কিসের মায়ায় সারা খেত ভরি ফিরিতেছে চঞ্চল।
মাঝে মাঝে তারে জালে জড়াইয়া টেনে নিয়ে যেতে চায়,
সকাল সাঁঝের আলো-ছায়াঘেরা সােণালী তটের ছায়।
শিশির তাহারে মতির মালায় সাজায় সারাটি রাতি,
জোনাকীরা তার পাতায় পাতায় দোলায় তারার বাতি।
#
পল্লী-বর্ষা
=
==
আজিকার বােদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘােলাটে মেঘের আঁড়ে
কেয়া-বন-পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝঝুম নিরালায়
ছােট ঘােট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়।
বাদলের জলে নাহিয়া সে-মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়
সে-হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা-
তারি স্রোতে আজি শুনাে পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া।
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙীন চিঠি
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন্ দিঠি।
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন-বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন-ঘাটে ।
কোন্ সে বিরল
বুনন ঝাউ-শাখে বুনিয়া গােলাপী শাড়ী
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগন্তে যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।
গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি’ মােড়লের দলিজায়,
গল্পে গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়।
কেউ বসে বসে বাখারী চিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাকা বাঁধে কসি’ কসি'।
*৫০
ধান খেত
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল ;
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে’ নিভূল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।
লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভূল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে,—আমীর সাধুর নাও,
বহু দেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুকাও চলিয়াছে ছুটি” এর হ’তে ওর হাতে,
নানা রকম রসি বুনান-ও হইতেছে তার সাথে ।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর-রূপকথা অকে।
যেন ও-বৃদ্ধ গায়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।
বউদের আজ কোনাে কাজ নাই, ‘বেড়ায় বাঁধিয়া রসি
সমুদ্রকলি সীকা বানাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙীন কথায় মেলিয়া বুকের স্বপন খানি
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী আখর টানি।
বৈদেশী কোন বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে
মিঠে-সুরে-গান কপিয়া রঙীন ঠোঁটের বাঁধন ছেড়ে।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলােকেশ, মন যেন চায় কারে।
জলের ঘাটে
নদীর
কুলে কেয়ার বন, তাহার নীচে ঘাট,
সেই ঘাটেতে ডুব দিয়েছে দিঘল পেঁয়াে বাট।
সেখান দিয়ে জলকে যেতে পল্লী-বধুর দল
দোলায় ঘড়া, এলায় চুল, বাজায় পায়ে মল।
সারি সারি কঁাখের ঘটে কঁাকণ বাজে রয়ে,
দেবারতির প্রদীপ-মালা চলছে যেন ব’য়ে।
কানাে পরণ হলুদ শাড়ী, কানাে পরণ লাল,
কারাে শাড়ী নীলাম্বরী, কারাে বা ‘মেঘ-জাল।
রঙের রঙের শাড়ীর লহর দুলছে রঙের বায়-
মেঘের বহর দুলছে যেন রঙিন সাঝের গায়।
দু’ধারে মাঠ সুদূর-ছাওয়া—সবুজ পারাবার
—সেই সাগরে ওরাই যেন করছে পারাপার।
রঙের রঙের শাড়ী ত নয়, শতেক রঙের পালে
বিদেশী কোন্ হাওয়া-কুমার জড়িয়ে রঙের জালে।
চলছে তারা এ-ওর সাথে নানান কথা কয়ে
গ্রাম্য কবির কাব্য যেন চলছে সাথে ব’য়ে।
শুনতে তাহা হয়ত মিঠে, চুড়ির গীতির মত,
হয়ত তাহা অমনি রঙীন, রঙীন শাড়ী যত।
নদীর ঘাটে এসে তারা ঘট ভরিয়া জলে
সারাটি গাঙ ওলট-পালট করে সানের হলে।
ধান খেত
কারাে খোপার ফুল খসে যায়, কারাে গলার মালা,
মাটির ঘড়া জড়িয়ে বুকে ভাসে বা কেউ বালা।
আলতা-রাঙা চরণখানি ঘসে বা কেউ তীরে,
কেউ বা গায়ে হলুদ-বাটা মাখায় ধীরে ধীরে।
‘ভেসাল’ মেলে জেলের ছেলে দুলছে ঘুমে, হায়!
জাল ছিড়ে তার মাছ পালাল, খেয়াল নাহি তায়।
ওই মেয়েদের জল-ভরণে যে ঢেউ জলে ভাঙে
হয় ত আরেক কূল ঘেসে তা কুলের বাঁধন মাঙে।
হয় ত ওদের রঙিন পায়ের আলতা-গােলা জল
কখন কখন এপার কারাে মন করে চঞ্চল।
হয় ত কেহ চলতে পথে ওদের নয়ন হতে
বিনা-তারের তার পেয়ে যায় অমনি কোন মতে।
এই ঘাটেতে নিতুই ওরা জলের খেলা সেরে
ভরা কলস ‘কাঙ্খে’ নিয়ে ঘরের পানে ফেরে।
পথের পরে রাঙা পায়ের আখর এঁকে যায়,
আঁচল-ভেজা জলের ধারা ছিটায় তারি গায় ।
তারি শীতল পরশ পেয়ে মাঠের ধুলাে বুঝি
রাঙা পায়ের ঘুলি স্বপন দেখছে নয়ন খুঁজি।
এই ঘাটেরি একটি ধারে কুমার-গাঙের কূলে
কদম্ব গাছ এলিয়ে শাখা দুলছে ফুলে ফুলে।
পাতায় পাতায় বুনিয়ে যেন সবুজ রঙের জাল
কোন বাতাসে বাঁধবে বলে বাড়িয়ে আছে ডাল।
তাহার ফাকে যায় যে দেখা খণ্ড-নীলের মায়া,
সেখান দিয়ে টুকরাে রােদের ঝরে সােণার কায়া।
ধান খেত
৭
বাতাস দোলায় গাছের শাখা, তাহার সুরে সুরে
ছােট ঘােট রােদের গুড়াে তলায় নাচে ঘুরে।
এই গাছেরি হেলান দিয়ে বিগান গাঁয়ের ছেলে
উদাসী তার বাঁশীর সুরে বুকখানি দ্যায় মেলে।
গাঁর মেয়েরা চলতে ঘরে ভেবে না কুল পায়,
জল ভরিতে কার কথা ও বাঁশীর সুরে গায়।
কেউ বা ভাবে সুরখানি তার বাঁধবে বাহুর ডােরে,
কেউ ভাবে তার গানখানিরে চুমােয় দেবে ভরে।
কারাে কারাে হয় বা মনে, তাহার রাঙা মুখে
যে রঙ ঝরে ওই বাঁশী তা গাইছে মন-সুখে।
রাখাল সে’ত বঁশীই বাজায় আপন মনে একা,
ওই মেয়েদের বুকে সে সুর আঁকে নানান রেখা।
কোন্ নারী সে ভাগ্যবতী যাহার কথা লয়ে
ওই বিদেশীর বাঁশী আজি ফিরছে ভুবন ব’য়ে।
কৃষাণী দুই মেয়ে
কৃষাণী দুই মেয়ে
পথের কোণে দাড়িয়ে হাসে আমার পানে চেয়ে।
ওরা যেন হাসি খুসীর দুইটী রাঙা বােন,
হাসি-খুসীর বেসাত ওরা করছে সারাখন।
ঝরা মাথায় কোঁকড়া চুলে লেগেছে খড়কুটো,
তাহার নীচে মুখ দুখানি যেন আপেল দুটো।
সেই মুখেতে কে দু’খানি তরমুজেরি ফালি
বেঁধে রাঙা ঠোঁটের শােভা দেখছে যেন খালি।
একটি মেয়ে লাজুক বড়, মুখর আরেক জন,
লজ্জাবতীর লতা যেন জড়িয়ে গােলাপ বন।
একটি হাসে, আর সে হাসি লুকায় আঁচল কোণে,
রাঙা মুখের খুসী মিলায় রাঙা শাড়ীর সনে।
পউষ-রবির হাসির মত আরেক জনের হাসি,
কুয়াসাহীন আকাশ ভরে টুকরো-মেঘে ভাসি।
চাষীদের ওই দুইটি মেয়ে ঈদের দুটি উঁদ,-
যেই দেখেছি পেরিয়ে গেল নয়নপুরীর ফাদ।
; মুন্সীসাহেব কাজল ডাঙার বছির মিঞা—মুন্সী যদিও খেতাবী তার, তবু তাহার এলেম দেখে মৌলবীরা মানে যে হার। ভূড়িটি তার মনেক তিনেক, বিদ্যে ভরা জাহাজ খানি, গার লােকদের ভাগ্য ভাল-ডাঙা দিয়েই যায় সে টানি ; গাঙ দিয়ে তার চললে জাহাজ ঢেউ ভাঙিত এমন জোরে দুখানি কূল টিকতনা’ক কেবল সামাল সামাল করে। চলতে পথে মুখ হতে তার দিন-এলেমের বচনগুলি উড়ে যেমন দমকা হাওয়ায় বালুচরের শুকনো ধূলি। কখন তাহা কাচাপাকা দাড়ীর বহর ভেদ করিয়া বৃষ্টি শিলার মতন ঝরে সাদা কালাে মেঘ ভাঙিয়া। কয় সে কথা কেতাব দেখে, মানতে যদি না চাও তাহা, ‘ছহি সােনা-ভানের সাথে মিলিয়ে নিও যখন যাহা। ‘কাছা-ছাল-আম্বিয়া’ আর ‘হাজার মছলা’ কেতাবখানি ‘আমির হামজা’ ছাড়িয়ে কথা কয়না সে তা আমরা জানি। - সাত গাঁর লােক নাম শুনে তার চোরের মত কাঁপতে থাকে, জানি কোন কসুর দেখে শাস্তি কখন দেয় বা কাকে। সাপ্তাহিকের স্তম্ভে যেমন শাহীজর্দা কুয়তেলাহি, ইত্যিআদির শুভ খবর দিনে দিনে যায় যে গাহি! তেমনি তার মুখের পরে সব সময়ে রইছে আঁকা- বিবি-তালাক, হাজার জুতাে, নজর-আনা একশ টাকা। চুল হবে কার লম্বা কত, রাখবে দাড়ী ক’হাত করে, কতখানি করবে নজর টুপী এবং কাছার পরে, এ সব লােকের জানাই আছে একটু হলে এদিক ওদিক মুন্সীসাহেব ফতােয়া দেন কেতাব দেখে কসুর-মাফিক। পাজামার দু’গলির মাঝে ঢুকিয়ে সরু পা দুখানি ভূড়ির পরে জগৎজোড়া আচকানেরে লয় সে টানি। ভাঙা চালের ছানির মত রয়েছে তায় হাজার তালি, সংখ্যাতে তা বেড়ে পসার মুন্সীসা’বের আনছে খালি। ২
১০
ধান খেত
মাথায় তাহার পাগড়ী বাঁধা, বগলেতে পুথির বােঝ,
লক্ষ লােকের মধ্যে গেলেও এই চেহারা যায় যে খোজা।
এই চেহারা যেথায় যাবে জানে খবর সেথায় সবাই
পােলাও রুটীর সাথে সাথে করতে হবে মুরগী জবাই।
এই চেহারার সঙ্গে চলে খাঁটি পাকা মুসলমানী,
আরব দেশের ঝাণ্ডা যেন মুন্সীসাহেব চলছে টানি।
তাহার আগমনের সাথে দূরের বাঁকা পথটি ধরে
অতীতকালের ইসলামী দিন বেড়িয়ে যায় গ্রামটি ভরে।
পাট বাছে যে শুকুর মামুদ, ধান কাটে যে ছদন মিঞা,
ছনুর বেটা সদরদ্দি কি করে বা লই চিনিয়া,
মুন্সীসাবের মফেলে আজ নতুন জামা সবার গায়ে,
মাথা সবার সজিয়ে নেছে রঙ-বেরঙের টুপীর ছায়ে।
মুন্সীসাবের মফেল ত নয়, রঙ-বেরঙের ফুলের বাজার
পূর্ণমাসীর চাঁদ ঘিরে আজ তারা-ফুলের উড়ছে বাহার।
গন্ধ তাদের ছড়ায় পবন আতর গােলাপ লােবানেতে
আল্লাহুমা-ছাল্লে-আলা দরুদ-গানের ছন্দে মেতে।
মুন্সীসাহেব মলুদ পড়ে, পুল-ছেরাতের পুলের সেতু
নাই পাটনী নাই তরণী পার হইবার কোনই হেতু।
নেকী-বান্দা পার হয়ে যায়, বদী-বান্দা ফসকে পড়ে,
নিয়ে নদী উথল পাথল, ঢেউ ভেঙে যায় ফেনার ভরে।
সকল নবী কঁদবে যেদিন:য়া-নছি য়্যা-নছি বলে,
চতুর্দিকে হায় হাহাকার উঠবে ধ্বনি ভীষণ রােলে
রােজ-হাসরের ময়দানেতে মােদারা সবজীবন পাবে-
মাটির পরে কপাল ঠুকি কাদবে তারা নানান ভাবে।
অতীতকালের পাপের বােঝ সকল তাদের পড়বে মনে,
কেউ হবে না ব্যথার দোসর দুঃসহ সেই নিদান্-ক্ষণে।
ধান খেত
য়্যা-উম্মতি য়্যা-উম্মতি কাদবে আমার দীনের রছুল,
হতভাগা মােমীনগণে সেদিন তাহার পড়বে না ভুল।
কেঁদে কেদে বলবে, খােদা, মাের উম্মতের সকল গুণা
মাফ করে দাও মাফ করে দাও মাের পুণ্যের লইয়ে দুনা।
মুন্সীসাহেব মলুদ পড়ে, বুক ভেসে যায় নয়ন জলে
তারি দোলায় চতুর্দিকের সবার হিয়া যায় যে গলে।
মুন্সীসাহেব বয়ান করেন আতসেরি লেবাছ পরে
শয়তান যে কাদবে সেদিন দোজখেরি দুয়ার ধরে।
সেখান দিয়ে চলবে হেঁটে এই দুনিয়ার হাজার পাপী,
দোজখ-ভরা আগুণ দেখে ভয়ে পরাণ উঠবে কপি ।
সেই আগুণের এমনি জ্বালা লক্ষ শিখা বাড়িয়ে দিয়ে
লাখ বছরের ভােখ নিয়ে সে ফিরবে আকাশ জমিন নিয়ে।
মাথার পরে হাজার রবি হানবে সেদিন তপ্ত নিশা,
জ্বলবে তাতে সপ্তধরা জ্বলবে আকাশ জ্বলবে বাতাস।
ভাইরা আমার, এই দোজখের আজাব হতে রেহাই কি চাও।
আজকে তবে সহজ সরল দীনের পথে চরণ বাড়াও।
বেহেস্তেরি দুয়ার ধরে দাড়িয়ে আছেন দীনের রছুল,
মােমীন জনের সবার তরে আজকে তাহার পরাণ আকুল।
সেই দরজা পার হইয়া মুছল্লিরা যায় চলে যায়
জরীর জামা জরীর জুততা বেহেস্তি লেবাছ পরে গায়।
পুত্রহারা মায়ের সাথে হবে সেথায় ছেলের দেখা,
মুখ হ’তে তার পড়বে ঝরে নয়া চাঁদের খুসীর রেখা।
লক্ষ বছর পার হইয়া মরা পতি আসবে হাসি’
জনম-দুখী বিধবাদের অশ্রুজলের ধারায় ভাসি।
শিশুকালেই যেই খােকাটি মরে ছিল মায়ের কোলে
জিন্নাতে সে যাবেই না’ক, মা না তাহার সঙ্গী হলে।
তখন খােদার আদেশ পেয়ে দোজখ হ’তে জননী তার
ভেস্তে যাবে হাত ধরিয়ে পুণ্য পেয়ে ছােট্ট খােকার ।
১২
ধান খেত
বেহেস্তের সে কী বর্ণনা, ভাইরা আবার বলব কত
সােণার বরণ ডালিম গাছে ফল ঝুলিছে হাজার শত।
তলায় তলায় হুর-পরিরা কখন নাচি কখন গাহি
বেহেস্তি ফুল ছড়িয়ে বয়ে চলছে সােণার পন্থ বাহি।
সেইখানেতে দেখতে পাবে লায়লী এবং মজনু চলে,
শিরী-ফরহাদ ফুলের মালা পরায় হেসে এ ওর গলে।
মা-ফাতেমা হাসেন হােসেন দুই ছেলেরে জড়িয়ে বুকে
কারবালারি করুণ গাঁথা স্মরণ করি কঁদবে দুখে।
জমীন সেথা সােণার বরণ, গাছের পাতায় রঙের খেলা,
দুপুর সেথা হবেই না’ক, কেবল সকাল সন্ধ্যাবেলা।
মেঘে মেঘে ঢেউ খেলিয়া নানান রঙের জলের ধারা
ফুলের রেণুর সুবাস লয়ে পড়বে ঝ’রে শিশির পারা।...
এই ভাবেতে মুন্সীসাহেব বেহেস্তেরি বয়ান করি
সহজ সরল গার চাষীদের দেয় যে সকল পরাণ ভরি।
সবার চোখেই জলের ধারা দিন-আখেরীর ভাবনা লয়ে
কোন্ সুদূরের সােণার দেশে মন ছুটেছে উধাও হয়ে।
মুন্সীসাহেব বুঝতে নারে, বেহেস্তেরি বয়ান করি’
আরেক নব-বেহেস্তেরে মফেলেতে আছে ধরি।
সেখানেতে মােমের বাতি জ্বলছে ঘুরি সােণার শিখায়,
লােবাণেরি উড়ছে ধূয়া বেহেস্তি-সুবাস মেখে গায়।
খনে খনে গার চাষীরা গদগদ কণ্ঠ লয়ে
আল্লাহুমা-ছাল্লে-আলা পড়ে দরুদ একিন হয়ে।
নানান বুকের সুর যে সেথা লােবাণেরি ধুয়ায় ভেসে
সাত-তবক আশমান পেরিয়ে যায় ভেসে কোন সুদূর দেশে।
খােদার আরশ-কুরছি পরে হয়ত সে সুর মুরছি পড়ে,
মুন্সীসাহেব মলুদ পড়ে মূখ পেঁয়াে চাষীর ঘরে।
দোষে গুণে পয়দা মানুষ, কি হবে তা হিসাব করি,
বছির মিঞা বহুন গাঁয়ে এমনিতর মলুদ পড়ি।
স্বপনপ্রিয়া
আর কতদিন রহিবে সজনি, মাের কল্পনা হয়ে,
স্বপনে স্বপনে আর কতকাল ভাসিবে আমারে লয়ে।
আজি দেখে যাও দেবের দেউলে বনের শৃগাল নাচে,
শ্মশানের ভূত আসিয়া এখন পূজার প্রসূন যাচে।
তােমারে ভাবিয়া জীবনের পথে করিয়াছি নানা ভুল,
যারে তারে আমি সঁপিতে গিয়াছি দেব-চরণের ফুল।
ধূপের সরায় ছড়ায়েছে তারা ভিজা তুষ আর বালি,
সােনার স্বপন ঢাকিছে তা আজ উগারি’ ধুয়ার কালি।
মাের চলনে মিশায়েছে তারা কেউটে সাপের বিষ,
তীব্র তাহার দহন-জ্বালায় কঁদে মাের দশদিশ।
আর কতকাল তাহাদের গেহে কঁাচা উনানের তলে
ভিজা কাষ্ঠেতে আগুন জ্বালায়ে তিতিব নয়ন জলে।
লােহার কালাই সিদ্ধ হয় না,—আশাররা নাহিক শেষ,
ভিজা কাষ্ঠেরে ফুকিয়া ফুকিয়া ভিজানু বুকের বেশ।
তুমি এসে দেখা দাও
মাের কল্পনা-তটিনীর জলে বাহিয়া সােনার নাও।
জীবনেতে আমি বড় যে ক্লান্ত-বড় যে শ্রান্ত দেহ,
বহু দেশ আমি ঘুরিয়া ফিরেছি খুজিয়া বুকের স্নেহ।
খুঁজিয়াছি আমি বুক-ভরা বুক, ফুল-ভরা ফুল হাসি ;
মন-ভরা মন--সে মনের লাগি মাের মন সন্ন্যাসী।
১৪
ধান খেত
শুধু মরীচিকা, হায় !
