Makardah Saraswat Library, Howrah

Swapno-sudha Vol. 1, Ed. 1st

Miya, Sardar Abdul Hamid · 2009/08/18

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্বপ্ন-সুধা
প্রথম ভাগ
মশিদপুর আই, জে, মাদ্রাসার ভূতপূৰ্ব হেডমাষ্টার
সরদার আব্দুল হামিদ মিঞা এম, এ (ইক প্লাকড়,
Il rights reserved ]
[ মূল্য এক টাকা

মসাত্মাৎ এম, এম, বেগম সাং দেওপুরা ; পােঃ মহনপুর জিলা-মালদহ প্রথম সংস্করণ ১৩৪৭ প্রিন্টার- শীতারাপদ ব্যানার্জী দি মডেল লিথাে এণ্ড প্রিন্টিং ওয়ার্কস ৬১এ, বৈঠকখানা রােড, কলিকাতা উপহার

No text on this page.

সূচীপত্র
বিষয়
छ।
১। গতি
১-৭
২। ফকির
৫ ০ ০
৩। মৃত্যু
২১-৩২
৪। পাগল
•••
•••
এঞ্জিন
০ ০ ০

No text on this page.

ভূমিকা
---
আমার মালদহের হামিদ ছাপানাে লেখাগুলা লইয়া হাজির।
অতএব একটা কিছু লিখিতেই হইবে।
পড়িতে লাগিলাম। বেশ ভাল লাগিল। ঝর-ঝরে বাংলা
চিন্তায় গোঁজামিল নাই। বরং সব কিছুই খােল প্রাণের খেয়াল,
বুজরুকিহীন ও সুস্পষ্টো।
যে কোন পাঠকেরই মেজাজে তাজা তাজা চিন্তাগুলা কিছু
কিছু দাগ বসাইতে পারিবে। হামিদ ছােকরা, কিন্তু এই
বয়সেই দুনিয়ার গভীর গভীর কথাগুলা লইয়া মগজ খেলাইতে
অভ্যস্ত। মগজটা খেলেও বেশ দরদের সহিত। দরদওয়ালা
লেখকের আবহাওয়ায় আসিলে ছেলে-ছােকরাদের মরমে কিছু-না-
কিছু ঘা লাগিবে। প্রবীণেরাও বেশ কিছু পুলকিত হইতে
পারিবেন।
হামিদ যখন তখন স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নগুলাকে ভাষায় রূপ
দিয়া হামিদ লােকজনের নিকট নিজের আত্মাটাকে খুলিয়া
ধরিয়াছেন। এই আত্মার ভিতরটায় প্রবেশ করিবার সুযােগ
পাইয়া পাঠকের আনন্দ পাইবেন বিশ্বাস করি।
কলিকাতা-
২৪শে এপ্রিল, ১৯৪০
(ভাঃ) বিনয় সরকার

No text on this page.

উৎসর্গ.
ঋণের কণামাত্র পরিশােধ করিতে আমি অক্ষম,
আম্মাজানের ভগ্নস্বাস্থ্যের
দরুণ যিনি আমাকে শৈশবে
পুত্ৰাধিক স্নেহে নিজ গৃহে লালন পালন করিয়াছেন এবং
আজীবন আমাদের শুভ কামনা করিয়া গিয়াছেন আমার পরম
শ্রদ্ধার পাত্রী সেই মরহুমা নানী সাহেবাণীর পবিত্র স্মৃতির
উদ্দেশে এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি উৎসর্গ করিলাম।
ঘুঘুডাঙ্গা
১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৩
আব্দল হামিদ

No text on this page.

নিবেদন : পাঠ্যাবস্থায় পুস্তক প্রকাশ করা যে কিরূপ কষ্টকর তাহা ভুক্তভােগী না হইলে বুঝা যায় না। প্রথমতঃ অভিজ্ঞতার অভাবে পুস্তক মুদ্রন ব্যাপারে বহু অসুবিধা ভােগ করিতে হয় : দ্বিতীয়তঃ সে পুস্তক বিক্রয়ের এজেন্ট পাওয়া যায় না। উপরন্তু নূতনত্বের গন্ধ থাকে বলিয়া সাধারণতঃ কেহ নূতন লেখকের বই পড়িতে চান না। এই সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও যাহাদের উৎসাহে স্বপ্ন-সুধা প্রকাশ করা সম্ভবপর হইয়াছে, তাহাদিগকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি। আমাদের সামাজিক জীবনের প্রাণ হইতেছে সৎগ্রন্থ। বর্তমানে পাশ্চাত্য প্রভুত্ব কর্তৃক আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের যে ক্ষতি হইয়াছে, পাশ্চাত্য সভ্যতার ভ্রান্ত অনুকরণের জন্য আমাদের সামাজিক জীবনের তদপেক্ষা অনেক বেশী ক্ষতি হইয়াছে। তাহার ফলে বাজারে পুস্তকাকারে যাহা চলিতেছে তাহার অধিকাংশই লক্ষ্যহীন উচ্ছ,ঙ্খল গড্ডালিকা প্রবাহের তরঙ্গে ন্যায় অথবা হলাহল পরিপূর্ণ এবং সামাজিক স্বাস্থ্য ধ্বংশকারী। সমাজের এই রােগ দূর করার অভিপ্রায়ে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। স্বপ্নসুধার আলোচ্য কঠিন বিষয়গুলি যথাসাধ্য সহজ করিবার চেষ্টা

করিয়াছি। ইহার পাঠক পাঠিকাগণের চিন্তাস্রোত এই দিকে
এতটুকু নিয়ন্ত্রিত হইলে ও শ্রম সার্থক মনে করিব।
এই পুস্তকে যে দুই একটা ভুল ত্রুটী দৃষ্ট হইবে, আশা
করি আমার সহৃদয় পাঠকপাঠিকাগণ সেগুলি অনিচ্ছাকৃত জানিয়া
আমাকে ক্ষমা করিবেন। ইতি
বিনীত
গ্রন্থকার

স্বপ্ন-সুধা
প্রথম ভাগ
(দাতা, দয়ালু বিশ্বপ্রভুর নামে আরম্ভ করিতেছি)
গতি
একদিন নৌকায় চড়িয়া কোথাও বেড়াইতে যাইতেছি
মহানন্দা নদীর বুকের উপর দিয়ে। অন্ধকার রাত্রি। চারিদিক
নিস্তব্ধ।
কেবল মাঝে মাঝে ঝি ঝি পােকার রব, দুই একটা
সজাগ কুকুরের চীৎকার ও দাড়ের একটানা ঝপ ঝপ. শব্দ
শুনা যাইতেছে ; মাঝে মাঝে একটু ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে হাত
বুলাইয়া দিতেছে এবং নৌকার আঘাতে জলগুলি কল কল
করিয়া সাড়া দিতেছে। এমনি করিয়া নৌকা চলিয়াছে, আর
আমি শুইয়া নদী সম্বন্ধে আকাশ পাতাল ভাবিতেছি।
এমন সময় কাহার ডাকে যেন আমার সকল ভাবনা
কাটিয়া গেল। দেখিলাম একজন বুড়া মানুষ আমাকে
ডাকিতেছেন। বয়স হইলেও সুন্দর চেহারা, পরণে ধব ধবে
সাদা ধুতি, পাড় নক্সা করা, রং সবুজ। লম্বা পাকা দাড়ী ও
সাদা বাবরীতে বেশ খাপ খাইয়াছে। দেখিলেই একজন

প্রাচীন কবি বলিয়া ভ্রম হয়। উদার চাহনি ও গম্ভ র ভাব দেখিলেই ভক্তি করিতে ইচ্ছা হয়। তিনি বলিলেন, “হামিদ, এদিকে নেমে এস।" আমি তাহার এইরূপ স্বাভাবিক স্বর ও পরিচিতের মত কথাবার্তা শুনিয়া অবাক হইয়া গেলাম। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি আমার নামটি জানিলেন কিরূপে? আমাকে এইরূপ থতমত খাইতে দেখিয়া তিনি বলিলেন, “আশ্চর্য হবারই কথা। তুমি আমাকে চেন না, অথচ আমি তােমার নাম পর্যন্ত জানি। এটা তােমার কাছে অদ্ভুত বটে, কিন্তু এটা আমার কাছে স্বাভাবিক হ’ল কি করে তার কারণ বলছি, শোন,আমার নাম মহানন্দা। আমি প্রায় দু'হাজার বছরেরও বেশী কাল হ’ল এখানে বাস করছি। মাল- দহ ত এই সেদিন হল। তার কত আগে কত সব রাজা রাজড়ারা আমার বাড়ীর কাছ দিয়ে বজরা ভাসিয়ে যেত, কত লড়াই হল, কত কাণ্ড হয়ে গেল আমার সামনে,-যাক, সে সব কথা বলে আর কাজ নাই। তা, কি যেন বলছিলাম ; হ এই তােমাকে কেমন করে চিনলাম তাই বলি। গত বৎসর বর্ষার সনয় তুমি ধােপর ঘাটে একদিন স্নান করতে এসেছিলে মনে পড়ে কি ? ঐ যেদিন সে ঘাটে একটা মরা গরু ভেসে যাচ্ছিল আর তার উপর কতকগুলাে শকুনি পড়ছিল, তাই দেখে তােমার এক সঙ্গী বলে উঠলাে যে, নদীতে স্নান

করা ঠিক নয়, নদীর জল খুব খারাপ, নদী অপদার্থ ইত্যাদি ।
আর তুমি তাকে বাধা দিয়ে আমার গুণ সম্বন্ধে অনেক কথা
বললে। সে দিনের কথা মনে পড়ে কি ? সে দিন আমি
কাছেই লুকিয়ে ছিলাম, আর তােমার কথা শুনে আমার প্রাণ
ঠাণ্ডা হ'ল। তােনাকে সেদিন থেকে ভালবাসলাম। তখনি
তােমার নামটি জানতে ইচ্ছা হল, সুযােগও শীঘ্রই পেলাম।
তােমার অপর সঙ্গী তখন বলেছিল, ‘ও---হামিদ না হলে এসব
বাখ। করবে কে ? তখনি তােমার নামটা মুখস্থ করে
ফেললাম। সেদিন থেকেই তােমাকে নিরালায় পেতে
মনের কথা জানাতে বহু চেষ্টা করেছি কিন্তু তা হয়ে উঠেনি
আজ দয়াময় সে সুযােগ দিয়েছেন, তাই দুটি মনের কথা বা
উপদেশ যাই বল তােমাকে বলতে এসেছি। আমি বৃদ্ধ হ'লেও
তােমার বন্ধু বলে জানবে, এস, ভয় নাই। আমি শপথ করে
বলছি, তােমার কোন অনিষ্ট হবে না।”
এতক্ষণে আমি তীরের দিকে লক্ষ্য করিলাম, দেখিলাম
নােকা তীরে বাঁধা, আর তিনি একটু দূরে আমার জন্য তাপেক্ষা
করিতেছেন! তাহার মুখে চোখে এমন একটা সত্যের ভাব
ফুটিয়া উঠিয়াছিল যে, আমি আর না যাইয়া থাকিতে পারিলাম
। ইতিমধ্যে চঁাদ উঠিয়াছিল, আমরা চাদের আলােয়
একটা পরিষ্কার যায়গা দেখিয়া ঘাসের উপর বসিলাম।
তিনি বলিলেন--আচ্ছা বল দেখি নদী কাকে বলে ?

;
আমি-কেন,
জলস্রোত পৰ্বত কিম্বা হ্রদ হইতে
বাহির হইয়া বহু স্থান দিয়া বহিয়া অবশেষে সাগরে কিম্বা
হ্রদে পড়ে তাহাকেই নদী বলে।
তিনি-না
বাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারলাম
আর কিছু জান কিনা বল।
আমি—ছােট বেলায় যা ভূগােলে পড়েছি তাই বললাম,
আর কিছু জানি না ।
তিনি—জান না,
তবে শােন,-স্রষ্টার যে আশীষ ধারা
বৃহৎ হতে বাহির হয়ে পুণ্যভূমিকে উর্বর ও পাপীর গৃহকে ধ্বংশ
করে শেষে বৃহত্তমের সহিত মিলিত হয়, তাকে নদী বলে।
আমি–আচ্ছা, আপনি যে আমাকে হঠাৎ নদী সম্বন্ধে
প্রশ্ন করলেন তার উদ্দেশ্য কি?
তিনি—হ, উদ্দেশ্য আছে, নদীর ভিতর দিয়ে তােমাকে
কিছু উপদেশ দিব বলেই প্রথমে নদীর বাখ্যা করতে বলেছিলাম।
যাই হােক, এখন আমি নদী সম্বন্ধে যে সব কথা বলব
সেগুলি খুব মন দিয়ে শুনবে, এবং তাহলেই বুঝতে পারবে যে নদী
ও মানুষের কিরূপ সম্বন্ধ এবং নদী মানুষকে কি উপদেশ দেয়।
“প্রথমতঃ দেখতে পাও বিশাল সমুদ্রের জলকণাগুলি
রৌদ্রের উত্তাপে বাষ্পের আকারে বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়,
তারপর সেই বাষ্পগুলি একসঙ্গে মিলে মেঘের সৃষ্টি করে।
সেই মেঘ যখন কোন পর্বতের ঠাণ্ডা গা বেসে ভেসে যায়,
৪

গত ]
[ স্বপ্ন-সুপা
তখনি সে অতিরিক্ত ঠাণ্ডার জন্য জমে তুষার হয়ে পৰ্বতের
গায় জমা
হয়।
সেই তুষারগুলো গ'লে আস্তে আস্থে
নামতে থাকে। পরে সেগুলি নদীর সৃষ্টি
করে। তারপর
সেটা বহু দেশের মধ্য দিয়ে কাউকে হাসায়ে কাউকে বা
• কঁাদায়ে ছুটতে থাকে সেই সাগরের উদ্দেশে। পরে তার
আয় ব্যয়ের হিসাব নিয়ে সাগরের কাছে হাজির হয়।”
আমি-- বেশ ; কিন্তু এতে মানুষের সঙ্গে তার কি সন্ধ?
তিনি-বলবার জন্যই আজ বসেছি। ব্যস্ত হয়ােনা।
আমি ধীরে ধীরে বলে যাই, আর তুমি মন দিয়ে শুনে যাও।
“তেমনি মানুষের বেলায় দেখ, সে প্রথমে দয়াময় বিশ্ব
স্রষ্টার নিকট থাকে। তারপর সে ক্ষুদ্র আকারে পিতার ঔরসে
মাতার গর্ভে কিছুদিন (প্রায় দশ মাস) বাস করে। তারপর
সে পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করে অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে
নিজের পথ করে নিয়ে ছুটতে থাকে সেই স্রষ্টার উদ্দেশে।
এখন দেখ, মানুষ আর নদী একরূপ কিনা।”
আমি-আপনি বললেন যে, মানুষকে অনেক দুঃখ কষ্ট
সহ্য করতে হয়। কিন্তু নদীর কোন দুঃখ নাই, সে ক্রমাগত
একই ভাবে অতি সহজে বয়ে যাচ্ছে।
তিনি-হাঃ হাঃ ; পাগল
হাঃ ; পাগল আর কি! নদীর কষ্ট যে
কিরূপ তা আমি জানি। সেই প্রথম যখন পৰ্বত হ'তে
বেরিয়েছিলাম সে দিনের কথা মনে হলে প্রাণ কেঁপে উঠে।

স্বপ্ন-সুধা ]
[ গতি
••
উঃ, সে ক। এক একটা গভীর গর্ত ভরতে হয়েছিল ; কী সব এক
একটা প্রকাণ্ড পাহাড় কেটে রাস্তা করতে হয়েছিল। কত সব
উচু, নীচু, খাল, বিল, বন, উপবনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
আমি -নদীর আবার জমা খরচ কি রকম?
তিনি—তা-আর বুঝলেনা ? এই কতটা জল তার পরে
নিয়ে গেল, কতটা জল শাখা প্রশাখা হয়ে বেরিয়ে পালিয়ে গেল,
এই সব হচ্ছে নদীর খরচ। আর কতটা গাছ পালা, জীব জন্তু,
স্বর বাড়ী সে ভাসিয়ে নিয়ে গেল এ সমস্ত হচ্ছে তার জমা।
মােট কথা তুমি একটু চিন্তা করলেই নদী যে সকল দিক দিয়েই
নানুষের মত, এটা আপনি বুঝতে পারবে।
আমি–আচ্ছা, নদী মানুষকে কি শিক্ষা দেয় ?
তিনি -হাঁ, এটা একটা প্রশ্ন বটে। নদী মানুষকে অনেক
কিছুই শিক্ষা দেয় ; তবে আমি এখানে তােমার সবচেয়ে দরকারী
বিষয়টারই উল্লেখ করব।দেখ, মানুষের ছয়টা রিপু আছে।
যথা কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ ও মাৎসর্য। এই ছয়
রিপু ফাক পেলেই মানুষকে কুপথে নিয়ে যায়। তখন মানুষ
জগৎ স্রষ্টাকে ভুলে যায়। তার গতি কোন দিকে, তার জীবনের
উদ্দেশ্য কি সব ভুলে যায়। তখন নদী তার কুলু কুলু স্বরে
বলে মানুষ সাবধান ! আমি যেমন বৃহৎ হতে এসে সেই
বৃহতের দিকেই যাচ্ছি, তেমনি তােমরা ও এক অসীমের নিকট
হ’তে এসে তার দিকেই ফিরে যাচ্ছ। সেখানে একদিন

[ স্বপ্ন-সুধা
.তোমাদের ভাল মন্দ সকল কাজের খতিয়ান নিয়ে দাড়াইতেই
লক্ষ্য ঠিক কর ; কারণ তােমাদের একমাত্র গতি সেই
বিশ্বপতির দিকে। তােমরা হাজার চেষ্টা করলেও এ গতি ফিরাতে
পারবে না, কারণ এটা হচ্ছে খােদাত্ত গতি। বুঝতে পেরেছ ?
আমি—হাঁ, আপনি যে আজ আমাকে এই সমস্ত অমূল্য
উপদেশ দিলেন, এজন্য আপনাকে শত সহস্র ধন্যবাদ।
ইতি মধ্যে আমার কানে মাঝিদের গলার স্বর পেীছিল। তিনি
বলিলেন--ঐ দেখ, তােমার মাঝিরা তােমাকে ডাকছে। ওরা বােধ
হয় এখনি নৌকা খুলবে। তুমি যে ধৈৰ্য্য ধরে আমার কথা গুলি
শুনলে এ জন্য আমি বড় সন্তুষ্ট হয়েছি। তা হলে আসি এখন।
পর মুহূর্তেই তিনি যে কোথায় মিলাইয়া গেলেন আমি
বুঝিতে
পারিলাম না।
সঙ্গে সঙ্গে শুনিতে পাইলাম মাঝিরা
“বাবু, বাবু” করিয়া ডাকিতেছে ।
আমি বিরক্ত হইয়া বলিলাম—আরে বােকার মত চেঁচা না :
নৌকা খােল যাচ্ছি।
তখনি একটা হাসির কোলাহল উঠিল, আর সেই সঙ্গে
আমার ঘুম ও ভাঙ্গিয়া গেল। দেখিলাম নৌকা নির্দিষ্ট ঘাটে
লাগিয়াছে। বুঝিলাম এতক্ষণ স্বপ্ন দেখিয়াছি।
কিন্তু, কেবলি কি স্বপ্ন ?
মালদহ বােডিং }
ইং ২১৭২৯

প্ন-সুধা 3
; ফকির
ফকির
রাজসাহ: গভর্ণমেন্ট কলেজ সংলগ্ন ফুলার হােষ্টল মুসলমান
ছাত্রদিগের থাকিবার স্থান, পদ্মার ধারে দ্বিতল পাকা ঘর। দূর
হইতে দেখিলে একটা রাজবাড়ী বলিয়া মনে হয় এমনি তার
গঠন প্রণালী। এখানে আমরা প্রায় ষাট, পঁয়ষষ্টি জন
কলেজের ছাত্র বাস করি। এই বাড়ীটা একেবারে নিজস্ব হইলে
কতটা গর্ব অনুভব করিতাম জানি না; তবে এইটুকু বলিতে
পারি যে, এহেন বাড়ীটার একটা ‘সি’ ও যে মাসিক চারি টাকা
ভাড়া দিয়া দখল করিয়া আছি এজন্য নেহায়েৎ কম গতি
নহি। তাহার প্রমাণ এই যে, কোন লােককে এতবড় বাড়ীটার
দিকে আসিতে দেখিলে মেজাজ আপনা হইতেই কেমন যেন
গম্ভীর হইয়া উঠে আর বুকটা অসম্ভব রকম ফুলিতে থাকে ।
আর সেই আগন্তুকটি ভদ্রতার গণ্ডী ছাড়াইয়া (?) ভুলিয়া
যদি কোন প্রশ্ন করিয়া বসেন, তবে সম্ভবমত একটা ছােট’ উত্তর
দিয়া অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া আর একটু গম্ভীর হইয়া খুব
বিজ্ঞের মত দুনিয়াটাকে লক্ষ্য করিতে থাকি
থাকি; এবং
সেই
লােকটাকে উত্তর দেওয়ায় পদমর্যাদা ঠিক থাকল কি না সেই
বিষয় চিন্তা করিতে থাকি।
সাড়ে চারিটায় কলেজের ছুটি হইয়াছে। তাই সকল
-

কাকর ]
[ স্বপ্ন-সুধা .
শ্রেণীর বন্দোবস্ত করা ফেরীওয়ালা সময় মত নানা রূপ খাবার
জিনিষ লইয়া আসিয়াছে, এবং বাদশাহী আমলের অমূল্য ‘হুজুর,
‘হুজুর' শব্দে সকলের মনােস্তষ্টি করিতেছে।
আর সকল
ছাত্রই জোর গলায় আপন আপন হুকুম চালাইতেছেন।
{ তবে এই সমস্ত ফেরীওয়ালাদের ও আমাদের মেজাজের একটু
পরিবর্তন তখনই দেখা যায়, যখন ফেরীওয়ালার নিকট অনেক
টাকা বাঁকী হইয়া যাওয়ার পরে ও অদূরদর্শী (?) অভিভাবকগণ
টাকা পাঠাইতে অনর্থক বিলম্ব করেন।
এমন সময় একজন বুলিওয়ালা লোেক আসিল তাহার হাতে
একটা সাধারণ
সাধারণ নাশের
বাশের লাঠি, পরণে ছেড়া ময়লা কাপড়,
মাথায় ছােট কর্কশ চুল ( পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্ত), শরীরটা
ময়লা ও বড় দুৰ্ব্বল। ঝুলিটার অবস্থা তত সুবিধাজনক না
হইলেও তাহাকে ককগুলি কাপড়ের নমুনা বলিলে বিশেষ দোষ
হইবে না। দেখিলেই বুঝা যায় যে, সে কিছু দিতে ত আসেই
নাই বরং কিছু লইতে আসিয়াছে। সে একজন ফকির।
সেই অদ্ভুত লােকটার দিকে দৃষ্টি পড়া মাত্র, জানি না কেন,
অধিকাংশ ছেলেরই মুখাকৃতি কিরূপ যেন বিকৃত হইয়া আসিল।
তাহার পর যখন সে ‘দয়া হয় বাবু -একটা পয়সা দেন হুজুর,
পরশু থেকে না খেয়ে আছি প্রভৃতি বলিয়া সকলের করুণা
প্রার্থি হইল, তখন দুই একজন, যাঁহারা পল্লীগ্রাম হইতে নূতন
সহরে আসিয়া ভর্তি হইয়াছেন, তাহারাই দুই একটা পয়সা

প্ন-সুধা ]
[ ফকির
দিলেন, তাহা ছাড়া অন্যান্য সকলে তাহার দিকে
তাহার দিকে দৃষ্টিপাত
না করিয়া কেহ নাস্তায় মনােনিবেশ করিলেন, কেহ বা ফর:-
ওয়ালার সঙ্গে বাজে কথা বলিতে লাগিলেন (ভাবটা এইরূপ,
যেন এখন তাহার ভিক্ষা দিবার সময় নাই )
আবার (তাহার কাছে টাকার পয়সা হইবে না ইহা নিশ্চিত
জানিয়া) বলিলেন, “কিহে, তােমার কাছে টাকার পয়সা
হবে ? অর্থাৎ টাকার পয়সা তাহার মত ভিক্ষুকে দিতে
পারিলে তবেই একটা পয়সা পাওয়া বােধ হয় সম্ভব ছিল।
একজন ছাত্র জিজ্ঞাসা করিলেন, “হারে, তুই কি জাত ?
তাের নাম কি ?” সে বলিল, “আজ্ঞে, আমার নাম জয়রাম,
আমরা জাতিতে পাহিড়া ( পাহাড়ি )।” উত্তর শুনিয়া
প্রশ্নকারী অপূৰ্ব্ব মুখভঙ্গি সহকারে বলিলেন, “ব্যাটা হিন্দু,
ত এ হােষ্টেলে এসেছিস কেন? ও জিকে ও-ই---নিউ
হােষ্টেলে যা ; ওখানে হিন্দু ছেলে অনেক আছে, ওখানে গেলে
অনেক পাবি। যা যা—এখান থেকে ! পালা, পালা !!” “তাই
যাচ্ছি বাবু’ বলিয়া সে একটা সালাম দিয়া বাহিরে যাইবার
জন্য সিড়ি দিয়া নামিতে লাগিল। আমি তাহার সেইরূপ
দুরবস্থা দেখিয়া ডাকিয়া কিছু দিলাম। সে “ভগবান আপনাকে
রাজা করুক বাবু” বলিয়া তাহার চিরমলিন মুখখানায় করুণ
হাসি হাসিয়া একটা সালাম দিয়া চলিয়া গেল। জানিনা
পূৰ্বের সালামের সঙ্গে পরেরটার কত প্রভেদ !

