Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Desh-bandhu

Das,ashalata · 2010/04/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

আমার দেশ
ভাত আমার জাননি অমর। ধাত্রি আমার ! আমার দেশ,
কেন গাে মা তোর শুধু নয়ন, কেন গা মা {•ঃ ক কেশ
কেন শাে মা তোর ধুলায় আসন, কেন গো মা হার মলিন বেশ
ত্রিংশ কোটি সন্তান যার, ডাকে উচ্চ আমার দেশ
* *
যদিও মা তাের দিব্য-আলোকে ঘেরে আছে আজ অধর ঘাের
কেটে যাবে মেঘ নবীন গরিমা ভাতিৰে অবির ললাটে তার
মুচাক মা তোর দৈনা। মানুষ গামরা নহি ই মে ।
মা:' সাধনা শর ' সা হন, ''মার
।
...

-দেশ মাতৃকার প্রিয় সন্তান- —দেশবন্ধুর আদর্শে গঠিত দেশ-বন্ধু, My F [ জাতীয় উপন্যাস] শ্ৰীমতী আশালতা দাশ, সাহিত্যভারতী, রত্নপ্রভা, কংগ্রেস অধিবেশন, পৌষ, ১৩৩৫ সাধারণ সং•] [ মূল্য ১ টাকা

প্রকাশক-সত্যেন্দ্রকুমার শীল
শ্রীকৃষ্ণ লাইব্রেরী
২১১১, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্ৰীমতী আশালতা দাশ, রচিত
মুক্তির-পরশ
বাহির হইয়াছে, সর্বত্র পাইবেন।
প্রিন্টার—শ্রীপঞ্চানন দাস
সত্যনারায়ণ প্রেস
২৫, দুর্গাচরণ মিত্রের স্ট্রীট, কলিকাতা।

ঘুতি-তর্পণ ===
দেশবন্ধু ।
—চির-পরাধীন চির-পদানত বাঙালী যেদিন সকল দেশে
অত্যাচারের প্রগাঢ়-পঙ্কে পড়েছিল তারা কাঙাল-বেশে,
বাজালে তােমার ত্যাগের তূর্য, মুক্তি-মন্ত্র উঠিলে গাহি ;
স্বরাজের পথে ছুটিল বাঙালী তােমার আশীষ-তরণী বাহি।
-দেশের বন্ধু, হে মহারাজ,
দুর্যোগ-রাতে তােমার মিলন ভুলিনি, ভুলিনি আমরা আজ--
তােমা,
প্রণতা---আশালতা ।

No text on this page.

উপহার
• • • • • • •
****
কলিকা।

গাও ভারতের মুক্তিগান-মেম্ব আরাবে-জলদ গম্ভীরে।
বাজাও-বাজাও বিজয়শঙ্খ গভীরে-সুস্বরে।
আজি এসেছে দুয়ারে তােমার ভারতের রাজা।
কোথা কে আছ ভক্ত ভারতবাসী শ্রদ্ধা-অর্ঘ্যে করগগা পূজা
ভারতের স্বাধীনতার প্রদীপ্ত প্রভাতারুণ—ভারতের গৌরবের
মহান অবদান—ভারতের প্রোজ্জ্বল উজ্জল কনক কেতন
—ভারতের নেপােলিয়ন
পাঞ্জাব-কেশী
ৱণজিৎ সিংহ
ঐতিহাসিক উপন্যাস-সম্রাট
শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়
সম্পদময় সাহিত্য সম্ভারে—রক্তময় ভাষার ঝঙ্কারে সুদৃশ্য
সুন্দর আধারে—নিসাড় অসাড় ভারতের প্রাণে চেতনা সঞ্চারে-
বিশ্বকাশে নূতন বিস্ময়ের মত অচিরে উদ্ভাষিত হইবে।

নিবেদন নাই। দেশবন্ধু—যাহার পূণ্য জীবনের আদর্শ লইয়া এই বই- খানির নায়ক চরিত্র আঁকিবার প্রয়াস পাইয়াছি—তাহার সহিত চাক্ষুষ পরিচয়-লাভ এ ভাগ্য-হীন জীবনে কখনাে ঘটিয়া উঠে দেবতার দর্শন লাভ না কি সকলের ভাগ্যেই ঘটিয়া উঠে না,তাই দুরদৃষ্টের পংক্তিতে নিজেকে ফেলিয়া সান্ত্বনা দিয়াছিলাম। তাহার অসামান্য মহত্বের পরিচয় পােকমুখে, সংবাদপত্রে বহুবার পাইয়াছি। তাহার অনুপম দেশ-প্রীতির জ্বলন্ত পরিচয় তাহার বক্তৃতার ছত্রে ছত্রে ফুটিয়া উঠিতে দেখিয়াছি—তাহার আত্মত্যাগের জ্বলন্ত উদাহরণ ভারতের ইতিহাসের পাতায় পাতায় ফুটিয়া থাকিবে।••••• তাহারই কয়েকটী উপদেশবাণী অবলম্বন করিয়া এই পুস্তক খানিকে উপন্যাসে রূপ দিবার প্রয়াস পাইয়াছি মাত্র। সফল কাম হইয়াছি কি না সে বিচার আমার নহে,-পাঠকের ; এই পুস্তক পাঠে যদি সহস্রের মধ্যে অন্ততঃ একজনের মনেও দেশাত্মবোেধ জাগিয়া উঠে, তবেই শ্রমকে সার্থক করিব। পরিশেষে,—আমার অকৃত্রিম বন্ধু শ্ৰীসতেন্দ্রকুমার গুপ্তকে

অন্তরের শ্রদ্ধা না জানাইয়া থাকিতে পারিলাম না, কারণ তাহার
উদ্যোগেই বইখানি লােকচক্ষুর সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করিতে সমর্থ
হইল।
৩০শে বৈশাখ, ১৩৩৫,
কলিকাতা
শ্ৰীআশালতা দাশ।

শে-বক্স পিতৃমাতৃহীন অমলকুমারের সিবিল সার্ভিস পরীক্ষায় সসম্মানে পাশ হওয়ার সংবাদে, তাহার পিতার বাল্যবন্ধু ও তাহার প্রতিপালক কলিকাতার প্রসিদ্ধ ধনী ব্যারিষ্টার মিঃ এ, সি, মুখার্জীর মনটা যে পরিমাণে আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়াছিল... ঠিক তাহার দ্বিগুণ পরিমাণে তাহার কন্যা নেলির তরুণ মনের নিভৃত করে সুখের অপূর্ব ও অনির্বচনীয় পুলকোচ্ছ্বাস বহিয়া তাহার অন্তর বাহির প্লাবিত করিয়া তুলিতেছিল। নেলি অমল কুমারের বাগদত্তা। চৈত্রের এক উষ্ণ মধুর রৌদ্রালােকিত প্রভাতে ড্রয়িং রুমে বসিয়া পিতা পুত্ৰী দৈনন্দিন চা পান করিতেছিলেন। দ্বারের চিত্র বিচিত্র রঙ্গীন পর্দাটা ঠেলিয়া ‘বয়’ আসিয়া প্রভাতের ‘ডাক’ রাখিয়া নীরবে অভিবাদনান্তে প্রস্থান করিল। চা পান করিতে- করিতে মিঃ মুখার্জী কন্যাকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন-“দেখ দেশবন্ধু তাে মা নেলি, বিলেত থেকে আমার কিছু চিঠিপত্র এসেছে কি ?” বিলাত•••! আশা, আনন্দ ও লজ্জার সংমিশ্রণে নেলির মুখের বর্ণ অপরূপ হইয়া উঠিল। পিতার স্নেহপূর্ণ আদেশে আনত বদনে সে পত্র বাছিতে সুরু করিল। পত্ৰ মধ্যে অধিকাংশই তাহার পিতার নামে আসিয়াছিল নেলি তন্মধ্য হইতে সন্তর্পণে বাছিয়া চির পরিচিত হস্তাক্ষরে লেখা ‘এনভেলাপ' খানি তাহার পিতাকে আগাইয়া দিল। মিঃ মুখার্জীর চা পান ইতিপূৰ্বে সমাধা হইয়া গিয়াছিল, তিনি ব্যগ্র হস্তে ‘এনভেলাপ’ ছিড়িয় পত্র বাহির করিয়া পাঠ করিতে করিতে মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন। পরে প্যান্টের পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া মুখ মুছিতে মুছিতে বলেন—“ভারী সুখবর মা-অমল লিখছে আগামী এপ্রিল মাসের first weekএ Calcuttaতে এসে পৌঁছুবে, এই নাও মা, পড়ে দ্যাখ।” রাঙ্গা মুখ আরও রাঙ্গা করিয়া কন্যা নতমুখে জড়িতস্বরে বলিল—“আপনি তত পড়েছেন বাবা, আমার আর দেখবার দরকার নেই।” । মিঃ মুখার্জী কন্যার এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে মনে মনে সন্তুষ্ট হইয়া উঠিয়া কন্যার মস্তকে আপনার স্নেহ শীতল হাতখানি রাখিয়া , বলিলেন—“তুই কি করে জানবি মা, যে অমলের এই পাশের দেশবন্ধু সংবাদে আমি কি সুখী হয়েছি। আঃ আজ মনে পড়ছে সেই দিনের ঘটনা...যখন সুবােধ তার সাগর-পেঁচা একমাত্র মাণিক অমলকে আমার হাতে সপে দিয়ে, আমারই চোখের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়বার পূৰ্ব্ব-মূহুর্তে বলেছিল—“দাদা, তোমার হাতে এই মাতৃহীন অনাথ বালককে তুলে দিয়ে গেলাম, আর আমি ত জন্মের মত পৃথিবীর বুক হতে বিদায় নিচ্ছি, দেখে ভাই, তােমার স্নেহে ও যেন পিতার সবখানি অভাব ভুলতে পারে, আর,আর আমার ছেলে যাতে দশের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, এটুকুও তুমি আমার অবর্তমানে মনে করে করাে। আঃ সেই বন্ধু আমার আজ কোথায় কোন দেশে চলে গ্যাছে-আমার বুকের একখানি পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে।” মিঃ মুখার্জী থামিয়া থামিয়া কথাগুলি বলিয়া ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন—যেন সেই কাল মৃত্যু-দিবস তার চোখের উপর হইতে ঘন যবনিকাখানি তুলিয়া সেই দিনটি সুস্পষ্টরূপে অভিনয় করিয়া গেল। লুপ্তপ্রায় অতীত আজ বহুদিন পরে বায়স্কোপের ফিল্মের মত পর পর, দৃশ্যের পর দৃশ্য উল্টাইয়া যাইতে লাগিল। প্রথম—তাহার বাল্যের প্রিয়তম সুহৃদ সুবােধ- কুমার চৌধুরীর মৃত্যু। দ্বিতীয় - সেই শশাকের বিষম আঘাতের ক্ষত মিলাইতে না মিলাইতে তাঁহার প্রাণাধিক পত্নীর অকালে ১১ দেশ-বন্ধু পরলােক গমন—আত্মীয় স্বজনের দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহের নিমিত্ত অনুরোেধ উপরােধ, অবশেষে ব্যর্থকাম,পরে কন্যা ও অমলকুমারকে লইয়া বারাকপুরের নূতন আবাসে উঠিয়া আসা- অমলের বিদ্যা শিক্ষার্থ বিলাত গমন। এ সকল কতদিনকার পুরাতন ঘটনাবলী আজ মিঃ মুখার্জীর স্মৃতির-দ্বারে ভাসিয়া আসিল। তাঁহার চোখের পাতা অশ্রুজলে ঝাপসা হইয়া উঠিল। আর নেলি? সেও মূক! তাহারও আজ ভাবান্তর ঘটিয়াছে। হারাণ দিনগুলির বার বার স্মরণ করা প্রতি ক্ষণ, প্রতি কথাটি আজ তাহার মনের ভিতর আছাড় খাইয়া পড়িল—যেন অধীর চঞ্চল ঊর্মিমালার ন্যায়। অমলকুমারের বিলাত গমনের পর দীর্ঘ একটি যুগ কাটিয়া গিয়াছে-দশ বৎসর কেম্বি জে থাকিয়া পড়া শুনা শেষ করিয়া আজ আবার ভারতে ফিরিয়া আসিতেছে। উঃ, সে কতদিন চলিয়া গিয়াছে, এতদিন পরে আবার, আবার তাহা- দের দেখা হইবে। কে জানে, বিলাতের সেই হিম-কুন্দ শুভ্র তুষার- বলিত শ্বেতাঙ্গনাদের সংস্পর্শে গিয়া আজিও তাহার মনখানি এই কত দেশ দেশান্তরের এ পারে একটি গৃহ কোণে ঘুরিতেছে কি না। সম্ভব অসম্ভব কত চিন্তাই না তাহার মনের পাতায় পাতায় ফুটিয়া উটিল, সে চিন্তার যেন শেষ নাই, রবার টানিয়া বড় করার মত বাড়িয়াই চলে! ভাবিতে ভাবিতে নেলির ব্যাকুল চিত্ত সবেগে দোল খাইয়া উঠিল—অজানিত আশঙ্কা মন হইতে জোর করিয়া

দেশবন্ধু
ঝাড়িয়া সে ভাবিল-না না এ সব সে কি ভাবিতেছে, ছিঃ ছিঃ
তাও কি হয়, ও সব কথা ভাবিতেও যে বিশ্রী লাগে, মা গাে!
“বয়, ভিতরমে সাব হয় ?”
বাহির হইতে এই কথাগুলি ভাসিয়া আসিল। পিতাকে
গভীর চিন্তামগ্ন দেখিয়া নেলি উঠিয়া বাহিরে আসিয়া উত্তর
দিল—“ইয়েস্ মিঃ বােস, কাম্ ইন প্লীজ।”
বদ্ধ ঘরের দ্বার ঠেলিয়া নেলির সহিত গৃহে প্রবেশ করিল
যৌবনের প্রথম সীমায় উপনীত সুন্দর কান্তি সম্পন্ন একটি
প্রিয়দর্শন তরুণ যুবক। সুপ্তিভঙ্গে প্রথমটা লােকে যেমন দিশেহারা
হইয়া কোন কিছুই সম্যক উপলব্ধি করিতে পারে না। তেমনি
যুবকের আগমনে মিঃ মুখার্জী পাঁচ ছয়বার এধার ওধার দৃষ্টিপাত
করিয়া বলিলেন—“কে আলােক নাকি, এস এস, ফিরলে কবে ?”
আলােক মিঃ মুখার্জীকে নমস্কার করিয়া একখানা চেয়ার
অধিকার করিয়া বসিয়া বলিল—“ফিরেছি কাল রাত্রে দশটা
পঁয়ত্রিশএর ট্রেণে। তারপর, এখানকার খবর সব আপনাদের
ভাল তাে? আপনি কেমন আছেন মিস্ -মুখাজ্জী, ওঃ কালকে
সারা পথটা রেবা আপনার নাম করতে করতে এসেছে।”
নেলি মুখ ঘুরাইয়া কৃত্রিম অভিমান মিশ্রিত সুরে বলিয়া
উঠিল—“তবে রেবা আপনার সঙ্গে এল না কেন ? বাড়ীতে
নেমে বুঝি আমার কথা ভুলে গেছে মিঃ বােস।”

দেশবন্ধু আলােক হাসিয়া বলিল—“না না সে কি কথা, সে আসবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল—হঠাৎ তার শরীর অসুস্থ হয়ে পড়াতে আসতে পারলে না। বিকেলে সুস্থ হলে সে নিশ্চয় আসবে, তখন বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করে অনেক দিনের রাগ মেটাবেন মিস্ মুখাজ্জী।” মিঃ মুখাজ্জী ‘অ্যাস ট্রে’তে চুরুটের ছাই ঝাড়িয়া বলিলেন- “জান আলােক, আজ তােমাকে একটি শুভ সংবাদ দিচ্ছি, অমল আগামী এপ্রিলে এখানে আসছে।” “তাই নাকি, কবে ফিরছেন তিনি ?” “খুব সম্ভব first weekএ।” “ইংলণ্ড থেকে আসছেন বুঝি ? ওঃ দাড়ান মিঃ মুখার্জি আজ আপনাকে একটা জিনিষ দেখাতে এনেছি” বলিয়া পকেট হইতে একখানি ইংরাজী সংবাদ পত্র বাহির করিয়া তাহার মধ্য হইতে লাল পেন্সিলে চিহ্নিত স্থানটিতে অঙ্গুলী রাখিয়া অবহেলাপূর্ণকঠে আলােক বলিল—“ফরােয়ার্ড কি লিখছে দেখুন, ‘আগত এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে ইংলণ্ড হইতে দেশের সুযােগ্য সন্তান কর্মবীর শ্রীঅমলকুমার চৌধুরী দেশ মাতৃকার উদ্ধার-কল্পমানসে ভারতে আগমন করিতেছেন, সমগ্র ভারতবাসী তাঁহার উপযুক্ত সম্বর্ধনার জন্য প্রস্তুত হউন।” হুজুগ আর বলেন কেন, লাগলেই হলাে। আঃ পথে ঘাটে আর বেরুবার জো নেই, ১৪

দেশবন্ধু
চারিদিকে স্বদেশীর দল একেবারে হৈ হৈ করে বেড়াচ্ছে, আচ্ছা
মিঃ মুখার্জী ইনি আমাদের মিঃ অমল চৌধুরী নন্ তাে? তা
হলেই সর্বনাশ•••”
মিঃ মুখার্জী এ সংবাদে একটু বিচলিত হইয়া পড়িলেন। পরে
বলিলেন—“নাঃ অমল সে রকমই নয়।”
“বলা যায় না মানুষের মনের গতি কখন কি ভাবে বেয়ে
চলে ; আচ্ছা এই স্বদেশীদের এত হুজুগের কি প্রয়ােজন?
এতে কি তাদের কোন লাভ আছে?”
“দেখ আলােক, তাদের আসল কৰ্ম্মটি হচ্ছে মাতৃপূজা,
লাভ বা অলাভের তারা ধার ধারেন না। এ মহা যজ্ঞের যে প্রধান
হােতা, তাকে যে তারা প্রাণ দিয়ে ভালবাসবে, পূজা করবে,
তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। এই দেখ না, এই যে অসংখ্য
কৰ্মী তাদের দেশভক্ত পূজারীর জন্য প্রচুর আদর অভ্যর্থনার
অনুষ্ঠান করছে•••হয়তাে এর চেয়ে বেশী আদর ও উৎসবের
আয়ােজন অমলের জন্য করবে। কিন্তু তুমি লক্ষ্য করাে বােস,
যে এ কর্মে প্রাণ খুলে কেউ যােগদান করবে না, তার কারণ
অমল আমাদেরই আত্মীয়, তাদের তাে কেউ নয়—অমলের
কৃতিত্বের সংবাদে আমরাই সুখী। কিন্তু বল দেখি আলােক,
‘অমলকে অভিনন্দিত করতে আমরা আত্মীয়-বন্ধু ছাড়া দেশের
কয়জন লােক যাবে?”

দেশবন্ধু আলােক প্রচ্ছন্ন হাসি টিপিয়া স্বগতঃ বলিল—“আপনার ও বিদেশী খােলসটা খুলে ফেলবার বড়ই প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে, মিঃ মুখার্জী।” মুখে সে বলিল—“তা দেশের লােক যােগ দিন বা না দিন তাতে আমাদের কোন ক্ষতি নেই। মিঃ চৌধুরী যে কারুর কার ভিখারী নন্ এটা আমরা খুবই জোর করে বলতে পারি, কি বলেন—মিঃ মুখার্জী ?” হাওড়া স্টেশনে ভীষণ জনতা -ইংলণ্ড হইতে দেশনেতা আজ কলিকাতায় পৌছিবেন। বিরাট জনবাহিনীর অগণিত উৎসুক আঁখি দূর, সুদুরের পানে অধীর আবেগে মেলিয়া রহিয়াছে—কখন তাদের ঈপ্সিত রত্ন বুকে ধরিয়া টেনখানি আসিবে। ক্রমে সিগন্যাল পড়িল, ধীরে ধীরে ধূম উদগীরণ করিতে করিতে সগর্বে ‘ট্রেণ’ ‘ই হইল। বিপুল জনতা হইতে উচ্চকণ্ঠে ধ্বনিয়া উঠিল—“বন্দে মাতরম্।” বন্দে মাতরমের প্রবর্তক ঋষি জগদ্বরেণ্য সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র। তঁাহার চরণে কোটী কোটী প্রণিপাত। যুগ লক্ষ্মীর আহ্বান শঙ্খ তিনিই প্রথমে বাজাইয়াছিলেন। সাত কোটী সুপ্ত সন্তানের হাত ধরিয়া তিনিই প্রথমে মাতৃ মন্দিরের পথের সন্ধান বলিয়া দিয়াছিলেন। প্রবুদ্ধ জনতা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে গাহিতে গাহিতে চলিল-

দেশবন্ধু
“আমার সােণার বাঙ্গলা আমি তােমায় ভালবাসি,
চিরদিন তােমার আকাশ বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাশী,
আমি পরের ঘরে কিনব না আর ভূষণ বলে গলার ফাসী।”
১৭

দেশবন্ধু দুই “কার” হইতে নামিয়া মিঃ মুখার্জী, নেলি ও আলােকনাথ বােস অতি কষ্টে সেই অসংখ্য রথী বেষ্টিত জন ব্যুহ ভেদ করিয়া প্রথমে ফাষ্ট ক্লাশ কামরা অন্বেষণ করিলেন। তাঁহাদের সমুদয় উদ্যম ব্যর্থ হইল। কামরার মধ্যে জনকয়েক ইউরােপীয়ান নর- নারী ছাড়া তাঁহাদের একখানি পরিচিত মুখের কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না। ক্ষুব্ধ চিত্তে তাহারা দাঁড়াইয়া রহিলেন। আলােক বলিল—“একবার ওদিকটা দেখলে হতাে না, যদিই আমাদের অন্যমনস্কতায় তিনি নেমে পড়ে থাকেন—কি বলেন আপনারা?” নেলি অপ্রসন্ন মুখে সেই শশাভাযাত্রার পানে তাকাইয়া উদ্বেগ কাতর স্বরে বলিল—“সে তত বেশ কথা মিঃ বােস, চলুন বাবা ঐদিকে। উঃ কী সাংঘাতিক ভীড়, অসম্ভব ঐ ভীড় ঠেলে যাওয়া-না মিঃ বােস?” মিঃ মুখার্জী মাথা নাড়িয়া বলিলেন—“হােক ভীড়, তবু ১৮ দেশবন্ধু আমাদের দেখতে হবে একবার। আচ্ছা দেখি ষ্টেশন মাষ্টারকে বলে, যদি কোন উপায়ে তিনি পথ করে দিতে পারেন—ঐ যে তিনি এ-দিকেই আসছেন। “হেস্লো মিঃ রয়, অনুগ্রহ করে একবার এদিকে আসবেন কি ?” ষ্টেশন মাষ্টার চলিতে চলিতে থামিয়া পড়িলেন। পরে বিস্মিত কণ্ঠে বলিলেন—“হেল্লো মিঃ মুখার্জী, তারপর কন্যাসহ এখানে আজ হঠাৎ এসেছেন ?” মিঃ মুখার্জী ভাবনা ব্যাকুলস্বরে বলিলেন--“বড় মুস্কিলে পড়েছি মিঃ রয়, আমার একটি আত্মীয়ের এই ট্রেণে আসবার কথা ছিল। ফাষ্ট ক্লাস আমরা খুঁজে দেখলাম, তাকে পেলাম না। ভাবছি একবার ও ধারটা খুঁজে দেখব, কিন্তু এমনি গণ্ডগােল বাধিয়ে তুলেছে ওরা, যে ওখানে যাওয়াই দুর্ঘট। আপনি একটু চেষ্টা করে দেখুন না, যদি কোন রকমে ওদের সরিয়ে দিতে পারেন ?” মিঃ রয় এ প্রস্তাব অনুমােদন করিতে পারিলেন না। “টাইম টেব খানি খুলিয়া দৃষ্টিপাত করিয়া মাথা দুলাইয়া বলিলেন- “ইম্পসিবল”—দেখছেন না, ওঁরাই জায়গার জন্ঠে কিরকম মারামারি বাধিয়ে তুলেছেন। ওদের ওদের বলতে গেলে শুনবে কেন ? আর জোর করেও হটিয়ে দিতে পারা যায় না কারণ ওরা রেল কোম্পানীর হুকুম পেয়ে তবে এসেছে। তা হলে ১৯

দেশবন্ধু
বুঝতেই পারছেন তাে এ ক্ষেত্রে কোন কথা বলা খাটবে না।
আচ্ছা, ক্ষমা করবেন, আপনার কিছু উপকার করতে পারলাম
, এর জন্যে বড় দুঃখিত আমি। এখন বড় ব্যস্ত আছি good
bye!” বলিয়া তিনি টুপী খুলিয়া অভিবাদন করিয়া দ্রুতপদে
অদৃশ্য হইলেন। মিঃ মুখার্জীর আত্মসম্মান ক্ষুন্ন হওয়াতে নেলি
জ্বলিয়া উঠিল। জনতার পানে একটা ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টি হানিয়া তীব্র
কণ্ঠে বলিল—“দেখছেন বাবা আজকাল সব স্পর্ধা কি রকম
বেড়ে উঠেছে, ছিঃ আপনাকে এরকম অপমান করতে ওঁর একটু
বাধল না ?”
মিঃ মুখার্জী শান্ত সুরে বলিলেন—“অপমানটা তুমি কোথায়
দেখলে মা? সত্যি আমারই বলা অন্যায় হয়েছে।”
নেলি বলিল-“বেশ যাহােক বাবা, ঐ রকম কাউকে কিছু
বলেন না বলে সবাই বাড়িয়ে তুলেছে। না বাবা, এ অপমানের
প্রতিশোেধ আপনাকে নিতেই হবে।”
“কাকাবাবু ?”
মিঃ মুখার্জী, আলােকনাথ, নেলি সকলে এককালে চমকিয়া
ফিরিয়া তাকাইলেন। মিঃ মুখার্জীর কণ্ঠ হইতে স্বর ফুটিল না।
আর নেলির মুখে দারুণ ঘৃণার ছায়া নিবিড় ভাবে ঘনাইয়া
আসিল। অমল সকলের ভাব বৈলক্ষণ্যে আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে

দেশবন্ধু
বলিল—“কাকাবাবু আপনারা কি আমার সামান্য পরিবর্তনে
চিনতে পারলেন না ?”
তাহার স্বর হইতে বেদনা ঝরিয়া পড়িল। মিঃ মুখার্জীর
মনের মধ্যে পুরাতন কথাগুলি তাল পাকাইয়া জাগিয়া উঠিল।
হাত বাড়াইয়া অমলকে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া তিনি রুদ্ধকর্মে
বলিলেন—“একটু আশ্চর্য হয়েছি বই কি বাবা, তুমি যে এতটা
এগিয়ে যাবে এ আমি স্বপ্নেও ভাবি নি।”
অমল একটু জোর করিয়া হাসিয়া বলিল—“এই যে নীলাও
এসেছ, ভাল আছ তো?”
নেলির পিত্ত শুদ্ধ এই সম্বােধনে জ্বলিয়া উঠিল, এতদূর!
সে একটু শ্লেষ পরিপূর্ণ স্বরে বলিল—“গুড ইভনিং মিঃ চৌধুরী,
আপনার স্মরণ শক্তির প্রাচুর্য দেখে না ধন্যবাদ দিয়ে থাকতে
পারছি না। ওঃ কত কালের সেই পুরাণে নামটা ঠিক মনে করে
রেখেছেনও তাে! একজন সিবিলিয়ান যে এরকম স্বদেশীয়ানার
পক্ষপাতী হয়ে পড়বে আগে জানতাম না। মিঃ চৌধুরী, বিলাতী
নামটা ধরতেও কি দোষ জন্মায় ?”
অমলের বাম পার্শ্বে শুভ্র খদ্দর পরিহিত গৌর বর্ণের একটি
যুবক উক্ত কথােপকথন শুনিয়া মনে মনে ক্রমশঃ অসহিষ্ণু হইয়া
উঠিতেছিল। কেবল অমলের আত্মীয় বলিয়া সে কোন কথার
অবতারণা করিতে সাহসী হইল না।
২১

দেশবন্ধু নেলির বিজ্ৰপৰাণভরা সুতীক্ষ্ণ বাক্যগুলি নীরবে হজম করিয়া অমল স্মিতহাস্যে বলিল—“নিশ্চয় দোষ বই কি নেলি-পরের দেওয়া জিনিষ নিয়ে কেন আমরা খাটো হ’ব বলুন তাে কাকা- বাবু? বলুন তাে কয়জন সাহেব আমাদের বাঙ্গালী নাম কমলা সুশীলা রাখে? সত্যি সাহেবদের অনুকরণে, আমরা এই বাঙ্গালী জাতি যতটা অসভ্য আর বােধ হয় বাঙ্গলা, বেহার- উড়িষ্যার একটা শিক্ষিত ভদ্রলােকও এতদূর বাড়াবাড়ি করতে সঙ্কুচিত হন। মিঃ মুখার্জী দেখিলেন—কথাগুলি ক্রমে ক্রমে দ্বন্দ্বে পরিণত হইবার উপক্রম ঘটিতেছে। সেই জন্য আপােষে উভয় পক্ষকে নিরস্ত করিবার প্রদান উপায় উদ্ভাবন করিয়া অমলের কাধে হাত দিয়া বলিলেন—“যার যা ইচ্ছে যাবে সে তাই করবে, তাতে রাগ কর কেন নেলি ? অমল কি বাড়ী যাবে না, তােমাদের তর্ক এখন থামাও দেখি! বাড়ী চল, তারপর যত পার অমলের সঙ্গে তর্ক কর।* কথা কহিতে কহিতে সকলে প্ল্যাটফর্মের বাহিরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অমল পূৰ্ববর্ণিত যুবকের হাত ধরিয়া বলিল, এইবার তুমি বাড়ী যাও মৃণাল, মা তােমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আমি পারি তাে বিকেলে যাবােখন। মৃণাল অমলের হাতে একটু চাপ দিয়া আবেগপূর্ণ কণ্ঠে দেশবন্ধু = = ১ বলিল-“পারি তাে নয় নিশ্চয় যাবেন, আর আশীর্বাদ করুন অমলদা, যে ভার আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের হাতে তুলে নিয়েছি, তা যেন সুশৃঙ্খলে শেষ করতে পারি।” অমল তাহার উচ্ছ্বাসে বাধা দিয়া বলিল—“আশীৰ্বাদ আমার কাছে চেও না মৃণাল, যিনি সকলের জননী জন্মভূমি ভারতমাতা তার আশীষ ধারা তােমাদের শিরে নিত্য ঝরে পড়ক, এই আমার প্রার্থনা। মিঃ মুখার্জী অবাক হইয়া বলিলেন—“অমল তুমিই কি সেই দেশ সেবক।” মৃণাল তৎক্ষণাৎ তাঁহার দিকে ফিরিয়া গাঢ়স্বরে বলিল - “আজ্ঞে হ্যা, ইনিই বাঙ্গলা মায়ের সুসন্তান আর আমাদের শিক্ষাগুরু। আমরা খুব আশা করছি যে ইনি আমাদের পতিত হিন্দু সমাজটাকে পুনরায় নূতন করে গড়ে তুলতে পারবেন।” প্রশংসা বাক্যে লজ্জিত অমল মৃদুস্বরে মৃণালকে বলিল- “আঃ কী বাজে বকছ মৃণাল, সামান্য মানুষকে এতটা বাড়িয়ে ভােলা তােমার উচিত হয় নি। না কাকাবাবু ওর কোন কথা শুনবেন না।” সামনেই মিঃ মুখার্জীর সুবৃহৎ মিনার্ভা ‘কার’ খানি অপেক্ষা করিতেছিল। মিঃ মুখার্জী অমলকে ডাকিয়া বলিলেন-“এসাে বাবা অমল।” ।

দেশবন্ধু
“ক্ষমা করুন, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমি ফিরে আসছি।”
বলিতে বলিতে অমল সেই বিপুল জনমণ্ডলীর মধ্যে ত্বরিত পদে
চলিয়া গেল! কিছুক্ষণ পরে সে ফিরিয়া আসিয়া ‘কারে’ উঠিয়া
বসিল। সােফেয়ার ষ্টার্ট দিল।
২৪

দেশবন্ধু —তিন গাড়ীর মধ্যে বসিয়া অমল একবার নিজের কৌতূহলী চোখ দুইটা বুলাইয়া সকলের মুখের ভাবগুলি দেখিয়া লইল। সহসা আলােক বলিল—“আচ্ছা মিঃ চৌধূরী, এই মােটা খদ্দরের কাপড় চাদরে আপনার কষ্ট হচ্ছে না?” অমল স্নিগ্ধ স্বরে বলিল-“কষ্ট, কিছুমাত্র না; বরঞ্চ আপনি একবার ব্যবহার করে দেখবেন যে আমাদের এই দেশীয় মােটা পরিচ্ছদ কত আরাম প্রদায়ক। আঃ ঐ বিলাতী কোর্ট, প্যান্ট, কলার, নেকটাই যেন এক একটা বন্ধনী। আমার তাে মনে হয় যে গলায় কলার নেকটাই লাগালে দম বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের এই শুভ্র সরু পাড় ধুতি খানির ভাজ খুলে পরলে মনে হয় যেন সারা অঙ্গে নিৰ্ম্মল চাদের স্নিগ্ধ রজত ধারা ঝরে পড়লাে। পাতলা কেঁাচান চাদরখানির প্রতিটি কুঞ্চন যেন নদীর বুকের এক একটি হিল্লোল। তবে সকলকার মনােভাব কিছু একরকম নয়, আপনি আমাকে বস্ত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন তাই বললাম। ২৫

দেশবন্ধু
সত্যি বলুন দেখি, ঐ সমস্ত আঁটা আঁটা পােষাক পরে কোথাও
হাত, পা মেলিয়ে বসবার জো আছে ?
আলােক চিন্তিতভাবে বলিল -“কতকটা সত্যি বটে কিন্তু
দু’দিন পরে যখন কোর্টে বেরুবেন, তখন তাে বাধ্য হয়ে আপনাকে
এ দেশীয় পরিচ্ছদ পরিত্যাগ করতে হবে।”
অমল স্বরের উপর জোর দিয়া বলিল—“সে আমি ভেবেই
রেখেছি, কোর্টে আমি বেরুচ্চি না।”
বিনা মেঘে সহসা বজ্রপাত হইলেও লােকে অতটা চমকাইয়া
উঠে না, যতটা অমলের কথায় মােটরশুদ্ধ লােক চমকিয়া
উঠিলেন।
মিঃ মুখার্জী মস্তকের কেশ বিরল স্থানটায় হাত রাখিয়া
বলিলে—“বল কি অমল, চাকরী করবে না?”
দ্বিধা-লেশ-বর্জিত সরল স্পষ্ট ভাষায় অমল বলিল-“না
কাকাবাবু।”
“অমল—কথাটা বলবার পূৰ্ব্বে বিবেচনা করে দেখেছ
কৗ ?”
“খুবই বিবেচনা করে দেখেছি কাকাবাবু। এই এতদিন
ধরে বিবেচনা করে করে শেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে,
মিথ্যার নামান্তর সত্য জিনিষটাকে শাস্ত্র এবং সমাজ নীতির
দোহাই দিয়ে মেনে চলতে পারব না। সেই যে চিরাচরিত ধরে

দেশবন্ধু
স্বাস্থ্যহীন দুৰ্বল অলস বাঙ্গালীর মুখে অবিরত শােনা যাচ্ছে হা
চাকুরী, যাে চাকুরী, চাকুরীই প্রাণ। ছিঃ ঘৃণা ধরে গ্যাছে, না
কাকাবাবু ও পথে চলতে আমি বড়ই নারাজ জানবেন।”
মিঃ মুখার্জী সংশয়পূর্ণ কণ্ঠে বলিলেন—“তবে বিলেতে গিয়ে
সিবিল সার্ভিস পাশ দিলে কেন অমল ?”
“দিলেই বা কাকাবাবু, শিক্ষাতে কি কোন দোষ আছে ?
কিন্তু হীন দাসত্ববৃত্তিতে জীবন যাপন করাটাকে, আমি অন্তরের
সঙ্গে ঘৃণা করি।”
মিঃ মুখার্জী মাথা নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন-“বাপু এখনাে
ছেলেমানুষ আছ তুমি। আমি ঐ সমস্ত দেখে দেখে চুল পাকালুম,
এখন এই স্বদেশীর ঢেউটা নূতন, দেশে আমদানী হয়েছে তাই
তােমাদের তরুণ মনগুলি অতি সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে ।
দেখতেই পাবে কিছুদিন পরে ওর স্বরূপ মূর্তিটা!”
অসহিষ্ণুকণ্ঠে অমল বলিল—“স্বরূপ মূৰ্ত্তি ওর আর কী দেখব
বলুন, দেখাদেখি তাে আমার মনে। আমি তাে ইচ্ছে করলে
এখনই এ সমস্ত ছেড়ে-ছুড়ে পরের গােলামী—যা আজকালকার
বাঙ্গালী জাতির প্রধান হয়ে দাড়িয়েছে তাই করতে পারি, কিন্তু
কেন তা করব ? দেশ আমার আরাধ্যা জননী। কাকাবাব
মাকে আমি ত্যাগ করব ? মায়ের প্রাণে আপনি ব্যথা দিতে
বলেন ?”
২৭

দেশ-ন্ধু নেলি আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। সে সহসা বলিয়া বসিল—“মায়ের মনে কষ্ট ! ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট ছেলে হলে মার প্রাণে আনন্দ হয় না, এ যে বড় আশ্চৰ্য্য কথা বলছেন মিঃ চৌধুরী ?” অমল শান্ত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলিল—“আনন্দ হবে না কেন নীলা হয়, কিন্তু সেটা বেশীর ভাগই অশিক্ষিতা মাতার। কিন্তু আজকালকার নবযুগের শিক্ষিতা হিন্দু জননী, সন্তান প্রতিপালন করবার সময় প্রার্থনা করবেন না যে ছেলে আমার হাকিম হয়ে বিদেশীর পদলেহন করুক। এক মায়ের কোল ছেড়ে বড় হয়ে যে মায়ের দেওয়া অন্ন মুখে তুলেছি সারা বছর যিনি আমাদের পুষ্টিকর খাদ্য যােগাচ্চেন, নানান দেশের নানান ছবি চোখের সামনে ধরে সত্যের পথ দেখিয়ে দিচ্চেন, যিনি জ্ঞানের আলাে জ্বেলে আমাদের ভবিষ্যতের আঁধার দূর করবার জন্য চেষ্টা করছেন, সেই চির স্নেহময়ী মা-টি যদি আজ হাজার হাজার সুস্থ, কৰ্ম্মঠ সন্তানদের কাছ হতে সহানুভূতি না পান, সেই মায়ের চোখের জল যদি গড়িয়ে পড়তে থাকে •••তা হলে সন্তানদের প্রাণে ব্যথা লাগা উচিত কি অনুচিত সেটা তুমিই তাে বিবেচনা করে দেখতে পার নীলা!” আবার সেই জীর্ণ, পুরাতন সম্ভাষণ—নীলা ! খোঁচা দিয়া খোঁচা খাইয়া নেলি বাহিরে চুপ করিল কিন্তু অন্তরে তার ২৮ দেশবন্ধু ক্ষুব্ধ রাগ, রােম সমুদ্রের মত গর্জন করিয়া ফেনাইতে লাগিল। গর্তের ভিতরে আহত ভুজঙ্গ যেমন মাটি ফাটাইতে না পারিলে রুদ্ধ রােষে নিজের মাথা নিজেই আছড়াইয়া ভাঙ্গে, ঠিক তেমনি বাক্যের দ্বারায় অমলকে পরাজিত করিতে না পারিয়া নেলি ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। ক্রমে ‘হর্ণ বাজাইয়া মােটার কম্পাউণ্ডের মধ্যে প্রবেশ করিল। ব্যথা ও অভিমানের ভারে প্রপীড়িতা নেলি অন্য দিকের দ্বার খুলিয়া নামিয়া পড়িল। দ্বিতলের ভিজিটর রুমে অমলকে বসাইয়া মিঃ মুখার্জী বলিলেন- “এইখানে একটু বিশ্রাম কর বাবা আমি একবার উপরে যাই, এস আলােক।” বারাকপুরের ঠিক গঙ্গার ধারেই মিঃ মুখার্জীর প্রকাণ্ড সৌধ। সম্মুখে দুই ধারে দুইটি রাস্তা সর্পাকারে আঁকিয়া বাকিয়া একটি গঙ্গার কোলেতে মিশিয়া গিয়াছে, অপরটি গাছের ছায়ায় ছায়ায় আপনার ক্ষীণ দেহখানি বিস্তার করিয়া চলিয়াছে কোন্ অসীম বিশাল পথে ভিড়িবার জন্য। গঙ্গাবক্ষে কঁপন জাগাইয়া সাদা সাদা ষ্টীম লাঞ্চগুলি শরতের শুভ্র মেঘশিশুর মত হাল্কা গতিতে নাচিয়া নাচিয়া ছুটিতেছে। বাম ধারে অনেকটা খােলা জমী পড়িয়া নষ্ট হইতেছিল, মিস মুখার্জীর ইচ্ছায় বা আবদারে সে স্থানটির আগাছা ও কঁটাবন ঘুচিয়া এক্ষণে শ্যামল শম্পবিস্তৃত সু-বিস্তীর্ণ ‘টেনিস কোর্টে পরিণত হইয়াছে। দক্ষিণে ২৯

দেশ-বন্ধু
বাগানের শােভা বর্ধন করিতেছে নানারকম বিলাতী ফুলের গাছ
এবং পাতা বাহারে লতা, মধ্যে মধ্যে হােয়াইট রােজের গােল
গােল কেয়ারী। আকাশ আজ ঘন ঘটাচ্ছন্ন। মেঘের কোলে
নিকষ কালাে থমথমে মেঘগুলি এলাইয়া স্থির হইয়া রহিয়াছে,
কোথাও এতটুকু ফাঁক নাই। চতুর্দিক কেমন যেন মৌনতায়
ভরা। সারা বিশ্ব সংসারটাও কেমন যেন অজানা ব্যথায়
আশঙ্কায় স্তব্ধ মূক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। আকাশের এই
'গুমরাণী•••প্রকৃতির এই এলান =োব দর্শনে, দীর্ঘকাল স্বজন
পরিত্যক্ত প্রবাস প্রত্যাগত যুবকের মনের মধ্যে বিশ্বের বিরাট
ক্ষুধা মূৰ্ত্ত হইয়া জাগিয়া উঠিল। তাহার সম্মুখে দুইটি পথ•••কোন
পথে সে যাইবে ? একদিকে কঠোর কর্তব্য...অন্যদিকে অগাধ
বিষয়ের সাথে সুন্দরী তরুণীর বুকভরা ভালবাসা...কোথায় সে
যাইবে? মন তাহার চঞ্চল হইয়া হু হু করিয়া উঠিল।
একটু ব্যাকুল স্বরে ডাকিল—“নীলা।”
নেলির চমক ভাঙ্গাইয়া সে স্বর মৰ্ম্মের পর্দা ছিড়িয়া ভিতরে
গিয়া পৌছাইল। তাহার মুখের কাঠিণ্য ভাব ঐ একটি মিষ্টি মধুর
বাণীতে গলিয়া কোমল হইয়া গেল।
সেও মৃদু মধুর সুরে বলিল
-“কী বলছেন মিঃ চৌধুরী ? ওঃ কত রাত হয়ে গ্যাছে দেখছেন
বাবা যে আমাদের অনেকক্ষণ উপরে যেতে বলে গেছেন
কিন্তু......

দেশবন্ধু
কী কিন্তু নীলা ?”
আমার একটি কথা রাখবেন?”
অমল গলার স্বর কোমল করিয়া বলিল—“বল—সাধ্য হয়
নিশ্চয় রাখব।”
নেলি একটু থামিয়া পরে বলিল—“অন্ততঃ এ সময়টা
আপনার বেশ পরিবর্তন করে ফেলাই উচিত, যেহেতু সেখানে
আমার অনেকগুলি বন্ধুবান্ধব এসেছেন•••”
“থাম দেখি নীলা—তােমার কথার ভাব বুঝতে পারছি না
আমি । এলেনই বা তােমার বন্ধুবান্ধব, আমার এই বেশে কী
এমন ভয়ঙ্কর পদার্থ আছে যে দেখলে তারা ভয় পাবেন বা ঘৃণা
করবেন ? না নীলা, তােমার এ অন্যায় আবদার আমি রাখতে
পারলাম না, বেশ আমি ছাড়তে পারব না। আশা করি আমার
যে প্রিয়জন, সেও যেন এই রকম দীন বেশে সমাজে মেশে।”
নেলি পা হইতে মাথা পর্যন্ত দুলিয়া উঠিল। মুখটাকে সে
যথাসম্ভব নীচু করিয়া ক্ষুব্ধস্বরে বলিল—“আমাকে বার বার ব্যথা
দিয়ে আপনি কী খুব সুখী হচ্চেন মিঃ চৌধুরী ?
বিস্মিত নয়নে অমল নেলির মুখের পানে তাকাইয়া বলিল—
“ব্যথা দিচ্ছি আমি তােমায় ! এ কী কথা নীলা, আমার কোন
কথার আঘাতে তুমি ব্যথা পাচ্চ আমি যে কিছুই বুঝতে পাচ্চি
না ?

দেশবন্ধু চোখের জল চোখে চাপিয়া নেলি বিষাদব্যঞ্জক স্বরে বলিল- “নাঃ কিছু মনে করবেন না, আমারই বলবার ভুল। অস্থিরভাবে চেয়ার ছাড়িয়া সে উঠিয়া দাড়াইল, পরে অন্যমনস্ক ভাবে জানালার সূক্ষ্ম নেটের পর্দাখানি টানিয়া টানিয়া সােজা করিতে করিতে অমল ডাকিল -নীলা। নেলি তাহার বাষ্পকুল নেত্ৰ ক্ষণেকের তরে অমলের বিশাল আঁখির পরে নিবদ্ধ করিয়া নতমুখী হইল। অমল একটু সরিয়া আসিয়া বেদনাবিদ্ধ সুরে বলিল—“নীলা, বহুদিন পরে স্বদেশে ফিরে এসে তােমাদের মূখ দেখে আমার চির দুর্ভাগ্যময় জীবন আবার বহুদিনের অনাগত আশার আনন্দে মেতে উঠেছিল। কিন্তু এখন দেখছি-যে আমার কথায় তুমি ব্যথা পাচ্ছ, কাকাবাবু গম্ভীর হয়ে উঠছেন, আরও কত কি। নীলা, যখন আমি আমার সঙ্কল্প ছাড়তে পাৰ্বনা—তখন এমনিতর দুঃখ আরও যে কত লােককে দেব তা কে জানে? যা এ মীমাংসা পরের জন্যে ভােলা থাক্‌ এখন এস। রাত অনেক হয়ে গ্যাছে। ত্রিতলের সুসজ্জিত হলঘর থানি আহুত অতিথি মণ্ডলীতে পরিপূর্ণ। নেলিকে লইয়া অমল তথায় উপস্থিত হইতেই অসংখ্য কণ্ঠ হইতে উখিত হইল, “ওয়েলকাম মিঃ চৌধুরী, আমরা আপনাকে ‘কংগ্রাচুলেট’ করছি।” অমল হাসিমুখে সকলকে যথাযােগ্য সম্ভাষণে আপ্যায়িত করিয়া

দেশ-বন্ধু
একখানি সােফার উপরে বসিয়া পড়িল। তারই পাশের চেয়ার
হইতে আলােক বলিয়া উঠিল—“জানেন মিঃ ডাট—বিলেত হতে
ঘুরে এসে ইনি দেশের হিতার্থে উঠে পড়ে লেগেছেন, আচ্ছা
মিঃ চৌধুরী, কি করলে দেশহিতৈষী হওয়া যায় আমাকে অনুগ্রহ
করে শিখিয়ে দিতে পারেন ? বােধ হয় পথে ঘাটে খদ্দর
প্রচারের জন্য খুব জ্বালাময়ী ভাষায় লেকচার দিলেই হয়, না?
ওঃ আপনি এখনও সেই খদ্দর পরে রয়েছেন যে দেখছি, না না
ছেড়ে ফেলুন মিঃ চৌধুরী, নিজের শরীরকে অতখানি কষ্ট দেবেন
, রেবা তুমি পরবে অমনি কাপড় ?”
আলােক পরিহাসের সুরে শেষােক্ত কথাগুলি পার্শ্বোপবিষ্টা
এক তরুণীকে লক্ষ্য করিয়া বলিল। রেবেকা তৎক্ষণাৎ চোখে
মুখে দারুণ ঘৃণা ফুটাইয়া বলিল—“বাব্বা, ও পরে বােধ হয় এক
সেকেণ্ডও আমি থাকতে পারি না, উঃ কি ভয়ঙ্কর মােটা সুতােয়
তৈরী।”
অমল তাহার দিকে ফিরিয়া ধীরস্বরে বলিল “দেখুন মিসেস
বােস সকলকার রুচি কিছু সমান নয় এ জিনিষটাকে আমি
ভালবাসি তাই ব্যবহার করি, কিন্তু এটা এমন কিছু নিন্দা
বা উপহাসের নয়। সনাতন পদ্ধতি অনুসারে, আমাদের মােটা
কাপড়, এবং মােটা ভাতেই সন্তুষ্ট থাকার বিশেষ দরকার।
আমাদের পূর্বতন পুরুষরা কিছু বিলাতী চাল চলনে অভ্যস্ত

দেশবন্ধু
ছিলেন না—কিন্তু তাদের মতন যথার্থ সুখী, সরল প্রাণ মহানুভব
ব্যক্তি, আজকাল সারা ভারত খুজলে বােধ হয় মুষ্টিমেয় মেলে।
অমলের কথায় ব্যঙ্গ করিয়া আলােক বলিল জানেন তাদের
মধ্যে অধিকাংশ পুরুষই ছিলেন অশিক্ষিত, তাদের ভালমন্দ
বিচার করবারই ক্ষমতা ছিল না। আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদা
যে কাকে বলে বােধ হয় তাই জানতেন না। কেবল হাঁটুর
ওপর কাপড় পরে পরনিন্দা আর পরচর্চায় দিন কাটাতেন। তারা
জানতেন সমাজে দলাদলি বাধাতে.কারুর পাণ হ’তে চুণ খসলে
সামান্য দোষেই তাকে গলাবাজী করে একঘরে করতে। কিন্তু
এটাও জানবেন মিঃ চৌধুরী-অসভ্যের মত হুকো হাতে নিয়ে
আর্কফলা নেড়ে শুধু শাস্ত্রালােচনা করলেই হয় না, পাশ্চাত্যের
খবরগুলােও একটু একটু জানার দরকার !”
আলােকের এই প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপের ভঙ্গীতে কথা বলিবার
ধরণ দেখিয়া গৃহমধ্যে একটা চাপা হাসির মৃদু গুঞ্জন শ্রুত হইল।
পিতৃপুরুষদের প্রতি একজন শিক্ষিত হিন্দু যুবকের এইরূপ
হীন ধারণা দেখিয়া অমলের সর্বশরীর রী রী করিয়া জ্বলিয়া
উঠল। সে ভাবিল ছিঃ ছিঃ এই কি নৈতিক উচ্চ শিক্ষার ফল।
মনের ভাব গােপন করিয়া বলিল-“মিঃ বােস, পাশ্চাত্যের খবর
বা রাখুন আর নাই রাখুন এটা আপনাকে স্বীকার করতেই
হবে যে লােকের বিপদে শিক্ষিত নামধারী বিলাতী খােলসে
৩৪

