Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Urbbashir Shapbimochon Kabya
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
自
উর্বশীর শাপবিমােচন
কাব্য।
জয়ােহন্তু পণ্ডুিপুত্ৰাণাং যেং পক্ষে জনার্দনঃ।
মহাভারত ।
শ্রীনৃত্যলাললাহাপ্রণীত।
শ্রীক্ষেত্ৰমােহনমুখােপাধ্যায়সংশােধিত
১.
কলিকাতা।
আমহাষ্টটি ৫৬ সংখ্যক ভবনস্থ
সরস্বতীযন্ত্রে
মুদ্রিত।
১১ সাল।
প্রকাশক–শ্রীনৃত্যলাল লাহি।
কলিকা, পঞ্চাননতলা লেন ৭৪ নং।
প্রিন্টার-শ্রীক্ষেত্রমােহন মুখোপাধ্যায়
কলিকাতা, আমহাষ্ট স্ট্রীট ৫৬ নং।
উৎসর্গ।
*
;
পূজনীয়া স্নেহময়ী জননী অামার
শতকোটী প্রণিপাত ও পদসরোজে ।
আশিষ দেবি ! পূর্ণ যেন হয় মানস
দীনের। কত যে সহেছ কষ্ট পালিতে
দাসেরে, না পারি বর্ণিতে তাহা; বর্ণনা
পারে শতবর্ষে বর্ণিবারে তোমার
মহিমা ; অজ্ঞ এ দাস কেমনে বর্ণিব ?
তোমার ঋণের মতিঃ নাহি পরিশােপি।
ইন্দ্র, চন্দ্র, অরুণ, বরুণ, ধনপতি,
কৃত্তিবাস, শ্রীনিবাস, পার্বতী, কমলা
সহায় হইলে তবু না পারি শুধিতে
একবিন্দু দুগ্ধধার সুধার অধিরি ।
কৃপাময়ি! ইচ্ছে দীন ও করকমলে
সঁপেতার উর্বশীরে (বতনের ধন)
রেখ মা ! যতনে তারে, এই ভিক্ষা চাই।
মনঃপদ্মে পাদপদ্ম করিয়া অর্চন
উৎসর্গ করিল দাস লই গো সস্নেহে
আমার যত্নের ধন উর্বশী সুন্দরী
শ্রীনৃত্যলাল লাহা।
;
No text on this page.
উর্বশীর শাপৗর্বমােচন কাব্য
প্রথম সর্গ
নমে, মাতঃ বীণাপাণি বিশ্ব-বেদাঙ্গিনী
তব পদাথুজে দাস; দেহ পদ-তরি
বিতরিয়া কৃপাকণা দীন হীন জনে।
তরিব রসের নব-সিন্ধু অবহেলে
তুলিতে কুসুম-রাজী প্রকৃতি-উদ্যানে ;
রচিব কাব্যের মালা, কাব্যপ্রিয় যাহে,
লইবে সৌরভ হর্ষে হৃদয়ে ধরিয়া
নিরবধি। ভক্তের মানস দেবি পুর
গাে ভাব্রতী, এ মিনতি ও পদ-সরােজে।
জানি সাধন, মাতঃ, যে সাধনগুণে
কালিদাস, কৃত্তিবাস বাল্মীকাদি কবি
সুকুসুমে পাদপদ্ম করিয়া অৰ্চ্চন
রেখেছে অজেয় কীৰ্ত্তি দুল্লভ জগতে
কিংবা ইন্দ্রজাল, যে মায়াতে গ্রীক কৰি
কুহুকের প্রায়, গাইয়া বিনােদ গান
সুন্দর বীণাতে মােহিত পৰ্ব্বত বৃক্ষ,
२
উর্বশীর শপবিমােচন কাব্য।
পশু পক্ষী নরে। তব পাদপদ্ম বিনা
কহ গো ভারতী কি আছে সম্বল মাের।
দীনের ভরশা মাতঃ কৃপাসিন্ধু তুমি
তেঁই গাে ভরশা মম লেখনী-ধারণে।
উর মাতঃ হৃষীকেশ-হৃদয় হইতে
বিরাজিতে এ দাসের রসনা উপরে।
রসনার রসধার রূপেতে রঙ্গিণী
পাণ্ডবের গুণ গান গাও মা সুতানে,
মধুর নিকণে যথা জরাসন্ধ-অরি
ব্রজাঙ্গনা গুণ গান গাইত স্বাশিতে
ভুলাইতে মধুস্বরে রাধা বিনােদিনী।
গাও মাতঃ বীণাপাণি ! কি হেতু পাণ্ডব
অমূল্য প্রণয় ত্যজি, কুরুবল লয়ে
সাজিলা দুৰ্ম্মদ রণে কৃষ্ণের বিপক্ষে।
রক্ষিতে ক্ষত্রীয়-গৰ্ব দানিল আশ্রয়
দণ্ডিরাজে ভীমসেন পূর্ণরুদ্র-তেজে
মরিতে কি কৃষ্ণকরে পতঙ্গের মত ?
ভবের মায়া কে বুঝো ভারতি! ভক্তের
ভরশা চিরানন্দ দৈবকেয়, ভক্তের
অধীন, তেঁই কি দুৰ্বার রণ সৃজিল
মাধব, পাণ্ডবের কীর্তি-বৃক্ষ রোপিতে
জগতে । দৈবলীলা কে বুঝে এ ভবে।
প্রথম সর্গ।
৩
তুঙ্গিণী লয়ে দণ্ডী মহাকুতূহলে
ফিরিলা অবন্তীধাম। রচিয়া অপূৰ্ব্ব
হৰ্ম্ম দণ্ডী দণ্ডেশ্বর রাখিলা গােপনে
হর্ষে তুরঙ্গিণী-ধনে; দরিদ্র যেমতি
তস্কর তরাশে রাখে,অতি সংগোপনে
বসুধার গর্ভমাঝে মহামূল্য ধনে।
গাও গাে কল্পনে দেবি! কোন যােগবলে
এ হেন অমুল্য নিধি পাইল নৃপতি
দিবসে অশ্বিনী আর নিশিতে রমণী
অপরা উর্বশী যেবা বৈজয়ন্ত-ধামে।
অটল যৌবন যার ত্রিদশ-আলয়ে
মােহিতে দেবতাকুল রূপের ছটায়।
অস্ত গেলা পদ্মকান্ত, হেরি রজনীরে
উদিল রজনীকান্ত ঈষৎ হাসিয়া
ভাঙ্গিতে প্রেয়সীমান ছত্র-চক্র সহ
উজলিয়া দশ দিক। বাড়িল মানিনী-
মান প্রাণকান্তে হৈরি, বৃকভানু সুতা
যথা গােবিন্দ-সমীপে। রসের সাগর
ইন্দু রসিক-প্রবর ভাঙ্গিল প্রেয়সী-
মান সুধা-বরিষণে। হাসি কুমুদিনী
আলিঙ্গিলা প্রাণনাথে সােহগে গলিয়া।
তুরঙ্গিণী-মূর্তি ত্যজি সহসা উর্বশী
বসিল নরেশপাশে বিমােহিনী-রূপে।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
কোটী নিশাকর জিনি উর্বশী সুন্দরী
অপ্সরা-কুলের গৰ্ব্ব; শােভিল সুন্দর
দণ্ডী সহ কুতুহলে বসি একাসনে
যথা পুলোমজা শােভে সহস্রাক্ষ সাথে
অপূৰ্ব্ব খচিত চারু সিংহাসনােপরে,
কিংবা যথা শিখর-বাসিনী সতী সদা
নিবসে শিখরে সুখে সিতিকণ্ঠ সহ।
কত ক্ষণে মৃদুস্বরে কহিলা দণ্ডীরে
শরদিন্দু-নিভাননা। “ত্যজ নরপতি
মােরে, বৃথা কেন দহিবে বিচ্ছেদে।
দুর্বাসা ঋষির অভিশাপ যেপ্রকার
বিবরিয়া সব আমি বলেছি তোমারে
নর-রায়, তবে কেন বৃথা। এ বাসনা ।
ক্ষণিক সুখের তরে ডুবিবে বিচ্ছেদে
অলঙ্ অম্বুধি যেবা বিস্তৃত এ পথে।
কিন্তু ভেবে দেখ নরনাথ! কি হইবে
তবে, যবে এ বারতা হইবে প্রকাশ
দিবসে তুরগী আর নিশিতে রমণী
পেয়েছে অবন্তীশ্বর মৃগয়া-কাননে ?
আসিবে অসংখ্য নৃপ তিস্পতি সম
পুলােমজা-পুলােমনন্দিনী, শচী।
সিতিক-মহাদেব।
তিযাপতি-সূর্য।
প্রথম সর্গ।
তেজে, পৰ্বত-নিঃসৃত জলপ্রপাতের
মত, যুবিাবে তােমার সাথে মহহবে।
নিশ্চয় আমার লাগি হইবে অত্যয়
নরপতি ; ত্যজ মােরে মঙ্গল-কারণে।
বিচ্ছেদ, প্রণয় প্রান্তে অলক্ষিত ভাবে
লুকাইত আছে, ভয় নাহি কি তাহারে ?
বুঝিয়া করহ যুক্তি অজ্ঞ নহে তুমি ।
;
নীরবিলা বিধুমুখী ঈষৎ হাসিয়া।
মজিল নৃপতি-মন সে হাস্য নেহারি
দামিনী কটাক্ষে যথা চাহি দেবরাজে
কাদম্বিনী-আড়ে থাকি ক্ষণেক হাসিয়া
মােহিল ত্রিদশনাথে হাসির ছটায়।
হায় রে অতনু কিবা মােহিনী শকতি
ধরে তব ফুলশর, যাহার সন্ধানে
ভাঙ্গিল যােগেন্দ্র-যােগ যােগাসন হতে,
কেমনে সহিবে বল এ দুর্জয় বাণ
নর-কুলােব মরি দণ্ডী নরপতি।
উত্তরিল নরপতি, “শুন সুধামুখি !
কেমনে ত্যজিব আমি তােম। হেন ধনে
অত্যয়-ধ্বংস।
মহাহবে-মহাযুদ্ধে।
কাদম্বিনী-মেঘ।
যােগে-মহাদেব।
অতনু -কামদেব।
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
পৌলস্ত্য-নন্দন বীর অসুরারি-রিপু
রাবণ, দেখ মীনকেতু-শরে হরিল
রামের সীতা পঞ্চবটীবনে, করল
অদ্ভুত যুদ্ধ দাশরথি সহ, মজিল
কনক-লঙ্কা, মরিল আপ্লনি, তথাপি
ছাড়িতে নাহি পারিলা সীতারে রাজন।
দীন যদি পায় রত্ন কভু দৈব-বলে
রাখে কি ফেলিয়া তারে চরণে দলিয়া ?
হৃদয়-প্রতিমা প্রিয়ে তুমিহে আমার
রাখিব স্ব-অঙ্গে তােরে একঙ্গি করিয়া
সদা, যথা বিরূপাক্ষ মিশাইল স্বীয়
অঙ্গে শৈল-বালিকারে, পাছে পূৰ্ব্ব মত
বিরহে তাপিত করে দাঙ্গায়ণী যথা।
সুমেরু তুলিব হস্তে, সহিব অক্লেশে
ইন্দ্রের অশনি বক্ষে কিংবা সুদর্শনে,
তথাপি নারিব আমি ত্যজিতে তােমারে
সুলােচনে। এ প্রতিজ্ঞা জানিহ আমার।
এইরূপ বাক-ছাদে দণ্ডী নরপতি
মােহিল উৰ্বশীমন অমৃত-বর্ষণে
প্রেমপূর্ণ স্বরে যথা গােকুলে বাঁশরি :
বর্ষিলা অমৃত-রাশি ব্রজাঙ্গনা-কানে।
অবন্তী ঈশ্বর নব প্রণয়িনী সনে
পুলস্ত-মুনিবিশেষ, রাবণের পিতা ভূরিবা
মীনকেতু-কামদেব। অশনিবজু।
প্রথম সর্গ।
চৈত্ররথে যক্ষরাজ বিহরে যেমতি
বিহরে নিকুঞ্জে কভু, কভু হৰ্যোপরে ।
মজিল রূপসীমন, পয়ােনিধি সম
উথলিল প্রেম-সীন্ধু মলয়-প্রবাহে।
উৰ্বশী স্বগীয় নানা রসেতে পূরিত
নিত্য নব সুখ ভুঞ্জে রাজার সংহতি ॥
ত্রিদশ-আলয়ে যথা ত্রিদশের পতি
কনক-আসনে বসি, হায় রে সেখানে
পশিল শশাঙ্ক প্রিয়া সশঙ্ক অন্তরে।
হেরি সন্ধ্যা-সমাগম হর্ষে বন্দিগণ
নিনাদি গভীর কম্ব, (অম্বুরব সম)
জানাইল দেবরাজে সন্ধ্যা আগমন ।
প্রমোদ-উদ্যানে যথা সখীদল সহ
তুলিয়া কুসুমরাজি পুলােমা নন্দিনী
প্রমুদা গাথিছে মনােহর হার হর্ষে ;
পশিল মরুৎ বাহী, হায়রে সে স্থলে
সহাস্যে, সুধাংশু যথা নলিনীর গেহে।
চাহিয়া ইন্দ্রের পানে সুচারুনয়নী-
চৈত্ররথ—কুবেরের প্রমোেদ উদ্যান।
পয়ােনিধি-সমুদ্র। শশাস্কপ্রিয়া—সন্ধ্যা।
কস্তু-শঙ্খ। পুলােমনন্দিনী প্রমদাসচী।
মরুৎবাহী—ইন্দ্র। সুধাংশু-চন্দ্র।
৮
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
;
( চঞ্চলা চপলা কিংবা রত্ননিধি সম
চারুনেত্র, সম্মােহন শর পূর্ণ তাহা)
পুছিল। পুলােমাত্মজা পূততু বীরে।
“কি কারণ প্রাণকান্ত নৰ্তকী নৰ্ত্তকে
কর আদেশ দেব পশিতে উদ্যানে;
অপেক্ষিছে দেখ তারা কানন-দুয়ারে।”
হাসি আদেশিলা মেঘবাহন ; আইল
হাস্যাধরে ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী
যন্ত্রিদল যন্ত্র লয়ে চিত্রলেখা সহ।
হেরি পয়ােনিধি যথা কলাপি সুন্দরী
ইন্দ্রধনু-সম-জ্যোতি পুচ্ছপুঞ্জ মেলি
থমকে থমকে নাচে, হায়রে তেমতি
রম্ভা তিলােত্তমা চারুনেত্রা সুহাসিনী
রঙ্গে ভঙ্গে সখী সঙ্গে মিল দেবেশে।
আদেশি দেবরাজ গীত আরম্ভিতে।
গায়িল গায়িকাকুল নাচিল নর্তকী ;
ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী সপ্তম্বরে
পূরিল অমরপুর, হায়রে তা সহ
শিঞ্জিল শিঞ্জিনী হর্ষে রুণু রুণু রোলে
বহুনিধি সম চারু নেত্র ইত্যাদি। খঞ্জন পক্ষী যেরূপ চঞ্চল
ও সুন্দর সেইরূপ ইন্দ্রাণীর নয়ন চঞ্চল ও তৃপ্তিকর এবং অনঙ্গ
তাহাতে সতত বিরাজিত।
পূততুন্দ্র।
পয়ােনিধিমেঘ। কলাপি-সুন্দরী-সয়ুরী
শিঞ্জিনী -- অলঙ্কারবিশেষ। শিঞ্জিল-বাজিল।
।
০
প্রথম সর্গ।
হেন কালে সমাঝে দেবর্ষি নারদ
উত্তরিল, হাসি হাসি অমনি সাদরে
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া দিল দিব্য সিংহাসন
দেবেন্দ্র, বসিলা মুনি ঈষৎ হাসিয়া ।
কতক্ষণে নৃত্য গীত হরি তপােধন
জিজ্ঞাসিলা দেবরাজে “কেন সুরমণি!
