Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sreebatsha-chinta

Karmakar,harimohon · 2009/09/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শ্রীবৎস-চিন্তা
গীতাভিনয়।
শ্রীহরিমােহন, কর্মকার
প্রণীত '।
কলিকাতা
সমাচার দুধাবর্ষণ যন্ত্র
२१७

No text on this page.

মান্যবর শ্রীযুক্ত বাবু জয়গােপাল মিত্র
বহুগুণমন্দিরে
মহাশয়।
গীতাভিনয়ের প্রতি আপনার যেরূপ অনুরাগ
তাহা বলা বাহুল্য মাত্র। শ্রীবৎস-চিন্তা গীতাভিনয় ছলে
রচনা করিতে আপনি আমাকে অনুরােধ করেন । আমিও
আপনার অনুবােধ পরবশ হইয়া, রচনা পূৰ্ব্বক পুস্তকখানি,
আদরের সহিত আপনাকে সমর্পণ করিলাম। পুস্তকখানির
প্রতি অনুকুল নয়নে দৃষ্টিপাত করিলেই চরিতার্থ হইব।
এন্থকারস্য

গীতাভিনয়ােক্ত ব্যক্তিগণ । ন শনি লক্ষী শ্রীবৎস প্রাগ-দেশাধিপতি। মন্ত্রী সুবাহু সৌতিপুরাধিপতি। মন্ত্রী চিন্তা শ্রীবৎস রাজার মহিষী। তরলীকা মহিষীর সহচরী । ভদ্র। সুবাহু রাজনন্দিনী। হেমলত ভদ্রার সহচরা । চাঁপা মালিনী। বিমাের্দিনী প্রতিবাসিনী। দুইজন ধীবর, জেলেনী প্রতিহারী ইত্যাদি। ভুম সংশােধন। পৃষ্ঠা পক্তি অশুদ্ধ পরেশ পরশ ২৯ ফৌশলে কোশলে २४ শরণ স্মরণ २8 নগরে নিবাসিনী নগর নিবাসিনী २७ কমল কলিতায় কমল কলিকা প্রায় ২৮ এসেছে এসেছে। ৪৫ সরিদোপরি সরিদুপরি পাঠ সংযােগ। চল্লিশ পৃষ্ঠায় উত্রিশ পক্তির পর রাজারা ভদ্রার এরূপ আচ রণ দেখে অমনি ছি ছি করে উঠে গেল। পাঠ করিতে হইবে । ও ৫ শ্রীবৎস-চিন্তা। গীতাভিনয়। প্রথম অঙ্ক। প্ৰাগদেশের রাজ পথ । ( শনি ও লক্ষ্মীর প্রবেশ।) লনি।(স্বগত) তাই তাে কি আশ্চর্য ! আমি সুৰ্য্যনন্দন শনি আমার প্রতাপে ত্রিলােক কম্পমান। আমি যদি একবার কোপ দৃষ্টে চাই তা হলে লক্ষ্মীই বা থাকেন কোথা আর ব্রহ্মা বিষ্ণই বা থাকেন কোখা, সকলকেই ভস্ম হয়ে উড়ে যেতে হয়। এতেও আবার লক্ষ্মী বলে আমি তােমার কত্তে বড় আমার মান জেয়দা। আরে মলে! নারায়ণ বক্ষ- স্থলে একটু স্থান দিয়েছেন বলে অহঙ্কারে আর যাঁচে না। আবার তাও বলি রূপ খানা ভাল আছে, তা না হলে নারায়ণ এত অনুগত বেন কেন ? ( প্রকাশে) লক্ষ্মি । আমা অপেক্ষা তুমি বড় একথা বলতে কি তােমার একটু লঙলা বোধ হচ্ছে না? লক্ষ্মী। কেন লজ্জ। আবার কিসের? তুমি আমা অপেক্ষা প্রধান কেমন করে হলে ? শনি। (হাস্য মুখে) এ কথা আমার বলা বাহুল্য মাত্র এ কে না জানে যে পুরুষ পরেশ। এই প্রথমেই তাে তােমার হার। লক্ষ্মী। তুমি পুরুষ বলে কি আমি তােমার কাছে নিকৃষ্ট হব । কেন স্ত্রী দিগকেও তো রমণী-রত্ন বলে থাকে ? ( ১ )

[ ২ ]
শনি। হাঁ বলে থাকে বটে, কিন্তু তুমি জান যে আমার আর একটি
বিশেষ গুণ আছে।
লক্ষ্মী। না-~-
শনি। আমি যদি এর কোপ দৃষ্টে চাই তাহলে
ত্রিলােকে কি আর কিছু থাকে? সব ভস্ম হয়ে যায়।
তার সাক্ষি গণেশ বাবাজীকে একবার দেখে ছিলেম তাতে
তার মুণ্ডটো যে কোথা উড়ে গেল, তা কেউ জান্-
তে ও পারলেনা। তবে সেই টে তােমাকে একবার দেখাতে
হলো।
লক্ষ্মী। (স্বগত) আ মরি মরি কি গুণ মুখে আগুণ তোমাৰ
গুণের। (প্রকাশে) তােমার ও গুলাে জগত বিখ্যাত তা
আর দ্বন্দে প্রয়ােজন নাই চল এখন গ্রীবৎস রাজার
কাছে যাই, সেখানে গেলে এর উপযুক্ত বিচার হবে।
শনি। হা হা বলেছ ভাল, কেন ঝগড়া করে মরি চল সেই
খানেই যাই। কিন্তু যেখানে যাও শম্মা বড় হৰেন ভার
আর কথাটি নেই।
( উভয়ের প্রস্থান)
রাজ-সভা।
(রাজা ও মন্ত্রীর প্রবেশ )
রাজা। মন্ত্রি! মহিষীর অভিলাষ হয়েছে যে তিনি কিছু দিন
যমুনার উপকূলে বিহার করেন। তুমি স্বত্বর হয়ে
সেখানে একটি সুরম্য আরাম প্রস্তুত করে দেও গে।
মন্ত্রী। যে আজ্ঞা মহারাজ।
রাজা। আর দেখ আমিও মহিষীর সঙ্গে যাব, তা যে পর্যন্ত
প্রত্যাগত না হই, সে পর্যন্ত তোমাকে রাজ্য ভার নিতে
মন্ত্রি। যে কি মহারাজ! অনন্ত-দেবের কাৰ্য কি যে সে করতে
পারে ?
( শনি ও লক্ষ্মীর প্রবেশ)
উভয়ে। মহারাজের জয় হােক।

با ৩ ] রাজা।(সসম্ভমে) আসূতে আজ্ঞা হােক আসতে আজ্ঞা হােক এ কি ভাগ্য আজ আমি চরিতার্থ হলেম, আমার জন্ম সফল হলাে। তবে এ পর্যন্ত আপনাদের কি মানসে আমা হয়েছে, আজ্ঞা করে এ দাসকে চরিতার্থ করুন? শনি। মহারাজ! আমরা একটা বিশেষ প্রয়ােজনে আপনার নিকটে এসেছি। রাজা। (সবিনয়ে) আজ্ঞা করুন। লক্ষ্মী। মহারাজ! আপনার সৌজনতায় আমরা অতিশয় সন্তুষ্ট হলে। কিন্তু আমাদের যে জন্য আসা হয়েছে, তা অৰি- চলিত চিত্তে শ্রবন করুন। রাজা। যে আজ্ঞা বলুন। লক্ষ্মী। আমাদের উভয়ের মধ্যে একটা বিবাদ উপস্থিত হয়েছে, উনি বলেন আমি প্রধান, আমি বলি আমি প্রধান, আপনি হচ্ছেন পরম ধাৰ্মিক, পক্ষপাত পরিশূন্য হয়ে বলুন যে আমাদের মধ্যে কে প্রধান। রাজা। (সবিষাদে স্বগত) কি সর্বনাশ! কি সর্বনাশ! এত ভারি ৰিপদ উপস্থিত দেখছি। আমার পক্ষে তত উভয়েই সমান, তবে কাকে ছােট কাকে ব ড় বলা যায়! ( ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া। তবে সেই ভাল তাই বলাযাক (প্রকাশে) আমি বিবেচনা করে দেখলেম যে আজ এর কিছুই হতে পারে না। আপনারা অনুগ্রহ পূৰ্ব্বক কাল এবার আসবেন তা হলে আমি এর যথার্থ বিচার করে দেব। লক্ষ্মী। আচ্ছা মহারাজ! তবে আমরা এখন চল্লেম কাল অতি প্রত্যুষেই আৰ। রাজা। ( সবিনয়ে) যে আজ। আসুন। (প্রণাম) ( উভয়ের প্রস্থান।) রাজা। শন্ত্রি ! এত বিষম বিভ্রাট দেখছি, এখন কি করা যায় ? মন্ত্রী। মহারাজ! তার আর চিন্তা কি, কোন কৌশলে এর একটা উপায় করা যাবে।

[ ৪ ]
রাজা। আচ্ছা তবে একটা উপায় স্থির করগে, বেলাটা অধিক
হয়েছে আমি এখন অন্তপুরে চল্লেম।
মন্ত্রী। যে আজ্ঞা মহারাজ ।
( উভয়ের প্রস্থান।
রাজাপুর ।
( চিন্তা ও তরলিকার প্রবেশ
চিস্তা। সখি ! আৰ্যপুত্র যে আমাকে প্রাণের সহিত ভাল
বাসেন তা এতদিনে জানতে পারলেম।
তর। রাজমহিষি! এত দিনের পর জালেন কেমন করে?
চিন্তা। সখি! আমি মহারাজের নিকটে একটি অভিলাষ
প্রকাশ করেছিলেন, যে যমুনার উপকুলে কিছুদিন বিহার
করব। মহারাজ আমার সে অভিলাষটি পূর্ণ করবেন
বলেছেন।
তর। 'রাজমহির্ষি ! আপনি হচ্ছেন তার হৃদয় সরােবরের পদ্মিনী
তিনি আপনার মনােরথ পূর্ণ করবেন এ কোন বিচিত্র
কথা ?
চিন্তা। সখি! অনুকুল পতি যে রমণীকুলের লােচনানন্দদায়ক
ও প্রীতিবর্ধক তার আর কি পরিচয় দেব।
রাগিণী-বসন্ত। তাল জলদ মধ্যমান।
পায় যদি নারী কুল অনুকুল কান্ত।
সদত সে রমণী সুখিনী নিতান্ত ।
বহে রতি-পতি বশে একান্ত।
প্রেমের পদার্থ চয়, সদা সম ভাবে রয়,
বিচ্ছেদের সাধ্যনয় করতে সে সুখান্ত ।
( রাজার প্রবেশ।)
চিন্তা। ( পশ্চাৎ অবলােকন করিয়া) সখি ! এই যে মহারাজ এই
দিকেই আছেন।
বাজা। কৈ মহিষ ! কোথায় ?

[ ৫ ]
চিন্তা। (সসম্ভমে) আসুন আসুন মহারাজ! আমি আপনার
আপথ চেয়ে রয়েছি। কিন্তু আজ আপনার এমন গান
বদন দেখছি এর কারণ কি?
রাজা। (সবিষাদে) প্রিয়ে ! আর কি দেখছ সর্বনাশ
উপস্থিত !
চিন্তা। (সভয়ে) কেন কেন মহারাজ! কিহয়েছে ? কিছুই যে
বলছেন না ? একেবারে নিরব হয়ে রইলেন যে?
রাজা। (দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) আর বিয়ে! কি বলব?
চিন্তা। কেন কেন এত বিষাদিত হচ্ছেন কেন? ব্যাপার টা কি
বন না?
রাজা। আজ লক্ষ্মী আর শনি উভয়ে বিবাদ করে এসেছিলেন।
চিন্তা। তাতে আপনার এত বিষাদিত হবার কারণ কি? আর
তাঁদেরি বা এমন কি বিবাদ উপস্থিত হয়েছে ?
রাজা। তাদের বিবাদ, লক্ষ্মী বলেন আমি বড়-শনি বলেন আমি
: বড়, এই রূপ বিবাদ করে আমাকে এসে মধ্যস্থ মেনেছেন।
কিন্তু আমি যে কাকে ছােট কাকে বড় করব সেই ভাবনা
ভেবে আমার বুক শুকিয়ে উঠছে।
চিন্তা। নাথ! এটি ভাবনার বিষয় বটে, তা বােলে চিন্তা সাগরে মগ্ন
হলে কি হবে? আপনি এ দুশ্চিন্তা পরিত্যাগ করে সেই
জগত-চিন্তামণিকে শরণ করুন, তিনিই আপনার দুশ্চিন্তা
দুর করবেন।
রাগিণী খাম্বাজ। তাল যৎ।
এত বিরষ বদনে কেন ভাবিছ রাজন।
শ্যাম নব জল ধরে করহ শরণ ।
যিনি জগত আধার, সকলের মুলাধার।
তিনি করিবেন তব দুশ্চিন্তা হরণ।
সনকাদি ঋষিগণ, ভাবে যার আঁচরণ,
করিবেন তিনি তব মঙ্গল সাধন।
মহারাজ! আপনি প্রসন্ন হন আপনার বিরস বদন দেখে