যত খুজিলাম ধূ ধূ মরুবালু উড়িছে উষ্ণ বায় ।
মায়ার জগৎ, ফুলের হাসিতে দাবানল হুতাশন
ঢাকিয়া রেখেছে, ছুইতে গেলেই পােড়ায় তনু ও মন।
ফুলের আড়ালে লুকায়ে রেখেছে তীব্ৰ কঁাটার জ্বালা,
চন্দন তরু বেড়িয়া দুলিছে দহন নাগের মালা।
তুমি এসাে সই, তােমার জীবন এদের মতন নয়,
তুমি শেখ নাই কথা দিয়ে কথা কেমনে ফিরায়ে লয়।
খেলার পুতুল করে,
তুমি খেল নাই ছিনিমিনি খেলা পরের পরাণ ধরে।
তুমি এস সই, তােমার অঙ্কে রাখিয়া শ্রান্তকায়
বালকের মত কাঁদিয়া কঁদিয়া আঁচল ভিজাব, হায় ।
আমার ঘরের দিবস রজনী দু’খানি দুখের চাল,
ঘসির অনল জ্বালায়ে সেথায় কাটায়েছি এতকাল।
সাপের মাথায় রাখিয়া সেথায় আপন বুকের মণি
ফুলের মধুতে পােষণ করেছি কাল অজগর ফণি।
তারা নাহি বশ মানে,
আঁধার ঘরেতে না জানি কখন বিষের কামড় হানে।
আগের দরজা বন্ধ ঘরের, পিছন দরজা খুলি’
সুজন বলিয়া ডাকাতেরে আমি এনেছিনু ঘরে তুলি
হায় নিদারুণ, রতন মাণিক লুণ্ঠন করি মাের
সমুখের দ্বার খুলে চলে গেল আমারে করিয়া চোর ।
ধান খেত
তুমি কভু সই এমন হবে না, তােমার ফুলের প্রাণ
শুধু হাসি জানে আর জানে দিতে ফুলের বুকের ঘ্রাণ।
মাের যত দুখ তােমারে শুনাব, বাঁশীর করুণ সুরে
বনের হরিণে ডেকে এনে বুকে বিষ বাণ দেয় পুরে ;
ওরা নিষ্ঠুর, আগুন জ্বলায়ে পােড়ায় বনের বুক,
কি দুঃখে বন পুড়ে ছাই হ’ল দেখে না ফিরায়ে মুখ ।
তুমি সই কভু এমন হবে না,যাহার যত না দুখ
ভাষা পাইবারে খুঁজিয়া ফিরিছে তােমার কোমল বুক
জগতের যত দুঃখ বেদনা যত হাসি আর গান
তােমার মাঝারে ধরিয়া ধরিয়া করিব যে আমি পান।
তুমি হবে মাের বাজাবার বাঁশী, তােমার করুণ সুরে
আমার মনের যত কথা সখি ফিরিবে ভুবন ঘুরে।
সে সুরের গাঙে ভাসাইয়া দিব আমার আঁখির জল,
যারা ব্যথা দেয় তাদেরও নয়নে নামিবে সেদিন ঢল।
তুমি এসাে সই আর কতকাল রবে কল্পনা হয়ে,
আঁধার জমেছে দেবতাবিহীন এ আঁখির দেবালয়ে।
কদম কেয়ার আহ্বান লিপি পাঠায়েছি তব দেশে,
তুমি এসাে আজ নব আষাঢ়ের কাজল মেঘের বেশে।
আমার পূজার ফুল
মাের অগােচরে হয় ত তােমার চরণে পেয়েছে কূল।
দেবতা জেনেই দিয়েছিনু মালা, তারা যে দেবতা নয়,
অসুর হইয়া দেবতার দান কেমন করিয়া লয় ।
ধান খেত
আমার হৃদয়ে আছিল তৃষ্ণা, চাহি মাের দেবতারে
পদে পদে তাই ভুল করে সখি ডাকিয়াছি যারে তারে।
স্তবের ভারেতে হৃদয় আকুল, না মানে বাঁধের মানা,
সেদিন সজনি, পথে পথে তাই ভুল করিয়াছি নানা।
সে-সব হয় ত মােরি অপরাধ, তবু তার গুরুভার
এমন নয়’ক তােমারে পাইতে আছে কোন বাধা তার।
দেবতারে আমি চেয়েছিনু সখি, যদি নাহি চিনে থাকি,
অগােচরে মাের পূজার কুসুম দেবতা ল’য়েছে ডাকি।
যত গান আমি ভাসায়েছিলাম অশ্রুমতীর জলে,
আজিকে তাহারা বাসা বাঁধিয়াছে তােমার মেঘের দলে।
সেই মেঘভার অলকে দুলায়ে এস গাে স্বপন-প্রিয়া
আমার বিজলী হাসিবে তােমারে লতা-বন্ধন দিয়া।
ফুলের পূজারী
আজি এ রাতেরে ঘুমােতে দেব না, আঁধারে পাতিয়া বুক,
গণিয়া দেখিব এ জীবনে আরাে লেখা আছে কত দুখ।
এখন হয়ত ঘুমায়েছ তুমি, উদাস পথিক বায়ু,
তােমার খোঁপার মালায় জড়ায়ে মাগিছে রাতের আয়ু।
হয় ত তােমার জানালার পথে অপ্সরী তারাগুলি,
আকাশ হইতে ছড়াইছে আনি নীল স্বপনের ধূলি।
শিয়রে প্রদীপ নিবিতে চাহে না, ফুরায়ে এসেছে তেল,
তবু ওই মুখে ছড়াইতে চাহে সােণালী আলাের খেল।
এখন হয় ত ঘুমায়েছ তুমি-আহা তুমি ঘুম যাও,
আমার বুকের এ বেদনা যেন তুমি না জানিতে পাও।
তােমরা র’চেছ পুষ্পের ডালি, আমি যেন ভুল করি
আমার দেশের দুঃখের কীট নাহি দেই সেথা ভরি।
আমি জানি দেৰি । তােমার কবির যশের কিরীট খানি,
হিমালয় ভেদি উপরে উঠেছে সৌর-কিরণ হানি।
সে অমর, তুমি তাহারি ছোঁয়ায় হইবে অমরাবতী,
বাঁশী বাজাইয়া রচিবে সে তব ত্রিকালে চলার গতি।
যে পুষ্প ঝরে নিদাঘের খাসে, বরষ দৈত্য আসি,
রূপের দেউল কঠিন চরণে ভেঙে যায় ক্রুর হাসি।
সে পারে তাদের ধরিয়া রাখিতে, কঠিন বাহুর বাঁধে
তব যৌবন বেঁধে সে রাখিবে অনন্ত আয়ু ফাঁদে।
ধান খেত
সে কবিরে মাের জানিয়ে প্রণাম, আর বলে দিও তারে,
আমার লাগিয়া কোন দুখ কভু সহিতে হবে না কারে।
অতি হীন প্রাণ, পথের কোণায় নিজেরি দৈন্য লয়ে,
রাতেরে লুকায়ে দিনেরে লুকায়ে রহি জড়সড় হয়ে।
তবু মাঝে মাঝে এই মনে হয়, যদি কোন দেবতার
দেখা পাইতাম, তাহারে সঁপিয়া সব দৈন্যের ভার,
বলিতাম আমি ধন্য হইব তােমারে পরশ করি,
এ বীণা আমার হইবে অমর তােমার মন্ত্র স্মরি।
তাই এসেছিনু তােমাদের গেহে পূজার প্রসুন ব’য়ে
বরণ ডালায় প্রদীপ সাজায়ে এসেছিনু দেবালয়ে।
মাের গানে কেহ ধন্য হইবে এমন স্পর্ধাভার,
এ শুধু তােমার কবিরই রহিল, আর হবে নাক কার।
আমি এসেছি তােমার মাঝারে অগাধ তৃষ্ণা গড়ি,
নিজেরে করিব সুন্দরতর কঠোর সাধনা করি।
তােমার কবিরে বলে দিও দেবী, ক্ষুদ্র এ বাহুখানি,
জানি, তাই বৃথা রামধনু লয়ে করি না’ক টানাটানি।
তাহার বাহু যে জগৎ জুড়িয়া, তারকা-চন্দ্র-রবি
ইচ্ছা করিলে ছিড়িয়া আনিতে পারে সে এখনি সবি।
তৃষ্ণারে মােরা বড় করে জানি, নহে তৃপ্তির লাগি,
ত্রিযামা যামিনী বে-ঘুম শয়নে একা একা বসে জাগি।
রামধনুকেরে পাই নাই বলে তাতে কোন খেদ নাই,
চক্ৰবালের ললাটে দেখেছি রেখা-রঙ রােশনাই।
পাখায় পাখায় সরু জাল পাতি বে-বুঝ পাখীর দল,
সারাটি গগন তাহারে ধরিতে ঘুরে মরে চঞ্চল।
ধান খেত
১৯
তারা নাহি জানে যে মেঘের গলে দোলে সাতনরি হার,
গগনে গগনে ফেরে সেই মেঘ সন্ধান করি তার।
তােমার কবিরে বলে দিও দেবী, যারা শুধু ফুল চায়,
ফুল তাহাদের, ফুলের সাধ্য নাহি কারাে হতে হয়।
তাই সেথা মাের নাহি অভিযােগ আবেদন-নিবেদন,
যতটা তাহারে লেগেছিল ভাল ততটা ভরেছে মন।
ফুলেরে যাহারা মালায় গাঁথিয়া গলায় পরিয়া রাখে,
তাহাদের ফুল এক রাত্রের, তার বেশী নাহি থাকে।
এই ধরণীর ফুলের উপরে যারা চাহে অধিকার,
ফুলেরে তাহারা বােঝে নাই, শুধু জেনেছে অহঙ্কার।
ফুল আকাশের-ফুল বাতাসেরফুল শিশিরের সাথী,
ফুলেরে ফোটাতে রবি-শশী-তারা শূন্যে দোলায় বাতি।
যারা সে ফুলের চারিধার ঘেরি রচে আবরণ পাশ,
তাহাদের ফুল শুকায় দু’দিনে না ছড়াতে ফুল-বাস।
জানিতাম দেবী, ফুলের দেশেতে যারা রচিয়াছে ঘর,
ফুলের মতন বড় সুন্দর তাহাদের অন্তর।
ফুলের প্রেমেতে মজিয়াছে যারা তাদের শুভ্র মন,
দেশে দেশে ফেরে ফুল পূজারীরে করিয়া নিমন্ত্রণ।
আজি বুঝিলাম তােমার দেশেতে এমনন পূজারী আছে,
কুসুমের গান ঈর্ষা বিষেতে ভরা যাহাদের কাছে।
দেবের দেউলে মজার পূজারী! শুনিয়া ভজন গান,
মন্দির ছাড়ি পালায় সুদূরে আঙ্গুলে ঢাকি কাণ।
ধান খেত
আমি কি করিব, দেবতার মনে যদি ভাল লাগে তায়,
রবি-কর যদি মেঘ বেষ্টনে নিজেরে ঢাকিতে চায়,
মাের ফুল যদি বাঁধা পড়ে আজ কারাে আবরণ জালে,
তার প্রতি মাের কোন অভিযোেগ হবে না কোন কালে।
তারে বলে দেব, যে ফুলের নেশা আমারে পাগল করি
কাঁদাইছে পথে, সে ফুলের কেহ তুমি নহ সুন্দরী!
আমার সে ফুল চির শাশ্বত, অনন্ত তার আয়ু,
অঙ্গে মাখিয়া রেণু গৈরিক আমি তার খ্যাপা বায়ু।
বাপের বাড়ীর কথা
বড়, তুই আয়, আরাে কাছে, মােরে জড়ায়ে ধরিয়া থাক্,
আকাশ ফাটিয়া হাকিয়া উঠিছে কাজল মেঘের ডাক।
এমনই বাদলে মায়ের আঁচলে তােরই মত ছােট মেয়ে,
কচি দুটি হাতে গলাটি জড়ায়ে জেগে রহিতাম চেয়ে।
ছােট ঘরখানি দুলিয়া উঠিত ঝাপটা হাওয়ার বেগে,
বিজলী নাচিত সােনার হারটি কালাে মেঘে মেঘে একে।
প্রভাত না হ’তে আম কুড়াইতে ছুটে যাইতাম বনে,
বেতের কঁাটার কঠিন পরশ কেইবা তখন গণে।
সিদুরী’ গাছের তলায় আসিয়া হর্ষে নাচিত বুক,
এ পােড়া ধরণী কেমনে বুঝিবে আম কুড়া’বার সুখ।
তলায় তলায় ঘুরিয়া ফিরিয়া কুড়ানাে হইলে শেষ,
এনে রাখিতাম মায়ের সমুখে, আজো মনে পড়ে বেশ।
মা তখন মাের কত খুসী হত, কোলের নিকটে ডাকি,
চুমায় চুমায় দুইটি গণ্ড সিদুরেতে দিত আঁকি।
বৈশাখ দিনে কাঠফাটা রােদে দিত গায়ের চাষী,
দাউ দাউ করা দমকা হাওয়ায় গুমট বেড়াত ভাসি।
আমরা তখন কুমারী মেয়েরা “বদনা বিয়ের গানে,
সারা মাঠখানি ভরিয়া দিতাম বাদল বিরহী তানে।
বদনার গায়ে হলুদ মাখিয়া কুলার উপরে রাখি,
প্রতি ঘরে ঘরে ব’য়ে ফিরিতাম ‘কালিয়া’ মেঘেরে ডাকি।
ধান খেত
জল ছিটাইয়া গাঁয়ের বধূরা হেসে হত কুটি কুটি,
ঘােমটার তল রাঙিয়া উঠিত রাঙা ফুলগুলি ফুটি।
কুমারী মেয়ের করুণ কঁাদনে গ্রীষ্মের হিয়া গলি,
সারা মাঠ ভরি কাজল মেঘেরা নামিয়া পড়িত ঢলি।
আঁকিয়া বাঁকিয়া জল ছুটে যেত মাঠে-যাওয়া পথ ধরি,
চাষীর হৃদয় নতুন ‘বানের আশায় উঠিত ভরি।
ছেলেবেলাকার বদনা বিয়ের খেলা-সাথী কেহ কেহ,
হয়তাে এখন ঘুমায়ে রয়েছে মাটিতে মিশায়ে দেহ।
হয়তাে কাহারাে বিবাহ হয়েছে অনেক দূরের দেশে,
হয়তাে কাহার এক বুক ব্যথা ঝরিছে বাদল বেশে।
বড়, তাের আজ দিনুর মায়ের মনে কি পড়েনা কিছু ?
যে তাের আঁচলে আম ঢেলে দিতে এসেছিল পিছু পিছু।
তার সাথে মাের বড় ভাব ছিল, ছেলে বেলাকার দিনে,
একদিননা মাের কাটিত না কভু এক সাথে খেলা বিনে।
মাের বিয়ে হলে কাঁদিয়া কহিল “বুরে! তুই ছেড়ে গেলি,
তােরে ফেলে এই শূন্য কুটিরে কি করে যে আর খেলি।”
সাথীদের সাথে কঁদিয়ে কঁাদায়ে উঠিলাম শােয়রীতে,
বাপের বাড়ীর সব ছবিগুলি আঁকিয়া লইয়া চিতে।
তারপর এই তিরিশ বছর আসিয়াছি এই দেশে,
বাপের বাড়ীর কথা মনে হলে আঁখি দু’টি যেত ভেসে
সাতে সত্তরে ‘বাজান’ আসিলে গলাটি ধরিয়া তার,
ধান খেত
কত যে মানুষ যেত চলে ওই গাঁয়ের পথটি ধরি,
আনমনা আমি চেয়ে থাকিতাম ঘােটা যে ফাক করি।
হায়রে অচেনা, তােরই মাঝে কত খুজিয়াছি চেনা মুখ,
নিরাশায় শুধু দহিয়া মরেছি ভাঙ্গিয়া পড়েছে বুক।
আপন দেশের শত খুটি নাটি শুধাতাম বারে বার।
দিনুর মায়েরা কেমন আছে গো? রাঙা ছুটু কোথা আছে ?
গাজনের বিলে জল উঠেছে কি ডুহার চকের কাছে ?
‘সাপলা পরীরা জল খেলে নাকি কালাে জলে মাথা নাড়ি,
কমল মেয়েরা হাসিয়া উঠে কি পরিয়া রঙের শাড়ী ?
যাইবার বেলা কেঁদে কহিতাম, হেথায় আমার মােটে,
ভাল যে লাগেনা, মায়েরে দেখিতে পরাণ কাঁদিয়া ওঠে।
কেঁচার খােটেতে চক্ষু মুছিয়া কহিত বাজান মােরে,
“কি করিব মাগাে, এরা যে এখন ছাড়িয়া দেয়না তােরে।”
সেবার বােশেখে ডুলিতে চড়িয়া গেলাম বাপের বাড়ী,
ছেলে বেলাকার সাথীরা তখন অনেকেই গেছে ছাড়ি।
হেলিয়া দুলিয়া শােয়রী যখন আসিল গাঁয়ের পাশে,
তালের পাতারা কঁদিয়া উঠিল শোয় শোয় করা শ্বাসে।
মনে হল হায়, ডুলির কাপড় ছিড়ে করি কুটি কুটি,
গাছ পালাগুলি জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে কেঁদে মাথা লুটি।
সেই চেনা পথ, ছায়া বটতল, তাল পুকুরের পাড়ী,
নীড়ে নীড়ে সেই পাখীর কুজন, চাষীদের ছােট বাড়ী।
২৪
ধান খেত
হাসিয়া হাসিয়া জননী তখন ডুলির কাপড় তুলি,
কহিল ডাকিয়া, বড় এলি নাকি? এতদিন ছিলি ভুলি !
তারপর সেই উঠানে বসিয়া অতীতের শত কথা,
ঢেউয়ের মতন বুকেতে আসিয়া দিয়ে গেল শত ব্যথা।
ছেলে বেলাকার খেলার সাথীরা কেহ কেহ কাছে আসি,
নয়নে নয়ন মিলাতে যাইয়া আঁখি জলে গেল ভাসি।
মােল্লা বাড়ীর বড়রা আসিল, মিনার বাড়ীর সাজু,
ফেলিরা আসিল, নিহাজের মাতা, দুলিয়ার বােন মাজু।
তাহাদের সাথে হাসিয়া কঁদিয়া এ পাড়া ও পাড় ঘুরি,
ভুলে যাওয়া শত স্মৃতিগুলি মাের বুকে লইলাম পুরি।
আমার মায়ের কত ব্যথা ছিল আমারে ছাড়িয়া দূরে,
সেই সব তারা আমারে কহিত এমনই করুণ সুরে ;
বুক যেন মাের জ্বলিয়া জ্বলিয়া পুড়ে হয়ে যেত ছাই,
ধিক্কার হত নারী জনমের, কোন কিছু নাই—নাই।
তারপর সেই আসিবার দিনে সারা গ্রামখানি ভরে,
বড় সকরুণ কঁাদন জাগায়ে এলাম তােদর ঘরে।
পেঁয়াে পথ দিয়ে শােয়রীখানিরে যতখণ গেল দেখা,
উদাসিনী সে যে চাহিয়া রহিল আমার জননী একা।
আকাশ ছোঁয়ান তাল গাছগুলি শেষ দেখা গেল দিয়া,
অচেনার দেশে শােয়রী চলিল, কাঁদিয়া উঠিল হিয়া।
তারপর এই স্বামীর ভিটায় বহুদিন গেছে কেটে,
বাপের মরার খবর শুনিয়া বুকখানি গেছে ফে’টে।
ধান খেত
এত দরদের জননী আমার শুয়েছে কবর দেশে,
আজো তাঁর স্নেহ মাের তরে নাকি মাটি হতে উঠে ভেসে।
বন্ধু তুই মাের আরও কাছে আয়, বড় ব্যথা আজ বুকে,
গগন ভরিয়া উতলা মেঘেরা কঁদিছে আমার দুখে।
ঝিলিকে ঝিলিকে বিজলী নাচিছে বন-পথ করি আলা,
মাের ব্যথা কি ও ছড়ায়ে চলিছে আকাশে দোলায়ে মালা?
কড় কড় কড় ঝঞ্জা হাঁকিছে, ঢল ঢল ঝরে জল,
মনে পড়িতেছে ছােট পেঁয়াে ঘর, ছায়াঘেরা বটতল।
মনে পড়িতেছে আঙিনার কোলে হাসি ভরা কার মুখ,
আহারে জননী কোথা গেলি তুই মােরে দিয়ে এত দুখ ।
৪
বালুচর
নদীতীরে ওরা বেঁধেছে কুটীর,
শ্যামল শোভায় ঘেরা;
মাটরে করেছে ছায়া মায়াবিনী
পল্লীর দুলালেরা।
আম কুঞ্জের শাখাবাহু ধরি,
এলাইয়া পড়ে বাতাসের পরী ;
ওদের কুটীরে শুনাই নিতুই
ঘুম পাড়ানিয়া গান ।
নদীতীরে ওরা পাতার কুটীরে
গড়েছে মুখের থান!