গন্ধৰ্ব্ব-কুলের মনােরমা উৰ্বশীরে
হেরি নর্তকী:মাঝে ? যার রূপানল
দহিত দেবতা-অঙ্গ অনঙ্গ-দহনে।”
উত্তরিলা মৃদুস্বরে দম্ভোলি-নিঃক্ষেপী।
“হায়রে অমরাপুরী অন্ধকার এবে
বিনা সে কুসুমরত্ন নর্তকী-প্রধান।
দুর্বাসা ঋষির শাপ কালান্তক সম,
এখনও কাপে অঙ্গ স্মরিলে সে কথা;
অবিদিত কিবা দেব! আছে তব পাশে।
তবে যদি অনুকম্পা করি দীন হীনে
করহ উদ্ধার তার, তা হলে উর্বশী
তোমার প্রসাদে আসে বৈজয়ন্ত-ধামে।”
• 'হেরিয়া রজনী-শেষ উষা বিষাদিনী
আবরণ মুক্ত করি ঈষৎ হাসিলা।
নিশা অবসান দেখি দেবতা-নিচয়
দন্তোলি-নিঃক্ষেপী-ইন্দ্র।
অনুকম্পা-দয়া। বৈজয়ন্ত--স্বর্গ। আবরণ-ঘােটা।
১০
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
ভাঙ্গিল সঙ্গীত-সভা; সঙ্গিদল সহ
নীরবে নৰ্তকী-বৃন্দ বিদায় হইলা।
পশিলা বিরাম-গৃহে বিরাম দায়িনী।
বঙ্কিম রঞ্জিত রাগে দেব বিরােচন
উদিল রজনী-শেষে নীলাম্বর-মাঝে
আহলাদে ঈষৎ হাসি সরোজে সম্ভাষি।
পলাইলা উষা দূরে, আইল ধাইয়া
মধুলােভে মধুকর কমলিনী পাশে
গুণ গুণ স্বরে গায়ি প্রণয়-সঙ্গীত।
রুষিল কৌমার রবি নেহারি নয়নে,
ভবিষ্যত প্রেম-আশা ভাবিয়া অন্তরে
ভঙ্গ দিল ভৃঙ্গরাজ নীরব হইয়া,
সসস্ত্রভাস্কর-মূৰ্ত্তি দরশন করি
নিত্য কৰ্ম্ম করিবারে মানব-নিকর
চলিল ভৃঙ্গার হস্তে জাহ্নবীর তীরে
স্মরি শৈল-সুতা। কিন্তু হায় ! হে মহর্ষি
সুধা-মাখা হেন নাম ত্যজিয়া প্রত্যুষে
কেমনে চলিলে বল দ্বারকা-নগরে
বীণা-যন্ত্র বাজাইয়া দ্বন্দ্ব বাঁধাইতে।
সূৰ্য্যেন্দু-সঙ্গমে তুষ্ট তস্কর যেমতি
তুমি কি তেমূতি তুষ্ট কলহ সৃজিতে ?
-
.
বিরাম-দায়িনী-নিদ্রা। বিবােচন—সূৰ্য্য।
সূৰ্য্যেন্দু-সঙ্গমে ইত্যাদি। অমাবস্যা পাইলে চোরেরা যেমন
সন্তুষ্ট হয়, তুমি কি সেইরূপ কলহ পাইলে তুষ্ট হও ?
প্রথম সর্গ।
।
বসিয়া রুক্মিণী সনে রুক্মিণী-রমণ
রজত-আসনােপরি, হেন কালে তথা
উত্তরিলা ঋষি-শ্রেষ্ঠ বীণা বাজাইয়া।
সসমে পাদ্য অর্ঘ্য-দানিয়া শ্রীপতি
পুছিল মধুর বাক্যে কুশল-বারতা।
তুষিয়া মধুর বাক্যে মাধবের মন
হাসিয়া চতুর শ্রেষ্ঠ আরম্ভিল তবে।
“কেমনে কহিব দেব! কেমনে হে আমি
বর্ণিব দারুণ কথা দ্বন্দ্ব বাঁধাইতে,
একেত সম্বােধে লােকে কোন্দলিয়া বলে
অহনিশ তাই দেব! ভয় বাসি মনে”।
অপূর্ব সুন্দর প্রসূ মৃগয়া-কাননে
পেয়েছে অবন্তী:রাজ। দিবা-অবসানে
অশ্বিনী মুরতি ত্যজি জ্যোতির্ময়ীরূপে
অবন্তী-ঈশ্বরে তােষে বিশ্ব-বিমোহিনী।
দেখেছি সুন্দরী কত ত্রিদশ-আলয়ে
তুলনায় তুল্য নহে সে রূপের কাছে।
চিকণ চিকুর-দাম মরি কি মাধুরী,
হেলিছে দুলিছে পৃষ্ঠে, তাহারে হেরিয়া
লজ্জিত হইয়া যেন তটিনীর তটে
রেদিতেছে তালবৃন্ত সন সন স্বনে।
তাহারে যদ্যপি দেব! যুগল নয়নে
হের এক বার, সত্যভামা রাধিকার
প্রঘােটকী।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
;
রূপের গরিমা কি ছার তাহার কাছে
বুঝিবে আপনি; ধন্যাদৃষ্ট অবন্তীর,
বামনে হায়রে চন্দ্র পায় অবহেলে
হাতে। না পারি সহিতে হেন বিড়ম্বনা
ব্রাহ্মণের যজ্ঞসূত্ৰ চালে পিঁধিলে
শােভে কি ব্রাহ্মণ সম কি দারুণ বিধি।
এ নারী তােমার শোভে হে যাদবপতি।
বুঝিয়া করহ যুক্তি যাহা লয় মনে।
অতুল বৈভব দেব! তব রাজপুরে,
কিন্তু হেন রত্ন কেন নাহি রাখ গৃহে ?
নীরবিয়া ঋষি-শ্রেষ্ঠ মাগিয়া মেলানী
ছাড়িল দ্বারকাপুরী মানস পূরিয়া।
শুনিয়া মুনির মুখে এসব ভারতী
পুত্রের অব্যর্থ শর স্মরিয়। অন্তরে
অস্থির কমলাকান্ত তুরগী হেরিতে।
ডাকাইয়া দারুকেরে দেবকী-নন্দন
কহিলা সুস্বরে যাও হে সূত-প্রবর !
অবন্তী-নগরে দণ্ডি-পাশে অবিলম্বে,
বল তারে মম বার্তা। মৃগয়া-কাননে
যে অশ্বিনী পেয়েছে ভূপতি হেরিতে
পুত্রের অব্যর্থ শর ইত্যাদি। কামশর, মহাদেবের কোপে কাম
ভস্ম হইয়া রুক্মিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।
মৃতপ্রবর—সারথিশ্রেষ্ঠ।
প্রথম সর্গ।
বাসনা তারে, কহিবা তাহারে তুমি
যেন ত্বরা করি, আইসে তুরগী লয়ে
দ্বারকানগরে। অন্যথা করিলে ইথে
কহিবে তাহারে তুমি আমার আদেশে
সাজিতে যুদ্ধের সাজে যুঝিতে আহবে ।
আনিব অশ্বিনী আমি সমরে জিনিয়া,
দেখিব কি বলে বলী নিবারে আমারে।
নারিবে আমার গতি রােধিতে দুর্মতি
ত্রৈলােকের চতুরঙ্গ সহায় করিলে।
বালুকা-আলি কি রােধে স্রোতস্বতী-গতি ?
প্রণমিয়া যদুশ্রেষ্ঠে আরােহি স্যন্দনে
চলিল সন্দেশ-বাহী, হ্রেষল বড়ব।
রােষে প্ৰাজন-প্রহারে। উড়িল অম্বরে
রথ ঘর্ঘরিল চক্র, ভীষণ নিনাদ ছাড়ি
খগরাজ যথা বিস্তার বিসম পক্ষ
উড়ে নভস্তলে। চলিল পবন-ভরে
ব্যোম-যান বেগে, হেরিয়া হরষ-চিতে
ফিরলা শ্রীপতি মরি রুক্মিণীর ধামে ।
যথায় সুবর্ণাসনে অবন্তী-ঈশ্বর
বিরাজে বিচার-গৃহে সভাসদ সনে
নরথ। বড়বাঘােটকী। প্ৰাজন-চাবুক।
অম্বর-শুন্য।
নভস্তল-আকাশ। ব্যোমযান-রথ ।
১৪
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
প্রবেশিল বন্দী সহ কৃষ্ণবার্তাবহ।
প্রণমিয়া নরবরে দুত-ব্যবহারে
আরম্ভিল বার্তাবহ আগমন-হেতু।
অপূৰ্ব্ব বাজিনী এক বাতায়ু-কাননে
পেয়েছ হে নররাজ! চক্রপাণি তাহা
মাগেন তােমার ঠাই দেহ পাঠাইয়া
মধুর বচনে ভূপ কহিল হাসিয়া,
“কি আশ্চর্য দূতবর! শুনিনু শ্রবণে,
কে বলে অরণ্যে প্রসূ পাইয়াছি আমি?
এসব বারতা কোথা শুনিল কেশব ?
ত্রৈলােক্য-ঈশ্বর যিনি জগত-কারণ
তত্ত্বময়, ধন জন যাহার প্রসাদে ;
কি ছার তুরগী তার শ্রীপদের কাছে ?
থাকিত যদ্যপি ইহা মম সন্নিধানে
দিতাম এখনি আমি হরিষ অন্তরে ॥
উত্তরিলা গুহপতি কে নৃপমণি
কপটে ভুলাতে চাহ কৃষ্ণের কিঙ্করে?
প্রমত্তা প্রমথী এক মৃগয়া-কাননে
লভিয়াছ নরপতি। বর্ণিল। দেবর্ষি ;
তাই কৃষ্ণ গুণমণি প্রেরিলা আমারে।
বাজিনী অশ্বিনী। বায়ু-মৃগ।
গুহ-পতি-দূত। প্রমথী-ঘােটকী।
প্রথম সর্গ।
আদেশিলা গােপীকান্ত লইতে তােমারে ,
ত্বরায় তুরগী সহ দ্বারকা-নগরে।
জাননা কি মহারাজ! মাধবমাহাত্ম্য ?
রুষিলে পুণ্ডরীকাক্ষ হায়রে কেমনে
রক্ষিবে রাজত্ব, ধন, আর তুরঙ্গিণী।
ধর বাক্য নরপতি রাখ কৃষ্ণমান
জীবিতে বাসনা যদি কর ভবতলে।
বেশি কি বুঝাব আমি অজ্ঞ নহ তুমি।
নীরবিল দূতশ্রেষ্ঠ, রুষিল নৃপতি
আরক্তিম চক্ষে চাহি কহিল তাহারে,
“যাও দূত! দ্বারকায় কৃষ্ণের সমীপে,
মম দূত হয়ে পুনঃ কহিবে তাহারে ;
অন্যায় বিচার কিংবা পরদার, চুরি
অথবা প্রজার কষ্ট নাহি মম পুরে ;
বৃথা কেন কোপ তবে করেন মুরারি ?
নহি দোষী কোন দোষে কেন ডরাইব
দুষ্টের দমনকারি দৈবকী-নন্দনে ?
ত্যজিব রাজত্ব, ধন, ছাড়িব সংসার,
ছার তুচ্ছ সিংহাসন, ছার সুত দারা,
তথাপি নারিব দিতে তুরঙ্গিণী:ধনে।
পুনঃ আরম্ভিল দূত মৃদু মধুস্বরে
“হায় ভূপ! কত আর বুঝাইব আমি,
পুণ্ডরীকাক্ষ-কৃষ্ণ।
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
ভবিতব্য-ফল তুমি অবশ্য ভুঞ্জিবে।
এতেক কহিয়া তবে কৃষ্ণের সারথি
ছাড়িল অবন্তী-রাজ্য স্তনে চাপিয়া।
গৈরিক বসন পরি প্রতীচী-অচলে
প্রবেশিল পারুদেব বিরাম লভিতে।
দিগদিগন্তর গত বিহঙ্গম-কুল
পশিল কুলায়-মাঝে হরিষ অন্তরে।
কুজনিল পক্ষিকুল, বহিল উল্লাসে
মলয় সে স্বর জানাইতে শশিপ্রিয়ে
সন্ধ্যা-আগমন। কুমুদিনী ফুটিল আহাদে,
ফুটিল সন্ধ্য:মালতী সন্ধ্যা-আগমনে।
হেরি সন্ধ্যা-সমাগম দণ্ডী নরপতি
চলিল নিরাশ চিত্তে বিরস বদনে
যথায় অন্দর-মাঝে উৰ্বশী সুন্দরী।
হৈরিয়া মলিনমুখ অবসন্নকায়
পুছিলা উর্বশী ধনী, “কহ নরপতি,
কি কারণে নাথ! তব হৃদয়-আকাশে
উদিল অকালে মেঘ, প্রাবৃটে যেমতি
ঘোর-ঘন-ঘটাচ্ছন্ন অবনী-মণ্ডল।
কি তাপে হৃদয় তব বিচলিত এবে
কিংবা দাসী কোন দোষে দোষী তব পদে।”
গৈরিক বসন—রক্তবস্ত্র। প্রতীচী-পশ্চিম। পারুদেব-সূৰ্য্য।
কুলায়-পক্ষীর বাসা। প্রাবৃট-বর্ষাকাল।
প্রথম সর্গ।
বিষাদে নিঃশ্বাস ছাড়ি কহিলা ভূপতি
লক্ষ্য করি চারুচন্দ্ৰবনার দিকে।
“নহে দোষী বিধুমুখি! শুধাংশু বদন
হৃদয়-চকোর-পাশে প্ৰেম-সুধা-দানে।
বিষধরবিষ কভু ধরে কি শশাঙ্ক ?
হায় সুলােচনে। নিদারুণ বিধি মোর
প্রতি, ছিনু মােরা শুন সুধামুখি ! সুখে,
কপােতক পত্নী সহ তুঙ্গ বৃক্ষচুড়ে
বাধি নীড় থাকে যথা মর্ত্যে স্বর্গসুখে ।
বিদরে হৃদয় মম সে সুখ স্মরিলে।”
এতেক কহিয়া রাজা নীরবে কাদিলা,
কাদিল অপর শ্রেষ্ঠ। সে নীর নেহারি।
কতক্ষণে চক্ষুজল মুছি নরপতি
পুনঃ আরম্ভিল তবে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ি।
“হায় প্রিয়ংবদে। আমি হায়লাে কেমনে
কহিক দারুণ বাক্য যা লিখিলা ধাতা।
হেরি সুখ অভাগার শুনলাে মুভগে !
যদুকুলভ কৃষ্ণে দেবর্ষি নারদ
কহিলা তােমার বার্তা বার্তাবহরূপে।
তিলেক যাহারে নাহি হেরিলে নয়নে
অস্থির পরাণ-পক্ষী হৃদয় পিঞ্জরে ;
.
কপােতক-ঘুঘু।
ধা-বিধাতা।
তুঙ্গ-উচ্চ
।
বার্তাবহুদূত।
১৮
উর্বশীর শপবিমােচন কাব্য।
;
হায়রে কেমনে আমি ত্যজি হেন ধনে
রাখিব এ ছার প্রাণ দহিতে বিচ্ছেদে।
পাঠাইয়া দূত কৃষ্ণ মাগিলাতােমারে ;
নাহি দিনু যেই তেঁই রুষিয়া কংশারি
যুদ্ধ হেতু দূতমুখে আহ্বানে আমারে।
এক্ষণে বাসনা ধনি। তােরে সঙ্গে লয়ে
লইব শরণ বীৰ্য্যবন্ত-বীরপাশে।
বুঝিয়া করহ যুক্তি যুক্তিদাত্ৰী তুমি।”
উত্তরিলা প্রিয়ংবদা পিক-সুধা-স্বরে।
“ভুলিনু স্বর্গের সুখ, মজিনু প্রণয়ে,
পাইনু পরম প্রীতি তােমার সদনে।
ভৃঙ্গরাজ-প্রেমে যথা মুগ্ধ কমলিনী
তেমতি আমি হে তব অবন্তী-নাগর ।
পারি সহিতে তব হেন হীন দশ
হেরি অশ্রুপূর্ণ আঁখি ইচ্ছি মরিবারে ।
বিদরে হৃদয় মম তুব দুঃখ হেরি।”
সুখে বাহুপাশে বাঁধি সুধা-বদনারে
আশ্বস্ত হইয়া পরে অবন্তী-ঈশ্বর
কহিলা উল্লাসে হাসি প্রাণ পুত্তলীরে।
কংশারি—কংশের শত্রু, শ্রীকৃষ্ণ।
পিক-সুধা-স্বরে--কোকিলের ন্যায় মধুরস্বরে।
ভৃঙ্গরাজ-ভ্রমর।
প্রথম সর্গ।
“তুমি যদি নাহি কঁদ কে আর কাঁদিবে ?
এ জগতে সমদুঃখী কেবা অভাগার।
ভালবাসা মর্মব্যথা জানে সেই জন
যে জন কাহারে ভাল বাসিয়াছে কভু।
বুঝে কি প্রণয়রস রসহীন জনে ?”
