Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Phool
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ফুল। শ্রীরাজেন্দ্রলাল ঘােষাল- প্রণীত। ‘শ্মশানেও ফোটে ফুল সুগন্ধি সুন্দর, কোকিলও কাল পাখী গায় মনােহর। কলিকাতা, বহুবাজার, শ্রীনাথ দাসের লেন, ১৭ নং ভবনে, বি, কে, দাস এবং কোম্পানির যন্ত্রে, শ্রী অমৃতলাল ঘোেষ দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত। .. ১৩১২
No text on this page.
উৎসর্গ। সন্তাপ ! চির সহচর ! তুমিই আমার হৃদয়ের একমাত্র অবলম্বন ; প্রীতি অঙ্কর নীরস করিয়াছ, ভাব মুকুল বিশুদ্ধ করিয়াছ। এ নীরস তরুর শুষ্ক ‘ফুল’ কে লইবে ?—তুমিই লও। সন্তাপ, তুমি আমার শৈশবের সরল হৃদয়ে কতই ব্যথা দিয়াছ, কৈশােরের উজ্জ্বল হৃদয়কে ঘাের অন্ধকারময় করিয়াছ, যৌবনের কোমল হৃদয়কে পাষাণ অপেক্ষাও কঠিন করিয়াছ ; বার্ধক্যের হতাশ হৃদয়কে কিরূপ করিবে—তুমিই বলিতে পার। সন্তাপ, তুমি চিরসুখী ব্যক্তিকে অকূল দুঃখ- সাগরে ভাসাইতে পার, জনস্থানকে ভীষণ শ্মশান করিতে পার, প্রণয়ীকে বিরহানলে দগ্ধ করিতে • পার ; আমার কৈশাের-হৃদয়ােদ্যানে প্রস্ফুটিত এই ‘ফুল’ট লইয়া কোন নীরস প্রাণে বাসন্তিক ভাবের সমাবেশ করিতে পারি কিনা, দেখিও।
No text on this page.
ফুল।
প্রাণের কথা।
হায় সখি ।
প্রাণে যত ভালবাসা সমুদায় দিয়ে
গড়িনু প্রাণের প্রাণ চিরদিন ধরি,
পুষিলাম ভালবাসা সেবায় সেৰিয়ে,
সাজালাম ভালবাসা মাখিয়ে যাহায়
হায় সধি এতদিনে
অভাগী কেমনে বল ভুলিবে তাহায় ?
ফুল।
যে চারু কুসুমে সখি মাথায় ধরিয়া,
আমােদিত ছিনু সদা সৌরভে যাহার,
হৃদয়ে রেখেছি যায় শতেক চুমিয়া,
পিরীতি গলিত প্রাণে পাষাণে গড়িয়া
বল সখি বল বল
কেমনে পাষাণ হয়ে রহিব ভুলিয়া ?
যে চাঁদে অমিয় পানে চকোরীর মত
অনুরাগে এ অভাগী উৰ্দ্ধমুখী সদা,
যাহার বিরহে হায় কাতরা সতত,
চিরদিন যার তরে কাদে মন প্রাণ *,
হায় সখি একবারে
কেমনে সে ভুলে রবে সে বিধু-বয়ান ?
হায় সখি,
হৃদয়-সরসী মাঝে খেলে যে মরালে
কমল কোরক লয়ে প্রেমনীরে ভাসি,
গলায় তুলিয়া লয় এ ভুজ-মৃণালে,
নিত নব প্রেম খেলা খেলে যেই হায়
বল সখি কোন প্রাণে
কেম েমরালরাজে দিবলাে বিদায় ?
ফুল।
সখিরে।
যে ফুল্ল কুসুম-হৃদে মধুকরী মত
হাসিতে মিলিয়ে হাসি বসি দিবারাতি
করেছি লাে মন ভোরে মধুপান কত,
হৃদয়ে দারুণ ব্যথা না যাইতে তার
বল সখি পারি কিলাে
সহিতে, দেখিয়া তার দুখে মুখ ভার ?
প্রফুল্ল সরেজি-হৃদে যেই মধুকরে
প্রেম-বিগলিত-দেহে করিতে বিহার
মধুপানে বসে সদা হসিত অধরে,
অভিমানে কতদিন যে ধরেছে পায়
আজ বল কোন প্রাণে
ফেলিব দারুণ বাজ তাহার মাথায় ?
কোন দিন মধুকর যদি মধুপানে
আসিয়া বিমুখ হয়ে ফিরাত বদন
চুম্বদানে ঘুচাতাম ঘাের অভিমানে,
বসাতাম পাতি দিয়া হৃদয় আসনে, ,
বল সখি বল দেখি
আজিলাে সেদিন বল ভুলিব কেমনে?
৪
ছিল যবে সে আমার বিজনে শয়নে,
বিষম ঘুমের ঘােরে অচেতন হয়ে,
ধীরি ধীরি বসেছিনু চুমিয়া বদনে,
আঁখি মেলি গলে ধরি দিলে শোধ তার
বল সখি এ জনমে
কেমনে ভুলিব তারে বলিতে ‘আমার?
ললাটের স্বেদবিন্দু বস্ত্রাঞ্চল দিয়ে
মুছাইনু কত যত্নে গলদেশ ধরি,
তােষিনু যাহার মন বদন চুমিয়ে,
এমন হৃদয়-নিধি যতনের ধনে
জনমের মত সখি
হৃদয় হইতে ছাড়া করিব কেমনে ?
শোকের তুফানে পড়ি যদি কোন দিন
অবিরল আঁখিনীরে ভাসে লো হৃদয়
বিষম দুঃখের ভারে বদন মলিন,
আঁখিনীরে আঁখিনীর মিশিয়ে যে জন
কেমনে ভুলিব তারে ?
হৃদয়ের দুখরাশি যে করে মোহন।
ফুল।
।
পীড়ায় কাতর হয়ে আঁখি দুটী মীলি,
ছিলাম যখন শুয়ে অচেতন হয়ে,
শিয়রের পাশে বসে পেয়ে নিরিবিলি
সতত নয়ন-নীরে ভাসাত হৃদয়,
বল সখি কোন প্রাণে
কেমনে পাষাণী হয়ে ভুলি সে সময় ?
যাহার মুখের হাসি সতত দেখিতে
চরণে ধরেছি কত, হলে অভিমানী,
সরমের মাথা খেয়ে যাহারে সাধিতে,
ভালবাসা দিয়া সদা পূজিয়াছি যায়
আজি বল কোন প্রাণে
ধূলার মতন তারে ঠেলিব লাে পায় ?
যে আমার কল্পতরু বাসনা-পূরণে
না চাহিতে আগে যেই করে প্রেমদান,
বিলাসের ছবি যেই অভাগীর মনে,
হাত মুখ হৃদি পাতি যাহা চাই, পাই ।
কেমনে ভাবিব সখি
আমি আর নই তার, সে আমার নাই ?
ফুল।
-
শিখিনী সুখিনী যথা শুনে মেঘধ্বনি
চাতকী আমােদে যায় বারিধারা পানে,
শুনিয়া অমিয়বাণী, মাণিকের খনি-
দেখিতে যে মুখ-শশী ব্যাকুলিত প্রাণ,
বল সখি! বল বল
কেমনে ভুলিবে দাসী সে চাদ বয়ান?
কেমনে ভুলিব তারে ? পারি না ভুলিতে,
হৃদয় যাহার তরে ব্যাকুল সতত,
মনে হলে বুক ফাটে যাহারে ছাড়িতে ।
যায় কুল—যায় মান ছাড়িব না আর
শােন সখি এ অভাগী
চিরদাসী হয়ে পদ সেৰিবে তাহার ।
ফুল।
প্রেমের চুম্বন।
সুনীল আকাশে শশী সুবিমল,
সাগরের গলে শুভ্র উৰ্মিদল,
সরােবর মাঝে কম কুবলয়,
নদীকূলে শ্যাম নব শস্পচয়,
বসন্তে পূর্ণিমা
কোকিলের ভাষ,
রতি-রতাধরে মৃদু মৃদু হাস,
বিরহিনী-ম্লান-মুখে কি শােভে এমন ?
প্রেমের চুম্বন তাহা প্রেমেরি চুম্বন।
পরের ললনা নেহারি নয়নে,
যদি বঁধু কভু হাসে তার সনে,
যদি কথা কয়, যদি ফিরে চায়,
যদি বা তাহার রূপ গুণ গায়,
রাহুগ্রন্তু হায় মুখ-শশধর !
নীরবে কাঁদিয়া ভিজায় অম্বর।
কিবা তার মর্মপীড়া করে নিবারণ ?
প্রেমের চুম্বন তাহা প্রেমেরি চুম্বন।
প্রবাসে গিয়াছে যার প্রাণধন,
শূন্য পড়ে আছে হৃদি-নিকেতন,
ফুল।
নিয়মিত দিন হইলে বিগত,
যদি প্রাণপাখী নহে সমাগত,
শয়ন ভােজন বিরাম ত্যাগিনী,
দিনমণি বিনা মুদিত নলিনী।
মুদিত কমলে কিবা ফুটায় তখন?
প্রেমের চুম্বন তাহা প্রেমেরি চুম্বন।
নিশায় আকাশে শশী সমুদিত,
খেলে কুমুদিনী হয়ে বিকসিত,
যদি শশধর দিবাভাগে চায়,
যদি কুমুদিনী নাহি তােষে তায়,
অভিমানে বঁধু হয় নিমগন,
নাহি কথা কয় ফিরায় বদন,
তােষে তারে রমণীর আছে কিবা ধন?
প্রেমের চুম্বন তাহা প্রেমেরি চুম্বন।
যদি পুস্পবতী হয়ে কমলিনী
অলি সহবাস নহে আকাঙিক্ষণী,
স্ত্রীপক্ষে
পুষ্পবর্তী-ঋতুমতী
কমলিনী--পদ্মিনী স্ত্রী
মধুকর ও অলি-কামুক
পুষ্পপক্ষে
পুষ্পবিশিষ্ট।
পদ্মিনী
ভ্রমর
যদি মধুকর মধু পিপাসায়,
গুন্ গুন, রবে তার কাছে যায়,
করে মধুপান না মানি বারণ,
অভিমানে ঢাকে , নলিনী আনন।
হাসায় তখন তারে কি আছে এমন ?
