Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kannarjun Ed.20
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
कसान
No text on this page.
কর্ণার্জুন
ন
অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
আর্ট থিয়েটার কর্তৃক ষ্টার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনীশনিবার ১৫ই আষাঢ়, ১৩৩০
গুরুদাসচট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দুই টাকা চার আনা সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
উৎসর্গ
নাট্যবিদ্যাভারতী
শ্রীযুক্ত নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায় কবিভূষণ
মহাশয়ের
কয়ল
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ
পুরুষগণ
কৃষ্ণ, বলরাম, মহাদেব, ইন্দ্র, সূৰ্য্য, জামদগ্ন্য, ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ,
ধৃতরাষ্ট্র, দুৰ্য্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণ, যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল,
সহদেব, অধিরথ, কর্ণ, বৃষকেতু, বিদুর, শকুনি, সঞ্জয়, বিচিত্রসেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন,
শল্য, জরাসন্ধ, অগ্নিহােত্র, ঋষি, ব্রাহ্মণগণ, মন্ত্রী, প্রতিহারী, দূত,
বালকগণ, দৌবারিকগণ, বন্দিগণ ইত্যাদি
স্ত্রীগণ
।
পাৰ্ব্বতী, কুন্তী, দ্রোপদী, সুকেতু, পদ্মাবতী, নিয়তি, ভৈরবী,
বন্দিনীগণ ইত্যাদি
কর্ণার্জুন
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
নদীতীর
কাল-প্রত্যুষ
কর্ণ
বন্দি-বন্দিনীগণের গীত
নমো নম রবি ছবি গগনবিহারী।
উজ্জ্বল তপন, ভুবন-নয়ন
সকল তিমির অপহারী।
জয় গ্রহেশ্বর, চির-রুচির দিব্য কলেবর,
স্ফরিত ব্ৰহ্মজ্যোতিঃ—পাপ তাপ হর,
জবা-কুম-বরণ, অমল অরুণ,
বিমল কনক কিরীটধারী।
প্রস্থান
কর্ণ।
অপূৰ্ব আলােকছটা উদয় অচলে,
অপূৰ্ব্ব পুলক জাগে হৃদয়-কমলে।
বুঝিতে না পারি
কি অজ্ঞাত আকর্ষণে
উদ্বেলিত হৃদয় আমার !
কহ বিভাবসু,
কি সম্বন্ধু তােমায় আমায় ?
কর্ণার্জুন প্রথম অৰু কেন এই উচ্চ উদ্দীপনা ? নীচ-কুলােদ্ভব রাধার নন্দন আমি সূত-পুত্র অধিরথ-সুত ; কিন্তু যবে প্রণমি তােমায় দেব, আনন্দে অধীর শুনি যেন অশরীরী বাণী ধীরে পশে কর্ণে মাের- দিবাকর আকর আমার, স্বর্ণ-সূত্রে সম্বন্ধ স্থাপিত অভিমানে ঘুরে এ অন্তর ! দিন দিন দিনকর সনে কত আশা-কত সাধ কত বিচিত্র কল্পনা রেখায় রেখায় ফোটে অন্তরে আমার। বুঝিতে না পারি কিবা মােহিনী-মায়ায় সমাচ্ছন্ন প্রাণ! অগ্নিহােত্র ও জনৈক শূদ্রের প্রবেশ অগ্নি। অপবিত্র সূতপুরীতে বেটা চণ্ডালের স্পর্ধা দেখ! গুরুদেবের জন্য যজ্ঞের হবি সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছিলেম, বেটা সংস্পর্শ-দোষে সব মাটি কলে! এ হবিতে কি আর হােম হবে ? চল বেটা রাজার কাছে, আজ তাের শুলের ব্যবস্থা করে তবে পূজা অর্চনা। শূদ্র। রক্ষে কর বাবা, রক্ষে কর, আমি ইচ্ছে করে তােমায় ছুই নি। ( কর্ণকে দেখিয়া) রক্ষে কর বাবা, নইলে রাজার কাছে নিয়ে গেলে আমার আর প্রাণ থাকবে না।
প্রথম পৃষ্ঠ ; কর্ণার্জুন কর্ণ। কেন ব্রাহ্মণ, আপনি এ নিরীহকে পীড়ন কচ্ছেন ? এ আপনার কি করেছে ? অগ্নি। কি করেছে। সকাল বেলা গঙ্গাস্নান করে শুদ্ধদেহে যজ্ঞের হবি নিয়ে যাচ্ছিলেম, বেটা চণ্ডাল ছুয়ে দিয়ে আমার এক কলসী ধৃত ভস্মসাৎ করলে ! এতে কি আর হােম হবে, না পূজা হবে? শূদ্র। দেখুন তাে কৰ্ত্তা, আপনিই বিচার করুন। ওঁরাও যেমন আমাদের ছোন্ না, আমরাও তেমনি ইচ্ছে করে ওঁদের ছুই না। হঠাৎ আমার ছায়া মাড়িয়েছেন বলে আমায় রাজার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন দণ্ড দিতে ; সেখানে গেলে কি আমি বাঁচব? দোহাই কৰ্ত্তা, আপনি আমায় বাঁচান। আপনাকে ছুতে আছে কি না জানি না, নইলে আপনার পা দুটো জড়িয়ে ধরতুম। কর্ণ। ভয় নেই, তুমি আশ্বস্ত হও। ব্রাহ্মণ, দীনের প্রণাম গ্রহণ করুন। প্রভু, আপনার যা ক্ষতি হয়েছে, তার দশগুণ হবি আমি দেব, এ হতভাগ্যকে কিছু বলবেন না। অগ্নি। ঘি তাে তুমি দেবে, কিন্তু এ যে পাপ কল্লে, এর শাস্তি বিধান করলে, দেশ যে ক্রমশঃ অরাজক হয়ে উঠবে ; অস্পৃশ্য জাতি কি আর ব্রাহ্মণকে মানবে ? কর্ণ। দেব। এ ব্যক্তি তে ইচ্ছাপূর্বক আপনাকে স্পর্শ করে নি; আর যদি ইচ্ছা করে স্পর্শ ক’ত তা হলে এমন কি মহাপাপ হত ? এও মানুষ—আপনিও মানুষ। নও (১০”*৫৯ণ অগ্নি। বটে ? আমি দ্বিজ, বর্ণশ্রেষ্ঠ, আর এ ব্যক্তি অস্পৃশ্য চণ্ডাল এতে আমাতে সম-পৰ্য্যায় ? তুমি কে বট হে, এমন অজ্ঞানের মত কথা ব’ছ। শাস্ত্রাচার জান না? কোন কুলােব তুমি? কর্ণ। অধীন সূত-পুত্র। অগ্নি। ও! ক্ষত্রিয়ের ঔরসে বৈশ্বানীর গর্ভে যে সংস্কার-বজ্জিত ;
৪ == কর্ণার্জুন প্রথম অঙ্ক সঙ্করজাতি সূত, সেই কুলকোজ্জ্বল তুমি? তুমি আর শাস্ত্রাচার জানবে কি করে ? বেল্পিক। (শূদ্রের প্রতি) চল, চল্ বেটা চল—আজ তাের মুণ্ডপাত করে তবে আমার কাজ। শূদ্র। তবে কি আমায় সত্যি সত্যি শূলে যেতে হবে ? কর্ণ। কিছুতেই না। আমি তােমায় আশ্রয় দিয়েছি, যদি প্রয়ােজন হয় আমি তােমার জন্য দণ্ডভােগ করব। তুমি সৰ্বজাতির অস্পৃশ্য হলেও আমার অস্পৃশ্য নও। তুমি আমারশরণাগত,আমার ভাই। এই দেহ- মাংসপেশী শােণিত, আর এর অন্তরালে যে প্রাণ—তা ব্রাহ্মণ শূদ্রের ভেদশূন্য। তুমি চণ্ডাল হলেও—তােমাতে আর পৃথিবীর সর্ব-মানবে কোন পার্থক্য নেই। ব্রাহ্মণ ! আপনার চরণে বারবার প্রণাম করে ভিক্ষা চাচ্ছি, একে পরিত্যাগ করুন, আপনার ক্ষতি আমি পূরণ ক’ব! অগ্নি। (স্বগত) বেটা বলবা, অধিক বিতণ্ডার প্রয়ােজন নাই। ( প্রকাশ্যে ) যা যা বেটা চণ্ডাল, বেঁচে গেলি। অনন্যোপায় হয়ে তােকে ক্ষমা কল্লেম, যা ! সুত-প্রদত্ত হবিতে হােম হবে কি না, কে জানে ? পুনরায় গঙ্গাস্নান করে যাই, দেখি গুরুদেব কি বলেন। শুদ্র। ওঃ! বাঘের মুখ থেকে তুমি আমায় রক্ষা করেছ। তুমি যেই হও, আমার কাছে তুমি দেবতা—তােমার জয় জয়কার হক। এস্থান কর্ণ। এ শাস্ত্রের বিধান, না দুৰ্ব্বলের প্রতি প্রবলের অত্যাচার ? কেন এ পার্থক্য? আমি সংস্কার বজ্জিত সূত-পুত্র, হীন কুলে জন্ম বলে কি উচ্চ অধিকার আমার নেই। আমি চিরদিনই কি হীন হয়ে থাকব? অধিরথের প্রবেশ অধি। পুত্র, তুমি কিশাের বয়স অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করেছ। কিন্তু তােমাকে আমি দিন দিন চিন্তিত দেখি কেন? আমি তােমার প্রথম দৃশ্য পিতা! কর্ণার্জুন পিতা, আমার কাছে মনােভাব গােপন করো না। বল, তুমি কি চাও? কিসে তুমি সুখী হও ? কর্ণ। সূচীবিদ্ধ অন্তর আমার নিয়ত কাতর তিল নহে স্থির কভু। উচ্চ আশা বহ্নিশিখা সম প্রজ্বলিত হৃদয়- করে। সাধ—নিজ কৰ্ম্মবলে, উচ্চগতি করিব অর্জন। শাস্ত্র যদি নিষিদ্ধ সুতের- শুনিয়াছি ক্ষত্রিয়ের সম শাস্ত্রে আছে অধিকার মাের, তাই নিবেন চরণে তােমার দেহ আজ্ঞা, যাব হস্তিনায়। শুনিয়াছি দ্রোণাচাৰ্য্য আচাৰ্য-প্রধান মতিমান্ কৌরবের গুরু শিষ্যত্ব হার করিয়া গ্রহণ করিব হে সফল জীবন! বাহুবলে সূতবংশ-খ্যাতি চিরদিন • ভারতের ইতিহাসে রহিবে অঙ্কিত। অধি। বৎস! এই তােমার মনােবেদনার কারণ ? এ কথা আমায় এত দিন বল নি কেন! কৌরবেশ্বর ধৃতরাষ্ট্র আমার পরিচিত, আমি = ।
কর্ণার্জুন প্রথম অঙ্ক তােমাকে পত্ৰ দিচ্ছি, তুমি তার নিকট গমন কর, তােমার বা সহজেই পূর্ণ হবে। তুমি সহজেই আচাৰ্য দ্রোণাচার্যের আশীর্বাদ লাভ ক’রুবে। কর্ণ। পিতা, সৰ্ব্বতীর্থের কল্যাণ তােমার চরণ-রেণুতে, তােমার পদে প্রণাম করে আমি অভীষ্টলাভে যাত্ৰা করি ! আশীৰ্বাদ কর, বিদ্যালাভ করে যখন ফিরে আসব, তখন যেন অধিরথ-সূত কর্ণের যশঃ সৌরভে পৃথিবী আমােদিত হয়। অধি। বৎস, সৰ্বান্তঃকরণে আশীর্বাদ করি, তুমি সফলকাম হও। কর্ণের প্রস্থান অধি। সিংহশিশু শৃগালের গহ্বরে পালিত হলেও সে সিংহেরই শিশু- শৃগালের নয়। এই গঙ্গাগর্ভে তাম্রপাত্রে সযত্নে রক্ষিত দিব্যকান্তি সহজাত কবচকুণ্ডলধারী তােমাকে যে দিন লাভ করি, সেই দিন দৈববাণী হয়েছিল, “অধিরথ ! এই শিশুর নামকরণ কোনাে কর্ণ আর একে জগতে তােমার পুত্র বলেই প্রচার কোরো।” কে এ বালক, কোন্ মহাকুলে এর জন্ম, দেবতা কি গন্ধৰ্ব্ব কিছুই জানি না। পুত্রস্নেহে তােমায় লালনপালন করেছি—তুমি যেই হও—এখন আমারই পুত্র। এন দ্বিতীয় দৃশ্য হস্তিনাপ্রাসাদ শকুনি শকুনি। বীজ বপন করেছি—ক্ষেত্ৰও উর্বর—কত দিনে অঙ্কুর তরুতে . পরিণত হবে, তরু ফল প্রসব করবে—কে জানে! গান্ধারি! স্বামী- পুত্রের মায়ায় তুমি ভুলেছ, কিন্তু আমি ততা ভুলতে পারি নি। কারাগারে পিতৃহত্যা ভ্রাতৃহত্যা—আমি শকুনি এখনও জীবিত—শুধু প্রতিশােধ নেব বলে। বিপক্ষে অস্ত্র ধরে নয়—দুৰ্য্যোধন, তােমাকে দিয়েই তােমার বংশ ধ্বংস ক’ব, তাই তােমার সংসারে অনুদাস হয়ে আত্ম-অভিলাষ গােপন করে আছি। দুৰ্য্যোধন দুঃশাসনের প্রবেশ দুৰ্য্যো। ক্রমশঃ অসহ্ন হয়ে উঠছে। অর্জুন—অর্জুন! আচার্যের কেবল শয়নে স্বপনে অর্জুন! শ্রেষ্ঠ অস্ত্রবিদ্যা যা, তা অৰ্জ্জুনকেই দান করেন, আমাদের বলেন, “তােমরা অধিকারী নও। কেন? শকুনি। একৰ্শিতা—বুঝলে বাবাজী—একদর্শিতা ? দুঃশা। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ভীমসেন; কিন্তু মল্লযুদ্ধে আচার্য্য প্রশংসা করেন তারই অধিক, আমাকে কাছেই ঘেসতে দেন না। শকুনি। অকৃতজ্ঞতা-অকৃতজ্ঞতা ! খেতে পেতেন না, দেশে দেশে ভিক্ষে করে কপ,নী জুটত না, ছেলে দুধ খাব বলে বায়না নিলে, পিটুলি গুলে খাওয়াতেন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আশ্রয় দিলেন, আচাৰ্য্য করে দিলেন—আর তার ছেলেরাই হ’ল দ্রোণের চক্ষুশূল। দুর্যো। আর পাণ্ডবেরা হ’ল তার প্রিয় ! কি অবিচার। শকুনি। যত অনিষ্টের মূল আমাদের মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র। ছিল শতশৃঙ্গ পর্বতে, পাণ্ডু আর মাদ্রীর মৃতদেহ নিয়ে কতকগুলি ঋষি এক দিন ৮ কর্ণার্জুন প্রথম অঙ্ক সকালবেলা উপস্থিত—সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডব আর কুন্তী,সেই সময় মহারাজ যদি অস্বীকার করতেন, তাহলে কি আর ওরা এখানে স্থান পেত ? দুৰ্যো। মহারাজ অস্বীকার করেন কি করে ? দেখেছিলেন তাের পিতামহ ভীষ্ম, পিতৃব্য বিদুর,এরাই তাে সমাদর করে নিয়ে এলেন। আর আচাৰ্য দ্রোণ, কৃপ, এদেরই বা যত্ন কত ? শকুনি। আনবেন না কেন? ভীষ্ম রাজ্যের মমতা কি বুঝবে ? অপদার্থ ! পুরুষ হয়ে বিয়ে কল্লে না। দ্রোণ কৃপ? জন্মরহস্য অদ্ভুত, এক জন জন্মালেন কলসীর ভেতর, আর দু’জন নিরাশ্রয় বনে পড়েছিল—রাজর্ষি শান্তনু মৃগয়া করতে গিয়ে কৃপা করে আশ্রয় দিলেন—তাই এক জনের নাম হল “কৃপ” আর বােটার নাম হল “কৃপী”—দ্রোণাচার্যের স্ত্রী। আর বিদুর ? ওটা তো বেদব্যাসের ফাউ, দাসীপুত্র, উপজীবিকা-ভিক্ষা! এরা রাজ্যের মমতা কি বুঝবে বল! জ্ঞাতি-শত্রুকে এনে স্থাপন কল্লেন ; যত দিন না এদের উচ্ছেদ হয়, তত দিনই ভুগতে হবে। দুৰ্যো। এই যে দুই আচাৰ্যই আসছেন। দ্রোণাচাৰ্য্য ও কৃপাচার্যের প্রবেশ দ্রোণ। এ কি বৎস, তােমরা শিক্ষাগার থেকে চলে এলে কেন ? দুৰ্য্যো। দেখলেম, আপনি ভীমার্জুনের শিক্ষাদানেই ব্যস্ত, সেই জন্য আপনাকে বিরক্ত না করে এইখানেই এসে বিশ্রাম কছি। দ্রোণ। বিশ্রাম সেইখানেই করা উচিত ছিল ; কেন না অর্জুনের ক্ষিপ্ৰকারিতা, বাণত্যাগের কৌশল মনঃসংযােগে দেখলেও উপকার হত। যখন একজনকে শিক্ষা দিই, মনে করাে না, যে কেবল তাকেই শিক্ষা দিচ্ছি, একজনকে লক্ষ্য করে সকলকে শিক্ষাদানই আমার উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয় দৃশ্য কর্ণার্জুন দুৰ্যো। কিন্তু গুরুদেব, মার্জনা করবেন, আপনি ত দেখি আমাদের সকলের অপেক্ষা অর্জুনকেই বিশেষ যত্নে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। দ্রোণ। (ঈষৎ হাসিয়া) না বৎস, এ তােমাদের ভ্রম। আমি সকলকেই সমানভাবেই শিক্ষা দান করি, তবে অর্জুনের প্রতিভা অধিক, সে যা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়, তােমরা তা পার না। বিদ্যা—বিমল জাহ্নবী-বারি- বেদ গিরিশৃঙ্গ হতে দুকুল ভাসায়ে চলে ; শিষ্যহৃদি উষর বা উর্বর কোথাও, তাই কোথা নয়ন-আনন ফলেফুলে হয় সুশােভিত ; কোথা মরুভূমি সম প’ড়ে রহে বিদগ্ধ প্রান্তর। ভাগ্য যার যে ফললাভ সেই মত ; ইথে বৎস ক্ষোভ নাহি কর ! আমি প্রাণপণে বিদ্যা করি দান, শিষ্য মাের পুত্ৰাধিক সকলে সমান, ঈর্ষা পরিহরি’ কর বিদ্যামৃত পান, তৃপ্ত হবে প্রাণ- বিদ্যাদান সফল হইবে মম। শকুনি। সফল হবে বৈ কি। ব্রাহ্মণ আপনি—আপনি যখন অস্ত্র ধরেছেন—সফল হবে না। তবে দুর্যোধনাদি বালক, বুঝতে পারে , মনে করে আপনি অর্জুনকেই অধিক ভালবাসেন। দ্রোণ। ৩, অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে তােমাদের কোন সন্দেহ আছে ? ।
কর্ণার্জুন প্রথম অঞ্চ শকুনি। তা সত্য কথা বলতে কি, ছেলেদের মধ্যে একটু আধটু আছে বৈ কি। দ্রোণ। বেশ, সন্দেহে কোন প্রয়ােজন নাই, সকলে সমানভাবে পরীক্ষা দাও। আমার শিষ্যগণের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ, তা নিরূপিত হক। আমি সত্বরেই অস্ত্র-পরীক্ষার আয়ােজন ক’ব। তাহলে তাে আর কোন আক্ষেপ থাকবে না। শকুনি। না, নিরপেক্ষ বিচার। দুৰ্যো। আমিও তো তাই চাই। আচার্যের কৃপায় আমিই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ক’ব নিশ্চয়। দ্রোণ। আশীৰ্বাদ করি তাই হক। দুৰ্যো। আচাৰ্য কি এখন অস্ত্রাগারে যাবেন ? দ্রোণ। তােমরা চল আমি যাচ্ছি। দুৰ্য্যোধন প্রভৃতির প্রস্থান কৃপ। পাণ্ডবদের প্রতি দুর্যোধনের ঈর্ষা দেখছি ক্রমশঃ বাড়ছে। দ্রোণ। প্রকৃতি সহজাত, উপায় কি? দুৰ্য্যোধন শুধু ঈর্ষাপরায়ণ নয়— মহাদাম্ভিক, নীচচেতা। কৃপ। আর দুর্ভাগ্যক্রমে আমরাই এই কৌরবের আচাৰ্য্য। দ্রোণ। বেতনভােগী অনুদাস! তুমি তো জান একমুষ্টি অল্পের জন্য স্ত্রী পুত্র নিয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করেছি। এই ভারতের কত রাজা কত মহারাজা আমার দারিদ্র্যকে উপহাস করেছে, কেউ আশ্রয় দেয় নি। সহপাঠী ধ্রুপদ-তার সিংহাসন মলিন হবার ভয়ে প্রার্থী আমি—নিকটে যেতে দেয় নি। দ্বারপ্রান্তে দণ্ডায়মান আমাকে দেখে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলেছে, “ভিখারী ব্রাহ্মণ কখনও রাজার সহপাঠী হতে পারে না। সেই অপমানের শেল বুকে নিয়ে, যখন আমি অনাহারে মৃতপ্রায়, সেই সময়ে আমার জীবন রক্ষা করেছেন
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
এই কৌরবের রাজা ধৃতরাষ্ট্র। অন্নের জন্ম-মৰ্য্যাদার জন্য জীবন
বিক্রয় করতে হয়েছে এই দুর্যোধনের কাছে।
কৃপ। এর কি কোন প্রায়শ্চিত্ত নাই ?
দ্রোণ। আছে।
কৃপ। কি ?
দ্রোণ। অবিচারিত-চিত্তে অন্নদাতা প্রভুর আজ্ঞাপালন।
কৃপ।
এ যে তুষানল অপেক্ষাও ভয়ানক।
দ্রোণ। ভয়ানক হলেও দাসত্বের এই শান্তি।
কৃপ। এই কি শাস্ত্রের বিধি ?
দ্রোণ। এই শাস্ত্রের বিধি। ব্রাহ্মণের দাসত্বেই কলির সূচনাকে জানে
এর পরিণাম কোথায় !
উভয়ের প্রস্থান
শকুনির পুনঃ প্রবেশ
শকুনি। দুর্যোধন! তােমার এই ঈর্ষার অগ্নিতে ইন্ধন দেবার ভার
আমার।
এছান
তৃতীয় দৃশ্য
মহেন্দ্র-পর্বত
জামদগ্ন্য রামের আশ্রম
কর্ণের উৎসঙ্গ-প্রদেশে মস্তক রাখিয়া জামদগ্ন্য রাম নিদ্রিত
কর্ণ। দ্রোণাচাৰ্য্য! বড় আশা করে তােমার কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে
গিয়েছিলেম, তুমি আমাকে সূত-পুত্র বলে অবজ্ঞায় প্রত্যাখ্যান
করেছিলে ? শেলের মত সে প্রত্যাখ্যান-বিষের জ্বালা এখনও এ হৃদয়
ত্যাগ করে নি। তাই তােমার সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলেম,
তােমার প্রিয়শিষ্য অর্জুনের অপেক্ষাও যদি শন্ত্রবিদ্যায় পারদশী না
কর্ণার্জুন
প্রথম অঙ্ক
হই তাে এ জীবন ত্যাগ ক’ব। তুমি প্রত্যাখ্যন করেছিলে, তাই
আজ জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নরদেহে ভগবান্ জামদগ্ন্য আমার গুরু।
নিয়তির প্রবেশ ও গীত
আমি কখন ভাঙ্গি কখন গড়ি নাইক ঠিকানা
থাকি সাথে সাথে, পথে কি বিপথে চিরদিন অচেনা অজানা।
ললাট পটে কালের রেখা, অদেখা আখরে বহি গাে লেখা
নাহি নাম ধাম, চলি অবিরাম, পড়ে নহে পাছে স্মৃতির নিশানা !
০
প্রধান
কর্ণ। এ কি! আমার উৎসঙ্গ-প্রদেশে কীট প্রবেশ কল্লে কি করে? এ
যে চৰ্ম্ম, মাংস, অস্থি, মেদ ভেদ কচ্ছে! উঃ অসহ! যন্ত্রণা যে অসহ!
কিন্তু কি করি। যদি চঞ্চল হই, যদি নিবারণ করতে যাই, গুরুদেবের
যে নিদ্রাভঙ্গ হবে। ব্রাহ্মণ উপবাসে পরিশ্রান্ত-অঘােরে নিদ্রা যাচ্ছেন।
না, না, মরে গেলেও ত এর নিদ্রাভঙ্গ করতে পাব না।
জান। (উঠিয়া) এ কি! আমার কর্ণমূল সিক্ত হ’ল কি করে? বারি
এল কোথা হতে ? না না, এ তো বারি নয়-এ যে শশাণিত !
তােমার উরুদেশ ভেদ করে উঠেছে! কি সর্বনাশ ! এ কি হল!
বৎস, তুমি আমায় জাগরিত কর নি কেন? ওঠ, ওঠ, তােমায় কিসে
দংশন কল্পে ?
কর্ণ। প্রভু !
জাম।
এ কি। অষ্টপদ, তীক্ষ্ণদংষ্ট্রা,
স্কুলচৰ্ম্ম, সুচীসম ললাম,
শূকর-আকার
কর্কশ অলর্ক এই
মাংস অস্থি ত্বক মেদ করিয়াছে ভেদ,
অকুন্ঠিত তুমি নিস্পন্দ নিৰ্বাক্
তৃতীয় দৃশ্য কর্ণার্জুন ১৩ অকাতরে সহিয়াছ যন্ত্রণা ভীষণ তবু জাগরিত কর নি আমারে ? কর্ণ। প্রভু! উপবাস-ক্লিষ্ট পরিশ্রান্ত আপনি, পাছে আপনার নিদ্রাভঙ্গ হয়, এই ভয়ে আমি আপনাকে জাগরিত করূতে সাহস করি নি। জাম। অম্লানবদনে এই কষ্ট সহ্য করেছ ? কর্ণ। মৃত্যু পর্যন্ত এর অপেক্ষাও অধিক যন্ত্রণা সহ্য করতেন, তবু আপনার বিশ্রামের ব্যাঘাত করতেন না। জাম। এ কি অদ্ভুত সহিষ্ণুতা ! এ কি অমানুষী ধৈৰ্য্য। এ কি অলৌকিক গুরুভক্তি। ব্রাহ্মণ ? ব্রাহ্মণ শুদ্ধসত্ত্বগুণে দেহের গঠন যার, বংশগত তপস্যার ফলে সুকুমার কলেবর, দিব্যকান্তি, হােম হবি সম কোমল-হৃদয়, সেই দ্বিজ-কুলে জনম তােমার ? এও কি সম্ভব ? বুঝিতে না পারি, কোন্ দৈবী মায়া-বলে ব্রাহ্মণত্ব আজ করিয়াছে তার সীমা অতিক্রম। সত্য কহ, সংশয়ে না রাখ আর, কহ সত্য- কোন্ শক্তি সহিয়াছে ১৪ প্রথম অঙ্ক কর্ণার্জুন দুৰ্বাৰ যন্ত্রণা এই, ইন্দ্র যাহা সহিতে অক্ষম ? কর্ণ। জাম। জড়িত রসনা মাের, কি দিব উত্তর, আমি নহি দ্বিজ । নহ দ্বিজ । কোন্ জাতি ? কোন্ কুলে জন্ম তব ? এ কি! কম্পাম্বিত কেন কলেবর ? যদি ভার্গবের রােষ-বহ্নি হতে বাঁচিবার থাকে সাধ- বল দুরাচার, কোন্ বংশে আকর রে তাের ? নিঃসংশয়ে ব্ৰহ্ম-অস্ত্র করিয়াছি দান ব্ৰহ্মণ জানিয়া তােরে, প্রয়ােগ সংহার যার, এক মাত্র সাতব্য দ্বিজের ; ব্ৰহ্মবিদ বেদ-পরায়ণ বংশগত অধিকারী যার, অকপটে সেই সিদ্ধ-মন্ত্র করিয়াছি দান ব্রাহ্মণ জানিয়া তােরে যদি বাঁচিবার থাকে সাধ । বল প্রতারক, সত্য কেবা তুই
তৃতীয় দৃষ্ণ
কর্ণার্জুন
কর্ণ।
পরিচয়-রহস্য কি তাের ?
নহে তােরে ভস্মপিণ্ডে পরিণত করিব এখনি।
দেব! সম্বর এ ক্রোধ ।
শিষ্য বলি’
একবার পদাশ্রয় দিয়েছ দাসেরে,
নিষ্ফল কোরাে না প্রভু, করুণা তােমার।
অকপটে কহি সত্য ভাষ,
আভাষে বুঝহ যদি মনটব্যথা মাের।
নহি দ্বিজনহি গাে ক্ষত্রিয়,
উচ্চ জাতি হতে
নহেক উদ্ভব মাের ;
নীচ আমি,
জন্ম মম অতি হীনকুলে
দীন রাধার নন্দন
অধিরথ-মুত,
স্তুতিপাঠ পিতৃবৃত্তি মাের,
সংস্কার-বর্জিত জাতি।
উচ্চ—অতি উচ্চ আশার তাড়নে
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আমি,
শুধু আত্মবলে প্রতিষ্ঠার আশে
সাজিয়াছি প্রতারক।
সূত বলি’ দ্রোণাচাৰ্য ঠেলিল চরণে,
অভিমানে আত্মহারা,
শুধু বিদ্যালাভ-আশে,
করিয়াছি মিথ্যা ব্যবহার।
৫
কর্ণার্জুন
প্রথম অঙ্ক
জাম।
ধরি চরণে তােমার,
পুত্র বলি’-শিষ্য বলি’ ক্ষমা কর মােরে
সূতপুত্র তুই
লভি’ জন্ম হীন সূতকুলে
দেবতা-বাঞ্ছিত উচ্চ আশা তাের ?
གi-4i;
তাও তো সম্ভব নয় !
কর্ণ।
তবে এ আশ্রমে প্রবেশের কালে
ভৃগু-বংশধর বলি’
কেন দিলি পরিচয় ?
নিজ বিধি কেন বিধি হও বিস্মরণ ?
তুমি দ্বিজ করিয়াছ শাস্ত্রের বিধান,
বেদ বিদ্যাদাতা যেই গুরু
তঁার বংশে পরিচয় দিতে
আছে দেব শিষ্যের এ অধিকার ;
তেঁই, হে ভাগব,
মনে মনে বরি’ গুরুরূপে তােম,
ভৃগু-বংশধর বলি’
পরিচিত করিয়াছি মােরে।
বুঝিয়াছি সব।
কিন্তু শাে মুর্থ !
বিদ্যা যাহা, তাহা চির সত্য ;
সত্যের আকর দেব মহেশ্বর
জাম।
পুরুষ সুন্দর,
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
শিব আখ্যা যার,
বিদ্যা—তার স্বরূপ প্রকাশ :
সত্য ব্ৰ,
বিদ্যা জ্যোতি তাঁর ;
সেই বিদ্যা কিনেছিস মিথ্যা-বিনিময়ে,
শােন্ মূখ।
মেধাবৃত সূৰ্য্য সম
আসন্ন সময়ে তাের
সমকক্ষ যােদ্ধাসনে দ্বৈরথ-সমরে,
এই বিদ্যা বিস্মৃতির আবরণে রহিবে আচ্ছন্ন !
কিন্তু তবু চমকিত হেরি আমি গুরুভক্তি তাের।
শাপ দিমু তােরে,
তবু করি আশীৰ্বাদ
এই অপকীর্তি-সনে
গুরুভক্তি তাের
ধরা-মাঝে চিরদিন রহিবে প্রচার।
কর্ণ।
জাম।
আশীৰ্বাদ তব
শপক্লিষ্ট জীবনের
একমাত্র সান্ত্বনা আমার।
যাও অমৃতভাষিণ,
ব্ৰহ্মবিদ তাপসের সত্যের আশ্রম
নহে যােগ্যস্থান তব !
ব্ৰহ্ম-অন্ত্র করিয়াছ লাভ,
রামদত্ত ধনু আজি শােভে সূত-করে,
১৮
কর্ণাৰ্জ্জুন
প্রথম অফ
তবু মম বরে,
বীৰ্য্যবান্ ক্ষত্রিয়-কুমার
সমকক্ষ তব কেহ নাহি রবে ভবে।
মিথ্যাবাদী সহবাসে অপবিত্র দেহ,
প্রয়ােজন শুচির বিধান।
উমে প্রদান
চতুর্থ দৃশ্য
উদ্যানমধ্যস্থ শিবমন্দির
পূজা নিরত পদ্মাবতী
পদ্মা ।
হে মহেশ!
নিত্য আসি নিত্য পূজি চরণ তােমার,
নিত্য নিরুত্তর তুমি।
বুঝিতে না পারি,
কতদিনে হবে মাের সিদ্ধ মনস্কাম,
তব বরে
মনােমত পতিলাভ হইবে আমার!
পিতার আদেশে
স্বয়ম্বর আয়ােজন পুরে ;
অবলা কুমারী
বুঝিতে না পারি
কার গলে বর-মাল্য করিব অর্পণ ?
কে সেই জন,
জীবন যৌবন, দিব ডালি চরণে যাহার?
চতুর্থ দৃশ্য
কর্ণার্জুন
কই আশুতােষ,
ধরা-মাঝে কেবা মাের স্বামী ?