ঈষৎ হাসিয়া সুখে উষা প্রভাময়ী
পশ্চিম-ইতর দেশে পশিল হরষে।
বিষাদে বিমর্ষ হয়ে প্রেম-খেলা ছাড়ি
পশিলেন খচমস রােহিণী-মন্দিরে।
আলােকে পূরিল বিশ্ব ; ছাড়ি জীবগণে
বিরামদায়িনী নিদ্রা পশিল অমনি
নলিনীর হৈমগৃহে, জাগরণ হেতু
বিরামিল কুমুদিনী নয়ন মুদিয়া।
গাইল সুতানে সুখে বিহঙ্গমকুল
সান্ত্বনিতে শশিপ্রিয়া, জননী যেমতি
পুত্রের সুপ্তি হেতু গায় মৃদুস্বরে।
উদিল আদিত্যনাথ উদয়-অচলে,
শশব্যস্তে কমলিনী ফুটিয়া অমনি
বিতরিল সুধারাশি নাথেরে তুষিতে।
পশ্চিম-ইতর-পুর্ব। খচমসচন্দ্র।
রােহিণীচন্দ্রের স্ত্রী। আদিত্য-সূৰ্য্য
অচল-পর্বত।
২
উর্বশর শাপবিমােচন কাব্য।
প্রভাতিল বিভাবরী হেরি নরপতি
ডাকাইয়া পুত্রবরে সভাবিদ্যমানে
সঁপি রাজ্যভার সুখে, মাগিয়া মেলানী
ছাড়িলেন রাজধানী তুরঙ্গিণী লয়ে।
শুনিয়া কাহিনী সব ব্যস্তে পাটরাণী
আলু থালু বেশে গেলা বুঝাইতে ভূপে।
বহিল ক্রন্দনধ্বনি রাজসভাতলে।
কিন্তু রে পাষাণ নাহি গলিল তাহাতে।
কালসর্পবিষ কোথা বিষে হয় ক্ষয় ?
উপেক্ষিয়া মহিষীরে দণ্ডী মহীপতি
বাহিরিলা চলচিত্তে তুঙ্গিণী লয়ে।
হেরিয়া পতির মতি সুমধুরস্বরে
আকাশের পানে চাহি পার্বতী উদ্দেশে
কৃতাঞ্জলিপুটে সতী কঁদি আরাধিলা।
“দনুজদলনি দুর্গে দুর্গতিনাশিনি!
দীনদাসী সাধে তােমা এ ঘাের বিপদে ;
ভক্তি বিনা দুঃখিনীর কি আছে সম্বল
দিতে রাঙ্গা পাদপদ্মে ওমা রঙ্গময়ি।
রক্ষ গো মা রক্ষাকালি! প্রাণকান্তে মম
কৃষ্ণের ভীষণ সেই কোপানল হতে।”
নীরবিলা বিধুমুখী তিতি অনীরে ॥
বিভাবরী-রাত্রি। উপেক্ষিয়া-অবহেলা করিয়া।
দ্বিতীয় সর্গ।
২১
সুখে যথা অলিরাজ মকরন্দন
বহে পুষ্পকুঞ্জ হতে, হায়রে তেমতি
রাণীর এ আরাধনা জলেশ্বর-অরি
বহিল কৈলাসে যথা হৈম-সিংহাসনে
বিরাজেন হলধর-বামে হৈমবতী।
শুনিয়া সু আরাধনা সারদা সুন্দরী
আশিষিলা স্বস্তি স্বস্তি বলি মহিষীরে।
দ্বিতীয় সর্গ।
গাও গাে কল্পনে সতি! গাইল। যেমতি
বরপুত্র শ্রোতা বুধে তুষিতে সুন্দর
মধুমাখা মৃদুস্বরে, মিলাইয়া’সপ্ত-স্বর
মধুর বীণাতে। পূরাও দীনের আশা।
ছাড়ি রাজ্য সিংহাসন অবন্তী-ঈশ্বর
বিচারিকৃষ্ণের শত্রু স্থির করি মন
ধীরে ধীরে উত্তরিলা জলধির কূলে।
করযােড়ে নরবর আরধিল হর্ষে
জলদলবলশ্রেষ্ঠে। বহিল উল্লাসে
বরপুত্ৰ-কালিদাস। জলদলবলশ্রেষ্ঠ-বরুণ।
উর্বশীর শাপবিমোচন কাব্য।
নৃপতির আরাধনা হাসি ফণি-প্রিয়
যথায় জলেশ পাশী সুবর্ণের গৃহে
প্রবাল-আসননাপরি জলেশ্বরী সহ।
টলিল শুক্তিজ-গৃহ নড়িল আসন
আয়স্কান্ত আকর্ষণে লােহ-রাশি যথা।
ধরি প্রিয়তমার জলেশ স্বকরে
চঞ্চল শফরী সম চকিত সময়ে
উত্তরিলা নিজকূলে নরবর যথা।
হেরিয়া পাশীরে হর্যে দণ্ডী নরপতি
করযােড়ে বিবরিলা আদ্যোপান্ত যত।
মৃদুমধু-স্বরে তুষি অবন্তী-ঈশ্বরে
আরম্ভিলা জলেশ্বর, শুন হে নৃপতি !
অগতির গতি কৃষ্ণ ব্রহ্মাণ্ড-ঈশ্বর
ইন্দু-বদনা মরি ইন্দিরা সুন্দরী
মনােহর, ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ কুবের
যাঁহার প্রসাদে সুখে ভুঞ্জে রাজসুখ
নিরাপদে। কহ তাহার বিরুদ্ধে অস্ত্র
ধরিব কেমনে বীরবর।ক্ষম মােরে,
হীন-বল আমি কিসে রক্ষিব তোমারে।
বামন হইয়া চাহ চন্দ্র পরিবারে ?
দেহ প্রসূ যদুকুলভে তুষ্টচিত্তে
ঘুচুক বিবাদ সুখে নিষস রাজ্যেতে।”
ফণিপ্রিয়-পবন। শুক্তিজ-মুক্তাময়। আয়স্কান্ত-চুম্বক।
শরী–পুটিমাছ। ইন্দিরা-লক্ষ্মী।
দ্বিতীয় সর্গ।
অভিমানে মহামানী অবন্তী-রাজন
মহারােষে কহিলেন সিন্ধুপানে চাহি।
“নির্লজ্জ নিষ্ঠুর তুমি জলদলপতি
প্রতিসঃ, এই কি সাজে তোমারে, অজেয়
অলঙ্ তুমি, ধন্য ঘৃণ্য প্রাণ তােমার।
প্রভঞ্জন হতে তুমি ভীমপরাক্রম
তেঁই ত তােমার পাশে শরণ মাগিনু।
কিন্তু হেন ক্ষুদ্র-মতি তব জলপতি !
জানিলে কখন তব কাছে ক্ষত্রবীর
মাগিত আশ্রয় যদি ধিক তার প্রাণে।
হেন নীচমতি তব দেখিয়া অগস্ত্য
গণ্ডষে শুযিয়াছিল তাই পয়ােনিধি।”
কেমনে এ হীন জনে রত্নাকর নাম
দানিলে হে পােড়। বিধি একি বিধি তব ।
শােভে কিহে মণিকন্ঠী প্লবগের গলে?
এতেক কহিয়া গর্বে ক্ষত্রবীরমণি
ক্ষোভে, রােষে বাহিরিলা বেগে (দ্রোণাচাৰ্য্য
যথা রুষি পাঞ্চালের প্রতি, কিম্বা ক্ষোভে
পরাশরাত্মজ কাশীধামে, যবে হর
হরি নামে অবহেলা হেরি, খেদাইল
মহারােষে কাশী-বাস হতে।) ভেটিবারে
বৃহদ্রথে চলিলা নৃপতি অভিমানে।
প্রতিসঃ-বরুণ। প্রভঞ্জনপবন।
প্লবগ-বানর। পরাশরাত্মজ-ব্যাসদেব।
২৪
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
পশিল নৃপ মগধ-রাজ্যে, ছড়ি দিল
পথ হর্ষে যুগল পাষাণ শরণ্যারে ;
দ্বারপাল চলিল অমনি নরবরে
সঙ্গে করি রাজসভাতলে, নৃপ যথা,
সূৰ্য্য-সম পরাক্রমে হৈম-সিংহাসনে।
নমিয়া মগধেশ্বরে দণ্ডী নরপতি
আরম্ভিলা মৃদুস্বরে আপন কাহিনী।
“ক্ষত্ৰ-কুল-শ্লাঘ্য তুমি বীর-চূড়ামণি
তব বীর-বীৰ্য বীর ! বিখ্যাত ভুবনে।
ত্রিদিবে দেবতাকুল তব নাম শুনি
থর থরে সিংহাসনে ; গােকুলনগরে
কঁপেন কংশহাসুর, রম্ভাবন যথা
প্রভঞ্জন-পরাক্রমে থর থর থরে।
রক্ষহ আপন্ন জনে এ বিপত্তিকালে,
রক্ষা কর বীরধর্ম আশ্রয়ি দীনেরে,,
বীরমণি, ভীত দীন দীননাথ-রােষে।”
এই রূপে বিলাপিয়া তুষি জরাসন্ধে
কহিলা সংক্ষেপে দণ্ডী আদ্যোপান্ত যত।
“সত্য বটে, উত্তরিলা মগধ-ঈশ্বর।
কিন্তু যে সুদূরদর্শী ক্ষত্রবীর-মাঝে
সে কি হে বিবাদে কভু নীচ-জন সহ।
লাঘবিয়া নিজগর্ব হীনবল-সাথে
কে কোথা যুঝিয়া কহ বীরগণ-পাশে
ফ্রিীয় স্বর্গ। পেয়েছে আর কিম্বা যশ বিশ্বমাঝে ? অজ্ঞ যদি মন্দ-ভাষে সম্ভাষে বিজ্ঞেরে হাস্য-রসে হেন বাক্য নাহি উড়াইয়া যদি সম-কটুভাষে প্রত্যুত্তরে তারে বিজ্ঞমাঝে সে কভু কি হাস্যাস্পদ নহে? এ নীতি হে তব কাছে নাহি অবিদিত। বীরের উচিত কাৰ্য্য সমরিতে সুখে বীৰ্যবন্ত-বীর-সনে। রথি-কুল যত অশক্ত-জনেরে অস্ত্র কভু না প্রহারে। শােভে কি অশনি-ঘাত রমণীর শিরে? মাের ভয়ে চিন্তামণি চির কম্পমান তস্কর লম্পট যথা হেরি গৃহস্বামী ডরে, কিংবা শিশু জিমূত-গর্জনে। যে যাদব মগধের ভুজ-যুগ-উরে পশিল জলধি তলে, পৰ্বত-কলরে যেবা যবনের ভয়ে, মুকুন্দ-তল্প- তলে ছিল লুকাইয়া। হেন হীন জনে কেমনে হানিবে অস্ত্র জরাসন্ধ রথী ? তাহে কি বীরত্ব বীর ! বরঞ্চ অযশ । মার্জার সহিত কিহে মৃগেন্দ্র কেশরী মাগে কি সমর কভু ? ক্ষান্ত হও মনে দেহ হয়ী যদুবীরে ঘুচুক জঞ্জাল। নীচ সহ নাহি যােধে মগধ-ঈশ্বর।” জিমূত-মেঘ। মার্জার-বিড়াল। হয়ী-ঘােটকী !
উর্বশীর শপিবিমােচন কাব্য।
বিষাদে নিঃশ্বাস ছাড়ি উঠিলা নৃমণি
প্রণমি মুগধ-বীরে, নমিলা কৃষ্ণারি।
আরােহি তুরগী-পৃষ্ঠে বিরাগীর মত
অলিঙ্গ পঞ্চাল দিল্লি কর্নট কলিঙ্গ
কাশী গয়া প্রয়াগাদিনেপাল কাশ্মীর
ভ্রমিলা অযুত দেশ, ক্লান্তি-বশে শেষে
প্রবেশিলা নররায় ত্রিদশ-আলয়ে।
কিন্তু হায় ভাগ্যদোষে ভাগ্যহীনে এবে
অরুণ শমন ব্রহ্মা অদিতি-নন্দন
গণেশ ধনেশ আদি দেব-কুল যত,
কেহ না রক্ষিল হায় এ বিপত্তি-কালে।
নীরব নিশির শেষে অবন্তী-ঈশ্বর
ক্লান্ত ক্লিষ্টকলেবরে উৰ্বশী-সহিত
উত্তরিলা ধীরে ধীরে কৈলাসের মূলে।
কৈলাস-শিখরে যথা বিরূপাক্ষবামা
বিহরে সানন্দ মনে। সে পদকমলে:
মাগিলা শরণ দণ্ডী, হায় রে যেমতি
রুদ্ৰভয়ে ব্যস্ত হয়ে শান্তনুনন্দন
অন্নপূর্ণা-পাদপদ্মে অন্ন ভিক্ষা হেতু।
মহাভয়ে ভীত হয়ে ভবানী ভবেশে
করযোড়ে নরবর বিবিধ বিধানে
আরাধিলা। কাপিল কৈলাস শৈলেশ্বর,
থর থরে, মড়মড়ে লড়িল সহসা
ত্রিদশ-আলয়-স্বর্গ। শান্তনুনন্দন-বেদব্যাস।
দ্বিতীয় সর্গ।
মহীরুহ, পলাইল পশু পক্ষী আদি
হেরি ঘাের ভূকম্পন ত্রাসে। হুহুঙ্কারী
বাহিরিলা বেগে হৰ্য্যক্ষ, স্বনিল ফণি-
গণ ত্রাসে ; গিরিবাসী কপিল আতঙ্কে।
থসিল ত্রিশূল নন্দী স্মরিলা শ্রীহরি,
বীরভদ্র চমকি ফেলিল সিদ্ধিগুচ্ছ;
উদ্ধপুচ্ছে ছুটিল বৃষভ, চমকি সতী
চাহি চারু-নেত্রে ছলে পুছিলা মহেশে।
হাসি শূলপাণি ধরি পদ্ম-পাণি সুখে
কহিলা, ‘মায়াময়ি! একি মায়া তব,
চল হেরি কার তাপে তাপিত এ পুরী।”
ধরি শঙ্করীর কর শঙ্কর স্বকরে
উত্তরিলা গিরি-মূলে, ব্রজবালা যেন
ধরি কৃষ্ণকর করে কদম্বের তলে।
কহিলা সরােষে রুদ্রপতি, “বৃথা কেন
আশা অতিরিক্ত আশে আইলে নৃপতি।
পঞ্চমুখে যে নাম জপেন পঞ্চানন
কেমনে রক্ষিবে শিব তাঁহার বিপক্ষে ?
এতে জগতে খ্যাত ক্ষেপা মহেশ্বর
এ কাৰ্য্য উচিত বটে তার পরিচয়।
যাও অন্যস্থানে বীর ! না পারিবে তুমি
ভুলাইতে ছলনায় তোলা ভােলানাথে ॥”
মহীরুহ-বৃক্ষ। হৰ্য্যক্ষ-সিংহ।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
জানিহে কপর্দী তােমা কহিলা নৃমণি।
“জানি তব কূটবুদ্ধি ধূর্জটি কুটিল।
মহারাষে দশঙ্কন্ধ তাই খেদাইল
লঙ্কা হতে; পলাইলা ত্রাসে প্রাণ লয়ে
নতুবা দমনে শমন যথা, দমিত তােমারে
লঙ্কেশ্বর। ভক্তিভাবে ভবদেবে পূজি
বীরমণি লভিল কি এই ফল ? ভাল
দেখাইলে ভক্ত ভরশা আশা ভাঙ্গড়
জটিল, ধ্বংসিলে অরুবংশ, নাশিলে
রাবণি, প্রেরি অস্ত্র রামানুজে, মায়ার
মায়ায় হরিলে রাক্ষসর প্রমীলা-
বিলাসী, সােণার লঙ্কা করিলে শ্মশান।
হে শম্ভু! যে শম্ভ, তােমা ভজি বাহুবলে
জিনিল এ তিন লােক, কেমনে তাহারে
নাশিলা কালীর করে ছলনা করিয়া ।
ভজিল তােমারে সে কি হেন গতি হেতু
বামদেব! কে ভজে এ হেন হীন জনে।
যাহারে ভজিলে লোকে মজে কাল-বিষে,
কি ফল তাহার ঠাই মাগিলে আশ্রয় ।
নীরবিলা নরপতি, হাসি বাহরিলা
t
ধূর্জটি, কপর্দী, রুদ্রপতি, ভবদেব-শিব।
শস্কন্ধ-রাবণ। অর-রাক্ষণ।
রাবণি-ইন্দ্রজিৎ। বামদেব-মহাদেব।
দ্বিতীয় সর্গ।
২৯
বরালিকা সঙ্গে রঙ্গে বৃষভবাহন
বিহরিতে প্রভাময়-প্রভাতকাননে।
প্রণমিলা উষাদেবী উমার চরণে।
গাইল বিহগকুল প্রভাতসঙ্গীত ;
মিলাইলা স্বর শ্যাম ভৃঙ্গরাজ সহ ;
গুণ গুণ স্বরে ধুয়া ধরিল মধুপ ;
ছাড়িল হরষে তান বাঙ্কারিয়া পিক।
পশিল সে সুধামাখা সুমধুর স্বর
যথায় বাবপুত্র রত্নদোলাপরি
সুবর্ণমন্দিরে সুপ্ত সুভদ্রার সহ ।
তমােময়ীনিশা-অন্ত হেরি পার্থ রথী
বসিলা কুসুম-শয্যাপাশে ; মনােলোভা
হায়রে সে শোভা, যথা বৈজয়ন্তধামে
শচীকান্ত বলী বিরাজেন শচীসনে
হৈম-শয্যোপরি তারাময়ী নিশাশেষে।
রথী মধু রস্বরে কহিলা ভদ্ৰারে।
উঠ প্রিয়ে ! প্রেমের পুত্তলি! প্রাণরত্ন!