[ স্বপ্ন-সুধা
তারপর যখন ঘরে আসিলাম তখন শুনিতে পাইলাম কেহ
বলিতেছেন, “আগে কেবল মুসলমান ফকিরই দেখা যেত,
এখন কিন্তু তাদের দেখা দেখি হিন্দু ফকিরের সংখ্যাও দিন
দিন বেড়ে যাচ্ছে।” কেহ বলিতেছেন, “আমরা এই বাঙ্গালী
জাতি ভিক্ষুককে প্রশ্রয় দেওয়াতেই তাদের সংখ্যা ক্রমশঃ
বেড়ে যাচ্ছে। বাঙ্গালা দেশ ছাড়া আর কোথাও এত ফকির
নাই।” কেহ বা বলিতেছেন, “আমার মনে হয় এরকম
একটা আইন করলে ভাল হয় যে, যে কেহ কোন ফকিরকে
দেখতে পাবে, সেই সে ফকিরকে জোর করে খাটিয়ে নিবে,
তবে তার উপযুক্ত মজুরী দিতে হবে, না দিলে আইনত দণ্ডনীয়
হবে। আর এক কথা, কোন রােগা ফকিরকে খাটাতে পারবে না
এবং যে ফকিরকে যে কাজের উপযােগী দেখা যাবে তাকে সে
কাজেই লাগাতে হবে (কে কোন কাজের উপযােগী তাহা :
পরীক্ষা করিয়া পুলিশ প্রত্যেক ফকিরের গায়ে একটা ছাপ
মারিয়া দিবেন ), ফকিরের প্রতি কেহ অন্যায় অত্যাচার করিতে
পারিবে না এবং বিনা পাশে কেহ ভিক্ষা করিতে পারিবে না।
দেখ, এরকম করলে দেশে ফকিরের সংখ্যা কমে আসবে, দেশের
লােক কাজ করতে শিখবে, দেশ আবার উন্নত হবে।”
একজন বলিলেন, “যাহােক তােমার বুদ্ধি ভাই। এমন
দু চারটা লােক যদি কংগ্রেসের নেতা হত তবে ভারতবর্ষ
এতদিনে অনেক উন্নতি লাভ করতাে, তা নয় কতকগুলাে

স্বপ্ন-সুপা।
i ফকির
‘গােবর-গণেশ কংগ্রেসের নেতা হয়ে কেবল ‘বন্দে মাতরম’
আর গ্রেপ্তার', আজ হরতাল কাল বিলেতী বৰ্জন, পরশু
কলেজ বয়কট, এসমস্ত করে বেড়াচ্ছে। তাতে দেশের
লাভ ত দূরের কথা ক্ষতিই হচ্ছে বেশী। কি বলহে ? আচ্ছা
দাদা, তােমার নূতন আইনে ত কানা খোঁড়া ফকিরের কোন
উল্লেখ নাই। তারা কি করবে ?”
উত্তর হইল, ‘ঘঁ, আমি কি তাদের কথা না ভেবেই
আইনের কথা বলেছি। তাদের জন্য এক মজার উপায় ঠিক
করেছি। দেশের যত সব কানা, খোড়া ফকির থাকবে, তাদের
অল্প বেতনে সরকার তার স্কুল, কলেজ, হােষ্টেল আর অন্যান্য
সমস্ত অফিসে নিযুক্ত করবে। তারা আপন সাধ্য মত সে সব
জায়গায় কাজ করবে। কেহ পাখা টানবে, কেহ ঘর ঝাড় দিবে,
কেহ বাসন মাজবে, কেই বাবুদের জুতা সাফ করবে, পায়ের আঙ্গুল
টেনে দিবে ইত্যাদি যে যে রকম পারবে সে তাই করবে
সকলে বলিয়া উঠিলেন, “সাবাস ভাই, ধন্য তােমার মাথা !
বেঁচে থাক দাদা, দেশের কাজে লাগবে।” তাহার পর যেরূপ
হাসি আর গােলমাল, তাহা বর্ণনার মত ভাষা এপর্যন্ত
আবিষ্কৃত হয় নাই। যাহা হউক একটু পরে যখন হাসির
জোয়ারে ভাটা আসিল তখন মজলিস্ ভঙ্গ করিয়া সকলে
নিজ নিজ ঘরে চলিয়া গেলেন। তাহার পর কলেজের মাঠে
ধুম ধুম করিয়া ফুটবলের শব্দ হইতে লাগিল।

অনেকে খেলায় যােগদান করিলেন আর আমরা দুই তিনজন
ছাত্র পদ্মার বাঁধ ধরিয়া বেড়াইতে বাহির হইলাম।
সন্ধ্যার একটু পরে যখন হােষ্টেলে ফিরিয়া আসিলাম তখন
সেখানে বেশ একটা হৈ,
চৈ, পড়িয়া গিয়াছে। অনুসন্ধানে
জানিতে পারিলাম--একটা ফকির ( সম্ভবতঃ জয়রাম )
কাচারীর রাস্তা ধরিয়া যখন যাইতেছিল সেই সময় দৈবক্রমে
স্থানীয় পুলিশ সুপারিন্টেণ্ডেণ্টের মােটর গাড়ীর তলায় পড়ে।
যাহা হউক সৌভাগ্যবশতঃ সে বাচিয়া গিয়াছে (?) তবে
তার একটা পা ভাঙ্গিয়া গুড়া হইয়া গিয়াছে। পুলিশ
সাহেব দয়া করিয়া তাহাকে হাসপাতালে পাঠাইয়া দিয়াছেন।
শুনিয়া মনে বড় দুঃখ হইল। মনে করিলাম এইরূপ
বাঁচিয়া থাকা অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেয়। যাহা হউক একবার
তাহাকে দেখিতে যাওয়া এবং বাস্তবিকই সে জয়রাম কিনা
সেটা জানা উচিত বলিয়া মনে করিলাম। কাজেই পরদিন
হাসপাতালে যাইব স্থির করিলাম।
হাসপাতালের পরিচয় আর নূতন করিয়া দিতে চাহি না ;
তবে এইটুকু বলা যায় যে, ইহা একটা অসহায় রােগীদিগের
নির্দিষ্ট আশ্রয়। ইহা কোন অবস্থাপন্ন লােকের উপযুক্ত
থাকিবার স্থান নহে, এবং এখানে আসিলে সুস্থ ব্যক্তির
শারীরিক রােগের কোন লক্ষণ প্রকাশ না পাইলেও মন অনেকটা
অসুস্থ হইয়া পড়ে।

অনুসন্ধান করিয়া জয়রামের ‘সিটের নিকটে গেলাম।
হাঁ, এ পূর্বের সেই জয়রামই বটে, তবে চিনিবার উপায় নাই।
একদিনেই চেহারার অনেকটা পরিবর্তন হইয়াছে।
বাম পা খানায় ব্যাণ্ডেজ করা হইয়াছে। তাহা ফুলিয়া ডান
পায়ের দ্বিগুণ হইয়াছে। সে জ্বরে একরূপ অজ্ঞান। সংসারের
কোন খবরই সে রাখে না। তবে যন্ত্রনা অসহ্য বােধ হওয়ায়
মাঝে মাঝে অস্ফুট করুণ আর্তনাদ করিতেছে। আহা, অসহায়
বেচারী! বােধ হয় তাহার আপনার বলিতে কেহ নাই। মনে
মনে বলিলাম, “দয়াময়! হয় তাকে এ অবস্থায় তােমার
কোলে টেনে নাও, আর না হয় তাকে শীঘ্রই পূর্ণরূপে সুস্থ
করে তােল•••”
দেখিয়া শুনিয়া হােষ্টেলে ফিরিয়া আসিলাম। তাহার পর
ঠিক সময় মত স্নান, আহার, কলেজ যাওয়া, খেলা, হাসি-
তামাসা সবই চলিতে লাগিল। বৈকালে একবার মনে হইল—
যাই, জয়রামকে দেখে আসি আর নার্সকে দু চার আনা দিয়ে
বলে আসি যেন সে জয়রামের দিকে একটু সুনজর রাখে।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে লইল—দূর, আমি কি পাগল হয়েছি ?
কোথাকার এক হিন্দু ফকির, নিজের দোষে মােটর চাপা পড়বে,
তাতে আমার কি ? সে মরলে বা বাঁচলে আমার কি আসে
যায় ? দুনিয়াতে এমন কত ফকির দিন রাত ভুগছে, তাদের খবর
কয় জনে রাখে? আর রাখতে চাইলেই কি সেটা সম্ভব হয় ?...
১৪

হায়রে মানুষ ! তুমি ত এক অদ্ভুত জীব, তাহার উপর তােমার ওই মনটা আরও অদ্ভুত! সেটাকে জানিতে চেষ্টা করা বােধ হয় জগতে সর্বাপেক্ষা কঠিন কাজ। সে এক সময় দয়া, দরদ ও সহানুভূতি দেখাইতে দেবতাকে ও পরাস্ত করিতে চাহে আবার পরক্ষণেই সে শত্রু অপেক্ষা নিষ্ঠুর হইতে ও বিরূদ্ধ ভাব পােষণ করিতে পারে : অন্যের কথা বলিতে পারি না, তবে এই টুকু নিশ্চয় বলিতে পারি যে, আমার মনকে আমি এখনও বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই, এবং কখন পারিব তাহাও ঠিক জানি না। মন কেবল ঠিক থাকে তাহাদিগের কাছে সাহারা মনকে জয় করিতে পারিয়াছেন। তঁাহারাই প্রকৃত মানুষ। তাঁহাদিগের আসন বহু উঙ্গে। সেইরূপ মানুষই এই জগতে থাকিয়া স্বর্গ সুখ উপভােগ করতে পারেন। আমাদের মত চঞ্চলমতি লােক নহে।••• যাহা হউক মনকে ঠিক করিয়া (?) জয়রামের চিন্তা দূর করিলাম। তাহার পর শরীরটাকে একটু হাল্কা করিবার জন্য ফুটবল খেলিতে নামিলান। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ ‘গােল কিপার’ পদে নিযুক্ত হওয়ায় জয়রামের চিন্তা মাঝে মাঝে উকি মারিয়া বিরক্ত করিতে লাগিল, এবং হঠাৎ একটা গােল’ খাইয়া আমার মন আরও খারাপ হইয়া গেল। কোনরূপে খেলা শেষ করিয়া পদ্মার ধারে বেড়াইতে গেলাম। সেখান হইতে অনেকটা প্রকৃতিস্থ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। তাহার পর পাঠ্য পুস্তকগুলির মধুর চাহনিতে সকল বিষয় ভুলিয়া নূতন চিন্তায় মনােনিবেশ করিলাম।

পরদিন সকালে একবার হাসপাতালে যাইবার ইচ্ছা হইল,
কিন্তু সেদিন পড়ার চাপ একটু বেশী ছিল বলিয়া আর সেখানে
যাওয়া হইল না। মনে করিলাম বৈকালের দিকে গেলেই চলিবে।
বৈকালে কলেজ হইতে আসিয়া দেখি ফেরীওয়ালারা
কেহই তখন আসে নাই। ক্ষুধার জ্বালায় এদিকে পেট
চন, চন করিতেছে। কাজেই হাসপাতালে যাওয়াটা আপাততঃ
স্থগিত রাখিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলাম। আর অমনি রুটী,
বিস্কুট, হালুয়া, কেক, চপ, প্রভৃতির ছবি দেখিতে লাগিলাম।...
কতক্ষণ এইভাবে ছিলাম জানিনা হঠাৎ দেখিলাম একটা
লােক আমার ঘরে প্রবেশ করিল। প্রথমে সে কোন ফেরী-
ওয়ালা হইবে বলিয়া মনে করিয়াছিলাম এবং উপস্থিত ক্ষুধার
হাত হইতে রক্ষা পাইবার আশায় উঠিয়া বসিলাম। কিন্তু
পরক্ষণেই যাহা দেখিলাম তাহাতে এমন অবাক হইলাম যে,
‘গােলদীঘিতে আগুন লেগে জল শুকিয়ে যাওয়াতেও সেইরূপ
আশ্চৰ্য্য বােধ করি নাই।দেখিলাম আমার সম্মুখে দাড়াইয়া
জয়রাম! যাহাকে তখন হাসপাতালে দেখিতে যাইব বলিয়া
মনে করিয়াছিলাম এ সেই জয়রাম-সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে ধব,
ধবে সাদা কাপড় পরিয়া আমার সম্মুখে পঁাড়াইয়া ! আমি
আপনাকে বিশ্বাস করতে পারিলাম না। ভাল করিয়া
চোখ রগড়াইয়া চাহিলাম। কিন্তু কোনই পরিবর্তন দেখিতে
পাইলাম না। সে একদৃষ্টে আমার দিকে চাহিয়া
১৬

সবা
হাসিতেছে। তাহার সে চেহারা নাই, তাহার সেই ভাঙ্গা
পায়ের কোন চিহ্নই নাই।
নাই। তাহার চোখে মুখে এক অপূর্ব
ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে মুখে কোনরূপ দুঃখের চিহ্ন
নাই। দেখিলে মনে হয় যেন সে দয়াময়ের আশীৰ্বাদ লাভ
করিয়াছে। জগতের কোন দুঃখই আর তাহাকে অভিভূত
করিতে সমর্থ নহে।
আমি কিছুক্ষণ পরে আপনাকে সামলাইয়া লইয়া জিজ্ঞাসা
করিলাম—কে, জয়রাম ?
“হঁ তাই, আপনাদের কাছে জয়রামই বটে।
তাহার এইরূপ উত্তরে আরও বিস্মিত হইয়া বলিলাম-তুমি
ত কাল হাসপাতালে পড়ে ছিলে, আর আজ এইরূপ অবস্থায়
এখানে কিরূপে এলে ? তােমার ঘায়ের ত কোন চিহ্নই দেখছি
না, একেবারে সেরে গেছে ?
“সে সব কথা হাপাতালে অনুসন্ধান করলে জানতে পারবেন।
আমি সে সম্বন্ধে এখন কিছুই বলব না। আমার সময় অল্প।
আপনাকে ভাল বলে জানি বলেই বিদায়ের এই শেষ মহুর্তে
আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে এসেছি।ভাল কথা,
একটা কথা রাখবেন ?”
“কি কথা বল।”
“তেমন কিছুই নয়, তবু সেটাকে বলা দরকার বলে আমি
মনে করি। কথাটা এই যে, কোন ফকিরকে ভিক্ষা দেন বা
১৭

“যসুধা}
1 vা ম
দেন, তাতে তেমন কিছুই যায় আসে না, তবে তাকে কখন
ঘৃণা করবেন না বা কড়া কথা বলে তার মনে আঘাত দিবেন:
; এই আমার অনুরােধ।”
“কেন এমন কথা বলছে বল দেখি ? কখন আমি কোন
ফকিরকে ঘৃণা করেছি, আর তােমার সঙ্গেই বা কখন খারাপ
ব্যবহার করলাম ?”
“ছি, ছি ; রাগ করছেন কেন? আপনি আবার কা'কে
কখন ঘৃণা করলেন । আমার সঙ্গেই বা কখন খারাপ ব্যবহার
করতে গেলেন ? বরং আপনি ত আমাকে সাহায্যই করেছেন।
তাই ত আপনার দয়ার কথা ভুলতে না পেরে বন্ধু হিসাবে
দেখা করতে এসে এই কথাটা বললাম। এতে রাগ করলে
চলবে কেন? দেখুন আমার এই কথা বলার কারণ হচ্ছে
এই;—আজ কাল অনেকেই ফকিরকে ঘৃণা করেন, এবং তারা
অর্থহীন (ধন হীন) লােককেই ফকির বলে মনে করেন। কিন্তু
তারা একথা ভেবে দেখেন না যে জগতে প্রায় সকলেই
ফকির। পৃথিবীতে কত রকমের ফকির আছে তা কে জানে ?
কেহ ধনের ভিখারী, কেহ জনের, কেহ শক্তির, কেহ স্বাস্থের,
কেহ বিদ্যার, কেহ জ্ঞানের, কেহ মনুষ্যত্বের, কেহ দয়ার, কেহ
স্নেহের, কেহ প্রেমের,ইত্যাদি কত রকমের যে ভিখারী
আছে তা কি কেহ বলতে পারে? কিন্তু নির্বোধ মানুষ, ধন
গর্বে গর্বিত ও কাণ্ডজ্ঞান হীন মানুষ সেই প্রথমটাকেই আসল
১৮

কর!
[আমবা"
ভখারী বলে মনে করে আর তাকে ঘৃণার চোখে দেখে থাকে।
আপনি হয়ত বলবেন যে, কে জ্ঞানের ভিখারী আর কে মনুষত্বের
ভিখারী এগুলি ত দেখে চেনা যায় না, শুধু অর্থের ভিক্ষুক
কেই তার ছেড়া ময়লা পােষাক দেখে চেনা যায়।--তার উত্তর
হচ্ছে—মােহ। যদি এই মােহ না থাকত, যদি প্রত্যেক
লােকই অপরের ভিতরের রূপটা দেখতে পেত, তাহলে মানুষ
সংসারে টিকতে পারতাে না। উদাহরণ স্বরূপ মনুষ্যত্বের ভিখারীর
কথাই ধরুন। এ জগতে শতকরা প্রায় নব্বই জন লােকই
এই দলের ভিখারী। এই অবস্থায় তাহাদের পশু ভাবাপন্ন
কলুষিত অন্তরের বীভৎস চেহারাটা যদি ঐ বাকী দশটা লােক
দেখতে পেত, তা হলে সংসারের প্রতি নিশ্চয় তাহাদের বিতৃষ্ণা
জন্মে যেত।—তাদের চেয়ে যারা কেবল ধনের ভিখারী, তাদের
অবস্থা অনেক গুণ ভাল নয় কি? তা হলে লােকে কেবল ধনের
ভিখারীকেই এত ঘৃণা করে কোন অধিকারে ? এটা তাদের
পক্ষে অন্যায় নয় কি?”
“হাঁ, তা—এক রকম অন্যায় বই কি! আচ্ছা, এতক্ষণ ধরে
দাড়িয়ে আছ একটু বসবে না?”
“না আর সময় নাই, যাই এখন।” বলিয়া সে চলিয়া
গেল। আমি তখন তাহার বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলাম।
এমন সময় আমার এক সহপাঠী বন্ধু ডাকিয়া বলিলেন, “কি হে
খুব যে ঘুমাচ্ছ দেখছি ! এদিকে যে রুটী ওয়ালার হালুয়া-রুটী
১
?

টেবিলের উপরে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ওগুলাে টেবিলে খাবে না কি হে? (বন্দোবস্ত করা রুটীওয়ালা নিয়ম মত নাস্তা টেবিলে রাখিয়া চলিয়া যায়। কোন ‘মিঞা’ ঘুমাইয়া পড়িলে সে জাগাইতে সাহস করে না।) আমি ধড়, মড়, করিয়া উঠিয়া বলিলাম, ‘হাঁ ভাই, এই নাস্তার-চিন্তা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম।” যাহা হউক হাত মুখ ধুইয়া জলযােগ করিবার পর হাস- পাতালে গিয়া অনুসন্ধানে জানিতে পারিলাম যে, জয়রাম ত দুনিয়াতে নাই তবে পদ্মায় অনুসন্ধান করিলে তাহার মৃত দেহটা পাওয়া যাইতে পারে। বাস্তবিকই শুনিয়া মন কেমন করিয়া উঠিল। চোখে দুই ফোটা জল দেথা দিয়াছিল কি না জানিনা, তবে মনে বেশ কয়েক ফোটা জমিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। ফুলার হােষ্টল, রাজশাহী ইং ২৩৭৩০ মৃত্য । স্বল্প- , মৃত্যু সবেমাত্র স্কুলের ছুটি হইয়াছে। তখন বেলা প্রায় সাড়ে চারিটা। ছেলেরা আপন আপন সঙ্গীদিগের সহিত বাক্যালাপ করিতে করিতে গৃহাভিমুখে চলিয়াছে, অতি বিশৃঙ্খল ভাবে। এতক্ষণ যেখানে কদাচিত দুই একটা ছেলে দেখা যাইত, এখন সেখানে ছেলেদের হাট লাগিয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। লাল পিড়ার বাসায় হঠাৎ খোঁচা দিলে যেরূপ অবস্থা হয়, ইহা কতকটা ঠিক সেইরূপ। বাের্ডিং-এ আসিয়া দেখি, একদল ছেলে ফুটবল বাহির করিয়া শট করিতেছে, একদল ‘ব্যাট-মিন্টনের নেট (জাল) টাঙ্গাইতেছে, আর একদল মাৰ্বল লইয়া থিং, ভিষ্টো ওয়ান টাইম’ প্রভৃতি সুরু করিয়া দিয়াছে এবং কেহ কেহ নাস্তায় মনােনিবেশ করিয়াছে। ঠিক সেই সময় নিজ কামরায় প্রবেশ করিতে যাইয়া দেখিলাম, সম্মুখেই নর্দমায় একটা মরা কোকিলের বাচ্চা পড়িয়া আছে, আর তাহাতে কতকগুলি পিপড়া লাগিয়াছে। আমি উহা কোথা হইতে আসিল মালীকে সেই কথা জিজ্ঞাসা করায় সে কোন সদুত্তর দিতে পারিল না। পরে তাহাকে উহা ফেলিয়া দিতে বলায় সে উত্তর করিল, “রাহনে দিজিয়ে বাবু, মেহতর আকে উঠাকে ফেক দেগা, হাম নাহি সেকেঙ্গে।”

স্বপ্ন-সুধা ।
[ মৃত্যু
—আমি পাছে ঐ মৃত দেহ হইতে দুর্গন্ধ বাহির হইতে পারে
ভাবিয়া সেটাকে ফেলিয়া দিয়া আসিলাম।
সেদিন একটা ফোড়ার বেদনায় শরীর অত্যন্ত খারাপ,
করিতেছিল এবং একটু জ্বরও আসিয়াছিল। তাই বিছানায়
শুইয়া পড়িয়া ঐ মৃত কোকিল ছানা সম্বন্ধে ভাবিতে ভাবিতে
বেশ একটু তন্দ্রামগ্ন হইয়া পড়িলাম।
কতক্ষণ পরে হঠাৎ শুনিতে পাইলাম কে যেন মিহি গলায়
আমাকে ডাকিতেছে। আমি চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম
কিন্তু কোথাও কিছু দেখা গেল না। ইহাতে আনি বড়ই
আশ্চৰ্যবােধ করিলাম, এবং উহা কাহার কণ্ঠস্বর হইতে পারে
চিন্তা করিতে লাগিলাম। -আবার শব্দ হইল, “ও মশায়,
আপনার জানালার দিকে চেয়ে দেখুন না!”
আমি জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করিতেই দেখিলাম—ছােট
একটী পাখী, হাঁ—শুধু ছােট পাখী কেন, একটা কোকিলছানা,
সবে মাত্র উড়িতে শিখিয়াছে বলিয়া মনে হয়, আমার জানালার
কপাটের এক কোণে বসিয়া আমাকে ডাকিতেছে ।
আমি জানি যে তােতা পাখী, টিয়া, ময়না প্রভৃতি।
পাখীগুলিই কথা বলিতে পারে, তাহাও আবার শিক্ষা দিলে ;
আর এই কোকিল ছানা স্বচ্ছন্দে মানুষের মত কথা বলিতেছে
কিরূপে? তাই তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আচ্ছা বলত,
তুমি কথা বলা শিখলে কিরূপে, আর কার বাড়ীতেই বা থাক ?

স্বপ্ন-সুধা
' উত্তরে সে বলিল, “দেখুন, আমি কারও বাড়ীতে থাকি না।
আমি থাকতাম—এই নিম গাছের এক ডালে কাকের বাসায়।
ছােট বেলায় ত তারা খুবই আদর করতো, কিন্তু আজ দুই তিন
দিন হ'তে তারা আমাকে সন্দেহ করে আমার উপর অত্যাচার
আরম্ভ করেছিল। যাক্, দয়াময় আমাকে সে কষ্টের হাত
থেকে বাঁচিয়েছেন। এখন আমি সংসারের সকল বাঁধন কেটে
মুক্ত। তবে মরবার সময় একটু কষ্টই হয়েছিল। না,
আর সে সব দুঃখের কথা তুলে বৃথা সময় নষ্ট করব না।---
হা, এই কি বলছিলেন যেন-কথা শিখলাম কার কাছে ?
-তা আর বুঝলেন না, এখন যে আমি মুক্ত, সংসারের কোন
বাধনই মানি না। এখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারি, যে
কোন মূত্তি ধরতে পারি, যে কোন ভাষায় কথা
কথা বলতে
পারি ! কোকিল মূর্তি ধরলাম কিজন্য ? আপনার চিনবার
সুবিধা হবে বলে। আপনি আজ যে মৃত দেহটা ফেলে দিয়েছেন
সেটা আমারই দেহ।”
“আচ্ছা বল দেখি, তুমি আমার নাম জানলে কি করে ?”
“এটা ত তেমন কঠিন কাজ কিছুই নয়। প্রতিবেশীর নাম
জানতে আর কত সময় লাগে? ভাল কথা, আমার নামটাও জেনে
রাখুন। আমার নাম হচ্ছে-‘টু। বেশ নামটী, কি বলেন?”
আমি – হাঁ, নামটী ত ভালই। আচ্ছা টু, তােমাকে
কি দোষে তারা মারপিট করলাে ?

