Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Udita

Debi, Maitreyee · 2009/12/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

উদিতা শ্রীমৈত্রেয়ী দেবী

৩১নং সেন্টাল এভিনিউ কলিকাতা
আর্ট প্রেস হইতে
শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখার্জি, বি-এ,
কর্তৃক মুদ্রিত।
মূল্য বাঁধাই—২১
অবাধাই–১৮০
[ চামড়ার বঁধাইয়ের মূল্য স্বতন্ত্র ।
১৫নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা
চক্রবর্তী, চাটার্জি এণ্ড কোং হইতে
রমেশচন্দ্র চক্রবর্তী, এম-এসসি
কর্তৃক প্রকাশিত।

আশংসিকা কল্যাণীয়া মৈত্রেয়ীর বয়স বেশী নয়। কিন্তু তার লেখা কবিতা প্রথম যখন আমার গােচরে আসে, তখন তার বয়স, ছন্দের পথে লেখনী চালনার পক্ষে আরো অল্প ছিল। পরে মনে হল বয়সের চেয়ে লেখা অনেকটা এগিয়ে চলেছে। স্বাভাবিক শক্তির আভাস পাওয়া গেল। কবিতাগুলি বয়সের হিসাবে নিপুণ তবু সাহিত্যের নিত্য আদর্শের পক্ষে কিছু কঁাচা ছিল। আমার মতে সেটা দোষের নয়, কাচা থাকাটাই স্বাস্থ্যের লক্ষণ। যতদিন বাড়বার বয়স থাকে ততদিন হাড় থাকে নরম ; সেটা কঠিন হলে বাড় বন্ধ হয়ে যায়। তেমনি লেখবার শক্তি থাকলেও অল্পবয়সের লেখার মধ্যে ভাবী বিকাশের যথেষ্ট অপেক্ষা থাকা আশ্বাসের বিষয় । আমাকে তার খাতা দেখতে দেওয়া হয়েছিল। আমি খুব বেশী স্কুল-মাষ্টারী করিনি। মাঝে মাঝে ছন্দে মিলে শৈথিল্য ছিল, সেই- গুলি নিয়ে বালিকাকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলুম। তখনি লক্ষ্য করেছিলুম মৈত্রেয়ীর মনের মধ্যে প্রকাশযােগ্য ভাবগুলি মুকুলিত হয়ে উঠছে। সেটা বিস্ময়ের বিষয়। অল্প বয়সে মন বাইরের জিনিষ ছুয়ে ছুয়ে বেড়াতেই ব্যস্ত থাকে। তখন খাপছাড়া অভিজ্ঞতাগুলিকে মিলিয়ে নিয়ে রূপ দান করবার মতাে ধ্যানশক্তি থাকে না। কারাে কারাে যদি বা থাকে কিন্তু দৈবাৎ সেটাকে আবার বাইরেকার উপকরণে প্রতিফলিত করবার প্রবর্তন দেখা যায়। = ১৯২৬, তখন মৈত্রেয়ীর বয়স বার বৎসর।

মৈত্রেয়ীর সেই প্রথম খাতা দেখবার পরে মাঝে মাঝে সাময়িক পত্রে তা’র কবিতা আমার চোখে পড়ল। তার মধ্যে যে পরিণতির চেহারা দেখেছি সেটা আমি প্রত্যাশা করিনি। এর পরে আরাে দুই একবার তার খাতা আমার হাতে এসেছে। কিন্তু এখন থেকে তার লেখা নিয়ে তাকে অধিক কিছু বলি নি। দেখলুম লেখিকার মন কাব্যের পথে চলতে শুরু করেছে, চলতে চলতে সে আপনার বিশেষ পথ আপনিই তৈরি করতে পারবে এই আমার বিশ্বাস। বাইরে থেকে তার সমালােচনা করা যেন সদ্য উন্মুখ অঙ্কুরকে ক্ষণে ক্ষণে তার শিকড়, নাড়া দিয়ে উৎপাত করা। যা প্রাণের নিয়মে আপনি বেড়ে উঠচে তাকে বাইরে থেকে তাড়া দেওয়া ভুল। কিছুকাল থেকে তার লেখায় এটা যে লক্ষণ দেখা দিয়েছে সেটা তার এ বয়সের পক্ষে একেবারেই অনপেক্ষিত। ভাবের ছবি মনে অল্প বয়সেও রচিত হতে পারে কিন্তু তত্ত্বের গাথুনি তত তেমন সহজ নয়। কাব্যের মধ্যে তত্ত্বের উকি ঝুকি চলে, কিন্তু তাকে ডাক দিয়ে ভিতরে নিয়ে আসা প্রায় দেখতে পাওয়া যায় না। যদি বা এমন ঘটে, মৈত্রেয়ীর বয়সে সেটা আশ্চর্যের কথা। জ্ঞানের পথে যে উপলব্ধি সে তাে পরিণত বয়সের অপেক্ষা রাখে বলেই জানি। শুধু চিন্তা করা নয়, চিন্তা করতে রস না পেলে সেটা কাব্যের বিষয় হতে পারে না। মৈত্রেয়ীর কাব্যে ক্রমে তত্ত্বের আনন্দই যদি প্রধান হয়ে ওঠে তবে এ সম্বন্ধে তার রচনার অনন্যপূৰ্ব্বতা বঙ্গসাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান নিতে পারবে। শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন ২৬শে নবেম্বর, ১৯২৯।

নিবেদিকা
গত চার বৎসর বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী, বিচিত্রা, ভারতবর্ষ প্রভৃতি
বিভিন্ন মাসিক পত্রিকার সম্পাদক মহাশয়দের অনুগ্রহ দৃষ্টিতে
কতকগুলি কবিতা প্রকাশিত হইয়াছিল। সে জন্য সর্বাগ্রে
তাহাদের নিকট আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। নূতন
কয়েকটি কবিতা সন্নিবিষ্ট করিয়া সে গুলিকে পুস্তকাকারে পুনঃ
গেল। প্রত্যেক কবিতাটী ভিন্ন
পৃথক পৃথক্‌ বিষয়ে রচিত। তাহাদের মধ্যে ভাবগত কোনও
ঐক্য আছে কিনা জানিনা। চিত্রশিল্পী শ্ৰীযুক্ত বিশ্বপতি চৌধুরী
মহাশয়কে শেষ পৃষ্ঠার ছবিখানির জন্য ধন্যবাদ জানাইতেছি।
ভিন্ন সময়ে
শ্ৰীমৈত্রেয়ী দেবী

No text on this page.

নির্দেশিকা ৭ ১২ २० ২৩ २९ ২৮ ৩২ ৩৫ ৩৭ ১। উপহার—সেদিন সকাল বেলা হয়ে এলােমেলাে ২। আপনা—ফানেরি পরশ এলাে জাগিয়ে নানা কল্পনা ৩। জন্মলীলা-কবে থেকে বয়েছিল দক্ষিণের বায় ৪। ভােগপাত্র—সেদিন সকালে ৫। আলো—ওরে আলো তােরে যদি ভালবেসে থাকি শেষের রেশ-আষাঢ়েতে চারিদিক জলে গেছে ধুয়ে • ৭। পরিচয়--সন্ধ্যা বেলা কাল ৮। প্রার্থনা—দিয়ে মােরে দুখ ৯। কোন কথা নহে—আজ কোন কথা নহে ১০। পরিণতি-লহ মােরে লহ মােরে চল মােরে ল’য়ে ... ১১। ফিরে নাও-নেবােনা নেবােনা আর ১২। নিঃস্ব হিয়া—নিজে নিঃস্ব করে ১৩। পৰ্যাপ্ত-কবে একদিন জ্যোৎস্না আলােয় ১৪। বর্ষার আয়ােজন-বিজলী থেকে থেকে চমকি যায় মন ১৫। সপ্তপর্ণ—যাবার বেলা এসেছি তাের কাছে ১৬। বয়স---তখন সন্ধ্যা কালে ১৭। নির্জন বনছায়ে—গভীর শ্যামল নিবিড় মুগ্ধ ১৮। প্রকাশ-যতবার আপনার অন্তরে অন্তরে ১৯। পরিত্যক্ত—এই সন্ধ্যা রশ্মি নামে বনানীর পর ২০। নাইবা কিছু থাক—আশ্বিনের ওই ব্যাকুল মেঘে ••• ২১। প্রয়ােজন—তুমি তখন চলেছিলে ২২। শৃঙ্খল-এ মহাসাগর সংসারমাঝে ২৩। শেষের খােজ-কোন খানেতে শেষ আমার ৪১ ৪৮ ৫২ ৬৫ ৬৬ ৭২ == ৭০ ৭৭ ৮৩ ৮৫ totr ৯২ ১ ০১ ২৪। ক্ষণিক—তখন সন্ধ্যার আলো স্নিগ্ধ মােহচ্ছটা ২৫। মরীচিকা-খর স্রোতা নদী পার্শ্বে শুষ্ক বালুপর ২৬। দ্বিপ্রহরে—স্তব্ধদুপুরেতে সকল কাজ ফেলে ২৭। প্রার্থনা—আমারে করগো সিক্ত ২৮। অন্তর—নিস্তব্ধ নির্জন গৃহে ফাঙ্কন সন্ধ্যায় ২৯। স্বদেশ-পূর্ণিমার আলােকেতে ৩০। মােছ এ ধূলি--কেন এ দ্বন্দ্ব এ ঘাের বন্ধ ৩১। আবাহনছিনু কোন দূর পুরে ৩২। আড়াল-ওমা আমায় বল কেন বল · ৩৩। স্বপ্ন-~-সন্ধ্যাবেলা আঁধার ঢালা ৩৪। মেঘ-তৃষিত ফুলের তৃষ্ণা মেটাতে ৩৫। আঁখি জল-তােমায় যখন অনেক লােকেমিলে ৩৬। ঘােটর দুঃখ—মাঠের পেছনেতে অচেনাগাছ মাের ... ৩৭। পাহাড়ী মেয়ে—সেই আষাঢ়ের রাতি ধরে ৩৮। প্রভাতে~-তখন ঘুচেছে শীতের মহিমা ৩৯। অধিকার-যে আসনে আজ বসালে আমারে ৪০। রিক্ত ও মুক্ত—সে কোন্ রাতে ভেবেছিলাম ৪১। মুক্তি অন্বেষণ-গৃহছাড়া দক্ষিণের উত্তাল হাওয়াতে ৪২। অপমানিত-মােহ মুগ্ধ চোখে ৪৩। অর্ঘ্য--আমার বাণী ছড়িয়েছিল ১০৮ ১১৮ ১২১ ১২৫ ১২৭ ১২৯ ১৩২ ১৩৭ ১৪২

উপহার
:
আনন্দ মধুর
সেদিন সকাল বেলা হয়ে এলােমেলো
অকস্মাৎ কোথা হতে যেন বন্যা এলো
বাধা বন্ধ ছিন্ন করি চূর্ণ করি সব
কোথায় ভাসাল মােরে ! যা কিছু দুর্লভ
তারি তরে হ’ল আশা।
দূরের সঙ্গীত ঢালে কর্ণে সুধা সুর।
সংসারের আলাে ছায়া তুচ্ছ লজ্জা ভয়
সব যেন মিথ্যা হ’ল ; শুধু চিত্তময়
কোন্ এক স্পর্শ লাগি ওঠে উতরােল
নিরন্তর গীতধ্বনি আনন্দ কল্লোল।
দুই চক্ষু মুদিলাম, কিছু বুঝি নাই
কি ইহার অর্থ আছে ? কিবা আমি চাই ?
কি বাণী প্রকাশ মাগে, কি যে বেদনায়
ক্ষুদ্র মাের তরীখানি কূল নাহি পায়।

উদিতা
কি আশ্চর্য গন্ধ আসে সুরভিত করি,
এ কি দীপ্ত আলাে লাগে
আহা মরি-মরি ।
সব যেন লুপ্ত হয়, কোথা নেয় মােরে,
সমস্ত নিমগ্ন করি এ কোন্ সাগরে ।
এ অপূৰ্ব দিনে আজ মত্ত হৃদি তটে
যদি কোনাে অনুচিত অপরাধ ঘটে,
হেরি এই উচ্ছ, ঙ্খল হৃদয়ের সুর
সংসার করে গাে যদি আঘাত নিষ্ঠুর ;
তুমি সব জান প্রভু ক্ষমা কোরাে তাই
শূন্যসূত্র ধরি আমি ভাসিবারে চাই
যখন জোয়ার আসে হয়ে আত্মহারা
উন্মত্ত দুর্ধর্ষ বেগে ছােটে জলধারা।
ভাঙ্গি দীর্ঘ বালুতট মরু প্রান্ত দিয়া
উত্তাল তরঙ্গ নাচে তীরে উচ্ছলিয়া।

উপহার
শত কম্বু নিনাদিনী ঘন অম্বু রাশি
দুরন্ত হৃদয়ােচ্ছাসে সহসা উচ্ছাসি
দুর্নিবার স্রোতে যবে ছােটে অন্যমন
চতুর্দিকে মেলি দিয়া শত লক্ষ ফণা
সৰ্ব্ব বন্ধ ছিন্নকারী সে বেগ চঞ্চল
আমি কি রুধিতে পারি ? কোথা পাব বল ?
কেন সেই বল নাই, কেন আসিলাম,
তুমি সব জান প্রভু কেন ভাসিলাম ?
আমি কিছু বুঝি নাই, শুধু স্তব্ধ হয়ে,
মুগ্ধ মনে দেখিলাম কোথা গেল ল’য়ে।
কি আনন্দ লাগে যেন, অনির্বচনীয়,
সব যেন কাছে পাই যাহা মাের প্রিয়।
অন্ধকার নাহি আর, চক্ষে লাগে আলাে
চারিদিকে যাহা দেখি তাহা বাসি ভালাে,
সুগন্ধ সুরভিত হৃদি মধ্যে চাই,
সব সেথা পরিপূর্ণ কোন দৈন্য নাই।

উদিতা
কি সুস্নিগ্ধ রশ্মি হানি তােমার আলােক
সেখানে করেছে সৃষ্টি নব স্বর্গলােক,
সেথামাের মুগ্ধ মন সারা দিনমান
যে অনন্ত ধ্বনি শােনে যে সঙ্গীত গান,
আজি এই অতি ক্ষীণ প্রতিধ্বনি তার
বাহিরে এনেছি নাথ দিতে উপহার।

আলপনা
ফালগুনেরি পরশ এলাে জাগিয়ে নানা কল্পনা,
তখন তােমার আসার লাগি আঁতে ছিলেম আল্পনা।
দক্ষিণেরি মত্ত বায়ে,
ঝল পাতা বনের ছায়ে,
আকুল হ’ল চিত্তখানি হৃদয় হ’ল আমনা,
তখন তােমার আসার লাগি আঁতে ছিলেম আল্পনা।
পূর্ণ হ’ল অর্ঘ্যথালা,
কুসুম কত রইল ঢালা
চন্দনেরি গন্ধে ভরি পুলক্ বহি আল রে,
পুণ্য সুরধুনীর পরে হৃদয়ধ্বনি ভাল রে।
অনেক কথা বলার আগে
সূচনা তার অনেক লাগে
সকল কথা বলার আগের এই পূজা ত তুচ্ছ না
এ ত শুধু সাদা রঙ, আর রিক্ত কুসুম গুচ্ছ না।

উদিতা
মাটীর পরের আপনারে
তুচ্ছ করে ভাবিরে
হৃদয় হতে প্রেমের বাণী ওরি পরে বইল গো,
ওযে তঁারি চরণ লাগি ধূলার পরে রইল গাে।
আমার নয়ন তােমায় চাবে,
ওযে তােমার পরশ পাবে
পুণ্যে ছেয়ে, রইবে চেয়ে, সাদা রঙের জাল বােনা,
আমার চেয়ে, ধন্য হবে আমার আঁকা আলপনা।
৫

