Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah

Mahanagar Ed.1

Mitra, Premendra · 2010/04/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Aadan

No text on this page.

মহানগর
প্রেমেন্দ্র মিত্র
১n

প্রথম সংস্করণ
আষাঢ়, ১৩৫০
দাম—দেড় টাকা
পূর্বাশা প্রেস পি১৩ গণেশচন্দ্র এভ্যি, কলিকাতা
হইতে সত্যসন্ন দত্ত কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত

মহানগর
অরণ্য-পথ
দুর্লঙ্ঘ্য
মুহূর্ত
জনৈক কাপুরুষের কাহিনী
নতুন বাস।

No text on this page.

মহানগর আমার সঙ্গে চল মহানগরে,-যে মহানগর ছড়িয়ে আছে আকাশের তলায় পৃথিবীর ক্ষতের মত, আবার যে মহানগর উঠেছে মিনারে আর চূডয, অভ্রভেদী প্রাসাদ-শিখরে তারাদের দিকে, প্রার্থনার মত মানবাত্মার। আমার সঙ্গে এস মহানগরের পথে, যে পথ জটীল, দুর্বল মানুষের জীবনধারার মত, যে পথ অন্ধকার, মানুষের মনের অরণ্যের মত, আর যে পথ প্রশস্ত, আলােকোজ্জল, মানুষের বদ্ধি, মানুষের অদম্য উৎসাহের মত । এ মহানগরের সঙ্গীত রচনা করা উচিত, ভয়াবহ, বিস্ময়কর সঙ্গীত। তার পটভূমিতে যন্ত্রের নির্ঘোষ, উৰ্দ্ধমুখ কলের শঙ্খনাদ, সমস্ত পথের সমস্ত চাকার ঘর্ধব, শিকলের ঝনৎকার–ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সতঘর্ষের আর্তনাদ। শব্দের এই পটভূমির ওপর দিয়ে চলেছে বিসর্পিল সুরের পথ , প্রিয়ার মত যে নদী যে আছে মহানগরের কোলে, তার জলের ঢেউযেব সুব, আর নগরেব ছায়াবীথির ওপর দিয়ে যে হাওয়া বয় তার, নির্জন ঘরে প্রেমিকেরা অর্ধস্ফুট যে কথা বলে তারে। সঙ্গীতের মাঝে থাকবে উত্তেজিত জনতার সম্মিলিত পদধ্বনি,শব্দের বন্যার মত , আর থাকবে ক্লান্ত পথিকের পথের ওপর দিয়ে পা টেনে নিয়ে যাওযার আওযাজ, মধ্য রাত্রে যে পথিক চলেছে অনির্দিষ্ট আমের খোজে।

মহানগর কঠিন ধাতু ও ইটের ফ্রেমে লক্ষ জীবনের সূত্র নিযে মহানগর বুনছে যে বিশাল সূচিচিত্র, যেখানে খেই যাচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে, উঠছে জড়িয়ে নতুন সূততার সঙ্গে অকস্মাৎ,-সহসা যাচ্ছে ছিডে--সেই বিশাল দুর্বোধ চিত্রের অনুবাদ থাকবে সে সঙ্গীতে । এ সঙ্গীত রচনা করার শক্তি আমার নেই। আমি শুধু মহানগরের একটুখানি গল্প বলতে পারি-মহানগরের মহাকাব্যের একটুখানি ভগ্নাংশ, তার কাহিনী সমুদ্রের দু’একটি ঢেউ। মহাসঙ্গীতের স্বাদ তাতে মিলবে না, তৃষ্ণা তাতে মেটাবাব নষ,—জানি। সঙ্কুচিত আড়ষ্টভাবে নদীব যে শাখাটি ঢুকেছে নগরের ভেতর, তারই অগভীব জলের মন্থর স্রোতে ভেসে আমরা গিযে উঠব নডালেব পােলের তলায় ফুটন্ত কদম গাছের নিশান-দেওয়া সেই পুরান পােণা আমবা পেরিয়ে যাব পুবান সব ভাঙাঘাট, পেরিয়ে যাব ন্যাড়া- শিবের মন্দির, পেরিয়ে যাব ইটখােলা আর চালের আড়ৎ, কেঠোকাটি আর পাজাকরা টালি ও ইট আর সুরকি বালির গােলা। চলেছি পােণার নৌকায়। আমাদের নৌকাব থােলে টইটম্বুর জল আর তাতে কিলবিল করছে মাছের ছানা। সেই পােণার চারা বিক্রী হবে কুণকে হিসাবে পােণাঘাটে। আষাঢ় মাসের ভাের বেলা। বৃষ্টি নেই, কিন্তু আকাশ মেঘে ঢাকা। সুৰ্য হয়ত উঠেছে পূবের বাঁকা নগর-শিখর-রেখার পেছনে, আমরা পেয়েছি মাত্র মেঘ থেকে চোয়ান স্তিমিত একটু আলাে। সে আলােয় এদিকের দরিদ্র সহরতলীকে আরো যেন জীর্ণ দেখাচ্ছে। ভাঙাঘাটে এখনও মানে বড় কেউ আসে নি, গােলাগুলি ঘটে। অামরা মহানগর ৩ বড় ফাকা, ধানের আডতের ধারে শূন্য সব শালতি বাঁধা। সব খা খা করছে। জোয়ারের টানে ভেসে চলেছে নৌকা। মাঝিরা বড় নদীতে বরাবর এসেছিল দাড টেনে। এখন তারা ছইএর ভেতর একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে। শুধু হালে বসে আছে মুকুল, আর তার কাছে কখন থেকে চুপটি করে গিয়ে বসেছে যে রতন তা কেউ জানে না,—সেই বুঝি রাত পােহাতেই। নৌকা তখন মাঝ নদীতে। বাদল রাতে আকাশে ছিল না তারা। রতনের মনে হয়েছে সক তারা যেন নেমেছে জলের ওপর। নদী তখন মহানগরের নাগাল পেয়েছে , দুধারে জাহাজ আর ষ্টীমার, গাধাবােট আর বড় কারখানার সব জেটি। অন্ধকারে তাদের রূপ দেখা যায় না, দেখা যায় শুধু গাযে আলাের ফোটা, অগুন্তি ফোটা, কালো জলের এপার থেকে ওপারে। মেঘলা আকাশ ছেড়ে তারাগুলিই ত’ নেমেছে নদীর ওপর। বতন ভয়ে ভযে এসে বসেছে নিঃসাড়ে হালের কাছে। কে জানে বাবা বকবে কিনা? হয়ত ধমকে আবার দেবে পাঠিয়ে ছইএর ভেতর। কিন্তু সে কি থাকতে পারে এমন সময় ছইএর ভেতর,নৌকা যখন পেযেছে মহানগরের নাগাল, আকারে তারা যখন জলের ওপর নেমেছে। তার যে কত দিনের সাধ, কত দিনের স্বপ্ন। রতন দুচোখ দিয়ে পান করেছে আলাে ছিটান এই নগরেব অন্ধকার আর নিঃশ্বাস পৰ্যন্ত ফেলেছে সাবধানে, পাছে বাবা টের পায়, পাছে দেয় তাকে ধমকে ভেতরে পাঠিয়ে। কিছুই ত বিশ্বাস নেই। বাবা ত তাকে আনতেই চায়নি বাড়ী থেকে। ছেলেমানুষ আবার সহরে যায় নাকি!

মহানগর আর নৌকায় এতখানি পথ যাওয়া কি সােজা কথা। কি করবে সে সেখানে গিয়ে ? কত কাকুতি মিনতি করে, কেঁদে কেটে, না রতন শেষ পৰ্য্যন্ত বাবাকে নিমরাজী করিয়েছে। তবু নৌকায় তুলে বাবা তাকে শাসিয়ে দিয়েছে, খবরদার, পথে দুষ্টুমি করলে আর রক্ষা থাকবে না। , দুষ্টুমি সে করবে না, কাউকে বিরক্তও না। তাকে যা বলা হবে তাই করতে সে রাজী। সে শুধু একবার সহর দেখতে চায়—রূপকথার গল্পের চেয়ে অদ্ভুত সেই সহর। কিন্তু শুধু তাই জন্যে কি সহরে আসবার এই ব্যাকুলতা রতনের ? আচ্ছা সে কথা এখন থাক। কিন্তু রতনকে কেউ লক্ষ্য করে না, কিম্বা লক্ষ্য করেও কেয়ার করে । রতন বসে আছে নিঃসাডে, শুধু সমস্ত দেহের রেখায় ফুটে উঠেছে তার ব্যর্থতার প্রখরতা। ধীরে ধীরে অন্ধকার এল ফিকে হয়ে । এবার নদী রেখায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথম ছিল চারিধারে আবছা কুয়াসা। প্রকৃতিব পটের ওপর যেন রঙের এলােমলাে ছােপ, কোথাও একটু ঘন, কোথাও হালকা, সে রঙের ছােপ তখনও নির্দিষ্ট রূপ দেয়নি। নীহারিকার মত আকারহীন সেই অস্পষ্ট ধোয়াটে তরলতা থেকে রতনের চোখের ওপরেই কে যেন এই মাত্র নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করে তুলছে। আকাশের গায়ে কালাে খানিকটা তুলির পোচ দেখতে দেখতে হয়ে উঠল প্রকাণ্ড একটা জাহাজ, তার জটিল মাস্তুলগুলি উঠেছে ছােঠখাটো অরণ্যের মত মেঘলা আকাশে, তার নােঙরের শেকল নেমেছে অতিকায় অজগরের মত জলের ভেতর। রতনদের নৌকা যে দানবের ভ্রুকুটির তলা দিয়ে ভয়ে ভয়ে পার হয়ে যায় ছােট শােলার খেলনার মত। জলের আরেক মহানগর বারে বিছান ছিল খানিকটা তরল গাঢ় রঙের কুয়াশা। সে কুয়াশা জমাট বেঁধে হয়ে গেল অনেকগুলাে গাধা-বােটের জটলা-একটি জেটির চারিধারে তারা ভীড় করে আছে। দূর থেকে মনে হয় ওরা যেন কোন বিশাল জলচরের শাবক—মাযের কোল ঘেসে তাল পাকিযে আছে ঘুমিযে। নদীব ওপরকার পর্দা আরো গেল সরে। কারখানার বিশাল সব দেহ উঠল জেগে নদীর দুপারে। জলের ওপর তাদের লৌহ-বাহু তারা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঁধান পাড় থেকে বড় বড় ক্রেন উঠেছে গলা বাডিযে, দুই তীরে সদাগৰী জাহাজের আশে পাশে জেলে ডিঙ্গি আর খেয়া নৌকা, ষ্টীমার আর লঞ্চ ভীড় করে আছে। এই মহানগর । ভয়ে বিশ্বযে ব্যাকুলতায় অভিভূত হযে রতন প্রথম তার রূপ দেখলে। তারপর তাদের নৌকা বাঁক নিয়ে ঢুকেছে এই শাখার ভেতর, চলেছে পুবাণণা সহরতলীর ভেতর দিয়ে। বড় নদীতে মহানগরের রূপ দেখে রতন সত্যি ভয় পেয়েছিল, হতাশ হয়েছিল আরাে বেশী। কিন্তু এই পুরান জীর্ণ শহরতলি দেখে তার যেন একটু আশা হয় । কেন আশা হয় ? আচ্ছা সে কথা এখন থাক। আগে নদীর আরেকটা বাঁক ঘুবেই দেখা যায নডালের পােল। থাকতে পাের সব নৌকা এসে জুটেছে পােণাঘাটে। মুকুন্দ হক দিযে এবার সবাইকে তােলে। লক্ষ্মণ উঠে তার কুণকে ঠিক করে। মাঝিরা গা মােডা দিয়ে ওঠে। আর রতন বসে থাকে উত্তেজনায় মহানগর আদায় করতে। উদগ্রীব হয়ে। আর চাপা দুটি পাতলা ঘােট ঠোটের নীচে কি সঙ্কল্প আছে, জানে কি কেউ? বড বড দুটি চোখে তার কিসের ব্যগ্রতা ? শুধু সহর দেখার কৌতূহল ত এ নয়! কিন্তু সে কথা এখনাে থাক। পােণাঘাটে এসে নৌকা লাগে। পােণাঘাটে আর জায়গা কই ডাবার। এরই মধ্যে মাটির হাঁড়ি দুধারে ঝুলিয়ে ভারীরা এসেছে দূর দূরান্তর থেকে পােণার চারা নিয়ে যেতে। তাদের ভীডের ভেতর পাডের কাদার ওপর কারা দোকান পেতে বসেছে পান বিডি আর তেলেভাজা খাবারেব। সরকারী লােকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে পাওনা দালালেরা ঘুরছে হাক ডাক করে। পাডে আর জায়গা নেই, তবু মুকুন্দদাসের খাস নৌকার একটু নােঙর ফেলবার ঠাই মেলে। মুকুন্দ ত আর যে সে লােক নয়। বর্ষার কটা মাসে তার গোটা ছয়েক পােণার নৌকা আনাগােনা করে এই পথে। মাঝিরা এব মধ্যেই নৌকার খােল থেকে জল ঘেঁচে ফেলতে সুরু করছে একটু-আধটু। লক্ষ্মণ কুণকে পরখ করছে—মাছ মেপে দেবার সময় খানিকটা জল রেখে হাত সাফাই করতে সে ওস্তাদ। মুকুন্দদাস নৌকো থেকে জলে নেমে ডাঙ্গায় ওঠে। পেছন দিকে হঠাৎ চোখ পড়ায় ধমক দিয়ে বলে,-“তুই নালি যে বড়।” রতন বাবার দিকে কাতরভাবে তাকায়। মুকুন্দ একটু নরম হয়ে বলে,-“আচ্ছা কোথাও যাসনি যেন, ওই কদম গাছের তলায় দাঁড়াগে যা।” রতন তাই করে। কদম গাছ থেকে অসংখ্য ফোটা ফুল ঝরে = মহানগর পডেছে মাটিতে। কাদা মানুষের পায়ের চাপে রেণুগুলাে খেলে নােংরা হয়ে গেছে। পােণা-চারার হাটে কদম ফুলের কদর নেই। বতনের চাবিধাবে হট্টগােল । “চাপড়াও না হে, নইলে বাড়ী গিযে মাছচচ্চডি খেতে হবে যে ” “একটা নতুন হাঁডিও জোটেনি। ভাতেব তিজেলটাই এনেছ বুঝি টেনে। তাবপর মাছ যখন ঘেমে উঠবে তখন হবে দালাল বেটার দোষ।” ভাবীরা কেউ এসেছে খালি হাঁড়ি নিযে, কারুর কেনা প্রায় সাত হ'ল। বসে বসে বা হাঁডির জল চাপড়ায, মবা মাছ ঘেঁকে ফেলে। নদীর ধারের কাদা মা মাছ আর কদম বেণু মিশে গেছে। রতন কিন্তু কদমতলায় বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে না। এখানে থাকবার জন্যে কাকুতি-মিনতি করে সে ত সহরে আসেনি। সারাপথ সে মনের কথা মনেই চেপে এসেছে। মুখ ফুটে একবার বুঝি লক্ষ্মণকে গােপনে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করেছিল,-“হ্যা কাকা পােণাঘাটের কাছেই উন্টোডিঙি না?” লক্ষ্মণ কাকা হেসে বলেছে—“দূর পাগলা, উল্টোডিঙি কি সেথা। সে হল কতদূর।” তার পর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছে—“কেনরে, উন্টোডিঙির খোঁজ কেন? উল্টোডিঙির নাম তুই শুনলি কোথা ?” কিন্তু রতন তারপর একেবারে চুপ। তার পেটের কথা বার করে কার সাধ্য। কদমতলায় দাড়িয়ে উৎসুকভাবে রতন চারিদিকে তাকায়। তার বাবা কাজে ব্যস্ত, রতন এক সময়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তাষ। কাউকে

৮
মহানগর
কিছু জিজ্ঞাসা করতে এখানে তার সাহস হয় না। একটা দিক
খেয়ালমত ধরে সে এগিয়ে যায়।
মহানগরের বিশাল অবণ্যে কত মানুষ আসে কত কিছু
খােজে ,কেউ অর্থ, কেউ যশ, কেউ উত্তেজনা কেউ বা বিস্মৃতি।
মৃত্তিকার স্নেহের মত শ্যামল একটি অসহায় ছেলে সেখানে এসেছে
কিসের খােজে ? এই অরণ্যে নিজেব আকাঙ্ক্ষিতকে সে খুঁজে পাবার
আশা রাখে—ভাব দুঃসাহস ত কম নয়।
অনেক দূর গিযে বতন সাহস কবে একজনকে পথ জিজ্ঞাসা কবে।
লােকটি অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়, বলে,—“এত অন্য দিকে
এসেছে ভাই, উল্টোডিঙি ওইদিকে, আর সে ত’ অনেক দূর ।”
-অনেক দূর। তা’ হােক, অনেক দূরকে বতন ভয় করে না।
রতন অন্যদিকে ফেরে। লােকটি
লােকটি কি ভেবে তাকে জিজ্ঞাসা করে,
“তুমি একলা যাচ্ছ অতদূর। তােমার সঙ্গে কেউ নেই ?”
রতন সঙ্কুচিত ভাবে বলে,-“না।”
লােকটির কি মনে হয়, একটু শক্ত হযেই জিজ্ঞাসা কবে—“বাড়ী
থেকে পালিযে যাচ্ছ না ত ? উল্টোডিঙিতে কাব কাছে যাচ্ছ?”
রতন ভয়ে ভয়ে বলে ফেলে—“সেখানে আমার দিদি থাকে।”
তারপর তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে যায়। লােকটা যদি আবো
কিছু জিজ্ঞাসা করে, যদি ধরে নিয়ে যায় আবার তার বাবার কাছে।
তাহলে এবার বলি। রতন এসেছে দিদিকে খুঁজতে। যেখানে
মানুষ নিজের আত্মাকে হারিযে খুঁজে পায় না, নেই মহানগর থেকে
তার দিদিকে সে খুঁজে বার করবে। সহর মানে তার দিদি।

মহানগর
বাড়ীতে থাকতে সে ভেবেছে সহরে গেলেই বুঝি দিদিকে পাওয়া যাষ।
মহানগরেব বিরাট রূপ তার সে ধারণাকে উপহাস করেছে , কিন্তু তবু,
সে হতাশ হয় নি। দিদিকে খুজে সে পাবেই।
শিশু-হৃদযের
বিশ্বাসের কি সীমা আছে '
কিন্তু দিদিকে খোঁজার কথা ত কাউকে বলতে নেই। দিদির নাম
করাও যে বাড়ীতে মানা, তাকি সে জানে না। অনুচ্চারিত কোন
নিষেধ তাব শিশুমনের ব্যাকুলতাকে মূক কবে রেখে দেয় ।
তাই সে সারা পথ এসেছে মনের কথা মনে চেপে। তাই সে একা
বেরিযেছে দিদিব সন্ধানে।
দিদিকে যে তা খুঁজে বার করতেই হবে। দিদি না হলে তাব
যে কিছু ভালাে লাগে না। (
ছেলে বেলা থেকে সে ত’ মাকে দেখে নি,
জেনেছে শুধু দিদিকে। দিদি তার মা, দিদিই তার খেলার সাথী।
বিয়ে হযে দিদি গেছল শ্বশুরবাড়ী। তবুও তাদের ছাড়াছাড়ি হয় নি।
কাছাকাছি দু’টি গাঁ, রতন নিজেই যখন তখন পালিয়ে গিয়ে হাজির
হযেছে দিদির কাছে। তারপর দিদির কাছ থেকে তাকে নিয়ে আসা
সােজা ব্যাপার নয়। দিদি যেখানে থাকতে পারে দিনের পর দিন,
সেখানে তার বেশী দিন থাকা কেন যে দোষের তা সে কেমন করে
বুঝবে!
তারপর কি হল কে জানে। একদিন তাদের বাড়ীতে বিষম
গণ্ডগােল। দিদির শ্বশুরবাড়ী থেকে লােক এসেছে ভীড় করে, ভীড়
করে এসেছে গাঁয়ের লােক। খান থেকে চৌকিদার পর্যন্ত এসেছে।
ছেলমানুষ বলে তাকে কেউ কাছে ঘেসতে দেয় না।

মহানগর
শুনেছে—দিদিকে কারা নাকি ধরে নিয়ে গেছে। তাকে আবার
কেডে আনতেই ত হয়। কেন যে কেউ যাচ্ছে না তাই ভেবে তার
বাগ হয়েছে।
তার পর সে আরো কিছু শুনেছে , শিশুব মন অনেক
বেশী সজাগ। দিদিকে কোথায় ধবে নিয়ে গেছে কেউ নাকি
জানে না।
এইবাব সে কেঁদেছে। কে জানে কারা নিয়ে গেছে দিদিকে ধরে।
তারা হয়ত দিদিকে মারছে, হযত দিচ্ছে না খেতে। দিদি হত
বতনকে দেখবার জন্য কাদছে। একথা ভেবে তার যেন আরও কান্না
পায়।
বাকা তাকে আদর করেছেন কান্না দেখে। মাথায় হাত বুলিয়ে
বলেছেন—“কান্না কেন বাবা?”
চুপি চুপি রতন বলেছে, “দিদি যে আসছে না বাবা।
মুকুন্দ শিশুর সজাগ মনের রহস্য না জেনে বলেছে,-“আসবে বৈকি
বাবা, শ্বশুর বাড়ী থেকে কি রােজ রােজ আসতে আছে।”
রতন আর কিছু বলে নি। কিন্তু বাবা তার কাছে কেন লুকোতে
চান বুঝতে না পেরে তার বড় ভয় হয়েছে ।
তাবপব একদিন সে শুনেছে যে দিদিকে নাকি পাওয়া গেছে।
দারােগা সাহেব, পুলিশ নিয়ে গিয়ে তাকে নাকি কোন দূবদেশ থেকে
খুঁজে বার করেছেন। দিদিকে খুঁজে পাওয়া গেছে। রতনের আনন্দ
আর ধরে না। দিদি এতদিন বাদে তাহলে আসছে।
কিন্তু কোথায় দিদি। একদিন, দুদিন, ব্যাকুল ভাবে রতন অপেক্ষা
করে, কিন্তু দিদি আসে না। দিদিকে ফিরে পাওয়া গেছে, তবু দিদি

মহানগর কেন আসে না রতন বুঝতে পারে না। দিদির ওপরই তার রাগ হয়। কতদিন রতন তাকে দেখেনি কি তার মনে নেই। দিদি নিজে চলে আসতে পারে না? আর বাবাই বা কেমন, দিদিকে নিয়ে আসছে না কেন? বতনেব সকলের ওপর অভিমান হযেছে। হয়ত দিদি চুপি চুপি শ্বশুরবাড়ী গেছে ভেবে একদিন সকালে রতন সেখানে গিয়ে হাজির হয়। কিন্তু সেখানে ত দিদি নেই। সেখানে কেউ তার সঙ্গে ভাল কবে কথাবার্তা পয্যন্ত কয় না , দাদাবাবু তাকে দেখতে পেযেও দূর থেকে না ডেকে চলে যান। মুখখানি কঁাদ কঁদ কবে রতন সেদিন বাড়ী ফিবে এসেছে। ফিরে এসে বাবার কাছে কেঁদে সে আব্দাব করেছে—“দিদিকে আনছ না কেন বাবা?” সেইদিন মুকুন্দ তাকে ধমকে দিয়েছে। তারপর থেকে দিদি আর আসে নি। দিদি আসে নি। দিদি নাকি আর আসবে না। কিন্তু রতন মনে মনে জানে, তাকে কেউ ডাকতে যায় নি বলেই অভিমান করে দিদি আসে নি রতন যে জানে না দিদি কোথায় থাকে, না হলে সে নিজেই গিয়ে দিদিকে ডেকে আনত। কিন্তু কেমন করে সে জানবে দিদি কোথায় আছে। কেউ যে তাকে দিদির কথা বলে না। দিদির কথাই যে বলতে নেই। রাত্রে সে চুপি চুপি শুধু দিদির জন্যে কাঁদে, দিদি কেমন করে তাকে ভুলে আছে ভেবে মনে মনে তার সঙ্গে ঝগড়া করে। দিদি কোথায় থাকে সে জানে না।

মহানগর কিন্তু শিশুর মন আমরা যা মনে করি তার চেয়ে অনেক বেশী সজাগ। শিশু অনেক কিছু শুনতে পায়, অনেক কিছু বোঝে। কোথা থেকে সে শুনেছে কে জানে, যে, দিদি থাকে সহরে, -রূপকথার চেয়ে অদ্ভুত সেই সহর। কোথা থেকে কার মুখে শুনেছে—উটোডিঙ্গির নাম। বাতাসে কথা ভেসে আসে, বিনিদ্র ভালবাসা কান পেতে থাকে, শুনতে পায়। তাই সে কাকুতি-মিনতি করে এসেছে মহানগবে, তাই সে চলেছে সন্ধানে। দিদিকে সে খুঁজে বার করবে, সে জানে দিদির সামনে একবার গিয়ে দাড়ালে সে আর না এসে থাকতে কিছুতেই পারবে না। এমনি গভীর তার বিশ্বাস। রতনকে আমরা এখানে ছেড়ে দিতে পাবি। মহানগরে অনেকেই আসে অনেক কিছুর খােজে, কেউ অর্থ, কেউ যশ, কেউ উত্তেজনা, কেউ বিশ্বতি, কেউ আরো বড় কিছু। সবাই কি পাষ? পথের অরণ্যে তাব হাবিয়ে যায় । মহানগর তাদের চিহ্ন দেয় মুছে। রতনও তেমি যাবে হাবিয়ে ভেবে আমরা তাকে ছেড়ে দিতে পারি । কিন্তু তা যাবে না। পৃথিবীতে কি সম্ভব কি অসম্ভব কে বলতে পারে ? রতন সত্যি দিদির খোঁজ পায়। দুপুর তখন গড়িয়ে গেছে বিকেলের দিকে। আষাঢ় মাসের আকাশ, মেঘে ঢাকা বলে বেলা বােঝা যায় না। ক্লান্তপদে শুকনাে কাতব মুখে একটি ছেলে গিয়ে পাড়ায় ভােলায় ছাওয়া একটি মেটে বাড়ীর দরজায়। একটি মেয়ে তাকে রাস্তা থেকে এনেছে সদে করে।

মহানগর
রতন অনেক পথ ঘুরেছে, অনেককে জিজ্ঞাসা করেছে পথ, শেষে
সে সন্ধান পেয়েছে। ভালবাসা কি না পারে।
খানিক আগে হায়রাণ হয়ে খোঁজ কবতে করতে রতন দূরে একটি
মেয়েকে দেখতে পায়, উৎসাহভরে সে চীৎকার করে ডাকে—“দিদি।”
মেয়েটি ফিরে দাড়াতেই রতন হতাশ হয়ে যায়। তার দিদি ত
অমন নষ। কুণ্ঠিত ভাবে সে অন্য দিকে চলে যাবার চেষ্টা করে।
মেয়েটি তাকে ডেকে বলে—“শােন”।
কাছে গেলে তার ক্লান্ত শুনাে মুখেব দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করে
কাকে খুঁজছ ভাই?”
রতন লজ্জিত ভাবে তার দিদির নাম বলে। মেযেটি হেসে
বলে—“তােমার দিদির বাড়ী বুঝি চেন না, চল আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
মেটে বাড়ীর দরজায় দাডিযে এখন মেয়েটি ডাকে—“ও চপলা
তােকে খুঁজতে কে এসেছে দেখে যা।”
ভেতর থেকে চপলাই বুঝি রুক্ষ স্বরে বলে—“কে আবার এল এখন?”
“দেখেই যা না একবার।”
চপলা দরজার কাছে এসে থমকে দাড়ায়। রতনের মুখেও কথা
ফোটে না। দিদিকে চিনতেই তার কষ্ট হয়। দিদি যেন কেমন হয়ে
গেছে।
দুইজনেই খানিকক্ষণ থাকে নিষ্পন্ন হয়ে দাড়িয়ে। যে মেয়েটি
রতনকে সঙ্গে করে এনেছে সে একটু সন্দিগ্ধ হয়ে বলে,—“তাের নাম
করে খুজছিল, তাই তাের ভাই ভেবে বাড়ী দেখাতে নিয়ে এলাম।
তাের তাই নয় ?”