• নিমীলিত পদ্ম-আঁখি হেরিয়া তোমার
প্রস্ফুটিত কমলিনী দেখতে ভাস্করে
রূপচ্ছটা (তারাদল যথা, অমানিশা-
কালে যবে রােহিণীরমণ নিদে সুখে)।
বালিকা-পার্বতী।
বাবপুত্ৰ-অর্জুন। রােহিণীরমণ—চন্দ্র।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
উঠ প্রিয়ে। চিরানন্দ মাের মনােরম
গৰ্বণীর গৰ্ব খর্ব করি বিধুমুখি।”
নীরবিলা ধনঞ্জয় ত্রাসে নিদ্রাদেবী
পলাইল সুভদ্রার নীলােৎপল ছাড়ি।
চমকি কমল-আঁখি মেলিলা সুন্দরী,
প্রমীলা রূপসী যথ। মেঘনাদ-ভাষে
তমােময়ী-নিশা-শেষে জাগিল চমকি।
ঈষৎ হাসিয়া ধনী সুচারুহাসিনী
আবরিলা গৌর-অঙ্গ নীলাম্বর দিয়া।
সাদরে চুমিলা পার্থ অলক্ত-কপােলে
নিশা-অবসানে ভৃঙ্গ পঙ্কজে যেমতি
সাদরে চুম্বন করে সোহাগে গলিয়া।
উঠিল হরষে রামা আঁখি কচালিয়া।
বিষাদে মলিনমুখে নলিনী সুন্দরী
নেহারি সে আঁখি, আঁখি মুদিল লজ্জায়।
যথা বিধিমতে তুষি মনােমমাহিনীরে
চলিলেন ধনঞ্জয় হরি স্মরিয়া
যথায় পাণ্ডব-শ্রেষ্ঠ যাজ্ঞসেনী সহ।
চয়নিয়া ফুলচয় চিকণিয়া মালা
সুহাসে ঈষৎ হাসি সখীরে সম্ভাষি
নীলােৎপল-নীলপদ্মের ন্যায় চক্ষুঃ।
চয়নিয়া ফুলচয়—ফুল তুলিয়া।
| দ্বিতীয় সর্গ।
কহিলা সুভদ্রা সতী, “চল লাে স্বজনি।
বিহরিয়া ভানুমুত শীতল সলিলে
পূজি গিয়া ইষ্ট-দেবে পুস্পাঞ্জলি দিয়া।
উত্তরিলা সহচরী (মধু-কালে যথা
কুহরে মদন-সখা ) কেমনে এ বেশে
কালিন্দী-পুলিনে সখি ! বিহরিবে তুমি ?
ত্রিভুবনজয়ী ষেবা পার্থ ধনুর্ধর,
তাহার রমণী হয়ে হায়রে কেমনে
এ বেশে সুমুখি ! তুমি বাহিরিবে পথে ?”
এতেক কহিয়া ধনী গজেন্দ্রগমনে
হর্ষাবেশে প্রবেশিলা সুবর্ণমন্দিরে।
কেয়ুর, নূপুর, হার, দিতি, স্বর্ণচিক,
কঙ্কণ, বলয়, কাঞ্চী, মণি, মুক্তা, হীরা,
বিবিধ রতনরাজি, দিবাকর সম
জ্যোতির্ময়, বাছিয়া বামা লইলা হরষে।
সাজাইলা বিনােদিনী বিনােদ-সজ্জায়
ভদ্রে, রজত কাঞ্চন হীরা মুক্ত দিয়া।
হাসি সুহাসিনী সুখে সুন্দর-সীমন্তে
পরাইল মনোহর সিন্দুরের ফোটা;
ধরিল অপূৰ্ব শােভা সুন্দর ললাটে
সৌদামিনীচ্ছটা যথা কাদম্বিনীমাঝে।
উজ্জ্বল কজ্জল দিল সুচারু নয়নে ;
কালিন্দী-যমুনা।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
হাসি মনসিজ অলক্ষিতে প্রবেশিলা
পঞ্চশরসহ সুখে সে আঁখির মাঝে।
বিশাল-নিতম্বােপরি ঝক ঝক ঝকে
নর্তকীর নৃত্য তুচ্ছি নাচিছে আদে
সৌরকররাশি-সম সুবর্ণ-মেখলা।
একেত সুন্দরী তাহে শােভিল সুন্দর
নীলাম্বর, নীলাম্বরে শশধর যথা।
উজ্জ্বল দর্পণে সতী সে চন্দ্র-আননে
হেরিয়া ঈষৎ-হাসে হাসিলা সুন্দরী।
ঝল মল বৃলে সাজি নানা আভরণে
বাহিরিলাল গােপবালা, চারুধারা যথা
সাজিলা কৌতুকে রঙ্গে ভ্রমিতে হরষে
নিদাঘ-নিশির শেষে মন্দাকিনীকুলে।
সুসজ্জিল সখীদল সতীর সহিতে,
বাজিল শিঞ্জিনী হর্ষে, বেলিল আহলাদে
ঘুনু ঘুনু বোলে মরি সুন্দর ঘুঙ্গর।
অন্তরিক্ষে চলিল উল্লাসে কুসুমেষু
যােজনিয়া কামশর কুসুমকাৰ্ম্মকে।
*
কতক্ষণে উত্তরিলা যমুনার কূলে
সুধামুখী; হুলুধ্বনি ধ্বনিল সকলে ;
গৌডগৃহে গৌরাঙ্গিণী হায়রে যেমতি
মনসিজ, কুসুমেযুকামদেব। মেখলা-চহার।
সৌর-কররাশি-সূৰ্য্য কিরণ। চারুধারা-শচী।
দ্বিতীয় সর্গ।
মাতায় জগত মরি ঘাের হুলুস্বরে
যবে হৈমগিরি ছাড়ি গিরিশ-গৃহিণী
শরতের সুখময় সূৰ্যেন্দুসঙ্গমে
অবতীর্ণা মহীতলে মহামায়ারূপে।
লয়ে কুলাঙ্গনগণে পার্থপ্রিয়তমা
বিহরে কালিন্দী-কূলে, হেন কালে তথা
বিষাদে বিমর্ষ চিত্তে দণ্ডী নরপতি
প্রবেশিলা ধীরে ধীরে বামী আরােহিয়া।
হেরি ভদ্রা শারদীয় বীণাবিনিন্দিত
স্বরে পুছিলা নরেশে। “কে তুমি কি হেতু
আইলা তটিনীতটে, কেন অপূর্ণ
আঁখি কহ বিস্তারিয়া মােরে বীরমণি।”
উত্তরিলা বীরবর “হায় গো কেমনে
কহিব দারুণ ব্যখা, কি ফল কহিলে ?
দেব নর যক্ষ রক্ষ কিমর অরা
কার সাধ্য না হইল রক্ষিতে আমারে।
তােমরা কুলের নারী অবলা সরলা
মম দুঃখ শুনে মাত্র হইবে দুঃখিনী ।”
“কি ভয় তােমার বীর ?” কহিলা রূপসী
“কি তব হৃদয়-ব্যথা কহ প্রকাশিয়া।
কৃষ্ণের ভগিনী আমি পার্থের রমণী
আমার অভাব কিবা অবনীমণ্ডলে।
বামী-ঘাটক।
৩৪
উর্বশীর শাপৰিমােচন কাৰ।
না ডরি দেবেন্দ্রে আমি কই মহাবাহু
কি তাপে তাপিত হয়ে ইচ্ছ মরিবারে।
নাশিব তােমার তাপ এ প্রতিজ্ঞা মম
বীরাঙ্গনাবাক্য সত্য অচল অটল।”
উমার উরসে বসি মনােসিজ বলী
হানে ফুলশর যথা নির্ভয় হৃদয়ে
কালকণ্ঠে, ভৈরবীর ভরশার বলে ।
সেরূপ ভদ্রার বাক্যে দণ্ডী নরপতি
সুস্থির হইল প্রাণে; আইল বাহরি
ধৈৰ্য্য বীৰ্য পরাক্রম দেবীর সাহসে।
বিবরিল বিবরণ অবন্তী-ঈশ্বর।
শুনিয়া সে কথা, সিহরিয়া সখীবৃন্দ
চাহিল সত্ৰাসে পাৰ্থমনোহর পানে।
হেরিয়া সখীর ভাব কহিলা হাসিয়া
সুহাসিনী পার্থপ্রিয়া। “কি ভয় স্বজনি!
বীরাত্মজা বীরনারী বীরের জননী
মোরা সবে, কেন ডরাইব রমানাথে ?
রক্ষিব রাজনে আমি নিজগৰ্ববলে।
সত্য বটে নাহি বল এ ভুজমৃণালে,
কিন্তু ভেবে দেখ সুবদনে! খরতর শর
বিরাজে লােচনে যার, সে কভু কি ডরে
উর-বক্ষস্থল। মনােসিজ-মদন। কালকণ্ঠ-মহাদেব
ভৈরবী-দুর্গা। রমানাথ-কৃষ্ণ।
দ্বিতীয় সর্গ।
জিনিতে গাণ্ডিব বীরে কটাক্ষসায়কে ?
রক্ষিবেন ধনঞ্জয় অবশ্য দণ্ডীরে,
তবে যদি হতমান করেন আমারে
মাগিব আশ্রয় ভীম ভাশুরের কাছে,
কিংবা পুত্ৰ অভিমনুবীরচূড়ামণি
রাখিবে মায়ের মান এবিপত্তিকালে।”
এতেক কহিয়া। তবে রােহিণী-নন্দিনী
রঙ্গে ভঙ্গে সখীসঙ্গে সারিলা সত্বরে
জলকেলি ; যােগাইল অমনি আনিয়া
অপুৰ্ব্ব স্যন্দন-বাহী মায়ারথ খানি।
উঠিল। সতী সখী-দল মেলি বিমানে
নিশাসঙ্গে আনন্দেতে তারাদল যথা।
কত ক্ষণে উত্তরিয়া হস্তিনা-নগরে
সঁপিয়া ভীমের করে অবন্তী-রাজনে
চলি গেল নিজ বাসে পার্থপ্রিয়তমা।
গাণ্ডিবী-অর্জুন। কটাক্ষ-সায়ক-নয়নবাণ ।
রােহিণন্দিনী—সুভদ্রা। স্যন্দনবাহী-সারথী।
তৃতীয় সর্গ।
কনক-আসনে বসি ধর্মের নন্দন
রাজলক্ষী রাজবালা দ্রৌপদী সহিত
চিন্তিত হৃদয়ে কহিলেন পার্থ বীরে।
“পাঠাও হে বীরবর! মাদ্রী-পুত্র-দ্বয়ে
যথায় দণ্ডীর সাথে ভীমসেন রথী
বিরাজে সানন্দমনে উপত্রে উপেক্ষি।
নিবার বীরেশে বীর! এ প্রতিজ্ঞা হতে।”
প্রণমিয়া ধৰ্ম্ম বীরে ভাই দুই জন
উত্তরিলা করযােড়ে ভীমের সম্মুখে ।
নমিয়া বিষন্নচিতে কহিলা বীরেশে
ধর্মের অনুজ্ঞা যত দণ্ডীর কারণে ॥
মহাক্রোধে বৃকোদর অগ্নিময় রোষে
চাহিল মাদ্রিয়-পানে; পলাইলা ব্রাসে
যুগল পুরুষ যথা যুধিষ্ঠির রথী।
হেরিয়া সে ভাব দুঃখে অধীর হইয়া
পাঠাইলা পার্থধীরে পাণ্ডব-প্রধান
সানিতে বৃকোদরে এ কুমতি হতে।
বিধিমতে ধনঞ্জয় তুষি বৃকোদরে
কহিলা ধর্মের বার্তা। শুনি বীরমণি
তৃতীয় সর্গ। ৩৭ উত্তরিলা পার্থ বীরে আরক্ত নয়নে। ক্ষত্ৰকুলােদ্ভব তুমি পাণ্ডুর নন্দন ভীমের অনুজ, শূর অভিমপিতা এ কুৎসিত বাক্য কিহে শােভে তব মুখে ? বিক্রমে বিশ্ববিখ্যাত দ্রোণাচাৰ্য গুরু, মায়ারথ, অক্ষয় গাণ্ডিব ধনু, শিব- দত্ত পাশুপৎ বাণ, এ সব থাকিতে ডর সমর-তরঙ্গে। সাহসে বাঁধহ হিয়া, ধর অগ্নিদত্ত শরাসন, ইন্দ্র দত্ত বাণ, টঙ্কার ধনুক-গুণ বিশ্ব কাপাইয়া মহাবাহু ! মৃত্যুভয়ে ভীত কি হে তুমি? কর কাৰ্য ক্ষত্রোচিত, ধর অস্ত্র রক্ষিতে আশ্রিতে। ক্ষত্ৰ-ধৰ্ম্ম-বিৎ তুমি, কহ কি রূপেতে নিজ কুলব্রত বীর! ত্যজিবে তরাসে। শূরত্ব বীরত্ব যার আছয়ে শরীরে, ডরে কি কখন সেই শমন-ঈক্ষণে? ধন্য বীর-ধৰ্ম্ম। রক্ষিতে ক্ষত্রিয়-গৰ্ব যদি হে তােমার থাকে শকতি, তবে লওরে শরণ নির্লজ্জ জীবন লয়ে দৈবকেয়পাশে। ধৰ্ম্ম-বল বাহুবল নাহিক যাহার সে কোথা আদর লভে ক্ষত্রবীরমাঝে । ক্ষধর্মবিৎ-যিনি ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম জানেন। ঈক্ষণ-দর্শন।
৩০
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
তােমার কলত্র আসি মাগিল আশ্রয়
তেঁইত দণ্ডীরে আমি করেছি রক্ষণ।
নিজ-কুল-বন্ধু-মান নাশিবার তরে
যাওরে অর্জুন! লয়ে নির্লজ্জ জীবন
যথায় বিপদ-ত্রাতা শ্রীমধুসূদন
তােমার পরম সখা ওগে শরণ।
যত যত বীরকাৰ্য্য সাধিলা সমরে
কৃষ্ণের সহায় তুমি, সাহায্য তাহারে।
নগণ্য ভীমের কাছে তােমার প্রভাব ?
যাও কৃষ্ণপাশে লয়ে ঘৃণিত জীবন।
ভেবেছ কি বীরশূন্য মেদিনীমণ্ডল ?
ভ্রান্তিমাত্র, তাই কৃষ্ণ হেন শ্লাঘা করি
মাগিল দম্ভেতে তুরঙ্গিণী দণ্ডী ঠাঁই।
এই যে দেখিছ গদা পৰ্বত-প্রমাণ,
বিশাল করেতে ধরি সমর-তরঙ্গে
ভেদিব যাদবকুলে, জানিবা যেমতি
বজ্রে ভেদে ধরাধরে অদিতি-নন্দন।
অথবা পড়িয়া রণে যদুপতি-শরে
সমরে ত্যজিয়া প্রাণ যাব দিব্যলােকে।
কিন্তু ভেবে দেখ ভাই! যবে সুধিবে জননী
“কোথা ধনঞ্জয়! মাের পুত্র ভীমসেন”
কি বলে কহিবে বল জননী-সমীপে
সমরে বিনষ্ট ভীম তব বিদ্যমানে ?
নীরবিলা নূরশ্রেষ্ঠ, বিষণবদনে
তৃতীয় সর্গ।
চলিল মন্দিরে ফিরে পাৰ্থ ধনুর্ধর
যথায় ধার্মিকশ্রেষ্ঠ পাণ্ডুকুল-মণি
বিরাজে দ্রৌপদী সহ চিন্তার সাগরে।
শুনিয়া পার্থের মুখে এসব কাহিনী
বিরসবদনা মরি ভাসি অশ্রু-নীরে
চলিলা পাণ্ডবপ্রিয়া আলু থালু বেশে,
সখী সঙ্গে ভেটিবারে পাণ্ডব-পারিন্দ্রে।
উত্তরিলা বাদল ভীমের মন্দিরে,
শিঞ্জিল অমনি রুণু রুণু বোলে মরি
সুন্দর শিঞ্জিনী। শুনিয়া সে সুধামাখা
সুমধুর স্বর চমকিল ভীম রথী ;
বিস্ময় মানিয়া বীর কহিল উল্লাসে,
“সপ্ত-স্বরে ভৃঙ্গ-রাজ পিকরাজ সহ
গাইছে কি প্রেমগীত বসন্তসঙ্গমে ?"