দৃশ্য পরিবর্তন
প্রস্তর-বিগ্রহ পরিবর্তিত হইয়া অনায়িকার প্রকাশ
উর্দ্ধে হরগৌরী আসীন
নায়িকগণ
গীত
রজতগিরি অঙ্গে,
হেমহার গৌরী আমার সােহগে ঢলিয়ে বলে।
ত্রিনয়নে হাসে ভােলা,
উমা ত্রিনয়নে চায়।
হাসির লহর, মসের সাগর, উজান বয়ে যায় ।
যে পূজে গেরী হর
মনের মত পাম সে বর
পদতলে লুটায় বতি মদনমােহন হৃভজে।
মহ।
তুষ্ট আমি পূজায় রে তাের,
মম বরে শ্রেষ্ট বর লভিবি ধরায়।
সহজাত কবচকুণ্ডল অঙ্গে শােভে যার,
রবিকর ঠিকরে নয়নে,
স্বর্ণকর খেলে কলেবরে,
নর-মাঝে নর-শ্রেষ্ঠ পুরুষ-প্রবর—
জেনাে সতি সেই পতি তাের।
কর অন্বেষণ
হলে পূর্ণ কাল দেখা পাবি তাের।
কর্ণার্জুন। প্রথম সৰু পদ্মা। জয় গিরীশবন্দিত সুন-নন্দিত মণ্ডিত গলে কত ফণি-ফণা-মাল। দেব দিগম্বর শর অরহর গৌরীশ্বর লটপট জটাজাল। জাহ্নবী-বারি, শিরসি-বিহারী কলুষ হারী- শশলাঞ্ছিত আধচন্দ্র ভাল। রাধিত-ভূতদল, কণ্ঠে হলাহল নিবিড় নীল জিনি তমাল তাল। বৃষবর-বাহন, গজ-চৰ্মাসন, শমন-সুশাসন নাদিত বাদিত ডম্বৰু-গাল। দেবেশ মহেশ, যােগেশ উমেশ, অশেষ বিশেষ নম নম দেব, হর মহাকাল। স্তবান্তে পূৰ্ব্বদৃশ্য পদ্মা। এ কি! এ কি দেব ! দেখা দিয়ে কোথায় লুকালে? কেতুর এবেশ সুকেতু। এই যে মা পদ্মা ! তাের পূজা শেষ হ’ল? মহারাজ যে তােকই খুঁজছেন ? পদ্ম। কেন মা? সুকেতু। পুরােহিতের সঙ্গে পরামর্শ করে তাের স্বয়ম্বরের দিন স্থির কবেন! পদ্মা।, মা, আর স্বয়ম্বরের প্রয়ােজন নাই।
চতুর্থ দৃ কর্ণার্জুন অকেতু। সে কি! এ তুই কি বলছিস? পদ্মা। মা ! সার্থক তােমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেম। নিত্য শিবপূজা করি, আজ হর-গৌরী প্রত্যক্ষ হয়ে আদেশ করেছেন কে আমার পতি। স্বয়ম্বরের প্রয়ােজন নাই ; দেবাদিদেবের নির্দেশে আমিই পতি অন্বেষণে যাব। সুকেতু। পদ্মা, এ তুই কি বলছিস? তুই রাজার ঝিয়ারী; রাজকুলের প্রথমত তাের স্বয়ম্বর হবে, তুই পুতি-অন্বেষণে যাবি কি ? পদ্ম। কেন মা, এ বিধি তাে নূতন নয়। সতীকুলরাণী সাবিত্রীও তাে ঋষির আদেশে স্বেচ্ছাকৃত স্বামীর গলে বরমাল্য দিয়েছিলেন। তিনিও তো মা রাজার ঝিয়ারী ছিলেন। তিনিও তাে মা জগতের নারী-কুলের আদর্শ। আমি তাঁর চরণােদ্দেশে প্রণাম করে দেবদেব মহাদেবের আদেশে পতি-অম্বেষণে যাব, এতে বিস্মিত হ’চ্ছ কেন মা? তুমি মহারাজকে ব’লে সুব্যবস্থা করে দাও। কুল পুরােহিত আমার সঙ্গে যাবেন, রাজরক্ষী, সহচরীগণ আমার রক্ষণাবেক্ষণ করবে, আমি পতি-অন্বেষণে যাব। সুকেতু। সে কি ? কোথায় যাবি ? তুই সােমত্ত মেয়ে-তােকে ছেড়ে দিয়ে আমিই-বা নিশ্চিন্ত থাকুব কি করে? আর তুই সে কষ্ট সহ কমতে পাবি কেন ? পদ্মা। সহ্যের কথা কি বলছ মা? পুরাণে কি পড় নি-হিমালয়-নন্দিনী জগজ্জননী উমা হরবর লাভের জন্য কর্কশ পর্বতাবাসে নিরঙ্কু উপবাসে পঞ্চতপা করেছিলেন? শুষ্কপর্ণ পৰ্যন্ত আহার করেন নি বলে তাঁর আর এক নাম “অপর্ণ*! তিনি এই দুঃসহ কষ্ট সহ্য করেছিলেন কি বৃথা? তার শিক্ষা কি নিষ্ফল? তবে আমারজন্য কাতর হ’চ্ছ কেন মা? সুকেতু। হরে।—উমা—তিনি হলেন মহাদেবী! তাঁর সঙ্গে আমাদের তুলনা? আর সাবিত্রী—তিনিও কি আমাদের মত মানবী ছিলেন ? ?
কর্ণার্জুন প্রথম অঞ্চ দেবী-অংশে তার জন্ম, নইলে যমের মুখ থেকে কেউ মৃত স্বামী ফিরিয়ে আতে পারে ? পদ্ম। সত্য মা! একজন মহাদেবী আর একজন দেবী-অংশে মহাসতী। তাঁদের সঙ্গে কার তুলনা ? তবে মা, আমরাও তো তাদের দাসী ; তাদের আদর্শ যদি না গ্রহণ করি, তাদের জীবনী কি শুধু পুরাণে পাঠ করবার জন্য ! মা! মহাদেবের আদেশ-তুমি অমত করো না, তুমি মহারাজকে ব’লে তার অনুমতি করে দাও। বিচিত্রসেনের প্রবেশ বিচিত্র। অনুমতি আমি দিচ্ছি মা। আমি তােমার কথা শুনেছি, শুনে বুঝেছি, তােমায় যে সুশিক্ষা দিয়েছিলেন তা বৃধা হয় নি। যে ম আদর্শ লক্ষ্য রেখে তুমি স্বয়ম্বরা হ’তে যাচ্ছ, আশীৰ্বাদ করি—সেই আদর্শের অনুরূপ তুমিও জগতে আদর্শ-সতী বলে বরণীয় হও। পুত্র কুলপাবন, কিন্তু সুকন্যাও কুলকে পুত্রের ন্যায়ই উজ্জ্বল করে। আমি তােমার এই আকাঙ্ক্ষিত স্বয়ম্বরের আয়ােজন করে দিচ্ছি; এস মা, যেন তােমার জন্য আমার পিতৃ-গৌরব পূর্ণ হয়। সুকেতু। বাঃ, যেমন বাপ তার তেমনি মেয়ে। আমি যেন কেউ নয়। সকলের এন
পঞ্চম দৃশ্য
বন
কর্ণ
কর্ণ।
বিধি বিড়ম্বনা !
শিখিলাম দিব্য অস্ত্র যত
দেব নরে অসম্ভব ;
কিন্তু গুরু অভিশাপে
বিদ্যা মৃত্যুকালে নাহি হবে ফলবতী
দ্বৈরথ সমরে
কার করে মৃত্যুবাণ রহিবে আমার।
জানেন অন্তরযামী।
নিয়তির প্রবেশ
নিয়তি। হাঁ গা, তুমি অমন বিষন্ন হয়ে আছ কেন? কি ভাবছ?
কর্ণ। কে তুমি বলনে ? গুরুদত্ত অভিশাপ লাভের পূর্বে মনে হচ্ছে
তােমাকেই যেন একবার আশ্রমের নিকট দেখেছিলেম, কে তুমি?
নিয়তি। কে আমি? আগে আমার কথার উত্তর দাও, বলতে পার,
হরিণ কখনও সােনার হয়?
কর্ণ। স্বর্ণ মৃগ। কৈ, কখনও দেখি নি।
নিয়তি। অথচ পূর্ণব্রহ্ম রামচন্দ্র, যার অজানা এ সংসারে কিছুই নেই,
তিনিই—জানকীর কথায় ধনুর্বাণ হাতে সােনার হরিণ মারতে
ছুটলেন, মজা দেখেছ ?
কর্ণ। নিয়তি।
নিয়তি। নিয়তি। তারই ফলে-সীতাহরণ আর সবংশে বারণ বধ।
২৪
কর্ণার্জুন
প্রথম অঙ্ক
কর্ণ। সে স্বর্ণমৃগ তো মায়া।
নিয়তি। মায়া ! তুমি মায়া, আমি মায়া, এ সংসার মায়ার তারে গাথা
বিচিত্র হার! গ্রন্থির পর গ্রন্থি• খােলবার যযা নেই। এক চুল
এদিক ওদিক নড়াবার যাে নেই। যেটার পর যেটী—থরে থরে
সাজানাে ঘটনা, ভাবলে কি হবে! উপায় নেই, উপায় নেই।
बर्शन
কর্ণ। কে এ উন্মাদিনী? বােধ হয় কোন জ্ঞানহীনা তাপস-কন্যা!
এ কি! ঐ অদূরে একটা মৃগ বিচরণ করছে না? হ, মৃগই তো।
তবে গুরুর নিকট হতে প্রাপ্ত আমার অব্যর্থ শর-সন্ধ্যানের প্রথম
লক্ষ্য হক ঐ মৃগ।
নেপথ্যাভিমুখে শনিক্ষেপ
'নেপথ্যে ঋষি।
কে রে দুর্বত্ত,আমার হােমধেনু-বৎসের প্রতিশর-সন্ধান
কলি ? কে রে হতভাগ্য গো-হত্যাকারী।
কর্ণ।
এ কি, কি সৰ্ব্বনাশ কল্লেম! মৃগভমে গাে-হত্যা কল্লেম।
নিয়তির পুনঃ প্রবেশ
নিয়তি। হাঃ! হাঃ! মজা দেখছ ? মজা দেখ ? রামচন্দ্রেরও ভুল
হয়েছিল—জগতের ঈশ্বর, সনিয়স্তা—তিনিও এড়িয়ে যান নি, তুমি
আমি কোন্ ছার!
बशन
জনৈক ঋষির প্রবেশ
ঋষি। এই যে কাৰ্ম্ম কধারী প্রমত্ত, নিজের বীৰ্য্যবত্তায় এতই উভ্রান্ত,
আমার হােমধেনু-বৎস বধ করলি! আরে দুরাচার যজ্ঞ বিঘ্নকারী
নরপাংশুল, আমি তােকে অভিশাপ প্রদান করছি-তুই যাকে তাের
প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে যুদ্ধে আহ্বান কবি—সেই যােদ্ধার সহিত
প্রতিযুদ্ধে চমকালে মেদিনী তোর রথচক্র গ্রাস করবে।
পঞ্চম দৃশ্য কর্ণার্জুন এষি। কর্ণ। কি ব্রাহ্মণ, আমার এই অজ্ঞানকৃত অপরাধের জন্য আমাকে এ কি দারুণ অভিশাপ দিলেন? প্রভু! দয়া করুন, ক্ষমা করুন-মৃগভ্রমে আপনার গাে-হত্যা করেছি, একটির পরিবর্তে আমি আপনাকে সহস্র সবৎস গাভী দেব প্রতিজ্ঞা করছি, অভিশাপ প্রত্যাহার করুন, আমার জীবন-ভিক্ষা দি। কে তুমি? কর্ণ । কেবা আমি ? পরিচয় কিবা দিব ! অতি হীন-কুলে জন্ম মম। দীন সুতের নন্দন- কিন্তু ততােধিক হীন অদৃষ্ট আমার ! মহামুনি ভৃগু, তার বংশধর রাম অবতার জামদগ্ন্য রাম- শিক্ষা তার হয়েছে নিস্ফল। মন ভাগ্য ধরি কীটের আকার ছিন্নদল করিয়াছে জীবন-কুসুম মাের, হে ব্ৰহ্মণ, তুমি আর তাহে নাহি হান শেল। বাক্য তব কর প্রত্যাহার, কুবের জিনিয়া দিব রত্নের সম্ভার, বাহুবলে জিনি, সসাগরা ধরা, উপহার দিব চরণে তােমার ;
কর্ণার্জুন থম অৰু মতিমা! শাপগ্রস্ত আর কোরাে না আমারে। ঋষি। বৎস, তােমার কাতরতা দেখে আমি মুগ্ধ হচ্ছি। বুঝতে পাচ্ছি, অজ্ঞানবশতঃ মৃগভ্রমে তুমি আমার হােমধেনু-বৎস বধ করেছ। কিন্তু যখন তােমায় একবার অভিশাপ দিয়েছি, সে বাক্য তাে আর কিছুতেই প্রত্যাহার করতে পারব না। কর্ণ। পৃথিবীর বিনিময়েও নয় ? ঋষি। পৃথিবী কি বলছ ? ইন্দ্ৰত্ব বা বৈকুণ্ঠের বিনিময়েও নয়। তুমি ব্রাহ্মণকে চেন না, তাই তাকে পৃথিবীর প্রলােভন দেখাচ্ছ। সত্যই ব্রাহ্মণের একমাত্র আশ্রয়, সত্যই তার জীবন, তার তপস্যা। সত্যভ্রষ্ট হলে প্রজাক্ষয় হয়, প্রজাক্ষয়ে পৃথিবীর ধ্বংস। তাই, যে সত্যাশ্রয়ী নয় যে মিথ্যাবাদীসে ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ কল্লেও চণ্ডালের ন্যায় হেয়, অস্পৃশ্য, অধম ! আমি কি করে এমন বাক্য প্রত্যাহার করি ? কর্ণ। আর যদি কেহ হীন-কুলে জন্মগ্রহণ করে এই ব্রাহ্মণের মত সত্যাশ্রয়ী হয়, তা হলে সে কি তখনও হীন বলে পরিগণিত হবে ? ঋষি। কখনই না। সত্যাশ্রয়ী যে, যে কুলেই তার জন্ম হক, সে ব্রাহ্মণেরই মত সৰ্বপূজ্য সৰ্বমান্ত। কর্ণ। বেশ! বাক্য যদি প্রত্যাহার না করেন,তা হলে প্রভু বলুন, আমার এই গাে-বধের প্রায়শ্চিত্ত কি? ঋষি। প্রায়শ্চিত্ত-দান। তুমি যে আমায় গাে-দান, পৃথিবী-দান কতে চেয়েছ, এতেই তােমার গো-বধ জনিত মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। কর্ণ। দানের এত মাহাত্ম্য ? এ ব্রত পালনে কি জাতি ভেদ আছে ? ঋষি। না। পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্রতদান, আর শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম-সত্য- পান। এ ধৰ্ম্ম পালনে, এ ব্ৰত আচরণে সকলের সমান অধিকার।
২৭
পঞ্চম দৃ
কর্ণ।
কর্ণার্জুন
বুঝিলাম—কেন দ্বিজ শ্রেষ্ঠ সকলের,
কেন গুরু দিল অভিশাপ।
সত্য যদি উচ্চতা জ্ঞাপক,
সত্য যদি একমাত্র জগৎ-কারণ,
আয়ু সত্য-প্ৰজায় মিথ্যা ব্যবহারে,
তবে হে ব্রাহ্মণ,
করি পণ তােমার সাক্ষাতে
আজি হতে এই সত্য
হক একমাত্র আশ্রয় আমার।
জন্ম যদি হীন কুলে,
অতি উচ্চ ব্রত-দান
আজি হতে হ’ক মম সম্বল জীবনে।
আজি হতে প্রতিজ্ঞ। আমার
প্রার্থী যাহা করিবে প্রার্থনা,
সাধ্যায় যদি,
বিমুখ না করিব তাহারে।
কৰ্ম্মফলে উচ্চতা অর্জন,
জীবনের পণ মম !
হে ব্রাহ্মণ,
দেহ পদধূলি, কর আশীৰ্বাদ,
যেন ব্রতভঙ্গ নাহি হয় কভু
বৎস, করি আশীৰ্বাদ,
মনােসাধপূর্ণ হ’ক তব।
উভয়ের প্রস্থান
মল্লভূমি
।
ভীষ্ম, দ্ৰোণ প্রভৃতি সকলে সমাসীন
পঞ্চপাণ্ডব ও দুর্যোধন প্রভৃতি কৌরবগণ দণ্ডায়মান
দূরে বৃক্ষশাখায় একটি পক্ষীর চক্ষু শরবিদ্ধ
ভীষ্ম। সাধু! সাধু! আচাৰ্য্য ! আপনার শিক্ষাদান সফল। অৰ্জ্জুন,
অপূৰ্ব তােমার সন্ধান!
অর্জুন। (দ্রোণাচাৰ্য ও ভীষ্মকে প্রণাম করিয়া) দেব, এ আপনাদেরই
আশীর্বাদ।
দ্রোণ। দুৰ্য্যোধন, দুঃশাসন, তােমরা দেখলে, আমি বৃথা কখনাে অর্জুনের
প্রশংসা করি নি। আমার শিষ্যদের মধ্যে আর কেউ এ লক্ষ্যবেধে
সমর্থ হলো না, কিন্তু অর্জুন অবলীলাক্রমে বক্ষ্যবেধ কমূলে। এখন
বুঝতে পাছে কেন অৰ্জ্জুন তােমাদের মধ্যে ধনুর্বেদে শ্রেষ্ঠ ?
যুধি। আচাৰ্য! এ তো আমাদেরই গৌরব
দুৰ্য্যো। (স্বগত) এ অপমান অসহ।
ভীম। ধত অর্জুন, ধন্য।
শকুনি। হাঁ হাঁ ধন্য!—বলতেই হবে ধ! অর্জুনের মত বীর্যবান
ছেলের মধ্যে আর কে আছে? সত্যই তো, এরূপ শসন্ধান
করতে কে পারে ?
ধনুর্বাণ হস্তে করে প্রবেশ
কর্ণ। আমি পারি।
শকুনি। (স্বগত) কে এ ? বীরের মত আকৃতি বটে। (প্রকাশ্যে)
কে তুমি? তােমায় ত কখনো দেখি নি।
তেজপুঞ্জ কায়,
बर्छ पृथ
কর্ণার্জুন
রবিদ্যুতি খেলে কলেবরে,
ভার্গব কাকধারী
কে প্রবেশে বঙ্গস্থলে।
কি নাম তােমার ?
কহ, কার শিয় ?
রামধনু করায়ত্ত কেমনে রে তাের ?
কর্ণ নাম,
অঙ্গদেশে বাস,
পরিচয়
ভুবন-বিখ্যাত বীর।
হে আচাৰ্য্য! প্রণাম চরণে;
তুমি হেতু
যাহে রাম-শিয় আজি আমি।
গৰ্ব তব—তুমি গুরু অর্জুনের ;
অস্ত্র পরীক্ষায়
শ্রেষ্ঠত্ব তাহার হইয়াছে পরীক্ষিত
কিন্তু লক্ষ্যবেধ কালে
কর্ণ রঙ্গভূমে করে নি প্রবেশ
হে আল্লা--
এক চক্ষু বিধিয়াছে পাণ্ডব ফানী,
এই সুতীক্ষ সায়কে
ঐ পক্ষীর দ্বিতীয় নয়ন করি উৎপাটিত।
শকুনি। সাধু! সাধু! এই যুবকের সৎসাহসের প্রশংসা ক’তেই
হবে। কি বলেন আচার্য্যমশায়, এর আর না করবার উপায় নেই।
এ পালেও পাতে পারে।
কর্ণার্জুন
প্রথম অঞ্চ
দুৰ্য্যোধন। (স্বগত) বীৰ্যবান হয় অনুমান।
;
যদি সমকক্ষ হয় অর্জুনের !
কর্ণ। হে আচাৰ্য! নীরব কেন ? অনুমতি করুন।
কৃপ। নীরবতার কোন কারণ নাই; তবে তােমার পরীক্ষা-গ্রহণের পূর্বে
একটি কথা আমাদের জিজ্ঞাস্য আছে।
কর্ণ। কি বলুন ?
কপ। রাজা বা রাজপুত্র ভিন্ন রাজকুমারদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরীক্ষা
দানে আর কারও অধিকার নাই। তুমি কোন্ কুলােদ্ভব, তােমার
পিতা কোন দেশের রাজা, এ পরিচয় না জানলে তােমায় তো এ
পরীক্ষায় অনুমতি দিতে পারি না।
কর্ণ। (স্বগত) হে তপন!
মেঘাবৃত হক কিরণ তােমার ,
ঘাের তমঃ ঘেরু মেদিনী,
প্রলয় ঝঙ্কায় রেণু রেণু করি মােরে,
লুপ্ত কর অস্তিত্ব আমার।
জন্মগত অপমান বংশ-পরিচয়
যদি চির দিন দীন করি’ রাখে,
কিবা প্রয়ােজন এ জীবনের তবে।
কপ। যুবক, এবার তুমি নীরব কেন ? আত্মপরিচয় দিয়ে পরীক্ষায়
অগ্রসর হও। বল, তুমি কে? কোন ভাগ্যবান্ ক্ষত্রিয় রাজা
তােমার পিতা ?
কর্ণ।
নহি ক্ষত্রিয় আমি,
নহি রাজপুত্র।
তবে কি ব্রাহ্মণ ?
কর্ণ।
যা দৃশ্য
কর্ণার্জুন
কর্ণ।
,
সে ভাগ্যেও নহি ভাগ্যবান্ ।
কপ।
তবে তুমি কে ?
কর্ণ। বৈশ্য আমি সুতবংশধর।
কৃপ। তুমি সামান্য সূতবংশে জন্মগ্রহণ করে, ভরতবংশধর এই অর্জুনের
সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অগ্রসর হয়েছ ? হীন-কুলােদ্ভব, তােমার এ
অসম-সাহস অমার্জনীয়।
অমার্জনীয়। কেন ব্রাহ্মণ ?
জন্ম?
সে তাে চির দৈবের অধীন,
নহে তাহা ইচ্ছালব্ধ মানবের।
সূত কিংবা সূত-পুত্র যে হই সে হই,
দৈবায়ত্ত কুলে জন্ম,
কিন্তু পুরুষত্ব করায়ত্ত মাের।
আমি কর্ণ, রামদত্ত ধনু অধিকারী
বীৰ্য্যবলে অর্জুন কি ছার ;
দেব নাগ নর অসুর রাক্ষস।
অবহেলে পারি জিনিবারে।
বীরত্ব আমার শ্রেষ্ঠ পরিচয়,
সেই পরিচয়ে আমি
পরীক্ষার যগ্য অধিকারী।
শকুনি। এ কথাটা বড় মিথ্যা নয়; যুক্তি আছে বটে। নিজেদের
ইচ্ছেয় কেউ তাে আর জন্মায় না ; ওটা নিতান্তই দৈব।
ভীষ্ম। বীৰ্য্যবান হলেও যে আত্মশ্লাঘাকারী, সে হীনচেতা।
কপ। (কর্ণের প্রতি) সূত্ৰপুত্ৰ হ'লেও ক্ষতি ছিল না, রাজা হলেও তুমি
কর্ণার্জুন
এবম অফ
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অগ্রসর হতে পারতে—এই যুদ্ধশাস্ত্রের বিধি। এ বিধি
ঘন ক’বার সামর্থ্য কারও নাই।
কর্ণ। বেশ, তা হলে কোন রাজত্ব জয় করে এসে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ
কব বলুন ?
দুৰ্য্যো। তার প্রয়ােজন নাই। সকলে তাে শুনলেন অঙ্গদেশে এর বাস।
অঙ্গদেশ আমার অধিকারে;
; এই মুহূর্তে আমি অঙ্গদেশের সিংহাসন
একে অর্পণ কলেম। ইনি আজ হ’তে অঙ্গাধিপতি কর্ণ—আমার
সখা•••মিত্র। এই রাজমুকুট ধারণই এর অভিষেকের কার্য সম্পন্ন
শকুনি। সাধু, দুর্যোধন, সাধু! সাধু!
কর্ণ। দুর্যোধন! কুরুশ্রেষ্ঠ! তুমি এত মহৎ ? অপরিচিত আমি,
আমাকে তুমি সিংহাসন দান কলে? মিত্র বলে সম্বােধন কলে।
আজ হতে আমারও প্রতিজ্ঞা—আমি রণক্ষেত্রে তােমার শত্রু সংহার
কব, উৎসবে ব্যসনে বিচার পরিশূন্য হয়ে তােমার আজ্ঞা পালন
কব। জীবনের অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ-মৰ্যাদা; এই সভা-স্থলে সেই
মৰ্যাদা দান করে তুমি আমার জীবনকে ধন্য করেছ; আমিও আজ
হ'তে এ জীবন তােমাকে উৎসর্গ কলাম!
অর্জুন। (স্বগত) হ’ল ভাল,
এত দিনে সমকক্ষ বীর মিলিল আমার।
দুৰ্যো। আচাৰ্য! কর্ণের পরীক্ষা-দানে আর তো কোন প্রতিবন্ধক নেই?
কৃপ। না। কর্ণ, এবার তুমি পরীক্ষা-দানে অগ্রসর হতে পার।
ধনুর্বাণহস্তে কর্ণের অগ্রসর
প্রতিহারীর প্রবেশ
প্রতি। দেব! কুন্তী দেবী অসুস্থ হয়েছেন।
বটে। এ অবস্থায় তা হলে আর পরীক্ষা গ্রহণ হতে পারে না।
তীষ্ম !
गर्छ पण কর্ণার্জুন মাতা অসুস্থ, আজ এইখানেই সভা ভঙ্গ হক। (স্বগত) দুর্যোধনের সহিত আমার গুরু জামদগ্যের শিষ্য এই কর্ণের মিলন—এ অগ্নির সঙ্গে বায়ুসংযােগের ন্যায় ভীষণ হল । কর্ণ। (স্বগত) এখানেও ব্যর্থতা। এ জীবনেই ধিক! দুৰ্য্যো। (কর্ণের প্রতি) চল সখা, সখার আতিথ্য গ্রহণ করবে চল। সকলের প্রধান অলিশের উপরে কুন্তীর প্রবেশ কুন্তী। ঐ চলে গেল- তরুণ-ভাস্কর সম কান্তি মনােহর, অক্ষয়কবচ ধারী, মণিময় কুণ্ডল শােভিত গণ্ড, সেই সদ্যপ্রস্থ সন্তান আমার, চঁদমুখে সেই মৃদু হাসি- লােকাজ্জা-ভয়ে যাবে, তাটাটে সলিলে ভাসায়ে দিছি- জ্ঞানহীনা পাষাণী জননী। আজি, কত বর্ষ পরে- অনন্তের সুপ্ত স্মৃতি নিমেষে জাগায়ে, ঐ চলে যায়—মাতৃসত্ত্বে মাতৃহারা- সুত-আখ্যা-ধারী অভাগা নন্দন মাের, অপমান শেল ল’য়ে বুকে! জানে না অজ্ঞান, কি বস্ত্র হানিয়া গেল অন্তরে আমার।
৩৪ কর্ণার্জুন প্রথম অক্ষ পঞ্চ কেশরীর মাতা আমি, যষ্ঠ চলে যূথশ্রেষ্ঠ জ্যেষ্ঠ সবাকার- পরিচয়হীন, অভাগিনী কুন্তীয় ননন ? নারায়ণ ! সংজ্ঞাহীন করে কেন পুনঃ জ্ঞান ফিরে দিলে? কিবা ক্ষতি হত কুন্তী যদি না জাগিত আর!
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
হস্তিনা—প্রাসাদ
বিদূর
গীত
কেআর আছে তােমা বিনে
দীনের ব্যথা তুমিই বােঝ, তাই ডাচি সদা নিশিদিনে
ভাঙ্গা আমার জীর্ণ তরী আশা তােমার চরণ হরি,
ভবের খেয়াল ঘাের তুফানে ভুল না এ হীনের হীনে
আমায় যত পার কর দীন, ( শুধু) মনে রেখ চরম দিন,
আমি চাই না খ্যাতি চাই না মান, ( কেবল ) কাঙ্গাল ব'লে রেখ চিনে।
ভীষ্মের প্রবেশ
ভীষ্ম। দুর্যোধনের আনন্দ দেখেছ বিন্দুর? হতভাগ্য বুঝলে না, এই
ঈর্ষাই তার মৃত্যুর কারণ হবে। কিন্তু সত্য সংবাদ পেয়েছ তাে ?
পাণ্ডবেরা সত্যই জতুগৃহ হতে পলায়ন ক’তে সমর্থ হয়েছে ?
বিদুর। হ দেব, সংবাদ সত্য ! আমি পূৰ্ব্ব হতেই দুর্যোধনের দুরভিসন্ধি
জানতে পেরে, যুধিষ্ঠিরের নিকট গােপনে লোেক পাঠিয়েছিলেন।
গােপনে সুড়ঙ্গ-পথ নির্মিত হয়। ভগবানের কৃপায়, সেই সুড়ঙ্গ
পথ দিয়ে পঞ্চপাণ্ডব, মাতা কুন্তীর সহিত সকলের অলক্ষ্যে পলায়ন
করেছে।
ভীষ্ম। তবে যে শুনলেম ছয়টি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে।
বিহুর। আমিও প্রথমে তাই শুনেছিলেম ; পরে অনুসন্ধানে জেনেছি
কর্ণার্জুন দ্বিতীয় অঙ্ক পাঁচটি চণ্ডাল তাদের বৃদ্ধাজননীর সঙ্গে জতুগৃহে পাণ্ডবদের আশ্রয় নিয়েছিল। জতুগৃহ-দাহে এই ছ’জনেই প্রাণ দিয়েছে। ভীষ্ম। বল কি বিদুর ? আমি যে আর চক্ষের জল রােধ করতে পাছি নি! পাণ্ডবদের কল্যাণের জন্য দুর্যোধনের ঈর্ষানলে জীবন আহুতি দিলে ছয়টা চণ্ডাল ? বিদুর, আমি যদি কখনাে কোন সৎ কাৰ্য্যে পুণ্য সঞ্চয় করে থাকি—এই নিরীহ চণ্ডাল কয়টার আত্মার উদ্দেশে আমি তা উৎসর্গ কলেম—তাদের অক্ষয় স্বর্গ হক। পাণ্ডবদের জন্যে আর আমার চিন্তা নাই! পাণ্ডৰ যে শ্রীকৃষ্ণ-রক্ষিত, এই জতুগৃহই তার প্রমাণ। বিদুর। দেব, আশীৰ্বাদ করুন, যেন পাণ্ডবদের মত আমিও ঐকৃষ্ণের কৃপালাভে সমর্থ হই। উভয়ের প্রস্থান শকুনির প্রবেশ শকুনি। এও কি সম্ভব? জতুগৃহে পাণ্ডবের পুড়ে মরেছে। কৃষ্ণ- রক্ষিত পাব, তাদের অপঘাত-এও কি সম্ভব—দুর্যোধন, তুমি এত ভাগ্যবান? আর আমি আমার ব্রত কি তবে নিস্ফল হবে? একটী নয়, দু’টি নয়—পঞ্চ দীপ-শিখা, পঞ্চ বাড়ব-অনল পঞ্চ-ভাই পাণ্ডুর তনয় ; সে আগুনে পুড়ে কুরুবংশ ভস্মীভূত হবে, আমি আনন্দে করতালি দিয়ে নাচব—আমার সে আশা পূর্ণ হবে না? এও কি সম্ভব ? হৃদয়! স্থির হও। পাণ্ডবেরা মরেছে, এ কথা পৃথিবীর সকলে বিশ্বাস করুক, তুমি কোরাে না। দুৰ্যোধনের প্রবেশ দুৰ্য্যো। মাতুল! এতদিনে আমি নিশ্চিন্ত। শকুনি। কিন্তু আমি তাে এখনাে নিশ্চিন্ত হতে পাছি নি দুৰ্য্যোধন!
প্রথম দৃশ্য কর্ণার্জুন ৩৭ ! দুৰ্য্যো। কেন? শকুনি। কেন? কেন? কেন? কেন ? দুৰ্য্যোধন, সত্যই কি পাণ্ডবেরা মরেছে ? দুৰ্য্যো। তােমার এখনাে সন্দেহ ? বারণাবত থেকে দূত সংবাদ দিয়ে গেল, সেখানকার নগরবাসীরা হায় হায় করছে, তারা সকলে স্বচক্ষে দেখেছে পাঁচটী দগ্ধাবশিষ্ট নরদেহ একসঙ্গে পাশাপাশি শুয়ে আছে, শিয়রে অর্থদা কুন্তী—তবু সন্দেহ ? শকুনি। স্বার্থ এমনি বিশ্বাসীহাঁ, তবু সন্দেহ ! দুৰ্য্যো। তবে তােমার সন্দেহ নিয়ে তুমি থাক! ওঃ কি কৌশলই করেছিলেম! কেউ জানত না, জ্ঞাতিবিরােধ নিবারণের জন্য পিতা পাণ্ডবদের বারণাবতে পাঠালেন, আমিই গােপনে যবন মন্ত্রী পুরােচনের সঙ্গে পরামর্শ করে জতুগৃহের ব্যবস্থা কলেম। অস্ত্র- পরীক্ষায় অপমান, শিবপূজা নিয়ে অপমান—এত দিনে তার শােধ। আর আক্ষেপ নেই। শকুনি। দুৰ্য্যোধন! দুৰ্য্যোধন ! দুৰ্য্যো। কেন মাতুল ? শকুনি। বাতাসে কি শ্মশান-ধূমের গন্ধ পাচ্ছ? অগ্নিশিখা কি আকাশ স্পর্শ করেছে ? মৃতের আর্তস্বরে কি ধরণীর বক্ষ কেঁপে উঠেছে ? দুৰ্যো। কতবার বলব? নেই—নেই । পিতা কাদছেন, মা হাহাকার করছেন; কিন্তু মাতুল, কি আশ্চর্য্য দেখ—যে বিদুর আর ভীষ্ম পাণ্ডবগত-প্রাণ ছিলেন, এ সংবাদে তাদের চোখে জল নেই। পিতামহ ভীষ্ম বরং কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ, কিন্তু বিদুর—শোক ত দূরের কথা—এ সংবাদে মুখ যেন তাঁর প্রফুল্ল ! মনুষ্য-চরিত্র যে একেবারেই দুর্বোধ্য, তা ঠিক। শকুনি। বটে? বটে? দুৰ্য্যোধন! দুৰ্য্যোধন! এ আনন্দ যে আর আমি চেপে রাখতে পাচ্ছি না। হাঃ হাঃ! মনুষ্য চরিত্র দুর্বোধ্যই
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অঙ্ক
বটে ! তুমি দেখতে পাচ্ছ না, আমি দেখতে পাচ্ছি—ঐ আগুনের
শিখা ল ল করে আকাশ ছেয়ে ফেলে। ঐ আৰ্তনাদ-ঐ
হাহাকার ! হাঃ হাঃ-শকুনি! আনন্দ কর-আনন্দ কর!
গান্ধারী কঁদছে, তােমার মুখের হাসি যেন কখনাে না ফুরােয় !
দুর্যো। এ কি! অতি আনন্দে মাতুল জ্ঞান হারালেন না কি ?
