Makardah Saraswat Library, Howrah

Sandhya Sankha

Bandyopadhyay, Kedarnath · 2009/08/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শ্রীকেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২৩১১, কর্ণালি , কলিকাতা

দাম—দু’টাকা
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৫
সি চট্টোপাধ্যায় এ সলের পক্ষে গত এিংি ওয়ার্কস হইতে
গােবিপদ ভট্টাচাৰ্য আরা মুমিত ও প্রকাশিত
২০১১ ওয়ালিস , কলিকাতা

ভাশীষ সহ
প্রিয় “বনফুল” কে—
সাদরে সমপিত।

No text on this page.

নিবেদন
শরীর বহুদিন অপটু। কোনাে প্রকারে আমার কয়েকটি লেখা
সংগ্রহ ও একত্র করে প্রেসে পাঠাই। ইচ্ছা ছিল—অনিয়ম ও
অশুদ্ধিগুলি প্রুফ, দেখবার সময় যথাসম্ভব ঠিক করে দেবার।
যখন প্রুফ, পেলুম তখন রােগ শয্যায়। সক্ষমতার আশায় প্রায়
মাসাধিক অপেক্ষা করেও ফল হ’ল না। সমগ্র একখানি পুস্তকের
টাইপ, এতদিন আটকে রাখার অসােয়াস্তি ও অভদ্রতা আর সহ
হওয়ায়, পূর্বাবস্থাতেই ছাপিতে সম্মতি দিতে হ’ল। অপরাধ
রহিয়াই গেল। বিশেষ—ইংরাজি কথাগুলি বাংলায় লিখে দেওয়া
বা বাংলা করে দেওয়া হয় নাই। আশা করি এ যুগে আমার
প্রিয় পাঠক পাঠিকাদের তা’তে বিশেষ অসুবিধা হবে না। অপরাধ
নিশ্চয়ই হােলা, সেজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি।
বিজয়া দশমী
পূর্ণিমা
২০শে আশ্বিন ১৩৭
কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

পুনশ্চ- দুর্ভাগ্য সঙ্গী বিনা আসেন না। একটু সামলে-নিজে দেখতে গিয়ে—এমন একটি গুরুতর ভুল ধরা পড়ল, স্তম্ভিত ও অশান্ত করে দিলে। ১৩ বৎসর পূর্বে যে লেখাটি আমার “কবুলতি” বলে পুস্তকে-“পূজার প্রসাদ” নামে একবার প্রকাশ পেয়েছে, সেটি পুনরায় সন্ধ্যাপের মধ্যে দেবদাসের দুর্গোৎসব” নামে ছাপা হয়ে গিয়েছে। সে কারণ আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও শান্তিহীন চিত্তে অপরাধ স্বীকার করছি। আমার আর উপায়ান্তর নাই। সকলে দয়া কোরে আমাকে ক্ষমা করেন—এই আমার বিনীত প্রার্থনা। কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিষয়-সুচী
১। দেবা ন জানন্তি--
(ক) সুরমার দন্তমূল
(খ) সজ্জন সঙ্গ
(গ) রিলেটিভ
(ঘ) শান্তিপর্ব
২। ভােলানাথের উইল
৩। মায়ের অনুগ্রহ
৪। দাদার শ্বশুরবাড়ী
৫। মেহের ফা
৬। চাটুযয্য সংবাদ
৭। কালাচাদের চতুর্বর্গ
৮। দেবদাসের দুর্গোৎসক

No text on this page.

দেবা ন জানন্তি

No text on this page.

সুরমার দন্তশুল ধীরাজবাবু হাইকোর্টের এড়ভােকে। বাড়ির যে তিনি কি, সেটা ভেবে পাননা, অবশ্য ননীর ও রাধারাণীর বাবা বটে, এবং সুরমার স্বামী। কিন্তু আলে সেখানে অল্পই কাজ দেয়। কারণ সুরমা তার আক্কেলের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না অথচ মূর্ণ মনে সে সম্বন্ধে অন্ধ। ধীরাজবাবু মিষ্ট প্রকৃতির মানুষ। কথা অল্পই ক—তাতেও থ এসে অনর্থ সৃষ্টি করে,—অভ্যাস সামলাতে পারেন না। সুরমা বড় ঘরের মেয়ে—আভিজাতের দাবী রাখেন ও সেই চালে চলতে চান। সম্রান্তদের সংশ্রব খোজেন।—ভ্রান্ত ধারণায় সেটা টাকার ওজন ধরেই চলে। ধীরাজবাবু আভিজাড়গােত্রের মানুষ নন, সাধারণ মধ্যবিত্ত ভদ্রবংশের লোেকসুরমার সম্মান রক্ষার্থে কেবল সেটার রিহার্সেল দেন কিন্তু বেসুরাে মানে তালু কাটে, সামলাতে অনেক সইতে হয়। আভিজাত্বের পরিচয় মধ্যে তার ‘গাউট মাত্র সম্বল। ওকালতী পাস করবার পর উঠতি সন্ধ্যা শঙ্খ মুখে এই সৌভাগ্যটুকু দেখা দেওয়ায় কোর্টে যাতায়াতের আগে এবং অন্য কারণেও একখানি সেকেলে 2nd hand Ford কিনতে বাধ্য হয়েছেন। গ্রহদোষে সেখানি কিন্তু “গুণ হােয়ে—দোষে দাড়িয়ে গেছে! বিশেষ বিশেষ ব্যাধি প্রায় ভাগ্যবানদেরই আশ্রয় নিয়ে থাকে, যথা—গাউট, ডায়েবেটি। আবার ‘দন্তয়ােগও নাকি লক্ষ্মীমন্তদের একটি লক্ষণ সুরমা সেইটি নিয়েই থাকেন,—সেটি একাই একশাে। অধুনা প্রমাণও হয়েছেদনই বহু রােগের Gateway এবং দাতের গােড়াই তাদের জন্মস্থান বা জঠর। যন্ত্রণারও নির্দিষ্ট সীমা নাই। রােগটির তাই কদরও আছে খাতিরও আছে। বিশেষ প্রথম শ্রেণীর Dentistদের কাছে। তাঁরা সুরমাকে যথেষ্ট সমাদরে চিকিৎসা করেন। Expertরা বলেন—“অমুক ‘ডচেসের ছিল, বড় বংশ ভিন্ন ওয়ােগটি হয়না,আশ্চৰ্য্য! Very pure and noble blood যাদের, তারাই সহজে সসেপটিব”—ইত্যাদি। কথাটা Dentist নির্মলবাবুর মুখ থেকে বেরােয়। সেই পৰ্য্যন্ত সুরমা তাকে ছেলের মত দেখতেন। নির্মলবাবুর বয়স কম, সুপুরুষ, আবার পিতার বিপুল ধনের অধিকারী হয়েছেন। সুরমার ধারণা -সন্ত্রান্ত বংশের ছেলে ভিন্ন এসব দিকে নজর কয়জনেরই বা থাকে। ফলে তিনিই তাঁর প্রিয় Dentist. কিন্তু রােগটির কদর ও খাতির ধীরাজবাবুর চেয়ে যে কার কাছে বেশী ছিল তা আমরা জানিনা। রােগটির শূলুনী কথায় ৪

দেবা ন জানন্তি
কথায় দেখা দেয়,কখন চাগাবে তার স্থিরতা নেই Air borne
কি word born তা ঠিক করা কঠিন ছিল, তাই তিনি সর্বদাই
সশৰু থাকতেন কারণ বাড়ির সকলকে তার তাড়স সমানে ভােগ
করতে হয়, কারাে শান্তি থাকেনা এমনি যন্ত্রণার জোর!
যাক, পূর্বেই উল্লেখ করেছি—2nd hand Ford কেনাটাই
ধীরাজবাবুর “গুণ হােয়ে” “দোষ” হয়েছিল। ওই “সেকেণ্ড কাণ্ড,
ফোর্ড” গৃহ প্রবেশের পর সুরমার পাতের যন্ত্রণা প্রবল হয়ে তাকে
অস্থির করে। কলকেতার সেরা সেরা আদ ডজন ডাক্তারদের
‘বাের্ড’ বসে এবং প্রাথমিক Blood ইত্যাদির চতুসগিরী পরীক্ষার
ভূমিকাতেই ধীরাজবাবুকে ভূমিসাৎ করে ফ্যালে। ওই চতুরঙ্গ
পরীক্ষাগুলি নাকি তাদের First aid-তদুপরি পথ্য—গ্ৰেপযুসে
গােল সেনাটোজেন চলতে থাকে, আর সর্বক্ষণ দাতে চকোলেট
চেপে রাখা ও বাইরে ওডিকলনে ভেজানাে রুমাল। Dentist
নির্মলবাবু জাৰ্মাণীর ডিপ্লোমাধারী, তার উপরেই সুরমার বিশ্বাস
বেশী, তিনি দু'বেলা দেখে যান এবং একটু সামলালে প্রতি সন্ধ্যায়
মােটরে বায়ু সেবনের ব্যবস্থা দেন। তাতে ধীরাজবাবুর আয়ু হরণ,
দিন দিন সুস্পষ্ট হতে থাকে।
কন্যা রাধারাণী—বেগুনে ফাষ্ট-আর্টস পড়ে। সে একান্তে
বাপকে বলে—“কিন্তু ও মােটারে তাে মা উঠবেন না, ও অপয়া
গাড়ীখানা বদলে ফেলাই ভালাে! তােমারাে গাউট ইত্যাদি।
মা বড় কষ্ট পাচ্ছেন...

সন্ধ্যা শখ
ধীরাজবাবু উদাসভাবে বলেন—তাতে দেখতে পাচ্ছি মা
কিন্তু
রাধারাণী বলে—“কিন্তুতে আর কাজ নেই বাবা, ওটা শিগগীর
বিদেয় করাই ভালো।”
“তাও তাে দেখছি। তবে আরাে যে একটা “কিন্তু রয়েছে
মাওনা যে তা হলে এখন 3rd handএ দাড়ালাে। 3rd
hand নেবার মতাে গাউটে-ধরা গরীব খুজতে আমাকেই যে
হাঁটতে হবে না। সাড়ে চারশাে টাকায় পেয়েছিলুম,—এখন
দেড়শােয়••••••
রাধারাণী তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললে—“তুমি বুঝছনা
কেন বাবা! ও-খানা না হয় নিলেমে দাও,-একখানা
‘বুই’, ‘মরি কি Standard না হয় নিয়ে এসাে,-নতুন হলেই
“তবে?
-“বুঝছি তাে সবই রাধন, তাতে সুবিধে হয় বটে, কিন্তু
‘গ্রেপ যুসে’ যে শুষে ফেললে মা-
রােগেয় পথ্যে আর চিকিৎসাতে তত কম
যাচ্ছে না।”
“কিন্তু Co-operative Bank তে Thank পেলেই টাকা
দেবেনা,-দেনায় যে ডুবে গেলুম-*
“ণা যে আর দেখতে পারা যাচ্ছেনা বাবা-
ধীরাজবাবু—“আর ওই কেতানিটা শুনতেও—*

দেবা ন জানন্তি
-“হ্যা, আগে আর এক কাজ ক মা। বাসার মালিক
আবার বাইরে এক পাতুরে “ট্যাবলেট” না তকমা এটে রেখেছেন
“শান্তি কুটীর।” ওইটের ওপর একখানা কাগজ আজই মেরে-
দেমা। যেতে আসতে যেন পরিহাস কোরে মাথা খারাপ কোরে
দিচ্ছে। তার কণা ছেলে তাঁর কাছে পদ্মলােচন হতে পারে,
আমার যে শান্তি মােচন হয়েছে।”
“ওতে তাে মায়ের রােগের জড় মরবেনা বাবা,—সে দেখা
দেবেই।”
“তবে আমাকেই দেখছি নেপালের চায়ের দোকানে না
গােপাল হয়ে সকাল বিকেল পথ চেয়ে থাকতে হবে—
“কেননা বাবা ?”
গাউটে কে খোঁড়াচ্ছেন—লক্ষ্য করতে হবে তাে,যা পাওয়া
যায়—
রাধারাণী বিষন্ন মুখে বললে—“তুমি এখন নাইবে চলল তােত
বাবা”
“হ্যা—মাথায় জল দেওয়াই ভালাে”—একটা গভীর নিশান
পড়লাে।
বাইরে মােটরের হর্ণ, সঙ্গে সঙ্গে—“ধীরাজবাবু বাড়ি
আছেন কি?
রাধারাণী বিরক্তভাবে বললে-আবার কে এলেন। সে
ভেবেছিল Dentist নির্মলবাবু।
৭

সন্ধ্যা শখ ধীরাজবাবু সসব্যন্তে উঠে পড়লেন—“এযে পরেশের গলা, extantcate Bar Library, Secretary."- রাধন একটু অন্তরালে সরে গেল। ধীরাজ। (সদর দরজা খুলেই) পরেশ ভায়া নাকি,–এসাে এসাে ভাই। পরেশবাবু ও তার কন্যা রাকা প্রবেশ করলেন। ধীরাজ। কি ব্যাপার? অতদূর থেকে! এসাে এসাে রাধারাণী বেরিয়ে এসে হাসিমুখে রাকার হাত ধােরে—“এসাে ভাই” বলে, বাপের দিকে চেয়ে—“আমরা এক সঙ্গে পড়ি বাবা।” ধীরাজ। তবে তাে ভালই হয়েছে, মাকে উপরে নিয়ে যাও। পরেশের প্রতি) খবর কি বলে ? পরেশ। বিশেষ কিছু নয় ভাই, বাসা খুজতে বেরিয়েছিলুম- ধীরাজ। কেননা, বালিগঞ্জে ছিলেন ? পরেশ। ছিলুম তাে, কিন্তু বালিগঞ্জ আমার জন্যে নয় ভাই, সে তেতে ক্ৰমে hot bed হওয়ায় খাপ খেলে না! জানই তাে- বালির তাতের কাছে সূর্যের তাত, Ice Cream,মাসখানেক হােললা বালিগঞ্জ ছেড়ে ডায়মণ্ডহার্বারে গিছি কিন্তু পেট্রলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছিনা ভাই—সে পেড়ে ফেলছে। আমাদের গমবাজারই ভালাে-খাটি দিশি জিনিষ,—যখন তখন ঠাকুরদের নামটাও করা হয়।

দেবা ন জানন্তি ধীরাজ। বাসা পেলে ? পরেশ। তােমার খুব কাছেই পেয়েছি, তাই একেবারে engage করে এলুম। তবে উঠে আসতে আমার দিন পনেরাে দেরি আছে, অর্থাৎ এই মাসটা সেখানে কাটিয়ে আসবে। একদিন বেড়িয়ে আসবে চলনা- ধীরাজ। বেশ কথা। কিন্তু তুমি আমার এবাসা চিনলে কি কোরে ? পরেশ। কেননা, তােমার কাছে তাে একদিন শুনেছিলুম- “শান্তিকুটীর”। সে কি ভােলবার সামগ্রী ভাই, ওযে দিন রাতের কাম্য। ধীরাজ। তাতে আর ভুল কি- তার পর দুই বন্ধুতে নানা কথা। রাধা সিঙাড়া আর চা খাইয়ে গেল। পরেশবাবু হাসতে হাসতে বললেন-“হাতে হাতে এইতাে তার প্রমাণ পেলুম, শান্তিকুটীর আর কাকে বলে? হ্যা একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, তুমি আমার সিনিয়ার ম্যান্“তুমি বলতে পারবে ধীরাজ। অনেক বিষয়ে সিনিয়ার বটে; কি—কথাটা পরেশবাবু বেশ গভীর ভাবে বললেন-“আচ্ছা—এই যে লােকে rather স্ত্রীলােকে, বৈদ্যনাথে ‘হত্যে’ দেয়—তাতে কাজ হয়, তুমি বিশ্বাস করাে?”

সন্ধ্যা শখ
ধীরাজ। ( সহাস্যে) তােমার আবার এ খেয়াল কেননা?
বিশ্বাসীর কাজ হয় বােধ হয়, তা নয়তাে তারা হত্যে দেবে কেননা !
তবে বিশ্বাস আর কার থাকে,—“কারে পড়লে তখন বিশ্বাস
অবিশ্বাসের কথা লােকের আর মনে আসেনা বলেই বােধ হয়।
তােমার এ দুর্ভাবনা কেনন? মক্কেলকে ব্যবস্থা দেবে বুঝি?
পরেশ বাবু একটু হাসি টেনেবললেন-“তাতে কোনাে বেটা কি
ফি দেবে! একজন যাচ্ছে দেখলুম--তাই। হাপুরুষেও হত্যে
দেয় নাকি ?
ধীরাজ। বিপদের severity আর Densityর কাছে
স্ত্রীপুরুষ আছে কি, সকলেই কাহিল...
পরেশ। তা বটে,তা হলে পুরুষেও দেয়-
রাধারাণীর সঙ্গে রাকা নেবে আসায়, কথাটা শেষ হতে
পেলেনা। রাকা বললে—“যাবেনা,১১টা বাজে যে বাবা।”
“এই যে মা, আচ্ছা, আজ তবে চলি ধীরাজ। বাসা তাে
চেনাই রইলাে। তুমি একদিন যেও কিন্তু।”
পরেশ বাবু ও রাকা চলে গেলেন।
রা। চলল—এইবার নাইতে চলাে বাবা, অনেক দেরি
হয়ে গেলাে=
“খা—সেই ভালাে মা।”

---
রাধারাণীর কলেজ বন্ধ, গ্রীষ্মের অবকাশ। সে সর্বক্ষণ মায়ের
সেবায় থাকে। সুযােগমত কথায় কথায় সুরমা দেবীকে সুসংবাদটা
শুনিয়েছে—“বাবা মােটরখানা নিলেমে দিচ্ছেন। বললেনড়
জার্কিং, ভারি অস্বস্তিকর,—সস্তা খুঁজে দুরবস্থাই বেড়েছে। নড়া-
চড়ায় গাউটের যন্ত্রণা বেড়ে যায়।” ইত্যাদি।
সুরমা গভীরভাবে শুনে, কেবল বললেন—“ভাগ্যে গাউন্টু ছিল!”
র কথাটায় অভিমানের চাপা সুর বেজে ওঠায়, রাধারাণী বলে,
“না মা—আসল কথা তােমার বৈকালে একটু বেড়াবার ব্যবস্থার
উপায় করবার জন্যেই তিনি ব্যস্ত হয়েছেন, নিজের গাউটই তাকে
গাড়ীখানার অপদার্থতা বুঝিয়ে দিয়েছে।”
“আচ্ছা—বেশ বেশ,তুই থাম্। আমার জন্যে তাকে ভাবতে
হবেনা ! নিৰ্ম্মল বেঁচে থাক, তার দুখানা “কা”-বেড়াবার জষ্টে
একখানা পাঠিয়ে দেবে বলেছে। অমন ছেলে লাকোয় একটি মেলে
,খাটি সম্রান্তদের ব্যবহারই স্বতন্ত্র।
রাধারাণী বলতে যাচ্ছিল—“সেটা কি ভালাে দেখাৰে মা,
তাতে বাবার ইত্যাদি। কিন্তু নিজেকে সামলালে, কথা
বাড়তে দিলে না।

সন্ধ্যা শঙ্খ === সুরমা আজ কয়দিন একটু ভালাে আছেন। ধীরাজবাবুও তার মুখে “ইদের চাঁদের হাসির ক্ষীণ রেখা লক্ষ্য করেছেন,—অর্থ- সেকেণ্ড-হাণ্ড গাড়ীর সুখ বুঝেছ তােতার কেবল ‘go'-এর দিকেই গতি, lumbago থেকে vertigo•••ও গাড়ী ‘go-এর পথেই নিয়ে যায়। আসল কথা—ঐ সঙ্গে মান সম্রমও! দুদিন থেকে বৈকালে নির্মল বাবুর ‘বুইক’ আসছে তার বেড়িয়ে আসবার জন্যে। নির্মলের সবিনয় নিবেদন আছে-একদিন তার Dentists-houseএ সকলের পায়ের ধূলাে দেবার। সুরমা সে কথা সকলকে জানিয়ে রেখেছেন। চৌকাটের বাইরে যাদের পায়ের কাজ বন্ধ, তাদের পায়ের ধূলাের কথা একান্তই অবান্তর, যাক। আজ যাবার দিন। ধীরাজবাবু সাগ্রহে প্রস্তুত, মাঝে মাঝে সকলকে তাড়া দিচ্ছেন। বলছেন—“নিৰ্ম্মল কাজের লোেক, তার সময়ের মূল্য আছে,তাকে যেন আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে না হয়।” শ্যামলী, রেবা—রাধারাণীর সহপাঠী, তারাও যাবে। তাদের প্রতি সুরমার ইঙ্গিত আছে—“রাধা যেন সেই পাশী-প্যাটার্ণের চাপা রঙের সাড়ী থানা পরে।” রাধারাণীর কিছু ভাল লাগছেনা-তার মাথা ধরেছে, সে বিরক্ত, যাবার ইচ্ছে নেই। রেবার কাছে সে কথা শুনে, ধীরাজবাবু চমকে গেছেন। একান্তে রাধাকে বললেন-“আমাকে রক্ষা করমা, জানই তাে এক ১২

দেবা ন জানন্তি
পরিণাম কি আর কাকে তা সইতে হবে। তুমি এ কষ্টটুকু না
সইলে আমার যে আর”.•••••রাধারাণী আর কথা কইলেনা।
তারপর “শ্রীদুর্গা” বলবার পালা। সেটা কেবল ধীরাজবাবুই
মনে মনে জপ ছিলেন।
—মােটর Start দিয়েছে। চিত্তরঞ্জন এভেনিউয়ে ঢুকতেই
সুরমাদেবী বলে উঠলেন-“একি,গাড়ী চলছে নাকি! কিছু বােঝবার
জো নেই তাে?” ধীরাজবাবু যেন মুকিয়ে ছিলেন, বললেন-“ঠিক
ওই কথাই ভাবছিলুম, দুধারের বাড়িগুলােকে পিছনদিকে ছুটতে
দেখে বুঝলুম, তাও অনুমানে•••••এমন না হলে মােটর!”
রেবা শ্যামলীর দিকে চাইলে।
মােটর নির্মলের গাড়ী বারাণ্ডায় এসে থামলাে। মা ব্যন্ত
হয়ে, আগেই নেবে গেলেন। উৎসাহের আতিশয্য তার রুমালখানা
সিড়িতে যে কখন্‌ পড়ে গেল, সেটা জানতেই পারলেন না।
রাধারাণী ধীরাজবাবুকে বললে—“আমার শরীরটা ভাল বােধ
করছিনা,আমি গাড়ীতেই থাকি বাবা-
“সেটা যে ভালাে দেখাবেনা মা। মিনিট পাঁচেক বসেই
আমরা••••••তােমার মা তাে কেবল দাত দেখাতেই এসেছেন...”
রেবার চঞ্চল প্রকৃতি-সে খুক কোরে উঠলাে,-অর্থাৎ
হাস্য মন।
পর মুহূর্তেই নির্মলবাবুকে এগিয়ে দিয়ে
এগিয়ে দিয়ে সুরমাদেবী
বেরিয়ে এলেন।
-

भकाभध নির্মলবাবু সবিনয় অভ্যর্থনা ও অনুনয়সহ সকলকে নাবিয়ে সুসজ্জিত সিটিংরুমে সােফা, কোচ, ও চেয়ারে বসিয়ে ধীরাজ বাবুর পায়ের ধুলে নিলেন, অর্থাৎ পা ছুলেন। সুরমা দেবী ধীরাজ- বাবুর দিকে সগৰ্ব্ব-প্রফুল্ল দৃষ্টি হানলেন,-মানে-“তব্য ব্যবহারগুলাে লক্ষ্য কোরাে।” তার পর ব্যন্ত ভাবে নির্মলবাবুকে বললেন—“তুমি যাও বাবা তুমি যাও। সে লােকটী হুঁ করে বসে আছে। তার যে কি যাতনা, সে অপরে বুঝবেনা—সে আমিই বুঝছি। যাও, যাও বাবা; আমরা ততক্ষণ একটু দেখি শুনি—বিশ্রাম করি। এ তো আমাদেরই বাড়ি—আমাদের জন্যে ভাবতে হবেনা। তার পর কিন্তু তােমার মাকেও বলেই একটু হাসতে গিয়ে, চোখ নাক মুখ কুঁচকে—উহু-হু করেই নাকি সুরে—“রুমাল খানা কোথা গেল! সিকের যে গোঁ.. ধীরাজবাবু কুড়িয়ে এনেছিলেন,-“এই নাও।” নিৰ্ম্মল—“আচ্ছা মা, আপনাকে এখুনি দেখছি।” ধীরাজবাবুর প্রতি—“ক্ষমা করবেন, এলুম বলে। লােকটা বড়...” ধীরাজবাবু। আহা ও বিষয়ে আবার কথা কি, যাবে বইকি। নির্মলবাবু চলে গেলেন। সুরমা। নির্মলের কি মিষ্টি কথা! বড় ঘরের ছেলে- ব্যবহারেই... শামলী। ( ধীরে ধীরে) মেশােমশার খুব নজর তাে, রুমাল পড়ে যাওয়া আমরা তাে•• ১৪

দেবা ন জানন্তি
ধীরাজবাবু। ও অভ্যাস যে আমার অনেক দিনের মা,নজর
খুব নয় মা-নজর রাখতে হয় খুব। দাতের যাতনা ওঁকে সব ভুলিয়ে
দেয় কিনা! সেটা তাে আমি বুঝতে পারি
সুরমা। ছাই পারে! হলে বুঝতে। আমার বয়সে
ধীরাজবাবু। সে সৌভাগ্য কি এবার আর হ্যা কাজের কথা
ভুলে যাই—নিৰ্ম্মল একদিন বলছিলনা—“আমেরিকার অনেক
সুন্দরী—সব জাতগুলি তুলিয়ে ফেলে—সুস্থ ও দীর্ঘজীবি হয়েছেন,
সৌন্দৰ্যও বেড়েছে। ঘন ঘন যে কঠিন যাতনাটা পাও—দেখতে
পারিনা! তার চেয়ে সব দাতগুলি ফেলে দিয়ে নিরাময় হওয়াই...
সুরমা। থাক থাক্‌-অত দরদ ভালাে নয়। নির্মলের কথা
আমি বিশ্বাস করি। আজ আমি রাধণের দাতগুলি ক্রেপিং
করিয়ে নিয়ে যেতেই এসেছি। মাঝে মাঝে ওটা করানাে ভালাে-
ভয় থাকেনা। রাধণ আমার একমাত্র মেয়ে তাই.••
ধীরাজবাবু। ভাল কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছ। তাইতাে,
সে আমাদের একমাত্র মেয়েই তত বটে! তাকে দীর্ঘজীবি করার
উপায় যখন রয়েছে, আমি বলি কি, বার বার ওকে আর
‘স্ক্রেপিংয়ের কষ্ট না দিয়েও পাপ নির্মূল করাই ভালাে। মনে
কোরে যখন দিলে, বাধা আর দিওনা, তুমি সম্মতি দাও
সুরমা। আর তােমায়াে-
ধীরাজবাবু। সে সৌভাগ্য এবারকার মত খুইয়েছি, তখন
কি জানি-দেশে এমন সঞ্জীবনী আসবে! দন্তবক্ষতীর্থ বেড়াতে

সন্ধ্যা শখ গিয়ে, পাঁচজনের কথায়, দাতগুলি তাকে উৎসর্গ করে নিজের পায়ে কুড়ল মেরে বসেছি। ওতে আর আমার অধিকার সুরমা। (ধীরাজবাবুর দিকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিবদ্ধ কোরে) আজো তুমি ওই সব ‘গণ্ডাকে-দেবতা মানাে নাকি? তুমি না বিজ্ঞানের Ph, D? ছি ছি ? একথা তাে আগে কোনাে দিন••• ধীরাজবাবু। সেটা সত্যই আমার উপর ভগবানের কৃপা। আগে শুনলে তােত দেখছি দ্বিতীয় কুড়ল পড়তে। প্রথমটা সইলেও সেটা যে আমি:•• সুরমা। ( বিপ ও ঈষৎ রােষ মিশ্রিত কণ্ঠে) সইতে পারনাে,-না? মিছে কথা গুলাে আর কইতে হবেনা। (নিৰ্ম্মলকে দেখে)-এইযে নিৰ্ম্মল এসেছ, ভালই হয়েছে। দাতই তাে যতাে রােগের জড়। আমায় কে দ্যাখে তার ঠিক নেই তার উপর আমি আর এদের সেবা নিয়ে থাকতে আর রােগের ভাবনা ভাবতে পারবনা। উপায় যখন রয়েছে তখন আগে থেকে সাবধান হওয়াই ভালাে। রাধণের ‘ক্রেপিং আর ওঁর দাতগুলি সব তুলে দিতে হবে বাবা। তখন বুঝবেন কি আরাম। ধীরাজবাবু। আহা ভুল করছে কেননা। আমার তাে আরামের অভাব নেই, ভগবান আমাকে (দুই হাত তুলে মাথায় ঠাকালেন) রেবা তার ভাব দেখে ছুটে বাইরে পালালাে । নিৰ্ম্মলবাবু উপায় না পেয়ে সুমা দেবীর দিকে চেয়ে বললেন-

দেবা ন জানন্তি
•
*
“তা হলে অন্তত সপ্তাহ খানেক ওঁকে বেশ নিয়ম করে বলকারক
‘ডায়েট’ গ্রহণ করতে হবে, যেমন যমুপ, ডিম্”-
সুরমা। (ধীরাজবাবুর
প্রতি) শুনলে
তত? তাহলে
রাধারাণীর ‘স্ক্রেপিংটা’
ধীরাজবাবু। ( বাধা দিয়ে) আহা আবার দোকর কাজ
কেননা, একেবারে জড় মেরে দেওয়াই ভাল,—কি বলল নির্মল ?
হা–পেসেন্টের মত নেবার একটা বিধি আছে না,—“ওরে রাখল
-কই সে ?”
ড্রাইভার এসে বললে—“দিদি গাড়ীতে বসে আছেন।”
নিৰ্ম্মল ধীরে ধীরে সরে গেল।
ধীরাজবাবু। ডাক ডাক—শীগগির ডাক্..
রাধারাণী এসেই—“কি বাবা ?”
ধীরাজবাবু। আহা, শােনননি মা? ভগবানের দেওয়া শরীর
রক্ষাৰ্থ সমূহ যত্ন করতে হয়। সে কারণ আমাদের দুজনের সব
পাতগুলি ফেলে দিতে হবে:
রাধা। দাত তবে কি ভগবানের দেওয়া নয় বাবা ?
ধীরাজবাবু। ওর ভগবান বােধ করি Dentist-যাক
এখন চলল মা—আমাদের প্রস্তুত হতে হবে, এক সপ্তাহ বলকারক
আহার-যগ সুপ, ডিম্ খেয়ে থাকতে হবে মা-
রাখা। আর ?
সুরমা। আহা-মেয়ের কথা শোেনন। আমার জন্যে
১৭

সবার যে ভারী ভাবনা ! মার বাঁচাটা বড় দরকার কি। আমি কোথায় ধীরাজবাবু। তা জানি, তােমার কষ্ট কি বুঝি না। কি করবাে-অদৃষ্ট অনিষ্ট করলে, কে কি করতে পারে। যা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মঙ্গলময়ের ইচ্ছা না হলে তাে••• সুরমা। তােমার মঙ্গল আসছে না,না ? কি কোরবে- সেটাও তাে আমার হাত নয়- ধীরাজ। God forbid—আহ—কেননা,—ও সব কি কথা,আমার সুখের জীবনটা বুঝি তােমার•• আমলী আর থাকতে পারলেনা—বললে-“বেলা হয়ে যাচ্ছে যে মেশােমশাই!” ধীরাজবাবু। এই যে মা-খুটা সেরে যাই। এক যাত্রায় পৃথক ফল হলে যে—তার ফল আমাকেই ভােগ করতে হবে। ওর দাতগুলি ফেলা না হলে লােকে যে আমাকেই দুষবে—যার কষ্ট তাকেই বাদ দিয়ে, এমন স্বার্থপরের মত কাজ- সুরমা। ও কি দরদ—একেবারে একাত্মা। সে দেখে এসােগে বাদুড় বাগানের অবিকল রায়কে। শিউলীমালার ম্যানিঞ্জাইটিস হওয়ায়,-আহা তার অমন রেশমের গােছ চুলগুলি, চোখখেগাে ডাক্তারেরা কিনা একেবারে মুড়িয়ে কেটে দিলে? জান হলে পাছে শিউলীমালা দুঃখ পাসে দুঃখ অপরে বুঝকে ১৮

দেবা ন জানন্তি
কি? ) অবিকলবাবু তখুনি নিজে নেড়া হয়ে এসে তবে রুগীর
ঘরে ঢােকেন! হা-একে বলি-
ধীরাজবাবু। (নিজেকে দেখিয়ে) আর একে কোনদিন
অমন সুযােগ দিয়েছিলে কি? তা তে দাওনি, সেটা তাে
আমার অপরাধ নয়! তা হলে দেখতে
সুরমা। কি দেখতুম শুনি
নিৰ্ম্মল এসে পড়েছিলেন—একটা ছুতাে কোরে-“ওঃ এগুলো
রেখে আসি” বলে সরে গেলেন।
রেবা হাসি চাপবার ছলে বললে—“ঘরগুলাে দেখেছিলুম,
দাতের ছবিই সব। এত রকমের পাতও আছে।”
সুরমা। ছবি দেখেই আশ্চর্য্য হচ্ছি। দাতের সংগ্রহ যদি
দেখিস—ভীমের পর্যন্ত
রেবা। সে কি করে বুঝলেন ?
সুরমা। ওমা,-এখনাে যে তাতে দুঃশাসনের রক্ত লেগে
রয়েছে,—আয় দেখবি আয়।
রেবা। বাবা রে ! না মাসীমা, আমি ওসব দেখতে
পারবনা-
সুরমা। দেখবিনি! দাতের চেয়ে বড় কিছু আছে নাকি।
বলে দাত থাকতে দাতের মূল্য কেউ বােঝে না !
ধীরাজবাবু ( আজকের হওয়াটা তার বেশ অনুকুল ঠেছিলাে)
বললেন-“খুব ঠিক কথা,-অভিজ্ঞের কথা। ভারতে তখন তো

সন্ধা শৰ
Dentist দেখা দেয়নি। এখন কিন্তু ওকথা বলবার আর উপায়
নেই। তাদের Bill পেলেই আমরা মূল্য বুঝতে পারি।
এইবার শ্যামলীর মুখেও হাসির আভাস দেখা দিলে।
সুরমা। খুব বুঝেছ তে! সে কোন্ দাতের ?
ধীরাজবাবু। ওঃ beg your pardon—সেটা বাঁধানাে
বাতের বটে। ঠিক—আসল দাতের মূল্য বােকে কার সাধ্য।
শ্রীভগবান গীতায় অর্জুনকে “উর্ধমূল” কথাটির মধ্যে একটু hint
দিয়েছিলেন মাত্র ;-অর্থাৎ এত বড় দেহটার জড় ওই মাথায়।
জড়—এক দাতেরি আছে কিনা
সুরমা। ( বিরক্তভাবে) আমরা তত তােমার মুখে ভাগবত
ব্যাখ্যা শুনতে আসিনি—এই বলতে বলতে স্থির অথচ অস্থির করবার
মত একটি সুতীক্ষ্ণ কটাক্ষ হেনে, নির্মলের কাছে চলে গেলেন।
শঙ্কিতা শ্যামলী ধীরাজবাবুকে বললে—“আপনার পায়ে পড়ি
মেশােমশাই বাড়ী চলুন।”
ধীরাজবাবু। এই যে—আর একটু। ভবিষ্যৎ-পুরাণ থানা
নাড়াচাড়া করে আমার দূরদৃষ্টি পরপর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে
যে! তাই নির্মলবাবুর চা না খেয়ে নড়বার উপায় নেই মা।
Tea-pot-এর সঙ্গে Tempestএর কথাটা চির প্রচলিত
বালাতে
চায়ের ঐ নিয়ে খানসামা ঢুকলাে। সঙ্গে সুরমা দেবী আর
নিবিট ও মােহন-পাপড়ি সহ।

