Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Marami

Chattopadhyay,amiyachandra · 2009/11/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

তমির চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
ও ১১ ,, কর্ণওয়ালিস ইট, কলিকাতা

• Lolapagain
Kaatratikuntantdki
alenानिदोह
Tatt
सिन्नान
जनश्रमिय
.

উৎসর্গ
অগ্ৰজা শ্ৰীমতী সুকুমারী দেবীর
করকমলে-
অমিয়চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

No text on this page.

ভূমিকা কবি অমশচন্দ্র *ংলা ববি-সাহিত্যে অপৰিচিত নহেন। ইতিপূর্বে তিনি “সন্ধ্যা”, “সিন্ধু”, “গাপন ব্যথা” ও “বীণ নামক চারি খানি কবিতা গ্রন্থ প্রকাশ ৫ বিষ, ও বহু সামযিক পত্রে লিখিয়া, সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রখ্যাত হইযাছেন, কাজেই এ নিবন্ধে কৰিব পবিচযের কোনো প্রযােজনই নাই। ববিব ব্যক্তিগত যে পৰিচয়ই থাকুক না কেন, তঁাই আসল পবিচষ কাব্যে, যেমন বৃক্ষে পবিচয তাহাৰ ফলে। আর এই কাব্যেৰ পৰিচয়ই কবি-জীবনের সব্বোত্তম পবিচয বলিযাই কবি মনে কবেন। কবির জীবন হযত ছােট, তাহাব আয়ু হত স্বল্প,—সে জীবনে হয়ত বহু দোষ কেটি, ঋলন, চ্যুতি আছে, কবিব ব্যক্তিত্বে পৰিচয এইজন্য সাধাবণের প্রিয় না-ও হইতে পাবে , কি তাহাব কাব্য-যাহা দেহাতীত, যাহা তাঁহার উচ্চ বা নীচ বংশজাত আভিজাত্য কিম্বা লজ্জার বহু উর্ধে, যাহা তাহার দেহেবই পৰিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়--তাহাব পরিচয়, কবি অন্তরের পৰিচয়, মনেব স্বৰূপ, চিন্তার প্রতিচ্ছবি এবং তঁাহাব জীবনে অন্তত নিগূঢ় সাধনাব সুপ্রকাশ। কাব্যে জাতি নাই, গােত্র নাই, কাল নাই, বয়স নাই—সে সকলকে লইয়া কিন্তু সকলেব অতীত, কাব্য কবি-জীবনের অন্তরতম তপস্যার ফল, কিন্তু প্রকৃত জীবন নয়, কাব্য সর্বলােকের, সর্বকালের নিখিল হৃদয়ের রাগ-রঞ্জিত চিরন্তন। কবিত্ব শক্তি ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ারী বা মােটর ড্রাইভিংএর মত শেখা যায় না-এ শক্তি লইয়া জন্মিতে হয়। শক্তিমান্ শক্তিসহ জন্মা এবং জীবনের স্রোতে, নিত্যনৈমিত্তিক জীবনযাপনের ঘাতপ্রতিঘাতে, আশায় নৈরাশ্যে, অনুরাগে বিরাগে, লাভে লােকসানে, জয়ে পরাজয়ে এ শক্তি নিত্য স্ফুর্তি লাভ করে। সুখে বিলাসে জীবনের সুখে বিলাসে জীবনের পরিপূর্ণ সুরা-পাত্রে কাব্যের উন্মেষ হয়ত তেমন ফলবতী হয় না, কিম্বা হয়, কিন্তু যেমন দুঃখে, দারিদ্র্যে, দৈন্তে, নিরাশায়, পরাজয়ে ও নিয়তির তীব্র কশাঘাতে ফুটে, তেমনটি বােধ হয় আর কিছুতেই সম্ভব হয় না। মৰ্ম্মন্তুদ বেদনায় কাব্যের জন্ম, দারুণ নৈরাশ্যে কাব্য সুন্দর, গভীর পরাজয়েই তাহার রাজটীকা! ব্যথার কথাই তাই সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য। যুগে যুগে মানুষ তাই ব্যথার কথাতেই কাব্যকে অমব করিয়া রাখিয়াছে। দুর্যোধনের অপরিমিত বিলাস-ব্যসনে মহাভারত নয়, পাণ্ডবের জীবনব্যাপী কৃচ্ছসাধনা ও দুঃখদৈন্যেই মহাভারতের কথা অমৃত সমান। রাবণের বিপুল ঐশ্বর্য রামায়ণের সম্পদ নয়, সীতার প্রিয়- বিরহ দুঃখই রামায়ণের মেরুদণ্ড। বিরহী যক্ষের হতাশা এবং প্রিয়াসঙ্গচ্ছেদ- বেদনাই পুঞ্জীভূত মেঘসৃষ্টি করিয়া প্রিয়ার উদ্দেশ্যে যে আকুল নিবেদন জানাইয়া রাখিয়াছেতাহা নিখিল নরনারীর চিরন্তন মর্মকথা। অব্যক্ত, অব্যক্তব্য, অকথিত বেদনাতেই কাব্যের জন্ম। কবি অমিয় চন্দ্রের মরমী সেই অব্যক্ত বেদনারই অরুণরাগে আগাগােড় সুরঞ্জিত। বাহিক জীবনে সাধারণ মানুষের সচরাচর যাহা কাম্য, কবির সে সবই আছে—সর্বোচ্চ ব্রাহ্মণবংশে স্বনামধন্য ভারতবিখ্যাত } [ ৩ ] পিতা ও মহীয়সী মাতার গর্ভে বিশিষ্ট অভিজাত বংশে জন্ম, শিক্ষা শালীনতা বিদ্যা অসাধারণ, এবং বিংশ শতাব্দীতে যতগুলি বিলাসের উপকরণ থাকা সম্ভব তাহার সমস্ত গুলি করায় করিয়াও তাহার কিসের এমন বেদনা ? বেদনা আছে—ব্যথা অাছে—একটা দুর্বিসহ যন্ত্রণা আছে, যাহা প্রতিনিয়ত কবির অন্তরকে বৃশ্চিকের মত দংশন করিতেছে। আর স্মৃতির সেই দংশন- তনাতেই কবির সমস্ত কাব্যের উদ্ভব। কবিতার সুরধুনী বেদনার গোমুখী হইতেই যে ঝরিয়া পড়ে ! যুগে যুগে এই মহাতীর্থের প্রক্ষিপ্ত জলকণাই নরনারীর নয়নে অশ্রু, প্রধাবিত সিক্ত উপলখণ্ড গুলিই তাহাদের মনে স্মৃতির তাড়না এবং বিপুল জল-কল্লোল ইহাদের কর্ণ বধির কবিয়া দিয়া অন্তবের মধ্যে তুমুল তুকানে পাড় তুলে। মৱমীতে তাই যখন দেখিলাম-- “ণে আকাশ ধরেছিল নীল ছত্রখানি যে ধরণী পেতেছিল ধূলার আসনখানি যে বাতাস ব্যজন করিল অদৃশ্য চামরখানি থে দেখাল জীবনের প্রথম আলাের বাণী”— -~-তখনি বুঝিলাম, কবির দুঃখ কোথায় এবং সে দুঃখটা কিসের। কবি তাহার মানসীর বিরহ-ব্যথায় আকুল। এ মানসী মানুষী কিনা, তা বােঝাও বড় শক্ত নয় ; তবে ইনি যে সমস্ত হৃদয় মন্ন অধিকার করিয়া কবির অন্তরে একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞীরূপে অধিষ্ঠান করিতেছেন, তাহাতে আর কোনাে সন্দেহ নাই। *

