Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mayachitra

Ray,sukhranjan · 2009/09/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মায়াচিত্র
শ্রীসুখরঞ্জন রায়, বি-এ
প্রণীত।
১৩১৮
মূল্য আট আনা।

প্রকাশক--দি ইণ্ডিয়ান পাব্লিসিং হাউস,
২২ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা।
২১১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট ব্রাহ্মমিশন
প্রেসে শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র সরকার দ্বারা মুদ্রিত।

‘চিত্রাঙ্গদা, চোখের বালি’ ও ‘রাজা’র রবীন্দ্রনাথকে এই গ্রন্থ ভক্তিভরে অর্পণ করিলাম। –গ্রন্থকার-

No text on this page.

মায়াচিত্র
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
গান্ধারের নিকটবর্তী সিতাচল নামক পৰ্ব্বতের গুহা ;
তপস্বী বিন্ধ্যসুত আসীন ; চিরবাসপরিহিতা তরুণী
দীধিতি সম্মুখে দণ্ডায়মান।)
দীধিতি। সৰ্ব্ব দেবতার মাের পরম দেবতা,
প্রভু গুরুদেব মাের, জানত সকলি,
তরুতে পল্লবে গুল্মে বর্ণে গন্ধে গানে
শীতসঙ্কুচিত শীর্ণ নরনারীপ্রাণে
অকস্মাৎ বসন্তের আগমন সম
মূঢ় চেতনাহর্ষ কম্পনে স্পন্দনে
পুলকিছে চিত্তে মাের, কিবা সে বেদনা
রূপরসগন্ধমাখা রঙীন তুলিতে
অঙ্কিত চরমতম সুখের মতন
আমার মরমপটে।—জিজ্ঞাসিছ কেন
দেব, তুমি জান সব !

মায়াচিত্র
বিন্ধ্য।
তবু শুনি বল।
দীধিতি | জানত সকলি, তবু
বিন্ধ্য।
লজ্জা কি মা, কেন তব অবনত শির,
সলাজ রাঙিমা ভার আননে তােমার ?
তাপসিনি, তপস্যার চ্যুতিতে কি তব
ভৎসিব ভেবেছ মনে ? না না মূঢ়ে, বল,
বলে যাও অকপটে সব।
দীধিতি।
আশীৰ্বাদ বহি, যেন নন্দন হইতে
আমার অন্তর-দেশে এসেছে সে নামি,
ছায়াস্ফুট ভাব পরে প্রমূৰ্ত্ত সে ছবি
দানাবাধা সুমধুর প্রকৃতির মত
অব্যক্তের পরে ; ধরণীর মাঝে রাজে
ধরণী-ঈশ্বর, তার প্রতিনিধি মাঝে
আমি পূজিব হায়, আজ্ঞা দেহ পিত
এ দাসীরে।
বিন্ধ্য।
এ যে আত্মপ্রবঞ্চনা শুধু !
এসেছে পরম ক্ষণ জীবনে মাের,
হেলা করি হারা’য়ােনা তায়। ভেবে দেখ
আজ সারা দিনমান সংযত মানসে

১ম অঙ্ক--২য় দৃশ্য
অবগাহি অন্তরের সীমান্ত সীমায়
কি তার প্রার্থনা, কোন্ সে. তপন পানে
ফুটন-উন্মুখ পদ্ম-কলিকার মত
তিলে তিলে মেলিছে তা শুভ্র দলগুলি।
( সহাস্যে স্নেহ-কোমল স্বরে)
সেটি কে মা,
ঈশ্বরের প্রতিনিধি যে তব মানসে ?
শব্দ নাই কেন ? অতিথি মিহির ?
( দীধিতি নিৰ্বাক নতশির আরক্তবদনা)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
( প্রদীপালােকিত গুহা ; কাল সন্ধ্যা )
বিন্ধ্য। কি মা, দেখিলে কি ভেবে ?
দীধিতি।
দেখেছি ভাবিয়া,
পাইনি খুঁজিয়া কিছু, অন্তরের প্রতি
কোণে কোণে রাজে সেই সুন্দর মুরতি,
তরুণ তপন সম আলােকে উজলি
প্রতি তম-কণা-হিয়া ; তিল ঠাই নাহি
বাহিরে তাহার, আচ্ছন্ন তাহাতে আমি।
বিন্ধ্য। ভেবে দেখ তবু মনে চাঞ্চল্যবিহীন

মায়াচিত্র
গত-রিপুবাধা পূত সংযত মিলনে
বাসনা-সমাধি ‘পরে বসি দুইজনে
অনন্তের ধ্যানমগ্ন বিমুগ্ধ অন্তরে
থাকিতে পারিবে কি না চির রাত্রিদিন।
(কিছুক্ষণ থামিয়া)
যাবে কি মা গেহে ফিরে ? রাজার নন্দিনী,
তােমার নন্দনচ্যুত আনন্দের ধন
লভিয়া থাকিবে সুখে ধনে প্রেমে যশে
মানবের মুখে মুখে অম্লান কিরণে ?
বাল্য কৈশােরের সেই কলমুখরিত
গৃহ কি টানিছে পুন ?
দীধিতি।
আজ্ঞা কর প্রভু।
বিন্ধ্য। ( চিন্তা করিয়া)
দেখেছি লখিয়া তােরে, হৃদয় তােমার
দর্পণ নয়নে মাের। যে আলােকরশ্মি
নবীন বিস্ময়ে খেলে মায়ারাজ্য রচি
তব চিত্তে, আদিত্যের দীধিতি তা নয় ;
ভুবন-উজ্জ্বল-করা তিমিরারি কর
নহে তা কখনি, এ যে নিশান্তের শুধু
অলীক বিভ্রম মালা, বাসনার শেষ
৪

১ম অঙ্ক-২য় দৃশ্য
বিন্ধ্য।
মূচ্ছাহত দীর্ঘশ্বাস, আসন্নমরণ
দীপের উজ্জ্বল ভাতি; তবু নিবে যাবে
দীপ, হাসিবে সুচির সূৰ্য্য চিত্তে তাের,
অপেক্ষা করতে হবে ততদিন।
দীধিতি।
ক্ষম মােরে
দেব, পাইব মিহিরে ?
(হাসিয়া)
পাইবে তাহায়,
মূঢ়ে, পাবে আরাে কিছু।
দীধিতি। অপেক্ষা করিতে হবে কতদিন ?
বিন্ধ্য।
হবে তার যুগল পরীক্ষা।
(স্বগত)
পারি না ছাড়িতে, নিজশক্তি লােভ এসে
পদে পদে ভেঙে চুড়ে দেয় বীচিক্ষোভে
সাগর সুপ্তিরে।
( তপস্বী একটি ছােট কাষ্ঠলক লইয়া রেখবর্ণে
তাহাতে আপন মন হইতে ছবি আঁকিতে প্রবৃত্ত।)

মায়াচিত্র
তৃতীয় দৃশ্য।
( 'গুহার বাহিরে একটি ঝরণার পাশে মিহির ও
দীধিতি দুইটি শিলাখণ্ডে পাশাপাশি আসীন।)
মিহির। সত্যই আজিকে তবে বিদায় মােদের ?
দীধিতি। হা সখা বিদায়, ফিরে যাও গৃহে তুমি,
ফিরে যাও, আর কভু এ তাপসিনীরে
আনিও না মনে। মুছে ফেল সৰ্ব্বস্মৃতি,
মরম-রঙেতে আঁকা চারু চিত্রপট
চিহ্নিত অন্তর হতে এ তিন দিনের।
ভুলে যাও চলদল পিপ্পলের তলে
ঝরণার নৃত্যখেল দুটি হৃদয়ের
গৃঢ় বক্ষ তালে তালে, মধুপর্ণিকার
শ্যামস্নিগ্ধ পর্ণচ্ছায়ে মুগ্ধ দোহাকার
ময়ুর-কলাপ-কলা আদরেতে হের,
ক্ষণে ক্ষণে হর্ষভরা কেলিকণ্ঠ শুনা ।
ভুলে যাও ছুটাছুটি গুহায় গুহায় ;
ক্লান্ত দেহভার এলাইয়া-দেওয়া কত
শিলায় শিলায় ; হেলাভরা হিয়াটির
সর্বাঙ্গে হেলিয়া-পড়া, কভু টুটে-যাওয়া
কাননকুন্তল শৈলে, দূরে সরেফুল্ল

১ম অঙ্ক-৩য় দৃশ্য
গৃঢ় পদ্মবনানীর আকুল সৌরভে,
তপনে অনিলে নীলে , ভুলে যাও রক্ত
করঞ্জক দল নিয়ে ওষ্ঠ কর্ণমূল
গঞ্জ গ্রীবা বক্ষ লখি মধু ছুড়াছুড়ি।
জাগ্রত জীবন হতে এ তিন দিনের
ক্ষুদ্র এক স্বপ্ন-কণা মুছে ফেলল সখা।
মিহির। প্রকাণ্ড জীবন-দেহে একবিন্দু হিয়া,
ক্ষুদ্র বলি ফেলিব কি মুছে তায় সখি ?
যেথা হতে মুঞ্জরিল মৃত জীনের
দুরতম প্রান্ত ভরি নব পুষ্পলতা,
গাহিল বিহগকুল, ফুটিল কুসুম
পুলক-রােমাঞ্চ ভরে; পাষাণের তলে
আকুল আনন্দ ধারা প্রেমক্ষীর-নীরে
অন্ধেরে নয়ন দিয়ে, মরণেরে প্রাণ,
বন্ধের টুটিয়া বাধা, বেদনার দান,
প্রদানিয়া জড়মূঢ়ে, উন্মাদ আবেগে
মৌন কলকণ্ঠে ছুটি শিরাজা সম
ছাইয়া ফেলেছে মাের অন্তর বাহির,
ফেলিব মুছিয়া তায় ?
বিন্ধ্য। (একটি সুবৃহৎ শিলাখণ্ডের অন্তরালে লুক্কায়িতভাবে
৭

মায়াচিত্র
স্বগত)
যৌবন উচ্ছাস
বৎস, তার পরে বেণী করােনা নির্ভর।
দীধিতি।
মুছে ফেল তায়।
যে নিস্পন্দ শিলা পরে মােরা সমাসীন
মানব তাহার বাড়া নহেক কখনাে
সূক্ষ্ম কণা পরিমাণে ; তাহারি মত সে
বদ্ধনেত্র আনন্দের পুণ্যমূৰ্ত্তি পানে,
রুদ্ধহৃদি প্রেম উৎসমূলে, প্রিয়স্পর্শে
উঠেন। শিহরি কভু, মুখে নাহি বাক,
একখণ্ড চিরাবৃত নির্জলা তপস্যা
সুন্দর ধরণী মাঝে সঙ্গীত মুখর,
নাহি গান নাহি প্রেম, নাহিক স্পন্দন।
মিহির। সুগােপন চৈতন্যের তবু ক্ষীণ রেখা
তাহারে অন্তরে বহে, শুভদিনে তারে
বয়ানে ফুটেগাে বাণী, নয়ানে নেহার,
পরাণ টুটিয়া জাগে রােমাঞ্চের মত
নবশ্যাম তৃণপুঞ্জ, চিরবাস তলে
যৌবন-উদ্ভিন্ন দেহ, বিদ্রোহের হৃদি
বিদারিয়া ফুটে কালের বিজয়তি।
মিছে তর্ক কেন সখি, আমি চিনি তােমা,

১ম অঙ্ক-য় দৃশ্য
টুটিয়া তপস্যাজাল বল্কল-বসন
বিকশি উঠিছে অঙ্গ আলিঙ্গন মাগি।
আলাে অনিলের, কেন রুধে রাখ তায় ?
( দীধিতি নীরব )
শব্দ নাই কেন সখি? ছাড় শৈলবাস,
এই কৃত্রিম জীবন ; বল তার পর
কোন্ রাজগেহ তুমি করেছ উজল,
কিম্বা পর্ণকুটীরেরে কোননা, হােক পর্ণ,
কাশ্মীরের কুমারেরে স্বর্ণ-পাতা জিনি
দিবে তা পুলকজ্যোতি !
দীধিতি। না, আজো হয়নি নাকি সময় তাহার,
অন্তরে বাহিরে মাের শুষ্ক পরিম্নান।
এখনো উঠিনি হয়ে, আঁখিকোণে কালি
কালিমায় আসেনিক ছেয়ে, বৃদ্ধ জরা
বলিহস্ত দেয়নিক বুলায়ে হিয়ায়।
যে স্রোতে ভাসিয়া যায় বন উপবন
তার নাকি হেথা কোনাে নাহি প্রয়ােজন,
সঘন সংযত যেই রসের পরশে
বীজটি অঙ্কুররূপে বিকশিয়া উঠে
অপেক্ষা করিতে হবে তারি লাগি নাকি,