১৫
মহানগর
উত্তর না দিয়া চপলা হঠাৎ ছুটে এসে রতনকে বুকে চেপে ধরে,
তারপর এদিক ওদিক চেয়ে অবাক হয়ে ধরা গলায় বলে,-“তুই একা
এসেছিস।”
রতন দিদির বুকে মুখ লুকিয়ে থাকে, কিছু বলে না।
মহানগরের পথে ধূলো, আকাশে ধোয়া, বাতাসে বুঝি বিষ ।
আমাদের আশা এখানে কখন কখন পূর্ণ হয়। যা খুজি তা মেলে।
তবু বহুদিনের কামনার ফলও কেমন একটু বিস্বাদ লাগে। মহানগর
সবকিছুকে দাগী করে দেয়, সার্থকতাকেও দেয় একটু বিষিয়ে ।
চপলা রতনকে ঘরে নিয়ে যায়। সে ঘর দেখে রতন অবাক |
মাটির ঘর এমন করে সাজান হতে পারে, এত সুন্দর জিনিষ সেখানে
থাকতে পারে রতন তা কেমন করে জানবে ? এত জিনিষ দেখে সে
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে প্রথম,—“এসব তােমার দিদি ?”
চপলার অকারণ চোখের জল তখনও শুকোয়নি, একটু হেসে সে
বলে-“হ্যা ভাই।”
কিন্তু দিদির ঘর যেমনই হােক তা নিয়ে মেতে থাকলে চলবে না
ত। আসল কথা রতন ভােলেনি। সে হঠাৎ বলে—তােমায় কিন্তু
বাড়ী যেতে হবে দিদি।
চপলা বুঝি একটু চমকে ওঠে তারপর ম্লান ভাবে বলে—“আচ্ছা
যাব ভাই, এখন ত তুই একটু জিরিয়ে নে।”
“কিন্তু জিরিয়ে নিয়েই যেতে হবে। আমাদের নৌকা কাল
সকালেই ছাড়বে কিনা। এসব জিনিষ কেমন করে নেব দিদি?”
এবার চপলা চুপ করে থাকে।

মহানগর
*এসব
হঠাৎ কেন বলা যায় না একটু ভীত হয়ে রতন জিজ্ঞাসা করে-
“একটু জিরিয়ে নিয়েই যাবে ত দিদি ?”
দিদির মুখে তবু কথা নেই। দিদি জিনিষপত্র নিয়ে যাবার
ভাবনাতেই হয় ত রাজী হচ্ছে না ভেবে রতন তাড়াতাড়ি বলে-
জিনিষ একটা গরুব-গাড়ী ডেকে তুলে নেব কেমন দিদি ?”
চপলা কাতর মুখে বলে ফেলে—“আমার যে যাবার উপায় নেই ভাই।”
যাবার উপায় নেই। বতনের মুখের সব দীপ্তি হঠাৎ নিভে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে যায় বাবার বাগ, মনে পড়ে বাড়ীতে দিদির
নাম পর্যন্ত উচ্চাবণ নিষেধ। সত্যই বুঝি দিদির সেখানে যাবার
উপায় নেই। বৃথাই এসেছে সে দিদিকে খুজতে, দিদিকে খুজে
পেযেও তার লাভ নেই ।
তারপর হঠাৎ আবাব তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলে,
“আমিও তা হলে যাবনা দিদি।”
"কোথায় থাকবি?”
“বাঃ তােমার কাছে তা” বলে রতন হাসে, কিন্তু চপলার মুখ
যে আরো ম্লান হযে আসছে তা সে দেখতে পায় না।
তারপর খেয়ে দেয়ে সারা বিকাল দুই ভাই বােনের গল্প হয়।
কথাই তাদের আছে বলবাব, জিজ্ঞাসা করবার। কিন্তু সন্ধ্যা যত
এগিয়ে আসে তত চপলা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। একবাব সে
বলে—“তুই যে চলে এলি একলা, বাবা হয়ত খুব ভাবছে।”
দিদির প্রতি অবিচারের জন্য বাবার ওপর রতনের একটু রাগই
হয়েছে, সে তাচ্ছিল্য করে বলে—“ভাবুক গে।”

মহানগর
দিদির মুখের
খানিক বাদে চপলা আবার বলে, “এখান থেকে নড়ালের পােল
অনেকখানি পথ, না রতন ?”
রতন এপথ পার হয়ে ত এসেছে। গতরে সে বলে-“ওরে
বাবা, সে বলে কোথায়।”
“পয়সা নিয়ে তুই ট্রামে করে, না হয় বাসে, যেতে পারিস না?”
“বাঃ আমি কি যাচ্ছি নাকি?”
দিকে চেযে সে কিন্তু থমকে যায় । দিদির চোখে
জন।
মাথা নীচু করে চপলা ধরা গলায় বলে—“এখানে যে তােমার
থাকতে নেই ভাই।”
রতন কিছুই বুঝতে পারে না, কিন্তু এবার তার অত্যন্ত অভিমান
হয়। দিদি সেখানেও যেতে পারবে না, আবার এখানেও বলবে তাকে
থাকতে নেই। আচ্ছা সে চলেই যাবে। কখখনাে, কখনাে আর
দিদির নাম করবে না, বাবার মত। ধীরে ধীরে সে বলে—“আচ্ছা
আমি যাব।”
মেঘলা আকাশে একটু আগে থাকতেই আলাে এসেছে ম্লান হয়ে।
চপলা উঠে তার আলমারী থেকে চারটে টাকা বার করে রতনের
হাতে গুজে দিয়ে বলে—“তুই খাবার খাস্।”
চার টাকায় অনেক পয়সা, তবু আপত্তি করবার কথাও আর
রতনের মনে নেই। দিদি যে এক্ষুনি তাকে চলে যেতে বলেছে তা
বুঝে সে যেন বিমূঢ় হয়ে গেছে। তার সমস্ত বুক গেছে তেলে।
রতন আর ঘরে দাড়ায় না, আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে আসে।

মহানগর
১৭
দিদির মুখের দিকেও আর না চেয়ে গলি দিয়ে সে সােজা বড়
রাস্তার দিকে এগিয়ে যায়। মুখের দিকে চাইলেও হয়ত দিদির
অবিশ্রান্ত চোখের জলের মানে সে বুঝতে পারত না।
চপলা পেছন থেকে ধরা গলায় বলে—“বাসে করে যাস রতন,
হেঁটে যাসনি।”
রতন সে কথা শুনতে পায় কিনা কে জানে, কিন্তু বড় রাস্তার কাছ
থেকে হঠাৎ আবার সে ফিরে আসে। তার মুখ আবার গেছে বদলে।
এইটুকু পথ যেতে কি সে ভেবেছে কে জানে।
চপলা তখনও দবজায় দাড়িয়ে আছে। বতন তার কাছে এসে
হঠাৎ বলে,-“বড় হযে আমি তােমায় নিয়ে যাব দিদি। কারুর কথা
শুনব না।”
বলেই সে এবার সােজা এগিযে যায়। তার মুখে আর নেই
বেদনাব ছাযা, তার চলাব ভঙ্গি পৰ্যন্ত সবল , এতটুকু ক্লান্তি যেন তার
আর নেই। দেখতে দেখতে গলিব মােডে সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
মহানগরের ওপর সন্ধ্যা নামে বিস্মৃতির মত গাঢ়।

অরণ্য-পথ ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। গভীর রাত্রে ষ্টীমার কখন ছাডিযাছে টের পাই নাই। বিমল গাযে ঠেলা দিয়া তুলি দিতে ধডমড করি জাগিয়া বসিলাম। অন্ধকারে পায়ের তলায় গভীর জলের আলােডন শহঠাৎ শুনিলে ভয হইবার কথা। ইমারের দুই পাশে মাল-বােঝাই গাধাবােট বাঁধা। তাহারা দৃষ্টি একেবাবে আড়াল করিযা আছে। কোনও দিকে চাহিযা ধীমার চলিতেছে কিনা বুঝিবার উপায় নাই। শুধু ইঞ্জিনের গতিব সঙ্গে বিশাল দারুদেহেব কম্পনে ও জলেব প্রবল আলােড়ন-শব্দে ষ্টীমাবের বেগ অনুমান কবা যায় । ডেকের উপর আমাদের আসন। আইনমতে ডেকের মাঝখানে একটি উজ্জ্বল হউক ম্লান হউক আলাে জ্বলিবার কথা। কিন্তু এদিকে জলপথে শুধু মালপত্রই যাতায়াত কবে—মানুষ যে করে না তাহা নয় কিন্তু তাহারা নগণ্য। তাহাদের জন্য সারা রাত বাতি খরচ করা কোম্পানী প্রযােজন মনে করে না। অন্ধকারে কিছুই দেখিতে না পাই ভারী অস্বস্তি বােধ হইতেছিল। যখন উঠিয়াছিলাম তখন প্রথম রাত্রি। যাত্রীব ভিতর আমরা তখন দুইজনই মাত্র ছিলাম। তাহার পর কতজন উঠিযাছে কে জানে। অন্ধকারে দূরে অস্পষ্ট গুঞ্জনধ্বনি শােনা যাইতেছিল-মনে হইল হয়ত নূতন যাত্রী পরে উঠিয়া থাকিবে। তাহাদের দেখিতে পাইলেও মরণ-পখ সময়টা কোনরকমে চরিত্ৰ-পৰ্যালােচনা করিয়া কাটিতে পারিত। কিন্তু ভিতরে বাইরে যখন দেখিবার কিছুই নাই তখন অকারণে জাগিয়া বসিয়া কি করিব। ঘুম হইতে জাগাইয়া তােলব জন্য বিমলকে ধমক দিলাম। “মিছিমিছি জাগালি কেন বলত?” “বাঃ—ষ্টীমার ছাড়লে জাগিয়ে দিতে বলেছিলে না।” বলিয়াছিলাম সত্যই। তখন আশা ছিল ষ্টীমার ছাডাটা অত্যন্ত একটা রহস্যময় ব্যাপার হইবে। মনে হইয়াছিল দীপালােক বিক্ষত দুই তীবের মধ্য দিয়া আসিয়া যাইতে-যাইতে ভাগীরথীর অন্ধকার বক্ষ হইতে নিদ্রিত মহানগৰীকে একটা জমকালাে রকমেব বিদায় নমস্কার দিযা যাইব।—তােমার পাষাণ বন্দীশালায় অনেক ঘুরিয়াছি-প্রস্তর কঠিন পথে চরণ জর্জরিত হইযাছে, দেওয়ালে দেওয়ালে মাথা ঠুকিয়াছে—তবু কিছু মিলে নাই। হে উদাসীন নগবী, তাই বিদায় লইলাম। এমনি সব বড় বড় কথা বুঝি মনের মধ্যে রচনা করিয- ছিলাম। কিন্তু কিছুই হইল না। মহানগরী অত্যন্ত অশ্রদ্ধাভরে আমাদের বিদায় দিযাছে। জানােযারের মত পিজরাবন্দী হইয়া যাইতে যাইতে কাব্য করা শােভা পায় না। বলিলাম,—বলেছিলাম ত, কিন্তু অন্ধকারের ভেতর ভূতের মত জেগে বসে থেকে কি হবে ? বিমলের উৎসাহ কিছুতেই ম্লান হয় না। বলিল,-“চলনা একটু ঘুবে আসি।” আগেই বলিয়াছি সমস্ত ষ্টীমার মালপত্রে বােঝাই। তাহার ভিতরে মহানগর দিল। অন্ধকারে পদে পদে হোঁচট খাইতে খাইতে ঘূরিবার বাসনা তখন হইল । বিমলকে তাহার অন্যায় চঞ্চলতার জন্য একটু ভৎসনা করিতে যাইতেছি হঠাৎ চমকিয়া উঠিলাম। উচ্ছ্বসিত হাসির শব্দ ,জলতরলের নীচের পর্দা হইতে সর্বোচ্চ পাত্র পয্যন্ত কে যেন দ্রুতবেগে যষ্টি টানিয়া দিয়াছে। অবশ্য নারীকণ্ঠ—কিন্তু সুর শুনিয়া মনে হয় বালিকার চাপল্য তাহাতে বেশী। অন্ধকারে এই কণ্ঠস্বর একেবারে যেন অভিভূত করিয়া মুগ্ধ মন এই ধ্বনির সাহায্যে সেই মুহূর্তে যে মুখখানি রচনা করিয়া ফেলিল, বাস্তবের সহিত হয়ত তাহা কিছুতেই মিলিবে না, তবু তখনকার মত তাহার স্নিগ্ধতায় একেবারে আবিষ্ট হইয়া গেলাম। দ্বিতীয়বার হাস্যধ্বনি উঠিতে না উঠিতে মাঝখানে থামি গেল। কে যেন সহসা জোর করিয়া তাহা চাপা দিয়াছে। উৎসুকভাবে হাস্যধ্বনির পুনরাবৃত্তির জন্য অপেক্ষা করিলাম অনেকক্ষণ, কিন্তু বিশাল পাথর চাপা দিযা কে বুঝি নিঝরিণীর মুখ বন্ধ করিয়া দিয়াছে। আর কিছুই শােনা গেল না। ব্যাপারটা একটু যেন রহস্যময়, অন্ততঃ ধীমাবের তলায় জলেব কল্লোল-শব্দ, নদীবক্ষের অন্ধকার এবং হাস্যধ্বনির আকস্মিক পরিসমাপ্তি আমাদের কাছে তাহাকে রহস্যমণ্ডিত করিয়া দিয়াছিল। শব্দটা কোন দিক হইতে আসিযাছিল বুঝিতে পারিযাছিলাম, কিন্তু কিছুই দেখিবার উপায় নাই।

অরণ্য-পথ ডেকে আলাে না রাখিবার জন্য এইবার সত্যই ষ্টীমার কোম্পানীর উপর রাগ হইতেছিল। বিমল আমার মতই কৌতুহলী হইযাছে বুঝিলাম। আশ্চর্যের বিষয় ষ্টীমারটা ঘুরিয়া আসিবার আর সে নাম করিল না। আমার পাশেই নীরবে কম্বলের উপর শুইয়া পডিল। খানিক বাদে শুধু সে জিজ্ঞাসা করিল ‘রাত এখন কত ? মনে মনে হাসি বলিলাম,—জানি না। ভােব হইতেই জাগিয়া উঠিলাম। ফান মাস তবু নদীর প্রবল জোলাে হাওয়ায় যেন শীত শীত করিতেছিল। পাশে বিমলকে দেখিতে পাইলাম না। সে কতক্ষণ উঠিয়া গিয়াছে কে জানে। ভােরের নীলাভ আলােম ডেকের সমস্তই এবার দেখা যাইতেছিল। উঠিযা এদিক ওদিক একবার পায়চারী করিয়া বেডাইলাম। এ ষ্টীমারে অধিকাংশই ডেকে যাত্রী। ফাষ্ট ও সেকেণ্ড ক্লাস নামে একটা সুসজ্জিত অংশ আছে কিন্তু সেখানে একটা যাত্রীও হয় না। সে দিকের কাঠের দরজায় তালা বন্ধই থাকে। বােঝা গেল আমাদের পরে বেশী যাত্রী ওঠে নাই। একটি কৃষক পরিবার একদিকে গােটাকতক কেরােসিন কাঠের বাক্সের পাশে তাহাদের জায়গা করিয়া লইয়াছে। দুটি পুরুষ একটি পাঁচ বছরের রুগ্ন শিশু একটি বৃদ্ধা। জিজ্ঞাসা করিযা জানিলাম তাহারা কাকদ্বীপে নামিয়া যাইবে।

মহানগর । আর একদিকে দুই বৃদ্ধ সাধু সকাল বেলাই গঞ্জিকা সেবনের উদ্যোগ করিতেছিল। আমার বেশভূষা দেখিয়াই বােধ হয় সাহস করিয়া নিমন্ত্রণ করিযা বসিল। নিমন্ত্রণটা প্রত্যাখ্যান করিতেই হইল। কি যে খুজিতেছিলাম সে কথা গােপন করিবার চেষ্টা করা আর নিষ্ফল। ডেকের নানা জায়গা পাকার করিযা কোথাও বা জিনিষ বােঝাই কেরােসিন কাঠের বাক্স, কোথাও বা ক্যানাস্তাবা, কোথাও বা বস্তা রাখা হইযাছে। সেই মাল পত্রের কূপের দরুণ ডেকের উপর অনেকগুলি নিভৃত কোটর সৃষ্টি হইয়াছে। একদিক হইতে সবগুলি দেখা যায় না। হয়ত কোথাও আনাচে কানাচে আর কোন যাত্রী আছে মনে করিযা আরাে একটু বিশদভাবে অনুসন্ধান করিলাম। কোন ফল হইল না। অমন রহস্যময় হাস্যধ্বনি তুলিতে পারে এমন কোন নারী দূরে থাক ষ্টীমারে আর যাত্রীই নাই। ব্যাপারটা সত্যই বড বিস্মযজনক ঠেকিতেছিল। তাহাব উপর সকাল হইতে বিমলটাই বা গেল কোথায়? সমস্ত ডেকে এবং সাবেঙেব সহিত ভাবসাব কবিয়া ইঞ্জিনের দিকটা ঘুরিযাও তাহার দেখা পাইলাম না। বিমলের এই ধরণের অস্থধানে সত্যই একটু চিন্তিত হইলাম। এই কয়েকদিনের আলাপে তাহাকে যেটুকু চিনিয়াছি তাহাতে তাহার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। বন্ধু ও সঙ্গী বলিয়া তাহার স্নেহ ভালবাসা এদ্ধা যতই আমার উপর থাক না কেন, মনের খেয়ালের মুহুর্তে আমাকে চিরদিনের মত ছাডিয়া যাইতে সে যে এতটুকু দ্বিধা করিবে না তাহা আমি ভাল রকমই জানি। তাহার সহিত আলাপ হইযাছে মাত্র এই কয় মাস। কেমন করিয়া অরণ্য-পথ আমার এই ছন্নছাড়া জীবনে সে যে আসিয়া জুটিল তাহা ভাবিলে এখনও বিস্ময় লাগে। প্রযাগে কুম্ভমেলা। সকালে স্নান করিবার জন্য মানুষের স্রোতে যখন হইতে মিশিয়াছি তখন হইতে পৃথক সত্ত্বা আর নাই। নিজের ইচ্ছাশক্তি আব প্রয়ােগ করিতে হয় না, ভিডের ভিতব কোন প্রকার চেষ্টা না করিযাই শুধু চারিদিকে ঠেলায় আমাবই মত বহু জ্ঞানার্থীর সহিত জমাট বাঁধিয়া আগাইয়া চলিযাছি। স্নান শেষ কবিযা সেইভাবেই ফিবিতেছিলাম। দুচোখ যতদূর যায, দেখা যায় শুধু নবমুণ্ড—যেন লক্ষশির একটা বিরাট প্রাণী নডিতেছে। তাহাব দেহ দেখা যায় না। কপালের ঘাম চোখে আসিয়া পডি চোখ জ্বালা করিতেছে। হাত তুলিযা যে ঘামটুকু মুছিব তাহারও উপায় নাই। চারিধারের চাপে দুইটা হাত জম্পেশ হইয়া নিজের গাযে আঁটিযা গিযাছে। যে স্রোতের সঙ্গে আসিযাছি সেই স্রোতের ভিতবই থাকিতে হইবে। এখনও মাইল খানেক পথ না পার হইলে মুক্তি নাই। মানুষের ভীড শাসনের অতীত হইয়া যাওযাব কিছুদূরে শৃঙ্খলা আনিবার জন্য কয়েকটা হাতী ছাডিযা দেওয়া হইয়াছে। সেই হাতীর একটা আমাদের দিকে আসিলে কি যে হইবে তাহা ভাবিয়া আতঙ্কে শিহবি উঠিলেও করিবার কিছু নাই। শামুকের মত গতিতে যেমন অগ্রসর হইতেছি, তেমনি হইতে হইবে। সমুদ্রকভােলের মত, অযুত মানুষের সেই পদধ্বনি ও কণ্ঠস্বরের সম্মিলনের ভিতর হঠাৎ নিকটে অদ্ভুত আওযাজ শুনিলাম। আর্ত এক ছাগ-শিশুর টীংকার।