প্রেমের চুম্বন তাহা প্রেমেরি চুম্বন।
নাহি ডরি কভু করাল শমনে,
অন্তে যদি পাই প্রেমের চুম্বনে।
নাহি ডরে সেও ভীষণ মরণে,
অন্তে যদি পায় প্রেমের চুম্বনে।
দুঃখ সুখময়, ভীতি প্রীতিময়,
বিষ সুধা বাহে, ঘূণ স্পৃহাময়,
শকতি দুর্বল মনে দিতে কি এমন ?
প্রেমের চুম্বন তাহা প্রেমেরি চুম্বন।
ফুল।
নলিনী কেতকী ও অলি।
বিমল সলিল মাঝে কে তুমি রূপসি !
ছড়াইয়া রূপরাশি, ছড়াইয়া মধু হাসি
হাসাইছ দশ দিশি সরােবরে বসি ?
হৃদয়ে মধুর রাশি করেছ ধারণ,
তুমিললাে নলিনী বুঝি রমণী রতন ?
কে বলে তােমায় ধনি, তুমি দ্বিচারিণী ?
অবরােধে যে ললনা পতি পাশে বিবসনা
সতত সহাস-মুখী রতি আকাঙ্গিণী,
আড়'লে পুরুষে যদি নিরখে তাহারে,
কলঙ্কিনী বলি ধনি, কেবা দোষে তারে ?
পলাশে আবরি থাক আপন বদন,
গুন্ গুন্ রব তুলি যবে পতি আশে অলি,
হৃদয়ে বসাও খুলি বুকের বসন,
মধুকরে আলিঙ্গনে মধু কর দান,
প্রেমের তরঙ্গ ভরে সদা ভাসমান।
দূরদেশে থাকি রবি—তৃষিত নয়ন,
সরােবরে পতিসনে, যবে রত আলাপনে,
আবেশে অবশ-হৃদি হওলো যখন,
১১
সংগোপনে অন্তরালে করে বিপােকন—
তােমার সে হাব ভাব, ও চারু বদন।
দিবসে মুদিতা * তুমি মীলিতা নিশায়,
তাই দেখে বুঝি ধনি, সবে বলে কলঙ্কিনী,
হবে না ব্যথিতা তুমি ও ছার কথায়,
নিশায় মুদ্রিতা-অলি গেলে তেয়াগিয়া,
দিবসে মুদিতা বঁধু-মুখ নিরখিয়া।
একিলাে নলিনি দেখি খুলিয়া বদন,
দেখিতেছ চারি ধার করি লাজ পরিহার,
প্রতীক্ষা করিছ বুঝি বঁধু আগমন,
ওই আসিতেছে অলি গুন্ গুন্ করি,
সাদরে বাও কোলে নাথে গলা ধরি।
বায়ুভরে হেলে দুলে পক্ষ প্রসারিয়া,
আসে অলি সুমধুর গুঞ্জন করিয়া,
সাদরে নলিনী হৃদে করিয়া ধারণ
নিরখে সতত সেই নাথের বদন।
মুদিতা...আনন্দিতা,...বিকশিত।
মীলিত...নিমীলিতা,মুদ্রিত।
অদূরে কেতকী এক ফুটিয়া কাননে
সুরভি সৌরভ ভারে, আমােদিয়া চারিধারে,
রূপের গরবে আছে অনত বদনে,
সৌরভ মাখিয়া গায় দিবস যামিনী।
ভুলায় অবােধ জনে সেই গরবিনী
কণ্টক কলঙ্কময় মাঝে লুকাইয়া
মৃদু মৃদু হাসিতেছে,
কতজনে হাসতেছে।
পত্র অবরােধে থাকি অন্তরাল দিয়া,
এই যা অলির মন করিল হরণ,
মনে মনে অলি এই করে আন্দোলন।
“ছড়াইয়া রূপরাশি হাসিছে কেমন।
কুসুম কুলের সার,
পূর্ণ-পরিমল-ভার,
কোমলতা-পূর্ণ সদা কেতকী রতন,
কহিতে কথা আগে ডাকিছে সুন্দরী
আহা কি রূপের শােভা মরি মরি মরি।”
কে বলে পরের রামা রমণী-রতন।
প্রেয়ন্সীর সুধামাখা, বস্ত্রে মুখ আধ-ঢাকা,
সততনৰ্তন-পর যুগল নয়ন,
গলিত শরীর লতা প্রেম আলাপনে,
সে মুখের হাসি নাহি যার মনে।
ফুল।
৩
-
নাচেনা যাহার মন জায়াকণ্ঠ শুনি,
নাচেনা হরষে তার, কঁদে না বিষাদে যার,
গলে না যাহার চিত, হলে অভিমানী,
পবিত্র প্রণয়ে নয় স্নিগ্ধ যার মন
সে বলে পরের রামা রমণী রতন।
কে বলে পরের রামা ললিত হসনা,
গলদেশ জড়াইয়া, কোলে জায়া বসাইয়া
প্রেমের চুম্বন দানে হসিত-বদনা-
দেখে নাই যেইজন প্রেমের নয়নে,
ললিত-হসনা সেই বলে অন্যজনে।
সে বলে পরের রামা ভালবাসাময়,
ফুটিতে কথায়, আপনি সে কথা কয়,
না বাড়াতে কর-যুগ করে ধরি লয়,
চাহিতে অাগে সেই করে প্রেমদান,
হাসিতে সদা তার হসিত-বয়ান।
কেতকীরে মনে অলি নাহি দিও স্থান,
যত চাও ভালবাসা, কোমল কণ্ঠের ভাষা,
যত চাও মধুহাসি প্রেমের আদান,
ভালবাস নলিনীরে প্রেমিক হৃদয়ে,
পাইবে সকল সুখ হৃদি বিনিময়ে।
ফুল।
কে চায় আপন জায়া পর-গতা হতে ?
হাসাইতে মধহাসি, দেখাইতে রূপরাশি
-অন্যজনে কেবা বল চায় ইচ্ছামতে,
কেবা চায় কোন্ কালে প্রেয়সীর মনে
গলাইতে অন্যজন-প্রেম-আলাপনে ?
কে না চায় প্রেয়সীর সতীত্ব রতন ?
কে না চায় সে আমার,
আমিই হৃদয়ে তার,
আমি বিনা হৃদে নাহি থাকে অন্যজন,
আমার কথায় যেন সময় কাটায়,
অবসরে রত থাকে আমার চিন্তায় ?
নলিনী যেমন তব আদরের ধন,
সেরূপ রমণী জুন,
পতির যতন ধন,
তুমিও নলিনী কাছে নিশ্চয় তেমন,
যেওনা যেওনা তুমি কেতকী সদনে,
দিওনা দিওনা ব্যথা নলিনী জীবনে,
বড়ই চঞ্চল চিত্তে বলে মধকর
‘আহা কি পরিমল,
বিতরিছে অবিরল,
কেতবর রূপ-রাশি অতি মনােহর,
যে বলিবে যাহা, সব সহিব হৃদয়ে,
যাইব নেকী পাশে প্রেমের অ লয়ে।”
}
**
ফুল।
নলিনীর কোল ছাড়ি তুচ্ছ করি তারে,
উল্লাসে উন্মত্ত হয়ে, মধকর যায় ধেয়ে,
কেতকীর মধুপানে পতত্র-বিস্তারে,
কণ্টকে ছিড়িল পক্ষ কিন্তু হায় হায় !
নয়ন-যুগল অন্ধ কেতকী ধূলায় ।।
* :
ফুল।
প্রণয় পত্রিকা।
(নায়ক দর্শনস্তে নায়িকার প্রথম লিপি।
যে শারদ শশী সুশীতল করে
বিলায় সবারে প্রেমের মালা,
যে বিমল চাদ অমিয় বিতরি
সােহাগে সরসে কুমুদ-বালা ;
চকোর চকোরী সুধার আশায়
যে চাঁদের পানে চাহিয়া রয়,
যাহারে না দেখে মলিনা যামিনী,
অভাগী সে চাঁদে নিকটে পায়।
এ ক্ষুদ্র অলয়ে ও চাদ উদয়
কত ভাগ্য-বলে বলা না যায়,
সুর-পুরী মাঝে বসতি যাহার,
জানি হেথা সে অসুখ পায়।
.
কুমুদিনী হাসে কৌমুদী মাখিয়া,
চকোরী যাহার অমিয় পায়,
সরমের কথা-হায় লাজে মরি
ভােগী নলিনী তাহারে চায়।
১৭
তা যদি না হবে—কেন বা নলিনী
বুক পেতে থাকে পাইতে তায়,
জগতের শােভা সুধাকর চাঁদে
কে না বা হৃদয়ে রাখিতে চায় ?
প্রার্থনা--আবার অভাগী আলয়
তব পদার্পণে পবিত্র হয়।
পবিত্র আকার দেখিতে সতত
নয়ন আমার চাহিয়া রয়।
প্রিয়তমার প্রতি পত্র।
চাতকে দারুণ পিয়াসা লেগেছে,
কেনরে নীরদ নীরবে রও?
মধু-পানাশায় ভােমরা আকুল,
কেনলো নলিনি মুদিত হও?
তব সমাগম হইবে বলে রে
জীবিত, পাষাণে বাঁধিয়ে হিয়ে,
ফুল।
তব মুখামৃত করিব রে পান
কোমল হৃদয়ে হৃদয় দিয়ে।
যে দিন হেরিনু নয়নের ঠাম,
হৃদয় কমল, সহাস মুখ,
পিরীতি অমিয়ে মজিলরে মন,
সেদিন পাইনু কতই সুখ।
সুখ ও গিয়াছে, সে সুখের স্মৃতি
কেলরে জ্বালায় সতত মনে,
হয় ছেড়ে যাক, এ ছার পরাণ,
নয় পাই তােমা হৃদয় ধনে।
সুখী হও তুমি চিরসুখে থেক
তোমার অসুখে অসুখ পাই,
সুধার আগার হৃদয় তােমার
হাসি হাসি মুখ দেখিতে চাই।
ফুল।
১৯
প্রিয়তমের প্রতি পত্র।
চকোরী কাতরা সুধার লাগিয়া,
কেন হে নিদয় হইলে চাঁদ ?
নয়নের জলে ভাসাইবে যদি,
কেন বা পাতিলে প্রেমের ফাদ ?