জন্মলীলা
কবে থেকে বয়েছিল দক্ষিণের বায়
দিকে দিকে দোলা দিয়ে,
খুলে দিয়ে দ্বার
স্তব্ধ বনবীথিকারে করি অধিকার।
আজি এই বসন্তের প্রথম সকালে
আকাশ রঙিন হ’ল নীলে আর লালে,
আনন্দ সিন্দুরে
সুন্দর করিয়া দিল শিশির বিন্দুরে ।
শুষ্ক পত্র ঝরে গেল আম্রবন তলে
বিকশিত কিশলয়ে সুগন্ধ উছলে,
যে বীচিটী স’ড়ে ছিল প্রাঙ্গণের কোণে
সে আজিকে হায়
কখন উঠিল কঁপি পুস্পিত লতায়।
৭

উদিতা
পত্রহীন শুষ্ক বৃক্ষ আছিল দাড়ায়ে
সে আজিকে আপনারে ফেলিল হারায়ে,
সবুজের
রঙিন আভাতে
লাল হ’ল কৃষ্ণচূড়া
যেন কার হৃদি রক্ত পাতে।
বাঁশ বনে পড়ে গেল সাড়া
বন হ’তে বনান্তরে বাতাস বহিল ঘর-ছাড়া।
রুদ্ধ বাতায়নে মাের মুক্ত হয় দ্বার
চিত্তের কুসুমগুচ্ছ করি একাকার,
সমস্ত হারায়ে
প্রথম মুকুল গন্ধে রহিনু দাড়ায়ে।
ঝাউবনে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস ঝরে
অব্যক্ত ব্যথারে মাের তােলে স্নিগ্ধ করে।
আজ পার্শ্বে চেয়ে দেখি শুধু মনে হয়,
এ বিপুল ধরণী যে মহাপ্রাণময়।
प

জন্মলীলা
নাহি কোনাে অবসান শেষ নাহি হেরি
ক্ষণে ক্ষণে সৃষ্টি নাচে পুরাতনে ঘেরি,
নাহি রাখে স্থির
সকল নূতন করে দক্ষিণ সমীর।
সে নূতন স্পর্শ লাগি কুঞ্জবীথি তলে
রজনী গন্ধার বুকে সুগন্ধ উছলে,
কলি যায় খুলে
তরুণ সূর্যের পানে স্নিগ্ধ আঁখি তুলে।
রক্ত করবীর শাখা ভরে যায় মুগ্ধ অনুরাগে
মৰ্ম্মে ছোঁয়া লাগে,
চূতপুষ্প উল্লসিত, ঝরে সন্ধ্যামণি
আপনারে সূর্যালােকে ধন্য মনে গণি।
শাল বনে জাগে ধ্বনি, তাল শ্রেণী মাঝে
মােহ মুক্ত বাতাসের প্রতিধ্বনি বাজে।
নাম হীন ক্ষুদ্র পাখী নীড় গড়ি তােলে
প্রচ্ছন্ন পল্লবচ্ছায়ে আম্রশাখা কোলে।
৯

উদিতা
তারাে ক্ষুদ্র
চিত্তমাঝে এ আনন্দরাশি
অব্যক্ত মূচ্ছনা ভরে উঠেছে উচ্ছাসি।
চারিদিকে এ আনন্দ মন্ত্র ভরি দিল
সমস্ত পৃথিবী তাতে নব জন্ম নিল ।
মাের মনে দিল সে যে নাড়া
এ উত্তাল আনন্দের মহামত্ত সাড়া।
তৃণ হ’তে আকাশের অনন্ত হৃদয়ে
এ অপূৰ্ব জনমের বার্তা গেল ব’য়ে ;
আজ মনে হয়
যারে শেষ মনে করি সে ত শেষ নয় ।
সেত শুধু জনমের নানা মুগ্ধ ছল
আপন প্রকাশ লাগি
নূতন
কৌশল,
চারিদিক হতে এসে নানা সৃষ্টি ধারা,
এ জন্ম জলধি তলে হ’ল আত্মহারা।
১০

জন্মলীলা
বিপুল সাগর হ’তে মহা বন্যা বয়ে
মৃত্যুর উত্তপ্ত মরু গেল সিক্ত হয়ে।
ভিজাল সমস্ত বালু এ সমুদ্রকূলে
নিৰ্ম্মল উচ্ছল স্নিগ্ধ কি তরঙ্গ তুলে।
সে মহান তীর্থে তবে
বসন্তের পরশ পরম
মাের স্তব্ধ হৃদয়েরে
নূতন আলােতে দিল
নূতন জনম।
১১

ভােগপত্র
( আকাঙ্ক্ষা )
সেদিন সকালে
জ্বলিল বহ্নির শিখা আকাশের ভালে,
ঝলিল প্রদীপ্ত আলাে
ভরি মহােচ্ছাসে
সুবৰ্ণনির্মিত সেই সুরাপাত্র পাশে ;
বসন্তের মত্তবায়ে সে সুরার ভাণ্ডখানি দিয়া
উচ্ছল মদির রস পড়ে উছলিয়া।
অনন্ত অম্বর তলে মহাসিন্ধু কূলে,
সে রসের লুব্ধ গন্ধ ওঠে দুলে দুলে ;
আকুল কল্লোল তােলে
বন হতে বনে
গৃহে গৃহে দ্বারে দ্বারে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
১২

ভােগােত্র
সে সুবর্ণ বর্ণ হেরি সে সুগন্ধ স্পর্শখানি লয়ে
সমস্ত বিশ্বের লােক ওঠে লুব্ধ হয়ে ;
আকাশের গায়ে গায়ে জলধির তলে
মহা দুর্নিবার লােভ নৃত্য করি চলে
উদ্দাম আনন্দ ভরা দক্ষিণের বায়ে,
তারি প্রতিধ্বনি বাজে কুঞ্জবীথি ছায়ে ।
মদিরার ভাণ্ডখানি সে বাতাসে
কাপে থর থর
সমস্ত নিখিল চিত্ত
বলে ‘ধর ধর’-
আকুল উচ্ছাস ভরি অন্তরে অন্তরে,
মেলিছে উৎসুক অক্ষি প্রসারিত-করে ।
সমস্ত ফেলিয়া দিয়া মুগ্ধ জন স্রোত
সাগর সন্তরি আসে লঘিয়া পর্বত
নানা দেশ হয় পার নানা পথ চলে
সেই লুব্ধ পাত্রখানি হাতে লবে বলে।

উদিতা
বহু দূর থেকে
কভু তারে দেখা যায়-
কভু যায় ঢেকে ;
কভু তপ্ত দ্বিপ্রহরে উজ্জ্বল আলােকে
তারি তীব্র দীপ্তি খানি লাগে এসে চোখে,
কখনাে বর্ষায়,
বিশাল মেঘের পক্ষে তারে ঢেকে যায়।
ফাল্গুনের মুগ্ধ রাতে বায়ুর মর্মরে
সুধাস্নিগ্ধ গন্ধ পূরা
তপ্ত সুরা
উছলিয়া পড়ে।
হেরি নিত্য তারি ধারা
চিত্ত হয় আত্মহারা
মত্ত হয়ে ছােটে
সে আশ্চৰ্য্য পাত্র দেখি দীপ্ত হয়ে ওঠে ;
প্রতি ক্ষণে ক্ষণে
দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার উদ্দীপ্ত কিরণে ॥
TIL
১৪

তােগােত্র
( শূন্যতা )
তখন থেমেছে বর্ষা কদমের শাখে
সিক্ত দুটি ছােট পাখী আৰ্তভয়ে ডাকে।
ঘেরিয়া পৰ্ব্বত
সেথা মাের শেষ হল পথ ;
দাড়ালেম আসি
কেতকীর ঘন বন তলে,
অকস্মাৎ মুগ্ধ চোখ উঠিল উচ্ছ। मि
পথ প্রান্তে চেয়ে ;
সদ্য ফোটা পুস্প গুচ্ছে কুঞ্জ গেছে ছেয়ে,
তারি ক্ষুদ্র কোলে
সে অপূৰ্ব্ব পাত্রখানি স্নিগ্ধ বায়ে দোলে।
তখনি মুহূর্তে যেন নীলাম্বর হতে
ঝরিল আনন্দ রাশি।
তরঙ্গ চঞ্চলে
চকিতে জোয়ার এল
নিঝরিণী জলে।

উদিতা
উঠিল উদ্ভাসি
সে সুন্দর দীপ্ত বর্ণ,
চক্ষু কর্ণ
নিমেষে নিরুদ্ধ করি মুগ্ধ বেদনাতে
তুলিলাম হাতে
সে দুর্লভ আকাক্ষারে।
বারে বারে
স্পর্শে মনােহর
কাপিল সমস্ত অঙ্গ সমস্ত অন্তর,
চরিতার্থ বক্ষপরি তুলিলাম তারে।
পরিহাস হাস্যভরে
হিমাংশু উঠিল হাসি !
সে মুহুর্তে স্তব্ধ শশাকে
সে আলােকে
এ কি দেখি হায়
আমার সর্বস্ব এযে মিথ্যা হয়ে যায় ।
১৬

তােগােত্র
সব গর্ব
পরিশ্রান্তি ক্লান্তিহীন
দীর্ঘ পথ দীর্ঘ দিন
দীর্ঘ সাধনার
হয় চূর্ণ
পরিপূর্ণ
পাত্রখানি আৰ্ত্তবেদনায়
শূন্য দেখি হায় !
ব্যর্থ শােকে চক্ষু হতে
তপ্ত রক্ত ঝরে
সে নিষ্ঠুর মিথ্যাময় স্বর্ণপাত্র পরে,
সেই মৰ্ম্ম রক্ত রেখা
পথে পথে রয় লেখা
অরণ্যের কোলে
হৃদয় ক্রন্দন ধ্বনি প্রতিধ্বনি তােলে।
২
১৭

উদিতা
(পূর্ণতা)
;
আসি নেমে বহু দূরে চাহি
গহন বনের মাঝে
কোন লক্ষ্য নাহি
সমস্ত আকাঙ্ক্ষা হীন ;-
বারংবার
নিদারুণ মিথ্যা লােভে করিয়া ধিক্কার
মুচ্ছিতের প্রায়
পথের ধূলায়
বসি অবরুদ্ধ চোখে।
অকস্মাৎ হৃদয় আলােকে
হেরি হৃদয়ের তল
রহি আত্মহারা
সেই স্বর্ণ পাত্রখানি সেই সুধা ধারা-
ক্ষণে ক্ষণে উছলিছে,
তবু অচঞ্চল
হৃদয়ের ঘন বনতল ।
১৮

তােগােত্র
বন্ধহীন সুগন্ধ বয়
চরিতার্থ বক্ষপরি রয়
পরিপূর্ণ পাত্র খানি।
শান্তি জ্যোতি হানি
তারি পরে
হৃদয় আলােক রশ্মি উছলিয়া পড়ে।
আত্মহারা চিত্ত প্রান্ত
এবার যে রয় শান্ত,
মােহ বন্ধ টোটে
সে আশ্চর্য পাত্র দেখি স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে।
প্রতি ক্ষণে ক্ষণে
বাসনার শান্তি মাঝে সুস্নিগ্ধ কিরণে।
৯

আলাে
ওরে আলাে তােরে যদি ভালবেসে থাকি
চিররাত্রি চিরদিন যদি তাের গীতে
ভরে থাকে মাের চিত্ত অপূৰ্ব্ব অমৃতে,
প্রভাতে সুদূর হতে আসি কত বাণী
নূতন পাতার সাথে করে কানাকানি
রাতের শিশির মাখা নব শস্পদল
তােমার চরণ লাগি হত বিহ্বল
দেখে তাই পূর্ণ হ’ত দৈন্য মাের
না রহিত বাকি,
ওরে আলাে তােরে যদি ভালবেসে থাকি

আলাে
শারদ প্রভাতে সেই শুভ্রখণ্ড মেঘে
তােমার চমক যবে উঠিত গাে জেগে
সদ্য ফোটা করবীর মঞ্জরীর তলে
তােমার পরশ যেত নেচে পলে পলে,
সুপ্তি তার কেড়ে নিয়ে তারে প্রাণ দিত
মাের প্রাণে তার সাড়া জাগায়ে তুলিত,
তন্দ্রা ঘুচে জীবন হইত ভাের
সে আলােয় ঢাকি,
ওরে আলো তােরে যদি ভালবেসে থাকি।
তবে যবে দিবা শেষে রাতের ছায়ায়
আমারে লুকাবে এসে বিপুল মায়ায়
দূরে ঝঙ্কা দেখা যাবে পুষ্প যাবে ঝরে
বায়ু কেঁদে কেঁদে যাবে নব পত্র পরে,
গভীর আঁধার এসে আপনা হারায়ে
আমারে কাড়িতে চাবে দুহাত বাড়ায়ে,
বিদ্যুৎ বিষম লাজে লুকায়ে হাসিবে
মেঘ যাবে হকি
ওরে আলো তােরে যদি ভালবেসে থাকি।
২১

উদিতা
তবে আজ বলে যারে হেন কোন বাণী
দিয়ে যারে কোনাে দান তারে লব মানি
সে বাণীর গুঞ্জরণে দানের মহিমা
মুগ্ধ প্রাণে ছড়াইবে নাহি রবে সীমা,
দেহ মনে সে একটি লীলা হবে সুরু
তাের কাছে দীক্ষা মাগি তােরে বলি গুরু,
সেই যে একটি কথা তারি ধ্বনি স্মরি
কেটে যাবে ঝঞ্চাভরা মত্ত বিভাবরী।
সে আঁধারে তাের বাণী টেনে নেবে মােরে
তাের কাছে ডাকি
ওরে আলাে তােরে যদি গুরু বলে থাকি ।

শেষের রেশ
আষাঢেতে চারিদিক জলে গেছে ধুয়ে
ঘন ঘোর বরষায়
মাঠ ঘাট ডুবে যায়
সব ধুয়ে যায় তবু কিছু যায় থুয়ে।
যত কিছু হয় শেষ
পিছে ফেলে যায় রেশ,
শেষ হয় তবু যেন শেষ নাই কিছু।
যেটুকু যেখানে পাই
চাপিয়া রাখিতে চাই,
আবার হারায়ে তারে পড়ে থাকি পিছু।
শেষ হ’ল মনে ভেবে
ব্যথা বুকে আসে নেবে,
তবু যেন মনে হয় শেষ হয় নাই।
সব যদি নাও পাই
অমি যতটুকু চাই
সেই মাের সব হবে যতটুকু পাই।

উদিতা
অনেক চাওয়ার পাছে
এতটুকু পাওয়া আছে
সেও মাঝে মাঝে যেন হারাইয়া যায়
বুকে তবু তার স্মৃতি
লীন হয়ে থাকে নিতি,
হারায় না যতটুকু একবার পায়।
তােমারে পেয়েছি আমি
যে কয়টি দিবা যামী
চিরকাল চিরযুগ সেই মাের হবে
সিক্ত হৃদি তট পাশে
ব্যথার কমল ভাসে,
সকল হারায়ে মাের তবু সব রবে
তাই নিয়ে রব পড়ে
নূতন জীবন গড়ে
হারান স্মৃতির মাঝে হারান পরশ,
তাই লয়ে ভরি বুক
চাপিয়া রাখিব দুখ
ক্ষণিকে অমর করি দুখের হরষ ।
২৪

পরিচয়
সন্ধ্যা বেলা কাল
আঁধার তখন আপন মনে পাতে ছিল জাল,
আমাদের ওই শুন মাঠের পাছে
একটা বড় কৃষ্ণচূড়ার গাছে
ছেয়ে গেছে রঙিন্ ফুলে ফুলে,
তারি শাখায় উত্তর বায় উঠতেছিল দুলে।
সেইখানেতে খেতেছিল একটী ছােট মেয়ে
বসেছিলেম তারি দিকে চেয়ে,
হর্ষে তাহার ভরা ছিল বুক,
অস্ত রবির আলােয় আলােয় রঙিন ছিল মুখ
চিত্ত তাহার মুগ্ধ ছিল, চরণ চঞ্চল
বাতাস লেগে উড়তেছিল আকুল অঞ্চল।
অন্ধকরা অন্ধকারে আলােক হ’ল লয়
আমার তখন তাহার সাথে ঘটুল পরিচয়।
২৫