মাতুল ! মাতুল!
উতরের এখন
দ্বিতীয় দৃশ্য
উপবন
পদ্মাবতীর সখীগণের গীত
সই লাে কি জানি কেমন
পেতে বাতাসে ফাঁদ, চাদ ধর সাধ দেখি নি এমন
বুঝি ঘুমের ঘােরে কারে দেখেছে
স্বপনে বুকে একেছে,
টেনেছে প্রাণের টান, বাঁধন নয় তাে যেমন তেমন।
পেয়ে ফুলের মত কোমল প্রাণ,
ধনুকে দিয়েছে টান,
থাকে না নারীর মান, বাণ হেনেছে মকর-কেতন।
নিয়তির প্রবেশ
নিয়তি। হাগা, হাগা ! তোমরা এখানে কি কছ ?
১ম সখী। আমরা তীর্থ কতে বেরিয়েছি, আজ এই আশ্রমে আছি।
২য়। না গাে না, আমরা বর খুঁজতে বেরিয়েছি।
নিয়তি। ঠাট্টা করছ ? বর বুঝি বনে থাকে?
দ্বিতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
৩১
১ম সখী। আমাদের কি যেমন তেমন বর? মনগড়া বর-হাওয়ায়
থাকে, হাওয়ায় ফেরে। তাই দেখছি বনের ফাকা হাওয়ায় যদি পাই।
নিয়তি। এই বনেই থাকবে, না আর কোথাও যাবে ?
২য় সখী। সেটা আমরা জানি নি, আমরা যার সহচরী তিনি জানেন।
নিয়তি। তােমরা বুঝি সঙ্গে ঘাের? ঠিক আমার মত, না?
১ম সখী। তুমি কে তা তাে জানি নি!
নিয়তি। আমারও ঐ ঘােরা-রােগ ; সঙ্গেই থাকি সঙ্গেই ফিরি।
১ম সখী। কার ?
নিয়তি। কার নয় বল ? সৃষ্টির ললাকের সব্বারই।
১ম সখী।
কেন ?
নিয়তি। তা জানি নি!
১ম সখী। তােমার বাড়ী কোথায় ?
নিয়তি। জগৎ জুড়ে আমার ঘর।
২য় সখী। (তৃতীয়ের প্রতি) বােধ হয় পাগল।
নিয়তি। কি বলছ ? বলছ, আমি পাগল? ঠিক পাগল নই, তবে
পাগলের মত। কখনও হাসি, কখনও কাদি। বহুরূপী—তাই
কেউ চিনতে পারে না ! জন্মাবার আগে আমি, জন্মদিন থেকে
আমি, মবার সময়ও আমি ; এক তিল ছাড়াছাড়ি নেই—এক
সুতােয় বাঁধা ! চলেছ—চলেছি। বাড়ী থেকে বেরুলে—আমি
সঙ্গে। মনের মত বর হবে—আমিই ঘটুকী। কিসে নেই ? কখন
নেই ? কেউ গাল দেয়—বলে, “রাক্ষুসী। কেউ পূজো করে
বলে, লক্ষ্মী। কেউ দূর দূর করে, কেউ শখ বাজিয়ে ঘরে তােলে।
আমার সব তাতেই সমান।
প্রাণ-হীন পুতলী সমান
সুখ দুঃথ সমজ্ঞান,
৪. কর্ণার্জুন দ্বিতীয় অঙ্ক উন্মাদিনী ভৈরবী কখনাে ! আদেশে আমার বহে কাল-স্রোত, হয় নৃপতি ভিখারী, রাজ্যেশ্বর দীন, ফুৎকারে সাগরে অনল জ্বলে, মরু-বক্ষে সুধার নিঝর, হয় নগরী শ্মশান—প্রান্তরে উদ্যান অন্তর পাষাণ- স্থিরচক্ষে সবভাবে নেহারি সকল ; যুগ-যুগান্তের স্মৃতি ছায়া সম ফেরে সাথে সাথে নাহি মৃত্যু নাহি ক্ষয়, আছি-রব চিরদিন অন্তহীন রহস্য অপার! ১ম সখী। ঐ আমাদের সখী আসছে, তােমার যা বলবার ওকে বল, ও অনেক জানে। । পদ্মবতার প্রবেশ পদ্ম। হাঁ লা, কার সঙ্গে কথা কচ্ছিস ? ২য় সখী। একটি নতুন মেয়ে। এই শােন না কি বলে, আমরা তাে বাপু কিছুই বুঝতে পারি নি। পদ্মা। তুমি কে গা? নিয়তি। তােমার জন্ম-সঙ্গিনী; তােমার সঙ্গে আমার খুব ভাব, কেমন ? পরী। হ, খুব ! নয়তি। আবার যখন আড়ি দেব তখন ভাব রাখবে? ;
দ্বিতীয় দৃশ্য
১১
কর্ণার্জুন
পদ্মা। কেন, আড়ি দেবে কেন?
নিয়তি। আমি কি দিই? আমায় দেওয়ায়। তুমি তােত মনের মত বর
খুঁজছ? তােমায়ই ত সঙ্গে করে নিয়ে যেতে এসেছি।
পদ্মা। কোথায় ?
নিয়তি। যেখানে তােমার স্বামী।
পদ্ম। সে কোথায় ?
নিয়তি। আমি যেখানে নিয়ে যাব।
পদ্মা। তুমি নিয়ে যাবে কেন ?
নিয়তি। নইলে আর কে নিয়ে যাবে ? এই তো আমার কাজ। সবাই
আমার অধীন। কিন্তু যে একমনে ভগবানকে ডাকে, আমি কেবল
তার দাসী। তুমি একমনে ভগবানকে ডাকছ, তাই তােমায় নিতে
এসেছি, বুঝলে?
পদ্মা। তুমি কোথায় যাবে?
নিয়তি। অনেক দেশ তত বেড়ালে ; চল না, পঞ্চালে যাই, আমি পথ
দেখিয়ে নিয়ে যাব। যাবে ?
পদ্মা। (স্বগত) বােধ হয় কোন গরীব অনাথিনী-মাথার ঠিক নেই,
পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। অনেক দেশ তো বেড়ালেম, পঞ্চাল তো
দেখা হয় নি। এ সেখানে যেতে বলছে কেন ?
নিয়তি। ভাবছ কেন? পঞ্চালে গেলেই তােমার স্বামীর দেখা পাবে।
সহজাত কবচকুণ্ডল অঙ্গের ভূষণ যার, সেই তো তােমার স্বামী ?
পদ্মা। তুমি জালে কেমন করে—তুমি জালে কেমন করে ?
নিয়তি। আমি জানি নি? আমি ছায়ার মত তার সঙ্গে সঙ্গে ফিরি।
আমি তােমার সঙ্গে কথা কচ্ছি, আমার প্রাণ পড়ে আছে সেখানে।
পদ্মা। তা হলে তুমি তাকে দেখেছ ? তুমি তাকে চেন?
কাকে না জানি বল, কাকে না চিনি বল? কিন্তু আমাকে
৪২
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অঙ্ক
কেউ চেনে না, বল্লেও বােঝে না—তাই অন্ধকারে থাকি। ঐ আঁধার
-ঐ আমার ঘর!
গীত
আমি আঁধারে বেঁধেছি ঘর আলাের দেশের পারে।
ছায়া দিয়ে ঘেরা সে যে মরণ নদীর ধারে ।
নাই ঠিকানা কূল-কিনারা
খুজতে গিয়ে দিশেহারা
আঁধার রাতে আনাগােনা পথ কি দেখাই যারে তারে ।
প্রস্থান
পদ্মা। (স্বগত) যদি উন্মাদিনী হয়, মনের কথা জানলে কেমন
করে! কে এ? বল্লে পঞ্চালে যেতে ; ক্ষতি কি? মহাদেবের
আদেশে যখন বেরিয়েছি, তখন ব্রত কখন নিস্ফল হবে না। এ বালিকা
কি মহামায়ার সঙ্গিনী ? হতেও পারে।
১ম সখী। হল, এ কে বুঝতে পাল্লি ?
পদ্মা। । কিন্তু যেই হক, এ আমার মনের কথা জানলে কি করে?
সখি, চল, এখানকার বাসা তুলে আমরা পঞ্চালের দিকে যাই।
সকলের প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
পঞ্চাল—স্বয়ম্বর-সভা
রাজস্যবর্গ, ব্রাহ্মণমণ্ডলী, ধৃষ্টদ্যুম্ন
ধৃষ্ট।
হের ভগ্নি, স্বয়ম্বর সভা
ই-সভা জিনি মনােরম ;
ক্ষুদ্র এই পাঞ্চাল-নগরী
ধন্য আজি মহাজনসমাগম হেতু,
হের, ভারত-বিখ্যাত-কীৰ্ত্তি রাজন্য সকল ;
১৩
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
সহ সৰ্ব্বপূজ্য শ্রেষ্ঠ বলরাম
যাদব-ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ মথুরাপতি ;
দ্রোণ, কৃপ, মহারথগণ,
কৌরব-গৌরব মহামানী রাজা দুৰ্য্যোধন,
সমবীৰ্য দুঃশাসন পাশে;
জরাসন্ধ, শল্য, অঙ্গ-অধিপতি, নৃপতি-ভূষণ সবে,
জনে জনে পুরন্দর সম, স্বয়ম্বরে সমাগত হেথা।
হের—ঋষিসঙ্ঘ, ব্রাহ্মণমণ্ডলী,
কুতুহলী হেরিবারে মৎস্যচক্র বেধ,
আয়ােজন যার
নহিল, নহিবে কভু ধরণী-মাঝারে !
দ্রৌপদী।
( স্বগত) নাহি জানি কে করিবে লক্ষ্যবেধ এই,
কার গলে বরমাল্য করিব অর্পণ,
ভ্রাতৃপণে আজীবন দাসী হতে হবে কার?
শকুনি। বিচিত্র সভা—এ সভা স্বর্গেই সম্ভব। তবে আর বিলম্ব কেন?
শুভকাৰ্য্য আরম্ভ হক। ত্রেতায় হরধনু ভঙ্গ হয়েছিল, ধনুক
ভেঙ্গেছিলেন রামচন্দ্র। দ্বাপরের শেষে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর। যদুপতিই
কি আগে ধনুক ধরবেন ?
শ্ৰীকৃষ্ণ। রাজা, বিস্মৃত হচ্ছেন কেন? আমি যে কৃতদার। আমরা এ
সভায় দর্শকমাত্র।
শকুনি। তা বােঝর উপর শাকের আটি। বৃন্দাবনে বােলশ গােপী,
মথুরায় রুক্মিণী সত্যভামা প্রভৃতি। সমুদ্রের বারি, এক কলসী গেলেই
বা কি, বড় লেই বা কি?
ধৃষ্ট। শুন শুন নৃপতিমণ্ডল,
গুন, সভাজন,
কর্ণার্জুন দ্বিতীয় অঙ্ক শূন্যপথে অবস্থিত মীন নিম্নে ঘােরে চক্র অনিবার- স্বচ্ছ নীরে স্ফটিক-আধারে হের প্রতিবিম্ব তার। করিয়াছি পণ, মম দত্ত এই ধনু ধরি’ চক্র-ছিদ্রপথে করিয়া সন্ধান বাণবিদ্ধ করিবে যে তাহে তার করে করিব অর্পণ সৰ্বসুলক্ষণ ভগ্নী মম এই যাজ্ঞসেনী- যজ্ঞ হতে উদ্ভব যাহার। হও আগুয়ান বীর-গর্বে গব্বী মহাশূর, করি’ লক্ষ্যবেধ বরমাল্য সনে জয়লক্ষ্মী করহ গ্রহণ। শ্ৰীকৃষ্ণ। রাজন্যবর্গ, আপনারা নিজ নিজ সামর্থ্য দেখিয়ে, যদি কেহ পারেন এই সুকন্যাকে লাভ করার চেষ্টা করুন। দুৰ্য্যোধন। অগ্রে তুমিই অগ্রসর হও। দুর্যো। ( স্বগত) নাহি জানি লক্ষ্যবেধে অলক্ষ্যে কি লেখা আছে অদৃষ্টে আমার ! সুহাসিনী দ্রৌপদীর কর কিম্বা উপহাস । ধৃষ্ট। ভগ্নি, ইনি কৌরব-ঈশ্বর রাজ দুৰ্য্যোধন।
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
দ্রৌপদী।
(স্বগত) শুনিয়াছি অতি ক্রুর রাজা দুৰ্য্যোধন,
কি জানি যদ্যপি করে এই লক্ষ্যবেধ !
দুৰ্য্যোধন অগ্রসর হইলেন এবং অকৃতকার্য হইয়া, নিজ আসনে বসিলেন
ধৃষ্ট।
হের-দেখ,
চক্ৰাহত বাণ ঠিকরি’ পড়িল দূরে।
শকুনি। বাণও পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে মানও গড়াল। দুর্যোধনের অবস্থা
দেখে মনে হচ্ছে সহসা কেউ ধনুকে হাত দিচ্ছেন না।
শ্রীকৃষ্ণ। এবার কে অগ্রসর হবেন ?
শল্য। আমি একবার চেষ্টা করে দেখি।
ধৃষ্ট। ভগ্নি, ইনি মদ্র অধিপতি শল্য।
দ্রৌপদী।
( স্বগত) হীন মদ্রদেশ,
তার অধিপতি।
শল্য অকৃতকার্য হইয়া ফিরিয়া আসিলেন
জনৈক ব্রাহ্মণ। মহারাজ দুর্যোধনের পর উঠাই উচিত হয় নি।
শল্য।
হয় অনুমান
চক্র ছিদ্ৰশূন্য ।
শকুনি। হাঁ, আপনার চরিত্রেরই মত!
ধৃষ্ট। আর কেউ সাহস কচ্ছেন না কেন? মহারাজ শল্য যে বল্লেন, চক্র
ছিদ্রশূন্য, তা নয়। বীরত্ব পরীক্ষার জন্য এই লক্ষ্যবেধের আয়ােজন,
এতে প্রতারণা নাই। যদি কেহ আত্মবিশ্বাসী বীৰ্য্যবান্ এই সভামধ্যে
থাকেন, তিনি আসুন, আমি পুনঃ পুনঃ সকলকে আহ্বান করছি।
কৈ, কেউ ত অগ্রসর হচ্ছেন না? তা হলে কি বুঝব ধরণী বীরশূন্য ?
ভীম। ( যুধিষ্ঠিরের প্রতি জনাস্তিকে) ধ্রুপদ-পুত্রের এ উক্তি অসহ।
কর্ণ। ( সহাস্যে) ধরণী বীরশূন্যা কি না এইবার তার পরীক্ষা হবে।
৪ কর্ণার্জুন দ্বিতীয় অঙ্ক ধৃষ্ট। ভগ্নি, ইনি অঙ্গ-অধিপতি কর্ণ, মহামুনি জামদগ্নের শিষ। দ্রৌপদী। (প্রকাশ্যে ) আমি সূত-পুত্রকে কখনও বরণ করব না। শল্য। ঠিক হয়েছে। বড় আস্ফালন করে ধনুক ধরেছিলেন,ঠিক হয়েছে। দুৰ্য্যো। তা কখনই হতে পারে না। ধৃষ্টদ্যুম্ন ! তুমি জাতি-নির্বিচারে সকল বীরকেই লক্ষ্যবেধে আহ্বান করেছ ; মহাবীর কর্ণ যদি লক্ষ্যবেধ করতে পারেন, তােমার প্রতিজ্ঞা অনুসারে দ্রৌপদী এর হবেন। ধৃষ্ট। ভগ্নি! দ্রৌপদী। কখন না—আমি প্রাণ থাকতে হীন সূতকূলের বধূ হ’ব না। দুৰ্য্যো। তা হলে ধৃষ্টদ্যুম্ন মিথ্যাবাদী দ্রৌপদী। আমি ক্ষত্রিয়কুমারী-ক্ষত্রিয় কিংবা ব্রাহ্মণের গলে বরমাল্য অর্পণই আমাদের কুলপ্রথা। সকলে শুনুন-ভ্রাতৃপ্রতিজ্ঞ-বশে সূতকে বরণ কবার পূর্বে আমি অনলে জীবন বিসর্জন দেব । কর্ণ। ( ক্ষণেক নিস্তব্ধ থাকিয়া পরে ধনুর্বাণ দূরে নিক্ষেপ করিয়া, সাম্য হাস্যে) সুন্দরি, তােমার অগ্নিতে জীবন বিসর্জন দেবার প্রয়ােজন হবে না। তােমার কুলগৰ্ব অক্ষুন্ন থাকুক, এই আমি ধনুর্বাণ ত্যাগের সঙ্গে এই সভা পরিত্যাগ কলেম। দুৰ্য্যো। কর্ণর এ অপমান আমি কখনও নীরবে সহ্য করব না। দেখি এই সভাস্থলে কে ক্ষত্রিয় কে ব্রাহ্মণ আছেন, যিনি লক্ষ্যবেধ করতে পারেন ; তারপর উদ্ধতা দ্রৌপদীর শাস্তি আমিই দিয়ে যাব। শ্রীকৃষ্ণ। সে পরের কথাপরে; উপস্থিত ক্ষত্রিয়-সমাজ’তাে দেখছি নিস্পন্দ। যাজ্ঞসেনী বলছেন—শাস্ত্রের বিধান—যদি কেউ শক্তিধর ব্রাহ্মণ থাকেন, এইবার তিনি লক্ষ্যবেধ করে দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করুন। শকুনি। তা হলে তাে সর্বাগ্রে দ্রোণাচাৰ্য্যকেই উঠতে হয়। দ্রোণ। নারায়ণ ! নারায়ণ ! মহারাজ দ্রুপদ আমার সহপাঠী বাল্যসখা; তার কন্যা আমারও কন্যা-স্থানীয়া। আমি দুৰ্য্যোধনের সঙ্গে এই ;
তৃতীয় দৃশ্য
৪৭
কর্ণার্জুন
স্বয়ম্বর-সভায় এসেছি বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে দেখতে, কোন্ বীরশ্রেষ্ঠ এই
লক্ষ্যবেধে সমর্থ হন।
শকুনি। বটে বটে, আপনি তবু এসেছেন, ভীষ্মদেব এসেও সভায় বলেন
, অন্যত্র অপেক্ষা কছেন। কাশীরাজ-কন্যার স্বয়ম্বরের পর
প্রতিজ্ঞা করেছেন, নারী নিয়ে বিবাদ যেখানে সেখানে আর তিনি
থাকবেন না।
অর্জুন। ( জনান্তিকে যুধিষ্ঠিরের প্রতি) হে জ্যেষ্ঠ । যদি অনুমতি
করেন, মনে মনে শ্রীকৃষ্ণ ও আচাৰ্য্যকে প্রণাম করে আমি লক্ষ্যবেধে,
অগ্রসর হই।
যুধি। ( জনান্তিকে) ভীম, কি বল ?
ভীম। ( জনান্তিকে) এখনি।
যুধি। (জনান্তিকে) কিন্তু যদি আত্মপ্রকাশ হয় ?
ভীম। (জনান্তিকে) তা হলে এই স্বয়ম্বর-সভায় কৌরব-বংশ নির্ধ্বংশ হবে।
নকুল। ( জনান্তিকে) আমরা মৃত বলে প্রচারিত, আত্মপ্রকাশের কোন
সম্ভাবনা নাই।
যুধি। জনান্তিকে) যা করেন শ্রীকৃষ্ণ! ভাই, আমি অনুমতি দিচ্ছি,
তুমি বিজয়ী হও !
ধৃষ্ট। আসুন-কে সাহস করেন, আসুন।
অর্জুন। আমি প্রস্তুত। (উঠিলেন)
শ্রীকৃষ্ণ। (স্বগত) আমি এরই জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা ক’চ্ছিলেম।
ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নি! সকলকে প্রতারিত করতে পেরেছ, আমায়
পার নি! (প্রকাশ্যে) তা হলে ব্রাহ্মণ আনুন—আসুন—দ্বিধার কোন
কারণ নেই; যাজ্ঞসেনী তাে ব্রাহ্মণকেও বরণ করতে ইচ্ছুক, পাঞ্চালীর
বাঞ্ছাই পূর্ণ হ’ক—আসুন।
অর্জুন অগ্রসর হইলেন
১৮
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অঙ্ক
জনৈক ব্রাহ্মণ। হাঁ হাঁ, কর কি? কর কি? এ বাতুল কোথা যায় ?
ধরে বসাও হে, ধ’রে বসাও! ওহে, এখনও তো ব্রাহ্মণ ভােজনের
ডাক পড়ে নি, এর মধ্যে উঠে যাচ্ছ কোথায় ?
অর্জুন। কেন? ব্রাহ্মণও তত আহূত হয়েছে।
ব্রাহ্মণ। টুকটুকে মেয়েটি দেখেছ,আর বুঝি লােভ সম্বরণ কতে পার নি ?
ওহে, এ শ্রাদ্ধবাসরে বিদায়ের ঘড়া নয়-স্বয়ম্বরে লক্ষ্যবেধ! বুঝেছ ?
অর্জুন। বহু পূর্বেই বুঝেছি এবং সেই জন্যই অগ্রসর হচ্ছি।
ব্রাহ্মণ। এই সালে রে! কি বিভ্রা বাধায় দেখ !
অর্জুন। আপনি আশ্বস্ত হন চিন্তার কোন কারণ নাই, আমি মুহূর্তেকে
এই লক্ষ্যবেধ ক’ব।
ব্রাহ্মণ। তােমার মুণ্ড করবে, উন্মাদ কোথাকার।
দ্রোণ। কেবা এ ব্রাহ্মণ ?
দিব্যমূৰ্ত্তি,
শাল তরু জিনি’ দীর্ঘভুজদ্বয়
আয়তলােচন
পার্থসম বীৰ্য্যবান্ হয়অনুমান!
অর্জুন। ( ধৃষ্টদ্যুম্নের নিকট আসিয়া )
বীর, দেহ অনুমতি
লক্ষ্য-বেধ করি আমি।
ধৃষ্ট। আসুন ব্রাহ্মণ—এই ধনু গ্রহণ করুন, যদি লক্ষ্য-বেধ করতে পারেন,
পাঞ্চালী আপনার পত্নী।
দ্রৌপদী।
(স্বগত) অগ্নি-সম তেজোদীপ্ত দ্বিজ
অগ্রসর লক্ষ্য-বেধে ?
কেন হৃদি হইল চঞ্চল ?
অর্জুন। নারায়ণ, গুরু, ব্রাহ্মণ ও অগ্রজের চরণে প্রণাম করে এই আমি
তৃতীয় দৃশ্য কর্ণার্জুন কামুক গ্রহণ কল্লেম। সকলে আশীর্বাদ করুন, যেন আমি লক্ষ্য বেধে কৃতকার্য হই। দ্রৌপদী। (স্বগত) আমারও মন অনুরূপ প্রার্থনাই করছে। অর্জুন কর্তৃক লক্ষ্যবেধমৎস্য পড়িয়া গেল দ্রোণ। হের, শরবিদ্ধ মৎস্য এই পতিত হেথায় ! সাধু সাধু ব্রাহ্মণ ! হে বীর-কেশরী, দেহ কোল, পরাজিত ক্ষত্রিয়-সমাজ, দ্বিজ হয়ে তুমি মান রক্ষিলে আমার! যাজ্ঞসেনি, দেহ মাল্য এই ভাগ্যধরে, বিজয়ীর রাখহ সম্মান- পণে মুক্ত কর মােরে। সাক্ষী করি’ অন্তর্যামী প্রভু ভগবান, সাক্ষী করি’ 'অন্তরীক্ষে দেবতামণ্ডলী, সাক্ষী করি’ সমাগত ব্রাহ্মণ-সমাজ, তব গলে জয়মাল্য করিনু অর্পণ আজি হতে চির আজ্ঞাধীনা তব আমি। দ্রৌপদী। অন্তরীক্ষ হইতে পুষ্পবৃষ্টি দুৰ্যো। এইবার কর্ণের অপমানের প্রতিশােধ! ব্রাহ্মণ, দৈবক্রমে লক্ষ্য। বেধ করে দ্রৌপদীকে তুমি লাভ করেছ—এইবার তােমাকে বধ করে এই গর্বিতা দ্রৌপদীর উপযুক্ত শাস্তিবিধান ক’ব। অর্জুন। যদি পার করে কোন আপত্তি নাই।-ক্ষত্রিয়ের বীৰ্যৰল তাে দেখলেম।
কর্ণার্জুন দ্বিতীয় অঙ্ক ১ম ব্রাহ্মণ। আবার যে ঠেলে হে? এইবার দিলে কাঁচা মাথাটা উড়িয়ে। বাবা, বামুনের কপালে সইবে কেন? শল্য। স্পর্ধা এই ব্রাহ্মণের, ক্ষত্রিয়-সমাজকে অপমান করে। আমরা এই ব্রাহ্মণকে পরাজিত করে দ্রৌপদীকে গ্রহণ ক’ব। ভীম। ব্রাহ্মণের সহায় আমরা ; দেখি কে বীৰ্যবান ক্ষত্রিয় আছে যে এই ব্রাহ্মণকে পরাস্ত করে। নকুল। বীৰ্য্যবান ব্রাহ্মণ কে আছেন, যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হন। নাহি ক্ষমা ব্রাহ্মণ বলিয়া। সাজ সাজ নৃপতিমণ্ডল, আজি বীৰ্য শুল্কে লভিব পাঞ্চালী। দুৰ্যো। আজ দেখছি ব্রাহ্মণেরা কুশাগ্র পরিত্যাগ করে অস্ত্র ধারণে উদ্যত। সকলে দুর্ব ও ব্রাহ্মণদের বধ করুন-বধ করুন। কষ্ণ। বীরােচিত বটে! তােমর ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দাও, বাহ- বলের আস্ফালন কর-লজ্জা করে না? এই সামান্য লক্ষ্য-বেধে কেউ সমর্থ হলে না—আর এই ব্রাহ্মণ নিজ নৈপুণ্যে বীরত্বের সম্মান রক্ষা করেছে বলে, বিনা কারণে সকলে একে শাস্তি দিতে উদ্যত ? শ্য। কথার সময় নাই, যুদ্ধ-যুদ্ধ ! ফ। ক্ষুদ্র পাঞ্চাল নগরী বুঝি ক্ষত্রিয়-কোপানলে ভস্ম হয়। নাহি চিন্তা মতিমা ক্ষুদ্র নহৈ পাঞ্চাল নগরী অঞ্চল-ভূষণ পাঞ্চালী যাহার! দেহ মােরে অস্ত্রপূর্ণ রথ একখান, দেখি এই ক্ষমাঝে বীর আছে কেবা, রহে স্থির সম্মুখে আমার।
চতুর্থ দৃশ্য কর্ণার্জুন তাম। রথে কিবা প্রয়ােজন? ভুজদ্বয় কাক আমার, শাল বৃক্ষ যােগ্য বাণ তাহে। দুৰ্যো। সকলে আসুন। অগ্রসর হন, যুদ্ধার্থ ব্রাহ্মণবনে কোন পাপ নাই। শ্রীকৃষ্ণ। নির্লজ্জ ক্ষত্রিয়ের এই হীন আচরণ আমি কখন সহ কৰ ন, এস দ্বিজ, আমার রথ, আমার অস্ত্র তােমায় দান কছি, তুমি পূর্ণায়ুধ হয়ে এই গর্বিত রাজাদের শাস্তি দাও। এস পাঞ্চালী, জয়লক্ষ্মী স্বরূপ তােমার স্বামীর অনুবর্তিনী হও। শকুনি ব্যতীত সকলের এন শকুনি। এ ছদ্মবেশধারী নিশ্চয় অর্জুন। হাঃহাঃহাঃ! চতুর্থ দৃশ্য প্রান্তর—রণস্থলের অপরাংশ রে এলে দ্রোণ। দুৰ্বার সংগ্রাম দেখিয়াছি বহু, কিন্তু দেখি নাই কভু হেন অদ্ভুত সমর। বিকল অন্তর- বুঝিতে না পারি দুৰ্য্যোধনে কেমনে যবি? পঞ্চ দ্বিজ করে মহামার হাহাকার চারিভিতে। ঐ শল্য ধূলায় লুটায়, জরাসন্ধ পলয় সভয়ে।
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অ
কোথা অশ্বত্থামা ?
রক্ষা কর দুর্যোধনে।
পালনের প্রবেশ
:
দেব! শরজালে আচ্ছন্ন গগন,
ছােটে বাণ নয়ন ধাঁধিয়া
নৃপকুল আকুল সকলে!
বুঝিতে না পারি কোন্ মায়াধারী
যুদ্ধ করে দ্বিজ-বেশে !
দুঃশাসন, চাল’ সৈন্য দক্ষিণে রাখিয়া,
কহ দুর্যোধনে বুহ-মুখ রক্ষিতে যতনে।
নহে বিজ।
দেখি, ফিরে যম ব্রাহ্মণের বেশে।
পালাও ভীরু সেনাদল,
রাখিও স্মরণ কৌরব-রক্ষিত তােমরা সকলে।
দুইটি শর দ্রোণাচার্যের চরণ স্পর্শ করিল
ভীম।
হে আচাৰ্য,
অদ্ভুত সমর হেন দেখি নাই কভু।
একা দ্বিজ বুঝে লক্ষ রাজা-সনে।
কিম্বা নহে অসম্ভব।
দিজ-শিষ্য আমি ভীষ্ম।
গুরু মম জামদগ্য রাম,
পুনঃ কি হে নব কলেবরে
কর্ণার্জুন
দ্রোণ।
হইল উদয়,
নিঃক্ষত্র করিতে ধরা ?
শরমুখে পরিচয় করিয়াছি লাভ,
হে গাঙ্গেয়,
শুন শুন আনন্দ সংবাদ।
নহে দ্বিজ,
ভীষ্ম।
বেশধারী প্রিয় শিষ্য অর্জুন আমার।
পাশে ঐ ভীমসেন
অরাতি সংহার করে
নলবন দলে যূথপতি যথা।
শুনেছিনু বিদুরের মুখে,
পেয়ে মুক্তি জতুগৃহ হতে
পঞ্চ ভাই বঞ্চে ছদ্মবেশে।
আজি ঘুচিল সংশয়
প্রত্যক্ষ হেরিয়া সবে।
ওই যুধিষ্ঠির সহদেব নকুল সুমতি
দ্বিজবেশে করে মহারণ,
রাজগণ প্রাণভয়ে পলায় সকলে।
হে আচাৰ্য, শিক্ষাদান সার্থক তােমার,
সার্থক জীবন মম,
স্বচক্ষে নেহারি আজি
ভরত-বংশের ওই পঞ্চ হােমশিখা
মুখােজ্জল করিয়াছে মাের।
আমি বটে পিতামহ পঞ্চ পাণ্ডবের
গৌরবের অভিধান এই !
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অঙ্ক
চল—দেখি কোথা দুর্যোধন,
নিবৃত্ত করিয়া রণে গৃহে ফিরি যাই।
যদুপতি দিয়াছেন রথ,
পাণ্ডবের হেতু চিন্তার কারণ নাই।
দ্বিজগণ করে আস্ফালন,
ক্ষত্রিয় পলায় ডরে
এই দেখিনু প্রথম।
ইথে গৌরব তোমার,
তুমি অর্জুনের গুরু
শিষ্য হতে গুরুর প্রতিষ্ঠা।
ট অর এন
কতিপয় সৈর প্রবেশ
নহে দ্বিজ, রাক্ষস নিশ্চয়
ওই আসে ধেয়ে-পলাও পলাও।
এন
লনের প্রবেশ
জাম।
আরে আরে ভীরু ক্ষত্রদল
যুমৃত্যু ভুলিয়াছ সবে?
ছি ছি প্রাণভয়ে কর পলায়ন ?
কোথা দুর্যোধন,
অকলঙ্ক কুলে দিলি কালি,
ডুবাইলি ভরত-বংশের মান?
কিবা ফল, হীনপ্রাণ রাখি ?
पिजिन बाम
বুখি। এন বৃকোদর,
অনর্থক প্রাণনাশে নাহি প্রয়ােজন;
কর্ণার্জুন
ভীম।
দেখ কোথায় অর্জুন।
চল ফিরে যাই কুম্ভকার বাসে,
একাকিনী জননী ভাবেন কত।
দুৰ্য্যোধন এখনাে জীবিত,
জতুগৃহ ঋণ হয় নাই পরিশােধ।
আজি শুভ দিনে বিষাদ না আন।
লক্ষ্যবেধে লক্ষ্মীলাভ করেছে অর্জুন,
লক্ষ রাজা পরাজিত বাহুবলে তব ;
হৃষ্ট মনে ক্ষমা করি” সবে, চল গৃহ-মুখে-
ফিরাও অর্জুনে!
যুধি।
উঃ এল.
পঞ্চম দৃশ্য
নদীতীর
কর্ণ
কর্ণ।
1'
ধিক্ ধিক্ শত ধিক্ জীবনে আমার।
সমাঝে উচ্চকণ্ঠে কহিল রমণী-
সূতপুত্রে না বরিব কভু,
বিষ-শল্য সম বাণী পশিল অন্তরে,
দুর্নিবার আল তার সহিতে না পারি-
মৃত্যু শ্রেয়ঃ-শতগুণে মৃত্যু শ্রেয়ঃ
লাঞ্ছিত জীবন হতে।
নারী-সেও ঘৃণা করে মােরে।
জন্ম যদি দুরারােগ্য ব্যাধির সমান
কর্ণার্জুন দ্বিতীয় অঙ্ক জীবনের চির সঙ্গী মাের, শুধু জ্বলার কারণ- কিবা প্রয়ােজন দুর্ভর এ ভার করিয়া বহন ? মৃত্যু-সমদর্শী বন্ধু জগতের উচ্চ নীচ ভেদাভেদ বর্জিত সুহৃদ কোল দেহ মােরে মুছে যাক, ধুয়ে যাক দেহ সনে বংশ-গত অপ অপমান এই, কলঙ্কের দীপ্ত রেখা সার্থময় সমাজের ঈর্ষার সৃজন । ৰগৰুবেশে নিয়তির প্রবেশ নিয়তি। হাঁ গা, তুমি ত একজন মস্ত বীর ? কর্ণ। বীর? কে বল্লে ? নিয়তি। তুমিই বলছ, আর কে বলবে ? কঁাধে ধনুক, পিঠে তুণ, কোমরে তলােয়ার আবার কি করে বলতে হয়? তা তুমি এখানে একলাটি কি ভাবছ? ও দিকে খুব যুদ্ধ হচ্ছে, আর তুমি বীর হয়ে এখানে বুঝি কেবল ভাবছ ? কর্ণ। যুদ্ধ হচ্ছে! কেন ? নিয়তি। গায়ের জ্বালায়। কর্ণ। সে কি! নিয়তি। আবার কি? ঐ জ্বালাতেই ত সবাই অস্থির। আচ্ছা তুমিই বল না। হাঁ গা সবাই কি সমান ? রাজার মেয়ের স্বয়ম্বর, কত দেশের সব বড় বড় রাজা এল, ক্ষত্রিয়-বীর—কিন্তু লক্ষ্যবেধ করতে কেউ পামূলে না! এক জন গরীব-বলে বামুন, লক্ষ্য বিধলে ৩০
পঞ্চম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
রাজ-কন্যাও তার গলায় মালা দিলে, এই সব রাগ! নিজেরা পালে
, দোষ হ’ল সেই বামুনের ; অমনি সব কোমর বাঁধলে বামুনকে
মারুতে-দেখ দেখি অন্যায় ।
কর্ণ। কোন ক্ষত্রিয় লক্ষ্যবেধ কতে পালে না?