[ ৪ ]
“অন্তরের অগ্নি সত্য গুপ্ত রাখি
গ
যদি ভুলে যাই নিয়ন্ত্রিত ভাগ্যলিপি
যদি ভিক্ষা চাহি মালাখানি তব কণ্ঠ হতে
যাচি তব কণ্ঠস্বর আর একবার
যদি তব শুভ্র শান্তিময়ী অঙ্গুলির
পরশন ভিক্ষা মাগি ললাটে আমার
মােরে ফিরে যেতে তুমি কয়াে প্রিয়া
চিরন্তনী ছলনার গূঢ় অন্তরালে
“মরমীর সমস্ত কটি কবিতাতেই এই সুর।
আমি তােমায় চাই, কিন্তু পাই না কারণ সত্য যাহাই হউক, এ
কামনা, এ দুর্দম আকাঙ্ক্ষাকে আমায় ছলনার জালে লুকাইয়া
রাখিতেই হইবে। ইহাই বিধিলিপি ! মৱমীতে নিরাশের
ব্যাকুলতা এবং সমাজভয়ে ভীত দুইটি মনের কুণ্ঠিত কামনায় যে দ্রোহবিষ
ফেণায়িত হইয়া উঠিয়াছে, তাহারই স্নিগ্ধ-করুণ-গানেই মৱমীর
প্রতিষ্ঠা। কবির এই বাঞ্ছিতাটি কেমন
—“এ জীবনের দিকে দিকে প্রিয়া'।
আপনারে রেখেছ ছড়ায়ে

[ ৫ ] তারপর এ জীবন সহসা ফুরালে তুমি রবে এই মাের গানের আড়ালে আর এই প্রিয়াকে বলিয়াছেন- “লাক্ষ লক্ষবার কত শত রূপে ' তােমারে দেখেছি আমি জলে স্থলে কতখানে, নীলাম্বর এলাে।” শন ১৩৩৮ সাল ২৯শে ভাদ্র (১৯৪১) ১এ, বিডন ইট কলিকাতা শীবসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়

No text on this page.

সূচী পত্র ১ ৫ জন্মদিন সন্ধান নিয়তি সৰ্বময়ী ৮ স্মরণে ০ ০ ‘ব্যর্থ ভিক্ষা :: বন্ধন সঙ্গিনী + + + মৃতের উক্তি ০ ০ ৪ উজান অতৃপ্ত ৮ । এ পয়লা বৈশাখ ৪ ০ ০ ২৯ একটি দিন বঞ্চিত। ৬১ দূরে भाटि চঞ্চল ০ ০ ০ = ৫ অবসান বার্তা r * * * చిన ৪ ০ ব্যথার পরশ নিষ্কাম | ০ ০ ৪২ ৪৪

No text on this page.

মরমী
জন্মদিন
বহু বর্ষ গতি হ’ল আজি এই দিনে
বিধাতার কোন্ এক নির্দিষ্ট লগনে,
অদৃশ্য ভাগ্যের ক্রীড়নক হয়ে এসেছি কবে,
কোন্ অজানা পথের নির্দেশ শুনিনু নীরবে ।
আজন্ম আজিও ছুটি কোন্ সেই দিগন্তের পথে
অস্থির চির-চঞ্চল কোন্ ছায়ার রথে।
এ মাের আকুল বেদনা-বিলাপ, ঘর্ঘর-নির্ঘোষে ডুবে মরে যায়
কে দিল মােরে ভাগ্যের লিখন কবে, আজিকার দিনে হায় ?
কবে সেই হাসিল ধরণী মহাদ্যুতির প্রথম কিরণে
আজি মনে পড়ে, এই আজিকার ভাগ্যের রবিহারা গগনে।

মরমী
৩
সে কবে এসেছিল, ক্ষণিক আলাের মত, আমার এ জীবনে
সেই মাের নিহিত ব্যথার দিনগুলি, আজি জাগে ঘুমে জাগরণে।
সে ছিল আমার অতি আপনার, আজি শুধু রয়ে গেছে
অফুরন্ত মায়ার স্বপনে,
নিত্য-শিশু সম খেলা করি, অনির্দিষ্ট কোন খেলা
চিরদিন কিসের ছলনে।
যে আকাশ ধরেছিল নীল ছত্রখানি,
যে ধরণী পেতেছিল ধূলার আসনখানি,
যে বাতাস ব্যজন করিল
অদৃশ্য চামরখানি,
যে দেখাল’ জীবনের প্রথম আলাের বাণী,
আজি তারা কোথা সেই বিস্মৃত অতীতের কৃষ্ণ যবনিকার
কোন্ অন্তরালে
মাঝে মাঝে ডাকে মােরে উচ্ছল আবেগ ভরে
মােহিনী ধরিত্রীর খেলার আড়ালে।
তাদের অশ্রুত আহ্বানগুলি মিশে যায় মাের প্রতি গানে,
আমি শুধু ছুটে যাই শূন্যময় লক্ষ্যহীন সম্মুখের পানে ;
বহুদিন গত হ’ল আজি, যাহারে বিশ্ব গিয়াছে ভুলি,
এই আজিকার দিনে
কে দিল আহুতি মােরে, এই অনিবাৰ্য অদৃষ্ট্রের প্রজ্জ্বলিত
হােমের আগুনে !
•

