Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Shukdeb

Bandhopadhyay,mahendranath · 2009/10/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কদেব |
কাব্য।
*
শ্রীগীতগােবিন্দ গীতিনাট্য, উপদেশমালা,
মালতী প্রভৃতি প্রণেতা
মহেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রণীত।
How charming is divine Philosophy !
Not harsh and crabbed, as duil fools suppose,
But musical as is Apollo's lute'.
Milton,
প্রকাশক-এনগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
৭ নং ডিহি ইটালি রােড।
প্রিন্টার-মুখার্জী এণ্ড কোম্পানি
কলকাতা প্রেস, ২৯ নং মসজিদবাড়ী ষ্ট্রট।
কলিকাতা।
মন ১৩১০ সাল।
মূল্য ১১ এক টাকা।

No text on this page.

নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষ। গােলােকনাথ। গােলােকেশ্বরী। দুর্গা। নারদ। শচী। শুকদেব। জনক (রাজর্ষি)। বিদূষক। জয়া। বিজয়। উৰ্ব্বশী। মেনকা। মন্ত্রী। কোষাধ্যক্ষ। প্রধান কর্মচারী। রাজাচাৰ্য। মদন । রম্ভা। তিলােত্তমা। পঞ্চচূড়া। চন্দ্রলেখা। ভক্তি। প্রেম। শুকদেবের স্ত্রী । ভালবাসা। মায়া। আদিরস । প্রমথপত্নীগণ, কিন্নরিগণ, প্রৌঢ়া ও যুবতী রমণিগণ, মুণিকগণ, বারনারিগণ, দৌবারিক, মােহন্ত, সস্ত্রীক যাত্রী, সস্ত্রীক পাহাড়ীয়া, সস্ত্রীক নাবিক, জনৈক ব্রাহ্মণ, রাখাল বালকগণ।

No text on this page.

শুকদেব।
(প্ৰশ্যকাব্য)
প্রস্তাবনা।
দৃশ্য -নন্দন কানন।
রম্ভা উর্বশী মধ্যে, মেনকা তিলােত্তমা একদিকে ও
পঞ্চচূড়া চন্দ্রলেখা অপর দিকে দণ্ডায়মান ও
রাঃ বাহার—তাঃ দারা।
ন
মে, তি, প, চ। প্রেম তরঙ্গে, রঙ্গে ভঙ্গে, আয়লাে ভেসে যাই ।
প্রাণের টানে, মনের সাধে, মনের সাধ মিটাই ।
রসিক রতন নাবিক যদি পাই ?
একলা জলে ভাসতে গেলে পাছে প্রাণ হারাই?
তি, প, চ। যৌবনে জোয়ার ভরা থৈ থৈ থৈ,
রসিক নাবিক জুটবে এসে,
ভাবিনি সই সই সই।

২
শুকদেব
AAAA
মনের বলে হেলে দুলে,-সমীরে পালটি তুলে,
(ওলাে) ভাবি যখন ভাবি তখন,
দরিয়ার কুল কিনারা নাই ।
সুখের ভরে, মাঝ উহরে,
যদি লে হালটি ছেড়ে যায়,
এমন সাধের তরীখানি,
'ওলো সই! ডুববে দরিয়ায়
মে, তি, প, চ। এমন নাবিক মিলে যদি,
দেব তার কালামুখে ছাই !
[ সকলের প্রস্থান।

প্রথম অঙ্ক।
si fill tHoughts, all passions, alt deligh's,
are but ministers of bove."
S. T. Coleridge
RSE SESSUESE

No text on this page.

প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
নন্দন কাননের অপরাংশ।
ইন্দ্র ও শচীর প্রবেশ।
শচী। নাথ! আজ সিংহাসনে বসতে অনিচ্ছা কেন ?
ইন্দ্র। প্রিয়ে ! নিরবচ্ছিন্ন অসার সুখ আর ভাল লাগে না।
মিষ্টান্ন কি ক্রমাগত খাওয়া যায় ?
শচী। তবে কি আমাকে বিরহানলে দগ্ধ হতে হবে ?
ইন্দ্র । হৃদয়েশ্বরি! তার জন্য ভাবনা করন। হংসের
মত দুগ্ধ পান করবাে।
শচী। তা হলে আমি কি সে সুখে বঞ্চিত হবে ?
ইন্দ্র। প্রিয় ! তাও কি কখন হয় ? তাই কি বিধাতার
কল্পনা ?
( নেপথ্যে ভেরী ধ্বনি)
শচী। (সভয়ে) ওমা ! একি ?
ইন্দ্র। তাইত, এখানে কে ভেরী ধ্বনি কচ্চে?
শচী। বােধ হয় কোন অসূর টসুর এসেছে।

শুকদেব
(পুনঃ নেপথ্যে ভেরী ধ্বনি)
শচী। ঐ যে আবার ? এখানে আর থেকে কাজ নেই, চল
আমরা এখান থেকে যাই।
ইন্দ্র । প্রিয়ে ! ভয় কি ?
(ভেরী হস্তে শিবদূতের প্রবেশ)
ইন্দ্র। ( দূতের প্রতি) তুমিই কি ভেরী ধ্বনি কচ্ছিলে ?
দুত। আজ্ঞা হা।
ইন্দ্র। কে তুমি? যেই তুমি হও, কোথায় এসে ভেরী ধ্বনি
কচ্চ জান ? এ দেবরাজ ইন্দ্রের বিলাসভূমি নন্দন
কানন। এখানে স্বয়ং বলিশ্রেষ্ঠ দেবরাজ শচী সঙ্গে
বিহার কচ্চে। কার সাধ্য তার অনুমতি বিনী এ
কাননে প্রবেশ করে ?
দূত। দেবরাজ ! আমি শিবদূত।
শিবদূত। সম্প্রতি আমি, মা
কৈলাসেশ্বরীর বার্তাবহ। তারই আদেশে আমার
এখানে আসা। দেবরাজ! আমিও আপনার
ন্যায়
যাহা সাধ্য জানি, অসাধ্য ও জানি, আর কোথায়
যে এসেছি, তাও জানি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে,
অগ্রে আনার পরিচয় না নিয়ে, আর আমার আস্বার
হেতু অবগত না হয়ে, বােষ পরবশ হয়ে আমার উপর
কটু উক্তি প্রয়ােগ করা, আপনার ন্যায় মহাজনের
উচিত কাৰ্য্য হয় নাই।
ইন্দ্র। তা হলেও কি তুমি আমার উপর দোষারােপ কত্তে

শুকদেব পারাে ? রমণীয় নন্দন কাননে ভীম নাদ না করে শান্তভাবে যদি প্রবেশ কত্তে, তা হলেই বড় আনন্দের বিষয় হত। আনন্দ পূর্ণ স্থলে শান্তিই চির বিরাজ করে, এটি স্বভাব সিদ্ধ। ভীষণ মূর্তি বা ভীষণ নিনাদ এ কাননের উপযুক্ত নয়। নয়। নন্দন কানন চির শান্তিময়। দূত। তা বটে, দেবরাজ ! কিন্তু আপাততঃ সময় আর কার্যের অনুরােধে ক্ষণিক আনন্দ ভােগ করা অপেক্ষা, চির- কালের জন্য পূর্ণমাত্রায় সেই আনন্দ ভােগ করবার চেষ্টা কল্লে ভাল হয় না কি ? ইন্দ্র। কেন ? সে বিষয়ে কিছু সন্দেহ আছে নাকি ? দূত। সন্দেহ না থাকলে, আপনার আদেশ বিনা আমি কেনইবা এখানে আসবে? ইন্দ্র। তবে আসবার হেতু শীঘ্র বল ? দূত। দেবরাজ ! হেতু প্রকাশ কত্তে মায়ের নিষেধ। তবে ার আদেশে আমি আপনাকে এই পর্যন্ত বলতে পারি যে, ইতিপূৰ্ব্বে, এমন কি বার বৎসর হ’লএক- দিন কৈলাসে আম্র কাননে বসে মা কৈলাসেশ্বরী কৈলাসনাথকে জিজ্ঞাসা করেন যে, ‘কলিযুগে জীবগণ কি উপায়ে মুক্তিলাভ করবে। তাতে বাবা বলেন যে, ‘যােগই জীবের মুক্তির উপায় হবে। তাতে মা আবার বল্লেন, সেই যােগের কথা আমার বড় শুনতে শুকদেব। ইচ্ছা হচ্ছে। বাবা তাতে বল্লেন, ‘বেশ, বলবাে। কিন্তু এ কাননে কোন জীব জন্তু থাকলে বলা হবে । তার পর, বাবার আজ্ঞায় নন্দী, সেই আম্র কানন থেকে সব জীবজন্তু, কীট পতঙ্গ, পক্ষী প্রভৃতি যে কেউ ছিল সব তাড়িয়ে দিলে। কিন্তু যে আম গাছ তলায় বাবা আর মা বসে ছিলেন, একটি সদ্যজাত শুক পক্ষী সেই গাছে ছিল। তার বাপ মা আগে পালিয়ে গিছলো। সদ্যজাত শুক উড়তে পারেনি বলেই সেইখানে ছিল। বাবা, মা, কি নন্দী, কেউই তা জানতে পারেন নি। তারপর বাবা মাকে বলেন, ‘শঙ্করি । আমি বলবো, কিন্তু তােমাকে আমার প্রতি কথায় সায় দিতে হবে। মা বলেন, বেশ, তাই হবে। বাবা তারপর বলতে লাগলেন। তারপর মা, খানিকক্ষণ বাবার কথার সায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। বাবা, তা জানতে না পােরে, ভাবে বিভাের হয়ে বলতে লাগলেন। তারপর ঐ সদ্যজাত শুক পক্ষী, বাবার মুখ হতে যােগের কথা শুনতে শুনতে অল্পক্ষণের মধ্যে বাহ্যিক আভ্য- ন্তরীক মহা বলবান মহাজ্ঞানী হয়ে উঠলাে। মা শঙ্করীকে নিদ্রিত দেখে, সেই শুকই বাবার কথায় সায় দিতে লাগলাে। ইন্দ্র। কি আশ্চর্য! তার পর ? দূত। তার পর যােগের কথা শেষ হয় হয়, এমন সময় মায়ের

শুকদেব ।
ঘুম
ভাংলাে। মা জেগে উঠে বাবাকে বল্লেন, ‘দেব !
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, অনেক আগে থেকে আবার
বলাে। বাবা তাই শুনে চমকে উঠে বল্লেন, সে
কি ? তুমি যদি ঘুমিয়ে পড়েছিলে, তা হলে আমার
প্রতি কথায় সায় দিচ্ছিল কে? তা হলে কেউ না
কেউ এখানে অবশ্য আছে। তারপর বাবার আদেশে
মন্দী, চারিদিক দেতে দেখতে ঐ আম গাছে সেই
শুক পাখীকে দেখতে পায়। দেখতে পেয়ে, বাবাকে
ঐ কথা বলতে বলতে, শুক নক্ষত্ৰগতিতে উড়ে গেল।
বাবা, তারপর, জন কএক দূতকে ডেকে বল্লেন, ‘ঐ
শুককে বন্ধন কর। তারপর অনেক দূত চারিদিকে
চলে গেল। পরে অনেক অনুসন্ধানের পর সংবাদ
পাওয়া গেল যে, ঐ শুক ব্যাসদেবের পুত্র হয়ে ধরায়
অবতীর্ণ হয়েছে।
ই। কি আশ্চর্য্য! তারপর ?
দূত। তারপর মা কৈলাসেশ্বরী আজ আমাকে বল্লেন, ‘তুমি
দেবরাজকে কৈলাসে নিয়ে এস। দেবরাজ! মায়ের
আদেশ এই পর্যন্ত আপনাকে বলা, আর আপনাকে
সঙ্গে করে নিয়ে তার নিকট উপস্থিত হওয়া। এখন
আপনার যা’ অভিরুচি ।
ইন্দ্র। অভিরুচি ? মহামায়ার আজ্ঞা পালন কত্তে দাসের
আবার অভিরুচি ? আমার সৌভাগ্য যে, তিনি

শুকদেব।
আমাকে স্মরণ করেছেন। তবে এখন চল, আর কাল
বিলম্বের প্রয়ােজন নাই। (শচীর প্রতি) প্রিয়ে।
সব শুনলেত ? এখন বিদায় ।
[ একদিক দিয়া দূত সহ ইন্দ্রের, ও অপর দিক
দিয়া শচীর প্রস্থান।]
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কৈলাস-শিখর—বিশ্বকুঞ্জ।
মা কৈলাসেশ্বরী দেবমঞ্চে আসীনা।
জয়া ও বিজয়া নিম্নে দুইদিকে দাঁড়াইয়া চামর
ব্যজন করিতেছে।
প্রমথপত্নীগণের গীত গাহিতে গাহিতে প্রবেশ ।
খাম্বাজ-একতালা।
পরম রতন ও রাঙ্গা চরণ, কত শােভা উপচয়।
বাসনা মনের কর’ মা পূরণ, হও না মা নিরদয় ।
চাহিনা চাহিনা রতন ভূষণ, চাহিনা দিও না মায়ারি বাধন,
চাই চাই শুধু প্রেমরতন, তব পদে মতি রয়। (
যাতে)
অবােধ বালকে জনক জননী, তােষে যথা খেলনায়,

কৰে। তেমতি জননি। এ জনমে যেন ভুলাও না ছলনায় :- পেয়েছি যখন দেখা তােমার, আঁখীর বাহিরে থেক না আর, হিয়াকাশে যেন পূর্ণিমা শশী চিরদিন তরে উদিত রয়। ( শিবদূতের প্রবেশ ও দুর্গার চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত।) কৈলা। এস দূত। দেবরাজ কৈ ? দূত। (নেপথ্যে দেখাইয়া) এই যে মা, তিনি এসেছেন। ( ইন্দ্রের প্রবেশ ও কৈলাসেশ্বরীর চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত।) কৈলা। এস দেবরাজ! ইন্দ্রলােকের মঙ্গল ত ? ইন্দ্র। মা সৰ্বমঙ্গলা যার সহায়, তার কি কখন অমঙ্গল সুম্ভবে ? অমঙ্গলের কি ভয় নাই যে, মঙ্গলময়ীর আশ্রিতকে আক্রমণ করে ? কৈল। তা সত্য, পুরন্দর। কিন্তু গ্ৰহবৈগুণ্যে তােমাদের যদ্যপ্তি কোনরূপ বিপদের সূচনা হয়, তা হলে তার প্রতিকারের কি হবে ? সে কি মা? অভয়ার আশ্রিতের বিপদ ? এ কি অসম্ভব নয় মা ? কৈলা। উপস্থিত ক্ষেত্রে অসম্ভব নয়। ইন্দ্র। তবে শ্রীপাদপদ্মে প্রার্থনা, বিপদের বিষয় বর্ণন করে’ এ দাসের উৎকণ্ঠা দূর কত্তে আজ্ঞা হয়। কুৈলা। ত বর্ণন কল্লে, তার প্রতিকারে বােধ করি কৃত- সঙ্কল্প হবে। মা কৈলাসেশ্বরীর শ্রীপাদপদ্মে যদি এ দাসের একান্ত ইন্দ্র। ইন্দ্র।

মতি থাকে, তা হলে বিপদকে বিপদে ফেলতে এ দাস সাধ্যমত ত্রুটি করবে না। কৈলা। সাধ্যের ও ত্রুটি হবে না সত্য, কিন্তু কৃতকাৰ্যতা সম্বন্ধে বােধ করি অপারগ হবে না। ইন্দ্র। মা ! আপনার অভয় পদ স্মরণ করে প্রাণপণে, একান্ত মনে, অদম্য উৎসাহের সহিত কোন কার্যে হস্তক্ষেপ কল্লে কি বিফলমনােরথ হয় ? প্রতিজ্ঞা কল্লেম, প্রাণপণ কল্লেম, সুফল অবশ্যম্ভাবী। এক্ষণে কৃপা করে অশান্তির বিষয় বর্ণন কত্তে আজ্ঞা হয়। কৈলা। সাধু সাধু, পুরন্দর ! আশীর্বাদ করি তুমি কৃতকাৰ্য্য হও। তবে উপস্থিত বিষয় শ্রবণ করাে। সম্প্রতি ধরাধামে, মহাজ্ঞানী মহাতপস্বী মহাপণ্ডিত এক মুনির আবির্ভাব হয়েছে। ইনি বেদসঙ্কলয়িত ব্যাস- দেবের পুত্র, নাম শুকদেব। এই গুকের আদিবৃত্তান্ত দূতমুখে অবগত হয়েছ। তারপর ঐ শুকদেব তীৰ্যক অবস্থায় কৈলাসনাথের শ্রমুখ হতে মুক্তিতত্ত্ব লাভ করে’, সেই তত্ত্ব জগতে প্রচার কত্তে মানস করেছে। যদি প্রচার করে, তা হলে জগতের সমুদয় জীবই প্রবৃত্তিমার্গ পরিত্যাগ করে নিবৃত্তি মার্গে যাবে। তা হলে কি সংসার থাকবে ? প্রলয় হবে, তােমার ইন্দ্রত্ব যাবে, এমন কি সমস্তই যাবে। এই জন্যে, অর্থাৎ সংসার রক্ষার জন্যে, বিশ্ব রক্ষার জন্যে, শুকদেবকে

শুকদেব।
এ
প্রবৃত্তিমার্গে আনা নিতান্ত প্রয়ােজন। আর এ কাৰ্য্য
তুমি ভিন্ন আর কেউই পাবে না। কিন্তু তা বলে
শুকদেব হেন মহাজনকে সামান্য জ্ঞানে সামান্য ভাবে
নেওয়া হবে না। সােপান অবলম্বন করে উপরে
উঠতে গেলে, একমাত্র উপরের দিকেই যেমন লক্ষ্য
থাকে, সেইরূপ এমন আয়ােজন করবে, যাতে নিত্য
বস্তু হ’তে শুকদেবের সাক্ষ্য ভ্রষ্ট না হয়। প্রবৃত্তি-
মার্গের ক্রিয়া যেন শুকদেবের উপরে উঠবার হেতু হয়।
আর সে ক্রিয়া যেন তার মহত্বকে হীনপ্ৰভ না করে।
ই। মা! এ যে বিপদ হতেও বিপদ ? এতদূর ত স্বপ্নেও
ভাবি নাই ? জগদম্বে !
এ যে পিপীলিকার স্কন্ধে
পৃথিবীর ভার অর্পণ করা হচ্ছে।
দেবরাজ! চিন্তা কি ? আমার আশীর্বাদে আমারই
আদেশ পালন করবে, এতেও চিন্তা ?
ইন্দ্র। ইচ্ছাময়ীর আদেশ, এ চিন্তার বিষয় নয় সত্য। কিন্তু
ইতিপূৰ্ব্বে বাবার ধ্যানভঙ্গের ঘটনাটি স্মরণ হ'লে মনে
'বড় ভায়ের সঞ্চার হয়।
কৈলা।
তার জন্যও বা দুর্ভাবনা কেন ? কামদেব তােমার
অনুচর। অপরাপর রিপুগণ কামদেবের আজ্ঞাবহ।
তাদের সাহায্যে তুমি ভগ্ন-মনােরথ হবে না। বায়ুর
সাহায্যে অগ্নির যেমন শক্তি বৃদ্ধি হয়, সেইরূপ রিপু-
গণের সাহায্যে তুমি নিৰ্বিঘ্নে কৃতকার্য হবে। আর
কৈলা।

১৪
কদেব।
এক কথা, আমার আদেশে ইন্দ্রিয়গণ সময়ে সময়ে শুক,
দেবের অন্তঃকরণে প্রবেশ কবে। তাতে রিপুগণের
কোন বিপদ হবে না।
ইন্দ্র। মা ! একখণ্ড অগ্নি স্পর্শ করা যায়। কিন্তু একথও
অগ্নিদগ্ধ লৌহ যেমন স্পর্শ করা যায় না,-রবিকর সহ
করা যায়, কিন্তু রবিকরতাপিত বালুকারাশ যেমন
স্পর্শ করা যায় না, সেইরূপ আপনাদের নিকট
আগমন করা যায়, কিন্তু আপনাদের শ্রীপাদপদ্ম পূজা
করে’, আপনাদিগের মহিমা কীৰ্ত্তন করে যে জন
মহাপুরুষ ও মহাতেজস্বী হয়, তার নিকট গমন
করা যায় না।
কৈলা। পুরন্দর! আমার আশীৰ্ব্বাদ বৃথা হবে না। তােমার
কোন ভয় নাই।
ইন্দ্র। (সােৎসাহে। না, মা। আপনি যখন সহায়, মহাশক্তি
মহামায়া যখন আমায় সহায়, তখন ভয় ও পরাজয় কি
মনে স্থান পায় ?
কৈলা। তবে একান্ত মনে স্বকাৰ্য্য সাধনে যত্নবান হও।
ইন্দ্র। যে আজ্ঞা, মা। তবে অনুমতি হলে এ দাস এখন বিদায়
গ্রহণ কত্তে পারে।
কৈলা। এস, দেবরাজ ! আবার আশীর্বাদ করি, নির্বিবাদে
কৃতকার্য হও।
[ অভয়াকে প্রণাম করিয়া ইন্দ্রের প্রস্থান।]

903, 96,
দ্বিতীয় অঙ্ক।
“There came and looked him in
the face
An angel beautiful and bright;
And that he knew it was a fiend.'
S. T. Coleridge.
"Its passions will rock thee
As the storms rock the ravens
on high.”
P. B. Shelley.

No text on this page.

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
কাননমধ্যে এক পুষ্করিণীর ঘাট।
কলসীকক্ষে একজন প্রৌঢ়া ও চারিজন যুবতী রমণীর প্রবেশ।
১ম-রম। (প্রৌঢ়ার প্রতি) ঠান্‌দিদি ! এবার থেকে তােমাকে
আমরা ‘ঠান্‌দিদি চুড়ােমণি’ বলে’ ডাক্বাে।
প্রৌঢ়া। ওলােয় তােদর এই সমত্ব বয়েস, তােরা এখন
কত রঙ্গে রঙ্গিণী, কত সঙ্গে সঙ্গিনী, কত ভঙ্গে ভঙ্গিনী,
আমি চূড়ােমণি হলে তােরা হবি কি ?
২য় রম। আমরা আর কি হবে ? আমরা ত বিদেন টিদেন
দিতে জানিনি, যে আমাদের নামের পরে আর একটা
উপনাম ববে।
৪র্থ রম ।
৩য় রম। হা ঠান্‌দিদি ! ঠাকুরদাদা কি তােমাকে ছেলে
বেলায় নেকা পড়া শিখিয়েছিলেন ?
‘ছেলে বেলায় কি বলচি লাে? ঠাকুরদাদা আর
ঠান্‌দিদি কি ভাই বােন, যে ছেলেবেলায় ওঁদের
দেথা শুনাে হয়েছিল ?

১৮
শুকদেব।
প্রৌঢ়া। (৪র্থ রমণীর প্রতি) ওলো! তা নয়, তা নয়।
ছেলে বেলায় আমার বিয়ে হয়েছিল বলে ও কথা
বচে। (৩য় রমণীর প্রতি) ছেলে বেলা থেকে না
শেখালে এত 'জানলুম কি করে ? আর ছেলে বেলায়
কেন, এখনও পড়ায়।
৪র্থ রম। হা ঠান্‌দিদি! ঘােয়ামীকে কি করে’ রাগাতে
হয় গা ?
প্রৌঢ়া। তা’ ও জানিনি ? খানিকক্ষণ তার কথার কোন
উত্তর না দিলিই হল, তা হলেই অমনি চটে’ আগুন।
১ম-রম। ও ঠান্‌দিদি! খানিকক্ষণ কি বচা ? আমি এক
মাস কথা না কয়ে দেখিছি, কিছুই হয় নি। বরং
আরাে কত ভাব, কত আমিত্তি, কত ভালবাসা,
কত কি।
প্রৌঢ়া। আচ্ছা, রাদ্দিন রেগে গর গর করে দেখিছিস্?
২য় রম। ঠাদিদি ! তাও কি বাকি রেখিছি ? ভাল করে
দেখিছি। রাগে গর গর করবার আগে বরং একটু
আধটু বাইরে থাকতাে, কিন্তু গর গর কল্লে, আঁচল
ধরে’ ঘরে ঘরে পেছনে পেছনে জড়িয়ে বেড়ায়। তার
পর রাগকে যমালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে, দফাকে রফা
করে’ হাঁপ ছাড়ে।
প্রৌঢ়া। তবে গোঁপ দাড়ি পরে শালা সেজে গালে দুটো
ঠোনা মারিস।

শুকদেব।
{
?
১ম রম। যাক, ও সব কথা যাক। হা ঠান্‌দিদি ! পােয়াতিরা ত
দশ মাসে খালাস হয় । কিন্তু ব্যাসদেবের মাগ,
পিবরী বার বছরের পর খালাস হ’লএমন ত আশ্চয্যি
কোথাও দেখিনি? এমন কেন হল, ঠান্‌দিদি ?
২য় রম। আবার ছেলেও হয়েছে তেমনি। শুনিছি, একেবারে
সমত্ব বয়সে ভূমিষ্টি হয়েছে।
৩য় রম। এর কি কিছু বিদেন টিদেন আছে ঠান্‌দিদি ?
প্রৌঢ়া। এর আর বিদেন টিদেন কি ? একি মনিষ্যির খেলা ?
এ দেবতার খেলা।
একান্তে শুকদেবের প্রবেশ ।
শুক। জগৎ ত দেখছি প্রবৃত্তির দাস। প্রাণীমাত্রই প্রবৃত্তিমার্গে
অনবরত বিচরণ কচ্চে। বিরাম নাই, নিবৃত্তি নাই, অথচ
নিবৃত্তির দিকে কারুরই লক্ষ্য নাই। শঙ্করের ক্ৰোধানলে
আমার যে মৃত্যুই শ্রেয়ঙ্কর ছিল? কেন ব্যাসপুত্র হয়ে
ধরায় অবতীর্ণ হয়েছিলেম? (পরিক্রমণ ) জগতের
সমুদায় পদার্থ চিন্‌তে ত জীবন কেটে যাবে। (চতু-
দ্দিক চাহিতে চাহিতে ঘাটে স্ত্রীলােকদিগকে দেখিয়া )
ঐ যে সব হাঁস, জলকেলী করবার জন্য ইতস্ততঃ কচ্চে।
(ঘাটে স্ত্রীলােকদিগের উচ্চ হাস্য।)
তক। এ কি ? এই কি হাঁসের হাসির ধ্বনি ? কোন গ্রন্থ ত
এরূপ বলচেনা? (একদৃষ্টে স্ত্রীলােকদিগকে দেখিতে
লাগিলেন)

? ১ম রম। ঠান্‌দিদি ! তুমি না হয় চাকরদের বলে দিও, তার যেন এই তিনটে সিড়ির শ্যাওলা তুলে দেয়। পা বাড়াবার যাে নেই, এমনি পেচোল। শুক। { স্তম্ভিত হইয়ঃ ) এ কি ? হাঁসেরা কি আমাদের মত কথা কয় ? এ সন্দেহ দূর কত্তে হ’ল। ( ঘাটে স্ত্রী- লােকদিগের নিকট গমন রঃ গঃ। ও মা ! ইনি কে ? শুক। তােমরা ত হাঁস ? প্রৌঢ়া। (স্বগত) এ কি ? ইনি কি বলচেন ? পাগল না কি ? আবার তাই বা কি করে বলি ? দেখতে ত দেব- তুল্য মূর্তি। ( প্রকাশ্যে ) আপনি কি করে চিনলেন যে আমরা হাঁস ? শুক। কেন? আমার পিতা যে বলে দিয়েছেন? প্রৌঢ়া। কে আপনার পিতা ? শুক। মহামুনি ব্যাসদেব। প্রৌঢ়া। (চমকিত হইয়া } আপনিই ব্যাসদেবের পুত্র দেব- তুল্য শুকদেব ? শুক। হাঁ, আমার নাম ঐ বটে, কিন্তু আমি দেবতুল্য নই। এ জগতে আমি একজন অন্ধ পরিব্রাজক। ৬ প্রেরিত আমি একটা মল মূত্ৰ ক্লেদের সমষ্টি। প্রৌঢ়া। আপনার পিতা কি আমাদের হাঁস’ বলে আপ- নাকে চিনিয়ে দিয়েছেন ?