মায়াচিত্র
অপেক্ষা করতে হবে রসচাষ লাগি
রস-শুষ্কতার। সখা, ভুলে যাও মােরে
চেয়োনাক পরিচয়।
(দীধিতি উত্তেজিত হইয়া শিলাখণ্ড
ছাড়িয়া বেগে পরিক্রমণ করিতে লাগিল ।
বিন্ধ্য। (লুক্কায়িত ভাবে স্বগত)
মেহের বিদ্রোহ তাের কতক্ষণ রবে ?
( দীধিতি ও মিহির উভয়ে কিছুক্ষণ নীরব )
দীধিতি। (শান্ত অনুতপ্ত স্বরে )
ক্ষম মাের প্রগল্‌ভতা, সখা ক্ষমা কর
স্নেহ-অভিমান-রুম্মা বাক্য ব্যঙ্গভর।
সর্বদশী গুরু মোর, চিরাগতার
ক্ষণিক বিদ্রোহ-কথা নিয়ােনাক মনে।
মমাদের অদৃষ্ট পরে স্থির ধ্রুবতারা
জ্বলিছে অম্লান করে, আলােক-অঙ্গুলি
স্বপ্নস্বর্গরাজ্য পানে দেখাইছে পথ ;-
অলঘ্য বিধান সখা গুরুর পিতার
মােদের মঙ্গল লাগি, মিলনের আজো
হয়নি সময়, ফিরে যাও দেশে।
মিহির। সত্যই বিদায় হবে ? এমনি নির্মম

১ম অঙ্ক—৩য় দৃশ্য
=
বিদায়ের বেলা সখি? এ তিন দিনের
বিচিত্র রঙীন এই সুখস্বপ্ন-খেলা
আজিকে ভাঙিল তবে ? সম্মুখে শয়ান
সীমাহীন সিন্ধুসম বিরহ অসীম,
বেদনায় মর্মভেদী, স্পন্দনে আকুল,
মূক হাহাকারপূর্ণ অনন্ত ক্রন্দনে,
তার আগে একবিন্দু অশ্রুকণা সখি
নাহি আঁখিকোণে, অথবা পরাণ-গলা
মুখে মধু বাণী ? একটি সস্নেহ স্পর্শ ?
পীড়িত পুরাণ-ভরা ব্যাকুল চাহনি,
নিশার নিঃসঙ্গ মৌন আঁধার হিয়ায়
এক বিন্দু আলােকণা ? এতই সহজে
বিদায় দিতেছ সখি ?
দীধিতি।
বড়ই সহজে
সখা, এমনি সহজে বুকভরা গানে
বংশীটি বিদায় দেয় শেষ কণ্ঠতান
নিজ বন্ধ হতে।
মিহির। যাই তবে সখি এবে, বিদায়ের কালে
দিবেনাকি চিন্তু কোননা, চির রাত্রিদিন
হবে যা স্মৃতির সঙ্গী ? .
১১

মায়ামি
দীধিতি।
লও চিত্র মাের
( কাষ্ঠফলকে অঙ্কিত চিত্র প্রদান )
মিহির। (একটি লম্বমান সূত্রে চিত্র আবদ্ধ করিয়া
কণ্ঠাবলম্বনে গাত্রাবরণের নীচে বক্ষে ধারণ)
ধরিব বক্ষেতে ইহা নিশায় দিবায়
আহারে নিদ্রায় কিম্বা যুদ্ধে ও বিশ্রামে
যত দিন তােমা সাথে না হবে মিলন,
মুগ্ধ বক্ষ-আলিঙ্গনে স্পন্দন-দোলায়
দ্বিতীয় পরাণ সম ; কূজনে গুঞ্জনে
বিহঙ্গ-দম্পতি সম কলকণ্ঠ ভাষে
আদরে চুম্বনে হবে পরাণ জোড়ার
অন্তহীন হর্ষ-গৃঢ় সুমৌন সম্ভাষ ।
দীধিতি। মধু ফাত্তনের শুক্লা চতুর্দশী আজ,
অজানা ভবিষ্যে কোনাে ফিরে এসাে হেথা,
ফিরাইয়া দিও এই চিত্রপট মােরে
এমনি অম্লানােজ্জ্বল অপরিবর্তিত
ফাল্গুনের এমনি নিশীথে।
( মিহির নিষ্ক্রান্ত)
দীধিতি। (শিলাতলে লুটাইয়া পড়িয়া)
হলাে না কিছুই বলা অন্তরের কথা,

১ম অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য
শিখানাে বুলির তলে মূক হয়ে র’ল
পরাণের মুগ্ধবাৰ্তা; হায় সখা মাের !
চতুর্থ দৃশ্য।
মিহির। পৰ্বত সামুতে যাব অশ্ব পাব তবে।
আর কত ক্ষণ ? থাক, বহু দূরে থাকু
বিচ্ছেদের নিম্নভূমি। এখনাে ত আছি
সিতাচলে, প্রিয়তমা-অঙ্গের পরশ
বাতাসে আসিছে ভাসি আলিঙ্গন সম,
দুটি হৃদয়ের মাঝে দূর ব্যবধান
দেয়নি আড়াল টানি; কিন্তু পারিনাক,
পারি না চলিতে আর, স্বেদ-বিন্দু ঝরে,
ক্লান্তিতে অবশ তনু, দেহ মন ভরি
অবসাদ ছেয়ে আসে সারাটি জীবনে,
মনে হয় এই স্বপ্ন-নিশীথিনী বুকে
আজিকে সমাধি মাের। চলি আরাে কিছু
চলি এই শৈল-পথে ; দুর্গম বন্ধুর,
তবুও কতই প্রিয় আমার নয়নে,
রাঙা দুটি চরণের মধুর পরশ
হেথায় আছে গো মাথা, তারি চিহু-আঁকা
১৩

মা য়াচিত্র
•
এরে আমি ভালবাসি। অার ভালবাসি
বুক ভরে ভালবাসি এই শিলাপটে
কার দেহভার হেথা লতাটির মত
এলাইয়া পড়ে ছিল, বিন্দু বিন্দু বারি
ললাট বাহিয়া ধীরে গণ্ডেতে গ্রীবায়
গেছিল গড়ায়ে কার ? চুম্বন-আকাঙ্ক্ষী
রক্ত ওষ্ঠপুট কার আদর লভিয়া
কেঁপে উঠেছিল ক্রোধে কৃত্ৰিম কৰুণ ?
বড়ই সৌভাগ্য তাের নিস্পন্দ পাষাণ !
বুকভরা আলিঙ্গন লভিয়া পরাণে
কি আনন্দ জেগেছিল তাের, কি পুলক
নবীন চেতনাফুল্ল গোপন হৃদয়ে !
নির্বোধ পাষাণ, চির-আকাঙ্ক্ষার স্বর্গ
নিজ হতে যবে আসি বক্ষ’পরে তাের
আসন রচিল হর্ষে অমর-কাঙ্ক্ষিত,
তখন পারিসনি কি শিলাতল হতে
দুইটি গােপন বাহু পলকে প্রসারি
বাঁধিয়া ফেলিতে তায়? চুম্বনে বন্ধনে
নিবিড় নিবিড়তর গৃঢ় আলিঙ্গনে
মানব-অঙ্গটি তার লুপ্ত করি দিতে?

১ম অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য
তার পর দুটি দেহ বিচ্ছেদবিহীন
চির আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে রাত্রি দিন
থাকিতি পড়িয়া মূক হর্ষে গৃঢ়তম
অনন্ত স্পন্দনময় সুচির মরণে!
এতই সহজে দিলি ছাড়িয়া তাহায় ?
আমি ত দিতামনাক। মূঢ়, কোথা এবে
পরাণ পাষাণে তাের, গেছে তা চলিয়া ;
প্রাণকায়াহীন ছায়া ভূতের মতন
আছিস পড়িয়া মলিন পাণ্ডুর-বর্ণ।
সুরভি দেহের তার তবু তােতে আছে,
রক্ত-স্ফীত গণ্ডটির কম কোমলতা,
বুকের সরস স্পর্শ।
(দুই দৃঢ় হস্তে আলিঙ্গন করিয়া শিলাপরে শয়ন)
দীধিতি দীধিতি ।
( আঁখি নিমীলিত করিয়া কতক্ষণ নীরবে অবস্থান ।
তারপর বক্ষাবরণের অন্তরাল হইতে
চিত্রপট উন্মােচন)
নাই সে ত; আছে শুধু চিত্রপট তার ;
চুম্বনে ছাইয়া দিব এর গণ্ডতল,
(ঘন ঘন চুম্বন প্রদান )

মায়াচিত্র
কোথা, লজ্জায় রাঙিয়া উঠনা যে এবে ?
পুট পুটে নিম্ন ঠোট হতে চুষি নিব
ঘােড়শ বর্ষের তার সঞ্চিত অমিয়া।
( ওষ্ঠে চুম্বন )
;
কোথা ? এখন ত কোপে কাপিয়া কাপিয়া
উঠিস্ না বড় ; দিব আলিঙ্গন দান,
কে ঠেকাবে এবে ? তৃপ্তি, সুগভীর
তৃপ্তি শুধু চাই! সুগােপন মৰ্ম্মপুরে
বেদনা-অক্ষরে অছে দীপ্ত সমুজ্জ্বল
চারু চিত্রপট তার, তৃপ্তি তাহে কোথা ?
সুচির-বিরহী বক্ষ মুহুর্মুহু উঠে
শূন্যতায় হা হা করি ক্ষুব্ধ বায়ুশ্বাসে
পৰ্বত গুহার মত। বাহিরের এই
স্পর্শগম্য চিত্রে আজি পূরিয়া ফেলিব
বুকের শূন্যতা সেই।
( আলিঙ্গন দান )
যৌবন নিটোল
বুকভরা দেহখানি পুলক অলস
আমার দেহেতে বাঁধা করি অনুভব

১ম অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য
কিন্তু হায়! সবি. স্বপ্ন সম, তারি মত
রঙীন সুন্দর, কিন্তু ব্যর্থত-আহত,
কাছে আসে হাসে হাসি, দুলাইয়া যায়
অঞ্চল-পরশ বুকে ;-বাহুবন্ধ তবু
মূৰ্ছাহত পড়ে থাকে শূন্য বক্ষ’গরে ;-
নিঝরিণী-কলস্বনে কঁপাইয়া বােল,
নুপূর গুঞ্জরি বনে ঝিল্লির আরাবে,
দিগ্বিদিকে ফুটাইয়া শুভ্র স্বপ্ন-হাসি
অনিলে মিলায়ে যায় !
স্তব্ধতা ভীষণ,
অনাদ্যন্ত প্রকৃতির চির-আদি বাণী,
ঝিল্লিতে নিঝর-নীরে ধরা-শিশুরবে
* অঙ্কে, ধরি, বসি আছে নিস্পন্দ নিথর
পূর্ণতায় মৌনমূক, সারা জীবনের
জমাট মুখর মেলা ‘পরে মেলে দিয়ে
নিমেষে যবনি ঘন! জ্যোছনা-সাগরে
জোয়ার এসেছে আজি, হের দিকে দিকে
কিছু নাহি যায় দেখা, শুধু বারি রাশি
স্বচ্ছ অচঞ্চল ; তারি একদিকে ভাসে

মায়াচিত্র
ছায়াস্ফুট শৈলমালা পরতে পরতে,
বনানী বিটপী-বীথি ; মনে হয় যেন
স্বপ্নাতুর নভপট, ফুট চন্দ্র তারা
ভাসে অন্যদিকে তার ।
হেথায় ভাসিছি আমি, আর দূরতম
অতলের সীমান্ত-শয়নে শুয়ে হের
মায়ার কিরণে ভরা স্নিগ্ধ তারা ওই
প্রিয়তমা মাের, কর-রেখায়-রেখায়
সমুজ্জ্বল, কত কাছে কিন্তু কত দূর,
স্বচ্ছ কিন্তু সীমাহীন দূর ব্যবধান
রচিয়া দুল্য বাধা।
কেমনে টুটিব আমি, হায় ! এই বাধা
কেমনে করিব দূর ! আর ভাবা নয়,
পুলকে নিমীলি’ আখি ডুবে যাব,
জ্যোৎস্না-সিন্ধু-সলিলের কোলে ডুবে যাব,
দেহ পড়ি রবে হেথা, মুক্ত লঘু হিয়া
পলকে পৌছিবে গিয়া তারকার দেশে,
ধরণীর ফুল জ্যোৎস্নাসিন্ধু-পরপারে
তারারূপে উঠিবে জাগিয়া, ফুটে রবে
কিরণ-বৃন্তটি ধরি চিরপ্রিয়া সাথে ।
!
১৮