অজানিত ভবিষ্যতের ঘনীভূত আঁধারে মাঝে, দিৱস শর
আমারে রাখিতে চাহে, রক্ত মাংস কঙ্কালের
কোন্ ক্ষুব্ধ উন্মাদের খেলার প্রতীক্ করি
আমারে রাখিতে চায় ধরি।
নদীস্রোতঃ সম কালেব প্রবাহ চলে
দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে প্রতিদিন
আপন দুয়ার খুলে, ভাগ্য আসে ছুটে হায়, চিরচঞ্চল চিরনবীন ;
সাথে আসে, মাের মােহন মরণ
প্রসারিয়া বাহু দুটি আলিঙ্গন তরে,
যেন আমারি বিরহে, আবদ্ধ বেদনা ভরে আমারে আহ্বান করে।
মৃত্যুর সে নিমন্ত্রণ, আমি শুনি এ জীবনের প্রতি ক্ষণে ক্ষণে
অতি স্পষ্ট করি এই আজিকার দিনে।
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়, রবি যবে দিয়ে যায়
রক্ত-রশ্মির শেষ মাল্যখানি
পশ্চিম দিগন্তে লক্ষ লক্ষবার, আমি দেখিয়াছি
মৃত্যুর রক্তিম জয়ধ্বজাখানি।
যে অব্যক্ত বারতা সেই সন্ধ্যা-গগন, মােরে দেয় আনি,
সে আমার গৌরবের মহাপরাজয়, আমি সই মানি।
প্রভাতে প্রভাতে গগনের রবি পুনঃ আসে ফিরে,
অস্তগত ভাগ্যরবি, আর কভু আসে না ফিরে
•

মরমী
আমি জানি হারায়েছি শুভজন্মের সেই প্রথম লগন,
শঙ্খের সেই মঙ্গলধ্বনি, নাম-হারা অতীতের অতলে মগন।
অদৃষ্টের অক্লান্ত রথচক্র অবিরত ছুটে চলে যায়,
আলােড়িত, উখিত ধূলিকণাগুলি দিগন্তে মিলায়
কতরূপ ধরি তবু ফিরে আসে জীবনের প্রতি বর্ষ মাঝে,
কভু বেদনার-কভু অনাগত বাঞ্ছিত মরণের অভিনব সাজে
অতীতে বর্তমানে, সুখে দুখে মিশ্রিত হয়ে,
সর্বশেষ দীপশিখার শেষ রশ্মি লয়ে
ফিরে আসে এই দিন ; আজি তাই এই জ্ঞানহারা
আনন্দের দিনে
এ জীবনের কবে-আসা, প্রথম জনমদিন আজি পড়ে মনে।
'।
৪

সন্ধান
জীবনের এই ধূলিকীর্ণ
দীর্ণ পথটুকু মাের,
তােমারি প্রিয়চিহ্নগুলি প্রিয়া
সবটুকু ছেয়ে রহে নিরন্তর ।
মাধবী-সন্ধ্যার মর্মরধ্বনি
ভেসে যায় গগনের বাতাসে বাতাসে,
তারি মাঝে তব নাম
আমি লক্ষবার শুনি ।
পথের সেই পুঞ্জীভূত ধূলি যবে
ওঠে ফুটে পুষ্পরূপে বসন্ত নিশীথে—
স্বপ্নরূপে অতৃপ্তির হয় অবসান,
বুঝি তবে, চিরপ্রিয়া, ব্যর্থ কভু নহে,
সে বেদনা, সে সাধনা, মরুহারা ধারা
অতলে অসীমে খুঁজে পেয়েছে সন্ধান।

নিয়তি
যে মিথ্যার অর্থহীন আবরণে
এ অন্ধ বিশ্ব চলিয়াছে চিরদিন,
ঘন-কৃষ্ণ সেই,
ধূম
যবনিকা
অফুরন্ত পাপ-পঙ্কে ছলনা-মলিন,
গব্বিত মানবের জ্ঞান অভিমান
তাহারে করেছে সৃষ্টি, ব্যর্থ উপাদান ;
অন্তরের অগ্নি-সত্য গুপ্ত রাখি,
ভ্রান্ত মনে বােঝে নাই নিজ অপমান।
অদৃষ্টের অনিবাৰ্য এ বিধান,
কভু যদি কোন দিন হয় বিস্মরণ,
ভুলে যাই নিয়ন্ত্রিত ভাগ্যলিপি,
তৃষ্ণায় কাতর বাণী করি উচ্চারণ
ভিক্ষা চাহি মালাখানি তব কণ্ঠ হতে,
যাচি তব কণ্ঠস্বর আর একবার,
তব শুভ্র শান্তিময়ী অঙ্গুলির
পরশন ভিক্ষা মাগি ললাটে আমার,

মরমী
ফিরে যেও, সে কথা শুনাে না প্রিয়া,
জ্ঞানহারা উন্মত্তের মরণ প্রলাপ ;
ভাগ্যলিপি মাের করাযাে স্মরণ,
আমার মঙ্গল তরে দিও অভিশাপ ;
মােরে ফিরে যেতে তুমি ক’য়াে প্রিয়া,
চিরন্তনী ছলনার গৃঢ় অন্তরালে,
তুমি শুধু অস্পৃশ্যে একে দিও
দুর্ভাগ্যের কৃষ্ণটীকা মাের ভাগ্যভালে ।

সর্বময়ী
এ জীবনের দিকে দিকে প্রিয়া আপনারে রেখেছ ছড়ায়ে।
সর্বহারা যবে
এই মর্মহীন ভবে,
বক্ষ হ’তে টেনে লয় সবটুকু দয়া
আমার সে করুণার মাঝে প্রিয়া,
আপনারে রেখেছ জড়ায়ে !
এ জীবন যতদিন মুক্ত বায়ু সম, তােমার করুণাগন্ধ
বহিয়া বেড়াবে,
মাের বেদনার অভেদ্য যবনিকা, তােমারে চিরদিন
যতনে রাখিবে ;
তােমার মন্দির তলে তুমি পাবে নিত্য-পূজা মম,
উচ্চারিব অসম ছন্দ মাের, দেবতার মন্ত্র সন!
তারপর এ জীবন সহসা ফুরালে-
তুমি রবে এই মাের গানের আড়ালে।

স্মরণে লক্ষ লক্ষ বার কত শত রূপে কভু স্পষ্ট, কভু চুপে চুপে, তােমারে দেখেছি আমি জলে স্থলে কতখানে, নীলাম্বর তলে। খর নিদাঘের অসহ উত্তাপে যবে, জর্জরিত ধরণী, শুকণ্ঠী পিপাসিতা বিহগীর আর্তনুর উঠিয়াছে রণি, চারিভিতে শুধু নীরবতা, শুধু খর তাপ মধ্যাহ্ন-রবির অগ্নিময় নির্মম প্রলাপ- তবু আমি তারি মাঝে পেয়েছি প্রিয়া, তােমার স্পর্শের মত, সুশীতল তরুছায়া— তখনি ঝরেছে অশ্রু তোমারে স্মরিয়া ; প্রিয়া--- . ঘন বরষায় জলধারা মূষলের মত ধরা পরে দিবারাত্রি পড়ি অবিরত প্লাবনের ধ্বংসস্রোতে, অসহায় দীনের কুটীর, ভেসে চলে যায়, সাথে লয়ে তপ্ত অনীর ;

