Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kalidasher Bidyalave Kabya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
-
কালিদাসের
বিদ্যালাভ কাব্য।
-
নবীনচন্দ্র দাস প্রণীত
'একং
প্রকাশিত।
কলিকাতা
বহুবাজার স্ট্রীট ২৭ নং ভবনে “ওয়েলিংটন প্রেসে
শ্ৰীনাথ দের দ্বারা মুদ্রিত হইল।
সন ১২৮৩ সাল।
No text on this page.
বিজ্ঞাপন।
প্রচলিত কিম্বদন্তী দ্বারা এইরূপ অবগত হওয়া যায় যে, সুবি-
খ্যাত কবিকুলচূড়ামণি কালিদাস প্রথমে সাতিশয় অজ্ঞ ছিলেন।
সুপ্রসিদ্ধ গোড়াধিপতি মাণিকেশ্বরের কন্যা রত্নাবতীর
(ইহার অপর নাম বিদ্যোত্তমা) সহিত তাঁহার বিবাহ হয় ।
রত্নাবতী সাতিশয় বিদ্যাবতী ছিলেন । তিনি পূর্বকৃত
প্রতিজ্ঞানুসারে অসংখ্য বরপাত্রকে বিচারে পরাস্ত করেন।
তন্নিবন্ধন যােক্তগণ যৎপরােনাস্তি ক্রদ্ধ হইয়া অশেষবিধ
কৌশল সহকারে রত্নাবতীর সহিত কালিদাসের পরিণয়
কাৰ্য্য সম্পাদন-করিয়া দেয়। কিন্তু, বাসরগৃহে কালিদাসের
অজ্ঞানতা প্রকাশিত ও অশেম প্রকারে প্রমাণিত হওয়ায়,
রত্নাবতী গুরুতর অবমাননা করিয়া, অবরােধ হইতে হারে
বহিস্কৃত করিয়া দেন। কালিদাস তৎপ্রযুক্ত সাতিশয়
দুঃখিত হইয়া সরস্বতীর আরাধনায় বিদ্যালাভ করিবার
অভিলাষে গহন কাননে প্রবেশ করেন। এবং তাবশেষে
বাগদেবীর বর প্রাপ্ত হইয়া অদ্বিতীয় কবি হইয়া উঠেন।
তিনি আপনার কবিশক্তির গুণেই বিখ্যাত মহারাজ
বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার প্রধানতম সভ্য পদে নিয়ােজিত
হইয়া সাত্র প্রথিত ও প্রতিপন্ন হয়েন। অদ্যাপিও
তাহার যশঃ সৌরভে চতুর্দিক আমােদিত হইয়া রহিয়াছে।
আমি সেই সমস্ত জনশ্রুতির সার সংগ্রহ পুৰ্ব্বক “কালিদায়ের :
বিধ্যালাভ কাব্য” এই নাম দিয়া, এই খণ্ড কাব্য
খানি প্রচার করিলাম। সহৃদয় পাঠক, মহােদয়গণ সন্নি-
ধানে সানুনয় প্রার্থনা এই, এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানির প্রতি
একবার সস্নেহ দৃষ্টিপাত করিলেই, আত্মাকে চরিতার্থ বােধ
করিব।
উপসংহার কালে বক্তব্য এই, সংশােধনকারক পণ্ডিত
অভাবে এই পুস্তকের প্রথম তিন ফৰ্ম্মার স্থানে স্থানে
বর্ণাশুদ্ধি হইয়াছে। সহৃদয় পাঠক গণ মহানুভবতাগুণে
সেই অপরাধ মার্জনা করিয়া অনুগৃহীত ও বাধিত করিবেন।
নামতি পল্লবিতেন
কলিকাতা।
আশ্বিন; সন ১২৮৩।
নবীনচন্দ্র দাস।
উৎসর্গপত্র।
বিকুলতিলক ও পদ্যকমলামােদী
সহৃদয় মহোদয়গনের
অনুগ্ৰহরসাভিষিক্ত করতলে
এই পদ্যময় গ্রন্থখানি গ্রস্থরচিয়িতা
কর্তৃক
সসম্মানে ও সমাদরে
অর্পিত হইল।
No text on this page.
কালীদাসে
বিদ্যালাভ কাব্য।
প্রথম সর্গ
পুণ্যভূমি জম্বুদ্বীপ এভব ভিতর।
রত্নগর্ভ সম যাহা কহিতে বিস্তর।
বহুশস্য জন্মে তাহে অতি মনোহর ।
যে শস্য ভক্ষণে ভবে জীয়ে থাকে নর ।
যে দ্বীপের জয় হেতু ব্রহ্মাণ্ডের ভূপ।
গৃধিনী প্রতিম সবে হয়েছে লােলুপ ।
তার মধ্যে উজ্জ্বয়িনী নামেতে নগরী।
যাহাতে বিক্রমাদিত্য বিক্রমে কেশরী ॥
ভার যশে পরিপূর্ণ ব্ৰহ্মাণ্ড হইল।
দ্বাপরে ধৰ্ম্মের পুত্র যথা পুরে ছিল ।
পাকত সন্ন্যাসি কটি বেতাল সিদ্ধিল।
সেই হেতু বিশ্বপতি দেব শক্তি দিল।
দৈব বল পেয়ে রাজা হয়ে বুদ্ধি জীবি।
একটি নগর তুল্য পালিল পৃথিবী।
(১)
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য
নবরত্ন সভাস্থাপপ করিয়া যতন।
স্বর্গে যথা সুরেশ্বর করিলা স্থাপন।
উক্ত সভামধ্যে ছিল সুধি নয় জন।
ভার্গব বশিষ্ঠ নিভ এক এক জন।
নবরত্ন চুড়ামণি কালীদাস কৰি ।
কবি মধ্যে কবিশ্রেষ্ঠ যথা গ্রহে রবি।
যাঁর যশঃ সাধুগণে করয়ে ঘােষণা।
যাঁর কাব্য পড়ি জ্ঞান পায় সৰ্বজন।
ধন্য সেই কবির ভারত ভিতর ।
বাল্মীকি প্রতিম এবে ছিলা ছন্দকর।
পরম ভাবুক কবি তুমি গুণাকর।
ভূমি মধ্যে মণিগভ যথা খুনিবর ।
যশের পতাকা তব উড়িছে সংসারে।
বিজয়ী কেতন যথা যুধিষ্ঠির দ্বারে।
দেখি যশঃস্তম্ভ তব লুদ্ধ মম মন।
কিছু যশঃ দেহ মোরে এই নিবেদন।
দুঃখি যদি ভূপালের সঙ্গে তীর্থে যায়।
শত সঙ্গ সমাগমে সুচি করে কায় ।
তদরূপ কবি দাস তব অনুগামি।
কৃপাকরি শিক্ষা কিছু দেহ কাব্যস্বামী।
দমিয়া অমর তুমি দুরন্ত সমনে।
ত্রিদিবে যেমত আছে চিরাদিত্যগণে ৷৷
অলঙ্কৃত করিয়াছ কলি কবিবর।
করিল যেরূপ ত্ৰতা দ্বিজ রত্নাকর ।
প্রথম সর্গ ।
চিরজীবি সে বাল্মীকি এভব মণ্ডলে।
বেদব্যাস আর তুমি যথা বিদ্যাবলে ।
রচিব জীবন কীৰ্ত্তি তব হে সুকবি।
জ্ঞান রশ্মি দেহ যথা বিশ্বে দেয় রবি।
কিম্বা সুধাদানি যেন দেব সুধাকর।
অনায়াসে সুরবাসি করয়ে অমর ।
সেই রূপে চিরস্থায়ী বিশ্বে মােরে কর ।
এমম মিনতি পদে তব বুধেশ্বর ।
নব সুধি লয়ে সুখে বিক্ৰম রাজন।
করিতেন মহানন্দে সুকাল যাপন।
একদা বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসি।
নবধি মধ্যে যেন নবগ্রহে শশি ।
মনােহর চন্দ্রাতপ উদ্ধভাগে ঝােলা।
নিরখিলে সেই সভা বুদ্ধি হয় ভােলা ।
চতুপার্শে ঝালরেতে মুকুতারঝলি ।
ঝুলিছে অসংখ্য গুচ্ছ সম হিরাবলি।
ঝুলে যথা রাসমঞ্চে রাসেশ্বর রাসে।
কিম্বা মহােংসবে লােক ঝোলায় আবাসে ৷
মস্তকেতে মণিময় শোভিছে মুকুট।
শােভে যথা হেমকূটে তুঙ্গতর কুট।
রতন সম্ভব বিভা সম ক্ষণপ্রভা।
ঝল ঝলি মুকুটের উজ্জ্বলিছে আভা।
প’লে সৌরকর তাহে খেলায় বিজলি।
খেলে যথা ঝললে শুদ্ধ হিরাবলি ।
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য :
চারিপাশে সুরিবৃন্দ বসে তারা সম।
বহুদর্শি বুদ্ধিজীবি কেহ নহে কম।
বামভাগে ধন্বন্তরি ক্ষপন মিহির।
ধীমান অমরসিংহ বরাহ সুধীর।
দক্ষিণেতে বররুচি ঘটককপূর।
শঙ্ক, বেতালের সহ কসে যেন সুর।
কবি গুরু কালীদাস বসে সেই পাশে।
যাহার কবিত্বে কবি নিরবয় ত্রাসে।
তরর মধ্যে যেন মৃগরাজ সম।
হেনরূপে বসি কৰি চির যম দম ||
শত শত পত্র মিত্র বসে হাস্য মুখে।
হাসে যথা সৌরকরে সরোরূহ সুখে
কৌতুকের ছলে রাজা কহে কালীদাসে।
সুমধুর ভাষি ভাষা শুনিবার আশে।।
শুন হে ভারত রত্ন কবি কালীদাস।
তােমার কবিত্বে কবিগণ পায় ত্রাস।
কবিত্ব সুষশ গীত গায় পরস্পরে ।
কাব্য সুধাকর আছে তােমার উদরে ॥
ভারতির বরপুত্র তুমি কবিবর।
নাহি দেখি তােমা সম শ্রেষ্ঠ কাব্যকর ।
যাদঃপতি যেমন বিশ্বেত রত্নাকর।
সেরূপ তােমারে দেখি এবে কাব্যাকর
এরূপ রচনা শক্তি পাইলে কোথায়।
বাণী অনুকম্পা বিনা যাহা নাহি পায় ।
প্রথম স ।
বাল্মীকি পাইয়া তাহা ব্রহ্ম কৃপা হেতু।
রামায়ণ রচি শেষে বাঁধে যশ সেতু।
বেদব্যাস পেয়ে পরে ব্রাহ্মির কৃপায়।
পয়োধি প্রতিম রচে ভারত যাহায়।
কোথা পেলে কবিবর দেবি বাগদেবী।
আদ্যোপান্ত কহ শুনি কিরূপেতে সেবি।
শুনিতে আমার মন আকাঙ্ক্ষিত অতি ।
যথ সীমন্তিনী ভবে পতি গুণ সতী ।
কিম্বা দুঃখি লােক যথা ধন অভিলাষে।
প্রকাশে যেরূপে স্পৃহা বদান্যের পাশে।
সুমধুর ভাসি তুমি এবে কালীদাস।
বিবরিয়া কহি মাের পূর্ণ কর আশ । •
কবিবর কহে তবে শুন দণ্ডধর।
কহিব আদ্যন্ত পাই যেরূপেতে বর ।
পেয়েছিনু বহু দুঃখ ভ্রমি বনে বনে।
অজ্ঞাত বাসেতে যথা পাণ্ড, পুত্রগণে ॥
বাল্যকালে ছিনু আমি দুরন্ত প্রবল।
করিতাম সদা খেলা লইয়া কুদল ।
দুৰ্বত্ত দেখিয়া মােরে পিতা মহাশয়।
দিলা পড়িবারে শেষে গ্রাম্য বিদ্যালয়, ॥
শিক্ষক নিকটে থাকি উপবিষ্ট গিয়া।
অধ্যয়ন প্রতি কিছু নাহি চায় হিয়া।
সর্বদা করিব খেলা এই মন গতি।
যুবতি যৌবন যেন সদা চাহে রতি।
,
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
অপরাহ্নে বিদ্যালয় বিরামের পরে।
বিতণ্ডি বালক সহ যথা নীচ নরে।
লেখনি হরণ করি বস্ত্র ছিড়ি কার।
দ্রুতগতি পলাইলে তার কান্না সার ॥
বালকদিগের পিতা আসি মমালয়।
কহিত পিতার কাছে দেখাইয়া ভয়।
তব পুত্র সকলেরে করয়ে প্রহার।
এরূপ দৌরাত্ম কভু ভদ্র নহে তার।
নানা ভয় প্রদর্শন করি তারা সবে।
গৃহে গেলে যাইতাম গৃহেতে নিরবে ।
তিরস্কার সহ পিতা বুঝান আমায়।
বুঝান উৎসঙ্গে করি ততােধিক মায়॥
দুষ্টত্ব বশত আমি নাহি শুনি কানে।
যথা হিত উপদেশ খল নাহি মানে।
উপদব পিতা মম নাপারি সহিতে।
কহিতেন শিক্ষকেরে যােগ্য দণ্ড দিতে ।
দোষ দেখি অধ্যাপক করিলে শাসন।
হইতাম মহাক্ৰোধি যথা মুঢ়গণ ॥
ক্রোধভরে না মানিয়া গালি দিয়া তারে।
পলালে আসিত ছাত্র মােরে ধরিবারে।
উপল খণ্ডের ঘাত করি ছাত্রগণে।
আশু পলাইলে তারা কাঁদে দুঃখমনে।
রােদন করিয়া শেষে পিছে পিছে মাের।
আসিত তাড়ায়ে যথা প্রহরিরা চোর।
প্রথম সর্গ।
দুরন্ত প্রান্তর আমি করি অতিক্রম।
উঠিতম বৃক্ষোপরি নাহি ডরি যম ॥
তাধারি গােধূলি করিলে আগমন।
নামিতাম উচ্চ বৃক্ষ হইতে তখন।
নামে যথা কা কাটি কাঠুরিয়াগণ ।
হেন রূপে ভয়ে ভয়ে হয়ে সচেতন ॥
দৃষ্ট পথ রােধ যবে করিত রজনি।
আসিতাম চুপে চুপে গৃহেতে তখনি ।
আসে যথা চৌরকুল ঘাের অন্ধকারে।
চৌৰ্য্যকাৰ্য হেতু রাত্রে সন্ধি কাটিবারে।
অবসান দিব দেখি জননী আমার।
বিষাদে কাতরা দেবি পর নাহি যার ॥
হ্রদশােষে শফরি যেমতি ঘুরে নীরে।
তেমতি জননী দেবি অসুখি শরীরে।
কিম্বা হারাইয়া মনি ফশিনী সহসা।
খোঁজয়ে যেরূপ মাতা সেরূপ বিবশা ।
গৃহে এলে মা আমার করিয়া স্ব কোলে।
দিতেন আহার সদা বহু স্নেহ বােলে।
অকৃত্ৰিম সেহবাক্যে অবিরল মােরে।
বুঝান জননী যথা প্রতিবাসি চোরে।
অত্যন্ত করিয়া ক্ষোভ করেন ভৎর্সনা।
অরে বৎস পরিণামে দিবি কি যন্ত্রণা।
ব্রাহ্মন কুলেতে তুই হইলি উদ্ভব।
. অজ্ঞানত্ব আশ্রয়িলি অভাগ্য এসব ।
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
ত্যজিয়া স্বকীয় গ্রাম গিয়া অন্য গ্রামে।
থাকিতাম নির্ভয়েতে নিজ জন ধামে।
দুই তিন দিবাপরে আসিলে স্বধমে।
দেখি হর্ষ মত। যথা যশমতি শ্যামে।
দরিদ্র সম্পত্তি নিভ করি মােরে কোলে।
বুঝান জননী কত সুমধুর বােলে ৷
অরে কালীদাস বুঝি বংস তোর প্রাণ।
নিশ্চয় পাষাণময় নাহি কিছু আন।
শুনেছি পাষাণময়ী উমা হরজায়া।
অচল অচল পিতা প্রতি নাহি মায়া
তেমতি কঠিন বৎস তােমার হৃদয়।
কিম্বা তুমি বনমালি প্রতিম নির্দয় ।
কাদাইল যুশমতি ভ্রমি বনে বনে।
শেষে মধুপুরে গেলা আনন্দিত মনে।
কাদি হারাইলা জ্যোতি নয়নের সতি।
যথা রাহুগ্রাসে নভে দেব তিষাম্প্রতি। ৪
তেমনি করিবি মােরে অনুভব হয়।
হারার কাঁদিয়া আঁখি বুঝিনু নিশ্চয়।
এরূপ বুঝান মােরে মাতা নিরস্ত।
তথা না শুনি আমি শুন নৃপবর।
অনন্তর ভুবদীয় পিতা, ষ করে।
তাহে বহু দ্বিজ গণ আইল নগরে।
ভূরি ভূরি দ্বিজ এলাে নানাবিধ নামে।
তাসহ আমার পিতা আসেন এধামে ৷
প্রথম শর্ত।
মহোৎসব করি নৃপ যজ্ঞপূর্ণ দিল।
যেরূপ পুৰ্বেতে যজ্ঞ সগর করিল।
কিম্বা দক্ষ মত করে পিতা তব ।
দ্বিগুণ বাড়িল তাহে তাঁর যশঃরব।
কনিষ্ঠ রামের সহ ছিলাম অবাসে।
সকলে হইত ভীত আমার তরাসে।
একদা জননী মােরে সুমধুর স্বরে।
কহিলেন বৎস কালী কাষ্ট নাই রে।
রন্ধন করিতে নারি কিকরি উপায়।
আহরণ করি কিছু আনরে ত্বরায়।
রন্ধনে প্রবৃর্ত আমি হতে পারি নাই।
বুভুক্ষা কাতর রাম কাঁদে তব ভাই।
জননী আদেশে আমি পরশু সংহতি।
চলিলাম বনে যথা কাঠুরিয়া গতি।
কৌতুক করিয়া রাজা কন কবিবরে।
পালিতে মায়ের আতা না লয় অন্তরে ।
তব সহেবিলে ব্যগ্র প্রতিবাসি যত।
যেহেতু অন্যায়ে তুমি সদা ছিলে রত।
মাহ বাক্য শিরোধার্য্য করিলে যে তুমি।
এসকল বাক্য বুধ অবিশ্বাস ভূমি।
হাসিয়া কহেন কবি শুন নরপতি।
রক্ষিতে মায়ের আজ্ঞা চির ছিল মতি।
কিন্তু বিদ্যোৎপন্ন জ্ঞান উপাজ্জিতে যবে।
আদেশিলে থাকিতাম সর্বদা নিরবে ।
२
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
পালিতম মাতৃবাক্য অন্যাদেশে ভূপ।
কহিনু নিশ্চয় এবে পাণ্ডব স্বরূপ।
প্রবেশিয়া ঘাের বনে কাষ্ট অন্বেষণে।
খুঁজিতে লাগিনু যথা পক্ষি ব্যাধগণে
দেখিলাম উর্ধে চাহি বহুপাদোপরি ।
বৃহত আছয়ে শাখা শুষ্ক মূর্তি ধরি।
তদোপরি ছেদাশয়ে কৈ আরােহণ।
যথা দেখি ত্বরা উঠে কাঠুরিয়াগণ ।
প্রখর পরশ্বাঘাতে বৃক্ষ শাখা মূল।
আরন্তিনু কাটিবারে বুদ্ধি হয়ে ভুল।
যদোপরি বসে আছি কাটিতেছি তারে।
সরম কহিতে নৃপ এক্ষণে তােমারে।
ছেদ সাঙ্গে শাখা সহ ভূমিতলে পড়ি।
পঞ্চত্ব পাইয়া শেষে যাব গড়াগড়ি।
হেন বােধ মাের নাহি ছিল নরেশ্বর।
কাটিনু একাগ্র চিত্তে নাহি কোন ডর ॥
ছেদিনু অর্ধেক শাখা পৰ্যন্ত রাজন।
অব্যাজ হয়েছি শেষে ভূমের পতন।
ইতিমধ্যে শুন তবে কহি ভবেশ্বর।
ঘটিল সুন্দর মেরে ঘটনা তৎপর।
গৌড়বাসি নাম রাজা মাণিক ঈশ্বর।
ছিল বরা কন্যা তার নর অগোচর ।
রত্নাবতী নাম তার সম পদ্মালয়া।
কিম্বা রূপে হর জায়া যেমতি অভয়া।
প্রথম সর্গ।
পাইয়া সুন্দরি কন্যা আহলাদিত ভূপ।
শিখাইল বিদ্যতিরে পুত্রের স্বরূপ।
ধারণীয়া স্বীয় বুদ্ধি হেতু রত্নাবতী।
উন্নতি করিল বিদ্যা যথা বৃহষ্পতি।
অদ্বীতিয়া সুপণ্ডিতা হৈল গুণবতী।
যথা বিদ্যাশিলা বাণী হরিপ্রিয়া সতি।
দেখিয়া মাণিকেশ্বর আনন্দিত অতি ।
যেন উমাপতি হর দুহিতা ভারতি।
যৌবন সময়ে রামা আসি উতরিল।
দেখিয়া মাণিকের কৌশলে কহিল ৷
বিবাহের কাল তব বৎস্যে উপস্থিত।
কিরীতি করিব কহ হয়েছি চিন্তিত ॥
স্বয়ম্বরা হবে কিম্বা সুশুভ সম্বন্ধ।
সুপাত্র দেখিয়া করি যে বিধি নিৰ্বন্ধ ॥
পিতৃবাক্য এবম্বিধ শুনি রত্নাবতী।
সঙ্কুচিত লজ্জা হেতু হইলা যুবতী।
কিঙ্করীর দ্বারা ধনী নিজ অভিপ্রায়।
প্রকাশ করিলে দাসী কহিল রাজায়।
স্বয়ম্বরা না হইবে রত্নাবতী সতি।
বিচারে জিনিবে যেবা সেই তাঁর পতি ।
দুহিতা মানস ভূপ
করি হৃদগত।
সভা সমারােহণেতে হইলেন রত ।
অমাত্য প্রভৃতি শেষে সমবেত হয়ে।
মন্ত্রণা করিল রাজা সভাসদ লয়ে ॥
কালীদাসেম বিদ্যালাভ কাব্য।
স্থিরীকৃত যুক্তি হলে যােজক ডাকিয়া।
কহিলেন যােক্তাগণে সব বিশেষিয়া ।
সুকুমার বিদ্যা বুদ্ধি সম্পন্ন সুধীর।
আন যােক্তা হেন পাত্র কহিলাম স্থির ।।
বিচারে জিনিবে যেবা বালিকা আমার।
বরিবে স্বামিত্ব পদে কহিলাম সার ।
জামাতা হইয়া সুখ ভুঞ্জিবে বিস্তর।
ত্রিদিবে যেমন সদা শতমনুবর ॥
অতএব ত্বরাকরি যােজকের দল।
আনহ সুপাত্র এবে করিয়া কৌশল ।
ভূপাদেশে যােক্তাগণ করিয়া গমন।
ক্রমশঃ করিল দেশ অনেক ভ্রমণ।
সুকুমার বিজ্ঞতম দেখি রাজ সুত।
আনি দিল রাজধানী সৰ্বগুণযুত।
মে বিদ্যা প্রভাবেতে দেবি রত্নাবতী।
পরাভূত পাত্রগণে করিল য
লজ্জাভয়ে ভুপালেরা করে পলায়ন।
হিমাংশু প্রভাবে যথা খল অহিগণ ।
কিনা কেশরিণী ভয়ে কুরঙ্গের দল।
সদা গতি সম ধায় বৃদ্ধি করি বল।
বার্তাবহ আসি বার্তা দিলেক ভূপালে।
ধৃতরাষ্ট্রে সঞ্জয় যেমতি যুদ্ধকালে ।
নৃপতি মণিকেশ্বর সবিশেষ শুনি।
চিন্তিত হইল যথা মােগ ধৰ্ম্মে মুনি।
যুবতী।
* *
.