উদিতা
শুধাই তারে ডেকে
এলে কোথার থেকে
কোথায় সে বা রয়
চেয়েছিলেম সকল পরিচয়।
নত করি স্নিগ্ধ আঁখিটীরে
ছােট মনের ছােট্ট কথা কইল ধীরে ধীরে
তাহার মনের যে টুক্ দিল খুলি
লুকিয়ে থাকুক্ সে সব কথাগুলি
লয় হয়ে যাক মনের বনের ধারে
রাতের অন্ধকারে।
হঠাৎ হ’ল মনে
এমনি করে এম্‌নি সঙ্গোপনে
আমাদের এই জীবন প্রান্তময়
কত লােকের চরণ চিহ্ন রয়,
কারু স্মৃতি লুকিয়ে থাকে মনের কূলে কূলে
কারু কথা তখনি যাই ভুলে।
২৬

পরিচয়
এমন মধুময়
এই যে পরিচয়
একি শুধু
আ ভােলা আ ভোলা
একটা দোলায় দোলা।
এর মাঝে কি এমন কিছু রয়না ওগাে বাকি,
এমন কিছু সত্য থাকে নাকি ?
যাহা মােদের চিত্ত মাঝে
নিত্য হয়ে রয়
সবার সাথে ঘটিয়ে দিতে গােপন পরিচয়।
২৭

প্রার্থনা
দিয়ে মােয়র দুখ
যদি পাও সুখ
দিও গাে আমারে দিও গাে-
টেনে নিলে মােয়র
দুখের সাগরে
সুখ পাও যদি নিও গাে ।
২৮

প্রার্থনা
যত ক্ষোভরোষ
যত আছে দোষ
যা কিছু তুচ্ছ পঙ্কিল
ধূলাতে লিপ্ত
যাহা অনিত্য
যাহা শঙ্কট শঙ্কিল
চঞ্চল দোলে
চিত্তের রােলে
সমস্ত চলে বয়ে
তবু আপনারে
মহা পারাবারে
ভাসাইনু সব লয়ে।
২৯

দিতা
অপরাধ যত
আছে কত শত,
ধূলায় অন্ধ প্রায়
আজি এই স্রোতে
অন্তর হতে
সব দেখি ধুয়ে যায়।
ওঠে উতরােল
জল কল্লোল,
সব বন্ধন টোটে,
পঙ্কের পরে
স্নেহ হাসি ভরে
পঙ্কজ ফুটে ওঠে।

প্রার্থনা
তবু সব লয়ে
আসিয়াছি ব’য়ে
পার হয়ে মহানদী
এই জল ধারে
ভাসায়ে আমারে
দিন রাত নিরবধি।
যদি নিতে চাও
নাও তবে নাও
চরণে কি তব অঙ্কে
এই উজ্জ্বল
ভক্তির জল
ধুয়ে দিক্ মােহ পঙ্কে।
দুখ দিতে চাও
দাও তবে দাও
আর সব কর নষ্ট
এই—আঁখি জল
হোক সম্বল
সার্থক হােক্ কষ্ট।
৩১

কোন কথা নহে
কোন কথা নহে আজ কোন কথা নহে
আজ শুধু রহ বসি নিস্তব্ধ নিৰ্বাক,
অন্তরের ব্যথা যদি ভার হয়ে রহে
তবু আজ মৌন রহ; সব পড়ে থাকি।
এই ঘন বনতলে স্নিগ্ধচ্ছায়াপর
মেলে রাখাে শান্ত তব বিমুগ্ধ অন্তর।
৩২

কোন কথা নহে
ইন্দু যবে ঢালে আলাে সিন্ধু গরজায়
আকুল তরঙ্গ ভাঙ্গে পাগলের প্রায়
শুক্তি ভাঙ্গি মুক্তা যত ছড়াইয়া পড়ে
দূরে দূরে সিন্ধুতটে বালুকার পরে।
রবি মহা দীপ্তি ল’য়ে জাগে পূর্বাকাশে
হে কবি, রহিও স্থির আকুল উচ্ছাসে ।
সেই দীর্ঘ তটপরে সুবর্ণ আলােকে
এ বিশাল বিশ্বখানি দেখে শান্ত চোখে,
স্তব্ধ করে মত্ত তব চিত্ত চঞ্চলতা
অবরুদ্ধ করি কণ্ঠ। পরাণের ব্যথা
নাহি যেন ছােটে বাক্য পথে ; কথা যত
মৰ্ম্ম মাঝে লুপ্তি পাক্। হে কবি, সতত
মেল তব অক্ষি খানি। এই ছায়া তলে
এই ফুল গন্ধে ভরা শ্যামল অঞ্চলে
ঢাকো তব চিত্তটিরে। শুধু দেখাে চেয়ে
অপরূপ শান্তরূপে সব যাক্ ছেয়ে।
৩৩

উদিত
এই স্তব্ধ সৌন্দর্যের অপূৰ্ব আলােকে
চারিদিক শান্ত হােক। শুধু লােকে লােকে
নিস্তব্ধ অন্তর হতে অমৃতের ধারা
আকুল উচ্ছাস ভরি হাে আত্মহারা।
কথা যত হােক্ শেষ। তর্ক ঘুচে যাক,
তােমারে করিয়া দিক্‌ নিস্তব্ধ নিৰ্বাক্ ।
চিত্ত যেন মুগ্ধ হয়ে শান্ত হয়ে রহে,
কোন কথা নহে আজ কোন কথা নহে।
এই মহা শান্তি মাঝে স্নিগ্ধ দৃষ্টি হানি
রাখি শুধু একবার চোখে চোখ খানি
আসিয়া দাড়াও এই কাননের ছায়,
হাসিয়া দাড়াও এই পথের ধূলায়,
কঁদিয়া দাড়াও এই শিশিরের জলে
এ উন্মুক্ত আকাশের চন্দ্রাতপতলে,
যেথা দূর দূরান্তরে বিশ্ব বায়ু বহে
কোন কথা নহে আজ কোন কথা নহে
৩৪

পরিণতি
লহ মােরে লহ মােরে চল মােরে লয়ে
আমার এ স্বপ্ন স্রোত যেথা গেল বয়ে
কালের এ সমুদ্রের স্তব্ধ হবে গতি
বাসনার হবে শেষ পাবে পরিণতি
তুচ্ছ এ জীবনখানি।
সব যাবে মুছে
বাধা বন্ধহীন হবে: মােহ যাবে ঘুচে
আশাহীন, ভাষাহীন, শেষ সেথা সব
পান্থহীন পথপরে নাহি কলরব
জন্মহীন, মৃত্যুহীন, নাহি রবে কাল
নাহি রাত্রি, নাহি দিন, না হয় সকাল,
লক্ষ্য নাই কৰ্ম্ম নাই, নাই কোন বােঝা
নাই এই ঝরা ফোটা অবিশ্রান্ত খোজা

উদিতা
চাওয়া নাই পাওয়া নাই শেয সব হবে
এ ভ্রান্তি ঘুচিয়া যাবে আত্ম অনুভবে।
অবিশ্রান্ত কৰ্ম্ম ক্লান্ত সকলের ক্লেশ,
নিমেষে সুস্নিগ্ধ হবে ব্যথা হবে শেষ ।
এ দুরন্ত বহ্নি শিখা শান্ত করে সেই,
সকল শীতল করে সে কি কিছু নেই ?
সমস্ত হরণ করি দিতে পারে সব
চিত্ত পরিপূর্ণতায় অতুল বিভব !
এই তুচ্ছ এ অনিত্য ক্ষণিকের সুখ
নিমেষে ভােলাতে পারে ভরে দিয়ে বুক,
পৃথিবীর মিথ্যা হতে পারে সেথা নিতে
মহা পরিণতি মাঝে সত্যের জ্যোতিতে।
ল’য়ে চল লয়ে চল জান যদি পথ
পিছে ফেলে অভিশপ্ত সমস্ত জগৎ,
মুগ্ধ অন্ধকার হতে দীপ শিখা হাতে
সবার অচেনা পথে সবার অজ্ঞাতে

ফিরে নাও
নেবােনা নেবােনা আর
এতদিন অনিবার
যা নিয়েছি দান,
সে দুর্লভ উপহার
কভু কি যথার্থ তার
করেছি সম্মান ?
বসন্তের গন্ধভরা
প্রতিদিন বসুন্ধরা
যাহা গেছে রাখি,
সমস্ত কি রয়ে র’য়ে
চিত্ত হতে গেছে ব’য়ে
কিছু নাই বাকি ?
৩৭

উদিতা
জন্ম হ'তে এতদিন
যা পেয়েছি গ্লানিহীন
অতল গভীর,
সে সমস্ত চিত্ততলে
আজো কেন নাহি জ্বলে
কেন নাহি স্থির ?
এত দিন এত কাজে
এত দান এসে বাজে
তবু
চিত্ততল
কেন সেই শূন্য রয়
চঞ্চল বেদনাময়
করে টলমল।
৩৮

ফিরে নাও
নিতে নিতে যায় চলে,
ক্ষণে ক্ষণে পলে পলে
রিক্ত হয় মন,
আবার অমৃত সুধা
মিটাইতে মত্ত ক্ষুধা
করে আয়ােজন।
দিনে দিনে দুখে সুখে
সেই পাত্র ধরে মুখে
তবু ওরে একি
ক্ষণে ক্ষণে মােহময়
সিক্ত ওষ্ঠ শুষ্ক হয়
সব রিক্ত দেখি ।
৩৯

উদিত
আর নয় অার নয়
মদ মত্ত চিত্তময়
উঠিয়াছে রােল,
গরলের পাত্র ধর
মােরে শুষ্ক জীর্ণ কর
দাও শান্ত কোল।
এতদিন এই চিত্তে
যাহা এসে হল মিথ্যে
ফিরে লও তারে,
অনন্ত শূন্যতা ভরে
দাও মােরে চূর্ণ করে
মত্ত পারাবারে।
৪ ০

নিঃস্ব হিয়া
নিজে নিঃস্ব করে
দিল বিশ্ব ভরে
তব দীপ্ত বাণী
গেল উচ্চ সুরে
হৃদিকুঞ্জ পুরে
সুধা গন্ধ হানি ;
বহু ভক্ত মিলে
কত অর্ঘ্য দিলে
তব দ্বার চুমি,
পূত চিত্ত ঝারি
ঢালে প্রেম বারি
তাহে সিক্ত তুমি ।
আমি কক্ষ কোণে
ছিনু ম্লান মনে
পাদ প্রান্ত মাগি
হত-চক্ষু ভ'রে
ব্যথা অশ্রু ঝরে
তব স্পর্শ লাগি।
৪১

উদিতা
আমি দ্বার বেঁধে
মরি ব্যর্থ কেঁদে
মম চক্ষু পাশে
রচে রাত্রি ছায়া
নানা মত্ত মায়া
কত রঙ্গে আসে ;
মম বক্ষ চাপি
আসে দুঃখ কপি
তবু স্পর্শ ধারা
নানা নৃত্যে দুলে
স্মৃতি চিত্ত কূলে
করে আত্মহার;
সব কর্ম ফেলে
দিনু মৰ্ম্ম ঢেলে
তব ভক্তি গানে
সুর অগ্নি শিখা
হয়ে বক্ষে লিখা
ওঠে উৰ্দ্ধ পানে।
৪২

নিঃস্ব হিয়া
কোন মুগ্ধ রাতে
মধু গন্ধ বাতে
ছিনু শয্যা পরে,
দূরে বর্ষা রাশি
ওঠে অট্টহাসি
মম চিত্ত ভরে,
ছায়া কুঞ্জে ছুটি
ভিজে পক্ষী দুটি
ডাকে আৰ্তনাদে,
মৃদুকম্পিলতা
মূক মৰ্ম্ম ব্যথা
তােলে নৃত্য ছাদে
শ্যাম শম্প পরে
কত পুষ্প ঝরে
দুখে নিঃশ্বসিয়া
পথ প্রান্ত জুড়ি
চলে পাংশু উড়ি
বন মর্মরিয়া।
৪৩

উদিতা
মহা মূৰ্ত্তি একি
দূরে লিপ্ত দেখি
আলো দীপ্তি ঢালা
এল স্নিগ্ধ হয়ে
নব বাৰ্তা ক'য়ে
হাতে পুষ্প থালা।
আমি চক্ষু খুলি
গেনু পৃথী ভুলি
ভাব-রুদ্ধ ভারে,
মােরে ভিন্ন করি
তার ই চিহ্ন ধরি
চলি অন্ধকারে
তার ই স্বপ্ন আসি
সব দুঃখ নাশি
মাের চিত্ত হরে
ব্যথা ধিক্কারিয়া
মাের তপ্ত হিয়া
জ্বালে দীপ্তি ভরে
৪৪

নিঃস্ব হিয়া
ঘন বর্ষা চুমি
জলে সিক্ত ভূমি
হৃত চন্দ্র তারা
সুখ স্পর্শ সম
বহে চক্ষে মম
নব অশ্রু ধারা।
দিবা রাত্রি কত
কাটে স্বপ্ন মত
রহি আত্ম ভােলা
নভো বক্ষ পাশে
একী দীপ্তি আসে
দেয় চিত্তে দোলা ;
ঘন রাত্রি টুটে
কিযে মূর্তি ফুটে
ছিড়ি অন্ধকারে,
ভাবি রাজ্য ছাড়ি
দেব অব্ধি পাড়ি
নব রাজ্য পারে।
৪৫

উদিতা
মম চক্ষু হ’তে
কি যে ব্যর্থ স্রোতে
ব্যথা অশ্রু বহে
কার দুঃখ বহি
সদা মত্ত রহি
সে যে লুপ্ত রহে
কার গুপ্ত ছোঁয়া
যেন অঞ ধোয়া
সদা কঁাদি ফিরে
যেন মুগ্ধ ঘুমে
মহা পৃথী চুমে
আসে মৃত্যু ধীরে
যত প্রাণধারা
হেথা আত্মহারা
সবি স্তব্ধ ভয়ে
কার স্পর্শ লভি
একি আৰ্ত্ত ছবি
আসে মূর্ত হয়ে।
৪৬

নিঃস্ব হিয়া
কেন হর্ষ শোকে
এই মুগ্ধ লােকে
ফেরে আত্মা দেহে
কেন চিত্ত মম
ছেড়া পুষ্প সম
ললাটে ভগ্ন গেহে ;
কি অনন্ত কোলে
দুখ হর্ষ দোলে
মহা স্বপ্ন মাঝে,
ছায়া স্নিগ্ধ কায়া
রচে চক্ষে মায়া
কি যে বক্ষে বাজে।
তারি স্মৃতিখানি
দূর স্বপ্ন মানি
লােকে মিথ্যা ক’বে,
মম নিঃস্ব হিয়া
তারে বিশ্বাসিয়া
পথে মগ্ন রবে।
৪৭

পৰ্যাপ্ত
কবে একদিন জ্যোৎস্না আলােয়
তােমারি ঘরের পাশে
আমার পরাণ কেঁদে মরেছিল
বেদনারি নিঃশ্বাসে,
শুক্লপক্ষ স্তব্ধ অাকাশ
ছেয়েছিল ছেড়া মেঘে
ঘন কাশ বন করে শন্ শ
উত্তর বায়ু লেগে।
তুমি বাহিরিয়া এলে
তােমার উদার দক্ষিণ হাতে
স্নিগ্ধ আলােক জ্বেলে,
ওগো বেদনার নাথ
আমার লুকানো মলিন হিয়ায়
করিলে নয়নপাত।
তােমার হাতের প্রদীপের শিখা
মৃদু মৃদু কঁাপে দেখি
মনেতে তখন নূতন বারতা
হতেছিল লেখালেখি,
৪৮

পৰ্যাপ্ত
আমি ত গগ চাহি নাই
তুমি আপনা হইতে আলােকে তােমার
মােরে দিয়েছিলে ঠাই,
তুমি যে উদার সূর্যের মত
মহান্ আলােক তব,
যতটুকু মাের পড়েছে চিত্তে
করিয়াছে অভিনব
সেই যথেষ্ট মাের
তারি সম্মান
করে যেন প্রাণ
মুগ্ধ জীবন ভাের।
৪
৪৯