নদীতীরে ওরা বেঁধেছে কুটীর,-
বৌ হাসে আঙিনায়,
আদুরে দুলাল বাঁকা পেঁয়াে পথে
ঝাজর বাজায়ে যায়।
ওপার হইতে ধান কেটে আনি’
সােনায় সাজায়ে পেঁয়াে ঘরখানি,
সয়ালি পায়ে পেঁয়াে ভাই সনে,
বাজায় সুখের বীণ,
বালুচরে ওরা কুটীর বেঁধেছে,
ভুলে গেছে তার চিন
ধান খেত
২৭
।
;
বালুচরে ওরা কুটীর বেঁধেছে
কৃষাণী জলেতে যায়,
জলের উপর আলপনা আঁকে
কঁখের কলসী ঘায়।
ভরা ঘট লয়ে ঘরে যায় ফিরে,
বাহুর লতায় বাঁধি নদী নীরে
পথেতে দেখিয়া কৃষান সখারে,
লুকায় মুখের হাসি,
নদীতীরে ওরা মেলিয়া ধরেছে
সুখের স্বপন রাশি।
বালুচরে ওরা কুটীর বেঁধেছে,
বালুর আঙিনা আঁকি,
কৃষাণী দিয়েছে লেপিয়া মুছিয়া
বুকখানি তার মাখি।
কেউ ভাই হয়ে কেউ বােন হয়ে,
জীবন কাটায় হাসি গান ল’য়ে ;
সখা হয়ে কেউ সখী হয়ে কেউ,
এ ওরে আদর করে,
বালুচরে ওরা ভুলিয়া রয়েছে,
ওদের বালুর ঘরে !
কুলঙ্কশা সে নদীতীরে ওরা
বেঁধেছে কুটীরগুলি,
বালুর উপরে আখর লিখেছে
একথা রয়েছে ভুলি।
২৮
ধান খেত
এ উহারে বলে, বড় ভালবাসি।
ছবি আঁকে কেউ দেখে কারাে হাসি,
কারাে মিঠে কথা ভাল লাগে বলে
স্বপনেতে যায় ভাসি।
বালুচরে ওরা কুটীর বাঁধিয়া
বাজায় বাঁশের বাঁশী ।
বালুচরে ওরা কুটীর বেঁধেছে,
-কতকাল-কতকাল!
আর কতদিন ছিন্ন সূতায়
গাথিবে মায়ার জাল ?
ঢেউ অজাগর ফেনিল হাসিয়া
বুকের বাঁধন যায় যে নাশিয়া,
বরষায় ওরা ভরা নদী বুকে
জীবন লইয়া ভাসে ;
তবু আর বার বালুচরে ওরা
কুটীর বাঁধিতে আসে।
অবেলায়
সন্ধ্যায় তুমি এলে
কনক মেঘের অলকায় আজি
রঙের কুহেলি মেলে।
পেঁয়াে নদীটীর দু’টী কূল ধরি’
ঝাউ-ঝাড়ে কেশ নাড়ে বিভাবরী,
জলের আঙিয়া উঠিয়াছে ভরি’
তারি ছায়া বুকে ফেলে।
কেন তরী তুমি বেয়ে’ যাও মাঝি
মাের নদী-তট দিয়া,
তােমার গানে যে বাসা বাঁধিয়াছে
আমার গােপন হিয়া।
তুমি চলে যাবে সাঝেরি মতন
আঁধারে ভাসায়ে মেঘের আগুন,
ঘিরিয়া আমার নয়ন-গগন
মেঘ দেছে ধারা ঢেলে।
ওগাে ক্ষণিকের
বন্ধু আমার,
ফিরে যাও তবে ঘরে ।
এই ব্যথা শুধু রহিল, তােমায়
নারি রাখিতে ধরে।
৩০
ধান খেত
মাের কেয়া-বনে ছিল যত ফুল
জলে ভাসালেম মিছে করি’ ভুল,
এখন আমার বেড়িয়া দুকূল
কঁদন বেড়ায় খেলে।
রাখালের রাজগী
রাখালের রাজা আমাদের ফেলি কোথা গেলে ভাই চলে,
বুক হ’তে খুলি সােণা লতা গুলি কেন গেলে পায়ে দলে।
জানিতেই যদি পথের কুসুম পথেই হইবে বাসি
কেন তারে ভাই গলে পরেছিলে এতখানি ভালবাসি?
আমাদের দিন কেটে যাবে যদি গলেতে কাজের ফাঁসি
কেন শিখাইলে ধেনু চরাইতে বাজায়ে বাঁশের বাঁশী ?
খেলিবার মাঠ লাঙল বাজায়ে চষিতেই যদি হবে,
গায়ের রাখাল ডাকিয়া সেথায় রাজা হলে কেন তবে ?
তুমি চলে গেছ, শুধু কি আমরা তােমারি কাঙাল ভাই,
হারায়েছি গান গােচারণ মাঠ বাঁশের বাঁশরী তাই।
সােজাসুজি আজ উধাও চলিতে কোথা সে উধাও মাঠ,
গােখর ধূলাের দোয়া-টাঙানাে কোথা সে গাঁয়ের বাঁট ?
চরণ ফেলিতে চরণ চলে না শষ্য-ক্ষেতের মানা,
খেলিবার মাঠে বড় জমকালাে মিলেছে পাটের থানা।
পেঁয়াে শাখী আজ লুটায়ে পড়িছে কাঁচা পাকা ফল-ভারে,
তলে তলে তার মাঠের রাখাল হাট মিলাইতে নারে।
চষা মাঠে আজ লাঙল চলিতে জাগে না ভাটীর গান,
সারা দিন খেটে অল্প কুড়াই, তবু তাতে অকুলান।
ধানের গােলার গর্বেতে আজি ভরে না চাষীর বুক,
টিনের ঘরের আট-চালা বেঁধে রােদে জ্বলে পায় সুখ।
৩২ ধান খেত ‘বাছের নায়েতে’ ছই দিয়ে চাষী পাটের বেপার করে, ‘দাবড়ের’ গরু হালের খেতেতে জোয়াল বহিয়া মরে। হেমন্ত নদী ঢেউ খেলে নাক’ শারীর’ গানের সুরে গরু-দৌড়ের মাঠখানি চাষী লাঙলেতে দেছে ফুড়ে। মনে পড়ে ঘর ছােনের ছাউনি, বেড়িয়া চালের বাতা, কৃষাণ-বধূর বুকখানি যেন লাউএর লতায় পাতা। তারি পাশে পাশে প্রতি সন্ধ্যায় মাটীর প্রদীপ ধরি কুমারী মেয়েরা আশিস্ মাগি গ্রাম-দেবতারে স্মরি। আজকে সেখানে জ্বলে না প্রদীপ বাজে না মাঠের গান, ঘুমূলী রাতের প্রহর গণিয়া জাগে না বিরহী প্রাণ। শুনাে বাড়ীগুলাে রয়েছে দাড়ায়ে, ফাটলে ফাটলে তার বুনাে লতাগুলাে জড়ায়ে জড়ায়ে গেঁথেছে বিরহ-হার। উকুন যাহার গায়ে মারা যায়—থন থন করে তাজা, এমন গরুরে পালিয়া কৃষাণ নিজেরে বনে না রাজা। ধানের গােলার গর্ব ভুলেছে, ভুলেছে গায়ের বল, চক্ষু বুজিয়া খুজিছে কোথায় টাকা বানানাের কল। সারা দিন ভরি শুধু কাজ কাজ আরও চাই, আরও—আরও- ক্ষুধিত মানুষ ছুটিছে উধাও, তৃষ্ণা মেটে না কারও। পেটে নাই ভাত মুখে নাই হাসি, রােগে হাড়খানা সার, প্রেত-পুরী যেন নামিয়া এসেছে বহিয়া নরক-দ্বার। হাজার কৃষাণ কঁদিছে অঝােরে কোথা তুমি মহারাজ ? ব্ৰজের আকাশ ফাড়িয়া ফাড়িয়া হাঁকিছে বিরহ-বাজ। আমরা তােমারে রাজা করেছিনু পাতার মুকুট গড়ে, ছিড়ে ফেলে তাহা মনির মুকুট পরিলে কেমন করে ?
ধান খেত
বাঁশরী বাজায়ে শাসন করেছ মানুষ পশুর দল,
সুর শুনে তার উজান বহিত কালাে যমুনার জল।
কোন্ প্রাণে সেই বাঁশের বাঁশরী ভেঙে এলি পেঁয়াে বাটে ?
কার লােভে তুই রাজা হলি ভাই মথুরার রাজপাটে?
বাঁশীর শাসন হেলায় স’য়েছি, বুনাে ফলে দিছি কর,
অসির শাসন কি দিয়ে সহিব, বেচিয়াছি বাড়ী ঘর ;
লের গরুরে নিলামে দিয়েও মিটাতে পারিনি ভুখ,
আধখানা ফলে পেট ভরে যেত—ভেবে ভেবে হয় দুখ ;-
এত পেয়ে তাের সাধ মেটে নাক, দুনিয়া জুড়িয়া ক্ষুধা,
আমরা রাখাল মাঠের কাঙাল যােগাইব তারি সুধা!
শােন রে কানাই পষ্ট কহিছি, সহিব না মােরা আর,
সীমার বাহিরে সীমা আছে যদি, ধৈর্য্যেরাে আছে বার।
ভাবিয়াছ ওই অসির শাসনে মােরা হয়ে জড়সড়,
নিজের ক্ষুধার অন্ন আনিয়া চরণে করিব জড় ?
বাঁশীর শাসন মেনেছি বলিয়া অসিও মানিতে হবে।
গুরু দেয়া-ডাকে কাজরী গেয়েছি, ঝড়েও গাহিব তবে?
বাঁশীর শাসন বুকে যেয়ে লাগে, নত হয়ে আসে শির,
অসির শাসনে মরাদেরর মাঝে জেগে ওঠে শত বীর।
ভাবিয়াছ মােরা গায়ের রাখাল, নাই কোন হাতিয়ার,
যে লাঙল পারে মাটীরে ফঁাড়িতে, ভাঙিতেও পারে ঘাড়।
৩৪
ধান খেত
ঝড়ের সঙ্গে লড়িয়াছি মােরা, বাদলের সাথে যুঝি,
বর্ষার সাথে মিতালী পাতা’য়ে সােণা ধান করি পুজি।
তবুও সেখানে প্রদীপ জ্বালাই, ঘন আঁধারের কোলে,
আঁকড়িয়া আছি পল্লীর মাটী কোন্ ক্ষমতার বলে ।
জনমিয়া যারা দুখের নদীতে শিখিয়াছে দিতে পাড়ী,
অসির শাসনও তরিবে তাহারা যা’ক না দু’দিন চারি।
পষ্ট করিয়া কহিছি কানাই এখনও সময় আছে,
গাঁয়ে ফিরে চল, নতুবা তােমায় কঁদিতে হইবে পাছে।
জনম-দুখিনী পল্লী-যশােদা আশায় রয়েছে বাঁচি,
পাতায় পাতায় লতায় লতায় লতিয়ে স্নেহের সাজি।
হিয়া খানি তার হানা-বাড়ী সম ফাটলে ফাটলে কঁদি
বক্ষে ল’য়েছে তােমারি বিরহ বনের লতায় বাঁধি।
আঁধা পুকুরের পচা কালাে জলে মূরছে কমল রাধা,
কৃষাণ বঁধুরা সিনান করিতে শুনে যায় তারি কঁাদা।
বেনুবনে তুমি কবে বেঁধেছিলে তােমার বাঁশের বাঁশী,
দখিনা বাতাস আজিও তাহারে বাজাইয়া যায় আসি।
কোমল লতায় দোলনা বাঁধিয়া শাখীরা ডাকিছে সুরে,
আর কত কাল ভুলে রবি ভাই পাষাণ মথুরাপুরে?
আমরা ত ভাই ভেবে পাই নাক’ তােরি বা কেমন রীত,
একলা বসিয়া কেতাব লিখিস ভুলিয়া মাঠের গীত।
ধান খেত
পুথিগুলাে সব পােড়াইয়া ফ্যাল, দেখে গা’ও করে জ্বালা,
কেমনে কাটা’স সারা দিন তুই লইয়া ইহার পালা?
ওরাই তত তােরে যাদু করিয়াছে, মােরা যদি হইতাম
ছি ডিয়া ছিড়িয়া বানাইয়া ঘুড়ী আকাশে উড়াইতাম।
রাজধানী যে রে পরদেশ তাের—ইট কাঠ দিয়ে ঘেরা,
ইট কাঠে তাই আট ঘাট বেঁধে মনেও কি দিলি বেড়া?
এত ডাক ডাকি শুনে না শুনিস, এমনি কঠিন হিয়া
আমরা রাখাল ভাবিয়া না পাই—গলাইব কিবা দিয়া ?
একলা আমরা মাঠে মাঠে ফিরি পথে পথে কেঁদে মরি,
আমাদের গান শােনে না রে কেউ, লয় নাক’ হাত ধরি।
চল গাঁয়ে যাই, আঁকা বাঁকা পথ ধূলার দোলায় দোলে,
দু’ধারের খেত কাড়াকাড়ি করে তাহারে লইতে কোলে।
কদম্ব-রে শিহরিয়া উঠে নতুন পাটল মেঘে
তমালের বনে বিরহী রাধার ব্যথা-দেয়া যায় ডেকে।
• •
নিমন্ত্রন
তুমি যাবে ভাই—যাবে মাের সাথে আমাদের ছােট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি’
মাের গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বােনের আদরে, ভা’য়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই—যাবে মাের সাথে আমাদের ছােট গাঁয়।
ছােট গাঁওখানি—ছােট নদী চলে তারি এক পাশ দিয়া,
কালাে জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া।
ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী
পারের খবর টানাটানি করি’
বিনা সুতী মালা গাঁথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া
বাঁকা ফঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।
কি
তুমি যাবে ভাই—যাবে মাের সাথে ছােট সে কাজল গাঁয়,
গলাগলি ধরি কলাবন যেন ঘিরিয়া রয়েছে তায়।
সরু পথখানি সুতায় বাঁধিয়া
দূর পথিকেরে আনিছে টানিয়া,
বনের হাওয়ায়, গাছের ছায়ায়, ধরিয়া রাখিবে তায় ;
বুকখানি তার ভরে দেবে বুঝি মায়া আর মমতায়।
৩৭
শ,
ধান খেত
তুমি যাবে ভাই যাবে মােয়র সাথে--নরম ঘাসের পাতে,
চুম্বন রাখি’ অধরখানিরে মেজে ল’য়াে নিরালাতে।
তেলাকুচ-লতা গলায় পরিয়া
মেঠো ফুলে নিও আঁচল ভরিয়া,
হেথায় সেথায় ভাব ক’র তুমি বুনাে শাখীদের সাথে,
তােমার গায়ের রঙখানি তুমি দেখিবে তাদের পাতে।
তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে, তােমারে সঙ্গে করি
নদীর ওপারে চলে যাই তবে লইয়া ঘাটের তরী।
মাঠের যত না রাখাল ডাকিয়া
তব সনে দেই মিতালী করিয়া,
ঢেলা কুড়াইয়া গড়ি ইমারৎ সারা দিনমান ধরি,
সত্যিকারের নগর ভুলিয়া নকল নগর গড়ি।
তুমি যদি যাও-দেখিবে সেখানে মটর লতার সনে,
সীম—আর সীম—হাত বাড়ালেই মুঠি ভরে সেই খনে।
তুমি যদি যাও সে-সব কুড়ায়ে
নাড়ার আগুনে পােড়ায়ে পােড়ায়ে,
খাব আর যত পেঁয়াে চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে
হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব দুই জনে।
৩৮
ধান খেত
তুমি যদি যাও--শামুক কুড়া’য়ে খুব—খুব বড় করে
এমন একটি গাঁথিব মালা যা দেখিনি কাহারাে করে,
কারেও দেব না, তুমি যদি চাও
আচ্ছা না হয় দিয়ে দেব তাও,
মালাটিরে তুমি রাখিও কিন্তু শক্ত করিয়া ধরে,
ওপাড়ার সব দুষ্ট ছেলেরা নিতে পারে জোর করে।
সন্ধ্যা হইলে ঘরে ফিরে যাব, মা যদি বকিতে চায়,
মতলব কিছু আটিব যাহাতে খুসী তারে করা যায়।
লাল আলােয়ানে ঘুটো কুড়াইয়া
বেঁধে নিয়ে যাব মাথায় করিয়া,
এত ঘুস পেয়ে যদি বা তাহার মন না উঠিতে চায়,
বলিব-কালকে মটরের শাক এনে দেব বহু তায়।
খুব ভাের করে উঠিতে হইবে, সূয্যি উঠারও আগে,
কারেও কবি না, দেখিস পায়ের শব্দে কেহ না জাগে।
রেল সড়কের ছােট খাদ ভরে
ডানকিনে মাছ কিবি করে ;
কাদার বাঁধাল গাঁথি মাঝামাঝি জল সেচে আগে ভাগে
সব মাছগুলাে কুড়ায়ে আনিব কাহারাে জানার আগে।
ধান খেত
ভর দুপুরেতে এক রাশ কাদা আর এক রাশ মাছ
কাপড়ে জড়ায়ে ফিরিয়া আসিব আপন বাড়ীর কাছ,
‘ওরে মুখ-পােড়া ওরেরে বাঁদর।
গালি-ভরা মা’র অমনি আদর
কতদিন আমি শুনিনারে ভাই, আমার মায়ের পাছ
যাবি তুই ভাই আমাদের গায়ে যেথা ঘন কালাে গাছ।
যাবি তুই ভাই, যাবি মাের সাথে আমাদের ছােট গাঁয়,
ঘন কালাে বন—মায়া মমতায় বেঁধেছে বনের বায়।
গাছের ছায়ায় বনের লতায়
মাের শিশুকাল লুকায়েছে হায় !