মরমী
তবু যবে দেখি, তারি মাঝে নিদাঘের তাপদগ্ধ
পিপাসিত বৃক্ষরাজি,
সুশীতল বারির সিঞ্চনে, তরুণ শ্যামল, নবপল্লবের
স্নিগ্ধ সাজে সাজি’
ক্রমে ক্রমে এক এক করি’ উঠিছে জাগিয়া,
আমি দেখি এলে তুমি, তব সঞ্জীবনী স্পর্শ টুকু নিয়া ;
-প্রিয়া !
সারা দিবসের ক্লান্তি-ভরা ম্লান সন্ধ্যাবেলা ;
নিথর নিস্তব্ধ ধরণী
অস্তগত দিবাকর ; বৃক্ষশাখা নিস্পন্দ অচল ;
নীরব বিহঙ্গ-জননী।
অযুতে অযুতে ফুটে ওঠে তারাগুলি ;
গৃহে গৃহে জ্বলে ওঠে দীপ-শিখা
ধ্যানমগ্ন মনে বুঝি, এও তব তিমির-নাশিনী
উদার দয়ার রেখা!
যবে নিশি নিশি অবসাদ ঘিরে রহে জীবন জুড়িয়া,
আমি বুঝি শুধু, তাও তব নিঃসীম নিদ্ৰাৰু ছায়া ;
;
প্রিয়া ।
১০

ব্যর্থ ভিক্ষা
আমি ভেসে চলে যাই
অবশ নিথর বিশ্ব দেখিছে দাড়ায়ে,
আমার প্রার্থনাটুকু
অশ্রুত ধরণী মাঝে ; গিয়াছে ফুরায়ে ।
যে বেদনা, আমার গানের ভাবটুকু থেকে
মলয় রাখিল বন্দী করি আপনার বুকে ;
সে রহিল বন্ধ শুধু মুক্ত কারাগারে
এ জীবনের সাক্ষী সম ধরণীর 'পরে ।
আমি চলি পথ দিয়ে
নিঃসঙ্গ জীবনের আয়টুকু লয়ে,
মাের পানপাত্র খানি
নীরবে, চুম্বনে চুম্বনে শূন্য করে দিয়ে।
সেই শূন্যতারে, তারা দেয় পরিপূর্ণ করি
কোন ব্যথাহীন উদাসীন আঁধারে আবরি’,
আমার পাথেয়টুকু কেড়ে লয়ে যায়-
অন্তর কঁদিয়া ওঠে নিষ্ঠুর হেলায়।

মরমী
আমি দ্বার খুলে দিই
আবদ্ধ এ হৃদয়ের প্রতি কোণ হতে
দীনের আহ্বান সম
নিত্য ভিক্ষার আবেদন ছড়ায়ে জগতে ;
কোন্ অপকল্পিত, মনুষ্যত্বের ভ্রান্ত অভিমান,
তারা লয়ে বিতরিছে বিশ্বে মধুর অজ্ঞান,
বাহিরের লােভে তারা আপনা মাতায়।
মাের ঘর, খােলা দ্বার রিক্ত রয়ে যায়।
আমি কহি “শােনো শােনাে-
হে ভাগ্যের খেলার মুগ্ধ পুতলি গুলি !
বুঝে লওঁ অাপনারে—
রবে না এ চিরদিন, লগ্ন যাবে চলি’-
শিক্ষা লভ অদৃষ্টের নির্মম উপহাস হতে ;
সে দিন পাবে না, অতীতে ফিরিয়া যেতে।”
তারা কহে “হে উন্মাদ, মিথ্যা তব বাণী,
অঙ্গ-সীমা মধ্যে যাহ, সত্য বলি মানি।

বন্ধন
জানি আমি, মাের এই নিঃসঙ্গ জীবনে,
বাধা আছি চিরদিন তােমারি স্মৃতির নিগূঢ় বন্ধনে,
ক্ষণিকের সুখ, আনন্দের কোলাহল, সব শুধু কল্পনার খেলা,
তুমি-হারা এ জীবনে অহরহ লেগে আছে ছলনার মেলা।
সত্যের পরশ লাগি মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে প্রাণ ;
যে আগুন বক্ষরক্তে একদিন পেয়েছে নির্বাণ,
ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে উঠে, আমারে দহন করে-
আরাে রক্ত, আরাে ব্যথা, মাের কাছে আজো ভিক্ষা করে।
আমি চাহি ছুটে যেতে ; একবার লভি’ তব দেখা,
ক্ষমা লব মাগি' ; নিভে যাক এ অনন্ত বহ্নিশিখা।
চেয়ে দেখি দিকে দিকে অদৃষ্টের মুগ্ধ পুতলিগুলি
মাের পানে চাহিছে কাতরে ; অজ্ঞানে ছলিছে নিজেরে,
আমারে তাদের আপনার বন্সি।
চরণ আমার ওঠেনা আর ; তারা যে আমারে রেখেছে ঘিরে,
মাের 'পরে, তাদের বিশ্বাসের অলঙ্ঘ্য প্রাচীরে।

সঙ্গিনী
হে মাের জীবনের চিন্তা-সহচরি ।
তাই ভাল, তাই ভাল, তুমি ল’য়াে আপনার বত্ম বিচারি,
সুবাসিত হিম-ছায়া-ঘেরা
জীবনের রুদ্র তাপ-হরা,
তরঙ্গিনীর বিক্ষিপ্ত মায়াতট ধরি’
তােমার জীবন-পথ রহুক বিস্তারি।
•
"আমি যাব আপনার ধূলি-ঢাকা ভিন্ন পথ বেয়ে,
রবি-চন্দ্র-তারা-হীন অনন্ত আঁধার সে পথ রহিবে ছেয়ে ;
দুঃসহ পাপের বােঝাগুলি মাথে করি’ লব’
বিস্মৃতির নিষ্ঠুর তমিস্র মাঝে সেথা ডুবে রব’
ক্ষণে ক্ষণে কোন্ নিশাচর বিহঙ্গের নিঃসঙ্গ আহ্বানে
অকস্মাৎ নভঃ-চ্যুত শত বজ্র গর্জনে
শুনে লব মাের নির্দয় অদৃষ্টের গুপ্ত দৈববাণী,
হারি শব্দ নির্দেশে পথ সব চিনি।