বর্ষার আয়ােজন
বিজলী থেকে থেকে চমকি যায় মন
বর্ষা নাই তার রয়েছে আয়ােজন,
গভীর কালো মেঘে আকাশ গেছে ঢেকে
এ জল নাহি জানি কাহার অভিষেকে।
দুয়ার খুলে রেখে বসিনু তারি পাশে
ওধারে ছেয়ে গেছে সবুজ ঘন ঘাসে
একটি পাশে জমী এসেচে নীচু নেমে
সকাল হতে জল রয়েছে থেমে থেমে
আকাশ কালাে হলাে গভীর ব্যথা ল’য়ে
তাহারি ছায়া জলে পড়িল কালো হয়ে।
অশথ তলে গরু গোয়ালা গেল বেঁধে
বাছুর কোথা ওর ফিরিছে কেঁদে কেঁদে,
একটি ফল লয়ে বসিয়া মুখােমুখি
শালিক দুটো শুধু করিছে ঠোকাঠুকি।
মাধবীলতা ওই কাহার অনুনয়ে
আকুল শাখাগুলি দুলায় লাজে ভয়ে।
তালের ছায়াতলে দখিণ বায়ু ছােটে
উদার পাতাগুলি ওপরে নেচে ওঠে।

বর্ষার আয়ােজন
সবুজ কচুবন জলের বুকে বুকে
দুধারে হেলে হেলে পড়িছে ঝুকে ঝুকে
মলিন রঙ্গে আজ মেলেছে নব মায়—
আমার বুকে তার ফেলেছে ঘন ছায়া।
৫১

সপ্তপর্ণ
যাবার বেলা এসেছি তাের কাছে
ওরে আমার ছােট্ট ছাতিম গাছ,
অনেক দিনই তােরি ছায়ে
দেখেছিলেম তােরি পাতার নাচ,
ওরে আমার ছােট্ট ছাতিম গাছ।
আমার গােপন দুঃখগুলি
তােমার পাতায় উঠল দুলি,
অনেক ব্যথা মলিন হ’ল তােমার শাখাময়,
তারি পরে শীতল হাওয়া বয় ।
যাবার দিন যে ঘনায় আসার পাছ,
ওরে আমার ছােট্ট ছাতিম গাছ।
বর্ষা যখন আকুল ধারায় ঝরে
ক্লান্ত হয়ে ফিরেছিলেম ঘরে ;
আমার তরে পর্ণপুটে রাখতে ভরে জল,
আমি এলে আমার দেহের পরে
.
সোহাগ ভরে
ঢালতে অবিরল।

সপ্তপর্ণ
বাতাস তােমার দুলিয়ে যেত শাখা
মুগ্ধ আকাশ রইত মেঘে ঢাকা,
তােমার একটা ডালের ওপর থাকি
ছােট্ট পাখী করত ডাকা ডাকি,
আমি তখন অনেক গাছের
কুড়িয়ে তানেক ফুল,
তােমার গােড়ায় ঢেলে দিতে
সৌরভে আকুল।
তখন যেন মনে হত তোর
পাতায় পাতায় বুল লজ্জা ভোের,
আমি হেসে বলেছিলেম দুঃখ কি আর আছে,
ফুল ত ফোটে অনেক গাছে গাছে
বলেছিলেম ভুলিয়ে নানা ছলে
আমি তােরে ভালবাসি
ফুল ফোটেন বলে।

সপ্তপর্ণ
আজকে যাবার কালে
সেই প্রেমেরি পরশ ছড়া তােমার ডালে ডালে
সেই দিনেরি গন্ধখানি ভােরের আলােয় মাখি
আমি আমার বক্ষে নেব আঁকি।
তােরও কিরে পাতার নীচে
কঠিন মৰ্ম্মতল
আমার স্মৃতির বেদনভরে
কবে না টলমল ?
মন্দ বায়ু নীল আকাশের সনে
আমার কথা পড়বে না তাের মনে ?
থাম্‌বে নাকি একটু খানি ভােরের আলাের নাচ,
ওরে আমার ছােট্ট ছাতিম গাছ।
এই তােমারি কুঞ্জতলে মাটির বক্ষ জুড়ে
মােদের কথা মরবে নারে ঘুরে ?
স্তব্ধ রাতে যবে
জোৎস্না আলাে আকুল হয়ে রবে,
সে কি তাহার চিত্ত মাঝে
রাখবে নারে লিখে
গাছের সাথে একটি মেয়ের
প্রেমের কথাটিকে?
৫৪

বয়স
তখন সন্ধ্যাকালে
অস্ত রবি দূরের থেকে রঙিন আলাে ঢালে,
বইল বাতাস ধীরে,
দিনের আলাে আল তখন সন্ধ্যা সাগর তীরে।
রবি তখন নামতেছিল সুদূর গগন বেয়ে,
দূরের মাঠে খেলতেছিল একটি ছােট মেয়ে
মধুর হাসি তার
নবীন কচি পাতায় পাতায় ছড়াল বার বার।
তখন ওই যে বুড়াে সব কাজে যার হেলা
বসে বসে দেখতে ছিল ছােট্ট মেয়ের খেলা,
যাট পেরিয়ে এলাে বােধ হয় তার
ভালয় মন্দ সকল ছন ধুলােয় একাকার।
বাতাস কঁপন লাগিয়ে গেল কোকড়া কালো চুলে,
বুডাের মনের গােপন পুরের সকল দিয়ে খুলে।

বয়স
সে বুঝিগাে ভাবতেছিল আপন মনে যেন,
এমন হ’ল কেন ?
এমন কেন হয় -
উহার বয়স আটু যদি বা হবে
আমারে বা ষাটু কেন গাে কয়?
আমারও ত এম্‌নি ছিল দিন, এনি ছিল খেলা,
আমারও ত বুকের উপর দিয়ে
গেছে এমন মধুর সন্ধ্যাবেলা,
আমারও ত এমনি ছিল হাসি
রঙিন মায়ার জাল,
লােকে বলে অনেক দিনের কথা
সে যে অনেক কাল ।

বয়স
এত শুধু ভােলায় কথার ছলে
কে জানেরে কাল কাহারে বলে,
কে জানেরে কোথার ধুলায়
ধুসর হয়ে হয়ে
কোন্ এক্ স্রোতে
সুদূর পথে
কাল চলেছে বয়ে ।
তাহার মাতাল প্রাণের সাথে
জড়িয়ে মােদের প্রাণ
সে কেনরে যাবার বেলায়
দেয়রে আবার টা ?
জীর্ণ করে দীর্ণ করে
পরাণ ছল ছল
সে কেনরে মােদের কাণে
বলবে চল চল ?
সকল তত্ত্ব সকল সত্য মিথ্যা হয়ে যায়,
তারেই কিরে বয়স বলে হায় ?
চাইনা আমি শুতে কোন কথা
হারিয়ে যেতে কথার অতল তলে,
আমায় শুধু সত্য করে বল
বয়স কারে বলে ?

নির্জন বনছায়ে
গভীর শ্যামল নিবিড় মুগ্ধ
গহন কুঞ্জতলে
তরুণ সূৰ্য্য উঠিয়া তখনি
লুকাত কি কৌশলে,
একটি ক্ষুদ্র পাখী ছিল সেথা
কি জানি কি করি আশা
মৰ্ম্মর বনে নেচে ক্ষণে ক্ষণে
বেঁধেছিল নিজ বাসা,
পাতার আড়ালে দুলিত পুষ্প
বর্ষা পড়িত ঝরি
সে নিজেরে ঢাকি কোমল পক্ষে
শিহরি শিহরি মরি,
সে কি আনন্দ দুলিত কাননে,
পুলক লাগিত গায়ে,
স্নিগ্ধ শ্যামল, আলো চঞ্চল,
নির্জন বন ছায়ে ।
৫৮

নির্জন বন ছায়ে
শুষ্ক পত্রে বৃক্ষের তলে
রাখিত শয্যা পাতি
নব কিংশুক বিকশিত হত
কাটায়ে আঁধার রাতি।
পাতায় পাতায় কি মধুর স্নেহ
করে যেত কঁাদা হাসা
সাথীটিরে তার ক্ষুদ্র পাখীটি
কি বাসিত ভালবাসা !
সকাল বেলায় শাখার আড়ালে
ক্ষুদ্র কুলায় খানি
মুখরিত হত সে দুটি পাখীর
সােহাগের কলবাণী,
ফুলের পাপড়ি উড়িয়া বাতাসে
ছড়ায় তরুর পায়ে,
প্রেম উজ্জ্বল মােহ উচ্ছল,
নির্জন বন ছায়ে ।
৫৯

নির্জন বন ছায়ে
কবে একদিন মেঘ দুর্দিন
সুপ্ত তারকা সাঁঝে
মুগ্ধা পাখীটি নিজ বন্ধুরে
জড়াল বুকের মাঝে,
বায়ু কেঁদে গেল করি মৰ্ম্মর
পুষ্প পড়িল ঝরি,
আকাশ তাহার ক্ষুদ্র হৃদয়
লইল বরণ করি,
মােহন মরণ একি পবিত্র
এ কিরে চমৎকার ।
জলদ ছাইল নীল অম্বরে
ঢাকিল অন্ধকার।
মুছাল ক্লান্তি, কি মহা শান্তি,
দুলিল মন্দ বায়ে,
স্নিগ্ধ মধুর, বেদনা বিধুর,
নির্জন বন ছায়ে ।
•

প্রকাশ
যত বার আপনার অন্তরে অন্তরে
আপনারে লুকাইয়া ভুলাইতে চাই,
ততবার ছিন্ন করে টেনে আনে মােরে
সবার চক্ষুর পাশে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে।
মুক্তি লাগি যতবার ছুটিয়াছি আমি
ততবার যেন কার নিষ্ঠুর শৃঙ্খলে
বাধিয়াছে মােরে অনন্ত বন্ধনে।
যতবার যতকিছু করিয়া গােপন
সঙ্গোপনে ধীরে ধীরে রেখেছি লুকায়ে,
কে যেন গাে ততবার ছিন্ন করে মােরে
তিলে তিলে পলে পলে বিশ্বের মাঝারে
করেছে প্রকাশ। আজ বুঝিয়াছি তাই
নাই, নাই, নাই, মাের কোন শক্তি নাই
এতটুকু লুকাইতে করিতে গােপন।
বিশ্ব প্রকৃতির কোলে এতদিন ধরে
লুকায়ে আছিল যাহা ঘনসুপ্তিময়
গাছ পাতা তরুলতা সবাকার মাঝে
নীরব নিস্তব্ধ যাহা গােপন রয়েছে,
নানা জীবশক্তি মাঝে নানা মূৰ্ত্তি লয়ে
নানা বাণীছন্দে তাহা প্রকাশিল ধীরে।
৬১

প্রকাশ
মৌন সৌন্দর্যের মাঝে এতদিন যাহা
গােপনে ফুটিয়া উঠে গােপনে শুকাত
আছিল সবার কাছে প্রাণহীন হয়ে
ছন্দবাক্যবন্ধহীন। সঙ্গোপনে
মানুষের কাছ হতে যা ছিল লুকায়ে
মানুষ তাহারে আজ ছিন্ন ভিন্ন করে
করিল প্রকাশ। ধীরে ধীরে আপনার
সূক্ষ্ম চিন্তা ধারা বাহি করি আবিষ্কার,
স্তব্ধ রহস্যেরে আজ ফুটায়ে তুলিল
প্রাণহীন ছিল যাহা প্রাণ তারে দিল।
প্রকৃতির মাঝে ছিল যা কিছু গােপন
নিষ্ঠুর পীড়নে তারে টানিয়া আনিয়া
টেনে নিল যত কিছু লাজ আবরণ।
টেনে নিল দ্বিধা দ্বন্দ্ব সব অন্তরাল,
নগ্নরূপে আজ তারে করিল প্রকাশ।
এতদিন পরে আজ বুঝিলাম তাই,
নাই, নাই, নাই, মাের অধিকার নাই
বিশ্বের নিকটে কিছু লুকায়ে রাখিতে,
আপন মৰ্ম্মের তলে করিতে গােপন।
৬২

পরিত্যক্ত
.
এই সন্ধ্যা রশ্মি নামে বনানীর পর
জলের কল্লোল জাগে তরুর মর্মর
আকাশেরে মত্ত করে, পুষ্পগন্ধধারা
দক্ষিণ বায়ুর বুকে হয় আত্মহারা।
শ্যাম শম্প রাশি দোলে পলের কোলে
তারি স্নিগ্ধ ছায়াখানি দীর্ঘ হয়ে দোলে
বটের জটার তলে সন্ধ্যার আলােক
আকুল অঞ্চল মেলি রচে নবপােক।
অন্ধকার চুমি নামে সৌন্দর্যের আলাে,
তাের এই রূপখানি বেসেছি ভালাে
হে জননী আজ মােরে সেই কথা স্মরি
একবার ফিরে লও তব অঙ্ক পরি।
অপূর্ব জ্যোতিতে তব রূপের ছায়ায়
মােরে লহ। ঢাকো সব নিবিড় মায়ায়
ঘরের ধূলার পরে নহে মাের ঠাই,
আমারে ছেড়েছে সবে, কেহ ডাকে নাই।
তবে আজ ভাঙ্গ বন্ধ ছাড়ো গৃহ কোণ
আমারে চাহেনি কেহ নাহি প্রয়ােজন।
বসন্তের বনে যবে জাগে ব্যাকুলতা
নিস্তব্ধ পূর্ণিমারাতে, আমার দেবতা

পরিত্যক্ত
আমারে করেছে পরিত্যাগ। বেদনায়
ছেয়েছে আকুল চিত্ত। পথের ধূলায়
আমারে রেখেছি এনে, প্লাবি অশ্রুনীরে,
অবসন্ন ভিন্ন মনে চলিয়াছি ধীরে
এ বিশাল ধরণীর এ সংসার মাঝে
আমার ত দাবী নাই, লাগি নাই কাজে
কোন দিন এতটুক, চিত্ত বেদনাতে
দ্বারে দ্বারে ফিরিয়াছি ভিক্ষাপাত্র হাতে
যে টুকু লভেছি কৃপা তারে ফেলে দিয়ে
আবার চলেছি দূরে শূন্য পাত্র নিয়ে।
সন্ধ্যালােকে একি বার্তা ছায় চিত্তময়
কি নিবিড় শান্তি নামে।
ওরে আর নয়
এ অপূর্ব সৌন্দর্যের পাদপদ্ম তলে
ব্যর্থ তব চিত্ত খানি আনাে অশ্রুজলে
তব জ্যোতি বয়ে যাক সৰ্ব্ব অঙ্গ চুমি,
কেহ যারে ডাকে নাই তারে ডাকো তুমি।
৬৪

নাইবা কিছু থাল
প্রভুহে,
আশ্বিনের ওই ব্যাকুল মেঘে
আকাশ খানা ঢাল,
আমার আর নাইবা কিছু থাকল।
দুই পাশে মাের বালুর চরে
বাঁশের ঝোপে আঁধার করে
পায়ের কাছে শ্রান্ত নদী
মুগ্ধ স্বরে বল।
পুষ্প ঝরা কুঞ্জ তলে
জোনা রাণীর আলােক জ্বলে,
ভাঙা ঘরের দুয়ারে মাের
বাতাস এসে হল।
আকাশ ভরা ছিন্ন মেঘে
তড়িৎ খেলে চমক্ লেগে
বজ্ৰ অতি আকুল স্বরে
অচেনারে ডাল।
আমার আর নাইবা কিছু থা।
প্রভুহে,
৫

প্রয়ােজন
তুমি তখন চলেছিলে
উচ্চ তব রথে
আমি তােমায় খুজতে ছিলেম
সকল পথে পথে।
যখন হে মাের প্রিয়,
বসন্ত তার রঙিন উত্তরীয়
উড়াল এই কাননে পৰ্ব্বতে,
আমি তােমায় খুজতে ছিলেম
সকল পথে পথে,
লােকে অামায় দেখে
হাত থেকে থেকে
বত আমায় কারে ললা তুই
খুজিস্ অনুক্ষণ
অনেক দূরের উচ্চ পুরের
তারে বা তোর কিসের প্রয়ােজন?