শুকদেব।
v
ক। হাঁ। একদিন আমরা পিতা পুত্রে এক জলাশয়ের
নিকট উপস্থিত হই। সেই পুষ্করিণীর ঘাটে দুই পদ
আর দুই পক্ষ বিশিষ্ট কতকগুলি শ্বেতবর্ণ সুন্দর জীব
দেখে, পিতাকে জিজ্ঞাসা করায়, তিনি আমাকে বলে
দিলেন, ‘ও গুলি স্ত্রীলােক। ত:ই শুনে আমি ওকে
বলেছিলেম, এই স্ত্রীলােক ? এদেরই মায়াতে জগৎ
মুগ্ধ ? তার পর অপর ঘটে তােমাদের মত কতকগুলি
জীব দেখে, আবার তাকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বল্লেন,
‘ওরা হাঁস। তাই শুনে আমি তাঁকে বলেছিলেম,
‘আমি একটা হাঁস পুষবো।”
প্রৌঢ়া। আমরা হাঁস নই।
এক। তবে কি আপনারা দেবতা ? আপনারা কি জীবের
ত্রাণকৰ্ত্তা ?
প্রৗঢ়া। আজ্ঞা না ।
তবে আপনারা যাই হ’ন, আমাকে অনুগ্রহ করে পথ
দেখিয়ে দিন। আমি যেখানে যাচ্চি, আমার যেটি
গন্তব্য স্থান, আমি তার পথ চিনি না। আপনারা
আমাকে পথ দেখিয়ে দিন।
প্রৗঢ়া। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
ক। তা বলতে পারি না। কোথায় যাচ্চি, কার সঙ্গে
দেখা কত্তে যাচ্ছি, আমি তার কিছুই জানি না। আমি
ভ্রান্ত পথিক, অন্ধ পরিব্রাজক, আবার তার উপর এ
স্থান আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত।
F
'।

শুকদেব।
প্রৌঢ়া। এ ত গেল স্থানের কথা। দেখা কত্তে যাচ্চেম
কার সঙ্গে ? তাকে কি আপনি চেনেন ?
শুক। না, আমি তাকে চিনি না, কিন্তু তিনি আমাকে
চেনেন। তাই বলছি, তিনি কোথায় থাকেন, আমাকে
বলে’ দিন। আপনারা দেবতা, বসন ভূষণে ভূষিত
অতি মনোেহর দেবতা, আপনারা সব জানেন।
প্রৌঢ়া। আমরা দেবতা নই, আমরা স্ত্রীলােক।
শুক। আপনারাই স্ত্রী লােক? ( চিন্তা
প্রৌঢ়া। (স্বগত) এ কি ? ইনি কি জগতের কিছুই চেনেন
? শুনিচি, ইনি ত মহাপণ্ডিত, মহাজ্ঞানী। তা
পণ্ডিতর', জ্ঞানীরা, তপস্বীরা কি জগতের কিছুই
চেনন না ? ( প্রকাশ্যে } আমরা প্রকৃতি।
শুক। (সকলকে দেখিতে দেখিতে । আপনাদের দেহে আর
আমাদের দেহে পার্থক্য কেন ? আপনাদের বক্ষদেশে
বৃহৎ মাংস খণ্ড কেন ? ওর নাম আর হেতু কি ?
প্রৌঢ়া। এর নাম স্তন। আর এ হেতুশূন্য নয়। এই স্তন
অমৃতের ভাণ্ডার। যে জীব আমাদের গর্ভে জন্মায়,
এই মাংস খণ্ড সেই জীবের আহারের ভাণ্ডার।
আপনি দ্বাদশ বৎসর গর্ভে থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন।
শৈশব অবস্থায় আপনি ত মাতৃ স্তনের অমৃত পান
করেন নি? তবে এর মর্ম আপনি কি বুঝবেন ?
শুক। (স্বগত) স্ত্রীলোেক ? অমৃতের ভাণ্ডারী গ্রন্থের উক্তি-

শুকদেব । যে স্ত্রী প্রবৃত্তিমার্গে আরােহণ করাবার প্রধান সােপান, যে স্ত্রীর মায়ায় জগৎ মুগ্ধ, যে স্ত্রীর মায়া চক্রে পড়ে পুরুষ সৰ্ব্বদাই বিঘূর্ণিত, সেই স্ত্রী আবার প্রাণ রক্ষক। জগতে উৎপত্তির জন্য, সংসারের বৃদ্ধির জন্য, শিশুর প্রাণ রক্ষার জন্য সেই স্ত্রীর সৃজন ? তবে জগতে যে স্ত্রী সন্তান প্রসব করে সেই সন্তানকে রক্ষা করবার জন্য আপনার প্রাণ উৎসর্গ করে, যে স্ত্রী সংসারের শ্রীবৃদ্ধি করে, যে স্ত্রী জগতের এত উপ- কারিণী, সেই স্ত্রী কি কখন সাধনার পথে কন্টক রােপণ কত্তে পারে ? ( পরিক্রমণ ) এ চিন্তায় যে অতিশয় ব্যাকুল হয়ে পড়লুম। সৃষ্টিকর্তা স্ত্রীলােককে হাঁস কল্লেন না কেন ? স্ত্রীলোক? অমৃতের ভাণ্ডার ? ( প্রস্থান। ২ম রম। একি দিদি। একে দেখে লজ্জা সরম সব কোথায় গেল? পুরুষ দেলে আমরা যে লজ্জায় জড়সড় হই, কিন্তু আজ সে লজ্জা কোথায় গেল ? দিদি। এতে যে এক নতুন দেখলুম? এতে বাবার রূপ দেখতে পেলুম, ছেলের রূপ দেথতে পেলুম, আবার ইষ্ট দেবতার রূপও দেতে পেলুম। এমন ত কাকেও দেখিনি ? ইনি কি ছদ্মবেশে কোন দেবতা এসেছেন ? চল যাই, আবার তাকে দেখিগে। [ সকলের প্রস্থান। ******

২
দ্বিতীয় দৃশ্য।
শুকদেবের তপোবন।
শুকদেব যােগাসনে উপবিষ্ট।
হে ভগব! সত্য সনাতন !
রাঃ ভৈরে—তাঃ—এক তালা (বা চোতাল)
শ্রীগুরুচরণ করিয়ে স্মরণ, তাঁরই উপদেশে পূজি হে তােমায়।
প্রণবােচ্চারণে, নানা আয়ােজনে,তাহে পূতনে শুদ্ধ করি কায় ।
অপার যে দেখি ভক্তি-পারাবার,
কুল কিনারার সীমা নাহি যার,
আনন্দে ভাসিব লহরীতে তার,
ধরে আছি প্রাণ যাহারি আশায় ।
কিন্তু কেন হয় বিচলিত মন ?
কেন সাধনায় বাধা অনুক্ষণ ।
ভাবি গাে অন্তরে, কি হইবে পরে,
জানি না, হে নাথ ! কি হবে উপায় !
পাই যেন, নাথ! সবলের বল,
জয় করি যেন ইন্দ্রিয় সকল,
তব নাম শেষে করিয়ে সম্বল,
মিসাইয়ে যেন যাই তব পায় ।
[ ধ্যান হইলেন।

কদেব।
ভক্তি ও আদিরসের দুই দিক দিয়া প্রবেশ।
ভক্তি। আমার আধারে কেন কর অধিকার ?
মানে মানে ফিরে যাও দেশে আপনার।
আঃ-রঃ। (হাব ভাব ভঙ্গীর সহিত)
আমার যা মান, জান মূল্য কত তার?
এর মর্ম বুঝিবারে সাধ্য কি তােমার ?
নীরস জীবন নিয়ে আছ এ ভুবনে,
রসের কি ধার ধারে বাস করে বনে।
ভক্তি। মানের বুঝি না মৰ্ম্ম ? এই কি আমার ধর্ম ?
‘নীরস জীবন মম’ বলিলে এ কথা ?
আমায় আদর করে যে জন রাখে লাে ধরে,
তুমি কি সাহস করে যেতে পারাে তথা ?
আঃ-রঃ। স্বর্গ মর্ত্ত রসাতল, সব মম করতল,
আমি মাত্র একেশ্বরী, সকলি আমার,
তােমায় কে চেনে বল, কে আছে তােমার ?
ভক্তি। তুমি মাত্র একেশ্বরী সকলি তােমার ?
কথা বলে হাসালে যে, কি কহিব আর ?
এ তিন ভুবনে সব, জীবন থেকেও শব
হয় যে লাে দিনে দিন গুণেতে তােমার ?
দুৰ্বল যাহারা, তুমি রাণী সে সবার।
আঃ-রঃ। তােমায়রা যে কথা শুনে হাসি রাখা ভার?
দুৰ্বল যাহারা, আমি রাণী সে সবার ?

--
দেখিয়ে মােহিনী রূপ, অতল রসের রূপ,
হারালেন মহেশ যে জ্ঞান আপনার ?
জীবাত্মায় পরমাত্মায় কে দেয় বিহার?
কার গুণে তরে’ যায় এ তিন সংসার?
ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র তুমি, কহিলাম সার ;
নীরস দেহেতে মাত্র তব অধিকার।
দেখিবে এখনি শুকে, কে তাহারে রাখে সুখে,
কা’ হ'তে সে কারে পায়, দেখিবে সংসার,
কি করিতে পার তুমি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রাকার ?
ভক্তি। বড়ই যে জোর দেখি পেয়ে যুবকের ;
রহিবে কি চিরকাল শুকদেবে ঘেরে ?
এত কি থাকিবে জোর ? নিশী কি হবেনা ভোের
পাকা কেশে রবে কি সে তােমা পানে হেরে ?
বুড়াে শুকে কিবা পাবে আঁখি কোণে ঠেরে ?
যুবতী থাকিতে তুমি পারাে চিরকাল।
আমিও থাকিতে পারি আজ যাহা কাল।
কিন্তু
কে তােমার পরাধীন হয়ে থাকে চিরদিন।
আমরণ কারে রাখ পেতে মায়াজাল ?
মাঠে কি বাহিতে পারাে তুলে দিয়ে পাল ?
আমি কিন্তু চিরকাল রহিব সমান ;
বরং বাড়িয়া যাবে দিনে দিনে মান।

শুকদেব।
শৈশব হইলে পার, যৌবনে পরিব হার,
চিরদিন গাব গান ধরিয়ে সুতান।
আমি কি তােমার মত হতে পারি ডান ?
আঃ রঃ। দেখবাে লাে! কার গানে মজে কার প্রাণ।
কেই বা মজাতে পারে, কেবা করে ত্রাণ ।
[ দুই দিক দিয়া দুইজনের প্রস্থান।
শুক। (ধ্যানাস্তে)
কি আশ্চর্য্যঅরিদল এখনাে প্রবল ?
এখনাে সাহস পায় ? এখনাে নিকটে ধায় ?
আমাকে কি ভাবে তারা এতই দুর্বল ?
। এ হেন সাধনা মম হবে কি বিফল ?
মাতৃগর্ভে রহিলাম দ্বাদশ বৎসর।
কি কারণে দিবাকর গ্রহ তারা সুধাকর,
চাহে নাই দেখিবারে আমার অন্তর ?
থাকিতে কি হবে বলে ধাঁধার ভিতর ?
এখনাে আঁধারে কেন পড়ি বার বার ?
তা হলে তফাতে থেকে, অরিগণ থেকে থেকে,
সাধিছে কি বাধ সবে সাধনে আমার
শেষে কি মজাতে মােরে বাসনা সবার ?
আরাে দেখি কিছুদিন ধরায় থাকিয়া।
যে ধন পাবার আশে, রহিয়াছি পিতৃবাসে,

২৮ শুকদেব তারে যদি নাহি পাই বিদেশে আসিয়া, নিজ দেশে যাব শেষে স্বেচ্ছায় চলিয়া ॥ (পুনরায় ধ্যানস্থ ) ধীরে ধীরে দূরে রম্ভার প্রবেশ। রম্ভা। এই ত দেবরাজের আদেশে শুকদেবের তপােবনে এলুম, দেবতারাও ত আমার সঙ্গে এসেছেন। কিন্তু গা’টা কেমন ছম্ মম্ কচ্চে। বেরুবার সময় একটা বাধা পড়েছিল, তাইতে কি এমন হচ্চে? ফিরে কি যাব ? না, তা হবে না। শুধু শুধু ফিরে গেলে নারীকুলে কি কলঙ্ক হবে না? নারী হয়ে, বিশেষতঃ অপ্সরা হয়ে একজন যােগীর ধ্যান ভাংতে পারবনা ? মৎস্যগন্ধা যে পরাশর মুনির মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিছলে ;- মেনকা যে অতবড় বিশ্বামিত্র ঋষির মাথা খেয়েছিল। আমি কি এই ছােরার ধ্যান ভাংতে পারব না ? কিন্তু ছােকরা দেখলে বড় ভয় হয়, বুড়াে সুড়ো হলে তত ভয় টয় হয় না। ন্যাজ খসা বুড়াে সাপের বিষের চেয়ে সলুইয়ের বিষের তেজ আরাে বেশী। আগুনের চেয়ে তপের তেজ আরাে খুর। তা যাই হক, দেব- রাজের আদেশ, একবার বেয়ে চেয়ে দেখতে হবে। একটু তফাতে গিয়ে রস ছড়াতে ছড়াতে ত এখানে আসি, তারপর যা হয় হবে। (উদ্ধাষ্টে) হে দেবগণ !

শুকদেব।
বক্ষা করাে। তেমন তেমন হলে, এখানে আমাকে
একলা ফেলে যেন পালিয়ে যেওনা।
( প্রস্থান।
( নেপথ্যে রম্ভার গীত।
ভৈরবী-দাদরা।
কামেরে জিনিতে, কে পারে মহীতে,
কাম সম বীর কেবা আর ?
যেবা যত বীর, অটল সুধীর,
তত দুরগতি দেখি তার।
শুক। (চমকিয়া উঠিয়া) কে ও গান গাচ্চে? এ যে মধুর
কণ্ঠস্বর ! মানৰ কণ্ঠে ত এত মধুরতা থাকে না? তবে
এক গাচ্চে? উদ্দেশ্য কি ? দেখি দেখি, ব্যাপার খানা
কি। { ধ্যানস্থ হইয়া) ও! ইন্দ্রের এই কাজ?
আমার উপর শত্রুতাচরণ ? (সহাস্যে,) ভাল দেখা যাক
কি হয়। ( মুদিত নয়নে অবস্থিতি।)
গীত গাহিতে গাহিতে ও মধ্যে মধ্যে নৃত্য
করিতে করিতে রম্ভার পুনঃ প্রবেশ ।
ভৈরবী-দাদা।
আগেতে হারিয়ে সাধের প্রাণ, পুনরায় প্রাণ হ’ল তার,
কামেরে সদয় বল কে না হয়, পরিতে সে রতি-সুখ হার ?

একদেব।
রূপপরি ছটায় মন ভুলে যায়, প্রাণে আঁকা থাকে ছবি তার,
শেষেতে মিলন, প্রেমেরি বাঁধন, দুয়ে মিলে হয় একাকার।
শুক। (চক্ষু উন্মীলন করিয়া শান্তভাবে ) কে আপনি?
কোথা হতে আগমন কচ্চেন ?.
রম্ভা। দেব। আমি একজন স্বর্গ-বিদ্যাধরী, আমার নাম
রম্ভা। উপস্থিত নন্দনকানন হ’তে আসছি।
শুক। অভ্যাগত অতিথি ? আগচ্ছ আগচ্ছ। কিন্তু দেবি
আমি একজন ফলমূলাহারী সামান্য ভিক্ষুক, বৃক্ষমূলে
বাস। এখানে কি স্বর্গ-বিদ্যাধরীর উপযুক্ত অতিথি-
সৎকার হবার সম্ভাবনা ? এতে কি আমার অপরাধ
হবে না ?
রম্ভা। দেব! আপনার কুষ্ঠিত হবার কোন কারণ নাই
আমি সে রকম সামান্য অতিথি নই।
শুক। তবে দেবি। আপনি যদি সামান্য অতিথি না হন,
তা হলে জিজ্ঞাস্য, ভগবানের বিশাল রাজ্যে শত শত
মহাজন থাকতে, শত শত সুরম্য প্রাসাদ থাকতে,
আমার নিকট এই সামান্য পর্ণ কুটীরে আপনার
আগমন কেন ?
রম্ভা। দেব! আমাকে ওরূপ সসম্মানে সম্বােধন করবেন না,
তা হলে সম্মানের অকমাননা করা হয়। এ অধিনীকে
আপনার দাসী জ্ঞান করবেন
শুক। দেবি ! আপনি যে-ই হন, আমার নিকট আজ আপনি

কদেব। অতিথি। দেব সম অতিথি। উপস্থিত দেবার্চনা হতেও আপনার সৎকার শ্রেষ্ঠ। রম্ভা। (স্বগত)এ যে একপ্রকার বিপদে পড়লুম। দেব- রাজের কল্পনা যে ভেসে যায়, দেখছি, এমন মহা- জনের সঙ্গে কি করে আদিরসের কথা কই? শুক। কি ভাবছেন ? রম্ভা। দেব। ভাবছি এই যে, আমার কতক গুলি মনােগত কথা ছিল, তা সে সব কি করে আপনার নিকট প্রকাশ করূবাে, তাই ভাবছি। তার জন্য আপনার ভাবনা কেন? আপনি অশঙ্কোচে বলতে পারেন। রম্ভা। দেব। মনােমত পাত্র বিশেষের শুভ দর্শনলাভ হ'লে আত্মহারা হতে হয়, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে স্বভাব- জাত কাজগুলিও অবিবাদে আপনি আপনি প্রকাশ ইয়ে পড়ে। শুক। আপনার কথার যে ভাবার্থ বুঝতে পাচ্ছি না। রম্ভা। (স্বগত) অরি চুপ করে থাকতে পারি না। যা থাকে ভাগ্যে, প্রকাশ করি। (উর্ধদৃষ্টে) হে কন্দর্প ! তুমি সহায় থেকো। (প্রকাশ্যে ) দেব! ( ভাব ভঙ্গীর সহিত)

শুকদেব।
ঝিৰিট-একতালা।
=
বসস্তাগমনে, সুরম্য কাননে,
দখিণ মলয় যবে বায়,
চায় না কি মন,
প্রেমিক রতন,
পীরিতি সাগরে যে ভাসায়।
শুক। ( সহাস্যে ) এ কি রকম কথা বলছো রম্ভা ?
গীত।
ঝিঝিট-একতালা ।
মায়া মােহ সবে, নাশিতে আহবে,
যে না পারে আসি’ এ ধরায়,
কোথা সুখ তার, মেদিনী মাঝার,
শান্তি কোথা সে দেখিতে পায় ?
রম্ভা। (হাবভাবের সহিত) দেব!
উত্তুঙ্গ পীনস্তনবৰ্ত্তলান্তরং
মুক্তাবলি হার বিভূষিতান্তরং
স্তনান্তরং যঃ পুরুষাে ন সেবতে
বৃথান্তরং তস্য নরস্ত জীবনং।
শুক। (সহাস্যে ) দেব।
ওঁকার মূলং পরমং পদান্তরং
গায়ত্রি সাবিত্রী সুভাষিতারং

শুকদেব।
৩৩
বেদান্তরং যঃ পুরুষাে ন সেবতে
বৃথান্তরং তস্য নরস্ত জীবনং।
গীত।
দুলু ঢুলু অখি,
ঝিঝিট-একতালা।
অঞ্জনে রঞ্জিত
কটাক্ষ বাণ মুরচিত ;
নিন্দিত ফণী লম্বিত বেণী
রতন ভূষণে বিজড়িত ;-
বিলী শশাভিত, নাভী সুগভীর
কোটীতে মেখলা সুশােভিত,
যে মুদ্রা
কে না হয় হেরে বিমােহিত ?
হেন রূপসীর
গীত।
ঝিঝিট-একতালা।
বঙ্কিম ঠাম,
ভঙ্গী মােহন,
নয়নে মােহিত, ত্রিসংসার,
ভূপদ রেখা
কৌস্তুভ মণি
বিরাজিত সদা হৃদে যার ;
ধ্বজ বজাঙ্কুশ পদে অঙ্কিত,
শ্ৰীঅঙ্গ চর্চিত চন্দনে যার,
যে না হয় তঁারে হেরে বিমােহিত,
কোথা সে শান্তি জীবনে তার ?

৩৪ শুকদেব। এখন বল, রম্ভা ! তােমার আর কোন কথা আছে কি? রম্ভা। (স্বগত) এ যে বিপরীত কাণ্ড বার লক্ষণ দেখছি। এখন আমি ওকে বর সাজিয়ে বাসর ঘরে নিয়ে যাই, কি উনি আমাকে তপস্বিনী সাজিয়ে তপােবনে রাখেন? এখন যে এই সমস্যা দেখছি। শুক। কি ভাবছে রম্ভা ? এখন বল’, তােমার আর কোন কথা আছে কি ? রম্ভা। দেব। আপনাকে আর অধিক কি বলবাে, আপনি মহা তেজস্বী, পূর্ণ বিবেকী, কিম্বা ত্ৰিলােক তৃণদর্শী মহা তপস্বী হলেও, আপনার যে তপস্যা, তা আদিরস- যুক্ত মায়ার কাছে হীনবল । শুক। (সহাস্যে) আমার তপস্যা যা-ই হক, আর আমিও যা হই, তাতে তােমার লাভালাভ কি ? রম্ভা। আমার অলাভ কিছু নাই। তবে এই লাভ যে আপনি আমাকে ভজনা করেন। শুক। তােমাকে কিছু উপদেশ দেবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তা হ’ল না। তুমি এখন স্বস্থানে প্রস্থান করাে। রম্ভা ! আপনাকে সঙ্গী না করে আমি অন্যত্র প্রস্থান কচ্ছিনা। শুক। (স্বগত) দেশ কাল পাত্র বিবেচনায় রূপান্তর ধারণ কত্তে হ’ল। (প্রকাশ্যে ) তুমি এখন প্রস্থান না কলে তােমার বিপদ হবে।

শুকদেব। রম্ভা। তা হলেও আপনাকে উদ্ধার কত্তে হবে। শুক। (স্বগত) হে ব্ৰহ্মণ্য দেব! অপরাধ মার্জনা করবেন। ( প্রকাশ্যে ) হে বৈশ্বানর! পরিত্রাহি, পরিত্রাহি। ( হঠাৎ রম্ভার চতুর্দিকে অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল ) রম্ভা। ( সভয়ে) কি সর্বনাশ! এ কি হল ? চারিদিকে যে আগুন জ্বলে উঠলাে। (সক্রন্দনে) হে দেবরাজ । হে দেবগণ ! রক্ষা করুন, রক্ষা করুন। প্রাণ যায়, রক্ষা করুন। ( ক্রন্দন ) শুক। ( সহাস্যে) স্বর্গ-বিদ্যাধরি ! কার সাধ্য এখানে এসে তােমাকে রক্ষা করে। কার ক্ষমতা, তােমাকে রক্ষা করবার জন্য আমার অনুমতি বিনা এ পােবনে প্রবেশ করে ? রম্ভা। ( সনে) তা হলে, হে দেব। হে মহাজন। আপনি নিজ গুণে আমাকে রক্ষা করুন। আমার অপরাধ মার্জনা করুন। ( ক্রন্দন ) তবে এখন তিষ্ঠ । মােহে মুগ্ধ হয়ে, এক স্থানে সমভাবে তিষ্ঠ । অগ্নিদেব! তিরােহিত হও। ( অগ্নি নির্বাণ হইল। রম্ভা একস্থানে বাকশূন্য হইয়া দাঁড়াইয়া শুকদেব পুনরায় ধ্যানস্থ হইলেন) ধীরে ধীরে দেবর্ষি নারদের প্রবেশ। নার। (রম্ভাকে দেখিয়া স্বগত) এ কি ? ইনি কে? রম্ভা ? ( ভাল করে দেখিয়া ) তাই ত, এ যে স্বর্গ- রহিল।

শুকদেব ।
বিদ্যাধরা রম্ভা। এখানে কেন ? কত্তাটি স্বয়ং
ধ্যানস্থ, টুকটুকে রন্তাটি নিকটস্থ, তপােবনটি লােকালয়
হ’তে কিঞ্চিত দূরস্থ, কি তবে মনস্থ ? এ যে আমাদের
একেবারে করে ফেল্লে ব্যতিব্যস্ত। ( পরিক্রমণ )
এই ইনি স্ত্রী পুরুষ কিছুই চেনেন না, মনুষ্যমাত্রকে
দেবতা-ভাব, জগতের যাবতীয় কাৰ্যে ইনি সম্পূর্ণ
অনভিজ্ঞ, তবে নিভৃত তপােৰনে একটি টুকটুকে
অপ্সরা সঙ্গিনী কেন? এর হেতু কি? একবার দেখি
দেখি বাপার থানা কি। (কিঞ্চিৎ ধ্যানস্থ হইয়া)
ও হাে! এ যে সুন্দর কৌশল! মা কৈলাসেশ্বরীর
কল্পনা, ইন্দ্র যন্ত্রী, আর রম্ভা যন্ত্র। কিন্তু হঠাৎ কি
এ যন্ত্র কোন কাজ কত্তে পারবে? এ যে আগেই ভোঁতা
হয়ে যাবে। ( পরিক্রমণ ) তাইত, আমি এখন কি
করি ? একটা গীত গাই। দেখি, এতে যদি মহা-
পুরুষের চটুকা ভাঙ্গে।
ভীমপলশ্রী-কওয়ালি।
জগততারণ সেই প্রেমেরি আধার।
যদি থাকে মন সে ধনে লভিতে সবার,
তবে হেসে হেসে যাও ঘেঁসে করিতে বিহার ।
একাসন অনশন, দিবা নিশী জাগরণ,

শুকদেব। ৩৭ বসন ত্যজিয়ে কেন কৌপীন সার? ছােলার খােসার মত, এ সংসারে অবিরত থাকিতে হইবে, কথা বলিলাম সার, কিন্তু ভিতরে থাকিতে হবে দেহে একাকার। ইস্, এখনাে যে বিভাের, এ যে শাড়া শব্দ কিছুই নাই। ( প্রকাশ্যে ) অহে শুকদেব গােস্বামি। কার ধ্যানে মগ্ন আছ ? চক্ষু দুটি মুদিত করে, একটি টুকটুকে অল্প- রাকে সম্মুখে দাঁড় করিয়ে রেখে, কা’কে একমনে ধ্যান কচ্চো ? শুক। (চক্ষু উন্মীলন করিয়া সচকিতে ও সসম্ভ্রমে ) একি ! আসতে আজ্ঞা হ’ক। (গাত্রেখান ) নার। এইত এলেম। শুক। এখন জিজ্ঞাসা কত্তে পারি কি, আপনি কোন্ মহা- পুরুষ, এবং কোথা হতে আগমন হচ্ছে? নার । আমি দেব-ঋষি। শুকদেব ! গমন বা কোথায়, আগ- মনই বা কোথায় ; এ স্থান বা কোথায়, সে স্থানইবা কোথায় ; তুমি বালক, তােমাকে আর কি বলবাে? বিশেষতঃ তুমি এখন বাল্য লীলায় রত। শুক। আজ তা সত্য, আমি বালক সত্য। কিন্তু—যাক। এখানে কতক্ষণ আগমন হয়েছে ? নার। তা’ ও বা কি করে জানবে বল ? টুকটুকে রম্ভাটিকে উদরস্থ করবার আগেই তােমার এই ভাব, না জানি