মহানগর যন্ত্রণা কষ্টে ঘাড় বাঁকাইয়া দেখিলাম আহত এক ছাগশিশুকে দুই হাতে ভীডের উর্দ্ধে তুলিয়া ধরিয়া একটি যুবক আমারি কিছু পিছনে আসিতেছে। ছাগশিশুটি পথভুল করিয়া পুণ্যলােভী এই জনতার মধ্যে কেমন করিয়া আসিয়া পড়িয়াছিল কে জানে। আনার্থীদের পদ- নিষ্পেষণে তাহার অক্ষয় স্বর্গলাভের পথ তৈরী হইয়া গিয়াছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। পাযেব চাপে তাহার মাথায় আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। সামনের দুইটা পা একেবাবে ভাঙ্গিযা ঝুলি পডিযাছে। একটা দিকের চোখ আর নাই। খুলিব খানিকটা অংশের সহিত উপড়াইয়া গিযাছে । যায় নাই শুধু প্রাণটুকু। তাই সে আৰ্তম্বরে চীৎকার করিতেছিল। যে ছেলেটি ছাগ-শিশুকে বহন করিযা আনিতেছিল তাহার চারিধারে ভীডের ভিতরই ভয়ানক গণ্ডগােল শুরু হইছে। ছাগশিশুর মাথার উপর হইতে টপ টপ করিয়া রক্ত সদ্যস্নাত জনতার মাথার উপর পড়িতেছে। তাহারা প্রতিবাদ ত করিবেই। সাধ্য থাকিলে তাহাব। ছেলেটিকে সেখানেই বােধ হয় উপযুক্ত শিক্ষা দিয়া দিত কিন্তু জিহ্বা সঞ্চালনের সুযােগ থাকিলেও হাত পা নাড়া একপ্রকার অসম্ভব। ভিডের ঠেলায় কখনও কখনও ছেলেটি আমার কাছাকাছি আসিয়া আবার সরিষা যাইতেছিল। একবার সুযােগ পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম ‘এটিকে কোথায় পেলে হে ? ছেলেটি সেই অবস্থাতেই হাসিয়া বলিল ‘এটি পুণ্যফল। কুডিযে পেয়েছি। খানিকক্ষণ পাশের একটা ধাক্কা সামলাইতে কথা কহিবার আর অরণ্য-পথ ২৫ অবসর পাইলাম না। আবার একটু সুবিধা হইতেই জিজ্ঞাসা করিলাম ‘ওর ত স্বর্গলাভের আর বিলম্ব নেই। (কন আর বয়ে নিয়ে নিজেকে আব আশে পাশের লােককে কষ্ট দেওযা । ছেলেটি কি বলিল শুনিতে পাইলাম না। যাহাদের গাযে বক্তের ফোটা পডিঘাছে তাহাদের তীব্র কণ্ঠ ও ছাগশিশুর আর্তনাদে তাহা চাপা পড়িযা গেল। কিছুক্ষণের জন্য আমি তাহার নিকট হইতে একটু আগাইয়া যাইতেও বাধ্য হইলাম। আবার যখন দেখা হইল তখন ছাগশিশুব পরমায়ু প্রায় বােধ হয় শেষ হইয়া আসিতেছে। মাথাটা নেতাই পড়িয়াছে-শব্দ করিবার আব তাহার সামর্থ্য নাই । তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলাম,-“রক্তে যে একেবারে নেয়ে গেছ হে। ছেলেটির মুখে এবার হাসি নেই। গম্ভীর মুখে বলিল ‘হু, যােগের স্নানটা ভাল কবেই হােল। এবার আমরা ভীডের নূতন একটা আবর্তনের মাঝে পডি প্রায় পাশাপাশি আসিয়া পড়িয়াছিলাম। দেখিলাম তাহার মাথায, মুখে, কঁাধে ছাগশিশুর টাটকা রক্ত পডিয়া ইতিমধ্যেই জমাট বাঁধিযা গিযাছে। অনেকক্ষণ একভাবে উৰ্দ্ধবাহু হইযা পশুটিকে বহন করিবার জন্য হাত তাহার কপিতেছিল। বলিলাম—কষ্টও ত খুব কম হচ্ছে না। ছেলেটি আমায় অবাক করিযা দিয়া বলিল ‘এখন বােধহয অজ্ঞান হযে গেছে , যা যন্ত্রণা পেযেছে আগে যদি দেখতেন। এতগুলাে মানুষের চাপ, একটা হাতী পড়লে থেৎলে ডাে হয়ে যায় আর এত

মহানগর
একটা বাচ্চা ছাগল। বেটাকে উদ্ধার কবতে গিয়ে আর একটু হলে
আমিই গেছলাম আর কি।
ইহাব পব কোন কথাই বলিতে পারিলাম না। ছেলেটি খানিক
বাদে বলিল, “আমাব চোখের ওপব বক্ত পড়ে চোখটা করব করছে
ভালাে দেখতে পাচ্ছিনে-দেখুন ত একেবারে শেষ হয়ে গেছে কিনা।
বলিলাম,—প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, একটু মুখটা নড়ছে মাত্র।
ছেলেটি শুধু বলিল, ‘একটু যদি জল পেতাম।
সব দুলােগেই একটা শেষ আছে । এক জায়গায় আসিযা ক্রমশঃ
ভীড় হালকা হইতে আবম্ভ করিল এবং পরে আরাে কিছুদূবে গিয়া
যখন দুধাবে হাত পা ছড়াইবাব জায়গা পাইলাম তখন প্রথম মনে
হইল এত বড় সৌভাগ্য মানুষের জীবনে খুব কমই আসিয়াছে।
ছেলেটি ইতিমধ্যে আবার পিছনে পডি গিযাছিল। তাহার কথা
ভুলিযাও বুঝি গিযাছিলাম। হঠাৎ পিছন হইতে কে ডাকিল,—ও
দাদা, চলে যাচ্ছেন যে।
ফিরিয়া দেখিলাম সেই ছেলেটি। ছাগশিশুটিকে এবার সে বুকের
উপর নামাইয়া আমার কাছে আসিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করিল, ‘কতদূরে
থাকেন?
জানাইলাম যে নিকটেই একটি অস্থায়ী পান্থশালায় কযেকদিনের
মত থাকিবার স্থান যােগাড কবিয়াছি।
ছেলেটি বলিল ‘তাহলে চলুন তাড়াতাডি। বেটাকে একটু জলটল
দিয়ে দেখি।
আমার পান্থশালায় আসি ছাগশিশুর জন্য অনেক কিছুই সে

অরণ্য-পথ ২৭ কবিল, কিন্তু জ্ঞানার্থীদেব চরণস্পর্শের পুণ্যের জোব অনেক বেশী। ছাগশিশুকে অক্ষয় স্বর্গ হইতে কোন মতেই বঞ্চিত কবা গেল না। ছেলেটি হাতের একটু জলপান কবিব চেষ্টা করিষা বার দুই পা গুলি একটু নাডিযা চাডি একেবাবে স্থিব হইয়া গেল। বলিলাম, যােগের স্নানের পর আর স্নান করতে নেই যে। কিন্তু গা-ময ও রক্ত নিযেই বা থাকবে কি কবে ? ছেলেটি বলিল ‘হু, যােগে আব স্নান করা হােল কখন ? অর্ধেক পথ থেকেই ফিবতে হল যে। কথাটা বিশ্বাস করা সহজ নয়। দূর দূরান্তর হইতে আসিযা জন- সমুদ্রের মাঝে এই নিদারুণ নিগ্রহ সহ্য কবিয়া কেহ যে মাঝ পথ হইতে শুধু একটা মুমূর্য ছাগশিশুর জন্য স্নান শেষ না করিয়া ফিরিতে পাবে ইহা আমার পক্ষে কল্পনা করাও শক্ত। আমাব বিস্মিত দৃষ্টি দেখিয়া ছেলেটি একটু হাসি বলিল,-“তা মস্ত বড় একটা কাজ করে ফেলেছি-কি বলেন দাদা। সেই কবে বুদ্ধদেব একবার ছাগল ছানার জন্যে সমস্ত জপতপ পুণ্যের সঙ্গে প্রাণটা ফাউ দিতে চেযেছিলেন আর এতদিন বাদে আমি কুম্ভ মেলার পুণ্যটা হেলাষ ছেড়ে দিলাম। প্রাণটাও দিয়াছিলাম আর কি তাহার কথায় আসিযা ফেলিয়া তাহার মনের বন্দোবস্ত করিবার চেষ্টায় গেলাম। ছেলেটি সেদিন আমাদের পান্থশালাতেই থাকিয়া গেল। তাহার ভাবগতিক দেখিযা মনে হইল অবস্থানটিকে দীর্ঘ করিতে তাহার বিশেষ আপত্তি নেই। জিজ্ঞাসা কবিয়া জানিলাম এ রকম আশ্রযহীন হইয়াই ২৮ মহানগর সে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে—শুধু কুম্ভমেলার এই কয়দিন নয়, আজ ছম বৎসর ধরিয়া । তাই বলিযা তাহাব রুচিব খুঁত খবিবাব কিছু নাই। পান্থশালাক আহায্যের ও শয়নের ব্যবস্থার অত্যন্ত কঠোর সমালােচনা করিতে ছাড়িল না। বান্নার দোষ ধরিযা বেশ দুকথা পাচক ব্রাহ্মণকুমারকে শুনাইয়া দিল এবং আমাকে এক সময় সহজ ভাবে জানাইল দেখ, দাদা, মাংস নইলে আমার খাওযাব জুৎ হয় না। বিমলের সহিত এমনি করিযা পরিচয। কুম্ভমেলা শেষ হইয়া গেল, কিন্তু বিমল আমার সঙ্গ পরিত্যাগ করিবার নাম কবিল না। আকার ইঙ্গিতে তাহাকে আমার অবস্থার কথা ইতিপূৰ্ব্বে জানাইযাছি শীঘ্রই যে আমার এস্থান পরিত্যাগ করিতে হইবে তাহাও বলিতে ভুলি নাই কিন্তু বিমল তাহাতে বিচলিত হয় নাই। একদিন আমায় স্পষ্ট বলি। দিল ‘তােমার ওসব হেঁয়ালি কথাটথা আমায় শুনিও না দাদা, তােমায় এখন আমি ছাড়ছিনে। আমার ভাল লেগে গেছে। ইহার পর আর কথা চলে না। বিমলকে লইযাই কলিকাতায় ফিরিলাম। হাঙ্গাম অবশ্য কম নয়। নিজের আশ্রয় জোটাই ভার। বিমলকে লইযা আরো ফাপরে পড়িলাম। সে কিন্তু নিশ্চিন্ত নির্বিকার। আশ্রয় ও আহার সংগ্রহের ভার আমার উপর অর্পণ করিয়া সে পরমানন্দে ঘুরিয়া বেড়ায়। ত্রুটি হইলে অনুযােগ করিতেও ছাড়ে না। দূর সম্পর্কের এক জাতির বাড়ীতে অনেক কষ্টে আশ্রয় পাইয়াছিলাম। কিন্তু সে আশ্রয় হইতে বঞ্চিত হইতে হইল। তাহার অরণ্য-পথ ২৯ গৃহটিকে নগরের যাবতীয় খঞ্জ, আতুর, পশুপক্ষী ও মানুষের পিজরাপােল বানাইবার বিমলের যে সাধু ইচ্ছা ছিল তাহা আমার জ্ঞাতি অনুমােদন করিতে পারিলেন না। বিমলের সহিত তাঁহার তুমুল বচসা হইয়া গেল। মহানগরে অন্নসংস্থানের জন্য উপায়ও এতদিনে খুজিযা পাই নাই। একদিন তাই বিমলকে লইয়া বিদায় হইলাম । তাবপর তাহারই অনুরােধ ও আগ্রহাতিশয্যেই এই জল- পথে চলিয়াছি। বিমল সত্যই কোথাও যায় নাই। দুপুরের আগেই তাহার দেখা মিলিল। তাহার অনুপস্থিতিতে বন্ধনের আযােজন আর করি নাই। দেখিলাম সে নিজেই আহার সংগ্রহ করিযা আনিছে। খালাসীদের সহিত ভাব কবি একছডা কলা, একটা বড় তরমুজ ও কয়েকটা পেঁপে জোগাড় কবিয়াছে। কোথায় ছিল জিজ্ঞাসা করিতে বলিল ভােরের বেলা উঠিযা সে একদিকের একটা গাধাবােটের উপর গিযা বসিয়াছিল। ষ্টীমারের তুলনায় সে স্থান যে অত্যন্ত মনােরম তাহাও সে সােৎসাহে জানাইল। সকাল বেলায় নদীর হাওয়ায় কেমন একটু ঠাণ্ডা বােধ হইয়াছিল, এখন তেমনি গরম। নীচে বয়লারের ও উপরে সূৰ্যদেবের তাপে সমস্ত ষ্টীমার তাতিযা আগুন হইযাছে। শান্ত ঢেউবিহীন বিস্তৃর্ণ গঙ্গার জল সুর্যের প্রখর আলােয় জ্বলন্ত ইস্পাতের সুপ্রশস্ত পাতের মত দেখাইতেছে। ডেকে যে কোণ হইতে গাধাবােটের ফাক দিয়া বাহিরের দৃশ্য একটু দেখা যায় সেই কোণেই দাড়াইয়াছিলাম। দুই ধারে ঢালু বন্ধ্যা পাড় দূরের নারিকেল-বনের রেখায় গিয়া মিশিয়াছে।

মহানগর
তাহারই ভিতর কোথাও কোথাও ধানের ক্ষেতের ফালি জলের
কিনারা চুইয়াছে, ও যেন জীবন-রস ভিক্ষা করিয়া জাহ্নবীর কোলে
শ্যামল ধরণীর সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত ।
খালাসীদের প্রাদেশিক ভাষাই এতক্ষণ শুনিয়া আসিতেছি তাহার
ভিতর আমাদের দেশের কণ্ঠ কাছে শুনিতে পাইয়া ফিরিয়া তাকাইলাম।
আধা-বয়সী স্থূলকায এক ভদ্রলােক সেকেণ্ড মেটেব সহিত আলাপ
করিতেছিলেন। আমাদের দেখিযা স্মিতহাস্যে আগাইয়া আসিলেন।
পরিচয় কবি জানিলাম তিনিই মালবাবু—দুইটি গাধাবােট
হারই জিম্মায় আছে। গত কযেক বৎসর ধরিয়া জলপথেই তাহার
যাতাযাত চলিতেছে , নদীই তাহার ঘরবাড়ী। নাম রামপদ
জানিলাম ।
তিনি হাসিয়া বলিলেন ‘এ পথে চাষাভুষাে ছাড়া বড় একটা কেউ
যায় না , আপনাদের দেখে বড় আশ্চয্য হলাম।
বিমল বলিল, আমরা যে চাষা-ভূষা নই তাই বা কেমন কবে
জানলেন
রামপদবাবু হাসিয়া বলিলেন, “সে কি আর জানতে বাকী থাকে
মশাই।
ভদ্রলােক বড় অমায়িক। আমাদের সুবিধা অসুবিধার খোঁজ
লইযা আপ্যায়িত করিয়া দিলেন। আসিবার সময় চা আনিতে
ভুলিযাছি শুনিয়া বিমলকে তাহার ভাণ্ডার হইতে চা আনাইয়া দিবেন
বলিয়াও আশ্বাসও দিয়া গেলেন।
সামান্য মালবাবু হইলেও দেখিলাম ষ্টীমারে তাহার প্রতিপত্তি

অরণ্য-পথ খুব বেশী। সারেঙ হইতে নিম্নতম খালাসী পৰ্যন্ত তাহাকে সমীহ করিয়া চলে। তাহার প্রত্যক্ষ কারণ অনেকগুলি। খালাসীদের কাছে শুনিলাম ইংরেজী জানাব দরুণ সাহেবদের কাছে তাহাদের হইয়া তিনিই দু'এক কথা বলিযা থাকেন, সময়ে অসময়ে আবার দরখাস্ত ইত্যাদিও লিখি দেন, দু'চার টাকা ধাব দিতেও তাহার কৃপণতা নাই। প্রথম দর্শনে লােকটিকে ভালই লাগিল। রহস্যময় হাসির কথাটা তাঁহাকে প্রায় জিজ্ঞাসা করিয়াই ফেলিযাছিলাম। কিন্তু কেমন শুনাইবে ভাবিয়া আর পাবি নাই। ষ্টীমারে আমাদেব যথেচ্ছ গতিবিধি । সাবেঙের সহিত বেশ ভাব হইযাছে। সন্ধ্যার পর ষ্টীমাবেব উপরকাব অবজারভেশন ব্রীজে গিয়া অনেকক্ষণ দাড়াইযাছিলাম। দিনের অসহ গরমের পর সমস্ত আকাশ জুডিযা ঘন মেঘ জমিছে। লােকালয় ফেলিয়া নদী এবার সুন্দরবনের ভিতর দিযা চলিযাছে। অন্ধকার জল ও সুদূব তীর প্রায় একাকার মনে হয়। শুধু তৃতীযার ক্ষীণ চাঁদ মেঘের আড়ালে পশ্চিমে যেখানে ডুবিতেছে ঘন বনের মাথায় সেখানে নিভুনিভূ আগুনের মত একটু রক্তাভ ছােপ। দিকচক্রবালঘেরা নিস্তব্ধ নদী ও বনের ভিতর আমরাই বােধ হয কযেকজন মাত্র মানুষ। চারিধারে আঁধার অরণ্যে প্রাণী- জগতের কি অপরূপ বিচিত্র কাহিনী চলিযাছে কে জানে। আমাদের ঘােট ঘমারের এই কটি কাহিনীও কম বিচিত্র নয়। কিন্তু কোথাও কাহারে। যােগ নাই। বিমল একটু অস্থির হইয়া উঠিতেছিল। খানিক বাদে চাঁদ মহানগর B একেবারে ডুবিয়া যাইবার পর আমাকে আর কিছু দেখিবার নাই বলিয়া জোর করিয়া নামাইয়া লইয়া আসিল। নীচে আর যাত্রী নাই। সাধুরা ডায়মণ্ড হারবারে ও কৃষক পরিবার কাকদ্বীপে নামিযা গিযাছে। বিমল বলিল,-“চল মালবাবুর বােটে যাই—তিনি পাঠালেন না। গাধা বােট ও ষ্টীমারের মাঝে সাধারণ সময়ে কোন পার হইবার তক্তা থাকে না। তবু বিমলের অনুরোধ এড়ানাে গেল না। গাধাবােটের উপরে গি ভূপীকৃত মাল পত্রের মাঝে পথ খুঁজিযা মালবাবুর কেবিনের কাছে যখন উপস্থিত হইলাম তখন সবজা বন্ধ থাকিলেও ভিতর হইতে আলাে দেখা যাইতেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় দরজায় ধাক্কা দিয়া কোন সাড়া পাইলাম না। মালবাবুর নাম ধরিয়া আরো জোরে ধাক্কা দিতে অনেকক্ষণ পরে যখন দরজা খুলিল তখন রামপদ বাবুব চেহারা দেখিয়া আমরা ত অবাক। প্রথম আলাপের সময়কার সে প্রসন্নমূর্তি আর তাহার নাই। ক্রোধ- বিকৃত-মুখে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ রুক্ষ কণ্ঠে তিনি বলিলেন,-'এ সময়ে আপনারা এখানে এসেছেন কেন ? অকস্মাৎ তাহার এত রাগের কারণ কি হইতে পারে বুঝিতে না পারিযা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। বিমল বলিল,-“আপনি রাগ করছেন কেন রামবাবু? সমযটা কি এমন খাবাপ। গলা আরাে চড়াইয়া রামপদবাবু বলিলেন,-“রাগ করছি কেন তার

অরণ্য-পথ
কৈফিযৎ আপনাকে দিতে হবে নাকি। যাত্রীদের এখানে আসার
অধিকার নেই জানেন
বিমল চটিয়া গিযা বলিল, আপনাব অত মেজাজ দেখাবারই বা
কি অধিকার আছে ?
‘অধিকার আলবৎ আছে। বলে কয়ে আমার বােটে কি জন্যে
উঠেছেন ? এটাও কি ষ্টীমার নাকি ?
‘না, এটা লাট সাহেবের অন্দর মহল। বিমল আরাে কিছু বলিত
কিন্তু তাহাকে জোর করিযা টানিয়া আনিলাম। মালবাবুর বাগটা যতই
অস্বাভাবিক হউক না কেন আমরাও যে আমাদের অধিকারের সীমা
লম্বন করিযাছি
একথা অস্বীকারেব উপায় নাই। এক্ষেত্রে ঝগড়া
কবিয়া লাভ নাই। বিমলকে সেই কথাই বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম।
কিন্তু তাহাব বাগ সহজে যাইবাব নয়। বলিল, মাথাটা ঐখানে
গুডাে কবে দিয়ে আসাই উচিত ছিল—এমন অভদ্র জানােয়াব ত
কখনাে দেখিনি। আমরা যেন ওব বােটে চুরি করতে গেছি।
সে রাত্রিটা তাহার পব সাধারণভাবেই কাটিল। হাস্যধ্বনির মত
কোন কিছু শুনিবাব ক্ষীণ আশা মনের ভিতর ছিল। কিন্তু তাহা পূর্ণ
হইল না।
সমস্ত বহস্যের কতকটা মীমাংসা সকাল বেলা হইল। মাতলার
খাড়ির ভিতর দিযা ঈমার চলিতেছে। চারিধারে অর্ধজলমগ্ন নাতিউচ্চ
উদ্ভিদে সমাচ্ছন্ন ঘােট ঘােট দ্বীপ। অবজারভেশন ব্রীজ হইতে অদূরে
সমুদ্রের বিশাল দিগন্ত-বিস্তৃত মরকতনীলকান্তি দেখা যায়। কয়েকটা
শঙ্খচিল আমাদের ষ্টীমারের অনেকক্ষণ ধরিয়া সঙ্গ লইয়াছে। ইমারের