প্রয়ােজন
কি মিথ্যারে বক্ষে করে
অনন্ত জগতে
কাজ ফেলে তুই মুগ্ধ মনে ফিরিস্ পথে পথে
ফিরিস্ পথে কাজের বেলায়
ফিরিস্ কেবল খেলায় খেলায়
সাগর মাঝে তুচ্ছ ভেলায়
করিস্ রে তুই কিসের আয়ােজন,
মমাদের চেয়ে অনেক দূরের যে রে
তারে বা তাের কিসের প্রয়ােজন ?
তখন ঘুরে ঘুরে সকল দিবস যামী
ভেবেছিলেম আমি,
এত লােকের মাঝে
অনেকে রয় আপন আপন কাজে
কেউবা আবার এই সাগরের কূলে
কাজ গিয়েছে ভূলে
সবার নিকট হতে
আমায় টেনে অপূৰ্ব্ব এক স্রোতে,

উদিতা
অমিলেরি সকল বােঝায় ভরে
বিধি বুঝি গড়েছিলেন মােরে,
তাই বুঝি মাের অনেক চাওয়ার ধন,
সবার কাছে দূরের তুমি কিনা
তােমারে তাই বিষম প্রয়ােজন।

শৃঙ্খল
এ মহাসাগর সংসার মাঝে
এ কি বন্ধনে বাঁধে
তাহার মাঝারে এটি পরাণ
মুক্তি লাগিয়া কঁাদে।
পাগলের মত বিশ্ব নিয়ম
লঙ্ঘন করিবারে
একটি কেবল চিত্তের পণ
চঞ্চলে আপনারে,
করিবে দগ্ধ সকল বাঁধন
জ্বলিল চিত্ত শিখা
রক্ত কঁাকন পরিবহস্তে
কপালে রক্ত লিখা,
বাজারে প্রজারে ভিখারী ধনীরে
এক ডােরে বাঁধিবার
কে গড়িল এই শৃঙ্খল খানি
কে লভিল অধিকার ?

উদিতা
দুয়ারের ধার করিয়া আঁধার
ঘন ব্যথা ভার নামে,
দক্ষিণে মাের কিসের এ ঘাের,
কি প্রাচীর মাের বামে ?
ক্ষুব্ধ হইয়া মুগ্ধ হৃদয়
বাহিরিল দিশাহারা,
বক্ষের পাশে কেঁদে নেমে আসে
লক্ষ সুরের ধারা,
বাধা পেয়ে পেয়ে বুকে যায় ছেয়ে
আকুল দুঃখ যত
এ মহা বাঁধন যায় না ছেদন
মাথা করে দেয় নত,
যত ভাবি আমি কোন বাধা নাই
মহান্ মুক্তি মাের
জাগে ক্রন্দন, আসে বন্ধন,
হস্তে নবীন ডাের।
৭০

শৃঙ্খল
নব নব রূপে বাঁধে চুপে চুপে
কত না মিথ্যা ছলে
পথে বাহিরাই পথ নাহি পাই,
আকুল অক্ষি জলে।
আর কিছু নাই নিশিদিন ধরে
শুধু এই ঘােরা আছে,
সে কোন্ লক্ষ্যে রাখিয়া চক্ষু
জানি সে কোন্ কাজে ;
একি এ বাঁধন যায় না ছেদন,
কে বাঁধিল এত করে ?
সবার মাঝারে বাধিল সবারে
কি যে শৃঙ্খল ডােরে।
৭১

শেষের খোঁজ
কোন্ খানেতে শেষ আমার
কোন্ খানেতে শেষ,
কোন্ খানেতে থামে আমার
দুঃখ সুখের লেশ।
ভরা স্রোতের মাঝখানেতে
কোথায় পাব পার,
অসীম মাঝে সীমা কোথায়
অচিন পারাবার,
কালের যবে হারিয়ে যাবে
মুহূর্ত নিমেষ,
কোন্ খানেতে শেষ আমার
কোন খানেতে শেষ ?
৭২

শেষের খোঁজ
পরাজয়ের ধুলায় মাখা
দুখের বােঝা বয়ে
তাকিয়ে রব হতাশ মনে
নিমেষ হারা হয়ে,
কবে আমার ঘরের মাঝে
জ্বলবে না গাে আলাে
আঁধার এসে নামবে চোখে
সেই হবে গাে ভালাে,
যাইগাে ছুটে অনেক দূরে
খুজি শেষের দেশ
কোন্ খানেতে শেষ আমার
কোন খানেতে শেষ ?
৭

উদিতা
লুটিয়ে আমি শেষের পথে
ধুলােয় রব পড়ে
হৃদয় খানি উঠবে তবু
শেষ গানেতে ভরে,
রবি তখন তলিয়ে যাবে
তলিয়ে যাবে চঁাদ
আলাে তখন পেরিয়ে যাবে
তমােপুরীর ফাদ,
রইবে নাগাে কোথাও মাের
কিছুর অবশেষ
কোন্ খানেতে শেষ আমার
কোন খানেতে শেষ ?
৭৪

ক্ষণিক
;
তখন সন্ধ্যার আলাে স্নিগ্ধ মােহচ্ছটা
দিয়েছিল ছড়াইয়া, করে নব ঘটা
মত্ত হয়ে বয়েছিল দক্ষিণের বায়
দিকে দিকে দোলা দিয়ে বনের শাখায়,
ধীরে ধীরে দেখিলাম মাের চারিধারে,
ছেয়ে গেল মুগ্ধ করা নিস্তব্ধ আঁধারে,
প্রত্যেক মুহূর্ত আমি বুঝিনু সেদিন
আসে যায় নিত্য হয়ে অনন্ত নবীন ;
আমি সেই নূতনের নূতন খেলায়
গিয়েছিনু মগ্ন হয়ে সাগর বেলায়,
সহসা কখন মােরে কে যে নিল টেনে
বিদ্যুৎ দেখাল পথ দূরে বজ হেনে
চকিতে চাহিয়া দেখি একি মত্ত স্রোতে
আমারে ভাসায়ে দেছে কোন দিক হতে,
অন্ধকারে বহুদূরে জানিনা কোথায়
পাশে শুধু তরঙ্গের শব্দ শােনা যায়,
যেখানে দাড়ায়ে থাকি তাহা ছাড়া আর
যে দিকে ফিরাই আঁখি সমস্ত আঁধার।
৭৫

উদিতা
যে মুহূৰ্ত্ত গত হয় মাের চিত্তময়
শুধু তার স্মৃতি খানি লেখা হয়ে রয়,
ক্ষণে ক্ষণে ব্যথা লাগে বুকে বাজে ভয়
তােমারে লভিনু পাশে এমন সময়।
অন্ধ-করা অন্ধকারে তরঙ্গ উছলে :
আমারে টানিয়া নিল তব বক্ষতলে,
সঙ্কট সমুদ্র মাঝে নিভে গেল ভয়,
ক্ষণিক বিশ্রাম তরে মিলিয়া আশ্রয় ;
তােমার বিশাল বাহু মমার চারিদিকে
মােহন স্নেহের গণ্ডি দিল লিখে লিখে
কাপে উত্তরীয় মাের মুক্ত কেশ পাশ
ক্ষণে ক্ষণে লেগে তব সঘন নিঃশ্বাস ।
আকুল আনন্দ মহাবেদনা বিহীন
অকূল অম্বরতলে রহিল বিলীন,
রাক্ষস আর্ত ভঙ্গ দূরে দেখা যায়
বিশাল তরঙ্গ আসে পাগলের প্রায়,
এখনি মুহূর্ত মাঝে তােমারে আমারে
দুই দিকে টেনে নেবে ঘন অন্ধকারে,
দুজনার মধ্যখানে সেই কাল জল
হাসিবে পূর্বের মত লুটায়ে অঞ্চল।
৭৬

মরীচিকা
খরস্রোতা নদী পার্শ্বে শুদ্ধ বালুপর
ছিল মাের ঘর,
মধ্যাহ্নের অভিশাপে বালুকার রাশি
উঠিত উত্তপ্ত হয়ে
সুদীর্ঘ নিঃশ্বাসি,
লক্ষ্যহীন
যেত দিন।
রুদ্ধ করি বাতায়নতল
শূন্য গৃহে রিক্ত মনে রহি অচঞ্চল।
কতদিন সুস্নিগ্ধ সকালে
অনন্ত রঙের আলাে
জ্বলিয়াছে আকাশের ভালে,
নদীপরপাশ্বটিতে কাশবন মাঝে
দক্ষিণের সমীরের ধ্বনি বাজিয়াছে,
মুকুলের গন্ধে ভরা স্নিগ্ধ বনতলে
শুষ্ক পত্র গেছে ঝরে
আকুল মর্মরে,
জলের জেগেছে প্রতিধ্বনি,
৭৭

উদিতা
সন্ধ্যামণি
চকিতে মুদেছে অক্ষি,
ক্ষুদ্র পক্ষী
ধরিয়াছে গান
অপূৰ্ব অমৃত সুরা করি নিয়া পান
সহকার বৃক্ষ হতে।
মুক্ত স্রোতে
অরবিন্দ পরে
ঝরেছে অমল রশ্মি
স্নেহ হাস্যে ভরে,
তাহারে নেহারি
হেসেছে অপরাজিতা কুঞ্জ হতে তারি
সুন্দরী সুনীলা।
কতদিন হেরি এই লীলা
শুক বালুতট হতে
দূর পানে চাহি
মুগ্ধ মন অবগাহি
উঠিয়াছে রুদ্ধ অশ্রুনীরে।
৭৮

মরীচিকা
ধীরে ধীরে
দুরন্ত চঞ্চল
উচ্ছাসে ভরিয়া গেছে হৃদয়ের তল ।
আপনারে ক্ষণে ক্ষণে
কি মিথ্যায় ভুলায়েছি,
করিয়াছি মনে
ভাঙ্গি এই তুচ্ছ দ্বার আনি আপনারে
কুঞ্জতলে ফুলগন্ধে ঐ নদী পরে ।
সে মুহূর্তে তখনি আবার
বারংবার
আপনারে দিয়েছি ধিক্কার,
দ্বার দিছি রুদ্ধ করি
চক্ষু ভরি জলে,
পরম দুলভ আশা হেরি চিত্ততলে।
সেদিন ফান্তুন রাতে
পূর্ণিমাতে
কেন গেল খুলে রুদ্ধ বাতায়ন দ্বার ?
৭৯

উদিতা
দক্ষিণের বায়ে
মুহূর্তের মাঝে দিল প্রদীপ নিয়ে,
দেখা গেল দূরে
অনন্ত অম্বরতলে স্নিগ্ধ হিমাংশুরে,
আমবন তল
সে অমল জ্যোৎস্নাধারে দেখিনু উজ্জ্বল।
তখনি সে উন্মত্তের প্রায়
সুদূর দক্ষিণ হতে উত্তাল এ বায়
সমস্ত হরিল মাের ভাঙ্গি গৃহ দ্বার
পুষ্প ঘেরা ক্ষুদ্র নায়ে করি দিল পার ;
পরপারে নদীধারা
মােরে গেল ধুয়ে
সেই কাশবনমাঝে।
বটজটা পড়িয়াছে নুয়ে,
তারি ডালে
রাত্রির খদ্যোত তার লক্ষ দীপ জ্বলে,
সেই স্নিগ্ধ কুঞ্জতলে মােহ মুগ্ধ চোখে
ফুল গন্ধে সিক্ত করা জ্যোৎস্নার আলােকে

মরীচিকা
হেরিলাম আপনারে—
পরিপূর্ণ আনন্দের ভারে,
রাত্রি এল শেষ হয়ে।
মােহ মন্ত্র লয়ে
তরুণ অরুণদেব তীক্ষ্ণ রশ্মি হানি
সুদীর্ঘ অম্বর মাঝে দিলেন বাখানি
আপনার মহিমারে।
এ কি ওরে একি ?
সে মহিমা স্নিগ্ধ চোখে একী আজ দেখি
কল্লোলিনী নদীস্রোতে কোথা হতে হয়
আমার সে তুচ্ছ ঘর কোথা ভেসে যায়।
তারি বক্ষপরি
কালাে জল
ছল ছল
ওঠে নৃত্য
নৃত্য করি,
৮১

উদিতা
সমস্ত অাকাঙক্ষা শেষ,
নির্নিমেষ
দৃষ্টি পার্শ্বে নিবে আসে আলো ;
তপ্ত বালু করে ধু ধূ,
মুহূর্তের তরে শুধু
মনে হয় ওই ছিল ভালো।
৮২

দ্বিপ্রহরে
স্তব্ধ দুপুরেতে সকল কাজ ফেলে
ওধারে বসে থাকি জালা রাখি মেলে,
একটা বট গাছ একটা ডােবা আছে
তাদের মাঝখানে ধানের ক্ষেত নাচে,
সেখানে ছায়াতলে হরষ বুকে ছেয়ে
সারাটা দিন থাকে একটি ছােট মেয়ে।
সে আসে ভাের বেলা অশথ তলা দিয়ে
বাঁশের লাঠি আর ছাগল শিশু নিয়ে,
যেখানে বট গাছে দুইটি জটা নেমে
কে জানে কবে হ’তে জড়ায়ে আছে থেমে,
সেখানে খেত দোল কেবল হেসে হেসে
বাতাস যেত খেলে ছড়ান কেশে বেশে,
ছাগল শিশু ঐ ডােবার পাশে পাশে
ফিরিত চরে চরে সবুজ ঘন ঘাসে।
ছড়ান সাদা কাল মেঘের ফঁাকে ফাকে
আকাশ থেকে থেকে প্রকাশে আপনাকে।

উদিতা
বটের গাছে বসে একটি ছােট পাখী
দূরের সাথীটিরে মরিত ডাকি ডাকি।
সূর্য নামে ধীরে আকাশ ধরে ধরে,
দুপুর কেটে গিয়ে বেলাটা যেত পড়ে।
বর্ষা ঝম্ ঝম্ ঝরিত ধীরে ধীরে
আকুল ধান ক্ষেত ডুবায়ে স্নেহ নীরে,
জলের বুকে বুকে ফুটিত মৃদু হাসি
দুধারে সরে গিয়ে শ্যাওলা রাশি রাশি
মেয়েটি নেমে এসে ছাগল শিশু নিয়ে
ঘরেতে ফিরে যেত মাঠের পথ দিয়ে,
ধানের গাছগুলি শিহরি উঠে ঝুকে
লুটাত ক্ষণে ক্ষণে কোমল মুখে বুকে,
আমার মন মাঝে কেবলি যেত ছেয়ে—
ধানের ক্ষেত আর একটি ছােট মেয়ে।
৮৪

প্রার্থনা
আমারে করগাে সিক্ত
নয়ন জলে,
আমারে করগে রিক্ত
চরণ তলে,
করগাে আমারে মুক্ত
পরাণে মনে,
করগাে আমারে যুক্ত
তােমার সনে,
করগাে আমারে দীপ্ত
আলােতে নব,
করগো আমারে লিপ্ত
চরণে তব,
ভরগাে নূতন গন্ধে
পরাণটীরে,
চিত্ত বাজুক ছন্দে
নয়ন নীরে।
করােনা আমারে ভিন্ন
বাহিরে ঘরে,
পড়ুক তােমার চিহ্ন
জীবন ভরে।

অন্তর
নিস্তব্ধ নির্জন গৃহে ফাল্গুন সন্ধ্যায়
নবীন মুকুল গন্ধ চারিদিকে ছায়,
পূরবীর স্নিগ্ধ সুর সকরুণ রাগে
সুদূরে ধ্বনিত হয়ে মর্মে এসে লাগে,
গােপন স্নিগ্ধতা ভরি দক্ষিণের বায়
ধীরে ধীরে দোলা দেয় বনের শাখায়,
এত যে মধুর রসে ভরে গন্ধে গানে
তবু কি যে রয়ে যায় এর কোন্ খানে ;
নিজেরে আড়াল করি লুকাইয়া রাখি
কি যেন গােপন থাকে কিছু থাকে বাকি
এত যে মাধুৰ্য আছে এত গন্ধ গান
এত যে বিছান আছে মােহময় প্রাণ
এত যে রূপের খেলা হয়ে রূপময়
এত যে রঙিন হয়ে চলে ঋতু ছয়,
তবু যেন মনে হয় সব আবরণ
সবটুকু বাহিরের ভুলাতে নয়ন।
৮৬