মরমী ৪
অন্তরের মঙ্গল কামনা মাের চিরদিন তাঁর সাথে রবে,
পথ পার্শ্বে তব, তরল বেদনা মাের, তটিনী রূপে বহিবে নীরবে।
আমার কল্পনা রহিয়া রহিয়া,
সেথা ছুটে যাবে ভাসিয়া ভাসিয়া,
ঝরা ঝরা কিংশুক কিশলয়, ঢেকে রবে তব সারা পথখানি,
আপনি নামিয়া চন্দ্র, আরতি করিয়া যাবে তব প্রিয় মুখখানি।
সেথা হতে আমি রব বহু দূরে
মরণ-প্রহরী-বেড়া কোন্ মায়াপুরে।
মাের সেই নির্জন পথ বাহিয়া
প্রলয়ের ঝা যাবে তােমারি নামটি গাহিয়া,
সন্ধ্যার সিন্দুর আলােকে
বৃক্ষপত্রের ফাকে ফাকে
দেখে লব তােমার আঁখির জ্যোতি,
তারি মাঝে শুনে লব শূন্যতার পরিহাস ; সেই মাের
নিগুঢ় নিয়তি।
;

মৃতের উক্তি
জানি জানি, জানি আমি, সাথীহীন সন্ধ্যার স্তব্ধতার মাঝে
নীরবে, শুধু তােমারি বেদনাটুকু চিরদিন বাজে।
অলক্ষ্যে বহিয়া আনে আমার অভিন্ন
বন্ধু
উদার বাতাস
তােমারই জীবনের অনন্ত অস্ফুট আভাস।
আমি হেথা আসিয়াছি একা,
সাথে নাই বসন্তের শােভা, কোকিলের গান, ময়ূরের কেক,
নিঃসঙ্গে আবােহিয়া গগনের অভ্র 'পরে চলি ভেসে ভেসে,
জন্ম-মৃত্যু লঙ্ঘিয়াছি নিয়ন্ত্রিত অদৃষ্ট-নির্দেশে।
তােমার বাস্তব অস্তিত্বটুকু হেথা আনি নাই,
ইন্দ্রিয়ের বক্ষে বদ্ধ মদির উল্লাস আর নাহি চাই ;
নশ্বর দেহীর অর্থহীন কোলাহল এসেছি ছাড়ায়ে--
আপনার দেহটির উন্মত্ত দহন নীরবে দেখেছি
আপনি দাড়ায়ে ;
পবন-বিক্ষিপ্ত অলক তােমার
অদৃশ্যে চুমিয়াছি কত বার বার ;

মরমী • স্মৃতির মন্দির মাঝে আজো আছে মূরতি তােমার- আমার ধারণাটুকু তােমার কল্পনা মাঝে ভেসে গেছে কতবার। তুমি রহ ধরণীর বক্ষ পূর্ণ করি, বহু দূরে আমি থাকি উন্মুক্ত মলয় সন্তরি ; সন্ধ্যার উজ্জ্বল দীপালিরাশি পথটুকু দেখায় তােমারে— আমি গেছি আজ, আলাে-ছায়ার দুয়ার-বাহিরে ! পুলকিত ধরণীর বর্ষগুলি গণে’ যায় রবি আর রজত চন্দ্রমা, যুগ যুগ ছেয়ে রহে আমার লহমা। এই মাের নির্জন জীবন মাঝে, মুক্ত হয়েছি আজ ;-তােমার কাতর মিনতিগুলি তবু আজো বাজে। মনে পড়ে কবে সেই দিয়াছিনু, তব শুভ্রকণ্ঠে শ্বেত ফুলহার, সেই মৃত মাল্যখানি আজিও রয়েছে বেঁচে আপনার গন্ধে তার। এ মাের কল্পিত মুক্তিটুকু, মুক্তি নহে প্রিয়া, ক্ষণে ক্ষণে তােমার স্মরণগুলি, আমারে বাঁধিছে আরাে নিগূঢ় করিয়া ।

উজান
ব্যথিয়া উঠিছে আজি কুঞ্জে কুঞ্জে
স্বপনের স্মৃতি,
নদীজলে বহে যায়,
কোন্ পিপাসার গান—
ভেসে আসে কোন্ কবে-ভুলে-যাওয়া-
মলয়ের গীতি।
মনে পড়ে এই মাের মানস সরােবরে
কবে তুমি ফুটেছিলে সৌভাগ্য নলিনী।
আপনার প্রতি পল্লব চূর চূর করি’
আবার কবে গিয়াছে ঝরি’ ;
প্রদর্শিলে রূপ শুধু,
গন্ধ দাওনি।
;
এ জীবনে, অসহ্য উত্তাপে যবে
জীবনের সবটুকু প্রায় এনেছিল নাশি’
একদিন সৌভাগ্য আমার
সেই খরতাপ মাঝে মেঘ হয়ে উত্তরিল আসি।

মরমী
শান্তির ছায়া বলি’
সে শুধু বিতরিল অমা,
জল দিল না ;
একদিন যে জ্বলেছিল, ভাগ্যের প্রদীপ--
সে শুধু উদগারিল ধুম,
আলাে দিল না ।
-

অতৃপ্ত এবারের ফাল্গুনের এই প্রথম সায়াহ্নে পৃথিবীর মুখ্য শােভাগুলির, বাৎসরিক প্রতি উজ্জল চিহ্নে, আমি দেখি আজি তব দেহহীন ছবি, লহমার হে ক্ষণিক দেবি । ভাষাহীন কবিতা তােমার উচ্ছল মলয়ানিলে আমি শুনি বার বার, তােমার আহ্বান, লুপ্ত আজি অনন্ত বেদনায় হায় ! ক্ষমা কর দেবি, সম্বর তব ক্ষুব্ধ অভিমান, অক্ষম হয়েছি আমি নিশ্চল নিস্পন্দ এ প্রাণ। তােমার সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করি নাই- ক্ষণে ক্ষণে মন-মাঝে জেগে ওঠে তাই। .

মরমী
আমি ভেবেছিনু দেবি, এই অভিশপ্ত জীবনের
অনন্ত সময় মাঝে-~-
তােমার মুক্ত দুয়ারে পিপাসিত ভিখারীর সাজে,
আমি যাব একদিন গােধূলি লগনে
এ জীবনের কোনাে একদিনে।
আমি বুঝি নাই, তােমায়াে নিমন্ত্রণ ছিল মধু অমরায়
মৃত্যুরথ তরে শুধু ছিলে অপেক্ষায় ;
যখনি আসিল রথ রঙিন হয়ে আকর্ষণী আপন মায়ায়,
আমার যাবার আগে তুমি চলে গেলে আলােক ছায়ায় ;
হায় !
মনে পড়ে সেই একদিন সকাল বেলায়
মাের কাছে তব পরাজয়, লয়ে ছিলে মানি, অস্ফুট ভাষায়।
হে দেবি, লও লও ফিরে লও, মাের এই জয়মাল্যখানি
এ নহে পরাজয় তব, এ নহে গৌরব আমার,
এ শুধু মাের অন্ধতার গ্লানি
নীরব ব্যঙ্গ-ভাষে মােরে জর্জরিত করি
রহে হেথা দিবস শর্বরী।
আজি তুমি অমরার শ্রেষ্ঠ লক্ষ্মীরূপে
ব’সেছ কি স্বর্ণ-সিংহাসনে দেবতার অলক্ষ্যে চুপে চুপে ?