ঘাের পিপাসায় আকুল হায়রে
চাতকী সতত বারিদ-মুখী,
কেন হে নিঠুর নীরদ তাহারে
জলধারা দানে না কর সুখী ?
তােমার ও মুখ হেরিবে বলে রে
নয়ন অামার সতত ধায়,
অমিয়-পূরিত বচন তােমার
শুনিবারে প্রাণ সতত চায়।
রমণী গড়েছে নিদারুণ বিধি,
কোমল পরাণে পাষাণে ঢেকে,
হৃদয়ের ভাব হৃদয়ে উথলে,
নাহি সরে কভু হৃদয় থেকে।
ফুল।
কেমনে বুঝিবে কত যে যাতনা
পায় এ অভাগী তােমার তরে ?
হুহু করে প্রাণ বিরহ দহনে,
বুক ফেটে যায় কথা না সরে।
যেন স্বপ্ন দেখি-জাগিয়া জাগিয়া,
আমি হে নলিনী, পরাণ বঁধু !
মত্ত মনচোরা তুমি হে ভােমরা,
সদা সুখে পান করিছ মধু।
গল দেশ ধরি থাকিব সতত,
আমি হে লতিকা, তুমি হে তরু;
তােমারে ধরিয়া র’ব চির দিন
আমি মরীচিকা-তুমি হে মরু।
চপলা-বিলাসী জলদের সনে
চপলার মত হরষে র’ব,
যদি দুখানলে দহে মন প্রাণ,
ও মুখ চাহিয়া বিস্মৃত হব।
এমন দিন কি দিবেন বিধাতা
চাতকী সুখিনী ধারার পানে,
ফুল।
চাদের কৌমুদী মাখিয়া চকোরী
সুধাপানে রবে বিভাের প্রাণে ?
সে দিন হবে কি-যে দিন নলিনী
হৃদয় আসনে বসাবে বঁধু
প্রেমের লহরেদুলিয়া দুলিয়া,
তোষিবে বঁধুরে প্রদান মধু ?
চপলা।
কে তুমি, চপলে ভুজগ-গামিনি ?
দ্রুত যাও সেজে জলধর বাসে,
জগতে মাতাও মৃদু মৃদু হেসে,
দোলাইয়া চারু অঙ্গ যথা বিলাসিনী,
কে তুমি, চপলে ভুজগ-গামিনি!
ফুল।
এত ব্যস্ত কেন অয়ি সৌদামিনি ?
একবার এস দুটা কথা কই,
নয়নে দেখিয়া হৃদয় জুড়াই,
একবার ফিরে এস সুচারু হাসিনি,
এত ব্যস্ত কেন অয়ি সৌদামিনি!
মিছা তবে কেন ঝলস নয়ন ?
নিমেষের তরে নিকটে আসিয়া,
তবে কেন হাস নয়ন ক্ষরিয়া ?
কেবল মরমে দাও বিষম বেদন,
মিছা কেন তবে ঝলস নয়ন ?
এখনাে এলে না সুচারু-হাসিনি !
দ্রুত পদ ভরে চপল গমনে,
লুকাইলে তুমি বারিদ বসনে,
বিষম কটাক্ষ তবে কেন সৌদামিনি ?
এখনাে এলে না সুচারু-হাসিনি ?
ও রূপ দেখিতে বড় ভালবাসি,
ঘন নীল বাস আহা কিবা সাজে
তব সুকুমার দেহ লতা মাঝে।
ফুল।
বদনে কেমন আহা সুমধুর হাসি !
ও রূপ দেখিতে বড় ভালবাসি।
আ মরি চপলে, কিবা রূপ ধর !
স্নান করি জলে সিক্ত বস্ত্র পরি,
কেমন সাজরে আহা মরি মরি !
একাকিনী জগতের মন প্রাণ হর,
আ মরি চপলে কিবা রূপ ধর !
যেও না চপলে চটুল গমনে,
চপলা বলিয়া নিন্দা করে সবে,
এই অপবাদ সহিতে না হবে,
আমিও মিটার সাধ দেখিয়া বদনে,
যেও না চপলে চটুল গমনে।
আঁধার নিশাতে তুমিরে সহায়,
আঁধারে পথিক পথ-ভ্রান্ত হয়ে,
অপথে যাইলে পলকে হাসিয়ে,
সুপথে বিদ্রুপভরে আন রে হায়,
আঁধার নিশাতে তুমিরে সহায়।
সকলে পরাস্ত তােমার সকাশে,
তব তেজে ম্লান অগ্নি শিখা হয়,
२४
ফুল।
তােমার উদয়ে দিনেশ লুকায়,
জগৎ স্তম্ভিত হয় তােমার বিকাশে,
সকলে পরান্ত তোমার সকাশে।
অতি ক্ষীণ তুমি অয়ি ক্ষণপ্রভে।
সৰ্ব্ব জন্তুদেহে মানব শরীরে
স্থাবরেও থাক আকাশ উপরে,
কেমনে সবারে তােষ একাকিনী শুভে !
অতি ক্ষীণ তুমি অয়ি ক্ষণপ্রভে !
তােমার সহায়ে ধরেছি জীবন,
তুমি যবে শুভে, আমারে ছাড়িবে,
সে দিন আমার এ পরাণ যাবে,
হৃদয়ে রেখেছি তাই করিয়ে যতন
তােমার সহায়ে ধরেছি জীবন।
৫০০)
নলিনী ও অলি।
উষা-কালে পিকবর কুহু কুহু রবে
নলিনীরে মধুভাষে হরষে জানায়,
দেখ চেয়ে ভানুপ্রিয়ে, খােল আবরণ,
ওই দেখ শশধর অস্তাচলে যায়।
বিরহ যাতনা আর সহিতে না হবে,
প্রভাত-গগনে দেখ অরুণ উদয়,
জানাইতে প্রিয়তমে দুখ অবসান,
দিবাকর সমুদিত কাতর হৃদয়।
অভিমানে কমলিনী ছিল নিমীলিতা,
নিজ করে ভানু তার খুলিল বদন,
পতি-রতা অতি সতী যেন কমলিনী,
গোপনে পতিরে কিন্তু করে প্রবঞ্চন।
নলিনীরে প্রমােদিতা দেখেমধুকর,
পরম হরষে আসে মধু আহরণে,
প্রভাত-সমীর বহে মৃদুল হিল্লোলে,
সদা তাহে সন্দোলিতাহরষিত মনে।
নলিনীর কাণে কাণে মৃদুল পবন
ছলিতে অলিরে ধীরে শিখাইয়া দেয়,
মাথা নাড়ি তাই এবে নলিনী সুন্দরী
সর সর শব্দে তারে এই কথা কয়
“স্বার্থপর তুমি অতি ওহে অলিবর !
সুখের আশায় এস ঞ্জামার ভালয়ে,
এ কল যামিনী মোরে কত দুখ দেয়
করুণ হৃদয়ে কভু নাহি দেখ চেয়ে !
“মধু ১াহরণে ব’স হাদয় উপর,
সনি হলে উৰু ধু সঞ্চয়
ক্ষ প্রচারণ করি উড়িতে সত্বর,
য! • মধুকর, বুঝেছি তােমায় ।
‘ন"হ হি ধুকর তােমা হেন জনে,
লি •") * তোম। সম অভাব কোথায়,
কেন বুথ! এ ক'রে উড়িতেছ কাছে
ও চলে মধকর ছু ওনা আমায়।
‘পতি থাকে দূর দেশে, দুঃখিত অন্তরে
৫গাপনে প{ণ মন করিনু অর্পণ,
স্বার্থপর মধুকর সুখের আশায়,
মজাইয়া অবলায় ডুবালে এখন।
ফুল।
“ফিরে যাও মধুকর, মধুকরীসহ
কর প্রেম আলাপন দিবস শর্বরী,
ত্যজ আশা ভালবাসা জনমের মত,
আর নহে অভাগিনী তব সহচরী।
“তবু কেন মধুকব ঘুরিতেছ কাছে ?
ছুইও না, এ অভাগ। কুল কলঙ্কিনী,
জানিনু পুরুষ জাতি কপটি এমন,
বুঝেছে সকল সুখ এই অভাগিনী?”
পবনের সহযােগে দুলিছে লিভা,
গুঞ্জরি প্রকাশে অলি মনের বেদনা,
“কমলা স্বরূপ একে রমণী প্রতিমা,
তাহে তুমি কমলিনী কমলা-বাসনা।
‘ক্ষমা কর বিনোদিনি, সরি তব পদে,
আমা সম পতি তব ভাগ ? ভুবনে,
ত্যজিলে এ অভাগা",
* ক্ষতি তব.
কিন্তু মরে এ অভণ ::: আগুনে।
।
নলিনী,
থামিলে পবন , "
মৃদু হাসি মধুক
," . এখন,
“এস নাথ কর মােরে দৃঢ় আলিঙ্গন,
হৃদয়ের জ্বালা এস জুড়াই দুজন।”
বিধবা বালিকা।
(বালিকা)
কবে মা আমার বিয়ে হবে গাে বল না ?
আর কেন কর মাগাে আমায় ছলনা ?
পাটের কাপড় পরে হাসিতে হাসিতে,
গয়না পরিয়ে যাব শ্বশুর বাড়ীতে।
অামার বিয়েতে হবে গড়ের বাজনা,
দেখিতে পাড়ার লােকে যাবে কত জনা,
ঘােমটায় ঢেকে মুখ বসিয়া থাকিব,
ববের কোলেতে পরে উঠিয়া বসিব।
দেবে ত আমায় মাগো রাঙ্গা বর এনে ?