[ ৬ ]
আমার হৃদয় (শতধা বিদীর্ণ হচ্ছে। দেখুন এই জগত
সংসার সুখ দুখে পরিপূর্ণ, তবে মনুষ্যরা আপনার কর্ম
দোষে সুখ দুঃখ ভোগ করে থাকে।
রাজা। প্রিয়ে। আমি সব জানি কিন্তু জেনেই বা কি করব? শেষে
• যে একটা কি ঘটনা উপস্থিত হবে তাই ভেবে আমার মন
অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে উঠছে। দেখ আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে
এই শব্দটা কি ভয়ঙ্কর কিন্তু ভেঙ্গে পড়লে সকলি
সহ্য হয়।
চিন্তা। মহারাজ! আমাদের ভাগ্য সেই জগত পিতার সেচ্ছা-
ধিন। তাঁর মনে যা আছে তাই হবে, তবে বিপদের সময়
আমরা তাঁর অভয়-চরণ বিস্মৃত না হই এই আমাদের
ঐকান্তিক প্রার্থনা।
রাগিণী সুরট খাম্বাজ। তাল আড়খেমটা।
প্রাণ পতি রাখ মতি সেই জন চরণে।
যার অন গ্রহে জীব জয়ী হয় শমনে ।
যাহার নিয়ম বলে, জীবগণ চলে বলে,
তপন গগণে থাকি, কর দেয় ভুবনে।
যােগীজন অনিবার, মন গৃহে দিয়ে দ্বার,
ভাবেন মুরতি যার, মুদ্রিত নয়নে।
মহারাজ! এর কিছু উপায় স্থির করেছেন কি?
রাজা। না প্রিয়ে! আমি এ পর্যন্তু এর কিছুই স্থির করতে
পারিনি। ৰােধ হচ্ছে পারবো ও না। বোধ করি মন্ত্রী
আমার নিমিত্ত অপেক্ষা করছে, আমি এখন রাসায়
লেম।
চিতা। যে আজ্ঞা মহারাজ! আসুন কিন্তু বিবেচনা করে কর্ম
করবেন, যাতে কোন বিপদ উপস্থিত না হয়, আমি আর
অধিক কি বলব।
( রাজার প্রস্থান।)

{ ৭ ]
চিন্তা। তাইতো সখি ! এ যে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত, একথা শুনে
অবধি আমার হৃংকল্প হচ্ছে।
তর। রাজমহিষি! তার জন্যে এত ভবেলেই বা কি হবে ? ঈশ্বর
অবশ্যই এর একটা উপায় করে দেবেন। বেলাটা অধিক
হয়েছে, এখন চলুন পুজার আয়োজন করে দিই গে।
চিন্তা। হা সখি ! চলো।
( উভয়ের প্রস্থান।)
রাজ-সভা।
(রাজা ও মন্ত্রীর প্রবেশ)
ৰাজা। (স্বগত) তাইতো এদের কাল আসতে বল্লেম এখন
কি করা যায় ? কিছুই ভেবে স্থির করতে পাচ্ছিনে? বাহক
এমমি একটা কৌশল করতে হবে যে আমি কোন কথা
কনা অথচ যথার্থ বিচার হবে। এ ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া)
তবে সেই তাল তাই করা যাক্, এ রূপ উপায় করলে ভৰি
ষ্যতে আর কোন বিপদ হবার সম্ভাবনা নাই।(মন্ত্রীর প্রতি
প্রকাশে) মন্ত্রি! এক কৰ্ম্ম ফর শীঘ দুখান সিংহাসন আন,
একখান সােনার আর একখান রূপার, এনে দুপাশে
দুখানা রাখ, তাদের বসতে দিতে হবে তাঁরা আগত প্রায়।
মন্ত্রি। যে আজ্ঞা মহারাজ! ( দুইখান সিংহাসন আনিয়া দুই
পাশে স্থাপন পূৰ্ব্বক)
( মন্ত্রীর প্রস্থান।)
( শনি ও লক্ষ্মীর প্রবেশ)
লী। মহারাজের জয় হােক।
ৰাজা। আসতে আজ্ঞা হােক আসুন আসুন।
শনি। মহারাজ আমরা তো এলেম তবে আমাদের বিচারটা
হােক।
রাজা। যে আজ্ঞা আপনার অগ্রে এই সিংহাসনে বসুন, তার
পরেই বিচার হবে।

{ ৮ }
শনি। আচ্ছা মহারাজ। (স্বর্ণ সিংহাসনে লক্ষীর উপবেশন,
ও রৌপ্য সিংহাসনে শনির উপবেশম।)
লক্ষ্মী।মহারাজ পক্ষপাত পরিশূন্য হয়ে বলুন যে আমাদের
মধ্যে কে প্রধান।
রাজা। দেবি ! এ বিষয়ে আমার কোন কথা কওয়া কেবল বাহুল্য
মাত্র। আসন বিশেষে, আপনারাই কেন বিবেচনা করে
দেখুন না যে আপনাদের মধ্যে কে প্রধান আর কে
নিকৃষ্ট?
শনি। ( সক্রোধে) কি তাের এত বড় আস্পর্ধা! রূপার সিংহা-
সনে বসিয়ে লক্ষ্মীর কাছে তুই আমাকে ছােট করলি?
আমি সূৰ্য্যনন্দন শনি আমার এত অপমান! হারে পাপিষ্ট
এর সমুচিত প্রতিফল তোকে না দিয়ে কখনই ক্ষান্ত হন?
তখন তুই মনে মনে করবি যে কেন লক্ষ্মীকে বড় করে
ছিলেম। (বলিতে বলিতে শনির প্রস্থান।)
লক্ষ্মী। ( গাত্রোত্থান পূৰ্ব্বক) মহারাজ! মান রক্ষা করাতে আমি
যে আজ আপনার প্রতি কি পৰ্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি তার
আর কি বলব। আমি আজ পর্যন্ত মহারাজের নিকটে
অ চলা হয়ে রইলেম। আর শনি আপনাকে যত দিন কষ্ট
দেবে, ততদিন আমি ছায়ার ন্যায় আপনার সঙ্গে সঙ্গে
থাৰ ও সৰ্ব্বদা রক্ষা করব। এতে আপনি ক্ষণকালের
জন্যও ভাবিত হবে না। মহারাজ ! এখন আমি বৈকুণ্ঠে
চল্পেম, আপনার মঙ্গল হােক।'
( লক্ষ্মীর প্রস্থান)
রাজা। (স্বগত) ইনিও তো গেলেন, এখন শমির কো প কেমন
করে রক্ষা পাই। তবে যাই একবার অন্তপুরে গে মহিষীকে
বলি, এখানে দাঁড়িয়ে আর ভাবলেই বা কি হবে?
( রাজার প্রস্থান)

দ্বিতীয় অঙ্ক।
রাজপথ।
( কথা স্কন্ধে লইয়া ছদ্মবেশে রাজা ও রাণীর প্রবেশ)
রাজা। (সরােদনে) প্রিয়ে ! আজ অবধি তো আমাদের জীবনের
সকল সাধ মিটলাে; শনির কোপে পড়ে রাজ্য,ধন,জন সকল
গেল, কেবল আমরা দুজন প্রাণে বেঁচে আছি মাত্র। (দীর্ঘ
নিম্বাস ত্যাগ করিয়া) হা বিধাতঃ! তাের মনে কি এই ছিল;
হায়! হায়! শেষে যে আমার অদৃষ্টে এত হবে তা আমি
স্বপনেও জাতেম না। প্রিয়ে! আমি এখন বন গমনে
কৃত-নিশ্চয় হয়েছি, কিন্তু যে পর্যন্ত আমার সৌভাগ্য শশীর
উদয় না হয়, সে পর্যন্ত তুমি পিত্রালয়ে বাস কর গে ।
রাগিণী খাম্বাজ। তাল একতালা।
যাও হে তব জনক ভবনে।
কেন আর প্রিয়ে আমার সনে,
'. পাইবে যাতনা, হরিণ নয়ন,
স্বাপদ সঙ্কল নিবিড় বনে।।
রাজার রমণী রাজার সতী,
রাজভােগে সদা ছিলে গুনবতি,
নিবিড় কাননে কষ্ট পাবে অতি,
নয়নের জল রবে নয়নে।
প্রিয়ে হে তব শ্রীমুখ নলিন,
বন পর্যটনে হবে মলিন,
অনুভব করি, হে জীবিতেশ্বরি;
এত দুখ সবে না।
( ২ )

[ ১ ]
বনের দারুণ কঠিন মাটিতে,
পাইবে যাতনা হাঁটিতে হাঁটিতে,
তাই বলি যাও জনক বাটীতে,
দিন পেলে সুখী হব মিলনে ।।
প্রিয়ে! তুমি কোমলঙ্গী; বনবাস ক্লেশ সহ করতে
পারবে না ?
চিন্তা । নাখ! ও কথা আপনি আর আমাকে বলবেন না,? আমি
এ অবস্থায় পিত্রালয়ে গেলে সমাদর পাব না। দুখিনী
বলে সকলেই ঘৃণা করবে। অতএব মহারাজ! এ দাসীকে
পরিত্যাগ করবেন না, সঙ্গে করে নিন। নাথ! বনবাসে
যদিও আমার ক্লেশ হয়, আপনার চন্দ্রবদন দেখে সমুদয়
ক্লেশ নিবারণ হবে। কিন্তু পিত্রালয়ে থেকে আপনার দুঃসহ
বিরহ যন্ত্রণা কোন মতেই সহ্য করতে পারব না। আর
আমি সঙ্গে থাকলে আপনারে অনেক ক্লেশের লাঘব হবে।
রাগিণী ঝিঝিট। তাল আড়খেমটা।
মহারাজ এ দুখিনীরে যেও না ত্যজিয়ে হে।
করিব চরণ সেবা নিকটে থাকিয়ে হে।
শুন ওহে চিতগামি, তুমি হলে বনােগামি,
কার মুখ চেয়ে আমি, থাকিব বাঁচিয়ে হে,
কি কহিব গুণরাশি, যদি দুখ পায় দাসী,
নিবারিব দুখ রাশি, ও-মুখ চাহিয়ে হে।
নাথ ! আমি আপনার চিরদাসী আমাকে পরিত্যাগ করে
যাবেন না। নাথ! আমিতাে কখন কোন অপরাধ করি
নাই, তবে আমাকে কি দোষে পরিত্যাগ করতে চাচ্ছেন?
রাজা। প্রিয়ে। আমি যে অপরাধের নিমিত্তই বলছি তা কখনই
মনে করাে না। তুমি স্বভাবতই অতি সুশিল ও পতি
প্রাণ তােমার অপরাধ কোন মতেই সম্ভব হয় না। তবে

[ ১১ । কেন বলছি, তুমি অতি কোমলাঙ্গী সৰ্ব্বদা রাজ পৰ্যঙ্কোপরি উপবিষ্টা থাকতে, তােমার শরীরে বনবাসের অসহ ক্লেশ কিরূপে সহ হবে ? চিন্তা। নাথ! এ কথাটি আপনার বলা বাহুল্য মাত্র, যদি আপ- নার শরীরে ক্লেশ হয় তা কি আমার হবে না ? অন্তত মনেও হবে । দেখুন সতী পতির অর্ধাঙ্গী। 'রাগিণী বাহার। তাল আখেমটা। সতী পতি ছাড়া রয় কি কখন। তার সাক্ষি দেখ সখ জানকী সতী যেমন। আর দেখ প্রাণপতি, কৃষ্ণা গুণবতী সতী, কাননে করিল গতি, লয়ে স্বামি পঞ্চজন। সাবিত্রী পতির সনে, প্রবেশি গহন বনে, বাঁচাইয়ে ছিলো নাথের, অমুল্য জীবন ধন ।। তা যদিও আমি পিত্রালয়ে থাকি, তা হলে আপনার বন গমন স্মরণ হলে যেরূপ ক্লেশ হবে, বােধকরি আপনার সঙ্গে গেলে, তার শতাংশের একাংশ ও হবে না। নাথ! দাসীকে পরিত্যগ করে যাবে না ? কারণ মানুষের শারীরিক ক্লেশ অপেক্ষা মানসিক ক্লেশ অতান্ত দুঃসহ। রাজ।। প্রিয়ে! সকলি সত্য বটে, কিন্তু তুমি সঙ্গে গেলে আমার ক্লেশ দুর হওয়া দুরে থাক, বরং সেই প্রচণ্ড মার্তণ্ড তাপে রাহু গ্ৰস্থ চন্দ্রের ন্যায় ভােমার মলিন মুখচন্দ্র দেখে আর ক্লেশ বৃদ্ধি হবে। অতএব প্রিয়ে। আমার সহিত বনগমনের ইচ্ছা পরিত্যাগ কর। চিন্তা। নাথ! সে বিষয়ে দাসীকে ক্ষমা করুন, আমি আপনার সঙ্গে যাবই। রাজা। (স্বগত) তাই তো এ যে আবার ঘাের সঙ্কটে পড়লেম। যদি নিয়ে যাই তাহলে স্ত্রী-লােক সঙ্গে থাকলে পথে অনেক বিপদ উপস্থিত হতে পারে। আর যদি না নিয়ে যাই তা