শুকদেব
শরে কি হবে। এখন তােমাকে এক কথা জিজ্ঞাসা
করি, এখানে এই টুকটুকে জ্যান্ত পুতুলটিকে নজর
বন্দী করে রাখবার হেতু কি?
শুক। দেবর্ষে ! ‘হেতু কি বলছেন? আমি এর কিছুই
জানি না। আমি আপনার কার্যে নিযুক্ত ছিলেম,
হঠাৎ আমার সম্মুখে এই মূর্তি এসে উপস্থিত। শুধু
কি উপস্থিত ? আবার তর্ক। তখন কি করি, কার্যের
ব্যাঘাত হয় ভেবে, অগ্নিদেবকে আনিয়ে একে একটু
ভয় দেখালেম।
নার। বটে? তাইত দেখাবে। তারপর ?
শুক। আজ্ঞা, তারপর বিদ্যাধরীকে ভয়াকুল দেখে অগ্নি-
দেবকে স্বস্থানে প্রস্থান কত্তে বল্লেম, অগ্নিদেব তিরাে-
হিত হলেন।
নার। অগ্নিদেবকে যে বেশ বশ কয়েছ দেখছি। তারপর ?
শুক। আজ্ঞা, তারপর আমার কিছু উপদেশ না শুনে পাছে
ও পালিয়ে যায়, তাই আপাততঃ ওকে স্তম্ভিত করে’
দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
নার। তা’ স্তম্ভিত করে দাড় করিয়ে রাখবার কি আবশ্যক
ছিল ? লগুড়ের প্রভাবে ধরায় একেবারে লম্বিত করে’
রাখলেই ত হত ? = যা হবার তা হয়েছে, এখন
একে প্রকৃতিস্থ কর ?
শুক। যে আজ্ঞা। (রম্ভার প্রতি মায়াবিনি। বিদ্যাধরি ।

শুকদেব।
প্রকৃতিস্থ হও।
রম্ভা। (চৈতন্য পাইয়া, পরে দেবর্ষিকে দেখিয়া ) একি
দেবর্ষি! আঃ প্রাণটা বলাে। ( সহাস্যে) এখন
প্রণাম করি, মন খুলে আশীৰ্বাদ, করুন। (দেবর্ষিকে
প্রণাম করিল।)
নার। বটে? একেবারে মন খুলে আশীর্বাদ কত্তে হবে ?
আচ্ছা, তবে এই আশীর্বাদ কচ্চি, শুকে বিহার কর,
চির সুখিনী হ।
রম্ভা। (সহাস্যে) আজ্ঞা তা-ই করবাে, আর তা কল্লেই
তা হবে। সম্প্রতি, একটু আগে যে প্রাণটি হারাতে
বসেছিলুম।
নার। তা কি জানিস, রম্ভা। যার প্রাণ আছে তারই প্রাণ
কখন কখন এদিকে ওদিকে হারিয়ে যায়। বিশেষতঃ
তােদের প্রাণ হচ্চে চেতন পদার্থ। এক স্থান হতে
আর এক স্থানে অবাধে সটান চলে যায়। আবার
আসে, আবার যায়। যাক, সে কথা যা। এখন
জিজ্ঞাসা করি, তুই এখানে কি কুত্তে এসেছিলি ?
রম্ভা। বলি, আপনার কি কিছু অৰিদিত আছে ?
নার। আমার বিদিত আছে কি না আছে, তার ত কোন
কথা হচ্ছে না ? কিন্তু তাের যে কি আছে আর কি
নেই, তাত কিছু বুঝতে পালুম না।
রম্ভা। কেন প্রভােব

কদেব।
নার। আবার কেন প্রভাে? ঢাল নেই খাঁড়া নেই, অমনি
হাত মুখ চো ঘুরিয়ে এলেই হল? একি আমাদের
দেবরাজকে, কি আর আর মুনিকে পেয়েছি যে,
‘পাগলা ভাত খাবি, না হাত ধােবাে কোথা ? ন্যাকা
নেকী। যা’, দূর হ’, বেবরা।
রম্ভা। (সহাস্যে ) বলি, শুধু মুখে শুধু হাতে দূর হলে’
মনিবকে কি বলে জবাব দেব?
নার। সে তখন দেখা যাবে। এখন যাবি কি না?
রম্ভা। আজ্ঞা, দেবর্ষে। তবু ইচ্ছে হচ্চে যে, আর একবার
নেচে গেয়ে যাই।
নার। তাইত, বড় নাচনাদার হয়েছি যে? বলি, এখন
একলা যাবি, না পেঁকিকে সঙ্গে দেব ?
রম্ভা। কেন দেবর্ষে ? নিজে গেলে কি হয় না ? (হাসিতে
হাসিতে প্রস্থান)
নার। এখন শুকদেব। তােমাকে জিজ্ঞাসা করি, তপস্যায়
কতদূর অগ্রসর হয়েছ ?
শুক। দেবর্ষে! অগ্রসর হওয়া দূরে থাক, বরং পশ্চাদগামী হচ্চি।
(নেপথ্যে রম্ভার গীত)
ভৈরবী-দাদরা ।
মনের ঘরে লাগলে আগুণ কে দেয় তাতে জল ?
কেঁদে কেঁদে বেড়ালে কি হবে তাতে ফল ?
প্রবৃত্তির চাবি নিয়ে, ভালবাসার কল খুলিয়ে,

শুকদেব ।
প্রেমের বারি ঝম্ফরিয়ে বল্লে অবিরল।
জলা আগুণ নিতে গিয়ে, যাবে রসাতল ।
বিধি বিষ্ণু মহেশ্বর, মানবাদি যত চর,
কে না বল পান করে সেই প্রেমকে অবিরল ? :-
জানিনা ক কোন পুরাণে, থাকতে বলে শুনাে প্রাণে,
এই কি ছিল প্রেমের ভালে টল, ঢল ঢল ?
আদর যেথায় পাব, সেথায় চল, চল, চল,
শুক। মহামুনে! এই কি আমার অদৃষ্টে লিপিবদ্ধ ছিল ?
ঘাের আঁধারময় উব কারাগারে এসে একা থাকতে
হ’ল ? একা যেমন এসেছি, কারুর কি দেখা
পাবনা, যিনি আমাকে অন্ধকার হতে উদ্ধার করে
নিবৃত্তি মার্গের সীমান্তে নিয়ে যান?
নার। শুকদেব! এ সংসার আঁধারময় কারাগার নয়,
আলােকময় শান্তির মেলা। কিন্তু তা চিতে নিজের
একটু দৃষ্টির আবশ্যক। দৃষ্টি টুকু খরতর হলে আর
কি আঁধারময় কারাগার দেবে? তখন দেখতে পাবে
যে, ঠিক তােমার মত অসংখ্য২ লােক শান্তি মেলার
চারিদিকে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন যে দিকে চাইবে,
সেই দিকেই তােমার বােধ হবে যেন তুমি দর্পণের
সুমুকে দাড়িয়ে আছি। তার পর নিবৃত্তি মার্গের সীমান্তে
আপনিই যেতে পারবে।
ওকদেবর্ষে ! চক্ষু থাকতে অন্ধ হয়ে রয়েছি। হস্ত পদ

৪২
শুকদেব
থাকতে ক্রিয়া হীন হয়ে রয়েছি। বাতুলের মত ঘুরে
বেড়াচ্চি। দেখছি সব, কিন্তু আমার চক্ষে সকল
দ্রব্যই অর্থশূন্য। তাই বলচি, দেবর্ষে ! তপস্যায়
পশ্চাগামী হচ্ছি।
নার। এর কারণ বুঝতে পাচ্চ কি ?
শুক। হৃদয় আকাশে মাঝে মাঝে ইন্দ্রিয় অরির উদয়, * এই
কারণ। ইচ্ছা হয় সাধনার জন্য পৃথিবীকে ইন্দ্রিয়
শূন্য করি।
নার। বুঝিছি। শুকদেব ! ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুদ্ধ কত্তে হলে,
অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে থাকলে কোন কাজ হবে না।
শুক। তবে দেবর্ষে ! যে উপায়ে অগ্রগামী হই, অনুগ্রহ করে
সেই উপায়টি আদেশ করুন।
নার। শুকদেবইতস্ততঃ ঘুরে ঘুরে বীরভাবে সশস্ত্র হয়ে
থাকলে কোন ফল ফল্‌বে না। তবে শান্তভাবে কোন
উপায়ে একটি দৈবশক্তি অধিকার কভে পারলে ফল
পেতে পারে, অর্থাৎ তােমার সে ঘাের টুকু যেতে পারে।
শুক। সে দৈবশক্তিটি পাবার উপায় কি প্রভাে?
নার। তুমি যে দেখছি নদীকূলে বাস করে’ জলের জন্য হাহা-
কার কচ্চ। তুমি ব্যাসদেবের পুত্র হয়ে এ কথা আবার
* প্রথম অঙ্কের দ্বিতীয় গর্ভাঙ্কে দেবরাজের প্রতি মা
কৈলাসেশ্বরীর আদেশ দেখুন।

শুকদেব।
আমাকে জিজ্ঞাসা কচ্চ? তুমি কি তােমার পিতাকে
জিজ্ঞাসা করেছিলে ?
শুক। আজ্ঞা না, দেবর্ষে! আপনি আমাকে আদেশ করুন
কি কত্তে হবে।
নার। তবে শুন, মিথিলাধিপতি রাজর্ষিজনকের নিকট যাও।
তার কাছে গেলে তােমার আশা পূর্ণ হবে।
শুক। তবে আমাকে অনুমতি দিন, আমি মিথিলা যাত্রা করি।
নার। তাঁর কাছে যাবার আগে তােমাকে আর একটি কথা
জিজ্ঞাসা করি। প্রবৃত্তি দেশের মাঝখান দিয়ে নিবৃত্তির
দেশে যেতে হয়। জগতে প্রবেশ করে তােমার কি
তাই ইচ্ছা আছে ?
শুক। দেবর্ষে ! ক্ষমা করবেন, জগৎ দুর্ভেদ্য।
নার। শুকদেব । এইটি তােমার ভ্রম। তবে দু’টি কথা বলতে
হল, মন দিয়ে শুন। জগৎ দুর্ভেদ্য নয়।
তবে যে ব্যক্তি শক্তিহীন, তার পক্ষে দুর্ভেদ্য। সেই
শক্তি প্রকৃতিগত। অথবা প্রকৃতিই সেই শক্তি।
পুরুষ হচ্চে শব, আর প্রকৃতি হচ্চে শক্তি কিম্বা শ্ৰী ।
শক্তিহীন জীব, জগতে শ্রীহীন ও অকর্মণ্য। জগতে
পুরুষ-জীব প্রকৃতির বশ, সুতরাং শক্তি সম্পন্ন।
কৈলাসে হর গৌরী, বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মী নারায়ণ ।
সাক্ষাৎ কৈলাসেশ্বরী আর কমলা হচ্চেন স্ত্রী ও পরমা
প্রকৃতি, পূর্ণ শক্তি। জগতস্থ স্ত্রীগণ হচ্চে শক্তি ও শ্রীর

।
৪৪
কদেব
অংশ। জগতের পুরুষগণকে, তুমি, আমি প্রভৃতি সমুদয়
পুরুষকেই সেই শক্তি ও শ্রী সম্পন্ন হতে হবে।
সেই
এক শক্তি হ’তেই জগতের উৎপত্তি। জগতের উৎ.
পত্তিই হচ্ছে বিধাতার কল্পনা। তােমার পরমারাধ্য
পিতামহ পরাশর মুনির শক্তি হতে তােমার পিতার
উৎপত্তি হয়েছে। তােমার পিতার কল্পনা হতে
তােমার উৎপত্তি
হয়েছে । আবার তােমার
শক্তি হতে অপর কোন মহাপুরুষের উৎপত্তি
উৎপত্তিই হচ্চে
কল্পনা।
শুকদেব ।
প্রবেশ করে’ ৷ ও
সু-প্রকৃতিযুক্ত শক্তিকে আশ্রয় কর, তা হলেই তােমার
মনের অন্ধকার দূর হবে, আর নিবৃত্তি মার্গে যেতে পারবে।
শুক। দেবর্ষে ! এর প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত দেখাতে পারেন ?
নার। তা হলেই তুমি প্রকৃতিস্থ হও ? আচ্ছা, তা হ'লে
আবার বলি, মিথিলাধিপতি রাজর্ষি জনকের নিকট
যাও, তিনিই প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত স্থল। তােমার পিতার
ও এই ইচ্ছা।
শুক। যে আজ্ঞা, তাই যাব।
উভয়ের প্রস্থান।

তৃতীয় দৃশ্য।
ভদ্রাশ্রম।
এক একটি ময়না পাকী হস্তে মুনিকন্যাগণের প্রবেশ।
গীত।
ভৈরবী-দাদরা।
গা’রে আমার সােণার পাকি! মধুর হরিনাম।
যে নামেতে সফল হয় রে, সকল মনস্কাম।
সােণা মুখে সােণার ছাদে, ঘাড়টি নেড়ে তায়,
পড়লে সে নাম, প্রেমের ফাঁদে আপনি পড়ে যায়,
শান্তি বাঁধে বাঁধন দিবি, বসে অবিরাম।
( চারিদিকে উদ্ধদৃষ্টে )
ডাক্ দেথিরে কোকিল যত,
‘কুহু কুহু’ অবিরত,
পঞ্চমেতে তুলে তান মাতিয়ে দেরে প্রাণ :-
আকাশ ভেদী স্বরটি তুলে,
পাপিয়ারা ডাক্ সকলে,
‘চো গেল, চো গেল’ ‘চো গেল বলে
আপন স্বরে প্রেমের ভরে বল রে বিভুনাম ।

একদেব
বল দেখি’রে যত পাকি! আছিস্ কাননে,
‘মনের কালি, ঘুচাও, কালি! পড়ি চরণে।
‘কালী’ ‘হরি দুটি গাছে,
এক ফল তােরা পাবি পাছে,
পাবি তােরা দু-নামেতে প্রাণের সেই আরাম :-
(হস্তস্থিত ময়নার প্রতি)
সে নামতে পাের যদি রে ঝরে নয়ন জল,
স্বর্গ মত্ত একেবারে করবি রসাতল,
কেউ কি তখন তিন ভুবনে হবে রে তাের বাম ?
একটি (নেপথ্য দেখিয়া । ঐ যে বাবার সঙ্গে দাদা আসছেন।
বালিকা চ’ ভাই। আমরা হরিংদের খাবার দিইগে চ।
(ভৈরবী’-রে) চ চ চ’ হরিংদের সব খাবার দিই গে চ'।
[ সকলের প্রস্থান।
ব্যাস ও শুকদেবের প্রবেশ।
শুক। পিত। আপনার কথার প্রতিবাদ করা আমার মহা পাপ।
কিন্তু সত্য কথা বলতে বােধ হয় কোন বাধা নাই।
স্বর্গ কামনায় কোন ক্রিয়া করবার অথবা পৰ্যয়ক্রমে
সুত্থান্তে দুঃখ আর দুঃখাত্তে মুখ ভােগ করবার আমার
ইচ্ছা নাই।
ব্যাস। তবে ভগবানের কল্পনার বিরুদ্ধে কাৰ্য করা কি
সম্ভব।
শুক। আজ্ঞা না।

৪৭
ধৰ্ম্ম ?
ব্যাস। মনুষ্য দেহ ধারণ করে, দেহী হয়ে পৃথিবীতে এসে,
পিতা মাতার আজ্ঞা অবহেলন করা কি পুত্রের
শুক। আজ্ঞা না, পিত। কিন্তু পুত্র কি কখন পিতা মাতার
অবাধ্য হয় ?
ব্যাস। তবে তুমি আমাদের আদেশ পালন কষ্ট না কেন?
শুক। তাত। বিধির বিধি পালন কল্পে কি পিতৃ মাতৃ আদেশ
পালন করা হয় না ?
ব্যাস। সংসারে এসে সংসারী হওয়া কি বিধির বিধি নয় ?
শুক, পিত। ক্ষমা করবেন। অক্ষ্য লক্ষ্য যােনি অমণ করেছি।
কখন কখন অঙ্গরা বেষ্টিত হয়ে নানা উপচারে স্বর্গ
ভােগ করেছি। কখন কখন কীট পতঙ্গ হয়ে, কখন
কখন শৃগাল কুকুরসিংহ ব্যাঘ্র ইত্যাদি হয়ে নানা স্থানে
ভ্রমণ করেছি। পূৰ্ব্ব পুৰ্ব্ব জন্মে যেরূপ দুঃসহ যাতনা
ভােগ করেছি, তা হতে সহস্র সহস্র গুণ অধিক কষ্ট,
সম্প্রতি গর্ভাবস্থান কালে মাতৃ গর্ভে এক এক দিন
ভােগ করেছি। অতএব পিত ! মৃত্যুর অধীন হতে
আর আমার ইচ্ছা নাই। যেখানে নিরবচ্ছিন্ন সুখ ও
শান্তি, যেখান হতে পতনের ভয় নাই, সেই স্থানে
যাবার জন্য ব্যাকুল হয়েছি।
ব্যাস। প্রিয়তম পুত্র। ভােমার ন্যায় নানা শাক্ত মহাপণ্ডিত
তুল্য সু-সন্তানকে আমি আর অধিক কি বলবাে? তবে
এই পর্যন্ত বলতে পারি যে, সংসারে এসে ন্যায়াধ্যায়

৪
কদেব
বিচার করে সাংসারিক নিয়ম সকল পালন করাই
বিধি।
শুক। পিত! অব্যয় সাধনারূপ পুন্য প্রভাবে বিদ্যার সহিত
ব্রাহ্মণত্ব ও ব্ৰহ্মতত্ত্ব লাভ করেছি। এ স্থলে, পিত।
আমি আর কি করবাে ? যা মিথ্যা, তা যখন মিথ্যা
বলে আমার উপলব্ধি হ’ল,আর যা’ সত্য, তার সঙ্গে
যখন আমার নৈকট্য সম্বন্ধ রইল, তখন আর আমার
স্যান্যায় বিচারের ভয় কি ?
ব্যাস। (স্বগত) আর বৃথা তর্ক কলে কোন ফল ফলবেনা।
বালকদের যে কাজ কত্তে নিষেধ করা যায়, তারা
তা-ই করে ; কিম্বা যা কত্তে বলা যায়, তা করে না।
এটি বালকদের স্বভাব। ( প্রকাশ্যে) আর তােমার
সঙ্গে তর্ক করব না। তুমি মুখ নও, তােমার হিতাহিত
বিবেচনা করবার ক্ষমতা আছে, এস্থলে তুমি যা ভাল
বিবেচনা কর, তাই কর। দেবর্ষির কাছে শুনলুম,
তিনি কি তােমাকে রাজর্ষি জনকের সঙ্গে দেখা কত্তে
বলেছেন?
শুক। আজ্ঞা হাঁ। এখন আপনার অনুমতি হলে, মিথিলা
যাত্রা করি।
ব্যাস। বেশ, উত্তম। আমি সম্পূর্ণ অনুমতি দিচ্চি।
শুক। যে আজ্ঞা।
[ উভয়ের প্রস্থান।

28onge
22022032.9
তৃতীয় অঙ্ক।
:-
7 know not which way
I must 'lank
Har Comfort.
*
W. Wordsworth.

No text on this page.

তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
মিথিলা। রাজর্ষি জনকের মন্ত্রণা গৃহ
বিদূষকের প্রবেশ।
বিদু। সাবাস সাবাস, হায়! অহং বিদূষক,
সুধা সম দেব-ভােগ মণ্ডার সেবক।
মণ্ডার মাহাত্ম কত, গুণ তার কত শত,
কে জানিবে অহং বিনা, আর সে মােক,
আর যত সুরসিক তাহার ভক্ষক।
ছানা চিনি উভয়ের প্রেমের মিলনে,
খর্জুর গুড়েতে পুনঃ লােহিত বরণে,
যবে হয়ে একাকার, এৰ্ত্তি ধরে গােলাকার,
কে না দেয় কর তাতে পুলকিত মনে?
কে না ইচ্ছা করে তারে পুরিতে বদনে।
সন্দেশের বীজ যদি হইত ধরায়,
ধন্যবাদ শত শত দিতাম বাতায়।
হয়ে কাহারাে দাস, দিবা নিশী দিয়া চাষ,

কবে।
পৰু হ’ল বােঝ বােঝা তুলিয়া মাথায়,
বাড়ি এসে ঢালিম ব্রাহ্মণীর পায় ।
সন্দেশ যদ্যপি হত অপরাবতার,
ছায়া সম গায়ে গায়ে থাকিতাম তার।
ভালবেসে প্রাণ ভরে, অশেষ যতন করে,
চাকিতাম দিবা রাতি তার সুধা-তার ;
রসিকের দলে নাম উঠিত আমার।
ভােজনের শেষ অঙ্কে মণ্ডর প্রবেশ।
ন্যায় শাস্ত্র কহে অর্থ ইহার বিশেষ ।
তিক্ত, কসা, ঝাল, টকে, পরে দধি থক থকে,
হয়ে এলে ভােজনের অভিনয় শেষ,
যবনিকা রূপে দেখ পড়েন সন্দেশ।
শ্বেতবর্ণ গােলাকার মণ্ডা মণ্ডা মহামৃতং,
ভােজনান্তে উদরস্থং পুনঃজন্ম বারং শতঃ।
মন্ত্রী ও কোষাধ্যক্ষের প্রবেশ।
মন্ত্রী। প্রণাম, বিদূষক মহাশয় । কার পুনঃজন্ম বারং শত ?
বিদূ। (আশীর্বাদ করিয়া) আর কার মন্ত্রী মহাশয় ? মণ্ড।
মন্ত্রেন দীক্ষিত যাে নরঃ তস্য নরস্ত পুনঃজন্ম বারং শত,
আর কার ?
মণ্ডা সুমিষ্ট বিশিষ্ট আকৃষ্ট কর।
গণ্ডা দুবিষটে ঘিনষ্টে এ কষ্ট হয়।

কোষা। সত্য কথা বলতে কি, বিদূষক মহাশয়! আপনারাই সুখী। | বি। তার কারণ, আপনারা আমাদের সুখে রেখেছেন বলে। আপনাদের গুণে, আপনাদের কাৰ্য প্ৰণা- লীতে, আপনাদের সুমন্ত্রণায়, এমন যে রাজর্ষি জনক, দেবতারা যার কাছে কম্প্যান, এ হেন রাজাকে আপনারা যখন সুখে রেখেছেন, তখন আমি যে তঁার আশ্রয়ে থেকে সুখে থাকবে, তার আর বি চত্র কি? (মন্ত্রী ও কোষাধ্যক্ষ বিদূষকের পদধূলি গ্রহণ করিলেন) মন্ত্রী। আপনাদের পদধূলির বলেই আমাদের যা কিছু। কোষা। আমাদের গুণই বলুন, আর যা-ই বলুন, সব ঐ পাদ- পদ্মে ভক্তি-বলে। আর এক কথা, বিদূষক মহাশয় ! আপনিই রাজর্ষিকে চিনেছেন। বিদূ। আপনাদের কাছে আর অধিক কি বলবাে, আমি যেন নন্দন কাননে বাস কুচ্চি। মন্ত্রী। সে কিরূপ? বিদূষক মহাশয় ! বিদূ। আমাদের রাজর্ষিই যেন নন্দন কানন। তার এক একটি কথা যেন এক একটি বিকসিত পারিজাত। ভাবের গন্ধে দশদিক আমােদ করে রাখে। আরও বলতে কি, তার হৃদয় যেন ক্ষীরােদ সাগর। রাজর্ষির পীরিত প্রেম ভালবাসা, যেন ইড়া পিঙ্গলা সুষুম্না,

৫৪
শুকদেব
রাদিনঅন্তরে অন্তরে বইছে, বিরাম নেই, অথচ কারুর
দেখবার যােটি নেই। আহা! রাজার দয়া যেন গ্রীষ্ম
কালের শিশির, কেউ দেখতে পায়না, অথচ গাছের
গােড়া সব রসে আছে আর মন্ত্রী মহাশয়। আপনার
আমার মনে কণিকা মাত্র দয়ার আমেজ হলে, চারি-
দিকে একেবারে হা মা কা পড়ে যায়, ঢাক ঢোল
জগঝম্প লম্পঝম্পর দাপােটে দেশ বিদেশ একেবারে
থরহরি কম্পন হয়ে পড়ে।
মন্ত্রী। বিদূষক মহাশয় ! এই অল্পদিন রাজর্ষির আশ্রয়ে এসে,
আপনি তাকে যথার্থই চিনেছেন। তবে এক কথা
জিজ্ঞাসা কত্তে পারি কি? আপনার পূর্বের মনীবের
হৃদয় কেমন ছিল? তার কাছে ত বহুদিন ছিলেন,
তাঁর হৃদয় কেমন ?
বিদূ। আহা হা! মন্ত্রী মহাশয়! সে কথা আর তুলবেন না।
তার হৃদয় যেন ধু ধু করা সরু সরু বালুকাময় মরু।
তার-দয়ার স্রোত যেন মজা সরস্বতী, উপরে ছাগলে
ঘাস খাচ্চে। তার ভালবাসা, যতক্ষণ না কিছু হস্তগত
হয়। তার পরেই স্বাকারে নিরাকারবৎ, চৈতন্যে
অচৈতন্য স্বরূপ। তার কথা শুনলে, কাষ্টে কুঠারাঘাতও
মধুর সঙ্গীত বলে বােধ হয়।
কতকগুলি দরখাস্ত হস্তে প্রধান কর্মচারীর প্রবেশ ।
মন্ত্রী। আসতে আজ্ঞা হয়। আপনার আসতে একটু বিলম্ব
হয়েছে বােধ হয়।

কৰে।
প্রঃ ক। আজ হাঁ কিন্তু বিয়ামেরও অভাব।
রাজর্ষি জনকের প্রবেশ, ও সকলের যথা যথা স্থানে উপবেশন।
রাজা। অদ্যকার কাৰ্য্য কি কি ?
প্রঃ কঃ। (একথানি দরখাস্ত দেখাইয়া, দক্ষিণ মহলের সমস্ত
প্রজা মহারাজের নিকট এই নিবেদন কচ্চে যে, এ
বৎসর প্রচুর বরষাভাবে তাদিগের ভালরূপ আবাদ হয়
নাই, এজন্য রাজস্ব সম্বন্ধে মহারাজের বিচার প্রার্থনা।
রাজা। মন্ত্রি। এ বিষয়ে তােমার অভিপ্রায় কি ?
মন্ত্রী। মহাভাগ। এ দাসের এই অভিপ্রায় যে, প্রজাদের
এক বৎসরের কর ক্ষমা করা হ’ক, আর তা’দিগকে
এই সংবাদ দেওয়া হ’ক যে, আগামী বৎসর যে প্রজা
সাধ্যমত যত অধিক জমীতে আবাদ করে ভালরূপ।
ফসল জন্মাতে পারবে, তারই রাজস্ব সম্বন্ধে বিশেষরূপে
বিবেচনা করা যাবে। আর অধিকন্তু সেই অনুসারে
তাকে রাজ সরকার হতে পুরস্কারও দেওয়া হবে।
প্রজা সন্তান, প্রজাকে রক্ষা করাই ধর্ম।
রাজা। (অপর সকলের প্রতি) কেমন, তােমাদের কি অভিপ্রায়।
কোষা। ( সকলের প্রতি চাহিয়া মহারাজ। মন্ত্রী মহাশয় যা
বল্লেন, তা সৰ্ববাদী সম্মত।
রাজা। বেশ, উত্তম।
বিদু। মন্ত্রী মহাশয়! ইচ্ছে হয় আমি আপনার গুণের বাঁধন
হয়ে থাকি। বলব কি, আমার আগেকার মনীবের