আজিকে সে-সব সরা’য়ে সরা’য়ে খুজিয়া লইব তায়,
যাবি তুই ভাই, যাবি মাের সাথে আমাদের ছােট গাঁয়।
তােরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে, ঘন-পল্লব তলে
লুকায়ে থাকিস, খুজে যেন কেহ পায়না কোনই বলে।
মেঠো কোন ফুল কুড়াইতে যেয়ে
হারাইয়া যা’স পথ নাহি পেয়ে,
অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে ঘুমা’স সন্ধ্যা হলে,
সারা গাঁও আমি খুজিয়া ফিরিব তােরি নাম বলে বলে।
যাব আমি তােমার দেশে
পল্লী-দুলাল, যাব আমি-যাব আমি তােমার দেশে,
আকাশ যাহার বনের শীষে দিক-হারা মাঠ চরণ ঘেসে।
দূর দেশিয়া মেঘ-কনেরা মাথায় লয়ে জলের ঝারি,
দাড়ায় যাহার কোলটি ঘেসে বিজলী-পেড়ে আঁচল নাড়ি।
বেতস কেয়ার বনে যেথায় ডাহুক মেয়ে আসর মাতায়,
পল্লী-দুলাল ভাই গাে আমার, যাব আমি যাব সেথায়।
তােমার দেশে যাব আমি, দিঘল বাঁকা পন্থখানি,
ধান কাউনের খেতের ভেতর সরু সূতাের আঁচড় টানি;
গিয়াছে সে হাবা মেয়ের এলো মাথার সি থীর মত
কোথাও সিধে কোথাও বাঁকা গরুর পায়ের রেখায় ক্ষত
গাজন-তলির মাঠ পেরিয়ে শিমূলডাঙা বনের বায়ে ;
কোথাও গায়ে খােদ মাখিয়া ঘুম-ঘুমায়ে গাছের ছায়ে ।
৪১
ধান খেত
তাহার পরে মুঠি মুঠি ছড়িয়ে দিয়ে কদম-কলি,
কোথাও মেলে বনের লতা গ্রাম্য মেয়ে যায় যে চলি।
সে পথ দিয়ে যাব আমি পল্লী-দুলাল তােমার দেশে,
নাম-না-জানা ফুলের সুবাস বাতাসেতে আসূবে ভেসে।
তােমার দেশে যাব আমি, পাড়ার যত দস্যি ছেলে,
তাদের সাথে দল বাঁধিয়া হেলায় সেথায় ফিরব খেলে।
ধল দিঘীতে সাঁতার কেটে আব তুলে রক্ত-কমল
সাপলা লতায় জড়িয়ে চরণ ঢেউ-এর সাথে খাব যে দোল।
হিজল-ঝরা জলের সাথে গায়ের বসন রঙীন হবে,
দিঘীর জলে খেলবে লহর মােদের লীলা কালােৎসবে।
লীল
তােমার দেশে যাব আমি পল্লী-দুলাল ভাই গাে সােনার,
সেথায় পথে ফেলতে চরণ লাগবে পরশ এই মাটি-মার।
ডাকব সেথা পাখীর ডাকে, ভাব করিব শাখীর সনে,
অজান ফুলের রূপ দেখিয়া মান্ব তারে বিয়ের কনে;
চলতে পথে ময়না কাটায় উত্তরীয় জড়িয়ে যাবে,
অঢেল মাটির হোঁচট লেগে আঁচল হ’তে ফুল ছড়াবে।
পল্লী-দুলাল, যাব আমি যাব আমি তােমার দেশে,
তােমার কাঁধে হাত রাখিয়া ফিরুব মােরা উদাস বেশে।
বনের পাতার ফঁাকে ফঁাকে দেখব মােরা সাঁঝ-বাগানে,
ফুল ফুটেছে হাজার রঙের মেঘ-তুলিকার নিখুত টানে।
৪২
ধান খেত
গাছের শাখা দুলিয়ে আমি পাড়ব সে ফুল মনের আশে,
উত্তরীয় ছড়িয়ে তুমি দাড়িয়ে থেকো বনের পাশে।
যে ঘাটেতে ভ’রবে কলস গাঁয়ের বিভােগ পল্লীবালা,
সেই ঘাটেরি এক ধারেতে আসব রেখে ফুলের মালা।
দিঘীর জলে ঘট বুড়া’তে পথে-পাওয়া মাল্যখানি
কুড়িয়ে নিয়ে ভাববে ইহা রাখিয়া গেছে কেই না জানি।
চেনে-না-তার হাতের মালা হয়ত সেবা পরবে গলে,
আমরা দু’জন থাকব বসে ঢেউ-দোলা সেই দিঘীর কোলে।
চার পাশেতে বনের সারি এলিয়ে শাখার কুন্তল-ভার
দিঘীর জলে ঢেউ গণিবে ফুল শুকিবে পদ্ম-পাতার।
বনের মাঝে ডাকবে ডাহুক, ফিরবে ঘুঘু আপন বাসে,
দিনের পিদীম ঢুলবে ঘুমে রাত-জাগা কোন্ ফুলের বাসে।
চার ধারেতে বন জুড়িয়া রাতের আঁধার বাঁধবে বেড়া,
সেই কুহেলীর কালাে কারায় দিঘীর জলও পড়বে ঘেরা।
সেই আঁধারে পাখায় ধরে চামচিকারা উচ্চে উঠি,
দিকে এবং দিগন্তরে ছড়িয়ে দেবে মুঠি মুঠি।
তখন সেথা থাকবে না কেউ, সুদুর বনের গহন কোণে,
কানাকুয়া ডাক্বে শুধু পহরের পর পহর গণে।
সেই নিরালার বুকটি চিরে পল্লী দুলাল আমরা দুজন
পল্লীমায়ের রূপটি যে কি, করব মােরা তার অন্বেষণ।
পলাতক
সে এক কিশাের ছেলে-
মাের আঙিনায় এসেছিল হেসে রাঙা পায়ে রেখা মেলে।
সাদা সাদা মেঘ রােদে ভেসে যায় শারদ গগন-গায়,
তারি পরে যেন অফুট উষসী সিদূর ছড়ায়ে যায়।
এমনি মেঘের গুডােকরা ধুলি মাখা ছিল তার দেহে,
সে দেহ পড়িছে এলায়ে এলায়ে মায়া মমতায় স্নেহে।
এলাে মাের আঙিনায়
হাসিখানি তার গােলাপী ঠোটের মালায় বাঁধিয়া যায়।
সেই হাসি,যারে কৌটায় ভরি’ প্রথম রবির রেখা
পুবের গগনে উকি মেরে চায় মেঘে মেঘে আঁকি লেখা ।
সেই হাসি, যাহা গােপন রয়েছে অফুট কুঁড়ির ঘরে,
যে হাসি আজিও গড়ায়ে পড়িছে চাঁদের কলস ভরে।
কবে সে আসিল আজ মনে নেই, কখন যে হাসে ফুল,
কখন যে জাগে সন্ধ্যার তারা কে জানে তা নিভুল।
প্রভাতেরে দেখি, কখন যে আসে সন্ধান নাহি জানি,
তেমনি সে এলাে মাের আঙিনায়ু রাঙা পায়ে রেখা টানি।
৪৪
ধান খেত
আমার দেশের ধানের আঁচল যে হাওয়া দোলায়ে যায়,
সেই হাওয়া তারে ঘুম পাড়াইত স্বপন-পরীর গাঁয়।
পাখীরা তাহারে গান শুনাইত,-মেঘেরা আঁকিয়া ছবি
প্রভাতে ও সঁঝে বানাইত তারে বিভােল কিশাের কবি।
গাছের পাতায় বাতাস দুলিত, পেতে সে রহিত কান,
রাতে সে বসিয়া নিরালে শুনিত ঝিঝি পােকাদের গান।
ভাবিত সে বসি’, ভাবিত সে তার কিশাের কালের মনে
মাটি যেন তার বুকের বেদনা ছড়াইছে তারি সনে।
রাত্রের আঙিনায়
যত অপ্সরী নাচিয়া যাইত নূপুর জড়া’য়ে পায়।
তাহারা কখন কে নাচিবে এসে জানিত সে সন্ধান,
এরই মাঝে সে যে ভরে নিয়েছিল তাহার কিশাের প্রাণ ।
অতীত তাহার বল্কল-ঘেরা কুহেলি-কুহর খুলে
নিয়ে যেতাে তারে স্বপন-জড়ান রূপকথা-রাজপুরে।
সে দূর দেশের অজানা রাজার কিশাের কুমার আসি
তার সনে যেচে মিতালি করিত তারই মত মৃদু হাসি।
হাসিয়া আসিত রাজার কুমারী কনক-মেঘের না’য়
হাজার যুগের ঘুম-লেখা যার চোখে মুখে আর গায়।
আমার দেশের এই গাঁওখানি মাটির পাত্র ভরি,
লতারে সাজায়ে পাতারে সাজায়ে ফুলেরে প্রদীপ ধরি’ ;
পাখীর গানেতে মন্ত্র পড়িয়া পূজা দিত তারে নিতি,
কিশাের দেবতা সেই পূজাভারে মাখা’ত মনের প্রীতি ।
ধান খেত
৪৫
ফিরিত সে মাঠে রাখালের সনে, বিকা’য়ে সােনার হার
সাপলা-লতার মালা সইবারে পরাণ কাঁদিত তার।
রাখালের সনে ভাব সে করিত, ঢেলার দালান গড়ি
তাহাদের নিয়ে রাজা-রাজা খেলা করিত সে দিন ভরি।
রাখাল ছেলেরা মনের হরষে শামুকের মালা গাঁথি
কিশাের রাজার গলায় পরা’য়ে করিত খেলার সাথী ;
রাঙা মুখখানি রােদে পুড়ে যেত, তাহারা ব্যাকুল হয়ে
সারা গায়ে তার বাতাস করিত কুমড়ার পাতা ল’য়ে।
কাশের পাতায় চরণ কাটিত, কঁাধের গামছা চিরে’
দুটি রাঙা পা বেঁধে দিতে তারা ভাসিত নয়ন-নীরে।
তার পানে চেয়ে মাঠের চাষীরা ভুলিত খেতের কাজ,
ভাবিত সে কোন্ সােনার দেবতা ধরায় এসেছে আজ!
তাহাদের মাঠে মাসে মাসে সাজে শস্যের আলপনা,
আবছা-হলুদ লালচে-হলুদ হলুদে-জরদে-সােনা ;-
সাজে তৃণ-ভার ফুলে ও পত্রে গােলাপী-সবুজে মিশে,
আসমানী নীল মেঘলীয়া নীল তাহাতে হারায় দিশে।
সব রঙ যেন কাড়াকাড়ি করি’ এ ওর হইতে বড়
বাতাসে হেলিয়া তৃণ এলাইয়া করিতেছে নড়নড়।
তবু কোন্ রঙ সব চেয়ে সেরা ভাবিবার আছে ধারা-
সে যেথা দাড়ায় সেথাকার রঙ সব চেয়ে লাগে বাড়া;
.
ধান খেত
উপরে আকাশ, নীচেতে অথই শস্যের পারাবার,
চার ধারে গাঁও ঘুরিয়া ঘুরিয়া বলয় হয়েছে তার।
মাঝখানে তারি দাড়া’য়ে হাসিত তরুণ কিশাের ছেলে
দূর শূন্যের পথে উড়ে যেতে কনক-মেঘেরা খেলে।
সে দূর শূন্য কথা কয় নাক মাঠেরও নাহিক ভাষা,
তাতে ফুল ফোটে বরণে বরণে পাতায় পাতিয়া বাসা;-
সে যেন তাদেরি জীবন্ত ভাষা, তাহারই কথার সুরে
এ মূক মাঠের সকল কাহিনী ছন্দে ফিরিত ঘুরে।
চাষীরা ভাবিত তাহাদেরি কোন ফসলের পথ বেয়ে
মাঠের দেবতা এসেছে বুঝিবা শস্যের গান গেয়ে।
ফিরিত সে রাতে জোৎস্নার রথে ছায়াপথ-মেঘ ধরি’
দেবতারা তার গায়েতে মাখা’ত তারকার ফুলঝুরি।
পূর্ণ চাদের গায়েতে জড়ায়ে আবছা মেঘের দোলা,
অলস দেহটি আলসে এলায়ে ঘুমা’ত সে ঘুম-ভােলা।
রাতের শিশির চরণ ফেলিয়া তার চোখে আর মুখে
মণিমাণিকের খেলা জুড়ে দিত আপন মনের সুখে।
রাতজাগা পাখী শুনাইত তারে ঘুমপাড়ানিয়া গান,
চাদেরে জড়ায়ে ঘুমায়ে হাসিত তাহার বদন-চান।
প্রভাত-মেঘের রাঙা পথ বেয়ে আসিত কিশােরী মেয়ে,
বন-বিহগীর অধরে অধরে ঘুম-ভাঙা গান গেয়ে।
গােলাপী ঠোঁটের চুমু এঁকে দিত তাহার সারাটি গায়,
রাঙা মুখ তার আরাে রাঙা হু’ত রঙীন আলাের ঘায়।
ধান খেত ৪৭ ঘুম হ'তে সে যে জাগিয়া উঠিত, গায়ে নীহারের দাগ, তাহাতে আবার ঢেউ খেলে গেছে নয়া প্রভাতের রাগ। এমনি কিশাের-বেশে এসেছিল সেই সােনার কুমার মাের আঙিনায় হেসে। সেই একদিন,-ধূ-ধূ বালু ওড়ে জীবনের সাহারায়, শিশিরের ফোটা ভেসে এসেছিল বিন্দু মেঘের গায়। জীবনের এই অনন্ত ক্ষত সীমাহীন ক্রন্দন, তার মাঝে কেবা ভালে একেছিল এতটুকু চন্দন। কে এই আকাশে দোলাইয়া গেল একটি রঙীন ঘুড়ি, কোন্ দুরাশার লিখন লিখিয়া পাখী চলে গেল উড়ি। কোন্ মায়ালােকে ছায়াপথ-পারে, আলােকের অলােকায় কে আনিয়াছিল কি যাদুমন্ত্রে মাের আঙিনার ছায় ? আজি যতদিকে যতবার চাহি, যেন দূর-কত দূর, সে দূরেরাে কোন্ দূর দুরাশায় মিশে গেছে সেই সুর। আজি মনে হয়—শুধু মনে হয়-কতকাল—কতকাল কতকাল এসে কতকাল গেছে পাতি’ বরষের জাল, তারি এক-কালে এসেছিল সেই সােনার কিশাের ছেলে- আর এক-কালে চলিয়া গিয়াছে মাের পূজাভার ফেলে। আজি নগরের পাষাণ-কারায় কঁদিছে বন্দী প্রাণ- আর কি জীবনে পাবনাক’ সেই কিশােরের সন্ধান ?
৪ ধান খেত পাষাণ-প্রাচীর পাষাণে ঘিরেছে, কোনখানে নাহি কঁক, পাষাণবক্ষ ভেদিয়া ইহার বাহিরে যায় না ডাক। ডাকি উভয়—সােনার কিশাের, ফিরে আয়, আয়, আয়, সুর লেগে তার দিন-রজনীর খেয়া-নাও ভেসে যায়। পাষাণের সাথে মাথা কুটে কঁদি, নয়ন-নদীর জলে যে গেছে চলিয়া সে যেন হায় রে আরও দূরে যায় চলে। কে সেই কিশাের শুধাইছে সবে, বলিব কি আমি আজ ?- পাষাণের দেশে কঙ্কালসার রুক্ষ ভিখারী-সাজ- এই সে কিশাের! এ দেহের এই ভাঙা মন্দির-মাঝে এসেছিল সেই সােনার কুমার নব জীবনের সাজে! রে, না রে, এ যে মিথ্যা প্রলাপ, অজান-গাঁয়ের ছেলে পথ ভুলে, ওরে শুধু পথ ভুলে এসেছিল হেসে-খেলে। তারপর সে যে চলিয়া গিয়াছে আপন খেয়াল-ভরে, কোথায় গিয়াছে কোন্ দূর দেশে, কে দেবে বলিয়া মােরে ? হয়ত সে কোন শস্যের খেতে ঘুমায়ে রয়েছে আজ, হিজলের বনে ছড়ায়ে তাহার গায়ের রঙীন সাজ- হয়ত সে কোন বেগান-গাঁয়ের কৃষাণ ছেলের সনে বেথুল কুড়ায়ে ডুমকি বাজা’য়ে ফিরিছে বিজন বনে।
দিদারুল আলম স্মরণে
খেলা না ভাঙিতে খেলা ছেড়ে গেলি কার ডাক শুনে ভাই ?
এখনাে যে তাের পূবালীর ঠোটে রঙ-লেখা মুছে নাই!
আজো এই মাঠে বাঁশের বাঁশীতে বাজে যে মাঠের গান,
কালিন্দী-জল আজো দুলে উঠে শুনিয়া তাহার তান।
তমাল-শাখায় আজিও জড়ায় কিশােরী মেয়ের শাড়ী,
মেঠো বাঁশী শুনে আজো ঢেউ খেলে কঁখের কলসে তারি।
কারে অভিমান করিয়া বন্ধু ছেড়ি গেলি আমাদেরে,
এই ব্রজধামে আজো আসে নাই মথুরার দূত যে-রে।
কাঞ্চা বয়সে কে দিলরে তােরে আঙিয়ার শ্বেতবাস,
কোন্ দরবেশ তাের কাণে কাণে খুলিল মন্ত্রপাশ।
হায় মুসাফির, কে তােরে বাতা’ল গােরের কুহেলি পথ,
সেই একাকীয়া দূর দেশে তুই ছাড়িলি জীবন-রথ ।
অভিমানী ছেলে, কারে চেয়েছিলি? কারে তুই পাস্ নাই ?
কোন্ নিদাঘের নিঃশ্বাসে তাের ফুল শুকাইল ভাই ?
ওরে বুলবুল, যারে শুনাইতে বেঁধেছিলি তুই গান,
সে ফুল-বনের কাটা দিয়ে কেউ বিধেছিল তাের প্রাণ?
তাই ছেড়ে গেলি—হায় পলাতক, শূন্য পথের বাঁকে,
তাের গাঁথা গান আমাদের বুকে উভরিয়া আজ ডাকে।
আমাদের খেলা জমে না যে ভাই তাের সে আদর ছাড়া,
আজি মনে হয়, অমন করিয়া আদর জানে না কারা।
৭
ধান খেত
একদিন মােরা ভুলে যাব তােরে, এ মায়ার দেশ পরে,
কেউ কারাে স্মৃতি চিরদিন ভরি রাখিতে পারে না ধরে।
তাের দেশে ভাই হয়ত এমন মায়ার কুহক নাহি,
জীবনের গাঙে ঘটনার তরী যায় না এমন বাহি।
সেই দেশে তাই লিখে রাখিলাম আমাদের দিনগুলি,
এই খেলা-মাঠ, এই হাসি গান, সেথা নিয়ে যাব তুলি।
বােজ কেয়ামতে যদি দেখা হয়, তখন তােমারি বুকে
এদিনের কথা স্মরিয়া আমরা কাঁদিব মনের দুখে।
এই গাঁয়ে তুমি
রহিও গাে মেয়ে
এই গাঁয়ে তুমি ঘুমাইও মেয়ে, ফুল-কলিকার পাতে,
অলস দেহটি শােহাগে মেলিয়া স্বপন গাঁথিও রাতে।
বিদেশী বাতাস আঁচল নাড়িবে, অলক ছড়া’য়ে যাবে,
গায়েতে মাখিবে ফুলের সুবাস তুমি নাহি টের পাবে।
পহেলী ঊষার নয়া মেঘ ভাঙা সিদূর গুড়ার রাশি,
তােমার কোমল কমল-অধরে ছড়া’য়ে পড়িবে আসি।
তখন তুমিও মেলিও নয়ন, শিথিল বসনখানি,
ফুলের বাতাসে ধৌত করিয়া অঙ্গে লইও টানি।
নয়ন মুছিও পদ্মপাতায়, অঢেল কেয়ারে চিরে
রেণুগুলি তার সারাটি অঙ্গে মাখাইও ধীরে ধীরে।
উতলা পবন যদি বহে জোরে বাঁধিও না তবে চুল,
ও বদন-শশী অলকে ঢাকিলে হইও না নিভুল।
পথে যেতে যদি গাছের শাখায় আঁচল জড়াতে চায়,
হয় থামিও, সুদীর্ঘ দিন সমুখেতে দোল খায়।
যদি ডাকে পাখী বৌ কথা কও, তারে গাল নাহি দিও,
যদি পায়ে বাজে পায়ের নূপুর সে কথা কাণে না দিও।
অত শত ভাবা তােমারে কি সাজে, মিহি সুরে গান গেয়ে
তুমি চলে যেও আপনার মনে গেঁয়াে পথ খানি বেয়ে।
৫২
ধান খেত
এই গাঁয়ে তুমি রহিও গাে মেয়ে, এ গাঁয়ের তরুলতা
তােমার সারাটি অঙ্গে জড়াবে যার যত কোমলতা।
কচি সীম-লতা বাহুতে বাঁধিও, খোঁপায় দো-পাটি ফুল,
মাঠের কুসুম ছিড়িয়া ছিড়িয়া পরিও কানের দুল।
নরম ডানার ডালায় ধরিয়া দূর আকাশের গান,
পাখীরা নিতুই আসিবে তােমার ভরিতে ফুলের প্রাণ।
এই পথ দিয়ে চলিবে যখন শাল বীথিকার ছায়,
মৃদু ফুলরেণু ঝরিয়া পড়িবে তােমার সারাটি গায়।
এই গাঁয়ে তুমি রহিও গাে মেয়ে, গ্রাম দেবতার কাছে,
নীরবে কহিও ছােট মনে তব যত না বাসনা আছে।
দেউল তাহার যত না সাজিবে তব পূজা ফুল পেয়ে,
তােমার একটি প্রণামে সাজিবে শতগুণ তার চেয়ে।
রাতে পেঁয়াে ঘরে জ্বালাইও দীপ, ঘর-হারা পরবাসী
বন্ধুর পথে চলিতে চলিতে দেখিবে তাহার হাসি।
একা
কারে লয়ে আজ ঘরে ফিরে যাব
এই একা বালু চরে
উদাসী বাতাস ফিরিছে উড়াল
ধূলার আঁচল ধরে।
তুমি যদি আজ পঁাড়াতে আসিয়া
তব রাঙা মুখে রঙিন হাসিয়া,
সাঁঝের সিদূর নিতাম লুটিয়া
তােমার মুখেতে ধরে।
তুমি যদি আজ আসিতে এখানে,
দূরের উদাস ছায়া
তােমার দুইটি নয়নে মাখিয়া,
দেখিতাম তারি মায়া।
তােমার বাহুর সােণার সূতায়
বেঁধে রাখিতাম সাঝের ছায়ায়,
জল-লহরীর হেরিতাম দোলা
তােমার মাঝারে ধরে।
কারে আমি চাই
কারে আমি চাই, কার তরে আজি বারণ না মানে হিয়া,
কার তরে সখি ঘুমেরে না মানে নিদারুণ এ রাতিয়া !
এ জীবনে যারা কাছে এসেছিল, যারা এ গাঙের ধারে
আলােক-তরণী ক্ষণেক ভিড়ায়ে চলে গেল পারাপারে-
পাগল পরাণ মিছাই তাদের স্কুলের বাঁধন দিলি,
প্রতিদানে শুধু কূল-ভাঙা ব্যথা কোল ভরে সঞ্চিলি!
মাের ঘাটে এসে কবে ভিড়েছিল বিদেশী ভঁদের তরী,
মনে আশা ছিল, রেখে দেবাে তারে কঁখের কলসে ভরি।
মাটীর কলস জলে ভরে গেলাে, কালাে সে নদীর জলে,
আধা গাঙখানি আলােকে ভাসা’য়ে উঁদ হাসে কুতুহলে।
ভাবিয়াছিলাম, তাহারে বসা’য়ে আমার আঁখির ঘরে
কাজল-লতার বাঁধন বাঁধিয়া রাখিব হেথায় ধরে।
সে আঁখি যে সখি পূর্ণ হইল আমার চোখের জলে ;
কাজল-লতার বাঁধন টুটিল তারি কল-কল্লোলে।
ধান খেত
আমার দুয়ারে এসেছিল তারা এসেছিল ফুল, পাখী,
এসেছিল আর ফিরে চলে গেলাে মাের বুকে ব্যথা রাখি।
কেন এলো তারা। এলােই যদি, কেন চলে গেল, হায় !