স্বপ্নসুধা )
[ত্যু
টু-সে কপা আর বলবেন না। আমার চেহারা দেখে
তাদের পূর্বেই সন্দেহ হয়েছিল। এ জগতে দুষ্ট লােকে
পরের অনিষ্ট করবার ফন্দি খুব সহজেই বের করতে পারে।
তাই তারা আমাকে মারবার ছলে এক নূতন ফন্দি আঁটলাে !
ধেড়ে কাকটা এসে আমাদের ডেকে বললাে, “দ্যাখ বাছারা,
তােরা এখন বড় হয়েছিল, এখন একবার ডাক দিকিন কে কি
রকম ডাকতে পারিস দেখি !” এই কথা শুনে ত কাকের
বাচ্চারা এক সঙ্গে ডেকে উঠলাে–“কা-কাকা,” আর
আমার এই লক্ষ্মীছাড়া গলা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাে-“কু-উ-'।
তারপরেই ত তারা সবাই ঘিরে ফেললাে আমাকে! আমি
প্রথমে মনে করলাম বােধহয় আমার আওয়াজটা খুব মিষ্টি
লেগেছে তাই তারা আমাকে আদর করছে। কিন্তু হায় !
আদরের মাত্রা এমন চরমে উঠলাে যে আমার প্রাণ যায় যায়
অবস্থা! আমি তার আগে কোন দিন উড়িতে চেষ্টা করিনি।
কিন্তু তখন আর স্থির থাকতে পারলাম না। সেই অত্যাচারে
জরিত দুর্বল শরীর নিয়ে উড়বার চেষ্টা করলাম। কিন্তু
বেশী দূর যেতে হলাে না। শরীর অবশ হয়ে এলাে, মাথা
ঘুরে উঠলল, চোখে সারা পৃথিবী অন্ধকার দেখলাম ! অমনি
ঘুরতে ঘুরতে আপনাদের নর্দমায় পড়ে গেলাম। সেই
নর্দমায় জল ছিল। শুধু বুঝতে পারলাম যে, আমার মাথা
জলে পড়েছে আর নিশ্বাস নিতে না পারায় ভয়ানক কষ্ট
২৪

মৃত্যু।
[ স্বপ্ন-সুধা
হচ্ছে। তারপর আর কিছু জানি না। পরে যখন জ্ঞান হল
তখন আমার বেশ ‘ফুর্তি’ লাগছে, ক্ষুধা পিপাসা কিছুই
নাই! আমি এক সুন্দর জীবন পেয়েছি। যেখানে ইচ্ছা
যেতে পারি। আমি এখন খুব সুখী। আপনি আমার
মৃত দেহটার সদগতি করেছেন বলে আপনাকে মৃত্যু সম্বন্ধে
দুই একটা কথা বলবাে। আপনি মানুষ, শ্রেষ্ঠ জীব। তাই
বলে আমাকে অবজ্ঞা করবেন না। মনে রাখবেন, অনেক
সময় ক্ষুদ্র হ'তেও বড় জিনিষ লাভ করা যায়।
আমি-বেশ, তােমার যা বলবার আছে বলে যাও।
তােমার কথা শুনে কোন ক্ষতি ত আমার হচ্ছে না, বরং কিছু
লাভও হতে পারে।আর দেখ,
পারে।আর দেখ, আজ আমার শরীরটা
খারাপ করছে। আমি উঠে বসতে পারবােনা। তুমি ওখান
থেকে নেমে এসে আমার মাথার কাছে এই টেবিলটার উপরে
তাহলে আমাদের দুইজনেরই সুবিধা হবে।—এই কথা
বলায় সে নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়া আপন বক্তব্য শুরু করিয়া দিল।
টু—আপনি বলিতে পারেন মৃত্যু জিনিষটা কি ?
আমি—এটা আর এমন শক্ত কথা কি ? কোন প্রাণীর
জীবনের দিন ক’টা যখন ফুরিয়ে আসে তখনি তার মৃত্যু হয়। আর
মৃত্যু হইলেই ত তার সব শেষ হয়ে যায়, এত—সবাই জানে !
টু-না, না, আপনি তাহলে ঠিক জানেন না।
সাধারণ বুদ্ধিতে মৃত্যু সম্বন্ধে যা বলে আপনি ঠিক সেই

স্বপ্ন-সুধা [ মৃত্যু ; কথাগুলােই বলে গেলেন। কিন্তু আসল কথাটা কি তা আর ভেবে দেখলেন না। আমি—বেশ, আমি না হয় জানিনা ; তুমিই তাহলে বলে দাও। যদি তােমারটাই সত্য বলে মনে হয় তবে চির- কাল মনে করে রাখবাে। টু-শুনুন, এই সংসাররূপ কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করার পর জীবের আত্মা বড় ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম চায় ঠিক সেই সময় যদি তার নির্দিষ্ট কাজগুলি শেষ হয়ে থাকে তবেই সে চিরবিশ্রামের দেশে প্রস্থান করে। আর এই চিরশান্তিময় মহাপ্রস্থানকেই আমরা আমরা মৃত্যুরূপ বিভীষিকাময় কাল্পনিক দৃশ্যে পরিণত করি। আমি—তা না হয় হল। কিন্তু আত্মাকে আজরাইল (যমে) নিয়ে যায় কেন ? আর তাতে ত আত্মা অনেক কষ্টও পায় ! টু-বেশ, মনে করুন, আপনি এক দূর দেশে গিয়েছেন আপনার পিতার আদেশে কতকগুলি দরকারী কাজ সারার সেখান থেকে যখন বাড়ীতে ফিরবেন তখন নিশ্চয় আপনার একটা বাহনের দরকার হবে, সেটা গাড়ী, ঘােড় বা ট্রেন যাই হােক না কেন। তবে আপনি বলতে পারেন, ‘আমি শক্তিশালী পুরুষ আমার কোন গাড়ী ঘােড়ার দরকার হবে না, আমি হেঁটেই যাব। তা আপনি স্বচ্ছন্দেই যেতে পারেন। কিন্তু পথে যদি একটা খুব বড় নদী বা সমুদ্র থাকে, জন্য।

মৃত্যু
তখন ত আপনাকে নৌকা বা ষ্টিমারের আশ্রয় নিতেই হবে !
তখনি একটা বাহনের দরকার হল। তেমনি, এই সংসার ও
পরপারের মাঝখানে যে ভীষণ রাস্তা আছে তার একমাত্র
বাহন হচ্ছে আজরাইল। তাই আত্মাকে যমের হাতেই যেতে
হয়।আর যে কষ্টের কথা বললেন তার কারণ হচ্ছে-
প্রথমতঃ একটা জায়গায় বেশীদিন ধরে থাকলে সেই জায়গার
উপর একটা মমতা জন্মে যায়।
তারপর হঠাৎ সেই জায়গাটা
ছেড়ে যেতে প্রাণে স্বভাবতঃই ব্যথা লাগে। আর এই
সংসার—যে সংসার প্রাণীকে স্নেহ, দয়া, মায়া, প্রেম, প্রীতি
প্রভৃতি সহস্র বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে,—সেই সংসার ত্যাগ করে
যেতে কার প্রাণে না দুঃখ হয়, বলুন
আমি—তুমি বললে মৃত্যু হয় আত্মার বিশ্রামের জন্য।
তা হলে মানুষ পরকালে শাস্তি পায় কেন?
টু-হাঁ, একথা সত্য। কিন্তু শাস্তি ত সকলেই পায় না! শাস্তি
পায় শুধু তারাই, যারা জগতে আপন কর্তব্য পালন করে না ও সেই
বিশ্বপিতার সামনে হিসাব নিকাশ দিতে পারে না। পূর্বেই
ত বলেছি যে আপনি দূর দেশে গিয়াছেন আপনার পিতার
আদেশে কোন কাজে। তার পর যখন বাড়ীতে ফিরে এসে
আপনার পিতার সামনে জমা খরচের খতিয়ান দিতে না
পারবেন, আর যখন তিনি জানতে পারবেন যে, আপনি নির্দিষ্ট
কাজ সম্পন্ন করেন নি বরং কুসঙ্গে মিশে কেবল স্মৃতি উড়িয়ে
দেখি ?
২৭

স্বপ্ন-সুৰা
[ মৃত্যু
দিবেন না ?
মরে
কেন ?
কু-কাজে মত্ত হয়ে দিন কাটিয়েছেন, তখন কি তিনি আপনার
উপর অসন্তুষ্ট হবেন না? আপনাকে কি এর জন্য শাস্তি
নিশ্চয় দিবেন। এমনকি আপনার অপরাধ
গুরুতর হলে আপনাকে বাড়ী থেকে দূর করে দিতেও পারেন।
এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আপন আপন কৰ্ম্মফল সকলকেই
ভােগ করিতে হবে। সৎ কাজের জন্য পুরস্কার আর অসৎ
কাজের জন্য দণ্ড ত আছেই, এ আর নূতন কথা কি ?
আমি—তবে কেহ শৈশবে আর কেহ বুড়া হয়ে
আর ছােট ছেলেদের হিসাব দিতে হয় না কেবল
বড়দের বেলাই হিসাব নিকাশের মারা মারি কেন ?
টু—তার কারণ হচ্ছে এই,-মনে করুন আপনি সেই দূর
দেশে কাজ করছেন। আপনার কাজ শেষ না হলে ত আর
বাড়ী ফিরে যেতে পারেন না; তা সে যত দিনই লাগেনা কেন।
এর মধ্যে হয় তাে আপনার মেজ ভাই ও ছােট ভাই বেড়াতে
এল। ছােট ভাই, সে শুধু বেড়াতেই এসেছে ; এক দিন
পরেই বাড়ী ফিরে যাবে। আর মেজ ভাই এসেছে দু এক
সপ্তাহ থেকে আপনার কাজ অনেকটা আগিয়ে দিতে।
পরেই সে বাড়ী ফিরে যাবে। এখন দেখুন, ছােট ভায়ের
কোন কষ্ট নাই। সে আরামের সঙ্গে এল আর আরামের সঙ্গে
ফিরে গেল। তাকে কোন হিসাব দিতে হবে না। মেজ ভাই
এল কতকটা কাজের ভার মাথায় নিয়ে, আর গেল-কাজের
;
২৮

মৃত্য!
স্বপ্নসুপা
হিসাব নিকাশের কথা ভাবতে ভাবতে । আর বড় ভাই
বেচারীর কথা না বললেও চলে। আপনি যে কথাটা জিজ্ঞাসা
করলেন এও ঠিক তেমনি।
আমি–আচ্ছা,
বলতে পার আত্মহত্যা করাতে পাপ
হ: কেন ?
টু-বেশ, মনে করুন আপনি সেই দূর দেশেই আছেন,
আর আপনাকে অনেকগুলি কাজ শেষ করতে হবে। এমন
সময় আপনি বুঝতে পারলেন যে সেই সমস্ত কাজ শেষ করতে
হলে অনেক বাধা বিঘ্ন উপস্থিত হতে পারে। এই না জেনে,
ভয়ে কাপুরুষের মত কাজগুলি ফেলে রেখে সটান্ সেখান থেকে
সরে পড়লেন। পর দিন হঠাৎ একেবারে বাড়ী গিয়ে হাজির ।
যখন আপনার পিতা সকল কথা জানতে পারবেন, তখন তিনি
আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন না বিরক্ত হবেন বলুন দেখি ? ঠিক
সেই কারণে আত্মহত্যা করা পাপ বা দোষের কাজ।
আমি-শুধু মানুষকে কেন হিসাব নিকাশ দিতে হয়,
অন্যান্য প্রাণীদেরই বা খতিয়ানের দরকার নাই কেন ?
টু-দেখুন, মানুষ হচ্ছে সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব।
যত সব
দায়ীত্বপূর্ণ কাজ তাদেরই হাতে। এ জন্যই তাদের খতিয়ানের
দরকার। যেমন মনে করুন,
করুন, আপনার এষ্টেটের
ম্যানেজারের হাতে। তার অধীনে অনেক পাইক, পিয়াদা,
গােমস্তা, দফাদার প্রভৃতি কাজ করে। এখন সেই এষ্টেটের

স্বপ্ন- । আয় ব্যয়ের জমা খরচ আপনি সেই ম্যানেজারের নিকট থেকে নিবেন, না সমস্ত পাইক বরকন্দাজের নিকট হতে ? নিশ্চয় বলবেন, ম্যানেজারের কাছে। এ ক্ষেত্রেও ঠিক সেই রকম। সৰ্ব্বশক্তিমান জগতপিতা শুধু তাঁর শ্রেষ্ট জীব মানুষের নিকট হতেই হিসাব নিকাশের খতিয়ান তলব করবেন।ভাল কথা, বলুন ত কেহ মরে গেলে তাকে কি করে ? আমি—হয় তাকে কবর দেয়, না হয় পুড়িয়ে ফেলে। যার শাস্ত্রে যেরূপ বলে সে সেরূপ করে। টু-উ-হু,-এটা আপনাদের আপনাদের একটা মস্ত ভুল ধারণা। কা'কেও কেউ কখন কবর দিতে বা পুড়িয়ে ফেলতে পারে না। আমি-সে কি রকম? বেশ করে বুঝিয়ে বল, না হলে আমি মােটেই বুঝতে পারছি না। টু-বেশ, মনে করুন আপনার একটা ঘড়ি আছে। একদিন কেউ এসে বেশ চালাকির সাথে ঘড়ির কাটা আর তার বাহিরের খােলসগুলো রেখে দিয়ে, কলকজ৷ যা কিছু সমস্তই বের করে নিয়ে চুপ করে সরে পড়লাে। আপনি ঘরে এসে দেখেন ঘড়ি বন্ধ । কোন রকমেই আর তাকে চালাতে পারলেন না। তখন রাগ করে সেই খােলটা ফেলে দিয়ে এলেন। এখন আপনি মনে করতে পারেন যে, আপনি ঘড়িটা ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবিকই কি তাই? তা কখনই নয়। মূল জিনিসটা ত যে নিয়েছে তার কাছেই রয়ে গেল। এখন সে চাবি দিলেই

]
{ বস্তুবা
সেটা টিক্ টিক্ করে চলতে থাকবে। ঠিক সেই রকম আত্মা
আপনার জায়গায় চলে যায়। তার কখন ও ধ্বংশ নাই।
আপনারা সৎকার করেন তার ক্ষণভঙ্গুর অপবিত্র দেহটার।
দেহটার কোন মূল্য হয় না। এখন বুঝতে পেরেছেন ত ?
আমি-আচ্ছা বলত আত্মীয় স্বজনের মৃত্যুতে দুঃখ
হয় কেন ?
টু --- দুঃখ হয় কেন ? তার কারণ হচ্ছে মায়া, যেমন
মনে করুন, আপনার এক আত্মীয় কোনও শুভ কাজে, নিজের
উন্নতির জন্য কোন এক দূর দেশে যাচ্ছেন। সেখানটায়
একবার গেলে জীবনে আর ফিরবেন না বা চিঠি পত্রও দিতে
পারবেন না। সেখানে গেলে আপনাদের সঙ্গে তাঁর চি,
বিচ্ছেদ হবে। এস্থলে আপনারা তাকে বিদায় দিতে নিশ্চয়
দুঃখ প্রকাশ করে থাকেন। কেহ কেহ আবার মনের দুর্বলতা
বশতঃ চোখের জল ফেলেন। (আমি অনেক হজ্জ যাত্রী
ও তাদের আত্মীয় স্বজনকে বিদায় বেলায় কাঁদতে দেখেছি।
মৃতের জন্য দুঃখও ঠিক সেই রকম। কিন্তু মনে মনে দুঃখ
করাটা অন্যায় না হলেও সেটা বাহিরে প্রকাশ করা বড়ই
অন্যায়। কারণ সেই বিদেশ যাত্রী যদি জানতে পারে যে তার
আপনাদের কষ্ট হচ্ছে, তা হলে তার মনের উৎসাহ
অনেকটা কমে যায়। আর সেখানে গিয়াও সে
আর সেখানে গিয়াও সে কিছুতেই
মনে শান্তি পায় না। আত্মার বেলায়ও ঠিক সেই অবস্থা।••••••
৩১

স্বপ্ন-সুধা
আমি আর ও কি যেন জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছিলাম
এমন সময় সে হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া বলিল -দেখুন, আপনার
ঘরে কে যেন ঢুকছে। আমি আর থাকতে পারবাে না ;
তাহলে যাই এখন। এই কথা বলতে বলতে সে তাড়াতাড়ি
উঠিয়া জানালা দিয়া বাহির হইয়া গেল। পরক্ষণেই আমার
ছােট ভাই মাহতাবের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গিলে উঠিয়া
দেখি সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে, অধিকাংশ ছেলেই পড়িতে বসিয়াছে
বা বসিবার আয়ােজন করিতেছে। সেকেণ্ড মৌলবী সাহেব
মগরেবের (সন্ধ্যার) নামাজ শেষ করিয়া নিজের ঘরে যাইতে
যাইতে বলিলেন, “সন্ধ্যার সময় ঘুমাচ্ছ কেন, কোন অসুখ
বিসুখ হয় নাই ত?”
“হা সার, একটু জ্বর জ্বর ভাব হয়েছে তাই শুয়েছিলাম”
বলিয়া বাহিরে গেলাম। পরে হাত মুখ ধুইয়া পড়িতে।
বসিলাম।
কিন্তু পড়াশুনায় মন দিব কি, কেবলি সেই
স্বপ্নের কোকিল ছানার কথা মনে হইতে লাগিল
ভাবিতে লাগিলাম—কথাগুলির কি কোনই মূল্য নাই !
মালদহ বাের্ডিং
ইং ৭১১২৯

{ }গল
পাগল
নাম ছিল তাহার নেজামউদ্দিন। কিন্তু মাথায় একটু
গােলমাল থাকায় গায়ের লােকে তাহাকে নেজাম পাগলা
বলিয়া ডাকিত। সে আপন ইচ্ছামত চলে, কাহারও বড়
একটা তােয়াক্কা রাখে না, যখন যেখানে খুসী যায়, হাতে একটা
মস্ত বাঁশের লাঠি, মাথায় কোকড়ান বাব্রী, পরণে সাত তালি
দেওয়া ময়লা কাপড়, গায়ে একটা সেই কাপড়ের উপযুক্ত
কোর্তা, ঘাড়ে একটা ছেড়া কম্বল, কেঁচার সম্মুখ দিকে অনেক
গুলাে পুটলী, সেই সমস্ত পুটলীতে ইট, পাথর, কাচ প্রভৃতির
ছােট ছােট টুকরা, মুখে চাপ দাড়ী, কেঁকড়ান ও লম্বা,-এই
নেজামের সাজ ! যেদিন যাহার বাড়ীতে ইচ্ছা সে পড়িয়া
থাকে। গৃহকর্তা দয়া করিয়া দুইটী ভাত দিলে সে বেশ সন্তুষ্ট
হয় ও আপন মনে হাসিতে হাসতে সেগুলি খায় ; আর ভাত
না দিলে সে সেখানে বসিয়া তাহার চৌদ্দ বা তদূর্ধ্ব পুরুষের
শ্রাদ্ধ করিত থাকে। তাহার মেজাজটা বড় রােখা। তাই
গ্রামের ছেলেরা তাহাকে বিরক্ত করাটা নিরাপদ বলিয়া মনে
করে না। যদিও দুই একটা বখাটে ছেলে তাহার নাগালের
বাহিরে কোন দুর্গবিশেষের আড়াল হইতে তাহাকে মাঝে মাঝে
বিরক্ত করে।
৩৩

স্বপ্ন-সুধা ] পাগ] নেজাম এখন অসহায় হইলেও পূৰ্বে নাকি তাহার অবস্থা মন্দ ছিল না। কয়েক বিঘা জমি, হাল, গরু, বাছুর, সবই তাহার ছিল। তাহার সুন্দরী স্ত্রী ছিল কিন্তু কোন ছেলে হয় নাই। স্ত্রীকে সে অত্যন্ত ভালবাসিত, এবং শুনা যায় এই স্ত্রীই নাকি তাহার পাগলামির প্রধান কারণ। তাহার পাগলামি সম্বন্ধে যে কয়টা প্রবাদ বাক্য শুনা যায় তন্মধ্যে নিম্নলিখিত ঘটনাটীই বিশ্বাসযােগ্য বলিয়া মনে হয়। বৈশাখ মাস। খাল, বিল, নালা, ডােবা, পুকুর, প্রভৃতি যেখানে যাহা ছিল সমস্তই শুকাইয়া গিয়াছে। এমন সময় প্রত্যেক বৎসরই বিলে মাছ মারিবার খুব ধুম পড়িয়া যায়, এবারও পড়িয়াছে। প্রতিদিন এক একজন নাকি বিশ পঁচিশ সের মাছ মারিতেছে। ইহা শুনিয়া নেজামেরও মাছ মারিবার সখ প্রবল হইয়া উঠিল। সে একদিন ভাত খাইয়া সকালেই অনেকগুলি চিড়া ও গুড় গামছায় বাঁধিয়া, স্ত্রীকে আদর করিয়া সাবধানে থাকিতে বলিয়া, তাহার সখের পলইটা ( মাছমারা একপ্রকার যন্ত্র, বাঁশের তৈরী) লইয়া বাহির হইয়া পড়িল। তাহার পর সমস্ত দিন বিলের মধ্যে একা ঘুরিয়া বিফল মনােরথ হইয়া বৈকালে দুঃখিত মনে ও ক্লান্ত শরীরে এক গাছের ছায়ায় ঘুমাইয়া পড়িল। --স্বপ্নে সে আপন প্রিয়তমা স্ত্রীকে পর- পুরুষের সঙ্গে অবৈধ প্রেমালাপ করিতে দেখিয়া চীৎকার করিয়া আর তাহার মাছ মারা হইল না। সে তখনি বাড়ীতে উঠিল। ৩৪

re
পাগল।
স্বপ্ন-সুধা
পোছিয়া অনুসন্ধানে যখন জানিতে পারিল যে তাহার স্ত্রী
চরিত্রহীনা, তখন সে জগৎ অন্ধকার দেখিল। জীবন তাহার পক্ষে
দুর্বিসহ হইয়া উঠিল। সে তাহার স্ত্রীকে ত্যাগ করিল, এবং সমস্ত
সম্পত্তি সেই স্ত্রীর নামে লিখিয়া দিয়া সে পাগল হইয়া গেল।
বাস্তবিকই উপরােক্ত ঘটনাটা সত্য বলিয়া মনে হয়।
কারণ এখনও সে “তাের ভাল হবে না। আমাকে কষ্ট দিয়ে
তুই কি সুখে থাকবি ? তা কখনই থাকবি না। আমি
তাের কি অনিষ্ট করেছিলাম•••" ইত্যাদি বলিয়া প্রলাপ
বকিতে থাকে, আর সময়ে বিকট রবে হাসিয়া উঠে।...
কয়েক মাস পরে নেজামকে টাউনে (রাজশাহীতে) দেখা
গেল। বৈকালে পদ্মার ধারে ধারে বেড়াইয়া যখন হােষ্টেলের
দিকে ফিরিয়া আসিতেছি, সেই সময় কেহ যেন আমাকে
ডাকিল “ও মশায়, ও-ভদ্রলােক, শুনছেন ?” পিছনে ফিরিয়া
দেখিনেজাম ! তাহাকে একটু চিনিতাম বলিয়া জিজ্ঞাসা
করিলাম, “নেজাম, তুমি এখানে এলে কি করে ?”
সে বলিল, “কেন, রেলগাড়ীতে চড়ে এসেছি।”
“টিকিটের পয়সা পেলে কোথায়।
“কানা খোঁড়ার কি পয়সা লাগে ? আমি ত এখন খোঁড়া
হয়েছি, দেখছেন না ?” এই কথা বলিয়া সে তাহার ডান
পায়ের হাঁটু দেখাইল। দেখিলাম সত্যই সেখানে একটা
বড় ঘায়ের উপর ব্যাণ্ডেজ বাঁধা আছে।
৩৫

স্বপ্ন-সুধা ]
“আচ্ছা, তুমি গ্রাম ছেড়ে চলে এলে কেন?”
“গায়ে আবার ফিরে যাব, তবে একটা কাজের জন্য
এখানে কয়েক দিন থাকতে হবে।”
কি কাজ, জিজ্ঞাসা করায় সে চারিদিকে একবার লক্ষ্য
করিয়া খুব সাবধানে আমার কানের কাছে মুখ আনিয়া ফিস
ফিস করিয়া বলিল, “আমি আবার বিয়ে করব, তার জন্য
সােনারকে এক সের সােনা কিনে দিব। তার পর গয়নাগুলাে
গড়ান হলে একেবারে নিয়ে থুয়ে বাড়ী চলে যাব।”
“তুমি যে অতগুলাে সােনা কিনবে তার টাকা কে ?”
এই কথা শুনিয়া সে খুব জোরে হাসিয়া উঠিল। বলিল,
“কত টাকা লাগবে ? লাখ, দু'লাখ বৈ ত নয়, তার জন্য
চিন্তা কি?” তাহার পর সে তাহার কোচার সম্মুখের ঝুলান
পুটলীগুলি দেখাইয়া বলিল, “দেখ, এই পুটলীগুলােতে কি
আছে বল দেখি?”
“তােমার পুটলীতে কি আছে, কি না আছে তা আমি
কেমন করে বলবাে?”
সে হাসিয়া বলিল, “হাঁ, ঠিক বলেছ, এ সমস্ত কিম্মতি (দামী)
জিনিষের কথা তােমরা বলবে কেমন করে । এসব থলেতে
(পুটলীতে) আছে হীরা, জহরৎ আর নম্বরী নােট’ বুঝলে?
“হাঁ, তা ত বুঝলাম, কিন্তু নম্বরী নােট-টা কি জিনিষ
ঠিক বুঝতে পারছি না।
ওটা কি রকম?”