দেশবন্ধু
ঢাকা, আজকালকার সভ্য সমাজ নেতাদের মত পিছন ফিরে
বলতে পারতেন না যে ও সব ছােটলােকদের কে দেখবে,
আমাদের মহামূল্য সময় নষ্ট হবে। কিম্বা কোন দুঃস্থ পরিবার
সাহায্যের আশায় প্রার্থী হয়ে দাঁড়ালে হয় গেটের ভােজপুরী
দ্বারােয়ানদের পাকা লাঠির বহর দেখেই ফিরতে হতাে...আর
ওরি মধ্যে যার বড় কপাল জোর বােধ হয় বিশ্ব বিদ্যালয়ের
ছাপ মারা, তাদের হয়ত বাবুর সরকার এসে বলে গেলেন
আপনি অন্য
সময়ে আসবেন, বাবু এখন গার্ডন পাটিতে
চললেন।” এই যে আজ যারা অন্ন সমস্যা, বস্ত্র সমস্যা বলে মুখে
খুব তর্জন গর্জন করছেন, তাদের মধ্যে যথার্থই কয়জন পল্লীগ্রামে
গিয়ে অন্ন ও বস্ত্র , সমস্যা সমাধান করবার জন্য চেষ্টিত হচ্ছেন
বলুন তাে? কত পরিবার যে না খেতে পেয়ে ঘরের কোণে মুখ
বুজিয়ে মারা পড়ছে সে খবর কি তারা একবারও কর্মের অবসরে
রাখেন? কেন আজ বাঙ্গলায় এমন দুর্দশা! আগেকার সেই
অশিক্ষিত মহাপুরুষরা নেই বলেই—আর গুন্তির মধ্যে যারা
আছেন তাঁদের ছাড়া, প্রায় অর্ধেক বিদ্বান ও ভদ্রমণ্ডলীর
প্রতীচ্যের মােহে প্রাচ্যের সমস্ত রীতি, নীতিগুলি ভুলে বসে
বসে আছেন। তাই আজ সারা ভারতে হাহাকারের ঢেউ বয়ে
চলেছে, সে হেতুই বাঙ্গালী আজ অন্নের কাঙ্গাল। একদিন
যারা নিজের হাতে চাষ করে সােণা ফলিয়ে স্ত্রী পুত্র, আত্মীয়,

দেশবন্ধু
বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত হয়ে, দীন দুঃখীকে প্রতিপালন করে হেসে
খেলে দিন কাটিয়ে গেছেন, আজ তাঁদেরই বংশধরেরা লাঙ্গল
ধরা কাজটাকে অপমান বলে বােধ করেন। তাই আজ ত্রিশটা
টাকার জন্য পরের দ্বারে গােলামী করতে দ্বিধাবােধ করেন না।
নিজের সুস্থ শরীর, কর্মক্ষম সবল বাহু থাকতেও আজ বাঙ্গালী
শক্তিহীন, বল বীৰ্য্যহীন কেন? সেটা আজকালকার এই
আবহাওয়ার ঢেউয়েতেই না?”
উত্তেজনায় অমলের কণ্ঠস্বর কপিতে লাগিল।
“তাহলে মিঃ চৌধূরী তােমার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে
গ্যাছে যে শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা সমস্ত ছেড়ে দিয়ে পল্লীগ্রামে গিয়ে
চাষ আবাদ করলেই যথার্থ মানুষ তৈরী হয়। তা হলে সি,
আর দাশ প্রমুখ অন্যান্য মণীষিদের বিলাত গিয়ে ডিগ্রী নিয়ে
আসাই অন্যায় হয়েছে কেমন?”
অবজ্ঞাভরে মিঃ ডাঢ় রেবেকার পিতা ভাগলপুরের ডেপুটা
ম্যাজিষ্ট্রেট এই কথাগুলি বলিয়া গেলেন। অমল সেই দণ্ডে
যুক্তকর কপালে ঠেকাইয়া গাঢ়কণ্ঠে বলিল—“ওঃ ওকথা বলবেন
মিঃ ডাট-তাদের প্রতি লক্ষ্য করে আমি কথাগুলি বলিনি,
মহাত্মা গান্ধী বা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও প্রধান প্রধান কর্মীদের
ত্যাগ অপূৰ্ব্ব.. অবর্ণনীয় কিন্তু আপনি, তাদের কথা ধচ্ছেন
কেন? আমি তাে বরাবরই বলে আসছি যে শিক্ষা চাই মুখ

দেশবন্ধু
হয়ে থাকলে চলবে না—শিক্ষা নেব আমরা –তাবিদেশীয় হ’লইবা
--কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনুকরণে চলে, আমাদের
স্বাধীনতাটুকুকে নষ্ট হতে দেব কেন? আমার এই ইচ্ছে যে
আমরা যেন প্রকৃত হিন্দু বলে সবার কাছে মাথা তুলে গর্বভরে
দাড়াতে পারি।
অমলের সুন্দর মুখখানি কী অপূৰ্ব দ্যুতিতে উদ্ভাসিত হইয়া
উঠিল। সমস্ত কক্ষ নীরব। সহসা রেবেকা উঠিয়া আসিয়া
অনুরােধ করিয়া বলিল “প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের হাঙ্গামা ফেলে
এবার উঠে পড়ন ত দেখি। নিন্ দেরী করবেন না
মিঃ চৌধুরী।
অমল উঠিরা চেয়ারখানা সরাইয়া বিনীত কণ্ঠে বলিল
“আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন, কেন না আমি এতগুলি কথা।
কাউকে বলি নি। তবে মনটায় ভারী আঘাত লেগেছিল তাই
এতগুলি অপ্রিয় অবান্তর কথার অবতারণা করে ফেলেছি।”
৩৭

দেশবন্ধু ন+। —চার- রেবেকার সহিত লাইব্রেরী রুমে আসিতেই অমলের দুই নয়ন ধাধিয়া গেল। এ কী উজ্জ্বল মধুরআলাে ও ছায়ার একত্র সমাবেশ...! তাহার মনে হইল সে মলােক ছাড়িয়া যেন স্বপ্ন মাধুরীর স্নিগ্ধ জড়িমা মাখা অচিন্ রাজ্যে অনাহূত পথিকের মত আসিয়া পড়িয়াছে, এখানকার যাহা কিছু সবই যেন মধুর রসে সিঞ্চিত•••কী একটা অজানা পুলকের সাড়া পাইয়া তরুণের সর্বশরীর কঁপিয়া দুলিয়া ফুলিয়া উঠিল। ইহার পূৰ্বে সকলের নিকট হইতে ঘৃণা ও তাচ্ছল্যের আঘাত পাইয়া তাহার সমস্ত মনখানি বিষাইয়া উঠিয়াছিল। এখন যেন শিশিরসিক্ত দীর্ণ ধরণীর বুকখানির উপর বসন্তের সুরভি মলয় বহিয়া গেল, নির্জন শুষ্ক বনানীর বুকে আবার যেন লতাগুলি ফুলে ফুলে বিকশিত হইয়া উঠিল । অন্তরে তার বেদনার স্থানে অসীম তৃপ্ততা ভরিয়া উঠিল। ভাবের সায়রে ভাসমান অমলের মনখানি যখন সীমা নির্দেশ করিতে পারিতেছিল না সেই সময়

দেশবন্ধু
কাহার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর তাহাকে সচকিত করিয়া ধাক্কা মারিয়া
মাটির রাজ্যে ফেলিয়া দিল।
“বাঃ বেশ হয়েছে নেলি, এইবার তাের টুকটুকে পা দুখানি
রাঙ্গা আলতায় রঙ্গীন হয়ে উঠবে। জানেন মিঃ চৌধুরী,
আপনাদের মিলন দিনটা শেষ হয়ে গেলে আপনাদের বাড়ী গিয়ে
একবার নতুন রাধুনীর রান্না খেয়ে আসব, দেখব বাঙ্গালী গৃহিণী
নেলী আমাদের কেমন রাঁধতে শিখেছে, কি বলিস ভাই
চেরী ?”
স্বপ্নরাজ্য হইতে অমলকে যেন ঠেলিয়া কে পৃথিবীর নিষ্করুণ
বুকে ফেলিয়া দিল। মুহূর্তে আবার তার মনখানি তিক্ততায়
ভরিয়া উঠিল। আঃ কোথায় সে যায় !
আঃ কোথায় সে যায়! সে প্রশ্নের জাল হইতে
মুক্তি পাইল ভাবিয়া সে রেবেকার সহিত এখানে আসিয়া
তৃপ্তিলাভ করিল আবার ঘুরাইয়া ফিরাইয়া সেই কথা !
এখানেও তাহার নিষ্কৃতি নাই গো। অমল মন হইতে সমস্ত দ্বন্দ্ব
জোর করিয়া ঝাড়িয়া বেশ সংযত ঘরেই বলিল--“মিস, দাশ,
ভাত রান্না আর আলতা পরাটা কি ভয়ানক শক্ত কাজ ?”
মিস, দাশকে আর উত্তর দিতে হইলনা, রেবেকা তাহার
কথার উত্তর দিল-“বাবাঃ যে পারে সে জন্ম জন্ম ভাতই রাধুক
গিয়ে, কিন্তু আমিতাে কক্ষণাে পারব না; কী একটা বিশ্রী রঙ সারা
পাটায় লেপে থাকবে, ছিঃ কাপড় চোপড় নষ্ট...•••আর ভাত

দেশবন্ধু
বুধবার সময়ই বা আমার কখন? সারাদিন মিটিংএ মিটিংএ
ঘুরতেই আমার এক লহমা টাইম থাকে না, তবে আমার এই
ননদটি ও-সকল বিষয়ে খুব পটু। এ বােধ হয় আপনারই ধাতে
গড়া, কি বল ফাল্গুনী ১৯
যাহাকে লক্ষ্য করিয়া রেবেকা কথাগুলি বলিল সমস্ত বিশ্বের
লজ্জা মাখিয়া তাহার আরক্ত মুখখানি ঝুকিয়া পড়িল। অমলের
শান্তাজ্জ্বল দৃষ্টি, অনাড়ম্বর পরিচ্ছদ, সংষত মিষ্ট ভাষাগুলি কী
সুন্দর ! ফাল্গুনী ভাবিল তাহার এই দামী দামী সাড়ী ব্লাউসের
কোন মুল্যই নাই। হঠাৎ তাহার দৃষ্টি সম্মুখস্থ দর্পণে গিয়া
পড়িল...সে শিহরিয়া উঠিল। আজ তাহার পােষাকগুলি যেন
উপহাস করিয়া উঠিল। নিজের দৈন্যতায় কুণ্ঠিতা, শ্যামলা তন্বীটি
অন্তরাল খুজিতে লাগিল।
“আহা ফাগুনকে নিয়ে টানাটানি কর কেন রেবা ও বেচারী
তােমাদের দল ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে যে, দেখছ কী »
আকস্মিক স্বামীর আগমনে স্তম্ভিত রেবেকা স্খলিত ভাষায়
বলিল-“ওরে বাসরে...বােনের পরে দরদ যে উথলে উঠছে।
সত্যি কথা বলেছি, তাতে হয়েছে কী, আমি কি ফাগুনকে ঘর
থেকে যেতে বলেছি না কি ?
রেবেকার মুখের উপর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া আলােক
বলিল-“না বল, কিন্তু ফাগুনের সম্বন্ধে অন্যায় দোষারােপ
৪০

দেশবন্ধু করছ যে রেবা ! তুমি কি ভেবেছ যে ও-ও এই ছেলেমানুষী খেয়ালে মাতবে ?” রেবেকা ব্যঙ্গোক্তি করিয়া বলিল—“দেখাে পরে কি হয়, কিন্তু তােমায় তাে এখানে আমি ঝগড়া কর্তে ডাকি নি, তুমি এখানে এলে কেন?” “কি আর করি বল রেবা•••মিঃ চৌধুরীকে তােমরা এতগুলি মিলে ঘেঁকে ধরে যে রকম অনবরত বাছা বাছা কথার বাণ বর্ষণ করে যাচ্ছ, তাই ওঁর হয়ে দু চারটে কথা বলবার জন্যে ওখান- কার মজলিস ছেড়ে এখানে এলাম। দেখছেন মিস, মুখার্জী... আপনার বন্ধুটি আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারলে যেন বাঁচেন, এর উপায় কী করি বলুন তত লক্ষ্মীটির মত।” নেলি হাসি চাপিয়া বলিল—“সত্যি রেবা আজকাল ভারী দুষ্ট হয়ে পড়েছে, মিঃ বােস-আপনি আমার কথা রেখে ঐ চেয়ারখানিতে স্বচ্ছন্দে বসতে পারেন, দেখি রেবা একবার কী বলে।” আলোক নেলির চম্পকাঙ্গুলীর নির্দেশমত রেবেকার পাশের চেয়ারখানিতে বসিয়া পড়িয়া কৃতজ্ঞভরে নেলিকে বলিল— “ধন্যবাদ আপনাকে! নাও রেবা এইবার তােমার কি বক্তব্য আছে বলে ফেলল, কেন না বিচারের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।” ৪১

দেশবন্ধু
রেবেকা মনে মনে চটিয়া ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলিল—“তােমার কথা-
বলবার সময় এখন নয়।” সে ঘুরিয়া অমলের সম্মুখে চেয়ার
টানিয়া বসিয়া বলিল—“জানেন তত মিঃ চৌধুরী, নেলি
জ্যাঠামশায়ের কি রকম আদুরে মেয়ে! আর কিছুদিন পরে ওর
সমস্ত ভার আপনার হাতে পড়বে, তাই আবশ্যক বােধে দু’
একটি প্রশ্ন করতে চাই, অবশ্য যদি আপনি রাগ না করেন।”
অমল বিব্রত হইয়া বলিল—“বলুন না কি বলবার আছে
মিসেস্ বােস্, সত্যি, কোন বিষয়েতে মনের সন্দেহ পুষে রাখা ঠিক
নয়।”
রেবেকা হাতের পাখাখানি নাড়িতে নাড়িতে মিহিসুরে
বলিল-“দেখুন, নেলি ঐ সমস্ত স্বদেশীয়ানা মােটেই পছন্দ করে
, তারপর চরকা ঘােরন, আর ঘর সংসারের উনকোটি কাজে
একেবারেই অনভ্যস্থা। তাই বলছি আপনি যদি ঐ সমস্ত বাজে
মত-টত গুলাে বদলে ফেলেন তা হলে আপনাদের মিলনের
পথে কোন অন্তরায়ই ঘটে না।”
রেবেকার কথায় অমল তড়িৎপৃষ্ঠের ন্যায় লাফাইয়া উঠিল
-পরে লজ্জিতভাবে অপ্রতিভমুখে অসাড় হইয়া রহিল। হায়
রে এই তাহার কর্মজীবনের সুখ সহায়তার সঙ্গিনী। অমল
একবার চট করিয়া ফানীর মুখের পানে তাকাইয়া দেখিল
কালাে মেয়েটির মুখখানি ব্যথার গ্লানিমায় শুষ্ক হইয়া উঠিয়াছে,
M
৪২

দেশবন্ধু শ্যামাভ তরুণীর পাণ্ডু মুখখানির প্রতি রেখায় রেখায় ক্ষণে ক্ষণে ফুটিয়া উঠিতেছিল যেন অন্তুরের কী একটা নিরুদ্ধ কাতরতা নিষেধ-নিগড়-নিপীড়িত অসহায়ার সকাতর আঁখিদুটি সকলের অলক্ষ্যে অমলের দীপ্ত চাহনীর নিকট হইতে নীরবে মৌন ভাষায় ক্ষমা মাগিয়া লইল। মুহূর্তে অমলের মন হইতে সমস্ত রাগটুকু সরিয়া গেল। সকলেই তাহা হইলে ইহাদের মত নিষ্ঠুর প্রকৃতির নহে•••এই নিৰ্ম্মম জগতে সমব্যয়ীও খুজিলে পাওয়া যায় ? তাহার সারা চিত্ত এক অচিন্ত্যনীয় পুলকের উৎসাহে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল তাহার উৎসাহিত চোখে মুখে একটা আনন্দের চিহ্ন পরিস্ফুট। হইয়া উঠিল। সে কণ্ঠস্বরে বেশ একটু উম্মার রেশ টানিয়া লইয়া বলিয়া উঠিল—“মিসেস, বােস আপনার বন্ধু ঠিক যেটিকে পছন্দ করেন না, সেইটিই হচ্ছে আমার সমস্ত জীবনের কাম্যবস্তু, আমি এই রকম ভাবে দীন হয়ে জীবন যাপন করাটাকে বড় সুখের-বড় শান্তির বলে মনে করি•••আমার এই আচার ব্যবহারে আপনারা সকলে অসন্তুষ্ট হচ্ছেন, সব বুঝতে পাচ্ছি... কিন্তু কি কৰ্ব্ব, আমি যে সত্য ও ন্যায়ের আহ্বানে নবযুগের পথে চলা শুরু করে দিয়েছি—প্রলােভন যদি শত সহস্র মুর্তি ধরে আমাকে মেহের আহ্বান করে—তবুও সে আমাকে ফেরাতে পাৰ্ব্বে না। আপনারা আমাকে ঘৃণা করুন, আমাকে হৃদয়হীন বলুন, ৪৩

দেশবন্ধু
আমি আপনাদের সমস্ত নিন্দার বিশেষণগুলিকে মূল্যবান
ভূষণ বলে মাথা পেতে নেব—কিন্তু তবুও জানবেন যে আমার
এই সঙ্কল্প শুভ্র তুষার কিরীট হিমগিরির মত অচল অটল
বাঙ্গালীর আজকাল একটা নিন্দে উঠেছে যে তারা কথার ঠিক
রাখতে জানে না—এইবার দেখবেন যে বাঙ্গালী কথায় ও কাজে
একই কিনা—আরও একটা কথা, আপনাদের এই রীতি-নীতি
হতে আমার রীতি নীতি টের তফাৎ-আমার আদর্শ বহু উচ্চ...
সহসা অমল মধ্যপথে থামিয়া গেল। সে রেবেকার অপমানহত।
মলিন মুখের প্রতি চাহিয়া ভাবিল—ছি ছি আগে তাহার ভাবিয়া
দেখা উচিত ছিল—যে রেবেকা একজন সামান্য নারী মাত্র•••সে
নিজের স্বভাব সুলভ চপলতাবশতঃ এই প্রশ্ন করিতে পারে,
এবং সেই কথার পরে এতটা উত্তেজিত ভাবে তাহার উত্তর
দেওয়াটা শীলতা সঙ্গত হয় নাই। মনের মধ্যে এই কথাগুলি
জাগিয়া উঠিতেই সে আপন হইতেই কেমন যেন লজ্জিত হইয়া
উঠিয়া কিছুক্ষণ - নিস্তব্ধ থাকিয়া অনুতপ্তসুরে বলিল—“ক্ষমা
করবেন মিসেস, বােস•••আমার এই উদ্ধত কণ্ঠের রূঢ়তার জন্য
মার্জনা চাইছি।” কথাগুলি সে ইংরাজীতেই বলিয়া সহজভাবে
সকলকে নমস্কার করিয়া লাইব্রেরী ঘর হইতে ধীর পদবিক্ষেপে
প্রস্থান করিল।
৪৪

দেশবন্ধু নীলা—নীলা চুপ করে থাকলে চলবে না•••আমার কথার একটা উত্তর দাও, জেনাে যে তােমার এই একটি উত্তরে আমার সমস্ত জীবনের সুখ দুঃখ নির্ভর করছে—ওকি মুখ ফেরালে? না না আমি একটা জবাব চাই, আমায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দাও, আমার এ প্রস্তাবে তুমি রাজী আছ কিনা ?” সিড়ি বাহিয়া নিমন্ত্রিতেরা দ্বিতলে খাইবার ঘরে নামিতে ছিল অমল সকলের পাশ কাটাইয়া নেলির পার্শ্বে দাড়াইয়া তাহার বাম হাতখানি চাপিয়া ধরিয়া আবেগভরে প্রশ্ন করিল, নেলি বিব্রতভাবে জড়িতস্বরে উত্তর দিল-“আজ, আজই—না থাক আজকে মাপ কন, আমি এখনি এর জবাব দিতে পাৰ্ব্ব না।” অমল ঘাড় নাড়িয়া বলিল-“না, তা হয় না নীলা—আমাদের এ জীবন মরণের সমস্যা আমি তােমার উত্তরে সমাধান কত্তে চাই বল।” অমল তাহার প্রেমপূর্ণ উজ্জ্বল নয়নদ্বয় নেলির মুখের পরে তুলিয়া ধরিল। মুখখানি ঘুরাইয়া নেলি কাতর সুরে বলিল- “তাহলে কি বলতে চান যে এই সমস্ত আচার ব্যবহার আমাকে সব ছেড়ে দিতে? এতদিনকার আজন্মের সংস্কার আমি কেমন করে ছাড়ি বলুন ?”

দেশবন্ধু
অমল ব্যগ্রস্বরে বলিল-“নীলা, তুমি কি আমার জন্যে
তােমার সামান্য সুখটুকু ছাড়তে পার না?”
নেলি মাথা নামাইল—তাহার মুখে অসন্তোষের ছায়া
ঘনাইয়া আসিতেছিল। অমল সেদিকে ক্ষেপও করিল না,
বিহ্বলকণ্ঠে বলিল—“এত অকরুণ তুমি নীলা—আর স্বজনহীন
বিলাতে যে তােমার স্মৃতি আমাকে অনুক্ষণ জাগিয়ে রাখত•••
আমার এত সুখের কল্পনায় গড়া স্বর্ণসৌধ তুমি এমন করে চূর্ণ
করে দিও না—নাইবা হলাে নীল বাইরের মিথ্যে কতকগুলাে
মুখস্থ ভড়ং যা আমি মােটেই ভালবাসিনা—আমরা পল্লীমায়ের
নিরালা জায়গাটিতে ছােট একখানি. নীড় রচনা করে সমাজ
সংসার লােকজনের হতে বহুদূরে একা দিন কাটাতে পারি-
কি ?”
নেলি বিস্ময়ান্বিত স্বরে বলিল-“বলেন কি পাড়া গাঁয়ে যাব
বাস করতে ?”,
অমল উচ্ছ্বাসভরে বলিয়া উঠিল—“হ্যা সেথায় আমি আর
তুমি থাকব, পল্লীমায়ের সেবা কৰ্ব। আমি থাকব পুরুষদের
উন্নতি সাধনে চেষ্টিত, আর তুমি আমার কল্যাণী হয়ে সেখানকার
বালিকা ও রমণীদের শিক্ষা দেবে—সেথায় আমরা এক নূতন
রাজ্য গড়ে তুলব, শান্তি, প্রীতি, মিলন, সাম্য, স্বাধীনতা এক হয়ে
যাবে সেথায়•••কোলাহল সেথা হতে দূরে পালাবে কেবল
৪৬

দেশবন্ধু
চারিধারে অসীম শান্তি, আমার সুদূর কল্পনাকে সত্যে পরিণত
কৰ্ত্তে ?”
নেলি অপ্রসন্নভাবে বলিল—“সে হয় না। না না তাতে
বাবাও মত দেবেন না।”
অমল নৈরাশ্যব্যঞ্জকস্বরে বলিল—“নীলা ওসব
হলাে বাজে ওজর-তােমার প্রকৃত মনােভাবটি কেবল আমায়
খুলে বল।”
নেলি নিরুত্তর।
“বুঝলাম এতদিনে যে সত্য সত্যই আমার মুখ চাইবার কেউ
নাই-আমার মতে অন্ততঃ একজনও সম্মতি দিতে পারে না।
আচ্ছা বেশ নীলিমা, তুমি যাতে শান্তিতে থাক করাে—আমি
আর তােমার চোখের সামনে আমার দীন হীন নগণ্য মূর্তিটাকে
এনে ধৰ্ব্বো না•••ওঃ যাও তুমি স্বাধীন, আশীর্বাদ করি তুমি
চিরসুখে থাক, যােগ্য পাত্রে আত্মসমর্পণ করে প্রীতিলাভ করে—
আমি ভাবব যে দুদিনের জন্যে কেবল অভাগাকে বিধাতা অমৃতের
আস্বাদ দিয়ে সুধার পাত্র কেড়ে নিলেন। কাঙ্গালের কাছে
রত্নমন্দির চিরদিনের নিমিত্তই বন্ধ থেকে যায় নীল সে একটা
কেবল স্বপ্নমাত্র। যে আজন্ম পরের কাছে মানুষ হয়েছে, তার
আবার উচ্চ আশা কেন ? যা পেয়েছি তাই যথেষ্ট, সেই
পূৰ্ব্বেকার পূণ্যস্মৃতি আমার বুকে জেগে থাকবে অহােরহ। যাক,
৪৭

দেশবন্ধু
আমার আজ এ একটা দায়িত্ব হতে মুক্তি লাভ হলাে-হা, তবে
যাবার পূর্বে একটা কথা বলে যাই-যে আমার মত এমন করে
অন্য কোন লােককে আশা দিয়ে নিরাশার স্রোতে ভাসিও না,
আর তার দীর্ঘনিশ্বাস কুড়িও না, এতে মৰ্ম্মে বড় গভীর ঘা
লাগে।
যাই তােমার মুল্যবান সময়ের আর অপব্যয় কৰ্বো না-
অমলের কণ্ঠে বিরাট ক্ষোভ, গভীর নৈরাশ্য, মুক্তির আনন্দ
একসঙ্গে একতালে বাজিয়া উঠিল। নেলির হাত ছাড়িয়া সে
দ্রুতপদে সিড়ি অতিক্রম করিতে লাগিল। নেলি ক্ষণেকের জন্য
একবার বাহিরের গুমােটভরা স্তব্ধ রাত্রির অন্ধকারের পানে
তাকাইল—পরে সে ভারাক্রান্ত চিত্তে নামিয়া ভােজনাগারে
আসিয়া দাড়াইল। তাহার মনের অগােচরে দুইটি চক্ষু অজ্ঞাতে
কোন্ বেদনা পীড়িত আশাহত ব্যক্তির সন্ধানে ফিরিতে লাগিল।
কিন্তু সে তখন কোথায়! অমল একেবারে নামিয়া নির্জন
বাগানের একপ্রান্তে দাড়াইয়া ঘন ঘন মাথাটাকে চাপিয়া
ধরিতেছিল। নেলি লােকচক্ষুর অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে বারান্দা
পার হইয়া নিজের ঘরখানিতে আসিয়া সােফার উপর হেলিয়া
পড়িল। অকারণে তার চোখের জলে সাগর উছলিয়া উঠিল।
তার হৃদয়ের কোমল তারগুলি কী এক করুণ সুরে ঝন্‌ ঝন্
করিয়া বাজিয়া উঠিল
৪৮