শুকদেব। হাতে এই রকম দরখাস্ত এলে, তার ঘুঘুরূপী মন্ত্রণা- দাতাগণ এই বন্দোবস্ত কত্তেন যে, সর্বাগ্রে প্রজাদের সৰ্বস্ব লুণ্ঠন ; তৎপরে কর্মচারী ঘুঘুগণ কর্তৃক লুষ্ঠিত দ্রব্যসব আপনা আপনি ঘরে ঘরে চুল চিরে বন্টন। তার পর প্রত্যেকের বাড়িতে দিনকয়েক চত চব্য চূষ্য লেহ পেয় এই চাতুৰ্বিধ সণ্টন; আর উপ- সংহারে, মনীবকে একটা যা তা করে বুঝিয়ে দিয়ে, তার হাতে দিত উত্তম আওয়াজদার একটি ঘন্টন। মন্ত্রী। বিদূষক মহাশয় ! ‘দিনকরেক সণ্টন’-এ কি রকম? বিদূ। আজ্ঞা, এটাও বুঝতে পাল্লেন না? সেই কর্মচারী ঘুঘুদের চাকরিই হচ্চে লুণ্ঠন, তাতেই যে ক’দিন চলে সণ্টন ; তার পর যে ঠক্ ঠক্ সেই ঠন্ঠ। রাজা। বল কি বয়স্য ? বিদূ। আর কি বম্ব মহারাজ ? একি আপনার রাজ্য ? যে অমাবস্যার রাত্তির কি পূর্ণিমার রাত্তির, কিছুই প্রভেদ নাই? বারমাস রাত্তিরে রাজধানীতে সরকারী আলাে জ্বলচে? বারমাস সরকারী চাদের আলো ? রাজপথের দু'ধারে চাঁদের মালা? প্রজারা রাত্তিরে নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে থাকে, আর রাজপ্রহরীরা পাহারা দিয়ে তাদের সর্বস্ব রক্ষা করে ? লেখা পড়ার উন্নতি হচ্চে? বড় বড় প্রজাদের সম্মান রক্ষা করে তাদের উপর বড় বড় উপাধি দেওয়া হচ্ছে। হাসি, সুখ, ঐ, শান্তি, এদের

কদেব।
দুর্ভিক্ষের নামটি পৰ্য্যন্ত নাই ? একি আপনার রাজ্য
মহারাজ
রাজা। (প্রধান কর্মচারীর প্রতি) আর সব দরখাস্ত
কোথাকার?
প্রঃ ক। মহারাজ! দ্বিতীয় দরখাস্ত কতকগুলি বণিকের।
কতকগুটি
রাজা। তারা কি বচে ?
প্রঃ ক। মহারাজ। তাদের এই নিবেদন যে তাদের বিক্রয়
বড় কম হচ্ছে। সেই জন্য তাদের রাজস্ব সম্বন্ধে
মহারাজের বিচার প্রার্থনা।
রাজা। মন্ত্রি। এতে তােমার অভিপ্রায় কি ?
মন্ত্রী। মহারাজ! এ দাসের এই অভিপ্রায় যে, বহুকালব্যাপী
একটি শিল্প প্রদর্শিনী মেলা খােলবার হুকুম হক।
তাতে অনেক প্রদেশের অসংখ্য যাত্রীর সমাগম হবে।
তা হলেই সমস্ত বণিক দোকানদার প্রভৃতি নানা
ব্যবসায়ীর দ্রব্য সকল প্রচুর পরিমাণে বিক্রয় হবে।
রাজা। ( সকলের প্রতি) কেমন, তােম্ কি বল,
কোষা। এ অতি সুন্দর পরামর্শ।
বিদু। (গাত্ৰোথান করিয়া) সাধু সাধু সাধু। মহৎ লােক,
অতি মহৎ লােক, খুব অতি মহৎ লোক। খুব বড়, খুব
বড়তর, খুব বড়তম। এমন না হলে মন্ত্রী ? মহারাজ ।
আমাদের মন্ত্রী মহাশয়ের কথা শুনে বলব কি, সৃষ্টি-
কর্তার উপর রাগ হচ্ছে।

৫৮.
শুকদেব ।
।
রা। সে কি বয়স্য, সৃষ্টিকর্তা আবার কি কল্লেন ?
বিদু। আজ্ঞা, তিনি নিজে কিছু করেন নাই, তবে আমাদের
সু-মন্ত্রীর মত তাঁর একজন মন্ত্রী থাকলে, তাঁর ও
আমাদের আরও ভাল হত।
রাজা। সে কি রকম ?
বিদু। আজ্ঞা, আমাদের মত তার একজন ভাল মন্ত্রী থাকলে,
সেই মন্ত্রীর পরামর্শে, তিনি, এমন যে স্বর্ণ, সােণা, তার
গায়ে গন্ধ রাখতেন; ইক্ষু গাছে ফল ফলাতেন; চন্দন
গাছে ফুল ফুটাতেন; পণ্ডিতদের অমর কত্তেন ;
রত্নাকরের জলকে মিছরির সরবতের মত মিষ্টি কনে ;
চাদের ক্ষয় রাখতেন না; যার ধারি, তাকে শীঘ্র শী
যমালয়ে না পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতেন না; আর যারা
ধরে, শুদের গুদ তস্য গুদ সমেত তাদের হাজির কত্তে
কাল ব্যাজটি কত্তেন না।
মন্ত্রী। বিদূষক মহাশয় ! আপনি মহা পণ্ডিত ; আপনি
যথার্থ জ্ঞানী ; আপনিই ধৰ্ম্মকে চিনেছেন।
রাজা। বয়স্ক ! যা বল্লে বলে, আর এমন কথা বলােনা। এখন
যা বল্লে, তার জরিমানা স্বরূপ উপস্থিত এই মালা
ছড়াটি নেও। (নিজের গলার মালা বিদুষকের গলায়
পরাইয়া দিলেন)
বিদূ। মহারাজ ! এ গরিব ব্রাহ্মণের একটি দরখাস্ত আছে।
রাজা। তােমার আবার কি দরখাস্ত ? বয়স্ক ।

বিদু। মহারাজ! আমাকে যে অট্টালিকা দিয়েছেন, তা ছাড়া
আর এক খানি সামান্য পর্ণ কুটীরের হুকুম হক।
আমি ব্রাহ্মণীর সঙ্গে সেই কুটীরে বাস করবে।
রাজা। এর কারণ কি বয়স্য ?
বিদু। আজ্ঞা, তার কারণ এই যে, অট্টালিকায় বাস কল্লে,
তার ভাবনায় মন খামকা গরম হয়ে যায়। গব্যঘৃত
আবরনী অন্ন ভিন্ন, উলঙ্গ অন্ন মুখে রােচে না। উত্তম
উত্তম পরিচ্ছদ ভিন্ন সামান্য কাপড়, পরা দূরে থাক,
একবার দেখতেও চক্ষু রাজি হন না। শকট ভিন্ন বাইরে
যেতে মন বড়ই কেমন কেমন করে, দু’পা চলতে চরণ
জোড়াটি বড়ই নারাজ হয়। জগতের লােককে তৃণ তুল্য
জ্ঞান হয়। আরও খুজে দেখলে অনেক সন্ধি পাওয়া
যায়। তাই বলচি, মহারাজ! আর সন্ধিতে কার্য
ই, এখন লােপ হয়ে গেলেই বাঁচি।
একজন দৌবারিকের প্রবেশ ও রাজাকে প্রণাম।
রাজা। কি দৌবারিক
দৌবা। মহারাজ। রাজাচাৰ্য মহাশয় এসেছেন।
প্রার্থনা-কোন বিশেষ প্রয়ােজন বশতঃ মহারাজের
সহিত একবার সাক্ষাৎ করেন। এক্ষণে মহারাজের
অভিরুচি।
রাজা। (স্বগত) বিশেষ কারণ। বােধ হয় কোন নূতন
সংবাদ আছে।( প্রকাশ্যে আচ্ছতাকে পাঠিয়ে দাও।

দৌব। যে আজ্ঞা।
(প্রণাম ও প্রস্থান)
বিদ্যু। (স্বগত) এইবার দেখচি চারটি ঘুলিয়ে গেল। এত
রকম সকম করে চারটি জমিয়ে এনেছিলুম, এইবারে
দেখচি রসাতলে যায়। (প্রকাশ্যে ) বলি, মন্ত্রণা গৃহে
রাজাচাৰ্য কেন? ঠাকুর ঘরে নাস্তিক কেন? খালি
ঘরে চোর কেন ? বাঁড়া গাছের গােড়ায় জল ঢালা
কেন? কুজোর পাঁচ হাত লম্বা বিছনা কেন?
আইবড় সম্বন্ধীর, ভগ্নিপতির যষ্টি বঁটার কাপড় দেখে
ব্যপান কেন ?
রাজাচার্য্যের প্রবেশ।
পাচা। মহারাজের জয় হক।
রাজা। আসতে আজ্ঞা হ’ক। কি প্রয়ােজন আচাৰ্য মহাশয়।
আচা। মহারাজ। ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব এসেছেন
রাজা। শুকদেব ? বালক শুকদেব ? কার কাছে এসেছেন ।
আচা। আজ্ঞা, মহারাজের কাছেই এসেছেন।
রাজা আমার কাছে ? কি জন্য? হেতু অবগত হয়েছেন ।
আচা। আজ্ঞা না। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিছুই বলেন নাই।
কেবল মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ প্রার্থনা। তবে এই
মাত্র বলছেন যে, ‘সব পণ্ড হ’ল, জন্ম বৃথা হ’ল, রাজর্ষি
জনকের জন্মই সার্থক। আর মধ্যে মধ্যে দীর্ঘ
নিখাস ফেলছেন।

শুকদেব।
০
রাজা। (স্বগত) হাঁ, কতক কতক বুঝতে পাচ্চি।( প্রকাশ্যে )
এখন তিনি কোথায় আছেন ?
আচা। আজ্ঞা, আমার চৌবাটীতে।
রাজা। আচ্ছা, তাকে আমার তােরণ দ্বারে এসে দাঁড়াতে
বলুন।
আচা। যে আজ্ঞা। মহারাজের জয় হক।
( প্রস্থান।
!
বিদূ। মহারাজ! শুনিচি, শুকদেব বালক হয়েও বিশেষ জ্ঞানী।
রাজা। হাঁ বয়স্য, মন্দ নয়।
বিদু। একটু ‘কিন্তু’ রাখলেন কেন? মহারাজ ।
রাজা। কিন্তু কার পক্ষে নাই ? বয়স্য ।
বিদূ। মহারাজ ! বাচালতার জন্য ক্ষমা করবেন। বড় কৌতূ
হল হল। শুকদেব সম্বন্ধে কৃপা করে একটু বিকাশ
হলে কৃতার্থ হই।
রাজা। শুকদেব বােধ হয় কিছু জানবার জন্যই আমার কাছে
এসেছে। এখন চল বয়স্য ! একটু স্থানান্তরে যাওয়া
যাক। মন্ত্রি । আজ এই পর্যন্ত থাক।
মন্ত্রী। যে আজ্ঞা মহারাজ।
[ সকলের প্রস্থান।

কদেব।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
ত
রাজর্ষি জনকের লীলা কানন।
শুকদেবের প্রবেশ।
শুক। (চতুর্দিক দেখিতে দেখিতে) একি? আমি কোথায়
এলেম ? এ যে একটি সুন্দর কুশুম কানন। রাজর্ষি
জনক কি তবে বিলাস প্রিয় ? (পরিক্রমণ । তার
দেখা পাচ্ছিনা কেন? যে আমায় এখানে পাঠিয়ে দিলে,
সেই বা কোথায় গেল?
গীত গাহিতে গাহিতে বারনারিগণের প্রবেশ।
ভৈরবী-দারা।
ফুটলে কলি, জুটবে অলি, লুটবে পরিমল।
এলে নাগর, করবি আদর, বাবি অবিরল,
ভাল বাসবি অবিরল।
আয়লাে আয়, প্রাণ সজনি। নদীর কুলে চল্ চল্ চল্,
মলয় বায়ে নাচে কেমন,লহরী বুকের মাঝে ঢল ঢল ঢল,
তত্ত্বরিয়ে ভাচে তরী, যৌবনে নাবলাে যেন চল্,
রসের রসিক এসেনাবিক,করে পার দেবি কেমন চল্।
ক! তােমরা কারা?
১ম র। আমরা পুরুষের ছায়া।
তক। তােমরা এখানে এলে কেন ?

কদেব।
৬৩
২য় র। আমাদের দেশের নিয়ম পালন কন্তে।
শুক। কি নিয়ম ?
৩য় র। আমাদের দেশের নিয়ম এই যে, কোন বিদেশী যদি
আমাদের রাজর্ষির সঙ্গে দেখা কত্তে আসেন, তা হলে
আমরা তাকে প্রথমে পরীক্ষা করে দেখি যে তিনি
রাজর্ষির সঙ্গে দেখা করবার যােগ্য কি না।
শুক। কৈ? যিনি আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিলেন, তিনি ও
আমাকে এ কথা বলে দেন নাই
খ র। এ নিয়মত বাইরের লােকে জানেনা? এটি আমাদের
ঘােয়া নিয়ম।
।
শুক। তােমরা আমাকে কি বিষয়ে পরীক্ষা করবে।
১ম র। প্রথম পরীক্ষা করবে ‘মনের। আমরা প্রথমে দেখবাে
বে, আপনার মন কতদুর উন্নত ।
শুক। আমার মন কি আমার কাছে আছে যে, তাকে পরীক্ষা
করে দেখবে উন্নত কি অবনত?
১ম র। আপনার মন তবে কোথায়?
শুক। রাজর্ষি জনকের কাছে।
২য় র। আর তারই মন যে আমাদের কাছে।
শুক। তার মন তােমাদের কাছে ? তােমরা কারা ? প্রকৃত
উওর দাও।
২য় র। আমরা বারনারী।

৩৪
শুক। (চমকিত হইয়া) তাঁর মন তােমাদের কাছে ? রাজর্ষি
জনকের মন বারনারীদের কাছে ?
শুক। মনই ত সব কাৰ্য্য করে। আবার পাত্র ও কাৰ্য্য
ভেদেত মান অপমানের উৎপত্তি, তার কি এ জ্ঞান
নাই ? ভাল, তর মন যদি তাঁর কাছে নাই, তবে তার
কাৰ্য্য করে কে? আর তার এত মানইবা কিসের?
৪র্থ র। যার মন নেই, তিনি আর কি কাজ করবেন ? আর
তার মানইবা কিসের ? রাজর্ষির যা কাজ, তাত
আমরাই করি। আমরা যে প্রকৃতি, প্রকৃতিই যে
সব কাজ করে। আবার প্রকৃতি-ভেদে প্রবৃত্তির
তারতম্য, তা’ত জানেন? কাজে কাজেই, মন যখন
কোন কাজ করে, তা প্রকৃতিগত প্রবৃত্তির অনুরােধে।
ধৰ্ম্মগত প্রকৃতি, প্রেম ভালবাসা মন যদি এই তিন
জনকে সঙ্গে নিয়ে সব কাজ করে, তাহলেইত জগতে
তার কাজ করা হলাে। প্রেমময়ের সঙ্গে অন্তরে
অন্তরে প্রেম না কল্লে কি কোন কাজ হয় ?
গীত।
ঝিঝিট—দারা।
বাতে যে জন জানে ভাল, তার কি থাকে মান ?
উধাও হয়ে উড়ে যায়, সে মানের অভিমান।
মনে মনে কল্পে রমণ, আঁধার কি আর লাগে ?

কদেব।
আলােয় এসে ঘেসে বসে, বাণ মারিলেতাগে,
আর কি নগর থাকতে পারে? অমনি মিসে যান,
দেহে অমনি মিশে যান,
তবে-সঙ্গোপণে সে নাগরে মারনা কেন বাণী
১ম, ৩য় র। তেল গায়ে মাথে যে জন জল দুনিয়ার,
জল কি কভূ লেগে থাকে গায়েতে তাহার ?
সর্দী কি তার লাগে, যে জন করে এমন চান ?
তবে-রুক্ষু গায়ে চান করে তুই হারাম কেন প্রাণ?
শুক। তােমরা কারা ? দেবী না মানবী ?
১ম র। আমরা মুর্তিমতী প্রেম। আমরা পথ দেখাবার আলাে।
( সকলে এক একটি
আলাের গেলাস হাতে লইয়া।)
জলের উপর তেলটি দেখ, পলতে জ্বলে তায়,
পতে, দেখ, ঠেকলে জলে, আপনি নিভে যায়।
মাথার আলাে জলে এসে আপনি নিভে যান,
দেখ, আপনি নিভে যান,
একমনেতে জ্বলে এলে হয়রে নির্বাণ।
শুক। জগতে তােমাদের কি কাজ?
১ম ব। আপনার পিতামহী সত্যবতী-মৎস্যগন্ধা, আপনার
জননী পিবরী জগতে কি কাজ করেছেন ? বশিষ্ঠের স্ত্রী
অরুন্ধতী কি কাজ করেছেন ? কশ্যপের দুই স্ত্রী, দিতি ,
আর অদিতি, জগতে কি কাজ করেছেন? জগৎসংসারে

শুকদেব।
প্রবেশ কত্তে কি আপনার মন আছে যে, আমরা কি
কাজ কচি আপনাকে বলবাে, আর তা বল্লে আপনি
বুঝতে পারবেন ?
শুক। তােমরা যে আমাকে ঘাের সংশয়ে ফেলে দিচ্চ।
২য় র। বলি, গােস্বামী মহাশয়। আকাশে পাখী সব দুটো
ডানা ছড়িয়ে উড়ে যায় দেখতে পান ত? ওরা কি
একটা ডানায় উড়তে পারে ?
শুক। না, না কখনই পারে না।
২য় র। আমরা মানুষ-রূপে পক্ষী। আমরা দু’ট ডানায়
সংসারে বিচরণ করি। একটা ডানা হচ্ছে ক্রিয়া,
আর একটা হচ্চে জ্ঞান।
শুক। এ জ্ঞান তােমরা কোথা থেকে পেয়ে ?
৩য় র। আমাদের প্রাণের ঈশ্বর যিনি, তাঁর কাছ থেকে
পেয়েছি।
শুক। কে তিনি? কে সে মহাপুরুষ ? :
৩য় র। আর কে ? রাজর্ষি জনক ?
১ম র। আমরা হচ্চি জীবাত্মা, আর তিনি হচ্ছেন পরমাত্মা।
আমরা হচ্চি স্বর্গ-বিদ্যাধরী, আর রাজর্ষি হচ্চেন
দেবরাজ। তা এ সব আপনি কি বুঝবেন? আপনি
যখন একটা ডানার জোরে সংসারে বিচরণ কত্তে
চেষ্টা কচ্চেন, তখন আমাদের ধর্ম, আমাদের মৰ্ম্ম,
আমাদের কাজ আপনাকে আর কি বুঝিয়ে দেব ?

শুকদেব।
আপনি যে যােগ টোগ কচ্চেন, তাতে একেবারেই
গােযােগ।
শুক। তা হলে, জগতে কি আমার কোন কাজই হচ্ছে না?
২য় র। বলি, দুটো জিনিষের মিলনকেত যােগ বলে ? বীজ
মাটিতে পুতলে, মাটির রসের সঙ্গে সেই বীজের সারের
সঙ্গে যােগ না হলে কি অঙ্কুর হয় ? না সেই বীজ
থেকে ফলের আশা করা যায় ? আপনার শুনাে প্রাণে
প্রেমের রস কৈ ? সংসারের মর্ম কি ?
হয় র। বলি, গােস্বামী মহাশয় ! এই গুরুজনের উপর স-প্রেম
ভক্তি, স্ত্রীর উপর স-প্রেম ভালবাসা, সন্তানের উপর
স-প্রেম স্নেহ, সমস্ত জীব জন্তুর উপর স-প্রেম যত্ন মমতা
স্নেহ দয়া ভক্তি ; সকল জিনিষেই যখন প্রেম রয়েছে,
তখন সেই প্রেমকে চিনব না? হয়ে কেন মরিনা ?
জগতে এসে, প্রেম যে কি অমূল্য জিনিষ, তা চিনব
? প্রাণে, প্রেমের অঙ্কুর বেরিয়ে ফলে ফুলে শােভা
হবে না ?
৪র্থ র। গােম্বামী মহাশয়। ঐ ভক্তির প্রেম, ঐ ভালবাসার
প্রেম, ঐ স্নেহের প্রেম, ঐ মমতার প্রেম, সব প্রেম
জড়াজড়ি করে মিশে গিয়ে যে এক অদ্ভূত প্রেম হয়,
সেই প্রেমেই যােগ হয়, কাজ হয়, যা মনে করবেন
তাই হয়। বলি, ঠাণ্ডা জলে চাল দিলে কি ভাত হয় ?
আগুণের তাতে জল না তালে কি সে চাল নরম হয় ?

শুকদেব
গীত।
সিন্ধু-যৎ।
কি করিতে এলেন এ ভবে ?
১ম র। আঁখি নিয়ে দিশে হারা কেন হও তবে ?
মহৌষধি কোথা পাই? কারইবা নিকটে যাই?
২৪ র। নাড়ী যদি দেখাও ভাই, ওষুধ দিই তবে ।
তােমরা যদি কবিরাজ, রাজর্ষিতে কিবা কাজ ।
দেখো তবে, যােগীবর ! শেষে যা হবে।
রমনিগণ।
সিন্ধু—দাদা।
তােমার যে হয়েছে বিকার ;
দিনে দিনে হচ্চ তাতে অস্থি চৰ্ম্ম সার।
রােগটি এখন দেখছি যেমন,
ওষুধ যদি পড়ে তেমন,
আরাম হয়ে সুখের ভবন করবে অধিকার ;
বলি-কার দেশে এসে কেন দেখছে নিরাকার ?
পীরিত আলােয় রাখলে মনে,
দেখতে পাবে প্রেম রতনে,
জলের মতন দুধের সনে থাকবে এককার,
তাই বলি হে প্রেমিক হয়ে থারাে প্রেমের ধার ।
( সকলের প্রস্থান।

:
তৃতীয় দৃশ্য।
রাজর্ষির বাটীর সম্মুখ। দূরে তােরণ দ্বার।
(কালসন্ধ্যা। রবি অস্তাচলগামী)
পীত গাহিতে গাহিতে রাখাল বালকগণের প্রবেশ।
পুরবী-দা।
বেলা গেল, সন্ধ্যা হল, চল্ চল্ চল্ ঘরে যাই।
সূয্যি মামা বচে পাটে, চাদা মামা উঠচে ভাই।
( আকাশ দেখাইয়া ) ঝাঁকে ঝাঁকে পাকী গুলি,
ঘর মুকো স যাচ্চে, বলে কিলি কিলি বুলি,
(নেপথ্য দেখাইয়া) বউ যাচ্চে চড়ে’ ঐ ডুলি, (কাদের)
আবার-ওই দেখ, সব, দলে দলে, যাচ্চে বলদ গাই
দেখ দেখ, দেখ, গাঙ্গে কেমন জল কুলি কুলি,
কলসী কাকে জল নিয়ে সব, যাচ্চে মেয়ে গুলি,-
ফুল ফুটেচে গায়ে গায়,
ফুলের বাস সব নিয়ে কেমন বইচে মলয় বায়,
ভােগ্রা কেমন মধু খাচ্চে তায়,
চল্ চল্ চল্ আমরা দুট ফুল নিয়ে পালাই।
[ দৌড়াইতে দৌড়াইতে সকলের প্রস্থান।
শুকদেবের প্রবেশ।
শুক। কি আশ্চর্য্য।
ছয় দিন দিবা নিশী, আলােক আঁধারে মিশি,
অনাহারে অনিদ্রায় করিয়া যাপন,

রহিয়াছি যার আশে, শুষ্ক কণ্ঠে উৰ্দ্ধশ্বাসে
পেলেম ন সে রাজার শুভ দরশন ?
নানা স্থানে মিথিলার, ঘুরিতেছি বার বার,
প্রাসাদেরে করিয়াছি শত প্রদক্ষিণ ।
পরিহরি নিজদেশ,
যাতনার নাহি শেষ,
কাটাতে কি হ’ল কাল হয়ে দিন হীন?
দেবর্ষি কি চুল করে’
পাঠালেন এ নগরে।
অবশেষে ভুলিনু কি তার ছলনায়।
মনের বাসনা যাহা, অপূর্ণ কি রবে তাহা ।
ভগ্নহৃদে ফিরিতে কি হইবে আমায়?
তাহাই যদ্যপি হবে,
রাজ-ঋষি কেন তবে
বলেছেন উপস্থিত থাকিতে আমায়।
নাহি হয়ে *ন্দিহান,
করিয়ে অভিমান,
তাই তাঁর দয়া আশে রয়েছি হেথায় ?
অবশেষে কিবা রূপ
পরীক্ষা করিয়া দূপ
লইয়া যাবেন মােরে আলােকের দেশে?
দেখাইবা কোথা ঠার ?
পলে পলে অন্ধকার
ঘেরিল যে হৃদি মাের মিথিলায় এসে ?
গুরুর আদেশ মত,
ঘুরিতেছি অবিরত,
দুৰ্বল হৃদয়ে আর কত দুঃখ সয় ?
সহিলাম এত যদি,
রব তবে তদবধি,
যে অবধি সৌভাগ্যের না হয় উদয়।

A
(নেপথ্যে-সন্ধ্যা সুচক গীত।
গৌরী—আড়াঠেকা।
রােহিণী আগত দেখি লাজে রবি লুকাইল।
প্রদোষের ছায়া আসি রঙ্গে রঙ্গে মিশাইল ।
হরিতে তিমির রাশী, উদিত হইল শশী,
ফুটিল তারকা রাশী, কুমুদিনী বিকসিল।
তমাল কুলবালা, নাশে জ্বালি দীপমালা,
শঙ্খ ঘণ্টা ঘণ্টারােলে সুমঙ্গল আচৰিল :-
সায়ং সন্ধ্যা সমাপন, বেদাদি স্তব পঠন,
দেবে সেবি’ দ্বিজগণ, শাস্ত্র আলাপে বসিল।
অক। আহা!
কি মধুর! কি লালিত্য । সুর ব্ৰহ্ম সত্য নিত্য,
সুর যােগে সুরজ্ঞান হৃদে উঠে জাগি।
সেই জ্ঞান কৃপা করে, দাও, নাথ ! এ পামরে,
কায় মনে এই ভিক্ষা তব পদে মাগি।
( অস্তমিত রবিকে দেখিয়া )
অস্তমিত দিনমণি,
সমুদিত নিশামণি,
ত্রিযামা সাজিছে কিবা মধুর বরণে।
দু’চার দণ্ডের পরে,
জীব জন্তু অকাতরে,
লীন হবে নিদ্রা অঙ্কে ঘাের অচেতনে।
কি—আমার কি হ’ল শেষে। আসিয়া সুদূর দেশে
রাজর্ষি-আলয়ে এসে কাটাতেছি কাল ;

৭২ •
শুকদেব।
-
অজ্ঞাত বংসের মত, ঘুরিতেছি ইতস্ততঃ,
এত বড় দায় হ’লবিষম জঞ্জাল ।
একজন লােকের প্রবেশ ।
লােক। তুমিই কি শুকদেব, ব্যাসের তনয়,-
অতিথি হয়েছ রাজ-ঋষির আলয় ?
শুক। আজ্ঞা হাঁ; কিন্তু কোথা অতিথি সৎকার ?
ছয় দিনে পেলেম না দরশন তাঁর ?
লােক। (সহাস্যে) ছয় দিন কি বলিছ ? যা’ক যুগ ছয়,
তবে যদি লম্পটের দয়া কিছু হয়।
শুক। লম্পট ?-এ কি কথা বলিছ কাহায় ?
সােক। আসিয়াছ যার কাছে এই মিথিলায়।
শুক। এসেছিত মিথিলার রাজার নিকট।
লােক। তার মত কেবা আছে মাতাল, লম্পট ?
শুক। লম্পট মাতাল, যিনি মিথিলার রাজা ?
লােক। কেন তার কথা কয়ে কর ভাজা ভাজা ?
শুক। জ্ঞানীর প্রধান সবে বলেনা হায় ?
লােক। অজ্ঞানী তাহার মত কে আছে ধরায় ?
শুক। তাপস প্রধান তাকে বলেন সকলে ?
লােক। নাস্তিক তাহার মত কে আছে ভূতলে ?
শুক। রাজ-ঋষি তঁাহারে না সব লােকে বলে ?
লােক। এ যশ হয়েছে তার পূর্বজন্ম ফলে।
[ প্রস্থান।

৭৩
.
শুক। একি ।
‘রাজ-ঋষি’আখ্যা তার, সাক্ষাৎ ধৰ্মাবতার,
যশ তার গাহিতেছে জগৎসংসার;
কিন্তু একি চমৎকার। দোষ তাঁর ব্যভিচার ?
পাপের মূরতি, যিনি রাজা মিথিলার ?
( ক্ষণেক চিন্তা )
শুনিলাম যাহা যাহা, সত্য যদি হয় তাহা,
কিসের আশায় তবে আসিনু হেথায় ?
কাহার নিকটে যাই। কার কাছে জ্ঞান পাই ?
কে আমায় লয়ে যাবে সাধনা যেথায় ?
( পট পরিবর্তন। এক গৃহ। তন্মধ্যে নানাবিধ বংশীর ধ্বনি,
ও বারনারিগণ সহ রাজবেশে রাজর্ষি জনকের
কেলীর দৃশ্য প্রকাশ।)
শুক। (দেখিয়া সবিস্ময়ে ওকি ) ওকি ?
ঝটিতি লােকের পুনঃ প্রবেশ।
লােক। আর ওকি,দেখে যাও লীলা জনকের।
যতই দেখিবে, তত বেড়ে যাবে জের।
শুক। উনিই জনকঋষি, রাজা মিথিলার ?
লােক। অজ্ঞা হা,–দেখে যাও লীলা কত তার।
[ প্রস্থান।
শুক। শুনিলাম যাহা যাহা, চক্ষের উপরে তাহা ?
রিপুমদে মত্ত সদা মিথিলার পতি ?