পাগল ]
[ স্বপ্ন-সুধা
নেজাম—নম্বরী নােট চিন না? এগুলো হচ্ছে খুব দামী
নােট। বিদেশে যেতে হলে অনেকগুলাে টাকা পয়সা সঙ্গে
নিলে খুব ভার বােধ হয়, এবং তাতে পথে চলার বড় অসুবিধা
হয়। তাই বড় লােকেরা টাকা পয়সার বদলে নম্বরী নােট
ব্যবহার করে।
আমি–আচ্ছা, ওগুলির দাম কত ?
নেজাম—সব রকমই আছে। শও, হাজার, লাখ টাকা
মেরও আছে আর দুআনা চার আনা দামেরও আছে।
এই কথা বলিয়া সে খুব সাবধানে তাহার একটা পুটলী
খুলিয়া তাহার মধ্য হইতে এক টুকরা নীল রংএর কঁাচ বাহির
করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, “দেখ, এই একটা
খুব
কিম্মতি
নােট। আমি খুসি হয়ে আপন ইচ্ছায় তােমাকে এটা দিচ্ছি।
“ঠিক মত চালাতে পারলে এর দাম কম করে ধরলেও
দশ হাজার টাকা হবে।”
আমি কোন রকমে হাসি চাপিয়া রাখিয়া বলিলাম,
“আমি ও নােট নিয়ে কি করবাে ? বিনা পয়সায় নিতেই
বা যাব কেন? আর নিয়ে ওটাকে চালাবই বা কোথায় ?
তার চেয়ে ও দামী নােট তােমার কাছেই থাকুক। তুমি
সব সময় রাস্তা ঘাটে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছ। ওটা
তােমার কাছে থাকলে সময়ে অনেক কাজে লাগবে ।"
এই কথা শুনিয়া সে বলিল, “আচ্ছা থাক। তারপর
৩৭

স্বপ্ন-সুধা ]
( পাগল
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কি যেন চিন্তা করিল। পরে
হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “ ভাই তােমার বিয়ে হয়েছে ?
আমিনা এখনও হয়নি, কেন ?
নেজাম—এ্যা, তুমি এত বড় হয়েছ তাও তােমার বিয়ে
হয়নি ? (তাহার আশ্চর্য্য হইবার যথেষ্ট কারণ
কারণ ছিল।
বরেন্দ্রের লােক শিক্ষার অভাবে এতদূর অধঃপাতে গিয়াছে
যে, বিবাহকেই তাহার সর্বশ্রেষ্ট কাৰ্য বলিয়া মনে করে
এবং সুযােগ পাইলে দুগ্ধপােষ্য শিশুর বিবাহ দিতেও ইতস্ততঃ
করে না। কেহ কেহ আবার
আবার গর্ভস্থ সন্তানের বিবাহের
চুক্তিতে আবদ্ধ হইয়া থাকে। এমনি আমাদের দুর্ভাগ্য !)
আমি—হ, সত্য সত্যই হয়নি।
সত্য সত্যই হয়নি। কেন, আমার কথা
বিশ্বাস হচ্ছে না?
নেজাম-না--তা-নয়-...আচ্ছা আমি যদি তােমার জন্য
একটা লাল টুক টুকে পাত্রী ঠিক করি, তাহলে পছন্দ হবে ত ?
“আমার পাত্রী তুমি ঠিক করতে যাবে কেন? আমার
বাবা, মা, ভাই, বােন, সকলে বেঁচে থাকতেও কি
পাত্রী ঠিক করে দিবে ?”
নেজাম অনেকটা নিরুৎসাহ হইয়া বলিল, “বেশ, তােমার
যখন বিয়ে হবে তখন আমাকে একটা চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ
করাে। তােমার বৌকে একটা নম্বরী নােট যৌতুক দিব।
সেটা লাখ টাকা দামেরও হতে পারে বুঝলে?
৩৮

পাগল ]
[ স্বপ্ন-সুধা
আমি-বেশ, যখন আমার বিয়ে হবে তখন দেখা যাবে।
আজকের মত তুমি যাও। সন্ধ্যা হয়ে এল, আমিও হােষ্টেলে
যাই।
নেজাম-হাঁ ভাই তােমাদের হােষ্টেলে আমাদের থাকতে
দিবে না ?
আমি—না, এটা গভর্ণমেন্টের হােষ্টল। এখানে ছাত্র
ছাড়া কোন বাজে লােককে থাকতে দেওয়া হয় না।
নেজাম-বেশ, আমি থাকতে চাই না, কেবল তােমাদের
হেষ্টেলটা দেখব চল।
“দেখবে যখন, তখন এস,” বলিয়া তাহাকে সঙ্গে লইয়।
হােষ্টেলে আসিলাম। তারপর তাহাকে হােষ্টেল, ইন্দার,
পাকের ঘর, খাবার ঘর প্রভৃতি দেখাইয়া অবশেষে বিদায়
দিলাম। পরে নিজের ঘরে যাইয়া সন্ধ্যার নামাজ শেষ
করিয়া লণ্ঠন জ্বলিয়া পড়িতে বসিলাম।••••••
পল্লীগ্রাম অপেক্ষা সহর অনেক বিষয়ে উন্নত। এইরূপ
উন্নত স্থানে যে কেহ বাস করিতে আসে সেই উন্নতি লাভ
করে। যাহার যে ব্যবসায় সে সেই ব্যবসায়ে লাভবান
অতএব আমাদের নেজামের পাগলামিও যে উন্নতিলাভ
করিবে তাহার আর আশ্চর্য কি?
নেজামের পাগলামি খুব দ্রুত গতিতে উন্নতি-লাভ করিতে
লাগিল, এবং অল্প দিনের মধ্যেই নেজাম উদ্দিন পাগল শ্রেণীতে

স্বপ্ন-সুধা )
পাগল।
ন:।
প্রথম স্থান অধিকার করিল । সে তাহার ভাবী স্ত্রীর জন্য
সােনারের দোকানে অলঙ্কারের বায়না দিবার কথা ভুলিয়া
গিয়, তাহার বহুমূল্য মণি, মুক্তা, নম্বরী নােট প্রভৃতি কেঁচায়
ঝুলাইয়া টাউনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।
কিন্তু এখন আর একা থাকে
কোন স্থানে
সে যাওয়া মাত্র তাহার
তাহার অনেকগুলি ভক্ত জুটিয়া যায়,
এবং তাহারা নানারূপ গােলমাল আর চীংকারে সে যায়গাটা
মুখরিত করিয়া তাহার মত বড় লােকের অস্তিত্ব সকলকে
জানাইয়া দেয়। সে তাহার ভক্তদিগকে যথাসাধ্য গালাগালি
ও প্রহারের ভয় প্রদর্শন করা স্বত্বেও তাহারা অসন্তুষ্ট, বিরক্ত বা
ভীত হয় না; বরং হাসিমুখে সমস্ত সহ্য করে এবং নেজামের
রাগ দেখিয়া আহলাদে আটখানা হয়।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সে এই অল্পদিনের মধ্যেই এই
সহরের প্রায় সকলের পরিচিত হইয়া পড়িয়াছে; এবং খুব
সতর্ক থাকা স্বত্বেও তাহার মণিমুক্তার কথা অনেকেই জানিয়া
ফেলিয়াছে। তাহার লাঠি কম্বল ও সেই মূল্যবান (?)
পুটলীগুলি তাহার অনেক ভক্তের চক্ষেই বেশ লােভনীয় বস্তুতে
পরিণত হইয়াছে ; এবং তাহারা একটু সুযােগ পাইলেই সেগুলি
হস্তগত করিতে চেষ্টা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এপর্যন্ত সেই
হতভাগ্যদের কাহারও মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই।
নেজামের চোহরার ও বেশ পরিবর্তন হইতে লাগিল।
;
৪০

পাগল ]
[ স্বপ্ন-সুপ
উঠিল।
তাহার দাড়ি ও চুল যেন পাল্লা দিয়া বাড়িয়া চলিল। তাহার
শরীর-অনিয়ম, অনাহার, অনিদ্রা, অশান্তি ও অতিরিক্ত
পরিশ্রমের ( ভক্তদের সঙ্গে অবিরাম ঝগড়ার) ফলে দিন দিন
শুকাইয়া যাইতে লাগিল। দেখিলে মনে হয় যেন দুই দিন
পরে আর একটু শুকাইয়া হাল্কা হইলে, সে আর মাটিতে পা
দিয়া হাঁটিবে না, একেবারে পাখীর মত উড়িতে সুরু করিবে।
তাহার কাপড়গুলি ময়লার গণ্ডী ছাড়াইয়া এতদূরে আসিয়া
পড়িয়াছে যে, কোন ধােপাই আর তাহাকে পরিষ্কার করিতে
সক্ষম হইবে না। এখন তাহার পুটলিগুলিও বেশ বড় হইয়া
কারণ রাজশাহীর পথে ঘাটে সেইরূপ মনিমুক্তা ও
নম্বরী নােটের অভাব হয় না। তবে দুঃখের বিষয়, আমাদের
মত সাধারণ লােকে সেগুলির মর্যাদা বােঝে না।
নেজামউদ্দিন এখন গান গাওয়া, ঝগড়া করা, চেঁচান প্রভৃতি
ছাড়া আরও অনেক কাজের কথা বলিয়া থাকে। সে বলে যে,
সম্রাট পঞ্চম জর্জ তাহার মাসতুতাে (খালাতাে ভাই, ভারতের
আট আনা অংশের সেই প্রকৃত মালিক, তবে সম্রাট নাকি
অন্যায় উপায়ে তাহাকে ফাকি দিয়া তাহার ন্যায্য পাওনা হইতে
তাহাকে বঞ্চিত করিয়াছেন। কলিকাতায় তাহার দাদার
( ঠাকুরদাদার) সাত তলা বাড়ী, পঁচিশটা হাতী, আমলা,
সিপাহী, গােমস্তা, বরকন্দাজ, ধনদৌলত সবই ছিল, কিন্তু
গভর্ণমেন্ট সে সমস্তই অন্যায় ভাবে বাজেয়াপ্ত করিয়াছেন।
৪১

স্বপ্ন-সুধা ]
[পাগল
• | ০ ০ ০
সে ইচ্ছা করিলে হাইকোর্ট’ পৰ্যন্ত মােকর্দমা করিয়া সেগুলি
উদ্ধার করিতে পারে এবং গভর্ণমেন্টকে বিশেষ রূপে জব্দ করিতে
পারে। তবে গভর্ণমেন্টের বিশেষ সৌভাগ্য, তাহার আর সে
সম্পত্তিতে মােটেই লােভ নাই। কারণ বর্তমানে তাহার যে
সম্পত্তি আছে তাহার আয় হইতেই অনেক অসহায় পরিবার
প্রতিপালিত হয়।-ইত্যাদি
একদিন যখন কলেজ হইতে ফিরিয়া আসিয়াছি এবং
হােষ্টেলে নিজ ঘরে ঢুকিতে যাইতেছি,
তখন বাবুর্চিখানার
দিকে একটা গােলমাল হইতেছে বলিয়া মনে হইল। অমনি
তাড়াতাড়ি বইগুলি রাখিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম।
কিন্তু পাক ঘরে যাইবার আর দরকার হইল না। সম্মুখেই
একজন সহপাঠীকে দেখিয়া ব্যাপার কি জিজ্ঞাসা করায় তিনি
বলিলেন, “আরে দূর, কোথাকার এক পাগল এসে পাকঘরের
বারান্দায় বসেছে। বাবুর্চিরা তাকে সেখান থেকে যেতে বলায়
সে গালাগালি দিচ্ছে আর মারতে উঠছে।”
আমি বলিলাম, “চল, একটু মজা দেখা যাক।”
তিনি বলিলেন -হঁা, মজা না ছাই দেখবে, ও পাগলের
পাগলামি দেখে কি লাভ হবে ? তার চেয়ে চল একটু নদীর
ধারে বেড়িয়ে আসি।
আমি আজ আর বেড়াতে যাব না, তােমার ইচ্ছা হয়ে
থাকে তুমি যাও। -এই কথা বলিয়া হােষ্টেলের ছাদে
3

পাগল ]
[ স্বপ্ন-সুধা
উঠিলাম। কারণ এই ছাদ হইতে চারিদিকে অনেক কিছুই
দেখা যায়। ছাদে উঠিয়া প্রথমেই বাবুর্চিখানার দিকে দৃষ্টিপাত
করিলাম। দেখিলাম এই পাগল আর কেহ নহে আমাদের
নেজামউদ্দিন ! বাবুর্চি তাহাকে দূর হইতে খুব শাসাইতেছে,
কিন্তু ভয়ে তাহার নিকট যাইতে পারিতেছে না। কয়েক জন
হােষ্টেলের ছাত্র ও বাহিরের কয়েকজন সেখানে দাড়াইয়া মজা
দেখিতেছেন। কেহ বাবুর্চিকে উত্তেজিত করিতেছেন এবং
উৎসাহ দিতেছেন। কেহ বলিতেছেন, “যাওনা বাবুর্চি আগিয়ে,
ভয় কিসের ? ও পাগলটা তােমার কি করবে ?” কেহ বা
বলিতেছেন, “বাবুর্চি, তুমি কোন কাজের নও। আরে চট
করে ওর লাঠিটা কেড়ে নিলেই ত মিটে যায়।•••” ইত্যাদি।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এ পর্যন্ত বাবুর্চি পাগলের নিকট যাইতে
পারিল না।
কেবল দূরে থাকিয়াই তাহার বীরত্ব প্রকাশ
করিতে লাগিল। আর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলােকপ্রাপ্ত
সুশিক্ষিত (?) হােষ্টেলের ছাত্রগণ তাহাতে এইরূপ বিকট অঙ্গ
ভঙ্গি (এ উহার গায়ে ঠেলা মারিয়া) সহকারে আনন্দে হাসিতে
লাগিলেন যে, তাহাদের কাহার কয়টা দাত, এবং মুখের গভীরতা
কতটা, এসমস্ত বিষয় অবগত হওয়া কাহারও পক্ষে সে সময়
তেমন কষ্টকর হইত না।
আমি একবার মনে করিলাম—“যাই, তাকে সে বিপদ
থেকে উদ্ধার করি। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হইল—বেশ,

স্বপ্ন-সুধা :
পাগল
তাকে ত উদ্ধার করতে যাব, কিন্তু এর মধ্যে যদি সে আমাকে
চিনে ফেলে ! তা হলেই ত সে আমার মান মৰ্য্যাদা সব নষ্ট করে
দিবে (?) ! ছেলেরা যখন দেখবে যে, তার মত একটা আস্ত
পাগলের সঙ্গেও আমার আলাপ আছে এবং সে আমাকে
বিলক্ষণ চিনে, তখন কি কেলেঙ্কারীটাই না হবে । আর সে
যে আমাকেও লাঠি নিয়ে তাড়া করবে না সে কথা কে বলতে
পারে?'—এই সকল বিষয় ভাবিয়া আর তাহাকে উদ্ধার করতে
ইচ্ছা হইল না। সুতরাং নীরবে বসিয়া বসিয়া তামাসা দেখিতে
লাগিলাম।
কথিত আছে-মুসলমানের ( অবশ্য কলিযুগের বাঙ্গালী
মুসলানের) তিনটা ছেলেকে একজায়গায় কবর দিলে তারা
ভূত হয়ে সেই কবরের মধ্যেই উৎপাত আরম্ভ করে ;-কাজেই
আমরা সেইরূপ ষাট পঁয়ষট্টিজন ছেলে জীবন্ত অবস্থায় থাকিতে
কি এই হােষ্টেলে পাগলের পাগলামী খাটে ? অতএব আমাদের
নেজামউদ্দিন অবশেষে তাহার পোঁটলা “টলী গুটাইয়া লইয়া
আমাদের গুণগান (?) করিতে করিতে এবং জোর গলায়-
আমরা যে তাহার বড় কুটুম্ব এবং এইরূপ আরও অনেক
প্রকারের মধুর আত্মীয় হই, এই কথা সকলকে জানাইয়া দিয়া
উঠিয়া পড়িল। তাহার খোঁড়াইয়া হাঁটা দেখিয়া সে যে শুধু
পাগল নহে খোঁড়াও বটে, ইহা ভাবিয়া মনে বড় দুঃখ হইল।
চলিবার সময় তাহার খোড়া পা টা পিছনে অর্থাৎ হােষ্টেলের
৪৪

পাগল ]
দিকে সমকোণ আকারে দুলিতেছিল। কিন্তু সেটা তাহার
পায়ের অসুখের জন্য অথবা হােষ্টেলের ছাত্রদিগকে সম্মান
প্রদর্শনের জন্য, তাহা বলা শক্ত।
বাহিরে গিয়া পাগল কি করে ইহা জানিবার জন্য বড়ই
ইচ্ছা হইল। সেই জন্য ছাদ হইতে নীচে নামিয়া আসিলাম।
কিন্তু বাহিরে যাইবার জন্য যেমনই সিড়িতে পা দিয়াছি অমনি
য্যাসিষ্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেবের স্বর কানে আসিল।
আমি দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম—-মৌলভী সাহেব,
আমাকে ডাকছেন কি ?
“হা, আপনার একখানা চিঠি আছে নিয়া যান ।” আমি
চিঠিখানা লইয়া বড় আগ্রহের সহিত পড়িতে লাগিলাম।
( কারণ ছাত্রগণ, বিশেষ করিয়া বােডংএর ছাত্রগণ একখানি
চিঠির জন্য বিশেষ লালায়িত।) কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ
কোন সুখবরের পরিবর্তে সেখানে লেখা ছিল,-“আমার
স্নেহাশীষ নিবে। অনেক দিন হতে তােমার পত্র না পেয়ে বড়
চিন্তিত আছি। তােমার দাদাজান অত্যন্ত পীড়িত, বাঁচিবার
আশা খুব কম। পত্র পাঠ মাত্র দুইদিনের ছুটি নিয়ে চলে
আসবে। বাটীস্থ অন্যান্য সংবাদ ভাল। তােমার কুশল কামনা
করি। ইতি-•••আশীৰ্বাদক তােমার পিতা।”
চিঠি পড়িয়া মন বড়ই খারাপ হইয়া গেল। মনে মনে
ভাবিলাম, সেই পাগলটার অভিশাপের ফলেই আমার এই
৪৫

স্বপ্ন-সুধা]
[ পাগল
শাস্তি হইল। যাহা হউক মনকে প্রবােধ দিয়া তখনই একটা
দরখাস্ত লিখিয়া সুপারিন্টেণ্ডেন্ট সাহেবের বাসায় উপস্থিত
হইলাম।
ছুটি মঞ্জুর হইতে বিলম্ব হইল না। হােষ্টেলে ফিরিয়া
আসিয়া তাড়াতাড়ি পরিষ্কার কাপড় পরিয়া রাস্তা খরচ সঙ্গে
লইয়া বাহির হইয়া পড়িলাম।
পড়িলাম। তারপর বাজারে কিছু
ফলমূল কিনিয়া টমে উঠিয়া শীঘ্রই ষ্টেশনে উপস্থিত হইলাম।
টিকিট কিনিয়া প্ল্যাটফর্মে দাড়াইতেই গাড়ী আসিল। আমিও
দয়াময়ের নাম স্মরণ করিয়া ট্রেনে উঠিয়া পড়িলাম।•••
দুই দিবস গত হইয়া গিয়াছে। সেই দিন বাড়ীতে পৌছিয়া
যখন দাদাকে দেখিলাম তখন তিনি এই জগৎ হইতে ছুটি
লইয়া অন্য জগতে চলিয়া গিয়াছেন। কেবল তঁাহার ক্ষণভঙ্গুর
দেহটী কাফন (মৃতদেহকে যে পােষাক পরান হয়। পরিয়া
বেশ আরামের সহিত শুইয়া আছে। অগত্যা হতাশ হইয়া
সকলের সহিত কাদিতে সুরু করিলাম।সে সব কথা বলিয়া
আর কি হইবে? এখন আমার ছুটি ফুরাইয়াছে তাই গরুর
গাড়ীতে চড়িয়া রেল ষ্টেশনের দিকে রওয়ানা হইলাম।•••কয়েক
ঘন্টা পরে আমার গাড়ী নির্দিষ্ট স্থানে পৌছিল। ষ্টেশন মাষ্টারকে
জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম যে, রাজসাহী যাত্রী ট্রেন
আসিতে তখন আরও সাড়ে তিন ঘণ্টা বাঁকী। অতএব কিছু
জলযােগ করিয়া গাড়ীতে যাইয়া শুইয়া পড়িলাম, এবং চাকরকে
৪৬

পাগল
[ স্বপ্ন-সুধা
বলিয়া দিলাম, যেন টিকিট কাটার ঘণ্টা পড়িলেই, সে আমাকে
স্মরণ করাইয়া দেয়। শুইয়া কেবল
কেবল দাদার কথাই মনে
হইতে লাগিল এবং চোখে দুইটি মুক্তাফল দেখা দিল।
কতক্ষণ পরে হঠাৎ এক পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইয়া
উঠিয়া বসিলাম। সম্মুখে চাহিয়া দেখি নেজাম ! সে আমাকে
দেখিতে পাইয়াই
বলিল, “কি
বাবু, বাড়ী কবে আসা
হয়েছিল ?”
আমি—আজ দুই দিন হ'ল, তুমি ভাল আছত? নেজাম
-হ্যা, আল্লা চাহে ত বেশ আছি।-আচ্ছা, তােমার চোখে
পানি কেন ?
আমি বড় অপ্রস্তুত হইয়া গেলাম। তাড়াতাড়ি চোখের জল
মুছিয়া বলিলাম –ও-এমনি, বােধ হয় ঘুমের ঘােরে বেরিয়েছে
নেজামউ—— ও এমনি কিছুতেই নয়। তুমি
কঁদছিলে কেন তা আমাকে বলতেই হবে। সে কথা না
শুনে আমি আর এখান থেকে নড় ছিনা।
তাহার কথা শুনিয়া আমার মন অনেকটা নরম হইয়া
গেল। চোখ দিয়া আরও জল বাহির হইতে চাহিল। আমি
অতি কষ্টে তাহা দমন করিলাম। ভাবিলাম,-হায়, যাদের
এমন হৃদয়, যারা পরের সুখ দুঃখ বােঝে, তাদের লােকে
পাগল বলে কেন ? যাহা হউক তাহার পীড়াপীড়িতে অবশেষে
বাধ্য হইয়া আমার দাদার মৃত্যুর কথা তাহাকে বলিলাম।
৪৭

স্বপ্ন-সুধা
| পাগল
সে সমস্ত কথা শুনিয়া ‘হাঃ, হাঃ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া
বলিল,-ও, দাদার মৃত্যুতে এ মায়াকান্না কঁদছাে ? কেন
সে বুড়াটার জন্য কাঁদবে ? আচ্ছা বল দেখি, তুনি যখন মরবে
তখন কি সেই বুড়াটা তােমার জন্য কাঁদতে আসবে?
কি এখই ঐ বিরাট অগ্নিকুণ্ডে পাঠান হইবে ?-
আমি তাহার এইরূপ ব্যবহারে খুবই আশ্চৰ্য্য ও বিরক্ত
হইয়া গেলাম। কিছুক্ষণ পূৰ্ব্বে তাহার জন্য যে সহানুভূতির
সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা হারাইয়া গেল। সে যে একটা বড়
দরের পাগল সেই কথা ভুলিয়া গিয়া তাহাকে কড়া স্বরে
বলিলাম,-দেখ নেজাম, হিসাব করে কথা বল, সব সময়
তােমার পাগলামি ভাল লাগে না, বুঝেছ?
এই কথা শুনিয়া সেও রাগিয়া উঠিয়া বলিল -দেখ, সব
সময় পাগল পাগল করো না। আমি যে পাগল তা কি
আমার গায়ে লেখা আছে ?
আমি—তা কি কারও গায়ে লেখা থাকে ? আচার, ব্যবহার,
পােষাক, পরিচ্ছদ প্রভৃতি দেখেই লোেক চেনা যায়।
নেজাম-বেশ, আমার ব্যবহারে এমন কি দেখলে যাতে
লােকে বুঝতে পারে যে, আমি একটা আস্ত পাগল ?
আমি-তার কারণ তুমি, হেঁড়া কাপড় পর, যা তা বাজে
বকতে থাক, খামখেয়ালীর মত যা খুসী তাই কর, তােমার
মতের সঙ্গে কারও মতের মিল হয় না...এ সমস্ত কারণেই
প্রমাণ হয় যে, তুমি একটা আস্ত পাগল।
৪৮

পাগল ]
স্বপ্ন-সুধা
নেজাম-দেখ, জগতে অনেক বড়লােক হেঁড়া তালি দেওয়া
কাপড় পরেন এবং প্রত্যেকেই নিজের খেয়াল মত চলেন
অথচ তারা পাগল না! আর যদি মতের মিল না হওয়াকেই
পাগলামির চিহ্ন বলে মনে কর, তাহলে জিজ্ঞাসা করি—তােমার
মতের সঙ্গে দুনিয়ার সব লােকের মত মিলেছে কি ? দুনিয়ায়
তােমাদের মত ঠাণ্ডা মাথাওয়ালা যত লােক আছে তাদের
প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের মত মিলেছে কি?
আমি—না, তা কি মিলে ? সেটা অসম্ভব।
নেজাম—তাহলে তোমরা প্রত্যেকে অন্যকে পাগল বলনা
কেন ? দেখ, আমি বলছি, দুনিয়াত আমাদের অর্থাৎ পাগল
নাম ধারীর সংখ্যা তােমাদের চেয়ে খুবই কম বলে তােমরা
আমাদের পাগল, ছাগল, ক্ষ্যাপা, প্রভৃতি যা খুসী তাই বলে যাচ্ছ।
কিন্তু আমাদের সংখ্যা যদি তােমাদের চেয়ে বেশী হত, তবে
তােমরাই এ সব উপাধী পেতে, এবং এগুলাে বাস্তবিকই
তােমাদের ন্যায্য পাওনা, বুঝেছ ?
আমি তাহার এইরূপ কথায়
কথায় অবাক হইয়া গেলাম।
পাগলের পেটে যে এত কথা থাকিতে পারে ইহা স্বপ্নেও ভাবি
নাই।
অতএব অনেকটা নরম গলায় জিজ্ঞাসা করিলামসে
কি রকম কথা, পাগল উপাধি আমাদের ন্যায্য পাওনা হলাে
কি করে ?
নেজাম—তােমরা পাগল বই কি? তােমরা এক জাতীয়
৪৯
৪

স্বল্প-সুধা ]
[ পাগল
অনেকগুলী পাগল (যাদের মতের কতকটা মিল আছে এমন
লােক) এক সঙ্গে মিলে পৃথিবীতে নানা দলের (যেমন-বাঙ্গালী,
উড়িয়া, কাফ্রি, ইরানী, ইংরেজ, ইত্যাদি) সৃষ্টি করে বাস
করছে, এবং মনে করছে যে, তােমরা খুব বুদ্ধিমান! তােমরা
দুনিয়া নিয়ে মেতে আছ বলে আমাদের পাগল বলে থাক।
কিন্তু দুনিয়া নিয়ে পাগল তােমরা, সে আমরা নই। অতএব
তােমরাই যথার্থ পাগল ।
আমি-বেশ, তা না হয় হল। কিন্তু কেহ মরলে কি
তার জন্য দুঃখ করা উচিৎ নয় ? তুমি তখন হালে কেন ?
নেজাম -মৃত্যুতে দুঃখ করার মত এমন কি আছে ?
মৃত্যু হলেই ত আত্মা মুক্তি পেল।
এটা একটা সুখবর
বলতে হবে। এর জন্য আবার দুঃখ করব কেন? কাহারও
মৃত্যতে এইরূপ মনে করা উচিৎ যে, তিনি যে পথ দিয়ে
গেলেন আমরাও একদিন সেই পথ দিয়ে যাব, এবং তারই
মত একদিন মুক্ত হয়ে তার সঙ্গে মিলতে পারব।
আমি—তবে কি মৃতের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা একেবারেই
উচিৎ নয় ?
নেজাম-হঁা, দুঃখ করা যেতে পারে। তবে তিনি যে
মরে গেলেন, আর ফিরে আসবেন না, আর তার সঙ্গে দেখা
হবে না, ••• ••এসব কারণে নয়। বরং দুঃখটা নিজেদের অর্থাৎ
জগতের দিক দিয়ে প্রকাশ করাই ভাল। অর্থাৎ তিনি

পাগল !
[ স্বপ্ন-সুধা
যাওয়াতে যে জগতের ক্ষতি হ'ল, তিনি বেঁচে থাকলে জগতে
আরও অনেক মঙ্গল জনক কাজ করতে পারতেন, এই সমস্ত
ভেবে দুঃখ প্রকাশ করা যেতে পারে।
আমি-আমার কিন্তু মৃতের জন্য দুঃখ প্রকাশ
প্রকাশ করাটা
অন্যায় বলে মনে হয় না।
নেজাম--এটা
তোমার ভুল ধারণা। মৃতের জন্য দুঃখ
করা যে খুবই অন্যায় সে কথা আমার অল্প বুদ্ধিতে যথাসাধ্য
বুঝাবার চেষ্টা করছি শােন। -জগতের সমস্ত কাজই দয়াময়
প্রভুর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। মৃত্যুও তাই। এখন এই মৃত্যুতে
শােক প্রকাশ করা মানেই হচ্ছে তাঁর কাজে অসন্তষ্ট হওয়া।
অতএব এটা অন্যায়। তার পর সবাকেই যখন একদিন
নিশ্চয় মরতে হবে তখন আর মৃতের জন্য শােক করা কেন ?
আর দেখ দুঃখ প্রকাশ করাটা নিজের অবস্থার কথা ভেবে
হওয়াই সব চেয়ে ভাল বলে মনে করি।
আমি ---সে কি রমক, ভাল করে বুঝিয়ে দাও।
নেজাম--নিজের দিকটা অর্থাৎ এই ভেবে দুঃখ করা
উচিত যে, হায় !
তিনি মুক্তি লাভ করলেন, আর এই
পাপে ভরা পৃথিবী হ'তে ত আমাকেও একদিন যেতে হবে।
তবে সে দিনটা আজকের এই দিনটাই হলাে না কেন? তার
কত দিন এ জগতে থাকব ভ ত জানি না। এর মধ্যে না
জানি কত পাপ কত অন্যায়ই না করব !••••••ইত্যাদি