দেশবন্ধু পাঁচ- নীরব নিশীথ। আঁধার চতুর্দিকে আঁধারে ঘেরিয়াছে... কালাে কালো মেঘগুলির বুকের পরে অসংখ্য উজ্জ্বল নক্ষত্র অমলকে যেন বিদ্রুপ করিয়া মিটিমিটি হাসিতেছিল। অমল চোখের উপর হাত রাখিয়া বাগানের মধ্যে একখানি লােহার বেঞ্চের উপর শুইয়া, গাড়ী হইতে নামা আরম্ভ পৰ্যন্ত, আর এই কিছুক্ষণ আগে ঘটিয়া যাওয়া একটা অস্বস্তির অজানা ব্যাপারগুলি মনের মধ্যে শতবার নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতেছিল। অমলের বুক ফাটিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতেছিল—উঃ পৃথিবীর নারী জাতি কি এত স্বার্থপর-এত নিষ্ঠুর। তবে নারীকে স্নেহ স্বরূপিনী বলে কেন? তবে লােকে নারীকে এত মমতাময়ী বলিয়া উচ্চ আসন দিয়াছে কেন? কই তাহাদের হৃদয়ে তাে দয়া-মায়ার লেশমাত্রও নাই। নীলা নীলা...তুমিও লােকের প্রাণে কঠিণ বজ্র হানিতে শিখিয়াছ -কোথায় তােমার সেই কারুণ্যভরা একান্ত নির্ভরশীল কোমল অন্তঃকরণটা। হায় গাে জাননা তুমি—যে তিল তিল করিয়া আমার অন্তরের মধ্যে কেমন করিয়া বাসা বাঁধিয়া বসিয়াছ,চিত্তের ৪৯ দেশবন্ধু আশা আকাঙ্খা তােমার কাছে জানাইতে গেলাম•••অকরুণ ইহা তুমি মুখ ফিরাইলে..নির্দয়া তুমি আমার প্রতি ফিরিয়াও চাহিলে না...তােমার ও কঠিন বুকের মধ্যে আমার স্থান নাই... তবে কি সে স্থান অপরের অধিকৃত হইয়াছে..তাই কি? উঃ তবে একপক্ষে আমাকে বড় মুক্তি দিয়াছ: তােমার সহায়তায় আমার এতটুকুও কৰ্ম্ম সফল হইত না। অমল ভাবিয়া শিহরিয়া চোখ মুদিল আঃ এই সব হিন্দু রমণী সন্তানের জননী মাতৃমূর্তি, ইহাদেরই নিকট হইতে আমরা আবার সাহায্য চাহিতেছি। এই সমস্ত বাহিক এটিকেটের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ স্ত্রীলােকের। এরাই করিবেন মাতৃপূজা! যাহাদের একটু প্রাণ খুলিয়া হাসিলে সভ্যতার কঠিন নিয়ম ভঙ্গ হয় যাদের চাল-চলন হাসি কথা সবখানিই পরের নিকট হইতে ধার করা•••এরাই আমাদের পুরাকালে শক্তির অংশ স্বরূপা আৰ্য্যনারী! অমলের হাসি আসিল, ভাবিল যে, ইহারা যেন দম দেওয়া কলের পুতুল। চাবি ঘুরাইয়া ছাড়িয়া দাও খুব খানিক ফর ফর করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবে...কিন্তু কাজ চাহিওনা ইহাদের নিকট তাহা হইলে সৰ্ব্বনাশ, কেবল সেই কালাে মেয়েটী•••সে যেন একরাশী বিলাতী ফুলের তােড়ার মধ্যে একটি আধফুটন্ত যুঁই বর্ণে না হউক গন্ধটি বােধ হয় তেমনিই স্নিগ্ধ প্রাণমুগ্ধকারী:আঃ, সে যেন ওদের দলভ্রষ্ট হইবার জন্য পথ খুঁজিয়া বেড়াইতেছিল। কিন্তু দেশবন্ধু ওরকম একটি কি দুইটি শান্তির প্রলেপে দেশের এত বড় গভীর ক্ষত সুস্থ হইবে না—চাই ঐ রকম মাতৃমুর্তি প্রতি ঘরে ঘরে। অমল শান্তির নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া উঠিয়া বসিল। পরে পকেট হইতে ক্ষুদ্র একখানি আলেখ্য বাহির করিয়া ভক্তিভরে মাথায় ঠেকাইয়া অস্পঃস্বরে আনমনে বলিয়া উঠিল—“বলে দাও আমায় দেবতা—যেন কৰ্ত্তব্যভ্রষ্ট না হই, যে নিষ্কাম ব্রতের অনুষ্ঠান তুমি দেখাইয়া দিয়াছ•••যেন তােমার আশীর্বাদে সেই মহাব্রতের হােমানলে আমার তুচ্ছ প্রাণটুকু আহুতি দিয়া ধন্য হতে পারি।” এই পৰ্য্যন্ত বলিয়া অমল এক বার উন্মুক্ত গগনের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া উঠিয়া দাড়াইল—সহসা সেই ঘন অন্ধকারের মধ্য হইতে জোনাকীর আলাের মত কী একটা মৃদু আলােক দপ দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। নির্ভীক হৃদয় অমল সেই আলাের রেখা লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইল। ছােট্ট একটা কামিনী গাছের অন্তরালে বসিয়া আলােক সেই মধ্য রাত্রে সিগারেট টানিতেছিল। অমল নিস্তব্ধ পদসঞ্চারে তথায় উপস্থিত হইয়া আলােকের পৃষ্ঠে হাত রাখিল। অতর্কিত আক্রমনে আলােক চমকিয়া ফিরিয়া বলিল— “ওঃ ‘গড’ মিঃ চৌধুরী—আপনাকে যে এইখানে এমন অবস্থায় দেখব আশা করিনি—ভালই হলাে আমার সঙ্গী মিলে গেল বসুন এই খানটায় আঃ কী ঠাণ্ডা বাতাস, নিন্ একটা সিগার ধরুন।

দেশবন্ধু
অমল মৃদুকণ্ঠে ধন্যবাদ দিয়া বলিল-“ওটা আপনিই রাখুন
আমি ও সমস্ত খাই না.., বলিয়া অমল আলােকের পাশের
জায়গাটিতে বসিয়া পড়িল। আলােক বলিল...“বলেন কী এই
নূতন যুগে আপনি এমন জিনিষ খান্ না। আশ্চৰ্য্য, ভারী
আশ্চৰ্য্য...কিন্তু আমার এ চাই-ই, না হলে এক মিনিট চলে
অমলও হাসিয়া উত্তর দিল-••“তা হতে পারে, কিন্তু শুধু
ঠাণ্ডা বাতাস উপভােগ কৰ্বার জন্যে যে এত রাত্রে নিরালায়
বসে সিগারেট ধ্বংস কচ্ছেন না:••এ আমি আপনার মুখের ভাব
দেখেই বেশ বুঝতে পাচ্চি।”
আলােক সিগারেটটা চুড়িয়া পুনরায় সিগার কে হইতে
আর একটি সিগারেট তুলিয়া তাহাতে অগ্নিসংযােগ করিয়া বলিল
“ঠিক ধরেছেন মিঃ চৌধুরী আপনার অনুমান ঠিক...আমি
একটা বিষম সমস্যায় পড়ে গেছি।
অমল কোমলস্বরে বলিল, “কি আপনার সমস্যাটি বলুনতাে?
আচ্ছা তার আগে একটা কাজ করুন তাে পরে ও সমস্যার
মীমাংসা হবে।”
“কি কাজ মিঃ চৌধুরী ?”
“না এমন বিশেষ কিছু না•••দেখুন আলােকবাবু আমরা
বাঙ্গলার ছেলে বাঙ্গালী, যার তার কাছ হতে ঐ মিঃ চৌধুরী

দেশবন্ধু
ডাক শুনে শুনে অধৈর্য হয়ে পড়েছি: অবশ্য বিলেতের কথা
আলাদা...কিন্তু জ্বরের সময় তেতাে ‘কুইনাইন’ গলাধঃকরণ
কৰ্ত্তে হয় বলে কি সুস্থ অবস্থায় সেটা ভাল লাগে..তেমনিই
আজ আপনার মত একজন শিক্ষিত স্বদেশীয়ের মুখে আমার
নিজের মায়ে দেওয়া বাঙ্গলা নামটি শুন্তে বড় ইচ্ছে করে।”
আলােক অপ্রতিভ হইয়া বলিল...“মাপ করুন অমলবাবু, হ্যা
তাহলে আমার সে কথাটা শুনবেন কি ?”
অমল আলােকের কাছে সরিয়া বসিয়া বলিল...“নিশ্চয়ই শুনব
বলুন ?”
“আচ্ছা তখন যে আপনি বল্লেন•••দেশের হিতে প্রাণ দেবার
মত লােক ভারতে মুষ্টিমেয় মেলে, এ কথাটা কি সত্য?”
“সত্য না তাে কি ভাই,কই তেমন লােকতত আমি সংখ্যাতীত
দেখতে পাই নে।”
আলােক সহসা বলিয়া বসিল “অমলবাবু আপনার অনুমতি
পেলে আমি আপনার কিছুও সাহায্য কব্বার জন্য কার্যক্ষেত্রে
নামতে পারি।”
অমল একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিল, সে যন্ত্রবৎ বলিল...
“সে কী আপনি! একি সম্ভব•••আলােক বাবু? আপনার
মুখে অন্য ধরণের কথা শুছি। না না, এ বিশ্বাসযােগ্য নয়।”
হা অমলবাবু আজ রাত্তিরে হয়তাে আমি অন্য ধরণের কথা

ক
দেশবন্ধু
বলে থাকতে পারি...কিন্তু কি জানি আপনার ভিতরে কি শক্তি
নিহিত আছে জানিনা••শুধু আপনার তেজোময় কথার মাধুর্য্যে
মুগ্ধ, আকৃষ্ট আমি এই পথে নামলুম...বলুন অমলবাবু আমার
দ্বারায় কি আপনি সামান্য উপকারটুকুও পেতে পারেন না?”
আলােকের স্বর যেন ভক্তিরসে আপ্লুত হইয়া পড়িয়াছিল।
আনন্দে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া অমল পুলকভরা সুরে বলিল—
“কেন হবে না ভাই-তােমার মত শিক্ষিত ব্যক্তির সাহায্য
পেলে আমি কৃতার্থ হয়ে যাব।” বলিয়া আলােককে বুকের মধ্যে
জড়াইয়া অপূর্ণনেত্রে বলিল—“বল ভাই একবার বলে-
মাতরম্।”
দমকা বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে কাল মেঘের আড়ালে লুকান
চাদের ক্ষীণ রশ্মিটুকু উভয়ের মুখের উপর লুটাইয়া পড়িল।
আলােক আস্তে আস্তে বলিল—“কাল আমরা এ বাড়ী ছেড়ে
চলে যাব। বলুন দয়া
একবার আমার বাড়ীতে
যাবেন ?”
অমল বলিল—“কাল, কাল বােধ হয় আমিও এখানে থাকচি
।”
“কেন, তার মানে ?
অমল বলিল—“তার মানে আমার ডাক এসেছে ভাই,
বােধ হয় এই ভােরের টেণেই আমাকে খুলনা যেতে হবে,

দেশবন্ধু
সেখানে শুছি যে ম্যালেরিয়ায় সারা গ্রামটা উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
যারা তার প্রতীকার কর্তে পারেন—তাঁরা যে যার প্রাণ নিয়ে
পালাতে পথ পাচ্ছেন না•••ডাক্তার তাে ভুলেও সে পথে চলেন
।•••শুধু যারা অসহায় বৃদ্ধ, পঙ্গু, শিশু বা অনাথা স্ত্রীলােক,
কেবল তারাই এখনও মরণের সঙ্গে প্রাণপণে যুদ্ধ কচ্ছে। অথচ
তারা নিজেরাই জানেনা মৃত্যুর সঙ্গে তাদের অসহায় প্রাণগুলি
যে ভীষণ সংগ্রাম বাধিয়ে তুলেছে•••তাতে জয়ী হতে পাৰ্ব্বে
কিনা! তার ওপর এ বছর অনাবৃষ্টিতে সমস্ত ফসল শুকিয়ে
নষ্ট হয়ে গ্যাছে সমস্ত গ্রামের লােকগুলি না খেতে পেয়ে ছট
ফটিয়ে মরে যাচ্চে••• তাই ভাবছি দেখি সেখানে গিয়ে একবার,
যদি একটা প্রাণীকেও বাঁচাতে পারি।”
সুদূর পারের মরণাহত দুঃস্থ পরিবারদিগের কষ্টের কথা
স্মরণ করিতে করিতে সরল-হৃদয় অমলের চোখ দিয়া দর দর
করিয়া করুণার অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। আলােক একটা গভীর
নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল -“কালকে আপনি চলে যাবেন অমলবাবু
—কাউকে বলেন নি ?”
“না, কি দরকার তাতে•••তবে দেখি যদি অবসর পাই,
তাহলে তাঁকেই বলে যাব-এ ভিন্ন আমার যাওয়ার কথা আর
কেউ জানবে না—আমার যাওয়া আসাতে তত কারুর ক্ষতি
বৃদ্ধি নেই।”

দেশবন্ধু
আলােক বলিল—“কাল ভােরে যাবেন বলছেন, কিন্তু
ভােরের তত আর ট্রেণ নেই অমলবাবু।
“নেই! বলেন কী ? বলিয়া অমল হাতে বাধা রিষ্টওয়াচটি
দেখিয়া বলিয়া উঠিল—“উঃ এত রাত হয়ে গেছে। তাইতাে
সেটা যে চারটে পঁয়তাল্লিশে ছাড়ার কথা—এখনই তাে হচ্ছে
চারটে উনচল্লিশ•••আচ্ছা যাগে সকালের দিকে যে কোন একটা
ট্ণে ধরলেই হবেন।”
“তাহলে কাল আপনি এখানে কিছুতেই থাকবেন না স্থির
করেছেন?”
“হ্যা ভাই, এখানকার সমস্ত যেন বিষাক্ত বলে ঠেছে।
বিশেষ এদের ব্যবহারে আমার মনতাে একেবারেই টিকতে
চাচ্ছে না। আচ্ছা আলােকবাবু, দাঁড়কাকের বর্ণ তত ময়ুর
পুচ্ছে ঢাকবার উপায় নেই তবে কেন এদের এই ব্যর্থ সজ্জা।
আলােক সহসা আপন মনেই বলিয়া ফেলিল—“অমলবাৰু
কাল আমি আপনার মুখে এ রকম ধরণের কথা শুনলে বােধহয়
চটকুম কিন্তু কি জানি এখন আমারও এই সমস্ত আচার ব্যবহার
বিসদৃশ ঠেকছে•••আচ্ছা অমলবাবু, মিস্ চাটার্জী তত আপনাকে
--কি বলে...বেশ•••ভাল,...আর তার সাথে অনেকদিন আগে
হতেই তােত আপনার বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক ছিল—তবে এখন কেন
মত দিলেন না ?”

দেশবন্ধু
আলােকের এই কথাটায় অমলের ব্যথিত অন্তরটা
নূতন
আঘাতে টন্ট করিয়া উঠিল। একমূহুৰ্ত্ত পরে সে ভাবটা
সামলাইয়া বলিল—“তিনি অমত করে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন
ভাই...সত্যি ও রকম স্ত্রী নিয়ে আমার মত অবস্থার লােকের
সংসার করা দুঃসাধ্য !
আমার স্ত্রী সামান্য বিলাস ব্যসন
নিয়ে মেতে থাকবে.••ভাই স্ত্রী তাে শুধু ভােগের সামগ্রী নয়...
আমি চাই তাকে সংসারের শ্রীরূপে, শক্তিরূপে, জননীরূপে...
সে এসে আমাকে শক্তিরূপে সাহায্য কৰ্বে...পিছন হতে আমাকে
উৎসাহ দেবে...যখন আমার কর্মক্লান্তি আসবে। আমার সন্তানকে
আদর্শ জননী রূপে শিক্ষা দিয়ে তাদের যথার্থ কর্মী মানুষ করে
গড়ে তুলবে। এই দেখনা আজই আমার শক্তি আছে সামর্থ্য
আছে•••অর্থ আছে:••সে মনের আমােদে হেসে খেলে দিন
কাটালাে। কিন্তু পরে ভবিষ্যৎ কি কেউ বলতে পারে ? ধর
যদি আমার শরীর শক্তিহীন অকর্মণ্য হয়ে পড়ে—যখন আমার
পয়সা দিয়ে চাকর দাসী রাখবার ক্ষমতা থাকবে না। তখন,
তখন বােধহয় একমুঠো অন্নের আশায় লালায়িত হয়ে পরের
দ্বারে হাত পাততে হবে? আর গৃহের লক্ষ্মী তখন আমার ডুয়িং
রুমে বসে অর্গেনের সঙ্গে তাল রেখে গান ধরবে
“এসহে হৃদয়ভরা—এসহে পিপাসা হারা
এসহে আঁখি শীতল করা ঘনায়ে এস মনে।”
৫৭

দেশ-বন্ধু “কেমন এই তত?” বলিতে বলিতে অমল করুণভাবে হাসিয়া উঠিল। পরে আলােকের হাতখানি ধরিয়া মৃদু মৃদু সুরে বলিল—“একদিক দিয়ে এই মুক্তির আনন্দে আমি এমন উৎফুল্ল হয়ে উঠেছি—ঠিক খাঁচার পাখীর বাঁধন খুলে দিলে সে যেমন বাইরের মুক্ত হাওয়ায় বুকভরা সুখে নেচে ওঠে—তেমনি নিছক নির্মল আনন্দ আজ আমি মনে প্রাণে অনুভব কচ্ছি...আঃ এখন যেথায় ইচ্ছে চলে যাব...পিছন হতে ডাক দেবার লােক আমার আর কেউ রইল না।” অমল নীরব হইল। আলােক তাহার আবেগময় বাক্যচ্ছাসে বাধা দিল না। বােধহয় তাহার সে ক্ষমতা তখন লুপ্ত হইয়া গিয়াছিল—সে শুধু নির্বাক হইয়া বসিয়া রহিল দেবতার সম্মুখে হীন ভক্তের মত। অমল পুনরায় বলিতে আরম্ভ করিল—“আলােক ভাই, তােমাকে আমি ‘তুমি বল্লাম বলে, হয়তাে তুমি আমাকে কত কিনা ভাবছ, কিন্তু বলতে কি তােমার মত একটি স্নেহপরায়ণ সােদরের জন্যে প্রাণের মধ্যে দিনরাত ছটফট কর্তো। প্রথম তােমাকে দেখেই আমার মনে হল- বুঝি আমার কত দিনকার হারাণ ভাইটি আবার বুকের মাঝে ফিরে পেলাম। আলােক তুমি কি আমার পরে রাগ করেছ ভাই ?” “রাগ !” নত হইয়া আলােক অমলের পদধুলি লইয়া গাঢ়স্বরে

দেশবন্ধু
বলিল—“রাগ। তাও আপনার পরে ? না না অমলদা আমি
এখন বড় দুঃখিত হচ্ছি এই ভেবে যে আগে আপনার অন্তর
বুঝে শুধু শুধু আপনাকে কত অপমান করেছি।”
আলােকের অনুতপ্ত হৃদয়টি ঐ কথা কয়টিতে মূর্ত হইয়া
উঠিল! অমল বিব্রত হইয়া পা সরাইয়া মুগ্ধকণ্ঠে বলিল—“কর
কি ভাই তুমি-কেন এত কুষ্ঠিত হচ্ছ ?”
তুমি যে অলীক মােহের মায়া কাটিয়ে এত শীগগীর পরিবর্তিত
হয়েছ, এইটুকুই তােমার বিশেষত্ব! যাক্, এখন ভাের হয়ে
আসছে কথায় কথায় সময় কেটে গেল, চল এইবার উঠে
পড়ি।”

দেশবন্ধু
বিকালের পড়ন্ত রােদটুকু ছাদের ঢেউ খেলান আলিসার
বুকের উপর দিয়া টবে সাজানাে নানাবিধ ফুলের গাছগুলিকে
নীরবে বিদায় বার্তা জানাইয়া প্রস্থান করিতেছিল। প্রিয় বিরহ
ব্যথায় শঙ্কিত হইয়া মলয় স্পর্শে দুলিয়া দুলিয়া নীরব ভাষায়
বলিতে লাগিল, ওগাে নিঠুর, ওগাে প্রিয়, তুমি এমনি করিয়া
চলিয়া যাইও না, ফিরিয়া চাহহা গােএকবার ফিরিয়া চাহ ;
অরুণ ফিরিয়া তাহাদের কপােল হইতে অলক গুচ্ছ সরাইয়া
শুভ্র মুকুলগুলিকে বিদায় চুম্বনে অভিষিক্ত করিয়া মৃদু মৃদু বচনে
বলিয়া গেল—“ওগাে রাণী, ভয় নেই গাে তােমাদের•••আমি
আবার আসব•••রাতে আমার প্রতিনিধির পরশ ঝরে পড়বে
তােমাদের বুকের পরে, তাকে দেখে তােমর ঘােমটা খুলে
শতেক দলে।
ছাদের উপর ইজি চেয়ারে হেলিয়া রেবেকা একখানি নূতন
ইংরাজী ‘ম্যাগাজিন’ পাঠ করিতেছিল। মুখে তাহার চপল হাসি

দেশবন্ধু
ক্ষণে ক্ষণে ফুটিয়া উঠিতেছিল। তার বাঁ-দিকের কঁাধের উপর
শ্যাম্পেন রঙের শিল্ক শাড়ীর কাজ করা আঁচলটুকু কেঁচকাইয়া
ছােট্ট একটী মীনা করা সােণার ব্রাচে আবদ্ধ। ঘাড়ের উপর
এলান খোপার ভিতর হইতে সরু একগাছি সােণার ‘চেন
বিকালের ম্লান আলােকে ঝিকৃমি করিয়া জ্বলিতেছিল। সহসা
পিছন হইতে আলােক আসিয়া তাহার উভয় চক্ষু চাপিয়া ধরিল।
সে স্পর্শে রেবেকা বিরক্ত হইয়া ঝাঝিয়া বলিল-“আঃ কী
ছেলেমানুষী আরম্ভ করে দিলে বলত, যাও ছাড়, দেখছ বইখানা
পড়ছি আজই ফেরৎ দিতে হবে।”
আলােক চট করিয়া চোখ ছাড়িয়া রেবেকার হাত হইতে
বইখানি ছোঁ মারিয়া তুলিয়া দুই চারি পৃষ্ঠা উল্টাইয়া অবহেলা-
ভরে চেয়ারের এক পাশে ফেলিয়া বলিল—“ছিঃ রেবা, তুমি এই
সব বাজে ‘ম্যাগাজিন পড়তে ভালবাস?”
রেবেকা হেঁট হইয়া বইখানি তুলিয়া তাহার পাতা খুলিতে
খুলিতে বলিল—“কেন ম্যাগাজিন’ খানায় কী দোষ তুমি
দেখলে ?”
আলােক বলিল -“দোষ নয়, ওতে যত সব বাজে ‘অথর’রা
লেখেন, আর সে লেখাও এমনি যে তীব্র সুরার মত উত্তেজক,
ঐ সমস্ত দুর্ণীতিমূলক উৎকট প্রেমের গল্প পড়ে পড়েই মেয়ে-
ছেলেদের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাতে করে ফল

দেশবন্ধু
দাড়িয়েছে এই যে উঠতে বসতে তারা স্বামীকে জন্তুবিশেষ ভাবে,
এই যেমন তুমি—নম্বর ওয়ান্ !”
রেবেকা ঝঙ্কার দিয়া আলােককে বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল—
“আমি তাে মন্দ চিরকালই আছি, সেটা আজ নতুন করে
শােনাচ্ছ কি...তােমার যদি মাথার ঠিক থাকে তা হলে উঠে
যাও, আজ সন্ধ্যার সময় আমাকে সিনেমায় নিয়ে যাবে বলেছ,
যাও বক্সটা রিজার্ভ করে এস, না হলে পরে পাওয়া যাবে না।”
আলােক চেয়ার ছাড়িয়া বলিল-“কেন, আমি তােমার
গােলাম নাকি যে যখন তখন তােমার হুকুম পালন করতে
ছুটব ?” বলিতে বলিতে আলােক ভিতর বাড়ীর বারান্দায়
ঝুকিয়া উচ্চকণ্ঠে ডাকিল-“ফাগুন ?”
শ্রাবণের ঘন মেঘের মত একরাশি ভিজা কালাে চুল পিঠের
পরে এলাইয়া সন্ধ্যা রাণীর মত মৃদু গতিতে উদয় হইয়া ফাল্গুনী
বলিল-“কি দাদা?”
আলােক পকেট হইতে সুন্দর লাল রেশম কাপড়ে মােড়া
মােটা অথচ ছােট্ট একখানি বহি বাহির করিয়া দূর হইতে
উভয়কে দেখাইয়া তরল কণ্ঠে বলিল—“এই বইখানার নাম যে
করতে পারবে তাকে আজ বায়স্কোপের নতুন ফিল্ম দেখিয়ে
আনব।”
রেবেকা সমস্ত রাগ ঝাড়িয়া মুছিয়া স্বামীর কাছে ঘেসিয়া