৩৪ মহানগর পিছনে, প্যাড়লে আলােড়িত হইযা যেখানে বিক্ষুব্ধ জলের স্রোত বহি যাইতেছে, সেখানেই তাহাদের দৃষ্টি। তাহার উপর বার বাব কাপ দিয়া পডিয়া তাহারা মাছ ধরিবাব চেষ্টা করিতেছিল। বেলা পডিবাব সঙ্গে অনাবৃত ব্রীজে বােদেব তাত বেশী লাগায় নীচে আসিযা একধাবেব রেলিঙ ধরিযা দাডাইলাম। দেখিবার অবশ্য কিছু নাই। সামনে মালবাবুর বােট। অন্যমনে ষ্টীমার ও বােটের মাঝে জলের ব্যবধানটুকুর দিকে চাহিয়াছিলাম। জল বেশ ঘােলা, কিন্তু কোনপ্রকাব আবর্জনা নাই। সে জল এত স্থিব মনে হয় যে, শুধু সে দিকে চাহিযা ষ্টীমাবের কোন দিকে গতি বুঝিবাব উপায় নাই। জলের উপর নিজের মাথাব ছা দেখিয়া বুঝিতে পাবিছিলাম ষ্টীমাব সােজা পূবমুখে চলিতেছে । হঠাৎ অবাক হইয়া গেলাম। আমাব মাথাব ছাযাব কাছে অপব দিক হইতে আব একটি মাথাব ছায়া পড়িয়াছে। সবিস্মযে মুখ তুলিয়া দেখিলাম গাবাবােটেব পাবাব গাঁটবির একটি ফাক হইতে একটি মেযে মুখ বাড়াইয়া আমারই মত জলের দিকে চাহিযা আছে। আমার সহিত চোখাচোখি হইতেই মেয়েটি খিল খিল করিযা হাসিয়া উঠিল কিন্তু সেখান হইতে নডিল না। এ হাসি চিনিতে দেরী হইল না। দেখিলাম হাস্যধ্বনি হইতে তাহার মুখ সেদিন নিতান্ত ভুল অনুমান করি নাই। মেযেটির বয়স বছব পনেরো ষােলাের বেশী ন্য অবশ্য কিন্তু মুখ চোখ দেখিয়া তাহাও বােঝা সহজ না। চোখের দৃষ্টিতে মুখের হাসিতে এমন একটি সারল্য আছে শিশুর মুখেও যাহা বেশী দেখিয়াছি বলিযা মনে পড়ে না। হাসিটি অপরূপ হইলেও মেযেটির মুখখানিতে কেমন একটি রুগ্ন স্লানিমা অরণ্য-পথ আছে। রুক্ষ চুলের রাশ শীর্ণ মুখটিকে যেন অতিরিক্ত পাতুরতা দান করিযাছে। হাসির শব্দ শুনিয়া বিমলও কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। মেযেটি তখনও স্মিতমুখে, সরল কৌতূহলী দৃষ্টিতে, আমাদের দিকে চাহিয়া আছে। এই লজ্জাবােধের অভাব হইতে তাহাব সারল্যেব স্পষ্টতব প্রমাণ পাইলাম। তাহাব পর কী যে হইল বুঝিতে পাবিলাম না। অস্ফুট হযের শব্দ কবিযা হঠাৎ একেবাবে পাংশুবর্ণ হইযা মেযেটি মুখ সরাইযা লইল। আশে পাশে চাহিয়া এই আকস্মিক ভযেব কোন কাবণই খুঁজি পাইলাম না। দুপুর বেলা হঠাৎ মালবাবু দেখা কবিতে আসিলেন। তাহার আবার এক পরিবর্তন হইযাছে। গত রাতের ঘটনার জন্য তাহার লজ্জা ও অনুশােচনার আর অন্ত নাই। কি বলিযা আমাদের নিকট হইতে তিনি যে ক্ষমা প্রার্থনা করিবেন তাহা ভাবিয়া পাইতেছেন না। জীবনভব ঘা খাইযাই মেজাজ তাহাব বিগড়াইয়া গিয়াছে-একটা মানুষের আর কত সহে। আব ভদ্রতাব তিনি জানেনই বা কি। দিন রাত্রি কুলী খালাসীর সঙ্গে মিশিয়া তাহাদের সামিল হইয়া গিয়াছেন। কাল ঘুমের ভিতব হঠাৎ জাগিয়া উঠিতে হওযার দরুণই মাথাটা ঠিক ছিল না। আমরা যেন তাহার এ অপরাধ মার্জনা করি মহানগর এবং মার্জনা যে করিযাছি তাহা প্রমাণ করিবার জন্য রাত্রের আহারটা তাঁহার কেবিনেই সমাধা করি। বিনয়ের এই আতিশয্যে অভিভূত হইয়া বিশেষ কিছু বলিতে পারিলাম না। রামপদবাবু আরাে বার কযেক অনুরােধ করিযা বিদায় লইলেন। বিমল সমস্তক্ষণ চুপ করিযাছিল। রামপদবাবুর বাক্য-স্রোতের মাঝে দু একটা উত্তর আমিই দিবাব চেষ্টা করিয়াছি। এবার সে আমার দিকে চাহিযা বলিল, ব্যাপারটা কিছু বুঝতে পারলে, দাদা? বুঝিতে কিছু পারি নাই। ওই মেযেটিব সহিত বামপদবাবুর গত- বাত্রের রাগ ও এদিনের অনুশােচনার যদি কোন সম্বন্ধ থাকে তাহা হইলে সে সম্বন্ধ আমার বুদ্ধির এখনাে অগােচর। মেযেটির আকষ্মিক ভযও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ষ্টীমারের সেকেণ্ড মেট অত্যন্ত ভাল লােক। বয়সকালে সে বারদরিয়ায় অনেক ঘুবিছে, এখন আর পাবে না। দেশ হইতে দূরে থাকিতে ভালােও লাগে না তাই এই নদীর কাজ লইযাছে। বুড়া প্রথম দিনই আমাদের কাছে একজোড়া ভাল শীতল পাটি অত্যন্ত সস্তায বিক্ৰী করিবার প্রস্তাব করিযাছিল। এমন খাটি জিনিষ আজকাল নাকি পাওয়া যায় না। পাটি ক্রয় করিতে পাবি নাই কিন্তু আলাপ জমি গিযাছিল। আজ আবার তাহাকে ধরিয়া বসিলাম। কথায় কথায় মালবাবুর কেবিনের রহস্যের কথা উঠিল। আশ্চর্যের বিষয় সেখানে যে একটি মেয়ে আছে এ কথা বুডা প্রথমতঃ স্বীকার করিতেই চাহিল না। আমরা নিজের চক্ষে দেখিয়াছি বলার পর খানিক চুপ করিযা থাকি অরণ্য-পথ কন্যা। বলিল ‘তা হবে বাবু, আমরা জানি না! নিজের কাজকর্ম নিয়েই থাকি, আমাদেব ফুরসৎ কই। বাধ্য হইযা শীতলপাটিটা ক্রয় করার প্রস্তাবটা আবার করিলাম। সেকেণ্ড মেট এবার একটু নরম হইল বােধ হয়। কিন্তু শীতলপাটী ক্রয় করিবার প্রস্তাবেও বেশী কিছু সে জানাইতে পারিল না। মালবাবুর স্ত্রী বহুদিন আগে আত্মহত্যা কবি মরিয়াছিল, না গৃহত্যাগ করিয়া গিয়াছিল এমনি একটা কথা সে শুনিছে। এই মেয়েটি মালবাবুরই গত বৎসর হইতে তিনি ইহাকে সঙ্গে লইযা ফিরিতেছেন। মেযেটিকে ষ্টীমাবেও মালবাবু বাহিব হইতে দেন না। ভদ্রলােক কোন আবােহ থাকিলে তাহাকে ত দেখাই যায় না। মেযেটি খুলনার জেটীতে যেবাব ষ্টীমার হইতে লাফ দিয়া পলাইবার চেষ্টা করে, মাত্র সেইবার সে ভাল করিয়া মেয়েটিকে দেখিয়াছে। ইহার বেশী কিছু সে জানে না। বিমল জিজ্ঞাসা করিল, মেয়েটি পালাতে চেযেছিল কেন ? ‘তা কি জানি বাবু। মালবাবুর নসীব নেহাৎ মন্দ, নইলে একটা মেযে, সেও অমন হয, বলিযা সেকেণ্ড মেট আবার তাহার পাটির গুণব্যাখ্যা আরম্ভ করিল। তাহার নিকট হইতে আর কিছুই বাহির কব। গেল না। সমুদ্রের দিকে আবার পিছু ফিরিয়া সুন্দরবনের গভীর অংশের ভিতর দিযা আমরা চলিয়াছি। এখানে সঙ্কীর্ণ নদীপথ। একটু এদিক ওদিক হইলেই মনে হয় ষ্টীমার পাড়ে লাগিয়া যাইবে। সূচিভেদ্য অন্ধকারের ভিতর সাচ্চলাইটের আলাে শাণিত তরবারির মত এক পাড় ৩ মহানগর হইতে অন্য পাড়ে ঘুরাইতে ঘুরাইতে ধীর গতিতে ষ্টীমার চলিয়াছে। উপব হইতে সারেঙের আদেশের ঘণ্টা ক্ষণে ক্ষণে বাজি উঠিতেছে। দুপাশে দুর্ভেদ্য গরান দরির জঙ্গল। তাহার উপর সার্চলাইটের আলাে পডিবামাত্র মন আপনা হইতেই উদগ্রীব হইযা উঠে-মনে হয় এই ক্ষণিক আলােয় অরণ্যের কি যে ভীষণ বৃহস্য আমাদের চোখের উপর এখনি উদঘাটিত হইবে। আসলে কিছু তেমন না হইলেও সমতক্ষণ গা কেমন ছম ছম করিতে থাকে। অরণ্যের এই গােপন নির্জন প্রদেশে আমরা যেন অনধিকার প্রবেশ করিয়া ক্ষমাহীন অপরাধ করিযাছি। মনে হয় ষ্টীমারের আওয়াজের ভিতরেও বিশাল অরণ্য- ভূমির কেমন একটা ক্ষুব্ধ আক্রোশের গুমরানি শােনা যায়। সমস্ত দেহ মন তাহাতে অস্পষ্ট আশঙ্কায় আডষ্ট হইয়া পড়ে। আজ বাতে আর লাফাইযা মালবাবুর বােটে উঠিতে হইল না। একজন খালাসী আমাদের অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া গেল। সামান্য গাধাবােটের ভিতরও মালবাবুর ঘরটি দেখিলাম নিতান্ত মন্দ নয়। গৃহের সমস্ত উপকরণই সেখানে আছে। কাঠের মেঝের উপর সতরঞ্চি পাতা ছিল। সেখানেই রামবাবু বসিতে বলিলেন। ঘরের চারিদিকে চাহিযা দেখিতেছিলাম। আমাদের সামনেই একটি দরজা চোখে পডিল। পাশে আরো একটি ঘর তাহা হইলে অাছে। কিন্তু সে ঘরের দরজাব এদিক হইতে খিল দেওয়া। রামবাবুকে আজ কেমন যেন বিচলিত মনে হইতেছিল। আহারের যােগাড় নিজেই করিতে করিতে মাঝে মাঝে অসংলগ্ন দু একটি কথা

অরণ্য-পথ
বলিতেছিলেন। আমাদের মনও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না, আলাপ
জমিতেছিল না বােধ হয় সেই জন্যই।
বন্ধ দরজার ওধাবে কি একটা শব্দ হইল একবাব। রামবাবু একটু
যেন চমকাইয়া উঠিলেন। আমবাও উৎকর্ণ হইয়া উঠিযাছিলাম।
রামবাবু, হঠাৎ অন্যকথা পাডিলেন। এখন আমরা যেখান দিয়া
চলিযাছি এত গহন জঙ্গল সুন্দব বনে নাকি খুব কম স্থানেই আছে।
দিনের বেলা কখন কখন ষ্টীমাব হইতেই এখানে বাঘ দেখা গিয়াছে।
একবার একটা বাঘ নদী পার হইবাব সময় ষ্টীমারের সামনে পডিয়া কি
রকম নাকাল হইযাছিল তাহাব গল্পও তিনি করিলেন।
সহজ হইবাব চেষ্টা কবিলেও বুঝিতে পারিতেছিলাম রামবাবুর মন
অস্থির হইয়া আছে।
আহার কবিতে বসাইযা রামবাবু প্রথম তঁাহার কন্যার কথা উল্লেখ
করিলেন। বলিলেন, 'আপনাদেব জন্য কিছুই করতে পারলাম না।
মেযেটাব আজ অসুখ, উঠতে পারছে না, নইলে তার হাতের রান্না
খেয়ে খুশী হতেন।
বিমল আসনের উপর হাত গুটাইয়া বসিয়াছিল। হঠাৎ
তাহার কথায় চমকাইয়া উঠিলাম। আপনি মিথ্যে কথা বলছেন
রামবাবু।
একটি কথায় ঘরের ভিতর কি যে পরিবর্তন হইয়া গেল তাহা
বােঝান কঠিন।
রামবাবুব মুখ একেবাবে দেখিলাম ছাইএর মত
মত সাদা হইয়া
গিযাছে। অস্ফুট স্বরে বলিলেন—‘মিথ্যে কথা।
কেন?

: ০ মহানগর বিমল দৃঢ় কণ্ঠে বলিল, “হ্যা মিথ্যে কথা, আপনার মেয়ের অসুখ করেনি। বামবাবু মাথা নীচু কবি নীরবে বসিয়া রহিলেন। বিমল বলিতে লাগিল, আপনার মেযেকে আপনি ঘরে বন্ধ কবে, পাযে শেকল দিযে রেখেছেন। শুধু এখন নয় এ বকম ভাবে শেকল দিয়ে তাকে অনেক সমযেই আপনি রাখেন। এবার আমিই প্রতিবাদ করিলাম—“কি বলছ বিমল? ‘ঠিকই বলছি, কাল থেকেই আমার কি বকম সন্দেহ ছিল। আজ সন্ধ্যায় আমি নিজে গাধাবােটের ধার দিয়ে ঘুবে গােপনে দেখে গেছি। ঘর অন্ধকার হলেও পাযেব শেকল দেখতে আমার ভুল হয়নি। বামবাবু এতক্ষণের মধ্যে একবারও মাথা তােলেন নাই। এইবাব কাতরভাবে আমাদের দিকে চাহিযা কি যেন বলতে চাহিলেন। বিমল তাহাকে সুযােগ দিল না। তীব্র কণ্ঠে সে বলিল, ‘আব মিথ্যে কৈফিযৎ তৈরী কববব চেষ্টা করবেন না। আমরা সবই বুঝতে পেবেছি। আপনাব মত পিশাচকে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়ালেও উপযুক্ত শাস্তি হয় না। আপনার স্ত্রী আত্মহত্যা করে আপনার উৎপীড়ন থেকে বেঁচেছে। আপনার অসহায় মেয়ে পালাবার চেষ্টা করে বিফল হযেছে, হযত শেষ পর্যন্ত তাকেও মার পথ নিতে হবে। শুব্ধ হইযা বিমলের কথা শুনিতেছিলাম। রামবাবুর বহু রেখাঙ্কিত কাতর মুখের দিকে চাহিযা সত্যই বিশ্বাস করিতে পারিতেছিলাম না যে সে মুখের পিছনে এত বড পৈশাচিক মন আত্মগােপন করিয়া আছে।

অরণ্য-পথ ৪১ ভাবিতেছিলাম নিজের স্ত্রী ও নিজের কন্যাকে এ ভাবে যন্ত্রণা দিবার কি হেতু তাহাব থাকিতে পারে। ইহা যদি তার অহৈতুক বিলাস হয় তাহা হইলে সত্যই তাহাব পৈশাচিকতা আমাদের ধারণার অতীত। বিমল বলিতেছিল ‘এই নির্জন নদীপথে মানুষের দৃষ্টি এডিযে গােপন থাকার সুবিধে আপনি অনেকদিন পেয়েছেন। কিন্তু এবার আব নিষ্কৃতি নেই জানবেন। রামবাবু হঠাৎ উঠিযা দাড়াইলেন। দেখিলাম তাঁহার মুখ হইতে পূর্বের সেই গাঢ় ছাযা অনেকটা সবিয়া গিয়াছে। নিজেকে তিনি যেন ইতিমধ্যে শান্ত করিয়াছেন। এবার তিনি কি করিবেন বুঝিতে না পাবিযা আমবাও সঙ্গে সঙ্গে উঠিযা দাড়াইলাম। কেবিনেব দেওল হইতে বাতিটা পাডিযা লইযা বদ্ধ দবজার দিকে অগ্রসর হইযা রামবাবু বলিলেন, ‘আসুন। তাহার এই আকস্মিক আচবণে বিমলও কেমন বিমূঢ় হইয়া পডিয়া ছিল। আমরা নীরবে তাহাকে অনুসরণ করিলাম। দরজা খুলিযা যে ঘবে বামবাবু প্রবেশ কবিলেন আকাবে সেটি অত্যন্ত ছােট। লণ্ঠনের আলোয় দেখা গেল, আসবাব পত্র সেখানে কিছুই নাই এবং সত্যই কাঠের মেঝের একটি শিকলের সহিত বদ্ধ হইয়া মেযেটি সেখানে বসিযা আছে। আমাদের দেখিযাই মেযেটি উচ্চৈস্বরে হাসিয়া উঠিল । সেই অপরূপ হাসি। বামবাবু নত হইযা তাহার শিকলটাই বুঝি খুলিতে গেলেন। সহসা আমাদের স্তম্ভিত করিয়া মেয়েটি তাহার হাত কামড়াইয়া ৪২ মহানগর ধরিল। আহত হাত অতি কষ্টে ছাড়াইয়া তাহার শিকল খুলিয়া বামবাবু যখন সােজা হইযা দাড়াইলেন তখন তাহার ক্ষতস্থান হইতে বক্ত পডিতেছে। কিন্তু তাহার আহত হাতের চেযে বিস্ময়কব দৃশ্য তখন আমাদের বিল করিয়া দিয়াছে। শিকল খােলা হইতেই আবার খিল খিল কবি হাসিয়া মেযেটি একদিকের দেওয়ালে ভর দিয়া উঠিযা দাড়াইল । এ পর্যন্ত তাহার মুখটুকুই দেখিয়াছি। লণ্ঠনের আলােয় তাহার সম্পূর্ণ চেহারা দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলাম। সৃষ্টির পবমাশ্চয্য নারীদেহ লইযা প্রকৃতির ইহার চেয়ে নিষ্ঠুব পরিহাস বুঝি আর হইতে পারে না। কোমল এবং প্রায় স্বাভাবিক মুখখানির জন্য বিকলাঙ্গ দেহের বীভৎস ছন্দহীনতা আরাে যেন অসহ্য হইযা উঠিয়াছে। বুঝিলাম তাহার চোখে সরলতা বলিযা যাহা ভুল করিযাছিলাম তাহা মনেব মহাশূন্যতার আভাস মাত্র। কণ্ঠের অপরূপ হাসি দিযা নির্মম বিধাতা তাহার সৃষ্টি- বিভীষিকার উপর ব্যদেব চরম ছাপ রাখিয়াছেন। বিমল সহসা অস্ফুট চীৎকার করিযা উঠিল। তাহার পর দ্রুত বেগে ঘরের বাহিরে গিযা তীব্র স্বরে যেন আর্তনাদ করিযা বলিল, চলে এস, শীগগীর চলে এস এ আর দেখা যায় না। মেযেটি শূন্য দৃষ্টিতে তখনাে আমাদের দিকে তাকাইয়া আছে। আমাকে বাহিরে লইয়া গিয়া রামবাবু দবজা বন্ধ করিয়া দিলেন। নিঃশব্দে আমরা আবার আসনে গিয়া বসিলাম। খানিকক্ষণ সব চুপচাপ ছিল। হঠাৎ ভিতর হইতে মেযেটি দরজার উপর তাহার সমস্ত শক্তি দিয়া আঘাত করিতে লাগিল। হঠাৎ সে অরণ্য-পথ ৪৩ আস্ফালন শুনিলে মনে হয হিংস্র কোন পশুকে বুঝি পিঞ্জরে আবদ্ধ কবি বাখা হইযাছে । এ তহাবই ক্ষুদ্র আক্রোশের পরিচয়। বামবাবুর চোখ দেখিলাম অশ্রুসজল হইয়া আসিযাছে। বলিলেন, ‘ওই জন্যেই মাঝে মাঝে শেকল দিয়ে রাখতে হয়। ছাড়া থাকলে এ সময় জলে ঝাঁপ দিযেও পড়তে পারে।' মেযেটি খানিক এই ভাবে আস্ফালন করার পর শ্রান্ত হইযাই বােধ হয় চুপ করিল। বিমল অনুতপ্ত কণ্ঠে বলিল, “আমায় ক্ষমা করুন রামবাবু। রামবাবু বিষন্ন মুখে বলিলেন, আপনার দোষ ত’ কিছু নেই বিমলবাবু। আপনি একটু তুঝ বুঝেছিলেন মাত্র। কিন্তু আমায় সামান্য যে তৎসনা করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী আমার প্রাপ্য। বিধাতার কাছে সেই পাওনা মিলছেও আজ পনেরো বছর। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া রামবাবু আবার বলিলেন, ‘নিজের সন্তানের এই রূপ দিনের পর দিন দেখাব যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে উন্মাদ হয়ে আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করে। সে রেহাই পেয়েছে কিন্তু আমার মুক্তি নেই। সংসারের মাঝে ওকে নিয়ে প্রতিদিন মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টিব সামনে থাকা একেবারে অসহ। এই ষ্টীমারে তবু নিজেব যন্ত্রণা নিয়ে নির্জনে থাকতে পাই। খালাসীদের কাছে আমার তেমন সঙ্কোচ নেই—তাদের কৌতুহল পরিমিত। তারা অভ্যন্তও হয়ে গেছে। আপনাদের মত আমার সমকক্ষ লােকদেরই আমার ভয়। রামবাবু খামিলেন। তিতরে মেযেটি আবার অশান্ত হইয়া উঠিযাছে। তাহাকে দরজার বাহির হইতে বার দুই ধমক দিয়া একটু ৪৪ মহানগর শান্ত করিযা আসিযা রামবাবু আবার তাহার কথা বলিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার সমশ্রেণীর কোন যাত্রী ষ্টীমাবে উঠিলে তাহাব উদ্বেগের সীমা থাকে না। তাহাদের কৌতূহলী দৃষ্টি হইতে প্রাণপণে তিনি মেয়েটিকে আড়াল রাখিবার চেষ্টা করেন। তাহাব দিকে কেহ ঘৃণাভরে তাকাইতেছে একথা ভাবিলে তাহার যন্ত্রণা দ্বিগুণ হইয়া উঠে। ‘ও যে আমাবি অপরাধের প্রত্যক্ষ শান্তি তা জানি। কিন্তু নিজের প্রায়শ্চিত্তকে সাধারণের চোখের সামনে প্রকাশ করে রাখার শক্তি আমার নেই।'—রুদ্ধ-গলায শেষ কথাগুলি বলিযা রামবাবু দুই হাঁটুব ভিতব মাথা গুজিযা চুপ কবিলেন। স্তব্ধ হইযা বসিয়া রহিলাম—করুণা নয়, হতাশায়। জনহীন শ্বাপদসঙ্কুল গহন অবণ্যের ভিতর দিযা তখন ষ্টীমার চলিতেছে। সে অরণ্য ভয়ঙ্কর, কিন্তু মনে হইল মানুষের মনের অবণ্য রহস্য-বিভীষিকায তাহাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। পাপ কবিতে পারে এত বড় অহঙ্কার ত পশুর নাই। অর্থ-হীন এ দুৰ্বল দম্ভ শুধু মানুষের। মনের গহন অন্ধকারে এ দন্তের নিরর্থক নিদারুণ শাস্তিও তাই তাহার একার।