{ ১২ ]
হলে প্রিয়ে দেছি যেরূপ পতিব্রতা, ও আমার প্রতি অনু-
রক্তা যদি আমার বিরহে প্রাণই ত্যাগ করেন ; তবে তাই
বা কিরূপে হয়? তবে না হয় নিয়েই যাই, যেরূপ বিপদ
উপস্থিত হয়েছে এর অপেক্ষা আর অধিক কি হতে পারে?
ভাল আর এবার কেন বুঝিয়ে দেখা যাক না? (প্রকাশে)
প্রিয়ে ! তুমি অতি কুসুম সুকুমারী; বনের ফল মূল আহার
ও গিরি-নদীর কষায় জল পান করে দেহ ধারণ করতে
পারবে না। অতএব শান্ত হও, চল বরং আমি তােমাকে
তােমার পিত্রালয়ে রেখে আছি।
চিন্তা। ( সবিষাদে) নাথ ! আমি তো পূৰ্বেই বলেছি যে পিত্রা-
লয়ে যাব না, তবে আপনি আমাকে কেন প্রতারণা করছেন ?
(সরােদনে) হা হত বিধি! তাের মনে কি এই ছিল ?
রাজ্য সুখে বঞ্চিৎ করে কি তাের এখনো মনে বাসনা পূর্ণ
হলো না? পুনৰ্বার পতি সুখ বঞ্চিৎ করতে উদ্যত হয়ে
ছিস ? তাের দোষ কি সকলি আমার কপালের দোষ। হা
নির্দয় শনি! তুই তাে এ অনর্থের মূল, তাের কোপানলে
পড়ে আমার প্রাণনাথ বনােবাসী হতে চল্লেন। ( বােদন )
রাজা। (হস্ত ধারণ পূৰ্ব্বক) ওকি ওকি প্রিয়ে ! আর কেঁদোনা,
কি করবে বলে সকলি ঈশ্বরের ইচ্ছা!
চিন্তা। ( চক্ষের জল মার্জিন করত।)
রাগিণী-ঝিঝিট! তাল জলদ মধ্যমান।
সখা ! সাধে কি অাখি মম করেহে রােদন।
তব মুন মুখ, হেরি ফাটে বুক,
কি বােলে নয়নে তবে করিব বারণ ।
তুমি হে ভূপতি বর, অনুপম গুণধর,
স্বপনের অগোচর, তব নিৰ্বাসন।
পিতৃ সত্য পালনে, রাম গিয়ে ছিলেন বনে,
কার সত্য হেতু তব কাননে গমন ।

{ ১৩ ] নাথ। আমি এই বিনয় করে গলায় কাপড় দে বলছি অধিনীকে পরিত্যাগ করে যাবেন না। রাজা। প্রিয়ে! যদি একান্তই যাবে তবে চলো বারণ তো শুলে না । ( উভয়ের প্রস্থান ) উভয়ের পুনঃ প্রবেশ ) রাজা। (হঠাৎ শনিকৃত মায়া নদী দেখিয়া স্বগত) কি সর্বনাশ ! এ কোথায় এলেম এ যে ভয়ঙ্কর নদী দেছি? আঃ এর যে কূল কিনারা কিছুই দেখতে পাচ্ছিনে? ( চতুর্দিক অবলােকন করিয়া) এ কি এ নদী: কি বনের চতু ব্দিক বেষ্টন করে আছে ? তবে এ নদী কেমন করে পার হওয়া যায় ? ( প্রকাশে চিন্তার প্রতি) প্রিয়ে ! এই তাে এক ভয়ানক নদী দেখছি এখন কি করা যায় ? রাগিণী ঝিঝিট। তাল তেলেনা। বল দেখি বিধুমুখি উপায় আমায় । দুখের দুখিনী বলি জিজ্ঞাসি তােমায়। কুল কুল রবে সতি, বহিতেছে সেতিস্বতি, বাড়িছে তরঙ্গ অতি, অনিল সহায়। কেমনে হইব পার, নাহি তরী কর্ণধার নিরখি নদী অপার, শােণিত শুকায় ॥ প্রিয়ে। আমি তােমাকে তখনি বলেছিলাম যে পিত্রালয়ে যাও, আমার সঙ্গে এসো না এলে সমধিক কষ্ট পাবে। চিন্তা। মহারাজ ! আপনি যখন আমার নিকটে আছেন, তখন এ কষ্ট আমার কষ্ট বলে বােধ হচ্ছে না। অধিক কি বন্ধ আপনার সঙ্গে এ গহন কাননে থেকে ও আমি যেন সেই সুখ ভোগ করছি। (শনির নাবিক বেশে প্রবেশ।) চিন্তা। (পশ্চাৎ অবলােকন করিয়া) না! ঐ এক জন নাবিক আছে যেন বোধ হচ্ছে না ?

[ ১৪ ] রাজা (পশ্চাৎ অবলােকন করিয়া) হ হ নাবিক বটে এই যে নৌকা নিয়ে এই দিকেই আসছে। আঃ ঈশ্বর জুটিয়ে দিলেন। (নাবিকের প্রতি) ওহে নাবিক! আমাদের পার করে দিতে পার ? নাবি। কেন মহাশয় পারবেনা কেন? রাজা। তবে দাও তো বাপু আমরা অনেকক্ষণ কষ্ট পাচ্ছি। নাবি। যে আজ্ঞা মহাশয়, কিন্তু ভাঙ্গা নৌকোয় আমি তিন জনকে একেবারে পার করতে পারবাে না। রাজা। (হাস্য মুখে) কৈ হে বাপু তিন জন কোথায়, এই তো আমরা দুজন। নার্বি। আজ হ। আপনারা দুজন বটে কিন্তু ও কঁাথা খানা এক জনের ধাক্কা। আমার এই ভাঙ্গা নৌকো ত আমি তিন জকে পার করতে পারব না। আগে আপনাদের পার করি পরে কথা পার করব, না হয় আগে কথা পার করি পরে আপনারা পার হবেন ? এতে আপনার যে রূপ মত হয়। রাজা। (স্বগত) তাই তাে এ ও যে ভারি বিপদ দেখছি ? আমার নিকটে যা যৎকিঞ্চিৎ গােপনীয় অর্থ আছে তা কাথার ভিতর। বিশ্বাস করে পার করতে দেব যদি নিয়ে পলায়? ( ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া) হা তা কি পারবে? এখনাে অধ- ৰ্ম্মের রাজত্ব হয় নি ? ( প্রকাশে) ওহে বাপু নাবিক তবে আগে কথাই পার কর ? . নাবি। যে আজ্ঞা। ( কথা লইয়া নাবিকের অন্ত ধ্যান) রাজা। ( চতুর্দিক অবলােকন করিয়া সচকিতে) প্রিয়ে এ কি ? সে নদীই বা কোথা, সে নাবিকই বা কোথা, আর সেই ভাঙ্গা নৌকাই বা কোথা? এ যে সেই গহন কানন দেখুছি? কি আশ্চর্য! আমি কি স্বপ্ন দেখলেম ? না স্বপ্নই বা কেমন করে আমি তাে জাগ্রতাবস্থায় আছি। চিন্তা। মহারাজ! বােধ হচ্ছে এ সেই দুবৃত্ত শনির কাজ। (নেপথ্যে) কেমন মহারাজ ! এখন তােমার লক্ষ্মী কোথায় ? চিন্তা। ওই শুনুন মহারাজ !

[ ১৫ ]
রাজা। হা দুবৃর্ত্ত শনি! রাজ্য সম্পদ সমুদয় নষ্ট করেও সন্তুষ্ট হলে
না শেষ যা যৎকিঞ্চিৎ গুপ্ত ধন ছিল তাও হরণ করলে ?
হা বিধাতঃ ! শেষে যে আমার অদৃষ্টে এত দুখ ছিল তা
আমি স্বপ্নেও জাতেম না। তা সে যাহক এখন তােমার
মলিন বদন দেখে আমার অন্তকরণ অত্যন্ত ব্যাকুল হচ্ছে!
প্রিয়ে ! তখনি তো বলেছিলে যে আমার সঙ্গে বনে
এসো না এলে অতিশয় কষ্ট পাবে ?
চিন্তা। মহারাজ! পূৰ্বেই তাে বলেছি যে আপনি যদি বনবাস ক্লেশ
অনায়াশেই সহ্য করতে পারেন তা হলে আমিও পারবাে।
নাথ! আপনি যখন আমাকে বিরহ ক্লেশ দেনি, তখন
এ ক্লেশকে কি আমি ভয় করি ?
রাজা! প্রিয়ে! বলছ বটে কিন্তু আমার মনে ভাল লাগছে না। তা
যাহক এখন ক্ষুধা তৃষ্ণায় অতিশয় কাতর হয়ে পড়েছি আর
চলতে পারি নে, সৰ্ব্ব শরীর ক্রমে অবসন্ন হয়ে পড়ছে।
এ দেখছি যে বিজন বন এ বনে ফল, মুল পাওয়া অত্যন্ত সু
বােধ করি আহার অভাবেই প্রাণ ত্যাগ করতে
হয়। আঃ ঈশ্বর করুন ভাই হােক! তা হলে এ যন্ত্রণ।
থেকে একেবারেই মুক্ত হই।
চিন্তা । মহারাজ! এত কাতর হচ্ছেন কেন? সুস্থির হােন, যিনি
আমাদের দেহে প্রাণ দিয়েছেন তিনিই আহার দেবেন।
(দুই জন ধীবরের প্রবেশ।)
রাগিণী বাহার। তাল খো।
মেলা মাচ ধরেছি আজ ভাগিরথী নদীর জলে।
মনের সাধে ঘরে গিয়ে পেট ভরে খাব সকলে ।
মাচ দেখে নানা মত, বৌ মা খুসি হবে কত,
রাঁধবে খেতে পারবে যত, মনের মত ঝোল অম্বলে ।
বাকি মাচ মাথায় করে; হাটে যাব বের তরে,
মাচ বেচে টাকা করে, মল গড়াব কুতুহলে।
কঠিন ।

[ ১৬ ] প্রথম। ভাই আজকে এই শােল মাটা দেখে বৌ মা একেবারে আহলাদে আটখানা হবে এখন, আর আমি অমনি নেজায় মুছােয় দশ খানা হয়ে যাব। দ্বিতীয়। দুর হত ভাগা বৌ মা কিরে ? প্রথম। কেন বাবা যে তিন বেলা বলতে আমি, কি এক বারো বলতে পারিনে। দ্বিতীয়। দুর বােকা সে যে তাের -রি। প্রথম। হা হা আমি জানি তােকে আর শিখিয়ে দিতে হবে না, ঐ-রি বলেই তো বলছি।কিন্তু ভাই তার যে রূপ তা আর আমি কি বলব। দ্বিতীয়। বলনা ভাই:শুনি? প্রথম। রাগীণী সােহিনী বাহার। তাল খেমটা। জেলেনীর ৰূপের পরিচয়। বলতেগেলে সিউরে উঠে অঙ্গ সমুদয় । কিম্ভূতকিমাকার, জেলেনী প্রাণ আমার, পেত্নী মেনেছে হার, লেজটী দিলেই হয় । যখন আবার হাস্য করে, খই খায় আঁধার ঘরে, নিকটে থাকিনে ডরে, কখন বা কি হয়। ভাই গুণে। আবার তেমনি! তার গুণে রাত্রিরে বাড়ীতে লােক ছাড়া থাকে না। যেন সােনাগাজির-দর করে ফেলেছে। দ্বিতীয়। এ তবেতাে তার বড় গুণ, তাকে একবার ডাকন ভাই? প্রথম। হু জেলেনীকে আমি ডাকি, আর তুই আমার অন্তরে কাটি দিস? তা হবে না বাবা আমি কি তেমনি কাচা ছেলে ? দ্বিতীয়। না রে না তাও কি হয় দুই ভাই একবার ডাক। প্রথম। দেখিস ভাই সে তাের বৌমা হয়, তবে আমি ডাকি (নেপথ্যেরদিকে আসিয়া) ও জেলেনি ! একবার এদিকে ৫