প্রথম সর্গ ।
আম্বানি ভুপাল দুঃখে যত ষােক্ত দলে।
অনাদর করি শেষে কহিল কৌশলে ।
কেমন ভূপাল সুত বরপত্র এবে।
আনিলে অবিদ্যা দেবি তার সষে সেবে।
পরাভূত হয়ে সবে করিল গমন।
চুপে চুপে অপহর্তা পলায় যেমন ॥
বরপাত্র অন্বেষণে পুন সবে যাও।
আর্ষাবর্ত দাক্ষিণাত্য যথােত্তম পাও।
নৃপাদেশে বদ্ধদল হয়ে যােক্তা গণ।
নানা জনপদে শেষে করয়ে : ভ্রমণ ।।
ভ্রমণের ক৪ে সবে সদা উচাটন।
তীর্থে যথা ভ্রমি পাপি পাপের কারণ।
কতিপয় দিবাস্তরে সুবিঃ সুবরে।
এনে দিল যােক্তাদল গৌড় নরবরে।
বিচারে ছারিয়া তার সহ রত্নাবর্তী।
পলাইল সরমেতে হারাহয়ে মতি।
কেশরীণ্যাক্রমে যথা পলায় শার্দ ল।
হেনরূপে ভূপতির বুদ্ধি হয়ে ভুল !
গােপনেতে স্ব স্ব দেশে তারা কৈল গতি।
নিশাকালে সভয়েতে যেরূপ অসতি।}
কিম্বা কেশৰ্ষাক্রমণে তরঙ্কু যেমন।
শঙ্কায়ে স্বারণ্য ত্যজি যায় অন্যবন।
আসিয়া সন্দেশবহ পুন বার্তা দিল।
শুনি শ্রুতিমূলে রাজা চিন্তিত হইল৷৷
২
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
উপযুক্ত
কি হবে উপায় বসি ভাবেন ভূপাল।
বলে কন্যা বিদ্যা শিখি হইল জঞ্জাল।
কিং কর্তব্য বিমুঢ় হইয়া গৌড়েশ্বর।
চিন্তা সিন্ধু মাঝে ডুবে হইল কাতর ।
ভৌমি সয়ম্বারে যথা জনক রাজন।
দুঃখ পয়ােধিতে
ডুবে আগে করি পণ।
কিম্বা লক্ষপেঁধা পণে দ্রুপদ ঈশ্বর।
পড়িল বিপদে যথা এবে গৌড়েশ্বর ।
যােক্তাগণে বারম্বার ডাকিয়া ভূপতি।
পাত্র হেতু প্রেরণিলা অতি শীঘগতি ।
পাত্র তারা না পাইয়া ভবে।.
আনিল ত্রিপুণ্ড ধারি টুলাে সুধী সবে ।
বিচারে কবিদগণ পরাজিত মানি।
পলাইল যথাজ্ঞানে ছাড়ি দেবি বাণী।
বিদ্যারত্ন বলে ভাই শুন শিরােমণি।
পলাইনু ভেক যেন হেরে কাল ফণী ৷
চমৎকার ইহা বুধ কহি শুন সাটে।
কোমল কমল দলে যথা বৃক্ষ কাটে।
শালতাড়িত যথা ধুত্ত্ব ফেরু খল।
পলাইল হেন রূপে টুলাে সুধীদল।
সঞ্জয় প্রতিম দূত বার্তা দিল ভূপে।
শুনিয়া বিষাদে রাজা ডুবে চিন্তাকুপে।
নিবৃত্ত হইয়া শেষে রাজ কাৰ্য প্রতি।
ভাবে কি হবে এবে দুহিতার গতি।
প্রথম সর্গ।
অহর্নিশি এই চিন্তা হইয়া প্রবল।
বৈরি সমা চিন্তা নৃপে করিল বিকল ৷৷
দিবা অবসান দেখি গৌড় নরপতি।
অবরোধে চলি গেলা মন দুঃখে অতি ।
ইতি কালীদাসের বিদ্যালাভ
কাব্য প্রথম সগ।
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
দ্বিতীয় সর্গ।
৫
প্রভাত হইল দ্রুত পলাল শর্বরী।
জরাসিন্ধু ভয়ে যথা শীহরি শ্রীহরি ।
পদ্মনন্দ। উষা অসি দিলা দরশন।
তিরােহিত বেগে তম গহ্বরে তখন।
যথা দেখি খগেস্বরে পন্নগ বিবরে।
আশু বেগে প্রবেশয় স্বীয় নাশ ডরে।
স্বকীয় দুতেরে হেরি সুখে পঙ্কজিনী।
তুলিলা বদন প্রিয় স্মরি বিনােদিনী ।
প্রেরিয়া উষারে দেব অংশুমালি রবি।
উদিলা উদয়াচলল কি বনিবে কবি ।
যথ ভব প্রলয়েতে ব্রহ্ম বিশ্বপতি।
প্রকাশিয়া তেজ রাশি ভাসিলা যেমতি
প্রভাকর করজালে দিবা প্রকাশিল ।
দেখি সূর্যমুখি নাথে হাসিতে লাগিল।
তাসহ সরসিরুহ হাসিলেন সরে ।
যথ। নারী প্রিয়তম স্বামি দেখি ঘরে।
ত্যজিয়া শয়ন শয্যা উঠি গৌড়েশ্বর।
নিরবে রহিল সদা যথা দুখি নর ৷
কিরূপে নিৰ্বাহ হবে দুহিতার বিয়া।
চিন্তি নৃপতির শেষে উড়ে গেল হিয়া।
দ্বিতীয় সর্গ ।
করতলে কপােল বিন্যাসি গৌড়েশ্বর।
উপবিষ্ট শয্যোপরি হইয়া কাতর।
দেবাঙ্গিনী নম্নি তঁার কল সেকালে।
সহসা আসিয়া কহে কর হেরি গালে।।
কি হেতু দুঃখিত নাথ বল গৌড়পতি।
লঙ্েিল কি রাজ ধর্ম হইয়া কুমতি ।
কিম্বা প্রজারঞ্জনেতে হয়েছ পতিত।
না হরিলে কার ধন করিয়া অহিত ॥
হেরিয়া মলিন তব কমল বদন।
দশদিক শূন্য দেখি হয়ে ক্ষুব্ধ মন।
যেহেতু মৃণাল যদি হয় আঘাতিত
নিরাপদ পঙ্কজিনী না হয় কিঞ্চিত।
কিম্বা রাহু গ্রস্থ দেখি কুমদিনী বসি।
সুখে কি থাকিবে যবে তমহর শশী ।
অতএব ত্বরাকরি প্রভু বিবরণ।
বাঁচাও দাসীরে কহি ক্ষুব্ধ কি কারণ |
বিষন্ন তোমারে নাথ হেরি গোড়পতি।
ক্ষোভযুক্ত দাসী যথা স্বামী হীনা সতি।
মৃদু সুমধুর বাক্য রাজ্ঞির ভূপতি।
শুনিয়া কহিঃ। পিক বসন্তে যেমতি।
অয়ি প্রিয়। উপস্থিত দেখি সৰ্ব্বনাশ ।
চিন্তিয়া এক্ষণে মােস বলবুদ্ধি হ্রাস ।
নাবুরি পড়া মেয়ে বহুবুধ আনি।
সুপণ্ডিত। এবে কন্যা যথা দেবি বানী।
২
কালীদাসের বিদ্যালঙ্ক কাব্য।
করিয়াছে পণ মেয়ে দেবী রত্নাবতী।
বিচারে জিনিবে যেবা সেই তার পতি।
বিস্তর নগর হতে রাজ সুত আসি।
বিচারে হারিয়া গেলা স্বীয় মান নাশি।
যথা চোর চোৰ্যকাৰ্য্য করি বনে বনে।
পলাইল হেন প্রিয়া বরপাত্র গণে।
আর্যাবর্ত কিম্বা আর দাক্ষিণাত্য দেশ।
অষেণি যােক্তা কষ্ট পাইল অশেষ ।
এক্ষণে কোথাও দেবি যােগ্য পাত্র নাই।
পরিণয় কিরূপে হইবে ভাবি তাই।
এ কন্যারে পরাভবে হেন পাত্র ভবে।
অধিক বিরল রাজ্ঞী কি হইবে তবে।
কিরূপে রাখিব বল কুলের পদ্ধতি।
বিদ্যাশিখি বিরুদ্ধ করিল রত্নাবতী।
জামাতা হইবে কুলে বাড়িবে গৌরব।
বৈপরিত্য কৈল মেয়ে শিখি বিদ্যাসব।
বিশেষ উরগ গৃহ ভয়ঙ্কর যথা।
বয়স্কা অদত্তা কন্যা গৃহে থাকা তথা ৷
কি জানি হে পরিণামে কলঙ্ক বা হয়।
ভাবি হৃদকম্প মম হয়েছে নিশ্চয়।
এক্ষণে বিমুগ্ধ আমি এবিপদে পড়ি।
ঘুরিতেছি যথা ঘুরে অন্ধফেলি নড়ি। )
শুনি অসম্ভব রাণী রাজার বচন।
বিশেমি কহিলা দেবী নৃপকে তখন।
দ্বিতীয় সর্গ।
কি ভয় তােমার নাথ স্থির কর মতি।
রক্ষিবে মানীর মান ব্রহ্ম বিশ্বপতি।
সৰ্বগত ব্ৰহ্মরীতে বদ্ধজীব ভবে।
যারাদৃষ্টে আছে কন্যা অবশ্য সে লবে।
হারিবে তাহার কাছে শুন গৌড়পতি।
জরাসিন্ধু যুদ্ধে দেব শ্রীপতি যেমতি ।
ব্রহ্ম নিয়মানুগত বিশ্বে যত জীব।
যে বিধির বিধি হেতু ধ্বংসকৰ্ত্তা শিব ।
লঙ্েিত দৈবের রীতি অসমর্থ সবে।
বাড়াবাড়ি কৈলে মিছ। তার এই ভবে।
বিশেষ মিথুন পদে জীব জন্তু যত।
করেছেন সকলেরে বিশ্বপতি রত ।
কাল প্রাপ্ত হলে হবে নিয়মানুগত।
নাহিক সংশয় নৃপ কহিলাম যত।
কীট যাত সুত্র গুটি ভেদি কীটা যবে।
বাহিরিলে তার পতি মিলেদেখ ভবে ।
যথা তথা থাকে কিন্তু অচিরায় আসি
পুরায় তাহার বাঞ্ছা বহুবাধা নাশি।
সময় হইলে নাথ তদরূপ হবে।
হারিবে নিশ্চয় মেয়ে দেখিবেক সবে ।
চিন্তাদূর করিপুন প্রোে যােক্তাগণে।
অনর্থক ভাব কেন বসে ক্ষৰূমনে।
চেতন পাইয়া রাজা বাক্য উপদেশে।
দুর করি চিন্তা যত উঠিলেন শেষে ।
২২
কালীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
সভা সমারােহনীয়া শেষে গৌড়পতি।
সমবেত হইলেন সচিব সংহতি।।
অনন্তর কহিলেন ওহে মন্ত্রিগণ।
কন্যার বিবাহ হেতু মন উচাটন।
ক র্তব্য এ ক্ষনে কিবা কহ মন্ত্রি তবে।
কুযশ হইবে বিয়া না হইলে ভবে।
পুনঃ যোক্তাগণে প্রেয়রা গোড়অধিপতি
কহিল সচিবগণ হয়ে হৃ৪মতি।
ডাকিয়। মাণিকেশ্বর যােজক সকলে।
পুনঃ বা পাত্ৰ আনি কহিলা কৌশলে ৷
নৃপাদেশে যোক্তাগণ কৈল আবেদন।
কোথাও সুপাত্র বিশ্বে না দেখি রাজন।
অার্যাবর্ত দাক্ষিণাত্য মধ্যে দেশ যত।
খজিলাম গ্রামে গ্রামে কবাে নৃপ কত।
নানা দেশ ভ্রমণেতে শীর্ণ কলেবর।
সুস্থতা বিহনে বপু যাবে নৃপবর।
এক্ষনেতে কিছু দিন দাও অবসর।
আনিদিব পরে খুজি যেবা শ্রেষ্ঠবর ।
বিজ্ঞ৪তম যতপাত্ৰ আনি দিনু মােরা।
পরাভব হল সবে মিছেমাত্র ঘোরা..