৭৪ ।
আমায় কি ছলনায় রেখেছেন মিথিলায় ?
উনি কি দেবেন বলি’ কোথা কার গতি ?
মিলি’ শত শত নারী,
সু কু না বিচারি,
আদি রসে রত সদা লম্পটের প্রায় ?
এই কি জ্ঞানীর কাজ ? পরিহরি মান লাজ,
সামাজিক বিধি সব দলিছেন পায় ?
( পট পরিবর্তন পূৰ্বের রাজবাটীর সম্মুখ, দূরে তােরণ-দ্বার)
সংসার কাননে পশি’ সর্বাঙ্গে মাখিয়া মসী,
ঢেকে কি রাখিতে হয় গেরুয়া বসনে ?
এই কি রাজারাচার ?
যাকে ধৰ্ম্ম অবতার
বলে সবে সগৌরবে এ তিন ভুবনে ?
পিতা তবে কি ভাবিয়া, আমাকে আশ্বাস দিয়া,
পাঠালেন মিথিলায় জনকের কাছে ?
খুজিতেছি আমি যাহা, জনক দেবেন তাহা ?
লম্পটের কাছে তবে কিবা ধন আছে ?
বীতস্পৃহ বীতভয়,
রিপু-অরি করি জয়,
শুদ্ধমনে সুধীসনে থাকিবে সংসারে।
কিন্তু একি চমৎকার ! সব বীপরিতাচার ?
পাপের কি জয় হয় ধর্মের বাজারে ?
এই কি কালের গতি
সমাজ করিবে নতি
পাপ-পূর্ণ রাজ-পদে গতবস্ত্র হয়ে ?
?

শুকদেব ।
কালে এই হ’ল শেষে। অধৰ্ম্ম আসিয়া হেসে
জিনিছে পুণ্যেরে আজি দল বল লয়ে ?
(পট পরিবর্তন। কক্ষ। তন্মধ্যে নানা কোমল যন্ত্রের ধ্বনি,
ও তাপস বেশে রাজর্ষির দক্ষিণ কর অগ্নিমাঝে, ও বাম কর
এক যুবতীর বক্ষে। এই দৃশ্য প্রকাশ।)
ওক। (দেখিয়া সভয়ে সবিস্ময়ে )
ওকি ওকি ? ওকি দেখি ? জ্যোতির্ময় মূর্তি কার?
দক্ষিণাঙ্গ আবৃত পাবকে ?
অগ্নি অঙ্গে দিয়া কর,
হাসিছেন ফুল্লমনে,
তুষিছেন যেমতি বালকে ?
পুনঃ ও কে বামদিকে ?
প্রেমময়ী মূর্তি কার ?
রূপে জিনি’ মদনের রতি ?
পুরুষের বাম কর
পীন পয়ােধর পরে ?
কেবা উনি সুন্দরী যুবতী ?
কে উনি পুরুষষর ? পুনঃ দেখি ভাল করে
( বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিয়া )
তাইত, উনিইত জনক।
একি লীলা দেখি ওঁর। সুন্দরী যুবতী বামে,
দক্ষিণাঙ্গে জ্বলিছে পাবক।
অগ্নি মাঝে এক কর,
অপর যুবতী হৃদে,
মন তবে কোথা আছে তার ?

শুকদেব। (কিঞ্চিৎ ধ্যানান্তে চমকিত হইয়া) ০ মরি মরি, একি দেখি! মন বাধা ব্ৰহ্ম-পদে ? রাজ-ঋষি ধৰ্ম্ম অবতার ? সুখ দুঃখ সম ভাব, রসের নাবিক ভেদ, যুবতী পাবকে সম জ্ঞান ? ‘যুক্ত হয়ে মুক্ত’ প্রাণ, দেবাদি ঈশান যথা ? হৃদে সদা পূর্ণ-ব্রহ্ম ধ্যান ? মুক্ত ভাব আবরণে অন্তর রাখিয়া ঢাকি, নিবসেন সদা ব্ৰহ্ম সনে। আর-যুক্ত ভাব আচরণে, খেলিছেন সকৌতুকে, শিশু যথা কৌতুকের বনে ? একি খেলা অদভূত! খেলিতেছ এ সংসারে। কেবা তুমি মিথিলার পতি? এই কি পরীক্ষা মােরে করিতেছ অনন্তর- ক্ষুদ্র আমি ক্ষুদ্রতম অতি ? জ্ঞান দাও, জ্ঞান দাও, অহে ধৰ্ম্ম অবতার। রেখনা হে সন্দেহ দোলায় । গুঢ়তর গুঢ়তম, মনের বাসনা যাহা, পূর্ণ করে বাঁচাও আমায় ॥ [ প্রস্থান।

শুকদেব।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
রাজর্ষি জনকের পূজাগর।
পট্টবস্ত্র পরিধানে রাজর্ষি জনক যােগাসনে উপবিষ্ট।
সম্মুখে হােম কুণ্ড ; পাশ্বে কোশা কূশী, তাম্রকুণ্ড
ও সমাজে পুষ্পপাত্র।
দূরে গললগ্নিকৃতবাসে মায়া, গৈরিক বসনে দণ্ডায়মান।
রাজর্ষি, পুষ্পপত্র হইতে একটী পুষ্প লইয়া, তাহাকে
মন্ত্রঃপুত করিয়া, মায়ার গাত্রে নিক্ষেপ করিবা মাত্র
মায়া। (কাতরকণ্ঠে করঘােড়ে ) হে মহাভাগ !
তেজময়! হে রাজৰ্যে ! ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন,
প্রাণ বধ করবেন না। নারীহত্যাপাপে লিপ্ত
হবেন না।
রাজা। ( সহাস্তে ) আমি নারীহত্যাপাপে লিপ্ত হব ?
মায়া। প্রভাে! আমিত আপনার শ্রীপাদপদ্মে কখন কোন
আপরাধ করি নাই ? তবে অকারণ দাসীর ভাগ্যে
এ দারুণ যাতনা কেন ?
রাজা। তােমার যাতনা অকারণ নয়। সংসারে তােমার
অসাধ্য কিছুই নাই। আমার উপর সৃজনের ভার
থাকূলে, তােমায় সৃষ্টি কত্তেম না।

৭৮। একবে। মায়া। (গীত) ভৈরবী-যৎ। রক্ষ অক্ষু রাজঋষি। বধ’না আমায়। ধরা হ’তে অধিনীরে কর’না বিদায়। ইচ্ছা করে ইচ্ছাময়, দিয়াছেন সঙ্গী ছয়, অবনী করিতে জয় তাহারি কৃপায়, বধ’না বধ’না তাই, বধ’না আমায় । জ্ঞানমার্গে আরােহণ, করে যেই মহাজন, নিবসেন ব্ৰহ্মসনে যেই তেজময়, আমার কি সাধ্য আছে, যাই আমি তার কাছে, তবে—বিধাতার ইচ্ছা পাছে লােপ হয়ে যায়, বধ’না বধ’না ভাই বধ’না আমায় । রাজা। (সহাস্যে) সন্তুষ্ট হলেম। এখন বর প্রার্থনা কর। কি বর চাও? মায়া। (করযােড়ে ) প্রভাে ! এই বর দিন যাতে শুক- দেবের দেহে নিরাপদে অবস্থান কত্তে পারি । ভগবান যখন আমাকে শৃঙ্খলরূপে সৃজন করেছেন, তখন পাত্র বিশেষকে বন্ধন কত্তে না পাল্লে, আমার যশের আশা কোথায় প্রভভ ? রাজর্ষে ! এই বৰ দিন, যাতে শুকদেবকে জয় করে তাকে প্রবৃত্তি মার্গে নিয়ে যাই।

শুকদেব।
রাজা। (স্বগত) উত্তম হয়েছে। প্রকারান্তরে • মায়াকে
এখন বর দিতে হবে, যাতে শুকদেবের তপস্যার
পথে কোন বিঘ্ন না হয়, অথচ মহামায়ার আদেশ
পালন করা হয়। ( প্রকাশ্যে,) তথাস্তু।
তােমার অল্পকাল স্থিতি পর্যন্ত জয় । ব্যাসদেবের
মানস সফল পর্যন্ত জয়। কশ্যপকে, বশিষ্টকে যে
পরিমাণে হস্তগত করেছিলে, সেই পৰ্য্যন্ত জয় ।
তার অতিক্রম হলে পৃথিবী মায়াশূন্য হবে।
মায়া। প্রভাে। ঐ শুকদেব কি আমার কম অপমান
করেছে ? পাছে আমার মুখ দেখাতে হয়, এই
ভেবে সে দ্বাদশ বৎসর পর্যন্ত মাতৃগর্ভে ছিল।
একি কম প্রগল্ভ যে, জীব সংসারে এসে মায়াশূন্য
হয়ে থাকবার বাসনা করে ?
রাজা। সত্য। কিন্তু আমি কি সংসার ছাড়া ? তুমি
আমার কত নিকটে আছ ?
মায়া। মহাভাগ ! দিবাকরের সঙ্গে কি খদ্যোতের তুলনা হয়?
রাজা। যাও তবে যাও। আমার কথা বিস্মরণ হওনা।
মায়া। যে আজ্ঞা। আপনার আদেশ শিরােধার্য।
দেবকে ক্ষণমাত্র অধিকার কত্তে পালে অপমানের
পরিশােধ হবে। এক্ষণে বিদায়।
[ রাজর্ষিকে প্রণাম করিয়া মায়ার প্রস্থান।
রাজা (হােম কুণ্ডে একটি আহুতি দিয়া) ও। (ধ্যানস্থ
হইলেন)

শুকদেব। :: ( নেপথ্যে-গীত ) বেহাগ-খয়রা। পাকের ভিতর পাকাল মাছের বাসা, ওরে ভাব, দেখি মন । বদেখি সে মাছের গায়ে, পা কে কোথা দেখেছে কখন ? হলুদ মেখে নামলে জলে, কুমীরে ধরে কি কখন ? মূল যদি ভুলটি করিস, অকুলে ভাসবিরে তখন। চক্ষু বুজে ঝড়ের মুখে, যদি তুই থাকিস্, ওরে মন! আর কি যত পথের ধূলাে, চোকে আর পড়ে রে তখন ? বিদূষকের প্রবেশ। বিদূ। (স্বগত) কি এক কিস্তুত কিমাকার গােস্বামীই ধরা- ধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। ইনি পূৰ্ব্ব জন্মে বােধ হয় আগ্নেয়গিরি, কিম্বা একটি কেঁদো বাঘ ছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি এ দু’য়ের এক টা ছিলেন। তা না হলে, প্রেম- ময়ের প্রেমের বাজারে এসে তিনি ছাতু খেয়ে মচ্চেন কেন? যার প্রাণের ভিতর প্রেমের ফোয়ারা নেই, যার প্রাণে প্রেমের স্রোত বয়ন, যার প্রাণে দু‘পন দশপন পীরিতের ফুল ফুটেনা, সে কি গােস্বামী পদবাচ্য হতে পারে, না তাকে গােস্বামী বলে’ ভক্তির বান ডেকে যায় ? (পরিক্রমণ ) আমাদের নূতন গোঁসাইকে দেখচি সৃষ্টি ছাড়া। প্রাণ একেবারে ধুধু মরু। (পরিক্রমণ ) বেড়ে হয়েছে, বেশ হয়েছে। যেমন চড়া তেমনি বান। বানের মুখে কি চড়া টড়া থাই পায় ? আজ ছ’দিন শুকদেব। ধরে’ বাছাধন চোকের জলে নাকের জলে হয়েছেন। ( পুষ্পপাত্র দেখিয়া ) এই যে ১০৮টি পদ্ম ফুল হােম- কুণ্ডস্থ হয়েছে। তবেত দেখহি পাক চড়েছে। রাজা। (ধ্যানান্তে বয়স্য ! বিদূ। মহারাজ। রাজা। শুকদেব কোথায় ? বিদু। আজ্ঞা, তিনি এখন পথে। রাজা। পথে ? কি রকম ? বিদূ। আজ্ঞা, তিনি আচার্যের সঙ্গে আসছেন। মহারাজ কি ওই বেশেই থাকবেন? রাজা। তােমার কি ইচ্ছা ? বিদূ। অমূল্য মণিকে একটি আচ্ছাদনের ভিতর রাখলে ভাল হয় না ? রাজা। ধূলাে কাদা সব মণির গায়ে না লাগে। যদি লাগে, তা হলে আচ্ছাদনের গায়েই লেগে থাকবে, ভিতরে প্রবেশ কওে পারবেনা। কেমন সখা। তােমার ত এই অভিপ্রায় ? বিদূ। মহারাজত অন্তর্যামী, তবে আর আমায় ও কথা আজ্ঞা কচ্চেন কেন ? রাজা। তবে তােমার যা ইচ্ছা হয় কর। তােমার বাসনা পূর্ণ হক। বিদূ। যে আজ্ঞা। [ প্রস্থান।

৮২ ০
শুকদেব
রাজা। { স্বগত) ব্যাসদেবের তনয়। শিবশক্তি সম্পন্ন।
পূর্ণবিবেকী। মানস, চিরকাল অচল অটল ভাবে
নিবৃত্তি মার্গে বিচরণ করা। আবার অপর দিকে-
ব্যাসদেব, মুনি ঋষিগণ প্রভৃতি সকলের অনুবােধ,
অচলকে চলৎশক্তি প্রদান করে প্রবৃত্তি মার্গে নিয়ে
যাওয়া। কিন্তু মা শঙ্করীর প্রত্যাদেশ, শুকদেবকে
সামান্য বেশে প্রবৃত্তিমার্গে আনয়ন না করা। সমস্যা
মন্দ নয়।
একপ্রস্থ রাজপরিচ্ছদ লইয়া বিদূষকের পুনঃ প্রবেশ।
রাজা। এই যে, সখা। যা বল্লে তাই কল্লে। এখন কি কত্তে
বিদূ। মহারাজের যা অভিরুচি।
রাজা। আচ্ছা, তােমার বাসনাই পূর্ণ হক।
( গৈরিক বসনের উপর রাজপরিচ্ছদ ধারণ করিয়া)
সথে ! লােকে আমাকে ‘বিলাসী’ বলে সমালােচনা
বিদূ। রাজর্ষে ! সে সমালােচনাকে রাস্তার ধূলাের মত
জ্ঞান কত্তে হয়। অর্থাৎ, তাকে পদদলিত করাই
বিধি। যার অন্তর্দৃষ্টি নাই, তার সমালােচনা করা
কেন? দোষ গুণের বাড়ি ত মনের ভিতর। যে সমা-
লােচক তা দেখতে পায় না, সে ত অন্ধ। যে অন্ধ,
আবার বুক ফুলিয়ে বিচার কত্তে যাওয়া কেন ?

শুকদেব।
০
(রাজাচাৰ্য, ও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শুকেদবের প্রবেশ।
অচা। মহারাজের জয় হক। রাজর্ষে ! এই শুকদেব
এসেছেন।
রাজা। (গাত্ৰোথান করিয়া) এসো, এসাে, শুকদেব !
( শুকদেবকে আলিঙ্গন )
শুক। ( করঘােড়ে, কাতরকণ্ঠে) মহাভাগ! রাজর্ষে ।
অজ্ঞান বালক বলে কি আমাকে এত কষ্ট দিতে হয় ?
রাজা। শুকদেব ! বয়সে তুমি বালক বটে, কিন্তু তােমার মত
জ্ঞানী, সাধু, পবিত্র মহাপুরুষ ত্রিসংসারে বিরল।
শুক। মহারাজ! এ যে আমার প্রতি অতি-উক্তি হচ্ছে ?
আবার অপর দিকে, আমি পবিত্র না হলে, আপনার
পবিত্র পাদপদ্ম দর্শন কত্তে আসবাে কেন? কেনইবা
আপনার শিষ্যত্ব স্বীকার কত্তে আসবাে?
রাজা। তুমি আমার শিষ্যত্ব স্বীকার করবে ?
শুক। ঐ আশাতেই মহারাজের নিকট আমার আসা ?
রাজা। তবে বল দেখি, শুকদেব ! কি জন্য আমার নিকট
এসেছ ?
শুক। রাজর্ষে! বলতে সাহস হয় না। মানস, যাবজ্জীবন
নিবৃত্তি মার্গে বিচরণ করি। দেবদেবের কৃপায়, এবং
তারই শ্রীমুখ হ’তে কিছু কিছু মুক্তি তত্ব অবগত হয়েছি,
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তার শেষাংশ, অর্থাৎ তার সার অংশ

৮৪ ০
শুকদেব।
টুকু লাভ হয় নাই। তাই, যাতে শেষাংশ টুকু লাভ
হয়, সেই আশায় মহারাজের নিকট আমার আসা।
রাজা। শুকদেব ! সীমান্তের পথ অতি দুর্গম। তুমি বালক,
পারবে কি ?. তবে পাৰ্তে পারাে যদি প্রবৃত্তি মার্গের
কিছু কিছু পরীক্ষা দিতে পারাে।
( শুকদেবের মৌনাবলম্বন)
রাজা। ( সহাস্যে) প্রবৃত্তি মার্গের কথাটা শুনে ক্ষুব্ধ হলে?
শুক। রাজর্ষে! ক্ষুব্ধ হয়েছি সত্য; কিন্তু যাতে চক্ষু মুদিত
করে পরীক্ষা দিতে পারি, সেই উপায়টি কৃপা করে
আদেশ করুন।
রাজা। মুদিত চক্ষে পরীক্ষা দেবার চেষ্টা কলে, অন্ধকার ভিন্ন
আর কিছুই দেখতে পাবে না, বরং তাতে পদে পদে
বিপদ ঘটবার সম্ভাবনা। তবে উন্মীলিত চক্ষে অন্ধের
ন্যায় যখন বিচরণ কত্তে পারবে, অথবা উন্মীলিত চক্ষে
জগৎকে যখন আত্মময় দেখতে পাবে, তখন পরীক্ষা
দেওয়া দূরে থাক, পরীক্ষা নিতে পারবে। তাই
বলচি, প্রবৃত্তি মার্গে বিচরণ ভিন্ন উন্মীলিত চক্ষে
অন্ধের ন্যায় ভ্রমণ কওে পারবে না, কিম্বা জগৎকে
আত্মময় দেখতে পাবে না। সুতরাং, এই ভিন্ন নিবৃত্তি
মার্গে আরােহণ করবার উপায়ান্তর নাই। এ
প্রবৃত্তি মার্গের পরীক্ষা দিতে হবে ।
শুক। রাজর্ষে! উপস্থিত, আমি কি পরীক্ষা দিতে পারব না ?

শুকদেব ।
.
রাজা। ( সহাস্যে) কি করে বলব? তােমার কত দূর অভ্যাস
হয়েছে তা ত জানি না ? তবে প্রথমে আমার গুটি-
কয়েক প্রশ্নের উত্তর কত্তে পাল্লে বুঝতে পারবাে।
শুক। যে আজ্ঞা, তবে প্রশ্ন করুন।
রাজা। প্রথম সােপান অতিক্রম করে দ্বিতীয় সােপানে
আরােহণ কত্তে গেলে, প্রথম সােপানকে কি স্পর্শ
কত্তে হবে না ?
শুক। আজ্ঞা হাঁ, স্পর্শ কত্তে হবে।
রাজা। আচ্ছা। কোন দ্রব্যের আস্বাদ না পেয়ে, তাকে
পরিহার করাকে কি ত্যাগ স্বীকার বলে ?
শুক। আজ্ঞা না, রাজর্ষে।
রাজা। উৎপত্তিই যখন সংসারের শ্রী, আর সংসার যখন তার,
তখন আমাদের দ্বারা তার সংসারকে শ্রীহীন করে’
রাখা কি ভগবানের অভিপ্রায় ?
শুক। আজ্ঞা না।
রাজা। ক্রিয়া না কল্লে কি ক্রিয়াশূন্য বলা যায় ? গৃহ প্রবেশ
কল্লে কি গৃহত্যাগী বলা যায় ?
শুক। আজ্ঞা না, রাজর্ষে !
রাজা। তা হলে সংসার কাননে এসে ধৰ্ম্মপরায়ণ হয়ে প্রবৃত্তি
মার্গে বিচরণ না কল্লে কি নিবৃত্তি মার্গে আরােহণ করা
যায় ?
শুক। আজ্ঞা না।

শুকদেব ।
রাজা। এইবাঙ্গে ক্রিয়ার কৰ্ত্তার অনুসন্ধান করাে। বল দেখি,
শুকদেব ! ‘আমি’র অর্থ কি ? ‘আমি’ কে ?
শুক। আজ্ঞা, তার সূক্ষ্মাংশমাত্র এই দেহে থাকাতে ‘আমি’
বুঝাচ্ছে।
রাজা। বেশ। তা হলে তিনি ছাড়া ‘আমি’, কি আমার
আমিত্ব’ কিছুই নাই ?
শুক। আজ্ঞা না। সমস্তই তিনি, এবং সমস্তই তার।
রাজা। তা হলে এই জগতস্থ সমুদয় পদার্থের অধিকারী এবং
সমস্ত ক্রিয়ার কৰ্ত্তা, সেই স্বাকারে নিরাকার ব্ৰহ্ম ?
}
;
রাজা। তা হলে আমারা’ কে, বুঝতে পাচ্চ ? তিনিই সব।
ভগবানই সব। তিনি আমাদের যে ভাবে চালান,
আমরা সেই ভাবে চলি। আমি কে ? তুমিও আমি ; যে
রমণিগণকে দেখেছ, সে রমণিগণও আমি, ক্ষুদ্র কীটাণু-
কীটও আমি। ‘আমি’তে জগৎ পূর্ণ। সবই ‘আমি’,
আবার সবই তিনি। প্রথমে প্রবৃত্তি মার্গে বিচরণ
কত্তে কত্তে সকলকে ‘আমি’ জ্ঞান কত্তে শেখাই হচ্চে
সাধনা। ‘আমি’র দর্শন পেলে ব্ৰহ্মদর্শন হবে।
শক। তবে, রাজর্ষে! সে জ্ঞান কিরূপে লাভ হবে ?
রাজা। যতক্ষণ সে জ্ঞান লাভ না হয়, ততক্ষণ এই মনে করে
লে, প্রবৃত্তিমার্গে তার চাকুরী কচ্চ, তার দাসত্ব কচ্চো।
সমুদয় কাৰ্যে সেই মণিবকে স্মরণ কত্তে হবে। সেই

শুকদেব।
আনময়ের আজ্ঞামত কারও অন্তঃকরণে কষ্ট দেবে
। নিজের রসনা যেমন কটু তিক্ত ত্যাগ করে
অমৃতপান করবার জন্য ব্যাকুল হয়, সেইরূপ অপরের
পক্ষে জ্ঞান কত্তে হবে। সাধ্যমত সকলকার আশা
পূর্ণ কত্তে হবে। সকলকে হাসিমুখ দেখাতে হবে,
আর সকলকার হাসিমুখ দেখতে হবে। এই নিয়মে
কাজ কত্তে কত্তেই ‘আমি’ দেখতে পাবে। আমি
দেখতে পেলেই জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হবে। তারপর সেই
চক্ষু উন্মীলিত হলে’ প্রবৃত্তিমার্গের সমুদায় পদার্থকে
উপেক্ষা করে নির্বিঘ্নে নিবৃত্তিমার্গে যেতে পারবে।
ক। রাজর্ষে! এ জগতের সমুদায় পদার্থ যখন অনিত্য,
তখন তাদের সঙ্গে কোন সম্বন্ধ না রাখলেইত হয় ?
রাজা। এ কথা তােমায় কে বল্লে ? একবার ভেবে দেখ
দেখি, এ জগতের সমুদয় যখন তিনি, তখন অনিত্য কি,
আর কে? তিনি কোথায় নাই, আর কিসেইবা নাই ?
তিনি তােমাতে আছেন, আমাতে আছেন, সমুদায়
জীবে আছেন, বৃক্ষে, লতায়, পাতায়, ফলে, ফুলে,
প্রান্তরে, প্রস্তরে, স্তম্ভে, সমুদায় পদার্থে তিনি চির
বিরাজ কচ্চেন। তা ছাড়া যখন কিছুই নাই, তখন
জগতে কি অনিত্য বস্তু আছে ? আর এক কথা, তুমি
যা’দিগকে অনিত্য বলছো, তাদের সঙ্গে সম্বন্ধ না রাখলে,
সৎ মনােবৃত্তির যে সকল কাজ, সে সকল কি করে

শুকদেব।
করবে। দয়া, ধৰ্ম্ম, স্নেহ, ভক্তি, যত্ন, মমতা, এদের
সব কাৰ্য্য কত্তে হবে না? প্রবৃত্তিমার্গে প্রবেশ করে
জগৎকে হিত উপদেশ দিতে হবে না ? জগতের
কল্যাণ-সাধন কত্তে হবে না? ধৰ্ম ভীতু হয়ে, আর
দেশ কাল পাত্র বিবেচনা করে প্রবৃত্তিমার্গে বিচরণ
কত্তে পাল্লেই যে সহজে নিবৃত্তিমার্গে আরােহণ কত্তে
পারবে। এ জগতে আমাদের পাঠাবার তার অভিপ্রায়
কি ?
তবে
শুক। (সহাস্যে) আজ্ঞা হাঁ, বুঝতে পাচ্চি।
রাজা। শুকদেব।
শুকদেব । প্রবৃত্তিমার্গে আমাদের দ্বারা সেই সব
সৎমনােবৃত্তির কাৰ্য্য করানই হচ্চে তঁার অভিপ্রায়।
তাঁর অভিপ্রায় অনুসারে সব কাৰ্য্য কত্তে হবে।
এটি মনে রেখাে যে, সমস্ত কাৰ্যই তার প্রীতির জন্য ।
এখন সারের সন্ধান করাে। আর এটিও মনে রেখাে
যে, প্রবৃত্তিমার্গ ভিন্ন অন্য স্থানে সারের প্রথম সাক্ষাৎ
পাবেন। আর এইটির মর্ম বুঝ দেখি ? (এই বলিয়া
উপরের রাজপরিচ্ছদ খুলিয়া ফেলিলেন)
শুক। রাজর্ষে ! বুঝতে পাল্লেম না ।
রাজা। বুঝতে পাল্লে না? দেহকে গৈরিকবসনে আবৃত রেখে,
উপরে অন্য পরিচ্ছদ ধারণ, অর্থাৎ, মনকে সাত্বিকভাবে
আবৃত রেখে, উপরে অর্থাৎ বাহিকে সাংসারিকভাবে
বিচরণ।

শুকদেব।
০
^^^^^^
গ
শুক। আজ্ঞা হাঁ, বুঝতে পাচ্ছি।
ব্ৰস্তভাবে একজন রমণীর প্রবেশ ।
রম। মহারাজ সর্বনাশ হয়েছে।
ব্রাজা। কি হয়েছে ?
বম। মহারাজ! ওদিকে আগুন নেগেছে, ঐ দেখুন।
রাজা। ( দেখিয়া ) তাইত ।
বিদূ। ( দেখিয়া) ও যে ভয়ানক আগুন লেগেছে, মহারাজ !
। রমণীর প্রস্থান।
রাজা। তাইত, বয়স্য !
শুক। (দেখিয়া সসব্যস্তে) ও দিকে যে আমার কোপন
কমণ্ডলু রয়েছে, সে সব বা পুড়ে যায় ? (উঠিতে উদ্যত
রাজা। ( শুকদেবের হস্ত ধারণ করিয়া) ও কি কথা বলছো ?
শুকদেব! এই না তােমার দেহে মায়া নাই ? এই
কি তুমি মায়াশূন্য নির্বিকার ? এখনও কৌপীন
কমণ্ডলুর মায়া ত্যাগ কত্তে পারনি ? সম্পদে সুখানুভব,
বিপদে দুঃখানুভব, কারা করে? এ দুই অবস্থায়
কারা আত্মহারা হয়ে থাকে? আত্মহারার পরিণাম
কি? দৈবঘটনাই হক, আর আত্মকৃত ঘটনাই হক,
তার জন্য সুখ দুঃখ অনুভব করা কি জ্ঞানীর কাজ ?
বিদূ। শুকদেব গােস্বামী মহাশয় ! এই রজককে ফাঁক
দেওয়া ভাবটি অন্তরে অন্তরে, আর বাইরে গৈরিক
বসন পরিধান :- পাওনাদারকে বৃদ্ধ অঙ্গুষ্ট দেখান
?