[ ১ ]
আয়গাে} { ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া। আমি জানি তার
ভারি গুমাের বৌ-মা না বল্লে কখনই আসবে না ও বৌ-মা
এবার এদিকে আয়-গগা।
( জেলেনীর প্রবেশ)
ঐ দেখ বৌ-মা বলেছি আর অনি এসেছে, আমাকে ভাই
বড় ভাল বাসে।
জেলেনী। আঃ মরণ আর কি! পােড়া যম কি তােকে ভুলে রয়েছে,
আমি কি তাের বেটার বউ যে আমাকে বৌ-মা বলে ডাক্-
ছিস।
প্রথম। কেন তুই আমার বাবার বেটার বৌ-মানস ? সে যাহক
জেলেনি! আজ মেলা মাছ ধরেছি। এই মাছ বেচে কোন
শালা না তােকে ডাইমন কাটা মল গড়িয়ে দেয়।
জেলেনী। আজ এত ঠাটাই হচ্ছে কেন?
রাগ শঙ্করা! তাল আড়খেমটা।
যাও যাও জেনেছি নাথ আমায় যত ভালবাস।
আশা দিয়ে অধিনীরে কেবল অন্তরে হাস।
কেন আর কর ছল, সে ধনীরে দিও মল,
যার প্রেমে ঢল ঢল, হয়ে সুখো-নীরে ভাস।
পূৰ্ব জন্ম পূণ্যতরে, পড়েছি তােমার করে;
যম যদি দয়া করে, তবেই মেটে অভিলাষ।
আমাকে আর তােমার গয়না দিতে হবে না, তুমিই সুখে
থাকো।
রাজা। প্রিয়ে! ওই দেখ দুজন জেলে আছে ওদের কাছে কিছু
মাছ ভিক্ষা করি, অনেক দিন মাছ খাইনি বড় ইচ্ছা হচ্ছে।
চিন্তা। (সরােদনে স্বগত) হা নিদারুণ বিধি তাের মনে কি এই
ছিল। হায়! হায়! শেষে মহারাজাধিরাজকেও ভিক্ষা করতে
হলাে। ( প্রকাশে) মহারাজ তবে তাই করুন প্রাণটা তো
বাঁচাতে হবে?
( ৩ )

[ ১৮ }
রাজা। ওহে বাপু ধীবর ! আমরা ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর হয়েছি,
দয়া করে যদি কিছু মাছ আমাদের দেও; তা হলে আহার
করে প্রাণটা বাচাই। আর এনেক দিন আহার করিনি
বড় ইচ্ছাটাও হচ্ছে।
প্রথম। আঃ কি আমার গুরু পুত্র এলে গাে,উনি অনেক দিন মাছ
খানি, ওঁকে মাছ দেও যা-যা- মাছ পাবিনি; আমরা
সারা দিন জাল ফেলে ফেলে খুন হয়ে গােটাকত মাছ
পেয়েছি, তা ওকে দিয়ে যাও।
চিন্তা। বাছা যাথার্থই আমরা ক্ষুধিত হয়ে তােমাদের নিকটে
কিঞ্চিৎ মাছ ভিক্ষা করছি, একটা মাছ দিয়ে যদি দুটো
মহা প্রাণির প্রাণ রক্ষা কর, তা হলে ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল
করবেন।
দ্বিতীয়। ওরে মেয়ে মানুষটার কি মিষ্টি কথা দেখেছিস, দে ভাই
একটা মাছ বৈত নয় ?
প্রথম। ইঃ শালা যেন দাভাকর্ণ সেন হয়ে এল রে উনি সাউকুড়ি
করছেন একটা মাছ দে। আমি দেব না, তুই আমার কি
করবি? আমি এখান থেকে চলম। আয় গাে আয় জেলেনি
আমরা ঘর যাই।
{ জেলেনী ও জেলের প্রস্থান)
দ্বিতীয়। মহাশয় ও শালা ভারি পাজি, এই নিন, এটা মাছ নিয়ে
আপনারা আহার করুন গে। ( মৎস্য প্রদান। )
রাজা। (মৎস্য গ্রহণ পূৰ্ব্বক) আঃ বাচালে বাপু ঈশ্বর তােমার
মঙ্গল করুন।
( দ্বিতীয় জেলের প্রস্থান)
রাজা। প্রিয়ে ! এইত অনেক কষ্টে এক্টা সকুল মৎস্য পাওয়া
গেল, তবে চল ওই সবােবরের ধারে দগ্ধ করে আহার করা
যাক গে।
চিন্তা। যে আজ্ঞা চলুন। ( উভয়ের প্রস্থান)
4

( ১৯ ] তৃতীয় অঙ্ক । - বন { রাজার প্রবেশ } রাঙ্গা। (স্বগত) হা দগ্ধ শনি! তাের মনে কি এই ছিল রাজা নাশ বনবাস দিয়েও কি ক্ষান্ত হলিনি? অবশেষে আমার প্রণাধিক প্রিয়াকেও হরণ করলি? হা লােচনানন্দ দায়িনি। হা আমার হৃদয় সরোবরের পদ্মিনি! তুমি আমাকে পরি ত্যাগ করে কোথায় গেলে ? হা সৌন্দর্য্যশালিনি! হা পতি প্রাণ! তুমি সর্বদা আমাকে বলতে যে নাথ ! আমি ছয়ার ন্যায় নিয়ত তােমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ থ। এখন আমার কপাল দোষে সে সকল কথা কি সকলি মিথ্যা হলো ? বেহাগ। তাল আড়খেমটা। কোখা গেলে পরিহরি প্রেয়সি আমায় । . তব অদর্শনবাণ যেন অশনির প্রায়। না দেখে সে বিধুমুখ, বিদীর্ণ হতেছে বুক, আমার কপালে দুখ, দোষিব বল কাহায় । আহা মরি হায় হায়, গ্রিয়ে তব স্বর্ণ কায়; কোমল কমল প্রায়, অতি সুলােলিত । •কিন্তু এ বিরহণ, অতিশয় খরশান, পাষাণেতে সুনিৰ্মাণ, হয় হেন অভিপ্রায়।। হায় হায় ! আজ আমি কি কুক্ষণে কাষ্ট আহােরণ করতে গিয়েছিলেম। গৃহে প্রত্যাগত হয়ে দেখি যে আমার প্রাণ- ধিকা প্রিয়ে গৃহে অন্ধকার করে একবারে অন্তহিত হয়েছে। হায় হায় কি দুর্দৈব ! প্রত্যেক প্রতিবাসী প্রতিবাসিনীদের জিজ্ঞাসা করলেম কিন্তু কেউ বলতে পারলে না যে দেবী ২০ । ১৫ A: কোথায় গিয়েছেন। হা হরিণ নয়নে ! তুমি পূর্বে আমার বিরহ বেদনা এক মুহুর্তও সহ করতে পারতে না; এখন এত দীর্ঘকাল কিরূপে সহ করছ। হা পূর্ণেন্দুমুখি ! হা অন্যথা সম্ভাবিনি! ভােমার সেই শরদ-শশী বিনিন্দিত চন্দ্রবদন আর কি দেখতে পাবনা ? রাগিণী সুরট খাম্বাজ। তাল একতালা। কোই মম প্রাণ প্রেয়সী, কোই প্রাণ প্রেয়সী নমহদি শশী, হও হে উদয়, হৃদে মােহন সাজে। না হেরি তােমার বিধুবয়ান, যুগ-শত মনে হতেছে জ্ঞান, অবিরত হানি কুসুম বাণ, দহে প্রাণ স্মররাজে । প্রাণ প্রতিমা প্রাণের ঈশ্বর, কোথা গেলে নাথে প্রতারণা করি, বলনা কেমনে জীবন ধরি, গহন কানন মাঝে। সধামুখি ! হেরি শ্রীমুখ তােমার, পাপ দেহে প্রাণ ছিল হে আমার, এখনাে নিলাজ জীবন আর, দেহে আছে কোন কাষে ।। হা পিয়ে! কোথাগেলে ! তােমার বিমল বদন না দেখে জগত অন্ধকারময় দেখছি, সৰ্ব্বশরীর ভারময় বােধ- হচ্ছে। তা এই শিলাতলে বসে ক্ষণকাল বিশ্রামকরি। (উপ- বেসন) আঃ শ্রান্তি দুর হল বটে, কিন্তু প্রিয়তমার বিরহ অনল দেহ অভ্যন্তরে যে একবারে জ্বলে উঠলাে। হা প্রিয়ে। ( মুচ্ছ।)

[ ২১ । (লক্ষ্মীয় প্রবেশ ) লক্ষ্মী। (স্বগত) আহা! জগত সংসারে প্রেমই অমূল্যধন। বি- ধাতা যদি এ প্রেমধন সৃজন না করতেন তাহলে জগতে কি কিছু থাকতো?ভা যাই দেখি গে মহারাজ বুঝি অচেতন হয়ে রয়েছেন। ( নিকটে আগমন করিয়া) আমরি মরি ! যেন শরদ কালের পূর্ণচন্দ্র ধূলায় পড়েরয়েছে, নৃশংস শনির হৃদয়ে কি দয়ার শেষ মাত্রও নেই। আমরি মরি । বিধাতাকি এর হৃদয় মন্দিরকে অকৃত্রিম প্রেমের আবাসস্থান করে দিয়েছেন। রাজা। (নয়ন উন্মিলন পূৰ্ব্বক গাত্রোপান করিয়া) রাম রাম আমিকি এতক্ষণ স্বপে পেয়সীকে দেখছিলেম ! হা পিয়ে কোথা গেলে? লক্ষ্মী। মহারাজ ! আর বিলাপ করবেন না। আপনি যথার্থই প্রেমের মাহাত্ম্য প্রকাশ করতে অবনীতে জন্ম গ্রহণ করেছেন। রাঙ্গা। (লক্ষ্মীকে দেখিয়া সচকিতে) আসুন আসুন দেবি। বিপদের সময় যে এ দাসকে মনে পড়েছে তাতেই আমি কৃতার্থ হলেম। ( সবরাদনে) দেবি! আপনি এসেছেন ভালই হয়েছে, আপনার সম্মুখে এ পাপ দেহ পরিত্যাগ করে যাতনার এক শেষ করি। হায়! হায়! আমি কি কেবল যন্ত্রণা ভােগ করতেই এ অবনীতে জন্ম গ্রহণ করে ছিলেন ? মাত! প্রথমত রাজ্য নাশ, বনবাস, তার পরে প্রিয়া ধনেও বঞ্চিৎ হলেম। লক্ষ্মী। মহারাজ ! আপনি আর বিলাপ করবেন না অবিলম্বেই আপনার সৌভাগ্য শশীর উদয় হবে। রাজা। দেবি! আপনি যা আজ্ঞা করছেন তা আমার শিরো ধাৰ্য্য! কিন্তু প্রিয়তমার দুঃসহ বিরহ যন্ত্রণা আর সহ্ করতে পারিনে ? আজি আমি বন হতে প্রত্যাগত হয়ে দেখি যে কুটীর শূন্যময়। প্রতিবাসিদের জিজ্ঞাসা করলেন তারাও কিছু নিশ্চয় বলতে পারে না। অতএব জননি! আপনি | ২২ যদি এর কিছু জানেন, তা হলে প্রকাশ করে আমার মনের উদ্বেগ দুর করুন? লক্ষ্মী। মহারাজ! আপনি আর চিন্তা করবেন না আপনার প্রিয়- তমার কোন অমঙ্গল ঘটনা হয় নি ? রাজা। দেবি ! তবে বিশেষ করে বলুন শুনে আমার অন্তর শীতল হোক। লক্ষ্মী। আজ চিন্তা সম্মুখস্থ ভাগীরথী নদীতে স্নান করবার জন্যে গিয়ে ছিল। হঠাৎ সেখানে এক জন সাধু চিন্তার অনুপম রূপ লাবণ্যে মােহিত হয়ে বল পূৰ্ব্বক আপনার নৌকায় নিয়ে গেল। রাজা। আঁ প্রিয়াকে নিয়ে গেল ? দেবি! তার পর? লক্ষ্মী। সাধুর এরূপ অত্যাচার দেখে আমি ভালেম যে চিন্তা অতি পতিব্রতা, বিশেষতঃ আমার প্রিয়সখী, যদি সাধু দুশ্চরিত্রতা প্রকাশ করে, তা হলে তো চিন্তার পতিব্রতা ধৰ্ম্ম নষ্ট হবে। এই ভেবে আমি পবনকে আজ্ঞা দিলেম, যে সাধুর তরী জলমগ্ন করে চিন্তাকে আমার নিকটে নিয়ে যায়। পবনকে এইরূপ আদেশ দিয়ে আমি প্রস্থান করলেম। ক্ষণকাল পরে দেখি যে পবন চিন্তাকে নিয়ে আমার নিকটে এসেছে। রাজা। দেবি। তার পর কি হলো ? লক্ষ্মী। মহারাজ সেই অবধি চিন্তাকে আমি যত্ন পূৰ্ব্বক রেখেছি, যতদিন পর্যন্ত আপনার সৌভাগ্য:শশীর উদয় না হয় সে পর্যন্ত চিন্তা আমার কাছে থাকুক। রাজা আঃ বালেম এ কথাটা শুনে তবু প্রাণ শীতল হলো। কিন্তু দেবি ! এখন আমি কোথায় যাব, আর কি করব? আমাকে অনুগ্রহ করে বলে দিন। লক্ষ্মী। মহারাজ ! আপনি এখন সৌতি-পুরে যান। তথাকার অধিপতি সুবাহু রাজার কন্যে সুলক্ষণা ভদ্রাকে যদি কোন কৌশলে বিবাহ করতে পারেন, তা হলেই আপনি আশু শনির কোপ দৃষ্টি হতে মুক্ত হবেন। কিন্তু উক্ত বিবাহ