সহসা মন্দিরে পশি কহিলা সঙ্গিনী,
সুধু কল-কণ্ঠ নহে দেখ একবার
বীরশ্রেষ্ঠ বৃকোদর বীরচূড়ামণি !
মরি কি প্রতিমাখানি অনঙ্গ-বিজেত্ৰী
অবতীর্ণা মূর্তিমতী বসন্ত-রাগেতে।”
)
চমকিলা বীরশ্রেষ্ঠ হেরি পাঞ্চালীরে
সম্মুখে, কহিলা শূর সতীরে উদ্দেশি।
পারিন্দ্র-সিংহ।
৪
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
“কহ কি কারণে তুমি পাণ্ডুকুল জ্যোতি
সজলনয়নে এবে ভীমের সদনে।
সুধাংশুবদনে কেন বিষগ্নের ভাব ?
কি তাপে তাপিত আজি কহ সুধামুখি।
হৃদয়মন্দির তব। না পারি সহিতে
হেন অবসন্ন ভাব তােমার অধরে।
বিস্তারিয়া কহ প্রিয়ে। মনের বেদনা।
জাননা কি প্রিয়ংবদে! ভীমের বিক্রম?
ত্রিভুবনজয়ী দুষ্ট কীচক দুৰ্ম্মতি
পড়িল কালক বলে কুষ্মাণ্ডের প্রায়
শত ভ্রাতা সহ দুষ্ট হিংসিয়া তােমারে ।
এই যে দেখিছ প্রিয়ে ! শৃঙ্গধর-সম
ভীমবলধারী মম এই বাহুযুগ
নাশিবে তােমার তাপ শুনলো সুন্দরি ।
কহ শীঘ্র সুধাধার সহেনাক আর
অসহ বিমর্ষবণ ও সুধা-অধরে।”
নীরবিলা নূরসিংহ; সজলনয়নে
উত্তরিলা পঞ্চকান্তা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ি।
“প্রাণনাথ! একি তব উচিত ব্যাের
দেখাইছ দাসী প্রতি, হরিছ আমার
হৃদয়-সৰ্বস্ব-ধন, হায়রে যেমতি
মন্দোদরী-হৃদি-ধন রাবণ হরিয়া
সমর্পিলা রামহন্তে দিব্যগতি হেতু।
তৃতীয় সর্গ।
{
বিজ্ঞ হয়ে একি রীতি তব বীরমণি।
রাখ কথা দুঃখিনীর জই দণ্ডীরে,
ধরি কর প্রাণনাথ। রাখ এ মিনতি।
আনন্দে হৃদয়ে ধরি, সুধবদনারে
দ্বিতীয় পাণ্ডব বীর কহিলা সুস্বরে।
“তব বাক্যে প্রাণেশ্বরি। ইচ্ছি মরিবারে ।
বীরাঙ্গা ধীর-নারী বীরের জননী
বীৰ্য্যবতী বাম হয়ে কেমনে কহনা
উচ্চারিলে হেন নীচ অব্যক্ত কথন ?
হা কি লজ্জা দুরদৃষ্ট মম বিধুমুখি ?
হেন দুরাচার পাপী কেবা ক্ষত্ৰকুলে,
আশ্রিততরে বাহুবলে না করি রক্ষণ
অকারণ বাহুযুগ ধরে সে দুৰ্ম্মতি ?
ক্ষত্ৰকুলে জন্ম লয়ে যুদ্ধে ভয় করি
হেন বাক্যে সম্মত কে হয় চন্দ্র নিনে ?
জানি আমি, সত্য বটে যদু-কুলপতি,
দেবের আরাধ্য বৈকুণ্ঠের অধীশ্বর ।
যাঁর পদ হৃদিমাঝে জপেন এ্যম্বক।
সে পদ চিন্তি প্রাণ ত্যজিয়া সময়ে
ফাঁকি দিয়া সূৰ্য্যসুতে যাইব গোলকে।
স্ত্রীবুদ্ধি তােমার প্রিয়ে। কিরূপে কহন।
ত্যজিয়া অমূল্য বীর-ধৰ্ম্ম সুধামুখি।
রক্ষিব এ ছার প্রাণ নিস্তেজের মত ?
ব্র্যম্বক-শিব। সূর্য্যতম ।
৪২
উর্বশীর শাপবিমােচন কাৰ্য।
;
স্বপ্নেও ভেবনা প্রিয়ে। হেন নীচাশয়ে
প্রবর্তিবে বৃকোদর বীরধর্ম ত্যজি।
যখন যে আজ্ঞা মােরে করেছ সুন্দরি !
করেছি পালন তাহা সেবকের মত
অনিবার ; কিন্তু এই অনুরােধ তব
রক্ষিতে অশক্ত, ক্ষমা কর ক্ষেমঙ্করি।
ধর ধৈৰ্য্য সুবদনে! কেঁদনাক আর,
করহ মঙ্গলচিন্তা সমর জিনিতে।”
থামিলা বীরেন্দ্র ভীম ; সজলনয়নে
ফিরিলা পদত্মজা, হায়রে যেমতি
রক্ষঃকুল-রাজলক্ষী রাণী মন্দোদরী
নিবারিতে দশস্কন্ধে নিষ্ফলা হইয়া
নীরবে কাঁদিয়া গেলা আপনার পুরে।
প্রবেশিলা ধৰ্ম্মপাশে পার্ষতী সুন্দরী
অপূর্ণা শােকাকুলা, বিষবদনে।
হেরিয়া সে নীর দুঃখে অধীর হইয়া
বিষাদে বিমর্ষচিত্তে পাণ্ডুপ্রিয়তমা
সানিতে চলিলেন দ্বিতীয় পাণ্ডবে ।
জননীর আগমন হেরি বৃকোদর
প্রণমিলা মাতৃপদে; আশিষিলা সতী।
গললঃকৃতবাসে উঠি বীরবর
পুছিল। কুন্তীরে। “মাতঃ ! কোন প্রয়ােজনে
তৃতীয় সর্গ।
৪৩
পবিত্ৰিল মাের পুরী শ্রীপদ-মর্পণে?
দানিলে সংবাদ, দাস মুহূৰ্ত্তভিতরে
ভেটিত ও পাদপদ্ম ; বৃথা ক্লেশ করি
আইলা দাসের ঠাই কেন গো জননি?”
উত্তরিলা ভােজবাল। মধুলিহস্বরে।
“কঁদেরে মায়ের প্রাণ তাইরে বাছনি !
আইনুরে তব পাশে বুঝাইতে তােরে।
দশ মাস দশ দিন ধরিয়া জঠরে
সহেছি যাতনা কত, তা হ'তে এ শ্রম
নহে গুরুতর তাই আইনু হাঁটিয়া।
শুনিলাম তুমি নাকি হেলি যদুবীরে
দিয়াছ আশ্রয় মরি দণ্ডী দণ্ডেশ্বরে ?
কি আশ্চর্য! বীরমণি! একি রীতি তব ?
যে যাদবে জগজ্জন পূজে অহর্নিশ
হৃদয়পঙ্কজ দিয়', হায়রে কেমনে
সে কারণে তুমি ডাকিবে সমরে ?
কত বার বিপদের ত্রাণকর্তা হরি
তারিলা বিপদ হতে, সে সব কাহিনী
কেমনে হে বীরবর! স্মৃতিপথ হতে
মুছিল। অবাধে হায় কৃতরে প্রায় ?
পবনাশ-নাশ যথা নাশে পবনাশে
মধুলিহ-মধুমক্ষিকা।
পবনাশনাশ-পবনাশ সর্প, তাহাকে যে নাশ করে অর্থাৎ গরুড়।
৪৪
উৰ্ব্বশীর শপিবিমােচন কাব্য।
তেমতি নাশিবে তােমা রাম নীলমণি ;
কেন তার বাণানলে ও মাের বাছনি!
পুড়ি ভস্মরাশি হবে পতঙ্গের মত ?
রাখরে মায়ের মান দেহ যদুবীরে
দণ্ডী ফাহু তুরঙ্গিণী ঘুচুক জঞ্জাল।”
শুনিয়া =ায়ের কোল ক্রোধে ভীমরর্থী
কন্তু কg মঙ করি আরক্তনয়নে
কহিলা বীরমাতা হয়ে মতিঃ কেমনে
এ বাণী উচ্চারিলা ক্ষমুখে নিস্তেজ
সমান ; জননী বলি ক্ষমিলাম তােমা
নতুবা এ গদাঘাতে দিতাম তােমারে
সেই সে দশমদ। ভৃগুরাম যথা ॥”
লাজ ভয় অভিমানে পাণ্ডুপাটেশ্বরী
ফেলিলেন অশ্রুবারি; হায়রে সে নীর
ভাষাইল হৃদশেলে নিবরিণীরূপে।
কতক্ষণে চক্ষুজল মুছি সুলােচনা
চাহিলেন ভীমসেনে, দেখিয়া সে আঁখি
পলাইল কুন্তী রাণী, নিকষা যেমতি
রাবণের ক্রোধ হেরি পলাইল ত্রাসে।
মাতার অবস্থা হেরি ধর্ম নরপতি
নানা মত নীতিবাক্যে বুঝাইলা ভীমে।
অচল অচল যথা প্রভঞ্জনবেগে
তৃতীয় সর্গ।
৪৫
;
তেমতি অটল ভীম-প্রতিজ্ঞা অচল
টলিল উপদেশবায়ুবেগভরে।
নিরস্ত হইয়া তবে ধৰ্ম্মের নন্দন
নিবৰ্ত্তিল নিকেতনে ; আইল অমনি
অৰ্জ্জুন মাদ্রেয়-দ্বয় দ্রুপদ-আত্মজা
বিরস বিমর্ষ চিত্তে যুধিষ্ঠিরপাশে।
সহসা সেখানে পশিল সন্দেশ-বহ
দ্বারকা হইতে। নমিল। দূত রাজায়।
পুছিল নৃপতি তারে কুশলবারতা।
না জানি রাজ্যের বার্তা” কহিলা দারুক
“কৃষ্ণের আদেশে আমি দণ্ডীর কারণে
ভ্ৰমিলাম নানা দেশ, পৰ্বতকর
বন উপবন আদি ত্রিদিব পাতাল।
পশিলাম জলধির অতল সলিলে
তথাপি না পাইলাম দণ্ডীর উদ্দেশ।
ভীমসেন মহারথী অবন্তী-ঈশ্বরে
দিয়াছে অভয়দান, তাই জ্ঞাত হয়ে
আইলাম তব পাশে দণ্ডী মাগিবারে।
যে হয় করহ যুক্তি বিলম্ব না সহে
চিন্তীন্বিত চিন্তামণি আমারে চাহিয়া ॥
বিবরিল ধর্মরাজ আদ্যোপান্ত যত,
শুনিয়া সিহরি দূত মাগিলা মেলানি।
নিকেতন-গৃহ।
ত্রিদিব—স্বর্গ।
৪৬
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
কতক্ষণে উত্তরিয়া দ্বারকানগরে
বিবরিলা বিবরণ নারায়ণপাশে।
মহাক্রোধে কুসুমেষু পিতার আদেশে
চলিলা হস্তিনাপুরে যুধিষ্ঠির যথা
পঞ্চ ভ্রাতা সহ সুখে সজ্যোতিরূপে।
মহাসমাদরে তুষি যাদব-অঙ্গজে
সুধিলেন ধৰ্ম্মরাজ-আগমন হেতু।
বাপের দুলাল মায়াধর রতিপতি
নানামত রঙ্গে ভঙ্গে বাক্য বিন্যাসিয়া
কহিলা দম্ভেতে চাহি পাণ্ডুবংশধরে।
“কার গর্বে এতদূর হইয়া গর্বিত
করিছ গর্হিত এত গােপালে না মানি।
যে কৃষ্ণের বলে বল ধর পঞ্চ ভাই
হারে উচিত নহে হেলিতে এরূপে।
কে রক্ষিত তােমা সবে বিনা শ্যামমণি
দুর্ভাশী দুর্বাসা মহাঋষি কোপানলে;
যবে বহু শিষ্য সহ রাজা দুৰ্য্যোধন
পাঠাইলা তব পাশে বিজন বিপিনে ?
যার গুণে ত্রিভুবন-বাসী নরপতি
নােয়াইলা শির আসি তব পদতলে ;
হেন কৃষ্ণে হতাদর করিয়া কেমনে
ইহ লেকে পর লোকে রাখিবে অখ্যাতি ?
যাদব-অঙ্গজ-কামদেব।
তৃতীয় সর্গ।
৪৭
যত যত বিপজ্জালে করিয়া উদ্ধার
হইল কি এই প্রতিকূল পরিশেষে ?
রাখ কথা, দেহ দণ্ডী সহ ভুঙ্গিণী
কৃষ্ণের চরণে; বাদ বিসংবাদে কেন
তাঁহার বিশিখে, পুষ্টি ভস্মরাশি হবে
পতঙ্গ যেমতি পড়ি বৈশ্বানরকোপে?
ভেবেছ কি বীর নাই অবনীমণ্ডলে
বৃকোদর! তব সম? সেই অহঙ্কারে
তৃণ জ্ঞান কর যত বীরেন্দ্রমণ্ডলে ?
জাননা কি যদুবংশ বিক্রম প্রভাব ?
ইন্দ্র, চন্দ্র, অরুণ, বরুণ, ধনপতি,
বৃষধ্বজ, চতুর্মুখ, দিকপাল আদি
যুঝিবে যাদবপক্ষে যদ্যপি কটাক্ষে
জানান এ সমাচার যদুকুলপতি।
কি ছার তােমার গদ গদাধর ঠাঁই
যদ্যপি আমারে আজ্ঞা দিতেন শ্রীপতি
লইতাম তুরঙ্গিণী নিজ বাহুবলে ।
শুনি রোঝিণেয়মুখে কর্কশ ভারতী
মহাফ্রোধে বৃকোদর কহিলা গর্জিয়া
“কি ছার করিস গর্ব কামকলাপতি
ক্ষত্রিয়সভার মাঝে পাগলের মত ।
তের যত বীরবীৰ্য কে না জানে ভবে ?
বিশিখ-বাণ।
বৈশ্বানর-অগ্নি।
৪৮
উর্বশীর শাপৰিমােচন কাব্য।
যা চলিরে মুঢ়মতি ! কহ গে কৃষ্ণরে
দিব যাহারে আমি দিয়াছি আশ্রয়।”
এইরূপ বাগযুদ্ধ করি বহুক্ষণ
মহাক্রোধে ফুলশর নিবৰ্ত্তিলা গৃহে।
সমূহ বিপদ দেখি পাণ্ড-কুল-মণি
পাঠাইলা মাদ্ৰীপুত্রে সাহায্য কারণ
কুরুশ্রেষ্ঠ মহামানী দুৰ্য্যোধনপাশে।
কনক-হ্মাসনে বসি চন্দ্র-কুল-রবি
কৌরব-কুলের গৰ্ব দুৰ্য্যোধন রথী
ভীষ্ম দ্রোণ দ্রৌণি কর্ণ শল্য কৃপাচার্য
বিদুর সুমতি সহ শােভিছে সুন্দর
রােহিণী-রমণ যথা নক্ষত্রমণ্ডলে।
অার সব সভাসদ, শত সহােদর
করিছে মন্ত্রণা ধূৰ্ত্ত শকুনির সনে
পাণ্ডবের সর্বনাশ, শকুনি যেমতি
তুঙ্গবৃক্ষে বসি খুজে জীবের সংহার।
হেন কালে সজ্জ যুবক দুই জন
প্রবেশিলা ধীরে ধীরে কুরুবীর যথা।
বসন্তসঙ্গমে যথা সুখে পিকরাজ
রমণীমোহন স্বর কুহু কুহু রবে
ঝঙ্কারে নিশাবসানে, তেমতি সুন্দর
মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসিলা কুরুকুলমণি
পাণ্ডবকুশলবার্তা মাদ্রী-পুত্ৰ-দ্বয়ে।
চকুলরবিচন্দ্রবংশের শ্রেষ্ঠ।
।
তুঙ্গ উচ্চ।
তৃতীয় সর্গ। ৪১ “কুশল সৰ্ব্বদা কিন্তু কুরুকুল-পতি ধৰ্ম্মাদেশে এ দাসের আগমন হেথা। ক্ষত্রিয়কুলের ধর্ম দানিলে আশ্রয় দীন-হীনে, নহে অবিদিত তব ঠাঁই নরেন্দ্র! অবন্তী-ঈশ্বর দণ্ডী মৃগয়া- কাননে পেয়েছে বাজিনী এক অপূর্ব- গামিনী, যথা ইরম্মদগতি। দেবর্ষি নারদ কহিলা বার্তা যদুকুলবীরে। মাগিল প্রসূ যদুকুলভ যাদব ; কিন্তু নাহি দিল নররায় তাই চক্রপাণি আজ্ঞা দিল ল’তে হয় বল প্রকাশিয়া। বার্তা পেয়ে নরনায় ব্রাসিত অন্তরে ঘুরিল ভুবনয় আশ্রয়কারণ ; কিন্তু নিরাশ্রয়ে কেহ না দিল আশ্রয়। অবশেষে নরবর দুঃখিত অন্তরে আইলা কালিন্দী-কূলে জীবন ত্যজিতে। জানিয়া এ সব বার্তা বলভদ্রস্বসা করিলা প্রতিজ্ঞা দণ্ডিরাজে রক্ষিবারে সমর্পিয়া নররায় বৃকোদরপাশে । জানিয়া ভারতী সব দেব যদুপতি সাজিছে করিতে রণ দেবকুল লয়ে। পরিহরি বৈরিতাব ভারতভূষণ ইম্মদ—বিদ্যুৎ। ভলভদ্রস্বসা-বলরামের ভগ্নী সুভদ্রা। মাতুল-শকুনি।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
ক্ষত্রিয়ের গৰ্ব রক্ষ এ বিপত্তিকালে
মাগেন সহায় তব পাণ্ড কুলপতি
সহ দল বল তব, সংগ্রামসাগরে ;
সুমতি ! করহ পূর্ণ মনােরথ তার।”
নীরবিলা বীরবর, কহিলা হাসিয়া
কুটবুদ্ধি মাতুল চাহিয়া সভাসদে,
ঊর্ণনাভ পড়ে যদি আপনার জালে
দানে কি আশ্রয় তারে চিরশত্রু যেবা ?