Hi!!KSALAH-1WOAH.
দেবা ন জানন্তি
০
নিৰ্ম্মল। ক্ষমা করবেন—দেরী হয়ে গেল। লােকটা বড় কষ্ট
পাচ্ছিল—তার••
ধীরাজবাবু। তাতে হয়েছে কি,-আমরা কথায় বার্তায়
একটুও টের পাইনি তাে-
সুরমা। রাধণ কোথায় ?
রেবা। শরীরটা ভাল বােধ করছে না—তাই আবার গাড়ীতে
গিয়ে বসেছে
সুরমা। ( বিরক্তভাবে আপন মনে) সব ধ্যা! ক্রেপিংটা•••
ধীরাজবাবু। আবার দোকর কাজ কেনন? সেই যখন
নির্দন্ত
সুরমা দেবী আর দাড়ালেন না। দ্রুত গিয়ে রাধাকে টেনে
নিয়ে এলেন। সে জড়সড়
রেবা চায়ে চিনি মিশিয়ে দিতে লাগলাে। সুরমার চেষ্টা ছিল
রাধারাণী সে কাজটি করে। তিনি গুম হয়ে কেবল এক দৃষ্টে
দেখতে লাগলেন।
ধীরাজবাবু একখানি মােহন-পাপড়ি তুলে বললেন—“নিৰ্ম্মল
তুমি বুঝেসুঝেই এ সুন্দর দ্রব্যটি এনেছ দেখছি! মােহন-পাপড়ি
খাবার এই শেষ কিনা! এ দাত গেলে আর-যাক। রাধ,
নে মা একখানি তুলে তার হাতে দিলেন)
রাধারাণী না হেসে থাকতে পারল না।
প্রতি,-“হ্যা আবার ভুলে যাবে, অনেকদিন

সন্ধ্যা শপ
থেকেই ভাবছি-মেয়েদের I mean মহিলাদের পাতে আর
পুরুষের পাতে কোনাে প্রভেদ আছে কি ?”
নিৰ্ম্মল। বিশেষ কই,—না। Anatoinically নেই
বােধ হয়-
ধীরাজবাবু। Practically? I meanin use ?
অর্থাৎ ব্যবহারে ?”
সুরমা দেবী। কিছু বাকিতাে নেই, আবার ও বিদ্যেটাও
শিখতে হবে নাকি!
ধীরাজ। না তা নয়, তবে-সজনে ডাটা চিবুতে আমরা••
সুরমা। চলল, চলল, আর অভদ্রতা বাড়াতে হবে না-
ধীরাজবাবু। সে কি কথা! ভুল বুঝছো কেন? নিৰ্ম্মলকে
পেয়ে, আমি মাত্র Scientific researchএর দিক থেকেই আমার
খাগুলাে,.••উঠলুম বলে—আর একটি মাত্র। বিশেষ দরকারি
না হলে নির্মলবাবুকে বিরক্ত
নির্মল। বলুন না, বিরক্ত আবার কি ?
ধীরাজবাবু। আচ্ছা, সাপে কি দাত দিয়ে বিষ ঢালে?
সুরমা । ( বিরক্তভাবে) নাব্যাজ দিয়ে
নিৰ্ম্মল। সাপের মতে সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে, তাই দিয়েই বিষ
ঢেলে দেয়। বিষের থলি ওদের তের গােড়াতেই থাকে কিনা-
ধীরাজবাবু। এই ঠিক কথা। তবে শরৎবাবু জিভ দিয়ে
ঢালার কথা কেননা লিখলেন! তাই না আমার
করতুম না*

দেবা ন জানন্তি
রাধারাণী মায়ের হাত ধরে বাইরের দিকে টানলে। শ্যামলী
"আর রেবা, নির্মলবাবুকে তাড়াতাড়ি নমস্কার কোরে বেরিয়ে
পােড়লল।
সুরমা। (রােযে, চাপা সুরে) আর যদি কোনাে ভদ্রলােকের
বাড়ী তােমাদের সঙ্গে করে আমি
ধীরাজবাবু। কেননা কি হেলাে? সব জেনে রাখা ভালো
নয় রাধণ? একটু না হয় দেরিই হােলল। এমন অথরিটি তত
antar--admirably intelligent !
সকলে গাড়ীতে উঠতেই নিৰ্ম্মলবাবু এসে উপস্থিত হয়ে
ধীরাজবাবুকে বললেন-“দয়া কোরে আবার আসবেন।”
ধীরাজবাবু। এক সপ্তাহ পরে তাে আমাদের তিনজনকেই
আসতে হবে বাবা। হাকটা কোরে ডিম্ ?•••
( গাড়ী স্টার্ট দিলে।)
২৩

ময়ূরভঞ্জের একটি বিশিষ্ট ধনী সংসারে নির্মল বাবুর জরুরী call আসায় তাকে বােধ হয় একমাসের জন্য কলিকাতা ত্যাগ করতে হবে। সুরমাদেবী শুনে বড়ই বিচলিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। নির্মলবাবু তাঁকে কেবল অভয় দিয়েই নিশ্চিন্ত করতে পারেন নি, তাঁকে নিজের personal assistant বা দক্ষিণ হস্তটিকে দিয়ে যাকেন বলে শান্ত করেছেন। দন্ত বিদ্যা সম্বন্ধে তার সােপার্জিত অত্যা দিব্যজ্ঞান এবং তার কাছে প্রাপ্ত নব-বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষা সংযােগে বিশেষজ্ঞ হয়ে পড়ায়, তার উপর তার অসীম বিশ্বাসও সে অর্জন করে ফেলেছে।—এই সব বুঝিয়ে সুরমা-দেবীকে তিনি নিশ্চিন্ত করতে পেরেছেন। ভূধরের চেহারাটা কিন্তু সুদর্শন নয়—কৃদন্ত। নির্মলবাবু হেসে বলেছেন-“ও দন্ত-বিদ্যা সম্বন্ধে অদ্বিতীয় হবে বলেই মনে হয়। ভগবান ওকে অতদন্তী করেছেন। বাল্যাবধি ওর দুপাটি তই সাধারণ নিয়মবদ্ধ নয়—অসম। তাই সৰ্ববিধ দন্তরােগে বহু যন্ত্রণা পেয়ে বহু অভিড়ের সাহায্যে এখন স্বয়ং রােজা দাড়িয়ে গিয়েছে। ২৪ দেবা ন জানন্তি ; পরে আমার আশ্রয়ে থেকে এখন বিজ্ঞান লাভ করেছে। ওর আর শেখবার কিছু নেই। এখন আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন, ও আপনার কাছেই থাকুক ও থাকবে; গােলমেলে case এলে তখন আমি ওর সাহায্য পাবাে ও নেব।” -“হা, ওঁদের দাত সম্বন্ধে তাড়াতাড়ি নেই, আমি ফিরে এলে সে কাজ হবে—আমি স্বহস্তে সে-কাজ করবাে। বলকারক diet যেন বন্ধ করা না হয়। Car রইলাে—ইচ্ছামত ব্যবহার করবেন, ব্যবহারে থাকলে ভালাে থাকবে”,ইত্যাদি উপদেশ দিয়ে সুরমা দেবীর ও ধীরাজবাবুর পদধূলি গ্ৰহণান্তে নির্মলবাবু রওনা হয়ে গিয়েছেন। ভূধর এসে এ বাড়ীর একটি ঘর দখল করেছে। কথায় কথায়, সে যে সুরমা দেবীর একটু দূর আত্মীয় তাও বেরিয়ে পড়েছে, আদর যঙ্গের ব্যবস্থাও তদনুরূপ চলেছে। ধীরাজবাবু সাংসারিক শান্তি রক্ষায় বহুদিন হতে অভ্যস্থ। তিনি সচেষ্ট। হাসিমুখে আনলে থাকেন। সুরমা দেবীকে বলেছেন- “ভূধরকে আমি ভগবানের দান বলেই ভাবি, মূল কিন্তু নির্মলতার কল্যাণেই ভূধরকে পাওয়া। আর ভূধর এই যে পাতের ওষুধ বােজ টাটকা তয়ের করিয়ে এনে দেয়, নিত্য একটাকা করে পড়ে বটে কিন্তু তার উপকারিতা সকলেই অনুভব করছি, সেটা স্বীকার করতেই হয়।” সুরমা দেবী। ওর যে ঠেকে শেখা,ওখানে তত ভুলের সম্ভাবনা ২৫

সন্ধ্যা শৰ
নেই। হ্যা সবই কি আমাকে লক্ষ্য করতে হবে—র ও-রকম জামা
আর ছেড়া চটি এ বাড়ির সঙ্গে খাপ খায়না—বিশেষ
ধীরাজবাবু। ঐ কথাই ভাবছিলুম—বিশেষ ও আমাদের
আত্মীয় যখন। ওটা আগে হওয়া দরকার, তুমি যখন বেড়াতে
যাও•••
সুরমা দেবী। তা জানি, আমার উপরই ভার পড়বে।
ধীরাজ। আমি কি আনতে কি আনবাে, পয়সাও যাবে-
সুরমা। ( সহাস্যে) সে আর বলতে হবেনা, কি সেমিজই
এনেছিলে! আমি সেটা ঝিকে দিয়েছি।
ধীরাজ। দেখলে তাে!
সুরমাই ভার নিলেন। সংসারে আজ কয়দিন এইরূপ শান্ত
ভাব চলছে।
আসল কথা ভূধর পরমাত্মীয় রূপে বাড়ী চেপে চিরস্থায়ী পাট্টার
মত ধীরাজবাবুর মুণ্ডে ভর করায়, তিনি একটু বাইরের হাওয়া
পাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নানা দুর্ভাবনায় মাথা ভরতি,
মকেল এলে মাপ চান। সর্বক্ষণ মনে মনে তাঁর শাস্ত্র পরীক্ষা
চলছে। পাত্র বলেন-কাব্যামৃত রসাস্বাদ আর সজ্জন সদ,
সংসার বিষবৃক্ষের এই দুইটিই মধুর ফল। প্রথমটি সম্বন্ধে নিৰ্মা
লােকের সন্দেহ থাকতেই পারেনা। মহাজন পদাবলী আর
চয়নিকা (অধুনা সঞ্চয়িতা) সাহায্যেই তাঁর দুরূহ দিনগুলি
কাটে

দেবা ন জাতি
কিন্তু ‘সজন’? অভিজ্ঞতায় পেয়েছেন-সমাজে সনতাে
তারাই যারা চাইলেই কর্জ দেন, কিন্তু তার শেষ ফল যে
কত মধুর তা ভুক্ত ভােগীই জানেন! সেটা ভাবলেই সব
ঘুলিয়ে যায়!
Bar Library আছে তাই দিন কাটে। সকাল সকাল
হাইকোর্টে গিয়ে হাই তােলেন আর লাইব্রেরীতে বসে আজ্ঞা দেন ও
চায়ের অর্ডার দেন। একান্ত হলেই ভূধরের শ্রীমূৰ্ত্তি সামনে ভেসে
ওঠে—তাকে ভুলতে দেয় না। চিন্তা ক্রমেই ইল্যাষ্টিক দাড়ায়,
সহজেই বেড়ে চলে। “ভূধর সুরমার শত-পরিচিত,অনেক করে
তিনবার ম্যাট্টীক ফেল কোরে, ইংরাজিতে দস্তুর মত দখল পাড়ার
পর Dentist হয়েছে। নিজের দন্ত-বিকারের অন্ত না থাকায়
সহজ অভিজ।
“ভূখর যে জন্ম Dentist সে সম্বন্ধেও আমার সন্দেহের ফাঁক
ছিল না, তার চেহারাই তা বলে দিতাে। তার উপরের পাটির
দাতগুলি নিজের পারিপাট্যেই অধর চেপে বেরিয়ে থাকে আর
তাদের চাপে থাকে কয়েকটি গজদন্ত! সুরমা বলেন, ওটা
ভাগ্যবানের লক্ষণ। আমার ভাগ্য mean কোরে বলেন, কি তার,
সেটা ঠিক বুঝতে পারি না।
“কসুরমাও এখন ভুগে ভুগে সমজার গড়িয়ে গিয়েছেন।
তাই এই সহজ-প্রাপ্যের মর্যাদা বুঝে, তাকে বাসায় এনে রেখেছেন,
এবং আমার Saving Bank-এর বইখানি সাফ কোরে তাকে
২৭

সন্ধ্যা শখ
দোকান কোরে দিচ্ছেন ও তারি তদবিরে আছেন। আমাকে
বুঝিয়ে দিয়েছেন। কারণ তাঁর কথায় আমার বিশ্বাস প্রবল কিনা )
“সবটাই লাভ। মাত্র চারটি খাবে, একটি ঘর জোড়া কোরে থাকবে
আর পরের সঁতে তুলবে বইতাে নয়! চা-টা ছ’বার খায়, তাই তার
জন্যে আলাদা Stove আর সরঞ্জম কিনে দিয়েছি। সে-ঝাট
আমাদের পােয়াতে হবে না। আমার তাে দাতের যন্ত্রণা লেগেই
আছে,-নিশ্চিন্তে থাকতে পারবােতােমাকেও জ্বালাতন হতে
—“একি কম সুবিধে। আমার জন্যও তার ভাবনা কম নয়।
একেই বলে দুঃখে সুখ!
-“সুতরাং তিনি যেন নিশ্চিন্তেই আছেন। কিন্তু আমার
জন্যে তার এত চিন্তা চেষ্টা সত্ত্বেও ভাগ্য দোষে দুশ্চিন্তা এসে
পড়েছে আমারই ভাগে বা ভাগ্যে, সেটা ছাড়ছে না। ভূধর নিশ্চয়ই
ভালাে ডেটিষ্ট-ভালাে নয় কেবল আমার ভাগ্য।
—“তাই বারলাইব্রেরির নিষ্কর্মা সজ্জন সঙ্গই মধুর লাগে।
মনে হয়—শাস্ত্ৰকারেরা কি সত্যবাদীই ছিলেন! মনে মনে তাদের
উদ্দেশে সবিনয় নমস্কার কোরে একটা amendment মঞ্জুর
করিয়ে, অর্থাৎ নিদ্রা আর সিগারেটকে সজ্জনের শ্রেণীভুক্ত করে
নিয়েছি। তাতেও কয়েক ঘণ্টা কাটে মন্দ নয়।”
বারলাইব্রেরীতে আড্ডা plus নিদ্রা, চা পান, আর সিগারেট
এই চতুষ্পদী বন্ধুই এখন তার সহায়। তার উপর ভাগ্য ভূধরকে
২৮

দেবা ন জানন্তি পাওয়ায়-অনায়াসেই পরেশবাবুর অনুরােধ রক্ষা কোরে ডায়মণ্ড- হার্বার ঘুরে আসতে পেরেছেন। কোনাে বিঘ্ন ঘটে নাই। ফিরে এসে দেখেন বাসায় কোনাে গােলমাল নেই, বেশ আরামের আবহাওয়া। নিৰ্ম্মলের ‘বুইক’ বাইরে সর্বক্ষণ ready! ভূধর দখলী-কক্ষে, চেয়ারে চোখ বুঝে, টেবিলে পা তুলে দিয়ে সিগারেট টানছে।সুপ্রভাতের দৃশ্য! পরের মােটরখানা বসে থাকলে পাছে কলকজায় মরচে ধরে যায়, তাই ব্যবহারে রাখা হয়েছে। পেট্রলটা মাত্র তাকে যােগাতে হবে—এ সুবিধে ছাড়তে নেই। তাই সুরমা সারাদিন কলকেতা ঘুরে-সংসারের বাজার করেছেন সাবান, সাড়ী, প্রফিলেটিক টুথ-ব্রাস, পেষ্ট, পাউডার, চকোলেট, ক্রিসম-কেক, টফি, রুজ, ভূধরের জন্যে একটি বেবি-পেট্রোম্যাক্স প্রভৃতি অত্যাবশ্য সবই এনে ফেলেছেন। দেখে ধীরাজবাবু একে একে সংসারের ওই সব প্রত্যেক প্রয়ােজনীয় দ্রব্যগুলির প্রশংসা করতে ভুলবেন না। সঙ্গে বললেন—সংসারের যখন সবই আনলে, আমার জন্যে একটি সিগারেট আনলে, ওর সঙ্গে বােধ হয় বেমানান হতনা।” সুরমা বললেন-“ওইতেই তিন ‘গ্যাল পেট্রল গেলো, সিগারেটের জন্যে আবার তেল কিনি। পয়সা তাে আর ২৯

সন্ধ্যা শখ
খােলামকুচি নয়! বাজে খরচ দেখতেও পারিনা,-করতেও
পারিনা”-
এসব আশ্বাসের কথা শুনলে কার মন না আনন্দ আর গর্ব
অনুভব করে! বােধ হয় ধীরাজবাবুর মনও করেছিল। কেবল
বললেন—“কাল সকালে আমার যে বড় জরুরি একটা কাজ
রয়েছে। আমাকে তবে পেট্রল কিনে বেরুতে হবে নাকি?”
এ কথা কয়টির মধ্যে কোন্ কথাটির উপর কোন গ্রহদেবতার যে
লােভ পড়তে পারে তা বােঝবার শক্তি তার ছিলনা এবং নাইও।
সকালে উঠে দেখেন সুরমার দাতের যন্ত্রণা দেখা দিয়েছে,
সবাক-শূলুনি আরম্ভ হয়েছে।
কন্যা রাধারাণী চিন্তিতভাবে এসে জিজ্ঞাসা করলে—“মাকে কি
বললছ বাবা?
তার কথা শেষ না হতেই—ডেন্টিষ্ট ভূধর এসে বলেল—“মাসিমা
বেশ ছিলেন, ওষুধটা বেশ কাজ করছিলাে। কিন্তু দাঁতের ওপর
কথার প্রভাবও বড় কম নয়-relative and relective action
আছে মশাই,সেটা ভুলে যান কেননা? শিক্ষিত লােকের...”
শুনে ধীরাজবাবুর ইচ্ছে হয়েছিল—তার গালে ঠাশ, কোলে
একটি চড় মারেন -কিন্তু কি কারণে সামলে যেন regative
and deminutive মেরে গেলেন।
বাইরে কে এসে ডাকায়, সত্বর নিজেই দের খুলে দিতে
সরে গেলেন।

দোর খুলেই পরেশবাবুকে দেখে—“এই যে, এসাে এসাে ভায়া।
আমারই যাওয়া উচিত ছিল, যাই যাই করছিলুম। একটা না
একটা বাধা-কৰ্ত্তব্যগুলাে চিরদিনই:..
পরেশ। তাতে আর হয়েছে কি-
পরেশবাবুর সঙ্গে মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে—“এই যে, মাও
এসেছেন। ওরে রাধাশ্যামলী:..”
রাধা, শ্যামলী, ওপর থেকেই দেখেছিল—ছুটে এলাে।
পরেশবাবু তখন বলছিলেন—“অশ্লেষা পেয়ে নতুন বাসায় চলে
এসেছি। সঙ্গে সঙ্গেই সৌভাগ্য-যােগও মিলে গেল, আজ মঘা,
শনিবার তায় অমাবস্যা, তাই সকলে মাকালীর পূজা দিতে
গিয়েছিলুম ভাই। জানই তাে-বাঙালী শক্তি-উপাসক,
রক্তারক্তিই ধৰ্ম্ম-অবশ্য ভয়ে ভয়ে ও ভায়ে ভায়ে। মায়ের
প্রসাদও আনা হলে আর মায়ের খাঁড়ার সিদূর। বাসার পাশেই
সাবিত্রী রয়েছেন—তাই দিয়ে আসতে পাঠালেন।”
শুনে ধীরাজবাবুর পীলে চমকে গেলেও বললেন-“বেশ করেছ,
বেশ করেছ—many thanks, বাচালে ভাই। মায়ের প্রসাদ
বহুদিন মেলেনি,-মুখের বৈজাত্য কাটবে। উঃ অনেক যে !
মায়ের হাত ভেরে গেলাে,রাধণ নেনে'..”

সন্ধ্যা শখ
বলচেন আর ভাবছেন—“প্রসাদের ফ্যাসাদ না প্রমাদ ঘটায়।
সুরমা খাটি উচ্চশ্রেণীর মহিলা, idolatoryর গল্প না দ্বন্দ্ব বাধায় !
পরেশ তার জন্যে সিদুর আনলে, ঐ সঙ্গে আমার জন্যে খাঁড়াখানা
আনলেই বন্ধুর কাজ হােততা!”
রাধারাণী বললে—“তুমি ভাবচো কেননা বাবা, বলেছি তাে-
রাকা যে আমাদের সঙ্গে পড়ে-
ধীরাজবাবু বললেন—“ও—তবে আর চিন্তা নেই, হাত
ভারুবেনা :-আজকাল মুগুর ভাজাও ‘সিলেবাসের সামিল না!”
মেয়েরা হাসলে।
রাধারাণী। ওঁরা এ পাড়ায় এসেছেন, কই তুমি তো আমাদের
কিছু বলনি বাবা-
ধীরাজ। তােমাদের সকলকে নিয়ে দেখা করতে যাবে, এই
ইচ্ছাই ছিল। কেবল তােমার মায়ের
পরেশবাবু ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—“কেন, তার কি
হয়েছে ? কই তিনি কোথায় ? নমস্কারটাও নেবেন না-
রেবা তাড়াতাড়ি বলে ফেললে-“দাঁতের যন্ত্রণায় তিনি যে...”
পরেশবাবু অপ্রতিভের মত বললেন-“মাপ কোনাে ভাই
আমি জানতুম না। আক্কেল দাঁত নয় তাে? সে ষে••*
ধীরাজবাবু স্পষ্ট কিছু না বােলে, বললেন-“ওর যে কি
যাতনা তা তিনিই জানেন। তার তাড়সে,"তুমিও ভু•••I mean
ওদের ক•ে•
২

দেবা ন জানন্তি পরেশ। না ভাই, আমাদের বিবাহের পূর্বেই সেটা তাঁর বেরিয়ে গিয়েছিল,—দয়া কোরে সেই ঘােয়াস্তিটুকু সঙ্গে করেই এসেছিলেন। সেটা যতক্ষণ না বেরয় ততক্ষণই ওঁদের যন্ত্রণা, তার পর থেমে গেলেন) ধীরাজবাবু। তার পর কি আমাদের নাকি! মেয়ে কয়টি তখন দুড়দুড়, শব্দে দালান পার হচ্ছে। রেবা চাপা হাসির ধাক্কায় পড়ে গেলাে। পরেশবাবু গভীর ভাবে বললেন-“ভগবানের কাছে পক্ষপাতিত্ব নেই ভাই...” ধীরাজবাবু (অন্যমনস্ক ভাবে) বাঙালী পল্টন বােধ হয় রওনা হয়ে গিয়েছে। যাক • তারা বেঁচে গিয়েছে। তাদের বুদ্ধির প্রশংসা করি। “হত বা প্রাপস্যসি স্বর্গং”—মলেও স্বর্গ লাভ হবে। ঠিক বলেছ পরেশ—“পক্ষপাৎনেই”, দয়াময় সকল রাস্তাই বাতলে দিয়েছেন- পরেশবাবু হেসে ফেললেন,—বললেন—“ওই একটিতেই ধীরাজবাবু। ( চমকে উঠে) আরাে আছে নাকি? পরেশবাবু। ডেসিয়ে ডেসিয়ে (ড্যাস দিয়ে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন—আছে তাে বহুৎ, রােগের অন্ত আছে কি? Variety-তে ভরা,জগৎ উন্নতির পথে চলছে কিনা। ওরাও তাে জগৎ ছাড়া নন-ক্ৰম বিবর্ধমানা। তবে domestic গবানল rather বাড়বানলগুলিই মােক ক

সন্ধ্যা শর
ধীরাজ। বুঝলুম না ভাই.••
পরেশ। না বােঝাই ভালল, God forbid—অর্থাৎ “জ্বলন্ত
ধীরাজ। রােসস শুনছি ভাই, তােমার ব্যাখ্যার ধাক্কা একটু
সামলাতে দাও। মাথায় ঢুকছেনা
পরেশ। অত্যন্ত আধ্যাত্মিক কিনা,সাধু সঙ্গ সাপেক্ষ।
একদিন এসােনা। একটা ভালাে ক্যামেরা সঙ্গে নিও।
ধীরাজ। থাক ভাই, মাথাটা রচি মুখাে ঝুঁকছে। হ্যা
নতুন বাসায় কোনাে অসুবিধে নেই তাে? তােমার তাে অনাদরে
দু’খানা আর বাইরে একখানা ঘর হলেই যথেষ্ট। আড় হয়ে
আলম পীড়া দেবার মক্কেল আসেনা তাে? বেশী খালি ঘর রাখা
কেবল বিপদ ডাকা...
পরেশবাবু একটু হাসি টেনে বললেন,—“না দেখলে বুঝবেনা
ধীরাজ, আমার detail একটু দরাজ ভাই। সব ডবল
ডবল চাই।
ধীরাজ। কেননা? তােমারও ‘ভূধর’ আছে নাকি!
পরেশ। (আশ্চৰ্য্যভাবে ) সে আবার কে!
ধীরাজ। দেখতে পাবে।
দেখতে পাবে। এখন ডবলের কথা কও।
পরেশ। আরে ভাই—গরু, পােয়াল, এতোক বিছানা মাদুর
কেউ বিজোড় নয়।
শুনে ধীরাজবাবু উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠলেন—“এইটি খুব

দেবা ন জানন্তি বুদ্ধিমানের কাজ করেছ,-পাকা কাজ। মাসে মাসে মুটো মুটো টাকা দিয়ে দুধের রঙ করা জল গিলে গিলে ব্রংকাইটিস্ আর বাগ, মানলেন, ডাক্তার বদ্যির bill আর ঘুচলােনা। গরু না থাকলে কি গৃহস্থ!” পরেশবাবু বললেন—“তা ঠিক, তবে আমার গরু পােষা দুধের জন্ঠে নয় ধীরাজ,-গােময়ের জন্যে ভাই-বেহারে বিরাটের গােগৃহ ছিল কিনা, সব রকম গরু পাওয়া যায়। তাই হরিহরছত্রের মেলা থেকে বেশ প্রবল পেটােগা দেখে আনাতে হয়। টা পড়লে তাদের জোলাপও দিতে হয়। অমন পবিত্র বস্তুততা আর নেই। ধীরাজবাবু অবাক হয়ে তাঁর কথা হ কোরে গিলছিলেন, কিন্তু-তলাচ্ছিলনা। বললেন,—“কি বােচো? বুঝছিনা ভাই- পরেশ। আরে, পবিত্রতা রক্ষায় কমলার কৃপা আসে, হিদুর আচারেই লক্ষ্মী কিনা। বেশ সাত্ত্বিক সুখ অনুভব করছি ভাই, -ওটা Great trunk Road-এর অর্থাৎ স্বর্গের first step একদিন ওকে নিয়ে এসােনা,শান্তি পাবে। ধীরাজ। যাবাে বই কি ভাই, নিশ্চয়ই যাবাে। তুমি যে লােভ দেখালে! পরেশ। আশা করি তুমি প্রভূত শান্তি নিয়ে ফিরবে।

সন্ধ্যা শখ
সন্ধ্যা শ
ওদিকে মেয়ে মহলে তখন রাকার সঙ্গে নানা প্রশ্নোত্ত আরম্ভ
হয়ে গিয়েছে—“মাকে নিয়ে এলেনা কেনাে”—ইত্যাদি।
রাকা। তিনি আসবেন বইকি। তাঁর নিত্যকর্মই ফুরােয়না,
তায় আজ মায়ের বাড়ী থেকে এই এত বেলায় ফেরা হল।
প্রসাদ নষ্ট না হয়ে যায় তাই,—তানাতে তার সঙ্গেই তাে
আসতুম।
বেচারী অন্য কথা পেড়ে প্রতি-প্ৰশ্ন আরম্ভ কোরে এড়িয়ে
চলছিল। শ্যামলী সেটা লক্ষ্য করছিল ও তাকে সাহায্যও
করছিল।
“মায়ের প্রসাদ” শুনে সুরমা দেবী অন্তরে অন্তরে জ্বলে
গিয়েছিলেন—“ভদ্রঘরে এ আবার কি, আপদ এলাে !” পাতের
আশ্রয় নিয়ে মুখে আঁচল চাপছিলেন,-অনুনাসিক হু হা করেই
সারছিলেন। রাধারাণী তাতে অসােয়ান্তি ও লজ্জা বােধ করছিল
আর ভয়ে জড়সড় হচ্ছিল-মানা বলে বসেন, “এ বাড়ীতে ও
‘পুতুলের’ প্রসাদ চলবেনা, ফিরিয়ে নিয়ে, যাও!”—মা বড় ঘরের
মেয়ে, ভগবান বাপ ভাইদের যা দিয়েছেন তাতে দেবতার খোঁজ খবর
রাখবার অভ্যাস তারা রাখেননা, দরকার বলেও মনে করেন না।
তাই রাধারাণীর ভয়।
সুরমার মুখের বিচিত্র কুঞ্চন দেখে রাকা কাতরকণ্ঠে বললে,
“তাইতাে, মাসিমার যে বড় কষ্ট দেখছি।” রাধারাণীর দিকে
ফিরে বললে-“বিনােচন কবিরাজকে একবার

দেবা ন জানন্তি ০ ০ ০ রাধা। ডেন্টিষ্ট, নিৰ্ম্মলবাবুর নাম শুনেছ বােধ হয় ? রাকা। সহরে তার নাম কে না শুনেছে, বিখ্যাত ডেন্টিষ্ট তা হলে আর কারুকে•• এতক্ষণে সুরমার উচু পর্দায় মিল হওয়ায়, তিনি মুখ তুলে কথা কইলেন, আর শ্যামলী ও রেবাকে লক্ষ্য কোরে বললেন- “গুলি তাে!” শ্যামলী বললে—“আমি খুব জানি মাসিমা। রেবা তাে তার কথা যখন তখন কয়”.. রেবা অনেক কষ্টে তার স্বভাবসুলভ প্রতিবাদ করাটা সামলালে। রাকাই কথা কইলে—“যেমন দেবতার মত দেখতে, গুণও তেমনি। কাকাবাবুর একুশ বছরের দুপাটি কঁচা দাত তিনি তার ঘুমন্ত অবস্থায় বেমালুম তুলে দিছলেন কি wonderful artist ! এখন কাকাবাবুকে দেখলে একদম Erect ! রাকা—“আজ তবে আসি মাসিমা বলে, র পায়ের ধূলাে নেওয়ায় সুরমা-“আবার এসস মা, আমার তাে এই দেখছে- রাকা। ভাববেন না মাসিমা, নিৰ্ম্মলবাবু যখন দেখছেন বলতে বলতে বিদায় নিলে। রাধা, শ্যামলী, রেবা সঙ্গে সঙ্গে পৌছে দিতে গেলাে। রেবা সুরমা দেবী

বেশ গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করলে—“স্বামীকে চিনতে এখন তােমার
কাকিমার বাধাে বাধাে ঠ্যাকেনা বােধ হয়—I mean ভুল হয়না
তাে•••Dont take it ill ভাই—ভালাে দেখালেও তাে স্বাভাবিক
হয় না,
৩ ০ ০ ০ ০
সিড়িতে হাসির হুল্লোড় শােনা গেল।
আদিম, মুর্থতা-মাখা হােটদের ওই মহাপ্রসাদকে যে কোথায়
স্থান দেবেন, সুরমা দেবী তা স্থির কোরেই রেখেছিলেন, কিন্তু
রাকার কথাগুলি নিজের সুরে মেলায় তার মতের পরিবর্তন ঘটে
গেল। স্থির করলেন—“আমাদের অতশত জানবার দরকার
কি। মাংস মাংসই।”
মেয়েরা ফিরলে বললেন-“রেবা কেমন রাঁধে আজ দেখা
যাবে।” তারা ভেবেছিল প্রসাদ আস্বাদের দফা আজ গয়া।
কয়জনেই তাই অবাক হয়ে সতর্ক দৃষ্টি বিনিময় করলে।
পরেশবাবু রাকাকে নিয়ে চলে গেলেন।
ধীরাজবাবু যেখানে যে অবস্থায় বসেছিলেন, ঠিক সেই অবস্থায়
চিন্তামগ্ন বসে ভাবতে লাগলেন—“পরেশ কি সব বলে গেল।
Familyটি তাে দেখছি কোনাে এক অভিনব সাধন-ভজন
সম্প্রদায়ভুক্ত। গােবর নিয়ে থাকে।যােপার্জিত না হলে
কোনাে জিনিষেরই কদর বােঝা যায় না। গােবর বস্তুটি মাথায়
নিয়ে জন্মেছিলুম, কষ্টার্জিত নয়, তাই তার কদর বুঝিনি। জীনটা
বৃথাই নষ্ট করেছি, কিছুই করলুম না, শেষের দিনও সামনে এগিয়ে
৩৮

দেবা ন জানন্তি
এলাে। পরেশ যেতে বলে গেলাে। বললে—“প্রভূত শান্তি নিয়ে
ফিরবে।” ওঁর দাত থাকতে তা কি হবে? নাঃ সময় নষ্ট করা
আর নয়—কালই যাবাে
মহাপ্রসাদের মহিমায় হােক বা যে কারণেই হােক—সুরমা দেবী,
রাধারাণী ও ভূধর নীচে নেবে এলেন। ধীরাজবাবুকে লক্ষ্য করে
সুরমা চিন্তিতভাবে বললেন—“এ নিয়ে এখন কি করি বলে দিকি ?
ভূধরের ওষুধে দাতের কনানিটে কমেছে। ওর সব আশ্চৰ্য্য
ধারণা, বলছে—আবশ্যক না হলে ভগবান অভাবনীয় কোনাে জিনিষ
পাঠানু না” !অবাক হয়ে রইলে যে?”
ধীরাজবাবু বললেন—“ভূধরের জ্ঞানের এতটা গভীরতা,
ভগবানের উদ্দেশ্য অনুমানে অভিজ্ঞতা আমাকে সত্যই অবাক
কোরে দিয়েছে। ও লেখাপড়া ছাড়লে কেননা, ফিলজফিতে
M. A. দিলেনা কেননা ? মহাপ্রসাদের কথা বলছো তাে? ও
ঠিক ধরেছে, বােধ হয় পরিমাণও ঠিক এসেছে-ভগবানের ভুল
হয় না। তা হলে আজ কেবল ওই খেয়েই থাকে। কি করবে-
রােগের জন্য সব কষ্টই সইতে হয়।
সুরমা ঈষৎ রােষমিশ্রিত হাসির lining টেনে বললেন-“হাসি
ঠাটার কথা তাে নয়,—যার কষ্ট সেই জানে। তােমার কাছে তে
তার ব্যবস্থা নিতে আসিনি, সে ভূধর দেবে”—