অন্তর
আপনারে রুদ্ধ করি ঢাকি চারিধার
সকল লুকান আছে যা আছে আমার,
রঙেতে ভরিয়া গেছে বাহিরের কুল
সকলে দেখিয়া তাহা করিয়াছে ভূল,
অন্তর হয়েছে শূন্য বাহিরে রেঙেছি
কেহ ত দেখেনি মােরে, ভেবেছে দেখেছি;
গন্ধ দিতে পারি নাই শুধু দিছি রেশ
ভাবিয়াছি কেন এত মিথ্যা ছদ্মবেশ ?
আমার এ চতুর্দিকে কেন এত সাজ
কেন রে রয়নি খােলা অন্তরের মাঝ ?
আজ তাই খুলি দিয়া যত আবরণ
আমার অন্তর তলে যা কিছু গােপন
তাহা জীর্ণ হয় হােক দৈন্য ভরা ঘাের
তবুও প্রকাশ কর যাহা আছে মাের ।
যা কিছু কেবলি মিথ্যা, যা আমার নয়,
খেলো না তাহারে লয়ে ওগাে খেলাময়।
মুছে যা সব রঙ কিছু নাহি চাই
আমার অন্তরে আমি পূর্ণ হয়ে যাই।
৮৭

স্বদেশ
পূর্ণিমার আলােকেতে
বায়ু উঠেছিল মেতে
অমল জ্যোৎস্নার ধারা নেমেছিল ধুয়ে,
বাতাসেতে বাঁশ বন
করেছিল শন্ শন্
দুধারে বৃহৎ শাখা পড়েছিল নুয়ে ।
সেদিন চাহিয়া দূরে
করুণ ব্যাকুল সুরে
কত প্রশ্ন উঠেছিল সে কথা কে জানে,
এ বিশাল ধরা মাঝে
কেবা দূরে কেবা কাছে
নিজ দেশ কার আছে হেথা কোন্‌খানে ?
এই ত জন্মায় নর
এই লয় অবসর
তবু মাঝে কিছুদিন কয়টী নিমেষ,
কোনো তুচ্ছ মাটীটু
ভরে রাখে তার বুক
তারে সে আপন বলে বলে নিজ দেশ।
৮৮

স্বদেশ সে কি শুধু যেথা তার বেড়ে ওঠে এ সংসার, কুল ক্রমাগত নীতি কুল ব্যবহার সপ্তম পুরুষ ধরি উঠিতেছে যেথা ভরি তৃণ সম তুচ্ছ যত দম্ভ অহঙ্কার । আজি কত দিন পরে মুহূৰ্ত্তেক চেয়ে ঘরে সে প্রশ্নের পেয়েছিনু সকল উত্তর- শ্যামল অঙ্গন পরে চেয়ে শুধু ক্ষণ তরে বুঝেছিনু কোথা দেশ কোথা কার ঘর। যেখানে কুটীরছায় স্নিগ্ধ বায়ু বয়ে যায় প্রভাতে অরুণােদয় আশীষের মত, প্রবাসী ছেলের তরে মা যেথায় কেঁদে মরে দুয়ারের পাশে বসে আঁখি করে নত। ৮৯

উদিতা
তুলসীর মঞ্চ পরে
কঁপে দীপ বায়ুভরে
মা’র চিত্ত হাহা করে নিজ পুত্র লাগি,
গভীর রাতের পরে
বাতায়ন খুলে ঘরে
প্রিয়া তার কেঁদে মরে দীর্ঘ রাত্রি জাগি
প্রদীপ জ্বালায়ে রাখি
কভু মুখ রাখে ঢাকি
গভীর বিরহ দুখে করিছে আহ্বান
সে আহ্বান চিত্তে তার
জাগে নাকি বার বার
পড়ে নাকি মনে তার সে দূরের স্থান ?
তার পরে মৃদু হাসে
যখন সে গৃহে আসে
জননী আকুল ভাষে বুকে ধরে তুলে,
বিরহিণী আজ ঘরে
শুধু হেসে হেসে মরে
তাপদগ্ধ গত দিন নিমেষেই ভুলে ।
৯
০

স্বদেশ
তখনি সে ঘর তার
হয় নিজ আপনার
তখনি সে দেশ তার হয় নিজ দেশ
যখন মনের টানে
অন্য মন টেনে আনে,
স্নেহ প্রেমে ভরা হয় মুহূর্ত নিমেষ।
৯১

মােছ এ ধুলি
কেন এ দ্বন্দ্ব এ মোর বন্ধ
হিংসা কেন
আমারে ঘেরিয়া রয়েছে বেড়িয়া
পাষাণে যেন,
হিংসা কেন ?
বহু দূর দেশ সেই কোথা হতে,
এই স্নেহ আসে কোন্ এক স্রোতে,
সেই জলধারে ধুতে আপনারে
মিথ্যা রােলে
অন্ধ হলে ?
রুদ্ধ প্রাচীরে কেন ধীরে ধীরে
বন্ধ হলে,
মিথ্যা রােলে
৯২

মােছ এ ধূলি
তবু দেখি এই ভাঙ্গা দ্বার পাশে
মুহূৰ্ত্ত তরে একী আলাে আসে,
বাহিরিতে চাই কেন বাধা পাই
অন্ধকারে
বন্ধ দ্বারে ?
ক্ষণে ক্ষণে একি উজ্জ্বল দেখি
দ্বন্দ্বটারে,
আন্ধকারে ?
একি অনিত্য দোলাতে নিত্য,
কেন দোলে এই আকুল চিত্ত,
কেন মােহময় হয়রে হৃদয়,
ধূলিতে মেশে ;
হিংসা দ্বেষে।

উদিতা
খােল খোল ওরে খোল খােল দ্বার,
ছিন্ন বীণায় তােল ঝংকার,
বন্ধনময় চিত্তে আমার
একী এ রােল,
লেগেছে দোল !
হৃদয়ে হৃদয়ে ওরে এইবার
তুফান তাে,
লেগেছে দোল:
একী আলাে এলো লাগিল চক্ষে
একী সুর নামে বক্ষে বক্ষে
একী এ ছন্দ আনে আনন্দ
আত্মহারা,
ভাঙ্গরে কারা।
১৪

মােছ এ ধূলি
চারিদিক হতে ব’য়ে যাক স্রোত,
প্রেমের ধারা
আত্মহারা।
কেবা আছে দূর কে বা আপনার
সমস্ত কথা ভােল এইবার,
খােলা দরজায় অম্বর তলে,
সকল ভুলি,
মােছ এ ধূলি।

আবাহন
ছিনু কোন দূর পুরে
বরষ বরষ কেটেছে সেথায় হেথা হতে বহুদূরে।
আমার জটিল কাজে,
দিবস কেটেছে ব্যথা সঙ্কুল অনেক লােকের মাঝে,
তবু সে সকল কর্মে
কাহার ব্যকুল কণ্ঠের সাড়া বেজেছে আমার মৰ্ম্মে।
চিত্ত উঠেছে নাচিয়া,
মৰ্ম্ম তন্ত্রে নব ঝংকার পলকে গিয়েছে বাজিয়া।
পরাণ উঠেছে ভরে,
বুঝি নাই আমি এত দূর হতে
কে ডাকিল এত করে।
যাহার কণ্ঠ ডাকের নেশায়
ঢাকিল সকল ঠাই।
করুণ মধুর কঠিন এ স্বর
কাহার তা বুঝি নাই।
৯৬

আবাহন
কাননে গেয়েছে পাখী
আমি শুনিয়াছি দূর হতে কে যে আমারে উঠেছে ডাকি।
ফুটেছে নূতন ফুল,
প্রভাতের কালে ঘেরিয়া তাদের গাহিয়াছে অলিকুল।
দিন রাত নিরবধি,
আপনার মনে রচি সঙ্গীত গাহিয়া গিয়াছে নদী।
দিবস কেটেছে খেলে,
বর্ষার তরে বিরহী চাতক বক্ষ রেখেছে মেলে।
চেয়ে দেখিয়াছি আমি,
অন্তর মাঝে ক্ষণিকের তরে
স্পন্দন গেছে থামি।
কিসের বেদনা ঢালিয়া দিয়েছে
মনের অন্ধকূপে
বসন্ত সে যে ফিরিয়া গিয়াছে,
মলিন শ্রীহীন রূপে।
৭
১৭

উদিতা
এসেছে বর্ষাকাল,
মনের গােপন মৰ্ম্মের তলে মেলেছে নূতন জাল।
চঞ্চল জল ধারা
মধুর শব্দে ঝরেছে আমারে করেছে আত্মহারা।
গাছের শাখায় থাকি,
বর্ষার জলে ভিজিয়া ভিজিয়া ডেকেছে ছােট্ট পাখী ।
তবু যেন মনে হয়,
উহার করুণ কণ্ঠের মাঝে কি যেন লুকায়ে রয়।
কার আবাহন ধ্বনি,
মর্মে বাজিয়া শিরায় শিরায়
চলিয়াছে রণরণি।
কোথা হতে এল কার ভালবাসা,
কাহার আখির নাের ?
করিল স্নিগ্ধ করিল সিক্ত
শুষ্ক বক্ষ মাের ।
৯৮

আবাহন
শরৎ গিয়াছে চলি,
যাবার সময় কানে কানে মাের বহু কথা গেছে বলি।
নেচেছে কাশের গুচ্ছ,
নদীর পাশের শষ্যের ক্ষেতে দুলায়ে দুলায়ে পুচ্ছ।
চিত্ত উঠেছে জেগে,
কোথাকার যেন উত্তাল হাওয়া লেগেছে শরৎ মেঘে।
বেজেছে দূরের বাঁশি,
ঘাসগুলি সব ভিজেছে শিশিরে ভেবেছি অশ্রুরাশি
জেগেছে কিসের দ্বন্দ্ব,
কাহার পূর্ণ ডাকের নেশায়,
টুটিতে চেয়েছে বন্ধ।
তবু সে ডাকের সাড়া দিতে গিয়ে,
হয়েছে রুদ্ধ
শিরায় শিরায় বক্ষের তলে,
চলেছে বিষম যুদ্ধ।
কন্তু
৯

উদিতা
ই
বন্ধ,
বুঝি নাই আমি কিছু,
ভুলিয়া কৰ্ম্ম ক্ষণেকের তরে সব ফেলিয়াছি পিছু,
শুনেছি সে ডাক মৰ্ম্মে,
বুঝি নাই তবু কে ডাকে কোথায় আমার সকল কর্মে।
ছুটেছে আমার মন,
বাঁধন ছিড়িতে আকুল চিত্ত করেছে কঠিন পণ।
মনে হয়
কাটে
পরাণ আমার এ অন্ধকারে কঁদিয়া হয়েছে অন্ধ ।
ছুটেছে ডাকের শব্দ,
আমারে নামায়ে প্রাঙ্গণ তলে
করিয়া অবাক্ স্তব্ধ।
অন্তর মাঝে তুলি ঘন রােল,
ফেলি বিস্ময় স্তুপে-
ছুটেছে সে ডাক বিশ্বের মাঝে,
অনন্তময় রূপে।
।
১০০

আড়াল
ওমা আমায় বল কেন বল ?
শ্রাবণ মাসের আকাশ ছিল
বাতাসে চঞ্চল
পাঠশালারি ছােট্ট ঘরের জানলাখানি খুলে
চেয়েছিলেম ভুলে
এইত শুধু দোষ
এতেই এত রােষ ?
দেখতেছিলেম জাল্লা দিয়ে একটা ছােট মাঠ,
পায়ের তলে ঘাস মরা তার হাটে যাবার বাট,
রােগা একটা ছেলে,
হাতে লম্বা ভাঙ্গা লাঠি
বেড়াচ্ছিল খেলে,
বাঁধন হারা কাদের বাছুর
খেলতেছিল ছুটে,
কুড়ােচ্ছিল ঘুটে
প্রকাণ্ড এক ঝুড়ি কঁাখে একটা কুঁজো বুড়ি
নড়, নড়ে থুড় থুড়ি।
১০১

উদিতা
+
ঝােপের পাশে থাকি
ডাক্‌তেছিল পাখী,
কাঠ ঠোক্রা গাছের পরে মারতেছিল ঘা,
মহিষ ছিল পুকুরেতে ডুবিয়ে তাহার গা।
কাঠবিড়ালি ছাড়ালে
নেচে নেচে লাফিয়ে বেড়ায়
ডালের থেকে ডালে।
দুধের ঘটী নিয়ে
গয়লা দিদি যাচ্ছিল মা মাঠের রাস্তা দিয়ে
বর্ষা ধােয়া পাতার থেকে পড়তেছিল জল,
ওরা বল কেন বল ?
বাতাস দোলা দিয়ে,
ঘরের থেকে টেনে আমায় কোথায় যে যায় নিয়ে,
তােমার গাওয়া গানের ধ্বনি
বাজতে থাকে কাণে,
মনে পড়ে তােমার বলা ছড়া,
ভুলে যে যাই পড়া।
১০২

আড়াল
লুকোনাে ওই মাঠের পিছে
কাদের বাস আছে,
ইচ্ছে যে হয় যেতে তাদের কাছে,
ভাবতেছিলেম রাত্রে উঠে তােমাকে না বলে
এলা যাব চলে,
হঠাৎ কেন কঁাল্ল বুকের তল,
তখন ওরা অমন করে বল্ল কেন বল ?
হঠাৎ গিয়ে শেষে,
সকাল বেলা উঠব যেন, নতুন লােকের দেশে,
আমায় তারা ডাবে কাছে,
বলবে কে গাে এলে ?
তাদের মাগাে বলব আমি
সব হারানাে ছেলে,
কলসী কাখে নিয়ে
বিকেল বেল। ঘাস মাড়ানো ঘাটের রাস্তা দিয়ে
মেয়ের যত দল
আতে যাবে জল,
উচ্ছলিত হাস্য তাদের ছড়িয়ে ক্ষণে ক্ষণে
তােমার কথা পড়িয়ে দেবে মনে।
১০৩

উদিতা
রাত্রি বেলা পথের পাশে
শুক্ননা পাতা আনি,
আমি আমার পাত্ব শয্যাখানি।
ওদের ঘরের জানলা যাবে খুলে,
ওদের মায়ের ঘুমপাড়ানির গান
আবে দুলে দুলে,
সব হারানাের মাঝে তখন
ঘুম পাড়ানাের গান
জুড়িয়ে দেবে কাণ।
সেই গানের সুরে,
তখন বুঝি অন্ধকারের স্তব্ধ আকাশ জুড়ে,
তােমার বাণী করবে মা টলমল ।
ওরা বক ল কেন বল ?
কল কেন রােষ,
দেখলে কিমা দোষ ?
খেলার সময় মাঠের দিকে চেয়ে রইলে মা ত,
একটু বকেন নাত,
তখন যা দোষ নয়
এখন কেন হয় ?
খেলা পড়ার মাঝখানেতে কে মা এমন করে,
এত কঠিন আড়াল করা দেয়াল দিল গ'ড়ে।
১০৪

স্বপ্ন
সন্ধ্যা বেলা আঁধার ঢালা
সকল ঘরে প্রদীপ জ্বালা
আমায় কোলে করে মা তুই বসে আঙ্গিনায়,
আমার গায় বুলাস হাত
ঘিরে আসে ঘুমের রাত,
চাদের দিকে চেয়ে কেবল বলিস আয় আয়,
মন যে আমার চঁাদের দেশে,
পাগল হ’ল ভেসে ভেসে,
অনেক দূরে মল ঘুরে ওই আকাশের ধার।
চাদের বুড়ি ব’সে বাটে
সেথায় শুধু চরকা কাটে,
পার্শ্বে তারি জোৎস্না রাশি আকুল একাকার।
হেনা বনের গন্ধ ভাসে,
ঘুম পাড়ানি কেন আসে,
ঘুমের সুরে জড়িয়ে দূরে অনেক দূরে
যাই।
কোথায় যেন কিসের টানে,
চোখের পাতা বুজিয়ে আনে,
তন্দ্রা ভ’রে, জড়াই তােরে কি যেনরে চাই।