২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য
দ্বিতীয় তাঙ্ক।
( কাশ্মীর )
প্রথম দৃশ্য।
(কুমার মিহিরের শয্যাকক্ষ)
মিহির।
সুন্দর লজ্জারুনিম আননে টানিয়া
তিমির-গুণ্ঠন খানি, সন্ধ্যা মন্দ পদে
নিশা-অন্ধকারে চলে আনন্দাভিসারে
অজ্ঞাত জনের কোন্ গােপন বাসরে।
সঘন হইয়া আসে মিলনের কাল,
চারিদিকে মরে আসে ধরণীর বাণী,
কনক নুপূর খানি রণিয়া রণিয়া
মুখর আলাপ-কলা সচকিত কানে
তুলিছে ফুটায়ে শুধু; নিলীন নয়নে
ঘিরে আসে প্রেমঘাের, দ্রুত বক্ষ-দোলা
দুলিয়া দুলিয়া উঠে, কেঁপে উঠে পদ।
তারাে পরে ধীরে ধীরে মৃদুতম ধ্বনি
কখন থামিয়া যায়, শেষ দীপ-রেখা

মায়াচিত্র
বাসর-শয়ন ঘরে আঁধারে মিলায়,
বুকের স্পন্দন আসে মরিয়া নিমেষে
মধুর মূচ্ছার মাঝে,—দুইটি পরাণে
মৌন কানাকানি শুধু গােপনে তখন।
কল্পনা-কুহকভারে ক্লান্ত চিত মাের ;
করুণ রঙীন হিয়া সাঁঝের মতন,
মরীচি-ময়ূখমালা ইন্দ্রজালে তার
পরাণ জড়ায়ে ফেলে, শত কলধ্বনি
আকুল অমিয়া ঢালে উন্মুখ শ্রবণে।
কিন্তু হায়! মায়াহৰ্ম্ম-মৰ্ম্মতলে বসে
নির্মম নিরাশা-ধ্বংশ! ছায়াচিত্র-খেলা
শেষ করি দিব এবে, সােনার বুদ্ব,দ
মিলন-মরণে এবে যাবে টুটি টুটি ;
কল্পনা-বর্ণের ফাক রাখিবনা এবে
বক্ষ আর চিত্র মাঝে ; হিয়া-আলিঙ্গনে
শয়নে চাপিয়া চিত্রে নিগুঢ় আঁধারে
মৌন মিলন-নিদে যাইব ডুবিয়া।
( শয্যায় উপবেশন।
কিন্তু তবু পুন দেখে নিব চিত্রটিরে
শয়নের আগে
২০ :

২য় অঙ্ক--১ম দৃশ্য ( চিত্র উন্মোচন) বার বার দেখি তবু মেটেনা দরশ সাধ। কেমন ঠেকিছে নয়নের আগে যেন, যেন- -মিলিছে না যেন পরাণ-কামনা সাথে, এই চিরবাস চারু অঙ্গ সাথে তার মিলনের পথে বাধা-ব্যবধান রচি যেন গাে দাঁড়ায়ে, চক্ষুশূল চোখে মাের ! এই ভস্ম-পরিচ্ছদ যৌবন-দীপ্তিরে তার আবরিয়া রাখে ; দেখিতে পারি না এই সন্ন্যাসিনী-বেশে, এই শুষ্ক প্রাণহীণ কুৎসিৎ জঞ্জালে ! ইচ্ছা হয় মুহূর্তেকে চিত্রপট হতে উপাড়িয়া চিরবাস ঝিলামের জলে এখনি নিক্ষেপি ফেলি। কিন্তু পারিব না, ভার হয়ে রবে ইহা বক্ষে চাপি ( মাের চিররাত্রি চিরদিন। (শয়ন ) ২১

মায়া।চত্র
দ্বিতীয় দৃশ্য।
ঝরাফুল ধীরে
(ঝিলামের তীর।)
মিহির।
দিবস খসিয়া পড়ে দিবসের পিছু
কালের কালিমকণ্ঠে পুলকে পরায়ে
ঝরা দিবসের হার।
মালাতে ম্লানিমা লয়ে মিলাইয়া যায়,
ফোটা সে টুটিয়া পড়ে, মুকুল আকুলি
পুষ্পেতে প্রস্ফুটি উঠে। মৃত কণ্ঠতান
বিলীন বীচির পাছে জাগে বীচি পুন,
অছিন্ন লহরে লীলা ঝিলামের বুকে
ললিত আলাপ নব ; সুচির-নবীন
বসন্ত-উৎসব ফুল বনে বনান্তরে
ধরণীর নরনারী প্রাণে।
মাের লাগি
শুধু নহে কিছু, শুধু এই চিত্র আছে
দিবসে দিবসে চির-শুষ্ক পুরাতন,
বসন্তের সুনবীন চলমান স্রোতে
ধরে-রাখা ঝরাফুল এক, নভস্রোতে
ভেসে-চলা লক্ষ তারা-তরণী হইতে

২য় অঙ্ক-২য় দৃশ্য
টুটিয়া-ডুবিয়া যাওয়া ম্লান তারা এই।
দিগন্তে ঘনয়ে আসে সঘন যবনি,
কিছু নাহি যায় দেখা, শুধু বক্ষে রাজে
অাগুন-অক্ষর আঁকা এই চিত্রখানি।
( চিত্র উন্মােচন)
চুম্বিব কি বিষ।ধরে ? শম্বুক-চিহিত
চারু কণ্ঠ মরালীর আদরে আঁকড়ি
পুলকে গলিয়া যাব ? বক্ষে
-এ কি! এ কি !
ওষ্ঠপুটে গণ্ডতলে রক্তরাগচি
কেমনে মিলায়ে গেল, কখন কেমনে
চিত্রদেহে বিকাশ-শ্রী হইল বিলীন।
ওষ্ঠ নয়নের সূক্ষ্ম সমুজ্জ্বল রেখা
মুছে গেল আলেখ্য হইতে ।
( দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া )
আর এই
রক্তহীন অধরেতে কি ফল চুম্বনে ;
রসস্ফীতি নাই এবে, এই কপােলরে
কেবা আদরিবে আর!
বু বাঁচা গেল,
যা, চুম্ব-আলিঙ্গনে আর প্রাণহীন

মায়াচিত্র
।
পঙ্গু অভিনয়ে নিতে হবেনা বহিয়া।
যা যা মুছে যাক্, মুছে যা সব।
লুপ্ত হােক দিগ্বিদিকে উদগীরিত ঘন,
রন্ধ হীন অন্ধকার, আর তারি মাঝে
দেবতা-দৃষ্টির মত উজ্জ্বল ভীষণ
স্লায়মান রশ্মিরেখা।
ফিরে এস মোর
পুরাণে। ধরণীখানি পরাণে আবার
লইয়ে আনন্দ-গলা তরল সঙ্গীত,
বর্ণে ছন্দে মােহগন্ধে পুলক সিঞ্চয় ;
ফিরে এস নিয়ে শত নরনারী-মেলা
বন্ধহীন আলো-বন্যা, খেলা অনিলের,
হর্ষে গানে পরিব্যক্ত বাধামুক্ত প্রাণ।
এস চড়ি পতঙ্গের রঙন পাখায়,
অনিল-দোলায় দুলি, আলােকেতে ভাসি,
এলায়ে রূপালি পাল নীলিম অতলে,
হে মাের সহজ ধরা! উদগ্র আলােকে
নয়ন জুড়িয়া তুমি থাকনাক পড়ি,
গলিত সীসক সম নরনারী-বুকে
আঁকি দিতে কৃষ্ণছাপ এক তিল তব
২৪

২য় অঙ্ক--২য় দৃশ্য
নাহি উন্মাদ প্রয়াস। শোণিতলােলুপ
শাণিত বন্ধন-পাশ ঘুচাইয়া তাই
নর-আত্মা ছুটি আসে মুক্তির আশ্বাসে
তব পাশে, দারুণ প্রাণান্তকর কত
প্রাণের প্রার্থনা টুটি তারে চেয়ে বসে
যে কভু চায়নি তারে, ছুটে তারি পাশে
যে কভু বসন্তে তয় নিশান্ত-বিদায়ে
পরায়নি ফুলহার, সাজায়নি সাজি
'শরতে শেফালি-দলে, হেমন্তেতে তায়
রসস্ফ,ওঁ মধুবক্ষে বাহু-আলিঙ্গনে
আনেনি টানিয়া; উদাসীন, তাই তার
সৰ্ব্বজয়ী আকর্ষণ ; ওয়াসবিহীন,
তাই অপ্রতিম জয় প্রেমের জগতে।
আলিঙ্গনে নাহি বাহু, চুম্বনে অধর,
ধরা দিতে নাহি অঙ্গ, তাই তােমা পাশে
হাফ ছেড়ে বাঁচে সবে।
তটিনী ঝিলাম,
তীরে তাের কতদিন যৌবন-উদ্ভিন্ন
স্বর্ণ-রৌদ্রে ফেটে-পড়া আনন্দ-প্রভাতে
প্রেমস্বপ্ন আঁকিয়াছি, তাের তরঙ্গের
}
২৫

মায়াচিত্র
শীর্ষে শীর্ষে নাচি হর্ষে
লঘু
চিত্তে দেহে
আকুল পাগল-করা কলকণ্ঠ-তানে
বাহিয়া সঙ্কুলগতি গিরি-নদী-পথ,
তীরে তীরে সুকঠিন শিলাপটু পরে
বুলায়ে কোমল হিয়া, কভু বা পুলকে
চূর্ণে চূর্ণে ফাটি গিয়া লঘুতর রাগে
সলিলে মিলায়ে দিয়ে বরণ-রাঙিমা
সূর্যকর-কণাটির মত ভেসে গেছি,
অলােক-সম্ভব আলােক-সঙ্গীত-যাত্রা।
হায় ! তােরেও আছিনু ভুলে !
[ বিভোর বিল
মিহির নামিল জলে, পুলক তরল
তরঙ্গে তরঙ্গে গেল বহি দেহে মনে
অন্তর সীমান্ত ছুয়ে। বারি-আলিঙ্গনে
তারপর ধীরে ধীরে করিয়া শিথিল
সলিল-নিষিক্ত বাসে তীরে উতরিল
স্বপন-নিলীন আঁখি। সহসা বিস্মিত
উঠিল চমকি যেন, পুলক সস্মিত
আননে নিবিয়া গেল, নিলীন নয়ন
নিমেষে বিস্ফারি এল।]

২য় অঙ্ক—৩য় দৃশ্য
( চিত্র-উন্মােচন)
কিন্তু সব মিথ্যা ! সত্য শুধু চিত্র এই !
আর কতদিন ? আঁধার আবরি আসে
আঁধারের পিছু, শুধু মাঝখানে হায়
একবিন্দু আলােকের ফঁাক,-যেই রন্ধে
দিগ্বিদিকে ফেটে পড়। আলো-শলাকায়
অমনি সংহরি আনি মুহূর্তেকে সব
তিমিরে নিবিয়া-যাওয়া। এক বিন্দু ফাক,
সেই খানে ফোটে ফুল, পাখী গায় গান,
নীলিম অঙ্গন হতে শ্যাম ধরা ব্যাপি
পুলক কাপিয়া নাচে, সেইখানে হায়,
সেই একবিন্দু ফঁাকে বিন্দু-আয়ু নিয়ে।
( নিষ্ক্রান্ত)
তৃতীয় দৃশ্য।
( চিত্র দেখিতে দেখিতে তগত ভাবে নির্জন পথে
ভ্রমণে নিরত)
মিহির।
চিত্র, চিত্র শুধু; দিবা নাই, রাত্রি নাই
নাহি আলাে অন্ধকার, নাহিক শয়ন,
নাহি পথ নাহি দৃষ্টি, নাহি গিরি বন,

মায়াচিত্র
ধরা নাই সৃষ্টি নাই, নাহি.---
-ছায়ার গুণ্ঠন
টানা সকলের পরে। আছে---
-চিত্র এই,
আর সূক্ষ্ম রশ্মিরেখা চিত্রপট হতে
সরল রেখায় আছে সম্মুখে শয়ান,
সূক্ষ্ম কিন্তু মৰ্ম্মভেদী উজ্জ্বল ভীষণ,
অদৃশ্য মায়ার বলে টানিছে পতঙ্গে,
জ্বলিছে পুড়িছে অঙ্গ, তবু শক্তি নাই
সেই রেখাঙ্কিত বত্ম হতে এক পদ
বাহিরে ফেলিতে, মায়াদ্যতি হতে তার
দৃষ্টিরে তুলিয়া নিতে ক্ষণিক পলকে ।
নহে শান্ত আনন্দের রসভােগ হেথা,
তেমন এ চিত্র নহে মাের ; তীব্র সুখ,
হেথা তীব্র দুঃখ, জীবন মরণহরা
রক্তলেহী আকর্ষণ ; মুহুর্তেকে ছাড়ি
আঁধার আরাম-শয্যা দীপ-প্রজ্জ্বলন
চিত্র ম্লানতর হলো কিনা দেখি নিতে ;
ব্রসনা-গলানাে হেথা আহার রাশির
আসন্ন গ্রাসটি ছুড়ে-ফেলে উঠে-পড়া