দুর্লঙ্ঘ্য বিনয বাবু আমার কথায় একটু হাসলেন , তারপর সামনের দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে বল্লেন—তােমার কথাটা একেবারে ভুল নয়। আজ- কালকার ছেলেমেযেরা জীবনের স্বরূপ যেন জেনে নিযেই আসে, তাদের মনে কোন ভ্রান্তি, কোন মবীচিকা-মােহ নেই। কিন্তু তাই বলে ট্র্যাজিডিকে তা’বা এড়িয়ে যেতে পারে মনে কোরো না। আমাদের ছিল স্বপ্নভঙ্গের আকস্মিক আঘাত, আব তােমাদেব হচ্ছে, মন্থর অবিরাম প্রাত্যহিক নিরাশার ট্র্যাজিডি। যদি তুলনা কবতে চাও তা হলে বলব আমাদেরই ছিল শ্রেয়। সামনের জানালা দিয়ে বন্ধুর উপত্যকাব পারে পাদপহীন পর্বতের কক্ষ ধূসব বেখা দেখা যাচ্ছে। ওই রেখাটুকুই এখানকার প্রকৃতির কঠোরতাকে যথেষ্ট স্পষ্ট করে তুলেছে। বাডিব পেছনের দিকে বিশাল শনিব উদ্ধত যন্ত্রদানব আকাশের দিকে আস্ফালন কবে উঠে সমত নিসর্গ দৃশ্যকে কি রকম ভয়াবহ কবে তুলেছে তা না দেখতে পেলেও ক্ষতি নেই। সে দিকে চাইলেই মনে পডে বাঙ্গলার সরস মাটি ছাডিযে অনেক দূরে আমরা প্রবাসী, নইলে ঘরের ভেতর কোন আবামের উপকরণের অভাব নেই। বাঙ্গালীর ঘরের একটি নিজস্ব শ্ৰীও সেখানে আছে। দেখে কে বুঝবে যে এটি চিরকুমার এক প্রৌঢ়ের দীর্ঘ বিশ বৎসরের আয়। মনে হয় যেন মেয়েদের হাতের কল্যাণ-চিহ্ন ঘরটিব সব জায়গায় পরিস্ফুট। বন্ধ্যা রুক্ষ মাটিব দেশে আমরা দুটি মাত্র বাঙ্গালী, একত্র হযেছি ৪৬ মহানগর জীবিকা অন্বেষণের প্রযােজনে। বিনয বাবু এখানকার ডাক্তার, আমি নিম্নপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার। আমার সম্বন্ধে জীবিকা অন্বেষণের কথাটা সম্পূর্ণ- ভাবে সত্য কিন্তু বিনয় বাবু সম্বন্ধে সে কথা ঠিক বলা চলে কি না সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমার এক এক সমযে মনে হয বিনয় বাবু জীবিকা অর্জনের জন্যে এই সুদূর স্বজনহীন প্রবাস বেছে নেন নি—বেছে নিয়েছেন আত্মগােপনেব প্রযােজনে,-জীবনেব অবিশ্ববণীয় কোন ঘটনাকে একান্ত গােপন মনে লালন করবার অভিপ্রায়ে । বিদেশে আমবা দুটি মাত্র বাঙ্গালী, বয়সেব পার্থক্য অনায়াসে ভুলে মিলতে পেবেছি। বিনয় বাবু অতি সহজে আমার কাছে নিজেকে উন্মুক্ত কবেছেন। বার্ধক্যকে সমীহ করার প্রযােজনে আমায় আড়ষ্ট থাকতে হয় নি। বিনয় বাবুকেও নিজেকে আমার বয়সেব স্তবে নামবার জন্য যে বিশেষ চেষ্টা করতে হযেছে তা মনে হয় না। বিনয় বাবু বৃদ্ধ হয়েছেন খালি বয়সেই—মাথার চুলের শুভ্রতাই তাহার বয়সের একমাত্র সাক্ষ্য, নইলে দেহ ও মনে কোথাও তাঁর কোন ভাঁজ পড়েছে বলে বােঝ যায় না। বন্ধ্যা দেশের শুষ্ক হাওয়াই তাকে এমন সজীব বেখেছে কি না কে জানে। বিনয বাবুব পরিচয় দিতে গিয়ে গল্পের ভূমিকা প্রায় কবেই ফেলেছি—এবার আসল পারায় নেমে এলেই হয়। বিনয় বাবুর কথা বল্লাম—আমি ত ওই কথাই বলছি। আপনাদের দুর্লঙ্ঘ্য ০ণ সমযে মরীচিকা মিলিয়ে যাবার আগে পর্যন্ত তবু আপনার কল্পনার স্বর্গে নিশ্চিন্ত আবামে থাকতে পেতেন, আমাদের আগাগােড়াই হতাশা। জ্ঞানবৃক্ষেব ফল খাবার প্রায়শ্চিত্ত আমাদের প্রতিদিনই করতে হচ্ছে। বিনয় বাবু বল্লেন—অবশ্য যাকে জ্ঞানবৃক্ষ বলছ, সে যদি সত্যি জ্ঞান- বৃক্ষ হয। সৃষ্টিটা দুঃখবাদেব উদাহবণ নাও হতে পারে। আমি একটু হাসলাম, বল্লাম—আপনি নিজের প্রতিবাদ করছেন। -কবছি? তা কবছি বটে। এক এক সময়ে কবতেও ইচ্ছে কবে । জ্ঞান যতই নির্ভুল ও সম্পূর্ণ হােক তাতে সান্ত্বনা ত নেই । তাব চেযে মবীচিকাও যে ক্ষণিক হলেও ঢের সুখের। এক এক সমযে নিজেকে প্রবঞ্চনা করাব লােভ দুর্নিবার হয়ে ওঠে। চুপ কবে ছিলাম। বিনয বাবু আবাব বলেন—কিন্তু যাই বল আমাদের সে মােহের যুগে পৃথিবীতে বঙ ছিল, রেখার বৈচিত্র্য ছিল। তােমৰা মােহমুদগর দিয়ে সব সমতল করে ফেলেছ—সব এক বঙা। তােমাদেব যুগ নিয়ে আর গল্প হয় না। হেসে বল্লাম—আপনাদের যুগেব একটা গল্প শুনি না। বিনয বাবু আমার দিকে চেয়ে একটু হেসে বল্লেন-নেহাৎই শুনবে ? বলতে আমার অবশ্য আপত্তি নেই। তবে সেই একঘেযে ট্রাজিডি। —তা ত জানি। তবু বলুন না । বিনয় বাবু বাইবের দিকে চেযে বল্লেন—গল্প এ কালের নয়, এদেশেরও নয়, কিন্তু একালের না হােক, এদেশেবই বুঝি হওয়া উচিত ৪৮ মহানগর ছিল। এমনি শুকনাে রুক্ষ তার রূপ, কোথাও সরলতা নেই, শুধু কাঠিন্য। তা ছাড়া আমি গুছিযেও বলতে পারব না বােধ হয়। তবু শােন। তার পর একটু চুপ করে থেকে বিনয বাবু আবাব আরম্ভ করলেন। সে যুগের কথা খুব সুন্দর নয় কিন্তু তবু তােমরা তার কিছুই জান না। তােমরা সে যুগেব কথা বইযে পডেছ ' হ্যত, মনে কর সব তােবা বােঝ কিন্তু আসলে সে যুগে বাঙ্গলাব কিছুই তােমরা জান না। বাঙ্গলা দেশের উনবিংশ শতাব্দী আর বিংশ শতাব্দীতে এমন একটা তফাৎ আছে যে আমার এক এক সময় মনে হয় এদুটোব ব্যবধান মাত্র এক সেকেও নয়—একটা গােটা শতাব্দী।—এই দেখ বৃদ্ধ বয়সের যা দোষ গল্প বলতে বসে সেই বাচালতাই করছি। তােমাদেব কাছে চিন্তার স্বাধীনতা একটা স্বাভাবিক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার-এতে তােমরা আশ্চয্যও হও না, কোন থিলও পাও না, কিন্তু আমরা তখন সবে মনের খােলসে ঠোকব মেরে একটু আধটু ফুটো করেছি, ঠোকর মারাতেই আমাদের ছিল বােমাঞ্চ ' আমাদের মনে তার নিজস্ব একটা মােহ ছিল। দোকানে লুকিয়ে চা খেযেই আমাদের বুক ভরে উঠত গর্বে, ফাউল খেতে পারলে নিজেকে আমরা নেপােলিয়নেব সমান মনে করতাম। ধুতির বদলে প্যান্ট পরা আমাদের কাছে ছিল দিগ্বিজযের সমান। তােমরা এখন এসব শুনে হত হাসবে —কিন্তু সে যুগের আবহাওয়া তােমরা জান না তাই। পুরুষের বেলায় যখন এই, তখন মেযেদেব ব্যাপারটা বােধ হয় আঁচ করতে পারাে। দশের জায়গায় চৌদ্দ পর্যন্ত রেখে যে বাপ দুর্লঙ্ঘ্য ৪১ কঠিন। মেয়ের বিয়ে দেয, সে একটা মস্তবড় সংস্কারক। কথামালা ছাড়িয়ে যে মেযে ইংরেজী ফাষ্টবুক ধরে তাব মৰ্যাদা ও নিন্দার অবধি নেই। সেই যুগে সূৰ্য্যকান্ত বলে একটি ছেলে নলিনী বলে একটি মেয়েকে ভাল বেসেছিল। আমি একটু হাসলাম । বিনয বাবু সেটুকু লক্ষ্য কবে বল্লেন—আচ্ছা, আচ্ছা, বকলম আর চালাব না। তােমরা এ যুগের ছেলে, সন্দেহ তােমাদের ঘােচান তা ছাড়া সূয্যকান্ত নামটাও বড় কটমট । বার বার উচ্চারণ কবলে গল্পের রস ভঙ্গ হবার সম্ভাবনা। কিন্তু নলিনী নামটা থাক্। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। আমিই ভালবেসেছিলাম নলিনী বলে একটি মেয়েকে। তের চোদ বছরের মেয়েকে ভালবাসার কথা শুলে তােমাদের আবার হাসি পাবে হয ত। কিন্তু আমি তােমায় বলছি সে যুগে তা সম্ভব ছিল। বঙ্কিম বাবুব রাধারাণীব বস কত ছিল জান? প্রথম সংস্করণে বােধ হয ছিল দশ এগার। পরেব সংস্কৃবণে বদলেছিলেন কিন্তু বারের বেশী বাড়াতে পাবেন নি। যাক নলিনী মেযেটির কথাই বলি। নলিনী সে যুগেব মেয়েদের অগ্রবর্তিণী । তার বাবা ব্রাহ্ম না হযেও ছিলেন—সে যুগে অত্যন্ত অগ্রসর। নলিনী জানলা সাসি বন্ধ করা ছ্যাকরা গাড়ী করে প্রত্যহ মেযেদেব স্কুলে গিয়ে সমস্ত পাড়ার জিহ্বার খােরাক জোগাত । বলতে পার অবশ্য কি সুযােগ ছিল সে যুগে প্রেমের। কিন্তু প্রেমের জন্যে কতটা সুযােগের দরকার হয় ? ওপারে ওরা দেহ-সংলগ্ন ৪ মহানগর হয়ে নাচবার সুযােগ পেয়েও অক্ষত হৃদয় নিয়ে সারা জীবন কৌমার্যে কাটিয়ে দেয়, আবাব নদীর জলে চুলের ছায়া দেখেও এককালে রাজপুত্ৰেবা পাগল হয়ে যেত। সে রাজপুত্রের রূপকথাতেই বন্দী হয়ে আছে মনে কোরো না। তাছাড়া নলিনীর সঙ্গে আমার দেখা হবার সুযােগের অভাব কি ? বিশেষ করে আমি ছিলুম তাদের জ্ঞাতি এবং সে যুগের সংস্কাবকে জয় কবে মেডিক্যাল কলেজে মডা কাটবার বিদ্যে শিথতে সাহস করেছিলাম বলে তার বাবার অত্যন্ত প্রিয়। আজকের দিনে থিযেটার বায়স্কোপ, একজিবিশন তােমাদের যে সুযােগ দেয, আমাদের যুগে তাই দিত বিযে-বাড়ি। বিযে-বাডিতে সেকালেও ছিল অবাধ গােপন মিলনের সুযােগ ও স্বাধীনতা। পরিবারে বিবাহ, উপনশনেব মত শুভকর্ম নিত্য হয় না বটে—কিন্তু তাতে কি আসে যাযহৃদয বিনিমষের পক্ষে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। , নীরব প্রেমনিবেদন আমার ছিল না—প্রতিদানহীন বলেও আমার বাবণা নয। বিবাহের উৎসবের রাতে পরিত্যক্ত ছাদের অন্ধকার আলসের ধারে আমি এসে পঁডিযেছি--সমস্ত বাড়িতে হাওয়া না পেয়ে নলিনীও উঠে এসেছে অন্যমনস্কভাবে ছাদের ওপর। অন্ধকার এমন কিছু গাঢ় নয় যে কিছু দূরে মানুষ আছে কিনা বােঝা যায় না, তবু বিশ্বাস করতে হবে যে নলিনী আমায় দেখতে না পেযেই আমার অত্যন্ত কাছ ঘেসে এসে দাড়িয়েছে, তখনকার জমকালাে, জরীতে ভারী বেনারসী শাড়ীটি গুছিয়ে প'বে ।

দুর্লঙ্ঘ
আমি সামনের অন্ধকারের দিকে চেয়ে বলেছি—বাবা! নীচে কি
গণ্ডগােল। টেকা যায় না।—এবং নলিনী সে স্বরে চমকে উঠে
বলেছে—ওমা, তুমি এখানে দাড়িয়ে আছ। কখন থেকে ?
এই ত এলাম—বলে আমি সান্নিধ্যের উত্তেজনায় একটু কেঁপে
উঠেছি। সদ্য পপটিকামুক্ত বেনারসী শাডীব অপূৰ্ব গন্ধেব নেশায়
মাথায আমাব ঘােব লেগেছে।
তারপর আর কথা নেই।
নলিনী খানিক বাদে বলেছে—মাগাে ওইটুকু মেযের কি কবে বিয়ে
হচ্ছে। আমি হলে কখন বিয়ে করতাম না।
রাঙা টুকটুকে একটা বর হলেও না?
আমার বযে গেছে । অমন মাকাল ফল আমার চাই না।
আর এরকম নিস্ফল হলে।-( অনুপ্রাস দেখে অবাক হযে না,
দাওরায় তখন আমাদের মন থেকে মরেনি)।
নলিনী বলেছে—ধ্যেৎ।
লক্ষ্য করলে বােধ হয় যে আমাদের প্রেমের আলাপেও ছিল তখন
সে যুগের সংস্কার-উন্মাদনার প্রভাব। তােমাদের যা গা-সওযা হয়ে
গেছে আমরা তখন নতুন স্বাদ পেযে জাগরণে নিদ্ৰাতেও তা ভুলতে
পারছি না।
এমনি প্রেমের চিত্র বেশী দেখবার আশা রেখো না—আমি সে
আশা মেটাতে পারব না। বেশী পেডাপীড়ি করলে মিথ্যে বানিয়ে বলতে
হবে। বুঝতেই ত পারছ যে তের বছরের মেয়ে আর আঠারাে উনিশ
বছরের ছেলে তখনকার বাধার ভেতর যা প্রেম করতে পারে, তা নিয়ে

মহানগর চমকপ্রদ তেমন কোন পূর্বগের ছবি তৈরী হতে পারে না, যাতে বুদ্ধিদীপ্ত বাণী করবে ঝলমল, ভাবাবেগের সমূদ্র উঠবে দুলে। বছরের মেয়ে কটা কথাই বা জানে? আর যা জানে, তার কটাই বা বলতে পারে গুছিযে। তােমায় ব্যাপারটা অনুমান করে নিতে হবে। কিন্তু তাই বলে প্রেম আমাদের কিছু কম গভীর মনে করো না, মৌন হ'লেও সে অতল। আমি তখন ভবিষ্যতের কি সব অপরূপ স্বপ্নই দেখছি নলিনীকে কেন্দ্র কবে ! স্বপ্নই বা তাকে বলি কেন ' ভাগ্যকে তখন আমি মনে মনে ভাবী জীবনের ফরমাজ দিয়ে ফেলেছি, সে ফবমাজ যে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে সে সম্বন্ধে আমার কিছু মাত্র সন্দেহ নেই। আগামী যুগের আমরা অগ্রদূত—প্রগতির বার্তা বহন করে চলব এগিযে। পৃথিবী তখন আমাদেব কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে শুরু কবেছে। নলিনী কি স্বপ্ন দেখেছিল সেই জানে, কিন্তু আমার থেকে বিশেষ তার তফাৎ ছিল বলে মনে হয় না। এইবার গল্পকে আমি তিন চারটে বছরের উপর দিয়ে চোখ-কাণ- বুজে টেনে নিয়ে যাব। এখানে রইল তােমার কল্পনার অবসর। তুমি ইচ্ছামত বিবরণে এটি ভরিয়ে নিতে পারে। শুধু মনে রেখাে, মরা মানুষের বুকের সমস্ত তথ্য জেনেও জীবিত মানুষের হৃদয় সম্বন্ধে আমি হতাশ হইনি এবং নলিনীও তার পাঠ্য পুস্তকে সৃষ্টির মূলে বিষ আছে এমন কোন তথ্য পায়নি। আমরা পরস্পরের আরাে কাছে ঘেসে এসেছি এবং স্বপ্ন আমাদের তখন বর্ণবাহুল্যে আরাে ঘােরললা হয়ে এসেছে।

দুর্লঙ্ঘ্য ৫৩ এমন সমযে ডাক্তারী পরীক্ষায় আমি হলাম সসম্মানে উত্তীর্ণ এবং সুদূর পশ্চিমে মােটা মাইনের এমন একটা চাকরীর সুযােগ পেলাম, যা ইতিপূর্বে নাকি কোন নেটিভের ভাগ্যে জোটেনি। নলিনীর বাবাই উৎসাহ দিয়ে আমায পাঠিয়ে দিলেন। বাঙ্গালীর নাকি, এমনি দুঃসাহসী হবারই বিশেষ প্রযােজন আছে । প্রেম ও কর্তব্য দুইএর মাঝে পডে কর্তব্যের টানে ও নলিনীর বাবার উৎসাহে আমি চলে গেলাম এমন সুদূর এক জায়গায়, যেখানে সে সমযে বৃথা অপব্যযের আশঙ্কায় লােকে চিঠি পাঠাতে পর্যন্ত সাহস করত না। গল্প অত্যন্ত মামুলী প্রণালীতে চলেছে কিন্তু সে আমার দোষ নয়। সে সুদূর প্রবাস থেকে চেষ্টা চরিত্র করেও বছর দুয়েকের আগে আমি ফিবতে পাবলাম না। কিন্তু ফিরতে না পারলেও মনে আমার কোন আশঙ্কা ছিল না। নলিনীর বাবার সাহস ও মানসিক সবলতায় আমার ছিল অটুট বিশ্বাস। আর যেই টলুক-মানুষেব জিহ্বা সঞ্চালনে তিনি যে টলবেন না এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু হায় মানুষের মন। দু’বছর বাদে ফিরে এসে দেখলাম দুনিষায় অপ্রত্যাশিত সব পরিবর্তন হয়ে গেছে। পৃথিবী হঠাৎ আমাকে অবজ্ঞাভরে পরিত্যাগ করে সূৰ্য্যকেই করছে প্রদক্ষিণ, পল বিপল হিসেব করে। কাল আমার জন্যে অপেক্ষা করেনি, নলিনীর বাবাও না। জ্ঞাতি কুটুম্বের ভৎসনায় অতিষ্ঠ হযে নলিনীর তিনি বিবাহ দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আঘাত এইখানে নয—আঘাত এই যে, নলিনী এক বৎসরের মধ্যে ফিরেছে বিধবা হযে।

৫০ মহানগর মামুলি হােক, সেকেলে হােক গল্প এইবার জমকালাে হয়ে আরম্ভ হ’ল ভেবে তুমি বােধ হয় উল্লসিত হয়ে উঠছ। কিন্তু ভুল করলে, গল্প এবার প্রায় শেষ হয়ে এল। নলিনীর বাবার সংস্কাবক-সত্তা আবার প্রবলভাবে জাগ্রত হওয়া সত্ত্বেও গল্প এল শেষ হযে। একান্ত আদরের মেযের অশ্রুমােচনের সঙ্গে সমাজের গোঁড়ামির মূলে আঘাত দেবার জন্যে নলিনীর বাবা উঠলেন মেতে, ভালবাসার পাত্রীকে ফিরে পাওযার সঙ্গে উদারতাব এতবড় কীর্তি রাখবার সম্ভাবনায় আমার মন আনন্দে উঠল নেচে। কিন্তু নলিনী সেই যে ঘাড় বেঁকিযে দাড়াল সে ঘাড় আর সােজা করা গেলাে না । বিয়ে, দু’বার বিযে-কারুর হতে পারে না, না পুরুষ না মেযের, এই তার মত। সে যুগে যা অসম্ভব, নলিনীর বাপ সে সুযােগও আমায় দিলেন। নলিনীর সঙ্গে দেখা করে, বুঝিয়ে বলার সুযোেগ আমি পেলাম । না, স্বামীর পাদুকা সামনে রেখে সে পূজোয় বসে ছিল না—তা হলে বুঝি কিছু আশা থাকত। তার বদলে তার মুখে দেখলাম অপরূপ সঙ্কল্পের দৃঢ়তা, চোখে প্রেমের গভীর তন্মযতা। যেন তার কাছে এপার- ওপারের যবনিকা গেছে সরে। প্রেমাস্পদের বিরহ সে জানে না। ব্যথাও যেমন পেলাম, তেমনি পেলাম লজ্জাহা লজ্জা, আমার সমস্ত কথা গেল ম্লান হয়ে মনের মধ্যে মিলিয়ে। কোন মতে সাধারণ দুটো আলাপ করে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম তেরাে বছরের যে কিশােরীটীর সঙ্গে আমি প্রেমের ছেলে- খেলা করেছিলাম, সে কোথায় গেছে হারিয়ে। পূর্ণযৌবনা নলিনীর

দুল
এক দিন
মন সত্যকার আর এক প্রেমের অমৃত-স্বাদ পেযে মধুময় হয়ে আছে।
সে-মনে আমার স্থান নেই।
বিনয বাবু থামলেন।
আমি হতাশ হয়ে বল্লাম-এই। এই আপনার ট্র্যাজিডি ।
ম্লান হেসে বিনয বাবু বলেন—অত অধীর হলে চলবে কেন? গল্প
শেষ হয়ে এসেছে, কিন্তু এই খানেই নয়।
দেশ থেকে এবার বিদায় নিলাম দীর্ঘ দিনের জন্য—চিরদিনের
জন্যেই ইচ্ছে ছিল কিন্তু হযে উঠল না। বছর পনেবে পরে আবার
ফিরলাম। সে বেশী দিনের কথা নয়। কলকাতাব বাস্তায মৃগাঙ্কের
সঙ্গে দেখা। ঠিকানা দিয়ে বলে, আমরা এখানে আছি।
আসুন না।
মৃগাঙ্ক নলিনীব ছােট ভাই।
কোন আশা নিয়ে নয়, অমনিই গেলাম একদিন। আহিরীটোলার
গঙ্গার ধারে ছােট একটা বাড়ী ভাড়া করে তা'ব্য আছে। দরজায়
গিযে মৃগাঙ্কের নাম ধরে ডাকাডাকি করছি, পেছন থেকে শুনলাম
একটু পাশ দেবেন তা
গঙ্গায় স্নান করে ভিজে কাপডে একটি শীর্ণ চেহারার মহিলা পেছনে
জডসড হয়ে দাড়িয়ে আছেন। আমি তাড়াতাড়ি পাশ কাটাতেই,
ভিজে কাপড় নিংডে সামনে জলের ছিটে দিতে দিতে তিনি ভিতরে
চলে গেলেন।
তুমি শুনেই চিনতে পেরেছ নিশ্চয় কিন্তু প্রথমটা আমি পারিনি।
মাথার চুল ছােট করে ছাঁটা, খাটো কাপড়ে শরীরের অতি কষ্টে লজ্জা

মহানগর
নিবারণ হযেছে-তার উপর সমস্ত মুখে চোখে অকাল প্রৌঢ়ত্বেব এমন
একটা ছাপ পডেছে যে নলিনীকে চেনা কঠিন। চিলাম আমি শুধু
তার চলার ভঙ্গি দেখে ।
আমি চিনলেও নলিনী যে চেনেনি একথা ঠিক। কাবণ আমি
নলিনী বলে ডাকলেও সে পেছন ফিরে খানিক বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার
দিকে তাকিয়ে রইল।
বল্লাম—চিতে পারছ না।
ওঃ—বিনুদা বিশেষ কিছু উল্লাস থাকবার কথা নয় সে স্ববে-
আমি তা আশাও করিনি।
বল্লাম-মৃগাঙ্কেব সঙ্গে সেদিন রাস্তা দেখা! বলেছিল, তাই দেখা
করতে এলাম। বাড়িতে আছে সে ?
আছে বােধ হয়। এস না তুমি ভিতরে।
নলিনী এগিয়ে চল—আমি তার পিছু নিলাম। লক্ষ্য কবে দেখলাম
এবং সে প্রত্যেকবার পা ফেলবার আগে ভিজে কাপড় নিংডে
গঙ্গাজল সামনে ছিটোতে ছিটোতে চলেছে।
বাইবের দরজা থেকে একটা লম্বা গলির মত রাস্তা পার হয়ে
নলিনীদের বাড়ীর ভিতর ঢুকতে হয়। গলিটা থাকার দরুণই নলিনীব
এ আচৰণ আমার চোখে পড়ল। দেখলাম এক একবার সে পিছনে
ফিরে সন্ত্রস্ত ভাবে তাকাচ্ছে।
প্রথমটা মানে বুঝতে পারিনি, কিন্তু গলি-পথ শেষ হবার আগেই
সেটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
ভেতরের দরজার কাছাকাছি এসে নলিনী হঠাৎ থমকে দাডিযে

দুর্লভ
পড়ল, একটু ইতস্ততঃ করে কুন্ঠিতভাবে বলে,—তুমি, তুমি ভেতরে যাও।
আমি একটু আসছি।
আবার কোথায় যাবে ?
অত্যন্ত সঙ্কুচিত ভাবে নলিনী বল্লে,—কি একটা যেন মাড়ালাম,
আব একটা ডুব দিয়ে আসছি।
তাব পায়ের দিকে তাকিয়ে বল্লাম—কিছুত মাডাও নি। ওটা
একটা কাঠি ।
তেমনি কুণ্ঠিত ভাবে সে বলে—কি এটো কাটা হবে। আমি,
আমি যাই। তুমি যাও না, মৃগাঙ্ক আছে ।
তাব মুখের দিকে এবার ভাল করে তাকিয়ে দেখবাব সুযােগ
পেলাম। কোথায় গেছে সে প্রেমেব আনন্দের জ্যোতি, কোথায় সে
তপস্যার কাঠিন্য । সমস্ত মুখে অকাল বার্ধক্যের ছাপ, চোখের কোণে
অধবেব দুপাশে ক্লান্তি ও দুর্বলতার গভীব রেখা। কে বলবে এই
সেই
তেজস্বিনী নারী, যাকে দেখে একদিন মনে হযেছিল যে ভালবাসা
মহিমায জীন মৃত্যুব যবনিক'ও এব কাছে সরে গেছে।
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । কুষ্ঠিত পদে নলিনী আবাব ফিবে
গেল গঙ্গার দিকে।
মৃগাঙ্ক এসে দরজায় দাঁড়িয়েছিল, আমায় ভেবে নিয়ে যেতে যেতে
বলে—দিদি আবার গঙ্গায় ডুব দিতে গেল ত। সকাল থেকে এই
চারবাব, এখনাে সমস্ত দিন আছে ! আলিয়ে খেলে বাবা ।
আমাকে ভাল করে বােঝাবার জন্যেই তাবপব সে আবার বল্লে,
এর কোন ব্যবস্থা আছে বলতে পারেন? ওই ত দেখুন না ঘর, ভেতরে

৫৮ মহানগর পচে যাচ্ছে তবু দরজা, জানালা খুলবে না। বাইরে থেকে যদি নােংরা জলের ছিটে যায় ঘরের ভেতর। এত করেও তবু কিন্তু সন্দেহ যায় । আধঘণ্টা অন্তর গঙ্গায় গিয়ে ডুব দিয়ে আছে। সারাদিন এই ছুলে, সেই ছিটে লাগল এ ছাড়া কোনাে চিন্তা নেই। একেবারে জালাতন হয়ে গেলাম । নলিনীদের বাড়ী তারপর আর যাইনি। বিনয় বাবু এবার চুপ কবলেন। বল্লাম—আপনি যে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারী শাস্ত্ৰই এনে ফেল্লেন। বিন বাবু ম্লান হেসে বল্লেন—ট্র্যাজিডি ত সেই খানেই ' অপরূপ, রহস্যময় এই মানব-আত্মা, শূন্য আকাশ যে দেবতায বিযে তােলে, প্রেমকে মৃত্যুর ওপারেও জয়ী করবার যে স্পর্ধা করে শেষ পর্যন্ত সেও একটা শুকননা, কুৎসিৎ ডাক্তারী শাস্ত্রের অধীন। ডাক্তারী শাস্ত্রের অমােঘ বিধান তার সমস্ত আদর্শ, সমস্ত স্বপ্নকে নির্মমভাবে গুড়িয়ে থেলে নিজের নির্দিষ্ট পথে চলে যায়। এটা কি ঠিক সেকালের ট্র্যাজিডি হ’ল?—জিজ্ঞাসা করলাম। বিনয বাবু বল্লেন—হাঁ, সেকালের ট্র্যাজিডি, একালের দৃষ্টিতে দেখা।

খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখে শশাঙ্কর ঘুম ভেঙে গেল। জেগে উঠেও প্রথমটা তার বুকে দ্রুত স্পন্দন যেন থামতে চায় না। স্বপ্নের সে বিভীষিকা এখনও যেন চার ধারের অন্ধকারে আত্মগােপন করে আছে। গলাটা তার শুকিয়ে গেছলাে তবু শশাঙ্কর কেমন যেন উঠে জল গড়িয়ে খেতে ইচ্ছে হলনা। স্বপ্নের বিভীষিকা তাকে যেন শিশুর মত অসহায় করে ফেলেছে। অন্ধকারে নিজেকে তার অত্যন্ত নিঃসঙ্গ অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে হচ্ছিল। এই ভয়াবহ একাকীত্ব সে যেন কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। চুপ করে খানিক শুয়ে থেকে আস্তে আস্তে সে অন্ধকারে পাশে হাত বাড়াল। হাতে ঠেকল মালতীর চুল। এইবার তার নিদ্রার ঘাের ও স্বপ্নের বিভীষিকা কেটে যাচ্ছে অনেকটা। মালতীর মৃদু নিশ্বাসের শব্দ নিস্তব্ধ অন্ধকারে সে শুনতে পেল। म শব্দেও যেন একটু আশ্বাস আছে। সেই নিশ্বাসের মৃদু শব্দটিতে যেন মালতীরও আর একটি পরিচয় আছে। হাতটা আরেকটু নামিয়ে শশাঙ্ক মালতীর গালের ওপর এবার রাখলে। অপরূপ স্নিগ্ধ কোমলতা। সমস্ত মন জুড়িয়ে যায়। সমস্ত দেহ প্রথম মেঘেব ছোলাগা গ্রীষ্মের আকাশের মত নরম হযে আসে। এই কোমলতা এই স্নিগ্ধতা সে মালতীর সমস্ত সত্তার কাছেই ত’ প্রত্যাশা কবেছিল। কিন্তু তার আশা পূর্ণ হয়েছে কি ? নিদ্রিত মালতীর এই রূপের সঙ্গে জাগ্রত মালতীর যে অনেক তফাৎ। মালতীর কঁাধের ওপর হাত রেখে শশাঙ্ক তাকে আস্তে একটু মহানগর নজের দিকে আকর্ষণ করলে। ঘুমের ভিতরই মালতী তার দিকে আব একটু সরে এসে একটি হাত রাখলে তার গলার ওপর। মালতীর মুখটি এবার একেবাবে শশাঙ্কর বুকের কাছে। মালতীব শীরেব উত্তাপ এবার সে অনুভব করতে পারছে। মালতীর চুলের ঘ্রাণ সে পাচ্ছে। শশাঙ্কর মনে হল এমন কাছাকাছি তারা অনেকদিন আসেনি। না এসেছে বটে—কিন্তু শীগগীর অত্যন্ত অল্প সময়েব মধ্যেই এই নিশ্চিন্ত আত্মনিমজ্জনের সুর গেছে কেটে । কেন যে কেটে গেছে শশাঙ্ক ভাল বুঝতে পারে না। ঠিক যে ঝগড়া তারা করে তা নয়, বাইরে থেকে তাদের জীবনে পরস্পরের প্রতি বিরূপ হবার কোন কারণ আছে বলেও শশাঙ্ক মনে হয় না। তবু কেমন যেন তারা মিলতে পারছে না সম্পূর্ণ ভাবে। কোথায় তাদের অবচেতন মনে বযেছে একটা আশঙ্কা, এমন কি একটা আক্রোশও বলা যেতে পারে পরস্পবের বিরুদ্ধে। শশাঙ্কর না থাক মালতীর আছে নিশ্চয়। মালতী কিছুতেই তার কাছে সম্পূর্ণভাবে ধরা যেন দিতে চায় না কিম্বা পাবে না। মালতী তার কাছে রইল অৰ্দ্ধমুদিত হযে, নিজের সমস্ত পাপডি সে খুললে না। অদৃশ্য কাটার ব্যবধান দিয়ে শশাঙ্ককে সে সব সময়েই একটু দূরে রেখে দিলে। কিন্তু নিস্তব্ধ রাতেব এই স্নিগ্ধ মালতীকে শশাঙ্কর যে অত্যন্ত প্রয়ােজন ছিল। যৌবন যাবার আগেই যৌবনের সমস্ত স্বপ্ন সমস্ত বিশ্বাস যাদের ভেঙ্গে যায় শশাঙ্ক সেই হতভাগ্যদের একজন। বা খেযে খেয়ে সে তার আশাকে সঙ্কীর্ণ করে এনেছিল, সমস্ত বিশ্বাস সমস্ত আশ্রয় হারিয়ে সে একটিমাত্র সান্ত্বনার ওপর ভর করতে চেয়েছিল। সে মুহুর্ত সানা প্রেমের। সমস্ত দুঃখ হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের মাঝে হৃদয়ের এই নিবন্ধু, কুলায়ে সে শান্তি পাবে ভেবেছিল। কিন্তু মালতী কিছুতেই তেমন করে কাছে এলনা, কিছুতেই উন্মুক্ত করলে না নিজেকে। বাইরে থেকে দেখলে তাদের দাম্পত্য জীবনে কোন চিড চোখে পড়বে না বােধ হয়। বেশ মসৃণভাবেই দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে। মালতীর কোন দোষ কোন ত্রুটি নেই। গৃহলক্ষ্মী হিসাবে সে আদর্শ। সংসারের তত্ত্বাবধান সে এমন নিখুঁতভাবে করে যে শশাঙ্ককে কোন দাযই পােহাতে হয় না। নিঃশব্দে ঘুবে চলে দিনের চাকা। ঘর দোব পরিপাটীভাবে সাজান। শশাঙ্ক না চাইতে তার প্রযােজনের জিনিষ যথাসময়ে যথাস্থানে এসে হাজির হবেই। তার লেখার টেবিলেব ওপর ব্লটিংকাগজ প্রতিদিন সকালে নিষ্কলঙ্কভাবে দেখা দেয়। ফাউন্টেন পেনটি যেখানেই ফেলে বাখুক না কেন প্রযােজনের সময় দেখা যায়, টেবিলেব ওপর সেটি নতমুখে মসীপূর্ণ হয়ে অপেক্ষা করছে। টেবলল্যাম্পে শেডটি প্রতিদিন রাত্রে সেই প্রথম দিনের মত ঝক ঝক্‌ করে। মালতীর আয়ােজন নিখুত নির্ভুল। কিন্তু এ আয়ােজন আনন্দময সেবার নয, পূজারও নয, এ আয়ােজন নীরস কর্তব্যের। এই কঠিন কর্তব্যপরায়ণতাই মালতীর চারিধারে দুর্ভেদ্য বর্মের মত। সেই বৰ্ম অতিক্রম করে মালতীর নাগাল আর কিছুতেই পাওয়া যায়না। সকালে উঠে হযত শশাঙ্ককে বেরুতে হবে। দেরাজ খুলে মােজা বার করতে গিয়ে মােজা সে পায়না। কিন্তু হেঁকে কিছু বলবার আগেই মালতীকে মােজা হাতে করে ঢুকতে দেখা যায়। শশাঙ্কর দিকে না মহানগর চেযেই সে বলে,-গােডালির কাছটা একটু ছিডে গিয়েছে। একটু দাও সেলাই করে দিচ্ছি। শশাঙ্ক বলে,- ওইটুকু ডােয় কিছু হবে না, কাল বরং সেলাই কোরাে’খন। মালতী একটা চেযাবে সােজা হয়ে বসে সেলাই করতে করতে বলে,-দেরী হবেনা এখুনি দিচ্ছি। তাড়াতাড়ি সেলাই করতে গিযে সূচটা অসাবধানে বুঝি আঙ্গুলে ফুটে যায়। যায়। শশাঙ্ক ব্যস্ত হয়ে উঠে বলে,-ওকি আঙ্গুল দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে যে। শশাঙ্কর সমবেদনাকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় না দিয়ে সহজম্বরে মালতী বলে,-ও কিছু নয়। মােজাটা এবার সে টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখে। শশাঙ্ক তবু নিরস্ত হয়না। ক্ষত আঙ্গুলটা ধরে বলে,-সামান্য একটু কাটা থেকে অনেক কিছু হতে পারে তা জান। আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মালতী বলে,-আচ্ছা একটু আয়ােডিন লাগিয়ে দিচ্ছি। ব্যস এরপর আর কোন কথা চলেনা। মালতীর দুর্ভেদ্য বৰ্ম্মের ভেতর সূক্ষ্মসুচিমুখেও প্রবেশের সুযােগ নেই। মালতী সব অবস্থাতেই এমনই সুন্দর এমনই অনধিগম্য চিরকাল। দরিদ্র শশুরকে নিজের মহানুভবতায় কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করে যেদিন সে মালতীকে ঘরে এনেছিল তখন কতই বা তার বয়স হবে, বড় জোর বােল কি সতেরাে। কিন্তু মালতীর চারিধারে তখন থেকেই মুহূর্ত এই তুষার প্রাচীর ছিল দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান রচনা করে। মালতী অবশ্য আঘাত দিযে শশাঙ্ক অগ্রসর হবার চেষ্টাকে প্রতিহত করে নি কিন্তু তাব তুষার শীতল স্থৈয্যের কাছে এসে শশাঙ্কর সমস্ত আবেগের উত্তাপ গিযেছে সঙ্কোচে জুডিযে। শশাঙ্ক আদর করলে মালতী রাগ কবে না, বাধা দেয় না কিন্তু কি এক অদ্ভুত উপাযে নিজেকে অদৃশ্য এক খেয়ালের মধ্যে গােপন কবে ফেলে। শশাঙ্ক বুঝতে শশাঙ্ক বুঝতে পারে তার কোন আবেদন সে খােলস ভেদ করে ভেতরে পৌছে:চ্ছে না। হতাশ হযে সে নিজেকে সংযত করে তাই। কিন্তু মালতী আঘাত না দিলেও এ আত্মদমনের আঘাত একটা শশাঙ্কের আত্মা পৰ্যন্ত সে আঘাতে যেন জর্জ হযে উঠেছে। শশাঙ্কের মন ইতবতার অনেক ঊর্জে, তবু, মালতীব এই শীতলতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত কয়েকটা দিনের ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। জঘন্য সন্দেহেব গ্লানিতে কুৎসিত সে দিন- গুলির কথা মনে হলেও শশাঙ্কর আজকাল ভয় হয়। নিজেব অনিচ্ছায নিজের সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও সেদিন সে পশুর মত হিংস্র হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল মালতী তাকে ভালবাসেনা বলেই হয়ত ধরা দেয় না। আর মালতী যদি তাকে ভাল না বাসে তবে কি নিজের মনের কাছে অনুচ্চারিত সেই প্রশ্ন সেদিন তাকে উন্মাদ করে তুলেছিল। প্রশ্নকে সে আমল দিতে চায়নি তবু ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুতের মত একটি নাতিক্ষুট জালাম উত্তর তার মনকে ঝলসে দিয়ে গেছে বহ্নি-বিষে। সেদিন কত নীচেই যে সে নেমে গিয়েছিল মনে হলেও তার এখনও লজ্জা হয়। মালতীর অসাক্ষাতে একদিন সে চোরের মত তার বাক্স

মহানগর
খুলে ওলটপালট করে দেখেছে। কিছু পায়নি অবশ্য। কিন্তু না
পেযেও যেন সন্তুষ্ট হতে পারেনি। বাল্প বন্ধ করে রাখবার আগেই
মালতী এসে ঘরে ঢুকেছিল। শশাঙ্ক অপ্রস্তুত হয়ে বলেছিল-আমার
কামাবার ছােট আযনাটা পাচ্ছিনা, তােমার বাক্সে রেখেছ কি না
দেখছিলাম।
মালতী সহজ স্বরে বলেছিল—আযনা ড্রেসিং টেবিলের ওপরেই
আছে। সে স্বরে ভৎসনা নেই, বিস্মযও নেই।
শশাঙ্ক মূখ চোখ লাল
করে ঘব থেকে বেরিয়ে গেছল ।
আব একদিন সে দুপুরবেলা হঠাৎ ঘরে ঢুকেছিল অত্যন্ত অস্থির
ভাবে। কি তার মনে ছিল কে জানে কিন্তু ঘরের ভিতর ঢুকে
মালতীর সামনে বােধ হয় সে তার সঙ্কল্প স্থির রাখতে পারেনি।
মালতী তখন তার ঘর গুছােচ্ছে। শশাঙ্ক একটু কঠিন স্বরে
জিজ্ঞাসা করেছিল—এ ছবি নামানাে হয়েছে যে বড় ?
মালতী একটু বুঝি চুপ করে থেকে শশাঙ্কের দিকে অদ্ভুত ভাবে
চেযে বলেছিল—নামালে কি হয় ?
এমনভাবে বাহুল্য-প্রশ্ন করে কথা বাড়ানো মালতীর স্বভাব নয়। তার
গলার স্বরেও বুঝি অস্বাভাবিক একটু উত্তেজনার রেশ ছিল। শশাঙ্ক
একটু বিস্মিত হ'ল। কিন্তু মালতী তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে
বল্পে—ধূলো পড়ছিল, ভাল করে মুছে তুলে রাখবে বলে নামিয়েছি।
শশাঙ্কের মন অনেকটা এবার গলে গেল। এ ছবি তার প্রথম
স্ত্রীর। বিয়ের পরই প্রথম দিন মালতীকে নিয়ে এ ঘরে ঢুকে এই ছবিটি
দেখিয়ে শশাঙ্ক বলেছিল—কে জান মালতী ?

মুহূর্ত মালতী খানিক একদৃষ্টে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল- জানি। এ ঘরে ওর অপমান যেন কখন না হয় মালতী। কোন দিন যেন আমরা মনে না করি ও শুধু একটা ছবি। মালতী এবারেও খানিক মাথা নীচু করে থেকে ঘাড় নেডে জানিয়েছিল সে তা করবে না। মালতী তার অসাক্ষাতেও এ ছবির যত্ন করে জেনে সত্যিই শশাঙ্ক খুসী হ’ল। একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়ে সে উৎসাহ ভরে বল্লে—কাজ করতে করতে হঠাৎ পালিযে এলাম, জান মালতী। কিন্তু মালতীর মুখে সে উৎসাহ প্রতিফলিত হবার আশা বৃথা। সাধারণ স্বরে জিজ্ঞাসা করলে, আবার এখুনি যাবে নাকি ? এ উত্তর শশাঙ্ক আশা করেনি, তারপর আবার কঠিন হয়ে উঠে হঠাৎ সে উগ্র স্বরে বলে, -আমি গেলেই তুমি বঁাচ, না ? মালতী তার দিকে ব্যথিত দৃষ্টিতে চেয়ে বলে—তা’ত বলিনি। বলনি, আবার কি করে তাহলে বলতে হয় ? মালতী এবার নীরব। শশাঙ্ক আবার বল্পে,-আমি যদি তােমার কাছে এমন বিষই হয়ে থাকি, তা হলে কি দরকার আমার কাছে তােমার থাকবার ? কি ইতর ভাবেই সে ঝগড়া করছে বুঝতে পেরে শশাঙ্ক যেন আরাে মরিয়া হয়ে উঠল। হিংস্র ভাবে মালতীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বল্লে- তােমার এখানে থাকতে ভাল লাগেনা কেমন? চল আজই তােমায দিয়ে আসছি।

মহানগর মালতী মুখ নীচু করে দাঁডিযেছিল। তার সমস্ত মুখ চোখ রাঙা হয়ে উঠেছে। মনে হল তার স্বাভাবিক স্থৈর্য বুঝি আর থাকবে না। তার অবিচলতার মুখােস বুঝি ভেঙ্গে পডে আবেগের ভবে। কিন্তু মালতী এবারেও জয়ী হল। অসামান্য শক্তিতে নিজেকে দমন কবে সে হঠাৎ মুখ তুলে দৃঢ়বে বল্পে—আমি এখান থেকে যাব না। নিজের ব্যবহাবে এবাব শশাঙ্ক লজ্জিত হযে উঠল মনে মনে। ঘরের ভেতর একম ভাবে মালতীব সামনে দাড়িয়ে থাকতে তার অত্যন্ত অস্বস্তি হচ্ছিল। সে ঘব থেকে বেরিয়ে গেল । সে কুৎসিৎ দিনগুলির ছায়া তাবপব শশাঙ্কের মন থেকে সবে গেছে কিন্তু দুজনকার ভেতবাব সম্বন্ধ সহজ হযনি আজো। মালতীকে সে পেল না পাশাপাশি শুয়েও তারা বইল একান্ত অপরিচিত হযে। অন্ধকারে অর্থহীন ভাবে শশাঙ্ক চেয়েছিল। দেয়াল ঘডিটার কাটা এগিয়ে চলেছে অশ্রান্ত ভাবে—টকাটক। সমস্ত অন্ধকাব সে শব্দে ভবে গেছে। সেই শব্দটা এবাব অদ্ভুতভাবে শশাঙ্ককে অভিভূত কবে দিল । টকাটক—টকাটক -বিবাম-বিহীন শ্রান্তিবিহীন পায়েব শব্দ। অসীম অনন্ত সমযেব অন্ধকাব মরুপ্রান্তর বেযে যেন চলেছে অনন্ত কালেব অক্লান্ত প্রহরী। তারই অশ্বক্ষুরধ্বনি শােনা যাচ্ছে নিয়মিত তালে তালে। এ চলার বিরাম নেই, এ যাত্রার শেষ নাই। কল্পনা যেখানে পৌছে না সেই অতীত থেকে ধারণার অতীত ভবিষ্যতে এই পথ। ভাবতেও ভয়ঙ্কর লাগে। এ বিশাল অনন্ত সমযের মরুতে কতটুকু পথ শশাঙ্কের? বালের সওয়ার নিমেষে তার সে আযুর পথ পার হযে যাবে। তারপর এমনি অন্ধকার আর শূন্যতা। এই নশ্বর আয়ুর কি মুহূর্ত স্বার্থকতা আছে একমাত্র প্রেমে ছাড়া। এ জীবনের একমাত্র সান্ত্বনা ভিতরের রঙে অন্ধকারকে ক্ষণিকের জন্য রঞ্জিত করে তােলায়। কিন্তু শশাঙ্কের সে সান্ত্বনাও নেই। একবার মৃত্যু তাকে ব্যঙ্গ করে গেছে, এবার জীবন আছে তার সামনে দুব রোধ করে। হঠাৎ শশাঙ্ক চমকে উঠল। জানলার পাল্লাটা কে যেন সশব্দে নেড়ে দিয়েছে। সেটা ঝণ ঝণ করে নডে উঠছে। শশাঙ্ক কৌতূহলী হয়ে উঠে যাবার আগেই সমস্ত ঘরটা যেন দুলে উঠল। দরজা নড়ছে, খাট দুলছে, আলমারীব জিনিষপত্র দেয়ালের ছবিগুলাে সব উঠেছে অস্থির ভাবে কেঁপে। চকিতে ব্যাপাবটাব অর্থ বুঝতে পেবে শশাঙ্ক ভীত হয়ে উঠল। সজোরে মালতীকে নাড়া দিয়ে ডাকলে—ওঠ ওঠ মালতী শীগগীর ওঠ। ঘর তখন রীতিমত দুলতে সুরু করেছে, ছিটকিনি খুলে গিযে জানলার পাল্লাগুলাে আছাড় খাচ্ছে গবাদের ওপর, ওপরের একটা তাক থেকে কাচের কটা বাসন সশব্দে নীচে পড়ে ভেঙ্গে গেল। শব্দে ও শশাঙ্কের ডাকে ধড়মড় করে উঠে পড়ে মালতী নির্বোধ ভয়ে শশাঙ্ককে ধরলে জড়িয়ে। ভূকম্প হচ্ছে মালতী শীগগীর ওঠ। শশাঙ্ক কোন রকমে মালতীকে সঙ্গে করে উঠে সুইচটা টিপে দিলে। অন্ধকারে শব্দটা পাওয়া যাচ্ছিল। আলােতে ভূমিকম্পের বেগটাও দেখা গেল। ঘরের আসবাবপত্র ভয়ানক ভাবে দুলছে, কয়েকটা ছবি আশ্রযচ্যুত হয়ে ঝুলছে, ঘড়ির কাটা গেছে থেমে। মালতীর এখনও ঘুমের ঘাের ভাল করে যায়নি। শশাঙ্ককে সে ৩৮ মহানগর অসহায় ভাবে জড়িয়ে ধরে থেকে সে কঁপছিল। এই নিদারুণ বিপদেব মুহূর্তেও মালতীর সে আলিঙ্গনের স্বাদ শশাঙ্ক সমস্ত শরীর দিয়ে অনুভব করে যেন নিশ্চল হয়ে উঠল। এমন কবে এত কাছে মালতী কোন দিন আসেনি। ভূমিকম্পে বুঝি মালতীর চারিধাবের প্রাচীর এতদিনে গেছে ভেঙে। মালতীকে এক হাতে জড়িয়ে রেখে আর এক হাতে দরজার খিলটা খুলতে খুলতে শশাঙ্ক বলে, শীগগীর নীচে চল মালতী, পুরণাে বাড়ীর দোতালা একে বিশ্বাস নেই। মালতী প্রায় অস্ফুট স্বরে বল্লে—আমরা ত এক সঙ্গে আছি। আমরা ত’ এক সঙ্গে আছি। শশাঙ্কের সমস্ত মন গুঞ্জন কবে উঠল আনন্দে। হােক ভূমিকম্প, হােক প্রল, সে বুঝি আর কেয়ার করে না। মালতী ধরা দিয়েছে। তারা ঘর থেকে বেরুবার আগেই সশব্দে একটা ছবি নীচে পড়ে গেল। থমকে দাড়িয়ে দুজনে একবার সে দিকে চাইলে। মালতী নিজের অজ্ঞাতসারে সে দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। শশাঙ্ক তাকে বাধা দিয়ে বল্পে—থাক—নীচে চল আগে। দুজনের একবার দৃষ্টি বিনিময় হল। সে দৃষ্টির ভাষা জটিল, গভীর, শব্দের অতীত। দুজনে এবার দ্রুতবেগে বেড়িয়ে পড়ল ঘর থেকে পরস্পরকে জড়িয়ে । কিন্তু হায় বেশী দূর তাদের যেতে হল না। ভূগর্ভের অগ্নিস্রোতের আলােডন মানুষের হৃদয়ের আলােডনের তােয়াক্কা রাখে না। একটা জীবন নাট্যের পরিবর্তন অর্ধসমাপ্ত রেখেই মাঝখানে ভূমিকম্প

মুহূর্ত
গেল থেমে। দরজা জানালা আর নড়ছে না। পৃথিবী শান্ত
হয়ে গেছে।
সিডি দিয়ে নামতে নামতে তারা দাড়িয়ে পড়েছিল। খানিক
নিঃশব্দে দাড়িয়ে থেকে মালতী ধীরে ধীরে শশাঙ্কের আলিঙ্গন থেকে
মুক্ত করে নিলে নিজেকে। এতক্ষণ যেন সে অভিভূত হয়েছিল।
আচ্ছন্নভাব এইবাব তার কেটে গেল। সে আবার সেই আত্মস্থ
অবিচলিত মালতী।
মালতী ধীরে ধীরে আবার ওপরে উঠে এল শােবার ঘরে।
পেছনে এল ক্লান্তভাবে শশাঙ্ক। ভূমিকম্প যেন শুধু তাকেই বিধ্বস্ত করে
গেছে।
মালতী ঘবে এসে ছবিটাকে তুলে ধরলে। কঁচটা শুধু ভেঙ্গে গেছে
আর কিছু ক্ষতি হয় নি।
মালতী শান্ত স্বরে বলে—সকালে কঁাচ বাধিয়ে নিয়ে এস
শশাঙ্ক বিমুঢ়ভাবে রইল সামনে তাকিয়ে।