উদিতা
ঘুমের
আমার খােলা জালা দিয়ে
মধুর আলাে সঙ্গে নিয়ে
জোৎস্নারাণী ছড়িয়ে আছে আমার চোখে মুখে,
তখন শুনি
ঘােরে
কে যেনরে ডাল মােরে,
তারি মৃদু কঁাপন যেন লাগল এসে বুকে।
তখন আমি বাইরে উঠি
ধূলার পরে পথে ছুটী
দূরে গিয়ে পড় নু যেন অজানা কোন্ দেশে।
চাদের আলো ছায়ায় ঢাকা
তােমার মত স্নেহে মাখা,
তারার মাঝে যেন সে দেশ অনেক দূরে মেশে।
এইত চাদের দেশরে বুঝি,
পেলেম আমি অনেক খুজি,
অনেক দূরে পেলেম তারে অনেক খোঁজার পর ।
এইত আলােয় আলাে আঁকা,
এইত ফুলের গন্ধ মাখা,
এইত চঁাদের রাজ্য বুঝি এইত চঁাদের ঘর ।

স্বপ্ন
হটাৎ ভােরের বাতাস লেগে
ঘুমের থেকে গেলেম জেগে,
সেই বাতাসে হারাল সব গভীর অন্ধকারে,
দেখি আমার মাথার কাছে
মা যে হেসে দাড়িয়ে আছে,
চাদের রাজ্য হারিয়ে গেল অতল পারাবারে।
তুমি শুনে বল্লে বােক।
ওরে আমার ছােট্ট খােকা,
মিথ্যে খেলা দেখছিলিরে স্বপ্ন কি আর সত্যি হয়।
তবু গাে মা শুধাই তােরে
সত্যি করে বলনা মােরে,
কিছুই কেন মিথ্যে হবে সবি কেন সত্যি নয়।
১০৭

মেঘ
f
তৃষিত ফুলের তৃষ্ণা মেটাতে
আনি পশ্চাতে আনি সাথে সাথে,
সিন্ধু নিঝর মন্থন করা
নব বর্ষণ বারি।
ক্লান্ত দুপুরে যবে বন শাখে
পল্লব দল ঘুমন্ত থাকে,
মাের আলো ছায়া রচি নব মায়া
বুকে দুলে ওঠে তারি ।
কঁপে মাের পাখা গগনে গগনে
বরষা অঝরে ঝরে ক্ষণে ক্ষণে,
শিহরিয়া জাগে নবীন কলিকা
মুখে লাগে জল বিন্দু।
কম্পিত শাখে করে বিশ্রাম,
দোলা দেয় যেন মাতা অবিরাম
বাতাসে আলােকে উছল পুলকে
উথলিয়া সুখ সিন্ধু।
১০৮

মেঘ
শষ্যের ক্ষেতে কাপায়ে সৃষ্টি
কভু ঢালি আমি শিলার বৃষ্টি
শুভ্র হিমানী পৰ্বত রচে
স্নিগ্ধ কানন মাঝে।
আবার আমার বরষার ধারে
তখনি তাহারা ঝরে একেবারে,
বজ্রের তালে আমি চলি, মাের
হাস্যের ধ্বনি বাজে।
নব বেদনায় রচি নব লীলা
পাহাড়ের নীচে ঝেড়ে ফেলি শীল,
তারা ব্যথা ভরি ওঠেগাে গুমরি,
আকুল কণ্ঠে ডাকি।
ঝঞ্চার কোলে মুগ্ধ পরাণে
মস্তক রাখি শীতল শিথানে
দীর্ঘ রাত্রি আসে শেষ হয়ে,
আমি নিদ্রিত থাকি
నని

উদিতা
আকাশ শিখরে কুঞ্জের মাঝে
রয়েছে দাড়ায়ে সহস্র সাজে,
আলােক জ্বালায়ে বিদ্যুত বালা,
আমার কর্ণধার ।
গিরি গহ্বরে মহা উৎসবে,
বাজে তার ধ্বনি ভৈরব রবে,
অব্ধির পরে বায়ু হাহা করে
তুলি মহা হুঙ্কার
ধরণীর বুকে সাগরের নীরে,
দেখাইয়া পথ কভু ধীরে ধীরে,
আকুল ভঙ্গে নূতন রঙ্গে
সে মের সঙ্গে চলে ।
কার আহ্বানে রহিয়া মুগ্ধ,
ধ্বংসের প্রেমে ছুটেছে লুব্ধ,
গভীর জলধি উত্তাল করি,
তারি নীলিমার তলে
১১

মেঘ
নিবিড় গুহায় প্রবাহিনী ব’য়ে
নীল সরােবর পার হয়ে হয়ে
উচ্চ শৃঙ্গ লঘিয়া কভু,
শ্যামল মাঠেতে আসে।
পৰ্বত নদ স্বপনের সম,
খুজে ফেরে তার সেই প্রিয়তম,
ভূলে যায় শুধু অচেনা সেজন,
রয়েছে তাহারি পাশে।
রক্ত সূর্য উল্কা চক্ষে,
ছড়ায়ে অগ্নি আকাশ বক্ষে,
বসে মাের পরে আমি বহু দূরে
পাল তুলে চলি বয়ে,
ভূমি কম্পনে করিয়া রঙ্গ
কঁপিলে পাহাড় যেন বিহঙ্গ,
এক মুহূৰ্ত্ত বসেছে তাহার
সােনালী পক্ষ ল’য়ে।
১১১

উদিতা
মলিন আলােক পড়িবে সাগরে,
সূৰ্য নামিবে শ্রান্তির ভরে
কহিতে কহিতে প্রেমের মন্ত্র
কাণে কাণে প্রকৃতিরে,
স্বর্গ হইতে তবে ধরাতলে,
সন্ধ্যা নামিবে নীল অঞ্চলে,
আমি ধীরে ধীরে কপােতের মত
ফিরিব আপন নীড়ে।
দিয়েছি অগ্নি রবিরে বেড়িয়া
গেঁথেছি মালিকা চাঁদেরে ঘেরিয়া,
ঘূর্ণাবর্তে ফেলেছি তারারে
ঢেকেছি অগ্নিগিরি,
সাগর লঙ্ঘি দুটি দ্বীপ জুড়ে
উড়ায়ে পতাকা চলিয়াছি উড়ে
রচিয়াছি
সেতু
মেলি আপনারে
চলিয়াছি ধরি ধরি।
১১২

মেঘ
সিংহ দরজা
কভু
বিরচিয়া,
পার হয়ে গেছি নৃত্য
করিয়া,
. মত্ত প্রলয়ে ঘন ঝঙ্কায়
কখনাে তুষার পাতে
বায়ুর শক্তি আমার আসনে
বাঁধিয়া রেখেছি বিপুল শাসনে,
লক্ষ রঙের ধনুক মেলেছি
আকাশের আঙ্গিনাতে।
কভু আকাশের কভু ধরণীর
আমি যে কন্যা এই জলধির
চলি আকাশেতে চলি সমুদ্রে
বরষার ধারা নিয়ে,
নবরূপে ফিরি বিনাশ হয় না,
আকাশে যখন বৃষ্টি রয় না
নূতন প্রাসাদ বিরচিত হয়
বাতাস আলোেক দিয়ে ।
১১৩

উদিতা
ছাড়িয়া আমার গহ্বরটিরে
আমি হাসি মাের স্মৃতি মন্দিরে,
আত্মা যেমন দেহ ছাড়া হয়ে
বাহিরে রয়েছে ভুলি,
তখনি আবার জলতলে গিয়ে
ঘন বরষারে নব ধার দিয়ে
নূতন করিয়া সুন্দর তারে
আবার গড়িয়া তুলি ।*
শেলির “Cloud” কবিতা অবলম্বনে লিখিত।
১১৪

আঁখি
জল
তােমায় যখন অনেক লােকে মিলে
কথার ছলে
অনেক কথা বলে
ব্যথার ঘাতে হায়,
চিত্তখানি অনি ভরে যায়,
তবু আমায় মিলিয়ে তাদের সাথে
কথার প্রতি ঘাতে,
নাতে আমায় হয়
মাতে যে হয় গভীর পরাজয়,
তাদের সাথে কথাই শুধু মেলে
কথার ওপর অনেক কালি ঢেলে,
অন্তর মাের অন্তরেতে হায়,
আপনি মরে যায়।
১১৫

উদিতা
তখন তুমি ভাব বুঝি মনে
ব্যথায় সঙ্গোপনে,
আমায় দেখে দেখে
আমি বুঝি কখন দূরের থেকে,
তােমায় গেছি ভুলে,
হারিয়ে গেছি কথার সাগর কুলে
পরাণ তােমার ব্যথায় ভরে যায়,
আমায় করে অনেক দূরের হায়,
পড়ে তােমার গভীর আঁখি জল
ব্যাকুল
টলমল।
সকল কাজে
বেদন বাজে
চিত্তে বয়ে রয়ে,
আমি তখন ভাবি আকুল হয়ে,
কথার রাশি দেখে
ইহার মাঝে থেকে
১১৬

আঁখি জল
মেনে এমন মিথ্যে পরাজয়,
তােমার কথাও অমন করে,
বলতে আমায় হয়,
মৰ্ম্ম আমার ব্যথার স্তুপে স্তুপে,
লুটিয়ে পড়ে গহন অন্ধকূপে,
কথার ধারা ছাপিয়ে ঝরে
আকুল আঁখির জল,
ব্যথায় ছল ছল।
তখন ধীরে ধীরে,
মহাসাগর তীরে,
তােমার আমার আঁখির জলের হায়,
মিলন হয়ে যায়।
১১৭

ছোেটর দুঃখ
মাঠের পেছনেতে অচেনা গাছ মাের
শীতের কোপে ছিল মরে,
ফাগুন বায়ু লেগে কখন গেল জেগে,
সবুজে গেল ভরে ভরে,
আকুল ফুল রাশি, উঠিল মৃদু হাসি,
পাতার তলে ক্ষণে ক্ষণে।
কত না পাখী এসে তাহারে ভালবেসে,
খেলিত কিযে তারি সনে,
একটী এলাে পাখী পালকে দেহ ঢাকি
রঙ্গীন ঠোটে শিষ দিয়ে,
সেখানে ধীরে ধীরে গড়িল নীড়টীরে
সােহাগ কত বুকে নিয়ে।
তরুণ সবিতার মােহন পরশেতে
উঠিত প্রভাতেতে জাগি।
কোমল শাখাগুলি আকুল হ’ত দুলি,
কঁাপিত
তুলিয়া কলরব সে তার ফেলি সব
ছুটিত কার যেন খোঁজে।
আকাশে দূর থেকে কে ওরে যেত ডেকে,
সে শুধু ওরি প্রাণ বােঝে।
মধু বায়ু লাগি।
১১৮

ঘােটর দুঃখ
সন্ধ্যা হলে তবে রঙ্গীন আলাে যবে
নামিত কিশলয় পরে।
সে তবে নিজ নীড়ে ফিরিত ধীরে ধীরে,
ঘুমায়ে পড়িত রাত হলে
জানি কোন দোষে বিধির মহারােষে
সেদিন এলাে ঝড় নেমে
সকলে গৃহ কোণে কাপিল নিজ মনে,
বহিল বায়ু থেমে থেমে।
আকুল পাখা মেলে বিজলী গেল খেলে,
উঠিল সবে শিহরিয়া।
বিশাল মেঘে মেঘে দখীন বায়ু লেগে,
কে যেন ওঠে গরজিয়া।
আকুল বায়ুরাশি নিঠুর পরিহাসি,
উড়ায়ে নিল তার বাসা।
গেল গাে গেল মরে উঠিয়াছিল গড়ে,
অনেক দিনের যত আশা।
সে বুঝি কেঁপে কেঁপে মরেছে ভেবে ভেবে,
তাহার সব যায় যদি।
১১৯

উদিতা
কারু ত প্রাণে আর জাগেনি হাহাকার,
আর ত কাহার নাই ক্ষতি।
একটী হৃদিদল করিল টলমল,
একটী পরাণ গেল দলে।
হেরিয়া তার দুখ, কঁদেনি কোন বুক,
বাতাস ভরেনি কোন রােলে।
১২০

পাহাড়ী মেয়ে
সেই
ঘন
আমি
মাের
ওই
আমি
মোর
আষাঢ়ের রাতি ধরে,
বরষা চলেছে ঝরে,
প্রদীপ জ্বালায়ে থুয়ে
ঘরেতে আছিনু শুয়ে
দূর আকাশের দিক,
চেয়েছিনু অনিমি
কুটিরের পথ দিয়ে
অচেনা পান্থ
ফিরেছে শ্রান্ত,
কত বােঝা বুকে নিয়ে।
মন্দির কার
দুইধারে তার
দাড়ায়ে পাইন শ্রেণী,
পাহাড়ের গায়
নদী বয়ে যায়
লুটান মুক্ত বেণী।
১২১

উদিতা
মেঘে রেখেছিল ঘিরে ঘিরে,
আজ পূর্ণ চন্দ্র তীরে
দেখি সে মহা আড়াল হতে
সে যে বাহিরিল কোন মতে
যেথা
পাইন শাখার কোলে
বরফ পড়েছে গলে
সেথা
ছড়াইয়া তার আলাে
হেরি জলের বিন্দু
হাসিল ইন্দু
তারেই বাসিল ভালো।
পাইন পাতার
কাটিল আঁধার
ধুয়ে গেল আলাে মাখি।
বুকে ব্যাকুলতা
কত গুলাে লতা
কঁপি গেল থাকি থাকি।
১২২

পাহাড়ী মেয়ে
দেখি
সে যে
তার
পাহাড়ের পথ বেয়ে
চলেছে পাহাড়ী মেয়ে
জ্যোৎস্নার হাসা কঁাদা
পদে পদে পায় বাধা
আঁচলের তলে তলে
স্নিগ্ধ প্রদীপ জ্বলে
মধুর কণ্ঠ সুরে
নতুন ছন্দ,
বহে আনন্দ,
এক
সেই
দূর হতে বহুদূরে।
সুরের দোলায়,
আমারে ভােলায়,
খােলায় রুদ্ধ দ্বার।
লাগি তার পায়,
ধূলাে উড়ে যায়,
সব রয় একাকার।
১২৩

উদিত
দেখি
সে যে
কভু
তার
কালাে
আঁকা বাঁকা পথ ঘুরে
চলে যায় বহুদূরে,
মত্ত দখীন বায়
আঁচল ওড়াতে চায়,
কবরীর বাঁধ খুলে
কুন্তল ওঠে দুলে,
কর পরে রণ রণ,
মহা ক্রন্দনে,
বাঁধি বন্ধনে,
বাজি ওঠে কঙ্কন।
ভাবি এই রাতে
উতল হাওয়াতে,
দেখিয়া কি কাজ ছিল
এক
তারে
মাের
রুদ্ধ ঘরের
ক্ষুদ্র প্রদীপ
বাতাসে নিয়ে দিল।
১২৪

প্রভাতে
তখন ঘুচেছে শীতের মহিমা
মুকুল ফুটেছে গাছে,
সকল জড়তা কেটে গিয়ে তার
রেশটুকু পড়ে আছে।
এমন সময় রাত্রি শেষের
রুদ্ধ জানালা খুলি,
উত্তর আর দক্ষিণ বায়
করে গেল কোলাকুলি ।
তখন শুনিনু নিদ্রার ঘােরে
বহু বহু দূর হতে,
ভরিয়া চিত্ত কে যে গেয়ে গেল
দেবালয় পথে পথে।
সঙ্গীত তার তুলিয়া লহর
কয়ে গেল জাগাে জাগে,
এমন মধুর প্রভাত বেলায়
তাহার আশীষ মাগাে।
১২৫