২য় অঙ্ক-৩য় দৃশ্য বিজনের লাগি, হেথা নিদ্রাখাদ্যহীন ক্ষুধাক্লিষ্ট জাগরণ- -প্রেমস্বপ্ন নয় ভীরু প্রেমিক দলের প্রিয়ার হৃদয়ে, নহে বিদাধরে জীবন-কণিকা পান লম্বিত অাদরে, হেথা- --হেথা শুধু চেয়ে থাকা -চেয়ে-দেখ। ম্লানতর হলাে কিনা! কত দিন যায়, তবে একদিন সত্য ?ত্য কাষ্ঠপটে চিত্র-রেখা আরাে কিছু আসে মিলাইয়া, সেই দেখা সেই দেখা শুধু মাের মধুর আহার ! তারপর অনশনে দীর্ঘ অপেক্ষায় উন্মত্ত কি আনন্দ! এযে আজ প্রচুর আহার সজ্জিত হেথায় হেরি ; বুর্ণরেখা আজি ছায়ালীন হয়ে এলো, বলবন--- : দেহবন্ধচ্যুত হয়ে গেছে ঝরি ঝরি

মায়াচিত্র
ক
এই ছায়ামূৰ্ত্তি হতে ; শারীর চিত্রের
এই ছায়াস্ফুট স্বল্প অবশেষ, সে-ও
ধীরে ধীরে যাবে সরে !
কী হর্ষ, কী সুখ!
ইচ্ছা করে নেচে উঠি।
না থাক্‌, আজো
নিঃশেষে যায়নি মুছে। কবে মুছিবে!
মন্থর অপেক্ষা আরাে ? না না
আজি তবে-
[ চিত্র প্রক্ষালনে রত ঝরণার জলে
মিহির উন্মত্ত সম, কতবিধ ছলে
তরুপত্র ছিড়ি আনি মাখিছে ফলকে,
কভু বা ঝরণাজল ঝলকে ঝলকে
বহাইছে তারি পরে, গিরিশিলা আনি
ঘর্ষিছে কাঠের পটে, পরাভব মানি
বিফল প্রচেষ্টা শেষে বিস্ময়ে ছাড়িল,
শেষে চিত্রছায়াটুকু তেমনি রহিল
মানব প্রকৃতি’পরে যুগল বিজয় ]
-একি এ বিস্ময়,
গেলনা মুছিয়া! স্নান ছায়া সাথে কাজ

২য় অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য ৭ হনু পরাজিত! যাক্, অপেক্ষা অপেক্ষা, ক্লান্তিপূর্ণ মৌন- পাঁচটি পরত স্বচ্ছ এই কাষ্ঠপটে একের পশ্চাতে আর ; ধীরে একে একে অন্তরালে টেনে নেয় মায়াচিত্রে এই ছায়াতে মিলায়ে ধীরে। তবু, তবু যেন চতুর্থ আড়াল হতে ছায়াদৃষ্টি তার এখনাে চাহিয়া আছে,—মানব-নয়নে ? নহে নহে কভু নহে; দৃষ্টি, দৃষ্টি শুধু, কোথাকার আঁখিহারা শূন্য দৃষ্টি এক শিকার খুঁজিয়া ফিরে এ মর জগতে ; পাবেনা, কখনাে নয়, চতুর্থ- এখনাে একটি বাকি (বেগে নিষ্ক্রান্ত) চতুর্থ দৃশ্য। [ দিনের উজল আলাে লালিম সন্ধ্যায় লভিল হিরণ জন্ম ; সঙ্গোপনে তায় কখন প্রকৃতি-রাণী ছাঁকিয়া আনিয়া, ছকিয়া উদগ্রবর্ণ দিবাদীপ্তি-দাহ,

মায়াচিত্র
রঙ্গিম সন্ধ্যার যত বর্ণ-চরমতা,
শুভশান্ত জ্যোছনায় তুলেছে ফুটায়ে,
আলাে-শরীরের সুকুমার সূক্ষ্ম দেহ,
কিরণের কোমল নিৰ্যাস!
রুদ্ধ কক্ষে
সারা অপরাহ সঝ অসীন মিহির ?
করে ধরি চিত্রপট প্রদীপ-আলােকে,
শব্দ নাই গতি নাই, নাহিক পলক
পেলব পল্লবপুটে আয়ত আঁখির,
স্পন্দহীন দেহ হতে অস্তিত্বের সাড়া
মুছিয়া চোখেতে যেন রয়েছে ফুটিয়া
পূর্ণতম মৌনতায় ! উন্মাদ আনন্দে ।
সহসা লাফায়ে উঠি কাপট নিয়ে
রুদ্ধ দ্বার দিল খুলি, বন্ধ-মুক্ত বায়
হিল্লোল-ফুৎকারে দিল প্রদীপ নিয়ে,
কক্ষটালা জ্যোছ নাহাসি অম্বর বাহিয়া।
নামিল আঁধার গৃহে। নিমেষে মিহির
মেঝেতে নিক্ষেপি দিল কাষ্ঠ-লকেরে।]
মিহির। ......."
গেছে, মুছে গেছে,
সৰ্ব্বশেষ ছায়া-আভা ডুবিয়া গিয়াছে

২য় অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য
শেষ স্তর-অন্তরালে, ভাসিবে না আর।
চিত্র-রহস্যের সীমা পরে বসি আজ
আনন্দ অামার, সচিত্র বন্ধন হতে
অপার উদ্দাম মুক্তি ! হাস গাও, আজ
ডুবে যাও সমুচ্ছল জ্যোৎসা-সলিলের
আলাে-বিগলিত কোলে, চুম বীচিদলে,
লঘুপদে অনিলের চূড়ায় চূড়ায়
পুলকে আকুলি নাচ ।
{ কাষ্ঠলক ঘিরিয়া উন্মত্ত নৰ্ত্তন)
ক্লান্তি, ক্লান্তি এরি মাঝে ? নাচো নাচো নাচো,
হরষে বিভাের নাগে; ভুলি জন্ম মৃত্যু,
ভুলি আলাে-অন্ধকার নাচো নাচো নাচো ;
দেহের সীমানা পারে শেষে জেগে থেকো
এক বিন্দু নৃত্যময় স্পন্দন রূপেতে !
নাচো আরো নাচো, টুটিয়া ভাসিয়া নাচো,
ডুবিয়া মরিয়া নাচো, নাচো, নাচো—
;
গ
{ জাগরণ-অনশন-ক্লিষ্ট, কাজেই আগু-অবসন্ন দেহে
অর্ধ-চেতনা-লুপ্ত হইয়া পতন ও কিছুক্ষণ
পরে বিস্মিত হইয়া উত্থান) :

মায়াচিত্র
ভুলে গেছি,
!
সব ভুলে গেছি, কি ভুলেছি ? তাও যেন
মনে নাহি মাের ; শুধু শূন্য, সীমাহীন
শূন্যতার মাঝে বক্ষ হাহা করি উঠে।
কিসে যেন ভরি ছিল বুকের গুহাটি,
শিৱাতন্তু সাথে ছিল গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে
জড়ায়ে জীবন সম, রক্তের মতন
অটুট অজেয় শক্ত করি রেখেছিল
কঠোর সংগ্রামে। যেন, যেন ছেড়ে গেছে,
আশ্রয়-দটি যেন নিখিল শূন্যেতে
রাখি নিম্ন হতে সহসা সরিয়ে গেছে!
অতলে তলিয়ে যাব, কিসে কিসে আর
আপনারে রাখিব ধরিয়া ?-~-
কোথ, গেল কোথা ?
কোথায় লুকাল গিয়ে চোখের পলকে ?
কোথা শেষ হয়ে গেছে যাত্রা আনন্দের,
কোথা কোন্ পথকোণে, যেথা পুন্ নব
যাত্রা আরম্ভিতে হবে ? ছিন্ন সূত্র ধরি
কোথা হতে পুন গেঁথে যেতে হবে ফুল ?
থেমে যাওয়া গানে
৩৪

২য় অঙ্ক—র্থ দৃশ্য
কোন্ পদে হইবে ধরিতে? ভুলে গেছি,
ভুলে গেছি, হয় ! এক নিমেষের ভুল,
জীবন তাহার ফলে হেথা হােথা ঘুরে
বিফ ভ্রমণে, দিন গুলি ঝরে পড়ে
মলিন ধূলায়, হায় ! অসমাপ্ত গান
গগনে কাঁদিয়া ফিরে। কোথ, গেল কোথা?
নিখিলে আমার লাগি আছে প্রাণভরা
গােপন আশ্রয় সেই ? এই বৃক্ষোদ্যানে ?
তারাঙ্কিত নভােপটে ? পাণ্ডুর জ্যোৎস্নায় ?
শ্বেত হৰ্ম্মে, কিম্ব এই কঠিন মর্মরে ?
নহে নহে কভু নহে; শূন্য, শূন্য সব,
বুদ্বুদের মত ফঁাকা, ফুৎকারে মিলাবে ;
স্পর্শ কর, গলি গলি যাবে ;-হাতে কিছু
ঠেকিবে না এর, কিছু নয় ! এরা দিবে
আশ্রয় আমায় ? আর পারিনা নিজেরে
ধরিয়া রাখিতে শূন্যে,
--ডুবে যাই—কোথা, কোথা ওগাে
আনন্দ-আলম্ব সেই ?
( মেঝেতে পতন ও যেমনি কাষ্ঠপট হাতে ঠেকিল
অমনি তাহা লইয়া উখান )
,
?
শূন্যে, যাই
ডুবে যাই,

মায়াচিত্র
এইত পেয়েছি এই, অ'রাম আরাম !
চক্ষু বুজে আসে যেন, বক্ষ-শূন্য হের
মুহূর্তেকে উঠিল পূরিয়া!-এ কি! এ কি !
চিত্র গেল কোথা ? মুছে গেছে, মুছে গেছে ?
ছায়ারেখাটুকু হায় চিত্রিত কায়ার,
তাও মুছে গেছে ? নহে নহে, অসম্ভব !
কি নিয়ে পরাণ রবে ? দেখি দেখি—
-শূন্য
হায় হায় ! কি হলাে এ! রহস্যের সীমা
( এক হাতে চিত্রপট ধরিয়া এক অপার্থিব
দেখিতে দেখিতে অন্য হাতে সজোরে ঘন ঘন কেশকর্ষণ;
দুৰ্বল হস্ত হইতে কাষ্ঠখণ্ড ভূমিতে খসিয়া পড়িল ; দুই
হাতে কেশ আকর্ষণ করিতে করিতে চিত্ৰোপরি পতন,
গুমরি-ক্রন্দন ও অর্ধ মূচ্ছা।)
-পরিষ্কার শূন্য ?
-
অদ্ভুত দৃষ্টিতে
শূন্ঠে গান)
ফুটেছিল তারা স্বপনের পারা
নিবিড় নিশীথ-লগনে,
মরত লাগিয়া
আসিল খসিয়া
চিরিয়া তিমির গগনে।
৩৬

২য় অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য
ধরণীর বায়
সহিল না হায়
নন্দন-বন-ফুলেরে,
মায়াকর-রেখা যায়নাকো দেখা
কোমল পাপড়ি-মূলে রে ;-
কণ্টক বনে
পঙ্কভূষণে
অম্বরতারা-ছায়াটি
ধরণী-কুসুমে
লভিলগাে ভূমে
নবীন জন্ম-কায়াটি ;
মলামাটি দিয়ে সুধাবিষ নিয়ে
বাহিরে রাঙা বরণে,
বাপ-জ্যোতিরে পাঠায়ে এ তীরে
জমাট গন্ধ-মরণে,
আয়ু-রেখা স্থির মুছিয়ে অচির
জীবন-বৃন্ত-ধৃতিতে,
নভেতর হায় ধরা-ফুলে ভায়
স্লানিমা-রুদ্ধ স্মৃতিতে।
না চাহি নয়ানে
চাহিলে পরাণে
তবুও বন্ধ টুটিয়া
উড়ে যাবে হেসে
তার হয়ে বসে ফুটিয়া।
ফুল সে নিমেষে

মায়া।চত্র
(মিহির স্বপ্লেখিত সম সহসা জাগিয়া উঠিল)
মিহির।
কি আশ্চৰ্য্য রূপসী এ দেখিনু স্বপনে !
কনক-জড়িত অনিন্দ্য কনক কান্তি
বক্ষ-মূলে যেন মাের বরি রেখায়
চিহূিত হইয়া গেছে। কর্ণে চারু ভূষা,
স্বর্ণ ললাটিকা ভালে, গলে কণ্ঠহার
কুষ্ঠিত শােভিছে যেন বক্ষকান্তি ‘পরে,
করেতে কঙ্কণ যেন সন্ধ্যাসূৰ্য-রেখা ;
হিরণ-রসূনা যেন মূৰ্ছিত আদরে
বেঠি আছে নীবিবন্ধ চরণ-কম্পনে
রণন-গুঞ্জন সেই স্বর্ণ নুপুরের
এখনাে বুকেতে বাজে প্রতিধ্বনিময়
চির পরাণ-স্পন্দনে; নীল শাটিখানি
দেহের বরণে গেছে সােনায় গলিয়া
পুলক-বিহ্বল চিতে! সবি অনুভব
নিগূঢ় করিছি মনে, যেন স্বপ্ন নয়,
এক জোড়া আঁখি-পাখী উড়িছে মানসে,
স্বপ্ন নয় ;-বাহুবন্ধ জড়াইছে।
;
৩৮