তবে কেন হে নরেশ ! এ বিপদকালে
পড়িবে সঙ্কটে চিরশগণ সনে ?
সামান্য মানব নহে যদুকুল-মণি।
উচিত তােমার এবে সেনাদল সহ
ভেটিতে রামের সনে সংগ্রামসাগরে।
শুভ যােগ পেয়ে কেন ত্যজহ নৃপতি!
হেলায়, মারহ অরি পার যে কৌশলে।”
থামিল চক্রীর চক্ৰ গম্ভীরনির্ঘোষে
প্রশংসিলা শত ভাই সাধু সাধু স্বরে।
হেন কালে সভা হ’তে সাধু এক জন
মহাক্রোধে গর্জিল কাৰ্ম্মক করে ধরি।
নির্লজ্জ পামর ! ক্ষত্রি-কুল-গ্লানি তুই
ধিশত ধিক্ তােরে। মূঢ় ! হেন যুক্তি
সাজে ততরে দুর্মতি! শৃগালের মত
কার্মুক-ধনু।
উর্ণনাভ-মাকড়শা।
তৃতীয় সর্গ ।
দিবে কি এ মত যত ক্ষত্রি-কুল-হরি
অটল সংগ্রামে যারা চন্দ্রচূড় সম।”
রে ভীরু শকুনি ক্ষত্রি-কুলের অন্তক!
কেন ধনুগুণ বাহু করিস বহন
দুৰ্ম্মতি ? ক্ষত্রিভুজ কি সৌন্দর্য্যের তরে।
ক্ষত্রিয় প্রতিজ্ঞা আছে রক্ষিতে আশ্রিতে
কর্ণে কি এ নীতিবাক্য অবিদিত আছে ?
যাবত জীবন রবে এ দেহভিতরে
ধৰ্ম্ম কি ত্যজিয়া ভীরু ! তাের অনুজ্ঞায়
পাণ্ডবের পক্ষ ত্যজি যত বীরগণে
মিলিয়া কৃষ্ণের সনে দ্বারকানগরে
প্রকাশিবে লােকমাঝে অধৰ্ম্ম আচার ?
কহিবে দেবতা নরে, সূৰ্য-কুল-রবি
কর্ণবীর যুদ্ধভয়ে লইল। শরণ
ক্ষত্রী হয়ে আশ্রিততরে না করি রক্ষণ,
নিজ দল বল লয়ে কৃষ্ণের নিকটে।
কেমনে”এ অপবাদু করিব বহন
নীচমতি কাপুরুষ নিস্তেজের মত ?
কর্ণ ভীরু হেন বাক্য কার সাধ্য কহে ?
প্রতিজ্ঞা আমার পাণ্ডবের সপক্ষতা
দেখাইব ভৃগুরাম-গুরুদেব-বল,
বৃথা যদি, বৃথা। তবে বাহুযুগ মম ।
ক্ষত্ৰিকুলচূড়ামণি রাজা দুর্যোধন
হরি--সিংহ।
চন্দ্ৰচড়-শিব।
-
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
কেমনে দেখাবে মুখ লজ্জায় সুমতি
সাজিয়া কৃষ্ণের সনে পাণ্ডবসম্মুখে।
ত্ৰিজগতের মান্য সুমতি দুৰ্য্যোধন
করেন যদ্যপি এবে মােরে আজ্ঞাদান
প্রবেশি সমরে দলি যদুদলবলে,
হরিণীমণ্ডলে যথা দলে মত্ত হরি।
বৃষকেতুপুত্ৰে দিনু কৃষ্ণেরে কাটিয়া
অযশ রাখিব শেষে, না দিয়া আশ্রয়
চকুলসূৰ্য পঞ্চ পাণ্ড,পুত্রগণে ?
বিমুখিব দেববৃন্দে, তুলিব বিমানে
পণ্ডিবের সিংহনাদ বিশ্ব বিদারিয়া।
নীরবিলা নূরশ্রেষ্ঠ ; উত্তরিলা তবে
কৌরব-কুল-শেখর দুৰ্য্যোধন রথী।
“যা কহিল সত্য বটে সূৰ্যকুল-মণি
এ উচিত কাৰ্য্য তব শােভে মহামতি ;
অনুচিত কৰ্ম্ম কভু করে না সুজনে।
এতেক আশ্বস্ত করি কৰ্ণ বীরবরে
কহিলেন কুরুবীর মাদ্রীপুত্রদ্বয়ে।
“মম দূত হয়ে পুনঃ ধৰ্ম্মের নন্দনে
বল এ বারতা বীর! সমরপ্রাঙ্গণে
উত্তরিব চম্ সহ যুবিতে আহবে।”
প্রণমিয়া বীরগণে ভাই দুই জন
বাহরিলা সভা হতে আপন নিলয়ে ।
চমূ-সৈয়।
তৃতীয় সর্গ।
হেথায় অস্থিরচিত্তে পাণ্ডুপাটেশ্বরী
বিরামমন্দিরে পশি কায় মন দিয়া
পূজিলেন দামোদরে। অমনি শ্রী হরি
অস্থির হইলা মরি রুক্মিণীর বাসে ।
টলিল দ্বারকপুরী, হায়রে যেমতি
টলমল করে জল পদ্মপর্ণ-মাঝে।
বিধিমতে বাসুদেব তুমি রুক্মিণীরে
উপস্থিত হইলেন পিতৃস্ব পাশে।
কোলে লয়ে কালো সোণা বদন চুম্বিয়া
কহিলেন কুন্তী দেবী ভাষি অনীরে।
“হাদে নীলমণি ! একি তােমার ব্যাভার ?
বিধবা তোমার পিসী তাই কি বাছনি।
হরিতে লালসা হরি! হয়েছে অন্তরে
নিরাশ্রয় বিধবার অঞ্চলের ধন ?
জেনেছি বাসনা তব, দুর্যোধন হেতু
করেছ মন্ত্রণা কৃষ্ণ! নাশিতে পাবে।
তাই কি দুৰ্বার রণ সৃজিয়া কেশব!
ছলেতে নাশিবে যত পাণ্ড,বংশধরে ?
ধর অস্ত্র ছেদ শীঘ্র আমার হৃদয়
নতুবা করহ মেরে পঞ্চরত্নদান।
পাণ্ডবসহায় কৃষ্ণ জগতে বিখ্যাত ;
কেমনে পাণ্ডবে নাশি কহ যদুমণি !
কলঙ্ক অর্পিবে তব কৃপাময় নামে ?”
পাণ্ডুপাটেশ্বরী-কুন্তী।
৫৪
উৰ্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
লজ্জিত হইয়া তবে রাধিকারমণ
কহিলা ঈষৎ হাসি কুন্তীরে উদ্দেশি।
“কে বলে নাশিব আমি পাণ্ডুপুত্র-গণে ?
স্বপ্নে কি দেখেছ মাতঃ ! হেন কুস্বপন ?
কৃষ্ণার্জুন একপ্রাণ জগতে বিদিত;
কেমনে কহ না মাতঃ! অর্ধাঙ্গ নাশিয়া
অর্ধাঙ্গ জীবিত রবে অর্ধাঙ্গ বিহনে ?
কি ভয় তােমার মাতঃ ! শুন মন দিয়া।
যেমতি প্রভাত-সূৰ্য্য পূর্বাচলে উদি
বিটপীর দীর্ঘ ছায়া খর্বাকার করি
প্রতীচী-অচলে উঠি হাসিয়া অমনি
পুনঃ দীর্ঘাকার ছায়া দেয় ছড়াইয়া,
তেমতি পাণ্ডবসাথে সমরে বুঝিয়া
বিস্তারিব যশঃখ্যাতি বিজয়সৌরভে।
নিশ্চয় পাণ্ডব হবে একচ্ছত্র পতি।
যাহ মাতঃ ! নিজগৃহে ভেবনাক আর ;
অলঙ্ঘ্য আমার বাক্য না হবে লঙ্ঘন।
এরূপে আশ্বস্ত করি পাণ্ড-মহিষীরে
অদৃশ্য হইলা শ্যাম স্বপনের মত ।
অর্ধাঙ্গ নাশিয়া ইত্যাদি—অর্জুন কৃষ্ণের অর্ধ অঙ্গ, সুতরাং
অর্জুন বিহনে শ্রীকৃষ্ণ প্রাণ ধারণ করিতে পারেন না।
চতুর্থ সর্গ।
নিমন্ত্রিতে সৰ্বদেবে যদুকুলমণি
পাঠাইলা দারুকেরে ; আইলা সকলে
যুঝিতে মানব-সনে সমর-প্রাঙ্গণে।
কৈলাসশিখরে বসি ত্র্যম্বক হাসিয়া
কহিলেন নন্দী ভূঙ্গে সাজাতে বৃষভ।
যােগাইলা সিদ্ধি গাজা জটাভদ্র বলী।
ঈষৎ হাসিয়া হর্ষে হলধর তবে
বিভাের নেশায় প্রাণ সঁপিলা অমনি।
সাজাইয়া বৃদ্ধ বৃষে বিবিধ সজ্জায়
শিঙ্গায় ফুৎকার দিয়া নন্দী মহাবল
ভূত প্রেত দানা আদি নিশাচরগণে
ইঙ্গিতিল। শিব সঙ্গে সাজিবার হেতু।
চড়িয়া বৃষভে দেব বৃষভবাহন
আইলেন মর্ত্যলােকে, হেরিয়া শঙ্করে
নাদিল যাদবসৈন্য বােম বােম্ নাদে।
হেরি হরে হরষিতচিত্তে হংস-রথে
আইলেন পদ্ম-যােনি, ঐরাবতােপর
প্রাঙ্গণ ক্ষেত্র।
এ্যম্বক-মহাদেব।
পদ্মযােনিব্ৰহ্মা।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
সহস্রাক্ষ, ভীষণ মহিষে দণ্ডপাণি,
দ্রুতগতি মৃগে দ্রুতগামী বায়ুপতি,
কার্তিকেয় শিখি-পরি অস্ত্রে বিভূষিত ;
সূৰ্য্য দিব্য রথে, অার দিকপাল যত
গন্ধর্ব কিন্নর সহ যুদ্ধক্ষেত্রে উলি
বােম্ বােম্ শব্দে সবে বিশ্ব বিদারিলা
আর আর যােধ যত যদুসৈন্য সহ
মিলিল দেবতা সনে, বাজিল অমনি
ঝম্ ঝম্ শব্দে যত স্বগীয় বাজনা।
রােধিল দেবতাসৈন্য হুহুঙ্কাররবে
ক্ষত্রিগণে, রােধে যথ। শৈলেশ্বর নদ
নদী গতি সহসা, কিংবা তীর তীরে।
পাঞ্চজন্য শঙ্খনাদ করিলা শ্রীহরি।
টঙ্কারিল রােযে ভীম ধনুঃ ; কপিল
সমরক্ষেত্ৰ বীরপদ ভরে আতঙ্কে,
পূরিল ভুবনয় ঘোর-কোলাহলে ;
সঘনে কঁপিল বিশ্ব থর থর থরে ।
সম্ভাষিয়া বীর-দলে শান্তনু-নন্দন
কহিলা গম্ভীরে, “যথা বিধিমতে, সম
রথী সনে রণ কর রথিগণ! রঙ্গে ;
শমনে কটাক্ষে কেহ কোরনা ঈক্ষণ
•
সহস্রাক্ষ-ইন্দ্র।
দণ্ডপাণি-যম।
শৈলেশ্বর-পৰ্বত। বিশ্ব—পৃথিবী।
চতুর্থ সর্গ।
তবে যদি ক্ষত্রিধর্ম দিয়া বিসর্জন
রাখ এই ঘৃণ্য প্রাণ, যাহ পলাইয়া
সিংহভয়ে শিবা যথা বিবরের মাঝে।
রণে পৃষ্ঠে অস্ত্রলেখা দেখিবে যাহার
দমিবে তাহারে শীঘ্র ঘাের প্রহরণে
দমে যথা আয়ুহীন জনে দণ্ডপাণি।
আক্রমিল দেববৃন্দে চতুরঙ্গ বলে
মানব অমর ত্রাস, হায়রে যেমতি
মদগৰ্বে মত্ত দুষ্ট দশানন বলী
আক্রমিলা দেবগণে সৌরকরতেজে।
বাধিল বিষম রণ দেবরক্ষনরে।
গঙ্গাতে আক্রমিলা দেব গঙ্গাধর
গর্জিয়া পিনাকহস্তে। গরজিল রােষে
নাগগণ, ককুদ ঝড়িল বৃদ্ধ বৃষ,
উজলিয়া দশ দিক ছুটিল অমনি
মহারাষে বিভাবসু ভীষণ গর্জনে
বিনাশিতে গঙ্গাতে, বৃথা সে বাসনা।
১ নহে কুসুমেষু বীর গঙ্গার নন্দন
কি করিতে পারে অগ্নি তাহার নিকটে ?
অস্ত্র লেখা-অন্ত্রের দাগ। প্রহরণ-অস্ত্র।
চতুরঙ্গ-সৈন্য।
পিনাক-মহাদেবের ধনুঃ ।
ককুদ-ষাঁড়ের ঝু টি। বিভাবসু-অগ্নি।
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
মন্দাকিনী মহাদেবমস্তকমণ্ডলে
হর্ষে হাসি ভীষ্মবীরে আশীর্বাদ দিল ।
উড়িল কলম্বকুল অম্বর ছায়াই,
বহিল শােণিতধারা বৰ্ম্ম চর্ম ভেদি।
অস্থির হইল ভীষ্ম ভবদেবতেজে।
যথা যবে অরিন্দম ইন্দ্রজিত রথী
হেরি উপায়, দুষ্ট দাশরথী প্রতি
হানিল সুবর্ণকোষা মহারােষভরে,
ক্রোধে ভীম শূল তুলি গঙ্গার নন্দন
হানিল বৃষভশিরে হায়রে তেমতি।
পড়িল বৃষভ হাঁটু গাড়ি, (মাতঙ্গ যথা
মাহুতপ্রহারে কপি) ফিরিলা কপদী
নাদিল কৌরবসৈন্য জয় জয় নাদে ।
আস্ফালিয়া দুৰ্য্যোধন দিব্য-রথে চড়ি
প্রবেশিকা রণমাঝে ভীষণ গর্জনে।
শুনিয়া সে মহারােল মহারেষভরে
নাদিয়া গম্ভীররবে কৌরবসম্মুখে
আইল দানব-অরি, নাদিলা অমনি
প্রমত্তকুঞ্জরবর বিশ্ব বিদারিয়া
মহাশব্দে। পশিলা রণে দম্ভোলিনিক্ষেপী
কলম্ব-বাণ।
কপদী—শিব।
কুসুমেষু-মদন। দভোলিনিক্ষেপী-ই।
।
চতুর্থ সর্গ।
রোষে। ছাইলা সায়কে নভঃস্তল বলী,
আবরিলা দশদিক, ছত্রচক্র সম
শােভিল বিমানমার্গ বাণের কিরণে।
নিমিষে নিবারি তাহা পাণ্ড-কুল-অরি
হানিলা তােমর লক্ষ-লক্ষি দেবরাজে ।
বহিল শােণিতধারা, মূচ্ছিল আদিত্য !