সন্ধ্যা শঙ্খ
ভূধর' বললে-“না, অতটা দরকার হবেনা, excessive
labourও ভালাে নয়। Nerve strain-এ বাড়তেও পারে, তার
ব্যবস্থা আমাদের অধিকারে”—
ধীরাজবাবু বুঝলেন—“এটা ভূধরের ফন্দি, সে নিজের পথ
পরিষ্কার করে রাখলে। সজ্জন যখন পাড়ায় এসেছেন, তখন
মহাপ্রসাদ মাঝে মাঝে আসবেই। ভূধর নিজে তাে একটি জ্যান্ত
crushing machine, সুতরাং তার চাই-ই। আর আমাদের
দাত তােলবার প্রস্তাব তত মাথার উপর ঝুলছেই।
ও Law
পড়লে আমাদের Practiceএ দ’ পড়িয়ে দিতে দেখছি।”
আর কথা বাড়ালেন না। রাধারাণীকে বললেন-“লাউ সেদ্ধ
হয়েছে কি,ক্ষিদে পেয়েছে, একবার দ্যাখ তত মা।”
রাধা। লাউ সেদ্ধ কেননা বাবা? মহাপ্রসাদ তত
ধীরাজ। আমাদের যে বলকারকের ব্যবস্থা মা, মহাপ্রসাদ
নিশ্চয়ই দুর্বলকারক-তানাতে ওরা কি...
সুরমা উত্তেজিতভাবে মেয়েকে বললেন-“কেননা শুনছিস ?
ও সব কথার মাথা আছে না মুণ্ডু আছে!”
৪০

রিলেটিভ
সকালে উঠে ধীরাজবাবু দেখেন মহাপ্রসাদ শরীর মন একদম্
চাঙ্গা করে দিয়েছে। সজ্জন আর কাকে বলে ! সুপ্রভাতের
সাড়াও পেলেন—সুরমা দেবী Car নিয়ে Bathgate Colgate
কিনতে গেছেন,-ছােটা দোকানে তার শ্রদ্ধা নেই।
মন স্বচ্ছন্দ থাকলে মানুষকে সহৃদয় ও উদার করে, কর্তব্য
জাগায়, ব্যবহার সরল ও সরস হয়।-“পরেশবাবু পাড়ায় এসেছেন,
আমারি উচিত ছিল খবর নিতে যাওয়া-বড় অপরাধ হয়ে
গিয়েছে।”
রাধারাণীকে নিয়ে return visit দিতে, পরেশবাবুর বাসায়
চললেন। তিনি বলেছিলেন বাসার নম্বর 49.
রাধারাণী যেতে যেতে বলে উঠলাে-“এই তত বাবা 49-কি
এ বাড়ী কি করে হবে, দু’খানি মাত্র ঘর।”
শুনতে পেয়ে ভিতর থেকে পরেশবাবু বলে উঠলেন -“হঁ্যা মা,
এই বাড়ীই, এটা সদর। এসস এসাে ধীরাজ,-বেরিয়ে এলেন।
রাকাও বেরিয়ে এলাে। এসাে এসাে রাধণ, আমার ঘরকন্ন
দেখবে এসাে।”
রাধা। মাকে দেখতে পাচ্ছিনা।
৪১

সন্ধ্যা শঙ্খ ষ্টোভে চায়ের জল চড়াতে চড়াতে রাকা বললে—“তিনি ও- মহলে আছেন, চাটা হয়ে গেলেই নিয়ে যাচ্ছি। এই চেয়ারখানায় বােসাে ভাই।” পরেশবাবুকে বাইরে বেরুবার পােষাকে দেখে ধীরাজবাবু বললেন-“এখন এসে তােমাকে যে বাধা দিলুম ভাই। কোথাও বেরুচ্ছিলে নিশ্চয়। দেখা তােত হােললা, অন্যদিন আসা যাবে”... পরেশ। পাগল হয়েছ! তােমাকে যখন পেলুম, দুটো কথা কয়ে বাঁচবাে। মক্কেলদের সঙ্গে বােকে-বােকে কার তাদের এক কথা ছত্রিশবার শুনে শুনে জীবনটা ঘরে বাইরে নীরস হয়ে গিয়েছে। যতাে প্রচ্ছন্ন সত্যবাদী আর ফন্দিজ নিয়ে সুপ্রভাত হয়, তারপর দিনরাত সেই চিন্তা—কিসে দাগাবাজ জিতবে। উদ্ধার আর নেই ভাই, ছেলেও নেই যে গয়ায় পিণ্ডি দেবে।” ধীরাজ। আমার কিন্তু আছে ভাই; পিণ্ডিটা পেলিটিতেই পড়বে। যাক—তােমার যে দেখছি পরকালের চিন্তা চেপেছে•• পরেশ। চাপেনি ভাই—চাপিয়েছে। আজ নয় বন্ধু—এক যুগ গত হ’ল! আগে দেখতুম—বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, তন্ত্র সবই সৎপরামর্শ দিচ্ছেন,—“সাধন-ভজন নিয়ে থাকে, আর এমন কাজ করাে যাতে জন্মটা আর না হয়।” ভাবতুম—কেনরে বাবা, কি দুঃখে ?-থাকতেন সব গাছতলায় আর গুহায়, খেতেন ফলমূল, পরতেন কৌপীন ; আবার তা-বড়ো যিনি—তিনি উলঙ্গ, চুল দাড়ির মুটে। তারা কোন্ সুখে আর জন্ম চাইবেন। পেতেন যদি বাগান ৪২

দেবা ন জানন্তি
বাড়ী, মােটর, পেলেটির প্লেট, র্যাঙ্কিনের ছাঁট, প্যারিস্ পুণ্যভূমির
পানীয়, safety shaving, তা হলে জন্ম চাওয়া তত দূরের কথা,
মরতেই চাইতেন না।—তখন এই ভাবতুম রে ভাই।
ধীরাজ। আর এখন ?
পরেশ। এখন নিত্যই তাঁদের স্মরণ কোরে অপরাধের ক্ষমা
চাই। উঃ কত কষ্টেই, কত ভােগাভােগের পর তারা ও পথ
নিয়েছিলেন, তাদের সত্যলাভ ঘটেছিল। এখন জন্মের নামে
শিউরে দেয় ভাই।
ধীরাজবাবু ভাবলেন—“পরেশ আবার কি দুঃখে সেই ঋষিদেরই
একজন দাড়িয়ে গেলাে।
ধীরাজবাবু হাে হাে কোরে হেসে বললেন—“মক্কেল বিরল
মেরেছে বুঝি? আর আসবেই বা কে, পিকেটিংয়ের মামলায় তাে
আর পয়সা বেরয়না। জমিদারেরা ঘায়েল, না আছে ভায়ে ভারে
বিষয় টানাটানি—সর্বস্বান্ত হবার moral courage—উইল
প্রােবেটের পয়সাই জোটেনা। বিধবার সরিকের সঙ্গে আপােস
মিল চলছে! Advocateএর পেট চলেনা—
রাধারাণীই চা আনলে।
চা খাওয়ার পর পরেশবাবু বললেন—“এইবার প্রস্তুত হও, কিছু
কিছু দেখে আসবে চলল।
—“যাবে বইকি, তার আবার প্রস্তুত হওয়া-হয়ি কি ?
“না—বেশী কিছু নয়,-দিব্য চক্ষু জোড়াটা লাগাও। বিশ্বরূপ
৪৩

সন্ধ্যা শঙ্খ
-
দেখতে—অর্জুনেরও দিব্য চক্ষুর দরকার হয়েছিল। সব ভুলে
যাও কেননা। কলিতে চশমা লাগালেই চলবে। আর
জুতাে জোড়াটা এই খানেই থাক ভাই,—ও-দিকটা সবটাই
দেবস্থান।”
ধীরাজবাবু মনে মনে ভাবলেন—পরেশ খুব কঠোর আরম্ভ
করেছে দেখছি!
উভয়ে খালি পায়েই এগিয়ে পড়লেন।
পরেশ। এইটি গােয়াল ঘর।
হাড্ডিসার দু’টি গরু, ঠক্ ঠক্ কোরে কাপছে—পাদিয়ে
জল ঝরছে।
ধীরাজ। এদের এ দশা কেন ?
শুদ্ধাচার পালন করতে হয়, দু’বেলা সব কাচতে
হয় কিনা।
ধীরাজ। গরুকেও কাচতে হয় নাকি?
পরেশ। হবেনা, তুমি যে বিলেত থেকে এলে হে। শাস্ত্রে
ব্রাহ্মণের কবার স্নানের বিধি ? গাে ব্রাহ্মণ কি তফাৎ? তায়
পেটরােগা দেখে আনা-
ধীরাজ। সেটা চেনাে কি কোরে ?
পরেশ। লক্ষণ আছে ভাই, ল্যাজনাড়া দেখে বুঝতে হয়।
শুনে ধীরাজবাবুর প্রাণটা দমে গেল—“দিনগুলাে বৃথাই
কাটালুম-কিছুই শেখা হয়নি।” বললেন—“এক ইস্কুলেই তাে
৪৪

দেবা ন জানন্তি বিদ্যার্জন, এসব শিখলে কবে? উঃ ল্যাজ, নাড়লে বুঝতে পারাে। ভাসে’টাইল জিনিয়াস।” পরেশ। সব তাঁর কৃপারে ভাই! এগিয়ে গিয়ে দেখেন—উঠোনে একখানি তক্তপােষ ভিজে ঢ্যাপ-চেপে,—তার উপর এক রাশ তােষক, বালিস—গড়াগড়া শুয়ে গােবর-জল আর দুর্গন্ধ ছাড়ছে! তাড়াতাড়ি রুমাল নাকে দিলেন। পরেশ। ভালো জিনিষ হেDisinfectant—পবিত্র গােবর- জলে ধােয়া। বােয়াকে উঠতেই দেখেন—গামছাপরা একটি শ্রীকৃষ্ণবর্ণা কুলাঙ্গী, দালানের কড়িকাটে গােবর-জলের ছিটে মারছেন। ধীরাজবাবু তাড়াতাড়ি বাইরের দিকে মুখ ফেরাতেই পরেশবাবু বললেন-“তিনি ন—তিনি ন-তার শ্রদ্ধেয়া শ্ৰীসখী সুরুচি। ভারী পবিত্রা, জীবন্মুক্তাই হবেন। আর সুরুচির পরিচয় তাে ওঁর হাতময় গাময় দেখতেই পাচ্ছ! বৃন্দাবন থেকে সংগ্রহ, বৃন্দাবন-চন্দ্ৰই জুটিয়ে দিয়েছেন। থাক, সে অনেক কথা। এখন ওঁর কড়িকাট- শুদ্ধি চলছে।” ধীরাজবাবু বললেন-“আর তােমার বেস্পতির দশা চলছে।” “হ্যা—তিনি এখন আমার একাদশে।” তারপর পরেশবাবু সুরুচিকে জিজ্ঞাসা করলেন—“সুরুচি, তােমার মা এখন কোথায়? তাঁর সব সার হয়েছে?” ৪৫ স্যা শঙ্খ সুরুচি-“না বাবা, এখুনি হবে কি বলল! তিনি ছাতে গা শুকুচ্ছেন। কলের জলে নাওয়া কিনা, সে জল গায়ে থাকতে, গঙ্গাজলে নাইলে সব যে একনেকুড় হয়ে যাবে বাবা! এখন কেবল তার সন্ধ্যের খোঁটু বাকি।” অর্থাৎ দাত খোটা। পরেশবাবু বললেন—“ভেতরে যাবে কি ধীরাজ ? আমি আজো পারিনি ভাই, কারণ ওই যে দোরের বাইরে একতাল শুদ্ধি (গােবর) রাখা আছে—ওইতে পা ডােবালে তবে Passport ছাড়পত্র পাওয়া যায়।” ধীরাজবাবু বললেন-“থাক আজ আর নয় ভাই,আবার আসব।” পরেশবাবু হেসে বললেন—“আর যে এমুখখা হবেনা তা জানি, —আসতেও বলিনা। তুমি একটু শান্তি নিয়ে ফিরবে বলেই ডেকেছিলুম।” Start i Enough-awfully grateful. Catuats at সুরমার কাছে কত অপরাধই করেছি। রােগের ওপর তাে কারুর হাত নেই। ইচ্ছা কোরে কে আর এসব কষ্ট স্বীকার করে। ওঁদের আর দোষ কি, দোষ আমাদের ভাগ্যের পরেশবাবু বললেন-“তবে এর মধ্যেও একটা silver lining খুঁজে পেয়েছি ধীরাজ, সেইটাই পরম সান্ত্বনা। নরকবাস এই- খানেই সেরে চলেছি। এক অপরাধে দু’বার সাজা ভােগের কথা “পিনাল কোডে’ বলেনা,বলে কি? যা কিছু ভেবনা ভাই, ৪৬

দেবা ন জানন্তি
-বেশ আছি। এখন মেয়েটার বিবাহ দিয়ে তার একটা গতি
করতে পারলে বাঁচি (দীর্ঘ নিশ্বাস পড়লাে।
ধীরাজবাবু বললেন-“তার পর?”
পরেশ। সখিসহ ওঁদের বৃন্দাবনে পাঠিয়ে নিজের জন্যে খাঁটি
বন জঙ্গল খোজা
ধীরাজবাবু শিউরে বললেন—“আর High Court ?”
পরেশ। High Court না থাকলেও সেখানে justice
আছেন। তাঁদেরও মহাপ্রসাদ দরকার! চলল এখন একটু
বাইরের বাতাস লাগানাে যাক।
চাকরকে ডেকে জুতাে জোড়াটা দিতে বললেন।
সে বললে—“মাযে কেচে দিয়েছেন হুজুর,-এখনাে শুকোয়নি।”
“তবে আজ আর বেরুনাে হ’ল না ধীরাজ।”
ধীরাজবাবুর কোনাে কথা সরলােনা—বাইরে বেরিয়ে বাঁচলেন,
রাধারাণীকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন।
কিন্তু গরুর কথা ভুলতে পারেন নি।“জীবনটা বৃথা হয়ে
যেতেও দিতে পারিনা।” একটা উপায় মাথায় এসে গেল।
“সাধনাটা অন্তমুখীই প্রশস্ত, কাশী গিয়ে যথা সম্ভব রাবড়ী উদরস্থ
করাই ভালাে, সেও তত গােমাতারই দান।”
৪;

শান্তি পর্ব
=
ঈজিচেয়ারে বসে সুরমা দেবী এক মনে “চিরকুমার সভা”
পড়ছিলেন, একমুখ হাসি উবছে পড়ছিল।
ধীরাজবাবু আর রাধারাণী প্রবেশ করায় সহসা তার মুখের ভাব
বদলে গেল।-“কোথায় সব হাওয়া খেতে যাওয়া হয়েছিল শুনি?
সংসারটা কেবল একা আমারই বুঝি ? কাজ কর্ম বাজার হাট,
চৌকিদারী—আমারই ভার—না? মক্কেলরা সব মরেছে বুঝি
আজ কদিন তাে”-
ধীরাজবাবু ধীরে ধীরে বললেন-“আহা, পরের ছেলেদের••তারা
মলে আর আমার সুবিধেটা কি হবে.••
রাধা উপরে চলে গেল।
সুরমা একদৃষ্টে চেয়ে বললেন-“না তারা মরবে কেনােবালাই,
সুবিধেটা আমি মলেই হবে—তা জানি। ভেবনা দেরি নেই যে
রকম লুচ্ছে-
ধীরাজবাবু। মােটরে যে বড় হাওয়া লাগে, তায় তােমার
আবার ‘টশীটে বসা অভ্যাস—আমি বারণ করতে সাহস
পাইনা
সুরমা। (কুপিত কটাক্ষে) আর কথা কমােনা, সংসারে
.

দেবা ন জানন্তি নজর কতত! পেট্রল ছিল কিনা,—নিৰ্ম্মলের ডিসপেনসরি থেকে আর আসতে পারিনা••• অগ্নৎপাৎ, আসন্ন বুঝে ও-কথা আর না বাড়িয়ে অপরাধ স্বীকারের সুরে বললেন-“মলে না আসায় মনের অবস্থা...” সুরমা। ওঃ—আর আমি না এলেপথের মাঝে পড়ে থাকলে, মনের অবস্থাটা ধীরাজ। ওরে বাপরে, সে কথা ভাবতেই পারিনা সুরমা। তা পারবে কেননা,দরকার ? কোনাে দিকেই রক্ষা নেই! অবস্থা আবার সঙ্গীন পাড়ায় দেখে ধীরাজবাবু যেন চট্‌কা ভেঙে উঠে বললেন—“আমি বলি কি, এ কষ্ট ভােগ করার চেয়ে কাল তােমার দাঁতগুলি তুলিয়ে বাঁধিয়ে নেওয়াই দরকার- “ধান্ ভাণতে শিবের গীত” বলে সুরমা হাসলেন— ধীরাজ। তুমি যাই ভাবাে-ও ছাড়া আমার আর কোনাে ভাবনা আছে কি? তােমার সর্বক্ষণের কষ্ট দেখে যে মা। (নরম সুরে) থামােথামাে-এ ত ফেলে গত বাঁধিয়ে নিলে কষ্ট যায় তা বুঝি, নির্মলও বলে—“তাতে যাতনার কষ্ট যায় বটে কিন্তু মুখ ঠিক পূৰ্ব্ববৎ স্বাভাবিক না থাকতেও পারে,-কার একটু টো খায়, কারাে বা একটু চাপা-চড়াণে ভাব পড়তেও পারে। এ শুনে কি মেয়ে মানুষের সাহস হয়? চোখের কোণে তার একটু হাসি খেলে গেলাে! ৪১ সন্ধ্যা শঙ্খ ধীরাজবাবু বললেন-“কেননা তােমার তাতে আর ভয়টা কি সুরমা ! তােমাকে তাে কেউ আর কনে দেখতে আসছেনা” সুরমা। (কল্পিত রােষে) যাও যাও, যা বােঝনা তা নিয়ে কথা কমােনা•• ধীরাজবাবু। (বােকার মত ভঙ্গীতে) এতে আর বােঝ- বুঝির কি আছে সুরমা, -দেখবে তত আমি! এ কষ্ট দেখার সুরমা। আর কারুর তত চোখ নেই—বলতে বলতে হাসি মুখ ঘুরিয়ে উঠে পড়লেন। ধীরাজবাবু। ও, তা বটে, বটেই তােত আছে বটে। অতটা আমি••• সুরমা টেবিল আয়নার কাছে ছুটলেন।-“না দাত ভােলা হবেনা।” ধীরাজ। তা বেশ তাে•••তা—কিন্তু মােজ এরকম কষ্ট••• ( আপন মনে) আমার হার্ট যেন নিত্যই উইক বােধ করছি••• সুরমা। কেননা, কই একদিনও তা বলনি তাে। আমার এমন কি হয়েছে? একটু যন্ত্রনা বই তাে নয়! • হ্যা দাত ফেলে দিলেই সেটা যায় কিন্তু তাতে নির্মলের সঙ্গে সম্পর্কও যে যায়- সেটি যে আমি পারবনা!—রূপে, গুণে, ধনে, বয়সে, স্বাস্থ্যে নিৰ্ম্মলের মত কটা ছেলে সহরে আছে? মানে, সন্ত্ৰমে, ব্যবহারে, বিনয়ে জোড়া মেলেনা।-( কাছে এসে নিয় কঠে) মেয়ের বয়সটা দেখতে

দেবা ন জানন্তি
পাওনা—তার বিয়ে দিতে হবেনা ! ওই আশা ধরেই তাে াতের
যন্ত্রণা সয়ে আসছি••সইতেও হবে। আমাদের কাতর আকর্ষণের
কি কোনাে•••
ধীরাজবাবু একদম নির্বাক,—তার মন তখন যে কোথায় তা
নিজেই বলতে পারেন না ;—অন্তর কেবল—“দেবা ন জানন্তি” —
আবৃত্তি করছে!

No text on this page.

ܦܟܙܦܝܐܐܫܠܐ ܟܦܦ

No text on this page.

পুর্বে ভাগলপুর বাংলার অন্তর্গত থাকায় সেখানে বহু বাঙালীর বাস, অনেকেই সম্পন্ন ও সাম্ভ। শিক্ষা-দীক্ষার সাহায্যে ক্রমে উন্নতির সহজ উপায় সকল উদ্ভাবিত হওয়ায়, যেমন একান্নবর্তিতাকে বাহানুবর্তিতায় রূপান্তরিত করে সত্বর স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করা ও স্বাতন্ত্রে সুখানুভব করা, সেইরূপ শিক্ষিত বিহারী বন্ধুরা বিহারকে বাংলা হতে বিচ্ছিন্ন করে স্বাতন্ত্র্য খোজায়, বাংলাকে বহু ত্যাগ স্বীকার করে ক্ষীণ হতে হয় ; ভাগলপুরকেও সেই হ’তে হারানাে পথের ধারে প্রাচীন বাড়ী ঘর বাগান আজও বাঙালীদের পূৰ্ব সমৃদ্ধির পরিচয় দেয়। পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে ভােলানাথের পিতা, ভবনার চাকুরি সুত্রে ভাগলপুরে এসে বাস করেন। বাঙালীর সময়টা তখন মােড় ফিরছে—গ্রহ রক্তগত হবার রাস্তা নিয়েছে। আমরা স্বরাজের আওয়াজ পেয়েছি, বঙ্গভঙ্গে সকলে বেজায় উত্তেজিত, বয়টে উৎকট প্রেম, বিলাতী নিবের বদলে কঞ্চি দিয়ে your most obedient 'servant” লিখছি। এই তেরম্পর্শে মহাহৰে যেতে রয়েছি ও প্রভুদের শুভদৃষ্টি হতে হটে চলেছি—দিন দিন তাদের বিষনয়নের লক্ষ্যস্থল হয়ে পড়ছি।

সন্ধ্যা শঙ্খ এই অবস্থায় অনেক বাবুর মত ভবনাথবাবুও চাকুরি সইল না। মতি তখন উলটো পথ ধরেছে। বাহবা সম্বলে বাহাদুরির হাসি হাসতে হাসতে তিনি বাড়ী ফিরলেন। বাড়ীর শান্তি-কুঞ্জে আগুন লাগল, আলাে দেখা দিলে বাইরে আর সংবাদ- পত্রের পৃষ্ঠায়,ছাই পড়ল সংসারে,-আঁধার হ’ল প্রিয়ার মুখ, আবার ও কান্না বাড়ল সন্তানদের। বাড়ীতে থাকা দায়। সেগুলাে হ’ল পাচিল-ঘেরা, ছাদ-আঁটা গারদ-বেকারের বনবাস। কেবল নাই নাই, চাল নাই, ডাল নাই, বাজারের পয়সা নিত্য চাই, ঘুম না ভাঙতেই ভূতত জিলিপি চায়, লিলির তরল আলতা জবাকুসুম ফুরিয়েছে, ছেলের ইস্কুলের মাইনে চাই। পূজো যত কাছাচ্ছে, ভবনাথ কুঁজো মারছেন। জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় প্রহরের দিকে চাওয়া বরং সহজ, কিন্তু মুখ তুলে পত্নীর মুখ পানে চায় কার সাধ্য! আড় চোখে, সশকে তার মেজাজটা যাচাই করতে গেলে হৃৎকম্প হয়। চা খাবার দুচারটি ডেলি-প্যাসেঞ্জার-সুধাংশু বিমল ডাক দিলে, ভবনাথের মুখ বুক দুই শুকিয়ে যায় ; লিলি গিয়ে বলে—“এখনাে দুধ আসে নি।” কেরানিদের চিরদিন ধারই লক্ষ্মী—মুদি কিন্তু হাত গুটিয়েছে। কেরানি কোনাে দিন পয়সার অল নয় - স্বচ্ছল সে পােক- পরিচ্ছদে, স্বচ্ছল দেনায়। ভবনাথ কুল পাচ্ছেন না, পাশের বাড়ীর গ্রামােফানটা কানে কেকল বিষ ঢালয়ে। বেচারার অবস্থা শুনে পূর্বপরিচিত মতিচা মাড়ােয়ারী নিজের ৩০ ভােলানাথের উইল কারবার থেকে কাপড় প্রভৃতি কিছু মাল দিয়ে তাকে একখানি ছােট দোকান খুলিয়ে দিলে। ভবনাথবাবু বললেন, বিলিতী কাপড় কিন্তু রাখব না মতিচাদ। মতিচাদ একটু হেসে বললে,-“ব্যবসায় ওসব বিচার রাখবেন না, খরিদ্দার সে বিচার করুক। আপনাকে তত বিলিতী মাল কিনতে হবেনা; সে তাে আমি দিব।” তারপর বহু পরামর্শ, উপদেশ, সৰ্ত্ত ও ব্যবসার গুঢ় মন্ত্র দিয়ে কাজ শুরু করিয়ে দিলে। তিনমাস সংসার চালাবার মতও কিছু দিলে, আর বললে, যা যা বলেছি, ঠিক ঠিক সেই মাফিক্‌ চললে তিনমাস পরে আপনে চালাতে পারবে—সেই হােবে আপনার বুদ্ধির ধাঁচ ( যাচাই)।••• কয়মাসেই ভবনাথবাবুর জীবনে বিতৃষ্ণ ও সংসারে বৈরাগ্য দাড়াচ্ছিল—অবশ্য অভাবে; এমন সময় মাড়ােয়ারী বন্ধুর সাহায্য ও উপদেশ পেয়ে উৎসাহের সহিত তিনি সাধনায় মন দিলেন। একে মাড়ােয়ারীর পরামর্শ, তার ওপর ভবনাথবাবুর ঠেকে শেখা অা, —দুয়ে মিলে অল্প দিনেই ব্যবসার ওপর লক্ষ্মীর দৃষ্টি এনে দিলে। মতিচাদ খুশি হয়ে বললে,-“ব্যস, অব, পাকা হো গিয়া। এর মধ্যে আর কিছু ঘুষিও না, নােজগারকে ধেয়ানমে চৌবিশ ঘণ্টা লাগা রহন—সচ্চা আনল ওই দেগা। আওর সব আন উকি গােলাম হায়। গেলামকে গদ্দিমে ঘুষনে না দেও,ইদি রাখে।” গুরুমতে অন্ধ রাখায় ভবনাথবাবু দিন দিন উন্নতি করতে ৫৭ সন্ধ্যা শখ লাগলেন এবং বিশ বাইশ বৎসরের সাধনায়—অর্থ,বাড়ি, বাগান, সম্পত্তি রেখে চলে গেলেন। যাবার সময় ছেলেকে সাধনায় দীক্ষা দিয়ে বললেন,—টাকা থাকলে তার মধ্যে সবই থাকে-মুখ্যান টাকাতেই, আর সব আনন্দ তার গােলাম—গৌণানন্দ। গােলামদের বাড়তে দিওনা, গদিতে ঢুকতে দিওনা, তারা আসে ডােবাতে।” আর বলে গেলেন, “আমাদের যেমন মােটা বিক্রির মরসুম আনন্দ- ময়ীর আগমনে, সেইরূপ স্থানীয়দের মােটা খরিদের মরসুম “দশে” পর্বে, অর্থাৎ দশমীতে। সেইটে মাল সাড়ের বিক্রি। সেইটাই আনন্দময়ীর নাম সার্থক করে থাকে। উপদেশমত কাজ করলে সকলেই খুশি হবে, নিজেরাও কম আনন্দ পাবে ,”—ইত্যাদি। ছেলে ভােলানাথ ছিল পিতার বাধ্য ও যােগ্য পুত্র। কারবার পূর্বের মতই চলতে লাগল, বরং নবােন্তম যােগ হওয়ায়—দিন দিন উন্নতি হতে লাগল। আগমনীর সুর উঠতেই দোকানটিকে তােলানাথ দর্শনরান মালের প্রদর্শনীতে পরিণত করে রাখলে। মায়ের ছিল ঘােটকে আগমনের কথা, তিনিও সত্বর এসে পড়লেন। বেপরোয়া বাঙালীরা বাড়ীর তাগাদামত আপিস যেতে আসতে দুবেলা পূজার মালের খবর নিচ্ছিলেন। মহালয়ার ( এজের) দিনে শা-কেসে শানিত ‘মদনবাণ’-শাড়ী ঝুলতে দেখে তারাও-গা বাড়িয়ে ঝুলে পড়লেন-হে মেরে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। ভােলানাথবাবুকে নগদ কিছু দিলেই তিনি খুশি, “বাকি পরে দিও, ৫৮ ভােলানাথের উইল -কড় তাগাদা নেই। সপ্তমীর মধ্যে বাঙালীদের খরিদ একপ্রকার শেষ, কেবল মহাষ্টমীতে দেবীকে দেবার মত সস্তা কন্তা-পেড়ের জন্যে তেমন তাগাদা ছিল না। একজোড়া নিলেই ঝিয়েরও একখানা হবে, দুর্গারও একখানা হবে ! পূজার ‘সেল’ ভােলানাথকে খুশির স্বর্গে পৌছে দিয়েছে। এইবার সে দশমীর রেশমী মাল সাজাতে বসল। জাপানের পূর্ব- রাগরঞ্জিত সুৰ্যোদয় মার্কা পেনি, ফ্রক আর ব্লাউজে-ষ্টোর হাউসে নানা বর্ণের প্রজাপতি উড়তে লাগল। আনন্দে তখন নিজের অজ্ঞাতেই ভােলানাথের গলায় গুণ গুণ স্বর ভর করেছে—অবিচ্ছেদে চলছে। যদিও ভােলানাথের বংশে কেউ কোনদিন সঙ্গীত বা এর চর্চা করেনি বা কেহ তা করতে শশানেনি, প্রকৃতই শত্রুতেও তাদের সে অপবাদ দিতে পারে না,তবু এরূপ হয়। অত্যধিক আনন্দের চাপেই ওটা অজ্ঞাতেই বেরয়। এটাও তা ছাড়া আর কিছু ছিল না। মহাষ্টমী থেকেই “দশের” বিক্রী সুরু হয়েছে। হেনকালে যেন দৈব-প্রেরিতভাবে একটি যুবকের আবির্ভাব। —“এস, এস ভাই, বহুদিন দেখা নেই-কি করছ বল? বিদ্যানন ভােলানাথের সহপাঠী ছিল। বললে, “পচিশ ত্রিশ সন্ধ্যা শঙ্খ টাকার চাকুরি করতে প্রাণ চাইলে না। আমাদের গ্রামখানি গণ্ডগ্রাম, অনেকেই ইংরেজী-সভ্যতার স্বাদ পাওয়া লােক। ইস্কুল, গার্লস-ইস্কুল থাকায়-কাপড়, জামা, শাড়ি, সেমিজ, ব্লাউজ আর এসেন্স, সাবান, পাউডার, কলিসের কাটতিতেই আমার বেশ চলে যায়। লােক রেখে স্যাণ্ডেল ও শু’র (shoe) ডিপার্টমেন্টও খুলছি। কাকেও আর টাউনে না আসতে হয়,—ইত্যাদি। তােমার কারবারের নাম-যশই আমাকে এ পথে টেনেছে। আমি প্রায় হাজারখানেক টাকার সওদা করতে বেরিয়েছি ভাই। তােমার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই আমি মাল নিয়ে যাব। দশেরায় কোন্ মালের কিরূপ কাটতি, কোন্ ফ্যাশানের চাহিদা কিরূপ- তােনার নিশ্চয়ই ভালাে জানা আছে। আমার এই ফর্দ নাও তােমার ইচ্ছামত কাটছাট করে তােমার পছন্দমত মাল দাও। আমি আজই নিয়ে যেতে চাই। বিকেলে পাঁচটার বাসে’ আমি রওনা হব ভাই।” চা, পান দিয়ে আর একটি সিগারেটের টিন খুলে দিয়ে, ভােলানাথ মাল বাছাইয়ে মন দিলে ও কর্মচারীদের কাজে লাগিয়ে নিজে চেয়ার টেনে বসে দেখতে লাগল।—“বিদ্যানন্দ ও তার সঙ্গীকে তাদের যাওয়ার আগে জল খাওয়ালেই হবে।” লুচি, তরকারি, হালুয়ার অর্ডার বাড়ীতে দেওয়া হয়ে গেল। মধ্যে মধ্যে বিদ্যানন্দকে রকমফের মাল “অ্যাপ্রুভ করানােও চণ।

ভােলানাথের উইল বেলা প্রায় তিনটে, কাজও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, বিদ্যানন ঈজি-চেয়ারখানায় চোখ বুজে একটু নিশ্চিন্তে আরাম করছে। ভােলানাথ একদিনের জন্যেও পিতৃ-উপদেশ ভােলে নি। পরিবর্তনের মধ্যে, ঘূৰ্ত্তি হলে নিজের অজ্ঞাতেই তার কণ্ঠে গুণ- গুণানি আসত। পাশের আপিসরূমে গিয়ে মালের দর-দামের হিসাব লেখা চলছিল। শেষ হলে কর্মচারীদের বিদায় দিয়ে একা বসে হিসাবে চোখ বােলাতে বােলাতে—বাল্মীকির কণ্ঠে “মা নিষাদের মত, তার কণ্ঠ হতে সহসা “আজ বিদ্যানন্দকে গলেমে চাকু চালায়ি-ঈ-ঈ-ঈ, মওকা পাকে কেয়া চাকু চালায়ি ঈ-ঈ-ঈ- হু হু, আরে বিদ্যানন্দকে গলেমে— এই কথাগুলি সুরে শব্দিত হয়ে উঠল। এটা ছিল সত্যই একটা অভাবনীয় ঘটনা, তাই তাড়াতাড়ি একজন কর্মচারী উকি মেরে দেখে,—বাবুই তাে বটে! তারা কেউ মুখ টিপে, কেউ চোখ টিপে হাসলে, যেহেতু কেউ কোনদিন বাবুকে গাইতে শশানে নি। যাক, কথাটা হচ্ছে—ঘটনার মাসকয়েক পূৰ্বে স্বামী সন্ধ্যা শঙ্খ শ্ৰদ্ধানন্দজীকে দুবৃত্তে হত্যা করে,চাকু চালিয়ে নয়—রিভলভার চালিয়ে। ভিক্ষুকেরা অতশত জানে না, তারা পথে পথে বােধ হয় ঐরূপই গাইত—অবশ্য শ্ৰদ্ধানন্দের নাম করে। ভােলানাথের কস্মিনকালে সঙ্গীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলনা—কোনাে গানও জানা ছিল । শ্ৰদ্ধানন্দজীর হত্যায় সারা ভারত বিচলিত হয়। ভাগলপুরেও কম উত্তেজনা দেখা দেয়নি। তাই বােধ হয় ভােলানাথের মস্তিষ্কে বিকৃতভাবে তার ভগ্নাংশ রয়ে গিয়ে থাকবে। প্রানন্দের স্থানে ‘বিদ্যানন্দ’ যে কি করে এলেন, সেটা বােঝা কঠিন নয়, যেহেতু ভােলানাথের মাথায় সারাদিন আজ পূৰ্ব সহপাঠী আগন্তুক ‘বিদ্যানন্দ’ ঢুকে ছিলেন। আসল কথা, জয়দেবের পুথিতে “দেহি পদপল্লব মুদামের মত ভােলানাথের মস্তিষ্কেও ‘শ্ৰদ্ধানন্দ’ বেমালুম ‘বিদ্যানন্দ হয়ে পড়েছিল। গান কথy আপনা আপনি থেমেছে, তার খেয়ালও নেই, কারণ সেটা ভােলানাথের চেষ্টাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ছিলনা। ক্লক ঘড়িটায় চারটে বাজতে শুনে সে চঞ্চল হয়ে মাল বিক্রির বিস্তারিত হিসাবের কাগজটা নিয়ে উঠে পড়ল। দোকানে ঢুকে দেখে ঈজি-চেয়ারে বিদ্যানন্দ নেই। চারদিক চেয়ে জিজ্ঞাসা করলে,-“বিদ্যানন্দ কোথায় গেল ?” একজন কর্মচারী বললে, “তিনি তত কিছুক্ষণ হ’ল উঠে গিয়েছেন,—বােধ হয় অন্যান্য কাজ সারতে। ‘বাসের সময় হয়ে এল, এখুনি নিশ্চয় ফিরবেন।”

ভােলানাথের উইল
মুহূর্তে ভােলানাথের প্রাণটা দমে গেল—“তােমরা আমায়
জানাওনি কেন?”
“আজ্ঞে, তিনি কি করতে উঠলেন, সেটা তাে তখন
ভােলানাথ মােটা টাকার হিসেব হাতে করে বসে পড়ল।
-“তার জলখাবার প্রস্তুত, সে গেল কোথায়?”
একজন কর্মচারী বললে—“তিনি তাহলে বােধ হয় খাবার কথা
জানেন না।—একবার খাবারের দোকানগুলাে দেখি ?
বােধ হয়”••••••
“হ্যা, (চঞ্চল হয়ে) আর দেরি করছ কেন বিধু?—নিমাই,
তুমি যে বড় দাড়িয়ে রইলে?—উ, এদিকে যে সাড়ে চারটে!
ঋথােগাখাে-
কর্মচারী দু’জনেই বেরিয়ে পড়ল। মােড় ফিরেই দুজনের হাে
হে হাসি। তারা সিগারেট বার করে ধরালে। কর্মচারীরা বিড়ি
খায়না, দোকানের মর্যাদা মাটি করেনা !
বিধু বললে—“কি হ’ল বল দিকি, ব্যাপারটা কি ?”
নিমাই বললে—“আমিও বুঝতে পারতুমনা, বাবু যদি না
আপিস-ঘর থেকে বেরিয়ে ঈজি-চেয়ার খালি দেখে “আইতি”
হয়ে জিজ্ঞাসা করতেন—“বিদ্যানন্দ গেল কোথায় ?
বিধু বললে-“তাতে কি?”
নিমাই বললে—“তাতে কি? বাবুর গানটা শুনিসনি?
বিদ্যানন্দকে গলেমে—

সন্ধ্যা শঙ্খ বিধু চীৎকারস্বরে—“ওঃ-হাে” হেসে তিন তুড়িলাফ মারলে! নিমাই বললে—“ঠিক বলতে পারিনা, তবে সন্দেহ হয়, ওই চাকুই সর্বনাশ করে থাকবে। বিধু। নাে সন্দেহ সার,লাউ আই ক্যান্ সােয়্যায়! নিমাই। গ্রহ যে কোন্ পথ ধরে মূকংকে করােতি বাচালং আর ঘরে আসা টাকা করােতি হরণং, তা দেবা ন জানন্তি ! যাক, চলল চলল—এখন চলন্তি! (ব’লে বিধুর হাত ধরে টেনে নিয়ে) “চল, চারুর রেস্তোরাঁয় চা খাওয়া যাকগে,—বিদ্যানন্দ আর এমুখখা হচ্ছে না—নিশ্চয়ই সটুকেছে— দুদিন নিলে ভােলানাথের বুদ্ধি থিতুতে। তার পর সােজা- পাকা প্রাচীন “মুসুবিদা-মাস্টার”অ্যাডভােকে অটলবাবুর কাছে গিয়েউইল লিখিয়ে বাড়ি ফিরল। সংক্ষেপ মৰ্ম্ম- “আমার বংশে যিনি গীতাদির চর্চা করবেন, আমার কারবারে বা দোকানের সূত্রে বা অংশে তার কোনাে অধিকার বা দাবী থাকবেনা। এই সৰ্ত্ত পুত্রাদি ও অন্যান্য উত্তরাধিকারী হইতে জামাই, ভগ্নিপতি পৰ্য্যন্ত সমপ্রবল ও বলবান থাকিবে। গদিতে অস্ফুট গুণাগুণ শব্দ পর্যন্ত—উক্ত ধারার অন্তর্গত রহিল, এবং গ্রামােফোনেরও প্রবেশ নিষেধ থাকিল।” ভােলানাথ ফিরে এসে গভীর ভাবে বললে--“দাও, দু’কাপ া লও। ৬৪ মায়ের অনুগ্রহ

No text on this page.