করিব পুতুল খেলা আমরা দুজনে,
পুতুলের সঙ্গে দোবাে পুতুলের বিয়ে,
আমার বরকে দেবব সেঙাত পাতিয়ে।
ফুল।
ভাল ভাল ফুল তুলে, ভাল মালা গেঁথে,
পরিয়ে বরের গলে বেড়াইব পথে,
হাত ধরাধরি করে, খেলিব
দুজনে,
নাচিব মনের সাথে বড় খুসী মনে।
ধূলাে খেলা দুই জনে করিব কেমন,
ধূলােতে করিব ঘর আমরা দুজন,
ছল করে গায়ে তার ধূলা মাখাইব,
আবার কাপড় দিয়ে মুছাইয়া দিব।
হইলে নাবার বেলা নাইতে যাইব,
লাল ফুল তুলি তার কানে পরাইব,
আর দুটী ফুল তুলে, নিজ কাণে পরে,
ঘরে যাব সারা পথ তার গলা ধরে।
একাসনে দুই জনে বসে সাদা রেতে,
চাঁদ পানে তাকাইয়া কব নানা মতে,
আবার কখন তারে শোলক শােনাব,
আবার সুতানে কভু ভাল গান গা’ব।
খেলিবার ছলে কভু তাস হাতে নিয়ে,
সায়েবে বিবিতে মােরা দোবে কত বিয়ে,
ফুল।
লইয়া তাদেরে তুলে বাসরে শােয়াব,
আবার শ্বশুর বাড়ী বিবিকে পাঠাব।
কখন বেড়াল ছানা কোলে বসাইয়া,
সােয়াগ করিব ‘যাদু কইরে’ বলিয়া ;
ছেলে বলে কখন বা তার কোলে দিব,
সােয়াগ করিতে কভু তারে শিখাইব।
মন ভরে নানা মতে রাঁধিয়া বাড়িয়া,
খায়াব মনের সাধে যতন করিয়া,
কভু বা তাহার সাথে শুইয়া থাকিব,
নানাবিধ আলাপনে রাতি কাটাই ।
মাতা। কত সাধে বেছে বেছে কত আশা করে,
এনেছিনু গুণােত্তম স্বামাতা রতন,
ভেবেছিনু তুমি বাছা হেম হার সম,
গলদেশ জড়াইয়া থাকিবে সতত।
বাছা ভব আশালতা মুকুলিত হয়ে,
সুখের সৌরভ তার না হতে বিকাশ
নিরদয়-কাল-কীট-করাল-দশনে
ছিন্নমূল শুষ্ক এবে জনমের মত।
ফুল।
হাসি হাসি পূর্ণ শশী উদিল গগনে,
ভেবেছিনু কুমুদিনী সুখী হয়ে রবে,
অকস্মাৎ হেরি তারে তিমিরে আবৃত,
কে জানে এমন হয়-রাহু গরাসিবে ?
দীপ-শিখা সম তব জীবন আলয়ে,
দশ দিক্ উজলিয়া ছিল প্রিয়তম,
প্রচণ্ড পবন আসি নিবাইল তায় --
আঁধারিয়া হায় তব হৃদয়-নিলয় ।
বাছা তব সুখ বীজ অঙ্ক রিত হয়ে,
নব রাগে বৃদ্ধিগত হলো দিনে দিলে,
শুকাল অঙ্ক র হায় সলিল বিহনে,
আর না হইবে কভু যাবৎ জীবন।
শমন-শাসনে বাছা কত কুলবালা,
পতিহীন হয়ে সদা অ-সহচরী,
কণ্টকিত হইয়াছে জীবনের পথ,
তুমিও শাসিত বাছা কালের শাসনে।
Wat
কুল।
বসন্তান্তে বিরহীর খেদ।
মনরে
বসন্ত সুখের সনে,
বহে গেল শূন্য মনে,
কোপবশে মুখ তাই আরজ করিয়া,
খর তেজে দহে রবি হৃদয় ভেদিয়া।
অবশেষে স্লান মুখে,
অস্তাচলে-মহা সুখে
দেখিয়া তােমার দুঃখ কাতর অন্তরে,
প্রবেশে দিনেশ হায় ত্যজিয়া প্রিয়ারে
নিশা কালে নিশানাথ
প্রিয়তমা নিশা সাথ,
প্রেয়সীর দুখ তব দেখিয়া নয়নে,
শিশিরা ফেলে সদা মলিন বদনে।
বিরহি-যুগল দুখে
আকাশ মলিন মুখে,
মলিন বারিদ বাসে কায়া আবরিয়ে,
কঁদিতে লাগিল কত ভুবন ভাসিয়ে।
ফুল।
তােমার গমন আশে,
সাজিল মুকুল বাসে
সহকার বায়ুভরে হেলিয়া দুলিয়া,
আসিবে প্রাণের বঁধু মনেতে ভাবিয়া ;
কিন্তু রে নিদয় মনঃ
নিরাশ করিলে কেন?
এখনাে তােমার আশে ধরেছে জীবন,
সুধাময় ফলচয় রেখেছে এখন।
মৃণালিনী শীতকালে
তন্তুসার ছিল জলে,
তােমার গমন আশে পাইল জীবন,
কমল কবরী বাঁধি সাজিল কেমন,
তবু না যাইলে মন,
করিবারে সম্ভাষণ ?
লইয়া কমলে তুমি না ধরিলে গলে,
নাহি দিলে প্রেয়সীর চরণ কমলে।
প্রেয়সীর দুখ দেখি,
ডালে বসি মুদি আঁখি,
কাদিতে লাগিল পিক কুহু কুহু স্বরে,
তবু না যাইলে মন তুষিতে প্রিয়ারে ?
৩৫
কোকিলের রব শুনি
কাদিতে লাগিল ধনী,
কুই রবে বিষদাগ্নি হইল দ্বিগুণ,
আমরি সে মুখখানি হলােরে বিগুণ।
তুমিত অবোধ নও,
যাও মন, শীঘ যাও,
তােমতরে প্ৰেমাধীনী হয়েছে পাগল,
দিবা নিশি ভেবে ভেবে হয় হীন-বল,
শুনিতে পাওনা মন,
এখনো কোকিল গণ,
প্রেয়সীর দুখ'শি জানাইয়া যায়,
তবুও যাওনা মন হায় হায় হায় !
দেখিতে পাওনা মন
সুশীতল সমীরণ,
তাপিত হইয়া করে শরীর দহন ;
প্রেয়সী-বিরহশ্বাসে হয়েছে এমন।
সারা নিশা জাগরণে,
বিষাদাশ্রু বরণে,
কালিম বরণে মুখ শুকায়েছে হায়
তবুও যাওনা মন যাওনা তথায়।
ফুল। এখনও সেই ধনী, সতত আঙ্গুল গণি, তােমার গমন আশে আশ্বাসিত হয়, সুন্দর বসনে সাজি পথ পানে চায় ; প্রদোষ হইলে গত, নিশাকালে অবিরত বসিয়া বিষন্ন মনে তােমারে ধেয়ায়, তবুও নিদয় মন যাওনা তথায় ! তুমি কি পাষাণ মন ভাবনাও এক ক্ষণ- অভাগিনী যে রমণী তােমা তরে মরে, তারে কি ভাব না মন ক্ষণকাল তরে ? বুঝেছি বঝেছি মন ! গেয়েছ হৃদ ধা। তাহা হত প্রিয়তর সরস সুরসে, তাহাতে চওনা মন যেতে তার পাশে। প্রিয়তম কোথা তব ? পাই খুঁজিয়া ভব, তাহা হতে প্রিয়তর না আছে ভুবনে । দিবারাতি থাক কেন বিষাদিত মনে?
৩৬
তবে কি ভাব না মন
সেই বিরহিনী ধন?
ভাবনায় প্রয়ােজন কিবা আছে বল?
ত্বরায় সাজিয়া মন ত্বরা করি চল।
ফুল।
এই ফোটে—ফুটিল না শুকাইয়া গেল।
ফুরাল উত্তর বায়ু ফুরাল শিশির,
খরতর কর দেয় আবার মিহির,
দারুণ শীতের দাপে ছিল লুকাইয়া,
আবার কোকিল গায় ঝঙ্কার করিয়া ।
ভুগিয়া দারুণ জ্বালা শিশির সময়
সরােবরে ক্রমে পদ্ম-কোরক উদয় ;
ছােট থেকে দিনে দিনে ক্ষণে বৃদ্ধি পায়,
কেবল অলির সনে মিলিবে আশায়।
মন প্রাণ সমর্পিয়া মধুকর পায়,
হৃদয়ে রাখিবে ভাবি পূর্ণ বৃদ্ধি পায়,
আজ ফোটে এই ফোটে অলিরে হাসায়,
এই ফোটে—অলিসহ মিশিবে আশায়।
এই ফোটে—ফুটিল না সে মুকুল-মার
উচ্ছেদিত হইয়াছে হায় বৃন্ত তার,
এত আশা মনে সব ফুরাইল হায় !
এত বৃদ্ধি প্রিয়-সহ মিলন আশায়
আসম-বিকাশ কালে অলির গুঞ্জরে,
সঞ্চিল প্রণয় মধু তাহার অন্তরে,
৩৮
ফুল।
এই ফুটে মধুকরে করে প্রেম দান
এই হাসে মুখভরা পিরীতি প্রমাণ।
এই হাসে হাসিল না কোরক রতন !
শৈশব-প্রণয়-বৃন্ত করিয়া ছেদন
নিদয় পুরুষ দূরে গেল তারে লয়ে,
জ্বালিয়ে দারুণ জ্বালা অলির হৃদয়ে।
কত দিন সরসতা কোরকে ছিড়িলে ?
থাকে কি সে শােভা কর-সন্তাপ লাগিলে?
অঘ্রাণে অঘ্রাণে যায় শুকায়ে হৃদয়,
শােভাহীন রসহীন ক্রমে শীর্ণ হয়।
এই হাসে-হাসিল না সে কোরক-সার,
এই দেয়-নাহি দিল, তারে প্রেম হার,
শােভাময়-শােভা হীন, সরস-বিরস,
শেষে হায় শুষ্ক হলো দেহে প্রাণ রস!
এই হাসে-হাসিল না শুকাইয়া গেল।
হায় বিধি কেন এই কোরকে গড়িল ?
আবার কেন বা তার কাড়ি নিল প্রাণ?
হয় ছাড়িত অলি প্রেমের আদান।
না হয় ভজিত কলি পুরুষ নিয়ে,
না হয় ফুটিত সেই তাহার আলয়ে,
পামর বধের হাতে নিদয় পরাণে
কেমনে নাশিল বিধি কোরকের প্রাণে !
সুখে কেন না রাখিল যেখানে রাখিল,
কোমল পরাণে কেন এত দুখ দিল?