লম্ফ দিয়া কুরুশ্রেষ্ঠ পড়িয়া ভূতলে
হানিলা ভীষণ গদা গজরাজশিরে।
গরজিয়া গজরাজ ব্যথিত অন্তরে
পলাইল ইন্দ্র সহ, হায়রে যেমতি
ভগ্ন দন্ত শিরে করি রাবণের ভরে।
হাতে ধনুঃ ঘোর সিংহনাদে, মদগৰ্ব্বে
দুর্যোধন চড়িলা স্বরথে, লঙ্কাপতি
নাশি যথা দশরথাগজে মােহবে,
চড়িলা পুষ্পকরথে আহলাদে বিলি ।
কুমকাৰ্ম্মক করে সৈন্যভঙ্গ হেরি
আইলা বসন্তসখা শরাসন হাতে।
উন্মাদনপূর্ণ তূণ পঞ্চ পুষ্প-শরে
কৌরব সম্মখে বীর রোধিল গরজি ।
হাসিয়া কহিলা কর্ণ যাদব-অঙ্গজে
ছত্রচক্ররা। আদিত্য-ই, দানব অরি।
পাণ্ডুকুল-অরি—দুর্যোধন। সায়ক-বাণ।
কাৰ্ম্মক-ধনু। বসন্ত সখাকামদেব। কৌরব-কর্ণ।
৬
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
“কুমার! কেন হেরি কাল সমরে তােমা,
আবার কি হারাবে পুরাণ? যাও রতি-
পাশে, পশহ মলয়ানিলে প্রেমানন্দে।
সমরসাজ সাজে কি তােমার নির্বোধ ?
সম্মোহন শরে তব কি করিবে বল,
অভেদ্য কবচ যার নাহি ভেদে শূলে ?
বৃথা আশা কুসুমেষু জিনিতে আমারে ;
যাও নারীপাশে কোমল কমল সম ;
হান শর অবলা- হৃদয়ে; মুগ্ধ যারা
সম্মোহনশরে, হায় নাথের বিহনে
ব্যথিত হৃদয়ে সাধে হেন হীনজনে।
শৰ্ব্বর! সংবরি রণ শৰ্বরীসদনে
যাও ত্বরা, কেন প্রাণ হারাবে আবার?
হায় যবে কামকল বিহবলা কাদিয়া
মাগিবে পরাণ তব, কেমনে হে আমি
বিমুখিব চারুনেত্রে দাতা কর্ণ হয়ে ?
হায়রে কেমনে কালী দিব হেন নামে ?
এতেক কহিয়া বীর ধনুঃ টঙ্কারিলা ॥
গর্জিয়া পিনাকি-অরি বসাইল চাপে
তীক্ষ্ণতম শর, আহা! ঝলমিল আঁখি,
ধুমকেতু সম বণ শােভিল গগনে।
শৰ্বর-কামদেব। শর্বরীতি।
পিনাকি-অরি-কামদেব।
চতুর্থ সর্গ।
নিমিষে কলম্ব কর্ণ কার্টি মুহুর্মুহু
আচ্ছাদিলা রবির চোক চেক শরে।
fণ ব্যর্থ দেখি তবে যাদব-অঙ্গজ
অর্ধচন্দ্র বাণ বীর সূর্যের নন্দনে
হানিলা বিষম রোষে, পড়িল অমনি
মূচ্ছিত হইয়া রথে অঙ্গ-অধিপতি।
ঘেরিল কৌরব-সৈন্য রক্ষিতে কর্ণেরে।
কতক্ষণে চেতন পাইয়া মহারাষে
গর্জিয়া ভাস্কর-সুত বসাইল চাপে
অগ্নিশিখাসম শর, ভীম সিংহনাদে
কাটিলা শিবারি, মরি রম্ভতি যথা
শাণিত কৃপাণে কাটে নিমিষভিতরে।
সবিস্ময়ে কর্ণ বীর বাখানিলা বীরে।
স্মরি ভৃগুরামে বীর হানিলা সরোষে
মহাশেল, ভীম রবে উঠিল গর্জিয়া
উজলি-দামিনীরূপে অম্বর-প্রদেশে।
পড়িল কাম মুচ্ছিত হইয়া বিমানে।
•নিবৰ্ত্তিলা কর্ণ বীর হেরি মূৰ্ছা রথী।
উঠিল চৌদিকে আর্তনাদ হাহাকার।
তরাসে সারথি রথ ফিরাইল বেগে ॥
অঙ্গ-অধিপতি-কর্ণ।
শিবারি-মদন।
চাপ-ধনুঃ
উৰ্ব্বশীর শাপবিমোচন কাব্য।
;
রোক্মীণেয় ভঙ্গ দেখি গভীর গরজি
প্রবেশিলা দণ্ডধর সংগ্রামসাগরে ;
পলাইল সৰ্ব্ব সৈন্য শমনে নেহারি।
অস্থির হইল কর্ণ দণ্ডধররণে
শুখাইল মুখচন্দ্র ; দর দর দরে
বরিতে লাগিল স্বেদ স্বর্ণকান্তি হতে।
হেরিয়া কর্ণের কষ্ট কোপে বীরমণি
দ্রোণাত্মজ অশ্বত্থামা প্রবেশিয়া রণে
করিলা অদ্ভুত যুদ্ধ শমনের সাথে।
যার নামে সুরাসুর সদা কম্পমান,
কেমনে তাহার সনে যুবিাবে আচাৰ্য ?
মুহুর্মুহুঃ শরজাল গভীর গর্জন
নারিলা সহিতে দ্রোণী। পলাইল ব্রাসে
সৈন্যবৃন্দ, (তুলা যথা প্রভঞ্জনবলে)।
হেরিয়া পাণ্ডবত্রাস দয়াময় হরি
হরিলা কৃতান্ততেজঃ মায়া প্রকাশিয়া।
দ্রোণাত্মজভঙ্গ হেরি দ্রুপদ-অঙ্গজ
টঙ্কারি শিঞ্জিনী মহা আস্ফালন করি
প্রবেশিয়া মহাক্রোধে সমরতরঙ্গে,
তীক্ষ্ণতম শরে শূর বিঁধিলা সুরেশে
অম্বর-আকাশ।
ভদ্রাণী-অশ্বখামা।
কৃতান্ত-যম।
দ্রুপদ-অঙ্গজ-খৃষ্টদ্যুম্ন।
বিমানবথ।
দামিনী-বিদ্যুৎ।
শিঞ্জিনী-ধনুঃ।
. চতুর্থ সর্গ।
মুহূর্তে। বিষমাঘাতে ব্যথিত হৃদয়ে
পলাইলা ধৰ্ম্মরাজ সেনাদল সহ ।
হেথায় ধর্মের পুত্র রাজা যুধিষ্ঠির
অস্থির হইয়া রণে মুচ্ছিত হইল।
চতুর্মুখতীক্ষশরে ; পাছু করি তরে
আইলা হিড়িম্বাত ব্ৰহ্মার সদনে।
রাক্ষসী মায়ায় মরি মােহন শরেতে
বিরামিলা পদ্মযোনি রথের উপরি
উড়িল মরাল শূন্যে স্যন্দন লইয়া,
নিবৰ্ত্তিল ঘটোৎকচ সিংহনাদ ছাড়ি।
সে আরব লঙ্কানাথ শুনিয়া শ্রবণে
রুযিয়া আইলা রণে বিভীষণ রথী।
হেরি বিভীষণক্ষে সম্মুখসংগ্রামে
হাসিয়া কহিলা বীর ঘটোৎকচ বলী ।
“লঙ্কানাথ। রাজ্য-ভোগ ত্যজি কি কারণে
আইলে সমরে মূঢ় ! বীরকুলমাবো ?
সত্য বটে হেরিয়াছ সমরতরঙ্গ
দুৰ্বল বালক যথা নৃপরঙ্গভূমে
নেহারে মল্লের যুদ্ধ সতৃষ্ণ নয়নে ;
কভু কি স্বহস্তে অস্ত্র ধরেছ দুৰ্ম্মতি ?
আত্মঘাতী পাপাচারী না শাস্তিয়া তােরে
ফিরিব না গৃহে আমি এ প্রতিজ্ঞা মম।
হিড়িম্বাত—ঘটোৎকচ।
৩৪
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
অধাৰ্ম্মিক দুষ্টমতি কে আছে ভুবনে
তাের সম ? তুচ্ছ রূজ্যলােভে বিনাশিলি
বংশ দুষ্ট! ধ্বংসিলি ছলেতে ভ্রাতুস্পুত্র
মেঘনাদ অজেয় জগতে রক্ষরত্ন।
কৰ্বরকুলের গৰ্ব ! হরিলি অকালে
রক্ষঃকুলগ্নানি তুই; নাশিয়া তােমারে
লঙ্কার কলঙ্ক আমি মুছিব শোণিতে।
মৃত্যুকালে স্মর দুষ্ট! রাণী মন্দোদরী
যার তরে রে দুর্মতি ! ত্যজি লজ্জায়
নাশিলি অরুবংশ মিলি রাম সনে।”
এতেক কহিয়া বলী গর্জি নিক্ষেপিলা
ভীম গদা, অনম্বর অাঁধারি ধাইল।
নিবারিলা রক্ষরাজ চেক চোক শরে।
শেল ব্যর্থ হেরি তবে ভীমের নন্দন
ঘটোৎকচ, মহাক্রোধে মেঘবাণ লয়ে
হানিলা লক্ষিয়া রক্ষে ; কঁপিল বসুধা,
গন্জিল জলধি, জীমূত গর্জি ধাইল।
চৌদিকে, চমকিল ক্ষণ-প্রভা, নাদিল
দম্ভোলি কড়ে কড়ে, বর্ষিল শিলা তর
তর তরে মরি প্রলয়ে যেমতি সদা,
4
কৰ্ব্বর-রাক্ষস।
অর-রাক্ষস।
জীমূত-মেঘ।
কৰ্বর কুলের গৰ্ব্ব-ইন্দ্রজিৎ
অনম্বর—আকাশ।
ক্ষণপ্রভা-বিদ্যুৎ।
চতুর্থ সর্গ।
বারিদ স্বনিল স্বনম্বনে ; লুকাইল
দিনমণি কাদম্বিনী-আড়ে, হেরি ঘন
ঘটাচ্ছন্ন করে যেমতি মৃগরাজ।
সভয়ে বায়ব্য অস্ত্র ধরি রক্ষ রথী
হানিল নির্ঘোষে মেন উড়াইতে বলে।
হুহুঙ্কারে বায়ুকুল বাহিরিল বেগে,
পাহাড় পর্বত বৃক্ষ মড় মড় গড়ে
পড়িল উপাড়ি। পলাইল কাল মেঘ
মৃগপাল যথা হেরি কেশরিবিক্রমে।
বাণ ব্যর্থ দেখি তবে বৃকোদরস্তুত
সহসা বরণমূর্তি ধরি বিভীষণে
আমিল মদগৰ্বে ; কেশরিরূপেতে
নিবারিল রক্ষরাজ বিলোমজিহ্বরে।
এইরূপ মায়াযুদ্ধ করি ঘটোৎকচ
মায়াপূর্ণ মহাবীর রাবণির মত
জুলাইলা বিভীষণে মহামায়ারণে।
অসহ্ন হইল রণে, পলাইল রক্ষ
দেখি বিভীষিকা মূৰ্ত্তি ভয়ঙ্কর রণ।
'সিহরিয়া দেবসৈন্য রণে ভঙ্গ দিয়া
পলাইলা বিনা যুদ্ধে, কুরঙ্গ যেমতি
বারিদ-বৃষ্টি। কাদম্বিনী-মেঘ
বিজেমিজিয়-হস্তী।
রাবণিরাবণের পুত্র মহীরাবণ।
কুরঙ্গ-হরিণ।
উর্বশীর শাপবিমােন কাব্য।
যূথমধ্যে মহাবল হৰ্যক্ষ হেরিয়া
কিংবা পানিরে হেরি লঙ্কাবাসী যথা।
ধরিয়া দুর্জয় শক্তি স্কন্দ তারকারি
বিঁধিল হিড়িম্বাসুতে, হায়রে যেমতি
দশরথাগজ পূর বিঙ্কিল তাড়কা।
অশক্ত হইয়া তবে পাবনি-আত্মজ
ভঙ্গ দিয়া রণরঙ্গে পলাইলা ত্রাসে।
সৈন্যভঙ্গ হেরি তবে পার্থের সারথি
চালাইল মায়ারথ প্রভঞ্জনবেগে
যথায় স্বসৈন্যমাঝে শৈলসুতাসুত
নাশিতেছে বীরগণে, কেশরী যেমতি
অনায়াসে নাশে সুখে মেষশিশুগণে ॥
কনকাকরীট শিরে করে ভীমপনুঃ
প্রবেশিলা মহাক্রোধে কিরীটী সংগ্রামে
(শােভিলা দ্বিতীয় ইন্দ্র সমর প্রাঙ্গণে)।
কহিলা হাসিয়া বীরশ্রেষ্ঠ কার্তিকেয়।
“কি কারণে শচীকান্ত! দেবদল ত্যজি
রক্ষিতে আইলে মরি দুষ্ট ক্ষত্রিগণে?
হৰ্যক্ষ-সিংহ।
পাবনি-হনুমান।
পাবনি-আত্মজ—ভীমের পুত্র ঘটোৎকচ।
কিরিটী—অর্জুন।
কি কারণে শচীকান্ত ইত্যাদি—এস্থলে অর্জুনকে ইন্দ্রমে
কার্ত্তিকেয় কহিতেছেন।
চতুর্থ সর্গ।
কৃষ্ণের অনুজ্ঞ। কি হে ভুলিলা আদিত্য ?