কুমারীশ ভায়া বললেন—“শরীরের উপর বড় অত্যাচার
করছেন! পায়ে পায়ে অনেকটা এসে পড়া হয়েছে-ফিরু, আর
নয়। বরং কিছু একটা বলুন—শুনতে শুনতে যাওয়া যাক।”
বললুম-“বেশ, তাই হােক, সিগারেটটা ধরিয়ে নি।”
—শহরতলির এক ভদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের তাঁরা ছিলেন তিন
ভাই-কনিষ্ঠ মতিলাল মুখুয্যে। পঞ্চাশ-ষাট বৎসর পূর্বে
মধ্যবিত্তদের সর্বাপেক্ষা সহজ কাজ ছিল—বিবাহ করাটা বা বিবাহ
হওয়াটা,অপরপক্ষে-বিবাহ দেওয়াটা,কারণ—সেটা ছিল পুণ্যকর্মের
মধ্যে, অর্থাৎলােকের কন্যাদায় উদ্ধার। এ কাজে যারা কথা কয়ে
সাহায্য করতেন তারাও সে পুণ্যের অংশ পেতেন।
মতিলাল কিন্তু এমন শিক্ষা পাননি যাতে ইংরেজের চাকুরি করা
চলে। দোকানে খাতা লিখে কিছু পেতেন মাত্র, অন্য কোননা
নির্দিষ্ট আয়ও ছিল না। তাই—তার ইচ্ছা না থাকলেও, দাদের
ও গ্রামের অন্যান্য প্রবীণদের কথা অমান্য করতে না পেরে বিবাহটা
হয়ে যায় এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফলও ফলতে আরম্ভ করে।
বলতে হয়,—দাদারা বলেছিলেন, “আমরা রয়েছি, তাের এতাে
দুর্ভাবনা কিসের।”
মতির রােজগার নামমাত্র, সংসার-বৃদ্ধি সুস্পষ্ট ;-ক্রমে
অশান্তির বৃদ্ধি তততাধিক। শেষ পৃথকারের সুপরামর্শ ও ব্যবস্থা

পূর্বপুরুষেরা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন-টোল রাখতেন, বিদ্যাদান
করতেন,-নাম যশ ছিল। এখন সে সব আর ছিল না, ছিল
কেবল চুড়ামণি মহাশয়ের বংশ-গৌরব। সহসা এই অভাবনীয়
ঘটনায় মতি মুখুয্যে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। সংসার নির্বাহ
হওয়া কঠিন।
গ্রামের প্রবীণেরা বললেন—“মতি, তুমি বাড়ির গৃহদেবতার
পূজাপাঠ তাে করে, ওই সঙ্গে পুরােহিতের ব্যবসাটা সুরু কোরে
দাও!”
মতি মধুয্যে বললেন-“সে শিক্ষা আমার কই।”
“অভয় চাটুয্যে পারে, আর তুমি পারবে না,-খুব পারবে।
একটু দেখে শুনে নিলেই হবে”—ইত্যাদি।
মতি মুখুয্যের মন তাতে সায় দিলে না।-“ধৰ্ম্মকর্মে,আধ্যাত্মিক
ব্যাপারে,—পেটের জন্যে এ আত্মপ্রবঞ্চনা পারব না। যারা
পুরােহিতের কাজকে ‘ব্যবসা’ বলেন, সহজ ভাবেন, তাঁদের সে
সাহস থাকতে পারে। সারা জীবন মানসিক অশান্তি বহন করার
চেয়ে কষ্ট বহন করা ভালাে।-অভয় পুরােহিত-অভয়।”
মুখুয্যে ছিলেন সরল প্রকৃতির মিষ্টভাষী আমােদপ্রিয়, মজলিসি
লােক। সকল বৈঠকেই তাঁর খোঁজ পড়তে-খোঁজ পড়ত না

মায়ের অনুগ্রহ কেবল তার সাংসারিক অবস্থার,—অর্থাৎ আহার জোটে কি-না। আবার তাকে না পেলে, তার উপর নানা অনুযােগও হােত। “আজকাল যে দুমূল্য দাঁড়ালে!” ইত্যাদি এই বিপন্ন অবস্থার পর গ্রামে তাঁকে অল্পই দেখা যেতাে। প্রতাপবাবু বললেন—“অমন উপায়টা বলে দিলুম, বােধ হয় ভালাে লাগলাে না,-বােঝবার মত বিচার-বুদ্ধি আছে কি? তা থাকলে আর- অম্বিকবাবু বললেন-“আগে আগে আসততা, গল্পগুজোব, তাস-পাশা আর মজলিসি কথাবার্তায় রাত দশটা পর্যন্ত বৈঠক সরগরম থাকতাে। দশজন ভদ্রলােক আসেন, সকলেই মতিকে চান—ভালবাসেন। অভাব হয়ে থাকে—জানালে কতরকম উপায় বেরিয়ে আসে, কত প্রকারে সাহায্য পৌছয়। সে সব আলে আছে কি?” বিশ্বনাথবাবু বললেন-“কেন মিছে বকচো, ভাংবেততা মচকাবে না।—পেটে কিছু থাকলে আর”.. নরসিংবাবু তাঁদের চেয়ে বয়সে ঘােট। তিনি বললেন- “এতদিন তাকে আমরা খুজতুম, আমাদের একজনের মত আসতেন যেতেন। এখন তিনি কষ্টে পড়েছেন, তাকে অন্নের চেষ্টায় ঘুরতে হয়। এখানে তাে পূর্বের মত আসা তর আর সম্ভব নয়, কষ্ট বানানও ভদ্রলােকের-বিশেষ পরিচিত লােকের, ততধিক কঠিন সন্ধ্যা শঙ্খ “থামাে থামাে-ছেলেমানুষের মত বােকো না। না জানালে লােক জানবে কি কোরে?” নরসিংবাবু হাসি টেনে বললেন-“আমাদের বৈঠকে গ্রামের কোন্ বাড়ির কোন্ কথাটি অজানা থাকে, তা তাে জানি না!” বিশ্বনাথবাবু বললেন -“সে জানায় কাজ হয় না। বছর ফিরতে চললে তারা কি না খেয়ে আছে?” নরসিংবাবু বললেন-“দেখলে তােত সেই রকমই মনে হয়। সে রহস্যপ্রিয় পরােপকারী মতি মুখুয্যেকে আর চেনা যায় না।-দূরে দূরে সরে সরে থাকেন- “পরােপকারী।” “নয় কিসে বলুন? টাকা তার নাই-টাকা দিয়ে পরােপকার তার পক্ষে সম্ভবও নয়, কিন্তু—কাজে কর্মে, বিপদে আপদে, রােগর সেবায়, আনন্দদানে—গ্রামে ওর মত কয়জন মেলে! আবশ্যক ওরূপ স্বতপ্ৰস্তুত শশানবন্ধু কয়জনই বা বেরয়। শিক্ষিত ধনী, উকীল, বুদ্ধিমান, চাকুরে, অনেক আছেন—তাঁদের মধ্যে যে পরােপকারী নাই তা আমি বলছি না। তবে আমাদের পােপকার প্রায়ই উপদেশ দানে* প্রতাপবাবু একটু কষ্ট ভাবেই বললেন-“বিশ্বনাথ, তুমি থামবে কি, যদি কেউ কারাে অযাচিত সহায়ক হয়, ভার নেয়, তাকে বাধা দাও কেননা ?” নরসিংবাবু সবিনয়ে বললেন-“ভায় নেবার মত বড় কথা আমি ৭০

মায়ের অনুগ্রহ
তাে উচ্চারণ করিনি খুড়ােমশায়, সেটা মধ্যবিত্তের অপমৃত্যুর মতই
লাগে। তাই সে পরিচিত আপন জনের কাছে অবস্থা জানাতে
পারে না—সকল কষ্টই সহ্য করে।”
প্রতাপবাবু বললেন—“তাই বা করা কেননা, এখন তত চারদিকে
“জুটুমি খুলছে, বিদেশীরা এসে বেশ দু’পয়সা রােজগারও করছে,
তাদেরও স্ত্রীপুত্র আছে—
নরসিংবাবু বললেন-“ক্ষমা করবেন, চুড়ামণি বংশের ভদ্র
মধ্যবিত্তের পক্ষে সেটা বােধ করি সহজসাধ্য নয়। আপনাদের
ছেড়ে বিদেশে গেলে মুখুয্যে মশাইও চেষ্টা পেতে পারেন, কিন্তু
আজন্ম যিনি আপনাদের একজন ছিলেন, এখন তার পক্ষে এ
শরীরে সে এমও বােধ হয় সম্ভব হবে না।”
অম্বিকবাবু বললেন-“থাক্, রাত হয়েছে, মতির দৌড়টা দেখাই
যা না।”
সকলে উঠলেন। নরসিংবাবু নীরবে ভাবতে ভাবতে বাড়ী
গেলেন -“যাহার হৃদয়ে শেল, সে জানে কেমন।-সংবাদ পত্রে
-মধ্যবিত্তের অপঘাৎ স্বীকারের দৃষ্টান্তও বিরল নয়”...
৭১

৩ মতি মুখুয্যে নিজ সমাজের বা নিজ গাঁয়ের লােকের দ্বারস্থ হতে পারতেন না। ভাের না হ’তে দূর গাঁয়ে চলে যেতেন, -কোনাে প্রকারে দুটি অন্নের উপায় করতে। যে গাঁয়ে পরিচিত কোনাে ‘বাবু’ আছেন, সে গ্রাম বাদ দিতে বাধ্য হ’তেন-নানা কারণে। কৃপার আঘাতের চেয়ে নিষ্ঠুর আঘাত আর নাই। যে গ্রামে কৃষক ও গােয়ালাদের বাস, সেই সব শ্রমিক-গৃহস্থবহুল গ্রামেই তিনি যেতেন। তাঁর সহাস সুমিষ্ট সত্যবাদিতা ও অমায়িক আলাপে—সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করতাে। তাঁর কাছে তারা মেয়ে-পুরুষে রামায়ণ মহাভারত আগ্রহের সঙ্গে শুনতে—আরব্য উপন্যাসের গল্পও শুনতত। ভদ্রলােককে আপন জনের মত পেয়ে তারা যেন একটা অজানা সুখ উপলােগ কোরতাে। কারণ, তাতে জাতির বা শিক্ষার ঝাজ ছিল না, দুঃখ দৈন্যের দুনিও ছিল না। তাকে তারা অনুনয় বিনয়ের সঙ্গে কিছু না খাইয়ে ছাড়তে না। সন্ধ্যার পর ফিরতেন—তাদের দু-একজন—চাল, ডাল, কলাই, গুড়, দুধ, ফল মূল প্রভৃতি ক্ষেতের জিনিষ নিয়ে বাড়ী পৌছে দিয়ে যেতাে--অতি কুণ্ঠার সহিত। তার মধ্যে হিতসাধন বা দয়ার ভাব ছিল না। কেনা জিনিষ নয়—কেতের জিনিষ,—‘না’ বলবার ৭২

মায়ের অনুগ্রহ
অবকাশ দিত না।—নিত্য এক গ্রামে যেতেন না; যেতে বিলম্ব
হলে সকলেই তার খোঁজ নিত-অপরাধীর মত। তাকে না পেলে,
তাদের যেন সুখ ছিল না।
এই ভাবে বৎসরাধিক কেটে গিয়েছে। কিন্তু নিয়মিত
দু-তিন ক্রোশ যাতায়াতে তার শরীরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তাদের ভালােবাসা ও অনুবােধ তাকে টেনে নিয়ে যায়, নিজেই
থাকতে পারেন না। দু-তিন দিন গায়ে বেদনা ও অরভাব সত্ত্বেও
সেদিন বেরুতে হয়েছিল। কোনাে প্রকারে গ্রামে পৌছে শুয়ে
পড়েছিলেন বেহুস।
সে গ্রামের একজন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ-বৈদ্যের কাজ করেন। দেখে
বললেন—“রােগ কঠিন, বােধ হচ্ছে বসন্ত বসে গিয়েছে, ওঁকে
গাড়ি কোরে এখনি বাড়ী পৌছে দাও। সেখানে ভালাে
চিকিৎসক থাকা সম্ভব। দেরি কোরাে না।”
গ্রামে সহসা বিষাদের ছায়া এল। মেয়েরা দলে দলে এসে
মুখুয্যে মশার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে চোখ মুছলে, ছেলেমেয়েদের
মাথাও মুখুয্যের পায়ে ঠেকলে, অতি কাতরে মেয়েরা পুরুষদের
জানালে—ঠাকুরকে বাঁচানােই চাই। ঘরে ঘরে সবাই মায়ের
পূজার মানসিক করলে।
পুরুষেরা নীরব, কি করবে ভেবে পায় না। একখানি গরুর
গাড়িতে খড় বিছিয়ে বিছানা পেতে তাতে মুখুয্যে মশাইকে অতি
যত্নে শােয়ানাে হােলদা, আর একখানি গাড়িতে কিছুদিনের মত
१७

এলো-“আমরা সন্ধ্যা শঙ্খ চাল ডাল গুড় প্রভৃতি বােঝাই করা হলাে।-মুখুয্যের একটু সংজ্ঞা এসেছিল, কষ্টে হাত তুলে সকলকে আশীৰ্বাদ করলেন—“ভেব , আমি তােমাদের মধ্যে ভগবানকে পেয়েছি, তিনি তােমাদের মঙ্গল করবেন। আমার তােমরা রইলে” আর বলতে পারলেন না। সকলে কেঁদে ফেললে। গাড়ি ছেড়ে দিলে। মেয়েরা সদ নিয়েছিল, অনেক কোরে ফেরানাে হােলাে।এত বড় আত্মীয় বহু ভাগ্যে মেলে। গাড়ি যখন বাড়ির সন্নিকট হােললা, মুখুয্যের তখন বিকার- মিশ্রিত জ্ঞান হয়েছে। গাড়ি আসতে দেখে—দু-একজন আত্মীয় ও জনকয়েক ভদ্রলােক বিশ্বনাথবাবু, অম্বিকবাবু প্রভৃতি সাগ্রহে চাষীদের জিজ্ঞাসা করলেন-“গরুর গাড়িতে কি হা-কে এলাে?” “আমি এসেছি দাদা, গাড়ি চড়াটা ভাগ্যে ছিল, হয়ে গেলাে। উঃ জল!” “জল কেননা ?” “জলই অনেকদিন দয়া কোরে রেখেছিলে—যাবার সময় আর বেইমানী করব না। উ।” আমাদের মতি মুখুয্যের কথাবার্তা চিরদিনই এইরূপ সরস। চাষীরা তাকে বাড়ির মধ্যে দিয়ে এলাে। আর দশটি তােমার ছেলে মা, নােজই খবর নিয়ে যাবে। যা দরকার ৭৪

মায়ের অনুগ্রহ
হয় কলবেন।
ভালাে ডাক্তারকে দেখা, খরচ আমরা
দেবাে-
বাইরে এলে ভদ্রেরা জিজ্ঞাসা করায় তারা বললে—“বাবুর
প্রতি মায়ের অনুগ্রহ হয়েছে।”
‘বসন্ত হয়েছে শুনে কয়েকজন শিউরে উঠে অলক্ষ্যে সরে
গেলেন। বলে গেলেন—“awfully contagious ! কত দিন
বারণ করেছি, ছছাটোলােকদের মধ্যে যাসনি। কেমন বদ অভ্যাস,
তাদের সঙ্গে মিশতেই ওর ভালাে লাগে। ফলে এই ভীষণ রােগটি
এনে গ্রামে ঢােকালে! শুনতে পাচ্ছিলুম-চাষীর গায়ে গিয়ে
এর দোর ওর দোরে ভিক্ষে করে। কেননা—আমরা কি নেই।”
মুখুয্যের আট-নয় বছরের ছেলে দীনবন্ধু উঠানে হতভম্বের মত
একপাশে দাড়িয়েছিল। বিশ্বনাথবাবুর ধমক শুনে চমকে কেঁপে
উঠলাে—“অত বড় ছেলে, দাড়িয়ে কি দেখছিস? যা, শীগগির
রাজকুমার ডাক্তারকে খবর দে, সেখানে ধারে কাজ হবে,
ডেকে আন।”
উঠানের সামনের ঘরেই মুখুয্যে যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ‘জল জল’
করছিলেন। বিশ্বনাথবাবুর কথা কানে যাওয়ায় বলে উঠলেন
“ছেলেটাকে এখন কোথাও আর পাঠাবেন না দাদা–ওর বড়
কাজের সময় এসে পড়েছে। মা যদি কৃপা করেছেন, ডাক্তার ডেকে
এ অপদার্থকে আর টেনে রাখবার কষ্ট নেবেন না। বড় কষ্ট
পেয়েছি, অনেক ছুটেছি দাদা, আর শক্তি নেই যে ছুটাছুটি করি।
.

সন্ধ্যা শঙ্খ মা ঠিক সময়েই দেখা দিয়েছেন—তার ভুল হয় না। যদি এসেছ মা, ভদ্রঘরের লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না—আর দেখিয়ে দেখিয়ে হাসি- থামিয়ে দাও,-এ জুচ্চরি আর পারি না মা,জ!” তাঁর কথা শেষ হবার পূর্বেই অম্বিকবাবু ও বিশ্বনাথবাবু সরে পড়েছিলেন। তিন দিনের দিন অবস্থা খুবই খারাপ, আশার আর কোন চিহ্নই নেই। চাষীরা নিত্যই খবর নিতে আসে, আজও পাচ- সাতজন উপস্থিত ছিল। নরসিংহবাবুও আসেন। তিনি বললেন-“আপনার দীনবন্ধু আর অজিতের লেখাপড়ার ভার আমার রইলাে দাদা, আমিই সেটা নিলুম।” পরিবার পায়ের উপর পােড়ে কেঁদে উঠলাে,—বললেন-“বড় কষ্ট পেয়েছ। আর পাবে না।”—চাষীদের দিকে দেখিয়ে বললেন, -“ভগবান আমাদের এতাে ছেলেমেয়ে দিয়েছেন, আমি এদের মধ্যেই তাকে পেয়েছি,এরা রইলাে-এরাই তােমার”••• তার রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলাে –“আপনি যে আমাদের সাক্ষাৎ ভগবান ছিলেন ! আমাদের জোটে তো মায়েরও জুটবে, কাচ্চাবাচ্চাদেরও জুটবে।” -“তবে আর কি! নারায়ণ !...” কুমারীশ একটি কথাও না কোয়ে নীরবে বাড়ীর দিকে ফিরলাে।

দাদার শুরবাড়ী

No text on this page.

বি-এ পাস করিবার পরই, শ্যামবাজারের শ্রীপতি বাবুর কন্যা চন্দ্রমার সহিত সুধাংশুর বিবাহ হইয়া গেল। ছােটভাই হিমাংশুর শরীর ভাল না থাকায়,কেঁচানন কাপড়, সিল্কের পাঞ্জাবী, সুগন্ধিসিক্ত রুমাল প্রভৃতি প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও এবং কলিকাতা দেখিবার এমন সুযােগ ঘটিলেও, তাহার মিত-বর হওয়া ঘটে নাই। দাদা সুধাংশু তাহাকে সুমিষ্ট কথায় অনেক বুঝাইয়া এবং শীঘ্রই স্বয়ং তাহাকে কলিকাতার দ্রষ্টব্য জিনিষগুলি-যাদুঘর, জু প্রভৃতি ও থিয়েটার সিনেমাদি দেখাইয়া আনিবার আশ্বাস দিয়া যায়। হিমাংশু কিন্তু তাহার দুর্ভাগ্যের অভিমান ও অবিচারের আঘাত লইয়া নিরাননে নীরবে একান্তেই ছিল।—তাহার কী এমন অসুখ যে তাহাকে লইয়া যাওয়া হইল না? তাহাকে আর গায়ে পরীক্ষা দিতে যাইতে ত’ কেহ কোনােদিন নিষেধ করেন নাই! দাদার কাল-পাচার মত একটা বউ আসে তত বেশ হয় আমি দেখতেও যাবনা••• পাড়াগাঁয়ের মেয়েরা কলিকাতার বধূ দেখিবার জন্য উদগ্রীব হইয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। পুষ্পমাল্যমণ্ডিত মােট বর্ণ দিতে দিতে উপস্থিত হইতেই -শখনিনাদ ও শত কষ্ঠের উলুধ্বনি বর-বধূকে আনন্দ-আহ্বানে স্বাগত জানাইল। ৭১ সন্ধ্যা শত মায়ের এত সাধের বন্ধু আসিতেছে, আজ তার কত আনন্দ- উল্লাসের দিন। কিন্তু প্রভাত হইতে তাঁহার মুখে কেহ হাসির বা আনন্দের রেখাটুকু পর্যন্ত দেখে নাই, তিনি আপন মনে এঘর-ওঘর করিয়া বেড়াইতেছিলেন। তাঁহার সােয়ান্তি ছিল না। একটা অভূতপূৰ্ব আশঙ্কায় বুকটা তার দুরদুর করিতেছিল—বউটি পাছে কুৎসিৎ, কুরূপা হয়, যেমনটি ভাবিয়াছিলেন তাহা যদি না হয়। গ্রামের জগতবাবুর মেয়ে সুভা অসুন্দরী নয়, তাহাকে না লইয়া কলিকাতা হইতে বধূ আনা হইতেছে -“হে ঠাকুর মুখ রক্ষা কোবরা! গ্রামের মেয়ে-মহলে টিটকারির অন্ত থাকিবে না।” ইত্যাদি চিন্তাই তাহাকে শঙ্কিতা করিয়া রাখিয়াছিল। বর-বধু পৌছিয়া গিয়াছে-তখনাে তিনি ঠাকুর-ঘরে। শিবানী ছুটিয়া আসিয়া তিরষ্কারকণ্ঠে বলিল—“তুমি কি করছো কাকি মা, একবার দেখে এসাে-এমন রূপ কখনও দেখনি”•••••• “মিছে কথা কোনি,—এটা ঠাকুর ঘর”..•••• “আচ্ছা, তুমি এসােত—নিজের চোখে দেখবে। ও পাড়ার বিমলা পিসি পৰ্য্যন্ত”..••••• বিমলা পিসির নাম করায়, আর বেশী কিছু শুনিবার আবশ্যক ছিল না। তাড়াতাড়ি প্রণাম সারিয়া দ্রুত বাহিরে আসতেই বর্ষিয়সীরা একযােগে বলিয়া উঠিলেন, “গ্রামের সেরা বউ এনেছিস লাে মেজ গিন্নি......” কথাটা সত্যই হইল। ৮০ দাদার শ্বশুরবাড়ী মােটর হইতে নামিয়াই সুধাংশু জিজ্ঞাসা করিল—“হিমাংশু কেমন আছে মা—তাকে যে দেখতে পাচ্ছিনা। সে ভালাে আছে তাে ?” সকালে মা একবার মাত্র তাহার খোঁজ লইয়াছিলেন ও মিছরি ও কিসমিস্ দিয়া আসিয়াছিলেন।' পরে আর কোন বিষয়েই মন দিবার অবস্থা তাহার ছিল না। সুধাংশুর প্রশ্নে উত্তরটা যা-তা বলিয়া সারিলেন বটে কিন্তু তাঁর অপ্রতিভ ও লজ্জিত মনটা হিমাংশুর জন্য চঞ্চল হইয়া উঠিল। চন্দ্রমা পঞ্চদশী, সুন্দরী ও স্বাস্থ্যবতী। সাজগােছ ও প্রসাধন- স্বচ্ছ ও ঝরঝরে, কোথাও অনাবশ্যক আধিক্যের পীড়া নাই। মাইনার পাশান্তে মাটিক দিবার জন্য বাড়িতেই প্রস্তুত হইতেছিল। একটি বিনম্র হাসির রেখা তার চক্ষু ও অধরে স্বতঃস্ফুর্ত যা অনুচ্চারিত বিনীত আবেদনে সহজেই পরকে আপন করে ভালােবাসা আকর্ষণ করে। প্রচলিত আচার ও নেকৰ্ম্ম শেষ হইতেই চন্দ্রমা পূর্বপরিচিতার মত এ-ঘর ওঘর করিয়া হিমাংশুর কক্ষে ঢুকিয়াই—“তুমি যেতে পারনি—আমি এসেছি ভাই। তােমার নাকি অসুখ-* বলিয়া তাহার কপালে হাত দিয়া, “এখন কেমন আছ ভাই?” বলিতে বলিতে শয্যাপাশে বসিল।

স্যা শখ হিমাংশুর যত্নে-পােষা অভিমান সহসা অরুণােদয়ে কুয়াশার মত কোথায় বিলীন হইয়া গেল! সে তাড়াতাড়ি প্রণাম করিয়া পদধূলি লইয়া ফেলিল। “আমি এলুম বলে”—বলিয়াই চন্দ্রমা দ্রুত কক্ষত্যাগ করিল ও কয়েক মিনিট পরেই নূতন ট্রের উপর দু’কাপ চা ও এক রেকাবি এপেল, বেদানা ও আঙ্গুর উপস্থিত করিয়া বলিল—“খাওতত ভাই- মিষ্টি মুখ করতে হয়। নাও—চা জুড়িয়ে যাবে...” সে রূপের কাছে অভিভূত হিমাংশুর কোনাে প্রতিবাদই সম্ভব ছিলনা, একটু ইতস্ততঃটা অবশ্য স্বাভাবিক। দেখিয়া চন্দ্রমা বলিল-“পর পর বলে মনে হচ্ছে,না? কাল থেকে খাওনি...” “কে বলেছে আপনাকে • আপনাকে নয়-তােমাকে। আমরাও যে অভিমানের ব্যবস্থা জানি ভাই। নাও-অপরাধটা তত আমি করিনি, সে তােমার দাদার সঙ্গে বুঝে•••* হিমাংশুর মুখে হাসি এলাে, সে বলিল—“আমি বুঝি একলাই চা খাব,-আপনি—তুমি ! চমা সুন্দর মুখখানি প্রসন্ন হাস্যে ভরিয়া উঠিল, বলিল—“ঐ কথাই তাে বলতে এসেছিলুম ভাই! মেয়েদের আগে খেতে নেই, তুমি খাও,বলছি।” “তা—এ সব••* ২ দাদার শ্বশুরবাড়ী “তােমার অসুখ শুনে, বাবা তােমার জন্যে... “অসুখ না ছাই! দাদা একটুতেই”...হিমাংশু হাসিমুখে ফল- গুলির সদগতি আরম্ভ করিয়া দিল। “এইবার তাে চা খেতে পারেন ?” “আবার ‘পারেন’ কেনন? না, আজ থাক—আজ আমি যে ওদের ব্যবস্থায় বদ্ধ। চা-বােধহয় জুড়িয়ে গেল, গরম করে আনি...” “খুব গরম আছে, তা দু’কাপ কেননা?” “অভ্যাসের এক কাপ, আর অভিমানের না হয় অসুখের এক কাপ, গাে।” হিমাংশু হাসিমুখে দু’কাপই শেষ করিল। অদৃষ্টপূৰ্ব রূপশক্তির ও অনাস্বাদিতপূর্ব সুমিষ্ট ভালােবাসার মেহম্পর্শে সে যেন সহসা আজ নবজগতে উপস্থিত। বলছিলেন—বলছিলে যে কি বলতে এসেছিলে”... “হ্যা সত্যিই তাে,—আমি ভাই তােমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে ছটফট করছিলুম—কেননা জানাে? মেয়েদের যে ঠাকুরপাের মত অমন বন্ধু নেই। নতুন জায়গায়, নতুন বাড়ীতে, অপরিচিত নতুন লােকেদের মধ্যে তাদের ওই একটি আপন লােক মেলে, যার কাছে তারা মুখের দুঃখের দরকারের সকল কথাই অসঙ্কোচে বলতে পারে,সে যে সত্যিকারের বন্ধু হয়। এটা ভাই একটা আশ্চৰ্য্য কথা। তুমি আমার সেই ঠাকুরপাে ! যারা ঠাকুরপাে পায়না, সন্ধ্যা শখ তাদের যে কতবড় অভাব থেকে যায় সেটা অন্তে বুঝবেনা। বৌয়েদের বন্ধু বলতে-ঠাকুরপাে! তুমি আমার সেই বন্ধু, কেমন? এই কথাটাই বলতে এসেছিলুম। এখন চললুম ভাই, কি জানি ওঁদের কি সব নেমকৰ্ম্ম থাকতে পারে।” বিজয়িনী তাহার অনিন্দ্যরূপ, মধুর হাস্য, অপূর্ব লীলাভঙ্গিমা হিমাংশুর নয়নে ঢালিয়া দিয়া, কক্ষটিতে অপূৰ্ব্ব রূপ রস গন্ধের স্পর্শ রাখিয়া—হিমাংশুকে পুলক-চঞ্চল করিয়া বিদ্যুল্লতার মত দ্রুত বাহির হইয়া গেল। ইতিমধ্যে মা ও সুধাংশু, হিমাংশুর সংবাদ লইতে আসিয়া কক্ষ মধ্যে নববধুকে দেখিয়া আনন্দ-প্রলুব্ধের মত বাহিরেই দাড়াইয়া গিয়াছিলেন। ক্রমে পাড়ার মেয়েরাও আসিয়া যােগ দেন। সকলেই সাগ্রহে নীরবে নববধূর বন্ধু-প্রাপ্তির ভূমিকা ও আয়ােজন বিস্ময়-মুগ্ধ রুদ্ধশ্বাসে উপতভােগ করিতেছিলেন। চন্দ্রমা বাহিরে পা দিয়াই কলহাস্যের মধ্যে চমকিয়া গেল ও সলজ্জ হাসিমুখে মাথার কাপড় টানিতে টানিতে দ্রুত নামিয়া পড়িবার পথ লইল। ঠাকুরঝি সম্পর্কীয়া করুণা বলিল—“সংসারে দায় আদায় তাে লেগেই আছে, তােমাকে আমার ওকালতনামা দেওয়া রইল ভাই।” তারপর হইতে আবশ্যক হইলে হিমাংশুকে চন্দ্রমার কাছেই পাওয়া যাইত। কাজ না থাকিলেও বিচ্ছিন্ন থাকাটা তাহার পক্ষে ৮৯