শুকদেব
ভাবটি অন্তরে অন্তরে, আর বাইরে যােগী রূপ ধারণ :-
যার তার বাড়িতে ভােগ সরান ভাবটি অন্তরে অন্তরে,
আর বাইরে পান্ সের আটা ঝট পটু দেলায় দে রাম’,
বলে’ ইতস্ততঃ ভ্রমণ; চক্ষুলজ্জাটিকে অতল জলে
নিক্ষেপ ভাবটি অন্তরে অন্তরে, আর বাইরে নির্বিকার
হবার ভাণ করে গঞ্জিকা সেবন ইত্যাদি ইত্যাদি
কল্লে কিছুই হয় না।
শুক। সাধু, সাধু। আপনার চিত্ত যথার্থই পবিত্র। আপনি
দেব-তুল্য। আপনি যথাই রাজর্ষির প্রিয় বয়স্য।
হাসিতে হাসিতে রমণীর পুনঃ প্রবেশ।
রম। মহারাজ। আগুন কোথায় গেল? তারত কোন
চিও নেই। জিনিষ পত্রও কিছু পােড়েনি।
মহারাজ! একি ভৌতিক কাণ্ড ?
রাজা। এ যা হ’ক একটা। এখন তুমি যাও।
রম। যে আজ্ঞা।
[ প্রস্থান।
রাজা। চল, শুকদেব ! স্থানান্তরে যাই। চল বয়স্ক ?
বিদু। যে আজ্ঞা।
[ সকলের প্রস্থান।
হয়।

চতুর্থ অঙ্ক।
"We must run glittering like a brook
In the opere sunshine."
W. WORDSWORTH.
.
S কেও ও কে

No text on this page.

চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
নন্দন কানন।
সিংহাসনে দেবরাজ ইন্দ্র আসীন।
সিংহাসনের একদিকে ঊর্বশী ও মেনকা, অপরদিকে
তিলােত্তমা ও পঞ্চচূড়া দণ্ডায়মান।
উঃ মেঃ। (তিলােঃ ও পঞ্চঃ প্রতি তােমরা দু'জনে
আমাদের যেন নাগর, আমাদের প্রেমের নদী পার
করাবার কর্ণধার। কিন্তু আজকাল তােমর যেন
আমাদের তুফানে ফেলে দিয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে
থাক। তাই যেন আমরা তােমাদের দশ কথা শুনাচ্ছি।
তিঃ পঃ। বেশ ভাই। তা হলে তােমরা যেন আমাদের
প্রেয়সী হলে। আচ্ছা বেশ, আমরাও ঐ সুরে,
গাইব।
ইন্দ্র। বেশ, উত্তম। আজকার আমােদ একপ্রকার নূতন,
সুতরাং অতি সুন্দর। আজ আমাকে বিশেষরূপে
সন্তুষ্ট কত্তে পালে, সময়ে তােমাদের মনােমত বর
দিতে কাল ব্যাজ করবনা। তবে আরম্ভ হক।

৯৪ • v. :- গীত। শুকদেব। . মে! (স্বগত) আমাদেরত বরের বড়ই অভাব। খাম্বাজ-কাওয়ালি। কি কর, কি কর ? সর, কেন জ্বালাতন কর । আমার নিকট হতে যাও। মন দিয়ে লম্পটে, পড়িব কি শঙ্কটে ? কেন তবে যাতনা বাড়াও ? তিঃ পঃ। মন্ যে তােমার কাছে, বহুদিন বাঁধা আছে, সেই মন আগে ফিরে দাও। তবে আমি যাব চলি, ত্যজিয়ে কমল কলি, বল আর নাই বল যাও। উৰ্ব্বঃ মেঃ। আগে সে কেতকী মান, কর গিয়ে খান খান, পরে তার পাদোদক খাও। তাই বলি, হে নাগর । ফুলকুল মনচোর, আওতায় ফুলেরে বাঁচাও। তিঃ পঃ। জান তত রাগের ভরে, নাগরেরা কি না করে ? নিজ হাতে কেন বিষ খাও? দয়া যদি কর, ধনি। শত সুখ মনে গণি, তাই বলি আঁখি কোণে চাও। উঃ মেঃ। শতেক রমণী যার, কিবা ধন আছে তার ? কেন মিছে গুমাের বাড়াও ? এক নারী আনিবার বিরাজিবে হৃদে যার, হেন জনে বলি কি হে, যাও?

শুকদেব।
ঐ–দারা।
(তাই) যাও যাও যাও, যাও হে নাগব, চাইনা হে তােমায়।
রম্ভার প্রবেশ।
রম্ভা।
গীত। ঐ ঐ।
গুমাের করে থাকলে ঘরে, কি হবে উপায় ?
এস, রম্ভা। এস এস, এত বিলম্ব হ’ল কেন ?
সংবাদ কি ?
রম্ভা। আর ‘সংবাদ কি, দেবরাজ। ভাগ্যে ভাগ্যে প্রাণটি
নিয়ে পালিয়ে এসেছি।
তিঃ। এম্‌নি রসিকের হাতে পড়েছিলে, যে শেষে প্রাণ নিয়ে
পালিয়ে আতে হ’ল ?
রম্ভা। এনি রসিক, যে মাসে মাসে একবার করে চক্ষু
খােলেন, আর বছরে বছরে একটি করে কথা
ক’ন। সম্প্রতি তাঁর রসিকতার তাতে ঝলসে
গিছলুম, অদৃষ্টের জোরে ভষ্ম হয়ে যাইনি।
ইন্দ্র। কি রকম ?
রম্ভা। আজ্ঞা, দেবরাজ! অপরাধের মধ্যে একটি গীত
গাইতে গাইতে রসিকরাজের কাছে গিছলুম, আর
দু’একটি কবিতা বলেছিলুম। তাতেই কৰ্ত্তা
মিষ্টভাবের ময়ান দিয়ে অগ্নিদেবকে ডাকলেন ।
অঙ্গঃগণ। বল কি ?
তিঃ। কি সর্বনাশ! তারপর ?

শুকদেব।
রম্ভা। তার পর, অগ্নিদেব এসে, ল ল করে’ জিব,
বার করে আমার চারিদিকে অঙ্গ ছড়িয়ে দিলে।
ইন্দ্র। (সক্রোধে) হু,-তার পর?
রম্ভা। তারপর, অগ্নিদেবকে ঠারে ঠোরে কিছু বলতে না
পেরে, বিশেষত শুকদেবের সামনে, আমি অমনি
আমাদের ব্রহ্মঅস্ত্র ছেড়ে দিলুম।
ইন্দ্র। সে কি রকম, রম্ভা ?
রম্ভা। কান্না আমাদের ব্রহ্মঅস্ত্র, যে অস্ত্র সকলকে জয় করে ?
ইন্দ্র। {সহাস্যে) তা বটে। তার পর?
রম্ভা। তারপর, শুকদেব, অগ্নিদেবকে চলে যেতে বলে,
আমাকে মােহমন্ত্রে মুগ্ধ করে রাখুলে। তার পর
সেই অবস্থায় কতক্ষণ ছিলুম জানিনা, চৈতন্য
হবার পর চেয়ে দেখি সামনে নারদ ঋষি।
ইচ্ছ। আঃ তিনি আবার সে সময় সেখানে কি কর্তে
গিয়েছিলেন ? তার পর ?
রম্ভা। তারপর তার সঙ্গে দু’একটা কথা কয়ে চলে এলুম।
নারদের প্রবেশ।
ইন্দ্র। আসুন আসুন, দেবর্ষে !
( দেবর্ষির চরণে সকলের প্রণিপাত।
উৰ্ব। এই আপনার কথাই হচ্ছিল।
নার। এই যে, তােরাও মন রাখবার
রাবার কথা কইতে
শিখিছিস ?

৯৭
উৰ্ব্ব! এটা কি রকমের কথা হল, দেবর্ষে ?
নার। কথাটা এই রকমের যে,
এই রকমের যে, অনেক দিনের ভুলে
যাওয়া কোন চেনা লােকের সঙ্গে, ছ'দিন পরে
হক, ছমাস পরে হক, কি ছ'বছর পরে হক,
হঠাৎ দেখা হলেই বলে যে, এই আপনার কথাই
হচ্ছিল। কেমন ? কথাটা এই রকমের না ?
ইন্দ্র। আজ্ঞা না, দেবর্ষে ! তা নয়। সত্য সত্যই আপনার
কথা হচ্ছিল। রম্ভাই আপনার কথা বলছিল।
নার। তা হলে ঠিক বটে। যাক্ ও কথা যাক। দেবরাজ !
সম্প্রতি একটি বৃহৎ কার্যে হস্তক্ষেপ করেছ না কি
ইন্দ্র। আজ্ঞা হাঁ, দেবর্ষে ! কিন্তু প্রথম উদ্যম ভঙ্গ হয়েছে।
নার। তা’ত হবেই। প্রথমে তেউড় গেল, ঘােড় গেল,
পাতা গেল, খােল। গেল, মােচা গেল, একেবারে
কিনা সাজ সজ্জায় ভরা একটি টুকটুকে মত্তমান
অযাত্রা পাঠিয়ে দিলে। কাজেই ভঙ্গ হল ।
ইন্দ্র। এখন কি উপায় দেবর্ষে ?
নার। এর উপায় কি তুমি কত্তে পারনা ? এর যে সব
রীতি নীতি, যে সব আচার ব্যবহার, সে সব
তােমার মাথা হতেই জন্মাবার কথা।
তবে যদি
জিজ্ঞাসা কল্লে’ তখন একটা উপায় বলি, দেখ
তােমার মনােনীত হয় কি না। দেখ, দেবরাজ !
কোন একটা কাজ কত্তে হলে, বড়ই হক, আর

।
কদেব।
ছােটই হক, তার একটা গোড়া বাঁধতে হয় ।
তা আগে যা হবার হয়ে গেছে, এখন এক কাজ
করাে মদন রতি আর বসন্তকে ডেকে, শুকদেবের
আশ্রমে গিয়ে, তাদের সব আপনার আপনার কাজ
কত্তে বল। তারপর, মায়া প্রেম ভালবাসা, এদের
সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে শুকদেবের অন্তরে আশ্রয়
নিতে বল। তার পর গোঁসাইজীর হাব ভাব লক্ষণ
দেখে, আর লগ্ন বুঝে রম্ভা সেখানে গেলেই, দেখবে
যে, রম্ভার গর্ভধারিণীকে এই সামনের ষষ্টবাটায়
শুকদেব জামাইকে তত্ব কওে হবে । দেবরাজ ।
আগে চার কল্লে কি কাদা মেখে ফিত্তে হয় ?
নেন। দেবর্ষে। এই সকল বিদ্যা শেখাবার জন্যে একটা
চতুষ্পাটী খুলুন। তাহলে আপনাকে আর চেঁকি চড়ে
এদোর ওদোর করে ঘুত্তে হবেন।
পপ ! না হয় আর এক কাজ কত্তে পারেন। এরির
ন্যায়ের ফাকি করে কৌট কৌট বিক্রী কল্লে বসে
বসে চিরকাল চলবে। টেকি ঘাড়ে করে’ আর দৌড়
দৌড়ি কত্তে হবে না।
না । ওরে দেখ, তোরা এক কাজ কর। রম্ভাও যা, তােরা ও
ত। পরাশর হচ্চে রম্ভার হােবাে দাদা শ্বশুর,
সুতরাং তোদেরও তাই। মৎসাগ। এখন গা ঢাকা
দিয়েছে। তোর পরাশরের কাছে যা, তিনি এখন

ওকদেব।
তােদের পেলে চতুষ্পটা কেন, অষ্টপাটী খুলে বসবেন।
আর তােদর নিয়ে তার আহার ওষুদ দু’ই চলবে।
হিলাে। কেন দেবর্ষে ? আপনি কি আমাদের নিয়ে কিছু
খুলতে পারেন না ?
নার। বটে ? তবে আমার সঙ্গে কে কে যাবি আয়।
দেবরাজ! এখন আমি চলুম।
শুভ কার্যে বিলম্ব
কর না।
[ নারদ ও ইন্দ্রের প্রস্থান।
পরাগণ।
কালেংড়া- দারা।
চল্ চল্ চল্ প্রেম-বাজারে যাই।
মনের মতন, সাধের জিনিষ যদি দেখতে পাই।
খুজি যদি মেলিয়ে আঁখি,
কেউ কি মােদের দিতে পারে সমূলে ফাঁকি ?
উচিত দরে রাখব না বাকি,
উড়, উড়, কল্পে পরে, মারব তাকে ঘাই।
[ অস্পরাগণের প্রস্থান।

১• •
শুকদেব
দ্বিতীয় দৃশ্য।
শুকদেবের পােবন।
শুরুদেব ঘাের ধ্যানে মগ্ন ।
আকাশে মদন ও রতির আবির্ভাব।
মদন ও রতির গীত।
মদ।
বসন্ত-কাওয়ালি ।
(ললিত লবঙ্গল-ছন্দেন গীয়তে )
মনােহর সুন্দর সাজে বসুন্ধরা, মন হর জগত জনার।
এসহে অশান্ত বসন্ত অনন্তরে বিহরহ সঙ্গে আমার।
( বৃক্ষরাজি নব পল্লবিত ও কুসুমচয় বিকসিত হইল)
রতি। পঞ্চম তানে, সুমধুর গানে, মাতি আনন্দে অপার,
এসহে বসন্ত-সেনাকুল আকুল কর শুকে কুজনে সবার।
(নেপথ্যে—কোকিল ডাকিল )
মদ। ধীর সমীর বহে যদি সুন্দর, চাহিবে রসিকে বিহার।
(দক্ষিণ মলয় বহিল )
রতি। কোথা প্রেম সুন্দরী, ভালবাসা সঙ্গিনী, শুকে সুখে
রাখলাে অপার ।
মদঃ রতি। শান্তির অন্তরে, রাখ পুরন্দরে, যাতনা ৰাড়াওনা তার।
পরম পুলকে শুকে রাখিবারে পারিলে, মানস সফল সবার।
[ মদন ও রতির তিরােভাব।

কদেব।
শুক। (ধ্যান ভঙ্গে মুদিত নয়নে) একি ? আমি জাগ্রত না
নিদ্রিত ? আজ হঠাৎ আমার এ ভাব হল কেন ?
মস্তিষ্কের গােলযােগ হ’ল কেন? মনেরও যে
অবস্থান্তর দেখছি ? মনের অবস্থান্তর হয়েছে বটে,
কিন্তু কৈ ? অশান্তির ত কোন লক্ষণ তং ভক
কস না ? এমন কি, শান্তির যে কখন তাভাব
হয়েছিল, তা ও ত বােধ হচ্ছে না ? মন যেন চিরকাল
শান্তির উপকরণে নিৰ্মাণ বলে’ বােধ হচ্ছে। তবে
আজ মনে সুখকর ন জন্মাচ্চে কেন ?
{ চক্ষু উন্মান করিয়া, চারিদিকে দেখিতে দেখিতে সৰি মেয়ে)
কি দেখ? আমি কোথা? ধরায় না অমরান :
কোথা আমি রয়েছি বসিয়া ?
সুরম্য স্বনি-রাজ্যে কে আমায় পাঠাইল ?
অচৈতন্যে ছিনু কি ডুবিয়া?
এই কি সে পােবন, শুকের যােগের না ?
সাত্বিক ভাবের জন্মস্থান ?
স্বভাবের এ সুন্দর
ভাবের যতেক শোভা
কোথা ছিল হয়ে অন্তর্ধান ?
কোথা হ'তে ফুল কুল
মধুর হাসিছে ? মরি!
মধুপানে মত্ত অলিগণ।
ওদিকে মাধবী লতা,
সহকার তরুনে
করিতেছে কিবা আলিঙ্গণ।

শুকদেব।
চারিদিকে তরুরাজি, সাজিয়া নবীন সাজে,
প্রকাশিছে নবীন গৌরব।
প্রকৃতি সুন্দরী আজি হাসিছে মধুর হাসি,
কি সুন্দর কুসুম সৌরভ।
( আকাশে কোকিল ডাকিল )
ওকে ও? বসন্ত সেনা ? ভুমিও আসিয়ে হেথা
করিতেছ মধুর ঝঙ্কার ?
এখানে ই, মনে হয়,
আসিতেন কোন দিন ?
আজ তবে কি কাজ তােমার ?
অহহ! আমি বুঝিলাম, বসন্তের সেনা তুমি,
রাজার প্রধান সহচর।
সাত্বিক ভাবেতে তুমি জাগাও জগতবাসী,
গাও তবে গাও পিকবর ।
{ দক্ষিণ মলয় বহিতে লাগিল )
এক । দক্ষিণ মলয় । তুমিও এসেছ হেথা ?
স্বাগত, হে অধীর অমর।
তুমিই জগৎ-প্রাণ, তােমা বিনা সবে শব,
অন্তরে তুমি প্রিয়তর।
কন্তু একি চমৎকার ! কেন এ পরিবর্তন ?
কোথা ছিল এরা এতদিন ?
হাসিতেছে পােবন ।
মুগ্ধ যে হল উদাসীন ।
মধুর মুরতি ধরি
’

শুকদেব।
প্রকৃতির হাসি দেখে ভাঙ্গিল ঘুমের ঘাের,
কি হেতু ছিলাম অচেতন ?
সচেতন ত্রিভুবন জীব জন্তু আদি সব,
বৃক্ষ লতা কুসুম কানন।
আমি খালি অচেতন সচেতন ধরা মাঝে ?
একি ভালে লিখন আমার ?
জীবনে মরণ সম
কেন হ'ল অধমের
(তৰে) অচেতনে কেন থাকি আর ?
( পুনরায় ধ্যান ?
(পরমা সুন্দরী রূপে প্রেমের প্রবেশ
ও বিবিধ কোমল যন্ত্রের সহিত গীত )
(ম।
সাহানা মিশ্র -একতালা।
আমি অন্তরের সার।
আদি, ভক্তি, দুই রসে গঠন আমার।
পুরুষ প্রকৃতি, ধরি দু’য়েরি আকার ।
কুসুমের পরিমল আসন আমার ।
যে জীবনে নাহি পাই কোন অধিকার
নাহি জানি কোথায় বা শান্তি তাহার ?
আমার আবার সেই সৰ্বগুণধার,-
হার আদেশে আমি ফিরি দ্বার দ্বার ।
{ শুকদেবকে প্রদক্ষিণ ছলে নৃত্য করিতে করিতে )
মা:
তাঃ দাদরা

শুকদেব।
র
যা যা যা প্রেমের বায় লাগ্‌গে শুকের গায়।
হাওয়া যেমন কমল বনে আপনি উড়ে যায়।
(শুকদেবের গাত্রে একটি ফুল ফেলিয়া দিয়া প্রস্থান)
(নারদ ও ফুলসাজে সজ্জি তা মনােহর বেশে রম্ভার
প্রবেশ ও দুই দিকে লুক্কায়িত ভাবে অবস্থিতি)
শুক! (ধ্যান ভঙ্গে গাত্রোখ। ন করিয়া) একি? হঠাৎ না
আমাৰ চঞ্চল হয়ে উঠলো কেন ? আজ মনে যে
এক অনির্বচনীয় অভিনৰ ভাবের সঞ্চার হয় ?
তপােবনের প্রকৃতি আজ যেমন হাস্যময়ী, আশার
অন্তরের প্রকৃতিও যে সেইরূপ হাস্যময়ী বলে শো
বসন্তসেনার মত এক অস্ফুট স্বরের
কঙ্কারে আজ আমার মনকে যেন আকুলিত কষ্ট।
দক্ষিণ মায়ের এক মনােহর ভারের :
আমার হৃদয়করে যেন প্রতি মুহূর্তে প্রবাহিত
হচ্চে। হৃদয় কুসুম যেন এতদিন মুদিত ছিল,
আজ যেন সত্য সত্যই বিকসিত হয়েছে। ( চক্ষু
মুদিত করিয়া) মরি মরি! কে উনি ? অনুপম
পরম পুরুষ যেন অলিরূপে আমার হৃদয় কুসুম
আসন পরিগ্রহ কচ্চেন? এতদিন এ মধুর ভাবের
অভাব ছিল কেন ?
( আকাশে পিক পাপিয়া, বৃক্ষশাখে ময়ুর প্রভৃতি
স্বর পক্ষী সকল ডাকিতে লাগিল।)

শুকদেব। শুক। আকাশের দিকে চাহিয়া) মরি মরি ‘বিহঙ্গম কুল। তােমাদের স্বর এত মধুময় ? এত পবিত্র ? এত হৃদয়গ্রাহী ? এর কারণ কি? (সহাস্যে) বাঃ আমি যেন ঠিক পাগলের মত বক্‌চি। ভগবানের গুণকীৰ্ত্তন ভিন্ন ওর। যখন অন্য কথা কয়না, তখন ত ওরা চির পবিত্র। সদানন্দে আহার, বিহার, আর তার মহিমা কীর্তন, এই তিনটি মাত্র যে ওদের কাৰ্য্য ; সুতাং ওরা নির্দোষী, পবিত্র, আর সদানন্দময়। আমরা মানুষ, আমাদের তবে এ দশা কেন? ( সহাস্যে) আবার আমি পাগলের মত বচি। ওরা কি বিজ্ঞান, ন্যায়, শঙ্খ, পাতঞ্জল, বৈষেষিক প্রভৃতি রাশি রাশি মতামতের ঘুর্ণীজলে আমাদের মত পড়ে থাকে ? হ, হাঁ, ভাল কথা, (পরিক্রমণ) ওরা গৃহী, না বনবাসী ? ওরা দুই আশ্রমভুক্ত। দিবাভাগে আলােকে ওরা গৃহী, আর রাত্রে অন্ধকারে ওরা বনবাসী। আমর তবে মানুষ হয়ে দিবারাত্র কেন বনে বাস করি ? কেন চির- কাল অন্ধকারে থাকি ? নারদের প্রবেশ। নার। তাত বটেই। ( শুকদেব নারদকে প্রণাম করিল।) নার। তাত বটেই ভায়া ? কেন আমরা চিরকাল অন্ধকারে

১৬,
ধাকৃষো? যখন এ জগতে আলাে’ নামে একটা
পদার্থ আছে, তখন আমরা দৃষ্টিকে দুঃখ দিয়ে কেন
অন্ধকারে থাকবাে ? আচ্ছা, বলদেখি শুকদেব !
অন্ধকার ঘুরে ঘুরে ঝোপে জঙ্গলে পড়া ভাল -
আলােয় এসে সুরম্য কুসুম কাননে কুল্ল মনে
ভ্রমণ করা ভাল? বল দেখি, শুকদেব! অন্ধকার
ভালবাস, না আমাে ভালবাস?
শুক। আজ্ঞা, আলােই ভালবাসি।
নার। তবে ভালবাসা” নামে একটি জিনিষ আছে তা
বুঝতে পাচ্চ ? যে ভালবাসা কেবল ভাল জিনিষকেই
আকর্ষণ করে ? যে ভালবাসার গুণে, এমন কি,
দেবতারাও পর্যন্ত বশ হন ?
শুক। (সহাস্যে ! অজ্ঞা হাঁ, বুঝতে পাচ্চি।
( নেপথ্যে-কোমল যন্ত্রের ধ্বনি)
শুক। দেবর্ষে। ভালবাসার দরশনে প্রাণ পুলকিত হচ্ছে।
কি সুন্দর। কি সুন্দর! ( মুদিত নয়নে অবস্থিতি )
( একদিকে মায়ার ও অপরদিকে ভালবাসার প্রবেশ ।
ভালবাসার গীত)
ভাল।
ভৈরবী-পােস্ত।
কেন সবে আমা ধনে করে অযতন ?
সুধা দিলে গরল তাতে মিশায় কি কারণ?
আগে হেসে কথা কয়, কত ভালবাসাময়,

১০৭
ঐ।
যেন অভিন্ন হৃদয়, কতই যতন ;-
পলকে প্রলয় ভাবে, হ'লে অদর্শন ;-
দু’দিন না যেতে যেতে, উভে যায় বাতাসেতে,
কাদি বসে’ দিনে যেতে, হয়ে জ্বালাতন,
আকাশে পাতিয়ে ফাঁদ বধে এ জীবন।
( মায়ার গীত।)
ঐ
মায়া! বাসতে যদি জানতে ভাল, সাদায়কি আর মিশতে কাল?
ভাল। বল, মায়া ! বল বল, কিসে পাই শান্তি নিকেতন ?
মায়া। মায়া বদি, প্রাণ সই! মাঝখানে দাড়ায়,
আর কি গরল মিশতে পারে স্বরগ সুধায় ?
ভালবেসে অমর হয়ে যায় ;
মায়ার গুণে সে আগুণে, হবে, সই! প্রেমের বরিষণ ।
(প্রেমের প্রবেশ। পরে প্রে', ভ লব:সা, মায়া, একত্রে নারদ
ও শুকদেবকে প্রদক্ষিণ ছলে নৃত্য করিতে করিতে গীত
ভৈরবী-দারা।
আদর করে রাখলে ধরে’, সুরসিক মনচোরে,
যৌবনের জোরে,
আর কি নাগর ঘুমে তথন থাকবে অচেতন ?
(তখন) প্রেমে মেতে চমকে উঠে, ওলাে সই! করবে আলিঙ্গন ;
শেষে সে-হেসে হেসে ভালবেয়ে করবে সচেতন।
নার। ভায়া ! এখন কেমন আছে ?
!