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী সকাল বেলা করুণা নিজে হাতেই চা নিয়ে এল। চায়ের আনুষঙ্গিকের বহর দেখে না হেসে পারলাম না। বল্লাম,তােমাদের এদেশী জলহাওয়া ভাল হতে পারে, কিন্তু আমার জীর্ণ করবার ক্ষমতাটা এখনাে খাটি স্বদেশী আছে,—এই দুদিনে তার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। উত্তরে শুধু একটু হেসে প্লেটগুলাে টেবিলের ওপর সাজিয়ে করুণা চলে যাবার উপক্রম করতে আবার ডেকে বল্লাম, তুমি কি আমার সঙ্গে লৌকিকতা শুরু করে দিলে না কি? বিমলবাবু লৌকিকতা কবলে না হয় বুঝতাম, কিন্তু কথার মাঝখানেই করুণা বলে,—বিমলবাবুর হযেই যদি করি, দোষ আছে কি ?—তার পর হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। চায়ের পেয়ালা সামনে ঠাণ্ডা হতে লাগল। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। না, করুণার ব্যবহারটা মােটেই ভাল লাগছে না, একথা নিজের মনের কাছেও স্বীকার করতে আর বাধা নেই। করুণা নাটকীয় একটা কিছু করে বসবে তা অবশ্য আশা করিনি। আশা কেন সেটা রীতিমত আশার বিষয়ই ছিল। গােড়ায় তার সহজ স্বাভাবিকতায় তাই বুঝি আশ্বস্তই বােধ করেছি। কিন্তু মনের কোন গােপন কোণে আহত অহঙ্কার তারপর ধীরে ধীরে সাড়া দিতে সুরু করেছে। মনে হয়েছে এতটা হবার বুঝি দরকার ছিলনা। সূৰ্য্য

জনৈক কাপুরুষেব কাহিনী
অস্ত গেছে যাক, কিন্তু তার বিলম্বিত রঙ পশ্চিমের মেঘে একটু লেগে
থাকলে ক্ষতি কি ছিল।
নাটকীয় না হযে করুণা অতি মাত্রায় কঠিন ও সংযত হযে উঠলে
বুঝি সব চেয়ে খুশি হতাম। ধরা দেবার ভয়ে তার সেই সযত্ব
সাবধানতায় আমার আত্মাভিমান সবচেয়ে বােধ হয় তৃপ্ত হত ।
কিন্তু করুণা নাটকীয় উচ্ছাস বা কঠিন ঔদাসীন্য দুইএর কোন দিক
দিযেই গেলনা।
তাতে আমার কিছু আসে যায় না, অনায়াসে এই কথাই ভাবতে
পারতাম। এবং তাই ভাবাই ছিল উচিত। সত্যিই করুণার সঙ্গে
দেখা হবার কোন আশা বা আকাঙ্ক্ষা আমার ত ছিল না। তার সঙ্গে
দেখা হবার কথাও নয়। বিশাল পৃথিবীর জনতাষ এমন নিশ্চিহ্ন হয়ে
আমরা হারিয়ে গেছলাম যে কোন দিন আবার পরস্পরকে খুঁজে
পাওযাই ছিল অভাবিত।
কিন্তু সেই অভাবিত ব্যাপার যখন ঘটল তখন দেখলাম করুণাকে
অনায়াসে ভুলে গেছি যখন মনে করেছি তখনও সে আমায় ভুলতে
পারে না—মনের এ গােপন গৰ্বটুকু ত্যাগ কবতে পারিনি।
এ রকম একটা গৰ্ব থাকা খুব অস্বাভাবিক বােধ হয় না।
সে সব দিনের কথা একেবারে তােলবার ত নয়। বিশেষ করে
সেই একটি বিকেল। সারাদিন বাইরে অবিশ্রান্ত ভাবেই বৃষ্টি পড়েছে,
ইচ্ছে থাকলেও কোথাও আর বার হওযা হয়নি। বিকেলে চাকর
এসে খবর দিলে একটি মেয়ে দেখা করতে এসেছে।
এই হোটেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে একটি মেয়ে। প্রথমটা

१२
মহানগর
সত্যিই একটু বিমূঢ় হয়ে গেছলাম। চাকরের সঙ্গে করুণা যখন ঘরে
এসে ঢুকল তখনও আমার মুখের বিস্ময় নিশ্চয় অত্যন্ত স্পষ্ট।
চাকর চলে যাবার পর করুণা কাছে এগিয়ে এসে বলে,খুব
আশ্চৰ্য্য হযেছ, না ?
তা একটু হয়েছি, কিন্তু তুমি যে একেবারে ভিজে গেছ।আমি
সত্যিই ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
করুণা কাছের একটা চেয়ারে বসে বলে,-বৃষ্টিতে বেলে ভিজতেই
হয, তােমায় ব্যস্ত হতে হবে না।
তারপর হেসে উঠে বল্লে,—ব্যস্ত হয়ে করবেই বা কি। তোমাদের
এ নারী-বিবর্জিত রাজ্যে মেযেদের পােষাক পাবে কোথায় ? সখেব
থিয়েটার-পার্টিও নিশ্চয়ই তােমাদের নেই।
একটু ভেবে বল্লাম,—ওপরে দশ নম্বরে একজনেব আছেন—
স্বামী স্ত্রী।
করুণা আবার হা,–তাঁদেব কাছে শাড়ী ব্লাউজ চাইতে যাবে ?
কি বলে চাইবে ?
হাসি থামিযে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বল্লে,তার চেয়ে ভিজে কাপডেই
আমি বেশ আছি। আমার অসুখ করবে না, ভয় নেই।
অগত্যা তার পাশে গিয়ে বসলাম। আমি কোন প্রশ্ন কববার
আগেই সে আবার বল্পে,—ভাবছ, এমন ভাবে এখানে আসার মানে
কি ? কেমন ?
এবারও কোন উত্তর দিলাম না। করুণা খানিকক্ষণের জন্যে
কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে মনে হল। তারপর সম্পূর্ণ

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী ৭৩ রূপান্তর। এই দুর্বার আবেগ সে এতক্ষণ জোর করে ধরে রেখেছিল বুঝলাম। একেবাবে আমার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে ব্যাকুল স্বরে বল্লে,—আমায পাটনায় নিয়ে যাচ্ছে। মামা কাল চিঠি দিযেছেন। বুঝতে কিছু পারলাম না এমন নয়। তবু বেদনাময সত্যটা যতক্ষণ সম্ভব অস্বীকার করে বল্লাম,তােমাদের কলেজের ত ছুটি হচ্ছে ? করুণা আরো ব্যাকুল ঋবে বল্লেনা না তা নয়। তুমি বুঝতে পাবছ না। এখানে অামায আব বাখবে না , এই যাওয়া আমার শেষ । তার ঠাণ্ডা একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে ধবে স্তব্ধ হষে বসে রইলাম। হঁ্যা, বেদনা সেদিন আমার হৃদযেও ছিল, কিন্তু করুণার উদ্বেল আবেগেব তুলনায় সে বুঝি কিছু নয়। আমার ভালবাসার মধ্যে সে উদ্দামতা ছিল না যা ভাগ্যেব বাধার বিরুদ্ধে উদ্ধত বিদ্রোহ করতে পারে। কিন্তু করুণা খানিক বাদে অশ্রুসজল মুখ তুলে দৃঢ় স্বরে বলে, আমি যাব না, কিছুতেই যাব না। কেন যাব ? কি উত্তর এ কথাব দেবাে ভেবে পেলাম না। মনের গভীরতায় হয়ত সেদিনই তার এ বিদ্রোহে আমার সায় ছিল না। তখনই আমি জানতাম যে এ বিদ্রোহ নিস্ফল। কথাটা একটু ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টায় বল্লাম—তুমি যা মনে কবছ তা ত নাও হতে পাবে করুণা , তুমি হয়ত মিছিমিছি ভয় পাচ্ছ। করুণা আবাব অস্থির হয়ে উঠল,-না, না, আমি জানি , জোর ৭ঃ মহানগর করে তারা আমায় সেখানে বন্দী করে রাখতে চান। তাদের ধারণা এ সব ছেলেমানুষী সারাবার তাই অব্যর্থ ওষুধ। করুণা একটু তিক্ত হাসি হাসল। তারপর আবার বলে,-আমি কলেজ যাবার নাম করে বেরিয়ে এসেছি। এখানে এসে তােমায় অসুবিধায় ফেলবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু না এসে যে উপায় নেই, পিসিমার বাড়ীতে তােমার যাওয়া ত প্রায় বন্ধ হযেছে। সেখানে এসব কথা তােমায় জানাতেও পারতাম না। একটু থেমে করুণা আবার অস্থির হয়ে উঠল আবেগে, সত্যি কি আমায় নিয়ে যাবে জোর করে। কিছুই আমরা করতে পারব না? সেদিন কি আশ্বাস, কি সান্ত্বনা দিয়ে করুণাকে তার পিসিমার বাডি রেখে এসেছিলাম, তার বিবরণের এখানে প্রয়ােজন নেই, কিন্তু মনে যত বড়ই ব্যথা পেযে থাকিনা, কিছুই তারপর করতে পারিনি এটা ঠিক। করুণাকে তার মামারা জোর করে কিনা জানিনা তারপর পাটনায় নিয়ে গেছে , বাবার আগে দেখা করার সুযােগও মেলেনি আমাদের। নিমন্ত্রিত অবশ্য হইনি, কিন্তু একদিন কোথা থেকে করুণার বিয়ে হয়ে যাওয়ার সংবাদও কাণে এসেছে। নিলিপ্ত নির্বিকার মনে সে সংবাদ শুনেছি এমন কথা বলতে পারব না, কিন্তু আজ বিশ্লেষণ করে

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী
৭৫
দেখে বুঝতে পাবি এ সংবাদ পাবার পর কয়েকটি দিন ও রাত যে
আমার কাছে হতাশায় ধূসর হয়ে গেছে, তা প্রধাণত করুণার দুঃখের
কথা ভেবে। ভালবেসে না পাওযাব ব্যর্থতা সেদিন নিজের দিক দিয়ে
নয়, করুণার দিক দিয়েই উপলব্ধি কবেছি, এবং সেই উপলব্ধির
বেদনা নিজের আত্মপ্রসাদ কিছু কম ছিল কিনা তা বােঝবার শক্তি
তখন ছিল না।
করুণার স্মৃতি যখন ম্লান হয়ে এসেছে তখনও মনের কোন্
গােপন কোণে এ বিশ্বাস বুঝি ছিল, যে আমি ভুললেও সে কোন দিন
ভূলতে পারে না।
সে বিশ্বাসে রূট আঘাত পাওয়ার পরই মনের যে বিস্ময়কর
প্রতিক্রিয়া শুরু হল তাতে নিজের কাছেই নিজে কেমন একটু লজ্জিত
বােধ করলাম, কিন্তু তবু আত্মসংযম করতে পারলাম না।
করুণ। খানিক বাদে যখন আমার ঘকে এল তখন আমার আচরণে
ও কথায় একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন চেষ্টা করলে হয়ত সেও লক্ষ্য করতে
পারত ।
করুণা খাবার প্লেটটার দিকে চেয়ে বলে,—এ কি। কিছুই যে
খাওনি।
পাঞ্জাবির বােতাম আঁটতে আঁটতে তার দিকে ফিরে চাইলাম ,
একটু হেসে বল্লাম,-লৗকিকতার বদলে লৌকিকতাই করতে হয় যে ,
দুর্ভিক্ষপীড়িতের মত প্লেট সাক্ষ, কবে ফেলে তুমি ভাবতে কি ?
-তুমি এখনাে সেই এক কথা ধবে বসে আছ।-করুণার স্বর
একটু যেন ক্ষুন্ন ।

মহানগর
—এক কথা ধরে বসে থাকা আমার একটা দুর্বলতা করুণা, এখনও
এটা শােধরল না। আমার স্বর বেশ গাঢ়।
করুণা অন্য দিকে ফিরে খাবার প্লেটটা সরিয়ে রাখছিল, তার মুখ
দেখতে পেলাম না। কিন্তু যে উত্তর সে দিলে তাতে সহজ কৌতুক
ছাড়া আর কিছুই আভাষ নেই।
আর সব দুর্বলতা তাহলে শুধরে ফেলেছ 'আমার দিকে ফিরে
করুণা আবার বলে,একি এরই মধ্যে বেরুচ্ছ নাকি ?
হ্যা, গাডিটার
কতদূর
কি হ’ল একবার দেখতে ত হয় ।
তুমি দেখলেই ত সেটা তাড়াতাডি মেমত হয়ে যাবে না।
উনিত খোজ নিয়ে আসবেন বলেছেন। ওঁর ফিরতে আব দেবী
নেই। তােমায় থাকতেই বলে গেছেন।
সুতরাং ততক্ষণ তােমাৰ সঙ্গে বসে গল্প করতে বলছ?হেসে
বলবার চেষ্টা করলাম।
সকৌতুক মুখভঙ্গি করে করুণা বলে, তা করতে পাব ।
আমার সব আপনা থেকে তখন বুঝি গাঢ় হয়ে এসেছে,
অনায়াসে বলে ফেলে যে করুণা ।
এমন কি একটা কঠিন কথা
যে অনায়াসে বলা যায়না ?
করুণার মুখে একাধারে হাসি ও বিস্ময়।
এমন কিছু কঠিন নয করুণা? সত্যি বলছ? আমার সঙ্গে একা
বসে গল্প করতে তােমার ভয করেনা? আমার যে নিজেকে এখনাে
ভ করে।
তােমার মাথাটি বেশ খারাপ হয়েছে দেখছি।-বলে হেসে আমায়

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী ৭৭ বেশ একটু অপ্রস্তুত করে করুণা এবার বেরিয়ে গেল। দরজার কাছ থেকে ফিরে আবার বলে, তুমি কিন্তু যেওনা, আমি এখুনি আসছি। কিন্তু অনেকক্ষণ করুণা তারপর আর আসে না। ঘরের ভেতর পায়চারি কবে বেড়াতে বেড়াতে মনের মধ্যে কি যেন একটা জাল অনুভব করি। সেটা আমার নিজের না করুণার বিরুদ্ধে বােঝ শক্ত। হযত সেটা নিয়তির বিরুদ্ধে। কি দবকাব ছিল এমন করে আবার তার সঙ্গে দেখা হবার। দেখা হওযাটা দৈবের আযােজিত পরিহাস ছাড়া আর কি ? কদিন ছুটি পেয়ে মােটরে একটু ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। কাল রাত্রে এই শহরের মাঝখানে এসে যখন তার কল হঠাৎ বিগড়ে গেছল তখন জঙ্গলের পথে না হয়ে একটা ভদ্রগােছর শহরের মধ্যে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে বলে ভাগ্যকে ধন্যবাদই দিয়েছিলাম। ভবিষ্যৎটা তখন জানতে পারলে বােধ হয় জঙ্গলের পথটাই শ্রেয় মনে করতাম। একে রাত্রিকাল তায় অচেনা শহর। ডাকবাংলাে ও ষ্টেশনের ওযেটিংরুম থেকে দরিদ্রতম হােটেল পর্যন্ত টাঙ্গা করে ঘুরে আশ্রয় না পেযে শেষে যে কারখানাতে মােটর মেরামত করতে দিয়েছিলাম সেখানেই ফিরে গেছলাম হতাশ হয়ে। সেখানেই বিমলবাবুর সঙ্গে পরিচয়। কাছাকাছি একটা কয়লার খনিতে তিনি কাজ করেন। সেখানকাব কি প্রযােজনে এ কারখানায় এসেছিলেন। প্রবাসে বিপন্ন

৭৮
মহানগর
বাঙালীর সাহায্যে তিনি নিজে থেকেই অগ্রসর হয়ে তাঁর বাড়িতে
রাত্রি কাটাবার প্রস্তাব করেছিলেন। সামান্য একটু আপত্তি হয়ত
কবেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শােনেন নি।
শহরেব নির্জন এক প্রান্তে বিমলবাবুর বাড়ি। সেখানে পৌছে
দেখা গেছল সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ। দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে
বিমলবাবু বলেছিলেন,—আজ আমাব আসবার কথা ছিল না কি না।
চাকর ব্যাটাব। নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমােচ্ছ।
খানিকক্ষণ পবে একটি মহিলাই লণ্ঠন হাতে এসে বাইরের দরজা
খুলে নিদ্রাজড়িত স্বরে বলেছিলেন,-বড় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু
তুমি যে বলে গেছলে আজ আসবে না'
বিমলবাবু হেসে বলেছিলেন,-বরাতে একটা পরােপকারের
পুণ্য ছিল, তাই বােধ হয আসার সুবিধে হযে গেল। আমি না
এলে এই ভদ্রলােক একটু বিপদেই পড়তেন বােধ হয় অজানা
শহরে ।
করুণা এইবার আমায় দেখতে পেয়েছিল। মাথায় ঘােমটা দিয়ে
সরে যেতে গিয়ে হঠাৎ সে থম্‌কে দাড়িয়ে পড়েছে।
বিমলবাবু তখনও বলে চলেছেন, তুমি চাকবগুলােকে ডেকে
দাও, বাইরের ঘরটা খুলে একটা বিছানা ঠিক কবে দিক।
ভদ্রলােকে একটু কষ্ট হবে
হঠাৎ তাকে করুণার কথায় সবিস্ময়ে থেমে যেতে হয়েছে।
করুণা হেসে বলেছে,—বিদেশ বিভুয়ে একটু কষ্ট হলই বা
শুভ্রলােকের '

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী
বিমলবাবু অবাক হয়ে আমাদের দুজনের মুখের দিকে চেয়েছেন,
—তার মানে! একে তুমি চেন নাকি।
তা একটু চিনি বই কি।-করুণা হেসে উঠেছে।
কি আশ্চয্য ।
আশ্চৰ্য্যটা কিসের? তােমার অচেনা বলে আর আমার চেনা
হতে নেই। তােমার সঙ্গে ত মাত্র তিন বছর বিয়ে হয়েছে, তার
আগে কুড়ি বছর আমি সলিটারি সেলে ছিলাম মনে কর ।
বিমলবাবু হেসে ফেলে বলেছেন, কিন্তু ভদ্রলােককে বাইরে ঠাণ্ডা
দাড় কবিয়ে রেখে আমাদের দাম্পত্য-জীবনের নমুনাটা নাই দেখালে।
করুণা গম্ভীর হবার ভাণ করে বলেছে,—ও, আমি শুধু ঝগড়া কবি
এই তুমি বােঝাতে চাও '
এবার একটা কিছু বলা উচিত বলেই হাসবার চেষ্টা করে কথা
বলেছি,ব্যবসাই পেশা বিমলবাবু, নমুনা দেখে আমি ভুলি না।
এতদিন বাদে করুণার প্রথম আলাপের ধরণে তখনই মনে কোথায়
আমার একটা খটকা লেগেছে।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে যখন নিজেই বেরিয়ে পড়ব কি না ভাবছি
তখন করুণ। এল। সাজ-পোষাকের পরিবর্তন দেখে যা বলতে
যাচ্ছিলাম নিজে থেকেই তার উত্তর দিয়ে সে বল্লে,- একটু বাইরে
যেতে হবে। আসবে আমার সঙ্গে?

মহানগর
চাদরটা আলনা থেকে তুলে নিযে বল্লাম,শুধু আদেশের
অপেক্ষা। কিন্তু কোথায় যাচ্ছ ?
বাজাব কবতে,—বলে করুণা হাসলে।
বাজাব করতে 'অবাক হযে জিজ্ঞাসা কবলাম ।
আমি ত প্ৰায় যাই।—সে হেসে বলে '—এখানে ‘চেঞ্জার’ ছাড়া
বাসিন্দাদের মেযেরা বড একটা নিজেবা বাজারে যান না বটে, কিন্তু
আমি ও সব মানিনা। উনি না থাকলে আমি নিজেই চাকর নিয়ে
বেরিয়ে পড়ি।
কিন্তু বিমলবাবু ত আজ আছেন।
ও, তােমায় বুঝি বলা হযনি। উনি খবর
উনি খবর পাঠিয়েছেন আজ
আর আসতে পারবেন না, হঠাৎ বিশেষ জরুবি কাজে আটকে
পড়েছেন।
করুণা বেশ সহজ ভাবেই কথাটা বলে গেল। কিন্তু আমি রাস্তার
মাঝেই থকে দাড়িয়ে পড়লাম, তাহলে।
তাহলে আর ভাবনা কিসের। উনি না থাকলে কি তােমার যত্ন
হবে না।-করুণার চোখে-মুখে কৌতুকের দুষ্টহাসি।
গম্ভীর হয়ে বল্লাম,তা নয় করুণা, আমি ভাবছি।
তুমি রাস্তায় দাডিযে ভাবতে শুরু কবলে, আমায় একাই এগিযে
যেতে হবে।
অগত্যা নীরবে তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হল। এ দিকে পথটা
বেশ নির্জন। দূবে দূরে দু’একটা বাডি। তারও অনেকগুলি খালি
পড়ে আছে। রাস্তায় লােক নেই বল্লেই হয়।

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী
–
থানিকদূর নীরবে চলার পর প্রশ্ন না করে পারলাম না,
আজ রাত্রে ফিরবেন ত ?
বােধ হয় না। এখন দু’চারদিন হত সেখানে থাকতে হবে।
আবার নীরবে অনেকটা পথ পার হয়ে গেলাম। করুণা কয়েকবার
আমার দিকে ফিরে তাকাবার পর হেসে বলে,-কি ভাবছ অত গম্ভীর
ভাবে ?
ভাবছি আজই আমায় চলে যেতে হবে।
তােমার গাড়ি ত আজকের মধ্যে মেরামত হযে উঠবে না।
গাড়ি এরা পরে পাঠিয়ে দেবেন। আমি ট্রেণেই যাব।
এত ব্যস্ত কেন ? তােমার এখামে ভয় কিসেব ?
রাস্তার মাঝে আবার দাড়িয়ে পড়লাম,বলেছি তাে ত আমার
নিজেকে নিজেকে আমি বিশ্বাস করি না।
করুণা এবার বেশ জোবেই হেসে উঠল।—নাই বা করলে, তাতে
কারুর ত কোন ক্ষতি নেই।
না, এ বুঝি আর সওযা যায় না। হঠাৎ সমস্ত সংযম হারিযে তার
হাতটা ধরে ফেল্লাম,-ক্ষতি যদি তােমাই হয়. •
করুণা হাত ছাড়িয়ে নিল না। কিন্তু পরিহাসের হাসিতে আমার
সমস্ত আবেগকে নিষ্ঠুর ভাবে হাল্কা করে দিয়ে বল্পে-কেমন করে হবে?
আমি ত নিজেকে বিশ্বাস করি।
করুণাব হাত ছেড়ে দিয়ে বল্লাম,সে বিশ্বাস এখনাে কি ভেঙে
চুর হয়ে যেতে পারে না করুণা ? সমস্ত নােঙর ছিডে তােমায়
ভাসিয়ে নিয়ে যাবার ঢেউ কি আসতে পারে না ?
০

মহানগর
করুণার চোখে সেই দুর্বোধ সকৌতুক হাসি,-কি জানি, পরীক্ষা
অব হয় নি।
কি তারপর বলতাম ঠিক জানি না, কিন্তু রাস্তা এবাব জনবহুল
হযে এসেছে। বাধ্য হয়েই চুপ করে গেলাম।
সকালবেলা বাইরে বার হবার পােষাকে করুণার এক রূপ
দেখেছিলাম। দুপুরবেলা যােডশােপচার আহারের আযােজনের
সামনে বসে তার আর এক রূপ দেখলাম। একটি শাদা সেমিজের
উপর লাল চওডা কস্তাপাড় শাড়ি পরে আধ-ঘােমটার পাশ দিয়ে ভিজে
এলােচুল পিঠে এলিযে সে কাছে এসে বসল। এমন আশ্চৰ্য্য তাকে
কোন দিন লাগে নি।
পাখাটা নাড়তে নাড়তে হেসে সে বল্লে,—কি দেখছ ? কখন
দেখ নি নাকি।
মনে হচ্ছে সত্যি কখন দেখিনি।
তা হতে পারে বলে সে অদ্ভুত ভাবে হাসল, তারপর জিজ্ঞাসা
করলে,-আচ্ছা, আমার বাজার করা দেখে কি ভাবছিলে বলত ?
এই কথাই ভাবছিলাম যে তুমি আমার কাছে একটা নতুন
আবিষ্কার।
তাই নাকি, কিন্তু দোহাই বেচারা কলম্বাসের দাবিটুকু উডিযে
দিও না।