দাদার শ্বশুরবাড়ী
যেন কষ্টকর। কি চাই, কি করিতে হইবে, কিসে বৌদি আনন্দ
পাইবে—তাহার প্রাণমন এই জিজ্ঞাসা বহন করিয়াই ফিরিত।
মেয়েদের প্রতি বালকের সহজ শ্রদ্ধা ও অনাবিল ভালােবাসা
নিবেদনের ইহাই বােধহয় প্রথম পাঠ—আশ্চৰ্য্য ও রহস্যময়।
দেখিতে দেখিতে আনন্দে, উৎসবে, বৌভাতে, সপ্তাহ গত।
ইতিমধ্যে চন্দ্রমা মহিলা-মজলিসে, গীতিবাদ্য-বন্ধনাদিতেও প্রশংসাপত্র
আদায় করিয়া লইয়াছে।
সুধাংশু আজ ‘জোড়ে’ যাইবে, শ্রীপতিবাবু বরকন্যা লইতে স্বয়ং
আসিয়াছেন। মা চন্দ্রমার চুল-বাঁধা, আলতা পরানাে লইয়া ব্যস্ত।
-“নীল রংয়ের রেশমী শাড়ীখানা পরা চাই বউমা!” চন্দ্রমা ঘাড়
নাড়িয়া সম্মতি জানাইল। তার মনােগত ইচ্ছা ছিল-চাপা রংয়ের
শাড়ীখানা পরা ; খোঁপাটাও কিঞ্চিৎ সেকালের পছন্দ-দেশ
হইয়াছে। আজ কিন্তু মায়ের পছন্দই পছন্দ,-চন্দ্রমা আনন্দের
সহিত তাহা স্বীকার করিয়া লইল, এবং সুন্দর সহাস্যমুখে আবদারের
সঙ্গে,হিমাংশুকে সঙ্গে লইয়া যাইবার প্রস্তাবটাওমঞ্জুর করাইয়া লইল।
“কিন্তু বেশিদিন দেরি করিওনা-পড়া-শােনার ক্ষতি হবে।
সেদিকে সুধাংশুর বড় কড়া নজর। আমার অমত নেই-বিয়ের
দিন সে যেতে পারেনি। তােমার বাবারও ইচ্ছে তাকে নিয়ে
যাওয়া, তা বেশ ।-যোে এখন•••
চন্দ্রমা ফিরিয়া বসিল। মা সিন্দুরের টিপ পরাইয়া দিতেই সে
তাড়াতাড়ি উপরে ছুটিল।

সন্ধ্যা শঙ্খ -“পিঠটা মুছে দিইনি যে-* —“দিও’খন মা” বলিতে বলিতে গিয়া হিমাংশুর ঘরে ঢুকিয়াই “আমার সঙ্গে কলকাতায় যেতে হবে ঠাকুরপাে, এসাে, ঠিক হয়ে নাও।” এই বলিয়া হিমাংশুর সাজগােছ করিয়া দিতে ব্যস্ত হইল। হিমাংশু কিন্তু চুল ফিরাইতে দিবেনা –“দাদা রাগ করবেন।” “কলকেতায় ও-সব করতে হয়, তােমার দাদা তা জানেন, কিছু বলবেননা। কয়দিনই বা থাকবে,-বই নেবার দরকার নেই।” শ্যামবাজারে শ্রীপতিবাবুর বাড়িখানি গলির মধ্যে হইলেও বড়- রাস্তা হইতে দুইখানি বাড়ির পরেই। বােয়া ও বারাণ্ডা হইতে বড় রাস্তার ট্রা, বা, লােক-চলাচল সবই দেখিতে পাওয়া যায়। শ্রীপতিবাবু করপােরেসনের কন্ট্রাক্টার,মােটর আছে বই কি। সেই মােটরেই মেয়ে-জামাই ও হিমাংশুকে লইয়া এই মাত্র তিনি ফিরিয়াছেন। বাড়ির সকলেই ও আগন্তুক আত্মীয়রা সেই অপেক্ষাতেই ছিলেন। মেয়ে-জামাই আসাতে আনন্দরােলে বাড়ী মুখর হইয়া উঠিয়াছে। মিলিত রমণীকণ্ঠে অর্গান্ সংযােগে এই লভিনু সঙ্গ তব- সুন্দর হে সুন্দর”। আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। প্রতিবেশিনী মহিলারা দ্রুত আসিয়া বাড়ীর মধ্যে ঢুকিতেছেন।

দাদার শ্বশুরবাড়ী
শ্রীপতিবাবু হিমাংশুকে লইয়া বাহিরেই আটকা পড়িয়াছেন।
অন্দরে যাইবার সুবিধা পাইতেছেননা, অন্দর এখন মহিলাদের
অধিকারে।—শুনিয়াছেন হিমাংশুর শরীর ভাল নয়,পরের
ছেলেকে আনা হইয়াছে; এই কথাটাই তাঁহাকে চঞ্চল করিতেছে।
তিনি স্বভাবতই নার্ভাস্ ও ভীতু লােক, অল্পেই বিচলিত হন।
আপিসের বাবুরা কিন্তু অপবাদ দেন,-কাজের বিল্ ( bill ) করা
সম্বন্ধে শ্রীপতিবাবু অকুতােভয় !
বাড়ির ঝি দাঙ্গায়ণীকে দ্রুত বাহির হইতে দেখিয়া তিনি
আশ্বস্তভাবে বলিলেন-“দাকি, শীগগির একবার ওঁকে”...
“এখন ও-সব হবেনি বাবু, আমার মরবার সময় নেই।”
শ্রীপতিবাবু বিরক্তভাবে বলিলেন-“কি এমন কাজ যে”...
“কাজ কি একটা বাবু, কম্মবাড়ী, জামাইবাবু এসেছেন।
লক্ষ্ণৌয়ের লছমনের দোকানে গােলাপী ছচিপান আনতে সেই
দরমহাটায় ছুটেছি।
। ওই সঙ্গে ফিরতিমুখে দ্বারিকের দোকান
থেকে, বােগদাদি বালুসাই”•••
শ্রীপতিবাবু—“সিলােনী সন্দেশ নয় তাে! তা ওঁকে একবার
ডেকে দিয়ে চুলােয় যা না।”
“তিনি কি এখন নড়তে পারেন বাবু? সিড়ি একদম জা।”
*কেননা -কি হলাে আবার ?”
নিম্নকঠে—“জামাইবাবু যে গান ধরেছেন,কি মিষ্টি গলা
বাবু! সে শুনে কি কেউ নড়তে পারে!
৮৭

সন্ধ্যা শঙ্খ “দূর-দূর-হ”••• সে হাসিমুখে দ্রুত রাস্তায় নামিয়া পড়িল। শ্রীপতিবাবুও সিয়া হিমাংশুকে বলিলেন—“আজ যেন আমরা পরের বাড়ী এসেছি, কেউ খোঁজও নেয়না। মেয়েদের কাছে জামাই এমনি আদরের জিনিষ। জামাই এলে ওরা আনন্দে সব ভুলে যায়। বাড়ীর ঝির পর্যন্ত আমাদের কথায় কান দেবার ফুরসৎ নেই। আমারও কি ভুল দেখাে ! বৈঠকখানায় তাে বসতে পারতুম। চল, চেয়ার সােফা সবই রয়েছে। তােমার শরীর ভালাে নয়, শুয়ে থাকতে পারবে...” হিমাংশুর অসুখ না থাকিলেও সে অসুখের মতই বােধ করিতেছিল। চারিদিকে সারবন্দি দ্বিতল ত্রিতল বাড়ী, জনস্রোত, রিক্সা, মােটর, বাস-দশমিনিটের মধ্যেই তাহার মনকে শ্রান্ত করিয়া ফেলিয়াছিল। সে অন্যমনস্কভাবেই পথের দিকে চাহিয়াছিল। তাহার মনে পড়িতেছিল পল্লীর সেই ভােলা মাঠ, সবুজ ঘাস, বেড়-ঘেরা বাগান, পুষ্করিণীর পদ্মফুল, বৃক্ষ ছায়া, পক্ষী-কলরব ও মুক্ত বায়ু। পুকুর পাড়ের সেই কাঞ্চন-গাছটির গাছ-ভরা রঙিন ঐশ্বৰ্য্য। আম্রমুকুলের দূরব্যাপী সুমিষ্ট সৌরভ। ডালা হাতে পল্লী-বালিকাদের সজিনা ফুল কুড়াইবার আনন চাঞ্চল্য ছুটাছুটি। গােয়ালের চালে বেলা-শেষে ঝিঙে ফুলের সে কী বাসন্তীসমানােহ। আরাে কত কি! সহরের ইট, কাঠ, চুল, সুরকির বিচিত্র প্রকাশ bobo দাদার শ্বশুরবাড়ী কি আয়না বন্দীশালা! মধ্যে মধ্যে কাকের কর্কশ রব। নূতন- তর হইলেও এই সব সমাবেশের মধ্যে সে যেন একটা উগ্রতাই অনুভব করিতেছিল। শ্রীপতিবাবুর আহ্বানে সে বৈঠকখানায় গিয়া বসিল। তাহার মুখ দেখিয়া তিনি বুঝিলেন—সঙ্গিহীন নূতন স্থানে আসিয়া তাহার ভালাে লাগিতেছে না। তাহার উৎসাহ জাগাইবার জন্য তিনি বলিলেন, “এখানে দেখবার জিনিষ অনেক, কত-কি দেখবেসিনেমা সার্কাস, থিয়েটার, জু-গার্ডেন, সব দেখা চাই। দু’টো দিন গােল- মালে যাবে, তােমার শরীরটা খারাপ, একটু বিশ্রামও দরকার। মােহনবাগানের নাম শুনেছ তাে- দেশ-বিদেশের কত বড় বড় লােক তাদের ফুটবল খেলা দেখতে আসেন। ফুটবল শ্যালাে তাে? কুমারের thro-পাসগুলাে দেখলে অবাক হবে, গােষ্ঠ পালের নাম শুনেছ তাে, তার মতন ব্যাক জন্মায়নি” ইত্যাদি। হিমাংশু ঘরে ঢুকিয়াই একখানি চেয়ারে মেরুদণ্ডহীনের মত বসিয়া পড়িয়াছিল। শ্রীপতিবাবু ছেলেদের প্রিয়-প্রসঙ্গ ফুটবলের কথা তুলিয়া ও কুমার গােষ্ঠাদির ইষ্টনাম শুনাইয়া হিমাংশুর অবসর দেহে উৎসাহ ইজেক্ট করিতেছিলেন। ক্রমেই হিমাংশুর চক্ষু দুইটি উজ্জ্বল ও একাগ্র হইয়া আসিয়াছিল এবং তাহার ন্যূজ অবস্থা ফুট খানেক সােজাও হইয়া পড়িয়াছিল। সহসা তাহার মুখ হইতে স্বতঃস্ফুর্ত আবেগে উচ্চারিত হইল—“আর সামা” ? “ওঃ তাহলে তুমি দেখছি সব খবরই রাখাে ! ব (ball) मका भक সামাদের পরম ভক্ত-পা ছাড়তে চায় না। তাঁর ইচ্ছামত চলে। ও-রকম খেলােয়াড় কমই দেখা যায়, তাই লাট-বেলাট তার খেলা দেখতে আসেন, তার সঙ্গে করমর্দন করেন। সামাদের নাম বিশ্বের খেলােয়াড়-মহলে সুপরিচিত। তাঁকে শুধু দেখলেই হবেনা বাবাজি, তার খেলার কায়দা যতটা পায়রা আদায় করা চাই, কি বলাে?” শ্রীপতি বাবু কলকাতার চৌকস্ লােক,-বৰ্ত্তমান হাওয়ার গতি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা তার যথেষ্ট। কিশাের ও যুবাদের নিকট স্পাের্টস { sports ) অপেক্ষা প্রিয়-প্রসঙ্গ যে আর দ্বিতীয় নাই তাহা তিনি জানিতেন। পাঁচ মিনিটে হিমাংশুকে চাঙ্গা করিয়া তুলিলেন। সে সাগ্রহে নানা প্রশ্ন আরম্ভ করিয়া দিল। শ্রীপতি বাবুর অসােয়াস্তি ভাবটাও কমিল। দ্বিতলে হারনােনিয়মের বিশ্রাম নাই---সে যেন শেষ ত্রাহি ত্রাহি আরম্ভ করিয়াছে। গ্রামােফোন নাকি-সুরে নামী গায়িকাদের পরিচয় আরম্ভ করিল। পাড়ার গায়িকারাও শ্রান্ত, তবু “সেই গানটা না শুনাইলে স্বস্তি নাই। জের টানা আর শেষ হয় না। তখন “এই গানটা ভালাে করে শােননা বাবাজি-কেষ্টবাবু গাইছেন। গলার কি ‘ভলুম’!” হিমাংশুর তখন সবই বিরক্তিকর লাগিতেছিল। ভলুম তখন জুলুম্ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। চারিদিকে ইলেকট্রীক আলাের মালা পরিয়া কলিকাতা হাসিয়া উঠিয়াছে। হিমাংশুর সে সব দেখিবার

দাদার শ্বশুরবাড়ী
শুনিবার মত মনের অবস্থা নয়। রাস্তার আলাে আবছা ভাবে
ঘরের মধ্যে আসিয়া কাক-জোৎস্নার সৃষ্টি করিয়াছে।
সহসা ‘রেডিও সাড়া দিল। গােবিন্দলাল মরদানা গলায়
রােহিণীকে চরম কথা শুনাইতেছেন। যেন কী একটা বিপদ ঘটে
ঘটে। ঘটিয়াও গেল! পরেই শ্মশানে রােহিতাশ্বকে কোলে
লইয়া শৈব্যার মড়া কান্না!
তার পরেই রেডিও সুসংবাদ আরম্ভ করিল-“সকলেই শুনে
সুখী হবেন—কয়েকটি বাঙালী যুবক লস এঞ্জেলস্-এ টাঙ্গাইলের
শাড়ী বেচিতেছে, অসম্ভব কাটতি। আর পাবনার মরমী-সামন্ত
নােভাজোয় চানাচুর চালাইয়া দিয়াছে। চাহিদা সামলাইতে
পারিতেছে না। শিবু রায় সামান্য মূলধনে গয়ার তামাক লইয়া
হলিউডে যাত্রা করে। দেড় মাসেই successful! Star-এরা
লুফে নিয়েছে। সিগারেটের চাহিদা কমায় আমেরিকায় হুলস্থুল
গড়িয়া গিয়াছে। শিবু রায়ের ব্যবসা-বুদ্ধি বাল্য কাল থেকে দেখা
দেয়, এতদিনে তিনি field পেয়েছেন ও জোর চিন্তা চালিয়ে
দিয়েছেন অর্থাৎ মেয়েরাই বা বেকার থাকে কেন—আহার নিদ্রা
ত্যাগ করে সত্বর এক টন্ কাচপােকার টিপ পাঠাতে লিখেছেন।
এই তাে চাই! ইত্যাদি...
হিমাংশুর এ সব কিছুই ভাল লাগিতেছিল না। তাহার নাড়ীতে
জর না আসিলেও সর্বাঙ্গে সে তা অনুভব করিতেছিল। সে
নির্জীবের মত পড়িয়া এই আনন্দের উৎপাত সহ করিতেছিল।

সন্ধ্যা শঙ্খ
অসহায় বালকের মন তিক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। তাহার অবস্থা
দেখিয়া নিদ্রাদেবী উপস্থিত হইয়া তাহাকে শান্তি দেন।
শ্রীপতিবাবু বলিলেন-“শুনচো বাবাজি, এসব ভারি দরকারী
কথা, মনে রাখা চাই—ভালাে করে শােনন। সহরে এই সুখেই
থাকা-বুঝলে বাবাজি।”
হিমাংশুর কোনাে উত্তর না পাইয়া—“আচ্ছা বাধা দেবনা, খুব
মন দিয়ে শােননা।”
=
চন্দ্রমা এঘর ওঘর করিয়া বৈঠকখানায় ঢুকিয়া—“একি! এরা
সব গেলেন কোথায়”, বলিতে বলিতে সুইচ, টিপিয়াই—“এই যে,
অন্ধকারে সব বসে রয়েছেন-আলােটাও জালতে নেই! হিমাংশুকে
জল টল”—
শ্রীপতিবাবু—“এদিকে যে কাকেও পাচ্ছিনা মা, ঝি-চাকর
পৰ্য্যন্ত উকি মারেনা। চা পৰ্যন্ত, তাই হিমাংশুকে ‘চাউ হােটেলে
স্যালাড়, খাওয়াতে নিয়ে যাবার কথা ভাবছিলুম। তােমাদের
যে আর
“আচ্ছা তুমি একবার ভেতরে যাও বাবা, মা ডাকছেন-নীচেই
এসেছেন
আপতিবাবু বাঁচিলেন, তিনি যেন অকষ্ট বদ্ধ অবস্থায়
পড়িয়াছিলেন।
১২

দাদার শ্বশুরবাড়ী চন্দ্রমা—“ঠাকুরপাে-ঠাকুরপাে, ঘুমিয়ে পড়েছ ভাই! হিমাংশু একটু অপ্রতিভের মত “না এই একটু “আমি বড় ভুল করেছি ভাই, বড় অপরাধ হয়েছে। তােমাকে এই হট্টগােলের মধ্যে কষ্ট দিতে না আনাই উচিত ছিল। আমি জাতুম না যে এরা আমাকে এমন করে নাকাল করবেন,আমি ছটপট করছিলুম, কেউ উঠতে দিচ্ছিলনা—কি কোরবাে.. ” “তাতে কি হয়েছে— “যা হয়েছে তা আমার মনই বুঝছে, তােমার শরীর কেমন আছে বলল- “শরীর ভালই আছে, তবে “তা বুঝতে পারছি, দোষ সবই আমার। এসব তাে জানতুম ভাই- “তােমাকে দেখতে পেয়ে, এখন আর আমার”--ইত্যাদি কথা চলিতে লাগিল। নীচের এক কক্ষে চন্দ্রমার মা মানদাসুন্দরী শ্রীপতি বাবুকে বলিতেছিলেন-“বুড়াে হলে এখনাে আক্কেল হলনা। একটু বুদ্ধি থাকলে, কুটুম-বাড়ীর রােগ ছেলেকে, কৰ্ম্ম-বাড়ীতে কেউ আনে। সকলেই ব্যস্ত, কে ঐ বােগা ছেলেকে দেখে বলল দিকি? নতুন কুটুম, একটু অযত্ন হলে,-তােমরা কি বুঝবে! আমার মাথামুড় খুড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। বে’ যেন কখনাে করনি। বিয়েবাড়ীর...

সন্ধ্যা শঙ্খ ঐপতি বাবু যে-সব অনুযােগর কথা ভাবিয়া রাখিয়াছিলেন ও যেরূপ মেজাজে ছিলেন, প্রলয় মূর্তির সম্মুখে তাহা অন্তরেই লয় পাইল। কেবল বলিলেন- —“বে’ সেই একবারটি কবে হয়েছিল” -- -“ওঃ—একবারটি’ বলে সেটা ভুলে গিয়েছ? তা হলে হয়”- -“না-তা বলছিনা,-শত্রুও যেন সে ভুল না করে। তবে মনে পড়ছেনা, তােমার মা জামায়ের গান শােনবার জন্যে সব কাজ ফেলে, তিন চার ঘণ্টা -“দেখাে-রাগিও না বলছি! এক-বাড়ী লােক থইথই করছে। জামায়ের খাবার-দাবার ব্যবস্থা করা আছে। শিক কাবাব,-কোরমা-কোন্ মাসিমা বানাবে, বানাক না! ‘মেয়ার’ সে দিন খেয়ে কি বলেছিলেন-মনে আছে।” “তা আর নেই ! তাতে আমার বুঝি বুকটা। তাই ভাবি- তুমি কি করে’ ও-সব শিখলে? দ্রৌপদীর যেন পাচজনের ভালাে লাগবার মত চেষ্টা-যত্ন পেতে হােত যাক। পেতে হােতাে•••যাক। এখন হিমাংশুর ভার নেবে কে?” —“শুনলে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যায় । কোথায় সব একটু আমােদ-আহ্লাদ করবে-না সঙ্গে এক ফ্যাচাং। যারা এনেছে তারা তার ভার নি।” “ল হলে তাকেই নিতে হয়...”

দাদার শ্বশুরবাড়ী
“হ্যা-তা তাে বটেই! সে ছেলেমানুষ, না বুঝে যদি...!
তা বার্লি কি সাবু, যে-কেউ করে দিতে পারবে। কুটুমের ছেলেকে
তাে অত্যাচার করানাে হতে পারে না! আচ্ছাসে আমরা
বুঝবাে’খন।”
শ্রীপতিবার সাহস পাইয়া বলিলেন-“সন্ধ্যেবেলায় যে ওষুধটা
খাই, সেটা কি আজ...শরীর যেন ভাংচে...”
মানদাসুন্দরী ঠোটের কোণে একটু হাসির রেখাপাত
করিয়া –“পুরুষের যুগ্যতা!—একদিন কি নিজে নিতে”..বলিয়া
দ্রুত ঔষধ আনিতে চলিয়া গেলেন।
চন্দ্রমা কিছুক্ষণ কথাবার্তায় হিমাংশুর অস্বাচ্ছন্দ্য দূর করিয়া
তাহাকে চা-বিস্কুট খাওয়াইয়াছে এবং দ্বারিকের সিঙ্গাড়া আনিতে
গিয়া মায়ের কাছে নিজে বকুনিও খাইয়াছে।-“জানিস, কুটুমবাড়ী
থেকে নােগা ছেলেকে টেনে এনে, আমার মাথায় বিশমােণ চিন্তা
চাপিয়েছিস! এখন ভালয় ভালয় পরের ছেলেকে ঘরে ফেরাতে
পারলে বাচি। ওদের পেটে পাড়াগাঁয়ের পীলে হাঁ কোরে আছে।
ঘিয়ের জিনিষ পড়লেই লাফিয়ে উঠবে, তারপর লেপ-মুড়ি! সারা-
রাত বসে সামলাও। মােগা ছেলের উপসী-পেট—তা জানিস।
এই খরচের উপর আবার ডাক্তার ডাকো।”
চেষ্টার হাসি টানিয়া চন্দ্রা বলিল-“হিমাংশুর শরীর ভালাে
নয় -তােমাকে কে বললে মা? সে তাে ভালই আছে.”

সন্ধ্যা শঙ্খ
-“কে আর বলবে,—তার মা বলে দিয়েছেন। তার উপরে
কথা আছে নাকি?-যা তুই এখন উপরে যা,-মল্লিকদের মৃদুল
সন্ধ্যে থেকে এসে বসে আছে জামাইকে নাচ দেখাবে,-তােমার
আর বা হয় না! যাও, আর দাড়িও না। হিমাংশুকে তােমার
পিসিমা আর আমি দেখছি। ভয় নেই-খাতির-যত্নের ত্রুটি হবেনা।
আমরা মরিনি...
এই বাক্যাঘাতের পর চন্দ্রমা আর দাড়াইল না। একটি কথাও
কহিয়া দ্রুত চলিয়া গেল। তাহাতেও কিন্তু অব্যাহতি পাইল
। মা তাহার পশ্চাতে তীব্র দৃষ্টি হানিয়া বলিলেন,-“মেয়ের
তেজ, দ্যাখাে”
নীচের লম্বা রান্নাঘরে রন্ধনের ঘটা চলিয়াছে। মানাদারীর
তত্বাবধানে একদিকে দু’জন উড়ে বামুন-মাংস ও পােলাও লইয়া
ব্যস্ত। পাড়ার বায়ুস্তর জাফরান্ ও পলাপুর প্রিয়-সৌরভে
ভারাক্রান্ত! পিসিমা অন্যদিক সামলাইতেছেন।
উতয়ের মধ্যে হিমাংশুকে বসিবার জন্য একখানি ‘পিড়ে
দেওয়া হইয়াছে,-যে হেতু পাড়াগাঁয়ে আসনে বসিবার অভ্যাস
নাই, হিমাংশুর অসুবিধা না হয়।—“তুমি আমাদের কত বড়
আদরের জিনিষ, এ তােমার আপনার বাড়ী, বাড়ীর ছেলের মত

দাদার শ্বশুরবাড়ী
থাকবে। কলকেতার দেখবার যা-কিছু সে সব ওঁর সঙ্গে গিয়ে
দেখবে। ওঁদের কর্পোরেসবিল্ডিং দেখলে তােমার ইন্দ্রপুরী
বলে মনে হবে—দেবতারা যেন গিজগিজ করছেন। দেখলে গাঁয়ে
ফিরতে আর ইচ্ছে হবে না। একবার বেরুলে ওঁকে সেলাম্ নিতে
নিতে গেলাম গেলাম করতে হয়,বড়দের ঐ জালা! টেলিফোন
দেখেছ তাে? কি করেই বা দেখবে। পাড়াগাঁয়ে তাে ও সব
নেই—থাকলে এখানে বসেই মায়ের সঙ্গে কথা কওয়াতুম।
আমাদের ওপরের ঘরে আছে, কাল দেখাে। লােকে বলে-
কাশীবাস কাশীবাস, দুত্তোর কাশীবাস! কলকেতায় যে থেকেছে,
তার কাছে আবার•••! আমি কটা কথাই বা শােনাবাে। তার
চেয়ে তুমি কিছু বলল শুনি। পাড়াগাঁয়ের কথা শুনতে আমার
বড় ভালাে লাগে,-দেখতে ইচ্ছে হয়।”—পরেই চঞ্চল ভাবে-
—“ও মা করছি কি,শিক-কাবাবটা যে আমার ভার
বলিতে বলিতে বামুনদের দিকে গেলেন।
মানদাসুন্দরীর কথাগুলি-না পিসিমার না হিমাংশুর ভান
লাগিতেছিল। কথায় মিষ্টতা ত’ ছিলই না বরং খোচাই ছিল।
ঐরূপই তার অভ্যাস।–বিরক্তিকর হইলেও হাসিমুখে হিমাংশুকে
তা শুনিতেই হইতেছিল। তিনি চলিয়া গেলে, হিমাংশু পিসিমাকে
জিজ্ঞাসা করিল-“ওঁদের বাড়ী কলকেতায় বুঝি?*
পিসিমা নিকণ্ঠে বলিলেন-“না, বিয়ের পর কলকেতায়
এসেছেন, বাড়ী ওঁদের গােবর-ডাঙায়। ও-কথা যেন...”
১৭

সন্ধ্যা শখ
“না না, আমি কি এতই...” বলিয়া হিমাংশু একটু হাসিল।
পােলাও কালিয়ার সুবাস এবং প্রলােভন বােধহয় তাহাকে অতিষ্ঠ
হইতে দেয় নাই।
পিসিমা যখন সয়েহে জিজ্ঞাসা করিলেন—“রাতে কি থাকে
বলদিকি বাবা? তােমার শরীর নাকি ভালাে নয় শুনচি ? তা
মাংসের ঝােল দিয়ে দুটি ভাত খেলে কিছু হবে না। পােলাটা
আর ওই সব কাবাব-কোরমা না হয়”...
মানদা—“কি—কি বলচো ঠাকুরঝি,-পােলাও খাবে কে?”
বলিতে বলিতে উপস্থিত হইলেন।
“না—আমি ওটা আজ বাদ দিতেই বলছি। আজ কেবল
একটু মাংসের ঝােল আর দুটি ভাত খেয়ে শুয়ে পড়াই ভালাে”
“তােমার তত সাহস কম নয় ঠাকুরঝি ! ওই জাফরান্
দেওয়া কালিয়া এই নােগা ছেলেকে খাওয়াবে? আমি যেন
হিমাংশুর জন্যে ভাবছি না। একটি আভাঙা রবিনের বার্লি
আলুম তবে কার জন্যে ? না না, আমি অত্যাচার করাতে
পারব না। আমার ছেলে আর হিমাংশুতে তফাৎ আছে নাকি।
তাকে যা দিতুম হিমাংশুও আজ তাই খাবে, কেমন বাবা? খাওয়া
তাে পালিয়ে যাচ্ছে না। সবই তাে ঘর-পােরা রয়েছে, একটু
ভালাে হলেই—সব রকম নিজের হাতে কোরে খাওয়াবাে। ওদের
পেট তাে বুঝতে পারছি। দ্বারিকের অমন ডাকসাইটে ‘মথুরা-
মাধুরী’ তা-ই জামাই মুখে করলে না। পারবে কেননা, অভ্যেস

দাদার শ্বশুরবাড়ী
নেই যে। আর এদের ব্যাখ না—দু’বেলা না হলে নয়। সব
বাড়াবাড়ি। একখানা—চার আনা কোরে!”
পিসিমা অতিত ভাবে বলিলেন-“তা হলে”•••
“ওই তাে বললুম, চট করে’ বার্লিটে করে দাও। আর আমি
সেই জামায়ের জন্ঠে আনানাে আসল কাবুলি বেদানা এনে দিচ্ছি
তাই চারটি খেয়ে আজ শুয়ে পড়াই ভাল।”
হিমাংশু খুবই শান্ত স্বভাবের ছেলে, সে চুপ করিয়া সব শুনিয়া
যাইতেছিল। শরীর তাহার সত্যই শ্রান্ত ছিল, এখন মনের
উৎসাহটুকুও বিদায় লইল। সে বলিল-“শরীর কেমন করছে,
রাত্রে আমি আর কিছু খেতে পারব না। বসতেও পারছি না,
আমাকে কোথাও শুতে দিন।”
“সে কি কথা—তা কি হয় বাবা, রাত-উপােস থাকতে নেই,
কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়। এই পাশের ঘরেই বিছানা করা
আছে, আমাদের কাছেই শােবে। তােমাকে কি...”
“তা হলে আমায় দেখিয়ে দিন।”
মানদা একটু যেন থমকিয়া, পরে বলিলেন-“খাওয়া নিয়ে
আমি কখনন কাকেও জেদ করি না, শরীর যেমন বুঝবে তেমনি
করবে বাবা, এ তােমার বাড়ী, আমরা তােমার পর নই। তা
ছাড়-উপােসের বাড়া ওষুধও নেই।”
পিসিমা বলিলেন—“বেশ তাে, এখন শুয়ে পড়, একটু পরে
আমি গিয়ে

০ ০ +
“না—তােমার ওই সব সেকেলে ‘আত্মি’ আমায় ভালাে লাগে
ঠাকুরঝি। ঘুম একটা মস্ত আরামের জিনিষ। হিমাংশু যদি
ঘুমিয়ে পড়ে, খবরদার তুলে খাইও না। আমি কাল বেলা দশটার
মধ্যেই বাবাকে মাগুর মাছের ঝােল আর ভাত নিজে রেখে
খাওয়াবাে-পেটটা ঠাণ্ডা হবে। তােমরা রাখলে কতকগুলাে
মশলা তাে দেবেই।”
হিমাং উঠিয়া দাড়াইল—“আমি আর বসতে পারছি না,
আমাকে...
“এই যে, এসাে বাবা
নীচের মাঝের ঘরে ঢালা বিছানা পাতাই ছিল। “তুমি
আমাদের কাছেই শােবে বাবা,শুয়ে পড়; তােমাকে একলা শুতে
দিতে পারি না। এখানে মশারি দরকার হয় না, এ তােমাদের
পাড়াগাঁ নয়,শুয়ে পড়।”
হিমাংশু শুইয়া পড়িল। মাকে তাহার মনে হইল—বােধ হয়
চক্ষু মুছিল। বালক কতক্ষণে ঘুমাইল, ঘুমাইল কি না, সে সংবাদের
জন্য বিশেষ চিন্তা কাহারাে ছিল না বলিলে বােধ হয় অপরাধ
করা হইবে।
মানদা মৃদুলার খঞ্জন নৃত্য দেখিবার জন্য অসম্ভব চঞ্চল ছিলেন,
বিরক্তিকর বাজে ঝঞ্জাট সরিয়া তিনি খােলসা বােধ করিলেন ও
উপরে ছুটিলেন। মনকে ঠেলিয়া রাখিলেও সে কিন্তু অস্বস্তির
স্থানটায় উকি মারিতে লাগিল-“তাই তাে-কুটুমের ছেলে

দাদার শ্বশুরবাড়ী
খেয়ে গুলাে। পাড়াগেঁয়ে গো-ভদ্রতা রাখতেও শেখেনি,একটু
কিছু মুখে দিলেও হােততা। সহরে ‘মানুষ’ না হলে—সব দিক্ বজায়
রাখতে শেখে না। যাক—ওর জন্যে আমি ভেবে মরি কেন?”
মনটা কিন্তু ওই কথাই তােলে।
“আহ্ কি পাপ! হতভাগা মেয়েটা অমন মন-মরার মত বসে
আছে কেননা। নাচের দিকেও নজর নেই। ওর আবার কি
হ’ল! হােক গে—নাচ দেখতে এলুম-নাচ দেখি।”
কিন্তু চন্দ্রমার বিমর্ষ ম্লান মুখখানি তার অপরাধ-আঁকা দলিলের
ছাপের মত চক্ষে আসিয়া পড়িতেছিল ও অন্তরে প্রবেশ করিয়া
তাহাকে অশান্ত করিতেছিল।
পিসিমাও ছেলের মা। এতখানি আনন্দ ও আয়ােজনের
মধ্যে অনাহারে ক্ষুব্ধচিত্তে বালকের শয়ন করিতে যাওয়াটার করুণ
ছবি তাঁহার মাতৃ-হৃদয়কে অধীর করিতে ছিল। তিনি ধুয়ার
ছলে অঞ্চলে ঘন ঘন চক্ষু মুছিতে ছিলেন। বুদ্ধিমতী বলিয়া মানদার
সুনাম আছে, সে বােধ হয় হিমাংশুর ভালর জন্যই এরূপ কঠোর
ব্যবস্থা করিয়া থাকিবে। কিন্তু তিনি আবার চক্ষু মুছিলেন।
থাকিতে পারিলেন না, এদিক ওদিক দেখিয়া নিঃশবপদে-হিমাংশু
ঘুমাইল কি না দেখিতে গেলেন; হিমাংশু সত্যই ঘুমাইতে পারে
নাই। তাহার মনের অবস্থা যাহাই হউক-মশার দৌরাত্ম্য
যে ততােধিক।
১০১

সন্ধ্যা শঙ্খ
‘কই তুমি ঘুমােওনি বাবা ?”
“এসেছেন যদি-মশারিটে ফেলে দিলেই আমার ঘুম হবে
পিসিমা !”
বালকের মুখে সুমধুর ‘পিসিমা’ সম্ভাষণ শুনিয়া মায়ের প্রাণ
উদ্বেল হইয়া উঠিল। সিক্তকণ্ঠে বলিলেন-“তা দিচ্ছি যাদু । কিন্তু
আমার একটি কথা রাখ, বাবা।আমি আনছি—যা হয় কিছু
মুখে দে বাবা-নইলে আমিও তাে•.”
একটু নীরব থাকিয়া—“তবে একটা কিছু দিন, আমার কিন্তু
খাবার ইচ্ছে মােটেই নেই পিসিমা
“তা আমি জানি বাপ।” পরে সত্বর
পরে সত্বর দুইটা রসগােল্লা ও এক
গেলাস জল হিমাংশুকে খাওয়াইয়া মশারী ফেলিয়া দিলেন।
“আমাকে বাঁচালি বাবা,-এইবার শুয়ে পড় যাদু,” বলিয়াই দ্রুত
চলিয়া গেলেন। স্বস্তি যেন তাঁহার মুখে চোখে ফুটিয়া উঠিল
পেটে কিছু পড়ায় হিমাংশু অচিরেই ঘুমাইয়া পড়িল।
শ্রীপতি বাবুর কর্পোরেশনের ইন্দ্র চন্দ্র বায়ু বরুণেরা পােলাও
কালিয়া ইত্যাদি উপলােগান্তে যখন নিজ নিজ মােটরে গিয়া আড়
হইলেন, তখন রাত প্রায় তিনটা। মনামী এতক্ষণে আপনাকে
কৃতাৰ্থ বােধ করিলেন।
হিমাংশু ভােরেই উঠিয়াছে। পিসিমার সহিত সাক্ষাৎ হওয়ায়,
তাহাকে জানাইয়াছে—আজ সে বাড়ী যাইবে—মাকে স্বপ্ন
১২