কেন যারে-তারে হঠাৎ দেখিয়া এত ভালাে লেগে যায় ।
যারে ভাল লাগে, কি হয় তাহার মনের মতন হতে ।
এ সব কথার উত্তর কেউ দিতে পারাে কোনাে মতে।
বামুন বাড়ির মেয়ে
বামুন বাড়ীর মেয়ে
কঁচা রােদের বরণ ঝরে গা-খানি তার বেয়ে ;-
সে বােদ দেখা যায় যেমনি বনের পাতার ফাঁকে,
শিশু রবির টুকরাে আলাে ছড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে ;
তেমনি তাহার বসন বেয়ে, আঁচলখানি বেয়ে
যে পথ দিয়ে চলে সে পথ রূপে যে যায় নেয়ে।
এই গায়েতে আধলা পুকুর, পচা কাজল জল ;
বেঙের ছাতি তাহার বুকে ভাসছে অবিরল।
সেখানেতে পানার বহর বেঙের ছাতার সনে
চিরস্থায়ী ঘর বাঁধিয়া বাস করে নির্জনে।
তারির ফঁাকে বরষ বরষ জল-কুমুদের পরী,
চাদের আলাে মাখায় তাহার ফুলের কুটীর ভরি
সেই জলেরি ঢেউ বাঁধিয়া সূক্ষ্ম লতার সনে
কলমী কুসুম নিতুই সাজে নতুন বিয়ের কনে।
সেখানেতে পদ্ম পাতায় মেলিয়া পূজার ফুল,
কমলিনী পুকুর জলে ভাসায় জাতিকুল।
ধান খেত
৫৭
তেমনি এই সুদূর গাঁয়ে ম্যালেরিয়ার বাস,
ঝগড়া ফেসাদ কুসংস্কার ঘুরছে চারি পাশ।
এরির মধ্যে বাস করে এই বামুন বাড়ীর মেয়ে,
সবার সনে থেকেও সে যে একলা সবার চেয়ে।
ও যেন ঠিক কুমুদ কুসুম দীঘির পচা জল,
আজও তাহার পায়নি ছুতে পরাগ শতদল।
ও যেন ঠিক ঝুমকো লতা, জড়িয়ে গায়ের সব,
হাসছে উহার পাতায় পাতায় ফুলেরি উৎসব।
এই গাঁয়েতে বরষ বয়ষ আসেন মহামারি,
হাজার পরাণ ধূলায় লােটে চরণ ঘায়ে তারি।
আসে হেথায় বসন্ত আর কলেরা প্লেগ আদি,
ওই মেয়েটির প্রতি এদের কেউ নাহি হয় বাদী।
সে যেন গাঁর পূজার কুসুম, সকল অত্যাচার,
সাহস নাহি পায় ছুইতে চরণ দুটি তার।
;
আছে গাঁয়ের নারদ পিসী ক্ষান্ত মাসীর মাতা,
যাহার যত গােপন কিছু লিখছে ভরি খাতা।
আছে গাঁয়ের মােদাসে খ্যাংরামুখী বুড়ী ;
মুখে কথার বজ্ৰশিলা ফিরছে ছুড়ি ছুড়ি।
ওই মেয়েটীর জগৎ যেন তাদের হতে আর ;
কিম্বা তারা বুঝছে যে ও নাগাল পাওয়ার বার
৫
ধান খেত
ওই মেয়েটার চলন-চালন আর যে হাসি-খুসী,
কারাে হাসিখুসীর সনে হয়নি আজো দুষী।
এ গাঁয় প্রথম চঁদ আসিয়া ব’সে শিমুল ডালে,
সােণা হাসির মুঠি মুঠি ছড়ায় উহার গালে।
সন্ধ্যা বেলায় যে রঙ, ঝরে গাঁয়ের পুকুর জলে ;
সেও হয়ত ওরির পায়ে আলতা মাখার ছলে।
গাঁয়ের মাঝে বামুন বাড়ী সকল বাড়ীর সেরা ;
চার ধারে তার নানান বরণ ফুল-বাগিচার বেড়া।
পাতায় পাতায় ফুলের বাসা, ফুলের স্বপন মাঝে,
ফুলের চেয়েও ফুলেল সাজে বামুন বাড়ী রাজে।
তাদের ঘরে ঠাকুর আছে মন্ত্র পড়ি রােজ
তুলসী তামা গঙ্গা জলে দেয় যে পূজার ভোজ।
সেথায় জ্বলে হােমের আগুন, ঘন্টা কাঁসর বাজে,
তাহার মাঝে বামুন বাড়ীর পূজার ঠাকুর রাজে।
বামুন পাড়ার স্বপন যেন ধুপের ধোঁয়ায় হেসে,
পূজারতির মন্ত্র সনে বেড়ায় ভেসে ভেসে।
তারি পরে দাড়িয়ে যেন বামুন বাড়ীর মেয়ে,
হােমাগুনের গন্ধ ঝরে সারাটি গাও বেয়ে।
আজি পুষ্পের জনমের তিথি
আজি পুষ্পের জনমের তিথি, শিশির ঘুমা’য়ে রয়,
ঘুমা’য়ে ঘুমা’য়ে স্বপনের ঘােরে চঁাদ সনে কথা কয় ।
ভােরের বাতাস পাতায় পাতায় সাবধানে পদ রাখি,
চলিছে উদাস অফুট কুঁড়িরে মিহি সুরে ডাকি ডাকি।
অতি সাবধানে চলেছে সে পথে, যেন তারি পদ ঘায়
নীহারের লেখা নাহি মুছে যায় পাতার কোমল গায়।
যেন না জাগিতে ভােরের কুসুম পাখীরা না ওঠে জাগি,
চলেছে বাতাস—তভারের বাতাস সাবধানে তারি লাগি'।
আজি পুষ্পের জনমের তিথি, চঁদ চলিয়াছে রথে,
দূর গগনের মায়া মেঘময় ছায়াপথ-ঘেরা পথে।
আসে নববধূ বরণ ডালায় সিদূর কৌটা ধরি,
চরণে চরণে গগন-পথেরে দলিয়া রঙীন করি।
৬
ধান খেত
আবীর-সাগরে দিক হারাইল শুক তারকার তরী,
আলােক-কুমার ছেড়ে বাঁকা তীর আধেক ধরণী ভরি।
শুক বঁধু তার সারীরে ডাকিছে, কুসুমের আগমনী
আকাশে বাতাসে ছড়া’তে হইবে দিয়ে কণ্ঠের ধ্বনি।
আজি পুষ্পের জনমের তিথি, ভােরের পুবাল বায়
অফুট রবির কিরণ ফুটিছে অফুট কুঁড়ির গায়।
জাগে বন পথে কানন-কুমারী ফুলের কৌটা খুলি',
বাতাসে বাতাসে ছড়াইয়া দিছে গন্ধের মিহি ধূলি।
বন-অপ্সরী খেলিতেছে দোল কাননের শাখে শাখে,
বরণে বরণ ঘুরিয়া ঘুরিয়া গায়েতে গন্ধ মাখে।
পুরাণ পুকুর
পুরাণ পুকুর, তব তীরে বসি কত কথা ভাবি সই,
খেজুরের গােড়ে বাঁধা ছােট ঘাট, করে জল থই থই ;
রাত না পােহা’তে গাঁয়ের বধুরা কলসীর কলরবে,
ঘুম হ’তে তােমা জাগাইয়া দিত প্রভাতের উৎসবে।
সারাদিন ধরি ঘড়ায় ঘড়ায় তােমার অমৃতরাশি,
বধূদের কঁখে ঢলিয়া ঢলিয়া ঘরে ঘরে যেত হাসি।
‘বদনায়’ ভরা এতটুকু, তারি ভরসায় পেঁয়াে-চাষী,
চৈত্র-রাদেরে করুণ করিয়া বাজা’ত গানের বাঁশি।
মাঠ হতে তারা জ্বলিয়া পুড়িয়া আসিত তােমার তীরে,
খেজুর পাতায় সােনালি চামর দোলাতে তাদের শিরে।
শান্ত হইয়া গামছা ভিজায়ে তােমার কাজল-জলে,
নাহিয়া মাহিয়া সাধ মিটিতনা—আবার নাহিবে বলে।
এইখানে বসি পল্লী-বধুরা আধেক ঘােমটা খুলি,
তােমার মুকুরে মুখখানি হেরে জল-ভরা যেত ভুলি।
সখিতে সখিতে কাঁধে কাধ ধরি খেলিত যে জল-খেলা,
সারাটা গাঁয়ের যত রূপ আছে তব বুকে হ’ত মেলা।
৬২
ধান খেত
পুকুরের জল ‘উথলি পাথালি’ ভাসিত তাদের হাসি,
ফুলে ফুল লাগি ফুলেরা যেমন ভেঙ্গে হয় রাশি রাশি।
আজি মনে পড়ে পুরাণ পুকুর, মায়ের আঁচল ধ'রে
একটি ছেলের ঝাপাঝাপি খেলা তােমার বুকের পরে।
ওই এত জলে সাপলার ফুল,-তারি ছিল এত লােভ,
তাই তুলিবারে জলে ডুবিলেও মনে নাহি ছিল ক্ষোভ।
আজিকে তােমার কোথায় সে জল ? কোথা সেই বাঁধা ঘাট।
পেঁয়াে বধূদের খাড়ুতে মুখর কোথা সে পুকুর বাঁট ?
চারি ধারে তব বন-জঙ্গল পাতায় পাতায় ঢাকা,
নিকষ-রাতের আঁধার যেন গাে তুলিতে রয়েছে আঁকা!
ডুকরিয়া কঁদে ডাহুক ডাহুকী তরু-মৰ্ম্মর-স্বনে,
তারি সাথে বুঝি উঠিছে শিহরি যত ব্যথা তব মনে!
হিজল গাছের মালা হ’তে আজি খসিয়া রঙিন ফুল,
সাঁঝের মতন দিতেছে ব্যথিয়া তােমার চরণ মূল।
সন্ধ্যা-সকালে আসিত যাহারা কলসী লইয়া ঘাটে,
তারা সবে আজি বিদায় নিয়েছে মরণ-পারের হাটে।
বক্ষ-মুকুরে সােনা মুখখানি দেখিবারে কেহ নাই,
কচুরীপানায় আধ বুক খানি ঢাকিয়া রেখেছ তাই।
ঘুচাও ঘুচাও মৌন তড়াগ, বুকের আরসী খানি,
মাের বাল্যের যত ভুলে কথা সারা গায়ে দাও টানি।
সেই ছেলেবেলা স্বপ্নের মত কত স্নেহ-ভরা মুখ
এনে দাও, শুধু বারেক দেখিয়া ভরে লই সারা বুক।
ধান খেত
এনে দাও সেই তব তীরে বসি মেঠো রাখালের বাঁশী,
স্বপনের ভেলা দুলা’য়ে দুলা’য়ে আকাশেতে যা ভাসি।
হায়রে, সেদিন আসেনা ফিরিয়া। শুধু ভিজে আঁখি পাতা,
পুরানাে স্বপন কুড়ায়ে কুড়ায়ে আকাশেতে জাল পাতা!
তুমিও স্বজনী আমারি মতন না জানি কঁাদিছ কত,
ছােট ঢেউ গুলি নাড়িয়া নাড়িয়া পাড়েরে করিছ ক্ষত।
বনদেবী আজ সমবেদনায় আঁচল বিছায়ে জলে,
ব্যথাতুরা তব সারা বুক খানি ঢেকেছ কলমী দলে।
চৌধুরীদের রথ
চৌধুরীদের রথ
ডান ধারে তার ধুলায় ধূসর তালমা হাটের পথ।
চামচিকে আর আরগুলারা নির্ভাবনায় বসি,
করছে নানান কল-কোলাহল রথের মাঝে পশি।
বাদুড় সেথা ঝুলছে সুখে, বাহির জগৎখানি,
অনেক দিনই ত্যাগ করেছে তাদের জানাজানি ,
গড়র বীরের মাথায় বসি পাকুড় গাছের চারা,
মেলছে শিকড়, তবু ঠাকুর দেয়নি কোন সাড়া।
কাঠের ঘােড়ার ঠ্যাং ভেঙ্গেছে, খসছে রথের ছাদ,
আজো তবু কেউ করেনি ইহার প্রতিবাদ ।
রাস্তা দিয়ে নানান রকম লােকের চলাচল ;
নানান রকম আলাপ-বিলাপ, নানান কোলাহল।
কেউ বা চাষী, কেউ বা ধনী, পরদেশী, কেউ দেশী,
ভাবে তারা সবার চেয়ে কাজের কথাই বেশী।
কেউ বা ভাবে মকদ্দমায় হারিয়ে দিয়ে কার
বসত-বাড়ী করবে নিলাম বাঁশ-গাড়ীতে তার ।
ধান খেত
কেউ বা ভাবে, কি কৌশলে মেলি কথার জাল,
এক-আনিতে আবে টেনে ছ’পয়সার মাল।
যতই কেন ব্যস্ত থাকুক, যতই কাজের তাড়া;
হেথায় এলে সব ভুলে চায় রথের পানে তারা।
চাক-ভাঙা আর বয়স-মলিন চৌধুরীদের রথ,
তাদের পানে করুণ চেয়ে সুধায় যেন পথ ;-
সুধায় যেন, সেই অতীতের চৌধুরীদের কে,
ছুতাের ডেকে রঙিণ এ রথ গড়ল পুলকে।
আল গাঁয়ের বৃদ্ধ প’টো, রঙিণ তুলির সনে,
রেখায় রেখায় বাঁধল সে কোন্ সােনার স্বপনে।
রথের চূড়ায় উড়ল ধ্বজা, গায়ের ছেলে-মেয়ে,
চলতে পথে থাকত খানিক রথের পানে চেয়ে।
তার পরে সেই রথের দিনে, হাজার লােকের মেলা
দোকান-পসার, ভােজবাজী আর ভানুমতীর খেলা ;
আত গাঁয়ের বৌ-ঝিরা সব, আস্ত ছেলে-মেয়ে,
রঙিণ হাসির দুলত লহর রঙিণ কাপড় ছেয়ে।
বুড়াে মাসীর স্কন্ধে উঠে ছােট্ট শিশু ছেলে ;
এই রথেরি ঠাকুরটিরে দেখত আঁখি মেলে।
গাঁর বধূরা ভালের সিদূর মেলে পথের পরে,
সরল বুকের আঁকৃত পুজা এই ঠাকুরের তরে।
ধান খেত
আঁচল তাদের জড়িয়ে ধরে ছােট শিশুর দল,
তালের পাতায় বাজিয়ে বাঁশী করত কোলাহল।
দৌড়ের নাও ভাত গাঙে, রঙিন নিশান লয়ে,
গলুই ভরি জ্বলত পিতল নবরতণ হয়ে।
তাহার গলে পরিয়ে দিত রঙিন সােলার-মালা,
এমনি মত হাজার নায়ে গাঙটি হত আলা।
সেই নায়েতে বাছ খেলা’ত গাঁয়ের যত চাষী ;
বৈঠা পরে বৈঠা হাঁকি চলত তারা ভাসি।
তারি তালে গাইত তারা ভাটির সুরে গান,
শুনে নদী উথল পাথল, ঢেউ ভেঙে খান খান।
কৌতূহলী দাড়িয়ে তীরে হাজার নর-নারী,
হাতে তাদের দুলত মালা গলায় দিতে তারি ;-
যাহার তরী সব তীরে পেরিয়ে যাবে আগে,
তারে তারা করবে বরণ মনের অনুরাগে।
সে-সব আজি কোথায় গেল, চৌধুরীদের রথ,
আজো যেন শুধায় সবে তাদের চলা-পথ।
চাকাগুলাে ভেঙেছে তার, উই ধরেছে কাঠে,
কোন্ অভিযােগ বক্ষে লয়ে সময় তাহার কাটে।
ছবিগুলাে যাচ্চে মুছে, ভাঙা কদম ডাল,
ত্যাগ করিয়া পালিয়ে গেছে নিঠুর বংশীয়াল।
তলায় বসে একলা রাধা কাপছে পুলকে,
জানতে আজো পায়নি তাহার বন্ধু নিল কে।
মাঠের পথে চলছে ধেনুঃবিরাম নাহি হায়,
রাখাল কবে পাও ভেঙেছে, কেউ না ফিরে চায়।
ধান খেত
৬৭
দল বাঁধিয়া চলছে কোথাও গাঁয়ের ছেলে-মেয়ে,
মৃদঙ্গ আর ঢােল বাজায়ে, বাঁশীতে গান গেয়ে।
হয়ত কোন পরব গাঁয়ের করবে সমাপন,
হাজার বরষ আগেই তাহার করছে আয়ােজন।
কারাে কাধের ঢােল ভেঙেছে, কাহারাে একতারা,
দলপতি যে নেইক সাথে টের পায়নি তারা।
এমনি কালের কঠোর ঘায়ে দিনের পরে দিন,
এ সব ছবির একখানিরও থাকবে নাক চিন।
এর সাথে সেই গাঁয়ের পােটো,-তাহার কথাও সবে,
ভুলে যাবে অজানা কোন্ দিনের মহােৎসবে।
কোন্ সে অতীত আঁধার সাগর, তাহার পারে বসি,
একেছিল সােণার স্বপন বরণ ঘষি ঘষি।
হয়ত তারি গাঁয়ের যত নর নারীর দল,
মনে তাহার ফুটিয়েছিল স্বপন শতদল ;
তারি একটি সােণার কলি আলােক-তরীর প্রায়,
সপ্ত সাগর পার হইয়া ভিড়ছে রথের গায়।
আজ হয়ত অনাদরেই অনেক অভিমানে,
চলছে ফিরে প্রদীপ-তরী সেই অতীতের পানে,
সেখানে সেই বৃদ্ধ পােটো বনস্পতির প্রায়,
হাজার শাখা এলিয়ে বায়ে ঢুলছে নিরালায়।
চাক-ভাঙা আর বয়স-মলিন চৌধুরীদের রথ,
আজো যেন চক্ষু মুদে খুজছে তাদের পথ।
বনের লতায় গা ছেয়েছে, গাছের শাখা তারে,
জড়িয়ে ধরে এ সব কথা শুনছে বারে বারে।
তুমি আমাদের কবি
তুমি আমাদের কবি,
খুব বড় কবি হয়ত তুমি বা, যতটা বড়রে
ধারণা করিতে পারিনে আমরা সবি।
আকাশের তারা, আকাশের চাদ, যতটা উচুতে
আমরা কি কেউ সেথায় যাইতে পারি ?