( ২৩ }
কাৰ্যে আমিও আপনার বিস্তর সাহায্য করব। এখন আমি
চল্লেম আপনার মঙ্গল হােক ।
রাজা। যে আজ্ঞা তবে অাসুন।
( লক্ষ্মীর প্রস্থান ।
রাজা। ( স্বগত) তবে সৌতিপুরেই যাই এখানে থেকে আর
ফল কি ?
( বাজার প্রস্থান ।
চতুর্থ অঙ্ক ।
সৌতিপুরস্থ উদ্যান।
{ রাজার প্রবেশ।
( স্বগত) আহা! এ উদ্যানটা কি রমণীয় রতিপতির
আবাস স্থান বল্লেই হয়। এ পুষ্প বৃক্ষ গুলি কুসুম কলি
প্রসব করে কি মনােহর শােভা সম্পাদন করছে ? বৃক্ষ গুলি
কেমন নব নব পল্লবে সুশোভিত হয়েছে। দেখলে চক্ষের পাপ
যায়। আ মরি মরি !এ সরােবরটা কি রমণীয় ? বােধ হয় স্মর
রাজ ভাবে দ্রব হয়ে সলিল ময় হয়েছেন। যাহক স্থানটা অতি
রমণীয় বটে? তবে এই স্থানে ক্ষণকাল বিশ্রাম করা যাক।
( উপবেশন) আঃ শরীর টে অতিশয় স্নিগ্ধ হলাে! যাহক
এই সৌতিপুরে তত এসে উপস্থিত হলেম, এখন কি করেই
বা সেই সুবাহু রাজনন্দিনী সুলক্ষণা ভদ্রাকে লাভ করা
যায় । ( অধােবদনে চিন্তা )
(চাপা মালিনীর প্রবেশ)
চাপা। (স্বগত) কি আশ্চর্য ! কাল দেখে গেছি সব ফুলের গাছ
গুলাে শুকিয়ে গেছে, রাতারাতি সব গজিয়ে উঠলাে
নাকি? এই যে! নব মালিক। গাছ গুলাের প্রতিপল্লবেই
ফুল ধরেছে । বা-বা বিধাতার কি আশ্চর্য সৃষ্টি কৌশল!

[ ২৪ |
(হাস্য বদনে) ওমা এই যে জুই ফুলের গাছ গুলিতে ফুল
ফুটেছে? বা ঐ যে কথায় বলে
* যখন যার কপাল ধরে।
আকাশের চাদ পায় করে ॥,,
তা বােধ করি আজ অবধি আমার কপাল ফিরলো ?
{ রাজাকে দেখিয়া ) ও মা ! এ-কে আ-মরি মরি ! কি ভুবন
মােহন রূপ যেন অকলঙ্ক পূর্ণশশীভূতলে উদয় হয়েছে।
রাগিণী সােহিনী বাহার। তাল আড়খেটা।
গগণে ত্যজি কি আজি শশী উদয় ধরায়।
অথবা কি রতি পতি ত্যজিয়ে প্রিয়ায়।
বুঝি ওই গুণধরে বিধি অনুরাগ ভরে,
গড়েছে বিরলে বসি হেন অভিপ্রায়।
হেরিলে ও মনােহরে, কাহার না মন হরে,
আমরা কি ছার রতি মােহ হয়ে যায়।
হেন মনে অভিলাষ, দাসী হয়ে বারােমাস,
নিয়ত নিযুক্ত থাকি চরণ সেবায় !
এর যদি নারী থাকে তা হলে তার তুল্য অরসিক এ জগতে
আর নেই।
তাহার জনমে ধিক শত ধিক তায়।
হেন পতি কাছ ছাড়া করে কে কোথায় ।।
কিন্তু এর বিরস বদন দেখছি, বােধ হয় যেন ভাবনা
সাগরে ডুবে আছে। তা কাছে গিয়ে কেন জিজ্ঞাসাই
করি না। ( নিকটে আগমন করিয়া প্রকাশে) এই গাছ
ভলাতে বিরস বদনে বসে আছ তুমি কে গা ?
রাজা। (সচকিতে নিরীক্ষণ করিয়া স্বগত) এ আবার কে? বােধ
করি এই নগরে নিবাসিনী হবেন ? তার আর সন্দেহ নাই।

{ ২৫ ]
( প্রকাশে) আমি প্রাগ-দেশাধিপতি, আমার নাম শ্রীবৎস ।
শনির কোপ দৃষ্টে পড়ে আমার এই দুরবস্থা হয়েছে ?
চাপ।। (স্বগত) মুখে আগুণ শনির দৃষ্টি দিতে আর লােক
পানি! ( প্রকাশে), তা এখানে বসে কেন ?
রাজা। আমি এই মাত্র এ দেশে এসেছি, সুতরাং কারো সঙ্গে আলাপ
পরিচয় নাই, কোথায় বা যাই আর কি করি, তাই গাছের
শীতল ছায়াতে বসে সেই ভাবনাই আছি। তুমি
কে গা ?
পা। আমি এই রাজবাড়ীর মালিনী আমার নাম চাপ। রাজ
বাড়ীতে ফুলের যােগান দিয়ে থাকি। রাজা ও রাণী যথেষ্ট
বাসেন। তা তুমি এ দেশে কি মনে করে
এসেছ ?
রাজা। কোন লোকের মুখে তােমাদের রাজকন্যা ভদ্রার অলো-
কিক রূপের কথা শুনে আমি এসেছি।
চাপা। (স্বগত) হু" এর এরূপ অবস্থা দেখলে তো রাজা তখনি
তার মেয়ের বিয়ে দেবেন। (প্রকাশে) ভাই! সে সামান্য কন্যা
নয় বোধ হয় কোন সুর-কন্যা শাপ ভ্ৰষ্টা হয়ে পৃথিবীতে
জন্মেছে। তা এ অবস্থায় রাজ কন্যার তোমাকে মনে ধরবে
কেন ?
রাজা। হা আমার অবস্থাটা এখন বড় মন্দ বটে। ভাল একটা কথা
জিজ্ঞাসা করি, রাজ কন্যা কি এতই রূপবতী ?
চাপা। সে রূপের কথা কেন জিজ্ঞাসা কর ত্রিলােকে তার রূপের
তুলনা নেই।
রাজা। আচ্ছা বল দেখি রাজ কন্য। তিনি কেমন?
চাপ।
রাগিণী আলেয়া। তাল ঝাপতাল ।
যুবরাজ পায় আজ তার রূপে 'দামিনী।
তুলনা তুলােনা আর যেন কাম কামিনী।
( ৪ )

[ ২৬ }
বিমল মুখ শোভা, যোগী-জন মনলোভা,
নয়ন রঞ্জন অতি যিনি হরিণী।
পীন পরােধর তায়, কমলকলি তায়,
হৃদী সরােবরে সাজে, মুনিমন হারিণী
সুবৰ্ণ বরণী ধনী, রমণীর শিরােমণি,
বিষাদে মলিন মণি, দিন যামিনী ।
শ্রীমুখে মধুর হাসি, যেন কত সুধারাশি,
পুরুষ কি ছার হেরি মােহ যায় কামিনী।
চাপ। তা তার রূপের কথা, 'কেন জিজ্ঞাসা কর, তেমন রূপ কি
ত্রিলোকে আছে? তা সে যাহক ভাই, এখনো তােমার
বাসার স্থির হয়নি, যদি অধিনীকে দুখিনী বলে অছে।
কর তাহলে আমার বড়ীতে তােমাকে বাসা দিতে
পারি ।
রাজা। (স্বগত) মন্দও নয় এর বাড়ীতে থাকলে আমার সকল
বিষয়ে সুবিধে হতে পারবে। কিন্তু মেয়ে মানুষটোর চরি-
এটা ভাল বােধ হচ্ছে না ! কি জানি এটা অনর্থ ঘটালেও
ঘটাতে পারে? তবে আগে থাকতে একটা গুরুতর সুষদ
পাতান যাক, সেই ভাল। ( প্রকাশে) আমি বিশেষ রূপে
বিবেচনা করে দেখলেম, যে আমার এই দুরবস্থা, আর এই
বিদেশ, তুমি স্নেহ পরবশ হয়ে আজ আমার মার মত কর্ম
করলে, সুতরাং এর বেশি আর কি উপকার হতে
পারে? তা আজ অবধি তুমি আমার মার মত মাসী
হলে।
চপ। (হাস্য মুখে) এ দুখিনীকে অনুগ্রহ করে যা বল। তা
বাহা চলে। বাড়ীতে চল বেলাটা ঢের হয়েছে, এখন খাব।
দাবার উদ্যোগ করে দিই গে!
ধাজ। হা মাসি চলে।
{ উভয়ের প্রস্থান)

[ ২৭ ]
রাজাপুরস্থ উদ্যান।
( ভার প্রবেশ )
রাগিণী ভৈরবী বাহার। তাল যৎ }
ফুটিলকুসুম উপবনে।
পুরিল নবীন ভাব ভুবনে।
সাজিল ধরণী যেন পুন যৌবনে।
সুখ সরােবরে, সুখ সরোবরে,
পদিনী বিহরে, অলিচয় চুম্বিত অধরে,
যেন সকল শশী অম্বরে,
কাহার না মন মোহে সেই শােভনে ।
সুখ মধুমাসে, সুখ মধুমাসে,
বসন্ত প্রকাশে; ফুলচয় কলিকা বিকাশে,
প্রিয় প্রিয়া রত সুখ বিলাসে,
তবে কেন দহে মম মন মদনে ।
( স্বগত) সকলেই বলে থাকে যে সুমধুর বসন্তকাল সততই
নয়ন মনের আনন্দ বর্ধন করে ? কিন্তু কই আমার অক্ষে
তে বিষ সদৃশ বােধ হচ্ছে। (ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া) ।
হতে পারে, সে দিন স্বপ্নে সেই যুবরাজকে দেখে একেবারে
তার ভুবন মােহন রূপের পক্ষপাতিনী হয়ে পড়েছি ? দেখ
দেখি কি আশ্চর্য্য! সে যুবরাজই বা কোথা-মধুর বসন্ত।
কালই বা কোথা-রতি পতি মদনই বা কোথা! কিন্তু
আমি কিছুই জাতে পাচ্ছিনে যে কে আমার প্রাণ মন
দহন করছে? তা ক্ষণকাল এই বৃক্ষের ছায়াতে বসে
বায়ু সেবন করি, তাতেও যদি একটুভাল থাকি। (উপবেশন,
(হেম লতার প্রবেশ ।
হেম। (স্বগত) তাই তো বেলাটা প্রায় একেবারে গেল কিন্তু

[ ২৮ )
রাজনন্দিনীকে তো দেখতে পাচ্ছিলে! এ বাগান ও বাগান
খুজম কোথাও দেখতে পেলুম না। দুর হােক চাই আর
পারি ও না? তাঁদের কি ঔার। রাজার মেয়ে হয় তো
কোথায় বসে গল্প করছেন। ( রাজনন্দিনিকে দেখিয়া )
এই যে রাজনন্দিনী এখানে বসে এক মনে কি আছেন।
(নিকটে আগমন করিরা) রাজনন্দিনি! উদ্যানে এসেছে তা
বলে আসূঙে হয় ? তােমাকে খুঁজে খুঁজে মম ! (উপবেশন)
ভদ্রা। কেন সখি! আসবার সময় তাে বলে এলে যে আমি
প্রমােদোদ্যানে যাচ্ছি, তবে বুঝি তুমি শুনতে পাওনি?
হেম। তা হতে পারে! আমি তখন সুলোচনার সঙ্গে কথা কচ্ছি,
বােধ হয় তাতেই শুনতে পাইনি? তা যাহক সখি ! তােমা-
কে এত ভাবান্তর দেখছি কেন ? আজ ক দিন অবধি যেন
একেবারে ভাবনা সাগরে ডুবে আছ, কেন বল দেখি?
(ভদ্রাকে অধােবদন দেখিয়া) সখি! আমি তখনি মনে মনে
করে ছিলেম যে তােমার মনের ভাব আমাকে বলবে না?
ভদ্রা। কেন সাখ! বলব না কেন? আমার মনের ভাব যদি
তােমাকে বলব না ভবে বলব কাকে ? তােমা বই আমার
দুখের দুঃখি আর কে আছে?
হেম। রাজ নন্দিনি ! তবে বলো, মন দুঃখ সখী জনের নিকটে বলে
দুখের অনেক লাঘব হয় ?
ভদ্রা। সখি তবে বলি, সে দিন যামিনীতে এক জন যুবরাজকে স্বপ্নে
দেখেছি।
(হম। তাতে কি ?
দ্রা।
রাগিণী পিলু। তাল যৎ।
শয়নে স্বপনে সখি সে ভুবন-মােহনে।
হেরিয়ে হয়েছি দাসী সে যুগল চরণে।।
নলিনী সূৰ্য্যের পক্ষপাতিনী এ ভুবনে।
আমিও সেরূপ সখি নিৱখিয়ে সে জনে