দাদার শ্বশুরবাড়ী
দেখিয়াছে—তাহার শরীর ভাল নয়। পিসিমা বলিয়াছেন—“না-
খেয়ে কিন্তু যাওয়া হবেনা বাবা, আমি এখুনি রান্না চড়াচ্ছি। তুমি
একবার দাদাকে বলল।” শ্রীপতি বাবুকেও সে জানাইয়াছে।
চমাও নীচে নামিয়াছিল, তাহাকেও হিমাংশু জানাইল। সে
পূর্বের ন্যায় সহজ ভাবে সহাস মুখে কথা কহিতে আর পারিনা
কেবল বলিল—“আমি আর কি বােলবাে ঠাকুরপাে, আমারি ভুল
হয়েছে ভাই, আমার জন্যেই”—বলিয়া মুখ ফিরাইল। তাহার
চক্ষু ছলছল করিয়া আসিয়াছিল।
“তুমি ওকথা কেন বলছ, আমি আবার শিগগীর আসবে,
সহরের কিছুই দেখা হয়নি।”
“না তােমাকে এখন আর সহর দেখতে আসতে হবেনা
শ্রীপতি বাবুর টাকার দরকার হওয়ায় মানদাকেও দরকার
হইয়াছিল। গতরাত্রের পরিশ্রমে কাতর হইয়া তিনি অকাতরে
নিদ্রা যাইতেছিলেন। শ্রীপতি বাবু পাচ-সাতবার ঘরের মধ্যে
সশব্দে ঘুরিয়াও কোনাে কাজ হইল না। শেষ ইতস্ততঃ করিয়া
“তাই ত’ এখন ঘুমুচ্ছে, বেলা যে অনেক হয়েছে, কাজও রয়েছে
যে—বলিয়া তাহার ঘুম ভাঙাইতে বাধ্য হইলেন।
“হিমাংশু আজ বাড়ী যাবে কিনা...”
“কেনন? আজি যাবে যে বড়! তা-মায়ের ছেলে মার

স্যা শঙ্খ
কাছে যা বাপু। নতুন কুটুমের নােগা ছেলে এনে আমায় কে
কি ভাবনায় ফেলেছ, তা তােমরা বুঝবে কি! এখন ভালয়-ভালয়
পৌছে দিতে পারলে বাঁচি। এক ভুল করেছ, আবার যেন
থাকবার জন্যে জেদ কোরােনা। সে যা করতে হয় আমি
করবাে’খন্।”
“তা কোরাে—এখন গােটা কয়েক টাকা দাও—দু’ গ্যাল
পেট্র কিনতে হবে।”
“এসব বাজে খরচ আমার পছন্দ হয়না। হাওড়া থেকে বাস
তাে যায় শুনেছি। অজিতকে সঙ্গে দিলেই হবে—
“না সে ভাল দেখায় না, বাড়ীর গাড়ী রয়েছে, আমিই পৌছে
দিয়ে আসবাে।”
“তােমাদের যে কিসে ভাল দেখায় বুঝিনা। ঐ করেই তাে”-
বলিতে বলিতে রােষভরে গিয়া টাকা আনিয়া দিলেন। শ্রীপতি
বাবু বাহির হইয়া গেলেন। কানে গেল—“সব বাড়াবাড়ি, ওরা
আবার ঘরের মােটরে-
পাশেই রান্নাঘর, হিমাংশু সেই ঘরে সেই পিড়ার উপর বসিয়া
সহাস-মুখে পিসিমার সহিত গল্প করিতেছিল।
“শুতে অনেক রাত হােলাে—ঘুম আর ভাঙেনা। এই যে
হিমাংশু, কেমন আছ বাবা?” বলিতে বলিতে মানদাসুন্দরী হাজির।
“ভালই আছি মা।”
মানদাসুন্দরী পিসিমার দিকে চাহিয়া—“বলেছিলুম তাে

দাদার শ্বশুরবাড়ী ঠাকুরঝি—উপােসের চেয়ে ওষুধ নেই’—দেখলে তাে।” হিমাংশুর প্রতি—“তােমার শরীর ভালাে নয় শুনে, আমার যে কি ভাবনাই হয়েছিল, তা কে বুঝবে! আজ তােমাকে পােলাও কালিয়া চপ, সব কিছু খাইয়ে তবে আমি তৃপ্তি পাব। কাল রাতটা ত মনের অসুখেই কেটেছে বাবা- “আমার শরীর এখনও ও-সব খাবার মত স্বচ্ছন্দ নয় মা। আমি দুটি ভাত আর মাছের ঝােল খেয়ে বাড়ী যাব।” “বাড়ী যাবে, তা কি হয়! এত শিগগীর তা হতে পারেনা। আমি সব ঠিক করে রেখেছি, তােমাকে থিয়েটার সিনেমা জু না দেখিয়ে ছাড়ছিনা। উনি আবার ফুটবলের কথা বলছিলেন। না— যাওয়া এখন হচ্ছেনা হিমাংশু। বাবুরা রাত্রে বলে গেছেন সিনেমার উজ্জলনক্ষত্রদের আজ নিয়ে আসবেন। বাড়ীতে বসেই তাদের নাচগান শােনাবেন ও শুনবেন। পাড়াগাঁয়ে জমিদারদেরও এ সৌভাগ্য ঘটেনা। না-না, থাকতে হবে বইকি— পিসিমা বলিলেন—“হিমাংশু রাত্রে মাকে স্বপ্ন দেখেছে, তিনি অসুস্থ, তাই যাবার জন্যে ছটফট করছে”— “দেখাে ঠাকুরঝি এ কথা যেন সুধাংশু না শশানে, তােমার পেটে যে কোনাে কথা থাকেনা” ••• “তুমি কি আমাকে পাগল ভাব বউ।” “তবু সাবধান করে দেওয়া ভাল, তাই, কিন্তু হিমাংশু না থাকলে যে আমার যদিও জানি স্বপ্ন কখনাে সত্যি হয়না, কিন্তু সন্ধ্যা শ ছেলের মন যদি খারাপ হয়ে থাকে, তাতেও তাে কিছুতে তার সুখ থাকবেনা। না, জোর করে রাখা ভালাে হবেনা -তাহলে আবার কবে আসবে বলে বাবা।” “মাকে জিজ্ঞাসা করে জানাবাে। যদি কেউ যান তাে- “কেউ আবার কি, তােমাকে কি অন্যের সঙ্গে পাঠাতে পারি, উনি নিজে গিয়ে রেখে আসবেন।-তুমি কি করচো ঠাকুরঝি ?” “বােলটা চড়িয়ে দি বউ “মাগুর মাছের তাে? জিরে দিয়ে সাঁতলাে, বড় এলাচের গােটাকতক দানাও দিও-পেটটা ঠাণ্ডা হবে। আমার যেমন কপাল—সব থাকতে বাছাকে কিছু খাওয়াতে পারলুমনা। এই মাতার নতুন বাজার থেকে সেরা-সেরা গলদা চিংড়ি এনেছে আমার যেমন কপাল! যাক যাওয়াই যখন চাই, মিছে আর দেরি করিওনা ঠাকুরঝি, সেখানেও তাে মায়ের প্রাণ ছটফট করছে। এখনাে সুধাংশুকে একবার দেখিনি,-আসছি.. মা জিজ্ঞাসা করিলেন-“দাদার শ্বশুর বাড়ী কেমন ছিলিরে।” হিমাংশু হাসিমুখে—“নিজের শ্বশুর বাড়ী না হলে সুখ নেই মা,” বলিয়াই কাপড় ছাড়িতে গেল। মা অবাক হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া হাসিয়া ফেলিলেন- “পাগল ছেলে।

সেহেৰ কঁাদ

No text on this page.

ত্রিপুরাসিনী বিধবা নন্দরাণী দুঃখ কষ্ট একটু ভুলিয়া থাকিবার আশায় ঢাকায় জন্মাষ্টমী উৎসব দেখিবার ইচ্ছায়—একমাত্র অন্ধপুত্র-পাচ বছরের গােপালকে লইয়া ঢাকায় বােনের বাড়ী আসিয়াছেন। উৎসবের সমারােহ অপূর্ব। চিত্তবিমােহন সাজসজ্জা—লক্ষ লক্ষ নরনারী উন্মুখ হইয়া দেখিতেছিল। ভক্তি বিস্ময় বিহবলা নন্দরাণীও সেই জনতা মধ্যে গােপালের হাত ধরিয়া আত্মহারাবৎ চলিয়া- ছিলেন। গােপাল যে কখন তাহার হস্তবিচ্যুত হইয়া গিয়াছে তাহা তাহার সই ছিলনা। ভিড় এতই অধিক যে তাহার ঘন সন্নিবেশে -একে অপরের অভাব অনুভব করিতেই পারেনা জানিতে পারিলেও, সে জন-সমুদ্র মধ্যে তখন কাহাকে খোঁজাও সম্ভব ছিলনা।“গােপালকে পাওয়া গেলনা। বিহ্বলা ব্যাকুল নন্দরাণী অসহায়া উন্মাদিনীর মত সারা দিন যথা সাধ্য পুঁজিবার পর বাড়ী ফিরিলেন। আশা ত্যাগ হয়না, গােপাল যদি কোন পরিচিতের সাহায্যে বাড়ী ফিরিয়া থাকে। • ২ ব্রজেশ্বরী কৃষ্ণনগরের একটি হােটখাট কায়স্থ জমিদারের বিধবা পুত্রবধু। কেহ না থাকায় এখন তিনিই মালিক। তাঁহার এক বিধবা খুড়তুতাে বােন দামিনী ও তাহার পনের ষােল বৎসরের পুত্র দেবেন তাহার সংসারে থাকে। দেবেন ইস্কুলে যায় কিন্তু লেখাপড়া তাহার ভাল লাগেনা, ফুটে সে বিশেষ ফল পাইয়াছে। তাছাড়া হােরাইজেন্টাল বারে তাহার মত খেলােয়াড় কৃষ্ণনগরে কেহ ছিলনা। তাহাকে অবলম্বন করিয়া ব্রজেশ্বরী ও তাহার মা ঢাকায় উৎসব দেখিতে আসিয়াছিলেন, আজই ফিরিবেন। জিনিষপত্র ক্রয় চলিতেছিল, ব্রজেশ্বরী কি একটা জিনিষের খোঁজে একটু উচ্চকণ্ঠে বলিলেন-“দেবেন তুই একবার দেখ বাবা, আমি ত কোথাও দেখতে পেলুমনা।” তার এই কথা শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গে একটি সুন্দর ছেলে “এই যে আমি মা,তুই কোথায় ছিলি ?” বলিয়া ব্রজেশ্বরীর গায়ের উপর ঝাপাইয়া পড়িতে গিয়া, পায়ের উপর পড়িয়া গেল। ব্রজেশ্বরী তাড়াতাড়ি “এস গােপাল আমার” বলিয়া তুলিয়া লইয়া মুখচুম্বন করিলেন। ছেলে তার বুকে মুখ গুজিয়া অভিমানে গুমরিয়া দিতে লাগিল, আর মধ্যে মধ্যে তাঁহাকে কিল চাপড় মারিতে লাগিল, ও ঠোট দুটি ফুলাইয়া বলিতে লাগিল—“আমি বড় ১১০ মেহের ফাদ পড়ে গেছি-আমি মরে গেছি,-আমি খিদেয় মলুম-তুই আমাকে ফেলে কেন চলে এলি ?” এই বলিয়া আবার মারিতে লাগিল। দামিনী ঝঙ্কার দিয়া বলিয়া উঠিল—“আ-মর, দেনা হাতটা মুচড়ে, অত বাড়াবাড়ি ভাল লাগেনা। কার ছেলে কি জাত—তার ঠিক নেই, দে নাবিয়ে দে।” ব্রজেশ্বরী বুঝিয়াছিলেন ছেলেটি ভিড়ে মাকে হারাইয়াছে বহু কষ্ট যাতনা পাইয়া, যে কারণেই হ’ক তাহাকে মা বলিয়াছে। তিনি দামিনীকে বলিলেন—“ও কি কথা, তুমি থাম, তুমি না ছেলের মা ? ভাব দিকি বাছার কি অবস্থাটা।” দামিনী বলিল -“ওঃ যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর,- বাড়াবাড়ি সইতে পারিনা তাই উচিত কথা কয়ে মরি।” ব্রজেশ্বরী ছেলেটিকে শান্ত করিয়া খাবার ও জল খাওয়াইলেন। খেলনা কিনিয়া দিবার সময় সকলে বুঝিলেন—ছেলেটি অন্ধ। তখন দামিনী এক গাল হাসিয়া বলিল—“গরীবের কথা বাসি হলে মিষ্টি লাগে।আবার অন্ধও।” ব্রজেশ্বরী বিরক্ত হইলেন, এবং ছেলেটির প্রতি আরও অধিক আকৃষ্ট হইলেন। দু’দিন অপেক্ষা করিয়া তাহার মার অনুসন্ধান করাইলেন। এ কাজটিতে দামিনী ও দেবেন খুবই উৎসাহ দেখাইয়া- ছিলেন, কিন্তু ফল হইলনা। দামিনী মনে মনে বলিল—“কোথাকার আপদ এসে জুটল, একে ছাড়াই কি করে ?” পরে বলিল—“পুলিশের জিন্মে করে দিয়ে ও ফঁাসাদ দূর করে।” ১১১ সন্ধ্যা শঙ্খ ব্রজেশ্বরী তাহা পারিলেননা, গােপালকে লইয়া কৃষ্ণনগর ফিরিলেন। দামিনী বলিল—“ভাল করচনা, যে ছেলে যাকে তাকে মা বলে ধরে সে নিশ্চয়ই ভিখিরীর ছেলে।” ব্রজেশ্বৰী বলিলেন- “তাত নয়ই, আমার বােধ হয় ওর মার স্বর আর আমার স্বরে কিছুমাত্র প্রভেদ নেই, সেই ধরেই আমাকে ধরেছে।” গােপাল দেখিতে গৌরবর্ণ, থােকা থােকা রেশমের মত চুল, নাক মুখ সবই সুন্দর। হাত পা খুব নরম, আঙ্গুলগুলি কলির মত, চক্ষুও বেশ, কেবল তাতে দৃষ্টিশক্তি ছিলনা। সে যে ভদ্রবংশের ছেলে তাতে কাহারও সন্দেহ হইতে পারেনা। কিন্তু দামিনী তাহার ছোয়া জল পর্যন্ত স্পর্শ করা বন্ধ করিলেন। “জাত ধর্ম থােয়াতে পারিনা তাে!” ব্রজেশ্বরী ভিতরে ভিতরে উত্যক্ত হইয়া উঠিতে লাগিলেন। তিনি গােপালের জন্য একটি দাসী নিযুক্ত করিয়া দিলেন, বাড়ীতে অন্যান্য চাকর ও দরােয়ান ত ছিলই। দুই তিন বছর পরে একটি বয়স্ক মাষ্টারও রাখিয়া দিলেন। তিনি গল্প করিয়া যাবতীয় জ্ঞাতব্য বস্তু জীবজন্তু, বৃক্ষলতা, পশুপক্ষী, সমাজ সংসার, পৃথিবী ঋতু ইতিহাস, সরলগণিত, হিতােপদেশ প্রভৃতি ক্রমে ক্রমে শিক্ষা দিতে লাগিলেন। এইভাবে তিন বছর কাটিল। তাহার অসামান্য মেধায় গােপালও বয়স্ক বালকের মত জ্ঞান সঞ্চয় করিতে লাগিল।

মেহের ফাঁদ তাহাকে পাইবার কিছুদিন পরে ব্রজেশ্বরী একদিন কৌশলে গােপালকে জিজ্ঞাসা করেন-“কেউ যদি তােমার নাম জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি বলবে?” তাহাতে গােপাল সরলভাবেই উত্তর দেয়-“কেন, আমি বলব- গােপালকৃষ্ণ ঘােষ।” তাহাতে ব্রজেশ্বরীর বক্ষ হইতে যেন একখানা পাথর নামিয়া যায়; কিন্তু দামিনী হাসে ও সেটা শেখান কথা বলিয়া ধরিয়া লয় এবং স্থান বিশেষে তা প্রচারও করিতে থাকে। ব্রজেশ্বরীর জমিদারীর আয় বাৎসরিক চল্লিশ হাজারের মধ্যে। বৃদ্ধ দেওয়ান হরিকমল বন্দ্যোই সব দেখেন। তাহার পরামর্শ না লইয়া ব্রজেশ্বরী কোন কার্য করেননা। দামিনী বিধবা হইয়া অনেক বুঝিয়া পুত্রটি লইয়া ভগ্নীর বাড়ী ভর করিয়াছেন। তিনি মধ্যে মধ্যে বলেন “ঐ বড়য্যে বুড়ােকে একশাে টাকা করে মাসে মাসে দেওয়া কেবল জলে ফেলে দেওয়া ;-ওটা বড় গায়ে লাগে। আর দু’বছর পরে দেবেন আমার সাবালক হলে এ বাজে খরচটা আর হতে দিচ্ছিনা।” ব্রজেশ্বরী হাসিয়া বলেন- “কর্তা বলে গেছেন, ওঁকে যেন আমরণ ত্যাগ করা না হয়। উনি যদি বয়সে কাষ কৰ্ম্ম না দেখতেও পারেন,তবুওনা।” দামিনী বলিল—“তবে আমার দেবেনের অত লেখাপড়া কি কোনাে কাযে আসবেনা? মিত্তিরদের বাড়ি অনেক বই আছে বলে সে সেইখানেই দিন রাত পড়ে থাকে।” ব্রজেশ্বরী কেবলমাত্র বলেন—বিয়ে কি কখন মিথ্যে হয়, তার ফল ১১৩ সন্ধ্যা শঙ্খ আছেই। আসল কথা ব্রজেশ্বরী দেবেনের বিদ্যার দৌড় বেশ বুঝিয়াছিলেন। এবং মিত্তিরদের বাড়ী কেননা যে সে দিন রাত পড়ে থাকে তাহাও জানিতেন। গােপাল পাঁচ ছয় বৎসর হইল কৃষ্ণনগরে আসিয়াছে। মাষ্টারের মৌখিক সাহায্যে জগতের সাধারণ জ্ঞাতব্য বিষয়ে জ্ঞান লাভও করিয়াছে ও করিতেছে। তাহার বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি' দেখিয়া ব্রজেশ্বরীর আনন্দের সীমা নাই। কেবল দামিনী দমিয়া যাইতেছেন ও মনে মনে প্রমাদ গণিতেছেন এবং ভগ্নীদের কাছে গােপনে এমন কথাও বলেন যে “চরিত্রহীনাদের ছেলেদের বুদ্ধিত’ বেশী হয়ই, শেষে সেই বুদ্ধিই সর্বনাশের কারণ হয়। দিদিরও কালসর্প পােষা, হচ্ছে, শেষে বুঝবেন।” ইত্যাদি কয়দিন পরে সূর্যগ্রহণ। কাশীতে দেখা যাইবে গুনিয়া, ব্রজেশ্বরী; গ্রহণ উপলক্ষে কাণী যাইবার সঙ্কল্প করিলেন। দামিনী বলিলেন- “আমি নবদ্বীপেই একটা ডুব দিয়ে আসব। সংসার দেখবে কে, বিশেষ গােপাল রইল।” কথাটা অসঙ্গত নয়, তাই ব্রজেশ্বরী গােপাল সম্বন্ধে সকলকে বিশেষ সাবধান ও অনুরােধ করিয়া, বৃদ্ধ- রামকমলের সঙ্গে যাত্রা করিলেন। দেবেন দূর গােয়াড়ী হইতে গাড়ীর বন্দোবস্ত করিয়া ১১৪ মেহের ফাঁদ আসিয়াছিল। গ্রহণের পূর্বদিন বেলা একটার সময় গাড়ী আসিয়া নির্দিষ্টস্থানে অপেক্ষা করিতেছিল। দামিনী বাড়ীর সকলকে সাবধান থাকিতে বলিয়া এবং গােপালের কোনরূপ নিয়মভঙ্গ না হয়, সে বিষয়ে বেশ উচ্চকণ্ঠে নানা উপদেশ দিয়া, দুর্গা বলিয়া নবদ্বীপ যাত্রা করিলেন। বাড়ীর চাকর দাসীরা হাঁপ ছাড়িল।—গােপাল বেলা একটা হইতে বেলা তিনটা পর্যন্ত ঘুমায়, কেহ যেন তাহার ঘুম ভাঙ্গায়, সে বিষয়ে বারবার সকলকে সাবধান করিতে ভুলেন নাই বরং ডাকিয়া যেন ঘুম ভাঙানাে না হয়—বলিয়া গিয়াছেন। বেলা পাঁচটার সময় দাসী সভয়ে ঘােষণা করিল,“গােপাল ঘরে নাই, তাহাকে কোথাও দেখিতেছি না।” চতুর্দিকে খোজ পড়িল, রাত্রি হইয়া আসিল, গােপাল আসিল না। বাড়ীর পশ্চাৎভাগে খিড়কীর পুকুর ও বাগান, বাগানের প্রান্তে একটি দরজা, তাহা বন্ধই থাকিত; আজ খােল! রাত্রেই পুকুরে জাল ফেলা হইল, বড় বড় মাছ উঠিল, গােল উঠিল না। প্রাতেও গােপাল আসিল না বা ভাসিল না। তখন আমলারা পাড়ার ভদ্রলােকের পরামর্শ মত পুলিশে সংবাদ দিল। পয়সাওলা বাড়ীর গােপাল, সুতরাং পুলিশও জোর অনুসন্ধান আরম্ভ করিল,নবদ্বীপেও লােক ছুটিল। দামিনী ও দেবেন গরুর গাড়ী করিয়া বৈকালে আসিয়া উপস্থিত হইল,সঙ্গে গােপাল নাই! এতক্ষণ অনেকের মনে ঐ একটু কাণ আশা ছিল, তাহাও নিভিয়া গেল। দামিনী শুনিয়া ছিন্নমূল তরুর মত সটান পড়িয়া গেলেন ও ১১৫ সন্ধ্যা শঙ্খ চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া বলিতে লাগিলেন—“আমি কি করে এ মুখ দিদির কাছে দেখাব, আমি কেন মরতে পূণ্য করতে গিয়েছিলুম, অভাগীদের পূণ্যিও সয়না। একটি দিন না থাকায়, এতগুলাে লােক থাকতেও এই হ’ল ! আমি কেন মলুম না। তখনই বলেছিলুম-ওপাপ জোটাসনি”, ইত্যাদি। দেবেনের মুখ সত্যই যেন কালী হইয়া গেল, সে ধীরে ধীরে ঘরে গিয়া শুইয়া পড়িল। সরকার মহাশয় কাশীতে তার যােগে ব্রজেশ্বরীকে ঘটনা জানাইলেন, কারণ পুলিশ এইবার ঘরের সমস্ত চাকর দাসীদের মধ্যে কড়া তদন্ত করিবার অভিপ্রায় জানাইয়াছে। ব্রজেশ্বরী পরদিবস আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দামিনীর চীৎকারে বাড়ী তিষ্ঠান কঠিন হইয়া উঠিল। ব্রজেশ্বরীর একটু গম্ভীর ভাব ভিন্ন কোনরূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ পাইল না। তিনি দামিনীকে বলিলেন-“পরের ছেলে এসেছিল—চলে গেছে ; যে কয়দিন থাকবার ছিল—ছিল। সময় হলে নিজের স্বামীপুত্রকে কেউ রাখতে পারে না; ওর জন্যে এতচীৎকার কেন ?” দামিনীকে অর্থপথে কে যেন ধাক্কা দিয়া থামাইয়া দিল। ব্রজেশ্বরীর সে স্বরে এমন একটা সুর ছিল যাহা দামিনীর অন্তর পর্যন্ত স্পর্শ করিয়া তাহাকে যেন সন্দেহের মধ্যে ফেলিয়া পিসিতে লাগিল; সে যেন এতটুকু হইয়া গেল। দেবেন সেদিন সকাল সকাল আখড়ায় গেল বটে, কিন্তু রুটে ফু ফুটিল না, বাঁশীটা হাত হইতে দু’বার পড়িয়া গেল। ব্রজেশ্বরী পুলিশ তদন্ত থামাইয়া দিলেন। ১১৬ বৃদ্ধ হরিকমলের সহিত পরামর্শ করিয়া ব্রজেশ্বরী দামিনীকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়া বিদায় করিলেন। তাহার স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেলেও একত্রে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়ায় সে সন্তুষ্ট হইয়াই গেল, কারণ এ বাটাতে আর সে কাহারও সহিত চোখাচোখী করিতে পারিতেছিল না। দেবেনের পার্টি পদ্য লিখিয়া দেবেনকে “ফেয়ার- ওয়েল” দিল, সঙ্গে সঙ্গে দুইটা খাসি দেহ ও প্রাণ দুইই দিল। ব্রজেশ্বরী তখন বিশ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি হাসপাতাল ধরণের বাটী নিৰ্মাণ করাইলেন। স্বতন্ত্র রন্ধনশালা, মানাগার, দাসদাসীদের থাকিবার ঘর করাইলেন এবং অন্ধ বালকদের অবাধে বেড়াইবার সুবিধার জন্য সেই বাটী সংলগ্ন প্রাচীর-বদ্ধ প্রশস্ত প্রাঙ্গন বা মাঠ রাখা হইল। প্রাচীরের বাহিরে কুপ খনন করাইলেন। ঘরগুলি খাঢ় বিছানা দিয়া সাজান হইল এবং বাটীর কপাল-ফলকে “অন্ধ নিবাস” অঙ্কিত শ্বেত প্রস্তর আঁটিয়া দেওয়া হইল। হরিকমল তখন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিলেন—“বারাে তেরাে বৎসর হইতে নিম্ন বয়স্ক গরীব অনাথ অসহায় অন্ধ বালকদিগের জন্য এই অন্ধ- নিবাস প্রতিষ্ঠিত হইল” ইত্যাদি। এই সব কৰিতে এক বৎসর কাটিল। ব্রজেশ্বরী সপ্তাহে একদিন করিয়া “অন্ধনিবাস” দেখিতে যান। ১১৭

সন্ধ্যা শখ
চার মাসের মধ্যে সাতটি অন্ধ অনাথ বালক আসিয়া উপস্থিত হইল।
যাহাতে তাহাদের কোনরূপ কষ্ট না হয় তিনি তার সুব্যবস্থাদি
করিয়া দিলেন। কিন্তু ফিরিবার সময় তাঁহার দীর্ঘনিশ্বাস পড়িত
ও চক্ষে জল দেখা দিত।
ব্রজেশ্বরী কাহারও নিকট কোনােদিন গােপালের জন্য দুঃখ
প্রকাশ করেন নি, চোখের জলও ফেলেন নি। আজ জন্মাষ্টমী,
আজ তাহার অন্তরটা কেবলি তাহাকে আকুল করিয়া তুলিতে
লাগিল। এই দিনেই তিনি গােপালকে পাইয়াছিলেন। ভগবান
তাকে এমন ছেলে দিয়াছিলেন যে চিরদিনই—-ছেলে,—চিরদিনই
অসহায়!—অঞ্চলে চকু মুছিলেন।
আজ তিনি উপবাসী ছিলেন। সন্ধ্যার পর পূজার ঘরে জপে
বসিলেন, কেবল গােপালকেই মনে পড়িতে লাগিল। পুরােহিত
পূজা সমাপ্ত করিয়া তাহাকে প্রসাদ পাইবার অনুমতি দিয়া গেলেন।
রাত্রি তখন বারােটা বাজিয়া গিয়াছে। অন্ধ গােপালগুলিকে
কিছু খাওয়াইয়া আসিবার জন্য তাহার প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠিল।
ঠাকুর দাসী লইয়া স্বয়ং “অন্ধনিবাসে” গেলেন! গিয়া দেখেন একটি
গৈরিকধারী যুবা চাতালে বসিয়া ভগবানের নাম করিতেছেন।
ব্রজেশ্বরী থমকিয়া দাড়াইলেন ও প্রণাম করিলেন। ব্ৰজেরীকে
১১৮

মেহের ফাঁদ দেখিলে যে-কেই বুঝিতে পারিত-ইনিই কৰ্ত্তী,-তাহার এমন একটা ভাব ছিল। যুবা দাড়াইয়া বলিলেন—“মা আপনিই বােধহয় এই প্রতিষ্ঠানের কত্রী?” ব্রজেশ্বরী মাথা হেঁট করিলেন। যুবা বলিলেন—“মা আমি শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের একজন সন্ন্যাসী সেবক। আপনার সঙ্গে আগে দেখা করে এখানে আসা আমার উচিত ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেল, আর ছেলেটিও বােগ থেকে উঠেছে, বড় দুর্বল তাই ব্রজেশ্বরী ধীর ব্যাকুল কণ্ঠে বাধা দিয়া বলিলেন—“কে ছেলেটি বাবা?” গৈরিকধারী যুবা বলিলেন—“মা,-অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় কিছুই পাই নি। একটি বছর বাবাের অন্ধ ছেলে। তবে চেহারা দেখলে সে যে ভদ্রবংশজাত তাতে সন্দেহ থাকে না। ছেলেটি কোথা থেকে কি ভাবে দক্ষিণেশ্বরে রাণী রাসমণির মন্দিরে এসে পড়ে। সেখানে চারটি অন্নের অভাব নেই। ছেলেটির রূপ ও অবস্থা দেখে সেখানকার কর্মচারীদের দয়া হয়, তারা তাকে সেইখানেই রাখিয়ে দেন। চারটি প্রসাদ পেতে, আর যেখানে সেখানে, সেই দেবালয় সংলগ্ন বাগানেই পড়ে থাকত। বােধ হয় গত শীতে বন্ত্রাভাবে বােগে পড়ে—রক্তামাশয় হয়। তখন সকলেই ব্যস্ত বা বিরক্ত হয়ে ওঠে। আমরা বরানগর মঠে থাকি, মধ্যে মধ্যে ভগবান রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সিদ্ধাসন দর্শন ও প্রণাম করতে আসি। সেই উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলাম। ১১৯ সন্ধ্যা শখ দেওয়ানজী ছেলেটির অবস্থা জানিয়ে, তাকে বিয়ের উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। উপায় আর কি, আমাদের ত কাষই ঐ, গাড়ী করে তাকে মঠে এনে তার চিকিৎসা আর সেবা যথাসম্ভব করায়-- তিন চার মাসে ছেলেটি সেরে উঠলাে। তার পর ? চিরকাল পােষা তাে আমাদের সাধ্য নয়।—সে ব্যবস্থাও নাই। —“এমন সময় সংবাদপত্রে আপনাদের বিজ্ঞাপন দেখতে পেয়ে বড়ই শান্তি ও আনন্দ বােধ করলাম। পরে আমার উপরই এখানে, পৌছে দেবার ভার পড়ল,—আমিই নিয়ে এসেছি মা। এখন আপনি দয়া করে তাকে স্থান দিলে, আনন্দে ফিরে যাই। বড় দুর্বল ছিল, পথে কষ্টও গেছে, ভাল খাট বিছানা পেয়ে, শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি এই দেখে আসছি,অকাতরে ঘুমুচ্ছে।” ব্রজেশ্বরী ব্যাকুলভাবে, “ছেলেটিকে আমাকে একবার দেখাবেন আসুন” বলিতে বলিতে অগ্রসর হইলেন,-সন্ন্যাসী পশ্চাতে চলিলেন। খাটের কাছে যাইয়া সন্ন্যাসী যেই “গােপাল কি ঘুমুচ্ছ?” বলিয়াছেন, অমনি ব্রজেশ্বরী “আঁ কি নাম বল্লেন” বলিতে বলিতে চাকরের হাতের ল্যাম্পটি উজ্জ্বল করিয়া তাহার মুখের উপর ধরিলেন ও “বাবারে বলিয়াই খাট ধরিয়া বসিয়া পড়িলেন। সন্ন্যাসী অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। ব্রজেশ্বরী প্রায় দশ মিনিট পরে সামলাইয়া ঠাকুরের প্রতি সন্ন্যাসীর আহারাদির ও শয়নের ব্যবস্থার ভার দিয়া, স্যাসীকে বলিলেন-“আপনি ১২০ মেহের ফাদ আমাকে ক্ষমা করবেন, আমার সঙ্গে না দেখা করে যেন যাবেননা, আমি নিজে কিছু দেখতে পারছি না, আমার মাথাটা বড় ঘুরছে। আমি আজ গােপালের কাছেই শুই।” সন্ন্যাসী বলিলেন—“এই জন্যেই আপনারা মায়ের জাতি, ধন্য আপনার সন্তান সেবা, ধন্য আপনার অন্ধ-নিবাস, যাদের পাশাপাশি থাকতে আপনার দ্বিধা-সঙ্কোচ নেই।” ব্রজেশ্বরী বাধা দিয়া বলিলেন-“কিছু না কিছু না বাবা—এ আমার গােপাল ধরা ফাদ !” * বহুদিনের কথা—ৰােধ করি ১৩৩৮৩৯ হবে, আমার কোনাে প্রীতিভাজন আমার কাছে বিশেষ অনুরােধসহ-গল্পের একটি plot চেয়ে পাঠান। তাঁর অনুরােধ রক্ষার্থে—“দেহের ফাঁদ” নাম দিয়ে,-গল্পের plot হিসাবে এই noteটুকু পাঠাই ও তাকে ইচ্ছামত পরিবজিত করে নিতে বলি। সেকথা আমার আর মনে ছিল না। পরে হঠাৎ একদিন ১৩৪০, জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা “ফানী” বলে পত্রিকা হাতে আসায় খুলে দেখি—প্রথমেই আমার সেই “মেহের ফ” বলে নােটটিকেই আমার লেখা গল্প বলেই এাশ করা হয়েছে। ওটা আমার লেখা—ঠিকই, তবে গল্প নয়—গল্পের প্লটের নােট মাত্র। সম্ভবত সেটা তারা জানতেন না।যাই হােক, আমি এখন আর তাতে হাত দিলুম না- একাশিত অবস্থাতেই গ্রহণ করলুম।-লেখক। ১২১

No text on this page.

য্যে-সংবাদ

No text on this page.