২য় অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য গােপন হিয়ায়, কভু, কভু স্বপ্ন নয় ; পীণ বক্ষ তার মরণ-শয়নে টানে গূঢ় আকর্ষণে, স্বপ্ন নয় ! যেন এই বাস্তব চিত্রের ছাপ বুকে বিঁধে গেছে, যেন- { সহসা ভূমি হইতে চিত্রপট কুড়াইয়া লইয়া বিস্মিত আনন্দে চীৎকার করতঃ ) এই ত অঙ্কিত পটে স্বপন-মূরতি সমুজ্জ্বল রেখাঙ্কনে! অঙ্গে অঙ্গে সেই তরঙ্গিত যৌবনের লহরী লীলায় টুটিয়া ফাটিয়া ফুটে, সেই প্রসাধন সৰ্ব্ব দেহে দহে, সেই গৌরবের লেখা কমল-সৌরভ সম মাখান ললাটে, সেই দিব্য দীপ্ত কান্তি, রেখা-ওষ্ঠপুটে প্রতিষ্ঠিত গৰ্ব্বচিদু ! নিলীন নিদ্রায় বক্ষলীন ছবি হতে ছাপ সুগভীর অঙ্কিত হয়েছে বুকে, স্বপ্ন নয়! এ যে- হােকনা দুধিগম্য—তবু মাের কাছে পরিস্ফুট বস্তু-সত্য! আমি এরে চাই, শুধুই এরেই চাই সবার উপরে,

মায়াচিত্র
সবায় হারায়ে কিম্বা ডুবায়ে সলিলে,
অম্বরে বাড়ায়ে বাহু শিশু জ্ঞানন্ধর
ক্ষুদ্র খেলনারে ফেলে উর্দ্ধে চাহে যথা
কিরণের মায়ালি কাকে ! ক্ষিপ্ত নই,
আনিব পাড়িয়া তায় !
( চিত্রকে ঘন ঘন চুম্বন ও আলিঙ্গন দান এবং দুর্বল
দেহের পক্ষে অসামান্য বেগে স্নায়মান জ্যোৎস্না-
নিশীথে চিত্রহস্তে গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত।)
৪ ০

৩য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য
তৃতীয় অঙ্ক।
( গান্ধার )
প্রথম দৃশ্য।
কাল-সন্ধ্যা।
(পথপার্শ্বে এক বৃক্ষতলে ধূলামলিন বেশে
মিহির উপবিষ্ট।)
মিহির। কায়া ধরি একদিন দিতে হবে ধরা,
নিখিল ছাঁকিয়া আমি করিব বাহির
মানব-মূৰ্ত্তিরে তাের, ওরে চিত্রপট
কাননে কান্তারে শৈলে ভূগর্ভে গহনে
লােক লােকান্তর প্রমি বাঁধিয়া ফেলিব
প্রমূৰ্ত্ত বন্ধনে তােরে ! কিন্তু যদি কভু
তাহারে নাহিক পাই। তবে একদিন
এমনি বসিব এক ম্লান সন্ধ্যাবেলা
এমনি বৃক্ষের তলে অজ্ঞাত বিদেশে,
আর, আর চিত্রপট, ছিন্ন করি এই
বর্ণাঙ্কিত চিত্ৰদেহ নারীকায়া তাের
নখেতে উপাড়ি তুলি আনিব বাহিরে,
?
৪১

মায়াচিত্র
রক্ত-আনন্দের পরে সুন্দরের নাচ
হইবে তখন!
( নিস্তব্ধ ) আজ আজ হেথা মাের
( বৃক্ষতলে শুষ্ক পত্ৰপুষ্প ‘পরে শুইয়া পড়িয়া)
বক্ষলগ্ন প্রিয়া সাথে মিলন-বাসর!
পর্ণমেলা মেলে দিছে শয়ন মধুর ;
তরু দেছে ফুলসাজ ; আরাম বিলায়ে
সমীর ফিরিছে ফুকি, ছিটায়ে আতর
তিতায়ে যুগলতনু সরস পরশে ।
সন্ধ্যা দিছে জ্বালাইয়া দীপ্ত দীপখানি
বাসর-পশ্চিমকোণে
( দূরে নারীকণ্ঠ শ্রবন )
এখনাে সখীরা
প্রিয়ার মিলনকামী বরটির কানে
ফুকারে কৌতুক-কথা, ধীরে কলকণ্ঠ
মিলাইয়া যাবে দূরে, দীপটি নিবিবে,
বাসর শয়ন আঁধা
(নিদ্রাবেশে কণ্ঠ জড়াইয়া গেল এবং নয়ন-পলব
মুদিত হইয়া আসিল। দুটি সন্ত্ৰান্তবংশীয়। যুবতী
রমণীর প্রবেশ।)

৩য় অঙ্ক --১ম দৃশ্য
প্রথমা। আমাদের রাজকন্যা, সত্য দিদি মােরে
রহস্যের মত ঠেকে ;—কত ধৰ্ম্মকথা,
শাস্ত্রপাঠ ব্রহ্মচর্য সংযম পীড়ন,
বুদ্বুদের মত যেন স্ফীত শূন্যগর্ভ
বুদ্ধির বাতাসে ভরা প্রাণতন্ত্রহীন,
বিলাসের ঝড়ে এবে অন্তিম
দ্বিতীয়া। যা যা কি জানিস্
অরুণার মন তু! ক্ষুদ্র মুখে তাের
প্রাংশু-জনােচিত বাণী কে চায় শুনিতে।
অরুণার জন্মক্ষণে দিব্যদর্শী সাধু,
জড়তা:বন্ধন মাঝে অন্তরে অন্তরে
চির-বৈরাগিণী হবে যায়নিকি তায়
বলিয়া অপনা হতে ? নেয়নিকি তার
চালনার ভার ধর্ম প্রাণ রাজা হতে,
আলায়নি পুণ্যদীপ মুক্তি-মন্দিরের
শ্রেষ্ঠমার্গ গৃহকোণে ? এ কি লজ্জা!
অকল্যান আনে কূলে দায়িত্ববিহীন
হেন হীন বাণী, বােন! রুধে রাখ রূঢ়
এ মুখর রসনারে !
প্রথমা।
ক্ষমহ নন্দিতা দিদি,
৪৩

মায়াচিত্র
জানি দিয়েছি ব্যথা নিন্দি অরুণারে,
তােমরা দুজনে সখী গেছিনু ভুলিয়া।
এখন যাবেনা গৃহে ? আমি যাই তবে।
(প্রথম নিষ্ক্রান্তা)
নন্দিতা। (শায়িত মিহিরকে লক্ষ্য করিয়া)
কে এ ভূল-শয়নে ? রুক্ষ্ম কেশবাস,
মলিনিমা-মাখা দেহ, তবু, তবু যেন
ভস্ম-আবরণ ভেদি ফুটে রূপবহি
সর্ব অঙ্গে তার। হায়, ইচ্ছা হয় মাের
অঞ্চলে মুছায়ে দিই সুকুমার দেহ,
সিক্ত কেশপাশে দিই ধুয়ে পদযুগ,
হৃদয়ের স্নেহ লেপি প্রসাধন করি
সর্বাঙ্গে ইহার। এ কি! চিত্র কি কাহারো ?
বুঝিবা প্রিয়ার তার, প্রবাসী বিরহী
বুকে ধরি জুড়াইছে হিয়া। পরাণ আমার
লুটাইছে তব সাথে ভূতল-শয়নে,
অশ্রু ভরি উঠে হায় ব্যথায় তােমার,
হায় রে বিরহী পান্থ ! তেরো তরে কাঁদি
স্বামীবিরহিণী ওলাে বােনটি আমার,
স্মৃতি-আঁকা শূন্য তাের বাসর-শয়নে
৪৪

৩য় অঙ্ক—২য় দৃশ্য
কেমনে বা কাটে দিন তাই ভাবি মনে।
স্বামীর বিরহ মাখা মুখনি তােমার
দেখি প্রিয় বােন মাের!
( এড়াইয়া মিহিরের বাহুর বেঠন
দেখিল চিত্রটি তুলি, বিস্ময়ে সহসা
বিস্ফারিয়া এল আঁখি, চিত্র খসি গেল,
নির্বাক নন্দিতা সুপ্ত মিহিরের পানে
দুঃসহ বিস্ময়ে রল অবাক চাহিয়া।
শেষে ধীরে অচঞ্চল পাষাণ-মুরতি
ঘুরিয়া নড়িয়া দ্রুত চলি গেল পথে।]
মিহির। (জাগিয়া উঠিয়া ভীত দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিয়া)
বটে, বক্ষশিরা ধরি মাের আকর্ষণ !
প্রিয়া সাথে মাের চেষ্টা বিচ্ছেদের, শত্রু,
শত্রু সব চারিদিকে !
( বৃক্ষে আরােহণের চেষ্টা )
দ্বিতীয় দৃশ্য ।
(রাজকন্যা অরুণার কক্ষ )
অরুণা। সখি; যেন এক নব পৃষ্ঠা গেছে খুলে
জীবনের গ্রন্থে মাের, পুরাতন যেন
৪৫

মায়া চিত্র
;
মায়ার মণ্ডল তলে ছায়াটির মত
যাইছে মিলায় দূরে। সখি, কতদিন
আক্ষেপ করেছ তুমি,-কনকভূষণে
দেহে গৃহসজ্জ। সাথে মরতের সুখে
কেন নেইনি রিয়া মনে, কেন ধীরে
অন্তর-তপস্যাজাল দিই না ঘুচায়ে।
আজ সখি মনে হয় সব বাধা গেছে,
শুষ্ক বল্লরীর বন্ধ গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে
টুটি গেছে হিয়া হতে ; ফাকা ধৰ্ম্মচর্চা
ছায়ালীন হয়ে গেছে অন্তর সীমান্তে,
গিয়াছে হৃদয়-ভার। সবি যেন ছিল
এই তব বার্তাটির মৌন অপেক্ষায়
বিদায়ের লাগি, আঁধারের চাপ যথা
ধরণীর বুকে থাকে অরুণে চাহিয়া।
পরাণ আমার সখি পুলকের রসে
উঠিছে পূরিয়া আক্তক বলেছ সখি,
বল না আবার শুনি,-সুন্দর সে তনু
পর্ণের শয়নে শুয়ে, অনশনে হায়
লাবন্যললামহীন, মলিন বসন,
কুন্তল সে কান্তিহীন জটার মতন,
৪৬

৩য় অঙ্ক-২য় দৃশ্য
আর আর চিত্র মোর
বল না আবার সখি। আচ্ছা সখি বল,
ঠিক এই মত? এই ভূষ-সজ্জা মাের
যেখানে যা আছে তেম্নি আঁকা চিত্রে তার ?
আর এই কক্ষ মাের ? অজানা পথিক
কেমনে লভিল এই আলেখ্য আমার ?
বল তার কথা।
নন্দিত। কি বলিছ সখি মােরে, যােগ্য নহে তব
হেন বাণী, শ্রেষ্ঠতর আপনারে তুমি
খণ্ডিত করিছ সখি এ হেন বচনে ;
জান তুমি জান মনে, ধরণীর শত
মূঢ় রাজকন্যাদল সম নহ তুমি,
নহ ঝরা পাতা বায়ে বায়ে উড়ে যেতে
অকূলে বিফলে। তুমি মাের ফোটা ফুল,
বৃন্তবন্ধ ধরি আছ ফলেরে অপেখি,
যে ভূমে ঝরিবে তুমি ধন্য হবে তাহা
নবীন জীবনে নব পর্ণ-পুষ্পদলে।
অরুণ। নূতন বচন শুনি আজি মুখে তব,
করুণ মিনতিগুলি এতদিন তব
তবে অর্থহন ছিল ? না সখি বল না
৪ ?