উদিতা
মুগ্ধ পরাণ লুব্ধ হইয়া
নীরবে উঠিল জাগি
নত মস্তকে
নূতন আলােয়
দাড়ানু আশীষ লাগি।
মনে হলাে যবে জীবনের রাত
শেষ হবে লভি আলাে।
নব জাগরণে টুটিয়া যাইবে
সকল মন্দ ভালো
তখন ঘুচায়ে সুপ্তি আমার
কে গাহিবে জাগাে জাগাে।
জীবন প্রভাতে নব উন্মেষে
তাহার আশীষ মাগাে।
১২৬

অধিকার
যে আসনে আজ বসালে আমারে
দিলে এ যে অধিকার,
যতটুকু মােরে দিলে আজি দান
হােক সে করুণা, হােক্ সম্মান,
শুধু সেইটুকু হােরে আজিকে
একান্ত আপনার।
তাহা কর দূর যাহা মাের নয়
যাহা কিছু দুর্লভ
বসাও আমারে আমার আসনে
কর অধিকারী আপনার ধনে
যা আছে আমাতে বিকশিত হােক
মুছে যাক্ আর সব।
অন্তর হতে বয়ে যাক্ স্রোতে
যাহা অন্তরে আছে,
বারে বারে মােরে করিয়া আঘাত
কেড়াে না হে তারে কেড়ে না হে নাথ
তােমারি এ দান করি সম্মান
রাখিব বক্ষ মাঝে।
১২৭

উদিতা
হােক্ তা ক্ষুদ্র, হােক দরিদ্র,
তবু সে ত মিছে নয়,
আমার যন্ত্রে বাজাবে যে সুর,
আমার মন্ত্রে তারে কোনাে পূর
আমার কৰ্ম্ম আমার মৰ্ম্ম,
এক হয়ে যেন রয় ।
১২৮

রিক্ত ও মুক্ত
সে কোন্ রাতে ভেবেছিলেম
এক্লা বাহির হব,
সঙ্গে আমার সঙ্গী নাহি লব,
শয্যা ছেড়ে উঠে এসে
খুলে দিলেম দ্বার,
সম্মুখেতে স্তব্ধ আকাশ
গভীর অন্ধকার ।
পৃথ্বী যেন সৰ্বহারা
মন্ত্রছায়াময়,
আজ আমারে বিশ্বমাঝে
নিঃস্ব মনে হয়।
পথের পাশে বাঁশের ঝােপে
কৃষ্ণচূড়ার গাছে
আমার বুকের বেদন যেন
নিবিড় হয়ে আছে।
সম্মুখে মাের চলেছে পথ,
কোথায় নাহি জানি,
মৃত্যু যেন মূর্ত হয়ে, ফেলেছে জালখানি।
৯
১২৯

উদিত
আমি এলেম নেমে,
ক্ষণেক আমার মুক্ত দুটি
দ্বারের পাশে থেমে
অন্তবিহীন অন্তরেতে
চিন্তা নাহি জাগে
আপনারে ভিন্ন বলে
মুক্ত বলে লাগে।
কখন্
দেখি
সম্মুখে মাের
বাঁধন্ গেছে টুটে,
রক্ত ঊষার ওষ্ঠ পুটে
হাস্য ফুটে উঠে।
রাতের মায়া পড়ল ছিড়ে
দীর্ঘ পথ মাঝে,
হৃদয়ে মাের এমন করে
দৈন্য কেন বাজে ?
পুষ্প মেলে মুগ্ধ আঁখি,
পক্ষী ওঠে জেগে
উচ্ছসিত পূৰ্বাকাশের
রশ্মি-রেখা লেগে ।
১৩০

রিক্ত ও মুক্ত
রাত্রি-ভরা স্বপ্ন মাঝে
গৰ্বে ছিনু ভরি
আপনারে রিক্ত হেরি
মুক্ত মনে করি
এখন মনে হয়
আপনারে রিক্ত করা
মুক্ত করা নয়।

“মুক্তি অন্বেষণ
( বিশ্ব যােগে )
গৃহছাড়া দক্ষিণের উত্তাল হাওয়াতে
চূতশাখা উত্তোলিত শাল বন মাতে,
গন্ধে ভরি চৈত্র সন্ধ্যা আসে স্নিগ্ধ হয়ে
বনে বনান্তরে তারি স্পর্শ যায় বয়ে,
জলের কল্লোল জাগে তরু শ্রেণী মাঝে
মৃদু মন্দ লাগে দোল প্রতিধ্বনি বাজে
সন্ধ্যামণি অক্ষি মেলে, পক্ষী কলরােলে
ক্ষণে ক্ষণে যুঁথিকারে মত্ত করে তােলে
অস্তের অন্তিম আলো অপূৰ্ব্ব মায়ায়
কি রঙ্গীন স্বপ্ন রচে বৃক্ষের ছায়ায়।
সেই আলােচ্ছটাময় এ অম্বরতল
আমারে করিয়া দেয় বেদনা বিহ্বল,
মসীলিপ্ত কিশলয়ে তরু গুল্মময়
রাত্রির শীতল স্পর্শ বদ্ধ হয়ে রয়।
তাহারি প্রচ্ছন্ন ছায়ে ঘন অন্ধকার
নিঃশেষে হরিয়া নেয় সমস্ত আমার ;
সকলের বক্ষ হতে মহানন্দ ধারা
আমার আনন্দে যেন হ’ল আত্মহার;
১৩২

মুক্তি অন্বেষণ
প্রেমে সুখে পৃথিবীরে আকড়িয়া ধরি,
তারি প্রতিছন্দে উঠি শিহরি শিহরি,
সৌন্দর্য্যের মধু স্পর্শে মৃদু মন্দ স্রোতে,
আপনারে ছিন্ন করি সর্ব বন্ধ হতে
ভেসে চলি সুধা গন্ধে চিত্ত উছলিয়া
আপনারে চারিপার্শ্বে ব্যাপ্ত করি দিয়া ;
তবু মনে ব্যথা বাজে, তবু মনে হয়
এত মােরে যুক্ত করা এ ত মুক্তি নয়।
( ত্যাগ যােগে)
তার পরে বর্ষ গেছে, বৈশাখের বায়ে
মাের গৃহ পাশে নদী এসেছে শুখায়ে ।
আমারে এনেছি টেনে বহু সাধনায়
বিশ্ব হ'তে ভিন্ন করে প্রাঙ্গণ কোণায় ;
নীরব নিস্তব্ধ রাতে অন্ধকারে ঘাের,
তনুরে করেছি ভিন্ন চিত্ত হ’তে মাের ;
রুদ্ধ করি গৃহ দ্বার প্রভাত বেলায়,
হারায়েছি স্নিগ্ধ উষা নিৰ্মম হেলায় ;
মধ্যাহ্নের খরতাপে বৈরাগ্য আগুনে,
আমারে করেছি দগ্ধ পল গুণে গুণে ;
;
১৩৩

উদিতা
কেঁপেছে বহ্নির শিখা তারি তপ্ত বায়ে
সমস্ত বাসনা মাের দিয়েছি জ্বালায়ে ;
সে রক্তিম মত্ত আলাে সব মাের লয়ে
ক্ষণে ক্ষণে দেখিয়াছি আসে ক্ষীণ হয়ে ;
সমস্ত আহুতি দিমু যে অগ্নিতে আনি
নিবে নিবে আসে দেখি তারি দীপ্তি খানি।
আপনারে রিক্ত লাগে সে শূন্যতা ভরি
হৃদয় কাঁপিয়া ওঠে গুমরি গুমরি,
তবু এই সূৰ্যালােতে কেন মনে হয়,
এ ত মাের দৈন্য দেখি এ ত মুক্তি নয়।
( আত্ম সৃষ্টিতে )
খুলে দিয়ে রুদ্ধ দ্বার শ্যাম মাঠে চাহি
অশান্ত হৃদয় মাের ওঠে অবগাহি,
রৌদ্র আসে স্নিগ্ধ হয়ে বৈকালের বায়ে
উত্তপ্ত ললাটে দেয় পরশ বুলায়ে ।
উন্মুক্ত দ্বারের পাশে চিত্তে অকারণে
ক্ষণে ক্ষণে দোলা দিয়ে আজ হয় মনে-
১৩৪

মুক্তি অন্বেষণ
এ মহা যাত্রার পথে সকল সঞ্চয়
আমারি এ চিত্তে যদি নিত্য হয় লয়,
যত সুধা যত সুখ যত মধু হাসি
জীবনের প্রান্তটিতে উঠিবে উদ্ভাসি,
যত কিছু ভাল মন্দ ভাঙ্গা গড়া যত,
যত সুখ যত দুখ আসে অবিরত,
সমস্ত মূহুৰ্ত্তগুলি আমার হৃদয়ে
নিমেষে নিমেষে যদি রহে লেখা হয়ে,
যে নিয়ম বন্ধনেতে বাঁধি পরস্পর
বহুচিত্ত ভাসে নিত্য দূরদূরান্তর,
এক গন্ধে আমােদিত এক ছন্দ মাঝে
সকল নিখিল হিয়া বদ্ধ রহিয়াছে,
এ বিপুল সৃষ্টি চলে যে নিয়ম স্রোতে
যাহা কিছু লভিলাম সেই স্রোত হতে
সে সমস্ত দানগুলি নিয়া ভিন্ন করি
সে বন্ধন হ’তে মােরে যদি ছিন্ন করি,
আপন নিয়মে তারে নূতন করিয়া
পারি যদি নব বিশ্ব লইতে গড়িয়া,
১৩৫

উদিতা
উজ্জ্বল জ্ঞানের দীপ মুগ্ধ হস্তে ধরি
বিষম বন্ধুর পথ মহা আলাে করি,
নীরবে পশিতে পারি আমারি হৃদয়ে
আমারি রচিত বিশ্বে নিভৃত আলয়ে,
মহা পৃথী বদ্ধ রাখি
ক্ষুদ্র
চিত্ত মাঝে
সেথা মােরে ছাড়ি দিব শত লক্ষ কাজে,
ক্ষণে ক্ষণে নিত্য নব সৌরভ বৃষ্টিতে
আমারে রাখিব পূর্ণ আমার সৃষ্টিতে,
সেই পরিপূর্ণতায় সেথা মাের তবে
ধরিয়া অনন্ত কাল মহা মুক্তি রবে।

অপমানিত
মােহ মুগ্ধ চোখে
যখন সাজানু অর্ঘ্য প্রদীপ আলােকে
তখন কি শােন নাই অন্তরের
মর্মান্তিক সুর
হে মাের ঠাকুর ?
তবে কেন মােরে গেলে লয়ে,
এই ধূলি-কলঙ্কিত
মানুষের মলিন আলয়ে ?
সেথা প্রাণপণ
যতবার করিলাম পূজা আয়ােজন
পুষ্প গন্ধ ঢালা,
যতবার সাজালেম
নৈবেদ্যের থালা,
ততবার হায়,
মুহুর্তে ঢাকিল সব
পথের ধূলায়।
১৩৭

উদিতা
তুমি দেব জানত সদাই,
আমি কভু খেলা করি নাই ;
আমার অন্তর তলে
নিরন্তর তুলিয়া কল্লোল
উঠেছে যে রােল,
জেগেছে অস্পষ্ট বাণী
মুগ্ধ বেদনাতে
সকলের দ্বারে তারে
গিয়েছি শােনাতে।
কুসুম কোমল
বিকশিয়া উঠিয়াছে
হৃদি পদ্মদল,
সুধা গন্ধে পূর্ণ করি
চিতল।
সে কুসুম
রাজি
দিতে গিয়ে উপহার
অকস্মাৎ একি দেখিয়াছি
মানুষের দৈন্যতার ধূলা,
মলিন করিতে চায়
মুগ্ধ
শুভ্র দলগুলা।
১৩৮

অপমানিত
সেদিন প্রভাত বেল।
ঝরে রশ্মি ধারা,
আত্মহারা
মুগ্ধ মাের হিয়া
এসেছিল এ সুদীর্ঘ
পথে বাহিরিয়া।
তুমি জান প্রভু
কা হারেও দেখি নাই
ছােট করে কভু।
সকলের অন্তরের বিমল জ্যোতিতে
চেয়েছিনু আপনারে
পূর্ণ করে নিতে।
যে অপূৰ্ব আলো,
বহুদূর হতে দেখে
বেসেছি ভালো
১৩৯

উদিতা
একি দেখি মায়া,
সেই আলো কঁপে কেন
ফেলি কালাে ছায়া ?
ওগাে দয়াময়
উচ্ছল ভক্তির ধারা
নিঙাড়ি হৃদয়
যেই যাই ঢালিবারে
বারে বারে
বিমুগ্ধ অন্তর
জুড়ি দুই কর।
অকস্মাৎ কি মত্ততা ভরে,
সেই স্নেহ বারিসিক্ত মুগ্ধ অক্ষি পরে
লাগে আসি নাথ,
সংসারের তুচ্ছতার
বিষম আঘাত।
১৪

অপমানিত
আমার সর্বাঙ্গ আজ
অপমান মানে
মাের লাগি নহে প্রভু
আমার দানের অপমানে
বারংবার
যাহারে ফিরায়ে দিল
তোমার সংসার
সেই অর্ঘ্য থালা খানি
হয়েছে দুঃসহ
প্রভু লহ-লহ
এ ধরার ধূলি পরে
নহে এর স্থান।
মানুষ পারে না নিতে মানুষের দান
১৪১

অঘ্য
আমার বাণী ছড়িয়ে ছিল
ধূলায় ধূলাময়,
তােমার দ্বারে আজকে তাহার
ঘটুক পরিচয়।
সেদিন আলোর রক্তধারা
নামল বনচ্ছায়ে
ভাসিয়ে দিয়েছিলেম তরী
গন্ধেভােলাবায়ে ।
দুই ধারেতে তীর দেখা যায়
বালা গাছের সারি,
উজান ঠেলে এলা আমি
দিয়েছিলেম পাড়ি।
সে দিন সে যে জলের তালে
আমার বুকের বাণী
বিভােল হয়ে করতেছিল
ব্যাকুল কাণাকাণি
কুঞ্জ শাখে পক্ষী ডাকে
পুষ্প পড়ে ঝরি,
আকুল জলে নৃত্য চলে
চিত্ত ওঠে ভরি।
১৪২

অর্ঘ্য
বাঁশের ঝোপে দূরের থেকে
ঝি ঝি পােকার রােলে
স্তব্ধ বনের হৃদয় খানি
মুগ্ধ করে তােলে।
আলাের ধারা ছড়িয়ে পড়ে
ঢেউয়ের মাঝে মাঝে,
আমার ছােট ভেলার পাশে,
জলের ধ্বনি বাজে।
সেই ভেলাতে ভাসিয়ে মরে
বহুদূরের পথে,
আকুল হিয়ার অর্ঘ্য ব’য়ে
এলেম কোনাে মতে।
আজকে এযে ভােরের আলােয়
দূরের থেকে একি,
তীরের কোলে স্নিগ্ধ তােমার
কুটীর ছায়া দেখি,
নদীর পাশে শুক্ন ঘাসে
সিক্ত ধূলা মাখি,
স্নানের কালে তােমার পায়ের
চিহ্ন গেছ রাখি।
১৪৩

উদিতা
।
সেই চরণের চিহ্ন খানি
হয়ে আলোেক ময়
মুগ্ধ আমার অক্ষিপুটে
বদ্ধ হয়ে রয়।
যে অর্ঘ্যেরে হস্তে লয়ে
আকুল স্রোতে ভাসি,
তােমার গৃহ দ্বারের পাশে
পোছিনু আজ আসি।
ও গাে আমার প্রিয়
সেই আমারি বেদন খানি
করুণ হাতে নিও।
()
১৪৪

I
مما fi
و . .

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Udita

Author
Debi, Maitreyee
Title
Udita
File name
Udita
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2009/12/14
Publisher
Rameshchandra Chakraborty, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
159
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Debi, Maitreyee
DLI number
513433
Barcode
4990010020411.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ousSX6JtfTw
Download PDF

Udita