স্বপ্ন-সুধা
[ পাগল
তাহার কথা শেষ হতে না হইতেই কেমন যেন একটা
গােলমাল শুনিতে পাইলাম। নেজাম যেন হঠাৎ কোথায়
মিশিয়া গেল ! আমার চাকরটার ডাকাডাকিতে ধড়মড় করিয়া
উঠিয়া বসিলাম। বুঝিলাম এতক্ষণ কেবল স্বপ্নই দেখিয়াছি
এবং ইতিমধ্যে ট্রেন আসিয়া ষ্টেশনে লাগিয়াছে। আমার
চাকর টিকিট কাটার ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাকে
নাই কেন, জিজ্ঞাসা করায় সে যাহা উত্তরে বলিল তাহাতে
বুঝিলাম যে, প্রভুভক্ত চাকর প্রভুরই অনুসরণ করিয়া থাকে।
যাহা হউক তাড়াতাড়ি টিকিট কিনিয়া ট্রেনে উঠিয়া
পড়িলাম এবং অল্পক্ষণ পরেই ট্রেন চলিতে সুরু করিল।.........
হােষ্টেলে আসিয়া ঢুকিতে একজন বন্ধু জিজ্ঞাসা করিলেন,
“কিহে বাড়ীর খবর ভাল ত? বাড়ী ওয়ালী কেমন আছেন ?”
আমি মনে মনে বিরক্ত হইয়া ছােট একটা উত্তর দিয়া
নিজের ঘরে ঢুকিয়া পড়িলাম। তার পর কাপড় চোপড় ছাড়িয়া
বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম। দাদার কথার সঙ্গে সঙ্গে নেজামের
কথাও মনে হইল। তাহার কথাগুলি (স্বপ্নের ঠিক বিশ্বাস
করিতে না পারিলেও একেবারে পাগলামি বলিয়া মনে হইল
না। মনে মনে ঠিক করিলাম যে নেজামের দেখা পাইলেই
তাহাকে কিছু দিয়া বেশ করিয়া বুঝাইয়া তাহার গ্রামে পাঠাইয়া
কিন্তু আমার মনের ইচ্ছা মনেই রহিয়া গেল।
নেজামের সাক্ষাৎ লাভ আর ঘটিয়া উঠিল না।
ফুলার হােষ্টেল, রাজশাহী
ইং ১৯৩২
দিব।
৫২

এঞ্জিন।
স্বপ্ন-সুধা
এঞ্জিন
;
মানুষের একটা জন্মগত অভ্যাস হইতেছে এই যে সে চিরকাল
একই স্থানে স্থিরভাবে আবদ্ধ থাকিতে পারে না, বা সকল
সময় একই কার্যে লিপ্ত থাকিতে পারে না; একটু পরিবর্তন
চায় । সেই কারণেই স্কুলের-ছুটির পর ছাত্রেরা বা অফিস
হইতে প্রত্যাগত কর্মচারিগণ গৃহে স্থির থাকিতে পারেন না।
বৈকালে একটু ভ্ৰমণ বা ক্রীড়া কৌতুক করিবার একান্ত
প্রয়ােজন হইয়া পড়ে। কেহবা সেই সময়ের সুযােগ পাইলে
থিয়েটার বায়ােস্কোপ প্রভৃতি
প্রভৃতি দেখিয়া থাকেন।আবার
কোন এক প্রকার কাৰ্য্য লইয়া সকল সময় অতিবাহিত
করা যায় না। যেমন সন্দেশ খাইতে সকলের ভাল লাগিলেও
রােজ যদি কেবল মাই খাইতে হয় আর অন্য কোন জিনিষ
পাওয়া যায় তবে কিছু দিন পরে নিশ্চয় মণ্ডার নামে
অরুচি জন্মিবে। অতএব পূজার ছুটি হওয়া মাত্র কোথাও
বেড়াইতে যাইব স্থির করিলাম। (কারণ ক্রমাগত তিনমাস
কাল পাঠ্য পুস্তক লইয়া ব্যস্ত থাকায় দেহ ও মন পরিশ্রান্ত
হইয়া পড়িয়াছিল।) সঙ্গে সঙ্গে রংপুর সহরের রংটা কিরূপ
তাহা দেখিবার ইচ্ছা বেশ প্রবল হইয়া উঠিল ; এবং ট্রেনের
কল্যাণে রাজসাহী হইতে রংপুর যাইতে বার ঘটার অধিক
সময় লাগিল না।

স্বপ্ন-সুধা
[ এঞ্জিন
আমার ধারণা ছিল রংপুর স্থানটী যখন তামাকের চাষের
জন্যই বিখ্যাত তখন নিশ্চয় উহার রং তামাকের ধুমের চোটে
হুক্কার মতই ঘাের কৃষ্ণ বর্ণ হইবে, অথবা তামাক বিক্রয়
করিয়া যে লাভ হয় সেই টাকার গরমে তাহার রং কতকটা
কল্কের মতই রক্তবর্ণ হইবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় রংপুর
সহরকে আমি হুক্কার নরিচার মধ্যে যে কাল দুর্গন্ধময় ময়লা
থাকে সেইরূপই দেখিয়াছিলাম ; তাহার কারণ—আমার রংপুর
ষ্টেশনে উপস্থিত হইবার পরক্ষণেই যে ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হইল
তাহ তিন দিবা রাত্রির মধ্যে একবারও থামিল না। মনে
হইল যেন রংপুরের ভাগ্যনিয়ন্তা আমাকে নাস্তানাবুদ করিবার
জন্যই মেঘ-রাজকে সাড়ে বিরানব্বই হাজার
হাজার মণ খাম্বির।
তামাক উপহার দিয়াছেন। তামাক পাইয়া মেঘরাহের
সে-কি ফুর্তি ! তাহার দুইটা বিরাট গড়গড়া হুক্কায়
কায় পালা
ক্রমে জল বদলাইয়া তামাক চড়ান হইতে লাগিল। এদিকে
যে বৃষ্টির আধিক্য বশতঃ রাস্তা ঘাটে বন্যার সৃষ্টি হইল সেদিকে
তাঁহার হৃক্ষেপ নাই। তাহার উপর তাহার এক একটা
‘টানের ফলে কল্কের মাথায় আগুন জ্বলিতে লাগিল, এবং
মেঘের ভিতর দিয়া তাহারই এক এক ঝলক আগুন ছিটকাইয়া
বাহিরে আসিতে লাগিল। সেই আগুনের চ্ছটায় চোখে
ধাঁধাঁ লাগে ! সেই হুক্কার কি কর্কশ রব কড়াৎ-কড়
-কড় কড়কড়-দুড়-গুড়-গুড়-গুড়-গুড়-গুম.••••• হুড়-হুড়
৫৪

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
হুড়হুড়হুম হুম ! এদিকে আমাদেরও আক্কেল গুড়ুম।
কোথায় লাগে ইহার কাছে করিম চাচার ডাবা হুকার ‘খুড়া
খুড়া’ ডাক !) সেই সঙ্গে দুইট; ভীষণাকার দৈত্য মিলিয়া
তাহার করে আগুনে খুব জোরে কঁদিতে লাগিল, তাহার
চোটে রংপুর সহরের উপর দিয়া অবিরাম গতি ভীষণ বেগে
ঝড় বহিতে লাগিল, এবং আমরাও একরূপ ঘরে বন্দী
হইলাম।-যাহা হউক এইরূপ বিপদের মধ্যে পড়িয়া রংপুরের
আসল রংটী দেখিবার সৌভাগ্য আমার হইল না।.........
তৃতীয় দিবস রাত্রি সাড়ে ৯ টার ট্রেন ধরিবার জন্য বহু
কষ্টে কাদা জলের মধ্য দিয়া ষ্টেশনে পৌঁছিলাম। কারণ
সেই দুর্যোগের মধ্যে আর এক ঘণ্টাও সেখানে থাকিবার
ইচ্ছা ছিল না। ছাতা মাথায় দিয়া চলাতেও সমস্ত কাপড়
জামা ভিজিয়া গিয়াছিল, জুতা ব্যবহার করিবার উপায় ছিল না,
কাজেই তখন তাহাদের ঘূর্তি দেখে কে? একেবারে ‘আনন্দে
আটখানা হইয়া হাতের উপর উঠিয়া বসিল। আমি আর ‘না’
করিতে পারিলাম না। কারণ একেত প্রায় ছয় সাত মাস
ধরিয়া তাহারা আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকায় বেশ একটা মমতা
জন্মিয়াছিল, তাহার উপর এতদিন যে তাহারা আমাকে বুকে
করিয়া বেড়াইয়াছে সে কথাও আমি ভুলিতে পারি নাই।••••••••
যাহাহউক ট্রেণ আসিলে তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িলাম।
কারণ সেই ট্রেণ পার্বতীপুর জংসনে দাড্ডিলিং মেল ধরাইবে

স্বপ্ন-সুধা ।
{ এন
বলিয়া শুনিয়াছিলাম। আমি শীতে বেশ কঁপিতে লাগিলাম
ठन् ঠক্ করিয়া কি ‘র-রি-রি-রি করিয়া তাহা ঠিক মনে নাই,
তবে মাঝে মাঝে আমার দাতে দাতে যে ঠোকাঠুকি হইতেছিল
সে কথা বেশ মনে আছে। মনে হইল যেন ম্যালেরিয়ার বুড়ী
আমাকে খাব খাব করিতেছে।••••••••
প্রায় দেড়-ঘণ্টা পরে পার্বতীপুর জংসনের প্ল্যাটফর্মে
নামিলাম। আর অমনি সে কী ডাকা হাঁকী !–‘চাই পুরী
মিঠাই ;—গরম খাবার আছে আসুন বাবু -পান বিড়ি
সিগারেট, সিগারেট বিড়ি পান ;-টাটকা গােস্ত পরেটা আছে
নিয়ে যান ;-কে-বিস্কুট-পাউরুচী, কি চাই আপনার ?
চা গরম, গরম চা' (আমার মনে হইল বলি-তােরাই খা! •••
ইত্যাদি। এই সমস্ত ফেরীওয়ালারা যেন মনে করে ট্রেণের
যাত্রীরা চৌদ্দ পুরুষেও কোন কিছু খায়নি, কাজেই জংসনে
ট্রেণ থাম মাত্র মরার উপর যেমন শকুনি পড়ে সেইরূপ তাহাদের
দোকানের চারিদিকে যাত্রীর ভীড় জমিবে।-তবে তাহাদের
অনুমান একেবারে মিথ্যা হইল না। কথিত আছে, আমাদের
পূর্ব পুরুষগণ নাকি অসভ্য (?) ও রাক্ষস ছিলেন, কাঁচা মাংস
খাইতেন, ইত্যাদি। কিন্তু আমরা এই সভ্য যুগে যে ক্রমশঃ
শকুনি হইতে চলিয়াছি সে দিকে লক্ষ্যই নাই!—ঐ যে মাথায়
বিকট ক্ষতযুক্ত কুকুরটা খােলা খাবারের বাক্সের
দূরে দাড়াইয়া কান ঝট পটু করিল তাহাতে কি ঐ সন্দেশগুলির

এঞ্জিন।
}
[ স্বপ্ন-সুধা
?
উপর কিছুই পড়ল না? ঐ বিস্কুট ও কেগুলি কিসের চব্বির
তৈরী? পরেটাগুলি কেমন ঘিয়ে ভাজা আর ঐগুলি কিসের
মাংস? ঐ যে গলায় র্যাপার জড়ান অতি ক্ষীণ, বক্র মেরুদণ্ড
বিশিষ্ট কাশির নােগীটা চা পান করিতেছে, ওকি থাইসিস
(যক্ষ্মা) এর রােগী নহে? ঐ পেয়ালাটা কি সেই একই পাত্রের
জলে ডুবান হইবে ?—সেদিন যে পান ওয়ালার অসাক্ষাতে
দুইটা কুকুর কামড়াকামড়ি করিতে করিতে পান-বিড়ি বিক্রয়ের
ঐ কাঠের বাক্সের উপরে পড়িল এবং দুর্বল কুকুরটা ভয়ে
অস্থির হইয়া যে প্রস্রাব করিল তাহার অধিকাংশই ঐ বাক্সের
মধ্যে পড়িল, ইহা কি পান ওয়ালা কোন উপায়ে জানিয়া ঐ
বাক্সটা সাবান দিয়া ধুইয়াছে ? পানগুলি বানাইবার পূর্বে
কি ভাল করিয়া থােয়। হয় ? ঐ যে ভদ্রবেশী লােকগুলি
নিৰ্দিকার চিত্তে আনন্দের সহিত পয়সা দিয়া পথের আবৰ্জনা-
গুলি গিলিতেছে এবং লােভী কুকুরদলের সহিত মাঝে মাঝে
উৎকট ভঙ্গীতে বাযুদ্ধ করিতেছে, তাহা মরার উপর শকুনির
পাল ও কুকুরের কলহের কথাটা স্মরণ করাইয়া দেয় না কি ?
এই সমস্ত চিন্তা আমাকে অস্থির করিয়া তুলিল ।
ভাবিলাম ঐ লােকগুলির প্রত্যেকেই (দুই একজন ব্যতীত)
নিশ্চয় কিছু আহার করিয়া তবে ট্রেণে চড়িয়াছে, এবং রাত্রি
ভাের হইতে না হইতেই কোন না কোন যায়গায় নামিয়া
পড়িবে। সেখানে খাদ্য সামগ্রীর অভাব হইবে না অথবা

স্বপ্ন-সুধা )
| এঞ্জিন
এক রাত্রি না. খাইয়া কেহ অনাহারে প্রাণ ত্যাগ করিবে না।
বাড়ীতেও কেহ রাত্রিতে ঘুম হইতে উঠিয়া মাঝে মাঝে কিছু
আহার করে না।—তবে এই ধ্বংশকর অভ্যাস কেন? আমার
মনে হইল ঐ লােকগুলি যে শুধু পার্বতীপুরেই নাস্তা খাইল,
ইহার পরে আর কোথাও কিছু খাইবে না এমন নহে; উহারা
যেখ:নে খাবার জিনিষ দেখিয়াছে সেইখানেই খাইয়াছে এবং
পথের মধ্যে যেখানে খাবার জিনিষ দেখিবে সেখানেই কিছু
না কিছু খাইবে। ইহার মূলে আছে লােভ তাহাদের
কুঅভ্যাস। হায়, অবাধ্য লােভ ! হায়, অসংযমী বাঙ্গালী !
আর হায়রে ইসলামের আদর্শ ভােলা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষায়
পড়িত পথহারা বাঙ্গালার মুসলমান !! •••
এদিকে আমার শারিরীক অবস্থ; ক্রমেই শােচনীয় হইতে
লাগিল আমার মনে হইল যেন পার্বতীপুর জংসনটা কোন
পৰ্বতের চুড়ায় বরফের উপর উঠিয়াছে। তাহা না হইলে
এত শীত কোথা হইতে আসিল ?—সেই সময় যদি কোন মন্ত্র
বলে আমি রেল কোম্পানীর ‘বড় সাহেব বা মালিক হইতাম
তবে সমস্ত ষ্টেশনে তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীগণের জন্য বিশ্রামাগার
প্রস্তুত করিয়া দিতাম !–পার্বতীপুরেরই বা দোষ কি? শীতের
কারণ যথেষ্টই ছিল।
আমরা এক পেয়ালা খুব গরম চা বা
দুধ ফু দিয়া দশ মিনিটেই ঠাণ্ডা করিয়া দেই, আর সেই
যায়গায় এই ঠাণ্ডা দুনিয়ার উপর দিয়া বাহাত্তর ঘণ্টা ধরিয়া
৫৮

এঞ্জিন। [ স্বপ্ন-সুধা ঠাণ্ডা বাতাস বহিয়া যাইতেছে এবং সেই যে ঠাণ্ডা বারিপাতের আরম্ভ হইয়াছে তাহার আর বিরাম নাই। তাহার উপর টাটকা জ্বর এবং গরম শুষ্ক বস্ত্রের অভাব; এরূপ অবস্থায় শীত না লাগিবে কেন? তবে আমার মনে হয় জ্বর ও শীত এক সঙ্গে থাকায় আমার পক্ষে শুভই হইয়াছিল। (করুণ:ময় যাহা করেন তাহা মঙ্গলের জন্যই করিয়া থাকেন। কারণ জের আসিয়া শরীর- টাকে গরম না করিলে আমি শীতে একেবারে ঠাণ্ডা হইয়া এবং শীত না থাকিলে হয়ত অতিরিক্ত জ্বরের উত্তাপে আমি সিদ্ধ হইয়া মরিয়া যাইতাম ! যাহা হউক রাজশাহী পৌছান পর্যন্ত আমি দুনিয়ায় থাকিব কিনা সে বিষয়ে চিন্তা করিতে লাগিলাম। দশ মিনিট পরে ট্রেন আসার কথা। কিন্তু এই দশটা মিনিট যেন তখন দশ ঘণ্টার ন্যায় দীর্ঘ হইয়াছে বলিয়া বােধ হইল। এই জগতে কিছুই চিরস্থায়ী নহে। অতএব সেই দশ মিনিটেরও মিয়াদ ফুরাইল। দেখিতে দেখিতে খটাং ঝনাৎ খটাং ঝনাৎ, হুড়হুড়হুড়-ইশশশশশশ করিতে করিতে মেল ট্রেন আসিয়া আমাদের পার্শ্বে দাড়াইল। সঙ্গে সঙ্গে আর একচোট ফেরীওয়ালাদের চীৎকার।-তাহারা বােধ হয় নূতন ভাবে গলাবাজী করিবার জন্যই ট্রেনটা আসিবার দুই মিনিট পূৰ্ব্ব হইতে নীরবে শক্তি সঞ্চয় করিতেছিল। মেল ট্রেনে মাত্র একটা তৃতীয় শ্রেণীর গাড়ী থাকে, এবং সময়ে স্বপ্ন-সুধা ; [ এঞ্জিন সে গাড়ীতে যেরূপ ভীড় হয় তাহা দেখিবার জিনিষ, এমন কি সেই ভীড়ের ছবি তুলিয়া বায়ােস্কোপে দেখাইলে নিঃসন্দেহে বেশ দু’ পয়সা উপার্জন হইতে পারে।-এইরূপ ব্যবস্থা না থাকিলে চলিবে কেন ? বড় ও ঘােটর মধ্যে অর্থাৎ সাহেব (ও বড় লােক) এবং সাধারণ বাঙ্গালীর মধ্যে প্রভেদ কতখানি তাহা দেখাইতে হইবে তাে? তাই যে সময় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রীগণ নরম গদীতে জমিদার বাড়ীর বড় কর্তার ন্যায় আরামে ঘুমাইতে ঘুমাইতে চলিয়াছেন, ঠিক সেই সময় তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীরা জমিদার বাড়ীর সিদ্ধিখাের ভােজপুরী দারােয়ানদিগের মত হুড়া হুড়ি, ঠেলা ঠেলি, ও গােলমাল করিতে করিতে সমস্ত রাস্তা চলিয়াছে । নিৰ্জীব বাঙ্গালীর জন্য রেল কোম্পানীর আর চিন্তার অন্ত নাই ! যাহাতে বাঙ্গালার জন সাধারণ উৎসাহ পাইয়া ব্যায়াম করিতে সুরু কবে, এবং ক্রমশঃ তাহারা একটা পাহালওয়ান জাতিতে পরিণত হয় সেই উদ্দেশ্য সফল করিবার জন্যই তাহারা অনুগ্রহ করিয়া এবং খুব ‘মাথা খাটাইয়’ প্রত্যেক মেল ট্রেনের সহিত কুস্তির আখড়ারূপ একখানি তৃতীয় শ্রেণীর গাড়ী জুড়িয়া দিয়াছেন । কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় এই যে, অবুঝ বাঙ্গালী এইজন্য কোম্পানীর উদ্দেশ্যে গালাগালি করে !! এই ট্রেন জংসনে পাঁচ ছয় মিনিট অপেক্ষা করে বলিয়া ধীরে সুস্থেই’ গাড়ীতে উঠিলাম। তাহা না হইলে বােধ হয় আমি উঠিবার পূর্বেই গাড়ী ছাড়িয়া দিত ! গাড়ীর ভিতরে প্রবেশ

এঞ্জিন ]
| স্বপ্ন-সুধা
করিয়া দেখিলাম এতটুকুও স্থান নাই, এবং দুই তিন জন লােক
দাড়াইয়া আছে। একজন পরিষ্কার পােষাক পরা ভুড়িওয়ালা
মাছােয়ারী নির্বিকার চিত্তে বিলাতী কম্বল গায়ে জড়াইয়া
সাদা নরম বিছানার উপর শুইয়া আছে। তাহাকে কিছুতেই
উঠান গেল না। কারণ বাঙ্গালীর গায়ের জোর এবং টাকার
জোর দুই-এরই অভাব, এবং শুধু মুখের জোর যতই হউক
সকল সময় তাহা কাজে লাগে না। যাহা হউক আমার একজন
রংপুরের সঙ্গী আমার অসুখের কথা জানিতেন। তিনি অনুগ্রহ
করিয়া তাহার জায়গাটী আমাকে ছাড়িয়া দিয়া দাঁড়াইয়া
রহিলেন। আমি প্রথমে বসিতে আপত্তি করায় তিনি আমাকে
একরূপ জোর করিয়া ধরিয়া বসাইয়া দিলেন, এবং বলিলেন,-
আমিতাে একটু পরেই হিলিতে নেমে যাব, ততক্ষণ আপনি
অসুস্থ শরীরে দাঁড়িয়ে কষ্ট ভােগ করবেন কেন ?-অগত্যা
তাঁহাকে ধন্যবাদ দিয়া বসিয়া পড়িলাম।••••••••
যখন ঈশ্বরডিহি জংসনে পৌছিলাম তখন রাত্রি প্রায়
সাড়ে বারটা।
এখান হইতে রাজশাহীর ট্রেন প্রায় সাড়ে
তিনটার সময় ছাড়ে। এই দীর্ঘ তিন ঘণ্টা কাল কিরূপে
কাটিবে ভাবিয়া অস্থির হইলাম।
জ্বর এত বেশী
হইয়াছিল
যে মাথা তুলিতে পারিতেছিলাম না, এবং হাঁটিতে গিয়া টল
মল করিতেছিলাম। দেখিলাম ব্যায়ামপুষ্ট শরীর হওয়া সত্বেও
আমার সােজা হইয়া দাঁড়াইবার শক্তি নাই। সুখের বিষয়

স্বপ্ন-সুদ ]
latega
রাজশাহীর গাভী প্ল্যাটফর্মের অপর পার্শ্বে দাঁড়াইয়া ছিল (কেবল
এঞ্জিন ছিল না। আমি অতি কষ্টে সেই ট্রেনের এক কামরায়
যাইয়া বেঞ্চের উপর শুইয়া পড়িলাম, এবং একটু পরেই
একেবারে অজ্ঞান হইলাম।...•••••
* * * এইরূপে কতক্ষণ কাটিয়াছিল জানি না। আমার মনে
হইল গাড়ীর মধ্যে খুব গরম বাতাস-শোঁ-শোঁ-করিয়া বহিতেছে,
এবং তাহাতে আমি বেশ কষ্ট অনুভব করিতেছি। ব্যাপার
কি দেখিবার জন্য উঠিয়া বসিলাম, এবং চোখ রগড়াইয়া
তাকাইতেই যাহা দেখিলাম তাহাতে আমার বুদ্ধি হারাইয়া
গেল !
আমি এ কোথায় আসিয়াছি ? আমি কি মরিয়া
গিয়াছি ? যদি মরিলাম তবে মৃত্যু যন্ত্রনার কথা স্মরণ হয় না
কেন ? আমি কি কোন গুরুতর পাপ কাৰ্য্য করিয়াছি ? তাহা
হইলে এই প্রেতপুরীতে আসিলাম কেন ? আমাকে
কি এখনই ঐ বিরাট অগ্নি কুণ্ডে পাঠান হইবে ?
দেখিলাম আমি এক প্রকাণ্ড হল ঘরে লৌহ নির্মিত চেয়ারে
বসিয়া আছি। সেই ঘরটা গােলাকৃতি, আগা গােড়া লােহার
পাতে মােড়া, এবং ঘাের অন্ধকার, ইহার পরিধি প্রায় দুই
মাইল হইবে, এবং উচ্চতা প্রায় এক হাজার ফুট! রেল সড়কের
পুলের নীচে যে লম্বা চওড়া লােহার তীর গুলি থাকে তাহার
প্রায় পচিশ গুণ লম্বা, চওড়া ও মােটা এক একটা লােহার
তীর ও কড়ি বর্গা এই ঘরে লাগান হইয়াছে। তাহার কোন

এঞ্জিন।
[ স্বপ্ন-সুধা
কোনটায় এক একটা বিরাট লােহার চামচ ও প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড
লােহার ফানেল মােটা মােটা লােহার শিকল দিয়া ঝুলান
আছে। ঘরের এক কোণে একটা ছােট খাটো পাথুরিয়া
কয়লার পাহাড় এবং তাহার নিকটেই একটা প্রকাণ্ড কাল
কুচকুচে জলের ট্যাঙ্ক বা চৌবাচ্চা রহিয়াছে। সেটা একটা
দীঘির সমান এবং যে নল দিয়া তাহার জল বাহির হয় তাহার
ব্যাস পাঁচ ফুটের উপর । সেই ঘরের মাঝখানে একটা নীচু
যায়গায় স্তুপাকৃতি কতকগুলি অগ্নি দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতেছে,
তাহার ফলে সেই ভূতের মত চেহারা বিশিষ্ট ঘরটার কোন
কোন অংশ অস্পষ্ট দেখা যাইতেছে, এবং সেই আগুনের
জন্যই ঘরটা বেশ গরম হইয়া পড়িয়াছে। ঘরে ধূমের অভাব
নাই।
আমার সম্মুখে যে ভীষণকায় দৈত্যটা দাঁড়াইয়া আছেন,
তাহার কথা মনে হইলে প্রাণ শিহরিয়া উঠে। তিনি প্রায়
এক শত হাত উঁচু, রংটা ঠিক কয়লার মত ! তাহার পরনে
ঘাের কাল ‘সুট কোট ও প্যান্ট,) এবং ধানের গােলার চেয়ে
বড় ভুড়িটা প্রায় সাত হাত চওড়া একটা লাল রংএর বেল্ট
দিয়া বাঁধা। সেই বেল্টের উপর চাপরাশের মত পিতলের
একটা চকচকে জিনিষ ; মনে হইল তাহার কতকগুলি ছিদ্র
আছে এবং সেইগুলির মধ্য দিয়া তাঁহার পেটের ভিতর জ্বলন্ত
আগুনের মত কি যেন দেখা যাইতেছে। হার মাথায় একটা