পুড়িছে অন্তর মম সে রতন বিহনে।
দেখাবার হলে সখি দেখাতেম যতনে ।।
বিকশিলে কমলিনী দিনকর কিরণে।
মুদিত করিতে তারে কে পারে গো কেমনে।
সখি! স্বপ্নে সেই ভুবন মােহনকে দেখে কুলে শিলে একে-
বারে জলাঞ্জলি দিয়ে বসেছি।
হেম। সখি! এ যে আশ্চর্য কথা, স্বপন দেখে এমন ব্যাকুল হলে
চবে কেন, ভাল তাকে চিনতে পেরেছ? তার নামই বা কি,
আর নিসই বা কোথা ?
ভদ্রা। না সখি! তাঁর নাম ধাম কিছুই জানি না, কেবল তাঁর ভুবন
মােহন রূপ প্রেম তুলিতে এই হৃদয় চিত্র পটে চিত্রকরে
রেখেছি; কিন্তু দেখলে চিন্‌তে পারি।
হেম। সখি! তাকে দেখলে চিনতে পারবে, কিন্তু তাঁর দেখা পাবে
কোথা ?
ভদ্রা। সখি! সেই ভাতেই তো সারা হলেম।
(চিত্র পট হন্তে লক্ষ্মীর চিত্রকরী বেশে প্রবেশ
চিত্র। কৈ গাে রাজনন্দিনি কোথায় গা ? (দেখিয়া) এই যে বসে
আছেন । ( নিকটে আগমন।
হেম। তুমি কে গা ?
চিত্র। আমি চিত্রকরী, আমার নিবাস প্ৰাগ দেশে ।
হেম। এখানে কি মনে করে ?
চিত্র। একখানি অপুৰ্ব্ব চিত্র পট এনেছি রাজ কন্যা যদি নেন,
তা হলে বিক্রয় করি।
ভদ্রা। চিত্ৰকরি ! দেখি কি অপুর্ব পট এনেছ ভাল যদি হয়
তা হলে নেব না কেন?
চিত্র। আচ্ছ। তবে দেখাই।(চিত্রপট বাহির করিয়া ভার হস্তে অৰ্পণ)
ভদ্র।। ( চিত্রপট দর্শন করিয়া) চিত্রকরি! এ চিত্রপট তুমি পেলে
কোথা ? আর এ যুবরাজের নামই বা কি আমাকে সক্তি
করে বলো ?

[ ৩ ] চিত্র । রাজনন্দিনি । ইনি প্রাগ-দেশের অধিপতি এর নাম শ্রীবৎস। দ্রা। বটে, ( হেমলতার প্রতি) সখি হেমলতা! দেখ দেখি কি ভুবন মােহন রূপ এমন রূপ তাে কোথাও দেখিনি। ( চিত্র করির প্রস্থান) রাগিণী সিন্ধভৈরবী। তাল মধ্যমান। এই সেই নগর রতন। স্বপনে যামিনী যােগে করি যারে দরশন। ভুবনমােহন সাজে, বসি মম হৃদিমাজে, শ্রীমুখে মধুর হাসি, হরিল গো মন। মম মন চাতকিনী, হয়েছে এর প্ৰেমাধিনী, কেমনে বল সঙ্গিণী, হই বিস্মরণ। লভিবারে এ রতনে, স্বজনি গো প্রাণপনে, যত্ন করিব যতনে, যাবত জীবন। সখি ইনিই সেই আমার চিত্ত চোর, স্বপনে এর মােহন মুর্তি দেখে একেবারে প্রেমাধিনী হয়ে পড়েছি। (চিত্রপট বক্ষ- স্থলে ধারণ পূৰ্ব্বক) রাগিণী সােহিনী। তাল মধ্যমান। কেন সখি যুড়ায় না জীবন। এই যে গাে প্রিয় বরে হৃদে করেছি ধারণ । প্রিয়রর দরশনে, সুখােদয় হয় মনে, তবে বিরহ দহনে, কেন দহে মন । কি করি উপায় বল, জ্বলিল গাে প্রেমানল, কেমনে হব শীতল, না হলে মিলন ।

{ ৩১ ।
সখি ! এ যে আরো দিগুণ আগুণ জ্বলে উঠলো ?.কি করব
সখি! কেনই বা চিত্র পট দেখুঁলেম তা না হলে তো এত
যন্ত্রণা হতাে না ?
হেম। সখি! তুমি বেগবতী নদীর মত হয়ে কেন এমন পঙ্কিল
হচ্ছ ? কি আশ্চর্য! এই যুবরাজকে একবার স্বপ্নে আর এই
মাত্র চিত্র পটে দেখলে বৈত নয়? তা এতই অধৈর্য হচ্ছ
কেন ? প্রণয়ের বস্তু যে এত শীঘ্র প্রিয়তর হবে তা আমি
স্বপ্নে ও জাতেম না ?
ভদ্র। সখি! এই স্মররাজ সদৃশ যুবরাজ যেন কত কাল আমার
হৃদয় মন্দীরে ছিলেন। দর্শন মাত্রেই যেন প্রিয়তম বলে
চিতে পারলেম। সখি ! অধিক কি বব জনক জননী
যাদের পর স্নেহের সামগ্রী এ জগতে আর নেই, আর তোমরা
আমার প্রিয় সখি সব্বদা তােমাদের সঙ্গে একত্র শয়ম, একত্র
ভােজন করছি। কিন্তু এই যুবরাজকে দেখে সকলের অপেক্ষা
প্রিয়তর বােধ হচ্ছে। কিন্তু সখি। নিরমল প্রেম যে এত কঠিন
পদার্থ তা আমি আগে জানতেম না।
হেম। সখি! প্রমের দোষ কি ? দুর্নিবার মদনি তােমাকে
যাতনা দিচ্ছে। তা সখি ! একটু সুস্থির হও, আমি গােটা
কত ফুল তুলে আনিগে কুসুমের সুশীতল সৌগন্ধে তবু একটু
শীতল হবে এখন।
ভদ্রা। মানা সখি! অমন কর্ম করাে না ?
রাগিণী ভৈরবী। তাল আড়াঠেকা।
তুলনা কুসুম সখি, ধরি তব দুটি পায় ।
কামিনী আর কুসুম পেতে শুকায়ে যায় ।
তুলি কুসুম নিকরে, দেবে সখি মম করে,
একর উত্তাপে আশু হইবে মলিন প্রায়।
যদি গুণময় বিধি, মিলাইয়ে দেয় নিধি,
তখন কুসুম হার, গাখিয়ে দিও গলায়।

তা যাহক সখি! আমি আর কোন মতেই সুস্থির হতে
পাচ্ছিনে। আমার মন অতিশয় ব্যাকুল হয়ে উঠলো। কি
হবে সখি! এই প্রমােদবনে শান্তিলাভ করতে এসে আজ
আমার বিপরিত ঘটল।
হেম। (হা মুখে) সে কি সখি! এই মনােহর প্রমােদোদ্যানে
অন্তর শীতল কারিণী উষাদেবী,ভুবন মােহিনী সাজে সুসজ্জিত
হয়েছেন। পুষ্পবৃক্ষ সকল কুসুম কলিকা প্রসব করেছে-
মন্দ মন্দ সমীরণ বহন হচ্ছে-বিহঙ্গের সুমধুর স্বরে গান
করছে- এমন স্থলে যদি তােমার অন্তর শীতল হবে না,
ভবে হবে কোথা ?
ভদ্রা। সখি বিরহিনীদের এই সকল তো কালের স্বরূপ ।
রাগিণী ভৈরবী। তাল মধ্যমান।
এতে যুড়ায় কি সই কামিনী, কামিনী ।
দহিছে বিরহ বিষে দিন যামিনী।
কোকিলের কুহুস্বর, যেন গো বিষাক্ত শর,
প্রফুল্ল ফুল নিকর, যেন সাপিনী
উষাদেবী সুপিনী, বটে গো প্রাণ-সঙ্গিণী,
কিন্তু মম পক্ষে যেন, প্রাণ নাশিনী ।
হেম! সখি! তুমি অবােধ বালিকার ন্যায় যে একেবারে অধৰ্য্য
হয়ে উঠলে? ছি ছি সখি! লােকে শুনলেই বা বলবে কি ?
আর বলবেই বা কি? বলবে যে রাজনন্দিনী অনুঢ়াবস্থাতেই
স্বেচ্ছাচারিণী হয়েছে।
ভদ্রা। সখি! এ যে তুমিই বালিকার ন্যায় কথা কচ্ছে।
হেম। কেন সখি! আমি বালিকার ন্যায় কথা কইলেম কেমন কয়ে?
ভদ্রা। ভাই এত তুমি জান যে “মেজে ঘসে রূপ আর ধরে বেঁধে
প্রণয়, কখনই হয় না।
হেম। হা তাতো জানি।

{ ও ৩
রাগিণী যােগিয়া । তাল অাড়াঠেক।
লােকের কথায় কি গো ত্যজিব প্রেম-রত ।
রাখিব হৃদয় মাঝে করিয়ে অতি যতন।
আগে প্রেমময় হলে, কত লােকে কত বলে,
ভুলিলে সে সব ছলে, হয় কি প্রেম সাধন।
লােকের গঞ্জনে ভয়, করিলে কি প্রেম হয়,
প্রেমের প্রেমিক চয়, ভুলে না তায় কখন ।
তা সখি ! সে যুবরাজুকে আমি কখনই ভুলতে পারব না ?
হেম। সখি!
সে তো পরের কথা, এখন চলাে অন্তপুরে যাওয়া
যাক, বেলাটা একেবারে গেল।
উজ।। হা সখি ! যাই চলে। (গমন করিতে করিতে) সখি?
সেই যুবরাজ ব্যতিত কোন মতেই শান্ত হতে পারব না ? তা
তুমি আমার প্রিয় সখি! যা ভাল হয় তাই করে ? আর
অধিক কি বলব?
হেম। রাজ নন্দিনি ধৈৰ্য্য না হলে কি হবে বলো, চেষ্টা করে তো
দেতে হবে !
উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক।
ভদ্রার শয়ন মীর।
{ ভদ্রার প্রবেশ }
ভদ্রা। (স্বত) সেই অজ্ঞাত কুল শীল যুবরাজের প্রেমাভিলাষিণী
হয়ে কি কুকর্মই করলেম! না মাতা পিতার অনুবােধ

{ ৩৪ ] বলেম-মা গুরু জনের ভয় করলেম-অনায়াসেই এক জন অপরিচিত যুবার প্রেম পাশে বন্ধ হলেন। ঐ যে বলে যে মেয়ে মানুষের হিতাহিত বিবেচনা কিছুই নাই, তা সত্তি। তা আর ভাবলেই বা কি হবে ? যা হয়ে গেছে তার আর চারা নাই। কিন্তু তাও বলি, যখন তঁাকে মনে মনে বরণ করেছি তখন তিনিই আমার পতি যত দিনে পাই। সে যাহক চিত্র করী পট খানা হাতে দিয়ে কি পাখী হয়ে উড়ে গে ? কি আশ্চর্য! আর তাকে একবারও দেখতে পেলে না ? ( চিত্রকরীর প্রবেশ । চিত্র। রাজনন্দিনি ! ভদ্রা। ( চিত্রকরীকে দেখিয়া চিত্রকর এস এস, আমি এই মাত্র তোমার নাম কচ্ছিলুম, অনেক দিন বাঁচবে ভাই। চিত্র। রাজনন্দিনি! আমি ক দিন এসে এসে ফিরে যাচ্ছি। ভদ্রা। কেন ফিরে যাচ্ছ কেন? চিত্র। তুমি হচ্ছ রাজার মেয়ে, সৰ্ব্বদা সখীগণ আবৃত থাক, বিরল না পেলে তত সকল কথা বলা হয় না ? ভদ্রা। হা তাও বটে, কিন্তু আজ তাই বেশ সময় এসেছ, তা কি বলবে বলনা? চিত্র। না এমন কিছু নয় বলি চিত্রপট খান নেওয়া হবে, না ফিরিয়ে দেবে তাই বলছি ? ভদ্র।। কেন নেবনা কেন ? চিত্র। না তাই বলছি- ভদ্রা। ভাল একটা কথা জিজ্ঞাসা করি তার সঙ্গে দেখা হবার কোন উপায় নেই ? ও মা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কি করবে ? ভদ্র। কেন জীবন যৌবন সমর্পণ করে তাঁর চরণে দাসী হয়ে থাকব ? চি। না ভাই তােমার কথা শুনে আমার ভয় হচ্ছে তাঁকে আমি কেমন করে দেখাৰ ? ভদ্র। চিত্ৰকরি। কোন উপায়ে যদি দেখাতে পারে তা হলে চিত্র।