আশা করি আমার প্রিয় পাঠকেরা--আমার চীনযাত্রার জাহাজী সঙ্গী চাটুযয্যকে বােধ হয় ভুলে যান নি। পূজনীয় কবিও যখন একদিন তার সম্বন্ধে কিছু শুনতে বা জানতে চেয়েছিলেন, তখন সে বস্তু যে ভােলবার নয় এমন অনুমান করা অন্যায় হবে না। সুতরাং এখানে আবার তার পরিচয় রিপিট করে তাকে খাটো করতে চাই না এবং তা অনাবশ্যকও। তিনি আমাদের সেই চাটুয্যে যাকে আমরা সুদূর সমরাভিযানে যাত্রার অকূল সমুদ্রে অবলম্বনরূপে পাই। সেই দিনের সেই চিন্তা, শঙ্কা ও বিচ্ছেদ-বেদনা-মথিত অবস্থায় তিনি যেন ভগবৎ-প্রেরিত সঞ্জীবনীর মত উপস্থিত হন। ‘লর্ড ক্লাইভ’ নামক ‘প্রয়েল মেরিণ ছিল আমাদের দুস্তরভব- পারের বাহক। সেখানি ক্রমে ‘নােয়া-আর্কে পরিণত। ভারতের ও ভারতের বাইরের বাছাই করা বিবিধ মূৰ্ত্তি তাতে যেন বীজ রক্ষার্থে সংগ্রহ করা হয়েছিল। আজব-ঘর বা মিউজির খােলবার মাও বলা চলে। হেনকালে চাটুয্যের আবির্ভাব—সকলকে একাগ্র করে দেয়। মস্তকে—বাঙালির বাড়ির পরিচয়-লিপির মত ডুরে সাড়ির খানিকটা ছিয়াংশ জড়ান। গায়ে আদময়লা গােল আস্তিনের ১১৫;

আজানু জামা। বাম স্কন্ধে-পৃষ্ঠ ও বক্ষ চাপা, দুইটি পূর্ণগর্ত চটের থলি ; দক্ষিণ কক্ষে টিনের একটি দড়ির ‘সেফ গার্ড জড়াননা পুরাতন তােরঙ্গ। পাদুকার পরিচয় অনাবশ্যক,—পৌছুতে পারলে সব কাজ ফেলে সর্বাগ্রে চীনেমুচী খুঁজতে হবে ! ঠাকুর বলতেন—“কাজলের ঘরে যাতায়াত থাকলে বেদাগ, কেউ বেরিয়ে আসতে পারে না। যতই সাবধান হও, দেহে একটু দাগ নিয়ে আসতেই হয়।” রংয়ের গাঢ়ত্বে আগন্তুক কিন্তু সে শঙ্কা হতে মুক্ত! বিপদসঙ্কুল সুদূর যাত্রায় সকলেই নিজেদের দলপুষ্টি চায়। এ ক্ষেত্রে কিন্তু সে আগ্রহ কালো জাগে নাই। অনেকেই অনেক অনুমান করেছিলেন -সকলেরই ভাবটা ছিল— প্রত্যাখ্যানের দিকে। মজুমদার ভায়া বলেন—“বােধ কালিমাখা কাবুলী-মেওয়া বেচতে বা খেলা দেখাতে যাবে।” শেষ আমাদেরই ভাগ্য প্রসন্ন হ’ল। তিনি বাঙালী! অর্ডার পেয়ে, রেঙ্গুন থেকে ভায়া’ (Via) ক্যালকাটা চীনে চলেছেন। সঙ্গে থলিভরা ক্লেশ-ট; তার ডিটেল অনেকেরই স্মরণ থাকা সম্ভব লঙ্কা হতে আধখানা কাটাল পৰ্যন্ত! শুনেছিলেন সমুদ্র সফরে সী- সিকনেস্ এড়াবার উহাই ব্রহ্মা বা মহৌষধ। যে কারণেই হউক- যেতে,না আসতেসী-সিকৃনে তাকে হেয়নি—বা ছুতে পারেনি। ১২৬)

চীন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর-পনেরাে-যােলাে বৎসর কেটে
গিয়েছে। সেখানে কোনাে সুবিধাই হ’ল না—“রণে মলে নাকি
স্বর্গ হয়,—আমরাও গেলুম, হত্যাকাণ্ডও থেমে গেল—স্বর্গপ্রাপ্তির
পথও ঘুচে গেল! একটি মাত্র উপায় রইল—কাশী। সেই আশায়
—অবসর গ্রহণান্তে কাশী এসে রইলুম। একটা কিছু নিয়ে থাকা
চাই! অনভ্যন্ত—পূজা, জপ, গঙ্গাস্নান নিয়ে অনির্দিষ্ট দিনের
অপেক্ষা করাও বড় ‘বােরিং’
এমন সময় একটি বন্ধু জুটলেন—তিনি ‘ভাদুড়ী মশাই-জীবন্ত
তিলভাণ্ডেশ্বর। তার একখানি লিপিফটো বা জীবনী চাই।
ফিল্ম ফঁাদা গেল—বৎসর দুই সময় কাটাবার খােরাক জুটলাে।
তাই নিয়ে থাকি।
জয়নারায়ণ স্কুলের সামনে, রেউড়িতলায় বাসা—দ্বিতলেই
থাকি। প্রীতিভাজন তরুণেরা আসেন—কেহ লেখক, কেহ
সাহিত্যপ্রেমিক-বেশ একটি আনন্দ-বৈঠক নিত্যই বসে-সাময়িক
সাহিত্য-কথা চলে। তারা যেন নবযুগের বার্তাবাহক-চোখে মুখে
আনন্দ, উত্তেজনা ও প্রাণশক্তির চাঞ্চল্য। কিছু সৃষ্টির জন্য
উৎসুক। ভাবতুম—এই তত যৌবন, একেই বলে যৌবন। এরাই
তাে জগতকে নুতন রূপ দিতে আসেজগতের যৌবন রক্ষক
১২৭

সন্ধ্যা শঙ্খ
ভারী আনন্দ পেতুম। তাদের তর্ক ও সমালােচনাটি নূতন ধারা
ধরে চলতাে—আমি উপভােগ করতুম। নব যুগের আগমন
বার্তার সাড়া পেতুম !
আমি বারাণ্ডায় বসে পথের লােক-চলাচল দেখছি আর ভাদুড়ী
মশায়ের কথা ভাবছি। সেটা ছিল মঙ্গলবার দুর্গাবাড়ীতে দুর্গা-
দর্শনে যাবার দিন। বহু বহিস, মহাজন ও জনসাধারণ গিয়ে
থাকেনযাচ্ছেনও। কেহ-বা দর্শনান্তে ফিরছেন। ফিরতি
জনতার মধ্যে একজনকে দেখে চমকে উঠলুম। চাটুয্যে না !
সে মুক্তি লাখে না মিলে এক’! নাকে, কপালে, গালে
সিন্দুর! স্থির নিশ্চয় না হলেও না ডেকে পারলুম না—
“চাটুয্যে নাকি?”
চাটুয্যে থমকে দাড়িয়ে বারাণ্ডার দিকে চাইলে। যােল
বৎসর পরে চারি চক্ষুর মিলন ! একমুখ হাসি—সেই গজদন্ত
বিকাশ !–“বড়য্যে মশাই নাকি?
*–দাড়াও, যাচ্ছি।”
পরিবার ছুটে এসেছিলেন—“কেকে গা?” বললুম—“চট্ট
কোরে এক কেটলি চায়ের জল চড়িয়ে দাও, আর চাকরটাকে
আধসের গরম জিলিপি,—দেরী না হয়।”
“একজন না?”
“
হ্যাহােলকারের বড়কুমার-আমার চীনের চাটুয্যে।”
বলতে বলতে নেবে গেলুম।
১২৮

চাটুয্যে-সংবাদ
-“এসাে, এসাে ভায়া। অ্যাঃ-বেঁচে আছছ? ভারী
'আনন্দ হচ্ছে।
“আগে বলুন তােহনুমানের বিষ আছে?”
চাটুয্যের প্রশ্নাদি ওইরূপই। তাই বললুম-“আগে খুবই
ছিল রে ভাই, কিন্তু রাবণ বংশ ধ্বংস করতে—সবটুকু ঝরে
গিয়েছে—এখন সব টেড়া হনুমান! এ প্রশ্ন কেন বলল
দিকি ?”
ম্লান মুখে কাতর কণ্ঠে বললে—“বড় বিপদ বাঁড়ুয্যে মশাই!
এই দেখুন হাতে হনুমানে কামড়ে দিয়েছে।”
কি সর্বনাশ! তখনও রক্ত ঝরছে। তাকে সাহস দিয়ে
বললুম-“কিছু ভেব না ভাই, হত্যার পাপ থেকে মুক্ত রাখবার
জন্যেই মহর্ষি গৌতম বলে গিয়েছেন—“গাে ব্রাহ্মণ আর হনুমানের
বিষ থাকবে না। এরা তিনই চিরদিন এক পৰ্যায়ভুক্ত থাকবে।”
খবরদার, ঋষিবাক্যে বিশ্বাস হারিয়ে না ভাই।”
তিন বৎসর চীনে অবস্থানকালে প্রায়ই চাটুয্যর একটা না
একটা অদ্ভুত সন্দেহের, শশাকের বা স্বপ্ন-সমাধানের বড় প্রব্লেম্
আমাকে মেটাতে হত। আমার শাস্ত্রজ্ঞানে তার অসীম বিশ্বাস
ছিল। তার ভয় ভাংলাে। হাতটা ভাল কোরে ধুয়ে, ‘আয়ােজি
লাগিয়ে বেঁধে দিলুম। সাবান দিয়ে মুখ ধােবার পর পাকা রং
বেরিয়ে এলাে—বে-ভেজাল চাটুযয্যকে পেলুম। তারপর একতাল
জিলিপি আর এক পটু চা—অতল স্পর্শে চলল। খান সাতেক

সন্ধা শৰ পেটে পড়বার পর বললুম-“তিনি কোথা?সস্ত্রীকে ধৰ্ম্মমাচরেৎ হচ্ছে শাস্ত্র বাক্য “সবই তাে করেছিলুম মশাই,” বলেই চাটুয্যে একদম বিমর্ষ-- অভ্যাসৰশে কেবল জিলিপি খাওয়া বন্ধ হয়নি। আমি ভীত হয়ে বললুম-“কেননা, কি হােলল—ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছ নাকি?” তার দ্বারা কিছুই অসম্ভব নয়। “সবটা নয়—আধখানা গিয়েছে মশাই- “বলাে কি? সে কি রকম! তিনি কোথায়?” “বেশ হয়েছে মশাই—ভালই হয়েছে। যেমন তীর্থ-তীর্থ করে মরছিলেন— “ব্যাপারটা খুলে বলল ভাই।” “আর মশাই-শাস্ত্র মানতে তত কসুর করি না—পঞ্জিকা না দেখে শ্বশুরবাড়ী পর্যন্ত যাই না। পঞ্জিকা বলেন—আপনারাও ‘ডিটো’ দেন—এয়ােদশীর মত যাত্রার ভালাে দিন আর নেই—সর্ব কৰ্ম্ম সিদ্ধি। শ্রীরামপুর, গুপ্ত প্রেস, বাগচি—সবারই এক রা। পরিবার পা বাড়িয়েই ছিলেন, এয়ােদশীতেই বেরিয়ে পড়া গেল— সােজা একেবারে বৃন্দাবন। সটেই বলি-যমুনা মানান্তে গগাবিন্দজী দর্শনে যাবাে। যমুনাকে নিবেদন করবার তরে এক- ছড়া পাকা কলা কেঁচায় বেঁধে ছিলুম। কিন্তু জল কোথায়, থাকলেও তাতে নাবে কার সান্দি—কচ্ছপের মােচ্ছপ লেগে আছে। সন্তর্পণে জলস্পর্শ করছি, একটানে কোমর থেকে কাপড়খানা চাটুয্যে-সংবাদ খসিয়ে নিয়ে একটা বাঁদর ছুটে পালালাে, থপ, কোরে বসে পড়লুম। ভাগ্যে গামছাখানা ছিল—তাই কোনাে প্রকারে গােবিন্দজী দর্শন সেরে বাসায় ফিরি। পাণ্ডাজী বললেন—“আপ, বড়া ভাগবান্ হায়, লালাজী ( শ্রীকৃষ্ণ) লীলা কিয়া। ভাবতে লাগলুম-আচাৰ্য্য শঙ্করের নিশ্চয়ই এই দশা ঘটেছিল—তাই বারবার—কৌপীন বস্ত থলু ভাগ্যবন্ত-বলে গিয়েছেন !” “তিন দিনে হাড়ির হাল্ কোরে ছাড়লে-কাপড় গেলাে, চটি গেলে, দুদিন রুটিও গেলাে। পরিবারকে পাণ্ডার জিন্মে কোরে নিশ্চিন্ত হয়েছিলুম। তীর্থ নয়-বাদরের একটি বিশিষ্ট আচ্ছা, মুহূর্তের শান্তি নেই মশাই। ডাঙ্গায় বাঁদর, জলে কচ্ছপ! হ্যা মিথ্যে কথা বলব না-বৃন্দাবনের সেরা চিজ বটেরাবড়ি! —“তারপর প্রয়াগে পলায়ন। সেখানে রামের পল্টনের নম্বর কিছু কম। মুণ্ডনের মাহাত্ম্যই ধর্মের সেরা। রক্তারক্তি চলছে। কেশের কন্ট্রাক্টার কড়া পাহারা দিচ্ছেন—এক কঁাচ্চা চুল না কেউ সরায়।আমি সঙ্গমে স্নান করতে সরে পড়লুম। “ফিরে এসে তাকে খুজছি, একটি স্ত্রীলােক কাঁদতে কাঁদতে হাজির। বললুম-“এখন কিছু হবে না, আগে আমাদের কাজ সারা যােক-পয়সাকড়ি সব তাঁর কাছে।”—স্ত্রীলােকটি ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠলাে-তুমি কি মরেছ’, চিনতে পারছ না! আমি গাে। —“সর্বনাশ-কে চিনবে মশাইযমকেও ফাঁকি দেওয়া যায়! ১৩১ সন্ধ্যা শঙ্খ হুলিয়া হারমানে!—আপনাকে বলি—ভাগ্যে এক চোখ ট্যারা ছিল, হলে আমার বাবারও চেনবার সান্দি ছিল না; তায় শুনেছি তীর্থস্থান প্রবঞ্চকের প্রফিট হাউ!-আমার কান্না পেলে। ‘এইস্ত্রী মানুষ হয়ে এ তুমি করলে কি—আমি না ম’লে তুমি দেশে ফিরবে কোন্ মুখে ? “ঘাটে মড়াকান্না পড়ে গেল,মাঝে মাঝে ঝঙ্কার—তুমি ছিলে কোথায়, তুমি তাে মরেই ছিলে। তুমি থাকলে (পাণ্ডাকে দেখিয়ে) এ পােড়ারমুখাে মিসে, শ্লোক আউড়ে, ভজন সাধন দিয়ে—“মায়ি অসংখ পুন্ হােবে—অহল্লিয়া মায়ি ভি”-আরাে কত কি বললে।” “পাণ্ডার দিকে চাইতে সে উত্তেজিত ভাবে বললে –“বাবু,তীর ঝুটুমঠ, গােলমা না কিজিয়ে, হাম্লােগ্ গণ নেহি, হাত গিণনে নেহি জানতে। আপলােগকা বিধবা সধবা কোন্ পয়চানে? সবকোই কিনারাদার সাড়ী আউর গলেমে হাতমে জেবর রাখতে, কেশমে কুণ্ডলিনী (কুন্তলীন) লাগাতে। প্রয়াগজীমে মুণ্ড প্রধান কর্তব্য হায়—উকা ভালেকে ওয়ান্তেই করায়া গিয়া। আওর পাছকে পুছিয়ে-বলে-হাক্ দেওয়ায়, যে পাঁচ্ পল্টনীমূর্তি এলাে আর রুম স্বরে বললে-“ক্যা,-ক্যা ঝুটমুঠ, 'বলবা হায়। যাে হুয়া, সাে ভালাকে ওয়ান্তে হুয়া ;আব, দচ্ছিনাকে দো রূপেয়া রাখকে, ধহ যানা হায় চুপচাপ চলে যাইয়ে-ইত্যাদি। “তাদের মারমূর্তি দেখে—তা ভিন্ন উপায় ছিল না। এদের ১৩২ চাটুয্যে-সংবাদ চেয়ে বাঁদর ভালাে ছিল মশাই। খাওয়া দাওয়া শিরস্থ হয়েছিল প্রথম ট্রেনেই কাশী। তাঁর এক পিসি কাশীবাস করেন- সােনারপুরায়। সেখানে উপস্থিত হয়ে—মুখে পেটে কিছু দিয়ে বাঁচি! “তিনি এখন বাসায় বদ্ধ—অসুখ অস্বস্তির সীমা নেই। আমি তার পানে চাইতে পারি না, চাইলেও চিনতে পারি না! পিসি পণ্ডিতদের বাড়ী কাটানছিড়েনের জন্যে ছুটোছুটি করছেন—কারাে সুখ নেই। “আবার গ্রামে তাবড় তাবড় মহামহােপাধ্যায় আছেন। তাদের কাছে উদ্ধারের ছাড়পত্র এ জন্মে মিলবে না। সুতরাং তাকে এখন তিন-চার মাস এখানে থেকে, অন্তত ‘বউ-হেয়ার বানিয়ে যেতে হবে। —“আমি বাইরে বাইরে পাগলের মত ঘুরছি। তার ওপর এই বাঁদুরে কামড়! আপনাদের এয়ােদশীকে শতকোটা নমস্কার মশাই! সস্ত্রীক তীর্থে আসার মত মুক্ষুমি আর নেই—এর চেয়ে সোদর বনে গেলে চুকে যেত! প্রয়াগকে আপনারা তীর্থরাজ বলেন—সব ঝুটুবাৎ মশাই -আমি স্বচক্ষে দেখে এলুম—পাণ্ডারাজ বা গুণ্ডারাজ।” এই অদ্ভুত কথা শুনতে শুনতে আমি সত্যই সম্বিৎহারা, স্তম্ভিত ও নির্বাক মেরে গিয়েছিলুম। বলবার কিছু পাচ্ছিলুম না—ফাকও নয়। চাটুয্যে তখন পাপড়ি ভাংচে।-আন্তো আর চলছে না।

সন্ধ্যা শঙ্খ
বললে—“আপনাকে পেয়ে আমি আর ভাবছি না। চীনে
তিন বছর আপনি আমার ভয়ত্রাতা ছিলেন, মানুষ বানিয়ে
দিয়েছেন—মহা মহা বিপদে রক্ষা পেয়েছি—এইবার বাঁচান—যা
করবার হয়—করুন। দু-তিন দিনের বেশী তত আমার থাকা
চলবে না,—ওঁর একটা ব্যবস্থা, পাঁচ মেয়ের বিবাহ, জ্যাঠতুতে
ভায়ের সাত বিঘে লাখরাজের দখল লওয়া, সবই করতে হবে।
তা ছাড়া চীনের চোদ্দো হাজার প্রসিদ্ধ সলিসিটার-পাণ্ডারার
ব্রাদার্সের পাল্লায় পড়ে রয়েছে! উঃ-আজই স্টার্ট করলে ভাল
হয় ; এয়ােদশী নয় তাে!...”
বললুম-“কি সব পাগলের মত বকচো, এতো তাড়া কিসের?
এখনাে তত তােমার ছুটি রয়েছে। যা বললে, ওসব তাে দু-চার
দিনের কাজও নয়...”
“আজ্ঞে, ব্যাপারটি যে খাঁটি শাস্ত্রীয়, ক্যাপ্টে বাক্সে ছুটি
দিয়েছেন বটে, কিন্তু কর্ণেল শমনের তত দিনক্ষণ নেই ! কন্ট্রাক্টরের
কড়া কটাক্ষে যে নাপতে বেটা ভুলেও একগাছি চুল রাখে নি।
ভগবানেরও ভুল হয় মশাই—টাকের মাঝে মাঝেও দু-এক গাছ
থেকে যায়, এ বেটা একদম্ মাইক্রসকোপি চঁাচ দিয়েছে যে!
সিদূর পরবার পথও রাখে নি,আমি আর ক’দিন!”
“ওঃ তুমি বুঝি ওই ভণ্ডদের ভুয়াে কথাটা নিয়ে এখন ভাবচো ।
আমার তাে কোনাে শান্ত জানতে বাকি নেই-ও কথা কোথাও
পাবে না। সামুদ্রিকের চেয়ে সেরা শাস্ত্র তাে আর নেই!-চীনে
১৩৪

চাটুয্যে-সংবাদ যাকে যা বলেছি কোনটা নিস্ফল হয়েছে কি ?—দাও, ডান হাতটা দাও দেখি। নিরেটুদের কথায় মিছে ভেবে মরচো!” “সত্যিই তাে—বিপদে পড়ে সে কথা ভুলে গেছি মশাই।” বলে, হাত বাড়িয়ে দিলে। নিবিষ্ট ভাবে দু’পিঠ নেড়ে চেড়ে পনেরাে মিনিট নিস্পলক নিরীক্ষণান্তেরংয়ের কল্যাণে পেলুম-নিবিড় অন্ধকার এবং দু’পিঠই সমান! বেশ গম্ভীরভাবে বললুম –“যাও, মিছে দুর্ভাবনা নিয়ে থেক না—সবাইকে আলিও না। এই দেখছ না—তর্জনির নিয়ে বৃহস্পতির ক্ষেত্র হতে—আয়ুরেখা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিক্রমান্তে নেবে প্রাণনাড়ী স্পর্শ করেছে—এ ভারি বিরল—দেখা যায় না--ভেরী রেয়ার”। একমাত্র ত্রৈলঙ্গ স্বামীর ছিল। তােমাকে মারে কে! তিরানব্বয়ের পূর্বে যমেরও সাধ্য নেই। পাঁচ-সাতদিন পরে দেশে গেলেও চলবে। গিয়ে বলল—“কয়দিন তার জ্বর হয়েছে, ছাড়ছে না-পেটটাও নরম। ডাক্তারের ‘টাইফয়েড বলে সন্দেহ করছেন। তার সব ব্যবস্থাদি কোরে, তাকে তার পিসির কাছে রেখে এলুম। থাকতে পারলুম না। চাকরি যে টাইফয়েডের চেয়েও টেরিবল অসুখ !বাবা বিশ্বনাথ রক্ষা করেন তােত তিন মাস পরে তাকে আনবাে”।-টাইফয়েডে অনেককেই নেড়া হতে হয়। তিন মাসে লােকের সামনে বেরবার মত চুলও গজিয়ে যাবে।” “আঃ—বাঁচালেন বড়য্যে মশাই—এরূপ অকাট্য কথা—আর কার কাছে পেতুম—জয় বিশ্বনাথ!* চায়ের পটু নিঃশেষ করলেন। এতক্ষণে মেঘ ফুড়ে হাসি ফুটলাে।—“আমাকে তাে চিন্তামুক্ত করলেন, এখন তার ভাবনাই ভাবছি মশাই—বাঙালীটোলার সেই স্যাৎসেতে সােনাখনির মধ্যে তিন-চার মাস বন্দীর মত কাটাবে কি কোরে?—সত্যিকার টাইফয়েড, যে টেনে আনবে...” “তার উপায়ও ভেবেছি ভাই— “আপনি ছাড়া আমার ভাবনা আর কে ভাববে••ভাবতাে বটে এক সম্বন্ধী—সে ওই চোদ্দো হাজার পাচার করবার চেষ্টায়। এখন পরলােকে গিয়ে পাচ্ছে”... “যাক ও কথা।-এখানে ‘বান্ধব সমিতি’ বােলে বেশ জমকালাে থিয়েটার পার্টি আছে। তাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। এই সেদিন “উর্বশী’র জন্যে তারা ফাষ্ট ক্লাস পরচুলাে আনিয়েছেন। বন্ধুত্ব আর মূল্য—দুয়ে মিশিয়ে তা পাওয়া যাবে।-পরুলে কারাে সাধ্য নেই যে পরচুলাে বলে বােঝে। তাই পােরে সারাদিন বেড়ান্ না, কেবল শশাবার সময় খুলে রাখা চাই, আর স্নানের সময়। ইচ্ছা হয় রাত্রে গিয়ে গঙ্গাস্নান করে আসতে পারেন-তখন আর কে কার নেড়া: মাথা দেখতে যাচ্ছে, আর তাকে চেনেই বা ক’জন।” চাটুয্য একদম চাঙ্গা হয়ে উঠলাে।-“তগবান আপনাকে কি মাথাই দিয়েছিলেন—আমাদের কেবল মুণ্ডু বয়ে বেড়ান! আমিও তত থিয়েটারে পার্ট নিয়েছি তিন-তিবার-অশ্বমেধের ঘােড় সেজেছি, কই আমার মাথায় তাে ও কথা আসে নি।বস-মা

চাটুয্যে-সংবাদ
দিয়া, আর ভাবি না মশাই। উঃ—এমন সহজ উপায় রয়েছে-
আর আমি কি-না..তবে দু-তিন দিনের বেশী থাকা চলবে না
মশাই, তা হলে আর ট্রেভাড়া থাকবে না।
“কেননা?”
“মশাই সতেরােখানা সন্দেশের দোকান, সবই সেরা পা।
দিন—দেড় টাকা কোরে খছে! তীর্থস্থান বটে! আবার চম্
বােলে কি চিজই বানিয়েছে। সে দিন চাখতে-
চাতে বার-আনা
খসে গেলাে।আর নয় মশাই...”
বললুম—“রাত্রে আজ এইখানেই একসঙ্গে আহার।” একগাল
হেসে বললে—“আমি নিজেই বলতুম বাঁড়ুয্যেমশাই, একটু ইতস্তত
ছিল—কাশীবাস করেছেন, রুটি না ফ্যাকাসে মেরে থাকে।
ত্রয়ােদশীতে যাত্রা কোরে এক প্রকার উপােসই চলছে, পুরি আর
হালুয়া মেরে জিভ, অসাড় আর মুখ ঘৃতপক দাড়িয়ে গিয়েছে।
সিগারেটে শেষটান মারতে সাহস হয় না মশাই, আধখানা থাকতে
ফেলেদি-মুখাগ্নি না হয়ে যায় !”
“ভয় নেই ভাই, কাশী ভােগের স্থান ত্যাগের বালাই বড়
দেখতে পাই না। চল না একসঙ্গেই বাজারে যাওয়া যাক।”
পথে—একটু নিয়কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলে—“মট মেলে না?”
এসাে না, সব মেলেযেবা ইচ্ছা হয়।”
“ওঃ—তাই এত ভিড় আর বড় বড় বিল্ডিং। বড় বড় সব
টাকার-মুটে সকাল থেকে মাছ-মাংসের বাজার ঘুটে বেড়াচ্ছেন
১৩৭

সন্ধ্যা শঙ্খ
সেরা মাল না উঠে যায়। মণিকর্ণিকা মনে পড়তে দেয় না—বেশ
আছেন।আর তিনটে বছর কাটাতে পারলেই আসছি মশাই—
তার পছন্দ মতই বাজার করা গেল। প্রায় দুসেরের ওপর
এক পি মট লওয়া হ’ল। বর্ণনা বাহুল্যে আর কাজ নেই।
তার পর তার অন্যান্য ব্যবস্থাদি শেষ কোরে চতুর্থ দিনে তাকে
রওনা করে দিলুম। চোখ ছল ছল করছিল, বারবার বললে-
“আপনি দেখবেন,” আর মধ্যে মধ্যে “আজ ত্রয়ােদশী নয় তত
মশাই ?”
“না হে না, কোনাে দুর্ভাবনা রেখ না।”
ট্রেন্ ছাড়লল। মুখ বাড়িয়ে—“আসল কথা বলতে ভুলেছি
মশাই –কি চিজই দিয়েছেন--তার মুখে হাসি দেখে যেতে
পারলুম ! পরচুলাে কি ফিই করেছে মশাই...”
আর শােনা গেল না।
দুর্গা-দুর্গা।
বড়য্যে
১৩

কালার্সাদের চতুর্বর্গ

No text on this page.

আমাদের স্বনামধন্য কালাদ খুড়ােকে সকলেই খুজতাে,—কি বৈঠকে কি বিপদে। তাকে না পেলে মজলিস্ জমতােনা, বিপদ উদ্ধারও হত না। তিনি ছিলেন যেমন সরসভাষী, তেমনি সরল। বাপমায়ে ভুল করেন না। তারা ছেলের নামকরণ করেছিলেন- কালাচঁাদ। কারণ ছিল। ছেলে ঠিক ভূমিষ্ঠ হয় নি-oil clothস্থ হয়েছিলেন। মা শেষ অনেক হাতড়ে ছেলেকে পান। সেদিন ভাের বেলা থেকে একটা দুশ্চিন্তা খুড়ােকে পেয়ে বসায়, তিনি বড়ই বিমর্ষ হয়ে ঘর-বার করছিলেন।-“তাইতে, দেখতে দেখতে পঞ্চাশ পার হয়ে পড়লুম, কই কোনাে মিঞা তাে একটুও বাধা দেননি। এ যে অভাবনীয় উদারতা ! যত বাধা কেবল মাইনে বাড়াবার বেলা ! যা তিনি পঞ্চাশের লাভালাভটা খতাবার জন্যে তামাক সাজতে বসলেন।–“ব্রাহ্মণের ছেলে, ধর্মের দিকেও তাে এগুনাে উচিত ছিল! বাঃ ছেলেরা তাে বেশ কথাটি বার করেছে—“প্রগতি”। বেঁচে থাকুক, মানে না বুঝে দুর্গতিই বাড়িয়ে বসেছি। এবার আর হােলােনাসুযােগ খােয়ানাে গিয়েছে। আসছে বারে better luck, মেয়ে হােলে, (তা ছাড়া আর হবেই বা কি) in anticipation and in advance “প্রগতি” নামই রাখা বইলাে; মধ্য- বিত্তের দুর্গতির সঙ্গে অমন মিল আর তত নেই। ১৪১ সন্ধ্যা শ তামাক সাজতে বসে খুড়াের আজ কেবলি ভুল হয়ে যাচ্ছে, কোটা টিকে, কোষ্টা তামাক, কোটা হুকো সব ঘুলিয়ে যাচ্ছে ! টিকে ভেবে আঙুলটা ধরিয়েছিলেন আর কি! চট্‌কা ভাংতে দেখলেন—ভুল হয়নি, নিজের হাত, টিকে, তামাক, হুকো,অভেদে সব একাকার দাড়িয়ে গিয়েছে। খুড়াে সবিস্ময়ে বলে উঠলেন- “চতুর্বর্গ আর কাকে বলে,-unity in diversity! এইতে বিশ্বরহস্যের সেরা ধৰ্ম্ম,—তা যখন হাতে হাতে পেলুম চিন্তা আবার কিসের! দেখছি এতদিন আমার অজ্ঞাতেই ধৰ্ম্মফল গজাচ্ছিলেন, আজ প্রত্যক্ষ হলেন। -এখন পীলেটা সারলেই বেরিয়ে পড়ি। পঞ্চাশ উর্দ্ধে সেই- টাই তাে বিধি ? অবশ্য চাকরি শাস্ত্রে—“পঞ্চা” কয়,-মনিবের দেশের জল-হাওয়াটা dashing কিনা—অসুর-প্রসূ। ‘অথৰ্ব্ব বেদের মতে আবার একটা কান্নাকাটি শাস্ত্রও আছে—তার বিধান ষাটেও ধাওয়া করে।-মরুকগে ; নিজের শাস্ত্রমতে ধৰ্ম্ম-রক্ষা করাই ভালাে।-“একটা “কিন্তু” এসে জন্তু বানিয়ে দিয়েছে—পীলেটা আবার সঙ্গ নিয়েছে। সতী-সাধ্বীর মত জড়িয়ে আছে,সহমরণে যাবে নাকি! এক ভরসা—সে-প্রথাটা উঠে গিয়েছে। ভাগ্যে Family না থাকলেও ডাক্তার সুসেন গুপ্ত আমার family physician হয়ে আছেন, সঙ্গ ছাড়েন নি। আশ্চৰ্য—এখানেও unity in diversity! এসব এতদিন লক্ষ্যই করিনি,—ধর্ম বরাবরই সঙ্গ নিয়েছেন দেখছি।” ১৪২

কালাচঁাদের চতুর্বর্গ
তামাকটা ধরতেই দেখতে পেলেন—ডাক্তার সুসেন আসছেন।
কি আশ্চৰ্য্য রহস্য! আজ সর্বত্রই পাচ্ছি uuity in diversity,
গন্ধ ছাড়লে কবন্ধকেও টানে! ধর্ম নিশ্চয়ই কাছিয়েছেন। আর
অবহেলা করা নয়।
-“এসস ডাক্তার, বড় সময়েই এসেছ ভাই—এই তােমাকেই
খুজছিলুম।”
ডাঃ। কেননা, আবার কি হলাে ?
কা। সেই প্রাচীন পীলেটা যে—পুলিস লাগিয়েও পালাচ্ছে
ভাই
ডাঃ। পুলিস কোথায় ?
কা। আহা—রােগের পুলিস তত তােমরাই গাে। এখন
পেটের অবস্থা যা—“সাধ’ দিতে হবে নাকি ?
ডাক্তার হাে হাে কোরে হেসে বললেন—“ভয় নেই, ভয় নেই।
সারবার আগে এই রকমই হয়” –
কা। কাকে সারবার আগে হে।
ডাক্তার আবার হাসলেন, বললেন-“দাও হুঁকোটা দাও।
ওতে তােমার ক্ষতি কি হচ্ছে ?
কা। ওরে ভাই, দরকার হয়েছে বলেই এত তাড়া। তা
নয় তাে—এই মাগগি গণ্ডার দিনে কোন মুখখু এমন ভুল করে।
—ভরা-পেট সারাতে-খালি করতে চায়!
—“কিন্তু আমার ভাই একটু বােরবার কাজ এসে পড়েছে,
১৪৩

সন্ধা শৰ ও-মােট নিয়ে তা পারব না।—কিছুতে বল পাচ্ছি না, একটু চাঙ্গা কোবরা দাও ডাক্তার, যাতে ছুটে বেড়াতে পারি—রক্তচাঞ্চল্য আসে, কাজে উত্তেজনা বাড়ে, মন-“কি করি কি করি’ করে। শুয়ে বােসে যে জড়, মেরে যাচ্ছি। তােমাদের শাস্ত্রে এমন কিছু কি নেই ?” ডাক্তার মাথা চুলকে বললেন-“আছে বই কিবহুৎ। থাকবে কেননা, তারাই তাে জ্যান্ত জিনিষলক্ষ্মী,*Bayer”-এর চেয়েও পেয়ারের বস্তু। তবে তুমি বন্ধু মানুষ”- কাঃ। তাই ভােগাচ্ছ বুঝি ? ডাঃ। আরে না না,ওটা সারলে, আর একটা কিছু চেগে উঠে না কষ্ট দেয়,তাই দিচ্ছি না কা। তাই নাকি! বেশ যুক্তি তত! তা হােক,আমি আর দিন খােয়ব না- ডাঃ। বেশ।—আমাদের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা, তুমি বন্ধু তাই- কা। তাই জিরিয়ে রেখেছ ? শশানে তিষ্ঠতির লােভটাও— ডাঃ। না হে না। তবে স্বার্থও একটু ছিল,—এই বােশেখে কন্যা ‘অঞ্জনার বিয়ে কিনা, সেই সময় ওষুধটা ছাড়তুম। যাক তােমার যখন এত তাড়াকালই ওষুধ পাবে, চাঞ্চল্যও আসবে, ছুটোছুটিও চলবে। ডাক্তার চলে গেলেন। কালাচঁাদ অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন-“সুসেনের কথা ১৪৪ কালাচঁাদের চতুর্বর্গ বুঝলুম না-মেয়ের বিয়েতে পীলের দরকার হয় নাকি! যাক- ওরা হাতে রেখে চিকিৎসা করে দেখছি। ওষুধ থাকতে টিপে ছাড়ে,রয়েছে তবুও দেবেনা”- সকাল হতেই ডাক্তারের লােক এসে, কালাচঁাদের হাতে এক তাড়া কাগজ দিলে। তিনি বললেন-“ওষুধ কই?” “আজ্ঞে উরির মধ্যেই আছে” বলে, সে চলে গেল। কালাচঁাদ ভাবলেন-“লিখে দিয়ে থাকবে। খুলে দেখা যাক।” দেখলেন, বিলের একটি বিরাট তাড়া।-মােট পাওনা একশ তেষটি টাকা চোদ্দ আনা ! দেখে—খুড়াের মাথাটা ঘুরে গেলাে, পীলেটা চোমকে চিতল মাছের মত চেত্তা মারলে। তিনি বিল হাতে কোরে চণ্ডীমণ্ডপে দ্রুত পায়চারী আরম্ভ করলেন। রক্ত-চাঞ্চল্য স্থির হতে দিচ্ছে না! খুড়ে ভাবতে ভাবতে ছুটে বেরিয়ে পড়লেন। একেবারে রখ- তলায় মহেশ সামন্তর বাড়ী হাজির।—সামন্ত বাড়ী নেই। -“ইস ডাক্তারের কি ত্যাগ স্বীকার ! কি বন্ধু-প্রতি••এতটা টাকা পাবেন-একবার ইসারাতেও জাতে দেন নি,তাগাদা তাে দূরের কথা। মধ্যবিত্তেরা সেধে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পায়না ভয় করে,-পাছে না পাগল হতে হয়। কোথাও কোথাও বিলবে ছয়টা নয়েও দাড়িয়ে যায়,-অধমর্ণ নাচার! নাঃ সুসেন সে লােক নয়। আহা মেয়ের বিয়েও সামনে! যাক বন্ধু বটে। এখন ১৪৫