নিয়তি। না গাে, কে পাবে বল ? সে যে দুর্জয় লক্ষ্য, কেউ পামূলে
। সকলে বললে কি জান? অর্জুন হলে পায়ুত, তার মত বীর
কি কেউ নয় ? আর বললে-পাত কেবল কর্ণ।
কর্ণ। সকলে বলে কর্ণ বক্ষ্যবেধে সমর্থ হত ?
নিয়তি। বলবে না? তার মত কে বল ? কিন্তু কি মজা দেখছ, কর্ণ
লক্ষ্য বিধতে উঠলাে অমনি রাজকুমারী বললে আমি সূতপুত্রকে বিয়ে
করবাে না আর কর্ণের লক্ষ্য বেঁধা হ’ল না, সকলে হো-হাে করে
হেসে উঠলাে। হাজার হ’ক ক্ষত্রিয়ের মেয়ে কি না, তার ঝজি
যাবে কোথা ?
কর্ণ। তার পর কি করলে?
নিয়তি। পালাল, আর কি করবে? একটা অপমান তো ! তুমিই বল না !
কর্ণ। আমি কে জান ?
নিয়তি। তুমি না বলে জানব কি করে?
কর্ণ। আমিই সেই সূত-পুত্র কর্ণ।
নিয়তি। তুমিই কর্ণ? আহা! তুমি যদি ব্রাহ্মণ কি ক্ষত্রিয় হতে,
তা হলে দ্রৌপদী তােরই হত, না? তবে কি জান, যার ভাগ্যে
যা। নইলে আর কেউ পালে না, সেই বামুনই বা পামূলে
কেন? এখনো দেখি কি হয়, দ্রৌপদীর অদৃষ্টে আবার কি আছে
কে জানে ? কি বল? সবই তাে ঐ পােড়া ভাগ্যের খেলা।
ভাগ্য মান তাে ?
ভাগ্য-ভাগ্য!
কর্ণ।
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অঙ্ক
নাহি জানি ছায়া কিংবা কায়া।
কোন্ মায়ার সৃজন ;
নারী কিংবা নর—কি আকার তার,
পীড়নে যাহার হ্রস্ত ত্রিসংসার ;
স্বেচ্ছাচার-শাসন দুর্বার
অবহেলে করে পদানত দেবতা মানব !
নিয়তি-নিয়তি
কোথা তার স্থান
বিশ্ব হতে কত—কত দূরে,
কোন স্বর্গে ভীষণ নরকে,
কিংবা অন্ধতম রসাতলে ?
যদি পাই বারেক সন্ধান তার,
যদি পাই সম্মুখে আমার,
গুরুদত্ত অসির প্রহারে খণ্ড খণ্ড করি, তারে
করি
দূর জগতের অলন্ত জঞ্জাল।
নিয়তি। ওঃ! তুমি দেখছি বড্ড রেগেছ। কি জানি যদি আমার ঘাড়েই
তরওয়াল বসিয়ে দাও! কাজ নেই, আমি গরিব বেচারা—আমারসরে
পড়াই ভাল। স্ত্রীলােক অপমান করে, তার আবার আস্ফালন দেখ।
কর্ণ।
রে হৃদয়,
সহজাত অভেদ্য কবচ
অঙ্গ আভরণ,
কোন্ অভেদ্য পাষাণে গঠন তোমার?
কতদূর সহ-গুণ তব ?
হে তপন,
পঞ্চম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
ন
হৃদয়-আনন্দ-নিধি, আরাধ্য আমার,
পাংশু আবরণে কেন ঢেকেছ বদন ?
দাড়াও দাড়াও দেব,
তুমি ইষ্ট-তুমি সাক্ষী
তুমি ক্ষণ রহ স্থির,
হে অস্তগামী অন্তর্যামী জগৎ-নয়ন,
এ জীবন ডালি দিই সম্মুখে তােমার
সূত-পুত্র কর্ণ নাম
যা মুছে
যা মিশে অনন্ত আঁধারে
মৃত্যু হক একমাত্র আশ্রয় আমার।
পবতীয় প্রবেশ
পদ্মা। আর তুমি হও একমাত্র আশ্রয় পদ্মায়। (মাল্যদান )
কর্ণ। কে! কে তুমি? এ কি ক'ল্লে? কার গলায় মালা দিলে?
পদ্মা। আমার স্বামী।
কর্ণ। কে তুমি?
পদ্মা। তােমার দাসী।
কর্ণ। কি সর্বনাশ করলে! উন্মাদিনী? কে তুমি? তুমি কি জান
আমি কে ?
পদ্মা। জানি তুমি আমার স্বামী ?
কর্ণ।
-না,
সূত-পুত্র আমি-
সৰ্ব্ব ঘৃণ্য, সৰ্ব্ব হেয়,
নীচ—অতি নীচ
কর্ণার্জুন
দ্বিতীয় অঙ্ক
কর্ণ।
পরিচয়হীন
অধিরথ-সূত, দীন রাধার নন্দন।
প। হক, তবু তুমি মাের স্বামী।
শােন উন্মাদিনী,
জীবনের তট-প্রান্তে
করিয়াছি চরণ স্থাপন
শােন-মৃত্যুকামী আমি।
পদ্ম। তবু—তুমি মাের স্বামী।
কর্ণ।
কি করিলে বালা ?
কার গলে দিলে কুসুমের মালা?
ফেলিয়া এসেছি আমি জীবন পশ্চাতে,
হের অস্তগামী রবি ছবি সম্মুখে আমার,
অনন্ত আঁধার আসিছে গ্রাসিতে মােরে-
তুমি চাহ
ফুলদল দিয়া রােধিবারে গতি তার ?
পদ্মা। না, আমি কারও গতিরােধ করতে চাই না। যদি তুমি মৃত্যুকামী
হও, কোন ক্ষোভ নেই, কোন দুঃখ নেই। আমি দাসী, তােমার
নিকট শুধু এই অধিকার চাই—তােমার সঙ্গে আমাকেও মরণকে
বরণ করতে দাও।
কর্ণ। এ কি আশ্চর্য ! স্বয়ম্বর সভামাঝে মুখ ফেরালে যে ' সেও
নারী—আর তুমিও নারী। আভিজাত্য-অভিমানহীনা, কে তুমি
রহস্যের মত আমার সম্মুখে এসে দাড়ালে? এখন আমি কি করি?
পদ্ম। যা তােমার ইচ্ছা ! তুমি মরুতে চাও, জেনাে, আমিও তােমার
সঙ্গিনী।
কর্ণ। কিন্তু জান কি সুন্দরি, কি সত্যে আমি আবদ্ধ ? এ পৃথিবীতে
পঞ্চম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
কর্ণ।
নিজের বলে আমি কিছুই রাখি নি। গুরুদত্ত অভিশাপ মাথায় নিয়ে
সংসার-প্রবেশ মুখে প্রতিজ্ঞা করেছি, এজীবনে প্রার্থীকে কখনও নিরাশ
ক’ব না। স্ত্রী, পুত্র, রাজ্য, সম্পদ, নিজের দেহ, প্রাণ—যে যা
চাইবে—অবিচারিত চিত্তে তখনই তা দান ক’ব, এ শুনেও কি তুমি
আমায় বরণ করুতে ইচ্ছা কর ?
পদ্মা। আমার তাে আর স্বতন্ত্র ইচ্ছা নেই। তুমি সর্বস্ব দানে প্রতিজ্ঞা
করেছ, কিন্তু প্রভু, আমি যে তােমায় আত্মদান করেছি। তােমারও
যে প্রতিজ্ঞা—শােন আমি—আজ হ’তে আমারও সেই প্রতিজ্ঞ।
সুদর্শনে!
দর্শনে তােমার
মৃত্যু আজ হ’ল পরাজিত ;
লাঞ্ছিত জীবন
ধন্য হ’ল পুণ্য পরশে তােমার।
অভিশাপ
মৃত্যুকালে রথচক্র গ্রাসিবে ধরণী,
আজি জীবন প্রভাতে
কালচক্র গ্রাসিলে রমণী।
এস এস মৃত্যুহরা সুধা জগতের,
আজি হতে তুমি ধৰ্মপত্নী মাের।
তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য ইন্দ্র-প্রস্থ-তােরণ-সম্মুখ দুৰ্য্যোধন ও শকুনি দুৰ্য্যো। বারবার এ অপমান সহ্য করে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। বাল্যকাল থেকে এই পাণ্ডবের প্রতি কাৰ্য্যে আমার অপমান করছে, অন্ধ পিতা, বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম-সৰ্বকাৰ্যে তাদেরই প্রশ্রয় দিচ্ছেন। অস্ত্র-পরীক্ষায় অপমান, জতুগৃহ ব্যর্থ, লক্ষ্যবেধে লক্ষ লক্ষ রাজার সম্মুখে দীন ব্রাহ্মণ-বেশী পাণ্ডবের অভ্যুদয়—আর আমি কৌরবের দুৰ্য্যোধন-ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ-মহারথী সব সহায় থাকতেও লাঞ্ছিত, পরাজিত। শকুমি। ছােট গাছ একটু বাতাসে ভেঙ্গে পড়ে, কে তা লক্ষ্য করে। আকাশস্পর্শী বৃক্ষ যখন মাটীতে লােটায়, লােকে তখনি করুণায় হায় হায় করে। মহামানী দুৰ্য্যোধনের অপমান সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, বিশেষত এই রাজসূয় যজ্ঞে। দুৰ্য্যো। এরও মুলে—আমার পিতা, ভীষ্ম আর বিদুর। শকুনি। রহস্য কিছুই বুঝতে পাল্লেম না। পরম আত্মীয়ও শক্ত হয়। পিতা-পুত্রের কল্যাণই যার একমাত্র কামনা—তিনিও সন্তানের সর্বনাশ করেন ? দুৰ্যো। কি ক্ষতি হত যদি পাণ্ডবেরা বনে বনে বাস করত? শকুনি। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম যেই শুনলেন—যে-ব্রাহ্মণ লক্ষ্যবেধ , কর্ণার্জুন করেছে—সে অর্জুন, জতুগৃহে পাণ্ডবের মরে নি--গােপনে কুম্ভকার- গৃহে বাস করছে—অমনি বিদুরকে পাঠিয়ে সমাদরে তাদের রাজ- ধানীতে নিয়ে এলেন। দুৰ্য্যো। মার্কণ্ডেয়ের পরমায়ু নিয়ে জন্মেছিল এই পাণ্ডবেরা !–আমি এখনাে বুঝতে পারি না, জতুগৃহে তারা কিরূপে নিষ্কৃতি পেলে। আর দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরেই তাে পাণ্ডবদের ধ্বংস হত। কিন্তু কি আশ্চৰ্য্য, পিতামহ ভীষ্ম অস্ত্রই বলেন না। শ্রীকৃষ্ণ নিজের রথ, নিজের অন্ত্র অর্জুনকে দিয়ে মহত্ত্ব দেখালেন। শকুনি। ঘটনা সবই বিচিত্র ! পুরুষের পাঁচটা কেন—অমন একশ’টা স্ত্রী হয়, স্ত্রীলােকের কখনও পঞ্চস্বামী হয় শুনেছ? আমি তো প্রথম শুনে বিশ্বাসই করি নি। তার পর বিদুরের কাছে সব রহস্য শুনলেম। কুন্তী-কুটীরে ছিলেন, পাঁচ ভাই ভিক্ষে করতে বেরিয়ে স্বয়ম্বরে একটা কাণ্ড করে দ্রৌপদীকে লাভ করলেন, ফিরে গিয়ে মাকে বলে, “মা, আমরা ভিক্ষে থেকে ফিরিছি।” মা বল্লেন, “বেশ করেছ, যা এনেছ পাঁচ জনে ভাগ করে নাও।”—আহা! মাতৃভক্ত সস্তান, কি আর করে বল ? পাঁচজনেই দ্রৌপদীকে ভাগ করেই ভােগ ক’ছেন। চমৎকার ব্যাপার! দুৰ্যো। যার পাঁচ স্বামী, তার যষ্ঠেই বা ক্ষতি কি? দ্রৌপদী। দ্রৌপদী। মাতুল, আমি এখনও স্বয়ম্বরের অপমান ভুলতে পারি নি। শকুনি। তার পর এই রাজসূয়। অপমানের যেটুকু বাকী ছিল, তা পূর্ণ হ’ল এই যজ্ঞে! লজ্জায়, অপমানে, ধিক্কারে—দুৰ্য্যোধন—কি আর বলব এ বুকের মধ্যে যে কি ঝড় তা তােমায় দেখাতে পারছি নি। প্রতি নিশ্বাসে অন্তরের উত্তাপ ছুটে বেরােচ্ছে! মহামানী দুর্যোধন কানে এ ধ্বনি এখন ব্যঙ্গ বলেই মনে হয় ! তােমাদের এখানে না এসে, আমার বনেই বাস করা উচিত ছিল।
৬৪
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
যুধিষ্ঠিরের প্রবেশ
যুধি। এই যে সুযােধন! ভাই, বৃহৎ কাৰ্যে অনেক ত্রুটী বিচ্যুতি হয়েছে,
কিছু মনে কোনাে না, কিছু মনে রেখাে না।
দুৰ্য্যো। না—না, মনে কি রাখব ?
শকুনি। তবে ঐ কপালের ফুলােটা। যতক্ষণ ব্যথা, ততক্ষণ মনে তাে
থাকবেই। আহা, কি সভাই করেছিল ময়দানব ! দানবীয় কাণ্ড
কি না? শুভ ক’তে গিয়ে, হয়ে গেল অশুভ। স্ফটিকের এমন
কারিকুরি—তিন হাত চওড়া দেওয়াল-মনে হ’ল কি না প্রশস্ত
পথ! কি বলব, বাবাজীর মাথা—একেবারে নিরেট্ লৌহপিণ্ড
নইলে আর কারো হলে গুড়িয়ে চুরমার হয়ে যেত।
যুধি। দানবীয় সৃষ্টি ! আমাদের সকলেরই ভ্রম হয়েছিল।
শকুনি। আর সত্যিকার জলটা ? দেখেছ তো বাবাজী, যেন ঘাস বিছান
মাঠ! যেমন দুৰ্য্যোধন পা বাড়িয়েছেন, একেবারে এক গলা জল!
চারিদিকে কি হাসির ধূম—বিশেষতঃ দ্রৌপদীর !
যুধি। সভার নির্মাণ-কৌশল দেখে সকলেই চমৎকৃত হয়েছিল! এও
আমার সুযােধনেরই গৌরব।
কৃষ্ণ, দুঃশাসন ও কর্ণের প্রবেশ
শ্রীকৃষ্ণ। রাজন্যবর্গকে বিদায় দিয়ে এলেম, তারা মহানন্দে স্ব স্ব দেশে
প্রস্থান ক’লেন। কুরুপতি দুর্যোধন! তােমার অভ্যর্থনায় আদরে
আপ্যায়নে সকলেই প্রীত, শতমুখে তােমার প্রশংসাধ্বনি, তুমি
সমাগত সকলেরই মৰ্যাদা অক্ষুন্ন রেখেছ।
শকুনি। হা-হা, মানী নইলে কি মানীর মান রাখতে জানে ? মহামানী
দুৰ্য্যোধন-কথার কথা তাে নয় ?
শ্রীকৃষ্ণ, মাতুল ঠিকই বলেছেন। দুৰ্য্যোধনকে আপনি যেমন চেনেন,
৫
প্রথম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
তেমন আর কে বলুন? গুণমুগ্ধ বলেই তাে ছায়ার মত তার সঙ্গে
সঙ্গে আছেন।
শকুনি। (স্বগত) ঠাট্টা করলে না কি ?
আকৃষ্ণ। আর মহারথ কর্ণ, তােমার প্রশংসারও অন্ত নেই; এই বিরাট
যজ্ঞ দানে তুমি সকলকে চমৎকৃত করেছ। তােমার দানে যাচক মুগ্ধ ;
ভীষ্ম প্রভৃতি সকলেই স্বীকার করেছেন। তােমর ন্যায় মুক্তহস্ত দাতা
কেউ কখন দেখেন নি।
কর্ণ। যদুপতি! তুমি যে যজ্ঞের ঈশ্বর সে যজ্ঞে তােত কোন ক্রী
হবে না—এতে আর আমাদের গৌরব কি এ যজ্ঞের সকল গৌরবই
তাে তােমার!
শকুনি। তবে কি না, দুষ্টলােকের জিহবা বায়ুর মতই মুক্ত, আটকাবার
যাে নেই। আমার সত্য কথা বলাই অভ্যাস ; যেমন শুনেছি, তাই
বলছি। লােকে বলছে, পরের ধন বিলিয়ে সকলেই অমন দাতা
হতে পারে।
কর্ণ। বলছে না কি ?
শকুনি। কা’র মুখ চাপা দেবে বল ? বলছে বৈ কি।
কর্ণ। কিন্তু আমি তো
যুধি। না—না, কেন কুষ্ঠিত হচ্ছ? আমি তাে তােমায় পর ভেবে
ভার দিই নি ; সহােদরের মত প্রিয়জ্ঞানেই, তােমার স্বভাব জেনেই
যদুপতি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশেই তােমাকে এই গুরুভার দিয়েছিলাম।
তােমার ন্যায় দানবীর ভারতে আর কে আছে ভাই ?
দুঃশা। তা আপনি যাই বলুন, মাতুল মিথ্যা বলেন নি। এ দানে কর্ণের
সুখতি অপেক্ষা নিন্দাই হয়েছে অধিক।
শ্রীকৃষ্ণ। যদি নিন্দাই হয়ে থাকে, সে নিন্দা কর্ণের নয়—আমার ; কে
না, আমি কর্ণকে এই ভার দিতে বলেছিলেম।
=
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অল্প
শকুনি। একেই বলে ভাগ্য, ভাল কাজ করেও কর্ণের অদৃষ্টে যশ নেই।
কর্ণ। সত্য, হে মাতুল !
চিরদিন মন ভাগ্য আমি!
করিয়াছি শ্রীকৃষ্ণের আদেশ পালন
ভৃত্য আমি,
কর্ণ।
নিন্দা-স্তুতি সমান আমার।
করি নমস্কার
রাজীব চরণে যদুপতি,
দেহ বিদায় আমারে।
হে পাণ্ডব !
পরিতৃপ্ত যত্নে তােমাদের ;
কৃতজ্ঞতা কি ভাবে প্রকাশি বল ?
যুধি। ভাই, সত্য বল, লােকের কথায় তুমি ব্যথিত হও নি ?
( বিবাদ হাস্যে) ব্যথা ?
কোথা ব্যথা
ব্যথাহারী সম্মুখে যাহার।
কর্ণের প্রস্থান
দুৰ্য্যো। ভাই তা হলে আমরা এইখান থেকেই বিদায় গ্রহণ কল্লেম,
আর তােমাদের কষ্ট করে আসতে হবে না। বহু অতিথি পুরে, যাও,
সকলেই যােগ্য আদরের প্রার্থী।
শ্রীকৃষ্ণ। এস রাজা। দুর্যোধন বিদায়। শ্রীকৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের এহান
শকুনি। বাবা, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেম। এক বিদায়ের ধাক্কায় অস্থির ;
চল, আমরাও ঘরে ফিরি।
দুৰ্য্যো। এখন বুঝতে পাচ্ছি, এ যজ্ঞে আমাদের না আসাই উচিত ছিল।
দুঃশা। আমার তাে মুখ দেখাতে লজ্জা করছে!
প্রথম দৃশ্য কর্ণার্জুন 5 শকুনি। কিন্তু মুখ তো দেখাতেই হবে। দুৰ্যো। হাঁ, দেখাতেই হবে। দুঃশাসন, কাতর হয়াে না। কাপুরুষ অপমানে মলিন হয় ; যে বীর, সে অপমানে জ্বলে উঠে। সে বেঁচে থাকে অপমানের প্রতিশােধ নেবার জন্য ! শােন দুঃশাসন, শােন মাতুল —আজ থেকে আমি পিতৃদ্রোহী, মাতৃদ্রোহী, আত্মীয়দ্রোহী! আজ থেকে আমার আহারে বিহারে, শয়নে স্বপনে, একমাত্র চিন্তা-পঞ্চ- পাণ্ডবের মৃত্যু! পঞ্চপাণ্ডবের উচ্ছেদই আজ থেকে আমার ব্রত। শকুনি। ছলে হ’, বলে হক, কৌশলে হ’-জেনাে দুৰ্য্যোধন, এই ধ্বংস যজ্ঞে আমিই তােমার একমাত্র সহায়। ভীষ্ম নয়, দ্রোণ নয়, কর্ণ নয় —আমি—শকুনি—এই ধ্বংসের বীজ-বহুদিন হ’তে সংগ্রহ করে রেখেছি; কেবল সুযােগর অপেক্ষা করছিলেন। সে আগুন বলে উঠেছে, তাকে নিবতে দিও না। অপমানের উচিত বিধান আমিই দুৰ্যো। এস দুঃশাসন, এস মাতুল। শকুনি। দুৰ্য্যোধন ও দুঃশাসনের স্থান ধীরে- ধীরে মিশে কাল অনন্তের কোলে! কহ অন্তর্যামী, কত দিন-কত দিন আর ? অন্ধকার কারাগারে বন্দী পিতা গান্ধার ঈশ্বর, সহ শত ভাই মােয়া- বৃদ্ধ শীর্ণ জরাভারে, মুক্তি দিল মৃত্যু একে একে! আমি শুধু’রহিলাম প্রাণে পিতৃ-সত্যে আবদ্ধ শকুনি কুরু-কুল ধ্বংসব্রত উদ্যাপন হেতু।
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
কহ পিতা, কহ, কত দিনে
শত ভাই দুৰ্য্যোধন লুটাবে ধরায়,
শত বিনিময়ে শত
কত দিনে ঋণমুক্ত হব আমি।
অস্থি তব পরিণত অক্ষের আকারে,
অতি যত্নে রাখি বক্ষ মাঝে ;
দধীচির অস্থি সম
কত দিনে
এই বজ্রে কুরুচুড়া পড়িবে খসিয়া-প্রতিহিংসা তৃষা
কত দিনে মিটিবে আমার ?
কহ—কত দিনে
শত ক্ষুধিতের অল্প ঋণ
শুধিবে শকুনি একা?
প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
প্রান্তর
নিয়তি
কালপ্রবাহ চলে ধীরে-ধীরে
জীবন মরণ ছায়া ভাসে কার-নীরে।
কভু কুসুম বিতান,
কুহু কুহু পাখী করে গান,
রােদন ধ্বনি কভু ছায় গগন ঘিরে।
হাসে—হাসে, কভু শিয়রে তরাসে,
উন্মাদিনী কেরে ফিরে আকুল তীরে
তৃতীয় দৃশ্য হস্তিনা প্রাসাদ-কক্ষ শকুনি শকুনি। যদি ধৃতরাষ্ট্র হয় অসম্মত? অসম্ভব। ভিত্তিহীন আশঙ্কা আমার। দুর্বলতা অন্য নাম যার অনায়াসে বিজ্ঞ জনে করে জ্ঞানহীন, বিশেষতঃ-পুত্রস্নেহ ! সুরে বাঁধা সুর- পিতা হেরে পুত্র-হৃদে প্রতিবিম্ব নিজ, সমপ্রাণ হয় দোহাকার- পায় লােপ বিচার বিবেক। দুৰ্য্যোধন বুঝেছে যখন এই অক্ষে পাণ্ডবের হবে সর্বনাশ, অন্ধ রাজা বুঝিবে নিশ্চয় ; ফল করে বৃক্ষের নির্দেশ। দুর্বোধনের প্রবেশ দুৰ্যো। মাতুল, পিতা সম্মত হয়েছেন। শকুনি। হতেই হবে, হতেই হবে এ আমি জাতেম। দুর্যো। তবে পিতা বলছিলেন, এ উপলক্ষে কোন বিরােধ না হয়।
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
শকুনি। এখানে মন আর মুখ এক কথা বলে নি। খেলার কল্পনাই
তো বিরােধ থেকে—আড়ি অর্থাৎ ভাবের অভাব।
দুৰ্য্যো। ভীষ্ম দ্রোণ ও বিদুর মহা আপত্তি তুলেছিলেন।
শকুনি। সব মুছে ফেলে দেব, কোন চিন্তা নেই, ভীষ্মও থাকবে না,
দ্রোণও থাকবে না। অস্থিসিদ্ধ।
দুৰ্যো। রাজসূয় যজ্ঞে যে ঐশ্বৰ্য্য দেখিয়ে আমায় অপমান করেছে, এই
পাশা খেলায় যুধিষ্ঠিরের সে ঐশ্বৰ্য্য সব জয় করে নিতে পার, তা
হলে বুঝি তােমার পাশার গুণ।
শকুনি। চিরদিন এই সাধনা করে এসেছি। যদি ই কি কুবের
আমার সঙ্গে পাশা খেলায় বসেন,তাদেরও সৰ্বস্ব খুইয়ে পথের ভিখারী
হতে হবে—পঞ্চপাণ্ডব তাে কোন ছার!
দুর্যো। আমি বিদুরকে পাঠিয়েছি, এই দূতক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরকে নিমন্ত্রণ
করতে।
শকুনি। বিদুর যে বড় সম্মত হ’ল ?
দুৰ্য্যো। পিতা বল্লেন—ধর্মভীরু—জ্যেষ্ঠের আজ্ঞা অমান্য করতে
পালেন না।
শকুনি। বেশ, এখন সভার আয়োজন। পাশার নেশা-একবার ছক
পাততে পারলে হয়। ঘুরিয়ে দেব, সব ঘুরিয়ে দেব। যুধিষ্ঠির,
ভীম, অর্জুন—সব ধেই ধেই নাচতে আরম্ভ করবে; আর তেমন
তেমন হয় তাে দ্রৌপদীও বাদ যাবে না।
ভীমের প্রবেশ
ভীম।
বংস,
এখনাে বুঝিয়া দেখ,
ভ্রাতৃদ্বন্দ্বে কভু নাহি ফলে শুভফল।
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
অন্তর বিকল
বৃদ্ধ আমি,
ভবিষ্যৎ নেহারি শিহরি।
পাণ্ডু আর ধৃতরাষ্ট্র,
দুই জানুপরে দুই ভাই,
সংসার-বিরাগী ভীষ্মের দুইটী বন্ধন,
তাহাদের বংশধর তাের,
মেহনীড়ে করেছি বর্ধিত
নীচ ঈর্ষা করিয়া পােষণ
সেই বংশমূলে
নিজ করে না হান কুঠার !
অতি ধীর পঞ্চ ভাই পাণ্ডুর তনয়
সদা ধৰ্ম্মে মতি
অনর্থক তাহাদের কোরাে না পীড়ন।
দুৰ্য্যো। পিতামহ কেবল পাণ্ডবদেরই ধার্মিক দেখেন। আমরা কি
অধার্মিক? ক্ষত্রিয়ের পক্ষে যুদ্ধও যেমন শাস্ত্রবিধি, অক্ষ-ক্রীড়াও
তেমনি নীতি-বিরুদ্ধ নয়। এতে পীড়নই বা কি, আর আশঙ্কাই বা
কি? শাস্ত্ৰকারেরাই এ কথা বলে গেছেন।
ভীষ্ম। সকলের চেয়ে বড় শাস্ত্রকার বিবেক। কোথাও ধৰ্ম্ম, কোথায়
অধম্ম, শাস্ত্রের সূত্র দিয়ে সব সময় তা বােঝা যায় না। হৃদয়ের
অপেক্ষা মীমাংসাকার আর নাই। দুর্যোধন, আমার ইচ্ছা ছিল,
এই দ্যুত-ক্রীড়ায় তুমি না প্রবৃত্ত হও।
দুৰ্য্যো। আপনি, আচাৰ্য দ্রোণ, পিতৃব্য বিদুর ওঁদের পরামর্শ শুনে
কাজ কর্তে গেলে আমায় বানপ্রন্থে যেতে হয়। পাণ্ডবেরা আপনাদের
প্রিয়, আমরা চক্ষুশূল!
কর্ণার্জুন তৃতীয় অঙ্ক শকুনি। না, না, ওঁরা বৃদ্ধ হয়েছেন, পরকালের চিন্তা অধিক, তাই আশঙ্কা করেন! দুৰ্যো। আমি সব বুঝি । রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষে আমাকে যখন অপমান ক’বার সঙ্কল্প করেছিল—কৈ, তখন তাে পাণ্ডবদের কেউ নিবারণ করেন নি? আমি ধৰ্ম্মও জানি, অধৰ্ম্মও জানি, কিন্তু তাতে আমার প্রবৃত্তি নিবৃত্তি নাই, আমার হৃদয় যা বলবে আমি তাই ক’ব শত ভীষ্ম, শত দ্রোণ, শত বিদুর আমায় সঙ্কল্পচ্যুত কতে পাবেন। । এস মাতুল, সভার আয়ােজন করি। শকুনি। প্রণাম, ভীষ্মদেব প্রণাম। কুরুবৃদ্ধ আপনি, আশীৰ্বাদ করুন- যেন আমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। শকুনি ও দুর্যোধনের প্রস্থান ভীম। সত্য সত্য- বৃথা চেষ্টা মানবের, বৃথা আকুলতা! বৃথা শাস্ত্রের শাসন! ধৰ্ম্মাধর্ম প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি অর্থহীন শব্দ আড়ম্বর। সর্বজীবে সৰ্ববিশ্বে স্থাবর জমে, সর্বকাৰ্যে সকল কারণে বিদ্যমান তুমি হৃষীকেশ ! অহি-দন্তে তুমি বিষ, তুমি সুধা জননীর হৃদয়-আধারে; হাসি অ—একাধারে মূরতি তােমার! ভুলে যাই, তাই কাদে প্রাণ, হই আতঙ্কে আকুল
চতুর্থ দৃশ্য
কর্ণার্জুন
অহঙ্কারে হই দিশে হারা ।
হৃদিস্থিত তুমি হৃষীকেশ,
অখিলের বিকাশ বিনাশ,
অধঃ উর্ধে সম্মুখে পশ্চাতে
লহ প্রণাম আমার ।
ইন্দ্রপ্রস্থ—উদ্যান
দ্রৌপদীর সখীগণের গীত
মাধব, রেখো চরণে
যুবতী ধরম সপেছি তােমারে
চিরদিন থেকে স্মরণে
যেতে চাও যাও যতেক দুরে
আসন তােমার যতনে পতিয়া রাখিব হৃদয় পুরে
তুমি এস ওগাে এস আপন বিয়ে
ভুলো না জীবনে মরণে।
ক ও পীরু এবেশ
কৃষ্ণ। সখি, তা হলে আমায় বিদায় দাও, বহুকাব্য ফেলে এসেছি।
রাজসুয়ে বহু আনন্দে দিন কেটেছে, আর তো বিলম্ব কতে পারি
না; আবার আসব, আবার দেখা হবে।
ক্রৌপদী। তােমার কাৰ্য্য তুমি জান যদুপতি, আমি তােমায় বিদায় দিতে
পাৰ না।
1ঃ ৫ কর্ণার্জুন তৃতীয় অঙ্ক শ্রীকৃষ্ণ। যুধিষ্ঠির, ভীমার্জুন সকলের নিকটেই বিদায় নিয়ে এসেছি, তুমি ছেড়ে দিলে আমি তাে যেতে পারি না। দ্রৌপদী। আঁখি-জল কণ্ঠ করে রােধ কেমন বিদায় দিব ? সখি বলি’ সম্বােধন করিয়াছ মােরে, হইয়াছে সার্থক জীবন ; আর কিছু নাহি চাই চরণে তােমার দেখে সখা, ভুলাে না সখীরে কভু। ভুলিব তােমারে ? বৃথা এ আশঙ্কা সতী অভিন্ন পাণ্ডব কৃষ্ণ। তবে কেন অভিমান ? আছি—রব চিরদিন বাঁধা। দ্রৌপদী। কথায় কে আঁটিকে তােমারে ? চিরদিন তুমি প্রতারক, মিথ্যা নহে এই বাণী। শ্রীকৃষ্ণ। যদি হই প্রতারক, প্রতারণা শিখেছি নারীর কাছে। রেখাে মনে—দাও গো বিদায়। লহ প্রণাম আমার। কৃষ্ণ। দ্রৌপদী। শ্রীকৃষ্ণ। পুনঃ কবে দেখা হবে? যখনি ডাকিবে ; আসি তবে। দ্রৌপদী কি যে ব্যথা বিরহে তােমার, সেই জানে,
চতুর্থ দৃশ্য
কণার্জুন
যারে ভাল বাসিয়াছ তুমি !
তুমি কাদাও সকলে,
কিন্তু কারো তরে প্রাণ কঁাদে কি তােমার ?
তুমি জান মহিমা আপন,
অজ্ঞ নারী
আমি শুধু জানি চরণ তােমার।
যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের প্রবেশ
যুধি। যদুপতি চলে গেলেন, আর সুযােধনের নিমন্ত্রণ নিয়ে পিতৃব্য
বিদুর এসে উপস্থিত হলেন। মুহূর্ত পূৰ্বে এলে কর্তব্য নির্ধারণ
আকৃষ্ণই ক’তেন! এখন কি করি? দূত-যুদ্ধে আহ্বান—এ তাে
প্রত্যাখ্যান করতে পারি না।
ভীম। এ অক্ষ-ক্রীড়ায় দুর্যোধনের কিছু দুরভিসন্ধি আছে ?