কত দূরে আছে—আমাদের কেউ তত দূর পথ
দেয়নিক কভু পাড়ী।
;
আমরা আকাশে ঘুড়ী উড়াইয়া সূতে ছেড়ে দেই,
উচু হ’তে আরাে উচুতে সে ধায় ;
-আরাে দূরে যায় ; তারপর যবে
লাটা’য়ের সূততা সব হয়ে যায় শেষ,
তখনাে সে ঘুড়ী ছুইতে পারে না যতটা উচুতে
তারা ও চঁাদের দেশ।
বালুচর হতে পাখী উড়ে যায়
লাল-নীল-সাদা নানান রঙের পাখী,
বালুর চরের কৃষাণী মেয়ের খুব ধরে ধরে সরু হাতে আঁকা
ছবিগুলাে যেন পাখার উপরে রাখি।
ধান খেত
বহু দূরে যায়, আকাশের মেঘ-শীতের কুয়াসা,
তাও ছাড়াইয়া চলে যায় তারা দূরে ;
শূন্যের পথে যত মিঠে গান ছড়াতে ছড়া’তে উড়ে যায় তারা,
তবু নাহি পারে পরশ করিতে চঁাদ ও তারার পুরে।
আমাদের কাছে আকাশের তারা ছােট ছােট ফুল,
ঘােট ঘােট যেন দীপ ;
অত দূরে চাঁদ, তবু তারে লয়ে পরি যে আমরা
কপালে চঁাদের টীপ।
শ
খুব বড় কবি হয়ত তুমি বা, আকাশের তারা আকাশের চাঁদ
হয়ত তুমি বা তাদেরই আপন কেহ ;
যতটা দূরেরে আমরা কেহই ধারণা করিনে
ততটা দূরেই হয়ত তােমার গেহ।
হয়ত চঁাদের খাটেতে ঘুমাও, শিশু তারাগুলি
তােমার সারাটি গায় ;
মণি-মাণিকের চূর্ণ ছড়া’য়ে খেলা করে তারা উড়াল পূবাল বায়।
হয়ত পাখীর পাখায় রঙিণ সােনার তরণী ভাসাইয়া নীল জলে ;
মনের খেয়ালে গান গেয়ে যাওযত দূর খুসী
তত দূরে যাও চলে।
এসব আমরা পারিনে বুঝিতে ভুল করে তাই আমাদের মাঝে
তােমারে ডাকিয়া আনি,
তুমি যেন কবি আমাদেরি কেহ মাঝে মাঝে তাই
তােমারে লইয়া করি মাের টানাটানি।
ধান খেত
তুমি কথা কও বাতাসের সনে আকাশের সনে
আর মেঘেদের সনে ;
দিগন্ত পথে রামধনু সাজে সাতনরি হারে
তােমার বিয়ের কনে।
আলাের দেশের কচি শিশু তুমি! ছায়া সনে খেলা করি,
বেন কোথা যাও ওগাে পথ-ভােলা
দিন-রজনীর দুইখানি পাখা ধরি।
আমরা কি এর বুঝি অত শত
আমরা মাটীর জীব,
মাটীর ঘরেতে খেলা করি মােরা
গড়িয়া মাটীর শিব।
তেমনি তােমারে ডাকিয়া আমরা যে কথা কহিব
সে সব কথা ত তােমার যােগ্য নয়,
কথার দেশেতে রাজ্য গড়িয়া কথার মাণিক ল’য়ে যে খেলায়
তার মত কথা কোথাও যে নাহি হয়।
তবু তুমি কবি--আমাদের কবি
আর আমাদের কথা,
—সে যে আমাদেরি—সেই গৌরবে তাই দিয়ে আজ
তােমার গলায় পরাই স্নেহের লতা।
তুমি আস নাই—এমন দিনেতে
আমাদের গেহে আসিত আলাে ও ছায়া,
আসিত আকাশ, আসিত বাতাস, সেদিনও তাহারা
গায়ে মাখে নাই তােমার চোখের মায়া।
৭১
ধান খেত
আকাশে আসিত নব নব মেঘ তড়িৎ-লেখায়
লিখিয়া কণক চিঠি,
দূর একাকীয়া শূন্যের পথে খুজিত মােদের দিঠি ;
সেদিন আমরা চিনিনি তাদের,
আমাদের যেন বুঝিবার অগােচরে ;
সমবেদনায়, স্নেহ ও মায়ায় আমাদের বুক
দিয়ে যেত তারা ভ’রে।
উপরে যুগ
যুগের
কেটে গেছে, শরৎ এসেছে
শেফালী ফুলেতে ভরিয়া আঁচলখানি ;
দিঘী-তড়াগের কাক-চোখ জলে সাপলার ফুলে
রেখেছে চরণখানি।
বর্ষা এসেছে কেতকী পাতায় সাজায়ে ফুলের তরী,
ঘন বন-ছায়ে নীপ কেশরের অফুট বেদনা স্মরি ;
আমরা ঘরের কপাট আঁটিয়া কত ফঁাক তার
বন্ধ করিতে ছিলাম ব্যস্ত যবে,
তারি একদিনে তুমি এলে কবি
ফুল ফোটানর দোলানর উৎসবে।
সেদিন হইতে দুয়ার খুলিল, দিগন্ত-ঘেরা বাহিরের ওই
সুনীল আকাশখানি;
তােমার গানের সুরের সূতায়
আমাদের ঘরে আনিলাম তারে টানি।
৭২
ধান খেত
বর্ষারে মােরা বন্ধু পাই বাদল রাতের
মেঘেতে মেলিয়া বুক,
কতবার মােরা খুলিয়া খুলিয়া দেখেছি মনের দুখ।
শরতের মেঘে পাল তুলে দিয়ে
সিদুর কুড়া’য়ে ছুটেছি সঁঝের দেশে,
দখিন হাওয়ায় দোলা দিয়ে মােরা
ফুল বিছায়েছি বন-রূপসীর কেশে।
সেদিন হইতে আকাশ হইল মােদের বসত বাড়ী,
ছয় ঋতু এসে বরণ ছড়ায় নাচিয়া নূপুর নাড়ি।
তুমি এসে কবি গান ছেড়ে দিলে, সে গানের সুরে
মানিলাম বিস্ময়,
আমাদের যত ছােট সুখ-দুখ তব ছোঁয়া পেয়ে
তাহাও এমন হয় !
দারা-সুত আর পরিজন লয়ে ভবের মঞ্চে
নাচিয়া কুঁদিয়া কঁদিয়া যাহারা করে দিত একাকার,
তাহাদের মাঝে খুলে দিলে তুমি স্বর্গের এক দ্বার।
আমাদের গেহে আসে মায়াপরী নবীন শিশুর বেশে,
যেথায় যাহারে যত ভালবাসি, সেই ভালবাসা
অলকায় যায় ভেসে।
এত বড় আর এত ছােট কথা কোথা পেলে তুমি
কোন্ সে যাদুর বলে,
আমাদের তুমি এত ভাল করে
দেখাতে পারিলে ছন্দের শতদলে ।
ধান খেত ৭৩ সুরের দুলাল, চলিয়াছ তুমি আপনার মনে গাহি', দূর বন্ধুর তব সুর-পথ বড় একাকীয়া সেথায় তােমার হয়ত দোসর নাহি। অজানা পথিক গ্রহের মতন চলেছ কক্ষ-পথে, দেশ হতে দেশে টানে মহাকাল রঞ্জু বাঁধিয়া তােমার কণক রথে। আমাদের মত কত দেশে তুমি রাখিয়া এসেছ গানের চরণ চিন্, হয়ত আরাে বা কত দেশে যাবে বাজাতে বাজাতে তােমার মরম-বীণ। তব চলা পথ দূর-বহু দূর- সীমা নাহি শেষ নাহি, যত চল তুমি তত তৃষা বাড়ে দূরন্ত যেন কঁদিছে তােমারে চাহি। সেই চলা-পথে চলিতে চলিতে হয়ত পথের ভুলে, আমাদের গ্রহে খনেক দাড়ায়ে দু’হাতে ছড়ালে কথায় কথার ফুলে। হে সুর-বিহগ, খনেক দাড়াও, বারেক ফিরিয়া চাহ আমাদের পানে হের তব সুর নদী বেয়ে আজ অলকানন্দা ছুটেছে বিপুল বানে। দিনেরে লুকায়ে রাতেরে লুকায়ে রঙিণ ঠোটের সুতায় গাঁথিয়া, যে কথার মালা বধূরা মােদের পরাইয়া দেয় গলে ।
৭৪
ধান খেত
তুমি ত জান না তব গান হ’তে সেই সব কথা,
খুব চুপি-চুপি কখন এসেছে চলে ।
লাজুক বধুর সিদূর কৌটা ভরিয়া গিয়াছে
কানে-কানে শােনা যে কথার লয়ে পুজি,
তােমার ঘরে যে সিদ কেটে মােরা
সেই সব কথা চুরি করিয়াছি
এ সব কি তুমি দেখিয়াছ কভু খুজি ?
আমাদের সুখে আমাদের দুখে ব্যথার জোয়ার জলে,
-তুমি জান কবি—সেই পথ দিয়ে
তােমার সুরের খেয়া-তরীখানি চলে।
দুঃখের রাতে কত যে কেঁদেছি
তােমার গানের সুরে সুরে বুক ফঁাড়ি,
শিয়রে প্রদীপ নিবিয়াছে তবু
তুমি যাও নাই ছাড়ি।
দরদী বন্ধু ! জানি মাের জানি তুমি বড় কবি
যতটা বড়রে ধারণা করিতে পারিনে আমরা কেহ,
তােমারে বলিতে আপনার জন সমান বয়সী
আজি উথলিছে সকল বুকের স্নেহ।
তুমি আমাদের, তােমার দুয়ারে
মাটীর প্রদীপ রাখি,
আজি সাধ যায় সব বুক ভরি
তােমারে আমরা আমাদের বলি ডাকি।
ধান খেত
হে দূর বিহগ, জানি মােরা জানি
তােমারে ডাকিছে তৃষ্ণার মায়াপরী,
তুমি একদিন আমাদের গ্রহ ছেড়ে চলে যাবে
আর গ্রহপথ ধরি।
তবু এই গ্রহে তােমারে আমরা বাঁচা’য়ে রাখিব
বহু বহু কাল ধরে,
তব গানগুলি অনাগত যুগে
দিয়ে যাব মােরা মােদের বংশধরে।
আর ব’লে যাব এ গানের জালে আমাদের কাল
ঘিরিয়া সুরের সনে,
যুগ হতে যুগে পাঠাইছে বসি
এক কবি নির্জনে।
তারি হাতে লেখা মােদের কালের
রঙিণ এ চিঠি পাছে
নিজে মহাকাল পড়িয়া শুনাবে
-আসা যুগের ভাই-বােনেদের কাছে।
প্রদীপ-তরণী ভাসিয়া চলিল
আজিকার নদী জলে
কাল হ’তে কালে যুগ হ’তে যুগে
আমরাও যাব এরি সাথে সাথে চলে।
ফুপুমাৰ কৰে
এইখানে সেই ছােট মেয়েটীরে দিয়েছিল তারা বিয়ে,
জীবন প্রভাতে ব্যাথার মুকুট মাথায় পরায়ে দিয়ে।
শুনাে পথপানে চাহিয়া থাকিত আসে যদি বাপ ভাই,
পেঁয়াে পথিকেরা পথ দিয়ে গেলে চমকি উঠিত তাই।
ভিখারীরে দিয়ে দুই মুঠো চাল কয়ে দিত কানে কানে,
“মায়ের আগেতে খবর কহিও বড় ব্যথা মাের জানে।
‘ডালিম-গাইছ’ বাড়ী আমাদের, পূর্ব-দুয়ারী ঘর,
কলার পাতার দোলায় চামর তাহার মাথার পর।
কাল রাত্তিরে স্বপন দেখেছি রােগে ভুগিতেছে মা-
তালতলী গাঁয়ে দেখে আয় তারে, ভিখারীরে তুই যা।”
স্বামী ছিল তার বদ্ধ পাগল, এ পাড়া ও পাড় ফিরি,
গল্প করিয়া সময় কাটাত না ছিল কাজের ছিরি।
রাগাইলে তারে নিস্তার নাই রক্তচক্ষু করি,
হাঁক ডাকে তার এক নিমিষেই সারা গ্রাম যেত ভরি
এমনি স্বামীরে লইয়া
বেঁধেছিল সুখ-হার,
রাজার কুমার ছেলে হয়েছিল মেয়ে গুটী তিন চার।
পঁচা পুকুরের ঘােলা জলে নেয়ে মাটীর কলস খানি,
পদ্মের বনে ঢেউদিয়ে যবে কক্ষে লইত টানি,
জল-কমলের সঙ্গে যে হত থল-কমলের দেখা
দলের লক্ষ্মী হাসিত যে তাহা স্থল-লক্ষ্মীয়রা শেখা।
ধান খেত
=
পঙ্করাণীরে কেউ দেখি না দেখিত যদি গাে কেহ,
বেণু লতাগুলি সােহগে জড়ায় তাহার পাতার গেহ,
তারিতলে জ্বলে মেটো দ্বীপখানি মশা ওড়ে দলে দলে,
সমুখে ঘুমায় গেহের লক্ষ্মী হাতে মুখে ফুল জ্বলে ;--
এপাশে ছেলেটী, ওপাশে মেয়েরা যেন খােদা বহুরূপী,
বিরলে লিখিয়া ভেস্তের ছবি দেখিতেন চুপি চুপি।
হায় মহাকাল কঠোর কৃপাণ কঠিণ চরণ ঘায়,
দলিয়াছ সেই সােণা মন্দির পথের ধূলার গায়।
সেকি তা জানিত, ছেলে-ধরা কোন মৃত্যু-ধূসর বুড়ী
একে একে তার বাছাগুলি হায় নিয়ে যাবে করি চুরি।
আমরা তাহারে দেখেছি যখন জীর্ণ শীর্ণ দেহ
পেঁয়াে লক্ষ্মীর ভাঙ্গাবুক ঢাকে ভেঙ্গে-পড়া কুঁড়ে গেহ।
ছেলের মেয়ের শােকে তাপে তার আন-জীবনের ভার,
বহিতে বহিতে ভাটিয়া এসেছে মরণ নদীর পার ।
আমার বাপের গলাটী ধরিয়া কঁদিত পাগল-পারা,
শাখায় শাখায় দেখা হত যেন গেড়ে এক ডাল যারা।
স্নেহের দুখান বাহু আগলিয়া বাঁধিয়া লইত মােরে,
কারে কারে আমি কত ভালবাসি শুধাইত তারপরে।
ভাবিতাম কোন ভেস্তের দেবী এই বন-পেঁয়াে ঘরে,
এত যে দরদ কেন বুকে ওর এই অভাগার তরে।
সেবার শুনিনু বৈশাখ মাসে তিন দিনে কোন্ জ্বরে,
সেই দরদিয়া ঢলিয়া পড়েছে কবর নিঝুম ঘরে।
২৮
ধান খেত
তারপর গেছে বহু দিন কাটি দুনিয়ায় নানা ঘােরে,
কত ব্যথা আর কত কঁদা আছে কে পারে রাখিতে ধরে
বহুদিন পরে আসিয়াছি আজ তাহার এ বুনাে বাড়ী-
বড় সকরুণ ঘুঘুরা ডাকিছে খেজুরের পাতা নাড়ি।
কবরে তাহার আবরণ দেছে ঝরা তেঁতুলের পাতা,
ঘুমলী মেয়েরে চাদরে ঢেকেছে যেন আদরিণী মাতা।
তারি স্নেহ যেন পাইতেছি আমি এই বুননা তরু-ছায়ে,
ঠাণ্ডা হাওয়ায় তাহারি পরশ পুলকি উঠিছে গায়ে।
ভূতের ভয়েতে এই পথে যেতে সরেনা কাহার কথা,
রাত্রে কে নাকি আগুণ জ্বালায় মাথায় জড়ায়ে কঁাথা ।
আমিও দেখেছি সারাদিন সেয়ে, উউ উউ করে কাঁদে,
শিথীল বাকল তেঁতুল পাতায় বাতাস দোলার নাদ।
রাত্রি বেলায় এই একা বনে জোনাকী-উজল রথে,
ছেলে মেয়েগুলি বক্ষে আগলি কেঁদে যায় পথে পথে।
‘ফুপুমা, ফুপুমা, বিদায়বিদায়-বেলা বেড়ে গেল যাই,
এই পেঁয়াে ঘরে যত ব্যথা তব ভুলি নাই ভুলি নাই।
কাটা ধানের বিদায়
আমি যাইরে আমি যাই ;
মঞ্জরী মাের কেঁদে ঝরে যায় ;
বেলা নাই—বেলা নাই।
চৈত্রদিনের ধূসর ধূলায়
উড়ে এসেছিনু দখিন হাওয়ায় ;
কৃষাণের স্নেহে ছেয়েছিনু হায়
সবুজেতে সব ঠাই ;
বেলা নাই-বেলা নাই।
ধরার মায়ের আদুরে দুলাল
মােরা নাচিতাম মাঠে,
মােদের মায়ায় পথিকের চলা
থেমে যেত সেয়াে বটে।
বরষার জলে গা খানি এলিয়ে
সবুজ আঁচল দিতাম ভাসিয়ে,
সাপলার ফুল কুড়িয়ে কুড়িয়ে
খেলিয়াছি ভাই ভাই,
যাইরে—আমি যাই।
শরতের কোন উতল হাওয়ায়
অন্তর গেল খুলে ;
সােণালী আলাের যত মায়া ছিল
ভরিলাম ফুলে ফুলে।
৮০
ধান খেত
সহসা দুলিতে কি দেখিনু হায়
পায়ের ঝাজর কার বেজে যায়
সারা মাঠ ভরি কে গান শুনায়
বেলা নাই বেলা নাই;
যাইরে—আমি যাই।
জানি জানি সই কলমী বন্ধুরা
কত যে কঁদিবি তাের,
ওই বুক হ’তে সিদুর শুখায়ে
কঁদাবে সকল ধরা ;
যে মালীকা তােরা পরালি আদরে
ফেলে যেতে হ’ল শূননবালু চরে
এ ব্যথারে মােরা ভুলিব কি ক'রে,
ভেবে যে বাঁচিনে তাই ;
যাইরে—আমি যাই ।
মটর শুটীরা বিদায়-বিদায়-
বেলা নাই বেলা নাই,
রহিল এ মাঠ তােমরা ইহারে
সবুজে সাজিও ভাই;
পরে কানে কানে হিলের দুল
শরীর দোলা করে দিও ভুল,
রাতে বালি রাঙা জোনাকির ফুল
হাসাইও সব ঠাই,
যাইরে—আমি যাই।
No text on this page.
No text on this page.
ধান খেত
bos
কবি-পরিচিতি
জসীম উদ্দীনের কবিতার ভাব ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরণের। প্রকৃত
কবির হৃদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে যাদের লিখিবার ক্ষমতা নেই
এমনতর খাটি জিনিষ তারা লিখিতে পারে না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
William B. Fraking, Inc,
Transcontinental Lecture Tours,
New York
The oth August, 1930
Dear Mr. Jasim Uuddin,
My friend Mr. Suresh Banerjee sent me two of your books which
I have read with great pleasure.
Your power to continue a creative impulse is immense. Instead
of a small canvas the pictures that you draw are large and incisive.
In short, you are a poet of the first rank. There are few who can
equal you ( in any country ) in the world. As for a superior, outside
of D' Anunzio, you have none. But then, he is old and you are
young. Given the time that you need to catch up with him I see no
reason why you should not be the greatest poet in the world in fifteen
years' time. In that time you will be forly five, precisely the prime
of D'Anunzio.
I am proud, and grateful to you for writing in our divine Bengali
than which there is no subtler living language in the world.