অমিকে বিনা মুলে কিনে রাখ। অধিক কি বল যেদিন চিত্রপটে তাঁকে দেখেছি সেই দিন অধি জীবন যৌবন সমু- দয় সমর্পণ করেছি। ৰাগিণী ভৈরবী। তাল আড়খেমটা। বিচিত্র এ চিত্র যদি দেখলে আমায়। তবে তার মিলনের বল দেখি সদুপায় । কি কহিব চিত্রকরি, কেমনে ধব ধরি, উহু উহু মরি মরি, বিনে রসরায়। নবিনে জানিনে, হবে দয়ি সে বিনে, ছি ছি মজে পোড়া প্রেমদায় }। চিত্ৰকরি। তুমি কি আমাকে অনবরতই বিরহ দহনে দহন করবে বলে কি চিত্র পট এনেছিলে ? হা দগ্ধ বিধাত। চির- কালটাই কি আমার দুখে যাবে ? “ সুখ ,, এই দুটি অক্ষর কি আমার অদৃষ্টে লেখ নাই ? চিত্র। রাজমন্দিনি । তােমার যদি এতই উদ্বেগ হয়ে থাকে তা হলে তোমাকে আর কষ্ট দেওয়া উচিত হয় না। আমি এই মাত্র রাজ সভায় শুনে এলেম, যে মহারাজ সয়ম্বরে উদ্যোগ করছেন। আর প্রায় যাৰদীয় ভূপালগণকেও পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। তােমাকে অতি শীঘ্রই সয়ম্বর হতে হবে। কিন্তু তাই আমি বলে রাখছি, সেই সয়ম্বরের দিন ছদ্মবেশে তােমায় মনচোর সেই ডালিম গাছের তলায় বসে থাকবেন। তুমি সয়ম্বরা হতে এসে তার গ মাল্য দিয়ে তার সহ- ধর্মিণী হবে। এই হলেই তো ভদ্ৰ।। । এ হলে হতে পারে। কিন্তু ভাই তঁাকে একবার দেখতে হবে, যদি সে সময় আমার ভ্রম উপস্থিত হয় ? চিত্র। হাঁ তাও বটে! তবে এক কর্ম কোরো, তােমাদের মালিনীর বাটীতে তিনি বাসা করে আছেন, তা মালিনীকে বলে কোন কৌশলে তাঁকে দেখো, আমি এখন চম। { চিত্ৰকৰীর প্রস্থান জ

| ৩৬ }
ভদ্র। (স্বগত) কি মালিনীর বড়ীতে আছেন ? জাগে এটা জানতে
পারলে কি এত যাতনা সইতে হতো ? ত। আগে এক
কেমন করেই বা জান্ধ ? দেখ দেখি বিধাতার কি আশ্চর্য
ঘটনা! কোথাকার জল কোথা এনে মিলিয়ে দিলেন। তা
যাই এখন মালিনীকে ডাকাই গে ।
( ভদ্রার প্রস্থান ।
ষষ্ঠ অঙ্ক ।
রাজ সা ।
{ সুবহু রাজা ও মন্ত্রীর প্রবেশ }
রাজা। মন্ত্রি ! সকল রাজাকে পত্র লেখা হয়েছে তো ? আর
কারেও লিখতে বাকি নাই ?
মন্ত্রী। আজ্ঞা না মহারাজ! সকলকেই লেখা হয়েছে।
রাজা। তবে বােধ করি নিকটস্থ প্রদেশের রাজা ও রাজপুত্রগণের
আজ এলেও আসতে পারেন, অতএব তুমি সত্বর হয়ে কাজ
বাটা সুসজ্জিত করে ফেল। আর রাজাগণের অভ্যর্থনা জন্য
যেন পাঁচ সহস্র পদাতিক সৈন্য সুসতি খাকে ?
মন্ত্রী। যে আজ মহারাজ!
( একজন প্রতিহারির প্রবেশ }
প্রতি। মহরাজ কি জুয়! মহারাজ ! হরকরা আকে আবি খবর
দিয়া, যো হস্তিকা রাজা, রণবীর সিংহ, আউর উদয়
পুরকা রাজা, সিংহ আপকে রাজমে পৌছায়কে,
‘কেলি কানন মে,, আপকো ওয়াস্থে ঠেড়া হৈ।
রাজ। আচ্ছা! তােম সিপাহি লােককে তৈয়ারি হােনে কহে,
হাম যাত। হৈ।
প্রতি! যে হুকুম, মহারক্তি ।
( ঐতিহাবির প্রস্থান )

( ৩৭ ) } মন্ত্রি। তবে আর বিলম্ব করা হয় না চল এখনি যেতে হবে ? । যে আজ্ঞা মহারাজ চলুন। ( উভয়ের প্রস্থান ভদ্রার শয়ন মন্দীর। ( হেমলতা ও উদ্রার প্রবেশ । । প্রিয় সখি ! জীবিত নাথের বিরহ অনল, অন্তরে একেবারে প্রবল হয়ে উঠলো। বোধ হচ্ছে তার মিলন রূপ সুশীতল জল ব্যতিত কোন মতেই নিৰ্ব্বাণ হবে না। সখি! দগ্ধ মদ- নের কুসুম-বাণ কি কেবল অবলার প্রাণ নিধন করবার জনে। সৃজন হয়েছিল। (সরোদনে) হায় হায় সখি ! প্রণয় পরবশ হয়ে যে এত যাতনা ভােগ করতে হবে, তা আমি মনের কোনেও স্থান দিইনি। দেখ সখি! দাবানলে বন দহন হলে সকলেই দেখে থাকে, কিন্তু প্রেমানলে অন্তর দহন হলে কেউ দেখতে পায় না। কিন্তু দেখাবারে। যাে নেই, যে থাকলে আমি তােমাকে এখনি দেখাতেম। হেম। রাজননিনি। এত ব্যাকুল হচ্ছ কেন? এরূপ তো প্রায় অনেকেরি হয়ে থাকে শুধু তােমা বলে নয়? তা তুমি যদি বলো তা হলে মহারাজ 'আর রাজমহিষীকে জানাই। তদ্র। না না সখি ! অমন কৰ্ম্ম কােেনা? কেন সখি ! তাতে দোষ কি ? ভদ্রা ! সখি ! ইনি যে প্রাগ-দেশাধিপতি মহারাজ শ্রীবৎস, এ কোন মতেই তাদের বিস্বাস হবে না। সুতরাং সে আশা আমার দুরাশা মাত্র। হেম। তবে সখি! তােমার যে মনোরথ পূর্ণ হয় এমন তাে বােধ হয় না ? আর লুকিয়ে তো এ কৰ্ম্ম হতে পারে না? বিশে- যত মহারাজ সয়ম্বরের সমুদয় উদ্যোগ করেছেন, কাল তােমাকে সয়ম্বর হতে হবে। ভদ্রা। সখি ! সেই জান্নাতেই তো সারা হলেন ! { মালিনীর প্রবেশ চাপা ; কৈ গাে মাতিন ঠাকুন কোথায় গা ? (দেখিয়) এই যে

| ৩৮ }
ইস্ অাজ যে মুখ খানা এত ভারি ভারি দেছি ? কাল সয়ম্বর।
হবে বলে কি এই তারি হতে হয় গা ? ( উপবেশন পুৰ্ব্বক)
মনের মতম পতি পেতে তুমিই পাবে, আমাকে তাে তার
আর যা দেবে না ? তা এত মুখ ভারা ভারিতে কাষ কি
ভাই। এই নেও মালা মেও অমি এখন চলুম।
আজ যে আইয়ের বড় গুমর দেখছি, সময় পেয়েছিস
বুঝি ?
**প। সময় আর কি ভাই! সেই মাস মাইনে বই আর তো উপড়
হন্ত করবে না ?
দ্ৰ।। না না অই আমার মনােরথ পূর্ণ করতে পারলে
খুব খুশি করব।
চাপ। আমাকে তো খুসি করবে, কিন্তু সেই ভাল মানূষের ছেলেকে
তত আশা ভরসা দিয়ে রাখলেম, তার উপায় কি করলে ?
তুতি তে। কাল সয়ম্বর হতে চলে, মনের মত পতি পেয়ে
প্রেম সােহগে গলে যাবে, ফিরে দেখা হলে আর কি তার
দিকে ফিরে চাইবে? কিন্তু তাই আমি বলে খালাস, তুমি
সয়ম্বর। হও আর যাই হও, সে তােমাকে কখনই
চূড়াবেন?
ভ। মর মাগি ! তিনি আমাকে ছাড়ুন অার না ছাড়ুন তুই
তাকে ছাড়লে বাঁচি।
“তাহার রূপের ফঁদে পড়িয়াছ ভাই।
অভাবে পেয়েছ ভাল নাতিন জামাই,,
তা তুমি তাকে ভুলতে পার কইহেমলতার প্রতি সখি !
বড় বয়েসে আইয়ের আমার যৌবন ফিরে এসেছে।
পা। অবাক করলে না? জীবন যৌবন গেলে কি আবার ফিরে
থাকে গা ?
ভদ্র।। তা যাহক আই, সে ভবন মােহন রূপ কি এ প্রাণ থাকতে
আর ভাতে প? যে দিন ছাত্ থেকে, তাঁকে দেখেছি,
সেই দিন অবধি র চরণে এ জীবন যৌবন সমুদয় সমর্পণ

( ৩৯ ] করেছি। কিন্তু আইফত দিনে ওঁকে পাইনে কেন তিনিই আমার পতি। রাগিণী ললিত। তাল অাড়াঠেক।। যেমন মােহন ৰূপ ভুলিবাে কি আর। সপেছি যৌবন চরণে তাহার । - সেই মম বমিতি, সেই প্রাণ প্রিয়পতি, প্রাণের অধির। যুকুমুদিনী আমি, তিনি কুমুদিনী আমি, ভাবি অনিবার। চপি। ওই ওকেই বলে মন ভুলােনা কথা, এখন ঐ কথা বই আর কি বলবে ভাই! আগে তাে সয়ম্বরা হও, তার পর সময় থাকে তো তাকে বিয়ে করবে । হু “ মন বােঝে না তীর্থ করি, মিছে কাজে ঘুরে মরি। তবে এখন যাই আপনার দুধের ধান্ধা দেখি গে এখানে থেকেই বা কি হবে? ভদ্রা। আই অমিতে। এখনো সয়ম্বরা হইনি, তবে তুমি এত অত- বুসা হচ্ছ কেন? তুমি তাকে গে বল, কাল সকাল সকাল তিনি এসে যেন সেই ডালিম গাছের তলায় বসেন। তা হলে আমার যা মনে আছে তা করব। চাপ। হেমলতা শুনলি তো, এই রাজ-পুয়ী-চতুর্দিকে চৌকি পাহারা- সে ভাল মানুষের ছেলে এখানে আসবে, তাঁকে প্রেম পাশে বদ্ধ করবার বলে-হাতে দড়ি বেঁধে কারাগারে বন্ধ করবেন। না ভাই তােমার অমন সােহাগে কাজ নেই, সে ঘরের ছেলে হয়ে যাক। ভা। সে কি আই এত ভয় কেন,? তুই এমন সুতুরা এই একটা সামান্য বিষয়ে ভয় পেলি? চাপা। আর তা বই কি ভাই কার ঘাড়ে দুটো মাথা যে এমন কৰ্ম্ম কৰে। না না আই ভয় কি ? কাল তুই তঁাকে সঙ্গে করে '

{ ৪০ }
রাসায় আসিস। দেখিস ! ভুলিনে আমার
মাথা খাস।
চাপ। অঃ মাথার দিব্বি দেও কেন ভাই, তাকে নিয়ে আসব, যা
আমার অদৃষ্টে আছে তাই হবে; তবে এখন আমি চল্লেম।
( মালিনীর প্রস্থান)
ভদ্র। সখি! মাগী দেখছি ভয় পেয়েছে, যদি সঙ্গে করে আনতে
না পারে তবেই তো সব নষ্ট হবে। তবে চলো আমি তােমাকে
একখানি পত্র লিখে দিই গে, তুমিই হয় একবার যাও।
হেম। আচ্ছা রাজনন্দিনি তবে চল।
উভয়ের প্রস্থান )
রাজপথ ।
( মালিনী ও বিনােদিনীর প্রবেশ )
বিনে। { মালিনীর দ্রুতগতি দেখিয়া ) ও মালিনি দিদি ! আজ যে
এত তাড়া তাড়ি যাচ্ছিস গ ? রাজ বাড়ীতে চাকরি করলে
কি এমনি হতে হয় গা ?
মালি! { পশ্চাৎ অবলােকন করিয়া কে ও বিনোদিন ! আমনে
চলে যাচ্ছিলুম ভাই, তাই শুনতে পাইনি, তা ভাই কিছু
মনে করে না ?
বিনে।। না ভাই তা নয় বলি তুমি এখন কি রাজ বাড়ী থেকে
আছ ?
মালি। হা ভাই রাজ বাড়ী থেকে আসছি ?
বিনো। মালিনি দিদি ! রাজ কন্যের সয়ম্বয়ার কথা কি শুমে
এসে বল দেখি?
মালি। না ভাই! রাজ বাড়ীর কথায় কাষ নেই-কেউ যদি শুনতে
পায় তা হলে এখনি আটখানা করে লাগাবে এখন?
বিনো। (চতুর্দিা অবলােকন করিয়া) কৈ এখানে তো কেউ নেই
তবে বলনা শােনা যাক ? শেটা কি হলো ?
মালি। আর আমার মাথা হলো সে দিন সয়ম্বর সভাতে ভদ্রা তত
রাজার অপমান করে গ্রীবংসয় গলায় এর মাল্য দিলে।