অৰ্জ্জুন। অনুমানের উপর ত সত্যাসত্য নির্ধারণ করা যায় না।
যুধি। তা হলে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি, কি বল ?
অর্জুন। আপনি এ কথা আমাদের জিজ্ঞাসা ক’ছেন কেন? আপনি
রাজা, আমরা আপনার অনুগামী ভৃত্য।
ভীম। নিমন্ত্রণ গ্রহণ না করলে দুর্যোধন মনে করবে আমরা ভয়ে তার
নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি নি।
যুধি। তােমাদের সকলেরই তা হলে এই মত? পাঞ্চালি, তােমার কি
অভিপ্রায় শুনি ?
দ্রৌপদী। যখন তােমার আদেশে অৰ্জ্জুন লক্ষ্যবেধ করেছিল, তখন কি
আমার মতামত জিজ্ঞাসা করেছিলে ? স্বয়ম্বর সভার যখন লক্ষ
রাজাকে পরাস্ত করেছিলে, তখন কি আমার মতামত জিজ্ঞাসা
করেছিলে? তবে আজ এ রহস্য কেন ?
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
যুধি।
যুধি। ধর্মপত্নী যে মন্ত্রণায় সচিব।
দ্রৌপদী। দাসীও বটে।
না, নহ দাসী,
সৰ্ব্ব অধিশ্বরী তুমি।
ভীম। তা হলে আমিই পিতৃব্য বিদুরকে বলে আসি যে, আমরা প্রস্তুত ?
যুধি। না না, চল, সকলে এক সঙ্গেই যাই।
দ্রৌপদী ব্যতীত সকলের প্রস্থান
দ্রৌপদী। যুদ্ধ বা ক্রীড়ায় ক্ষত্রিয়ের সম উল্লাস, ক্ষত্রিয়ের চরিত্রই
বিচিত্র।
নিয়তির প্রবেশ
নিয়তি। তােমার পাঁচ স্বামী পাশা খেলতে চলল, তুমি বেশ আছ ?
চোখে জল নেই, কাদছ না।
দ্রৌপদী। কেন, কাদব কেন ?
নিয়তি। রাজসূয় যজ্ঞে বড্ড হেসেছ, একটু কঁদবে না? কবে-কাবে
-খুব কদবে। তােমার-চোখের জলে আগুন জ্বলবে! এক এক
ফোটা জল দাবানলের সৃষ্টি করবে! তুমি আর কাদবে না ?
দ্রৌপদী । কে তুমি এমন অমঙ্গলের কথা ব’ছ? তােমায় তো কখনাে
দেখি নি, তােমার কথা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল কেন ?
নিয়তি।
ধরিত্রী কঁপিবে ;
সরিৎ সাগর
অভ্রভেদী সুমেরু-শিখর,
তারামালা চন্দ্রমা তপন,
বাতাহতপত্র সম সঘনে কাঁপিরে,
দিকে দিকে দ্বিগঙ্গনা
চতুর্থ দৃশ্য
৭৭
কর্ণার্জুন
হাহাকারে থরথরি উঠিবে কাপিয়া
আজি সূচনা তাহার
অতীতের যবনিকা পারে,
মন্দাকিনী তরঙ্গ লহরে,
মায়াবিনী আঁখি-নীরে
ভেসেছিল প্রস্ফুটিত কনক কমল,
অদূর ভবিষে
দর বিগলিত ওই তব নয়নের ধারে,
ফুটিবে অনল-পদ্ম
তৃঙ্গ সম দুৰ্ম্মদ ক্ষত্রিয়-দল
সে আগুনে হবে ছারখার
আজি চনা তাহার
কাদ-কাদ নারি।
ক উচ্চতরালে,
-ধক দাবানল জ্বলুক ভীষণ !
ভস্ম হক অত্যাচারী নর।
প্রস্থান
দ্রৌপদী। কে এ অপরিচিতা আমার আনন্দের ঘর এক নিশ্বাসে ভেঙ্গে
দিয়ে গেল।
बशन
পম দৃশ্য
হস্তিনাকুরুসভা
ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, বিদুর, দুৰ্য্যোধনাদি,
যুধিষ্ঠিরাদি ও শকুনি, প্রতিকামীইত্যাদি।
দুৰ্য্যোধন। হে মাতুল, অদ্ভুত নৈপুণ্য তব
অক্ষ নহে,
জয়লক্ষ্মী পাশার আকারে--
নিমেষে জিনিলে সব!
কহ যুধিষ্ঠির,
রাজসুয়ে স্ফটিক তােরণ
হইয়াছে ধূলিসাৎ ?
রাজত্ব সম্পদ
হারাইলে সকলি অকালে।
বিনা পঞ্চ ভাই,
আছে কিহে আর কিছু রাখিবারে পণ?
ভীম।
নিশ্চয় এ মায়া-অক্ষ নাহিক সন্দেহ,
মায়াধর শকুনি নিশ্চয়,
মায়াবলে দুরাচার জিনে বার বার
অ অক্ষ ল’য়ে কর খেলা।
শকুনি। ত’ তো নিয়ম নয়। যে পাশা নিয়ে আরম্ভ হয়েছে, সেই
পাশাতেই শেষ ক’তে হবে। ভীমসেন! দুরাচার ব’ছ বটে, কিন্তু
বুদ্ধনীতি তাে কিছু কিছু জানি। ভাল, সভাস্থ সকলে বলুন, আমি যা
বলছি তা যদি সত্য না হয়, এই পাশা ফেলে দিয়ে উঠে যাচ্ছি। যুদ্ধে
বা ক্রীড়ায় যে ভয় পায়,তার সঙ্গে সন্ধি করারও একটা নিয়ম আছে।
পঞ্চম দৃ
কর্ণার্জুন
যুধি। মায়া যদি হয়,
কিবা ক্ষতি তাহে ?
এ সংসার মায়ার আগার—
অলক্ষ্যে বসিয়া মায়া ফেলে অক্ষপাটী,
মন্ত্রমুগ্ধ খেলে নর মায়ার নির্দেশে !
ভাল, সন্ধি করিব মাতুল,
আগে সন্ধিক্ষণে
বলি হক পঞ্চ পাণ্ডুর তনয় !
শকুনি। হাঁ হাঁ, এই তাে বীরের মত কথা ? এই তাে চাই। তাহলে
কি পণ করবে, পণ কর।
যুধি। এ বারের পণ
যদি হারি
পঞ্চ ভাই
কৌরবের দাসত্ব করিব অঙ্গীকার।
শকুনি। কত দিনের জন্য দাসত্ব অঙ্গীকার কবে ? আজীবন বােধ হয়।
ধৃত। থাক থাক, আর কাজ নেই, যথেষ্ট হয়েছে; বৎস দুৰ্য্যোধন এইবার
ক্ষান্ত দাও। আজীবন দাসত্ব-বড়ই গর্হিত, বড়ই গর্হিত ।
শকুনি। রহস্য-রহস্য! বুঝেছেন কৌরবের, সব রহস্য। দাস বল্লেই
কি দাস? আজীবন না হয়—যুধিষ্ঠির বারাে বৎসরের জন্য দাসত্ব
অঙ্গীকার করুন। বারো বছর—এমন কি বেশী।
ধৃত। বারাে বৎসর রাজপুত্রের দাস হয়ে থাকবে ?
শকুনি। তার স্থিরতা কি? আমিও তাে হারতে পারি ?
ধৃত। বারাে বৎসর! বড় বেশী হ’ল-বড় বেশী হ’ল।
দুৰ্য্যো। পিতা স্থির হ’ দেখুন না পরিণাম কি হয়।
বিদুর। পরিণাম দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি, পরিণাম ধ্বংস।
কর্ণার্জুন তৃতীয় অফ দুৰ্য্যো। এ সভাস্থলে ভিক্ষুকের কিবা প্রয়ােজন? যান পিতৃব্য, আপনার কুটীরে বসে কৃষ্ণ নাম করুন। বিদুর। ভীষ্ম, দ্রোণ, নীরব সকলে ? কেহ নাহি করে নিবারণ ? মায়া-অক্ষে খেলিছে শকুনি অভিসন্ধি তার বুঝিবারে নারি। দুৰ্য্যোধন, শুনহ বচন, বিষ সংহরিয়া পঞ্চ নাগ, পঞ্চ জ্ঞাতি তব, পঞ্চ পাণ্ডুর কুমার বসি আছে স্থির মুখে তার স্ব-ইচ্ছায় অঙ্গুলি প্রদান কভু নাহি কর- এখনও নিবৃত্ত হও। আমি দরি ভিক্ষুক, সত্য বটে রাজসভা নহে যােগ্য-হান মাের। দুর্নীতির সহবাস ত্যজিতে উচিত। এখন দুৰ্যো। আমার আত্মীয় নন, বিদুর আমার চির-শ। ভাল বাদশ বৎসরের জন্য দাসত্ব স্বীকার, এইবার যুধিষ্ঠিরের পণ হক। মাতুল আপনি ভাগ্য পরীক্ষা করুন। শকুনি। শুষ্ক অস্থি হও, সঞ্জীবিত । বহুদিন শুষ্ক তুমি আকুল তৃষ্ণায় আজি প্ৰাণ পুরে মিটাও পিপাসা কর্ণার্জুন ৮১ হাঃহাঃ! সাবাসি মাতুল ! প্রত্যক্ষ আমার অক্ষ- দেখ ভাগ্যপটে লিখিয়াছে শকুনির জয়। দুৰ্য্যো। কহ যুধিষ্ঠির, আর কিবা করিবে হে পণ ? কর্ণ। আছে মাত্র দ্রৌপদী সম্বল । ভীষ্ম। আরে হীন রাধার নন্দন, এত স্পর্ধা তাের । কুললক্ষ্মী মা আমার পাঞ্চাল-নন্দিনী নীচ তুই, সুত-অম্নে বর্ধিত শরীর, হীন রসনায় তাের উচ্চারণ করিস পামর ভরত বংশের কুলবধূ নাম-- মৰ্যাদা যাহার ঈর্ষা করে সুরনারী নন্দনে বসিয়ে । ধিক্ ধিক্, কি কব অধিক তােরে বংশােচিত বুদ্ধি তাের আরে রে অধম ! ধৃত। থাক থাক কাজ নেই,কুলবধূ-কুলবধূ! দুর্যোধন, মা আমার কুলৰধূ! দুৰ্য্যো। পিতামহ, রহ স্থির, রাজায় সভাসীন তােমর সকলে। আমি কহি- নহে কর্ণ, আমি কহি, শুন যুধিষ্ঠির, কর্ণার্জুন তৃতীয় অঙ্ক দ্রৌপদীরে রাখিবারে পণ, সন্মত কি তুমি ? দুৰ্য্যোধন, এইবার নিরুত্তর করিয়াছ মােরে। ভীষ্ম। ভীম। রাজা! যুধি। শকুনি। নহি রাজা, দাস মােরা, প্রভু সুযােধন, দাস মােরা পঞ্চ ভাই। ভাল, হে মাতুল, করিলাম পাঞ্চালীরে পণ! ভাল তাল, দেখ অক্ষ কিবা কহে 'হের দেখ, সুপ্রসন্ন তাগ্য কৌরবের, পরাজিত যুধিষ্ঠির ! হে মাতুল, দেহ পদধূলি, তুমি আজ উড়াইলে কৌরবের গৌরব-নিশান রাজসূয় অপমান শােধ দিলে। শকুনি। এই বটে সুচনা তাহার ! দুৰ্য্যোধন। কৌরব-ঈশ্বর! শুষ্ক অস্থি তৃপ্ত এত দিনে। ওই দেথ- ক্ষুধাতুর কাতর নয়নে চাহে ;
পঞ্চম খ
কর্ণার্জুন
ঋণ শােধ’--ঋণ শােধ
শুষ্ক-কণ্ঠে উঠে ধ্বনি অবিরাম,
চারিভিতে প্রতিধ্বনি তার
করে হাহাকার।
তুমি তৃপ্ত—আমি তৃপ্ত-তৃপ্ত পিতৃলােক?
ঋণ শােধ বুঝি হয় এত দিনে।
শকুনির প্রস্থান
দুৰ্য্যো। তা হলে যুধিষ্ঠির। আর সম আসনে কেন? যাও, রাজমুকুট
পরিত্যাগ করে পঞ্চ ভাই দাস-যােগ্য স্থানে বােসস গে।
যুধি। ভাই, সত্য বটে,
রাজবেশে আর নাহি অধিকার।
ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব,
অনুগামী ভাই মাের।
অর্জুন। হে অগ্রজ, তুমি যদি আজ ভৃত্য, আমরা তা হলে ভৃত্যের ভৃত্য।
এই রাজমুকুট রাজবেশ পরিত্যাগ কলেম।
ভীম। দুর্যোধন! মায়া অক্ষের ছলনায় পরাস্ত করেছ বটে, কিন্তু
জেনাে-ভীমের এ গদা—এ মায়া নয়। তােমার এ দুরাচারের
প্রতিফল আমিই দেব।
যুধি। ভাই, সত্যবদ্ধ আমি।
ভীম। তােমার সত্য যাই হক, আমার সত্য তুমি। তুমি যার দাস হও,
আমার রাজা তুমি। তােমার অপমান আমি প্রাণ থাকতে দেখতে
পারব না।
অর্জুন।
হে মধ্যম।
ক্রোধ কর সম্বরণ
নাহি হও বিস্মরণ
ধর্মরাজ অনুগামী মাের।
}
3
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
হিতাহিত জ্ঞান, মান অপমান,
সুশ সম্মান,
জ্যেষ্ঠ-পঙ্গে সব দিছি বিসর্জন।
মিথ্যাবাদী হবে যুধিষ্ঠির,
চারি ভাই মােরা রহিতে জীবিত?
ভবিষ্যৎ বংশধর গাহিবে কুষশ,
সত্য-ভ্রষ্ট হবে-
জগৎ হাসিবে-
নিদারুণ এ কলঙ্ক
সহিতে কি জনম মােদের ?
কিবা ক্ষতি?
হব ভৃত্য জ্যেষ্ঠের আদেশে,
অনুজের এই তো আচার।
দুঃশা। যাও যাও, ভৃত্যের আসনে বসগে যাও।
দুৰ্য্যো। হাঁ হাঁ ! আর পণে বদ্ধা দ্রৌপদী তাে আজ থেকে
কৌরবের দাসী। প্রতিকামী। যাও, দ্রৌপদীকে কৌরবসভায়
নিয়ে এস।
প্রতিকামীর প্রস্থান
ভীম। (অর্জুনের প্রতি) ইহাও সহিতে হবে।
অর্জুন। নিয়তি-লিখন ।
ধৃত। বড় বাড়াবাড়ি হ’লবড় বাড়াবাড়ি হ’ল। না সঞ্জয়, আর নয়,
আমার হাত ধর, আর এখানে নয় আর এখানে নয় ; কুললক্ষ্মীর,
অপমান! জন্মান্ধ-দেখতে হবে না, কানেই:বা শুনি কেন? সঞ্জয়,
আমার হাত ধর—হাত ধর। পুত্রের নিতান্তই অবাধ্য !
সঞ্জয়ের সহিত স্থান
পঞ্চম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
৮
ভীষ্ম। দুৰ্য্যোধন, এখনো কি সভায় থাকতে হবে।
দুৰ্য্যো। হাঁ হুঁ, বসুন—আপনি, আচাৰ্য দ্রোণ ; এত মমতাই বা কেন?
দ্রোণ।
হে গাঙ্গেয় ; এই তাে প্রায়শ্চিত্তের আরম্ভ, এর শেষ কোথায়?
ভীষ্ম।
অন্ন-ঋণে বদ্ধ দেই,
হে আচাৰ্য্য,
প্রায়শ্চিত্ত হইবে সম্পূর্ণ
জীবন আহুতি দানে।
প্রতিকামীর পুনঃ প্রবেশ
দুৰ্যো। এ কি! তুমি একা কেন ?
প্রতি। দেবী বল্লেন, ধৰ্ম্মরাজ ভিন্ন তিনি আর কারও দাসী নন, তার
অনুমতি না পেলে তিনি কখনো সভায় আসবেন না।
দুৰ্যো। মুখ, তুমি দূর হও !—বিকর্ণ, তুমি যাও, উদ্ধতা পাঞ্চালীকে
এখনি এখানে নিয়ে এস।
বিকর্ণ। আমি এখনাে বুঝতে পাছি নি, এ সভাস্থলে অভিনয় হচ্ছে, না
এ সব সত্য ? কুরুরাজ ! সত্যই কি আপনার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে ?
পিতামহ ভীষ্ম, আচাৰ্য দ্রোণ, মহারথী কর্ণ! আপনারা জীবিত না
মৃত ? এত বড় অত্যাচার-যা পৃথিবীর কেউ কখনাে কল্পনাও
করে নি—সকলে নীরবে অনুমােদন করছেন ? আমার কুলবধূকে
অসূৰ্য্যস্পশ্যা ভরত-বংশের কুলবধূকে এই নরক-তুল্য সভায় নিয়ে
আব আমি? আর কেউ দ্রৌপদীকে আনতে যাবার পূর্বে আমি
জানতে চাই, দ্রৌপদী পণ্যা কি না—যুধিষ্ঠির তাকে পণ রাখতে
পারেন কি না।
দ্রোণ । (স্বগত) ধষ্ণ বিকর্ণ, ধন্য! কণ্টক-বৃক্ষেও অমৃত ফল ফলে,
তুমিই তার নিদর্শন।
৮ ।
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
দুঃশা। যুধিষ্ঠির পণ রাখতে পাবেন না কেন?
বিকর্ণ। আমি জানতে চাই, যুধিষ্ঠির তাে একা দ্রৌপদীর স্বামী নন
বুদ্ধিভ্রষ্ট যুধিষ্ঠির কোন্ অধিকারে ভীমার্জুনাদির বিন সম্মতিতে
দ্রৌপদীকে পণ রাখেন।
দুৰ্য্যো। বিকর্ণ, তুমি বালক, তােমার নিকট আমি উপদেশ শুনতে চাই
, আমার আজ্ঞা পালন কবে কি না?
বিকর্ণ। কখনই না।
দুৰ্যো। বিকর্ণ, ভুলে যাচ্ছ যে তুমি আমার কনিষ্ঠ ?
বিকর্ণ। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি আপনার সহােদর।
দুৰ্যো। তুমি এখনি এই সভাস্থল হতে দূর হও।
বিকর্ণ। এত বড় সৌভাগ্য আমার হবে, এ আমি আশা করি নি। ভীষ্ম,
দ্রোণ, যুধিষ্ঠির, আপনাদের মহিমা আপনারাই জানেন, আমি মুখ—
আপনাদের চরণে নমস্কার করে আমি এই পাপ-সভা ত্যাগ কল্লেম।
बहान
দুৰ্য্যো। উত্তম, তাই হ’!—দুঃশাসন, তুমি যাও, দ্রৌপদীকে কেশাকর্ষণ
করে নিয়ে এস।
দুঃশা। যথা আজ্ঞা।
দুৰ্যো। অগ্নি কাষ্ঠ হতে জন্মগ্রহণ করে কাঠকেই দগ্ধ করে, বিকর্ণের
প্রকৃতি সেই অগ্নির মতই দেখছি।
নেপথ্যে দ্রৌপদী। ছাড়, ছাড়, দুরাচার।
একবা নারী পুরবধূ কৌরবের,,
সভাস্থলে নাহি লও মেয়ে!
ভীম। অর্জুন! অৰ্জ্জুন!
অর্জুন। জ্যেষ্ঠের আদেশ।
পঞ্চম দৃঙ্গ কর্ণাৰ্জ্জুন ৮৭ দ্রোণ। মাধব! মাধব! হে মধুসূদন! কহ-কোন্ বজ্র ভীষণ এমন, দাসত্ব তুলনা যার ? কহ, পরাধীন পর-অভােজী দাস, পরার্থে বিক্রীত দেই- নর বলি’ কেন পরিচিত ? আমি দ্রোণ যজ্ঞসূত্রধারী, বীরশ্রেষ্ঠ কৌরব-আচাৰ্য্য, পর-আজ্ঞাবাহী দাস উপহাস এ হ’তে অধিক কিবা ? স্বাধীন কুকুর শ্রেষ্ঠ দেখি পরাধীন গুরু দ্রোণ হ’তে ! নেপীর কেশবপুর্বক দুঃশাসনের প্রবেশ ক্লোপ। ওগো—এত ছিল ভাগ্যে অভাগীর। কোথা দিগ্বিজয়ী জামিগণ মাের। বাঃ বাঃ- এই যে, ভৃত্যাসনে বসেছ সকলে। কহ ধৰ্ম্মরাজ। ভাৰ্য্যা দাসী কিবা নহে? হেঁট-মুণ্ডে বসে আছে ভীম, ফানী নীরব সহদেব নকুল নিস্পন, আমি পাণ্ডব-মহিষী সামান্য-বনিতা সম ৫ ৮ কর্ণার্জুন তৃতীয় অঙ্ক ভী। আজি দুঃশাসন কেশে ধরি’ করিছে দুর্গতি-- এ সমাজে পুরুষ কি নাহি কেহ ? পিতামহ, গুরু দ্রোণ, আর আর সভাজন যত- কহ, নীরব কি হেতু ? কহ, এই কি হে পুরুষের রীতি ? নীতিবিদ কহ মতিমা, কোন্ ধৰ্ম্মে কোন্ শাস্ত্রে আছে এই বিধি ? কুললক্ষ্মী মা আমার, উত্তর তােমার, অসিমুখে শােণিত-অক্ষরে চিরদিন কাললিপি-পটে রবে লেখা অত্যাচারী নরে পরিণাম তার করাতে স্মরণ। দুৰ্য্যো। দ্রৌপদী, ওখানে দাড়িয়ে কেন ? এস-দাসীর উপযুক্ত স্থানে ৰসৰে এস। (উরু দেখাইলেন ) তম। নভঃ বরিষ অনলধারা, ধরাভিত্তি হ’ক স্থানচ্যুত। আরে আরে কুরু-কুলাঙ্গার ! কি কহিব, সত্যে বদ্ধ, জ্যেষ্ঠ-অনুগামী ; কিন্তু শােন দুরাচার, প্রতিজ্ঞা আমার পূর্ণ হলে কাল, এই গদার আঘাতে ওই উরু তব পঞ্চম দৃশ্য কর্ণার্জুন দ্রৌপদী। রেণু রেণু করি’ উড়াব আকাশে। শােন দুঃশাসন । পশু তুই, কুলনারী-অপমান করিলি পামর, পশু-বক্ষ তাের বিদারিয়া নখে, তপ্ত বক্ত সেই দিন করিব রে পান, সেই দিন তৃপ্ত হবে প্রাণ ! শোন ভীম । দুঃশাসন ধরিয়াছে কেশে ; এই কেশ সেই দিন করিব বন্ধন যেই দিন তার বক্ষের শােণিত-সিক্ত-করে তুমি-তুমি বেণী মাের করিবে সংহার। আজি মনে পড়ে লক্ষ্যবেধ, মনে পড়ে, “সূতপুত্রে বরিব না কভু।” হে ফানি, আজি কোথা সে বীরত্ব তব ? শােন্-শােন্ দুরাচার, বীরত্ব বৈভব সমৰ্পণ করিয়াছি জ্যেষ্ঠের চরণে ; কিন্তু শােন দুষ্ট, প্রতিজ্ঞা আমার ধূলি সম উড়াইব কৌরবের দলে, নিজ হস্তে পশুবৎ বধিব রে তােরে আরে আরে সুতবংশাধম তুই বীরকুল-গ্লানি। কর্ণ। অর্জুন।
কর্ণার্জুন তৃতীয় অঙ্ক দুৰ্যো। নিৰ্বিষ ভুজঙ্গের আস্ফালন অসহ! দুঃশাসন, পণে বিক্রীত এই দাসীকে বিবস্ত্র কর তীম, দ্রোণ। নারায়ণ ! নারায়ণ ! কহ রাজা, এও কি দেখিতে হবে ? যুধি। অত্যাচারী-কল্পনা-ভীষণ! কল্পনা ভীষণ তবু ভাই, নাহি হও বিচঞ্চল। অক্ষ-পণে যবে সত্য করিয়াছি দান, সত্যগ্রাহী হইয়াছি যবে নহে কবির কল্পনা নহে বাক্যে নরত্বের আদর্শ সৃজন- এই চক্ষে হইবে দেখিতে, এই বক্ষে হইবে সহিতে, কল্পনার অতীত পীড়ন- পত্নী-পুত্ৰ সহােদর-নির্যাতন হক যতই ভীষণ । শােন ভীম, শােন ভাই, সহ-সহ বিকার-বিহীন-চিত্তে সহ কর এই অপমান-বনিতার এ লাঞ্ছনা; দেখিবে অচিরে নিজ বিযে হবে জর্জরিত, আজি যারা ব্যাভিচারী শক্তির প্রয়ােগে উৎপীড়িত করিছে মােদের!
পঞ্চম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
১১
দুৰ্যো। দুঃশাসন, দাড়িয়ে কি শু? দাসীকে বিবস্ত্রা কর।
এস বালা,
ছিল পঞ্চ স্বামী-
যষ্ঠে কিবা ভয় ?
দ্রৌপদী। এ্যা-এ্যা!
এ যে সত্য আসে দুঃশাসন।
এ কি! কপিল কি ধরা ?
নারী আমি,
বিবসনা করিবে আমারে ?
সত্যে বন্ধ স্বামিগণ মাের
জড় সম নিস্পন দেখিবে তাহা ?
নাহি চিন্তা লাে সুন্দরি,
আজি নগ্ন রূপ তব দেখিবে সকলে।
তবে-তবে-
কে রক্ষিবে রমণীর মান,
স্বামী যদি হেন বিকার-বিহীন।
কোথা জগতের স্বামী,
কোথায় অনাথ বন্ধু
যদুপতি অগতির গতি
দীননাথ দীনের শরণ!
কোথা নারায়ণ,
দ্রৌপদীর সখা কৃষ্ণ
অবলার লজ্জা-নিবারণ!
কোথাকত দূরে-
কোন্ স্বর্গে গােকুলে বৈকুণ্ঠে,
দ্রৌপদী।
কর্ণার্জুন
তৃতীয় অঙ্ক
দ্বারকায় কিংবা মথুরায়,
কোথায় হে তুমি ?
ক্ষীণ রােদনের ধ্বনি মাের
পশে নি কি অন্তরে তােমার ?
কোথা হে মধুসুদন !
নিতান্ত দুঃখিনী আমি
সখা-সখা-দয়া কর মােরে !
দুঃশাসন বস্তু আকর্ষণ করিতে লাগিল। শূন্যে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাববস্তু ফুরায়
; দুঃশাসন ক্লান্ত হইয়া পড়িয়া গেল। সকলে বিস্ময়-বিস্ফারিত
নেত্রে দ্রৌপদীর দিকে চাহিয়া রহিল
চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য হস্তিনা বিদুরের কুটীর শ্রীকৃষ্ণ ও কুন্তী কুন্তী। তবু ভাল, যে এত দিন পরে এ হতভাগিনীকে মনে পড়েছে। কৃষ্ণ। না, না, আৰ্য্যে। মনে তােমরা নিয়তই আছ! তবে অনেক দিন দেখা হয় নি, নানা কাৰ্যে ব্যস্ত, তাই বহুকাল পরে একবার দেখতে এসেছি। কুন্তী। কি দেখতে এসেছ? চির-অভাগিনী আমি, রাজ-মহিষী রাজ- মাতা হয়ে বনে বনেই প্রায় চির-জীবন কাটুল! কিন্তু তাতেও দুঃখ ছিল না হরি, যদি পুত্রেরা সব কাছে থাকত! আহ, নকুল সহদেব বালক। মাদ্রী মরে গেল, আমার কোলে ছেলে দু’টাকে দিয়ে বলে গেল—অনাথাভার নিও-দেখাে। খুব দেখছি-খুব ভার নিয়েছি! রাজকন্যা-রাজবধূ-একবস্ত্রাতাকে কুরুসভায় কেশে ধরে অপমান কল্লে ; নারী আমি—পাষাণী—সব শুনলুম। তার পর সেও বনে বনে কোথায় আছে কে জানে। কৃষ্ণ! দুঃখ এই, মৃত্যু যার শান্তি, তাকে মৃত্যু দাও না কেন ? শ্রীকৃষ্ণ। দেবি, তুমি যুধিষ্ঠিরের জননী হয়ে এই কথা বলছ ? ধর্মরাজ যার পুত্র, বিপদে কি তার কাতরতা শােভা পায় ? তােমার আর সখী কর্ণার্জুন চতুর্থ অঙ্ক দ্রৌপদীর জীবন চিরকাল জগতের নারীকে শেখাবে, দুঃখের জীবনে মৃত্যুই শান্তি নয়—সহ করাই শান্তি ? কি হল ? বিদুরের প্রবেশ বিদুর। ও, অত্যাচায় তার সীমা ছাড়িয়ে উঠল —এই যে, এই ৰে ভক্তবৎসল ! কি ভাগ্য আমার, আজ তুমি এ ভিক্ষুকের কুটীরে ? শ্রীকৃষ্ণ। বিদুর! তােমার ক্ষুদের আস্বাদ যে আজও ভুলতে পারি নি। কিন্তু তুমি অত্যাচারের কথা কি বছিলে ? বিদুর। তােমাকে আর বলব কি অন্তর্যামী, তুমি কি না জান ? দুর্মতি দুৰ্যোধনের আচার ব্যবহার যে ক্রমে আমায় অতিষ্ঠ করে তুলছে। কৃষ্ণ। কেন বিদুর, আবার নুতন কুন্তী। কুলাঙ্গার আবার কি কল্পনা করেছে ? বৎস, আমার পুত্রেরা বেঁচে আছে তাে? পাপিষ্ঠ কি আবার তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছে ? বিদুর। না, পাপিষ্ঠ কল্পনা করেছে, বনবাসী পাণ্ডবদেয় ঐখৰ্য্য দেখিয়ে পীড়া দেবে। মাৎসর্যের পূর্ণমূৰ্ত্তি দুৰ্য্যোধন, শকুনির পরামর্শে পুরাঙ্গনাদের নিয়ে পাণ্ডবদের উপহাস করবার জন্য যাত্রা কমছে। সর্বনাশ করেও তৃপ্তি নাই। ঐশ্বর্যের মাদকতা হীন-চিত্ত দুৰ্য্যোধনকে এমন অভিভূত করেছে, সে যে মানুষ, সে কথা সে ভুলে গেছে। কৃষ্ণ। কেন বিদুর, এতে বিস্মিত হ’চ্ছ ? ঐশ্বর্যের ধর্মই তাে এই। যে অভাগা ঐশ্বৰ্য্যকে পরের জন্য উৎসর্গ করে নি, তার দশা তো চিরদিন এমনিই হয়ে থাকে, এ তো নূতন নয়। কুন্তী। ওঃ! এত দুঃখ আমার বাছাদের ভাগ্যে ছিল। ভাগ্যের এমন ক্ষমতা—জগতের ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, পাণ্ডবদের আত্মীয় হয়ে, সখা হয়ে, হিতকারী হয়েও এই ভাগ্যের হাত থেকে তাদের নিষ্কৃতি দিতে পালেন না।
প্রথম ৮
কর্ণার্জুন
শ্রীকৃষ্ণ।
ভূঞ্জে নর নিজ কৰ্ম্ম-ফল,
ঈশ্বর নিষ্ক্রিয় সদা !
কর্মফলে ভাগ্যের সৃজন,
নহে ভাগ্য কৰ্ম্ম হ’তে স্বতন্ত্র শকতি।
ইচ্ছা করে কর্মের জন,
এই ইচ্ছা সতত স্বাধীন।
বাসনার খেলা, রঙ্গ প্রকৃতির ;
তাই মহামায়া
নেত্রীরূপে সৰ্ব্ব জীবে সৰ্ব্ব বিশ্বে
সর্ব ভূতে সদা বিদ্যমান।
মুক্ত সেই,
এই তত্ত্ব অবগত যেই জন,
তারি হয় বাসনার নাশ,
সেই হবু ভাগ্যের অতীত।
দুৰ্য্যোধন--অত্যাচারী
তার সহজাত প্রকৃতির গুণে
যুধিষ্ঠির-সুখে দুঃখে সম নির্বিকার,
মহা তত্ত্ব শিখাইতে নরে
জনম তাহার।
তুমি মাতা, তাহার জননী।
শােক নহে উচিত তােমার।
বিদুর। মায়াময়! তুমি যাই বল, আমার বিশ্বাস এ সবই তােমার
লীলা! বল দেব, কত দিনে যুধিষ্ঠির আবার মেঘমুক্ত সূর্বের ন্যায়
ভারত-সিংহাসনে বসবে?
শ্রীকৃষ্ণ। দুর্যোধনের এই ধােষধাত্রায়, যুধিষ্ঠিরের কার্যের উপর সময়
কর্ণার্জুন
চতুর্থ অঙ্ক
ফলাফল নির্ভর করছে ! জেনে বিদুর, দুর্যোধনের এ মাৎসর্যের
খেলা বৃথা নয়। কৌরব-সভায় দ্রৌপদীর অপমানে যুধিষ্ঠিরের
নিশ্চেষ্টতায়, ভীমার্জুনের আনুগত্যে অজ্ঞরা মনে করেছে যুধিষ্ঠির
ভয়ে, নিজ অক্ষমতায় সেই অত্যাচারের প্রতিবিধান করে নি, নিরুপায়
হয়ে সকল পীড়ন সহ্য করেছে। দুর্যোধনের এই ঘােষধাত্রায়
যুধিষ্ঠিরের কাৰ্যে, ব্যবহারে প্রতিপন্ন হবে, নিরুপদ্রবে সকল উৎপীড়ন
সহ করা সব সময়ে অক্ষমতা নয়। এ নিশ্চেষ্টতায় মৃত্যুর লক্ষণ নাই,
এ মহাজীবন লাভের পূর্বলক্ষণ।
কুন্তী।
অজ্ঞ নারী
পুত্র স্নেহে অন্ধ সদা,
বুঝিতে না পারি, কৰ্ম্ম-কৰ্ম্মফল,
ফলাফল চরণে তােমার!