মরমী
অন্তরের নিহিত-ব্যথা কি তব কাণে কাণে কহে-
“মানুষের মূল্যের হেথা রক্ত-মাংসে পরিমাপ নহে,
হেথা স্বরগের নিত্য কবি
আঁকে শুধু অন্তরের ছবি,
সে অগ্নি-কাব্যের গূঢ় সত্য বাণী
দেবতার দিব্য প্রাণে নিত্য ওঠে রণি”—
।
মনে পড়ে মর্ত্যে যবে ছিলে, সেই আর একদিন
বিকাল বেলায়
তুমি বলেছিলে গাবে গান, আমি যবে বসে রব
তব কুঞ্জের দোলায়।
তােমার সেই কথাটুকু মনে পড়ে আজি,
জীবনের কথায় কথায়,
শুধু বৃথা ; হায় !
হে দেবি, তােমার সেই প্রতিশ্রুত গানখানি গাও আজি
অমর সভায় ।
এ বিষন্ন ধরণী পরে আমি শুনে লব হাওয়ায় হাওয়ায় ;

মরমী * ১ তােমাতে আমাতে শুধু গগনের ব্যবধান ; গাহ গাহ, গাহ দেবি! গাহ তব গান । ব্যর্থ কর মৃত্যুর দর্পিত আস্ফালন, প্রমাণিত কর আজি, যথা প্রেম, প্রাণ তথা নিত্য চিরন্তন। আমি হেথা তােমারি পুণ্য-স্মৃতির লাগি, সবার করিব মঙ্গল-কামনা, অন্ধকারে নিশি নিশি জাগি। আজিকে যে শুনেছি তব অব্যক্ত আহ্বান, সে মন্ত্রের অবাধ্য শক্তি, ধন্য করুক তব নিঃশেষ জীবন্ত নির্বাণ- বহুক ধরণী 'পরে তােমার মঙ্গল বায়ু, আমি তারে দিয়ে যাব মাের, বাকিটুকু আয়ু।

পয়লা বৈশাখ
আবার এসেছে ফিরে পয়লা বৈশাখ ;
ঘরে ঘরে আবার উঠেছে বেজে নববর্ষের আগমনী শাখ
অজানিত সুখ দুখ, কত যাওয়া কত আসা,
কত হতাশের আশার অদম্য পিপাসা
আপন অদৃশ্য বক্ষে গুপ্ত করি রাখি
অসম্ভব মরীচিকা প্রলােভনে ঢাকি
ধরণীর লক্ষ লক্ষ মনে, কেটে যায় আঁক্‌,
এই পয়লা বৈশাখ।
বসন্তের হয়েছে নি:শেষ,
আজি হতে ধরণী ত্যজিবে, শ্যামলিম বেশ,
ফুটিতে মুকুলে বকুল পড়িবে ঝরিয়া,
অনাঘ্রাত গন্ধ তার মরিবে কঁদিয়া।
ব্যর্থ জনমের অসহ বেদনা
লুপ্ত হবে মরণের সাথে ; কোনখানে পাবে না সান্ত্বনা।

মরমী
ওই সুবাসিত, মুকুলিত আম্র শাখে শাখে,
লুপ্ত কুন্তল সৌরভ তার, আমি ধরেছিনু রেখে,
তাও যাবে, সেও আজি হবে ছারখার
সে শুধু ফিরায়ে দেবে যাতনা আমার।
কিংশুক পুষ্পগুলি রেখেছিল ধরে, তারি অধরের অলক্তক রাগ,
আজিও হাসিছে ফুটে, আজিও তারা মরণে বিরাগ ;
তবু কহে এই দিন “যা যা সব যাক্,
আমি যে এসেছি ফিরে, পয়লা বৈশাখ।”
K
গত বরষের দিনে দিনে এক এক করি’
আমার নয়ন হতে বিন্দু বিন্দু যত অশ্রু পড়িয়াছে ঝরি’
পিপাসিত এ ধরণী মুছে দেছে তার প্রতি রেখা
এই হৃদয়ের অব্যক্ত ইতিহাসে শুধু রবে লেখা।
আমি জানি তাদের কুড়ায়ে পাব না ফিরে
তারা গেছে ডুবে, গত বরষের অনন্ত গহ্বরে ;
দিন যায়, দিন আসে, স্মৃতি রহে ঘিরে
যে গিয়েছে একবার চলে, তারে কভু পাইনা ফিরে--
তাদের অনন্ত বিরহে চিরদিন রহিব নিৰ্বাক
এই আজি হতে—পয়লা বৈশাখ।

মরমী
যে বরষ যায় চলে আর নাহি ফিরে,
সুখ দুখ বিজড়িত স্মৃতিগুলি তাদের রহিবে ঘিরে।
আজি এই শেষ বিদায়ের ক্ষণে-
গত বর্ষ কহিছে কাণে কাণে--
“সাধ্যের মাঝারে যে দিন আমার কুলায়েছে যত,
তােমারি সুখের লাগি, মাের ডালি, উজাড় করিয়া
দিছি অবিরত,
সে দিন ত’ তুমি হাসিমুখে দু’বাহু বাড়ায়ে
আনন্দের প্রতি কণা নিয়েছ কুড়ায়ে,
রিক্ত আমি আজ, মাের ফুরায়েছে বেলা,
তাই কি অজিবে মােরে আজি, করি’ অবহেলা?”
অজানিত নূতনের অব্যক্ত মায়ায় কহিছে ধরণী,
“যা ও যাক্‌
আজি হতে বরিব নূতনে—আজি পয়লা বৈশাখ।”