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী
আমার মুখের
কলম্বাসের আগেকার দাবি যদি থাকে।
দাবি থাকলেও দলিল নেই ত 'নিজের রসিকতা করুণা নিজেই
হেসে মাৎ করে দিলে।
নিঃশব্দে অনেকক্ষণ খেয়ে যাবার পর বল্লাম,—দলিলের দাম
সকলের কাছে নেই। ও তুচ্ছ জিনিষ অনায়াসে পুড়িয়ে ফেলা যায়।
এবার করুণা হাসল না ।
দিকে খানিক অদ্ভুতভাবে
তাকিয়ে থেকে,—তােমায় মিষ্টি দেওয়া হয় নি,
হয নি, বলে হঠাৎ
উঠে গেল।
তারপর মিষ্টি কৰুণা নিয়ে এল না, নিয়ে এল ঠাকুব।
কিন্তু খানিক বাদে ঘরে সে নিজেই পান নিয়ে এল, এবং হঠাৎ
বলে বসল,-তুমি আজ সন্ধ্যার গাড়িতেই তাহলে যাচ্ছ ?
সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। আমারই মনের ভুল,
তার মুখে একটা অস্ফুট অস্থিরতার ছাযা ?
বক্সাম-বেশ, তাই যাব।
বেশ, তাই যাব, 'মানে। আমি যেন তােমায় জোর করে পাঠিয়ে
দিচ্ছি। আমি ত তােমায থাকতেই বলছি, তুমি নিজেই ত যাবার
জন্যে অস্থির হয়ে উঠলে তখন।
—গলার ঝাঁঝটা এবার লুকোবার নয়।
হেসে বল্লাম,আমি কি তােমায দোষ দিচ্ছি ? আমার সত্যিই
না গেলে নয়।
একটু যেন লজ্জিত হয়ে করুণা হাসবার চেষ্টা করে বলে,
জানি, এমন জায়গায় তােমার মন টেকে? কিন্তু শােন, সন্ধ্যায় ঐ

১০
মহানগর
একটি ছাড়া আর গাড়ি নেই তা জান ত? ঠিক সাড়ে ছটায়, মনে
থাকে যেন।
গাডির সময় আমার মনে রাখবার প্রয়ােজন ছিল না। বিকেল
হতেই জিনিষপত্র বাধিযে, আমায় মােটরের কারখানায় খবর দিতে
পাঠিয়ে, ষ্টেশনে যাবার গাডি ডাকিয়ে করুণা নিজেই সব বন্দোবস্ত করে
ফেল্পে, এবং ষ্টেশনে যাবার পনেরাে মিনিটের পথ যেতে পাছে কোন
গােলমাল হয় বলে এক ঘণ্টা আগে আমায় গাড়িতে তুলে দিয়ে
নিশ্চিন্ত হল।
এতক্ষণ আমার সঙ্গে বিশেষ কিছু বলবার অবসর তার মেলে নি।
বাড়ি থেকে টাঙ্গায ওঠবার সময় সে কাছে এসে দাড়িয়ে বলে,-
তুমি আমায় কি ভাবছ কে জানে! যেন তােমায় বিয়ে করতে
পারলেই বাঁচি মনে হচ্ছে, না ?
সেইটুকু ভেবেই যা কিছু সান্ত্বনা।
করুণা হেসে উঠল—সানাটা এত সস্তা হলে আর সত্যিকার কিছু
মেলে।
টাঙ্গাওয়ালার গাড়ি চালানাের শব্দে তার হাসির রেশ মিলিযে
গেল।
এ গল্পের শেষ ঐখানেই হলে ভাল হত, কিন্তু তা হল কই।
ষ্টেশনে যখন পৌছালাম তখনও ট্রেনের অনেক দেরি।

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী
ওয়েটিংরুমে জিনিষপত্র রেখে এদিক ওদিক অকারণে ঘুরে বেড়িযেও
সময় কাটাতে না পেরে তখন বইএর ষ্টলে এসে দাডিযে কি কেনা যায়
ভাবছি। হঠাৎ পাশে চোখ পড়ায় চমকে উঠলাম।
এ কি। করুণা, তুমি এখানে ?
ম্লান একটু হেসে বলে,-এই এলাম ।
ষ্টেশনের শেডের আবছা আলাের দরুণ, না সত্যিই, করুণাকে
দুৰ্বল দেখাচ্ছে।
উল থেকে একটু সরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি ঠিক বুঝতে
পারছি না করুণা, হঠাৎ ষ্টেশনে আসা মানে '
করুণা আবার হাসল, তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে,দলিল
পুড়িয়ে দিয়ে এলাম।
খানিকক্ষণ সত্যিই কিছু বুঝতে না পেরে তার দিকে বিমূঢ়ভাবে
তাকিয়ে, বইলাম । তাবপবে ব্যাকুলভাবে বল্লাম,—কি বলছ
করুণ।
খুব অসম্ভব কি কিছু বলছি ? সব নােঙর ভাসিয়ে নিয়ে যাবার
মত ঢেউ কি আসে না কখনাে? করুণার স্বর ক্রমশঃ যেন গাঢ় হযে
উঠল।
আমার বুকের একেবারে কাছে এগিয়ে এসে চোখের দিকে চোখ
তুলে সে বলে, তুমি আমায় নিয়ে যেতে পার না? যাবে না নিয়ে,
বা ?
অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়লাম,আমি তােমায় নিয়ে
কোথায় যাবে ভাবছ? যেখানে খুশি।

মহানগর
।
কোন কথা এবার আর মুখ দিয়ে বেরুল না। মনের ভেতর শুধু
একটা অস্থির আলােড়ন অনুভব কবছি।
তােমার অনেক অসুবিধা, অনেক লাঞ্ছনা সইতে হবে জানি, কিন্তু
আমিও ত তারই জন্যে প্রস্তুত হযে সমস্ত লজ্জা কলঙ্ক নিন্দা মাথায় নিযে
এসেছি।
করুণা কাতর ভাবে মুখের দিকে চেয়ে আছে। কি বলব কি
এখন বলতে পারি। তাকে আঘাত না দিযে সমস্ত অবস্থা বুঝিযে
বলবার মত ভাষা কি আছে ' নির্বোধের মত আমিই তার রুদ্ধ বন্যার
বাঁধ খুলে দিয়েছি, এখন তাকে কেমন করে ফিরিয়ে দেব?
কিন্তু সব কথা তুমি বােধ হয় ভাল করে ভেবে দেখ নি করুণ।
যে ঝড় এবার উঠবে তা কি তুমি পারবে সইতে ? তার সঙ্গে যুঝতে
বুঝতে ক্লান্ত হযে হয়ত আমরা পরস্পরকেই একদিন ঘৃণা করতে শুরু
করুণা তখনও আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিযে, কিন্তু ধীবে ধীরে
—অত্যন্ত ধীরে ধীরে তার সমস্ত মুখ যেন বিপের হাসিতে ভরে
উঠল।
তােমার মূল্যবান উপদেশের জন্যে ধন্যবাদ।—আর একটু হলেই
নােঙর উপড়ে গেছল আর কি করুণা এবার সশব্দেই হেসে উঠল।
অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। সমস্তই কি তবে আমাকে
বিদ্রুপ করবার জন্যে অভিনয় !
করুণা সহজ ভাবে বলে,-যাও তােমার ট্রেন আসবার ঘণ্টা
পড়েছে। আমার ট্রেনেরও বােধ হয় দেরি নেই।

জনৈক কাপুরুষের কাহিনী ৮৭ তােমার ট্রেন। পিসিমারা কলকাতা থেকে আসছেন। তারা বাড়ি চেনেন না। উনিও নেই, তাই নিজেই এলাম নিয়ে যেতে। শুনে খুব হতাশ হলে বুঝি ? কোন কথা আর না বলে ওধারের প্লাটফর্মে যাবার জন্যে ওভার- ব্রীজের দিকে অগ্রসর হলাম। করুণাকে শেষ যখন দেখতে পেলাম তখন ষ্টলের বইগুলােব দিকে সে ঝুকে পড়েছে। সত্যিই পিসিমাদেব নিয়ে যাবার জন্যে সে কি ষ্টেশনে এসেছিল ? জীবনে কোনদিন সে কথা জানা যাবে না।

নতুন বাসা
শীর্ণ কঙ্কালসার বেড়ালছানাটা পাশের নর্দামা থেকে সারা গায়ে
কাদা মেখে কোন মতে রাস্তার ধারে উঠে এসে কাতরভাবে ডাকছে।
গলা তার অবশ্য এখন অত্যন্ত ক্ষীণ—একেবারে থেমে যাবার আর
দেরী নেই।
অমল নােংরা সরকারী কলতলার পাশ দিয়ে সরু গলিটায়
ঢােকবার আগে এক মুহূর্তের জন্যে বুঝি একটু থমকে দাড়ায়। গত
দুই রাত বেড়াল ছানাটা বড় জ্বালিয়েছে—কোথা থেকে কে ছানাটাকে
এই নর্দামায় ফেলে দিয়ে গেছল কে জানে—সারা দিন রাত তাব
কাতর একঘেযে ডাকে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে।
কিন্তু অমলেব অস্বস্তিটা শুধু বিরক্তিব দরুণ নয়, মনের কোথায়
একটা অক্ষমতার গ্লানিও যেন তাকে বিধেছে। সেটা আমল দেবার
জিনিষ নয় অমল বুঝেছে-একটা আধমবা নােংরা বেড়াল ছানা,
অমল তার কি করতে পারে। কিছু করতেই বা তাকে হবে কেন?
যতই কাতর ভাবে সেটা চেঁচাক, তাকে বাঁচান ত আর অমলের
দাষ নয়।
নর্দামার ধারের জানলাটা ভাল করে বন্ধ করে দিয়ে অমল
কালরাত্রে শুয়ে পড়েছিল। তাকে ঘুমােতে হবেই। সকাল
থেকে তার অনেক কাজ। কিন্তু তবু অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুম কিছুতেই
আসেনি।
বেড়াল ছানাটারকে একবার তাকিয়েই অমল আবার হনহন

নতুন বাসা করে এগিয়ে যায়। একটা আধমরা বেড়াল ছানার কথা ভাবলে তার চলবে না। বাইরের দরজাটা ঠেলে উঠোনে পা দিতেই পিসিমা চেঁচিযে ওঠেন—্যারে, ক'টা মুটে আর একটা গরুর গাড়ী ডাকতে এই এত দেরী! কখন জিনিষপত্র ভােলা হবে, আর কখনই-বা সেখানে গিয়ে ঘর-দোর গুছােব। গরুর গাড়ী পাইনি, একটা লরী ঠিক করে এসেছি—ব'লে অমল উঠোন পার হয়ে তাদের দিকের বুকে গিয়ে ওঠে। পরী।—পিসিমা প্রথমটা একেবাবে স্তম্ভিত হয়ে যান, লরী—সে অনেক ভাড়া নয়। তােমার এই রাজ্যের মাল ত আব একটা গরুর গাড়ীতে হত নারীতে এক খেপেই হয়ে যাবে, তাড়াতাডিও হবে —-দুটো টাকা বেশী তাতে লাগলই বা। অন্যদিন হলে পিসিমা বােধ হয এত সহজে প্রবোধ মানতেন না। দুটো টাকা যে কতখানি, কতদিক সামলে কি পরিশ্রমে, কি ভাবে দুটো টাকা যে তাকে সংসারে সঞ্চয় করতে হয়, কি সামান্য আয় থেকে কি ভাবে তিনটি অনাথ ভাইপােকে তিনি মানুষ করে তুলেছেন, সমস্ত সুদীর্ঘ ইতিহাসই হয়ত অমলকে শুনতে হত। কিন্তু আজ তার মেজাজটা অত্যন্ত প্রসন্ন, তিনি একটু উদারভাবেই বলেন,—তা বেশ করেছি, তাড়াতাড়ি গিয়ে ওঠা যাবে । পাশের ঘরের ভাড়াটেদের বৌ মানদা কপাল পর্যন্ত ঘােমটা টেনে, এটো বাসন-কোষন হাতে নিয়ে কলতলায় যেতে একটু কৌতুহলভরে মহানগর থেমে দাডিযেছিল, তাকে উদ্দেশ করে পিসিমা বলেন—গরুর গাড়ীর যা টিমে চাল—সেই এবেলা আর ওবেলা, তাতে কি আর আজকের মধ্যে ঘর-দোর গুছােন হত । যেমন তেমন দুটো খুপরি ত নয়, যে এখানকার মত জিনিষ-পত্ৰ ঠাসাঠাসি করে রাখলেই হবে—পাকা ঘর, অঢেল জায়গা, ভালাে কবে একটু গুছিযে না বসলে পাড়াপড়শী বলবে কি? নতুন ভাড়া করা বাসার গুণ বর্ণনা একবার শুরু হলে আব শেষ হবে না জেনে মানদা তাড়াতাড়ি সরে পড়ে। এ কদিন পিসিমার কাছে নতুন বাসব বর্ণনা সবিস্তারে শুনতে এ বাড়ীর কোন ভাড়াটের বাকী নেই। সে যে এমন টিনে ছাওযা কঁচা গাঁথুনীর পাঁচ ভাড়াটে একত্র কবা বাড়ী নয়, দস্তুরমত ভালো রাস্তায় ভদ্র পাড়ায় একখানা আলাদা পাকা বাড়ী,--তাব আশে পাশে এমন নােংরা নর্দাম যে নেই—যত বাজ্যের উডে খােটা ছােটলােকের সঙ্গে সেখানে যে কলতলায় জল নিতে যেতে হয় না, ইত্যাদি সকল সংবাদই তারা পেযেছে। পিসিমার কাছে বাড়ী বদল একটা বাহাদুরীর ব্যাপার প্রতিবেশীদের একটু ঈৰ্য্যা, একটু বিস্ময় জাগাতে পেরেই তিনি সুখী। কিন্তু অমলের কাছে সত্যিই এই বাড়ী বদল একটা মুক্তি-একটা পরিত্রাণ ' এই আবেষ্টনের মধ্যেই সে মানুষ হযেছে সত্য, কিন্তু তবু এখানে সে হাঁপিয়ে ওঠে, এর চেয়ে বিস্তৃত মুক্ত জীবনের স্বাদ তার মনে আছে।

নতুন বাসা ১১ তাদের তিনটি অনাথ ভাইকেই পিসিমা কোন রকমে মানুষ করেছেন। তাই এরা সাবালক হতে না হতেই কাজে ঢুকেছে, তাদের রােজগারে ও পিসিমার হিসাবী পৰিচালনাতেই এ সংসার দিন দিন উন্নতি করেছে। অমলকে তাই আর পড়াশুনা ছেড়ে অল্প বয়সে রােজগারের চেষ্টা করতে হয়নি, সে কলেজে পড়ে। একটি ছােট খুপরীর মত ঘর তার জন্যে এ বাড়ীতে নির্দিষ্ট। একটি প্রমাণ তাপােষেই ঘরটি জুড়ে যায, জামা কাপডের আলনাটা থেকে কাপড়-চোপড় তার বিছানাব ওপবই ঝুলে থাকে। বই কাগজ বাখবার একটা চৌকি আছে এক পাশে। পড়ান তাকে তক্তপােষের ওপরে কবতে হয়। ঘরে একটি মাত্র জানলা। পেছনের খােলা নর্দমার দুর্গন্ধের দরুণ সেটা অধিকাংশ সময়েই বন্ধ রাখতে হয়। দুর্গন্ধ যখন না আসে তখনও নিস্তার নেই। পাশের বাড়ীর একটি কলহপ্রবণ দম্পতীর প্রতিদিনেব ঝগড়া লেগেই আছে। নতুন যে বাড়ীতে তারা উঠে যাচ্ছে, সেখানে একটি চমৎকার ঘর সে নিজের জন্যে ঠিক করে নিযেছে। দোতলার ওপর প্রকাণ্ড বড় বড় দু’টি জানলা সমেত ঘর। একদিকের জানলা দিয়ে আবার পাশের বাড়ীর সাজান একটি বাগান পেরিয়ে কাদের রাস্তাটুকু দেখা যায়। সে ঘরটুকুই যেন এই দুঃসহ আবেষ্টন থেকে মুক্তির প্রতীক। অন্ততঃ সে ঘরে গভীর রাত্রে দেয়াল ভেদ করে পাশের কুঠুরির অসহায় মেয়ের রুদ্ধ কান্না ত’ শােনা যাবে না।

মহানগর পাশের ঘরের এই চাপা কান্নায় কতদিন তার ঘুম ভেঙে গেছে গভীর রাত্রে। এ যেন কোন একজন বিশেষ মানুষের নয়, সমস্ত ননাংরা দরিদ্র দুর্বল বসতিটারই রুদ্ধ আক্ষেপ। কান্না যেদিন বাড়ে সেদিন এখানে অস্থিরভাবে তাকে পায়চারী করে বেড়াতে হয় নিজের ঘরে। কি করতে পারে সে। কিছুই না। পৃথিবীতে এত অবিচার এত দুঃখ এত শােক—তার তা নিয়ে অস্থির হযে লাভ কি। কার বেকার স্বামী দেনার দায়ে স্ত্রী-পুত্র ফেলে পলাতক হয়েছে, কোন্ হতভাগিনী সারাদিন মুখ বুজে পরের বাডী দাসীগিরি করে কোনমতে ছেলে-মেয়ের মুখে অন্ন দেবার চেষ্টা করে, গভীর রাত্রে নির্জনে নিজেকে আর সম্বরণ করতে পারে না—তা নিয়ে তার মাথা ঘামাবার কি দরকার। মেয়েটিকে সে দিনের বেলায় ভালাে করেই দেখেছে। প্রতিবেশী হিসেবে ভাল করেই তাকে জানে। অত্যন্ত ঝাঁজালাে তার মুখ, তার দিনের বেলার সে উগ্র চেহারা দেখে মনে হয় না গভীর রাত্রে তার কণ্ঠ থেকে অমন কাতর কান্না বা’র হতে পারে। হষত নিষ্ঠুর পৃথিবীর সামনে এই মুখখাস তুলে ধরে মেয়েটি ভালােই করেছে। কিন্তু এই মুখখাস দিযেই সে পার হয়ে যাবে কি। এ বাড়ীর লােকেরা তার সম্বন্ধে বলাবলি করে—তার চাল-চলন নাকি ভালাে নয়। হবেও বা। কিন্তু কি দরকার তার এ সব দুর্ভাবনার। আবেই থেকে সরে যেতে চায়—যেথানে এসব ভাবনা তার দরকার সে এই হবে না-

নতুন বাসা
—যেখানে প্রতিদিন বাড়ীর দরজা দিযে বার হ'তে রুগ্ন অবিনাশের
সঙ্গে দেখা হবে না ।
লাঠিটায় ভর করে প্রতিদিন সকালে প্রৌঢ় অবিনাশ গলিটার
মুখে পৈঠেটার ওপর গিরে বসে পায়। তার বেশী তার যাবার
ক্ষমতা নেই।
কলেজে যাচ্ছ বুঝি অমলব’লে অবিনাশ কাশতে থাকে।
অমলের সত্যি এই রুগ্ন লােটার পাশে দাড়াতে কেমন একটা
অস্বস্তি হয়। কি রােগ তার কে জানে।
কিন্তু তবু তাকে দাড়াতে হয়।
অবিনাশ কাশি থামিয়ে বলে,তােমার সেই ডাক্তারের কাছে
আর ত নিয়ে গেলে না ভাই।
অমল একদিন তার দুর্বলতার মুহূর্তে নিজে থেকেই এ প্রস্তাব
করেছিল। তার পর আর সময় হয়নি।
অমল নিজের কটিটাকে চাপা দেবার জন্যেই বলে—আপনাকে
নিয়ে গিয়ে লাভ কি বলুন, আপনি ত অত্যাচার ছাড়বেন না। যত
কুপথ্যি করলে রোগ সারে ?
কুপথ্যি, বল কি অমল। আমার মেয়েটা বুঝি লাগিয়েছে।
অবিনাশের কাশির বেগ অত্যন্ত বেড়ে ওঠে। অমলকে ধৈৰ্য্য ধরে
তবু দাড়িয়ে থাকতে হয়।
অনেকক্ষণ পরে নিজেকে সামলে অবিনাশ বলে-পথ্যিরই পয়সা।
জোটে না তা কুপথ্যি করব কোথা থেকে বল।
কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়, অমল জানে।

মহানগর আচ্ছা এবার ঠিক নিয়ে যাব। বলে সে চলে যাবার উপক্রম করতেই অবিনাশ তার জামার প্রান্তটা নােংরা জীর্ণ আঙ্গুলে ধরে ফেলে। একটু ভালাে ওষুধ হলেই আমার এ রােগ সেরে যায়, প্রেসের চাকরীটা এখনাে তাহলে করতে পারি। আমায় না হয় একটা হাসপাতালেই ব্যবস্থা করে দাওনা ভাই। হাসপাতালে কি সহজে যাকে তাকে নিতে চায়।—অমল জামার প্রান্তটা একরকম জোর করে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে, অবিনাশ নাছােড়বান্দা। এবার গলা যথাসাধ্য নামিয়ে আসল প্রস্তাবটা সে করে ফেলে,-চারটে খুচরাে পয়সা তােমার কাছে হবে ভাই। আমি কালই দিয়ে দেব। অমলের কাছে কলেজে যাবার ট্রাম ভাড়ার বেশী পয়সা সত্যিই থাকে না। পিসিমা সে দিকে অত্যন্ত সাবধানী। তবু অবিনাশের কবল থেকে মুক্তি পাবার জন্যেই সে চারটে পয়সা তাড়াতাড়ি বার করে দেয়। হপ্তা খানেক অন্ততঃ অবিনাশ আর তাহলে তাকে বিরক্ত করবে না সে জানে। এক হপ্তাই বা তার আর পরমায়ু। রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে অমলের মনে হয় রাস্তার কলে হাতটা ধুয়ে ফেল্পে হয়। পয়সা দেবার সময় অবিনাশের ঘর্মাক্ত ভিজে ঠাণ্ডা হাতটার স্পর্শ লেগে কি রকম যেন অস্বস্তি বােধ হ'তে থাকে। কিন্তু অমলের হাত ধােয়াও হয় না। কোন একটা সঙ্কোচ বােধ হয়। নিজের সম্বন্ধে কেমন একটা লজ্জা।

নতুন বাসা
লরীতে সমস্ত মাল বোঝাই করে অমলই সবার শেষে এ বাড়ী
ছেড়ে যায়। পিসিমা আর সকলের সঙ্গে ঘর দোর গুছােবার জন্যে
আগেই নতুন বাসায় গিয়ে উঠেছেন।
শেষ মালপত্র তুলে, বােঝাই কব লরীব ড্রাইভারের পাশের সীটে
উঠে বসে সে হুকুম দেয়, ‘চালাও'।
পিছন ফিরে আর সে তাকাতেও চায় না। এখানকার কোন
ভাবনা তার মনে অস্বস্তি যেন না জাগায, তার নতুন পাওয়া মুক্তির
অনুভূতি যেন ক্ষুন্ন না করে।
আসবার সময় সকলের কাছে সে নেহাৎ আলগাভাবে বিদায়
নিয়ে এসেছে।
সকলের সঙ্গে অবশ্য দেখা হয়নি। দিনের বেলাকার মুখােস খুলে
গভীর রাত্রে যে মেয়েটি লুকিষে কাদে, সে তখন সম্ভবত নিজের
কাজের ধান্দাতেই বাড়ী ফেরেনি। শুধু রুগ্ন অবিনাশ মানা সত্ত্বেও
জোর করে হাঁপাতে হাঁপাতে গলিব মুখ পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিযে
চার আনা পয়সা ধার চেয়ে নিয়েছে, ডাক্তার দেখাবার কথাটা আর
একবার স্মরণ করিয়ে দিতেও ভােলেনি।
অমল কোন উত্তর দেয়নি। সত্য মিথ্যা কোন উত্তরই সে
আর দিতে চায় না। এখানকার সঙ্গে সকল সম্পর্ক তার শেষ।
এ আবেষ্টন থেকে সে মুক্তি পেয়েছে এইটুকু শুধু সে মনে
রাখতে চায়।
এ ভাড়াটে বাড়ীর জীবনযাত্রা আবার এমনি করেই চলবে সে
জানে। তাদের খালি করা ঘরে আবার আর কোন দুঃস্থ পরিবার

মহানগর
এসে কালই হয়ত আশ্রয় নেবে কি দরকার এ সব ভাবনার-ভেবে
সে কিছু করতে পারে।
লীতে ষ্টার্ট দেওয়া হয়। সশব্দে রাস্তা কাঁপিয়ে পরীটা যাত্রা
করবার সঙ্গে সঙ্গে অমলের দৃষ্টি হঠাৎ আপনা থেকে রাস্তার ধারে
গিয়ে পড়ে।
কাদামাখা বেড়াল ছানাটা কখন সেখানে ম'রে পড়ে আছে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mahanagar Ed.1

Author
Mitra, Premendra
Title
Mahanagar Ed.1
File name
Mahanagar Ed.1
Text
OCR done
Citation
1943
Published
2010/04/19
Publisher
Purbasha Press, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
109
Library
Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Mitra, Premendra
DLI number
514969
Barcode
4990010016789.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
oUTVQKRxCWX
Download PDF

Mahanagar Ed.1