কুটীরে বসিয়ে এই,
নিত্য নয়নের নীরে
সিক্ত করি ওই তব চরণ কমল ;
তুমি বন্ধু, তুমি সখা, আত্মীয় আমার,
তুমি জান ভাগ্য পাণ্ডবের,
আমি জানি তােমারে কেবল।
বিদুর। মা-মা, তুমি যা জান, তুমি যা জেনেছ, তার চেয়ে জান্বার আর
কিছুই নেই। মহা ভাগ্যবান্ আমি, তাই তােমার মত জননীকে
আমার এই ভগ্ন কুটীরে পেয়েছিলাম, যার জন্য আজ শ্রীকৃষ্ণ আমার
দ্বারে অতিথি।
কৃষ্ণ। বিদুর, অতিথি তাে বলছ, কিন্তু আহারের আয়ােজন ক’ছ
কৈ? দেবি, ছেলেদের কথায় আমার খাবার কথা যে ভুলে গেলে,
আমি যে এখনও অভুক্ত।
প্রথম দৃ কর্ণার্জুন বিদুর গীত দয়াময়! বল কোখা কিবা পাব, কি আছে আমার কি দিব তােমায় হে। বিনে ভক্তি সুধা, তােমার মিটিবে কি ক্ষুধা, ( ওহে ভবের ক্ষুধাহারী) ( তুমি সর্বতৃষাহারী, ভকতবৎসল হে) আমার নিত্য অনটন অনিত্য সংসার হে। (কত) পায়ে ধরে সাধি, নিশিদিন কঁদি, তুমি তো চাহ না ফিরে, ( ওহে নিষ্ঠুর!) আমার মরুভূমি প্রাণ হয়েছে শ্মশান, তােমারি চরণ করিয়া স্মরণ কত দিন অবসান, ( তুমি তো চাহ না তিলেক) ( আমি অভাবে অভাবে করি দিন অবসান) ( তােমার ভাবের অভাবে মরুভূমি প্রাণ) আমি ভক্তি সুধা কোথা পাব বল, ভিখারীর ঘর সে নিধি কোথা পাব বল, কি আছে আমার কি দিব তােমারে হে। সকলের!এন দ্বিতীয় দৃশ্য প্রভাস-কাম্যবন ভীম। ভীম ও যুধিষ্ঠির মহাসৈন্য সমাবেশ দেখিলাম বনে, আসিয়াছে দুর্যোধন চতুরঙ্গ দলে ; হয় হস্তী রথ অগণিত দাস দাসী রত্নের সম্ভার, . ৭.
কণার্জুন
চতুর্থ অঙ্ক
বিচিত্র বৈভব,
বাদ্য ভাণ্ড নানাবিধ,
শত শত পট্টবাসে আচ্ছন্ন কানন ;
সৈন্যগণ গরজে ভীষণ,
মহা দত্তে করে আস্ফালন!
দেহ আজ্ঞা নরপতি,
যদি ভাগ্যবশে গৃহ-পাশে মিলিয়াছে অরি,
করি’ অতি নিধন
বাঁধি আনি’ দুৰ্যোধনে
চরণে দিই উপহার।
দ্রৌপদীর অপমানে
যেই আল দহে অন্তস্থলে,
আজি করি নির্বাণ তাহার।
শুন ভীম, কাল পূর্ণ নহে এৰে,
বাদশ বৎসর হবে অতিক্রম,
নহে বেশী দিন আর ;
পরে অজ্ঞাত বৎসর ;
এইরূপে ত্রয়ােদশ বৰ গতে
হইব উদয় লােকালয়ে পুনঃ।
বহুদিন স্ব-ইচ্ছায় সহিয়াছ দুঃখ
ভাই, চাহি মুখপানে মাের
ধর ধৈৰ্য কিছু কাল আর!
যুখি।
এলে বেশ
অর্জন।
হে নরেশ,
মিলিল সুযােগ।
দ্বিতীয় দৃশ্য
১
কর্ণার্জুন
দেখিলাম দুৰ্য্যোধন কর্ণের সহিত,
মহােল্লাসে মত্ত সবে।
আকুল গাণ্ডীব শুনি সৈন্য-কোলাহল,
তূণে বান হতেছে চঞ্চল।
অনুমানি-
পতিত জ্ঞাতিরে
আসিয়াছে দেখাতে বৈভব
কেশরি-আবাসে ফেরু,
৭ ইচ্ছায় পশিয়াছে পতঙ্গ অনলে !
কহ নররায়,
বিনা শান্তি ফিরে যাবে দুর্যোধন ?
শাস্তিদাতা নারায়ণ ভাই ।
কাল পূর্ণ হলে
ভগবান্ করিবেন শাস্তির বিধান।
!
যুধি।
ৗপদীর প্রবেশ
দ্রৌপদী।
শুন শুন হইয়াছে সর্বনাশ।
প্রতিহারী দিল সমাচার
গন্ধর্ব ঈশ্বর চিত্রসেন সনে
মহারণে পরাজিত কুরু-কুলাঙ্গায়।
সঙ্গে কুলাঙ্গনা
কৌরব ঘরণী যত বন্দিনী তাহার,
বাঁধি ল’য়ে যায় সবে গন্ধর্বের দেশে;
রণে ভঙ্গ পলায় শকুনি, শল্য,
সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ সবে,
কর্ণার্জুন চতুর্থ অঙ্ক ভীম। নারীগণ হাহাকারে গগন বিদারে ; কৌরবের রাণী ভানুমতী কাদিয়া আকুল, পাঠাইলা সঙ্গোপণে দূত উপায় করিতে ত্বরা। পূৰ্বাপর ঘটনা যেমন শুন প্রতিহারী মুখে, ভয়ে ভীত অনুচর শিহরে তরাসে। যুধি। সে কি! কি সর্বনাশ! দেবি, কোথায় সে প্রতিহারী ? দ্রৌপদী। আশ্বস্ত করিয়া তারে এসেছি হেথায় দানিতে সংবাদ। হ’ল ভাল, গন্ধৰ্বে বাঁধিল, মুটুমতি দুর্যোধনে উপযুক্ত শাস্তি দিল ভগবান্। অর্জুন, কিবা উচিত এখন ? অৰ্জ্জুন। তুমি জান তাহা, মােরা শুধু আজ্ঞাবহ দাস। যুধি। দুঃশাসন বক্ষ রক্ত পান আছে প্রতিজ্ঞ আমার ; ভাবিতেছি- গন্ধর্ব যদ্যপি বধে, সে প্রতিজ্ঞা না হবে পালন। যুধি। কহ পাঞ্চাল-নন্দিনি, যুক্তিকিব এ সঙ্কটে যুধি। ভীমসেন ? । ভীম।
দ্বিতীয় দৃশ্য
কণার্জুন
দ্রৌপদী।
আমি নারী,
যুক্তি তর্ক নাহি জানি।
শুনিলাম দূত-মুখে
বন্দিনী রমণী,
রাজরাণী কৌরব-ঘরণী যত।
আকুল পরাণ কাদিল তখনি,
বুঝিতে না পারি
কি লাঞ্ছনা আছে লেখা ভাগ্যে সবাকার।
ধরি পায় নররায়,
উপায় যদ্যপি থাকে করহ বিহিত,
উদ্ধার করহ সবে
হিতাহিত যুক্তিতর্ক কিছু নাহি বুঝি!
ভীম। কিন্তু দেবি, এই দুৰ্য্যোধনই তাে তােমার লাঞ্ছনা করেছিল।
ভগবান ন্যায্য বিচারই করেছেন ; দুর্যোধনের মহিষী আজ গন্ধর্ব
কর্তৃক লাঞ্ছিত।
দ্রৌপদী। আমি জানি,
আমি সহিয়াছি যে লাঞ্ছনা,
জগতের কোন নারী যেন
নাহি সহে সে যাতনা আর!
আমি জানি—কি সে ব্যথা,
পুরুষ যখন দুৰ্বল ভাবিয়া
নিপীড়িত করে রমণীরে,
করে অপমান অত্যাচার
দুর্দশা অসীম।
তাই আশঙ্কায় শিহরে অন্তর
কর্ণার্জুন
চতুর্থ অঙ্ক
লাঞ্ছিতার অপমান স্মরি’
নারী কঁদে ক্তি হেতু,
নারী কাঁদে, নারী যাচে,
নারী পাঠায়েছে দূত
নারীর সকাশে,
ভয়ে ভীত নারী
নিরুপায় করে হাহাকার।
বীৰ্যবান তোমরা সকলে
অবলার আঁখি জল
যদি না কর বারণ
কিবা ফল পুরুষ-জনমে ?
কিবা ফল বীরত্ব আখ্যান ?
হে বীর-কেশরী,
শাস্তি দিয়ে গন্ধৰ্ব্ব-ঈশ্বরে
রমণীর রাখহ সম্মান।
অর্জুন। ঠিক বলেছ যাজ্ঞসেনি, জ্ঞাতির দুর্দশা দেখে যে পুরুষ নিশ্চেষ্ট
হয়ে থাকে, তার মরণই মঙ্গল। দুর্যোধনের মহিষী আমাদের ভ্রাতৃবধু,
আমরা জীবিত থাকতে ছার গন্ধৰ্ব তার লাঞ্ছনা করবে ? জাতি-
জাতি। এক গােল, এক ধারা, এক শোণিত। আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে
বিবাদ করি, যুদ্ধ করি, সে আমাদের ঘরের কথা; কিন্তু তাই বলে
পর সেই জ্ঞাতির অপমান করবে, আর আমরা তাই দাড়িয়ে দেখব?
ধর্মজ আদেশ করুন, এখনই গন্ধৰ্ব্বকে তার সমুচিত শিক্ষা দিই।
ভীম।
অর্জুন! অৰ্জ্জুন!
কোল দে রে—কোল দে রে মােরে।
কৌরব পাণ্ডব
১০৩
দ্বিতীয় দৃ
কর্ণার্জুন
এক বৃক্ষে দুই শাখা
দুষ্ট গন্ধর্ব ছেদিবে,
ছিন্ন বাহু করিবে মােদের
তাও কি সম্ভব কভু ?
দুষ্ট জানে না নিশ্চয়
ভীমার্জুন রহে হেথা
আর তারা কৌরবের ভাই।
যুধি। তুষ্ট আমি
হেরি উৎসাহ সবার !
যাও পার্থ, যাও ভীমসেন,
ত্বরা মুক্তিদান কর দুর্যোধনে।
ভুলে যাও পূর্বের বিবাদ,
দেখাে, ঘুণাক্ষরে অপমান কোরাে না তাহার।
মহা সমাদরে
যত্ন করি কুলাঙ্গনগণে
দরিদ্রের এ কুটিরে আন সযতনে।
হে পাঞ্চালি,
উচ্চ বাঞ্ছা তব পূরিবে এখনি
নাহিক সংশয় ;
কর আয়ােজন ভ্রাতৃবধূগণে মাের
যথােচিত করিতে সৎকার।
ক্রৌপদী। হে কৃষ্ণ! হে দ্রৌপদীর সখা। সভাস্থলে তুমি দ্রৌপদীর
লজ্জা নিবারণ করেছিলে, দেখাে প্রভু! যেন কৌরবরমণীগণের লজ্জা
নিবারণ হয়।
তৃভীষ্ম দৃশ্য
অঙ্গদেশ
কর্ণের উদ্যান
বৃষকেতু ও বালকগণ
বালকগণের গীত
রাজা রাজা খেবাে নতুন খেলা
দেখি পারি কি হারি?
১।
আমি বসবাে সিংহাসনে
হয় ভাল, কেউ যদি কোটাল হয়ে চোর ধরে আনে ;
কে বল করবে চুরি
কাণা মাছি চোরের ধাড়ী
যদি ছুয়ে দেয় বুড়ী
আমি মন্ত্রী হয়ে চাবাে মাথা,
আমি তবে ধ’রবাে ছাতা
এম।
সকলে।
( আমরা সবাই যদি রাজা হই মজা হয় নি।
বৰ। কি ভাই, দিন রাত গান গাওয়া ? আমার ও ভালাে লাগে না ;
তার চেয়ে আয়, আমরা ব্যুহ রচনা করে যুদ্ধ করি, দেখি কে
কাকে হারায়।
২য় বালক। কে ব্যুহ রচনা করবে ? আমার এখনও লক্ষ্যই ঠিক হয় নি,
আমি রচনা করতে পাব না।
৩য় বালক। আমিও না।
বৃষ। তােদের কিছুই ক’তে হবে না, আমি ব্যুহ রচনা করি, তাের।
তৃতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
দেখ, ! কি ব্যুহ রচনা করব বল? মৎস্য-বুহি, ময়ুর-বৃহ, না চক্রব্যুহ ?
২য় বালক। তুই পারবি?
বৃষকেতু। পারব না? এই দেখ, এই দেখ, এই এমনি করে সব
দাড়া, ধনুক কাঁধের উপর রাখ, তুই এই, তুই এই—আর আমি
এই মাঝখানে।
১ম বালক। এ ভাই ভাল না—তার চেয়ে আর কিছু খেল।
বৃষ। আচ্ছা বেশ, আর এক রকম খেলি তবে।
২য় বালক। কি ভাই ?
বৃষ। এক জন ছুট্টে একটা ফল পেড়ে নিয়ে আয় তত।
৪র্থ বালকের প্রস্থান
৩য় বালক। ফল কি হবে ভাই ?
বৃষ। এই দেখ, না কোন মজা করি।
তুই যা ভাই
ফল লইয়া বালকের পুনঃ প্রবেশ
৪র্থ বালক। এই নে ভাই ফল।
বৃষ। দে, দে, দেখ, এই ফলটা কেউ ভাই মাথায় করে রাখ, (একজনকে
লইয়া) এই তুই আয়-দাড়া ঠিক সােজা হয়ে নড়িস নি—ফলটা না
পড়ে যায়—আর আমি, দেখ, তীর দিয়ে বিধে ফেলি।
৪র্থ বালক। (ভয় পাইয়া) না ভাই, আমি পাবে না। যদি ভাগ
ফকে মাথায় লাগে, যদি মরে যাই ?
বৃষ। দূর, তুই বড় কাপুরুষ। ময়ূতে ভয় করিস? আচ্ছা! তােদর
মধ্যে কে পাবি আয়, আমি এই মাথায় ফল রাখলুম। নে, তীর
ছেড়। লাগে আমার লাগবে।
ও বালক। ওরে, ওই তাের মা আসছে, আর খেলা নয় !
বৃষ। তাই তো !
'
কর্ণার্জুন
চতুর্থ অঙ্ক
পাবতীর প্রবেশ
পদ্মা। তােমরা এখনও খেলা কছ ? যাও, অনেক বেলা হয়েছে,
পানাহার করগে আবার বন্দর পড়লে ওবেলা খেলতে আসবে।
২য় বালক। ওরে কেতু, আমরা তবে চলুম ভাই।
বালকগণের এন
বৃষ। হাঁ মা, বাবা রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের গল্প বল্লেন ; আমাদের
কবে যজ্ঞ হবে মা?
পদ্মা। সকলের ত রাজসূয় যজ্ঞ কতে নেই ; বড় হও, বুঝতে পারুকে
কোন্ যজ্ঞের কে অধিকারী।
বৃষ। আচার্য্য বল্লেন, মা-বাপের পা পূজোর চেয়ে বড় যজ্ঞ আর নেই ;
এতে অধিকারী অনধিকারী নেই, সকল ছেলেই এ যজ্ঞ করতে
পারেনা মা?
পদ্মা। হাঁ বাবা।
বৃষ। আচ্ছা মা, যাদের মা-বাপ নেই, তারা কি করবে ?
পদ্ম। বাবা, সকলের মা-বাপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তার চরণ পূজা ক’লেই
মা-বাপের চরণ পূজা করা হয়। সৰ্ব্ব-যজ্ঞেশ্বর শ্রীহরি—তার চরণ
পূজা কল্লে সকল যজ্ঞই করা হয়।
বৃষ। তা হলে তাে মা এ খুব সােজা। আর কোন যজ্ঞ না করে এক
কৃষ্ণকেই পূজো করলেই তাে হয়? আমি বড় হয়ে অন্য যজ্ঞ
কব না।
এখন বােজ তােমার আর বাবার পা পূজো ক’বাে,
আর শ্রীকৃষ্ণের পা পূজো করবে, তা হলে আর কোন যজ্ঞ করতে
হবে না, কেমন মা?
পদ্মা। বেঁচে থাক বাবা ; এই সৎবুদ্ধি নিয়ে দীৰ্ঘজীবি হও।
বৃষকেতুর স্থান
(স্বগত) এমন ভক্তিমান্ পুত্র দীর্ঘজীবী হয়, তবেই না।
;
তৃতীয় দৃশ্য
কণার্জুন
কর্ণের প্রবেশ
কর্ণ। অন্তরাল হ’তে বৃষকেতুর কথা শুনেছিলেম! মাতার শিক্ষায়
পুত্রের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। তোমার শিক্ষায় তােমার আদর্শে
বৃষকেতু আমার বংশগৌরবকে উজ্জল করবে-এ ভরসা আমার
আছে। আশীৰ্বাদ করি-বয়সের সঙ্গে সে যেন তােমার ভাগ্য
লাভ করে—আমার মত দুর্ভাগ্য না হয়।
পদ্মা। কেন এ কথা ছ নাথ ?
কর্ণ। চিরদিন দুর্ভাগ্যই আমার সহচর। আমার জীবনের কথা সবই
তাে জান। ভাগ্য কেবল একস্থানে পরাজিত হয়েছে—তােমার
কাছে। নইলে দেখ, শিক্ষা নিস্ফল হ’ল, জীবন নিস্ফল হ’ল, অপষশ
সঙ্গের সাথী। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে দানের ভার দিলে আমায়,
লােকে বল্লে “পরধনে মুক্তহস্ত কর্ণ।”
পদ্ম। তুমি নীতিবিদ, তােমাকে আর কি বলব ? ভাগ্যদেবী চিরদিনই
ছলনাময়ী।
এতিহারীর প্রবেশ
প্রতি।
}
কর্ণ।
মহারাজ ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ পুরে,
পারণ-প্রয়াসী তিনি।
শুভ এ সংবাদ।
রাণি, পাদ্য-অর্ঘ্য কর আয়ােজন।
অতিথি ব্রাহ্মণ
সমাগত কৃতার্থ করিতে মােরে।
চল প্রতিহারী,
দেখি কোথায় সে দ্বিজ ।
সকলের একান
চতুর্থ দৃশ্য
প্রাসাদ-কক্ষ
;
মত্রী ও ব্রাহ্মণ
মন্ত্রী। ব্রাহ্মণ, আপনি সিংহাসনে উপবেশন করুন। মহারাজকে সংবাদ
দেওয়া হয়েছে, তিনি এখনি এসে আপনার চরণ-বন্দনা ক’বেন।
ব্রাহ্মণ।
ক্ষুধায় কাতর,
অন্ধকার নেহারি সংসার
ঘূর্ণমান কালচক্র সম্মুখে আমার,
বুঝি আয়ুশেষ করে মাের!
উপবাসী আমি,
বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধার প্রহার,
সহিতে না পারি আর!
কোথা গৃহস্বামী,
অপেক্ষায় কতক্ষণ রব ?
মন্ত্রী। দেব, আর অপেক্ষা ক’তে হবে না; ঐ মহারাজ আসছেন,
এইবার আসন পরিগ্রহ করুন।
।
কর্ণের প্রবেশ
কর্ণ। আসুন ব্রাহ্মণ, আসুন দ্বিজশ্রেষ্ঠ, অন্তঃপুরে প্রবেশ করে অর্ঘ্য
গ্রহণ করুন। আপনি কি অবগত নন্, ব্রাহ্মণের পক্ষে আমার দ্বার
সদা অবারিত ?
ব্রাহ্মণ।
কথার সময় নাই,
শুষ্ক-কণ্ঠ, শুষ্ক-তালু উদরে অনল,
চতুর্থ দৃশ্য
কর্ণার্জুন
একাদশী ব্রতধারী আমি,
পারণের আশে
ফিরি দ্বারে দ্বারে ;
হেরি মােরে
দ্বার রুদ্ধ করে পৌরজন,
শুধাইলে কেহ কথা নাহি কহে,
পথশ্রমে শ্রান্তপদ।
হে রাজন!
যদি ব্ৰহ্মবধে নাহি থাকে সাধ,
কর ত্বরা সৎকারের আয়ােজন।
পাদ্য অর্ঘ্য ল’ব,
করিব বিশ্রাম,
অগ্রে কর অঙ্গীকার,
বিমুখ না করিবে আমারে!
বিমুখ করিব তােমা?
ক্ষুধা-ক্লিষ্ট তুমি দ্বিজ অতিথি আমার
সমাগত পুরে
কৃতার্থ করিতে মােরে
কৃপা করি’ অন্নপানি করিয়া গ্রহণ
আমি বিমুখ করিব তোমা?
নাহিক সঙ্কোচ,
করহ আদেশ,
কিবা আয়ােজন করিবে এ দাস
তব তৃপ্তি হেতু।
কোন্ ভােজ্যে আসক্তি তােমার ?
কর্ণ।
কর্ণার্জুন চতুর্থ অক করি অঙ্গীকার বাস্থা তব এখনি পুরাব। বহুদিন করি নাই আমিষ ভােজন, ব্রাহ্মণ। বৃদ্ধ আমি, কোমল নধর মাংসে আসক্তি আমার। কর্ণ। ব্রাহ্মণ। হে দ্বিজ, কহ কোন্ মাংসে প্রীত হবে তুমি ? ছাগ, মৃগ কিংবা মেষ না—অখাদ্য সকলি। বহুদিন আছি হে বঞ্চিত নরমাংস হতে সুস্বাদু নধর- নরমাংস! মন্ত্রী। ব্রাহ্মণ। হাঁ হাঁ ! কর্ণ। ব্রণ। কে রে মুখ, বাধা দেয় মরে ? নয়-মাংস অতি উপাদেয় । নর-মাংস প্রিয় তব ? হা হা। ধমাঝে শ্রেষ্ঠ জীব নর, মাংস তার শ্রেষ্ঠ খাদ্য নাহিক সন্দেহ। নর-মাংস অভিলাষী আমি হে রাজন! যদি সাধ্যায়, কহ, রহি অপেক্ষায় নহে চলে যাই
চতুর্থ দৃশ্য
কর্ণার্জুন
১১১
কর্ণ।
অভুক্ত ক্ষুধার্ত আমি বিমুখ ভিক্ষুক
মৃত্যু-ক্রোড়ে লইতে আশ্রয়।
-না-
কেন যাবে বিমুখ হইয়ে,
মধ্যাহ্নে অতিথি তুমি
ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ,
নরমাংস সুদুর্লভ যদি
আমি নর
অতি ক্ষুদ্র-অতি তুচ্ছ, অনন্ত এ নরসিন্ধু-মাঝে
বিন্দু বিম্বপ্রায় ;
কিবা ক্ষতি
যদি তাহা হয় লয় তােমার সৎকারে।
যদি কৃপা করি’ আসিয়াছ পুরে,
তিষ্ঠ ক্ষণকাল,
বলি দিই এ জীবন সম্মুখে তােমার,
সুপকার করুক রন্ধন
সুখে ভূমি করহ পারণ
নারায়ণ অতি পূজ্য অতিথি আমার।
ভাল ভাল,
গতিরােধ করিলে আমার।
মাংসাশী ব্রাহ্মণ আমি,
লবণাক্ত মাংসের স্বাদ
প্রলুব্ধ করিছে মােরে ;
প্রত আমি বাক্যে তব;
কিন্তু
ব্রাহ্মণ।
কর্ণার্জুন চতুর্থ অঙ্ক । বয়ঃপক মাংস তব নহে তো কোমল ; কহ কিবা ফল বৃথা বিনাশি তাহারে ? আমি চাই নধর কোমল মাংস শিশুদেহ হতে। আহ উপাদেয়—অতি উপাদেয় । স্মৃতিমাত্রে লালা ঝরে রসনায়। কহ, হবে কি উপায় ? মহারাজ! মন্ত্রী। কর্ণ। স্থির হও; মুখে ব্যক্ত তব অন্তরের ভাব ; স্থির হও, রুদ্ধ কর বাক্যের দুয়ার। (ব্রাহ্মণের প্রতি) দেব! স্তুতিবাদ নাহি সাধ; কহ শীঘ্র, ফিরে যাব, কিন্তু রব অপেক্ষায় ? নর-শিশু! ব্রাহ্মণ। কর্ণ। ব্রাহ্মণ। - কর্ণ। অষ্টম বর্ষীয় শিশু রাজবংশধর বিলাসে পালিত অঙ্গ কোমল-মসৃণ। এ কি প্রহেলিকা সম্মুখে আমার! এ কি শুনি বাণী। শিশু-মাংস-লােলুপ ব্রাহ্মণ, কহে সত্য, কিম্বা উপহাস করে মােরে! কহ দেব, চতুর্থ দৃশ্য ১১৩ ব্রাহ্মণ। কর্ণ। ব্রাহ্মণ। মন্ত্রী। কর্ণার্জুন সত্য তুমি দ্বিজ, কহ ক্ষুধায় কাতর, কিম্বা বেশধারী, মুঢ়জনে ছলিতে এসেছ দেবতা গন্ধৰ্ব্ব কিম্বা মায়াধর কেহ ! ছলনায় নহি পটু, ক্ষুধার্তের কোথায় ছলনা ? চাতুরী কি সাজে তারে, যেই জন ক্ষুধার ব্যথায় অন্ধকার নেহারে ভুবন, মৃত্যু যার সম্মুখে দাড়ায়ে ? কিন্তু ক্ষমা কর দেব, কোথা পাব অষ্টম-বর্ষীয় শিশু রাজবংশধর? শুনিয়াছি পুত্ৰবা তুমি। মহারাজ! মহারাজ! নহে দ্বিজ, রাক্ষস নিশ্চয় । নির্বোধ অজ্ঞান, রসনা সংযত কর। ভেবেছ কি হেন মায়াধর আছে কেহ তিন পুরে, কর্ণের সম্মুখে যাচে বংশধর তার, ক্ষুধা নিবৃত্তি হেতু ? সত্য দ্বিজ তুমি নাহিক সন্দেহ ; বিশ্বনাশী এই ক্ষুধা একমাত্র তোমাতে সম্ভব। বুঝিয়াছি ইঙ্গিত তােমার পুত্রবান্ বটে আমি। কর্ণ।
কণার্জুন :
চতুর্থ অন্ধ
হে ব্রাহ্মণ, করাব পারণ,
আশীর্বাদে তব
জ্ঞানহারা কোরো না আমারে
যতক্ষণ অভীষ্ট তােমার না হয় পূরণ।
ব্রাঙ্গণ।
সাধু! সাধু!
আশ্বস্ত হইমু আমি শুনি’ সঙ্কল্প তােমার।
কিন্তু হে রাজ,
আছে পারণের সামান্য নিয়ম।
কর্ণ।
অসামান্থ করুণা তােমার,
সামান্যে কি আসে যায় ?
কহ কি নিয়ম ?
ব্রাহ্মণ। তুমি আর মহিষী তােমার
করাতে কাটিবে তনয়ের শির,
হাস্যমুখ,
বিন্দু অশ্রু ঝরিবে না নয়নে কাহারে।
তবে সিদ্ধ হবে সেই বলি ;
পরে সূপকার করিবে রন্ধন,
আনন্দে পারণ করিব ক্ষুধার্ত আমি।
কর্ণ (স্বগত) প্রার্থী যে করিবে প্রার্থনা,
বিমুখ না করিব তাহারে !
হৃদি-বৃত্তি, স্নেহ মায়া মমতা করুণা,
অশ্রুধারা হৃদয় কম্পন,
কিছু আর নহে তো আমার
বিসর্জন দিয়াছি সকলি
কোন দুর অতীত সায়াহ্ে
চতুর্থ দৃশ্য কর্ণার্জুন সাক্ষী করি তােরে ব্রাহ্মণ। আজ দেখি, সে প্রতিজ্ঞা ধরি’ দ্বিজের আকার আসিয়াছে পরীক্ষিতে মােরে। একদিকে, আত্ম হতে উদ্ভুতসন্তান আত্মজ আমার এই হৃদয়ের শােণিত-আধার; অন্যদিকে জীবনের সার মহাসত্য, অক্ষরে প্রত্যক্ষ ব্ৰহ্ম অক্ষয় অব্যয় ! কারে রাখি, কারে করি বিসর্জন ? ( প্রকাশ্যে ) হে ব্রাহ্মণ ! এস, কর বিশ্রাম গ্রহণ, মহাভাগ্যবান আমি আজি তােমা করাব পায়ণ। কর্ণ ও ব্রাহ্মণের প্রস্থান মন্ত্রী। নাহি জানি কে মায়াবী দ্বিজ-বেশধারী আসিয়াছে অনর্থ বাধাতে আজি। পিতা মাতা স্বহস্তে বধিবে তনয়ে আপন- শুনি নি কখনো। মহাপাপ বুঝি আজ ঘেরিল মেদিনী! আচ্ছয় ভূপতি, কর্ণার্জুন চতুর্থ অঙ্ক জ্ঞানহীন উন্মত্তের প্রায় পুত্রবধে হইল সম্মত দেখি পুত্রঘাতী স্পর্শে মহাপাপ। बान পঞ্চম দৃশ্য কর্ণের অন্তঃপুর কর্ণ ও পদ্ম পদ্ম। কর্ণ। পদ্ম। কর্ণ। পুত্র বলি। নিজ হস্তে ? নিজ হস্তে : তুমি-আমি-জনক-জননী। সত্য দ্বিজ ? দ্বিজ কিম্বা নহে দ্বিজ কিবা আসে যায়, সত্য বাক্য- সত্য প্রতিজ্ঞা মােদের। কিন্তু স্বামি- নাহি কিন্তু, নাহি বিচার বিতর্ক। বৃষকেতু! পদ্ম। কর্ণ। পরা। বৃষকেতু প্রবেশ পলা। কেন মা? নানা, ডাকি নাই তােরে। পালাও পালাও দূরে, পঞ্চম দৃশ্য কর্ণার্জুন কর্ণ। ধরণীর সীমান্ত-প্রদেশে, যেথা সত্যে বন্ধ নহে পিতা, মাতা নহে পুত্রহস্তা-স্বামী-অনুগামী ! রানি, বিন্দু-অশ্রু না ঝরিবে নয়নে কাহারাে। ভগবান! কেন পুত্রবতী করেছিলে মােরে ? পদ্মা। কর্ণ। ও কি ? পদ্ম। কপিবে না মাংসপেশী অন্তর চরণ, শুষ্ক চক্ষু-কঠোর করাল, অবিকৃত নয়ন বদন। কেন মা, কেন বাবা, আপনারা অমন ক’চ্ছেন? জগতের আদি দিন হতে ভূ-ভারতে শশানে নাই কেহ হেন অসঙ্গত কাৰ্য বিপরীত। পশু শুনি’ আতঙ্কে কাপিবে, ব্যাঘ্ৰী শিহরিবে, নিবিড় গহনে সিংহিনী লুকাবে ডলে, মুক্ত-তৃষা ভুলিবে রাক্ষসী, উন্মাদ কাদিবে, সৃষ্টি মুছে যাবে, বন্ধ্যা হবে স্তম্ভিতা যেদিনী- জননী যদ্যপি হয় সন্তান-ঘাতিনী। -না-অসম্ভব। কোথা পুত্র ?
১১ কর্ণার্জুন চতুর্থ অঙ্ক কোৎ বৃষকেতু ? আয় বাপ বক্ষমাঝে- মাতৃ-বক্ষ সন্তানের চির-নিরাপদ আনন্দ আলয়। বৃষকেতুকে বক্ষে ধারণ পদ্ম। মা মা ! ক ব, জুড়াক জীবন! পুত্ৰমুখে এ কি সম্বােধন ! মামা-একাক্ষর বাণী সুধার নিঝর, মামা ভাঙ্গা ভাঙ্গা আধ আধ স্বরে, একেবারে পুঞ্জিভূত জগতের সমস্ত সঙ্গীত। মা-মা এই স্ফুরিত অধরে মা-মা- কৈশােরে যৌবনে পরিণত বার্ধক্য বয়সে সমসুরে বাঁধা সুর মধুর মধুর বল্ বল আরবার ; শুনিতে শুনিতে হই লয় সমাধির কোলে, চেতনা বিলুপ্ত হ’ মহা সন্ধিক্ষণে। = কর্ণ। রাণি ! নাহি হও সংজ্ঞাহীন, পঞ্চম দৃশ্য কর্ণার্জুন ১১৯ জেনাে--সত্যাধীন মােরা পদ্মা। কিন্তু মহারাজ, জ্ঞান নহে অধীন আমার পুত্রস্নেহে বন্দিনী অধীন। নেপথ্যে ব্রাহ্মণ) কহ রাজা, কতক্ষণ র’ব অপেক্ষায় ? পারণের বেলা বয়ে যায়। কর্ণ। দেব! বহ ক্ষণ, আমিও প্রস্তুত বৎস! পদ্ম। কেন বাবা! হ’ জিহ্বা পাষাণে গঠিত, পক্ষাঘাতে জড়পিণ্ডে পরিণত হ’ উভয়ের দেহ, কর্ণ। মৃত্যু যদি কৃপা নাহি করে। রাণি, শােন নি নিষেধ। স্ব-ইচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছিলে তুমি পরেছিলে সত্যের শৃঙ্খল, নহে সে কথার কথা। সেই দিন হতে মৃতা সম এ সংসারে করিতেছ বাস- অতিথিনী পরগৃহ-মাঝে, সতত্য বদ্ধ পাষাণ বিগ্রহ পপুত্রে আদরে হৃদয়ে ধরি। আজি পরীক্ষার দিনে
৯
কর্ণার্জুন
চতুর্থ অফ
কেন ভােল সেই কথা !
আমিই বলিব
আমি বলি দিব--
তুমি সহমৃতা সঙ্গিনী আমার,
বাধ বুক, হও দৃঢ়,
জেনাে সত্য ভগবান
যদি রাখি সত্য, রাখি সব,
নহে এ সংসার ধ্বংসের আগার,
প্রয়ােজন নাহি কিছু তার।
শুন বৎস, শুন বৃষকেতু!
সত্যে বদ্ধ ব্রাহ্মণের ঠাই,
বলি দিব তােমা ক্ষুধার্তের তৃপ্তি হেতু।
পুত্র, ঋণে মুক্ত কর আমাদের।
বৃ। মা, এই ভনু তুমি কাতর হয়েছ ? ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণের তৃপ্তির জয়
আমি বলি হ’ব, এ তো আনন্দের কথা।
বা একে
ব্রাহ্মণ। কৈ মহারাজ, আর বিলম্ব কত? আমি অপেক্ষা ক’তে পারব
, ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হয়ে উঠেছি। আমার সামনেই বলি
দাও। কৈ? এই ছেলেটা? বাঃ বাঃ! দিব্য কান্তি।
বৃষ। ব্রাহ্মণ, প্রণাম! আপনিই ক্ষুধার্ত ? একটু অপেক্ষা করুন।
আসুন পিতা, আমায় বলি দি।
ব্রাহ্মণ। শুধু পিতা না, মা বাপে দু’ভনে কাটাব—আমার সামনে
আমি দেখ-চোখে যেন এতটুকু জল না পড়ে। সত্যাশ্রয়ীর পণ,
আমিই তার সাক্ষী।
পঞ্চম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
পদ্ম।
হে ব্রাহ্মণ !