?
দেশবন্ধু
বলিল-“কি বই গাে দেখি, ওখান কি “টুর্গেনিভের” ? কি বল
ততা, আমার নাম ঠিক মনে পড়েছে না। দেখি না, দাও
একবার। রেবেকা হাত বাড়াইল।
আলােক সরিয়া হাসিয়া বলিল—“ছাই পাল্লে বলতেছি
ছি রেবা, তােমার বি-এ পড়াই মিথ্যে, সামান্য একখানা বইয়ের
নাম তুমি বলতে পারলে না? ফাগুন্ তুই বল তাে এ খানা
কি বই ?”
রেবেকা আহতা ভুজঙ্গীর মত ফোস করিয়া বলিয়া বসিল
-“ঠিক লােককে ধরেছ, ই উনি আবার তােমার ব’য়ের নাম
বলবেন।*
“কেন ও কি তােমার চেয়ে নীচু নাকি, কিরে ফাগুনী তুইও
ঠলি নাকি?”
ফাল্গুনী কৌতুকোজ্জ্বল চোখ দুইটি রেবেকার মুখের পরে
স্থাপিত করিয়া বলিল -“দাড়াও দাদা একেবারে জবাব দিতে
পারব না, কেন না ওর নামটা তাে মােটেই দেখতে পাচ্ছি না—
আচ্ছা ধর প্রথম, বােধ হয় গীতা হবে নয় কি?”
আলােক পরিতৃপ্তির হাসি হাসিয়া রেবেকার কাঁধে হাত
দিয়া বলিল-“কি হলাে রেবা, হার মানছ তাে ফাগুনের কাছে,
আহা তােমার বায়স্কোপটাই মাটি হয়ে গেল। একটা অল্প

দেশবন্ধু
শিক্ষিত। পাড়াগেঁয়ে মেয়ের কাছে হেরে গেলে ? ফাগুন্ এই
নে ভাই তাের গীতা।”
রেবেকা জ্বলিয়া বলিল—“এর আবার হার জিত কি? ও
সব বাজে ব’য়ের খবর আমি রাখি না, তােমরা সব এক একটি
পণ্ডিত, তােমরা ও সব মন্ত্র শেখ , যাও পথ ছাড়, নীচে আমার
কাজ আছে।”
প্রস্থানােতা ক্রুদ্ধা পত্নীর হাত ধরিয়া আলােক সুতীক্ষ কঠে
বলিল—“অবাক করলে যে রে! হিন্দুর মেয়ে তুমি গীতার
খবর রাখ না ?”
মুখটা বাঁকাইয়া জদ্বয় কেঁচকাইয়া রেবেকা বলিল—“অবাক
আমি কিছুই করি নি গাে•••অবাক হচ্ছি তােমার দিন দিন
পরিবর্তন দেখে।”
“তাই নাকি রেবা, আমার পরিবর্তনটুকু তা হলে তােমার
অত কাজের ভীড়েও নজর এড়ায় নি দেখছি, আমার কি হচ্ছে
হচ্ছে তা হলে সেটুকুরও খবর রাখছ। হঠাৎ হতভাগার
উপর এ অনুকম্পা এল কেন রেবেকা, বলতে কি তােমার
আপত্তি আছে?”
ধ। করিয়া আলােকের হাত হইতে নিজের হাত মুক্ত করিয়া
পুনরায় চেয়ারে বসিয়া বলিল-“দেখ সকল কাজের একটা সীমা
আছে জান তাে? তুমি আজকাল সভ্যতার গণ্ডী ছাড়িয়ে
৬৪

দেশবন্ধু বাইরে বেরুতে শিখেছ,বারে যিনি ননকোর নামে খঙ্গহস্ত তিনি এখন একজন ভণ্ড ননকো-অপারেটারের পায়ের ধূলাে মাথায় করে নিচ্ছেন•••চমৎকার, এক রাত্তিরে একটা বিদ্রোহীর কথায় মেতে উঠে চারিদিকের লােক হাসানাে, এ তােমার চমৎকার ব্যবহার। নাঃ তুমি আর আমাকে এ বাড়ীতে টিতে দেবে না দেখছি।” আলােক পূৰ্ব্ব হইতেই এইরকম প্রশ্নের উত্তরের জন্য প্রস্তুত হইয়া ছিল। বার দুই মাথা নাড়িয়া ক্ষুব্ধস্বরে সে বলিল—“রেবা, আমার মত এইরকম পরিবর্তন যদি আজ তােমার হ’তাে••• হলে স্ত্রীর গৌরবে আজ আমি ধন্য হতুম। রেবা ভগবান যে আমাকে এত শীগগীর মুক্তি মার্গের সােপান দেখিয়ে দেবেন এ আমার কল্পনাতীত ছিল। রেবেকা, একবার বলাে যে স্বামীর ধর্ম পালন করাই সতী স্ত্রীর কর্তব্য। আমি তােমার মতেই চলব।” আমি কি আশা করতে পারি রেবা যে তুমি তােমার ভুল সংশােধন করবার চেষ্টা করবে?” রাঙ্গা ঠোট দুখানি উল্টাইয়া রেবেকা ঘৃণার সহিত বলিল- “হ্যা আগে তাই করব। তােমার মত তত আমি পাগল হই নি যে দেশ আমার জননী” বলে ক্ষেপে উঠবাে—আমাদের চিরা- চরিত রীতি নীতিগুলাে ভুলে যাও গাে, তােমার ও বহুমূল্য

দেশবন্ধু
উপদেশগুলো এখানে না ছড়িয়ে, অন্য কোথাও লেকচার’ দাও
গে—তাতে কাজ দেখবে।”
আলােক তাহার দন্তপূর্ণ উত্তর শুনিয়া বিমূঢ় হইয়া রহিল।
সহসা একটা তীব্র ঝঙ্কার তাহার কাণে আসিয়া বাজিল -
“ফাগুন, এই অ বেলায় তুমি স্নান করেছ অসুখ করলে কে
দেখবে? তুমি দিন দিন ভয়ানক জেদী মেয়ে হচ্ছ, আগে তো
এমন ছিলে না।”
রেবেকার তিরস্কারে ফাল্গুনীর ডাগর আঁখি ছলছল করিয়া
উঠিল। আলােক ঝটিতি আসন ত্যাগ করিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া
বলিল—“উঠে আয় ফাগুন, অবেলায় স্নান করে যে অসুখে পড়ে
সে তােমাদের মত অবলা কোমল। নারীদেরই বেশীর ভাগ দেখা
যায়। অত শরীরের কি ভয় করলে সংসার চলে? গায়ে
কাপড়, জামা এটে স্বাস্থ্য নষ্ট করে ঘরের কোণে এলিয়ে থাকা
তােমাদের মত বিলাসিনী অলস মেয়েদের সাজে, কিন্তু ওর শরীর
ফ্যানের নীচে শুয়ে নভেল পড়বার জন্য সৃষ্টি হয় নি...ও
যাতে আদর্শ হিন্দু রমণী হয় সেই শিক্ষাই আমি দেব বুঝতে
পারলে ?”
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রেবেকাকে দগ্ধ করিয়া ফাল্গুনীর হাত ধরিয়া
টানিতে টানিতে আলােক নামিয়া গেল। জড় পুতুলের মত
রেবেকা নিশ্চেতন হইয়া বসিয়া রহিল। ক্রোধে তাহার সাদা

দেশবন্ধু
মুখখানি টকটকে হইয়া ফাটিয়া পড়িবার উপক্রম হইতেছিল।
ও এতদূর! এত তাচ্ছিল্য ! এত অপমানসূচক কথা যে
স্বভাব কোমল আলােকনাথের মুখে শুনিতে পাইবে সে তাহা
প্রত্যাশা করে নাই। অভিমানের আতিশয্যে তাহার চোখ
ঠেলিয়া জল আসিতে চাহিল। হাতের সেই অর্ধ-পঠিত
‘ম্যাগাজিন’খানি ছুড়িয়া অসহিষ্ণু ভাবে উঠিয়া দাঁড়াইতেই সম্মুখে
যে দৃশ্য তাহার পড়িল, তাহাতে তাহার চোখের জলের ধারা
নিঃশেষে শুকাইয়া, তৎপরিবর্তে জালায় ভরিয়া উঠিল। যেন
তাহাকে উপেক্ষা ও বিদ্রুপ করিবার মানসে কাহারা গাহিয়
উঠিল—
“ওগাে, গৃহলক্ষ্মী ধরি তােদের পায়
এই জীর্ণ ঘরটি গুড়িওনাক
একটি লাথির ঘায় ?”
রেবেকা তাড়াতাড়ি তাহার সুন্দর ধপধপে চরণ দুখানি
লাল মখমলের “শ্লিপারের মধ্যে ঢুকাইয়া এক ঝলক দমকা
বৈশাখী ঝড়ের মত উদ্দামগতিতে ঘুরিয়া দ্বিতলের বারান্দার
উপর আসিয়া দাঁড়াইল। যাহা সে দেখিল তাহাতে তাহার বুকের
মাঝখানটা দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। স্বামী তাহাকে এত তুচ্ছ
জ্ঞান করিতেছে•••যে যাহাতে সে আজন্ম ঘৃণা করিয়া আসিতেছে
সেই স্বেচ্ছাসেবকেরা তাহারই বাটীর উঠানের মধ্যে বসিয়া গীত
৬৭

দেশবন্ধু
গাহিতেছে ? রেবেকা কি একটা কথা বলিবার জন্য ঝুকিয়া
পড়িল—সেই সময় গায়কেরা গানের শেষ চরণ গাহিয়া
উঠিল—
“তােমরা যাহার মুখের বেণু-তােমরা যাহার পায়ের রেণু,
তােমর। বিন যাদের বীণা বাজবে নাকো হায় ।
তােমরা তাদের মাথায় বসে, আপন টান টেনে কসে
চালাও যদি মনােরথ তবে দেশটা কোথায় যায়।
এই দেশেতে সীতা ছিল......”
ক্ষিপ্ত হইয়া চীৎকার করিয়া ডাকিল—“মানসিং ?”
“কেয়া মাজী ?
নেপালী দ্বারােয়ান ভাটার ন্যায় ক্ষুদ্র গােলাকার চক্ষু ঘুরাইয়া
উপরে তাকাইল। রেবেকা চোখ মুখ ঘুরাইয়া বলিল—“শুয়ার...
তুম্ কঁহা গিয়া
থা•••অন্দরমে এত্যা ডাকু ঘুসনে দিয়া
হারামজাদ।”
নীচে স্বেচ্ছাসেবকদের পাশে দাড়াইয়া আলােক মুচকি
মুচকি হাসিতেছিল। তাহা দেখিয়া রেবেকা জ্বলন্ত কামানের
গােলার মত ছিটকাইয়া বলিল—“এ মানসিং, আভি নিকাল
দেও, কুছ, বাত নেই শুনেগা।”
“রেবা।”
৬৮

দেশবন্ধু অকস্মাৎ আলােককে সম্মুখে পাইয়া রেবেকা মনের রাগ মিটাইবার সুযােগ পাইল। ক্রুদ্ধা সিংহীর ন্যায় ফুলিয়া বলিল- “কী ?” = “সহ্যের সীমা যে তুমি অতিক্রম করে যাচ্ছ রেবা..ভদ্রলােকের ছেলেদের দারােয়ান দিয়ে গলাধাক্কা দিতে তােমায় লজ্জা করে ? এতে তােমার স্বামীর মাথা কত নীচু হচ্ছে তা কি এত লেখাপড়া শিখেও জানতে পাচ্ছ না?” “তাই নাকি গাে? কিসে তােমার মাথাটা নীচু হচ্ছে শুনি...আর তুমিও যে আজকাল বড় বাড়িয়ে তুলেছ, আমি এ বাড়ীর কত্রী...তােমার ন্যায় অন্যায়গুলাে আমাকেও দেখতে হবে, যাও শীগগীর ওদের বিদেয় কর—আর তুমি যদি না পার- আমিই যাচ্ছি।” ‘চুপ চুপ রেবা—খুব হয়েছে—আর জালিও না—আস্তে কথা বলনীচে ওঁরা শুনতে পেলে কি ভাববেন বল তাে?” রেবেকা মাথা নাড়িয়া বলিল—“ভাববেন আবার কী সত্যি কথা বলছি, তাতে ভয়টা কি? না না, এত সব অনাচার আমি চোখে দেখতে পাৰ্ব না—“শে” ওঃ তুমি কি ভুলে যেতে বসেছ যে তুমি একজন নামজাদা ব্যারিষ্টার। ছিঃ এমন হীন হয়ে পড়েছে তুমি...যে সমাজে এ সব কথা উঠলে•••তারা আমাদের দেশবন্ধু সান্নিধ্য হতে ঘৃণায় সরে যাবে।” বলিয়া সত্য সত্যই যেন সেই অনির্দিষ্ট আশঙ্কায় রেবেকা শিহরিয়া উঠিল আলােক তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া কঠোরসুরে বলিল- “আমি যে ব্যারিষ্টার, আর তুমি যে ব্যারিষ্টার পত্নী, সে কথা ভুলে যাও রেবা-ভাব তােমার স্বামী একজন দীন দরিদ্র মায়ের ছেলে।” মুখ মচকাইয়া রেবেকা বলিল—“মায়ের সন্তান না তাে কি অমনি হয়েছ।” “স্বেচ্ছাচারিণী প্রগল্ভা...ইট, ইস্ মাই মিসফরচুণ দ্যাট আই হাভ, মারেড, ইউ ।” আলােক ত ত করিয়া ক্ষিপ্রগতিতে সিড়ি বাহিয়া নামিয়া অমলের কাঁধে হাত দিয়া করুণম্বরে বলিল—“চলুন অমলদা আমিও আপনার সঙ্গে খুলনায় যাব।” অমল তাহার বেদনা পীড়িত অথচ কিসের দীপ্তিতে প্রভান্বিত মুখের পানে চাহিয়া সানন্দে বলিল—“সেততা আমার সৌভাগ্য ভাই।” আলােক তাহার হাত ধরিয়া অনুনয় করিয়া বলিল—“একটু দাড়িয়ে যান একবার দয়া করে মৃণাল বাবুকে নিয়ে আপনাকে ওপরে যেতে হবে।” ৭০ দেশবন্ধু গ ফাল্গুনীর ছােট্ট ঘরখানিতে উভয়কে বসাইয়া আলােক ভগ্নীর সন্ধানে বাহির হইয়া গেল। অমল ও মৃণাল সবিস্ময়ে ঘরখানির প্রতি দৃষ্টি বুলাইয়া দেখিল—সখের প্রাচীর গাত্রে মহাত্মা গান্ধীর প্রকাণ্ড তৈলচিত্ৰ সন্ধ্যার ঝিকিমিকি আলােতে পূতময় হইয়া উঠিয়াছে- পার্শ্বে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্চন, বালগঙ্গাধর তিলক, মাননীয় গােখলে, দাদা ভাই নৌরজী, লালা লাজপৎ রায়ের এবং কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি বাঙ্গলার কয়েকটি উজ্জ্বল রত্ন স্বদেশ প্রাণ মহাত্মাদিগের আলেখ্য গৃহ প্রাচীর সুসজ্জিত পবিত্র । দক্ষিণদিকের জানালার কোলেই ঝঝকে জলচৌকীর পরে কমলা চরকা, ও সুতা কাটিবার সমস্ত সরঞ্জাম সুরক্ষিত। গৃহের প্রত্যেক খুটিনাটি বস্তুগুলিও কাহার শ্রীকর স্পর্শে নিপুণভাবে সাজান, গুছানাে। ধূনা ও গুগগুলের মধুর সুবাস তাহাদের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়া গেল। সেই মুহূর্তে সােনার থালায় খান কয়েক সােনার চুড়ী ও দুই থাকে দুই শত টাকা লইয়া আলােকের সহিন ফাল্গুনী দেবী প্রতিমার মত ঘরে ধীরে ধীরে প্রবিষ্টা হইল! তাহার আগমনে ঘরের সমস্ত অপূর্ণ টুকু যেন পূর্ণতায় ভরিয়া হাসিয়া উঠিল। উভয়ের পদপ্রান্তে থালা খানি রাখিয়া মােটা আঁচলখানি গলায় তুলিয়া ফাল্গুনী ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিল। আলােক কুণ্ঠাপূর্ণ সুরে বলিল“অমলদা,

দেশবন্ধু
ফাল্গুনী
আপনাদের
স্বরাজ
ফওে
যৎসামান্য উপহার
দিচ্চে !”
অমলের চোখ জ্বলিয়া উঠিল। ফাল্কনীর হাত ধরিয়া
উঠাইয়া স্নেহ গৰ্গ ভাষায় বলিল—“দিদি ফাল্গুন লক্ষ্মী তুমি
•••তােমার এ দান আমাদের অমুল্যরত্ন। এ ঘর বােধ হয়
তােমারই না ?
আলােক এই রকম শান্তিকুঞ্জ যদি প্রতি
গৃহে গৃহে হয়, তাহলে আমাদের সমস্ত অভাব শীগগীরই দূর
হবে আশা করি।”
অমলের প্রশংসা বাক্যে কালাে মেয়েটির সর্বাঙ্গ রাঙ্গিয়া
উঠিল। আর মৃণাল•••সে সেই কালােরূপের স্নিগ্ধ শুচি-শুভ্র
অন্তরখানির পরিচয় পাইয়া কী একটা পুলক...কী একটা মাধুৰ্য্য
অন্তরে অন্তরে অনুভব করিয়া অভিভূত হইয়া বসিয়াছিল।
অনেক বর্ণশ্রেষ্ঠা সুন্দরীদের সে দেখিয়াছে••এবং সুন্দরের প্রশংসা
সে কত জায়গায় করিয়াছে কিন্তু সে সব সুন্দরীদিগের মধ্যে
প্রাণের পরিচয় পায় নি। এখন তাহার মনে হইল যে বহিঃ-
সৌন্দর্য্যে সার পদার্থ কিছুমাত্র নাই, সে কেবল দর্শনেন্দ্রিয়ের
তৃপ্তি সাধন করে মাত্র•••কিন্তু অন্তরের যা সৌন্দৰ্য্য...সে পুষ্প
পরাগের মত লুপ্ত থাকিয়া পরকে মাতাইয়াই সুখী হয়। মেঘে
ঢাকা ক্ষণপ্রভা...কিম্বা অন্ধকারের বুকে লুকান চঁাদের মিষ্ট
আলােটুকু•••অথবা শামলা ধরিত্রী: এ, এর সবটুকুই যে
৭২

দেশবন্ধু সুন্দর...কি দিলে ইহার উপমা খুঁজিয়া পাওয়া যায়। বেশী আলাে লােকের চোখে সহ্য হয় না আলাের আড়াল খুঁজে••• তেমনিই চিরটাকাল সৌন্দর্য্যের উপাসক মৃণাল•••ঐ কালাে মেয়েটির অন্তর খুঁজিতেছিল অন্তদৃষ্টি দিয়া। একমুহূৰ্ত মৃণালের প্রশংসামান মুগ্ধ অপলক নেত্রের প্রতি চাহিতেই বিশ্বের সমস্ত লজ্জা যেন ঝাপিয়া ফাল্গুনীর মুখে চোখে আসিয়া পড়িল। উদ্বেলিত হৃদয়ে পুনৰ্বার উভয়কে প্রণাম করিয়া ফাল্গুন। ললিত গতিতে বাহির হইয়া গেল।

দেশবন্ধু -সাত- কাজল-কালাে-মেঘে-ছায়া মেদুর দিনের সজল সন্ধ্যাখানি। ভাদ্রের শেষ। সেদিন সকাল হইতেই আকাশের মুখটা অল্প অল্প করিয়া ঘােরালাে হইয়া উঠিতেছিল। বাতাসটাও কেমন যেন এলােমেলাে হইয়া ছন্নছাড়ার মত ঘুরিতেছিল। মধ্যে মধ্যে যেন কোন ব্যথাতুরের মর্ম নিঙড়ান দীর্ঘশ্বাসের মত ছুটিয়া আসিয়া বদ্ধ জানালার কোলে কোলে আছাড় খাইয়া পড়িতে- ছিল। মানুষের স্বভাবতঃই এই মেদুর ক্লান্ত দিবসে মন বড় চঞ্চল হইয়া উঠে, বিশেষ প্রিয়জন যাহার সুদূর প্রবাসে হাতের কাজ গুলা চটপট, করিয়া সারিয়া যখন নিজের ক্ষুদ্র গৃহটির কোণে ফাল্গুনী বিকল চিত্তে আসিয়া দাঁড়াইল, তখন আকাশ চুয়াইয়া দুই এক ফোঁটা জলকণা ঝরিতেছে! খােলা জানালা হইতে জলের ছি। লাগিয়া পাছে তাহার চরকাটি নষ্ট হইয়া যায়•••এই কারণে ফানী জানালার কপাটটা ভেজাইয়া, পিতলের প্রদীপ জ্বালিয়া, ছােট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলিয়া সুতা তুলিতে বসিল। ৭৪

দেশবন্ধু
“ফাল্গুনী ?”
ফাল্গুনী মুখ তুলিয়া দেখিল, রুমালে, কাপড়ে এসেন্স ঢালিয়া
কুঞ্চিত মুখে রেবেকা দাঁড়াইয়া। রেবেকার আগমন এ গৃহে
নূতন। ফাল্গুনী জিজ্ঞাসুনেত্রে চাহিয়া রহিল। অপ্রসন্ন মুখে
রেবেকা বলিল—“বাবাঃ যখনি এই ঘরটার সামনে দিয়ে ওদিকে
যাই, তখনি মনে পড়ে সেই রূপকথার সেই সেকেলে বুড়ীর
কথা, আঃ জ্বালাতন। চব্বিশ ঘণ্টা ঘ্যানর, ঘ্যানর ।
লাগে•••? কি ভাই বসতে পারি কি এখানে না ম্লেচ্ছ রমণীর
স্পর্শে হিন্দু রমণীর শুচিপূর্ণ ঘর অস্পৃশ্য হয়ে যাবে। কি বল,
সরে পড়ব ?”
ফাল্গুনী বলিল—“তুমি হলে ম্লেচ্ছ রমণী, তা হলে
দাদা...”
“বালাই, তােমার দাদা কেন ম্লেচ্ছ হতে গেল, সে জন্ম জন্ম
হিন্দু হয়ে জন্মাক। এবারে এলে বললা—যেন টিকি রাখে, মন্দ
দেখাবে না, অবতারের ‘কভারের মত কতকটা হবেন।”
বলিয়া তীক্ষদৃষ্টিতে ঘরের চারিদিক দেখিয়া বলিল-“ও কাঠের
চেয়ারগুলাে দেখছি ঘর থেকে গ্যাছে, তা হলে কি অবশেষে
এই ধূলােতেই বসব নাকি?”
“ধূলাের ওপর বসবে কেন বৌদি,-আহা অমন ‘ক্রীম
কলারের’ সাড়ীখানাই যে নষ্ট হয়ে যাবে, দাড়াও ভাই দিচ্ছি
৭৫

দেশবন্ধু
বসবার জায়গা।” বলিয়া ফাল্গুনী তাহার হাতে-বােনা চটের
আসনখানি বিছাইয়া বলিল-“বসাে বৌদি।”
“ও আবার কি বিশ্রী জিনিষ দিলে ? থাক, আমি বিন.
কারণে আসিনি, যা বলতে এসেছি শােন, তােমার এ রাস্তার
ধারের ঘরটা আমার চাই। দেবে কি ?”
ফাল্গুনী রেবেকার মতলব বুঝিয়া বলিল—“এটা যে মার ঘর
ভাই।”
“আঃ ঐ তাে তােমার ‘সেন্টিমেন্ট’! মার ঘর, বাবার ঘর,
ও কী! কেন তােমার মা তাে এ বাড়ীর সব ঘরগুলিই
ব্যবহার করে গ্যাছেন—তবে তােমার আপত্তিটা কিসের ?”
ফাগুনী কোন উত্তর করিল না। রেবেকা আপন মনেই
বলিয়া চলিল—“আমি মনে করছি এই ঘরটাকে আমার ‘স্টুডিও
রুম করলে বেশ সুবিধে হয়। কি বল, দিতে পারবে না ?
কথার জবাবটাই দাও না ।
ফাল্গুনী বেশ স্পষ্টসুরেই মুখ তুলিয়া জবাব দিল—“না।”
ছােট্ট এই ‘না’ কথাটি রেবেকার বুকের পরে জ্বলন্ত
আগুনের টুকরার মত ছিটকাইয়া পড়িল। “কী—আমার
মুখের পরে’ জবাব ! জানাে ফাল্গুনী—এ বাড়ীর কত্ৰী তুমি
নও, আমি ।
শশব্যন্তে জিভ, কাটিয়া ফাল্গুন।
বলিল—ছিঃ বৌদি, ও
s
৭৬

দেশবন্ধু
কথা কি বলতে আছে-কখনও তত আমাকে এমন করতে না ?
আজকাল তােমারই বা কি হলাে ভাই?”
অধিকতর উষ্ণস্থরে রেবেকা বলিল—“হয়েছি তােমাদের
আক্কেল দেখে ! তােমরাও কি এমনি ছিলে ? এই সেদিন ভাই
বােনে মিলে প্রায় শ’ চারেক টাকা কী একটা বাজে ফণ্ডে দিয়ে
এলে, পয়সা লি তো অমনি আসে না।”
রেবেকার মুখে শেষােক্ত কথাগুলি উপহাসের ন্যাষ শুনাইল।
-এই রেবেকাই সেদিন তাহার পিত্রালয়ের বন্ধু ডাঙার এস,
কে গুপ্তের বিবাহােৎসবে একছড়া দামী মুক্তার নেকলেস বধূকে
উপহার দিয়া আসিল । তারপর বায়স্কোপ, বােটানিক্যাল
গার্ডেনে যাওয়া আসা, পিকনিকে এক একটা বড় বড় ভােজ
দেওয়া, এ ত হামেসাই হইতেছে। রেবেকা অস্থিরভাবে
বলিল...“তা হলে ঘর বােধ হয় পাব না? কিন্তু শােন ফাল্গুনী
তােমার পিছনে আজকাল ডড় বেশী খরচ হতে, সে খবর কি
রাখে ?”
ফানী অবাক হইয়া বলিল—“আমার পিছনে বাজে খরচ।
সেকি বৌদি ?”
“নিশ্চয়ই। এই পরশুদিন কতকগুলাে চরকাই কিনে
ফেললে, তারপর তােমার আলমারীতে বােধ হয় নানারকম
কাপড়ে ভর্তি, তবুও তুমি দাম দিয়ে মােটা খদ্দর কিনে পরছে।
৭৭