রিক্ত গিরিরাজ বক্ষ হতে এই ধরণীতে ঝর ঝর ঝরিছে নিঝর- উচ্ছল আপন বেগে বহে নিরন্তর। একা আমি বসি’ হেথা তারি পদমূলে, তটিনীর করুণার কূলে। জ্যোৎস্না-হসিত পূর্ণিমার স্বচ্ছ মধ্যরাতে - আঁখি যবে মুদে আসে সুপ্তির আঘাতে, সারা জীবনের ঘনীভূত অবসাদ--সব ছুটে আসে, অপ্রাপ্ত শান্তির নিঃসীম পিয়াসে। তারি মাঝে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বপনের ক্ষণিক বিরামে, কে যাচে আমার ক্ষমা, অনুতপ্ত মন্থর সরমে- ঐ গিরিশ্রেণীর অনাদি ওপার হতে, ভেসে আসে ক্লান্তি-হরা স্নিগ্ধ বাতাসেতে মাের গুপ্ত বাঁশরীর লুপ্ত বেহাগ সুর- অকরুণ অবহেলায় বেদনা আতুর ! ર૧ মরমী ঐ দূরাগত বংশীধ্বনি সাথে ক্ষুন্ন করি আজি, পূর্ণ নিশীথের নাথে, কে পাঠায় ক্ষমা ভিক্ষা তার, মাের অন্তরেতে-~- এই স্তব্ধ মধ্যরাতে ! কিছু নাই, কিছু নাই, রিক্ত এ জীবন, এসেছি সকল দিয়ে, বাকি শুধু রেখে দিছি আপন মরণ ; হে অজানা, হে সুদূর, শান্ত কর তব ব্যথাতুর প্রাণ, তব ভিক্ষারই সাথে সাথে, মাের ক্ষমা হয়ে গেছে দান- আমার যা কিছু ছিল, বিশ্বমাঝে রয়েছে ছড়ায়ে, যা’ চাহ যখনি, তুমি নিও আপনি কুড়ায়ে।

একটি দিন
শুধু একটি সুখের দিন
(ওগাে) আমি চেয়েছিনু ঋণ,
এবার বুঝি বা এল’ না ভাগ্য
সে দিনের ডালি নিয়া,
জীবনের বৃন্ত হতে বুঝি তাই,
অশাির কুসুম পড়েছে ঝরিয়া !
আজি এই নিদাঘের মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যার গগনে
আসন্ন কালবৈশাখীর শীতল আহ্বানে
ভীমবেগে ছুটে আসে জল-ভরা উত্তর বাতাস,
ক্ষণে ক্ষণে দিয়ে যায় তােমারি আভাস
যে গন্ধটুকু বন্দী ছিল
তব বদ্ধ-কবরী-কুন্তলে,
যে অশ্রুটুকু মুছেছিলে
তব পাত বসন-অঞ্চলে,
২৯

মরমী
তারি সাথে ভেসে আসে
তব কণ্ঠ-মঞ্জু-সুর,
তারা কহে পথ আছে,
আরাে বহু-বহু দূর।”
এই যে আজিকে আপনারে
ছিন্ন ছিন্ন করি
প্রকৃতির মাঝে অকাতরে
দিয়াছ বিতরি’,
আজি মাের মদির অবসাদ মাঝে
এই মম জীবনের মলিনিম সাঝে,
ভেসে আসে সেই তব প্রিয় চিহ্নগুলি,
স্থির এ শােকজলধি মাের উঠিছে উছলি’
এল কি আজি মাের
বাঞ্ছিত সেই দিন
শুধু একটি দিনের তরে
চেয়েছিনু যাহা ঋণ ?

বাঞ্ছিতা
হে মাের বহ্নিবীণা, হে ললিতা,
শিশির-ধৌত সদ্য-স্নাতা-
শ্যামল-বসনা হাস্য-মুখী ধরণীর মত ;
আপন লাবণ্যে, আঁখি তব করি’ অবনত,
তুমি এলে মাের পিপাসিত এ জীবনে-
সেই কোন্ শুভক্ষণে
তােমার মােহন দিব্য তন্ত্রীরাজি
মুক্ত সুরের আবেগে সাজি’
অদৃশ্য সুন্দর তব অঙ্গুলির কল্প-পরশনে
যে তান ছড়াল’ ক্ষুব্ধ-বক্ষ অলুক গগনে--
তাহার মূচ্ছনা আজি শুনি কাণে কাণে,
-এই কৰ্মহারা দিনে।
*

মরমী
আম
স্থির চিত্ত উঠি’ উছলিয়া-
অশ্রু-কণা ব্যথায় মিশিয়া,
শান্তি-বারি সম তপ্ত বক্ষে পড়িল ঝরিয়া ;
তব দৃষ্টির পরশে পুনঃ গেল অলক্ষ্যে মুছিয়া।
বুঝেছিনু তব বাণী আধ-খােলা নয়নে
সেই কবে-ভােলা দিনে ।
তার পর তুমি চলে গেলে--
সুরের কোন্ আঁচল মেলে—
অজানা বিদেশে দৈনন্দিন কাহার আহ্বানে।
আমি আছি বসে এই নিদ্রাহীন জীবন-গহনে;
এ ললাটে শুষ্কপত্র ঝরে পড়ে অবিরত,
তােমার স্পর্শের মত।
১
যদি তব প্রতি প্রিয় কাজ,
সাঙ্গ হয় জীবনের মাঝ
যদি কোনােদিন এ জীবনে পাওঅবকাশ,
আমার নয়ন-পটে আপনারে করিও প্রকাশ ;
পূর্ণ করিব তােমা’ স্পর্শহীন মঙ্গল-বরণে,
জীবনের শেষ দিনে।
১

দূরে !
ধরিত্রীর এই রুক্ষ্ম বজ্র বুকে
আমি বেঁধেছিনু মাের পর্ণ কুটীরখানি,
তরুহীন ছিল অঙ্গন মাের,
শুষ্ক তটিনী-বুক
প্রখর সূর্য ঢেলে দিল সেথা,
আপনার সবটুকু তাপ আনি।
মাের কল্প-স্বপনের উচ্চ আসন ত্যজি’
তুমি প্রিয়া নেমে এলে
মাের শূন্য পূজারে যাচি’?
তুমি ফিরে গেলে মাের স্বপ্ন-স্বরগ 'ভূমে,
পূত তােমার চরণ যুগল,
মাের অঙ্গন নিল চুমে।

মরমী সেদিন তােমার পরশ পেয়ে তরুহারা সেই অঙ্গন মাের- আজি নন্দন বন, পল্লবিত লতার শাখে বর্ণে বর্ণে নিত্য ফোটে পুস্প অগণন । সেই বনানীর মধ্যখানে আমি যখন যাই- পুষ্প পাতার রঙের খেলা দেখতে নাহি পাই, দুর হতে বুঝি শুধু, এ সব নয় ক’ ফাকি, দূরে দূরে সদাই রব দূরে দূরেই থাকি।