ধরি পায়,
আগে বলি দেহ মােরে,
পরে কোনাে যেবা অভিরুচি তব।
ব্রাহ্মণ। তাও কি হয় ? তোমার স্বামী যে সত্য করেছেন—তাও কি হয় ?
প।
হে দেবদেব মহাদেব !
হে নারায়ণ! হে ব্রাহ্মণ !
সত্য যে গাে নিৰ্ম্মম এমন
আগে তাে বুঝি নি,
দীনা জ্ঞানহীনা,
কর পার মহা পরীক্ষায়।
জানি উপায়
আঁখি নীর করিতে নিরােধ!
কহ স্বামি, কিবা আজ্ঞা তব ?
আজ্ঞ মম লেখা অসি ধারে।
দৌবারিক দেহ অস্ত্র।
পুত্র!
পিতা, আমি তো প্রস্তুত।
দৌবারিক কর্তৃক অস্ত্র প্রদান
ব্রাহ্মণ। বৃষকেতু, এই আসনে বসে। রাজা, রাণী, আর বিলম্ব কেন?
অ ধর।
মা, কিছু দুঃখ করাে না, আমার এতটুকু লাগবে না। আমি মনে
মনে তোমার আর বাবার চরণ ধ্যান করি, আর তােমরা আমার
কাটো। শ্রীকৃষ্ণের চরণ তো ধ্যান ক’তে পাবে না, কখনও তাে
কৃষ্ণের চরণ দেখি নি।
কর্ণ।
১২২ কর্ণার্জুন চতুর্থ অঙ্ক কর্ণ। রাণি ! পদ্ম। জ্ঞানহীন হইনি এখনো প্রভু, আমিও প্রস্তুত। নারায়ণ ! পদ্ম। স্বামী! দৈববাণী। উভয়ে কাটিতে লাগিলেন, সহসা ব্রাহ্মণ অন্তর্হিত হইলেন সত্য মাত্র আহার আমার! বহুদিন ছিনু উপবাসী আজি পরিতৃপ্ত ক্ষুধা, . সুধাপানে আনন্দ বিভাের, ধন্য কর্ণ, ধন্য পদ্মাবতী। সার্থক জীবন—এ সংসারে সত্যাশ্রয়ী আদর্শ দম্পতি, সত্য-পাশে বেঁধেই আমারে। বৎস বৃষকেতু! দেখ নাই শ্রীকৃষ্ণ চরণ, দেখ কৃষ্ণমূৰ্ত্তি সম্মুখে তােমার। এ কি! কর্ণ। শ্রীকৃষ্ণের হাত ধরিয়া বৃষকেতুর প্রবেশ বৃষ। মা! মা! কে এসেছে দেখ। পদ্ম। বাবা ! বাবা ! (বক্ষে ধারণ) শ্রীকৃষ্ণ। ইন্দ্রপ্রস্থ হতে মথুরায় ফেরুবার পথে একবার তােমার এখানে অতিথি হতে এলেম। উভয়ে। দয়াময়, তােমার এত করুণা ! শ্রীকৃষ্ণ। তােমরা যে সত্যে আমায় বন্ধ করেছ, আমি যে দাত-কর্ণের সখা । আহারের উদ্যোগ কবে চ, সত্যই আমি ক্ষুধার্ত। সকলের এহন
পঞ্চম অঙ্ক
প্রথম দশ
শবাচ্ছন্ন রণস্থল
ভৈরব ও ভৈরবী
গীত
রবি শশী ডােবে শােণিত সাগরে, রুধিরে ভাসিছে ধরা
প্রলয় ধুম ছেয়েছে গগন, গরজে পবন প্রাণহারা ।
কেরে অট্ট অট্ট হাসে ?
কাপে নিখিল ভুবন ত্রাসে,
নাচে মহাকাল-ফেরে ফেরুপাল
ভৈরবী ভীম হুঙ্কারে ঘন রুধির তৃষা মাতােয়ারা।
উভয়ের প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
হস্তিনা
ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয়
ধৃত। সঞ্জয় ! দিক্হস্তী গর্জন করছে কেন? কুলবধূরা হঠাৎ কেঁদে
উঠলো কেন? আমার সিংহাসন কঁপছে কেন ? অকালে বজ পাত
হ’ল কেন? দুর্যোধন ভূমিষ্ঠ হয়ে রাসভের ন্যায় চীৎকার করেছিল,
আজ আবার সেই চীৎকার-ধ্বনি হচ্ছে কেন? পৃথিবীর সমস্ত
অমঙ্গল একসঙ্গে দেখা দিয়েছে ? আজ কি তার ধ্বংস আসন্ন ?
১২৪
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অঞ্চ
সঞ্জয়। হে আৰ্য! পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন নয়। জড়িত রসনা-কি
ব’লব—আজ আচাৰ্য দ্রোণ, অর্জুনের শরে
অর্জুনের শরে ভূমিশয্যা গ্রহণ
করেছেন।
ধৃত। আচাৰ্য দ্রোণও আমাদের ত্যাগ করে গেলেন ? জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম
যার সমকক্ষ বীর তিনলােকে কেউ ছিল না—তিনি শরশয্যায় ইচ্ছায়
মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন। আচাৰ্য দ্রোণ-মহামুনি জামদগ্ন্যর
শিষ্য—তিনিও হত ? সঞ্জয়! সঞ্জয় ! আমায় একবার রণক্ষেত্রে নিয়ে
যেতে পার ? অন্ধ-দেখতে পাব না—একবার স্পর্শ করে অনুভব
করে আসি, মৈনাক কেমন করে শশাণিত সাগরে আত্ম-গােপন
করেছে।
সঞ্জয়। হে মহাভাগ! স্থির হন। যুদ্ধে জয়-পরাজয়ে ক্ষত্রিয়ের তো
সম উল্লাস, তবে আপনি বিচলিত হচ্ছেন কেন ?
বৃত। সঞ্জয় ! সব জানি, সব বুঝি—কিন্তু তবু-শত পুত্রের পিতা
আমি-আমাকে কি বড়ই বিচলিত দেখছ?
সঞ্জয়। হাঁ দেব।
ধৃত। অবরণ দিয়ে রেখেছিলেম। ক্ষুব্ধ সাগর বিচলিত আজ হয় নি,
বহুবহুপূর্বে এ সাগরে তরঙ্গ উঠেছে। কাউকে জানতে দিই নি
বুঝতে দিই নি ।
কুলক্ষয়ের দুর্বিসহ দৃশ্য আমার অন্ধ চক্ষুকে
প্রতারিত করতে পারে নি।
সঞ্জয়। মতিমা! কেন বৃথা কুলক্ষয়ের আশঙ্কা ক’চ্ছেন? এই তত
যুদ্ধের প্রারম্ভ ; এখনও ত কৌরবের হীনবল নয়।
ধৃত। সঞ্জয় ! আশঙ্কা বৃথা নয়, তােমার সান্ত্বনা বৃথা। আর কেউ
জানে কি না বলতে পারি না, কিন্তু আমি জানি—শত পুত্রের
শােক নিয়ে আমাকে আর গান্ধারীকে বেঁচে থাকতে হবে। যে দিন
দুর্যোধন জন্মগ্রহণ করেছে, সেই দিন আমি জানি—পুত্র আমার
দ্বিতীয় দৃশ্য কর্ণার্জুন কুলনাশন! যে বিন থেকে দুৰ্য্যোধন পঞ্চপাণ্ডবের উপর ঈর্ষা পােষণ করেছে, সেই দিন থেকেই জানি আমার বংশনাশ নিশ্চিত। দুৰ্য্যোধন বুঝতে পারে নি, আমি বুঝতে পেরেছিলেম-যে দিন সে জতুগৃহে আগুন দিয়েছে, সেই দিনই কুরু-বৃক্ষের মূলে অগ্নি প্রবেশ করেছে। অস্ত্র-পরীক্ষায় যে দিন আমার পুত্রের সহিত কর্ণের মিলন হয়েছে, আমি সেই দিন থেকে জানি-কৌরবের ধ্বংস অনিবার্য। সঞ্জয়। সবই বিধিলিপি। ধৃত। বিধিলিপি ? কখনও নয়। বিধিলিপি ত অজ্ঞেয়; কিন্তু আমি দিব্য চক্ষে সেই দিনই দেখেছিলেম, আমার শতপুত্র মৃত্যুর ক্রোড়ে সেই দিনই আশ্রয় নিয়েছে, যেদিন শকুনি কপট অক্ষক্রীড়ায় ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের সর্বস্ব অপহরণ করেছে। যেদিন কৌরব-সভায় আমার কুলবধূ দ্রৌপদীকে আমারি পুত্র দুঃশাসন কেশকর্ষণ করে বিবস্ত্রা ক’তে গিয়েছিল, আমি সেইদিনই বুঝেছিলেম, সমস্ত দেবতার রােষবহ্নি আমার মহাবংশকে ধ্বংস করবার জন্য এগিত হয়ে উঠেছে। যদুপতি শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের দূত হয়ে যেদিন আমার পুত্রের নিকট পঞ্চ পাণ্ডবের জন্য পাঁচখানি মাত্র গ্রাম ভিক্ষা করতে এসেছিলেন, আর তার উত্তরে, দুষ্ট মন্ত্রীর পরামর্শে দুর্যোধন দূতের অপমান করে ভগবানকে বঁধতে গিয়েছিল—আমি সেইদিনই জানি ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, দুর্যোধন, দুঃশাসন সকলে মৃতের ন্যায় অবস্থান করছে ! বিদুর ও দুর্যোধনের প্রবেশ দুৰ্যো। হে পিতৃব্য। বৃথা অনুরােধ, দুর্বার প্রতিজ্ঞা মাের, যতক্ষণ দেহে রবে প্রাণ- কর্ণার্জুন পঞ্চম অঙ্ক সূচ্যগ্র মেদিনী নাহি দিব পাণ্ডবেরে কভু। হন শ্রীকৃষ্ণ সহায়, কিবা ক্ষতি তায়? ক্ষত্র-ক্ষেত্রে জন্ম মাের, মহামানী আমি দুর্যোধন, পিতা মােয় কৌরব-ঈশ্বর, মৃত্যুভয়ে সন্ধি করিব হে আমি বাতুলের এ কল্পনা ! ছিল প্রাণ, নহে রণক্ষেত্রে করিব শয়ন- জন্ম মৃত্যু সমান আমার। কে? দুৰ্য্যোধন ? সঙ্গে কে ? বিদুর ? আর কে ? বিদুর। হে জ্যেষ্ঠ, আপনি এখনো দুর্যোধনকে নিবৃত্ত করুন। আজ আচাৰ্য দ্রোণের পতনে সৈন্যেরা সকলেই নিরুৎসাহ হয়েছে। কাল যুদ্ধে আর প্রয়ােজন নাই। ধৃত। বিদুর। কালের গতি পরিবর্তন করতে মহাকালও পারেন না— তুমি আমি কোন ছার! দুৰ্য্যো। পিতা, নিরুৎসাহ হবেন না। কপট-সমরে পিতামহ ভীষ্মকে বধ করে পাণ্ডবদের এত উল্লাস! ধৰ্মাত্মা যুধিষ্ঠির মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আচাৰ্য দ্রোণকে বধ করেছে, তাই পাণ্ডবদের এত উল্লাস। কিন্তু এবার কপটতা আর মিথ্যার আবরণ পাণ্ডবদের রক্ষা ক’তে পারবে ! আমি কর্ণকে, কুরুসৈন্যের সেনাপতি করেছি। আর মমতা নেই, স্নেহের বন্ধন নেই, এবার দেখব, কি কৌশলে শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের রক্ষা করেন। আমি মহারাজ শল্যের শিবিরে যাই, তাকেই কর্ণের সারথি হতে হবে। দুর্যোধনের প্রস্থান
দ্বিতীয় দৃশ্য
কর্ণার্জুন
১২।
ধৃত। দুর্যোধন চলে গেল? বিদুর কি এখনো অপেক্ষা কছ ?
বিদুর। অনুমতি করুন।
ধৃত। আর কত দিন?
বিদুর। আমায় আর জিজ্ঞাসা করছেন কেন? আপনার অগোচর
কি আছে ?
ধৃত। বলতে পার, কত জন্মের কৰ্ম্মফলে এই শাস্তি? এই পুত্র দুৰ্য্যোধন
আর তার উনশত ভাই, কেউ থাকবে না, তবু আমাকে বেঁচে
থাকতে হবে।
বিদুর। হে জ্যেষ্ঠ ! আজ আমি আপনার নিকট বিদায় নিতে এসেছি।
ধৃত। বুঝেছি বিদুর কুলনাশ স্বচক্ষে দেখবে না বলে বিদায় চাচ্ছ। কিন্তু
ভাই, বিদায় ও তােমায় সেই দিনই দিয়েছি, যে দিন দূতসভায়
দুৰ্য্যোধন তােমায় তাড়িয়ে দিয়েছিল, আর আমি তা নিবারণ করি নি।
কোথায় যাবে?
বিহুর। মহর্ষি ব্যাসের আশ্রমে, আর সংসারে নয়।
ধৃত। বেশ তাই যাও; তােমার কুটীরাশ্রমে একটু স্থান রেখাে—আমি
আর গান্ধারী সত্বরই তােমায় অতিথি হ’ব। ভাই, ভাই, শত্ৰুপুরীতে
আমার একমাত্র আত্মীয় ভাই! অভিমানে কখনাে আমার অনুগ্রহণ
কর নি, কিন্তু চিরদিনই আমার মঙ্গল কামনা করেছ, তােমায় বিদায়
দেব—পুত্র-শােকেরই মত এ বিদায়ে আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। ভাই,
যাবার পূৰ্ব্বে একবার আমার বুকে এস।
বিদুর। দাদা, আমার স্থান আপনার চরণ তলে !
তৃতীম্ন দৃশ্য
পাণ্ডব-শিবির
শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন
অর্জুন।
ধিক্ ধিক্ জীবনে আমার
ছার রাজ্য, ছার সিংহাসন
করিলাম গুরু-বধ শেষে !
ছিল যার পুত্ৰাধিক স্নেহ মম প্রতি,
পুত্রশােকে দরবিগলিত ধারা
তানহারা সেই গুরু মাের
অজেয় ভুবনে,
হিমাদ্রির সম
অচল অটল স্থির রণসিন্ধু মাঝে,
মাৎসৰ্য-তাড়নে
হানিলাম পুনঃ পুনঃ বাণ
দেব-অঙ্গে তার।
যদুপতি!
কই,
কত দিনে হবে এই যুদ্ধ অবসান ?
মহাপাপে মুক্ত হ’ব আমি?
হে কৌন্তেয় ।
পুনঃ কেন অজ্ঞানের সম এই শােক
কেন অহঙ্কারে ভাব
তৃতীয় দৃ কর্ণার্জুন অর্জুন। তুমি বধিয়াছ দ্রোণে? মহাকাল করে মহামার, তুমি নিমিত্ত কারণ তার। ধৰ্ম্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে কহিয়াছি তােমা ধৰ্ম্মের নিগূঢ় তত্ত্ব। তবু শােকমগ্ন কেন, কেন বীর অধার এমন দুর্বল হৃদয়, বিচিত্র গঠন তার, বিবেক বিহ্বল দেখি হৃদয়ের কাছে। শুন হৃষীকেশ, হ’ জ্ঞান যতই কঠোর, পদে পদে পরাজিত তাহা অন্তরের সামান্য আঘাতে। শােক বল কেমনে নিবারি ? ভীমের প্রবেশ ভীম। হে মাধব। মহােল্লাস শুনিলাম বিপক্ষ-শিবিরে, মহা আস্ফালন করে কৌরবীয় চক্ষু কর্ণ হ’ল সেনাপতি রণে। দামামা-নির্ঘোষে দত-বংশাধম সৈন্মাঝে করিছে প্রচার- কালি রণে বধিবে পাবে।
কর্ণার্জুন পঞ্চম অঞ্চ ভৗম। হল ভাল- পিতামহ ভীষ্মদেব, গুরু দ্রোণ, আছিলেন নায়ক যখন, মমতায় করিয়াছি রণ; এবে কর্ণ সেনাপতি, প্রাণ ভরি’ মিটাইব রণতৃষ্ণা মম। রে অর্জুন। কেন স্নান কেন হেরি নিরুৎসাহ তােমা? শ্ৰীকৃষ্ণ। আচার্যের মৃত্যুতে অর্জুন শােকে কাতর হয়েছেন। এ তো শশাকের সময় নয়। বৈরী আস্ফালন ক’ছে, আর আমরা শােক ক’ব ? শােক ক’ব—যখন কুরুপক্ষের কেউ থাকবে না। তখন শতভাই দুৰ্য্যোধন, ভীষ্ম, দ্রোণ সকলেরই জন্য শােক কব- এখন নয়। আশ্চর্য্য! অৰ্জ্জুন দূতসভার প্রতিজ্ঞা কি এর মধ্যে ভুলে গেলে? অর্জুন। ভুলি নাই, আছে হৃদয়ের স্তরে স্তরে লেখা- জ্যেষ্ঠের লাঞ্ছনা, পাঞ্চালীর অপমান অগ্নির অক্ষরে তবু ভাই বিকল অন্তর, গুরু-হা আমি। গুরুশােক করিব হে রণ-অবসানে। কৃষ্ণ। এই তাে বীরের কথা। যুঃ অন্তে ক্ষত্র করে শােক, তীম।
इौवन কর্ণার্জুন ১১ অর্জুন । । হাসিমুখে পুত্রে দেয় বলি, হৃদয়ে পাষাণ বধি। ক্ষত্রিয়ের শােক ফুটে অসিমুখে! হত অতিম- তবু আছি স্থির অশ্ব-রজু ধরি’! আঁখি নীর শুষ্ক সব সমর উত্তাপে। সপ্তরথী মারিয়াছে অভিমন্য মাের- হে মাধব, ভাল কথা করালে স্মরণ। ব্যহমুখে ছিল জয়দ্র, আজি পরপারে করিছে বিশ্রাম । সপ্তরথী মাঝে কর্ণ একজন ভাল কথা করালে স্মরণ। হে মধ্যম। কোথা রাজা? কোথা যুধিষ্ঠির ? দামামা নির্ঘোষে দুষ্ট দুর্যোধন প্রকাশে উল্লাস, শত বস্ত্র কর আবাহন- উঠুক গজিয়া সপ্ত সমুদ্রের বারি- মহারােলে হারি’ পবন করুক প্রচার- কালি রণে কর্ণবধ প্রতিজ্ঞা আমার । যাও দুই ভাই, দেখ কোথা জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির। অতি ম্লান গুরু-বধে তিনি, অনুমানি, নির্জনে করেন খে। শােক-অগ্নি তার করিব নির্বাণ
১২
কর্ণার্জন
দুঃশাসন বক্ষ-রক্ত ঢালি’
এস ভাই।
ভীম ও অর্জনের প্রস্থান
কৃষ্ণ। ভারত-যুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করব না; কিন্তু সমস্ত অস্ত্রের ধার-মুখে
আমি। অর্জুন প্রতিজ্ঞা করলে, কর্ণ বধ করব; কিন্তু কর্ণ তাে
সামান্য বীর নন্। সহজাত কবচ-কুণ্ডলধারী জামদগ্ন্য-শিষ্য কর্ণকে বধ
ক’তে দেবতারাও পারেন কিনা সন্দেহ। অর্জুনের পক্ষে এক কর্ণ
বধ অসম্ভব। আর যদিও অর্জুন কোনরূপে কর্ণের শৌৰ্য্য সহ
ক’তে পারে—যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব অগ্নিমুখে তৃণের মত
কর্ণের শরানলে দগ্ধ হবে। যদি তাই হয়, তা হলে আমার এই
ভারত-যুদ্ধের আয়ােজন, সবই তাে পণ্ড!
কুন্তীর বেশ
গ্রীকৃষ্ণ।
কহ মাতা,
কিবা প্রয়ােজনে আগমন হেথা তব ?
শুষ্ক মুখ, ভয়ে ভীত সঙ্কুচিত গতি,
মহারণে পড়িয়াছে দ্রোণ,
পুত্রগণ বিজয়ী তােমার,
তবে কেন নিরানন্দ হেরি?
শুনি অন্তর্যামী তুমি।
যদি সত্য অন্তর্যামী,
অন্তরের ভাষা মাের বুঝহ আভাষে।
বুঝ
কি বেদনা তার
যেই নারী পুত্রের জননী।
কুন্তী।
কৃষ্ণ।
কিন্তু মাতা,
তৃতীয় দৃষ্ণ
কর্ণার্জুন
কুন্তী।
পুত্রগণ নহেক সামান্য তব,
তবে কি হেতু কাতর?
যদি বুঝিয়া না থাক,
হতে পারে তুমি ভগবান,
কিন্তু সুনিশ্চয়-নহ অন্তর্যামী কভু।
পুত্রগণ বিজয়ী আমার
নাহিক সন্দেহ ;
কৃষ্ণ।
কালি রণে ভ্রাতৃদ্বন্দে মাতিবে মেদিনী,
সহােদর, সহােদরবধে তুলিবে কৃপাণ,
আমি কুন্তী জননী পুত্রের
নিরুদ্বেগে দেখিব সে রাক্ষসীয় লীলা ?
কহ, নারী বলে
সহেও কি নাহি সীমা মাের ?
মাতা,
এতদিন কথা কর নি প্রকাশ
আজি যদি কহ ধৰ্ম্মরাজে,
যুধিষ্ঠির-সদাধৰ্ম্ম-অনুগামী
সিংহাসন ডালি দিবে জ্যেষ্ঠের চরণে
অভীষ্ট আমার
ধৰ্ম্মরাজ্য স্থাপনের মহা আয়ােজন,
সকলি হইবে পণ্ড!
বুঝ দেবি,
মহাকাৰ্য্য হবে নাশ,
তুমি হবে নিমিত্ত তাহার।
১৩ কর্ণার্জুন কুন্তী। তবে পুত্রবধ হেরিতে হইবে মােরে ? তুমি জান, কর্ণ মহাবীর, তিন লােকে সমকক্ষ নাহি তার কেহ, পঞ্চ-পাণ্ডব-জননী আমি পুত্রহারা হ’ব তার রণে? যাহাদের তরে সহিয়াছি এত দুঃখ, বনে বনে ভিখারিণী বেশে, কভু নিৰ্জন কুটীরে, আঁখি-নীরে ভাসায়ে মেদিনী যাপিয়াছি অন্ধকার দিবস যামিনী ? মাতা, বৃথা এ আশঙ্কা তব ! তিনলােকে নাহি কেহ অর্জুনে বধিতে পারে। আর চারি পুত্র মাের? ধৰ্ম্মরাজ রক্ষিত সকলে যম-জয়ী সবে। ঐকৃষ্ণ। কুন্তী। শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু কর্ণ? কুন্তী। কৃষ্ণ। মাতা! এইবার চিন্তিত কৰিলে মােরে কিন্তু দেবি, বুঝিতে না পারি কিবা খেদ কর্ণ যদি পড়ে রণাঙ্গনে চির পুত্র-বৈরী তব সেই। • আর তুমিও তাে মাতা, জননীর গেহে তারে কর নি পালন, তবে আজি কেন এই মায়া ?
তৃতীয় দৃশ্য কর্ণার্জুন কুন্তী। গুনি ভগবা তুমি জগতের জনক-জননী, তবে কেন নাহি বুঝ মা’র মনটব্যথা? পালন করি নি তারে। কত দিন-কত মাস-কত বর্ষ হয়েছে বিগত, মুখ তার করি নি দর্শন- কিন্তু নারায়ণ, মাতৃবক্ষ-মাঝে নিমিষের স্মৃতি দিয়ে গড়া, সেই পরিত্যক্ত সন্তান আমার পলে পলে হয়েছে বর্ধিত ! কল্পনায় মাতৃস্তন্য করিয়াছে পান, কল্পনায় ক্ষুদ্র বাহু বেড়ি ধরিয়াছে গলদেশ মাের, কল্পনায় কেঁদেছে কখনাে, খলখল হেসেছে মধুর, শত চুম্বনের সােহাগ মাখান সেই ফুল্ল কুসুমের মত ক্ষুদ্র মুখখানি কতবার গণ্ডে মাের করেছে স্থাপন ! সেই অভাগা নন- যদি কালি রণে হয় তার নাম- নিবাস। কহ, কেমনে ধরিব প্রাণ? কৃষ্ণ। এর একমাত্র আছে গাে উপায়, কৃষ্ণ। ; কর্ণার্জুন পঞ্চম সঙ্ক কিন্তু তাহা অতীব কঠিন ; পারিবে কি তুমি? কুন্তী। পুত্রশােক হ’তে আছে কি কঠিন কিছু ? কর্ণে তুমি পার কি করিতে নিবারণ এই মহারণ হতে? কুন্তী। কোথা দেখা পাব তার? কৃষ্ণ। মধ্যাহ্নে সমর ত্যজি নিত্য যায় সুৰ্য-অর্ঘ্য দিতে যমুনা-সলিলে কালি নিভৃতে তাহার সনে কর দেখা, কহ তারে আত্মপরিচয় তার, কর অনুবােধ মিলিবারে যুধিষ্ঠির সনে। অনুমানি, যদি শশানে তুমি জননী তাহার, অনুরােধ তব এড়াতে নারিবে। কুন্তী। ভাল, তব আজ্ঞা করিব পালন, যদুপতি ! যাব আমি কর্ণের নিকটে। সঙ্কটে সঙ্কটহারী, তুমি মাত্র সহায় আমার । কুন্তীয় স্থান কৃষ্ণ। কুন্তী! তােমার এই মমতাই তােমার পুত্রনাশের কারণ হবে। একা অৰ্জ্জুনের সাধ্য কি কর্ণকে বধ করে! সহজাত কবচ-কুণ্ডল- ধারী কর্ণের নিধন অসম্ভব। দেখি, ইন্দ্রকে দিয়ে যদি কবচ- কুল ভিক্ষা করাতে পারি। কুন্তী! তুমি, আমি, ই, মেদিনী, রামের অভিশাপ এবং অর্জুন এই ছয়জনের দ্বারাই কর্ণ বধ হবে। बशन নদীতীর কর্ণ ও কুরী কুন্তী। কহ কেবা তুমি শুভ্রবাসে বর-অঙ্গ করি আচ্ছাদন, প্রতীক্ষায় রয়েছ এখানে? কহ, কিবা প্রয়ােজন তব ? বৎস, ভিখারিণী আমি। বৎস বলি’ সম্বােধন করিলে আমারে। নমস্কার সহ দেবি ? কহ মাতা, কেবা তুমি, কিবা প্রয়ােজন তব ? কেবা আমি? পরিচয় মাের অজ্ঞাতে তােমার কণ্ঠে উঠিছে ফুটিয়া। সুপ্ত ছিল এতদিন যাহা শােণিতের অন্তরালে তব, কাল যাহা পারে নি নাশিতে। কুম্ভী। বৎস, আমি কুঞ্জ- পার্থের জননী ? কহ মাতা, এ কি অঘটন আজি?
১৮ পঞ্চম কর্ণ। কর্ণার্জুন পঞ্চকেশরী-জননী তুমি, পাণ্ডব-ঈশ্বরী দীনা ভিখারিণী বেশে আসিয়াছ মাের কাছে চির পুত্র-বৈরী তব ! কহ কিবা প্রয়ােজন? আসিয়াছি ষষ্ঠের নিকটে। আসিয়াছ যঠের নিকটে । কহ, কি সম্বন্ধ তােমায় আমায় ? এ কি! ম্লান কেন বান তােমার ? অ কেন নয়নের কোণে ? স্নান কেন মধ্যাহ্ন-ভাস্কর, স্নান হেরি দিক-চক্ররেখা। মলিনতা যমুনার নীরে। কহ, সত্য কেবা তুমি ? আমি রে জননী তাের ! সূত-পুত্র আমি বাধার নন্দন, চিরদিন এই খ্যাতি- পরিচয়-পতাকা আমার পূরােভাগে করেছে গমন- আজি তুমি এসেছ হেথায় শতচ্ছিন্ন করিবারে তারে ? তুমি যদি না হইতে ধৰ্ম্মরাজ মাতা, যদি আর কেহ বলিত এ কথা, মিথ্যাবাদী বলিতাম তারে। কুন্তী। কর্ণ।
চতুর্থ দৃ কর্ণার্জুন কুন্তী। নহে মিথ্যা, সত্য, নহ তুমি রাধার নন্দন, অভাগিনী কুন্তীর নয়, বুদ্ধি দোষে মাের আজি সূত আখ্যাধারী, ভ্রাতৃ-বৈরী-মিত্র কোরবের। বৎস, তুমি মাের প্রথম নয়। সূৰ্য-তেজে জনম তােমার । কর্ণ। বিচিত্র নাটক-কাব্য কথা হেন- ইতিপূর্বে আর কেহ করে নি রচনা। পাটেশ্বরী ভারত-ঈশ্বরী জননী আমার পিতা ওই তমােহর দেব দিবাকর আলােক আকর, আর, আমি ফিরি শৃগালের প্রায় অন্ধকার সংসার অরণ্যে, পরিচয়হীন—ব্যঙ্গ জগতের ! যাও–যাও দেবি, উন্মাদ কোরাে না মােরে। তুমি মাের মাতা, মরণ শিয়রে করি’ এই পরিচয়ে নাহি প্রয়ােজন। কুন্তী। বিধির নির্বন্ধ বৎস, সত্য আমি তাের মাতা। ( দৈববাণী—সূৰ্য।) বৎস, সন্দেহে না মনে সেহ স্থান।
কর্ণার্জুন
পঞ্চম
কর্ণ।
তুমি কর্ণ সন্তান আমার,
জননী তােমার সম্মুখে দাঁড়ায়ে ওই ।
দিবালােক গ্রাস করিল রজনী,
স্থান কাল হারাইল নিজ ব্যবধান,
অতীত উদয় হেরি বর্তমান মাঝে।
আমি কর্ণ কুন্তী-পুত্র রবির তনয়,
মাতৃহারা আজি মাতার সম্মুখে,
অদ্ভুত বিধির বিধি।
হে জননি,
হও যত অপরাধী
তবু তুমি আরাধ্য। আমার!
নহে ভিক্ষা,
কহ কিবা আজ্ঞা তব ?
ভী, দ্রোণ, গত,
শুনিলাম এ সমরে তুমি সেনাপতি
আকুল আমার প্রাণ
ভ্রাতৃবধে ভাই ।
পুত্রহারা হবে কুন্তী তুমি কিম্বা পাণ্ডব উচ্ছেদে,
তাই লােকলজ্জা দিয়া বিসর্জন
যে কলঙ্ক গাে পনের তরে
বক্ষ ক্ষীরে বঞ্চিত করিয়া তােমা,
নয়নের নীরে ভাসি’
নদীলে দিয়াছিনু ডালি-
আজি স্ব-ইচ্ছায় সে কলঙ্ক ধরি’ শিরােপরে,
সেই নদীতটে
কুন্তী।
•
চতুর্থ দৃ কর্ণার্জুন কর্ণ। ভিখারিণী বেশে এসেছি তােমার কাছে। পুত্র ! ভিক্ষা—এ সমরে দেহ ক্ষমা, মিল’ যুধিষ্ঠির সনে, ছয় পুত্র মাের বহুক জীবিত। এত মায়া, এত গেহ, এতই করুণা- ওই বক্ষে তব ! তবে কহ গাে জননি, কোন প্রাণে বিসর্জন করেছিলে মােরে, -অসহায় অবােধ অজ্ঞান শিশু, দশ মাস দশ দিন গর্ভে দিয়ে স্থান ? মৃত্যুমুখে দিয়েছিলে সপি প্রথম তনয়ে তব ? কহ মাতা, তখন কি কাদে নি মায়ের প্রাণ? বিন্দু বারি ঝরে নি কি নয়নে তােমার? কুন্তী। পুত্র! কর্ণ। আর লজ্জা নাহি দেহ মােরে। কোথা লজ্জা চির লজ্জাহীনা তুমি- যাক- বুঝিয়াছি মাতা, বুঝিয়াছি আগমন কারণ তােমার- পুত্রস্নেহে অন্ধ তুমি! কিন্তু আস নাই মাের তরে,
১৪২
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অৰু
কুন্তী।
কর্ণ ।
আমি সেই বিসজ্জিত অভাগা তনয় তব !
আসিয়াছ
পঞ্চ-পাণ্ডবের কল্যাণ কামনা করি’
আর-কলঞ্চের ডালি তুলে দিতে শিরে মাের ।
হকতা’তে না ছিল আক্ষেপ
কিন্তু সত্যে বদ্ধ আমি দুৰ্য্যোধন পাশে,
আমরণ আত্রা তার করিব পালন।
ত্যজিতে তাহারে না পারিব কভু,
যদি জগতের সমস্ত মাতৃত্ব
আজি দীন-কষ্ঠে ভিক্ষা করে কর্ণের নিকটে।
তবে নিষ্ফল হইবে ভিক্ষা?
এ জীবন করেছ নিষ্ফল,
ব্যর্থ করিয়াছ সব সাধনা আমার,
ক্ষত্র হয়ে নহি ক্ষত্র আমি,
রবিদ্যুতি ধূলিসাৎ করেছ হেলায়-
দুর্যোধন বক্ষে স্থান দিয়েছে সাদরে,
কি আশ্চর্য, ভিক্ষা তব হইবে নিল।
মাতা,
নাহি জান কি করেছ তুমি!
নাহি জান,
কি উত্তাপ-কি যন্ত্রণা ভীষণ
এই হৃদয়ের স্তরে স্তরে
আছে সঞ্চিত আমার!