দেশবন্ধু
তৃতীয় ; তুমি সেদিন কতকগুলাে স্বদেশী গুণ্ডাদের নতুন চুড়ীগুলাে
আর দু’শাে টাকা অনর্থক দিয়ে দিলে—এগুলি কি বাজে খরচ
নয় ? আমি এসব গুলাে মােটে পছন্দ করি নে।”
অপমানে ফান্তুনীর মুখ লাল হইয়া উঠিল...শক্তভাবে
কথাটার উত্তর দিতে যাইয়া কি ভাবিয়া সে আত্মসংবরণ করিয়া
গলার স্বরকে যতদূর সম্ভব কোমল করিয়া বলিল—“বেশ তত
বৌদি, তােমার বিবেচনায় যদি এ সব বাজে খরচ বলে মনে হয়...
তা হলে এক কাজ করাে ভাই আমাকে তিন চার মাসের জন্যে
সময় দাও- আমি তােমার যা টাকা কড়ি খরচ করেছি সমস্ত
শােধ করে দেব':”
রেবেকা বিদ্রুপ করিয়া বলিল—“তাই নাকি! তুমি আবার
উপায় করতেও শিখেছ নাকি?”
মলিনভাবে হাসিয়া ফাল্গুনী বলিল—কাজে কাজেই...কি
আর করি বল বৌদি, তােমার মত তাে আমি বাপের বিষয় পাই
নি। কাল দেখলুম “আত্মশক্তিতে একজন নার্সের জন্যে
বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, না হয় সেই কাজটাই নিইগে। তা হলে
আজই তাদের চিঠি লিখে দি, কিছু এলাউন্স’ টাকা পাঠিয়ে
দিলেই শুধু এ ঘরটা কেন, সমস্ত বাড়ীটাই আমি ছেড়ে
দেব।
একফোটা মেয়ের মুখে এত শক্ত শক্ত কঠোর সত্য মিশান
৭৮

দেশবন্ধু
জবাব শুনিয়া রেবেকা ইতিকৰ্তব্যতা হারাইল। কি বলিবে
খুঁজিয়া না পাইয়া হঠাৎ উত্তেজ-বশে বলিয়া ফেলিল—“তা
কিছুদিন পরে কেন বাড়ী ছাড়বে আজই ছেড়ে দাও, আমিও
তােমার মত বিদ্রোহী মেয়ের ঘরে থাকাটা পছন্দ করি না।”
ফাল্গুনী নিঃসঙ্কোচে বলিয়া উঠিল—“বেশ আমি এখনই যেতে
প্রস্তুত আছি। ভাল বৌদি, একজন অনেকদিন আগেই গেছে,
বাকী ছিলাম আমি...আমিও চললুম ভাই। প্রার্থনা করি তুমি
সুখে থাক।”
“ফাগুনী-তুমি বড় লম্বা লম্বা কথা বলছ, তােমার দাদা
ইচ্ছে করে চলে গ্যাছে—তাকে তো আমি যেতে বলি নি, তার
জন্য কি দায়ী আমি?”
“কতকটা দায়ী বই কি বৌদি। পায়ে পড়ি তােমার ভাই,
রাগ করাে না, তুমি লেখাপড়াই শিখেছ কিন্তু স্বামীকে কেমন
করে ভালবাসতে হয় জান না—স্বামীর মৰ্যাদা কিসে থাকে সে
শিক্ষা তােমার হয় নি। তা যদি জানতে, তাহলে—তাহলে
আজ দাদা তােমাকে এমন করে উপেক্ষা করতাে না।
“বাঃ বেশ লেকচার দিচ্ছ তত। তাহলে তােমার দাদার
মহা ভুল হয়েছিল যে এক বিলাত ফেরৎ ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের
উচ্চ শিক্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করা—আর তারই পিতৃদত্ত ধনে
বিলেতে গিয়ে ব্যারিষ্টার শেখা। তার উচিত ছিল: পাড়াগাঁয়ের
৭৯

দেশবন্ধু
অসভ্য, জংলী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করা, তা
হলে তােমার দাদার মত গুণী ব্যক্তির মর্যাদা যথার্থই থাকত
ফাল্পনী বেশ সহজ, সরল ভাবেই বলিল—“বৌদি আমাদের
পাড়াগাটাকে অতটা তুচ্ছ ভােবাে না, সত্যি যদি তুমি একজন
অশিক্ষিত মেয়ের কাছে শিক্ষা পাও, তাহলে তােমার ওসব
‘সায়েন্স’, ‘ম্যাথমেটিক্স’, ‘ফিলজফির’ কতকগুলি দুর্বোধ্য ভাষার
চেয়ে সে গার্হস্থ্য শিক্ষা বড় সরল লাগবে।”
অবহেলাভরে উচ্চহাস্য করিয়া রেবেকা লুটাইয়া পড়িল ;
হাসির বেগ প্রশমিত হইলে বলিল—“অবাক করলে আমায়
ফাল্গুনী...‘ফাই’! সেখানে আমার সমকক্ষ কেউ কি আছে, তারা
আমার মূল্যই বােঝে না। আমি যাব সেখানে শিক্ষা
নিতে......?”
ফাল্গুনী আর থাকিতে পারিল না, ফস করিয়া বলিল—“হ্যা
বৌদি কথাটা খুব সত্যি বলেছ, খনি গর্ভস্থিত রত্নের মূল্য সে
চাষার মেয়েরা কেমন করে জানবে.•••••তারা কেবল কাজই
শিখেছে......
“বাব্বা, হার মানছি তােমার কাছে...তােমার সঙ্গে কথা
কইতে আসাই ঝারী হয়েছে। আচ্ছা তুমি যে অনর্থক
‘সায়েন্স আর ইংরেজী ব’য়ের নিন্দে করলে, তারা ‘সায়ান্স
কাকে বলে জানে ?”

দেশ বন্ধু
ফাল্গুনী দৃকণ্ঠে বলিল—“কেন জানবে না—তাদের ‘সায়েন্স
‘রামায়ণ মহাভারত। ভােমার আদর্শ হয়ত ‘জোয়ান অফ
আর্ক, হতে পারে, কিন্তু তাদের আদর্শ সীতা, সাবিত্রী, সতী,
দময়ন্তী.. তুমি যতটা সময় বাজে নভেল পড়ে কাটাও তার চেয়ে
সে সময়টা আমাদের আদর্শ রমণী লীলা, খনা, গার্গী এদের
জীবন চরিত্রগুলো পড়াে, মনের সমস্ত জড়তা কেটে গিয়ে নির্মল
হয়ে যাবে তাতে শান্তি, তৃপ্তি দুইই পাবে। যাক অনেক
কথাই বলে ফেললুম মাফ করে ভাই, এখনি তাে যাচ্চি-মা ?”
ফাল্গুনী উচ্চরবে দাদাকে ডাকিল। হাসিমুখে রমা আবির্ভাব
হইয়া লিল—“কেন দিদিমণি।
রেবেকা চোখ, ঘুরাইয়া ধমক দিয়া বলিল—“আজ তােকে
ফুল দিয়ে হল্ট। সাজাতে বলেছি, হয়ে গ্যাছে সাজানাে ?
রমা ভীতি বিবর্ণমুখে বলিল—“সাজাচ্ছিলুম তত...দিদিমণি
ডাকলেন :
রেবেকা কঠোরস্বরে বলিল—“তােমার দিদিমণির কাজ
করতে হবে না, তার ইচ্ছে হয় কুলী দিয়ে সমস্ত জিনিষপত্র নিয়ে
যাক। আমাকে অপমান করে আমার চাকর দাসীর সাহায্য
নেবে ভেবেচো, তা হবে না—যাও আমার চাকর দাসীর দ্বারায়
একটাও সাহায্য পাবে না। তােমার যা যা জিনিষপত্র আছে
নিয়ে যাও কিন্তু আমার জিনিষের একটি জিনিষও ভাগ পাবে

-তবে অবশ্য তােমার মায়ের জিনিষপত্র, গহনা সব বের করে দিচ্ছি নিয়ে যেতে চাও তাে যাও। তাতে তােমার অধিকার আছে...আইন সঙ্গত কাজ আমি করব। তখন যে তােমার দাদা এসে কোন কথা বলবে, সে সহ্য করবার মেয়ে আমি নই। তােমার জিনিষে আমার জোর নেই। রক্ত জবার মত রাঙ্গা হইয়া ফাল্গুনী বলিল সে জোর হয়তাে তােমার আছে বৌদি..সবই তাে তুমি জোর করে করছে। দাদাকে তুমি কটু কথা বলে তাড়ালে—কিন্তু একদিন এর জন্যে তােমাকে পস্তাতে হবে এটা স্থির জেননা। আর তােমার দয়ার দান আমি গাইনে বৌদি... আমার মায়ের গহনা রেখে গেলুম- দাদার ছেলের বৌ এসে পরবে। ফাগুনী বস্তু সংযত করিয়া উঠিয়া দাড়াইল-পরে হেঁট হইয়া বলিল—“যতই কর বৌদি বয়সে দু’এক বছরের ছােট হােলেও তুমি আমার প্রণম্য।” রেবেকার সুন্দর শ্লিপার শােভিতা চরণের ধূলা লইয়া সিক্ত আঁখি পল্লব দুই করে আবরিত করিয়া ফাল্গুনী গভীরসুরে বলিল—“চলুম বৌদি, পথের একটা কাটা অনেকদিন হলাে বিদায় নিয়েছে, আর আজ দ্বিতীয়টিও জন্মের মত দূর হ’লল।” দীপ্তমুখে দীপ্তিময়ী ফাল্গুনী আজন্ম পরিচিত মেহনীড় পিতৃ ভবন ত্যাগ করিয়া নূতন আলােকের সন্ধানে যাত্রা করিল।

দেশবন্ধু
হাঁফ ছাড়িয়া রেবেকা বলিল—“দেখলি রমা, তাের দিদিমণির
আক্কেল—আমি ওর মান্যে কত বড়, আর আমাকেই অহঙ্কার
দেখিয়ে চলে যাওয়া হলাে—আসতেই হবে যাবে কোথায় ?”
রমা পরম বিজ্ঞভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল—“কক্ষনাে নয়-
সে রকম হালকা মেয়েই সে নয়। না খেতে পেয়ে রাস্তায়
মরলেও এ বাড়ীতে আর পা দিচ্ছে না।”
“যা, যা কানে তুই, ঐ দেখ দেখি সন্ধ্যে হয়ে এল...এক্ষুণি
ওরা সব এসে পড়বে। এই যে গুড ইভনিং মিঃ রয়—আসুন,
আসুন—কিন্তু আজ আপনার তিন মিনিট লেট হয়ে গ্যাছে•••
এই দেখুন পাঁচটায় আসবার কথা--পাঁচটা তিন হয়ে
গ্যাছে।”
ডাক্তার কল্লোল রায়ের আগমনে রেবেকার মুখে চোখে
আননের উজ্জ্বল আভা ছড়াইয়া পড়িল। কল্লোল মৃদু হাসিয়া
বলিল—“গুড ইভনিং মিসেস্ বােস্-লেট হবার দরুণ মাফ
চাইছি, কিন্তু জানেনই তাে আমরা বাঙ্গালীর ছেলে অতটা ঠিক
‘টাইমলি’ সব কাজ করে উঠতে পারিনে...কিন্তু ও ঘরটায় কি
হয়েছে বলুন তাে•••মিনিট কয়েক আগে রণযুদ্ধ হয়ে গ্যাছে
নাকি জিনিষ পত্র এমন বিশৃঙ্খল হয়ে রয়েছে কেন?”
চট করিয়া অলক্ষ্যে রেবেকা সুগন্ধি রুমাল দিয়া ধপধপে

দেশ বন্ধু
গাল দুইটা মুছিয়া তাতে তাজা রক্তের ঢেউ খেলাইয়। মিহিসুরে
বলিল-“ওঃ সে ভয়ানক বিশ্রী ব্যাপার! চলুন বাইরে, সমস্ত
শুনবেন—এ ঘরটার মধ্যে যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
উভয়ে কক্ষ পার হইয়া ছাদের উপর দুইখানি সােফার উপর
বসিয়া পড়িল।
“ভারপর—মিঃ বােসকে দেখছি না কেন? তিনি কি টুরে
বেরিয়েছেন?”
অন্যমনস্কতার ভাব জোর করিয়া আনিয়া কঁপিয়া কঁপিয়া
বলিল—“ঠিক বলেছেন তাে মিঃ রয় -জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী
হলেন কবে থেকে ?”
কল্লোল হাসিয়া ফেলিল, বলিল-“জ্যোতির্বিদ্যার ধার
ধারিনে—এমনিই মন গড়া একটা কথা বলে দিলেম, তা পূজোর
এদিকে তাে মিঃ বােস ফিরছেন ?”
ছলনাময়ী রেবেকা সকরুণকণ্ঠে বলিল—“তাহলে
বাচতুম মিঃ রায় কি জানেন•••আমাদের মধ্যে যাক, হ্যা
পূজোর শেষেই বােধ হয় বাড়ী আসবেন।”
মিঃ রায় বলিল—“তা হলে পূজোর ছুটিতে বাড়ীতে বসেই
থাকবেন?”
কৃত্রিম মলিন ভাবে কম্পিতকঠে রেবেকা বলিল—“তাই হয়
ত হবে আপনি এবারে কোথায় বেরুবেন মিঃ রয়?”
৮৪

দেশবন্ধু
“এখনও প্রােগ্রাম ঠিক করিনি, তবে কোথাও যে যাব, এটা
নিশ্চয়ই।”
“মিঃ রয়—যদি আপনার কোন অসুবিধা না হয় তাহলে
আমাকে কি আপনি এবার সঙ্গী করে নিতে পারেন।
চেয়ার হইতে উঠিয়া বিস্ময়সূচক কণ্ঠে কল্লোল বলিয়া উঠিল—
“আপনি যাবেন। সে তাে আমার সৌভাগ্য মিসেস বােস, যে
আমি এবার আপনার মত সাথী পাব—একথা আবার কুণ্ঠিত
ভাবে জিজ্ঞেস করছেন ? সত্যি যেতে প্রস্তুত আছেন মিসেস
বােস ?”
টানিয়া টানিয়া রেবেকা বলিল—“সত্যিই বলছি, মিঃ রয়,
মিথ্যে কেন বলব বলুন। কিন্তু আপনার যেন আপত্তি নেই
জানলম—মিসেস্ রয়ের তাে কোনও
হা হা করিয়া কল্লোল হাসিয়া উঠিল। বলিল—“মিসেস
রয়ের কথা ভুলবেন না মিসেস বােস, সে মানুষই নয়—বােধ
হয় এই পুজোর সময় সে বাপের বাড়ী যাবার জন্যে বায়না
ধৰ্বে।”
একটা পাতলা হাসির রেখা বিদ্যুৎবেগে রেবেকার মুখের
উপর খেলিয়া গেল। সরল কল্লোল সে ভাবটুকু দেখিল না।
বুকের আনন্দ চাপিয়! রেবেকযেন পরম দুঃখিতের মত অত্যন্ত
করুণা প্রকাশ করিয়া বলিল-“ও তাহলে আপনি সাংসারিক

দেশবন্ধু
হিসেবে বড় সুখী নন্ না মিঃ রয়? কিন্তু আপনার স্ত্রী তাে
গুনেছি বেশ শিক্ষিতা ?”
কল্লোল সহানুভূতিতে আর্দ্র হইয়া বলিল—“জ্বালাতন হয়ে
গেছি মিসেস বােস-সে শিক্ষিতা হলে কি হবে ? সে পুরাতন
মতটাই শ্রেষ্ঠ করে মানতে চায়—সে যে অমন জান্তাম না, ভারী
আশ্চৰ্য্য ?”
“আশ্চৰ্য্য কিছুমাত্র নয় মিঃ রয়, আমার ননদের বিসদৃশ
ব্যবহারে সে ভ্রম আমার ঘুচে গ্যাছে। উঃ কি একরােখা মেয়ে
সে—আজ একটা সামান্য কথার জন্যে বাড়ী ছেড়ে দিয়ে চলে
গেল।
“তাই নাকি, মিস, বােস, তাহলে কোথায় গেলেন ?”
কে জানে কোথায় কোন সেবাশ্রমের নস’ হতে। যাক, ও
সব বাজে কথা, তাহলে ঠিক যাচ্ছেন তাে মিঃ রয়?
“সার্টে লি, আমি সৰ্ব্বক্ষণই ‘রেডী হয়ে রয়েছি, বলুন না
কবে আপনি যাবেন ?”
“কোথায় যাওয়া হচ্ছে রেবা ?”
চমকিতা রেবেকা পিছন ফিরিয়া নেলিকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি
উঠিয়া তাহার হাত ধরিয়া আনন্দোৎফুল্ল স্বরে বলিল—“নেলি ?
কতদিন পরে দেখা হল ভাই ? সেই মিঃ চৌধুরী আসতে
তােদর বাড়ী গেছলুম ; তারপর থেকে চারদিক দিয়ে আমার
৮৬

দেশবন্ধু
এমন কাজ পড়ে গেল, যে মােটে ফুরসুৎ পেলাম না—কিন্তু, তুই
তাে ভাই একবার আসতে পারতিস ?”
নেলি বলিল—“কেমন করে আসব ভাই, মাঝে বাবার
প্লরিসি’ হ’লআজ কদিন হলাে তিনি একটু ভাল হয়েছেন,
তাই মনে করলাম একবার তােমায় দেখে আসি।”
রেবেকা উৎকণ্ঠিত ভাবে বলিল-“নেলি! জ্যাঠা মশাইয়ের
‘প্লরিসি’ হয়েছিল? আমাকে জানাস নি, কেন ভাই?”
মি: রয় এতক্ষণ নীরবে ইহাদের আলােচনা শুনিতেছিল
সহসা সে বলিয়া উঠিল—“বাঃ মিসেস, বােস,ওঁকে কি বসবার
অবসর দেবেন না ?”
রেবেকা ঈষৎ লজ্জিত হইয়া পাশের চেয়ারটিতে নেলিকে
বসাইয়া বলিল—“মিঃ চৌধুরীর কোন খবর পেয়েছিস?”
অস্তগামী রবির রাঙ্গা কিরণের মত সহসা নেলির মুখের বর্ণ
হইয়া উঠিল। সে নতমস্তকে বলিল—তা জানিনা।”
রেবেকা কল্লোলের দিকে ফিরিয়া বলিয়া উঠিল—“মিঃ রায়,
ইনি হচ্ছেন আমার প্রিয়তম বন্ধু মিস, নেলি মুখার্জী, আর
নেলি—ইনি মিঃ কে, কে, রায়।”
কল্লোল সহাস্যে বলিল—“বড় সুখী হলুম মিস, মুখার্জী
আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে।”
নেলিও হাসিয়া বলিল—মিঃ রয়, আমিও তদ্রুপ।”
৮৭

দেশবন্ধু ‘ইট্রোডিউসের পালা শেষ হইল। সান্ধ্য-সমিতিতে রেবেকার পরিচিত বন্ধুবর্গের শুভাগমনে আলােকের বাটী পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। রেবেকার মৃদু মৃদু বচন বিন্যাসে, সকলে মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত হইয়া হইয়া গৃহকর্তীর গৃহসজ্জা ও সেই সুসজ্জিত গৃহের অধিশ্বরী মিসেস, বােসের রূপের ছটা উপভােগ করিতে লাগিল। হায় হতভাগ্য আলােকনাথ! তুমি ব্যারিষ্টার হইলে কি হইবে। দূর দৃষ্ট তােমার তাই গৃহে এমন রূপের রাণী সুন্দরী পত্নীকে ফেলিয়া স্বদেশ উদ্ধার সাধনে ঘুরিয়া মরিতেছ? গ হাসনুর প্রাণ মাতান সুবাস, ইলেটাকের তীব্র জ্যোতিঃ, সুন্দরী তরুণীদের চটুল হাস্য পরিহাসে রেবেকার প্রকাণ্ড হলখানি সুরভিময়, সমুজ্জ্বল, গীতি মুখরিত হইয়া উঠিল। আছে সবই গাে, নাই কেবল যাহার বড় সাধের সাজানাে গৃহ, যাহার সর্বস্ব--সেই আলােক, আর নাই শান্ত শ্ৰীসম্পন্না শ্যামলা নম ভাবা ফাল্গুনী। কেন জানিনা••আজ রেবেকার স্ফুর্তি শতধারে উশ্রী প্রপাতের ন্যায় ঝরিয়া পড়িতেছিল। শুভ্রবেশ-পরিহিতা নেলির যে এ সমস্ত ভাল লাগিতেছিল তাহা নয়। সে রেবেকার এতদূর বাড়া- বাড়ি দেখিয়া মনে মনে বিরক্ত স্তম্ভিত হইয়া উঠিতেছিল। কি একটা, দারুণ লজ্জা, ঘৃণায় নেলি শিহরিয়া উঠিল । ছিঃ ছিঃ ছিঃ—তাহার বাল্যের সহচরী, আলােকের পরিণীতা

দেশবন্ধু
পত্নী রেবেকা, এ যে তাহার আত্মসম্মান পৰ্য্যন্ত বিসর্জন দিতে
বসিয়াছে, সামান্য বিলাসপ্রিয়া স্ত্রীলােকের ন্যায়। আলােক ও
ফানীর গৃহত্যাগের কারণ শুনিয়া নেলি একেবারেই সন্তুষ্ট
হইতে পারে নাই...যতদূর হইবে রেবেকা ভাবিয়াছিল নিজের
মন দিয়া। আলােকের অবস্থা স্মরণ করিতেই, কি জানি, কেন
অকারণে নেলির বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। বাম হস্তে বুকটা
চাপিয়া মনের এই চাঞ্চল্য ঘুচাইবার মানসে সে ধীরে ধীরে
আসিয়া দাড়াইল-যেখানে রেবেকা গাঢ় নীল রঙের সাড়ী
পরিয়া অর্গেনের সহিত নিজের মােহন গলার সুর মিলাইয়া
গাহিতেছিল--
“ওহে সুন্দর, মম গৃহে আজি পরমােৎসব রাতি,
আমি রেখেছি কনক মন্দিরে কনকাসন পাতি।”
রেবেকার অসংখ্য স্তাবক দলের প্রশংসার মৃদুগুঞ্জন গান
ছাপাইয়া উর্ধে উঠিল। প্রশংসা গর্বিতা রেবেকার সুরের লহরী
বিচিত্র মালায় প্রবাহিত হইতে লাগিল। নেলির এক মুহূর্তও
তথায় দাড়াইতে অসহ্য বােধ হইতে লাগিল। টলিতে টলিতে
নেলি একটা কৃত্রিম লতামণ্ডিত থামের পরে মাথা রাখিয়া
নষ্পলক নেত্রে নিস্তব্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিল। ভাবিল,
আলােক!
তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের সভ্যতার আবরণ
তলে এ কি হীন কদৰ্য্য মুৰ্ত্তি লুকান ছিল। এই সমাজেরই
ఆ