কি জানি কেমন সুধি তব দুহিতারে।
পড়াইল যেবা আসে হারায় তাহারে।
কি শাস্ত্র পড়িল মােরা বুঝিতে না পারি ।
শপিষ্ট বানী বুঝি তােমার কুমারী ॥
দ্বিতীয় সর্গ ।
২৩
ত। নাহলে এত পাত্র কেন পরাভবে।
এমত ঘটনা নৃপ কে দেখেছে কবে।
সে যাহা হউক এবে দাও অপসর।
আসিব নিশ্চয় মাের। অল্পদিন পর ।
রুযিল নৃপতি শেষে যােক্তাবাক্য শুনি।
ভগীরথে দেখি যথ। অষ্টাবক্র মনি।
কিম্বা মূঢ় দ্রৌণি যবে দ্রৌপদি সন্তান।
বধিলে রুষিত যেন অজ্জনের প্রাণ।
দেখি গৌড়েশ্বর ক্রোধ কহে যােক্তা বর।
অনর্থক কেন রােমাে কহ নরেশ্বর।
বিশ্রাম মাগিনু মাের। কিছু তব কাছে।
নাহি দেহ যাব পুনঃ ভাগ্যে যাহা আছে।
আজীবন তব কাৰ্যে হেলা করি নাই।
সহসা রাগিলে এত দুঃখে মরি তাই ।
অতএব নৃপ মাের। অনেনে যাই।
খুঁজি গিয়া ইতঃস্তত যথ। পাত্র পাই ।
ইহা বলি যোক্তাগণ বিদায় লইয়া।
চুপে চুপে পরামর্শ করে দরে গিয়া ।
প্রধান যােক বলে অন্য যােজকের।
কর্তব্য কি কহ সবে পড়িলাম ফেরে।
দুশ্চরিত্রা হেন নাহি দেখি রাজবালা।
বিদ্যা শিখি ঘটাইল ঘটকের জাল।
ভ্রমণ ক৪েতে গেল জীবনের আশা।
নাহি হেরি হেন কন্যা যযাক্তাকুল নাশ।
২৪
কাগীদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
পথশ্রমে মৃত্যু কিম্বা রাজ কোপে দেশ।
নিশ্চয় ছাড়িতে হবে কহিনু বিশেষ ।
উভয় অনন্য ভাই হইল প্রতিম।
যত দুঃখ দিল বামা কহিতে অসীম।
অতএব চল সবে এই বার যাই।
মাতৃমুখ পাত্র আনি খুজে যথা পাই ৷৷
করিয়া চাতুৰ্য বিয়া দিব অবশেষে।
থাকি বা না থাকি সবে এরাজার দেশে
বিশেষত মম মনে অনুভব হয়।
অহঙ্কারি জনে শুভ কদাচিত নয় ।
যার হেতু ধাৰ্তরাষ্ট্র সহ সহােদর।
হইল অচিরে রণে নাশকুরুবর ॥
সীতাহর নৈকষেয় অহমিকা তরে।
বংশ সহ ধ্বংস দু৪ রাঘবের শরে ।
অহঙ্কারী জনে ক্ষমা প্রভু বিশ্বপতি।
কভু না করেন তার শেষে অধঃ গতি।
অন্য অপরাধ হতে দম্ভ দোষ অতি।
বুঝিয়া সত্বর দণ্ডে ব্রহ্ম বিশ্বপতি।
একারণে রাজ বালা ভাগ্যে অজ্ঞ স্বামি ।
লিখেছেন সৃষ্টিপতি অনুভবি আমি ।
চল সবে যাই মােরা অবিদ্যা যেজন।
নিশ্চয় অনিব হেথা দৃঢ় কর পণ।
অবিবাদি জনে যেবা দুঃখ দেয় মনে।
বিড়ম্বনা দেখ ভবে তার সর্বধনে।
দ্বিতীয় সর্গ ।
ঐকবাক্য যোক্তাগণ হয়ে অবশেষে ।
অজ্ঞান কুপাত্র খুজি ভ্রমে দেশে দেশে |
কোন স্থানে না পাইয়া পাত্র মাতৃমুখ।
ভ্ৰমিল। অনেক মিছা পাইয়া অসুখ।
অবশেষে হেথা আসি উজ্জয়িনী-পুরে।
খুঁজিল নির্বোধ পত্র গৃহে গৃহে ঘুরে।
প্রাক্তনের ফল লঘে কার সাধ্য ভবে।
কাটিতেছি কাষ্ঠ যথা উপস্থিত সবে ।
বৃক্ষতল দিয়া রাজা রাজপথ ছিল।
আতপে তাপিত হয়ে তথায় বসিল।
কুঠার-নিনাদে মম, যােজকেরা যত।
ঊদ্ধে চাহি দেখে মাের জ্ঞানবুদ্ধিহত।
কহিলা প্রধান যােক্তা শুন যােক্তগণ।
পূর্ণিবে মনের আশা সিদ্ধ হবে পণ ॥
এইত পাইনু মােরা পাত্র মাতৃমুখ ।
এতদিনে গেলা বুঝি পথশ্রম-দুখ ।
কৌশল করিয়া শেষে নামাইয়া তলে।
সুমধুর ভাষে তারা মম প্রতি বলে।
কহ হে যুবক! তুমি কোন কুলােব।
নাম ধাম জাতি মােরা শুনিব এসব।
ব্রাহ্মণসন্তান, মম নাম কালিদাস।
কহিনু যােজকে স্বীয় পরিহরি ত্রাস।
কাষ্ঠ হেতু আসিয়াছি বাস এই গ্রামে।
কি লাভ হইবে তব বল মম নামে।
৪
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
শিরােধার্য্য মাতৃবাক্যে কাষ্ঠ আহরণে।
আসিয়াছি নামাইলে কহ কি কারণে ॥
কাৰ্যকাণ্ড আমার দেখিয়া যােক্তগণ।
অদ্বিতীয় অজ্ঞ মোরে করে নিরূপণ।
কহিল প্রধান যােক্তা বুঝি অনন্তর।
বিবাহ করিবে কালি ! চল হয়ে বর ।
ঊষার প্রতিম পাবে মনোহরা নারী।
শ্বশুর পাইবে বাণ সম তেজ ভারি ।
বিয়া হলে রাজ্যপাবে তুমি বৎস গুণী।
শান্তা বিয়া করি যথা ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি।
কিন্তু ক্ষীরাদেতে সুখী খলারি শ্রীপতি।
এইবে তেমতি কালি! শীঘ কর গতি ৷
চারুশীলা বিদ্যাবতী আছে কন্যা ভবে।
নারায়ণ-র-লাভ সম তব হবে।
কিম্বা হিমাদ্রিজা উমা পেয়ে যথা হয়।
হইবে তেমতি সুখী শুন দ্বিজবর ।
কহিলাম, কোথা হেন কন্যা কহ শুনি।
দিবেক বিবাহ মােরে আমি কিবা গুণী ।
অবিদ্যের মধ্যে আমি গণিত এ ভবে।
এমন মিলয় যদি অসম্ভব হবে।
কোন দেশে পরিণয় দিবে কহ মাের।
কিম্বা লয়ে যারে যথা ছেলেধরা চোর |
কোন রাজা যযাগ্য কন্যা বিশ্বে রাখিয়াছে।
যাব যদি সত্য কহ সবে মাের কাছে ।
দ্বিতীয় সর্গ ।
কহিল, নগর গৌড় বসুধা-ভিতর।
প্রসিদ্ধ ভূপাল তাহে মাণিক ঈশ্বর।
রত্নবতী নাম্নী তার কন্যা মনােহরা।
তাহার প্রতিম বিশ্বে নারী নাহি বর।
পদ্মক্ষী গৌরাঙ্গী ধনী যেন সে ইন্দিরা।
বিদ্যাবতী বাণীসমা শচিসমা ধীরা।
দেখিলে ভুলিবে তুমি তার ভুজ ভুব্ধ।
ভ্রমে বাসব পড়ি না মানিল গুরু।
বদনকমল যদি হের বৎস! তার।
ভুলিবে সুধাংশুভ্রমে কহিলাম সার।
কিম্বা পঙ্করুহ মনে না ধরিবে পুন।
নিশ্চয় কহিনু কালি মনযােগে শুন।
রম্ভাতরু মৃণালেরে হৃদে আদর্শিয়া।
বুঝি বিধি উরুভুজ গড়িলেন গিয়া।
মনোজ-নিগড় বাম এ বিশ্বে অতুল।
কি আর কহিব বৎস! কহিলাম
স্থল।
মনােহর বাক্য শুনি যােজকের মুখে।
হইনু দ্বিগুণ স্ফীত স্বীয় মন-সুখে।
ভুলালে আমারে কহি কথা মনােহর।
কুহক-চতুর যথা বিশ্বে বাজিকর ।
চলিলাম আনন্দেতে যােজক-সংহতি।
সুধাংশু ধরিতে যথা বামণের গতি ॥
হেথায় রন্ধনহেতু মাতা স্নান করি।
কষ্ঠ প্রতীক্ষায় ছিল মম আশা ধরি।
কালিদাসের বিল্লালাভ কাব্য।
ক্রমে ক্রমে তৃতীয় প্রহর হৈল গত ।
শেষে দেবী হইলেন রন্ধনেতে রত |
যথা কথাঞ্চিত অন্ন সুপাক করিয়া ।
মম অপেক্ষায় মাতা ছিলেন বসিয়া।
কিন্তু পুন আগমন না করি আমি।
চিন্তিত দেখিয়া দেবী শুন ভবস্বামী ,
দিরা অবদন দেখি দেব দিবাকর।
আকর্ষিয়া গেলা রশ্মি অস্তাচলান্তর ।
বিরাজিল অস্তাচল ভানু-আগমনে।
ভালে ধরি স্থাণু যথা সুধানিধিনে ।
কিন্থ প্রকাশিলে শশী যেমতি ব্রহ্মাণ্ড।
শােভিল অচল অতিসুন্দর প্রকাণ্ড ।
দেখিয়া গােধূলি যত কৃষক সকলে।
বিশ্রাম-আশয়ে এলাে গৃহে কুতূহলে ।
গাভিবৃন্দ হাম্বুরিবে পালক-আবাসে।
ধাইল সহিত বৎস বিরামের আশে ।
নীড়ে আসি সুনাদিনী-বিহুঙ্গিনী-দল।
আরম্ভিল চিত্তসুখে রব কল কল।
কমলিনী স্বীয় নাথ রবি অদশনে।
ক্ষুব্ধা যথা কৃষ্ণ বিনা রাধা, বৃন্দাবনে ॥
মলিনা হইল ক্ষোভে পন্ধজিনী সরে।
অভিমানে প্রতি প্রতি বামা যেন ঘরে
তাসহ তাপিল বনে খেদে সূর্যমুখী।
প্রবাসে যুবতী পতি গেলে যথা দুখী
দ্বিতীয় সর্গ।
নিশা আসি অন্ধকারি জগত ব্যাপিল।
না দেখি আমায় মাতা কাতরা হইল।
কাঁদিতে লাগিলা দেবী ঘাের শব্দে ঘরে।
গৃহদাহে যেমন দুখিনী উচ্চৈঃস্বরে ॥
শুনিয়া রোদনধ্বনি পড়ন্সী সকলে।
জিজ্ঞাসিল আসি তবে অনেক কৌশলে।
কি হেতু রােদন কর কালিদাস-মাতা।
কি বিপদ, তােমারে দিলেন কহ ধাতা ॥
এত দেবি লােদনের কারণ কি তব।
দাঁড়াইল ইহা বলি নরনারী সব।
কাদিয়া কহিলা মাতা কি কহিব আর।
কাছ আহরখে কালি গিয়াছে আমার।
সকালে গিয়াছে বাছা এবে এলাে নাই।
কি জানি কি হলো তার ভেবে মরি তাই ।
বৃক্ষ হৈতে পড়ি কি হইল বাছা সারা।
জানি ভুলায়ে নিল ছেলেধরা যারা ॥
কিম্বা সে বিরাগী হয়ে কোন দেশে গেলা।
, রহিল ভুলি মােরে পেয়ে কোথা খেলা।
বিদরে হৃদয় মম কালির বিহনে।
কি করি পড়সি! কহ স্থির নহি মনে।
সেবিবে আমারে বিস্ত হয়ে কালিদাস।
চাতকিনী সম আমি করেছিনু আশ
দশমাস যতনেতে উদরেতে ধরি।
লীখনু উরুগ যেন শিরে মণিকরি।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
কি অন্ধজন নড়ি প্রতিম সুআশা।
সদাই পড়সি! হৃদে ছিল মাের খাসা।
দুখিনী হইনু আমি হারায়ে সে আশা।
যথা বিহঙ্গিনী বৃক্ষে বৎসসহ বাসা৷
শোকসিন্ধু-মাঝে মম ডুবিল হৃদয়।
মৃণাল সুহ দে যথা নিলে কুবলয় ॥
কাঁদিল জননী দুখে কি কহিব কথা।
অজ্ঞাতে পাণ্ডব গেলে কুন্তি দেবী যথা।
কিম্ব। পিতৃসত্যে গেলে মহারণ্যে রাম।
যেরূপ কৌশল্যা দেবী বিধি যবে বাম ।।
অবিরল জননীর চক্ষে বহে ধারা।
ধ্রুবের জননী যথা ধ্রুবে হয়ে হারা।
কহিলা পড়ী যত কালির জননী।
উঠ, না কাঁদিও আর পাড়িয়া ধরণী।
তােমাদের অধ্যাপক গেছে রাজধানী।
কালিদাস গিয়াছেন তথা অনুমানি।
নিরর্থক কেন দেবী করগাে রােদন।
প্রভাত হইলে নিশি পাবে পুত্রধন ॥ ৮
নানা মতে বুঝাইয়া প্রতিবেশবাসী।
গেল। সবে স্বীয় ঘরে মায়েরে আশ্বাসি ॥
প্রভাত হইলে নিশি আমার জননী।
পিতার নিকটে দূত প্রেরিলা আপনি।
রাজধানী মঙ্গলকোটেতে গিয়া দূত।
ত্রিদিরপ্রতিম পুরী দেখিল অদ্ভুত ।
দ্বিতীয় সর্গ।
৩১
1
মম অনুদ্দেশ শেষে পিতার নিকটে।
কহিলা সন্দেশবহ বার্তা অকপটে ।
শুনিয়া জনক মম হলেন অস্থির।
বনে গেলে রাম যথা দশরথ ধীর।
কিম্বা কংশষজ্ঞ হৈতে না এলে মুরারি।
যেরূপ নন্দের প্রাণ সদাসুস্থ ভারি ।
ভবদীয় পিতাকে কহিয়া আসি ঘরে।
জিজ্ঞাসিল আদ্যোপান্ত বিবরণ পরে।
নিবেদিল মাতা মম সমাচার যত।
শুনিয়া জনক শােকে বুদ্ধি হৈলা হত।
হা পুত্র! বলিয়া পিতা
ক্ষুব্ধ
হৈলা মনে।
যেমতি হারালে রাজ্য ভাবে রাজাগণে।
অন্বেষিলা পিতা মােরে শেষে অহর্নিশি।
ঋষ্যশৃঙ্গ হেতু যথা বিভাণ্ডক ঋষি।
দেখিলেন ইতস্ততঃ অনেক যতনে।
যেরূপ রাঘব বনে বৈদেহী-রতনে।
কোথাও নাপেয়ে শেষে আমার সন্ধান।
বিদ্ধ হৈল পিতৃ-হৃদে পুত্র-শােক-বাণ।
ছায়াধর-বৃক্ষ-তলেবসি মন-দুখে।
বিলাপেন বহুবিধ অন্তর-অসুখে।
যথ জলমগ্নে পােত পেপতিবাহী কাঁদে।
সেরূপ আমার শােকে পিতা নানা ছাদে।
বাল্যবিধি বিদ্যা নাহি শিখ কালিদাস।
তথা আমার মনে ছিল বহু আশ ।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
কিম্বা কোন কার্যে ব্রতী না হইলে কালি।
ভ্রমক্রমে তবু তােরে নাহি দিনু গালি। এ
তবে কেন বৎস! মােরে কিবা দোষী করি ।
পিতা মাতা ছেড়ে গেলি ওই দুঃখে মরি।।
দস্যুসম দৌরাত্ম করিলি বহুতর।
ব্রেতাযুগে দ্বিজসুত যথা রত্নাকর।
সহিলাম পুত্রস্নেহে দৌরাত্ম্য তােমার।
শেষকালে বৎস কালি ! কান্না হৈল সার ॥
মধুজীবী মধুমক্ষী প্রতিম সঞ্চিয়।
পালিলাম বৎস! তােরে সহ নিজহিয়া ।
পরিণামে আমারে পালিবি যতনে।
অহনিশি সে আশা বাড়িতেছিল মনে।
কিম্বা অন্তিমেতে বৎস! ব্রহ্মের সুনাম।
শুনায়ে আমার কর্ণে পুরাইবি কাম।
সে সমস্ত আশা মাের বৃথা হৈলএবে।
দুগ্ধশে যেমন লােক বন্ধ্যা ধেনু সেবে ৷
কাষ্ঠ আহরণ হেতু এসেছিলে বনে।
বৃক্ষ হৈতে পড়েছিলে বােধ হয় মনে ।
সুযােগ-প্ৰয়াসী ব্যাঘ সুযােগ পাইয়া।
আক্রমণি তাের দেহ খেয়েছে বসিয়া।
হা পুত্র ! হারায়ে আমি শশাকে মরি তােরে।
যেমতি দরিদ্র-ধন নিলে দুষ্ট চোরে।
হায় মরি কিবা দোষে রে দারুণ বিধি ।
অন্তিম ভরসা মােন নিলে পুনিধি।
দ্বিতীয় সর্গ।
কি পাপে হারানু কালি! তােম। হেন ধন।
থাকিব কিরূপে গৃহে তিন্ঠি স্বীয় মন
অক্ষেপিল। এই রূপে পিতা মন-দুখে।
রাম বিনা ঈশ্বরগ্ধ যেমন অসুখে।
কিম্বা শত পুত্র হত শুনি কুরুপতি।
যেরূপ দিল। শোকে হারাইয়া মতি ।
ক্ষণে উাঠ ক্ষণে পড়ি কাঁদিলেন পিতা।
যেমন জনক ঋষি বনে গেলে সীতা
অনন্তর কৃষিবন্ধ কৃষা আসিয়া।
উপস্থিত সহসা হইল তথা গিয়া ।
তদবস্থা পিতার দেখিয়া চাষা-পণ।
জিজ্ঞাসিল কহ সুরি! কঁাদ কিকারণ ।
কি সন্তাপ হৃদয়ে হইল প্রভু! তব।
করি’ছ রােদন কেন করি ঘের রব ।
কহিনে ক্ষোভে পিতা বৎস রে কৃষণ !
জান কোথ। মম পুত্র করেছে প্রস্থান ?
কহিলা কৃষাণ প্রভু ! শুন বিবরণ ।
গৗড়গ্রামদিগে গেছে তব পুত্রধন 1
অদ্য বুধ! দিন দুই মনে অনুমানি।
ব্রাহ্মণগণের সহ গে’ছে আমি জানি ॥
জীবিত যে আছি আমি, জানি পিতা শেষে।
অগত্যা গৃহেতে গিয়া রহিলেন ক্লেশে।
ইতি কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্যে দ্বিতীয় সর্গ।
---
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
তৃতীয় সর্গ ।
হায়! নৃপ অন্নদাতা জনক এ ভবে।
বষি বারি শূন্য যথা শস্য দেয় সবে ৷৷
কিম্বারুণ নীহারের সহ দিয়া তাপ।
বাড়ান যেরূপে শস্য সেইরূপ বাপ।
পুত্র-প্রেম পিতৃ-হৃদে গুপ্ত তানুক্ষণ।
মুদিত কমলে যথা থাকে গন্ধধন।
বিরহ হইলে স্নেহ প্রকাশিত হয়।
ফুটিলে সেরূপ পদ্ম সৌরভ নিশ্চয়।
হেন পিতা সেবে যেবা রীতি অনুসারে।
তার যশঃ-স্তম্ভ কেহ উপাড়িতে নারে।
ধন্য ভবে নরপতি। নর সেই জন।
যে হেতু যশস্বী বিশ্বে প্রভু রাম-ধন।
অনন্তর গৌড়পুরে যােক্তা সহ আমি।
উপস্থিত হৈনু শেষে শুন ভবস্বামি !
গৌড়রাজ-রাজগৃহ অদূরে শােভিল।
দেখিয়া ধবলাকৃতি বিস্ময় জন্মিল ।
অদ্ভুত তুষার-শুপ বােধ হৈল মম।
কি যেন স্থায়ী আছে শ্বেতগিরি সম।
জিজ্ঞাসিনু যােক্তা প্রতি কহ যােত্বর !
কি শােভে সম্মুখে যেন শুভ্র নগেশ্বর।
তৃতীয় সর্গ।
ধবল আকৃতি দেখি ভীত মমন্তির।
কহ অশু কিবা উহা শোভে ঘােরতর।
কহিলা প্রধান যােক্তা বৎস কালিদাস।
গৌড়েশ্বর-গ্রাজগৃহ নাহি তব ত্রাস ॥
যে রাজ-জামাতা হতে চলিয়াছ এবে।
নিরখি প্রাসাদ তার ভীত কেন ভেবে।
চল বলি সঙ্গে করি লয়ে মােরে সবে।
নগরের প্রান্ত দিয়া চলিল নীরবে ।
রাজপথ দিয়া তবে চলিনু সকলে।
দুইধারে সৌধাবলি দেখি কুতুহলে।
প্রধান-যােকাবাসে উত্তীর্ণ হইয়া ।
রহিলাম নিশাকালে তথায় শুইয়া।
পর দিন যােক্তা তবে গিয়া রাজালয়।
কহিল এনেছি পাত্র নৃপ মহাশয় !
অদ্বিতীয় কবি তিনি বিজয়ী ভুবন।
করহ বিধান যাহা উচিত এখন।
তাহার প্রতিম বি বিরল এভবে।
বহু দেশ ভ্রমি দেব! আনিয়াছি সবে।
প্রতিপন্ন ব্যাস-নিভ বেদেতে সে জন।
কিম্বা ছন্দকৰ্ত্তা যেন বাল্মীকি সুজন।
সংহিতায় যথা ছিলা মুনি পরাশয়।
কৌতুকে নারদ সম শুন গৌড়েশ্বর ।
বহুদর্শী হেন ভূপ! কি কহিব কথা।
বেদব্যাস-পুত্র ছিল শুকদেব যথা।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
গদ্য ভাষা কহে সম বৈবস্বত মণ।
বহু বিদ্যা আছে যথা রঙে ইন্দ্র-ধনু ৷
পৌরাণিক স্মৰ্ত্ত কিম্বা নৈয়ায়িক বটে।
অদৃষ্ট নাহিক শাস্ত্র এপাত্র নিকটে।
কাশমীর মহারাষ্ট্র, কিম্বা বারাণসী।
তার বিদ্যালয়ে পড়ি পেলে জ্ঞান-শশী।
কাণ্যকুঞ্জ বিদ্যালয়ে পাঠ পড়ি শেষে।
প্রতিষ্ঠা প্রকাশ তাঁর এবে দেশে দেশে।
ধরিয়া প্রতিষ্ঠা-পুত্র আনিয়াছি মােরা।
সমাধা, হইলে বাঁচি নৈলে মিছে ঘােরা।
শুনি গোঁড়েশ্বর বড় সন্তুষ্ট হইল।
সম্বােধি যােজুকে শেষে কহিতে লাগিল।
ধন্য প্রভুভক্ত তুমি যােজক সুজন।
পাইয়াছ বহু কষ্ট দুহিতা কারণ ॥
আনিয়াছ ৰিজ্ঞতম পত্র যদি একে।
দাস-দাসী দেহ লয়ে যেন তারে সেবে ।
মনােহর সৌধে যােক্তা! বাসা দেহ তার।
ভক্ষ্যভােজ্য দেহ যাহা ভক্ষণের সার ॥
রত্নাবতী পুরী-গ্রান্তে আছে সেখােম।
তাহে বাসা দেহ তাহাবৈজয়ন্ত সম।
কোষাধ্যক্ষে ডাকি রাজা কহিলেন ভরে।
ধন দিও এ যােক্তার বাক্য-অনুসারে ॥
রাজ-আজ্ঞা শিরোধার্য্য করি যােত্বর।
আইলেন গৃহে ফিরি অতি শীঘতর।
তৃতীয় সর্গ ।
৩৭
একত্র যােজক যত হয়ে সজন।
চলিল আনন্দে নৃপনির্দিষ্ট ভবন।
পরিগ্রহ করি স্থান, মম সহ সবে।
কহিল প্রধান যােক্তা শেষে মােরে তবে।
শুনহ বচন মম বৎস কালিদাস !