তুমি যদি স্থান দিতে কোলে,
আজ ভারতের ইতিহাস হত অপ
চতুর্থ তৃ কর্ণার্জুন ১৪৩ - কুন্তী। কর্ণ! কি করিব, বাক্য-বন্ধ, নাহিক উপায় আমি রব চির-বৈরী পাণ্ডবের ! আজ আমি যদি বলি, যুধিষ্ঠির সগৌরবে সিংহাসনে বসাবে তােমারে জ্যেষ্ঠ বলি’ পূজিবে চরণ। ভাগ্যবান যুধিষ্ঠির, ভাগ্যবান চারি ভ্রাতা তার এই মাতৃস্নেহে বদ্ধিত হয়েছে তারা। চিরদিন ভাগ্যহীন আমি, এই স্নেহে হ'য়েছি বঞ্চিত। আলিয়াছ পঞ্চ তনয়ের কল্যাণ কামনা করি পঞ্চ পাণ্ডব-জননী, এসেছ যখন, সাধ্যায়ত্ত যাহা তাহা করিব গো আন- নহে সিংহাসন লােভে ; সিংহাসন অতি তুচ্ছ কর্ণের নিকটে। শুধু রাখিতে সম্মান তব, করি পণ-- এই যুদ্ধে হয় পার্থ নয় কী ধরা হতে লইবে বিদায় তুমি রবে চিরদিন পঞ্চ-পুত্রের জননী। বৎস, বুঝিয়াছি অভিমান তৰ। আমি নারী দুর্বল অভাগী, কুন্তী।
১৪৪
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অং
মনােব্যথা মাের,
জানেন সে অন্তর্যামী যিনি!
কি বলিব-ক্ষমা করো মােরে,
ক্ষমা কোয়ে জ্ঞান-ছীনা জননী বলিয়ে,
জেনে-
শুধু করি নাই ব্যর্থ তােমার জীবন,
জীবনসঙ্গিনী ব্যর্থতা আমার
আমি মাতা অভাগ করে।
প্রান
কর্ণ।
রে অর্জুন।
এত দিন করিয়াছি হিংসার পােষণ,
আজি দেখি ব্যর্থ সব।
তুমি বটে কুন্তী-পুত্র,
আমি চিরদিন রাধার নন্দন;
অদ্ভুত অদৃষ্ট লিপি।
মাতা, নহে পরিচয়
নিজ হস্তে মৃত্যু দিয়ে গেলে মােরে!
পঞ্চম দৃশ্য কর্ণের প্রাসাদ-কক্ষ পদ্মাবতী ও ছদ্মবেশী সূৰ্য্য পদ্মা। আপনি কে ? সূৰ্য্য। মা, সে পরিচয় দেবার তাে সময় নেই, পরে জানবে আমি কে। স্নেহান্ধ, নিশ্চিন্ত থাকতে পারি নি, ছুটে এসেছি। কাল রাত্রে স্বপ্নে তােমার স্বামীকে সাবধান করেছিলেন, কিন্তু তাতে কোন ফল হবে কি না কে জানে! পদ্মা। আপনি তাকে দেখা দিয়ে সাবধান কলেন না কেন ? সূৰ্য্য। কোন বিশেষ কারণে—যতক্ষণ তােমার স্বামী জীবিত থাকবেন- আমি দেখা দিতে পাব না, নচেৎ তােমার সাহায্য গ্রহণ কব কেন ? পদ্মা। তিনি তাে যুদ্ধসজ্জা করছেন, এখনি তাে রণক্ষেত্রে যাত্রা কবেন। সূৰ্য। এখনাে সময় আছে। তুমি আর বিলম্ব কোরাে না, যাও-দেখাে রথে উঠবার পূৰ্ব্বে যেন কোনো ব্রাহ্মণের সঙ্গে কিম্বা কোন ব্যক্তির সঙ্গে তার দেখা না হয়। তােমার স্বামী সত্যে বদ্ধ, যে যা চাইবে তাকে তাই দেবে। জেনাে মা, আজ যে আসবে, সে তােমার স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইবে, তার সহজাত কবচ-কুণ্ডল চাইবে। যদি স্বামীকে রক্ষা করতে চাও, আজ পুরদ্বার সব বন্ধ করে দাও, ভিক্ষার্থীকে আজ তােমার স্বামীর সম্মুখীন হতে দিও না। যাও- নিজহস্তে তাকে রণসাজে সাজিয়ে রণক্ষেত্রে পাঠাও। এ যদি কর্ণার্জুন পঞ্চম অঙ্ক পার মা, তা হলে জেনে—তােমার স্বামীর মৃত্যু নাই, তােমার স্বামীর জয় অবশ্যম্ভাবী। পদ্মা। কে আপনি মহাভাগ, করুণায় আমার স্বামীকে রক্ষা করতে এসেছেন? যদি পরিচয় না দিলেন, পদধূলি দিন, আশীৰ্ব্বাদ করুন যেন স্বামীর জীবন রক্ষা করুতে পারি। সূৰ্য। খুব সাবধান, কোন প্রার্থী যেন তােমার স্বামীর সম্মুখীন না হয়। মন্ত্রীদের বলে দাও, রাজকর্মচারীদের বলে দাও-ভিক্ষুক যেন পুরীতে প্রবেশ না করে। (স্বগত) ইন্দ্র! দেখি তুমি কিরূপে কৃতকার্য হও। बशन পদ্মা। কে ইনি কিছুই তাে বুঝতে পারুলেম না, নিশ্চয়ই আমার স্বামীর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী কেউ দেবতা ছদ্মবেশে আমায় সাবধান করে দিয়ে গেলেন। মা সতী-কুলরাণি ! দেখাে মা, তনয়ার মুখ রেখাে, যেন দেবতার আদেশ পালন করতে পারি। নিয়তির প্রবেশ নিয়তি। আমায় চিনতে পার? পদ্ম। চেনার সময় নেই, মহাকাৰ্য্য সম্মুখে ! বােধ হয় তােমায় কোথায় দেখেছি, বােধ হয় তােমায় চিনি—কিন্তু এখন নয়, এখন নয়। যদি দিন পাই, তখন তােমায় চিনব—এখন নয়। थशन নিয়তি। পদ্মাবতি ! তুমি ভিক্ষুককে পুরপ্রবেশ করতে দেবে না—আজ নগরীর দ্বার বন্ধ কবার জন্য ছুটে চলেছ—কিন্তু তুমি জান না যে, মহাকালের পথ সদা উন্মুক্ত, কেউ তার প্রবেশের পথ অর্গলবদ্ধ কতে পারে না; লােক-লােচনের অন্তরালে সে পথ চির-অন্ধ-
যষ্ঠ দৃশ্য
১৪৭
কর্ণার্জুন
কারে ঢাকা, কিন্তু সে আলো ধরে নিয়ে যাই আমি-তাই
যম সৰ্বজয়ী! ব্রাহ্মণবেশী ইন্দ্রকে তােমার স্বামীর নিকটে আমিই
নিয়ে যাব।
पशन
পদ্মাবতীর পুনঃ প্রবেশ
পদ্ম। মন্ত্রী রাজ-কর্মচারীদের প্রতি আদেশ দিয়ে এসেছি-নগরীর দ্বার
রুদ্ধ-যাই-স্বামীকে নিজ-হস্তে রণ-সাজে সাজিয়ে রণক্ষেত্রে পাঠাই।
হে অপরিচিত, দ্বিজ ! আপনার চরণে কোটী কোটী প্রণাম, আপনি
পিতার স্থায় আমার মহৎ উপকার করে গেলেন।
কর্ণের প্রাসাদ-কক্ষ
কর্ণ ও ব্রাহ্মণবেণী ই
কর্ণ।
কর্ণ।
চাহ কবচ-কুণ্ডল ?
হাঁ কবচ-কুণ্ডল-অঙ্গ হতে তব
কিবা প্রয়ােজন তাহে দেৰ ?
প্রয়ােজন জানিবার নাহি অধিকার।
শুনি সত্যবাদী তুমি,
দান তব বিখ্যাত ভুবনে,
প্রার্থীজনে নিরাশ না কর কভু।
যদি অঙ্ক হতে তব
১০
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অঙ্ক
ছিন্ন করি সহজাত কবচ-কুণ্ডল
ভিক্ষা দিতে পার মােরে।
কর্ণ। (স্বগত) অদ্ভুত স্বপন দেখেছি নিশি শেষে
পূৰ্বাশার দ্বার মুক্ত করি
জ্যোতির্ময় পুরুষ-প্রবর
স্নেহ গদগদকণ্ঠে কহিছেন মােরে,
“বৎস!
কালি প্রাতে প্রার্থী যদি কেহ
ভিক্ষা চাহে কিছু,
নিঃসংশয়ে বিমুখ করিও তারে।”
স্বপ্ন-মৰ্ম্ম পারি নি বুঝিতে,
আজি দেখি অর্থ তার
দিবালােক সম সুস্পষ্ট আমার আছে।
প্রকাশ্যে ) দেব!
জান কি হে তুমি,
কোন্ বস্তু করিছ প্রার্থনা ?
জানি-কবচ-কুণ্ডল।
কর্ণ।
না, না, জান নাক কিছু ।
কি জান সমুদয়,
জেনে শুনে প্রাণ মাের এসেছ লইতে।
' আজ যদি
কবচ-কুণ্ডল দান করি তােমা
জেনে, রণক্ষেত্রে নিশ্চয় মরণ মম।
এখনাে বুঝিয়া দেখ,
যদি পার,
पर्छ भूण কর্ণার্জুন ১৪৯ বাক্য কর সংযত, এখনাে চাহ আর যেবা অভিরুচি তব, শুধু কুরুক্ষেত্র মহরণ যতদিন নাহি হয় অবসান, নাহি হয় পার্থের বিনাশ, ততদিন আর সব লই- যাহা ইচ্ছা তব শুধু চেও নাক কবচ-কুণ্ডল। কিন্তু প্রয়ােজন কবচ-কুণ্ডল মােয়। বুঝিয়াছি, প্রয়ােজন কর্ণের নিধন, তাই যাত্রাকালে তুমি দ্বিজ সম্মুখে আমার, ভিখারীর বেশে ! কিন্তু বাক্য যবে করিয়াছি দান, কর্ণ। তুচ্ছ কবচ-কুণ্ডল অকাতরে দিব উপহার চরণে তােমার। কিন্তু কই, চর্মচ্ছেদে জীবিত কেমন রব ? দুৰ্য্যোধন পাশে করিয়াছি প্রতিজ্ঞা ভীষণ, নিষ্পবা করিব ধরণী কিম্বা রণস্থলে দিব আহুতি জীবন- সেই বাক্য- সেই প্রতিজ্ঞা কর্ণের হইবে নিল।
পঞ্চম অঞ্চ
এস দ্বিজ
কর্ণার্জুন
কহ এ সমস্যার উপায় কি করি?
মম বরে
অঙ্গচ্ছেদে প্রাণনাশ না হবে তােমার,
অক্ষত রহিবে দেহ।
পাবতীর প্রবেশ
পদ্ম। এ কি! কে তুমি?
কেমনে আসিলে হেথা ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ,
রুদ্ধ যবে পুরদ্বার সব ?
কর্ণ।
পদ্ম, চেন কি ব্রাহ্মণে?
পক্স। নাহি জানি না,
সর্বনাশ সম্মুখে উদয় !
নহে দ্বিজ,
মহাকাল এসেছেন ব্রাহ্মণের বেশে।
কর্ণ। নাহি ক্ষতি,
হন মহাকাল
প্রতিজ্ঞা আমার নিশ্চয় পালিব আমি।
এই অঞ্জ
সহজাত কবচ-কুণ্ডল-ধারী কর্ণ হ’ক কবচ-বিহীন।
কইত্রে স্থান
পক্স। কেমন করে ব্রাহ্মণ এখানে প্রবেশ করলে? কোন পথ দিয়ে
প্রবেশ কলে? কে ওকে এখানে আলে?
নিয়তির বেশ
নিয়তি। আমি-আমার সঙ্গে ভাব, না আড়ি?
পদ্ম। তুমি। তুমি !
প্ৰষ্ঠ দৃশ্য
কর্ণার্জুন
নিয়তি। হাঁ, চিনতে পেরেছ ?
পদ্মা। চিনিছি, চিনিছি, স্বামীর প্রাণ মূল্য দিয়ে তােমায় চিনিছি।
তবে রাসি, তুমিই ব্রাহ্মণকে পথ দেখিয়ে এখানে এনেছ ?
নিয়তি। আমিই তত পথ দেখিয়ে পাঞ্চালে নিয়ে গিয়েছিলেম, আমিই
তােত তােমার স্বামীকে চিনিয়ে দিয়েছিলেম ; তাই তো তােমার স্বামী
তখন মৃত্যু হতে রক্ষা পেয়েছিলেন, তবে রাক্ষসী বলছ কেন?
পঙ্গ।
কেবা তুমি প্রহেলিকাময়ী
ছায়া সম ফের সাথে সাথে?
কভু মমতায় বিগলিত প্রাণ,
কভু পিশাচী সমান,
করি’ ভেদ দুর্ভেদ্য প্রাচীর
মৃত্যু ডেকে আন ঘরে।
কভু সঙ্গীত-ঝঙ্কার,
কভু হাহাকার,
তব বাজে,
কভু ফণিমালা মাঝে,
কভু কুসুমের সাজে,
প্রাণের দোসর অতি ইষ্ট আরাধ্য কখনাে,
তীমা ভয়ঙ্করী কভু।
ধরি পায়, কহ
কেবা তুমি মায়াবিনী, ভ্ৰম ধরাঝে?
সমনুরে কয়ে
কর্ণের প্রবেশ
কর্ণ।
সব শেষ
আজি দান সার্থক আমার ।
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অঞ্চ
পদ্মাবতি
এ কি!
সেই তাপস-তনয়া
গােধূলি আচ্ছন্ন বনে
তুমি তবে মায়ামৃগ ধরেছিলে সম্মুখে আমার ?
আজি পুনঃ আসিয়াছ
মায়া-কায়া করিতে বিনাশ ?
কহ কেবা তুমি-দেহ পরিচয়,
সংশয়ে না রাখ আর।
নিয়তি।
পদ্মা। (সভয়ে) নিয়তি।
কর্ণ।
রণক্ষেত্রে অসিমুখে
নিয়তির ছেদিব বন্ধন।
নিয়তি।
নাহি ভয়,
সকলের এহন
সপ্তম দৃশ্য
রণস্থল
শকুনি
শকুনি। মহাঝড়ে বৃক্ষ হতে ফল পড়ছে—একটার পর একটা ; আজ
কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধের তৃতীয় দিন! আমি কবে যাব? শত ভাইয়ের
বাকী দুঃশাসন আর দুর্যোধন। আমারও উনশত ভাই অপেক্ষা
কছে। বহু বর্ষের ক্ষুধা-মিটেছে কি? মিটেছে কি? বাকী
শুধু দুৰ্য্যোধন আর দুঃশাসন।
সপ্তম দৃশ্য কর্ণার্জুন দুৰ্যোধনের প্রবেশ দুৰ্য্যো। হে মাতুল, অদ্ভুত সমর হেন দেখি নাই কভু। কর্ণ আজ করে মহামার ; বিচ্ছিন্ন পাণ্ডব সেনা, যুধিষ্ঠির পলায় সভয়ে, অর্জুনের নাহিক সন্ধান। দেখ কোথা সহদেব, হও আগুয়ান, প্রতিজ্ঞা করেছে সেই বধিবে তােমারে। চারিদিকে শুনি ক্ষুধার্তের চীৎকার ভীষণ। চল দুর্যোধন, দেখি কোথা সহদেব- আজি আনন্দ ধরে না মাের। শকুনি। উভয়ের প্রস্থান শলের প্রবেশ শল্য। কর্ণ রথ পরিত্যাগ করে ভূমিতে অবতীর্ণ হয়ে যুদ্ধ করছে। ছি ছি। কি লজ্জা, কি ঘৃণা! রথীশ্রেষ্ঠ শল্য আমি, আমি সূতপুত্র কর্ণের সারথি! কর্ণের মৃত্যু না হলে আমার বীরত্ব দেখাবার নেপথ্যে কর্ণ । ধন্য পার্থ, ধন্য সারথি তােমার, পলায়ন-পটু হেন দেখি নি কখনাে। কোথা ভীমসেন, যদি পার, রক্ষা কর ধৰ্ম্মরাজে তব ।
১৫৪
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অঞ্চ
শল্য। যুধিষ্ঠিরও দেখছি রথ পরিত্যাগ করে কর্ণের সম্মুখীন হয়েছে।
যাই, আমি রথ প্রস্তুত রাখি গে যদি প্রয়ােজন হয়।
बहान
নেপথ্যে যুধিষ্ঠির। কোথায় অর্জুন! কোথা ভীমসেন।
অষ্টম দৃশ্য
রণস্থলের অপরাংশ
শকুনি ও দুঃশাসন
শকুনি। তুমি ভীমসেনকে খুঁজছিলে ? সারথিকে ঐ দেখ !
আনতে বলব কি ?
, রথে নাহি প্রয়ােজন,
গদাযুদ্ধে ভীমসেনে পাড়িব এখনি।
সহদেবের এবে
সহ।
হে সোবল
!
আজি নাহি নিস্তার তােমার।
যেই করে অক্ষপাটি করেছ চালন,
সেই কর কাটি শরমুখে
কুকুরে করিব দান।
ন ও দুঃশাসনের প্রবেশ
আরে আরে কৌরব কলঙ্ক
আরে দুঃশাসন,
তিনপুরে নাহি কেহ আজি রক্ষা করে তােরে।
কর্ণার্জুন
ভাল, ভাল,
দেখিব বীরত্ব তাের।
উমের প্রধান
শকুনির পুনঃ প্রবেশ
শকুনি। রণ-সিন্ধু উথলে ভীষণ,
ঐ ঐ দুঃশাসন যুঝে ভীমসেন সনে।
ভীম, মনে রেখো
দুঃশাসন বক্ষরক্ত পান
প্রতিজ্ঞা তােমার!
এ
রণস্থলের অপয়াংশ
দুঃশাসন শায়িত-বক্ষোপরি ভীমসেন
আরে হীন পণ্ডর অধম।
আজি পড়ে কিরে মনে
পাঞ্চালীর কেশ-আকর্ষণ?
ওহহ! আর নহে উষ্ণ
হিম দেখি বক্ষ রক্ত তাের।
ক! কৃষ্ণা।
এইবার বেণী তব করিব সংহার!
নবম দৃশ্য
দুৰ্যোধনের প্রবেশ
দুৰ্য্যো।
কোথা দুঃশাসন ?
বহুক্ষণ নাহি হেরি তারে ।
কেন মাের অন্তর ব্যাকুল ?
শকুনির প্রবেশ
শকুনি। দুৰ্য্যোধন! দুৰ্য্যোধন!
দুৰ্য্যোধন। এ কি মাতুল ! তােমার ললাটে রক্তের তিলক কেন?
শকুনি। শুধু ললাট নয়, এই দেখ, হাতেও রক্ত মেখেছি! দেখ
চিনতে পার কার রক্ত ?
দুৰ্যো। কোন শত্রুর রক্তে হস্ত রঞ্জিত করেছ মাতুল ? সহদেব
কি মৃত?
শকুনি। সহদেব নয়—দুর্যোধন-চিনতে পাছ না? সহদরের রক্ত!
তােমার সহােদর দুঃশাসন নেই, ভীমসেন তাকে বধ করেছে।
দুৰ্য্যোধন। আঁ! দুঃশাসন! ভাই-ভাই! (মূচ্ছা)
শকুনি। এ মূচ্ছাও ভাঙ্গবে, এখনো উরুভঙ্গ বাকী। আর আক্ষেপ
নেই-আর আক্ষেপ নেই। পিতা আশ্বস্ত হও! তােমরা অনাহারে
মরেছিলে, দেহে এতটুকু রক্ত ছিল না—এ রক্তের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে।
এইবার আমিও যাচ্ছি—যাচ্ছি—আর বিলম্ব নেই! দুৰ্য্যোধন।
দুৰ্য্যোধন!
দুয়ো। হত দুঃশাসন ?
শকুনি। কিন্তু ভীমসেন এখনাে জীবিত রয়েছে।
নবম দৃশ্য কর্ণার্জুন দুর্যো। হে মাতুল! সত্য বটে ভীমসেন্স এখনাে জীবিত। কোথায় সারথি ? লহ রথ ভীমের সম্মুখে, দেখি কত বল ধরে সে পামর! শকুনি। হাঁ, হাঁ, চল-চল, আর বিলম্ব সইছে না—আর বিলম্ব সইছে না। ধমুছলে যুধিষ্ঠিরের গলদেশ বেষ্টন করিয়া কর্ণের প্রবেশ কর্ণ। যুধি। কর্ণ। কোথা পার্থ, কোথা ভীমসেন- ডাক ডাক উচ্চৈঃস্বরে ; কোথা যদুপতি সারথি তােমার ? শুনি অগতির গতি তিনি, গতি মুক্তি করুন বিধান। আরে হেয় রাধেয়। জান এক কথা- হীন আমি রাধার নন্দন, ক্ষত্র হয়ে আর নাহি জান কিছু? বংশ-পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা স্থাপন আমি চাহি নাই কভু! বীৰ্য্যবলে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় জাতি তােদ, ধরা হতে করিব নিৰ্ম্মল। বাল্য হতে আছিল প্রতিজ্ঞ মাের আজি সে প্রতিজ্ঞা অংশে পূর্ণ পরাজিত তুমি যুধিষ্ঠির।
১৮
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অঙ্ক
যদি ইচ্ছা করি,
এখনি নাশিতে পারি
কিন্তু তুমি নাহি জান কি রহস্য সেই,
যাহে অকাতরে প্রাণ দান করি আমি তব।
যাও–যাও ধর্মের নন্দন।
কহ ভুবনবিজয়ী পার্থে আসিতে সম্মুখে।
কোথা শল্য,
হে রথ,
দেখি ভীমসেন কোথা।
যুধি। অর্জুন কি সত্যই প্রাণভয়ে পালিয়েছে। এ অপমান অপেক্ষা
মৃত্যুই শ্রেয়। কিন্তু এ কি! কর্ণের সহিত যুদ্ধে আমার মনে
হিংসার উদয় হয় না কেন? কেন কর্ণের চরণের দিকে চাইলে মাতা
কুন্তী দেবীর চরণ যুগল আমার মনে পড়ে! এ কি দুর্বলতা! কেন
এ সাদৃশ্য? দেখি কোথায় অর্জুন।
শম দৃশ্য
রধারা কর্ণ ও শল্য
শর-জালে আচ্ছন্ন গগন!
শুন শল্য অধিপতি।
দেখ কোথা কপিধ্বজ রথ,
আজি যুদ্ধে
হয় পার্থ নয় কর্ণ
ধরা হ’তে লইবে বিদায়।
দশম দৃশ্য
কর্ণার্জুন
শল্য। কর্ণ। ঐ দেখ দূরে যদুপতি চালিত রথ। চল, এখনি তােমার
রথ অর্জুনের নিকটে নিয়ে যাচ্ছি।
(নেপথ্যে অৰ্জ্জুন। হে মাধব,
বিলম্ব না সহে আর।
কোথা কী ?
সই রথ সম্মুখে তাহার,
আজি রণে দিব বলি রাধার নন্দনে।
রধাৰােণ প্রীকৃষ্ণার্জুনের প্রবেশ
কৃষ্ণ।
ভাল ভাল, ওহে শল্য চালিয়াছ রথ,
বহুকষ্টে পেয়েছি সন্ধান।
অৰ্জ্জুন। হও স্থির আকুল গাণ্ডীব,
যােগ্য অরি নেহারি অদূরে,
এতদিনে মিটিবে তােমার তৃষা।
কর্ণ। হেলায় জীবন দান
করিয়াছি চারি সহােদয়ে তব,
কিন্তু আর নাহি ক্ষমা।
শল্য অধিপতি।
কেন অশ্ববলা করেছ সংযুত ?
চাল, চল, রথ দ্রুতগতি
বধি পার্থে
জীবনের সমস্ত আক্ষেপ
দিই জলাঞ্জলি।
শল্য। কর্ণ। তুমি অর্জুনকে বধ কবে কখন স্বপ্নেও তেব না।
অর্জুনকে বধ করব আমি! তবে আক্ষেপ এই, তুমি নিহত হলে
আমার রথের সারথি হবে কে ?
কর্ণার্জুন
পঞ্চম অঙ্ক
কর্ণ।
নাহি চিন্তা বীরশ্রেষ্ঠ,
শমন সারথি হবে তব।
এবে নিজ কার্য কর সমাধান,
চাল অশ্বগণে
হে পার্থসারথি ।
যদি পার রক্ষা কর রথীরে তােমার।
শল্য। রথচক্র অকস্মাৎ হেরি গতি-হীন,
বুঝিতে না পারি
কেবা রােধে গতি তার।
কর্ণ। আমি জানি, আমি দেখিয়াছি তারে;
কিন্তু নাহি চিন্তা,
ধরাব করি খান, খান, ,
আমি চিরদিন তরে
গতিরােধ করিব তাহার।
শল্য। কর্ণ! মেদিনী যে ক্রমশঃ রথচক্র গ্রাস করছে! এ কি অদ্ভুত
ব্যাপার! এ তাে কখন দেখি নি।
কর্ণ। সকলি অদ্ভুত অদৃষ্টে আমার!
কিন্তু তাহে নাহি ক্ষোভ।
হে অর্জুন!
তিষ্ঠ ক্ষণকাল,
দেখি, কত শক্তি ধরে সে মেদিনী।
রাহুমুক্ত চন্দ্র সম
ধরামুক্ত রথচক্র করিব এখনি।
রথ হইতে অবতরণ
শ্রীকৃষ্ণ। অর্জুন! এইবার যুধিষ্ঠিরের অপমানের প্রতিশােধ নাও।
सनम तय কর্ণার্জুন কর্ণ। শ্ৰীকৃষ্ণ। ( রথচক্র ধারণ করিয়া) কোথা শক্তি, কোথা গুরুত্ত সিদ্ধ মন্ত্র মাের। এস এস, স্মৃতিপটে হও হে উদয়, প্রাণপণে করি আহ্বান, আজি বিমুখ না কর মােরে। বিস্মৃতির মেঘে ঢাকা মস্তিষ্ক আমার, ধূমাচ্ছন্ন নেহারি সংসার। দাবানল জালিয়াছ সপ্তরথী মিলি’ বধেছিলে অভিমন্তে, আজি দেখি সেই চিত্র সম্মুখে আমার। হে ফানি, পুত্রঘাতী তব, জীবিত এখনও। রে অর্জুন, পুনঃ কহি, তিষ্ঠ ক্ষণকাল, এ কি পাপ! ক্ষত্ৰকুলে দিয়ে কালি- হান শর বিরধী অরাতি প্রতি ? নীচ মূতের নন্দন, প্রতিজ্ঞা আমার কই স্মরণ, পশুসম সংহারিব তাের, কয়েছি পণ মিথ্যা নহে সে প্রতিজ্ঞা মাের ? বটে। আরে ক্ষত্ৰকুলগ্নানি, কর্ণ। অর্জুন। কর্ণ। পত আমি, ১১ ১৬২ কর্ণার্জুন পঞ্চম অঞ্চ আর তুমি ক্ষত্রিয়-পুঙ্গব ? থাক থাক ঘুচাই বীরত্ব তিৈর ? - হাে হো শল্য! যদি পার দেহ মােরে রথ একধান ! কিম্বা নাহি প্রয়ােজন- কৃষ্ণ। কর্ণ। শূন্য নহে তূণ, দেখিয়ে অর্জুন, রথােপরি কেমনে বহিস স্থির। মতিমা! শরবিদ্ধ অঙ্গ তব কবচ-বিহীন, আর কেন, রণে দেহ ক্ষমা ! দিৰ ক্ষমা, এ জীবন দিব পুষ্পাঞ্জলি যবে চরণে তােমার। শল্য। কর্ণ ! তুমি আহত, চল তােমায় শিবিরে লয়ে যাই। ভেবেছ কি সত্য এত হীন আমি, রণক্ষেত্র ত্যজি’ শিবিরে করিব পলায়ন ? এখনাে এ দেহে আছে প্রাণ, কর মাের নহেক অবশ, দৃষ্টিহীন হই নাই আমি। কে আছ সুহৃদ হয় দেহ রণ-মৃত্যু মােরে, নহে—পুনঃ কহি, দেহ রথ একথন!
কর্ণার্জুন অর্জুন। রণ-মৃত্যু আমি দিই তােমা। } বাণ ত্যাগ করিলেন কর্ণ । পূর্ণ বিধিলিপি। পড়িয়া গেলেন রে নিয়তি, বাঞ্ছা তব পূর্ণ এত দিনে । আমি কর্ণ রাধার নন্দন, জন্মদিন হতে মহারণ করেছি তােমার সনে, সহিয়াছি বহু ক্লেশ ; কিন্তু দেবী, সাক্ষী তুমি- হই নাই সত্য-ভ্রষ্ট কভু ! স্বহস্তে জীবন দান করিয়াছি আমি, তাই আজ বিজয়িনী তুমি! বীর! নহ তুমি রাধার নন্দন, কুন্তীপুত্র তুমি, আমি জানি জন্মকথা তব। কিবা নাহি জান তুমি, নিখিলের জ্ঞানের নিদান, কিন্তু দেব, আমি কভু না কহিব কুন্তীপুত্র আমি। ( রথ হইতে নামিয়া) এ কি শুনি ? কহ যদুপতি, কুন্তীপুত্ৰ কৰ্ণ মহাবীর। কর্ণ। অর্জুন। ০ কর্ণার্জুন পঞ্চম। শ্ৰীকৃষ্ণ। অর্জুন। কর্ণ। হ, সহােদর তব। তবে করিয়াছি ভ্রাতৃবধ ? ভাই, ভাই । কেন দাও নাই পরিচয় ? এ কি মহাপাপে লিপ্ত করিলে আমারে ? এ কি অদ্ভুত রহস্য! তুমি সহােদর মম, চিরদিন শত্রু বলি’ পরিচয় করেছ প্রদান ? হায় হায়, আত্মীয় বিনাশ হেতু জনম আমার ? নাহি খেদ ক্ষত্রিয়ের পরম আত্মীয় সেই, যেই করে রণ-মৃত্যু দান, রে অর্জুন! আমি জ্যেষ্ঠ তব, করি আশীৰ্বাদ, হও রণজয়ী তুমি। হে মাধব। দেখিলাম ভাগ্য বলবান। কহ আছে কি উপায়, ধরি’ দেহ নিয়তির হাত হতে লভিতে নিষ্কৃতি ? একমাত্র সেই জন পারে রােধিবারে নিয়তি শাসন, যেই জন নারায়ণে কৰ্ম্মফল করে সমর্পণ। কৃষ্ণ।
দশম দৃশ্য
কর্ণাৰ্জ্জুন
কর্ণ ।
নারায়ণ
আজি মাের কৰ্ম্ম অবসান ।
ঐ হেরি সায়াহু তপন
জনক আমার,
বক্ষমাঝে পাদপদ্ম তব,
আর কিবা ভয়-
নিয়তির গতিরুদ্ধ আজি।
মৃত্যু
সূৰ্যমণ্ডল হইতে দিব্যজ্যোতিঃ প্রকাশ
যবনিকা
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে
মুন্নার ও প্রকাশক-এগােবিপদ ভট্টাচাৰ্য, ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ফ্রীট, কলিকাতা।
প্রথম অভিনয় রাত্রির কুশালবগণ ১৫ই আষাঢ় ১৩৩০ সাল ••• মহাদেব । । • • . . . শ্রীকৃষ্ণ বলরাম ••• ইন্দ্র (ছদ্মবেশী ) সূৰ্য্য (ঐ) কৃষ্ণ (ব্রাহ্মণবেশী ) পরশুরাম ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র দ্রোণাচাৰ্য্য • • • ••• শ্রীইন্দুভূষণ মুখােপাধ্যায় শ্রীপঞ্চানন রায় নরেন্দ্রনাথ সেন শ্ৰীআশুতােষ ভট্টাচাৰ্য্য বিজয়কৃষ্ণ মুখােপাধ্যায় শ্রীনরেশচন্দ্র মিত্র অপরেশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় সন্তোষকুমার দাস শ্ৰীভুজেন্দ্রনাথ দে কালীপ্রসন্ন পাইন (পরে ব্রজেন্দ্রনাথ সরকার) শ্রীতুলসীচরণ চক্রবর্তী শরৎচন্দ্র সুর শ্ৰীহেমেন্দ্রকুমার রায়চৌধুরী (এমেচার) শ্রীননীগােপাল মল্লিক ••• ... কৃপাচার্য বিদুর যুধিষ্ঠির ভীম ••• * * * অর্জুন নকুল ০ ০ ০ সহদেব ••• দুর্যোধন দুঃশাসন বিকর্ণ শকুনি কর্ণ ৮ । ••• শ্ৰীঅহীন্দ্র চৌধুরী শ্ৰীআশুতোষ চক্রবর্তী সতীশচন্দ্র দত্ত প্রফুল্লকুমার সেনগুপ্ত তুলসীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীদুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নরেশচন্দ্র মিত্র শ্ৰতিনকড়ি চক্রবর্ত্তী নরেন্দ্রনাথ সেন শ্ৰীঅমূল্যচরণ নাগচৌধুরী ( এমেচার) বিজয়কৃষ্ণ মুখােপাধ্যায় বিশ্বনাথ চক্রবর্তী শ্ৰীমতী তারকবাল প্রতারকনাথ ঘােষ শ্ৰীসুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রমেশচন্দ্র বিদ্যানিধি (এমেচার ) বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ননীলাল দাস শল্য ধৃষ্টদ্যুম্ন অগ্নিহােত্র অধির ••• বৃষকেতু ০ ০ ০ ০ ০ ০ কর্ণের মন্ত্রী বিচিত্রসেন জনৈক ঋষি সঞ্জয়, প্রতিহারী বিনােদবিহারী ঘােষ } ও দূত গৌরী : নিয়তি • • • শ্ৰীমতী আঙ্গুরবালা শ্ৰমতী নীহারবাল শ্ৰীমতী মনােরমা মতী নিভাননী ০ ০ ০ কুন্তী দ্রৌপদী
৮ ০ ।
:
+ ০ +
•••
•••
পদ্মাবতী
ভৈরবী
মতী গােলাপসুন্দরী
শ্ৰীমতী কৃষ্ণভামিনী
শ্ৰীমতী ফিরােজাবালা
০৮
সখীগণ-শ্ৰমতী ফিরােজাবালা, রাণীসুন্দরী, আঙ্গুরবালা, সন্তোষকুমারী,
মতিবালা, রেণুবালা, শ্বেতাঙ্গিনী, ননীবালা, রাধারাণী,
খুদীবালা, নীলিমা, ভবানী
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.