স্বপ্ন।]
[ এঞ্জিন
কাল রংএর হ্যাট (বােধ হয় লােহার তৈরী)—তাহার সম্মুখ দিকে
আমাদের সম্রাটের মুকুটের ছবি ! (ভাবিলাম ইংরাজেরা
যমালয়ে ও রাজত্ব করে নাকি ?--তিনি হাঁ করিয়া কতকগুলি
পাথুরিয়া কয়লা সেই প্রকাণ্ড চামচ দিয়া তুলিয়া মুখে দিয়া
তাহার বড় বড় পাটার মত দাত দিয়া চিবাইয়া খাইতেছেন,
এবং সেই প্রকাণ্ড ফানেল-মুখে দিয়া কল টিপিতেছেন, আর
সঙ্গে সঙ্গে প্রায় পাঁচ শত মণ জল তাহার পেটে চলিয়া
যাইতেছে। তাহার নাকের এক ছিদ্র দিয়া অনবরত গরম
বাষ্প আর অন্যটা দিয়া আগুনের টুকরা ও ধুম বাহির
হইতেছে ! তাহার কপালে একটা মাত্র প্রকাণ্ড গােলাকার
চক্ষু বিদ্যুতের মত জ্বলিতেছে ! সেদিকে চাহিতে চোখ
ঝলসিয়া যায়। তিনি ঐরূপে আহার ও জলপান করিয়া
কিছুক্ষণ ধরিয়া ঘরের চারিদিকে ছুটাছুটি করিয়া পুনরায়
কিছুক্ষণ একস্থানে দাঁড়াইয়া আরাম করিতেছেন ! উঃ, সে কি
তাণ্ডব নৃত্য! সমস্ত পৃথিবী যেন তাহার
তাহার চোটে টলমল
করিতেছে এবং তাহার শব্দের চোটে হৃতকম্প উপস্থিত
হইতেছে ! তাহার পায়ে ইস্পাতের তৈরী বুট জুতা থাকায়
সেই শব্দ এমন কর্কশ হইয়াছে যে কর্ণ বধির হয় আর কি
কিন্তু একি? এতবড় একটা দৈত্যের গলার স্বর এত
মিহি ? তিনি কি আমাকে ডাকিতেছেন ?-হ, হনুমান
মিথ্যা নয়। ভাবিলাম এইবার বােধ হয় আমাকে আহার
৬৪

এজন |
[ স্বপ্ন-সুধা
করিবার অথবা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিবার পালা !হায় !
মৃত্যুর পরে যে এই বিপদের মধ্যে পড়িতে হইবে ইহা পূর্বে
জানিলে কখনই কোন অন্যায় কাজ করিতাম না। আহা
পুনরায় যদি দুনিয়ায় ফিরিয়া যাইতে পারিতাম!•••••••••এখন
আর সে কথা ভাবিয়া কি হইবে?•••••••••আমি ভয়ে কঁদিয়া
ফেলিলাম। কাপিতে কঁাপিতে কোন রকমে হাত জোড়
করিয়া বলিলাম,-“খােদার দোহাই, আপনি আমাকে শাস্তি
দিবার পূর্বে আমি কোন পুণ্য কাজ করেছি কিনা সে কথা
শুনুন !” তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন-“তুমি ভয় করােনা,
আমি যমরাজ আজরাইলও নই অথবা তােমাকে শাস্তি দিতেও
নিয়ে আসিনি। ছিঃ, অমন জ্বর নিয়ে শুধু বেঞ্চের উপর কেউ
শুয়ে থাকে ? আমি তােমার ওরকম অবস্থা দেখে এখানে
নিয়ে এসেছি। এই ঘরের গরমে তুমি এখন অনেকটা সুস্থ
হয়েছ এবং একটু পরেই তােমাকে এখান থেকে যেতে হবে,
কারণ এই গরমে বেশীক্ষণ থাকাও তােমার পক্ষে উচিত হবে
। কিন্তু তুমি যাওয়ার পূর্বে তােমাকে কয়েকটা কথা বলবাে
বলে মনে করেছি, এবং সেই জন্যই ডাকছি।”
আমি তাহার এইরূপ মােলায়েম কথা শুনিয়া অনেকটা
আশ্বস্ত হইলাম এবং শাস্তি পাইতে হইবে না দেখিয়া এবং আমি
জীবিত আছি ভাবিয়া দয়াময়ের উদ্দেশে মনে মনে অসংখ্য
ধন্যবাদ দিলাম, কিন্তু তখনও সন্দেহ একেবারে যায় নাই।

স্বপ্ন-সুধা ] [ এঞ্জিন কারণ এরূপ অদ্ভুত স্থানে ঐ জাতিয় জীবের কথা তাে কখনও শুনি নাই। তবে কি আমাকে পাতাল পুরীতে ভূতের বাড়ীতে আনা হইয়াছে ? এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতেও ভয় হইল। যদি তিনি হঠাৎ চটিয়া যান ? তবে কোন রকমে ভয়ে ভয়ে উত্তর করিলাম—“আপনি আমাকে কিছু বলবেন এটা আমার পরম সৌভাগ্যের কথা। কিন্তু আপনার পরিচয় সম্বন্ধে কিছু না জানলে তাে আমার সন্দেহ যাবে না, এবং সেই অবস্থায় আপনার মূল্যবান কথাগুলির দিকে সম্পূর্ণ মনােযােগ দেওয়া হয়তাে আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।” তিনি—আমার সম্বন্ধে এটুকু মাত্র জেনে রাখ যে আমি একটা এঞ্জিন, এবং এই যায়গাটার নাম এঞ্জিন পাড়া। এখানে আমার মত ছােট বড় অনেক রেল এঞ্জিন ও অন্যান্য এঞ্জিন বাস করে। আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করা অনুচিত হইবে ভাবিয়া ভয়ে ভয়ে বলিলাম—এবার আপনি দয়া করে আপনার কথা শুরু করুন। তিনি—দেখ, তুমি এ কথা নিশ্চই জেনাে যে জগতে উদ্দেশ্য বিহীন ভাবে কোন জিনিষই সৃষ্টি করা হয় নাই। তুমি প্রত্যেক জিনিষের কাছে কিছু না কিছু উপদেশ নিতে পার, এবং এজন্য তােমার দৃষ্টি শক্তিকে তীক্ষ্ণ ও তােমার মনকে সকল সময় সজাগ রাখতে হবে। এ বিষয়ে যদি অবহেলা বা অবজ্ঞা কর তাহলে তুমি হয়তাে এত মূল্যবান জ্ঞান লাভে বঞ্চিত হবে, যা সারা জীবন চেষ্টা করলেও আর লাভ করতে পারবে না।

এঞ্জিন ] [ স্বপ্ন-সুধা আমি-দেখুন এ জগতে এত বেশী ভিন্ন রকমের জিনিষ আছে যে একটা মানুষের পক্ষে সে সমস্ত থেকে উপদেশ নেওয়া অসম্ভব। এখন আমি কোন্ কোন্ বিষয় হতে উপদেশ নিতে পারি তা দয়া করে বলে দিলে আমি সে বিষয় চেষ্টা করে দেখতে পারি। তিনি-হাঁ তােমার কথাটা মিথ্যা নয়। তবু দেখ, তুমি যতই চেষ্টা করনা কেন জগতে কখন একা থাকতে পার না। ভােমার জীবনের প্রতি মুহুর্তে নিশ্চয় এই জড় জগতের কোন কোন জিনিষের সঙ্গে তােমার ঘনিষ্টতা থাকে। ঠিক সেই সময় যদি তুমি সেই জিনিষ সম্বন্ধে খুব স্থির ভাবে চিন্তা কর তবে কিছু জ্ঞান লাভ না করেই পার না। অবশ্য এমন কতক- গুলি জিনিষ আছে যাদের নিকট হতে কেবল সূক্ষ্মদর্শী লোকেরাই জ্ঞান লাভ করতে পারেন। তবে সচরাচর তুমি এমন অনেক জিনিষই দেখে থাক যেগুলির কাছ থেকে সাধারণ লােকেও অনায়াসে কিছু শিখিতে পারে। এই ট্রেনের কথাই ধরা যাক। এটা এমন জিনিষ যা হতে তুমি চেষ্টা করলে অনেক জ্ঞান পেতে আমি—কৈ, ট্রেনের কাছে যে কিছু শিখিবার আছে বলে তাে মনে হচ্ছে না। আপনি যদি দয়া করে নমুনা স্বরূপ দুই একটা বিষয়ের উল্লেখ করেন তবে হয়তাে আমি এ বিষয়ে চিন্তা করার একটা পথ পেতে পারি।

স্বপ্ন-সুধা ]
[ একি
তিনি—বেশ, উদাহরণ স্বরূপ দুইটা বিষয়ের উল্লেখ করছি।
দেখ, প্রথমতঃ এই পৃথিবীকে তুমি স্বচ্ছন্দে ট্রেনের সঙ্গে তুলনা
করতে পার।—এই পৃথিবী তার লক্ষ্যের পথে অবিরাম গতি
ছুটে চলেছে যেমন তােমার দাজ্জিলিং মেল কলিকাতার উদ্দেশে
ছুটেছে। এক একটা নূতন শতাব্দীর আরম্ভ হচ্ছে পৃথিবীর
চলতি পথের এক একটা ষ্টেশন। তুমি যেমন হঠাৎ এক ষ্টেশনে
ট্রেনের মধ্যে উঠলে, গাড়ীর অপরিচিত যাত্রীদের সঙ্গে চট করেই
ভাব হয়ে গেল ; সেখানে গল্প, গুজব আমােদ, আলাদ, সুখ
দুঃখ ভােগ ইত্যাদি সবই কিছু হলাে, তারপর ট্রেনের চলতি
পথের শেষ হবার বহু পূৰ্বেই তােমার নির্দিষ্ট ষ্টেশনে গাড়
থামলে তুমি সবারই কাছে বিদায় নিয়ে নেমে পড়লে ; সংসারটাও
ঠিক সেই রকম নয় কি ?
আমি—জী হাঁ, কতকটা সেই রকমই বটে।
তিনি—তারপর দেখ, সেই চলতি পথে ট্রেন যদি তার নির্দিষ্ট
লাইন ভুলে হঠাৎ অন্য লাইনে চলে যায় তাহলে যেমন সে
অন্য দিকে চলে যেতে পারে অথবা তার সঙ্গে অন্য ট্রেনের ঠোক
ঠুকি হতে পারে, সেই রকম পৃথিবী যদি কোন রকমে একবার
নিজের কক্ষ ভ্রষ্ট হয়, তবে সূর্যের মত প্রকাণ্ড গ্রহের সঙ্গে
ঠোকাঠুকি হওয়া অসম্ভব নয় এবং তাহলে পৃথিবী এমনি
ভাবে গুড়া হয়ে যাবে যে তখন তার কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট
থাকবে না। আবার দেখ, সংসারে সাধারণতঃ তিন রকমে

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
এদের অন্তরটা
।
লােক বাস করে। প্রথম রকমের লোকগুলাে নিজেদের ন্যায্য
পাওনা পেলেই সুখী হয় ; তারা কাহারও সাহায্য করতে বা
কাহারও অসুবিধার সৃষ্টি করতে চায় না, ট্রেনের সাধারণ যাত্রীরা
সেই রকম। এরা নিজেদের ন্যায্য পাওনা না পেলে বিরক্ত
হয় বটে কিন্তু তার জন্যে মারামারি করতে যায় না। দ্বিতীয়
প্রকারের লােক হয় মানুষরূপী শয়তান।
লােভ, হিংসা, ক্রোধ প্রভৃতিতে ভরা। এরা নিজেদের প্রাপ্যের
অনেক বেশী ভােগ দখল করতে চায় এবং পরের মাথায় কাঠাল
ভেঙ্গে সম্পূর্ণটাই নিজে খেতে চায়। তােমার পার্বতীপুরের
সেই মাড়ােয়ারীটা এই দলের। এদের দেখলে ‘ঈশপস
ফেবল'এর ‘দি ডগ ইন দি ম্যানজার’এর সেই বদমেজাজী
কুকুরটার কথাই মনে পড়ে। (সকল মাড়ােয়ারীই যে এই
রকম সে কথা আমি বলছি না। তারপর তৃতীয় প্রকার লােক
এঁদের মধ্যে ফেরেস্তাদের গুণ কিছু পরিমাণে থাকে। এরা
অনেক সময় পরের জন্য নিজের স্বার্থ বলি দিয়ে থাকেন।
তােমার রংপুরের সঙ্গীটী, যিনি তােমার দুঃখ দেখে নিজের
জায়গায় তােমাকে বসিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থাকলেন, তিনি এই
শ্রেণীর অন্তর্গত বলা যায়।
আমি–দেখুন, হঠাৎ একটা কথা আমার মনে পড়েছে। একদিন
আমাদের একজন প্রফেসার (অধ্যাপক ) বলছিলেন—“তােমরা
যদি নিজের জন্য বসবার জায়গা দেখতে না পাও,
ট্রেনে চড়ে

স্বপ্ন-সুধা ]
[ এঞ্জিন
তবে জোর করে সাধ্যমত ঠেলাঠেলী করে সেখানে নিজের
জায়গা করে নিবে। নিজের অধিকার ছাড়বে কেন? দুনিয়ার
নিয়মই হলাে—জোর যার মুলুক তার—বুঝলে?” এবিষয়ে
আপনার মত কি ?
তিনি—এ বিষয়ে আমার মতের একটু পার্থক্য আছে। দেখ,
সাধ্যমত অন্যের কষ্টের বা অসুবিধার সৃষ্টি করা ঠিক নয় :
কারণ শুধু গায়ের জোরের সদ্ব্যবহার করাই যদি মানুষের মূখ।
উদ্দেশ্য হয়, তাহলে মানুষে আর পশুতে প্রভেদ থাকলে
কোথায় ? তুমি কি মনে কর যে তােমার চেয়ে পশুদের দৈহিক
আত্মসুখবােধ কম আছে ? তা নয় বরং এ বিষয়ে তারা তােমার
চেয়ে অনেকগুণে শ্রেষ্ঠ। তবে মানুষে আর পশুতে প্রভেদ
হচ্ছে এইখানে যে, মানুষ ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, পরের জন্য
জীবন দিতে পারে, কিন্তু পশুরা তা পারে না। সেইজন্য আমি
বলি যে, তােমার অস্তিত্বকে বজায় রেখে তুমি যথাসাধ্য অন্যের
সুবিধা করে দিতে পার এবং তাহলে ঠেলাঠেলি বা মারামারি
করার মত ব্যাপার প্রায়ই ঘটে না।
আমি—নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে একথার অর্থ কি ?
তিনি—এতাে খুব সােজা কথা। মনে কর তুমি-
পার্বতীপুরের ট্রেনে উঠলে। তােমার উদ্দেশ্য রাজশাহী যাওয়া ;
যে কোন রকমেই হােক তােমাকে সেখানে যেতেই হবে।
এখন গাড়ীর মধ্যে জায়গার অভাব দেখে তুমি মারামারি না করে

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
কিন্তু
দাড়িয়ে দাড়িয়েই ঈশ্বরডিহী পৰ্যন্ত আসতে পার,, অথবা একটা
রােগীর জন্য তােমার স্থানটা ছেড়ে দিয়ে তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে
পার। তবু তুমি তােমার গন্তব্য পথে চলতে থাকবে। কিন্তু
যদি তুমি নিজের অসুবিধা দেখে এবং গাড়ীর মধ্যে ভীড় দেখে
নেমে পড় তবে তুমি পথ চলা থেকে ক্ষান্ত হলে এবং যথাসময়ে
রাজশাহীতে পৌছিতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে। এরই নাম
নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখা।আবার দেখ তুমি নিজ
পরিবারকে ঠিক রেখে দান ধ্যান সবই করতে পার।
তুমি তােমার বাড়ীটা বা তােমার স্ত্রী পুত্রাদি কোন
ভিক্ষুককে দান করতে পার না, কিম্বা অন্যের সুবিধার
জন্য বা পরিশ্রম ও কষ্টের হাত এড়াবার জন্য তুমি যে সদুপায়ে
জীবিকা উপার্জন কর তা থেকে ক্ষান্ত থাকতে পার না।
তুমি নিজের অস্তিত্ব ঠিক রেখে অনেকের উপকারের বা সেবার
উপায় করতে পার। কিন্তু যদি তুমি নিজেই ভিক্ষুক বা
পরের গলগ্রহ হও তবে তােমার দ্বারা অন্যের কি উপকার
হতে পারে? তবে একটা কথা মনে রাখবে যেন তােমার
জীবিকার পথ অন্যের অনিষ্টকর না হয়।
আমি-দেখুন সংসারে অনেকগুলাে ধৰ্ম্ম আছে। এদিক
দিয়ে সংসারের সঙ্গে ট্রেনের কোন সাদৃশ্য আছে বলে তাে মনে
হয় না।
তিনি -কেন হবে না ? দেখ, প্রায় সকল ধর্মের উদ্দেশ্যই
৭১

স্বপ্ন-সুধা ।
[ এঞ্জিন
এক, মানুষের আত্মাকে সাংসারিক কালিমা থেকে মুক্ত করা।
তেমনি এই ঈশ্বরডিহী দিয়ে যতগুলি ট্রেন যাচ্ছে তাদের প্রায়
প্রত্যেকের লক্ষ্য কলিকাতা যাওয়া। আবার ধর্মগুলি যেমন
সমান শক্তিশালী বা কাৰ্য্যক্ষম নহে, তেমনি ট্রেনগুলিরও
গতি সমান নয়। দার্জিলিং মেলে গেলে যেমন তুমি সবারই
আগে ও মালগাড়ীতে গেলে সবারই পরে কলিকাতা পৌঁছাবে,
তেমনি কোন ধর্ম তােমাকে দ্রুত গতি এবং কোনটি অতি
বিলম্বে তােমার গন্তব্য স্থানে পৌঁছাবে।—উদাহরণ স্বরূপ
দুইটা নিয়মের উল্লেখ করছি :-
প্রথমতঃ তুমি একটী বালককে বললে—“দেখ সর্বশক্তিমান
আল্লাহ সকল জিনিষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি ঐ সূৰ্য্যকে কেমন
উজ্জ্বল করেছেন এবং তার গরম আলো তােমার গায়ে পড়াতে
তােমার শীত পালিয়ে যাচ্ছে, কাজেই তুমি সেই দয়াময়ের
উদ্দেশে সেজদা ( প্রণাম ) কর ;
আর একটী
বালককে বললে-“তােমাকে
বললে-“তােমাকে শীত লাগছে ? আচ্ছা যাও
রােদে বস;
কেমন গরম লাগছে, না? শীত একটু কম
লাগছে নয় ? দেখ, এই রােদ যা তােমাকে আরাম দিচ্ছে
সেটা কোথা থেকে আসছে জান? ঐ সূৰ্য্য থেকে এই রােদ
আসছে। সূৰ্যটা কেমন উজ্জ্বল দেখেছ ? ঐ সূৰ্য্য, এবং
এই সমস্ত গাছপালা, নদী, পাহাড়, আকাশ, পৃথিবী, জীব,
জন্তু, যা কিছু দেখতে পাচ্ছ সে সমস্তই একজনে সৃষ্টি করেছেন।
এবং
৭২

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
তিনি হচ্ছেন আল্লাহ, বুঝেছ ? এখন তােমার, সেই আল্লার
উদ্দেশে সেজদা করা উচিত, কাজেই সেজদা কর।”
এখন এই দুইটী ছেলেই আল্লার পরিচয় পেল। কিন্তু
প্রথম নিয়মটী যে দ্বিতীয়টী অপেক্ষা সরল ও সংক্ষিপ্ত তা
স্বীকার করতেই হবে। উপরন্তু দ্বিতীয় নিয়মটীতে একটা
গুরুতর বিপদের আশঙ্কা আছে। ছেলেটী সূর্যের চিন্তায় বা
জীবজন্তুর চিন্তায় হঠাৎ এরূপ তন্ময় হয়ে যেতে পারে যে,
তােমার পরের কথাগুলি তার কানে না যেতেও পারে। সে
ক্ষেত্রে তােমার তাহাকে আল্লার পরিচয় দানরূপ উদ্দেশ্য ব্যর্থ
হতে পারে।–ঠিক সেই রকম তুমি যে মালগাড়ীতে চড়ে
যাবে, কুলীদের ভুলে সেটা কলিকাতা না গিয়ে আমরা
জংসনে যাওয়াটা বিচিত্র নয়।
অতএব সকল সময় বিশেষ
বিবেচনা করে নিজের যাত্রাপথের বাহনটা বেছে নেওয়া উচিত।
আমি-আপনি বলছেন যে, সমস্ত ধর্মই একই উদ্দেশ্য
দ্বারা চালিত হচ্ছে। তাহলে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে এত মারামারি
তিনি -দেখ, মানুষ যে ঘরেই জন্ম গ্রহণ করুক, প্রথমে
তাদের মধ্যে কোন পার্থক্যই থাকে না। পরে বয়স হবার
সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাপ, মা, আত্মীয় স্বজন ইত্যাদি তাদের
হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ প্রভৃতিতে পরিণত করে। কিন্তু বড়ই
দুঃখের বিষয়, তারা নিজ নিজ ধৰ্ম্মের সার মর্মটা কি তা বুঝতে
१७

স্বপ্ন-সুধা [ এঞ্জিন কোন দিনই চেষ্টা করে না। তারা মনে করে যে, হিন্দুর ঘরে জন্মিলেই সে খাটী হিন্দু অথবা মুসলমানের মধ্যে জন্মেছে বলেই সে খাটী মুসলমান হল ! তার উপর প্রত্যেক ধর্মের লােকেই নিজেদের ধর্মের বিধানের সঙ্গে কতকগুলাে স্বার্থসিদ্ধির পথে সাহায্যকারী নিয়ম কানুন আচার ব্যবহার জুড়ে দিয়েছে। তার ফলে প্রত্যেকেই বহুদিন পূর্বে নিজের ধৰ্ম্মের পথটা ভুলে নিজেদের সৃষ্টি সেই সমস্ত আবর্জনার দ্বারাই চালিত হচ্ছে এবং যত রকম সাম্প্রদায়িক বিবাদের সৃষ্টি করে দুনিয়াকে অশান্তিময় করে তুলেছে।...... আজ প্রায় লােকেই খাসীর মাথার মাংস খেয়ে সন্তুষ্ট ; কিন্তু হাড়ের খােলের মধ্যে যে মস্তিষ্ক আছে সেটা অনেকেই জানে না, অথবা খােলটা ভাঙ্গার কষ্ট স্বীকার করতে চায় না। আজকাল সকল ধৰ্ম্মের লােকই এমন একদল লােকের মত, যারা একটা রাস্তার দুই পাশ্বের সামনা সামনি দুইটা বাড়ীতে বাস করে এবং প্রত্যেকে নিজের মােটর গাড়ীটা বারান্দায় তুলে নিয়ে এঞ্জিনের ঢাকনাগুলিশুদ্ধ সমস্ত গাড়ীটা জল দিয়ে হরদম ধুচ্ছে এবং সেগুলিতে নানা রংএর বার্নিশ ঘষছে আর জোর গলায় অন্যের বার্নিশের নিন্দা করছে। এদিকে যে জলের ছিটা পেয়ে, রাস্তার ধূলা পড়ে এবং নিষ্কর্মভাবে পড়ে থাকায় প্রত্যেক এঞ্জিনেই মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে সে দিকে তাদের খেয়াল নাই।...... ৭৪

এঞ্জিন ]
। স্বপ্ন-সুধা
উভয়
আবার মনে কর তােমরা দুই দল লােক কলিকাতা যাবে
বলে পার্বতীপুরে উঠলে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে। কিন্তু দুই দলই
ভুল করে পাশাপাশি এমন দুটা মাল গাড়ীতে উঠলে যেগুলির
মাঝখানে দুইটা জানালা থাকায় বেশ দু’দলের সঙ্গে দেখা
শুনা চলতে লাগলাে। আবার ব্যাপারটা এমনই হলাে যে,
দলই নিজেদেরটিকে যাত্রীবাহী ও অন্যদের গাড়ীকে
মালগাড়ী বলতে লাগলাে, নিজেরা ঠিক কলিকাতা যাবে এবং
অন্যেরা কখনই সেখানে যেতে পারবে না এই বলে পরস্পর
ঠাট্টা বিজ্ৰপ করতে লাগলাে, এবং শেষে গালাগালি ও জুতা
ছোড়াছুড়ি শুরু হল। কিছুক্ষণ পর তােমরা তােমাদের গাড়ী
আর চলছেনা দেখে শান্ত হলে, এবং ব্যাপার কি দেখবার জন্য
বাহিরে গিয়ে দেখলে যে হিলী ষ্টেশনে তােমাদের রেখে দিয়ে
ট্রেন বহুদূরে চলে এসেছে।...ঠিক সেই রকম আজ ধর্ম প্রায়
প্রত্যেক সমাজের কাছ থেকে বহুদূরে সরে পড়েছে।
আমি--তা হলে বর্তমানে বিভিন্ন সমাজের লােকগুলাে
কোন অবস্থায় আছে?
তিনি।মনে কর তােমরা দুই দলই হিলীতে আছ এবং
কলিকাতায় যেতে না পারায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন
এই ক্ষতির জন্য তােমরা কখনই আপনাদের ভুল স্বীকার
করবে না। এর জন্য অন্য দলকেই সম্পূর্ণ ভাবে দায়ী করবে।
এর ফলে তােমাদের মধ্যে একটা স্থায়ী বিদ্বেষভাবের সৃষ্টি ও
৭৫

স্বপ্ন-সুধা
[ এঞ্জিন
তার ক্রমবৃদ্ধি হবে। কিছুক্ষণ পরে তােমরা যে কলিকাতার
যাত্রী এবং সেখানে যেতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ, সে
কথা ভুলে গিয়ে অন্যের মনে কষ্ট দিবার জন্য নানা রকম ফন্দি
আঁটতে লাগবে ; এবং অবশেষে মারামারি করে, ফৌজদারী
সাক্ষী যােগাড়, দল পাকান প্রভৃতি কাজে এমনি মেতে যাবে
যে, তখন আর কলিকাতার কথা মনেও হবে না। বর্তমান
সমাজের লােকগুলির অবস্থাও ঠিক সেই রকম।
সেই রকম। তারা আজ
তাদের লক্ষ্য, ধর্ম, আদর্শ, এ সমস্ত কতকটা স্বেচ্ছায় বিসর্জন
দিয়ে এবং কতকটা বিস্মৃত হয়ে একেবারে শয়তানের পাণ্ডা
সেজেছে। সে সমস্ত দেখে আমাদের এই পাষাণ প্রাণেও
একটু দুঃখ হয়।
আমি-আমরা যে ট্রেনে টিকিট কিনে চড়ি, এর মধ্যে কোন
শিক্ষার বিষয় আছে কি?
তিনি—হাঁ, খুব ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। এই
টিকিট কাটার সঙ্গে পরকালের হিসাব নিকাশের যথেষ্ট সাদৃশ্য
আছে। তুমি টিকিট দেখাতে না পারলে যেমন ‘চেকার’
তােমাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিবে, তেমনি সৎকাজ তােমার
পরকালের টিকিট।
যদি তুমি
টিকিট দেখাতে
এবং সঙ্গে অতিরিক্ত মালপত্রও না থাকে, তবে শিয়ালদহের
মত কড়া ষ্টেশনেও যেমন তােমার ‘গেট পার হতে কোন
কষ্ট হয় না; তেমনি তােমার মৃত্যুর পর তােমার আত্মা তােমার
৭৬