[ ৪১ ] বিননা। আঁ সকলেই উঠে গেল ? মালি। আর যাবেনা ভাই! নেমন্তন্ন কোরে এনে এত অপমান করলে কে সইবে ? বিনাে? আচ্ছা ভাই শ্রীবৎস সেটি কে? মালি।( জনান্তিকে) তিনি প্রাগ-দেশের রাজা, এখানে ছদ্ম বেশে এসেছেন। বিননা! ! তার পর রাজা কি বলেন? মালি। রাজা আর কি বলবেন, রেগে একেবারে আগুণ হয়ে উঠ লেন, মেয়েটাকে কতগুলো তিরােস্কার করলেন। শেষে জমা দারকে ডেকে শ্রীবৎসর হাতে দড়ি বেঁধে, কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন। বিননা। আঁন কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন? মালি। ভাই মেয়েটার যে কান্না দেখে বুক ফেটে যেতে লাগ্ল, তাও বলি তেমন রূপত ভাই কোথাও দেখিনি, সাধ করে কি ভদ্রার মন ভুলেছিল। বিনে। তাইতো ভাই কথাটা শুনে বড় দুখ হলো। মালি। তবে ভাই চলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর গােলমালে কায় নেই, কেউ যদি শুনতে পায় তাহলে সৰ্ব্বনাশ হবে। ৰিনো। আচ্ছা ভাই তবে চলাে ! ( উভয়ের প্রস্থান) রাজ-সভা। ( রাজা ও মন্ত্রীর প্রবেশ) রাজা। মন্ত্রি। ভাগ্যে তাকে মনে পাঠিয়ে দেওয়া যায়নি, তা হলে এটা মহা বিভ্রাট উপস্থিত হতো। কারা রুদ্ধ করে বুদ্ধের কার্য করা গিয়েছিল। কিন্তু তাও বলি বিশেষ পরিচয় না পেলে কেমন করে জানা যাবে, যে ইনিই প্রাগ-দেশাধি- পতি মহারাজ শ্রীবৎস। মন্ত্রী। কেন মহারাজ! পুৰ্ব্বে মালিনীও তো বলেছিল, যে ইনি প্রাপ্ত দেশের অধিপতি। ( ৬ ) t [ ২ ] রাজা। হাঁ বলে ছিল বটে, কিন্তু তার কথায় তখন এত বিশ্বাস হয়নি। মন্ত্রী। হঠাৎ মহারাজের এত বিশ্বাস কিসে হলো ? রাজা। মন্ত্রি! আমার ভাগ্যের কথা আর কি বলব গত রাত্রে লক্ষ্মী দেবী স্বয়ং আগমন করে তাঁর পরিচয় দিয়ে গেছেন। এতে বােধ হচ্ছে যে তিনি লক্ষ্মী দেবীর স্নেহের বিশেষ পাত্র । মন্ত্রী। এ বলেন কি মহারাজ! তবে তো আমাদের সৌভাগ্যের আর সীমা নাই। রাজা। মন্ত্রি! তুমি এক কর্ম কর সত্বরে কারাগারে যাও, গিয়ে সন্মা- নের সহিত মহারাজকে সঙ্গে করে এখানে নিয়ে এস। মন্ত্রি। যে আজ্ঞা মহারাজ আমি এখনি চল্লেম। ( মন্ত্রীর প্রস্থান) রাজা। (স্বগত) ভাগ্যে পরিচয়টা পাওয়া গেল নতুবা একটা মহা উৎপাৎ ঘটত। হয় তাে কারাগারের যন্ত্রণায় শ্রীবৎস রাজা প্রাণ পরিত্যাগ করতেন। তা হলে আমাকেই সুকুমারী কুমারীর বৈধব্য যন্ত্রণার কারণ হতে হতো। তা জগদীশ্বর সেটা রক্ষা করলেন। এখন আমার বােধ হচ্ছে যে ভদ্র। উপ যুক্ত পাত্রেই আত্ম সমর্পণ করেছে। সে যাহক মন্ত্রী এখনো আছ না কেন? এত বিলম্বই কি জন্যে হচ্ছে। ( শ্রীবৎস রাজার সহিত মন্ত্রীর প্রবেশ, রাজা মন্ত্রীকে দেখিয়া ) এই যে মন্ত্রি! কৈ মহারাজ শ্রীবৎস কোথায় ? মন্ত্রী। আজ্ঞ এই যে তিনি এসেছেন। রাজা। (শ্রীবৎস রাজাকে আলিঙ্গন করিয়া) এস এস বাপু আমি তােমার বিশেষ বৃত্তান্ত না জানতে পেরে তােমাকে অতিশয় কষ্ট দিয়েছি, তা অনুকুল হয়ে আমার সে অপরাধ মার্জন। কর। ঐবৎস। (সবিনয়ে) সে কি মহারাজ আপনি অমন কথা বলবেন মা, আপনার অনভিমতে সয়ম্বর স্থলে উপস্থিত হয়ে, আপ- নার কন্যার পাণিগ্রহণ করে আমিই অপরাধি হয়েছি।

[ ৪ ] রাজা। মন্ত্রি! শীঘ্র একজন পরিচারিণীকে অন্তপুরে পাঠিয়ে দাও ভদ্রাকে এখানে আছে বল। মন্ত্রি। যে আজ্ঞা মহারাজ। ( মন্ত্রীর প্রস্থান) বাজা! বাপু আমি যখন তােমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেম তখম পরিচয় দিলে না কেন, তা হলে তো এ দুর্ঘটনা হতো না। শ্রীবৎস। মহারাজ আপনি কি জানেন না, যে ক্ষত্রিয় সন্তানের মৃত্যু স্বীকার করে, অথচ আত্ম মুখে আপনার পরিচয় কখ- নই দেয় না। { মন্ত্রীর পুন প্রবেশ) বাজ। হ ভাও বটে। ( মন্ত্রীকে দেখিয়া ) কৈ মন্ত্রী ভদ্রা কি আছে। মন্ত্রী। আজ্ঞা হ মহারাজ! রাজনন্দিনী এখনি আসবেন। ( হেমলতার সহিত ভদ্রার প্রবেশ) ভদ্র। সখি ! বােধ হচ্ছে বিধাতা এতদিনে এ দুখিনীর মনদুঃখ নিবারণ করলেন। কিন্তু সখি পিতার নিকটে যেতে আমার লজ্জা হচ্ছে। হেম। সখি পিতার নিকটে যেতে আবার লজ্জা কি? চলে। রাজা।( ভদ্রাকে দেখিয়া ) এস এস মা (ভদ্রাকে শ্রীবৎস রাজার করে সমৰ্পণ করিয়া ) এই নেও বাপু সুবাহুর সৰ্বস্ব ধন এই তনয়া রত্ন আজ তােমাকে সমগণ করলেম একে স্নেহ মমত্ত করে এ কথা আমার বলা বাহুল্য। এখন জগদীশ্বরের নিকটে প্রার্থনা করি তােমরা যাবজ্জীবন অবিচ্ছেদে সুখ ভোগ কর। ( উভয়ের প্রণাম ) { চিন্তাকে লইয়া লক্ষ্মীর প্রবেশ) লক্ষ্মী। মহারাজের জয় হােক। উভয়ে আছে আজ্ঞা হক। লক্ষ্মী। শ্রীবৎস রাজার প্রতি। মহারাজ এই আপনার চিন্তাকে নিন। আজ অবধি শমি প্রসন্ন হয়ে আপনার দেহ পরিত্যাগ ( ৪৪ } করলেন। এখন সুলক্ষণ। ভদ্রা ও প্রিয়সখী চিন্তাকে নিয়ে স্বরাজ্যে গমন করত, সুখ ভােগ করুন। আর আমি পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞানুসারে আপনার নিকটে অচল হয়ে রইলেম। অতএব আপনার মঙ্গল হােক আমি এখন চল্লেম। শ্রীবৎস। যে আজ্ঞা দেবি আসুন, কিন্তু এ দাসকে যেন বিস্মত নাহন এইটি আমার প্রার্থনা। { লক্ষ্মীর প্রস্থান) সুবাহ। ( শ্রীবৎসের প্রতি) বাপু তুমি সৌতিপুরে এসে আমার প্রাণাধিকা তনয়ার পাণিগ্রহণ করে আমাকে চরিতার্থ কর, লে। আমি জন্ম জন্মান্তরে যে কত পূণ্য করে ছিলাম, ভার আর কি বলব। সেই পূণ্য ফলে লক্ষ্মী দেবীর কৃপা, এবং তােমাকে জামতা রূপে লাভ করলেম। যাহক বাপু! লক্ষ্মী দেবী এই বর বর্নিনী রূপ গুণ সম্পন্ন, কামিনীকে এখানে রেখে গেলেন, ওঁর কোন পরিচয়ও দিলেন্ না। কিন্তু ওর ইতিবৃত্ত শুনতে আমার নিতান্ত কৌতুহল জন্মাচ্ছে। রাজা। মহারাজ! উনি কুশধৃজ রাজার কন্যা আমার পরিণীত। ভাৰ্য্যা। সুবাহু। এঁ। উনি তােমার সহধর্মিণী? তবে এতদিন ছিলেন কোথা ? রাজা। মহারাজ! সে দুখের কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করেন; বতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। আমি শনি কর্তৃক রাজচ্যুত হয়ে, প্রিয়তমা সঙ্গে বনুপ্রবেশ করলেন। সেখানে কয়েক জন কাষ্ঠ ছেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়াতে, আমি তাদের আশ্রয়ে থেকে কাষ্ঠ আহােরণ পূৰ্ব্বক কোন মতে জীবন যাত্রা নিৰ্বাহ করতে লাগলে। সুবাহু। বাপু, তার পর। রাজা। তার পর আমি এক দিন কাষ্ঠ ছেদনের জন্য, বন গমন করলে, প্রিয়তমা চিন্তা নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলো। সেখানে একজন সাধু বল পূৰ্ব্বক চিন্তার পতিব্রতা ধৰ্ম্ম নষ্ট করতে উদ্যত হলে, লক্ষ্মী দেবী ভগবান পবনের সাহাৰ্য্যে [ ৪৫ ] দুৰ্বত্ত সাধুকে জলমগ্ন করে, চিন্তাকে নিয়ে প্রস্থান করলেন। সুবহু। ( সোৎসুকে চিন্তার প্রতি) বৎসে ! মেঘাছন্ন রজনী যােগে পান্থ জনেরা রাজপথে সঞ্চারিণী দীপ শিখা দেখলে, যেরূপ আনন্দসাগরে নিমগ্ন হয়, তােমার বিমল চন্দ্র বদন দেখে, আমিও তদ্রুপ আনন্দিত হলেম। অতএব বৎসে ! প্রাণাধিকা ভদ্রার প্রতি সপত্নীভাব পরিত্যাগ করে, ভগ্নী ভাবে প্রতিপালন কর এইটি আমার প্রার্থনা। চিন্তা। মহারাজ! এবিষয়ে আমাকে অনুরােধ করা কেবল বাহুল্য মাত্র। আমি জাবজ্জীবন তদ্রাকে স্নেহ পরবশ হয়ে ভগ্নী ভাবে প্রতিপালন করব। সে জন্য আপনি কিছু মাত্র চিন্তা করবেন না। ভদ্রার প্রতি) ভগ্নি! এস এখন আমরা জীব- নের শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছেদে পতি সেবায় নিযুক্ত থাকি। রাজা। মন্ত্রি! এক কৰ্ম্ম কর শুভ বিবাহ তো সম্পন্ন হলো, এখন উৎসবের সমুদয় উদ্যোগ কর গে, আমি এঁদের নিয়ে অন্তপুরে চলেম, বােধ করি পুরবাসিনীরা বর বধূ দেখিবার জন্য ব্যগ্র হয়ে থাকবেন। ( সকলের প্রস্থান । মন্ত্রী। মহারাজ আজ আমরা চরিতার্থ হলেম । ( মন্ত্রীর প্রস্থান।) { নেপথ্যে ) রাগিণী ললিত, তাল আড়াঠেকা। এত দিনের পরে হলো মন দুখবিমােচন। পাইলেন ভুপবর প্রাণ প্রেয়সী রতন। শনি কোপ সম্বরিল, সৌভাগ্য শশী উদিল । আনন্দনীরে ভাসিল, যত পুরবাসী গণ । প্রমােদ পুমদ। গণ ফুখে মাতিল, ( আজি) অশেষ হরষে রাজপুরি পুরিল ৷ রাজ বালা গুণবতী, পেয়ে মনমতপতী, সুখের সরিদোপরি; সুখে করে সন্তরণ। সম্পূর্ণ।

No text on this page.

-

No text on this page.

No text on this page.

Sreebatsha-chinta

Author
Karmakar,harimohon
Title
Gitavinay
File name
Sreebatsha-chinta
Text
OCR done
Citation
1866
Published
2009/09/11
Publisher
Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
56
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Bhodra
DLI number
513320
Barcode
4990010020309.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
nbdRDmZO1Qa
Download PDF

Sreebatsha-chinta