মায়াচিত্র
সন্ধ্যাবেলাকার কথা।
নন্দিত। সে ‘সখী নন্দিতা যে তোমারে চেয়েছিল
সংসারের সুখে দুখে ভাল মন্দ মাঝে
ভালবাসা দিতে আর পেতে প্রতিদান,
আমি চাই নাই। এ ‘ভক্ত নন্দিতা আজ
আনন্দে যাচিয়া লয় করুণার কণা,
পূজাপুষ্পে ভরি সাজি উর্দ্ধে ধরণীর
বরণ করিতে চায় দেবীরে তাহার ।
অরুণা। না না চাহিনাক পাষাণ-হৃদয় নিয়ে
একা শুধু দেবী হতে মৰ্ম্মর-মন্দিরে
চ্যুতিক্রটিহীন ভালবাসা-সখ্য-শূন্য ।
কেন ভুলে যাও সখি, আমি সখী তব,
শুধু সখী, ধরণীর মলামাটি নিয়ে
নিতান্ত ঘরের লােক। আনিওনা আর
হেন বাক্য মুখে তব। চল সখি দোহে
গােপনে দেখিয়া আসি সেই বৃক্ষতল,
পথপ্রান্তে সে তরুণ পান্থ যদি থাকে,
রাজগেহে আছে দেহ রাখিবার স্থান।
চল চল, হাতে নাও ম্লান দীপ এক,
গােপনে যাইতে হবে। নিস্পন্দ পাড়ায়ে
৪৮

৩য় অঙ্ক- দুঃ
কি ভাবিছ মনে ? দেবী তব রত আজি
দেবীর অযােগ্য কাজে ? সহেনা বিলম্ব,
দীপ নিয়ে শীঘ্র চল।
( অরুণার ও দীপহস্ত নন্দিতার গােপনে গৃহ
হইতে বহির্গমন)
তৃতীয় দৃশ্য।
(পথপার্শ্বে )
নন্দিত। এই সখি তরু সেই, এরি তলে--
কোথা নাহি পান্থ হেথা !
অরুণা। নাহি পান্থ হেথা? নাহি ! শূন্য বৃক্ষতল!
পথিক আমার, চলে গেলে, গেলে তুমি!
বিদায়ের বেলা হায় দেখিলে না মােরে ।
মােদের হলােনা হয় বাণী-বিনিময় ।
আসিলে চলিয়া গেলে বিজলীর মত
রাখিয়া রেখাটি হায় আঁধারের বুকে
সুচির-গােপন ? না না সখি, বল বল
কোথা কোন স্থানে ছিল পথিক আমার,
দেছিল এলায়ে কোথা ক্ষীণ তরুভার
১৯

মায়াহিত্র
কোথা কোন্
এই ত এই ত !
এইখানে রেখেছিল দেহটি তাহার,
সুচারু চিহ্নটি শুধু রেখে গেছে হের
শুষ্ক তরুপত্র-কোলে ; তরুণ- পথিক
হেথা বুঝি থুয়েছিল চরণ দুখানি,
হেথা হেথা বক্ষ তার স্পন্দন-আকুল
মােরি চিত্র-আলিঙ্গনে প্রেমক্লান্তিভরে
কাপিয়া ঘুমায়েছিল; আর আর এই,
এইখানে হায়, প্রেমজাগরণ-ম্লান
মুখানি তাহার সুরভি-নিশ্বাস-বায়
ফেলেছিল পর্ণপরে ! হে পান্থ নবীন!
(বৃক্ষতলে মিহিরের শরীর-চিহ্নের উপর শয়ন)
হে পান্থ আমার! প্রেমের অতিথি মাের
অন্তর-দুয়ারে ! :: ::
নন্দিতা। ( বিস্ময়-সূচক ধ্বনি প্রকাশ করতঃ
উর্ধে অঙ্গুলি-নির্দেশ করিয়া)
দেখ সখি দেখ দেখ,
সমুচ্চ শাখায় সেই পান্থ বসে আছে,
কিছু নাহি যায় দেখা, শুধু, শুধু হের
এক জোড়া দৃষ্টি যেন চির ক্ষুধাবশে

৩য় অঙ্ক—৩য়।দৃশ্য
চাহি আছে তােমা পানে, যেন পাইয়াছে
আনন্দের ভােজ তার।
অরুণা। ( লাফাইয়া উঠিয়া )
প্রিয়তম, প্রিয়তম! এই দৃষ্টি দিয়ে
হরে লও আমার আমারে, ছেয়ে ফেল
অন্তর বাহির মাের, লুপ্ত করে দাও
লােক ভূলােক।
সখি সখি কি উপায় ; হজ্ঞানহীন
হের প্রিয়ের আমার, কৰ্ম্মেন্দ্রিয়গুলি ;
স্তব্ধ, স্তব্ধ হয়ে গেছে শুধু, শুধু চোখে
সারা সত্তা দিয়ে চেয়ে মাের পানে;
সখি সখি হের হের মুষ্টিবন্ধ ধীরে :
শিথিল হইয়া আসে তরুশাখা হতে,
চরণ খসিয়া যায়, আর বুঝি,
বুঝি শেষ হলাে সব, উচ্চ. শাখা হতে
কি হবে, কি হবে সখি ? এস এস প্রিয়তম ।
এস বক্ষে মাের, মরণ-শয়ন হেথা
( দুই বাহু বাড়াইয়া পতিত মিহিরকে ধারণ-চেষ্টা;
কিন্তু কঠিন ভূমিতলে উভয়ের পতন
ও সংজ্ঞাহীনতা।)

মায়াচিত্র
চতুর্থ দৃশ্য।
( অরুণার কক্ষ )
অরুণী। (উঠিয়া পড়িয়া) ছাড়, ছেড়ে দাও সখি ।
নন্দিতা।
শুন সখি মাের,
একটুকু বসে হেথা, বসাে স্থির হয়ে ।
যে মাগে মঙ্গল তব প্রিয়ের তোমার
আপন পরাণ দিয়ে, শুনিবে না তারে,
সেই চির-সঙ্গিনীরে ?
অরুণ। ( বসিয়া) আচ্ছা বল !
নন্দিতা। গােপনে রেখেছি তায় রাজগেহ হতে
দূরে উদ্যান-বাটিকা-কোণে, বিজ্ঞ বৈদ্য
বিজনে সেবায় রত। কয় দিন মাঝে
খুলে নাই আঁখি-কোণ, মত্ত চিত্ত-বেগে
প্রলাপ-আলাপ নিত্য। আজ শান্ত কিছু
চোখ চেয়ে থাকে তােমার দরশ আশে,
অন্ধ অন্য সবা ‘পরে ; মুখ সে শুধুই
‘কোথা সে’ ‘কোথা সে’ বলি ফুকারিয়া ফুটে
অন্য বাণীহীন, আর
অরুণা। (বেগে উঠিয়া পড়িয়া )

৩য় অ—৪র্থ দৃশ্য আমার পরাণ প্রিয়, স্বরগ আমার, চির-কামনার মাের কাক্ষিত অমরা! আমার সুন্দর পাপ । রূদ্ধ হৃদয়ের মোর- না সখি ছাড়, ছাড় মোরে, কিছু শুনিব না আমি আর। ( শান্ত করুণ স্বরে) হৃদয়ের রাজা, তােমার মুখামি পরে রাখিব বয়ান, মুখর বাণীরে তব চুম্বন-গ্রহনে মরণে গাঁথিয়া দিব, নয়ানে দিব হে মদালসভরা এক মধু নিলীনতা, তৃষাদীর্ণ বুকে দিব অমিয়ার খনি প্রাচুর্য্যে ফাটিয়া-পড়া! সখা, সখা মাের ! ছাড়, ছাড় বলি পুন, ছেড়ে দাও মােরে। নন্দিতা। (মেঝেতে বসিয়া অরুণার পা জড়াইয়া ধরিয়া) সখি, অকল্যাণ তব, অমঙ্গল প্রিয়ের তােমার ; রাজগেহে হবে জানাজানি, কীৰ্ত্তিত হইবে দেশে নরনারী-মুখে-মুখে কুৎসিৎ কুৎসায় । সর্বোপরি প্রিয় তব দুব্বল এখনাে,

মায়াচিত্র
তব দরশন-বেগ পারিবে না সহিতে সে,
বৈদ্যের আদেশ নাই—
অরুণা। কে সে বৈদ্য ? মূখ, রাজ-তনয়ার পরে
চালায় আদেশ ! কিছু শুনিব না আমি,
কুৎসা সে ফিরুক ফুটি ফেরুপাল-মুখে
গােপনে, কে ডরে তায় ! যাও, ছাড় মােরে,
রাজার দুহিতা আমি, আদেশ আমার
ছাড়, ছেড়ে যাও মােরে।
( অরুণ জোর করিয়া পা ছিনাইয়া লইল। সুপ্তা ফণিনীর
মত নন্দিতা জাগিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল )
নন্দিত। ছাড়িব না তােমা, কভু নহে; হওনাক
ক্ষুদ্র রাজকন্যা, অম্বর-সাগর-বেড়া
কিম্বা রাণী ধরণীর, মো পরে
অসামান্য অধিকার মাের, অধিকার
সখিত্ব প্রেমের,বাল্যকৈশােরের সেই
গ্রন্থিবদ্ধ জীবনের; নিভৃতে দোহার
প্রাণ-বিনিময়ে, কত রজনী উষার
শয়নে ভ্রমণে, সুগােপন সুখে দুখে !
রাজকন্যা তুমি? তুমি ক্ষিপ্ত উন্মাদিনী,
অজ্ঞান আনন্দে চাহ নিজ হাতে মুঢ়ে
৪

৩য় অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য
বধিবারে প্রিয়জনে। নন্দিতা তোমার
ছেড়ে যাবে তােমা ? ছেড়ে যাবে যবে তব
সর্বশ্রেষ্ঠ প্রয়ােজন ? যখন তােমার
প্রিয়তম মৃত্যু, সম্মান ধরম
পলায়ন লাগি আছে দ্বার পানে চাহি ?
হেন মূখ নহি আমি ! কোথা যাবে তুমি ?
স্থির হয়ে বসাে হেথা, আদেশ অমার।
অরুণা। নন্দিতা, নন্দিতা! প্রিয় সখি মাের ।
শয়নের উপর লুটাইয়া ক্রন্দন )
নন্দিতা। ( দূরে সরিয়া আসিয়া স্বগত)
কেঁদে নিক কিছু ক্ষণ, ক্রন্দনে তাহার
এ অদ্ভূত উন্মাদনা আসিবে কমিয়া।
কি আশ্চর্য! হেন দশা সখীর আমার
স্বপ্ন-অগােচর ছিল ; শান্ত চিরদিন
বনান্ত বেলায় লীন তটিনীর মত,
কেমনে হইল ক্ষুব্ধ ! হায় সখি মাের,
কি
তুফান বয়ে যায় পরাণে আমার,
জানিস না তুই !—সখী, দেবী তুমি
এখনাে অন্তরে মাের, তবু শিখিবার
আছে কিছু মাের কাছে,—কেমনে অশান্ত

মায়াচত্র
তুফানে রুধিতে হয় শান্তির আড়ালে।
শান্তি এ ক্ষণিক তার, আবার বহিবে
প্রলয় বিশ্রাম-লব্ধ দ্বিগুণ বেগেতে,
কেমনে বা নিবারি তায়!
পরিচয়হীন, তবু উচ্চকুলজাত,
সন্দেহ নাহিক তায়। প্রলাপের যদি
অর্থ কোনাে থাকে তবে মনে হয় মাের
রাজপুত্র হবে কোননা। জিজ্ঞাসিলে কিছু
দেয় উত্তর, কোনাে দৃশ্য যেন তার
মন-পটে ফেলেনাক ম্লানতম ছায়া,
বাক্য নাহি পশে কানে, এক সূক্ষ্ম স্থির
ধারা বাঙ্গি চলে চিত্ত-শ্রোত! এ অদ্ভুত,
অতি-মানবীয়, তবু চিত্ত কভু নহে
দৃঢ় তার ভিত্তিহীন। কাম্য ধন সাথে
উগ্র কামনার যবে হইবে উদ্বাহ
উদগ্র সে যাবে খসি, চির দিবসের
সুখদুঃখময় নর থাকিবে পড়িয়া।
আর আর দুর্ভাগিনী নন্দিতা আজিকে
এই আত্ম - Yত্যাখ্যানে তাের মর্মান্তিক
আত্মার পরীক্ষা; ছিড়ে যায় প্রাণতন্তু,

৩য় অঙ্ক—৪র্থ দৃশ্য সুকঠিন, তাই আজ অন্তিম নিশ্বাসে সাধনা তাহার। গোপনে সাধিতে হবে, শুভ ফলে সবে অনিন্দ বাটিয়া লবে, মন্দ থাক্ শুধু নন্দিতার লাগি ! আর যদি অরুণার -ভগবন। আমার কৰ্ম্মের লাগি দায়ী শুধু আমি, দিতে হয় দিও তবে স্বস্তিশান্তিহীন মােরেই অনন্ত শাস্তি। পঞ্চম দৃশ্য। [ বন প্রান্তে নিভৃত কুটীর, অন্ধকারে দিগ্বিদিক ভরা, শুধু ম্লান দীপ এক জ্বলিছে গৃহের কোণে ; মিহির অরুণা সমাসীন বরকন্যাবেশে ; লিঙ্গমূর্তি মহাদেব স্থাপিত সম্মুখে, লুপ্ত অঙ্গ ফুল- বিপর্ণে চন্দন-সিদূর রাঙা ; পুরােহিত মন্ত্র পড়ে, নন্দিতা নীরবে দাড়ায়ে নিষ মোন যন্ত্রের মতন মিহির উচ্চারে মন্ত্র, কিন্তু আঁখি দুটি