১৮,
AWAM
শুক। (মুদিত নয়নে) দেবর্ষে ! আপনার কৃপায় ভাল আছি ।
নার। মনের অবস্থা কিরূপ?
শুক। মহামুনে! মন আর্ল । ভালবাসার দরশনে, মায়ার
আলিঙ্গনে, প্রেমের শান্তিবারি বরিষণে, মন এক
অদ্ভূত রসে আজঁ। প্ৰাণাধারে এক অপূৰ্ব্ব প্রকৃতি
সুন্দরী আধেয়। মরি মরি! স্বর্গের রমণী, ভালবাসার
খনি, প্রেম প্রদায়িনী, শান্তি বিধায়িনী। প্রেম-শান্তি,
প্রেম-শান্তি, প্রেম-শান্তি। (স্থির ভাবে দণ্ডায়মান।
নার। (স্বগত) এই যে ঔষুধ ধরেছে। তাইত বলি, এতটা
আয়ােজন কি বৃথা হবে? তাও কি কথন হয় ?
মুক্তকে যুক্ত কত্তে দুনিয়ায় এমন ঔষুধ কি আর
আছে ? দেবরাজ যদি আমাকে আগে বলে, তা
হলে কি আমাদের সােনার চাদ রম্ভার অমন চাদ
পানা মুখ খানি ভোঁতা হয়ে যায় ? তা যা হক,
এখন ঐ ভোঁতা মুখেই কাজ কত্তে হবে । ( প্রকাশ্যে )
বলি, গোঁসাই জি! ও শুকদেব গােস্বামি । আমি
এখানে দাঁড়িয়ে আছি, মনে আছে? দেখ, ভায়া!
ঝিমন্ত অবস্থায় যেন ঘুমন্ত ভ্রম আসেনা। আমি
তোমার প্রেম প্রদায়িনী নই, তােমার
ভালবাসার খনি নই। ভ্রমকে একটু জাগিয়ে রেখ ।
( রম্ভার প্রতি অনুচ্চস্বরে) আর দেরি কেন? এই
সময় এস, শুভ লগ্ন উপস্থিত।
নারদ,

কদেব।
waA
*.
(রম্ভার গীত গাহিতে গাহিতে প্রবেশ),
সন্তা।
ভৈরে—যৎ।
বিকসিত এ কমল,
পরিমলে ঢল ঢল,
কেন তাহে মধুকর বসিতে না চায় ?
সুধার কি নাই তার ? প্রেম শূন্য প্রেমাধার ।
রসিক কি একেবারে লুকাল ধরায় ?
সুধা কি সােহাগভরে, ডেকে এনে মধু করে,
মাতিতে বামনা করে প্রেম-পিপাসায় ?
এত কি অঙ্গরা ভালে লেখা ছিল কালে কালে ?
ধরিতে কি হ’ল শেষে নাগরের পায় ?
শুক। (চক্ষু উন্মীলন করিয়া গীত । রাঃ ঐ তা ঐ।
কে তুমি ঢালিছ সুধা? বাড়ছে প্রাণের ক্ষুধা,
পিয়াসী চকোর আজি মরে পিপাসায়।
কর মােরে অধিকার, আমি নিতান্ত তােমার,
এস হে সুধার খনি, তােষ হে আমায় ॥
( হস্ত প্রসারণ)
রম্ভা। ধীরে ধীরে গুরুদেবের হস্তধারণ ও গীত)
রাঃ ঐ-তাঃ ঐ।
যদি হে রসিক বর,
অাপনি ধরিলে কর,
দেখিও বিরহে যেন জীবন না যায়।
এত যদি ছিল মনে,
হারিবে আমার পণে,
তবে কেন এত দুঃখ দিলে হে আমায়?

শুকদেব।
শুক। পুরিল রাসনা মাের, ভাঙ্গিল ঘুমের ঘাের,
সচেতনে, বরাননে। রেখ হে আমায় ।
আর কি কহিব আমি, দোহে দোঁহাকার স্বামী,
আধেয় আধারে যেন শেষে মিশে যায়।
( উভয়ে উভয়ের প্রতি নিরীক্ষণ ও
উভয়ের স্থিরভাবে দণ্ডায়মান)
আদিরসের প্রবেশ ।
আর। (নেপথ্যাভিমুখে)
এস, ভক্তি। দেখ এসে, কার হল জয়।
গেরুয়া বসনে শুধু সাধনা কি হয় ?
বৃক্ষ মূলে বসে থাকা, ফল খাওয়া কচি পাকা,
সংসারকে ঢেকে রাখা, কোন্ ধৰ্ম্ম কয় ?
পদ্মাগেনি যিনি নিজে, গেছে তার মন ভিজে,
পূজিলেন মনসীজে, কার হ’ল জয় ? (বল)
হাতে সুতাে না বাঁধিলে ধরম কি রয় ?
এলেন এলেনা, সখি! মনে হল ভয় ?
যাও তবে যাও সেথা যেথা মরুময়।
প্রেম?ভালঃ
একত্রে গীত।
ময়ও আঃর। ভৈরবী-দারা।
প্রেমিক যদি কেউ না হ’ল আসিয়ে ধরায়,
জ্ঞানের বােঝা কি করবে তার সাধের সাধনায় ?
আঁখি মুদে জাগতে যে জন জানে দুনিয়ায়,
আদিরসে মজে’ কিসে ভাসে দরিয়ায় ?

শুকদেব।
ভালবাসার তার যদি কেউ জীবনে না পার,
অন্তে কি সে মিশতে পারে অনন্তের পায় ?
[ নাচিতে নাচিতে অদৃশ্য।
( ধীরে ধীরে শুকদেব ও রম্ভা প্রস্থান।
নার। একটি বাসর ঘর করে রাখলে ভাল হত।
[ প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
গৌরীশঙ্কর পর্বত।
দূরে ‘সহস্রধার’ ঝরনা।
{ ( ঝরনা মধ্যে হইতে মৃদুম্বরে একটি স্বর, আর
সঙ্গত কালীন মধ্যে মধ্যে তালের ন্যায় একটি শব্দ
অনবরত উঠিতেছে।)
মােহন্ত সহ পুষ্প বিল্বপত্র সহিত ফুলের সাজি হস্তে
সস্ত্রীক জনৈক যাত্রীর প্রবেশ।
যা স্ত্রী! বাবা! এ পর্বতের নাম কি?
মােহ। মা! এ পৰ্ব্বতের নাম গৌরীশঙ্কর পর্বত। প্রবাদ
এই যে, বাবা কৈলাসনাথ আর মা কৈলাসেশ্বরী
ত্রিপুরাসুর বধের পর এই পৰ্বতে কিছুক্ষণ অবস্থান

কবে।
করেছিলেন, তাই এ পৰ্ব্বতের নাম গৌরীশঙ্কর পর্বত।
আর ঐ যে দূরে সহস্রধার ঝরনা দেখছেন, ঐ ঝরনার
জলে তারা উভয়ে শ্রীচরণ ধৌত করেছিলেন বলে
এস্থান মহাতীর্থ বলে গণ্য।
ধার্থী। ( মােহন্তের প্রতি ) বাবা । ঐ ঝরনায়ত
স্নান কত্তে হবে ?
মােহ। হা মা, তাত হবেই । আর বাবাজীকে শ্রদ্ধাদি
তর্পও কত্তে হবে।
যাত্রী। আজ্ঞা হাঁ, বাবা! সমস্তই করবাে।
যাঃ স্ত্রী। (উৎকর্ণ হইয়া, মােহন্তের প্রতি) বাবা! ঝরনা
থেকে ঐ যে একটি সুরের শব্দ হচ্ছে, আর মধ্যে মধ্যে
আর এক রকমের শব্দ হচ্ছে, এর কারণ কি?
মােহ। বাবা আর মা এই পৰ্বতে যখন বিশ্রাম করেছিলেন,
সেই সময় গন্ধৰ্ব্ব আর কীন্নরেরা এইখানে এসে গীত
বাদ্য দ্বারা ত’দিগকে সন্তুষ্ট করেছিল। তাদের গীত
বাদ্যে সন্তুষ্ট হয়ে বাবা গৌরীশঙ্কর তা'দিগকে এই বর
দিয়েছিলেন যে, তােমরা যেমন আমাদিগকে সন্তুষ্ট
করিলে, তােমাদিগের স্বরের আর বাদ্যের তালের ধ্বনি
চিরকাল এই ঝরনা হইতে উখিত হইবে । প্রবাদ
এই যে, ঐ দুই শব্দ সেই স্বর আর বাদ্যের তালের শব্দ।
যাত্রী। বাবা! এখানকার আর একটি বিষয় যা শুনিছি,
তা কি সত্য ?

কবে।
মােহ। কি বিষয় ? বাবাজি।
যাত্রী। শুনিছি যে, বহুকালের পুরাতন একটি ব্যাঘ্র নাকি
এই পৰ্বতে আছে ? এ কথা কি সত্য?
মােহ। হাঁ, বাবাজি! এ কথা সত্য।
যাঃ স্ত্রী। তবে ত এখানে ভয় আছে ?
মোহ। না, না! তাতে কোন ভয় নাই। সে বাঘ কারও
অনিষ্ট করে না। বরং আরও একটি আশ্চর্য্য দেখবে।
ঐ পাহাড়ের উপরে একটি গুহা আছে। সেই গুহা-
মধ্যে গৌরদাস বাস করে।
যাঃ স্ত্রী। গৌরীদাস কে? বাবা!
মোহ । ঐ ব্যাঘ্রের নামই গৌরীবাস। যে কেউ ঐ গুহার
মুখে ফুল বিল্বপত্র, মিষ্টান্ন, কি প্রসাদী মাস দেয়,
গৌরীদাস কেবলমাত্র নাথাটি বার করে সে ব ায়।
আর যে ব্য িঐ সব জিনিষ দেয়, গৌরীদাস মাথাটি
লুটি: ভক্তিভাবে তাকে প্রণাম করে’ গুহ মধ্যে
প্রবেশ করে। তার সাক্ষ্য দে , আমি কিছু ফুণ
বিল্বপত্র দিয়ানি।
(মেহম্ভ তদ্রুপ করিলেন। ব্যাঘ্রও সেইরূপ কাৰ্য্য করি।
যাঃ স্ত্রী। কি আশ্চৰ্য্যি ! কি ভগবানের খেলা।
যাত্রী। অদ্ভুত! অদ্ভুত! ভাল কথা। বাবা! ব্যাসদেবের
পুত্র শুকদেব নাকি আজ কদিন হ’ল রাজর্ষি শকের
কাছে এসেছেন?

১১৪
কদেব।
গীত।
মােহ। হা, বাবা! কেবল এসেছেন নয়, তিনি এক বিষম
সমস্যায় পড়েছেন।
যাত্রী। আজ্ঞা হাঁ, তাও শুনিছি। আবার রাজর্ষি জনক সে
সমস্যা পূরণ করেছেন, তা ও শুনিছি। তা বাবা!
সংসারে এসে প্রবৃত্তিমার্গে পবিত্রভাবে পবিত্র সঙ্গিনী
নিয়ে বিচরণ কত্তে পারলে, সহজেই নিবৃত্তিমার্গে
আরােহণ করা যায় ।
মােহ। এখন চল, বাবা! ঐ ঝরনায় স্নান শ্রাদ্ধ তর্পণ
করবে চল।
যাত্রী ও যাঃস্ত্রী।
ঝিঝিট-একতালা।
জয় জয় জয় মহেশ্বর, তাপ এয় বারণং ।
জয় জয় জয় মহাদেব, ত্রিপুরার নাশনং।
জয় পশুপতি অগতির গতি, পাৰ্বতী পতি মহেশং,
পরাৎপর করুনাসাগর, শান্তি সুখ কারণং।
সকলের প্রস্থান।
নারদ ও শুকদেবের প্রবেশ।
শুক। দেবর্ষে! মন আর জ্ঞানের তর্ক বিতর্কে অন্তর যার
পর নাই চঞ্চল হয়ে উঠলাে। আমার উপর এত
বিড়ম্বনা কেন?
ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে আমি কি
এতদুর অপরাধী হয়েছি যে, প্রবৃত্তিমার্গে এসে রিপুর
সঙ্গী হতে হবে ? তা হলে, দেবর্ষে! নিবৃত্তির

কদেব।
শান্তিময় রাজ্যে আর কি আমি বিচরণ কত্তে পাব না ?
নার। শুকদেব! দুঃখিত হও না। প্রথমে প্রবৃত্তির রাজ্যে
কিছু দিন সুখ সম্ভোগ করে’, পরে নিবৃত্তির রাজ্যে
প্রবেশ করে পূর্ব প্রবৃত্তির সমস্ত সুখ উপেক্ষা করাই
হচ্চে বীরের আর জ্ঞানীর লক্ষণ। সুখের আস্বাদ
পেয়ে, পরে তা ত্যাগ করাই হচ্চে ত্যাগ স্বীকারের
লক্ষণ। এইরূপ ক্রিয়াই সুফলপ্রদ। ( নেপথ্য
দেখাইয়া) ঐ দেখ কারা আসছে। চল আমরা একটু
অন্তরালে যাই।
[ উভয়ের অন্তরালে গমন।
পৃষ্ঠে তুণ স্কন্ধে ধনু,-পাহাড়ীয়া ও পাহাড়ীয়া পত্নীর প্রবেশ।
পাহাঃ ও পাহা-পত্নী
গীত।
ভৈরবী-কাহার’য়া।
তাগ করনা, তাগ করনা, বাণ মারনা ভাই।
পেটের তরে শীকার টিকার পাবিরে এ ঠাঁই।
হিয়ে রাখলে বিশােয়স, হাড়ের ভিতর পাব শাঁস,
শুকনাে ভুয়ে হবে চাষ, ভজলেরে গোঁসাই -
কালা মনে সােণা মানিক, সব হবেরে ছাই,
(আরসাদা মনে ঝুলি পােরা পাবিরে বছরই ।
রাঙ্গা মুকস্ কালা মু, আরে রাম রাম থু থু,
সােণামুখী পীরিত করে, কালামুখী ডুকরে মরে,

- "
( নেপথ দেখিয়া ) ধ ধ ধর, মা মা মা বাঘ যায়রে ভাই,
(উভয়ে উভয়ের চিবুক ধরিয়া) চল চল চল চাদমুখী তে’গা সানাই।
| নাচতে নাচতে উভয়ের প্রস্থান।
অন্তরাল হইতে নারদ ও শুকদেবের পুনঃ প্রবেশ।
। শুকদেব। এ পাহাড় বাসিরা কি বলে গেল বুঝতে
পাল্লে ? জগতে পুরুষ প্রকৃতির কাৰ্য্য দেখতে পাচ্ছ ?
ক্ষুদ্রমনে হান জাতিতেও ওরা পবিত্র ভাবে পুরুষ
প্রকৃতি। ওর। সামান্য লােক হলেও, ওদের অন্তঃ-
করণে প্রবৃত্তির সঙ্গে সাত্বিকভাবের ক্রিয়া দেখ। আর
শেষটা মনে রেখ, ওরা সংসারী।
শুক। দেবর্ষে ! সবই বুঝতে পাচ্ছি, কিন্তু
( উভয়ের প্রস্থান।
পট পরিবর্তন।
নদীর কুল।
দাড় হস্তে নাবিক ও নাবিক পত্নীর প্রবেশ ।
নারদ ও শুকদেবের প্রবেশ ও অন্তরালে অবস্থিতি।
নাঃ পঃ। খাবি কি রে ভোদার বাপ! ঘরকে নেই যে চাল ?
নাবি। তাইত, ক্ষেপি! আজ যে আমি হয়ে গেনু ঘাল?
নাঃ পঃ। দু’চার কাহন কড়ি মাসে, তিনটে পেট কি চলে?
নাবি। কোথা যাব পেটের দায়ে, লা’ রেখে এই জলে ?

শুকদেব।
নাঃ পঃ।
(হাসিতে হাসিতে)
ভাবনা কি রে ভোদার বাপ! আয়না ডাকি তায়।
পাই কি না পাই, দেখে শেষে করবাে যা মন চায় ?
উভয়ের গীত।
টোড়ী ভৈরবী-দারা।
পারে যে যায়, কচ্চি রে পার।
নদীর জল সব শুকিয়ে গেলে, পার হবে কে আর ?
পেটের জ্বালায় মরবাে ঘুরে, থাকবো পড়ে’ বহৎ দূরে,
কাবে না ক া কুকুরে, দেখলে মােদের বইতে দুঃখের ভার,
কইব কি আর ঠাকুর তােমায়, এ চেস্তাতে পড়চে বুকে ভার।
মনে করি সকাল বিকেল, নমি তাের রাঙ্গা দুটি পায়,
পড়ি ফাঁদে, ভোদা কাদে, দুবেলা পেটের জ্বালায় :
বল ঠাকুর কি করি তবে ? চ্যারাে কাল কি কাদবো ভবে।
কে আর মােদের আপন হবে কলে হাহাকার ?
তাে’ বিনে কে আছে মোদের বলতে আপনার ?
( উভয়ে নেপথ্যাভিমুখে চাহিয়া চাহিয়া যাত্রী দেখিতে লাগিল।
নার। শুকদেব! শুনলে ? ভগবানের উপর ওদের দৃঢ়
বিশ্বাস শুনলে? ওরাও ক্ষুদ্রমনে পুরুষ প্রকৃতি,
আবার সংসারী।
নাবি। হাই, ভোদার মা! একজন যাত্রী আসচে ।

শুকদেব।
এক জন ব্রাহ্মণের প্রবেশ।
দেখ,
ব্রাহ্ম। নারায়ণ পৱা বেদা; নারায়ণ পরক্ষঃ নারায়ণ পরা-
মুক্তিঃ নারায়ণ পরাগতিঃ ।
(নাবিক স্পতীর প্রতি) কিরে, তােরা কি এখন
পারে যাবি ?
নাবি। এজ্ঞে যাব। তবে এক কথা জিগ গুসি, তুমি আপনি
কি বেরায়ণ ঠাকুর ?
ব্রাহ্ম। হা।
উভয়ে। তবে আগে বলতি হয়? (ব্রাহ্মণ চরণে উভয়ের
প্রণাম।
ব্রাহ্ম। জয়,
তােদের মঙ্গল করুন। ওরে
একটু দেরি কলে হয়না? এই ভাটা আরম্ভ হল,
আর একটু ভাঁটার জোর হ’ক, তাহলে যাবার
সুবিধা হবে, উজান ঠেলে আর যেতে হবেনা, তার
কারণ একটু দক্ষিণ দিকে যেতে হবে।
নাঃপঃ। তা বেশ ত ঠাকুর ? ত্যাতক্ষণ আমি তবে এই
দাঁড়টা লা’তে বেঁধে রেখে আসি।
[ নাবিকপত্নীর প্রস্থান।
নাবি। ঠাকুর! দক্ষিণ দিকে কদ্দদূর যেতে হবে ?
ব্রাহ্ম। এই ক্রোশ খানেক। তা ভাটার টানে গেলে,
তােদের বেশী বাইতে হবেনা।
(নেপথ্য হইতে নাবিকপত্নী) ওরে ভোদার বাপ!

কদেব। শিগগির আয়, শিগগির আয়, একবার দেখে যা এখানে কি। নাবি। কিরে কিরে। [ প্রস্থান ও মুখ অটা একটা কলসী লইয়া উভয়ের পুনঃ প্রবেশ।] ব্রাহ্ম । ওটা কিসের কলসী রে ? নাঃপঃ। তা কি করে জানব, ঠাকুর লা’তে সবে দাড়িইচি এমন সময় লায়ের তলায় ঠক্ ঠক্ করে’ কি আও- আজ হতে লাগলো। অমনি তড়াক করে নিচে নাপিয়ে পড়ে দেখি যে, এই মুখ আঁটা কলসীটে। ভাটায় বুঝি বেরিয়ে পড়েছে। ব্রাহ্ম । আচ্ছা, ওর মুখটা খােল দেখি ? নাবি। ওর ভিতরি যদি সাপ থাকে ? ব্রাহ্ম। তা হলে কি তারা বেঁচে আছে ? হাওয়া খাওয়া পেয়ে সব মরে গেছে। আচ্ছা, আমিই খুলচি। ( ব্রাহ্মণ কলসী খুলিয়া দেখিলেন, সেটি মােহরে পরিপূর্ণ।) ব্রাহ্ম । ওরে, এ যে এক কলসী মােহর ? নাঃপঃ। মােহর কি ঠাকুর ? ওকি খায় ? ব্রহ্ম। ওরে, এ খায়না। মােহর হচ্চে সােণর টাকা। উভয় । সে কি ঠাকুর? ( কলসী দেখিল ) নাঃপঃ। তবে, ঠাকুর! তুমি আপনি নিয়ে যাও। ব্রাহ্ম । সে কি রে বেটি ? আমি নেব কি? এ সব যে

কদেব।
তােদেব। তােরা যখন কুড়িয়ে
কুড়িয়ে পেয়িচিস, তখন
এ সব কি আমার ? এ সব ত তােদের।
নাঃপঃ। আর আপনি যে খুলে ? আপনি যেই খুললাচো,
তাইত মােহর বেরুলাে ? আমরা খুললে ওর ভিতরি
থেকে সাপ বেরতাে।
ব্ৰহ্ম } (স্বগত) হা ভগবান! এ কি শুনচি ? এরা কি
নাবিক দত্ত, পে কোন দেব দেবী ? (প্রকাশ্যে )
তােরা খুনে। ওর ভিতর থেকে মানিক মুক্ত।
বেরুতে। আমি খুলিচি বলে তােরা এত
পেলি। বা, তােরাত ওপারে থাকিস? জেদের
বাড়ি ত ওপর ?
নাবি। এজ্ঞে।
ব্রাহ্ম। তবে চ। এটা নৌকায় তুলবি চ।
মোহর সব তােদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি
বাড়ি যান।
নাবিক দম্পতীর গীত।
রাঃ পরোয়--তাঃ দাদা।
নাঃ পঃ ঠাকুরের খেলা, ওরে দেখরে, ভোদার বাপ ।
নাৰি। আমি বেছিনু ওটায় পােরা আছে সাপ।
নাঃ পঃ। বল্ দেখিয়ে ভোদার বাপ, মােহর দিল কে ?
নাবি। পরের কাজ নিজে কাঁদে, এমন দয়াল যে?
নাঃ পঃ। ঠাকুরের দয়া দেখ, একবার,