সকা শব
উপায় ? কার কাছেই বা এত টাকা মিলতে পারে। ভদ্রলােকে
তাে টাকা রাখেন না,-up to date পােষাক-পরিচ্ছদ রাখেন,
পত্নীর “ঝরণা-সাড়ী” রাখেন, সেখানে ধরণা দেওয়া বৃথা। তাদের
লক্ষ্মী—“উঠনাে’ আর ‘Hand Note,-ময়শা বটে পয়সা
রাখে,-সে আবার বাড়ী নেই! তাইতাে,-তাইতাে,-হা
হয়েছে,জয় মা দুর্গা।
–“মাঝ-গাঁয়ের সাধুচরণ মাইতি—টাকার কুমীর, লেন-দেন
করে শুনেছি। শুনেছিই বা কেননা—দেখেছি। বাড়িতে গামছা
পরে থাকে,-কুবেরও নাকি পরতেন। এখন অনেকেরই সুমতি
হয়েছে-gentlemen-এও পরছেন,rose is rose-গামছা না
বােলে ‘লুঙ্গি’ বলেন, খাটো করতে কতক্ষণ!
“সাধুচরণকে দেখেছি—শেষা-হাটে পয়সায় বারােটা বাচ-পড়
মূলে কেনে। বলে-“মুড়ি দিয়ে তােফা লাগে খুড়ে। শীতকালটা
বাড়িতে আর রাঁধবার কষ্ট দিই না—ওরাও তাে মানুষ ! এই
এক পয়সার মূলাে আর বাড়ির মুড়ি, কে কতাে খাবে খানা-
ভেজালের ভয় নেই। দিব্যি আকার-আঁচে আগুন পােয়ায় আর
মুড়ি ভাজে। শীতের বালাই নেই—না ব্লাউস্ না কাফ! কি সুখ
বলুন দিকি—কারুর মুখ, চাইতে হয় না। মেয়েটার একটা
গ্রামােফোন চাই,না হলে তার দিন কাটে না! বলি,-তাের
কি কান্ নেই,বাড়িতে অমন ‘বাগাফোন্ নিয়ে জীবন কাটালুম,
আর তাের দিন কাটেনা ! শোনবার জিনিষ কি কিনতে হয়,
১৪৬

কালাচঁাদের চতুর্বর্গ আনাচে-কানাচে দিনরাত তার কান্নাকাটি তাে লেগেই রয়েছে, শােনা কতত শুনবি ! পাশেই তাে ঘােষেদের বাড়ী, নিত্য সন্ধ্যেবেলায় মােষবলির চীৎকার ! জেলার লােক জ্বালাতন, আর তাের কানে পৌছয় না! লােকে বধির ভাবলে যে এরপর আমাকে খেসারৎ দিতে অধীর হতে হবে। ও কথা আর মুখে আনিসনি মা! -“যাক্,-এই সব লক্ষ্মীমন্ত লােক আছে বলেই দেশে এখনও দু’পয়সা আছে,যাদের ধরে ভদ্রলােকেরা কন্যাদায় মুক্ত হয়, অবশ্য ভিটের বদলে।” সাধুচরণকে মনে পড়ায় খুড়াে যেন স্বর্গ হাতে পেলেন-“দুর্গা বােলে দ্রুত পা চালালেন। opgestar ate Board-47 Vice, cfare fincas Tea tahle- এর সামনে চেয়ারে বসে Orange পিকো উপভােগ করছিলেন। বাের্ডের বেয়ারা ফুলের তােড়া দিয়ে গেল। রমেশ টাকার তাগাদায় এসেছিল। অপূৰ্ব্ব বাবু বলছিলেন—“নাও চা খাওততা, ও আর কটা টাকা হে, সাতশাে চুরাশি টাকা বইতে নয়,—বাজেটে তার বহুৎ রাস্তা রেখেছি।” রমেশ। না, আর ফেরাবেননা, ফেলে রাখতে পারবনা। মাথার ওপর এতে ঋণ থাকতে, কি বােলে অতত দামী মােটর নিতে গেলেন? ওর অর্ধেক দামে সিভলরেট নিলেই হােত! অপূৰ্ব। (সহাস্যে ) তুমি বােৰােনা রমেশ, respectability ১৪৭ সন্ধ্যা শখ and prestige বজায় রাখতে হয় হে! সেটা আগে-ওটা ভদ্র- ললাকের ভাইটালিটির থামমিটার রমেশ। টাকা না থাকলেও ? অপূর্ব। Certainly,-চোদ্দ আনা ভদ্রলােককে এই করতে হয়—ভদ্র হওয়া সহজ নয় রমেশcraft থাকা চাই.••••• রমেশ। তবে আমি উঠলুম। ওই কথাই কোর্টকে বলবেন। অপূর্ব। বােস বােসস, আর তিনটে মা ভাই- খুড়ােকে দ্রুত যেতে দেখে,-“ছুটে চলেছ যে খুড়, ব্যাপার কি? এসস এসে, তামাকটা খাসা ধরেছে। খাস লক্ষ্ণৌয়েক খুসবু intact••• খুডাের আজ গতিভ হলনা। “আসছি” বলেই পা চালালেন। অপূৰ্ব্ব বাবু অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন- রমেশ বললে-“নিশ্চয়ই কারুর বাড়ী বিপদ আছে-কিম্বা কাঁধ দিতে হবে। তা নয় তত খুড়াে কখনাে সাজা তামাকের অমর্যাদা করেন না। ঐ একটি খাটি লোেক দেখতে পাই,—অন্যের জতেই মলেন- অপূর্ব। কেবল তাই নয়,ছােটা-বড়, জাত-অজাত, নির্বিচারে,—বিপদ শুনলে “না” বলা নেই। কি কলেরা, কি বসন্ত খুড়াের কাছে দ্বিধা নেই। কিন্তু অতটা আবার ১৪ কালাচঁাদের চতুর্বর্গ বাড়ী-বন্ধকের প্রস্তাব শুনে সাধুচরণ খুড়ােকে আর কথাটি কইতে দিলেন, বললে,-“দেবতা, আপনার ঋণ সাত জন্মেও সুধতে কেউ পারবেনা। আঁধার রাতের দুর্যোগে, সেই ঝড় জল বজ্রাঘাতের মধ্যে,যখন শ্যাল কুকুর বেরয়না, আপনি একা,-এক হাতে লাষ্ঠান, আর এক কঁাধে আমার ছিরুকে (সাধুচরণ ঢােক গিললে,—চোখ মুছলে ) কা। ওসব গত কথা আবার তােললা কেন সাধুচরণ- = ভুলে যাও সা। বলেন কি! আমি বাপ, আমি লাঠানটা নিয়েও সঙ্গে যেতে পারিনি। সে আপশােষ মলেও আমার যাবে না; কিন্তু রাত্রে যে দেখতে পাই না, একথা কে বিশ্বাস করবে দাদা ঠাকুর! সে দিনের কথা কি জন্মে ভুলতে পারি- কা। থাক সাধুচরণ। এখন আমার এই উপকারটুকু কোরে দাও—আমি তীর্থ-ভ্রমণে যাবার সঙ্কল্প করেছি ভাই। ব্রাহ্মণের ছেলে কিছুই করা হয় নি। সা। বন্ধক বলছেন? কাঃ। ভাই- সা। এমন কাজটি করবেন না। কবে আছি কবে নেই, ছেলেদের মতিগতি তত জানেন। পরে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ কমবে, আমি তাে আর দেখতে আসব না, শেষ ভিটেটি থােয়াকে। আমাকে আর নরকে ডােবাবেন না। তার চেয়ে, যা দরকার নিয়ে, ১৪৯

সন্ধ্যা শঙ্খ
ওটা আমার নামে বিক্রিনামা লিখে দিন ; ও আপনারই থাকবে।
বাবা আমার ‘সাধুচরণ’ নাম মিছে রাখেন নি। আমার এক
কথা চিরদিনই, যা বলেছি, এখন তিনশাে টাকা নিয়ে যান, বেশী
টাকা থাকলে রাস্তায় বহু বিপদ আছে। এরপর যখন যেমন
দরকার হবে দয়া কোরে জানাবেন। এতে পরের সঙ্গে কারবার
নয়। হ্যা ঠিকানাটি স্পষ্ট কোরে লিখতে ভুলবেন না।ওরে
অটুলা বাক্সটা নিয়ে আয়-
কা। তবে হােলােনা সাধুচরণ, আমি চললুম। বলেছি তােত
-ও ভিটে এক গরীবকে দেব বলে বাক্যদত্ত আছি:..
সা:। (সহাস্যে) বাক্যদত্ত কথার কোনাে অর্থ আছে
নাকি? বরং অক্রুর দত্তের, নিমাদ দত্তের, কুড়েরাম দত্তের,
মধুসূদন দত্তের মানে হয়। যাক্‌-লিপি-দত্ত, রেজেষ্ট্ৰী-দত্ত করা
হয়েছে কি ? ঐ ‘বাগদত্ত' কথাটা বিবাহ ক্ষেত্রে আগে চোলতে
শুনেছি, এখন সেটা বিষ-পাত-ভাঙা কথা—অচল,—বিশ টাকা
কম-বেশতে মানে বেগুড়ায়? ওসব ভুলে যান—ভুলে যান।”
কালাচাদ খুড়ে রাজি নয় বুঝে, অটল বাপকে চোখ টিপলে
—অর্থাৎ “বাঁধা রাখা” মানেই—“ঘরে বাধা।”
পরে—কোর্টে গিয়ে মুসুবিধে, লেখাপড়া, রেজিষ্ট্রী শেষ করতে
বেলা সাড়ে চারটে বেজে গেল। সাধুচরণ তিনশাে টাকা দিয়ে
সাড়ে চার হাজার টাকার সম্পত্তি বন্ধক রাখলে। সুদ একটা
লিখতে হয় তাই সাধুচরণ নিজের ইচ্ছামতই লিখলে-অবশ্য

কালাচঁাদের চতুর্বর্গ খুড়ােকে বুঝিয়ে—“নচেৎ document অসম্পূর্ণ হয়।” বললে- “ঠাকুর সুদের কথা আমার সামনে আপনি আর উত্থাপন করবেন , আমি ওটা সইতে পারব না। আমি সব ভুলতে পারি, কেবল সেই দুর্যোগের রাতটি-ছিরুর সৎকার (দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে)••• খুড়াে সারাদিন মুখে জল দেন নি, কেউ বলেওনি। সাধুচরণকে আশীর্বাদ করতে করতে ধৰ্ম্মস্থান থেকে বেরিয়ে এসে সর্বাগ্রে “নারায়ণ” বােলে আরামের বা নিষ্কৃতির নিশ্বাস ফেললেন। কাপড়টা খসে পড়ছে দেখে কষিটা আঁটতে গিয়ে পেটে হাত পড়ায় দেখেন,-পীলের পাত্তা নেই-কোথায় সরে পড়েছে, তাই কষি ঢিলে মেরেছে! আশ্চর্য হয়ে আপনা-আপনি বললেন- আলবাৎ বিদ্যে বটে, দাওয়াই একেই বলে! খেতে ছুতে হয় ,দেখলেই কাজ,—a miracle! এ ম্যালেরিয়ার দেশে দীর্ঘজীবী হয়ে পীলের প্রলম্বানুর বােনে, বেঁচে থাক’ সুসেন,- গুডবাই।” সারাদিনান্তে আবার নিজের হাতের বানানাে চা আর তামাক খেয়ে খুড়ো, ধাতে এলেন। মৃদুমন্দ ফুরফুরে বাতাস গায়ে শুড়শুড়ি দিয়ে ফুৰ্ত্তি এনে দিলে। মন বললে—“আর কেনাে ;-ধর্ম নিজেই এসে গিয়েছেন—অর্থ এখন টাকে মজুদ-কাম-সিদ্ধি তারি মধ্যে অপেক্ষা করছে-পা বাড়ালেই তীর্থ ভ্রমণ ! ডাক্তার পীলে থেকে

সন্ধ্যা শখ
মােঙ্গ দিয়েছেন, বাড়ির বন্ধনও ঘুচিয়েছিসাধুচরণের গর্তে সে
অগস্ত গমন করেছে,-চতুর্বর্গ পার কোরে পঞ্চমে পরিব্রজার
প্রশস্ত পথে পৌছে দিয়েছে,-ঝঞ্চাট মিটেছে—আর কেননা ।
উঠে পড়লেন
সুসেনের বিল পরিশােধ কোরে এসে, তারপর ক্ষুদ্র একটি
‘বেডিং দু’পানি কম্বল, বাঁশের লাঠি গাছটি আর ঘােট একটি
সুটকেসেটিকে, তামাক, দেশালাই আর হুকো নিয়ে—তুলসী-
তলায় মাথা ঠেকিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
১৫২

দেবদাসের দুগে সব *

No text on this page.

দেবদাসবাবু একজন গুপ্তসাধক কিন্তু বাহ্যিক কর্মীও।
অনেকেই বলেন তিনি মধ্যে মধ্যে দেব-দেবীর সাক্ষাৎ লাভ করেন।
পৌত্তলিকতায় তার প্রগাঢ় বিশ্বাস ও দৃঢ় নিষ্ঠা। তাই তিনি
প্রবল উৎসাহে দুর্গোৎসবের আয়ােজন করেছেন।
প্রতিমাও সুন্দর হয়েছে; চাল চিত্রের দেব-দেবী দৈত্য দানবের
সমাবেশও চমৎকার। তাঁদের যেন জীবন্ত দেখাচ্ছে।
ছিদাম পাল বলিল,-“প্রতিমা প্রস্তুত, ঘামতেলটা আনিয়ে
দিন, লাগিয়ে দিয়ে যাই,
দেবদাসবাবু বলিলেন,-“ছিদাম, তেলটা আমি নিজেই দেব,
তােমাদের আর কিছু করতে হবে না।”
ছিদাম। বাবু ঐটাই শক্ত কাজ, বড় সাবধানে তুলি
চালাতে হয়।
দেবদাস। আমার ও-কাজটায় বিলক্ষণ অভ্যাস আছে ;
তুলিরও দরকার হয় না,দু’হাতেই কাজ চলে।
ছিদাম। দেখবেন বাবু, তয়েরি জিনিস বিগড়ে ফেলবেন না।
দেবদাস। ( সহাস্যে ) তেলে বিগড়ােয় নাহে-তেলে
বিগড়ােয় না,সুধবােয়। শােননি, সমুদ্রে তুফান যখন প্রলয়ের
আকার ধারণ করে, জাহাজ ডােবে ডােবে, তখন সমুদ্রে তেল
ঢালতে পারলেই রক্ষা।

সন্ধ্যা শখ ছিদাম। আজ্ঞে, মাটি ঘেটে খাই, জাহাজের খবর পাব কি করে। তবে এখন চললুম। দেবদাস। এত তাড়া কেন হে- ছিদাম। আজ্ঞে বিশ্বব্যাপী “ধৰ্ম্মঘট”—ঘট যুগিয়ে উঠতে পারছি না, সবাই তাড়া দিচ্ছে। প্রস্থান বাড়ীর যুবা ও প্রৌঢ়েরা সস্ত্রীক ও সপুত্র, কেহ পুরী, কেহ কাশ, কেহ কাশ্মীর যাত্রার জন্য প্রস্তুত। দেবদাসবাবু বলিলেন- “একি, বাড়ীতে পূজা, তােমরা যাও কোথা ? এত বড় উৎসবকে উজ্জ্বল করে তুলবে কে? সকলে মিলে পূজায় যােগ দিলে, তবে দেব-দেবী তুষ্ট হবেন, তবে না মঙ্গল হবে ! সকলে। আমরা আর পূজায় নাই, ওটা দুর্বলের একটা ভূয়াে আশ্রয়। ঐ নিয়ে করঘােড় আর কান্না ভাল লাগে না। অনেক করা হয়েছে, লাভ কেবল পুথির লেখা আশ্বাসের সেই একঘেয়ে বুলি। আমরা এখন দেখে ঠেকে—সােহ হং পথই নিলাম। আবেদন নিবেদনে-ইস্তফা। দেবদাস। দেবতার সঙ্গে বিরােধ! ওসব কথা মুখে আনতে নেই, অপরাধ হয়। সকলে। যাই বলুন, আমরা আর আপনার দেবতার সম্পর্কে নেই। তাতে যদি বিবােধ ভাবেন ত’ সে বিরােধে রক্তারক্তি পাবেন না, সেরেফ, তফাৎ থাকা, কেউ মারে ত’পড়ে মার

দেবদাসের দুর্গোৎসব
খাওয়া! মরার বাড়া ত’ গাল নেই, তাতে বরং ব্রহ্মসাক্ষাৎ
ঘটবে :
সকলের প্রহান
দেবদাসবাবু চিন্তিত হয়ে ভাবতে লাগলেন--একি বুদ্ধি বাপু!
তাইত’, সমর্থরাই যদি গেল ত’ রইল কে ? অন্ধ খুড়াে, বেহেড়,
মামা, রুগ্ন বৃদ্ধ ও দুর্বল পরিজনগুলি! এদের নিয়ে এত বড়
উৎসব ব্যাপার নির্বাহ হবে কি করে ?
(পুরােহিত ও কামারের প্রবেশ )
দেবদাস। আসুন ভট্টচায্যি মশাই, -এস মহেশ,
ভট্টচায্যি। একটা কথা বলতে এলুম,-একজন অন্য পুরােহিত
দেখুন, আমার দ্বারা আর এ পূজা চলবে না। পুথি পড়া মন্ত্র
আর কাজ দেয়না •
দেবদাস। সেকি, বলেন কি,-কারণ।
ভচায্যি। এতদিন যে কি করে আসছি তা ঠিক বুঝতে
পারলুম না। ঠিক করচি কি ভুল করচি তা ঠাওরাতে পাচ্ছিনা।
মুখস্থ মন্ত্র পড়ি, আর লেখা আশ্বাসবাণীগুলাে যজমানদের
কই একটাও ত’ ফলতে দেখলুম না! পূজো-ফুলে
মিছে বলেই মনে হচ্ছে। পাঁচসিকে দক্ষিণে আর ভিজে চাল
শােনাই ।
১৫৭

সন্ধ্যা শঙ্খ ছােলার লােভে, নিজেও মজেছি পাঁচজনকেও মজিয়েছি। ভক্তি যখন টলে গেছে, আর নয়। দেবদাস। সেকি, বয়সে দেবদেবীতে অবিশ্বাস ? দেনেওয়ালা ত তারাই। ভট্টচায্যি। পানেওলা দেখতে পেলে ত’ তাই বিশ্বাস করে শান্তি পেতাম ; কাউকে ত’ কিছু পেতে দেখলাম না। মুদির কাছে মাথা বিকিয়ে নেই এমন তদ্রলােক ত’ দেখতে পাইনা। যা হয় করবেন, আমি আর ওতে নেই। ; প্রস্থান দেবদাস। (চিন্তিতভাবে ) এদের আক্কেল দেখছ, মহেশ দেবতায় অবিশ্বাস ! কাল সকাল সকাল এস, নটার মধ্যে কোপ। মহেশ। আজ্ঞে আমাকেও মাপ করতে হবে, আমি ঘােষ- পাড়ার কণ্ঠী নিয়েছি,“বানানাের” কাজ আর আমার দ্বারা হবেনা। দেবদাস। তােমরা কি দল বাঁধলে নাকি? বেশ-দেশে তাে কুমাণ্ডের অভাব নেই, না হয়, তাই বানিও! মহেশ। আজ্ঞে না, অন্তরগুলাে ত্যাগ করেছি, ওর ফ্যাসাদে ফতুর করে দেছে। চেতলায় কোন্ এক মাগীকে কে বানিয়ে ছিল, বরিজহাটিতে আমায় ধরে টানাটানি। বলে-খাড়া বার কর, কলকেতায় পরীক্ষা করতে পাঠাতে হবে,-মেয়েমানুষের রক্ত ১৫৮

দেবদাসের দুর্গোৎসব
শুষেছে কিনা দেখতে হবে। সে অনেক কথা,—তার পরই এই
কণ্ঠী কোম।
প্রস্থান
দেবদাসবাবু বড়ই বিপদে পড়লেন। প্রাতেই সপ্তমী ! এমন
সময়, গােপাল মালী আসিয়া বলিল,-“ফুল দিতে পারবনা, অন্য
উপায় দেখুন বাবু।
দেবদাস। কেন হে গােপাল ?
গােপাল। আজ্ঞে কারা সব অসেছেন, হাওড়া থেকে ইটিলি
পর্যন্ত রাস্তায় ফুল বিচুতে হবে, গাড়ীর উপর বেদম মালা আর
তােড়া বিষ্টি হবে; ১২৭ মণ ফুলের দরকার, ফুলকপি পর্যন্ত টান
ধরেছে-
দেবদাস। দেবতায় ফুল পাবে না ?
গােপাল। পণ্ডিতেরা বলছেন—তাদের ত’ চিরদিন ফুল
যােগান হয়েছে, অনেক ফুলই পেয়েছেন, কিন্তু কোন কাজই হয়নি,
তারা কেবল নিতে জানেন, দেবার কেউ
ময়রা আসিয়াও ঐ রায়ে রায় দিল। সে বলিল-“অনেক
ভোগ বানিয়েছি-সীতাভােগ থেকে নবাব ভােগ,-শেষে কিনা
আমাদের ভাগ্যেই কেবল কর্মভােগ-অনাহার! শিন্নিও খাবেন
ভরাও ডােবাবেন, এমন দেবতায় দূরে থেকে নমস্কার -
উভয়ের প্রস্থান
নন।

সন্ধ্যা শখ
বাজরে আসিয়া বলিল,-“বাবু এগারটাকা মণ চাল।
পেটের জ্বালায় সব বােলই ভুলিয়ে দিয়েছে-কেবল বিসর্জনের
বােটাই মনে আছে, বলেন ত’ সুরু করি-
দেবদাস। চুপ চুপ, ওরকম অবক্ষণের কথা মুখে আনতে
নেই;—আজ সবে ষষ্ঠী।
বাজর। যে দেবতা দশ হাতে কেবল নেয়, এক হাতেও
দিতে দেখলুম না, তার আর খেজমৎ কেন!
দেবদাস। দেবতা মানবেনা ত’ মানবে কাকে ?
বাজর। নিজেকে, নিজের হাত-পাকে।
দেবদাস। তােদর এ কুবুদ্ধি দিলে কে?
বাজর। পেট আর দেবতার ব্যাভার। আপনি কেনেন ত’
ঢােল ঢাক বেচি, আপনার ত’ চাই? এখন নিজের ঢােল নিজেই
তাে সব বাজাচ্ছেন! (একটু অপেক্ষা করিয়া )—তবে চলুন।
প্রস্থান
।
মাতুল নিমন্ত্রণ করিতে গিয়াছিলেন, ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন -
“দেবদাস, চেপে যাও, আর কেলেঙ্কারী বাড়িও না।-একজনও
নিমন্ত্রণ নিলেনা।
দেবদাস। কি? এই কষ্টের দিনেও কেউ নিমন্ত্রণ নিলেনা?
বেশ,-কাঙালী খাওয়াব।
মাতুল। তারাও না।
১৬০

দেবদাসের দুর্গোৎসব
দেবদাস। কি রকম?
মাতুল। সবারই এক কথা,-“একদিন দেবতার প্রসাদ
পেয়ে ত আর দুক্ষু ঘুচবে না, সব রকমে ত মরেছি,মরতে
দাও। দয়া করে একদিন ঘটা দেখিয়ে, ছেড়া-নাড়ীতে গেরাে
দিয়ে দণ্ঠে মারার ইচ্ছে কেন? দোতায় নমস্কার,-
দেবদাস। তাইত, দেশটা হঠাৎ এমন নাস্তিক হয়ে দাড়াল
কি করে ?
মাতুল। তারা বলছে—দেবতার দয়ার দাপটে
দেবদাস। পুরাণাদি কেউ পড়বে নাত’; হাজার হাজার
বছরের সাধনায় দেবতারা তুষ্ট হতেন।
মাতুল। সাধকদেরও তখন মার্কণ্ডের প্রমাই ছিল, এক একটি
‘মালং মুগুরং' ছিলেন। এখন যে অনুগত প্রমাই!--অন্নই নাই !
দেবদাস। তা বলে আমি ত’ নাস্তিক হতে পারিনা।
মাতুল। রামঃ তুমি তা পারবে কেন,—হ’তে যাবেই বা
কেননা। তােমার কিসের দুক্ষু ! দেবতার কৃপায় তােমার ত’
কি ঘরের কি বাইরের, অন্নবস্ত্রের চিন্তা নেই।
দেবদাস। এখন উপায় কি! এত বড় আনন্দ উৎসবে
কেউ যােগ না দিলে যে পূজাই পণ্ড হয়ে যাবে!—যাই একবার
সাধন-মন্দিরে হত্যা নিয়ে দেখি।
মাতুল। ভক্তের কথাই ত’ এই। ঘাবড়ে না বাপ।
দেবদাসের প্রস্থান।
১৬১

মাতুল। (দেবদাসকে ফিরিতে দেখিয়া) কি বাবা,
মা ত ?
দেবদাস। (সােৎসাহে) বলং বলং দৈব বল, তারা নিজেরাই
সব ভার নিয়েছেন। কি দয়া ! লােকে আবার দেবতা মানতে
চায় না! দেখে সব তাক লেগে যাবে। এর পর পস্তাবে। এখন
জোরসে লেগে যাও মামা, দেবতাদের উপযুক্ত আয়ােজন চাই’
(কাণে কাণে উপদেশ)
মাতুল। ধন্য কৃপা! যাও রাত হয়েছে, লম্বা হয়ে শুয়ে
পড়গে বাবা।
উভয়ের প্রস্থান।
সপ্তমী প্রভাত হতেই নাস্তিকেরা দেখে,-দেবতারা চালচিত্তির
থেকে ঝুপঝাপ নেবে, কাজে লেগে যাচ্ছেন। গন্ধর্বেরা বাজনা
শুরু করে দিয়েছে। শাস্ত্রী বৃহস্পতি পূজায় বসেছেন। নন্দনকাননের
ফুল,-পবন এনে হাজির করেছেন। খাবার জিনিস জনার্দনের
জিম্মায়। দেবতার খাদ্যে মাছি না বসে, বা নিকৃষ্ট নরের নজর
১৬২

দেবদাসের দুর্গোৎসক পড়ে, তাই খুব চাপাচাপি ঢাকাঢ়াকির মধ্যে রাখা হয়েছে। ইন্দ্রের অচার্ড থেকে রম্ভা বাতাবি নেবু প্রভৃতি এসে পড়েছে। হাড়কাঠের কাছে নধর নধর চনপুষ্ট ছাগ ভেড়া ও মহিষের দল কাপতে কাপতে স্বর্গস্থ হবার অপেক্ষা করছে। দেবতাদের মধ্যে যারা খাঁটি বীরাচারী, তাঁরা সেগুলি গর্ভস্থ করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে বলিদানের তাড়া দিচ্ছেন। নন্দী, খাড়া হাতে সিদুরের সুদীর্ঘ ফোটা কেটে প্রস্তুত। অমৃত বণ্টনের ভার স্বয়ং দেবরাজ নিয়েছেন। ভিড়টা তার কাছেই অধিক। আলাের ভার চন্দ্রদেব, মঘা অশ্লেষা আর সৌদামিনী নিয়েছেন। দেবদাসবাবু করযােড়ে সকলকে অভ্যর্থনা করছেন। বেহেড়, মাতুল এক চুমুক অমৃত খেয়ে একটা খুটি ঠেস দিয়ে পড়েছিলেন। বলিদানের সময় খুটি ছেড়ে দেওয়া বিধি, তাই হঠাৎ কে ধাক্কা মারায়, মাতুল বেজায় চম্‌কে উঠে বললেন—“কি বাবা, একি দেব হস্তের পাতুরে গুততা! হাহ্ আস্তিক হয়, কিন্তু ওর সেকেণ্ড এডিস ছাড়লেই নাস্তিক হব বাবা। পা বাড়িয়েছি কি সবাই শাঁখ বাজিয়ে লুফে নেবে।”

সন্ধ্যা শঙ্খ চাইতে হয়, তাই দশ হাতে দশদিক সামলাই। তবে, ভারত আমার বড় মেয়ে, তার পূজা আর তার অন্নই আমি বেশী খাই— বেশী গ্রহণ করি, আর বেশী ভালবাসি। তার উপর আমার পূরে জোর চলে। তার ভক্তি, নিষ্ঠা, পূজা চিরদিন পেয়েছি, সেটা ছাড়তে পারি না। আজ নাস্তিক হব বল্লে ছাড়ে কে? দেবদাস, তুমি তাদের বুঝিয়ে দিও, ওসব দুৰ্ব্বদ্ধিতে মঙ্গল হয়না। বড় হবি ত’ ছােট হ’, এইটে তুমি তাদের উঠেপড়ে বােঝাও। বড় মেয়ে আমার কোনাে দিনই মাথা তুলতে জানেনা—চায়না। দিতেই তার আনন্দ, ত্যাগই তার ধর্ম...সেই চরম পন্থাটি সে যেন ত্যাগ না করে,বাঢ়— বিষ্ণু। শােন দেবদাস, তােমার ব্যবহারে আমরা বড়ই প্রসন্ন হয়েছি; ঠাকুর দেবতায় এইরূপ অচলা ভক্তি রাখলেই তােমাদের মঙ্গল আর মুক্তি হবে তােমাদের বাসনা পূর্ণ হবে। এ কাজ ব্যস্ত হবার নয়, অধ্যবসায় চাই। সাধনার পক্ষে পাঁচ সাতশ” বছর কিছুই নয়, সেটা পাঁচ সাত দিনের মত জানবে। তারপর বিজয়ার কোলাকুলির তরে, দেবদাস বাবু দেবতাদের প্রণামান্তে উঠে, হাত বাড়িয়ে যাওয়ায় তারা বিশ হাত তফাতে সরে গিয়ে—আশীৰ্বাদ করলেন। দেবদাস থতমত খেয়ে গেলেন। দ্রব্য সামগ্রী প্রচুর বেঁচেছিল। দেবতারা বেছে বেছে উত্তরীয় পূর্ণ করে পিঠে বাঁধলেন, আর নন্দীকে হুকুম করলেন,-“যা রইল সব কৈলাসে নিয়ে যাও,—কেবল হাড়কাঠটি বাদে। ওটা দেবদাসের দেবদাসের দুর্গোৎসব জিম্মায় থাকবেপরে কাজ দেবে। আর দেখ, যাবার সময় দেব- দাসকে কিঞ্চিৎ এই প্ৰসাদ ( বুঝলে কি না) দিয়ে যেও।” গণেশ। (চুপি চুপি) সেটা কি ভাল হয়। বিষ্ণু। (কাণে কাণে ) বাবাজি, আহারটা একটু কমাও, তার চাপে বুদ্ধিটা চেপটে গেছে দেখছি। ইংরিজি পড়ে ওদের কি আর সত্যিকার শ্রদ্ধাভক্তি আছে ? আমাদের তুষ্ট রাখতে কখন বা ওরা পূজো দেয়, তেমনি ওদের তুষ্ট রাখতে কখন বা আমরা দুটো কথা শুনি, বাস। ভাষায় ভুল কোরােনা তার পর সকলে প্রস্থান করলেন, -মুর্তি বদলে। সকলে দেখলে, যেন একপাল “গেছে পেঁড়ি” চলেছে,—পিঠে প্রকাণ্ড মােট আর চক্ষুর বদলে সামনে দুটি শুড়! এই পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞাসা করায়, নন্দী বললে—“দেবতার মায়া, তাঁরা চিরদিনই ওই বেশে কাজ করে আসছেন। চক্ষুলজ্জা এড়াবার জন্যে চোখের বদলে ঐ গুড় (ফিলা) বার করেচেন—ওর সাহায্য বহু বাধা বিঘ্নও এড়ান যায়। কোথাও ঠেকলেই পথ বদলান।” কথা কইতে কইতে নন্দী বেবাক ঝেটিয়ে দুটি প্রকাণ্ড মােট বেঁধে ফেলে। এমন খুটে চালগুলি নেওয়া হ’ল যে, একটু পরে গণেশের ইদুরটি দেড়শ ঘুরপাক খেয়েও একটি কণার সাক্ষাৎ পায়নি। ১৬৭

সন্ধ্যা শখ,
পরে বত্রিশ নাড়ী আর সহস্র শিরায় টান দিয়ে নদী যখন
বাক কঁাধে করবার চেষ্টা করলে,—শিবহুল গলাটা ফুলে যেন
বটের শেকড়-ঘেরা খেজুর গাছ হয়ে দাড়াল! আর তার সেই
শ্রীমূর্তি—দন্ত বিকাশে ও কপােল ও ওষ্ঠাধর কুঞ্চনে এমন বিকট ও
বিদঘুটে হয়ে উঠল যে, অর্থশায়িত মাতুল হঠাৎ দেখতে পেয়ে,
“ওরে বাবারে, এ আবার কোন্ জানােয়ার বলে চীৎকার করে
লাফিয়ে উঠলেন, আর দেবদাসের ওপর বেজায় চটে বল্লেন--“যত,
বেল্লিকের রেণ্ডেভো!—এই চেহারা দেবতার হয়? তা হলে স্বর্গে
কোন্ শা—যাবে ! উঃ-মুখ তুলে না চাইতেই অমন ঘােরালাে
নেশাটা একদম ফ্যাকাশে মেরে গেল!”
দেবদাস মাতুলকে ঠাণ্ডা করলেন—“ওদের চটাতে নেই মামা
ওঁরা শিবের বড়।”—নীর হাত ধরে অনেক অনুনয় বিনয়ে
বেহেড়, মাতুলকৃত অপরাধের ক্ষমা চাইলেন।
নন্দী যায়, এমন সময় প্রসাদের প্রসঙ্গ ওঠাতে “হাঁ হাঁ—এই
নাও” বলে নন্দী এক ছড়া বা দেবদাসের হাতে দিয়ে, দুর্গা বল্লেন।
সা নন্দিশৰ্মা
প্রবাস জ্যোতি পত্রিকা-কার্তিক ১৬৭

No text on this page.

No text on this page.

Sandhya Sankha

Author
Bandyopadhyay, Kedarnath
Title
Sandhya Sankha
File name
Sandhya Sankha
Text
OCR done
Citation
1940
Published
2009/08/27
Publisher
Gurudas Chottopadhaya And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
179
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Sandhya Sankha-Short stories
DLI number
513216
Barcode
4990010020215.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
p6N3o7dkxl8
Download PDF

Sandhya Sankha