মুখস্থ শ্রুতির নাম করহ অভ্যাস।
চতুর্দশ শাস্ত্র আর পুরাণাদি যত।
শিখহ তাহার নাম অহিমন্ত্র মত।
পাণিনীর দুইচারি পাত মুখে মুখে।
অমরকোষের সহ শিখ বসি সুখে।
বাক্যের জড়তা যত দূরীভূত হবে।
বিবাহ হইলে দেশে তব যশ রবে ।
প্রথমে ভূমিকাহেতু রত্নাবতী ধনী।
আদ্রমন তার বৎস হবে গুণমণি।
সুতরাং বিদ্বান্ বলি করিবে বিশ্বাস।
তাহলে নিশ্চয় এবে পূর্ণ হবে আশ ।
বিশ্বাস সবার মূল জানিও এভৰে।
বিশ্বাস হইলে প্রাণ দান করে সবে ।
ইহা বুলি শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিল।
যে যত জানে মেরে সবে পড়া দিল।
নীভােব কুঞ্জ-সখা শুক বিহঙ্গম।
শিখাতে লাগিল নৃপ! মোরে তার সম ॥
শিখালে শাস্ত্রের নাম একে একে গনি।
সাবধানে হেম-মুদ্র। যথা গণে ধনী।
৩৮
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য
পড়াতে লাগিলা মােরে দিতে জ্ঞান-শশী।
শিখিনু মুখস্থ যথা শুক দাঁড়ে বসি।
অনন্তর অবরােধে গিয়া রাজদূত।
কহিল এনেছে যােক্তা বিজ্ঞ রাজসুত।
প্রতিপন্ন সুধী তিনি জয়ী ত্রিভুবন।
কহিল রাজার কাছে যত যােজগণ ॥
এ সংবাদ দিতে মােরে পাঠালে রাজন।
করগাে কুমারি ! এবে যাহা লয় মন ।
তব হেতু সতত চিন্তিত নৃপ সতি।
মৈথিলীর জন্য যথা মিথিলার পতি।
যেহেতু তােমার এবে ধনুর্ভঙ্গ পণ।
শমিত সমাধা বিনে নহিবে রাজন।
ইহা বলি চলিগেল দূত রাজালয় ।
প্রফুল্লিল মন-পদ্ম কুমারি-হৃদয়।
দেখিয়া আদিত্যে যথা জলে কমলিনী।
হাসিলা নৃপতিবালা হর্ষে সুভাষিণী।
কিম্বা সোমে দেখি রাত্রে যেন কৈরবিনী।
রত্নাবতী সেরূপ হইল আদরিণী।
ভাসিলা আনন্দনীরে বসি ধনী ঘরে।
আশুগ-হিল্লোলে যথা পঙ্করূহ সরে'।
পতিলাভ-অনুধ্যানে হৈল ধনী সুখী।
প্রভাতে ঊদিলে সূৰ্য্য যেন দুৰ্য্যমুখী।
বাসন্তি-সুন্দরী নাম্নী প্রিয়সখী তার ।
সম্বােধিয়া তারে কহে সুভাষা অপার ।
*,
তৃতীয় সর্গ।
৩১
অয়ি সখি এত দিনে বুঝি বিশ্বপতি।
অনুকুল হয়ে দিলা যেজকে সুমতি।
তেঁই তারা হেন বুধ আনিল নগরে।
জিনিবে এসুধী মােরে বুঝিনু অন্তরে।
তাহলে কৃতার্থ আমি হইব এভবে।
ধন্যবাদ দিবে মোরে নগরিক সবে ৷
যেমন কঠিন পণ করে আমি সতি।
হারাইয়াছিনু শেষে ভেবে স্বীয় মতি।
আমােদিনী হব এবে স্বামিপদ সেবি।
সেবিয়া বিষ্ণর পদ যথা লক্ষ্মী দেবী।
কিম্বা আমি হব ভবপ্রিয়ার প্রতিম।
অক্ষয় অচল প্রেম যাহার অসীম।
নীরবিলা ইহা বলি রত্নাবতী সতী ।
গাইয়া বসন্তে ক্ষণ কোকিলা যেমতি।
নগরে হইল গােল সুধী আসিয়াছে।
হারিবে নৃপতিবালা এবুধের কাছে।
শুনেছি চতুর-বিধ বিদ্যালয়ে পড়া।
কার সাধ্য তার সঙ্গে শাস্ত্র লয়ে নড়া।
পরম বেদাঙ্গী ভবে এসুধী সুমতি।
হারিবে নিশ্চয় এবে রত্নাবতী সতী ।
তাহলে উৎসব হবে এ গৌড় নগরে
দেখিব দম্পতি মােরা সুখে বসি ঘরে ।
ঘাটে মাঠে রাজপথে কহে এই কথা।
ভাঙ্গিলে হরের ধনু মিথিলায় যথা ।
৪
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
অনন্তর নৃপবালা দূত পাঠাইয়া।
যেক্তিবরে কহিতে লাগিল লয়ে গিয়া ।
কিরূপ পণ্ডিত আনিয়াছ যােত্বর ।
কিবা জানে বিশ্বসারা বিদ্যা সেই বর।
কোন্ বিদ্যালয়ে ছিল তার বিদ্যা-শেখা
কেমন কবিত্বশক্তি কিরূপ বা লেখা ।
কি নাম ধরেন ধাম কহ কোন্ স্থানে।
স্বভাব কেমন ভার কি রূপ বা মানে
মুমূৰ্ত্তি কেমন তঁার কহ যােক্তা শুনি।
সৌজন্যপ্রকাশে তিনি কেমন বা গুণী।
বাদ্য-সারা বীণানিভ ধনী রত্নাবতী।
কহিলা সুস্বরে সুখে যােজকের প্রতি।
যােক্তা কহে অবধান কর নৃপবালে !
শুনিবে কবিত্ব তার বিচারের কালে ।
সুরগুরু বৃহস্পতি-প্রতিম বিদ্বান।
কেহ কভু বিচারেতে জয় নাহি পান।
যথা যান জয়ী তথা এপাত্র গাে সতি।
সর্বত্র বিজয়ী যথা ব্যাস মহামতি।
শ্যামবর্ণ বর্ণে তিনি মঞ্জুরূপধারী।
হেরিলে মােহিত ভঁরে আশু হয় নারী।
গুণাকর রূপাধার এপাত্ৰ কুমারি !
ভাগ্যগুণে পায় যেবা ধন্য সেই নারী।
তাঁহার সদৃশ বিজ্ঞ বিরল এভবে ।
বহুদেশ ভ্রমি দেবি! আনিয়াছি সবে।
তৃতীয় সর্গ।
শুনি প্রতিপন্ন অধুনা সেজন।
অদ্বিতীয় কবি ভদ্রে। বিজয়ী ভূবন।
বহু প্রাজ্ঞ হেন কি কহিব কথা।
বেদব্যাস:পুত্র ছিল শুকদেব যথা ।
পৌরাণিক স্মৰ্ত্ত কিম্বা নৈয়ায়িক বটে।
অদৃষ্ট নাহিক শাস্ত্র এপাত্র নিকটে।
মহারাষ্ট্র কাশমীর আর বারাণসী।
পাইয়াছে পড়ি তথা শুদ্ধ জ্ঞান-শশী।
কান্যকুজ বিদ্যালয়ে পাঠ পড়ি শেষে।
প্রতিষ্ঠা প্রকাশ তাঁর এবে দেশে দেশে ।
কালিদাস কবিরত্ন নাম তাঁর সতি।
পরম বিদ্বান, যথা দিবে বৃহস্পতি।
তব পণ শুনি বুধ অনুগ্রহ করি।
এসেছেন গৌড়পুরে কহিনু সুন্দরি।
এসকল শুনি তবে দেবী রত্নাবতী।
কহিলেন অনুনয়ে যােজকের প্রতি ৷
বিচারের দিনস্থির কর যােবর ।
যাহাতে বিবাহ এবে হয় অতির।
যেই হেতু প্রতিবন্ধ শুভকর্মে ঘটে।
রুক্মিণী-বিবাহে দেখ সে প্রমাণ বটে।
যােজক কহিল দেবি! কহি শুন সার।
আগামী ফান মাসে হইবে বিচার ।
ত্রয়ােদশী দিনে দিন বিচারের সতি।
বলেছেন পাত্র এই নিশ্চয় ভারতি ॥
(৬)
৪২
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
ভাল বলি সায় রামা সে কথায় দিল।
ফিরিয়া প্রধান যােক্তা দলেতে আইল ।
অনন্তর সখী লয়ে দেবী রত্নাবতী।
কহিতে লাগিল সুখে মনের ভারতি।
এত দিনে অয়ি সখি বাসন্তি-সুন্দরি।
দিবেন আমারে পতি বিধি কৃপা করি ।
যে হেতু এ পাত্র নাকি চারি বিদ্যালয়।
পড়িয়াছে কহিলেন যােক্তা মহাশয় ।
সুতরাং স্বামিত্ব তার সর্বশাস্ত্রে আছে।
অবশ্য হারিব আমি এ বুধের কাছে।
পণ-অনুসারে পাত্র এবে দিলা বিধি।
চরিতার্থ হবে আত্মা পেয়ে স্বামি-নিধি।
বিশেষ সুপ্রশ্ন আমি করিব এ বরে।
“মুনীনাঞ্চ মতিভ্রম” কহে পরস্পরে ।
মম হেতু মম পিতা চিন্তাযুক্তকায়।
জনক সীতার হেতু যথা মিথিলায় ॥
জননী আমার ভেবে হয়েছেন দুখী।
বিবাহ না হলে কেহ না হইবে সুখী।
বিশেষতঃ মনসিজ মাের মনে বসি।
দগ্ধিছে আমারে যথা বনে বহ্নি পশি।
তার উপদ্রবে এবে পড়েছি বিপাকে।
নিশায় নিদ্রার তেজ সদা লঘু থাকে ।
আক্ৰময় তেজে মাের অসহায় পুরী।
উঠি বসি সদা সখি। শুদ্ধ ভ্রমে ঘুরি।
তৃতীয় সর্গ।
মুহুর্মুহুঃ অনন্যজ হানে পুষ্প-ইযু।
অনুক্ষণ ভাবি যথা অসহায় শিশু
জানিতাম নাহি সখি! এত দিন আমি ।
এত তেজ কুসুমেষু ধরে বিনা স্বামী।
এই হেতু কুল-মানে জলাঞ্জলি দিয়া।
বরাােেহা নীচপ্রতি ভজে দুঃখে গিয়া।
যামিনীর যে যাতনা কি কহিব কথা।
স্বাম্যাভাবে পিতৃগৃহে দময়ন্তী যথা
মদন-তাপিতা রামা এরূপ কথন।
কহিতে লাগিল সদা অসুখে রাজন।
সুতরাং সর্বদা যেই স্মরে স্মর-লীলা।
ক্রমশঃ তাহার বিদ্যা হয়ে পড়ে ঢিলা
নিরূপিত দিন পরে দেখিয়া আগত।
কহিতে লাগিল যযাক্তা মােরে বিধিমত।
নির্ভয়ে থাকিবে সদা বৎস কালিদাস।
বিদ্যাহীন বলি কভু না করিও ত্রাস।
ভরসা পুরুষপক্ষে পয় এই ভবে।
সাধিবে যাহারে সিদ্ধ অবশ্য তা হবে ।
সে প্রমাণ দেখ ধ্রুব ভ্রমি বনে বনে।
লভিল পরম-বস্তু রমাপতি-ধনে।
দৃঢ়মনে চিন্ত এবে দেব লক্ষীপতি।
নিশ্চয় পাইবে ওমি রত্নাবতী সতী।
ইহা বলি লিখিত তুলতু গ্রন্থ লয়ে।
বাঁধিল বিশদ ৰস্ত্রে সাবধান হয়ে।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
কুট্যঙ্গ পুরাণ বলি নাম তার দিয়া।
চলিল তাহার সহ আমারে লইয়া।।
সাবধান-হেতু মােরে কহিলেক সবে।
কদাচ রে বৎস! তুমি ভীরু নাহি হবে।
যখন নৃপতিবালা কুপ্রশ্ন করিবে।
উপযুক্ত ভাব বুঝি প্রত্যুত্তর দিবে ।..
যদি বলে কোন্ শাস্ত্র পড়া তব আছে।
কহিবে অদৃষ্ট নাহি শাস্ত্র মাের কাছে।
সংহিতা পুরাণ যত সব আমি জানি।
হইলাম বহুদেশে পড়ি এৰে জ্ঞানী।
আজীবন নানা শাস্ত্র পড়িয়াছি ধনি!
কুট্যঙ্গ পুরাণ কিন্তু সর্বোত্তম গণি ।
এরূপ ভূমিকা করি এ পুস্তক খানি।
সম্মুখে রাখিয়া কবে সুমধুর বাণী।
কুঠার-আঘাতে কাষ্ঠ করিনু ছেদন।
কুট্যঙ্গ-পুরাণ নাম সে হেতু রাজন।
অনন্তর নিমন্ত্রিত রাজগণ যত।
এলো গৌড়নগরেতে ক্রমে শত শত
বাজি-রাজি দন্তী সহ এলাে ঘাের দলে।
দময়ন্তী স্বয়ম্বরে যথা কুতূহলে ..
কিম্বা যথা দ্রৌপদীর লক্ষ-বেঁধাপণে।
আসিয়াছিলেন হর্যে দিকপাল-গণে।
মহাকোলাহলে পুরি সে সুন্দরী পুরী।
আরলি অশ্বারােহী বেড়াইতে ঘুরি।
তৃতীয় সর্গ।
ভারে ভারে দধি-দুগ্ধ লয়ে এলো ভারী।
পণ্ডিবের রাজশূয়ে যথা সারি সারি ।
রঞ্জিল বিপণি সরে নানাবিধ রাগে।
যথাপূর্বে সগরের অশ্বমেধ-যাগে।
চারিদিকে বাদ্যোদ্যমে নগরী পুরিল ।
মহাকোলাহল পুরে আরম্ভ হইল।
জনস্রোত রাজপথে বহিল কল্লোলে।
মহাবেগে বারি যথা পয়ােধি-হিল্লোলে ।
আইল নৃপতিতা-দূতগণ যত।
ভয়ানকরূপী সহ যান শত শত । :.
যােজকসমীপে আসি এই বার্তা দিল।
পাত্র সহ চল যােক্তা কুমারী কহিল ।
যান সহ যানবাহী দ্বারে উপস্থিত।
আহােরণ কর সবে যার যে বিহিত ॥
অপরায়ু ক্ৰমে আসি উপস্থিত হল ।
বিচারের গৃহে যেতে সে হেতু কহিল।
যােজক কহিল শুন রাজদূতগণ!
যানােপরি যেতে এবে নহে মম মন।।
দেখাইয়া কবিরত্নে গৌড়ের বিভব ।
যথাকালে অবরােধে যাব মােরা সব ।।
এরূপ প্রবােধ দিয়া যােক্তগণ তবে।
চলিল আমার সহ মহানন্দে সবে ।
অগ্ৰে অগ্রে ধ্বজধারী পিছে দূতগণ।
রাজব্যবহারে সবে করিনু গমন
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
দুইধারে শোভিল সুরম্য হৰ্ম যত।
নানারূপ চিত্র তাহে নিবেদিব কত।
বিস্মিত হইনু দেখি গৌড়ের বিভব।
দেখিলে ত্রিদিব নর যেইরূপ সব।
দেখাতে বৈভ্রাজসম রাজ-উপবন।
চলিল আমারে লয়ে যত যােক্তগণ ।
দেখিনু প্রবেশি তাহে চমৎকার শােভা।
স্বগীয় উদ্যান যথা দেবমনােলােভ।
মঞ্জল কুসুম-দ্রুম সারি সারি রােপা।
নিম্নমুখ ঝােলে তাহে প্রসূনের থােপা।
ফুটে আছে কৃষ্ণচূড়া চূড়ার আকার।
মুরারির মস্তকেতে শােভা ছিল যার।
অশােক কিংশুক পুষ্প শােভিছে সুন্দর।
দূর হতে যার শেভি শোভে মনােহর।
ফুটিতেছে শেফালিকা অতি মনােহরা।
মুক্তাসম পড়ি যাহা উজ্জ্বলয়ে ধরা।
শােভিয়াছে স্থলপদ্ম উত্তম বিশদ।
পুণ্ডরীক শােভা করে যেইরূপ হদ।
অধােমুখী সুৰ্যমুখী বিরহের ছলে।
যেই হেতু অংশুমালী যান অস্তাচলে।
সরােবরে সরােরূহ কিম্বা কুমদিনী।
আধফোটা কেহ সুখী কেহ বা দুখিনী ।
ধারে ধারে কৃষ্ণকেলী ফুটিছে সুঠাম।
শ্রীকৃষ্ণ খেলিল বলি কৃষ্ণকেলী নাম।
তৃতীয় সর্গ।
৪৭
ভুরি ভুরি মঞ্জু, পুষ্প শােভিছে ফুটিয়া।
মধুজীবী মত্ত অলি যার মধু পিয়া।
গৌড়পুরে মনােরম সেই উপবন।
নন্দনকানন যথা নন্দন রাজন ।
ইতি কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্যে তৃতীয় সর্গ
৪৮
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য
চতুর্থ সর্গ।
ros
অনন্তর সম্মুখে শােভিল দেবালয়।
রূদ্রাবাস-বারাণসী যথা শােভাময় ।
দেখিনু সুহেমচুড় মঠ সারি সারি।
ভয়ঙ্কর লিঙ্গ তাহে বসে শৃঙ্গধারী।
ঢলঢল করে হর আয়ত লােচনে।
হলাহল পিয়ে যথা অম্বুধি-মথনে ৷
ডমরু শৃঙ্গের শােভা শােভে দুই হাতে।
বিবরনিবাসী অহি গজ্জে যার ঘাতে।
শােভিছে মস্তকে রম্য দীর্ঘ জটারাশি
ধরিবারে যাহা শিরে যােগী অভিলাষী।
বিস্তারিয়া ফণী ফণা স্কন্ধদেশে খেলে।
ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবহেলে ৷
ভস্মেতে ভস্মিত অঙ্গ লিঙ্গরূপী হর।
বসিয়া আছেন যেন শুভ্র মহীধর।
কণকত্রিশূল-চূড় কালীর মন্দির।
তাহাতে রূদ্রাণি-সৃকে বহিছে রুধির।
লােল জিহ্বা লুলি দেবী দাঁড়ায়ে কৌতুকে।
পুর্বে যথা লুলি শূল হানে শম্ভু বুকে।
নরকরকিঙ্কিণীতে শােভে কটিদেশ।
পলাইল রক্তবীজ দেখি যেই বেশ।
চতুর্থ সর্গ ।
উরসেতে নরম দুলিছে সঘনে ।
হর্ষিতা ললনা যথা দোলায় নন্দনে ॥
মেঘমালা সম পড়ি আছে মুক্তকেশ।
কাকনপূর পদে নাহি যার শেষ ।
বিশুদ্ধকাঞ্চন-কান্তি মঠ মনােহর।
গণেশজননী তাহে শােভিছে সুন্দর।
করভ-গণেশ-শুণ্ড ধরি করি দয়া।
চুম্বি’ছেন মনােল্লাসে ঈশ্বরী অভয়া।
প্রস্তরনির্মিত মঠে শার্দল-বাহিনী।
পুরাণেতে বিশ্বধাত্রী শুনেছি কাহিনী ।
তার ছটা ঝলঝলা অতি চমৎকার।।
ঘনােব ক্ষন প্রভা যথা মনােহরা ।
উষ্ণরশ্মি-প্রতিবিম্ব ফলিত মন্দিরে।
শুভ্রবর্ণা দেবী তাহে রত্ন-ছটা শিরে।
বাণীরূপা হরিপ্রিয়া বিরাজেন দেবী।
কবি হৈল রত্নাকর যার পদ সেবি ।।
হীরচুড়াশির মঠে অন্নদা সুন্দরী।
মােহিনী মূরতি দেবী বসিয়াছে ধরি ।
শােভিছে কনক দৰ্ব্বী দক্ষিণ করে।
রুদাবাসে ভঁর হস্তে যথা শােভা ধরে।
নীলকান্তমণি-শির মঠ তুঙ্গতর।
রমা সহ নারায়ণ তাহে মনােহর।
সুচারু-হাসিনী লক্ষী বিঘােষ্ঠ-ধারিণী।
মাধবের বামে যেন হাসি’ছে তারিণী।
*
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য
রত্নাকর-রত্নোত্তমা বিরাজেন দেবী।
ধনদ হইল ধনী যার পদ সেবি।
নয়ন-রমণী রমা মােহি নারায়ণে।
বসেছেন হেন, যথা ব্রজকুঞ্জবনে ।
দক্ষিণে মুরলী হাতে শােভিছে মুরারি।
যেরূপ হেরিয়া মােহে ব্রজকুল-নারী।
শিখিপুচ্ছ-চূড়া তাঁর শিরে সুশােভন।
উম্মত্ত হইলা যাহা হেরি গােপীগণ।
চন্দ্রক শােভিছে তাহে অতি মনােহর।
উজ্জ্বলিয়া গােলাকারে যথা সুধাকর ।
ধন্য ভবে গৌড়পুর ধন্য গৌড়েশ্বর।
করেছে প্রতিষ্ঠা মঠ রম্য বহুতর ।
শােভিছে তাহার চূড়া পরম সুন্দর।
যুবতিযৌবন যথা বিশ্বে মনােহর।
উজ্জ লিছে দেবালয় নানাবিধ সাজে।
করয়ে উজ্জ ল যথা রুদ্রাবাসে রাজে।
সুরম্য হৰ্ম্মেতে বিষ্ণু রামমূৰ্ত্তিধারী।
নীলগিরি সমরূপে বামে সীল নারী 1
বনবাস-অন্তে যথা বৈদেহীরঞ্জন।
হেন বেশে বসি অঙ্গে রাজ-আভরণ ।
দক্ষিণে উর্মিলানাথ ছত্র ধরি করে।
দাঁড়ায়ে সেখানে যথা অযযাধ্যা নগরে ।
নরসিংহরূপী শােভে বিগ্রহ ভীষণ।
ধরিলা যেরূপ শৌরি দৈত্যের কারণ।
৫১
চতুর্থ সর্গ ।
হিরণ্যকশিপু আছে উরূদেশে তার।
নাশিয়া যাহারে প্রভু হরিলা ভূভার ।
নখকুলীশের ঘাতে উরস বিদারি।
পরেছেন গলে তার ধমনী মুরারি।
সম্মুখে প্রক্লদ ভয়ে আছে যােড়হাতে।
দুঃখিত পিতার মৃত্যু দেখিয়া সাক্ষাতে।
শিলাময়প্রতিমূর্তিধারী মুনিগণ।
নিরাশ্রমে বসি যেন যােগে দিয়া মন
দীর্ঘজট। কবিগুরু বাল্মীকির শিরে।
বসিয়া আছেন যথা সরযুর তীরে ॥
বেদখণ্ড করি যেন নাপুরিল আশ।
হেন ক্ষোভে উপবিষ্ট মুনি বেদব্যাস
অঙ্গলি নাচায়ে বীণ। নারদ বাজায় ।
হেন বেশে বসি তথা ভস্মরাশি গায়।
রক্তবর্ণ ত্রিপুণ্ড ক রঞ্জিত ললাটে।
রঞ্জিল প্রয়াগে যথা জাহ্নবীর ঘাটে ।
কতশত মুনিমূৰ্ত্তি সারি সারি ছবি।
উদিলে তাহাতে শােভে প্রতিফলি রবি।
দেখি দেবালয় সবে সুন্দর গঠন।
বহিদ্বারে ক্রমে শেষে করিনু গমন।
দেখিলাম তােরণের শােভা মনােহর।
ত্রেতাযুগে লঙ্কাধামে যেরূপ সুন্দর ।
কিম্বা হস্তিনায় যথা পাণ্ডব-তােরণ।
গঠিল দানব যাহা করিয়া যতন।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
তদুপরি তোলা আছে ধূজা ভয়ঙ্কর।
উচ্চতর-চূড়া যেন কৈলাসশিখর।
তার শিরে লম্বমান পীত বস্ত্ৰসাজ।
উড়িতেছে সমীরণে যেন পক্ষিরাজ।
তুঙ্গতর নৌবত স্থাপন দুই পাশে।
বাজি’ছে বাদি মিষ্ট যথা সুরবাসে।
ভয়ঙ্কর দুই ধারে দুই সিংহ-ছবি।
বক্রভাবে আছে যেন ধরিবারে রবি।
তারাকার চক্ষ তার অগ্নিসম জ্বলে।
বনান্তরে যায় দন্তী যার তেজ-বলে ।
গজবন্ধনীতে বহু দন্তী সারি সারি।
মেঘাকৃতি গিরি সম আছে শুণ্ডধারী।
শুভ্রবর্ণ দীর্ঘ রদ তার দুই পাশে।
বৃংহিত শুনিয়া লােক সদা ভীরু ব্রাসে ।
দণ্ডহস্ত নিশাদিরা করি’ছে শাসন।
নগরপালের হাতে তস্কর যেমন।
বাজিরাজি বক্ৰগীব মন্দুরায় আছে।
হে যারব শুনে ভয়ে নাহি গেনু কাছে ।
লোহিতবরণ, শ্বেত, কৃষ্ণ, যত বাজী।
সারি সারি বন্ধনেতে সহ তাজি-রাজি।
প্ৰথরব কিম্বা হে ষা ঘন ঘন করে ।
ভীত হয়ে লােক সব দূরে যায় ভরে 1.