শান্তি
আজি এই কর্মহীন দিনে
জ্যৈষ্ঠ শেষের প্রদীপ্ত মধ্যাহ্নে,
আমি রহি এই মাের
রুদ্ধ কক্ষে বিজন শয়নে।
দুয়রি বাহিরে তপ্ত রবিকর
করিছে তার উন্মাদের খেলা।
জলহারা শুষ্ক পুষ্করিণী তটে-
জনহীন উত্তপ্ত প্রান্তরে
অগ্নিময় ধূসর আকাশে
জর্জরিতা উন্মুখী ধরণী
-ভিক্ষা মাগে স্নিগ্ধ শান্তি-বারি।
বহুদূর হতে ক্ষণে ক্ষণে
পশিছে শ্রবণে,

মরমী
তৃষাতুর কাতর বায়স-ধ্বনি ;
স্তব্ধ চরাচর মুখরিত করি'
ভেসে চলে যায় তা'রি ব্যর্থ প্রতিধ্বনি
বাহিরের সে ব্যাকুল ভিক্ষায়
নিথর ধরিত্রী পায়,
শুধু দীপ্ত বহ্নিচ্ছটা।
তবু প্রিয়া, মাের এই
নিরালা শয়ন মাঝে,
তােমার স্মরণগুলি আসি,
আঁখি হ’তে মাের
অশ্রুকণা ক্ষরিত করি’-
মোরে দেয়-
কোন্ এক
অফুরন্ত স্নিগ্ধ শান্তি বারি।

চঞ্চল
হে প্রিয়া ! বিস্তৃত এই ধরণীর মাঝে
জীবনের কত অকরুণ সঁঝে,
গগনে গগনে দেখিয়াছি, আমারি বৈরাগ্যের গৈরিক বরণ,
সে শুধু ক্ষণিকের তরে, আমার অন্তরে দিয়াছে চেতন?
তারপর নিশি কেটে যায়
স্বপ্নহীন অলস নিদ্রায় ;
পুনরায় ফিরে আসে প্রভাত কিরণ,
দিন যায় চলে—বৃথা কাজে শুধু অকারণ,
জীবনের পরে লােভ আসে ফিরে,
অভেদ্য মােহে ঢাকা, আশা রহে ঘিরে।
তুমি রহ বিস্মৃতির গৃঢ় অন্তরালে ;
এই ভাবে জীবনের দিন যায় চ'লে ।
f
১
শুধু দিনান্তের সাথীহীন ব্যথাতুর সাঝে
মুহূর্ত তােমারে স্মরণ করি জীবনের মাঝে।

অবসান
শুষ্ক এই পুষ্প হতে
খসে গেল পূজার চন্দন;
জীবনের মধ্য হতে
ঝরে গেল হিয়ার স্পন্দন ।
এই কি তবে অবসান ?
যাবার বেলায় অচিন পথে
ব্যথা শেষের সাথে সাথে,
কেউ কি তােরা নিবি না রে আমার শেষের দান ?
আজ যে আমার অবসান ।

বার্তা সেই চির-পরিচিত তব একখানি ঘর এই মাের 'শপ্ত জীবনের অনিশ্চিত বর, অতীত অস্তিত্বের মূক সাক্ষী সম- আমার আপনার হ’তে গভীর আপনতম, আজি সম্ভাষিল মােরে, নিজেরে ব্যথাভরা শূন্যতায় ভরে। এ মাের আকুল হিয়ার ব্যাকুল কম্পন ব্যথার পাথারে মাের করিল মন্থন ; উপেক্ষিত সেই ঘরখানির ধূলার রাশির 'পরে দুই বিন্দু তপ্ত অশ্রু পড়েছিল ঝরে ; আমার সেই অর্ঘ্যটুকু যে বাতাস বুকে করে নিল। আজিকার তব সুদূর আবাসে, সে কি তাহা এনে দিয়েছিল?

ব্যথাৱ পৱশ
এই জীবনের অমল প্রভাত বেলায়-
নীল আকাশের শুভ্র মেঘের খেলায়
তােমার পরশ পেয়েছিনু সজল আঁখির ঘায়,
আজকে আমার হৃদয়খানি তাই ত’ ব্যথা পায় ।
আমার থেকে বহুদূরে তােমার যাবার কালে
চরণ তােমার পড়ল আমার গানের তালে তালে ;
হৃদয় আমার উঠল বেজে ভৈরবীর কোন্ সুরে
কোন্ বিষাদের তানে তানে আমায় দিল ভরে।
আমার কুলার-বাতায়নে কোন্ গােধূলি-বেলা,
অস্তাচলের সীমানায় রক্ত-রাঙ্গা-খেলা,
একা বসে দেখতে ছিলাম নদীর উম্মিমালা-
তাহার মাঝে বেয়ে গেলে তােমার রঙিন ভেলা।

মরমী
নদীর বুকে তােমার ডাক শুনেছি আমি,
তার বদলে আমার ডাক শুনলে না যে তুমি !
ভেসে গেল তােমার তরী যেমনি এসেছিল,
প্রতিধ্বনি আমার ডাকের বাতাস নিয়ে গেল।
আমি জানি তােমার সেই শেষের তরী বাওয়া-
আর পাব না তােমার সেই করুণ আঁখির চাওয়া ;
সেই যে তােমায় পেয়েছিনু সজল আঁখির ঘায়-
আজকে আমার হৃদয়খানি তাই ত’ ব্যথা পায়।

নিষ্কাম
বৌদ্র ছায়াব ফাকে ফাকে,
'অসীম সাগব আমায় ডাকে
কোন্ সে গানের সুবে।
রূপ দীপালী মিটিয়ে-দেওয়া
শেষেব গানের প্রথম ধূয়া
পডছে তাহায় ঝবে।
স্মৃতি তুফান উঠল জেগে
কাল হৃদয় ভিক্ষা মেগে
মন তটিনীব কুলে ;
শশনিয়ে পাগল বাতাস,
ব্যখিয়ে দিল সুনীল আকাশ
দখিন দুয়ার খুলে।
.

মরমী
২।
কইল আমার প্রাণের কাণে,
“আজকে পাবি সঙ্গোপনে
তাের প্রেমের প্রতিদান।”
"
4
মন আমার বল্লে হাসি ভরে-
“নিষ্কাম মাের প্রেমের তারে
চাই না কোনই দান।”

কল্পনা
কবি কহে “এ ধরণীরে নূতন করি’ সৃজিব আবার”
কাব্য কহে ‘আমিই যে প্রভু, চির-নবীন জগৎ তােমার”

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Marami

Author
Chattopadhyay,amiyachandra
Title
Marami
File name
Marami
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/11/6
Publisher
Haridas Chattopadhyay
Language
Sanskrit
Pages
66
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Chattopadhyay,AmiyaChandra
DLI number
512917
Barcode
4990010019945.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
njpm84GeltJ
Download PDF

Marami