নদনুর রব শুনি নদনু যেমতি
গভীর গরজেরােষে, হায়রে তেমতি
নাদি মহাক, পার্থ অম্বুরবসম
কহিলা ৫ নহি শচীপতি অমি দেখরে
নয়নে, কৃতান্ত আমিরে তাের, ধর্মের
অনুজ বীর পাণ্ডুর আত্মজ অর্জুন,
যার ভুজবলে তুষ্ট ধূর্জটি জটিল।
লজ্জিত হইয়া মনে ভবানীনন্দন
আক্রমিলা শূরশ্রেষ্ঠে, হৰ্যক্ষ যেমতি
আরক্তিমচক্ষে রােষে ধরে করেণুরে।
উথলিল চারিদিকে সমরতরঙ্গ
মহারোলে, সিন্ধু যথা কুনাভি সহিতে।
চলিল পুষ্পকবেগে নন্দিঘোষখানি
বৰ্ঘরিল রথচক্র গম্ভীরনির্ঘোষে ;
ধাইল পাণ্ডবচক্ষু হেরিয়া বীরেশে।
বাঁধিল তুমুল রণ দেব রক্ষ নরে
অনম্বর আঁধারি ধাইল বাণকুল ;
মুহুর্মুহুঃ শরজাল কাটিলা উভয়ে।
অমুরবসাগরগর্জন।
করেণু-হস্তী।
নদনু-মেঘগর্জন।
নদ—সিংহ। কুনাভি—ঘূর্ণিবায়ু।
নন্দিঘােষ-অর্জুনের রথ। চ-সৈন্য।
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
রুমিয়া দানব-অরি পূরিলা সন্ধান
ভীষণ রিপু-নাশক বায়ু-অস্ত্র লয়ে।
উড়াইল প্রভঞ্জনবলে সৈন্যরাশি
তূলা যেন ; নিবারিল আকাশ-বাণেতে
কুন্তীসুত ; ভুশুণ্ডী কোমর জাঠা শক্তি
শূল শেল হানিল উভয়ে অবিরাম ;
কাটিলা দুজনে শরজাল দুজনার।
ধনুকে টঙ্কার দিয়া তুলি কাল শর
হারিলা শক্তিধর ধনঞ্জয়বীরে ;
উজলি অম্বরদেশ বজসম বেগে
পড়িল পার্থের বুকে, পড়িল অমনি
অচেতন হয়ে পার্থ রথের উপরি ।
নাদিল দেবতাসৈন্য জয় জয় নাদে
নাদিল দানবজেতা হুহুঙ্কাররবে।
পিতার দুর্দশা হেরি অভিমন্যু রথী
সিংহনাদে শূরসিংহ প্রবেশিলা রণে।
মহাক্রোধে পার্থাত্মজ চোক চোক শর
সন্ধানিয়া প্রহরিলা শিখিধ্বজবুকে।
বরিষার কালে যথা বর্ষে মেঘরাশি
দানব-অরি--কার্ত্তিকেয়। প্রভঞ্জন-বায়ু
শক্তিধর-কার্তিক।
পার্থাত্মজ-পার্থের পুত্র অভিমনু।
শিখিবজ-কার্তিক ।
চতুর্থ সর্গ।
আঁধারি ভুবনয় মুসলধারায়,
হায়রে তেমতি শরজালে সৌদ্রেয়
বিঁধিল সুরেশে, বহিল শোণিতধারা
নিঝরিণীরূপে। অশক্ত হইলা বীর ;
পড়িল খসিয়া শরাসন তীক্ষ্ণ বাণ;
উড়িল মার্জারকণ্ঠ অমনি আকাশে,
গরজিল পাণ্ডুসৈন্য ঘোর কোলাহলে ॥
রণবঙ্গে ভঙ্গ দেখি রেবতীরমণ
হলধর, ধাইল লাঙ্গলকরে বেগে।
ধরি ভীমগদা রােষে গর্জি ভীমনাদে
রােহিণীনন্দন শূরে পবন-আত্মজ
রােধিলা সহসা ; মণ্ডলী করিয়া দেহে
ফিরিলা অমনি চক্রাকারে ; কেহ কারে
নারিলা জিনিতে। ত্যজি গদা, অসি বৰ্ম্ম
চৰ্ম্ম লয়ে ধাইলা দুজনে ; মল্লযুদ্ধ
হইল অদ্ভুত সুন্দ উপসুন্দ যথা।
মূৰ্ছিত হইলা ভীম বলভদ্রবলে।
মহারোষে হলধর ধরিলেন কষি
আঁকড়িয়া বৃকোদরে, অমনি হরিলা
;
সৌভদ্ৰেয়—অভিমন্যু। মার্জারকণ্ঠ-ময়ূর
হলধর, রােহিণী নন্দন-বলরাম।
সুন্দ উপন্দ-দৈত্যদয়।
উৰ্ব্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
হরি তেজঃ ; নারিলা তুলিতে ভীমবীরে,
লাজে অভিমানে বীর ফিরিলা তখনি ।
কত যে হইল রণ না পারি বর্ণিত
তব বর-সুধ। বিনা ওমা শ্বেতাঙ্গিনি।
অজ্ঞ দাসে হে বরদে! দেহ গাে ভরশা।
শল্য শাল্য কৃপাচার্য পাঞ্চাল বিরাটী
শিশুপাল দন্তবক্র নৃপতি মণ্ডলে
কত যে করিলা রণ না পারি বর্ণিতে।
গর্জিয়া বিপুল ধনুঃ টঙ্কারিয়া পাশী
রােধিলা শ্রবণপথ, হায়রে যেমতি
ভৃগুরাম ধনুগুণ টঙ্কারিয়া রোষে
দাশরথি দিব্য-বাণ বইলা চাপে।
আইল ধাইয়া নদ নদী তড়াগাদি
উথলি হাঁপলি যথা প্রলয়ের কালে।
তীরবেগে ধায় নীর প্রচণ্ড তরঙ্গে
স্থাবর জঙ্গম গিরিমূল উপাড়িয়া
তরল তরঙ্গে মরি ভাষিল সংসার।
প্রলয় দেখিয়। তবে বিস্ময় মানিয়া
দ্রোণাচাৰ্য-ণ ত্যজি ব্যস্তে শীঘ্রগতি
অগ্ৰসরি গদাধর কহিলা গম্ভীরে।
শ্বেতাঙ্গিনী-সরস্বতী। পাশী-বরুণ।
ভৃগু-পরশুরাম। দাশরথি-রামচন্দ্র। চাপধঃ।
তীর-বাণ। অম্বুপতি-বরুণ। জীবন-জল।
চতুর্থ সর্গ।
* কি করহে অম্বু
পতি! নিবৰ্ত্তহ রণে,
কেনহে প্রলয় দেখি সংহারিতে সৃষ্টি ?
মরিল দেখ নয়ন উন্মীলি দেবতা
মানব রক্ষ পাণ্ডু-দল সহ জীবনে।
নিবৰ্ত্তিলা বারিপতি, পশিল তখনি
অতল পাতালপুরে তরঙ্গিণী যত।
আইল ধাইয়া দেব নর রক্ষ যক্ষ
অস্থির করিয়া রণে কুরু-পাণ্ডুদলে।
স্মরিল বিপত্তে মরি
কুরুকুল-অরি
পাণ্ডবকুলভরশা রুক্মিণীরমণে।
সেচিন্তায় চিন্তামনি চঞ্চল হইল।
বিরূপাক্ষ শূলী যথা নৈকষেয়ধ্যানে।
দানিলা আজ্ঞা হাসিয়া শ্রীপতি পক্ষীন্দ্রে।
যাও বীরবর! হর তেজঃ দেবতার।”
নমিয়া বীর বিমানে উড়িল গরুড়
হরিল দেবতাতেজঃ হরির আদেশে,
শুম্ভ নিশুম্ভের বীৰ্য্য কপদী যেমতি
হরিলা হরষে আসি হরজায়াদেশে।
নিস্তেজ হইয়া রণে দেবতানিচয়
জলেশ্বরে রাখি রণে পলাইলা ত্রাসে ।
বিরূপাক্ষ-মহাদেব, এস্থলে শূলীর বিশেষণ।
নৈকষেয়-নিকষানন রাবণ।
বিমান-শুন্য।
কপদী-মহাদেব।
৭২
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
দমিয়া কার্তিকবীরে অভিমন্যু রথী
চালাইলা রথ (আহা ক্ষণপ্রভা যেন )
যথায় নাশিছে সৈন্য সৰ্বভুকরূপী
সুবৰ্ণ-স্যন্দনমাঝে জলধি-ঈশ্বর।
রিপুকুল-কাল বলী পাণ্ডজ-আত্মজ
রণপ্রিয় বীরমদে প্রমত্ত সতত
অতি পরিপক্ক রণে, খেদাইল দূরে
বাণে বাণে শূরসিংহ দেবতানিচয়ে।
ধরিয়া দুৰ্জ্জয় জাঠ। বিষম বিক্রমে
হানিলা শূরেশিরে কঁাপিলা জলেশ
থর থর থরে, মরি রম্ভাতরু যথা
কাপে ঘনে ঘন বারণের শুণ্ড ঘিাতে।
বধির হইল কর্ণ জাঠার আরবে।
প্রবল পবন যথা প্রমত্ত হইয়া
করে সিন্ধু বিলোড়ন, তেমতি পার্থজ
বিশৃঙ্খিল। দেবসৈন্য দুর্জয় সংগ্রামে ।
লাজে ক্রোধে অভিমানে আইল ধাইয়া
ফেনাশনি হস্তে ফেনবাহী ঐরাবতে,
সৰ্বভুকৃ—অগ্নি।
পাণ্ডুজ-আত্মজ—পাণ্ডুর পুত্ৰ অৰ্জ্জুন, তাহার তনয় অভিমনু।
জলেশ-বরুণ। বারণহস্তী। আরব-শব্দ।
ফেনাশনি-বজ। ফেনবাহ-ই।
চতুর্থ সর্গ।
৭৩
হংসরথে আরােহী আইলা কমণ্ডলু
করে ব্রহ্মা, যম দণ্ড করে, অম্বুপতি
পাশ হস্তে, চঞ্জ কৃষ্ণ, শক্তি শক্তিধর,
নিজ নিজ অস্ত্র ধরে তার দেব যত ।
হেথায় ভীষ্মের শরে অধীর হইল।
পার্বতীর প্রাণধন শম্ভ, শূলপাণি ;
লড়ল মস্তকে জটা, ভৈরবগর্জনে
গর্জিল ভুজঙ্গগণ, জ্বলিল ললাটে
বিভাবসু ধক ধকে, উচ্ছাসিল গঙ্গা
বায়ুবেগে স্রোতস্বতী উচ্ছাসে যেমতি।
কুঁপিল আতঙ্কে বিশ্ব ; নাশিতে ভীষ্মেরে
বিষম ত্রিশূল শূলী তুলি নিল হাতে।
বজ্রাগ্নিসদৃশ অগ্নি ছুটিল চৌদিকে।
;
মহানন্দে দেববৃন্দ উল্লাসে নাদিল
নাদিল ভীষণরোষে উত্তরা-বল্লভ
সুভদ্রার প্রাণ-ধন পাকুলােত্তম।
.হেরি নিজ নিজ অস্ত্র দেবগণহাতে
চিন্তিত হইলা বলী, অন্তরে জানিয়া
স্বপনের মত শ্যাম আসিয়া অমনি
সংসারনাশক বাণ দিলা আর্জুনিরে ।
বিভাবসু-অগ্নি। স্রোতস্বতী-নদী।
আর্জুনি-অভিমন্যু।
৭৪
উৰ্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
আনন্দে সে কাল শর তুলি লয়ে হাতে
ধনুকে টঙ্কার দিলা বিষম আক্রোশে,
সভয়ে কাঁপিল বিশ্ব ঘাের কোলাহলে ;
থর থর থরে কপিল কৈলাসগিরি।
।
অজীন-আসনে যথা বসেন পার্বতী
পশুপতিপ্রিয়তমা, পশিল সে স্থলে
আরব, চমকি সতী পুছিল। জয়ারে।
“কেন লাে স্বজনি! কাঁপিছে বসুধা ঘন
ঘাের ভূকম্পনে যথা, বাণপুঞ্জ কেন
ঘূরিতেছে নভস্তলে ঘনাবলীরূপে
ভীষণ গৰ্জন করি ? শুন কাণ দিয়া
যুদ্ধের কল্লোল যথা কালিন্দীকল্লোল।
হাসিয়া কহিল সখী, “ও রাঙ্গাচরণে
অবিদিত আছে কিবা এ মহীমণ্ডলে ;
দণ্ডী হেতু পাণ্ড সহ যুঝিতে মুরারি
সাজিল ত্রিদিব সহ হারিলা ত্রিদিবে।
ধরেছে বিজয়-অস্ত্ৰ অভিমন্যু রথী
জিনিতে দেবকুল, তাই গাে ভবানি!
উজলিছে দশ দিক বাণের কিরণে ;
সঘনে কঁপিছে মহী প্রলয়ে যেমতি ॥”
অজীন-মৃগচর্ম।
বসুধা-পৃথিবী। নভস্তল-আকাশ।
ঘনাবলী-মেঘ।
মুরারি--শ্ৰীকৃষ্ণ।
।
চতুর্থ সর্গ।
হাসি উত্তরিল। শরদিন্দু-নিভখী
সারদা সুন্দরী, “চললো স্বজনি। মােরা
শূন্য দেশে থাকি হেরিগে সমররঙ্গ।”
সাজিয়া সুসাজে, মেঘদলে লুকাইয়া
বিরাজিলা বিভুপ্রিয়া সুন্দর গগনে;
সহসা পূরিল বিশ্ব স্বর্গীয় সৌরভে।
হেরি সপ্ত-বজুগণে খেদান্বিতমনে
আকাশের পানে চাহি উৰ্বশী-রূপসী
আরাধিলা জগদম্বে কৃতাঞ্জলিপুটে।
তব পদাজে মাতঃ! কি দোষে উর্বশী
হয়েছে এত দোষিণী, চাহ কৃপাদৃষ্টে
অম্বিকে! ভুলনা দেবি! দীনা দুঃখিনীরে।
চায় গাে আশ্রয় আজি তােমার চরণে
চিরাশ্রিতা দাসী তব, ঠেলনা মা পায়।
কত যে পেতেছি দুঃখ অবিদিত নহে
ও রাঙ্গাচরণে মাতঃ! বিশ্বরূপা তুমি।
আর কত দুঃখ দেবি! দিবে দুঃখিনীরে ?
দয়াময়ী দনুজ-দলনী দুঃখ-হরা ;
তর নিজ তত্ত্ব-গুণে, তত্ত্বময়ী তুমি
তারা ত্রিগুণ-ধারিণী। ভক্তের ভরশা
ভীমা ভক্তের বৈভব, তেঁই গাে ভ্রামরি ।
শরদিন্দুনিভনখী-শরতের চন্দ্রের ন্যায় নখ যার।
•••-r...র্গ। ভাবী-দুর্গা।
ভাবী-দুর্গা। ভীমা-দুর্গা।
উর্বশীর শাপবিমোচন কাব্য।
স্মরি এ বিপত্তিকালে। কত কাল কহ,
তুরগিণীরূপে, ঘূরিব এ বিশ্বমাঝে
কালি ! কুলকুণ্ডলিনি! কলুষনাশিনী
হয়ে কৈবল্যদায়িনী, কলুষ নাশিতে
কেন কৃপণ হইলা কল-কণ্ঠে ! চিন্তা-
স্রোতে চিন্তাময়ি ! চিন্তি মা তােমারে সদ।
চতুভুজা চিরঞ্জীব-চিত্ত-চকোরিণী।
পশুপতি পদপদ্ম পূজিয়া পাৰ্বতি !
বনজ ধুম্ভরপুষ্পে তুষিলা তােমারে ;
কিন্তু হায়! বাম বিধি মোর প্রতি সদ।।
পূজি রাঙ্গা পা দুখানি মনঃপুষ্প দিয়া
বাম দেবি অহর্নিশি; উদ্ধারি’ দাসীরে
রাখ গাে মাহাত্ম্য মাতঃ! কৃপাময়ীনামে।
এতেক কহিয়া ধনী কঁাদি নিরবিলা।
শুনিয়া সে অরাধনা নগেন্দ্ৰনন্দিনী
হাসিয়া তথাস্তু বলি আশিষিলা সতী ।
;
হেরি দেব হতবল সারদা সুন্দরী
উলিলেন রণক্ষেত্রে ; সহসা তখনি
বজনদে মহাশক্তি গর্জিতে লাগিল,
উজলি অম্বরদেশ, সৌদামিনী যথা
ঘনাবলীমাঝে জ্বলে উগ্রচণ্ডরূপে।
কপিল সভয়ে দেব নর রথি-বৃন্দ
থরে থরে, কাপে যথা ভূধরমণ্ডল
চতুর্থ সর্গ।
৭৭
ভীষণ-অশনি-ঘাতে ঘের মড় মড়ে ।
কহিলেন সুরেশ্বরী “সদাগতি বলে
উপাড়িয়া ফেলে সত্য পৰ্বত পাথর,
পরশে কি কভু সেই শৈবালের দলে ?
ছি ছি হে ত্রিদিবনা ! ত্রিদিব সহিত
ধরেছ সংহার-অস্ত্র বধিতে মানবে?
নারিলে ছেদিতে বলে তুচ্ছ তৃণরাজি
শাণিত কৃপাণ দিয়া ধন্য শূরগণে।
লজ্জিত হইয়া যত দেবতানিচয়
সারিলা সংহার-অস্ত্র যে যার আপন
বিরূপাক্ষ-বক্ষোবাসী বামারে হেরিয়া।
হেরি অষ্টবজগণে দণ্ডিতুরঙ্গিণী
সহসা উর্বশীরূপে শাপবিমোচনে
প্রণমিলা যদুবীরে স্তব স্তুতি করি।
দুর্বাসার শাপ অন্ত জানিয়া শ্রীহরি
নিবারিলা দেব-নরে সংগ্রাম হইতে।
বিধিমত দেব রক্ষ যক্ষ নর গণে
তুষিয়া বিদায় দিলা অখিলের পতি।
আশ্চৰ্য হেরিয়া তবে রুক্মিণীনন্দন
কৌতুকে কুসুমশর তুলি লয়ে হাতে
হানিলা দেবতাগণে ; সম্মােহনশরে
উন্মত্ত হইলা যত দেবতানিচয় ।
সদাগতি-পবন। কৃপাণ—অস্ত্র, অসি।
৭৮
উর্বশীর শাপবিমােচন কাব্য।
অস্থির হইয়া শূলী বিবস্ত্র হইয়া
ছুটিলা উর্বশীপিছে পাগলের মত।
হেরি ত্র্যম্বকের ভাব হাসি হাত ধরি
শক্তিপ্রদায়িনী মাতা দেবী শাকস্তুরী
সানিয়া লয়ে গেলা.প্রমোদকাননে।
অধীর হইয়া শশাকে দণ্ডী নরপতি
পড়িলা কৃষ্ণের পায় শরণ মাগিতে।
হাসি দামােদর দানিলা অভয় স্নেহে
অবন্তী-ঈশ্বরে ; হইল বিবাদশান্তি,
ঘুচিল বিভ্রাট, সবে গেল নিজগৃহে।
;
লয়ে পঞ্চপাণ্ডবেরে কুন্তির মন্দিরে
প্রবেশিয়া ধীরে ধীরে পাণ্ডবভরশ
কহিলা “লহগাে পাণ্ডবমতঃ ! তােমার
রতন, নিরাপদে তব পদে অপিছে
শ্রীপতি ; আশিষ দেবি! যাই নিকেতনে।”
বিধিমতে তুষি তবে দ্রুপদবালারে,
মাগিয়া মেলানি হরি গােপবালাপুরে
প্রবেশিলা ধীরে ধীরে আনন্দিতমনে।
হুলুস্বরে সখীগণ করিয়া মঙ্গল
পশিল। আনন্দমনে বিরামমন্দিরে।
ইতি যদুপাণ্ডবীয়-যুদ্ধ-নামা সর্গ সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.