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
মধ্যে খাঁটি ধর্ম বিশ্বাস এবং অন্তরের পবিত্রতার জন্য উজ্জ্বল
রূপবিশিষ্ট দেখাবে, তা দেখে ফেরেস্তা স্বর্গীয় দূতগণ
} তােমাকে স্বর্গের গেট স্বচ্ছন্দে পার হতে দিবে। আবার
যদি তােমার কাছে টিকিট থাকে এবং সঙ্গে অতিরিক্ত মালপত্র,
থাকে, তবে শিয়ালদহে চেকার দস্তুরমত পরীক্ষা করে।
তবে তােমাকে ছেড়ে দিবে ; জরিমানা (বা অতিরিক্ত মাশুল
আদায়) করতে এবং কাজ বিশেষে তােমাকে বিচার না হওয়া
পর্যন্ত হাজতে রাখতেও পারে। মােট কথা তােমার ন্যায়
কাজের সঙ্গে সন্দেহের লেশ মাত্র থাকলে যেমন শিয়ালদহে
তােমাকে নিয়ে টানাটানি করবে, তেমনি তােমার সৎকাজের
বা ধৰ্ম্মকর্মের সঙ্গে পাপের বা অন্যায়ের লেশ মাত্র থাকলে
পরকালে তােমাকে নিয়ে টানাটানি করবে। কিন্তু যদি তােমার
কাছে টিকিটও না থাকে এবং সঙ্গে অনেক মালপত্র থাকে
তাহলে যেমন নিঃসন্দেহে শাস্তি ভােগ করবে, পরকালেও
ঠিক তেমনি।
আমি—দেখুন, আমাদের ধর্ম মতে আমরা একথা বিশ্বাস
করি যে শেষ বিচারের দিন (হাশরের দিন) প্রত্যেক আত্মার
পাপ পূণ্যের বিচার করা হবে ; তারপর একেবারে যারা
নিস্পাপ তাদের সােজাসুজি বেহেশতে (স্বর্গে ) পাঠান হবে,
যারা পাপও করেছে এবং পূণ্যও করেছে তাদের প্রথমে হিসাব
মত কিছুদিন দোজখ-যন্ত্রণা ভােগ করিয়ে তার পর বেহেশতে
৭৭

স্বপ্ন-সুধা ]
[ এঞ্জিন
পাঠান হবে, এবং যাদের কোনই পুণ্য নাই তাদের অনন্ত
কালের জন্য নরকে পাঠান হবে। (আমার মনে হয় একেবারেই
কোন পুণ্য বা সৎকাজ করে না এমন লােক দুনিয়াতে নাই।),
এবং সেই বিচারের দিনের পূৰ্বে পবিত্ৰাত্মাগণকে কবরে শান্তিতে
ও পাপীগণকে গাের আজাব (কবরের শাস্তি। এর মধ্যে দিয়ে
কাটাতে হবে।—এই সমস্ত ব্যাপারের কোন সাদৃশ্য ট্রেণের
সঙ্গে আছে কি ?
তিনি—ঠিক তেমনটী না হলেও কিছু সাদৃশ্য আছে বৈকি ?
মনে কর রানাঘাট জংসনে একজন ‘চোর’ একটা গাড়ীতে উঠে
ঠিক তিন রকমের তিনজন যাত্রী দেখতে পেল, এবং তাহাদের
প্রত্যেকের উদ্দেশ্য শিয়ালদহে নামা। প্রথম জনের টিকিট
আছে এবং সঙ্গে তেমন জিনিষ পত্রও নাই। তাকে চেকারের
বলার কিছুই নাই। অতএব তিনি নিশ্চিন্ত মনে শিয়ালদহ
পৰ্যন্ত গেলেন। দ্বিতীয় জন টিকিট দেখালেন বটে, কিন্তু
সঙ্গে প্রায় দেড়মণ ওজনের একটা বাক্স এবং পয়সার অভাবে
সেটা বুক’ করিতে পারেন নাই। তাঁকে চেকার একটু
কড়া কড়া কথাই শুনালাে। তৃতীয় জন একটা ধড়িবাজ।
সে টিকিট তাে কিনেই নি তার উপর প্রায় একমণ ওজনের
পাঁচ ঝুড়ি আম নিয়ে যাচ্ছে। চেকার’ তাকে খুব ধমকে
দেওয়ায় সে বললাে যে, কলিকাতার কোন এক সাহেবকে
নাকি সে আমি দিতে যাচ্ছে, এবং সাহেবের কাছে কোন
৭৮

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
কিছু নিয়ে যেতে হলে যে টিকিট কিনতে হয় এবং মালগুলি
‘বুক’ করতে হয় সে কথা তার জানা নাই। চেকার' তাে
এ দুটো শিকারকে পাহারা দিবার জন্য আর কোন গাড়ীতে
না গিয়ে সেখানেই বসে পড়লো এবং মাঝে মাঝে তাদের
বেশ ধমকাতে লাগলাে) কারণ এতে তার চাকুরীর উন্নতি
হতে পারে।-এখন এই দুটা যাত্রী শিয়ালদহে পৌঁছার পূর্ব
মুহূর্ত পর্যন্ত যে অশান্তি, ভয় ও দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে সময়
কাটাল, তাকে তােমার গাের আজাবের মত বলা যেতে পারে।
তারপর শিয়ালদহে পৌছে প্রথম লােকটী সচ্ছন্দে টিকিট
দিয়ে ‘গেট পার হয়ে গেলেন, কিন্তু পরের দুইটা বন্দী হলাে।
হয়তাে দ্বিতীয়টা অনেক লাঞ্ছনা গঞ্জনা ভােগ করার পর নিস্কৃতি
পেল, আর তৃতীয় জন লাঞ্ছনা ভােগ তাে করলই তার উপর তার
জুয়াচুরির জন্য সে জেলে গেল।—তােমার পাপ পুণ্য মিশান
হাশরের দিনের) লােকের সঙ্গে দ্বিতীয় লােকটার এবং
একেবারেই পুণ্যহীন লােকের সঙ্গে তৃতীয় লােকটার তুলনা
করা যায়, কি বল ?
আমি–আচ্ছা, এ ব্যাপারটার কিরকম অর্থ হয় বলতে
পারেন? এই যে, আমাদের শাস্ত্রে বলে (এবং বােধ হয় সকল
ধৰ্ম্মেরই এই মত) যে, যাহারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না বা
নানে না, তারা জগতে যতই সৎ কাজ করুক না কেন, তাদের
দোজখে পুড়তেই হবে।

এখন
স্বপ্ন-সুধা ]
[ এঞ্জিন
“দেখ, এখন আমার পায়খানা করার সময় হয়েছে। তুমি
একটু অপেক্ষা কর, আমি ফিরে এসে তােমার কথার উত্তর
দিচ্ছি।” ইহা বলিয়া তিনি ঘরের মাঝখানে যে আগুনের
স্তুপ ছিল তাহার উপরে যাইয়া উপুড় হইলেন। আমি পূর্বেই
বলিয়াছি যে তাঁহার বেল্টে (কমর বন্ধে) ছিদ্রযুক্ত উজ্জ্বল
পিতলের চাপড়াশ ছিল, এবং তাহার ভিতর দিয়া তাহার
পেটের মধ্যে আগুনের মত কি যেন দেখা যাইতেছিল।
তিনি সেই চাপড়াশ রূপ কপাট খুলিয়া একটা প্রায় চল্লিশ
হাত লম্বা লৌহ দণ্ড দিয়া পেটের মধ্যে হুড়াইতে লাগিলেন ।
শব্দ হইল—ঘটাং ঘটাং ঘট ঘট ঘটর ঘট, আর সেই সঙ্গে
সঙ্গে হড় হড়, ঝ ঝর ঝর করিয়া প্রায় ত্রিশ মণ ছাই
মিশান জ্বলন্ত আগুন সেই অগ্নিস্তুপে পড়িল। অমনি ঘরট।
আরও একটু গরম বােধ হইল। এমন ব্যাপার জন্মে দেখি নাই
বা কেহ দেখিয়াছে বলিয়াও শুনি নাই। হাঁ, এঞ্জিন না হইলে
এমন খাওয়া আর এমন পায়খানা কাহার হইবে যাহা হউক
জ্বরের দৌলতে যে আজ বহুমূল্য জ্ঞান ও অঃশ্চৰ্য্য অভিজ্ঞতা
লাভ হইল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। (“খােদ যা করেন
সমস্তই মঙ্গলের জন্য, একথা যে সত্য তাহা এতদিনে বেশ
অনুভব করিলাম )
তাহার পর তিনি পেটের কপাট-টা ভালরূপে বন্ধ করিয়া
তাহার পূর্বের স্থানে আসিয়া দাঁড়াইলেন, এবং হাসিয়া
৮০

বলিলেন-“আমার কাণ্ডগুলাে দেখে আশ্চৰ্য বােধ করছে।
? কিন্তু এখন তােমার ভয় দূর হয়েছে কি বল ? (বাবা,
সে কি হাসির রূপ ! দেখিলেই প্রাণ কাপে !!)
আমি-জী না, ভয় এখনও যথেষ্টই আছে, কারণ আপনার
দিকে দেখলে আজরাইলের (যমরাজের) কথাই মনে পড়ে।
তবে আপনি যে আমার কোন ক্ষতি কোরবেন না এই বিশ্বাস
এবং আপনার প্রতি আমার ভক্তি এই দুইটা মিলে ভয়টাকে
কাবু করে ফেলেছে।
তিনি—সে কথা যাক, কারণ সময় অল্প। তাড়াতাড়ি
করলে সমস্ত বিষয় বলার সময় পাব না।--দেখ, কোন
ট্রেনে চড়ে কোথাও তুমি
কোথাও তুমি যাচ্ছ। তােমার সঙ্গে টিকিট
আছে এবং বাজে অন্য কোন জিনিষই নাই। কেবল তােমার
পকেটে তােমাদের গভর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কতকগুলি
গােপনীয় চিঠি পত্র আছে। তারপর মনে কর একজন গােয়েন্দা
পুলিশ তােমার অজ্ঞাতসারে তােমাকে লক্ষ্য
করে সেই
গাড়ীতে চড়েই চলেছে, এবং তােমার কথাবার্তায় ও হাব ভাবে
মনে সন্দেহ জন্মেছে। এ অবস্থায় তুমি যে ষ্টেশনে
নামলে সেখানে সে নেমেই চট করে তােমাকে পরওয়ানা
দেখিয়ে গ্রেপ্তার করলো এবং খোঁজ করে তােমার গােপনীয়
কাগজপত্রগুলি বের করে নিল। তারপর তােমাকে ষ্টেশন
মাষ্টারের হেফাজতে রেখে দিয়ে পুলিশ কনেষ্টবল ডাকতে
৮১

স ম
গেল।এখন কি তুমি টিকিট দেখিয়েই নিষ্কৃতি পাবে, না
রেল বিভাগের কোন আইন অমান্য করনি বলে রক্ষা পাবে।
তােমার এই অপরাধের জন্য অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
করার জন্য কারাদণ্ড ভােগ করতে হবে না কি ? অবশ্বাসী
বা আল্লাহকে অমান্যকারী লােকদের অবস্থাও ঠিক সেই
( তারপর আর একটা ব্যাপার দেখ—তুমি হয়তাে টিকিট
নিয়ে ট্রেণে উঠেছ, বেশী মাল পত্রও নাই এবং তুমি রাজদ্রোহীও
নও। কিন্তু তুমি ট্রেনে চলার সময় একজনের উপর অত্যাচার
করলে বা কাহাকেও প্রহার করলে, এ অবস্থায় যেমন ষ্টেশনে
নেমেই বিচারের জন্য বন্দী হতে হবে, সেইরূপ তুমি ধৰ্ম্মের
সমস্ত কাজ করেও যদি কাহারও প্রতি কোন অন্যায় কর
তবে পরকালে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে, এবং যাহাকে
কষ্ট দিয়েছ সে তােমাকে ক্ষমা না করলে তােমার রক্ষা নাই।
অথচ এই সত্যটা তােমরা তুচ্ছ বলে মনে কর।)
আমি–আচ্ছা, সকলে যদি নিজ নিজ কর্মফল ভােগ
করবে, তবে সাধারণ লােকে
সাধু দরবেশ প্রভৃতির নিকট
দোয়া নিতে যায় কেন?
তিনি—এটা একটা সােজা কথায় বুঝিয়ে দিচ্ছি। তুমি
জান, যে ট্রেনে চড়ে তুমি যে ষ্টেশনে নামলে সেখানে যদি
টিকিট দেখাতে না পার তবে তােমার শাস্তি হতে পারে।
৮২

কিন্তু সে সময় যদি তােমার পরিচিত কোন ‘চেকার' বা
রেলকর্মচারী সেখানে উপস্থিত হয়ে তােমার জন্য সুপারিশ
করেন, তবে তুমি রক্ষা পেতেও পার। এই সুবিধার জন্যই
দেখবে অনেকে রেল কর্মচারীদের সঙ্গে খাতির জমাতে চায়।
তেমনি সাধু, দরবেশ, এঁরা বিশ্বপ্রভুর প্রিয় পাত্র। কাজেই
‘াদের প্রার্থনায় ইহকালে ও পরকালে মঙ্গল হতেও পারে,
এই আশায় সাধারণ লােকে তাদের দোয়া নিতে চায়।
আমি—ট্রেনের কাছে এসব ছাড়া আর কিছু শিখবার
আছে কি?
তিনি—নিশ্চয় আছে। ট্রেনের সম্বন্ধে তুমি যত বেশী
চিন্তা করবে ততই তােমার শিক্ষার বিষয় বেড়ে যাবে। সে
সমস্ত বিষয়ের উল্লেখ করার মত সময় না থাকলেও আমি
সংক্ষেপে দুটি বিষয়ের দিকে তােমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে
চাই। তার মধ্যে একটা হচ্ছে সময়ের সদ্ব্যবহার, আর একটা
হচ্ছে অজ্ঞ থাকার বিপদ এবং এ দুটীর সঙ্গে
সঙ্গে তােমার
সাংসারিক পারলৌকিক জীবনের ঘনিষ্ট সম্বন্ধ।
আমি—সেটা কি রকম আর একটু পরিষ্কার করে বলুন।
তিনি—প্রথমতঃ যথা সময়ে সকল কাজ না করলে
পরে অনেক বাধাবিপ্ন উপস্থিত হতে পারে।
যেমন
প্রত্যেক ষ্টেশনেই কোন একটা ট্রেণ পৌছার একটা নির্দিষ্ট
সময় আছে, এবং সেই সময় তার রাস্তাটা অতি অবশ্য সতর্কতার

ব না।
তার
সহিত পরিষ্কার করে রাখা হয়। কিন্তু সে যদি নির্দিষ্ট
সময়ের অনেক পূর্বে নিজের খেয়াল মত এসে পড়ে, তবে
রাস্তা ঠিক না থাকার কারণে হয় সে ‘লাইন থেকে পড়ে
যাবে, অথবা সে অন্য গাড়ীর সঙ্গে ঠোকাঠুকি করে চুরমার
হয়ে যাবে। (অবশ্য
(অবশ্য অদৃষ্টগুণে বেঁচে যাওয়াটাও অসম্ভব
নয় ।)
আবার নির্দিষ্ট সময়ের পরে আসলে ও
অনেক বিপদ ঘটতে পারে।
তােমার সাংসারিক
জীবনের কাজগুলিও সেই রকম। প্রত্যেকটা কাজ যথাসময়ে
করার ফলেই মানুষ অনেক সময় বিপদাপন্ন হয় কিন্তু
সেটা তারা বুঝতে পারে না।—দ্বিতীয়তঃ মনে কর ট্রেণে
বিপদের সময় যে শিকলে টান দিতে হয়, কেহ অজ্ঞতা
বশতঃ স্যোয় বেশ করে এক টান দিল এবং যথা নিয়ম
ট্রেণ থেমে গেল ; অথবা সে তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট কিনে
প্রথম শ্রেণীর গাড়ীতে উঠে গদীর উপর শুয়ে যখন আরামের
একটা আন্দাজ বুঝতে চেষ্টা করছে সে সময় একজন চেকার
উঠে তাকে ধরে ফেললাে। এ অবস্থায় যেমন সে তার
অজ্ঞতার দোহাই দিয়ে শান্তি বা জরিমানার হাত এড়াতে
পারবে না, তেমনি তুমি যদি প্রকৃতি বিরুদ্ধ বা ধৰ্ম্ম বিরুদ্ধ কোন
কাজ কর, তবে নিশ্চয় তুমি তার ফল ভােগ করতে বাধ্য হবে।
-একটা ছােট ছেলে কিছু জানে না বলে কি তার হাত আগুনে
পুড়বে না? তুমি অজানাতে বিষ খেলে কি মরবে না? তেমনি
৮৪

এঞ্জিন। [ স্বপ্ন-সুধা তুমি জগতে প্রতিদিন ছােট খাট এমন অনেক পাপ কাজে লিপ্ত থাক যেটাকে তুমি পাপ কাৰ্য্য বলে জান না, কিন্তু তার জন্য তােমাকে পরকালে পূর্ণ মাত্রায় শাস্তি পেতে হবে। তখন কিন্তু জানি না' বলে রেহাই পাবার উপায় থাকবে না। এইজন্য তোমাদের বহুদর্শী ধৰ্ম্ম গুরু জগতের শ্রেষ্টতম মানব বলেছেন- জ্ঞান লাভ করা প্রত্যেক মুসলমান নর নারার অবশ্য কর্তব্য, এবং সেজন্য যদি আরব থেকে ( সুদূর) চীন দেশে যেতে হয় সেও স্বীকার, (তবু তােমরা জ্ঞান লাভে ক্ষান্ত হবে না। ) কিন্তু তােমরা এখন তাহার সেই বহুমূল্য উপদেশের মর্যাদা রেখেছ কি ? আমি জী--না, অনেক মুসলমান একথা জানেই না। শুধু তাই নয়, আমরা আজ এতদূর অধঃপাতে গিয়েছি যে শত করা নিরানব্বই জন মুসলমান তাঁর অমূল্য জীবনীর কোন সংবাদই রাখেন না। তিনি-- সেকথা যাক। তােমাকে আমি ট্রেন সম্বন্ধে মােতা- মুটিভাবে অনেক কথাই বলেছি। এখন আমি দ্বিতীয় বিষয়টীর একটু আভাস দিব। আভাস দিব। আমার মনে হয় তােমার মন এখন এমন অবস্থায় পৌঁচেছে যে, আমি দ্বিতীয় বিষয়টী সম্বন্ধে সামান্য একটু উল্লেখ করলেই নিজে নিজে চিন্তা করে সে সম্বন্ধে অনেক সত্য আবিষ্কার করতে পারবে। কিন্তু তােমাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। ঘন ঘন খাওয়া আমার অভ্যাস। কথায় কথায় ৮৫

স্বপ্ন-সুধা ]
[ এঞ্জিন
এমন
অনেকক্ষণ ধরে কিছু খাইনি তাই পেটটা এমন চন চন করছে
যে আর স্থির থাকতে পারছি না।—এই কথা বলিয়া তিনি
পূৰ্ব্ববর্ণিত নিয়মে প্রায় একশত মণ কয়লা আর সাতশত মণ
পানি উদরস্থ করিয়া দুই তিন মিনিট ধরিয়া ঘরের মধ্যে ছুটাছুটি
ও তাণ্ডব নৃত্য করিতে লাগিলেন, তাহার সহিত তাহার নাসিক
দিয়া গাঢ় মেঘের মত কাল রংএর ধূম বাহির হইতে লাগিল,
এবং তাহা দেখিয়া আমার মনে পুনরায় ভয়ের সঞ্চার হইতে
লাগিল।
যাহা হউক কিছুক্ষণ পরে তিনি তাহার পূর্বের নির্দিষ্ট
স্থানে আসিয়া দাইয়া শান্ত ভাব ধারণ করিলেন।
আমি -আপনি প্রত্যেক বার কিছু খাওয়ার পর
ছুটাছুটি করেন কেন ? সত্যি—ওতে আমার খুব ভয় হয়।
তিনি কিছু খেলে আমার পেটের মধ্যে বাষ্প আর ধোঁয়ার
চাপ খুব বেড়ে যায়। সে সময়ে লাফালাফি করলে তার কতকটা
তাড়াতাড়ি নাক দিয়ে বেরিয়ে যায়, এবং আমি তাতে অনেক
হালকা বােধ করি। যদি এই উপায়ে ওগুলিকে বের করে
না দেই তবে পেটের মধ্যে বাষ্পের চাপ খুব বেড়ে গিয়ে হঠাৎ
আমার মাথা গরম হয়ে আমি হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে নিজের
ও অন্যের ক্ষতিকর অনেক কাজ করতে পারি। কিন্তু দেখ,
অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগার জন্য আমি এবার খুব বেশী পরিমাণে
খেয়েছি; এমত অবস্থায় পেট ফেটে অনেক এঞ্জিন মারা
পড়ে। তাই তােমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, আমি এরকম

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
অপঘাত মৃত্যুর লক্ষণগুলাে পূৰ্বেই টের পাব এবং সে সময়
আর দাড়িয়ে থাকতে পারব না, বসে পড়তে বাধ্য হব। আমি
বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি প্রাণপণে ছুটে এই ঘরের শেষ
প্রান্তে চলে যাবে। তুমি তাে জানাে আমার শরীর লােহা
দিয়ে তৈরী। কাজেই এর একটা টুকরা তােমার দিকে ছুটে
গেলে আর রক্ষা নাই।
ইহা শুনিয়া আমি আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিলাম, এবং যাহাতে
এই অপ্রিয় ঘটনাটা না ঘটে সেই জন্য মনে মনে প্রার্থনা
করিতে লাগিলাম, ভয়টা যে শুধু নিজের জন্যই হইয়াছিল এমন
নহে, তাহার কথা ভাবিয়াও দুঃখ হইতেছিল। কারণ এইরূপ
একজন জ্ঞানী সজ্জনের আকস্মিক মৃত্যুতে দুঃখ হওয়াই
স্বাভাবিক।
“হা, তােমাকে যে দ্বিতীয় বিষয়টীর কথা বলতে চেয়েছিলাম,
সেটা আর কিছুই নয়, এই এঞ্জিন জীবনের কাছ থেকে জ্ঞান
লাভ করা।
আমি-ও বুঝেছি, আপনি বলতে চান যে, প্রত্যেক
প্রাণীই এক একটা এঞ্জিন বিশেষ, কি বলেন ?
তিনি - হাঁ, ঠিক তাই। শুধু তাই নয়, এই দুনিয়ার সব
কিছুই এক একটা এঞ্জিন বিশেষ। প্রত্যেকের মধ্যেই একটা
গুপ্ত অদৃশ্য শক্তি আছে, যার সাহায্যে সে তার লক্ষ্য পথে
এগিয়ে চলেছে।
৮৭

স্বপ্ন-সুধা
[ এঞ্জিন
আমি—কিন্তু এর মধ্যে একটা জিনিষের সাদৃশ্য নাই বলে
মনে হয় ; সেটা হচ্ছে এই যে, আপনি আগুন ও জলের
সাহায্যে চালিত হচ্ছেন কিন্তু আমরা এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা
চালিত হচ্ছি।
তিনি—এই দেখ, তুমি একটা বড় রকমের ভুল করে বসেছ।
আমি তাে বাষ্পদ্বারা চালিত হচ্ছি, আগুন ও জল তার উপলক্ষ
মাত্র। তুমি যেমন শক্তি সঞ্চয়ের জন্য আহার করে থাক,
এও ঠিক তেমনি।
আমি—তা হলেও আপনার বাষ্প তত বের হলে দেখা যায়
কিন্তু আমাদের শক্তি তাে দেখা যায় না।
তিনি—না, বাষ্প তুমি দেখতে পার না। তােমার শক্তিকে
যেমন কোন কাজে নিযুক্ত করলে সেটা বুঝতে পার, তেমনি
বাষ্প যখন আমার ভিতর থেকে বের হয়ে এসে ঠাণ্ডা বাতাসের
সঙ্গে মিশে ছােট ঘােট অসংখ্য জলবিন্দুর সৃষ্টি করে তখনই
তুমি দেখতে পাও। তুমি বাষ্প দেখ না, বাষ্প হইতে ষ্ট
জলকণাগুলিই দেখে থাক।
আমি—সেটা সত্য বটে। কিন্তু আপনি একটা বিষয়ের
উল্লেখ করেননি। আমরা যে আত্মার দ্বারা চালিত হচ্ছি, তার
সঙ্গে তাে আপনার ভিতরের কোন জিনিষের সাদৃশ্য নাই।
যেমন মনে করুন, আপনার বাষ্প অদৃশ্য জিনিষ হলেও সেটা
আপনার মধ্যে কম বা বেশী হতে পারে এবং আমার শরীরের
৮৮

এঞ্জিন।
[ স্বপ্ন-সুধা
শক্তিও অসুখের সময় কম আর সুস্থ সময়ে বেশী হয়ে থাকে।
কি আত্মার তত তেমন বেশী কমি হয় না। আমি দুর্বল
হলে আমার আত্মা অর্ধেক আর খুব সবল হলেই আমার পাঁচটা
আত্মা এরূপ তো কখনও হতে পারে না ।
তিনি-দেখ, এ সমস্ত অতি সূক্ষ্ম বিষয়ের আলােচনা
করলে তােমার মত ছেলে মানুষের পক্ষে বুঝতে খুবই কষ্ট
তার ওপর এ সমস্ত বিষয় বােঝার জন্য পূর্বে তৈরী
হওয়া উচিত। তা না হলে তােমার মাথা বিগড়ে গিয়ে তুমি
পাগল হয়ে যেতে পার।
আমি-সে কি রকম? আমি এ বৎসর বি, এ. পরীক্ষা
দিতে যাচ্ছি ; দুদিন পরে গ্র্যাজুয়েট হতে পারলে সবাই মানুষ
বলে স্বীকার করবে ; কত নাম করা লেখকের বই পড়েছি।
আর আপনি আমাকে এখনও ছেলে বলে মনে করছেন।
তিনি হাঁ, আমি কোনই ভুল করিনি। তুমি যে সমস্ত
শিক্ষা পেরেছ সেটা তােমার সাংসারিক উন্নতির পক্ষে (?)
তােমার আত্মজ্ঞানের বিরুদ্ধেই কাজ করবে। তুমি
যদি দুনিয়াদারীর বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতে,
তা হলে আমি তােমাকে খুব সেয়ানা বলেই মনে করতাম
এবং তােমাকে ওস্তাদ বলে মেনে নিতাম। কিন্তু তুমি যে
বিষয়ের কথা উঠিয়েছ, সে সম্বন্ধে তুমি একেবারেই অজ্ঞ এবং
নেহায়েৎ নাবালক। তুমি হয়তাে কলেজে দর্শন শাস্ত্র পড়।
এবং