চিবাইছে মুখস ভুমিতে পদ ঝাড়ি।
দেখিয়া অগণ্য বাজি বসে গেলা নাড়ি।
চতুর্থ সর্গ।
অস্ত্রপাণি শত শত খাড়া দ্বারবান।
নারায়ণী সেনা যেন তথা বর্তমান।
দীর্ঘকায় রাজপুত বন্দক লইয়া।
দণ্ডধারী দূতসম আছে দাড়াইয়া ।
কৌরবপ্রতিম সেনা দম্ভে ফিরে দ্বারে।
কুরুক্ষেত্রে ফিরে যথা কুরু রক্ষিবারে।
শিরস্ত্রাণ বাঁধা শিরে শিখা সহ কসা।
ঝলঝল করিতেছে হেমরসে রসা
উৰ্দ্ধগামী তার শিখা শােভিছে সুন্দর।
ভুজঙ্গ-ভুকের শিরে যথা মনােহর।
অঙ্গে বৰ্ম্ম চমৎকার কাঞ্চন আকার ।
অংশুমালিকরে তাহা শোভে চমৎকার।
হেমবৰ্ম্মে অংশুরাশি খেলিছে সুন্দর।
ধকধকি সুমেরুতে যথা মনােহর ।
ঝুলিছে বর্তুলাকার চর্ম পৃষ্ঠোপরি ।
শোভিছে রতন চক্র তাহে মন হরি।।
দিনকরকর চক্রে প্রতিবিম্ব ফলি।
ভবতলে রবি যেন খেলিছে বিজলি ।
অসিকোষ সহ অসি ঝুলে লম্বমান।
ধুমপুঞ্জমধ্যে যেন বহ্নি তেজবান।
শূল হাতে শ্রেণিবন্ধে খাড়া সৰ্বজন।
ঘরবােলা আমি, দেখি ডরাইল মম।
ভয়েতে টলিরা শেষে পড়িলাম ভূমে।
আঁখি না মেলিতে পারি যথা পড়ি ধূমে।
কালিদাসের বিদ্যালত কাব্য।
মতিশূন্য হয়ে ভাবি হৈমু অচেতন।
উত্তরগােগৃহে যথা বিরাটনন্দন।
বৃহণ্যলা সম যােক্তা সান্তিয়া আমরে।
উপস্থিত হৈল মােরে লয়ে বহিদ্বারে।
তােরণ হইয়া পার প্রথম মহলে।
চলিলাম সবে শেষে মহা কুতুহলে।
দেখিলাম রমণীয় প্রাসাদের শােভা।
অযােধ্যা নগরে ছিল যথা অখিলােভা।
পরে পশুপক্ষ্যালয়ে করিয়া গমন।
দেখিনু খেলিছে তাহে নানা জন্তুগণ।
পিঞ্জরতে বদ্ধ যত কেশরীর দল।
ভীমাকৃতি জটাধারী ঘুরিছে প্রবল।
সোর-অংশু-তেজ-সম দুই চক্ষু জ্বলে।
কিম্বা তারা জ্বলে যথা আকাশমণ্ডলে।
হীরার্থপ্রতিম তার নখ পদতলে।
ছিন্ন করে দন্তিমূণ্ড যার তেজ-বলে ।
সুক্ষতম কটিদেশ সুঠাম সুন্দর।
যুবতী ভীমার যথা শোভে মনােহর।
ভয়ানক হিংসাশীল দেখিনু শৰ্দল।
যারে নিরখিলে হয় নরবুদ্ধি ভুল।
সুনয়নাকুরঙ্গিনীযূথ মন-সুখে।
খেলিছে চিবাই তৃণ স্বীয় স্বীয় মুখে
বাক্যাতীত জবৃন্দ চারি দিগে আছে।
ঘুরে ঘুরে দেখিলাম সকলের কাছে।
il
চতুর্থ সর্গ ।
বহুবিধ বিহঙ্গম দেপিনু সুন্দর।
খেলিতেছে মনানন্দে পিঞ্জর-ভিতর ।
নাচিতেছে সুখিনী শিখিনী শিখিসঙ্গে।
ধূমযােনি হেরি যথা মহীধরে রঙ্গে।
বিস্তারিয়া পুচ্ছপুঞ্জ খেলে কুতুহলে।
নর্তকী নাহিক যার সম ভবতলে ||
চন্দ্রক শােভিছে তাহে বর্ণাতীত রাগে।
ইন্দ্রধনু যথা কাদম্বিনী-শিয়ােভাগে।
বহুরূপী পক্ষিগণ দেখি অবশেষে।
চলিলাম গৌড়পতিসভার উদ্দেশে।
অচিরায় পঁহুছিনু সভামাঝে গিয়া।
কিন্তু তার জাঁক দেখি কেঁপে গেল হিয়া।
দাসদাসী উপস্থিত নৃপতি সহিত।
আছয়ে সভায় সবে যেরূপ বিহিত।
নিমন্ত্রিত রাজগণ চারিপাশে অাছে।
পাত্রমিত্ৰ লয়ে সবে স্বীয় স্বীয় কাছে।
আহ্বানিল মােরে স্বয়ং গৌড়-নরবর ।
সম চিত অনুরাগে উঠিয়া সত্বর ।
যােজক সহিত আমি সভায় উঠিয়া।
বসিলাম নতভাবে ভয়ে ভয়ে গিয়া ।
দেখি সভা সাজায়েছে অনেক কৌশলে।
মনােহর তার শােভা অতুল তলে।
শােভিছে রতনাবলি কি কহিব কথা।
ফুটিলে মানসসরে সরােরুহ যথা ।
ge
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
নীল, পীত, শ্বেত, রক্ত, স্তম্ভ সারি সারি।
উজ্জলিছে রাজসভা বর্নিতে না পারি ।
তার শিরে শােভিতেছে ছাদ মন হরি।
অহীশ্বরশিরে যেন অবনী সুন্দরী।।
ঝুলিছে ঝালরে কত রতনের ঝলি।
ঝুলাইল চন্দ্রাতপ যক্তে যথা বলি।
কিম্বা রাজা হবে বলি বৈদেহী-রঞ্জন।
বুলাইল সভামাঝে তার পাত্রগণ।
ছত্র ধরি চারিপাশে ছত্রধারিগণ।
দাঁড়াইয়া আছে যেন শতাংশে মদন।
অনন্তর জিজ্ঞাসিল মােরে গৌড়েশ্বর।
কিনাম কহগো বাপ তব সুরিবর!
বসতি কোথায় এবে কোন ! পােত্র ধর।
অধিকারী তব রাজ্যে কোন নৃপবর।
কহিনু শাণ্ডিল্য গােত্র নাম কালিদাস।
রাজেন্দ্র-বিক্রমাদিত্য-অধিকারে বাস ।
উজ্জ্ব গিনী নামে পুরী বিশ্বে মনোহর।
বসতি তথায় মম শুন গৌড়েশ্বর।
ভবদীয় কন্যা নাকি বড় বিদ্যাবতী।
লইবে পরীক্ষা করি স্বীয় মােগ্যপতি ।
যােক্তপ্রমুখতে
ত শুনি এসব ভারতি।
আইলাম তব দেশে তেঁই গৌড়পতি।
নিরবিল পরিচয় শুনি গৌড়েশ্বর।
কিন্তু পুলকিত হৈল শরীরে বিস্তর।
চতুর্থ সর্গ।
ভূপের
অদির করিল মােরে সুমধুর সুরে।
যেমতি জনক ঋষি ধীর রঘুবরে ॥
পরে তম সহ তমি আসি আবরিল।
দেখি রাজ ত্যগণ দীপ জ্বালাইল।
করিল এলাকময় ত, সমাজ।
কমাত্র সম্বরে যথা কুরুরাজ।
কিম্বা অশ্বমেঘকালে সগর রাজন।
করিল উছল যথা স্বকীয় ভবন।
অনন্তর রত্নাবতী দূতগণ আসি।
নিবেলি রাজপদে মধুস্বরে ভাষি।
চারু সুসজ্জিত এবে বিচার-আলয় ।
প্রের তর বরপাত্র নৃপমহাশয়।
শুনি গৌড়েশ্বর তবে কমে যােবরে ।
বিচার-অলিয়ে যাহ সহ সূরীরে।
চলিলাম নৃপাদেশে যােজকের সঙ্গে।
চারিদিকে দীপাবলি দেখি মহারঙ্গে।
জ্বলিছে সুন্দর দীপ, বাতায়নে বাতি।
তমি তমিতে ভরি উজ্জ্বলিয়া ভাতি।
দুইধারে অট্টালিকা দেখিয়া ভপতি।
চলিনু বিচারালয়ে যথা রত্নাবতী।
ক্রমশঃ উত্তীর্ণ শেষে বিচার-আলয়।
হইয়া হইল মাের মনে বড় ভয়।
দেখিনু ঝুলিছে তাহে পল্লবের দাম।
কুলাইল বাসে যথা ব্ৰজকুঞ্জে শ্যাম।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
খচিত মকুলে-ফুলে শােভিছে সুন্দর।
ধনেশ-আলয়ে যথা: রত্ন মনােহর
উজ্বলিছে চারিদিগে দীপাবলি যত।
সময়ন্তি-সয়ম্বরে যথা শত শত।
অনন্তর আসি যত নৃপবালাদাসি।
কহিতে লাগিল মােরে সবে হাসি হাসি।
কত আসে কত যায় এবে নাহি চিনি।
নাহি জানি কেবা লবে রত্নাবতী জিনি।
ইহা বলি হাস্যমুখে সুখে মােরে লয়ে।
ভিতরে চলিল সবে আনন্দিত হয়ে।
দেখিনু তাহার সজ্জা মঞ্জ. অতিশয়।
বৈজয়ন্ত ধাম যেন চিসজজাময় ।
কমনীয় নিংহাসন ভযিত রতনে।
রাখিয়াছে চারিদিকে পরম যতনে ।।
বসিতে তাহাতে মোরে কহিল কিঙ্করি।
সিলে চরণ বিল পদ্যি অধরি।
জ্বলিছে সুদীপাবলি উজ্বলিয়া ঘর।
দেখিয়া সে গৃহশোভা হৃদে হৈল ভর।
কপিলাম থরথরি গিয়া সেই ঘরে।
দেখিয়া মদন যথা ধ্বংসপতি হরে।।
কিল মেঘনাদ দেখি যথা আখণ্ডল।
কাপিলাম হেনরূপে হই বিকল ।
স্থানে স্থানে রত্নরাজি উজ্বলিছে ঘর।
ধনীদের হৈম গৃহ যখ মনােহর
ซ์ ตุช
দেখি গৃহ সজ্জা ভয়ে ভুল হৈলমতি।
উত্তর গােগৃহে যথা উত্তর ভুপতি।
বসিলেক চারিদিগে যােজনিকর।
বরযাত্ৰ আসি যথা ঘিরে বসে বর।
রতনখচিত্তেম চামর কিঙ্করী।
লাইল মমােপরি সম বিদ্যাং
কেহ গিয়া অবরােধে দিল সমাচার।
শুনি তুই রত্নাবতী পর নারিয়ার।
যথােচিত আভরণ পরিয়া সুন্দরী।
আইল বিচারালয়ে সঙ্গে সহচরী।।
রঙ্গিণী সঙ্গিনী সহ আসি উত্তরিল।
যেন হরিপ্রিয়া দেবী বাণী দেখা দিল।
নানাবেশ ধারিণী সঙ্গেতে সখীগণ।
ঘিরিয়া আইল সবে প্রমােদিতমন
চারিদিগে সখীবৃন্দ মধ্যে রত্নাবতী
শোভিল তারকামাঝে যথা নিশাপতি।
হেরিয়া তাহার অঙ্গে বিবিধ ভূষণ।
ভয়েতে হইল মম বিচলিত মন।।
রুণ, রুণ, মধুবােলে বাজিল কিঙ্কিণী।
গজপতি সম গতি এলাে বিনােদিনি।
সুবর্ণ কঙ্কন করে চরণে নপুর।
শিঞ্জিতে লাগিল তাহা শ্রবণে মধুর ।
শোভিল কাষ্ণণকাঞ্চি কাঞ্চিপদোপরি ।
হিমাংশু মণ্ডল যথা এজগত ভরি।
কালিদাসের বিদ্যালাত কাব্য।
উরসে হীরার হার তরল সহিত।
মাতুলুঙ্গকুচোপরি শােভিছে বিহিত ।
দুলিছে কুণ্ডল কর্ণে সিথি মধ্যে মণি।
ভাতিছে মস্তক যেন মণিময়ফণী ।
মহিষিমুকুট শিরে শােভিছে সুন্দর।
অম্বিকা প্রতিমা শিরে যথা মনােহর।
তাহার মাঝারে মণি কি বর্ণিব ভুপ!
প্রভাতীয় প্রভাময়ী তারকা যেরূপ।
রত্নময় সিংহাসনে বসিল সুন্দরী।
বসিল ঘিরিয়া পাশে যত সহচরী ।
কেহবা যুবতী নব্য কেহ পীনস্থানী।
তিলোত্তমা সম রূপে এক এক ধনী ॥
মনােহরা বেনী কার শােভিছে বিশেষে।
নয়নরঞ্জন কাঞ্চি কার কটিদেশে ।
বামদলনিতবিম্বের শােভা বত।
হেরিয়া সহসা মাের জান হৈল হত ।
কপিলাম ভয়ে রাজা কি শুনিবে তুমি।
থর থর ভূমিকম্পে আ ক জিয়।
রতনখচিতােম চার কিল্ক।
আরম্ভিল ঢালাইতে রত্নাব্যুপরি ।
ভারতি সম্মুখে যথা বঙ্গবাসিগণে।
চুলায় চামর ধরি প্রফুল্লিত মনে ।
গন্ধদ্রব্য পরিমল মন্দ সমীরণে।
আমােদিল ঘর যথ নন্দন কাননে।
চতুর্থ সর্গ।
রত্নাবতিগতি দেখি যােকনিকর।
বাহির মহলে গেলা পরিহরি ঘর ।
আপাদমস্তক মাের দেখি রত্নাবতী।
জিজ্ঞাসিল কহ বুধ! কোথায় বসতি।
কিবা নাম আপনার রাজ্যেশ্বর কেবা।
কোন্ দেশে করিয়াছ কোন বিদ্যা সেবা
বৈয়াকরণিক কিম্বা নৈয়ায়িক হবে।
পৌরাণিক কিম্বা স্মার্ত অকপটে কবে ৷
কি শাস্ত্রে নৈপুণ্য তব নাম কর তার।
জানিলে উল্লেখ করি করিব বিচার।
কহ হে মনস্থি সুধি! করিয়া সত্বর।
উপস্থিত প্রশ্ন মম আছয়ে বিস্তর।
কহিলাম শুন এবে কহি নৃপবালে !
বহু শাস্ত্র অভ্যাস করেছি বাল্যকালে ।
উজ্জয়িনী নামে পুরী ভারতে সুন্দর।
ইন্দ্রলয় সুরর যথা মনােহর।
বিক্রমকেশরী এবে অধিপতি তার।
রাজত্বসস্তৃত কীৰ্ত্তি ভবে ঘােষে যার ।
বসতি তথায় মম নাম কালিদাস।.