চিরসুখী
মধুকর
জীবনে তাহার ;
এখন অলির হৃদি পূর্ণ-শােকাসার।
কুহু কুহু।
বসন্তে পূর্ণিমা রাতি অতি মনোহর,
মৃদুল মলয়ানিলে শরীর জুড়ায়,
কুসুম সৌরভসহ মিশি শশিকর
অপার আনন্দ নীরে ভাসালে আমায়।
নিরমল শশধর সুশীত কিরণে,
শান্তিময় সুধাময় করেছে ভুবন,
দেখিতেছি এক মনে শশধর পানে,
মৃদুল হিল্লোলে বায়ু হরিছে চেতন।
কুহু কুহু কুহু রবে ডাকিল কোকিল,
শেল সম কুহ রব বিধিল অন্তরে,
চঞ্চল হইল মন তনু শিহরিল,
মরমে লাগিল ব্যথা কুসুমেষু শরে।
সুশীতল নিরমল শশধর-কর,
অগ্নিময় হলাে এবে লাগিল দহিতে,
সুস্নিগ্ধ মারুত হায় দহিছে অন্তর,
বিরহিনী বালা আমি না পারি সহিতে।
আবার ডাকিল পিক কুহুকুহু সুরে,
শিথিল হইল দেহ মুদিল নয়ন,
শরীর জর্জরীভূত হলাে কাম শরে,
পুলকে পূরিল অঙ্গ খসিল বসন।
বিনা শীতে কম্পমান হইল শরীর,
স্বেদরূপে উচ্চ কুচ লাগিল কাদিতে
সুধাময় করে শশী পীন পয়ােধর,
ধরিল মনের সুখে সাধ মিটাইতে।
কুসুম-কোরক বলি মলয় অনিল,
ফুটাইতে কুচযুগে লাগিল চুমিতে,
যে দুলভ ধনে চাহে নিখিল ভূতল
ধন্যরে অনিল তুই ধন্য এ মহীতে।
ডাকিল কোকিল পুন কুহু কুহু রবে ;
বড় অরমিক তুমি ওহে পিকবর !
দেখিতেছ বিরহিনী পরাণে মরিবে,
তবুও ডাকরে পুন কুহু কুহু সুর!
কুহু কুহু রব আর সহিতে না পারি,
কেন ওরে পােড়া পিক জ্বালাস আমারে ?
দুরন্ত মদন বাণে বুঝি আমি মরি,
ডাকিও না আর পিক নিদয় অন্তরে।
এই কি পুরুষকার তােমার মদন !
একাকিনী বিরহিনী আছি নিরজনে,
কাল পেয়ে নারীবধ কর অকারণ,
ধন্যহে বীরত্ব তব অতুল ভুবনে
বিরহিনী বধ কর কেন পিকবর !
তোমার
ঐ
কুহু রব না পারি সহিতে,
কেমনে জানিবে তুমি যাতনা উহার ?
অভাগিনী মরে আজি তােমার কুহুতে !
যদি বা ডাকিলে পিক কুহু কুহু স্বর,
ত্বরায় যা ওরে তুমি যাওরে তথায়,
যে দেশে আছেরে পিক মম প্রাণেশ্বর
কুহু কুহু রবে তারে আনরে হেথায় ।
ক
কেন কাদে প্রাণ?
সুখ নাই, শান্তি নাই, বিষয়ে বাসনা নাই,
হাসি নাই, আশা নাই, সুধু নিরাশার গান,
সদা ব্যাকুলিত প্রাণ।
সুখকর সুধাকর--
বিমল সুশীত করে এবে দেহ দগ্ধ করে,
তুষানল সম পােড়ে, হৃদয় ভিতর।
সেই মন, সেই প্রাণ, কেন নাই সুখগান?
ছিল সুখময়,
কত আশা ভালবাসা, হৃদয়ের কত ভাব,
ছিল মধুময় ;
অগাধ সাগর মরু হয়েছে ভীষণ।
অতীত ঘটনা হয় স্বপন এখন।
নিবে গেছে প্রেমালােক।
জীবন আঁধার ময়, দুৰ্বল ইন্দ্রিয়চয়,
আমােদের কণা নাই হৃদয় মাঝারে-
করে খেলা রােগ শোক।
সুখস্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে।
বিষম
ঘুমের ঘােরে,
দেখিয়াছি সুক্ষপন
অমৃত সাগরে করি অমৃত চুম্বন।
সুখস্বপন ভেঙ্গে গেছে, সুধু স্মৃতি-দুখ আছে ।
৪৪
হয়েছিল আশার মুকুল,
কত সুখী মনােমধুকর ;
কাটিল রে কাল-কীটে হায় বৃন্ত তার
ফুটিতে ফুল ;
তাই ত এ ভােমরা আকুল।
সরােবরে ফুটিল নলিনী-
কত আশা ছিল দিনকরে,
শুকাইল মধুমতী হিমপাত-ভরে,
-হায় সরােজিনী ।
তাইত এ দুখী দিনমণি।
কত আশা করে ডুবিনু সাগরে,
পাব মুকুতা নিচয়,
(সহি বহু ক্লেশরাশি )
শেষে, হারালাম জীবন রতন ,
কাচ পাব বলে-
দিলাম হীরক হায় রতনের সারে।
কে জ্বালা’ল চিতা, মনের ভিতর ?
এ নহে শ্মশান ;
কে চালাল হল হৃদয় উপর ?
নহে কৃষিস্থান।
স্কুল।
৪৫
কেন কাদে প্রাণ ?
দিয়া শােক দুঃখ স্মৃতি,
প্রবঞ্চকে নিয়ে গেছে-সুখশান্তি হাসি প্রীতি,
করিয়া বঞ্চন।
হৃদয়ে আকাঙ্ক্ষা নাই, বিষয়ে বিতৃষ্ণা তাই
সুধু নিরাশার গান,
তাই কাদে প্রাণ।
বিলাসিনী।
দেখে যুবজনে,
হরষিত মনে
মৃদু হাসি সদা চায়,
ভুজগ গমনে,
কলাপি-নর্তনে
শরীর দুলিয়ে যায়,
দুপা আগে যায়, পাছু পানে চায়
কখন চরণ পানে,
ফিরিয়ে বদন,
নিতম্ব আপন
দেখে নয়নের কোণে ;
কুলের পাংশুলা এই হেয় বিলাসিনী
জরায় কাতরা হতগরবিনী।
উরস বসন
নয়নের কোণে দেখ যুব জনে
না দেখা ছলনা করে,
সমীর সেবনে
চরণ চারণ
কেবল মিলন তরে।
সুধীর পবনে
ছলেতে স্খলিত হয়,
শৈবাল বিমুক্ত কমল কোরক
অমনি কি শোভা পায় !
যাহে গরবিনী এত এই বিলাসিনী
অদূর সময়ে হত-গরবিনী।
কম্পিত অধর
কুঞ্চিত চিবুক
কুঞ্চিত কপােল আঁখি
উজলে সঘন
মৃদু হাসি ভাব করে প্রদর্শন
নবীন যুবক দেখি ;
স্ফটিক দর্শন
রক্ত ওষ্ঠাধর মাঝে,
নবীনা যুবতী হাসিয়া পলায়
আবির বদন লাজে ।
কুলের কামিনী হায় এও বিলাসিনী
চরম সময়ে নিৰ্বেদ ভাগিনী।
নয়ন সরসে তার ইন্দীবর
ভাসে চারু বিকসিত,
বিলাস সমীরে
করে তারে সন্দোলিত,
মৃদুল প্রবাহে
তারকা কমল
অপাঙ্গে সরিয়া যায়,
যে বিষম তেজ করে বিকিরণ
কে পারে সহিতে তায় ?
চারু অপাঙ্গিনী, হয় এই বিলাসিনী
যৌবন পতনে হত-গরবিনী।
হেরিয়া যুবক
মুকুর কঙ্কত
যার সহচর
উচ্চ হাসি মুখ ভরা,
৪৮
ফুল।
পানপিকে যার রঞ্জিত অধর
শরীর মার্জন-পরা,
লাজে সরে যায় চপলার প্রায়
দেখে যেই প্রিয়জনে,
আদি রসময় কবিতা নিচয়
রত সদা অধ্যয়নে,
কুল কলঙ্কিনী হয় এই বিলাসিনী
চরম সময়ে যাতনা ভাগিনী।
পাখী।
ওই যে রহেছে পাখী ওই ওই ওইরে,
ধরিতে গেলেই হায়, অমনি পালিয়ে যায়,
মরমেতে দিয়ে ব্যথা কি বলিব হায়রে ।
কতই ডাকি তারে আয় আয় আয়রে ।
পেয়ে ধরিতে যবে মনাে-দুখে বসিরে
অভাগা পানে চেয়ে, হাসি হাসি আসি ধেয়ে
বসিয়া অনতিদূরে সুললিত গায়রে,
ধরিতে গেলেই তারে পলাইয়া যায়রে।
ফুল।
বসিয়া হতাশ হয়ে যতই ডাকি রে।
একটুও না সরিয়া, এক দৃষ্টে তাকাইয়া
হাসি মুখে প্রণয়ের প্রতারিকা মতরে
রহিল বসিয়া আহা লাজভরে নতরে!
আয়রে আয়রে পাখী আয় আয় আয়রে !
ইচ্ছা হয় ওরে পাখী, সদা তােরে হৃদে রাখি,
অবিরত মুখশশী দেখি তব হায় রে !
একবার আয় পাখী আয় আয় আয়রে ।
মুচকে হেসে এখন সে নিজ স্থানে বসে রে,
জালাইছে মােরে হায়, বুঝি প্রাণ বাহিরায়,
মননামাঝে দুয়া তার কিছু নাহি হয় রে,
হায় এত কুটিলতা সরলেতে রয় রে !
!
জানিতাম অবলারে সরলা বলিয়া রে,
জানি এখন হায়,
বিশেষ দেখিয়া তায়,
মুখে দুধ বিষে পােরা নারীর গঠন রে,
নহিলে আসিয়া উড়ে করিতে সান্তন রে ।
নারীর নয়ন ফাদে হয়েছে যে বাধা রে,
মৃদু হাসি বারে বারে, জ্বালাতন করে তারে,
আকাশের চাঁদ কভু হাতে যেন পায় রে।
সুখস্বপ্ন ভঙ্গে যেন কভু দুখময় রে !
ওরে রে অবােধ পাখী কত ভাল বাসি রে!