স্বপ্ন-সুধা;
; এঞ্জিন
কিন্তু প্রায়ই সেগুলি যুক্তি, কুতর্ক ও চিন্তার দ্বারা লেখা
হয়েছে, আবার কোনটা বা খুব নাম করা শয়তানের পাণ্ডাদের
লেখা। সমস্ত পুস্তকে কোন সাধকের তপস্যালব্ধ অভিজ্ঞ
তার উল্লেখ পাবে না। এমন অবস্থায় তুমি বি, এ, পাস করে
আত্মা ও পরমাত্মা সমন্ধে কী বা এমন জ্ঞান লাভ করবে ?
তােমার বর্তমান শিক্ষার উপকারিতা আমি অস্বীকার করছি
, কিন্তু এর মধ্যে মারাত্মক দোষের সংখ্যাই বেশী ? যাক,
এসমস্ত কথা এখন বলে লাভ নাই। এ বিষয়ে তুমি নিজে
নিজে চিন্তা করলেই অনেক কিছু জানতে পারবে।
আমি - তাহলে বলুন আপনার মধ্যে আত্মার মত কিছু
নাই !
তিনি-দেখ, সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের
আত্মাটা।
এ অতি সূক্ষ্ম, অতি সুন্দর, চিন্তার অতীত, অক্ষয়,
অমর কিছু। এর সঙ্গে পার্থিব কোন জিনিষের তুলনা করতে
যাওয়াই বােকামি। এটা সমস্ত যুক্তি তর্ক ও চিন্তার বাহিরে।
কেবল দৃঢ় বিশ্বাস ও পবিত্র অন্তরের সহিত দীর্ঘকালব্যাপ
একাগ্রচিত্তে কঠোর সাধনার দ্বারাই ইহার পরিচয় রূপ জ্ঞান
জন্মিতে পারে !–তবু তােমাকে একটা বিষয়ের কথা বলছি
আত্মার (রূহের) সঙ্গে যার সাদৃশ্য আছে বলা যেতে পারে।
একথা নিশ্চয় জেনাে যে, শুধু বাষ্প কোনদিন কোন কাজ
করতে পারে না। তুমি একটা পাত্রে করে জল ফুটাও, দেখবে

এঞ্জিন ]
[ স্বপ্ন-সুধা
.
অনেক বাষ্পতৈরী হয়ে বাতাসে মিলে যাচ্ছে। তাদের কোনই
কাজ করবার শক্তি নাই। কিন্তু যদি সেই পাত্রীর মুখ একেবারে
বন্ধ করে আগুনের উপরে বসিয়ে দিয়ে সেখান থেকে সরে পড়,
তাহলে দেখবে
দেখবে পাত্র। লাফাতে শুরু করেছে ; এবং ফেটে
যাওয়াও আশ্চৰ্য্য নয়।–কিজন্য এমন হয় ? -- না, বাষ্প বের
হতে না পারায় পাত্রের ভিতরে একটা শক্তির চাপের সৃষ্টি
আমার মধ্যেও ঠিক সেই রকম হয়। এই শক্তিই
কতকগুলাে বাষ্পকে জোর করে বের করে দিতে চায়। তার ফলে
সেই পাত্রটা লাফায় বা ফেটে যায় ; এবং সেই জন্যই এঞ্জিনের
ভিতর থেকে তার চাকাকে ঠেলা দিয়ে কিছুটা বাষ্প বেরিয়ে
যায়। তোমার আত্মার আদেশে যেমন একটা শক্তি তোমাকে
চলায় , তেমনি আমার ভিতরের এই শক্তি বা চাপের’ আদেশে
বাষ্প আমাকে চালায়। এই শক্তিকে তুমি দেখতে শুনতে
বা অনুমান করতেও পার না। শুধু এটুকু বুঝতে পার যে,
এটা একটা শক্তি। আবার দেখ তােমার দেহ নষ্ট হলে,
অর্থাৎ দেহের যে গুণটা আত্মাকে ধরে রেখেছে সেটা নষ্ট হলে
যেমন তােমার আত্মা দেহত্যাগ করে চলে যায়, তেমনি আমার
মধ্যে কোথায়ও মরিচা ধরে, ক্ষয় হয়ে বা ভেঙ্গে গিয়ে আমি
শক্তি ধারণের অযােগ্য হলে সেই শক্তি আমার বাহিরে চলে
যায় ; এবং তোমার আত্মার যেমন ধ্বংশ নাই, তেমনি এই
শক্তি বা প্রাকৃতিক নিয়মেও ধ্বংশ নাই।
নিয়মেও ধ্বংশ নাই। তবে এই পৃথিবী

স্বপ্ন-সুধা
[ এঞ্জিন
ধ্বংশের পর এ নিয়মটী থাকিবে কিনা সেটা আমি বলতে
ক
পারি না।
আমি-আপনার সঙ্গে যে অনেকগুলো গাড়ী জুড়ে দেওয়া
হয় তার সঙ্গে আমাদের জীবনের কোন ব্যাপারের সাদৃশ্য
আছে কি?
তিনি নিশ্চয় আছে। এখানে
কেবল নিজের জীবন
নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য কোন জিনিষকে সৃষ্টি করা হয়নি।
আমার চলার পথে যেমন কতকগুলি গাড়ী জুড়ে দেওয়া হয়,
তেমনি প্রত্যেকের সঙ্গে কতকগুলি কৰ্ত্তব্যের বােঝ বেঁধে
দেওয়া
সে গুলি না করলেই মুস্কিল। যেমন মনে
কর, গাছ বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে, ফুল ফুটাবে, ফল দিবে,
মানুষের বা জীবজন্তুর সেবায় লাগবে ; মানুষ তার কর্তব্য
পালন করে উন্নত হতে চেষ্টা করবে ; দুনিয়া তার নির্দিষ্ট পথে
যথানিয়ম সূর্যের চতুর্দিকে ঘুরে সৃষ্টি রক্ষা করবে ইত্যাদি
(সূৰ্য্য কার পানে ছুটেছে কে জানে ?
আমি--আপনি একটা লােকের দ্বারা চালিত হন, আমরা
তাে তেমন কারও দ্বারা চালিত হই না ।
তিনি কেন, তােমাদের মনটা কোথায় থাকে। সেই
মনটাই তােমাদের পথপ্রদর্শক। ড্রাইভার বা চালক আমার
কেউ না হলেও যেমন চলার পথে তার সাহায্য নিতে হয় বলে
তার সঙ্গে আমার একটা অস্থায়ী সম্বন্ধের সৃষ্টি হয়, এবং আমার

। ডাইভার হুসিয়ার ও ভাল লােক হলে আমি নিরাপদে থাকি, আনাড়ী বা মাতাল হলে আমার সব্বনাশ করতে পারে । তেমনি তােমার মনটা যদি সুমতি বিশিষ্ট হয় তবেই তােমার মঙ্গল, আর তা না হলে অর্থাৎ সে শয়তান বা কুমতির দ্বারা চালিত হলে তােমার ধ্বংশ নিশ্চিত। আমি--দেখুন, কোন এঞ্জিন ছােট, কোনটা খুবই বড়, কোনটী এক জায়গায় বসে কাজ করে কেহবা কেবল ছুটে বেড়ায়, কেহ লাইনের বাহিরে যেতে পারে না আবার কেহ সৰ্ব্বত্রই চলতে পারে, কেহ জলের মধ্যে ডব দিয়ে যায় আবার কোনটী আকাশে উড়ে বেড়ায় ;—এসমস্ত ব্যাপারের সঙ্গে আমাদের জীবনের সাদৃশ্য আছে কি তিনি---কিছুটা সাদৃশ্য আছে বই কি? তবে তুমি একসঙ্গে এতগুলি প্রশ্ন করেছ যে এত অল্প সময়ে সে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবু মােটামুটি ভাবে যতটুকু বলা সম্ভব তাই বলছি,-এই প্রশ্নগুলি প্রধাণতঃ দুই দিক দিয়ে বিচার করা যায়। প্রথমতঃ জগতের দিক দিয়ে। যেমন বড় ও ছােট এঞ্জিনের সঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের তুলনা; এক- জায়গায় কাজ করা এঞ্জিনের সঙ্গে দোকানদার, কেরাণী, গদীয়ান প্রভৃতি যারা একজায়গায় বসে জীবিকা উপার্জন করে তাদের তুলনা; যে সমস্ত এঞ্জিন সর্বত্র ছুটে বেড়ায় তাদের সঙ্গে ব্যাপারী সদাগর, চিকিৎসক, গৃহস্থ প্রভৃতি লােকের তুলনা, জলের মধ্যে ?

ডুব দিয়ে যেগুলি চলে তাদের সঙ্গে অজ্ঞাত মূৰ্থ লােকের তুলনা ; এবং যেগুলি আকাশে উড়ে বেড়ায় তাদের সঙ্গে খুব নাম করা শিক্ষিত লােকের তুলনা প্রভৃতি করা যেতে পারে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে আত্মােন্নতি ও ধৰ্ম্মের দিক দিয়ে তুলনা।-যেমন ছােট ও বড় এঞ্জিনের সঙ্গে মূর্খ ও জ্ঞানীর তুলনা ; এক জায়গায় কাজ করা এঞ্জিনের সঙ্গে একস্থানে ধ্যান রত সাধকের ; যারা সৰ্ব্বত্র ছুটাছুটি করে তাদের সঙ্গে ধৰ্ম্মে আস্থাহীন চঞ্চলমতি লক্ষ্যবিহীন লােকের ; লাইন ছাড়া চলে না এমন এঞ্জিনের সঙ্গে ধয়ে অচলমতি সচ্চরিত্র দুনিয়াদার লােকের ; যেগুলি জলের মধ্যে ডুবিয়া চলে তাদের সঙ্গে অবিশ্বাস, দুষ্ট, কুচরিত্র লােকের ; এবং যেগুলি উড়িয়া চলে তাদের সঙ্গে পবিত্ৰাত্মা সিদ্ধপুরুষ দরবেশ, সন্ন্যাসী প্রভৃতির তুলনা করা যেতে পারে। এ সমস্ত বিষয় তুমি ধীরভাবে নির্জনে চিন্তা করে দেখলে অনেক নূতন সত্যের সন্ধ্যান পাবে। এ সম্বন্ধে বহু কথা বলার আছে, কিন্তু তােমার আর সময় নাই এখনি যেতে হবে। আমি–দেখুন আর দুই একটা প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারছি না। কারণ আপনার কাছে জীবনে যে দ্বিতীয় বার আসতে পারব তেমন ভরসা নাই,। আর এঞ্জিন সম্বন্ধে আমার এই সমস্ত প্রশ্নের মীমাংসা করার উপযুক্ত লােকও আমি চিনি না। কাজেই দয়া করে আমার আর দু একটা প্রশ্নের উত্তর দেন। বাস্তবিকই আপনাকে যে আমি কি বলে ধন্যবাদ দিব তা ভেবে ঠিক করতে পারছি না।

তিনি বেশ, তোমার আর কি বলার আছে তাড়াতাড়ি বলে
শেষ কর ।
আমি—একটি বিষয় আমি বুঝতে পারছি না। দরবেশ
বা সিদ্ধ পুরুষগণ কি উড়ােজাহাজের মত উড়তে পারেন?
তিনি —ও, এই কথা? বেশ, বুঝিয়ে দিচ্ছি, মন দিয়ে শােন।
তুমি জান যে, মাটীর একটা আকর্ষণ শক্তি আছে, সেটা সবারই
উপর কাজ করে। কিন্তু উড়াে জাহাজ এমন ভাবে নিজের
শরীরটাকে তৈরী করেছে, এবং এমন শক্তি পেয়েছে যে সে ইচ্ছা
করলে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন ধরে শূন্য পথে চলতে পারে।
তার সে গতিকে মাটীর আকর্ষণ শক্তি বাধা দিতে পারে না।
ঠিক সেই রকম সিদ্ধপুরুষগণ এমন ভাবে নিজেদের জীবনকে
গড়ে তুলেছেন এবং এমন শক্তির অধিকারী হয়েছেন যে, তাঁর।
ইচ্ছা করলে জগতের সমস্ত বিষয় ভুলে গিয়ে আধ্যাত্মিক জগতের
দিকে বহুদূর অগ্রসর হতে পারেন। সে সময় তাঁদের দেহটা
মৃত দেহের মত পড়ে থাকে। উড়াে জাহাজের মাটির আকর্ষণকে
উপেক্ষা করার মতই তারা দেহের বা জগতের আকর্ষণকে
উপেক্ষা করতে পারেন। তবে তাদের সে শক্তিরও একটা সীমা
আছে। কাজেই কিছুক্ষণ পরে তারা তাদের জড় দেহে পুনরায়
আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়; যেমন উড়াে জাহাজকেও মাটীতে
নামতে হয়। যাক, এ সমস্ত কথা বাদ দাও; কারণ আমি বেশ
বুঝতে পারছি যে এগুলি তুমি ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছ না।

t আজ ? আমি—আর দেখুন, অনেক রকমের এঞ্জিন আছে। কোনটা জলের দ্বারা চালিত যেমন নায়াগ্রা জলপ্রপাতের জলের ধাক্কায় চালিত এঞ্জিন।) কোনটা বাষ্পের দ্বারা, কোনটা কেরােসিন, কোনটা মােটা তেল ( ক্রুড অয়েল,) কোনটা পেট্রোল, কোনটা গ্যাস, আবার কোনটা বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত হয়। এ সকলের সঙ্গে আমাদের জীবনের কোন সাদৃশ্য আছে কি ? তিনি—এইতাে আবার তুমি বড় বড় কথা টেনে আনলে। বিষয়ে তােমাদের নিশ্চয় সাদৃশ্য আছে, কিন্তু সে বিষয় বুঝিয়ে বলতে গেলে একটা প্রকাণ্ড বই হয়ে যাবে। অথচ এদিকে সময় খুব কম!তবু সংক্ষেপে বলছি শােন।নানারকমের এঞ্জিনের মত তােমাদের মধ্যেও নানারকম ধৰ্ম্ম আছে। তােমরা মুসলমান, হিন্দু, খৃষ্টান প্রভৃতি এক একটা ধর্ম নিয়ে আছ। আকাশে উড়িতে পারাই যেমন এঞ্জিন জীবনের চরম উন্নতি, তেমনি আত্মাকে উন্নত করা ও তাকে দিব্যচক্ষু দান করাই সকল ধর্মের মুখ্য উদ্দেশ্য। এখন এই উড়বার জন্য যে জাতীয় এঞ্জিন সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত বলে মনে হবে সেটাই উড়ােজাহাজে লাগান হবে ; তাছাড়া অন্য জাতীয় এঞ্জিন লাগালে তােমার উড়ো জাহাজ উড়তে পারে কিন্তু তাতে যেমন অনেক অসুবিধা ভােগ করতে হবে ; তেমনি তােমার আহােন্নতি ও দিব্যজ্ঞান লাভের জন্য তােমার যে ধৰ্ম্ম সর্বাপেক্ষা বেশী উপযুক্ত সেটা অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ, তা না হলে বেশী অসুবিধা ভােগ

এঞ্জিন
[ স্বপ্ন-সুধা
?
করতে হয় এবং তােমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতেও পারে।
যেমন ষ্টীম বয়লার’ চালিত এঞ্জিন লইয়া উড়ােজাহাজ উড়িতে
অক্ষম, তেমনি কোন কোন ধর্ম মানবাত্মাকে তার লক্ষ্যস্থলে
পৌছাতে অক্ষম অতএব বর্জনীয়।
আমি–আচ্ছা, নাস্তিকদের আপনি কোন্ দলে ফেলবেন ?
তিনি—যে এঞ্জিন কোনকালেই এবং কোন মতেই উড়াে
জাহাজে লাগানর যােগ্য নয় নাস্তিকদের আমি সেই দলে
ফেলব।
আমি—এমন এঞ্জিন জগতে আছে কি ?
তিনি-হা,
আছে
বৈকি তুমি জলের ধাক্কায় চালিত যে
এঞ্জিনের উল্লেখ করেছ, আমি তার কথাই বলছি। তুমি উড়াে
জাহাজ যত বড়ই করনা কেন, সেখানে একটা জলপ্রপাত
নিশ্চয় রাখতে পারবে না। আবার জলের ধাক্কা না পেলে
তােমার এঞ্জিন চলবে না বা উড়ো জাহাজও নড়বে না, উড়া তাে
দূরের কথা।“দেখ, আত্মপরিচয় ও আত্মােন্নতির মূলে হচ্ছে
ধর্ম পথে থেকে কঠোর সাধনা করা ; আবার ধর্মের মূলে হচ্ছে
বিশ্বাস (বিশুদ্ধ বিশ্বাস)। নাস্তিকদের মন এমনই অদ্ভূত হয়ে
পড়ে যে, সেখানে সেরূপ বিশুদ্ধ বিশ্বাসের কোনই স্থান নাই।
যদি পৃথিবীর সকল শােকই আত্মা বিশ্বাস করে, তবু সে একাই
আত্মাকে ও সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করবে। এমনি তার মন্ !!
আমি-আপনি যে কিছু আহার করার পরেই খুব ছুটাছুটি
**.
৯৭
৭

‘ঈনুধা।
এঞ্জন
করে কিছু শক্তিক্ষয় করেন এবং তা না করলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য
হয়ে নিজের ও অন্যের ক্ষতি করার আশঙ্কা করেন, মানুষের জন্যও
কি সেই নিয়ম :
তিনি-হা, সেই রকমই বটে। প্রত্যেক মানুষই যেন
শক্তিশালী হবার সঙ্গে সঙ্গে সৎকাজে লিপ্ত থাকে। তা না হলে
তার মাথা ঠিক না থাকতেও পারে এবং সে সংসারের অনেক ক্ষতি
করতে পারে।
আমি--আর একটা মাত্র কথা বলেই আমি ক্ষান্ত হব, “য়া
করে এর একটা ছােট উত্তর দিলেই আমি নিজেকে দৃশ্য মনে
তিনি--কি কথা, চট করে বলে ফেন্স। এপর কিন্তু
তোমাকে যেতেই হবে। এদিকে আবার আমার শরীরটাও হঠাৎ
কেমন কেমন করতে লেগেছে। অদৃষ্টে কি যে তাছে ঠিক
বুঝতে পারছি না !
আমি—এই যে আপনার ভিতরে অনবরত দাউ দাউ করে
আগুন জ্বলছে, এর সঙ্গে আমাদের কোন জিনিসের সাক
আছে কি?
তিনি--উ, তুমি তো আচ্ছা ছেলে ! মনের গােপন কথাটুকু
সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা না করে কি থাকতে পারতে না ?
আমি অত্যন্ত অপ্রস্তুত হইয়া ভয়ে ভয়ে বলিলাম -- “দেখুন,
আমি জ্ঞাতসারে আপনার কাছে কোন অপরাধ করে থাকলে

এঞ্জন !
{ স্ব-সুধা
তার জন্য করজোড়ে ক্ষমা চাচ্ছি। এমন কথা জিজ্ঞাসা করলে
যে আপনার মনে কষ্ট হতে পারে সে বিষয় স্বপ্নেও ভাবিনি।”
তিনি-হাঁ, এ কথায় আমার একটু কষ্টই হয়, তবে তুমি
যখন কথাটা ভুললেই তখন এসম্বন্ধে দু এক কথা বলছি শোেন।
তবে আমি নিশ্চয় জানি তুমি এ বিষয়ে কিছুই বুঝতে পারবে
।
০
“আমি প্রথমে ছিলাম চিরমহান, চিরপবিত্র, চিরসুন্দর,
সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার মধ্যে।
ইচ্ছার মধ্যে। তার পর তিনি আমার
অন্তরের ভক্তি ও প্রেমকে পরীক্ষার জন্য আমাকে মানুষের
মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেন। মানুষ আবার আমাকে এই লােহার
খাঁচায় বন্ধ করে আমার দ্বারা অনেক কাজ করিয়ে নিচ্ছে।
আমি কিন্তু পূর্বের কথা মােটেই ভুলতে পারিনি। তাই যখন
আমার পূর্বের কথা স্মরণ হয়, তখন আমি বিরহের হেলায় স্থির
• হয়ে পড়ি। কিন্তু আমার আত্মহত্যা করারও আদেশ নাই।
তাই সেই পূর্কের কথা যেন ভুলে থাকতে পারি, এবং বিরহের
জালা কিছু কম হয় সেজন্য পেটের মধ্যে না বুকের মধ্যে )
সর্বদা আগুন জ্বেলে রাখি এবং ছুটাছুটি করে মনটাকে হালকা
করতে চাই।--তােমাদের অবস্থাও তেমনি। যদি সংসারের
শােক তাপে তোমাদের হৃদয় দগ্ধ না হত, তা হলে তােমরাও
তার বিরহ জ্বলা সহ্য করতে পারতে না। উপরন্তু সংসারের
আসক্তিরূপ আগুন মানুষের হৃদয়ে দিনরাত এমনি প্রবল ভাবে

স্বপ্ন-সুধা। : এঞ্জিন দয়া ! জ্বলছে যে তারা সেই প্রিয়তম চিরসুন্দরের কথা একদম ভূলে গিয়েছে।-হায়রে মায়াময়ী সংসার : আর হায়রে মােহাঙ্ক মানব !! বাস্তবিকই তােমাদের জন্য শােক প্রকাশ করা উচিৎ। দেখ এই বিরহের আগুনেই মানুষ ছা: আর সকলেই দিনরাত জ্বলে পুড়ে সারা হচ্ছে। এই সৃষ্টির প্রত্যেকটী জিনিষই প্রথমে সেই প্রিয়তমের অন্তরের মধ্যে ছিল। তার পর তিনি প্রত্যেকের প্রেম পরীক্ষা করার জন্য এই বিচিত্র বিশ্বজগতের সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তােমরা সে কথা আজ ভুলে গিয়েছ। আহা, তঁার কত তিনি মানব জাতির এই ভ্রান্তি ও সংসারাসক্তি দূর করার জন্য যুগে যুগে কতই না ধৰ্ম্মগুরু বা পয়গাম্বর প্রেরণ করেছেন, কতভাবে তােমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন, সে সব বিষয় কখনও চিন্তা করেছ কি ? তুমি কি জান–নিরীহ বাতাস কোন দুখে সময় সময় পাগল হয়ে প্রলয় কাণ্ডের সৃষ্টি করে, কার জন্য চলন্ত মেঘ কোন কোন সময়ে অশ্রু সম্বরণ করতে না পেরে ঝর, ঝর করে কেঁদে ফেলে? কোন্ আক্ষেপে সে মাঝে মাঝে বিকট চীৎকার করে উঠে ? তার অন্তর থেকে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎরূপে কিসের আগুন বের হয় ? ঐ নীল আকাশের অযুত নক্ষত্র কোন দারুণ বিচ্ছেদ বেদনায়, কোন প্রিয় বিরহের শশাকে সকল সময় নীরব হয়ে রয়েছে ?—তুমি কি জান-পৃথিবীর অন্তরের তাপ কত ?-সূৰ্য্য কোন বিরহ জ্বালায় দিনরাত ভীষণ ভাবে জ্বলে পুড়ে ছাই হচ্ছে...”

এঞ্জিন]
[ স্বপ্ন-সুধা
হঠাৎ এক বিকট চীৎকার করিয়া তিনি বসিয়া পড়িলেন।
আমি প্রথমে হতবুদ্ধি হইয়া পরক্ষণেই উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া গৃহের
শেষ প্রান্তে গিয়া ভয়ে কঁপিতে লাগিলাম। অমনি বজ্রপাতের
স্যায় ভীষণ শব্দ হইল, আর সেই সঙ্গে তিনি ফাটিয়া চৌচীর
হইলেন; সমস্ত ঘরখানি দেখিতে দেখিতে অগ্নিময় হইয়া
গেল, এবং আমাকে বাষ্প ও ধূমে অস্থির করিয়া তুলিল :
এদিকে কোথা হইতে একখণ্ড অর্ধদগ্ধ পাথুরে কয়লা ছুটিয়া
আসিয়া আমার মস্তকে লাগায় আমি যাতনায় চীৎকার করিয়া
উঠিলাম
***চাহিয়া দেখি, আমি কোথায় ? এ যে রাজসাহী ষ্টেশন !
তবে কি ঘুমের ঘােরেই এত কাণ্ড হইয়া গেল ? একজন
যাত্রী জিজ্ঞাসা করিলেন –“কি মশায় চোট পেয়েছেন নাকি?”
আমি কিসের চোট জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন যে
তাড়াতাড়ি নামিতে গিয়া একজনের হাত হইতে একটা
ছােট ষ্টীলের সুটকেস সশব্দে আমার মাথার কাছেই বেঞ্চের
উপর পড়িয়া যায়. (সম্ভম্বতঃ তাহার একটা কোনার আঘাত
আমার মাথায় লাগিয়া থাকিবে।) এবং সেই শব্দ শুনিয়াই
আমি চীৎকার করিয়া উঠিয়া বসি।
যাহা হউক আমি আর কিছু বললাম না। স্বপ্নের ক'।
স্মরণ করিয়া দয়াময়ের উদ্দেশে প্রার্থনা করিয়া বলিলাম—
প্রভু, এই অধমের প্রতি যখন তােমার এতই অনুগ্রহ, তখন এই
১০১

( এম
দয়া কর যেন মাঝে মাঝে এই রকম স্বপ্ন দেখার সৌভাগ্য
হইতে বঞ্চিত না হই !
রাজশাহী নিউ মােমে, হােষ্টেল ।}
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমার সমস্ত ভ্রাতা ভগ্নি স্বসুধা
পাঠ করিয়া উপকৃত হন। করুণানিধান বিশ্বপালকের নিকট
অধমের ইহাই প্রার্থনা। (আমিন)
সমাপ্ত

১। এই তরুণ কবি ও তাপসের বিশ্বপ্রভুর প্রতি প্রেম ও ভক্তিপূর্ণ কবিতার বই ‘কুসুম' পাঠ করিলে প্রাণে নিশ্চয় শান্তি পাবেন। ধৰ্ম্ম পিপাসু ব্যক্তি মাত্রেরই বইখানি পাঠ করা উচিত। মূল্য মাত্র ১ ছয় আনা। ২। মানুষ আজ মাটা খুলিয়া পুরাত; কীর্তি উদ্ধার কহিতে যত্নবান হইয়াছে, কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, সে তাহার হয় খুজিয়া আপন পরিয় জ্ঞান লাভ করতে একেবারে উদাসীন। এই প্রান্তি ও তাহার ধ্বংশকর পরিণতি হইতে জাতি বৰ্ম্ম নির্বিশেষে সকল প্রাত ভগ্নিকে ফিরাইয়া নিতে কবির ‘গুপ' : যঃস্থ } নিশ্চয় কাব্য জগতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করিবে । মূল্য ১ মাত্র প্রাপ্তিস্থান- ১। সেক্রেটারী দেওপুর পল্লী উন্নয়ন সমিতি পোঃ রহনপুর, মাল। ২। হামিদিয়া লাইব্রেরী ৩৬ং, আপার সার্কুলার রোড, কলিকাতা।

No text on this page.

Swapno-sudha Vol. 1, Ed. 1st

Author
Miya, Sardar Abdul Hamid
Title
Swapno-sudha Vol. 1, Ed. 1st
File name
Swapno-sudha Vol. 1, Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1940
Published
2009/08/18
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
119
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
513384
Barcode
4990010020366.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
oGnxS9HQRys
Download PDF

Swapno-sudha Vol. 1, Ed. 1st