শুকদেব।
~~~~~
ভোঁদা মােদের কঁদূৰেনাক পেটের জ্বালায় আর
উভয়ে। ঠাকুর দ্যাবতা পূজ করে, অতিত সেবা মুটো ভরে,
রং বেরংএর কাপড় পরে, যাব ভবের পার,
(ব্রাহ্মণের প্রতি তােমার কোপায় মােহর পেনু
তােমাকে করি ( ভূমিষ্ট হইয়া) নমস্কার,
আর যদি কেউ হত, তবে কত্তো এসব গাপ।
(উভয়ে ব্রাহ্মণের চরণে প্রণাম করিয়া, নাবিকপত্নী কলসী
মাথায় লইয়া অগ্রে অগ্রে, তৎপশ্চাৎ ব্রাহ্মণের ও
নাবিকের প্রস্থান।
অন্তরাল হইতে নারদ ও শুকদেবের পুনঃপ্রবেশ।
নার। শুকদেব ! ভগবানের কল্পনার ভিতর প্রবেশ
কত্তে পালে ?
ওক। দেবর্ষে! বুঝতে পাচ্ছি। তার পদে একান্ত মতি
থাকলে, মনে অচলা ভক্তি থাকলে, প্রবৃত্তি মার্গে
প্রকৃতির মায়া কোন রকম অনিষ্ঠ কত্তে পারে না,
কিন্তু-( চিন্তা )
নার। (স্বগত) এত আয়ােজন করে এসে, কোথা হতে একটা
‘কিন্তু’ র আবির্ভাব হল ? এখন ঐ ‘কিন্তু’ টুকুর
তিরােভাব হলেই যে আমি বাঁচি। (প্রকাশে)
এখন চল, স্থানান্তরে যাওয়া যাক।
উভয়ের প্রস্থান।
১১

২২
শুকদেব ।
পট পরিবর্তন।
কুটীর।
কুটীর মধ্যে জনৈক সাধ্বী রমণী, নিদ্রিত স্বামীর
পদ সেবা করিতেছে ।
( শুকদেব ও নারদের প্রবেশ ও অন্তরালে অবস্থিতি।
দুর্বাসার প্রবেশ।
দু। 'অতিথি । ( কিছুক্ষণ উত্তর না পাইয়া, কিঞ্চিৎ উচ্চৈস্বরে)
অতিথি
রম। (স্বগত) কি সর্বনাশ! এযে দুর্বাসা মুনি অতিথি
হয়েচেন। কি করি? এর পা নামালে পাছে
ঘুম ভেঙ্গে যায় ?
দু। (কিঞ্চিৎ ক্রুব্ধভাবে ) এখনও নিরুত্তর ? ক্ষুধার্থ
ব্রাহ্মণ অতিথি উপস্থিত, এখনও নিরুত্তর?
রম। (স্বগত। কি করি? হে দয়াময়! পতির ঘুম ভাঙ্গান
যে মহাপাপ। আবার অতিথ, ফিরে গেলেও বে
মহাপাপ । এ যে উভয় শঙ্কটে পড়লুম ।
দু। (পূর্ণভাবে) কি? এতদুর স্পর্ধা ? এত অহঙ্কার ?
দুৰ্ব্বাদ দরজায় উপস্থিত, বারবার ডাকূচি, এখনও
নিরুত্তর ? আমাকে অবজ্ঞা। তবে এই দেখ,
(এই বলিয়া মস্তকের একটা জটা ছিড়িয়া ভূতলে
ফেলিবামাত্র তাহা অলিতে লাগিল।)

শুকদেব।
রম। (স্বগত সভয়ে ) হে নারায়ণ ! হে মা দুর্গতিনাশিনী
দুর্গা! রক্ষা করুন । আমি মরি, তাতে কোন
ক্ষতি নেই, আমার পরম দেবতা
দেবতা স্বামীর যেন
কোন অমঙ্গল না হয়।
দু। (ক্রোধে অগ্নিবৎ জ্বলিয়া) তবে রে পাপিয়সি! এখনও
তাের চৈতন্য হল না ? তবে এই দেখ পূর্ণ
অভিসম্পাৎ কলেম। ( এই বলিয়া যেমন দ্বিতীয়
জটা ভূতলে ফেলিলেন, তাহাও আবার জ্বলিতে লাগিল,
দুর্বাসাও মুচ্ছিত হইয়া ধরায় পতিত হইলেন)
রম। { ধীরে ধীরে পতির পা দু'খানি বিছনায় নামাইয়া
রাখিয়া, জল ও পাখা অনিয়া মুচ্ছিত দুর্বাসাকে
শুশ্রষা করিতে করিতে স্বগত) কি সর্বনাশ ।
একে দুৰ্ব্বাসা মুনি, তাতে আবার তার মৃচ্ছ।
হয়েছে। মূচ্ছ। ভাংশে কি আমার রক্ষা থাকবে ?
আমাকে যে একেবারে ভস্ম করে ফেলবেন।
দু। (চৈতন্য পাইয়া ক্ষীণস্বরে) মা! বড় তৃষ্ণা, একটু
জল ।
বাবা!
রম। (স্বগত) আঃ—রক্ষা হল। ( প্রকাশ্যে ) এই যে
হাঁ করুন, জল খান ? ( দুর্বাসার মুখে
জল দান।
দু। ( জল পানান্তে) মা। বড় দুর্বল হয়েছি, উঠতে
পাচ্ছি না। আমি নিস্তেজ হয়ে পড়িছি ।

১২৪ ।
শুকদেব।
রম। ও কি কথা বলছেন ? বাবা। আপনি এক জন মহা
তেজস্বী ঋষি, দেবতারা পয্যন্ত আপনার নামে
কাপেন, আপনি এত বড় ঋষি হয়ে আজ নিস্তেজ
হয়ে পড়লেন'? আপনার এমন অবস্থা কে করূলে ?
বাবা !
দু। (ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিয়া) মা! আমি বড় লজ্জিত
হয়েছি। তােমাকে অভিসম্পাৎ করিছি বটে, কিন্তু
সে অভিসম্পাৎ বায়ুর সঙ্গে আকাশে মিশ্রিত হয়ে
গেছে। ভস্ম করা, ছিন্ন জুটাতেই রয়ে গেল।
আমার আর কোন ক্ষমতা নাই, কোন তেজ নাই।
বুম। বাবা! বিনাদোষে আমাকে কেন অভিসম্পাৎ
কল্লেন ? আমিত আপনার শ্রীপাদপদ্মে কোন
অপরাধ করিনি? আমি সতীর কাৰ্য পরম দেবতা
পতির সেবা কচ্ছিলুম ! আবার তাতে তিনি নিদ্রিত,
আমাদের কুটীরে আপনার পদধূলি পড়েছে, তা
জেনেছিলুম। কিন্তু কি করবাে? বাবা ! তখন
আপনার কথার উত্তর দিলে পাছে পতির নিদ্রা
ভঙ্গ হয়, এই ভরে আমি চুপ করেছিলুম। এতে
কি আমার অপরাধ হয়েছে ?
৪। , মা! তােমার কোন অপরাধ হয় নাই। তােমার
অপরাধ হলে আমার অভিসম্পাৎ ব্যর্থ হত না।
এখন আমাকে তােলে। সন্তানকে যেমন করে তােলে

শুকদেব।
তেমনি করে তোলাে, তেমনি করে আমার হাত
ধরে আমাকে ভােলা। আমাকে কিছু খেতে দাও,
বড় ক্ষুধা, বড় তৃষ্ণা।
রম। যে আজ্ঞা, বাবা । আসুন।
( দৈববাণী ) ভাে দুৰ্ব্বাস চিরকুমারব্রত অবলম্বন ককূলে
ও বরাষপরবশ হয়ে থাকলে তেজস্বী হয় না।
যে পতিব্রতা সতী, তার পরম দেবতা পতি সেবায়
নিযুক্ত, এমন সতীর প্রতি অভিসম্পাৎ করে, নিজে
হীনপ্রভ হতে হয়। পতিব্র সতী, দাক্ষায়িণী সতী
সমা । এমন সতীর প্রতি যে বিনাদোষে অভিসম্পাৎ
করে, সে মহাজন পদবাচ্য হতে পারে না, আর
তাতে সে সতীর ও কোন অশুভ হয় না।
( দুর্বাসার পদধূলি মশুকে ধারণ করিয়া,
তাহাকে লইয়া রমণীর প্রস্থান।)
নারদ ও শুকদেবের প্রবেশ ।
নার। দেখলে, শুকদেব ! সতীর পুণ্য প্রভা দেখলে ?
সংসারে পবিত্র মতি দম্পতীর ক্রিয়া দেখলে ?
দুর্বাসা হেন মহাতেজস্বী তাপসের অবস্থা দেখে
বুঝতে পারলে, জগতে শুদ্ধমতি দম্পতীর কত পরি-
মাণে পুণ্য প্রভা? পবিত্র প্রকৃতিগত শক্তির কত
মহিমা, হৃদয়ঙ্গম কত্তে পাচ্ছ ?

শুক। দেবর্ষে! বিষম সমস্যা। সামান্য বুঝতে পাচ্ছি কিন্তু
নার। (স্বগত) আবার ঐ ‘কিন্তু। কি ‘কিন্তু
জন্মগ্রহণ করলে গা ?
[ উভয়ের প্রস্থান।

পঞ্চম অঙ্ক।
"Serene will be our days and bright
And happy will our nature be
When love is an unerring light,
And joy its own security."
IV. Wordsworth..

No text on this page.

পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম
দৃশ্য।
শান্তিরাজ্যের পথ।
এদিক দিয়া ভক্তির ও অপরদিক
দিয়া আদিরসের প্রবেশ।
আঃরঃ। পেয়েছ কি কিছু সমাচার ?
ভক্তি। সমাচার কার ?
আঃরঃ। ( সহাস্যে) মহামুনি শুকদেব, সমাচার তার,
আর কার ?
ভক্তি। হেসে
হেসে দেখছ যে আলােকে আঁধার ?
কিবা হেন শুভ সমাচার ?
আঃরঃ। বড় যে বড়াই আগে করেছিলে তার ।
বল দেখি, শুকদেব আজ কাল কার ?
এখন সে শুকদেব আপন দারার।
ভক্তি। (স্বগত) শুকদেব বিবাহিত ? একি সমাচার ?
(প্রকাশ্যে ) এইতেই দেখাতেছ এত জোরজার?
চিরকাল রাখিবে কি শুকে পর পার ?

শুকদেব। ১৫। ' -- জান তুমি, শুকদেব তনয় কাহার । মনের বা কত তেজ, তাও জান তার । আঃরঃ। তেজ টেজ চলে গেছে ভবনদী পার, তপবনে বসে’ শুক গাঁথিতেছে হার- যেমন তেমন নয়, প্রেমের সে হার। স্বরগের বিদ্যাধরী সম রূপ তার, তাহার উপরে তার যৌবনের ভার,- দেখিয়া ঘুরিয়া গেছে মাথাটি বাছার আর কি করিবে শুক ন্যায়ের বিচার ? তপােবন তার, এবে প্রণয় আগার,- আদিরসে হরযে করিছে বিহার, দারা নিয়ে সুখে শুক করিছে বিহার, দু’জনেই দু’জনের আধেয় আধার। ঠিক করে বল দেখি জয় হল কার ? পিলু-বারোঁয়া -দারা। মিছে গুমাের ভবে যে তােমার ? ভালবেসে ক’জন তোমায় করে অধিকার ? মালা গলায়, তিলক সেবায়, বাজারে কিবা চটদার, ত্রিপুণ্ডু, কারুর ভালে, গেরুয়ায় কেউ দেয় বাহার,

শুকদেব।
১৩১
বল দেখি কত টুকু অন্তরে থাক সে সবার ?
এলিয়ে বেণি, ভস্ম মাখা,
কমণ্ডলু ত্রিশূল নিয়ে তার,
করেতে জপের মালা, পুণ্যির ছালা,
বাজারে লুটে চলে যায়,
বল দেখি কত টুকু অন্তরে থাক সে সবার ?
বক ধাৰ্মিক কত শত,
রং বেরংএর পােষাক এটে গায়,
সভাতে ফাটিয়ে গলা, দু’বেলা,
চলে যায় দু’চোক্‌ যেথা যায়,
বল দেখি কতটুকু, অন্তরে থাক সে সবার ?
আমায় দেখ করে আদর
ধরাতে জীবে সমুদায়,
হৃদ মাঝারে ধরে রেখে
কি সুখে জীবন কাটায়,
বল দেখি, আদর কত সকলে করে লো আমার ?
ভক্তি। অমুলক তােমার এ শুক-সমাচার।
[ উভয়ের প্রস্থান ।

দ্বিতীয় দৃশ্য।
নন্দনকানন মধ্যস্থ প্রমােদ কুঞ্জ।
রম্ভাকে মধ্যে রাখিয়া উৰ্বশী মেনক। একদিকে, ও তিলােত্তমা
পঞ্চচুড়া অপর দিকে দণ্ডায়মান।
গীত।
ভৈরবী-দাদরা ।
উঃ তিঃ। সাধের তরী ভাসলাে জলে দেখবি যদি আয়।
মেঃ পঃ। আয় আয় আয়, আঁখি মেলি কুলে কুলে আয় ।
রম্ভা। নাবিক বিনা তরণী কি ভাসে লাে জলে ?
ঝড়ের মুখে তলিয়ে যায় তলে,
উঃ তিঃ। সুবাতাসে হালের বশে
তত্ত্বরিয়ে যায়।
মে, প,। প্রেমের বায়ে, পীরিত ছায়ে,
রম্ভা। মনের মতন মাঝি যদি ধরে তরীর হাল,
ঘুর্নী পাকে হয় কি লাে বানচাল ?
উ, তি,। বানের মুখেও পড়লে তরী,
মে, প,। মনের ভেঙ্গে জারি জুরি, নেচে নেচে যায়।
ইন্দ্রের প্রবেশ।
ইন্দ্র। রম্ভা! দেবর্ষির আয়ােজনে, তুমি যে মা কৈলাসেশ্বরীর
আদেশ পালন কত্তে বিশেষ মনোেযােগী হয়েছ, তাতে
আমি তােমার উপর যার পর নাই সন্তুষ্ট হয়েছি।

4,
:-=-=****
-----
এজন্য তুমি আমার নিকট মনােমত বর প্রার্থনা কর।
তুমি যে বর চাইবে, আমি তাই দেব ।
রম্ভা। দেবরাজ! আগে কৃতকার্য হই। সম্প্রতি ভাবী
আননে আমি এখন আত্মহারা হয়েছি। এখন
আমার মন বড়ই চঞ্চল। আপনার এখনকার বর
আমি সমত্মান্তরে নেবো।
ইন্দ্র' বেশ, উত্তম, তাই হবে ।
অপরগণের গীত! ভৈরবী--- দাদা।
ও;
উ, তি,
}
রম্ভার প্রতি মনের মতন প্রেমিক রতন মিললাে
আজি তাের !
স্বপনেতে চমকে যদি ভাঙ্গে ঘুমের ঘাের।
কোথা ছিল ন্যাংটা যােগী, কিবা তপের জোর,
যােগাসনে বসে’, শেষে করবে নিশী ভাের,
রম্ভা। কপাল গুণে মুনি ৰদি হয় লাে মনচোর ।
উ, তি, | লাল বসনে ফুলের অলঙ্কার,
মে, প, । যােগীর গলায় ঝুলবি যেমন মরকতের হার,
এলিয়ে বেণি এলােকেশে বাঁধবি লাে নাগর,
সুধা পানে প্রাণ জুড়ালে পিয়াসী চকোর।
[ সকলের প্রস্থান।
১২

তৃতীয় দৃশ্য। শুকদেবের তপােবন ; শুকদেবের প্রবেশ । ( একান্তে রম্ভার প্রবেশ ও অন্তরালে অবস্থিতি।) শুক। সংসার, সংসার, ভগবানের নাট্যশালা। এই পর্যন্ত কি আমাদের কর্মকাণ্ডের সীম? গর্ভের কথা বিস্মরণ হয়ে’, মায়ার বশীভূত হয়ে’, বহুরূপী হয়ে সংসার রঙ্গমঞ্চে অবতরণ করে, নানা রঙ্গের রঙ্গিনী সঙ্গে লীলা পর্যন্ত কি আমাদের কষ্মকাণ্ড ? এই কি আমাদের ইহ জগতের কাৰ্য? এই জন্যই কি আমরা সংসারে এসেছি ? (পরিক্রমণ ) কিন্তু ভগ- বানের কল্পনা কোথায় ? হায়রে! সে যে আমাদের অন্তদৃষ্টির অতীত। (পরিক্রমণ ) কি কার্যের জন্য এই সংসার নাট্যশালায় আমাদের আগমন ? কি কাৰ্য্য কল্লে আমরা তাঁর আশীর্বাদের পাত্র হব ? কি কাৰ্য্য কলে আমরা তার প্রসাদ লাভ করবে ? ( পরিক্রমণ) প্রকৃতির শােভায় মােহিত হয়ে, স্বার্থ ও পার্থিব সুখ সম্ভােগের বশ হয়ে জীব উৎপত্তির জন্যই কি আমাদের সংসারে আসা ? ইন্দ্রিয়গণ কি আমা- দের পরিচালক? আমরা কি বীৰ্য্যহীন? আমরা শুকদেব। ১৩৫ কি ইন্দ্রিয়গণের কৃতদাস ? আমাদের যে টুকু জ্ঞান আছে, তা কি ইন্দ্রিয়গণের কাছে তেজহীন ? যারা তেজহীন, যারা প্রভাহীন, যারা স্বার্থ ও ইন্দ্রিয়গণের দাস, তারা কি সেই দ্যুতিমান ভগবানের প্রসাদ লাভ কত্তে পারে ? চিন্তা) রম্ভার প্রবেশ। রম্ভা। দেব ! প্রণাম করি। {শুকদেবকে প্রণাম করিল } গুক। কে তুমি ? রম্ভা। আমাকে কি চিনতে পাচ্ছে না ? পলকে পলকে ভুলে বাচ্চেন ? ক। তুমি রম্ভা ? স্ব বিদ্যাধরী রম্ভা ? দেবরাজের প্রীতি কাননের চির বিকসিত পারিজাত রম্ভা ? কন্দর্প- প্রিয়ার দর্পহারিণী রম্ভা ? আবার আমার কাছে কেন? আবার আমার কাছে তোমার কি প্রয়ােজন? রম্ভা। (স্বগত) একি ? আবার একি ভাব ? ( প্রকাশ্যে ) দেব! উপস্থিত প্রয়ােজন কিছু গুরুতর, কিন্তু অভিসম্পাতের ভয় করি। ক। আর অভিসম্পাতের ভয় কর না। অভিসম্পাত আমার অন্তর হতে বহুদূরে প্রস্থান করেছে। এমন কি সে চির- নিৰ্বাসিত হয়েছে। এখন বল, রম্ভা। আবার তােমার কি প্রয়ােজন ? রম্ভা। দেব! আপনি বীৰ্য্যহীনের মত কথা বলছেন কেন?

Fa*
আপনি যা বলছিলেন, আমি যে সব শুনিছি। আপনি
মহা মুনির তনয় হয়ে, নিজে মহাজ্ঞানী হয়ে, প্রভ)-
হীনের মত প্রকাশ পাচ্ছেন কেন ?
শুক। 'তার আমার সে প্রভা কোথায় ? রম্ভা।
রম্ভা। সে কি ? দেব ! শক্তির সংস্পর্শে জীব শক্তিসম্পন্ন হয়,
না শক্তিহীন হয় ? আপনি ভগবানের প্রিয় পাত্র
হয়ে, শক্তি যুক্ত হয়ে, নিজেকে প্রভাহীন' বলে
আত্মা ভৎসনা কচ্চেন ? আপনি মহা তপস্থা হয়ে,
মহাবীৰ্য্যবান হয়ে রিপুর ভয় কচ্চেন?
শুক। ও কি কথা বলছো ? রম্ভা ! তুমিই না ইতিপূৰ্ব্বে বলেছ,
যে, রিপুর কাছে তপস্যা হীনবল ? এখন আবার
বিপরীত কথা বলছো?
রম্ভ। দেব। আগে যা বলিছি তাও সত্য, আবার এখন যা
বলছি এও সত্য।
ক। তােমার যে এ কথার ভাব বুঝতে পাচ্ছি না।
রম্ভা। প্রভো! দাবানল যখন অল্প মাত্রায় আরম্ভ হয়, তখন
সামান্য বারি পতনে কি সেই অনল নিৰ্বাণ হয় না।
ক? হয়।
রম্ভা। কিন্তু সেই অনল প্রজ্বলিত হয়ে নির্বিঘ্নে যখন ভীষণ
মূর্তি ধারণ করে, লক্ লক্ করে তার শিখা যখন বিমান
ভেদ করে উথিত হয়, তখন সেই সামান্য বারি কি তার
কোন অনিষ্ট কওে পারে ?

কদেব।
১৩৭
শুক। (সচকিতে বীরভাবে না, তা পারেনা, কখনই পরেনা।
রম্ভা। তবে আপনার চিন্তা কেন ? তবে কি জন্যই এত
দুর্ভাবনা ? আপনার অসীম জ্ঞান, ঘাের তপস্যা, এ
সব কি সামান্য কারণে নষ্ট হয় ? মনে করুন, আদ্র
বস্তু কি রবিকরে আগের মত শুষ্ক হয় না? জলের
সৃজন না হলে কি অগ্নির সৃজন হত? অলি, কুশুমের
পরিমল চুমি চুমি পান করে বলে কি কুশুম অপবিত্র
হয়, না সে কুশুমের অঞ্জলি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে
অর্পণ করা যায় না?
শুক। রম্ভ। প্রবৃত্তি কি অস্পৃশ্য নয়? প্রবৃত্তি কি সাধনার
পথে কণ্টক নয় ?
রম্ভা। এ কি কথা বলচেন ? প্রভাে! প্রবৃত্তি অস্পৃশ্য ? প্রবৃত্তি
সাধনার পথে কণ্টক? প্রকৃতি-ভেদে প্রবৃত্তির যে
তারতম্য, তা কি বিস্মরণ হয়েছেন ? ধৰ্ম্মগত প্রকৃতি
কি কখন অশুভ ফল দেয়। আর প্রকৃতি যদিও দোষ
যুক্ত হয়, তা হলে আপনার ন্যায় মহাজনেরা কি সেই
দোষকে গুণে পরিণত কত্তে পারেন না? যে প্রবৃত্তি
হতে জগতের উৎপত্তি আর শ্রী, যে উৎপত্তি আর শ্রী
হচ্চে ভগবানের কল্পনা ও সৃজন, সেই প্রবৃত্তি কি কখন
অস্পৃশ্য হতে পারে ?
শুক। (স্বগত) রমণীর কি রমনীয় প্রলােভন ! ইতিপূর্বে
রম্ভার প্রতি একটু সন্তুষ্ট হয়েছিলেম বলে, আমাকে

শুকদেব ।
।
কি রিপুর দাস করবে বলে মনে করেছে? জানিনা,
কি পাপে রম্ভার সঙ্গে আমার পুনঃ পুন সাক্ষাৎ হচ্চে।
কিন্তু আর না । ( প্রকাশ্যে ) রম্ভা ! আর আমাকে
স্তোক বাকে ভুলিও না ।
স্থা। (সহাস্যে) দেব! প্রভো! আমার কি ক্ষমতা যে
স্তোক বাক্যে আপনাকে ভুলাই। তবে আবার
পুরাতন কথা বলতে হ’ল। প্রকৃতিস্থ হন, অপ্রকৃতিস্থ
হয়ে থাকবেন না। দেবাসুরের পিতা মহামুনি কশ্যপ,
মহামুনি বশিষ্ট, এরা কি অপ্রকৃতিস্থ হয়েছিলেন ?
কি আমবাসী, কি তপােবনবাসী, জগতের যত পুরুষ,
সকলেই কি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে থাকেন? ভগবানের
অতি কমনীয় ধীর শান্ত সূজন যে প্রকৃতি, তা কি
পুরুষের চক্ষে হেয় হয়। প্রকৃতিকে ঘৃণা নেত্রে দেখা
কি পুরুষের পুরুষকার ?
(গীত।)
সিন্ধু-বৎ ।
দিও না দিও না আর দিও না যাতনা ।
চরণে লইনু স্থান, আর যেন ঠেলনা।
প্রম ফাঁসে বঁধা রব, সুখ-দুঃখ ভাগী হব,
যতনে পরিব অঙ্গে কুশমের গহনা
নিতান্ত আমি হে তব, যা সহাবে তাই সব,
জানেন কেশব সব, প্রমূ-দায়ে ফেলনা ।

শুকবে।
* * * *
ক। রম্ভা ! আমাকে বলতে কিছু আর রাকী, রাখনি।
সব শুনিছি, সব বুঝিছি। কিন্তু-কিন্তু রম্ভা। আমার
মন এক প্রকার নূতন পদার্থে গঠিত। তীৰ্যকরূপে
বাবা কৈলাসনাথের শ্রীমুখ হতে মুক্তিতত্ত্ব লাভ করে
অপার আনন্দ ভােগ করেছি। মাতৃগর্ভবাসে, গর্ভের
যাতনা উপেক্ষা করে, সেই তত্ত্ব বারবার আলােচনা
করে পূর্ণ আনন্দ ভােগ করেছি। তুমি এখন
আমাকে প্রকৃতির মায়ায় মােহিত হয়ে অন্য এক
প্রকার আনন্দ ভাগ কতে অনুরােধ কচ্চো। রস্তা !
তােমার এ অনুরােধ বৃথা । এখন আমি তােমাকে
অনুরােধ কচ্চি, তুমি আমাকে আর বৃথা অনুরােধ কর
। তবে যদি রাজর্ষি জনকের মত হতে পারি, তা
হলেও যে কি করবাে, তাও এখন বলতে পারিনা।
উপস্থিত আমাকে ক্ষমা কর।
[ প্রস্থান।
ৰা। এতদিনের পর যে আমার মনে ভয়ের সঞ্চার হ’ল ?
উপস্থিত শুকদেবের মনের অবস্থা যেরূপ দেখছি, তাতে
বড় ভাল বােধ হচ্ছে না। তাইত, কি করি?

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক , #
ভক্তির আলয় ।
ভক্তি। (প্রবেশ করিতে করিতে নেপথ্যাভিমুখে।
ওকি ওকি ? আদিরস! কোথা যাও হেঁট মুখে ?
দেখেও যে দেখনা আমায় ?
আগেকার সেই তুমি, আজ কেন হেন ভাব ?
একমনে চলেছ কোথায় ?
সঁাড়াও দাড়াও, ভাই! মাথা খাও ফিরে চাও,
কথা দু’টো শুনাও আমায়।
এস, সই। এস এস, বুক ভরা রাগ কেন?
অধিনীরে কেন ঠেলাে পায় ?
আদিরসের ধীরে ধীরে প্রবেশ।
আঃ র। কি আর শুনাব ? সখি! কিবা কথা আছে আর ?
কোন দিকে মুখ আর নাই।
আগে যদি জানিতাম নীরস জীবন তার,
তা হলে কি তার কাছে যাই ?
ভক্তি। কোথায় মনের গতি, কিরূপ আচার কার,
মুখ দেখে পার না বুঝিতে ?
গ্রন্থকার, এই গৰ্ভাকে, পদ্য ও গীতে, একটি মাত্রও যুক্তাক্ষর
ব্যবহার করেন নাই।
প্রকাশক।

শুকদেব।
....ta ,
. ******
* - - * * *
* *
শুধুই আমােদে মাতি’ নিতি নিতি নানারসে
ফেরো সদা নব নবনীতে ?
(তামার যা আমােদ, তা দু’দিনের বেশী নয়,
আসা যা’য়া কাচায় কঁাচায়।
তাই বলি শুন, সই। কসিতে আমােদ দাও,
হাঁটি হ'লে তােমায় কে চায় ?
আমি দেখ চিরদিন নিবসি হিয়ায় তার,
যে আমায় করে লো আদর।
দিনে দিনে কত তার বেড়ে যায় যশ মান,
সব লােকে পায় সমাদর।
আমার গমন যেথা, অগণন সুখ সেথা,
অবশেষে গিয়ে অমরায়,
অমরের কারে’ সেবা সুখে থাকে চিরকাল ।
তােমাকে যে ভজে, সে কি পায় ?
(কীত্তন)
সাধ করে সাজায়ে বাসর, থাক রসবতী সনে।
পলে পলে রসের খেলা খেলাও হরষিত মনে ॥
নবীন নবীনা পেলে, পড়ে তাদের গায়ে হেলে,
দিনে রেতে রাখ তাদের কতমত রসে ফেলে,-
আবার—কখনবা করাও মান, বাড়াও কখন্ অভিমান
{ বাড়িয়ে দিতে রসের খেলা )

১৪২
শুকদেব।
আঁখিনীরে করাও আবার নিশী অবসান,
শেষে-অভিমান ভাসিয়ে দিয়ে,মাতাও তাদের নিরজনে।
( মরি কিবা খেলা খেলে )
( ভুলিয়ে দিয়ে আসর বাসর খেলা খেললা)-
(কত রসে রসিয়ে তাদের, খেলা খেলাে )-
( রসাতলে পাঠিয়ে মানে, খেলা খেলাে )
(মরি কিবা খেলা খেলাে)
নব রসে সহরষে মাতাও তাদের নিরজনে।
[ আদিরসের প্রস্থান।
ও পশ্চাৎ পশ্চাৎ গীত গাহিতে গাহিতে ভক্তির প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য।
গােলােকধাম।
বিচিত্র দেবমঞ্চে গােলােকেশ্বরী সহ গােলােকনাথ আসীন।
গােলােক-কিরিগণ মঞ্চের নিয়ে দণ্ডায়মান
হইয়া চামর ব্যজন করিতেছে।
নারদ ও ইন্দ্রের প্রবেশ, ও দেব দেবী চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত।
গােলাে। এস, নারদ! এস, দেবরাজ !
গােলােকে। কেমন ? তােমাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল ত ?

শুকদেব।
১৪৩
• নার। মা! আপনাদের কৃপায় আমি ত কখনই অমঙ্গলের
মুখ দেখুঁতে পাইনা। তবে সম্প্রতি দেবরাজের জন্য
কিঞ্চিৎ চিন্তিত আছি।
গােলােকে। কেন? দেবরাজের কি হয়েছে ?
নার। মা ! দেবরাজ সম্প্রতি একটি দুরূহ কায্যে হস্তক্ষেপ
করেছিলেন, তাতে ভবিষ্যতে ওর মঙ্গল কি
অমঙ্গল, কি যে নিহীত আছে, তা’ত বুঝতে
পাচ্ছিনা।
গােলাে। (সহাস্যে) কেন ? দেবরাজ কি এমন কাৰ্য করেছেন ?
ইন্দ্র। (করযােড়ে ) প্রভু ত অন্তমি,—ত্রিসংসারে এমন
কি বিষয় আছে, যা প্রভুর বিদিত নয় ?
নার। (করযােড়ে ) দেব! আর ছলনা কেন ? শান্তি দিন।
গােলাে। তার জন্য চিন্তা কি ? মা ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছায়
সকলই হচ্ছে। এর ভবিষ্যতে কি অমঙ্গল নিহীত
থাকতে পারে ?
গােলােকে। তবে মায়াকে একটু সাবধান করে দিও।
সে যেন সময় বুঝে শুকদেবকে আশ্রয় করে।
নার। মা ! সে পক্ষে ও চিন্তা নাই। রাজষি জনক হতে
মায়া সুশাসিত হয়েছে।
গােলা। তবে দেবরাজের চিন্তার কারণ কি?
ইন্দ্র। প্রভাে! মুনি ঋষিদের মস্তিস্কের ঠিক নাই। তারা
কখন কি ভাবে থাকেন, কিছুই অনুভব করা যায়

১৪৪
কদেব
মা। ' ক্ষণে তুষ্ট ক্ষণে কষ্ট।
তুষ্ট ক্ষণে অষ্ট। এই একটু ভয়ের
কারণ।
গােলো। মহামুনি শুকদেব ধীর শান্ত। তা হতে কোন
চিন্তা নাই।
দুই দিক দিয়া ( দুই জুন করিয়া । চারিজন
কিন্নরের গীত গাহিতে গাহিতে প্রবেশ ।
ভৈরবী-একতালা ।
কিন্নরগণ। জয় জয় জয় জগতনাথ, জগত পালন কারণঃ
জয় জয় জয় কলুষ নাশন, শান্তি নিকেতনং।
।
{ দুই দিক দিয়া, দুই জন করিয়া, চারিজন
কিন্নরীর গীত গাহিতে গাহিতে প্রবেশ।
ব্ল:
ঐ
তা:
কিন্নরীগণ।
জগত জননী, গত পালিনী,
জগজ্জনের অশুভ নাশিনী,
ভুংহি পিতা, সুংহি মাতা,
শান্তি বিধায়িনী
কিন্নরগণ।
পরম পুরুষ পরাৎপর,
সংসার সারাৎসার,
দীন দয়াল দীন বন্ধু,
দনুজ দর্প দলনং।

কদেব।
কিন্নরীগণ।
পরমা প্রকৃতি পরমা শক্তি,
তুমি মা সেথায়, যেথায় ভক্তি,
কি কব তােমার মহিষা-অপার,
ভকত মন চারিণি!
তুমি অনাদি তুমি অনন্ত,
ভুমি হে বীর ধীর শান্ত,
ক তান্তের তুমি কৃতান্ত,
তাপ এর নাশনং,
সকলে।
লইনু চরণে শর
দিগন্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Shukdeb

Author
Bandhopadhyay,mahendranath
Title
Drishya Kabya
File name
Shukdeb
Text
OCR done
Citation
1903
Published
2009/10/8
Publisher
Nagendranath Bandhopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
156
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Madan
DLI number
513288
Barcode
4990010020280.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
p4d8JSbWGlh
Download PDF

Shukdeb