তােমার মধুর হাসি, তােমার ও মুখ শশী,
তােমার করেতে আমি পরাণ সঁপেছি রে,
ইচ্ছা হয় তােমা কাছে উড়িয়া পলাই রে ।
জাগ্ৰত স্বপনে সদা ভােমা সনে বসে রে
আলাপন মধুময়,
রসময় কথায়
কতদিন প্রিয় পাখী কতই রে বলেছি,
নিশার স্বপনে তােরে কত ভাবে দেখেছি।
.
আমার মানস পাখী আবদ্ধ হয়েছে রে
নয়নের পাশে তব, আর কত প্রাণ স’ব ?
যে জ্বালা জ্বলিছে মম হৃদয় নিয়ে রে,
কোন জন তুমি বিনা ? যে তারে নিবায় রে।
ফুল।
ভ্রান্তি।
পাতায় আবরি মুখ নলিনী সুন্দরী
হেরি পতি দিনকরে, মজিয়া আনন্দ সরে,
দুলিতেছে বায়ুভরে হাসিতেছে মরি।
অলিগণ হাসিতেছে দেখিয়া তাহারে,
ভাবিছে-নলিনী সুধু হালায় তাদেরে।
কুমুদে কৌমুদী করে চন্দ্রমা হাসায়,
থে হেরি প্রমােদিনী, হাসিতেছে কুমুদিনী ;
মীলিত মুদিত ক্ষণে আলােক মালায়-
হাসিছে নক্ষত্ৰচয় তাহারে হেরিয়া,
ভাবিছে কুমুদ হাসে তাদেরে দেখিয়া।
কুমুদে হেরিয়া শশী হাসিছে গগনে ;
মিলনে প্রণয়ি-জন করে প্রেম আলাপন
প্রিয়তমে হেরি বসি চাঁদের কিরণে,
প্রণয়ি দম্পতি সবে ভাবে মনে মনে,
চাঁদ হাসে আমাদের সুখের কারণে।
কেবা জানে সুমধুর কোকিলা কুজন !
আগত বসন্ত কালে পতি যার নাহি কোলে,
ফুল।
* - - -
সে জানে পিকের রব মধুর কেমন ;
বসন্তের অনুরাগে পিক ধরে তান,
বিরহ বিধুরা বােঝে দহে মাের প্রাণ !
চারু সাজে সুশোভিত হয়ে কাদম্বিনী
হেরি পতি রত্নাকরে, থাকিয়া আকাশশাপরে,
চমকি নয়ন, হাসে হাসি সৌদামিনী ;
কলাপ প্রসারি শিখী নাচে দেখি তারে,
ভাবে কাদম্বিনী সুধু হাসায় তাহারে।
স্নেহপর কাদম্বিনী তটিনী-জননী
বর্ষাকাল আগমনে
সুতামুখ নিরীক্ষণে
দিগন্ত হইতে আসে উদ্দাম-গামিনী ;
তােষে তারে পয়ােধর পয়ােদান করি,
দিনে দিনে নদী তাই বৃদ্ধিগত হেরি।
যেই জলে লালায়িত নিদাঘ সময়,
কাদম্বিনী সেই জল, বরিষয় অবিরল ;
চাতক প্রেমের আশে আশ্বাসিত হয়,
অবােধ চাতক হায় মোহে অন্ধ হয়ে
আছে সদা কাদম্বিনী মুগ্ধমুখ চেয়ে
?
৩
অগ্নিশিখা হাসে অম্লবাষ্পসহ মিশি,
বিলা সমীর ভরে দুলিয়া রূপের ভরে,
দেখায় কতই খেলা মুখভরা হাসি।
দেখিয়া পতঙ্গকুল আনন্দে মগন,
ভাবে—সেই হাব ভাব তাদের কারণ।
রমণীর হাসি মাখা দেখিয়া বদন,
যতেক রসিক জন, হর্ষসরে নিমগন,
ভাবে—সে নলিনী হাসে হেরি এ তপন ;
জানে না সে হাসিতেছে হেরি প্রিয়জন,
অন্য জন লক্ষ্য তার, সে নহে কখন।
সরলে গরল।
ওই যে দেখিছ সবে, নিম্ব ফলচয়,
ঝুলিতেছে শাখি-শাখে মুক্তারাজীম
রসন করিতে তাহা সদা ইচ্ছা হয়,
ভিতরেতে আছে কিন্তু রস তিক্ততম ।
কি সুন্দর পণ্ড ব্যাঘ্র নয়নরঞ্জন,
কি রূপ-মাধুরী তার মােহন মূরতি,
ফুল।
দরশন মাত্রে হরে সকলের মন,
কিন্তু সে খলতাপূর্ণ ভয়ঙ্কর অতি ।
কেমন জ্বলিছে ওই দীপশিখা মরি !
একাই আলােকময় করেছে ভুবন,
মৃদু মৃদু দুলিতেছে অন্ধকার হরি,
বােধ হয় হাসিতেছে ভরিয়া বদন।
হেরিয়া প্রশান্ত মূর্তি কোমল সুন্দর,
মনে হয় সুনিশ্চয় নিরাপদ নয়,
কিন্তু তারে পরশিলে যাতনা বিন্তর,
সরলেও রয় তীব্র গরল নিশ্চয়।
সুরম্যদর্শন কিবা নাগ রাজীমান্ !
দর্শনে নিরীহ বলি প্রতীতি জন্মায়,
আশীবিষে একবার দগ্ধ যার প্রাণ,
তার কাছে পরিচিত পূর্ণ খলতায়।
আকাশে জলদ বাসে তনু লুকাইয়া
হাসিয়া চপলা মুগ্ধ করে মন:প্রাণ
সে জানে কেমন তার নিদারুণ হিয়া,
আসম-অশনি-স্পর্শে যে পেয়েছে ত্রাণ
ফুল ।
৫৫
Marc=
----
সতত সরস শমী স্পর্শ সুশীতল,
নধর পল্লব যার অঙ্গ শোভা করে,
মহাতেজা দারুভুক্ প্রচণ্ড অনল
অসঙ্কোচে হৃদয়েতে সে পাদপ ধরে।
গভীর জলধি মাঝে নয়ন রঞ্জন
জলাবৰ্ত-জলরাশি হয় বিঘূর্ণিত,
জীবনে মিশিয়া তাহার জীবন,
কোন জন যদি তার হয় সন্নিহিত ।
কিরূপ ধরেছে শশী মৃগ কোলে লয়ে।
সুস্নিগ্ধ কিরণে আহা মাতায় ধরণী,
শান্তিময় হাস্যময় সুধাময় হয়ে
পােড়াইছে মনে মনে কিন্তু বিরহিণী।
কেমন কোমল মুর্তি কামিনী কুসুম।
কি সুন্দর রূপরাশি নয়ন রঞ্জন,
শান্তিময়ী মূর্তি তার কিবা মনােরম,
আয়ত নয়ন কিবা সহাস্য বদন !
ভক্তি ভাবে গলবস্ত্রে পূজি অনুক্ষণ
তাহার প্রশান্ত মূৰ্ত্তি হেরিয়া নয়নে,
ফুল ।
!
মনে হয়--মননামালা সাজিয়ে চরণ
দিবা নিশি হেরি সদা আনন্দিত মনে।
অমৃতে গরল বিধি মিলাইল হায় !
ধরিল অপাঙ্গে দৃষ্টি আয়ত নয়ন,
ওষ্ঠাধর মাঝে হামে দন্ত সমুদায়,
ভক্তি পুষ্প উড়ে গেল ঠেকিল জীবন।
গম্ভীর সে আস্য হলাে চিন্তায় মগন,
নয়ন বিরাজে সদা গবাক্ষের পাশে,
ছাদোপরি যেতে ব্যস্ত রঞ্জিত চরণ,
বদন রঞ্জিত হয়ে মৃদু মৃদু হাসে।
কর দ্বয় ব্যস্ত হলে ইঙ্গিত করিতে,
কবরীতে সুনিবদ্ধ হলাে কেশ পাশ,
সুচিকণ বাস এলাে তনু আবরিতে,
হাসিময় হলাে আজি সুমধুর ভাষ।
দর্পণ সম্মুখে সদা করিছে বিরাজ,
কঙ্কতিকা এলাে হাতে চুল আঁচড়িতে,
মুখ দেখে, গাল মােছে, করে কিবা সাজ,
পান পিকে রক্ত ওষ্ঠ লাগিল দেখিতে ।
ফুল।
আপন নিতম্ব পানে চায় অবিরত,
মাঝে মাঝে হানে বাণ পুরুষ উপরে,
অবােধ পুরুষ তায় মরে কত শত,
এমন নিরা নারী সরল আকারে !
০ ০
বারাঙ্গনা।
চন্দ্রমারে প্রতিনিধি রাখি দিনমণি
অত্তাচলে চলিলেন কঁদিয়ে নলিনী ;
ধীরে নীরে ভর দিয়া
কুমুদ তুলিল হিয়া,
কুমুদের সঙ্গে রঙ্গ-ভঙ্গে বারাঙ্গনা
উপাধানে ভর দিয়া বলে সুবসনা।
ফুটিল কুসুমচয় চারু উপবনে,
শােভিল তারার মালা সুনীল গগনে,
আমােদিত পরিমলে
চারিদিক পুষ্পদলে,
হাসিল মধুর হাসি নক্ষত্র নিচয় ;
শােভিল তাদের সম বারনারীচয়।
- -FATH=
* * - : ----.... ==-=-=
পরম যতনে বেঁধে কবরীরতন
কুসুমে সাজায় তায় অতি সুশােভন,
সুবৰ্ণ লেপন মাখি,
দর্পণ নিকটে রাখি,
পথ পাশ্বে সৌম্বােপরে অলিন্দ উপরে
উপবিষ্টা রূপাজীবা সস্মিত অধরে ।
কখন গম্ভীর ভাব করে প্রদর্শন,
কখন মধুর হাসি করে বরষণ,
কভু সুকুমার করে
যুবকে ইঙ্গিত করে,
বিফল প্রয়াসে কভু যাপে বিভাবরী,
নয়নের নীরে যায় বদন মাধুরী।
পুরােভাগে আলাে রাখি চিন্তায় মগন
কুসুম সৌরভ ঘ্রাণে আসে অলিগণ ;
মমাদক বিপণি জেনে
মক্ষিকা তাদের সনে
বদন মণ্ডলে যায় মধু আহরণে,
তাদেরে তাড়ায় রামা করের বীজনে।
অর্থ চিন্তা ছেদিতেছে আয়ুবৃন্ত হায় !