নানা শাস্ত্র পড়িয়াছি কীর্তি করি আশ ।
চতুর্দশ শাস্ত্র কিম্বা পুরাণাদি যত।
কণ্ঠস্থ আমার ধনী ! অহি মন্ত্র মত ।
অলৌকিক বেদে মম নৈপুণ্য অপার ।
শ্যাম যজু ঋকথৰ্ব্ব যাহা শাস্ত্র সার ।
৬
কালিশের বিদ্যালাভ কাব্য।
ন্যায় সাংখ্য পাতঞ্জল মীমাংসা দর্শন।
বৈশেষিক সহ ধনি। এ ষড়দর্শন।
সকলি দখল মম আছে মনস্বিনী।
বিজয়ী বিশ্বেতে আমি সৰ্ববুধে জিনি।
ধন্য নারী সার রামা ধন্য বুদ্ধি তব।
অলঙ্কত করিয়াছ জন্মি এই ভব ।
নারী হয়ে এত শাস্ত্র কেবা পড়ে কবে।
আমার নয়নে হেরি বিরল এভবে।
ধন্য তব মাতা বিশ্বে ধন্য তব পিতা।
ধন্য বরায়ােহা ওমি যথা ভোমী সীতা।
কিন্তু কিছু কহি রামা শাস্ত্রকথা আর।
কুট্যঙ্গপুরাণ নামে শাস্ত্র মূলাধার
পুরাণেতে হেন গ্রন্থ নাহিক উত্তম।
শ্রুত বলি গণ্য বটে কিন্তু শ্রুতিসম।
কহিলা নৃপতি বালা কহ হে সুধির।
কোন শন্ত্রি হতে তাহা হয়েছে বাহির ॥
বেদাঙ্গ দর্শন কিম্বা পুরাণাদি যত।
সকলি পড়িয়া এবে শাস্ত্রে আমি রত।
বল দেখি কবি বুধ! তার কোন মূনি।
বিস্ময় হইনু এবে তব বাক্য শুনি।
সকলি পড়ালে মােরে শিক্ষক আমার।
পড়ালে কুট্যঙ্গ পরাণ যাহা সার ।
কহিমু দুরূহ শাস্ত্র নারী যােগ্য নয় ।
এই হেতু পড়ালে মনে হেন লয় ।
চতুর্থ সর্গ ।
কুট্যঙ্গ পুরান হতে আঠার পুরাণ।
বিষ্ণুপাদ হতে যথা গঙ্গার পয়াণ।
যােজকের যথােচিত বাক্য মনে করি।
কহিলাম অবিকল ভয় পরিহরি ।।
ক্ষণ স্তব্ধ থাকি শেষে দেবী রত্নাবতী।
পরাভুত মম কাছে মাগিল যুবতি ।
বাজাইল কম্বুরাশি সহচরী যত।
পূজিতে অম্বিকা বঙ্গে বাজায় যেমত ।
হুলহুলী রামাগণ আনন্দেতে দিল ।
কল কল শব্দে পুরী পুরীয়া উঠিল ।
শুনিয়া মহিষী তবে সহপুর বাসি।
ডুবিল আমন্দ নীরে কল কলে হাসি ।
আইলা নৃপতি সহ কুল পুরােহিত।
দিল বিয়া মন্ত্র পড়ি যেমত বিহিত।
চলিলা দম্পতি লয়ে যত সহচরী।
চলিলাম রত্নাবতী সহ হস্ত ধরি।
আগে আগে শঙ্খ ধ্বনি করি চলে সবে।
যেইরূপে ভাগীরথ গঙ্গা আনে ভবে।
কিম্বা ধনঞ্জয় বিয়া সুভ সহিত।
দিয়া বাজাইল কস্তু যেমত বিহিত ।
অবরােধে পঞ্চগ্রাস অ লয়ে খ্রণ ।
হইলাম স্তম্ভ সম স্থির নহে প্রাণ ।
দুগ্ধ সার কিন্তু দধি সার ক্ষীর ননী।
খাইলাম শেষে ব্ৰজে যেরূপ নীল মণি |
কাগিদাসের বিদ্যালা কাব্য।
আহুত ভূপাল সহ পুরবাসি যত।
আনন্দে হইল সবে ভােজনেতে রত ।
ভেজনান্তে যার যেই স্থানে সবে গিয়া।
শয়ণ করিল সুখে স্থির করি হিয়া।
রত্নময় পালঙ্গেতে বদর মহলে।
রহিনু শয়ণে শেষে মহা কুতুহলে।
ইতি কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্যে চতুর্থ স্বগ
পঞ্চন সর্গ ।
পঞ্চম সর্গ।
প্রভাত হইল সুখে দেবী বিভাবরী।
জাগিল বিহঙ্গকুল নিদ্রা পরিহরি।।
মধুস্বরে মধুসখা গায় পিকবর।
শারদ-পার্বণে যথা বঙ্গবাসী নর।
কিম্বা মহোৎসবে স্বর্গে যথা সুরবাসী।
গাইল কোকিল হেন সুমধুরভাষী।
যনচর সুনাদ বিহঙ্গম যত।
গাইতে লাগিল সুখে তারা শত শত।
কলকল কলরব কলহৎসগণ।
আরম্ভিল চিত্তসুখে তৃপ্ত করি মন।
হেমকান্তি-ধারিণী উদিল দেবী উষা।
শােভিল জগতভালে যথা ফণীভুমা।
বাজিল নৌবতে রাজা সানিক। সুন্দরী।
ব্রজে যথা বৈণবিক মাধববাঁশরী
ঘাের রবে চারিদিকে বাদি বাজিল।
টল টলে গোড় যেন কঁপিয়া উঠিল।
দেবালয়ে বাজিল মঙ্গলারতি যত।
নানা তীর্থে মনােহর যথা শত শত ॥
মহাকোলাহল পুরে আরম্ভ হইল।
দ্বন্দিবায়ু সহ যেন সিন্ধু উথলিল।
শয্যা ত্যজি পুরবাসী উঠিল সকলে।
উঠল মানিকের চিত্তকুতুহলে।
কালিদাসের বিদ্যালাও কাৰ।
দেবাঙ্গিনী শ্বশু মম সহ পুরবাসী।
করিলেন কুশণ্ডিকা সজ্জা হাসি হাসি ।
হিতকারী পুরােহিত অবরােধে আসি।
পড়াইল মন্ত্র যত বিধিমত শাসি ।
শুচিরূপে আমি মন্ত্র কহিতে পারি ।
অধরােষ্ঠ নেড়ে শেষে বহু দিমু সারি
দম্পতি বেড়িয়া হর্ষে যত সহচরী।
দাঁড়াইল বরণীয় দ্রব্য হাতে করি।
সে রুচির রুচি নৃপ ! কি কহিব কথা।
বেড়িলে অপ্সরা স্বর্গে আখণ্ডলে যখা।
ঈড়াইল নৃপবালা মম বাম পাশে।
আহলাদিনী হয়ে ধনী মনের উল্লাসে।
যথাবিধি বরণ করিলে রামাগণ।
নানাবেশে বাসরেতে করিনু গমন।
ভােজনান্তে সখিমধ্যে রহিলাম বসি।
রাসলীলাকালে যথা শ্যাম কালশশী।
অহুিত ভূপতি আর দীন-দুঃখী যত।
অাহার করিল তারা নিজ বাঞ্ছামত ।
{ কহিলেন ভবপতি বিক্ৰম রাজন।
কহ জিজ্ঞাসিব কবি! কিছু বিবরণ।
কোন প্রশ্ন না করিয়া রত্নাবতী ধনী।
বরিল স্বামিত্বপদে সুরি তােমা গণি।
বিস্মিত হই আমি শুনি তব কথা।
কৈকেয়ীর বরেন্থায় দশরথ থা॥
পঞ্চম স।
দেশ-বিজয়িনী রামা একি অসম্ভব।
কি ভ্রমে ভুলিল কহ আদ্যোপান্ত সব
কবি কন আদ্যোপান্ত শুন কহি হবে।
দৈবের নির্বন্ধ লম্বে কার সাধ্য ভবে ।
কুট্য পুরাণ নাম শুনি রত্নাবতী।
বুঝিতে না পারি তার ভ্রান্ত হইল মতি ।
উদার স্বভাব ভাবে যত নারীকুল।
বাড়ালে পড়য়ে শেষে বুদ্ধি হয়ে ভুল।
বিশেষ বিধির বিধি লয়ে সাধ্য কার।
বাড়াবাড়ি করে যেবা সৰ্ব্ব মিথ্যা তার ।
যেমন বর্ষার বারি পূরি দেশে দেশে।
অচিরায় গতি তার রত্নাকরে শেষে
মানব কি দেব চির শুন হে ভূপতি।
কার হেন সাধ্য রােধে প্রাক্তনের গতি।
ধর্মমায়া সরসীতে পাণ্ড র নন্দন।
ত্রিকালজ্ঞ সহদেব হইল পতন।
কিম্বা পুত্র সহ রাম জানকিরঞ্জন।
ঘাের যুদ্ধে তপােবনে ত্যজিল জীবন।
ববাহনের পিতা ধনঞ্জয় বীর।
পুত্ৰবানে দৈববশে ত্যজিল শরীর ।
দেব দৈত্য গন্ধর্ব জিনিয়া রক্ষোগণ।
ভক্ষণীয়নরবাণে সবংশে নিধন
বিধির বিধির তেজ সর্বাগ্রেতে গতি।
রোধে তারে হেন জন বিরল ভুপতি।
কালিদাসের বিদ্যালাভকাব্য।
ব্রহ্মের নিয়মে বাঁধা সৰ্বৰ্জীব ভবে।
ভাগ্য অতিক্রমে হেন সাধ্য কার কৰে।
অদৃষ্টবশত
শতঃ শেষে রত্নবতী সতী।
হইল অজ্ঞানভাৰ্য্যা হারাইয়া মতি।
শুভাশুভ-ভাগ্যদেশে চলে যত নর।
'নিষাদী-আদেশে যথা মত্ত কবির।
কিম্বা পােত চলে জলে মাঝির কৌশলে ।
সেরূপ সকল জীব নিজভাগ্যবলে।)
ভােজনান্তে গোড়পতি বিশ্রাম করিয়া ।
পত্রমিত্ৰগণে হর্ষে কহিলা ডাকিয়া।
প্রদক্ষিণ কর পুরী সহিত দম্পতি।
রাজব্যবহারে যাহ যেরূপ পদ্ধতি ।
ঘরে ঘরে নগরের করহ ঘোষণা।
নিশাকালে দীপাবলি দিবে সৰ্ব্বজনা
রম্ভাতরু পূর্ণকুম্ভ দ্বারে দ্বারে দিবে।
মঙ্গলের আচরণ সকলে করিবে।
নানা বাদ্যোদ্যম যত নাগরিকগণ।
করিবে স্বকীয় দ্বারে ছুয়ে হৃষ্টমন।
মহাসমারােহে সবে করহ গমন।
যাহাতে সন্তুষ্ট হয় জামাতার মন ।
শুনিয়া সচিবশ্রেষ্ঠ নরপত্যাদেশ।
ডিগুিমঘােষণা পুরে করিল অশেষ ।
সচিবের প্রচারিত বাক্য:অনুসারে।
রাখিল নগরবাসী স্বীয় স্বীয় দ্বারে।
পঞ্চম সর্গ।
।
নৃপাদেশে দীপাবলি শ্রেণিবদ্ধে শেষে।
সাজাইল রাজপথে অশেষ বিশেষে।
স্থাপিল পতাকাবলি বহু দুইধারে।
নানাবিধ চিত্র তাহে কে গণিতেপারে ।
ফর ফরি উড়িতে লাগিল বায় ভরে।
ঝাঁকে ঝাঁকে বিহঙ্গম যথা শূন্যোপরে ।
করিয়া অশেষ সজ্জা পাত্ৰবর শেষে।
প্রস্তুত হইল সবে নানাবিধ বেশে।
রত্নাবতী সহ মাের লয়ে চতুর্দোলে?
বাহিরিল পাত্রমিত্র গৌড়পতি-বােলে ।
সন্ধ্যার প্রাক্কালে সবে হৈল বহির্গত।
চলিল মাতঙ্গযুথ অগ্রে শত শত।
শত শত অশ্বারােহী দেখিতে অদ্ভুত ।
চলিল আননে যত সম যমদূত।
লম্বিত করল ভাসি দেশে দোলে।
মনে যাহার ধ্বনি ঝন ঝণি বােলে।
বারিক সৈন্য চলিল বিস্তর।
টেখ কালি মম চিত্ত থরথর ।
অসিকোষ ই অসি ধরি সর্বজন ।
মহাকু হলে মধ্যে করিল গমন।
" ঢলে বাজিরাজি যত ধীরে ধীরে।
নালি --স্ত্রে শিখা অশ্বারােহি-শিরে ।
চলল বহুল সৈন্য অগ্রে চতুরঙ্গে।
বাদ্যোদ্যম করি চলে বাদ্যকর সঙ্গে।
কালিদাসের বিদ্যালাক্ত কাব্য।
মহাকোলাহলে পুরী পূরিয়া উঠিল।
ঘরে ঘরে কুলবধু কাঁপিতে লাগিল ।
প্রবেশিল জলচর ভয়ে জলতলে।
চমকিল বনচর বনে দলে দলে।
বিস্ময়িলা শব্দে দিবে আদিতেয় যত।
রসাতলে শেষ সহ নাগ শত শত।
চলিল বিস্তুর সৈন্য অনেক কৌশলে।
পরিণয়-অন্তে রাম যথ। রাজ্যে চলে ।
কিম্বা অনিরুদ্রে উমা দানি বান ভূপ।
করিল উৎসব যথা ঘটিল সেরূপ।
নাচিল গমন-হর্ষ বাজিরাজি যত।
দেখি পয়ােধরে : ময় র যেমত।
করিল দ্বিরদযুথ বারে বারে গতি।
যথ বরায়ােহা চলে আনন্দে যুবতী।
বেশধারী নিষাদীরা তার স্কন্ধদেশে।
পুষ্পরথে যেমন সারথি নানাবেশে।
চলিল শটগ্রাম মুড়ি রাজপথ।
কুরুক্ষেত্ৰযুদ্ধে যথা ঘোররবে রথ ।
উড়িল পরাগরাশি অবরি অম্বরে।
ধাঁধিল নয়ন যেন প’লে ধূমঘরে
মহারঙ্গে সাজিয়া
চলিল সেনাগণ।
বধিতে তারকাসুরে যথা ষড়ানন ।
কি জয়দ্রথ বীরে কুরিতে নিধন।
জিলা গাণ্ডিী পার্থ যেরূপ সাজন।
পঞ্চম সর্গ।
৭১
দ্বারে দ্বারে গৌড়বাসী বাদ্যোদ্যম করে।
রাসপূজা করি যথা বঙ্গবাসী নরে ।
দুইধারে অট্টালিকা শেভিল সুন্দর।
প্রাসাদ কি সৌধাবলি যত মনােহর।
বহিল মানবসােত রাজপথে রঙ্গে।
সমুদ্র পাথারে যথা উৰ্ম্মি বায়ুসঙ্গে।
দলে দলে নরগণ চলিলেক সঙ্গে।
কেহ বা প্রাচীরে উঠি দেখে মহারঙ্গে।
কেহ ধায় রড়ে কেহ ছাড়ি গিয়া পথ।
দৌড়িল দেখিতে যেন জগন্নাথ-রথ ।
ভূরি ভূরি নরগণ দেখে বসি ছাদে।
প্রশংসিয়া মােরে বহু মনের 'আহলাদে।
গবাক্ষ ভিতরহৈতে দেখি রামাগণ।
হুলহুলি দিল সবে হয়ে হৃষ্টমন।
বাজাইল কম্বুরাশি ঘাের রবে সবে।
হইল প্রবল নাদ যথা সিন্ধুরবে ।
হাসিতে লাগিল সুখে যত বিনােদিনী।
সুধাময় শশী দেখি যথা কুমুদিনী ।
কিম্বা দেখি উষান্তে রবিরে সুৰ্য্যমুখী।
হাসিল সেরূপ সবে হয়ে মহাসুখী ।
শশাডিল গবাক্ষর নাৰ্যাস্য সুন্দর।
পাতার আড়ালে যথা পদ্ম মনােহর।
পরস্পয়ে কহিতে লাগিল রামাগণে।
ধন্য বিদ্যা এবুধের এতিন ভবনে ॥
২
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
বৃহস্পতি সম বুধ এবে মহীতলে।
বিজয়ী হইল গৌড় স্বীয় বিদ্যালয় ।
উদ্ধারিল পণকূপ হৈতে রা:
বৈদেহিবিলাসী রাম যথা শীতাস।
কিম্বা শিশুপাল হৈতে zিনী য যতী।
উদ্ধারিল স্বীয় গুণে কৃs : *তি ॥
কেহ বলে পুণ্যশীল। ধন্য রবর্তী।
লইল পরীক্ষি রাম স্বীয় যােগ্যপতি।
যেমন রতনক্রেতা পরীক্ষি রতন।
লইল সেরূপ রামা নিজ পতিধন ||
ভাগ্যবতী রত্নাবতী কি কহিব কথা।
নলের কলত্ৰ ভৈমী দময়ন্তি যথা।
স্বস্তি স্বস্তি বলি যত দ্বিজনারীগণ।
ভরি ভরি ধন্য বাদ দল সৰ্বজন।
ভীমশূলপানি সৈন্য অর্থে অগ্রে চলে।
ঘিরিতে বিরাটগাভী যথা কুরুদলে ।.
কিম্বা অভিমনুবধে বৈরনির্যাতনে।
গিয়াছিল রণে পার্থ যেরূপ জিনে।
গাইল গায়কদল যানােসরি সুখে।
নাচিল নর্তকবৃন্দ সদা হাস্যমুখে ॥
নাচিতে নক-আস্য মনােহর দোলে।
স্বচ্ছ হ্রদে পদ্ম যথা বায র হিল্লোলে ।
শেভিল বিপ!্যাবলি রু দুইধারে।
কিাদব উপমা তার অতুল সংসারে
পঞ্চন সর্গ।
করিল প্রমোদবন দুই ধারে শােভা।
নন্দনকানন যথ{ দিবে মনলোভ ।।
বৰ্তমান ঋতুরাজ সমরূপে তথা।
ছারারূপে কুসুমেষ রতি সঙ্গে যথ।
জ্বলিল দেখিয়া নিশি সবে দীপাবলি।
শোভিল সহসা যেন শম্পা নভে ঝলি ।
রাজপথে ঘরে দ্বারে কিম্বা ছাদোপরি ।
উলিল দীপাবলি গোড়পুর ভরি ॥
অনন্তর স্থানে স্থানে যত গৌড়বাসী।
পোড়াইল নানাবিধ বাজি রাশি রাশি।
হইল আলােকময় তাহে ভয়ঙ্কর।
দোলের চরে বঙ্গে যথা করে নর।
দশদিক আলো করি করিল বিকল।
বোধ হইল ধরা-বৃক্ষে গোড়-অগ্নিফল ।
ঘটিল যে রূপ শোভা কি কহিব কথা।
ভৈমী স্বরস্বরে নৃপ! বিদভেতে যথা!
প্রদক্ষিণ করি পুরী মম সহ সবে।
আইল তোরণে শেষে মহাকলরবে ।
চতুর্দোল সহ গিয়া যানধারিগণ।
দাড়াইল রাজদ্বারে হয়ে হৃ৪মন ।
শেভিল রতনময় দোলা মনোহর।
ধনপতি-ধনাগার যেমন সুন্দর।
নদপয়োধর। ধনী রত্নাবতী সতী ।
শোভিল আলােকমাবে প্রতিমা যেমতি ৷
৭s
কালিদাসের বিদ্যালা কাব্য।
দেখিয়া সে শোভা, মােরে যত রামাগণ।
ভূরি ভূরি প্রশংসিল আহলাদ-কারণ।
ধন্য বুধে গোড়পতি কন্যা প্ৰদানিলা।
যথামর সিন্ধু মথি কৃষ্ণে লক্ষী দিলা
প্রশংসি এরূপ মােরে যত রামাগণ।
দম্পতি লইয়া সবে করিল গমন।
অবরােধে গিয়া শেষে করিয়া ভােজন।
বারমহলে সুখে করিনু শয়ন।
যার যেই স্থানে গিয়া অধিকৃত যত।
শয়ন করিল সবে ভক্ষি বিধিমত।
বিরামদায়িনী নিদ্রা দেবী পরে মােরে।
ঘিরিলে রহিনু আমি শয্যোপরি ঘােরে।
ডাকিল বিহঙ্গকুল নিশা-অবশেষে।
প্রকাশিল উষা দেবী হেমকাস্তি-বেশে।
শয্যা ত্যজি পুরবাসী উঠিল সকলে।
উঠিল মাণিকেশ্বর চিকুতুহলে ।
আহ্নিক প্রভাতি বাদ্য বাদ্যকরগণ।
অারম্ভিল দেবালয়ে হয়ে হৃঔমন ।
বন্দিগণ আনন্দে বন্দিল বহুতর।
বেদধ্বনি করিল বেদজ্ঞ দ্বিজবর ।
প্রাতঃকৰ্ম্ম সকলে করিয়া সমাপন।
করিনু মধ্যাহ্নে অন্ন সুখেতে ভোজন ।
অনন্তর সখীদল নিশাকালে আসি।
ফুল শষ্যালয়ে মােরে লয়ে গেলা হাসি।
পঞ্চম সর্গ ।
ভয়ে ভয়ে ভবপতি! করিনু গমন।
দাগিয়া তস্কর যথা সদা উচাটন।
দেখিনু কুসুমদাম কুলিতেছে দ্বারে।
নানাবিধ পুষ্প তাহে কে বর্নিতে পারে ।
চারিদিকে রাশি রাশি কুসুমের রাশি।
রেখেছে ব্ৰজেতে যথা রাসে ব্রজবাসী ।
কিম্বা গান্ধারীর সহ দ্বন্দী কুন্তি সতী।
সুবণ চম্পকে পূজে পিকি যেমতি।
শােভিছে তাহার শোভা পরম সুন্দর।
ধনেশ-আলয়ে যেন রত্ন মনােহর।
ক্রমশঃ বাসরে গিয়া দেখিনু ভূপতি!