মায়া চিত্র
আয়ত উজ্জ্বল, তনু -শির ধরি
যুগল কমল ফুটিয়া তপন পানে
পলকবিহীন। সহসা কি হলো-মনে,
বক্ষবৃত চিত্রপট আনিল খুলিয়া,
নিক্ষেপিল ভূমিপবে প্রয়ােজনহীন
মনে করি যেন, যেন বহু দিবসের
সঞ্চিত ভারের মত।
প্রশান্ত মিহির।
উগ্র দৃষ্টি আঁখি-কোণে সলাজ নিলীন,
আনত ভূমিতে শির! মুহূর্তের লাগি
তরুণ, বরের মত অধরের কোণে
ফুটিল সলাজ হাসি; মুহূর্তের লাগি
নন্দিতার হৃদি হতে নেমে গেল ভার,
ভরিল আনন্দে হিয়া, অরুণার মন
দূরাগত স্মৃতি নিয়ে উঠিল কঁপিয়া ;
--মুহূর্তের মাঝে সব !
এ কি ! কার এ মুরতি
ফুটিল কাঠের পটে ? শৈলনিবাসিনী
সন্ন্যাসিনী সেই ? মিহির লাফায়ে উঠি
৫৮

৩য অঙ্কম দৃশ্য
কুড়াইল চিত্রপট, নিমেষে সর্বাঙ্গে
আরণ্যক বিভীষিকা আসিল ফিরিয়া ;
চিত্রটি ধরিল বুকে, দীর্ঘ পদক্ষেপে
কুটীর ছাড়িয়া এল ; তার পর বনে
নিলীন আঁধারে গেল নিমেষে মিলায়ে ।
-অসমাপ্ত উদ্বাহের ক্রিয়া, অরুণা সে
দুঃসহ বিস্ময়ে মৃক, নন্দিতা সে দুখে
ক্রোধে স্তব্ধ ম্রিয়মাণ, ভূত-কাণ্ড-ভয়ে
ভীত পুরােহিত!]
নন্দিতা। কোথা যাবে? অদূরেতে আছে অনুচর,
পাঠাইব দিকে দিকে, তন্ন তন্ন করি
বন হতে আনিবে ধরিয়া—যাই--
অরুণা। সখি ! নাহি প্রয়ােজন।
নন্দিতা। মূঢ়ে কি বলিছ তুমি, এক নিমেষের
এই অসমাপ্ত কাজ সারাটা জীবন
মরিবে যে কঁদি তুশি, প্রতি বিন্দু তার
অনলের কণা সম দহিবে আমায়।
হায়! সখি মাের আ মারি লাগিয়া তব -
না ছাড়, ত্বরিত উদ্যম এবে ;
নয়, ব্যর্থ অনুতাপে বিফল জীবন,

মায়াচিত্র
ছাড়, ছেড়ে দাও।
অরুণা। না না কভু নয়, উন্মাদিনী তুমি সখি !
কি ফল আনিয়া তায়! সখি, নিমেষের
প্ৰাচুৰ্য্য-উচ্ছাসে তরু বসন্ত-সন্ধ্যায়
মুকুলে ভরিয়া উঠে, নিমেষের ঝড়ে
মলিন রিক্ততা তার অনুতাপ সম
শাখে শাখে ঘিরে আসে ; ঝড়ে যে বা আসে
ঝড়ে সে মিলায় পুন।
নন্দিত। বুঝি না তােমার কিছু, বিলম্বে সকল
পণ্ড হয়ে যাবে, ছাড়, ছেড়ে দাও মোরে !
অরুণ। উন্মুখ পাপের ‘পরে, হে মাের দেবতা,
উদ্যত রাখিও বজ অমােঘ কঠিন
এমনি সকল-দহা ; দিবস যখন
নিশীথে ঘনায়ে আসে আলাে-স্মৃতি-ঘায়ে
বারে বারে জাগাইও তারে মিলনের
আলােক-বাসরে তব। সখি, চল সখি,
গৃহে চল হেথা হতে; অন্বেষণ তার
বনে কি মনে অজ সমূহ নিষ্ফল ;
আঁধার ছেয়েছে হের ঘিরি চারিধার
অন্তরে বাহিরে, যদিও নিকটতম

৩য় অঙ্ক--৫ম দৃশ্য
নয়ন দেখে না তবু প্রিয়তম জনে।
আলােক-সাধনা সখি আজ হতে মোর ;
দুর্নিবার তম-দ্রোহ নিঃশেষে যখন
ফুরাবে হৃদয় হতে আপনি সে আসি
লইবে খুঁজিয়া, সখি, আজ গৃহে চল।
( নন্দিতাকে ধরিয়া লইয়া প্রস্থান)

চতুর্থ অঙ্ক ।
( কাশ্মীর ও সিতাচল )
প্রথম দৃশ্য ।
কাশ্মীর রাজ-অন্তঃপুর।)
( রাজা শঙ্খচূড় ও রাণী অধীতা ম্লানমুখে আসীন )
( অতর্কিত ভাবে মিহিরের প্রবেশ।)
( বিস্ময়সূচক ধ্বনি করিয়া ।
রাণী।
কে মিহির ? হায় হায় ! বাছনি আমার,
এলে কি ফিরিয়া তবে !
( আলিঙ্গন পৃর্বক মস্তক আঘ্রাণ করিয়া )
তাের লাগি বাছা
উৎকণ্ঠিত রাজ-পরিবার, মাতৃহিয়া
অমঙ্গল-আশঙ্কায় ব্যথিত সদাই,
পিতার রাজত্ব-চিন্তা ঘুচে গেছে, আর
তাের কি এমনি করি গুপ্ত নিরুদ্দেশে
ঘুরিয়া ফিরিতে হয়! হায় কালিমায়
অঙ্গ ছেয়ে গেছে ছিন্ন ধূসর বসন,
পরাণ-পুত্তলি মাের।

৪র্থ অঙ্ক-১ম দৃশ্য
T
।।
মিহির। (মাতা ও পিতাকে প্রণাম করিয়া --
মা আমার, পিতৃদেব, ক্ষমা কর আজ ::
এ অবােধ সন্তানেরে ক্ষমা কর. তার ;
সৰ্ব্ব অপরাধ!
রাজা। বৎস!
( অষ্টমবর্ষীয়া.তামালীর প্রবেশ :)
তমালী। ( বিস্ময়ে )
দাদা দাদা
( মিহিরের দিকে অগ্রসর হইয়া কি ভাবিয়া আবার
থমকিয়া দাড়াইল, মুখের কথা থামিয়া গেল )
মিহির। তমাল আমার, আজো ভয় লাগে মােরে ?
দাদারে করিবি ঘৃণা আজো বােন মাের ?
( মিহিরের গণ্ড বাহিয়া টস টস করিয়া অশ্রুবিন্দু
গড়াইয়া পড়িল)
দিদি, দাদাটি, তাের নূতন জনম
পেয়েছে যে আজ, শিখেছে কেমনে হায়
তাের মত বাে। আদর করিতে হয় ।
তমাল আয়লো.কোলে।
( তমাল অগ্রসর হইয়। দাদার কোলে উঠিয়া কাদিতে
লাগিল ; মিহির তাহাকে ধুকে ধুরিয়া তাহার
?

মায়াচিত্র
?
তমালী।
কচি মুখে চুম্বন করিল এবং নিজেও কঁদিতে
লাগিল; তাহাদের ক্রন্দনে রাজারাণী
অশ্রু-বিসৰ্জন করিতে লাগিলেন।)
মিহির। আমারে ভুলিয়া ছিলি
তুমি মিথ্যা বল,
সেদিন নিলীনা মেরে মেরেছিল, আমি
দাদা দাদা বলে কত কদিনু, মা আসি
কোলেতে তুলিয়া নিল আপনি কাঁদিয়া ;
আঘাতের কথা ভুলে গেনু আমি, তবু
মা আমি কাঁদিমু কত স্মরিয়া তােমারে।
হাঁ দাদা, কোথায় ছিলে তুমি এত দিন ?
মিহির। সে কথা ভুলে যা বােন, আর দাদা তােরে
এমন যাবে না ছাড়ি।
তমালী। আমার হরিণ-ছানা, দাদা, কত বড়
হয়েছে দেখিবে চল।
মিহির। চল, বােন।
(তমালীকে হইয়া মিহির নিষ্ক্রান্ত।
রাজা। এই বেলা বিবাহ-বন্ধন ; তবে তার
উদাসীন ঘুরাফিরা ঘুচে যাবে সব
চির জনমের লাগি ; গান্ধার-নৃপতি

৪র্থ অঙ্ক-২য়-দশ্য
বাল্যবন্ধু মোর, কন্যা তারি রূপে গুণে
শুনিয়াছি অনিন্দিতা।
রাণী। যা কিছু দিন,
শান্ত হতে দাও কিছু বাছারে অামার।
4
দ্বিতীয় দৃশ্য।
(সিতাচল)
মিহির।
এই সেই সিতাচল, শুক্লা নিশীথিনী
সেই মধু ফাল্গুনের, সেই গিরি-বত্ম
সঙ্কুল বন্ধুর, পল্লবিত সারে সারে
তরল-শ্যামল পর্ণে রিক্ত শীত-বর্ণ
চম্পক তরুর দল পথ-প্রান্ত ধরি ;
বেতস-বনান্তে মুঞ্জরিত মল্লিকার
তল বাহি ছুটে সেই গিরি-নিঝরিণী,
শত শিলা-কুটিমের ‘পরে ফুটে উঠে
কোমলে কঠিনতমে সঙ্গীত মধুর
মৌনতার বক্ষ ভরি। অন্ধ দিশাহারা
৫

মায়াচিত্র।
Ser
মিলিত পুষ্পের গন্ধ, নবীন শপের,
মলয়-পাখায় চড়ি পাগলের মত
জীবের মুকুল-প্রাণে খুজে ফিরে যেন
গন্ধ-সঙ্গিনীরে তার বারে বারে দ্বারে
অঙ্গুলি-আঘাত করি। হের সেই সব !
তিনটি বরষ আগে হায় একদিন
এমন নিশীথে এই শশী-ফুল্ল পথে
শৈল-পথ বাহিনীচে গেছিঃ নামিয়া
শান্ত জ্যোৎস্না ধীরে যেন জমিয়া জমিয়া।
রঙীন প্রবৃত্তি হয়ে পরাণে আমার
গেছিল ঘনায়ে, অন্তরে বাহিরে যেন
রক্তে নীলে শ্যামে মিলে কাড়াকড়ি-খেল।
পরাণ লইয়া মাের। ৩
সঘন বরণ গুলি আঁধারের মত
দিগন্তে আসিল ছেয়ে লুপ্ত একাকারে -
বুদ্ধি স্মৃতি প্রীতি পূজা সবি যেন সেই
ভেসে গেল আঁধার-প্লাবনে, আর এক
অন্ধোন্মাদ নর-আত্মা মরীচি-সন্ধানে
হেথা হােথ ফিরিল ঘুরিয়া, স্বপ্নসম
ওয়ণ মনে আসে মাের, যেন এক খণ্ড
৩ারাে পরে ধীরে

৪র্থ অঙ্ক-২য় দৃশ্য
কৃষ্ণ মেঘ ঝটিকার মত বহে গেল
অন্তর সীমান্ত দিয়ে চকিত পলকে
লুকায়ে তপনে মাের; যেন ছিল তার
মানব-মূর্তির মত বাহু পদ, মুখ,
আকর্ষণ মৃত্যু সম, চিত্ত লীলায়িত
আঁধারের নৃত্যভরা ! হায়, তার সাথে
যে,—যেন পিতা মােরে চাহিল বাধিতে,-
“গান্ধারের কন্যা সাথে বিবাহ তােমার”—
পিতৃকণ্ঠ হতে যেমনি ফুটিল বাণী
পরাণ উঠিল কেঁপে
; -আঁধারি-মূরতি,
বিস্মৃতির তীর হতে কুড়ােনাে স্বপন,
ছাইল অন্তর মাের।
( দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া) যাক বেঁচে গেছি,
তবু এসেছি ঘুচায়ে। দীধিতি, দীধিতি।
( উষ্ণীষ হইতে চিত্রপট খুলিয়া আনিয়া)
জ্বলে ওঁঠ সর্বাঙ্গের মাকে, অন্তরের
অতি গৃহতম কোণে। দেবী তুমি মোের,
তোমার নিশ্বাস-বায়ে সুপ্ত বীণা সম
সর্ব অঙ্গ হতে মাের সঙ্গীত-নিৰুণ
রণিয়া রণিয়া উঠে, পুণ্য রশ্মিরেখা