কুসুম কোরক বৃন্ত কাল-কীট প্রায়।
সুখের চিন্তায় রত
কি নিদ্রিত কি জাগ্রত ;
জাগ্রতে নয়ন মুদি নিদ্রিতের প্রায়
অনিবার সুখ চিন্তা করে হায় হায় !
নয়ন মুদিয়া কভু যােগিনীর প্রায়
চিন্তাপর চিত্তে থাকে বিলেপন গায়,
ললাটের স্বেদরসে
বিলেপন যায় ভেসে,
ছিন্ন-বন্ত কুসুমের কোরকের প্রায়
বিশুষ্ক শরীর কান্তি এবে দেখা যায় ।
বরাঙ্গে বিরাজে সদা সুচিকণ বাস,
অলঙ্কার শোভে অঙ্গে যথা চন্দ্রহাস,
চলিষ্ণু পথিক তায়
যদি কভু ফিরে চায়,
পরম আনন্দ রসে হয় নিমগন,
আকাশ কুসুম প্রায় করয়ে চিন্তন।
গভীর সাগর মাঝে তরণীর প্রায়
মানস দোদুল্যমান আশায় দোলায়।
আশার তরঙ্গাঘাতে
কভু স্বর্গ পায় হাতে,
যখন আশার আশা না হয় পূরণ,
গভীর বিষাদ নীরে হয় নিমগন ।
অর্থবতী রূপবতী থাকে সৌধােপরি,
প্রদোষে কভু বা ফেরে হয়-যান চড়ি,
অপরে নিবাস করে,
দ্বিতীয় নরকপুরে,
ভ্রমে সদা পথে পথে গেলে দিনমণি,
পথ প্রান্তে শ্রেণীবদ্ধ আসিলে যামিনী
পৰ্য্য উপরে কেহ কোমল শয়নে
কেহ পড়ি নিদ্রা যায় জীর্ণ আবরণে,
দেখিলেই বােধ হয়
রাণী ভিখারিণী প্রায়,
মনের ভিতরে কিন্তু সমদুখভাগী ;
মৰম যাতনা সম হৃদে আছে জাগি ।
৬১ সুখ অন্বেষণে ফেরে আজন্ম জীবনে, সুখ শব্দ মুখে-পড়ে অন্তিম শয়নে, ইহলীলা শেষ হ’ল সুখ সাধ না মিটিল, দাস দাসী সুসেবিত রতন-শালিনী, বিমল সুখের তারা তবু ভিখারিণী ! অগণ্য-পতিকা হয়ে পতির চিন্তায় কেহ সদা ম্রিয়মাণা আকুলিতা হায়! অকূল দুঃখ পাথারে ভাসাইয়া আপনারে নয়নের নীরে যাপে দিবস যামিনী, বিমল পবিত্র সুধু প্রেম ভিখারিণী। সতত বাসনা কারাে, সহ পরিজন- কুলের কামিনী হয়ে করে আলাপন, উদর অন্নের তরে যদি ভাও হয় করে, তাহেও উদ্যত রামা ভব বিরাগিণী, ' প্রভূত ধনের তবু নহে আকাক্ষিণী।
ফুল।
পবিত্র মিলন হায় কোথা পাবে আর,
সে পথ কণ্টকাকীর্ণ অগম্য অপার !
একমাত্র সদুপায়
নূতন জনম তায়,
যত দিন ইহলােকে জীবন তাহার,
ততদিন অনুতাপে দহে অনিবার।
কলাবতী নৃত্য গীতে সদা আমােদিত,
সুললিত বাক্যে করে মানস মােহিত,
স্বার্থ সিদ্ধি অভিলাষে
যাহা বলে, সে যে হাসে,
তাহে কি করিতে পারে প্রীতির সঞ্চার,
কেমনে তোষিবে বল মানস সবার ?
সুরা দেবী সহচরী বার বণিতার,
নির্ধতা চৌর্য্য মিথ্যা অনুগামী তার,
অসেব্য সেবনে তায়,
কত ক্লেশ দুঃখ হায় !
পরম নিগ্রহ শেষে অস্ত যাতনা,
গণিকার মায়া ফাদে কভু পা পেত না
প্রবাসীর স্মৃতি।
আবার হৃদয়ে কেন সে সুখ বিকাশ?
আবার মানসে কেন আশার বিভাস ?
অপার সে সুখ রাশি
দেখা দিল কেন আদি ?
সে সুখ ভাসিলে হয় দুখের সঞ্চার,
জাগিল সে ভাব রাশি হৃদয়ে আবার।
আহা সেই বিনােদিনী রূপের আধার,
সতত সুহাস ধন সম্বল যাহার,
যে চাঁদ মুখের কথা
সতত অমিয় মাখা,
প্রেম প্রীতি সরলতা ভূসণ যাহার,
কোমলতা কান্তি যার মাখন আকার,
সে আমার হৃদয়ের প্রতিমূর্তি খানি
কোথায় পড়িয়া আছে কিছুই না জানি,
বিরহ অনলে হায়
মনে কত ব্যথা পায়,
সতত আঁখির জলে ভাসে সে আমার,
কোথা আমি কোথা বা সে সকলি আঁধার ।
ফুল।
}"
কত দিন সে আমার বলেছিল হায়,
প্রাণধন প্রাণনাথ ছেড়াে না আমায়,
পৃথিবী প্রলয় জলে
কখনও ডুবে গেলে,
তোমায় আমায় সুখে র’ব চিরদিন,
মুহুর্ভেরে। তরে কভু নাহি হ’ব ভিন।
লতা সম তরুবরে ছিল জড়াইয়া,
বাঁধিয়া এ অভাগারে প্রেম ডাের দিয়া,
কত আশা করেছিল,
কত ভালবেসেছিল,
একে একে লেখা আছে হৃদয়ে আমার,
কোথা আমি কোথা বা সে সকলি আঁধার !
সতৃষ্ণ নয়নে অহা অঙ্কদেশে বসে
কত কথা বলেছিল মৃদু মৃদু ভাষে,
মনে মন মিলাইয়া,
গলে গলা মিশাইয়া,
কত গান গেয়েছিনু কত মত তানে,
মাঝে মাঝে তাল দিত গাঢ় আলিঙ্গনে।
ফুল।
প্রভাতে প্রদোষে মাের। উঠি সৌধোপরি
হেরিতাম প্রকৃতির ছবি কর ধরি ;
সে ভাব এখন হায়
সকলি বিগত প্রায়,
দেখিয়া সুনীলাকাশে তারার মালায়,
কত রসে কত ভাষে বলিত আমায়।
p
উপবন মাঝে হায় সমােবর নীরে
কত কেলি করেছি মাের ধীরে ধীরে,
কমল কুমুদ তুলে
সাজিয়ে দিতাম গলে,
দুই ফুল দুই কানে গলে মালা দিয়ে,
কেমন সাজাত আহা মন মিলাইয়ে।
করেছিনু কত খেলা কমল তুলিয়া,
না দিতাম যদি তারে, লইত কাড়িয়া ;
একটী করিলে চুরি,
দুইটী কোরক ধরি
‘পেয়েছি হারান ধন’ বলিনু যেমন,
বলে সে-হার’ল এক, দুটী ধর কেন ?
জীবনের আশা এবৈ পতির চরণে
উৎসৃজি, তাহারে সুধু করেছ আয়।
পতির কুশলে বাল। কুশলিনী হয়ে,
মন সুখে আলাপনে যাপ দিবা রাতি,
বিপদ ঝটিকা কভু সমুদিত হলে,
পতি সহ দুখ ভোগ কর অবিরাম।
প্রাণের মমতা ছাড়ি পতির অত্যয়ে
পার ছিড়িতে কভু প্রেমের বন্ধন,
শুষ্ক মুখী হয়ে কর তাহারে আশ্রয়--
যে দশা পায় লো তব প্রাণ-প্রিয়তম।
পতিরে উৎফুল্ল দেখি প্রফুল্ল অন্তরে
কুসুম কুন্তলে পরি সাজিয়া সুন্দরী,
তরুণি লতিকে ধরি নাথে জড়াইয়া,
অনিমেষে দেখ আহা তাহার বদন !
কুসুম-কুন্তলে লতে, প্রমােদিতা হয়ে
আমোদিত কর সবে সৌরভ বিস্তারে,
মধুর সৌরভ তব বাল্য সহচর
গন্ধবহ প্রচারণ করে জনে জনে।
বসিয়া চাঁদিনী রাতে প্রেমিক প্রেমিকা
সুশীতল শশিকর সুখে ভােগ করে,
কাল পেয়ে গন্ধবহ তােমার সৌরভ
বিকাশি তাদের কাছে সমাদর পায়।
অনাথা কুলের বালা শােকাকুলা হয়ে
পতিশােকে অবিরাম কাদে দিবা রাতি,
তােমার সৌরভ রাশি নাশিকায় পশি
মুহুর্তেকো তরে তার মুগ্ধ করে মন।
আবার কাহারও হৃদি উঠে উথলিয়া
নিৰ্বাপিত বিষাদের লহরী নিয়ে,
পতি সনে বসি রামা মনের উল্লাসে
পরিমলময় বায়ু করিত সেবন।
চিকুর শােভন তব কুসুম রতনে
বালক বালিকাগণ করিয়া চয়ন,
গলদেশে কবরীতে ধারণ করিয়া,
নিরন্তর ক্রীড়া পর হরষিত মনে।
ফলবতী হলে লতে অবনত মুখে
সন্তানের পরিপুষ্টি করহ সাধন,
ভােগ সুখ অভিলাষ সব পরিহরি
সন্তানের সুমঙ্গল সতত কামনা।
আবার কখন তুমি উৰ্দ্ধমুখী হয়ে
পরমেশে ভাব তার মহিমা ভাবিয়া,
অনন্ত ঈশের শক্তি অনন্ত মহিমা
প্রকট পবিত্র প্রেম প্রেমিকের মনে।
বিদায়।
সখা হে,
প্রাণে কত ভালবাসি কি দিয়া বুঝাব ।
পরাণের ব্যাকুলতা কেমনে জানাব।
দিন যায় রাত আসে
আমার হৃদয় সুধু আঁখিনীরে ভাসে।
তোমার বদন চাঁদ নিরখিব ব'লে
প্রাণ সখা ধরি পায়
দাও দেখা প্রাণ যায় ;
দিবানিশি ভাসি সদ। নয়নের জলে।
প্রাণ-শখা,
ভুলো না রাক্ষসী বলে এই অভাগীরে,
নিবা’ও না প্রেমদীপ হৃদয়মন্দিরে,
একবার দেখ চেয়ে,
একবার প্রাণনাথ
কাছে এসে কথা কয়ে,
দেখে যাও এ অভাগী
তােমা বিনা বেঁচে আছে কতই যাতনা সয়ে।
হয়েছি কঙ্কালসার রােগ শোকে হায় !