Yours Faithfully,
Sd/- Dhan Gopal Mukherjee,
৮২ ধান খেত নক্সী কাঁথার মাঠ শ্ৰীযুক্ত দীনেশ্চন্দ্র সেন ডি-লিটু ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাবে বাঙ্গালা ভাষার শ্রী উন্টিয়া গিয়াছে। যেমন আজকাল দুধে ভেজাল, ঘিয়ে ভেজাল, মধুতে ভেজাল, মেঠাই ভেজাল, তেমনই এখন সাহিত্যেও ভেজালের ছড়াছড়ি। এমন যে তিলােত্তমা, তাতেও না কি রেবেকার ভেজাল আছে। উৰ্বশী পড়িতে পড়িতে হঠাৎ এপিপসাইকিডিয়ান মনে পড়িয়া যায়। ইংরেজী সাহিত্য-ইংরেজী সমাজ আমাদের বাঙ্গালা সাহিত্য ও বাঙ্গাল। সমাজের গায়ে যে দাগ দিয়া যাইতেছে, তাহা বড় স্পষ্ট এবং সময়ে সময়ে কলঙ্ক স্বরূপ। কিন্তু আমরা বৃদ্ধ হইয়াছি। বাঙ্গালা পল্লীর ঐ আমরা একবার দেখিয়াছিলাম,-বাঙ্গালী সাধ্বীর মাথায় বড় সিন্দুরের টিপটি দেখিয়াছিলাম, -নববিবাহিতা কিশােরীর কঁাকণ ও নূপুরের রুনুঝুনু শুনিয়াছিলাম,-শুভ্র রজনীগন্ধার ন্যায় শ্বেতবসনা বিধবার হােমাগ্নির মত উজ্জল ব্রহ্মচর্য দেখিয়া- ছিলাম সেই পল্লীর স্বর্ণ-শ্রী—যাহাতে বাঙ্গালীর ঘরকন্না ঝলমল করিত, তাহা আর যেন তেমন ভাবে দেখিতে পাই না। বিদেশের আমদানী বাহিরের চাকচিক্যপূর্ণ নানা অনুকৃতি প্রাণহীন খেলনার মত মনে হয়, এখন এসব আর চোখে লাগে না। পল্লীর তরুণ তরুর ছায়া ও শ্যামল দুৰ্ব। এখন সহরের প্রাসাদ হইতে ভাল লাগে। এ দেশকে কেহ ঐশ্বৰ্য্য দিয়া দীর্ঘকাল ভুলাইয়া রাখিতে পারিবে না,-এ যে মাধুর্যের দেশ। তাই আজ জসীমউদ্দিনের নক্সী কাঁথার মাঠ” কাব্যখানি পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছি। এ যেন সেই পুরাতন পল্লীকে ফিরিয়া পাইলাম,—সেই পল্লীর পথ-ঘাট—এ যেন কত চেনা-হৃদয়ের দরদ দিয়া আঁকা। পাড়াগাঁয়ের মেয়ের দুটি ডাগর চোখ, পল্লীরাখালের চোখজুড়ানাে কাল রূপ মুসলমান লেঠেলদের মারামারি—বাঙ্গালার বিবাহ-বাসর, গিন্নীর ঘরকন্না—এই সকল দৃশ্যে বুক জুড়াইয়া গেল। এই পল্লী-দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ছিল—এখনও হয়ত কিছু কিছু আছে। কিন্তু এ সকল হারাইয়া ফেলিয়াছিলাম। এই হারানাে জিনিষ নূতন পাওয়ার যে আনন্দ, কবি জসীমউদ্দিন তাহা আমাদিগকে দিয়াছেন। ইনি তরুণবয়স্ক তরুণবয়স্ক কিন্তু বীরবিক্রম। ইনি কবিতারাজ্যে যে পাঠশালা খুলিলেন, তাহা ইহার নিজের আবিষ্কার। জানিনা সহরে থাকিয়া কবি তাহার এই সবুজ প্রাণ, বঙ্গজীবনের অতুলনীয় গ্রাম্যসম্পদ-ঘরকন্নার এই সাঁঝের ভােগ হারাইয়া ফেলিবেন কি না।
ধান খেত সর্বগ্রাসী সহরের মায়াজাল কাটাইয়া পল্লীর অনাবিল ভাব ও স্ফুর্তি বজায় রাখা বড় শক্ত। আমরা কাব্যখানির একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে চেষ্টা করিব। ১৪টি ছােট ছােট দৃশ্যপটে এই কাব্যচিত্র সম্পূর্ণ। প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র অঙ্কে বাঙ্গলার কুটারগুলির এক একটি দৃশ্য উদঘাটিত হইয়াছে। উহা যেমনই পূর্ণ, তেমনই কবিত্বময়। এই কবিত্ব সংস্কৃত বা ইংরেজী হইতে ধার করা নহে। কবি একজন গ্রাজুয়েট, ইচ্ছা করিলে সেরূপ ধার পাইতেন, কিন্তু তিনি সর্বদা তাঁহার অপরিণােধনীয় পল্লীমাতৃকার ঋণ শােধ দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন,-কাহারও কাছে দান পাওয়ার জন্য হাত বাড়ান নাই। প্রথমাঙ্কের বর্ণনীয় বিষয়,-একটি মাঠ দিয়া বিভক্ত করা দুইটি পাশাপাশি গ্রাম; সেই মাঠটিই কালে “নক্সী কাঁথার মাঠ” নামে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিল। দুইটি গ্রাম দুইটি ভ্রাতার মত জড়াজড়ি করিয়া আছে-ইহাদের মধ্যে ভাব ও অসম্ভাব—কিছুরই অভাব নাই; “ও-গাঁর বধু ঘট ভরিতে যে ঢেউ জলে লাগে, কখন্ কখন্ দোলা তাহার এ গায় এসেও লাগে। এ-গাঁ’র চাষী নিঘুম রাতে বাঁশের বাঁশীর সুরে ওই না গাঁয়ের মেয়ের সাথে গহন বাথায় ঝুরে। এ-গাঁও হতে ভাটীর সুরে কাঁদে যখন গান, ও-গাঁর মেয়ে বেড়ার ফঁাকে রয় সে পেতে কান। এ-গাঁও ও-গাঁয় মেশামেশি কেবল সুরে সুরে, অনেক কাজে এরা ওরা অনেকখানি দূরে।” এই ভাবের বিনিময় সত্ত্বেও সময়ে সময়ে সুরটা বেসুরাে হইয়া বাজে । “এ-গাঁর ললাকে করতে পরখ, ও-গাঁর লােকের বল। অনেক বারই লাল করেছে জলী-বীলের জল। দ্বিতীয় অঙ্কে কাব্য-নায়ক কিশাের-রূপার চিত্র। রূপা চাষার ছেলে তাহার বর্ণটি কালাে। এই কালো রূপে সে সমস্ত গ্রামটি আলাে করিয়া রাখিয়াছে। মুসলমান কবির চোখে এই কালাে রংটি সকল রংএর সেরা এখানে ইনি বৈষ্ণব কবির মত :- } ।
৮৪ ধান খেত কালােয় যে জন আলাে বানায়, ভুলায় সবার মন, তারির পদরজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন।” রূপা শুধু কালাে রং ও কিশাের মূর্তি দিয়া সেই গ্রামটি মুগ্ধ করে নাই, “আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী, খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি। জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে, “শাল সুন্দী বেত” যেন ও, সকল কাজেই লাগে।” তৃতীয় অঙ্কে নায়িকা সাজুর কথা। কবি বলিতেছেন, এই রূপসী কিশােরী ‘তুলসীতলার প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা।” সে যেন “দেবদেউলের ধূপ”; কিন্তু মন্দিরের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাইয়াও তিনি মুসলমানের গৃহের আদিনার কথা ভুলিয়া যান নাই - সাজুর সম্বন্ধে লিখিয়াছেন, “লাল মােরগের পাখার মত ওড়ে তাহার শাড়ী”। সাজু হাঁড়ির উপর নানারূপ সুন্দর চিত্র আঁকিতে জানে, সিকায় ফুল তুলিতে তাহার হাত অতি নিপুণ। “বিয়ের গানে ওরই সুরে সবারই সুর কাদে ; সাজু গাঁয়ের লক্ষ্মী মেয়ে বলে কি লােক সাধে ?” ইহার পরে কয়েক অঙ্কে শ্যামল কিশাের নায়ক ও কিশােরী গৌরী সাজুর প্রেমের লুকাচুরি খেলা -এখানে যৌবনের উদ্দাম ঘূর্তি, করম্পর্শে অঙ্গে বিদ্যুৎ বয়ে যাওয়া, রূপের ফাদে প্রেমিককে পাড়িয়া ফেলিয়া তাহার জীবনমরণ সমস্যার সৃষ্টি করা—এ সকল দুরন্ত অভিনয়ের কিছুই নাই। কিশাের-কিশােরী এখানে আদতেই খেলােয়াড় নহে—ইহারা ভালবাসার পাঠ নূতন শিখিতেছে। সাজু মেঘের পূজার মাঙন চাহিতে চলিয়াছে- সঙ্গে চার জন খেলার সাথী। রূপার মা তাহাদিগকে একসের ধান দিলেন। কিন্তু হঠাৎ সাজুকে দেখিয়া পরম উদ্যমে রূপা আসিয়া বলিল -“এই দিলে মা থাকবে না আর মান,” এবং আরও পাঁচসের দিয়া তরুণ হৃদয়ের অনুরাগের উৎসাহ ও আবেগ দেখাইল। রূপা বাস কাটিতে গিয়াছে, সেখানে আবার সাজুকে দেখিতে পাইল;-প্রাণে পুলক, তাহা ঢাকিতে পারিতেছে না, দেখিবার ইচ্ছা প্রবল কিন্তু লজ্জায় সাহস করিয়া চক্ষু মেলিতে পারিতেছে না -কিশাের বয়সের এই সপ্রতিভ লাজুকতার চিত্র কবি এমন নিপুণ তুলিতে ;
ধান খেত আঁকিয়াছেন-তাহার সমালােচনার চেষ্টা বৃথা মনে হয়—কেবল বলিতে ইচ্ছা করে “কি সুন্দর।” সাজুর মা রূপাকে আদর করিয়া খাওয়াইতেছেন- রূপা যাহা খায় তাহাই প্রশংসা করিতেছে—সেই প্রশংসা শুনিয়া সাজুর মুখ লজ্জায় রাঙ্গা হইয়া উঠিতেছে—কারণ সেই ত রান্না করিয়াছে। তার পরে শত ছলে ও ছুতােয় রূপা কতবার সাজুদের বাড়ীতে যাইতেছে। সেই সকল ছলনা প্রায় ধরা পড়িয়া যাইতেছে। একদিন সে হঠাৎ তথায় উপস্থিত হওয়াতে সাজুর মা জিজ্ঞাসা করিল—“অসময়ে এসেছ কেন বাবা?” সে বলিল “খালা মা, তােমার জ্বর হয়েছে শুনেছি, তাই তােমার খাবার জন্য আধ সের গজা কিনে এনেছি।” “কই, আমার তাে আর হয়নি। আর জ্বর হলে কি গজা খায় কেউ? সাজুর মাএর উক্তিতে বালকের অসতর্ক চাতুরী ধরা পড়িয়া গেল, সে লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া রহিল। এরূপ লুকোচুরি খেলা অনেক আছে “এমনি করিয়া দিনে দিন যেতে দুইটি তরুণ, এ উহারে নিল বরণ করিয়া বিনি-সুতি মালা দিয়া।” কিন্তু এবার দুইজনেই কিশাের বয়সের সীমা অতিক্রম করিয়া যৌবনের অকুল সমুদ্রে পড়িয়াছে। তখন যাহা সরল ও অনাবিল ছিল—তাহা জটিল সমস্যায় দাড়াইল। কৈশােরের উচ্ছল লীলাখেলা সংযমের বাধা মানিয়া চলিল—তথাপি বেলফুলের ন্যায় অতি নিৰ্মল দুইটি প্রাণের কথা লইয়া দুষ্ট প্রতিবেশীরা নির্মম ভাবে টানা-হেঁচড়া করিতে ছাড়িল না ;—তাহারা কলঙ্ক রটাইতে সুরু করিল, অকর্মা সংবাদবাহী বুড়দের গ্রাম্য অবসর পূরণের বেশ একটা সুযােগ জুটিয়া গেল। “টুনীর ফুপু আসিল হাতে ডলতে তামাক পাতা, এমন সময় ওই গা হতে আসিল খেদির মাতা ; ক’জনকে আর থামিয়ে রাখে ?”—এই অযাচিত নিন্দা ও উপদেশে সন্ত্রস্ত হইয়া রূপার মা তাঁহার ছেলের সঙ্গে সাজুর বিবাহ স্থির করিয়া পাড়া-পড়শীর শাণিত জিহ্বা ভােলা করিয়া দিলেন। এই বিবাহের ঘটকালী হইতে বাসর রজনীর শেষ পৰ্য্যন্ত কবি যে দৃশ্যপট আঁকিয়াছেন, তাহা বঙ্গীয় কৃষকগৃহের একখানি নিখুৎ সামাজিক চিত্র। দুখাই ঘটক বিবাহের প্রস্তাব লইয়া সাজুর মায়ের কাছে যাইতেছে; কবি লিখিতেছেন :- ;
৮৬ ধান খেত “দুখাই ঘটক নেচে চলে, নাচে তাহার দাড়ী, বুড়াে বটের শিকড় যেন চলছে নাড়ি নাড়ি। ধানের জমি বায় ফেলিয়াডাইনে ঘন পাট, জলী-বিলে নাও বাহিয়া ধরল গাঁয়ের বাট।” বিবাহের আসরের বর্ণনা খুব একটা জমকালাে রকমের-- “বিয়ের কুটুম এসেছে আজ সাজুর মায়ের বাড়ী, কাছারী ঘর গুমগুমামলােক হয়েছে ভারি। গগায়ালঘরে ঝেড়ে পুছে বিছান দিল পাতি", বসল গায়ের মােল্লা-মােড়ল গল্পগানে মাতি'। পড়ে কেতাব গাঁয়ের মােড়ল নাচিয়ে ঘন দাড়ী, পড়ে কেতাব গাঁয়ের মােল্লা মাঠ-ফাটা ডাক ছাড়ি'।” তারপরে মিঞারা কত কেচ্ছা শুনাইয়া সমবেত লােকদের মন-হরণ করিতেছেন,-হানিফের কথা, জয়গুণ বিবির কথা শুনিয়া লােকেরা মাতিয়া গিয়াছে,-হানিফের যুদ্ধ-বর্ণনায় খুব বাহাদুরী “কাতার কাতার সৈন্য কাটে যেন কলার বাগ, মেষের পালে পড়েছে যেন সুন্দর-বনি বাঘ।” এদিকে আবার “উঠান’পরে হল্লা করে পাড়ার ছেলে-মেয়ে, রঙীন বসন উড়ছে তাদের নধর তনু ছেয়ে।” পরের অঙ্কে রূপা ও সাজুর গৃহস্থালী। এইখানে বাঙ্গালী চাষী-জীবনের সুখ-দুঃখ ও জীবনের মূল সূত্ৰটী অতি স্পষ্ট রেখায় আঁকা হইয়াছে। আমরা দেখিতেছি সাজু স্বামীর পায়ের টিপ, পরিয়া কত আল্লাদে অবিশ্রান্ত গৃহকর্ম করিতেছে ; অর্ধরাত্ৰি পৰ্যন্ত ধানের মলন চলিতেছে-নবীনা “কৃষাণী “ঢেকির পাড়তে মুখর করিছে একেলা সারাটি বাড়ী।” কোন কোন দিন হেমন্তের জ্যোৎস্নায় সাজু “ঘুমিয়া পড়িছে ঝাড়িতে ধান।” সারাদিনের শ্রান্তির পর দম্পতির সুখ শয়ন। এক রাত্রির কথা এইরূপ :- “সেদিন রাত্রে বাঁশী শুনে শুনে বউটি ঘুমিয়ে পড়ে, তারি রাঙা মুখে বাঁশী-সুরে রূপা বাঁকা এনে ধরে। তার পর খুলে চুলের বেণীটি বার বার করে দেখে, বাহুখানি দেখে নাড়িয়া নাড়িয়া বুকের কাছেতে রেখে। কুসুম ফুলেতে রাঙা পাওদু’টি দেখে আরাে রাঙা করি, মৃদু তালে তালে নিস লয়, শুনে মুখে মুখ ধরি। ভাবে রূপাও যে দেহ ভরি’ যেন এনেছে তােরের ফুল, রােদ উঠিলেই শুকাইয়া যাবে, শুধু নিমিষের ভুল।” একাদশ অঙ্কে জমি লইয়া দাঙ্গা-হাঙ্গামা । রূপা চাষার ছেলে- কিন্তু বাঙ্গালী সন্তান—তার প্রাণের প্রেম ও হাতের লাঠি উভয়ই অতুলনীয়, • ধান খেত ৮৭ তাহার হাতে বাঁশের বাঁশী ও বাঁশের লাঠি এ দুইই অনিবাৰ্য-একদিকে সে ফুল-সম মৃদু মৃদু হিল্লোলে প্রেমের গান গাহিতেছে, অপরদিকে ঝগড়ার স্থলে সে দুর্দান্ত পশুর মত। দুই দলে বিবাদ বাধিয়াছে—তরুণ রূপ। এক দলের নেতা। মত্তহস্তী যেরূপ শতদলের বেষ্টনী হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া অনায়াসে চলিয়া যায়, রূপা এক মুহূর্তে সাজুর কোমল আলিঙ্গন হইতে নিজকে বিমুক্ত করিয়া নিৰ্মম উৎসাহে রণভূমির দিকে চলিয়াছে - “আলী আলী আলী আলী রূপার যেন কণ্ঠ ফাটি ইস্রাফিলের শিঙ্গা বাজে, কাঁপছে আকাশ, কাঁপছে মাটি। তারি সুরে সব লাঠেলে লাঠির’ পরে হাল লাঠি, আলী আলী শব্দে তাদের আকাশ যেন ভাঙবে ফাটি। আগে আগে ছুটল রূপা, বোঁ ৰেী বোঁ সড়কি ঘােরে, কাল সাপের ফণার মত বাবড়ী-মাথার চুল যে ওড়ে। চলল পাছে হাজার লাঠেল আলী আলী শব্দ করি, পায়ের ঘায়ে মাঠের ধুলাে আকাশ বুঝি ফেলবে ভরি। চল্ল তারা মাঠ পেরিয়ে, চল তারা বিল ডিঙিয়ে কখন ছুটে, কখন হেঁটে বুকে বুকে তাল ঠকিয়ে। চল যেমন ঝড়ের দাপে ধােলা মেঘের দল ছুটে যায়, বাওকুড়ানীর মতন তারা উড়িয়ে ধুলি পথ ভরি’ হায়।” বর্ণনাগুলি এরূপ জীবন্ত, মনে হয় যেন আমরা রণক্ষেত্রের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছি এবং দুই দলের উন্মত্ত বীরমূর্তি প্রত্যক্ষ করিতেছি। রূপা খুনের দায়ে পড়িয়া পুলিশের হাত হইতে নিস্তার পাওয়ার জন্য পলাইয়া গিয়াছে- “ঘরের মেঝেতে সপটি ফেলায়ে বিছায়ে নক্সী কাঁথা, সিলাই করিতে বসিল যে সাজু একটু নােয়ায়ে মাথা। পাতায় পাতায় খসখস করে, শুনে কান খাড়া করে, যারে চায় সেত আসে নাক শুধু ভুল করে করে মরে। তবু যদি পাতা খানিক না নড়ে ভাল লাগে নাক তার, আলাে হাতে লয়ে দুর পানে চায়, বার বার খুলে দ্বার।” ইহা গ্রাম্য ভাষায় জয়দেবের “পততি পত্রে, বিগলিত পত্রের অনুবাদ। সেই রাত্রে যখন আকাশের গায় শুকতারা ডুবু ডুবু শেষ রজনীর চাপা নিশ্বাস অতি ধীরে বাঙ্গালার কুটীরে বহিতেছে, চোখে পলক নাই, সাজু বসিয়া আছে। এমন সময় রূপা চোরের মতন ঘরে ঢুকিল। সুন্দরী গৃহিণীকে সিঃসহায় ভাবে ঘরে একেলা ফেলিয়া যাইতে যে মর্মান্তিক কষ্ট তাহ অতি অল্প কথায় রূপা ব্যক্ত করিতেছে। রূপার মা মারা গিয়াছেন, সাজু সেই শূন্য ঘর একলাটি কিরূপে আগলাইয়া থাকিবে ? আজ শেষ ৮ ধান খেত আর দেখা হইবে না-এই আলিঙ্গন শেষ আলিঙ্গন! রূপা অকূলে ঝাপ দিবে। সাজুর কণ্ঠ জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রু-চক্ষে বলিল - “মাকড়ের আঁশে হস্তী যে বাধে পাথর ভাসায় জলে তােমায় আজিকে সঁপিয়া দিলাম তাহার চরণ-তলে।” “মাের কথা যদি মনে পড়ে সখি, যদি কোন ব্যথা লাগে, দুটি কালাে চোখ সাজাইয়া নিও কাল কাজলের রাগে। সিন্দুরখানি পরিও ললাটে-মােরে যদি পড়ে মনে, রাঙা সাড়ীখানি পরিয়া সজনি চাহিও আরশী-কোণে। মাের কথা যদি মনে পড়ে সখি যতনে ৰাখিও চুল, আলসে হেলিয়া থােপায় বাঁধিও মাঠের কলমী ফুল। আর যদি সখি মােরে ভালবাস, মাের তরে লাগে মায়া, মাের তরে কেঁদে ক্ষয় করিও না অমন সােনার কায়া! ইহার পর শেষাঙ্ক। কত বৎসর ধরিয়া সাজু একখানি কঁাথার উপর গৃহসন্নিহিত মাঠটির ছবি নকসা করিয়া সূতায় বুনট করিতেছিল। যেদিন এই নক্সী কাঁথা সেলাই করিতে আরম্ভ করে, তখন :- “স্বামী ব’সে তার বাঁশী বাজায়েছে-শেলাই করছে সে যে, গুন্ গুন করে গান কভু রাঙা ঠোটেতে উঠেছে বেজে।” এই কতা তৈরী করার সঙ্গে তাহার কত মধুর স্মৃতি জড়িত। সে-সকল দিন চলিয়া গিয়াছে। এবার কোমল হস্তে সে নক্সার শেষ রেখাটি টানিল -“খুব ধরে ধরে আঁকিল সে সাজু রূপার বিদায়-ছবি, খানিক যাইয়া ফিরে ফিরে আসা-আঁকিল সে তার সবি।” কথা আঁকার পালা। এবার শেষ ; কঁাথাখানি মেলিয়া সাজু নিজের বিছানার উপর ছড়াইয়া দিল—সেই শয্যাই তাহার মৃত্যুশয্যা; যখন চিরনিদ্রার ভরে চোখদুটি মুদিয়া আসিতে লাগিল, তখন সে পার্শ্ববর্তিনী সােনা-মাকে বলিল - “সােনা-মা আমার, সত্যিই যদি তােরে দিয়া যাই ফঁাকি” “এই কথখানি বিছাইয়া দিও আমার কবর 'পরে ভােরের শিশির কঁদিয়া কাঁদিয়া এরি বুকে যাবে ঝরে। সে যদি আবার ফিরে আসে কভু, তার নয়নের জল, জানি জানি মাের কবরের মাটি ভিজাইবে অবিরল। হয় ত আমার কবরের ঘুম ভেঙে যাবে মাগাে তাতে, হয় ত তাহারে কাঁদাইয়া আমি জাগিব অনেক রাতে। একথা সে মাগাে কেমনে সহিবে, বল তারে ভাল করে। তার আঁখিজল ফেলে যেন এই নক্সী কাথার 'পরে।”