মায়াচিত্র- ; গুহা-অন্ধকারে সুপ্ত আলােক-মাণিকে প্রকাশিছে প্রােজ্জ্বল কিরণে। ধন্য আমি নবীন উদয়-শৈল হইতে অরুণে লভিয়া পরাণ ভরি ; সারা জীবনের উচ্ছ জ্বল ঘুরে-ফিরা তােমারে ঘিরিয়া ছন্দ-রণনের মত বন্দন-লীলায় সঙ্গীত রচিয়া দিক্ ; তুমি কেন্দ্র মাের সীমাহীন নিখিল-নিলয়ে; আজি হতে আনন্দ কিরণ-বহা স্পন্দন তােমার জাগরণে তুলিবে কাপায়ে, প্রতি তৃণে রােমাঞ্চেরে তুলিবে শিহরি, ফলপর্ণে শ্যাম-রসে উঠিবে রসিয়া, শাখে শাখে তােমারে ঘিরিয়া পাখী গাহিবে আকুল, নিঝরের ভাঙা স্রোতে মিলন-তটিনী বহি যাবে নবলব্ধ জীবন-আস্বাদে। তোমারে ঘিরিয়া বীর অন্যায়ের শিরে ধূলি-নম্র পদানত করি, রক্ত-লেখা লিখে লিখে যত সব গৰ্ব্ব-দৃপ্ত বুকে, শুধু-রক্ত-লােভাতুর নিঠুর বীরত্বে হানিয়া মৃত্যুর বাণ, মরণ-সমরে ৬৮

৪র্থ অঙ্ক-২য় দৃশ্য
জয়-মাল্য লতি তােমার চরণােপান্তে
দিবে পূজাঞ্জলি। তােমারে ঘিরিয়া দেবি
সমর-বিজয়ী বীর গৃহ-কোণে তার
ক্ষুদ্র বােনে বক্ষে তুলি নিবে, সেহ-দ্রব
ভক্তি-অর্ঘ্যে পূজা দিবে জননী-পিতায়,
অনুগত জনে হবে সহাস্য কোমল
তাদের আপন সম ; তােমারে ঘিরিয়া
দীন প্রজা-জনে রাজা বুকেতে আদরে
লইবে সোদর সম, সৰ্ব্ব প্রয়ােজনে
নিয়ােজিবে বরাভয় কর ; মুখে মুখে
হাসির আকার ধরি মঙ্গল-আশীষ
হরষে উঠিবে ফুটি, ধনে-জনে-প্রাণে
ভাণ্ডার ভরিয়া যাবে, জরা-মৃত্যু-ব্যাধি
মানবের চিত্ত হতে রি সিংহাসন
পলকে লইবে তুলে,—সেথা কোথাকার
আলােক-বারতা খানি আসিবে নামিয়া
পুলক-সরস, তােমারে ঘিরিয়া দেবি,
সকলি তােমারে ঘিরি !
( বহুক্ষণ নীরবে শৈরোহণ )
আশা মাের মিথ্যা হয় যদি ? কে জানে বা
৩

মায়াচিত্র
তিনটি বরষ কত অদৃশ্য তুমিতে
একে গেছে বিকৃতি লাঞ্ছন! সে তপস্বী,
গিরি-গুহা, আর তাতে সে দেী দীধিতি
যদি বা না থাকে এবে! ঘৃণ। উপেক্ষায়
যদি---
তৃতীয় দৃশ্য।
(দীপ-প্রজ্জ্বলিত' গুহাভ্যন্তর ; শ্বেতকৃষঃশ্মশ বিন্ধ্যসুত ও
উদ্দাম-যৌবনাপগতা চীরবাসপরিহিতা দীধিতি মৌন
প্রতীক্ষায় সমাসীন। গুহাদ্বারে কাহার অাগমন-শব্দ
শুনিয়া দীধিতির মুখ প্রীতি-প্রফুল্ল হইয়া উঠিল।
বিন্ধ্যত নীরবে উঠিয়া গুহাদ্বারে উপস্থিত হইলেন ;
মিহির ভক্তিভরে ভূপতিত হইয়া তাহাকে প্রণাম করিল।
বিন্ধ্যসুত মিহিরকে ভিতরে লইয়া আসিলেন।)
মিহির। (দীধিতিকে লক্ষ্য করিয়া সহসা আপাদমস্তক
বিস্ময়-চমকে কঁপিয়া উঠিয়া )
গান্ধার-তনয়া তুমি?
৭

৪র্থ তাঙ্ক-৩য় দৃশ্য
বিন্ধ্য।
-
গান্ধার-তনয়া পাপ-অনুতাপে এবে
চিরমৃত্যু লভিয়াছে, উঠেছে জাগিয়া
নবীন জনমে এই দীধিতির মাঝে।
'অরুণা’ সে পিতৃদত্ত নাম ; জন্মকালে
দেখেছি তারি মাঝে এই দীধিতিরে,
ভবিষ্যের রাণী-যোগিনীরে, অঙ্কুরেতে
থাকে যথা সঙ্কুচিত তরু,-তাই তার
গিয়েছিনু শিক্ষা-ভ, র নির্জন গুহায়
মানব-বর্জিত এই গিরিকূট-বনে
প্রকৃতির বক্ষ মাঝে প্রত্যক্ষ সাক্ষাতে
ধরণী-পতির সাথে। ক্ষণিকের লাগি
প্রেমযােগ-ভঙ্গে তার সংসার-বিলাসে
আবার পাঠায়েছিনু, কণ্টক-সাহায্যে
উপাড়িতে কণ্টকেরে। সার্থক আজিকে
স্ত কাজ মাের, বিবাহ-বন্ধন আজ
ধরণীর ভােগ-সূত্র নয়, আত্মত্যাগে,
প্রেমের মঙ্গলময় সুচির মিলনে,
দুটি ফুলে গাঁথা পরম পিতার গলে
ফুল্ল মালিকায়।
মিহির।
দেব, ধন্য আমি আজ।

মায়াচিত্র
•
( বিন্ধ্যসুত নীরবে গুহা হইতে নিস্কন্ত)
(দীধিতির নিকট জানু পাতিয়া দীধিতির হস্তে মিহি-
রের চিত্রপ্রদান; দীধিতির চিত্র গ্রহণ ও ভূমিতে স্থাপন,
এবং মিহিরের পাশে জানু পাতিয়া উগবেশন; দীধিতির
একটি করপল্লব মিহিরের আপন হস্তে ধারণ এবং নীরবে
উভয়ের ধ্যানরসে নেত্ৰ-নিমীলন)...( গুহাভ্যন্তরে
বিন্ধ্যসুত ও তপস্বিনী বেশে নন্দিতার প্রবেশ এবং
আনন্দাশ্রু-বিগলিত মুগ্ধ দৃষ্টিতে দুইজনের ধ্যাননিলীন
মিহির ও দীধিতিকে নিরীক্ষণ।)
বন্ধ। নন্দিতা, বিধাতা নিজে পুরােহিত আজ
উদ্বাহে এদের, বাহ্য আচারের কিছু
নাহি আয়ােজন।
(মিহির ও দীধিতি ধ্যান হইতে জাগিয়া উঠিল)
হয়ে গেছে বিবাহ বন্ধন,
এ বৃদ্ধের লহ আশীর্বাদ।
( ভূমিতে নত হইয়া দুইজনের প্রনাম এবং অশীৰ্বাদ
গ্রহণ )
মা দীধিতি, কৰ্ম্ম-যজ্ঞ সম্মুখে তােমার,
আশীৰ্বাদ করি রাণীর বসন নিয়ে
এই চীরবাসে যেন সুচির জীবনে
१२

অর্থ আঙ্ক--৩য় দৃশ্য
পারহ রাখিতে। বৎস, যােগরাজ্য তব,
যােগিনী সঙ্গিনী এই, মনে থাকে যেন।
যাও মা নন্দিতা ত্বরা, বিশ্রামের স্থান
দাওগে এদেরে আজ এ রাত্রির লাগি,
প্রত্যুষে যাইবে দেশে।
( মিহির ও দীধিতিকে লইয়া নন্দিতা নিষ্কন্ত)
বিদ্যা। (চিত্রহস্তে )
ক্ষমা করাে প্রভু মাের তব শক্তি পাশে
মানবের এই মায়াশক্তি-কণা, যেথা
হতে যাত্রা করেছিনু তোমারি লাগিয়া,
হয়, ভ্রান্ত আমি! উচ্চ গিরি-শিখরেও
ক্ষণে ক্ষণে জাগে তাই নিম্ন-আকর্ষণ।
সমাপ্ত সে সব আজ, বাবাহীন প্রেম
অন্তরে ফুটুক এবে দীনতম বেশে
শক্তি-গৰ্ব ডুবে যা গভীর গুহায় !
{ গুহাভ্যন্তরে একটি সুগভীর অন্ধকারময় দ্বিতীয়
গুহায় চিত্র-বিসর্জন।)
সমাপ্ত।
।)

No text on this page.

গ্রন্থকারের অপর গ্রন্থ সম্বন্ধে কতিপয় অভিমত। কবিবর রবীন্দ্রনাথ বলেন—“একটি সুকুমার স্বপ্নপেলব বিষয়—সালঙ্কার ভাষা ও অজস্র কলা-নৈপুণ্য—এই কাব্যে সম্পদ যথেষ্ট আছে। আপনার যে যথেষ্ঠ কবিত্বশক্তি আছে সে সম্বন্ধে আমার কোনাে সন্দেহ নাই—কিন্তু আপনার কবিত্বের প্রাচুৰ্য্য দ্বারাই এই বইখানি ভারাক্রান্ত হইয়াছে বলিয়া আমার মনে হইল।” শ্ৰীযুক্ত সাৱদা চরণ মিত্র বলেন- অনেক স্থলেই যথেষ্ট কবিত্বের পরিচয় আছে—পড়িয়া প্রাত হইলাম। শ্ৰীযুক্ত দেবেন্দ্রবিজয় বসু এম-এ বলেন--“শুক্লার মধ্যে স্থানে স্থানে অসাধারণ কবিত্ব শক্তির পরিচয় পাইয়া অত্যন্ত আহ্নাদিত হইয়াছি। আপনার এ কাব্যে আপনার কৃতিত্ব ও অসামান্য প্রতিভার বিকাশ হইয়াছে।......রূপকের জন্য বৃথা অনু- সন্ধান না করিয়া কেবল সাধারণ উপাখ্যান ভাবে এ কাব্য গ্রহণ করিলেও ইহাতে অসাধারণ রচনা কৌশল আছে। আশা করি শিক্ষিত সমাজে ইহার যথােচিত প্রতিষ্ঠা হইবে।”

“ট্রেন ট্রামের দিনে নুতন কাদম্বরী।” -অর্ঘ্য। তরুণ কবির প্রথম কাব্যটিই ভবিষ্যতের মহিমায় সমুজ্জ্বল। স্বপ্ন-কাহিনীটি পার্বত্য ডালিয়ার ন্যায় নয়ন- রঞ্জক সুষমায় অলঙ্কত। সুখরঞ্জন বাবুর স্বাভাবিক প্রতিভা, সুন্দর শব্দযোজন শক্তি ও ছন্দ-নৈপুণ্য আছে। সুপ্রভাত। “কবির কল্পনা-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইতে হয়। কবি অসামান্য শক্তি লইয়া বঙ্গসাহিত্যে-আসরে নামিয়াছেন। কাব্যের চরিত্রগুলি জীবন্ত, হীরকের ন্যায় অগন্য বাক্যাবলী কাব্যের মধ্যে ঝিমি করিতেছে।” ভাৱতমহিলা। মানসী পত্রিকায় ১৩১৭ সালের বঙ্গসাহিত্যের রিপােটে শ্ৰীযুক্ত সারদাচরণ মিত্র ‘শুক্লা’র বিশেষত্ব লক্ষ্য করিয়া লিখিয়াছেন—“বহু দিন যাবৎ বঙ্গসাহিত্যে গীতি- কাব্য ও কোষ-কাব্যেরই প্রাধান্য চলিয়া আসিতেছে। কোন গল্প অথবা বিষয় বিশেষ অবলম্বনে কাব্য রচনা করা অত্যন্ত বিরল হইয়া পড়িয়াছিল। নবীন কবি সুখরঞ্জন রায় ‘শুক্লা' নামে এই শ্রেণীর একখানা কাব্য লিখিয়াছেন। কাব্যখানি সুখপাঠ্য হইয়াছে।” কন্তলীন প্রেসে পুরু এন্টিক কাগজে সুন্দর ছাপা, বাহ্য আকৃতি মনােহর, ১৩১ পৃষ্ঠা,-মূল্য দশ আনা মাত্র। প্রাপ্তিস্থান ২২, কর্ণওয়ালীশ ষ্ট্রীট, ইণ্ডিয়ান পাব্লি- সিং হাউস; ২০১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, গুরুদাস লাইব্রেরী ; ৬৫; কলেজ ষ্টীট, ভট্টাচাৰ্য্য এণ্ড সন্স ; ২০, কর্ণওয়ালীশ স্ট্রট, মজুমদার লাইব্রেরী—কলিকাতা। •

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mayachitra

Author
Ray,sukhranjan
Title
Mayachitra
File name
Mayachitra
Text
OCR done
Citation
1911
Published
2009/09/12
Publisher
Indian Publising,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
86
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Plays
Keywords
Jhelumer Tir
DLI number
512926
Barcode
4990010019953.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
o5fAVhkQxgY
Download PDF

Mayachitra