দেশবন্ধু বুকের পরে দাড়াইয়া সভ্যতার মুখােস পরিয়া এমনি করিয়া কুৎসিৎ অভিনয় করিয়া যাইবে! অথচ কেহ ইহাকে একটি কথাও বলিতে পারিবে না? বা সমাজে এ যে চলিত হইয়া গিয়াছে! “অতিথির সম্মানের জন্য তাহার সম্মুখে বাহির হওয়া অবশ্য কর্তব্য...অতিথির মনস্তুষ্টির নিমিত্ত দুই একটা গান, তা গাহিলেই বা দোষ কি।” এই সমস্ত বলিয়া কহিয়া হিন্দুনারীকে তার গৃহাশ্রম হইতে বাহির করিয়া “এডুকেটেড” করার ফল যে কতদূর বিষময় হইতে পারে সময় সময় এটুকু প্রত্যেক মানবের বুঝিয়া দেখা উচিত। অবশ্য সকল নারীই কিছু সমান নহে, তবে স্বাধীনতার নাম দিয়া স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দেওয়া কোনমতেই উচিত না। নারী সব্ব বিষয়ে সুশিক্ষিতা হইয়া সৰ্বদিক দেখুন, যথাথই নারীমূর্তিতে প্রকটিত হউক; কিন্তু দোহাই কয়েকটি বাজে নভেলের নায়িকা সাজিয়া সমাজের সংসারের সর্বনাশ করিয়া বেড়াইলে এ ভারতের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী ! অসহ্য! নেলির দেখিয়া দেখিয়া অসহনীয় বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। এই সমস্ত বিদেশীয় পরিচ্ছদে কালাে অঙ্গ ঢাকা বাঙ্গালী সাহেবদিগের প্রতি নেলির চিত্ত আজি সহসা বিমুখ হইয়া উঠিল। ক্ষণেকের তরে সে কল্পনায় অমলের দেশীয় বস্তু শােভিত দেবকান্তি ইহাদের পার্শ্বে আনিয়া উপস্থিত করাইতেই নেলির দেশবন্ধু মন বলিল-“না, না। বিবেক বলিল—না, না, সমস্ত দেহের শিথিল কলকজাগুলিও নড়িয়া চড়িয়া বলিয়া উঠিল—“না গাে না কিসে আর কিসে তুলনা।” চিত্তের নিকট দ্বন্দ্বে পাজিতা নেলির শ্রান্ত দেহ দাঁড়াইতে অক্ষম হইল। গৃহের একপাশে একখানি সােফার পরে এলান দেহ এলাইয়া, চোখ মুদিয়া নেলী পড়িয়া রহিল। পাশের রঙ্গীন কাচের টবের কয়েকটি প্রস্ফুটিত নিশিগন্ধার মিষ্ট সুবাস তাহার নাকের কাছ দিয়া দুলিয়া চলিয়া গেল। নিজের মনের এই আকস্মিক ভাব পরিবর্তনে নেলী কেমন একটা অস্বস্তি বােধ করিল । নেলী কেমন কঁপিয়া উঠিল-তাইতােনাঃ পায়ের নীচে মেঝেটা যেন দুলিয়া দুলিয়া উঠিতেছে•••অমল—অমলকেও তো সে এমনি করিয়া প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। সত্য, কিন্তু কেন অমলের প্রতি তার ভালবাসা একবিন্দুও কমিয়া যায় নাই? সে অমলকে এখনও ভালবাসিয়া চলিয়াছে—কেন আজ তাহার বিরহ এমন শাশ্বত হইয়া ফুটিয়া উঠিল। আজ কেন তাহার বঞ্চিত ক্ষুধিত তরুণ হৃদয় পরাণ-প্রিয়র সঙ্গ যাচনা করিতেছে। উন্মনা ভাবে নেলী উঠিয়া বসিল, আবার তাহার দৃষ্টি রেবেকার মুখের পরে পড়িল। ছিঃ কি ঘৃণিত মূর্তি, এতকাল সুরুচির আবরণে অতি সঙ্গোপনে লুকাইয়াছিল । রেবেকার পরিণাম কি ভয়ানক, ভাবিয়া নেলী তাহার জন্য সত্য সত্যই একটা বেদনা উপলব্ধি করিল, ~ দেশবন্ধু আর নিজেকে সে ধন্যবাদ দিল—আর যাহাই হউক না কেন- এ রকম করিয়া পুরুষের লালস-বহ্নিতে পতঙ্গের মত ঝাপ দেয় নাই—তাহাদের লালসাপূর্ণ কামনার মােহে মুগ্ধ হয় নাই—ছিঃ, এতদিন সে পিশাচিনীকে হিতকামিনী ভাবিয়া ভালবাসা দিয়া অবাধে মেলামেশা করিয়াছিল। “জাগরণে যায় বিভাবরী, আমার আঁখি হতে নিল ঘুম কাড়ি।” রেবেকার গানখানি নেলীর কাণে তীক্ষ্ণ শরের ন্যায় ছুটি আসিয়া বিধিল। নেলীর ইচ্ছা হইল সে ছুটিয়া যাইয়া রেবেকা কণ্ঠ চাপিয়া বলে—থা রেবেকা••এইখানেই এ পরিচ্ছদ সমাপ্ত করাে আর মুখ পুড়াইও না—যথেষ্ট হইয়াছে। মিসেস বােসের মুখের প্রতি সতৃষ্ণ নয়নে চাহিয়া মিঃ সরকার, মিঃ লাহিড়ী, মি সেন ইত্যাদি শিক্ষিত নামধারী ব্যক্তিগণ তৃষিত হৃদয়ে বসিয়া আছে। হায় হতভাগ্য অপরিণামদর্শী যুবকের দল ভাবিয়াছ ঐ রঙীন প্রজাপতিকে ধরিয়া ফাঁদে ফেলিবে তােমরাই ঘুরিয়া মরিবে একবিন্দু করুণার প্রত্যাশী হইয়া—পাইবে না একবিন্দুও। বড় বিচিত্র এই নারীর হৃদয়। সে নিজের স্বামীকে স্বেচ্ছায় বিতাড়িত করিয়া বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত হইয়া আপনাকে সৌভাগ্যবতী মনে করিতেছে ! ধিক্ রেবেকা !! নেলী উঠিয়া ৯২

দেশবন্ধু
রেবেকার পৃষ্ঠে হাত রাখিল। চমকিতা রেবেকা মুখ তুলিল
অর্ধ সমাপ্ত গান আর্তনাদ করিয়া থামিয়া পড়িল।
“কি নেলী ?”
রেবেকা সবিস্ময়ে চাহিল।
নেলী অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া স্মলিতভাবে বলিল—“বড় মাথা
ধরেছে ভাই। আমার ‘কার’ ঐ বাইরে আছে, দয়া করে
কাউকে বলাে গাড়ী-বারান্দায় আনতে, আমি চললুম।”
“সে কি নেলী, এখনি যাবি? আর একটু বসবি নি?”
নেলী বিরস অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলিল-“না ভাই।”
অগত্যা রেবেকাকে উঠিতে হইল। সকলের সমবেত উৎসুক
আঁখি অপরিচিতার মুখের পরে’ পড়িতেই কী এক পবিত্র দীপ্তিতে
ঝলসাইয়া অপ্রতিভ আঁখির দল নিম্নদৃষ্টি হইল। পাশ কাটাইয়া
নেলী কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেল। সশব্দে হর্ণ দিয়া মােটর
বাহির হইয়া গেল। গাড়ীর মধ্যে অবস্থিত নেলী অবসন্ন হইয়া
পূৰ্ব্ব কথার সমালােচনা করিতে লাগিল।

দেশবন্ধু -আ- “বাবা।” টেবিলে ছড়ানাে কাগজপত্র হইতে মুখ তুলিয়া কন্যাকে গৃহ প্রবিষ্টা হইতে দেখিয়া মিঃ মুখার্জী স্নেহভরাকণ্ঠে বলিলেন- “কে, মা নেলি, এখনি ফিরে এলে ?” “স্থা বাবা আর আমার ভাল লাগলো না”.••সহসা পিতার জানু পরে মুখ রাখিয়া সিক্তকণ্ঠে নেলি বলিল-“হ্যা বাবা, মা কোথায় মারা গেছলেন, এইখানে কি ?” পুরাতন স্মৃতির দ্বার উদঘাটিত হইতে দেখিয়া মিঃ মুখার্জী একটু বিমনা হইয়া কন্যাকে নিকটে টানিয়া বেদনামিশ্রিতকণ্ঠে বলিলেন—“কেন মা,...সে কথা এতদিন পরে তুলছ?” “না, এমনিই জিজ্ঞেস্ কম্•ি••আচ্ছা বাবা, মা কি আপনার এই সমস্ত বিলাতী আদব কায়দায় চলতেন ?” “না মা, তাের মা ছিলেন আদর্শ রমণী•••প্রফেসরের কন্যা ছিল সে, শিক্ষার কোনটাই তার বাকী ছিল না। তবে মনে ১৪ দেশ-বন্ধু বােধ হয় ঘৃণা করতেন কিন্তু মুখ ফুটে কখনাে আমার কোন কাজেই বাধা দ্যায় নি। কেবল মাঝে মাঝে আমার অমিতাচার দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সরে দাঁড়াতে... “বাবা,বাবা...” নেলি ফুপাইয়া কঁদিয়া উঠিল । “কি হয়েছে মা নেলি? মিঃ মুখার্জী নেলির ব্যাকুলতায় কন্যার মস্তকে ধীরে ধীরে হস্তাবমর্ষণ করিতে লাগিলেন। এই মাতৃহীনা মেয়েটিকে তিনি এক দণ্ডের জন্য কঁদিতে দেন নাই। আজ বুঝিলেন না যে তাহার এ কান্না কি কারণে। “বাবা মা যেখানে আগে ছিলেন আমাকে সেইখানে নিয়ে চলুন না ?” “সে কি মা, তুমি সেখানে যাবে, সে বড় খারাপ জায়গা: ম্যালেরিয়া...... “হােক ম্যালেরিয়া সে তত আমাদের জন্মভূমি বাবা, আম আপনার ছেলেবেলার দেশ দেখবো। চলুন না বাবা একবার।” “দূর পাগলী বেটী, যাওয়া বললেই কি যাওয়া হয়, সেখান- কার ঘর দোর সব সংস্কারের অভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। দাঁড় মা, ম্যানেজারকে একখানা চিঠি দি—তিনি সব সারিয়ে বাসের উপযােগী করে দিন তারপর যাওয়া যাবেন।”

দেশ-বন্ধু
“না বাবা, আমি সেই ভাঙ্গা বাড়ীই দেখবাে, আমাকে না
নিয়ে গেলে আপনাকে আজ সারারাতই জ্বালাতন করব।”
কন্যার এই দেশপ্রীতি দেখিয়া মিঃ মুখার্জী সন্তুষ্টচিত্তে বলিলেন
-“বেশ তাে মা, তা হলে কবে যেতে চাও ?”
“আমি কালই যাব।”
“কালই যাবে—অসম্ভব!”
“কেন অসম্ভব বাবা?”
সমস্ত গুছােতেও তো অন্ততঃ একটা দিন সময় চাই।”
নেলি মাথা নাড়িয়া বলিল—“কেন, জিনিষপত্রে দরকার নেই
বাবা। দরকার হলে সেখানকার জিনিষেই চলবে, আমার আর
একতিল এখানে ভাল লাগছে না। বলুন না বাবা, তা হলে
কাল যাবেন কিনা ?”
“যাব মা নিশ্চয়। তােমার মনের এই পরিবর্তনে আমি বড়
সুখী হয়েছি: নেলি এইটি যদি কিছুদিন আগে হত।” মিঃ
মুখার্জীর বুকের ভিতর কি একটা ব্যথা ক্রমাগত পীড়ন
করিতেছিল।
“কি মা?”
নেলি ক্ষণকাল থামিয়া বলিল—“বাবা সুনীতি আমার নাম
কে রেখেছিল ?”

দেশবন্ধু
“তোমার মা।”
“মা! তবে আপনি আমার নাম নেলি রাখলেন কেন ?”
“নেলি আমি ভেবেছিলুম কি জানিস, যে তাের মায়ের কাজে
সকল বিষয়ে বাধা দেব। কিন্তু তােমার নাম নেলি রাখতেই
সে আর ভুলেও তােমাকে সুনীতি নামে ডাকে নি, দরকার
পড়লে সে খুকী বলে সেরে নিতে। তােমার মাকে অমল বড়
ভালবাসত..তাই সে বিলেত হতে এসেই তােমাকে ঐ নামে
প্রথমে অভিহিত করে।”
অন্তর্বেদনায় নেলির বুক মােচড়াইয়া চোখ ফাটিয়া জল
ঝরিল। মিঃ মুখাজ্জী নেলির মাথা কোলে টানিয়া ব্যথিতভাবে
বলিলেন--“অনেক রাত হয়েছে মা-যাও শােও গে। কাল
যখনি বলবে...সেইক্ষণেই কল্যাণপুর রওনা হব।
নেলী শিথিল চরণে কম্পিত বক্ষে নিজের কক্ষে যাইয়া...
অলস ক্লান্ত দেহলতা সুকোমল সােফার অঙ্কে অর্পণ করিল।
“আকাশ কাঁদে হতাশ সম
নাই যে ঘুম নয়নে মম
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম
চাই যে বারে বারে।
পাশের বাটী হইতে কে গাহিয়া উঠিল করুণ সুরে। নেলির
অন্তরাত্মাও সমতালে গাহিয়া বলিল—
৯৭

দেশবন্ধু
“অন্তরে আজ কী কলরােল
দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল
হৃদয় মাঝে জাগল পাগল
আজি ভাদরে।”
বাহিরে মেঘের গুরু গুরু গর্জন•••বাতাসের ঝাপটার সাথে
ভেসে আসা•••কাহার গানের এক টুকরা কলি" নেলির ব্যাকুল
অন্তর আজ হাহাকার করিয়া কাঁদিয়া বলিল—কই গাে কই,
যারে চাই আজ, সে কোথায়, কোন্ কল্পলােকে • নানা সে নাই,
সে নাই গাে।” টলিয়া টলিয়া উঠিয়া পাশের ঘরে কপাট
ঠেলিয়া নেলি ডাকিল—“লখিয়া ?”
এক ডাকে ঘুম ভাঙ্গা লখিয়ার অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল।
ধড়মড়িয়া উঠিয়া নিদ্রা-জড়িতকণ্ঠে লখিয়া বলিল-“কি
দিদিমণি ?”
কপাটটা দুই হাতে চাপিয়া ব্যথা কাতরম্বরে নেলি বলিল—
আয় না লখিয়া•••একটু আমার ঘরে বসবি।
“চল দিদিমণি, ভয় করছে বুঝি•••আহা একলাটি, অমন বয়সে
আমরাও একলা থাকতে পারতুম না।”
“ভয় কিরে, নাঃ ভয় করবে কেন? একলা সত্যিই ভাল
লাগছে না। হারে লখিয়া তাের শ্বশুর বাড়ী আছে?”
৯৮

দেশবন্ধু
“নেই আবার দিদিমণি, সবই আছে দিদি••বাপের বাড়ী
এলাহাবাদে, শ্বশুর বাড়ী গয়ায়।”
“কে কে আছে সেখানে ?”
“সবই আছে, সােয়ামী আছে, তিনটে ছেলে, দুটো
মেয়ে••••••
নেলি বলিল—“তবে মরতে তুই চাকরী করতে এসেছিস
কেন ?”
“পেটের দায়ে দিদিমণি, এ যে বড় জ্বালা...“লখিয়া গম্ভীর
ভাবে নিঃশ্বাস ফেলিল।
নেলি উৎসুকভাবে বলিল-“মাস গেলে তাে পনের টাকা
মাইনে পাস্তাতে তাের খরচে কুলােয় ?”
লখিয়া ললাটে করাঘাত করিয়া বলিল- “আ পােড়া কপাল
আমার দিদিমণি...আমার একটা পেটের জন্যে কি ভাবি? মাসে
যে দশটাকা করে দেশে পাঠাই।”
“কার কাছে পাঠাস ?”
“কেন সােয়ামীকে ••রুগ্ন আছে সে, কি করব দিদিমণি,
বুড়ােমানুষ একে, তাতে আবার বাতে পঙ্গু, আমি না দিলে
সে খাবে কি করে•••ও কি দিদিমণি, তুমি কাঁদছ কেন?”
নেলি ভাবিল এই অশিক্ষিত নীচজাতিয় রমণী-হৃদয়েও কী
গভীর স্বামীভক্তি•••তাহার চোখে করুণার অশ্রু আসিতেছিল।

দেশবন্ধু বলিল—“দূর, কঁাদব কেন! দেখ লখিয়া, কালকে বাবাকে বলে তাের মাইনে পঁচিশ টাকা করে দেব, তা হলে তাের চলবে তাে! আর কাল তােকে দু' মাসের মাইনে দেব, তুই দেশে চলে যাস। আঃ কী করিস লখিয়া পা ছাড় না..যা যা, কাল যে আমরাও দেশে যাবাে। যা এখন, আমি ঘুমােব।” বিস্ময়-বিমূঢ়া লখিয়াকে একরকম ঠেলিয়াই শয্যায় আসিয়া সে আছড়াইয়া পড়িল। বাহিরে বর্ষার অবিরাম গীতিধ্বনিতে তার চাপা কান্নার অস্ফুট শব্দ মিশাইয়া গেল। আকাশের বুক ভাসাইয়া বাদল ধারা ঝর ঝর করিয়া নিঝুম ধরণীর তাপিত চিত্ত শীতল করিয়া ঝরিতেছিল। ঝমঝমে নিশুত রাত। ষ্টেশনে জনমানবের সাড়াটি নাই। দূরে একটা তেলের ল্যাম্প তৈলাভাবে নিতান্ত, দ্যুতিহীন, নিষ্প্রভ তারার মত টি টিম্‌ করিয়া জ্বলিতেছিল। মধ্যে মধ্যে জলে হাওয়ার এক একটা ঝাপটায় কঁপিয়া কঁপিয়া নিৰ্বাণােম্মুখ হইতেছিল। দূরাগত নীড়হারা ঝিল্লীর অস্পষ্ট করুণ রাগিণী কেমন যেন চাপা কান্নার গুমরাণীর মত শুনাইতেছিল। প্ল্যাট- ফৰ্ম্মের টিনের চাল ভেদ করিয়া অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ধারা ঝরিতেছে। কল্যাণপুর গ্রামখানি যেন অকল্যাণের পূর্ণ মূর্তি ধরিয়া দাড়াইয়া- ছিল। কী একটা অনির্ণীত শঙ্কায় নেলির বুকটা ঘঁাত করিয়া w

দেশবন্ধু
উঠিল । পিতার পাশটিতে দাঁড়াইয়া ভীতিবিহ্বল নেত্রে চারিদিকে
চাহিতেছিল।
“মুখুজ্জ্যে মশাই!”
প্রকৃতির বুকভরা মােরাশী নাশ করিয়া আলাের রেখা
প্রান্তভাগে ফুটিয়া উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে মানব কণ্ঠের সাড়া পাইয়া
নেলি ফিরিল। শ্যাওলা রঙের হাতকাটা সার্ট গায়ে, মােটা
লাল পাড় ধূতি পরণে•••উজ্জ্বল শ্যামকান্তি সম্পন্ন এক যুবকের
দৃষ্টিতে নেলির চঞ্চল দৃষ্টি মিলিল। নেলি লজ্জাজড়িত আঁখি
‘িরাইয়া দূরে ‘সিগন্যালের’ পানে নিবদ্ধ করিল। মিঃ মুখার্জী
বিস্মিত হইয়া বলিলেন—কে......”
“আমি মানস, চিন্‌তে পাচ্ছেন না?”
“ওহহা তুমি হরকুমারের ছেলে মানস, না?”
“আজ্ঞে হ্যা”—মানস মিঃ মুখার্জীর পায়ের ধূলা লইয়া
মিষ্টসুরে বলিল—“ওঃ আজ কতদিন কত মাস পরে আপনার
সঙ্গে দেখা হলাে।
ষ্টেশনে প্রায় পাঁচ ছ’ঘণ্টা লেট’
করে ফেললে, কোথায় লাইন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু আমি
এত করে ম্যানেজারকে চিঠি দিলাম...কিন্তু সেও তাে এলন্য ;
আর দুৰ্যোগ.. “খুব সম্ভব, এই দুর্যোগে তিনি বাড়ী থেকে
বেড়বার অবসর পাননি। আর আজও আমি কেমন অভাবনীয়
ভাবে এখানে এসে পড়লুম—এই ট্রেণটায় আমার এক বন্ধুর
১০১

দেশবন্ধু
=
আসবার কথা ছিল। তাকে আনতে এসে আপনার দেখা মিলে
মিলে গেল.••উঃ আরাে যে চেপে বৃষ্টি আসছে•••আচ্ছা আপনি
আমার ছাতিটা নিন্ বলিয়া মানস নেলিকে লক্ষ্য করিয়া
সন্ত্রমভরা কণ্ঠে বলিল—“কিন্তু উনি
মিঃ মুখার্জী হাসিয়া বলিলেন-“বাঃ মানস আমাকে চিনলে
আর নেলিকে চিনতে পারলে না? উটি যে আমার ছােট মা,
আর তােমার মনে না থাকবারই কথা--কেননা ও যখন এখানে
এসেছিল, তখন খুব ছােট।”
• মানস লজ্জারক্ত মুখখানায় স্নিগ্ধহাসি ফুটাইয়া বলিল—“তবে
আপনি আমার এই ম্যাকিন্টসটা নিন পরে ফেলুন—আমি
একবার দেখে আসি গাড়ী পাওয়া যায় কিনা ?” বলিয়া নিজের
ম্যাকিন্টসটা খুলিয়া নেলির হাতে তুলিয়া মানস দ্রুতপদে সম্মুখে
অগ্রবর্তী হইল। মিঃ মুখার্জী বলিলেন-“আর তুমি নিজে যে
ভিজে গেলে মানস—শােন, শােন...”
প্রবল ঝড়ের শব্দে তাহার কথাগুলি মিলাইয়া গেল। মানস
চক্ষের নিমিষে একটা বাকের মুখে অদৃশ্য হইয়া গেল।
১০২

দেশবন্ধু -নয়- প্রভাতের মুক্ত অরুণ কিরণ চোখে মুখে লাগিতেই নেলির গাঢ় নিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল। দুই হাতে চোখ রগড়াইয়া ফুল্লমনে শয্যার উপরে উঠিয়া বসিল। রেবেকার বাড়ী হইতে আসিয়া পৰ্যন্তু নানারকম দুশ্চিন্তায়, ও কয়দিন তাহার ঘুমই হয় নাই। তাহার পর কালকের সারাদিন ট্রেণ ‘জার্ণি’তে অবসন্ন নেলি অতরাত্রে বাড়ী ফিরিয়া শয্যা আশ্রয় করিতেই শান্তিময়ী সুপ্তির কোমল অঙ্কে নিভাবনায় ঢলিয়া পড়িয়াছিল। আজ এতখানি বেলা অবধি ঘুমাইয়াছে ভাবিয়া ঈষৎ লজ্জিতা নেলি আস্তে আস্তে পা টিপিয়া দ্বার খুলিয়া চওড়া দালানের পরে’ দাড়াইতেই সবিস্ময়ে দেখিল.•তাহার পিতা বহু পূর্বেই উঠিয়া কালকের সেই অচেনা দয়ালু যুবকটীর সহিত গল্প জুড়িয়া দিয়াছেন। সামনে অভুক্ত চায়ের পেয়ালা পড়িয়া রহিয়াছে, বােধহয় এখনও স্পর্শ করেন নাই। একে বেলায় উঠার দরুণ লজ্জা...তাহার উপর একজন অপরিচিত যুবকের সম্মুখে হঠাৎ আসিয়া পড়িল-নেলির মুখের ১০৩

দেশবন্ধু
পরে প্রভাতের অরুণরাগের মত লজ্জার অরুণিমা ছড়াইয়া
পড়িল। পিতা কন্যাকে সম্বােধন করিয়া মেহসিঞ্চিত ভাষায়
বলিলেন— এস মা কালকে তােমার ঘুমের কোন অসুবিধা হয়
নি তাে ?”
আরক্তমুখে নেলি বলিল—“না বাবা-বরঞ্চ সেখানের চেয়ে
কাল এখানে বেশীই ঘুমিয়েছিলাম।”
মানস তাহার সরল চোখ দুইটি নেলির প্রশান্ত চক্ষুর পরে
সমাবেশ করিয়া বেশ পরিচিতের মতনই বলল—“কালকে
এদেশে নূতন এসেছ দিদি.••তাই মশার উৎপাত টের পাওনি
কিন্তু দুচার দিন থাক, দেখবে রাত্তিরে মশার দল কি রকম
‘কনসার্ট’ বাজাতে আরম্ভ কৰ্ব্বে, আর একদণ্ড মশারীর বাইরে
শােবার জো নেই...সেই জন্য প্রতি বছর ম্যালেরিয়াতে দেশটা
উচ্ছন্ন যেতে বসেছে।”
নেলির কাণে মানসের এই স্নেহ সম্বােধন যেন নূতন সুরে
বাজিয়া উঠিল। সে একটু ভয় ব্যাকুলস্বরে বলিল—তাই নাকি
মানসদা ? কিন্তু আজকাল তাে অনেক স্বদেশীর দল এই পল্লী
সংস্কারে মন দিয়েছেন, তারা এ কল্যাণপুরের সংস্কার করছেন
কেন?”
“হ্যা সে চেষ্টাও হচ্ছে বই কি, অমলদা আজকাল পল্লী
সংস্কার, জাতীয়তা উন্নতি লাভাশায় যতটা ঝুকে পড়েছেন,
১০৪

দেশবন্ধু বােধ হয় তার মত স্বার্থত্যাগী কৰ্ম্মঠ, উৎসাহী কর্মী খুবই বিরল। তিনি এদেশে এখনও পৌঁছুতে পাচ্ছেন না; কিন্তু আমাকে প্রতি পএে জানাচ্ছেন—এখানে স্বায়ত্ব শাসন প্রতিষ্ঠা কর, বয়ন বিদ্যা, শিল্পোন্নতি দ্বারা গ্রামে, দেশের অর্থাগমের প্রকৃত পন্থা বলে দাও। হিন্দু মুসলমান মিলে সংঘ গঠন করতাদের প্রত্যেকের কাণে স্বাধীনতা বীজমন্ত্র শুনাও। কিন্তু কাকে শােনাব দিদি বলতে গেছলুম তাতে ফল হয় এই যে নিরক্ষর চাষারা ক্ষেপে উঠল, ভদ্রবাসীরা বললে—“বিপ্লব বাদী রাজদ্রোহীর কথা আমরা মানব না—আমরা রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কৰ্বো না। কিন্তু এটা তারা বুঝছেন না যে রাজা এই ভারতবর্ষের রাজাই থাকুন কিন্তু আমরা নিজেদের স্বাধীনতাটুকুকে পরের হাতে তুলে দেব কেন? বিপ্লব বাধায় কারা ? যাঁরা পরভৃতি, চিরদিন পরাধীন হয়েই থাকতে চান, তাদের কাছেই স্বদেশ সম্বন্ধে বলতে গেলেই বিদ্রোহ বাধিয়ে তুলে, কিন্তু আমরা জানি এ কাজ বিদ্রোহ করে বিরােধ করলে সফল হবে না। কিন্তু সে কথা কয়টি আমরা বুঝলুম—আর সম্প্রদায়ের সকল কর্মী বুঝল না— ফলে কত জায়গায় হাতাহাতি হ’বার উপক্রম পৰ্য্যন্ত হয়ে গ্যাছে। সেই জন্যে আমি আপাততঃ হাল ছেড়ে দিয়েছি। অমলদা’কে লিখে দিয়েছি যে তিনি না এলে, এখানকার সংস্কার কিছুতেই হবে না।”

দেশবন্ধু
মিঃ মুখার্জী উৎসুক ভাবে বলিলেন—“মানস—তুমি কোন্
অমলের কথা বলছ?”
মানস মিঃ মুখার্জীর কথার প্রতিধ্বনি তুলিয়া সহাস্যে বলিল
-“অমলদা’র পরিচয় অমলদা তার অন্য কোন পরিচয় পাই
নি। তবে এইটুকু বলতে পারি যে কেম্বি জ থেকেই আমাদের
পরিচয়ের সূত্রপাত হয়, আমি যে বছর পরীক্ষা দিয়েছি তার
পরের বছর তিনি সিবিল সার্ভিস পরীক্ষা দেন
মুহূর্তে কক্ষের মধ্যে একটা গাঢ় নিস্তব্ধতা আসিয়া দেখা
দিল। মিঃ মুখার্জী একটি সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া
চেয়ারের পরে সােজা হইয়া বসিলেন। আর নেলি আপনাকে
সম্বরিতে গৃহান্তরে আশ্রয় লইল।
শুভ্র থানে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আবরিত করিয়া, মৃণালের
মত দুখানি অলঙ্কার শূন্য হাতে, দুই থালা জল খাবার লইয়া
মিঃ মুখার্জীর বিধবা ভাগিনেয়ী মমতা আসিয়া মৃদুস্বরে ডাকিল
“মামাবাবু ?”
মিঃ মুখার্জী মুখ তুলিয়া বলিলেন-“কি মা মমতা?”
“আপনার জলখাবারের সময় হয়েছে উনি, হাত মুখ ধুয়ে
খেতে বসুন।”
“কি করে জানলে মা যে আমার ক্ষিধে পেয়েছে ?”