ধান খেত ৮৯ সাজুর মৃত্যু পর বহুদিন চলিয়া গিয়াছে—রূপাকে গ্রামের সকলে ভুলিয়া গিয়াছে । “বহুদিন পরে গায়ের লােকেতে গভীর রাতের কালে শুনিল কে যেন বাজাইছে বাঁশী বেদনার তালে তালে। প্রভাতে সকলে আসিয়া দেখিল সেই কবরের গায় মােগাের একটী বিদেশী মরিয়া রয়েছে হায়! সারা গায়ে তার জড়িয়ে রয়েছে সেই সে নক্সী কাঁথা। আজ ও গাঁ’র লােকে বাশী বাজাইয়া গায় এ করুণ গাথা। নকশী কাঁথার মাঠে এমন অনেক কথা আছে, যাহা বাঙ্গলার আর কোন কবি এভাবে লিখিতে পারিতেন কি না সন্দেহ। গ্রামের মেয়েরা মেঘকে আবাহন করিতেছে—এই সকল মেঘ যে কত রূপে, কত লীলায় আকাশে বিচরণ করে, তাহা এদেশের কৃষকের লাঙ্গল ঘাড়ে ফেলিয়া উৰ্দ্ধমুখে লক্ষ্য করিয়া তাহাদের নামকরণ করিয়া দিয়াছে, পল্লীবালিকারা তাহাই আবৃত্তি করে। শিক্ষিত পাঠক পুষ্কর, আবৰ্ত্ত প্রভৃতি মেঘের ‘ভুবনবিদিত’ নাম অবশ্য জানেন, কালিদাসের কৃপায় তাহা মুখস্থ আছে; কিন্তু বাঙ্গলার চাষীরা মেঘকে আদর করিয়া যে কত নাম দিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। বালিকারা মেঘদর্শনে উল্লসিত হইয়া মেঘগুলিকে নাম ধরিয়া আহ্বান পূৰ্ব্বক স্তবস্তুতি করিতেছে - ‘কালো মেঘা নামাে, নামাে, ‘ফুল তােলা মেঘ নামে, ‘ধুলট মেঘা’ ‘তুলট মেঘা’, তােমরা সবে নামে! ‘কানা মেঘা টল মল বার মেবার ভাই, আরাে ‘ফুটিক’ চলক দিলে চীনার ভাত খাই। ‘কাজল মেঘা নামাে নামাে, চোখের কাজল দিয়া তােমার ভালে টপ আঁকিব মােদের হ'লে বিয়া। ‘আড়িয়া মেঘা’ ‘হাড়িয়া মেঘা’ ‘কুড়িয়া মেঘা’র নাতি, নাকের নলক বেচিয়া দিব তােমার মাথার ছাতি। কৌটা-ভরা সিন্দুর দিব ‘সিন্দুর মেঘা’র গায়, আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়।”
ধান খেত গ্রামের মুসলমান মেয়েরা এখনও বােধ হয় এই ভাবের একটা ছড়া গাহিয়া থাকে—কবি তাহা আধুনিক ছন্দে সাজাইয়াছেন। বাঙ্গলাদেশে বাঁশের যত প্রকার শ্রেণীভেদ আছে—তাহারও একটা তালিকা পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু ইহাকে বােধ হয় তালিকা বলা ঠিক হইবে না,-নীরস শুষ্ক কথাগুলি কবির হাতে পড়িয়া বেশ কাব্যময় ও সুন্দর হইয়া উঠিয়াছে। নক্সী কাথার মাঠের কবি দেশের পুরাতন রত্ন-ভাণ্ডারকে নূতন ভাবে করিয়াছেন, সঙ্গে সঙ্গে অনাগত রাজ্যের বার্তা বহিয়া আনিয়াছেন। ‘রাখালী’ নামক কাব্যে ইহার প্রতিভার যে পরিচয় পাইয়াছিলাম, নসী কঁাথার মাঠে তাহার পূর্ণ বিকাশ দেখিতে পাইতেছি। বহুদিন হইল শরৎচন্দ্রের বিশ্ববিশ্রুত প্রতিভার পরিচয় পাইয়া আমি ভারতবর্ষে তাহার প্রথম অভিনন্দন জানাইয়াছিলাম, আজ নক্সী কাঁথার মাঠের কবিকেও আমি কিঞ্চিৎ দ্বিধার সহিত সম্বর্ধনা জানাইতেছি। বাঙ্গলা সাহিত্যে কাব্যের পাঠ একরূপ উঠিয়া গিয়াছে। কণিকাতে রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছিলেন, একটা মহাকাব্য রচনার তঁাহার সাধ ছিল, কিন্তু তাহার মৰ্ম্মের কথা শত সুরে বাজিয়া উঠিল এবং মহাকাব্যের স্থান গীতকবিতা অধিকার করিয়া বসিল। কবি হয় ত ইহা পরিহাস করিয়াই বলিয়াছিলেন, কিন্তু কবির এই উক্তির পর বাঙ্গলার উদীয়মান কবির কবিতায় উপাখ্যান রচনা ছাড়িয়া দিলেন। রবীন্দ্রনাথের কথা ও কাহিনীর ধরণে মাঝে মাঝে ছােট ছােট কাব্যোপাখ্যান পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু অধুনা কাব্যের বাজার বড় মন্দা। জসীম উদ্দিনের এই বইখানি ছেটে লইলেও ইহা একখানি কাব্য, ইহার উপাদান বাঙ্গালীর চিরাভ্যস্ত গীতকবিতার কতকগুলি সুর ও ছন্দ, কিন্তু নানা সুর একত্র করিয়া একটা বড় রাগিণী সৃষ্টি করার শিল্প-শক্তি ইহার আছে। নানা কুসুমের মালার মত খণ্ড কবিতাগুলিকে একটা অখণ্ড রূপ দেওয়ার বিলক্ষণ শক্তি ইনি দেখাইয়াছেন; ইহাতে মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের ক্ষমতা ও প্রচুর সৌন্দর্যের সমাবেশ দেখা যায়। অবনীন্দ্র বাবু এই কাব্যের ভূমিকায় কতকটা দ্বিধার সঙ্গে পুস্তকখানি প্রশংসা করিয়াছেন, সেই দ্বিধার ভাব আমারও আছে, যেহেতু এক সময় যাহা বলিতাম ও লিখিতাম তাহার উপর আমার প্রচুর আস্থা ছিল, কিন্তু এখন প্রতিক্ষণে মনে হয়, বাঙ্গলার নব আশা আকাঙ্ক্ষাদৃপ্ত তরুণের নৃতন জগৎ ঠিক আমার কথায় সায় নাও দিতে পারেন, হয় ত যে যুগ আসিয়াছে, আমরা তাহার পশ্চাতে পড়িয়া গেছি। তরুণের সঙ্গে প্রাচীনের পা ফেলিয়া সমান তালে তবে আমি আমার মনের কথা লিখিয়াছি—মনের শৈশব নাই, যৌবন ও বার্ধক্য নাই। মনের কথা বলিলে তাহার সম-মর্মী শ্রোতা হয় ত জুটিয়া যাইতে পারে। বিচিত্রা, বৈশাখ, ১৩৩৯। শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন ৩ ধান খেত ৯১ রাখালী কবিতার বই। জসীম উদ্দিন প্রণীত। মূল্য এক টাকা। ৬২ পৃষ্ঠা। নবীন কবিদের মধ্যে এই কবিটির রচনা কিছুকাল হইতে লক্ষ্য করিতেছি। ইহার সম্বন্ধে সুহৃদর ডাঃ সুনীতিকুমারের সহিতও সেদিন আলােচনা হইতেছিল। সুনীতিও আমাকে ইহার রচনাগুলি লক্ষ্য করিতে বলিতেছিল। গত দুই বৎসরে কল্লোল পত্রিকায় শ্রীমানের যে কবিতাগুলি প্রকাশিত হইয়াছে সেগুলি আমি পড়িয়াছিলাম। তাহাতে শ্ৰীমানের অঙ্কুরিত কবিশক্তির পরিচয় পাইয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি। এই পুস্তকখানিতে কল্লোলে প্রকাশিত ছয়টি কবিতা ছাড়া আরও কয়েকটি কবিতা আছে। ‘কবর’ কবিতাটি--Matric Selection এ আগেই পড়িয়াছি। আগামী বৎসর পরীক্ষার্থীদিগকে কবিতাটি পড়াইতেও হইবে। বঙ্গসাহিত্যে Pastoral Songs লেখার জন্য কবি কুমুদরঞ্জনের খ্যাতি আছে। কবি কুমুদরঞ্জন রাঢ়দেশের লােক। রাঢ়দেশের রীতি-প্রকৃতি ও পল্লীজীবনটি কুমুদরঞ্জনের কবিতায় বেশ ফুটিয়াছে। জসীমউদ্দিনও Pastoral Poems লিখিয়াছেন-রাখালিয়া সুরে। পুস্তকের নামও রাখালী। জসীম- উদ্দিন যে দেশের পল্লীপ্রকৃতির আব হাওয়ায় ও পল্লীসমাজে বাল্য কিশাের যাপন করিয়াছেন, সে দেশ ভৌগােলিক হিসাবে বাংলাদেশ হইলেও রাঢ় দেশ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। দেবমাতৃক রাঢ়-দেশের নরনারীর জীবন ও প্রকৃতির লীলা-বৈচিত্র্য নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গ হইতে রীতিমত বিভিন্ন। জসীমউদ্দিনের রাখালিয়া গান পূর্ববঙ্গের নদীর চড়া হইতে ভাসিয়া আসিয়াছে। তাই ইহা বঙ্গসাহিত্যের অভিনব সম্পদ। তারপর যতীন্দ্রমােহন ও কুমুদরঞ্জন বঙ্গের পল্লীপ্রকৃতিকে দেখিয়াছেন হিন্দুর চোখে। শ্ৰীমান জসীমউদ্দিন তাহাকে বাঙ্গালীর চোখে দেখিয়াছেন অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের দৃষ্টিতেই দেখিয়াছেন। সে হিসাবেও কবিতা- গুলির অভিনবত্ব আছে। জসীমউদ্দিনের কবিতার ভাষা তাহার আখ্যানবস্তু ও তাহার আবহাওয়ার সম্পূর্ণ উপযােগী। বাঙ্গালীর নিজস্ব স্বাভাবিক ভাষাতেই কবিতাগুলি লিখিত।
৯২ ধান খেত জসীমউদ্দিন কবিতার মধ্যে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন—যাহা আমাদের সুপরিচিত নয় বলিয়াই ভয়ে ভয়ে শ্রীমান্ সেগুলিকে ত্যাগ না করিয়া ভালই করিয়াছে। কবি শব্দগুলিকে জোর করিয়া—ভাষার বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্যই প্রয়ােগ করেন নাই। ঐ শব্দগুলি ব্যবহার না করিলে রচনার স্বাভাবিকতা নষ্ট হইয়া যায়—রসসৃষ্টির ব্যাঘাত ঘটে। বেশ ত ! উহাতে আমাদের শব্দসম্পদ বাড়িল—লাভই হইল। রাখালিয়া ভাষাতেই যে গানগুলি রচিত, সেগুলি আমার সব চেয়ে ভাল লাগিল। সম্মিলনী—১লা পৌষ, ১৩৩a। কুমারী পুষ্পলতা দে কবি জসীম উদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ’ ও ‘রাখালী’ আমরা পাঠ করিয়াছি। বর্তমানে কাব্যখানি পঞ্চদশটী নাতিদীর্ঘ কবিতার সমষ্টি। সকল কবিতাগুলিই ইতঃপুর্বে 'কল্লোল, ‘প্রবাসী’, ‘উত্তরা’, ‘মােহাম্মদী’, সওগাত’ ও ‘মুয়াজ্জীন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। কবি সেই বিক্ষিপ্ত সুখ-দুঃখের বালু-কণাগুলিকে একত্র করিয়া এই বালুচর’ গড়িয়াছেন। নদীর জল পথ পাইয়া মাঝে মাঝে ইহার উপর শীর্ণ জল-রেখা টানিয়া গেলেও, আসলে ইহা একথানি বালুচর। এই বালুচরে খেলা করিয়াছি পল্লীর তুমি-আমি, ঘরে-বাহিরের তুমি- আমি, স্বপ্ন-লােকের তুমি-আমি। বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এই তুমি-আমিতে জড়াইয়া আছে পূর্ববঙ্গের পল্লীর আকাশ, পল্লীর বাতাস—পল্লীর সুষমা। বালুচরে আছে তুমি-আমির অত্যুচ্চ আকাথা, অনন্ত তৃষ্ণা, নিকটের আনন্দ-নিরানন্দ, দূরের বেদনা-বিরহ-এক কথায় চিরন্তনী পাওয়া-না-পাওয়ার আদি-পরিণতি। বাঙ্গলার অধিকাংশ কবি এবং লেখকের ন্যায় কবি জসীমউদদীনও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ পাইয়াছেন। কিন্তু এ আশীর্বাদ প্রকৃত কবি হৃদয়ের পরিচয় পাইয়া ; তাই ইহাতে একটু বৈশিষ্ট্য আছে। বালুচরের গাঁখা দেখিয়া মনে হয়, কবি বাস্তব-রাজ্যে অতি বড় আঘাত পাইয়াছেন। কিন্তু এই বয়সেই সেই কারণে মুসাফিরের গান গাহিয়া ভাল করেন নাই—তাহাতে আরও পাঁচজনে আঘাত পাইবে। যাই হােক, কাব্যাংশ আলােচনায় বালুচরের মিলন ও বিরহ-উভয়ই বড় মধুর বলিয়া প্রতীয়মান হইল। অনন্তকালের আসার আশা যখন নিকটে আসে, তখন সে নিকটও কাটিতে চাহে না। সেই না-কাটা কবির ছলে ধরা পড়িয়াছে।
ধান খেত “কাল সে আসিবে, মিছাই ছিড়িছি আঁধারের কালাে কেশ, আজকের রাত পথ ভুলে বুঝি হারাল উষার দেশ।” তারপর কাল সে আসিয়াছিল, কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসার আনন্দ তার যােগ্য আসন খুঁজিয়া পাইল না- “বুকে যে তােমারে রাখিব, বন্ধু, বুকেতে শ্মশান জ্বলে ; নয়নে রাখিব? হায়রে অভাগা ভাসিয়া যাইবি জলে।” তাই মানুষের স্কন্ধে দোষ চাপিয়াছে - “শুধু মানুষেরে পায় না মানুষ, নাহি কারাে অধিকার, মানুষ সবারে পাইল এ-ভবে মানুষ হল না কার।” তথাপি না-পাওয়াও একজনের ভাল লাগাতে প্রতিদান দেয় ? “যে মুখে সে কহে নিঠ রিয়া বাণী, আমি লয়ে সখি, তারি মুখখানি, কত ঠাই হতে কত কি যে আনি, সাজাই নিরন্তর আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মােরে করেছে পর।” চিন্তারাজ্যে তাহাকে লইয়া কবি অনেক কিছুই করিতে পারেন, কিন্তু সম্মুেখে তাহাকে আর সাধা যায় না। তখন অভিমানে কবিকে জগৎ ছাড়িতে হয় :- “মাটীর দেবতা লবে পূজা ভার নাহি যদি লয় হেলা নাহি তার ; আসিবেনা কভু পায়ে দলিবার, জীবনের অকাতরে— বর্তমানের আবহাওয়া কাটাইয়া কবির এই উক্তি প্রশংসনীয়। কিন্তু আবার কেন কবিকে সবুজের ছোঁয়াচ লাগিল :- “তােমাকে স্মরিয়া কঁদিতেছি আমি, চোখে পােকা লাগিয়াছে তাই এত জল, প্রত্যয় নাহি শুধাও না কারাে কাছে ?” জগৎ ছাড়িয়াও এমন করিয়া ‘ভাবের ঘরে চুরি, না করিলেই ভাল হইত। যুগ-যুগান্তের অমীমাংসিত সমস্যা কবিকে আবার ঠেলা দিয়াছে। কবি-মুসাফির ; সব দেখিতেছে, সব শুনিতেছে, তাই ঃ- “চলেছে পথিক-রহিয়া রহিয়া করিছে আর্তনাদ, ও যে ধরার সকল সুখের জীবন্ত প্রতিঘাত।” = ১৪ ধান খেত দূরে—অতি দূরে সরিয়া যাইয়া না-পাওয়ার সুখকে কবি শেষে অনুভব করিয়াছেন- আনন্দ পাইয়াছেন; অকূলেতে কুল গড়িয়া কবি তৃপ্তির আশা মিটাইয়াছেন “এ জীবনে মাের এই গৌরব তােমারে যে পাই নাই, আর কারাে কাছে না পাওয়ার ব্যথা সহিতে হয়নি তাই।” চুচুড়া বার্তাবহ নিকষমণি (বারীন্দ্রকুমার ঘােষ ) জসীম উদ্দীনের “বালুচর” কবিতার বই। বইখানির প্রচ্ছদের ছবি একেছেন শিল্পী শ্রেষ্ঠ নন্দলাল। বিজলিতে আমরা জসীমের “নক্সীকাঁথার মাঠের অন্তরের সৌন্দৰ্য্যতার আঁকা পদ্মাপারের গ্রামের ঘােষণার ছবি খুলে দেখিয়াছিলাম। বালুচরের কবি সেই কর, সেই ছবি, সেই রূপরেখা আবার জাগিয়েছেন। বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়াছে বালুর চরে কেমনে পশিব গােধন লইয়। গায়ের ঘরে ? কোথায় খেলার সাথী আমার কোথায় ধেনু, সাঝের হিয়ায় রাঙিয়া উঠেছে গােখুর রেণ, সাঝের শিশির দুটি পাও ধরে কাদিয়া ঝরে বশরী আমার হারায়ে গিয়াছে বালুর চরে।
ধান খেত
জিতা রহহ ভাই, বাঙলার কবি! কে বলে তুমি মুসলমান, কে বলে
তুমি হিন্দু, তুমি ত অত ছােট নও যে ধর্মের ময়ূরপঙ্খী দাড় কাক সাজিবে।
বাঁশী তােমার চিরদিনই হারাইয়া যাক ঐ পদ্মা ব্রহ্মপুত্রের বালুরচরে বালুচর
জুড়িয়া উঠুক তোমার রূপের রেখা, ধ্যানের গীত, শ্রোতের দরদ, আম বনের
মায়া, ঢাকাই সীমের আচল, চিরদিনই সেই হারান বাঁশীর সুরে।
উড়ানীর চর ধুলায় ধুসর
যােজন জুড়ি
জলের উপর ভাসুক ধবল
বালুর পুরী।
তোমায় অভিসাপ দেই, এ হারালাে বাঁশী ইহ জন্মে আর যেন তুমি খুজে না
পাও, তবেই না পল্লী লক্ষ্মীর ছবিখানি আমাদের চোখ ভরে মর্শজুড়ে তােমার
সুরে দুলে উঠবে ।
জাঙলা ভরিয়া লাউএর লতায়
লক্ষ্মী সে যেন দুলিছে দোলায়
ফাগুণের হাওয়া কলার পাতায়
নাচিছে ঘুরি
উড়ালী চরের বুকের আঁচল
কৃষাণ পুরী।
কবির দয়িত ওপারে “কাল (সে) আসিবে, তার আশা আনন্দ ভয়
ব্যাকুলতা ও অবশ আত্মদানের যে চিত্র কবি একেছে তা অনবদ্য।
কাল সে আসিবে মুখখানি তার নতুন চরের মত,
চখা আর চখী নরম ডালায় মুছায়ে দিয়েছে কত।
গ
মাথায় বাধিবে দুধালীর লতা কচি সীমপাতা কাণে,
বেণর অধর চুমিয়া চুমিয়া মুখর করিবে গানে।
কাল সে আসিবে রাই সরিসার হলদী কোটার শাড়ী,
মটর বােনর সাথে করে যেন খুলে দেখে নাড়ি নাড়ি।
ধান খেত
হয় তাে দেখিবে হয় দেখিবে না, কাল সে আসিবে চরে,
এপারে আমার ভাঙা ঘরখানি, আমি থাকি সেই ঘরে।
কবির এ চিন্তামণির নাচ দুয়ার হইতে কত রত্ন আর জুড়াইয়া দেখাইব।
সারা বালুচরখানি তার দেশলক্ষ্মীর রাঙা পা দুখানি ছোঁয়ায় মণিমন্ত্র হইয়া
গিয়াছে।
আকাশের তলে ঘর
যারা বাধিয়াছে তাদের তৃষ্ণা অমনি বিপুলতর।”
আজও বসে আছি এই বালুচরে, দু’হাত বাড়ায়ে ডাকি
কাল সে আসিল এই বালুচরে, আর সে আসিবে নাকি?
হায় রে রূপের অতৃপ্ত তৃষ্ণা, প্রেমের অক্ষয় সাধ, ছন্দের আজন্ম আকুতি।
ঐ পিপাসা মিটিলে কবি যে ফুরাইয়া যায়। কবির প্রতিদান”ত তাই কত
অপূৰ্ব অনবদ্য অনুপম ও প্রতি দানের ও তুলনা কেবল বুঝি বাঙলার
স্নিগ্ধ দুধালী লতার রূপেই মিলে।
“আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মােরে করেছে পর।”
“কবির সমাধি” কবিতাটির বেদনায় গভীর অতল প্রেমের আর জোড়া
নাই, একটু তাহার উদ্ধৃত না করিয়া পারিলাম না।
“এ মালায় মাের কি হইবে কাজ”? মালিনীর মেয়ে কয়,
কবি কহে, “সখী, বেদনার দান জগতে যে অক্ষয়।
তুমি কি জান না তােমার বিধাতা তােমারে পাঠাল ভবে।
এই কথা বলে-ও দেহের রূপে জগৎ জিনিতে হবে।
তােমার গলায় মাের মালাখানি এযে তব জয় হার,
ওরূপে তোমার কত মােহ আছে, ভাষা যে এ সখী তার ।
মাের মালাখানি লয়ে যাও সখি । মহাকাল নদীজলে
রূপের তরনী করে টলমল ঘটনার হিল্লোলে।
ওই তব হাসি ওই রাঙা মুখ, ও যেন স্রোতের পান,
আজ যারে দেখি, কালিকে তাহারে অমনি দেখিতে মানা।”
विजनी
No text on this page.
No text on this page.