বসিয়াছে শয্যোপরি রত্নাবতী সতী ।
শােভিছে কমলে যেন বসে পদ্মালয়া।
কিম্বা যথা নিত্য শোভে কৈলাসে অভয়া।
ভাতিছে তাহার ভালে ললাটীকা শােভা।
ভবানীললাটে যথা শশী আখিলােভা ।
শিরােধরললন্তিকা কুচযুগােপরি।
শােভিছে তারকাবলি যথ বিশ্বভরি।
মধ্যে মধ্যে মণি যার কি কহিব কথা ।
হর্ষ রসে কৌস্তুভ শোভয় চারু যথা ॥
পরিহৰ্য্য সহ হস্তে শােভিছে কঙ্কন।
চরণে নূপূর তার বিচিত্র গঠন।
বিশুদ্ধ কাঞ্চন কাঞ্চি শোভে কাঞ্চি পদে।
প্রভাকর প্রতিবিম্ব যেমন সুদে
কালিদাসের বিদ্যালাভকাব্য।
হাসিল আমায় দেখি সহচরী যত।
প্রভাতে মিহিরে হেরি পদ্মিনী যেমত ?
কিম্বা ব্রজকুঞ্জবনে যত ব্রজনারী।
দেখিয়া মনের সুখে যেরূপ মুরারি ॥
বীণাহাতে সখীবৃন্দ বসে আছে সবে।
দশাংশে ভারতি যেন অবতারি ভবে।
চারিদিকে গৃহমাঝে অলেখ্য বিস্তর।
সাজায়েছে যথা পুজি পটেশ্বরী নর।
কোন স্থানে ভগীরথ শঙ্ঘণ্টা ধরি ।
আনিতেছে কুতুহলে জাহ্নবী আদরি।
উদ্ধারিতে জীবকুল বিষ্ণুপদী সর্তী।
করেছেন মহাবেগে ধরাতলে গতি।।
কোনস্থানে বাত্মজ বলি নৃপবর।
করিতেছে মহাযজ্ঞ তুষ্টি মরমর।
বামণমূরতিরূপী শ্ৰীমধুসূদন।
দানার্থে দাঁড়ায়ে তথ। মোহি ত্রিভুবন।
দ্রৌপদী বিলাসী পার্থ খরতর বাণে।
অলক্ষে বিধিছে লক্ষ সুখে কোন স্থানে।
লক্ষ লক্ষ রাজাগণ বসে চারিপাশে।
এসেছিল যে সকল দ্রৌপদীর অাশে।
কোথাও মহিষাসুরনাশিনী পাৰ্বতী।
শেভিতেছে দশভুজে মঞ্জরূপে সতী।
ষড়ানন সরস্বতী লক্ষী গজানন।
শােভিছে দক্ষিণ বাসে তাহার সন্তান ।
পঞ্চম সগ।
৭৭
If
শিরােপরি পঞ্চানন বসি পঞ্চমুখে।
গাইছেন গীত যেন বীণাসহ
সুখে
কোনস্থানে লগ্ন। দেবী চণ্ডী শম্ভ নাশ।
নাশিতেছে রক্তবীজ রূপে বিশ্বাস।
মৌনভাবে সুর যেন ভাবিতেছে সবে।
কিরূপে ব্রহ্মের সৃষ্টি এইবার রবে।
কোনস্থানে ধৰ্মত্ম দ্রৌপদীবিলাসী।
বসেছেন রাজপদে কুরুকুল নাশি।
বসুধার ভূপবৃন্দ কর করি করে ।
অর্পিছেন পদে তার পরম আদরে ।
দক্ষিণে দ্বারকানাথ বসুদেবাত্মজ।
বামেতে তাহার শুর সহোদরব্রিজ।
শােভিতেছে চিত্রপটে ফুলশয্যাঘরে।
সুন্দর দ্বাপরে যথা হস্তিনা নগরে ।
ব্রজগােপী সহ কোন স্থানে দামোদর ।
করিছেন বহুলীলা কহিতে বিস্তর।
চিত্রপট দরশন করি আসি শেষে।
বসিলাম শয্যোপরি ভয়ে একদেশে ।
কৌশলে কৌতুক করি যত সহচরী।
আরম্ভিল গীতবাদ্য সম বিদ্যাধরী।
ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী আদি যত।
গাইল সুতানে গান সখীগণ তত।
চিত্তবিনােদন গীত গাইয়া সুতানে।
চলি গেল। সখীবৃন্দ স্বীয় স্বীয় স্থানে।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
দ্বার রুদ্ধ করি শেষে রত্নাবতী সতী।
বসিলেন শয্যাপরি আনন্দে যুবতী।
ধরিল আমার কর হর্ষে ধনী হাসি।
পারণ দেখিয়া যথা আশু উপবাসী ।
করিনু শয়ন দোঁহে ফুলশয্যাপরি ।
রাধাকুঞ্জে রাধাসহ যেরূপ শ্রীহরি ।
মনোজ-তরঙ্গে রঙ্গে ভাসিল যুবর্তী।
প্রলয় প্লাবনে বেগে তৃণাদি যেমতি।
করিল আমায় শেষে ধরি কোলগত।
তৈষেতে মনুষ্য বহ্নি আনন্দে যেমত ।
মনােহরা রত্নাবতী রূপের নিধান।
স্পর্শেতে জাগিল মনে মনসিজ বাণ।
ভয় হেতু পাণ্ড হয়ে রহিনু ভূপতি।
মাজ্জারে দেখিয়া যথ। কপােত কপােতী
রহিনু শয্যাতে আমি কি কহিব কথা।
হিমভয়ে অগ্নি কো সূর্যদেব যথা।
হাব ভাব বিভ্রম কা;:: রত্নাবতী।
বিফল বুঝিয়া যৌনে রহিল যুবতী।
ইতি কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্যে পঞ্চম সর্গ
ষষ্ঠ সর্গ।
যষ্ঠ স।
পরিণয় দিয়া কন্যা গৌড়ের ভূপাল।
প্রদানিল মন-সুখে দীনে ধনজাল ।
ভাসিলা নৃপদম্পতি আনন্দের নীরে।
প্রদানি জনক যথা সীতা রঘুবীরে।
কিম্বা পাণ্ডুপুত্রগণে দ্রৌপদীরে দিয়া।
ভাসিল আনন্দ-নীরে দ্রুপদের হিয়া
পরম সন্তুষ্ট রাজা হইয়া অন্তরে।
প্রদান করিল ধন যােজকনিকরে।
বাঞ্ছামত ধন পেয়ে যােজকনিকর।
পরিতুষ্ট হয়ে চলে স্বীয় স্বীয় ঘর ।
একত্র হইয়া শেষে যােজকের দল।
হাসিতে লাগিল সুখে করি খল খল।
প্রধান যােজক বলে শুন যােক্তা যত।
পাইবে নৃপতিবালা দণ্ড বিধিমত।
যত দুঃখ দিল ভাই! আমা সবাকারে।
পাইবে দ্বিগুণ কষ্ট সেই অহঙ্কারে।
যেমন দাম্ভিক ভবে নৃপতির বালা।
তদুচিত ভবে তার ঘটিবেক জ্বালা।
মূখ স্বামী হেতু রাম জ্বলিবে সতত।
স্বামিহীনা চিরদুঃখে প্রমদা যেমত ।
এরূপ কহিয়া সবে নিজনিজালয় ।
চলি গেলা ধন সহ হয়ে তৃপ্তকায় ।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
অনন্তর প্রভাত হইলে বিভাবরী।
রত্নাবতীকাছে এলো যত সহচরী ।
জিজ্ঞাসিল কহ ধনী? শুনি সমাচার।
কিরূপ করিল কবি রাত্রে ব্যবহার।
রত্নাবর্তী বলে শুন সহচরিগণ !
বুঝিতে নারিনু আমি এবুধের মন।
বচনপটুত। তাঁর শুনেছ বিচারে।
বাকহীন সদাভীরু এবে দেখি তারে।
পরম পণ্ডিত বলি পরিচয় দিল।
বেদপুরাণের নাম অনামে কহিল ।
প্রশ্ন নাকরিনু আমি করিয়া বিশ্বাস।
এবে তার কাৰ্য্য দেখি পাইতেছি ত্রাস।
কি জানি ললাটে সখি ! কিবা মম আছে।
বিজ্ঞ বলি বরিলাম অজ্ঞ হয় পাছে ৷
তা হলে কি বলে মুখ দেখাইব তবে।
ইন্দুসম চির মাের একলঙ্ক রবে ।
পণ্ডিতে হারায়ে আগে শেষে আজ্ঞ-কাছে।
কি জানি হারিব। এবে সেই ভয় আছে।
হৃদূকম্প হৈল রাত্রে দেখি ব্যবহার।
তদবধি সুখ নাই কি বলিব আর ।
কিরূপ করিল সখি ! যােজকের দল।
বুঝিতে নারিনু আমি যোক্তার কৌশল।
সর্বদাই ভীত কেন একি অসম্ভব।
নাপারি বুঝিতে এবে এচাতুরী সব।
ষষ্ঠ সর্গ।
অজ্ঞ বিজ্ঞ অদ্য রাত্রে পরীক্ষা লইব।
বুঝিলে উচিত কাৰ্য প্ৰভাতে করিব ।
ইহা বলি ভাবি দুঃখ ভাবি হৃদে ধনী।
নীরবে রহিল যেন আঘাতিত ফণী ।
নিশ্চয় একত্রে পুনঃ করিয়া শয়ন ।
রহিল নৃপতিবালা সদা ক্ষুন্নয়ন।
হেন কালে পশ্বালয়ে উদ্ভুিকা ডাকিল।
শুনি রামা স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করিল ।
কহ! নাথ কি ডাকিছে পুনঃ পুনঃ বলে।
জানিবারে মম জ্ঞান কহিল কৌশলে ।
অগত্যা কহিনু আমি ত্যজি স্বীয় ভয়।
ডাকিতেছে উড় ধনী! হেন মনে লয় ।
বিশুদ্ধ কর্ণেতে ভূপ! অশুদ্ধ বচন ।
শুনিয়া হইল তার বংশয়িত মন ।
কহিল আমায় পুনঃ কহ পুনৰ্বার ।
বুবিতে নারিনু আমি বচন তােমার ॥
কহিনু ডাকিছে উড় পশ্বালয়ে ধনি ।
শুনিয়া কাপিল মােরে মহাজ্ঞান গণি
বিস্ময়লা শুনি: রামা মমেতর ভাষা।
ও যথা চণ্ডী দেখি রক্তবীজনাশা।
কিম্বা রক্ষেশ্বরপুত্র অক্ষয়কুমার।
হনু হাতে মলে যথা রাক্ষস অপার ।
কুষিলা অশুল্ক বাক্যে মহাক্রোধে ধনী।
উমুরুর
রবে যথা আশু কালফণী ।
কালিদাসের বিদ্যালাজ কাব্য।
শিহরিল লােম তার কি কহিব ভূপ!
ভয়ে চমকিলে শল্য শলক যেরূপ ।
কহিল পরীক্ষা সুরি ! দেহ পুনৰ্ব্বার।
সলেই হয়েছে মম বচনে তােমার ॥
বল দেখি হর্য রস কোন সন্ধি পায়।
সূত্র বলি পদ সাধি বুঝাও আমায়।
কোন বিভক্তিতে বুধ! রাম শব্দ হয়।
কহ আশু এসকল করিয়া নিশ্চয়।
হৰ্যেতে সম্রাট ধন করিতেছে দান।
কেবা কর্তা কেবা কৰ্ম্ম কর অনুমান।
শ্যামচাঁদ মধুপুরে করিছে গমন।
কহ ত্বরা কোন বাচ্য এসব বচন।
কোন সমানতে সুধি । সৰ্বভেদীপদ।
লিঙ্গ-মধ্যে কোন লিঙ্গ বল দেখি হ্রদ।
কুঙ্গ পুরাণ নাম বিচারের কালে।
লইয়া ফেলিলে মােরে ঘাের ভ্ৰম-জালে ।
এরূপ করিল প্রশ্ন দেবী রত্নাবতী।
শুনিয়া সভয় আমি হারাইনু মতি।
জড়ের প্রতিম শেষে না কহিয়া কথা।
রহিনু নীরবে নৃপ! জড় থাকে যথা ।
অ্যান দেখিয়া শেষে রাজার দুহিতা।
রুলি আমায় যথা রাবণেরে সীতা।
ক্রোধভরে শয্যা ত্যজি রত্নবতী সতী।
দিতে লাগিল যেন স্মরহারা রতি।
মঠ সর্গ।
রােদন-নিনাদে ভয়ে যত সহচরী।
আশুগতি এলাে তথা সকলে শিহরি।
কি হইল নৃপবালে ! কহ শুনি তব।
ইহা বলি জিজ্ঞাসিল করি ঘাের রব।
সখীবৃন্দ-কণ্ঠম্বরে খুলিয়া দুয়ার।
কাঁদিয়া কহিল সখি ! কি কহিব আর ॥
মহাজ্ঞ এস্বামী দেখি বুধ কভু নয় ।
কৌশলে আমায় এবে করিয়াছে জয়।
বুঝিনু গৌরব-রবি ভ্ৰম-অন্ধকারে।
ডুবিল আমার আর দুঃখ কব কারে।
সুখাশ-ছলনে মম বিপদ ঘটিল।
কৌশলে যােজককুল এবে দুঃখ দিল।
অজ্ঞানদ্বেষিণী আমি ছিনু সখীগণ।
সেই মূঢ় মমাদৃষ্টে ঘটিল এখন।
ধিক্ মম বিদ্যা এবে ধিক্ মম জ্ঞানে।
জলাঞ্জলি দিনু শেষে ভ্রমহেতু মানে।
সখীগণ বলে সখি না হও কাতর।
কিরূপে জানিলে কহ মূঢ় সুধবর।
রত্নাবতী বলে সখি কি কহিব আর ।
উষ্ট্রকে কহিল উড় ক্রমে দুই বার ।
বিশেষ জেনেছি আমি নানারূপ মতে।
এর সম অজ্ঞ নাহি সখি এজগতে।
বিজ্ঞ বলি অজ্ঞ পাত্র যােক্তা দিল মােরে।
কাঞ্চনরসিত তাম যথা জয়াচোরে।
#
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
শুনি সহচরিগণ জিজ্ঞাসিল মােরে।
কহ বুধ! কিকথা কহিলে নিদ্রা-ঘােরে ।
কপিতেছি থরথরে আশঙ্কিত মনে।
শাল তাড়িত মৃগ যথা ঘাের বনে।
বাক্য নাহি সরে মম কি দিব উত্তর।
কঁদিতে লাগিনু ভয়ে হইয়া কাতর।
দেখি সহচরীবৃন্দ অবাক হইল।
অদ্বিতীয় অজ্ঞ শেষে নিশ্চয় বুঝিল।
কহিল অসম আশা কিহেতু তােমার ।
হইল আসিতে হেথা, কহ মৰ্ম্ম তার।
যােজকবৃত্তান্ত আমি বনুি সকল।
বিস্মিত হইল শুনি সহচরীদল ।
চাতুরী-বৃত্তান্ত শুনি দেবী রাবন্তী।
কাঁদিতে লাগিল যেন পাতিহার সর্তী।
কৌশল-জালেতে পড়ি ভাবে রত্নাবতী।
কিরাত-আনয়ে বনে সিংহিনী যেমতি ।
হইল বিষন্ন অতি ক্ষোভে বিনােদিনী।
দিনান্তে ভাস্করে হেরি যথা পন্ধজিনী।
সখীগণ বলে সখি কি করিবে আর।
যা ছিল কপালে একে ঘটিল তােমার।
এই পতি লয়ে ধনি কর সংসার।
বিধির নির্বন্ধ খণ্ডে সাধ্য'বলক র ॥
দুঃখেতে কাঁদিয়া শেষে কহে বত্নাবতী
কিরূপে লইব আমি হেন মূঢ়তপ ।
ষষ্ঠ সর্গ।
কৃতান্ত-দূতের দেখি প্রতিম এজন ।
কহ সখি প্রেমামােদে কিসে লবে মন ।
দুষ্ট অজ্ঞানত্ব-অহি আছে মুঢ়োদরে ।
মন্থনে বিপদ হবে যথা সিন্ধু হরে ।
প্রণয়-অমৃত-আশে কলহ-গরল ।
নিশ্চয় উঠিবে, মূঢ় না হয় সরল ।
লইতে স্বামী যদি করি আমি আশা।
প্রফুল্ল কমলে যেন হবে কীট-বাসা ।
কহিব কি সহচরি! মন-দুঃখ আর ।
ভ্রমিবে যৌবনারণ্যে অজ্ঞ দুরাচার ।
ত্যজিব এ স্বামী আমি শুন বিনোদিনী।
অধঃবারি কুলমানে যথা চাতকিনী ।
খেলে যে হংসিনী সুখে স্বচ্ছ সরােবরে।
কি সে যায় ধনি! পঙ্কিল কুসরে ॥
কিম্বা কেশরিণী কবে সংসর্গের অাশে।
মিত্রভাবে শৃগালেরে প্রমােদে সন্তাষে।
মৃণালের তেজে সখি! পদ্মিনীর শােভা।
বিমল করতে যথ। মণি মন-লােভা।
নহিলে বিজ্ঞের ভাৰ্য্যা কেহ না আদরে ।
বিষদন্তহীন সর্পে যথা নাহি ভরে।
সুধাময় শুক্লপক্ষে ইচ্ছে ভববাসী।
কহ সখি! ভাল বাসে কেবা তােরাশি ।
সুগন্ধ সহিত যদি বহে সমীরণ।
দ্বিগুণ আর তার তিন ভুবন।
কভু
৮৬
কালিদাসের বিদ্যাপিত কাব্য।
অনাবৃষ্টি সহ যদি বহে প্রভঞ্জন।
দ্বিগুণ যাতনা তাহে দগ্ধ করে মন।
যে বিপিনে খল ব্যান্ড্র পশে হিংসাকারী।
পাশ্ববর্তী লােক তার ভয়ে থাকে ভারি ।
মৃঢ় পতি হলে নারী সদা ভয়ে মরে।
বিষধের ভজঙ্গমে যথা লােকে ভরে ।
সদাই পদ্মের রুচি সরা মৃণালে।
প্রভাময় যেইরূপ শশী গৌরিভালে।
শুষ্ক মৃণালেতে তার সদা রুচিহীন।
অন্নক৪ে লাবণ্য হারায় যথা দীন।
মুঢ়পতিলাভে দেহ শুষ্ক হয়ে যাবে।
বিধবার কুচ সখি যথা স্বাম্যাভাবে।
অ -বি-মনোবৃত্তি-ভেদ কব কত।
সুধাতরঙ্গিণী সহ তিমির যেমত |
শিরোধর-গলদেশে যশোরত্নহার।
পরিয়াছে যেই, রত্নে যত্ন লঘু তার ।
কিম্বা যশােমৃতে স্বাদ জশ্নে যার ভবে।
বৈভবে সেরূপ যত্ন থাকে তার কবে।
পণ্ডিতে অজ্ঞানে সখি সদা সেইরূপ।
নিশ্চয় কহিনু আমি বচন স্বরূপ।
পরমজ্ঞানদা বিদ্যা দেহে নাহি যার।
বিড়ম্বনা মহীতলে জীয়ে থাকা তার ॥
অসাবধানতা হেতু জিনিল কৌশলে।
অবগাহকেরে যথা ক্রে ধরে জলে।
ষষ্ঠ সর্গ।
৮৭
মিথ্যা সখি? জীবিত আমার এই ভবে।
একলঙ্ক ইন্দুসম চির ভবে রবে ।
লাবিতে মান মম যােক্তা দুরাচার।
করিল এ অভিসন্ধি বুঝিলাম সার ।
প্রাণাধিক মান কভু না ছাড়িব আমি।
বরঞ্চ ত্যজিব সত্য এই
মূঢ়
স্বামী।
করিব কলঙ্কদূর শুন সহচরি!