দেশবন্ধু
লজ্জাবনত মুখে মমতা বলিল-“এতখানি বেলা গড়িয়ে
পড়লাে—মানুষের পিপাসা পায় না? ও মা! মানসদা যে
অনেকদিন পরে এ পাড়ায় ?
মানস বলিল—“তা জানি মমতা, যে এর জন্যে তােমাকে
কৈফিয়ত দিতে হবে। কিন্তু এ পাড়ায় কেন—এ পাড়া, ও
পাড়া, রায় পাড়া, মুখুয্যে পাড়া, প্রত্যেক পাড়া খুজলেও আমাকে
পেতে না। আমি এখানে ছিলেন না।
“কোথায় গেছলে ?”
“আমি অমলদার কাছে দৌলতপুরে গেছলুম।”
“তুমি গেছলে দৌলতপুরে ।
দৌলতপুরে ! সেখানে তুমি কী কাজ
করলে?”
কেন মমতা, আমার দ্বারায় কি কোন কাজ হয় না মনে
“কি জানি-আমি তাে কেবল জানি, তুমি কেবল বাঁশী
বাজাতেই জান; তােমার মত আত্মভােলা মানুষে যে কোন কাজ
করতে পারে এ আশ্চর্য্য।”
মিঃ মুখার্জী এইবার মমতার কথায় প্রতিবাদ করিয়া
বলিলেন-“না মমতা, মানস বােধ হয় এখন খুব কাজের
লােক হয়েছে••• |”
মমতা মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিল—“ঐ যে ভাল ছেলেটির
১০৭

দেশবন্ধু
কাজের নমুন। দেখুন না। জলখাবার দিলুম, তা উনি আবার
নিজের বাড়ীতে বসে লৌকিকতা করছেন। দেখছেন তাে
সন্দেশ দুটো পাতে ফেলেই জলের গ্লাস মুখে তুলছেন।”
মানস বলিল-“না মমতা বাড়ী থেকে এক দফা খেয়ে
বেরিয়েছি:..আর কখনও খাওয়া যায় ?
তাই তাে, বাড়ীতে তােমার জন্যে কে খাবার তৈরী করে
বসে আছে? তুমি যে আবার নিজের জন্যে জলখাবার তৈরী
করেছ•••ভাল, তবু আজ তােমার মুখে একটা নূতন কথা
শুনলুম।”
মানস মমতার এই স্পষ্ট উত্তরে অপ্রতিভ হইয়া মাথা নত
করিল। মিঃ মুখার্জী মানসকে বলিলেন—“এ কি সত্যি কথা
মানস, বাড়ীতে তােমার কেউ নেই ?”
ম্লানমুখে মানস বলিল-“আত্মীয় স্বজন তাে বহুদিনই
আমাদের পরিত্যাগ করেছেন•••আর বাবাকে বিলেত থেকে
ফিরে এসে আর দেখতে পাই নি..... »
মিঃ মুখার্জী বলিলেন—“কোন জায়গাটায় থাক তুমি বাবা
—অনেকদিন হ’ল আসিনি, সব ভুলে গেছি
মাথা নীচু করিয়া মানস বলিল—“আজ্ঞে পৈতৃক বাড়ীখানা
হাসপাতালের জন্যে ছেড়ে দিয়েছি...এখন থাকি দত্ত পাড়ার
ওদিকে অলকা নদীর ধারে...
১০৮

দেশবন্ধু
“কোথায় মাটীর বাড়ীতে।”
আজ্ঞে হ্যা ”
“বুদ্ধিমান ছােরা, নিজের মাথা রাখবার ঠাইটুকু বিলিয়ে
দিয়ে এখন কুঁড়ে ঘরে আশ্রয় নিয়েছ, এও কি তােমাদের মহাত্মার
আদেশ ?”
“না না মহাত্মার আদেশ হবে কেন? আমার জন্মভূমি
আমি স্ব ইচ্ছায় মাতৃভূমির কাজে লাগিয়েছি, আর একা মানুষ,
অত বড় বাড়ীটায় থাকতে পারা যায় না।”
“তার তত্ত্বাবধান করে কে ?
“কোথায়, হাসপাতালের ?•••তার জন্যে বিশ্বস্ত লােক নিয়ােগ
করেছি—তা ছাড়া আমিও জে দু’বেলা গিয়ে দেখাশুননা
করে আসি। আচ্ছা উঠি এখন জ্যাঠামশায়, বড় বেলা হয়ে
গ্যাছে
মানস উঠিয়া দাঁড়াইল। মিঃ মুখার্জী মানসের হাত ধরিয়া
বলিলেন—“আর তােমায় যেতে দেব না বাবা। মায়ার বাঁধনে
যখন তুমি নিজে হ’তে ধরা দিচ্ছ, তখন তােমার এই বুড়াে
ছেলেকে, আর তােমার ছােট বােনটিকে দেখতে হবে। তা
হলে তােমার জিনিষপত্র নিয়ে এস এইখানে ?”
মানস এই প্রস্তাবে চঞ্চল হইয়া অনুনয়ের সুরে বলিল—“এ
আমার বড় সৌভাগ্য জ্যাঠামশায়, কিন্তু ঐ বিষয়ে আমাকে মাফ

দেশবন্ধু
করতে হবে। আমার একলা থাকতে কোন কষ্ট হয় না•••আর
এতদিন যখন কেটে গ্যাছে, তখন
মিঃ মুখার্জী ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলিলেন-“আচ্ছা তা হলে আজ
রাত্তিরে এখানে খেয়ে যেও...কেমন, আমার এই কথাটা তত
রাখবে?”
ব্যস্ত হইয়া মানস বলিল—“অমন করে বলবেন না জ্যাঠা-
মশায়, এ আপনার অনুরােধ নয়, মেহের আদেশ বলে আমি
মাথা পেতে নিলুম..
১১০

দেশবন্ধু
মহা রহস্যের অন্তরালে বসিয়া বিশ্ব নিয়ন্তা যে কখন কাহার
মনের পরিবর্তন সাধিত করেন—তাহ কি কেহ বলিতে
পারে?•••
বিস্ময় ও বেদনার প্রথম আঘাতটা সম্বরণ করিতে না পারিয়া
নেলি চঞ্চল পদে ছুটিয়া আসিয়া নির্জন ছাদের তপ্ত শানের
উপর লুটাইয়া পড়িল।••••••
অমল, অমল, তাহারই অমল•••তাহারই অনাদৃত প্রিয়তম,
অমলের প্রশংসা আজ লােকের মুখে ধরিতেছে না!...
তাহারই নিভৃত অন্তরের চির বাঞ্ছিত দেবতা নিজের স্বার্থ,
সুখ, ঐশ্বৰ্য্য তুচ্ছ করিয়া কামনা শূন্য অন্তরে দেশের সেবায়
আপনাকে নিঃশেষে বিলাইয়া দিয়াছে।
জ্ঞানে শিক্ষায়, হৃদয়াকুলতায় তাহার অমল যে, দশের
বুকে, সব হারাদের প্রাণের মাঝে আজ আসন পাতিয়া
বসিয়াছে।
ওরে অভাগী কি জিনিষ তুই পাইয়াছিলি
১১১

দেশবন্ধু
আর কী জিনিষ তুই স্বেচ্ছায় বিলাইয়া দিয়াছি-একবার
ভাবিলি না?••••••বদ্ধ দুয়ারের একটী পাশে দাঁড়াইয়া ভিখারী
রিক্ত হাত দু’খানি মেলিয়া পাষাণ প্রতিমার কাছে এক বিন্দু
প্রেম ভিক্ষা করিয়াছিল—কিন্তু পাইল কী? তীব্র করুণ বেদনা,
নির্মম প্রত্যাখ্যান, আর নিষ্ফল আশার অনন্ত জ্বালা।
উঃ......
‘শুভ্র’ নিটোল কপােল বহিয়া টপ টপ করিয়া মুক্তা ফল
ঝরিল।•••
অনুতাপ, অনুতাপ••অতীতের সকল কথা স্মরণ করিয়া
নেলির কোমল
কোমল অন্তরে অনুতাপের প্রখর অগ্নি জ্বলিয়া
উঠিল।
“ওগাে, ফিরিয়া এস, ফিরিয়া এস••আমার সুখের স্বপন
ঘেরা চির শক্তিময়ী অতীত—ফিরিয়া এস.••জীবনের ভুলটাকে
সংশােধন করিয়া লই.•••••কন্তু, না না—দরকার নাই, সে
ভালবাসা পাইয়াছিল—ভালবাসিয়াও ছিল,•••তবু নিজের সামান্য
স্বার্থের লােভটুকু ত্যাগ করিতে পারে নাই, হৃদয়হীনার মত
অকরুণ হইয়া সে অমলের প্রেমপূর্ণ অন্তরে আঘাত করিয়া
যে অপরাধের বােঝাটুকু মাথায় তুলিয়া লইয়াছে’-আজ
সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইলে যে তাহাকে বর্তমানের
সহিত যুঝিতে হইবে• মর্ম বেদনায় বুক ফাটিয়া চোখে
১১২

দেশবন্ধু
জল আসিলেও, বাহিরে তাহাকে সবার সাথে হাসিতে হইবে।
তাই ভাল—প্রভু, তাই ভাল, এই শাস্তির অনলে নেলীর গর্বিত
অন্তরকে দহন করিয়া নিৰ্ম্মল করিয়া তােল•••এই না পাওয়ার
গভীর বেদনার মধ্য দিয়া সে তাহার হারানাে জীবন টীকে
খুঁজিয়া লউক।
অন্তরের দুব্বলতাকে বলে বাড়িয়া নেলি চোখ মুছিয়া
উঠিয়া দাড়াইল।
ইচ্ছা করিলে সেও কি অমলের
মত নিঃস্বার্থ হইতে
পারে না? পারে, পারে—নারী বলিয়া সে কি সাধারণ নারীদের
মত দুৰ্বলতাটাকেই প্রশ্রয় দিতে থাকিবে। অতীত জীবনের
সুখের স্মৃতি স্মরণ করিয়া বেদনার নিঃশ্বাস ফেলিয়া শুধু চোখের
জলকে সম্বল করিয়া জীবনের দীর্ঘ পথটা অতিক্রম করিবে ?
, না—সেও অমলুকে দেখাইবে—পুরুষের মত অবহেলে
সকল ঝঞ্চা বিপদ মাথায় তুলিয়া লইতে পারে কি না, সে-শক্তি
তার আছে কি-না।
নেলি টলিতে টলিতে নামিয়া আসিয়া রান্নাঘরে মমতার
বুকের উপর ঝাপাইয়া পড়িয়া ঋলিতকণ্ঠে ডাকিল—“মমতা
দি?
মমতা রান্নাঘরে তাহার হবিষ্য চড়াইবার জন্য উনানে আঁচ
দিতেছিল। সহসা এই ধূলি-ধূমের মধ্যে অসহ্তা নেলিকে
১১৩

দেশবন্ধু ছুটিয়া আসিতে সে বিস্মিত-কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—কি ভাই নেলি ?—এমন সময়... মমতাকে বাধা দিয়া নেলি চঞ্চলক বলিল—“সময়ের মূল্য বােঝবার দিন আর আমার নেই ভাই—এসেছি তােমার কাছে একটা জিনিষ ভিক্ষে করতে দেবে কি ? নেলির কণ্ঠ সহসা রুদ্ধ হইয়া আসিল। মমতা অবাক হইয়া নেলীর মুখের পানে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে চাহিল।••• নেলি নত মুখে অশ্রুসিক্তকণ্ঠে বলিল—তােমার মত ঐ রকম মােটা শাড়ী একখানা আমাকে দিতে পার মমতা- দি’? স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া মমতা মৃদু হাসিয়া বলিল-ওঃ এই! আমি মনে করি না-জানি কি !•••কিন্তু এত মােটা কাপড় নিয়ে তুই কি করবি ভাই?”... ব্যথা-কাতর চোখ দুইটী তুলিয়া নেলি উত্তেজিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল- “পরব—পর মমতা দি’—কী অমন করে তাকিয়ে রয়েছ যে ?—খুব আশ্চর্য হয়ে হয়ে গেছ নয়?—আশ্চর্যের কথাই বটে, আমিও নিজে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে এত শীগগীর আমি আমার জীবনের ভুলটাকে, ক্ষতিটাকে লক্ষ্য করলুম কি করে। ১১৪

দেশবন্ধু
মমতা দি'—এতদিন অন্ধের মত পরশ
মত পরশ মানিককে পায়ে
ঠেলে হাতড়ে হাতড়ে পথ চলে এসেছি আজ দৃষ্টি লাভ করে
দেখলুম—আমারি অবহেলায় সে কোথায় লুকিয়ে পড়েছে।
আজ তাকে ফিরে পেতে হলে কঠিন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে...
দিদি, ভাই...আমাকেও অমনি তােমাদের মতই সাধারণ ভাবে
থাকতে দাও।•••দেখি, যদি নুতন জীবন লাভ করে...”
উদ্বেলিত অঞ চাপিতে না পরিয়া নেলি মুখ ফিরাইল।•••
এলাে চুলটা বা হতে জড়াইয়া মমতা সেই কালী মাখা
হাতেই নেলিকে বুকের ভিতর টানিয়া লইল।•••
আনন্দের প্রথম আবেগটা কাটিয়া গেলে মমতা সিক্তকণ্ঠে
বলিল—“সুমতি হােক তাের নেলিমাসীমার কত আদরের
বড় আশার ধন তুই...মাসীমার মতই তাের অন্তর নির্মল হক...
দৃঢ় হােক•••আর, আর আশীর্বাদ করি—যা হারিয়েছি,তা
যেন তাের একনিষ্ট সাধনায় আবার তাের বুকের মাঝে ফিরে
আসে—তার পাশে দাঁড়াবার যােগ্যতা তুই যেন লাভ করতে
পারিস—দিদি আমার, বােনটী আমার, এর বেশী আশীর্বাদ
আর ত’ আমি জানিনে ভাই।”
মমতার দুইটী নয়ন জলভারে আনত হইয়া পড়িল।
১১৫

দেশবন্ধু দৌলতপুর- আমার নীলা আজ মানসের একখানা চিঠি পেয়েছি। তার ভেতর দিয়ে তােমার যেটুকু পরিচয় পেয়েছি—সেইটুকুর জোরেই আজ তােমাকে আমার নীলা বলে ডাকতে পারলুম-জানিনা তুমি আমার অসংখ্য অপরাধের ভেতরে এটুকুকে ক্ষমার চোখে দেখবে কি না।••• মানসকে আমি কোনদিন অবিশ্বাস করিনি—তবু আজ তােমায় জিজ্ঞেস করছি নীলা-এ কী সত্য? সত্যিই কি তােমার নব-জন্ম সুরু হয়েছে ? তুমি হয়ত জানােনা, তােমার নির্মম উপেক্ষায় আমার বুকের মাঝখানটা কি রকম নৈরাশ্যের প্রবল ঘায়ে ভেঙ্গে পড়েছিল। আঘাতের বেদনায় প্রাণ যখন আমার একটা কিছুকে আঁকড়ে ধরবার জন্যে অধীর হয়ে উঠেছিল—সেই সময় প্রাণের দ্বারে বেজে উঠেছিল—লক্ষ লক্ষ দেশবাসীর দাসত্বের লোহ শৃঙ্খলের শব্দ। চোখ মেলে চেয়ে দেখলুম-দাসত্বের পায়ে আত্মবিক্রয় করবার জন্যে তারা দলে দলে মরণের পথে এগিয়ে চলেছে••• নিজের বেদনা ভুলে গিয়ে নিখিলের বেদনা দুর করাই তখন ১১৬

দেশবন্ধু
আমার কর্তব্য হয়ে দাড়াল।•••প্রাণ চাইল—দেশের মুক্তি•••
দেশবাসীর স্বাধীনতা! তারই উন্মাদনায় জীবনের সকল
প্রলােভন কামনা আলস্য স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কৰ্ম্মসাগরে ঝাঁপ
দিয়েছি। নিজের জীবন দিয়েও যদি একজন দেশবাসীর অভাব
দূর করতে পারি—সেই হ’ল আমার চরম উদ্দেশ্য । কাজ চাই,
শুধু কাজ••সত্যিকারের কাজের মধ্যেই আমি জীবনকে ডুবিয়ে
দিতে চাই। এই বিরামবিহীন অবিশ্রান্ত কৰ্ম্মেৰ মাঝখানেও
যে তােমায় আমি ভুলতে পারিনে নীলা ! তােমার কাছ হতে
আজ আমি অনেক, অনেক দূরে রয়েছি সত্য...কিন্তু আমার
মনের মাঝে এই দূরত্বের ব্যবধানটুকু একেবারেই নেই..বুকের
পটে যে মুখখানি এঁকে নিয়ে এসেছি—আমরণ সে মুখখানি
এমনই উজ্জ্বল, এমনই মধুর হয়ে ফুটে থাকবে।
জানিনা—তুমি আমার এ ভালবাসার প্রলাপ শুনে কী
ভাবছ?
তােমার কাছে আমার এই শেষ চিঠি নীলা,...আর কখনো
তােমাকে বিরক্ত করতে আসব না।•••সহরের বাইরে কাঙাল
ভাই বােনদের কষ্ট দেখলে চোখ ফেটে জল আসে-তারাও
মানুষ, আমরাও মানুষ, শুধু পার্থক্য এই তারা অশিক্ষিত...তার
মূখ...তারা দরিদ্র। আমি এদের মানুষ করে গড়ে তুলব,
নীলা,•••এই আমার পণ।•••
১১৭

উঠিল।
দেশবন্ধু
দুঃখ করােনা,•••দেশের দুঃখ দুর করে যদি কোনদিন ‘মানুষ’
হয়ে ফিরতে পারি...তখন-যাক্•••
আমার শেষ অনুরােধ, আমার পানে গকিয়ে নিজের
জীবনটাকে নষ্ট না করে ভগবানের পানে তাকিয়ে পথ চলাে
তাহলেই তােমার মনের অশান্তি ঘুচে যাবে।
নীল, আশীৰ্বাদ করি-তােমার মনের আশা সফল হােক।
হতভাগ্য অমল ।
নেলীর ব্যথিত বুকের অন্তরে সঞ্চিত রুদ্ধ অশ্রুরাশি উথলিয়া
অমলের চিঠিখানি সযত্নে বুকের ভিতর চাপিয়া রুদ্ধকণ্ঠে
বলিয়া উঠিল—
তাই হােক প্রিয়তম, তাই হােক। তুমি আমার কাছ হইতে
দূরেই সরিয়া যাও। দেশের বন্ধু তুমি.••দরিদ্রের আনন্দ ধন,
সবার প্রাণে ব্যথা দিয়া তােমাকে আমি নিজের কাছে ফিরিয়া
পাইতে চাহিনা, এতদিন ভালবাসার যথার্থ মৰ্ম্ম বুঝিতে পারি নাই
-তাই নিজের স্বার্থর দিকে নজর দিয়া সবাইকে বঞ্চিত করিয়া
তােমাকে নিজস্ব করিতে গিয়াছিলাম। আজ আমার অনেক
দিনের মােহ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। দেবতা আমার, আমার সকল দর্প
এক নিমিষে পথের ধূলায় লুটিয়া পড়িয়াছে। আজ তােমাকে
আমি দেবতার আসনে বসাইয়া অন্তরের প্রেম ঢালিয়া পূজা
করিব। এই দেশ, এই বাড়ী—এরই বুকের মাঝে তুমি বাড়িয়া
১১৮

দেশবন্ধু
উঠিয়াছিলে••এই বাড়ী আমার মহাতীর্থ...ইহারই মাটীতে, শেষ
জীবনে শুইয়াও আমি তােমার পায়ের ধূলার জন্য অপেক্ষা করিব।
এতেই আমার সুখ এতেই আমার চরম তৃপ্তি। ওগাে, আর
কিছু চাহিনা।
নেলীর চোখের অজস্র উষ্ণ-ধারায় অমলের পত্রখানি সিক্ত
হইয়া উঠিল।...ধীরে ধীরে তার আরক্ত কম্পিত অধর পুট
দুইখানি অমলের নামের তিনটী অক্ষরের পরে নত হইয়া পড়িল।
তখন হেমন্তের কুহেলী-অঞ্চলের অন্তরালে প্রতিপদের ক্ষীণ
চাদখানি মেঘের আড়াল ঠেলিয়া উকি মারিতেছিল।••••••
১১৯

মধু মিলন রাজপুত বীনা ষষ্ঠ সংস্করণ —মূতন পুস্তকের তালিকা ( মিলন মধুর উপন্যাস) পঞ্চম সংস্করণ মাহমেয়ে (হস্যময় উপন্যাস) তৃতীয় সংস্করণ সতীলক্ষ্মী (পল্লীচিত্র ) চতুর্থ সংস্করণ মাধব মন্দির ( উপন্যাস। হিন্দু-সতী ( সতীর তেজ ) (ঐতিহাসিক উপন্যাস তৃতীয় সংস্করণ মতিঝিল স্ত্রীর-চিঠি (দাম্পত্য পত্রাবলী) দ্বিতীয় সংস্করণ ব্যথার শেষ (নারী জাগরণ ) তৃতীয় সংস্করণ ( চরকা ও অহিংস অসহযােগ মূলক উপন্যাস) হত্যা-বিভীষিকা (রােমাঞ্চকর ডিটেকটিভ উপন্যাস) চতুর্থ সংস্করণ রুদ্ধ আবেগ ( আধুনিক সভ্যতামূলক উপন্যাস) তৃতীয় সংস্করণ সইয়ের বর (স্ত্রী পাঠউপন্যাস) চতুর্থ সংস্করণ খুনিকে খুন (ডিটেকটিভ উপন্যাস ) দ্বিতীয় সংস্করণ প্রেমের স্বপন (মিলনান্তক উপন্যাস) হীরাঝিল ঐতিহাসিক উপন্যাস) দ্বিতীয় সংস্করণ ( মিলন মধুর উপন্যাস) তৃতীয় সংস্করণ গৃহ-ক্ষ্মী দাম্পত্য জীবন প্রত্যেক পুস্তকখানি সুন্দর বহুমূল্য এ্যান্টিক কাগজে মুদ্রিত ও সুন্দর সুন্দর রঙ্গিন চিত্রে শোভিত।

বাজিল দুন্দুভি-ঘােযিল শুভ বার্তা মন্দ্রে মন্দ্রে।
গাহিল বাঙ্গালী-বাণীর জয়গান ছন্দে ছন্দে।
স্বপ্ন আজ সফল হইল-সাধনা আজ সার্থক হইল।
শ্রীকৃষ্ণ লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠান পূত-পাঠকের আশা আজ পূর্ণ হইল।
সাহিত্য-জগতে সৰ্ব্বজন নন্দিত বন্দিত
মানসী সম্পাদক সাহিত্যের
শ্ৰীযুক্ত প্রভাতকুমার মুখােপাধ্যায়
মহাশয়ের প্রতিভা-সঞ্চারিত-খেনী-সম্পাতে গঠিত
প্রতিমা
সাহিত্য দেবীর আশীষধারী পূজকের সমস্ত প্রতিভাললাকে উজ্জলিতা
শােভা-সম্পদে-সৌন্দর্য্যে-মাধুর্যে মণ্ডিত
-প্রতিমা
সত্যই অনুপম-অতুলন—অতি মনােম।
ঐকৃষ্ণ লাইব্রেরী হইতে চাকচিত্রে চিত্রিত হইয়া অচিরে বাংলার
আকাশ বাতাস পুলকাঞ্চিত করিয়া প্রকটিত হইবে।
পূণ্য-পুলকময়ী, স্বর্গালােকময়ী প্রভাত-প্রতিভালােক-প্রদীপ্তা এ
প্রতিমা
বাংলার শুদ্ধাচারিণী-দেবীরূপিণী ললনাগণ কর্তৃক—বাঙ্গালীর
পূণ্য-মন্দির সম অন্তঃপুরে প্রতিষ্ঠিত হােক—বরিত হােক—
ঘরে ঘরে প্রতিমা আরতি হােক।

তরুণ-সাহিত্যিক প্রবােধচন্দ্র মৈত্র, এম-এ, প্রণীত সাঁঝের পুৱবী গ্রন্থকার তার সাবের পূরবী নিয়ে বঙ্গবাণীর মন্দিরে নৈবেদ্য দিতে এয়েছেন। দুঃখ-ভরা বেদনার বাণী, বাংলা মায়ের পল্লীর এক নিখুত ছবি, যুগের নানা সমস্যা, লেবার ক্যাপিট্যালে সংগ্রাম, ধণী শ্রমিকের বিবাদ, অসহযােগের ভাবপ্লাবন, নূতন ভাবে পূরবী রাগিণীতে বেজে উঠেছে। -শরৎচন্দ্রের পথের দাবীর- = পরে এমন নূতন সমস্যা নিয়ে আর কোন উপন্যাস বের হয়নি। অপূৰ্ব্ব মনস্তত্বের বিশ্লেষণ, নরনারীর চিরন্তন বুভুক্ষা পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে। নবীন পূজারী প্রাণের দরদ দিয়ে পূজা সার্থক করার চেষ্টা করেছেন, আপনারা কি সে পূজায়, সে মাতৃষজ্ঞে, সাহায্য করবেন না?

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Desh-bandhu

Author
Das,ashalata
Title
Desh-bandhu
File name
Desh-bandhu
Text
OCR done
Citation
1928
Published
2010/04/12
Publisher
Styendrakumar Shil, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
128
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Novel
Keywords
Das,Ashalata
DLI number
511020
Barcode
4990010018207.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
o7VN9DELMYG
Download PDF

Desh-bandhu