জনমের মত নাথ মাগিহে বিদায় !
হ’ওনা হ’ওনা সখা পাষাণ হৃদয় !
একবার দেখে যাও অন্তিম সময় ;
হায় আমি পাষাণী রাক্ষসী।
কিন্তু মনে কত ভালবাসি,
দিয়াছি কতই ক্লেশ কতই যাতনা,
তা বলে অন্তিম কালে
দয়া করে দেখা দিতে করাে না বঞ্চনা।
তুমি নাথ সরল হৃদয় ;
মজাইতে তােম। চাল,
এ তার। পাতিল ফাদ,
ফুল।
মায়াবিনী বসে থাকে চাহি সুসময়,
দিন নাই ক্ষণ নাই,
আশা-ঐ চাঁদ পাই ;
অবশেষে হলাে যবে বাসনা পূরণ,
বাদ সাধি বাধিলাম ও রাঙ্গা চরণ।
সখা হে তােমায়
করিয়াছি পথের ভিখারী ;
থাকি আমি রাজভােগে উচ্চ সৌধপরি ;
দিবে কি না পদাশ্রয়-সুধু সেই ভয়ে,
তােমারে করেছি দোষী নিদারুণ হয়ে।
হায়রে আমার
বিবিধ অমৃত রসে রসনা রসিছে,
নাথ হে তােমার
ক্ষুধায় আঁখি জলে হৃদয় ভাসিছে।
রাক্ষসীর সম মায়া করেছি বিস্তার,
তবে কেন রাক্ষসী হইয়া
বাসনা-দেবের সনে প্রেমের সঞ্চার ?
ছিলে যবে দেবের সমান,
কত মতে ভুলালাম পাপ প্রলােভনে ;
ফুল।
৩
ছাড়ালাম গৃহবাস,
পরালাম জীর্ণবাস
ভিজালাম আঁখিনীরে মলিন বসনে,
হা ধিক আমার এই পিশাচী জীবনে।
নাথ,
কি কষ্ট হৃদয়ে মম কেমনে জানাব ?
এত সুখে কিবা সুখ কেমনে দেখাব ?
কোমল শয়ন কণ্টকময়,
অমৃত অশন গরলময় ;
বাসনা--আর না থাকি ভবনে,
সুধু হে ভ্রমি হে তােমারি সনে।
সখা হে,
রসনার তৃপ্তিকর খাদ্য যবে পাই,
কেবল নয়ননীরে হৃদয় ভাসাই,
সুকোমল সুন্দর শয়নে
বড়ে হৃদয়ের জ্বালা ;
নিবাইতে তায়-
পড়ে থাকি সুশীতল মৃত্তিকা আসনে।
তােমার চরণে মাখা ধূলিরাশি লয়ে ,
জুড়াই প্রাণের জ্বালা মাখিয়ে হৃদয়ে।
৭৪
ফেলিয়া দিয়াছি যত রত্ন অলঙ্কার,
বঁধিয়াছি জটাজাল চামর চিকুরে,
ধূলি মাখি দূর করি রূপের বিস্তার,
জীর্ণবাসে ঢেকে রাখি এ পাপ শরীরে।
নখাঘাতে কলেবর ছিন্ন ভিন্ন করি,
তােমার বিরহে নাথ
সদাই বাসনা-পাপ প্রাণ পরিহরি।
সখা হে
ছিড়িয়া ফেলেছি যত সুন্দর বান,
ভেঙ্গেছি ললাটদেশ হানিয়া কঙ্কণ ;
সুধু কুলমান ভয়ে-লুকাইতে ক্ষত স্থান,
লুকাইতে ছিন্ন বাস,
লুকাইতে শােকশ্বাস,
কত মতে তারে কত করেছি ছলন।
সখা হে তোমার তরে
পায়ে ধরে কত তার করেছি সাধনা,
জানিয়েছি বিনা সেই, অন্যজনে জানিনা।
জীবন সঁপেছি যার পায়,
কেন বল কুল মান
বেঁধে রাখে শূন্য প্রাণ?
}
নাথ বলে সম্বােধিতে কেন ভয় পাই ?
কেন বা প্রাণের জ্বালা প্রাণেতে নিবাই ?
বড়ই সরম সখা হইতেছে মনে,
প্রাণনাথ বলে ডাকি তােমায় কেমনে ?
কি বলিয়া সম্বােধিব হে সখা তােমায় ?
বাৎসল্যের সরলতা
পতিপ্রেম কোমলতা
সতত মাখান আছে যে মধু কথায়,
কোথা পাব তায় ?
কি বলিয়া সম্ভাষিল তারা চন্দ্রমায় ?
বাহিরে বাৎসল্য ভাব কত দেখায়েছি,
অন্তরে পতির সম সদাই পূজেছি ।
সুখ আছে বা কোথায় ?
সৌধগৃহ রম্য স্থান,
সুরলােকে সুধা পান,
রত্নমালা বিভূষণ, সুগন্ধি লেপন,
সুখ নাহিক তথায়,
সুখ লুঠে তব পায়।
ফুল।
তাপিত হৃদয়ে যদি ওই পদ পাই,
অতুল স্বর্গের সুখ কভু নাহি চাই।
কি লজ্জা! কেমনে হয়
পাষাণহৃদয় বলি তােমা হেন জনে !
যিনি সরলতা ময়,
কোমলতা যার হৃদি অলঙ্কার,
কেমনে তাহারে বলি পাষাণহৃদয় ।
সহিয়াছ কত দুঃখরাশি,
গিয়াছে সে চাদ বদনের হাসি,
সহে যে এতই ক্লেশ সে কি শিলা নয় ?
দাও নাথ প্রতিশােধ সুখী হব মনে।
কুসুম সুগন্ধরাশি পশি নাসিকায়,
ক্ষণে ক্ষণে অচেতন করেছে আমায় !
সেই সে বসিয়া তুমি,
তােমার চরণে আমি
বসিয়া ফুলের ঘ্রাণে মােহিয়াছি প্রাণ,
সেই সে মধুর ভাষে জুড়ায়েছি কান ;
মনে হলে সেই ভাব,
সেই কথা মধু মাখা;
৭৭
সেই মিটি মিটি দেখা,
হৃদয় জ্বলিয়া যায় বিষাদ দহনে ;
বল জুড়াই কেমনে ?
নাথ একিহে দেখিহে।
কেন চাঁদ রক্তময়।
ওই আসে গ্রাসিতে আমায় !
কেন করে অনল বর্ষণ !
জ্বলে গেল প্রাণ, নাথ কর নিবারণ
ওকি সেই শশী ?
তােমায় আমায় যবে ছিলাম বসিয়া,
তুষিত সতত যেই শীত কর দিয়া।
।
আগুন! আগুন ! সখা, সকলি আগুন।
ওই যে অনিল বয়,
ওই যে আলােক রয়,
ওই যে জ্ঞানের ছায়া সকলি আগুন !
তিমিরে স্নিগ্ধতা আছে,
অজ্ঞানে শীততা আছে,
করুক এ পাপ প্রাণ তিমির আশ্রয় !
হউক এ পােড়া প্রাণ অজ্ঞানতা ময় ।
বিলম্ব নাহিক আর হয়েছে সময় !
একবার প্রাণনাথ হওহে সদয় ;
একবার কাছে নিয়ে,
চরণের ধূলি দিয়ে,
একবার ম্লানমুখে হেসে কথা কও,
একবার সখী বলে কোলে তুলে লও;
রােগে শােকে হয়েছি অবশ্য,
একবার দেখে যাও দশ ;
চলিতে শকতি নাই, চোকে না দেখিতে পাই,
মুখে নাহি সরে ভাষ, মৃদু মৃদু বহে শ্বাস ।
এজনমে চলিলাম ছাড়িয়া তােমায় !
জনমের মত নাথ দাওহে বিদায় !
ভেবেছিনু চিরদিন তােমায় আমায়
থাকিব এ ভবধামে চিরসুখী হয়ে,
দুঃখের কুটী কভু ফেলিতে না দিব
তােমার সে সুকুমার সরল হৃদয়ে ;
কত আশা প্রাণে বেঁধেছিনু,
কত দিন মনে ভেবে ছিনু,
চিরদাসী হয়ে পদ সেবি তােমার,
দাসী বলে সমাদর করিবে আমার।
ফুল।
৭১
সে আশা ডুবিল সব যমের উদরে !
• চলিলাম মহাপথে চিরদিন তরে।
অন্তিমের এই নিবেদন --
যাই আমি ছাড়িয়া ভুবন,
ছাড়িয়া জীবন তােমাধন ;
ফেলােনা ফেলােনা নীর কমল নয়নে,
দিওনা দিওনা ব্যথা ও সরল মনে।
আবার জনম যদি হয়,
যেন পতি পাই তােমায় সে সময় ।
আবার আনন্দে জীবন ভাসাব,
আবার প্রেমেতে পরাণ মাতাব !
ফুল।
প্রেম সঙ্গীত।
(প্রিয়ে) কেনরে দাও আশা জ্বালাতে ?
(যদি) না পার বিরহানল বল নিতে।
প্রতীচী ললাটে ঘন সঞ্চরে,
আমােদী চাতক কত অন্তরে,
উড়িল ঘন সে, চাতকে কাদাতে।
যখন এলােরে নয়ন পথে,
পলাও তখনি, বিরহ মথে,
দারুণ যাতনা পারি না সহিতে।
অবলা সরলা তােমারে বলে,
তুমি প্রাণসখি পূর্ণ। গরলে,
আমিরে চাইরে চাওনা চাইতে ।
সুধুরে নয়নে হেরিব তােরে,
আর না বাসনা মম অন্তরে,
দেখা’ও বদন অভাগা জুড়াতে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.