ত্যজিয়া মৈথিলী যখ রামরূপে হরি ।
এরূপ কহিয়া রামা ঘাের তােেবশে।
মারিলেক পদাঘাত ক্রোধে মশােরসের
পড়িলাম পদতলে হইয়া কাতর।
রক্তবীজনাশা-চণ্ডী-পদে যথা হর ৷
কাদিলাম ধরি তার রাজীব-চরণ।
যেরূপ শ্রীমতিমানে ব্রজে নারায়ণ
তথাপি রােযেতে মােরে দিল তাড়াইয়া।
কাদি বিস্তর আমি বহিদ্বারে গিয়া ।
নিঝরপ্রতিম মাের নয়নের বারি।
বহিতে লাগিল বক্ষে মন-দুঃখে ভারি।
ঘাের অন্ধকার নিশি কোন দিকে যাই।
কি করি উপায় কিছু ভাবিয়া না পাই ।
কলরে, পদাঘাতে মনের যন্ত্রণা।
বাড়িল যেরূপ তার নাহিক বর্ণনা
মনে মনে বিলাপ করিয়া বহুতর।
করিলাম পণ শেষে শুন পর
কালিদাসের বিদ্যালাভকাব্য।
যদি বিদ্যা আমারে অপেণ সরস্বতী।
তবেত ফিরিব নহে চির বনে গতি।
কিম্বা যদি প্রাপ্ত নাহি হই হরিপ্রিয়া।
অর্পিব এ প্রাণধারে ব্যাঘ্রে বনে গিয়া ।
চলিলাম বাগীশ্বরী-অন্বেষণে বনে।
শ্রীকৃষ্ণ আনিতে ধ্রুব যথা ক্ষম মনে
কিন্থা কৈকেয়ীর পণে দাশরথি বীর।
প্রবেশিল বনে হৃদে যেরূপ অস্থির।
এরূপ করিয়া পণ মনে ভবপতি।
ছাড়ি মত্যুভয় বনে করিলাম গতি।
বহুদূর গেলে দিব হইল প্রকাশ।
চলিনু পশ্চিম দিকে ছাড়িয়া তরাস ।
অবিরাম চলিলাম সমস্ত দিবস।
বুভুক্ষা পিপাসা মােরে করিল অবশ ।
ক্রমশঃ হইল শেষে দিবা-অবসান।
ভয়েতে হইল ব্যস্ত আমার পরাণ।
দশদিক্ ঘাের তম বাপিল আসিয়া ।
কি করি উপায় কিছু না পাই ভাবিয়া।
সম্মুখে দেখিনু এক ঘােরতর বন।
প্রবেশিনু তাহে আমি ইঞ্জুিয়া মরণ।
লতাবৃত স্থানে শেষে প্রবেশ করিয়া ।
বসিয়া রহিনু স্বীয় ধংস অপেক্ষিয়া ।
বাহির হইল কত ভল্লুক শার্দুল।
শুনিয়া পশুর রব হইনু অকুল ।
যই সখ ।
পড়িয়া রহিনু আমি কাতরেতে বনে।
নিম্মোক ছাড়িয়া যথা কৃশ অহিগণে।
ডাকিলাম ভারতিরে হইয়া কাতর।
দস্যুবৃত্তি-অপবাদে যথা রত্নাকর।
দৃষ্টি নাহি চলে তাহে ঘাের অন্ধকার।
নীরবে কাঁদি আমি অন্তরে অপার ।
মৃত্যুভয়ে পাণ্ড হয়ে হইনু বিকল ।
ইন্দ্রজিত-ভয়ে যথা স্বর্গে আখণ্ডল।
কিন্তু মােরে না দেখিল যত জন্তুগণ।
ভাগ্যহীন যথা নৃপ! পথে পড়াধন ॥
প্রভাত হইলে নিশি যত জন্তুগণ।
ভূধধ-করে শেষে করিল গমন
অম্বুজ-সন্তোষ রবি হইল প্রকাশ।
দেখিয়া হইল দর আমার তরাস ।
ক্ষ ধায় কাতর হয়ে বিবাদিত মনে।
ভ্রমিতে লাগিনু বনে ফল-অন্বেষণে।
দেখিলাম খেলিতেছে কুরঙ্গিনীদল।
ব্রজের নিকুঞ্জে যেন গােপিকা সকল ।
চমকিল দেখি, মােরে যত কুরঙ্গিনী।
সহসা যেরূপ ব্যাধে দেখি বিহঙ্গিনী।
ক্ষুধার জ্বালায় আমি ভ্রমি ইতস্ততঃ।
বৃক্ষ লতা বনজন্তু দেখিলাম কত।
সম্মুখে দেখিনু পরে মঞ্জ সরােবর।
প্রস্ফুটিত পদ্ম তাহে শােভিছে সুন্দর।
১২.
৯৩
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাৰ্য।
তুহৈল জলাশয় দেখি মম প্রাণ ।
পাই তাহার বারি-পানে পরিত্রাণ ।
মৃণাল তুলিয়া আমি উদর পূরিয়া।
খাইয়া তাহার তীরে রহিনু শুইয়া ॥
নিৰ্ম্মলসলিলকণবাহী প্রভঞ্জন।
করিল পরম তৃপ্ত বহি মম মন।
একেত বাসন্তানিল তাহে বৃক্ষ-ছায়া।
ঘেরিল সুযােগে নিদ্রা আসি মাের কায়া।
আরম্ভিয়া মনসুখে সম্বেশ-সেবন।
হইলাম অচেতন মদিয়া নয়ন।
আশ্চর্য্য দেখিনু স্বপ্ন মর্ম শুন তার।
শিদেদেশে বসি যেন জননী আমার ।
কহিছেন বৎস কালি ! তােমার বিহনে।
অহনি শি অসুখিত আছি ক্ষুব্ধ মনে ।
তুি, বৎস! বিদ্যা হেতু পূজিতে ভারতি।
এসেছ শুনিয়া হয় বাড়িয়াছে অতি ।
জগতবকামােদে ত্যাগ করি বনে।
যদ্যপি এসেছ বাণী ভজ দৃঢ়মনে।
শুনিয়া অপ্রতিহত বিদ্যোৎসাহ পাের।
হয়েছি রে বৎস কালি! আনন্দেতে পাের।
যদ্যপি পড়েছ বিদ্যা-উৎসাহ-তরঙ্গে।
ভাসরে ভজনালুদে স্বীয় মন-রঙ্গে।
নিত্য বানা-পাদপদ্ম পূজই সংযমে।
অমররত পাবি দমি ভব-দম যমে।।
অষ্ট সর্গ।
৯১
অচিরায় বিশ্বজ্ঞানদায়িনী ভারতি।
দিবেন অসীম বিদ্যা এবে তাের প্রতি।
ভবঘুধি পার হবি বৎস! অনায়াসে।
করিলা যেরূপ বাণী কৰি বেদব্যাসে ।
কাব্য-রসু অনেক জন্মিবে তবােদরে।
জম্মায় যেরূপ রত্ন অগাধ সাগরে।
ধন্য তব জন্মদাতা ধন্য গর্ভ মম।.
অমরপ্রতিম হবি জয় করি যম।
যমবিজয়িনী কীৰ্ত্তি ঘােষিবে এ ভবে।
যেরূপ ভবের বৎস! বিশ্ববাসী সবে ।
কহিলেন এইরূপ বসি শিয়ােদেশে।
চমকি উঠি নিদ্রা দূরে গেলে শেষে।
হায় ! নৃপ মমোরিস নয়নের জলে।
আদ্রয়িল বস্ত্রসহ মায়ার কৌশলে।
অধৈৰ্য্য হইনু দুঃখে হইয়া কাতর।
মাতৃহীন শিশু যথা শােকে নিরন্তর।
হায় মাত’! বলি আমি হৈনু মূচ্ছাগত।
পাদপ হইতে লােক পড়ি যেই মত।
চৈতন্য পাইয়া শেষে কাঁদিনু বিলাপে।
দশরথ মলে যথা রাম মনকাপে ।
ক্ষণে উঠি ক্ষণে পড়ি কাদিতেছি সুখে।
সহসা দেখিনু এক রমণী সম্মুখে ।
শুক্লবস্ত্রা শুভকেশা অতিস্থূলকায়।
আইলেন বাণীদেবী করি মহা মায়া ॥
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাৰ্য।
জিজ্ঞাসিল মােরে বৎস! কহ বিবরণ।
আইলে এ ঘােরারণ্যে কিসের কারণ।
কেনবা ধরায় পড়ি করিছ লােদন।
কাঁদিছে তােমারে দেখি বৎস! মম মন ।
আদ্যোপান্ত তার কাছে সমস্ত বর্নিয়া।
স্বপের বৃত্তান্ত আমি কহিনু কাদিয়া।
কহিলেন মাতৃবাক্য সত্য তাের হবে।
ধ্রুবের প্রতিম বিশ্বে চির যশঃ রবে।
অবশ্য পাইবি তুই দেবী বাগদেবী।
যেরূপে পাইল ধ্রুব কৃষ্ণে বনে সেবি।
কিন্ত, বৎস! মম বাক্য শুন অতঃপর ।
এই বাপীনীরে স্নান কররে সত্বর।
ভজনার মন্ত্র আমি শিক্ষা দিব তােরে।
পাইবি ভারতি বাছা! সেই মন্ত্র-জোরে ॥
শুনি জলাশয়ে আমি কৈনু সান দান।
নারদ-বাক্যেতে যথা ধ্রুব করে পান।
আদ্র বস্ত্রে আমি শেষে দেবীর সম্মুখে।
বসিলাম পূর্বমুখে হৃদয়-অসুখে ।
কহিলেন বাগীশ্বরী বৎস কালিদাস !
মা তৈলােমার আশু পূর্ণ হবে আশ৷৷
রসনা বাহির কর লিখি কৃষ্ণনাম।
যে নামে তােমার শীঘ্র সিদ্ধি হৰে কাম।
নিশ্চয় কহিনু আমি এসকল তােরে।
পাইবি ভারতিপদ কৃষ্ণনাম-জোরে ॥
ষষ্ঠ সর্গ।
৪
হর্ষরসবাসিনী ভারতি সবে বলে।
পাইবি দেবীরে বাছা! নামের কৌশলে।
শুনিয়া রসনা আমি করিনু বাহির।
লিখিলেন কৃষ্ণনাম দেবী হয়ে স্থির।
বাগীশ্বরী স্পর্শে মম অজ্ঞানত্ব যত।
পলাইল সুৰ্য দেখি তিমির যেমত ।
প্রকাশিল জ্ঞানজ্যোতিঃ কি কহিব কথা।
বিশুদ্ধ কাঞ্চন নৃপ! রসানেতে যথা ।
পড়িলাম দেবী-পদে হইয়া কাতর ।
কহিনু আমারে মাতঃ ! দেহ বিদ্যাবর।
ধরিলেন নিজমূৰ্ত্তি দেবী সরস্বতী।
যেরূপে মােহিত সদা কৃষ্ণ ব্রজপতি ।
বাণী-স্পর্শে জন্মিল কবিত্বশক্তি মুম।
স্বাতি-তারকার জলে শুভিমুক্তাসম ॥
দেখিয়া প্রথমে আমি দেবীর বদন।
উল্লাসে ছন্দেতে রূপ করিনু বর্ণন।
অনন্তর হযুরস-বাসিনী ভারতি।
উঠিল হাউই সম নভে আশুগতি।
শােভিল দেবীর প্রভা নভে সহ ধরা।
জীমূতমন্দ্রেতে যথা শম্পা মনােহরা ॥
ঝলিল বাণীর রূপ কি কহিব কথা।
ঘণাবৃত রাত্রে রাজা ইরম্মদ যথা ।
উচ্চস্বরে কহিলাম মাতঃ সরস্বতি !
কি হবে এক্ষণে কহ এদাসের গতি ৷
৯৪
কালদিাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
চিরকালদাস দেবি ! ওচরণে দাস।
নিজগুণে দয়া করি সিদ্ধ কর আশ৷
জ্ঞানহীন ভক্তিহীন চিরমুঢ় দাস।
তা বলে জননি! মােরে করনা নৈরাশ।
মা ভৈ মা ভৈ বৎস অরে কালিদাস !
পাইবি অসীম বিদ্যা সিদ্ধ হবে আশ ।
কবিমধ্যে শ্রেষ্ঠ হবি এভবভিতরে।
ঘোষিবে কবিত্বশঃ বিশ্ববাসী নরে।
বিদ্যোদ্যান তবেদরে হবে বৎস কালি !
অনাসে সুবিজ্ঞ হবি যাবে মূখ-গালি।
ফুটিবে তাহাতে বহু কাব্যরূপ ফুল।
পিবে গৌড় তার মধু যথা অলিকুল ।
তৃপ্ত হবে গৌড়বাসী কি কহিব কথা ।
পিয়ে পদ্মিনীর মধু শিলীমুখ যখা।
সরস কবিতা তব মুখে অবিরল।
বাহিরিবে গোখীতে যথা গঙ্গাজল।
কাব্য-পদবি করি বৎস ! তুমি হবে।
অক্ষয় কবিত্ব এ চিত্র তাের রবে।
চিরস্থায়ী যশঃ তব ঘােষিবেক নরে।
বহুপদ যথা ভবে মৈথিলীর বরে ।
কিন্তু মম পদ ছাড়ি বর্নিলি বদন।
এই দোযে হবে তাের কুস্থানে মরণ
এক্ষণেতে রুদ্রবাস যাহ বারাণসী।
নিশ্চয় পূর্ণিবে তব তথা বাঞ্ছা-শশী।
যষ্ঠ সর্গ।
বিষ্ণু শিরােমণি নাম তাহে সুধী আছে।
অভ্যাস করহ বিদ্যা গিয়া তাঁর কাছে ।
তব জিহ্বাগ্রেতে দৃষ্টি রহিল আমার।
নিরাপদে যাহ এবে চিন্তা নাহি আর।
অচিরায় তোর বিদ্যা হইবে উন্নতি।
দিন দিন সুধাধার যথা নিশাপতি।
ইহা কহি বিদ্যাকর-বাণী নীরবিল ।
স্বর মধুর সম কর্ণেতে বাজিল।
ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী আদি যত।
শুনিনু বাণীর বাণী মধুর সেমত ।
কৃতাঞ্জলিপুটে পুনঃ কহিলাম বানী।
কিরূপে যাইব মাতঃ! পথ নাহি জানি।
বিশেষতঃ বনজন্তু চারিদিকে আছে।
সম্মুখে পড়িলে মােরে গ্রাস করে পাছে ।
কহিলেন বাগীশ্বরী বৎস তাের ভয়।
নাহিরে এঘােরারণ্যে কহিনু নিশ্চয়।
অতুৰ্তম-অঙ্গে দেখি হরিপদচেনা।
যথা দেখি নাগন্তক সদা তার কেনা।
সেরূপ আমার বরে বনজন্তু গণ।
স্পর্শিবে না তোরে কালি ! স্থির কর মন।
এইরূপ উপদেশি মােয়র সরস্বতী।
হইলেন অন্তহিত নভে আশুগতি।
অনন্তর দেব্যাদেশে চলি গিয়া 'শেষে।
উপনীত হইলাম বারাণসী দেশে।
কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্য।
কাশীধামে শিরােমনি-বিদ্যালয়ে গিয়া।
কহিনু ভারতী-অজ্ঞা সব বিশেষিয়া ॥
শুনি ছাত্রসহ তবে বিষ্ণ, শিরােমণি।
বিস্মিত হইল সব অসম্ভব গণি ॥
জিজ্ঞাসিল মেরে পরে কহ দ্বিজবর !
কিরূপে পাইলে তুমি ভারতীর বর।
কলত্ৰবৃত্তান্ত শেষে আদ্যোপান্ত ভূপ
শিরােমণি সন্নিধানে কহিনু স্বরূপ ।
ছাত্র সহ আশ্চৰ্য্য হইল টোলপতি।
শোযুদরে বিশ্ব দেখি যথা যশােমতি।
শেষে বুধ আরম্ভিল শিক্ষা দিতে মােরে।
শিখিতে লাগিনু বিদ্যা ভারতির জোরে।
বিদ্যামন্দিরের পন্থা বর্ণপরিচয়।
পঞ্চম দিবসে সব শিখিনু নিশ্চয় !!
দ্বাররূপ সংক্ষিপ্তসারের শব্দ যত।
আশুপড়ি শেষে আমি শাস্ত্রে হৈনু রত।
বেদ শ্রুত যত আছে এ ভবমণ্ডলে।
ছয় মাসে পড়িলােম বাণীপদ-বলে ।
বিশ্বয়িল শিরােমণি কি কহিব কথা।
প্রহলাদের বিদ্যা দেখি মামার্ক যখা।
অনন্তর শিরােমণি আশীর্বাদ লয়ে !
শােইলাম গৌড়দেশে আনন্দিত হয়ে।
কৃতকার্য হয়ে শেষ দ্বিগুণ আমার।
বাড়িল যেরূপ নৃপ! কি কহিব তার।
*
যষ্ঠ স র্গ।
নৃপতি-মাণিকেশ্বর-সন্নিধানে গিয়া।
কহিনু বাণীর কৃপা সব বিশেষিয়া ।
শুনি সুখে গৌড়পতি ধন্যবাদ মােরে।
দিলেন বহুল শেষে আমোদের ঘােরে ।
দৈববিদ্যা গৌড়বাসী শুনিয়া আমার।
বিস্মিত হইল তবে সকলে অপার ।
নিশাকালে রমণীর নিকটেতে গিয়া।
মাগিনু বিচার পুনঃ অন্তরে রাগিয়া
নূতন নূতন ছন্দে কবিতা সকল।
কহিলাম ভূরি ভূরি রচি অনর্গল।
বিদ্যা দেখি অধােমুখী রৈল লাজে ধনী।
মহৌষধগুণে যথা নমমুখ ফণী।
ধরিল চরণ মম ক্ষম বলি দোষ।
করেছি কুকৰ্ম্ম নাথ! না করিও রােষ।
কহিনু'তােমার প্রিয়ে! কিছু দোষ নয়।
দোষে গুণ জন্মিয়াছে জানিহ নিশ্চয়।
অতএব পুৰ্বশোক জাত শোক যত।
বাহিরিল ভূধরের প্রস্রবণ মত।
শুনিয়া ভূপতি হর্ষে কন কবিবরে।
ধন্য কবি তুমি কবি এ ভবভিতরে ।
ধন্য তব পিতা ভবে ধন্য তব মাতা।
ধন্য লয়ে তােমারে প্রেরিলা বিশ্বে ধাতা
ধন্য ভজনের ফল ফলিল তােমার।
হইলে ভারতি পেয়ে ভবঘুধি পরি।
কালিদাসের বিদ্যাসাঙ কাব্য ।
যশোেগন্ধে পূরিল ভারত বেড়ি তব।
মধুকালে পুষ্পমােদে যথা এই ভব ।
এরূপ প্রশংসি রাজ। অনেক কৌশলে।
ভূরি ভুরি পুষ্পদাম দিলা কবিগণে।
সভাসদ সকলেতে দিয়া আলিঙ্গন।
ভূপতি সহিত দিলা রাজকার্যে মন।
ইতি কালিদাসের বিদ্যালাভ কাব্যে যষ্ঠ সঙ্গ
লেখকের নিবেদন শুন বন্ধুগণ !
নাম ধাম আমার করিব নিবেদন ।
অনুকম্পি স্বীয় গুণে না লইবে দোষ।
কিম্বা নাহি প্রকাশিবে ইথে কোন রোষ।
নবদ্বীপ জনগণ বঙ্গে মনােহর।
সরে যথা সরােহ দেখিতে সুন্দর ।
কিল্কপ্রতিম তাহে ঘেরা বিদ্যা দেবী।
কবি হৈল কালিদাস যাঁর পদ সেবি।
সুভাষা এমন ভাষা নাহি বঙ্গদেশে ।
নবদ্বীপে যেরূপ আছয়ে শুদ্ধবেশে।
পূৰ্বেতে কুজরবাগী নামে গ্রাম তার।
জনম আমার তাহে কহিলাম সার।
জননী গােলকেশ্বরী ব্রজনাথ পিতা।
ছিলেন দয়ালু মম যথা রাম-সীতা
গ্রন্থ সমাপ্ত।
No text on this page.
এই পুস্তক ঘঁহার প্রয়ােজন হইবে, তিনি কলিকাতা ২৭ নং বহু ৰাজার ঈীটস্থ ওয়েলিংটন প্রেসে, ঝামাপুকুর বেচু চাটুৰ্য্যের ঐটস্থ সংস্কৃত ডিপজিটেরিতে এবং পটলডাঙ্গাস্থ সমস্ত পুস্তকালয়ে তত্ত্ব করিলে পাইতে পারিবেন।
No text on this page.
No text on this page.